Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Bishad O Ashru
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বিষাদ ও অশ্রু
ঐজিতেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী প্রণীত
কলিকাতা, ১৩ নং জোড়াবাগান হইতে
শ্রীপ্রসাদকুমার মুখােপাধ্যায়
কর্তৃক প্রকাশিত
কলিকাতা।
১৩৩ নং মজিবাড়ী থ্রট “হরি-যন্ত্রে”
শ্ৰীযােগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত।
সন ১৩০১ সাল।
[ মুল্য ॥ আট আনা।
No text on this page.
বিষাদ ও অশ্রু।
বিষাদ ও অশ্রু।
ডুবিয়াছি বিষাদ সাগরে,
মনােসাধে আঁধারে মগন ;
মনােসাধে পাই মনােব্যথা,
সাধে করি অশ্রু বরিষণ।
দুঃখের উচ্ছাস বহে প্রাণে,
উচ্ছাসে অধীর মননাপ্রাণ ;
সাধে প্রাণে সহি এ যাতনা,
সাধে প্রাণ ঈদে অবিশ্রাম ।
কোন দিকে দৃষ্টি নাহি চলে,
এ আঁধারে পথ নাহি পাই ;
নাহি জানি প্রাণের বাসনা,
অন্ধকারে কোথা ভেসে যাই
"বিষাদ ও অশ্রু
সুধু দুঃখ সুধুই বিষাদ,
প্রাণ ভরা সুধু অন্ধকার ;
প্রাণের শােণিত রাশি
এই অশ্রু জল
বহে প্রাণে দুঃখের উচ্ছাস !
কেন কাঁদি?
কেন কাঁদি?
কেন অশ্রু করি বিসর্জন ?
আসিয়াছি নিভৃত নিলয়,
একটিও সাথী নাই,
একটিও প্রাণী নাই,
একটি গাছের পাতা
কঁপেনাকে। হায় !
একটিও
ও সাড়া শব্দ শুনা নাহি যায়
কেন যেন জীবন উদাস,
নাহি পাই শীতল বাতাস ;
কেবলি আঁখির জল
বয়ে যায় বয়ে যায় ?
কেন কঁদি?
== =
সেই যে পুরােণাে কথা,
এত দিন ভুলেছিনু,
আজ আবার কেন মনে হয় ?
কল্পনা সাগর দিয়া,
দুঃখের তরঙ্গগুলা,
হৃদিতটে কেন লাগে হায় ?
বাঁধিতে পারিনা বুক
ভেঙে যায় ভেঙে যায় !
একদিন সুখ ছিল,
এ হৃদয়ে শান্তি ছিল ;
প্রাণ ভরা আশা ছিল
কোথা গেল কোথা গেল ?
সকলি কি অবসান ।
ফুল্ল ফুল ম্রিয়মাণ ?
এমনি বিরলে বসি
একেলা কঁদিতে হল ?
কেন কাঁদি? কেউ কি কাদায় ?
প্রাণে মাের বিষ ঢেলে দেয় ?
বিষাদ ও অশ্রু
বিষে মাখি দুঃখময় বাণ,
কেউ মােরে করে কি সন্ধান ?
মনটদুঃখে কেঁদে মরে প্রাণ ।
কেউত করে না জ্বালাতন,
তবে প্রাণে কিসের বেদন?
নিশি দিন শুধু চেয়ে থাকি,
প্রাণ ভরি কতই নিরখি ?
মন খুলে কই কত কথা,
কেন নাহি ঘােচে মনােব্যথা ?
কেন করি অশ্রু বিসর্জন ?
কেউ কি কুকথা কয় মােরে ?
বুঝি কয় না ?
কেউ কি কাদাতে চায় মােরে ?
বুঝি চায় না।
তবে কেন ভাসি দুখনীরে ?
কেন আঁখি অবিরাম ঝরে ?
কেন প্রাণ বিষাদে মগন ?
কমল ফুটিলে সরােবরে,
সে কুসুমে কীটাণু লুকায় ;
কেন কঁাদি ?
= = = = =
নীরবে দংশন করে তারে ;
নীরবে (সে) আঁধারে মিশে যায় !
বিষাদ কি সেধে এসেছিল ?
এমন কি এসে থাকে ?
সেধে এসে হৃদে বসেছিল ?
এমন কি বসে থাকে ?
আমি তায় করেছি যতন,
নহিলে সে কেনবা আসিবে ?
সে আমার সাধনার ধন,
তা না হলে কেন কথা কবে ?
নিরবধি তার সনে মিশি,
চেয়ে থাকি বিষাদের পানে,
বিষাদ সাগরে যাই ভাসি,
কই কথা বিষাদের সনে,
বিষাদ আমায় ভালবাসে,
আমি তারে ভালবাসি প্রাণে,
যখন সে হেথায় এসেছে,
তখনি মিশেছে আমা সনে,
মেশা মশি ভালবাসা যবে,
বিষাদ ও অশ্রু।
বিষাদ কি হেসেছিল তবে ?
“হাসিবে সে ? হাসি কোথা পাবে ?
হাসিলে বিষাদ ঘুচে যাবে,
সুধু হাসি পাবে।
কেঁদে কেঁদে কাদিতে শিখেছি,
বিষাদ কাদিতে ভালবাসে ;
হাসি যেন কবে ভুলে গেছি,
সেত আর কাছে নাহি আসে।
প্রাণ ভরে কঁাদে কত জনে,
আমি কই বিষাদের কথা।
তারা ত কাদে না আমা সনে,
তারা ত বােঝেনা মনােব্যথা।
হেসে হেসে হাসিতে পেয়েছে,
কাদিতে ত নাহি পায় তারা,
কাদিলে হাসিত যাবে ঘুচে,
আর নাহি দিবে এসে সাড়া,
হেসে তারা কিবা সুখ পায়,
বিষাদ পশেন সে হিয়ায় ;
মলিনের হৃদয়ে বিষাদ,
প্রাণের ঘুমন্ত অবসাদ ;
কল্পনা সম্বােধন
মলিনের সুধু অশ্রুজল,
মলিনের দুঃখই সম্বল,
মলিনের অশ্রু বিসর্জন,
মলিনের মলিন বদন,
দুঃখের তরঙ্গ বুকে ধরা।
দুঃখভরে সুধু কেঁদে পড়া !
কম্পনা সম্বােধন।
ডাকি তােরে দীন হীন আমি,
কল্পনারে আয় আয় আয় ।
কোমল আঁচল বাতাস দিয়ে,
পাখীরে ঘুম পাড়াতে যেয়ে,
কেন ফিরে আসিলিনা আর ?
আয় আয় কল্পনা আমার।
আজ আমি পেয়েছি যে ব্যথা,
বলি তােরে আয় আয় আয়,
প্রাণ পাখী ঘুমাইতে চায় ;
খুঁজে তােরে কোথাও না পেয়ে,
পাখী মাের ফুপিয়ে ফুপিয়ে,
বিষাদ ও অশ
কেঁদে কেঁদে উড়ে যেতে চায়,
তাই তারে ঘুম পাড়া এসে,
নহিলে সে রবেনা হেথায়।
আয় সখি আয় আয় আয় !
ঘিরিয়া নবীন মেঘে হাসিয়া হাসিয়া।
দামিনীরা খেলিয়া বেড়ায় ;
কোথা তুই র’লি এ সময় ?
ওরা যেন কেমন হয়েছে,
সখি তুই আয়লাে হেথায় ;
ছুড়ীদের আদব দিবিলো,
সরে যাবে মেঘটীর ছায় ;
মুখগুলি ঢাকিয়া দিবিলাে,
বিমল কোমল ঘােমটায়।
বৌ গুলাে বাড়ীর বাহিরে,
আয় তুই হেথা চলে আয় !
লজ্জায় এমনি সরে যাবে,
দেখে শুনে হাসি পাবে সখি,
কল্পনারে আয় আয় আয় ।
আছে হেন একটি আলয়,
প্রাণের এমনি নিরালায়,
কল্পনা সম্বোধন
যেথায় আলােক নাহি পশে,
চোখ বুজে আঁধারের ছায়।
শত শত জানালা ভেদিয়া।
আঁধারের মুখ দেখে।
ভয়ে ভয়ে কোথা সরে যায়।
সে আলােক আঁধারে ডোবেনা,
সে আঁধার পরশ করে না,
সে আলােকে আঁধার টুটে না।
আলাে যেন প্রাণে ভয় পায়,
আয় মাের হৃদয়ের ধন,
আমি তােরে রাখিব সেথায়।
সখিরে এমনি নিরালায়,
সাড়া শব্দ পশেনা সেথায় ;
ভীষণ আঁধার রাশি,
ঘেরা ঘিরি করি সবে,
চারিদিকে রয়েছে সেথায়।
হয়ত অনেক বাঁশী বাজে,
একটিও পশেনা সেথায়,
হয়ত অনেক গান,
হয়ত অনেক তান,
বিষাদ ও অশ্রু।
আসে যায় হেথায় হােথায়,
একটিও ও শুনা নাহি যায় ;
আয় আয় কল্পনা আমার,
আয় তােরে রাখিলে সেথায় !
আজি সখি আঁধারে আঁধারে,
পাতিয়াছি তােমার অসিন,
নিরালায় ভালবাসি বলে,
বেছে দিনু হেন নিরালায়,
সাড়া শব্দ পাবেন কখন।
হয়ত এমন হতে পারে,
দু’এটি ভাঙা আলাে,
রয়েছে আঁধারে পড়ে,
আঁধার সাগর ভেদি,
আলাে সনে মিশিতে না পেয়ে,
ঘুচিল না আঁধারের কারা,
আঁধারেই হয়ে গেল সারা,
আঁধারে বয়েছে হায়,
সুধু অন্ধকারময়,
চকিবেনা তােমার নয়ন !
সেই আঁধারের মাঝে,
কল্পনা সম্বােধন ।
অবিরাম অবিশ্রাম,
পাখী মাের শুধু কাঁদে হায়।
হাতখানি দিয়ে সখি ।
দেখুসে পিজিরা মাঝে
পাখী তােরে ডাকিতেছে আয়
জানি পিজিরা ভেঙে
কবে পাখী উড়িয়া পালায়।
সুকোমল হাতখানি
বুলিয়ে দে গায় ওর,
গলায় পরায়ে দেলো
প্রেমের শিকলি তাের
সাধ নাহি হয় যেন
ভাঙিতে এ ঘুম ঘাের ;
কল্পনার ভাবে সখি
পাখিটী থাকুক তাের।
বুকে তুলে লও এসে হেথা,
বুকে . তার লুকাইতে চায়।
নির। :য় ভালবাস বলে
এ আসন পেতেছি হেথায় ;
আজি এ ঘুমের ঘােরে
১২
বিষাদ ও অশ্রু
পাখী তারে ডাকিতেছে আয়
তুই যদি হেথা না আসিবি,
সাধের পিজিরাখানি
ভেঙে কবে চলে যাবে,
শূন্য খাঁচা পড়ে রবে হায়,
তাই ডাকি দীন হীন আমি,
কল্পনারে আয় আয় আয় ।
আপনা হারা।
ভােলা মন আপনা ভুলে
আপন পানে চায় না !
তটিনী ধায় উজানে
ফিরে ঘরে যায় না।
ফুলেরা আপন হারা,
লিত মাতােয়ারা,
ভানুত প্রেম পারা
ঘরে পড়ে রয় না।
পাখীত আপনি সাধে
বিষাদে আপনি কাঁদে,
আপনা হারা ।
আঁখিত আপনি ঝরে
শুকিয়ে পড়ে রয় না !
লটী আপনা ভুলে
তরুর গায় পড়ে ঢলে,
তরুর গায় ঘুমিয়ে পড়ে
সুখ যেন টুটে না।
হাওয়াত আপনি সেধে,
ডেকে লতার ঘুম ভেঙেদে,
লতাটা কেঁপে মরে,
আঁখির সরম ভাঙে না !
পাতারা দুলে দুলে,
লতারে সরূতে বলে,
লতাত যায় না সরে
ব্যথা বুঝি সবে না !
আমরি কি লজ্জাশীলা,
কথাটী কয়না বালা,
রূপে ওর বনটী আলা,
রূপের গরব করে না !
১৪
বিষাদ ও অশ্রু।
ভাবে প্রাণ উছলে পড়া,
নীরবে কয় কথা ওরা,
বােবা ভাষা দেয় গাে সাড়া
তবু কথা ফোটে না।
কেউ যদি ছোঁয় ওরে,
বুক খানি ভেঙে পড়ে,
একটি কথা কয় না ফিরে,
আঁখির বারি ঝরে না !
ঢলে ঢলে গলে পড়ে,
শুকিয়ে ভূয়ে নুয়ে পড়ে,
বিষাদিনী লজ্জাবতী
মাথাটী আর তােলে না !
আঁখির বারি ঝরে না !!
হরিষে বিষাদ।
কেন কাঁদে প্রাণ?
কেন আঁখি ঝরে ?
কেনরে বিষাদে ভাসিয়া যাই ?
ব্যথিত হৃদয় কি যাতনা হায়!
হরিষে বিষাদ।
একিরে অনল একি বিষময় !
কেন প্রাণে আজি এত ব্যথা পাই?
কেন এত বিষ অন্তরে আমার ?
এত সুধা রাশি ফুরাল এবার,
সুধু বিষ ভরা সুধার ভাণ্ডার,
জ্বলেরে অনল প্রাণে অনিবার।
কিবা আলাে ছিল, একি অন্ধকার।
এত হাসি পেয়ে কেন কাঁদি আর ?
সুখে ভেসে ভেসে দুখে ডুবে মরা ;
পথে যেতে যেতে কেন ভেঙে পড়া ?
হরিষে সজনি বিষাদ আবার।
বিদরি পাষাণ পড়ে বারি ধারা;
বিষের জ্বালায় অঙ্গ জ্বলে মরা
অনলের তাপে সুধু গলে পড়া ;
নিশি কেঁদে কেঁদে ফুল গেছে মারা;
অলি ডেকে ডেকে নাহি পেল সাড়া,
সুধু প্রাণে লয়ে বিষাদের ভরা,
কবে চলে গেল আর এল না।
কেন দুঃখরাশি অন্তরে আমার ?
কেন রে হৃদয় এত অন্ধকার ?
;
বিষাদ ও অশ্রু
ও কে জ্বেলে দিল ওই অগ্নিরাশি ?
ওরে দগ্ধ প্রাণ কোথা যাও ভাসি ?
কেন হৃদয়ের ব্যথা ঘােচে না ?
•
এ দুঃখ হৃদয়ে আর ধরে না
অাখি ফেটে যায় আর ঝরে না ;
ভাব কেঁদে মরে কথা সরে না ;
ব্যথিত বেদন কেউ বুঝে না ;
এত ব্যথা প্রাণে বুঝি সবে না।
আমি কেঁদে মরি উষা হাসি পায় ;
ওই সমীরণ হেলে দুলে যায় ;
ওই পাখী দুটী কিবা গান করে,
ফুল দেখে দেখে হেসে ঢলে পড়ে ;
ওরাত আমার ব্যথা বােঝে না ;
প্রাণে কেঁদে মরি কেউ শােনে না ;
ব্যথা কাকে বলে ওরা জানে না ;
বুঝি তাই হবে,—ওরা জানে না;
কেন কাদে প্রাণ ওরা বােঝে না,
বুঝি তাই হবে,—ওরা বােঝে না।
চিরসুখে ভাসে ব্যথা আসে না,
ব্যথিত বেদন তাই বােঝ না।
ক্ষুদ্র হৃদয়ের ভালবাসা।
১৭
সুধু চেয়ে থাকে সুধু হাসি পায়,
ব্যথা চলে যায় কাছে আসে না।
হরিষে বিষাদ বুঝি ঘটে না।
সারা নিশা জেগে গাঁথি ফুলহার,
কেন ভিঁড়ে গেল মম প্রিয় তার?
আমি দিশা হারা পথ নাহি পাই ;
কোথা যাব বলে কোথা চলে যাই।
আশা ফুটে ছিল সে চলে গেছে।
সুধু প্রাণ ভরা বিষাদ রয়েছে,
ওইত সজনি বিষাদ আসিছে,
ওই সে বিষাদ, ওই ভয়ঙ্কর !
কেন হেঁসে হেঁসে শুধু কেঁদে পড়ি ?
সুখে ভেসে ভেসে দুখে ডুবে মরি ?
শরদের শশী কেন রে আঁধার ?
হরিষে সজনি বিষাদ আমার?
ক্ষুদ্র হৃদয়ের ভালবাসা।
আমি বড় ভালবাসি তারে,
তাই সুধু এসেছি হেথায়,
১৮
বিষাদ ও অশ্রু।
সেত থাকে কতই অন্তরে,
দরশন দিতে নাহি চায় ?
আমিত দেখিতে চাই তারে,
সেত কভু দেখে না আমায়,
সে আমায় বড় ঘৃণা করে,
তবু প্রাণ তার পানে ধায়।
প্রাণ ভরি দেখি যদি তারে,
তা হলে বড়ই ভালবাসি,
যতক্ষণ নাহি দেখি তারে,
কেঁদে কেঁদে দুখনীরে ভাসি।
সে আমার কাছে নাহি আসে,
আমি তারে অন্তরে রেখেছি
হৃদয়ের সব দিছি তারে,
পৃথিবীর সব ভুলে গেছি।
ভালবাসা কোথায় আছিল ?
কে আনিল সম্মুখে আমার ?
স্বর্গের কুমারী ভালবাসা ;
কে খুলিল স্বর্গের দুয়ার ?
সাগরের বারি ভালবাসা,
ভালবাসা আকাশের তারা,
ক্ষুদ্র হৃদয়ের ভালবাবা।
আজ যেন বাণ ডাকিয়াছে ;
ধরায় এসেছে ছুটে তারা।
সাগর তরঙ্গ তুলিয়াছে
এ তরঙ্গ অর ঘুচিবে না,
তারাগুলি ফুটেই রয়েছে,
আঁধার হেথায় আসিবে না।
আমি আজ অমিয়া পেয়েছি,
সেরে গেছে বিষের যাতনা,
অমিয়া কি কখন দেখেছি ?
দেখেছি কি ? মনে পড়ে না
বিষ কি আমার কাছে ছিল ?
তা হলে কি এত ভালবাসি ?
এরি মাঝে কোথায় লুকাল ?
ছিল তবে ; আমি ভুলে গেছি
ভালবাসা হেথায় ছিল না,
স্বর্গ-মাঝে বসতি তাহার ;
আমি তবে স্বর্গে চলে যাব ;
হেথা ফিরে আসিব না আর।
ভালবাসা কুহকের মেয়ে,
সে বড় মােহিনী মন্ত্র জানে ;
বিষাদ ও অশ্রু
একবার আমা পানে চেয়ে,
সে যেন মিশেছে আমা সনে।
একি ঘোর কুহকে পড়েছি,
স্বপ্নে আমি,—কিবা জাগরণে ?
অমৃত, না গরল পিইছি ?
ধরায়, না এসেছি গগনে ?
আমি যেন সব ভুলে গেছি,
স্মৃতি আর কাছে নাহি আসে,
তাকেত কবেই হারিয়েছি,
কোথা যেন যাইতেছি ভেসে !
সব যেন স্বপন দেখিছি,
আশা যেন কোথায় গিয়াছে,
আমি যেন কোথায় এসেছি,
কেউ হেথা নাই মাের কাছে!
পৃথিবী কোথায় পড়ে আছে,
সমীরণ নাই হেথা আর ।
দুরাশাত কবেই মিটেছে,
ঘুচে গেছে বিষাদ আমার ।
কোন কথা কাণে নাহি শুনি,
কলরব পশেনা হেথায়।
পোর্ণমাসী।
২১
নীরব রয়েছে যত প্রাণী,
শান্তি যেন পেয়েছে সবায় !
কত প্রেম যাইতেছে ভেসে,
পড়ে আছে কত সুধারাশি,
সে আমার ওইত এসেছে,
আমি যারে বড় ভালবাসি !!
পৌর্ণমাসী
হেথায় আলেয়া জ্বলছে কেন ?
ওই যামিনী হাছে যেন !
যামিনীর ওই সিঁথিটা কেমন
অমিয় মাখানাে হেন ?
অত অমিয় কোথায় পেলে ?
নিশি হাসিলে পড়ে গলে ;
নিশি কাদিলে মুকতা ফলে,
ঘুরে ফিরে এসে সমীরের বালা
বিলায় আঁচল ভরে ?
পাষাণগুলা দাড়িয়ে থাকে।
নয়নে বারি ঝরে !
১২
বিষাদ ও অশ্রু।
এমন শ্যামল, এমন কোমল,
এম্নি রূপের খনি !
এমন রূপের রাশি,
কবে কে দিল সােণর শশী
ওর গুণের কথাটা শুনি ?
কোমল আঁধার এম্নি উজল
দেখিলে নয়ন ভোলে !
(আবার) সােণার ফুল তুলে এনে
জড়িয়ে দিয়েছে চুলে !
যেমন কোমল তেন্নি বিমল,
তেমি প্রাণের কবাট খােলা!
মরমে বালার সরম কত,
বে-বাসরের বৌয়ের মত,
ঘােটা ঢাকা চাঁদের আলা !
মলয়ের ওই ছােট মেয়েগুলা,
বাসর জাগাতে এসেছে যেন।
করি ঘেরা ঘিরি হােথায় এসে,
ভুড়িগুলা মুচকি হাসে ;
উষা।
যামিনীর ওই ঘােন্টা ফেলে,
হেসে হেসে যাচ্ছে চলে,
জানালার পাশে দেবের মেয়েরা,
ওই মুখ পানে দিতেছে উকি,
রূপ দেখে বুঝি পেয়েছে সরম
দিতেছে কবাট মুদিয়া আঁখি।
দুটি ফুল ওই রয়েছে ফুটিয়া,
আর একটি ওই চাদের কোলে ;
সরসীর নীরে ফুটেছে কুসুম,
মেঘের কোলে বিজলি দোলে ।
সাথী হারা সেই পাখিটী আমার,
ভুলে গেছে সব জঙলা বুলি ;
হারানাে সঙ্গীর মায়াটী ঘিরিয়া,
দাড়িয়েছে যত কিরণগুলি।
উষা।
আহা কি দিব্যি মেয়ে ওই এসেছে !
মরা মালঞ্চে ফুল ফুটেছে !
নিশাতে লতা ঘুমিয়ে ছিল ।
বিষাদ ও অশ্রু।
বালাটা তারে জাগিয়ে দিল ;
তরুণ তপন ওই উঠেছে,
পাখীর ডাকে ঘুম ভেঙেছে।
শীতের ভয়ে লুকানাে পাতা,
ওইত এসে তুলেছে মাথা।
পাখী বড় গান ধরেছে,
সমীর গিয়ে দাড়াল কাছে ;
কেঁদে নিশি জেগেছিল,
সকালে তাই ঠাণ্ডা হল ।
থালে পাখী যাচ্ছে চলে,
ফুলের মুখ মুছাবে বলে।
হাওয়া পেয়ে সরম ভুলে,
ফুলেরা দেছে ঘােটা ফেলে !
জলে ডােবা গোলাপ হাসে,
হাওয়া পেয়ে সুখে ভাসে।
সমীর গিয়ে খবর দিল,
ঘুমােন অলি ছুটে এল।
ফুলের জলে মুখ ধুয়ে ;
রেগে বঁধু চলাে ধেয়ে ।
ঠাণ্ডা বাতাস গায় লেগেছে,
উষ।
২৫
তাইতে কুমুদ ঘুমিয়ে আছে।
ভােরা হেথা চলে আয় রে,
ঘুমােন ফুলে জাগিয়ে দেরে।
ঘুম ভাঙানাে মধুর রবে,
ডাকলে তারে জাগবে তবে।
গানের রাগে উঠবে জেগে,
দাড়ারে তুই যাসনে রেগে।
অলিগুলাে প্রেম জানে না,
ঘুমােন ফুলে জাগিয়ে দেন।
উষার বদন দেখবে বলে,
নবীন ভানু এল চলে,
পুরুষ দেখলে সরম ধরে,
তাইতে উষা চায়না ফিরে,
উষাটী বেশ আদব জানে,
চায়না কারাে মুখের পানে !
মুখানি ওর ঘােমটা ঢাকা,
বিষাদ মাঝে হাসির রেখা
আমরি কি কোমল মেয়ে,
ছুড়ীগুলাে ওকে দেখছে চেয়ে!
ওদের প্রাণে বিষের ভরা,
[ ৩ ]
বিষাদ ও অশ্রু।
দ্বেষে ঘেষে যেন যাচ্ছে মারা !
ফুলের হাসি সয়না গায়,
বিষাদে আঁধারে লুকায়ে রয় ।
উষার গায় চাঁদের আলো,
ঘুমােন চাদ ময়লা ভাল।
চোকে কান্না মুখে হাসি,
ওই রূপ আমি ভালবাসি।
জাগাতে উষা ভালবাসে,
জাগাতে তাই ধরায় আসে ;
উষা যদি হেথায় থাকে
তাহলে সবাই জাগে।
নিশা-শেষে এসে ধরায়,
উকি মেরে অন্নি লুকায়,
ঘােটায় মুখ ঢাকিয়া রয়,
নীরব ভাষায় ডাকিয়া যায় ;
ওই ডাকে কি ভারত জাগে ?
ঘুমােন ভারত ঘুমিয়ে থাকে।
অশ্রু (সুখের ও দুঃখের )
অশ্রু
( সুখের ও দুঃখের )
যেজন পেয়েছে সুখের জীবন,
একটি কাটাও ফুটেনি পায় ;
একটি দুখের মলিন বদন,
কখন আসেনি কঁাদাতে তায়।
একটি বেদনা জাগিয়ে থাকে না,
পশিতে তাহার হৃদয়-নিলয় ;
একটি বিষাদ ভ্রমেও আসে না,
পরশিতে তার কোমল কায় ।
সুখ-কুঞ্জবন-পরাণে তাহার,
সুখের কুসুম কতই ফুটে;
পরাণ খুলিয়া সুধা ঢেলে দেয়,
ঘুমােন সৌরভ জাগিয়া উঠে।
সেই অগােচর কুঞ্জের মাঝারে,
অগােচরে বায়ু লুকায়ে বয়,
অগােচরে সেই মধুর সৌরভ,
বহিয়া বহিয়া ছড়ায়ে দেয়।
২৮
বিষাদ ও অশ্রু
ক্ষুদ্র বিষাদের দু’ একটি কণা,
যদিও মাথাটী তুলিয়া থাকে ;
অতি অগােচরে হৃদয়ের দ্বারে,
যদিও আঁখিটি মেলিয়া থাকে।
অমিয় সিক্ত বায়ুর হিল্লোলে,
সে বিষাদ আর সজীব থাকে না,
পাখিটী যেমন বিষাদে আকুল,
চাদের কিরণ সহিতে পারে না।
কি ভাবে বিভাের পরাণ তাহার,
কিবা অচঞ্চল সুখের স্বপন।
কত সুখ যেন উছলিয়া পড়ে,
মাতা’য়ে তাহার মােহিত মন।
অগােচর সুখে সে রহে মগন,
অগােচরে কত সুখ ভেসে যায়,
অগোচরে কত ফুল ফুটে থাকে,
অগােচরে কত অমিয়া লুটায়।
তারি সুখ তরে, তারি শশী তারা,
তার নীলাকাশে উদয় হয় ;
অশ্রু ( সুখের ও দুঃখের )
তারি সুখ-ভানু অরুণ-বিমানে,
তরুণ কিরণ ঢালিয়া দেয়।
তারি তরে আসে মলয় অনিল,
ফুলের সৌরভ ছড়ায়ে বয় ;
তারি তরে ওই কোকিল পাখিটি,
“কুহু কুহু কুহু” সঙ্গীত গায় ।
যাকিছু সুখের সকলিত তার,
অথবা সকলি সুখের ভরা ;
সমস্তই তার সুখের সংসার,
সুখময়ী এই বিশাল ধরা।
সেজন কেবল সুখে মাতােয়ারা ;
আত্মহারা প্রাণ হেথা এসেছে ;
সুখ-সাগরের সারাটী তুফান,
কবে এসে তার হৃদে পশেছে।
সারা নিশি দিন শুধু ঢেউ ভােলা;
;
সাগরের বুকে ধরে না আর ;
তবু নাহি টুটে, পুনঃ ঢেউ উঠে,
ঢেউ ভােলা যেন ঘােচেনা তার।
বিষাদ ও অশ্রু
অধীর হৃদয় সুখে উচ্ছসিত
সুখ বুঝি প্রাণে ধরে না আর ;
তাই ঝরে পড়ে কত অশ্রু রাশি,
সুখের উচ্ছাস নয়নে তার ।
সবাইত কাদে এ ধরায় ;
সুখী যারা, কত কঁাদে তারা ;
কত হাসি, কত অশ্রু ধারা ,
সুখে বুঝি অশ্রু ঝরে পড়ে ।
সুখ-নীরে বুঝি ডুবে রয়!
দুখী কঁাদে প্রাণ ফেটে যায় ;
দুঃখ বুঝি প্রাণে নাহি সয় ;
সুখ বুঝি কোথাও মেলে না ;
আলাে বুঝি আঁধারে পশে না ;
হেরে ধরা সুধু দুঃখময় !
অতি ক্ষুদ্র আশা-লতাটীর
একটি অঙ্কুর হয়েছিল,
ভেঙ্গে গেল !
অশ্রু (সুখের ও দুঃখের )
হৃদয়ের কুঞ্জবনে,
একটি সুখের ফুল,
জাগিল ফুটিবে বলে,
ফেটে ফেটে ফুটিল না
শুকাইল!
তপনের একটি কিরণ,
ভিক্ষা মাগি আনিলাম,
মনে মনে ভাবিলাম,
এমনি উজ্জ্বল হবে।
কেন বৃথা হেথা আসিলাম,
কেন আলাে হেরিলাম,
দেখিতেই অমনি ফুরাল !
আমি দুখী,-আমি আত্মহারা;
চৌদিকে দুঃখের কারা,
দিশাহারা, পথহারা,
আশাহারা, মতিহারা,
সংসার দুঃখের পার ;
আমি ভাবিতেছি
প্রাণ আমার বুঝি দুঃখে গড়া !
বিষাদ ও অশ্রু।
মনে পড়ে স্বপনের মত,
কতক্ষণধরে ছিনু
সুখ সাগরের নীরে,
প্রাণ ভরি সুধু ভাসিতাম,
বুঝি ভেসে ভেসে ঘুমিয়েছিলাম,
তাই অগোচরে হেথা আসিলাম
দিশা নাহি পায় আঁখি
সুধুই ঝরিয়া মরে !
সেথায় কোকিল পাখী
সুধু দিন রাত্ বসি
শুনাত আমারে তার
সুধামাখা গান গুলি ;
মনে পড়ে স্বপনের মত,
আজো ওই ডাকিতেছ সেত,
আজো কি তেমনি সুধা ঢালে ?
আমি বুঝিতে পারি না
কেন প্রাণ বিষে যায় জ্বলে ?
মনে পড়ে ফুল গুলি
কেমন থাকিত ফুটি ;
অশ্রু (সুখের ও দুঃখের )
ও
তুলি আনিতাম আমি
ছােট ছােট জুই দুটি ;
;
এমন মধুর বাস
জাগিত সুখের আশ,
অঙ্কুরিত-আশা যেত
হৃদয়ের কাছে কাছে ;
পথহারা দুটি ঢেউ
জাগিয়া উঠিত পাছে ।
গিয়াছে অনেক দিন,
দেখা শুনা নাই আর,
মনে পড়ে স্বপনের মত ;
আজো ফুল ফুটিয়াছে কত ;
তেমন মধুর বাস
আজো কি আছে ও ফুলে ?
বুঝিতে পারি না আমি
কেন প্রাণ যায় জ্বলে ?
আগে আমি হাসিতাম কত,
আজি কাঁদিতেছি ;
আমার প্রাণের মাঝে
বিষাদ ও অশ্রু।
কি যেন আছিল এক
আমি যেন তাকে হারিয়েছি।
প্রাণ যেন কেমন হয়েছে,
কথাটী কহেনা,
সুধু কেঁদে পড়ে রয় ।
একটি বর্শীর গান,
একটি চাদের আলো
পশেনা প্রাণের মাঝে হায় !
সারাটী আকাশ যেন
কেবলি মেঘেতে ঘেরা,
ভানুটী উঠে না ;
একটী তারার ফুল
পারে ফুটিতে সেথা
আঁধার টুটেনা !
সারাটী সাগর মাঝে
সুধুই একেলা আমি
সাথী কেহ নাই।
অশ্রু (সুখের ও দুঃখের )
একটি কোমল কথা,
একটি গানের তান
শুনিতে না পাই।
দুঃখের তরঙ্গগুলি
চারিদিক হতে যেন
ছুটে পড়ে প্রাণের উপর।
সুধুই নয়নে বহে
প্রাণের উত্তপ্ত সেই
শােণিত আমার !
ক্ষুদ্র এ হৃদয়ে মাের
ধরেনা এ দুঃখরাশি
সুধু কেঁদে মরি ।
পুষেছি অনেক দিন
প্রাণের ভিতরে
রেখেছি গােপন করি ।
কেঁদেছি অনেক
গােপনে গােপনে
করেতে ঢাকিয়া আঁখি !
৩৮
বিষাদ ও অশ্রু।
নয়নের জল
ঢেকেছি কতই
বসন আঁচলে রাখি।
নিশি দিন সুধু
বরষিয়া আঁখি
বিরস হয়েছে হেন ;
বিষাদে প্রাণের
শােণিত টানিয়া
উগারিয়া দেয় যেন!
প্রাণের শােণিত,
এত দিই ঢেলে,
তবু ঘুচিল না পিয়াস তার ।
তবু ঘুচিল না,
এ জনমে আর,
প্রাণের দুঃখের ভার ।
যতই কেঁদেছি,
ততই দেখেছি,
তত বাড়ে প্রাণে দুখের ঢেউ।
বাসনা।
৩৭
জুড়াল না আর
তাপিত হৃদয়,
জুড়াবার বুবি নাইকো কেউ।
প্রাণের মাঝারে
কেবলি সজনি
উঠিছে পড়িছে দুখের ঢেউ !!
বাসনা।
সুধু চেয়ে দেখা,
সুধু ফিরে থাকা,
কত ফিরে দেখা
তবু দেখেনা।
সুধু ছুটে যাওয়া,
সুধু ধর্তে চাওয়া,
সেধে ধরা দেওয়া
তাও ধরে না।
সুধু ছুতে চাওয়া,
সুধু সরে যাওয়া,
[ ৪ ]
বিষাদ ও অশ্রু।
সেধে ছোয়া দেওয়া,
সেত ছোঁয় না।
হেসে চলে যাওয়া,
কেঁদে ফিরে আসা,
কেঁদে ফিরে চাওয়া,
ফিরে চায় না।
কত হাসি পাওয়া,
সুধু ভেসে যাওয়া,
কত ডুবে থাকা,
হাসি আসে না
কথা বলি বলি,
ভাবে থাকি ভুলি,
আধ-ভাঙা ভাষা,
মুখে ফোটে না
কেঁদে সেধে আসা,
সেধে মান ভাঙা,
সেত রেগে থাকে,
মান ভাঙে না !
বাসনা।
সুধু আপনা হারা,
সব সঁপে দেওয়',
সুধু ভুলে থাকা,
সেত ভােলে না
তারে ছেড়ে দেওয়া,
তারে ফেলে যাওয়া,
তারে ভুলে থাকা,
ভুল হয় না।
ব্যথা সেরে যাওয়া,
আরে ব্যথা পাওয়া,
প্রাণে ব্যথা সওয়া,
তাত সয় না ।
নব দুরাশায়,
প্রাণ মেতে যায়,
সুধু চলে যায়,
তাত মেটে না।
পুনঃ ধেয়ে যাওয়া,
কত বাধা পাওয়া,
5 ৫
বিষাদ ও অশ্রু।
স্রোতে ভেসে যাওয়া,
বাঁধ মানে না।
হাওয়া আসে যায়,
কত ঢেউ খায়,
ভাঙা আলো পায়,
তাই থামে না।
আধ চলে যায়,
আধ পড়ে রয়,
আধ কথা কয়,
আধ ভাষে না।
আধ হাস হাস,
আধ ভাস ভাস,
শুধু আধ আধ,
আধ মেশে না।
এত আসা যাওয়া,
এত স্রোতে ভাসা,
এত ঢেউ খাওয়া,
প্রাণে সয় না।
অভিমান ও আত্ম-প্রবােধ
তাই কেঁদে মরি,
তাই আঁখি ঝরে ;
আঁধারে মিশাতে,
তাই বাসনা।
অভিমান ও আত্ম-প্রবােধ।
আসিয়াছি দরশন আশে,
সে মুখ দেখিতে মন আশা;
চায় মন তারি দরশন,
চায় প্রাণ তারি ভালবাসা।
কোথায় রয়েছে সেই জন ?
পূরিল না দরশন আশা।
বুঝি প্রেম নাহি তার মনে,
বুঝি সে বােঝে না ভালবাসা।
যত্ন করে পাই না আদর ;
সত্য কি রে এই ভালবাসা।
এই কি রে প্রাণের মিলন ?
তার মনে নাহিকো পিয়াসা !
১২
বিষাদ ও অশ্রু।
কেন তবে সহি এ যাতনা ?
সেধে প্রাণে এত ব্যথা পাই ?
বুঝিয়াছি প্রেম নাহি পাব ;
ফিরে নাহি আসিব হেথায় !
কেন আমি আসিব না হেথা ?
এখানে ত অনেক এসেছি ;
কেন নাহি সব মনোব্যথা ?
যাতনা ত অনেক সয়েছি।
* *
কঁদিতেই জন্মেছি ধরায়
কাদিতে ত বড় ভালবাসি ;
কঁদিলে হৃদয় শান্তি পায় ;
পাই প্রাণে সে মধুর হাসি।
ভাল আমি বেসে থাকি যারে,
প্রাণভরি ভালই বাসিব ;
সে ভুলেছে ?-ভুলুক আমারে ;
আমি কেন তারে ভুলে যাব ?
ভুলে যাব ?—তারে ভুলে যাব ?
ভােলা কথা ভুলেই বলেছি।
অভিমান ও আত্ম-প্রবোধ।
৪ :
তার নামে ভুল ভুলে যায় ;
আপনারে আপনি ভুলেছি।
সে যদি আমায় ভালবাসে,
আপনিই সে ভালবাসিবে ;
যে বাসে—সেইত ভালবাসে,
ভালবাসা সনে মিশে যাবে।
ভালবেসে ভালবাসি আমি,
তাই তারে আরাে ভালবাসি ;
ভালবাসা সে বুবি বাসে না,
তাই সে পরে না প্রেম ফাসি
বাসে সে না বাসুক ভাল ;
সে যদি তাতেও ভালবাসে,
সে যেন না বেসে থাকে ভাল
সে যেন আপনি ভালবাসে।
কয়দিন ভালবেসে তারে,
পেয়েছি এতই ভালবাসা ;
দিছি কত, দিতেছি লুটায়ে,
তবু যেন ফুরায় না আশা।
s
৪
বিষাদ ও অশ্রু।
ভালবাসা পেয়েছি হৃদয়ে,
তবে কেন আশাটী ঘােচে না ?
চায় প্রাণ প্রেম-বিনিময় ;
নাহি জানি কেন এ বাসনা ?
সেধে সব সঁপে দিছি তারে,
সেত এসে কিছুই ধরেনি ;
সে আমার কথাটা বলেনি ;
ভাল তারে আমিই বেসেছি।
এবে কেন বিনিময় সাধ ?
কেন চাই তারি ভালবাসা ?
কেন চাই তারি দরশন ?
কেন ফোটে নব নব আশা ?
ভালবাসা প্রাণে ভালবাসা;
প্রাণে প্রাণে কিবা বিনিময় ?
আমি যদি আপনি না বাসি,
ভালবাসা কে দিবে আমায় ?
সেধে তারে দিছি ভালবাসা ;
কেন তবে নিতে আকিঞ্চন ?
অভিমান ও আত্ম-প্ৰবোধ।
৪ ৫
আকিঞ্চন এসে বারে বারে,
কেন মােরে করে জ্বালাতন ?
ঘুচাইতে চাই আকিঞ্চনে ;
মন এসে করে মােরে মানা।
মনেরে বুঝিয়ে বলে দিছি ;
এ মানাত নাহি যায় শােনা !
:
ভালবাসা ঢেলে দিয়ে তারে,
প্রাণে আমি ভালই বেসেছি ।
কত প্রেম পেয়েছি অন্তরে,
আপনিই আপনা ভুলেছি !
আজি প্রাণে বিনিময় সাধ,
তাইত আসে না ভালবাসা ;
তাই প্রাণ ভালই বাসে না,
জেগে উঠে সুধু মন আশা !
ভালবাসা সব সঁপে দেওয়া,
ভেঙে যাবে নিলে ভালবাসা;
সঁপে দেব, ছেড়ে দেব,
আপনারি প্রেম-ডোরে
বিষাদ ও অশ্রু।
আপনি রহিব বাঁধা ;
উঠিবে না জেগে মন আশা।
অভিমানিনী।
বালা, সুখত হয়েছে তাের ?
দেখিস্ হােনে যেন ভাের !
ভাের হলে,-ভাের হয়ে যাবে
সুখের যামিনী তাের !
ভােরে তপন আসিবে বালা
আর হবে না রে ফুল তােলা
আর পাবিনে গাঁথিতে মালা;
গাঁথা মালা তাের
বাসি হয়ে যাবে,
পাবি রে দারুণ জ্বালা !
বিনােদ তােমার
রবেনাকো হেথা,
কবে না একটি কথা ;
ফুরাবে সাধের প্রেম ;
মরম আগুণে
অভিমানিনী।
পুড়িয়া মরিবি
পাইবি হৃদয়ে ব্যথা !
আপনা আপনি
কঁদিবি সজনি
কবি রে দুখের কথা।
এমন ডাগর এমন নয়ান,
হাসিভরা ওই মু-খানি তােমার ;
কলঙ্কিত ওই চাঁদের বয়ান,
সরস কমলে বিষাদ আসার,
এমন রবে না আর ।
হাসিটি তাের ফুরিয়ে যাবে ।
মুখখানি তাের মলিন হবে ;
ভানুর জ্বালায় আঁখি ফেটে যাবে ;
সরমে মরমে সবে না আর।
কুসুম কোমল হৃদয়ে তােমার,
কীটাণু বিষাদ পশিবে হেন ;
মরমে মরমে ভেদিয়া ভেদিয়া,
মরম পাঁপড়ি ফেলিবে ছেদিয়া,
দেখিবি জগৎ আঁধার যেন!
৪৮
বিষাদ ও অশ্রু।
পাবি সখি এক তাপিত প্রাণ,
কঁদিবি শুনি পাখীর গান ;
দেখিবি যদি ফুলের হাসি,
দুঃখের সাগরে যাইবি ভাসি;
এ জনমে সখি পাবেনাকো আর
( বারেকের তরে,—তিলেকের তরে)
হবে না হবে না হবেনাকো আর
সুখের বিকাশ পরাণে তাের !
কি ঘুমে মগন ! কি সুখ স্বপন।
কাঁচা ঘুম যদি ভাঙ্গে লাে সজনি,
বুঝিবি কেমন কুহক ঘাের !
মনঃ প্রাণ তারে সঁপে দিস্ বালা,
বিনিময় সাধ হয় না যেন ;
ভুলিয়ে থাকি চানে ভুলাতে ;
ভুলাবার সাধ হয় বা কেন ?
সাধ হয় যদি আপনি কঁদিবি
তারে কাদাবারে কঁদিস কেন ?
সন্ধ্যা সােধন।
সন্ধ্যা সম্বােধন।
সন্ধ্যারে, তুই আয় আয় আয়,
আমারে হাওয়া দিয়ে যা ;
সারাদিন খেটে খুটে সখি,
সবে এই আসিলাম ঘরে
তুই মােরে দেখা দিয়ে যা।
সারাদিন রােদে পুড়ে পুড়ে,
প্রাণে আজ পেয়েছি যে ব্যথা,
ব্যথা তুই সেরে দিয়ে যা।
বুকের প্রাণের মাঝে গিয়ে,
হাত খানি বুলিয়ে বুলিয়ে
ব্যথা মাের সেরে দিয়ে যা।
দে আসি হৃদয়ে আমার,
পশিয়াছে অনেক আলোেক ;
পরাণের বন্ধ গুলা দিয়া,
হাওয়া সনে মিলিয়া মিশিয়া,
আসিয়াছে অনেক আলােক,
প্রাণ পাখী আলাে দেখে দেখে
ওই কঁপিতেছে থেকে থেকে,
ওগুলো নিয়ে দিয়ে যা।
•
বিষাদ ও অশ্রু
পাখী মাের পিজিরার মাঝে,
আঁধারে থাকিতে ভাল বাসে,
সখিরে আঁধার করে যা।
রন্ধ গুলা বুজিয়ে বুজিয়ে,
গায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে,
পাখীরে ঘুম পাড়ায়ে যা।
সন্ধ্যা রে ও রােদের কিরণে,
পাখী মাের ব্যথা পায় প্রাণে,
তাই তােরে ডাকিতেছে আয়
পাখী মাের সন্ধ্যা ভাল বাসে
ডাকে তােরে আয় আয় আয়।
আমার প্রাণের কুঞ্জবনে,
ফুল গুলি ফুটাইয়ে দিবি ;
রােদে পুড়ে কত গুলা,
শুকায়ে গিয়াছে মারা;
সেগুলা সজীব করে দিবি ;
আয় আয় আঁধারের সাজে,
সাঝের বাঁশীটী লয়ে আয়।
শীতল বাতাস বয়ে বয়ে,
আয় হেথা ত্বরা করে আয়।
---
সন্ধ্যা সম্বােধন।
ধীরে ধীরে হেলে দুলে সখি,
বাতাস দিবিলে মাের গায় ।
কুসুমের বাস বিলাইয়া,
পাখীরে ঘুম পাড়াবি আয়।
আঁধারের আবরণে সখি,
চঁাদের আলােক ঢেকে দিবি ;
কাদা হাসা—আঁধারে আলােকে
মেশামিশি সন্ধ্যা তাের গায়।
দু’একটি তারকার ভাতি
সন্ধ্যা তাের আঁধারের ছায় ;
আয় সখি ত্বরা করে আয় ।
সঁঝের সে গান গুলি
পাখীটিরে শুনাইবি ;
গানের সে তান গুলি
পাখীরে শিখিয়ে দিবি ;
সাঁঝের সে গান গুলি শিখে
পাখী তােরে শুনাইতে চায় ;
তাই তােরে ডাকিতেছে আয় ।
হয়ত সে গানের মাঝে
দু’একটা জল্লা বুলি
বিষাদ ও অশ্রু।
যদি শােনা যায়।
হয়ত সে ভাঙা গান গেয়ে
পাখী যদি প্রাণে ব্যথা পায় ;
হারাণ সঙ্গীর কথা যদি মনে হয়
শোন্ তােরে বলি সাবধানে
হাওয়া দিস্ পাখীটির গায় ;
সাঁঝের হাওয়া সে ভাল বাসে ;
হাওয়া পেলে সব ভুলে যাবে,
ঘুমায়ে পড়িবে তাের গায় ;
তাই তােরে ডাকিতেছি আমি
সন্ধ্যা তুই আয় আয় আয়।
সাঁঝের বাতাস দিয়ে দিয়ে,
হাত খানি বুলিয়ে বুলিয়ে,
পাখীরে ঘুম পাড়াবি আয়।
ওই পাখী ডাকিতেছে তােরে,
সন্ধ্যা তুই আয় আয় আয় ?
বিষাদ গান।
বিষাদ গান।
আয়রে আয় কবি যদি
আমার কাছে ছুটে আয় !
আমার প্রাণে আঁধার ভরা
(সেত) আঁধার মাঝে রইতে চায় !
তােমরা হেসে ফেল কঁদতে পার না ;
প্রাণের ব্যথা ঘােচেনা ;
কালে পরে নয়ন ঝরে
মনের আগুণ নিভে যায় ।
অমন হেলার ডাকে কান্না আসেনা ;
হাসি সইতে পারে না ;
খুসীর কাছে ঘেসেনা সে
আঁচল বাতাস সয়না গায়।
আমি কেঁদে কেঁদে কাদতে শিখেছি ;
তারে ভাল বেসেছি ;
আমি পরের সনে কইনা কথা
কইলে কথা ফুরিয়ে যায়।
বিষাদ ও অশ্রু।
সেত আমায় ফেলে রইতে পারে না;
সেত গরব করে না;
আধ কথা কইতে জানে না ;
চোখে চোখে দেয়না দেখা
মায়ার বুকে লুকিয়ে রয়।
আমার আঁধার প্রাণে হাসি আসে না,
হাসি দেখতে পারি না ;
ফুলের হাসি দেখলে পরে
রাগ করে সে চলে যায়।
আমি কেঁদে কেঁদে পাকা হয়েছি ;
সুধু কান্না পেয়েছি ;
আমার প্রাণ কাঁদানাে হৃদয় কাঁদে,
আঁখি দুটি ভেসে যায় !!
কুসুমে-কীট।
শােক, দুঃখ, হা-হুতাশ,
বিষাদ কীটাণুগুলা
যারে তােরা দূর হয়ে যা
কুসুমে-কীট।
আমার হৃদয় মাঝে,
আমার প্রাণের কাছে
আর আসি না।
প্রাণ মাের দলিয়া দলিয়া
করিয়াছ কঠিন পাষাণ ;
কি যেন বিষের বাতাস
লেগে লেগে বিষাক্ত পরাণ ।
বুঝি জ্বলে গেল ফুল
নাহি আর কোমল তেমন ;
তাের কুসুমের কীট যত,
সরে যা রে সরে যা রে
হেথা আর নাহি পাবি স্থান ।
তােত ফুলের কীট
ফুলে রবি সরসে হরষে ;
শুষ্ক ফুলে আছ কিবা আশে ?
তােরা পাষাণের কীট ন’স ;
তবে মরা ফুলে কেন কর বাস ?
বিষাদ ও অশ্রু।
পাষাণের কীট যারা,
পাষাণ ভেদিয়া চলে যায় ;
নাহি ছোয় কুসুম কোমল,
হয়ত তেয়াগে উপে খায় ;
অথবা কোমল বলে
দয়া করে বুঝি ফেলে যায়।
তােমরা চিরকাল ফুলে ফুলে কর বাস
চিরকাল ফুলের অমিয়া লুটি খাও;
চিরকাল গরল উগারি
ফুলের জীবন কর নাশ।
আহারে দারুণ কীট।
কোমল ফুলের কীট তাের,
তােরা কেন কঠিন এমন ?
বুঝি না চিনিলি কুসুম কেমন !
বুঝি না বুঝিলি কোমল কেমন !
এমন অবােধ তােরা ।
চিরকাল ফুলে থেকে
বুঝিলি না ফুলের গৌরব !
কুসুমে-কীট।
এমন কোমল, এমন মধুর
এমন সৌরভ।
এমন করিয়া হায়,
চরণে দলিস্ তায়,
প্রাণের শােণিত বিন্দু
শুকাইয়া যায় !
আরে ও অবোধ কীট,
কি করিলি হায় !
ও রে বিষময় কীট ।
জগতের বিষ ছেড়ে,
কি লােভে পশিলি হা রে,
সুধা ভরা কুসুমের
কোমল হিয়ায় ?
মিটে কি পিয়াস্ তাের
সুধার ধারায় ?
করিস্ অমিয়া পান
বিষ বিনিময় ?
৮
বিষাদ ও অশ্রু।
কুসুমের সুকোমল অঙ্কে বাস!
কুসুমের হৃদয়ের শােণিত পিয়াস ।
তােরা যদি না দলিতি,
নীরবে ফুটিতে দিতি ;
ফুলের সৌরভ জেগে
থাকিত হেথায় !
আমার এ জগৎ মাঝে,
প্রাণের সাধের ফুলবনে
কেন তুই পশিলি রে হায় ?
যা রে যা রে দূরে যা রে,
ফুলময় দেশ ছেড়ে,
ফিরে নাহি আসি হেথায় !
যা রে কোন বিষময় দেশে,
যেথায় ফুলটি নাহি ফোটে?
যেথায় তপন নাহি উঠে;
কেবলি সে আঁধিয়ায়,
চারিদিক হতে যেন
বিষমাখা বাণ গায় ফুটে !
কুসুমে-কীট।
৫৯
নাই সেথা মালতী বকুল,
নাই সেথা বেল জুই,
একটী গােলাপ নেই
একটি সৌরভ যেন
ভুলেও যায় না ছুটে !
একটীও কোমল তেমন
নাইকো সেথায় !
যে মরিবে জ্বলিয়া পুড়িয়া
বিষের জ্বালায় !
সুষমা সুরভিময়
কুসুমের দেশে
কেন রে কীটাণু বিষময় ?
কুসুমে যে কীট রয়,
এমনি সে বিষময়,
বিষাক্ত অনল শিখা
কুসুমের প্রাণে ঢেলে দেয় !!
৬০
ই
বিষাদ ও অশ্রু
সন্ধ্যা।
ওইত ওই গােলাপ হাসে !
সুখের প্রাণ দুখে ভাসে!
ওইত সমীর বয়ে যায় !
তাপিত প্রাণ কি শীতল হয়
পাখিরা ওই যাচ্ছে চলে ;
ভুল ভানু নদীর জলে।
শীতল জলে শীতল হবে,
তাই কি ভানু এসেছে নেবে ?
ভানুর প্রাণে বড় ব্যথা;
কমল কেন কনে কথা ?
ওটি ত শেষে কেঁদে যাবে ;
কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে রবে !
লতা-বধূর প্রাণে ব্যথা ;
ভানু-শােকে ঢ’ছে লতা !
হাওয়ার ভরে পাতা দোলে ;
ফুলটি ভাসে আঁখির জলে ।
হাওয়ার্টি ত ছুটে যায়,
ফুলের সৌরভ ছড়ায়ে রয় ।
সন্ধ্যা।
৬১
ফুলকুমারী তুফান গণে;
থেকে থেকে চায় আকাশ পানে।
ওটি ত দেখছি ডাগর মেয়ে ;
কপাট খুলে রইল চেয়ে !
একটী নয় ও দু’টি তিনটী,
চেয়ে আছে মেয়ে ক’টি।
ওদের কিগাে সরম নেই ?
তাহলে কি আর দেখতে পাই ?
তা হলে কি আর এম্নি এসে,
হাত চখের সামনে বসে ?
ঘােটা বুঝি দেয়নি ভুলে ?
ছিল, ওরা দিয়ােছ ফেলে !
সরম খেয়ে নড়েও না !
আঁখির পলক পড়েও না !
হতে পারে আইবুড় ঝি ;
অত বেহায়া তাই বলে কি ?
ওরা অত হাস্ছে কেন?
দাড়িয়ে তরুটী দেখছে যেন !
তরুর গায় পাতাটী নড়ে,
দাড়িয়ে ওকে উকি মারে ?
[ ৬ ]
বিষাদ ও অশ্রু
ফুলের পানে বারেক চায়,
আবার কেন লুকায়ে রয় ?
ওইত বুঝি হেথায় আসে;
আহা কিবা মধুর হাসে !
ঝুর ঝুরে রয় সঁঝের বায়,
গায়ের গন্ধ টেনে লয় ।
গায়ে বুঝি ওর সুধা মাখা ;
ললিত করুণ ছবি আকা!
কত সুধা লুটিয়া দেয় ;
সুধার আসে অনিল ধায়।
ফুলেরা হাসে মাণিক ঝরে
সুধারাশি গলে পড়ে !
তরুর কোলে ঘুমাল লত
সুধা পিয়ে ঘুচেছে ব্যথা।
তরুর প্রাণে আলাে ভরা,
কি আনন্দে বিভাের ওরা !
ফুলের বুঝি ঘুম পেয়েছে ;
স্বপন দেখে উঠছে কেঁপে!
আলাে ভরা সুধার হাসি,
কিবা মধুর যাচ্ছে ভাসি ।
*৭
সন্ধ্যা।
.
বাগানে ওই গােলাপ ফুলটি ;
ওখানে ওই সােণার উঁদটি।
চাদের প্রাণে বিষাদ নাই ;
ও তবে কি দেখতে পাই ?
বুকের ভিতর কাল রেখা ;
লুকান বিষ সুধায় ঢাকা ।
এতকাল হেসে হেসে,
কান্না বুঝি ভুলে গেছে ।
অমন করে কি কান্না পায় ।
কালে ব্যথা সেরে যায়।
আগুণ যদি চেপে রাখে
কখন কি নিতে থাকে ?
কত সুধা অঙ্গ ভরা,
বিষে কেন জ্বলে মরা ?
সুখের প্রাণ বিষাদ ভরা,
সয়ে সয়ে ভেঙে পড়া !
সুখের প্রাণে বিষাদ কোথা ?
সুধা মাঝে কেন গরল হােথা ?
ভুলে বুঝি বিষ খেয়েছে ;
কোমল হৃদয় দগ্ধে গেছে ।
বিষাদ ও অশ্রু।
ঠাণ্ডা হাওয়া লাগবে বলে,
বুকের দুয়ার দি’ছে খুলে ?
এখানে বয় বিষাদ বায়,
তা’তে কি প্রাণ শীতল হয় ?
বিলায়ে সুধা আঁচল ভরা,
বিষের জ্বালায় জ্বলে মরা ?
সুধায় মরা বাঁচে না ;
বিষের জ্বালা ঘােচে না !
চাদের প্রাণে বড় ব্যথা।
সুধায় ভারত দুখের কথা !
ঘুচাতে বিষাদ এসে হেথায় ;
বিষাদ ভরে কোথায় লুকায়
মুখানি ওর সুধা মাখা
হৃদয় মাঝে বিষাদ আঁকা।
ভিতরে কাল বাইরে আলাে ;
তার চেয়ে সুধু কালই ভাল ।
চাদের আলাে কি হেথায় সাজে।
ফুলের বাসে পরাণ মজে !
চঁাদ হারা ওই অমা নিশি,
তাকে আমি বড় ভালবাসি।
বিষাদিত তারকা।
বিষাদে সুখ ভালবাসা,
সাধ করে দুঃখে ভাসা !
আঁধার ভারত আঁধার রয় ;
তবে যদি ভানু উদয় হয় !
বিষাদিত তারকা।
তারকারে, তারকা আমার,
কি খেলা খেলিতেছিস্ ব ?
অন্ধকারে সব ডুবে গেল,
ফেলে তােরে সবে চলে গেল ;
বন্ধুহীন সঙ্গীহীন তারা,
একা তুই জাগিয়া জাগিয়া
কি খেলা খেলিতেছিস্ বল্ ?
সারাটী আকাশ মাঝে তাের,
একটিও সাথি নাহি আর ;
তবে আর কিসের লাগিয়া,
এ নিশিথে রয়েছ জাগিয়া ?
কেউ তােরে দেয়নাকো সাড়া,
ঘুম ঘােরে অচেতন তারা ;
বিষাদ ও অশ্রু।
তারা তােরে ফেলে গেছে বলে,
খুজে খুজে পথ নাহি পেয়ে,
কেউ তাের সাথি নাহি বলে
পথ হারা কক্ষভ্রষ্ট তারা
তাই কিরে কাদিতেছ বল্ ?
তারকারে, সুখের সাগরে,
এতদিন করিয়া সিনান,
কি বিষাদে আকুল পরাণ?
বিশাল আকাশ মাঝে তাের,
একটিও সাথি মিলিল না ;
তুই যেন অচেনা অচেনা,
কারো সনে মিশিতে পার না ;
আকাশের তারাগুলি যত,
তারা যেন তাের কেউ নয়,
তারা সকলে চলে গেল,
তুই শুধু কঁদিতেছ হায়!
জানি কোথায় ছিলি তুই,
উড়ে উড়ে এসেছ হেথায়,
সাথি হারা হয়েছিস্ বলে,
স্মৃতি হারা হস্ নাই বলে,
বিষাদিত তারকা।
৬৭
সেই পথে প্রাণ যেতে চায় ।
খুঁজে পথ নাহি পাও বলে,
চেনা মুখ নাহি দেখ বলে
নিশিদিন কাঁদিতেছ হায় !
তারকারে হেন লয় মনে,
ছিলি তুই কুসুমেরি মাঝে
আললা দিতি বন উপবনে ;
ছিলি তুই মলয় মরুতে,
জুড়াইতি তাপিত জীবনে ;
ছিলি তুই যুবতীর হাসি,
(পূর্ণিমার অকলঙ্ক শশী )
বুঝিতার কণামাত্র খসি,
বায়ুভরে উড়ে উড়ে
গিয়াছিস্ সুদূর গগনে ;
মনটদুখে মরিতেছ প্রাণে।
বুঝি তা না হবে !
ছিলি তবে বাঁশরীর স্বর,
মনঃপ্রাণ হরি নিরন্তর
ছিলি তবে মেঘেতে বিজলী
খেলাইতি লয়ে মেঘদলে ;
;
বিষাদ ও অশ্রু।
এবে তাহা ছাড়িয়া আইলি
তাই বুঝি ব্যথা পা’ প্রাণে ?
বুঝি তা না হবে !
ছিলি তবে সরসে নলিনী,
ফুটিতি তপনের তরে ;
সংসারের লীলাখেলা বুজি
ভাল নাহি লাগিল রে মনে,
তাই অভিমানিনী নলিনী
সংসার ছাড়িয়া ভিখারিণী ;
তাই বুঝি কঁদি দুখভরে ;
তাই বুঝি এসেছ আঁধারে !
তারকারে আঁধারে কি ছিলি ?
না, অন্ধকারে নয়,
ছিলি তুই জোছনায়,
আলােমাঝে ছিলি ?
অালোকে আলােকে মিলি, জ্বলিতে পুড়িতে ছিলি,
তাই কি রে জুড়াইতে আঁধারে আইলি ?
ছি ছি তারা আলাে ছেড়ে আঁধারে আইলি ?
সেধে সেধে কাঁদিতে আইলি ?
মূখ তুই, জান না কি হায়, আঁধারে প্রাণ না জুড়ায়।
বিষাদিত তারকা।
৯
দুঃখের সমুদ্র মাঝে সুখ কি থাকিতে চায় ?
সুখ কি থাকিতে পারে নীরবে মরিয়া যায় ।
সেধে কেন এসেছিস্ ডুবিতে এ আঁধিয়ায় ?
ছিলি তুই সুখের আবাসে,
আইলি দুঃখের পরবাসে,
পূর্ণ সুখ হতে খসে
ক্ষুদ্র এক সুখের কণিকা
তুই রে তারকা,
ডুবেছিস্ বিষাদসাগরে ;
হােথা আর সুখী নস্ তুই
মরিতেছ দুখভরে।
কঁদ তুই, তবে তারা ;
ডেকে ডেকে পেলিনাত সাড়া !
বুঝি সুখ হবে না রে আর
প্রাণভরে কঁাদ একবার।
সয়ে সয়ে এ মনােবেদনা, কেন ও কোমল প্রাণে
দিতেছিস্ দ্বিগুণ যাতনা ?
জানি আমি সবে না সবে না।
নীরবে থাকি না রে আর,
দেখ যদি ঘােচে অন্ধকাব !
বিষাদ ও অশ্রু।
তারকারে কঁদিতে পার না,
প্রাণভরা এত ব্যথা তাের,
তবু তাের হাসিটি ঘোচে না?
সহিতেছ বুকের ভিতরে,
দুখে দুখে বুক যে বিদরে।
হেন ভাবে সয়ে সয়ে ব্যথা
যদি তুই না কঁদি তারা,
একটি দুঃখের কণা, এ জনমে ঘুচিবে না,
মরে যাবি দুখভরে।
তরকারে !
জানি আমি কাদিতে জান না !
তাই এত ব্যথা পাস্ প্রাণে,
তবু তাের হাসিটি ঘােচ না !
চিরকাল কাটাইলি হেসে,
অবশেষে এসেছি ভেসে
দূরে দূরে উড়ে এসে
সহিতেছ দুঃখের যাতনা !
বুঝি সে দেশের কথা সুধু তাের মনে পড়ে!
সে দেশের যত বুলি স্বপ্নে যেন শােনা যায় !
বাজে তাের বুকের মাঝারে।
।
বিষাদিত তারকা।
৭১
জ্বলে বহ্নি হৃদয় নিলয় !
প্রাণের শােণিত রাশি শুকাইয়া যায় ।
পােড় আঁখি ঝরিতে পারে না
মরমব্যথার ঘায় !
তুই যদি না কঁদিবি তারা
প্রাণের বিষাদ ঘুচিবে না !
বুকভরা প্রাণভরা ব্যথা
মিছে হাসি আর হাসিও না।
হাসি চেপে রাখ, সুধু প্রাণ খুলে কাদ;
নয়নের জল বিনে
প্রাণের অনল নিভিবে না ।
তারা তুই কাদিতে জান না,
কাঁদ্ এসে মাের সাথে ;
দেখিবি কেমন করে কাঁদে,
দেখিবি কেমন করে সাধে,
প্রাণের শােণিত রাশি
আসিবে ছুটিয়া নয়নের পথে !
নীরবে থাকি না রে পড়ে ;
গাও গান বিলাপের স্বরে !!
বিষাদ ও অশ্রু।
আমি কে ?
বলে দে রে বলে দে আমায়,
আমি কে এ বিশাল ধরায় ?
ঘুচে গেছে উষার আলােক,
ঘুচে গেছে ভানুর কিরণ ;
ঘুচে গেছে সন্ধ্যার তারকা,
ঘুচে গেছে পূর্ণিমার হাসি
আমি সুধু দুখনীরে ভাসি
ডুবিতেছি মেঘের মাঝারে
ডুবিতেছি ঘাের আঁধিয়ায় ;
বলে দে রে বলে দে আমায়,
আমি কে এ বিশাল ধরায় ?
ক্ষুদ্র আমি-অনন্ত-সংসার,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মেঘ সারি সারি,
হাতে হাতে করি ধরাধরি,
চারিদিকে ঘিরেছে আমার ;
চারিদিকে অনন্ত আঁধার !
কেন মিছে আশা জাগে মনে ?
কেন প্রাণে তরঙ্গ সঞ্চার ?
আমি কে ?
৭৩
অন্ধকার আলােকিতে সাধ ?
আসিয়াছে শরদের শশী ;
সেত ওই মেঘের মাঝারে,
সাধ হয় উড়ে যাই হােথা,
ধীরে ধীরে সরায়ে দি মেঘে,
চাদের অমিয়া করি পান ;
সাধ হয় চাঁদের কিরণে
জগতের আঁধার ঘুচাই,
জগতের পিয়াস মিটাই।
আমার সাধের ফুলবনে,
একটি
কুসুম ফুটে ছিল,
সে ফুলের হাসি দেখিতাম,
কুসুমের সৌরভ আসিয়া
পশিত এ প্রাণের মাঝারে,
আমি সুখে কত হাসিতাম ;
ফুলের সে হাসি ঘুচে গেছে,
সেই হ’তে কঁদিতেছে প্রাণ
সেই হ’তে কল্পনা সুধায়,
একই কথা কত দিন কয় ;
সুধায়েছি মনেরে সে কথা,
৭৪।
বিষাদ ও অশ্রু।
মন বুঝি না জানে বারতা ;
আমি কে এ বিশাল ধরায় ?
আমি কে ?
চাদ এসে কতই ত হাসে,
কুমুদিনী কতই ত ভাষে ;
ফুল দল কইত ত ফোটে,
অলিরা কতই মধু লােটে;
সমীরণ মৃদু মৃদু বয়,
লতা পাতা কত কথা কয়,
আমি সুধু আঁখি-নীরে ভাসি,
মনেরে সুধাই দিবা নিশি,
কে বলিবে আমি কে হেথায় ?
আমি কে ?
হেমন্তের তরুটী আমার,
কেঁপে কেঁপে গিয়াছিল মারা ;
থেকে থেকে সমীর আসিত,
কেঁদে কেঁদে ফিরে যেত কত,
ডেকে ডেকে নাহি পেত সাড়া
ভানু-ভয়ে শীত চলে গেল,
মুকুলিত হ’ল সে তরুটি,
আমি কে ?
ডালে আসি বসিল পাখিটি,
ফুল গাছে কুঁড়িটি ধরিল ।
কাল যেটি আধ ফোটা ছিল,
মেখে ছিল মুখে আধ হাসি,
আজ ফুলে পরিমল ভরা,
অধরে ধরে না সুপ রাশি।
এ জনমে ফোটা ত হবে না,
চিরদিন মুদিত কি রব ?
ফোটা ফুল কতই হাসিছে,
আমি আর হাসিতে না পাব ?
শুধু আমি ভাঙা প্রাণ লয়ে,
বড় দুঃখ সাথীটি মেলে না,
নিশি দিন সবাই ত হাসে,
সুধু হাসে কখন কাদে না।
হাসে যারা তারা কি কাদে না ?
কে বলেছে ?
ফোটা ফুল শুকিয়ে পড়ে না ?
ভুল হয়েছে !
ফুল ফোটে আবার শুকায়,
তারা দল আকাশে লুকায়,
৭৬
বিষাদ ও অশ্রু।
।
চাতক চাদের পানে ধায়,
চঁদ হাসে আবার ফুরায় ;
সমীরণ হেলে দুলে চলে,
আবার সমীরে মিশে যায়।
ভাঙা প্রাণ বুঝেও বােঝে না,
ভাঙা কথা শুনেও শোনে না,
সুধু ব্যথা পায়।
কাল কুঞ্জে কোকিল এসেছিল,
সুধা মাখা গান গেয়েছিল ;
আজ ত সে নীরবে রয়েছে;
আজ ত শুনি না কোন কথা,
তবে বুঝি পাখী চলে গেছে ;
হেথায় বসন্ত এসেছিল,
তাই পাখী গান গেয়েছিল ;
আজ ত বসন্ত নাই হেথা,
তাই পাখী নীরবে রয়েছে !
আমি কে ?
উষা এল—সেত কেঁদে গেল ;
ভানু এল—সেও কেঁদে গেল ;
নিশি হেসে এসে কেঁদে ফিরে যায়
আমি কে ?
৭
;
সবে হেসে থাকে কাঁদেও সবায় ;
সুধু কাঁদে হাসে সুধু আসে যায়!
সুধু ভেসে আসা-সুধু ভেসে যাওয়া ;
মিছে কেঁদে কেঁদে ফিরে ফিরে চাওয়া
মিছে দেখা দেখি মিছে হাসি পাওয়া ;
শুধু যাওয়া আসা সুধু ঢেউ খাওয়া।
আমি কে ?
সাগরের বারি বিন্দু আমি,
হেসে উঠে পুনঃ ভেসে যাই ;
ধেয়ে চলি আকাশের পানে,
জল বিম্ব জলেতে মিশাই।
আমি কে ?
অতি ক্ষুদ্র বায়ু কণা আমি,
শূন্য ভরে সদা বয়ে থাকি ;
হেথা হােথা ছুটে যাই কত,
আবার সমীরে মিশে থাকি।
আমি কে ?
আমি তারা অনন্ত আকাশে,
ভেসে ভেসে কূল নাহি পাই,
নিশি আসে হাসি পাই প্রাণে ;
৭৮
বিষাদ ও অশ্রু।
নিশি শেষে ফুরাইয়া যাই।
আমি কে ?
ক্ষুদ্র আমি—ক্ষুদ্রতম আমি ;
সে অনন্ত সমষ্টি আমার ;
কোটি কোটি আমি মিলি অনন্ত সংসার ;
পােড়া প্রাণ মিশিতে পারে না,
তাই সে অনন্ত হারা;
আমি যেন কেউ নই অনন্তের আর ;
অনন্তের আঁধারে মিলন,
ভয়ে ভয়ে ক্ষুদ্র প্রাণ কাঁদে,
দেখি সে অনন্ত অন্ধকার।
আমি কে ?
অনন্ত আঁধার ।
আমি আঁধারের পরমাণু,
আমি অনন্তের পরমাণু,
কোটি কোটি আমি মিলি
ওই সে অনন্ত অন্ধকার ।
তবে কেন ভয় হয় প্রাণে
ভাবিলে সে অন্ধকার !
হায় আমি অনন্ত পাসরা,
অনন্তের হাওয়া।
হায় আমি আত্মহারা,
তাই বুঝি দুঃখ ভয়,
করিতেছি হাহাকার !
অনন্তের হাওয়া।
হাওয়া হতে সাধ হয় প্রাণে,
দূরে দূরে দূরে উড়ে যাই ;
সীমাবদ্ধ জগৎ মন্দিরে,
শৃঙ্খলিত পদে আছি পড়ে,
ইচ্ছা হয় শৃঙ্খল ঘুচাই ;
ইচ্ছা হয় জগৎ ছাড়িয়া,
( অনন্তের হাওয়া যদি পাই )
অনন্ত অনন্ত পানে ধাই।
অনন্তের অনন্ত আকাশে,
সে অনন্ত শশাঙ্ক উদয়,
এ জগতে কলঙ্কী সে চঁাদ,
হেসে হেসে ক্ষয় হয়ে যায়।
প্রাণ যেন কি ভাবে বিভাের,
৮ ৮
বিষাদ ও অশ্রু
প্রাণ যেন কিসে মাতােয়ারা,
শান্তি নাহি পায়।
অনন্তের অনন্ত আঁধারে,
রবি ভােবে, চঁাদ ডােবে,
তারকা নক্ষত্র ডােবে,
ডুবে থাকে কিরণ টুটে না,
(ফুল ফোটে আঁখি ত মেলে না)
কিবা আলােময় ওই অন্ধকার।
জগতের অন্ধকারে মন ভেসে যায়,
সীমাবদ্ধ জগতের,
সীমাবদ্ধ আঁধার মাঝারে,
ডােবা নাহি যায় ।
জগতের সেই ভাঙা গান,
ভাঙা ভাঙা সেই সুরের তান,
বাজে আসি এই বুকের দুয়ারে,
ভেঙে যায় বুক ব্যথার ঘায় !
ভাঙা বাঁশরীটি বাজায়ে বাজায়ে,
ভাঙা কথা দুটি শুনায়ে শুনায়ে
বিষাদের সেই সাথী গুলি যত,
মুখ দেখে তারা চিনে লয়।
অনন্তের হাওয়া।
৮১
চেনা মুখ গুলি দেখায়ে দেখায়ে,
মেঘ ভাঙা আলাে ঢাকা দিয়ে দিয়ে,
জোনাকীর ওই কিরণ ছড়ায়ে,
স্মৃতি গুলি যত জাগিয়ে উঠিয়ে,
আঁধারে আমারে কাঁদাতে চায়।
মলয়ের সেই মৃদুল সমীর,
সারাটী জগতে কতই বয় ;
প্রাণের বেদনা কিছুতে ঘােচে না,
না যায় যাতনা প্রাণ না জুড়ায়।
কুহক স্বপন আশার ছলনা
সারাটী জগতে বিষাদ ভরা,
সুধুই যাতনা সুধুই বেদনা
সুধু ইন্দ্রজাল কুহকে ঘেরা।
অনন্তের জীবনে মরণ,
অনন্তের মরণে জীবন
জানি সে অনন্ত কেমন?
অনন্তের আঁধারে মিলন ;
আঁধারে আলােকে মেশা মিশি;
সে আলােকে অনন্ত আঁধারে
জগৎ ফুটিছে ধীরে ধীরে !
৮২
বিষাদ ও অশ্রু।
আঁধারে কথাটি নাহি ফোটে ;
সাগরে তরঙ্গ নাহি উঠে ।
সে অনন্ত শান্তি নিকেতন,
সেথা সুধু প্রেমের মিলন।
জগতের ক্ষুদ্র রন্ধ দিয়া,
চলে যাব ক্ষুদ্র প্রাণ নিয়া,
সে মধুর হাওয়া সনে মিশি
অনন্তের পানে যাব ভাসি।
প্রাণের সন্তাপ নাহি রবে ;
ব্যথা যত সব সেরে যাবে।
ডুবে রব শান্তির সাগরে,
ভেসে ভেসে আসিব না ফিরে।
সুখ দুঃখ কিছু নাহি সেথা,
কুহকের নাই কপটতা ;
নাহি আশা, স্বপ্ন নাহি ফোটে,
দুঃখের তরঙ্গ নাহি উঠে।
অনন্তের জীবনে মরণ ;
অনন্তের মরণে জীবন।
স্বপ্ন।
স্বপ্ন।
ভেসে যাই স্রোতের টানে,
ভেসে যাই স্রোতের সনে,
কোথা যাই কেউ না জানে,
পাখীরা গান গায়।
স্রোতের আর টান মানে না,
মাঝিত হাল ধরে না,
দাড়িরা দাড় ছেড়ে দে
বাতাস পেয়ে ঘুমিয়ে রয় !
নদীর গায় বাতাস লেগে,
ঢেউ গুলি উঠছে জেগে,
নেচে নেচে বেড়ায় ছুটে,
ঢেউ লাগে মাের তরীর গায়।
আমার এই শুনা তরী,
ঢেউ লেগে ভিজে গেছে,
হাওয়া আজ আমার কাছে
কমল ফুলের গন্ধ বয়।
ছুটেছি ভাটার টানে,
কোথা যাই কেউ না জানে,
৮৪
বিষাদ ও অশ্রু।
স্রোতের বেগে, থামেনারে,
কোথায় টেনে নিয়ে যায়
মিলেছে চাঁদের মেলা,
ওইত ওই সুরবালা,
গলায় দোলে তারার মালা,
মুখ ঢাকা ওই জানালায়।
এইত এই স্বর্গ নদী,
ছুটেছে সাগর পানে,
ওইত ওই সাগর পারে
স্বরগ পুরী দেখা যায়।
স্বর্গে ওই বাঁশী বাজে,
সুর গুলি ভেসে আসে,
সুর গুলি বুকে বাজে,
পশে প্রাণের নিরালায়।
ওইত ওই দেবের মেয়ে,
বাঁশীর সুরে সুর মিলায়
বশীর ওই মধুর গান,
সুরের ওই কোমল তান,
বাতাসে মিশে যায়।
মধুর ওই সুরের তানে,
স্বপ্ন।
ঢেউ গুলি জেগে উঠে,
গানের তান শুতে চায়।
গানের তান শুনে শুনে,
তানের এই বাতাস পেয়ে,
স্রোতের টানে ভেসে যায়।
আমার বুকের পর দিয়া,
গানের বাতাস চলে যায় ;
আমার এ তরীর গায়,
গানের সে ঢেউগুলি লাগে,
গানের সে সুরগুলি,
সে মধুর বােলগুলি,
বুকের দুয়ার দিয়া
পশে নিরালায়।
তরী মাের ছুটেছে জোয়ারে
জোয়ারের টানে ভেসে যায়।
আমার তরীর গায়,
আমার বুকের পরে
তারাফুল বরিষণ হয়।
তারাময় ঘরগুলি ওই দেখা যায় ।
ওই যে স্বরগবাসী কতই নীরব কথা কয়।
৮৬
বিষাদ ও অশ্রু।
আমার তরীর আর,
এ হেন নাইকো অবসর
দু’টি কথা শুনে লয়,
উজ্জ্বল সে ঘরগুলি,
অচেনা সে মুখগুলি
একবার দেখে লয়,
অবিরাম অবিশ্রাম সুধু ভেসে যায়।
এইত স্বরগ ছাড়ি এসেছি কোথায়,
স্বর্গের সে আলােগুলি দেখা নাহি যায়।
স্বর্গের সে বাঁশী নাহি বাজে,
ফুলের মধুর বাস
ভুলেও পশেনা আসি
এ অনন্ত আঁধিয়ায়।
বাঁশী নাই, গান নাই, তারা নাই, আলাে নাই,
কিছুইত নাইকো হেথায়।
নাই সে স্রোতের টান,
শুধু এ তুফান মাঝে
বড় ভয় হয় ;
আর আমি ভাসিতে পারি না,
অন্ধকারে ডুবিতেছি হায়।
স্বপ্ন।
আমার মাথার পর দিয়া,
আমার বুকের পর দিয়া,
বুকখানি দলিয়া দলিয়া
তরঙ্গের চলে যায় ।
বুক ভেঙে গেল আর নাহি সয় ।
নাহি হেন অবসর,
একটি নিশ্বাস ছাড়া যায় ।
এ আঁধারে আলােকে যাবার
একটিও পথ খোঁজা যায় !
প্রাণের উপর দিয়া,
সাগর তরঙ্গগুলা
সুধু আসে যায় !
গেল বুক ভেঙে গেল হায় !
ওকি শব্দ-শব্দ শুনা যায় ?
অনন্ত সাগর মাঝে,
কিসের এ গরজন,
এ অনন্ত আঁধিয়ায় ?
বুঝি ডাকে ওই অন্ধকার,
ভৈরব, নিনাদ ছাড়ি
তরী মাের সাগরে ডুবায় !
৮৮
বিষাদ ও অশ্রু।
বুক কাপে—বড় ভয় হয় ;
কোথা যাব-পালাব কোথায় ?
মুখে আর কথাটি সরে না,
সুধু বুক ফেটে যায় ।
কে কোথায় ? কেউত এলো না;
কারো সনে দেখাত হল না ;
আয়ু বুঝি ফুরায় ফুরায় !
তরী গেল—ডুবে গেল গাে,
পথ নাহি পায়।
কেঁদে কেঁদে ঘুম ভেঙে গেল,
কিছুইত নাহি দেখা যায়।
সুধু কঁাদে প্রাণ—সুধু ব্যথা পায় !!
ভন্নতরী।
বিষাদসাগরে সঁপিয়াছি তরী
কে যাবিরে তােরা আয় আয় ।
দুঃখের নিশান তুলিয়া তুলিয়া,
বিষাদের জয় গাহিয়া গাহিয়া
কে যাবিরে তােরা আয় আয়!
সুখ চিহ্নগুলি মুছিয়া মুছিয়া,
ভগ্নতরী।
৮।
সুখ আশা যত সব তেয়াগিয়া,
দুঃখের বাঁশরী বাজায়ে বাজায়ে
যাবি যদি কেউ আয় আয় আয় ।
দীপ-শিখাগুলি সব নিভাইবি,
ফুলগুলি সব ছিড়িয়া ফেলিবি,
এ জনমে আর হাসিতে পাবি না,
চিরদিন শুধু কঁদিতে থাকিবি ;
ঘুচিবে না তাের প্রাণের বিষাদ,
পূরিবে না তাের মনের সাধ ;
জ্বলিয়া পুড়িয়া কেবলি মরিবি,
কেবলি কঁদিবি যাতনায় ;
যাবি যদি কেউ আয় আয় আয় !!
এমন দুঃখের আঁধার-সাগরে,
যেতে যদি কারাে সাধ হয় ;
বিষের জ্বালায় জ্বলিয়া মরিতে,
প্রাণে যদি কারো সাধ হয় ;
আয় ত্বরা। তবে চলে আয় ।
ভাঙা তরী লয়ে এসেছি সাগরে,
ঢেউ লেগে লেগে ভেঙ্গেছে হল ;
দকা বাতাসে ছিড়ে গেছে পাল ;
৩:
.
বিষাদ ও অশ্রু।
বিষাদ তরঙ্গ ঘুরিয়া ফিরিয়া
লাগিছে আমার তরীর গায়।
সে তরঙ্গগুলা কাদিতে জানে না,
সে তরঙ্গগুলা কাঁদিতে পারে না,
ছুটে আসি সুধু মিশিয়া যায় ।
সুখ-সাগরের ক্ষুদ্র প্রাণীগুলি,
পথভুলে বুঝি এসেছে হেথায়।
পথ পাবে বলে করি ছুটাছুটি,
থেকে থেকে তাই মুখ জাগায়।
বিষাদের তরী বিষাদে নাচিয়া,
বিষাদের রাশি ভেদিয়া ভেদিয়া,
বিষাদ-বাতাসে ভাসিয়া যায় ।
যাবি যদি কেউ আয় আয় আয় !!
ভাঙাতরী মাের সাগরে ভাসিতে
প্রাণে নাহি পায় ভয়,
সুধুই ভাসিতে চায় ;
তরঙ্গের তালে নাচিয়া নাচিয়া,
তরঙ্গের রাশি ভেদিয়া ভেদিয়া
ডুবিয়া থাকিতে চায় ;
যাবি যদি কেউ আয় আয় আয় !!
উপহার।
১
উপহার।
অন্ধকার অনন্তে মিশেছে,
সে অনন্ত অন্ধকার ;
আঁধারের পদধূলা,
চঞ্চল বিষাদগুলা,
ঘিরিয়াছে হৃদয়ে আমার।
অন্ধকারে যেতে সাধ হয়,
মিশে সেই অনন্ত আধারে,
চাই সদা ডুবিয়া থাকিতে,
প্রাণ যেন কেন ভয় পায় ?
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলাে রেখাগুলি
চারি দিকে ওই দেখা যায়,
ওই আলাে ভেদিয়া ভেদিয়া
বিষাদের বিষ লাগে গায়।
কেঁদে মরে বিষন্ন হৃদয়।
কি যেন কি বাতাসের টানে
পারি সে আঁধারে ডুবিতে,
পড়ে আঁখি ক্ষুদ্র আলাে পানে
ভেসে যাই কোথায় কোথায় !
বিষাদ ও অশ্রু।
আধার সাগর মাঝে,
রাশি রাশি আঁধার ভেদিয়া,
কোথা হতে এ বাতাস আসে ?
ডুবিতে পারি না আঁধিয়ায় !
সে আঁধার সাগরের বুকের উপরে
চঞ্চল তরঙ্গগুলা,
নিশি দিন করে খেলা,
হাওয়া এসে দেখা দিয়ে পাগল ক্ষেপায়
ওই আলো রেখা দেখে,
ওই বাতাসের টানে
সুধু খেলা করে তারা বিরাম না লয়।
দেখিয়া আলােক রেখা
মনে কত ভাব উঠে ;
এই বুঝি ঘুচে দুখ
প্রাণের বিষাদ টুটে ;
এই বুঝি স্বর্গ দেখা যায়,
স্বর্গের বাতাস লাগে গায়
স্বর্গের ফুলের বাস
সমীর কতই বয় !
সব শূন্য সব শূন্য কেঁদে আশা মরে যায়
;
উপহার।
এমন অনেক স্বর্গ
মনে হয় পলে পলে,
বিষাদ তরঙ্গরাশি
কতই উঠে উথলে ;
সাধ হয় চলে যাব
আলােগুলা পাছে ফেলে।
চঞ্চল তরঙ্গগুলা
খেলাইবে ভেসে ভেসে ;
আমি আঁধারের সনে
এক হয়ে যাব মিশে।
প্রাণের সুখ দুঃখ
প্রাণের বিষাদগুলা,
কিছুই রবে না আর
ভুলে যাব যত জ্বালা;
এস তবে অন্ধকার
দীন হীন ডাকি আমি,
থেকোনা হে অত দূরে
নিকটে এস না তুমি।
প্রাণের বিষাদ রাশি
বিষাদের অশ্রুধারা,
৯৪
বিষাদ ও অশ্রু।
সঁপিলাম অন্ধকারে
দুখী আমি আত্মহারা ;
শুকায় শুকবে অশ্রু,
অন্ধকারে মিশে যাবে,
ওই অনন্তের কোলে
আঁধারে ঘুমায়ে রবে।
দেখিও অশ্রুর গায়
মলিন এ মুখ-ছায়া,
আর উঠিবে না জেগে
চঞ্চল সুখের মায়া ;
চরণের ছায় তব
ওরা তবে থাক্ পড়ে ;
ডুবাও আমারে আসি
সে অনন্ত অন্ধকারে !!
সম্পূর্ণ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.