Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Hriday-pratidhwani
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
EVERYDESSIONE
হৃদয়-প্রতিধ্বনি
শ্ৰপুলিনবিহারী দত্ত বিরচিন্তা..
A schoolboy freak, unworthy praise or blame
I printed Older child on do the same.
'Tis pleasant, sure, to see one's pame in print ;
A book's a book, although there's pothing in to
Byron,
PAINTING
1
EXECUTED
NEATLY
কলিকাতা :
গােপীকৃষ্ণ পালের লেন নং ১৫:
নুতন বাঙ্গালা যন্ত্রে শ্রীদ্বারকানাথ বিদ্যার কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সন ১২৮৯।
No text on this page.
পরম স্নেহময়ী
স্বর্গীয় পিতামহীর
চরণেদ্দেশে
প্রণতি-নম্র
segons
গ্রন্থকার
কর্তৃক
ভক্তিভাবে
উৎসর্গীকৃত
হইল
১৫ই বৈশাখ-সম্বৎ ১৯৩৯
No text on this page.
সূচীপত্র পাতা মুড়িবেন না ••• ১ ... ৫ । ৩ ১০ ••• ••• ••• ১৬ ।। ১৯ ২১ ২২ ৫ । २८ ••• কেন বিষাদিত হৃদয় আমার? কোথা পাব সুখ ? প্রভাতে মিলন। বিভাবরী। মহারাষ্ট্রীয় রণ-গীত। নিদ্রা সম্বােধনে। ••• যৌবনে যােগিনী। শুষ্ক মালা। নিশীথ সময়ে, তটিনী হৃদয়ে। আশা-নৈরাশ্য-সংবাদ। অতীত জীবনালোক। কাহে ঝুরে আখি ? দুটি চাদ। কেন তােরে এত ভাল বাসি ? যামিনী। রূপ রবে কতক্ষণ? ফিরে পাব কি আবার? ললিত এসরাজ। ••• ২৭ ৩৭ । . ••• ৩৯ । ৪১ 82 . ••• ৫৩
•
বনদেবী।
শষ্যা কন্টক।
•••
প্রকৃতি সম্বােধনে।
স্বগীয় পিতামহীর চরণােদ্দেশে।
বিদায় বিদ্যালয়।
৬১ ৬৩ ৬৭
৭১
হৃদয় প্রতিনি।
কেন বিষাদিত হৃদয় আমার ?
হায়, কেন বিষাদিত হৃদয় আমার ?
কেন আঁধার বিজন ?
প্রসন্ন আকাশ-পটে মেঘের সঞ্চার--
বিভীষিকা কি কারণ?
ওরে মোর মন।
এ যে রে সুখের ধরা-
আনন্দ উৎসবে ভরা,
তুমি সুধু দুখানলে
কেন তবে মর জ্বলে ?
বল মোর মন।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
লক্ষণ;
বিমল আকাশে পাখী সমাগত প্রায়
বুঝে
ঝটিকা
অনুভব করি কিহে নিকট বাত্যায়
তাই বিষন্ন এমন?
ওরে মাের মন!
আমি যাহা বলি শােন,
পার তুমি যতক্ষণ,-
হও হে আনন্দময় ?
ভেব না ভবিষ্য ভয় ;
রে পাগল মন!
তথাপি না জানি কেন, অবােধ অন্তর,
মম না শুনি বচন,
উষ্ণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলি দিলি রে উত্তর,
মৰ্ম্ম করিয়া মথন।
ওরে মাের মন!
“সন্ধ্যাকালে নীলাকাশে
রাঙা রাঙা মেঘ হাসে,
রজনীর ছায়া তায়-
বল, কভু কি ছাপায় ?”
উত্তরিল মন।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
কোথা পাব সুখ ?
কোথা পাৰ সুখ, কে কবে আমারে ?
রাজার প্রাসাদে, গৃহীর আগারে,
দীনের কুটীরে,
দেবের মন্দিরে,
কোথায় না আমি, সুখ পাইবারে,
খুঁজিলাম এই ভবের বাজারে ?
==
শৈশব অবধি, সুখের সন্ধানে
ফিরিলাম আমি কত শত স্থানে,
ভীম হিমাচলে, সাগরের তলে,
সমতল ভূমে, মরুময় দেশে,
কোথা না গেলাম সুখের উদ্দেশে ?
সরলতাময় শৈশব সময়,
হিতাহিত বােধে অক্ষম হৃদয়,
শিশুগণ সঙ্গে ধূলা মাখি অঙ্গে-
হইত আনন্দ পুতুল খেলায় ;
এখন কি তাহে মন সুখ পায় ?
ও
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
পরে বিদ্যালয়ে একপাঠী সনে
বিজ্ঞান রহস্যে,
গণিত দর্শনে,
ভূগােল জ্যোতিষে, কাব্য ইতিহাসে,
পাইত আমােদ নবীন হৃদয়,
এখন সে সবে নাহি সুখােদয়।
তার পর সেই যৌবন সময়
নবীনা নারীর কোমল প্রণয়,
ভাবে গদগদ, প্রেমে বশম্বদ,
কতই আগ্রহ দেখিতে সে মুখ,
নয়নে নয়নে কি অসীম সুখ
মধুর সন্ধ্যায় প্রমােদ কাননে,
কুসুম রূপিণী প্রিয়ার মিলনে,
তুলি ফুলভার,
পরিতাম হার
দুজনে, বিরলে আনন্দ অপার ;
এবে সুখ তাহে নাহি কিছু আর ?
প্রভাত-কুসুম-সদৃশ নন্দনে,
স্নেহের প্রতিমা তনয়া রতনে,
কোলেতে লইতে,
হৃদয়ে ধরিতে,
জুড়ত জীবন, ভুলে যেত মন ;
এখন কি হেতু নহেরে তেমন ?
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
কুকুবের দেবের আরাধনা তরে,
অগাধ-তরঙ্গ অকূল-সাগরে,
মুকুতা তুলিতে, প্রবাল লভিতে,
ডুবি বার বার ভীম রত্নাকরে,
বাছিয়া লয়েছি তন্ন তন্ন করে।
কাঞ্চন রজত
আবার বসুধা-হৃদয় খুলিয়া,
আঁধার গভীর আকর খুঁজিয়া,
আদি ধাতু কত,
হীরা, পান্না, চুনি, আর মণি যত
করেছি সকলি নিজ হস্ত গত ।
সােণার প্রাঙ্গণে, হীরার মন্দিরে,
যশের পতাকা উড়ায়ে সমীরে,
কমল আসনে,
পূজেছি কমলা-যুগল-চরণে ;
এবে সুখ নাই ধন উপার্জনে।
কোমল ভূষণে,
বেণু, সপ্তপরা,
আবার কখন বিলাসভবনে,
উজল আলােকে, সুবাস পবনে,
মৃদঙ্গ, সেতারা,
কামিনী-চরণ-নূপুরের সনে
মিলি একানে বাজে মধুম্বনে ;
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
কুটিল কটাক্ষে চৌদিক মােহিয়া
আনিতম্ব বেণী পিছে দোলাইয়া,
নৃত্য গীত লয়ে, হাব ভাব চয়ে,
অঙ্গের বিক্ষেপে রূপের তরঙ্গ,
তুলি মৃদু মৃদু, জাগায়ে অনঙ্গ
নাচিত নর্তকী, মাতায়ে দর্শকে
সুধাপূর্ণ পাত্র ফিরিত চৌদিকে ;
সুমধুর তান,
সুললিত গান,
তখন সে সবে জুড়াত পরাণ ;
এবে তাহে হয় বিষ অনুমান!
কখন কুটুম্ব সমাজে বসিয়া
হাসায়ে সকলে, আপনি হাসিয়া,
তাস পাশ ধরে, খােস গল্প করে,
কভু তোষামােদে, কভু প্রশংসায়
তুষেছি সকলে, যে যেমন চায়।
হায়! এইরূপে আশার ছলনে,
কতই যতনে সুখের কারণে,
কতই দেখেছি, কতই ঠেকেছি,
কতই শিখেছি একে একে করে
সুখ অন্বেষণে ধরণী ভিতরে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। নব নব ভােগে জনমে আহলাদ, পুরাণ হলেই অমনি বিষাদ, বুঝিলাম সার, খুঁজিব না আর ; ধরণীতে কিছু নিত্য সুখ নাই- এ ভূলােক সুধু অসুখের ঠাই। ৯. একদা দাড়ায়ে যমুনা-পুলিনে, প্রদোষ সময়ে, ব্ৰজের বিপিনে, হৃদয়ের কথা, মরমের ব্যথা এই খেদ-গান, একাকী বিজনে গাইতেছিলাম আপনার মনে। গীত শেষ হােলাে, অমনি তখনি স্বর্গীয় সৌরভে ভরিল মেদিনী, অগ্রা-বীণার সম সুললিত, মেদুর পবনে এই কথাগুলি আনিল শ্রবণে।- মধুর ঝঙ্কার “ধর বৎস, ধর মম উপদেশ, যদি চাও নিত্য সুখের উদ্দেশ, দুঃখ দূর হবে, চির সুখে রবে, মনের মালিন্য, হৃদয় বিকার, ঘুচিবে মানব-জ্ঞানের আঁধার।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
ধনের গৌরব,
“কৃত্রিম আমােদ, মান, অহঙ্কার,
বিষয়-লালসা কর পরিহার ;
বিদ্যার সৌরভ,
অলস বিলাস, ইন্দ্রিয়ের আশা,
ত্যাগ কর যত পার্থিব-পিপাসা।
“দুষ্ট রিপুচয়ে কর হে দমন,
নিন্দা তােষামােদে দিওনাকো মন,
সুখের সন্ধানে ফিরি স্থানে স্থানে,
যতই বেড়াবে তুমি ঘুরে ঘুরে,
ততই তােমার সুখ যাবে দূরে।
“মানবের জ্ঞান ভ্রান্তি-জাল ভরা
মানবের গ্রন্থ কপটতা পােরা;
হেন জ্ঞান তরে, হেন গ্রন্থ পড়ে
করিওনা বৃথা সময় ক্ষেপণ,
প্রকৃতির পুথি কর অধ্যয়ন।
“তাহলেই পাবে সুখ অবিনাশী
যার তরে তুমি এত অভিলাষী,
প্রকৃতির পত্র, স্বভাবের ছত্র,
আনন্দের উৎস, সুখের আকর,
বিরাজে সন্তোষ যাহে নিরন্তর।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
“চাদের আলােকে, রবির কিরণে,
ভীম প্রভঞ্জন, মৃদু সমীরণে,
ভ্রমর-ঝঙ্কারে, কেশরী-হুঙ্কারে,
সলিল-প্রপাতে, তুটিনী-হিল্লোলে
উষ্ণ প্রস্রবণে, সাগর-কল্লোলে,
“কুসুম-সৌরভে, কোকিল-কূজনে,
শৈবালের দলে, কমল-কাননে,
পত্রের মর্মরে, বিমল নিঝরে
তরুতে, মরুতে, মাটিতে, গগনে,
জন-কোলাহলে, অথবা বিজনে,
“প্রকৃতির রাজ্যে যেখানে যাইবে,
অবিচল সুখ সেখানে পাইবে।
সৃষ্টির মাঝারে দেখিতে স্রষ্টারে
সদা সাবধানে করিবে সাধনা,
নিসর্গ-সন্দর্ভ যাহার রচনা।
“সুখের দুঃখের মনই জনক,
মনেই স্বরগ, মনেই নরক,
শান্তি বিনােদিনী সুখের জননী।
সন্তোষ-অমৃত কর বাছা পান,
অমর আনন্দে জুড়াবে পরাণ !”
১•
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
এই কথা বলে বাণী শেষ হলো,
গগনের বাণী গগনে মিশালে,
শবদ-সঙ্গিনী প্রতিধ্বনি ধনী
অমনি তখনি গভীরে ভাষিল;
“সন্তোষ-অমৃত কর বাছা পান,
অমর আনন্দে জুড়াবে পরাণ !”
প্রভাতে মিলন।
চললাে নলিন, যাই বেড়াতে দুজনে,
এখনাে তপন দেব হয়নি উদিত,
এই সবে উষা কাল, যেন সূক্ষ্ম ধুমজাল
রাখিয়াছে অবনী জড়িত।
ঈষত অরুণ আভা পুরব গগনে
নায়িকার মুখ যেন নায়ক-মিলনে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
১১
ওই দেখ শুক্রা উজ্জ্বল কিরণে
তারা-হীন গগনের গৌরব প্রকাশে,
আজি শুরু চতুর্দশী, ঢুলিয়া পড়েছে শশী-
আভাহীন, পশ্চিম আকাশে।
সহজে কে ছাড়ি যেতে চায় প্রিয়জনে ?
বিধুর বিধুর মুখ-বিধির লিখনে।
সরসী-তরঙ্গে ক্ষণ খেলিয়া পবন,
আমরি! অলক তব মৃদু দোলাইয়া,
কুসুম সৰ্ব্বস্ব ধন-সৌরভ, করি হরণ,
টিপি টিপি যায় পলাইয়া,
কুকাজ গােপনে তার রবে কতক্ষণ,
শাখা নাড়ি দেখাইয়া দেয় তরুগণ।
চমকিলে কেন ধনি, সহসা শুনিয়া,
কোকিলের প্রভাতিক আগমনী-গীত?
বনমাঝে লুকাইয়া, উঠিল ঝঙ্কার দিয়া,
প্রতিধ্বনি করি দ্বিগুণিত ;
তাহা শুনি কত পাখী উঠিল ডাকিয়া,
চাতক, শালিক, শামা, দয়েল, পাপিয়া।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
চেয়ে দেখ চারি দিকে ফুলকুল ফুটিল,
শ্যামাঙ্গিনী বনস্থলী কত শােভা ধরিল,
উষার কুন্তল দলে, যেন মণি রত্ন দোলে,
নিশিতে জোনাকি যেন জ্বলিল,
অথবা সুনীল নভে তারায় উদিল,
কিম্বা অম্বুরাশি-জলে কম্বুরাশি ভাসিল।
এস বসি শশিমুখি, এই শিলাসনে
যথায় শৈশব কালে বসিয়া বিরলে,
এই ভাগীরথী কূলে, এই বট
তরুমূলে,
হেরিতাম তরঙ্গিত জলে,
খেলিতাম জলমাঝে আনন্দে দুজনে,
বাল্যের সে সব কথা আসিতেছে মনে।
প্রদোষে উষায় নিত্য আসি এইস্থলে,
তুলিতাম ফুলকুল খুঁথিতাম মালা,
দুজনে দাড়ায়ে তীরে, পবিত্র জাহ্নবী নীরে,
ভামাতেম কুসুমের ডালা,
নেচে নেচে ফুলমালা ভেসে যেত জলে
নাচিম করতালি দিয়া কুতুহলে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
ওই যে পাখীটি মাখি সােণার কিরণ,
ভাসাইয়া ধরাতলে সঙ্গীত লহরী--
অপ্সরার বীণায়, মিশালে গগনগায়,
চাতকিনী জলদ-কিঙ্করী ;
কত দিন বাল্যে ওরে করেছি দর্শন,
বিননাদিনি সে সকল আছে কি স্মরণ ?
এই কূলে তরুমূলে
গীত সমস্বরে,
বসিয়া
দুজনে,
গাইতাম
মধুময়
মিশিত সলিল সঙ্গে, মিশিত অনিল অঙ্গে,
মিশাইত পত্রের মর্মরে,
মিশাইত তাহা কল বিহঙ্গ কূজনে;
সে সকল কথা কিলাে পড়ে তব মনে?
আজো দেখ শুভে, সেই আগেকার মত
হাসিছে অরুণ গঙ্গা তরুণ কিরণে,
সুমন মলয় বায়, ওই তরি ভেসে যায়,
শ্বেত পাল উড়ায়ে গগনে।
অস্থির তরঙ্গমালা আসি অবিরত
সবলে আস্ফালি কুলে করিছে আহত।
১৪
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
ঠিক এই ভাব আজি ধরেছে আমার,
প্রফুল হৃদয়-নদ তব দরশনে,
আশা-তরি তালে তালে, সুখময়ী চিন্তা-পালে,
নাচিতেছে স্মৃতির পবনে,
সংশয় প্রচণ্ড ঢেউ আসি বার বার,
সবেগে হৃদয়-তটে করিছে প্রহার।
হায়, কুল-অভিমানে জনক তােমার,
অভাগারে দিয়ে ফঁাকি অভীষ্ট রতনে,
অপর জনের করে, চেয়েছিল দিতে তােরে,
লােক ভয়ে, মানের কারণে ;
সেই দুঃখে জন্মভূমি পরিত্যাগ করে,
ভ্ৰমিলাম দেশে দেশে ভুলিবার তরে।
কিন্তু কিরে পারিয়াছি ভ্রমি নানা স্থানে,
ভুলিতে ক্ষণেক তরে ও রূপ মােহন
অমল কমল আস্য, সরল তরল হাস্য,
প্রেম-উৎস ও দুটি নয়ন ?
ভূধর নগর গ্রাম অরণ্য শ্মশানে,
সমভাবে ছিল মনে, গিয়াছি যেখানে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
কুসুমিত উপবনে সুবাস অনিলে,
কলবিহঙ্গীর গানে, ভ্রমর গুঞ্জনে,
বিমল সরসী-জলে হেরি ফুল শতদলে,
শশধরে শারদগগনে;
জগতে সুন্দর কিছু দেখিলে শুনিলে,
ডুৰিত বিষন্ন চিত্ত চিন্তার সলিলে।}
কে পারে ছেদিতে দৃঢ় প্রণয় বন্ধন ?
করাকদর্শন কাল পারে কি না পারে।
প্রণয় চুম্বক প্রায় প্রিয় পাশে পুনরায়
টানিয়া আনিল অভাগারে;
আজি নিশি সুপ্রভাত, তাই দরশন
পাইলাম ভাগ্যফলে, অদৃষ্ট লিখন।
কি বলিলে প্রাণকান্ত (কহিল নলিনী)
কি আছে সংসারে যাহা তুল্য তােমাসনে ?
জননী সদয়া হয়ে, জনকেরে বুঝাইয়ে,
চেয়েছেন দিতে ও চরণে;
ধরীতে যে রমণী পতি-সােহাগিনী,
তার চেয়ে ভাগ্যবতী কোন সীমন্তিনী ?
১৬
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
ভুলে ছিল দাসী বুঝি ভাবিয়াছ মনে,
ও সুন্দর মূৰ্ত্তি তৰ ও চারু বয়ান,
এই ভাগীরথী কূলে, এই বট তরু মূলে,
নিত্য আলি করিতাম ধ্যান ;
বিদেশে না যেতে যদি তাহলে দুজনে
মিশিম মিশে যথা সৌরভে পবনে।
ইহা বলি প্রিয়তমা কুসুম চয়ন
করি, নিজ করে মালা গাঁথিল আপনি,
প্রেমের পুতুলি বালা, গলে মাের দিল মালা,
সাক্ষিণী করিয়া সুরধুনী ;
আদরে অধর ধরে করিনু চুম্বন ;
সাগরে লভিল নদী, প্রভাতে মিলন।
বিভাবরী।
বিভাবরী-বিশ্রামের কাল,
দিবসের শ্রম সেরে-শ্রান্ত ক্লান্ত কলেবরে
যখন শয়ন করি বিরামশয্যায়
,
শান্তিতল্পে মাথা রেখে, আলস্যেতে অঙ্গ ঢেকে
তখন কি সুখােদয় কোমল নিদ্রায় !
সে সময়ে সমসুখী রাখাল ভূপাল।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
বিভাবরী-স্বপনের কাল,
সত্যাসত্যে মিশাইয়া, নানা রসে চিকণিয়া-
রমণীয় নাটকের অভিনয় মত,
স্মৃতি যবনিকা তুলে খেলে মনাে-রঙ্গস্থলে ;
হায় রে! জাগ্ৰত-স্বপ্ন-আশা ভঙ্গে যত
হৃদি দাহ, নিশাস্বপ্নে নাহি সে জঞ্জাল।
বিভাবরী-সাধনের কাল,
প্রাচীন শাস্ত্রের খনি মাঝে গুপ্ত রত্নমণি
যতন খনি যােগে করিতে সঞ্চয়,
কবিগীতি, ধর্মকথা, বীরকীৰ্ত্তি, নীতিগাথা,
অতীত-করে যাহা হতেছে বিলয়-
অনাদরে, সে সব পুরাণ ধনজাল।
বিভাবরী—বিলাপের কাল,
যে সকল প্রাণসম-পরিজন প্রিয়তম
চিরনিদ্রাগত নদী-সৈকত-শয্যায়।
মতল ভেদ করি, নীরবে নয়নবারি,
সে সকলে ধীরে ধীরে অলক্ষ্যে ভিজায়।
প্রণয়-কোমল-কলি-চ্ছেদ কি করাল।
১৮ হৃদয়-প্রতিধ্বনি। বিভাবরী-ভাবনার কাল, বিজনে বিদেশী বসি, নীলাকাশ, তারা, শশী হেরি স্বদেশের কথা ভাবে মনে মনে, পরিচিত ঘরদ্বার, প্রিয়বন্ধু পরিবার- ছাড়িয়া এসেছে সবে, অদৃষ্ট লিখনে, যে সকলে প্রাণাধিক বেসেছিল ভাল। বিভাবরী-যাতনার কাল, অনুতাপ অগ্নি দিয়া,পুটপাকে গুমরিয়া, পাপীর হৃদয় হয় দগ্ধ স্তরে স্তরে। নৈরাশের নিশাচর, মূৰ্ত্তি ধরি ভয়ঙ্কর নয়ন সম্মুখে হাসি, কত ব্যঙ্গ করে। শিহরে পাতকী হেরি সে মূৰ্ত্তি করাল। = বিভাবরী-কল্পনার কাল, বাহিরিয়া দেহ হতে—মন, অন্তরীক্ষ পথে- মৰ্ত্তলােক সীমাপারে বিচরণ করে, বৈজয়ন্ত, অলকায়,-কভু বা বৈকুণ্ঠে যায়- কভু নরকের ভীম তামস গহ্বরে চিয়ােজ্জল ব্ৰহ্মলােকে অনন্ত বিশাল।
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
মহারাষ্ট্রীয় গণ-গীত।
পর্বতশিখরে, গহনগহ্বরে,
শার্দল-নাদিত কানন ভিতরে,
মরুভূমি মাঝে, দুর্গম প্রান্তরে,
যথা তথা থাকি অভয় অন্তরে।
সুদৃঢ় আশ্রয় নিজ বাহুবল,
অবিচল ধৈৰ্য পাথেয় সম্বল,
মহারাষ্ট্রবাল-কটাক্ষ কেবল
ভয় করি সুধু পৃথিবী ভিতরে।
ভ্রমি দলে দলে, রণে দৃঢ় কায়,
বিন্ধ্য, নীলগিরি, মলয় চূড়ায়,
শয়ন ভােজন চড়িয়া ঘােড়ায়,
সম গ্রীষ্ম শীত, দিবস রজনী।
তুগিরি-শিরে অদৃশ্য থাকিয়া
নগনদী প্রায় পাষাণ ভেদিয়া
অরি-বক্ষে পড়ি, অসি প্রহারিয়া
রিপুরক্তে করি, উর্বরা ধরণী।
২
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
রােগে মৃত্যু কি তা জানি না কখন,
জানি না কখন ভীরুতা কেমন,
পরের পাদুকা মাথায় বহন,
জানি না কখন গােলামী কাজ।
স্বাধীন শরীর, স্বাধীন জীবন
স্বাধীন হৃদয়,
স্বাধীন মনন,
স্বাধীনতা সহ প্রাণ বিসর্জন,
হাসিয়া দিই রে সমরমাঝ ।
কি জানিবে তারা সমরে কি সুখ?
কি বুঝিবে তারা, যাহাদের বুক
সাহসের নামে করে ধুকধুক,
রণরঙ্গে নাচে ধমনী যবে ?
কি বুঝিবি তুই অরে রে বিলাসি,
অসম সাহসে কত সুখ রাশি,
অতুল বিপদে কি আনন্দে ভাসি, .
যবে তেজোবলে এড়াই সে সবে ?
যখন তুলিয়া বিজয় নিশান
রণবেশে সাজি কটীতে কৃপাণ
করে সজ্য ধনু, বর্ষা খরশান,
দোলায়ে পশ্চাতে সশর তুণীর।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
২১
তখন সমরে নহে কম্পবান্
কোন্ হিন্দু যােধ, কোন্ মুসলমান্,
ক্ষ, বৌদ্ধ, শিখ, মােগল, পাঠান,
আমাদের ডরে নহে নত শির ?
এস ভাই সব ধর হাতিয়ার,
ধনুগুণ টান, খােলা তলােয়ার,
অনার্য যবনে সিন্ধু নদ পার
করে দিব চল,-ভারত হইতে।
মঙ্গল-নিধান শকরী ঈশান
করুন সবার বিজয়-বিধান;
বল হর হর, যায় যাক প্রাণ
স্বদেশ উদ্ধারে সমর ভূমিতে।
নিদ্রা সম্বােধনে।
কোথা নিদ্রাদেৰি, এস এ সময়ে
সঙ্গে আন স্বপ্নদূতী, শ্রমবিনােদিনী,
বিরামৰ্যজন মৃদু দোলাইয়ে
তাপিত ললাট মম স্নিগ্ধ কর ধনি।
২২ হৃদয়-প্রতিধ্বনি। শােক-দন্তে যবে হৃদি জর জর, কৌতুকরসিকে ! কেন পলাও তখন? অথবা, যখন শীর্ণ কলেবর- অশ্রুসিক্ত-শয্যাতলে করে বিলুণ্ঠন? যবে ফুল ফলে প্রফুল্ল কানন, শান্তি সখী সঙ্গে লয়ে সুখ বিতরিয়া কোমল চরণে বেড়াও তখন, সুখের সময়ে এত নহ ত নিদয়া। কাজ নাই দেবি ! হওলল বিদায়, অদূরেতে কালরাত্রি নীরবে যখন মহানিদ্রে! বলি ডাকিবে তােমায়, চিরশান্তি দান কোনাে আসিয়া তখন। যৌবনে যােগিনী। ওই যে মলিন-মুখী সরল কামিনী- বিরলে বিজনগৃহে বসি একাকিনী ; নীরবে নয়ন দিয়া-গণ্ড বক্ষ ভাসাইয়া- বহিছে সলিল ধারা, কেও অভাগিনী ?
হৃদয় প্রতিনি।
২৩
মলিন বসন পরা, ধূসরিত কেশ,
ঘনশ্বাসে জানাইছে অন্তরের ক্লেশ ;
কর্ণ কণ্ঠ করে তার-নাহি কোন অলঙ্কার,
শূন্যদৃষ্টে চেয়ে কেও, উদাসিনী বেশ ?
বালিকা বয়স তার হয়নি অতীত,
হয় নাই আজো তার জ্ঞান বিকসিত ;
এ বয়সে কেন তার হৃদে হেন গুরুভার ?
প্রভাত না যেতে পদ্ম কেন নিমীলিত ?
জান কি উহারে কেহ, কেও অনাথিনী ?
চিনেছি চিনেছি ও যে বিধবা রমণী
সধবলক্ষণ তাইসীমন্তে সিন্দুর নাই,
আহা শ্বেতবাস পর, যৌবনে যােগিনী।
হায়রে এ জন্ম মত ঘুচেছে উহার
সুখভােগে অভিলাষ, শরীর-সংস্কার,
বার মাস এক বেশ, চিরদিন সমক্লেশ,
দিবস রজনী এবে সমান আঁধার।
বাজু বালা কণ্ঠহার বসন ঢাকাই,
আতর তাম্বুলে আর অধিকার নাই,
সকল সাধের সার-বাঁধিবে কবরী ভার—
হায়, সে সাধেও তার পড়িয়াছে ছাই।
CC
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
শ্বশুর শাশুড়ী আছে পিতা মাতা ভাই,
এ সব থেকেও যেন কেহ তার নাই
আর কভু তুলে মাথা-হাসিয়া কবে না কথা,
ঘরে পরে তিরস্কার লাঞ্ছনা সুদাই।
যে দিন গিয়াছে পতি, আনন্দ উল্লাস
সঙ্গে তার গেছে সব, সুধু হা হুতাশ ;
এ কাল। বয়স হতে আমরণ খেতে শুতে-
সার মাত্র তার পক্ষে ব্রত উপবাস !
রমণী মরিলে পরে পুরুষে আবার
বিবাহ করিতে পাবে, মরে যতবার,
কামিনী কোমল বলে, তাই দাও পায়ে ঠেলে,
বিদ্বান্ পুরুষ জাতি! ধন্য এ বিচার।
হা ধিক্ ! পুরুষজাতি, একবারাে ভাবনা
সরলা বিধবা বালা সহে কত যাতনা ?
পতি পরলােকে যার, বল কি সে অবলার
থাকে না কি দেহে আর অস্থি মাংসে যােজনা !
২
বসম্ভ-প্রভাতে প্রেয়সীর সলে
ভ্রমিতে ছিলাম ফুল উপবনে ;
কুসুম-সৌরভ, মেদুর পবনে,
নাচিয়া নাচিয়া নাচালে অন্তরে।
বাছিয়া বাছিয়া কাননের সার
সুচারু সুবাস তুলি ফুলভার,
গােলাপ চম্পকে গাঁথিলাম হার,
প্রিয়া কবরীতে পরানু আদরে।
শিরে ফুলকুল শােভিল সুন্দর,
তার তলে মুখ আরাে শােভাকর ;
ফুলের সৌরভ কিবা মনােহর,
প্রেয়সী নিশ্বাস পবন যেমন!
যে দেখিল, আঁখি তাহারি ভুলিল,
হরিষ বিস্ময়ে সবাই বলিল,-
‘আমরি! ও চুলে যেমন শােভিল
কাননে কুসুম শােভে না এমন।
২৬
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
সারাদিন গেল, যখন সুন্দরী
সন্ধ্যার সময়ে খুলিল কবরী,
পড়িল মালিকা বেণী হতে ঝরি
শােভা পরিমল নাহিক তেমন।
শুষ্কপ্রায় মালা হেরিয়া ভামিনী
বারেক মুচকি হাসিল, অমনি
অশ্রু এক বিন্দু ঝরিল তখনি
সন্ধ্যার কুসুমে শিশির মতন।
হরিষ বিষাদ বিরােধী উভয়,
মনে তার দেখি একত্রে উদয়,
কি ভাবি, এ ভাবে ভরিল হৃদয়.?
নয়নে নয়নে জিজ্ঞাসিনু তায়।
ছাড়িয়া নিশ্বাস বলিল সরলা
“হ্যাদে দেখ নাথ, প্রভাতে এ মালা
ছিল কি সুন্দর, হায় রে এ বেলা
কোথা সে মাধুরি ? রসহীন প্রায়
প্রভাতে প্রাণেশ আপনার করে,
পরালে এ মালা কতই আদরে,
তুমি সুখী হেরে, আমি সুখী পরে,
সে সুখ স্মরিয়া হৃদয়ে আহলাদ।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। “এ মালার মত সকলি কি, হায়! তুমি আমি, নাথ, প্রফুল্ল ঊষায় ? জীবনের সন্ধ্যা—কাজ কি কথায় ভাবিয়া দেখ না কিহেতু বিষাদ।” নিশীথ সময়ে, তটিনী-হৃদয়ে। আজি একাদশী-বিজয়ার পর ; শারদ রজনী, শশধর কর- ভাগিরথী জলে খেলে কুতূহলে ; সুনীল গগনে শ্বেত মেঘমালা ভেসে ভেসে যেন করিতেছে খেলা, কভু বেগে ধায়, কভু ধীরে যায়, কখন বিস্তৃত, কভু দীর্ঘ কায় । কাদম্বিনি, বল, একি খেলা খেল ? মানব-অদৃষ্ট সদৃশ চঞ্চল, আসিছ, ভাসিছ, ছুটিছ, কেবল।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
নীরব বিজন বিমল রজনী
একাকী চলিনু চড়িয়া তরণী ;
শ্যামল আকাশ, কোমল বাতাস,
তটিনী-তরঙ্গ, তারকা, চন্দ্রমা,
সবে বিরাজিছে শান্তি মনােরমা।
মহানগরীর জন-কোলাহল
মৃদু গুগুণে আসিছে কেবল,
প্রবাহ নিকরে
কুলু কুলু করে,
কচিৎ কোথাও নাবিক-চীৎকার
যামিনী-বিরাম করিছে সংহার।
জাহ্নবী-হৃদ স্বচ্ছ দরপণে
অঙ্কিত জলদ, শশী, তারাগণে-
দেখে সমুদয়
হেন জ্ঞান হয়-
দ্বিতীয় আকাশ বুঝি জল তলে
সৃজিয়াছে কেহ ইন্দ্রজাল বলে।
সুদূর উত্তরে আকাশ নামিয়া
তরঙ্গিণী সনে গিয়াছে মিশিয়া,
সুধু মাঝে তার
ক্ষীণ শ্যামাকা
রেখা মাত্রে, সীমা হয় অনুমান,
তাহে দুচারিটি আলো বিদ্যমান।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। ২৯ পশ্চাত ফিরিয়া দেখিনু অদূরে উজল বিশাল নদী কক্ষ যুড়ে, তুঙ্গ সেতু তলে, গ্যাসলােক জ্বলে ; রম্য শ্রেণীবদ্ধ আলােক প্রভায় মণিময় কাঞ্চী সম শোভা পায়। নদী দুই কূলে দেখরে আবার, কোথাও আলােক, কোথাও আঁধার ; যেই পাদপের, যেই প্রাসাদের উচ্চ লিবাে ভাগ, কিম্বা পার্শ্ব দেশ- হাসে শশী করে ধবলিত বেশ ; তারি তলদেশ, তারি অন্য ধার, কালি মাখা যেন, নিবিড় আঁধার ; সংসারের সমা, ধরেছে প্রতিমা আজি যেই জন হাসিছে আল্লদে, কালি সেই পারে কাদিতে বিষাদে। । তালে তালে মৃদু নাচিয়া নাচিয়া চলিল তরণী তটিনী বাহিয়া, কাহার হৃদয় নাহি মুগ্ধ হয়- দেখিলে এ দৃশ্য রম্য চিত্ৰোপম এ দিব্য বিরাম মুনি-মনােরম।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। সম্রাট, কৃষক, ধনেশ, ভিখারী, যােগী কি বিয়ােগী, সন্ন্যাসী, সংসারী, স্থবির বালক, যুবতী যুবক, রােগী, সুস্থ-কায়, সকলের চিত এ সুন্দর শােভা করে বিমােহিত। আছে কি জগতে এমন হৃদয়- নরক সদৃশ অন্ধতমােময়, পাষাণ সমান যাহা নাহি হয় বিভাের উল্লাসে প্রকৃতির হেন কোমল বিলাসে ? নীরস পরাণ, যদি কেহ থাকে, তাহার অন্তর কালকূটে ভরা, পাপের আকর ; চুরি, কৃতঘ্নত, জাল, বিদ্রোহিতা, নরহত্যা আদি সকলি সে পারে ; কোরাে না কঞ্চন বিশ্বাস তাহারে। । । এ সময়ে ওকি শুনিবারে পাই। কই, কোথা গেল—আর কিছু নাই। ওই যে আবার, বাঁশরী.কাহার- নৈশ: সমীরণে হইয়া বিস্তত- ঢালে). শ্রুতিমূলে স্বর সুললিত।
হৃদয়।প্রতিধ্বনি।
যত হইতেছে তরি অগ্রসর
তত বংশীরব আসে স্পষ্টতর,
আহা! বেণু গানে
মিশি এক তানে-
তীরস্থ কুসুম কামন হইতে
ভরিল চৌদিক বামা কণ্ঠ গীতে।
আমরি! সে গীত যামিনীর সনে
মিশিল,—উজল শশীর কিরণে,
মিশিল সলিলে, মিশিল অনিলে,
সুমধুৰ ভাবে পরাণে মিশিল
সুধা ধারা যেন হৃদয়ে সিঞ্চিল।
ক্রমে চলিলাম ছাড়িয়া সেস্থান,
শুনা নাহি যায় আর বেণু গান ;
দেখিতে দেখিতে ভাসিতে ভাসিতে
এ কোথা আইনু ? কি ভীষণ স্থান!
চিতানল জ্বলে-তবে এ.শ্মশান।
পড়িয়া কোথাও দগ্ধ, অস্থিজাল,
কোথাও করােটী, কোথাও কঙ্কাল,
হেথা ভস্মরাশি, সেথা মৃৎকলসি,
শব মাংস লয়ে শমীমূলে দূরে
করিছে কলহ শ্মশান-কুকুরে।
৩২ হৃদয়-প্রতিধ্বনি। চারিদিক হতে শৃগালের দল করিয়া উঠিল ভীম কোলাহল, পরেই অমনি একটি রমণী আইল তথায়, পইনু দেখিতে মৃত শিশু কোলে, কঁদিতে কাদিতে কি করুণ স্বরে কঁদিছে অবলা পুত্রশােকে, হায়, হইয়া বিহ্বলা । শুনে সে রােদন, সিহরিল মন, শশাকের সাগরে পরাণ ডুবিল- শরীর বন্ধন শিথিল করিল। ছাড়িয়া সে স্থান চলিনু আবার ভাসিয়া ভাসিয়া দেখি চারি ধার, কোথাও ভবন, কোথা কুঞ্জবন, হেথা. উচ্চ তরু, সেথা গুল্মচয়, এই ঘাট, মাঠ,—ওই দেবালয়। এইরূপে কত আসি দেখা দিল, আবার ক্ষণেকে অদৃশ্য হইল, ক্রমে এ সময়, হইল উদয়- নয়নের পথে একটি মন্দির, ভগ্ন চূড়া তার পতিত প্রাচীর।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। দেখিলাম আমি কত দেবালয়, কিন্তু এর মত একটিও নয়; কাল-দন্তে পেষা, যদি ভগ্ন দশা, তবু দেখে আজো হয় অনুমিত- বহু ব্যয়ে কোন ধনীর নির্মিত। ঘাট, নহােত, বিস্তৃত সোপান, দীর্ঘ স্তম্ভচয়ে ঘেরা রঙ্গ-স্থান, মধ্যে ভবানীর বিশাল মন্দির, দ্বাদশটি শ্রেণী বদ্ধ শিবালয় যার পদ চুষি সুরধুনী বয়। রম্য সরোবর, কমল কানন, চারি পাশে তার ছিল উপবন, যার ফুল ফল লােভ পাখিদল আসিয়া তথা করিত নিবাস, ঢালিত মধুর স্বর বর মাস। নিত্য ভক্তিভাবে আমি এ মন্দিরে, যতেক ভকত পূজিত দেবীরে, সম্মুখ প্রাঙ্গণে কত নব নব রঙ্গ দেখাইত ; অদূরে সুনাদে নৌবত বাজিত। নট নটী গণে- ক
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
হায় রে, কালের বিষম পরশে
মন্দিরাদি সব পড়িয়াছে খসে,
দেখরে এখন হয়েছে বিজন,
বট অশ্বথের নিবিড় শিকড়ে-
ভেদিয়াছে যত দেউল প্রাচীরে।
বিভীষিকা পূর্ণ, ভূজগের গেহ,
ভয়ে এর কাছে নাহি আসে কেহ;
ওই গৃহ হতে
ডাকিতে ডাকিতে
উড়িল পেচক, তারি পরক্ষণে
ডাকিল তক্ষক ভীষণ নিক্কণে।
এই মন্দিরের দুর্দশা দেখিয়া,
স্বদেশের কথা উঠিল জাগিয়া-
আমার অন্তরে ;
ধরণী ভিতরে
একদা ভারত এ দেউল মত
ধন-মান-যশে ছিল সমুন্নত।
স্বাধীনতা রূপ সুরম্য মন্দিরে
আৰ্য ভক্তগণ পূজিত শক্তিরে,
সমর প্রাঙ্গণে বীর নটগণে
কতই অদ্ভুত রঙ্গ দেখাইত,
যশের নৌবত জগতে ঘােষিত।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
দেব-ভাষা রূপ শােভন কাননে,
ফুল ফল কত সাহিত্য দর্শনে,
কবি পিককুল
গাহিত অতুল,
গৃহ সরােবরে নারী কমলিনী
ফুটিত, সৌরভে ভরিয়া মেদিনী।
গিয়াছে সে দিন, ভারত এখন
কালের পরশে-অরণ্য গহন,
ভেঙ্গেছে মন্দির,
পতিত প্ৰাচীর,
নাহি বাদ্য রব, নাহি মহােৎসব,
জড় কুশীলব, স্তব্ধ পাখী সব।
শুকায়েছে ফুল, ফলে না সে ফল,
ফোটে কিরে আর সে নলিনী দল ?
বিদেশী এক্ষণে
বিস্মিত নয়নে
দেখে তাহাদের চিতাভস্ম চয়,
যাহারা কদাপি মরিবার নয়।
জগত-বিজয়ী বীরের জননী,
ভব-বিনােদিনী কবিতার খনি,
নীতির
ভূধর,
শিল্পের সাগর,
‘ভুবন-প্রতিমা ছিল যার নাম,
তাের কি মা আজ এই পরিণাম !
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
বারি-কণাচয় বাষ্প রূপ ধরে
ঘনঘটা করি ঢাকে দিনকরে,
গরজে অশনি,
হাসে সৌদামিনী,
চমকে চৌদি, কিন্তু ক্ষণপরে-
সেই জল গলে মিশায় সাগরে ।
উদয় পতন,
বারি বিন্দু প্রায়, হায় এ জগতে
ফিরে ঘােরে সবে অদৃষ্টের পথে ।
জনম মরণ,
হরষ বিষাদ সকলেরি ক্রম ;
ভাঙ্গা গড়া লয়ে বিধির নিয়ম।
৩
গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, মেদিনী,
বর্ষ, ঋতু, মাস, দিবস, যামিনী,
প্রাণী, পরমাণু,
দেবতা, কীটাণ,
আর যা যা আছে সৃষ্টিতে, সকলি-
বাঁধিয়াছে এক পৰ্য্যায় শিকলি।
স্বাধীনতা, দাস্য, জনম, মরণ,
পাপ, পুণ্য, শােক, অদৃষ্ট-লিখন,
তটিনী-হৃদয়ে,
নিশীথ সময়ে-
কত চিন্তা আসি হৃদয় ভরিল,
ওই মেঘ জালে শশাঙ্ক ডুবিল।
ক
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
আশা-নৈরাশ্য-সংবাদ।
এক দিন, রােগে শশাকে জীর্ণ দেহ মন
অশ্রুসিক্ত শয্যায় পড়িয়া,
নৈরাশ্যের সহ আশা, শুনিনু তখন,
কহে কথা অন্তরে থাকি।
“ওই যে নদীর তটে সৈকত শষ্যায়
সুকোমল বিরামের স্থান,
দগ্ধ হৃদয়ের তীব্র যাতনা জুড়ায়,
ভীরু বলে বিকট শ্মশান।
“যথায় বারেক জীব হইলে নিদ্রিত
জাগিয়া উঠে না কভু আর,
সমান তখন বন্ধু-করুণ-ক্রন্দিত,
কিম্বা ঘাের বজের হুঙ্কার।
“হায়! কবে ও শয্যায় করিয়া শয়ন
মৰ্ম্ম জ্বালা করিব শীতল;
করিবে না শান্তি ভঙ্গ কখন স্বপন,
অথবা ধরণী-কোলাহল।”
৩.
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
“কে তুমি, নাবিক বুঝি? সংসার সাগরে,
অসহায়, চোদিক আঁধার,
উত্তাল তরঙ্গ মাঝে দুর্বিপাক ঝড়ে
ডুবেছে কি অরণি তােমার ?
দৌর্ভাগ্য তােমারে লয়ে করিতেছে খেলা
আজি যদি, হয়ােনা কাতর,
ভয় নাই, অচিরাৎ শান্তিময়ী বেলা
পাবে, কর সাহসে নির্ভর।
“অদৃষ্টেতে যাই থাক, যে হও সে হও,
নিজ দোষ করিয়া স্বীকার,
পরম পিতার দণ্ড নত শিরে লও,
পক্ষপাতহীন সে বিচার।
“সকল সন্তানে তার করুণা সমান,
মৃতে নহে অসি-ঘাত তার,
শােধন কারণে তার শাসন বিধান,
পাপে যাহে হইবে উদ্ধার।
“আছে বটে নদীতটে সৈকত শয্যায়
পথিকের বিরামের স্থান,
মাটির শরীর যথা মাটিতে মিশায়,
হয় হর্ষ বিষাদ সমান।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
“তখন জীবের আত্মা দেহ মুক্ত হয়ে
ঈশ্বরের ছায়ার সমান,
অনাদি-অনন্ত-সীম শূন্যপরে গিয়ে
সূৰ্য্য সম রবে দীপ্তিমান।
.,"
“সে পবিত্র জ্যোতি কাছে স্ফুলিঙ্গ সমান
ক্ষণ-ধ্বংসী তপন কি ছাই!
ভূত ভব্য ভবৎ প্রভু স্বয়ম্ভ সন্তান
আত্মার বিনাশ কভু নাই।
অতীত জীবনালােক।
হায়, কত দিন গভীর রজনী,
যখন নীরবে ঘুমায় ধরণী,
সে সময়ে স্মৃতি মানসমন্দিরে
অতীত আলােক জালে ধীরে ধীরে,
কত কান্না-কত হাসি-
---
কত ভালবাসাবাসি-
মধুমাখা প্রেমকথা নবীন যৌবনে,
প্রোেজ্জল নেত্র কত
নিবিয়াছে জন্ম-মত,
কত উল্লাসিত হৃদি হতাশ এক্ষণে।
•
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
হায়, কত দিন গভীরা যামিনী,
যখন অঘরে ঘুমায় মেদিনী,
সে সময়ে ধীরে ধীরে,
ভূত স্মৃতি আসে ফিরে,
ভাসি আমি আঁখিনীরে আপনা আপনি,
সে সব বান্ধব, যাহাদের সনে
বেঁধেছিনু হিয়া প্রণয়-বন্ধনে,
দেখেছি তারাই কালের কবলে,
শুষ্কপত্র প্রায় পড়িয়াছে গলে।
যেন আমি ক্লান্ত হয়ে,
রঙ্গ-শেষে রঙ্গালয়ে,
ভ্রমিতেছি মৃদু পদে একাকী বিরলে।
নিবিয়াছে আলােলা,
শুকায়েছে ফুলমালা,
আমি ছাড়া আর সবে গিয়াছে রে চলে।
হায়, এইরূপে গভীরা যামিনী,
যখন নীরবে ঘুমায় ধরণী,
সে সময়ে স্মৃতি মানস মন্দিরে
অতীত আলােক জ্বালে ধীরে ধীরে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
কাহে ঝুরে আঁখি।
কাহে দিন যামিনী কুরে মঝু আঁখি,
কাহে, সখি, পুছসি হামারে ?
যদি হিয়া-বল্লভ পরবাসে যাও,
টুটইয়ে পেম-হেম-হারে,
তাহে ব্যথা কৈছন পরাণে না লাগত,
বিরহে পিরিতি পরিপাক,
থােড়ি দুখ গমই সুসমাগমে পুন
হরষ বাঢ়ত লাখে লাখ।
যে সব পিয় জন ইহ লােক ছছাড়ি,
চির তরে গত পরলােকে,
ইহ আঁখি যাে মুহ অরু না পেখব কভু,
না রােয়ে মঝু মন তাসব শােকে ;
গত-জীবন আজু যে জন বিলপয়ে,
সস পিছে যায়ব উহ জন-পাশ ;
যাহা চির মিলনে বিভেদ না ভই কভু,
যাহা না বহে পিয়-বিরহ-নিশাস ।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
জীবন অধিক যাে-অনুপম জগতে,
কায়মন বিকায়নু যাহে,
কলঙ্ক রটন, আলি, করু সুচরিতে আজু,
লােকে তবু অপযশ গাহে;
সখিরে, রতনমণি কিবা এ জীবন দানে,
ভেয়ব অপনয় তারু ?
নাথকে অযশকথা মরম দগধে ঘাের,
তথি আঁখি ঝুরে অনিবারু।
দুটি চঁাদ।
সুখের বসন্তকাল, প্রদোষ সময়,
মলয় পবন ধীরে সরসীর স্বচ্ছনীরে
ক্ষুদ্র বীচিমালা তুলি, ধীরে ধীরে বয়।
অস্তগত প্রায় ভানু সে দিনের তরে,
উচ্চতরু-শিরােপরে,
রবি-রশ্মি রঙ্গভরে,
দিয়াছে কনক-চূড়া পরায়ে আদরে।
---
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
স্থানে স্থানে কালাে ছায়া পড়িয়াছে জলে,
তরু, লতা, চারি কূলে, সাজি ফুলে হেলে দুলে
সরােবরে নিজ শােভা হেরে কুতূহলে।
উপরে আকাশ মরি। কি শোভা ধরেছে,
লােহিত পাটল পত, নানা বর্ণ বিভূষিত,
জলে প্রতিবিম্ব তার আসিয়া পড়েছে।
সেই রম্য সরসীর ঘাটের উপরে,
সােপান করিয়া আলা, বসিয়া একটি বালা,
বনদেবী মূৰ্ত্তি যেন গঠিত প্রস্তরে।
সন্নিহিত বকুলের প্রশাখা হইতে
আশুষ্ক কুসুমগুলি মৃদু সমীরণে খুলি
নীরবে পড়িছে তার মস্তকে অংসেতে।
।
নবজাত কুসুমের ঘন গুচ্ছ ভরে
বকুলের শাখাশ্রিত
একটি মাধবীলতা
অযত্নে ঝুলিছে তার বাম স্কন্ধোপরে।
স্থাপিত দক্ষিণ ভুজে সুচারু বদন,
শ্লথবিলম্বিত-বেশ,
কুসুম-খচিত-কেশা,
কর্ণ, কণ্ঠ, করে, চারু কুসুম ভূষণ।
৪৫
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
সুন্দর সৌরভময়,
কুসুম-রচিত মালা ন্যস্ত অঙ্কদেশে,
বাসন্ত কুসুমচয়,
স্তরে স্তরে বিকীর্ণ রয়েছে চারিপাশে।
বারেক সতৃষ্ণ নেত্রে হেরি চারি ধার,
আবার আপন মনে
শূন্য দৃষ্টে ভূমিপানে,
বসিয়া রহিল যেন প্রতীক্ষায় কার।
ক্রমে ক্ষীণালােক সেই রবির কিরণ
উচ্চ তরু শির ছাড়ি,
মেঘমালা পরিহরি,
পশ্চিম সাগর নীরে হলো অদর্শন।
প্রফুল্ল পূর্ণিমা শশী এ দিকে অমনি
সঙ্গে লয়ে তারাদলে দেখা দিল নভস্থলে;
হাসিল আনন্দে ধরা, হালিল রজনী।
“কই, প্রিয়তম মাের, কোথায় এক্ষণে,
বলেছিলে ‘প্রাণেশ্বরি যখন দিবা শরী—
মিলিবে, তখন আসি মিলিব দুজনে।
“ওই তারাসহ শশী হাসিছে আকাশে,
আমােদে হাসিছে সন্ধ্যা, বিকশিত নিশিগন্ধা
শুধু কঁাদে প্রাণ মন না পেয়ে প্রাণেশে।”
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
বলিয়া প্রেয়সী মাের নিশ্বাস ছাড়িল,
বৃক্ষ-অন্তরালে থেকে, ও সুরম্য শোভা দেখে,
হৃদয়ে মরম যন্ত্রে কি গীত ধ্বনিল ।
কি সঙ্গীত ধ্বনি? তা কে বুঝিতে পারিবে ?
কারে বা বুঝতে পারি, আপনি বুঝিতে নারি
কোন স্পর্শে হৃদয়ের কোন তার বাজিবে।
আনন্দে উন্মও প্রাণ চপল চরণে
কাছে গিয়া, কর ধরি বলিলাম “প্রাণেশ্বরি।
আসিয়াছি যথাকালে তব দরশনে।
“আশ্চর্য হয়েছি, প্রিয়ে। আজিকে আসিয়া,
স্বচক্ষে এখানে প্রিয়ে দুটি চঁাদ নিরখিয়ে
অবাক্ হইয়া ছিনু দূরে দাঁড়াইয়া।”
“কি আশ্চৰ্য্য! দুটি চাদ! এ কি সত্য কথা ?
-মিছে করিছ ছল, কোথায় দেখিলে বল ?
আমারে দেখাও, নাথ, খাও মাের মাথা।”
“স্বচক্ষে দেখ না প্রিয় সত্য কি অলীক,
ওই দেখ নীলাম্বরে এক চাদ শােভা করে,
আর চাঁদ হাতে মাের-সুন্দর অধিক।”
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
বলিয়া অধর ধরে করিনু চুম্বন।
প্রেয়সি সম্মিত মুখে,
বদন রাখিয়া বুকে,
গলে মাের ফুল মালা করিল অর্পণ।
হৃদয়ের যন্ত্রে পুন সঙ্গীত ঝঙ্কার -
উথলিল, তাহে মিশি,
বায়ু জল শশী নিশী,
গাইল; সঙ্গীতময় হইল সংসার।
কেন তােরে এত ভালবাসি ?
প্রিয়তমে, কেন তােরে এত ভালবাসি ?
ওমুখ দেখিলে কেন সুখের সাগরে ভাসি?
নিবিড় নীরদ জাল সদৃশ কবরী কাল,
কামের নিগড় বলে যায় ;
সে বেণীর তরে ভাল বাসি কি তােমায় ?
প্রেমের পতাকা-সম জযুগ-শােভিত
পরিষ্কার, কৃষ্ণতার, আকৰ্ণ বিস্তৃত,
অতুল সুন্দর, আহা,
ও দুটি নয়ন যাহা,
মদনের সঞ্জীবক মণি;
অরি তরে কিলাে তাের ভালবাসি ধনি?
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
৪।
অকপট, প্রীতিময়, মনের দর্পণ,
নিয়ত হাসিতে ভরা ও চারুবদন,
সরলতা, দয়া, মায়া, স্নেহ, ভকতির ছায়া,
নিরন্তর যাহে বিরাজিত ;
সে বদন তরে কিলাে ভালবাসি এত ?
পুষ্পিত অশােক পাশে, বসন্তে যেমতি,
শােভে নবীন পল্লবা সুন্দরী ব্রততি,
কোমল অঙ্গুলিময়,
শােভিয়াছে ও বরাঙ্গ পাশে;
সে কারণ এ জন কি তােরে ভালবাসে?
তেমতি ও ভুজদ্বয়,
বসন্তে প্রফুল্লমুখী নলিনী যেমতি,
অথবা বরষাগমে যথা স্রোতস্বতী,
কি সে শারদ নভে যথা শশধর শেভে.
তেমতি যৌবন শােভাকর ;
কুসুম-যৌবনে, তাই এত কি আদর ?
মৃদুমন্দ তরঙ্গিত স্বচ্ছ সরােবরে
প্রফুল্ল কৌমুদী কান্তি যথা ক্রীড়া করে,
তার চেয়ে শােভাকর, ও লাবণ্য মনােহর,
কোথা লাগে চম্পক কাঞ্চন ;
এ ভালবাসার প্রিয়ে তাই কি কারণ?
৪৮
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
নিতম্ব, উবােজ, উরু, জঘন, চরণ,
আর যা যা দেহে তব আছে সুশােভন,
সাধারণে যার আশে নারী জাতি ভালবাসে,
ভুলে যাহে বিলাসীর মন ;
আমার এ ভালবাসা প্রিয়ে কি তেমন ?
তা নয়, তা নয়, বলি, শুনলাে প্রেয়সী।
প্রাণের অধিক তােরে কেন ভালবাসি,
দেখিলে ওমুখ তাের, কেনরে আনন্দে ভাের,
হয় মাের হৃদয় নয়ন ;
এ ভালবাসার তবে শুন লো কারণ।
চারুশীলে, মনে তাের পড়ে কি সে দিন?
হারায়ে সম্পদ, হয়ে সহায়-বিহীন,
কোনরূপে যােগে যাগে, নগরের প্রান্তভাগে,
তােমাসনে লইনু আশ্রয়,
অট্টালিকা ছাড়ি হলাে কুটীরে আলয় ;
সে দিন সুমুখী সেই সন্ধ্যার সময়,
উপবাসে কাটাইয়া দিন সমুদয়,
সারাদিন
ঘুরে ঘুরে, গৃহে আইলাম ফিরে,
শূন্য-করে, শূন্য-মনে যবে,
বসন্ত কোকিল বন্ধু পলাইল সবে!
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
তখন কুটীর দ্বারে তুমি দাঁড়াইয়ে
সজল নয়নে ছিলে পথ পানে চেয়ে,
পাছে আমি দুঃখ পাই, বিমলে, তুমিললা তাই,
স্নানভাব করিলে,গােপন,
সুধামাখা হাসি আসি দিল দরশন।
হাসি কান্না একসঙ্গে হইল মিলন,
দরিদ্র-কুটীর হলাে কুবের ভবন,
হাতে শত স্বর্গ পেলে, তাও আমি দিই ফেলে,
অমরতা চাহে না এ জন,
যদি পাই হাসি কান্না একত্র মিলন।
আর সেই দিন, যবে পড়িয়া পীড়ায়
অবশ শরীর, মন অচেতন প্রায় ;
অশুভ লক্ষণ দেখে, বন্ধুগণ একে একে,
ছলভরে লইলে বিদায়,
পড়িয়াছিলাম যবে হয়ে অসহায়।
ব্যথিত মস্তক মম ক্রোড়েতে লইয়া,
দিতেছিলে তুমি গায় হাত বুলাইয়া,
অবিরল নেত্ৰজল,
ভাসাইয়া বক্ষস্থল,
হতেছিল নীরবে পতিত,
মন-উৎস হতে যেন প্রণয় গলিত।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। বারেক ও মুখ পানে করিনু দর্শন, (বিদায় লইতে যেন জনম মতন) প্রিয়ে তাের ইলাে ভয়, পাছে মাের কষ্ট হয়, দেখে তােরে করিতে রােদন, তাই কান্না চেপে তুমি হাসিলে তখন। ৫ হাসি কান্না এক সঙ্গে হইয়া মিলন- সঞ্জীবনী রস যেন করিল সিঞ্চন, রােগের যাতনা গেল, শরীর সবল হােললা, মৃত দেহ পাইল জীবন, হাসি কান্না যেন মণিকাঞ্চন মিলন। জগতে রমণী বটে অমূল্য রতন থাকে যদি অকপট প্রেমে পূর্ণ মন, সরল প্রেমের কাছে, আর কি ভূষণ আছে, যাহা এত কামিনী-শােভন, বাহে হতে পারে এত আদর ভাজন। যদি লো সরলে তাের রূপ না থাকিত, যদ্যপি বিধাতা তােরে কুরূপা করিত, তথাপি ও মন তরে ভাল বাসিতাম তােরে, রহিতাম যাবত জীবিত ; ঐ মন,-যাহে মিলে কান্না আর হাসি, তাই তােরে, সুহাসিনি, এত ভালবাসি।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
যামিনী।
লােহিত-বসনা সন্ধ্যা মৃদুমন্দ হাসি
লুকায় পশ্চিম সিন্ধু-জলে,
দিনের উগ্রতা সঙ্গে, কোলাহল রাশি
ধীরে ধীরে যায় যবে গলে,
পরিচিত মূর্তি, আর চিন্তা অগণিত,
(সুখ শান্তি লাভ করি যায়,)
অজ্ঞাতে হৃদয়াকাশে হয় সমুদিত
মৃদুজ্যোতি তারকার প্রায়।
যামিনী আধারতম যবনিকা মেলে
করে যবে আবৃত আমায়,
সে সময়ে, দিবসের সুপ্ত ভাবদলে
মৃদু স্পর্শে, কল্পনা জাগায়।
পার্থিব বন্ধন চয়ে ছিন্ন করি, প্রাণ -
শূন্যপথে করে বিচরণ,
দেখে-ষড়ঋতু যথা চির বিদ্যমান,
ভীমকান্ত, অগ্র-কানন।
৫২
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
কোথাও আলােকময়, কোথা গাঢ়তম,
হই ভয় বিস্ময়ে স্তম্ভিত,
শৈশবের চিরস্মৃত সুখ স্বপ্নেপম
কখন বা আনন্দে প্লাবিত ।
যামিনীর অশ, হায়! দূৰ্ব্বাদল গায়
মুক্তা-শােভা থাকে কত কাল ?
প্রভাতে বিহগ-গীতে অমনি পলায়,
হেন মনােরম ইন্দ্রজাল।
রূপ রবে কতক্ষণ ?
গােলাপ, ফুটেছ ভালাে উপবন করে আলাে,
মুখে হাসি ডালে বসি নাচিছ রঙ্গিণী,
নিজ রূপে গরবিণী।
তুলিব কি? তুলিব না; যবে সেই সুলােচনা
আসিয়া আপন করে পরিবে খোপায়,
তুমি শােভিবে মাথায় ;
তখন আমার হয়ে, দুটো কথা বুঝাইয়ে
বােলাে তারে, যে আমারে করেছে ফকীর,
এই প্রেম ভিখারীর।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
ও ফুল, কথায় বলে কাজ নাই, বোলো ছলে,
মুখে বলে কত দিন হয়েছি নিরাশ,
তাই করি না বিশ্বাস।
সবিনয়ে বার বার কতই সেধেছি তার,
গলে না কাতর বাক্যে নারীর হৃদয়,
ভুগে জেনেছি নিশ্চয়।
ইঙ্গিতে, বা উপমায় উপদেশ দিও তায়,
তাহলে বুঝিতে যদি পারে সে কামিনী,
নিজ রূপে গরবিণী।
ক্ষণেক থাকিয়া চুলে, ঝরে পােড় পদমূলে,
শুকাইয়ে, শিখাইও তাহারে তখন,
রূপ রবে কতক্ষণ।
ফিরে পাৰ কি আবার ?
আবার জগতে আজি বসন্ত উদয়,
আবার মলয় হতে সমীরণ বয়,
শ্যামল গগন তল, শ্যামল শাল দল,
শ্যামল পলব শাখী পুনঃ শশাভা পায় ।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
আবার ফুটিছে ফুল, গুঞ্জরিছে অলিকুল,
আবার বিহঙ্গরবে মেদিনী মাতায়।
নব ঋতু সমাগমে প্রফুল্ল সংসার,
কিন্তু ভূত কাল ফিরে পাব কি আবার?
।
আবার পড়ে যে মনে শৈশব সময়
অকপট, সুকোমল, হাসি-কান্নাময়,
যবে বন্ধুগণ মেলি, আনন্দে করিয়া কেলি,
কাটাতেম মহাসুখে ছুটীর সময়।
আর আমি ভাবিব না, স্বপ্ন সম সে ভাবনা,
ভুতলে দুল্লভ বলি এবে বােধ হয়।
বাল্যকাল বাল্যমায়া গিয়াছে যাহার,
সে কি ফিরে সে সকলে পাইবে আবার ?
আবার দেখি যে আজি মানস-নয়নে
জীবন-প্রতিমা,—সেই নবীন যৌবনে;
ভ্ৰমিতাম যার সনে, সুখে সন্ধ্যা-সমীরণে,
হাত-ধরাধরি করি কুসুম-কাননে।
এ জনমে মুখ তার, দেখিতে পাব না আর,
বিভূষিত এবে তাহা স্বর্গীয়-কিরণে।
গিয়াছে যৌবনকাল, প্রেয়সী রতন,
আর কিরে পাব ফিরে সে সবে কখন ?
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। দূর হৈতে হয়। এই সংসার-কানন— দেখাইত সুখ উৎস, শান্তিনিকেতন, রৌপ্য-স্রোত প্রবাহিত, স্বর্ণ-ফল বিভূষিত, না হরে অন্তর কার হেন প্রলােভন ? কিন্তু যেই ভ্রমিয়াছে, একবার ভুগিয়াছে, জেনেছে সে মরুময় কণ্টকের বন। আর কি পাইব সেই সরল অন্তর, হেরিতাম যার গুণে ভূতলে সুন্দর ? ললিত এসরাজ। বাজ বাজ বাজ, ললিত এসরাজ, প্রাণ খুলে তান ছেড়ে দেরে আজ ; তাের মুখে মাের প্রেমের কাহিনী- শুনিলে যদি রে গলে সে কামিনী, মুখ ফুটে যারে বলিতে না পারি । উচ্চ, সে যুবতী, আমি তুচ্ছ অতি, তাহাতে আমাতে হবে কি সংগতি? ললিত পঞ্চমে হয়ে একতান- তাের তারে বাজে সুমধুর গান, তবে নেত্রে মাের কেন ঝরে বারি ?
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
বীণা তাের তার কাপিছে যেমনি,
সেই মত কঁপে আমারো ধমনী ;
তবে কেন বল উঠে না রে তায়—
সে সংগীত, বাহে হৃদয় জুড়ায় ?
এক সুরে কেন করে হাহাকার ?
প্রেম ছটিকার স্পর্শে, সে বামার
যদি রে বাজিত হৃদয়ের তার,
তা হলে দুজনে একতানে মেলি,
লহরে লহরে প্রতিধ্বনি তুলি,
গাহিতাম সুখে, হাসিত সংসার।
সে বড় কঠিন, তুই রে কোমল,
তুই চিত্ততােষা, সে হৃদয়-দলা,
কর্ণে ঢালি তার, কোমল সংগীতে,
আঁখির কুটীল কুটী ঘুচাতে
পারিবি না তুই,-হাসাতে বদনে
t
তাই বলি আজ, থামরে এস্রাজ,
তারে দ্রব করা নহে তাের কাজ,
অমৃত সমান অপর পীড়ায়,
প্রণয়-বিকারে তুই বিষ প্রায়,
হৃদয়ের জ্বালা বাড়ে শত গুণে।
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
বনদেবী।
“কে তুমি নিঝর তীরে বসিয়া, সুন্দরি,
প্রফুল্ল কৌমুদী রূপে বন আলাে করি ?
তব ছায়া বুকে ধরি—উল্লাসিতা ধিরি ধিরি
পদতলে কলনাদে, নাচিছে লহরী,
“তরুমূলে পৃষ্ঠ রাখি হেলাইয়া কায়,
বল্কল বসনে কেন বসিয়া শিলায় ?
করেতে মৃণাল বালা, কর্ণে কণ্ঠে ফুলমালা,
সপল্লব ফুল মরি । দোলে অলকায়।
“নীন যৌবনে বনে কেন একাকিনী,
নিভৃত নিকুঞ্জে যেন বন-বিহঙ্গিনী?
শ্বাপদ সঙ্কুল বনে নাহি কিছু ভয় মনে?
বনবালা বুঝি তুমি, বন-বিহারিণী ?
“যে হও সে হও তুমি, মম বাক্য ধর,
বনবাস অভিলাব পরিহার কর ;
এস তােমা সঙ্গে লয়ে, যাব আমি লোকালয়ে
পরম আদরে তথা রবে নিরন্তর।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
“রম্য শিলাময় হৰ্ম্মে থাকিও, ললনে,
কখন বা কুসুমিত প্রমােদ কাননে,
মণিময় ছাদে বলি-লজ্জা দিও, লাে রূপসি
শারদ পূর্ণিমা চাদে, তরুণ তপনে।
“স্তরে স্তরে পদ্মরাগ কবরীতে দিয়া,
কর্ণে মরকত হল মৃদু দোলাইয়া,
করে হীরকের বালা, কণ্ঠ-দেশে মুক্তামালা,
হাসিয়া দেখিও মুখ স্ফটিক দর্পণে।
“সতত শতেক দাসী সেবিবে যতনে,
পুরাব বাসনা তব না উঠিতে মনে,
কলকণ্ঠে গাহনায়
যদি কভু তৃষা পায়,
সুতার সিরাজ সুধা ঢালিও বদনে।
“ওই দেখ, দিবাকর উঠিল মাথায়,
দেখ জীব জন্তু সবে ছায়া পানে ধায়,
প্রখর মধ্যাহ্ন কালে, একা নিঝরিণী-কূলে-
কেন বসি ? এস যাই শীতল ছায়ায়।
“এ ধনি, হাসিলে কেন সত্য করি কও?
তুমি কি নগরে যেতে অভিলাষী নও?
আমিও, লাে মুক্তকেশি, বনে বাস ভালবাসি,
গেঁথেছি এ বনমালা দয়া করি লও।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
“তুমি আমি দোঁহে মিলি বেড়াব কাননে,
সাজাব বরাঙ্গ তব কানন প্রসূনে,
বন ফুল মধু খাব, আনন্দেতে গীত গাব,
তথাপি নাড়িলে মাথা কেন বরাননে ?”
ইহা বলি পান্থ যবে নীরব হইল,
ধীরে ধীরে বনবধূ উঠিয়া বসিল,
কোমল অঙ্গুলি দিয়া- অলকাগ্র সরাইয়া
মৃদু স্বনে সুভাষিণ বলিতে লাগিল।
বিস্মিত বিহঙ্গ কুল নীরবে শুনিল,
মুগ্ধনেত্রে কুরঙ্গিণী ফিরিয়া চাহিল,
বায়ু যেন নাহি বয়, স্তব্ধ সব বনময়,
নিঝর লহরীচয় উজানে বহিল।
“হে মানব, কি বলিলে, যাব জনপদে ?
জানিয়া যাব কি সেই মানবের ফাঁদে?
স্বার্থে যাহাদের সুখ, ছলনায় ভরা বুক,
ইন্দ্রিয়-লালসা প্রেম, সৌহৃদ্য সম্পদে ;
'?
“আশা স্বপ্নে যাহাদের হাসে কাঁদে মন,
আকাঙ্ক্ষা-পিপাসা সদা করে নিপীড়ন,
মােহের কুহকে ভুলে, কৃত্রিম আমােদে গলে,
রােগ জ্বরা শরীরেতে, সন্দিগ্ধ জীবন।
৬
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
“হেন ক্ষুদ্র চেত নর বুঝিবে কেমনে,
আমাদের সুখ কি তা? নন্দন কাননে
ইন্দ্র ধনু পথে যাই, ফুৎকারে ফুল ফুটাই,
সাজাই আবাস কুঞ্জ খদ্যোতিকা গণে ;
“তরল সুধাংশু রশ্মি নেত্ৰ দিয়া পান,
তারা মালা অলকায় করি পরিধান,
পতঙ্গের পৃষ্ঠে চড়ে, বেড়াই গগনােপরে,
কল্লোলিনী তটিনীর সঙ্গে গাই গান,
“চপলার সঙ্গে খেলি নীরদে বসিয়া,
আঁখি মেলি নিদ্রা যাই কমলে শুইয়া।
হেন সুখ পরিহরি, মানবের সহচরী-
কোন্ সুখে হব বল, স্বভাব ছাড়িয়া ?”
ইহা বলি, প্রস্রবণে আসি দাড়াইল,
পদ বেড়ি চক্রাকারে তরঙ্গ নাচিল,
ধীরে ধীরে তার পরে ডুবিল সলিলান্তরে,
পথিক বিস্মিত নেত্রে চাহিয়া রহিল।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
৬১
শয্যা-কণ্টক।
মাঠ হতে ধীরে ধীরে
পাভী দল যায় ফিরে,
বৃষ্টি-ধারা, ভ্রমর-গুঞ্জন,
জল-পাত, সাগর, পবন,
বিস্তৃত প্রান্তর চয়,
গগন নীলিমা ময়,
একে একে সমুদয়
ভাবিলাম মনে।
একা শুয়েনিদ্রা নাই,
লতা পাতা ভস্ম ছাই
কত কি ভাবিছি তাই মনে ;
সুখ নিশা পােহইবে ক্ষণে ;
এখনি খুলিয়া প্রাণ
পাখীরা ছাড়িবে তান,
চাতক প্রভাতি গান
গাইৰে গগনে।
ও
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। A দুই নিশা অনিদ্রায় কাটায়েছি যাতনায়, আজো বুঝি যাইবে অমনি অয়ি নিদ্রে, বিরাম-দায়িনি, তােমা বিনা সে সকল প্রভাতের সুকোমল সুখ শান্তি সুবিমল যাবে অকারণে। তাই বলি শীঘ্র এস আঁখি সিংহাসনে বসসা, মাের এ কাতর দেহ মন- করি তব চরণে অর্পণ ; দেখা দিয়ে বার বার পলায়ে যেও না আর, দয়া কর অভাগার মিনতি বচনে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
প্রকৃতি সম্বােধনে।
মােহিনী কামিনী বেশে, অয়ি লো প্রকৃতি,
সাজিয়াছ কার মন তুষিবার তরে ?
বল, তুমি কার তরে, সাজ নানা বেশ পরে,
নানা কালে, নানা দেশে, ধরায় অম্বরে ?
এই যে আজিকে তুমি, শারদ নিশীথে
পরেছ উজল বাস সুধাংশু কিরণে,
গলে তার হার দোলে, সুধাকর টিপ ভালে
হাসিয়া হেরিছ মুখ, তটিনী-দর্পণে ;
শ্যামল গগন তৰ নিবিড় কবরী,
ছায়াপথ সিঁথি রূপে সীমন্তে বিরাজে
চারিদিক শান্তিময়, বল তুমি এ সময়
সাজিয়াছ কার তরে, এ বিমল সাজে ?
আবার যখন, সেই বসন্ত প্রভাতে
উঠেন পূরবাকাশে তরুণ তপন ;
রাঙা রাঙা মেঘগুলি চারি পাশে থাকে ঝুলি,
ধীরে সরােবর নীরে খেলে সমীরণ,
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। নানা জাতি ফুল ফুটে সৌরভ ছড়ায়, নিভৃত নিকুঞ্জে গায় বিহঙ্গিনীচয় ; নবীনা নায়িকা যেন বিবাহের বেশে, কেন- হাসি হাসি মুখে তুমি সাজ সে সময় ? নিদাঘ মধ্যাহ্,ে যবে প্রচণ্ড ভাস্কর বর্ষেণ অনল-কণা ধরণী উপরে, জলহীন জলাশয়, জগৎপ্রাণ অগ্নিময়, চারি দিক মরুভূমি সম ধূ ধূ করে, তৃষাকুল জীবকুল ছাড়ি ঘনশ্বাস- শীতল ছায়ায় কয়ে আশ্রয় গ্রহণ, কোন দিকে নাহি রব, নিতান্ত নির্জীব সব, কেন সেই উগ্ৰমূৰ্ত্তি ধর লাে তখন ? আবার যখন, সেই প্রাবৃট প্রদোষে উড়াইয়া জয়ধ্বজা চারু সৌদামিনী, ভীষণ অশনি করে, প্রভঞ্জন-রথে চড়ে, 'দলে দলে নভস্থল ঢাকে কাদম্বিনী, বিচিত্র বাসব-চাপ কিরীট মস্তকে, দোলায়ে বলাকা মালা কণ্ঠের ভূষণ ঘাের হুহুঙ্কার রবে কঁপাইয়া ধরানভে, সে ভৈরবী রণসজ্জা কর কি কারণ ?
হৃদয় প্রতিধ্বনি।
কি সুরম্য শােভাময় পৰ্বত প্রদেশ
বিবিধ বিচিত্র লতা পাদপে ভূষিত,
শৃঙ্গগুলি স্তরে স্তরে, উঠিয়াছে পরস্পরে,
চূড়া তার হীরা সম তুষারে জড়িত।
দুর্গম ভূধর
শিরে লভিয়া জনম,
ফেনিল-প্রপাত পথে হয়ে বিনির্গত,
শ্রোতস্বিনী নানা দেশে পবিত্রিয়া, অবশেষে
কলনাদে সিন্ধুসনে হয় সমাগত,
ফেনরাজি বিরাজিত বিশাল জলধি,
মিশিয়াছে নীলাম্বর নীল জল সনে,
আস্ফালে তরঙ্গচয়, চারি দিক সাম্যময়,
কি গভীর ভাব তুলে দর্শকের মনে।
সাহারার মহামরু বালুকা-সাগর,
মায়াময়ী মরীচিকা যথা রঙ্গভরে
শ্রান্ত পান্থে ভ্রান্ত করে; প্রচণ্ড পবন ভরে
তপ্ত বালুরাশি উড়ে পৰ্বত আকারে ।
ভীষণ শ্বাপদ পূর্ণ নিবিড় অরণ্য,
সদম্পতি যুথপতি করে বিচরণ,
শাখাহতে শাখান্তরে, শাখামৃগ ক্রীড়া করে,
কুরঙ্গ-কদম্ব সুখে খেলে অনুক্ষণ।
৬৬ হৃদয়-প্রতিধ্বনি। প্রসারিয়া শাখা-ভুজ মহীরুহ ব্ৰজ প্রেমভরে পরস্পরে করে আলিঙ্গন, কুসুমিত লতাগুলি তদুপরি আছে ঝুলি, কি সুন্দর শােভা ধরে বিশাল কানন। যেমতি নর্তকী কোন ভিন্ন ভিন্ন বেশে, নানা অভিনয় করে রাজেন্দ্র সভায়,-- কাদে সাজি ভিখারিণী, হাসে হয়ে রাজরাণী বিরহিণী বেশে কভু প্রেম-ব্যথা গায়। দেখিয়া সে অভিনয় দর্শকের মন- নানা রস ভাব স্রোতে উথলিয়া যায়, কিন্তু কভু সে নটীর মনােগত প্রকৃতির, কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য জনমে না তার। তেমতি তােমারাে, সতি, কত অপরূপ লীলা খেলা প্রকাশিত ভুবন ভিতরে, মানবের ক্ষুদ্র মন, করি তাহা দরশন, কভু বা আনন্দে হাসে, কভু কঁদে ডরে। না জানি কি ইন্দ্রজালে অলক্ষ্য শৃঙ্খলে তােমাসনে বাঁধা আছে মানবের মন, যাই তােমা পানে চাই, অমনি ভুলিয়া যাই সংসারের হলাহল, যমের পীড়ন।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি। নিরাকার বিধাতার মূৰ্ত্তি দৃশ্যময়ী! অসীম অনন্ত জ্ঞান শক্তি নিদর্শন। ধন্য সে পবিত্র মন, ভক্তিভাবে অনুক্ষণ, সৃষ্টিতে স্রষ্টার সত্ত্বা যে করে দর্শন। স্বর্গীয়া পিতামহীর চরণেদ্দেশে কোমল শৈশবে যবে সরল অন্তর- যূথিকা-কলিকা সম ছিল সুকুমার ; যা দেখিত, যা শুনিত, সকলি সুন্দর ; দেখে নাই, শিখে নাই, কপট সংসার। যে সময়ে—শুনে নাই বাল্মীকি হােমর বীণা-যন্ত্রে বীর-গাথা লঙ্কা ট্রয় নাশ; কালিদাস বায়রণ—প্রণয়-নিঝর- গলিত অমৃত পানে মিটেনি পিয়াস ; v দেখে নাই যবে-সেক্ষপীর ভবভূতি চিত্রিত হৃদয়-চিত্র সজীব উজ্জ্বল অথবা মিল্টন ব্যাস, লইয়া সংহতি, যায় নাই যবে স্বর্গ-মর্ত্য-রসাতল।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
এ সকল দূরে থাক, কেবা বিদ্যাপতি, .
মাইকেল, কে ভারত, যবে নাহি চিনি,
বন্দ মাতা, দাতা কর্ণ, চাণক্যের নীতি,
পাঠশালে গুরু মুখে জানি কি না জানি;
সে সময়ে, আৰ্যে তব স্নেহময় কোলে
শয়ন করিয়া নিত্য নিশাকালে, সুখে-
পুরাণ রচিত কথা সুমধুর বােলে
শুনিতাম, শিখিতাম কভু মুখে মুখে।
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর, রুক্মিণী-হরণ,
জানকীর পরিণয়, রাম-বনবাস,
সাবিত্রী-পবিত্র-কথা, কুরুক্ষেত্ৰ-রণ,
ঐবৎসের শনিগ্রাস, নল-উপন্যাস।
.
কত দিন কাদিয়াছি, তব মুখে শুনি
দশরথ, করি-ভ্রমে, তমসার জলে,
বধিলে তনয় রত্নে, হায়! অন্ধমুনি
শােকাকুল, পত্নী সহ পশিল অনলে।
কখন বা হাসিয়াছি—বৃকোদর বলে
পিণ্ডাকারে কীচকেরে করিলে নিধন।
রোষে গঞ্জিতাম কভু-যবে সভাতলে
পাপ দুঃশাসন হরে পাঞ্চালী-বসন।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
শ্ৰীমন্ত বিস্মিত নেত্রে কালিদহ জলে,
অপূর্ব অতুল সৃষ্টি কমলে কামিনী;
সিংহল মশানে-ভূত প্রেত দানাদলে
লয়ে সঙ্গে রণরঙ্গে নৃমুণ্ড-মালিনী ;
কত দিন সে কাহিনী, মুদিত নয়নে
শুনিয়া, ধরেছি, আৰ্যে, জড়ায়ে গলায় ;
শুনিতে কৌতুক বড়, ভয় কিন্তু মনে,
শিশুমনে যথা ভয় কৌতুক ভথায়।
আর যত উপকথা—দুয়া সুয়া রাণী,
নৃপতির সাত পুত্র, বেঙ্গমা বেঙ্গুমী-
আদি করি, সে কোমল শৈশবে না জানি
কি মন্ত্র ঢালিয়াছিলে শ্রুতিমূলে তুমি।
তব সেই মন্ত্র, আৰ্য্যে, আজিও যৌবনে
দেখায় অদ্ভুত স্বপ্ন জাগ্রত রাখিয়া,
আনন্দে কহায় কত কথা জড় সনে,
সচেতন সম তারে দেহ মন দিয়া।
হাসে ফুল, নাচে লতা, গায় বিহঙ্গিনী,
তিতে তরু নেত্ৰ নীরে, খেলে সৌদামিনী,
ভূধরের সঙ্গে কথা কয় তরঙ্গিণী,
আকাশে কুসুম ফুটে, ঘুমায় মেদিনী,
৭০
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
সিন্ধু সহ রণবঙ্গে মাতায় পবনে,
নন্দনের পারিজাত সাজায় ভূতলে,
শুনায় অপ্সরা-গীতি নিকুঞ্জকাননে,
ছড়ায় মুকুতা পুঞ্জ শ্যাম দূৰ্বাদলে।
এ সকল দেখি শুনি তােমার প্রসাদে,
কিন্তু তুমি কোথা ? হায়! কোথায় এক্ষণে ?
শৈশবের শিক্ষয়িত্রী, নিয়ত বিষাদে
কঁদে এ আকুল প্রাণ তােমার বিহনে।
নিবিয়াছে কত দীপ—মনাকাশ হতে,
বিস্মৃতির অন্ধকারে, কালের বাত্যায় ;
তব স্নেহােজ্জল মূৰ্ত্তি রহিবে তাহাতে
সগৌরবে চিরদীপ্ত তপনের প্রায়।
তব স্নেহ দয়া কথা, আমি বলে নয়,
প্রতিবেশী দীন, দুঃখী, আত্মীয়, স্বজন,
জানে তারা, তব কথা হইলে উদয়
যাহাদের বাষ্পকুল হয় দুনয়ন।
যে লােকে গিয়াছ তুমি আজি, পুণ্যশীলে,
সে লােকে কি মানবের অশ্রুধারা যায়
যায় যদি, ধর সান্দ্র নয়ন সলিলে,
ভক্তিভাবে উপহার দিতেছি তােমায়।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
৭১
বিদায় বিদ্যালয়।
কুহকিনী দুরাশার ছলনায় ভুলিয়া,
ত্যজি প্রিয় বন্ধুগণে, পরিহরি পরিজনে,
যদিও পথিক যায় নিজ গৃহ ছাড়িয়া,
তথাপি তাহার মন, অশ্রু করি বরিষণ,
চাহে স্বদেশের পানে বার বার ফিরিয়া
কঁদে চির পরিচিত জন্মভূমি স্মরিয়া।
তেমতি অভাগা এই কালের আজ্ঞায়
শৈশবের সুখময় ক্রীড়াক্ষেত্র বিদ্যালয়,
. গুরু, সহাধ্যায়ী বৃন্দ ছাড়ি সমুদয়,
অজ্ঞাত সংসার পথে, প্রবেশিবে আজ হতে,
তাই সে বিষন্ন মনে মাগিছে বিদায়,
তাই কাদে প্রাণ তার বিয়ােগ-ব্যথায়।
૧૨
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
জ্ঞানের মূরতি, গুরাে, ভকতি-ভাজন,
এ দীনের মনাঞ্চলে দিয়াছিলে যে সকলে,
বিদ্যামণি, জ্ঞানরত্ন, উপদেশধন ;
প্রমাদের ছিদ্র দিয়া, অধিকাংশ ছড়াইয়া
সে অঞ্চল হতে, হায়! হয়েছে পতন,
বিস্মৃতি তস্করে আরাে করেছে হরণ।
স্বল্পমাত্র আছে যাহা তাহাই লইয়া,
মৃদুবিকম্পিত পদে, গুরুচিস্তানত হৃদে,
সংসার কানন দ্বারে আছি দাঁড়াইয়া।
ঢুকি ঢুকি মনে করি, কিন্তু প্রাণ পছু ফিরি
সুদীর্ঘ হৃদয়-ভেদী নিশ্বাস ছাড়িয়া
অতীতবাল্যের প্রতি দেখিছে চাহিয়া।
সম্মুখে সংসার ওই উজ্জ্বল কিরণে,
স্বর্ণ ফল বিভূষিত তরুগুলি অগণিত
রহিয়াছে সারি সারি রঞ্জিয়া নয়নে ;
ওই মৃদু প্ৰবাহিণী—নাচিতেছে শ্রোতস্বিনী-
রজত তরঙ্গ তুলি ধীর সমীরণে ;
ওই যে ডাকিছে পাখী সুমধুর স্বনে।
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
৭৩
আর যা যা দেখিতেছি সংসার কাননে,-
এ জনের ভাগ্যে কি—সত্য কিম্বা হবে ফাঁকি,
দূর হতে ক্ষুদ্র বুদ্ধি বুঝিবে কেমনে!
আশা ভয় দুই দিকে দাঁড়াইয়া একে একে,
দোলাইছে গুরু বেগে অলিশ্চিত মনে ;
দুলিছে অপৰু চিত্ত সংশয়-দোলনে।
মৃদু হাসি বলে আশা মধুর-ভাষিণী,
সম্মুখেতে যে কানন-দেখিছ ও মধুবন,
কল-প্ৰবাহিণী ওটি নদী মন্দাকিনী,
ওই যে বিহঙ্গ সব করিতেছে কলরব,
মদন সারিকা ওরা বসন্ত-সঙ্গিনী,
সংসার-সুখের উৎস, উৎসবের খনি।
কুঞ্চি ললাট নেত্র, বিকম্পিত স্বরে
ধীরে ধীরে কহে ভয়, ও গুলি রসাল নয়,
মাখালের বন উহা সংসার প্রান্তরে,
সুখ-শান্তি-ধৰ্ম্ম-নাশা ওটি নদী কৰ্ম্মনাশা
ডাকিছে বিকট স্বরে বায়স নিকরে,
দুর্গম সংসার মরু কণ্টকে প্রস্তরে।
এ ৫
হৃদয়-প্রতিধ্বনি।
পুনঃ সেই সুখ বাল্যে-অস্থির অন্তর
মনে করি ফিরে যাই, ফিরিতে ক্ষমতা নাই,
কাজে অনিচ্ছায় তাই হই অগ্রসর।
নিয়তির দৃঢ় আজ্ঞা, কি সাধ্য করি অবজ্ঞা,
অদৃষ্টে গতি বােধ দেবের দুষ্কর ;
কোথা লাগে মানবের শক্তি ক্ষুদ্রতর !
সবিনয়ে বলি আমি শ্রীগুরু চরণ ;
প্রাণভরে, বন্ধুগণ, এস করি আলিঙ্গন,
বিদায় লইয়া যাই জনম মতন ;
হয় তাে কাহার সনে, কোন দিন কোন খানে
দেখা হবে, অথবা এ শেষ দরশন !
তাই ক্ষুন্ন মনে করি বিদায় গ্রহণ ।
শেষ;
কলিকাতা-গােপীকৃষ্ণ পালের লেন নং ১৫, নূতন বাঙ্গালা যন্ত্রে মুদ্রিত।
។
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.