Makardah Saraswat Library, Howrah
Surama Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
সুরমা
শ্রীযােগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
বেঙ্গল পাবলিশিং হোম
৫নং সুরমহম্মদ লেন
মূল্য
এলবিয়ন প্রেস
৫, সুর মহম্মদ (মান
শিশিরকুমার বাগচি
কর্তৃক মুদিত
প্রথম সংস্করণ
১৩৩৭
| সব্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
বেঙ্গল পাবলিশিং হোম
৫, সুর মহম্মদ সেন।
বীরেন্দ্রনারায়ণ মিত্র
কর্তৃক প্রকাশিত
মান উপেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
স্নেহাস্পদে
উপে,
তুমি আমার লেখা পড়তে ভালবাস। তাই, এ বইখানা
তোমাস দিলুম মন দিয়ে পডে ।
কলকাতা
তােমার
বৈশাখ ১৩ সন
দাদা
No text on this page.
জুমা সন্ধ্যার পর সুরেশের বসিবার ঘরে একটা মহাসমারােহ পডিয়া মাঝে মাঝে গভীর রাত্রে তাহাদের বিতর্ক এরূপ উদ্দাম হইয়া উঠিত যে, পাড়ার লােক উত্ত্যক্ত হইয়া একটা বিশেষ দ্রব্যের ইঙ্গিত করিয়া যখন-তখন তাহাদের প্রতি গালি পাড়িয়া, এই কথাই বলিয়া বেড়াইত যে, ইহাদের উৎসঃ যাইবার পথ অত্যন্ত সুগম হইয়া উঠিয়াছে এবং অচির ভবিষ্যতেই তাহারা যে অধঃপাতের নিম্নতম সােপানে গিয়া পৌছিবে, ইহাতে আর বিন্দুমাত্র সংশয় নাই। সে দিনও সন্ধ্যার পর একে একে সবাই আসিয়া জুটিয়া, তাহাদের নিত্য কার্যের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল । তখনও পর্যন্ত গৃহস্বামীর অনুপস্থিতিটাই যেন সকলকে ভিতরে ভিতরে অস্থির, চঞ্চল করিয়া তুলিতেছিল। অসহিষ্ণু বীরেন আর থাকিতে পারিল না। মণীন্দ্রের উদ্দেশে ডাকিয়া কহিল, “ওহে মণি, আজ সুরেশের ব্যাপার- }
২
সুরমা
যেন
খানা কি বলতে পার ? বাড়ীতেও নেই এবং কোথায় গেছে,
তাও বলে যায় নি ; এর ত কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিনে।”
মণি নিজের মনে ছকের উপর পাশার খুঁটি সাজাইতেছিল।
বীরেনের প্রশ্নে মুখ তুলিয়া উত্তর দিতে গিয়া একেবারে লাফা-
ইয়া উঠিল।-“কিহে, যতীনদা যে ! এসো এসাে, আমাদের
আজ কি সৌভাগ্য যে, তােমার পায়ের ধূলাে মাথায় নিতে
পারলুম।” বলিয়া প্রণাম করিয়া যতীনকে একেবারে আরাম
কেদারাটার উপর বসাইয়া দিল ।
তারপর কিছুক্ষণ যতীনের পায়ের ধূলার অন্য
কাড়াকাড়ি পড়িয়া গেল।
গােলমাল থামিলে যতীন হাতের লাঠিটা পাশের দেয়ালে
ঠেস দিয়া রাখিয়া গলাটা একটু পরিষ্কার করিয়া লইয়া স্বাভাবিক
মৃদু কণ্ঠে কহিলেন, “তােমরা যে করে আমায় ঘিরে ধরলে
এবং ভক্তিতে যেমন ক'রে গলে পড়লে, তা দেখে আমি একে-
বারে অবাক হয়ে গেছি।”
অবাক হবার কি আছে, যতীনদা? আমরা কি তােমায়
ভক্তি করিনে ? ভালবাসিনে ?” বলিয়া মণি তাহার ভান
হাতটা যতীনের সামনে তুলিয়া ধরিয়া কহিল, “দেখ ত যতীনদা,
আমার সময়টা এখন কেমন যাচ্ছে।”
মণীন্দ্রের প্রসারিত হাতখানা নিজের দুই হাতের মধ্যে লইয়া
যতীন স্নেহের স্বরে বলিলেন, “তােমাদের ভালবাসা ত আমার
অজানা নেই, তাই।” বলিয়া একটু নিশ্বাস ফেলিয়া গভীর
সুরমা
কণ্ঠে বলিলেন, “কিন্তু, শুধু ভালবাসা পেলেই ত হয় না ।
নেবারও ত একটা সত্যকারের অধিকার থাকা চাই।”
প্রত্যুত্তরে মণীন্দ্র কি বলিতে যাইতেছিল। কিন্তু, ঠিক
সেই সময় সুরেশ ও ধারের দরজা দিয়া বাড়ীতে ঢুকিয়া উচ্চকণ্ঠে
ডাকিল, “মনুয়া, মনুয়া !”
মনুয়া উপরে রান্নাঘরে কি একটা কাজে ব্যস্ত ছিল।
প্রভুর আহ্বান শুনিতে পাইল না। সুরেশ কণ্ঠস্বর আরও
চড়াইয়া দিয়া হাঁকিল, “মনুয়া, মনুয়া—মন-”
প্রভুর উচ্চকণ্ঠে ভীত হইয়া মনুয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া আসিয়া
দরজার আড়ালে দাড়াইয়া ভয়ে ভয়ে কহিল, “আপনার চা
আব কি ?
মনুয়ার সন্ত্রস্ত ভাব দেখিয়া সুরেশ হাসিয়া ফেলিল ।
সম্মুখে ডাকিয়া, জামা-চাদর, হাতের লাঠিটা মনুয়ার হাতে
তুলিয়া দিয়া সদয় কণ্ঠে কহিল, “ওকি, ভয়ে অনে কাটা হয়ে
রয়েছিস কেন রে ? যা, শীগগির ক'রে চা নিয়ে আয়।
আর অমনি ঠাকুরকে বলে দিস, আমি আজ রাতে বাইরে
ধাবাে।”
সুরেশ তাহার বসিবার ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র সকলে
সমস্বরে তাহার বিলম্বের হেতুটা জানিবার জন্য যেন একেবারে
অস্থির হইয়া উঠিল । সুরেশ হাসিয়া কি একটা জবাব দিতে
যাইতেছিল। কিন্তু, পাশের দিকে চোখ পড়িতেই থামিয়া
গিয়া যতীনের পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া তাহার পাশে আসিয়া
৪
সুরমা
বসিল। কহিল, “যতীনদা, তুমি যে এমন করে আমায়
ভুলে থাকতে পার, তা আমি জানতাম না।”
“আমিই কি জানতুম, সুরেশ, তুমিও এমনি করেই
আমার কথাগুলি উড়িয়ে দেবে ?” বলিয়া যতীন পরম স্নেহে
সুরেশের গায়ে-মাথায় হাত বুলাইতে
হাত বুলাতে বুলাইতে কহিলেন,
“আচ্ছ। সুরেশ, তুই কি কোন দিন মানুষ হবি নে ? এমনি
করে ঘুরে ঘুরে নিজের শক্তির অপচয় করে বেড়াবি ?
'ভগবান তাের মধ্যে যে শক্তি দিয়েছেন, তার অমৰ্য্যাদা করিস
নে রে,তাের যতীনদার একথাটা মনে রাখিস।”
সুরেশ তৎক্ষণাৎ অভিমানের সুরে কহিল, “তুমি ত শুধু
দেখছ, আমি অকাজ করেই বেড়াচ্ছি। আমার শক্তিই বা
কি, আর তার অপচয়ই বা কি!”
ক্ষণকাল সুরেশের দিকে সস্নেহ দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া
যতীন গম্ভীর কণ্ঠে কহিলেন, “তােমার ভিতরটা আজও দেখতে
পাচ্ছ না বটে; কিন্তু যে দিন পাবে সে দিন তােমার এই
গরীব বন্ধুকে একবার মনে করে। যাক, এ নিয়ে আগেও
অনেক কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে এবং পরেও বিস্তর হতে
পারবে। কিন্তু, আজ আর এই নিয়ে তর্ক বাড়াতে চাই নে।
আমাকে এখুনি উঠতে হবে।”
সুরেশ রাগ করিয়া কহিল, “আমার এখানে এলেই খালি
তুমি উঠে যেতে চাও। কেবল কাজ আর কাজ ! জগতে
বিশ্রাম, সুখ-শান্তি বলে কি কোন জিনিষই নেই ?”
সুরমা হচ্ছে, যতীন নিঃশব্দে সুরেশের একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে টানিয়া লইয়া ক্ষণকাল স্তব্ধ, স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন। তার পর একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস চাপিয়া গিয়া বলিলেন, “ কাজ ?- কাজ ত কিছুই করতে পারলুম না, সুরেশ। মনে শুধু অকাজের বােঝা বয়েই বেড়াচ্ছি। যাক্, যাবার আগে আবার সে কথাটাই বলে যাচ্ছি সুরেশ। এমন নিঃসঙ্গ জীবনে সুখ যতই থাক, শান্তি তাতে বিশেষ আছে বলে মনে হয় না। আর একটা কথা,-নীতির দোহাই পেড়ে সমাজ তােমাদের কাজের গণ্ডী যতই ছােট করে আনুক না কেন,-আমার মতে দুস্কাৰ্য্য বলে কোন জিনিষই নেই, যদি তাতে মানুষের উপকার হয়। এ নিয়ে ত অনেক দিন অনেক কথাই হয়ে গেছে। আজ আর তর্ক থাক্। সময় করে আমার ওখানে এক দিন যেও,-আমার অনেক কথা বলবার রইল । ভুলো না কিন্তু সুরেশ ।” বলিয়া লাঠিটা বইয়া যতীন উঠিয়া পড়িলেন। সুরেশ তৎক্ষণাৎ হেঁট হইয়া পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া বলিল, “আচ্ছ। দেখে নিও, যতীনদা, তোমার কথা শুনি কি যতীন পা বাড়াইতেছিলেন। সহসা থামিয়া গিয়া সুরেশের দিকে স্মিতহাস্যে চাহিয়া নিমেষের জন্য তাহার মুখ- খান। আর একবার দেখিয়া লইলেন। তার পর ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেলেন।
সুরমা
যতীন নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেলে বহুক্ষণ পর্যন্ত সুরেশ
সে দিকে চাহিয়া থাকিয়া একটা নিশ্বাস ফেলিয়া মুখ ফিরাইয়া
সম্মথের খােলা জানালা দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল।
ওদিকে পাশার ধুম এত বাড়িয়া উঠিয়াছিল যে, যতীনের
নিঃশব্দ অন্তধন কেহ লক্ষ্যই করিল না।
সুরেশের কিন্তু কিছুই ভাল লাগিতেছিল না। কিসের
অভাবের বেদনা যেন আজ যতীনের কথার ভিতর হইতে
অকস্মাৎ বাহির হইয়া আসিয়া তাহার সমস্ত হৃদয় জুড়িয়া
হাহাকার তুলিতেছিল। তাহার উপর ও-দিকের
ও-দিকের পাশার
উন্মত্ত কোলাহল উত্তরােত্তর যেরূপ প্রচণ্ড হইয়া উঠিতেছিল,
তাহাতে তাহার ব্যথিত মন কিছুতেই এই ঘরের ভিতর
এক দণ্ডও তিষ্ঠিতে চাহিল না। কোথাও ছুটিয়া গিয়া নিজের
ভবিষ্যতটা একবার ভাবিয়া লইতে পারিলে সে যেন বঁচিয়া যায় ।
অথচ, ভাহার বাড়ীতে যখন তাহারই বন্ধুরা খেলায় মগ্ন
হইয়া রহিল, তখন তাহাদিগকে কিছু না বলিয়া-কহিয়া
নিতান্ত সঙ্গোপনে বাহির হইয়া যাওয়াটাও তাহার কাছে
অত্যন্ত অন্য অভদ্রতা বলিয়া মনে হইতে লাগিল। কিন্তু,
শত চেষ্টা সত্ত্বেও যখন তাহার অশান্ত মন কিসের টানে বাহির
হইয়া পড়িবার জন্যই উন্মাদ হইয়া উঠিল তখন আর কিছুতেই
নিজেকে সংযত রাখিতে পারিল না।
একবার এমনও মনে হইল যে, ঐ খেলার মধ্যে নিজেকে
সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করিয়া দিয়া তাহার অন্তরের এই তীব্র
সুরমা
৭
তারপর
বেদনাকে ভুলিয়া থাকে। কিন্তু, আজ কেন যেন তাহার
অবসাদগ্রস্ত মন ঐদিকে কিছুতেই মুখ বাড়াইতে চাহিল না।
নিঃশব্দে সামনের দরজা দিয়া বাহির হইয়া উপরে উঠিয়া
একটা জামা পরিয়া লাঠিটা লইয়া মােহাচ্ছন্নের মত ধীরে
ধীরে বাহির হইয়া গেল।
বাহিরে আসিতেই তাহার মনে হইল, কোথায় যাই ?
সহসা মনে পড়িয়া গেল, তাহাকে বন্ধু নিৰ্ম্মলের
বাড়ীতে নিমন্ত্রণ রাখিতে যাইতে হইবে। তখন সেই পথ
ধরিয়াই ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল।
সমস্ত পথটা নিরন্তর যতীনের কথাগুলি তাহার মনের
মধ্যে আনাগােনা করিতে লাগিল। একবার মনে হইল,
তাহা হইলে কি তাহার এই বন্ধনহীন, উচ্ছ ঙ্খল জীবনের
উদ্দাম স্রোত কূলে কূলে ধাক্কা খাইয়া শেষে একদিন সরল পথ
ধরিয়া তাহার সার্থকতা লাভের জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিবে ?
তাহার যতীনদা হাত দেখিয়া এই কথাই তাহাকে বলিয়াছিলেন।
এ কথা মনে হইতেই চোখ তুলিয়া সংখ্যাহীন নক্ষত্র-পচিত ,
কালো আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিল। পঞ্চমীর চাঁদ
তখন সবেমাত্র অস্ত যাইতেছিল। তাহার রজত-শুভ্র কিরণটুকু
তখনও গাছের মাথায়, বাড়ীর চুড়ায় মুছিয়া যায় নাই
উপরে সীমাহীন অনন্তের গায়ে ঐ যে হীরকখণ্ডের মত
তারকাগুলি জগতের দিকে চোখ মেলিয়া চাহিয়া রহিয়াছে,
তাহাদের দিকে চাহিয়া চাহিয়া অকস্মাৎ তাহার দুই চক্ষু
৮ সুরমা আদ্র হইয়া উঠিল । অনির্বচনীয় আনন্দরসে তাহার অন্তর-বাহির ভরিয়া একাকার হইয়া গেল । কত দিন ত এমন করিয়া চোখ মেলিয়া চাহিয়া দেখিয়াছে ; কিন্তু বিশ্বের সৌন্দৰ্য্য এমন করিয়া রূপ ধরিয়া কখনও ত তাহার চোখের সামনে প্রতিভাত হয় নাই। হাতের কোণে চোখ মুছিয়া, আর একবার উর্ধে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া যুক্ত করে ভগবানের উদ্দেশে প্রণাম করিয়া মনে মনে কহিল, ভগবান! এই যে তােমার অপূর্ব রহস্যে আবৃত সৃষ্টি, এই যে গ্রহ-উপগ্রহগুলি নিরন্তর পৃথিবীর প্রহরায় নিযুক্ত রহিয়াছে, তাহারা কি সামান্য প্রহরী মাত্র ? তাহাদের কি অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই ? তাহাদের হাতে কি সৃষ্টির মঙ্গলমঙ্গলের তার কিছুই নাই ? তবে, কোন পাপে তাহারা একটা উদ্দেশ্যহীন জীবন লইয়া ঘুরিয়া মরিতেছে ? অকস্মাৎ তাহার চোখের উপর দিয়া যেন এক রূপের তরঙ্গ খেলিয়া গেল। ঠিক সম্মুখেই শুক তার হাসিতেছে! আর একবার কপালে হাত ঠেকাইয়া কহিল, ঠাকুর! তােমার ইচ্ছায়ই আজ পৃথিবীতে প্রেমের বন্যা বহিয়া যাইতেছে। নর- নারীর মিলন-বিচ্ছেদ, মিলন-বিচ্ছেদ, সে ত তােমারই কাজ ! ! বিশ্বব্যাপী ভাঙ্গা-গড়া, সৃষ্টি-সংহার অবিরাম চলিতেছে, তাহার কাজ ত বিধাতা তােমারই হাতে দিয়াছেন। কত সৌন্দৰ্য্য তুমি সৃষ্টি করিয়াছ। যুগে যুগে যত কবি, যত শিল্পী পৃথিবীতে সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন, তাহারা ত তােমারই অনুগৃহীত।
সুরমা
তবে, কে বলে প্রাকৃতিক নিয়মে উঠা-নামা ছাড়া তােমার
আর কোন কাজ নাই ?
প। করিয়া একখানা মােটর গাড়ী ‘হর্ণ বাজাইয়া, পাশ
কাটাইয়া চলিয়া গেল। গাড়ীর পিছন হইতে একটা সুগন্ধ
ও কোমল হাসির হিল্লোল
হাসির হিল্লোল ভাসিয়া আসিয়া তাহাকে যেন
ঠেলিয়া সজাগ করিয়া দিল। সে চোখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিল।
মনের কোণ হইতে অনুক্ষণ এই প্রশ্নটা উঠিতে লাগিল, সত্য
হোক, মিথ্যা হোক—এই যে নিমিষের জন্য তাহার মনের
গােপন কোণে সৌন্দর্যের একটু ছোয়া আসিয়া লাগিল, ইহা
কি একেবাৰেই অর্থহীন, নিতান্তই অশ্রদ্ধেয়, তুচ্ছ ? সত্য
বলিয়া গ্রহণ করতে কোথায় যেন বাজিতে লাগিল। অথচ
মিথ্যা বলিয়া একেবারে উড়াইয়া দিতেও মন তাহার চাহিল
না। মনে মনে কহিল, “শুক্ৰদেব। তােমার বার্তা তুমিই
জান।”
-এই পাকড়ো-পাকড়ে।। পুলিশ-পুলিশ। চাপা
পড়েছে,-মরে গেছে। না-না, এখনও প্রাণ আছে। শীগগির .
জল-হাসপাতাল-” একট। বিকট সােরগােল পড়িয়া গেল।
সুরেশ চাহিয়া দেখিল, অদুরে অনেকগুলা লােক ভিড়
করিয়া গােলমাল করিতেছে। মাঝে মাঝে পুলিশের বংশীধ্বনিও
সুরেশের কানে আসিয়া পৌছিতে লাগিল। ব্যাপার বুঝিতে
তাহার আর বিলম্ব হইল না। এক মুহুর্তেই ভাবের নেশা
ছুটিয়া গেল। বিদ্যুৎ বেগে ঘটনাস্থলে গিয়া সুরেশ যাহা
১০
সুরমা
দেখিল, তাহাতে মুহুর্তের জন্য তাহার সর্বশরীর অবশ হইয়া
আসিতে চাহিল।
অতি কষ্টে, অতি যত্নে সুরেশ যখন যুবকটিকে গাড়ীর
চাকার তলা হইতে বুকে করিয়া তুলিয়া অন্য একটা গাড়ীতে
উঠিয়া বসিল, তখনই তাহার সংজ্ঞাহীন দেহ সুরেশের বুকের
উপরই চিরদিনের জন্য শেষ নিশ্বাস ফেলিল। সৰ্বাঙ্গ দিয়া
তখনও রক্তস্রাব হইতেছিল। তাহার সঙ্গে রমণীটিকেও
সুরেশ গাড়ীতে তুলিয়া লইয়া সজোরে গাড়ী হাকাইতে
বলিল। একটা পাহারাওয়াল। তাহাদের সঙ্গে চলিল।
বেদনায় সুরেশের সমস্ত মন ভরিয়া গেল। অথচ, বােধ হয়
তিন মিনিটও হয় নাই ইহাদেরই আনন্দের ছবি কল্পনা
করিয়া প্রাণ-মন তাহার ভরপুর হইয়া উঠিয়াছিল। আবেগে
শুক্ৰদেবকে পর্যন্ত কত কথা বলিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু,
এখন যে আর এক করুণ, শােচনীয় দৃশ্যের সংঘটন হইয়া গেল,
ইহার ভিতরের দুঃখ-কষ্ট যতই সে প্রাণ দিয়া অনুভব করিতে
লাগিল ততই কাহার উপর রাগে যেন তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া
যাইতে লাগিল।
পিছনের লােকগুলা তখনও জটলা বাধিয়া, কোলাহল
করিয়া যেন তামাসা দেখিতেছিল। তাহাদের উপরও রাগে,
ঘৃণায় মন তাহার কম বিরূপ হইয়া দাড়াইল ।
দু'চোখ তাহার জলে ভরিয়া গিয়াছিল। বারংবার
ভগবানকে দোষী করিয়া কহিতে লাগিল,তুমি যদি দয়াময়ই
সুরমা
হও, তাহা হইলে কয়েক মুহূর্ত পূর্বের সেই সুন্দর ছবিটাকে
এরূপগুয়ঙ্কর পরিণতিতে পর্যবসিত করিলে কেন ?
তােমারই কাজ ? না, তােমার নিয়ােজিত কোন নিষ্ঠুর
শক্তির তাণ্ডব লীলা ?
অতি ক্ষীণ একটু কান্নার শব্দে চকিত হইয়া মুখ ফিরাইতেই
পাশের রমণীটির উপর তাহার চোখ পড়িয়া গেল। নিতান্ত
সঙ্কুচিত হইয়া কহিল, “ছি ছি, এতক্ষণ আপনার কথা ভুলেই
গেছিলুম,—মাপ করবেন আমার অপরাধ । আপনার লাগে নি
রমণীটি অস্ফুটে কি কহিলেন, বুঝা গেল না। ক্ষণকাল
সব চুপ-চাপ। মােটরের শব্দ যেন আর্তনাদের মত রহিয়া
বহিয়া দুঃখই জানাইতে লাগিল। ঠিক সে সময় একটা
মােড় ঘুরিতেই টাল সামলাইতে না পারিয়া রমণী টি একেবারে
সুরেশের গায়ের উপর আসিয়া পড়িলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই
রাস্তার একটা আলো আসিয়া তাহার মুখে পড়িল ।
মুহূর্তের জন্য চোখখাচোখি হইতেই সহসা তিনি দু’হাতে
মুখ আবৃত করিয়া ফেলিলেন। সুরেশও আর কোন কথা
বলিয়া ওপারে মুখ ফিরাইয়া ভাবিতে লাগিল, রমণীটি সুন্দরী
বটে; কিন্তু সে রূপের পিছনে কিসের যেন একটা ঝড় বহিয়া
যাইতেছে। একবার মনে হইল, হয়ত ক্ষণকাল পূর্বের ঐ
ভয়াবহ দৃশ্য এই নারীর সহ্যের সীমাকে কঠোর আঘাত করি-
য়াছে বলিয়া ইহাকে ওরূপ দেখাইতেছে।
১২
সুরমা
সহসা পরিষ্কার কণ্ঠে প্রশ্ন আসিল, “ওর অবস্থা কেমন ?
প্রাণের আশা আছে বলে মনে হয় কি ?”
প্রশ্ন শুনিয়া সুরেশ একটু বিস্মিত হইল। ক্ষণকাল পূর্বে
যাহাকে শােকার্ত, অশ্রু ভারাক্রান্ত দেখিয়াছে, সে এত সত্বর
মনের কোণ হইতে সমস্ত ঝাড়িয়া ফেলিয়া এরূপ সহজ, হালকা
সুরে কথা বলিতে পারে কি করিয়া !
তাই, একটু নিশ্বাস ফেলিয়া সুরেশ কহিল, “প্রাণের
আশাই বলুন আর ভরসাই বলুন, সবই ওঁর গাড়ীতে তােলবার
সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু মানুষের গড়া আইনের
দাবীতে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।” বলিয়া একবার আড়
চোখে চাহিয়া দেখিল । সে মুখে সুখ-দুঃখের—কোন ছবিই
সুরেশ দেখিতে পাইল না।
“বাবু, হাসপাতাল আ গিয়া।” পুলিশ, টেক্সি-ড্রাইভার
ও সুরেশ—এই তিন জনে মিলিয়া যুবকটির মৃতদেহ ধরাধরি
করিয়া হাসপাতালে বুঝাইয়া দিয়া, গাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া
সুরেশ কহিল, “চলুন আপনাকে বাড়ী পৌছে দিয়ে আসি
ভাল কথা, ওঁর বাড়ীতে খবর দেওয়া দরকার। ওঁর ঠিকানা
বােধ হয় আপনার
ভগ্ন কণ্ঠে তৎক্ষণাৎ উত্তর আসিল, “না না, ওঁর আর আমার
এক ঠিকানা নয়। উনি আমার কেউ নন।”
“কেউ নন ?” সুরেশ চমকিয়া উঠিল। মনে মনে
সে যাহা সন্দেহ করিয়াছিল, সত্যই তবে তাই ? একথা মনে
সুরমা
হইতেই সমস্ত ব্যাপারটার উপর হইতে মন তাহার বিতৃষ্ণায়
সরিয়া দাড়াইল।
তার পর এক সময় জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল, যুবকটির নাম
নরেন। বড়লোকের ছেলে,সঙ্গ দোষে ইত্যাদি ইত্যাদি।
মদ খাইয়া মাতাল হইয়া বাহির হইয়াছিল। হঠাৎ ঝোঁকের
মাথায় চলন্ত গাড়ী হইতে নামিতে গিয়া এই বিপত্তি
ঘটাইয়াছে।
নরেনের বাড়ীতে খবর দিয়া সুরমাকে লইয়া সুরেশ যখন
তাহার ( সুরমার) বাড়ীতে পৌছিল রাত তখন প্রায় একটা
হইবে । নমস্কার করিয়া কহিল, “এখন তবে আসি।” বলিয়াই
সুরেশ পা বাড়াইয়া দিল।
চক্ষের পলকে তাহার সম্মুখে আসিয়া ফিক্ করিয়া হাসিয়া
সুরমা কহিল, “বা রে, আমার জন্যে আপনি এত কষ্ট
করলেন, আর আপনি একটু না বসেই চলে যাবেন, এ আমি
কেমন করে হতে দিতে পারি বলুন !” বলিয়া সুইচ
টিপিয়া পাখা খুলিয়া দিয়া কহিল, “দয়া করে একটু বসুন।
আমি এক্ষুণি আসছি । ” বলিয়া সুরেশের কিছু মাত্র
সম্মতির অপেক্ষা না করিয়া ওধারের দরজা দিয়া যেন নাচিয়া
বাহির হইয়া গেল।
প্রথম হইতেই এই স্ত্রীলোেকটার উপর সুরেশের কেমন
একটা অশ্রদ্ধার ভাব ছিল। এখন কিন্তু মন তাহার বিরক্তিতে
ভরিয়া গেল। ইহার নিজের, ঘরের বাহিরের সমস্ত সৌন্দৰ্য্য
১৪
সুরমা
এক নিমেষেই নিভিয়া মলিন হইয়া গেল। একটা অশ্বস্তিতে
মন তাহার ভরিয়া উঠিল। উঠি উঠি করিতেছে ঠিক এমনি
সময়, সুরম! তাহার প্রমত্ত চক্ষু দু’টি লইয়া একেবারে সুরেশের
কাছে আসিয়া, বসিয়া বলিল, “আপনার জন্য এক গ্লাস
সরবৎ-এই রামচরণ, জলদি। বাবুক। বহুৎ পিয়াস ল্যাগ
গিয়া।”
রামচরণ আসিয়া সসম্রমে এক গ্লাস সুন্দর লেবুর সরবৎ
সুরেশের হাতে তুলিয়া দিয়া সেলাম ঠুকিয়া প্রস্থান করিল।
অনেকক্ষণ হইতেই সুরেশের পিপাসা পাইতেছিল।
কাজেই, দ্বিরুক্তি না করিয়া অত্যন্ত তৃপ্তির সহিত সমস্তটা
পান করিয়া গেলাসটা যখন টিপায়ের উপর রাখিল তখনই
বুঝিল, এই সরবৎ কি উপাদানে প্রস্তুত !
ক্রোধে তাহার সমস্ত শরীর জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু,
তথনই মনে পড়িল, অনেক আমােদ-প্রমােদে, অনেক
বারই তাহাকে ইহা অপেক্ষা তীব্র সরবৎ পান করিতে
হইয়াছে। তথাপি, এই স্ত্রীলােকটার অসহনীয় স্পর্ধায় তাহার
ধৈৰ্য্য একেবারে শেষ সীমায় আসিয়া পৌছিল।
অত্যন্ত
তিক্ত কণ্ঠে কহিল, “আমার সঙ্গে এরূপ অসঙ্গত ব্যবহার
ক’রবার আপনার কি দরকার ছিল ? সত্য কথা বললেই ত
পারতেন। যাক্, আপনি স্ত্রীলোেক,-আপনাকে বেশী কিছু
বলতে পারব না।” বলিয়াই লাঠিটা টানিয়া লইয়া সুরেশ
বাহির হইয়া পড়িল।
সুরমা পিছন হইতে একটু চাপা কণ্ঠের হাসি ছাড়া কোনরূপ অনুরােধ-উপরােধ আসিল না। অথচ, এই না-আসাটুকুও কিন্তু সুরেশকে খুসি করিতে পারিল না। বরঞ্চ, হৃদয়ের কোন এক নিভৃত প্রদেশ হইতে অস্পষ্ট অভিমানের সুর বাজিয়া উঠিতেছে আভাস পাইয়া নিজের উপরও কম ঘৃণা বােধ হইল না। তাড়াতাড়ি বারান্দা পার হইয়া সিঁড়ির নিকটে আসিয়া দেখিল, সিড়ির দরজা একেবারে তালা দিয়া বন্ধ ; নামিয়া যাইবার কিছুমাত্র উপায় নাই। তথাপি, নিতান্ত অভ্যাস- বশতঃই দুই একবার ঠেলিয়া দেখিল। কিন্তু যাহা সত্য তাহাকে ঠেলিয়া যাওয়া নিতান্ত অসম্ভব। অথচ, এরূপ উপায়হীন অবস্থায় দাড়াইয়া থাকাও অত্যন্ত অপমানজনক। ক্ষোভে, বিরক্তিতে সুরেশের দু’চোখে জল আসিয়া পড়িল। রুমাল বাহির করিয়া চোখ দুটা মুছিয়া ফেলিয়া, বারান্দার রেলিংএর উপর ভর দিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল। ঠিক মাথার উপরেই কালপুরুষ জ্বল অল করিতেছে। নিশ্বাস ফেলিয়া সুরেশ ভাবিল, এই যে আজই তাহার মাথায় উপর দিয়। এত কাণ্ড ঘটিয়া গেল, তাহার বিন্দুবিসর্গও ত পূর্বাহ্নে সে জানিত না। অথচ, যখন ঘটিয়া গেল তখন ‘না’ বলিয়াও ত তাহাকে উড়াইয়া দেওয়া চলে না। তবে কি সত্য সত্যই মানুষের কিছু করিবার ক্ষমতা নাই ? শুধু কি গ্রহের শক্তিতেই মানবের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হইতেছে ?
১৬
সুরমা
ডান হাতের উপর একটু কোমল স্পর্শ অনুভব করিয়া
চমকিয়া ফিরিয়া চাহিতেই সুরমার ব্যগ্র চক্ষু দু’টি সুরেশের
চোখের সঙ্গে মিলিত হইয়া গেল। প্রায় অন্ধকারে ও সুরেশ
দেখিতে পাইল, তাহার মুখখানি পলকের জন্য দীপ্ত হইয়া
উঠিল । কিন্তু, তখনই মাথা নীচু করিয়া একান্ত মিনতির
স্বরে সুরমা বলিল, “আমায় ক্ষমা করুন, সুরেশ বাবু। আমার
অন্যায় যে কি পৰ্যন্ত হয়ে গেছে, তা শুধু বুঝলুম তখন, যখন
আপনি ঘৃণায় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।” বলিয়া হঠাৎ
হেঁট হইয়া হাতটা সুরেশের জুতায় ঠেকাইয়া কপাল স্পর্শ করিয়া
কহিল, “আপনি ব্রাহ্মণ, আপনার পায়ের ধূলো নিতে দোষ কি?
বরং পুণ্য”
সসঙ্কোচে দু’পা সরিয়া গিয়া সুরেশ বলিল, “থাক থাকুক,
যা হবার তা হয়ে গেছে। এর জন্যে মনে কিছু গ্লানি রাখবেন—
। দোষ হয়ত আমারও কিছু আছে। সে যাই হোক,
দয়া করে আপনার চাকরকে দরজাটা খুলে দিতে বলুন। রাত
একটা বেজে গেছে,—এখনও আমার খাওয়া হয়নি কি না।”
শেষ কথাটা বলিয়া ফেলিয়া সুরেশ ভাবিল, কথাটা ঘুরাইয়া
লইতে পারিলে সে বাঁচিয়া যাইত।
সুরমা লজ্জায় এতটুকু হইয়া নিতান্ত অনুতপ্ত কণ্ঠে কহিল,
“আঁা, তাই ত। ছি ছি, কি অন্যায় হয়ে গেছে আমার।
আপনাকে ত তাহলে এভাবে কিছুতেই ছেড়ে দিতে পারিনে।”
বলিয়া সুরেশের আপত্তির পথ সজোরে বন্ধ করিয়া দিয়া, এক
সুরমা
১৭
রকম টানিয়া লইয়া গিয়াই বরের বড় কোচটার উপর বসাইয়া
দিল। ডাকিল, রাম চরণ ! ও রাম চরণ, শীগগির।”
রাম চরণ গােটা দুই হাই তুলিয়া চক্ষু মুছিতে মুছতে
নিতান্ত অনিচ্ছুক মুখে জিজ্ঞাসা করিল, “দিদিমণি কি আমাকে
ডাছিলে?” বলিয়া সুরেশকে একবার আড় চোখে দেখিয়া
লইল।
প্রত্যুত্তরে সুরমা তৎক্ষণাৎ উঠিয়া গিয়া দেরাজ খুলিয়া
একটা টাকা বাহির করিয়া ঠং করিয়া মেজের উপর ফেলিয়া
দিয়া কহিল, “যা ত দৌড়ে শীগ্গির। সে উড়েটার দোকান
থেকে বেশ ভাল গরম লুচি আর পাশের দোকান থেকে-
কথার মাঝখানে বাধা দিয়া সুরেশ হাত জোড় করিয়া
বলল, “রক্ষে
এত রাতে দোকানের গরম লুচি
গলা দিয়ে হয়ত বা চলতে পারে; কিন্তু পেটে সইবে
কি না, একথা আপনাকে আমি সঠিক বলতে পারিনে।
ছাড়া, এত রাতে কোন দোকান খােলা আছে বলে ত আমার
মনে হয় না।”
রাত
কত হবে?” বলিয়া দেয়ালের ঘড়িটার দিকে
চাহিয়া দেখিয়া সুরমার মুখে আর কথা রহিল না। ম্লান মুখে,
নিতান্ত হতাশ ভাবে সুরেশের পায়ের কাছে বিছানাটার উপর
বসিয়া পড়িয়া, তাহার বড় চোখ দু'টি সুরেশের মুখের উপর
তুলিয়া ধরিয়া আৰ্ত্তকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “তা হলে কি হবে,
সুরেশ বাবু!”
করুন।
১৮
সুরমা
সুরমার মুখের স্নান, বিশুদ্ধ ছবি, এই একান্ত হতাশ দৃষ্টি,
আর্তকণ্ঠ সুরেশকে আঘাত করিল। কিন্তু, উত্তর দিল সংযত
কণ্ঠেই। বলিল, “কি আর হবে বলুন? উপায় যথন নেই
তখন শুধু শুধু আর দুঃখ ক'রে লাভ কি ? তার চেয়ে
বরঞ্চ আমায় বাড়ী যেতে দিন এবং আপনিও সুস্থ হয়ে
ঘুমােন।”
সুরমা সহসা কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ মৌন থাকিয়া
ধীরে ধীরে অত্যন্ত কুণ্ঠার সহিত কহিল, “আমি যদি একটা
অনুরোধ করি, দয়া করে রাখবেন কি ?” বলিয়া সাগ্রহে
সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল ।
সুরেশ কথাটা ঠিক বুঝিতে না পারিয়া কি রকম একটা
বিশ্রী অশ্বস্তি বােধ করিতে লাগিল। জিজ্ঞাসা করিল, “কি
অনুরোধ বলুন। রাখবার হলে রাখব না
রাখবর হ'লে রাখব না কেন ?” তাহার
কথাগুলি ভিতরের আতঙ্কে যেন কাপিয়া গেল।
সুরেশের এই সত্ৰাসভাব লক্ষ্য করিয়া সুরমার অভ্যস্ত
জীবনের তরল চটুলতা ফিরিয়া আসিল। হাসিয়া বলিল, ‘ভয়
পাবেন না সুরেশ বাবু। এতে ভয় পেয়ে অমন শুকিয়ে উঠবার
আপনার কোন কারণ নেই। বরঞ্চ, ভয়ে আমারই মুখ দিয়ে
কথা বেরুচ্ছে না।”
সুরেশ ধরা পড়িয়া লজ্জিত হইয়া কহিল, “বাঃ । ! ভয় !
ভয় কাকে করতে যাব ? কথা সে নয়। কথা হচ্ছে, আপনার
অনুরােধ নিয়ে। সেটা এখন ব্যক্ত করলেই যে বেঁচে যাই।”
সুরমা
১৯
“সত্যি বলছেন, বেঁচে যান ?” বলিয়া সুরমা হাসিতে
লাগিল।' এই হাসির মাদকতা সুরেশকে স্পর্শ করিল ।
সেও হাসিয়া বলিল, “কেন সন্দেহ করছেন ?”
“সন্দেহ ঠিক করছিনে। আপনি হয়ত বেঁচে যেতে পারেন ।
আমাকে কিন্তু লজ্জায় মরে যেতে হবে।” বলিয়া সুরমা
সুরেশের পাশের চেয়ারে আসিয়া বসিল।
সুরেশ তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিল, “আপনাকে লজ্জায়
মরে যেতে হবে কেন ?”
“আপনি যদি আমার অনুরােধ না রাখেন, যদি ঘৃণায় সেবার
মত উঠে চলে যান। এই সময় অকস্মাৎ সুরমার মুখের
উপর একটা করুণ ছায়া ভাসিয়া আসিয়া, আবার আপনিই
মিলাইয়া গেল।
“আমার বিশ্বাস আপনি এমন কোন অসঙ্গত অনুরােধ
করবেন না, যা আমি প্রত্যাখান করতে বাধ্য হব।”
“আমার উপর এতটা বিশ্বাস এর মধ্যে কেমন ক'রে ভুল ?”
বলিয়া সুরমা মুচকি হাসিয়া কহিল, “এত তাড়াতাড়ি আমাদের
উপর এতটা বিশ্বাস স্থাপন করবেন না।” কিন্তু, তৎক্ষণাৎ
সংযত কণ্ঠে পুনশ্চ কহিল, “না সুরেশ বাবু, এখন আর পরিহাসের
সময় না। আপনি না খেয়ে আছেন। তাই আমি-আমি বলছিলুম
কি, ঘরে সবই ত আছে, যদি খান কয় লুচি ভেজে দি, তা হলে
“তা হলে আমার গলা দিয়ে চলবে কি না। এই না?”
সুরমা চুপ করিয়া রহিল।
;
২০
সুরমা
সুরেশ পলকের
আর একবার সুরমার মুখের
দিকে ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিল । কিন্তু, সেই দৃষ্টিতে
সে মুখে যে সে কি দেখিল, ভগবান জানেন। তৎক্ষণাৎ
স্বীকৃত হইয়া কহিল, “আপনি এর জন্যে
এত কুষ্ঠিত
হচ্ছেন কেন? শীগগির যা হয় কিছু আনুন। ক্ষিদেয় আমার
পেট জ্বলে যাচ্ছে।"
“এই জলার কষ্টটার সঠিক সন্ধান এতক্ষণে পেলেন বুঝি ?”
বলিয়া সুরম্য হাসিতে হাসিতে ও-পারের পরজা দিয়া বাহির
হইয়া গেল।
মিনিট কুড়ি পরে সুরমা যখন এক হাতে একটা ডিসে করিয়া
খান কয় লুচি, কিছু ভাজা এবং অন্য হাতে আর একটা ডিসে
করিয়া গােটা কয় সন্দেশ ও কিছু রাবড়ি আনিয়া সুরেশের
সামনের টিপায়ের উপর রাখিয়া হাসিয়া কহিল, “কি গো,
ঘুমােচ্ছ নাকি ? খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল যে,” তখন দেয়ালের
ঘড়িতে টং টং করিয়া ২টা বাজিয়া গেল।
একলা বসিয়া সুরেশের ঘুম পাইতেছিল। অকস্মাৎ
সুরমার কণ্ঠস্বরের অনির্বচনীয় শসাহাগে তাহার হৃদয়ের বাধা
তারগুলি এক সঙ্গে যেন ঝম ঝম করিয়া বাজিয়া উঠিল।
এক আশ্চর্য অনুভূতি সমস্ত হৃদয় আলােড়িত করিয়া দিয়া
তাহার কণ্ঠ রােধ করিয়া ধরিল। নিৰ্বাক, বিহ্বল দৃষ্টিতে সে
শুধু সুরমার দিকে চাহিয়া রহিল।
সুরমা
সুরমা একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া সুরেশের কাছে বসিয়া
অনুযােগের স্বরে কহিল, “আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলে
ত আর পেট ভরবে না। এই যে বলছিলেন, ক্ষিদেয় আপনার
পেট জ্বলে যাচ্ছে। কই পান।”
“এই যে
যে থাচ্ছি।” বলিয়া সুরেশ তৎক্ষণাৎ আহারে
মন দিল। কিন্তু, খান দুই তিন লুচি খাইয়াই সুরেশ বলিল,
“আর যে পাচ্ছিনে।” বলিয়া সুরমার মুখের দিকে চাহিল ।
সুরমা তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “সে হবে না, সুরেশ বাবু,
তা আমি বলে দিচ্ছি। এই যে বলছিলেন, খুব ক্ষিদে
পেয়েছে। এমন কি তার চোটে পেটটাই নাকি পুড়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু, খাওয়া দেখে ত তার কিছুই মনে হল না। তার চেয়ে
বলুন না
কেন যে, আমার হাতের রান্না খেতে আপনার
প্রবৃত্তি হচ্ছে না। আগে বুঝতে পারলে ত আপনাকে এমন
অশ্রদ্ধার মধ্যে টেনে আনতুম না।” তাহার শেষ দিকের কথা
গুলি একটা রুদ্ধ অভিমানের ভারে অস্পষ্ট হইয়া থামিয়া গেল।
অপ্রতিভ সুরেশ আর কোন কথা না বলিয়া পুনর্বার
আহারে মন দিল। ক্ষণেকের জন্য সব চুপ-চাপ। তারপর
সুরমা সহসা একটা নিশ্বাস ফেলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা,
বলুনত সত্যি করে, আমার হাতের রান্না খেতে আপনার
ঘৃণা হচ্ছে কি না !
এইবার সুরেশ তাহার খালি পাত্রটার দিকে অঙ্গুলি
নির্দেশ করিয়া হাসিয়া কহিল, “এর পরেও কি আমাকে এর
২২
সুরমা
উত্তর দিতে বলছেন ?” বলিয়া হাত মুখ ধুইতে রাম চরণের
প্রদর্শিত পথে বারান্দার ওধারে চলিয়া গেল।
সে দিকে চাহিয়া সুরমার দুই চক্ষু যেন জুড়াইয়া গেল।
আজ হঠাৎ মনে হইল, তাহার এই ভ্রষ্ট, কলঙ্কিত, অভিশপ্ত
জীবনে এমন করিয়া সমস্ত প্রাণ ঢালিয়া দিয়া এই যেন সে
প্রথম কাহাকেও খাওয়াইল। ইহার আনন্দ, ইহার তৃপ্তি,
ইহার শান্তি যেন আজ অকস্মাৎ তাহার মুমূর্ষ নারী হৃদয়টাকে
সঞ্জীবিত করিয়া তুলিল। তাই ঐ শূন্য পাত্রটার দিকে চাহিয়া
চাহিয়া তাহার দু'চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। মনে মনে বলিল,
“ভগবান্ ! এ স্বপ্ন যেন সত্য হয়।”
সুরেশ ফিরিয়া আসিতেই সুরমা চকিত হইয়া চক্ষু মুছিয়া
নিজের আঁচলটা বাড়াইয়া দিয়া কহিল, “এটাতেই হাত-মুখ
মুছে ফেল।”
মুহূর্তের জন্য সুরেশের হাতটা একটু কঁপিয়া গেল।
তথাপি, হাত-মুখ মােছর কাজ ঐ আঁচলেই শেষ করিতে
হইল।
সুরমা গােটা দুই পান সুরেশের হাতে তুলিয়া দিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “তা হলে সুরেশ বাবু, এখন বাড়ী চললেন ত ?” একটা
চাপা হাসিতে তাহার দু'চোখ নাচিতেছিল। অন্য দিকে মুখ
ফিরাইয়া পুনরায় কহিল, “আমার ভারি ভয় ছিল, পাছে আপনি
আমার হাতে না খান ; পাছে অযত্ন পেয়ে কাল সকলের
কাছে আমার নিন্দে করে বেড়ান। যাক, অনেক কষ্টই ত
সুরমা
আপনাকে দিলুম। দয়া করে আমার সব অপরাধ মাপ
করবেন। আচ্ছা, নমস্কার।'
দুঃসহ বিস্ময়ে সুরেশ স্তম্ভিত, নির্বাক হইয়া দাড়াইয়া
রহিল। ক্ষণকালের জন্য তাহার এমন শক্তি বহিল না যে,
চোখ তুলিয়া এই নিষ্ঠুর রমণীর দিকে চাহিয়া দেখে। তাই।
হইলে হয়ত অনেক কথাই জানিতে পারিত। কিন্তু, সে দিকে
তাহার লক্ষ্যই ছিল না। ক্ষণিক পূৰ্বেই যাহার আচার-ব্যবহার,
আলাপ-আপ্যায়নে মন তাহার বসন্ত বাতাসে উড়িয়া বেড়াইতে-
ছিল, এক অপূর্ব আনন্দের নেশায় হৃদয় কানায়-কানায় ভরিয়া
উঠিয়াছিল ; স্নেহের
সুর বাজিয়া উঠিয়া তাহার মনকে
নাচাইয়া তুলিয়াছিল ;-ক্ষণিক পরে আবার তাহারই গভীর
ঔদাসীন্য, নিষ্ঠুর বিদায়ের ইঙ্গিতে মন তাহার একেবারে
ভাঙ্গিয়া, ছিড়িয়া পড়িতে চাহিল। একটা ব্যথার তরঙ্গ সমস্ত
হৃদয় জুড়িয়া গড়াইয়া বেড়াইতে লাগিল।
সুরেশের চিন্তার স্রোত যে কোন দিকে বহিয়া ভাঙ্গন শুরু
করিয়াছে, সুরমার তাহা অবিদিত রহিল না। তথাপি, শান্ত
অথচ দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, “রাত যে অনেক হয়ে গেল সুরেশবাবু।
কই, বাড়ী যাবেন না ?”
সুরেশের অন্তর জ্বলিতেছিল। সুরমার প্রশ্নে তাহার
ভিতরের দাহ অকস্মাৎ ক্রোধের আকারে বাহির হইয়া আসিয়া
সুরমাকে আঘাত করিল। ব্যঙ্গ করিয়া কহিল, “আমি যাব
ত কি আপনার এখানে রাত কাটাতে এসেছি নাকি ?
২৪
সুরমা
এতক্ষণ যে থেকে গেলুম, এটাই আপনার সৌভাগ্য বলে মনে
করবেন।”
সুরেশের কথার গায়ে সুরমার মুখ ক্রোধে পলকের জন্য
রাঙ্গা হইয়া উঠিল। কিন্তু, পরক্ষণেই নিজেকে সামলাইয়া
লইয়া আস্তে আস্তে কহিল, “আপনাদের মত লােকের
আসা-যাওয়াটাকে সৌভাগ্য বলে মনে করাই ত আমাদের
কাজ। আবার কোন দিন এলে, সৌভাগ্যের মাত্রাটা বাড়বে
বই কমবে না, এ কথাটাও এই সঙ্গে আপনাকে স্মরণ করিয়ে
দিতে চাই।” তাহার কথার শেষ দিকে যে কুৎসিত শ্লেষ
নিহিত ছিল, তাহা সুরেশের অগােচর রহিল না।
সুরেশ জ্বলিয়া উঠিয়া উত্তর দিল, “এ জীবনে এমন
সম্মান-সৌভাগ্য ইতি পূর্বে ত অনেকের কাছ থেকে পেয়ে-
ছেন। বেঁচে
বেঁচে থাকলে এমন আরও অনেক পাবেন, সন্দেহ
নেই। কিন্তু, কেন শুধু শুধু একটু স্নেহের অভিনয় করে
আমাকে ফাদে ফেলবার চেষ্টা কচ্ছিলেন ?”
কঠোর কথা সহ করা সুরমার অভ্যাস নহে। সুরেশের
তীক্ষ ব্যঙ্গোক্তি তাহাকে প্রায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করিয়া
তুলিয়াছিল। তথাপি, ভিতরের দুর্জয় ক্রোধ প্রাণপণে চাপিয়া
দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, “আপনি যান, সুরেশবাবু। আপনার দু’টো
পায়ে পড়ি—যান এখুনি।” বলিয়া অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বরে
কহিল, “কঁদে ফেলবার কথা কি বলছিলেন না ? "
৭
সুরমা সুরেশ, কণ্ঠে আরও শ্লেষ মাখাইয়া বলিল,“ কথাটা শুনতে পেয়েও না-শােনার অভিনয় কচ্ছেন কেন ? ও সরলতার ভান করে লাভ কি ? আপনাকে তা মানায় না।" সুরমা ওদিকের দরজা দিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া যাইতেছিল। সহসা বিদ্যুৎ গতিতে ফিরিয়া দাড়াইয়া সুরেশকে আর একবার দেখিয়া লইল। তাহার চোখ দুটা একটা অস্বাভাবিক দীপ্তিতে জ্বলিতেছিল। দৃপ্ত কণ্ঠে কহিল, “ফাদ আর অভিনয়, এ দু'টো কথা বড় যে জোর গলায় বল- ছেন,-কিন্তু, একবারও ভেবে দেখেছেন কি, ফাদে ফেলবার ইচ্ছাই যদি আমার থাকত, তাহলে আপনি ওখানে দাড়িয়ে এমন কটু কথা বলতে আমার সাহস করতেন না। এতক্ষণে আমার এই । যাক্, আর বেশী কিছু বলব না। আপনার সঙ্গে ঝগড়া করে শেষ রাতে আর লােক হাসাতে চাইনে। আপনি এখুনি যান। চাকর দরজা খুলে গাড়ী ডেকে দেবে।” বলিয়া টলিতে টলিতে সামনের দরজা দিয়া, বাহির হইয়া আসিয়া তাহার শােবার ঘরের চৌকাঠে মাথা ঠেস দিয়া দাড়াইয়া রহিল। তাহার সর্বাঙ্গ ঝিম্ ঝিম্ করিতেছিল। ক্ষণকাল পরে ফিরিয়া আসিয়া রাম চরণ ভাঙ্গা বাংলায় জানাইল যে, বাবু চলিয়া গিয়াছেন এবং অনর্থক আর রাত জাগিয়া শরীর নষ্ট করিয়া কোন লাভ নাই। সুরমা মাথা তুলিয়া কি যেন জিজ্ঞাসা করিতে চাহিল ;
সুরমা
কিন্তু পারিল না। তার পর ধীরে ধীরে যখন তাহার শয়ন
কক্ষে প্রবেশ করিল তখন কি জানি, কিসের অসহ বেদনার
তারে তাহার দুই চক্ষু প্লাবিয়া অজস্র অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে
লাগিল।
দুই পরদিন মনুয়ার ডাকাডাকিতে অনেক বেলায় ঘুম ভাঙ্গি- তেই সুরেশের মনে হইল, এক অব্যক্ত গ্লানি পুঞ্জীভূত বেদনার বােকর মত তাহার বুকের উপর চাপিয়া বসিয়া রহিয়াছে। ইহার ক্লেশ, ইহার গুরু ভার ঝাড়িয়া ঠেলিয়া ফেলিয়া দিয়া নিত্য দিনের মত সহজ ভাবে কাজ-কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত করিয়া ফেলিবার মত শক্তি নিজের মধ্যে আজ আর সে খুঁজিয়া পাইল না। অথচ, এভাবে বিছানায় পড়িয়া থাকিতেও তাহার অত্যন্ত অশান্তি বােধ হইতে লাগিল। তাহার নিজের দেহের শক্তি-সামর্থ্য এক বিন্দুও কমে নাই। কিন্তু, আজ কেন যে তাহার চিত্ত সমস্ত কাজ হইতে মুখ ফিরাইয়া হাত গুটাইয়া রহিল, তাহার কারণ অনুসন্ধান করিতে গিয়া দপ, করিয়া যে কথাটা তাহার মনে পড়িল তাহাতে, মুহুর্তের জন্য তাহার ভিতরটা আতঙ্কে কাপিয়া উঠিয়া সর্বাঙ্গে কাটা দিল। ভিতরের উত্তেজনায় অকস্মাৎ লাফাইয়া উঠিয়া মনে মনে কহিল, এমন হয় না। এ অত্যন্ত কুৎসিত মিথ্যা। মনুয়া চা দিয়া গিয়াছিল। তাড়াতাড়ি এক নিশ্বাসে তাহা পান করিয়া, জামাটা টানিয়া লইয়া ঝড়ের মত ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। কিন্তু, যে জিনিষটাকে সে কুৎসিত মিথ্যা বলিয়া
২৮
সুরমা
বিদ্রুপ করিয়া উড়াইয়া দিতে চাহিল, তাহাই যেন ছায়ার মত
তাহার হৃদয়ের কোণে যখন-তখন উকি মারিয়া ঐ দিকেই মনকে
তাহার ক্রমাগত টানিতে আর ঠেলিতে লাগিল।
নিৰ্ম্মল সকাল বেলা চা’র পিয়ালাটা মুখে তুলিয়া দিয়া
নিজের মনে খবরের কাগজ পড়িতেছিল। এমন সময় তাহার
ছােট বােন অনিতা একখানি বই হাতে করিয়া, কি একটা
কাজে, এ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া খানিকক্ষণ চুপ করিয়া
দাঁড়াইয়া রহিল। নিৰ্ম্মল একবার মাথা তুলিয়া সে দিকে
চাহিয়া পুনর্বার খবরের কাগজে মন দিল। অনিতা কিছুক্ষণ
আপন মনে এটা-সেটা নাড়িয়া এক সময় জিজ্ঞাসা করিল,
“সুরেশ বাবু কাল খেতেও এলেন না, কোন খবরও পাঠালেন
না!
এর কারণ কিছু বলতে পার দাদা ?”
নিৰ্ম্মল মুখ না তুলিয়াই কহিল, “বােধ হয় তাকে হঠাৎ
বর্ধমানে যেতে হয়েছে।”
“বর্ধমান ? বর্ধমানে কেন যাবেন ? কই এমন কথা
কখনও ত তিনি বলেন নি।” বলিয়া টেবিলের উপর ঝুকিয়া
উত্তরের অপেক্ষায় অনিতা উৎকর্ণ হইয়া রহিল।
অনিতার জিজ্ঞাসা করিবার ধরণ, তাহার এই উদ্বিগ্ন-কোমল
কণ্ঠের আশ্চৰ্য্য সুর, কারণ জানিবার একান্ত ব্যগ্রতা নিৰ্ম্মলকে
হঠাৎ আজ বিস্মিত করিয়া যেন এক নূতন তথ্যের সন্ধান দিয়া
গেল। নিৰ্ম্মল মুখ তুলিয়া খবরের কাগজটা এক দিকে ঠেলিয়া
সুরমা
২৯
রাখিয়া সস্নেহ দৃষ্টিতে তাহার এই ছােট বােনটিকে এক বার
একটু দেখিয়া লইল। তারপর কিছুক্ষণ পাশের জানালা দিয়া
বাহিরের দিকে চাহিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে মুখ ফিরাইয়া
কহিল, "বােধ হয় ওর বৌদির অসুখের সংবাদ পেয়ে হঠাৎ
চলে গেছে। তাই হয়ত সংবাদ পাঠাতে পারেনি।”
অনিতা সুরেশের সম্বন্ধে অতটা আগ্রহ প্রকাশ করিয়া মনে
মনে লজ্জিত হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার উপর তাহার দাদার
সস্নেহ সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ভিতরে ভিতরে তাহাকে অত্যন্ত সঙ্কুচিত
করিয়া আনিতেছিল। সে শিক্ষিত মেয়ে,-বথা লজ্জাকে
দুর্বলতার ন্যায়
ন্যায় দমন করিয়া একটু বিস্ময় প্রকাশ করিয়া
কহিল, “সুরেশবাবুর বৌদি ? তার কোন আপনার ভাই
আছে বলে ত শুনি নি।”
নিৰ্ম্মল সহসা গম্ভীর হইয়া ভারী গলায় বলিল, “তাের
কথাই ঠিক, অনি। সুরেশের আপনার ভাই কেন, সংসারে
নিজে ছাড়া আপনার বলতে আর কেউ নেই।” বলিয়া একটা
নিশ্বাস ফেলিয়া কতকটা যেন নিজের মনেই বলিতে লাগিল,
“আমরা দু'জনে যখন একসঙ্গে পড়তুম তখন বরাবরই ও
প্রথম হ'য়ে এসেছে।
অথচ, শেষ পর্যন্ত বি, এ টাই পাশ
করতে পারলে না। মা-
বাপ নেই। বিয়েটা পর্যন্ত করলে
བ། | হাতে অগাধ পয়সা,-সঙ্গী-সাথীরাও সব ভাল নয়।
দুঃখ হয়, কিন্তু কি আর করা যাবে।”
সুরমা
অনিতা একাগ্রচিত্তে দাদার কথাগুলি শুনিতেছিল।
শুনিতে শুনিতে তাহার চোখের কোণে একটু অশ্রুর মত দেখা
দিল। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলাইয়া লইয়া কহিল, “আচ্ছ',
সুরেশ বাবুর সেই যে বৌদির কথা বলছিলে—তিনি তবে কে ?
তিনি কি সুরেশ বাবুর কাছে এসে থাকতে পারেন না ?”
নিৰ্ম্মল সুরেশকে যথার্থ ই ভাইয়ের মত ভালবাসিত।
প্রায় সমবয়স্ক হইলেও
হইলেও নির্মল ধীর, স্থির, সংযমী।
সুরেশ ঠিক তাহার বিপরীত। অথচ, এই দুই বিভিন্ন প্রকৃতির
লােকেরই বন্ধুত্ব যখন ভালবাসায় পর্যবসিত হইল তখন বাহিরের
লোকেরাও কম আশ্চর্য হইল না।
তাই, সুরেশের কথা উঠিলেই নির্মল নিজের অন্তরের
ভালবাসায়, তাহার এই বিপথগামী, অস্থির চিত্ত বন্ধুটির দুঃখে,
তাহার শুভ কামনার আবেগে অনেক কথাই বলিয়া ফেলিত ।
অনিতা তাহা জানিত। তাই, যখন-তখন ঐ দিকে আঘাত
দিয়া সুরেশের সম্বন্ধে দাদার অন্তরের ছবিটা দেখতে সে-ও বড়
ভাল।সিত। প্রথম প্রথম অনিতা কিছুই মনে করিত না।
কারণ, বাপ-মা ছিল না বলিয়া এতকাল অনিতা এলাহাবাদে
মামার কাছে পড়িতেছিল। কিছুদিন হইল নিৰ্ম্মলের সনির্বন্ধ
অনুরােধ এড়াইতে না পারিয়া তাহার মাসীমা আসিয়া সংসারের
ভার লইয়াছেন এবং অনিতাও আই, এ পাশ করিয়া বি, এ
পড়িবার জন্য কলিকাতা আসিয়া কলেজে ভর্তি হইয়া গিয়াছে।
ইতিমধ্যে বার দুই তিন সুরেশের সঙ্গে নির্মলের বাড়ীতে
সুরমা অনিতার' দেপা হইয়াছে। সম্প্রতি, কেন যেন, দাদার সহিত সমবেদনায় সুরেশের জন্য প্রাণ তাহার সময়-অসময়ে আলােড়িত হইয়া উঠিত। ইহা যে শুধু সুরেশের জন্য সদিচ্ছা ছাড়া আর কিছুই নহে, এ কথাও অনিতা নিজেকে বার বার বুঝাইত। কিন্তু, কাল যখন সুরেশকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইয়া নিজের বেশভূষায় বিশেষত্ব ফুটাইয়া গভীর ফুটাইয়া গভীর রাত পর্যন্ত বসিয়া থাকিয়াও তাহার দেখা মিলিল না তখন অকস্মাৎ তাহার বুক চিরিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস আপনিই বাহির হইয়া গেল । মনে হইল, তাহার আজিকার দিনটা একেবারে ব্যর্থ, নিতান্ত অর্থহীন, মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। তাই, শুধু অশ্রু আর হৃদয়ের বেদনা ইয়াই সে বিগত রাত্রে ছট্ফট্ করিয়া এক সময় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল । নিৰ্ম্মল নিজের মনে কথা কহিতেছিল। অনিতার প্রশ্নটা তাহার কাণে গেল না। নিজের মনেই বলিতে লাগিল, “ অথচ ভগবান ওকে সমস্ত জিনিষ দিয়েই সংসারে পাঠিয়ে- ছিলেন। শক্তি, স্বাস্থ্য, রূপ, অর্থ—কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু, ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত হয়ত কিছুই কাজে আসবে না।” অনিতা আর সহিতে পারিল না। কথার মাঝখানে সেই প্রশ্নটাই আবার জিজ্ঞাসা করিল, “ তার সেই বৌদি এসে কেন সুরেশবাবুর ভার নেন না? তাহলে ত সব দিক দিয়েই নিৰ্ম্মল নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “ তা ত হবার নয়। তিনি বুড়াে মানুষ. তায় আবার বাতে পঙ্গু। মা মরার পর ওকে ত
৩২
সুরমা
তিনিই মানুষ করেছিলেন। তিনি ভাল থাকলে কি ওকে
আজ পয়সা খরচ করে উপােস করে থাকৃতে হত! ”
অনিতা আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ উপােস কি
রকম ? ”
৫
উপােস ছাড়া আর কে কি বলব, অনিতা ! শনিবার দিন
দু’টোর সময় ভাবলুম, সুরেশের বাড়ী হয়ে যাই। গিয়ে দেখি
বাড়ীর সামনে তালা ঝুলছে।
অনিতা উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,
তার পর? ৭১
নিৰ্ম্মল একটু শুষ্ক হাসি হাসিয়া কহিল, তার পরের
ব্যাপারও মন্দ না। চাকরটা সামনের একটা দোকানে হয়ত
তাস খেলছিল, হয়ত আর কিছু করছিল। আমাকে দেখতে
পেয়ে তাড়াতাড়ি
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিয়ে এক পাশে দাড়ালো।
জিজ্ঞাসা করলুম, তাের বাবু কোথায় রে?' সে উত্তরে কি
বল্পে বােঝা গেল না। একটু কৌতুহল হল। উপরে গিয়ে
দেখি—উঃ!” সে দিনের স্মৃতির বেদনার ভারে তাহার গলাটা
কঁপিয়া গেল।
অনিতা নিবিষ্ট চিত্তে কথাগুলি শুনিতেছিল। সহসা
বলিয়া উঠিল, “ বলনা দাদা, থামলে কেন ?” তাহার চোখের
কোণে জল দেখা দিল।
নিৰ্ম্মল বলিতে লাগিল, ৫ শােবার ঘরটা যেমন নাের
তেমনি খাপছাড়া। চায়ের কাপটা তখনও মেজে গড়াচ্ছিল।
বইগুলি ওখানে-সেখানে পড়ে আছে। ময়লা কাপড়গুলি-
কতক বিছানার উপর. কতক খাটের নাচে। একরাশ নৃত
জুতো পরিষ্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রান্না ঘরে গিয়ে
দেখি, কবে বামুনটা রেধে বেড়ে পালিয়েছে, আবার গুলি ঠাণ্ড।
জল হয়ে গেছে। একটা বিড়াল ঢাকৃ• ঠেলে ফেলে
দিয়ে, তা ছড়িয়ে, মাছ খেয়ে আমাদের দেখতে পেয়ে ছুটে
পালালাে। বলিয়া ভিতরের আবেগে সহসা পা দু হইয়া
উঠিয়া নিৰ্ম্মল বারান্দায় গিয়া পায়চারি করিতে লাগিল ।
অনিতা কষ্টে দাদার সম্মুখে নিজেকে সংযত রাখিয়াছিল ।
কিন্তু, সে বাহিরে যাইতেই তাহার দুই চক্ষু অশ্রু জলে ভরিয়া
গিয়া অনিতা টেবিলের উপর মাথা রাপিয় স্থির হইয়া বসিয়া
রহিল ।
ক্ষণকাল সব চুপ চাপ ।
সহসা নিৰ্ম্মল দকিল, ৫ অা।
অনিতা চোখ মুছিয়া মাথা তুলিয়া উত্তর দিল, কেন
ডাকছ, দাদা ?
এক মুহুর্ত মৌন থাকিয়া নিৰ্ম্মল বলল, “ এ দিকে আয়
দিকি, দিদি। ”
অনিতা ধীরে ধীরে দাদার পাশে গিয়া দাড়াইতেই নিৰ্ম্মল
তাহার বােনটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাইতে জিজ্ঞাসা
করিল, সুরেশকে আমাদের বাড়ীতে এনে রাখতে তাের
কিছু আপত্তি আছে, অনিতা ? ”
আজই খানিক পূর্বে মনুয়া যে সংবাদ 'হাকে দিয়া
গিয়াছিল, সহসা অনিতার তাহা মনে পড়িয়া গেল। পড়িতেই
৩৪ সুরমা সােজ। তাহার দাদার মুখের দিকে চাহিয়া কৃঢ় কণ্ঠে কহিল, * সে হয় না, দাদা। তাছাড়া, তিনি নিজেই হয়ত এখানে থাকতে রাজী হবেন না। ” “ কেন রাজী হবে না? সে ত আমার কথা অমান্য করে না।” “তার প্রমাণ ত কালই পেয়েছ।” নিৰ্ম্মল আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “প্রমাণ কি করে পেলুম ?” “কাল সুরেশবাবুকে নিমন্ত্রণ করে শেষ পর্যন্ত নিজেই সারা রাত না খেয়ে কাটালে। তুমি হয়ত বিশ্বাস করতে পার, সে বন্ধমান গেছে। আমি জানি, কাল সে রাত নটায় বাড়ী থেকে বেরিয়ে তিনটায় বাড়ী ফিরেছে।” বলিতে বলিতে অনিতার মুখ একটা নিবিড় ঘৃণার ছায়ায় কালাে হইয়া উঠিল। নিৰ্ম্মল তাহার এই শিক্ষিতা, তেজস্বিনী ভগ্নীটিকে মনে মনে ভয় করিত। তাড়াতাড়ি কহিল, “সুরেশ আর যাই করুক, কখনও বাইরে রাত কাটিয়ে আসবে, এ কথা আমি বিশ্বাস করতে পারি নে।” তাহার প্রতি দাদার গভীর গেহ, বিশ্বাস অনিতার অবিদিত ছিল না। তথাপি, সুরেশের প্রতি মমতায়, শুভ ইচ্ছায় তাহার দাদা যে আজ তাহার কথাগুলি সন্দেহের চোখে দেখিয়া সত্য- মিথ্যা যাচাই করিতে চাহিবে, তাহা কখনও অনিতা ভাবে অন্য দিন হইলে সে হয়ত মনে কিছু করিত না। কিন্তু, আজ নাকি মনুয়ার কথায় সুরেশের প্রতি তাহার নাই।
বিতৃষ্ণার সীমা ছিল না। তাই, অত্যন্ত ক্ষুন্ন কণ্ঠে উত্তর দিল, “কখনও কি এমন করে আমাকে মিথ্যা বলতে শুনেছ, দাদা ?” তাহার এই অভিমানিনী বােনটি তাহার কথায় ক্ষুন্ন হই- যাছে, বুঝিতে পারিয়া নিৰ্ম্মল তৎক্ষণাৎ কহিল, “না না, তােমায় অবিশ্বাস ক'চ্ছিনে। তবে, ভুল ত সবারই হতে পারে।" অনিতা মুখ তুলিয়া কি একটা উত্তর দিতে গিয়া পুলকিত বিস্ময়ে দেখিল, সুরেশ ছাদের ওবার ঘুরিয়া তাহার দাদার বরে ঢুকিতেছে । নির্মলের দৃষ্টি সে দিকে আকর্ষণ করিয়া অনিতা দ্রুতপদে অন্য দিক দিয়া নিজের ঘরে ঢুকিয়া একটা চেয়ারের গা আশ্রয় করিয়া স্থির হইয়া রহিল। সুরেশের এই অপ্রত্যাশিত, আকস্মিক আগমনে তাহার হৃদয়ের মধ্যে যে ঝড় উত্তাল হইয়া উঠিয়াছে, তাহা শান্ত হইয়া না যাওয়া পর্যন্ত সে যে কোন মতে সুরেশের সম্মুখে উপস্থিত হইতে পারিবে না, তাহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অথচ, মুহুর্ত কয়েক পূর্বেই নিৰ্ম্মলের সঙ্গে কথায় কথায় সুরেশের বিগত রাত্রির কথা স্মরণ করিয়া তাহার প্রতি অনি- তার বিরাগের অন্ত ছিল না। কিন্তু, সুরেশের আগমনের শব্দে চোখ তুলিতেই তাহার শুষ্ক, বিবর্ণ মুখের যে ছবিটা হঠাৎ অনিতার চোখে পড়িয়া গেল, তাহার অসীম বেদনাই এখন সমস্ত ছাপাইয়া তাহাকে কেবল ঐ ঘরের দিকে ঠেলিতে লাগিল।
সুরমা
সুরেশ ঘরে ঢুকিতেই নিৰ্ম্মল তাড়াতাড়ি দু’বাহু বাড়াইয়া
তাহার বন্ধু, তাহার আবাল্য সুহৃদকে সাদরে গ্রহণ করিয়া সামনের
চেয়ারে বসাইয়া দিল। চাকরকে চা আনিতে বলিয়া দিয়া
নিজেও আর এক খানা চেয়ার টানিয়া উপবেশন করিল।
নিৰ্ম্মল, সুরেশের আকস্মিক আগমনের আনন্দে এতটা অতি-
ভূত হইয়া পড়িয়াছিল যে, এতক্ষণ পর্যন্ত ভাল করিয়া সুরেশের
মুখের দিকে চাহিয়া দেখিতে পৰ্যন্ত সময় পায় নাই। এখন
মুখ তুলিয়া কথা বলিতে গিয়া কিন্তু ক্ষণকাল আর তাহার মুখে
কথা রহিল না। সুরেশের ম্লান, বিশুষ্ক মুখ চোখে পড়িতেই তাহার
ভিতরটা যেমনই বেদনায় কঁদিয়া উঠিতে চাহিল, অন্য দিক
দিয়া এক
অজ্ঞাত আশঙ্কায় তেমনই তাহা দুলিয়া উঠিতে
লাগিল। অনিতার কথা যদি সত্য হয় ! যদি সুরেশ এমন
করিয়া বিগড়াইয়া বিপথগামী, কদাচারী হইয়া থাকে, তাহা হইলে
তাহার এত দিনের একান্ত বাসনার চরম সমাধি আজই হইয়া
যাইবে। একথা মনে হইতেই তাহার গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল।
নিৰ্ম্মলের এই নির্বাক, বিস্মিত দৃষ্টির সম্মুখে সুরেশ কেমন
যেন অশ্বস্তি বােধ করিতে লাগিল। জোর করিয়া একটু শুষ্ক
হাসি হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “অমন করে আমার মুখের দিকে
চেয়ে কি দেখছ হে ?”
নিৰ্ম্মল তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলাইয়া লইয়া কহিল,
“ বিশেষ কিছু দেখছিনে। শুধু ভাবছি, তােমাকে আজ অমন
কৃনাে দেখাচ্ছে কেন। কোন অসুখ করেনি ত ? ”
সুরমা
“ অসুখ করবার কোন কারণ ত খুঁজে পাইনে, নিৰ্ম্মল ।
তা ছাড়া অসুখ জিনিষটা আমার কাছে ঘেসতেই চায় না।
আজ হয়ত চায় না; কিন্তু এক দিন যে চাইবে না,
তারও ত কোন মানে নেই। যা শরীরটার প্রতি একটু
যত্ন রেখো। ” বলিয়া আলােচনাটা এ দিক দিয়া আর অগ্রসর
করিতে নিৰ্ম্মল সাহস করিল না। কথা পাড়িয়া
জিজ্ঞাসা করিল, কাল খেতে এলে কেন ? আমরা
তােমার জন্যে অনেক রাত পর্যন্ত বসেছিলুম। ”
সুরেশ ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া বাহিরের দিকে মুখ করিয়া
বলিল, “ বিশেষ কাজে পড়ে আসতে পারিনি। বেরিয়েছিলুম
ঠিক সময়ই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছুতে পারলুম না।”
কেন পারলে না ?
ঐ যে বললুম, বিশেষ কাজে আটকে পড়ে গেছলুম।
* তা ত বল্পে। কিন্তু, বিশেষ কাজটা কি, ভ ত বলছনা।
শুনতে পাই, অনেক রাত্রে নাকি
নিৰ্ম্মলের সন্দিগ্ধ কণ্ঠস্বরে সহসা মুখ ফিরাইয়া সুরেশ
নিৰ্ম্মলের দিকে চাহিয়া দৃঢ়স্বরে বলিল, “ নিৰ্ম্মল, এ কথাটা
কেন ভুলে যাচ্ছ, সুরেশ আর যাই করুক, সে দুর্নামের ভয়ে
কখনও মিথ্যা কথা বলবেন। বিশেষ করে আজ পর্যন্ত
তােমার কাছে ক’টা মিথ্যা কথা বলেছি।
নিৰ্ম্মল তাহা ভাল করিয়াই জানিত। তাই প্রশ্নটা নিতান্ত
সহজ ভাবে করিতে গিয়া যখন তাহা উভয়েরই কানে প্রচ্ছন্ন
স
ماری
সুরমা
সন্দেহের মত বাজিল তখন নিৰ্ম্মল লজ্জিত হইয়া বার বার এই
বলিয়া ক্ষমা চাহিতে লাগিল যে, সে বিশেষ কিছু মনে করিয়া এ সব
কথা বলে নাই। শুধু তাহার ঐরূপ মলিন বিষন মুখচ্ছবি
দেখিয়াই এত কথা জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিয়াছে এবং সে যেন
কিছু মনে না করে।
সুরেশ, নিৰ্ম্মলের অনুতাপের পরিমাণ দেখিতে পাইয়া
একটু ম্লান হাসি হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ আচ্ছ। নির্মল,
তুমি আমায় ভালবাস কেন ? ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত
তুমি শুধু দুঃখই পাবে।” এক মুহুর্ত মৌন থাকিয়া পুনশ্চ
কহিল, “ আমাকে ভালবেসে আজ পর্যন্ত কেউ সুখ পেয়েছে
ব'লে ত মনে হয় না। তাহার শেষ দিকের কথাগুলি দুঃখের
সুরে বাজিয়া উঠিয়া কান্নার মত শুনাইল।
নিৰ্ম্মলের চোখে জল আসিয়া পড়িতে চাহিল। তাহাই
গােপন করিবার জন • আফিসের বেলা হইয়াছে ; আর
বসিয়া থাকিলে চলিবে না' বলিয়া অনিতাকে ডাকিয়া দিয়া,
স্নানের ঘরের উদ্দেশে প্রস্থান করিল।
সুরেশ মুখ নীচু করিয়া নিৰ্ম্মলের কথা ভাবিতেছিল।
অনিতার নিঃশব্দ আগমন টের পায় নাই।
একটা চেয়ার
শব্দে মুখ তুলিতেই অনিতা ক্ষুদ্র একটু নমস্কার করিয়া
অনুযােগের কণ্ঠে কহিল, “ সুরেশ বাবু ত আজ কাল আমাদের
একেবারে ভুলে গেছেন দেখতে পাচ্ছি।
সুরমা
সুরেশ প্রতি-নমস্কার করিয়া হাসিয়া বলিল, * কে বয়ে,
ভুলে গেছি ? ?
* কে
আর বলবে ; দেখতেই ত পাচ্ছি। कान मामा
আপনাকে পেতে বলে শেষ পর্যং নিজেই না খেয়ে কাটালেন।
সুরেশ নিতান্ত অপ্রতিত হইয়া বলিল, “ আমার অত্যন্ত
অন্যায় হয়ে গেছে। বেরিয়েও আসতে পারলুম না,তার
জন্যে ক্ষমা চাইছি।
অনিতা হাসিয়া কহিল, “বাঃ ! বেশ ত আপনি।
খেয়ে রইলেন দাদা, আর ক্ষমা চাইছেন আপনি আমার
কাছে !
নির্মল আজ পর্যন্ত আমায় এত ক্ষমা করে এসেছে যে,
নৃতন করে ক্ষমা চাইতে গেলে শুধু তাকে লজ্জা দেওয়াই
আমি কিন্তু এত ভাল মানুষ না।
এত সহজে কাউকে
আমি ক্ষমা করিনে।
জন্যেই ত আপনার কাছে বিশেষ করে ক্ষমা
চাইছি।
অনিতা কৃত্রিম গম্ভীর কণ্ঠে কহিল, তা হলে কি সত্যই
আপনি বলতে চান, আমি ভাল মানুষ নই ? ”
আমি কিছুই বলতে চাইনে। শুধু সবিনয়ে কালকের
অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনা
অনিতার দিকে চাহিল।
চাই।
বলিয়া যুক্তফরে
৪০
সুরমা
1)
সুরেশের ভঙ্গি দেখিয়া অনিতা হাসিয়া কহিল, “ আপনাকে
শুধু এক সৰ্ত্তে ক্ষমা করা যেতে পারে।
সুরেশ তেমনই যুক্তকরে বলিল,
* সৰ্ত্তটা এখন
করলে যথাসাধ্য পালন করতে চেষ্টা করতে পারি।
অনিতা গম্ভীর ভাবে কহিল, “ আপনাকে এ বেলা এখানে
স্নান আহারাদি করে আমাকে কলেজে পৌছে দিয়ে আসতে
হবে।
সুরেশ ভাবিয়া বলিল, অত্যন্ত কঠিন সৰ্ত্ত । পালন
করা দুঃসাধ্য বলেই মনে হয়।
হ'লে ক্ষমা করাও হবেনা। বলিয়া অনিতা
হাসিয়া ও-ঘরে চলিয়া গেল।
ক্ষণকাল পরে চাকর আসিয়া নিবেদন করিয়া জানাইল যে,
প্রানের জল দেওয়া হইয়াছে।
কলেজে যাইবার পথে সুরেশ বাহিরের দিকে চাহিয়া চুপ
করিয়া কি ভাবিতেছিল। সহসা অনিতা জিজ্ঞাসা করিল,
“ সুরেশ বাবু, কি ভাবছেন, বলুন ত।
সুরেশ চকিত হইয়া তাড়াতাড়ি বলিল, “ বিশেষ কিছু না।
* বিশেষ না হােক, অবিশেষ কিছু ত ! সেটাই কি ?
বলিয়া ফেলিয়াই অনিতা তাহার এই অসঙ্গত কৌতুহলের
জন্য লজ্জা পাইয়া চুপ করিল। ক্ষণকাল উভয়ে নীরবে
থাকিয়া এক সময় অনিতা জিজ্ঞাসা করিল, আজ কি সুরেশ
বাবুর বিকেলে বিশেষ কোন কাজ আছে ?
সুরমা
৪১
অনিতার জিজ্ঞাসা করার ধরণটা সুরেশের তাল লাগিল না।
মনে হইল, অনিতা যেন কোন বিশেষ ইঙ্গিত করিয়া এ কথা
বলিতেছে। তাই, কিছুক্ষণ চুপ করিয়া
চুপ করিয়া থাকিয়া সুরেশ
নিস্পৃহ ভাবে উত্তর দিল, “বিশেষ কাজ আছে বলে ত এখন
মনে হয় না। তবে, কখন যে কি এসে জোটে তা ত আগে
থেকে বাবার জো নেই।”
“সে ত ঠিক কথা।” বলিয়া অনিতা চুপ করিল। সুরেশও
আর কিছু বলিল না।
গাড়ী হইতে নামিয়া কলেজের গেটে ঢুকিতে ঢুকিতে
অমিতা কহিল, “আজ একবার সন্ধ্যার পর আমাদের ওখানে
এলে ভাল হত। সে দিনকার সেই কথাটা ভাল করে বুঝে
নিতুম ।
আচ্ছা,
নমস্কার।” বলিয়া তাড়াতাড়ি গেটের
ভিতর ঢুকিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল !
তিন
কিছু দিন সুরেশের আর দর্শন মিলিল না। সন্ধ্যার পর
বন্ধুরা আসিয়া ক্ষুন্ন হইয়া ফিরিয়া যায়। নির্মল দিন দুই আসিয়া
হতাশ হইয়া ফিরিয়া গিয়াছে। সংবাদ শুনিয়া অনিত।
উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। কেমন যেন কোন কাজে তেমন করিয়া
তাহার আর মন বসে না। মনে অনেক কথাই উঠে ;
আবার কিছুক্ষণ পরে আপনিই মিলাইয়া যায়। সময় মত
কলেজে যায়। ছুটি হইলে গাড়ী চড়িয়া বাড়ী ফিরিয়া আসি-
বার সময় রাস্তার দু'ধারে চোখ পাতিয়া কাহাকে যেন খুঁজিয়া
বেড়ায়; কিন্তু দেখা মিলে না। রাত্রে পড়িতে বসিলে,
খােলা বহিতে মন নিবদ্ধ থাকে না। কিসের ভাবনায় যেন
সহসা সে মগ্ন হইয়া পড়ে। তার পর এক সময় চোখের
জলের ভিতর দিয়াই সে ঘুমাইয়া পড়ে।
আর সুরেশ ? সেই যে সে দিন কলেজে পৌছাইবার পথে
অনিতা তাহাকে সন্ধ্যার পর আসিবার জন্য অনুরােধ করিয়া
দিয়াছিল, সে তাহা রাখিতে পারে নাই। বিকাল বেলা
বন্ধুরা আসিয়া ধরিয়া পড়িল, থিয়েটারে যাইতে হইবে।
সুরেশের কিন্তু প্রথম কিছুতেই যাইবার ইচ্ছা ছিল না।
তাহার
অনিতার অনুরােধের কথা মনে পড়িয়া গেল। কহিল, “না
সুরমা ৪৩ হে, আজ আমার শরীরটা ভাল বােধ হচ্ছে না। আজ থিয়ে- টারে নাইবা গেলে।” বীরেন রাগ করিয়া কহিল, ৫ নাইবা গেলে' কি রকম ? সে দিন কথা দিলে,—টিকেট পৰ্যন্ত কেনা হয়ে গেছে। এখন ‘না’ বল্লে চলবে কেন ?” সুরেশ ভাবিতে লাগিল। রমেন বলিল, “অত ভাব-ভাবি কিসের ? তােমাকে যেতেই হবে, তা বলে দিচ্ছি।” সুরেশ জানিত, ইহাদের বিরুদ্ধে তাহার কোন আপত্তিই টিকিবে না। তথাপি, আর একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিল। কহিল, “তােমরা না হয় আজ যাও। আমি আসচে দিন সুরেশের কথাটা কেহ গ্রাহই করিস না,—সকলে হাসিয়া উড়াইয়া দিল। তাহাদের সনির্বন্ধ অনুরােধ, তাহাদের উৎ- সা, পুনঃ পুনঃ উত্তেজনা সুরেশকে বিচলিত করিয়া তুলিল, —কিছুতেই সঙ্কল্প ঠিক রাখিতে দিল না। তার পর ক্ষণকাল পরে নিজেই থিয়েটারে যাইবার জন্য অধীর হইয়া উঠিল। রাত এগারটায় থিয়েটার তাঙ্গিলে বাড়ী ফিরিবার জন্য সুরেশের আর তাড়া রহিল না। মন যেন তাহার কিসের টানে উড়িয়া বেড়াইতে লাগিল। থিয়েটারের বিচিত্র ভাব, চিত্ত উন্মাদক লা ভঙ্গি এবং বৃ পটাদি তাহার ভিতরে যে উত্তেজনা, যে আলােড়ন সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহা কিন্তু থিয়েটার ভাঙ্গিবার
৪৪
সুরমা
সঙ্গে বিন্দু মাত্রও নির্বাপিত হইল না। বরঞ্চ উহাকে আরও
বিশেষ করিয়া উপভােগ করিবার অত্যুগ্র বাসনায় মন তাহার
আজ একেবারে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। ডাকিয়া কহিল, “চল
হে, হােটেলটা ঘুরে যাই।”
বন্ধুরা সায় দিয়া নাচিয়া উঠিল এবং পরক্ষণেই হােটেলে
যাইবার জন্য সকলে একেবারে অস্থির হইয়া গাড়ী ডাকাডাকি
করিতে লাগিল।
*
*
রমেন হাতের গ্লাসটা শেষ করিয়া একটা সিগারেট ধরাইয়া
কহিল, “আজ বিত। যা অভিনয় করলে তার কাছে কেউ
দাড়াতে পারে না।”
বীরেন তাহার গ্লাসটা মুখে উঠাইয়াছিল। বড় করিয়া
এক চুমুক টানিয়া লইয়া, হাতের পিছনে মুখ মুছিয়া মাথা
নাড়িয়া বলিল, “আরে রাম ! বিভার আবার অভিনয় !
সুশীলার কাছে আর কারুকে দাড়াতে হয় না।” বলিয়া
সগর্বে সকলের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল ।
শৈলেনের নেশা বাড়িতেছিল। অর্ধ মুদ্রিত চক্ষু দু’টি
তাহার টানিয়া খুলিয়া লইয়া জড়াইয়া কহিল, “তােরা বিভা-
সুশী নিয়ে এত কথা কাটাকাটি কচ্ছিস কেন? তােরা যাই
বলিস, আমার কাছে কিন্তু সব চেয়ে ভাল লাগল পটুলিকে।”
রমেন আর এক পাত্র শেষ করিয়া অকস্মাৎ টেবিলের
উপর একটা চড় মারিয়া উচ্চকণ্ঠে কহিল, “তােদের আট
সুরমা
৪৫
সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই নেই। তােদের আবার মতের মূল্য !
ছোঃ।” বলিয়া নিজের মনে গান ধরিয়া দিল।
রমেনের আস্ফালনে বীরেন হাতের গ্লাসটা লইয়া লাফাইয়া
উঠিয়াই ধপ করিয়া বসিয়া পড়িল। হাতের গ্লাসের খানিকটা
জিনিষ চলুকাইয়া পড়িয়া গিয়া টেবিলের উপরের কাপড়টার
অনেকটা ভিজিয়া গেল।
শৈলেন-রমেন, বীরেনের অবস্থা দেখিয়া বিকট ভাবে
হাসিয়া, উঠিয়া গিয়া তাহাকে ধরিয়া বসিল। “জিনিষ নষ্ট
করেছ,—ফাইন দিতে হবে, বলে দিচ্ছি। কি বলহে, সুরেশ ?”
সুরেশের সে দিকে কিছুমাত্র লক্ষ্য ছিল না। হােটেলে
চুকিবার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন যেন বিমনা হইয়া পড়িয়াছিল।
দুই এক পাত্ৰ টানিবার পর তাহার অবসাদের ভাবটা যতই
কাটিয়া যাইতে লাগিল, ততই কাহাকে দেখিবার জন্য মন
তাহার চঞ্চল হইয়া উঠিল। ভাবিতে ভাবিতে অকস্মাৎ
সুরমার কথা মনে পড়িয়া গেল এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে দেখিবার
বাসনায় একেবারে অধীর হইয়া উঠিল । অথচ, আজই
সকাল বেলা এ কথাটা মনে হইতেই তাহার সর্বাঙ্গে কাটা
দিয়া উঠিয়াছিল। আর এখন কিন্তু প্রমত্ত মন তাহার ঐ
দিকেই রশ্মিযুক্ত অশ্বের মত উদ্দাম বেগে ছুটিয়া যাইতে
চাহিল। তথাপি, এই অবস্থায় নিতান্ত অভদ্রের মত তাহার
নিকটে যাওয়া যে অত্যন্ত বি, একথাটাও তাহার মনের
কোণে সাড়া দিয়া ঐদিকের পথ রুদ্ধ করিয়া দাড়াইল।
৪৬
সুরমা
সহসা তাহাদের মত্ত কণ্ঠের প্রশ্নে মুখ ফিরাইয়া এক পাত্র
টানিয়া লইয়া সুরেশ হাসিয়া কহিল, “কিহে, ফাইন কিসের ?”
শৈলেন-রমেন তৎক্ষণাৎ উঠিয়া আসিয়া সুবেশকে
আলিঙ্গন করিয়া ধরিয়া জড়িত কণ্ঠে সমস্বরে কি যে বলিয়া
গেল, শেষ পর্যন্ত তাহা বুঝাই গেল না। নালিশটা তাহারা
যত বারই করিতে চাহিল, ততবারই হাসিয়া শেষ পর্যন্ত
কিছু বলিয়া উঠিতে পারিল না। সুরেশের অসহ্য বােধ হইতে-
ছিল। ধমক দিয়া কহিল, “ও রকম করে হাসছ কেন? যাও,
নিজের নিজের জায়গায় বসে গিয়ে। পাশের ঘরের লােকেরা
কি মনে কচ্ছে, বলত।”
রমেন বিদ্রুপ করিয়া কহিল, “তুমি যে বড় সাধু হয়ে
পড়লে, দেখতে পাচ্ছি।”
শৈলেন তৎক্ষণাৎ সুরেশের পক্ষ অবলম্বন করিয়া জোর
দিয়া বলিল, “আলবৎ সাধু হবে। তােমার মত ২১ পাত্র
খেয়ে ত আর কেউ বেলেল্লা গিরি করবে না।”
রমেন টেবিলের উপর প্রচণ্ড একটা মুষ্ঠাঘাত করিয়া
চীৎকার করিয়া বলিল, “আমি বেলেল্লাপনা করি! খবরদার
ওকথা বল না, তা হলে এখুনি শিখিয়ে দেবো ভাল করে।*
শৈলেন সহসা হাতা গুটাইয়া কহিল, “কি শিখিয়ে দিবি
তুই ?” বলিয়া টলিয়া খাড়া হইয়া দাঁড়াইতেই কাত হইয়া
একেবারে টেবিলের নীচে গড়াইয়া পড়িল। পাশে বীরেন
ঝিমাইতে ঝিমাইতে বোধ করি বা ডার্বিনের থিওরিটাই
সুরমা
৪৭
ভাবিতেছিল। অকস্মাৎ শৈলেনের পায়ের ধাক্কা সামলাইতে
পারিয়া সেও একেবারে টেবিলের নীচে গড়াইয়া পড়িল।
সঙ্গে সঙ্গেই টেবিলটা উলটাইয়া উপরের মাস, বােতল সহ
সশব্দে পড়িয়া গেল । হােটেলের চাকর, বয়, যে যেখানে
ছিল সভয়ে ছুটিয়া আসিল। পাশের ঘরে একজন মদ খাইয়া
মাতাল হইয়া তাল ঠুকিয়া নিজের মনে গান গাহিতেছিল।
অকস্মাৎ এই বিকট শব্দে ভয় পাইয়া আত্মরক্ষার্থে তাড়াতাড়ি
নিজের টেবিলের নীচে ঢুকিয়া পড়িল।
অন্য দিকের ঘরগুলা হইতে ভিড় করিয়া তামাসা দেখিতে
লােক ছুটিয়া আসিল। সমস্তটা মিলিয়া এমন একটা কদৰ্য্য
হৈ চৈ পড়িয়া গেল যে, লজ্জায় সুরেশের নেশা ছুটিয়া গিয়া
মাথাটা তাহার হেঁচিয়া ফেলিতে ইচ্ছা করিল।
অলক্ষ্যে হােটেল হইতে লুকাইয়া বাহির হইয়া সুরেশের
বাড়ী ফিরিবার প্রবৃত্তি তিল মাত্র রহিল না। এই মাত্র যে
কদৰ্য্য অভিনয় এতগুলা অপরিচিত লোকের চক্ষুর সম্মুখে
তাহারই বন্ধুদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হইয়া গেল, তাহার লজ্জা,
তাহার হীনতা স্মরণ করিয়া এখন নিজেকে নিজের কাছে
ছোট বলিয়া মনে হইতে লাগিল। হৃদয়ের ভিতর হইতে
একটা ধিকার ধ্বনিত হইয়া উঠিয়া মাথাটা তাহার আপনিই
শুইয়া পড়িতে চাহিল। তথাপি যাহা ঘটিয়া গেল তাহা মুছিয়া
ফেলিবার কোন উপায় কোন দিকে চাহিয়া সে দেখিতে পাইল
না। ইহা যে অতিরঞ্জিত হইয়া কাল নির্মলের কানে পৌছিবে
৪৮
সুরমা
তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। হােটেলের মালিক যিনি,
তিনি নিৰ্ম্মলের সঙ্গে এক আফিসে কাজ করিতেন। সেই
সূত্রে সুরেশকেও তিনি চিনিতেন এবং তাহার আর্থিক
অবস্থা ইত্যাদিও বিশেষরূপে অবগত ছিলেন। তাই, তাহার
বন্ধুরা যখন ঐরূপ ব্যবহার করিয়াছিল তখন তিনি বরঞ্চ
তাহাদের পক্ষ অবলম্বন করিয়াই সমস্ত ব্যাপারটা চাপা দিবার
জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। কিন্তু, তথাপি এই কথা যে
গােপনে তিনি নিৰ্ম্মলের কানে তুলিয়া দিতেও বিন্দু মাত্র
বিলম্ব করিবেন না, তাহা তাহার মুখ দেখিয়া সুরেশের আর
বুঝিতে বাকী রহিল না।
তারপর কথাটা যখন ক্রমে আরও কালাে হইয়া অনিতার
কানে পৌছিবে, তখন ?—“উঃ! বলিয়া সুরেশ দু’হাতে
মুখ ঢাকিয়া তাড়াতাড়ি বড় রাস্তা পার হইয়া একটা গলির
মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। সামনেই একটা গাড়ী দেখিতে পাইয়া
চড়িয়া বসিল এবং গঙ্গার দিকে হাঁকাইতে বলিয়া গাড়ীর
কোণে মাথা রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
গাড়ােয়ান মাতাল মনে করিয়া এ-রাস্তা সে-রাস্তা ঘুরিয়া
কিছুক্ষণ পরে নীচে নামিয়া আসিয়া ভাড়া চাহিয়া যাহা বলিল
তাহার মর্ম এই যে, ঘােড়া দু’টা সারাদিন খাটিয়া ক্লান্ত হইয়া
পড়িয়াছে, আর চলিতে নারাজ এবং তাহার উপর চাবুক
মারিয়া চালাইতে গেলে হয়ত শেষ পর্যন্ত গরীবকে ঘােড়া
দু’টাই হারাইতে হইবে।
সুরমা ৪৯ সুরেশ তাহার কথা কানে তুলিল না। ধমক দিয়া বলিল, “চল, গঙ্গার ধারে।” বলিয়া একখানা নােট দেখাইয়া কহিল “ডবল ভাড়া দেবো, বকসিস, পাবি। চল শীগগির।” নােট দেখিয়া গাড়ােয়ান তৎক্ষণাৎ পূৰ্বোক্তি ভুলিয়া গিয়া, উপরে চড়িয়া, ঘােড়া দু’টাকে মারিয়া-পিটিয়া একেবারে আধমরা করিয়া তুলিল । এবং অনতিবিলম্বে গঙ্গার ঘাটে পৌছাইয়া দিয়া, ভাড়া,বকসিস, লইয়া ডবল সেলাম ঠুকিয়া প্রস্থান করিল। সুরেশ একটা পরিস্কার স্থান বাছিয়া লইয়া ওপারের দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার চোখের সামনে দিয়া কত নৌকা গান গাহিয়া, কত ছােট ছোট ষ্টিমার নানা প্রকার সাড়া-শব্দ করিয়া, জল কাটিয়া চলিয়া ফিরিতে লাগিল, সে দিকে সুরেশ চাহিয়াও দেখিল না। কিছুক্ষণ ওপারের দিকে চাহিয়া চাহিয়া সহসা তাহার দু'চোখ জলে পূর্ণ হইয়া উঠিল। নিতান্ত ব্যথার ভারে মন কেন বার বার এই প্রশ্নটাই জিজ্ঞাসা করিল, সে ভগবানের কাছে এমন কি অপরাধ করিয়াছে যে, তিনি তাহার কপালে কিছুমাত্র মুথ- শান্তি লিখেন নাই। । আজ এই ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত সেহ-মমতার লেশ মাত্রও সে কাহারও নিকট হইতে পায় নাই। বাপ-মা কবে মরিয়াছে তাহা তাহার মনে পরে না। তাই, তাহাদের কথা ভাবিতে কোন দিনই চেষ্টা করে নাই, আজও করিল না। কিন্তু, তথাপি তাহাদের কথাই আজ সহসা সুরমা . সর্বাগ্রে মনে পড়িয়া তাহার বেদনাহত হৃদয় তাহাদিগকে পাই- বার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিল। জননীকে দোষী করিয়া, অশ্রুজলের ভিতর দিয়া, বারংবার সে এই কথাই বলিতে লাগিল যে, যদি তিনি তাহাকে এই পৃথিবীতে আনিয়াইছিলেন, তবে এমন নিষ্ঠুরভাবে তাহাকে নিতান্ত অসময়ে ত্যাগ করিয়া গেলেন কেন ? যদি গেলেন, তবে তাহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেলেন না কেন? তারপর তাহার যতীনদা’র কথা মনে পড়িল। তিনি তাহাকে গেহ করেন, ভালবাসেন। কিন্তু, সে স্নেহের ভিতর সে যা খুঁজিয়া বেড়ায় তা পায় না। বরঞ্চ, যতীনদার কথাগুলি যখন-তখন মনে পড়িয়া হয় তাহার আরও শূন্যতায় ভরিয়া উঠিয়া খা খা করিতে থাকে। নির্মল তাহাকে ভাইয়ের মত ভালবাসে। তথাপি, তাহার ভিতর হইতে সেই মেহরস ঝরিয়া পড়ে না, যাহার স্পর্শে হৃদয় কানায় কানায় ভরিয়া উঠিবে। তার পর তাহার অনিতাকে মনে পড়িল, সুরমাকে মনে পড়িল। অনিতা যখন আজিকার কথা শুনিবে তখন তাহার সুরুচিপূর্ণ, উচ্চশিক্ষিত মন যে বিরক্তিতে ভরিয়া যাইবে এবং কোন দিন কোন কারণে সে যে আর সুরেশের দিকে ফিরিয়া চাহিবে না, ইহাও সুরেশ চোখের উপর আজ স্পষ্ট দেখিতে পাইল। এই সময় সুরমার কথা আবার মনে পড়িল। এখন আর তাহার কথা মনে পড়িলে মন তাহার বিরূপ হইয়া পাড়ায় না।
সুরমা
বর, কেমন এক প্রকার করুণা মিশ্রিত সহানুভূতি তাহার
মনের কোণে জাগিয়া উঠে। মনে হয়, হয়ত সুরমার জীবনটাও
তাহারই মত একটা সুখ-শান্তিহীন-তপ্ত-মরুর ন্যায় দিবা রাত্রি
হা হা করিতেছে। নিজের কথা ভাবিতে গিয়া হঠাৎ সুরমার
বুকের ভিতর তাহার দৃষ্টি পড়িতেই এক সহানুভূতির বেদনায়
হৃদয় তাহার অদম্য কান্নায় ভরিয়া গেল। তাহার গণ্ড, তাহার
চিবুক অশ্রুজলে ভিজিয়া উঠিল
অতি প্রত্যুষেই বিগত রাত্রির ক্লান্তিপূর্ণ নিদ্রা ভাঙ্গিয়া
মনুয়াকে ডাকিয়া সুরেশ কহিল, “আমি বর্ধমানে চম।
আসতে কিছুদিন দেরী হবে। এই খরচের টাকা রেখে দে,
আর বাড়াটাকে একটু যত্ন করিস।” বলিয়া সুরেশ মনুয়াকে
কাপড়-চোপড় গুছাইয়া বাক্স-বিছানা বধিতে দুকুম দিয়া
নিজেই গাড়ী ডাকিতে বাহির হইয়া গেল।
গাড়ী আসিলে যায়-বিছানা গাড়ীর মাথায় তুলিয়া দিয়া
মনুয়া এক পাশে দাঁড়াইল। সুরেশ গাড়ীর ভিতর ঢুকিয়া
মনুয়ার দিকে চাহিয়া চমকিয়া উঠিল। তাহার চক্ষু অশ্রুতে
ভরিয়া উঠিয়া ঠোট দু’টা ভিতরের কান্নার আবেগে কাপিতেছে।
সুরেশ আদর করিয়া ডাকিয়া কহিল, “আয়, কাছে
আয়, মনুয়া।”
মনুয়া একমুহুর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে কাছে
আসিতেই সুরেশ মাথায় হাত বুলাইয়া কহিল, “কি রে,
ও
সুরমা
অমন কেঁদে সারা হচ্ছিস কেন? আমিত একেবারে যাচ্ছিনে।
ভয় কি! শীগগিরই ফিরে আসব।” বলিয়া নিজের চোখ
দু’টা অলক্ষ্যে মুছিয়া লইয়া কহিল, “আর দ্বাথ, কেউ জিজ্ঞাসা
করলে বলবি, আমি কলকাতায়ই আছি ; তবে বিশেষ কাজে
আছ।”
হুকুম পাইয়া গাড়ােয়ান গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
একবার মুখ বাড়াইয়া বাড়ীটার দিকে চাহিয়া দেখিল। দেখিল,
মনুয়া তখনও সেইখানে দাড়াইয়া ঘন ঘন চোখ মুছিতেছে।
তার পর ধীরে ধীরে যখন বাড়ীটা অদৃশ্য হইয়া গেল, তখন
সুরেশের বুকের ভিতরটা বেদনায় মুচড়াইয়া উঠিয়া চোখের
ফোনে জল আসিয়া পড়িল। ভগবানের উদ্দেশে প্রণাম
করিয়া মনে মনে কহিল, “যাক বাচা গেল। ভগবান যা
করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।”
চার
সুরেশের সঙ্গে কলহ করিয়া অবধি সুরমার মন ভাল ছিল
। একটা অশান্তি সমস্ত হৃদয় জুড়িয়া প্রচ্ছন্ন ক্ষতের মত
নিরন্তর খচ, খচ, করিয়া বাজিতে লাগিল। অথচ, কেন যে
এমন হইল এবং কোথায় যে সে বা আত্মগােপন করিয়া
রহিয়াছে, তাহাও সে খুঁজিয়া পাইল না। এই অভিনয়, তাহার
পক্ষে নূতন নহে। এই সুদীর্ঘ পাঁচ বছর ধরিয়া কত রাত্রে
ইহা অপেক্ষা কত যে কুৎসিত বিসম্বাদ ঘটিয়া গিয়াছে তাহার
অবধি নাই। কিন্তু ইতিপূৰ্ব্বে কথনও কোন কারণে অনু-
শােচনার দাহ, গ্লানির বেদনা এমন
করিয়া তাহার
হৃদয়ের উপর চাপিয়া বসিয়া সমস্ত মনটাকে বিস্বাদ, বিবশ
করিয়া তােলে নাই। অথচ, সারাদিন ধরিয়া নিজেকে এই
বলিয়া সান্ত্বনা দিতে লাগিল যে, ইহা শুধু একজন অপরিচিত
ভদ্র লােকের সঙ্গে কলহ করার জন্যই এইরূপ মনে হইতেছে।
ইহা যে নিতান্ত দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নহে এবং অনতি
বিলম্বেই যে ইহার চিহ্ন পৰ্য্যন্তও তাহার মন হইতে মুছিয়া
যাইবে, এ কথাও বার বার করিয়া নিজেকে বুঝাইতে লাগিল।
এমন কি আজিকার রাত্রির আনন্দ-উৎসবের কথা স্মরণ করিয়া
নিজের মনকে আশা ও উৎসাহ দিতে লাগিল। তথাপি, সমস্ত
৫৪
সুরমা
দিন ধরিয়া উঠিতে-বসিতে, ঘুরিতে-ফিরিতে তাহার নিভৃত
হৃদয় তলে একটা দুঃখের বেদনা কাটার মত বিধিতেই লাগিল।
আসল কথা হইতেছে এই যে, সুরমা তাহার বাহিরের
মন লইয়াই ব্যস্ত ছিল। ডুব দিয়া ভিতরের মনের দিকে
চাহিয়া দেখিতেও চেষ্টা করে নাই। কিম্বা, ইচ্ছা করিয়াই
সে দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া রহিয়াছে। সে যদি ভিতরের
সন্ধান পাইত, তাহা হইলে দেখিতে পাইত, সেখানে সুরেশ
এক রাত্রের মধ্যে যে স্থান দখল করিয়া লইয়াছে তথা হইতে
তাহাকে নড়াইবার শক্তি সুরমার আর এক তিলও নাই
এবং তাহার অভ্যস্ত জীবনের উলঙ্গ বীভৎসতা চাবুকের মত
বুকের উপর কাটিয়া কাটিয়া বসিয়া,-তাহার পঙ্গু, তাহার
নির্জীব নারীত্ব আজ সার্থকতা লাভের জন্য মাথা তুলিয়া
খাড়া হইয়া দাড়াইয়াছে।
তাই, বেলা যত পড়িয়া আসিতে লাগিল অস্বস্তির আলাও
ততই বাড়িতে লাগিল; তাহার পীড়িত, সন্তপ্ত মন ততই
রাত্রির কদৰ্য্য প্রমােণ হইতে ঘৃণায় মুখ ফিরাইয়া দাড়াইতে
চাহিল।
সুরমা জানালার ভিতর দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া
তন্ময় হইয়া ভাবিতেছিল। কখন যে দিনের আলো নিভিয়া
গিয়া সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকের উপর
ছড়াইয়া পড়িতেছিল, সে দিকে তাহার কোন খেয়াল ছিল না।
সহসা বাড়ীওয়ালীর সুমধুর কণ্ঠের তীব্র ঝঙ্কারে ভিতরটা
সুরমা
কাপিয়া উঠিয়া তাহার যেন ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। রাত্রির
আসরের জন্য প্রস্তুত হইতে বাড়ীওয়ালী গা ধুইয়া সুরমায়
ঘরের পাশ দিয়া, বােধ করি বা, ভগবানের স্তব ও গুণ
করিয়া গাহিতে গাহিতে, যাইতেছিলেন। হঠাৎ সুরমাকে
নির্বাক মূর্তির মত চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে দেখিয়া,
আশ্চৰ্য্য হইয়া, ভিজা কাপড়েই দুই পা আগাইয়া আসিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন, “হালা সুরে, তুই অমন চুপ করে বসে
আছিস কেন? রাত হয়ে এলাে, তাের কি কোন খেয়ালই
নেই ? গা ধুবি কথন আর সাবি-গুজবিই বা কখন ?
তাের যেন সব তাতেই ঢং! কলের জল ফুরিয়ে গেলে শেষে
কি গা ধুবি নর্দামার জল দিয়ে ?” বলিয়া এক রকম রাগ
করিয়াই বাড়ীওয়ালী দ্রুত পদে তার নিজের ঘরের দিকে
প্রস্থান করিলেন।
বাড়ীওয়ালীর মধুমাখা কণ্ঠস্বরে চমকিয়া সুরমা মুখ তুলিয়া
চাহিয়া দেখিল, সন্ধ্যা প্রায় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে এবং পথে
পথে গ্যাসের আলো জ্বলিয়া উঠিয়াছে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস
ত্যাগ করিয়া সুরমা ধীরে ধীরে উঠিয়া দাঁড়াইয়া একবার
চারিদিকে চাহিয়া দেখিল। দেয়ালে দেয়ালে ছবিগুলি তেমনি
হাসিতেছে । বড় ঘড়িটা টক্ টক্ করিয়া তেমনি সময় নির্দেশ
করিয়া যাইতেছে। আলমারি, টেবিল, চেয়ার, কোচ, অর্গেন
মায় ছােট টিপায়টা পর্যন্ত তেমনি ঘরের আলােকে ঝক
ঝক করিতেছে। তারপর বিছানার দিকে চাহিল,কখন
সুরমা
যে রাম চরণ আসিয়া বিছানা পরিষ্কার করিয়া তাকিয়া গুলিকে
যথাস্থানে সাজাইয়া রাখিয়া গিয়াছে, তাহা সে টের পায় নাই।
চোখ তুলিয়া সামনে চাহিয়া দেখিল, তাহার বড় অয়েল
পেন্টিংট। হীরার অলঙ্কার পরিয়া তেমনি তাহার দিকে
চাহিয়া মুখ টিপিয়া হাসিতেছে যৌবনের সৌন্দৰ্য্য তেমনি
ফার্টিয়া পড়িতেছে, প্রতি আঙ্গুলে আংটী গুলি তেমনি ঝিক
মিক করিতেছে। সমস্তই ঠিক সেই ভাবেই রহিয়াছে—
কাহারও কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটে নাই। তথাপি, তাহারা
আজ তাহাকে বিন্দুমাত্রও আনন্দ দিতে পারিল না। বরঞ্চ
সে দিকে চাহিয়া বেদনায় বুক তাহার ভরিয়া উঠিয়া একটা
অবরুদ্ধ কান্না হৃদয় ভেদিয়া বাহির হইবার জন্য ভিতরে
মাথা কুটিতে লাগিল।
পৰ্য্যন্ত এই অপর্যাপ্ত আসবাবপত্র, ঐশ্বর্যের এই
উদ্দাম বাহুল্য তাহাকে ভিতরে ভিতরে আনন্দ দিয়াছে। ঐ
দিকে চাহিয়া গর্বে, অহঙ্কারে তাহার বুক ভরিয়া উঠিত।
কিন্তু, আজ এক মুহূর্তে সমস্তই পঙ্কিলতায় মাখামাখি হইয়া
তাহাকে যেন আঘাত করিল। তাহার মনে হইতে লাগিল,
চিরদিনের মত ইহাদের আবশ্যকতার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়া
গিয়াছে। কোন দিন কোন কারণে ইহার আর তাহার
প্রয়ােজনে আসিবে না।
সহসা দরজার বাহিরে কতকগুলি জুতার শব্দ
উন্মত্ত হাসি শুনিতে পাইয়া সুরমার হৃদপিণ্ড থামিয়া যাইবার
সুরমা
৫৭
মত হইল। তৎক্ষণাৎ রাম চরণকে ঠেলিয়া দিয়া পাশের
দরজা দিয়া, ব্যাধ-ভয়-ভীতা-হরিণীর মত, নিশ্বাস রুদ্ধ করিয়া
পলায়ন করিল। এইবার তাহার অবরুদ্ধ কান্না সহস্র ধারে
ফাটিয়া বাহির হইল । সে তাহার শয়ন কক্ষের শয্যার উপর
লুটাইয়া পড়িয়া বুক ফাটা কান্না কাদিতে লাগিল ।
যাহারা আসিয়াছিলেন, তাহার ঘরে ঢুকিয়া কাহাকেও
দেখিতে না পাইয়া একটু আশ্চর্য্য হইলেন। পরক্ষণেই আর
একবার এমন কদৰ্য হাসিতে ঘর ফাটাইয়া ফেলিবার উপক্রম
করিলেন যে, ওঘরের খাটের উপর পড়িয়া সুরমার সংজ্ঞা
লােপ পাইবার মত হইল।
বাবু যিনি, তিনি ডাকিলেন, “রাম চরণ।”
রাম চরণ সেলাম করিয়া এক পাশে দাঁড়াইল।
বাবু জিজ্ঞাসা করিল, “ও কোথায় রে?”
রাম চরণ শিক্ষিত ভৃত্য। সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “দিদি-
মণি কলে গেছেন। কাপড় ছেড়ে এখুনি আসবেন।”
বাবু খুসি হইয়া “বেশ বেশ” বলিয়া টাকা বাহির করিয়া
কহিলেন, “দু' বােতল মদ, দু’ ডজন সােডা, আর ছ' পেকেট
সিগারেট, চার আনার পান নিয়ে আসবি—যাবি আর আসবি,
দেরী যেন না হয়, বুঝলি?” বলিয়া দু'খানা নােট রাম চরণের
হাতে দিয়া বড় কোচটার উপর গিয়া জাকিয়া বসিলেন।
সঙ্গের বন্ধু তিনটি সােজা গিয়া সম্মুখের বড় বিছানাটার
উপর চড়িয়া বসিলেন। কিন্তু, তাহাদের মধ্যে একটা তর্ক
৫৮
সুরমা
বাধিয়া গিয়াছিল। বিষয়টা জটিল এবং তাহাদের অবস্থাও
জটিলতর ! কাজেই, মীমাংসা হইতে পারিতেছিল না।
বিলাস একটা তাকিয়া কোলের উপর টানিয়া লইয়া কহিল,
আজকালকার নভেলগুলি নভেলই না। বিশেষ করে
বাঙ্গলা নভেলগুলি অত্যন্ত বাজে-রাবিস !”
প্রফুল্ল উত্তেজিত হইয়া বলিল, “এ তােমার অত্যন্ত মন
গড়া কথা। তুমি কি করে জানলে, আজকালকার বাংলা
নভেলগুলি নভেলই না ? কখানা বই পড়েছ আজ পৰ্যন্ত ?”
যামিনী এতক্ষণ চুপ করিয়া তামাসা দেখিতেছিল ; সুযােগ
পাইয়া বিজ্ঞতা দেখাইয়া কহিল, “বিলাস তােমার চেয়ে ঢের
বেশী বই পড়েছে।”
যামিনীর রােক দেখিয়া প্রফুল্ল হাসিয়া কহিল, “আমি ত
এমন কথা বলিনি যে, বিলাস আমার চেয়ে কম বই পড়েছে।
আমি শুধু জানতে চেয়েছি, বিলাস ক’থানা বই পড়েছে এবং
কার কার বই পড়েছে।”
বিলাসের হইয়া যামিনী তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “অনেক
বই পড়েছে-দামােদর বাবুর বই, সুরেন ভাজ্জির বই, আর
কথার মাঝখানে প্রফুল্ল হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিয়া
বলিল, “পাঁচকড়ি বাবুর বই, তিনকড়ি বাবুর বই, নারাণ
বাবুর বই। বল, বল-থামলে কেন হে ?”
বিলাস চটিয়া উঠিয়া বলিল, “তুমি যে একেবারে হেসেই
খুন, দেখতে পাচ্ছি। এরা, কি নভেলিষ্ট নয় নাকি? পথ
সুরমা
দেখালে কে ? এরা, না তােমার সেই যে সেই বইটা কে
লিখেছে ?-কে লিখেছে বল না হে যামিনী।”
যামিনী অন্যমনস্ক হইয়া কি ভাবিতেছিল ; সহসা বিলাসের
প্রশ্নে মুখ ফিরাইয়া জবাব দিল, “ডিওয়াসের হােয়াইট লেবেল
হুইস্কিও ছাড়া অন্য জিনিষ মুখেই লাগে না।”
সঙ্গে সঙ্গেই প্রফুল্ল, বিলাস এসং বাবুটি সহ দেয়ালগুলি
পৰ্য্যন্ত উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিল। কিছুক্ষণে হাসি থামিলে
বিলাস যামিনীর পিঠে একটা চড় মারিয়া বলিল, “সাবাস
ভাই! তুমি যে স্তরে বিচরণ কচ্ছ তাতে আর সিদ্ধি লাতের
কিছুমাত্র বিলম্ব নেই।”
যামিনী তেজের সঙ্গে বলিল, “নয়ই ত । ও ছাড়া অন্য
জিনিষ আমার ভালই লাগে না। কি বলহে সুবােধ দা ?”
বলিয়া বাবুটিকে একবার কটাক্ষ করিল ।
বিলাস তাকিয়াটা এক পাশে রাখিয়া আগাইয়া আসিয়া
কহিল, “ঠিক, ঠিক বলেছ । কিন্তু জিজ্ঞেস কচ্ছিলুম কি-”
“কি জিজ্ঞেস কচ্ছিলে ?”
“ঐ যে সে দিন ‘ছােড় দিদি’ না কি একটা বই দিয়ে গেলে
ঘােড়া ছুটোতে ছুটোতে রক্ত উঠে মরে গেল—সে বইটা কে
লিখেছে ?”
“তার আমি জানি কি? বই দিয়ে গেলুম বলে, কে
লিখেছে, কি লিখেছে তা যে জানতে হবে তার ত কোন মানে
নেই।'
সুরমা
প্রফুল্ল মদও কম খাইত, বক্তৃতাও কম করিত। তাহাদের
মুখের কথা শুনিয়া উত্তর দিতে পৰ্যন্ত তাহার লজ্জা বােধ
হইল। তথাপি, ভিতরের উত্তেজনা চাপিতে না পারিয়া
বলিল, “তুমি যে কি ইঙ্গিত কচ্ছ, বিলাস, তা আমি বুঝতে
পেরেছি। কিন্তু, তিনি যেই হােন—তার সিকিও যদি অন্য
লেখকের ক্ষমতা থাকৃত তা হ'লে—”
“তা হলে কি হত ?”
“তাহলে অন্য কিছু না হােক, বাংলা দেশে যে সত্যকারের
নভেল হতে পারে, এ কথা হয়ত পৃথিবী জানতে পারত।”
বিলাস বিক্রপ করিয়া কহিল, “তার জন্যেই ত ওসব
বই বাড়ী নিয়ে কারুর হাতে দেওয়া যায় না।”
প্রফুল্ল জিজ্ঞাসা করিল, “এ কথা কি পড়ে বলছ, না শুনে
বলছ? আচ্ছা, ধরে নিলুম তােমার কথাই ঠিক। কিন্তু,
এ কথাটা তােমায় জিজ্ঞেস করি বিলাস, এই বই গুলি যদি
রুচিবিরুদ্ধ, নীতিবিরুদ্ধ বলে মনে হয়, তাহলে
আজই রাতে এখান থেকে ফিরে গিয়ে নিজেকে কারুর হাতে
তুলে দেবে কোন নীতির দোহাই পেড়ে ?”
বিলাস লাফাইয়া উঠিয়া প্রত্যুত্তরে কি একটা কাণ্ড করিতে
যাইতেছিল। ঠিক সেই সময় সুরমা ধীরে ধীরে সে ঘরে
প্রবেশ করিল। সকলে কলহ ভুলিয়া গিয়া একটা অশ্রাব্য
কলরব করিয়া উঠিল। বাবুটি আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠিয়া
আসিয়া সুরমার হাত ধরিয়া নিজের পাশে বসাইয়া দিলেন।
সুরমা
সকলে আপত্তি করিয়া কহিল, “তা হবে না। সুবােধদা,তােমার
জিনিষ যে তুমি অমন করে আগলে থাকবে, তা হবে না বলে
দিচ্ছি।”
সুরমা, বাবুটির হাত হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া
বিছানার উপর এক পাশে গিয়া বসিল। সুবােধা রসিকতা
করিয়া বলিলেন, “দেখলে, তােমাদের উপর কত টান। কথা
বেরুতেই তােমাদের কাছে গিয়ে বসল।” বলিয়া নিজের
রসিকতায় নিজেই টানিয়া টানিয়া হাসিতে লাগিলেন।
এই অভদ পরিহাস, এই উন্মত্ত হাস্য-কলরােল সুরমার
বুকের মধ্যে গিয়া তীরের মত বিঁধিতে লাগিল। লজ্জায়
আজ ভাল করিয়া কথা পৰ্যন্ত কহিতে তাহার প্রবৃত্তি রহিল না।
অথচ, চারি দিকে চাহিয়া ইহার উপায়ও কিছু খুঁজিয়া পাইল
। অর্থের জন্য দেহটাকে তাহার যখন বিক্রয় করিয়া ফেলিয়ছে
তখন সে কেমন করিয়া কামােন্মত্ত ক্রেতার লুব্ধ আলিঙ্গন হইতে
নিজেকে রক্ষা করিবে ? তাই, নিজেকে শক্ত করিয়া লইয়া চুপ
করিয়া বসিয়া রহিল।
এই সময় রাম চরণ দ্রব্য-সম্ভার সহ ঘরে ঢুকিল। সকলে
তাহা লইয়া এমন ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন যে, কাহারও আর
সুরমার ক্লিষ্ট, ব্যথিত মুখের দিকে চাহিয়া দেখিবার সময় পর্যন্ত
রহিল না।
সকলের যেন তৃষ্ণায় বুক ফাটিয়া যাইতেছিল ।
সুরমা অনেক রাত্রে আসর তাঙ্গিলে সুরমা সেই খানেই আচ্ছন্নের মত বসিয়া রহিল। আজই তাহার প্রথম মনে হইল, তাহার সৰ্বস্ব, তাহার নারী জীবনের সার রত্নটুকু স্বেচ্ছায় সে এক কদাচারী পুরুষের লালসাপূর্ণ কামনার পায়ে বিসর্জন দিয়া ফেলিয়াছে। তাই, নিবিড় ঘৃণায় তাহার দেহটাকে আজ পােড়াইয়া ফেলিতে ইচ্ছা হইল। কোথায় গেলে, কি করিলে যে, তাহার এই দেহের কলুষতা ধুইয়া-মুছিয়া পবিত্র করিয়া তুলিতে পারিবে, তাহা আর কোন দিকে চাহিয়া সে দেখিতে পাইল না। তথাপি, একটা কথা মনে পড়িয়া, তাহার এই অসীম বেদনার মধ্যেও এক অভূতপূর্ব আনন্দের বেগে তাহার দেহ থর থর করিয়া কঁপিয়া উঠিল। তাহার সুরেশকে মনে পড়িল। বার অসম্ভব বলিয়া মনে হইল। তথাপি, তাহার নিপীড়িত মন এই কুৎসিত জীবনের নিষ্ঠুর নিষ্পেষণ হইতে মুক্তি পাইয়া সুরেশকে পাইবার জন্য, তাহার কাছে ক্ষমা চাহিবার জন্য, তাহাকে ভাল- বাসিয়া, তাহাকে সেবা-যত্ন করিবার জন্য প্রাণ তাহার আকুল হইয়া উঠিল। যাহা তাহার গিয়াছে তাহা সে আর ফিরাইয়া পাইবে না। কিন্তু, বাকী জীবনটা যদি তাহাকে ভালবাসিয়া, সেবা করিয়া, নারী হৃদয়ের সমস্ত উজাড় করিয়া তাহার পায়ে ঢালিয়া দিয়া তাহাকে পূজা করিতে পারে, তাহা হইলে কি তাহার এই ভ্রষ্ট এই কলঙ্কিত নারী জীবনটাকে এক দিন সার্থক করিয়া তুলিতে পারিবে না ? তাহার চোখ-মুখ অশ্রুজলে প্লাবিয়া
সুরমা
যাইতেছিল। সেইখানে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিয়া কহিল,
“ঠাকুর ! আর একটি বার যেন তার দেখা পাই।
পাঁচ দিন কয়েক পরে কি একটা পর্ব উপলক্ষ্যে সে দিন স্কুল- কলেজ-আফিস বন্ধ ছিল। ছুটির দিনের কর্মহীন, উদাস সকাল বেলাটায় বসিয়া নিৰ্ম্মলের কিছু ভাল লাগিতেছিল না। উঠিয়া গিয়া বারান্দায় খানিকক্ষণ পায়চারি করিয়া, রেলিংএ ভর দিয়া সামনের দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অনিতা নিজের ঘরে বসিয়া নিবিষ্ট চিত্তে টেনিসন পড়িতেছিল। এমন সময় নিৰ্ম্মলের মাসিমা উমাসুন্দরী আসিয়া ডাকিলেন, “নির্মল কোথায় রে ? নিৰ্ম্মল ঘরে ঢুকিয়া বলিল, “এই যে মাসিম।” মাসিমা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আজ তােদর অফিস বন্ধ না ?” নিৰ্ম্মল আগ্রহ ভরে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন বল সিকি মাসিমা ?” “দু’দণ্ড বসে যে তাের সঙ্গে কথা বলব এমন সময় পাইনে। অনিতা বলছিল, আজ ছুটি। তাই মনে করলুম, যাই একটু বসে নিৰ্ম্মলের সঙ্গে দু একটা কথা বলে আসি।” নিৰ্মল মনে মনে আশ্চৰ্য্য হইল। মাসিমা আসিয়া অবধি সংসার লইয়াই ব্যস্ত ছিলেন। এমন সাধ করিয়া আলাপ করিতে আসিতে নিৰ্ম্মল তাহাকে কখনও দেখে নাই। তাই, নিৰ্ম্মল শুধু সুরমা বিস্মিত হইল না; ভিতরে কেমন যেন ভয় ভয় করিতে লাগিল। ঢােক গিলিয়া শুষ্ক মুখে কহিল, “তা বেশ করেছ মাসিমা। আমরাও ত তাই বলাবলি করি, মাসিমা কেন আমাদের কাছে এসে বসে দু' দণ্ড গল্প করেন না। মা নেই, তুমিই ত আমাদের মায়ের মত। আমাদের ভাল-মন্দে কথা বলবে, এই ত আমরা চাই। কেবল সংসার নিয়ে খেটে-খেটে সারা হ’তে ত তোমাকে আনিনি। ” মাসিমা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। বোধ হয়, যাহ। বলিতে আসিয়াছিলেন, তাহার সূত্ৰ নিৰ্ম্মলের কথায় ছিন্ন হই। গিয়াছিল এবং মনে মনে তাহাই জুড়িয়া লইতেছিলেন। ক্ষণ- কাল পরে গলাটা একটু সাফ, করিয়া লইয়া মাসিমা ভূমিকা করিয়া কহিলেন, “তা বাছা, তােমাদের সংসার দেখতে এসেছি, তাই দেখব। তােমাদের ভাল-মন্দে কথা বলার অামার দরকার কি ?" নিৰ্ম্মল একটু ক্ষুন্ন কণ্ঠে কহিল, “আমাদের সংসারটা কি তাহলে আমাদের বাদ দিয়ে যা দাড়ায়, তা ?” মাসিমা সহসা সে কথার উত্তর না দিয়া কাজের কথা পাড়িয়া বলিলেন, “কথা যদি বলতে হয় ত বলি, অনিকে কি তুই বিয়ে দিবি নে ? বামুনের মেয়ে, সতের-আঠের হয়ে গেল আর বিয়ে দিবি কবে ?” নিলের এই আশঙ্কাই ছিল। তাই, মাসিমার আপ করিবার অকস্মাৎ এরূপ অভিরুচি দেখিয়া নিৰ্ম্মলের ভিতরটা সুরমা ভয়ে শুকাইয়া উঠিতেছিল। এক মুহুর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “তা মাসিমা, এত তাড়াহুড়াের দরকার কি ?” মাসিমা চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন, “শােন কথা। উনিশ- কুড়ি বছরের সােমত্ত মেয়ে—এখনও বলছিস, তাড়াহুড়ো করে লাভ কি ? দিদি বেচে থাকূলে এমন অনাছিষ্টির কাজ কি কখনও হ'ত, না হতে দিত ? তােরা যে এমন বি,এ, এল,এ পাস করে জাত-জন্ম থােয়াবি, তা বাছা আমি চোখের উপর দেখতে পারব না ! এমনিই ত লােকে কত কথা বলাবলি কচ্ছে।” পাশের ঘরেই যে অনিতা পড়িতেছিল নিৰ্ম্মল তাহা জানিত। পাছে 'মাসিমার কণ্ঠস্বর আর এক পর্দা চড়িয়া গিয়া অনিতা শুনিতে পায়, তাই তাড়াতাড়ি আগাইয়া আসিয়া গলা খাটো করিয়া নিৰ্ম্মল জিজ্ঞাসা করিল, “কে কি বলছে, মাসিমা ?” উমাসুন্দরী অশিক্ষিত গ্রাম্য স্ত্রীলােক হইলেও একেবারে যে তাহার বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল না, তাহা নহে। তিনিও কণ্ঠস্বর নত করিয়া কহিলেন, “তা, লােকের মুখ কি করে চেপে রাখবে, বাবা ? পাড়ার পাঁচজন আছে। তা ছাড়া, আত্মীয়-স্বজন আছে, তারাও ত দেখতে পাচ্ছে ! ” নিৰ্ম্মল মিনতি করিয়া কহিল, “মাসিমা, তােমার দুটো পায়ে পড়ি। বলনা, কে কি বলছে ? ” মাসিমার যে নিৰ্ম্মল-অনিতার প্রতি স্নেহ-মমতা ছিল না, তাহা নহে। তাহার নিজের সন্তান ছিল না বলিয়া এখানে আসিয়া অবধি তাহার মাতৃ-মেই অলক্ষ্যে তাহাদের দিকে ছুটিয়া চলিয়া- - সুরমা ৬৭ ছিল। কিন্তু, তাই বলিয়া তাহার আজন্ম শিক্ষা-সংস্কারে আঘাত লাগিলে যে, মুখ বন্ধ করিয়া তাহা তিনি নীরবে সহ করিবেন, ততখানি প্রশস্ততা তাহার মনের মধ্যে ছিল না। বিশেষ করিয়া সে দিন দুপুর বেলা পাশের মুখুয্যেদের বাড়ীতে গিয়া অনিতার সম্বন্ধে একটু খর আলােচনা শুনিয়া আসিয়াছিলেন। সেই অবধি কথাগুলি তাহার মনের মধ্যে পাক খাইতেছিল। আজ তাই তিনি সুযােগ পাইয়া নিৰ্ম্মলকে দু'কথা শুনাইতে আসিয়াছিলেন । কহিলেন, “তাের। কলেজে-আফিসে গেলে সে দিন দুপুর বেলা ভাবলুম, একা একা বসে কি করব—যাই ওদের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসি। গিয়ে দেখলুম, গিন্নির মুখখানা ভার। প্রথমত কথাই বলতে চায় না। তার পর দু' এক কথার পরে কি বল্লে জানিস ?” “কি বল্লে, মাসিমা ?” নির্মলের বুকের ভিতরটা ভয়ে দুলিতেছিল। মাসিমা একটু নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “বল্পে, ‘অনিতার কি বিয়ে তােমরা দেবেনা ? বুড়ী হতে চলল, বিয়ের নাম গন্ধ নেই। তার উপর তােমাদের বাড়ীতে যখন-তখন নিৰ্ম্মলের বন্ধুদের আনাগােনা দেখতে পাই । সে দিন ত অনিতাকে একটা ছোড়ার সঙ্গে দুপুর বেলা হাত ধরে বেরিয়ে যেতে দেখ- লুম। । ৭ নিৰ্ম্মলের বুঝিতে বাকী রহিলনা, কেমন করিয়া সে দিনকার সুরেশের সঙ্গে অনিতার কলেজে যাওয়ার ব্যাপারটার কদৰ্থ করিয়া
সুরমা
অথচ,
ইয়া আত্মীয়-প্রতিবেশীরা রটনা করিয়া বেড়াইতেছে।
ইহার প্রতিবাদ করিবারও কোন উপায় নাই। হয়ত, তাহাতে
কুৎসিত সমালােচনা আরও প্রখর হইয়া উঠিবে।
এমন কি,
বই শাখ-প্রশাখা বিস্তার করিয়া ইহা যে আরও কালাে, আরও
বি হইয়া উঠিবে, ইহাতে সন্দেহ নাই। তাহার ব্রাহ্ম সমা-
জের নয় যে, ইচ্ছা করিলেই যাহার-তাহার হাত ধরিয়া,জুতা-মােজ।
পরিয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িবে । অথচ, তাহার শিক্ষাভি-
মানিনী ভগ্নীটি যে হিন্দু সমাজের অর্থহীন আঁটা-আঁটি মানিয়া
চলিতে চাহিবে না, ইহাও নির্মল জানিত। তাই, মাসিমার
হাত ধরিয়া অত্যন্ত অনুনয় করিয়া নিৰ্ম্মল বলিল, “মাসিমা,ওঁদের
একটু বুঝিয়ে বলল, আসছে বছর অনিতা বি, এটা পাশ
করলেই বিয়ের বন্দোবস্ত করব।
মাসিমা আপত্তি করিয়া বলিলেন, “সে কি হয় নিৰ্ম্মল ?
আগামী সমস্ত বছরটাইত অকাল। তাছাড়া, এখনত শুনতে
পাই, বিয়ের পরেও কত মেয়ে ইস্কুল-কলেজে যায়।”
নির্মল ভাবিতে লাগিল। মাসিমা বলিতেছিলেন, “আমি
বলি কি, আমাদের নবীনের সঙ্গে ঠিক করলেই ত সব জিকে ভাল
তাদের অবস্থা ভাল, ছেলেও যা হােক দু’একটা পাশ
দিয়েছে।
শুনতে পাই, ওর বাপ নাকি ওকে বিলেত পৰ্য্যন্ত
পাঠাতে পারে ।
তা বাপু, বিলেত-টিতে আমার ভাল
লাগেনা। অবস্থা ভাল, কুলীন বামুনের ছেলে। আর কি চাই?
নবীন গ্রাম সম্পর্কে উমাসুন্দরীর ভ্রাতুস্পুত্র। সমাজের দিক
3
সুরমা দিয়া তাহার সঙ্গে অনিতার বিবাহ আটকায় না। তাহারা সঙ্গতিপন্ন এবং সেও বার দুই বি,এ ফেল করিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িতে বিলাতে যাইবার জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প হইয়া উঠিয়াছে ? তাহাও সত্য। কিন্তু, সে বৎসর নবীন কি একটা অসুখে পড়িলে অনেকে অনেক কথাই বলিয়াছিল। নির্মল নিৰ্ম্মল তাহা সমস্তই জানিত। তারপর তাহার শিক্ষিতা, বয়স্থা ভগ্নীর অমতে কোন কাজ করিতে গেলে শেষ পর্যন্ত যে সমস্তটা একটা বিষম বিভ্রাটে পরিণত হইবে, তাহাও সে চক্ষের উপর স্পষ্ট দেখিতে পাইল। এই সময় সুরেশকে তাহার মনে পড়িল। মনে মনে বড় আশা করিয়াছিল, তাহার বন্ধু, তাহার আবাল্য সুহৃদ সুরেশের হাতে তাহার স্নেহের বােনটিকে তুলিয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইবে। কিন্তু, সেই অবধি সুরেশের আর দেখা নাই। লােকে বলে, সে কলি- কাতায় নাই; কিন্তু মনুয়া প্রতিবাদ করিয়া বলে, বাবু কলি- কাতায়ই আছেন। ইহারও কোন কারণ সে খুঁজিয়া পায় না। নিৰ্ম্মলকে স্তব্ধ মুখে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া উমাসুন্দরী আরও কি বলিতে যাইতেছিলেন । এমন সময় চাকর আসিয়া জানাইল, যতীন বাবু আসিয়াছেন এবং নীচে অপেক্ষা করিয়া দাড়াইয়া আছেন। খবর শুনিয়া নিৰ্ম্মল ব্যস্ত হইয়া উঠিল। মাসিমাও যাই দেখিগে, বামুন ঠাকুর কি কচ্ছে” বলিয়া অন্য দিকে চলিয়া গেলেন। নিৰ্ম্মল তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া পরম সমাদরে যতীনকে
१२
সুরমা
সেটা ঠিক বলতে পারিনে। তবে, সে যে এখানে নেই,
একথা এক রকম জোর করেই বলতে পারি। হয়ত বর্ধমানে
গেছে, হয়ত আর কোথায় গেছে।
“আমাদের এমন না বলে-কয়ে হঠাৎ চলে যাওয়ার কারণ ত
বুঝতে পারলুমনা !”
যতীন মুহুর্তের জন্য নির্মলের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন;
তারপর আস্তে আস্তে বলিলেন, “ কারণ যে খুব শক্ত, তাত
মনে হয় না। ওর হৃদয়টা যত বড় ততখানি যদি ওর মিথ্যা
চক্ষু লজ্জা-যাকে সহজ কথায় দুর্বলতা বলে-না থাকত, তা
হ'লে ওর কাছ থেকে অনেক কাজই পাওয়া যেত। '
তার মানে ?”
“তার মানে ত তুমিই আমার চেয়ে ভাল জান। সে তােমার
বাল্য বন্ধু, সহপাঠী-তাকে তুমি ভালবাস।”
“কিন্তু, তাকে ত আজ পর্যন্ত এমন কিছু করতে দেখিনি,
যার জন্য তাকে এমন করে পালিয়ে থাকতে হবে।”
“নিৰ্ম্মল, তাকে তুমি এত ভালবাস যে, তার কোন কাজই
তােমার খারাপ বলে মনে হয় না। তা ছাড়া, সে দিকে
তােমার লক্ষ্যই নেই। তা বলে আমি বলছি নে যে, সে
বিশেষ গহিত কিছু করেছে। মনে হয়, হয়ত সামান্য কিছু
করেছে এবং
নির্মল কথার মাঝখানেই বলিয়া উঠিল, “কই, সে ত
কখনও আমার কাছে মিথ্যা বলে না।”
সুরমা
যতীনহাসিয়া বলিলেন, “সেই ভয়েই ত পালিয়েছে। পাছে
তােমার কাছে সত্য কথা বলতে হয়, পাছে তুমি দুঃখিত
হও; তাই মনে করেছে, দিন কয়েক বাইরে থাকতে পারলে
হয়ত তুমি আর ওকথা তুলবে না !”
নিৰ্ম্মল অত্যন্ত ব্যগ্রতার সহিত কহিল, “তাকে যে আমার
বড় দরকার। সে যে এমন ক'রে এ সময় চলে যাবে তাত
জানতুম না।”
“সেই-বা কি করে জানবে, তােমার তাকে এর মধ্যে এত
দরকার হয়ে পড়বে ?”
আমি যে কি করব ঠিক করে উঠতে পাচ্ছিনে। লােকে
বলছে, অনিতার
কথার মাঝখানে সহসা যতীন উত্তেজিত হইয়া উঠিয়া,
লাঠির একটা ঠোকা দিয়া বলিলেন, “লােকের কথা শুনে তুমি
কি অনিতাকে বি, এ, পাশ করবার আগেই বিয়ে দিতে চাও
নাকি ? এ দুৰ্বদ্ধি তােমায় কে দিলে ?”
“দুর্বুদ্ধি কেউ দেয় নি, কিন্তু
“না না, এর মধ্যে আর ‘কিন্তু’ নেই। আগে সে পাশ
তারপর দেখা যাবে। তা ছাড়া, সুরেশের সম্বন্ধে
যদি ওকথা বলে থাক, তাহলে তুমি আর একটা ভুল করতে
বসেছ।
“ভুল কি রকম?”
যতীন ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া গম্ভীর কণ্ঠে বলিলেন, “আমার
করুক,
৭৪ সুরমা হয়ত এ কথা না বলাই উচিত ছিল। তবু বলছি জানিনা, তুমি সইতে পারবে কিনা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষেরই উপকার হবে, তা বলতে পারি।” “কি কথা যতীনদা ?” বলিয়া ভিতরের উদ্বেগে নির্মল উঠিয়া দাড়াইল। যতীন ক্ষণকাল বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিলেন ; তার- পর ধীরে ধীরে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন, “সুরেশের হৃদয়টা যে ভাবে গড়া তাতে মনে হয়, ও-কখনও একজনকে বেশী দিন ভালবাসতে পারবে না। ভালবাসা চায় বিশ্বের উপর ছড়িয়ে পড়তে । আজ হয়ত অনিতাকে হৃদয় দিয়ে ভাল বাসতে পারে। কিন্তু, দু’দিন পরে যখন ওর চোখের সামনে আরও সুন্দর কেউ পড়বে তখন তাকে পাবার জন্যও ও উতলা হয়ে উঠবে। তারপর হয়ত এক দিন দেখবে, একন দুঃখ লাঞ্ছনার ভিতর দিয়ে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে। অমনি করুণায় বিগলিত হয়ে তাকেও ভালবাসবার জন্য ওর মন উন্মুখ হয়ে উঠবে।” নিৰ্ম্মল অবাক হইয়া কথা শুনিতেছিল ; সহসা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিয়া উঠিল, “এক জন কি করে এক সময় তিন জনকে ভালবাসতে পারে ?” যতীন বলিতেছিলেন, “জগতে তিন রকম প্রেমেরই দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। প্রেম হৃদয়ের থেকে আসে, ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনায় আর পরের দুঃখ দেখে করুণার ভিতর দিয়েও আসে
সুরমা।
৭৫
এক রকম না হলে লােক বাঁচতে পারে না, দু'রকম হলে বিপদ
ঘটে। তিন রকম প্রেমেরই সাড়া যার হৃদয়ে পাওয়া যায়,
তার শেষ পর্যন্ত সর্বনাশই ঘটে।” বলিয়া একবার নির্মলের
দিকে চাহিয়া দেখিলেন। নিৰ্ম্মল অস্বাভাবিক মুখে তাহার
কথাগুলি শুনিতেছিল।
তিনি পুনশ্চ বলিতে লাগিলেন, “যার প্রাণ এমনি করে
গড়া তাকে যদি টেনে এনে কোন বন্ধনের মধ্যে রাখতে চাও,
তা হলে সে ত সুখ পাবেই না ; তা ছাড়া, অপরের জীবনটাও
নষ্ট হয়ে যাবে। তাকে সামান্য পাওয়া না পাওয়ার দুঃখ প্রথম
আঘাত করবে বটে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের ভিতর দিয়েই
তাকে বড় হতে হবে! সুরেশের হৃদয়টাও ঠিক এমনি।
আজ
হয়ত যৌবনের উন্মাদনায় মন তার পাওয়ার জন্য, ভােগ করবার
জন্য উতলা উন্মত্ত হয়ে উঠতে চাইবে। কিন্তু, দু’দিন পরে যখন
নিজেকে ভাল করে দেখতে পাবে, বিচ্ছেদের বেদনা তেমন
ক'রে আর বিধবে না; বরঞ্চ বিরহের ব্যথাটাকেই এক
অনির্বচনীয় আনন্দের মত উপভােগ করতে থাকবে, তথনই
কর্তব্যের সিংহদ্বার তার সম্মুখে উন্মুক্ত হয়ে দাঁড়াবে। ওকে
বড় হতে হবে বিচ্ছেদের ভিতর দিয়েই। অপূর্ণ অথচ পরিপূর্ণ
হৃদয়ের মধ্য দিয়েই ওর জীবন সার্থকতা লাভের জন্য অগ্রসর
হবে।” বলিয়া যতীন লাঠিটা লইয়া উঠিয়া দাড়াইলেন।
নিৰ্ম্মল সহসা চীৎকার করিয়া বলিল, “এ হয় না। এ আমি
বিশ্বাস করিনে।”
৭৬
সুরমা
যতীন পা বাড়াইতেছিলেন, ফিরিয়া দাড়াইয়া কহিলেন,
•আজ হয়ত বিশ্বাস হয় না। কিন্তু, সে দিন হবে যে
দিন---
“কি বিশ্বাস হয় না, দাদা ?” বলিয়া অনিতা একেবারে
ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইল।
নির্মল তাড়াতাড়ি পাশের দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল।
যতীনও আর একদিন বলব দিদি বলিয়া নিঃশব্দে বাহির হইয়া
গেলেন।
দাদার এই সন্ত্রাস পলায়ন, যতীনের নিঃশব্দ অন্তর্ধান
অনিতাকে বিস্মিত করিল, ব্যথা দিল। সে এই স্তব্ধ, গম্ভীর
গৃহের চারিদিকে একবার চাহিয়া দেখিল। তারপর নিশ্বাস
ফেলিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।
ছয়
বর্ধমান ষ্টেশনে নামিয়া সুরেশ খুসি হইয়া বলিয়াছিল, “এই
আমার ভাল। শীগগির আর কলকাতা মুখাে হচ্ছিনে।” তার পর
বাড়ী পৌছিয়া ভক্তিভরে বৌদিদিকে প্রণাম করিয়া বিছানার এক
পাশে গিয়া বসিল। বৌদিদি আশ্চৰ্য্য হইয়া নিনিমেষ চকে
কিছুক্ষণ সুরেশের দিকে চাহিয়া রহিলেন। বােধ হয় , নিজের
চক্ষুকে প্রত্যয় করিতে পারিতেছিলেন না। খানিকক্ষণ ভাল করিয়া
ঠাহর করিয়া দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “সুরেশ নাকি রে?”
“খ, বৌদি।”
বৌদিদি মনে মনে আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, “তুই এসে-
ছিস দাদা ? বেশ করেছিস।” বলিয়া বােধ হয় ক্লান্তিবশতই
চুপ করিলেন।
“তােমার অসুখের বাড়াবাড়ি শুনে কি আর না এসে
থাকতে পারি বৌঠান ?”
বৌদিদি কাসিতেছিলেন, হঠাৎ কাসি থামিয়া সুরেশের
দিকে চাহিয়া হাঁপাইতে হইতে বলিলেন, “আর বাড়াবাড়ি
কি ভাই; এখন যেতে পারলেই বাঁচি।”
“না. বৌদি, তােমাকে এত শীগগির যেতে দিচ্ছিনে।
তাহ'লে আমার দশা কি হবে ?"
৭৮
| সুরমা
।
বৌদিদির নিমীলিত চোখের কোণ বহিয়া এক বিন্দু অশ্রু
আসিয়া বালিসে পড়িল। কহিলেন, “যখন নােট ছিলে, খাইয়েছি-
দাইয়েছি; মানুষ করেছি। এখন বড় হয়েছ, মানুষ হয়েছ ;
এখন আমায় বিদায় দাও ভাই। দু'দিন ধরে পথের দিকে
চেয়ে রয়েছি, কখন তুই আসবি। তারপর মনে হ’ল, তুই
আর এলিনে। যাবার আগে আর তাের সঙ্গে দেখা হল না।”
বলিয়া সহসা তিনি চুপ করিলেন।
সুরেশের চোখে জল আসিয়া পড়িতেছিল, কহিল, “এই ত
এসেছি, বৌদি। এই ত দেখা হ’ল। আমি যে তােমার কাছে
থাকব বলেই এসেছি।”
বৌদিদি চোখ মেলিয়া ক্ষণকাল সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া
রহিলেন ; তারপর সহসা ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, “ তােকে এত
শুকনাে দেখছি কেন রে ? কোন অসুখ করেনি ত ?”
* না বৌদি, আমি ভালই আছি।
না না, তুই কখনও ভাল নেই। আমার কাছে লুকো-
চ্ছিস, নিশ্চয়ই তাের কোন অসুখ করেছে। আমার কাছে
এগিয়ে আয় ত দেখি। * বলিয়া বৌদিদি নিজেই উদ্বেগে
উঠিয়া বসিতে চেষ্টা করিতেই অবসন্ন দেহ তাহার ধপ করিয়া
বিছানায় পড়িয়া গেল। সুরেশ হায় হায় করিয়া তাড়াতাড়ি
উঠিয়া আসিয়া, ভাল করিয়া শােয়াইয়া দিয়া বাতাস করিতে
লাগিল। বৌদিদি গভীর ক্লান্তির ভারে হাঁপাইতে লাগিলেন। তার
পর এক সময় শ্রান্ত চক্ষু দু’টি তাহার নিদ্রায় মুদ্রিত হইয়া গেল।
সুরমা
৭৯
পর fন অতি প্রত্যুষেই উঠিয়া সুরেশ কবিরাজ ডাকিয়া
আনিয়া বৌদিদির ঔষধ পত্রের
ঔষধ পত্রের সুবন্দোবস্ত করিয়া দিল।
তারপর নিতান্ত সামান্য পােষাকেই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ
করিতে বাহির হইয়া গেল। যাহার সঙ্গে দেখা হইল তাহাকেই
বলিয়া আসিল, সে আর শীঘ্ৰ কলিকাতা ফিরিবে না; বৌদিদির
শুশ্রুষা করিবে এবং বাকী সময়টা ধর্মালােচনা করিয়া কাটাইবে।
এই প্রসঙ্গে পরম পবিত্র সনাতন হিন্দু ধর্ম যে জগতে শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম,
অন্য কোন ধৰ্ম্ম এর তুলনায় কিছুই নয় এবং শাস্ত্রানুসারে পালন
করিলে যে মােক লাভ অনিবাৰ্য, এ কথাও সে নজির তুলিয়া
বার বার করিয়া বলিয়া আসিল।
সুরেশ বাড়ী ফিরিয়া যথা-শাস্ত্র সন্ধ্যা আহ্নিক করিল এবং
রাত্রে শুইবার পূর্বে গীতা পাঠ করিয়া তবে শয়ন করিল।
ও দিকে বৌদিদির সেবা-শুশ্রুষার এমন ঘটা পড়িয়া গেল যে, দিন
চারেক পরে একটু ভাল হইয়া বৌদিদি হাসিয়া বলিয়াছিলেন
“ সুরেশ, তাের বৌ না দেখে আর আমি যাচ্ছিনে।
যম এলে,
তােকে দেখিয়ে বলব, ‘দেবতা ! ওর বৌকে আশীর্বাদ না করে
ত যেতে পাচ্ছিনে। অতএব তুমি কিছু দিন অপেক্ষা কর।”
আরও কিছুদিন এভাবে কাটিল। সকাল বেলা সুরেশের
আহ্নিক আর কিছুতেই শেষ হইতে চায় না এবং খাওয়া-দাওয়া
সম্বন্ধে তাহার বাচ-বিচার, নিষ্ঠা এত বাড়িয়া গেল যে, ঝি-ঠাকুর
পৰ্যন্ত অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল।
বিকাল বেলা যে রাস্তাটা বর্ধমান হইতে পালা সরকারী
সুরমা কৃষি ক্ষেত্রে গিয়াছে, সেই রাস্তা ধরিয়া সে একাকী রাম প্রসাদী সুর ভাঁজিতে ভাঁজিতে বহুদূর পর্যন্ত যাইত ও হঠাৎ হয়ত একস্থানে থামিয়া গিয়া সীমান্তরাল প্রসারিত দোলায়মান সবুজ শস্য ক্ষেত্রের দিকে দু’চোখ মেলিয়া সে চাহিয়া থাকিত। তারপর ধীরে ধীরে অস্তগামী সূর্যের শেষ সুবর্ণ-রশ্মিটুকু যখন নদীর জলে, গাছের মাথায় রাঙ্গা হইয়া কাপিয়া কাঁপিয়া নিভিয়া যাইত, তখন গভীর শ্রদ্ধাভরে সৃষ্টিকর্তার এই আশ্চৰ্য্য সৃষ্টির কথা ভাবিতে ভাবিতে সুরেশ ভক্তিতে আপ্ন ত হইয়া উঠিত। সময় সময় কৃষকেরা কেমন করিয়া দিনান্তে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত দেহ লইয়া, লাঙ্গল কাবে করিয়া, গরু ঠেঙ্গাইয়া বাড়ী ফিরিয়া যাইত, তাহা লক্ষ্য করিয়া বেদনায় বুক ভরিয়া তাহার চক্ষে জল দেখা দিত। ইচ্ছা হইত, আজই কিছু টাকা সে ইহাদের মধ্যে বিলাইয়া দেয় । তারপর সে, রাস্তা হইতে মাঠে নামিয়া, ধানের শীষ, ছিড়িয়া পরীক্ষা করিয়া ইহার বৈজ্ঞানিক নাম মনে আছে কিনা, তা যাচাই করিতে ‘ওরাইজা সেটাইভা—ওরাইজা সেটাইভ করিয়া উচ্চৈস্বরে বলিয়া উঠিত। সহসা বৃষ্টি আসিলে গাছতলায় দাড়াইয়া গরীব-দুঃখী কৃষকদের কথা ভাবিতে ভাবিতে তাহার চক্ষে জল আসিত। রাত্রে বাড়ী ফিরিয়া সুরেশ তাহার বৌদিদির কাছে বসিয়া গভীর তত্ত্বকথা আলােচনা করিত। তারপর এক সময় বিমনা হইয়া উঠিয়া গিয়া জানালার পাশে চুপ করিয়া সে আকাশের দিকে চাহিয়া থাকিত। মধ্যে মধ্যে অনিতার কথা মনে পড়িত এবং সুরমার স্মৃতিও দু’একবার তাহার মনের কোনে উকি
রম।
৮১
মারিয়া গিয়াছে। কিন্তু, ও কিছু না বলিয়া সে হাসিয়া
উড়াইয়া দিত। বৌদিদি তাহাকে ছেলে বেলা হইতে মানুষ
করিয়া আসিয়াছেন। সুরেশের ভাব লক্ষ্য করিয়া তিনি মুখ
টিপিয়া হাসিয়া পাশ ফিরিয়া শুইতেন; কিন্তু পরক্ষণেই অশ্রুও
সম্বরণ করিতে পারিতেন না।
দিন কয়েক পরে এক দিন বিকাল বেলা বৌদিদির এক দুর
আত্মীয়া তাহার সতের আঠার বৎসরের সুন্দরী অনুঢ়া কন্যাসহ
দেখা দিলেন। তিনি এমন মাঝে মাঝে প্রায়ই আসিতেন; কিন্তু
একা আসিতেন। আসিয়া কন্যার বিবাহের জন্য সুরেশের
বৌদিদিকে অনেক অনুরােধ-উপরােধ এমন কি অনুনয়-বিনয়
পর্যন্ত করিয়া যাইতেন। লক্ষ্যটা যে তাহার সুরেশের
উপরই ছিল তাহা বৌদিদি বুঝিতে পারিয়াও চুপ করিয়া থাকি-
তেন। কারণ, সুরেশকে তিনি চিনিতেন এবং এই সমস্ত
ব্যাপারে সুরেশের সম্বন্ধে কোন মতামত প্রকাশ যে নিরাপদ
নহে, তাহাও তিনি সবিশেষ অবগত ছিলেন।
মধ্যে বহুদিন
কন্যার মাতার এরূপ যাতায়াতের বিরতি ছিল। আজ হঠাৎ
যে তাহার কেমন করিয়া একেবারে সকন্যা আবির্ভাব হইল,
তাহা ঠিক বােঝা গেল না।
বিকাল বেলা বাহির হইবার পূর্বে বৌদিদির সঙ্গে দেখা
করিয়া শারীরিক কুশলাদি প্রশ্ন করিতে আসিয়া সুরেশ একেবারে
অবাক হইয়া গেল এবং কিছু না জিজ্ঞাসা করিয়াই তৎক্ষণাৎ
লাঠিটা লইয়া মাঠের দিকে বাহির হইয়া পড়িল। কিন্তু, আজ
সুরমা } আর বেশী দূর পায়ে হাঁটিয়া যাইতে তাহার ইচ্ছাই করিল না। কাহার সরল, সুন্দর অথচ আড়ম্বর-বর্জিত মুখচ্ছবি চোখের উপর ভাসিয়া উঠিয়া তাহার প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য উপ- লব্ধিতে যেন বার বার বাধা দিতে লাগিল। আকাশে হয়ত সামান্য মেঘ ছিল, হয়ত ছিলনা। উপর দিকে চাহিয়া সে মনে মনে বলিল, আজ বেশী দুর যাইয়া কাজ নাই। কাল এমন সময় বৃষ্টি আসিয়াছিল, আজও আসিতে পারে। অতএব সুরেশকে বােধ হয় বৃষ্টির ভয়েই সে দিন সকাল সকাল বাড়ী ফিরিতে হইয়াছিল। বাড়ী ফিরিয়া সুরেশ বৌদিদির শয্যার একাংশে গিয়া বসিল। তাহার মন যেন কি কথা বলিতে চায় ; কিন্তু জিহ্বা তাহা উচ্চারণ করিয়া উঠিতে পারিতেছেনা। বৌদিদি ইতি- মধ্যে অনেকটা সারিয়া উঠিয়াছিলেন। সুরেশের ভাব লক্ষ্য করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “ বিয়ে করবি দাদা ?” সুরেশ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “ না বৌদি, আমার ও সব ভাল লাগেনা। তা ছাড়া, তুমি মরে গেলে কে তাকে দেখবে?” “ তাহলে তাের বৌকে দেখবার জন্যই আমাকে চিরকাল বেঁচে থাকতে হবে নাকি রে?” সুরেশ লজ্জিত হইয়া বলিল, “ দূর ! আমি কি সে কথা বলছি নাকি? আমার বিয়ে করবার ইচ্ছা নেই. বুঝলেন। বৌঠান?”
সুরমা
“কিন্তু যদি করতিস তা হলে ভাল হত। মেয়েটি বেশ
সুন্দরী, লেখা পড়া কিছু শিখেছে। আর কাজ-কর্মের ত
কথাই নেই।”
সুরেশ চুপ করিয়া রহিল। বৌদিদি পুনরায় কহিতে লাগি-
লেন, “কিন্তু তারা বড় গীব। দু'বেলা ভাল করে খেতে
পর্যন্ত পায় না। শীতের দিনে মায়ে-ঝিয়ের কি কষ্টে কাটে—ত।
আর বলতে পারি নে।” এই সময় তাহার চক্ষু ছল ছল করিয়া
উঠিল ।
সুরেশ সহসা আগ্রহের সহিত জিজ্ঞাসা করিল, “তারা খুব
গরীব বলছিলে না ? খেতে পর্যন্ত পায় না, না ?”
বৌদিদি ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, “শুধু কি
তাই ! মামার বাড়ী থাকে যেন ঝি-চাকর ! উঠতে-বসতে
গাল-মন্দ আর খাবার বেলা শুকনো লঙ্কা আর মােটা চালের
কড়-কড়া ভাত।”
সুরেশ অধীর হইয়া বলিল, “তা হলে তুমিও ত তাকে
তাদের সাহায্য করতে পার। তারা ত তােমার আত্মীয়া ।”
বলিয়া সুরেশ নিজের মণি ব্যাগটা বৌদিদির হাতে দিল।
বৌদিদি সুরেশের হাতখানা নিজের অসমর্থ হাতের মধ্যে
লইয়া বলিলেন, “তুমি ত এক দিন বলেছিলে দাদা, ‘বিয়ে যদি
করি ত গরীব সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করব।” তা যদি হয়
তাই, তবে ঐ যে মেয়েটি বিকালে এসেছিল তাকে বিয়ে কর না ?
আমিও মরবার আগে ছােট বােনটিকে নিয়ে দিন কয়েক
৮৪
সুরমা
আমােদ-আহলাদ করে যাই।” বলিয়া সহসা জিজ্ঞাসা করিলেন,
“হরে সুরেশ, তাের সেই মেয়েটিকে পছন্দ হয় ? করবি
তাকে বিয়ে ?”
সুরেশ উত্তরে কি বলিল, বােঝা গেল না। কেবল এইটুকু
বােঝা গেল, রাত্রে চিন্তা করিয়া একথার উত্তর কাল দিবে।
পর দিন সুরেশ কি উত্তর দিয়াছিল, জানা গেল না বটে।
কিন্তু, সেই দিন হইতে সামান্য পােষাকে সে আর বাহির হইতে
চাহিত না এবং খােলা মাঠের পরিবর্তে বন্ধুদের আবদ্ধ গৃহের
মধ্যেই বেশী আনন্দ উপভােগ করিতে লাগিল । ক্রমে যত দিন
যাইতে লাগিল ততই সন্ধ্যা-আহ্নিক তাহার ভুল হইতে লাগিল।
শয়ন করিবার পূর্বে গীতাটা আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।
অগত্যা তাহাকে ঐহিক পরমার্থ চিন্তার মধ্য দিয়াই ঘুমাইতে
হইত।
বৌদিদি আড়ালে আনন্দাশ্রু মােচন করিয়া ঝিকে ডাকিয়া
বলিলেন, “সুরেশের আমার এবার সুমতি হয়েছে।”
কি বুঝিতে না পারিয়া “হ” বলিয়া অন্য কাজে চলিয়া গেল।
কিন্তু, এখন প্রায়ই সুরেশের রাত্রিতে ফিরতে দেরী হয়
এবং রাত্রের খাবারগুলি অমনি ঢাকা পড়িয়া থাকে। সকাল
বেলা উঠিয়া তৃষ্ণার জলের জন্য সে হাঁকাহাঁকি করিতে থাকে।
তার পর এক দিন সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ আছে বলিয়া সে বাহির হইয়া
গেল এবং ফিরিতে তাহার প্রায় রাত তিনটা হইল।
রাত্রে গাড়ীর এবং পরক্ষণেই দরজার সম্মুখে জুতার শব্দে
সুরমা বৌদিদির ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। ঘরে আর অল্প আলো বলিতেছিল। সে স্বালােকে সুরেশের দিকে চাহিয়া তিনি যাহা দেখিলেন তাহাতে তাহার হৃদপিণ্ড এক সেকেণ্ডের জন্য থামিয়া পুনরায় হাতুড়ির মত তাহার জীর্ণ বক্ষ-পঞ্জরে আঘাত করিতে লাগিল। সুরেশের পা টলিতেছিল এবং অনেক চেষ্টা করিয়াও সে বিছানা খুঁজিয়া পাইতেছিল না। তথন মেঝের উপরই সে গভীর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িল। সুরেশের অবস্থা দেখিয়া তাহার বুক ফাঠিয়া যাইতে লাগিল। একবার তিনি উঠিতে চেষ্টা করিলেন; কিন্তু তাহার রুগ্ন, কঙ্কালসার দেহের উপর সুরেশের সেই শােচনীয় অবস্থা যে মুগুরাঘাত করিল তাহাতে তাহার চিরদিনের মত উঠিবার শক্তির পরিসমাপ্তি হইয়া গেল। বাকী রাতটুকু কপালে করাঘাত করিয়া, ভগ- বানকে ডাকিয়া তিনি কাঁদিয়া কাটাইলেন। পর দিন হইতে বৌদিদির অবস্থা উত্তরােত্তর মন্দ হইয়া চলিল। সে দিকে লক্ষ্য করিবার সুরেশের এখন আর সময় ঘটে । বিকালে বাহির হইয়া যায় অনেক রাত্রে বাড়ী ফিরিয়া না খাইয়া ঘুমাইয়া পড়ে। ঝি কবিরাজ ডাকিয়া আনিল। তিনি নাড়ী দেখিয়া মুখ বিকৃত করিয়া ঔযধ দিয়া গেলেন। দর্শনিটা অবশ্য তিনি ছাড়িলেন না। সে দিন বিকাল বেলা অতি কষ্টে বৌদিদি ঝিকে দিয়া সুরেশকে ডাকাইলেন। বহুক্ষণে সুরেশ আসিয়া দেখিল, বৌদিদির খাস উঠিয়াছে। চীৎকার করিয়া বৌদিদির বুকের
সুরমা
=
উপর লুটাইয়া পড়িয়া কঁদিয়া কহিল, “ওগাে বৌদি, তুমি এমন
করে নিঃশব্দে আমায় শাস্তি দিয়ে গেলে এই বুকে সে
ষােল বৎসর কাটাইয়াছে ; আজ তাহার স্পন্দন চিরকালের জন্য
3 থামিয়া যাইতেছে।
বৌদিদি অনেক থামিয়া, অনেক কষ্টে কহিলেন, “সুরেশ
তাই, এখনও সময় আছে। এখনও মানুষ হ'—আমি ওপার
থেকে দেখে সুখী হব রে। বিয়ে-তুই–করিস।” তাহার
মৃত্যুভারাক্রান্ত ক্ষীণ কণ্ঠস্বর চিরদিনের জন্য থামিয়া গেল। কেবল
তাহার চোখের কোণ বাহিয়া অশ্রু তখনও ঝরিয়া পড়িতেছিল।
সুরেশ কাঁদিয়া কাটিয়া শেষে এক সময় শান্ত হইয়া, লোক
ডাকিয়া তাহার মাতৃসমা বৌদিদির শেষ কাজ করিয়া আসিল।
পর দিন এমনি এমনি ঘুরিয়া বেড়াইল। তার পর বাড়ীটার
বন্দোবস্ত করিয়া একদিন বাক্স-বিছানা বঁধিয়া কলিকাতায়
আসিয়া উপস্থিত হইল।
সে দিন যতীন-নিৰ্ম্মলের কথা-বার্তা হইতে ঠিক কিছু বুঝিতে পারিলেও কেমন করিয়া যেন এ কথাটা অনিতার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল যে, ইহার সহিত তাহার একটা বিশেষ সম্বন্ধ রহিয়াছে। অথচ, কি যে সম্বন্ধ, কেন যে তাহার দাদার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ঐ কথা উদভ্রান্তের মত উচ্চারণ করিয়াছিল তাহাও এই দু’দিন ধরিয়া চিন্তা করিয়া অনিতা ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই। তথাপি, অন্তৰ্শায়ী মন তাহার একটা অনিৰ্দেশ্য শঙ্কার ভারে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হইয়াই রহিল। সেই অবধি সুরেশের দেখা নাই। সময়-অসময়ে সুরেশের চিন্তা তাহার মনকে নাড়া দিয়া গিয়াছে, ব্যথা দিয়াছে ; দৈনিন্দিন কাৰ্যগুলি তাহার আনন্দহীন, নীরস, বিস্বাদ বলিয়া মনে হইয়াছে। কিন্তু তথাপি, মন তাহার নিগূঢ় সঙ্কোচের ভারে সুরেশের কোন কথাই দাদার নিকটে জিজ্ঞাসা করিতে সমর্থ হয় নাই। নির্মল আফিস হইতে ফিরিয়া আসিলে কত দিন অনিতা নিজের হাতে চা এবং খাবার তৈরী করিয়া দিয়াছে। নির্মল আনন্দে গদগদ হইয়া তাহাকে কত প্রশংসা করিয়াছে ; কন্তু যে কথা আনিবার জন্য তাহার এত চেষ্টা, এত উদ্যম তাহার কোন আভাসই দাদার মুখ হইতে বাহির হয় নাই। হতাশ মন তাহার সুরেশের প্রতি
সুরমা
ব্যর্থ অভিমানে ভিতরে মাথা কুঠিয়া দিয়াছে ; তথাপি মুখ
ফুটিয়া জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করে নাই।
সে দিন কলেজে গিয়া ক্লাসের মধ্যে অনিতার বেদনাহত মন
কিছুতেই আবদ্ধ থাকিতে চাহিল না। ইংরাজি অধ্যাপকের
বক্তৃতার মধ্যে কেমন যেন একটা দুঃখের সুর বাজিয়া উঠিয়া
অনিতাকে ভিতরে ভিতরে কাঁদাইতে লাগিল। অলক্ষ্যে এক
ফোটা অশ্রু মুছিয়া বই হাতে করিয়া উঠিয়া গাড়ী করিয়া সকাল
সকাল বাড়ী ফিরিয়া আসিল।
মাসীমা আড়াল হইতে সন্দিগ্ধ চিত্তে বার বার অনিতার
আপাদমস্তক অবলােকন করিয়া আগাইয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, “আজ এত সকাল সকাল কি করে এলি, অনিতা ?
ইস্কুলের গাড়ী ত দেখতে পেলুম না।
অনিতা নিজের ঘরে যাইতেছিল। মাসীমার সন্দেহপূর্ণ
প্রশ্নে থম্কিয়া দাড়াইল এবং মুখ না তুলিয়াই কহিল, “শরীরটা
ভাল লাগল না তাই চলে এলুম।” বলিয়া তাড়াতাড়ি নিজের
ঘরের মধ্যে ঢুকিল।
ঘণ্টা দুই পরে অনিতা নির্মলের ঘরে বসিয়া কি একটা
বুনিতেছিল। অথচ, মন যে তাহার এই তুচ্ছ বােনার কাৰ্য্যে
নিবদ্ধ ছিল না, তাহা তাহার মাসীমার চক্ষু পৰ্য্যন্ত এড়াইল না।
অকস্মাৎ জুতার শব্দে মুখ তুলিতেই অনিতার হৃদপিণ্ড একেবারে
লাফাইয়া উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই বােনার জিনিষ গুলা হাত
লিত হইয়া পায়ের কাছে নীচে পড়িয়া গেল। পরক্ষণেই
সুরমা
৮৯
।
সুরে আরও
সুরেশ সােজা ঘরে ঢুকিয়া নমস্কার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“কেমন আছেন আপনি-আপনারা ?” বলিয়া একটা চেয়ার
দখল করিয়া অনির সম্মুখে আসিয়া বসিল ।
অনিতা না পারিল মুখ তুলিয়া চাহিতে, না পারিল কথার
উত্তর দিতে। সে তাড়াতাড়ি দু'হাতে মুখ আবৃত করিয়া স্থির
হইয়া বসিয়া রহিল।
সুরেশ খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হাসিয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “ওকি, আমার সঙ্গে কথা বলবেন না, নাকি?”
অনিতা তেমনি নিরুত্তরে বসিয়া রহিল । ।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “তাহ'লে কি
আর করা যাবে ? কথা যখন আপনি বলছেন না। তখন
উঠতেই হল।”
অনিতা মুখের উপর হইতে হাত সরাইয়া আস্তে আস্তে
বলিল, “আমি কি বলছি, কথা বলব না !”
“সে ঠিক। কিন্তু, মুখ ঢেকে যে রকম চুপ করে রইলেন,
তাতে মনে হল, হয়ত আমি এমন কিছু করেছি যার জন্য আপনি
আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন না।”
অনিতা মুখ না তুলিয়াই কহিল, “আপনার সঙ্গে কথা না
বলাই উচিত ছিল; কিন্তু
“কিন্তু, কেন ?”
‘আপনি কি তা জানেন না ? কলকাতায় আছেন, অথচ
এত দিনের মধ্যে এখানে আসা দূরে থাক, একটা খবর পর্যন্ত
সুরমা
দিলেন না। দাদা কত দিন ত এমনি এমনি হেঁটে এসেছেন।
সে দিন পর্যন্ত আপনার কথা কত বলা-বকিচ্ছিলেন।”
সহসা অনিতা লজ্জায় চুপ করিয়া গেল। নিৰ্ম্মল বার কয়েক
সুরেশের সঙ্গে দেখা করিতে গিয়া হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিয়া-
ছিল বটে; কিন্তু কোন দিন সুরেশের সম্বন্ধে তাহার সহিত
নিৰ্ম্মলের বিশেষ আলােচনা হয় নাই। অনিতা মিথ্যা বলিতে জানিত
না। অথচ, আজ এই মিথ্যাটুকু হঠাৎ যখন তাহার মুখ হইতে
বাহির হইয়া গেল তখন আর তাহার লজ্জার সীমা রহিল না।
সু” বলিতেছিল, “নিৰ্ম্মল যে আমার ওখানে গেছিল, তা
আমি কাল এসেই শুনেছি। মনুয়ার আমার এসব বিষয়ে
মাথা খুব সাফ, কিনা!”
অনিতা সহসা মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এসেই
অনেচেন—তার মানে ?” বলিয়া চাহিয়া দেখিল সুরেশের
আর সেই লাবণ্য নাই। একটা বিষাদের ছায়া তাহার মুখের
উপর ভাসিয়া বেড়াইতেছে।
‘‘তার মানে হচ্ছে, আমি এখানে ছিলুম না।”
অানতা বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিল, “এখানে ছিলেন
! কোথায় গেছিলেন ?”
“বর্ধমান।”
“হঠাৎ বদ্ধমান যেতে হল কেন?”
“বৌদির অসুখ বেড়েছিল। তাই খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি
চলে গেছিলুম।”
সুরমা
অনিতা উৎকণ্ঠিত হইয়। জিজ্ঞাসা করিল, “এখন তিনি
কেমন আছেন ?
সুরেশ নিশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিল ।
অনিতা পুনরায় বলিল, “ভাল নাই তা বুঝতে পেরেছি।
কিন্তু, তিনি ভাল না হতেই বা আপনি চলে এলেন কেন?”
“আর দরকার হ’ল না বলে চলে এলুম।”
অনিতা রাগ করিয়া কহিল, “এ আপনার কি রকম কথা ?
আপনি ছাড়া তার আর কেউ নেই—দরকার হ’ল কি রকম ?”
এক মুহুর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া সুরেশ কহিল, “শুধু শুধু
রাগ করলে কি হবে বলুন! তার দরকার চিরদিনের মত শেষ
হয়ে গেছে ! তিনি নেই !”
“তিনি নেই !” বলিয়া অনিতা সােজা খাড়া হইয়া উঠিয়া
সুরেশের প্রতি বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া রহিল ।
“না, নেই।” এই সময় সুরেশের চক্ষের কোণে জল দেখা
দিল। অনিতার চক্ষুও বাম্পাকুল হইয়া উঠিয়াছিল। গণকাল
দু’জনেই নির্বাক, নিস্তব্ধ। ঠিক এমনি সময় নির্মল আফিস
হইতে ফিরিয়া ছাতিটা কাধে করিয়া ঘরে ঢুকিয়া একেবারে
বিস্মিত, স্তম্ভিত হইয়া গেল।
অনিতা বাহিরের দিকে মুখ করিয়া বসিয়াছিল; কিন্তু কথা-
বার্তায় মগ্ন ছিল বলিয়া নিৰ্ম্মলের নিঃশব্দ আগমন টের পায়
এখন মুখ তুলিতেই দাদাকে দেখিতে পাইয়া পলকের
জন্য চমকিয়া উঠিয়া তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলাইয়া লইল।
নাই।
৯২
সুরমা
নিৰ্ম্মলের বিস্ময়াহত মুখের দিকে চাহিয়া অনিতার বুঝিতে
বাকী রহিল না, তাহাদের এই নিভৃত সাক্ষাৎ, এই চক্ষের
জলের অর্থ তাহার দাদা কি ভাবে গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু,
সে তাহার দাদাকে ভাল রকমেই চিনিত এবং সহসা যে তাহার
দাদার কোন জিনিষের কদৰ্থ করিয়া লওয়া নিতান্ত স্বভাব
বিরুদ্ধ, তাহাও সে জানিত। তথাপি আজিকার নিম্মলের
মুখের দিকে চাহিয়া অনিতা মনে মনে একটু শঙ্কিত হইয়া
উঠিল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া গিয়া ইসারা
গিয়া ইসারা করিয়া ডাকিয়া
নিৰ্ম্মলক লইয়া নিজের ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল।
সমস্ত কথা শুনিয়া নিৰ্ম্মল নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “তাই
সুরেশকে ওরকম শুকনাে দেখলুম। কবে মারা গেছেন বললি ?
‘দিন চারেক হ’ল। আচ্ছা, সে কথা পরে হবে’খন। তুমি
এখন ওঁর কাছে যাও, না হলে মনে কিছু করতে পারেন। আমি
তােমাদের চা নিয়ে যাচ্ছি।” বলিয়া অনিতা রান্না ঘরের দিকে
চলিয়া গেল।
সুরেশ বাহিরের দিকে চাহিয়া কি ভাবিতেছিল। নির্মল
ঘরে ঢুকিয়া সুরেশের সামনে গিয়া বসিয়া তাহার একখানা
হাত নিজের হাতের মধ্যে লইয়া করুণার্ভ কণ্ঠে কহিল
“ভেবে আর কি করবে ভাই! ভগবানের উপর ত কারুর হাত
নেই।”
সুরেশ মুখ ফিরাইয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “যাক, একটা
বন্ধন ছিল, তাও গেল।”
সুরমা
“কি হয়েছিল তার ?”
“কি আর হবে ! বুড়ো মানুষ—অনেক দিন ধরেই ভুগছিলেন।
আমার জন্যই তার প্রাণটা এতদিন আটকে ছিল। কিন্তু
আমিই শেষে
নিৰ্ম্মল উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমিই শেষে, কি ?”
সুরেশ এক মুহুর্ত্তের জন্য দাত দিয়া ঠোট দু’টা চাপিয়া
পরিল; তারপর সহজ গলায় কহিল, “আমিই তাকে মেরে
ফেলেছি।”
“তুমিই তাকে মেরে ফেলেছ—তার মানে ?”
“অৰ্থ একটা আছে বইকি; কিন্তু তা শুনে আর কাজ নেই
ভাই।” বলিয়া সুরেশ চুপ করিল। নিৰ্ম্মলও আর কিছু
জিজ্ঞাসা করিতে সাহস না করিয়া চুপ করিয়া রহিল।
মিনিট দশেক পরে নিজের হাতে চা আর খাবার আনিয়া
টেবিলের উপর রাখিয়া অনিতা হাসিয়া কহিল, “সুরেশ বাবু,
খেয়ে নিন্ শীগগির করে। আমি আজ বায়স্কোপে যাব কিনা।
আপনাকেও কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে হবে। বসে বসে মন
খারাপ করতে কিছুতেই আমি দেব না, তা বলে দিচ্ছি।”
সুরেশ বিনা-বাক্য-ব্যয়ে আহারে মন দিল। চায়ের কাপটা
মুখে তুলিয়া দিয়া নিৰ্ম্মল বলিল, “সে ত উত্তম কথা। যা ও না
সুরেশ, তুমিও অনিতার সঙ্গে বায়স্কোপে। মনটাও ভাল
থাকবে; তা ছাড়া আমার টিউশনিটা শুধু শুধু বন্ধ রাখতে
হবে না।”
৯৪
সুরেশ তেমনি নীরবে আহার করিতে লাগিল।
আধ ঘণ্টা পরে বিশেষরূপে বেশবিন্যাস করিয়া অনিতা
আসিয়া ব্যস্ত হইয়া কহিল, “চলুন সুরেশ বাবু; আর দেরী
নয়।
প্রায় ছ'টা বাজে—গাড়ী এল বলে।”
সুরেশ-অনিতাকে ঐ ভাবে বাহির হইয়া যাইতে দেখিয়া
মাসীমা শঙ্কিত হইয়া আসিয়া কহিলেন, “ইরে নিৰ্ম্মল, ওরা
কোথায় যাচ্ছে দু’টিতে ?”
“বায়স্কোপে যাচ্ছে। আমি যেতে পারলুম না বলে সুরেশ
অনির লেঙ্গে যাচ্ছে।” বলিয়াই নিৰ্ম্মল তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে
গিয়া ঢুকিল।
মাসীমা মুখ আঁকাইয়া কহিলেন, “জানিনে বাপু তােমাদের
ভাব-সাব। এই সে দিন ওকে নিয়ে এত কথা হয়ে গেল
আজ আবার যে কে সেই!” বলিয়া মাসীমা মুখ ভার করিয়া
চলিয়া গেলেন।
গাড়ী ছাড়িয়া দিলে ক্ষণকালের জন্য সব চুপ চাপ। সহসা
অনিতা জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি আমাকে “আপনি” বলেন
কেন ??
সুরেশের বুকের ভিতরটা লাফাইয়া উঠিল; কিন্তু উত্তর
দিল হাসিয়াই, তা হলে কি বলব ?”
অনিতা মাথা নীচু করিয়া আস্তে আস্তে বলিল, ৫ ‘তুমি
বললেই পারেন।”
“তাতে লাভ ?”
সুরমা ক অনিতা হাসিয়া বলিল, “লাভ না থাক, লােকসান ত নেই।” “লােকসান না 'কলেই যে তা বলতে হবে তারও ত কোন মানে নেই।” ‘‘অন্য মানে না থাকতে পারে; কিন্তু আপনি ত আমার চেয়ে বয়সে বড়। তাছাড়া-" তা ছাড়া, কি ?” “যান, জানিনে।” বলিয়া অনিতা মুখ নত করিল। “না-ই যদি জানেন, তাহলে অনিতা তর্জনী তুলিয়া কৃত্রিম ক্রোধ ভরে বলি " বাবার ?” “আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করতে হবে না। তােমার হুকুমই মেনে নিচ্ছি ; কিন্তু আমারও যে একটা নিবেদন আছে।” অনিতা হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, “আপনার নিবেদনটা এখন ব্যক্ত করুন। সম্ভব হলে মঞ্জুর করা হবে।” সুরেশ ছদ্মগাম্ভীর্যের সহিত কহিল, “নিবেদনটা মঞ্জুর হবে বলে ভরসা হয় না। সে জন্যই সেটা ব্যক্ত করতে সম্প্রতি তীত হচ্ছি। তার চেয়ে তােমার যদি আর কোন হুকুম থাকে ত, তা শিরােধার্য্য করতে একান্ত প্রস্তুত আছি।” অনিতাও গম্ভীর ভাবে বলিল, “আরও হুকুম আছে বইকি।” সুরেশ সন্ত্ৰমের সহিত কহিল, “যথা।” “বায়স্কোপের পরে আমাদের ওখানে এক জনকে নৈশ- ভােজন করতে হবে।” “তার পর ?”
সুরমা
“তারপর তাকে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম লাভ করতে হবে।”
“ততঃপর ?”
“তারপর—তঁাকে সেই দিনকার অসমাংশ বিষয়টা আমাকে
বিশদ রূপে বুঝিতে দিতে হবে।”
“কিম, ততঃ পরম, ?”
“রাত বেশী হয়ে পড়লে দাদার কাছে তাকে রাত্রের
জন্য আবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে।”
না পারলে ?”
“, “রবে না বইকি—তােমাকে পারতেই হবে।'
বলিয়াই অনিতা তাড়াতাড়ি মুখ ফিরাইয়া বসিল
সুরেশের দিকে কিছুক্ষণের জন্য চাহিতে পৰ্যন্ত পারিল না।
সুরেশ আরও কিছু জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিল। এমন
সময় গাড়ী আসিয়া বারস্কোপ-থিয়েটারের
দাড়াইল। সুরেশ তাড়াতাড়ি নামিয়া অনিতার দিকে হাত
বাড়াইয়া দিল। অনিতা অন্যমনস্ক ভাবে নামিতে গিয়া হঠাৎ
পা ফসকাইয়া একেবারে সুরেশের বুকের উপর আসিয়া
পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গেই সুরেশ দুবাহ বাড়াইয়া অনিতাকে
সযত্নে তুলিয়া
এতগুলা অপরিচিত চক্ষুর
সম্মুখে অকস্মাৎ যে কাণ্ড ঘটিয়া গেল তাহাতে লজ্জায় মরিয়া
গিয়া অনিতা জিত, কাটিয়া মনে মনে ছি ছি’ করিতে লাগিল।
তথাপি, এক পা এক পা করিয়া সুরেশের সঙ্গেই বায়স্কোপ
দেখিতে ম্যাডেন থিয়াটারে ঢকিতে হইল ।
গেটের সম্মুখে
ধরিল।
সুরমা
বায়স্কোপ দেখিয়া বাড়ী ফিরিবার পথে সুরেশ কহিল,
“সোজা বাড়ী না গিয়ে, একটু ঘুরে গেলে হত না?" বলিয়া
আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টিতে অনিতার দিকে চাহিল।
অনিতা ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া আস্তে আস্তে বলিল,
“সে আপনার ইচ্ছা।”
সুরেশ একটু ম্লান হাসি হাসিয়া কহিল, “আমার ইচ্ছাতেই
কি সব হয়, অনিতা ! নিৰ্ম্মল আমাদের দেরী দেখে হয় ত মনে
কিছু করতে পারে।”
মুখ তুলিয়া অনিতা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “এর মধ্যে মনে
কাবার কি আছে, তা ত বুঝতে পারলুম না। তুমি সঙ্গে রয়েছ
—দাদা ত সেই জন্যই তােমাকে সঙ্গে পাঠালেন।”
সুরেশ কহিল, “আমি সঙ্গে থাকলে বিপদের কোন আশঙ্কা
নেই নাকি ?
অনিতা হাসিয়া ছেলে মানুষের মত মাথা নাড়িয়া বলিল,
“বিপদ যদি কিছু থাকে, ত’ থাক। তার জন্য জবাবদিহি যদি
করতে হয়, তু তােমাকে হবে আমাকে নয়।”
সুরেশও হাসি মুখে কহিল, “অর্থাৎ সব বােঝা আমার
মাথায় তুলে দিয়ে তুমি নিজে নিশ্চিন্ত হতে চাও, এই না?”
অনিতা অভিমান-ক্ষুন্ন করে বলিল, “আমি কিছুই
বলতে চাইনে।
এটা যদি এতই ভারী বলে মনে হয়
তােমার মাথায় নিও না।"
১৮
সুরমা
সুরেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, মানুষ ইচ্ছা করলেই কি
সব কাজ করতে পারে অনিতা ! ছেলে বেলা থেকে
কামনাই ত ক'রে এসেছি ; কিন্তু ক’টা তার সার্থক হয়েছে!”
“মানুষের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয় না বলে কি কেউ কিছু আশাই
করবে না ??
“আশা করতে আমি নিষেধ করিনে। কিন্তু তার সঙ্গে
নিরাশার দুঃখটা সহ করবারও শিক্ষা থাকা চাই। তা না
হলে হতাশ্বাসের নিষ্ঠুর আঘাত জীবনটাকে তার একদিন
লণ্ডভণ্ড করে দেবে।” বলিয়া সুরেশ বাহিরের দিকে চাহিয়া
চুপ করিয়া রহিল।
সুরেশের মন যে কোন জিনিষ লক্ষ্য করিয়া একথা
বলিতেছে, তাহা অনিতা না বুঝিতে পারিলেও, কথাগুলা যে
তাহার হৃদয়ের গভীর প্রদেশ আলােড়িত হইয়া বাহির হইতেছে
ইহা অনিতায় বুঝিতে বাকী রহিল না। তাই, সমস্ত জিনিষটাকে
আবার সরল পথে ফিরাইয়া আনিবার জন্য হাসিয়া কহিল,
“তা হলে তুমি জীবনের সমস্ত আশা-আকাঙ্খা বিসর্জন দিয়ে
বিরাগী হতে চাও নাকি?”
}
সুরেশ তেমনি বাহিরের দিকে চাহিয়া বলিল, “বিরাগী
শব্দের তাই অর্থ বটে। কিন্তু, বিরাগীদের কি কোন কামনা
নেই? এই কি সত্য ?
অনিতা আশ্চর্য হইয়া বলিল, “তঁাদের আবার কামনা কি ?
সুরমা
৯৯
সুরেশ সহসা মুখ ফিরাইয়া কহিল, “তাহলে তারা বেঁচেও
মরে আছেন বােধ হয়। কারণ মানুষের কামনা বাসনার
শেষ হয় তখনি যখন তার দেহে প্রাণ থাকে না। হিন্দুরা ত
আরও এগিয়ে গেছেন। তঁারা বলেন, মৃত্যুর পর সূক্ষ্ম
আত্মাটাও নাকি বাসনা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।”
“তাহলে যে শুনতে পাই, বড় বড় সাধু-সন্ন্যাসীরা নিষ্কাম
ভাবেই ভগবানকে ডাকে। সেটা কি মিথ্যা কথা ?”
“সেটা মিথ্যা কথা, এমন কথা কি আমি জোর ক'রে
বলতে পারি, অনিতা? কিন্তু সেই নিষ্কাম শস্কেল, সঠিক
অর্থটা আজও আমার বােধগম্য হয় নি। যদি কামনাই নেই,
তবে এক জনকে পাবার জন্য এত ডাকাডাকিই বা কেন, এত
সাধন-ভজনই বা কেন? এর মধ্যে কি কামনার কোন গন্ধ পাওয়া
যায় না ?" বলিয়া সুরেশ অনিতার মুখের দিকে চাহিল।
অনিতা বিস্মিত মুখে সুরেশের কথা গুলি শুনিতেছিল।
সুরেশ মুখ ফিরাইতেই অনিতা বলিল, “নিষ্কাম-সকাম—ও সব
আমি বুঝিনে। আর বােঝবার বয়স ও বােধ করি হয় নি এখনও
আমার।
চেয়ে বরঞ্চ যা বুঝতে পারব সেটা
বুঝিয়ে দাও।” বলিয়া তাহার এসেন্স মাখা রুমালটা বুকের
ভিতর হইতে বাহির করিয়া মুখ খানা মুছিয়া লইয়া সুরেশের
দিকে চাহিয়া হাসিল।
এই সুগন্ধ, এই প্রাণ-মাতানো হাসিতে সুরেশের বুকের
রক্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ নিজেকে সংযত
সুরমা করিয়া লইয়া কহিল, “কোন কথা বুঝতে চাইছ, মনে পড়ছে না।” “ঐ যে, যে কথাটা নিয়ে দাদার সঙ্গে সে দিন তর্ক কচ্ছিলে।” সুরেশ ক্ষণকাল স্তৰূমুখে বসিয়া থাকিয়া কহিল, “যে জিনিষটা নিয়ে নির্মলের সঙ্গে সে দিন কথা হচ্ছিল, তা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলােচনা ত করতে পারব না। অনিতা। উচিতও নয়।” আমাকে কি এতই অনুপযুক্ত মনে কর? আমারও Psychology পড়তে হয়—সেটা কি ভুলে গেছ ?” সুরেশ তাড়াতাড়ি অনুতপ্ত স্বরে কহিল, “আশ্চৰ্য্য অনিতা, আমি এ-কথাটা একেবারেই ভুলে গেছিলুম, তুমি বি-এ পড়। এমনি আমাদের সংস্কার—কখনও কোন মেয়ে যে এত পানি উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে তা যেন ভাবতেই পারি না। মনের ভুলে যদি কিছু অপরাধ করে থাকি, ত ক্ষমা করাে।” সুরেশকে এভাবে অনুতপ্ত হইতে দেখিয়া অনিতার ভারি হাসি পাইতেছিল। কিন্তু, পাছে তাহার হাসির অর্থ অন্ত রূপ বুঝিয়া সুরেশ আহত হয়, এই ভয়ে ভিতরের হাসি প্রাণ পণে দমন করিয়া সহজ ভাবে বলিল, “তুমি এমন কোন অপরাধ করনি যার জন্য এমন করে ক্ষমা চাইতে হবে। আমাদের মধ্যে শিক্ষার অভাব যখন অস্বীকার করা চলে না, তখন তা নিয়ে যদি কেউ ভুল করে, তা হলে তাকে দোষ দেওয়া যায় না। বরঞ্চ আমি যা জানতে চাইছি,
সুরমা
১০১
তা যদি না বুঝিয়ে দাও, তাহলে সত্যই আমি দুঃখিত হব।”
সুরেশ কিছুক্ষণ ভাবিয়া কহিল, “তুমি জানবার জন্য যখন
জিদ কচ্ছ, তখন আমি বলব এবং এর ফলাফলও আমি
মাথায় করে নেব। যাক্, তুমি জানতে চাইছ, স্ত্রীলােক
পুরুষের মত একজনকে ভালবেসে ভুলতে পারে কিনা।
এই না ?
তার উত্তর হচ্ছে,-তারাও ঠিক তেমনি ভুলতে
পারে। ঐ যে একটা কথা আছে—গ্রীলােক একবার ভাল
বাসলে আর ভুলতে পারে না এবং ওটাই হচ্ছে নাকি তাদের
সব—ও কথাটা শুনতেই ভাল এবং তা বলে বেড়াচ্ছে বেশী
কারা, জান ? পুরুষ-স্ত্রীলােক নয়। তার কারণ হচ্ছে-
সে জিনিষটা পুরুষের কাছে অত্যন্ত উপাদেয় । যখন-তখন
ব'লে বেড়ালে স্ত্রীলােকদের মনের মধ্যে এ কথাটা বদ্ধমূল হয়ে
যাবে এবং তাতে পুরুষের পরম লাভ। তারা চায়, স্ত্রীলােক
তাদের সারা জীবন প্রাণ ঢেলে ভাল বাসুক এবং তারা
ইচ্ছামত যা-তা করে বেড়াক। বলিয়া সুরেশ হাসিল।
অনিতা গভীর মনােযােগের সহিত শুনিতেছিল ; উত্তর
দিল না।
সুরেশ বলিতে লাগিল, “ এই বিশ্ব সৃষ্টির যে দিকেই চেয়ে
দেখবে, এই একই নিয়ম চলেছে। পুরাণো ভেঙ্গে নূতন হচ্ছে
পুরাণাে সৰ্বত্ৰ অনাদৃত। প্রকৃতি তার সৃষ্টির মধ্যে
পুরাণের স্থান কোথাও রাখেন নাই। মানুষ প্রকৃতির পথ
ধরে চলেছ। তুমি যদি দৃষ্টান্ত তুলে বল, অমুক স্ত্রীলােক
১০২
সুরমা
অমুক পুরুষকে সারা জীবন একভাবে ভালবেসে এসেছে, তা
হলে আমি তার উত্তর দেব,-সেটা নিয়ম
নয়,
নিয়মের ব্যতিক্রম।
তার কারণ আমি তােমায় দেখিয়ে দিচ্ছি। বিবাহের পর
স্বামী-স্ত্রী একমন, এক প্রাণ। কিন্তু, কত দিন? এক বৎসর
দু’বৎসর জোর তিন বৎসর কি চার বৎসর। তারপর দেখবে,
ছােট-খাটো গড়া চলছে। তার কারণ, দু'জন দু'জনের মধ্যে
আর নুতন খুজে পাচ্ছে না। তাই একে অন্যের থেকে
বিচ্ছিন্ন হতে চায়। অথচ, মজা দেখ, দাম্পত্য কলহ বলে
সত্যকার জিনিষটাকে কেমন করে তারা চাপা দিতে চায় ।
তারপর ক্রমে সেই ছােট-খাটো বিবাদ এমন বেড়ে ওঠে যে, অতি
তুচ্ছ কারণেও দু’জনে নিলজ্জের মত ছেলে-মেয়েদের সামনে
তুমুল কাণ্ড করে বসে।”
অনিতা তেমনি চুপ করিয়া রহিল। সুরেশও একটু চুপ
করিয়া থাকিয়া পুনরায় কহিতে লাগিল, “অথচ, আশ্চৰ্য্য এই
যে, মনকে তারা বিশ্লেষণ করেও দেখতে চায় না। ভিতরের
মন একে অন্যের প্রতি কতখানি বিমুখ হয়ে দাড়িয়েছে, ভুলেও
তারা সেদিকে দৃকপাত করে না। তখন যদি তারা কিছু দিনের
জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকে আবার মিলিত হয়, তখন দেখবে, কিছু
দিনের জন্য তাদের ঘর-সংসার বেশ শান্তিতে চলছে। তার
পর যেই সেই নূতনত্বটুকু কেটে গেল, অমনি সুরু হল তাদের
সেই কলহ। সুতরাং এটা প্রমান হয়ে গেল, মানুষের মন
চায় পেতে নূতনত্বের আস্বাদ। যে স্ত্রী দিনের পর দিন তার
সুরমা স্বামীর কাছে চির নূতন থাকতে পারবে, সেই-ই চিরকাল স্বামীর ভালবাসা সমান ভাবে পেয়ে আসবে। আর পুরুষের বেলাও ঠিক তাই। যে স্বামী তা’ পারবে, তার স্ত্রীর ভালবাসাও তেমনি সে পাবে। রঙ্গ মঞ্চে অভিনেতা-অভিনেতৃদের খুব ভাল লাগে, না? তার কারণ, এক অভিনেতা কিম্বা অভিনেতৃপ্রতিদিন নূতন নূতন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এক অভিনেতা কিম্বা এক অভিনেত্ যদি দিনের পর দিন একই ভূমিকায় রঙ্গমঞ্চে দেখা দেয়, তাহলে দু'দিন পরে কোন দর্শকই তার দিকে ফিরে চাইবে না। এই জন্যই এক বই বেশীদিন চলে না। মানুষ চায় নূতন জামা, নূতন জুতাে, নূতন সেমিজ, নূতন ব্লাউজ-সব নূতন। পুরানাে হলেই তাকে ফেলে দিয়ে, আবার নূতন করে পেতে চায়। বিশ্বজগতের এই হচ্ছে নিয়ম। কেবল স্ত্রীলােকদের ভালবাসার বেলায় এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে বলে ত মনে হয় । তবে, স্ত্রীলােকদের মধ্যে এটুকু তফাৎ দেখা যায়, তাদের মন অন্য দিকে গেলেও, দেহটাকে তারা সহজে নষ্ট করতে চায় না। তার কারণ, সতীত্বের প্রতি অসীম ভক্তি বলে নয়। তার কারণ, তাদের দেহের ভিতরকার গড়ন এমন যে, ইচ্ছা না থাকলেও, মাতৃত্বের গৌরবের জন্য, সন্তানের কল্যানের জন্য, তাদের ভাল থাকতেই হবে। যা এর বেশী বলতে গেলে জিনিষটা অত্যন্ত অশােভন হয়ে পড়বে।” বলিয়া সুরেশ হঠাৎ চুপ করিয়া গেল।
১০৪
সুরমা
এই সময় গাড়ী আসিয়া নিৰ্ম্মলের বাড়ীর সম্মুখে থামিল।
অনিতা তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া দ্রুতপদে উপরে উঠিয়া গিয়া
নিজের ঘরে শুইয়া পড়িল। তাহার দেহ-মন
ঝিম ঝিম
করিতেছিল। সুরেশও শরীর ভাল
সুরেশও শরীর ভাল না বলিয়া নির্মলের
সম্মতির অপেক্ষা না করিয়া বাহির হইয়া গেল। নিৰ্ম্মল আবিষ্টের
মত একবার অনিতা, একবার সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া
নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে নিজের ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল।
আট সে রাত্রে বড় জ্বালায় জ্বলিয়া সুরমা ভগবানের চরণে কাহিয়া কহিয়াছিল, “আর একটাবার যেন তার দেখ) পাই।” সেই দিন হইতে কেমন করিয়া যেন এ আশাটা তাহার হৃদয়- তলে একটা ক্ষীণ অথচ সুস্পষ্ট বঁশীর সুরেরমত অনুক্ষণ বাজিয়া উঠিতেছিল যে, তিনি একদিন আসিবেনই। অথচ, যখন দিনের পর দিন করিয়া মাস কাটিয়া যাইতে লাগিল; তিনি আসা দূরে থাকুক তঁাহার একটা সংবাদ পর্যন্ত কোন পথ ধরিয়া তাহার কাছে আসিয়া পৌছিল না, তখন বুক জোড়া নিরাশার দুঃখ লইয়া ব্যর্থ আক্রোশে নিজেকে এই বলিয়া বিধিতে লাগিল যে, সে অশ্যা, লাঞ্ছিতা, সমাজ-বিবর্জিতা—কেমন করিয়া তাহার মনে এই দুরাশা জন্মিয়াছিল যে, যাহার সঙ্গে তাহার এক দিনের বেশী সাক্ষাৎ লাভ ঘটে নাই, তিনি আসিবেনই। সে রাত্রের সমস্ত কথাগুলা তন্ন তন্ন করিয়া পৰ্যলােচনা করিয়া এমন কিছুই সে দেখিতে পাইল না যাহা হইতে তাহার এমন অসম্ভব আশা জন্মিতে পারে। বরঞ্চ, সে দিনের সেই কলহের কথা স্বরণ করিয়া হতাসের বেদনার ভারে হয় তাহার যতই তাজিয়া পড়িতে লাগিল ততই সে নিজেকে “বুদ্ধিহীনা, পাপিষ্ঠা, হতভাগী” বলিয়া কটুক্তি করিয়া তিরস্কার করিতে লাগিল। কিন্তু তথাপি, ৩ সুরমা সে দুরাশাটাও তাহার মনের কোণ হইতে নড়িয়া বসিতে চাহিল না। আবার এক এক সময় বিকট ভয়ে সর্বাঙ্গে কাটা দিয়া একথাটাও তাহার মনের কোণে উকি মারিতে লাগিল যে, যাহাকে দেখিবার জন্য, পাইবার জন্য মন তাহার দিগ্বিদিক- জ্ঞান শূন্য হইয়া ছুটিয়া চলিয়াছে, তিনি যদি ইহার কোন মূল্য না দিয়া, নির্মম উপেক্ষায় সমস্তটা বিদ্রুপ করিয়া উড়াইয়া দিয়া যান, তাহা হইলে তাহার এ পােড়া মুখ কোথায় গিয়া লুকাইয়া রাখিবে ! এই সময় চোখের জলে তাহার দৃষ্টি ঝাপসা হইয়া উঠে। প্রত্যুষে উঠিয়া নিভৃতে ভগবানের চরণে হৃদয়ের ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়া দিতে গিয়া হয়ত এক ফোটা চোখের জল তাহার গণ্ড বহিয়া নীচে পড়িয়া অদৃশ্য হইয়া যায়। সংসারের যাবতীয় কাজ-কৰ্ম্ম করিতে গিয়া এক সময় তন্ময় হইয়া সে সুরেশের কথা ভাবিতে থাকে। দুপুর বেলা বই পড়িতে বসিয়া চোখের জল আর কিছুতেই সে সামলাইতে পারে না। রাত্রিতে দরজায় খিল দিয়া জানলার পাশে বসিয়া, যতদূর সৃষ্টি যায়, চোখ মেলিয়া বসিয়া থাকে। সহসা দ্বারের সম্মুখে জুতার শব্দ হইলে ছুটিয়া দরজা খুলিতে গিয়া সে কিয়া দাঁড়ায় । তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া ফিরিয়া আসিয়া পূর্বস্থানে চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। শেষে গভীর রাত্রে শয়ন করিতে গিয়া দেখে, তাহার চোখ-মুখ অকতে ভিজিয়া গিয়াছে।
সুরমা
১০৭
মাস দুই পরে এক দিন সকালে উঠিয়া সুরমার মনে হইল,
এ জীবনে যেন তাহার আর কিছুই করিবার নাই, সমস্ত একবারে
নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে। তাই, ঘর ছাড়িয়া বাহিরে আসিতে
পৰ্যন্ত তাহার আর একতিলও ইচ্ছা রহিল না। অথচ, এমন
করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতেও মন তাহার চাহিল না।
উঠিয়া-বসিয়া, ঘর-বার করিয়া এক সময় স্নান-আহার, করিল।
তারপর ধীরে ধীরে শয়ন কক্ষে প্রবেশ করিতে গিয়া আশ্চৰ্য্য
হইয়া দেখিল, প্রফুদ্ধ কখন আসিয়া তাহার পুস্তকের ছােট
আলমারিটির সম্মুখে দাঁড়াইয়া চুপ করিয়া বইগুলি দেখিতেছে।
সহসা পদ শব্দে মুখ ফিরাইতেই সুরমাকে দেখিতে পাইয়া
প্রফুল্ল হাসিয়া কহিল, “বৌদির যে এত পুথি-পত্ৰ আছে, তা ত
নতুম না !”
সুরমা ঘরের ভিতর ঢুকিয়া প্রফুল্পকে তাহার পাশে বসাইয়া
একটু ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল, “তা হলে বল, তুমি আমার
অন্য সব জিনিষেরই অনুসন্ধান পেয়েছ। কেবল বইগুলির
পাওনি বুঝি ?"
‘সন্ধান তােমার কিছুই পাইনি বৌদি, তা সে বইয়ের
হােক কি অন্য কিছুই হোক।”
সুরমা তেমনি কৰুণ কণ্ঠে কহিল, “তা হ'লে ঠাকুর পো
তুমি কি বলতে চাও, আমার সমস্তটাই একটা রহন্তে আবৃত ?”
প্রফুর তাড়াতাড়ি বলিল, “তুমি যে জটিল একটা কিছু
তা মনে হয় না। অথচ, অনেক চেষ্টা করেও তােমাকে
sob
সুরমা
ঠিক
বুঝে
উঠতে পারিনি। এটাতেই আমি অনেক সময়
আশ্চৰ্য্য হই।”
“ আমাকে কেন বুঝে উঠতে পারনি, কার কারণ আর
একটু ভাল করে তলিয়ে দেখলে, আশ্চর্য হবার আর কোন
কারণ থাকবে না ঠাকুরপাে।” বলিয়া সুরমা উঠিয়া গিয়া
একটা পা আনিয়া প্রফুল্লর হাতে দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ আজ
হঠাৎ এ সময় কি মনে করে ঠাকুরপাে?”
“হঠাৎ কিছু মনে করে না, বৌদি। এ পথ দিয়ে যাচ্ছি-
লুম। মনে করলুম, অনেক দিন আসিনি, এক বার দেখা করে
যাই।
সিড়ি দিয়ে উঠে দেখি, তােমার বাবার ঘরটা তালা
দিয়ে বন্ধ।
মনে করলুম, তুমি শােবার ঘরে আছ । ধরে
ঢুকেই প্রথম নজর পড়ল তােমার ঐ ছােট্ট জিনিষটির উপর।”
বলিয়া সুরমার দিকে তাল করিয়া চাহিয়া প্রফুল্ল অত্যন্ত বিস্মিত
হইয়া কহিল, “ একি বৌদি, তােমার অত গয়না গেল কোথায় ?
হাতে দু’গাছা ক'রে চুড়ি আর গলায় ঐ ছােট্ট সরু হারটি ছাড়া
যে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে?”
সুরমা একটা নিখাস চাপিয়া আস্তে আস্তে বলিল, “একটু
আগেই ত বলছিলে, আমার কিছুই বুঝে উঠতে পারনি ।
“ হয়ত বুঝতে পারতুম। কিন্তু যতই তােমার পূর্ব-ইতিহাস
জানতে চেয়েছি ততই সে প্রসঙ্গ তুমি চাপা দিয়েছ। তােমার
এখানে ঐ দাদাটির সঙ্গেও কম দিন আসিনি; একটি একটি
করে অনেক কথা ও অনেক দিন জিজ্ঞাসা করেছি। কিন্তু,
;
সুরমা
কি হবে
তুমি তার কোন সদুত্তর দাও নি বৌদি। যতই তােমার জীবনের
ভিতর ঢুকতে চেয়েছি ততই তুমি তার দ্বার দু’হাতে বন্ধ করে
ধরেছ। রাস্তাই, যদি না পেলুম তাহলে ভিতরের জিনিষের
সন্ধান কি করে পাব বল ?”
সুরমা কিছুক্ষণ প্রকুল্পের দিকে চাহিয়া থাকিয়া নিখাস
ফেলিয়া বলিল, আমার জীবনের ইতিহাস জেনে
জেনে
ঠাকুরপাে? তুমি কবি, হয়ত তােমার শুধু দুঃখই বাড়বে।”
প্রফুল্ল দুই হাত একত্র করিয়া কহিল, “ আমাকে অত বড়
আখ্যা দিও না বৌদি। না না, আমি কবি ও নই, সাহিত্যিকও
নই। তবে দরদ দিয়ে পরের দুঃখ বুঝে, তা নিবারণ করতে
চেষ্টা করি; এই মাত্র।”
প্রশ্নের ভাব দেখিয়া সুরমার মুখে হাসি আসিয়া পড়িল ;
কহিল, তােমাক কবি বলতে অমন করে উঠলে কেন ঠাকুর
পাে?”
“তার কারণ, তারা অত্যন্ত বড় লোক। তাদের আমি
দূর থেকেই নমস্কার করি। তার কল্পনাতে যেমন করে
দুঃখীর দুঃখ বুঝে বইতে লিখে যান, তেমন করে তারা যদি
সত্য সত্যই পর-দুঃখ মােচন করতে তৎপর হয়ে উঠতেন, তা
হলে ঐ উপরের স্বর্গটা আজ মর্তে নেমে আসত। অতএব
তাদের কথা ছেড়ে দিয়ে, যা কল্পনা নয়, যা সত্যি-সেই তােমার
জীবনের ইতিহাসটা যদি বল, তাতে তােমার ঢের বেশী কাজ
হবে।”
-,
সুরমা
“এ পােড়। জীবনের ইতিহাস জেনে তােমার এমন কি
কাজ হবে তাই ?”
“না এনে, আগে থেকে ত কিছু বলতে পারব না বৌদি।”
সুরমা কিছুক্ষণ মােন থাকিয়া আদ্র কণ্ঠে কহিল, “তুমি
যখন ওদের সঙ্গে এসে আমােদ-প্রমােণ, ঠাট্টা-তামাসার
মধ্যে একএক বার আমার কথা জানতে চাইতে তথন প্রথম
প্রথম আমার ভারি রাগ হত। কিন্তু, কিছু দিন পরে তােমাকে
যতই বেশী করে দেখতে লাগলুম ততই তােমার ভিতরটা
আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে আসতে লাগল। দেখলুম, তুমি ওদের
অনেক উপরে। তখন আবার তােমার উপর অন্য ভাবে রাগ
হতে লাগল। মনে মনে কত দিন গাল দিয়েছি, কেন তুমি
ওদের সঙ্গে মিশে এমন কুস্থানে আস ! মনে হত, তােমার
কাছে আমার সমস্ত কথা বলে তােমাকে এখানে আসতে
নিষেধ করে দি। কিন্তু, কেমন যেন একটা লজ্জা এসে সব
গােলমাল করে দিত।” বলিয়া সুরমা সহসা চুপ করিয়া
গেল।
প্রফুল্ল মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিল, সুরমার চক্ষু ছল ছল
করিতেছে। নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “থাক বৌদি, বুঝতে
পাচ্ছি, তােমার ওকথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আজকে থাক,
আর এক দিন না হয়”
অশ্রু বিকৃত কণ্ঠে সুরমা তৎক্ষণাৎ কহিল, “না ঠাকুরপো,
আর একদিন নয়। আজই তােমার কাছে সব বলব।
সুরমা ১১১ বই। যে বই গুলি দেখতে পাচ্ছ, ওগুলি আমার ছাত্রজীবনের এলাহাবাদ থেকে এণ্টেন্স পাস করে আই, এ পড়তে কলকাতায় আলি। সঙ্গে সঙ্গে তিনিও এলেন। এন্টেন্স পরীক্ষার পর যে বিষ মনের মধ্যে ঢুকল, তা, আর বার করতে পারলুম না। বিয়ে করবেন আশা দিয়ে বােডিং থেকে লুকিয়ে বার করে নিয়ে এলেন। তার পর-সুরমা আ” বলিতে পারিল না। একটা অদম্য বাষ্পেচ্ছস ক পৰ্য্যন্ত ফেনাইয়া উঠিয়া তাহার বা রােধ করিয়া ধরিল। প্রকুল্পের চক্ষুও আদ্র হইয়া উঠিল সে সুরমার একখানি হাত নিজের হাতের মধ্যে লইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। কিছুক্ষণ দু’জনে মৌন থাকিয়া চক্ষু মুছিয়া সুরমা বলিতে লাগিল, “তারপর এক রাত্রে আমার সর্বনাশ করে দিয়ে সেই যে পালালেন, আর ফিরলেন না। তখন আর বুঝতে বাকী রইল না, ঠাকুর পাে, আমার কপাল চির দিনের এ ভেঙ্গেছে। তবুও, আশায় আশায় কিছুদিন কাটালুম। তার পর সত্য-সত্যই যে দিন দেখতে পেলুম, পৃথিবীর সমস্ত দুয়ার আমার সামনে বন্ধ সে দিন মনে হ’ল, কে যেন তপ্ত সাড়াশি দিয়ে আমার হৃদপিণ্ডটা ছিড়ে বার করে নিলে। কিন্তু, এমন হত- ভাগী আমি-আমার মৃত্যু হল না।” বলিতে বলিতে সুরমা -হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। তেমনি অবিকৃত ক জোর করিয়া বলিতে লাগিল, “অজ্ঞান হয়ে ৭ দিন কাটালুম। তার পর ধীরে ধীরে যা দেখতে পাচ্ছ, তা হ'য়ে দাড়ালুম। মন থেকে
১১২
সুরমা
সমস্ত স্নেহ মমতা, ভালবাসা জোর করে বার করে দিয়ে মনে
করলুম, যখন নেমেছি, তখন রসাতল পৰ্য্যন্ত নামব। কিন্তু,
পারলুম কৈ, ঠাকুর পাে?” বলিয়া বিছানার উপর লুটাইয়া
পড়িয়া * পিয়া কাদিতে লাগিল।
প্রফুজ স্তব্ধ হইয়া শুধু ঐ লুষ্ঠিতা, বেদনাবিদ্ধ রমণীর দিকে
চাহিয়া হিল। এমন একটা কথাও আজ সে খুঁজিয়া পাইল
, যাহা দিয়া সে এই হতভাগিণী নারীর অপরিসীম বেদনার
কিছুমাত্র লাঘব করিতে পারে। তাই, চুপ করিয়া শুধু
সুরমার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। রুমাল বাহির করিয়া
যতবারই নিজের চোখ দু'টা মুছিতে লাগিল ততবারই
তাহা আ হইয়া উঠিতে চাহিল।
বহুক্ষণ পরে সুরমা ধীরে ধীরে উঠিয়া আঁচল দিয়া চক্ষু
দুটি মুছিয়া লইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। প্রফুলও
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল,
“আচ্ছা, এলাহাবাদে তােমার বাবা কি ডাক্তারি করতেন?
তােমার নাম কি ছেলে বেলায় সুনীতি ছিল ? তােমার বাবার
নাম কি গোবি”
সুরমা সহসা দু'হাত দিয়া প্রফুরে মুখ চাপিয়া ধরিয়া
মাথা নীচু করিয়া রহিল।
প্রফুল্ল সস্নেহে সুরমার হাত দু’থানি নিজের হাতের মধ্যে লইয়া
বহুক্ষণ পর্যন্ত সুরমার দিকে এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিল। তারপর
সহ দুই বাহ বাড়াইয়া সুরমাকে নিজের বুকের কাছে টানিয়া
যুর
১১৩
লইয়া কহিল, “সুরে, তুমি ত আমার বৌদি নও; তুমি যে
আমার বােন। মনে পড়ে, তােমার সেই গরীব প্রফুল্লদাকে ?”
আজ বিশ্ব প্রায় অতীতের দিকে চাহিয়। সুরমার অনেক
কথাই মনে পড়িল। ছেলে বেলায় প্রফুল্ল তাহাদের বাড়ীতে
আসিলে, কথা বলা দূরে থাকুক, গরীব আত্মীয় মনে করিয়া
ভাল করিয়া চাহিয়া পর্যন্ত দেখিত না। কিন্তু, আজ সেই
প্রফুল্লই তাহার লাঞ্ছিত জীবনের দুর্বিসহ দুঃখের অংশ লইয়া
তাহাকে তুলিয়া ধরিতে চেষ্টা করিতেছে মনে করিয়া তাহার
বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। প্রচুল্লের স্নেহালিঙ্গন হইতে ধীরে
ধীরে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া হেঁট হইয়া প্ৰফুল্পের পায়ের
ধূলা মাথায় লইয়া সুরমা তাহার পায়ের কাছে স্থির হইয়া বসিল।
প্রফুল্ল তাড়াতাড়ি দু'হাত দিয়া তাহাকে তুলিয়া লইয়া
নিজের একান্ত সন্নিকটে বসাইয়া বলিল, “আমার কাছে আজ
আর কিছু গােপন করো না, বােন। আজ তোমায় দেখে,
তােমার কথাবার্তা শুনে আমার মনে হচ্ছে, সুরো, তুমি যেন
সত্যই কাউকে ভাল বেসেচ।"
সুরমা অবনত মস্তকে কি যেন ভাবিতে লাগিল। তারপর
মুখ তুলিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “না প্রফুল্ল দা, তােমায়
কাছে আজ আর কিছুই লুকোবে না।” বলিয়া এক মুহুর্ত
চুপ করিয়া থাকিয়া পুনরায় কহিল, “ঐযে, সেদিন মটরের
দুর্ঘটনার কথা বলেছিলুম। সে দিন যিনি আমায় বাড়ী পৌছে
দিয়ে গেছিলেন-” বলিয়া সুরমা হঠাৎ চুপ করিয়া গেল।
১১৪
সুরমা
প্রফুল্ল ক্ষণকাল ভাবিয়া
ভাবিয়া বলিল, “তােমায় কি সেদিন
সুরেশ পৌছে দিয়ে গেছিল ?”
সুরমার বুকের ভিতরটা ধড়াস করিয়া উঠিল। তৎক্ষণাৎ
মূপ তুলিরা অত্যন্ত ব্যগ্র ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি তাকে
চিনলে কি করে ? আর
একথা জানলেই বা
কাছ থেকে ?”
“সে যে আমারও বস্তু, যােন। আমরা সিটি কলেজে এক
সঙ্গেই পড়তুম। কিছু দিন হ’ল কথায় কথায় মটরের ঐ
ঘটনার কথা উঠতে, সে তােমার নাম করে দু’একটা কথাও
বলেছিল। আমি তখন খেয়াল করিনি; এখন দেখছি, সেটাই
আমার মস্ত ভুল হয়ে গেছে।”
“তখন খেয়াল করলে, কি করতে প্রফুল্প দা
“আর কিছু না করতে পারলেও, এটা করতে পারতুম,
তােমাকেও এত কষ্ট পেতে হতনা; সেও এমনি করে নষ্ট হয়ে
যেত না।”
সুরমা শঙ্কিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তার কি হয়েছে দাদা ?”
“তার যা হয়েছে তা শুনলে কি তুমি সহ
পারবে কেন ?”
সুরমা অসহিষ্ণু ভাবে কহিল, “তােমার দুটি পায়ে পড়ি
প্রফুল্লাশীগগির বল, তার কি হয়েছে।”
“তোমাকে যে রাত্রে এখানে পৌঁছে দিয়ে যায় তার দিন
দুই পরে সে বর্ধমানে চলে যায়। তারপর এখানে এসে যায়
সুরমা
য
মাঝে তার বন্ধু নিৰ্ম্মলের বাড়ী যেত, আর সন্ধ্যাবেলা
খেয়ে ঘুরে বেড়াত। কেউ নেই যে একটু যত্ন করে, বাধা
হাতে অনেক পয়সা, তাই সঙ্গী-সাথীরও অভাব নেই।'
বলিয়া প্রফুল্ল সুরমার মুখের দিকে চাহিল ।
সুরমা . অত্যন্ত অধীর হইয়া বলিল, “বলনা দাদা, চুপ
করে গেলে কেন ?"
“সে দিন সকাল বেলা গিয়ে দেখি, এ পাল ভিখিরী জুটিয়ে
টাকা বিলিয়ে দিচ্ছে। সুরেশ যাই করুক, এদিকে মনটা
তার খুব উচু কি না। সুরেশ না থাক্লে, তােমার প্রফুদার
কলেজে পড়া দূরে থাক, খেতে না পেয়ে মরে সে এতদিনে ভূত
হয়ে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু, যাক সে কথা। আমাকে দেখতে পেয়ে
বলে, এসহে প্রফু, মদ খাওয়া যাক' বলে সত্য সত্যই সেই
সকাল বেলা মদ সুরু করে দিলে। আমি নিষেধ করলুম ;
ন্তু সে ক্ষেপও করল না।”
সুরমা কিকত কণ্ঠে কহিল, “তুমি শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে
দেখলে বুঝি ! এদের বােতলটা কেড়ে নিতে পারলে না?”
প্রফুল্ল একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “তা হয়ত তুমি
পারতে বোন। তাই বলছিলুম, সে এমন করে নষ্ট হয়ে
যেত না। যা, তারপর কথায় কথায় শুনলুম, কয়েকদিন
হল নিল আর তার বােনের সঙ্গে, কি জানি কি নিয়ে,
ঝগড়া করে সে দিন-রাত ম খাচ্ছে আর টাকা নষ্ট কচ্ছে।
আছে পানাহার, না আছে নিদ্রা। এরকম করে কত
১১৬
সুরমা
দিনই বা বাঁচবে। সে রূপও নেই, সে ৰাস্থ্যও নেই। দেখলে
চোখে জল আসে।” বলিয়া হাতের কোণে চোখ মুছিল।
সুরমা কাদিয়া ফেলিয়া বলিল, “তাকে আজ একটি বার
এখানে আনতে পারবে দাদা?”
‘আনতে পারব না কেন বােন ! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তােমাদের
কি উপায়া যে করব তা ত ভেবে পাইনে।”
“তােমার অত ভাবতে হবে না দাদা! তুমি শুধু তাকে
একটিবার এখানে আনবে। বল, আনবে।”
‘‘আনব রে, আনব। তােকে এত ব্যস্ত হতে হবে না।”
সহসা সুরমার একটা কথা মনে পড়িয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“নিৰ্ম্মল বাবুর বােনের নাম কি দাদা ?”
নিতা।”
সুরমা চিন্তা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে ইতস্ততঃ
করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তার মামার বাড়ী কি এলাহাবাদে ?”
প্রফুর বিস্মিত
হইয়া প্রশ্ন করিল, “তুই তাকে
চিনিস নাকি?”
“যদি সেই অনিতা হয়, তা হলে চিনি বইকি। আমরা
এক স্কুলে পড়তুম; কিন্তু সে আমার এক ক্লাস নীচে পড়ত।
ছেলে বেলায় কত দিন ত টিফিনের সময় দু’জনে পালিয়ে বাড়ী
চলে আসতুম।”
এই সময় প্রফুর নিজের হাত ঘড়িটা দেখিয়া কহিল, “তিনটে
বাজে। আর না, এখন উঠি আমরা।”
সুরমা
১১৭
সুরমা তাড়াতাড়ি । বলিল, “তোমার সেই কথাটা মনে
আছে ত ?
আছে রে পাগল।।” বলিয়া প্রফুল্ল ছাতিটা লইয়া বাহির
হইয়া পড়িল ।
সুরমা সিড়ি পর্যন্ত আসিয়া আর একবার
করাইয়া দিয়া ধীরে ধীরে
বলে
ফিরিয়া
আসিল।
একবার উন্ধে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া যুক্তফয়ে
ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম করিল। তার পর মুখ ফিরাইয়া
বাহিরের দিকে চাহিতেই কয়েক ফোঁটা অঞ্জ টপ, টপ, করিয়া
ঝরিয়া পড়িল।
স্মরণ
নয় ; সেই রাত্রে অনিতাকে পৌছাইয়া দিয়া সুরেশ সােজা বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া, না-খাইয়াই শুইয়া পড়িল,আহারে তাহার কিছু মাত্র প্রত্তি ছিল না। শয্যা গ্রহণ করিল বটে; কিন্তু সুস্থ চিত্তে নিদ্রাও যাইতে পারিতেছিল না। অনেক রকম চিন্তা তাহার মনের মধ্যে আনা-গোনা করিয়া গেল। অথচ, বিশেষ কোন একটা চিন্তার উপরও মন তাহার স্থির থাকিতে চাহিল না। বহুক্ষণ পৰ্য্যন্ত চিন্তা করিয়া ইহাও সে ঠিক করিতে পারিল না, কিসের উদ্দেশ্যে চঞ্চল মন তাহার ছুটিয়া মরিতেছে। অনিতার কথা মনে পড়ে; কিন্তু তাহাতে কেন যেন আজ আর সে শান্তি পায় , সুখ পায় না। হঠাৎ একবার হয়ত সুরমার কথা মনে পড়িয়া যায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই মন তাহার ব্যাকুল হইয়া উঠে। কিন্তু, তখনই নিজেকে এই বলিয়া তিরস্কার করে যে, ইহা অত্যন্ত অন্যায়, গহিত। অথচ, যাহাতে সে আনন্দ পায় তাহাও যে তাহার মনের পিছন ছাড়িতে চায় না। এমন করিয়া একবার অনিতা, একবার সুরমা তাহাকে যেন অহির করিয়া তুলিল। কিছুক্ষণ পরে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া শূকক্ষটার চারিদিকে চাহিয়া সহসা তাহার দুই চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। একটা দুঃসহ ব্যথার ভারে বুক যেন তাহার &িড়য়া পড়িতে চাহিল। মনে মনে কহিল, এমন ক': আর পারিবে, আর পর.ন।
সুরমা
রাত্রির অপরিপূর্ণ নিদ্রা ভাঙ্গিতেই প্রপীড়িত মন তাহার
নিজেকে এই প্রশ্নটাই করিল, এখন কি করা যায় ? তার পর
মনে হইল, কিছুই করা যায় না। এই কথাটা মনে হইতেই
সে তাড়াতাড়ি লাঠিটা লইয়া নিঃশব্দে বাহির হইয়া পড়ি
এবং শূন্য মনে বহুক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইয়া দুপুর বেলা বাড়ী
ফিরিয়া আসিল। তারপর সন্ধ্যা বেলা বন্ধুরা জুটিলে এ
ভরিয়া মদ খাইয়া মাতাল হইয়া ঘুমাইয়া পড়িল।
এমন করিয়া অসময়ে খাইয়া, ঘুইয়া এবং সন্ধ্যা বেলা
মদ খাইয়া সুরেশ কিছুদিন কাটাইল । তারপর এক দিন সকাল
বেলা নিৰ্ম্মলের বাড়ী আসিয়া উপস্থিত হইল। নির্মল একবার
মাত্র সুরেশের দিকে চাহিয়াই পুনরায় খরবের কাগজে মন দিয়া
গল্পীর কণ্ঠে কহিল, “এত ভাের বেলা সুরেশ কি মনে করে ?”
সুরেশ মনে মনে বিস্মিত হইয়া একটু হাসির চেষ্টা
করিয়া বলিল, “মনটা ক'দিন ধরে ভাল নেই, তাই তােমাদের
দেখতে এলুম।” বলিয়া এক খানা চেয়ার টানিয়া বসিল।
নিৰ্ম্মল গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ পড়িতে লাগিল; কথা
কহিল না।
সুরেশ নিৰ্ম্মলের মুখের দিকে চাহিয়া একটু ও হাসি
হাসিয়া বলিল, “কি হে নিৰ্ম্মল, তােমাকে আজ এত অসন্তু
গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন? কথা বলবে না নাকি আমার সঙ্গে ?”
নিৰ্ম্মল কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সহসা খবরের কাগজটা
একপাশে ঠেলিয়া রাখিয়া সুরেশের দিকে ফিরিয়া কক কঠে
মরমা
কহিল, “তােমার সঙ্গে কথা না বলাই উচিত। মনে করেছিলুম
ওকথা আর তােমাকে বলব না। তােমাকে নিজের ভাইয়ের
মত স্নেহ করতুম বলে নীরবে তােমার অনেক অনাচার সহ
করে গেছি। কিন্তু এখন দেখছি, তুমি তার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।”
সুরেশ একটু ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল, “হঠাৎ তােমার
মেহের এতটা অনুপযুক্ত হয়ে উঠলুম কি করে ?”
নির্মলের সহজে রাগ হয় না, কিন্তু সুরেশের কথা গুলি
আজ ব্যঙ্গোক্তি মনে করিয়া ক্রোধে তাহার দুই চক্ষু রক্তবর্ণ
হইয়া উঠিল এবং কুদ্ধকণ্ঠে কহিল, “মনে করােনা, তােমার
কোন কথা আমি শুনতে পাই নি। সে রাত্রে তুমি হােটেলে কত
গুলি হতভাগা জুটিয়ে যে কাণ্ড করে এসেছ, তাতে তােমার
না না হতে পারে ; আমাদের কিন্তু তাতে মাথা কাটা যায়।
তাও না হয় সহ করতে পারতুম। কিন্তু, তুমি এত নীচ হয়ে
গেছ যে, প্রকাশ্য দিনের বেলা বেশ্যা নিয়ে মাতামাতি করতে
তােমার লজ্জা হওয়া দূরে থাক, তুমি তাতে
বরঞ্চ গৌরব
অনুতব কচ্ছ।” বলিয়া হঠাৎ খাড়া হইয়া উঠিয়া নিৰ্ম্মল
ঘরের মধ্যে পায়চারি করিতে লাগিল।
সুরেশ কিছুক্ষণ চেয়ারের একটা হাতলের উপর মাথা
রাখিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তার পর একটা দীর্ঘ
নিশ্বাস ফেলিয় ধীরে ধীরে মাথা তুলিয়া বলিল, “তুমি কি
এসব চোখে দেখেছ, না শুনেছ ? তােমার শেষ কথা গুলি কি
তুমি নিজেই বিশ্বাস কর নির্মল ?
১২১
নির্মল সুরেশের দিকে না চাহিয়াই তিক্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
তােমার আর সাধু সাজতে হবে না সুরেশ। যারা দেখেছেন
তারা আমার
কাছে মিথ্যা বলবার লােক নন। যাক তােমার
সঙ্গে আমি আর কথা কাটাকাটি করতে চাইনে। তুমি দয়া
করে আমার বাড়ীতে এসে অনিতার সঙ্গে আর দেখা করােনা।
আমি বিশ্বাস করে তােমার হাতে অনিতাকে ছেড়ে দিয়েছিলুম।
কিন্তু তুমি তার খুব প্রতিদান দিলে !”
ক্ষণকাল স্তব্ধ থাকিয়া সুরেশ উঠিয়া দাঁড়। মা শান্ত অথচ দৃঢ়
কণ্ঠে কহিল, “নিশ্মল, আজ যখন অন্যের কথা শুনে আমাদের এত
দিনের বন্ধুত্বের কোন মর্যাদাই রাখলে না, তখন তার দাবী করে
আর তোমাকে কোন কথা বলতে চাইনে। শুধু এ কথাট
বলতে চাই, আমি ইচ্ছা ক'রে কখনও তোমার বােনের সঙ্গে
মিশতে চেষ্টা করিনি। তুমি আমায় ভালবাসা বলেই কে
আমার সঙ্গে মিশতে দিতে। আমি যে ভাল নই, সে ও তুমি
জানতে ভাই। তা ছাড়া, আমার কোন কথাই তোমার কাছে
গােপন করিনি। কি ঘটেছে না ঘটছে, তা আমি বলতে
চাইনে। আজ যখন তোমার বিশ্বাস হয়েছে যে, আমি অ্যন্ত
নীচে নেমে গেছি এবং আমার দ্ব! সব সস্তা তখন আমিও
তােমাদের কাছ থেকে চির দিনের জন্য নিখ লুম।”
এই সময় গােলমাল শুনিয়া অনিতা আসিয়া নির্যকে
জিজ্ঞাসা করিল, “কি হয়েছে দাদা ?”
বলিয়া বুয়েণের
মুখের দিকে চাহিয়া চমকিয়া উঠিয়া চুপ করিয়া গেল।
১২২
সুরমা
সুরেশ বলিতে লাগিল, “কোন দিন, কোন ছলে তােমাদের
এখানে আর আসতে চেষ্টা করব না।” বলিয়া অনিতার উদ্দেশে
কহিল, “আজ তুমি-আপনি আমায় ক্ষমা করবেন। আপনি
হয়ত জানেন না যে, আমি ভাল নই। আমার সঙ্গে মেশা
দূরে থাক কোন ভদ্রমহিলারই আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলা
উচিত নয়, একথাটাও আজ আপনাকে আমি বলে দিয়ে যেতে
চাই। কৃত্রিমতা আমি জানিনে এবং নিজেকে সাধু বলেও
কখনও প্রচার করতে চেষ্টা করিনি। নিৰ্ম্মল আজ না বলে,
হয়ত আমিই এক দিন সব বলতুম। যাক, ওকথা যখন শেষ
হয়ে গেছে, তখন আর আমার কিছু বলবার নেই। অপরাধ
যদি কিছু করে থাকি-ক্ষমা করবেন।” বলিয়া দুই হাত
একত্র করিয়াই সুরেশ তাড়াতাড়ি নীচে নামিয়া বাহির
হইয়া গেল।
অনিতা আচ্ছন্নের মত সে দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া
হাত বাড়াইয়া একবার সামনের দরজাটার কপাটটা ধরিতে চেষ্টা
করিল। পরক্ষণেই টলিয়া নিজের ঘরের মধ্যে
মধ্যে ঢুকিয়া
বিছানার উপর লুটাইয়া পড়িল।
সে দিন হইতে সুরেশ সকাল বেলা মদ ধরিল ; কিন্তু বাড়ীতে
খাইত না।
সারা দিন মদ খাইয়া ঘুরিয়া বেড়াইয়া সন্ধ্যাবেলা
বাড়ী ফিরিয়া বন্ধুদের সঙ্গে আবার মদ সুরু করিয়া দিত ;
তারপর অজ্ঞান হইয়া ঘুমাইয়া পড়িত। এক এক দিন হয়ত সে
ভিখারী, অন্ধ-খঞ্জ জুটাইয়া পকেটে যাহা থাকিত বিলাইয়া দিত।
সুরমা
১২৩
৭।
এমন করিয়াও কিছু দিন চলিল—কেহ বলিবার নাই,
বাধা দিবার নাই। তার পর এক দিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গতেই
সুরেশ মনুয়াকে ডাকিয়া কহিল, “মনুয়া,
“মনুয়া, সােডা নিয়ে
আয় ।
মনুয়া নড়িল না, দরজার আড়ালে চুপ করিয়া দাড়াইয়া
রহিল। দেরী দেখিয়া সুরেশ ধমক দিয়া কহিল, “যা শীগগির
সােডা নিয়ে আয়।”
মনুয়া কাদিয়া ফেলিয়া বলিল, “সকাল বেলা সােডা কি
হবে বাবু ?"
মনুয়া অনেক দিনের চাকর। এক বৎসর বয়সে তাহার
পিতার সঙ্গে পশ্চিম হইতে আসিয়া অবধি এ বাড়ীতেই আছে।
পাঁচ বৎসর বয়সে তাহার পিতার মৃত্যু ঘটিলে সুরেশের সঙ্গে
সঙ্গে ঘুরিয়া, হুকুম তামিল করিয়া, ধমক খাইয়া, প্রহার
খাইয়া আজ সতের বৎসর কাটাইয়াছে। তাই, সন্ধ্যার ব্যাপারটা
যদিও সে কোন মতে সহিয়াছিল; কিন্তু সুরেশের যখন আজ
সকাল বেলাই ঐ দ্রব্যের ইঙ্গিত করিয়া সােডা চাহিয়া বসিল
তথন মনুয়ার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল ।
সুরেশ টলিয়া উঠিয়া রাত্রির ঢাকা দেওয়া মাসটা ধরিতে
যাইতেছিল; কিন্তু হাতের ঠিক ছিল না বলিয়া পাকা লাগিয়া
গ্লাসটা নীচে পড়িয়া চুরমার হইয়া গেল। মনুয়া তাড়াতাড়ি
ছুটিয়া আসিয়া কাচের টুকরা গুলি কুড়াইতে লাগিল। সুরেশ
ছুসে দিকে কিক্ষণ চাহিয়া রহিল । তারপর একটা নিশ্বাস
।
১২৪
সুরমা
ফেলিয়া বলিল, “মাথা তুলিতে পাচ্ছি না রে মনুয়া। শীগগির যা
দৌড়ে-সােডা নিয়ে আয়।”
তথাপি মনুয়া নড়িল না। নিঃশব্দে উড়াইয়া রহিল।
মনুয়ার ভাব দেখিয়া সুরেশ শুষ্ক হাসি হাসিয়া কহিল, “তুই
সােডা না এনে দিলেই আমাকে বাঁচাতে পারবি মনে করেছিস!
আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় কচ্ছেরে বড়। ও না খেতে
পেলে এখুন মরে যাব।” বলিয়া সুরেশ মনুয়ার দিকে একটা
করুণ দৃষ্টিতে চাহিল।
সুরেশের শুষ্ক, করুণ মুখের দিকে চাহিয়া মনুয়ার চোখের
জল আর থামিতে চাহিল না। চক্ষু মুছতে মুছতে বাহির
হইয়া গিয়া সােডা আনিয়া দিয়া এক পাশে দাড়াইল।
সুরেশ উঠিয়া বসিয়া এক পাত্র ঢালিয়া লইয়া এক চুমুকে
নি:শেষ করিয়া ফেলিল। তার পর উপরি উপরি আরও
দুই পাত্র শেষ করিয়া আরও এক পাত্র ঢালিতে যাইতেছিল।
মনুয়া সহসা ছুটিয়া আসিয়া সুরেশের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া
কাদিয়া কহিল, “আর খাবেন না বাবু; তা হলে আপনি আর
বাঁচবেন না।” বলিয়া সুরেশের পায়ের উপর মাথা রাখিয়া
কাঁদিতে লাগিল।
সুরেশ আস্তে আস্তে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া মনুয়ার
মাথার উপর ডান হাত রাখিয়া কিছুক্ষণ তাহার দিকে চাহিয়া
রহিল। তার পর টলিয়া উঠিয়া গিয়া জামা গায়ে পরিয়া
কহিল, “মনুয়, একটা গাড়ী-জলদি।”
সুরমা
গাড়ী আসলে সুরেশ চড়িয়া বসিযা কহিল, “শ্রীরামপুর।*
কিন্তু, কিছুদূর যাইতে না যাইতেই মত বদলাইয়া একটা নম্বর
বলিয়া দিয়া হে পিকে চালাইতে বলল।
সেই
প্রায় মিনিট পােনের পরে গাড়ী আসিয়া একটা বাড়ীর
সম্মুখে দাড়াইল। ড্রাইভার কহিল, "বাবু সাব, আপ, এবি
নম্বর মাঙ্গতা ?"
সুরেশ চোখ খুলিয়া এক বার বাডীটার দিকে চাহিয়া দেখি।
বলিল, “সিধা চালাও।
তার পর একটা দােকানের সামনে গাড়ী থামাইতে বলিয়া
ভাইভারকে দিয়া দুই বােতল মদ কিনিয়া আনিল। সঙ্গে
মাস ছিল না, শোডা ছিল না, তাহাও ড্রাইভারকে দিয়া
কিনিয়া লইল এবং কিছুক্ষণ ঘুরিয়া ধীরেন-শৈলেনকে তাহাদের
বাড়ী হইতে গাড়ীতে তুলিয়া লইয়া সােজ। শ্রীরামপুরের দিকে
হাকাইতে বলিল।
সুরমার বাড়ী হইতে বাহির হইয়া প্রফুল্ল নিশ্বাস ফেলিয়া
ভাবিল, “এর পণাম কোথায় !” তারপর ট্রামে চড়িয়া
যখন সুরেশের বাড়ীতে আসিয়া পেীছিল তখন বেলা চারটা
বাজিয়া গিয়াছে। নিস্তব্ধ বাড়টার দিকে চাহিয়া প্রফুর
একটু আশ্চর্য্য হইয়া ভিতরে ঢুকিয়া দেখিল, মহুয়া সুরেশের
বসিবার ঘরের সম্মুখে চুপ করিয়া বসিয়া আছে। সুরে।
যে বাড়ীতে নাই, এ কথা বুঝিতে প্রকুল্পের আর এক মুর্তও
১২৬
সুরমা
বিলম্ব হইল না। তথাপি, কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“তাের বাবু কোথায় রে মনুয়া ?”
প্রত্যুত্তরে মনুয়া নির্বাক মুখে শুধু প্রফুল্পের দিকে চাহিয়া
রহিল। প্রফুল্ল কহিল, “সুরেশ যে বাড়ীতে নেই, তা বুঝতে
পেয়েছি; কিন্তু কোথায় গেছে বলতে পারিস?”
মনুয়া আস্তে আন্থে বলিল, “না।”
*, “কখন বেরিয়েছে ?”
“ভাের বেলা।”
“ভাের বেলা !” প্রফুল্ল চমকিয়া উঠিল। উৎকণ্ঠিত হইয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “সেই ভাের বেলা বেরিয়ে এখনও ফেরেনি,
? আর কেউ সঙ্গে ছিল না কি রে ?”
“আজ্ঞে না।”
প্রফুল্ল ক্ষণকাল ভাবিয়া বলিল, “আচ্ছা, তুই এটা
খুলেদে-সুরেশ যতক্ষণ না ফিরে আসে ততক্ষণ আমি তার
জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকব।”
মনুয়া উঠিয়া দরজা খুলিয়া দিয়া উপরে চলিয়া গেল ।
মনুয়ার চোখ দু’টা যেন ছল ছল করিতেছিল।
মনুয়া চলিয়া গেলে প্রফুধু একখানি বই টানিয়া লইয়া
চুপ করিয়া পড়িতে লাগিল। রাত যখন ন'টা তখন প্রফুল্ল
হতাশ হইয়া মনুয়াকে ডাকিয়া কহিল, “আমি চললুম রে
মনুয়া। তাের বাবু এলে বলিস, আমি বিশেষ কাজে এসে
ছিলুম ; কাল আবার আসব। বলিয়া প্রফুল্ল বাহির হইয়া পড়িল।
সুরমা ১২৭ গ্রেী হইতে যে রাস্তাটা বালাখানা স্ক্রীটে ঢুকিয়াছে, তাহার মােড়ে, নামিয়া প্রফুল্ল সুরমার বাড়ীর উদ্দেশে পা বাড়াইতেই দেখিতে পাইল, একটা ট্যাক্সি দ্রুত বেগে গ্রে স্ত্রী দিয়া ছুটিয়া যাইতেছে এবং তাহারই এক কোণে মুখ ও জিয়া কে একটা লােক পড়িয়া রহিয়াছে। ঠিক সেই সময় রাস্তার একটা আলো সেই লােকটার উপর পড়িতেই প্রফুল্ল দুই হাত তুলিয়া চীৎকার করিয়া গাড়ী থামাইতে বলিল। ট্যাক্সি কিছু দূর গিয়া থামিলে প্রফুল্ল ছুটিয়া গিয়া সুরেশের অবস্থা দেখিয়া বুকের ভিতরট। তাহার হু হু করিয়া উঠিল। সুরেশ অজ্ঞান হইয়া গাড়ীর কোণে মুখ গুজিয়া ঘুমাইতে- ছিল। সারা দিনের অত্যাচারে মাথার চুল গুলি ধূলা বালিতে প্রায় সাদা হইয়া উঠিয়াছে। পরণের কাপড় স্থানে স্থানে ছিড়িয়া গিয়াছে। গায়ের সিল্কের জমাট। নানা বিধ দাগে কুৎসিত, বিশ হইয়া উঠিয়াছে। পায়ের একস্থানে কাটিয়া গিয়া তথনও অল্প অল্প রক্তস্রাব হইতেছিল। এক পাটি জুতা যে কোথায় পড়িয়া গিয়াছে, তাহার কোন ঠিকানা নাই। চোখের চসমা জোড়া ভাঙ্গিয়া এক পাশে পড়িয়া রহিয়াছে। প্রফুল্ল আর সহিতে পারিল না। সুরেশকে কোলের উপর টানিয়া লইয়া ডাকিল, সুরেশ !” সুরেশ তেমনি মড়ার মত পড়িয়া রহিল। প্রফু ভয় পাইয়া দুই তিন বার নাড়া দিয়া সুরেশের কানের কাছে মুখ আনিয়া ডাকিল, “সুরেশ !”
১২৮
সুরমা
সুরেশ অতি কষ্টে জড়িত কণ্ঠে কহিল, “কে দাদা, গোল
মাল কচ্ছ। মদ-ফদ আর নেই।”
প্রফুল্প বলিল, “সুরেশ মদ খাবে ?”
“খাবো।” বলিয়া সুরেশ উঠিয়া বসিতে চেষ্টা করিল,
কিন্তু তখনই প্রকুল্পের কোলের উপর পড়িয়া গেল ।
প্রঃ ইসারা করিয়া ড্রাইভারকে গাড়ী চালাইতে বলিয়া
দিয়া সুরেশের মাথাটা কোলের মধ্যে লইয়া চুপ করিয়া বসিয়া
বহিল।
দূর হইতেই এই দৃশ্য দেখিতে পাইয়া সুরমার দম বন্ধ
হইয়া আসিতে চাহিল। তথাপি, জোর করিয়া কোন মতে
সিড়ির দেয়াল ধরিয়া নীচে আসিয়া অন্ধকারে সদরের পাশে
দাড়াইল।
গাড়ী আসিয়া সুরমার বাড়ীর সম্মুখে থামিলে প্রফুল্ল
বহু চেষ্টায় সুরেশকে উঠাইয়া লইয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিতেই
সুরমা দুই ব্যগ্র বাহু বাড়াইয়া সুরেশকে গ্রহণ করিল। তাহার
অশ্রুসিক্ত মুখ খানি অন্ধকারে অস্বাভাবিক রূপে কঠিন দেখাইতে
ছিল । তার পর দুইজনে ধরাধরি করিয়া আনিয়া সুরেশকে
যখন সুরমার বিছানার উপর শােয়াইয়া দিল তখন রাত এগারটা
বাজিয়া গিয়াছে। সুরমা প্রশ্লের হাত ধরিয়া মিনতি করিয়া
কহিল, “তুমি আমার জন্য অনেক করেছ দাদা। তুমি এখন
বাড়ী যাও—যা করবার আমিই করব। কাল একবার এসাে
কিন্তু।”
সুরমা
প্রফুল্ল চলিয়া গেলে সুরমা আস্তে আস্তে সুরেশের গায়ের
জামাটা খুলিয়া ফেলিল। কাচ ভাঙ্গা হাত ঘড়িটা খুলিয়া
টেবিলের উপর, রাশিয়া দিল। তার পর সুরেশের মাথা, মুখ
চোখ ধুইয়া দিয়া আঁচল দিয়া ভাল করিয়া মুছিয়া দিল।
পায়ের ক্ষতটা পরিস্কার করিয়া দিয়া পা দু’টা মুছিয়া দিল
এবং নিজের এক খানি সরু পাড়ের দেশী কাপড় বাহির
করিয়া সুরেশের কোমরে ভাল করিয়া জড়াইয়া দিয়া আস্তে
আস্তে তাহার নােংরা ছেড়া কাপড়টা ভিতর হইতে টানিয়া
বাহির করিয়া লইল। তারপর সুরেশের শিয়রের কাছে
বসিয়া পাখা দিয়া বাতাস করিতে লাগিল। প্রায় এক ঘন্টা
পরে সুরেশ পাশ ফিরিয়া মুদিত চক্ষে জড়াইয়া বলিল,
“শৈলেন, একটু মদ ।
সুরমা তাড়াতাড়ি সুরেশের মুখের কাছে ঝুকিয়া পড়িয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “একটু জল খাবে?”
সুরেশ কষ্টে চক্ষু মেলিয়া সুরমার মুখের দিকে ক্ষণকাল শূন্য
দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া তেমনি জড়িত কণ্ঠে কহিল, “বাঃ ।
বেশ সুন্দর ত তুমি ! আমার বাড়ীতে এলে কি করে সুন্দরী ?”
সুরমার চক্ষে জল আসিয়া পড়িল। জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি
কি আমায় চিনতে পাচ্ছ না?”
সুরেশ চক্ষু বুজিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “কিছু না।
কিন্তু, একটু মদ দিতে পার সুন্দরী ?”
সুন্দরী কহিল, “আজ এখন ঘুমােও, কাল মদ খেও।”
??
১৩০
সুরমা
সুরেশ তৎক্ষণাৎ টলিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল, “কি,
ঘুমােবো ! কখখন না। আমি মদ খাবাে।” বলিয়া সুরমার
মুখের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া কহিল, “তােমায় যেন
কোথায় দেখেছি সুন্দরী। কিন্তু, মদ না খেলে ঠিক বুঝতে
পাচ্ছি নে।
দেবে একটু মদ ?”
“আচ্ছা দিচ্ছি।” বলিয়া সুরমা এক গ্লাস সরবৎ সুরেশের
মুখের কাছে আনিয়া ধরিল । সুরেশ এক নিশ্বাসে তাহা পান
করিয়া লইয়া কহিল, “আঃ! বাঁচালে । তুমি যেই হও সুন্দরী,
--বুঝলুম, তুমি আমায় মারতে চাও না। বলিয়াই শুইয়া
পড়িল এবং পরক্ষণেই গভীর নিদ্রায় অভিভূত হইয়া গেল।
সুরমা বহুক্ষণ পর্যন্ত সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে উঠিয়া গিয়া সুরেশের পায়ের উপর
মাথা রাখিয়া প্রাণ ভরিয়া কঁদিয়া লইল। তারপর নীচে
এক থান কাপড় বিছাইয়া বাতি নিবাইয়া শুইয়া পড়িল ।
পর দিন সুরেশের যখন ঘুম ভাঙ্গিল, তখন অনেক বেলা
হইয়া গিয়াছে। চারিদিকে চাহিয়া সুরেশের প্রথম মনে হইল,
সে তখনও ঘুমের ঘােরে স্বপ্ন দেখিতেছে। তাই, নিজেকে নাড়িয়া-
চাড়িয়া চোখ মুছিয়া আর একবার ভাল করিয়া চারিদিকে চাহিয়া
দেখিল। এই গৃহের সহিত তাহার কোন কালে পরিচয়
ছিল না; ইহার একটি জিনিষও সে চিনিতে পারিল না।
অথচ, কেমন করিয়া কখন যে এখানে আসিয়া উপস্থিত
হইয়াছে, তাহাও অনেক চেষ্টা করিয়া স্মরণ করিতে পারিল না।
সুরমা
১৩১
মনে পড়িল, কাল কাল বেলা বাহির হইয়া দুই বন্ধু
লইয়া শ্রীরামপুর গিয়াছিল । কিন্তু, কখন যে তাহার বন্ধুরা
তাহাকে ঐ অবস্থায় ছাড়িয়া দিয়াছে এবং কেমন করিয়া
যে কলিকাতায় ফিরিয়া এই বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে,
তাহা কিছুতেই তাহার মনে পড়িল না। তথাপি, একটা
জিনিস বিস্মৃতপ্রায় স্বপ্নের মত মাঝে মাঝে তাহার মনের
মধ্যে জাগিয়া উঠিতেছিল যে, কে যেন বড় যত্ন, বড় স্নেহ করিয়া
তাহাকে এখানে আনিয়া শােয়াইয়া দিয়াছিল এবং আকণ্ঠ
পিপাসায় বারি দিয়া তাহার তৃষ্ণা-দগ্ধ প্রাণ শীতল করিয়াছিল।
এই সময় সুরমা তাহার নিত্য দিনের প্রাতঃস্নান শো
করিয়া ভিজা চুল গুলি পিঠের উপর ছড়াইয়া দিয়া ঘরের
মধ্যে প্রবেশ করতেই একেবারে সুরেশের সঙ্গে চোখােচাখি
হইয়া গেল।
সুরেশ সে দিকে চাহিয়া আর দৃষ্টি ফিরাইতে পারিল না।
সেই সদ্যস্নাতার শান্ত, সুন্দর, স্নিগ্ধ মুখের দিকে চাহিয়া
পতিতার কোন কালিমাই আজ আর সুরেশের চোখে পড়িল
। বরঞ্চ মনে হইল, সে যেন বহু যুগের সাধনার পরে তাহার
বিগত দিনের সমস্ত কলুষতা ধুইয়া-মুছিয়া সুপবিত্র হইয়া
এই মাত্র আসন ছাড়িয়া
উঠিয়া আসিয়াছে।
পরমাশ্চর্য অনুভূতিতে তাহার মন-প্রাণ আপ্লুত হইয়া
সে শুধু নৰ্ণিমেষ নয়নে সুরমার মুখের পানে
চাহিয়া রহিল ।
উঠিল।
সুরমা
সুরেশের পলকহীন দৃষ্টির সম্মুখে সুরমার মুখ মুহূর্তের জন্য
রাঙ্গা হইয়া উঠিল। কিন্তু, পরক্ষণেই নিজেকে সংবরণ করিয়া
লইয়া হাসিয়া বলিল, “আজ আমাকে চিনতে পাচ্ছ বলে মনে
হচ্ছে কি ?” বলিয়া সুরেশের পায়ের কাছে একটা ছোট
চৌকিতে হাসিয়া বসিল।
সুরেশ ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “সত্যি
সুরমা, আজই তােমায় আমি প্রথম চিনলুম।”
সুরেশের উত্তর শুনিয়া একটু আচৰ্য্য হইয়া সুরমা কহিল,
“এর আগে কখনও আমাকে দেখেছ বলে মনে হয় না কি?”
সুরেশ একটু শুষ্ক হাসি হানিয়া বলিল, সুরমা, সে রাত্রে
তােমার এখানে এতক্ষণ কাটিয়ে গেলুম,
এত যত্ন করে
খাওয়ালে—সেকি আমি ভুলে গেছি মনে করে ?”
সুরমা উত্তর দিল না ; স্তব্ধ মুখে বসিয়া রহিল। নিশ্বাস
ফেলিয়া সুরেশ পুনরায় বলিল, “অথচ মজা দেখ, তােমার অত
যত্নের পরিবর্তে নিজের অহঙ্কারটাই এত বড় হয়ে উঠল যে,
শেষ পর্যন্ত তােমাকে নিষ্ঠুর কথায় আহত করে ঘৃণায় বেরিয়ে
গেলুম।” বলিয়া সুরেশ সহসা চুপ করিল। সে দিনের সেই
দুব্যবহার স্মরণ করিয়া সুরেশের চোখের কোণে জল দেখা দিল।
সুরেশের দিকে চাহিয়া সুরমার চক্ষুও সজল হইয়া উঠিল।
কহিল, “সে দিন আমারও ত অহঙ্কার কম ছিল না। আমিও ত
কম রূঢ় কথা তােমায় বলিনি। কিন্তু, তার ভিতরে দুঃখু যতই
থাক, আজ আমার মনে হচ্ছে, তারও যেন একটা দরকার ছিল।
সুরমা
১৩৩
তা না হলে, তােমার কথা এমন করে ভাসতে পারতুম না।”
সুরেশ সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, “আমার কথা ভাবতে
সুরমা ”
এক মুহুর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া সুরমা কহিল, “শুধু ভাবতুম
না-আজও ত সে ভাবনার আমার শেষ হয়নি।” বলিয়া একটু
ম্লান হাসি হাসিয়া কহিল, “অথচ তুমি প্রথম আমাকে চিনতেই
পারলে না।”
সুরেশ তাড়াতাড়ি বলিল, “তােমাকে কোন দিনই আমি
ভুলিনি। ভুলিনি বলে যে এর আগে তােমায় ঠিক চিনতে পেরে-
ছিলুম তাও নয়।”
সুরেশের কথা শুনিয়া সুরমার ঠোটে হাসির রেখা দেখা দিল ;
কহিল, “আজই তাহলে তুমি আমায় প্রথম চিনলে কি বল ?”
“আমি ত সে কথা পূৰ্বেই বলেছি।”
সুরমা তেমনি মৃদু হাসিয়া কহিল, “আমাকে যদি ভােলইনি,
তবে এর আগে আর এসােনি কেন ? কত দিন ত তােমার পথ
চেয়ে বসে থাকতুম।” বলিয়া সুরম। হঠাৎ একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস
ফেলিল।
“অনেক দিনই আসতে সাধ হত; কিন্তু এখানে আসার
লজ্জাটাও কেমন যেন কাটিয়ে উঠতে পারতুম না। তা ছাড়া,
এসব স্থানে আসতে আমার বড় ঘৃণা হয়।”
সুরমা একটু শক্ত হইয়া বলিল, “একি তুমি নূতন আসছ
এসব স্থানে যে, তােমার ঘৃণা হবে !”
t
১৩৪
সুরমা
সুরেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলিল, “সুরমা, হয়ত তুমি বিশ্বাস
করবে না; তবু আমার এ কথাটা সত্য যে, মদ খেয়ে হিতাহিত
জ্ঞান শূন্য না হলে কখন এ সব স্থানে আস তুম না। এলেও
বেশীক্ষণ থাকৃতে পারতুম না-তখনি উঠে যেতুম ।”
সত্য বলছ ?”
৩
“আমার মধ্যে যদি কোন সত্য থাকে, ত’ একথা সত্যি।
তবে শুধু শুধু মদ খেয়ে বেড়াচ্ছ কেন ? বল, আর মদ খাবে
।” বলিয়া সুরমা সুরেশের প্রতি মিনতি পূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিল ।
সুরেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘মদ কি কেউ শুধু শুধু,
খায় সুরমা ! কিন্তু মনে কচ্ছি, তাও আর খাব না।”
সুরমা কিছুক্ষণ সুরেশের দিকে চাহিয়া রহিল। তার পর
ধীরে ধীরে সুরেশের নিকটে আসিয়া সুরেশের ডান হাত খান।
নিজের মাথার উপর চাপিয়া ধরিয়া কহিল, “বল, আমার
মাথা ছুঁয়ে, আর কখনও মদ খাবে না।”
সুরেশ একটু ক্ষীণ হাসি হাসিয়া বলিল, “এমন ক'রে
শপথ করিয়ে নিলে কি ভাল হবে সুরমা ? আমি অত্যন্ত দুর্বল
-হয়ত শেষ পর্যন্ত শপথ রাখতে পারব না। তাতে কোন
দিকেই লাভ হবে না।”
“শপথ না কর, অন্তত আমাকে একথাটা দাও যে, আর
কখনও মদ খাবে না।”
সুরেশ একটু মৌন থাকিয়া বলিল, “তবে তােমায় ছুয়ে একথা
বলতে পারি, ওটা না খেতে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব।”
ন
সুরমা
“বাস! এ-ই আমার যথেষ্ট। এর বেশী চাইনে—চাইলেও
পাব না।” বুলিয়া সুরমা স্বস্থানে ফিরিয়া গিয়া বসিল।
উভয়ে কিছুক্ষণ নীরবে থাকিবার পর সুরেশ ডাকিল,
‘সুরমা !”
সুরমা মুখ তুলিয়া চাহিল । সুরেশ বলল, “আমাকে
একটা সত্য কথা বলবে ?”
‘জিজ্ঞেস কর।”
“তােমার বসবার ঘরে না শুইয়ে আমাকে এ ঘরে শােয়ালে
কেন ?”
“ও ঘরত আমি ছেড়ে দিয়েছি।”
“তাহ'লে তোমার জিনিষ পত্র গেল কোথায় ?
সুরমা এক মুহূর্ত চুপ থাকিয়া কহিল, “জিনিষ পএ সব
বিক্রী করে ফেলেছি।”
‘বিক্রী করে ফেলেছ ?” বলিয়া সুরেশ বিছানার উপর
সােজা হইয়া উঠিয়া বসিল।
“হাঁ, বিক্রী করে ফেলেছি।”
সুরেশ তেমনি বিস্মিত মুখে জিজ্ঞাসা করিল, “হঠাৎ সব
বিক্রী করতে গেলে কেন?”
“তিন মাসের ভাড়া পড়ে ছিল। তাছাড়া, পেটটাও
চলা চাইত।” বলিয়া সুরমা একটু শুষ্ক হাসি হাসিল ।
সুরেশ বহুক্ষণ পর্যন্ত সুরমার আনত মুখের দিকে চাহিয়া
থাকিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “বুঝতে পেরেছি সুরমা, কেন
সুরমা
তুমি সব বিক্রী করে ফেলেছ এবং কেনই বা পেট চালাবার
মত অর্থের আজ তােমার অভাব।” বলিয়া একটু
চুপ
করিয়া
থাকিয়া সহসা জিজ্ঞাসা করিল, “সে দিন থেকে আর কেউ
আসেনি?”
“এসেছিল কিন্তু এক দিন ছাড়া বসাই নি।”
“তারপর তুমি কি করবে মনে করেছ ?”
সুরমা আস্তে আস্তে কহিল, “তুমি যা হুকুম করবে।”
সুরেশ একদৃষ্টে সুরমার মুখের পানে চাহিয়া কি যেন
ভাবিতে লাগিল।
সুরমাও তেমনি নীরবে বসিয়া রহিল।
কিছুক্ষণ পরে সুরেশ আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু
যে জিনিষটার সব চেয়ে বড় দরকার—অন্তত সংসারে থাকতে
হলে—তা পাবে কোথায়?”
সুরমা নিমেষের জন্য সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল ।
তারপর তেমনি অধোমুখে মৃদুকণ্ঠে কহিল, “তুমি যা ইঙ্গিত
কচ্ছ আমি তা বুঝতে পেরেছি। এবং পূর্বেও একথা ভেবেছি।
দরকার যদি হয় ত তােমার কাছে চেয়ে নেবো।”
“তাই নিও।” বলিয়া সুরেশ চুপ করিল।
আজ সুরেশের সেই রাত্রের কথা মনে পড়িল । সেই
রাত্রে যাহাকে অস্পৃশ্যা, কলঙ্কিণী মনে করিয়া ঘৃণায় তাহার
সর্বশরীর কণ্টকিত হইয়া উঠিয়াছিল আজ সেই রমণীই এই
জীবন যাত্রার পথে তাহাকে পশ্চাতে ফেলিয়া দ্রুত অগ্রসর
সুরমা
১৩৭
হইয়া যাইতেছে। এ কথা মনে হইতেই এক দিকে মন যেমন
তাহার আনন্দে পূর্ণ হইয়া উঠিল, অন্য দিকে তেমনি তাহ।
নিজের দুর্দশার কথা স্মরণ করিয়া নিতান্ত ব্যথার ভারে কাঁদিয়া
কঁদিয়া উঠিতে লাগিল।
সুরেশকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া সুরম; কহিল,
“কাল প্রফুল্ল দা তােমায় এখানে না নিয়ে এলে কি উপায়
হ'ত বল দিকি ?”
সুরেশ মুখ ফিরাইয়া iজজ্ঞাসা করিল, “কোন প্রফুলের
কথা বলছ ?”
“তােমার বন্ধু প্রফুল গে।।”
“ওঃ ! সেই প্রফুল্ল। হঁা, তার কাছে তােমার কথা এক
দিন বলেছিলুম বটে; কিন্তু সে আমাকে পেলে কোথায় ?
সুরমা চুপ করিয়া রহিল ।
“কি গো বলবে না নাকি?” বলিয়া সুরেশ হাসিল ।
সুরমা কয়েক মুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,
আমি তোমাকে এখানে আনবার জন্য
কাল তাকে
অনুরােধ করে পাঠাই। কিন্তু, তিনি গিয়ে হতাশ হয়ে যখন
আমার বাড়ী ফিরে আসছিলেন
আসছিলেন তখন গ্রেীটের মােড়ে
তােমাকে একটা গাড়ীর মধ্যে দেখতে পেয়ে এখানে নিয়ে
এসেছিলেন।
“তারপর তুমি বুঝি এই অপদার্থ টাকে সেবা-যত্ন ক'রে
ঘুম পাড়িয়ে রাখলে
১৮
{
}
১৩৮
সুরমা
}
সুরমা মুখ নত করিয়া চুপ করিয়া রহিল। সুরেশও ক্ষণ -
কাল চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “আজ যাই সুরমা। অনেক
বেলা হয়ে গেছে।”
সুরমা দাড়াইয়া উঠিয়া গড় হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল,
“আমি ত আর এখানে বেশী দিন থাকতে পারব না।
চার-পাঁচ
দিনের মধ্যেই চলে যেতে চাই—এত দিন শুধু তােমার হুকুমের
জন্যই অপেক্ষা করে বসে ছিলুম।”
সুরেশ ভাবিয়া বলিল, “আচ্ছা, দু'এক দিনের মধ্যেই
আমার মতামত তােমায় জানিয়ে যাব।” তার পর নিজের
গায়ের, পায়ের দিকে চাহিয়া বলিল, “তােমার এক খানা
চাদর থাকূলে, দাও । আর অমনি এক খানা গাড়ী ডেকে
দিতে বল।”
সুরমা উঠিয়া গিয়া একখানি গরদের চাদর বাহির করিয়া
দিয়া, পাশের ঘরের চাকরকে দিয়া একটা গাড়ী আনিতে
পাঠাইয়া দিল। তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল,
একটা কথা জিজ্ঞাসা করলে রাগ করবে না ত ?
সুরেশ হাসিয়া বলিল, “রাগ করব কেন সুরমা ? তােমার
যা ইচ্ছা, বল না।”
সুরমা বড় ভয়ে ভয়ে কহিল, “আমাকে আর তুমি ঘৃণা
করনা, না ?
সুরেশ তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, না। বরঞ্চ তােমায়”
সুরেশ সহসা থামিয়া গেল।
সুরমা
১৩৯
সুরমার ইচ্ছা হইল, কোথাও ছুটিয়া গিয়া কাদিয়া আসে।
সুরেশ হাত ঘড়িট! পরিয়া, জামাটা ব্র্যাকেট হইতে
টানিয়া লইয়া পকেট হাতড়াইয়া আশ্চৰ্য্য হইয়া দেখিল,
তাহার মণি ব্যাগটা খােয়া যায় নাই। কিন্তু খুলিয়া ফেলিয়া
তাহাতে আর অবশিষ্ট কিছু পাইল না। অথচ, এক কোণে
ছোট এক টুকৃর। কাগজের মত কি দেখিতে পাইয়া খুলিয়া
দেখিল, এক খান। হাজার টাকার নােট রহিয়াছে।
কখন যে সে মদের খেয়ালে ঐ নােট খানা লুকাইয়া রাখিয়া-
ছিল, তাহা তাহার মনে নাই। এখন তাহা খুলিয়া সুকুমার
হাতে দিয়া বলিল, “আর তােমার যা দরকার হয়, পশু আমাকে
বলো।
হাত পাতিয়া সুরেশের এই প্রথম দান গ্রহণ
করিতে
সুরমার হাত কঁপিয়া গেল। তথাপি, তাহা গ্রহণ করিয়া
মাথায় তুলিয়া লইল।
সুরেশ চলিয়া গেলে বহুক্ষণ পর্যন্ত সে দিকে চাহিয়া থাকিয়া
মুখ ফিরাইতেই সহসা দুই চোখ দিয়া আজ তাহার আনন্দা
একেবারে ধারা বহিয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।
দশ সুরমার বাড়া হইতে নিজের বাড়ীতে ফিরিয়া সুরেশের অত্যন্ত অসুস্থ বােধ হইতে লাগিল। পূৰ্ব্বদিনের অত্যাচারের গ্লানি তাহার সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া যে অবসাদের সৃষ্টি করিয়াছিল, এখন তাহা অসুখের আকারে আত্মপ্রকাশ করিতে লাগিল। তথাপি, ইহা যে নিতান্ত অবসাদ ছাড়া আর কিছুই নয় এবং গান-আহার করিয়া সুনিদ্রা হইলেই যে ইহা নিশ্চিত রূপে সারিয়া যাইবে, এ কথাও সে নিজেকে বার বার করিয়া বুঝাইতে লাগিল। কিন্তু, বিকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গিতেই যখন সে বুঝিতে পারিল, মাথা তুলিয়া দাড়াইবার শক্তি পর্যন্ত আর তাহার নাই এবং চোখ দু'টা অত্যন্ত জ্বালা করিতেছে, তখন শুধু পশ্চিমের জানালা দিয়া অস্তোন্মুখ সূর্যের শেষ রশ্মি রঞ্জিত বিচিত্র আকাশের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া আবার শুইয়া পড়িল । সন্ধ্যার কাছাকাছি নিবিড় মেঘে সমস্ত আকাশটা সমাচ্ছন্ন হইয়া গিয়া দুর্যোগের লক্ষণ সূচনা করিল এবং সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই এমন মাতামাতি শুরু হইয়া গেল যে, সারা রাত্রির মধ্যে তাহার • আর কিছু মাত্র ব্যতিক্রম ঘটিল না। সুরেশও সেই যে শয্যা গ্রহণ করিল, সমস্ত রাত্রির মধ্যে তাহার আর কোন হুস রহিল না।
সুরমা
১৪১
}।
প্রবল জ্বরের অসহ্য যাতনায় অতি প্রতু্যমেই ঘুম ভাঙ্গিয়া
সুরেশ হাপাইতে হাপাইতে ডাকিল, “মনুয়া :
মনুয়া পাশের ঘরে ঘুমাইতেছিল। প্রভুর কাতর কণ্ঠের
আহ্বান শুনিতে পাইয়া চক্ষু মুছতে মুছতে এঘরে ঢুকিয়া
সুরেশের অবস্থা দেখতে পাই। আশা মনুয়ার মপ কালো
হইয়া উঠিল ।
সুরেশ হাত নাড়িয়া •য়াকে কাছে ডাকিয়া
বলিল, “কিছু ভয় নেই রে—আমি • খাই নি। জ্বরে গা
পুড়ে যাচ্ছে।”
“তাহলে আমি ডাক্তার বা বুকে ডেকে আগে । 7 লয়।
মনুর বাহির হইয়া যাইতেছিল।
সুরেশ হাত নাড়িয়া নিষেধ করিয়া কহিল, “আজ থাক
মনুয়া। তার চেয়ে আমার মাথায় একটু হ'ওয়া কর। ক্যান
খুলিসনে কিন্তু।”
মনুয়া একখানা পাখা লইয়া ধারে বারে বাতাস করিতে
লাগিল। সুরেশ ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করল,
“কাল রাত্রে খুব ঝড়-জল হয়েছিল নাকি রে।”
“আজ্ঞে হঁা। এখনও ত একটু একটু বৃষ্টি পড়ছে।”
এ্যা, তাই নাকি? মহুয়া, দে দে, মাথার কাছের জানালাটা
খুলে দে। যাবার আগে একবার প্রকৃতির উচ্ছ জ্বল চেহারাটা
দেখে যাই।
যাই। কত দিন ওই চেহারা দেখে ভেতরটা আনন্দে
নেচে উঠেছে রে। আর ত সময় পাব না-দে একবার ধুলে।”
{
১৪২
সুরমা
প্রভুর উচ্ছাসের অর্থ বুঝিতে না পারিয়া মনুয়া ইতস্ততঃ
করিয়া কহিল, ঠাণ্ডা হাওয়া লাগবে যে।”
সুরেশ রাগিয়া উঠিয়া বলিল, 'এই তাের বড় দোষ মনুয়',
-তুই বড় কথা কাটিস।”
মনুয়া উঠিয়া গিয়া আস্তে আস্তে জানালাটা খুলিয়া দিতেই
বাহিরের প্রবল হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির ছাট ঘরে ঢুকিয়া সুরেশের
মাথাটা ভিজাইয়া দিয়া গেল ।
“আঃ!” সুরেশ রক্তচক্ষু মেলিয়া অনিমেষ নয়নে বাহিরে
দিকে চাহিয়া চাহিয়া দুই চক্ষু তাহার অশ্রুতে ভরিয়া উঠিল ।
নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে বলিল, “ভগবান ! তােমার সৃষ্টির
এমৃত্তি আর বােধ হয় এজীবনে দেখতে পাব না।” তারপর
মনুয়াকে ইঙ্গিতে জানালাটা বন্ধ করিতে বলিয়া চক্ষু মুদিত
করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল ।
এভাবে দিন দুই কাটিল ; কিন্তু জ্বর ছাড়িবার কোন
লক্ষণ দেখা গেল না। তার পরের দিন সুরেশ কহিল,
“মনুয়া ডাক্তার ভাক রে, একবার শেষ চেষ্টা করে যাই।”
পর দিন সকাল বেলা ডাক্তার আসিয়া রােগ পরীক্ষ।
করিয় উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন এবং ঔষধ লিখিয়া দিয়া, বিশেষ
সাবধান না হইলে টাইফয়েড, হইতে পারে, একথাও বার বার
করিয়া বলিয়া গেলেন।
ঘণ্টা দুই পরে সুরেশ ডাকিল, “মনুয়া !”
“আজ্ঞে।”
সুরমা
১৪৩
?
*
“একটা কাজ করতে পারবি?”
“কি বলুন।”
“না থাক।' বলিয়া সুরেশ চুপ করিল।
আরও ঘণ্টা দুই পরে সুরেশ চোখ মেলিয়া পুনরায় কিল,
“মনুয়া।"
“আজ্ঞে।'
‘আমার মনে হচ্ছে, কিছু বলবার মত অবস্থা জমার আর
ওবেলা পর্যন্ত থাকবে না। তাই, সময় থাকতে ; করবার.
করে যাই।'
সুরেশের উত্তপ্ত নিশ্বাস ঘন ঘন পড়তেছি ।
মনুয়া চক্ষু মুছিয়া কহিল, “কি করতে হবে বাবু ?”
সুরেশ মুদ্রিত চক্ষে চুপ করিয়া কি যেন ভাবতে লাগল ।
বহুক্ষণ পরে একটা সুদীর্ঘ তপ্ত নিশ্বাস ত্যাগ করিম। অতে খাতে
বলল, “একটা ঠিকানা লিখে দিলে, সেখানে বলে আসতে
পারবি আমার অবস্থার কথা ?”
তাড়াতাড়ি এক টুকরা কাগজ এবং একটা পেন্সিল সুরেশের
হাতে দিয়া মনুয়া কহিল, “আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।”
মনুয়ার ব্যগ্রতায় সুরেশ চোখ মেলিয়া তাহার দিকে চাহিয়া
কাগজ পেন্সিল লইয়া কম্পিত হস্তে ঠিকানা লিখিয়া নি।
মনুয়া মুহুর্ত মাত্র বিলম্ব না করিয়া সুরেশের ছাতিটা লইয়া
বাহির হইয়া পড়িল। বলিয়া গেল, “আমি যাবো আর আসবো।
মনুয়া চলিয়া গেলে সুরেশের জ্বর বাড়িতে লাগিল।
তথাপি, রাস্তার দিকে একটা কান নিযুক্ত রাখিয়া উন্মুখ
১৪৪
সুরমা
হইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে অদম্য তৃষ্ণায় একবার কষ্টে
উঠিয়া বসিয়া দুই হাতে গ্লাস লইয়া প্রাণ ভরিয়া জল পান
করিল।
তার পর শুইয়া পড়িল ।
;
সুরমা ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, সুরেশ অঘােরে ঘুমাইতেছে ; কিন্তু
ভিতরের যাতনায় এক এক বার ছট ফট করিয়াও উঠিতেছে।
সুরমা তাড়াতাড়ি শিয়রের কাছে বসিয়া সুরেশের মাথায়,
গায়ে হাত দিয়া চমকিয়া উঠিল। কাহল, “শীগগির
একটা ওডিকলন আনতে হবে নে নয় । কিন্তু, আমার সঙ্গে
ত টাকা নেই।”
মনুয়া সুরেশের পকেট হইতে চাবির রিংট। বাহির করিয়া
সুরমার হাতে দিয়া বলিল, “ঐ বাসকে টাকা আছে। যা
লাগে, আপনি খরচ করুন—বাবু কিছু বলবে না।
সুরমা বাক্স খুলিয়া টাকা বাহির করিয়া মনুয়ার হাতে দিল।
চাবির রিংটা নিজের আঁচলে বাধিয়া রাখিয়া পূৰ্ব্বস্থানে ফিরিয়া
আসিয়া আস্তে আস্তে সুরেশের মাথায় বাতাস করতে লাগিল।
মিনিট দশেক, পরে একটা জলপটি সুরেশের কপালে
বদলাইয়া দিয়া সুরমা কহিল, “বলতে পার মলুয়া, ডাক্তার
বাবু কি কি বলে গেছেন ?”
মনুয়া বলিতে পারিল না; শুধু সুরমার মুখের দিকে চাহিয়া
রহিল। তার পর সহসা কি মনে করিয়া বলিল, “ডাক্তার
বাবুকে আর একবার ডেকে আনব কি ?”
সুরমা
১৪৫
পারলে ভাল হত মনুয়া।”
মহুয়া দরজার বাহিরে গিয়া তখনি ফিরিয়া আসিয়া
বলিল, “এখন ত তেনাকে পাব না। বারােটার পর রােগী
দেখতে বেরিয়ে সেই বিকেলে ফিরে আসে।”
“আচ্ছা, তা হলে বিকালেই তাকে ডেকে এনো।”
বলিয়া ওডিকলনের জলে ভিজান নেকড়াটা দিয়া সুরেশের
চোখ দু'টা সযত্নে মুছিয়া লইয়া সুরমা কহিল, “তুমি ততক্ষণ
ঘরটা ঝাট দিয়ে নােংরা কাপড় জামা
গুলি দোকানে
দিয়ে এসো।”
ঘর ঝাট দিয়া মনুয়া ময়লা কাপড়-জাম গুলি বাছিয়া
লইয়া বাহির হইয়া গেলে সুরমা উঠিয়া গিয়া টেবিলটা
পরিষ্কার করিয়া ফেলিয়া ঔষধের কাগজ এবং শিশি পড়িয়া
দেখিল। তার পর আলমারি খুলিয়া একখানা ফস। বিছানার
চাদর বাহির করিয়া আনিয়া সুরেশের শিয়রে বসিয়া জলপটি
বদলাইয়া দিল।
এই সময় সুরেশ পাশ ফিরিয়া সুরমাকে দেখিতে পাইল
বহুক্ষণ নিমেষহীন চক্ষে তাহার দিকে চাহিয়া থাকিয়া সহসা
হাত দিয়া সুরমার জলসিক্ত হাতখানি নিজের বুকের মধ্যে টানিয়া
লইয়া বলিল, “এসেছ সুরমা ! বেশ করেছ, তা না হলে
আর ত দেখা হত না। আজ না এলে হয়ত তােমার সঙ্গে কথা
বশবারও সময়
সময় পেতুম না।”
বলিয়া ক্লান্তির তারে চুপ
করিয়া গেল।
১৪৬ সুরমা সুরেশের কথা শুনিয়া সুরমার বুকের ভিতরটা কান্নায় ভরিয়া উঠিল। পরম স্নেহে সুরেশের কপালের উপরের রুক্ষ চুলগুলি সরাইয়া দিয়া চক্ষ মুছিয়া সহজ কণ্ঠে কহিল, “তয় কিশীগগির ভাল হয়ে যাবে।” ‘‘ভয় ! বলিয়া সুরেশ তাহার রােগ-মলিন চক্ষের নিত দৃষ্টি মেলিয়া কিছুক্ষণ সুরমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তারপর একটু করুণ হাসি হাসিয়া চক্ষু দিত করিল । সুরেশের মুখের পানে চাহিয়া সুরমার বুক ফাটিয়া যাইতে চাহিল। তথাপি প্রবল চেষ্টায় নিজেকে সংযত রাখিয়া নীরবে জল-পটি দিতে লাগিল। মিনিট কয়েক পর সহসা সুরেশ দুই হাত দিয়া সুরমার শীতল হাতখানি নিজের তপ্ত ললাটের উপর চাপিয়া ধরিয়া ক্লান্ত কঠে কহিল, “নিজের জন্য ভয় আমি কোন কালেই করিনি সুরমা। আজ শুধু এই ভয়টাই আমার সবচেয়ে বেশী হচ্ছে—যদি এ- শােয়াই আমার শেষ শােয়া হয়, ত’ তােমার দশা কি হবে ? তােমাকে আবার হয়ত” সুরেশের শুষ্ক কণ্ঠ দিয়া আর স্বর বাহির হইল না । শুধু ফেঁাটা দুই অশ্রু নিঃশব্দে ঝরিয়া পড়িল। সুরমা আর নিজেকে ধরিয়া রাখিতে পারিল না। উঠিয়া আসিয়া সুরেশের পায়ের উপরে মাথা রাখিয়া কাঁদিয়া কহিল, “ওগাে, তুমি আর সেই ভয় করােনা! কিন্তু, আমি বলছি, ভগবান তােমায়, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন।” সুরেশ ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দুই বাহু বাড়াইয়া সুরমাকে
সুরমা
১৪৭
উঠিল।
একেবারে বুকের উপর টানিয়া লইয়া স্থির হইয়া রহিল।
মুহুর্তের জন্য সুরমার সৰ্বাঙ্গ সুরেশের বুকের ভিতর কাপিয়া
ক্ষণকাল পরে সুরেশ দুই হাত দিয়া সুরমার অশ্রুসিক্ত
মুখ খানি তুলিয়া ধরিয়া বহুক্ষণ পর্যন্ত সে দিকে চাহিয়া
রহিল। তারপর সহসা তাহার রোগ-তপ্ত ওষ্ঠাগুর
সুরমার
অশ্রু-ধৌত শীতল ওষ্ঠাধর স্পর্শ কর। নিশ্বাস ফেলিয়া পাশ
ফিরিয়া শুইল ।
কিছুক্ষণ পরে সুরেশ আবার পাশ ফিরিয়া চক্ষু মেলিয়া
বলিল, “সুরমা, এর বেশী আর আমি চাইনে। বেঁচে থাকূলে ও
চাইব না। কিন্তু, আজকের এই অপরাধ আমার ক্ষমা করতে
পরবে কি ?
সুরমার চোখ দিয়া তখনও অশ্রু ঝরিতেছিল। মাদক
কহিল, “তুমি ত কোন অপরাধ করনি।'
“সত্য বলছ ?”
সুরমা ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়। তেমনি অ-গাঢ় কণ্ঠে
কহিল, “আজ আর তােমার কাছে আমার কোন কথা বলতে
লজ্জা নেই। আমি ত এত দিন ওজিনিষট। তােমার কাছ থেকে
আশীর্বাদের মতই সমস্ত অন্তর দিয়ে কামনা করে এসেছি।
কিন্তু, তা'ত হবার নয় !”
“কেন সুরমা ?”
‘আমি যে কি, তাত তুমি জান।”
“ওঃ !” বলিযা সুরেশ চক্ষু মুদ্রিত করিয়া চুপ করিয়া গেল।
১৪৮
সুরমা
মিনিট দশেক পরে সহসা সুরেশ চক্ষু মেলিয়া কহিল, “আমার
একটা অনুরােধ রাখবে সুরমা ?”
“তােমার আদেশ মাথায় করে নেবো বলেই ত সব ছেড়ে
দিয়েছি।”
“আমার ঐ বাক্স থেকে চেক বইথানা নিয়ে আসবে।
সুরমা নড়িল না ; অবনত মস্তকে চুপ করিয়া বসিয়া
রহিল।
সুরেশ বলিল, “কই, আমার অনুরােধ ত রাখলে না ?”
সুরমা তেমনি নতমুখে বসিয়া রহিল।
“রাখবে না তাহলে শেষ অনুরােধ আমার, সুরমা ?”
বলিয়া সুরেশ একান্তভাবে সুরমার দিকে চাহিল ।
সুরমা আর পারিল না।
চক্ষু মুছিয়া উঠিয়া বাক্স খুলিয়া চেক বই আনিয়া দিল ।
সুরেশ বালিশের তলা হইতে কলমটা বাহির করিয়া লইয়া বহু
যত্নে, দৃঢ় হস্তে এক থানা চেক্ সই করিয়া সুরমার হাতে তুলিয়া
দিয়া কহিল, “মরা-বাচার কথা কেউ বলতে পারে না সুরমা।
যাক, ওটা থাকলে তােমাকে আর পথে দাঁড়াতে হবে না।”
এই সময় আবার এক ফোটা অশ্রু সুরেশের গণ্ড বাহিয়া বালিশে
আসিয়া পড়িল।
মুহুর্তের জন্য সমস্ত সংসারটা সুরমার চক্ষের সম্মুখে দুলিয়া
উঠিল এবং পর মুহুর্তেই সুরেশের বুকের উপর লুটাইয়া পড়িয়া
বহুদিনের রুদ্ধ বেদনার অশ্রুজলে সুরেশের বুক ভাসাইয়া দিল।
সুরমা
১৪১
সুরেশ নড়িল না, কথা কহিল না। মনে হইল, সুরমার
অশ্রুর উৎস অকস্মাৎ আজ যেন সুরেশের রােগের সমস্ত প্রদাহ
ধুইয়া শীতল করিয়া দিয়া গেল। তাই বােধ হয়, একটা তৃপ্তির
নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া সুরেশ চক্ষু মুদিত করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল।
এই সময় মনুয়া আসিয়া ডাকিল, “মা।”
সুমা চক্ষু মুছিয়া কহিল, “কেন বাবা ?”
মনুয়া এই প্রথম সুরমাকে ‘মা' বলিয়া ডাকিল। ছেলে
মানুষ হইলেও মনুয়া এই কলিকাতাতেই বাড়িয়া উঠিয়াছে।
তাই ইহার আদব-কায়দাও সে শিখিয়া লইয়াছিল।
“ডাক্তার বাবু এসেছেন।”
সুরমা মাথার কাপড়টা একটু টানিয়া দিয়া এক পাশে
দাড়াইল ।
ডাক্তার বাবু এই পরিবারের সঙ্গে বিশেষরূপে পরিচিত।
তাই ঘরে ঢুকিয়া আশ্চর্য্য হইয়া সুরেশের দিকে চাহিলেন ।
সুরেশ একটু ম্লান হাসি হাসি বলিল, “আশ্চর্য হবার কিছু
নেই ডাক্তার বাবু। অসুখের সংবাদ পেয়ে ও আমায় সেবা
করতে এসেছে। যা বলবার ওর কাছেই বলে যান।
আমার বােন।” বলিয়া সুরেশ চুপ করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল।
পলকের জন্য সুরমার মনে হইল, যেন তাহার পদতল হইতে
কঠিন ধরিত্রি সরিয়া যাইতেছে। যেন সে চৈত হারাইয়া
পড়িয়া যাইবে। তাই, তাড়াতাড়ি পাশের দেয়ালটা আশ্রয়
করিয়া নিজেকে বহু কষ্টে সংযত করিয়া রাখিল ।
সুরমা সহসা শুশ্রুষা সম্বন্ধে উপদেশ দিয়া ডাক্তার বাবু প্রস্থান করিলে পর সুরমা ছুটিয়া আসিয়া সুরেশের পা দু'খানি মাথায় তুলিয়া লইয়া হু হু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। সুরেশ তেমনি নীরবে পড়িয়া রহিল ; শুধু তাহার দুই চক্ষুর শুধু তাহার দুই চক্ষুর কোণ বাহিয়া অশ্রু বালিসে আসিয়া পড়িতে লাগিল। সুরমা শেষ রাত্রির দিকে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। ভাের বেলা একটা অস্ফুট আর্তনাদে ঘুম ভাঙ্গিয়া চাহিয়া দেখিল, সুরেশ দুৰ্ব্বিহ রােগ-যন্ত্রণায় বিছানার উপর ছট ফট, করিতেছে। সুরমা ধড়মড় করিয়া উঠিয়া সুরেশের গায়ে হাত দিয়া দেখিল, প্রচণ্ড উত্তাপে গা যেন পুড়িয়া যাইতেছে। সুরেশ অতি কষ্টে একবার চোখ মেলিয়া শূন্য দৃষ্টিতে সুরমার দিকে চাহিল ; কিন্তু কথা বলিতে পারিল না। ভয়ে, দুশ্চিন্তায় সুরমার প্রাণ উড়িয়া গেল। তাড়াতাড়ি মনুয়াকে ডাকিয়া ডাক্তার আনিতে পাঠাইয়া দিল । ডাক্তার আসিয়া রােগ পরীক্ষা করিয়া ‘আইস ব্যাগের ব্যবস্থা দিয়া গেলেন। সুরমা কাদিয়া ভগবানের চরণে মাথা খুড়িয়া, আহার নিদ্ৰা পরিত্যাগ করিয়া, প্রাণপণে শুশ্রুষা করিতে লাগিল। মনুয়া শুষ্ক মুখে সুরমার কাছে কাছে ঘুরিয়া বেড়ায়। এক এক বার সজল চোখে সুরমার মুখের দিকে চাহিয়া থাকে ; কিন্তু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস পায় না। দিনের পর দিন কাটিতে লাগিল; সুরেশের অবস্থা কিন্তু খারাপের দিকেই চলিল। ডাক্তার দুই বেলা আসিতে লাগি- সুরমা লেন। সুরমা চারিদিকে চাহিয়া উপায় না দেখিয়া, মনুয়াকে নিৰ্ম্মলের বাড়ী পাঠাইয়া দিল । সে ফিরিয়া আসিয়া জানাইল, দিন কয়েক পূর্বে নিৰ্ম্মল বাবু ছুটি লইয়া দিদিমণিকে সঙ্গে করিয়া পশ্চিমে চলিয়া গিয়াছেন। খবর পাইয়া যতীন আসিলেন, প্রফুল্ল আসিল। সুরমা ত্রস্ত হইয়া এক পাশে দাড়াইল। যতীন কোমল কঠে বলিলেন, “থাক থাক, আপনি আর উঠবেন না । আমি ফুলের কাছে আপনার সমস্তই শুনেছি। এ-ই ত তার পরিচয়। মানুষ তার অবস্থার জন্য দায়ী নয়—তার ভিতরকার মানুষটির জন্য দায়ী। সেটি যার নষ্ট হয়ে গেছে, তার সব গেছে। সেটি যার যায়নি, সে অন্যের কাছে না হােক, আমার কাছে অন্তত সব সময়েই শ্রদ্ধার পাত্র।' সুরমা যতীনের পায়ের কাছে ভূমিষ্ঠ প্রণাম কৰিল। যতীন সুরমার মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিলেন। সে দিন হইতে যতীন প্রত্যহ আসিয়া একবার করিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিলেন। এক এক দিন সুরমার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রাণ- পাত সেবা দেখিয়া মুগ্ধ-নেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া থাকিতেন। পরে নিশ্বাস ফেলিয়া নিঃশব্দে লাঠিটা হইয়া উঠিয়া যাইতেন। দিন আঠারো পরে সুরেশের অবস্থার একটু পরিবর্তন দেখা গেল। তারপর ধীরে ধীরে সুরেশের অবস্থা ক্রমেই উন্নতির দিকে চলিল এবং দেড় মাস পরে একদিন সে অন্ন পথ্য করিয়া উঠিয়া বসিল।
সুরমা
ডাক্তার বাবু সে দিন হাসিয়া নিজের পাকা চুলে হাত দিয়া
বলিলেন, “আমার এবয়সে চিকিৎসাও কম করলুম না,
Nursingও কম দেখলুম না। কিন্তু, এমন প্রাণ দিয়ে সেবা
করতে আর কোন দিন দেখেছি বলে মনে ত হয় না। সুরেশ !
যাক, এ যাত্রায় তুমি বেঁচে গেলে বােধ হয় সে জন্যই।”
সুরেশ গুধু ‘হু’ বলিয়া চুপ করিল। তাহার অন্তরের কথা
অন্তর্যামীই জানিলেন ; মানুষ শুধু বাহিরটা দেখিয়াই আশ্চর্য
হইল ।
এখন সুরেশের সুরমাকে না হইলে এক দণ্ডও চলে না।
বিকাল বেলা বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসিয়া দিনান্তে সূর্যাস্তের
দিকে চাহিয়া বিগত দিনের কত কথাই না মনে আলােড়িত
হইয়া উঠে। তন্ময় হইয়া তাবিতে ভাবিতে চোখের কোণে
জল দেখা দেয়। সুরমা কাছে থাকিলে চোখ মুছিয়া করুণ কণ্ঠে
জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি সত্যিই এমাসের শেষে আমায় ছেড়ে
চলে যাবে ?
সুরমা গভীর স্নেহে সুরেশের মাথার চুল গুলি ঠিক করিয়া
দিয়া কহে, “আমাকে যে যেতেই হবে-সংসারে যে আমার
স্থান নেই তা ত তুমি জান।”
“কেন, আমার বাড়ী ত তােমারই সুরে।”
সুরমার চোখ ফাটিয়া জল আসে। জোর করিয়া নিজেকে
সংবরণ করিয়া কহে, “তাতে ত তুমি সুখ পাবে না। সমাজ
যা চায় না, তাকে ত কেউ জোর করে তা দিতে পারে না।”
সুরমা
সুরেশ সহসা উত্তেজিত হইয়া বলে, “যে সমাজ এমন, তাকে
আমি চাইনে। অামার মা নেই, বাপ নেই--কেউ নেই
আমি তােমাকে রাখলে কে আটকাতে পারে ?"
সুরমা একটু ক্ষীণ হাসি হাসিয়া কহে, “ওগো, অমন
পাগলামাে করাে না। তুমি ভাব চ, তােমার কেউ নেই,
সমাজকে তুমি চাও না। কিন্তু, সমাজ ত তোমাকে চায় ।
সংসার তােমার কাছ থেকে অনেক আশা করে। অ মসক,
লের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে তুমি আমাকে ধরে রাখ, তাহলে ভবিষ্যতের
কৰ্ত্তব্যের দ্বার তােমার সামনে আপনিই বন্ধ যাবে ।
সমাজ তােমার বিপক্ষে এমন করে দাড়াবে যে, তােমার কোন
বড় কাজই আর কেউ শ্ৰদ্ধার চক্ষে দেবে । তোমার
সমস্ত কাজেরই একটা কুঅ করে নিয়ে কর্তব্যের গণ্ডী তােমার
এত ছােট করে আনবে যে, তুমি নিজেই হয়ত একদিন চমকে
উঠবে। তখন আমার প্রতিও তােমার বিতৃষ্ণার অন্ত থাকবে না!'
সুরেশ সংসারানভিজ্ঞ নিতান্ত শিশুটি নয়, সমস্তই বুঝিতে
পারে। কিন্তু, মন ত তাহা মানিতে চায় না। তাই, ভিতরের
অপরিসীম বেদনা কষ্টে দমন করিয়া কোন অসীমের দিকে
চাহিয়া থাকে।
আরও কিছু দিন এভাবে কাটিল । তারপর একদিন
নিল-অনিতা কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলে, সুরেশের সংবাদ
শুনিয়া অনিতা কাদিয়া ফেলিল। নিৰ্ম্মলও চক্ষু মুছিয়
অনিতাকে লইয়া সুরেশকে দেখিতে আসিল।
১৫৪
সুরমা
সুরেশ শুইয়া একখানা বই পড়িতেছিল। অনিতা সুরেশের
বিশীর্ণ, রােগ-পাণ্ডুর মুখের দিকে চাহিয়া পায়ের কাছে উপুড়
হইয়া পড়িয়া কাদিতে লাগিল। কত দিনের বেদনাবিদ্ধ
গােদন আজ মুক্তি পাইয়া আর থামিতে চাহিল না।
নিঃশব্দ ক্রন্দনের ভিতরে কতখানি মিনতি, কতবড় ক্ষমা প্রর্থন
যে ছিল তাহা সুরেশ বুঝিল না বটে ; কিন্তু যিনি সব জানেন
তাহার কাছে কিছুই অবিদিত রহিল না।
ক্ষণকাল পরে নির্মুল কহিল, "সুরেশ ভাই, আজ তুমি
আমায় ক্ষমা করো। তােমার উপর সে দিন যে কি অন্যায়
করেছি তা তখন বুঝিনি বটে; কিন্তু পরে বুঝতে পেরে
নিজেকেও কম শান্তি দিইনি।”
সুরেশ শুষ্ক হাসি হাসিয়া বলিল, “তুমি ত মিথ্যা কিছু
বলনি। আমি ত আজও ভাল নই; আর কোন দিন হতে
পারব কি না, তাও জানিনে।”
নির্মল কহিল, “যাক্, তােমার এ শরীরের উপর ওকথা
নিয়ে কথা বাড়িয়ে তােমাকে আর অসুস্থ করে তুলতে
চাইনে।
শুধু বল যে, আমার উপর আর তােমার কোন অভি-
মান নেই। তােমার মুখের কথা নিয়ে আমাকে এখুনি
যতীনদার ওখানে যেতে হবে।”
সুরেশ প্রত্যুত্তরে শুধু নিৰ্ম্মলের ডান হাত থানা টানিয়া লইয়া
নিজের কপাল স্পর্শ করিল।
নিৰ্ম্মল গােপনে চক্ষু মুছিয়া বাহির হইয়া গেলে সুরেশ
সুরমা
উঠিয়া দুই হাত দিয়' অনিতাকে তুলিয়া লইয়া নিজের অতি
নিকটে বসাইয়া মুগ্ধ নয়নে অনিতার অশ্রু-সিঞ্চিত নষ্কলঙ্ক মুখের
কে চাহিয়া নারীত্বের অপরূপ সুষমা দেখিতে লাগিল।
এই সময় সুরম এঘরে ঢুকল। সুরেশ ও অনি তাকে ওই
অবস্থায় দেখিতে পাইয়া পলকের জন্য সৃষ্টির নিষ্ঠুরতম আঘাতে
বুক যেন তাহার ছিড়িয়া পড়িতে চাহিল । কিন্তু, তৎক্ষণাৎ
নিজেকে সংবরণ করিয়া লইয়া আবেগে অনিতাকে পরিতে
যাইতেছিল।
সহস
থম কিয়া' সরিয়া আসিয়া দাঁড়াইল।
সুরেশ সমস্তই বুঝিতে পারিল । শুধু এক মুহুর্তের জন্য দাত
কিয়া ঠোট দু'টা চাপিব ধরিল ; তারপর শান্ত কণ্ঠে কহিল,
“এসো পুরো, অনিতা ত তােমারই বােন। এর মধ্যে সমাজের
বড়-ছােটর কথা থাকতে পারে না।”
অনিতার হাত দু’পানি সুরেশের হাতের মধ্যে শিহরিয়া
উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া অনিত।
আত-বিস্ময়ে দেখিল,-সুনীতি! সুরমা দেখিল,-অনিতা।
তারপর দু’জনে নিভৃতে বড় কান্না কাদিল । সেই ছেলে-
বেলাকার কথা মনে পড়িল। তথন অনিতা-সুনীতির
মধ্যে
প্রভেদ ছিল না। কিন্তু আজ ? আজ অনিতা, অনিতা।
আর সুনীতি ? সংসার জানিয়া রাখিল, সুরমা কুলটা।
সমাজ
ঘৃণা, অবজ্ঞা তবে কহিল,-সুরমা পতিতা, পাপিষ্ঠা !
কিন্তু, কেহই তাহার ব্যর্থ, অভিশপ্ত জীবনের দিকে করুণার
দৃষ্টি ফিরাইল না।
সুরমা
একটি একটি করিয়া সমস্ত কথা জানিয়া লইয়া অনিত।
কহিল, “তা হলে তােমার মত আমারও ত সংসারে অনেক
কাজ করবার আছে তাই।”
সুরমা আদর করিয়া অনিতাকে নির্ষের কোলের মধ্যে
টানিয়া লইয়া বলিল, “না বােন, সংসারে সবার কাজ এক নয়,
হলেও তাতে সৃষ্টি চলে আমি আজ তােমাকে ওঁর
হাতেই সপে দিয়ে যাবাে।
অনিতা নিঃশব্দে মুখ নত করিয়া রহিল। সুরমা হাসিয়া
কৌতুক করিয়া কহিল, “এর মধ্যেই এত লজ্জা ! দু’দিন পরে
না জানি । । যাক্, সবটাই তুমি নিও না। আমার জন্যও
কিছু রেখো ভাই, তা না হলে ম’লেও সতীনের জ্বালা মিটবে
না।” বলিয়া অনিতাকে লইয়া সুরেশের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া
দেখিল, সুরেশ বাহিরের দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া কি ভাবি-
তেছে। সুরমা হাসিয়া বলিল, “কি গো, বাইরের দিকে চেয়ে
কি ভাবছ ? কবিতা লিখবে নাকি ?”
সুরেশ মুখ ফিরাইয়া দেখিল, এই সেই হাসি, এই সেই সুরমা !
সুরমা সুরেশের মুখের দিকে চাহিয়া সহসা গম্ভীর হইয়া
বলিল, “আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি কি ভাবছ । মাঝে মাঝে
পূৰ্ব দিনের অসংযম একটু বেরিয়ে আসতে চায় বই কি! কিন্তু,
ভয় নেই, সুরমা মরে গেছে।”
সুরমার দিকে চাহিয়া হঠাৎ সুরেশের কাধে ভূত চাপিয়া গেল।
অনিতার সম্মুখেই জিজ্ঞাসা করিল, “সুরে তুমি কবে যাবে ?”
সুরমা
১৫৭
“পও।”
“না, হতে পারে না।
সুরমা আশ্চৰ্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কেন ?"
সুরেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলিল, “আমার ইচ্ছে ”
সুরমা বুঝিল, এ মিথ্যা আস্ফালন নয়। সত্যই কি যে
সে ভাবিয়া ঠিক করিয়া লইয়াছে। জিজ্ঞাসা করিল, “আমাকে
রেখে কি করবে ?”
সুরেশ উত্তর দিল না। সুরমা অনিতাকে সুরেশের কাছে
বসাইয়া দিয়া সুরেশের হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে লইয়া
বলিল, “ও পাগলামাে করাে না লাটি। সমাজ যাকে চায় না,
নাকে ঘৃণা করে, তাকে ধরে পুরে রাখার যে কতদুঃখু তা' ত
আমার চেয়ে তুমি বেশী জান। আমি কলঙ্কিনী, আমি ঘূণীতা-
তাই ত আমার পরিবর্তে আমার এই বােনটিকে তােমার হাতে
সপে দিয়ে যেতে চাই। মধ্যেই আমাকে
পাবে।
বলিয়া অনিতার একখানা হাত সুরেশের হাতের সঙ্গে সম্মিলিত
করিয়া দিল। দিবার পূর্ব-মুহুর্তে হয়ত একটু দ্বিধা করিল,
হয়ত করিল না; কিন্তু নিজের হাতটা একটু কঁপিয়া গেল ।
সেই রাত্রে সুরমার কান্না আর থামিতে চাহিল না।
সুরেশ অন্যের। সে অধিকার স্বেচ্ছায় সে অন্যের হাতে তুলিয়া
দিয়াছে। তথাপি, নারী হৃদয়ের ভালবাসা নিভৃতে বসিয়;
মাথা কুটিয়া কঁদিতে লাগিল।
দিন দুই পক্ষে সকাল হইতে সুরেশকে অস্বাভাবিক রূপে
১৫৮
সুরমা
গন্তীর দেখাইতেছিল। মনুয়া আসিয়া বার দুই ধমক খাইয়া
দূরে দূরে ঘুরিয়া ফিরিতেছিল ।
সুরেশ চারিদিকে চাহিয়া দেখিল,—বর খান পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন। প্রভাতের স্নিগ্ধ আলােকে সমস্ত ব্যঞ্জ-ম করিতেছে।
নিৰ্ম্মল আকাশের মধুর বাতাসে ঘর ভরিয়া গেল। তথাপি,
মন তাহার উদাস, উদ্ভ্রান্ত হইয়াই রহিল ।
বিক।বলা যতীন, আসিয়া দেখিলেন, সুরেশ তন্ময় হইয়া
বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, মুখ খানা তাহার বিষাদের
ছায়ায় সমাচ্ছন্ন।
যতীন ডাকিলেন, “সুরেশ, কি ভাবছ ?”
সুরেশ মুখ ফিরাইয়া শুষ্ক মুখে কহিল, “কিছু না যতীনদা।”
“আমার কাছে কিছু লুকিওনা ভাই।”
সুরেশ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “আমি ভাবছি যতীনদা,
এই পাওয়া-না পাওয়ার মধ্যে তফাৎ কতখানি।”
যতীন তাহার স্বাভাবিক স্নিগ্ধ হাসি হাসিয়া বলিলেন, “সে
তফাৎ ত তুমি আজও বুঝতে পারবে না ভাই। আজও যে
তােমার পাবার আকাঙ্খা কমেনি। মানুষ বড় হয় না-পাওয়ার
ভিতর দিয়েই। ভগবানকে পাওয়া যায় না বলেই বােধ হয়
মানুষ অমন ক'রে এগিয়ে যেতে পারে। অপূর্ণতার ভিতর
দিয়ে যে পূর্ণতার আস্বাদ পাওয়া যায়, তাতে করেই মানুষ
বড় হয়।”
সুরেশ নির্বাক মুখে যতীনের দিকে চাম্বিয়া রহিল। যতীন
সুমা
বলিতে লাগিলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি, তােমাকে কেন আজ
গমন দেখাচ্ছে। আজ সুরমা যাবে, না ?”
সুরেশ এক মুহূর্ত চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, "ই। ”
যতীন বলিলে আমার একথাটা কখনও ভুলাে না
সুরেশ-মা যে নেই থাক, সে চিরকাল তােমারই হয়ে
পাবে। দেহ তার পেলে না বলে দু:খু করােনা ভাই। তুমি
যা পেয়েছ তার মূল্য যে কতখানি, তা বুঝবে তখন চা5 রম।
চলে যাবে। সে বেঁচে থাকতে কারুর সাধ্য হবে না আর
তাকে স্পর্শ করতে। তার হৃদয় সিংহাসনে তােমার স্থান
চিরদিনই সমান থাকবে।
ওখানে তুমিই রাঙ্গা।”
সুরেশ তৎক্ষণাৎ উঠিয়া যতীনের পদধূলি মস্তকে ধারণ করিয়া
কহিল, “আচ্ছ। যতীনা, তােমার কথাই মাথায় করে নিলুম।
যাক সে।”
এই সময় সুরমা একখানা মােটা সাদা চাদর গায়ে দিয়া
প্রস্তুত হইয়া আসিয়া যতীনের পায়ের কাছে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম
করিয়া পদধূলি মাথায় লইল। তারপর সুরেশের পায়ের উপর
মাথা রাখিয়া কিছুক্ষণ স্থির হইয়া রহিল।
দাড়াইল তখন যতীন দেখিলেন, সুরমার চোখ দু’টা রান্স।
হইয়া ফুলিয়া রহিয়াছে। সুরেশ দেখিল, সুরমার চোখে এক
ফোটা জল ।
এই সময় গড়ােয়ম রাস্তা হইতে চীৎকার করিয়া জানাই,
অনেক দেরী হইতেছে।
যখন সে উঠিয়া
১৬০ সুরমা A সুরমা মুখ ঢাকিয়া পা বাড়াইতেছিল। কিন্তু সহসা থামিয়া শান্ত কণ্ঠে কহিল, “আমি চলে যাচ্ছি বলে দুঃখু করাে না । আমি আড়াল থেকে যতীনদার সব কথাই শুনেছি। তার কথা কখনও ভুলেও অমান্য করো না। আমি যেখানেই যাই- গিয়েই চিঠি লিখব। আর আমায় একটা থা দাও।” “কি কথা সুরাে ?” ‘মদুআর খাবে না তা আমি জানি। তাই, ওকথা আর তুলবো না। কিন্তু সুরেশ ব্যস্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু, কি ?” সুরমা এক মুহুর্ত মৌন থাকিয়া কহিল, “কিন্তু একথাটা আমায় দাও-যে সংসর্গ উপরে উঠবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে শুধু অধঃপথের পথ দেখিয়ে চলে, তা থেকে তুমি দুরে থাকবে।” সুরেশ তৎক্ষণাৎ দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, “নিশ্চয়।” “আর একটা কথা।” বলিয়া সুরমা চুপ করিয়া গেল । সুরেশ আবেগে দাড়াইয়া উঠিয়া কহিল, “আর কি কথা সুরো ?” সুরমা কিছুই বলিতে পারিল না, শুধু ওষ্ঠাধর একটু কাপিয়া গেল। তারপর : সহসা “আচ্ছা, তা হলে আসি” বলিয়া আবার গড় হইয়া উভয়ের সম্মুখে প্রণাম করিয়া, মুখ ঢাকিয়া দ্রুত পদে নীচে নামিয়া গেল। যতীন-সুরেশ পিছনে পিছনে নীচে আসিয়া দরজার কাছে দাড়াইলেন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.