Bally Sadharan Granthagar

Nandini

Mukhopadhyay, Sri Sailajanand · 2009/08/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নন্দিনী
শৈলজানন্দ মুখােপাধ্য
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
১০ ৩১১, কর্ণওয়ালিস ইট, কলিকা

No text on this page.

নন্দিনী

প্র"
হদি চট্টোপাধ্যায়
গুরুদাসচট্টোপাধ্যায়
২০১৯ নওয়ালিটি
কবিত
দাম-দেড় টাকা
হেমন্ত, ১৩৩৮
প্রিন্টার—শীকরুণাময় আচার্য্য
রামকুমার মেশিন প্রেস
১৬৩, মুক্তারাম বাবু ষ্ট্রীট, কলিকতা

মাকে দিলাম সংশকে

No text on this page.

নন্দিনী
মেয়ের আদর দেখিলে গা জ্বালা করে। ঝি-চাকরেরাও
আড়ালে-আবডালে নাক সিটকায়। বলে :
দু’দিন বাদে যে পরের বাড়ী চলে যাবে তার
আবার অত কেন ?
কিন্তু মায়ের মন,—একটিমাত্র মেয়ে, মানা মানে
। ছেলেটি ছােট। বলে, ‘ছেলে ত’ চিরকালের
বাছা, আদর-যত্ন মেয়েকেই করতে হয়।
মেয়র তখন আর মাটিতে
পা পড়ে না।
সােহগে-আহলাদে যেন থইথই করে।
রং ফর সা। চেহারা মন্দ নয়। গয়নাগাঁটিতে গা
একেবারে বােঝাই। বয়স তেরাের চেয়ে রং কিছু

নন্দিনী বেশি, কিন্তু দেখিলে মনে হয়—যােলাে-সতেরাের কাছাকাছি। • মেয়ে নাকে এখনও নােলাে পরে। মা বলে, ‘উঠে গেচে কি লা? উঠে আবার যায় নাকি কিছু। কই, দ্যাখ, ত’ মা সুখদা! বলিয়া চাকরাণীকে তাহার কাছে ডাকিয়া দেখায়। মেয়ের মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া বলে, “দ্যাখ, ত’ মা, কেমন মানিয়েছে! ঘাড় নাড়িয়া সুখদা বলে, ‘বেশ। মেয়ে এ-বেলার কাপড় ও-বেলায় আর পরে না। এ-বেলার গহনা ও-বেলায় অচল। সৌদামিনী বলে, ‘মেয়ে আমার রাজরাণী হবে। তা এমন বিচিত্র কিছু নয়। সৌদামিনী জমিদার- গৃহিণী। রাজরাণী হয়ত সে হইতেও পারে। কিন্তু সঙ্কল্প মানুষের, সিদ্ধি বিধাতার রাজরাণী সে হয় নাই। ২ নন্দিনী এখন সৌদামিনী বলে, “ইচ্ছে করেই মল্লিকাকে আমি অমনি ঘরে দিলাম বাছা ! না দিলে আমার যখন- খুশী দেখতে পেতাম না যে। লােকে ভাবে, হয়ত তাই। সৌদামিনী আবার তাহাকে কাছে ডাকিযা ভাল করিয়া বুঝাইয়া দেয় ; বলে, ‘অমন কুলীন আর এদেশে কোথাও নেই। তাহাও হয়ত সত্য হইতে পারে। কিন্তু গরীবের ঘরে বিবাহ দিয়াও মেয়েকে যখন- খুশী দেখিতে পাওয়া বড় শক্ত। আমের সময় আম, কাঁঠালের সময় কাঁঠাল, লিচু লেবু, তরি-তরকারি, কাপড়-জামা, যখনকার যাতত্ত্ব করিয়া মল্লিকার কাছে লোক পাঠানাে হয়। জামাইকে আসিবার জন্য অনুরােধের আর অন্ত থাকে না। জামাইএর বাড়ীতে মাত্র বুড়া ঠাকুরদাদা আর এক মেয়ে- বিধবা পিসি। তত্ত্ব লইয়া মেয়ে জামাইকে যে আনিতে যায়, বুড়া তাহাকে কাছে ডাকিয়া বসায় ; বসাইয়া বলে, “বসেছ ?

নন্দিনী
সাড়া পাইলে পর, হাত বাড়াইয়া বুড়া হাতড়াইয়া
হাতড়াইয়া তাহার গায়ে-মাথায় হাত বুলাইতে
বুলাইতে বলে, ‘চোখে আমি ভালাে দেখতে পাইনে
বাবা। দিদিমণিকে তুমি আমার নিয়ে যেতে চাও।
কেমন ?
‘হা কত্তা, দিন একবার পাঠিয়ে। ওদিকে মা
নইলে কেঁদে কেঁদে সারা হলাে।
হো হাে করিয়া হাসিয়া বৃদ্ধ তাহাকে চুপ করাইয়া
দেয়। বলে, আমরা বুঝি কঁদব না? আমরা কঁদতে
জানিনে , না? বৌমা চলে গেলে আমাদেরও ঘর যে
-অন্ধকার বাবা ! যাক, ও-সব স্নেহ-মমতার কথা তুমি
বুঝবে না। তুমি ছেলেমানুষ।
লােকটি বলে, তাহলে মাকে গিয়ে আমি কি বলব
বলুন ? এই নিয়ে ত’ অনেকবার হলাে।
বৃদ্ধ কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলে,
‘অনেকবার হলাে ; না ?
বলিয়াই মৃদু একটুখানি হাসিয়া বলে, “আচ্ছা
ডাকো আমার বৌদিদিমণিকে ডাকো এইখানে।

নন্দিনী
অবরে দাড়াইয়া মল্লিকা বােধকরি সবই শুনিতে-
ছিল, তৎক্ষণাৎ কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল :
‘ডাকছেন আমায় ?
ঘাড় নাড়িয়া বৃদ্ধ বলিল, হ্যা দিদি; ডাকছি।
আচ্ছা, সেই যে, যে-কথাটা তােমার মাকে তুমি বলবে
বলেছিলে এই নিয়ে ক’বার বলা হলো ?
সে যে এ-প্রশ্ন করিবে তাহা সে ভাবে নাই। চুপ
করিয়া হেঁট মুখে দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া, মল্লিকা তাহার
পায়ের নখ দিয়া মাঢ়ি খুড়িতে লাগিল।
বৃদ্ধ বলিল, লজ্জা কিসের ? বল!
ভয়ে-ভয়ে অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে মল্লিকা কহিল, ‘চার,
বৃদ্ধ আবার ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “না, তুমি ভুল
বললে দিদি ! আমার ঠিক মনে আছে। চিঠি লিখে
জানিয়েছ, দু’বার,, আর ললাকের মুখে বলে’ পাঠানো
হয়েছে চরে বার। এই নিয়ে ছ’বার হ’লল। এই
বলিয়া একটুখানি থামিয়া বৃদ্ধ বলিল, “আর তােমায়
নিতে এসে ফিরে গেছে ক’বার ?

নন্দিনী
মল্লিকা বলিল, ‘তিনবার।
বৃদ্ধের দন্তহীন মুখে আবার হাসি ফুটিল। সম্মুখে
উপবিষ্ট ব্যক্তিটিকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, ‘হ’লল ত’ ?
শুনলে ত বাবা ? সুতরাং এবারও তুমি বল গিয়ে যে,
ওরে ক্ষ্যাপা মেয়ে, সংসার করতে হলে সব জিনিস ভুলে
গেলে চলে না। মেয়ে যদি আব্দার করে কিছু চেয়েই
বসে ত’ সেটা তাকে দিতে হয়। দিলে রাগ
করে। মেয়ে যাবে কেন ? কিছুতেই যাবে না।
আরও কি যেন সে বলিতে যাইতেছিল, মল্লিকার
বাপের বাড়ীর লােকটি জিজ্ঞাসা করিল :
‘কি চেয়েছিস্ রে মল্লিকা ?
মল্লিকা বলিল, ‘এক হাজার টাকা নায়েব-মশাই।
আপনি বাবাকে বলবেন।'
শেষের কথাটা এনিভবে মল্লিকার গলায়
আটকাইয়া গেল যে, সেখানে দাঁড়াইয়া থাকা তাহার
পক্ষে আর সম্ভব হইল না, চোখে কাপড় চাপা দিয়া
তৎক্ষণাৎ সে সেখান হইতে একরকম ছুটিয়াই পলায়ন
করিল।

নন্দিনী
বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, ‘এষ্টেটের নায়েব
আপনি ?
ও হাে হে, তাহলে ত’ আপনার উপযুক্ত
সম্মান আমি করতে পারলাম না দেখছি! তা—তা
আপনি যেন আমার অপরাধ•••আমি বুড়াে মানুষ, তার
ওপর দেখতেই ত’ পাচ্ছেন•••আচ্ছা, দিদিমণি, টাকাটা
তুমি কি-জন্যে চেয়েছিলে তাও ত’ ওঁকে শুনিয়ে দিতে
নায়েব বলিল, মল্লিকা চলে গেছে।
বৃদ্ধ বলিল, “দেখলেন ? মা-বাপের ওপর কি-রকম
রেগেছে দেখলেন ? ছি-ছি, টাকাটা এতদিন ওঁদের
পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।
ব্যাপারটা শুনবেন তবে ?
শুনুন। শােনা আপনার উচিত।কথায়-কথায় সেদিন
মাছের কথা উঠলাে। বললাম, আমার ত’ দিদি পুকু
নেই, মাছ হয়ত তােমায় আমি সবদিন খেতে দিতে পারব
। এই না শুনে’ দিদিমণি আমার বলে উঠলো পুকুর
আমি কিনব। তারপর আমি আর কোনও খবর
রাখিনি। ভেতরে ভেতরে বৌমা যে এত কাণ্ড করেছেন
তাও জানতাম না। হঠাৎ একদিন শুনি, রায়দের

নন্দিনী
পুকুরট, নাকি দিদিমণি কেনবার সব ঠিকঠাক করে
ফেলেছেন। দাম পৰ্য্যন্ত স্থির হয়ে গেছে—হাজার
টাকা। দিদিমণি বলে, আমার গয়না বিক্রি করে পুকুর
কিনু। জমিদারের মেয়ে কিনা, বিষয়-সম্পত্তির মৰ্যাদা
ঠিক বােঝে। বললাম, রাম, গয়না কি আর বিক্রি
করতে আছে দিদি ? লােকে বলবে কি ? তার চেয়ে কথা
যখন ওদের দিয়েছ দিদি, টাকা তােমার মা-র কাছে চেয়ে
পাঠাও। এক হাজার টাকা তৎক্ষণাৎ তিনি পাঠিয়ে
দেবেন। কিন্তু চাওয়া ত’ এই নিয়ে হলাে ছ’বার।'
এই পৰ্যন্ত বলিয়াই বৃদ্ধ খানি, থামিয়া আবার
বলিতে লাগিল, মনে ওর বড় আঘাত লেগেছে,
বুঝলেন ? রায়েরাও বারবার তাগাদা দিচ্ছে, দিদিও
‘আমার লজ্জায় তাদের মুখ দেখাতে পারে না। তাই
ও মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেছে—টাকা যতদিন না পাঠাকে
বাপের বাড়ী ততদিন ও যাবে না। আমি অনেক করে’
বুঝিয়ে দেখেছি নায়েব-মশাই, কিন্তু......
বলিয়া বৃদ্ধ তাহার মাথাটি বার-কত নাড়িয়া
বলিল, “কিছুতেই না। হাজার হাে, বনেদি ঘরের

নন্দিনী
মেয়ে ত! আর-কিছু না থাক্‌, আত্মসম্মান জ্ঞানটুকু ওর
পুরাে মাত্রায় আছে।
নায়েব উঠিয়া দাড়াইল। বলিল, ‘তাহ'লে আসি
আমি।' বলিয়াই হাত বাড়াইয়া বৃদ্ধের দু'টি পায়ে
হাত দিয়া সেই হাতটি সে আবার তার মাথায়
ঠেকাইল।
বৃদ্ধ বলিল, “মঙ্গল হােক ••কই, দিদিমণি কি
তামার চলে গেছে ?
নায়েব বলিল, “হ্যা।
বৃদ্ধ তখন অপেক্ষাকৃত নীচু গলায় বলিতে লাগিল,
‘দিদিটি আমার ভারি চাপা, মুখ ফুটে সহজে কোনও
কথাই বলতে চায় না। আমি বলি কি, তা যদি তুমি
নিজের নামে বলতে লজ্জা কর দিদি, টাকা তুমি আমার
নাম করেই চেয়াে। জামি বুড়ােমানুষ, দু'দিন বাদে
মরে যাব ; আমার আর কি বাবা, ওদের জন্যেই
সব।•••যাও তাহলে, যাবার সময় একবার দেখা করে
যাও দিদিমণির সঙ্গে।
মল্লিকার সঙ্গে নায়েব দেখা করিতে গেল।

নন্দিনী
সদর দরজাটা বন্ধ না করিলে বৃদ্ধ রসিকলের
ঘুম হয় না।
অথচ স্বামী ঘরে না ফিরিলে দরজা বন্ধ করিতে
মল্লিকার একটুখানি বাধে।
কিন্তু রসিকলাল ছাড়িবার পাত্র নয়। বারেবারে
দরজা বন্ধ করিতে বলিয়া বলিয়া যখন হায়রাণ হইয়া
ওঠে, তখন সে চেঁচাইতে শুরু করে। বলে, “কই গাে,
মা-লক্ষীরা, কথা কি আমার শুনবে না ? নাত-বৌ
বন্ধ করতে না পারে, কামিনী কি করছিস্ ?
কামিনী তাহার বিধবা মেয়ে। কোথায় কোন
তীর্থে গিয়া মাথার চুলগুলা কাটিয়া দিয়াছে, কম-বয়সেই
সঁত ভাঙ্গিয়াছে, রােগে শােকে জরাজীর্ণ হইয়া দিবারাত্রি
একরকম চুপ করিয়া বসিয়াই থাকে । এবং তাহার
এই চুপ করিয়া বসিয়া থাকার কথাটা কেহ উল্লেখ
করিলেই তাহাকে সে বাক্যবাণে একেবারে জৰ্জরিত
করিয়া ফেলে। বাপ তাহার একে বুড়া, তায় অন্ধ ;
বারেবারে কথার যন্ত্রণা দেওয়া তাহাকে উচিত নয়,
অথচ কথা না বলিয়াও সে থাকিতে পারে না। অতি

নন্দিনী
কষ্টে উঠিয়া গিয়া দরজাটা সে সশব্দে বন্ধ করিয়া দিয়া
আসিয়াই বাপের একখানা হাত ধরিয়া চড় চড় করিয়া
তাহাকে সজোরে টানিয়া তুলিতে তুলিতে বলে, ওঠো,
চল, শােবে চল।
রসিকলাল বলে, “থাম্। অত জোরে জোরে
টানিনে। হাতটা যে গেল।
কামিনী বলে, যাক্। কথা শুনলে গা জ্বালা
করে ! মা-লক্ষী যাকে বলছ, তাকেই বল, আমাকে
কেন ?
রসিকলাল উঠিয়া দাঁড়ায়।
বলে, ‘তা বই-কি ।
এত রাত পর্যন্ত দরজায় খিল্ দিবিনে, শেষে কোনদিন
চুরি-ডাকাতি হয়ে যাক্।
কামিনী বলে, ‘যায় তবে, যার যাবে তার যাবে,
আমার কি ! তােমার টাকাকড়ি থাকলেও যা আমার
থাকলেও তাই। বাবা রে বাবা, হে ভগবান, মেয়ে,
হয়ে যেন কেউ না জন্মায়।
কামিনীর চিরকাল ওই এক নালিশ!—ছেলে
হইলে সে বিষয় সম্পত্তির ভাগ পাইত, মেয়ে হইয়া

নন্দিনী
জন্মিয়াছে বলিয়া বাপের বিষয়ে তাহার আর কোনও
অধিকার নাই!
রসিকলালেরও সেই এক কথা! চুপি-চুপি বলে,
“থাম্পাগল থাম্ । তাের আমি সব ব্যবস্থাই করে
দিয়ে যাব।
কামিনী বিশ্বাস করে না। বলে, 'সে আমি জানি।
বলিয়াই এদিক-ওদিক তাকাইয়া কমিনী অত্যন্ত
ধারকণ্ঠে বলিতে থাকে, দরজা বন্ধ করতে যে বলছ,
কিন্তু তােমার সে নাতিটি যে এখনও•••
কথাটা তাহাকে শেষ করিতে হয় না, রসিকলাল
চেঁচাইয়া ওঠে, ‘আসেনি ? না ? শালাকে আমি হাজার
দিন বারণ করি, বলি, যাত্রা-থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকলে
ত’ আর দিন চলবে না, তার চেয়ে বরং জমি-জায়গাগুলো
দ্যাখ. রায়েদের পুকুরটা যাতে••বৌটা রয়েছে নাকি
এখানে ?
কামিনী তাহার বাবার হাতে একটা চিমটি কাটিয়া
দিয়া বলে, ‘হা, চুপ কর।—এই যে, এইদিকে এসাে,
চৌকাঠটা ডিঙিয়ে—
2
১২

নন্দিনী
।
বাবাকে ঘরে শােয়াইয়া দিয়া কামিনীও সুমাইয়া
পড়ে।
নিস্তব্ধ গ্রাম। কোথাও কাহারও সাড়াশব্দ নাই।
মল্লিক শুধু একলা ঘরে জাগিয়া বসিয়া আছে।
স্বামী তাহার কখন আসিবে কে জানে।
সহসা ধুপ করিয়া একটা শব্দ হইতেই মল্লিকা
উঠিয়া বসিল। দরজা তাহার খােলাই ছিল। জুতা-
জোড়াটা হাতে লইয়া যোগীন ঘরে ঢুকিয়া চাপা-হাসিতে
মুখখানা উজ্জ্বল করিয়া বলিল, ‘চুপ ! আজও তেমনি
পাঁচিল টপকে এসেছি।
বৃদ্ধ রসিক লালের ঘর হইতে চীৎকার শোনা
গেল, ও কিসের শব্দ র্যা।
ভাদ্র মাস। বাড়ীর কাছাকাছি এদিকে-ওদিকে
কয়েকটা তালের গাছ আছে। সময় অসময় অমনি
ধূপধাপ, করিয়া তাল
পড়ার
শােনা
যায় । মল্লিকা বলিয়া দিল, কোথায় যেন ল
পড়লো।
রসিকলাল জিজ্ঞাসা করিল, ‘যােগীন এসেছে?

নন্দিনী
ল্লিকা একবার তাহার স্বামীর মুখের পানে
তাকাইয়া বলিল, “হ্যা।
‘দরজা কে খুলে দিলে ?
মল্লিকা বলিল, “আমি।'
‘কই, শব্দ পেলাম না যে ?
মল্লিক্লা চুপ করিয়া রহিল। দাত কিসমিস্ করিয়া
যােগীন বলিল, ‘শা-লা।'
মল্লিকার হাসি যেন আর ধরে না ! হাসিতে
হাসিতে জল গড়াইয়া আসন পাতিয়া খাবার ঢাকা খুলিয়া
দিয়া বলিল, ‘এসস।
যােগীন খাইতে বসিল। মল্লিকা পাখা লইয়া
তাহাকে বাতাস করিতে লাগিল।
যােগীন জিজ্ঞাসা করিল, ‘তােমার বাপের বাড়ীর
সেই নায়েব না কে—চলে গেছে?
মল্লিকা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “হ্যা। ।
‘বুড়ো টাকার কথা বলেনি ?
‘বলেছিল।
যােগীন বলিল, “আচ্ছা দ্যাখাে ত বুলাের আঙ্কেল,
১৪

নন্দিনী
বলে কিনা পুকুর কিনে মাছের চাষ করার মত লাভ
নেই। ধেৎতেরি, তার হাঙ্গামা কত ! এত টুকু-টুকু
পােনা, রােদ নেই, বৃষ্টি নেই, চোর-ডাকাতের হাত
থেকে অগ লাও, কেউ ছিপ ফেললে কি না দেখে
এসাে, তারপর বড় হবে পঁচিশ বচ্ছর পরে। ততদিন
কে মরবে কে বাঁচবে তার ঠিক নেই। বল ঠিক,
কিনা ?
মল্লিকা ঈষৎ হাসিল।
দু’এক গ্রাস খাইয়া যােগীন আবার বলিতে লাগিল,
‘তার চেয়ে ওই এক হাজার টাকা দাও আমার হাতে,
মাসে হাজার টাকা না কামাতে পারি ত’ কী! পাঁচশ’,
টাকা ত’ ফেলে-ছড়িয়ে ! কলকাতার সেই নির্মুলা
অপেরা পার্টির লাভ কত জানাে? বাপরে বাপ!
ভাবলে গালে হাত দিতে হয়।•••আমাদের ধরাে সুবিধে
কত ! মেম্ এ্যাকটার ত’ নিজে, ম্যানেজারও নিজে,
বাকি যে-ক’জন থাকবে দু’দশটাকা করে দিলেই
ব্যাস্ ! ছ'মাস বাইরে ঘুরে বেড়াব, ছ'মাস বসে থাকব।
ভাল যাত্রার দলের ডিম্যাণ্ড, কত !

নন্দিনী
বলিয়া সে মল্লিকার মুখের পানে তাকাইয়া
তাকাইয়া খাইতে আরম্ভ করিল।
খাওয়া শেষ হইলে বলিল, ‘টাকাটা এসে গেলে
তুমি আমার হাতে দিয়ে, তারপর আমি দেখে নেবে।
বুড়ো কেমন করে পুকুর কেনে।
মল্লিকা একটি কথাও বলিল না, হাত হইতে
পাখাটা নামাইয়া পানের বাটায় পান আনিতে গেল।
•. হাজার টাকার আশায় নাতি-ঠাকুরদাদা দু’জনেই
বসিয়া আছে, এমন দিনে রাধানগর হইতে দারুণ এক
দুঃসংবাদ আসিয়া উপস্থিত।
মল্লিকার যে একটিমাত্র ভাই ছিল, তিন দিনের
জুরে তাহার সে-ভাইটি হঠাৎ মারা পড়িয়াছে ।
মল্লিকা ত’ কাদিয়া-কাটিয়া অস্থির ! তাহাকে
চুপ করানাে দায়।

নন্দিনী
জামা-জুতা পরিয়া যােগীন তাহাদের যাত্রার
রিহাসা দিতে বাহির হইতেছিল, কামিনী বলিল,
‘বাবা তােক ডাকছে যােগীন!
বৃদ্ধ রসিকলাল তাহার নির্দিষ্ট স্থানটিতে বসিয়া
তামাক টানিতেছিল, বলিল, কে ? যােগীন ? আয়,
বাে।'
যােগীনের বসিবার অবসর ছিল না। দাঁড়াইয়া
দাড়াইয়াই বলিল, “কি বলছ বল।
রসিকলাল জিজ্ঞাসা করিল, “বৌদিমণি কি
করছে ?
যােগীন বলিল, “কঁদছে, আবার কি করবে ?
মাথা নাড়িয়া বৃদ্ধ বলিল, কঁাদু। কালে--
আমাদের দুঃখের অনেকটা লাঘব হয়।
এই বলিয়া একটুখানি থামিয়া বৃদ্ধ আবার
বলিতে আরম্ভ করিল, কিন্তু এই আমি বলিহারি
যাই যােগীন, যা ভাবলাম, শেষ পর্যন্ত ঠিক সেই
রকমটিই হয়ে গেল। তার বাবা যখন মারা গেল,
মা গেল,-সবাই বলতে লাগল—ছেলেটা বড় অপয়া
২
১৭

নন্দিনী
ছেলে।
একমাত্র আমি তার পিতিবাদ করলাম ;
বললাম,—না। তার কারণ কি জানিস্ ? রতু স্যা
একবার আমার কাছে পঁচিশটি টাকা ধার নেয়, তারপর
দেবাে দেকে করে দিতে আর কিছুতেই পারে না,
শেষকালে যায় মরে। ভাবলাম, টাকা আমার গেল।
লেখাপড়া নেই, হ্যাণ্ডোলাে নেই, টাকার আশা আমি
ছেড়েই দিয়েছিলাম। তারপর—তাের যেদিন জন্ম
হ'লাে, আমার ঠিক মনে আছে, চোখে আমি তখন
দেখতে পেতাম। বর্ষাকাল, ঝম্ ঝম্ করে বৃষ্টি পড়ছে,
হঠাৎ দেখি, জলে ভিজুতে ভিজতে ঘােমটা টেনে একটি
মেয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়ালাে। বললাম, কে
মা ? কি জন্যে এসেছ ? মেয়েটি তার আঁচলের
একটি গিট খুলে তিরিশটি টাকা আমার পায়ের কাছে
নামিয়ে দিয়ে ধীরে-ধীরে বললে, ‘কালোের বাবার কাছে
পঁচিশটি টাকা আপনি পেতেন। পাঁচটি টাকার বেশি
সুদ আমি আর দিতে পারব না বাবা, ওই নিয়ে আজ
আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। হিসেব করে দেখতে
গেলে সুদ হয়েছিল পঞ্চাশ টাকার ওপর ! তা দিলাম
১৮

নন্দিনী
ছেড়ে। কিন্তু ওই যে তিরিশটে টাকা পেলাম, সেও
কি আর তুই না জন্মালে পেতাম ভেবেছিস? কখনাে
। বলিয়া বৃদ্ধ একবার ঘাড় নাড়িয়া গড়গড়ার
নলটা হাত হইতে নামাইয়া দিয়া বলিল, “সেই থেকে
আমি জানি যে, তাের ভাগ্য প্রবল।•••নানা
জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এলাে, কিন্তু সব ভেঙ্গে-চুরে’
অনেক ভেবেচিন্তে—দিলাম শেষে রাধানগরে।
হঠাৎ কাহার পায়ের শব্দ পাইয়ারসিকলাল বলিয়া
উঠিল, কে ?
কামিনী একটা পাথরের খ-নুড়ি হাতে লইয়া
তাহার ঔষধ দিতে আসিয়াছিল, বলিল, ‘আমি।
রসিকলাল বলিয়া উঠিল, এখানে ঘুরঘুর করছিস
কেন মা দিনরাত ? আমাদের, নাতি-ঠাকুরদাদার দুটো
মফঃস্বলী কথা হচ্ছে, তাও হ’তে দিবিনে ?
কামিনী বলিল, “তােমারই পিণ্ডি ওষুধ দিতে
এসেছিলাম। ওই রইলাে ওইখানে, খেতে হয় খেয়াে।”
বলিয়া নাক সিটকাইয়া বিরক্ত হইয়া হন্ হন করিয়া
সে চলিয়া গেল।

নন্দিনী ‘থাক’ বলিয়া বাঁ-হাত দিয়া হাতড়াইয়া খ- নুড়িটা একবার স্পর্শ করিয়া, এইবার অত্যন্ত নিম্নকণ্ঠে কহিল, হা, কি বলছিলাম...তারপর, বিয়ে যখন দিলাম ওখানে, আমার তখনই কেমন যেন মনে হয়েছিল, রাধানগরের জমিদারী:••ও আমার নাতির হাতে এলাে- বলে। তারপর এই দ্যাখ, না ভাই, হাতে-হাতে ফলে গেল কিনা দ্যাখ। অবিনাশবাবুর এমন ছেলে, জ্বর নেই, জ্বালা নেই, তিনটি দিনের দিনেই কেমন ধড়ফড়িয়ে— বলিয়া কথাটা শেষ না করিয়াই , ঠোঁটের ফাঁকে ঈষৎ হাসিয়া বলিল, ‘ হাজার টাকা হাজার টাকা কৃরছিলাম, এখন কত হাজার টাকা তুমি কত লােককে দান করবে ভাই? তাই বলছিলাম কি জাননা? যােগীন তখন তাহার যাত্রার দলের স্বপ্ন দেখিতে- ছিল। দেখিতেছিল, চুমকি-দেওয়া রাজার পােক পরিয়া, কোমরে তলােয়ার বাঁধিয়া, মাথায় মুকুট দিয়া, বুকে একবুক মেডে ঝুলাইয়া, সে তখন আসরের মাঝখানে বক্তৃতা করিতেছে, চারিদিকে নীরব নিস্তব্ধ মুগ্ধ २०

নন্দিনী
জনতা, চিকের আড়ালে মেয়েরা বসিয়া আছে, ছেলেরা
পৰ্যন্ত টু শব্দটি করিতেছে না•••এমন সময় নিদ্রোখিতের
মত নিতান্ত অন্যমনস্কভাবে সে তাহার বৃদ্ধ পিতামহের
প্রশ্নের উত্তরে বলিয়া উঠিল, ‘আঁ?
রসিকলাল বলিল, “দিদিমণিকে এতদিন পাঠাইনি,
কিন্তু এবার হচ্ছে গিয়ে আমাদের নিজের গরজ। ওরা
নিতে আসবার আগে, কালকেই তুমি ওকে সঙ্গে নিয়ে
চলে যাও। বুঝলে ভায়া, সেইজন্যেই ডেকেছিলাম।
মল্লিকাকে লইয়া যােগীন রাধানগরে আসিতেই ।
জমিদার-বাড়ীতে আবার একবার নূতন করিয়া কান্নার
রােল উঠিল।' মা কঁাদিল, মেয়ে দিল, বাবা কঁদিল,
এবং তাহাদের দেখাদেখি দাসী-চাকরেরাও কঁদিতে
লাগিল।
মা-বাবা যদিই-বা পথে আছে, মল্লিকার সে চীৎকার
করিয়া ধূলায়-মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া ভীষণ কান্না আর
কিছুতেই থামে না!
২১

নন্দিনী
পুত্র-শােকে কাতর মাকেই শেষে বলিতে হইল,
চুপ কর, মা, তোর কান্না দেখে বুক আমার ফেটে
যাচ্ছে। কি আর করি ব্ল, বিধাতা বড় নিষ্ঠর।
নিষ্ঠুর যে, তাহাতে আর কোনও সন্দেহই নাই
একটি মাত্র পুত্র,—দর মত তাহাকেও ছিনাইয়া
লইয়া কি সুখ যে তাহার হইল কে জানে!
সৌদামিনী বলিল, “তােকে কিন্তু আমি আর
চোখের আড়াল করব না বাছা, তুই এইখানেই থাক্‌ ।
যােগীনকেও বলেছি।
থাকিতে পাইলে মল্লিকা বাঁচে, কিন্তু উহারা রাখিবে
কি ?
দু’চারদিন পরে শােকের মাত্রাটা একটুখানি কমিয়া
আসিলে মল্লিকা একদিন রাত্রে তাহার স্বামীকে বলিল,
দ্যাখাে তােমার কাজকর্ম ত’ কিছু নেই, মা আমাদের
এই খানেই থাকতে বলছেন; থাকে না।
যােগীন বেশ লম্বা-চওড়া জোয়ান, কালো
কুচকুচে গায়ের রং, লেখাপড়া ভাল জানে না, গলার
আওয়াজটাও রুক্ষ।

নন্দিনী
‘ধেৎ ! বলিয়া মল্লিকাকে সে এমন জোরে এক
ধন দিল যে, মল্লিকা সহসা চমকিয়া উঠিল। তাহার
চুপ করিয়া থাকা ছাড়া আর উপায় নাই। কিয়ৎক্ষণ
পরে দেখা গেল, বিছানায় উপুড় হইয়া পড়িয়া পড়িয়া
সে কঁদিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যােগীন ভাবিয়াছিল, ছেলে যখন মরিয়াছে,
শশুরবাড়ীতে গিয়াই দেখিবে, শশুরের বিষয়-সম্পত্তি
একেবারে তাহার হাতের মুঠার মধ্যে। কিন্তু এখানে
আসিয়া হাল-চাল দেখিয়া সে অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া
বুঝিয়াছে, তাহার এখনও অনেক দেরি। শশুর-শাশুড়ী
বাঁচিয়া থাকিতে সে-আশা খুব কম। তবে শেষ পর্যন্ত
একদিন আসিবেই। সে-কথা যখন স্থির নিশ্চিত, তখন
মল্লিকাকে এমন করিয়া তিরস্কার করা উচিত হয় নাই।
বলিল, ‘বা-রে, আবার কান্না দ্যাখাে মেয়ের !
ভাল করে না বুঝে-সুজেই কথা বল, তাইতে বড় রাগ
ধরে। 'কাজকৰ্ম্ম আমার নেই কি রকম ? ‘সুভদ্রা-
হরণের’ রিহাস্যাল্ চলছে, আর আমি এইখানে—শ্বশুর
বাড়ীতে ধন্না দেবো বুঝি ? মাইরি আর-কি!”

নন্দিনী
মল্লিকা কোনও কথা বলিল না। উপুড় হইয়া মুখ
জিয়া যেমন কাদিতেছিল তেমনি কঁদিতেই লাগিল।
যােগীন কিয়ৎক্ষণ ধরিয়া চো চো করিয়া একটা
সিগারেট টানিয়া মনে-মনে কি যেন ভাবিল। বলিল,
‘আচ্ছা, থাকো তুমি। বুড়ােকে আমি বুঝিয়ে বলে
দেবাে।”
তাহার পর মল্লিকার কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া
চুপি-চুপি বলিল, “বাপের বিষয়-সম্পত্তির ত’ এখন তুমিই
মালিক। না কি বল ? আপদ যেটা ছিল সেটা ত
ফর্সা হয়ে গেল।
আরও কি যেন সে বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু
তাহার কথা শুনিয়া মল্লিকা একেবারে শিহরিয়া উঠিয়া
শুইয়া শুইয়াই খানিকটা সরিয়া গেল।
যােগীন বলিল, “সরে গেলে কি হবে ? যা সত্যি
সেই কথাই বলছি। তবে তার এখনও অনেক দেরি।
ভাবিয়াছিল, স্ত্রীর কাছ হইতে জবাব একটা সে
নিশ্চয়ই পাইবে, কিন্তু জবাবের পরিবর্তে তখনও সে
কঁদিতেছে দেখিয়া যােচীনের রাগ আবার চড়িয়া গেল।
২৪

নন্দিনী
বলিল, ‘ফ্যাচ, ফ্যাচ করে কেঁদো না বাপু, ভাল
লাগে না-ধেৎ !
মল্লিকা চুপও করিল না, কিছু বলিলও না।
পরদিন মল্লিকাকে কাছে ডাকিয়া মা জিজ্ঞাসা
করিল, ‘জামাই বড় রাগীদার মা, বার-বার কথা বলতে
ওকে আমার বড় ভয় করে। তাের এখানে থাকবার
কথা বলেছিলি ? না তোর বাপকে দিয়ে একবার
বলাব ?
মল্লিকা বলিল, “না মা, বলাতে হবে না। আমি
থাকলাম।
মা’র ভয় হইল। বলিল, “না না, জামাই যদি
বকে ? যদি রাগ করে ?
মল্লিকা বলিল, “করুক।
দেখা গেল, যােগীন রাগ-অভিমান কিছুই করে
নাই। পরদিন সকালে সে জুতা পরিয়াই তাহার
২৫

নন্দিনী
শাশুড়ীর কাছে গিয়া দাঁড়াইল। বলিল, শুনছেন ?
আমি আজ চললাম।
সৌদামিনী বসিয়া বসিয়া মল্লিকার চুল আঁচড়াইয়া
দিতেছিল। মুখ তুলিয়া বলিল, ‘আজই চলে বাবা?
আবার কবে আসবে ?
মল্লিকা তখন তাহার মাথার কাপড়টা টানিয়া দিয়া
দূরে একেবারে জানালার কাছে সরিয়া গেছে। যােগীন
একবার সেইদিক-পানে তাকাইয়া কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া
থাকিয়া বলিল :
‘কবে আসব ? তার কিছু ঠিক নেই। তবে
ঘুড়ির লাটাই রইলাে এইখানে, ঘুড়ি আর যাবে
কোথায় ? তাকে আসতেই হবে।
শাশুড়ী লজ্জায় মরিয়া গেল। রাগে তখন
মল্লিকার সর্বাঙ্গ জুলিয়া উঠিয়াছে। জানলার কাছ
হইতে কটমট করিয়া তাহার এই নির্বোধ স্বামীটির
মুখের পানে তাকাইয়া চোখের ইসারায় সেখান হইতে
তাহাকে সে চলিয়া যাইতে বলিল।
কিন্তু যােগীন তাহার সে নীরব চোখের মিনতি
২৬

নন্দিনী
বুঝিল না। স্ত্রীর দিকে তাকাইয়া সে বেশ জোরে-
জেরেই প্রশ্ন করিয়া বসিল, 'কেন ? কি হয়েছে কি ?
মল্লিকা কথা বলিবে কি, লজ্জায় একেবারে যেন
মাটির সঙ্গে মিশিয়া গিয়া, মাথা হেঁট করিয়া সেইখানে
দাড়াইয়া দাড়াইয়াই শক্ত সিমেন্টের মেঝের উপর
পায়ের বুড়াে আঙুলটা ঘষিতে লাগিল।
সৌদামিনী ভাবিল, তাহার এখানে দাঁড়াইয়া থাক।
অন্যায়। মেয়ে-জামাই নিশ্চয়ই দুটা কথা বলিবে ।
তাই সে ধীরে-ধীরে সেখান হইতে বাহির হইয়া পাশের
ঘরে গিয়া ঢুকিল। কিন্তু সেখান হইতেও শুনিতে পাইল,
জামাই বলিতেছে, 'টাকা আনতে গেল বুঝি ?
অপরাধের মধ্যে মল্লিকা তাহার দুই ঠোট, দিয়া
এক-প্রকার শব্দ করিয়া চুপি-চুপি বলিল, “আ-মর!
বলিয়াই সে ছুটিয়া গিয়া ভিতর হইতে দরজাটা বন্ধ
করিয়া দিল।
যােগীন বলিয়া উঠিল, “কি বলি ? মর? কেন,
আমি কেন মরব ? একটা আপদ ত’ বিদেয় হয়েছে,
এইবার তুই হ’ না! জ্বালা-জঞ্জাল চুকে যায় তাহলে।
२१

নন্দিনী মল্লিকা ঝর ঝর করিয়া দিয়া ফেলিল। যােগীনের রাগ তখনও পড়ে নাই। সশব্দে । ধন্ খুলিয়া সে বাহিরে গিয়া দাড়াইল। জুতার শব্দে সৌদামিনী বুঝিল, জামাই চলিয়া যাইতেছে। পাশের ঘর হইতে বাহির হইয়া সে অনুচ্চ- কণ্ঠে ভয়ে-ভয়ে ডাকিল, ‘শােনে বাবা যােগীন ! যােগীন ফিরিয়া দাড়াইয়া বলিল, কী ? সৌদামিনী দশ টাকার একখানি নােট তাহার হাতে গুজিয়া দিয়া বলিল, ‘আবার এসে যেন বাবা, রাগ কোরাে না। মল্লিকা ছেলেমানুষ। নােটখানি পকেটে পুরিয়া যােগীন বলিল, ‘আসব। বলিয়াই সে চলিয়া গেল। নিস্তব্ধ বাড়ীর মধ্যে সিড়ির উপর জুতার খট খট শব্দটা মা ও মেয়ে দু’জনেই উৎকর্ণ হইয়া শুনিতে লাগিল। ২৮

নন্দিনী
আব সহজে
যােগীন যে-রকম ভাবে গেল, মনে হইল সে যেন
আর সহজে ফিরিবে না। কিন্তু সপ্তাহ পার হইতে না
হইতেই যোগীন আসিয়া হাজির।
রাত্রে সে-দিন মল্লিক অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে তাহার
ঘরে ঢুকিয়া সর্বাগ্রে দরজা-জানালাগুলা
করিয়া বন্ধ করিয়া দিয়া তাহার কাছে গিয়া
দাড়াইল।
জিজ্ঞাসা করিল, ‘হলো সুভদ্রাহরণ ?
যােগীনের মুখখানা কেমন যেন ভার-ভার। বলিল,
‘নাঃ। মানকেটার জ্বর হয়ে গেছে। তাছাড়া
‘বলিয়া চুপ করিয়া একটা বিড়ি টানিতে টানিতে
ধোঁয়াটা মল্লিকার মুখের উপরেই ক্রমাগত ছাড়িতে ..
লাগিল।
চোখে মুখে নাকে ধোঁয়া লাগিতেই খুক খুক
করিয়া কাশিয়া মল্লিকা একটুখানি সরিয়া দাঁড়াইয়া
বলিল, তা ছাড়া কি?
যােগীন বাঁ-হাত বাড়াইয়া তাহার শাড়ীর এক
প্রান্তভাগ ধরিয়া টানিয়া তাহাকে কাছে সরাইয়া
?
২৯

নন্দিনী
আনিয়া বলিল, তাছাড়া শখানেক্ টাকার দরকার ।
দিতে পার ?
মল্লিকা বলিল, “আমি টাকা কোথায় পাব ?
যােগীন বলিল, তোমার ভাবনা কি আজকাল !
তুমিই ত’ মালিক।
স্বামীর মেজাজ ভাল ছিল, তাই ভরসা পাইয়া
মল্লিকা বলিল, ‘কী যে বল ছাই চবিবশ-ঘণ্টা ! ও-কথা
বােলাে না, ছি! মা যদি শুনতে পায়, কি মনে করবে
বল দেখি?
যােগীন বলিয়া উঠিল, থাম, থাম, আমাকে আর
উপদেশ দিতে হবে না। তুই চুপ কর।
মল্লিকা বলিল, “উপদেশ দিই কি সাধে ? কথা
বলতে জানে না যে !
এবার যােগীনের আত্মসম্মানে আঘাত লাগিবারই
কথা। বলিল, কী! কি বলিলি ? কথা বলতে জানি
? আমি ? আচ্ছা, কথা বলতে জানি কি না দ্যাখ,
তবে।' বলিয়া বিড়ির শেষ অংশটুকু হাত হইতে ঘরের
কোণের দিকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া উচু খাট হইতে

নন্দিনী যোগীন নামিয়া পড়িয়া জামাটা লইবার জন্য দেওয়ালের গায়ে ব্যাকেটের দিকে হাত বাড়াইল। রাগ করিয়া সে চলিয়া যাইতেছে ভাবিয়া মল্লিক। তাড়াতাড়ি তাহার পা দুইটা জড়াইয়া ধরিল। বলিল, ওগাে, তােমার পায়ে পড়ি—তুমি...' বলিতে বলিতে সে কঁদিয়া ফেলিল। এই অন্ধকার রাত্রে যােগীন যাইবেই বা কোথায় ? ধীরে-ধীরে আবার সে খাটের উপর উঠিয়া গম্ভীর মুখে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। সারারাত্রির মধ্যে মল্লিকা আর ভয়ে তাহাকে একটি কথাও বলিতে পারিল না। পরদিন নায়েবের কাছে মল্লিকা তাহার গলার এক ছড়া সােনার হার দিয়া বলিল, “এইটে কোথাও বন্ধক রেখে আমায় একশ টাকা এনে দিতে পারবেন নায়েব- মশাই ? ৩১

নন্দিনী
নায়েব বলিল, “কেন মা, বন্ধক রেখে টাকা আনতে
কেন হবে মল্লিকা ? বাবুকে না বলতে পার মাকে
বল না ! জামাইবাবুকে দিতে হবে বুঝি ?
শেষের কথাটার জবাব না দিয়া মল্লিক। বলিল, না,
আপনি যেখান থেকে হােক এনে দিন।
নায়েব হার-ছড়াটি ফেরত দিয়া বলিল, ‘এটি তুমি
নিয়ে যাও মা, এমনিই আমি এনে দিতে পারব বােধ
হয়।
মল্লিকাকে বাধ্য হইয়া তাহাতেই রাজি হইতে
হইল।
এবং সেই দিনই সন্ধ্যায় দেখা গেল, একশ টাকার
একখানি নােট হাতে লইয়া নায়েব-মশাই মল্লিকাকে
খুঁজিয়া বেড়াইতেছে।
নােটখানি হাতে লইয়া ঈষৎ আনন্দের হাসি
হাসিয়া মল্লিকা তাহাকে কি যেন বলিতে যাইতেছিল,
কিন্তু কৃতজ্ঞতার অত্যধিক আবেগে কণ্ঠ তাহার রুদ্ধ
হইয়া গেল, মুখ দিয়া একটি কথাও বাহির হইল না।

নন্দিনী
দিনকয়েক পরে দোতলার একটা ঘরের মধ্যে বাবা
ও ’র তুমুল ঝগড়া শুনিয়া মল্লিকা হঠাৎ দরজার
আড়ালে থমকিয়া দাড়াইয়া পড়িল ।
ঝগড়াটা কিছুক্ষণ পূর্বেই আরম্ভ হইয়াছে ; প্রথম
হইতে কথাগুলো সে শুনিতে পায় নাই, তবু তাহার
বুঝিতে কিছু আর বাকি রহিল না।
অবিনাশবাবু বলিলেন, ‘একশ ছেড়ে তুমি এক
হাজার নাও, তার জন্যে ত’ কিছু বলছিনে, বলছি শুধু
ওই জামাইটাকে দেওয়ার জন্যে।
সৌদামিনী বলিল, “থামাে। তা কেন বলবে তুমি ?
তুমি বলছ—আমার জন্যে। ওই যে আমি নিয়েছি,
আর তােমার সহ্য হচ্ছে না। বেশ গাে বেশ, তােমার
সংসারে আমার কোনও অধিকার নেই, তা আমি
জানি।
অবিনাশবাবু বলিতে লাগিলেন, ‘না গাে না—
আমি শুধু এইজন্যে বলছি যে, ওকে যত দেবে, ও ততই
পেয়ে বসবে। দেখলে না, হাজারটা টাকার জন্যে কি
কাণ্ডটা করলে ওরা। মেয়েটাকে তার জন্যে কত গঞ্জনাই

নন্দিনী
সইতে হয়েছে। তবু দিলাম না। দিলাম না শুধু
পেয়ে বসবে ব'লে। তােমার জন্যে নয়।
সৌদামিনী বলিল ‘দেবে না তা আমি অনেকদিন
থেকেই জানি। ও যে মেয়ে ! গরীব লােকের ঘরে
বিয়েও দিলাম, তারপর মেয়ে যদি আমার খেতে পাচ্ছি
বলে হাত পেতে কিছু ভিক্ষে করে ত’—
বলিতে বলিতে সৌদামিনীর চোখে জল আসিল।
কান্নায় গলাটা তাহার রুদ্ধ হইয়া আসিতেছিল,
তবু সে বলিতে লাগিল, ‘অমন জামাইএর হাতে দেখে
শুনে তাহলে তুমি দিলে কেন,—কেন দিলে ? বিয়ের
সময় যা দের তাই দিয়ে তুমি তাহ'লে বলে কেন দিলে
না যে, এই শেষ ; আর যদি তুই কোনােদিন কিছু চা’স্ত
তাের অপরাধ হবে! বাপের সম্পত্তিতে মেয়ের কোনও
অধিকার নেই তা আমি জানি-জানি—জানি। কিন্তু
অত আদরে মানুষ-করা মেয়ে আমার,ভাবি যখন,
শ্বশুরবাড়ীতে বাছা আমার দু’বেলা পেট ভরে খেতেও
পাচ্ছে না তখন তােমার বাড়ীর রাজভােগে যে আমার
অরুচি ধরে’ যায়•••তা জানাে ? তখন মনে হয়--
=
৩৪

নন্দিনী বলিয়া কথাটা সে আর শেষ করিতে পারিল না, পালঙ্কের উপর স্বামী বসিয়াছিলেন, সৌদামিনী তাহার পায়ের কাছে মাথা লুটাইয়া দিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতে আরম্ভ করিল। অবিনাশবাবু তাহার হাতে ধরিয়া তুলিবার চেষ্টা করিলেন। সৌদামিনীর কান্না তাহাতে দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। কাদিতে কাদতে বলিল, “আজ যদি আমার ছেলেটা বেঁচে থাকতাে ! বাপ হয়ত মেয়েকে অবহেলা করতে পারে, কিন্তু ভাই করতো না। অবিনাশবাবু এইবার তাকে অনেক রকম করিয়া বুঝাইলেন। বলিলেন, ‘ছি ! এই সামান্য কথা নিয়ে•••. বেশ হয়েছে একশ’ টাকা জামাইকে দিয়েছ, তার জন্যে এত কেন ? আমি শুধু এই কথাই বলছি যে, ও- টাকায় আমার মেয়ের কোনও কাজে লাগবে কি ? জামাইটা হয়েছে হতচ্ছাড়া হতভাগার একশেষ, যাত্রার দলে বক্তৃতা করে’ আর বাজনা বাজিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মত টাকাই দাও ওকে, ফুর্তি করে’ দু’দিনে ফুকে দেবে।

নন্দিনী
= = = =
সৌদামিনী সজল চক্ষে মুখ তুলিয়া তাহার স্বামীর
পা দুইটা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, ‘ওগাে থামাে তুমি
চুপ কর, তােমার পায়ে পড়ি। মল্লিকা যদি শোনে ত’
তার দুঃখের কিছু বাকি থাকবে না।
অবিনাশবাবু চুপ করিলেন। সৌদামিনীও চোখ
মুছিয়া ঘর হইতে বাহির হইতেছিল। দেখিল, জানালার
পাশ হইতে মল্লিকা তাড়াতাড়ি পলায়ন করিতেছে।
যা ভাবিয়াছিল, তাহাই ঘটিয়াছে। সবই যখন সে
শুনিয়াছে, তখন আর বলিতে দোষ কি !
সৌদামিনী ডাকিল, মল্লিকা, শােন্ ?
লজ্জায় জড়ােসড়াে হইয়া মল্লিক। তাহার কাছে
আসিয়া দাঁড়াইল।
ভিতরে অবিনাশবাবুকে শুনাইয়া শুনাইয়াই
সৌদামিনী বলিল, “দ্যাখ, মল্লিকা, ওই হতচ্ছাড়া
জামাইটাকে দেবার জন্যে আর যদি কোনােদিন কিছু
তাের বাবার কাছে কি আমার কাছে চাস্ ত’ তােকে
আমার দিব্যি রইলাে।
বলিয়াই সে ঝর ঝর্ করিয়া কঁদিয়া ফেলিল এবং

নন্দিনী
তাহার সেই উদগত অশ্রু গােপন করিবার জন্য হন
হন করিয়া সেখান হইতে চলিয়া গেল। এবং একাকী
সেই ধাে-আলােকিত আধাে-অন্ধকার বারান্দার মধ্যে
মল্লিক। শুধু গুম হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
কিন্তু কথাটা বােধকরি রাগের মুখে বলা
সৌদামিনীর উচিত হয় নাই। মেয়ে না জানি কি মনে
করিয়াছে ! এই কথা ভাবিয়া ভাবিয়া সারাদিন
সৌদামিনীর চোখে ঘুম আসিল না। এবং তাহার ফল
হইল এই যে, কথাটা মল্লিকাকে ভুলাইয়া দিবার জন্য
পরদিন হইতে আদর যেন তাহার আরও শতগুণে
বাড়িয়া গেল।
চাকর-দাসী সৌদামিনীর ধমকানির চোটে একে-
বারে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। এবং এই কথাই তাহার
সেদিন হইতে খাটি জানিল যে, এ-বাড়ীতে চাকরি বজায়
রাখিতে হইলে মল্লিকার সেবা-যত্ন করাই তাহাদের
0
একমাত্র কর্তব্য।
৩৭

নন্দিনী
সারা দিবারাত্রির মধ্যে একটি দণ্ডের জন্যও মল্লিকা
চোখের আড়াল হইলে সৌদামিনীর চলে না। তক্ষণাৎ
অমনি চারিদিকে ছুটাছুটি পড়িয়া যায়। বাবুর
জন্য মাছ যদি নির্দিষ্ট হয় দুখানা ত’ মল্লিকার
চারখানা ; বাবু খান একসের দুধ, মল্লিকা খায়
সের।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইতে না হইতে সৌদামিনী তাগাদা
দেয়,-“বলি ও বামুন-মা, লুচি হলো ?
বামুন-মা তাড়াতাড়ি লুচি-কয়টি ভাজিতে ভাজিতে
বলে, এই যে মা, হয়ে গেল।
লােকজনকে তিরস্কার করা সৌদামিনীর স্বভাব
নয়, তবু সে বলিতে ছাড়ে না। বলে, মেয়ে সেই কখন
চারটি খেয়েছে, তােমাদের বেশ আক্কেল যা-হােক, দাও
তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে দাও।
বামুন-মা তাড়াতাড়ি হাত চালাইয়া লুচি ভাজিয়া
দেয়। থালার চারিদিকে পঞ্চোপচার ব্যঞ্জন সাজাইয়া
সৌদামিনী ডাকে, ‘আয় মল্লিকা, খাবি আয়।
বৈকালে একদকা খাইবার পর এত তাড়াতাড়ি

নন্দিনী
খাইবার ইচ্ছা তাহার না হওয়াই স্বাভাবিক। বলে,
‘না মা এত সকাল সকাল...'
'কাল-সকাল কি লা! বলিয়া মা তাহার আঁচল
ধরিয়া টানিয়া বসায়। বসাইয়া ঠিক ছােট মেয়ের মত
আদর করিয়া বলে, এসাে লক্ষী মা আমার, খাইয়ে
দিই, নইলে এক্ষুণি বসবে আর উঠবে।
এই বলিয়া মা তাহার নিজের হাতে লুচি ছিড়িয়া
ছিড়িয়া মেয়েকে খাওয়াইয়া দিতে থাকে ।
ঝি-চাকরেরা দূর হইতে দেখে, আর মুখ টিপিয়া
টিপিয়া হাসে।
বিধাতা হাসেন কি না জানি না।
প্রথমবার যােগীন আসিয়াছিল সপ্তাহ পার হইতে
না হইতে, এবার আসিল মাস-দুইএক্ পরে।
সৌদামিনী ঘরের মধ্যে একাকী বসিয়াছিল,
অবিনাশবাবু প্রবেশ করিলেন—“কি গাে, জামাই
এসেছে?
এমন ভাবে ঘাড় নাড়িয়া ‘’ বলিয়া কথাটার সে

নন্দিনী
জবাব দিল, দেখিয়া মনে হইল, জামাই আসা সৌদামিনী
তেমন পছন্দ করে না।
অবিনাশবাবু বলিলেন, “কেমন ? আমা: কথাই
ঠিক কি না ?
সৌদামিনী বুঝিতে পারে নাই। জিজ্ঞাসা করিল,
কী তােমার কথা ?
অবিনাশবাবু ঠোটের ফাঁকে মৃদু একটুখানি
হাসিয়া বলিলেন, এবার সে দু’মাস পরে এলাে, না ?
টাকাগুলি সব খরচ করে তার পর এসেছে। কিছু না
দিলে সে আরও আগেই আসতাে।
সহসা পাশের একটা ঘর হইতে হারমােনিয়ামের
শব্দ শােনা গেল।
অবিনাশবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, “ও কে ?
হারমােনিয়াম কে বাজাচ্ছে ?
সৌদামিনী বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু বলিবার
প্রয়ােজন হইল না, হারমােনিয়ামের আওয়াজের সঙ্গে
যােনর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হইয়া উঠিল,
‘পুঞ্জে পুঞ্জে কুঞ্জে কুঞ্জে চললাে সঙ্গিনী, চললো রঙ্গিনী !---

নন্দিনী অবিনাশবাবু লজ্জায় সেখান হইতে অন্য পথ দিয়া পলায় করিলেন। যাইবার সময় স্ত্রীকে বলিয়া গেলেন, ‘তুমি শানো! গান শুনিয়া মল্লিকা ঘরে ঢুকিল। দেখিল, খাটের মাঝখানে বসিয়া ফুটা হারমােনিয়ামটির উপর একটা বালিস চাপা দিয়া যােগীন তন্ময় হইয়া চোখ বুজিয়া গান গাহিতেছে। কাছে গিয়া বলিল, কাছে গিয়া বলিল, “ওগো, ওটা তুমি রাখাে। ও ভাল বাজছে না। শেষের কথাটা তাহার একেবারেই মিথ্যা। হার- মােনিয়াম বাজার ভাল-মন্দ সে বােঝে না। বলিল, ‘সেরে আসুক আগে, তারপর তােমার যতখুশী বাজিও। যােগীন জিজ্ঞাসা করিল, ‘নায়েব-মশাই তােমাদের কবে কলকাতা যাবে জানাে কিছু ? মল্লিকা বলিল, না। যােগীন বলিল, কাল একবার জিজ্ঞেস্ কোরে ত’! যাবার সময় আমার সঙ্গে যেন দেখা করে’ যায়— ৪১

নন্দিনী
হারমােনিয়ামটা সারতে দেবাে, আর একটা পিলু
বাঁশীর দাম জেনে আসবে।
মল্লিকা বলিল, “কেন, তুমি জিজ্ঞাসা করা ও ত’
পারাে। আমার বাপু লজ্জা করে।'
যােগনি বলিল, ‘লজ্জা? আ হা হাহা লজ্জাবতী
লতা গো
মল্লিকা দেখিল, আর খানিকক্ষণ থাকিলেই
যােগীন হয়ত বাড়াবাড়ি সুরু করিবে, তাই সে ‘আসি’
বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
পরদিন মল্লিকার শরীরটা ভাল ছিল না, দুপুর
হইতে মাথা ধরিয়াছে, সন্ধ্যায় সৌদামিনী তাহাকে চারটি
খাওয়াইয়া দিয়া, মাথাটা তাহার কোলের উপর রাখিয়া
টিপিয়া দিতে দিতে বলিল, “আজ আর ও-ঘরে গিয়ে
কাজ নেই মল্লিকা, তুই আমার কাছে শাে।
মল্লিকা কোনও কথা বলিল না, লজ্জায় চোখ
বুজিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া রহিল ।
82

নন্দিনী
শেষ পর্যন্ত হইলও তাহাই। মল্লিকাকে সৌদামিনী
সেদিন আর যােগীনের কাছে যাইতে দিল না।
কিন্তু এমনি মজা, সৌদামিনী ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল,
ঘুম ভঙিতেই অন্ধকারে হাতড়াইয়া দেখে, মল্লিকা
নাই। ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিয়া আলাে জ্বালিয়া
তৎক্ষণাৎ সে
সে এদিক-ওদিক খুজিয়া বেড়াইতে
লাগিল।
ঝি সুখদাকে উঠাইয়া বলিল, “দ্যাখ, মা, মল্লিকা
কোথায় গেল দ্যাখ, !
সুখদা বলিল, “যাও মা ঘুমােও গে যাও!
কথাটা সৌদামিনী বুঝিতে পারিল না। বলিল,
‘কেন বল্ দেখি ?
সুখদা' বলিল, ‘জামাইএর কাছে গেছে, তুমি সুগন
করছ কেন মা ?”
সৌদামিনী বলিল, শরীরটা যে ওর আজ বডেড
খারাপ করেছে মা, মাথা ধরেছে বলছিল।
সুখদা বুঝাইয়া বলিল, ‘তুমি অমন কোরাে না মা,
মেয়ে তােমার মনে-মনে রাগে।
t
৪৩

নন্দিনী
সৌদামিনী চুপ করিয়া কি যেন ভাবিল। ভাবিয়া
বলিল, ‘তা ত’ বুঝি বাছা, কিন্তু আমার বড় ভয় করে।
জামাইটে বদরাগী, তার ওপর মেয়ের আমার-রীরটে
বড় খারাপ। ওইটিই এখন পুঁজি বাছা, কি ভয় যে
আমার হয়, তা তােরা বুঝবি কেমন করে ?
এই বলিয়া সুখদাকে আর বিরক্ত না করিয়া
সৌদামিনী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। লণ্ঠনটা
নিবাইয়া দিয়া বিছানায় গিয়া শুইয়াও পড়িল, কিন্তু
ঘুম তাহার কিছুতেই আসিল না। হঠাৎ এক সময়
দেখা গেল, অন্ধকারে পা টিপিয়া টিপিয়া সে তাহার
মেয়ে-জামাইএর ঘরের কাছে জানালার পাশটিতে গিয়া
চুপ করিয়া দাঁড়াইয়াছে।
জানালায় কোথাও কোনও ছিদ্রপথে কিছু দেখা
যায় কি না সৌদামিনী ঘুরিয়া ফিরিয়া অনেক রকম
করিয়া প্রথমে তাহাই দেখিবার চেষ্টা করিল। দেখিল
সে সুযােগ কোথাও নাই। তবে, মনে হইল যেন
ভিতস্বােমী-স্ত্রীর কথােপকথন চলিতেছে। মল্লিকার
উপর সৌদামিনীর রাগ হইল। এমন করিয়া রাত্রি
৪৪

নন্দিনী
জাগিলে মানুষের সুখ করিবে না ত’ কি ! জামাইটা
গোয়াতের একশেষ,দেখিতেছে, মল্লিকার অসুখ, তবু
তাহাকে অনর্থক বক বক করিয়া রাত্রি জাগাইয়া কি
লাভ ।
হঠাৎ তাহাদের কথাবার্তার সুর যেন ঢাড়িয়া
উঠিল। বাহির হইতেই স্পষ্ট প্রত্যেকটি কথা শােনা
যায়। সৌদামিনী কান পাতিরা শুনিতে লাগিল।
মল্লিকা বলিতেছে, হারমােনিয়া সারতে তােমার
কত লাগবে শুনি?
যােগীন বলিল, “না তােমার আর শুনে কাজ
নেই। অমন কথা যখন বলতে পার•••
‘তবু শুনিই না!
‘তা দশ-পনেরাে টাকা।
‘আর টিকলু বাঁশী না কি বললে ?
‘হ্যা, টিলু নয়—পিলু, পিকলু।
মল্লিকা জিজ্ঞাসা করিল, ‘তার দাম ?
‘ঠিক জানি না, তা—আন্দাজ সন্তোর-আশী টাকা
৪৫

নন্দিনী
মল্লিকা বলিল, তাহলে ফের আর-একশ’ ।--
কেমন ?
যােগীন কি বলিল শােনা গেল না। বােধকরি
ঘাড় নাড়িয়া হা বলিয়াছে ।
মল্লিকা একটুখানি থামিয়া জবাব দিল ‘টাকা
তামি এবার নিজে চাইতে ত’ পারব না, তুমিও যদি
চাও ত’ আমার মাথা খাও।
যােগীন রাগিয়া উঠিল। বলিল, “বটে ! তাহলে
ও-সব আমার হবে না ? অত দূর থেকে ঘাড়ে করে
নিয়ে এলাম হারমােনিয়ান্টা•••
মল্লিকা বলিল, ‘আনতে কে বলেছিল তােমায় ?
আনলেই পারতে!
যােগীন বলিল, ‘ভারি যে ট্যাক্ টা করে কথা
বলতে শিখেছ দেখছি।
মল্লিকা বলিল, ‘হা শিখেছি, সেই কথাই বলতে
এসেছিলাম, নহিলে আজ আর আসতাম না তােমার
কাছে।
৪৬

নন্দিনী
যােগন বলিল, 'আহলাদে মেয়ের ভারি যে দেমা
হয়েছে দেখি!
মল্লিকা বলিল, 'হ্যা, হয়েছেই ত’! তাই বলে
বার-বার টাকা তােমার জন্যে আমি চাইতে পারব না।
বাপু।
যােগীন বলিয়া উঠিল, ‘পারবে না ত’ বেরােও
এখান থেকে, বেরােও বলছি ! আমিও কাল চলে যাব,
আর কখখনো আসব না।
মল্লিকা চুপ !
সৌদামিনী ভাবিয়াছিল, রাগিয়া সে ঘর হইতে
বাহির হইয়া আসিবে নিশ্চয়ই, কিন্তু অনেকক্ষণ দাড়াইয়া
থাকিয়া দেখিল, সে আসেও না, কথাও বলে না। অথচ
ব্যাপারটা যে কি সেখান হইতে কিছুই বুঝিবার উপায়
নাই। এত দিনের পুরানাে জানালার কপাট,—এতটুকু
একটা ফুটাও ত’ থাকা উচিত।
শেষে কি আর করিবে, অন্ধকারে কানের কাছে
মশা ভন্ ভন্ করিতেছিল, রাত্রি নেক, ঘুমও পাইয়াছে,
অমন করিয়া চোরের মত কতক্ষণই বা দাঁড়াইয়া
১৭

নন্দিনী
থাকে,—সৌদামিনী ধীরে-ধীরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিয়া সেখান হইতে চলিয়া আসিয়া আবার তাহার
নিজের বিছানার উপর শুইয়া পড়িল।
মল্লিকার কথা ভাবিতে ভাবিতে কখন সে ঘুমাইয়া
পড়িয়াছিল জানে না, প্রভাতে ঘুম ভাঙ্গিতেই দেখে,
মল্লিকা ঠিক তাহার পাশে, সন্ধ্যায় যেমন করিয়া
ঘুমাইয়াছিল, তখনও ঠিক তেমনি করিয়া ঘুমাইতেছে।
মনে-মনেই ঈষৎ হাসিয়া মেয়ের গায়ের কাপড়টা ভাল
করিয়া টানিয়া দিয়া ঠাকুরদের নাম করিতে করিতে
সৌদামিনী শয্যাত্যাগ করিল।
সকালে জামাইকে চা দিতে গিয়া সুখদা-ঝি চায়ের
বাটি হাতে লইয়া ফিরিয়া আসিল।
চা পাঠাইয়া দিয়াই সৌদামিনী কাপড় কাচিতে
গিয়াছিল, মল্লিকা তখন সবেমাত্র বিছানা ছাড়িয়া চাবি-
বাঁধা কাপড়ের আঁচলটা মেঝের উপর দিয়া টানিতে
টানিতে ঘর হইতে বাহির হইতেছে, সুখদা জিজ্ঞাসা
করিল, ‘জামাই কোথা গেল মল্লিকা ?
৪৮

নন্দিনী
ধরা-ধরা গলায় মল্লিকা জবাব দিল, তা আমি কি
জানি !
বলিয়াই সে কাপড়টা তাহার ভাল করিয়া গায়ে
জড়াইয়া চোখে-মুখে জল না দিয়াই এক-পা এক-পা
করিয়া আগাইতে আগাইতে যােগীন যে-ঘরে শুইয়াছিল,
সেই ঘরের দরজায় গিয়া দাড়াইল। উকি মারিয়া
দেখিল, ঘরে কেহই নাই । তাহার পর ঘরে ঢুকিয়াই
প্রথমে দেওয়ালের ব্র্যাকেটটার দিকে তাকাইয়া দেখে
তাহার জামা নাই, জুতা যেখানে থাকে, দেখিল সেখানে
জুতা নাই; এদিক-ওদিক তাকাইয়া, খাটের নীচে
একবার ভাল করিয়া দেখিয়া, দেওয়ালের গায়ে
লাগানাে বড় আলমারিটা খুলিয়া ভাঙ্গা হারমােনিয়াটারও
কোনও সন্ধান করিতে পারিল না। বুকের ভিতরটা
তাহার ধ্বক করিয়া উঠিল। তবে কি সত্যই সে রাগ
করিয়া চলিয়া গেছে ? চোখ দুইটা তাহার তৎক্ষণাৎ
জলে ভরিয়া আসিল। কয়েক ফোঁটা অশ্রু তাহার
হাতের উপর দিয়া গড়াইয়া বিছানায় পড়িল। ভাবিল,
যাক, আবার আসিবে। ভাবিয়া সে তাহার আঁচল দিয়া
৪৯

নন্দিনী
ভাল করিয়া চোখ মুছিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইবে,
সহসা তাহার চোখে পড়িল, সুমুখের সাদা ধপধপে
দেওয়ালের উপর বড় বড় অক্ষরে পেন্সিল দিয়া লেখা-
‘তােমার নিকুচি করেছে। আমি চললাম । আর।
আসছি না বাবা।
মল্লিকা তাড়াতাড়ি তাহার কাপড় দিয়া ঘষিয়া
ঘষিয়া দেওয়ালের দাগ উঠাইতে লাগিল ।
পেন্সিলের দাগ তখনও সম্পূর্ণ মুছে নাই এমন
সময় দরজায় তাহার মা আসিয়া ডাকিল, মল্লিকা !
আচম্‌কা মল্লিকা চমকিয়া উঠিয়া বলিল, “কি ?
‘জামাই কোথায় রে ?
মল্লিকার মুখ দিয়া সহজে কথা বাহির হইতেছিল
। ধীরে-ধীরে বলিল, “চলে গেছে।
‘যাক্‌-গে, আয়।' বলিয়া সৌদামিনী তাহাকে
একরকম জোর করিয়াই সে-ঘর হইতে বাহিৰে টানিয়া
আনিল ।

নন্দিনী
"
যােগীনের রাগ বােধ হয় আর ভাঙ্গে না।
এক মাস যায়, দু’মাস যায়, তিন মাসও পার
হইতে চলিল, যােগীনের আসিবার নাম নাই।,
মল্লিকা চিঠি দেয়, কিন্তু জবাব আসে না।
তিনমাস পর্যন্ত কোনাে রকমে সে ধৈৰ্য্য ধরিয়া ছিল,
এবার ধীরে-ধীরে তাহার ধৈর্য্যের মাত্রা অতিক্রম
করিতেছে।
মা তাহাকে কত রকম করিয়া বুঝায়। বলে,
‘আমার মত অদৃষ্ট যেন আমার কোনও শত্রুরও না
হয় মা ! একটা ছেলে ছিল সেও গেল, একটা মাত্র
মেয়ে—তাকেও যে কোনাে রকমে সুখে রাখব তারও
উপায় নেই।
মল্লিকা আজকাল ভাল করিয়া খায় না, সাজ-সজ্জা
এক রকম পরিত্যাগ করিয়াছে, একা থাকিলেই পড়িয়া
পড়িয়া দে।
মায়ের মন,জামাইএর উপর যতই বিরূপ হােক,
শেষ পর্যন্ত মেয়ের কষ্ট দেখিয়া তাহাকে একটা-কিছু
করিতেই হয়।

নন্দিনী
বিনাশবাবু একখানা চিঠি লিখিয়া সঙ্গে কিছু,
আম, সন্দেশ দিয়া জামাইএর বাড়ী লােক পাঠাইয়া
দিলেন।
• পরের দিন তােক ফিরিয়া আসিল। বুড়া
রসিকলালের চিঠিখানি সৌদামিনীর হাতে দিয়া বলিল,
‘পড়ে দেখুন।
চিঠিখানি সৌদামিনী মল্লিকার হাতে দিয়া বলিল,
‘পড়, ত’ মা, শুনি কি লিখেছে।
অন্য সময় হইলে চিঠি সে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিত,
কিন্তু এখন আর সে অবস্থা তাহার নয়। চিঠিখানি
সে মনে-মনেই পড়িয়া বলিল, ‘বুড়োর চিঠি।
সৌদামিনী বলিল, “দাদা-শশুরের ? কি লিখেছে
শুনি !
‘তুমিই পড় না মা! বলিয়া মল্লিকা কহিল,
‘কানা বুড়াে নিজে ত’ লিখতে পারেনি, কাকে দিয়ে
লিখিয়েছে। লিখেছে, উনি বাড়ী নেই। কলকাতার
কোন্ একটা যাত্রার দলে গিয়ে ঢুকেছে। তাদের সঙ্গে
বক্তৃতা করে করে’ ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে একবার

নন্দিনী == এসেছিল। এবার এলে তাকে এখানে পাঠিয়ে দেবে লিখেছে। সৌদামিনী বলিল, “ছি, ছি, ছাখ, দেখি মা জামাই- এর কাণ্ড! যাত্রার দলটা যদি এই দিক পানে কোথাও বায়না-টায়না নিয়ে আসে ! লোকে বলবে অমুক বাবুর জামই ! এবার মল্লিকার রাগ হইল। বলিল, ‘কেন মা, ও-কথা কেন বলছ ? এতই যদি লজ্জার ভয় ত’ তােমাদের মুখ যাতে না পড়ে তার ব্যবস্থা ত’ করে’ দিলেই পার। এমন কথা মল্লিকা কোনােদিন বলে না। আজ যে কেন বলিল কে জানে। সৌদামিনা সেই কথাটাই সারাদিন ধরিয়া ভাবিতে ভাবিতে সেদিন সন্ধ্যায় মল্লিকাকে কাছে ডাকিয়া আদর করিয়া বলিল, ‘সেজন্যে তুই দুঃখু করিসূনে মল্লিকা, তোর বাবাকে বলে সে-ব্যবস্থা আমি করে দেবাে দেখি। অথচ এতদিন ধরিয়া মুখে না বলুক, মনে-মনে মল্লিকা ঠিক ভাবিয়া রাখিয়াছে যে, বাপের বিষয়-সম্পত্তি

নন্দিনী
এখন সবই
তাহার। সংসারে বাজে-খরচ হইলে
মল্লিকার রাগ হয়, এক-একদিন ইচ্ছা করে, জমিদারী
সেরেস্তায় দু'একজন মাত্র ভালাে লােক রাখিয়া বাকি
সক অকর্মণ্য কৰ্মচারীগুলাকে ছাড়াইয়া দিয়া খরচ
কমাইয়া দেয়, মনে হয়, বাড়ীতে মাত্র তিনজন লােকের
জন্য পাঁচজন দাসী-চাকরের কোনও প্রয়ােজন নাই।
কিন্তু আজ হঠাৎ তাহার মা তাহাকে এমন কথা
বলিল কেন ? বাবাকে বলিয়া তাহার একটা-কিছু
ব্যবস্থা করিয়া দিবার অর্থ সে ঠিক বুঝিতে পারিল না।
কথাটা সেইদিন হইতে মল্লিকার বুকের মধ্যে
কেমন যেন সদা-সর্বদাই কাটার মত খচ খচ্‌ করিয়া
বিধিতে লাগিল।
কিন্তু সে আর কতদিন!
যােগীনের না-আসার দুঃখটাই তাহার কাছে দিনে-
দিনে এত বড় হইয়া উঠিল যে, সে-দুঃখটা তাহার আর
মনেই রহিল না।
৫৪

नमिनी
মাসের পর মাস পার হইয়া যায়—
যােগীন আর আসে না।
মল্লিকার ইচ্ছা, আর-একবার সেখানে লােক
পাঠায়, কিন্তু মুখ ফুটিয়া সেকথা কাহাকেও বলিতে
তাহার না করে।
এমনি যখন তাহার মনের অবস্থা, তখন, একদিন
সে হঠাৎ একটা বড় গােপনীয় তথ্য আবিষ্কার করিয়া
ফেলিল।
আবিষ্কার করিল, সৌদামিনী সন্তান-সম্ভবা !
মাও আর সে-কথা মেয়ের
কাছে গােপন
রাখিতে পারিল না।
মল্লিকা তাহার দু’চোখ বুজিয়া মাথা হেঁট করিয়া
ভাবিতে বসিল। ভাবিল—ছেলে হয়ত তাহার নাও
হইতে পারে, হয়ত-বা তাহার একটি বােন হইবে।•••

নন্দিনী
যাত্রার দলের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া ঘুরিয়া
বহুদিন পরে যােগনি বাড়ী ফিরিল–ম্যালেরিয়া ধরাইয়া।
অমন জোয়ান চেহারা তাহার মাসখানেক্ জ্বরে ভুগিয়াই
কঙ্কালসার হইয়া গেছে।
কামিনী বলিল, আচ্ছা হয়েছে ! আর যাবি
যাত্তার দলে ?
যােগন বলিল, ‘যাব বেশ করব, তাের কি ?
বৃদ্ধ রসিকলাল তাহাকে কাছে ডাকিয়া বুঝাইতে
লাগিল, বলিল, ওরে গর্দভ, আমি না তােকে এখন রাগ
করতে বারণ করেছিলাম ।
যােগীন বলিল, “না, করবে না! শ্বশুর-শাশুড়ী
কবে মরবে তার ঠিক নেই, তার পর বিষয়-সম্পত্তি
পাব কি পাব না, তার জন্যে এখন থেকে আমি ওদের
‘চন্নমে’ খাই। মাইরি আরকি ! না খেলেই নয়।

নন্দিনী
বৃদ্ধ হিসাবী মানুষ ; বলিল, “না রে দাদাভাই
মাথা গরন করিসনে বিষয়-সম্পত্তি সামান্য জিনিস
নয়, এককাঠা জমির জন্যে কত লোেক জীবন দিয়ে
দেয়—তা জানিস ? আমার কথা শোন! অনেকদিন
যানি, শ্বশুর-শাশুড়ী ভেবে ভেবে খুন হচ্ছে। তুই
একবার যা। আর•••তমনি পরিস্ ' কথায়-কথায়
রায়েদের পুকুরের কথাটা পেড়ে দেখিস। শাশুড়ীর :
কাছে, বুঝলি ? আর, কারও কাছে নয়। আমি তােকে
হদি শিখিয়ে দিচ্ছি।
অনেকদিন সে মল্লিকাকে দেখে নাই, নিমরাজি সে
হইয়াই ছিল, তাহার উপর বৃদ্ধ রসিকলের বচন
.
অবশেষে রাগ-অভিমান পরিত্যাগ করিয়া শশুরবাড়ী
যাইবার জন্য রাজি তাহাকে একদিন হইতেই
হইঞ্চ।
যােগীন ‘আজ যাই’ ‘কাল যাই করিতেছে, এমন
দিনে মল্লিকার এক চিঠি আসিয়া উপস্থিত ?
চিঠিখানি খুলিয়া পড়িতেই তাহার মাথা ঘুরিয়া
গেল। আর-একবার ভাল করিয়া পড়িল। তাহার

নন্দিী
পর আর-একবার !•••বৃদ্ধ রসিকলের কাছে গিয়া
বলিল, এই দ্যাখাে, কি সর্বনাশ হয়েছে শোনাে !
রসিকলাল বলিল, ‘
সর্বনাশ কিসের যােগীন ?
কার সর্বনাশ ?
যাের্গীন বলিল, ‘কার আবার ? বৌএর চিঠি
এলাে। শাশুড়ীর আবার একটা ছেলে হয়েছে।
কথাটা শুনিয়াও রসিকলাল বিশ্বাস করিতে পারিল
। বলিল, “দ্যাখ, আবার, কার চিঠি বলে’ কার চিঠি
খুলেছিস্ হয়ত'। লেখাপড়া ত’ আর তেমন শি লিনে
হতভাগা ; দ্যাখ, আবার, কি পড়তে কি পড়লি
দ্যাখ।
যােগীন ভেংচি কাটিয়া বলিল, তােমার মাথা!
বছ মাসখানেক আগে শাশুড়ীর একটি ছেলে হয়েছে,
তা বুঝি বিশ্বেস্ হচ্ছে না?
রসিকলাল কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।
তাহার পর একটা হাই তুলিয়া হাতের দুই আঙুলে
চুটকি দিতে দিতে বলিল, ‘মায়া, মায়া, সবই মায়া !
সবই পরীক্ষা! তা হাে, তুই যা। গিয়ে বলবি,
৫৮

নন্দিনী
বৌকে নিতে এলাম। অনেকদিন যায়নি, ঠাকুদ্দার বড়
কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই আমি বলে রাখছি যােগনি, এ
ছেলেও টিকবে না। তখন বলি যে, হা, বুড়ে।
বলেছিল।
বলিয়াই বুড়া একটা বড়-রকমের দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিয়া হেঁটমুখে কি যেন ভাবিতে লাগিল।
বলিল, ‘তা হােক। তুই ভাবিনি যােগীন, যেমন
করে’ পারিস্ বৌকে নিয়ে আসবি, তারপর আমি দেখে’
নেবাে।
রাধানগর যাইতে যােগানের দু’-চারদিন দেরি
হইল।
গিয়া দেখে, জমিদারবাড়ীতে আনন্দের ঘটা
পড়িয়া গেছে। ইহারই কিছুদিন পূর্বে যে এই
বাড়ীতেই, একদিন একটা শােকাচ্ছন্ন ভয়াবহ অন্ধকার
নিবিড়ভাবে ঘনাইয়া উঠিয়াছিল, সে-কথা এখন আর
কাহারও মনে নাই।
.
৫৯

নন্দিনী
আহারাদির পর একটুখানি রাত্রি করিয়াই মল্লিক।
যােগীনের সঙ্গে দেখা করিল।
যােগীন চুপ করিয়া খাটের উপর বসিয়া বসিয়া
বিড়ি টানিতেছিল। মজিক। ঘরে ঢুকিয়াই দরজা বন্ধ
করিয়া তাহার কাছে গিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কঁাদিতে
লাগিল।
যােগীন কথা কিছুতেই কয় না, ভাবিল, মল্লিকাই
আগে কথা কহিবে ।
কিন্তু মল্লিকার কান্না যখন আর কিছুতেই থামে
না, যােগীন তখন চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, ওগো
থামাে, থামাে, জানি, সব জানি। তুমি এক কাজ কর,
তার চেয়ে নিয়ে এসাে কাল একবার ছেলেটাকে আমার
কাছে। দিই টুটি টিপে মেরে। তারপর মরা
ছেলেটাকে তেমনি শুইয়ে দিয়ে আসবে ধীরে-ধীর।
কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। বুঝলে ?
যেই কথাটা বলা, জানালার বাহিরে ধুপ, করিয়া
একটা শব্দ শােনা গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল,
কে যেন অস্পষ্টভাবে গােঙানি শুরু করিয়াছে।

নন্দিনী
ব্যাপারটা কি, দোবার জন্য যােগীন ও মল্লিকা
দু’জনেই লণ্ঠন হাতে লইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া
আসিল।
আসিয়াই দেখে, সৌদামিনী নৃচ্ছিত হইয়া
জানালার কাছে পড়িয়া আছে।
ইহার কারণ আর বুঝিতে কাহারও বাকি রহিল
। সে যে স্বকর্ণে সমস্ত শুনিয়াছে, তাহাতে কোনও
সংশয় নাই। যােঙ্গীন মাথা হেঁট করিয়া পুনরায় ঘরে
গিয়া ঢুকিল, মল্লিকা তাহার হাতের লণ্ঠনটা সেইখানেই
নামাইয়া দিয়া ‘মা’ ‘মা’ বলিয়া ছুটিয়া ছুটিয়া দাসী
চাকরকে ডাকিয়া লােক জড়াে করিয়া বাড়ীতে তৎক্ষণাৎ
একটা হৈ চৈ বাধাইয়া তুলিল।
কি একটা মােকর্দমার জন্য অবিনাশবাবু শহরে
গিয়াছিলেন তাই রক্ষা।
সুখদা বহুকালের পুরাণে ঝি ; সে-ই তাড়াতাড়ি
জল আনিয়া সৌদামিনীর চোখে-মুখে ঝাপ্টা দিয়া
: তাহার জ্ঞান সঞ্চার করিল এবং নিজেই তাহাকে সেখান

নন্দিনী
হইতে উঠাইয়া হাতে ধরিয়া ধরিয়া ঘরে লইয়া গিয়া
শােয়াইয়া দিল।
মল্লিকা তাহার শিয়রের কাছে গিয়া ডাকিল, ‘মা!
কথা বলা দূরে থাক্‌, মা একবার সেদিক পানে
ফিরিয়াও তাকাইল না। তৎক্ষণাৎ পাশ ফিরিয়া সে
তাহার নবজাত শিশুপুত্রটিকে হাত বাড়াইয়া
আগলাইয়া ধরিয়া চোখ বুজিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া
রহিল।
মল্লিক। তখন তাহার উদগত অশ্রর ধারা অাঁচল
দিয়া মুছিতে মুছিতে ধীর পদক্ষেপে গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত
হইয়া গেল।
পরদিন অতি প্রত্যুষে, দেখা গেল, লজ্জায়
কাহাকেও কিছু না
যােগন সেখান হইতে
পলায়ন করিয়াছে।
বাড়ীর চারিদিকে কেমন যেন একটা ভয়াবহ
স্তব্ধতা! যে মল্লিকার সুখ-সুবিধা আদর-যত্নের জন্য
আঁতুড়-ঘরেও সৌদামিনীর স্বস্তি ছিল না, সেই
সৌদামিনীই আজ নীরব !
৬২

নন্দিনী
মল্লিকা কতবার কীরকম করিয়া মাকে তাহার
বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছে যে, ইহাতে দোষ তাহার
বিন্দুমাত্রও নাই এবং তাহার স্বামীও যে অপরাধী
তাহাও নয়। কথাটা সে বলিয়াছিল মাত্র হাসি-রহস্য
করিয়া।
কিন্তু সৌদামিনী বােধহয় সে-কথা বিশ্বাস করে
নাই। বলিয়াছে, ‘হ্যালাে হ্যা আমি জানি, তুই চুপ
কর।
তাহার পর মল্লিকার সঙ্গে সে যে একেবারেই
কথা কয় নাই তাহা নয়, স্নানের সময় স্নান করিতে
বলিয়াছে, খাইবার সময় খাইতে ডাকিয়াছে, দু'একটা
অন্য কথাও হয়ত কহিয়াছে, কিন্তু সবই যেন কি রকম
করিয়া।
অথচ মল্লিকা নির্দোষ।
সে আর কাহারও সঙ্গে ভাল করিয়া কথা বলে
। মুখ ভার করিয়া একাকিনী চুপ করিয়া বসিয়া

নন্দিনী
থাকে। মার কাছে বড়-ধঃকটা যায় না। যােগান
সেদিন সে-জায়গাটায় বসি। নবজাত শিশুটিকে হত্যা
করিবার কথাটা বলিয়াছিল, সেইখানে গিয়া সে
খাটের গায়ে ঠাই ঠাই করিয়া মাথা ঠোকে, তাহার পর
মেঝেয় লুটাইয়া পড়িয়া গড়াগড়ি দিয়া কঁদিতে সুরু
করে।
সে-কান্না কেহই তাহার থামাইতে আসে না ;
নিজেই শেষে এক সময় উঠিয়া বসে, ভাবে, তাহার প্রতি
সৌদামিনীর এই যে ভাবান্তর, যােগীনের ওই একটি
মাত্র কথাই হয়ত তাহার যথেষ্ট কারণ নয়।
ভাবে
• হয়ত ওই ভবিষ্যৎ বংশধরটি জন্মাইবার পর হইতেই
মা’র মনে তাহার প্রতি বিরাগের সঞ্চার হইয়াছে।
তাহার স্বামীর মুখের ওইদুষ্ট, কথাটা ছুতা মাত্র।
যে-মেয়ের আদর-সােহাগের একদিন সীমা ছিল না,
সেই মল্লিকাই আজ সৌদামিনীর শত্রু হইয়া দাঁড়াইয়াছে
-একেবারে দু-চক্ষের বিষ !
৬৪

নন্দিনী
দাসী-চাকরের ভিতরে ব্যাপার কিছু জানে না।
তাহারা অবাক হইয়া শুধু দেখে আর ভাবে-জগতে
ইহাও সম্ভব।
সৌদামিনীর শিশু-পুত্রের নাম রাখা হইয়াছে—
টুকু।
টুকুন্ ওই অতটুকু ছেলে ; মাথায় এক-মাথা
কালাে কালাে চুল, গায়ের রং ফর্সা, চোখ দুইটি বড়,
মুখের চেহারা দেখিতে অনেকটা মল্লিকারই মত।
মানুষ দেখিলেই সে তাহার কচিকচি হাত-পাগুলি ছুড়িয়া
ছুড়িয়া খিলখিল করিয়া হাসে। হাসিবার সময় দুই
গালে দুটি টোল পড়ে, দেখিলেই কোলে লইয়া চুমা
খাই আদর করিতে ইচ্ছা করে।
মল্লিকা ভয়েভয়ে সেই ঘরে গিয়া ঢােকে।
ছেলেটার মুখের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া আদর করিতে
যায়, মা তাহার মুখখানা ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়া বলে,
.কেন ওকে বিরক্ত করছিস্ বাছা? ওর ঘুম পেয়েছে।

নন্দিনী
বলিয়া সৌদামিনী তাড়াতাড়ি হাত বাড়াইয়া তাহার
কচি শিশুর গায়ে-মাথায় থুপ থুপ করিয়া চাপড়াইতে
থাকে। বলে, “আর হাসতে হয় না,—ঘুমে।
ক্ষুন্নমনে মল্লিকা সেখান হইতে সরিয়া গিয়া
দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া দাড়ায়।
কিন্তু এমন করিয়া বেশি দিন চলে না।
মাস-দুইএর ভিতরেই কথাবার্তা আবার সবই হয়।
মা ও মেয়ের গুমােট ভাবটা যেন কাটিয়া গেছে।
সৌদামিনী আবার আগের মতই মেয়ের খাওয়া-দাওয়ার
সুখ-সুবিধার খোঁজ-খবর সবই রাখে।
মল্লিকার ভারিভারি মুখ আবার যেন প্রসন্ন হইয়া
উঠিতেছে ।
==
৫
৪
কিন্তু হইলে কি হয়
সৌদামিনী সেদিন সকালে বােধকরি খিড়কির
বাঁধানাে পুকুরে কাপড় কাচিতে গিয়াছিল। কুন
হঠাৎ কঁদিয়া উঠিল
কঁদিয়া উঠিতেই মল্লিকা ছুটিয়া ঘরে ঢুকিয়া
টুকুনকে তাড়াতাড়ি তাহার বিছানা হইতে দুইহাত দিয়া
৬৬

নন্দিনী
বুকে তুলিয়া লইয়া আদর করিয়া চুমা খাইয়া তাহার
কান্না চুপ করাইবার চেষ্টা করিতেছে, এমন সময় ভিড়।
কাপড়েই ছুটিতে ছুটিতে সৌদামিনী আসিয়া হাজির
আসিয়াই আর কোনও কথা নাই বার্তা নাই,
মল্লিকার কোল হইতে টুকুকে একেবারে ছিনাইয়া
কাড়িয়া লইয়া সৌদামিনী বলিল, “থাক্।
বলিয়া ক্রন্দনরত ছেলেটাকে সে আবার তাহার
বিছানার উপর শােয়াইয়া দিয়া কাপড় দ্বাড়িতে লাগিল।
মল্লিকার ঃখ হইবারই কথা। দুর্দমনীয় ক্রন্দনের
বেগ তখন ঠাহর কণ্ঠ পৰ্যন্ত ঠেলিয়া উঠিয়াছে।
লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া ঘর হইতে সে বাহির হইয়া
গেল এবং নিজের ঘরে গিয়া আপন মনেই ফুলিয়া ফুলিয়া
খানিকটা কাদিয়া সে তার স্বামীকে চিঠি লিখিত
বসি।
-বােকার মত কি কাণ্ড যে করিয়া গেলে। আমি
ছাহার ফলভােগ করিতেছি। লজ্জা না করিয়া শীঘ্র এখানে
৬৭

নন্দিনী
আসিয়া আমাকে লইয়া যাও। তােমার পায়ে পড়ি, তুমি আর
আমার উপর রাগ করিও না।
১
কিন্তু নিষ্ঠুর বিধাতা সহসা একদিন নিজের হাতে
সব যেন ভাঙিয়া-চুরিয়া তছনছ, করিয়া দিলেন !
স্বামীর আগমন প্রতীক্ষায় মল্লিকা এদিকে পথ
চাহিয়া বসিয়া আছে, ওদিকে রাধানগরের জমিদারীর
উপর বৃদ্ধ রসিকলের লােভ !
অবিনাশবাবু সেদিন তাহার কাছারী-বাড়ীতে বসিয়া
আছেন, এমন সময় কোথা হইতে একটি লােক অসিয়া
তাহাকে ভূমিষ্ঠ হইয়া একটি প্রণাম করিয়া এক
চিঠি তাঁহার পায়ের কাছে নামাইয়া দিয়া বলিল, 'ভারী
জরুরী চিঠি বাবু।
চিঠিখানি খুলিয়া অবিনাশবাবু দেখিলেন, সম্পূর্ণ
অপরিচিত হস্তাক্ষর। প্রায় ক্রোশ-পাঁচেক্ দূরের
একুখানি
৬৮
",

নন্দিনী বৈনাচিতি গ্রাম হইতে চিহিখানি আসিয়াছে। ভদ্রলােক , লিখিয়াছেন যথাযোগ্য অভিবাদনান্তে নিবেদনমেতৎ- আমাদের গ্রাম্য বারােয়ারী উৎসব উপলক্ষে পূৰু-অঞ্চল হইতে একদা যাত্রাগানওয়ালাদিগকে আনা হয়। ক্য রাত্রি হইতে তাহাদের দলের এক ব্যক্তি হঠাং কলেরা রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। ব্যক্তিটির নিকট বিশেষ সংবাদ লইয়া অবগত হইলাম, আপনার কন্যাকে সে-ব্যক্তি বিবাহ করিয়াছে, আপনি তাহার শুর। অতএব মহাশয় যদি এবম্প্রকারই হইয়া থাকে, তাহ হলে আপনি নিজে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক সমভিব্যাহারে ত্বরায় আমাদের গ্রামে আগমন করিয়া তাহার নিরাময়ের ব্যবস্থা করুন । আমরা গ্রামবাসীরা আমাদের যথাসাধ্য করিতেছি। জ্ঞাতার্থে নিবেদনমিতি। বশংবদ এজনার্দন দেবশর্মা চিঠির কথা বিনাশবাবু কাহাকেও জানাইলেন । নায়েবকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘চল, আমার সঙ্গে তােমায় যেতে হবে। সঙ্গে শ'খানেক টাকা নাও।

নন্দিনী
পথ।
বেনাচিতি যাইতে হইধে ট্রেণে চড়িয়া যাইতে হয়।
যাইবার পথে গঞ্জে নামিয়া তাল একজন ডাক্তার সঙ্গে
লইয়া বেনাচিতি গ্রামে যখন তঁাহারা উপস্থিত হইলেন,
সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে ।
নিস্তব্ধ পল্লী গ্রামের অন্ধকার
সঙ্গের
লােকটি পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল। বারােয়ারী-তলায়
প্রতিমার সুমুখে টিম টিম করিয়া একটি আলো
জুলিতেছে। যাত্রার জন্য প্রাঙ্গণের উপর প্রকাণ্ড
একটা সামিয়ানা টাঙানো হইয়াছিল। সামিয়ানাটা
এখনও তেমনি টাঙানােই রহিয়াছে । লাল নীল
নানারঙের কাগজের তৈরী শিলিগুলা গ্রামের ছেলেরা
বােধকরি টানিয়া ছিড়িয়া চারিদিকে ছড়াইয়া দিয়াছে।
সামিয়ানার নীচে গ্রাম্য কয়েকটা কুকুর ইতস্তত ঘুরিয়া
বেড়াইতেছিল। সুমুখে
এতগুলা লােক দেখিয়া
তাহাদের মধ্যে একটা একবার একটুখানি খেউ খেউ
করিয়া চীৎকার করিবার চেষ্টা করিয়াই লেজ গুটাইয়া
সরিয়া গেল। বারেবারে পিছন ফিরিয়া তাকাইতে
তাকাইতে কয়েকটা কুকুর ছুটিয়া পলায়ন করি।
৭

নন্দিনী
বাকি যাহারা শুইয়া ছিল, নিতান্ত নির্বিকারচিত্তে মুখ -
তুলিয়া একবার তাকাইয়া দেখিয়াই আবার তাহার
তেমনি মুখ খুঁজিয়া কুণ্ডলী পাকাইয়া শুইয়াই রহিল ।
কিছু দূরে বহুদিনের পুরাতন পােড়াে একটা ভিটের
পাশে কয়েকটা আলাে দেখা যাইতেছিল। গ্রামের যে
লােকটি তাহাদের আনিতে গিয়াছিল, আঙুল বাড়াইয়া
সেইখানটা সে দেখাইয়া দিয়া বলিল, “ওহঁটে সাজ-ঘর।
ওইখানেই আছে।
দেখা গেল, জনকয়ে লােক লণ্ঠন লইয়া ভিটের
মাঝখানে চক্রাকারে বসিয়া বসিয়া গল্প করিতেছে।
এতগুলি লোক দেখিয়া তাহার প্রায় সকলেই উঠিয়া,
দাড়াইল। একজন জিজ্ঞাসা করিল, গােবিন্দ, এলি ?
বলিয়াই সে এই আগন্তুক তিনজনের মুখের পানে
তাকাইয়া ব্যথিতকণ্ঠে কহিল, ‘বিকেল পর্যন্ত কোনাে-
রকস , রেখেছিলাম মশাই, তারপর আর পারা
গেল না।
বৃদ্ধ-গােছের মােটা-সােটা একজন লােক আগাইয়া
অলিলেন, কঁাধে গামছা, গলায় যজ্ঞােপবীত ; বলিলেন,
৭১

নন্দিনা
‘আমার চিঠিখান। তাহলে পয়েছিলেন ঠিক। আমি
ত’ মশাই সেই থেকে আর বাড়া ঢুকিনি, এইখানেই
পড়ে আছি চব্বিশ ঘণ্টা'। কি আর করি বলুন,
ব্যাটাদের এত করে বললাম, তা হাজার-হাক্, তােদের
দলেরই ত’ একজন আসামী, বিপদে যখন পড়েছে
বেচারা, তা অন্তত একজন থাক্‌! বলিয়াই মুখখানা বিকৃত
করিয়া ঘাড় নাড়িয়া তিনি আবার বা+তে লাগিলেন,
‘কেউ থাকলাে না! অধিকারী থেকে আরম্ভ করে’
মায় সেই বাচ্চা রাধিকাটি পৰ্য্যন্ত প্রাণের ভয়ে সব
পালালাে। সাজের বাক্সগুলাে এই 'এক্ষণে আমি
গরুর গাড়ী করে’ বিদেয় করে দিলাম। বললাম, “যা
বেটারা! আমরা ত’ আর পালাতে পারিনে, বিশেষ করে
যখন শুনলাম গিয়ে•••আমাদের রাধানগরের..তা আর
এখন কেঁদে কি করবেন বলুন, নিয়তি, নিয়তি! যার
যেখানে মাটি, তাকে সেইখানে•••আসুন, ভেতরেই
আসুন একবার। ওরে ও বিনােদ, আলােট ধর বাবা
ভাল করে’--
দু’জন লণ্ঠন দেখাইয়া আগে আগে চলিল।
৭২

নন্দিনী
ঘরের চৌকাঠের কাছে কেরােসিনের একটা কুপি
জুলিতেছিল। চারিদিকে ভাপসা মাটি ও কঁচা হলুদের
একটা অস্বস্তিকর গন্ধ ! শুকনাে কতকগুলো খড়
ইতস্তত ছড়ানাে। দরজার পাশেই মাটির একটা কলসি
ভাঙ্গিয়া পড়িয়া আছে, আর তাহারই পাশে শুকনো
খড়ের শয্যায় যােগানের মৃতদেহ। দয়া করিয়া গায়ে
একটা কাপড় কেহ ঢাকা দিয়া দেয় নাই। মৃত্যুর
পূর্বে তাহার যন্ত্র। র বােধকরি অবধি ছিল না। মুখখানা
বিকৃত কিম্ভুতকিমাকার হইয়া উঠিয়াছে, হাতপা কাঠের
মত সোজা ! তাহার উপর সর্বাঙ্গে হলুদের দাগ।
মল্লিকার কথা ভাবিয়া অবিনাশবাবুর চোখের জল
তার কোন প্রকারেই বাধা নানিতেছিল না।
নায়েব-মশাই তাহার হাতে ধরিয়া টানিয়া তাহাকে
বাহিরে আনিলেন।
সৎকারের ব্যবস্থা পূর্বাহেই সব প্রস্তুত হইয়াই
ছিল।
গ্রামপ্রান্তে শুষ্ক একটি ক্ষুদ্র নদীতীরে শ্মশান ।
প্রকাণ্ড একটি বটবৃক্ষের তলায় চিতা রচিত হইল এবং

নন্দিনী
সেইখানেই দাহকাৰ্য্য সমধা করিয়া, নায়েব-মহাশয়
গ্রামের সেই বৃদ্ধ ভদ্রলােকটিকে কাছে ডাকিয়া তাহার
হাতে কিছু টাকা দিয়া বলিলেন, ‘যা-কিছু করতে হয়
আপনার ওপরেই ভার দিয়ে আমরা
কিন্তু তাহা নাকি হইবার নয়। সকলেই একসঙ্গে
হৈ-চৈ করিয়া কথাটা তাহাকে শেষ করিতে দিল না।
জনার্দন শৰ্ম্মা টাকাগুলি তাহার কাপড়ের খুটে বাঁধিতে
বাঁধিতে বলিতে লাগিলেন, ‘একে কালরার রােগী, তার
ওপর এখান থেকে ফিরে গেলে যে গ্রামের অকল্যাণ
হবে বাবা, একবারটি সকলে মিলে গ্রামে ঢুকে—বাস্,
তারপর তােমরা চলে যেয়াে।
গ্রামে ফিরিয়া আর-এক বিপদ বাধিল। একে
অজানা পথ, তাহার উপর ঘাের অন্ধকার রাত্রি, ষ্টেশন
পর্যন্ত আলাে লইয়া কেহই তাহাদের সঙ্গে যাইতে
চাহিল না, কাজেই বারােয়ারী-তলায় রাত্রি প্রভাত না
হওয়া পর্যন্ত শ্মশানযাত্রী সকলকেই অপেক্ষা করিতে
হইল ।
৭৪

নন্দিনী
পরদিন একেবারে অতর্কিতে অকস্মাৎ যে দুঃসংবাদ
অবিনাশবাবু তাহার স্ত্রী-কন্যার কাছে বহন করিয়া
আনিলেন, তাহা একেবারে নিদারুণ !
মেয়েকে জড়াইয়া ধরিয়া সৌদামিনী কাদিয়া
আকুল হইল। মল্লিকার যে কি হইল সে-কথা আর
বলিয়া কাজ নাই,।
এ ধাক্কা সামলাইতে তাহাদের অনেক দিন
লাগিল।
হাতের শাঁখা ভাঙ্গিয়া, নোয়া ভাঙ্গিয়া, কপালের
সিদুর মুছিয়া, সাদা থান্ পরিয়া, শুষ্ক ম্লান মুখে মল্লিকা
ঘুরিয়া বেড়ায়। সৌদামিনী দেখে আর কঁাদে। কাহারও
মুখে একটি কথা নাই ! মনে হয়, এত বড় বাড়ীতে
লােকজন কেহ যেন আর বাস করে না। শােকাচ্ছন্ন
একটা নিস্তব্ধতায় দিবারাত্রি ঢারিদিক থম্ থম্ করিতে
থাকে।
৭৫

শনা
মল্লিকা কাহারও সঙ্গে একটি কথা বলে না, একটা
কথা দু’বার বলিতে হইলেই ঝরঝর করিয়া কাদিয়া
ফেলে, রাগিয়া কাঁদিয়া চীৎকার করিয়া ওঠে।
খাইবার সময় সৌদামিনী তাহাকে ডাকাডাকি
করে, এক ডাকে আজকাল তর তাহার সাড়া পাইবার
উপায় নাই, ডাকিয়া ডাকিয়া হায়রাণ হইয়া গেলে পর
মল্লিকা হয় ত’ মুখ তুলিয়া বলে, “উ!'।
সৌদানিনা বলে, ‘অমন করলে সার ক’দিন বঁাচবি
বাছা ?
মল্লিকা বলে, ‘নাই বা বাঁচলাম ।
সৌদামিনী আর দ্বিতীয় কথা মুখ দিয়া উচ্চারণ
করে না। জানে, সে তাহা হইলে এখনই হয় ত’
বিনাইয়া বিনাইয়া কঁদতে বসিবে। ঘরে খি বন্ধ
করিয়া আর সহজে বাহির হইতে চাহিবে না।
সৌদামিনীর শিশু-পুত্রটিতে যােগীন একদিন হত্যা
করিতে চাহিয়াছিল, সে-কথা আজ আর তাহার মনে
৭৬

নলিনী
থাকিবার কথা নয় ; কি তাহার ওই অত সাধের
পুত্র-সন্তানটির অত বড় অমঙ্গলের কথাটা মনের মধ্যে
তাহার এমনি দৃঢ় বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে যে, তাহাকে
সে ভুলিতে কিছুতেই পারে না। মল্লিকাকে ‘স তাহার
টুকুনের কাছে দেখিলে এখনও আতঙ্কে চমকিয়া ওঠে।
অথচ মল্লিকার সে-কথা মনে কিছুতেই থাকে না।
ছেলেটা কঁদলে মল্লিক তাহাকে কোলে করিতেও
যায়, হাসিলে সে তাহার যন্ত্রণার কথা ভুলিয়া নিজেও
একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করে।
না সেদিন খাইতে বসিয়াছিল। খাওয়া শেষ হইলে
ঘরে আসিয়া দেখে, টুকুনের শয্যা শূন্য, টুকুন নাই !
থাকো বারান্দায় বষ্মিা পান সাজিতেছিল,
সৌদামিনী জিজ্ঞাসা করিল, “ছেলে কোথায় রে থাকো?
থাকো বলিল, “দিদিমণি নিয়ে গেলেন হাঁস
দেখাতে।'
সৌদামিনীর বুকের ভিতর ধ্বক করিয়া উঠিল।
বলিল, ‘কোথায় নিয়ে গেছে ?
৭৭

নলিনা
‘পুকুরের ঘাটে।
? সৌদামিনী তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, ‘নিয়ে আয়
বাছা, যা দৌড়ে যা, যা বলছি, যা যা !
বলিয়া তাহাকে বিদায় করিয়া সৌদামিনী তাহার
পিছু পিছু সিড়ির কাছে গিয়া দাড়াইয়া রহিল।
ছেলে লইয়া ঝি যতক্ষণ না ফিরিয়া আসিল
ততক্ষণ তাহার স্বস্তি রহিল না ।
ঝির কাছ হ হাসিয়া টুকুনকে নিজের কোলে
লইয়া চুমা খাইয়া সৌদামিনী জিজ্ঞাসা করিল, “সে কি
করছে রে ?
থাকো বলিল, কি আর করবে মা, কঁদছে বসে
বসে।
‘কেন, পুকুরের ঘাট ছাড়া কঁাদবায় আর জায়গা
হােলল না ?
বলিয়া সে উত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়া ছেলেকে
আদর করিতে লাগিল।
৭৮
:

নন্দিনী
ঘাট হইতে ফিরিয়াই মল্লিকা সেদিন কঁাদ-কঁাদ
মুখে মার কাছে গিয়া দাড়াইল। বলিল, “আমায়
শশুরবাড়ী পাঠিয়ে দাও মা!”
সৌদামিনীর মনের অবস্থা ভাল ছিল না। বেশ
একটু রাগ করিয়াই বলিল, 'সেখানে কে আছে তাের
যে, শশুরবাড়ী যাবি ?
মল্লিকা তাহার কান্নাটা কোনােরকমে এতক্ষণ
চাপিয়া ছিল, এইবার সে আবার কঁদিয়া ফেলিয়া বেশ
জোরে-জোরেই বলিল, “যেই থাক, সেইখানেই আমি
যাব।”
‘কেন ?
মল্লিকা বলিল, ‘কেন ? যাব না ত’ কি এইখানে
তােমাদের লাঞ্চিঝাঁটা খেয়ে আমায় থাকতে হবে ?
সৌদামিনী অত্যন্ত রুক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ‘কে
'তােকে লাথি-ঝাটা মারলে তা শুনি ?
ঠোটে ঠোটে একরকম শব্দ করিয়া মল্লিক। বলিল,
‘শুনতে চাও ? কেন, জান না?
সৌদামিনী চুপ করিয়া রহিল।
৭৯

নন্দিনী মল্লিকা প্রবলবেগে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না না না, পারব না---পারব না তােমাদের কাছে থাকতে, ওই ছেলে যে বড় হয়ে আমায় লাথি-ঝাটা মারবে, আর আমি দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের জন্যে.••না না তা হবে না, তা হবে না, আমায় পাঠিয়ে দাও। বলিয়া চোখে আঁচল চাপা দিয়া মল্লিকা ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। ছেলের কথায় মা তখন রাগে থর থর করিয়া কাপিতে কঁপিতে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, ‘ও, তাই বুঝি তুই এ-ছেলের গলা টিপে মারতে চেয়েছিলি ? ও, তাই বুঝি তােরা দু’জনে ষড়যন্ত্র করে’ টুকুনকে আমার- মল্লিকার চোখ দিয়া তখনও দর করিয়া জল গড়াইতেছিল, ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ‘হ্যা, চেয়েছিলাম । চেয়েছিলামই ত! বলিতে বলিতে গলাটা তাহার বন্ধ হইয়া গেল। তাড়াতাড়ি পিছন ফিরিয়া খান হইতে সে চলিয়া যাইতেছিল, দেখিল, পশ্চাতে তাহার বাবা আসিয়া,

নন্দিনী
দাড়াইয়াছেন। সর্বনাশ ! লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া
মল্লিকা একবার থমকিয়া দাঁড়াইয়াই সেখান হইতে
দ্রুতপদে পলায়ন করিল।
শুনিল, বাবা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘কি, হলে কি
তোমাদের ?
মা বলিয়া উঠিল, ওগাে, তাড়াও, তাড়াও, তােমার
ওই শত্রুকে তাড়াও বাড়ী থেকে, নইলে তােমার এ
ছেলেকে একদিন ও হিংসেয় খুন করে ফেলবে।
বলিয়া ছেলেকে তাহার বুকে চাপিয়া ধরিয়া
সৌদামিনী কঁদিতে লাগিল।
এবং এই সামান্য ব্যাপারের ফল দাড়াইল এই যে
রাত্রে খাবার সময় ডাকিতে গিয়া মল্লিকাকে কোথাও
খুঁজিয়া পাওয়া গেল না। বাড়ী ছাড়িয়া কখন যে সে
চলিয়া গিয়াছে কেহ দেখে নাই ।
চারিদিকে খোঁজ, clাজ, পড়িয়া গেল।
{

নন্দিনী
সৌদামিনী সেই যে মেয়েকে তিরস্কার করিয়া
বির কোলে ছেলে দিয়া মেঝের উপর উপুড় হইয়া
পড়িয়া পড়িয়া কঁদিতে শুরু করিয়াছিল, সে-কান্না
তাহার তখনও থামে নাই। মল্লিকাকে খুঁজিয়া পাওয়া
যাইতেছে না শুনিয়াও সে তেমনি পড়িয়াই রহিল।
মাত্র সুখদা-ঝিকে একবার কাছে ডাকিয়া বলিল, “বাবুকে
বল্।
অবিনাশবাবু তাহার পূর্বেই খবর পাইয়াছেন।
পাইয়া অবধি তাহার ছুটাছুটির আর বিরাম নাই।
গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ী, প্রত্যেকটি স্থান, তন্ন তন্ন
করিয়া খুঁজিয়াও কোথাও তাহাকে যখন পাওয়া গেল
না, তিনি তখন জেলেদের ডাকিয়া পাঠাইলেন।
প্রত্যেকটি পুকুরে জাল ফেলিয়া দেখুক, গ্নে মনের দুঃখে
জলে ডুবিয়া আত্মহত্যা করিয়াছে কি না।
কিন্তু কোনও পুকুরেই মল্লিকার মৃতদেহের সন্ধান
মিলিল না।
তৎক্ষণাৎ লোেক ছুটিল হার শ্বশুরবাড়ীতে।
সেখানেও নাই ।
৮২

নন্দিনী
তবে সে গেল কোথায় ?
অবিনাশবাবু মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন ।
সৌদামিনী কঁদিতে লাগিল ।
কিন্তু একে জমিদারের বাড়ীর মেয়ে, তায় আবার
বিধবা যুবতী।
মান গেল, মৰ্যাদা গেল, অথচ বেশি গােলমাল
করিবার উপায় নাই।
গল্পের যবনিকা আমরা এইখানেই
এইখানেই টানিয়া
দিয়াছিলাম।: বলিবার আর আছেই বা কি?
বাংলাদেশে মল্লিকা মেয়ে হইয়া জন্মিয়াছে।
পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী সে নয়। লােভ
করিয়া যেমন সে সেদিকে হাত বাড়াইয়াছিল, তেমনি
উপযুক্ত শাস্তিই তাহার হইয়াছে। উহার জন্য দুঃখ
করা আমাদের অন্যায়।

নন্দিনী যাই হােক, সুদর্বি কুড়ি বৎসর আমরা আর কাহারও কোনও সংবাদ রাখি নাই। কুড়ি বৎসর পরে দেখা গেল, ছােট্ট একখানি গ্রামের পান্তে লাল কঁকরের ‘গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডের পাশে একটা বটগাছের তলায় কালাে রঙের একটি মোটরকার দাড়াইয়া আছে। কোথাকার কোন এক বাবু নাকি বন্দুক লইয়া পাখী শীকার করিতে আসিয়াছেন । বন্দুকের শব্দ পাইয়া দলে দলে গ্রামের ছেলে- মেয়েরা শীকারী দেখিতে যাইতেছিল। কাহারও বাপ- মা হয়ত ছেলেমেয়েদের জোর করিয়া ধরিয়া রাখিলেন। -“খবরদার আসনে বলছি, একটা গুলি যদি ধ করে’ এসে লাগে ত’--বাস্। কিন্তু কৌতূহলী ছেলের দলকে আটকাইয়া রাখা দায় ! দেখিতে দেখিতে গ্রামের মধ্যে রাষ্ট্র হইয়া গেল, —যিনি আসিয়াছেন, তিনি রাধানগরের জমিদারের ছেলে, কোট-প্যান্ট পরা সাহেবের মত চেহারা ! ছােট্ট গ্রামের ততােধিক ছােট এক জমিদারের, ৮৪ নন্দিনী ছোট একটি ঠাকুর-বাড়ী। ঠাকুর-বাড়ীর পাশেই ঘাট- বাঁধানো পুকুর। পুকুরের পাড়ে বড় বড় অনেক গুলি তেঁতুলের গাছ। হঠাৎ সেই তেঁতুলছের তলায় দুড়ন করিয়া একবার বন্দুকের আওয়াজ হইল। ঠাকুরের ভোগ- মন্দিরে বিধবা যে-মেয়েটি রান্না করিতেছিল, সংবাদটা তাহারও কানে গিয়া পেঁছিয়াছে ; গুলির আওয়াজে চমকিয়া উঠিয়া মেয়েটি তৎক্ষণাৎ খিড়কির দরজা খালিরা পুকুরের পাড়ে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিল, চমৎকার একটি ছেলে, সাদা ধপধপে সাহেবদের মত। গায়ের রং, মাথায় টুপি, হাতে বন্দুক, উপরের দিকে তাকাইয়া তেঁতুলগাছের তলায় দাঁড়াইয়া আছে। অতিকষ্টে বার-কত ঢোক গিলিয়া এদিক-ওদিক তাকাইয়া মেয়েটি ডাকিল, ‘টুকুন! ভাকিমাত্র অদম্য বাষ্পেচ্ছ্বাসে কণ্ঠ তাহার রুদ্ধ হইয়া গেল। চোখ দুইটি ছলছল্ করিতে লাগিল । কে ডাকিল বুঝিতে না পারিয়া ছেলেটি আচমকা পিছন ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘আপনি ডাকছেন ? ৮৫

নন্দিনী
।
মল্লিকা আর স্থির থাকিতে পারিল না। যে-মেয়ে
আজ বিশ বৎসর বাড়ী হইতে পালাইয়া আসিয়াছে, সে-
হতভাগীর পরিচয় দিয়া তার কাজ নাই।
হেঁটমুখে ঢােখের জল গোপন করিয়া রুদ্ধকণ্ঠে
কহিল, ‘না।•••ডাকিনি।
বলিয়াই সে থর থর করিয়া কঁপিতে কঁপিতে
পিছন্ ফিরিয়া চলিয়া আসিল।
ডাক্-নাম ধরিয়া কে কোথায় তাহাকে পিছু
ডাকিল তাহার সন্ধান লইবার মত অবসর তখন টুকুনের
নাই। যে-পাখীর সন্ধানে সে এতদূর ছুটিয়া আসিল,
সেই ঘুঘু আবার আকাশে উড়িয়াছে।•••তাহারই
সন্ধান করিতে করিতে সে বন্দুক হাতে লইয়া কয়েকটা
গাছের আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গেল।
পুষ্করিণীর পাষাণ-চত্বরে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মল্লিকা
চোখ মােছে আর দেখে—আবার চোখের জল গড়াইয়া
আসিয়া দৃষ্টি তাহার ঝাপসা করিয়া দেয়।

নন্দিনী
তবু দেখা যেন তাহার শেষই হয় না।
এদিকে বন্দুকের আওয়াজ শুনিয়া খিড়কির
দরজায় তখন পাড়ার দু’জন, বর্ষীয়সী মহিলা আসিয়া
দাড়াইয়াছে।
মল্লিকা ফিরিয়া আসিতেছিল, একজন বলিল,
“কি লা, সায়েব দেখতে গিয়েছিলি নাকি ? ইদিকে
তরকারি যে তাের পুড়ে গেল।
মল্লিকা বলিল, ‘সায়েব কেন হবে দিদি, আমার
ভাই।
‘ভাই ? বলিয়া মেয়েটা মুখ টিপিয়া ঈধৎ
হাসিয়া পাশের মেয়েটির গায়ে একটা ঠেলা দিয়া বিদ্রুপ
করিয়া বলিল, ‘জমিদারের ছেলে তাের ভাই ? মা’র
পেটের ভাই নয় ত?”
‘ভাই’ বল তাহার উচিত হয় নাই। এক
মা’র পেটের সন্তান ভাই আর বােন্। একজন
বড়লােক, একজন গরীব। লােকে ইহা . বিশ্বাস
করিবেই বা কেন ?
মল্লিকা তাড়াতাড়ি ভােগ-মন্দিরে গিয়া ঢুকি।
৮৭

নন্দিনী
খুন্তি দিয়া কড়াই এর তরকারিটা একবার নাড়িয়া
তাহারই শব্দে নিজের কণ্ঠস্বর মিলাইয়া ধার মৃদুকণ্ঠে
মল্লিকা আপন-মনেই প্রশ্ন, করিল, ‘ভাই টুকুন, আমার
মা বেঁচে আছেন ত? বাবা ?
বলিতে বলিতে বুকের ভিতরটা তাহার মােচড়
খাইয়া উঠিতেই সে ঝর ঝর করিয়া কঁদিয়া ফেলিল।
হাতের উটাপিঠে চোখের জল মুছিয়া সে উনান
হইতে তরকারি নামাইবার জন্য সাঁড়াশীটা তুলিয়া লইল।
সহসা বহুদূরে আবার একটা বন্দুকের আওয়াজ হইতেই
আচমকা চমকিয়া উঠিয়া কড়াই-শুদ্ধ গরম তরকারি
" তাহার পায়ের উপর উল্টাইয়া ফেলিয়া মল্লিকা ভাল
করিয়াই কঁদিতে বসিল।
:

জননী

No text on this page.

মেয়ে ত’ অনেকেরই হয়, কিন্তু এমন মেয়ে
সবাই বলে, “বাবা, জন্মে কখনও দেখিনি।
মেয়ে বড়লােকের, এবং শুধু বড়লােকের নয়-
ওই একমাত্র । বাল্যকালে মা মরিয়াছে, আদর-যত্নে ·
প্রতিপালিত, তের বছরের মেয়ে—মনে হয় যেন ষােলো
বছরের যুবতী। মােটা-সােটা কদাকার কুৎসিত নয়,
অস্থিচৰ্ম্মসার রােগা-পটকা নয়, পল্লীগ্রামের সতেজ
সবুজ'দেবদারুর মতই স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী।
বাবা ডাকেন, ‘শঙ্করী !
বাড়ীর ছাদের উপর শঙ্করীর গলার আওয়াজ
পাওয়া যায়। বলে, 'যাই।

নন্দিনী
যাই' বলিয়া আর আসে না। কেদারবাবুর ভয়
হয়। বর্ষায় পিছােল্ কাঠের সিঁড়ি দিয়া দস্যি মেয়ে
ছাদে উঠিয়াছে, পা হড়কাইয়া পড়িয়া যাইতেই-বা
কতক্ষণ ! রাগিয়া বলেন, ‘
ছাতে উঠেছিস্ কেন ?
নেমে আয় শগগির! নেমে আয় বলছি।
ছাদের কিনারে ছোট প্রাচীরের উপর মুখ
বাড়াইয়া শঙ্করী বলে, “কি বলছ তুমি বল না বাপু
ওইখান থেকে। দেখতে পাচ্ছি না—আমি--যু
ওড়াচ্ছি যে !
ঘুড়ি !•••কেদারবাবু অবাক্‌ ।
নিজেই শেষে ধীরে-ধীরে উঠিলেন।
সিড়িটার কাছে গিয়া ডাকিলেন, ‘আয় মা, নেমে আয়
শঙ্করী। ছি, ছি, ছাতে উঠে ঘুড়ি ওড়ানাে•••অত বড়
মেয়ে, লােকে দেখলে
বলিতে বলিতে হঠাৎ তিনি থামিয়া গেলেন।
বেশি কথা বলিবার উপায় নাই
শঙ্করীর মাথাটা বােধকরি আজ ঠাণ্ডা ছিল।
ছাদ হইতে নামিয়া আসিল। এবং নামিয়া আসিয়াই
ছাদের
৯২

নন্দিনী
বুড়ি ও লাটাইটা তাঁহার পায়ের কাছে ফেলিয়া দিয়া
বলিল, ‘ঘুড়ি ওড়াব তাও তােমাদের সহ্য হোলো না।
বাবা রে বাবা !
বলিয়াই সে ছুটিয়া পালাইতেছিল, কেদারবাবু ,
ধরিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, ‘ভবদেবের পেপে
গাছটা কে কেটেছে রে ? ভবদেব নালিশ করতে
এসেছিল।
শঙ্করী হাসিল। ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “হ্যা, দিয়েছি
কেটে। দিইছিই ত !
‘কেন কাটলে ? ছি ! পরের অনিষ্ট করতে
আছে কখনও? বলিয়া মেয়েকে তাহার আদর করিয়া
কেদারবাবু কাছে টানিয়া আনিলেন।
শঙ্করী, বলিল, ‘দেব না? ভব’দার বৌকে
বললাম, ওই পাকা পেঁপেটাদে বৌ, আমরা কেটে
কেটে খাই, এই সময় ভব’দা বাড়ী নেই।
মাগী কি-না আমায় যা তা বলে তেড়ে মারতে
এলাে।
যেমন কর্ম তেমনি ফুল। কেটেছি' বেশ
করেছি।
నం

নন্দিনী
•
কেদারবাবু বলিলেন, ‘ছি ! ও-কথা কি বলতে
আছে মা ! পেঁপে খাবার ইচ্ছে হয়েছিল, আমায় তুমি
বললে না কেন ?
শঙ্কৰী এবার মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল ;
কথাটার জবাব খুঁজিয়া পাইল না।
কেদারবাবু বলিলেন, ‘দশটি টাকা দিয়ে ভবদেবকে
বিদেয় করলাম। এমন করে জরিমানা আর আমি
কত দেব মা ? বল্ আর দুষ্টমি করবি নে !
ঘাড় হেঁট করিয়া শঙ্করী বলিল, না।
দিন-কয়েক পরেই দুর্গা পূজা।
কেদারবাবুরা তিন ভাই—তিন সরি। কিন্তু
এই পূজার সময় সকলেই একত্র হয়।
চারিদিকে লােকজনের ছুটাছুটি। কেদারবাবুর
বিশ্রামের আর এতটুকু অবসর নাই। শঙ্করীকে
ডাকিয়া বলিলেন, ‘দেখিস্ মা, পূজোর সময় আর
দৌরাত্যি করিস, নে যেন।
৯৪

নন্দিনী শঙ্করী বলিল, “কি যে বল বাবা তার ঠিক নেই। আমি বুঝি দৌরাত্যি করি ? কেদারবাবু ঈষৎ হাসিয়া তাহার কাজে চলিয়া গেলেন। দুর্গাবাড়ীর প্রকাণ্ড চত্বরে বড় বড় কাচা বাঁশের খুটি দিয়া সামিয়ানা খাটানো হইতেছে। রাণীগঞ্জ হইতে আলাের ঠিকাদার পঞ্চ তখন পাঁচ-পাঁচটা পাঞ্চ- লাইটে কেরােসিন তেল দিয়া পাম্প, করিতে সুরু করিয়াছে। এ বৎসর আর দেশােয়ালী যাত্রা হইবে । কলিকাতা হইতে সাবিত্রী অপেরা পার্টির প্রকাণ্ড দল আজ সকালের ট্রেণে তাহাদের গ্রামে আসিয়া পৌছিয়াছে। ধূমধামের আর তান্ত নাই। সন্ধ্যারপরে যাত্রা আরম্ভ। সংবাদ পাইয়া আশ- পাশের প্রায় দশ-বারােখানা গ্রামের লােক সন্ধ্যা হইতে না হইতেই সামিয়ানার নীচে জড়াে হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে আলাে জ্বলিল, আসর পাতা ইইল, বাজনা বাজিল, প্রােগ্রাম বিলি হইল, কিন্তু চারি ৯৫

নন্দিনী
দিকে এত এত লোকের ভিড়—গােলমাল কিছুতেই
থামে না !
বাবুদের বাড়ীর ছেলে সিল্কের জামা পরিয়া ছড়ি
হাতে লইয়া লােকগুলাকে বসাইয়া দিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া
গােলমাল চুপ করাইবার চেষ্টা করিতেছে।
তাই বলিয়া যাত্রা বন্ধ রাখা চলে না। সবাই
বলিতে লাগিল, যাত্রা আরম্ভ হইলেই গােলমাল
থামিবে।
দলের ম্যানেজার কেদারবাবুর হুকুম লইয়া
গিয়া আসর হইতে ঢং করিয়া একটা ঘণ্টা বাজাইয়া
দিলেন।
তৎক্ষণাৎ একদল সখী আসিয়া নাচিয়া নাচিয়া
গান আরম্ভ করিল।
অথচ গােলমাল তাহাতেও থামিল না ।
তাহার পরেই প্রথম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য, রাজপথ,
শ্রীকৃষ্ণের বক্ততা।
শ্রীকৃষ্ণের পরনে ভেলভেটের উপর সাল্লা-চুমকির
কাজ-করা পােষাকটা নিতান্ত খাটো হইয়াছিল বলিয়া
বেচারা ভাল করিয়া নড়িতে-চড়িতে পারিতেছিল না।
৯৬

নন্দিনী
তা না পারুক, ছােকরার রং কালাে হইলেও চেহারা
ভাললা, বক্ততাও সে করিতেছিল প্রাণপণে চীৎকার
করিয়া, কিন্তু তবু তার এক বর্ণও শােনা
যায় না।
কেষ্টর শেষ কথাটা শুনিতে না পাইয়া পাছে ঠিক
সময়ে আসরে ঢকিতে না পারে বলিয়া সাজঘর হইতে
রাধিকাকে অনেকখানি আগাইয়া আসিতে হইয়াছে।
আসরে ঢুকিবার ফটকের কাছাকাছি একটা
পানের দোকানের পাশে দাঁড়াইয়া
পাশে দাঁড়াইয়া রাধিকা বিড়ি
টানিতেছিল। নিজের বক্তৃতা শেষ করিয়া ঘাড় নাড়িয়া
চোখ টিপিয়া কেষ্ট তাহাকে আসিতে বলিল।
আসরে তখন হারমােনিয়ামে সুর দিয়াছে ।
রাধিকাকে গান গাহিয়া গাহিয়া ঢকিতে হইবে।
গানের প্রথম কলিটা আরম্ভ করিয়া হাসি-হাসি
মুখে সে কেষ্টর কাছে গিয়া দাঁড়াইল।
এবং যেই দাঁড়াননা, আর অমনি কপালে হাত
দিয়া ভেউ ভেউ করিয়া কান্না !
ব্যাপার দেখিয়া ত’ সকলেই অবাক! যারা
৭
৯৭

নন্দিনী
}
এতক্ষণ গােলমাল করিতেছিল, হঠাৎ তাহারা চুপ
করিয়া স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিল।
কোথা হইতে সজোরে একটা ঢিল আসিয়া
রাধিকার কপালে লাগিয়াছে।
এত বড় একটা ঢিল—ধ করিয়া আসিয়া লাগিল
তাহার কপালে ; বেচারা নিতান্ত ছেলেমানুষ,—কঁদিয়া
ফেলিবার কথাই।
কিন্তু এই এতগুলা লােকের মধ্যে কে যে ঢিল
ছুঁড়িয়াছে এবং কেন যে ঘুড়িয়াছে, কে জানে। তবে
ঢিলটা কোনদিক হইতে আসিয়াছে, কাছে যাহারা
বসিয়া ছিল তাহারা ঠিক বলিয়া দিল।
কেদারবাবুর ভাইপাে নরেশ গেল তাহার সন্ধান
করিতে।
আসরের লােকজন তখন ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে,
রাধিকাকে লইয়া।-“চুপ কর ! ছি ! কাদে না, ও আর
কী এমন হয়েছে! রক্ত ত’ পড়ে নি ?
সাজ-ঘরে টিঞ্চার আইডিন ছিল ; ম্যানেজার নিজে
গিয়া শিশিটা লইয়া আসিলেন। লােকজন সরাইয়া
৯৮

নন্দিনী
রাধিকার ফোঁটা-তিলক-কাটা কপালের এক পাশে
তাহাই খানিকটা লাগাইয়া দিয়া তিনি বলিতে লাগিলেন,
‘ওঠ,
বাবা ওঠ, ভারি ত’ একটু লেগেছে, তার আবার
ফুলে ফুলে কান্না দ্যাখাে ছেলের ! অমন কত লাগে ।
ওঠ, আমার যাত্রা মাটি হয়ে গেল। ওঠ, এইবার সব
চুপ করেছে, গানটা জমবে ভালাে। নাও হে নাও,
তােমরা আর হাঁ করে বসে থেকো না। লাগাও সঙ্গৎ!
বলিয়ায় তিনি একরকম জোর করিয়াই রাধিকাকে
দাড় করাইয়া দিলেন।
আবার গান চলিতে লাগিল।
শ্রোতারা তখন চুপ করিয়াছে।
কোরবাবু আসরের এক পাশে বসিয়া তামাক
টানিতেছিলেন, এমন সময় নরেশ তাহার ছড়ি হাতে
হন্তদন্ত হইয়া ছুটিতে ছুটিতে তাহার কাছে আসিয়া
বলিল, ‘আসুন।

নন্দিনী
হুকাটা অন্য হাতে দিয়া মুখ তুলিয়া কেদারবাবু
জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন রে ?
‘আসুন, আপনি একবার উঠেই আসুন না !
কেদারবাবু উঠিয়া তাহার পিছু পিছু চলিতে
লাগিলেন।
পূজার তিন দিন অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের পর
বিজয়াদশমী-কেদারবাবুর পা যেন আর
চলিতেছিল না।
তাহার বৈঠকখানার সুমুখে গিয়া নরেশ থকিয়া
দাঁড়াইল। বলিল, কে ঢিল ছুড়েছিল জানেন ?
নরেশ বলিল, “দেখুন খুলে। এই ঘরে আমি বন্ধ
করে রেখেছি।
কেদারবাবুর বুকের ভিতরটা ধ্বক্ করিয়া উঠিল
—শঙ্করী নয় ত ?
শিকল খুলিয়া দরজা ঠেলিয়া ঘরে ঢুকিতেই
দেখিলেন, জানালার পথে পাঞ্চ-লাইটের খানিকটা
আলো ঘরে আসিয়া ঢুকিয়াছে এবং সেই আলােকে স্পষ্ট

নন্দিনী
দেখা গেল, বসিবার চৌকিটার পাশে খােলা জানালার
ধারে দাড়াইয়া-শঙ্করী !
নরেশ বলিল, 'ওদের জয়ীর সঙ্গে পুকুরের পাড়ে
দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। বলে, ঢিল
ছুড়েছি বেশ করেছি। গােলমাল করছিল থামিয়ে
দিয়েছি।'
প্রত্যুত্তরে কেদারবাবু একটি কথাও বলিলেন না।
নরেশের হাতে ছিল বেতের ছড়ি। তাহাই তিনি কাড়িয়া
লইয়া নীরবে আগাইয়া গিয়া শঙ্করীর পিঠের উপর
সপ, সপ্ করিয়া সজোরে ঘা-কতক বসাইয়া দিলেন।
বেতের ছড়ি কাপড়-জামা ভেদ করিয়া শঙ্করীর
পিঠের চামড়ায় গিয়া লাগিল। মা গাে ! ৰলিয়া
উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া শরী আত্মরক্ষা করিবার
- জন্য চৌকির ও-পাশে গিয়া দাড়াইল।
কিন্তু তাহাতেও নিস্তার নাই। কেদারবাবুর মাথায়
তখন খুন চাপিয়াছে। চৌকিটা ডিঙ্গাইয়া গিয়া আবার
তিনি শঙ্করীর গায়ে মাথায় হাতে পিঠে যেখানে পাইলেন
সজোরে বেত চালাইতে লাগিলেন।

নন্দিনী
এবার আর শঙ্করী একটি কথাও উচ্চারণ করিল
, হাত দিয়া বার-কতক সে তাহার পিতার প্রহার
প্রতিরােধ করিবার চেষ্টা করিল মাত্র, কিন্তু কিছুতেই
পারিয়া শেষে দাতে দাতে চাপিয়া সে কাঠ হইয়া
দাড়াইয়া রহিল, আর চোখ দিয়া দর দর করিয়া
অনবরত জল গড়াইতে লাগিল।
চোখের সুমুখে এত মার নরেশেরও সহ্য হইয়া
উঠিয়াছিল।
কেদারবাবুকে একরকম জোর করিয়াই
সে সেখান হইতে টানিয়া আনিয়া দরজার শিকলটা
আবার টানিয়া দিয়া বলিল, “থাক, ও এই ঘরের মধ্যেই
বন্ধ থাক সারারাত। আপনি যান।
হাতের ছড়িটা ফেলিয়া দিয়া উন্মাদের মত
কেদারবাবু একবার বাহিরে গিয়া দাড়াইলেন, একবার
উঠানের উপর বারকতক পায়চারি করিলেন, তাহার পর ।
আপন মনেই বিড়বিড় করিয়া কি যেন বকিতে বকিতে
তাঁহার দোতলার ঘরে গিয়া খিল্ বন্ধ করিয়া বিছানার
উপর শুইয়া পড়িলেন। গত তিনটি দিনের মধ্যে এমন
করিয়া হাত-পা ছড়াইয়া শুইবার অবসর হার একটি
১০২;

নন্দিনী
মুহূর্তের জন্যও মিলে নাই,শুইবামাত্র তার ঘুমাইয়া
পড়িবার কথা , কিন্তু কন্যাকে প্রহার করিয়া আসিয়া
অবধি কিসের যেন একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ভিতরে ভিতরে
তাহাকে এমনিভাবে পীড়িত করিয়া তুলিতে লাগিল যে,
বহুক্ষণ পর্যন্ত শয়নে তাহার না হইল তৃপ্তি, চোখে
তঁাহার না আসিল ঘুম। শঙ্করীর মাতার মৃত্যুর পর
হইতে আজ অবধি শঙ্করীকে প্রহার করা দূরে থাক্‌
কোনাে দিন একটি রূঢ় কথা বলিয়া তাহাকে শাসন
করিতে তঁাহার কোথায় যেন বাধিয়াছে। অথচ আজ
তিনি এত বড় নিষ্ঠুর হইলেন কেমন করিয়া ! কেদারবাবু,
নিজেকেই নিজের আচরণের জন্য বারেবারে ধিক্কার
দিতে দিতে হঠাৎ কোন সময় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন,
রাত্রির শেষ প্রহরে কি যেন একটা দুঃস্বপ্ন দেখিয়া
চীৎকার করিয়া জাগিয়া উঠিলেন। অপরাধীর মত
ধীরে-ধীরে বিছানা হইতে উঠিয়া গিয়া অন্ধকারে
হাতড়াইয়া, দরজা খুলিলেন। সিড়ি দিয়া তাড়াতাড়ি
নামিয়া আসিয়া দেখেন, যাত্রা, কখন্ ভাঙ্গিয়া গেছে,
লােকজন কেহ কোথাও নাই, চারিদিক নিস্তব্ধ।

নন্দিনী
কেদারবাবু বৈঠকখানার দরজায় গিয়া দাড়াইলেন।
শিকল খুলিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া ঘরে ঢকিয়া
দেখিলেন, ঠাণ্ডা মেঝের উপর শঙ্করী কখন্ ঘুমাইয়া
পড়িয়াছে। রাত্রে হয় ত’ কিছুই সে খায় নাই, মা’র
খাইয়া হয় ত’ সে কাঁদিয়া কাঁদিয়া সারা হইয়াছে।
কেদারবাবু তাহার ঘুমন্ত মুখের পানে একদৃষ্টে কিয়ৎক্ষণ
তাকাইয়া থাকিয়া আবার তেমনি সন্তর্পণে বাহির হইয়া
আসিলেন।
বাহিরে আসিয়াই চীৎকার করিয়া ঝি-চাকরকে
ডাকাডাকি শুরু করিয়া দিলেন।
সকলেই সন্ত্রস্ত হইয়া তাহার কাছে আসিয়া
দাড়াইল।
কেদারবাবু বলিতে লাগিলেন, ‘বেরিয়ে যা সব
আমার বাড়ী থেকে—কালই দূর হয়ে যা ! কাউকে ,
চাই নে আমি।
কি অপরাধ যে তাহারা করিয়াছে কেহ বুঝিতে
পারিল না।
বাবুর চীৎকার শুনিয়া লণ্ঠন হাতে লইয়া তরু-ঝি
১০৪

নন্দিনী
বাহিরে আসিতেছিল, কেদারবাবু তাহাকেই উদ্দেশ
করিয়া বলিতে লাগিলেন, মেয়েটা যে সন্ধ্যে থেকে পড়ে
আছে বাইরের ঘরে, তা সে খেয়েছে কি না খেয়েছে,
বেঁচে আছে না মরেছে, সে সবই বুঝি আমায় দেখতে
হবে ? দূর, দূর ! কি জন্যে যে আছিস্ তােরা সব•••••
বেরাে বেরাে—আমার বাড়ী থেকে বেরাে! বাড়ীতে
একটা গিন্নি-বানি' বলিয়া কথাটা তাহার অসমাপ্ত
রাখিয়াই তিনি আবার তাহার শুইবার ঘরে চলিয়া
গেলেন।
নীচে ঝি-চাকরের জটলা চলিতে লাগিল।
কিয়ৎক্ষণ পরে তরু আসিয়া বাবুর দরজার কাছে
দাড়াইল। ভয়ে-ভয়ে বলিল, “মেয়ে ত’ কিছু খেলে না
বাবা !
কেদারবাবু তেমনি শুইয়া শুইয়াই জবাব দিলেন,
এই কি খাবার সময় না কি মানুষের ? এখন খেলে
তার অসুখ করবে, খাওয়াস্ নে কিছু।
‘খাবে কেমন করে বাবা ! গা-টা কেমন
ছাঁক্-ছাত্ করছে। জ্বর-জ্বালা কিছু হলাে কি না

নন্দিনী
।
তাই-বা কে জানে! বলিয়া ঝি সেখান হইতে চলিয়া
যাইতেছিল।
কেদারবাবু তড়াক্‌ করিয়া বিছানা হইতে লাফাইয়া
উঠিলেন। কি বললে তরু ? জ্বর ?
‘া বাবা, গায়ে হাত দিয়ে দেখি, গা যেন পুড়ে
যাচ্ছে।
‘হবে না ? বেশ হয়েছে। ঠাণ্ডা মেঝের ওপর
সারারাত...মর মরছি ছি, আমার মরণটা হলে বাঁচি
চ, দেখি।' বলিয়া তিনি ঝি'র পিছু পিছু পাশের ঘরে
গিয়া দেখিলেন, শঙ্করীকে তাহার বিছানার উপর আনিয়া
শােওয়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। গায়ে মাথায় হাত দিয়া
দেখিলেন, সত্যই জ্বর। ডাকিলে সাড়া দেয় না। বেহুস
অবস্থায় কোনাে রকমে সে এখানে আসিয়াই জ্বরের
ধমকে আবার ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
গ্রামে ডাক্তার নাই। বুড়া দয়াল কবিরাজকে
তৎক্ষণাৎ ডাকিয়া আনা হই। কোনও ভয় নাই
বলিয়া লাল-লাল গােটাকতক বড়ি তিনি দিয়া গেলেন।
কিন্তু তিন চার দিন পরে শঙ্করী যতক্ষণ পর্যন্ত না সম্পূর্ণ

নন্দিনী
নিরাময় হইয়া আবার তেমনি আগের মত ছুটাছুটি
দৌড়াদৌড়ি করিয়া বেড়াইতে লাগিল, ততক্ষণ পর্যন্ত
কেদারবাবুর আশঙ্কা, উদ্বেগ, এবং প্রার্থনার আর অন্য
রহিল না।
বিবাহ দিলে হয় ত’ তাহার এই চঞ্চলতা থামিয়া
যাইতে পারে ভাবিয়। কেদারবাবু এইবার শঙ্করার
বিবাহের চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
কিন্তু তাই-বা কেমন করিয়া সম্ভব । বিবাহের
পর কন্যা তাহার শ্বশুরবাড়ী চলিয়া যাইবে, একটি
দিনের জন্যও হয় ত তাহাকে আর তিনি দেখিতে
পাইবেন না, হয় ত' তাহার এই চঞ্চল স্বভাবের জন্য
শ্বশুর-শাশুড়ী তাহাকে নিষ্ঠুরভাবে তিরস্কার করিবে,
শাস্তি দিবে, অথচ বলিবার কিছু থাকিবে না, কন্যার
সম্পূর্ণ অধিকার পরের উপর ছাড়িয়া দিতে হইবে।
দু’তিনটা সম্বন্ধ তিনি নিজে ভাঙ্গিয়া দিলেন।
ভাল ঘর, ভাল বর, জমিদারের ছেলে কিন্তু না,
১০৭

নন্দিনী
কেদারবাবু বলিলেন, ‘আর কিছুদিন পরে হলেই যেন
ভাল হয়। মেয়ে এখন আমার নিতান্ত ছােট। '
কিন্তু ছােট’র অজুহাত দেওয়া বুঝি আর চলে
।
বয়সকে ফাঁকি দিয়া শঙ্করী প্রতিদিন যেন বাড়িয়া
চলিয়াছে।
ঘটক তিনি নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাহারাই
মেয়ে দেখিবার জন্য বরপক্ষকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিতে
লাগিল। দু'একটা ভাঙ্গিয়া গেল কোষ্ঠীর মিল হইল
বলিয়া, দু'একটা ভাঙ্গিল টাকাকড়ির গােলমালে ।
কেদারবাবু মনে-মনে খুশীই হইলেন।
- *
কিন্তু ঘটকের কল্যাণে লােক আসা তখনও বন্ধ
হয় নাই। কন্যাপক্ষ বড়লােক। বিবাহ হােক আর
নাই হােক্, পাওনার লােভে মাসের মধ্যে অন্তত দু'টা
সম্বন্ধ তাহারা আনিবেই।
এবার যাহাদের
যাহাদের আনিল তাহারা বড়লােক।
১০৮ :

নন্দিনী কল্যাণচকের জমিদার। ছেলেটি কলিকাতায় থাকিয়া বি-এ পড়ে। এমনটি বােধ হয় একবারও আসে নাই। টাকার গাকুতি একরকম নাই বলিলেই হয়। মেয়েটি পছন্দ হইলেই তাহারা বিবাহ দিবেন—এইরূপ ইচ্ছা। কেদার- বাবু ভাবিলেন, হয় ত' তাহা হইলে এইখানেই হোক্। কিন্তু বিধির এমনি বিড়ম্বনা – গয়না কাপড় পরাইয়া পিঠে একপিঠ চুল খুলিয়া দিয়া শঙ্করীকে আনিয়া সেইখানে বসাইয়া দেওয়া হইল। পরমাসুন্দরী মেয়ে ! অপছন্দ হইবার কিছুই নাই। বরের বাবা নিজে দেখিতে আসিয়াছিলেন। শঙ্করীর আপাদ-মস্তক মুগ্ধদৃষ্টিতে একবার নিরীক্ষণ করিয়াই বলিলেন, এ আর দেখব কি। আহা চমৎকার মেয়ে ! তােমার নাম কি মা? লজ্জায় শঙ্করী মাথা হেঁট করিল না, কথা বলিতে গিয়া থতমত খাইল না, স্পষ্ট পরিষ্কার তাহার মুখের পানে তাকাইয়া বলিল, আমার নাম—শ্ৰীমতী শঙ্করী দেবী। ডাক-নাম টুনু। ১০৯

নন্দিনী
কেদারবাবু হাসিতে লাগিলেন।‘মেয়ে আমার
লিখতে পড়তে সবই জানে। কাজকম্ম রান্না-বান্না
সব দিকেই ওস্তাদ।'
শঙ্করী ঈষৎ হাসিয়া ঘাড় নাড়ল। বলিল, হে !
রান্না-বান্না আমি কিছু জানি না।
কেদারবাবু হঠাৎ অপ্রস্তুত হইয়া গিয়া বলিলেন,
‘তবে যে সেই সেদিন—মাছের ঝোলটা বলিলি আমি
রাঁধলাম !
শঙ্করী তাহার বাবার মুখের পানে তাকাইয়া বলিয়া
উঠিল, ‘বা রে ! তা আবার কখন্ বললাম ?
কেদারবাবুর অবস্থাটা বরকর্তা বুঝিয়াছিলেন, তাই
তিনি ব্যাপারটাকে তরল করিয়া দিবার জন্যই বােধ করি
হাে হাে করিয়া খুব খানিকটা হাসিয়া বলিলেন, ‘তা
বেশ, তা বেশ, তােমার বাবার দেখছ কি, সব মিছে
শঙ্করী একটা ঢোঁক, গিলিয়া বলিল ওদের পাচী
খুব ভাল রাধতে জানে। ওর মা ওকে শিখিয়েছে।
আমার মা নাই যে !

নন্দিনী
.
শেষের কথাটা সে এমনভাবে উচ্চারণ করিল যে,
বরকত্তার মুখের হাসি তৎক্ষণাৎ ম্লান হইয়া গেল।
বলিলেন, ‘তা হােক্, তুমি লেখাপড়া জাননা ত’ মা
তাহ'লেই হবে।
শঙ্করী ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “উহু! পড়তে
একটু-একটু পারি, কিন্তু লিখতে ভাল পারি না।
কেলাে-মাষ্টারের পাঠশালে দ্বিতীয় ভাগ’ পড়তাম। তা
কেলাৈ-মাষ্টার একদিন আমাকে মেরেছিল। আমিও
দিয়েছিলাম কামড়ে তার হাতটাকে ছিড়ে একেবারে
রক্ত বের করে। বাস, সেইদিন থেকে আর যাই না।
চিঠি লিখিয়া তাহার অভিমত জানাইবেন বলিয়া
বরকর্তা চলিয়া গেলেন।
তাহার পর এক সপ্তাহ যায়, দু সপ্তাহ যায়, চিঠি
আর তিনি লেখেন না।
ঘটক তখন নিজে একদিন তাহার সন্ধান করিতে
গেল।

নন্দিনী ফিরিয়া আসিয়া ঘাড় হেঁট করিয়া জানাইল, “আজ্ঞে না কর্তা, হ’লল না ওখানে। ছেলে এখন বিয়ে করতে রাজি নয়। কেদারবাবু একট। একট। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। বলিলেন, ‘হবে না তা আমি সেইদিনই জানি। হতভাগা মেয়ের অদৃষ্টে দুঃখু আছে। বলিয়া তিনি কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কি যেন ভাবিয়া বলিলেন, ‘এবার যা তুই যেখান থেকে পারি যেমন হােক নিয়ে আয় সম্বন্ধ,-আমি সেই- খানেই বিয়ে দেব। ঘটক বুঝিল, এটা নিছক্ রাগের কথা। বলিল, ‘তাহলে আজ্ঞে মাধবপাড়ার ওরা কি দোষ করেছিল ? ঘর ভাল, বর ভাল, পাঁচশ' টাকা বেশি চেয়েছিল বই ত’ নয়। তা রাজি হয়ে যান ত’ দেখুন আমি তাদেরই আবার ধরে নিয়ে আসি। কেদারবাবু বলিলেন, ‘তাই আন্। ১১২

নন্দিনী
তাহাই হইল ।
•
মাধবপাড়ার মুখুজ্যেরা মাঝারি-গােছের গৃহস্থ।
ছেলেটির বয়স একটুখানি বেশি, দেখিতেও তেমন সু ৷৷
নয়। তা হােক্, পুরুষ আবার সু৷৷ কু৷ আছে না
কি ?
একে বড়লােক, তায় আবার ওই একটি মাত্র
মেয়ে। পঁচিশ' টাকার একটা দাও কবিয়া রাখিয়া
ভিতরে ভিতরে তাহার প্রস্তুত হইয়াই ছিল
বরের বাপ আসিয়া তাহার পরের দিনই ধান-দূর্বা
এবং পাঁচটি টাকা হাতে দিয়া শঙ্করীকে আশীর্বাদ করিয়া
গেলেন।
বিবাহ যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালাে।
এবং হলও তাই।
বর দেখিয়া সকলেই অবাক।—যেমন রােগ,
তেমনি ঢ্যাঙ্গা,—তার না আছে মুখের , না আছে
চলার ছাদ
পাড়া-পড়শীরা কেদারবাবুর দোষ দিতে লাগিল।
‘মিনসে এদ্দিন ধরে তবে করছিল কী গা! ওমা!
১১৩

নন্দিনী
এত এত টাকা খরচ করে’ শেষে কি না এই বাঁদরটাকে
ধরে নিয়ে এলাে।
বয়স্কা যাহারা, তাহারা বলিল, ‘মিছে তক্ক মা, ও
যার যা বরাতে থাকে। মা-মরা মেয়ের সুখ হওয়া বড়
1
যুবতীরা রাত্রে বাসর জাগাইতে আসিয়া জামাইকে
লইয়া ঠাট্টা-তামাসা করিতে থাকে। বলে, “কি হে,
তােমার কি পানের দোকান ছিল না কি ভাই ?
জামাই রাগিয়া মুখ ভারি করিয়া কাহারও কথার
জবাব দেয় না। বলে, “যান আপনারা, আমার ঘুম
পেয়েছে, বিরক্ত করবেন না।'
জামাই যত রাগে মেয়েরা তত রাগায়।
শঙ্করী কিন্তু মুখ তুলিয়া একবার চাইয়াও দেখে
না।
}
ব্যাপারটা যে কেদারবাবু বুঝেন নাই তাহা নয়।
কিন্তু এখন আর বুঝিয়াই বা উপায় কি !
১১৪

নন্দিনী
বিবাহের সমস্ত ব্যাপার ঢুকাইয়া, নিজের ঘরে
গিয়া একটু হাত-পা ছড়াইয়া শুইতে তাহার তনেক
রাত্রি হইয়াছিল। কিন্তু রাত্রি অধিক হইলে কি হইবে,
ঘুম তাঁহার চোখে আসিল না। প্রথমেই মনে পড়িল
তঁাহার স্ত্রীকে।—-স্ত্রীর সেই অন্তিম-শয্যা। তিন মাস
রােগ ভােগ করিয়া সত্যই সে যেদিন বুঝিল আর বাঁচিবে
না, সেদিন চোখে তাহার সে কি করুণ দৃষ্টি ! মরিতে সে
চায়না, তবু তাহাকে মরিতে হইবে। শঙ্করীকে কাছে
ডাকিয়া বুকের উপর টানিয়া সে কা কান্না ! মুখে কথা
নাই, চোখ দিয়া শুধু ঝর ঝর করিয়া জল ঝরিতেছে।
শঙ্করীর হাতখানা তঁাহার হাতে ধরাইয়া দিয়া স্ত্রী তার
নিতান্ত করুণ কণ্ঠে কহিল, দেখাে।
শঙ্করী তখন নিতান্ত ছোট। ছোট হইলেও মৃত্যুর
অভিজ্ঞতা হয় ত’ তাহার হইয়াছে। মুখখানি শুনো।
চোখ দুইটি ছল্ ছল্ করিতেছিল ।
কেদারবাবু বলিলেন, “আঃ, ছি ! কি করছ গো!
আর-কিছু তিনি বলিতে পারেন নাই। বলিবার
ছিলই বা কি

নন্দিনী
তাহার দু'দিন পরে মৃত্যু! বাহিরে ঝম্ ঝ
করিয়া জল ঝরিতেছে। নীরব নিস্তব্ধ রাত্রি। পাশের
ঘরে শঙ্করী ঘুমাইতেছে। ঝি চাকর সকলকে বিদায়
করিয়া দিয়া বিছানার পাশে কেদারবাবু একাকা বসিয়া
আছেন।
থাকিয়া থাকিয়া আজ তাহার শুধু সেই দৃশ্যই মনে
পড়িতে লাগিল । আজ তােমার সেই শঙ্করীর বিবাহ।
আজ তুমি কোথায় ?
চোখের জল মুছিয়া তিনি বিছানার উপর ছটফট
করিতেছিলেন। জানালার পথে ঠাণ্ডা বাতাস আসিয়া
গায়ে লাগিতেই ঢাহিয়া দেখিলেন, প্রভাত হইতে আর
বেশি বিলম্ব নাই। জানালার বাহিরে তাহারই বাঁধানাে
পুকুরের পাশ দিয়া বাউরী কুলি-মজুরেরা গান গাহিতে
গাহিতে কয়লা-কুঠিতে কাজ করিতে চলিয়াছে। সুমুখে
সবুজ ধানের ক্ষেত—দূরে একটি গাছে-ঘেরা ছােট্ট গ্রামের
প্রান্তে গিয়া শেষ হইয়াছে। তাহারই মাথার উপর
রক্তবর্ণ রঞ্জিত আকাশ। বােধকরি সূর্যোদয় হইতেছে।
সেই দিক পানে কিয়ৎক্ষণ তিনি তাহার একাগ্র দৃষ্টি
১১৬

নন্দিনী
নিবদ্ধ করিয়া দাড়াইয়া রহিলেন। তার পর যুক্ত করে
বারম্বার প্রণাম করিতে করিতে তিনি আপন মনেই
বলিতে লাগিলেন, হে জ্যোতির্ময় দিবাকর, হে বিশ্বদেব,
মেয়ের বিবাহ দিয়া অপরাধ করি কি-না জানি না,
যদি করিয়া থাকি ত’ ক্ষমা করিও। শরীর সমস্ত
সুখ-দুঃখের ভার তােমারই হাস্তে সমপণ করলাম।
তাহকে সর্বপ্রকারে সুখী করিও।
পরদিন বিদায়ের পালা।
বর-কন্যা চলিয়া যাইবে। যে-শঙ্করীকে একটি
দিনের জন্য কেদারবাবু চোখের আড়াল করেন নাই,
সেই তাহাকেই আজ এক নিতান্ত অপরিচিত সংসারে
তাহার উপর সমস্ত দাবী-দাওয়া চিরজীবনের মত
পরিত্যাগ করিয়াই পাঠাইতে হইবে ।
অথচ উপায় নাই।
মাতৃহীনা কন্যার বিদায়ের আয়ােজন মুখ বুজিয়া
তিনি নিজেই করিতে লাগিলেন। দরজায় খিল বন্ধ
.
১১৭

ननिनौ করিয়া নূতন একটি প্রকাণ্ড বাক্সের ভিতর শঙ্করীর ভাল ভাল জামা কাপড়, সেমিজ সায়া, আতা এসেন্স, সাবান চিরুণী--এমন-কি মাথার কাটাটি পৰ্য্যন্ত পরিপাটি ভাবে সাজাইয়া বাক্সটি বন্ধ করিতে গিয়া বুকের ভিতরটা তাহার হু হু করিয়া উঠিল, বাকের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া অতি কষ্টে কান্নার বেগ দমন করিতে গিয়া দুই হতে মুখ চাপা দিয়া তিনি ভাল করিয়াই দিয়া ফেলিলেন। সকালে কুশণ্ডিকা হইয়া গেছে। শঙ্করীর সিথিতে সিদূর দিয়া মাথায় ঘোমটা টানিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহার পর হইতে সে আর তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়ায় সন্ধ্যায় নিজে খাইতে বসিয় কেদারবাবু গকিলেন, ‘শঙ্করী। কেদারবাবুর এক ভাই-ঝি ছিল কাছে দাঁড়াইয়া। শঙ্করীকে সে ডাকিয়া দিল। সর্বাঙ্গে সােনার অলঙ্কার। পরণে চমৎকার এক- খানি শাড়ী। সিথিতে সিদূর, কপালে সিঁদুরের টিপ। সলঞ্জ দেবী-প্রতিমার মত অপরূপ রূপলাবণ্যবতী নাই। ১১৮

নন্দিনী
শঙ্করী ধ'রে-ধীরে তাহার কাছে আসিয়া ডাকিল,
‘বাবা ।
কেদারবাবু হেঁটমুখে অন্যমনস্ক হইয়া কি যেন
ভাবিতেছিলেন। ডাক শুনিয়া মা বলিয়া মুখ তুলিয়া
চাহিলেন।
বলিবার কিছুই নাই, শুধু প্রাণ ভরিয়া একটিবার
দেখতে চান ! জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘খেয়েচি শঙ্করী ?
“না বাবা।
‘আয় তবে বােস এইখানে।'
শঙ্করী বসিল।
নিজের থালাটা দেখাইয়া দিয়া কেদারবাবু বলিলেন,
‘খ।
শঙ্করী বলিল, “তুমি খাবে না বাবা?
‘এই যে খাই।' বলিয়া থালা হইতে তিনি নিজেও
একখান লুচি তুলিয়া লইলেন।
তাহার পর বাল্যকালে শঙ্করীকে কাছে বসাইয়া
যেমন করিয়া খাওয়াইতেন, সেদিনও ঠিক তেমনি
করিয়াই খাওয়াইতে লাগিলেন ৷
১১৯

নন্দিনী
পরদিন প্রত্যুষে যাইবার দিন ।
পাকি আসিয়া দরজায় পঁাড়াইয়াছে।
লােকাচার-মতে কেদারবাবুকে কন্যার মুখে
তাঞ্জলি পাতিয়া দাড়াইতে হইল। ইঁদুরের গর্তে
বেওয়ারিশী চুরি-করা যে ঢাল থাকে, তাহাই একমুঠ
সংগ্রহ করিয়া আনিয়া শঙ্করী দাড়াইল তাহার পিতার
সম্মুখে।
মেয়েরা বলিয়া দিল, ‘ওই চালের মুঠোটা তাের
বাবার হাতে দিয়ে বল্—এতদিন তোমার যা খেয়েছি,
তােমার যা পরেছি, তা এই শােধ করে দিলাম।
চালের মুষ্টি পিতার প্রসারিত অঞ্জলিপুটে ফেলিয়া
দিয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও শঙ্করীকে তাহাই বলিতে হইল।
ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জ্ঞাপন করিতে গিয়া
কেদারবাবুর কি যে হইল কে জানে, দাতে দাত
চাপিয়া তাড়াতাড়ি সেখান হইতে এমনভাবে চলিয়া
গেলেন যে, শঙ্করী তাহাকে প্রণাম করিবারও অবসর
পাইল না।
এইবার শঙ্করী কঁদিয়া ফেলিল। মেয়েরা

নন্দিনী তাহাকে চুপ করাইতে করাইতে গাঁটছড়া-কাপ। পরের সঙ্গে পালকির কাছে লইয়া গেল। রৌদ্র বেশি হইতেছিল, বলিয়া বেহারারা অধৈয্য হইয়া উঠিয়াছিল। শঙ্কর। কিন্তু কিছুতেই পাকিত চড়িতে চায় না, সজল চক্ষে বারে বারে শুধু সে এদিক- ওদিক তাকাইয়া কহিকে যেন খুজিতে থাকে । কিন্তু তাত-সব মনের কথা বুঝিবার মত বুদ্ধি সেখানে কাহারও ছিল না, শঙ্করীকে তারা একরকম জোর করিয়াই বরের পাশে পালকিতে বসাইয়া দিয়া কি একটা রসিকতা করিয়া বাড় দুইটা সশব্দে বন্ধ করিয়া দিল এবং বেহারারা তৎক্ষণাৎ পাকি তুলিয়া লইয়া চলিতে আরম্ভ করিল। কেদারবাবু এতক্ষণে দুটিতে ছুটিতে বাহিরে আসিয়া দাড়াইলেন। মেয়েরা তখন আপনা-আপন বাড়ীর' দিকে চলিতেছে ; কে একজন বর্ষিয়সী মহিলা কহিল, ‘চলৈ’ গেল বাছা তুমি এতক্ষণে এলে ? “হ্যা এই জামাটা। বলিয়া তিনি তাহার নিজেরই হাতের পানে তাকাইয়া সবিস্ময়ে দেখিলেন, নন্দিনী জামা তিনি আনিতে ভুলিয়াছেন; এবং জামার ছুতা করিয়া কন্যার মুখখানি আর-একবার দেখিবার সুযােগ হয়ত-বা তাহার হইলেও হইতে পারি, কিন্তু পাকি তখন অনেক দূরে। পাঁচ দিন পরে শঙ্করী ফিরিল। অষ্টমঙ্গলার পর আবার গেল, আবার আসিল। এবার কিন্তু জামাই আসিয়াই শশুরমহাশয়কে একটি প্রণাম করিয়া পকেট হইতে একখানি চিঠি বাহির করিয়া তাহার হাতে দিয়া বলিল, “বাবা দিয়েছেন। বৈবাহিকের চিঠি। চিঠিখানি কেদরবাবু তৎ- ক্ষণাৎ পড়িয়া ফেলিলেন। যথাযােগ্য নমস্কারান্তে তিনি নিবেদন করিয়াছেন—“দু’দিন পরেই বিপিনের - সঙ্গে শ্রীমতী বধূমাতাকে এ-বাটি পাঠাইয়া দিবেন। সেইজন্যই বিপিনকে সঙ্গে দিলাম। বধূর্মাতার বয়স হইয়াছে, কিন্তু আপনার বাড়ীতে অভিভাবিকা কেহ নাই বলিয়াই হােক্ কিম্বা যে-কোনও কারণেই হােক্, তাহার ১২২

নন্দিনী
বুদ্ধি-শুদ্ধি এখনও পরিপক্ক হয় নাই। তাহাকে এখন
কিছুদিন আমরা এইখানেই রাখিব। ইহাতে কোনো
প্রকারেই অন্যমত করিবেন না। আপনার বৈবাহিকার
এবং
এবং আমার কন্যাদের তাহাই ইচ্ছা জানিবেন
পাঠাইতে অন্যথা যেন না হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
চিঠিখানি মুড়িয়া রাখিয়া কেদারবাবু একটি দণি-
নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন, “বেশ, তাই হবে।
বলিলেন বটে, কিন্তু মনের মধ্যে তাহার অহরহ
শুধু এই কথাটাই বারেবারে উদয় হইতে লাগিল যে,
বিবাহের পর, সেদিন সেই বিদায়ের মুহূর্তে কন্যা তাহার
সমস্ত ঋণ পরিশােধ করিয়া দিয়াছে। কন্যার উপর
আর বোনও
বোনও অধিকারই তাহার নাই। বৈবাহিক
লিখিয়াছেন, বধূমাতার বয়স ইয়াছে কিন্তু বুদ্ধি তাহার
এখনও পরিপক্ক হয় নাই। মেয়েটা হয় ত’ সেখানে
গিয়াও তাহার স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা প্রকাশ করিয়াছে,
হয় ত’ এমন-কিছু করিয়া বসিয়াছে, যাহার জন্য তাহারা
চটিয়া গিয়াছেন এবং সেইজন্যই বােধ করি তাহার এই
শাস্তির ব্যবস্থা।

নন্দিনী
বাড়াতে গৃহিণী নাই। কেদারবাবু কি আর
করেন, শঙ্করীকে কাছে ডাকিয়া পাশে বসাইয়া পিঠে হাত
দিয়া, মুখের পানে একাগ্র দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ তাকাইয়া
থাকিয়া কহিলেন, সেখানে তাের কষ্ট হয় নি ত’ মা ?”
শঙ্করী মুখ তুলিয়া বলিল, “হ্যা বাবা, হয়েছিল ।
ওখানে আর আমায় পাঠিয়ে না কিন্তু। আমি যাব না
বলে দিচ্ছি।
কেদারবাবুর বুকের ভিতরটা সহসা ছাৎ করিয়া
উঠিল কন্যার পিঠের উপর ধারে-ধীরে হাত বুলাইতে
বুলাইতে বলিলেন, “ছি মা, ও-কথা কি বলতে আছে ?
যাবে, আবার আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব।
শঙ্করী বলিল, ‘প্রথমবারে কেউ কিছু বলে নি
বাবা, কিন্তু এবারে গিয়েআমি খুব কেঁদে ফেলেছিলাম।
সত্যি বলছি বাবা, আর আমায় পাঠিয়ে না তুমি।
বলিতে গিয়া চোখ দুইটা তাহার জলে ভরিয়া আসিল।
বলিল, ‘একদিন একটা কাচের গেলাস ভেঙ্গে
ফেলেছিলাম, আর একদিন মার্বেল খেলেছিলাম, আর
লাটু ঘুরিয়েছিলাম—সেই পিন্ট, বলে একটা ছেলে

নন্দিনী
তাছে আমার ঠাকুরানর,—সেই তার সঙ্গে। আর
কিচ্ছ, করি নি বাবা, না-কালার দিব্যি করে বলছি ।
তাইতে আমার সে কী বুবুন ! শাশুড়া-নাগা ত’
একেবারে মা-না-ইচ্ছে তাই ! * সারারাত আমি তোমার
জান্যে কেঁদেছিলাম।”
কেদারবাবু হেট মুখে কিছুক্ষণ কি নেন ভাবলেন,
তাহার পর ধীরে-ধারে শঙ্করাকে অনেক কথাই
বুঝাইরার চেস্টা করিলেন। কিন্তু শরীর সেই এক
কথা—‘আমি আর গেলে ত !
নিরুপায় হইয়া কেদারবার তাহার ভাই-বিকে
ডাকিয়া পাঠাইলেন। বলিলেন, “দ্যাখ, মা তোরা যদি
পারিস ওকে কোনও রকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে---
এবং শুধু ভাই-ঝি নয়, পাড়ার মেয়েরা সকলে
মিলিয়া শঙ্করীকে সেইদিন হইতে বুঝাইবার চেষ্টা
করিতে লাগিল। কিন্তু শ্বশুরবাড়ী যাওয়ার কথা বুঝানাে
দূরে থাক, এতগুলো মেয়ে—একটিবারের জন্যও, এমন
কি জোর করিয়া তাহাকে, কেহ জামাইএর কাছে
লইয়া যাইতে পারিল না।
?

নন্দিনী
বপিনকে শেষে অগত্যা একাই ফিরিতে হইল।
কেদারবাবু আনেক অনুনয় বিনয় করিয়া বৈবাহিক
মহাশয়কে একখানি চিঠি লিখিয়া দিলেন। লিখিলেন,
‘ভাই আমাকে ক্ষমা করিও। কোনাে প্রকারেই এবার
আমি আপনার অনুরােধ রক্ষা করিতে পারিলাম না।
মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করিয়াছে। এ অবস্থায় তাহাকে
পাঠানাে বিপদজনক। আমি একা মানুষ। মেয়েটার
মা নাই যে বুঝাইবে। তাহা হইলেও আমি যত শীঘ্রপারি
তাহাকে বুঝাইয়া নিজে গিয়া আপনার বাড়ীতে দিয়া
আসিব।
‘পুনশ্চ-আপনি লিখিয়াছেন, আমার ময়ের বয়স
হইয়াছে। কিন্তু তাহা নয়। দেখিলে তাকে বড়
বলিয়া মনে হইলেও আমি ভগবানের নামে শপথ করিয়া
বলিতেছি, গত চৈত্র মাসে বয়স তাহার এই সবে বারাে
বৎসর পূর্ণ হইয়াছে, এখন সে তেরােয় চলিতেছে।
**

নন্দিনী
একটি বৎসর আর কোনও পক্ষের কোনও
।
উচ্চবাচ্য নাই।
.
আমের সময় আম, পূজার সময় জামা-কাপড়,
শীতের সময় শাল দিয়া কেদারবাবু ভঁহার জামাতাকে
‘ত করিয়া পাঠান, কিন্তু বরকত নীরব। বদমাতার
জন্য না পাঠান ত’, না দেন একখানা চিঠি।
কেদারবাবু মনে-মনে শান্বিত হইয়া উঠিলেও
বলেন, ‘না দিক্‌ । মেয়ের আমার ভাব কিছু
নেই।
শঙ্কর হাসিয়া-খেলিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়। মেয়েরা
তাহাকে (ছে ডাকিয়া তাহার বাড়ন্ত গড়নের প্রতি
ইঙ্গিত করি হাসি-ঠাট্ট উপহাস-বিদ্রুপ করে, শঙ্কর।
হয়ত-বা কখনও তাহাতে কান দেয় না, আবার
কখনও-বা রাগিয়া গিয়া মেয়েদের গায়ে থুতু দিয়া ঢিল
ছুড়িয়া তাহাদের পরাস্ত করিয়া ছুটিয়া পলায়।
এমনি করিয়া একা নির্ভাবনায় তাহার দিন কাটিতে
থাকে।
এমন দিনে হঠাৎ একেবারে অপ্রত্যাশিত ভাবে
১২৭

নন্দিনী
কেদারবাবুর কাছে তাহার বৈবাহিকের এক চিঠি
তাসিয়া হাজির ।
‘এবার যদি মেয়েকে আপনার না পাঠান তাহা
হইলে ছেলের আমি আবার বিবাহ দিব । এই আমার
শেষ চিঠি।
চিঠি পাইয়া কেদারবাবু এইবার একটুখানি শক্ত
হইয়া উঠিলেন। শঙ্করীকে বুঝাইবার কোনও চেষ্টাই
আর করিলেন না।
পুরােহিতকে দিয়া একটি দিন দেখাইয়া শঙ্করীকে
তাহার মামার বাড়ী লইয়া যাইতেছেন বলিয়া নিজেই
তাহাকে সঙ্গে করিয়া বৈবাহিকের কাছে গিয়া
উপস্থিত হইলেন। হাতে ধরিয়া ক্ষ। চাহিয়া
বলিলেন, ‘ছেলেমানুষ ভাই ওর দোষ-অপরাধ কিছু
নিও না।
বৈবাহিক-মহাশয় কথাটা শুনিয়া টপ, করিয়া
খানিকটা জিব বাহির করিয়া ফেলিলেন। বলিলেন,
‘রাধামাধব ! ও যে আমার ঘরের লক্ষমা ! এসাে মা
এসো! তবে কি না•••মেয়ে যদি তােমার এতই অবুঝ,
}
১২৮

নন্দিনী । বিয়েটা দেওয়া তােমার উচিত হয় নি। বেগানা- টামি হয়ে গেলেই পারতে।' শ্লেষের অর্থ তিনি বুঝিলেন। কিন্তু কন্যার পিতা, —বুঝিলেও কিছু বলিবার উপায় নাই। কন্যার কাছে বিদায় লইতে গিয়া দেখিলেন, শঙ্করী কঁদিতেছে। অন্তরাল হইতে বেয়ান-ঠাকুণের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, মেয়ের বয়েস না কি শুনলুম নেই-শাই লিখে পাঠিয়েছিলেন বারো, কিন্তু ভাই আমরা সব অসভ্য- র মানুষ, সব জিনিসই উটো বুঝি। ১২টকে তাই উটে নিয়েছিলুম।•••তা এতই যদি কঁদছ মা, তা বেশ হয়েছে, এক বছর পরে পায়ের বুলাে দিয়ে আমাদের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করেছ, এবার আবার বাপের গলা জড়িয়ে ধরে চলে যাও। বেদারবাবুর মুখ দিয়া একটি কথা ও বাহির হইল , ক্রন্দনরত কন্যাকে চুপ করাইবার চেষ্টাও করিলেন না, ধীরে-ধীরে শুধু আসি’ বলিয়া নিজের চোখের জল গােপন করিবার জন্য সেই যে তিনি তাড়াতাড়ি পিছন

নন্দিনী
ফিরিলেন, দুনিবার ইচ্ছা সত্ত্বেও মেয়ের মুখের পানে
আর-একবার ফিরিয়া তাকাইবার সাহসটুকু পণ্যন্ত তাহার
তার হইল না।
-
বিবাহ দিয়া যাহার দুরন্তপনা থামাইতে চাহিয়া-
ছিলেন, কেদারবাবু আজ আবার তাহাকেই ফিরিয়া
পাইতে চান।
এক শঙ্করীর অভাবেই সমস্ত বাড়ীখানি তাহার
দিবা-রাত্রি খা খা করিতে থাকে ; দাপাদাপি নাই,
ছুটাছুটি নাই, হাসি নাই, কান্না নাই, গােলমাল নাই,
সমস্ত পৃথিবী নিথর নিস্তব্ধ ; কোলাহলমুখরিত এই
শব্দময়ী ধরিত্রীর পরমায়ু যেন শেষ হইয়া গেছে।
শঙ্করী যে-ঘরে থাকিত, কেদারবাবু এক-এক সময়
নিঃশব্দ পদসঞ্চারে পা টিপিয়া টিপিয়া সকলের অলক্ষ্যে
সেই ঘরে প্রবেশ করেন ; নীলরঙের বাক্সটি তাহার
যেখানে থাকিত সেটি সেখানে নাই; আনলার অব্যবহৃত
কাপড়-জামা দিব্য পরিপাটি সাজানাে। কিন্তু এ

নন্দিনী পরিচ্ছন্নতা এখন আর তাহার ভাল লাগে না। শঙ্কর। থাকতে চারি দিক যেমন বিশৃঙ্খল হইয়া থাকিত, আজও তিনি তেমনিটি দেখিতে চান, চুপি চুপি তাহার কাপড় জামাগুলি নাড়িয়া ঢাড়িয়া দেখেন ; বুকের ভিতরটা হু করিয়া ওঠে, না জানি সেখানে সে কত কষ্টই না পাইতেছে•••! বারেবারে মনে হয় শুধু শাস্তি তাহার নিজের দেওয়া। তিনি নিম্মন নির। । এমন করিয়া কেদারবাবুর দিন যেন আর কটিতে চায় না। 'টি মাসের মধ্যে বৈবাহিকের কাছ হইতে একটি মাত্র চিঠির জবাব পাইয়াছিলেন। তাও আবার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। শঙ্করার কথা। তিনি কিছুই লেখেন নাই। ঘন ঘূন ‘তত্ব লইয়া লােক পাঠানো হয় ! লোক- জন ফিরিয়া আসিয়া বলে, শরী আপনার মস্ত মেয়ে হয়েছে দেখলাম বাবু, আমাদের সঙ্গে কথা বলে না।

নন্দিনী
কেদারবাবু ভাবেন, এইবার তিনি নিজে গিয়া
দেখিয়া আসিবেন। কিন্তু নিজের যাওয়া আর কোনো
ক্রমেই হইয়া ওঠে না। শঙ্করার শ্বশুর-শাশুড়ীর কথা-
গুলা মনে হইতেই সর্বশরীর কেমন যেন রী-রী করিতে
থাকে, আত্মসম্মানে কোথায় যেন বাজে।
কন্তু অপত্যস্নেহের জোয়ারে আত্মসম্মান ভাসিয়া
যায়। মনে-মনে সঙ্কল্প করেন, এবার আর কোনও
কথা নয়, এবার তিনি নিজে গিয়া কন্যাকে হার
একটিবার মাত্র চোখে দেখিয়া আসিবেন।
ইহাই স্থির করিয়া কেদারবাবু শরীর কাছে
যাইবার আয়ােজন করিতেছেন, এমন দিনে ৫াহস একটি
গরুর গাড়ীতে চড়িয়া শঙ্করী তাহার দরুঙ্গায় আসিয়া
নামিল।
কেদারবাবু আনন্দে একেবারে নির্বাক হইয়া
তাহার কাছে গিয়া দাড়াইলেন। বলিলেন, ‘হঠাৎ
•••কই চিঠিপত্র•••একটা খবর
শঙ্করী নীরবে তাহার আয়ত দুইটি চক্ষু পিতার
মুখের দিকে তুলিয়া আবার হেঁটমুখে দাঁড়াইয়া রহিল।
১৩২

নন্দিনী
গাড়োয়ান কাল হইতে তাহার বাটা মাইয়া
দিয়া কাপড়ের খটে-বাধা চিঠিখানি বাহির করিয়া
কেদারবাবুর পায়ের কাছে নামাইয়া দিয়াই ঢলিয়া
যাইতেছিল। বাবু বলিলেন, “কি রে, চলে যাচ্ছিস
গে, বোস, খেয়ে-দেয়ে সেই ও-বেলায় যাবি।
‘আজ্ঞে না, হুকু নেই।' বলিয়া গাড়োয়ানট
ঢলিয়া গেল।
কেদারবাবু চিঠিখানি খুলিয়া পড়িলেন।
সর্বনাশ!
বৈবাহিক লিখিয়াছেন,
পূরা ছয়টি মাস ক্রমাগত চেষ্টা করিয়াও কন্যাকে
আপনার শে আনিতে পারিলাম না।
অন্যান্য
গুরুজনদের কথা না হয় ছাড়িয়াই দিলাম, কিন্তু অতবড়
ধিলি মেয়ে হইয়াও স্বামীকে সে চিনিতে পারিল না,
এমনকি তাঁহাকে কিল চড় লাথি মারিতেও সে কস্তুর
' করে না, তাহাকে আর আমার বাড়ীতে রাখিতে সাহস
করিলাম না, আপনার মেয়ে আপনার কাছেই পাঠাইয়া
দিলাম।

নন্দিনী
চিঠি পড়িয়া কেদারবাবু আনন্দিত হইলেন।
বলিলেন, “বেশ হয়েছে। আমার মেয়ে আমার কাছে
আসবে না ত’ যাবে কোথায় ? আমি নিজে গিয়েই
নিয়ে আসতাম। শয়তান বেটারা মেয়েটাকে আমার
মেরে ফেলবার চেষ্টা করেছিল। বেশ হয়েছে মা, বেশ
হয়েছে, আচ্ছা হয়েছে।
কথাটা ধীরে ধীরে গ্রামের মধ্যে ছড়ায়া পড়িল।
ছড়াইয়া পড়িল এই ভাবে যে,—শরীকে তাহার
শশুর-শাশুড়ী তাড়াইয়া দিয়াছে, আর কখনও তাহাকে
লইয়া যাইবে না।
শঙ্করীর চেয়ে বয়সে যাহারা বড়, সেই সব মেয়েরা
তাহাকে ডাকিয়া ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করে, না মা, কিছু
জিজ্ঞেস করতে তােকে ভয় করে। হা লা, কেন
তাড়িয়ে দিয়েছে বল্ দেখি ?
১৪

নন্দিনী
।
শঙ্করী তাহাদের ভেংচি কাটিয়া জবাব দেয়, “হ্য,
তাড়িয়ে দিয়েছে। যা-খুশী তাই নি বলেই হলো।
কি না! তাড়িয়ে দিয়েছে তা দিয়েছে—তাতে তোমাদের
কি বাপু ?
সমবয়সী যাহার—সদ্য-বিবাহিত, শঙ্করীর সঙ্গে
পুকুরে স্নান করিতে গিয়া শশুরবাড়ীর কথা কয়, স্বামীর
গল্প করিতে গিয়া মশগুল হইয়া ওঠে।
‘ঙ্করীর সঙ্গে নীরুর ভাব যেন একটুখানি বেশি।
আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গিয়া নীরু তাহাকে জিজ্ঞাসা
করে, তােদর কি হয়েছিল লা?
শঙ্কর হাসিতে হাসিতে বলে, “শুনবি ?
বলিয়া তাহার কানে-কানে চুপি-চুপি অনেকক্ষণ
ধরিয়া কথা হয়।
তাহার পর দু'জনেই হাে হো করিয়া
হাসিয়া ওঠে।
নীরু বলে, “ওমা! এই কথা !
ঘাড় নাড়িয়া শঙ্করী বলে, “হ্যা !
নীরু বলে, “তবে যে বলৈ তােকে না-কি তাড়িয়ে
দিয়েছে ?
১৩৫

নন্দিনী
তাড়াইয়া দিবার কথাটা বলিতে শঙ্করীর লজ্জা
হয়। বলে, ‘হ্যা, তাড়িয়ে দিয়েছে না কচু! আনার
আসবে দেখি।
দিনকতক পরেই দেখা গেল, নীরকে যে-কথ' সে
বলিয়াছিল অত্যন্ত সন্তর্পণে, সেই কথা লইয়াই বিদের
বাড়ীতে প্রকাশ্যে আলােচনা চলিতেছে।
শঙ্করী গিয়াছিল ডাবিকে জিজ্ঞাসা করিতে
বৈকালে সে আজ বাঁধা-পুকুরে কাপড় কাচতে যাইবে
কি-না। জিজ্ঞাসা করিতে গিয়া সে তাহাদের উঠানের
পেয়ারা গাছটার নীচে দাঁড়াইয়া ছিল।
কলি তাহাকে দেখিবামাত্র হাসিয়া হাসিয়া
গড়াইয়া পড়িল। আঙুল বাড়াইয়া আর সবাইকে
দেখাইয়া দিয়া বলিল, “ওই দ্যাখ, কে এসেছে ! বলি
| লা, শঙ্করী, শােন্ শােন্ এই দিকে আয়!
‘কি বলছিস্? বলিয়া শঙ্করী আগাইয়া আসিল।
১৩৬

নন্দিনী
*
কলি জিজ্ঞাসা করল, ‘পরের গালে বুঝি
মেরেছিলি এক-ঢড় ?
মঙ্করী ।
রাগিয়া উঠিল। বলিল, “কে বনে
।
‘সবাই বলছে ।
শঙ্করী বলিল, “তারা দেখতে গিয়েছিল ববি ?
কলি বলিল, “দেখতে যাবে কেন, তুই-ই ?
বলোসি হাবিকে।
হা তাহাদের দলের মধ্যেই বসিয়া ছিল।
বলিল, “ ভাই, ও বলে নি, আমি শুনিছি, লিলির
কাছে।
লিলি বলিল, ‘আমি শুনেছি পাচির কাছে।
কিন্তু পাঁচি সেখানে অনুপস্থিত। সুতরাং মামাংস।
কিছুই হইল না। নারুর নামটা কেহই করিল না
দেখিয়া শঙ্করীর জোর বাড়িল। বলিল, “এই চললাম
আমি পাচির কাছে, না যদি বলা হয় –
১৩৭

নন্দিনী
সেই দিন হইতে কথাটা একরকম চাপাই পড়িয়া
গেছে। সে সম্বন্ধে কেহ আর কোনােরূপ উচ্চবাচ্য
।
করে না।
কথা উঠিলে বরং নিজেরাই চাপা দেয়। বলে,
‘কাজ কি ভাই পরের কথা নিয়ে। বলে, নিজের
ভাবনাই কে ভাবে তার ঠিক নেই।
কিন্তু মাসখানেক পরে নিজের ভাবনা ভুলিবার
মত একটা সংবাদের মত সংবাদ পাওয়া গেল,—ঙ্করীর
বর না-কি আবার বিবাহ করিয়াছে। সে তা তাহাকে
গ্রহণ করিবে না।
খবরটা সত্য কি না তাহারই যাচাই চলিতে লাগিল।
কেদারবাবু বলিলেন, হ্যা মা, সত্যি। কি করব
ব,—আমার—' বলিয়া কথাটা তিনি আর শেষ করিতে
পারিলেন না। কম্পিত হস্তে নিজের কপালটা দেখাইয়া
দিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া নিরতিশয় বেদনায় কাঠ হইয়া
বসিয়া রহিলেন।
*এ সংবাদ কিছুদিন আগে পাইলে শঙ্করী কি
করিত জানি না, কিন্তু সেদিন সে রাত্রির অন্ধকারে
১৩৮

নন্দিনী
বিচানায় শুইয়া কেবলমাত্র এপাশ-ওপাশ করিয়া ছটফট
করতে লাগিল। মাথার চুল ছিড়িয়া, হাত কামড়াইয়া,
উঠিয়া বসিয়া একাকী সেই নিন গৃহের স্তব্ধ অন্ধকারে
এমন-সব কাণ্ড করিতে আরম্ভ করিল যাহা দেখিলে মনে
হয় মেয়েটা হঠাৎ বুঝি-বা পাগল হইয়া গেছে।
কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে গোপনে সে যাহা করিল,
দিনের আলােকে কেহ সে-কথা টেরও পাইল না।
সকলে ভাবিয়াছিল, মেয়েটা সুন্দরী হলে কি
হইবে, দেমাগ, যাহার এত বেশি, স্বামী তাহার বিবাহ
করিয়া ভাল কাজই করিয়াছে। শঙ্করার গুমর এইবার
ভাঙ্গবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু অবাক্ কাণ্ড!
শঙ্করী দিব্যি হাসিয়া হাসিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়। এত
বড় যে একটা কাণ্ড ঘটিয়া গেছে তাহার এতটুকু
চিহ্নমাত্র,সে-মুখে কোথাও স্পষ্ট হইয়া ফুটিয়া ওঠে না।
কিন্তু, হিতৈষী মেয়েদের তাহা ভাল লাগিবে কেন ?
শঙ্করীর সঙ্গে দেখা হইবামাত্র কে-বা গালে হাত
দিয়া সাহানুভূতি জানায়—ও মা গাে। বলে, 'এমন
{
১৩৯

নন্দিনী
সুন্দর পিতিমের মত মেয়ে ছেড়ে মুখপোড়া কি না যার
একটা বিয়ে করলে !
আবার কেহ-বা শঙ্করকে খুঁচিয়া খচিয়া বলে,
‘বলি হ'লা, কোথাকার হাবা মেয়ে লা তুই ! गान
একটু দুঃখ হয় না তাের ! আমরা হলে ত’ কেঁদেই
সারা হতাম।'
শঙ্করী সেখান হইতে তাড়াতাড়ি পলাইতে পারিলে
বাড়ে।
।
হয় ত’ আড়ালে গিয়া আজকাল চুং। করিয়া
বসিয়া থাকে, কিন্তু নীরুর কাছে গিয়া দু’টা মনের
কথা কয়।
নীরুর সঙ্গেই ভাৰ যেন একটুখানি বেশি।
শেষে নীরুই একদিন আবিষ্কার করিল, শঙ্কর।
পােয়াতি -ওমা, সেই এসে অবধি ? কই এতদিন
তবে বলি নি যে লা ?
লজ্জায় শঙ্করীর কান পর্যন্ত রাঙা হইয়া উঠিল।
‘যাঃ! আমার লজ্জা করে।
কথাটা এ-কান ও-কান হইতে হইতে কেদারবাবুর
বলি,
১৪০

নন্দিনী
কানে গিয়া পৌছিল। নন্দে আত্মহারা হয়!' ঢােখ
দুইটা তাহার ছল্ চল্ করিতে লাগিল। তৎক্ষণাৎ তিনি
দুর্গার মন্দিরে গিয়া হাতজোড় করিয়া না না বলিয়া
ডাকিতে ডাকিতে প্রতিমার বোধহমুখে ভূলুণ্ঠিত হইয়া
কঁদিতে লাগিলেন।-- করুণাময়ী মা আমার, তুই
আমার মুখ রক্ষা করিয়াছিস্ ম : শঙ্করী নেন আমার
পুত্রবতী হইয়া সকল দুঃখ ভুলিতে পারে।'
শঙ্করীর তত্ত্বাবধানের জন্য সেইদিনই কেদারবাবু
গ্রামের একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণের মেয়েকে নিজের ঘরে
আনিয়া রাখিলেন। তাকে আড়ালে ডাকিয়া ভাল
করিয়া বুঝাইয়া বলিয়া দিলেন, শঙ্গরী ছেলেমানুষ,
কিছুই জানে না, তার সমস্ত ভার তােমার ওপর দিয়ে
আমি নিশ্চিন্ত হলাম না। চবিবশ দণ্টা তুমি যেন
তার কাছে কাছে থেকে।
কেদারবাবর আনন্দ যেন আর ধরে না।
সেদিন কি-একটা কাজের জন্য তিনি শহরে
গিয়াছিলেন। ফিরিয়া আসিয়া বাড়ীতে পা দিয়াই
ডাকিলেন, ‘শঙ্কর!
১৪১

নন্দিনী
'না ডাকিলে শঙ্করী আজকাল তাহার বাবার কাছে
আসিয়া দাঁড়ায় না। গায়ের কাপড়টা ভাল করিয়া
জড়াইয়া লইয়া শঙ্করী ধীরে ধীরে বাহিরে আসিয়া বলিল,
‘কি বাবা?
‘তোর জন্যে অজ কি এনেছি বল দেখি মা ?
শঙ্করী বলিল, “রােজ রোজ কী যে তুমি করছ
বাবা ।
হাসিয়া কেদারবাবু বলিলেন, “বল্ না পাগলী, কি
এনেছি বল!
শঙ্করী বলিল, “কোথায় আছে বল—দেখি
আগে।
‘হা, দেখে অমন সবাই বলতে পারে। পকেটে
আছে।”
শঙ্করী তঁাহার পকেটে হাত দিয়া বাহির করিল—
দুইটি পাকা আম।
পৌষ মাসে পাকা আম। দুর্লভ নিঃসন্দেহ।
শঙ্করী বলিল, ‘রােজ রােজ কেন এত খরচ কর
বা। আমার জন্যে ?
১৪২

নন্দিনী ‘কেন করি? কেদারবাবু হাসিয়া তাহার মেয়ের মুখের পানে তাকাইয়া বলিলেন, “তাের একটা ছেলেমেয়ে হােক্ আগে, তার পর বুঝবি।' এমনি প্রহ। যা তিনি কখনও করেন না, আজকাল তাই করিতে লাগিলেন। গ্রামের রাস্তা দিয়া পার হইয়া যাইতেমেনু, মাখন ময়রা তাহার চালায় বসিয়া উনানে কড়াই ছড়াইয়া ড়াইয়া বেগুনী ভাজিতেছে। কেদারবাবু পকিয়া দাড়াইয়া পড়িলেন—“কি হে মাখন, বেগুনী ভাজছ ? ‘আজ্ঞে হ্যা, লােকে আজকাল...শীতকাল কি না,•••' বলিতে বলিতে বোম-মাখা হাতেই মাখন একটি প্রণাম করিয়া তটস্থ হইয়া উঠিয়া দাড়াইল। পকেট হইতে চারিটি পয়সা বাহির করিয়া কেদার- বাবু বলিলেন, ‘দে ত’ বাবা, চার পয়সার। মেয়েটা বেগুনী খেতে বড় ভালবাসে। ১৩

নন্দিনী
যখন অবাক হইয়া গেল। অত বড় লোকটা
হাতে করিয়া চার পয়সার বেগুনী লইয়া যাইবে•••মাখন
বলিল, “আমি দিয়ে আসছি আজ্ঞে, আপনি বহন।
“না রে না, কাজ ছেড়ে তোকে আর যেতে হবে
, দে।
বলিয়া তিনি হাত পাতিয়া শালপাতার ঠোঙায়
বেগুনী লইয়া বাড়ী গেলেন।
কোনাে দিন হয় ত’ ছেলেরা পেয়ারা গাছে ফড়িয়া
পেয়ারা পাড়িতেছে । কেদারবাবু ধীরে-ধীরে তাহাদের
কাছে গিয়া দাড়াইলেন। বলিলেন, ‘কই দেখ রে, দে
দেখি দুটো পেয়ারা আমায় !
এমনি করিয়া আদর-যত্নে শঙ্করীর দিন কাটিতে
থাকে।
শঙ্করী আজকাল আর বড়-একটা বাড়ীর বাহির
হয় না, সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবেরাই তার কাছে আসিয়া
গল্প করে, বই পড়ে, তাস খেলে, গান গায়, বাজি রাখে ;
-বলে, 'শঙ্করীর মেয়ে হবে কি ছেলে হবে ঠিক করে
যে ধলতে পারবি তাকে পাঁচ টাকার সন্দেশ।
১৪৪

নন্দিনী কেহ বলে, মেয়ে। কেহ বলে, ছেলে।' “আচ্ছ। তবে দেখাই যাক, কার কথা ঠিক হয়।' দেখিতে দেখিতে দশটি মাস কাটিয়া গেল। | তাহার পর আষাঢ়ের এক বসণ-যুখর প্রভাতে শঙ্করীর,হইল একটি মেয়ে। ‘আমু, একটি ছেলে হ'লেই বেশ ভাল হতো। ‘তা হোক, মেয়ে ত’ আর কে নয় মা ! কেদারবাবু রাত্রির শেষ প্রহর হইতে দুর্গা-বাংলায় বসিয়া বসিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া স্তৰ পাঠ করিতে- ছিলেন। সংবাদ পাইয়া ভিজিয়া ভিজিয়া বাড়ী আসিয়া সর্বপ্রথমেই পঞ্জিক। খুলিয়া মেয়ের জন্মক্ষণ, তারিখ ইত্যাদি লিখিয়া রাখিলেন। সদ্যপ্রসূত শিশুর ক্রন্দন- ধ্বনি শুনিতে পাওয়া যাইতেছিল। ধাত্রী আসিয়া তাঁহাকে ডাকিয়া লইয়া গেল। একটি গিনি হাতে দিয়া কেদারবাবু নাৎনীর মুখ দেখিলেন। সাদা ধপ ধপ ১৪৫ নন্দিনী ; গায়ের রং, বড় বড় চোখ, মাথায় কৃষ্ণ কুঞ্চিত চুল•••বহু কাল পূর্বে শঙ্করার জন্মক্ষটি তার মনে পড়িল । সেও ঠিক এই রকমই দেখিতে হইয়াছিল। যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, “দেখতে অবিকল আমার শরীর মতই হয়েছে। বহু কালের বৃদ্ধ ধাত্রী শঙ্করীর জন্মদিনেও উপস্থিত ছিল; কিন্তু দেখিতে সেও ঠিক এই রকমটিই ছিল কি না সে-কথা আজ আর তাহার মনে নাই ; না থাকলেও ঘাড় নাড়িয়া কেদারবাবুর কথায় সায় দিল বলিল, ‘আজ্ঞে হ্যা বাবু, একেবারে হুবহু ঠিক মদের মত। কাপড় জামা বদলাইয়া শঙ্কর। তখন আঁতুড় ঘরের এক পাশে নিঞ্জীবের মত শুইয়া ছিল । কথা- গুলা তাহার কানে যাইতেই একাগ্র করুণ দৃষ্টিতে সে তাহার সদ্যোজাত কন্যার মুখের পানে তাকাইয়া, মনে- মনে সর্বদেবতার চরণে প্রণাম করিয়া জানাইল,-মেয়ে যদি দেখিতে ঠিক তাহারই মত হয় ক্ষতি নাই, কিন্তু হে ভাগ্যনিয়ন্তা, হে অদৃশ্য লিপিকার, কন্যার ললাট- লিপি যেন ঠিক তাহারই অদৃষ্টলিপির অনুরূপ ১৪৬

নন্দিনী
অনুকৃতির না হয় ; ল্যাবধি সেও যেন ঠিক কর
মত দুরন্ত চঞ্চল হইয়া জ্ঞান শুধু দুঃখ, দুভে,
আর বঞ্চনা সহ্য না কর ।
শঙ্করার শিশুকন্যা এতদিনের প্রত্যেকটি ঘটনা
লিপিবদ্ধ নাই-বা করলাম। করৰার প্রয়ােজন ও পিছু
তাকে ভাবি ভাবিয়া কেদারাবু তার ।
রাখিলেন—তাপর্ণা। পর্ণ।--দেবী দুর্গার নাম।
কেদারবাবু শঙ্করীকে বুঝাইয়া বলিলেন, ‘মার কাছে
আমি অনেক সাধ্য-সাধনা, অনেক আরাধনা করেছি
শঙ্কর, তাই মা আমার ঘরে জন্ম নিয়েছেন। মার পুজো
এ-বছর আমি কেমন করে’ করল দেখ।
পূজায়, সে-বৎসর সত্যই ধূমধামের আর অন্য
রহিল না। সমস্ত খরচ কেদারবাবু নিজে বহন
করিলেন ।
' তবে এত আনন্দের মধ্যেও একটি দুঃখ তাহার
১৪৭

নন্দিনী
বুকের মধ্যে অনির্বাপিত বহ্নিশিখার মত অহরহ
জুলিতে লাগিল। অপর্ণার জন্মাবধি আজ পর্যন্ত কত
চিঠি যে তিনি তাহার জামাতাকে লিখিয়াছেন, কতবার
গােপনে..যে তাহাকে ' আনিতে পাঠাইয়াছেন তাহার
ইয়ত্তা নাই, কিন্তু আসা দূরে থাক, জামাতা কিম্বা
বৈবাহিক—কেহই তাহার চিঠির একখানি জবাব পৰ্যন্ত
দেওয়া সঙ্গত মনে করে নাই।
করুক। অপর্ণাকে কোলে লইয়া,, তাহার
মুখের পানে তাকাইয়া, কেদারবাবু তাহার সমস্ত দুঃখ
ভুলিয়া যান; দিবারাত্রির মধ্যে অধিকাংশ সময় অপর্ণাকে
তিনি তঁাহার কাছে-কাছে রাখেন ; শঙ্করীকে ডাকিয়া
বলেন, ‘হা মা শঙ্করী, বুড়াে বয়েসে শেষে কি আমার
সেই জড়-ভরতের মত হলো না কি রে ?
আবার কখনও-বা ম্লান একটুখানি হাসিয়া বলেন,
‘অপর্ণা বড় হবে, তার বিয়ে দেবাে--ততদিন বাঁচব
ত’ মা ?”
শঙ্করী বলে, ‘বালাই ষাটু! ও-সব কথা কেন
বলছ বাবা ?
১৪৮

নন্দিনী
নিন্তু শঙ্করীর সদাই ভয় হয়, বাবা সে-রকম ভাবে
মেয়েটাকে আদর দিত সব করয়াছেন, শেষে সে ঠিক
তাহারই মত না হইয়া যায়। ' দুরন্ত চপল হওয়ার যে-
দুঃখ, সে-দুঃখ শঙ্করী আজ তাহার মৰ্ম্মে-মন্মে উপলব্ধি
করিয়াছে। ধন নয়, জন নয়, মান নয়, অট্টালিকা
এই আর্থ-সম্পদ, পিতার স্নেহ, বন্ধুর প্রীতি, এত সােহাগ,
এত' আদর, এত যত্ন,আজ সবই যেন তার কাছে
নিরর্থক; অন্তঃসারশূন্য, নিতান্ত অপ্রয়ােজনীয় বলিয়া
বােধ হইছে। নারী-জীবনের একমাত্র কাম---স্বামীর
এতটুকু স্নেহ-সােহাগ হইতে বঞ্চিত তাহার অপর্ণাও
যেন না হয় !
।
মেয়েটা তাই কঁদিয়া-কাটিয়া বায়না ধরিলে ওই
অতটুকু মেয়েকেও শঙ্করী নিতান্ত নিষ্ঠুরের মত চড়-
চাপড় মারিয়া চুপ করাইতে গিয়া আরও কঁদাইয়া দেয়।
কান্না শুনিয়া কেদারবার ছুটিয়া আসেন। রাগিয়া
শঙ্করী বলে, কঁাদু বাবা, এখন থেকে অত বেয়াড়া
হ’তে ওকে তুমি দিও না।
মেয়ে তাহার এতদিনে বুঝিয়াছে।
১৪৯

L নন্দিনী শঙ্করার মুখ-চোখের চেহারা দেখিয়া কেদার- বাবুকেও কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিতে হয়। পরে বলেন, কিন্তু দেখে নিস্ শঙ্করী, অপর্ণা দুরন্ত চঞ্চল কখনও হবে না। ও যে মা-দুর্গা এসেছে আমার বাড়ী, সে-কথা ত’ তোকে আগেই বলে দিয়েছি। পাঁচ বছরের অপর্ণ। একদিন তাহার এক খেলার সাথীকে এমন মার মারিল যে তাহার মা আসিয়া মেয়েটার কপালের রক্ত দেখাইয়া শঙ্করীকে অনেক কথাই শুনাইয়া দিয়া গেল। শঙ্করী আর না চাহিল বাটু, অপর্ণার মাথার উপর জোরে-জোরে গােটাকতক চড় বসাইয়া দিয়া তাহার কানে ধরিয়া হিড় হিড় করিয়া টানিতে টানিত কেদার- বাবুর কাছে লইয়া গিয়া বলিল, 'নাও বাবা, তােমার মা-দুগগার কীর্তি ছাখাে'! ভবানীর মেয়েটাকে এমন র মেরেছে যে, তার কপালের চামড়া কেটে রক্ত

নন্দিনী
৫
বেরিয়ে গেছে। আমি জানি বাবা, ওর অদৃষ্টে যে কি
আছে তা আমি জানি। বলিয়া অভিমান-ভরে সজল
চক্ষে শঙ্করী তাড়াতাড়ি সেখান হইতে চলিয়া গেল।
অপর্ণা হইয়াছে ঠিক শঙ্করীর মত। বাল্যকালে
দেখিতে সে ঠিক যেমনটি ছিল, অপও দেখিতে
ঠিক তেমনি হইয়াছে,--তেমনি দুরন্ত, তেমনি চপল।
শঙ্করীর এত প্রার্থনা, দেবতার কাছে এত মাথা
কুটা-কুটি সবই যেন ব্যর্থ করিয়া দিয়া অপর্ণা দিনে-দিনে
আরও বেশি দুর্দমনীয় হইয়া উঠিতে লাগিল।
মারিয়া, শাসন করিয়া শঙ্করী কোনাে প্রকারেই
যখন অপর্ণাকে বুঝাইয়া বশে আনিতে পারে না, তখন
সে দোষ দেয় তাহার বাবার। বলে, বাবাই আমার
যত নষ্টের মূল। আমার সর্বনাশের ত' আর বাকি
নেই, আবার মেয়েটারও সর্বনাশ না করে ছাড়বে না।
আমরা না হয় সহ্য করছি, পরে সহ্য করবে কেন মা ?
যাহারা শােনে, তাহারা হয় ত খোদামুদি করিয়া
বলে, “ছেলেমানুষ—অমন একটু-আধটু হয়ই, বড় হ'লে
শুধরে বাবে দেখাে।

নন্দিনী
শঙ্করী ঘাড় নাড়িয়া প্রতিবাদ করে। বলে, ‘ন।
মা, তা হয় না।
বলিয়া তাহার নিজেরু কথাটা মনে পড়িয়া যায় ।
একাকী কোনও নির্জন ঘরে গিয়া কাদিতে বসে ।
কল্পনায় সে যেন অপর্ণার ভবিষ্যৎ তাহার চোখের সুমুখে
দেখিতে পায়। মনে হয়, অপর্ণা বড় হইয়া শ্বশুরবাড়ী
গিয়াছে, সেখানে সকলে তাহাকে বাক্যবাণে জর্জরিত
করিতেছে, শাশুড়ী-ননদের অত্যাচারের আর সীমা নাই,
স্বামী তাহাকে দু’চক্ষে দেখিতে পারে না,অবশেষে
একদিন সকলে মিলিয়া জোট পাকাইয়া পরামর্শ করিয়া
তাহাকে তাড়াইয়া দিল। অভাগী মেয়ে আসিয়া দাড়াইল
মায়ের কাছে। কাহারও দুঃখ কাহাকেও মুখ ফুটিয়া
বলিবার জো নাই ! সারা জীবন ধরিয়া দু’জন দু’জনের
মুখের পানে চাহিয়া শুধু কান্না!—এই ত’ পরিণাম !
শঙ্করী শেষে আর পারিয়া উঠিল না। আশা
ভরসা সমস্তই পরিত্যাগ করিয়া মেয়ের হাল ছাড়িয়া
দিয়া একেবারে নির্বিকার উদাসীন হইয়া সঙ্গী-সাথীদের
সঙ্গে কথায়-গল্পে দিন কাটাইতে লাগিল। অপর্ণা যেন
১৫২

নন্দিনী
তাহার কেহই নয় ; তাহার সঙ্গে যেন তাহার কোনও
সম্বন্ধই নাই ।
মা’র কাছে অপর্ণা কেন-কিছুর জন্য নালিশ
করিতে আসিলে শঙ্করী বলে, ' আমি কি জানি : ২
বাবার কাছে যা।
বাবা বলেন, হ ম শঙ্করী, এমন করে মেয়ের
হাল ছেড়ে দিলে কেমন করে কি হবে বল ? তমি
আর কত দিন বাঁচব মা ?
সত্যই ত! বাবার বয়স হইয়াছে। আজ হোক
কাল হােক্ দশ দিন পরে হোক একদিন তাহাকে
বিদায়
লইতেই হইবে। সে কথাটা এতদিন
একটি দিনের জন্যও শঙ্করার মনে হয় নাই। আজ
হঠাৎ তিনি নিজেই কথাটা তাহাকে মনে করাইয়া
দিলেন। শঙ্করী তাহার ঘরে গিয়া একাকা তাহার
বিছানার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া, বহুক্ষণ ধরিয়া
। ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল।—“হে মা দুর্গা, হে মা
কালী, বাবাকে আমার তরও কিছুদিন বাঁচাইয়া
রাখিও।
--

নন্দিনী
শঙ্করীর ইচ্ছা, বারাে-তেরাে বছর বয়সে অপর্ণার
বিবাহ সে কিছুতেই দিবে না। অথচ কেদারবাবু
ঠিক ;
সেই একই কথা বলিয়া জেদ ধরিয়া বসিলেন,—“শরীর
আমার সত্যিই ভেঙ্গে পড়েছে মা, আর ত’ বেশি দিন
বাঁচব না, অপর্ণার বিয়েটা আমায় দেখে যেতে দে।
মুখে শঙ্করী কিছুই বলিতে পারিল না, কিন্তু মনে
মনে বলিল, হামেয়ে আমার মত হােক্ আর-কি !
তখন ত’ আর তুমি পুড়তে আসবে না, জ্বলে পুড়ে মরব
আমিই।
শঙ্করীকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া কেদারবাবু
জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন, ভাবছিস কি শঙ্করী ? বিয়ে
দেবার বুঝি তোর ইচ্ছে নেই ?
মাথা হেট করিয়া শঙ্করী বলিল, “আর-একটু বড়
না হলে বুদ্ধিসুদ্ধি·••
কথাটা সে আর শেষ করিতে পারিল না।
কেদারবাবু বলিলেন, ‘ভাবিনে মা, আমি
আশীর্বাদ করছি ওকে। ও সুখী হবে। তা নইলে
আমি আর দেখতে পাব না।
১৫৪

নন্দিনী
শঙ্করী ভাবিল, আশীর্বাদ তিনি তাহাকেও করিয়া-
ছিলেন। ও কথার কোনও মুল্য নাই। বাবার কাছে
স্পষ্ট করিয়া কিছু বলাও যায় না।
অথচ ওই দুরন্ত
মেয়ের এই এত কম বয়সে জোর করিয়া বিবাহ দিবেন
এবং তাহার ফলে শেষ পর্যন্ত সাহা ঘটিবে—ভুক্তভােগী
সে নিজে, তাহা বেশ ভাল করিয়াই জানে।
ছেলে
একটি বেশ ভালই পাওয়া গেল ।
মুক্তাজোড়ে বাড়ী। গরুর গাড়ীতে ঢাড়িয়া কেদারবাবু
নিজে গিয়া দেখিয়া আসিলেন। ছেলেটি দেখিতেও
চমৎকার। কলিকাতার কোন একটা কলেজে হাই-এ
পড়িতেছে। অপর্ণার সঙ্গে মানাইবে ভাল।
কেদারবাবু আর দেরি করিলেন না। গরমের
ছুটিতে ছেলেটি বাড়ী আসিল। সেই সময়েই তিনি
দিন স্থির করিয়া অপর্ণার বিবাহ চুকাইয়া দিলেন।

নন্দিনী
যেমন ছেলে তেমনি মেয়ে ।
পাশাপাশি দাড় করাইয়া কেদারবাবু রাজ্যের
লোক জড়াে করিতে লাগিলেন ।
তা দেখিবার বই বটে।
শঙ্করীকে শাশুড়ী বলিয়া মনেই হয় না।
জামাই প্রণাম করিলে পর লজ্জায় তাহার মুখ দিয়া
আশীর্বাদের কথা ফুটিল না। মনে-মনেই বলিল,
‘তােমরা সুখী হও। মায়ের মন,—আরও কত-কীই
যে বলিল তাহা একমাত্র অন্তর্যামীই জানেন।
আশীর্বাদ করিল বটে, কিন্তু বুকের ভিতরটা তাহার
দুরদুর করিতে লাগিল। নিজের বিবাহিত জীবনের
প্রতিদিনের তুচ্ছ ঘটনাটি পৰ্যন্ত তাজও সে ভুলিতে
পারে
মেয়েকে
তাহার
এবং চেনে বলিয়াই বেশি ভয় ! তাই সে তাহাদের
ঘরের মা-দুর্গা হইতে আরম্ভ করিয়া নূতন পুকুরের পাড়ে
তেঁতুলগাছের তলায় যে ব্রহ্মচারী-বাবাজি আছেন,
তাহাকে পৰ্যন্ত মনে-মনে তাহার সহস্র কোটি প্রণাম
জানাইয়া এই বলিয়া প্রার্থনা করিতে লাগিল যে,
নাই।
চেনে,
১৫৬

নন্দিনী
তাহার যা হইবার তা হইয়া গেছে, তেমনটি যেন আর
তাহার মেয়ের কপালে না হয় ।
কেদারবাবু কেমন করিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলেন
কে জানে। তাপর্ণার বিবাহ দিয়া দু’মাস পার হইতে
হইতেই হঠাৎ একদিন বৈকালে তাহার জুর হইল
এবং তিন দিন অবিশ্রান্ত জুরভোগের পর চারদিনের
দিন সকালে শঙ্করী ও অপর্ণাকে কাছে ডাকিয়া তাহাদের
গায়ে হাত দিয়া আশীর্বাদ করিয়া এবং তাহার জন্য
কোনরূপ চিন্তা করিতে না বলিয়া দিব্য সজ্ঞানে
দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলিয়া চক্ষু স্থির করিয়া দিলেন।
দেখিতে দেখিতে নাভিশ্বাস উঠিল এবং মিনিট-কয়েকের
মধ্যেই বার-কতক্ হিক্কা তুলিয়া তিনি শেষ নিশ্বাস
পরিত্যাগ করিলেন ।
শঙ্করী ঢাৎকার করিয়া কঁদিয়া উঠিল। তাপর্ণাও
কাদিতে লাগিল। ভাই, ভ্রাতৃবধূ, জ্ঞাতি কুটুম্ব, আত্মীয়-
স্বজন, পাড়াপড়শী সকলেই আসিয়া জড়াে হইল।
কেদারবাবুর অবশ্য মরিবার বয়স হইয়াছিল, দুঃখ
করিবার কিছু নাই। তবে শঙ্করী ছেলেমানুষ, তাহারই
১৫৭

নন্দিনী
মাথার উপর সব দিক রক্ষা করিবার ভার আসিয়া
পড়িল, এই যা দুঃখ ।
শঙ্করী এই ভয়ই করিয়াছিল। অপর্ণাকে লইয়া
যদি একটা-কিছু হয় 'এইবার সালাইবে কে ?
।
;
একমাস পরেই পূজা।
এ বৎসর শঙ্করীর চোখে পূজা আসিল কান্না
লইয়া। ষষ্ঠীর দিন হইতে সে কাদিতে তার করিয়াছিল,
চুপ করিল বিজয়ার দিন।
পূজার ছুটিতে শঙ্করীর জামাইটি কলিকাতা হইতে
বাড়ী আসিয়াছিল বিজয়ার দিন আসিল শাশুড়ীকে
প্রণাম করিতে। জামাইএর সুমুখে কান্নাকাটি করা
উচিত নয় বলিয়াই সে জোর করিয়াই কান্না চাপিয়া
রাখিল।
সরকারকে পাঠাইল পুকুরে মাছ ধরিতে এবং
সারাদিন ধরিয়া সেদিন সে জামাইএর সুখ-সুবিধার
আয়ােজনেই ব্যস্ত হইয়া রহিল।
১৫৮

নন্দিনী
.. কিন্তু সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে এক পর্ণার
চিন্তাটাই তাকে নিরতিশয় ব্যথার ম; নিরন্তর পডি
করিয়া তুলিতে লাগিল।
. উপরের দর জানাইবে: পাকিতে দেওয়া ইয়াছে,
কিন্তু একটিবারের জন্যও অপর্ণা সে-পথ মাড়ায় নাই।
রাত্রে তাজ সে তাকে সেখানে পাঠাইতে পারবে
কিনা কে জানে।
দিনের পর রাত্রি আসিল। শঙ্কর কাছে বসিয়া
জামাইকে পেট ভরিয়া খাওয়াইল, খাওয়া হয়। পরে
ঘরে পাঠাইয়া দিয়া অপর্ণাকে বলিল, “চল্।
অপর্ণা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, 'যা !
‘যা নয় মা, ওঠ, আর কেলেঙ্কার করিস নে।”
বলিয়া জোর করিয়া হাতে ধরিয়া তাহাকে টানিতে
টানিতে নিতান্ত নিল্লদের মত শঙ্করী তাহাকে উপরের
ঘরের ভিতর ঢ কাইয়া দিয়া দরজাট! বাহির হইতে
। টানিয়া বন্ধ করিয়া দিয়া আসিল
তাহার পর সমস্ত রাত্রি, শঙ্করীর চোখে আর ঘুম
নাই।

নন্দিনী
অতি প্রত্যুষে পা টিপিয়া টিপিয়া শঙ্করী তাহাদের
দরজার কাছে গিয়া কাণ পতিয়া দাঁড়াইল। তাহারা
ঘুাইতেছে। নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শােনা
যায় না। নিঃশব্দে দরজার শিকলটা খুলিয়া দিয়া সেখান
হইতে তেমনি চোরের মতই সে পলায়ন করিল
এমনি দিনের পর দিন।
কাহারও মুখে কোনও কথা নাই ।
অপর্ণাকে প্রত্যহ জোর করিয়াই দিয়া আসিতে
হয়। ভয়ে শঙ্করীর বুকের ভিতরটা দুরদুর করিতে
থাকে।
জামাইটির হাসি-হাসি মুখ। সর্বদাই হাসিয়া
হাসিয়া কথা কয়। কিন্তু অপর্ণার কথা কিছু তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিতে লজ্জা করে। অথচ অপর্ণাকে কোনও
কিছু জিজ্ঞাসা করিতে গেলে সে তাহার গায়ে থুতু
দিতে আসে।
তিন দিন পরে জামাই মাথা হেঁট করিয়া বলিল,
“মা, আজ আমি যাব বিকেলে।
জামাইএর মুখে ‘মা’ ডাক শুনিবামাত্র আনন্দে

নন্দিনী
?
শঙ্করীর আপাদমস্তক রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল । লল,
‘আজই যাবে ? কেন বাবা, আর দুদিন থেকেই যাও
না ! এখন ত’ ছুটি তোমার ?
জাই বলিল, 'না মা, পড়াশোনা••• অর বাবা
বলে দিয়েছিলেন......'
ইহার উপর আর কথা চলে না। মৌন নত মুখে
কিয়ৎক্ষণ দাড়াইয়া থাকিয়া গভীর একটা দাগনশ্বাস
ফেলিয়া পাকর ব্যবস্থা করিয়া রাখিবার জন্য শঙ্করা
তাহার সরকারকে ডাকিলা পাঠাইল ।
বেকালে কি আসিয়া জানাল, 'জামাইবাবুর মাথা
ধরেছে মা, আজ আর তার যাওয়া হবে না।
জামাইএর জন্য শঙ্করী জল-খাবার তৈরি করতে-
ছিল।--মাথা ধরেছে ? পঁড়ি। '
ধরেছে ? দাড়। ' মা এইখানে
একটু দেখে হাসি।' বলিয়া তাড়াতাড়ি সে উপরে
উঠিয়া গেল।
‘কি বাবা, মাথা ধরেছে সুধাংশু ?
দেখিল, চাদরটা গায়ে টানিয়া লইয়া সুধাংশু খাটের
উপর শুইয়া আছে। বলিল, ‘সান্ত।

নন্দিনী
দেখি। বলিয়া শিয়রের কাছে উঠিয়া বসিয়া
শঙ্করা তাহার কপালে হাত দিয়া বলিল, “কই না, গা ত’
গরম হয় নি।
এমন সময় ফিক্‌ফিক্‌ করিয়া চাপা হাসির শব্দে
সমস্ত ঘর যেন ভরিয়া গেল।
আচমকা চারিদিকে চাহিয়া শঙ্করী: কাহাকে
দেখিতে পাইল না; কিন্তু এ-হাসি যে অপর্ণার, শঙ্করী
তাহা বুঝিতে পারিয়াছিল। দুষ্ট, মেয়ে হয় ত বাহিরে
দাড়াইয়া হাসিতেছে! অজানা আতঙ্কে শঙ্করার বুকের
ভিতরটা ছ্যাৎ করিয়া উঠিল। সুধাংশু তাহার কন্যার
এই নির্লজ্জ ব্যবহারে পাছে কিছু মনে করে ভাবিয়া
আগে হইতেই সালাইয়া লইবার জন্য বলিল, মেয়েটা
ভারি চঞ্চল বাবা সুধা, তুমি কিছু মনে কোরাে না বাবা,
ছেলেমানুষ, অপরাধ নিয়াে না যেন।
এবার আর শুধু হাসি নয়, অপর্ণা হুস্ করিয়া
খাটের তলা হইতে বাহির হইয়া আসিল এবং হাসিতে
হাসিতে শায়িত সুধাংশুর গায়ে ঢলিয়া পড়িয়া বলিল,
‘বব ? বল্ব ?–না মা, ওর কিচ্ছ, হয়নি মা, মাথা
১৬২

নন্দিনী
ধরেছে বলে চালাকি করে শুয়ে আছে মা, ৪ আজ
যাবে না।'
“তাহলে আমিও বলি। বলিয়া তড়াক্‌ করিয়া
বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়া সুধাংশু বলিল, “ও আজ
আমায় 'এমন এক চড় মেরেছে মা! আমিও ওকে
এমন মার, মারব, আপনি কিছু তখন বলতে পাবেন
না বলে রাখছি।
বালিশটা অপর্ণা তাহার স্বামীর গায়ের উপর ছুড়িয়া
দিল। বলিল, ‘ধেৎ! বলব না বলে আবার শেষে...'
বলিয়া কৃত্রিম অভিমানভরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে উভয়ে
উভয়ের মুখের পানে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ক্ষণকাল তাকাইয়া
রহিল।
এ দৃশ্য শঙ্করী আজ কাহাকে ডাকিয়া আনিয়া
দেখাইবে ? চোখ দুইটি সহসা তাহার জলে ভরিয়া
আসিল। তাড়াতাড়ি ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়া
পাশের ঘরে সে তাহার বাবার বিছানার উপর লুটাইয়া
পড়িয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতে লাগিল।
শেষ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nandini

Author
Mukhopadhyay, Sri Sailajanand
Title
Nandini
File name
Nandini
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/08/5
Publisher
Gurudas Chattopadhaya And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
176
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Nandini - Story
DLI number
512982
Barcode
4990010020003.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
WCJxGzTH72e
Download PDF

Nandini