Bally Sadharan Granthagar
Gangesh
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মঃ পরমদৈবত-শ্রীমদম্বায়ৈ সর্বমঙ্গলায়ৈ। গঙ্গেশ। “কিং গবি গােত্ব মুতাগবি গােত্বং চে গবি গােত্ব মনর্থকমুক্তং। অগবিচ গােত্বং যদি ভবদিষ্টং ভবতি ভবত্যপি সম্প্রতি গােত্ব।” (গঙ্গেশ-সিদ্ধি-প্রসিদ্ধি ) সর্বমঙ্গলা-সভার সম্পাদক সুপ্রসিদ্ধ-ধৰ্ম্মতত্ত্ব প্রচারক পণ্ডিতবর শ্ৰীযুক্ত শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব ভট্টাচার্য্য বিরচিত। = সহকারি:সম্পাদক- দানবারি গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত। আশ্বিন। মুল্য ১এক টাকা ।
কলিকাতা।
১০ নং শম্ভু চন্দ্র চাটুষের ট, ঠনঠনে
নমূত
কাৰ্যমিশন যন্ত্রে মুদ্রিত।
গঙ্গেশ। কিং গবি গােত্ব মুতাগবি গােত্বং চেদ গবি গােত্ব মনর্থক মুক্তং । অগবি চ গােত্বং যদি ভবদিষ্টং ভবতি ভবত্যপি সম্প্রতি গােত্বম্ । উল্লিখিত শ্লোকের ব্যাখ্যা বিবরণ ও তাৎপৰ্য পাঠকবর্গ গঙ্গেশের যথা- স্থানে অবগত হইবেন। গঙ্গেশের—সিদ্ধি সাধনার—প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বরূপে এই শ্লোকটি শত শত বৎসর হইতে ভারতীয় গুরু-সম্প্রদায় সাধক-সম্প্রদায় এবং অধ্যাপক-সম্প্রদায়ের কণ্ঠে কণ্ঠে কীৰ্ত্তিত হইয়া আসিতেছে, কিন্তু দুঃখের কথা বুলিতে কি,কেন? কিসের জন্য ? কোথা হইতে, কাহার কণ্ঠে এ শ্লোকের উৎপত্তি, অনেকেই তাহার কোন সন্ধান সংবাদ কিছু মাত্র রাখেন না। বহি- দৃশ্যে-নৈয়ায়িকী ভাষায় বাকচাতুর্যের আমােদময় একটি শ্লোক না শ্লোক, এই পর্যন্তই অনেকের ধারণা, কিন্তু বটবীজাকার এই একটি শ্লোকের মধ্যে যে এমন দিগদিগন্ত-বিসারী অভ্রভেদী বিশাল বৃক্ষের ন্যায় গদেশের বিশ্ববিজয়ী অদ্ভুত অলৌকিক সিদ্ধি-সাধন-কীর্তিকলাপ নিগূঢ় ভাবে নিহিত আছে, তাহার সন্ধান সাধক-সম্প্রদায়ের মধ্যে কেহ কেহ জানিলেও সাধারণ-সমাজে প্রায় কেহই অবগত নহেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। যাহা হউক, এই বীজে জলসেক করিয়াই আমরা আজ গঙ্গেশ-সুরতরু- চ্যুয়ায় সন্তপ্ত, তাই সংসার-সন্তপ্ত পথশ্রান্ত সাধন-পথিক ভাই সাধক। তােমাকেও দু-দণ্ডের জন্য এই স্থানে বসিয়া মনঃপ্রাণ সুশীতল করিতে বলি !—আর বলি ভাই! তুমিই একবার প্রাণের কপাট খুলিয়া বল!
যে গঙ্গেশের সিদ্ধি-সাধন-ব্যাপার এইরূপে করুণাময়ীর কৈবল্যধামে উন্মুক্ত দারে উপনীত, সেই গঙ্গেশ, গৌতম-দর্শন ন্যায়-শাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইয়াছিলেন বলিয়া “গঙ্গেশ উপাধ্যায়” নামে প্রসিদ্ধ, এ কথা মনে করিতেও আজ এই সিদ্ধি-সাধন-বাৰ্তা-পর্যন্ত-বিবর্জিত আমাদিগের ন্যায় অধঃপতিত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত-সমাজের বস্তু-বিচার-শক্তি দেখিয়া আপনাকে আপনি শত শত ধিক্কার দিতে ইচ্ছা হয় কি না? গঙ্গেশ প্রসিদ্ধ কি প্রসিদ্ধ, এই অসিদ্ধ অসাধক সমাজে তাহা বুঝিবার সামর্থ্য কয় জনের আছে? যাহার যাহা সাধনা, সে তাহারই সিদ্ধি বুঝিয়া থাকে, সেই অনুসারে বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত-সমাজ বহু শতাব্দী পূর্ব হইতে যে সাধনায় মত্ত হইয়াছেন, গঙ্গেশের পক্ষেও তাহারা সেই সাধনার সিদ্ধিই বুঝিয়া- ছেন। জানি-এ বঙ্গভূমিতে তাহার জন্য দুঃখ করিতে নাই। অগাধ-জলচারী মহামীন যেমন পরিণামে আপন ভারে আপনি অচল হইয়া মহানদীর তীরন্তরে ভূগর্ভে চির-শয্যায় শয়ন করে-তদ্রুপ কত শত গঙ্গেশ আজী- বন নিজ তত্বময় জীবনে বিচরণ করিয়া পরিণামে ব্রহ্মময়ীর ব্রহ্মানন্দে আপন ভারে আপনি বিভাের হইয়া নর-নয়নের অজ্ঞাতসারে বঙ্গভূমির এই বিস্তীর্ণ অঞ্চ-শয্যায় অনন্ত সমাধি গ্রহণ করিয়াছেন, কাহার সাধ্য তাহার সংখ্যা বা সন্ধান পায়। তবুও বলি –ভাই সাধক! তুমিও যদি গঙ্গেশকে কেবল গঙ্গেশ উপাধ্যায়” বলিয়াই জানিয়া থাক, তবে সে দুঃখ রাখিবর আর স্থান নাই, তাই ভাই ! তোমার জন্য আজ গঙ্গেশের এই দৃশ্যপট-উন্মােচন। তুমি একবার নিজ-লােচন উন্মীলিত করিয়া গঙ্গেশের এই তত্ত্ব-মধুর মত্ত-মূর্তি নিজ-হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত করিয়া লও—আমিও আমার একজন ইহ-পর লােকের সুখের সুখী দুঃখের দুঃখী দেখিয়া যাই। শিবচন্দ্র দেবশর্মা শ্ৰীশ্ৰীশ্বরী সর্বমঙ্গলা বিজয়তে। পরিহার। অনেক ; ভাই সাধক! মায়ের সোহাগের ছেলে গঙ্গেশের জন্মান্তরীণ-সাধনার সিদ্ধিবৃত্তান্ত এই প্রচারিত হইল। অভিনয়ে প্রদর্শন করিবার উপায় থাকিলেই বঙ্গদেশে তাহার নাম নাটক হইয়া থাকে। বস্তুতঃ গঙ্গেশ নাটক নহে, তবে ইচ্ছা করিলে দৃশ্যচিত্ররূপে উপস্থিত করা যায় এই মাত্র। কল্পিত উপন্যাস নবন্যাসের ছায়া লইয়া আজ কাল অনেক নাটক অভিনীত হইতেছে; কিন্তু দুঃখ এই যে, মানবজীবনের শীর্ষস্থানীয় আদর্শ-সিদ্ধসাধক মহাপুরুষগণের অলৌকিক সিদ্ধিসাধনাপূর্ণ পবিত্র ঘটনাবলীর সংবাদ সাধারণ- সমাজের শ্রবণ নয়ন হৃদয় হইতে কত শত যােজন দূরান্তরে ঘােরন্ধকারে আচ্ছন্ন রহিল, আজ পর্যন্ত কেহ তাহার সন্ধানও লইলেন না; সেই দুঃখেই আজ সর্বমঙ্গলা-সভার উদ্দেশ্যসাধনে নিয়তব্ৰত শিবপুরস্থ সাধক-সমাজের বিশেষ অনুরােধে গঙ্গেশের অলৌকিক সিদ্ধিসাধনাচিত্রের এই অভিনব অবতারণা। কি পুস্তক পাঠে, কি সঙ্গীতে, কি অভিনয়ে সকল প্রকারেই গঙ্গেশের তপঃয়িদ্ধিপ্রভাব যাহাতে সাধারণ-সমাজে বিপুল বিস্তৃতভাবে প্রচা- রিত হয়, তাহার জন্যই গঙ্গেশের চিত্র অভিনয়ের উপযােগিতায় চিত্রিত হইল। নাটক শব্দ শাস্ত্রসিদ্ধ।—অলঙ্কার-শাস্ত্রের নিয়মানুসারে নাটক রচনা করিতে হইলে তাহার যে সকল সন্ধিবন্ধন ও আনুষঙ্গিক নানা রসের অবতারণার প্রয়ােজন, গঙ্গেশের সিদ্ধিবৃত্তান্তে একতঃ তাহা অসম্ভব ; . কারণ ইহা উপন্যাস বা কোনরূপ কল্পিত গল্প নহে, গঙ্গেশের জীবনে ইহা সত্য সংঘটিত ঘটনা। সেই সত্য রক্ষা করিয়া যত টুকু যাহা করিতে পারা যায়, এ ক্ষেত্রে তত টুকুই লেখকের অধিকারের সীমা, রসপুষ্টির জন্য তাহা অতিক্রম করিবার সাধ্য কাহারও নাই। এই জন্য রসের অনুগত হইয়া গদেশের চরিত্র চিত্রিত হইবার নহে; কিন্তু গঙ্গেশ-চরিত্রের অনুগত হইয়াই, গঙ্গেশের রসে রসিক হইয়াই গঙ্গেশের কথা অবতারণা করিবার কথা। তাই বলিতেছি- গঙ্গেশকে নাটক বলিয়া বুঝিবার বা বলিবার কিছু নাই। দ্বিতীয়তঃ- এ সংসারে যাঁহারই জীবনের যে কোন ঘটনাই হউক না কেন, তাহাকে আর নূতন করিয়া নাটক বলিবারই বা কি আছে ? ভাবিতে গেলে ভাই! নাটক করিতেই আসিয়াছি, নাটক করিতেই বসিয়াছি, ইহার মধ্যে আবার নূতন নাটক লিখিবারই বা কি আছে ? তাই, সকল নাটক ভুলিয়া গিয়া, গঙ্গেশকে লইয়া নটবর-রমণীর উদভ্রান্ত-নৃত্যলীল গুরুমুখে যাহা শুনিয়াছি—আজীবন প্রাণে প্রাণে পােষণ করিয়াছি, প্রাণগত উপহারস্বরূপে তাহাই আজ সাধক-সমাজের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম। ভাষা ভাব রসমাধুৰ্য্যছন্দোবন্ধ চিত্রনৈপুণ্য ইত্যাদি বিষয় চিন্তা করিবার অবকাশ গঙ্গেশের জীবনে আমার হয় নাই। কারণ, সকল রসের পৰ্যবসান যে রসে হয়, গঙ্গেশের জীবন সেই রসেরই মত্তমধুকর। যে চরণারবিন্দ হইতে এ রসমকরন্দ নিত্য নির্গলিত, সে রসে যিনি আত্মসমর্পণ করিয়া সেই কমলের সেই সরােবরে চিরশয্যায় শয়ন করিয়া স্বয়ং চৈতন্যময় হইয়াও শবরূপ সাজিয়াছেন, তঁাহার সে অপরূপ রসের কথা তুলিয়া আর কায কি ভাই! এ রসের কথা যে লেখে সেও পাগল, যে শােনে সেও পাগল, যে বােঝে সে যে পাগল সে কথা আর বলিবার অপেক্ষা কি আছে ? তাই ভাই! যার বাবা পাগল, মা পাগল, দাদা পাগল, ভাই পাগল, লােকে তাহাকে পাগল বলিলে তাহাতে আর তাহার ভয় কি ? আরও এক কথা ভাই! যে সকল পাগলের জন্য এ সকল পাগলামি, তুমি যদি তঁাহাদের কেহ হও, আর গঙ্গেশ পড়িয়াও গঙ্গেশের লেখকের সমালােচনা করিবার প্রবৃত্তি তােমার প্রাণে জাগে, তবে ভাই! ইহা তােমার পড়িয়া কাষ নাই। গঙ্গেশ কেবল পাগলেরই নিজস্ব সম্পত্তি ; পাগল না হইয়া ভাই! ইহা তুমি পড়িও-ও না, দেখিও-ও না, ইহাই আমার শেষ পরিহার-প্রার্থনা !! তােমাদিগেরই পথের ভিখারী- তােমাদিগেরই গঙ্গেশের দাস।
ভাই গঙ্গেশ। প্রাণের ভাই গঙ্গেশ আমার! জানি তােমাকে “ভাই” না বলিয়া দাদা বলায় অনেক লাভ আছে; কিন্তু ভাই ! কি করিব? তুমি আমার বাল্য- সখা। সেই বাল্যকাল হইতে এ পর্যন্ত তােমার যে মূর্তি দিনরাত্রি নয়নে নয়নে দেখিয়া আসিতেছি, তাহাতে ভাই! তেমাকে “ভাই” না বলিয়া দাদা বলা আমার অসাধ্য। গঙ্গেশ! আমি যদি তােমাকে সর্বশাস্ত্রে অগাধ পণ্ডিত, শত সহস্র ছাত্রের অধ্যাপক, বয়ঃপ্রবীণ গঙ্গেশশাপাধ্যায় বলিয়া কখনও ভাবিতাম বা দেখিতাম, তাহা হইলে “ভাই” কেন ভাই। দাদা! তােমাকে দাদার দাদা বলিয়াও দেখিবার কথা ছিল। কিন্তু ভাই! যে দিন হইতে গুরুমুখে তােমার জন্মজন্মান্তরীণ-সাধনার সিদ্ধি- বৃত্তান্ত শুনিয়াছি, সেই দিন সেই সময় হইতেই জানি না কেন ভাই। তুমি এ দীনদুঃখীর দুঃখময় জীবনের চিরসহচর হইয়াছ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মথুরামণ্ডলীর অধিনায়ক এবং দ্বারকার অধীশ্বর হইলেও ব্রজবালকের দৃষ্টিতে চিরকালই সেই রাখাল-সখা --তাই অনুভুত বিষয়ের অনুভবতত্ত্ব অনুভব-কর্তার অধিকার-সাপেক্ষ। আমি যে দিন গুরুমুখে তােমার যে বয়ঃক্রম যে সিদ্ধিসাধনার অনুরূপ অপরূপ বালকমুৰ্ত্তি হৃদয়ে ধারণা করি- মাছি, সে দিন তােমার সে মূর্তির বয়ঃসংখ্যা, আর আমার সেই দিনের সেই বয়ঃসংখ্যা দুইই একরূপ ছিল। তুমি শত শত বৎসরের পূর্ববর্তী পুরুষ হইলেও সৰ্ব্বপ্রথমে আমার হৃদয়ে মহাসিদ্ধ-বালকমুৰ্ত্তিতেই দর্শন দিয়াছিলে ; অসম্ভব হউক, সম্ভব হউক সে বিচারের অধিকার তখন আমার ছিল না। একতঃ তােমার সেই অলৌকিক সাধনা-সিদ্ধির প্রলাে- ভন; দ্বিতীয়তঃ তােমার সেই মাতৃ-প্রেমমন্থর স্বভাব-সুন্দর মধুরমূৰ্ত্তিতে সমবয়স্কতা-নিবন্ধন ভ্ৰাতৃভাবের আকর্ষণ কিছুতেই আমি এড়াইতে পারি নাই।তাই ভাই! তােমাকে “ভাই” না বলিয়া এক দিনের জন্যও দাদা বলিবার প্রবৃত্তি আমার অদৌ হয় নাই। সেই হইতে এ পর্যন্ত যখনই তােমাকে ভাবিতেছি, তথনই দেখিতেছি—প্রজ্বলিত চিতানলের ;
মধ্যস্থলে জ্যোতির্মলমণ্ডিতা পুত্রবাৎসল্যচঞ্চলা উদ্ভ্রান্ত-নৃত্যময়ী মুক্তকেশী মা আমার, আর তাহারই সম্মুখে—আনন্দময়ীর আনন্দ-বিভাের, মা বলিয়া বাহু তুলিয়া কোলে উঠিতে অগ্রসর ভাই তুমি ব্যগ্রড়াবে দণ্ডায়মান। তােমার সে মূর্তি দেখিয়া দাদা বলিয়া ডাকিতে পারে, এমন পাষাণ প্রাণ এ জগতে কাহা আছে তাহা জানি না। যদি কোহারও থাকে থাক, আমার ত ভাই! তাহা নাই। তােমাকে দাদা বলিয়া আমি মায়ের ছােট ছেলেটি হইয়া মায়ের কোলে উঠিব, আর তুমি ভাই আমার দাদা হইয়া সম্মুখে দাড়াইয়া তাহাই দেখিবে ; একতঃ এ দৃশ্য আমার প্রাণে সহ হইবার নহে যে, তােমাকে নামাইয়া দিয়া আমি মায়ের কোলে উঠিব ; দ্বিতীয়তঃ আমারও হাতে ক্ষতি লাভ কিছু নাই। কেন না, আমি মায়ের কোলে উঠিলে কেবল মাকেই দেখিতে পাইব, আর তােমাকে মায়ের কোলে উঠাইয়া দিয়া আমি নিয়ে দাঁড়াইয়া থাকিলে মাকে আর তােমাকে এক সঙ্গে দুজনকেই দেখিতে পাইব। তাই বলি- ভাই! তুমি ভাই থাক। মা তােমাকে কোলে করিয়াছেন, মায়ের কোলে উঠিবার অধিকার পাইয়াছি, তুমি মায়ের কোলের ছেলে কোলেই থাক, আমি তােমার দাদা হইয়া নিয়ে দাঁড়াইব-মায়ের সােহগ ছাড়িয়া দিয়া বাবার সােহগে প্রাণ মাতাইব-এ দেহ ধরাতলে লুটাইয়া বাবার সােহগে তঁাহার বক্ষস্থলে মস্তক রাখিব-বাবার বক্ষঃস্থলে মায়ের চরণতলে এ মস্তক আমার সেই দিন স্থান পাইবে,—ভাই গঙ্গেশ! সেই দিন আমি ধন্য হইব!! মায়ের কোলে উঠিলে এ সাধ আমার কথও পুরিবে না, তাই ভাই! আমি ধরাতলে থাকিয়া বাবার বক্ষঃস্থলে ছুটিয়া পড়িয়া মায়ের চরণতলে “জয় মা।” বলিয়া এ সাধের জীবন ঢালিয়া দিব! ভাই রে ! লােকে ভাই হইয়াও যে সােহাগ পায় না, আমি তােমার দাদা হইয়াও সে দিন সে সােহাগ পাইব। ভাই রে—তাে- কি জানি কে ?
জয় মা !
অবতারণা।
ভৈরব-ঘাটে-ভৈরবী।
রক্তবস্তু-পরিহিতা, অস্থিমালা-রুদ্রাক্ষমালায় বিভূষিতা, বামহস্তে
নর-কপাল—দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল, ললাটে সিন্দুরের অর্ধচন্দ্ররেখা,
ভাবােন্মত্তা মুক্তকেশী ভৈরবীর— গান গাহিতে গাহিতে) প্রবেশ।
গান। (১)
আহা মরি ! কি হেরিলাম।
তাণ্ডবরস-বিবশা—বিবসনা ত্রিভঙ্গিনী।
কিবা, রসুনে দশনে, মধুর হসনে,
ত্রিনয়নে ঘন-অপাঙ্গিনী।
ললিত-লাবণ্যে কলিতমাধুরী দ্বিরদ-গমনে নীরদ-সুন্দরী,
রদ-বিদলিত-অধর-গলিত,
দর-সুধাধারা—সৌদামিনী ।
কিবা দল মল গলিত চিকুর আকুল চকোরকুল কি বিধুর।
হেরিচরণচন্দ্রমা, চাতক চতুর
ধাইছে (হেরি) নবকাদম্বিনী।
বব্যাম ব্যোমপদে পদে ব্যোমকেশ ব্যোমবসনে দোলে এলােকেশ,
আবেশ-হিল্লোলে উড়ে লাজ-লেশ,
(তাই কি) পদে পড়ে শিব হেরে উলঙ্গিনী।
গীতান্তে ধ্যানাবস্থায়-“মা! মা!” ধ্বনি ও নৃত্য করিতে করিতে গান। (২), কার ঘরের আদরের নিধি তুই মা আমার এলােকেশী। এত—অনাদরে থাকি তবু দেখে বােধ হয় ত্রিশলাকেশী ৪ শ্মশানের সব ছাই ভস্ম উড়ে গিয়ে লেগেছে গায়। তবুকি অপরূপ জ্যোতির্ময়রূপ, ঝরিছে লাবণ্য তায়। কেউ কোথা নাই একাকিনী, দেখে বােধ হয় কতই বা দুখ ? তবু—বিশ্বধরে ধরে না হাসি, হাসি, ধরাতে যেন ধরে না সুখ? যােগিজনে হৃদয়াসনে ধ্যানে পায় না যে চরণ। তাের—শিবা সনে যাের শ্মশানে সেই চরণে বিচরণ। কেবল নয়, শিবা সনে শিবাসনে কখনও বা শবাসনে। শিব-হৃৎ-পদ্মাসনে যােগাসনে ব’ মা! একবার যােগা সনে। অথবাকা নাই ব’সে, বেড়াও নেচে ইচ্ছাময়ি! ইচ্ছা যেরূপ। এলেকেশ—দুলবে ভাল, খেলবে ভাল, সাজর্বে ভাল তায় কালােগ। মা তাের ঐ—এলােচুলে হেলে দুলে ঢলে পড়া ভাবের সনে। আমি—যাই মা! গ'লে, চরণতলে—“জয় মা?” বলে এ জীবনে। আ মরি মরি! এত কি রূপের মাধুরী মা!-ও ভুবনভরা রূপের ছটায় নয়ন মন যে মাতিয়ে যায়। কালেরূপে এলােকেশে এত কি শােভা হয় মা ! শরদের শ্যাম-আকাশে শশী যদি মা! শ্যাম হত, সেই শ্যাম- শশী ললাটে ধরে পূর্ণিমা যদি দেখা দিত, আর সেই উজ্জল শ্যাম-সুধাকরের মণ্ডলের চতুর্দিকে ছায়াময়ী মেঘমালা যদি হেলে দুলে খেলা কত, আবার সে শরসে শশী-সে পূর্ণিমা এ সবই যদি নিত্য পদার্থ হত, তবেই কদিন শতাংশের একাংশের সাধ মিটায়ে বলতে পারতাম—এলােকেশের মাঝে আমার এলােকেশী কেমন সাজে। হায়! হায় মা! এই শ্মশানেই এক দিন তুই তেমনি করে সেজে আবার তিনি করে নেচেছিলি! সেই শ্মশান আজও এই তেমনি ভাবেই প'ড়ে মাছে; কিন্তু মা! তােরু-শিবা সনে ঘাের শ্মশানে সেই চরণে বিচরণ” মার ত এখন দেখি না মা-বুঝেছি মা!—সে বিচরণ তােমার শ্মশানেও য়, মশানেও নয়—শবাসনেও নয়, শিবা সনেও নয়, জীবের হৃদয়াসনে তুমি সে না বসলে এ নির্দয় শশানে তােমার চরণদর্শন, কে পায় মা- ছা শ্মশান! তুমি সেই—ভারতের শ্মশান! –এ জগতের সকল শ্মশানই বিকঙ্কালে ভূষিত হয়, ভারত-শ্মশান! তুমিই কেবল শ্মশান হয়েও জগদম্বার টরযােহাগের জীবন্ত সন্তান সকল কোলে করে নাচাইতে, এ গৌরব এ জগতে কেবল তােমারই ছিল। আজ সেই সকল কোলের ছেলেকে মা কালে তুলেছেন, তাই তােমার দেহ আজ মৃতদেহে সমাচ্ছন্ন, কোলের ছেলে হারিয়ে শ্মশান! তুমিও আজ অচৈতন্য! কোলের ছেলে কোলে তুলতে মা-ও আমার আর আসবেন না, তুমিও আর হাসবে না! আনন্দে আনন্দময়ী আর মা আমার শ্মশানে নাচবেন না, সে নৃত্যভরে ঘুমের ঘােরেহায় রে শ্মশান! তুমিও আর জাগবে না ! গান। (৩) এই কি রে সেই -মায়ের আমার চিরসােহাগের ভারতশ্মশান । ত্যজি কৈলাস কৈবল্যধাম, এই ছিল মায়ের নিত্য নৃত্য-লীলা স্থান । কি ব্ৰহ্মা কি শঙ্কর, মায়ের চির-কিঙ্কর, চক্রধর আজ্ঞাধর, ত্যজি নিজ নিজ স্থান- মায়ের চরণের সঙ্গে সঙ্গে, ভাসি সেই প্রেমতরঙ্গে, যথায় আসি মুক্তকেশীর তাণ্ডব-গানে দিতেন তান ।
দিয়ে আনন্দে করতালী, গাইতেন জয় জয় কালী; সেই শবময় চৈতন্যভূমি, হায় শ্মশান! শ্মশান তুমি, হারিয়ে শ্মশানবাসিনীর সেই সাধের অধিষ্ঠান। অাজ, মায়ের সব যত ছেলে, উঠেছে মায়ের কোলে, নাই রে কেউ আর, তাই আঁধার, আজ সেই জ্যোতির্ময়ীর ব্ৰহ্মজ্যোতির অন্তর্ধান । । নাই শঙ্কর সর্বানন্দ, (নাই) বিরূপাক্ষ ব্ৰহ্মানন্দ, নাই সে গঙ্গেশ, যার তরে কেঁদেছিল মায়ের প্রাণ। হা গঙ্গেশ! বাপ, তুই কোথায়, সেই ভৈরব ঘাট এই রে হায়! কোথা দেব বিজয়-ভৈরব! এই কি তােমার শেষ বিধান। (গীতান্তে )— দেব ! তুমিও আজ নিরুত্তর ?-না!আবার কারও সে সৌভাগ্যের দিন নিকটে এসেছে? এ ভৈরব-ঘাটের অধিকারের মধ্যে আবার কি কোন ছেলেকে মায়ের কোলে তুলে দিতে সােহাগ করে আনতে গিয়েছ? আ মরি ! মরি! করুণাময় ! এই গুণেই তুমি বিশ্ব। বিশ্বেশ্বর, বিশ্বনাথ, বিশ্বময়, বিশ্বপিতা-এ সকল নামের গৌরবও তত নয়, বিশ্বমাতার নিয়ােগে আজ বিশ্বগুরু নামের গৌরব যত দেবদেব দিগম্বর । তােমার কোন নামেই তােমার প্রাণ আর তেমন গলে না--শরণাগত ভীত সাধক “জয় গুররা! শ্রীগুররা!” বলে ডালে “মাভৈঃ মাভৈঃ রবে তুমি ব্যাকুল প্রাণে যেমন ধাবিত হও !! তাই না দেব! গঙ্গেশের জন্ম- স্তরেও তুমি তাকে ভুলতে পার নাই। হায় রে ! হায়! ভৈরব-ঘাটে এসে আজ, কেবল গঙ্গেশের কথাই মনে পড়ছে! সেই শ্মশান, সেই প্রান্তর। কিন্তু যেন সবই শ্মশান, সবই বন,এখন কেবল হিংস্র জন্তুর আবাসভূমি! হায়! হায় রে ! এই বনেই সেই বাঘের মুখে গঙ্গেশের আমার প্রথম পরি- চয়। ঐ ত সেই বন, যাই না একবার দেখে আসি। না—আর কি দেখতেই
বা কোন্ প্রাণে যাব? গেলে ত কেবল সেই সকল কথাই মনে পড়বে! না-
তবুও যাই। বিস্মৃতির পট উঠে গেলেই স্মৃতির চিত্র জেগে উঠবে, মুহূর্তের
জন্যও ত সেই অভিজ্বানে গঙ্গেশকে আবার দেখতে পাব। আহা! বাছার
আমার সেই কি সুন্দর বাল্যবিক্রম! কি সুন্দর অভয়ভাব! আর সর্বোপরি
সেই কি সুন্দর জন্মান্তর-সাধনার প্রভাব । ধন্য দেব বিজয়-ভৈরব। ধন্য
গুরাে করুণাময় ! ধন্য ধন্য মায়ের আমার মহামন্ত্র-সাধনার জয় |
গান। (৪)
জয় জয় জয় করুণাময় জয় বিজয়-ভৈরব।
জয় ভীত-চকিত-সাধকত-ভীতিহরণ-মাভৈঃ-রব।
জয় ভুবন-পরমগুরুকুলগুরুকুলগৌরব।
জয় ভব-রৌরব-তারণ-গুণ-সৌরভ কুলগৌরব।
জয় সাধককুলরাধিত পদ—বাধিতকলিকৈতব।
জয় জয় শিবচন্দ্র হৃদয়—পদপল্লব-বৈভব।
(করতালী দিয়া গান গাহিতে গাহিতে প্রস্থান।)
No text on this page.
নমঃপরমদৈবত-শ্রীমদম্বায়ৈ সর্বমঙ্গলায়ৈ। গঙ্গেশ। অনেকক্ষণ প্রথম দৃশ্য। বনমধ্যে অশ্বথমূলে জটাজুটমণ্ডিত ভস্মভূষিত ধ্যানস্থ সন্ন্যাসী। (গঙ্গেশকে ক্রোড়ে করিয়া কাষায়-বসন-পরিহিতা রুদ্রাক্ষশঙ্খ- সিরমাত্র-ধারিণী মহামায়ার প্রবেশ।) মহামায়া। (সন্ন্যাসীকে প্রণামপূর্বক এক পার্শ্বে অবস্থান স্থিরদৃষ্টিতে সন্ন্যাসীর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ)। গঙ্গেশ। (মহামায়ার অঞ্চল ধরিয়া) মা! আয় মা ! আর এখনও দাড়িয়ে আছিস কেন? চল না - বাড়ী যাই । মহা। ( হস্তসঙ্কেতে নিবারণ) গঙ্গেশ। চল, না মা ! (মহামায়া কর্তৃক পূর্ববৎ নিষেধ ) ঙ্গেশ। (বনবিভাগে দৃষ্টিক্ষেপ পূর্বক সোল্লাসে হাতে তালী দিয়া) মা! মা! মা! ঐ দেখ, মা!-- দেখ, মা ! কেমন সুন্দর বাঘের বাচ্ছা । ( হস্ত-সঙ্কেত পূৰ্ব্বক) গান। (৫) ঐ দেখ মা! বাঘের বাচ্ছা আমি গিয়ে ধ’ব ওটায়। দৌড়ে গিয়ে চড়ব ঘাড়ে দেখি বেটা কমনে পালায়।
২
গঙ্গেশ।
নেচে নেচে ঐ বেড়াচ্ছে, আবার দৌড়ে গিয়ে ঐ দুধ খাচ্ছে।
ঐ দেখ, মা । দাঁত বের করছে, (উঃ) ভয় দেখাচ্ছে বেটা আমায়।
লেজ নাড়ছে ঘুরে ঘুরে,
ভাবছে আমি কত দূরে,
এই দেখ বেটা ধরুলাম তােরে, আয় আয় আয়, মা শীগগির আয় ।
(গীতান্তে)
আমি ওটাকে ধরে আনি মা! ধরে আনি।
( প্রস্থান।]
মহামায়া। (সচকিতে) হা জগদম্বে ! এ কি বিপদ! (গঙ্গেশের
পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইয়া) হাঁ রে গঙ্গেশ! করিস কি ?
করিস্ কি ? এ দিক আয়! ঐ দেখ, ওর মা বসে আছে।
(গঙ্গেশের হস্তধারণ)
গঙ্গেশ। আছে তাই কি? ছেড়ে দে মা ! আমায় ছেড়ে দে ! আমি
ওটাকে ধ’বই ধ’ব।
মহামায়া। হাঁ রে অবােধ। একে বাঘের বাচ্চা, তাতে ও মা রয়েছে সম্মুখে,
ওকে তুই ধরুবি কি করে? তা হলে যে, ওর মা এখনই
তােকে মেরে ফেলবে।
গঙ্গেশ। কেন? তুইও ত আমার মা আছিস, তুই ঠেকাতে পারবিনে ?
মহামায়া। হাঁ রে অবােধ ।-ও যে বাঘ ।
গঙ্গেশ। দুর হ বেটি ! বাঘ দেখে তাে এত ভয়?
আগে জালে
আমি তাের সঙ্গে আতাম না। লােকে বলে আমার বাবা
যেখানে গিয়েছে, সেখানে কত বাঘ ভালুক আছে, আর তুই
বেটা আমার মা হয়ে বাঘ দেখে এত ভয় করিস? আমি
ওটাকে ধ’যুবই ধ’রূব ! এই দেখ, তুই—বাদে আমার কি করে ?
( সবেগে মায়ের হাত ছাড়াইয়া আঁচল ছিড়িয়া পালাইবার
চেষ্টা।)
প্রথম দৃশ্য।
মহা । ( আলুলায়িতকেশে অতি ত্রস্ত ব্যস্ত ভাবে কাতর কণ্ঠে)
হ মা সৰ্বমঙ্গলে! কি কলে মা! এ পরে তােমার মনে আর কি
আছে মা! একমাত্র অঞ্চলের নিধি গঙ্গেশ আমার, তাও বুঝি
আজ অঞ্চল ছিড়ে পালিয়ে যায় মা! আমি যে আর কিছুতেই
ধরে রাখতে পারিনে। হায়! হায়! আমার সকল সাধ বুঝি
মিটুল মা! এই জন্যই কি আজ সাধ করে মহাপুরুষকে দর্শন
ক’তে পাঠিয়েছিলে? এ কালান্তক যমের সম্মুখে গেলে বাছা
আমার কি আর ফিরে আসবে? (গঙ্গেশকে লক্ষ্য করিয়া)
হরে গঙ্গেশ! দোহাই বাপ! তাের হাতে ধরি, এ সংসারে
আমার বলতে কেউ নাই বাপ্। আমার মাথা খাস বাপ।
যানে-বামে ।
[ মায়ের হাত ছাড়াইয়া গঙ্গেশের সবেগে প্রস্থান।
মহা। ( উর্ধে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া) হাঁ মা! তাের মনে এই ছিল মা!
আরে গঙ্গেশ! কি ক’লি রে ! ( উচ্চৈঃস্বরে) তারা! তায়।
রক্ষা কর মা! ( সবেগে সন্ন্যাসীর চরণে পতন ও মুচ্ছা।)
সন্ন্যাসী। (সচকিতে ক্ষুব্ধভাবে) তারা! তার!-(চরণতলে মহামায়াকে
দর্শন করিয়া ইতস্ততঃ দৃষ্টিক্ষেপ ও গঙ্গেশের লক্ষ্যে সবেগে দৌড়িয়া
গিয়া তাহার কর ধারণ করিয়া) কোথা যাও বাপ! সম্মুখে যে বাঘ!
গঙ্গেশ। ( তীব্র দৃষ্টিতে সন্ন্যাসীর মুখের দিকে চাহিয়া সাহঙ্কারে)
তুমি না সন্ন্যাসী?
সন্ন্যা।
(কিছু ক্ষণ গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া) কে তুমি বাপ!
গজেশ। আমি সন্ন্যাসীর ছেলে! আমার বাবা কত শত বাঘের মধ্যে থাকে।
স্যা। (মহামায়ার দিকে তর্জনী-নির্দেশ করিয়া) ওখানে ঐ যে মা-টি
পড়ে আছেন, উনি তোমার কে?
গঙ্গেশ। বাঃ! তুমিও মা বললে? ও যে আমার মা। এখন থেকে তবে
আমিও তোমাকে দাদা বলে ডাকব।
* * *
৪ গঙ্গেশ। স্য। তা ডেকো ! এখন চল—আগে মার কাছে যাই। গঙ্গেশ। সে কি সন্ন্যাসী দাদা! তা হবে না, আমি যে ঐ বাঘের বাচ্চাটাকে ধ’ব। আগে ওটাকে ধরে আনি, তার পর মার কাছে যাব। সন্ন্যা। বল কি ভাই! ঐ যে ওর মা বসে রয়েছে, এখনি তােমাকে খেয়ে ফেলবে। গণেশ। তুমি সন্ন্যাসী তবে চোক বুজে বসে বসে কর কি ? সন্ন্যা। ভাই রে ! আমি চোক বুজে বসে বসে তােমারি ঐ বাঘ ঠেকাচ্ছিলাম, নইলে কি ভাই! তুমি এতক্ষণ এখানে থাকতে ? গজেশ। তবে আবার কি? এখনও ঠেকাও না। সন্ন্যা। ছি ভাই! মায়ের ছেলেকে কি মায়ের কোল-ছাড়া ক’রুতে আছে? ঐ দেখ—তুমি এয়েছ দেখে তােমার মা কেমন হয়ে পড়ে আছেন। ছি ভাই! মায়ের অমন দুঃখ দেখতে নাই। চল-চল! আগে মাকে উঠাই-গে। ওরা নিরপরাধ বনের পশু, ওদের উপর কোন অত্যাচার ক’তে নাই। গণেশ। ওর। তবে মানুষ খায় কেন? স্যা। কৈ? তােমাকে, আমাকে ত খায় না ? গঙ্গেশ। তুমি যে সন্ন্যাসী। সন্ন্যা। ভাই!-না, মনে হিংসা না থাকলে এ সংসারে কেউ কাকেও হিংসা করে না। সে কথা এখন থাক, চল-তুমি চল ! আগে মায়ের কাছে যাই। (গঙ্গেশের হাত ধরিয়া মহামায়ার নিকটে গমন ও উপবেশন)। (মহামায়ার লক্ষ্যে) মা! মা!—উঠ মা! ( সসম্ভমে মহামায়ার মন্তকে হাত দিয়া) মা! মা। উঠ মা! উঠ মা! উঠ । মহা। (সুপ্তোতিবৎ সসমে উঠিয়া সন্ন্যাসীর লক্ষ্যে ব্যগ্ৰস্বরে) হায়! কি হ’ল দেব ! আমার সর্বনাশ হল। দয়া করে দেখ—এতক্ষণ আমার গঙ্গেশের কি ঘটল ? সমা। (পাশ ফিরিয়া গঙ্গেশের পিঠে হাত দিয়া। এই নাও মা! তােমার গঙ্গেশ। (গঙ্গেশকে উঠাইয়া মহামায়ার ক্রোড়ে দান ) উঠ।
হা। প্রথম দৃশ্য। ( অতি আগ্রহে গঙ্গেশকে বক্ষে ধরিয়া) বাপরে! এই ত অভাগীর সর্বনাশ ঘটিয়েছিলে? ভাগ্যে মহাপুরুষ রক্ষা করলেন। (গঙ্গেশকে লইয়া সন্ন্যাসীর পদতলে পড়িয়া) দেব! কেবল গঙ্গেশকে রক্ষা কর নাই, গঙ্গেশের উপলক্ষ্যে আজ এ হতভাগিনীর জীবন রক্ষা করলে! সন্ন্যা। মহা। গঙ্গে। মহা। গছে। মহা। সন্ন্যা। ( সহাশ্যে ) মা ! যে গলেশ তােমার! তোমার গঙ্গেশকে গদেশ নিজেই রক্ষা ক’ছেন। (গঙ্গেশের লক্ষ্যে) বাবা ! ঠাকুরকে প্রণাম কর ! (হাসিয়া মায়ের মুখের দিকে হাত ঘুরাইয়া) ওমা! ও আমার দাদা হয়। হলেন—দাদাই হলেন, তুই প্রণাম ক না! প্রণাম ত তুইই কলি। কি দুরন্ত ছেলে বাপ. ! আচ্ছা! প্রণাম আমিই কছি। ( প্রণাম পূৰ্ব্বক সন্ন্যাসীর লক্ষ্যে আশীর্বাদ কর বাবা! এ পাগলের দুরন্ত পণা যেন ক্ষান্ত হয়! ও মা! ও আশীৰ্বাদ আমি করতে পাৰু না। তােমার গদেশের দুরন্তপণ আর পাগলামী, দিন দিন বাড়বে বৈ আর কমবে না, এই আমার সর্বান্তঃকরণে আশীৰ্বাদ। সে কি বাবা! ও পাগলামীতে যে সংসার অস্থির। আমি আশীৰ্বাদ কছি মা! ওর পাগলামীতেই একদিন এ সংসার সুস্থির হবে। বল কি বাবা! একে মনসা, তায় ধুলাের গন্ধ—একে ও-নিজেই পাগল, তার পর আবার তােমার আশীর্বাদ। তা হলে যে, এক তিলার্ধও ও-কে আমি রক্ষা করতে পাব না। মা! ওকে রক্ষা করবেন জগদম্বা ও ছেলে কেবল তোমার ছেলে নয়, তুমি নিশ্চয় জেনো-ও সেই ব্রিজগতের মায়ের সােহাগের ছেলে। মায়ের কোল ছেড়ে খেলা করতে-মায়ের মহিমা প্রচার কতে ভূতলে এসেছে। এ তােমার ছেলে নয় মা! জন্মান্তর- মহা। সন্ন্যা। মহ। সন্ন্যা।
' গশে। সাধনসিদ্ধ মহাপুরুষ। অতি অল্প দিনের মধ্যেই এ বালক এই মনুষ্য- দৈহেই দেবদুল্লজ-মহাসিদ্ধি লাভ করবে, ইহাও তুমি নিশ্চয় জেনো। —অঙ্গস্পর্শ মাত্রেই ও দৈবশক্তি আমি সম্পূর্ণ অনুভব করেছি। নইলে কি মা। মানুষের ছেলে কখনও সাহস করে বাঘের ছেলে বতে বাঘিনীর মুখে দৌড়ে যায়। সে কথা এখন থাক্, আমি আর একটি কথা তােমাকে জিজ্ঞাসা করছি মা! আমি একজন উদাসীন সন্ন্যাসী, পর্যটনের পথে এক দিনের জন্য এই বনমধ্যে অশ্বত্থামূলে এসে বসেছি, তুমি সম্ভবতঃ জনপদবাসিনী কুলকামিনী, এ বিজন-বনমধ্যে আমার নিকটে কেন এসেছ মা! আমি ত তা কিছু জানতে পারি নাই। মহা। দেব! তুমি মানবদেহধারী হয়েও মর্ত্যলােকে দেবতা, তােমাকে দর্শন করতে-প্রণাম করতে আসতে ত সকলেরই অধিকার আছে। তার পর আমি অতি হতভাগিনী, এমন সংসার-নিৰ্ম্মক্ত মহাপুরুষকে দর্শন করূতে আসতেও স্বার্থের অভিসন্ধি করে এসেছি। সন্ন্যা। মা! যে ভুবনপাবন পুত্রের গর্ভধারিণী তুমি, তােমার মত সৌভাগ্য- শালিনী জননী এ জগতে আর কে আছেন তা জানি না। হতভাগিনী হওয়া তােমার পক্ষে অসম্ভব মা! অতি শীঘ্রই সেই নিজ পরিচয় তুমি নিজেই পাবে, এখন বল -আমার নিকটে তােমার কি স্বার্থসিদ্ধির সম্ভাবনা ? মছা। (অধােবদনে নীরবে অশ্রুবিসর্জন।) সন্ন্যা। ও কি মা ! কঁাদ কেন ? কেঁদ না মা! যা মনে থাকে নিঃসঙ্কোচে নিষ্কপটে তা আমাকে বল, যদি তােমার কোনও উপকার আমার সাধ্যায়ত্ত হয়, তবে আমি তা অবশ্য ক’ব। মহ। (গদগদ অরে) দেব! বলতেই এসেছি; কিন্তু সে কথা আমার বার নয়। সন্ন্যা। মা ! যে কথাই হক না কেন? জেনে আমি তােমার দ্বিতীয় গঙ্গেশ, আমার নিকটে কোন কথা বলতে লজ্জা সঙ্কোচ করাে না। মহা । (গদেশকে নির্দেশ করিয়া) বাপ! এই বালকের বয়ঃক্রম যখন • সন্ন্যা। প্রথম দৃশ্য। এক বৎসর, সেই সময় হতে আমি সনাথা হয়েও অনাথা, সধবা হয়েও বিধবা, জীবিত হয়েও মৃতপ্রায়। এখন এর বয়ঃক্রম আট- বৎসম, এই সাত বৎসর আমার এ সর্বনাশ ঘটেছে। হাঁ মা তােমার অঙ্গে ত এখনও সধবার চিহ্ন, তবে কি তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন ? দেব! তা কি উপায়ে জাব, তিনি ত তার ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে আমাকে সহচারিণী করেন নাই ? আমি হতভাগিনী কেবল কাতেই এসে ছিলাম, কেঁদে কেঁদেই এ জীবন শেষ করলাম। মহা। গান। (৬) বলব কি দেব দয়ার নিধান ! (আমার) বিধির বিধান যা ঘটেছে। হারিয়ে-জীবনধন, পতিরতন, এখনও পাপ-জীবন আছে। (জীবন-মীনের জীবন আছে, জীবন হারা হয়ে ) সন্ন্যাসী অামার স্বামী, তার ধর্মের কণ্টক আমি, (সেই অপরাধে ) আজ, ত্যজে আমায় গেছেন তিনি তার পথে। আমি, জানিনা দেব। এ তাপ হ’তে, (এখন) শান্তি পাই গেলে কোন্ পথে ? (আর ত সহেনা সহেনা, পতিবিরহ-বেদন) সতীর পথ সেই পতিপদে, সে পথ কত দূরে আছে ? (আমায় বলে দাও, বলে দাও, যদি দয়া হয়ে থাকে) (অভাগিনী পাপিনী বলে) আমি, মনে ভাবি এ পাপ-জীবন, জীবনে আজ দেই বিসর্জন, ২ গণে। ( কিন্তু কি করি !) অনাথ সন্তান আছে অঞ্চল ধরি। এখন, আমি যদি ত্যজি জীবন, ও আঁধার হবে এ তিন ভুবন, (গঙ্গেশ জানেনা জানেনা, আমা বই কারে) বাছার আমার, “আমার” বলতে (আর) কে আছে সংসারের মাঝে ॥ ( এমন কেহ নাই কেহ নাই, বাছার পানে ফিরে চায়।) মহা। সন্ন্যা। কেন মা! কঁাদ কেন? তুমি পুত্রবতী ; মনুষ্য-ঋণ, পিতৃ-ঋণ পরিশােধ করে দৈব-ঋণ পরিশােধের জন্য তিনি যাত্রা করেছেন । উপযুক্ত পিতার উপযুক্ত পুত্ৰই জন্মগ্রহণ করেছে, তুমি সেই পুত্রের সৌভাগ্যশালিনী প্রসুতী, তােমার কাবার কোন কথা নাই। ওঃ!—এই জন্যই গঙ্গেশ বলছিল—আমি সন্ন্যাসীর ছেলে। তা মা! ভালই হয়েছে। দেখি মা ! তােমার হাত দেখি! ( বামকরতল প্রদর্শন) ( তীব্ৰদৃষ্টিতে হস্তরেখা পরীক্ষাপূৰ্ব্বক) মা! তােমার কঁদবার দিন ফুরিয়ে এল ; যা কেঁদেছ, সেই তােমার শেষ কান্না। মা তােমাকে অতি শীঘ্র শ্রীচরণে স্থান দিচ্ছেন, দিন অতি নিকটে মা! আমার কথা বিশ্বাস কর মা! গঙ্গেশের জন্য দুঃখ করো না, ও তােমার ত্রিলােকবিজয়ী কুলকুমার, অতি শীঘ্র ত্রিলােক-জননী এই মর্ত্য- লােকে নিজে এসে ওকে কোলে কবেন, এ সংসারে অতুল বিপুল কীৰ্তিশালী হয়ে গঙ্গেশ তোমার চিরজীবী হবে। আর এক কথা মা! আজ হতে তিন দিনের মধ্যে কৈলাসের মণিমন্দিরে তােমার জন্য মুক্তির দ্বার উদঘাটিত হবে। মা ! পরমপথচারী তােমার পতি ধন্য ! মুক্তকেশীর মুক্তিদ্বারে তুমিও ধন্য হতে চললে, জন্মান্তর-সাধন বলে পুত্র ও তোমার ধন্য ধন্য হবে। এর আর সুখসৌভাগ্য গৌরবের কথা কি আছে মা। •| প্রথম দৃশ্য। ৯ তোমাদের এই ধতা দেখে শুনে আজ আমিও ধই হলেম !! মহা। ( সবেগে সন্ন্যাসীর পদগ্রহণপূর্বক) বাবা! আজ তোমার মত পুত্র পেয়ে আমিও, ধন্য ধন্য হলেম! এ মৃত্যু-সংবাদ যে আমার কি আনন্দের, তা আমি বলে বুঝাতে পারি না! পতির সংবাদ পাব বলে তােমার নিকটে এসেছিলাম, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আজ তােমার নিকটে আমার সংবাদই পতিকে দিতে বলে চম। বাবা! যদি কখনও তােমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, তবে এ দাসীর কোটী কোটী প্রণাম তঁার শ্রীচরণপ্রান্তে জানিয়ে বলবে-এই আমার শেষ বিদায় ! গঙ্গেশের আমার এ সংসারে আমার বলতে আর কেউ রইল না! ( অঞ্চলে অশ্রুমােচন ও বােদন ) সন্ন্যা। মহা। একি মা! তুমি বিশেষ জ্ঞানবতী বলেই তােমাকে আমি এ সংবাদ বলাম, তাতে কাতর হলে কেন মা! বাবা ! মৃত্যুসংবাদে আজ আমার মৃতপ্রাণে জীবন এসেছে, এ আসন্ন মৃত্যু দেহেও সহস্রগুণ বলের সঞ্চার হয়েছে; কিন্তু বাপ! আমার অঞ্চলের নিধি, সােহগের ধন, অনাথ গঙ্গেশের আর আমার বলতে কেউ রইল না! (পুনৰ্বার অশ্রুমােচন) সন্ন্যা। মা! তুমি আমার কথায় বিশ্বাস কর, সেই ভবদুঃখনিহন্ত্রী নিজে এসে কোলে করে তােমার গঙ্গেশের সকল দুঃখ দুর করূবেন!-মা ! তােমার গঙ্গেশের প্রসাদে এ সংসারে অনেকের দুঃখ মােচন হবে। আর তােমাকে কি বলব মা! গঙ্গেশের জন্য তুমি এক তিলাৰ্দ্ধও ভেব না—কেঁদ না !! ( কৃতাঞ্জলিপুটে ) দেব! তুমি দয়ার নিধি, তাই আমার একটি দয়ার প্রার্থনা ! কি প্রার্থনা? বল মা! বাপ! যদি আমার গঙ্গেশের অদৃষ্টে সেই সৌভাগ্যই লেখা থাকে, মহ। সন্ন্যা। মহা।
গজল 1. পিতার মুখে তৰে ত বাবা! তুমি বলছ তা অতি শীঘ্রই হবে; যদি তাই হয় বাবা! তবে যে কয়েক দিন মা এসে আমার এই মা-হারা ছেলেটাকে কোলে না করেন, সে কয়েক দিন বাবা! তােমাকে আমার গলে- শের উত্তর সাধক হয়ে থাকতে হবে। আমি শুনেছি, উত্তর সাধক মহাপুরুষ গুরু না থাকলে অতি মহাত্মা সাধক দের ও বিপদ ঘটে থাকে, তাতে ও ত দুর্দান্ত অবােধ বালক, জানি না ও অদৃষ্টে কি ঘটবে? তাই বাবা! আমার শেষ প্রার্থনা গঙ্গেশের রক্ষার জন্য তােমাকে ও উত্তর সাধক হতেই হবে। সন্ন্যা। (সহাস্যে) মা! সাধকেরই উত্তর-সাধক প্রয়ােজন, ও ত তােমার স্বয়ংসিদ্ধ মহাপুরুষ সন্তান, ওর উত্তর-সাধকের প্রয়ােজন কি ? তবুও মা! তােমারও আজ্ঞা, আমারও সৌভাগ্য! কিন্তু মা! সে সৌভাগ্য ঘটবার উপযুক্ত আশীৰ্বাদ কি আমাকে করেছ? বিনা সাধনায় সিদ্ধিদর্শনই বা কার ভাগ্যে ঘটে থাকে? তথাপি তােমার গঙ্গেশের সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে অন্ততঃ সে সংবাদ জেনেও আমি ধন্য হয়ে যাব! মা! তুমি এখন তােমার গঙ্গেশকে কোলে করে গৃহে ফিরে যাও। এ তিন দিন মা! মায়ের ধ্যানে, মায়ের জ্ঞানে, মায়ের নাম-মহিমা গানে দিন রাত্রি কাটিও। মা ! তােমার এ পুণ্যদেহে বিশেষ কিছু ব্যাধি হবে না, ভয় করো না মা ! অভয়া মা আসছেন তােমার জন্য। আমি তােমার সে সুখসৌভাগ্যের সময় উপস্থিত হয়ে তােমার মুখেই শুন্ব—আমি যা বললাম তা সত্য কি না ? মহা । (গঙ্গেশের হাত ধরিয়া) বাপরে! আমার অঞ্চলের নিধি সৰ্বস্বধন মা-হারা গঙ্গেশ তুই, ঐ ত শুন্লি বাপ! তাের জন্য জগতের মা-আছেন। জগতের মা,—কে মা? যখন আসূবেন তখনই তাকে দেখিস। গঙ্গে। তিনি ত জগতের মা, তিনি এলেই বা আমার কি? না এলেই বা আমার কি ? তিনি ত আর আমার মা ন ? ;;
প্রথম দৃশ্য। মহ। হারে নির্বোধ! যিনি জগতের মা, তিনি কি আর তােৰু মা নন্ । গঙ্গেশ। আরে! সে যে জগতের মা ; জগৎ আমার কে যে, তার মা আমার মা হবে ? সন্ন্যা। আ মরি! মরি! ভাই সাধক! এমনি প্রাণের এমনি আবদার নিয়েই তুমি সংসারে এসেছ ! জগতের মা কেন ভাই! তােমার মা হবেন? অথবা তােমার মাকেই বা কেন তুমি জগতের মা হতে দেবে ? কি আর বলব ভাই, চিরজীবী হয়ে তুমি এই রূপেই জগৎকে পতলে দলিত করে জগদম্বার জয়পতাকা জগতে উড়াও! তােমার মাকেই জগতের ললাকে মা বলে ডাকুক। গঙ্গেশ। হ সন্ন্যাসী দাদা! এই কথাই ঠিক। সন্ন্যাসী। তা বই কি ভাই। মহা। তা ত ঠিক হ’ল ; হারে পাগলা! আর একটা কথা ঠিক করে, রাখ।-সে দিন তাে সে মা এলে যদি তাকে চিনতে না পারি, তবে তখন তাের এই দাদাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করি, উনি তােকে চিনিয়ে দেবেন। গঙ্গেশ। বা!-মজার কথা! এই বলছ আমার মা, আবার বলছ আমিই তাকে চিনতে পাব না? তুমিও ত আমার মা, তােমাকে চিছি কি করে ? সন্ন্যাসী। ভাল মাের ভাই! এমন নইলে কি মায়ের ছেলে হয় ? গঙ্গেশ। (মায়ের অঞ্চল ধরিয়া) হ মা ! সে মা আমার যখন আসবে, তখন তুই কোথায় থাকবি মা! মহা। ( গদগদরে ) কেন গঙ্গেশ ! কথা কেন জিজ্ঞাসা কছিস্ রে ? গঙ্গেশ। তুই যে বলছি-সন্ন্যাসী দাদা দেখিয়ে দেবে। মহা। বাবা! তা না; এই ত শরীরের অবস্থা, কখন কি হবে কিছু ত বলা যায় না? তা যাই হক বাবা! আমিও তখন তাের সেই মার কাছেই থাকব। দিনে কি রাত্রে তা ত জানি না
১২
গণ।
যদি রাত্রে হয়, আর তখন আমি ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে আর
তােকে চিনিয়ে দেবাে কি করে ?
গঙ্গেশ। এই না বলছি-সে মার কাছে থাকৃবি, তবে আবার ঘুমােৰি কি
করে? (সবিস্ময়ে) হ মা ! তুই কি তখন আমাকে ছেড়ে
সেই মার কাছে গিয়ে থাকবি?
মহা। -বাবা!-না, তােমার কাছেই থাকব।
গঙ্গেশ। তা হলে আমি তােক ঘুমােত দে’ৰৰ কেন?
সন্ন্যাসী। বার বার এই বার ; ভালা মাের ভাই! ঐ কথাটি যেন আগা-
গােড়া ঠিক থাকে। (মহামায়ার প্রতি) এমন ছেলে পাও নাই
মা! যে, কোথাও গিয়ে ঘুমােবে।
গঙ্গেশ। দেখ সন্ন্যাসীদাদা! তুমি এই বেলা শুনে রাখ, মাকে কিন্তু
আমি তখন ডেকে ডেকে ঘুমােতে দেব না।
সন্ন্যাসী।, ভাই রে ! তােমার মা ত ঘুমােবার মা নয়; মা-হারা ছেলের মা
যে হয়, তা কি আবার ঘুম থাকে। আহা! গদেশ রে !
আমি তেলে ঠিক পাইনে,-ততাকে ভাই বলি,—কি দাদা বলি?
গঙ্গেশ। (সহাস্যে করতালী দিয়া) ওমা! শুনছিস মা! সন্ন্যাসীদাদা
আমাকে দাদা বলে ডাকলে। তুই আবার না আমাকে বলছিলি
ওকে প্রণাম কতে?
সন্ন্যাসী। তাই ত দাদা! দেখ ত ভাই কি অন্যায়!!
মহা । বাবা! তােমার দাদা তােমাকে সােহাগ করে দাদা বলছেন।
গঙ্গেশ। না—তা না, আমি সত্যিই ওর দাদা। তুই যদি তা না বলিস ত
তােৰু এই কাপড়ের আঁচল ছিড়ে দেব-এখনি।
সন্ন্যাসী। তাই ত দাদা! ভাগ করে তুমি অর্ধেকটা আঁচল ছিড়ে
আমায় দাও; একাই তুমি সৰ আঁচল ধরে থাকবে কেন?
গঙ্গেশ। হা ! তাই বুঝি! আমি ছিড়ে ফেলে দেব।
সন্ন্যাসী। হা জগদম্বে! এ রাজ্যেও দায়ভাগ আছে?
মহা। হারে পাগলা! শােন! অমন করে পাগলামি করিসনে ।
গঙ্গেশ। কি মা।
প্রথম দৃশ্য। যা আমার, লক্ষ্মী আমার, তােমাকে একটি কথা বলে দেই- এই কথাটি বাবা! সত্য সত্যই মনে করে রেখাে। তুমি ত কাকেও ভয় কর না; কিন্তু বাবা। যে দিন তুমি বড় ভয় পাবে, যে দিন তােমাকে রক্ষা করতে কেউ আর আসবে না বাপ,—আমি যেখানেই কেন না থাকি, তােমার সে মায়ের কথাও যদি মনে থাকে, তবে যত পার সে সময়ে তুমি আমাকে ডেকো ! ভয়ে যদি মুখে ডাকতে না পার, তবে মনে মনেও আমাকে ডেকো ! গঙ্গেশ। তা তুই শুনতে পাবি? মহা। পাব। সন্ন্যাসী। মনেও এমন স্থান নাই রে ভাই! তােমার মা যেখানে শুনতে না পান। গান। (৭) (ভাই রে !)তােমার মা শুনতে না পান এমন স্থান নাই ত্রিভুবনে। মা আমাদের বিশ্বশ্রবা রন-ভবনে 'বনে মনে। ৭ গােপনে আপন মনে, কথা কয় রে কত জনে, মা মমদের তথায় গিয়েও কান পেতে সে কথা শােনে। মুখের কথার কথা কি ভাই। মনের কথাও মা-ছাড়া নাই, যারা বলে মানিনা মাকে তারাও মানে মনে মনে। শ্রবণ-মনন-দর্শন-শক্তি, মা মােদের সেই আদ্যাশক্তি, মানি বা না মানি শক্তি গানাও সে শক্তির গুণে।
১৪ গছে। (গীতান্তে মহামায়ার প্রতি) মা! সূৰ্য্যদেব অন্তে গেলেন, মে সন্ধ্যা হ'য়ে এল, আর এ সময়ে এখানে থাকা উচিত নয়, গজেশকে কোলে করে গৃহে যাও মা! চল! বনের প্রান্তভাগ পর্যন্ত আমি তােমাদিগকে সঙ্গে করে রেখে আসছি। মহামায়া। সন্ন্যাসীর প্রতি কৃতাঞ্জলিপুটে) বাবা! যা আদেশ করলে তাতে আমার সূর্যদেব ত সত্য সত্যই অরে চললেন, সন্ধ্যা • ত নিকট হয়ে এল, চারদিকে আঁধারে ঘিরে ধরল, সম্মুখে সেই কালরাত্রি। বাবা! আজ এ বনের প্রান্ত পর্যন্ত যেমন সঙ্গে করে রেখে যাচ্ছ, মনে রেখাে-তােমার এ হতভাগিনী মায়ের কথা, সে দিনেও বাবা । এ সংসার-বিজন-বন হতে আমাকে বিদায় দিতে এমনি করেই সঙ্গে থেকে অভয় দিও। সন্ন্যাসী। মা ! বলেছি ত অভয়া মা আসছেন-তােমার অষ্ট ; কতক্ষণ ভম মা! মহামায়া । ততক্ষণই হয়, যতক্ষণ তাঁকে দেখতে না পাচ্ছি। সন্ন্যাসী। আচ্ছা মা! দেখবার সময় কিন্তু আমি গিয়ে তা দেখব। বল, আমি দেখতে পাব কি না? মহামায়া। যদি অদৃষ্টে থাকে বাপ,! তোমার আমি দেখব, আর তুমি দেখতে পাবে কি না, তাই আমাকে জিজ্ঞাসা ক’ছ ? সন্ন্যাসী। থাক্ মা! থাক্, সে কথা এখন কাষ নাই, সে বিচার সেই দিনেই হবে। এখন রাত্রি হয়ে এল, আর বিলম্ব করাে না মা। মহামায়া। রাত্রি ত হয়েই এসেছে বাবা! আর হ’ল কি ? সন্ন্যাসী। ও কি মা! তোমার মুখে আঁধার-আঁধার, রাত্রি-রাত্রি ও একটা কি কথা মা! পূর্ণিমার রাত্রিও কি একটা রাত্রি মা? তােমার ত দিনের তাপ ঘুচে এল, সফল জলা জুড়াতে এখন শান্তি-চন্দ্রিকার উদয় হল, তােমার কিসের রাত্রি মা। মহামায়া। তুমি যাকে মা বলেই, যাকে মা বলেই, জেনেছি-তার আর রাত্রি নাই। এস বাবা! তবে সঙ্গে এস-
দ্বিতীয় দৃশ্য।
সন্ন্যাসী। আমি যাকে মা বলেছি, তিনি আমার মা, গদেশের মা,
কার্তিকের মা, গণেশের মা ; আর অধিক কি বলব মা!
এই মা-ই আমার জগতের মা। আমার মায়ের মাৰিও নাই,
দিনও নাই, সন্ধ্যাও নাই, প্রভাতও নাই; এ অখণ্ড কালের
বুকে চরণ দিয়ে বাড়িয়ে আছেন কেবল ঐ এক আমারই
মা একেশ্বরী।
মহামায়া। গঙ্গেশ! তােমার দাদাকে প্রণাম কর !
(গঙ্গেশ ও মহামায়া কর্তৃক সন্ন্যাসীকে প্রণাম)(সন্ন্যাসীর
প্রতিপ্রণাম)
গঙ্গেশ। (মায়ের কোলে উঠিয়া) এস! সন্ন্যাসী দাদা! সঙ্গে এস।
সন্ন্যাসী। ভাই রে! এনি করেই সে দিন ডাকি, আর যে দিন
মায়ের কোলে উঠবি।
(গঙ্গেশকে কোলে লইয়া অগ্রে অগ্রে মহামায়ার ও
পশ্চাৎ পশ্চাৎ সন্ন্যাসীর প্রস্থান।)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
প্রান্তরে পথমধ্যে বৃক্ষমূলে সন্ন্যাসী ও তাহার
পার্শ্বে উপবিষ্ট গঙ্গেশ।
সন্ন্যাসী। গজেশ। এখনও তােমার মামার বাড়ী অনেক দূর, ক্রমেই
বেলা বেশী হয়ে উঠছে, চল ভাইটি ! আর বিলম্ব করে না,
এখনও অনেক দূর যেতে হবে।
গঙ্গেশ। ব’সে না, সন্ন্যাসী দাদা! আর একটু বসাে না। আবার কত
দিন পরে তােমায় দেখতে পাব ব’সস না! তােমার কাছে
বসে আরও গােটা কয়েক কথা শুনি।
১৬ সন্ন্যাসী। হাঁরে গঙ্গেশ! ক্রমেই বেলা হচ্ছে, তাের ক্ষুধা পাচ্ছে না? গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! তুমি কাছে থাকলে আমার ক্ষুধা পিপাসা কিছুই পায় না। সন্ন্যাসী। (স্বগত) তাই যদি পাবে তবে আর গঙ্গেশ হবে কেন? (প্রকাশ্যে ) আচ্ছা! তবে আর একটু বসি। বল দেখি, কি কথা শুনবি? গঙ্গেশ। 'আচ্ছা সন্ন্যাসী দাদা। বলতে পার, মা আমার কোথায় গিয়েছে ? বুঝেছি—সেই সন্ন্যাসী। বলেছি ত ভাই! মা সেই মায়ের কাছে গিয়েছে। গদেশ। তুমি যেতে দেখেছ ? সন্ন্যাসী। দেখেছি বুই কি। গঙ্গেশ। ছাই দেখেছ। সন্ন্যাসী। সে কথাও মিথ্যা নয় ভাই! তাও দেখেছি। গঙ্গেশ। তাও দেখেছ কি ? ছাই দেখেছ ? ও,তা যে শ্মশানে যে কাঠের মধ্যে মা আমার শুয়েছিল, আমি সেই কাঠে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম ; কেমন জ্বলেছিল সন্ন্যাসী দাদা? ঠিক যেন সেই দুপুর বেলা,-না ? সন্ন্যাসী। হাঁ! তা বই কি। গঙ্গেশ। সেই কাঠ পুড়ে ছাই হয়েছিল, তাই তুমি দেখেছিলে? আচ্ছা সন্ন্যাসী দাদা! কাঠ ত পুড়ে ছাই হয়ে গেল, আমার মা গেল কোথা? তো আমাকে সরিয়ে নিয়ে এলে, আমি তার পর ঘুমিয়ে পড়লাম ; তার মা আমার বুঝি চলে গিয়েছিল? তা থাকবে কি করে ?-যে আগুন! আচ্ছা তাের সব কেমনতর লােক? জান-মা কাঠের মধ্যে শুয়েছিল তবে অমন করে আমার হাত দিয়ে তার মধ্যে আগুন জ্বেলে দেওয়ালে কেন ? · সন্ন্যাসী। দেখেছিলে ত ভাইটি। গঙ্গার জলে মা কতক্ষণ গা-ডুবিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন, মার কত শীত পেয়েছিল! দেখেছিলে ত শীতে দ্বিতীয় দৃশ্য। ১৭ . একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন, তাইতেই ত মার আগুন পােহাবার জন্য আমরা কাঠে আগুন ধরে দিয়েছিলাম। গঙ্গেশ। আচ্ছা, তা ত দিয়েছিলে, আমার মাকে তােমরা অমন করে সাজিয়ে দিলে কেন? | সন্ন্যাসী। কেমন করে ? গঙ্গেশ। সেই যে সেই লাল-টুকটুকে নূতন চেলীর সাড়ী এনে মায়ের সকল গা ঢেকে দিলে, কত চন্দন রক্তচন্দন মার সারা গায়ে লেপে দিলে, তুমি মার কপালে সিঁদুরের ফোটা দিয়ে পায় আলতা পরিয়ে দিলে, কত জবার মালা অপরাজিতার মালা করবীর মালা দিয়ে মাকে সাজিয়ে দিলে । তাে প্রণাম করলে, আমাকেও প্রণাম করতে বলে। আমার কিন্তু দাদা। তখন ভারি সাধ করেছিল-মার বুকে উঠে একটু দুধ খেয়ে আসি। অনি তােমরা সকলে মিলে “দুর্গা দুর্গা-তারা তারা কালী কালী” বলে যে চেঁচিয়ে উঠলে, আমি ভাবলাম কি হ’ল? আর সে কথা ভুলে গেলাম্, অমনি তােমরা সবাই মিলে ধরাধরি করে আমার ঘুমন্ত মাকে কোলে করে নিয়ে “জয় মা !” বলে কাঠের উপরে শুইয়ে দিলে। অমনি সবাই তাড়াতাড়ি করে আগুন ধরাতে লাগল। মার ঘুমিয়ে উঠে খাবার জন্য তুমি সেখানে ভাত রেধে এনে আমার হাতে দিয়ে বলে-মার মুখের কাছে রেখে দে, আমি তাই রেখেদিলাম । আবার বল্লে–মা অন্ধকারে দেখতে পাবে না, তুই এই আলােটাও ঐখানে রেখে দে, এই বলে একটা সতে এনে আমার হাতে দিলে, আমি মার মুখের কাছে তা রেখে দিলাম- আর অমনি সেই সময়ে মার ঘােটা খুলে মুখখানি একবার দেখে নিলাম,-মা তখনও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাছিল। সন্ন্যাসী। হাসছিলেন ত, তোকে কিছু বল্লেন না ? গঙ্গেশ। হা-দেখ সন্ন্যাসী দাদা! তুমি ভারি বােকা ! বল্লাম--মা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসছিল,আর তুমি বল্লে কি না-তােকে ।
কিছু বল্লেন না? ঘুমিয়ে থাকলে কি, মা আবার কথা
বলে?
সন্ন্যাসী। ভাই রে! বেঁচে থাক্ ভাই! যা বলেছিস ঐ কথাই ঠিক।-
ঘুমিয়ে থাকলে কি আর মা কথা বলেন ? কথা বলেন না
তা সত্য; কিন্তু ভাই! ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও মায়ের হাসি টুকু
যায় না। বেটীর যে কতই ঘুম ? সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি,
চিরকালটা বেটী ঘুমিয়েই কাটালে!
গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! ও সব তোমার কি মিথ্যা কথা ? আমার
মা বুঝি দিন রাত্রিই ঘুমিয়ে থাকত ?
সন্ন্যাসী। না ভাই!-না; তােমার মা এক নিমেষের জন্যও কখন ঘুমান
নাই, ঘুমিয়েছেন—আমার মা।
গঙ্গেশ। 'কেন সন্ন্যাসী দাদা? তুমি না আমার মাকেই তােমার মা
বলতে, তবে তােমার আবার কোন্ মা কবে ঘুমিয়েছিল ?
সন্ন্যাসী। হ্যা ভাই! তাই ঠিক। ও কথাটা আমার মনে ছিল না।
গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! তুমি ত ভারি বিশ্রী লােক! মার কথা তােমার
মনে থাকে না?
সন্ন্যাসী। যা বলেছিস রে গঙ্গেশ! ঐ দুঃখেই গেলাম এবার।
গঙ্গেশ। আচ্ছা দাদা! আমার ত মনে আছে, তােমার কেন মনে
নাই?
সন্ন্যাসী। ঐ জন্যই ত বলছিলাম ভাই ! তােমার মা কখন ঘুমান নাই,
ঘুমিয়েছেন—আমার মা।
গঙ্গেশ। তােমার সব ভারি মজার কথা! মনে থাকে না তোমার,আর
দোষ দাও মার।
সন্ন্যাসী। মনে যে থাকে না ভাই! ওটাও বােধ হয় মায়েরই দোষ?
গঙ্গেশ। কেন ?
সন্ন্যাসী। দোষ যদি না থাকে, তবে বেটা হবে কেন?
গজেশ। বাঃ! আচ্ছা লােক তুমি ; দোষ থাকলেই বুঝি হাসে?
সন্ন্যাসী। দোষ কাকে বলে তা তুই জানিস?
দ্বিতীয় দৃশ্য। ১৯ গঙ্গেশ। হাসি কারে বলে তা তুমি জান ? সন্ন্যাসী। (সবিস্ময়ে) বাপ্ রে বাপ! ছেলে ত নয়,-ছেলের ঠাকুর- দাদা ! গঙ্গেশ। ও-সন্ন্যাসী দাদা! তবেই তুমি- সুন্ন্যাসী। গেলাম!-গেলাম! এটার জ্বালায় যাব কোথায়, তার পথ নাই যে? গঙ্গেশ। পথ নাই ত যাচ্ছ কি করে ? সন্ন্যাসী। মাগাে! মা! এ কি বিপদ ? গঙ্গেশ। ডাক! তােমার গােষ্ঠী শুদ্ধ যে যেখানে আছে, সব গুলােকে ডাক !!-একবার বাপরে বাপ!আবার মাগাে মা?-আবার ছেলে আর তার ঠাকুর দাদা। কেউ যেন আর বাকী না থাকে। সন্ন্যাসী। গঙ্গেশ! তুই বড়ই বকা ! গঙ্গেশ। দাদা। তুমিও বড়ই বােকা! সন্ন্যাসী। (স্বগত) বােকা নইলে আর এমন বকার দাদা হয় ? গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! ঐ ছােট করে তুমি কি বল্লে ? সন্ন্যাসী। না—তা তাের শুনে কায নাই। গঙ্গেশ। আচ্ছা, আমিও মনে মনে গাল দেব-এখন। সন্ন্যাসী। সে কথা থাক, তুই কি বলছিলি? গঈেশ। এর মধ্যে ভুলে গিয়েছ ? বলছিলাম-আমাদের মায়ের কথা, তােমাকে জিজ্ঞাসা কছিলাম-তো আমার মাকে অমন করে সাজিয়ে দিলে কেন? সন্ন্যাসী। হাঁ ভাই! ঠিক। সেই কথা। মা সেজেগুজে রথে উঠে সেই মার কাছে চলে গেলেন। গঙ্গেশ। ছি! আমাকে তা তােমরা ডেকে দেখালেই না,আমি একটুকু দুধ খেয়ে নিতাম। সন্ন্যাসী। থাক্ না ভাই! আর কয়েকটা দিন থাক না!—ততাকে আবার কোলে করে দুধ খাওয়াবার জষ্ঠ মা এই এলেন বলে।
২০
গঙ্গেশ।
গান। (৮)
আন্ কেন কাদিস রে গঙ্গেশ! গঙ্গাধরমমােহিনী-
গঙ্গেশ রে! তােয়, ধরূতে কোলে আসছেন ধরাধর-নন্দিনী
তুই রে তার মা-হারা ছেলে, (এই) ব্রহ্মাণ্ড যার কোলের ছেলে,
গঙ্গেশ রে !
ও যার,—বিশ্বসন্তান কোলে দোলে,
সেই জননী তাের জননী।
ওরে, অন্তরে বাহিরে সে মা, কোথাও বামা কোথাও শ্যামা,
যার যেমন সাধনার সীমা, সে তেমনি দেখে সে মা ;
মায়ের রূপের নাই উপমা
মা কেবল রে মা-রূপিণী ।
।
গঙ্গেশ রে তোেয়, কোলে ক’রুতে, সেই) কৈবল্যের ধন আসছেন মর্তে,
যে দিন মায়ের লীলামৃত্যে, আসবেন মাকে দর্শন করূতে,-
দেবদল রে-
সে দিন—এ ধরাতল নারূবে ধরুতে, সে আনন্দের জয়ধ্বনি।
সে দিন, পুত্রস্নেহে মায়ের আমার, পয়ােধরে ধরবে না ধার,
তুই মুখে ধরিবি সে ধার, ব্রহ্মা বিষ্ণু ভিখারী যার,
গঙ্গেশ রে!
কি কব তাের সৌভাগ্য আর ।
হবি, মৃত্যুঞ্জয়ের ধনে ধনী।
দ্বিতীয় দৃশ্য। ২১ গঙ্গেশ। আচ্ছা, সন্ন্যাসীদাদা! মা যে আমাকে সেই বলেছিল-যে দিন তুই বড় ভয় পাবি, সেই দিন আমাকে ডাকলে আমি তখনই তাের কাছে আসব। সে ত আজ কত দিন হয়ে গেল, আমি কত দিন ডেকেও ছিলাম, কৈ ? মা ত আমার এক দিনও এল না? সন্ন্যাসী। ভয় পেয়ে ডেকেছিলে কি? গঙ্গেশ। ভয় হয়ই না, তার পাব কি ? সন্ন্যাসী। ভয় পেয়ে না ডাকূলে ত মা আসবেন বলেন নাই ? গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা ! বলতে পার ভয় পাব কবে ? সন্ন্যাসী। যে দিন একেবারে অভয় হবে। গঙ্গেশ। অভয় কা নাম দাদা ? সন্ন্যাসী। ও রে! ভয় যা না থাকে, তারই নাম অভয়। গঙ্গেশ। তা ত আমি এমনিই আছি, তা আর হব কি ? সন্ন্যাসী। (স্বগত) তা বটে! তােমাকে ও-কথা বলাই আমার ভুল হয়েছে। গঙ্গেশ। আবার ছােট করে কি বলে ? সন্ন্যাসী। চল ভাই! চল! বেলা হল, ও সব কথায় আর এখন কাষ নাই। গঙ্গেশ। বাঃ! তুমি বুঝি আমার সে কথাটি বলবে সন্ন্যাসী। কোন্ কথাটি ? গঙ্গেশ। সেই-যে দিন ভয় পাব, সেই দিনের সেই কথাটি। কথাটি। কবে ভয় পাব যদি সেই কথাই না বলবে তবে তােমার সঙ্গে যাব কেন? সন্ন্যাসী। কবে হবে, তা ত বলতে পারি না ভাই। তবে খুব শীঘ্ন হবে এ কথা বলছি। আর এ কথাও কথাও বলছি- বলছি-ভয় হলেও, তাতে তােমার ভয় হবে না। গঙ্গেশ। বাঃ-মজা! তবে ত আমার ভারি ভয় ? সন্ন্যাসী। তােমার ভয় চিরকালই ঐ রকমের। না ?
২২ গঙ্গেণ। t গঙ্গেশ। না, সত্যি সন্ন্যাসী দাদা! বলতে কি, তােমাকে দেখে আমার ভারি ভয় হয়। সন্ন্যাসী। (স্বগত) তাই না এখনও প্রাণে প্রাণে বেঁচে আছি ? এর পরে যদি ভয় না থাকত, তা হলে এত দিন তুমি যে আমায় কি করতে তা ত আমি ভেবেই পাইনে। গঙ্গেশ। (তর্জনী তুলিয়া) দেখ দাদা! এইবার নিয়ে তুমি তিনবার ছােট করে কথা বলে! সন্ন্যাসী। হাঁ! বল্লেম। গঙ্গেশ। আমিও তােমাকে এমনি করে এগারবার ছােট ছােট করে কথা বলব, সন্ন্যাসী। তা বলি-এখনি, তােকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি-ততাকে যে তােৰু মামাবাড়ীতে রাখতে যাচ্ছি, সেখানে গিয়ে মামা মামীর কাছে থাকতে পাবি ত ? গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! আমার যে আর কেউ নাই। সন্ন্যাসী। বাড়ীতে যেমন ক’তি, সেখানে গিয়েও তাদের কাছে তেমনি দুষ্টমি কবি ত ? গঙ্গেশ। কেন? বাড়ীতে কি দুষ্টমি কত? সন্ন্যাসী। (স্বগত) তবেই হয়েছে ! গঙ্গেশ। এইবার তোমার চারবার হল। সন্ন্যাসী। তা ত হ’ল, তার পরে বল দেখি ভাইটি। সেখানে গিয়ে কবে কি? গঙ্গেশ। কি ক’ব, সন্ন্যাসী দাদা ? সন্ন্যাসী। কি আর করবে ?—মামা মামীর কাছে থাকবে, আর মামা ত দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত, তঁার টোলের ছাত্রদের সঙ্গে থেকে তার কাছে বসে লেখা পড়া করবে! গঙ্গেশ। ও-দাদা! ঐটি আমার দিয়ে হবে না ভাই! মাটি কোপাতে বল তা পারি, কিন্তু লেখা পড়াটি করতে পারব না। সন্ন্যাসী। হরে গঙ্গেশ! ব্রাহ্মণের ছেলে যে ?—লেখাপড়া শিখতেই হয়। --- **
দ্বিতীয় দৃশ্য।
গঙ্গেশ। সন্ন্যাসী দাদা! যার বাপ থাকে সে ব্রাহ্মণের ছেলে হয়, আমি যে
দাদা! মায়ের ছেলে!
সন্ন্যাসী। হারে গঙ্গেশ। মায়ের ছেলে হলে কি তার আর বিদ্যা শিখতে
হয় না?
গঙ্গেশ। বিদ্যা কার নাম দাদা? আমি ত মার কাছে শুনেছি—আমার সে
মার নাম মহাবিদ্যা। হাঁ দাদা! তাইনা?
সন্ন্যাসী। (স্বগত) তােমার পক্ষে তাই বই আর কি ?
গঙ্গেশ। এইবার তােমার পাচ বার হ’ল !
সন্ন্যাসী। তা হক; ভাইটি ! দাদাটি! লক্ষ্মীটি আমার! সেখানে গিয়ে লেখা
পড়া করাে!
গঙ্গেশ। আচ্ছা সন্ন্যাসীদাদা! লেখা পড়া না করলে কি হয়, তা কিছু
ব’তে পার ?
সন্ন্যাসী। কি আবার হবে ?-মুখ হয় !
গঙ্গেশ। মূখ হলে কি হয় দাদা?
সন্ন্যাসী। আ মরি! মরি! মুর্থ হলে কি হয়, তাই জিজ্ঞাসা ক’ছ? মুখ হ'লে
মা তাকে কোলে করে, আদর করে, সােহাগ করে নাচান।
গঙ্গেশ। তবে দাদা! আমি তাই হব।
গান। (৯)
দাদা! আমি মুগ্ধ হব, লেখাপড়া শিখব না আর।
মহাবিদ্যা যার জননী, সে কি ধারে এ বিদ্যার ধার।
মূৰ্থ ছেলে হলে পরে,
মা তায় কত সােহাগ করে,
পণ্ডিতগুলাে ধাঁধায় ঘােরে,
বুয়ে মরে অবিদ্যার ভার।
৪
২৪
গণেশ।
মুর্থ ছেলে কোলে করে, (দেন) মােদা মােফল করে,
ও তার, ঘুচেছে অবিদ্যার আঁধার,
মহাবিদ্যা জেগেছেন যার।
শিবচন্দ্র বলে গঙ্গেশ। বিদ্যার ফল ভাই! উপাধি শেষ,
তার ঘুচেছে উপাধি-ব্যাধি,
ওরে, নিরুপাধি ব্ৰহ্ম মা যার।
সন্ন্যাসী। (স্বগত) হাঁ! তা বিলক্ষণ বুঝেছি; নিজেও মূর্ব হবে,
আর দেশশুদ্ধ পণ্ডিত-গুলােকেও মুগ্ধ করবে। তা নইলে কি
আর মহাবিদ্যা তোমার বিদ্যার ধার শুধতে আছেন ?
(প্রকাশ্যে ) তা না পারলে বিদ্যার ধার, চল!এখনও
অনেক দূর যেতে হবে ; আর বসে কাষ নাই।
গঙ্গেশ। আচ্ছা দাদা! চল । এইবার যাই।
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
ভবদেব সিদ্ধান্তের বাটীচণ্ডীমণ্ডপ।
(জলপূর্ণ কুম্ভকক্ষে অপর্ণার প্রবেশ ও পূজার বেদীর
সম্মুখে কুত্তস্থাপন।)
অপর্ণা। (নেপথ্যাভিমুখে) হ লা-মুক্তকেশি !-ও বরদা! চুড়ী
দুটো তােরা কোথায় গেলি? এ দিকে বেলা হয়ে উঠল,
কৰ্ত্তা গঙ্গাস্নান করে এলেন বলে। কাল রাত্রেই তােদের
২৫ তৃতীয় দৃশ্য। সকলকে একে একে বলে দিয়েছেন-কাল, সূৰ্য্য উঠতে না উঠতে পূজার সমস্ত উদ্যোগ করে দিবি, এক প্রহরের মধ্যে গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ করাতে হবে। তার ৩ বেলা প্রায় চার দণ্ড হয়ে উঠল, এখনও তােদর কারও কোন খােজ খবর নাই। এর পর কখন্ এসে সব কি কবি ?—আমি ত তার কিছু বুঝতে পারছিনে। একা আমি কদিক ঠেকাব ? আমি এ দিকে এলে ওদিক আবার ঠাকুরের ভােগ রাতে বেলা হয়ে যাবে, তােরা ত তা কিছু বুঝেও বুঝবিনে? আমি আর এমন করে দিন রাত্রি পারিনে। (নেপথ্যে)-ও মা!—আমি যে গঙ্গেশকে স্নান করব বলে তেল হলুদ মাখাচ্ছি। অপর্ণা। তা ত জানি মুক্তকেশি! তুই কেবল ঐ সকল কাযেই সাজিস ভাল। কোন কাযের ত আগাগােড়া একটা হিসাব নাই ? পূজার্চা হয়ে গেলে তার পর ত গঙ্গেশের আসবার দরকার ? তুই সে সব ফেলে রেখে আগেই গিয়েছিস-গঙ্গেশকে তেল হলুদ মাখাতে, ছুড়ীটার যে দশা তা আর কি বলব। (নেপথ্যে)-ওগাে মা ! না গাে!-না, তুমি শুনতে পাও নাই, কাল, বাবা বলেছেন—গঙ্গেশকে স্নান করে সেজেগুজে পূজার আগেই গিয়ে বসতে হবে। অপর্ণা। আচ্ছা বেশ! তুই এখন বসে বসে তাই সাজাতে থাক, এ দিকে পূজা হক আর না হ’! বলিও বরদা! তুই গেলি কোথা? (নেপথ্যে)-মা! আমি পূজার ফুল বেলের পাতা তুলতে গিয়েছিলাম। বাবা কাল বলেছিলেন-আজ বেশী ফুল লাগবে, তাই মা । এ বাড়ী সে বাড়ী ঘুরতে ঘুরতে বেলা হয়ে গেল। (ফুলের সাজি হাতে করিয়া বরদার প্রবেশ )- বরদা। যাও মা! তুমি ভােগ রাতে যাও!-ব্যস্ত হয়ে না; আমি আছি, মুক্তকেশ আছে, আর দুই বােনে এখনই পূজার সব উদ্যোগ করে দিচ্ছি। * অপর্ণা। আহা! অমন গুণের বােটি ত আর পাবে না? মুক্তকেশী এসে তােমার পূজার সাজ করে দিচ্ছে ! ঐ দেখ গিয়ে সে ব'সে ব'সে গঙ্গেশকে তেল হলুদ মাখাচ্ছে, পান করাচ্ছে, কাপড় পরাচ্ছে, সাজাচ্ছে, গুজোচ্ছে; তার যে কায সে তাই নিয়েই আছে। অমন নচ্ছার মেয়ে কখন দুটো দেখি নাই। বরদা। ছি মা! মুক্তকেশীকে অমন করে যােচ্ছ কেন? গঙ্গেশকে সাজান গুলজান সেটাও ত একটা কাষ? অপর্ণা। হা! কাষ বই কি? তবে তুইও যা,দুই বােনেই বসে বসে সাজিয়ে গুজিয়ে আজ, বিদ্যারম্ভ করা এখনি ! যা তােদের ইচ্ছা তাই তােরা কগিয়ে, আমি এই চল্লেম ভােগের ঘরে। বরদা। যাও বাপু! যাও, তুমি অমন্ করে সকল কাষেই তাড়িও না। ঠাণ্ডা হয়ে আপন কায আপনি কর গিয়ে। অপর্ণা। তা কাযেই। ( সবেগে প্রস্থান) ৩ বরদা। ( নেপথ্যাভিমুখে) হ্যা লা? মুক্তকেশি! তােৰু ওদিক কত দূৰু লা? গঙ্গেশকে স্নান করিয়েছিস্? (নেপথ্যে)-স্নান করিয়েছি দিদি !—এই-চেলীর জোড়টা পড়িয়ে নিয়ে আছি; তুমি ততক্ষণ জিনিস গুলাে গুছিয়ে নাও, আমি এই এলাম বলে ! বরদা। (স্বগত) তবে যাই, পূজার সাজটাই আগে সেরে নিয়ে আসি। ( প্রকাশ্যে ) মুক্তকেশি! আমি পূজার সাজ করতে গেলাম, তুই ততক্ষণ গঙ্গেশকে নিয়ে মণ্ডপে আয় !! (নেপথ্যে)-আছি দিদি ! ( ফুলের সাজি লইয়া এক দিক দিয়া বরদার প্রস্থান, অন্যদিক দিয়া গঙ্গেশকে সঙ্গে করিয়া মুক্তকেশীর প্রবেশ) মুক্তকেশী। (বেদীর সম্মুখে একখানি ও তাহারই বামপার্শ্বে আর এক- খানি আসন পাতিয়া গঙ্গেশের প্রতি আসন দেখাইয়া )
তৃতীয় দৃশ্য।
२१
ভাইটি! তুমি এই খানে স্থির হয়ে বসে থাক, আমরা সব
পূজার জিনিস পত্র নিয়ে আসি।
গঙ্গেশ। (উপবেশন করিয়া) ছােটদিদি ! বসে বসে কি কব ?
মুক্তকেশী। কবে আবার কি? তােমাকে যে স্থির হয়ে বসে থাকতে
বলছি!
গঙ্গেশ। স্থির হয়ে বসে আর বুঝি কিছু করা যায় না?
মুক্তকেশী। কি জানি ভাই! তােকে কথায় পারা ভার, তোর যা ইচ্ছা
তুই তাই কর।
গঙ্গেশ। আচ্ছা! তাই করি, তুমি যাও।
( মুক্তকেশীর প্রস্থান, গঙ্গেশের বসিয়া বসিয়া
আপন মনে গান )
গান। (১০)
যাদের হয় বিদ্যার অন্ত, তারাই করে বিদ্যারম্ভ ;
আমার বিদ্যা মহাবিদ্যা, নাই রে তার অন্ত আরম্ভ।
•
হাতে খড়ী দিয়ে শিলায়, মামা ! কি লেখাবে আমায়?
এ ত, লিখতে লিখতেই মুছে যায় হায়!
জলে যেমন জলবিম্ব।
হৃদয়-পাষাণে আমার, (যা) আছে লেখা কি বলব তার,
এ জীবনে মুছবে না আর
সেই যে জীবের অবলম্ব .
এ সংসার-পাঠশালা হতে, যাব যে দিন পরীক্ষা দিতে,
এখন ভাবছি বসে দিনে রেতে;
সে দিনের কদিন বিলম্ব
২৮
গদেশ।
( ফুলের সাজ, নৈবেদ্য, ধূপ-ধুনাে, পঞ্চ-প্রদীপ ইত্যাদি লইয়া
মুক্তকেশী ও বরদার প্রবেশ এবং যথাস্থানে
সমস্ত দ্রব্য স্থাপন)
বরদা।
মা! একবার এসে দেখে যাও, সব ঠিক হ’ল কি না?
নেপথ্যে)-এই এলাম মা!-এলাম।
মুক্তকেশী। ( গান শুনিয়া গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া ) হরে গঙ্গেশ!
ও কি ভাইটি। গান গাচ্ছিস্ ত অমন্ করে কাছি কেন ?
(সবিস্ময়ে বরদার মুখের দিকে চাহিয়া) হঁ্যা • দিদি !
দেখেছ ? গঙ্গেশ গান গাচ্ছে, আর ওর দুই চো দিয়ে
জল পড়ছে।
(গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া ) তাই ত! হা গঙ্গেশ !
কান্ছ কেন ভাইটি।
(অপর্ণার প্রবেশ
অপর্ণা। কৈ? তাের কি করলি? দেখি-
বরদা। এই দেখ মা! সব ত এক রকম গুছিয়ে দিয়েছি, এখন বাবা
এসে কি বলবেন, তা ত জানি না।
অপর্ণা। সব ত দিয়েছি, আসন অঙ্গুরী মধুপর্কের বাটী ত আনি নাই ?
হাতে খড়ী দিবার শিল ইদুরের মাটা খড়ীমাটা , এ সব
এনেছিস্?
বরদা। ( সচকিতে) না মা! তা ত আনি নাই।
অপর্ণা। ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের মেয়ে তােরা এত বড় হলি, কোন্ জন্মে যে
কি শিখুবি তা ত আমি জানি না! মুক্তকেশি! তুই চালনের
প্রদীপ কয়েকটা জেলে দিয়ে রান্থ না? তাে ত ঐ সবই
কা!
মুক্তকেশী। তুমি ত আমার ঐ সব কার্যই দেখ! তা দেব-এখনি। এ দিকে
একবার দেখেছ মা! গঙ্গেশ কি করে বসে বসে কাছে ?
তৃতীয় দৃশ্য। অপর্ণা। গঙ্গেশ ত ঐ আপন মনে বসে বসে গান গাচ্ছে, কাছে কৈ ? ক্তকেশী। ঐ দেখ মা! ও মুখের দিকে চেয়ে দেখ। অপর্ণা। (গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া ) তাই ত, সত্যিই ত? দুই চোকের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। বাছা আমার কাছে কেন? ( গঙ্গেশের কাছে বসিয়া গায়ে। হাত বুলাইয়া ) আহা ষাট! বাছা আমার কাছ কেন? ( বরদা ও মুক্ত- কেশীর মুখের দিকে চাহিয়া) আহা! কাদবে না? ও আজ যা দুঃখ, তা ওই জানে। মুক্তকেশী এতক্ষণ বসে বসে সাজিয়েছে গুজিয়েছে, আর ওর কেবল সাজ সজ্জা দেখে শুনে মায়ের কথাই মনে পড়ছে। আহা! আজ যদি ঠাকুরঝিই বেঁচে থাকত, তবে আজ তার কতই আনন্দের দিন। ঠাকুর-জামাইয়ের যাওয়ার পর হতে সকল হারিয়ে এক গঙ্গেশকে কোলে করেই সে, সে সকল দুঃখ ভুলেছিল। আজ সেই গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ, হা ঠাকুরঝি ! এ সময়ে তুমি কোথায়! ( অঞ্চলে অশ্রুমােচন) মুক্তকেশী। ভাল লােককে মধ্যস্থ ডেকে এনেছি! একে মনসা, তায় ধুনাের গন্ধ ;—একেইত গঙ্গেশ তার পর আবার তুমি! তুমি খুব করে ঐ সব কথা মনে করে দাও, আর দুজনে একসঙ্গে বসে বসে কঁাদ, তবেই বিদ্যারটা খুব হবে-এখনি! বাবা এসে যদি এ সব দেখেন, তবেই ব’কে ভূত ছাড়াবেন-এখনি। (নেপথ্যে)-ও ভূত কি আর ছাড়বার ভূত মা? বাবা ও অনেক দিন দেখছেন! (কোশা, তিলদানী, ভিজে কাপড় ও তামার ঘটীতে জল লইয়া ভবদেব সিদ্ধান্তের প্রবেশ ও আসন পার্শ্বে কোশকুশী ইত্যাদি স্থাপন) অপর্ণা। (সসম্রমে অবগুণ্ঠন টানিয়া দিয়া গদ গদ স্বরে অঞ্চলে অশ্রুমােচন) গঙ্গেণ। ন .. ভবদেব। (অপর্ণার দিকে চাহিয়া) এই নাও, তোমাদের বিদ্যারম্ভ ত আগেই হয়েছে। আমার ও সব জানাই আছে। তুমি তােগের ঘরে থাকবে, মণ্ডপে এসে কানূতে বসেছ কেন? ( অপর্ণার প্রস্থান।) মুক্তকেশী। না বাবা! মায়ের দোষ নাই, গঙ্গেশ আপনা হতেই বসে বসে কাছিল। ভবদেব। থাম্ ! থাম্! বকা ছুড়ীটে! যত হাসি যত কান্না, সব তার মধ্যেই তুই আগে আগে। পূজার সব জোগাড় হয়েছে ? [ মুক্তকেশীর দ্রুতপদে প্রস্থান ' ভবদেব। এই নাও, হতভাগাটা যেমন শুনেছে কাযের কথা, অমনি সােজা দৌড়। বরদা। বাবা! ও যেন কি কাষ করতেই গেল। ভবদেব। গেল ওর মাথা করতে, তাড়া খাবার ভয়ে পালিয়ে বাঁচুল। যাক, এ দিকের সব হয়েছে মা ? বরদা। হাঁ বাবা! পূজার সব ত আমরা এক রকম গুছিয়ে দিয়েছি, এখন আপনি দেখে নেন। ভবদেব। বিদ্যারম্ভের শিল, মাটী, খড়ী সে সব এসেছে? বাবা। এই আমি আনতে যাচ্ছি। [ প্রস্থান ] ভবদেব। (আসনে বসিয়া গঙ্গেশের চাহিয়া ) হাঁ গঙ্গেশ! তুই না কি কাছিলি? গঙ্গেশ। না মামা! কঁদব কেন? দিদীরে কি যেন বছিল, আর মামী-মা কি যেন বলছিলেন ! ভবদেব। কি বলছিল? গঙ্গেশ। কি জানি মামা! আমি তা শুনি নাই। ভবদেব। তাের কাছেই কথা বলছিল, তুই শুনি নাই ? গঙ্গেশ। না মামা ! আমার যেন কেমন একটুকু ঘুম পাচ্ছিল। (ইদূরের মাটী ও খড়ীমাটী লইয়া মুক্তকেশীর প্রবেশ ) ; মুখের দিকে তৃতীয় দৃশ্য। মুক্তকেশী। হ্যা! ঘুম পাচ্ছিল বই কি? না বাবা! ও গান গাচ্ছিল আর ভবদেব। দূর হ হাবিটে! গান গাচ্ছিল আর কাছিল? গান আর কান্না দুইই এক সঙ্গে হচ্ছিল, তুই দেখৃছিলি ? (শিলা লইয়া বুরদার প্রবেশ) ভবদেব। (বরদার প্রতি) গঙ্গেশের সম্মুখে রেখে দে! ( বরদা কর্তৃক শিলা স্থাপন) ভবদেব। তােরা দুজনে এখানে থাক! (বরদা ও মুক্তকেশীর ভবদেবের দুই পার্শ্বে উপবেশন, ভবদেবের পূজারম্ভ। ঘটস্থাপন, ধ্যান, আরাত্রিক ইত্যাদি সমাপন করিয়া গঙ্গেশের হস্তে পুষ্প- ঞ্জলি দিয়া) দাও বাবা! উঠে দাঁড়িয়ে মাকে দাও। ( তিনবার এইরূপ পুস্পাঞ্জলি দান ) ভবদেব। বরদা! এদের ডাক্ ত মা ! বরদা। (নেপথ্যাভিমুখে অপেক্ষিত উচ্চৈঃস্বরে) ও মা!-গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ হবে, তুমি এখন এস! গঙ্গেশ। (অর্ধস্ফটম্বর রুদ্ধশ্বাসে বুক ফুলাইতে ফুলাইতে দুই চোকে হাত দিয়া কান্না )। ভবদেব। ও কি গঙ্গেশ! কান্ছ কেন বাপ, ? গঙ্গেশ। (ত্তিতে কাঁদিতে) বড়দিদী যে ঐ কি বল্লে ? বরদা। হরে গঙ্গেশ! সে কি ? আমি কি বল্লাম ? বাবা, মাকে ডাকতে বল্লেন, আমি ত তাই কেবল বলেছি-ওমা! গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ হবে, তুমি এখন এস !—তা তুমি কালে কেন ভাইটি ? ভবদেব। গঙ্গেশ! মার জন্য অমন্ করে সর্বদা কেঁদনা বাবা! গঙ্গেশ। কি ক’ব মামা! মা আসছে শুনলেই আমার কান্না পায়। (অপর্ণার প্রবেশ ) ভবদেব। (গঙ্গেশের প্রতি) ঐ যাও ! তােমার মামীর কোলে যাও! আর কেঁদ না ।
গঙ্গেশ।
অপর্ণা। (গঙ্গেশকে কোলে করিয়া ভবদেবের বামপার্শ্বে উপবেশন ও
অঞ্চলে মুখ ঢাকিয়া বােদন)
ভবদেব। (বরদা ও মুক্তকেশীর মুখের দিকে চাহিয়া) হায়! হায়! এ
কি বিপদেই পড়লাম আজ? তােরা দুটোও কাছিস? আগে
জালে তােদের কাকেও এখানে ডাকতাম না। (অপর্ণার দিকে,
চাহিয়া) ছাই! তুমিই অমন্ করে কঁাদ কেন? তােমার পুত্র
• সন্তান নাই, তােমার জীবনে ত এ ঘটনা এই নূতন, অদৃষ্টক্রমে
গঙ্গেশ আজ মা-হারা; তােরা দুজনে দুজনকে পেয়ে ত আপন
আপন দুঃখ ভুললেও পার ? মনে কর না কেন,-তােমার আজ
সেই আনন্দের দিন, তাতে কাবার কথা কি আছে ?
অপর্ণা। (অবগুণ্ঠন ঈষৎ তুলিয়া) সেই আনন্দের দিন ভেবেই ত আজ
না কেঁদে থাকতে পাছি না। যার আনন্দে আমার আজ এই
আনন্দ, সে যদি আজ বেঁচে থাত, বল দেখি-তার কি আনন্দ
ভবদেব। আ মরি মরি ! কি অভাবের কি পূরণই কলে? ছাই ! এ
আনন্দ সে আনন্দ ভুলে একবার “জয় আনন্দময়ীই বল না কেন?
গঙ্গেশ। (চোক মুছিয়া) হঁ্যা মামা! ঠিক্ কথা! আমি মার মুখে শুনেছি
এ নাম আমার সেই মার নাম।
ভবদেব। কোন্ মা রে ?
গঙ্গেশ। কেন? যে মার কাছে আমার সে মা গিয়েছে।
ভবদেব। যে মাসে মা কি বাপ? তােমার ত একই মা ছিল, তা ত
নাম মহামায়া।
গঙ্গেশ। হঁ্যা মামা ! ঠিক কথা ! আমার ত একই মা, তারই নাম মহামায়া।
ভবদেব। তবে
গঙ্গেশ। না মামা! মহামায়া ত আমার দুদুমার নাম, আর আমার সেই মার
নাম আনন্দময়ী।
ভবদেব। হারে! সেই মা-কোন্ মা?
গঙ্গেশ। বুঝলে না মামা ?-যে মার কাছে আমার এই মা গিয়েছে ।
তৃতীয় দৃশ্য। ভবদেব। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) হ জগদখে! এমন ছেলেরও বিদ্যারম্ভ করাতে বসেছি! গঙ্গেশ! কি আশীর্বাদ ক’ব বাপ! তােৰ বিদ্যারম্ভ আর কি করব? বুঝি বা তােৰু এ বিদ্যা মহা মহা বিদ্যা হলেও জন্মজন্মান্তরের সিদ্ধবিদ্যা ।। আমার এই একমাত্র আশী- ৰ্বাদ বাপ-তােমার সেই বিদ্যাই সিদ্ধা হউন! (করতলে অশ্রু- মােচন করিয়া) মহামায়া ! তােও এ তপােবল অল্প নয়! আর আমার ভগিনীর এ সৌভাগ্য, আমারও অল্পসৌভাগ্যের কথা নয়। তুই মার কাছে গিয়েছিস, মার কাছেই আছিস্, গঙ্গেশের এ সকল কথা সেই খান থেকেই শুছি; তোর গঙ্গেশকে যা আশী- ৰ্ব্বাদ করবার থাকে, মহামায়া ! তুইই আজ তা কর! (গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া ) গঙ্গেশ! সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়, আর বিলম্ব করো না বাপ! গণেশকে নারায়ণকে মহাদেবকে সূর্যকে প্রণাম করে মা-সরস্বতীকে প্রণাম কর ! গঙ্গেশ। মামা। মা-সরস্বতী আবার কোন্ মা ?-কৈ? আমার মা ত সরস্বতী মার কথা কোন দিন বলে নাই ? মা বলেছে—সেই মাই এক মা, তুমি যে আবার বছ—সরস্বতী-মা। ভবদেব। বাপরে! অামার বেঁচে থাক্। গঙ্গেশ! তোমার সেই মাই আর এক নাম সরস্বতী-মা। গঙ্গেশ। ও কত নাম আছে মামা ? ভবদেব। তা কি বলা যায় বাবা ? কত যে নাম তার সীমা সংখ্যা নাই। গঙ্গেশ। এ সব নামেই-মা ? ভবদেব। সব নামেই মা-কেমন ? গঙ্গেশ। বুঝলে না মামা? যেমন কালী-মা, তারা-মা, দুর্গা মা। ভবদেব। হা! এখন বুঝেছি ; সব নামেই মা। গঙ্গেশ। খুড়ীমা, জ্যেঠীমা, মাসীমা, মামীমা ? ভবদেব। হাঁ-তাও সেই মা। গঙ্গেশ। এ সব আমার সেই মার নাম ? ভবদেব। হাঁ! সেই মার নাম। ! ;
গঙ্গেশ। হাঁ মামা! এদের নিজের কোন নাম নাই ?
ভবদেব। (স্বগত) হায়রে ! হায়! এ কি সঙ্কটেই পড়লাম! কি করেই
বা বুঝাই! (প্রকাশ্যে ) ওদের নিজেদের যে সব নাম আছে,
তা ত তুই জানিসই।
গঙ্গেশ। হাঁ জানি বই কি। বড়দিদীর নাম বরদা, ছােটদিদীর নাম মুক্ত
কেশী, মামী-মার নাম অপর্ণা, আমার মায়ের নাম ছিল-মহামায়া।
-মামা! তােমার মায়ের নাম কি মামা ! (বরদা, মুক্তকেশী
ও অপর্ণার উৎকট হাস্য)।
ভবদেব। (সহাস্যে) আঃ-গেল যা! আমার মায়ের নাম শুদ্ধ টা?
আমার মায়ের নাম কি ছিল, তা তাের শুনে কাষ কি?
গঙ্গেশ। বলই না,শুনি।
ভবদেব। আরে গেল যা ? আমার তা মনে নাই।
গঙ্গেশ। বা-মামা! তুমি ত তােমার মার আচ্ছা ছেলে? তুমি না এত
বড় পণ্ডিত ? তােমার এত শাস্ত্রের কথা মনে থাকে, যার নাম
মনে থাকে না?
ভবদেব। সত্য কথা বলছি রে গঙ্গেশ! অত শাস্ত্রের কথা মনে আছে বলে
মায়ের নাম একেবারে ভুলেছি।
গঙ্গেশ। এক্টুও মনে হয় না?
ভবদেব। কখনও কখনও একটু একটু মনে হয়, তাও আবার বাবা ! ভুলে
যাই।
গঙ্গেশ। ঐ সব শাস্ত্র ভাবতে ভাবতে বুঝি ভুলে যাও ?
ভবদেব। হ্যা বাবা! তাই-ভুলে যাই।
গঙ্গেশ। আচ্ছা, যেটুকু মনে হয়, সেই টুকুই বল দেখি?
ভবদেব। আমার মায়ের নাম-জগদম্বা।
গঙ্গেশ। ও—তাইতেই তুমি পূজা করতে বলে অমন ক'রে বারে বারে
জগদম্ব-জগদম্বা-করে ঈদ ?
ভবদেব। তাইতে ই।
গঙ্গেশ। তবে যে আবার তুমি আমাকে বল-মার জন্যে কাঁদিস্ কেন? তুমিও
"
;
তৃতীয় দৃশ্য।
ত তোমার মার জন্য কঁদ! তুমি অত বড় বুড়ো ছেলে হয়ে কাঁদ,
আমি ত ছােট্ট-ছেলে।
ভবদেব। না আর পারি না!
গঙ্গেশ। মা পারুলে; আর পেরে কাষ নাই। এক মায়ের নাম বলতেই
হাঁপিয়ে গেলে,-মামা! তুমি অত ছাত্র পড়াও কি করে?
ভবদেব। (স্বগত) অত ছাত্র পড়াচ্ছি। কিন্তু তােমার মত একটিও আমার
পড়ান কঠিন।
. গঙ্গেশ। মামা! তুমি, ও-ঘােট ছােট করে কি বলে ?
ভবদেব! সব কথাই কি তাের শুনতে হবে ? মায়ের নাম শুনছিস, তাই
শােন!
গঙ্গেশ। আচ্ছা, মামা! এই যে বড়দিদীর নাম বরদা, ছােদিদীর নাম
মুক্তকেশী, মামী-মার নাম অপর্ণা, সত্যি সত্যিই এ সব এদের
নিজের নাম ?
ভবদেব। সত্য সত্যই নিজেদের নাম।
গঙ্গেশ। দেখ!–গঙ্গাজল ছুঁয়ে বলছ ?
ভবদেব। (সসমে কোষার মধ্য হইতে হস্তোত্তোলন)।
গঙ্গেশ। ও কি ? হাত তুল্লে যে? গঙ্গাজল ছুয়ে দিব্বি ক’ঝতে পারূলে না,
তবুও বছ—সত্যি সত্যিই ওদের নিজেদের নাম। হাঁ মামা!
তুমি কি মিথ্যা কথা বল ?
ভবদেব। কি ক’ব বাবা! এই মিথ্যার সমুদ্রেই ডুবেছি! জানি তা-
জীবের নাম রূপ সবই মিথ্যা, তবুও যে বাবা ! বলতে হয়!
গঙ্গেশ। মামা! তুমি কেমন পণ্ডিত ? যা জান মিথ্যা, তা বল কেন ?
ভবদেব। নইলে কি আর বাবা! তােমার বিদ্যারম্ভ করাই ?
গঙ্গেশ। তবে মামা! ও ছাই আর করে কায নাই।
ভবদেব। এই নাও, এই ত বিদ্যারম্ভের মঙ্গলাচরণ?
মুক্তকেশী। বাবা! তুমি গঙ্গেশের সঙ্গে কথা ক’য়ে পারবে? ওর কেবল
হাড়ে হাড়ে কথা।
গঙ্গেশ। ছােটদিদি ! মুখে মুখে কথা কহার চেয়ে হাড়ে হাড়ে ভাল না ?
গঙ্গেশ। ঠিক কথা মুক্তকেশী। (সকাতরে) রক্ষা কর ভাইটি। দোহাই মা-ষষ্ঠীর ! তুমি আমাকে ছেড়ে বাবাকে ধর। ভবদেব। হাঁ! আরও খুব করে শিখিয়ে দে! (অপর্ণার উৎকট হাস্য)। বরদা। হাঁ বাবা! তুমিও যে ও সঙ্গে সেই হ’তে কথা আরম্ভ করেছ, আর কিছুতেই ছাড়ছে না ! গঙ্গেশ। হাঁ! বড়দিদি। বনেছ! দেখ না-মামা মার নাম ভুলে গিয়েছে। ভবদেব। ছাড়ছি না? আরে!-ছাড়াই যে কি করে তা আর দেখছি না? বরদাণ হাঁ বাবা! তা বলে কি হবে? বিদ্যারম্ভ ত করতে হবে? গঙ্গেশ। সে কি বড়দিদি ! এই ত শুনলে মামার কাছে, ও সব মিথ্যা কথা ! বিদ্যা কি দিদি ? মার নামই ত মহাবিদ্যা; তােমাদের নামও ত মারই নাম। আমি ত মার কাছে শুনেছি—অপর্ণাও সেই মার নাম, বরদাও সেই মার নাম, মুক্তকেশীও সেই মার নাম। যা-তােদের নামই নাই! এখন হ’তে তাদের আমি “মা” বলেই ডাক্ব, তাই হলেই ত বিদ্যারম্ভ হ'ল? (সকলের উচ্চ হাস্য) ভবদেব। আরে পাগল!-চুপ কর ! ও কথা কি বলতে আছে ? গঙ্গেশ। বাঃ!-মামা ! সত্যি কথা বলতে নাই ?-মিথ্যা কথা বলতে আছে ? তুমি খুব পণ্ডিত। ভবদেব। গেলাম!-গেলাম! গঙ্গেশ। চল যাই। ভবদেব। তবেই ত বিদ্যারম্ভ হ’ল দেছি। গজেশ। সে কি মামা! তুমি সেই বেলা বসেছ, আর এতক্ষণ হয়ে গেল, তবু এখনও তােমার বিদ্যারম্ভ হল না? ভবদেব। (স্বগত) তাই -বটে! বিদ্যারম্ভ আমারই ঠিক! (প্রকাশ্যে) গঙ্গেশ। বাবাটি আমার, লক্ষ্মীটি আমার, একটু চুপ করে তােমার মামীর কোলে বস, আমি এই হাতে খড়ীটি দিয়ে দেই, তার পর তােমার যা ইচ্ছা হয় বলে ?
৩৭ তৃতীয় দৃশ্য। (নেপথ্যে)-ই। লা ! মুক্তকেশি! তাের মা কোথায় ? দিদী কোথায় লা! আমরা যে সব, তােদর গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ দেখতে এলাম! মুক্তকেশী। দিদিমা !–এসাে!-এসাে। এই যে মণ্ডপে বিদ্যারম্ভ হচ্ছে, আমরা সবাই এখানে। বরদা। (মুক্তকেশীর প্রতি) যা-না! এগিয়ে নিয়ে আয়, না ! মুক্তকেশী। হ!বুড়ীগুলো কি এমন পাপের ভােগ! '(প্রস্থান ও '. পটান্তরে বৃদ্ধাবর্গের সহিত প্রবেশ) বৃদ্ধাগণ।(দেবতা স্থানে প্রণাম করিয়া) আহা! মা সরস্বতি! গঙ্গে- শের দিকে মুখ তুলে চাও মা! (ভবদেবের প্রতি) ভবদেব । তােমার গঙ্গেশ কৈ বাবা? ভবদেব। এই যে-জ্যেঠিমা! এই খানে। মুক্তকেশি! আসন দে মা ! জ্যেঠিমা! তাে ব’সস! আশীর্বাদ কর-গঙ্গেশের যেন শাস্ত্রে বিদ্যা হয়। (স্বগত) তা যত হবে তা ত দেখছি। তা বাবা! তােমার ভাগিনের বিদ্যা হবে না? শাস্ত্রেই বলে— “রাণাং মাতুলক্রমঃ”। তুমি দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত-মামা, তােমার ভাগিনের আবার বিদ্যা হবে না ? ভবদেব। (স্বগত) মামার ভাগিনা দেখছ মা!—ও ভাগিনা নয়, বৃদ্ধপ্রপিতামহ। গঙ্গেশ। মামা! তুমি বারে বারেই ছােট ছােট কথা বলছ! ভবদেব। তা থাক বাবা! তুমি তােমার আইমাদের প্রণাম কর আমাকে প্রণাম কর!-তোমার মামীকে প্রণাম কর!-দিদীদের প্রণাম কর! মুক্তকেশী । ( সহাস্যে ভঙ্গী করিয়া) আবার সেই প্রণাম? (গঙ্গেশ কর্তৃক প্রত্যেককে প্রণাম) আহা! বাবা! বড় পণ্ডিত হয়ে চিরজীবী হয়ে থাক। মামার নাম রেখ তুমি।
গদেশ। কেন আইমা? মার নাম রাখব না?
বৃদ্ধা। (গঙ্গেশের মাথায় হাত দিয়া) আহা! রাখবে বই কি দাদা।
তুমি আমাদের মহামায়ার ছেলে, তোমার মুখ দেখলে
নাম শুনলে, আমাদের মহামায়ার কথাই মনে পড়ে।
গঙ্গেশ। হাঁ! আইমা! আমার মা মহামায়ার কথা বলছ?-না, সেই মা
মহামায়ার কথা বলছ? আমায় দেখে কার কথা মনে পড়ে
আইমা ?
বৃদ্ধা। ওভবদেব! গঙ্গেশ এ সব কি বলে বাবা ।
মুক্তকেশী। তা—দাঁড়াও বুড়ি!-থাক একটু-টেটা পাইয়ে
দেবে
এখনি।
বৃদ্ধা। (হাসিয়া) দেখ, বরদা! মুক্তকেশী আমায় ঠাট্টা করছে।
ভবদেব। না জ্যেঠিমা! তুমি ওদের ও সব কথা শুন না !
(গঙ্গেশের সম্মুখে শিলার উপরে ইদূরের মাটী দিয়া
শিলার এক পার্শ্বে প্রদীপ, অন্য পার্শ্বে ধান্য দূৰ্বা ইত্যাদি
রাখিয়া, গঙ্গেশের হাতে খড়ীমাটী ধরাইয়া) জ্যেঠিমা।
তােমরা অনুমতি পাও, আমি গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ করাই।
বৃদ্ধা। আহা! গঙ্গেশের বিদ্যারম্ভ, তার আবার অনুমতির অপেক্ষা?
আমরা অনুমতি দিলাম, তুমি আরম্ভ করাও। দেখােশ ও
সকলের চেয়ে বড় পণ্ডিত হবে।
ভবদেব। জয় জগদম্বা ! (বলিয়া গঙ্গেশের হস্তসঞ্চালন)
গঙ্গেশ। (মামার মুখের দিকে চাহিয়া) তােমার মার নাম ক’বলে,-
কৈ? আমার মার নাম ত কলে না?
ভবদেব। করেছি বাবা! এখন তুমি লেখ! হাতে লেখ, আর মুখে
আমি যা বলি তুমিও তাই বল!
গঙ্গেশ। তা বলব; কিন্তু আমার মার নাম করো।
ভবদেব। তাই ক’ছি? ( লিপিবিন্যাস)
বল!-অ। (ক্রমে পঞ্চাশদ্বর্ণমালার অক্ষরবিন্যাস ও পাঠ)
মামা!
তৃতীয় দৃশ্য।
গঙ্গেশ। অ-। (ক্ৰমে ক্ষকার পর্যন্ত পাঠ করিয়া) কৈ?
আমার মার নাম কৈ? এ সব তুমি কি বলে? এর একটাও
ত আমার মার নাম নয়।
ভবদেব। গঙ্গেশ রে! এই পঞ্চাশ অক্ষরের সবগুলিই তাের মায়ের নাম।
তাের মায়ের নাম-ছাড়া আর অক্ষর নাই।
গঙ্গেশ। এই সবগুলিই আমার মায়ের নাম ?
ভবদেব। হাঁ ! বগুলিই তাে মায়ের নাম।
গঙ্গেশ। বল দেখি কেমন করে ?
ভবদেব। (স্বগত) এমন সঙ্কটেও ত কখন পড়ি নাই ।
গঙ্গেশ। আবার তুমি ঐ ছােট করে কি কথা বল্লে ?
ভবদেব। হারে পাগলা ! আমি ত এখন এই ছােট করে ব’ছি, তুই
এর পর যা বলবি, তা এ চেয়েও ছােট করে বলবি।
গঙ্গেশ। তা বলি ত একা একা ব’লব, তােমার মত অমন করে এক
জনের কাছে বসে ছােট কথা আমি কখনও বলব না।
ভবদেব। তা ত হাড়ে হাড়ে বুঝতে পাছি।
গঙ্গেশ। সে কথা থাক, তুমি আগে বল—এ সকল কেমন করে আমার
মায়ের নাম হ'ল?
ভবদেব। কেমন করে, তাই শুনবি?—তবে শাে-আচ্ছা বল দেখি-
তাের মায়ের নাম কি ?-কি ?
গঙ্গেশ। খুব শুনােচ্ছ মামা! আমি বলে দেব, তবে তুমি শুননাবে ?
ভবদেব। হাঁ ! তাই শুনােব! তুই আগে বল দেখি।
গঙ্গেশ। মামা! তুমি এতকাল ছাত্রগুলােকে কি পড়াচ্ছ ?
আমি ত
মার কাছে আমার সে মার নাম কত শুনেছি, তুমি তাও জান
না? আচ্ছা তুমি পণ্ডিত-মামা !!
ভবদেব। (গগদকণ্ঠে) তােমার মা জান্ত বলেই তুমি পুত্র গর্ভে এয়ে-
ছিলে; আমি মুখ তা কি বুঝব? (হস্তদ্বারা অমােচন)
.
৪০
গঙ্গেশ। ও-জ্জা! একেবারে কেঁদে ফেল্লে ? আর তােমার মার নাম
করে কায নাই; এই আমিই বলছি-শােন!-আমার সে
মার নাম-কালী-মা-তারা-মা-দুর্গা-মা।
ভবদেব। (বাধা দিয়া) থাম্ !-থা! আর বলতে হবে না।
গঙ্গেশ। চিনেছ ?
ভবদেব। চিনেছি, এখন শােন্!-দেখ, মায়ের নাম কালী ত?
গঙ্গেশ। না,-সুধু কালী কেন? মার নাম যে কালী-মা।
ভবদেব। আচ্ছা! তাই হল! এখন দেখ-( অক্ষরে তর্জনী নির্দেশ
করিয়া) কালীনাম ব’তে হলেই আগেক-ব’লতে হয়,
সেই-ক—এই।
গঙ্গেশ। (স্থিরদৃষ্টিতে অক্ষরের উপর চাহিয়া অশ্রুবিসর্জন ও
অস্ফুটস্বরে রােদন)
ভবদেব। ও কি রে গঙ্গেশ! কাঁদিস কেন ? হা রে! কি হল?
অমন করে কাদিস কেন ?
গঙ্গেশ। (নােদন স্বরে ) —গান। (১১)
বল হে ক-কার। তুমি ক কার?
বল, তুমিই বা কার ? বল আমিই বা কার ?
অক্ষর হে! এ রূপ তােমার, তােমার রূপ, কি, রূপ, আমার মার,
অক্ষর-রূপ সম্ভব ত নয় তােমার
ক্ষর হয় হে! এ বিশ্বরূপ, (কেবল) অ-ক্ষর আমার মায়ের স্বরূপ;
তাই জিজ্ঞাসি কিসে অক্ষর-রূপ তােমার ?
মন্ত্রশক্তি-মায়ের আমার, যন্ত্ররূপ হে তােমার আকার,
অ-কারাদি ক্ষ-কারান্ত মাতৃকার ;-
স্বরে মায়ের স্বরূপশক্তি,
ব্যঞ্জনে ব্যঞ্জনাবৃত্তি,
স্বর প্রকৃতি, ব্যঞ্জন হয় পুরুষাকার।
৪১
তৃতীয় দৃশ্য।
স্বর না হলে রয় না ব্যঞ্জন, শক্তি বিনা পুরুষ চেতন,
হয় না কভু, তাই হন বাবা শবাকার ;-
সেই—শবের বুকে চরণ দিয়ে, মা রন্ মুক্তকেশী হয়ে,
স্বর-ব্যঞ্জনে তখন হয়ে একাকার।
অকার হ’তে কারান্ত, (মায়ের চরণ হতে কেশপ্রান্ত,
আদি অ-কার শেষে ক্ষ-কার মার আমার ;
ও মা হ ল ক্ষ ভেদি দ্বি-দলে, (তুই) হ। লক্ষ্য সহস্রদলে,
মা, লক্ষ্য হলে অক্ষমালার সংখ্যা নাই আর।
তখন, অ-কার -কার আদি অন্তে, ক-কার! তুমি মধ্যযন্ত্রে,
স্বর-ব্যঞ্জনসন্ধিক্ষেত্রে সবাকার ;
তাই, নিগুণ ত্রিগুণাতীত, ক-কার-আকার-পরিণতা,
লকারে ঈকারে যুগল নির্বিকার।
ককার আকার, ল ঈকার, কি নাম কি রূপ দুই(ই) কালিকার,
তাই জিজ্ঞাসিককার! তুমি বল কার ?
কেঁদে শিবচন্দ্র বলে,
ককার কি ভাই! কথা বলে ?
সুধাও, আকারকে, এ আকার তুমি কান্ আকার ?
(গীতান্তে অগ্রে গঙ্গেশের, পরে ভবদেবের গম্ভীর স্বরে “তারা !
তারা।” ধ্বনি, গঙ্গেশের পতন ও মুচ্ছা)
অপর্ণা। ও-বরদা! এ দিক আয়, মা! মুক্তকেশি! শীগগির পাখা নিয়ে
আয়-জল নিয়ে আয় মা ! (গঙ্গেশের কর্ণে ফুৎকার দিয়া
82
গঙ্গেণ।
7
মুক্তকণ্ঠে)—ও মা! মা! আমার কি হ’ল গাে? গঙ্গেশ যে
আৰু কথা বলে না !
বরদা। হা দুর্গে!—কি করূলে মা।
মুক্তকেশী। (সসম্ভ্রমে) ও বাবা! গঙ্গেশের কি হল বাবা !!
ভবদেব। ( বিরক্তিস্বরে) রাখ! রাখ! অমন করে ব্যস্ত করে তুলিসনে।
(গঙ্গেশের গায়ে হাত দিয়া) গঙ্গেশ!-গঙ্গেশ!
অপর্ণা। ( কাঁদিতে কাদিতে) আর গঙ্গেশ !!
ভবদেব। আঃ-রাম ! রাম! তুমিও কি পাগল? একটু স্থিরই হও না
কেন ?
অপর্ণা। আমি যে আর স্থির হতে পারিনে !! (ক্রোড় হইতে গঙ্গেশকে
ভূতলে ফেলিয়া কাঁদিতে কাদিতে সবেগে প্রস্থান)
ভবদেব। (দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া গঙ্গেশকে কোলে উঠাইয়া লইয়া)
তারা।-তারা!—এ আবার কি খেলা মা তােমার ? অথবা তােমার
খেলাই এই তুমি যাকে নিয়ে খেলা কর, অথবা তােমাকে নিয়ে
যে খেলা করে, এই দশাই তার ঘটাও মা! (গঙ্গেশকে কোলে
করিয়াই ধ্যানস্থভাবে অবস্থান এবং মধ্যে মধ্যে--“তারা!
তারা!”- ধ্বনি) হাঁ মা! কি ক’ৰূলে মা ! (কিয়ৎকাল পরে)
মহামায়া ! তুই ত সৌভাগ্যবতী, মায়ের চরণতলে স্থান পেয়েছি,
এখন আমার অদৃষ্টে জানিনে আর কত ভােগান্ত আছে! মহামায়া।
মা ত আমার কথা শুলেন না, তুই এসে একবার তাের গঙ্গেশকে
জাগিয়ে দিয়ে যা বােন্!-জয় মা !জয় মা !তারা!-তারা!
গঙ্গেশ। (ঐ সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে) জয় !-জয় মা !—তারা।
তার !
ভবদেব। জয় জয় তারা!-জয় জয় তারা !জয় দুর্গা! জয় কালী!—জয়
জয় জয়কালী ! কালী।
গঙ্গেশ। ঐ সঙ্গে সঙ্গে) জয় জয় জয় কালী-কালী! (বলিতে
বলিতে পুনর্মুচ্ছিত)।
৪৩
।
তৃতীয় দৃশ্য।
মুক্তকেশী। (উচ্চকণ্ঠে) ও-মা ! আর কঁদিসনে মা! দেখসে-গঙ্গেশ
“জয় তারা! জয় কালী। জয় কালী!” বলছে !! প্রস্থান ও
পটান্তরে অপর্ণার সহিত প্রবেশ)।
অপর্ণা। ( ব্যস্তভাবে গঙ্গেশের নিকট আসিয়া) হাঁ বারা গঙ্গেশ!
(কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া) কৈ ?-মুক্তকেশি! তুই না বল্লি-
গঙ্গেশ মায়ের নাম ক’ছে, কৈ? কথাও ত বলে না, ডাকূলেও
ত উত্তর দেয় না ।
বরদা। হাঁ মা! সত্যি সত্যি এখনি বলেছে—জয় জয় তারা!
জয় জয় কালী!
গঙ্গেশ। (ঐ সঙ্গে সঙ্গে) জয় জয় তারা ! জয় জয় কালী! (পুনর্মুচ্ছ)।
ভবদেব। ( সকলের মুখের দিকে চাহিয়া) দেখ! তােমরা ব্যস্ত হয়ে
, আমার কথা শােন! গঙ্গেশের এ রােগও নয়, মূচ্ছাও নয়, এ
যে কি, তা তাে এখন বুঝতে পারবে না। আমি যা বলি তাই
শােন!-মাকে প্রণাম করে গঙ্গেশকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে সকলে
বাড়ীর ভিতর যাও। আমি হােমটা সমাপন করে এখনি আসছি,
কেউ ব্যস্ত হয়াে না। বরদা! আর মুক্তকেশি! তােরা দুজনে ওর
কাছে থাক্ গিয়ে ; মাথায় জল দিয়ে বাতাস দিয়ে, কেবল ওর
কাণের কাছে—“তারা। তারা!-কালী! কালী।
মা নিজেই ওকে জাগিয়ে দেবেন এখনি, আমিও এই একটু পরেই
আছি। (স্বগত)—আর জাগিয়ে দেবে কি মা !
তােমার জেগেই আছে, কেবল ঘুমিয়ে আছি আমরা!! আহা!
ৰাছার আমার বােগই বা কি সুন্দর ! ঔষধই বা কি মধুর !!
(গঙ্গেশকে কোলে লইয়া অপর্ণার এবং তৎপশ্চাৎ
পশ্চাৎ বরদা ও মুক্তকেশীর প্রস্থান)
বলি !
চতুর্থ দৃশ্য।
g, দৌড়,
ভবদেব সিদ্ধান্তের চতুষ্পাঠী।
(ছাত্রগণের নিজ নিজ পুথি খুলিয়া আবৃত্তি)।
ভূতনাথ। হাঁ হে কাশীনাথ-দা! একটু তামাকই খাওনা ছাই! কেবল দিন
রাত্রি ঘ-য, ঘ-ঘ, আবৃত্তি করেই যে পরমায়ুটা ক্ষয় করলে?
বঙ্কিম। ও পরমায়ুটুকু আর থেকে হবে ভূতনাথ-দা! কাশীনাথদার ত
ষাটের কোলে সবে এই আটচল্লিস বৎসর, আর দুই বৎসর পরেই
বনং ব্ৰজেং; সংসার-ধর্ম যা, তা ত এই-টোলেই শেষ!
কাশীনাথ। আরে—যেতে দেও ভাই। তুমিও যেমন, আর ক দিনই বা বাকি।
আবার পাঠ সেরে, পণ্ডিত হয়ে বাড়ী যাও, মাথায় টিকি দেখলেই
অনি যারে পাও তারে ধর, শুদ্ধিতত্বের বচন কি
বিচার কর, শকুন উড়তে না উড়তে শ্রাদ্ধের
দৌড়! কোথাকার পাঠ চুরি করে কোন্ বেটা,
পূর্বপক্ষ
করে বসে, কোথায় কার ব্যবস্থায় কোন্ বেটা
কার বিচারে কে পক্ষপাত করে ; কোন্ বেটা
য় বেশী
নেয়, চিতায় না ওঠা পর্যন্ত শয়নে স্বপনে চি: কেবল
এই।-এত করেও মাথার ঘাম পায়ে ফেল, পায়ের মাথায়
তুলে ভূতের বােঝা বয়ে এনে, তাতেও আবার দিনরাত্রি শ্রীমুখের
সেই কুটী ভঙ্গী; তায় আবার গােদের উপর বিষফোড়া-পঙ্গপাল
ছাত্রের দল। কাষ কি ভাই? অত উৎপাতে ? খাচ্চি দাচ্চি বেশ
আছি, “ষত তত পাপং ভট্টচামশার চাপং” নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তায়
উদরান্নের সংস্থান হয়ে যাচ্ছে, এমন সুযােগ কি ছাড়তে আছে রে!
তােরাও যেমন নির্বোধ, মাসে মাসে পরীক্ষা দিস! আমি পাঠ
বুঝেও বুঝিনে, মনে রেখেও ভুলে যাই, জিজ্ঞাসা করলেই নির্বোধ
হয়ে চুপ করে বসে থাকি। আমার পাঠ শেষ হবার নয়।
তৃতীয় দৃশ্য।
৪৫
যে কদিন আছি, এমনি করেই কাটিয়ে যাব-বােকাগুলাে সব
বােক বলবে বই ত নয়? আমি বসে বসে এখনও হাসচি,
তখনও হাব।
ভূতনাথ। আহা কাশীনাথদা! এত সূক্ষ্মবুদ্ধি তােমার, এই সময় ভট্টচার্য্য
মশায়কে বলে রাখগয়ায় একটা পিণ্ড দিতে।
হরিদাস। আরে কাশীনাথদার পিণ্ড গয়ায় দেওয়ায় কি অবা? ও ত
অচ্চে কাশীনাথ, তুমি নি অচ্চ বৃথ, তােমারগ পিণ্ডটা নি
গয়ায় দেওয়ার পার ?
ভূতনাথ। অঃ -কি রসের কথাই কয়চ অরিদাসদা! একটু তামাকু নি
খাওয়াই বা ?
হরিদাস। তামাকু খাওয়াইমু না ত তোমারগ খাওয়াইমু কি ছাই ? রহঃ-
হাজাইবারে লাগচি।
নারায়ণ। কাশীনাথদা! ভাই! তােমরা ত আমােদ ক’ছ, তামাক খাচ্ছ,
আমি ত ভাই। দিন গণ শেষ করতে পাছিনে। এ কি
সঙ্কটেই পড়লাম,-দেশের সকল টোল ছেড়ে বড় অধ্যাপক বলে
এখানে এলাম,এখন ত দেখি কেবল নামেই বড়। অধ্যাপক
গুরু বলে স্বীকার করেছি, এখন কিছু বলতেও পারিনে, সহ
ক’তেও পারিনে। আমাকে ত ভাই। আর দুই চার
দিন দেখে পালাতে হচ্ছে। এমন করে এক মাসে দুই তিন
পাঠ করে পড়ে কি জন্মান্তরে পণ্ডিত হয়ে বাড়ী যাব?
ভূতনাথ। তাের বাড়ী আছে, তুই ও সকল ভাবনা ভাগে নারাণে!
আমাদের—যথারণ্যং তথা গৃহং, আমরা আছি ভাল রে!
বঙ্কিম। এর মধ্যে আমাদের বুদ্ধিমতী হচ্চেন গিয়ে কাশীনাথদা।
হা নিৰ্বংশের বেটা! কাশীনাথদা-বুদ্ধিমতী ?
বঙ্কিম। আহা ভূতনাথদা। ধন্যি তােমার বাপ মা, যেন বুদ্ধি দেখে নামটি
রেখেছিলেন! আরৈ-“আকারান্তা মেয়েলিঙ্গা বজ্জয়িত্ব খুড়া জেঠা”
তার মধ্যে ‘দাদা’ নাই রে আবাগের বেটা দাদা নাই !
( সক্রোধে) দেখেছ-দেখেছ-পাজি বাপান্ত করে।
১৬ গঙ্গেণ। বস্কিম। কেন বাবা! আমি ত তােমায় কেবল বাপান্ত করেছি, তুমি যে আমায় বাপান্ত শাপান্ত এক প্রস্থেই দুই প্রস্থ করলে। নিৰ্বংশের বেটা বললে কেন? নিৰ্বংশের কখন যেটা হয় ? কারণ নাই কার্যের উৎপত্তি? খুব ন্যায়শাস্ত্রটা পড়ে নিলে ? নারায়ণ। আহা বঙ্কিম ভাই। একটু থাম না ! কাশীনাথ। যা ব’ছ নারায়ণ ! সে কথা সত্য; কিন্তু ভেবে ত কোন পথ পাইনে। আজ, দুই তিন বৎসর থেকে দেখছি ভট্টচাষ, মশায়ের যে কি রােগেই ধরেছে,—দিন নাই রাত, নাই, কেবলই সন্ধ্যা আহ্নিক, কেবলই জপা তপা, কেবলই পূজা আর পুরশ্চরণ। দেশ বিদেশের নিমন্ত্রণে যাওয়া একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন, পদ প্রতিপত্তি পসার যা ছিল, ক্রমে ক্রমে সব গেল, সংসারেরও দুরবস্থার সীমা নাই, টোলের ছাত্রগুলিকে একেবারে গােয়ালের গরু করে তুল্লেন। ক্ষণাদুদ্ধ মতার্কিক,—নিজেও যে শাস্ত্র অস্ত্র ভুলে না যাচ্চেন, তাই বা কে বল? আমি ত ভাই! দিনরাত্রি দেখে শুনে কেবল অবাক হয়ে যাচ্ছি। গুরুজন,-কিছু বলতেও সাহস পাইনে, না বললেও চলে না, আবার বলিই বা কি বলে ? শাস্ত্ৰদৰ্শী বিজ্ঞ বিচক্ষণ পণ্ডিত ধৰ্ম্মনিষ্ঠ জ্ঞানীর যা কৰ্তব্য কৰ্ম্ম, তাই করছেন ; ধৰ্ম্মকাৰ্য্যে বাধাই বা দেই কি বলে ? তবুও আঁকারে ইঙ্গিতে কথার প্রসঙ্গে দুই একদিন এক আধটুকু ব’লেও দেখেছি-বল্লেই কেবল বলেন-বাপু হে! চিরকালটাই কি এই ভূতের ব্যাগার খাব? দিন ত ফুরিয়ে এলআর কেন বাবা! মান, সন্ত্রম, পদ প্রতিপত্তি, আয় উপায় যথেষ্ট হয়েছে, এখন আমাকে ছেড়ে দেও, যে দিকের কোন উপায় হয় নাই,-একবার সেই দিকের উপায় দেখি। জগদম্বা আছেন, জগৎকে যিনি রক্ষা ক’ছেন, তােমাকে অামাকেও • তিনিই রক্ষা ক’রূবেন। (নেপথ্যে অপেক্ষিত উচ্চস্বরে)-কাশীনাথ ! তোমাদের আবৃত্তি শেষ হয়েছে ?
; গ্রহণ, ভবদেব চতুর্থ দৃশ্য। ৪৭ কাশীনাথ। ( সসম্ভ্রমে ) ঐ চাষ, মশায় আছেন। (অপেক্ষিত উচ্চ- স্বরে) আজ্ঞা!-হয়েছে। ( সকলের সংযতভাবে স্ব স্ব স্থানে উপবেশন ও মধ্যস্থানে অধ্যাপকের আসন স্থাপন) ( ভবদেবের প্রবেশ, আসনে উপবেশন ছাত্রগণ কর্তৃক ভবদেবকে প্রণাম ও পদধূলি কর্তৃক হস্তোত্তোলন পূর্বক প্রত্যেককে প্রত্যভিবাদন, ছাত্রগণের স্ব স্ব স্থানে উপবেশন ) ভবদেব। আজ ত এয়ােদশী, নুতন পাঠ নাই, পুরাতন পাঠের পরীক্ষার দিন। আজ কা কা পরীক্ষার দিন ছিল ? কাশীনাথ। আজ্ঞা আমার, ভূতনাথের, আর-গঙ্গেশের। ভবদেব। ভাল কথা—গঙ্গেশের পরীক্ষা ক’ব সে ত দূরের কথা, ছোঁড়াটা যে কি করে আমি ত তার কোন সন্ধানই পাই নে। এর পূর্বে একদিন পরীক্ষা করেছিলাম, তাতে ত দেখেছিলাম-পড়েও না, শােনেও না, কিছু করেও না। ও যে দিনে দিনে কি হয়ে উঠল আমি ত তার কিছুই বুঝি নে তােমরা কিছু জান কি? কাশী। আজ্ঞা ! জানি ত অনেক, তবে ছেলে মানুষ বলে সে সব কথা আপনার কাছে কিছু বলিনে। লেখা পড়া দূরে থাক্, অধিকন্তু ও বড়ই দুর্দান্ত হয়ে উঠল। উপনয়নের পর হতে এই এক- বৎসর পর্যন্ত ও যে এক দিনও পুথি ছুয়েছে, আমার ত তা বােধ হয় না। ভবদেব। বল কি ? ওকে যে ? ওকে যে সে দিন এত করে পাখী-পড়ান করে পড়ালাম, তার কোন কথাই মানে না-শশানে না-কিছু করে না? তা ত করেই না, তার পরে আর যা সব করে, তা আর আপনার কাছে কি ব’র্ব ?, ভবদেব। কি করে ? আজ্ঞা ! এই দেখুন আমাদের কি ঘরে, কি পনে কারও একখান আস্ত কাপড় নাই। কাপড় দেখলেই দুই হাত দিয়ে ছিড়ে বানরের . গণেশ। ; মত ফালা ফালা করে দেয়, জিজ্ঞাসা করূগেই বলে-“আরে । কাপড় পরে আর কি হবে ?” লঘু গুৰু জ্ঞান ত একেবারে নাই-ই, যা মুখে আসে তাই বলে, বাচালের একশেষ, তারপর অধিকন্তু আবার এই সকল দৌরাত্ম। ব’লব কি ভটচামশায় ! এই দেখুন—একথানা পুথির একটা পাত আস্ত নাই। কাপড়ও যেমন ছেড়ে, পুথিও তেমন ছেড়ে ; বললেই বলে-আরে! ও বিদ্যায় আর কায নাই। আমরা যত বলি—তাের দৌরাত্ম্যে এখানে থাকতে পারব না? ও ততই বলে—এই সময় তবে বেরিয়ে যায় না। সংসারে থেকে আর কি কবি ? বসে বসে মামার অন্নধ্বংস করা বই ত আর কিছু না ? ভবদেব। বটে! অন্নধ্বংস করছ তােমা, আর অন্ন সার্থক করছেন উনি? যা ত রে বঙ্কিম! গঙ্গেশকে বাড়ীর ভিতর হতে ডেকে নিয়ে আয়, ত! ব’ল গিয়ে—আমি তার পরীক্ষা ক’ব। (বঙ্কিমের প্রস্থান) ( কিছুকাল পরে পটান্তরে বঙ্কিমের সহিত নাকী সুরে গান করিতে করিতে গঙ্গেশের প্রবেশ ও ভবদেবকে প্রণাম করিয়া পার্শ্বে উপবেশন) ভবদেব। বাবাজির আমার প্রণামে ত যথেষ্ট ভক্তি! দুঃখ এই যে, লিখতে প'ড়তেই মা সরস্বতীর বরপুত্র। গঙ্গেশ। বরপুত্র কি ? মামা । ভবদেব। এই নাও গেল।-বরপুত্র কি মামা?-বরপুত্র কি? তা তাের শুনে কায কি ? গঙ্গেশ। আমার যদি শুনেই কাব নাই, তবে তােমার ব’লেই বা কি কায ? শুনব না যদি, তবে বল্লে কেন? ভবদেব। অন্যায় করেছি। গঙ্গেশ। ও-মামা! তুমি ন্যায়শাস্ত্রের পণ্ডিত হয়ে অন্যায় কর, তুমি আবার আমার পরীক্ষা করবে কি? ভবদেব। পরীক্ষা কব—যা পড়াই, তারই। ৫ ৪৯ চতুর্থ দৃশ্য। গঙ্গেশ। এই ত পড়ালে-সরস্বতীর বরপুত্র। ভবদেব। ওরে!-না,-ব্যাকরণের যা প'ড়েছিস তারই পরীক্ষা। গঙ্গেশ। সেও ত এই রকমই। ভবদেব। “এই রকমই কেমন ? গঙ্গেশ। আর কেমন ? এই “বরপুত্রের” অর্থ এই “বরপুত্রের” অর্থ করতে পারে না যেমন! ভবদেব। আরে গেল যা! বরপুত্রের অর্থ করলাম না বলে ব্যাকরণেরও আমি অর্থ করতে পারিনে ? গঙ্গেশ।, অর্থ করতে ত দেখিনে মামা! ভবদেব। তােকে নিয়ে যে এই প্রতিদিন-ছদণ্ড এক প্রহর করে বকি, এ সব তবে কি করি? গঙ্গেশ। কৈ মামা! একদিনও ত অর্থ কর নাই ? আমি ত দেখি-যা কর, তা কেবল অনর্থ। ভবদেব। আরে ম’ল! পরীক্ষা করতে বসেছি ?-না,-দিতে বসেছি ? গঙ্গেশ। আচ্ছা-মামা! সেই ভাল! তুমি আগে পরীক্ষা দেও, তারপর আমি পরীক্ষা দেব। ভবদেব। এ কি—খেলা না কি রে! গঙ্গেশ। মামা! খেলা বই আর কি ? ভবদেব। হারে হতভাগা! মামার সঙ্গে খেলা ? গঙ্গেশ। মায়ের সঙ্গে খেলা হয় ত, মামার সঙ্গে দোষ কি? ভবদেব। মায়ের সঙ্গে–কি খেলা রে ? গঙ্গেশ। কেন ?-মা-মা, ছেলে-ছেলে ; তেমনি তােমার সঙ্গেও মামা-মামা, ভাগিনে-ভাগিনে ভবদেব। হারে! তুই এ সব খেলা শিখলি কার কাছে? গঙ্গেশ। কেন মামা! তােমাদেরই কাছে। ভবদেব। কেন রে । আমি তাের মত খেলা করি না কি ? গঙ্গেশ। আমার মত না কর, তােমার মতও ত কর ? ভবদেব। আমার মত আবার কি রে ?
৫০
গঙ্গেশ। কেন? এই যে টোল চৌপাটী করে পণ্ডিত হয়ে সব ছাত্র
নিয়ে পড়াতে বসেছ, এটা কি মামা! খেলা নয় ? আমরা
ছেলে মানুষ, ছেলে মানুষের সঙ্গে খেলা করি ; তুমি
তুমি ধাড়ী,
তুমি তােমার বাড়ী ধাড়ী ছাত্র নিয়ে খেলা কর।
ভবদেব। তুইও সেই খেলাই ক না দেখি ।
গঙ্গেশ। ও খেলা ত আমি শিখি নাই মামা! খেলব কি করে?
ভবদেব। হারে গঙ্গেশ! দেশদেশান্তর হতে এত যে ছাত্র এসে এত
শাস্ত্রের লেখা পড়া শিখুছে, এ সব কি তুই সত্য সত্যই খেলা বলে
মনে করি?
গঙ্গেশ। সত্য সত্যই খেলা বলে মনে করি মামা-
গান। (১২)
(আমায়) বল বল মামা। এ হ’তে কি খেলা আবার!
এই ভব-রঙ্গালয়ে,
কত রঙ্গ ল’য়ে-
আসি বারে বারে অনিবার।
আমি, হারায়েছি মা,
মামা! তুমি মামা,
“আমি আমার আমা” কেহ নাই আর
(দেখ যত) তােমার আমার মেলা, শ্যামা-মায়ের খেলা,
খেলে মা মাের্ ল’য়ে বিশ্ব-সংসার।
মামা! তুমি আমার,
আমি তােমার আবার,
এ সব তােমার আমার সম্বন্ধ তার ;
(আমি) কারু নই গাে মামা। আমার মা সেই শ্যামা
কি মামা কি মা সেই শ্যামা আমার ।
ও সেই, বাজীকরের মেয়ে, নিজেই ছেলে হয়ে,
নিজেই মা হয়,
নিজেই বাবা আবার ;
চতুর্থ দৃশ্য।
তার, যেমন মায়ার বাজনা, তেমনি মােদের নাচনা,
(আজ) না না মামা! “জয় মা !” বলে একবার।
( এই খেলা ভেঙ্গে)
দেখ, আজ যে জন মা ছিল, কাল সে ছেলে হল,
বাবা মরে নাতি হ’ল আবার ;
আজ, আমার মামা তুমি, কালই হয় ত আমি,
তােমার মামা হয়ে আসব আবার ॥
গঙ্গেশ রে! তাে মামা, শিব বলে, ও মামা,
একাধারে মা যে পুরুষ-বামা ;
তিনি, কখন হন মামা,
কখন হন মা,
নাচেন-বাবা হয়ে বাবার
বুকে
আবার।
ভবদেব। এই যে প্রতিদিন তিন সন্ধ্যা শিখাচ্ছি, তবুও ত কোন কাণ্ডজ্ঞান
হচ্ছে না?
গঙ্গেশ। আর আমার কাণ্ডজ্ঞান হয়ে কায নাই মামা! এখন তােমার
যে টুকু কাণ্ডজ্ঞান আছে, ওটুকু গেলেই আমি বাঁচি।
ভবদেব। বাচ আর মর, আজ আর তােমায় আমি ছাড়ছিনে।
গঙ্গেশ। কি করবে মামা! মান্ববে?
ভবদেব। না-না, মাঝব না; যা পড়েছিস্ তার পরীক্ষা দে।
গঙ্গেশ। আচ্ছা! বাকি পড়েছি ?
ভবদেব। আরে গেল যা ! কি পড়েছিস তা আমি বলে দেব ?
গঙ্গেশ। তুমি বলবে না? তবে কি আমি বলব?
ভবদেব। পড়লি তুই, তুই বলবি নে ?
গঙ্গেশ। পড়ালে তুমি, তুমি ব’লবে না ?
ভবদেব। তা বুঝেছি,-বিদ্যা তােমার এমনিই হচ্ছে ।
* গঙ্গেশ। হামামা। ঠিক বলেছ মামা। বিদ্যা আমার এমনিই হচ্ছে। পড়ে শুনে আর কি হবে? তুমিও মামা। বুঝাতে পার না,-আমিও ও ছাই বুঝতে পারি নে। ভবদেব। বল দেখি—কি বুঝতে পারিস নে। গঙ্গেশ। ( সকলের মুখের দিকে চাহিয়া) দেখ—আমার মামার বিদ্যা দেখ ! “বল, দেখি কি বুঝতে পারিস নে ?”—আরে ! যা বুঝতেই পারি নে, তা ব’ কি করে, এ বুদ্ধিটাও কি তােমার নাই ? ( সকলের হাস্য) ভবদেব। তা ঠিক! তােমায় দেখে শুনে ক্রমেই হতবুদ্ধি হচ্ছি।' আচ্ছা। থাম্ ত দেখি-তােয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। গঙ্গেশ। কর ! ভবদেব। আচ্ছা, কাশীনাথ যে ব’লছে—তুই ব্যাকরণের সুত্র বৃত্তি পদ একে- বারে না কি সব ভুলে গিয়েছিস? গঙ্গেশ। কোন্ ব্যাকরণের ? ভবদেব। অ্যাঃ! গণেশের আমার কত ব্যাকরণেই যে বিদ্যা!—আবার কোন্ ব্যাকরণের ? কোন ব্যাকরণের আবার? পড়ছিস যে ব্যাকরণ-মুগ্ধবােধ! গঙ্গেশ। ও গাে-বােধে ব্যাকরণ আমি পড়িনে। আমি পড়ি মাহেশ ব্যাক- রণ। তুমি যদি তা পড়ে থাক, তবে পরীক্ষা কর ভবদেব। (সবিস্ময়ে কাশীনাথের মুখের দিকে চাহিয়া) কাশীনাথ! ও মাহেশের নাম পেলে কোথায় ? কাশীনাথ। আজ্ঞা ! কোন্ ব্যাকরণ বড় বলে অনেক সময় আমাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়, সেই সব কথার প্রসঙ্গে হয় ত মাহেশের নাম নেছে। ভবদেব। (স্বগত) অসম্ভব ওর কিছুই নয়। (প্রকাশ্যে গঙ্গেশের প্রতি) আচ্ছা! মাহেশের সূত্র বৃত্তি পদ জিজ্ঞাসা করলে বলতে পাৰে। গঙ্গেশ। তুমি জিজ্ঞাসা ক’তে পাৰে ।
চতুর্থ দৃশ্য। ভবদেব। পারব। গঙ্গেশ। তবে আমিও বলতে পাব। ভবদেব। বল্ দেখি-মাহেশের প্রথম সূত্র কি? গঙ্গেশ। (সহাস্যে) তাও তুমি জান না? মাহেশের প্রথম সূত্র-মা। ভবদেব। বিলক্ষণ! মাহেশের প্রথম সূত্ৰ-মা ? গঙ্গেশ। মা নয় ? তুমি মাহেশ লিখুতে জান ? ভবদেব। হারে নির্বোধ ! তুই যা ভাবছিস তা নয়; মাহেশের প্রথম সূত্র মা-না, প্রথম অক্ষর মা। গঙ্গেশ।,ও মামা! যে অক্ষর, সেই সুত্ৰ, সেই আমার মা। ভবদেব। সূত্র ত বুঝলাম, তোমার বৃত্তিও বুঝি এই সূত্রেরই ? গঙ্গেশ। ছি মামা! তুমি পণ্ডিত হয়ে এমন কথা বল? সূত্র ছাড়া বৃত্তি কখন হয় কি ? ভবদেব। হ্যা ! বৃত্তিও বুঝলাম! এখন পদ- গঙ্গেশ। ও মামা! সে ও আমার মায়ের পদ। ভবদেব। এই রকম পদ হলেই তােমার সুবিধা হয়না? গঙ্গেশ। ও মামা! আমার সুবিধার কথা বলছ? সে পদ যদি সাধতে পারুতে তবে তােমারও সুবিধা হত। ভবদেব। হাঁ! প্রত্যয়ও, নাই, বিভক্তিও নাই, সাধা পদ সাধাই আছে। যেমন জিজ্ঞাসা, তেমনি বলা! গঙ্গেশ। কি বলে মামা! প্রত্যয়ও নাই ? বিভক্তি নাই ? মার পদে যার প্রত্যয় নাই, সেও কখন মাহেশ পড়তে পারে। আর বিভক্তির কথা ; বিভক্তি কার নাম মামা ? ভবদেব। ওরে! যা দিয়ে পদ বিভাগ করা যায় তার নাম বিভক্তি। গঙ্গেশ। ও মামা! তােমার দেখি, বিলক্ষণ ভক্তি। মার পদ বিভাগ করবে কার সঙ্গে ? আমার মাহেশ-ব্যাকরণের বিভক্তি কি, তা জান? ভবদেব। কি ?বল ত!- গঙ্গেশ। শুনে তুমি কি করবে? সে ৰিভক্তিতে বিভাগ হয় না। ( দন্ত বিকাশ করিয়া )—তার নাম, বিভক্তি।
ভবদেব। (সজল-নেত্রে) হারে গঙ্গেশ! এ বি-ভক্তি দিয়ে সে পদ কথন
সেধেছিস ?
গঙ্গেশ। ও মামা! তােমার মত নয়। আমাদের মাহেশের টোলে যে অধ্যা-
পক, তার কাছে ও পদ না সাধলে একদিনও কাও রক্ষা নাই।
ভবদেব। হারে। অধ্যাপক কে ?
গঙ্গেশ। হাঁ মামা! মাহেশের অধ্যাপক মহেশ, তাও তুমি বােঝ না?
ভবদেব। সে টোল কেমন রে ?
গঙ্গেশ। বড় বড় ছাত্রগুলি সব তােমারই টোলের মত, (ভূতনাথকে
দেখাইয়া) ঐ নাম-ঐ চেহারা,! (ভূতনাথ ব্যতীত আর
সকলের উচ্চ হাস্য)
ভবদেব। (গভীরভাবে অনেকক্ষণ চিন্তার পর) গঙ্গেশ! এত পরিশ্রম
ক’রুলাম, তাে আর লেখাপড়া কিছু হ’ল না রে।
গঙ্গেশ। যা কপালে লেখা আছে মামা! তাই আগে পড়ি, তারপর সময় থাকে
ত আর লেখা পড়া।
ভূতনাথ। ওর লেখা পড়া হবে-না,-ছাই হবে।
গঙ্গেশ। তা তােমারও একদিন হবে।
ভূতনাথ। দেখ, গঙ্গেশ! বড় জ্যেঠা হয়েছি।
গঙ্গেশ। ভূতনাথ দাদা! ভেড়ের ভেড়ে! তােমার কাণ্ডজ্ঞান নাই? ভাইকে
বল-জ্যেঠা ?
ভূতনাথ। ভটচা, মশায়! এই দেখুন-বাপান্ত করে গাল দেয়।
ভবদেব। বাপু হে! তােমায় বাপান্ত করে গাল দেয়, আমারই অদৃষ্টে
কি আছে, তা বুঝে উঠতে পাছিনে!
ভূতনাথ। আপনি বুঝতে হয় বুঝুন, না হয় না বুঝুন, আমরা সহ করব
কেন ?
গঙ্গেশ। সহ্য না করে যাবে আর কোন চুলােয়? এই যে তিন সন্ধ্যা আমার
মামার বাপের শ্রাদ্ধের ফলার ক’ছ, এ নিমন্ত্রণ আর কোথায়
যুটুবে ?
৫
চতুর্থ দৃশ্য।
ভবদেব। এই নেও! দেখুলে? বলতে কি ফ’লতে! (গঙ্গেশের দিকে
চাহিয়া) যা! তুই উঠে যা! তােকে আর এখানে থেকে কায নাই।
গঙ্গেশ। পরীক্ষা হয়েছে ?
ভবদেব।.রক্ষা কর বাবা! আর পরীক্ষায় কাষ নাই, তােমার পরীক্ষা করা,
আমার বাবার চৌদ্দপুরুষেরও কৰ্ম্ম নয়।
গঙ্গেশ। তার পর বুঝি আর নাম মনে নাই ?
ভবদেব। থাকলেও তোমার কল্যাণে তা ভুলতে হয়েছে।
হরিদাস। পােলাবান্ ছাড়া তুই কেম্বাই বাঁদর ঐবার লাগচ।
গঙ্গেশ। (হস্তভঙ্গী করিয়া) ও অরিদাস বাই! বাঁদর গ বাঁদর ! বাঁদর
কৈবার লাগচস্ রে ! তাের বাবানি বাঁদর আছলাে ?
হরিদাস। তােদরূতো-
( নাকী সুরে গান গাইতে গাইতে গঙ্গেশের সবেগে প্রস্থান)
বঙ্কিম। (স্বগত) আর ধরেছিস!-
কাশীনাথ। ভাল, হরিদাস দা! গঙ্গেশ যা বল, তা মিথ্যা না; সত্য সত্যই
তােমরা কি হ-গুলােকে অ, আর তালব্য-শগুলােকে হ- না
বলে থাকতেই পার না? হ—আরশ তােমাদের মুখ দিয়ে বের
হয় না,-না কি ?
হরিদাস। (মুখ তুলিয়া রুক্ষম স্বরে) হঃ! আম্রা বুলতি তালব্য হ-ই বুলি,
আপনারা হুতিই অম হােনেন!
বঙ্কিম। আঃ মরণ আর কি ? আবার সংশােধন করে বললেন-“হুতিই
অমন হােনেন।”
ভবদেব। থাম! থাম! চুপ কর ! চুপ কর ! এখন এস দেখিকে কিসের
পরীক্ষা দেবে ?
কাশীনাথ। শারীরকসূত্র, গৌতমসূত্রের পাঠ ত আমার এখনও ঠিক হয় নাই,
আজ পরীক্ষা দেই কি করে ?
ভবদেব। (ভূতনাথের দিকে চাহিয়া) তোমার পাতঞ্জল কত দূর?
ভূতনাথ। আজ্ঞা !হয়েছে।
গসেশ।
কাশী।
ভবদেব। অবস্থা কয় প্রকার ?
ভূতনাথ। আজ্ঞা।-“এবমবস্থাঃ পঞ্চবিধা ভবন্তি।”
(নেপথ্যে উচ্চৈঃস্বরে )—বাবা! এ দিক্ এস বাবা! দেখসে-গঙ্গেশ
কি সর্বনাশ করলে! ধর্মের ষাঁড়ের পীঠে চড়ে বাড়ী আসছে।
ভবদেব। কাশীনাথের মুখের দিকে চাহিয়া ) মুক্তকেশী চেঁচাচ্ছে না?
আজ্ঞা ! হা!
ভবদেব। নাঃ!-এটার জ্বালায় ঘরে টেকা ভার হ’ল!!
(আবার নেপথ্যে)-ও-বাবা! শীগগির এস, সর্বনাশ হ’ল! গঙ্গেশকে
শিঙ্গে তুলে যাঁড়ে আছড়ে ফেলেছে!
ভবদেব। এস ত হে! তােমরা এস ত! এস ত !!
( ভবদেবের সঙ্গে সঙ্গে সকলের প্রস্থান)।
ভূতনাথ। ( যাইতে যাইতে) নিৰ্বংশের বেটা, মরে ত আপদ যায় !!
পঞ্চম দৃশ্য।
বিজন প্রান্তরে গঙ্গেশ।
গঙ্গেশ। (স্বগত) এই ত রৌদ্রও কমে এল, বেলাও শেষ হতে চলল।
(আকাশের দিকে চাহিয়া) এই আমার মার সেই আকাশ,
মামা আমার এই আকাশের কত নাম রেখেছে,-একবার বলে
ঘটাকাশ, একবার বলে জলাকাশ, একবার বলে মেঘাকাশ, আবার
বলে মহাকাশ। এই আকাশই আমার মার সেই আকাশ। এই
আকাশের উপর দিয়েই রথে চড়ে মা আমার সেই মার কাছে
গিয়েছে। আমি তখন কেন ঘুমিয়ে ছিলাম রে! জেগে থাকলে ত
অনায়াসে মার সঙ্গে যেতে পারতাম। তখন ত সবাই তাই বলল,
পঞ্চম দৃশ্য।
৫৭
এখন আবার বলে মরে গিয়েছে। আচ্ছা, মরে গেলেই মানুষ
যায় কোথায় ? এখন বুঝেছি-তাই ঠিক হবে, মা ত ঘুমিয়ে
ছিল না, মা তখন মরে গিয়েছিল, মরবার সময়েও আমি দেখতে
পাইনাই; মা বললে-বাবা গঙ্গেশ! “কালী কালী বল!" আমি তাই
ব’লা, আর মা অমনি চোক বুজুল ! ম’ল কখন তা ত কিছু টের
পেলাম না! আচ্ছা, মা যদি মরূবে, তবে সকলে মাকে অমন করে
সাজিয়ে গুজিয়ে শ্মশানে নিয়ে গেল কেন ? আর, মরে গেলেই বা
অমন করে সাজাবে গুজোবে কেন ?
(আকাশের দিকে চাহিয়া উচ্চৈস্বরে ) হাঁ মা! তুই কি মরেছিস?
(পেটে হাত দিয়া) বড় ক্ষুধা পেয়েছে মা! পেট জ্বলে গেল মা !
মা রে!—আর দাঁড়াতে পারি না, আজ তিন দিন হ’ল কিছু খাই নাই
ম! পথেও কেউ একদিন ডেকে কিছু হাতে দিল না মা ! মা রে !
তুই আমায় কত সােহাগ ক’বৃতি, কত খাওয়াতি, কত ভালবাস
তিস্। মা রে! আজ আমার কেউ নাই মা-মা! আমি আজ
মা-হারা ছেলে মা!-মা যার নাই, তার কেউ নাই মা।
(দুই হস্ত দুই চক্ষে দিয়া বােদন ও ভূতলে পতন এবং কিয়ৎকাল পরে
অতি কষ্টে বামহস্তে নির্ভর রাখিয়া ভূতল হইতে অৰ্ধোঙ্খিত
হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া )—ও মা তারা!হায় !
হায়! এ মা ও কথা বলে না, সে মাও কথা বলে না, কোথা গেলি ,
মা! আয়, মা!-আয়! একবারটি আয়, ! তােৰু দুটি পায়ে ধরি মা।
মা। আমার বড় কষ্ট হচ্ছে। পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে না। মাথা
ঘুরে পড়ছে, উঠতে পাছিনে-দাঁড়াতে পারছিনে! কোথাও আর
যেতে পারছিনে মা! আর যাবই বা কোথায়? কোথাও গেলেও
ত মা !আর তােক দেখতে পাব না? আর ত মা ! কেউ
আমার তেমন করে, সােহাগ করে দুই হাতে গায়ের ধুলো ঝেড়ে
কোলে উঠিয়ে নিয়ে যাবে না মা ! আয়, মা!-মারে ! আর
তােক দেখতে পাচ্ছিনে! বলেছিলি-তুই ত আমাকে দেখতে
পাচ্ছি,-হা মা! আমার এই দশা দেখে শুনেও কি তোর একটু
গদেশ।
দয়া হয় না? মা-তুই না আমায় কত ভালবাতি, এখন আমি
কার কাছে যাব মা! তুই যদি এখানে না থাকি , আমাকে
তবে তাে কাছেই কেন নিয়ে যা না মা ! মামা মামী দুজনেই
আমাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে মা! আজ এক মাসের
উপর হয়ে গেল-আমি বাড়ীতে গেলেও কথা কয় না, ডেকেও
একবার জিজ্ঞাসা করে না, খেতে চাইলেও মামীমা পােড়া বাসী
পচা ভাত খেতে দেয়। খেতে পারিনে মা! আমার বমি ওঠে,
তা বড়দিদীও দেখে শুনে কিছু বলে না, হােটদিদীই কেবল বসে
বসে কাঁদে। মা ! টোলে গেলে ছাত্রগুলো আমাকে বাজার
করতে পাঠিয়ে দেয়। মামী-মা গােক রাখতে বলে, মামা বলে
গােরুর ঘাস কেটে আতে। তার পর আবার বাড়ী গেলেই পড়ে-
দাদারা আমাকে যখন তখন ধরে মারে। (অঙ্গ প্রত্যঙ্গে হাত
দিয়া) এই দেখ, মা! সারা গায়ে আমার মায়ের দাগ। কিল মেরে
মেরে বুকে, পিঠে, পাঁজরে, মা! আমার ব্যথা করে দিয়েছে মা!
উঃ ! (বামােক উত্তোলন করিয়া)।
আজ দু’পর বেলা পথের ধারে ভূতনথি-দাদার সঙ্গে দেখা হ’ল, (কাদিতে
কাদিতে) এই দেখ, মা ! বাখারি দিয়ে কেমন করে আমার উরতে
মেরেছে। তার পর আবার তিন চারটা লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে গেল।
তখন ত কত রক্ত পড়ল, এখন এমন ঘা হয়েছে মা! এই দেখ,
কত পিপড়ে লেগেছে।
(ফু দিয়া পিঁপড়া ছাড়াইতে ছাড়াইতে ঘায়ের চারি দিকে
হাত বুলান—আর মা! মা! মা! বলিয়া বােদন )
ও মা! বড় পিপাসা মা! আমার বুক যে ফেটে গেল! (বক্ষস্তান ও
শিয়ােলুণ্ঠন) মা রে! আমার কেউ নাই! (পুনঃ পতন ও
মুচ্ছা অভিভূত অবস্থায়) ও গাে মা! মা গাে! ম'লেম!-ম'লেম!
-তুই না বলেছিলি - মা! আমি ভয় পেলে তুই তখন আসবি?
হায় রে পােড়াকপাল! কিছুতেই আমার সে ভয় আর
০
পঞ্চম দৃশ্য।
হ’ল না। এই ভয় হ’বার জন্য কতই ক’ছি,-ঘাটে ঘাটে,
মাঠে মাঠে, বনে বনে, জঙ্গলে জঙ্গলে একা একা বেড়াচ্ছি,
কেবল মা ! ভয় পেলেই তুই আসবি, তা হলেই তােকে
দেখতে পাব বলে ! সে ভয় ত কিছুতেই হ’ল না মা।
হায়! আমার মরণও নাই। শুতে পাই-মরবার সময়
লােকের দারুণ ভয় হয়, জানি নে আমার কপালে সে ভয়ও হবে
কি না? ওমা তার! তুই না আমার সে মা ? আমার
এ-মাকে তুইও ত একবার বলে কয়ে পাঠিয়ে দিস না মা! এ মা
যদি আসতে না চায়, তবে তুই-ই একবার আয়, না মা। মার
কাছেই ত শুনেছি মা!—তুই না কি পাহাড়ে পৰ্বতে, শ্মশানে
মশানে, ঘাটে মাঠে, বনে জঙ্গলে সকল খানেই থাকিস, আর
চুলগুলি সব ছেড়ে দিয়ে মুক্তকেশী সেজে তুই যেখানে সেখানে
নেচে বেড়া। আয়, মা ! আয়, মা! ও মা! পিপাসায় বুক ফেটে
গেল! মা রে !-মা! (পুনঃ পতন ও মুচ্ছা)
(দ্রুতপদে মুক্তকেশীর প্রবেশ )
মুক্তকেশী।(ব্যগ্রস্বরে কঁদিতে কাদিতে) এই না আমার সােণার চাদ
ভাইটি এখানে ধূলায় পড়ে ? হায় হায় রে ! পােড়াকপাল !
ভাইটি আমার কদিন যেন না ভাত খেয়ে, না জল খেয়ে এখানে
( সম্মুখে বসিয়া গায়ে হাত দিয়া )
গঙ্গেশ!—গঙ্গেশ-ভাইটি আমার । এখানে এসে মাঠের
মধ্যে পালিয়ে আছিস, আমি আজ দুদিন থেকে না পেয়ে,
দেয়ে কত জায়গায় তােকে কত খুজে বেড়াচ্ছি। আজ
বৈকালে কাশীনাথদাদার সঙ্গে দেখা হ’লসে বল্লে—ভূতনাথ
তােকে আজ পথের ধারে দেখেছিল। আমি সেই পথ ধরে
খুজতে খুজতে মাঠের মধ্যে এইখানে এসে পড়েছি। ভাইটি
আমার, সােণাটি আমার, লক্ষ্মীটি আমার, ওঠ, ভাই! চল,
বাড়ী যাই! তুই না খেলে আমি খেতে পারিনে।
আজ
পড়ে ঘুমুচ্ছে!
গঙ্গেশ। ৬০ ওঠ,! ! দুই দিন থেকে না খেয়ে ভাই! কেঁদে কেঁদে আমিও চলতে পাছিনে! ওঠ, রে গঙ্গেশ । (গদেশের গায়ে ঝাঁকি) গঙ্গেশ। (অতি ক্ষীণকণ্ঠে কাতরস্বরে) মা রে ! বুক ফেটে গেল, একটু জল! মুক্তকেশী। হায়! হায়! কি কপালের দশা রে। পিসীমা আ তুমি কোথায় ? পিপাসায় বাছার আমার মুখ বুক সব শুকিয়ে গিয়েছে। হায় রে ! কি করব ?-কোথা যাব? কোথা এখন জল পাব ? দেখি একবার নিকটে কোথাও আছে কি ? তা ছাই! থাকলেই বা আনি কি করে? হা ! মা তারা! এ কি সঙ্কট! যাই ত দেখি—যা করেন মা। ( সবেগে প্রস্থান, কিছুকাল পরে আঁচল ভিজাইয়া জল লইয়া দ্রুতপদে দ্রুতপদে পটান্তরে প্রবেশ ও গঙ্গেশের মুখে বিন্দু বিন্দু জলসেচন) গঙ্গেশ। (অতি কাতরতার সঙ্গে সাগ্রহে জলপান) মুক্তকেশী। হায় হায় রে ! ভাইটির মার গলা পর্যন্ত এটে গিয়েছে। হা মা দুর্গে ! কি করেই আমায় নিয়ে এলে মা ! যদি না আসতাম, জানি আমার কপালে এতক্ষণ কি ঘটুত! বাবা বাবা গাে! মাগাে! তােরা এ ক’বলে কি? আজ পিসীমা বেঁচে থাকলে সে কি এ সব সইতে পার ত?-না, তােই এমন কতে পারুতে? (দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া) হায় রে ! পিসীমাই যদি বেঁচে থাকত, তবে গঙ্গেশই কি এমন করে অনাথ হয়ে মামার বাড়ী আসত ? আর বাবা মারই বা দোষ দেব কি? তারাও ত ওর উপরে এমন নিষ্ঠুর কখনও ছিলেন না, ওর দেবতার উপর ভক্তি দেখে তারাও ত সন্তুষ্টই ছিলেন। কি কুক্ষণেই গঙ্গেশ, সেই যে সেদিন শ্মশানে বেড়াতে গেল, সেই দিন হতেই যে, ও সেই কেমন কি হয়ে এল, তা ওই জানে,আর মা জানেন। সেদিন হতেই কি যে ওকে ভূতে পেল--আর না পঞ্চম দৃশ্য। ৬১ ছুৰ পুথি, আর না ক’ল লেখা পড়া। তার পর দৌরাত্ম্যের পর দৌরাত্ম্য ক্রমেই বাড়াতে লাগল, তাই না বাবা আর মা ওর উপরে একেবারে হাড়ে হাড়ে চটে গেলেন? আর তারপর হতেই টোলের সেই হতভাগা ছাত্রগুলাে ওকে দিন রাত্রি গাধার মত, গােরুর মত পিটে তুলতে লাগল। এত-তাতেও ভাইটি আমার কোন দিন কিছু বলে নাই। তারপর সেই যে সেদিন-পরশু দিন, বাবা বললেন—ওকে বাড়ী থেকে বের করে দেও! আমি কত করে বুঝিয়ে সুজিয়ে তারপরেও হাতে ধরে নিয়ে এসে খেতে বসালেম, মা এসে অনি রাগ করে পােড়া ভাতগুলো পাতে ঢেলে দিলেন, আবার দিয়ে বলেন- এই খাও, জন্মের মত খাও! আর তোমাকে এ বাড়ীতে খেতে আসতে হবে না ! অনি ভাইটি আমার কাতে কাতে ভাত থুয়ে উঠে ছুটে পালাল! আমি পিছনে পিছনে দৌড়ে এসেও কিছুতেই আর ঠেকাতে পালাম না। ভাই আমার সেই যে, সেদিন বেরিয়ে এয়েছে, আজ তিন দিন, তিন রাত্রির মধ্যে একবারের জন্যও বাড়ী যায় নাই। তিন দিনের মধ্যে পেটে ভাত জল কিছু পড়ে নাই! এই তিন দিন আমি পাড়ায় পাড়ায়, পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কত লােককেই জিজ্ঞাসা করছি।—এম্নি পােড়র দেশ, আর এমনি পােড়র গাঁ, যাকে জিজ্ঞাসা করি, সেই বলেগেছে বালাই গেছে।—অমন আপদ আবার ডেকে আন কেন ? কলেই ত আপদ ব’লে অবসর নিল, আমার যে প্রাণ কেমন করে—আমি তা কাকে ব’ব? আমার মার পেটের ভাই নাই, গঙ্গেশকে আমার ভাই বলেই মনে হয়, পােড়র লােকে আর তা কি বুঝবে ?, দুঃখ এই যে, বাবা মাও তা বুঝলেন না। পিসীমা যখন গঙ্গেশকে কোলে করে নিয়ে আমাদের বাড়ী আসতেন, তখনও যে গঙ্গেশ, এখনও সেই গঙ্গেশ; কিন্তু তখন ত গঙ্গেশকে দেখে প্রাণ এমন ক’ত না? পিসীমার
গঙ্গেশ।
মরা পর থেকে গঙ্গেশ যেন আর এক গঙ্গেশ হয়ে এয়েছে।
ওকে, দেখলেই এখন পিসীমার সেই রূপ আমার মনে পড়ে।
আহা! এই তিনদিনেই ভাইটির আমার শরীর যেন আধুখানা
হয়ে গিয়েছে। দেখে বুক ফেটে যায়, এখন এ অবস্থায় নিয়েই
বা যাই কি করে ? সূৰ্য্যও ত অন্তে গেলেন, এ-মাঠের মধ্যে
এখন ডাকিই বা কাকে ?—আর করিই বা কি? হ মা দুর্গে!
এ কি বিপদে ফেললে মা? গঙ্গেশ রে!-গঙ্গেশ!-
গঙ্গেশ। (পাশ ফিরিয়া) ওমা তারা। দে মা !-দো-আর একটু
জল!
মুক্তকেশী। ( আঁচল নিংড়াইয়া পূর্ববৎ আবার জলদান) হায়!
হায়! আবারও যদি জল চায়, তা হলে আমি কি ক’ব
এখনি,-ভেবেও যে কোন পথ পাইনে ! (জোরে ঝাঁকি দিয়া)
গঙ্গেশ রে !গঙ্গেশ!-ওঠ, ভাই! বেলা গেল, সন্ধ্যা হয়ে এল।
( আবার ঝাকি) ও গঙ্গেশ !-এখনও জাগলিনে ভাই ?
গঙ্গেশ। (অতি ধীরে চক্ষু মেলিয়) ও মা তারা!
মুক্তকেশী। (দ্রুতস্বরে) ও-গঙ্গেশ!—গঙ্গেশ!
গঙ্গেশ। (স্পষ্ট চাহিয়া) ও কে ? ছােটদিদী ? দিদিরে আমার
মা নাই! (ভগ্নস্বরে রােদন)
মুক্তকেশী। ( অঞ্চলে অশ্রুমােচন করিতে করিতে গদগদ স্বরে)
আয়, মা!-দেখে যা মা! আজ তােৰু সেই
গঙ্গেশের এই দশা ! হতভাগিনী আমি এখনও বসে বসে
দেছি! ও মা! তারা! তােমার মনে আর কি আছে মা!
(গঙ্গেশের গলা জড়াইয়া নােদন স্বরে)—ভাই রে! তাের
কেউ নাই, তবু আমি আছি!
পিসী-মা !
1)
পঞ্চম দৃশ্য।
গান। (১৩)
কেহ না থাকিলেও আমি আছি হায়!
ও ভাই! তােহ’তে কে আপন আমার, তােরে ফেলে যাই কোথায় ?
শিশুকালে তুই রে—পিতৃ-মাতৃহীন,
পথে পথে কেঁদে বেড়াস্ পথের কাঙ্গাল দীন হীন ;
কেহ নাই তােয়, আমার ব’লতে, কেহ নাই তােয়, কোলে তুলতে,
তাই, এ সংসারের পথে চ’তে
ব্যথা পা’স ভাই! পায় পায়।
জানি রে ভাই!—সে দুঃখ তুই গণি না,
তাের যে দুঃখ, তা ত কারেও জানতে তুই দিস্ না ;
কেহ তাে তা বুঝতে আর নাই, যার তরে এ দুঃখ পা’স ভাই।
তাের সেই—দুঃখ-হরা তারা বুঝি,
এইরূপেই স্থান দিবেন পায় ।
যাবি রে তুই এমনি করেই, দুঃখ নাই,
(তাের এই অভাগিনী মুক্তকেশী -ভগিনীর আর ভাই নাই;
তাই বলি রে প্রাণের গঙ্গেশ! (তাের) য দিন না হয় এ লীলার শেষ ;
আমি ত দিন আছি, কিন্তু
ছেড়ে যা’ না শেষ দিন্ আমায়।
যেখানে যাবি রে-সঙ্গে যাব ভাই!
যা পাবি’ যা খাবি আমিও তাে সঙ্গে খাব তাই ;
যে দিন রে তুই ভাবি খেলা, (তাের):ফুরাবে এ দুঃখের লীলা,
উঠবি রে ! তুই মায়ের কোলে,
লুঠব আমি সেই রাঙ্গা পায়। (সে দিন)
গদেশ।
(নেপথ্যে)।—( দূরে-উচ্চৈঃস্বরে)
ওরে-হরে! বন। বাছুরটো ছুটে গেল, এই সময় ধরে ।
মুক্তকেশী। (সচকিতে চাহিয়া ) ওই না আমাদের পাড়ার গােয়ালা হরি-
দাস? (মুক্তকণ্ঠে) ও হরিদাস-দাদা! শীগগির এ দিকে এস!
(নেপথ্যে ।তুই কে রে!-ওখানে বসে?
মুক্তকেশী। হরিদাস-দাদা! আমি সিদ্ধান্তদের বাড়ীর মুক্তকেশী। তুমি শীগগির
এস!-গদেশকে নিয়ে বড় বিপদে পড়েছি।
( নেপথ্যে)।—ওই—সেই ড্যারা ছেলেটা?
মুক্তকেশী। (স্বগত) হায় রে হায় ! এমন পােড়র দেশেও মানুষে বাস করে?
(নেপথ্যে)।—কেন গা—দিদীঠাকরু! সেটার কি হয়েছে? আচ্ছা,
এলাম আমি–এই বাছুরটো তেইড়ে দিয়ে আসি।
মুক্তকেশী। না-হরিদাসদাদা! আমার মাথা খাও, তুমি এখনি এস।
(নেপথ্যে)।-আঃ! বামুনে বালাই কি এমন বালাই !
দিদী-ঠাকরুণ গাে! আর মাথা খাইও না, এই এলাম।
(হরিদাসের প্রবেশ)
হরিদাস। (গঙ্গেশের দিকে চাহিয়া)-কেন? ওটার কি হয়েছে? ওটা
যে, একেবারে দাড়া গােরুর মত শুয়ে পড়ে আছে।
মুক্তকেশী। ছি হরিদাসদা! অমন করে কি বলতে আছে ? ভাইটি আমার
আজ তিন দিন-না ভাত, না জল, কিছু না খেয়ে একেবারে অবসন্ন
হয়ে পড়েছে, ক্ষুধা পিপাসায় বুক মুখ সব শুকিয়ে গিয়েছে। আমি
ত একে একা নিয়ে যেতে পারি নে, হরিদাস-দা। তুমি যদি একটু
ধ’তে ?—ধরে নিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ীতে পৌছিয়ে দিতে ?
হরিদাস। আমি ধ’ব কি করে? আমার পালের গােৰু যে সব একা চলে
গেল! আচ্ছা, তুমি ব’স! আমি গাই বাছুরগুলাে সব গুছিয়ে দিয়ে
পলাকে বলে আসিও সবগুলােকে তেড়ে নিয়ে বাথানে যাক্।
বস তুমি, আমি আছি। (প্রস্থান)
মুক্তকেশী । (গঙ্গেশের দিকে চাহিয়া ) এই নেও! আবার যে ঘুমিয়ে
!
পঞ্চম দৃশ্য।
৩৫
পড়ল! গঙ্গেশ!-গঙ্গেশ।-আর ঘুমাস নে ভাই! একবার চো
মেলে চা!
গঙ্গেশ। দিদি ! আমি কথা কইতে পারছিনে; তুমি এলে কোথা থেকে ?
মুক্তকেশী। সে কথা ভাই! তােব এখন শুনে কাষ নাই। তােৰু শরীর
কেমন ? বাড়ীতে যেতে পাবি ত ?
গঙ্গেশ। ও দিদি। আবার সেই-বাড়ী ? ও বাড়ীর চেয়ে আমার যমের বাড়ী
ভাল দিদি! তােমার পায়ে ধরি ছােটদিদি ! ও কথা আর ব’ল না।
মুক্তকেশী । ছি ভাই! সে কি কথা? বাবা মা বকেছেন, তা মামা মামী
থাকলেই অমন ব’কে থাকেন, তাইতে কি এমন ক'রে রাগ করে
বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে, তিন দিন, তিন রাত্রি না খেয়ে-না
দেয়ে এম্নি করে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হয় ?
গঙ্গেশ। (কঁদিতে কাদিতে) দিদি ! মামীমা ত বলেছেন—যা খেলি,
এই জন্মের মত খেলি!! হ ছােদিদি ! মা থাকলে কি আমার
এই কথা ব’ত?
মুক্তকেশী। (গদ্গদকণ্ঠে) কি ক’ব ভাই! আমার অদৃষ্টে মবণ নাই, তাই
আমি এখনও এ সব কথা শুনছি! ( উচ্চস্বরে) পিসীমা রে!
(রােদন ও অঞ্চলে অমার্জন)
গঙ্গেশ। (অতি কষ্টে ধীরে ধীরে উঠিয়া মুক্তকেশীব হাত ধরিয়া)
আমার মাথা-খা ছােদিদি! অমন করে কঁদিস না।
মুক্তকেশী। আমি না কঁদলে ত তুমি উঠতে না ভাইটি।
গঙ্গেশ। কি ক’ব ছােদিদি! আমার উঠবার শক্তি নাই।
মুই। (গঙ্গেশকে ধরিয়া) একটু স্থির হয়ে ব’স ভাই! আমি,
মেলা হরিদাসকে ডেকেছি, সে এখনি এল বলে। আস্ত্রা
দু’নে তােমাকে ধরে নিয়ে বাড়ী যাচ্ছি।
গঙ্গেশ। (দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া) ওমা তারা! আবার সেই বাড়ী ?
(মুক্তকেশীর কাঁধের উপর মাথা রাখিয়া ফুফিয়ে ফুফিয়ে
কান্না )
গঙ্গেল।
মুক্তকেশী। ( অঞ্চলে অমার্জন)
(নেপথ্যে)।-কৈ? দিদি-ঠাকরুণ! কত দূর? আমি ত এই এয়েছি।
(হরিদাসের প্রবেশ)
মুক্তকেশী। এস হরিদাসদা! এদিক এস !-তুমি একদিকে, আর আমি
একদিকে ধরে নিয়ে যাই। (গঙ্গেশের প্রতি) গঙ্গেশ। ভাইটি
আমার, এই কাধের উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে
ধড়াও ত!
হরিদাস। ওঠ না—গঙ্গেশ ঠাকুর! ওঠ না!-কত গাছে ওঠ, পাহাড়ে ওঠ,
আর বাড়ী যাবার সময় হলেই শুয়ে পড়?
মুক্তকেশী। ছি হরিদাসদা! একটু চুপ কর না! দেখছ ত ও শরীরের অবস্থা ?
হরিদাস। দেব আর কি দিদি-ারুণ! বামুনের ছেলে, আর গােয়ালার
গােৰু ও-ঐ রকমই হয়। গঙ্গেশ-ঠাকুর! কিছু মনে করে না!
এখন চল-তােমাকে দেখে যে, ভক্তিও করে, ভয়ও করে।
মুক্তকেশী। (গঙ্গেশের হাত ধরিয়া) ওঠ, ত ভাই।
গঙ্গেশ। ওমা তারা।-( উঠিতে উঠিতে বেদনায় অস্থির হইয়া পতন
এবং উরুতে হাত দিয়া) উঃ!-মলেম গো!-বড় বেদনা
দিদি। আমি আর পা উঠাতে পারছি নে।
মুক্তকেশী। কেন ভাইটি! পায়ে কি হয়েছে?( দেখিয়া ) হাঁরে গঙ্গেশ।
এ কি রে! পায়ে এমন বা কেন? ওমা! এ যে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
আহা হা!-তার উপরে আবার পিপড়ে ধ'রেছে! হারে গঙ্গেণ।
হয়েছে কি? এমন করে কাটুল কিসে?
গদেশ। দিদি ! তা তােমার শুনে কাষ নাই।
মুক্তকেশী। কেন রে ! শুনব না কেন? আমার মাথা খা, কি হয়েছে বল্ ?
গঙ্গেশ। সত্যই শুনবে?—দুপুরবেলা ভূতনাথদাদা আমাকে পথে দেখতে
পেয়ে বল্লে–পয়সা দিচ্ছি বাজার থেকে শীগগির একখানা
“দেশকে কিনে টোলের উপর দিয়ে যা।
দেখ, দিদি।
আজ তিনদিন কিছু খাই নাই, ক্ষুধা পিপাসায় আমার তখন
পঞ্চম দৃশ্য।
৬৭
মাথা ঘুরে পড়ছিল, তাতে আমি যেতে পালাম না, আর
অনি বাগানের বাখারী তুলে এমন করে মারলে যে, দিদি !
এই দেখ—কেটে কি হয়েছে! (ধা প্রদর্শন) আমি যা খেয়ে
মাটীতে উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম, তার পরে আমায় লাথি দিয়ে
একেবারে ফেলে দিয়ে আরও তিন চারটা লাথি দিয়ে চলে
গেল! (কাঁদিতে কাদিতে) আবার বলে গেল-থা!
আবার তোকে যে দিন দেব, সেই দিন এর শােধ তুলব।
মুক্তকেশ। আহা হা! গদেশ রে! হায় হায়! এখন আমি এ কি
ক’ব ? চল, ত আগে বাড়ীতে যাই, আজ বাবার টোল আমি
আগুন জেলে পােড়াৰ! এমন সব অসুরও বামুনের বাড়ীতে
থাকে? (হরিদাসের দিকে চাহিয়া) হরিদাসদা! দেখলে ত?
শুনলে ত? বাবাকে গিয়ে এ সব কথা তোমাকে বলতে হবে।
হরিদাস। তাই ত গা-দিদিঠাণ! আমরা ত গােরুগুলােকেও এমন
করে ঠেঙাইনে, তােমাদের ও ভূতনাথ-ঠাকুর বামুন?-না,
চামার? চল ত যাই আগে, বাবাঠাকুরকে সব কথা বলে দেব।
তােমার বাবার ত ও-টোল নয়?-বাঁদরের বাথান?
মুক্তকেশী। হরিদাসদা! পায়ে এ ঘা নিয়ে গঙ্গেশ ত হেঁটে যেতে পারবে
না, তুমি যদি ওকে দয়া করে কোলে করে নিয়ে যেতে?
ভাইটির জন্য আমিও আজ তিন দিন খাইনি, আমারও গায়ে
একটু বল নাই।
হরিদাস। বল থাকলেই ত তুমি দুর্ব করেছিলে আর কি ? চল-তুমি
আগে আগে চল-গঙ্গেশ ঠাকুরকে আমি কঁাধে ফেলে নিয়ে যাচ্ছি।
(গঙ্গেশকে ধরিয়া) ওঠ দেখি ঠাকুর! কাধে ওঠ ত!
(গঙ্গেশকে কাঁধে করা)
মুক্তকেশী । (শশব্যস্তে) ও হরিদাসদা! কর কি? ও যে পায়ে ।
( ধীরে ধীরে গঙ্গেশের উত্ হইতে হরিদাসের হাত সরান)
হরিদাস। গঙ্গেশ-ঠাকুর! মনে রেখে—এই কাধে করে নিয়ে যাচ্ছি,
এর একটু গুণ গেয়ো !আর কি গুণ, গাইবে,তা নয়,
,
দয়া করে এই করাে যে,-যাড়গুলােকে, অমন ক'রে তেড়ে
নিয়ে পিঠে চড়োনা, আমাদের বাড়ীর ছেলেগুলােকে পথে
আড়িয়ে মেরেনা, গাের বাথানে আগুন দিয়ে সব শুদ্ধ
পুড়িয়ে মেরে না! তােমার ত যে বেক্ষতেজ, কাধে করতেও
গান। (১৪)
গঙ্গেশ-ঠাকুর। মনে রেখাে, এইটি করাে দয়া করে ;
শিং ভেঙ্গোনা অমন করে, যাড়গুলােকে তেইড়ে ধরে।
(ও ঠাকুর !)
পথের ধারে ছেলে গুলােয়, আছড়ে আর ফেলল ধূলােয় ;
তারা, তােমার জ্বালায় যায় কোন্ চুলােয়,
দেখলেই ভয়ে আঁতকে মরে।
যেন, বাঘ কি ভালুক)
আগুণ দিয়ে বাথান ঘরে, গােরু-গুলােকে পুড়িয়ে মেঝে
দেখিও না বেক্ষতেজ আর,
তারাও-তােমার ভয়ে যায় না চরে।
ভূত সেজে বটগাছের ডালে, ভয় দেখিয়ে মেয়ের পালে
মেরাে না আর, তােমার সেই মার
দোহাই দেই আজ পায়ে ধরে।
( ও ঠাকুর। তােমার সেই মায়ের দোহাই !)
মুক্তকেশ। ছি! হরিদাসদা।
হরিদাস। না-, তুমি চল-চল!
( অর্থে অর্থে মুক্তকেশী পশ্চাৎ পশ্চাৎ গঙ্গেশকে
কাঁধে করিয়া হরিদাসের প্রস্থান।)
ষষ্ঠ দৃশ্য।
ভবদেব সিদ্ধান্তের চতুম্পাঠী।
( রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর, নিজ নিজ শয্যায় ছাত্রগণ নিদ্রিত।
(শয্যার পার্শ্বে স্থিরভাবে উপবিষ্ট গঙ্গেশ)
গঙ্গেশ। (হঠাৎ চমকিয়া) এ কি দেখলাম? বসে বসে কি ঘুমিয়ে
ছিলাম ?
এ কি ধা--না-স্বপ্ন ? বাপ, রে ঝপ,!
কি ভয়ঙ্কর-মুৰ্ত্তি !—যেমন জটা, তেমনি তিন চোক, তেমনি
কালো রং, আর তেমনি হাতে শূল! বাপ, রে বাপ!
আমার উপর এত রাগ কেন ? আমি গঙ্গেশ, আমার কোন
দিনের জন্য একবারও ত ভয় হয় নাই ? আজ যে ভয়ে গা
ফুলে উঠল! ওমা! এ কি ভয় মা! শূল হাতে করে যেন
আমার চারদিকে ঘুরছে। ঐ যে আবার না? না-না, আমিই
ভাবতে ভাবতে অম দেছি। যাই হক, ভয় ত বড় হয়েছে ।
(সােল্লাসে). হা! বেশ হয়েছে !--বেশ, হয়েছে ! আজ
আমার বুঝি সেই দিন আসছে! মা যে বলেছিল—তুই ভয়
পেলেই আমি আব! আজ আমার মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।
(পুনর্বার চমকিয়া) ওমা!-ঐ যে আবার কি দেখি? আঁ-
আঁ-আঁ চীৎকার, পতন ও মুচ্ছা)
(একটু পরে নারায়ণের নিদ্রাভঙ্গ)
নারায়ণ। (পাশ ফিরিয়া জড়িতস্বরে) ও-কাশীনাথদা! অমন্ করে--
আঁআঁ-শব্দ করলে কে ভাই?
কাশীনাথ। উ!কি নারায়ণদা! ডাকছ কেন?
নারায়ণ। হাঁ রে ভাই! কে যেন-আঁ-আঁশ ক’ছিল।
কাশীনাথ। ! শব্দ ক’ছিল? নিজেই বুঝি স্বপন দেখে কেঁদে উঠেছ।
---
।
নারায়ণ। না ভাই। তা না।
বঙ্কিম।
আরে ভাই! হরে।
(গাড় লইয়া কপাট খুলিয়া কাণে পৈতা দিয়া বাহিরে প্রস্থান, পটা-
স্তরে দ্রুতবেগে ঘরে আসিয়া কপাটে খিল দিয়া)
ও কাশীনাথদা!-কাশীনাথদা!-বাপরে বাপ,! দেখসে ভাই!
বাইরে আজ কি অন্ধকার।
কাশীনাথ। কি বল্লি ভাই! এমন কথা? আজ যাদও অমাবস্যা, তার
একটু জ্যোৎস্নাও নাই ?-সব, অন্ধকার?
বঙ্কিম। আরে ভাই ! অমাবস্যা ত মাসে মাসেই হয়, এমন, অমাবস্যা
আমার বাপের চৌদ্দপুরুষেও কখন দেখে নাই।
কাশনাথ। খুব কালাে না কি রে?
ৰকিম। ভাই রে! কালো ব’তে কালাে? এ যেন সেই কার্তিক মাসের
অমাবস্থার কালো !
কাশনাথ। ভালই হল! শীতটা চলে যাচ্ছিল, আবার নূতন করে শীত
এল রে! আবার বুঝি-কপি, কলা, বেগুন উঠল।
বঙ্কিম। তুমি বেরােও না! দেখে যাও—একবার, শীত এল কি না? শীত
তােমাকে আপনিই বেগুন চটকাবে, আর বেগুন খুঁজতে হবে না।
কাশীনাথ। তাই ত রে! প্রস্রাব করতে না উঠলে ত চলছে না।
(পৈতা কানে দিয়া উঠিয়া অন্ধকারে হাতড়াইতে হাতড়াইতে ‘ধপ
করিয়া গাড় ফেলিয়া দিয়া)-ও জ্জা!-( এড়াতাড়ি উঠা-
ইতে গিয়া গাড়ির জলে আছাড় খাইয়া চিৎ হইয়া বঙ্কিমের
ঘাড়ে পতন )
বঙ্কিম। (চীৎকার করিয়া) এই-নিৰ্বংশের বেটা মরেছে।
কাশীনাথ। (শশব্যস্তে) দোহাই ভাই!-বঙ্কিমদা! তােৰু পায়ে ধরি,
কিছু মনে করিস নে ভাই। বড় সামলিয়েছি।
বঙ্কিম। হাঁ। সালিয়েছ যে, তা কি আর বলতে ? আর পায়ে ধরে কাষ
নাই, ঘাড়ে যা ধরেছ, এখন তাই ছাড়।
!
যষ্ঠ দৃশ্য। ৭১ কাশী। ছাড়ি ভাই ছাড়ি ভাই। আগে উঠি বঙ্কিম। না—আগেই ছাড়, তার পর ওঠ। কাশী। (উঠিতে (উঠিতে উঠিতে আবার সেই গাড়র জলের মধ্যে ধপাস করিয়া পড়িয়া) এ-জ্জা! সব ভিজে গিয়েছে। রঙ্কিম। কিসে? ছিটিয়ে ত গায়ে দিলে, তার পর যা আছে কপালে। কাশী। (সভয়ে) দোহাই ভাই! বঙ্কিম। আঃছাই! দুয়াের খুলে বেরােওই না কেন ? কাশী। খুলি-খুলি-ভাই! (কপাট খুলিতে গিয়া চৌকাঠে মাথায় ঘা লাগিয়া ) আঃ!-শালার ঘর! বঙ্কিম। এই বার-গুরুদক্ষিণা ! কাশী। না হে! -না, ওটা অভেদে ষষ্ঠী। শালার ঘর নয়, ঘরই শালা। (কপাট খুলিয়া গাড় লইয়া প্রস্থান) ( একটু পরেই নেপথ্যে—“ধপাস করিয়া শব্দ, অমনি বাহিরের দিকে ঘরের বেড়ায় মাথা গুজিয়া পড়িয়া ভয়ার্তস্বরে ) বঙ্কিম! ভাই রে ! ধর রে ধর ! ওরে ভাই! মরেছি রে ম'রেছি। ( সবেগে কপাট খুলিয়া গাড় লইয়া হুড়মুড় করিয়া ঘরের মধ্যে পতন) বঙ্কিম। এখনআলু, বেগুণ, কপি, খাও না ? কাশী। ওরে ভাই! আলু বেগুণ! চৌদ্দবছর শাক চড়চড়ি খেয়ে থাকলেও আর না ? বাপ রে বাপ! কি অন্ধকার রে! যেন ধরে খেতে আসছে! বঙ্কিম। আঃছাই। একটা দিয়াশলাই ই আল না কেন ? আঁধারের মধ্যে অমন্ করে আঁকেই ম’র কেন ? কাশী। জালি—আলি, ভাল কথা মনে করেছি ভাই। এই বুদ্ধি যদি এতক্ষণ দিতি ? বঙ্কিম। এতক্ষণ তুমি আমাকে যে বুদ্ধি দিচ্ছিলে? আহা!
গণেশ। কাশী। (মাসার আগুনে পাটকাঠি-গন্ধকের দিয়াশলাই ধরাইয়া প্রদীপ জ্বালিয়া) হ ভাই! বঙ্কিম! সত্য সত্যই ভাই। অন্ধকার দেখে এমন ভয় ত কোন দিন হয় নাই ভাই! আবার তার উপরে পাস করে কি একটা পড়ল! দেখ-দেখ ভাই । ভয়ে আমার সারা-গাটা ফুলে একেবারে ঢোল হয়েছে। ঘরের মধ্যে যে দিকে যে কোণে তাকাচ্চি, অমনি সেই ঐ কি যেন কি একটা-ধরে খেতে আসছে ! বঙ্কিম। খেত ত বালাই যেত । কাশী। (গঙ্গেশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করিয়া) ঐ দেখ, ভাই । সত্য সত্যই কি যেন একটা ঐ বসে আছে। বঙ্কিম। (ভয়ব্যঞ্জকস্বরে) তাই ত দাদা। সত্যই তা-ওটা একটা কি বসে আছে ? (ভয়ে জড়সর হইয়া—গঙ্গেশের প্রতি হাত ঘুরাইয়া) ওরে—তুই কি রে ? কাশী। বঙ্কিম! ভাই! তুই এই দিকে আয় না। বঙ্কিম। এই মরেছে–আভাগের-ভূত। কাশী। আর নাম করিস্ নে ভাই! বঙ্কিম। ওই দেখ,-ওই দেখ--তােকে খেল খেল- (আঁউ আঁউ শব্দ করিয়া পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিয়া নারায়ণ ও হরিদাসের গাঁ-গাঁ-শব্দ করিতে কুরিতে ঘুরিয়া গঙ্গেশের গায়ে পতন ) গঙ্গেশ। তারা!-তারা! মা!-আজ আমার ভয় ! মা!—আজ আমার ভয় ! সন্ন্যাসীদাদা! আজ আমার সেই ভয় !! কাশী। (বঙ্কিমের দিকে চাহিয়া) ও বঙ্কিমদা! ঐ শােন শােন, ওটা কথা ব’লছে—গঙ্গেশ। ও আবার একটা সন্ন্যাসীদাদা পেল কোথায় ? ৰঙ্কিম। থাক এখন সে কথা! ও অরিদাসৰাই! ও নারায়ণদাস বাই। বলি-আছ ?-না, গেছ? হরিদাস। ও বঙ্কিমদা! দীপটা লৈয়া আইস ত ?
ঘষ্ঠ দৃশ্য। বঙ্কিম। আরে! ভয় নাই—ভয় নাই! ওটা গলেশ। হরিদাস। (রুক্ষ স্বরে) আরে! তুমি দীপটা লৈয়া আইস না! (বঙ্কিমের দীপ লইয়া উপস্থিতি) হরিদাস। (ঘাড় নামাইয়া অনেকক্ষণ গঙ্গেশের মুখ দেখিয়া ) ওয়ে ৰাই বঙ্কিমদা! মুই কি কমুরে বাই! এ স্থান আঁদার-গরে কি কমু মুই বাই! তুই বিশ্বাস করুবান্ না, ছ্যাড়ার ঐ কবালটার পর দপ দপ করে আর একটা চক্ষু অবার লাচলে বাই বঙ্কিম। দেখছিস কি? দপ, দপ করে, ও—তাের কপালই অলবারে লাগলো ! হরিদাস। আঃ! আপনি অ কি হন? মুই হত্যি হত্যি ক'রে কইবারে লাগচি-(হাত দিয়া দেখাইয়া) এম এম ডাগর চক্ষু ! বঙ্কিম। হরিদাস-দা! থাম—থাম! নারায়ণ। (উঠিয়া বসিয়া কোমর বাঁধিয়া গঙ্গেশের মুখের পাশে চড় উঠাইয়া ক্রুদ্ধস্বরে) ভেড়ের ভেড়ে! ঘুমিয়ে ছিলে ত উঠে ব’সছ কি মর জন্যে ? এটা চড়ে তাের এই বত্ৰিশপাটি গত উড়িয়ে দেই ত গায়ের দুঃখ যায়, এই দেখছি দেখছি-- -এক দিন তােকে মেরেই ফেলব, তারপর যা থাকে কপালে তাই হবে। নিৰ্বংশের বেটা, ছিল শুয়ে, এই রাত্রি আড়াই প্রহরের সময়ে অন্ধকারের মধ্যে উঠে বসে টোল গুদ্ধ লােক গুলােকে একেবারে ভয়ে আড়ষ্ট করে তুলেছে! আভাগের বেটা! তােমার মরণ নাই ? বঙ্কিম। আহা! নারায়ণ-দা আমার বীর বটে! এতক্ষণ ছিলে কোথায় ? হরিদাস। ও-বঙ্কিম-বাই! মুই ত বাইগাচাই । বঙ্কিম। এই মরেছে! ভেড়ের ছেড়ে! এতক্ষণে মরেছে রে। ও মলেও বেরােবে না, সে কৰ্ম ঘরেই ক'রে গােষ্ঠীশুদ্ধকে তাড়াৰে এখনি। ওরে নির্ধ্বংশের বেটা! তুই শীগগির বেটে! হরিদাস। যামু বাই! একবার তামাকু কামু। কাশী। ভাল কথা মনে করেছি ভাই। একবার ত তামাক না খেলে চলছে না!
৭৪ গঙ্গেশ। হরি। রঃ-বাই। মুই হাজাইবারে লাগচি। (ক’লকে লইয়া তামাক সাজিয়া কাশীনাথের মুখের দিকে চাহিয়া ) আ-বাই! আগুন পামু কোন্ টাই ? কাশীনাথ। ঐ দেখ, ভাই! মালসায় আগুন আছে। হরিদাস। আগুন তুলিতে গিয়া হাত ভরিয়া ছাঁই তুলিয়া) তােমা গ কা মুহে দিমু? বঙ্কিম। দাও!-কাশীনাথদার মুখে দাও! কাশী। তা দিস! আমি যে এখনি দিয়াশলাই ধরালাম। এর মধ্যেই তুই বলছিস-আগুন নাই? সে কি কথা রে! আন্ ত দেখি! হরিদাস। এই—দ্যাহ!- এক মুষ্টি ছাই লইয়া কাশীনাথের গাত্রে নিক্ষেপ, হঠাৎ দমকা বাতাস আসিয়া প্রদীপ নির্বাণ) বঙ্কিম। এই সেরেছে রে-সেরেছে! কাশী। ও বঙ্কিমদা। নারায়ণ। ( ভীতস্বরে) ও কাশীনাথদা ! হরিদাস। ও নারাণদাস বাই ! অরে বাই-বৃত!বুত! আরে-বুবু ( বিশাল চীৎকারে হাতে,তালী দিতে দিতে) জয় জয় বুতা!জয় জয় বৃতনা!-জয় জয় বুনাহ্! ভুতনাথ।(ঘুম ভাঙ্গিয়া চমকিয়া উঠিয়া ) ওরে হরিদেসে-রে। কি হ’ল রে! কি হল? বঙ্কিম। আঃ-পােড়াকপালে! তুমি এতক্ষণও ঘুমুচ্ছিলে? ভূতনাথ। কেন? কি হয়েছে রে বঙ্কিম ? বঙ্কিম। হয়েছে যে কি কত, তার আর বলব কত? ভূতনাথ। আরে! এ কি আঁধার রে ? নারায়ণ। :! ভূতনাথ। আয়ে!-ওটা-দু: ক’রূল কি রে ? বঙ্কিম। তােমার আর ভয় কি ?—তুমি ত স্বয়ংই ভূতনাথ। ভূতনাথ। না রে বঙ্কিম। সত্য সত্যই গা যেন ছপ ছপ ক’ছে। তাের সকলে মিলে ক’ছিস কি রে? . ১) ষষ্ঠ দৃশ্য। ৭৫ কাশীনাথ। আরে ভাই! ক’ছি, আর মাথা! তামাক খাব—তা মালসার আগুণ নিবে গিয়েছে। দিয়াশলাই দিয়ে প্রদীপ জ্বেলেছিলাম, বেড়ার দড়মা ভেঙ্গে তাই দিয়ে তামাক খাব ভালা, তাও দমকা-বাতাসে প্রদীপটা ধপ করে নিবে গেল; এখন তামাক সেজে বসে আছি, আগুন ত পাই না রে ভাই। ভূতনাথ। (রুক্ষ স্বরে) কেন ?-গ’ঙ্গেশে কোথায় ? বঙ্কিম। কেন ?-গঙ্গেশ তোমার কি করবে ? ভূতনাথ। ওটা ত আছেই একটা অগ্নিদগ্ধ, ঐটাকেই আগুন আনতে পাঠিয়ে দেও না! ৰঙ্কিম। পিয়ে বসে পেঁড়াের খবর মাছ, টেটা ত পাচ্ছ না? একবার বাইরে বেরিয়ে শ্রীমুর্তি দেখে এস না! ভূতনাথ। শ্রীমুর্তি কাৰ রে ? বঙ্কিম। শ্রীমান্ অন্ধকারের। ভূতনাথ। কেন রে ! কি হয়েছে ? ৰঙ্কিম। ব’ কি ভূতনাথ-দা! আজকার অন্ধকার যে কি অন্ধকার, একবার জিজ্ঞাসা করে দেখ—এদের সবাইকে। আর জিজ্ঞাসা করেই বা কাষ কি?-একবার বেরিয়েই দেখ না। ভূতনাথ। তা হ’,—যত ইচ্ছা তত অন্ধকার হ’ক, গঙ্গেশ আমাদের দৈত্য- কুলের প্রহলাদ, ওর মৃত্যু কিছুতেই নাই। দেও-ককে দেও ও হাত, পাড়ার ভিতর থেকে আগুন নিয়ে আনুক। হরিদাস। কি হন কাশীনাথ ঝই! দিমু? কাশীনাথ। দেও না! ভয় কারে বলে, তা ও অভিধানে নাই । ভূতনাথ। ভাল তুমি নিয়ে এয়েছ! মলে হাসতে বই কাতে কেউ নাই- ওটার উপরে আবার একটা দুর্থ-দরদ ! হরিদাস। দৰু রে গঙ্গেশ! এই ছিলুম দর! এই দ—হুকার পর। গঙ্গেশ। বঙ্কিমদাদা! আমার সঙ্গে একটু দাড়াবে ? বড় যে ভাই। ভয় ক’ছে! কাশ। আপােড়-কপাল! তােমার জাবার ভয়? ।
গকেশ।
৫
নারায়ণ। ভয় নাই রে! না কেন ?
বঙ্কিম। (নারায়ণের প্রতি। এ দিক এস-তোমার পিণ্ডিটা চটকাই
নারায়ণ। আমার পিণ্ডি চটকিয়ে কি করবি ? না ফলে পিণ্ডি খাবে কে রে?
বঙ্কিম। আহা! আর একটু থাকলেই সেটা হ’ত রে!- .
ভূতনাথ। আরে গঙ্গেশে! নিৰ্বংশের বেটা ! -না ?
গঙ্গেশ। ভূতনাথদা! গটা যেন আমার বড় ভয় ভয় ক’ছে!
ভূতনাথ। ( উঠিয়া বসিয়া সক্রোধে) দূর-ই পাজি! ঘর থেকে বের
শীগির, আগুন না আনিস ত এখনি জুতিয়ে হাড় গুঁড়াে করে
দেব! তারপর কাল প্রাতঃকালে ভটচাৰ্য মশায় টোলে এলে
তােৰু কপালে আর যা আছে তা কৰে।
গঙ্গেশ। (দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া) দেও!-কাশীনাথদা! ক’লকে দেও!
( কলকে লইয়া প্রস্থান)
ভূতনাথ। (বঙ্কিমের প্রতি) এটাকে টোল থেকে তাড়াবার কি করা যায়
বল দেখি হে! ভটচাৰ্য মশায় ত ওটাকে টোলের চালে কে
রেখে গিয়েছেন। তাঁর জ্ঞাতসারে ও কিছু হবে না।
বঙ্কিম। হ'লে—তার পরে ?
ভূতনাথ। তার পরে আবার কি হে !
বঙ্কিম। বলি—তার পরে—এই অমাবস্যার রাত্রি, আড়াই প্রহর রাত্রির সময়
পাড়া থেকে আগুন খুজে এনে তােমার এই মুখে দেবে কে?
ভূতনাথ। হা! ও যত দিন টোলে না এয়েছিল, তত দিন ত আর কেউ
তামাক পায় নাই ?
বঙ্কিম। খেত বটে, কিন্তু এমন করে আর কেউ কোন দিন খায় নাই।
ভূতনাথ। আগে আসুকই ত, তার পরে আদর সােহাগ করো।
বঙ্কিম। ভেবে দেখ ভাই-আও ত ভাই! সবাই মায়ের ছেলে?
আহা! ওই যেন মা নাই, তােমার কি ওকে দেখে একটুও
দুখ, দরদ হয় না ?
ভূতনাথ। ওটা মরে না বলে আমার খুব দুঃখ হয় !
}
যষ্ঠ দৃশ্য।
বঙ্কিম। ছি ছি ভাই! এ কথাটা বললে কোন প্রাণে? তােমার মত
নরপিশাচ এ সংসারে আর দুটি নাই।
হরিদাস। আমার ত বাই! পিচ্চাশের বয় ঐবার লাগছে।
বঙ্কিম। তা, এ-যে পিচ্চাশ, বয় ঐবারই কথা !
ভূতনাথ। দেখ বঙ্কিম! মুখ, সামলিয়ে কথা বলো।
বঙ্কিম। সে ভয় আমার নাই-জুতাের মুখ লালবন্দী করাই আছে।
ভূতনাথ। কি রে বঙ্কিমে! তাের এত বড় কথা ?
বঙ্কিম। হয়ে ভূতনেথে ! তােও এত বড় মাথা? জুতিয়ে তােকে
পিশে খুঁয়ে টোল থেকে বেরিয়ে খাব।
ভূতনাথ। আচ্ছা, যা’! যাওয়াটা তােকে কাল সকাল দেখায়।
বঙ্কিম। সকাল দেখাবি কি ? আয়, না! তোকে এই রাত্রেই দেখাই।
কাশীনাথ। এই বায়-কীচকবধের পালা।
বঙ্কিম। দ্রৌপদী সাবধান!!
(নেপথ্যে)—প’ভাে-দাদারা!-পাড়ায় ত ঘরে ঘরে খুজে এলাম, কাও
ঘরে আগুন নাই।
কাশীনাথ। পাড়ায় নাই বলে কি, এ গয়েও নাই।
ভূতনাথ। হাত,—ঠিক কথা! গাঁয়ের মধ্যে যা না ।
(নেপথ্যে)—তাও গিয়েছিলাম ভূতনাথ দাদা! কেউ আমার ডাকে সাড়াও
দিলে না, কাৰু বাড়ীতে আগুনও দেখলাম না।
ভুতনাথ। হারে মিথ্যাবাদি। এই না বলিপাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে খুঁজে
এলাম, এর মধ্যে আবার গায়ের ভিতর গেলি কখন ?
(নেপথ্যে)-গিয়েছিলাম ভূতনাথদাদা! তােমর পাড়া খুঁজতে বলে
ছিলে, আমি তােমাদের জিজ্ঞাসা না করে গাঁয়ে খুঁজতে গিয়ে
ছিলাম বলে যদি কিছু বল, এই ভয়ে আমি সে কথা বলি নাই।
ভূতনাথ। এ ! ভেড়ের ছেড়ে কি শিষ্ট শান্ত ভাল মানুষ রে!-আর
কামিতে কাষ নাই, বাঁচতে চাস ত যেখান থেকে পারিস
শীগগির আগুন নিয়ে আয়।
৭৮
(নেপথ্যে )—বাঁচতে চাই, আর ম’তে চাই দাদা! সে কথা দূরে, এখন
আগুন পাই কোথা? তাই বলে দেও।
ভূতনাথ। দেখ, শীগগির, মাঠের ভিতর বেরিয়ে খুঁজে দেখ!-কোন দিকে
কোথাও আগুন আছে কি না?
(নেপথ্যে —আচ্ছা-দেখি।
ভুতনাথ। হতভাগা ছোঁড়াটাকে দেখলেই আমার ইচ্ছা হয়, দু ঘা বসিয়ে
দিই। “যেং ন মাতান পিতা ন বন্ধু ভেড়ের ভেড়ে! টোলে
থাকৃবি ত পড়াদের চাকুরী কবি, তা না আবার কথায় কথায়
উত্তর-কথায় কথায় এয়ারকি! ভটচাটি যেমন নিজেও নিৰ্বং
শের বেটা, ভাগনেটিও যুটেছে তেমনি নিৰ্বংশের বেটা। “রাণাং
মাতুলক্রমঃ” না হবে কেন?
নারায়ণ। তােমারও যে, ক্রমে ক্রমে বাতুলমঃ আচ্ছা, ভূতনাথ-দা! কথায়
কথায় উত্তর করে বলছ, আজ ত তােমার কোন কথায় উত্তরও
করে নাই,-নাওলে নাই ?
ভূতনাথ। হু! “উত্তর করে নাই, না বলে নাই”—বলে তাের ওকে ভাল
মানুষ ঠিক করেছ, ও এমন ক্ষণজন্মা ছেলেই নয়! আজ যে চুপ,
করে আছে,আর কথা শুনছে, এই দেখ-এখনি একটা কিছু
ক’রুল বলে!-ক’লকের আগুন আনুক, আর না আনুক, ঘরে
ত আগুন দিল বলে ।
(নেপথ্যে )-প’ড়ো-দাদারা! গ্রামের আশে পাশে মাঠের ভিতরে ত
কোথাও আগুন নাই ? আগুণ কেবল দেখছি—সেই—মাঠ শেষ
করে গঙ্গার তীরে-ভৈরব-ঘাটের শ্মশানে একটা চিতা জ্বলছে।
ভূতনাথ। যাহতভাগা শীগগির যা সেইখান থেকেই আগুন নিয়ে
আয়!
বঙ্কিম। তবুও এ তামাক খাওয়াই চাই।
ভূতনাথ। আমি শুধু তামাক খাচ্ছি? দেখিস—এই তােদের সব গুলােকে
খাচ্ছি।
বঙ্কিম। গঙ্গেশ! তুই যাসনে রে!
'।
যষ্ঠ দৃশ্য। (নেপথ্যে )-না-বঙ্কিমদাদা! ভূতনাথদাদা রাগ করবেন—মামা ব’বেন। যা থাকে কপালে আমি চল্লেম দাদা! (ছুটিয়া যাইতে যাইতে)- জয় জয় মা তারা। তারা ! গান। (১৫) তবে, যাই যাই শ্মশানে জয় জয় মা বলে। মা বলে সাধে কি আর মা মা বলি, দেখি মা আজ কি বলে। শ্মশান আমার মায়েরই ঘর, তথায় আমার কেহ নাই পর, যারা আছে তারা আমার মার পদতলে ; কার সাধ্য আমারে কে কি বলে ? আমি, ঘরের ছেলে ঘরে যাচ্ছি, (মা) হাত বাড়ায়ে নেবেন কোলে। মায়ের ছেলে হয় রে যারা, কারেও কি, ভয় করে তারা ? জানে তারা, সবই তাৰ-মায়ের পায়, ধরা, তবুও মা উর্ধে বরাভয়-ধরা, ধরেন খড়গ, ছেলের মাঝেও কেউ কারে কিছু না বলে। শ্মশানের ভূত দেখে যারা, ভয়ে হয় জীয়ন্তে মরা, জানেনা যে তারা, তাদের ঘরের ভূত কারা ? শ্মশানের ভূত ত কেবল ভূত তারা ঘরের ভূত যে, কি অদ্ভুত্ ভূত, দেখে শুনেও কেউ কি, বলে ? ভূতের ভয়ে ভয় কি রে তার ? ভূতভাবন-ভাবিনী মা যার, সে যে, ঘরে পরে কোন ভূতের ধারেনা রে ধার- তার, ভূই খুলে দেয় অভয়ের দ্বার ; হয়, ভূতের ভয় তার অভয়ের দূত, ভূনাথের সােহাগের ফলে। ১১
ভূতনাথ। ( কাশীনাথের প্রতি) শুলে! একবার ভেড়ের ভেড়ের গানের
ছটা, গান গাবে, তাও ভুতনাথের গায়ে চিমটি কাটবে। আসুক
আগে ফিরে ত ওর গান গাওয়াটা এইবার আমি দেখাচ্ছি।
কাশীনাথ। আরে ভাই ভূতনাথ ! এরপর আবার কি দেখবি? বল দেখি
ভাই-কলি কি ? আজ মঙ্গলবার অমাবস্যার ঘাের—মহানিশা,
ভৈরব-খাটের শ্মশান ত এক ক্রোশ দূরে। এই রাত্রে এই মাঠ
পার হয়ে আগুন আনা ত দূরে থাক, ছোঁড়াটা যাবেই বা
কি করে?--আসবেই বা কি করে?
ভূতনাথ। বটে? আগুন আনা দূরে থা? আগুন যদি না আনে ত ওকে
আগুন দিয়েই পােড়াব।
বঙ্কিম । এত বিদ্যা পেটে না হলে কি আর আগুন আতে পাঠাও?
আগুন না আনে ত আগুন দিয়েই পােড়া!-নাই চলি ত ভাতে
ভাতেই খাব! ভট্চায়, মশায়ের বাড়ীতে পূজা অর্চা থাকলে
এমন সব ছাত্র অনেক দিন উদ্ধার হয়ে যেত।
( ঘরের চালের উপরে হুড় হৃড় দূড় দূড় শব্দ, ঘন ঘন গৃহকম্পন,
নেপথ্যে—অনেকের মিলিত কণ্ঠে,-টেট্যাংটী টেট্যাং
টী-শব্দ।)
( সকলে সম স্বরে)—মলেম রে! মলেম রে! বাপ, রে! মা রে ! রাম!
রাম!-হরি! হরি।—দুর্গা দুর্গা !
(আবার ঝাকি আবার শব্দ) ?
সকলে ও গাে ! ভটচাষ, মশায় গাে! মলেম বাবা ! মলেম মলেম !!
(কপাট খুলিয়া দূড় দূড় শব্দে একটার ঘাড়ে একটা
পড়িতে পড়িতে পলায়ন)।
---
সপ্তম দৃশ্য।
-
গঙ্গাতীর ভৈরব-ঘাট-মহাশ্মশান।
গঙ্গাপ্রবাহের নিকটে প্রজ্বলিত চিতা।
(ক’কে হস্তে গঙ্গেশের প্রবেশ
মঙ্গেশ। এই ত ভৈরবধাটের শ্মশানে এলাম! এই চিতা থেকে ক’লকের,
করে, আগুণ নিয়ে যাব, তবে আমার পড়ােদাদরা জমাক
খাবেন। বাপরে বাপ! কি তামাক খাওয়া লােগ ? না-
রােগই বা কিসে কলি? ও ত তামাক খাওয়া নয়-খাওয়া কেবল
আমাকে। তামাক ত এরা চিরকালই খেয়ে থাকে, কিন্তু এমন
করে আগুণ নিতে শশানে কবে কাকে পাঠিয়ে থাকে ?
আমার বাপ নাই-মা নাই, ভাই নাই-বন্ধু নাই, মামা মামী
বই আর এ সংসারে কেউ নাই ; সেই সম্বন্ধে তোদের সব্বাইকে
দাদা বলে ডাকি—যখন যা বলি তখন তাই করি। যদি কখন
কিছু করতে না পারি, অনি যত ইচ্ছা ধরে মারিস, অকাতরে
সহ করি !-তাতেও তােদের মন ওঠে না। কত কত মিথ্যা
কথা বলে বলে দণ্ডে দশবার মামা মামীকে দিয়ে বাড়ী থেকে
তাড়িয়ে দিস! বামুনের ছেলে শাস্ত্র পড়িসধ কৰ্ম্ম মানি,
এ অধর্মের ফল কি তাদের কোন দিনও ফলবে না? না-
তা বুঝি ফলবে না। আজ যদি আমার মা বেঁচে থাকত, তবে কি
তােরাই এমন ক’তে পারতিস?-না-মামা মামীরই আমি
এমন চক্ষুশূল হতে? তাদের পক্ষে সবাই আছে, আমার
পক্ষে ত কেউ নাই । এক মা ছিল, তাও আমি হারিয়েছি,
তবে আর আমার পক্ষ থেকে তােদর প্রতিবিধান করতে
কে আছে ? মা ত আর ফিরে এলই না! আর এক মার
কথা বলে গেল, তার সঙ্গেও ত দেখা নাই। হায় রে আমার
৮২ পােড়াকপাল। দেখা-মা ই আমার অদেখা হয়ে গেল, তার পর আবার অদেখা-মার দেখা পাব, এ আশাও আমার মনে আসে । যাবার সময় মা আমায় বলে গেল—যখন তুই বড় ভয় পেয়ে আমায় ডাবি, তখনই আমি এসে তােক কোলে করব। তা ছাই! এমনি হতভাগা আমি, এই ত মা গিয়েছে—সেও আজ পাঁচ ছয় বছর হতে চলল, এ পর্যন্ত ত জলে জঙ্গলে, আঁধারে পাথারে, মাঠে ঘাটে, শ্মশানে মশানে, দিন দুপুরে রাত দুপুরে একা একা কত ঘুম—কত বেড়ালাম, কত গাছে উঠলাম, জলে ঝাঁপ দিলাম, একা একা কত বনে জঙ্গলে বসে কত রাত্রিই কাটিয়ে দিলাম, কত বাঘ দেখলাম, ভালুক দেখুলাম, চোর দেখলাম, ডাকাত দেখলাম, কত ছেলের সঙ্গে ঠেঙ্গাঠেঙ্গি মাথা ফাটাফাটি কলাম, কত ভাঙ্গলাম কত চুলাম, কত লােকের কত ঘর বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার কলাম, কত লােক শত্রু হল, কত লােক মারুতে এল, কত মােক মেরে ফেলবে বলে কত দিন পিছনে পিছনে ঘুরল, তবুও কি ছাই! এক দিনের জন্য-এক নিমিষের জন্য—একবারের জন্যও পােড়া মনে আমার একটুও ভয়ের সঞ্চার হল? লােকে আমায় যত ভয় দেখায়, ততই আমার সাহস বাড়ে, শেষে ত দেখি—এমন একজন কাকেও পেলাম না, যে আমাকে দেখে ভয় না করে। কিন্তু কখন কাকেও দেখে আমার ভয় হ’ল না। তখন মনে ক’তাম—ভয় যে আমার হয় না, এ আমার খুৰ বাহাদুরী, আর খুব আমার কপালের জোর! এখন দেছি—নিতান্তই আমার কপাল মন্দ, নিতান্তই আমি হতভাগা, তাই আমার ভাগ্যে সে ভয় কখন ঘটল না! ভয় যে আমার অভয়, তা ত, আমি বুঝলাম না ? সেই সন্ন্যাসীদাদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- দাদা! কবে আমি সে ভয় পাব? তিনি বলেছিলেন-“যেদিন তুমি একেবারে অভয় হবে!” অভয়ই বা আর হব কি, তাও ত কিছু বুঝি না!—ভয় যার থাকে, সেই ত অভয় হয়? এ জন্মে সপ্তম দৃশ্য। বার কখন ভয় হল না, তার অভয় হওয়া অসম্ভব কথা। তবে আর ত কোন ভয় দেখি না, এখন ভয়ের মধ্যে এই এক ভয় যে - ভয়:-আমার কেন হল না? মাগাে! এ উপরে আরও কত কি অদৃষ্টে লিখেছ ?-ভয় হলে যে তো মার দেখা পেয়ে সেসব আমার খণ্ডিয়ে যায়, তাই না? আমাকে ভয় দেখাতে তুমিও বুঝি ভয় পাও ? নইলে ত মা! শ্মশানে এসে কত লােকে কত ভয় পেয়ে যায়, কি জানি কেমন কপাল আমার, সেই শ্মশানে এলেই আমি আর যেন কোন ভয়ের ধার ধারি না ! হায়! হায়! সকলই কি আমার কপালে বিপরীত? এই ত আজ মঙ্গলবার অমাবস্যার মহানিশা, এই ঘাের প্রান্তকে মহাশ্মশানে জলন্ত চিতার সম্মুখে দাড়িয়ে একা আমি, ঐ ত মরা মানুষটা চিতার মধ্যে চটুপট করে পুড়ছে, মুখের মাংসগুলাে গলে পড়ে বত্রিশপাটী ঈপত একেবারে বেরিয়ে পড়েছে, দুই চক্ষু পুড়ে গিয়ে চক্ষুর কোট কত বড় হয়েছে, নাকটা পুড়ে গিয়ে মুখখানা একেবারে খাদা হয়ে পড়েছে; শুতে পাই—কত লােকে এই দেখে ভয়ে আতঙ্কে ছুটে পালায়, আমার কিন্তু ওর দাঁত দেখে মুখ দেখে কেবলই হাসি পাচ্ছে।-আমারই যেন এ সংসারে বাপ, নাই, মা নাই, আমার বলতে কেউ নাই! ও বেটা যে চিতায় পুড়ছে, ও ত গণাগােষ্ঠী সবই ছিল, তবু ও পুড়ে যাবার সময় পর্যন্ত সে বেটাদের ভর সয় নাই, চিতায় আগুণ জেলে দিয়েই দে-চম্পট। যত বেটা বেটী গাঁয়ে থাকে, সব বেটা বেটীই বলে-ভৈরবঘাটের দিকে দিনে দুপুরে তাকাতে যেন ভয় করে, বেটাদের এত সস্তা ভয় আসেই ৰা কোথা থেকে, ভাও কিছু বুঝি না ?-ছঃ! হয় ত তারাও আবার ভাবছে—গঙ্গেশে-বেটার ভয় আসে না ই বা কোথা থেকে, তাও আমরা বুঝি না! এই ত শ্মশানের স্থানটা প্রায় এক ক্রোশ নিয়ে হবে, মরার বাঁশ, কলসী, চিতা, পােড়াকাঠ, আঙ্গরা, মরার হাড়, মরা মানুষ, মরা মানুষের মাথার খুলি, মরার হাত, মরার দাত, মরা মানুষের মাথার চুল, মরার বিছানা বালিশ,
৮৪
?
খাট মাদুর, আর মধ্যে মধ্যে এই যে, সারাঁধা চিতার উপরে
নিশান, এ ও ত হাজার বার শ র কম নয়? বাপরে বাপ!
বাঘের মত কুকুরগুলো লুফে লুফে এক একবার দৌড়ে গিয়ে
শেয়ালগুলাের পালের মধ্যে দাপুটে পড়ছে, আর শেয়ালগুলো
অমনি পালিয়ে গিয়ে আর একটা মরা ধ’ছে, কুকুরটা অনি
এ মরাটার খানিকটা খেয়ে অনি সেটায় গিয়ে কামড় দিচ্ছে।
তা ত দিচ্ছে, দিয়েই থাকে ; আচ্ছা—রাত্রে ত শশনে কাক
শকুন ওড়ে না ? তবে এই আমার মাথার উপরে—এ দিকে ওদিকে
চারপাশে যেন শকুনের পাখার বাতাসের মত এক একটা সাপটু
এসে গায়ে লাগছে, শ্মশানের দুই তিন হাত মাছাড়া যত দূরে
ততই ঘন ঘন ধুয়ে ধুয়ে চেহারা এসবগুলাে কি? ( উদ্ধদৃষ্টিতে)
আরে মলে। উপর থেকে, দলে দলে ঝেকে ঝেকে এসে
এক একটা চিতার উপরে দাঁড়াচ্ছে, আর হাতে তালী দিয়ে
নাচছে! কেমন যেন ছায়া ছায়া-ধূয়ে ধুয়ে, দেখাও যায় না,
আবার দেখাও যায়; (নেপথ্যে স্ট্যাটাংটী ট্যাটাংটী শব্দ )
আরে ম'লাে ! এ যে আবার শব্দ করছে। এই গুলােকেই
বুঝি ভূত প্রেত পিশাচ বলে ? আমর! এ গুলো ত সৰু
ঝাঁধা গাং-শালিক আর চখাচখী পাখীর মত দেখবার জিনিস্।
উঠছে পড়ছে—নাচছে চেঁচাচ্ছে, লুফোলুফি করে মরা ছেলে
গুলাে তুলছে, আর খাচ্ছে। এ ত এক রকমের অদ্ভুত-আকাশে-
জানােয়ার। এ গুলাে ধ’তে পারুলে খাঁচায় পুরে কত রগড়
করা যায়। না–বাবা! এ ছাই গুলাে বাড়ীতে পুষে প্রত্যহ প্রত্যহ
মরা ছেলে সব খােরাক জোগাবে কে ?
নেপথ্যে—( দূরে লােদন-ধ্বনি) “মা গাে! মা! এই তােমাকে রেখে গেলাম,
আর দেখতে পাব না মা! আমি আজ থেকে মা-হারা হলেম মা!
ছেলে বলে সােহাগ করে আর কেউ এসে আমার কোলে কবে
মা। মা রে মা! রেখে গেলি মা!-এ সংসারে মা-হারা হয়ে
এখন আমি কান্ কাছে গিয়ে দাড়াৰ মা!”
৮৫ সপ্তম দৃশ্য। গঙ্গেশ। এই নাও !-ঐ. এটা চিতা ধুয়ে কায়া ওরা সব বাড়ী চল, ওর মধ্যে থেকে কে একটা কাছে! ওটার কপালও বুঝি আমারই মত !! (উচ্চৈঃস্বরে) যা রে যা! কাল সকালে তাের সঙ্গে দেখা ক’! (চারিদিকে ঘুরিতে ঘুরিতে) আমার মাকেও ত এই শ্মশানে এমনি করেই রেখে গিয়েছি! ওর বা যা হবে বলে গেল, আমার ত সে সব সারা হয়ে গিয়েছে। মায়ের দেখা আমিও যেমন পাচ্ছি, তুই ও তেমনি পাবি, এখন খুঁজে দেখ গিয়ে মামা বাড়ী আছে কি না? শুধু মামা নয়, পণ্ডিত মামা আছে কি না? আর শুধু পণ্ডিত মামা নয়, টোল আছে কি না? আর শুধু টোলও নয়, আমার ভূতনাথ দাদার মত—কাশীনাথ দাদার মত পালের গােদা ছাত্র সে টোলে আছে কি না? আর, ভূতনাথ- দাদারই বা অমন্ করে দোষ দেই কেন ? ভূতনাথদাদা ত এ সংসারে অনেক টোলে অনেক আছে, কিন্তু গঙ্গেশের মত হতভাগ্য ছাত্র কবে কোন্ টোলে যুটেছে ? হায় রে ! এক মা-হারা হয়েই আমি জগৎ-হারা হয়েছি। মা রে! এই শ্মশানে তুই আমাকে একা ফেলে চলে গিয়েছি, সেই শ্মশানেই আজ আমি মা! তেমনি আবার একা হয়েই এয়েছি। মা । তখনও তোর চিতা ছিল, তাই আমার “আহা!” বলিবার ও অনেকে ছিল, আজ সেই তাের চিতার সঙ্গে সঙ্গে মা! আমার সে সবই ধুয়ে মুছে গিয়েছে! মা! আজ তােরও যেমন সন্ধান নাই, তাের চিতারও তেমনি সন্ধান নাই। হাঁ মা! চিতার সন্ধান পেলেই কি আর তাের সন্ধান পেতাম? হায়! হায়! তবুও কেন সে চিতা ব'লে এখন ও আমার প্রাণ কাঁদে? আগে যদি জান্তাম মা ! তবে কি আর আমি তেমনি করে সকলের কথায় তাের চিতার কাঠে আগুন ধরিয়ে দিতাম? আহা মা! কত ভাল বাতি মা! সেই যে চিতার উপরে গুলি, অনি কি ঘুম ঘুমিয়ে পলি, আর একবারও ফিরে চাইলি না?-এক দিনও আর কাছে এলি না!--কোলে করে বলি না! এক দিনও আর আমায় আদর করে, সােহাগ ৬ করে তেমন করে খাওয়ালি না মা? 'মা! আমি তাের সেই গঙ্গেশ মা!-তুই আমার সেই মা; সেই শ্মশান, সেই চিতা, সেই আমি, সেই দুই, সে সবই মা ! আর সবই আছে, তুইই কেবল নাই মা !! আচ্ছা মা ! তুইই যেন দেখা দিলি না, তাের মুখেই ত অনেক দিন শুনেছিলাম-তুই যখন আমার সে-মার কথা বল- তিস মা! তখন ত কতবার বলেছিলি,-সে-মা আমার-শ্মশানে থাকে, ছাই মাখে, চিতার আগুনের মধ্যে নাচে। এই ত মা ! সেই শ্মশানের সেই জ্বলন্ত চিত। কৈ মা?-সে মা ত আমার এ চিতার মধ্যে নাচে না? ওঃ-না; তুই যে সে-মায়ের কাছে গিয়েছিস, এখন বুঝি বারণ করে দিয়েছি, তাই তাের দেখা দেখি সে-মাও আমার আসে না। কেন মা। বারণ করে দিয়েছি কেন? সে মার সঙ্গে সঙ্গে পাছে আমি তাের কাছে যাই বলে ? বলেছিলি ত—সে মার সঙ্গে সঙ্গে তুইও থাকৃবি দুই জনই একসঙ্গে আসবি? হ্যা মা!-আমি তখন কোন মাকে আগে মা ব’ব মা? তাকে যতক্ষণ দেখতে না পাব, ততক্ষণ যদি সে মাকে মা বলে ডাকি, হ মা! তা হলে কি তুই রাগ রাগ কৰি ? সে মাকে আমি ঠিক মা বলে ডাকব, তােকে আর মা বলব না। তুই এমন করে কঁাদাস আমাকে, আমিও তােক কাঁদাব! হায়! হায়! কবে " বা মা ! তাের দেখা পাব-কবে বা আমার এ অভিমানের সাধ, ওমা! একবার আয়, মা !দেখে যা মা! তাে গঙ্গেশের কি দশা !! এই দুরন্ত শীতের রাত্রে এই এক ক্রোশ থেকে আগুন নিয়ে এখনি সেই টোলে যাব, তবে মা। আমার অব্যাহতি! হায়! হায়! এখনও আবার কোন্ মুখে। বলি-অব্যাহতি। আজ পাঁচ বৎসর-ছয় বৎসরের মধ্যে এক দিন এক. বেলাও অব্যাহতি পেলাম না ! মা রে ! আর আমি টোলে ফিরে যেতে পারি না। হয় তুইই এসে দেখা দে, আর হয় মা! এই শ্মশানেই গঙ্গেশের এ পাপের বােঝ—দেহের মিটাব ?
• সপ্তম দৃশ্য। ৮৭ বােঝা এই খানেই আজ ধসে পড়ক! আর আমি পারি না মা! মা! তুমি কোথায়? হ মৃত্যু! তুমি কোথায়? ( অবসন্ন হইয়া ভূতলে পতন ও অভিভূত অবস্থায় কিয়ৎক্ষণ অবস্থানের পর) যাই।—যা ক'তে এয়েছি, তাই করি। কেউ আমায় না থাকলেও অদৃষ্ট ত সঙ্গেই আছে, আমার আবার ভয়ই বা কি ?—দুঃখই বা কি? বুঝেছি মা-যেমন মা, তেমনি মামা; তেমনি আমার পড়াে দাদারা। দেখতােমাদের মনে যা যত আছে! যত পার গঙ্গেশ থাকতে থাকতে এই বেলা সৰ সেরে নেও! -আমিও যত পারি, তা এই বারেই শেষ করি।! ( ধীরে ধীরে কলকে লইয়া গাত্রোত্থান, চিতার দিকে চাহিয়া) আরে মলে। এখনও যে দপ দপ করে পুড়ছে ! একটু কয়লাও নাই, আগারও নাই, আগুন গুলাে সব চিতার মধ্যে, কাঠগুলো আবার তেমনি মােটা। ( অপেক্ষিত নিকটে গিয়া) বাপরে বাপ! কাছেও যে এগােন যায় না। কাছে যেন একেবারে বাড়ীপপাড়া বেড়া আগুনের মত !! (একটু সরিয়া আসিয়া) যাই হক, তা বলে আর উপায় নাই, আগুন আমাকে নিতেই হবে। (শ্মশানের বাঁশ উঠাইয়া লইয়া চিতার মধ্য হইতে-আগুন টানিয়া ফু দিতে দিতে কলকের উপর উঠাইয়া আবার ফু দিতে দিতে প্রস্থান)। ভূত। (খট্টাঙ্গ স্কন্ধে করিয়া নাচিতে নাচিতে ভৈরবদূত ভূতের প্রবেশ) বেটারা পালিয়ে বাঁচবেন আমার হাতে! বেটাদের বাপ মায়ে নাম রেখেছে—ভূতনাথ কাশীনাথ। বেটারা সব বামুনের ছেলে হয়ে এসেছেন শাস্ত্র পড়তে—তা আবার উঠতে বসতে ন্যায়শাস্ত্র। বেটাদের যেমন ন্যায়, তেমনি শাস্ত্র, তা বেটারা! তােদেরও যেমন ন্যায়শাস্তু, আমারও তেমনি ন্যায়শাস্ত্র !! তােদেরও ন্যায়- গঙ্গেশকে মেরে ফেলা, আমারও ন্যায়-ততাদের ঘাড় মটকান! বাবা গঙ্গেশ! বেঁচে থা; এমনি করে দুই চাটা ভুতনাথ কাশীনাথ যদি প্রত্যহ ষােটাতে পারি, তা হলে ত আমরাও বাবা ভৈৰৰ নাথের পূজা অর্চার অনেকটা সুবিধা পাই। যাক, যাবার আজ্ঞা ত প্রতি পালন হ’লযাই এখন এ সুসংবাদটা বাবাকে দিয়ে আসি। (সবেগে প্রস্থান)।. ( দূর হইতে গম্ভীর স্বরে “জয় জগদলে ! জয় জগদম্বে।” ধ্বনি করিতে করিতে ত্রিশূল হস্তে ধীর-পদক্ষেপে রক্তাম্বর- বদ্ধকটি ব্যাচম্মোত্তরীয়ধারী রুদ্রাক্ষ-কঙ্কালমালা- শােভিত জটাজুট-বিমণ্ডিত বিভূতিভূষিত ভৈরবের প্রবেশ)। ভৈরব। (উন্ধে নিয়ে চতুর্দিকে দৃষ্টিক্ষেপ পূৰ্বক) আ মরি মরি- কি মধুর ভৈরব-নিস্তব্ধতা! কি অনন্ত শান্তি প্রস্রবণ। আনন্দময়ী মায়ের আমার ব্রহ্মানন্দ-লহরী যেন কৈবল্যধাম হতে নিষতি হয়ে ধরাধাম বিপ্লাবিত করছে। আ মরি মরি অমাবস্যার মহানিশার এই নবনীরদ-নিবিড়-নীল সৌন্দৰ্য-সাগরে পুর্ণিমার পূর্ণেন্দু-চন্দ্রিকা কি আজ জলবুদ্বুদ-বিন্দু বলিয়া যােধ হয় না? উদ্ধে ঐ অনন্ত আকাশ, নিম্নে এই বিশাল বিস্তীর্ণ ধরিত্রীমণ্ডল ইহারই আবার মধ্যস্তরে কখন শূন্য কখন পূর্ণ, কখন বায়ু কখন অগ্নি, কখন মেঘ কখন বিদ্যুৎ, কখন বৃষ্টি কখন রশ্মি, কত রঙ্গে কত তরঙ্গ কত বার আসছে, কত বার যাচ্ছে, কার সাধ্য তার ইয়ত্তা করে! সুধুই কি এই ?-এর মধ্যে আবার কত চন্দ্র সূৰ্য্য গ্ৰহপুঞ্জ নক্ষত্র লােক স্তরে স্তরে সুসজ্জিত, জ্যোতিষ্ক মণ্ডলের এই সমুজ্জ্বল জ্যোতিপুঞ্জ এক জ্বলছে আর নিভৃছে, যেন সুবর্ণকুসুমস্তবক-খচিত প্রসারিত নীলাম্বরের উদীপ্ত অঞ্চল বায়ুবেগে একবার উড়ছে একবার পড়ছে আর সেই সঙ্গে ১) সপ্তম দৃশ্য। এই চন্দ্র সূর্য গ্রহনক্ষত্র জ্যোতিষ্ক-দামও যেন অয়ন ঋতু তিথিভেদে একবার জ্বলে উঠছে, অঞ্চলের পরিবর্তনে আবার যেন নিতে যাচ্ছে-কখন দিন কখন রাত্রি, কখন সন্ধ্যা কখন মধ্যাহ্ন কথন শীত কখন গ্রীষ্ম, কখন শরৎ কখন বসন্ত, কখন পূর্ণিমা কখন অমাবস্যা কত নিত্য নবপরিবর্তনে এ অঞ্চল, একবার উঠছে একবার পড়ছে, অথচ লােকে দেখছে-আকাশ কেবল শূন্য শূন্য-শূন্য বই আর কিছুই নয়, এমন অসীম পূর্ণতা কি আর কোথাও সম্ভব ? এই অসীম অনন্ত আকাশের নামই আবার অম্বর, অসম্বরস্ব-রূপিণী দিগম্বরী মা আমার এই অম্বরে গা-ঢাকা দিয়েছেন, পূর্ণব্রহ্ম-সনতনী যাকে সাধ করে নিজের আবরণ করেছেন, সে যদি শূন্য হয় তবে আর পূর্ণ কার নাম? ( উন্ধে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া) তা ত হ’ল-বলি! আবরণ বলেই কি এমন করে গা-ঢাকা দিতে হয় যে, স্বর্গ মর্ত্য রসাতল আকাশ পাতাল কোথাও আর খুঁজে সন্ধান পাবার উপায় নাই। তুমি গা-ঢাকাই দাও আর যাই কর, ও অসম্বর প্রকাশ স্বরূপ তােমার অম্বরে কি ঢাকে মা ? আমার কিন্তু দেখে বােধ হয়-খেলার ঘােরে উন্মাদিনী বালিকা যেমন আপন ভাবে আপনি আত্মহারা হয়ে বসন ভূষণ দূরে ফেলে খেলতে খেতে এক দিগন্ত হতে অন্য দিগন্তে ছুটে পালায়, তেমনি—কি জানি কি খেলার ঘােরে আপন ভাবে আপনি বিভাের হয়ে মা ! তুই তাের এ দিগম্বর ছুঁড়ে ফেলে উন্মাদিনী উলঙ্গিনী সেজে যেন কোন্ নিভৃত দিগন্তে গিয়ে কোথায় আবার কি খেলা খেলছিস, তাই তাের অভাবে তাের বৃসন এ পূর্ণ আকাশও আজ, শূন্য হয়ে পড়ে আছে, অম্বরের অঞ্চলে এই স্তরে স্তরে তাই না কত চন্দ্র সূৰ্য্য গ্রহ নক্ষত্র প্রকৃতির সােহগের হিল্লোলে ও অভিমানে ধূলায় পড়ে গড়াগড়ি : দিচ্ছে। হ মা! তুই কি ভারতের গগনাঙ্গনে এসে এ বসন কখনও আর পবি না ? দিগম্বরীর দিগন্ত অঞ্চল ধ'রে ভারত-সন্তান আর কি মা বলে মা! তাের কোলে কেউ কখন কেঁপে ।
গঙ্গেশ। উঠবে না ? কি জানি না। কারে নিয়ে তুই কখন্ কি খেলা খেলবি। যার সঙ্গে খেলা তাের—তারই সঙ্গে মে তাের, আজ কিন্তু গঙ্গেশকে নিয়ে তােমার সেই খেলার দিন মা! আজ ত-বভাবিনীর খেলা যার—ভবের খেলা ঘুচল তার এই ত সেই মাকরী অমাবস্যার মহানিশা, গঙ্গেশের জন্মান্তরে সেই ত সে দিন—এই রাত্রির জন্যই তােমার প্রতিশ্রুতি।। ভালই হ’ল—এবার ত সে—কোলে উঠিয়ে দেবার ভার আছে আমার উপর—উদ্যোগ অধিবাস যা করতে হবে, তাও ত আজ, আমাকেই করূতে হবে। আ মরি মরি-যেমন ভাবুছিলাম- আকাশ পাতাল কোথাও খুঁজেমা। তােমার আর সন্ধান পাবার উপায় নাই—তেমনি আজ বিনা সন্ধানে যােগি-যােগীরে হৃদয়নিধি আপনি এসে এ ধরাধামে ধরা দিবেন!!! আনন্দময়ী মায়ের দর্শন আজ ত আমি পাবই পাব!! গশে রে বাপ! তুই ত আজ ধন্য ধন্য, তাের কল্যাণে আমিও ধন্ঠ ! দেখি এখন তাের সেই কৈবল্যের কবাট খুলতে আর কতক্ষণ অপেক্ষা আছে। ( স্ব-পরিবর্তনপূর্বক নেপথ্যের অভিমুখে উচ্চৈঃস্বরে) হারে—গজেশ এয়েছিল, তােরা কেউ দেখেছিস? (নেপথ্যে)- উচ্চৈঃস্বরে) ও বাবা? এঁয়েছিল-এয়েছিল। আমরা দেখেছি দেখেছি। ভৈরব। এয়েছিল ত কোথা গেল? (নেপথ্যে এল-বদল-গল্প কঁবুল-তামাক খেল-চলে গেল। ভৈরব। কার সঙ্গে গল্প কল রে? (নেপথ্যে)-আঁভা। নিজে নিজেই বে। দুর হ আভাগের বেটারা! (নেপথ্যে) বাবা। তোমারই ভৈরব। বেটাদের কেৰল ঐ বেলায় বিদ্যা। (নেপথ্যে)-কোন বেঁলায় নয় বাবা?
সপ্তম দৃশ্য। ভৈরব। খাম! থাম! এখন, বলি-তামাক খেয়ে গেল?-না! ক’লয়ে, আগুন নিয়ে গেল। (নেপথ্যে)! বাবা! তাই-তাই- ভৈরব। তাই-তাই-কিরে ? (নেপথ্যে)—ঐ শেষবারে যা বল্লে, তাই ভৈরব। কলকে আগুন নিয়ে গেল? নেপথ্যে )হা গো! হা! হা গো। হা-হা গো হা ?? ভৈরব। হরে! তােরা ত কেউ তাকে ভয় দেখা নাই ? (নেপথ্যে)-খালে ? ভৈরব। হরে! থাকলে ত, কি রে ? (নেপথ্যে)—আঁরে বাবা! তার ভয় থাকলে তঁ তারে ভয় দেখব? সে বেঁটার ছেলে আঁমাদের লেখাখী, পাখপাখী--একবার বলে—আকাশের নােয়ার, একবার বলে-খাঁচায় পূরব, ভঁয় দেখাব ছেড়ে সেঁ বেঁটার ভয়ে আঁমরাই দশহাত তফাৎ দিয়ে হেঁটেছি। ঐ দেখ বাবা।-আঁবার বেটা ঐ আঁসছে। ভৈরব। (তীব্র দৃষ্টিতে চাহিয়া )বাবাজির বুঝি বিদ্যা ফুরিয়েছে। কলকের আগুন নিভে গিয়েছে। তাই গঙ্গেশ আগুন নিতে আবার আসছে। এরার আর আগুন নিভবেনা। একবার ত আমাকে পরীক্ষা করতেই হবে। দেখি এই চিতার পাশে থেকে, ব্যাপারটা কি হয় ? ( চিতার পার্শ্বে উপবেশন)। ( গঙ্গেশের প্রবেশ) গঙ্গেশ। (ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধস্বরে) খা! ভেড়েরা তামাক খা! (আছাড় দিয়া কলকে ফেলিয়া দিয়া) যেমন ভেড়েদের বদ ফরমা’-তেমনি ভেড়ের চিতার আগুন! নিবি নিভূবি, বেটার আগুন এই খানেই নে! তা না—সেই নেভাই নিভূল-আমাকে আধক্রোশের পাল্লা হটিয়ে তবে নিভূল! দেখি আবার সে-ভেড়েদের ক’কে গেল
• •
.
কোথায় ?(ক’লকে খুঁজিয়া তুলিয়া ক’লকের তামাক পড়িয়া
গিয়াছে দেখিয়া) যেমন ভেড়ের ক’লকে তার তেমনি ভেড়ের
তামাক! দেখ দেখি-ভেড়ের তামাক আবার আমি এখন এই
চিতার ছাইগাদার মধ্যে থেকে কি করে ছাই খুঁজে বের করি?
সেম্মুখে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া) ঐ বেশ হয়েছে। কোন ভেড়েরা যেন
মরা পােড়াতে এয়েছিল, এক তাল তামাক ফেলে চলে গিয়েছে।
ভালই হয়েছে—এই ভেড়েদের তামাক নিয়ে, ঐ ভেড়েদের খাওয়াই,
(তাল ভাঙ্গিয়া তামাক উঠাইয়া ক’কেয়, সাজিয়া) আরে
ম’লাে। আমিও ত কম বােকা নই। আবার সেই আপদ-পথে
গিয়ে বেটার আগুন অমনি করেই নিভে যাবে কি আপদেই
পড়লাম আজ! আগুন নিয়ে যাইই কি করে ? যা-ভেড়েরা।
এবার আর ক’লকে ফ’লকেয় নয়, ঐ চিতার একখানা কুঁদো কাঠ
কাঁধে করে রওনা গুদই। যা থাকে কপালে-ভেড়েদের মুখে গিয়ে
ঠেসে ধরুব-খা ভেড়েরা ! তামাক খা ! ( সবেগে চিতার নিকটে
গিয়া কাঠ ধরিয়া টান)।
(চিতার পার্শ্ব হইতে গম্ভীর স্বরে হুঙ্কার করিয়া ভৈরবের উত্থান)
ভৈরব। কেরে!
গঙ্গেশ। ( ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া) কিরে !- .
ভৈরব। পাড়া-ঐ খানে-
গঙ্গেশ। তুই আয়, না!
ভৈরব। (সক্রোধে) আমি আসব ?-(ত্রিশূল উদ্যত-করিয়া ভয়-
প্রদর্শন পূর্বক হুঙ্কার করিয়া গঙ্গেশের সম্মুখে আগমন)।
গঙ্গেশ। (কুটী-ভঙ্গী করিয়া) আরে বেটা! আমাকে ভয় দেখাস?
বেটার হাতে ত্রিশূল, আমার হাতে কিছু নাই-না? এই আয়,
তােকে দেখাচ্ছি! (জ্বলন্ত-চিতাকা উত্তোলন করিয়া ভৈরবের
প্রতি আঘাতের উদ্যম)।
(ভৈরবর্তৃক বামহন্তে গঙ্গেশের হস্তধারণ ও গঙ্গেশের হস্ত
হইতে চিতাকাষ্ঠ পতন )
সপ্তম দৃশ্য।
ভৈরব। (বীভৎস স্বরে)-কেমন?-
গঙ্গেশ। (ক্ষুব্ধ হইয়া) তুই বেটা আমাকে ধ’রলি কেন?
তৈরব। কার আদেশে তুই চিতায় হাত দিলি? জানিস্ ত এ শশ্মানের
নাম ভৈরঘাট। আমি সেই—শানের রাজা ভৈরব। হতভাগা
ছেলে! এখনি আমি তােকে আছড়িয়ে মারব! বল! তুই-কার
আদেশে চিতায় হাত দিলি ?
গঙ্গেশ। তুমি কার আদেশে আমার হাত ধ’ৰূলে?
ভৈরব। আমি তোর হাত ধরেছি মার আদেশে।
গঙ্গেশ। আমিও চিতার কাঠ তুলেছি আমার আদেশে।
ভৈরব। তােমার আদেশেই তুমি কাঠ তুলেছ? খুব আদেশ বটে !!
গছে। আমার আদেশ নয় ত কার আদেশ? আমি গঙ্গেশ, কোন
বেটার আদেশের ধার ধারি? তুমি যে আমার হাত ধলে
তােমার মার আদেশে, বল দেখি তােমার সে মা টা কে ?
ভৈরব। ওঃ!-বেটার কি অহঙ্কার রে!-আমার মা কে ?
গঙ্গেশ। অহঙ্কার আবার কি ? বল না—তােমার মার নাম কি ?
ভৈরব।-শুনবি?—আমার মার নাম-শ্যামা।
গঙ্গেশ। ওরে বেটা ! সে যে আমারই সে-মা। আমার মা বলে গিয়েছে
-সে মা আমার মা, বেটা তার নাম রেখেছে শ্যামা। ছাড়, বেটা।
আমার হাত ছাড়! আমার মা হুকুম দিয়েছে আমাকে মারুতে? না।
ভৈরব। গঙ্গেশ! এখনওঁ বলছি—সাবধান হ! এখনও বলছি—আমাকে
দেখে ভয় কয়। এখনও বলছি—যদি নিস্তার পেতে চাস এইবার
আমার শরণাগত হ!
গঙ্গেশ। তােকেও বছি-তুই সাবধান হ! আমাকে দেখে ভয় কর, আর
শেষকালে সেই যে কি বললি তাও হ।
ভৈরৰ। এই-হই (ত্রিশূল মাটীতে পুতিয়া দুই হস্তে গঙ্গেশের দুই
গ্রীবা ধরিয়া কুটী ভঙ্গী পূর্বক গর্জন করিয়া) বুঝেছি
যা না হলে, তা-তােৰু হচ্ছে না।
গঙ্গেশ। (ভৈরবের মুখের দিকে অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া
.
.
হঠাৎ সভয়ে চক্ষু নিমীলন ও দুই হস্তে দুই চক্ষুঃ আচ্ছাদন
সর্বাঙ্গে থর থর কম্প, ভীত স্বরে) মাগাে মা-মনে-গাে-
মলেম!! মলেম!! # পতন ও মুচ্ছা)
ভৈরব। (উন্ধে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া) এই ত দীনদয়াময়ি।
তােমার দয়ার দ্বার উদঘাটিত হ’ল! এ কিঙ্করের প্রতি যা আদেশ
তােমার, কিঙ্কর ত তা ক’রূছে মা, এখন আর যা বাকি আছে,
সিদ্ধেশ্বরি নিতে এসে তা সিদ্ধ কর!-(গজেশের প্রতি) আমরি
মরি। গণেশ রে! আজ এই এক জন্মে তােৰু জন্মান্তর, এক
দেহে তাের দেহান্তর! এ শ্মশানে সকলেই ত এমনি করে এসে
মনে পড়ে, কিন্তু তােৰ মত এমন মরে বেঁচে ওঠে কয়জন?
আহ! বাছার আমার ত বিভীষিকার মূচ্ছ। নয়, যেন অভি-
মানের গভীর নিদ্রা।
গঙ্গেশ রে--
মা-হারা ত এ সংসারে অনেকেই হয় রে।
কিন্তু,-হারা-মা আজ এমন ক'ৰ্বে কারে ধরা দেয় রে!!
মায়ের মুখে মায়ের কথা অনেকেই ত শােনে রে।
কিন্তু এমন করে মনে প্রাণে ক-জনে দিন গণে রে।।
তাের,-যুকূল এ দিন—এল সে দিন দীনতারিণী মার কোলে
চললি রে বাপ! ঘুচলরে তাপ, দিন যামিনী “মা” বলে।
আয় রে বাছ! আয়রে আমার আয় রে গঙ্গেণ। আয় রে আয়।
আয় রে তােরে কোলে করে ধন্য করি আজ আমায়।
এই লােভেই বাপ। কৈলাস ছেড়ে শ্মশানভূমে করি বাস।
মায়ের ছেলে মায়ের কোলে উঠিয়ে দিতে প্রাণে আশ।
সবাই আমায় ভিক্ষুক জানে, আমি ভিক্ষুক এই ভিক্ষায়।
আমার ভিক্ষার শেষ দক্ষিণা দক্ষিণা-চরণ-দীক্ষায়।
তােৰু কি রে বাপ! ভয় আছে আর, যার জননী অভয়া।
?
সপ্তম দৃশ্য।
তোর-ভয় ঘুচাতে ভবদারা পেতেছেন এই ভয়ের মায়া।
আজ হতে বাপ! অভয় হলি, আর পাবি না কোন ভয়।
অন্যে পরে কা কথা ? আজ মৃত্যুঞ্জয়কে করলি জয় !!
গেজেশ রে, আজ ভৈরব দেখে ভয় পেয়েছিস, তাই কি মায়ের
উপর অভিমান করে মাটীতে এ গড়াগড়ি ? মায়েরই বা দোষ
কি বাপ!-ভৈরবেরই বা দোষ কি? তুই যে এই ভয় পাবার
জন্য দিন রাত্রি কেঁদেছিস! তাই না মায়ের আদেশে তােকে আজ
ভয় দেখাতে আমি এসেছি। এ ভয় না পেলে যে তো ভবের
ভয় ঘােচ না! তাের ভয় না ঘুচলেও যে, কোলের ছেলে কালে
পেয়ে শিবসীমন্তিনী শান্ত হন না!তাই না বাপ! আজ
আমার এ ঘাের নিষ্ঠুরতার অভিনয় ! নইলে এমন পাষাণ প্রাণ
এ সংসারে কার আছে যে, এমন ভুবনবিজয়ী সৎসাহসী শিশুর
বীরবিক্রম দেখে বিমুগ্ধ না হয়? আয় রে বাপ! আর অভি-
মানে কাষ নাই। আমার অভিনয় আমি শেষ করি।-মা
আমাকে তোমার ভয় দেখাতেও যেমন পাঠিয়েছেন, ভয়
ঘুচাতেও তেমনি পাঠিয়েছেন। (গঙ্গেশের দুই পাশে দুই
হাত দিয়া উঠাইতে উঠাইতে )—ওঠ বাপ! ওঠ! আয় রে
বাপ! আজ কোলে আয়!—গজেশ রে! এই সকল ভয় ঘুচল
বাপ! আর ভয় নাই !-ভয় নাই !! এইবার একবার চেয়ে
দেখ--কে আমি তােমায় কোলে করেছি!-(ক্রোড়ে ধারণ)
গঙ্গেশ! (ভৈরবের গলা জড়াইয়া ধরিয়া ভয়ে ভয়ে ফুপিয়ে
ফুপিয়ে কান্না )
ভৈরব। হরে গঙ্গেশ! আবার কঁদি? এই চেয়ে দেহ্-কে আমি !
গঙ্গেশ। (মাথা উঠাইয়া সভয়ে ভৈরবের মুখের দিকে চাহিয়া
সবিস্ময়ে সানন্দে একি? তােমাকে যে আমার সেই সন্ন্যাসী
দাদার মত দেখাচ্ছে, সত্য কি তুমি আমার সেই সন্ন্যাসী দাদা?
হ সন্ন্যাসী দাদা! তুমি আমাকে এমন করে ভয় দেখালে ?
৯৬ গঙ্গে আমাকে যখন তুমি মামাবাড়ী নিয়ে এস, সেই সময়ে পথের মধ্যে আমি তোমাকে বলেছিলাম-আমার আর কারেও দেখে ভয় করে না, কেবল তােমাকে দেখে ভয় করে ; তখন তুমি হেঁসে ব’ল্পে—“ভয় করেই এই, এর পর ভয় না ক’বুলে তুমি যে আমার কি করতে, তা ত কিছু ভেবেই পাই না!” সত্যসত্যই সন্ন্যাসী দাদা। তখনও আমার তােমাকে দেখে ভয় করত; তবে তা জেনে শুনেও তুমি আমাকে এমন করে ভয় দেখালে কেন? কাইত আমি এখনও ঠিক করে উঠতে পাছি না— তুমি সত্য সত্যই আমার সেই সন্ন্যাসী-দাদা ?-না --আর কেউ? তােমার পায়ে ধরি, সত্য করে বল তুমি কে ? ভৈরব। গঙ্গেশ! তখন আমি তােমার সন্ন্যাসীদাদা ছিলাম, এখন আমি তােমার গুরুদেব। শুনেছ ত—এ শ্মশানের নাম ভৈবরঘাট; এ শশ্মানের রক্ষার ভার আমার উপরে, আবার এই শ্মশানের অধিকার যতদূর তার সমস্ত লােকের সাধন-সিদ্ধির কর্তৃত্বের ভারও আমার উপরে। তােমার মায়ের জন্মান্তর-সাধনার বল যা ছিল, সেই বলে তিনি তােমার মত সন্তান গর্তে ধরেছিলেন, সেই বলেই তােমার মায়ের মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে ছদ্মবেশ সন্ন্যাসি- মুৰ্ত্তিতে আমি তাকে দর্শন দিয়েছিলাম, আমার এ প্রত্যক্ষ- রূপ দর্শনের উপযুক্ত সিদ্ধি সাধনার বল তার ছিল না। যা হােক, সেই প্রসঙ্গে তুমি তােমার সন্ন্যাসীদাদাকে পেয়েছিলে। সে সন্ন্যাসী-দাদা আর কেউ নয় আমিই; এই ভৈরবটে— আমার নাম বিজয়-ভৈরব। গঙ্গেশ। (হঠ: --কিয়া সবিস্ময়ে সভয়ে ভৈরবের মুখের দিকে চাহি.) আবার তুমি এ কি হ'লে ? আবার যে সেই-দেখে ভয় হচ্ছে—আবার যে আমার বুকের ভিতর ধড়ফড়, করছে গা কাপছে! সন্ন্যাসীদাদা! তুমি যে হও, সে হও-ভৈরব হও—মহা দেব হও-( কৃতাঞ্জলিপুটে) দোহাই তােমার পায়ে ধরি-আমাকে আর এমন করে ভয় দেখিও না! ওগো মা ! মা গো !’শেম!-
৯৭
এখনও
সপ্তম দৃশ্য।
ম'লেম।-(ভৈরবের বক্ষঃস্থলে মস্তক রাখিয়া অতি বেগে
হস্তপদাদি কম্পন )
তৈর। (সহাস্যে) বুঝেছি বাপ! একেবারে ভয়ের শেষ না হলে আর
তােমার এ ভয় ঘুচছে না! গঙ্গেশ!—গঙ্গেশ !-ভয় নাই!
ভয় নাই।-(কোল হইতে মাটীতে নামাইয়া নিকট হইতে
একটু সরিয়া দাঁড়াইয়া) কেমন? এখন ভয় গিয়েছে ত?
গঙ্গেশ। (ভৈরবের মুখের দিকে চাহিয়া ) না—আমার
করছে। (দুই হস্তে দুই চক্ষুঃ আচ্ছাদন )
ভৈরব। হারে গঙ্গেশ! তাের যাতে আর ভয় না হয়, তার জন্য তােকে
আমি যদি কিছু দেই, তা হলে তুই ত নিবি কি ?
গঙ্গেশ। (চোক বুজিয়াই) নেব! কৈ?—দাও না!
ভৈরব। তুই ভয়ে মুখ তুলে আমার দিকে চাইবিই না, তা, দেব কি করে?
গঙ্গেশ। (হাত পাতিয়া ) এই ত হাত পেতেছি, দাও না!
ভৈরব। (সহাস্যে) হারে! কি করব ? তা যে একবারে হাতে দেওয়া
যায় না।
গুঙ্গেশ। না হয় তুমি বারে বারেই দাও না, আমি নিচ্ছি।
ভৈরব। ওরে! বারে বারেও না, একবারেও না; দেওয়া একবারেই
যায়, কিন্তু হাতে দেওয়া যায় না।
গঙ্গেশ। সে আবার কি?
ভৈরব। কি, তা তোকে বলছি, তুই আমার একটা কথা শােন্।
গজেশ। কি কথা?
ভৈরব। কথা আর কিছুই নয়, তুই গঙ্গার জলে নেমে একটা ডুব
দিয়ে গান করে, আয়!
গঙ্গেশ। (ভৈরবের মুখের দিকে চাহিয়া ) ঘাড়ে টিপে মারূবে না ত?
ভৈরব। (সহাস্যে) আ রে পাগল! ভয় নাই-ভয় নাই !
গণেশ।
গজেশ। ভয় থাক আর না থাক, আমি তা কিছুতেই পাব না !
আমি যেমন জলে নেমে ডুবটি দেব, আর অমনি তুমি আমার
ঘাড় টি মটকাবে !
ভৈরব। না, ঘাড়, মটকাব না, যা তুই স্নান করে আয়।
গঙ্গেশ। না, আমি তা কিছুতেই যাব না।
ভৈরব। তুই জলে নেমে স্নান ক’বি না?
গঙ্গেশ। না, আমি তা কিছুতেই ক’ব না।
ভৈরব। ( সহাস্যে ) তা কবে কেন? যার মায়ের এত সােহাগ, সে
ছেলে কি আর জলে নেমে স্নান করে ? বুঝেছি-ও কর্ম
আমার হাতেই হবে।
গঙ্গেশ। (সভয়ে) কি কৰ্ম্ম ?
ভৈরব। আরে! ভয় নাই-ভয় নাই! আমি মাব না, তুই জলে না।
গঙ্গেশ। মারূবে না, তবে তােমার হাতে হওয়াটা কি ? দোহাই।
তােমার পায়ে ধরি, আমি জলে নামতে পারব না।
ভৈরব। আচ্ছা, না পালি তুই এই খানেই দাড়া, এই দেখ, আমার হাতে
হওয়াটা কি ? (গঙ্গাজলে অবতরণ ও অঞ্জলিপুটে জল লইয়া
গঙ্গেশের মস্তকে অভিষেক) কেমন বাবা! এখনও ভয় করে ?
গঙ্গেশ। (স্তম্ভিত—ভাবে স্থিরদৃষ্টিতে ভৈরবের মুখের দিকে
চাহিয়া নিঃশব্দে কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান )
ভৈরব। (গভীর স্বরে ) গঙ্গেশ !-গঙ্গেশ!-গঙ্গেশ!
গঙ্গেশ। (পূর্ববৎ নিরুত্তর)
ভৈরব। গঙ্গেশ!-
গঙ্গেশ। ( কৃতাঞ্জলিপুটে গদ্গদ-কণ্ঠে) কি বাবা!
ভৈরব। আয়, দেখি বাপ্ !-আয় আয়, !
সপ্তম দৃশ্য।
(উৰ্দ্ধদৃষ্টিতে কৃতাঞ্জলিপুটে—}
জয় দীনদয়াময়ি।
শরণাগতবসলে সর্বমঙ্গলে।
জয় যােগীন্দ্রদুর্লভে—সন্তান-সুলভে মা।
জয় মা। কেবল তােমার মা-নামেরই জয়।
(কিয়ৎকাল ধ্যানাবস্থিত হইয়া গঙ্গেশের দক্ষিণকর্ণে তিনবার ও বামকর্ণে
একবার মহামন্ত্রদানমন্তক হইতে নাভি পর্যন্ত এবং নাভি,
হইতে মস্তক পর্যন্ত হস্তস্পর্শ করিয়া)
গঙ্গেশ!
গঙ্গেশ। (কৃতাঞ্জলিপুটে )
কৃতার্থ কৃতার্থঃ কৃতার্থোহস্মি শন্তো।
প্রসীদ প্রসীদ প্রভাে দীনবন্ধো !!
বিমুক্তোহপি মুক্তঃ পুনশ্চাস্মি মুক্তঃ।
পরং ব্রহ্মতত্ত্বং মহামন্ত্রমুক্তঃ ।
গতং মে ভয়ং সঙ্গতঞ্চাভয়ং মে।
জিতং সর্বমেতন্নজিতং কিঞ্চিদস্তি।
মিতং 'সমেতন্নমিতং কিঞ্চিদস্তি।
হিতং সর্বমেতন্নহিতং কিঞ্চিদন্তি।
পদান্তোজপ্রান্তে মতি দীয়তাং মে।
পদান্তোজপ্রান্তে গতি নীয়তাং মে।
পদান্তোজপ্রান্তে রতি দীয়তাং মে।
পদান্তোজপ্রান্তে নতি দীয়তাং মে।
দাসােহস্মি ভৃত্যোহস্মি চ কিঙ্কনােহস্মি
তবৈব পাদামুজ-সেবকোহস্মি ।
ন চাম্মি কস্যাপি ন মেহস্তি কশ্চিৎ
পুত্রোহস্মি তে ত্বঞ্চ পিসি সচ্চিৎ।
জয় গুয়াে.শ্রীগুরাে শন্তো করুণামৃতবারিধে।
চরণান্তোজকিগুদ্ধে স্থানং মে দীয়তাং প্রভাে !!
(চরণতলে দণ্ডবৎ পতন)
ভৈরব। (সস্নেহে দুই হাত ধরিয়া গঙ্গেশকে উঠাইতে উঠাইতে)
উত্তিষ্ঠ বৎস মুক্তোহসি সত্যং তাতােহস্মি তে সুত।
পশ্য রেহদ্য মদঙ্কন্থে জগদম্ব-পদাথুজং।
(গঙ্গেশকে বামক্রোড়ে করিয়া দক্ষিণহস্তে চিতাগ্নি-মণ্ডলে
তর্জনী নির্দেশ করিয়া)
গঙ্গেশ-দেখ দেখি বাপ! ঐ কেরে!
গঙ্গেশ। (সচকিতে সােল্লাসে)-
“শবশিব-হৃদয়সােজ-নিহিত-দক্ষিণচরণা।
জয়তি কাপি মে মধুর-মধুর-হসিননা দিসনা লােলরসনা।
(ভৈরবের কোল হইতে দুই হাত বাড়াইয়া, মা?—মা-মা।
বলিয়া ঝাঁপিয়া অগ্নিমগুলে পড়িবার চেষ্টা)।
( অগ্নিমণ্ডল ভেদ করিয়া গঙ্গেশকে কোলে করিবার জন্য
প্রসারিত-ভুজলতা মা মুক্তকেশীর আবির্ভাব )
মা।
আয় আয়, ! আয়, বাছা আমার! অনেকক্ষণ কোলে, করি
নাই!!
ভৈরব। ( সহাস্যে মায়ের প্রতি) তােমার ত মা ! ক্ষণই বটে, জীবের
কিন্তু যুগযুগান্ত! (গঙ্গেশের প্রতি) গঙ্গেশ! বাপ বল দেখি-এখন
আমার কোলেই থাকবি?-না—ওঁর কোলেই যাবি?
গঙ্গেশ। গুরুদেব ! তােমার থাকব চরণতলে, কোলে উঠব মার। (মায়ের
সপ্তম দৃশ্য।
প্রতি) “মা! মা! মা!” (ঝাপিয়া মায়ের কোলে উঠিতে
চেষ্টা, উভয় বাহু প্রসারণে জগদম্বা কর্তৃক ক্রোড়ে ধারণ)
মা।' (সস্নেহে গঙ্গেশের শিয়ােঘ্রাণ, মুখ চুম্বন ও চিবুক ধারণ
করিয়া) বাছা আমার ! কেমন ছিলি ?
গঙ্গেশ। (অভিমানে মুখ ভার করিয়া) মা তুই যেমন রেখেছিলি?
হ মা! তুই মা থাকতে আমি মা-হারা ছেলে মা ! এক তােকে
হারিয়েই আমি সব হারিয়েছিলাম মা !
মা। কেমন বাবা! এবার বুঝে এলে ত ?-মা না থাকলে কি হয়?
গঙ্গেশ। “মা না থাকলে কি হয় তা ত আমি বুৰূলাম মা!, কিন্তু
ছেলে না থাকলে কি হয়, তুমি কি তা বুঝলে মা ?
মা। (সহাস্যে) সে বুদ্ধিটা আমার চিরকালই হ’ল না বাবা।
কে যে আমার নিকটে আছে, আর কে যে আমার দূরে
আছে, এ কাল সে কালের মধ্যে কোন কালে তা আমি বুঝে
উঠতেই পালাম না।
গঙ্গেশ। ওমা! যার দূর থাকে না, নিকট থাকে না, এমন মার
ছেলেও কখন না থাকাই ভাল।
গঙ্গেশ। তা যদি মনে করতে পেরে থাক, তবে ত তা তাই।
গঙ্গেশ। তা যদি মা! তা-ই হয়, তবে ত তােমারও কেউ ছেলে নয় মা,
তুমিও কারু মা নও মা! তবে আবার মা! মিথ্যা-মিথ্যি “কেমন
ছিলি বলে এত সােহাগ দেখাচ্ছ কেন? (মায়ের বক্ষঃস্থলে
মুখ রাখিয়া অভিমানে বােদন)।
মা। আমি, কিছুই না হই, তবু “মা” হই, কঁদিস না রে বাপ!
কিছুতেই গলি না আমি বিনা তােদের দুখের তাপ ।
গঙ্গেশ। (দুই হাতে মায়ের কপােল-প্রান্ত হইতে মুক্তকেশ সরাইয়া
মুখমণ্ডল তুলিয়া) হ মা! বল দেখি—আমার কি একটু
অপরাধ পেয়ে এমন করে পায়ে ঠেলে দূরে ফেলে দিলি?
আবার জিজ্ঞাসা ক’ৰূলে বলিস-তাের
দূরও নাই, নিকটও
মা।
গঙ্গেশ। নাই! সত্য করে বল দেখি মা !—এমন অপরাধ কি করে ছিলাম । এমন করে এক অপরাধ এই ত ছিল, ভেবেছিলে-এই না ? বিদ্যা বুদ্ধি নইলে ভবে আমারে কেউ পায় না ! গঙ্গেশ। তাই না হয় মা ! তাই হ’ল ; তাই বলে মা ! মা-হারা করে এত দুঃখ যাতনা দিয়ে এমন করে কঁাদালি কেন মা? দুঃখেও আমার দুঃখ ছিল না মা!, মা! “আমার মা নাই” কেবল এই দুঃখেই বুক ফেটে গিয়েছে মা! মা। (গঙ্গেশের মুখ ধরিয়া) আমি কি ক’ব বাবা! তুমি অপূর্ণ সাধনায় সিদ্ধি না পেয়ে রেগে বলেছিলে-“চাই না আমি অম মা, আমি এ সংসারে একাই থাকব।” তাই আমাকে দুরে থাকতে হয়েছিল! যতক্ষণ তােমার সে সাধ না মিটেছে, ততক্ষণ আমি তােমার কাছে আসি কি করে ? গঙ্গেশ। আচ্ছা মা ! তবু ত আমার মা ছিল ? সাধন কি আর একেবারে মিথ্যা হয় বাপ! ফল প্রতিফল দুই ই-ত তােমার ফলেছে। মায়ের ছেলেও হ'লে, মা-হারাও হলে!-মাকে হারালেও, আবার আজ এই -মাকে পেলেও!! এখন বুঝলে-সিদ্ধি সাধনা সত্য কি না ? ভৈরব। তুমি এম্নি করেই বুঝিও মা! গঙ্গেশ। সত্যই মা! ফল প্রতিফল দুই-ই ফলেছে,-আজ আমার আর চাইবার পাইবার কিছু নাই। মা। সে কি গঙ্গেশ? আজ যে তােকে না চাইলেই হবে না বাপু! গঙ্গেশ। কেন মা? কি চাইব? মা। ( অখােবদনে) বাপরে! আজ আমার মুখ অবনত ক’লি ! আমাকে যে পেয়েছে বাপ! তার যে কিছু পেতে বাকি নাই, তা ত আমি জানি, কিন্তু বাবা! মা হয়ে যখন আসি আমি, তখনই ছেলের হাতে কিছু না দিয়ে থাকতে পারি না বাপ! যে শাস্ত্রের সাধনায় তুমি আজ সিদ্ধ, আমিও যে সেই শাস্ত্র- { মা । সপ্তম দৃশ্য। অনুসারেই ফল দিতে বাধ্য। তাই তুমি কিছু না চাইলেও আমাকে যে দিতেই হবে বাপ- গঙ্গেশ। হ মা ! তাইতে কি ডান দিকের নীচের হাতখানি তুই দিন রাত্রি অমন ক'রে ঝুলিয়ে রাখিস?: হাঁ, মা! ঐ হাতখানি না তাে বরের হাত বলে? (মায়ের মুখখানি ধরিয়া) হা মা। প্রতিদিন তুই কত জনকে বর দিস মা। যখন যাবে বাবার কোলে বসে বসে দেখো। গঙ্গেশ। আচ্ছা, তা দেখব। এখন আমাকে কি দিবি?—তা দে- মা। এই যে বলি—কিছু চাইবি না! গঙ্গেশ। আমি কি কিছু চাচ্ছি মা! তুইই যে বল্লি-তােকে দিতেই হবে। তবে বল-কি চাস? গঙ্গেণ। সে কি মা? আমি বলব কি করে? তাে আঁচলে কি বাধা আছে, তা তুইই জানি। মা। তবে আমিই বলি-শোন্ রে গঙ্গেশ! তাের মামাবাড়ীর দেশের লোক-সবাই তােকে মূখ জানে, এ দুঃখ আমার সয় না বাপ,! গঙ্গেশ। (অভিমান-স্বরে) তবে খল-মামার ঘরের যে কখানা পুথি আছে, তাতেই আমার বিদ্যা হােক! মা । ( গঙ্গেশের মুখ তুলিয়া) কেন বাবা! অভিমান করিস? আমি ত তােকে তা বলি নাই! তাের মামার ঘরে কেন বাবা ! আমার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-ঘরে যত বিদ্যার পুথি আছে, আজ হতে তুমি তার সৰ্ববিদ্যায় সিদ্ধবিদ্য হলে! বাবা! আমি যার মা মহাবিদ্যা তার কি বিদ্যার অভাব রে! জীবের-অবিদ্যাভেদ যায় রে দূরে আমার বিদ্যার প্রভাবে!! বিদ্যা আমি-আমি বিদ্যা বিদ্যা মন্ত্র যন্ত্র। মন্ত্র-যন্ত্র-বিদ্যা সূত্রে গাঁথা আমার তন্ত্র । ধর বাবা। এই বিদ্যার ভাণ্ডার আজ হতে তোমার হাতে দিলাম। ভৈরব। সেই দেওয়াই দেও মা! কিন্তু টোলের কিল না খেলে আর না । ভৈরব ! তুমিই না! সে টোলের অধ্যাপক। ১৪ ১০৪ গদেশ। মা। ভৈরব। তােমার ছেলেগুলি যে কেমন, তা ত আর দেখবে না? সেটা নিজে নিজে দেখলেই পার? ভৈরব। তাই ত! এখন ত দয়াটা বড় বেড়েছে। কোলে করে ঘরে এনে দিলে তখন সােহাগ ক’তে অনেক মা ই পারেন! তােমারও ত কুটভঙ্গী বই আর কিছু নয়? ভৈরব। (কৃতাঞ্জলিপুটে) সেও-ঐ দয়াময়ীরই আজ্ঞার ফল !! গঙ্গেশ। হ্যা মা! তােরা দুজনে ঝগড়া আরম্ভ ক’বুলি? দেখ না বাবা! উনি তােমাকে নিতে চান। গঙ্গেশ। বাঃ! উনি নেবে না ? আলে উনি, রাখলে উনি, দিলেন উনি, উনি নেবেন না? তুমি ত মা ! হাতে পেলে কোলে করবে? তােমার চেয়ে খাবার ভরসা অনেক বেশী !! ভৈরব। (স্বগত) হাঁ! তুমি কোলে বসে বসে খুব বাহবা দাও। ( প্রকাশ্যে) গঙ্গেশ! নেমে আয় ত! গঙ্গেশ। ( মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া) ও মা ! তােমার পায়ে পড়ি। বাবাকে দেখে ভয় করে। মা। আবারও ভয় ? গঙ্গেশ। না-মা!—তা না, যাবার ভয় নয়, যাবার ভয়-আমি তাে কোল থেকে নাম্ব না ! মা। না বাবা! তোমাকে যেতেই হবে, উনি ডাকলে আমি তােমাকে রাখতে পারি না। “অভীষ্টদেবে রুষ্টে চ রক্ষণে সক্ষমাে গুরু। ন সমর্থ গুরৌ রুষ্টে রক্ষণে সর্বদেবতাঃ । ভৈরব। ওরে পাগলা! কোলে থাকলেই, দেখা যায় না ওরে। দেবি যদি, আয়! তবে আয়, ! স্বরূপ দেখাই তােরে। গঙ্গেশ। দেখ, মা ! তাের দুখানি পায়ে ধরি, তুই একটু এখানে দাঁড়া, আমি একবার দৌড়ে গিয়ে বাবার ওখান থেকে তােকে দেখে আসি-কেমন দেখায় !!
সপ্তম দৃশ্য।
(বলপূর্বক কোল হইতে নামিয়া ভৈরবের নিকটে গমন)
মা।
ওরে গঙ্গেশ! শােন-শাে। ওখানে গেলে শীঘ্র আস্ত
পাবি না।
গঙ্গেশ। আভাগের বেটি! এলাম কোন্খান দিয়ে?
মা। আচ্ছ-তবে দেখ!-
গঙ্গেশ। ( যাইতে যাইতে মায়ের দিকে তর্জনী হেলাইয়া)
দেখ মা! তুমি ঠিক দাড়িয়ে থেকো।
মা।। আমি তােকে না দেখলেই বে-ঠিক হয়ে যাব।
গঙ্গেশ না-
মানা, মাটি লক্ষ্মীটি। এই আমি এলাম বলে।
(দৌড়িয়া গিয়া ভৈরবের করাঙ্গুলী গ্ৰহণ)
ভৈরব। (তজ্জনী নির্দেশ করিয়া )
দেখ দেখি বাপ!-স্বরূপ কেমন ?
গান। (১৬)
ঐ সে মহেশ-মমােহিনী ;-
কিবা, প্রেমে টলমল,
মদে ঢল ঢল,
অলস বিল ত্রিভঙ্গিনী।
সজল জলদ শ্যামাঙ্গ সুষমা, নিরুপায়ে মায়ের রূপর উপমা ;
স্মরহরে স্মর-সমর-বিষমা,
সম-রসে সম-সমর-রঙ্গিণী ।
চরণলম্বিত বিগলিত বেণী, বিধুমুখে সুধামাধুরী-দামিনী ;
কিবা ভাবাবেশে, আসে হেসে হেসে,
স্খলিত চরণে গজেন্দ্রগামিনী।
সমুন্নত ধরাধর পয়ােধর, গঙ্গেশ রে! তাের স্তন্যভারে আজ কাতর ;
সে ভার কেবা ধরে, ধর রে অধরে,
(আজ) তাের তরে অধরা ধরাধর-নন্দিনী।
;
গণেশ।
দেরে গঙ্গেশ! তাের কি সৌভাগ্য ভবে,
বিরিঞ্চি কেশবের ভাগ্যে না সম্ভবে ;
ভবে যা সম্ভবে,
ভবে স সবে,
( মা যে) কি শিবে কি শবে ভুবভয়-ভঙ্গিনী
গঙ্গেশ। (নাচিয়া নাচিয়া করতালী দিতে দিতে)
বিকসিত সুদর্শন
গান। (১৭)
সজল-জলদ-দম তনু-রুচি-নীলিম
লম্বিত-কুন্তল-জালে।
রক্ত কমল-দল
চঞ্চল কোমল
ঘূর্ণিত-নেত্ৰ-বিশালে।
কুন্দ-বিশেষণ
বিধুকর-নির্গলদাস্যে ।
কুটি-কুঞ্চিত- মাসব-সিঞ্চিত
মট্টরবাঞ্চিতহাস্যে।
রসনা-লােলিত শােণিত চর্জিত
মধুরাধর-মধুধারে।
লহ লহ খেলিত
জ্বণ-মীলিত
দিতিত-দর-খরধারে !
রণমদ-মর্দিত দিতিকুল-কর্দম
নৰ্ত্তন-রণসুখ-পারে।
শরযুগ-বেধিত
শব শিশু-কুণ্ডল
মন্দান্দোলিত-গণ্ডে।
১০৭ সপ্তম দৃশ্য। স্মিতমদ-বিকাল ত্রিনয়ন ঢল ঢল ঘন-মনসিজ-রণচণ্ড! শবশিৰ-হৃদি নিজ ভৈরব-সঙ্গ- বিজয়-বিপুল বল-দণ্ডে। ত্রিভুবন-তারণ কারণ-বরতনু লীলালম্বন-কেত। হস্ত-চতুষ্টয় ভক্তবরাভয় হেতাে ! বামাধঃকর শশাভিত নরশির দিতিকুলবারিধি-সেততা। জ্বলদসি-রঞ্জিত বাম-করাজ ষটপদ-দানব-লক্ষ্যে। ছলবণ-মন্ত্রিত দিতিকুল-সন্ততি- মৃতি জনু ভয়কৃতরক্ষে। পীন-পয়ােধর যুগ্ম-ধরাধর- শঙ্কিতকম্পিত বক্ষে । ত্রিবলী-বলয়িত চলদলি-পুঞ্জিত নাভি সরােবর গর্ভে। কাঞ্চীকৃত-নর করধর-সুন্দর সূক্ষম-কটীতট-গর্বে। হর-পরিরম্ভিণি নিবিড়-নিতম্বিনি গর্বিত-ভূতল-খৰ্বে। সুর-করিব-কর জঘনজ-পরিকর নরশির-মাল্য-বিভূষে।
sobre
গলেশ।
গগন-পবন-ঘন বসন-লসিত-তনু
ভুবনাঞ্চল-ভব-বাসে।
রলোৎপল-দল রঞ্জিত-পদতল
শঙ্করবক্ষ-বিলাসে
শ্রীপদ ভূষণ
ভহাদয়-ভয়
গাঢ়-তিমিরচয়
দরণ-কিরণ-কুলকেন্দ্রে।
শব-শিব-বাহন
শিব-শির-ভূষণ-চন্দ্রে।
শ্রীমদ্-ভৈরব হৃদি-নিজ-বৈভব
চরণ-শরণ-শিবচন্দ্রে।
ভীম-তরঙ্গিত সংস্কৃতি-সাগর
নিস্তর-দুস্তর-পারে।
দীন-দয়াময়ি করুণাংকুরু ময়ি
তদপিচগদিতুমপারে।
শ্রীধর-বাঞ্ছিত শঙ্কর-কাঙ্ক্ষিত
পাদযুগম্বুজ-তারে
তারে-
তারে !! তারে !!!
গঙ্গেশ। জয় মা ! জয় মা ! জয় মা !!- উৰ্দ্ধবাহু হইয়া মাকে প্রদক্ষিণ
পূর্বক নৃত্য করিতে করিতে সম্মুখে আসিয়া চরণতলে
পতন ও মােহ)
ভৈরব! এই ত সুষােগ, আমি এই সময় অন্তর্হিত হই।
ভৈরব। (কৃতাঞ্জলিপুটে সকাতরে) ও মা! তা হলে আমি একে
বাঁচাতে পারূব না! উঠে যদি দেখে তুমি নাই, তা হলে সে
মা।
সপ্তম দৃশ্য।
বজ্রাঘাত এ শিশুর প্রাণে সইবে না মা! এখনও ত ওর কাল পূর্ণ হয়
নাই, সবে এই মাত্র শিশু; এ দেহ পরিহার করলে এখনি যে মা!
তােমার কোলে উঠে কৈবল্যধামে যাত্রা করবে! ভুক্তি মুক্তি
কিছুই ও তুমি অকালে দাও না? মহাকালমন্মােহিনি। তাই
একটু অপেক্ষা কর মা!—আমি গঙ্গেশকে ডেকে তুলে শুনি।
ও আর কি বাকী আছে
(সহাস্যে) তােমরা দুজনেই দেখি এক দলের। ও উঠলে কি
• আর আমি ওকে ছাড়াতে পাব ?
ভৈরব। কেন?
মা । কেন?—তা কি আর বুঝছ না? ছাড়াতেও পারব না, ছাড়তেও
পাব না!
ভৈরব। তবে, তাই কেন বল না! গঙ্গেশ ত এখন ছেড়েছে, তবুও তুমি
অন্তর্হিত হতে পারছ না কেন?
মা।
ভৈরব ! অন্তর্হিত হব কোথায়? আমি যে ও অন্তর্নিহিত !!
ভৈরব। আরও আমরাই দুজনে এক দলে?
কি কবে? গুরু হয়েছ, আমার চেয়েও যে তােমার দায় বেশী ।
ভৈরব। কার দায়ে যে এ দায়, তা আর কি বলব? নিজে নিজেই জীব
হয়ে, নিজেই তারে সংসারে এনে, ছেলের মা হয়ে ছেলে কাদান,
আর কাদিয়ে সে আমােদ দেখা,আবার তারই মধ্যে গুরু হয়ে
নিজেকে নিজে মধ্যস্থ রাখা, এ সােহাগ তােমাকে ক’রুতেই বা
বলে কে ?আর এমন করে কোলের ছেলে আছড়ে ফেলে,
আবার—“আহা!” বলে কোলে তুলে এ দায়ই বা দেখাতে বলে
কে? আমি শুরু হয়েছি তাই কেবল দেখতে পাও মা! তুমি যে
গুরু করে পাঠিয়েছ কারে, তা ত , একবারও ভাব না ?-ঐ
দুঃখেই না পাগল হ'লেম!!
মা। নেও! নেও! বুঝেছি—বুঝেছি। আর গণেশের গলা ধরে কেঁদে
কাষ নাই! যেমন শিষ্য তেমনি গুরু
ভৈরব।তেমনি কালী-কল্পতরু !!
গদেশ।
যেমন বীজ, তেমনি তরু! এই জন্যই ত একবার বলেছিলে -
অদেয়া পরমা বিদ্যা ফলো পূর্ণফলপ্রদা” দেবার সময় ত আর
তা মনে থাকে না ? নিজের যে আবার বিদ্যা কত?
ভৈরব। (মাথা ঝাকাইয়া) তাই ত? এ দিকে যে আবার
“মহাবিদ্যা সৰ্বাদু কলৌ সিদ্ধিরনুত্তমা।”
আমার ত কেবল বিদ্যা, নিজে যে মহাবিদ্যা—সে কথা বােঝেই
বা কে? আর শােনেই বা কে? শুধুই কি কেবল তাই?
তারপর আবার শপথের পর শপথ করে
“ব্ৰহ্ম-বিষ্ণু-শিবাদীনাং শিবােরত্নপাথুজা।
কলৌ কালী কলৌ কালী নাতো দেবঃ কলৌ যুগে।”
• না দিলেই ত পারূতে ?
ভৈরব। এ দিকে যে-ভাণ্ডার খালি, তা বােঝে কে ? (হাতে তালি
দিয়া নাচিতে নাচিতে) যার ভাণ্ডার খালি হয়-তারই ভাণ্ডার
কালীময় !!
মা ।
তাই হক, তােমার হাতে কর্তৃত্ব, তা বই আর হবে কি? তা
তুমি বসে বসে উপস্বত্ব ভােগ কর ! আমাকে এখন ছেড়ে দেবে
কি না, তা বল ? দেখ-রাত্রি ঐ শেষ হয়ে এল।
ভৈরব। তা ত হবেই মা! তুমি যে রাত্রি জেগে থাক, সে রাত্রি এমনি
করে ছােটই হয়! আর তুমি যে রাত্রে কেবল ‘ঘুমাও, সে রাত্রি
আর কিছুতেই পােহায় না! (গঙ্গেশের হাত ধরিয়া) গঙ্গেশ
রে! ওঠ, ওঠ,! তো রাত্রি প্রভাত হয়েছে।
এই নেও! আবার আমাকে বাধালে।
ভৈরব। ছেলে গুলাে ঘুমিয়ে থাকলে থাক ভাল-না?
( অতি ব্যস্ত হইয়া) ভৈরব! কর কি? ভুলও! ভুলও!-শীঘ্র
ভুলও! ও অমন ছেলেটি হয়ে থাকলে আমি কিছুতেই ওকে
ছাড়িয়ে যেতে পাব না। তুমি ওর জীবত্বের অতিমান শীত্ব দেও।
শীঘ্র আত্মশক্তি সম্বরণ কর !
মা।
সপ্তম দৃশ্য। ভৈরব। সে শক্তিও ত তুমিই মা! তুমি আপুনি এসে ধরা পড়েছ, আমি তার কি করব মা? তবুও তোমার আজ্ঞা-এই নেও, ছেলেকে প্রবীণ প্রাচীন প্রাজ্ঞ করে দিলাম। কি যে মায়ার খেলা তােমার, তা তুমিই জান। গঙ্গেশ। (উদ্ধ দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে ) মা! আজ আমার এ কি সৌভাগ্য! ব্রহ্মময় গুরু আমার, ব্ৰহ্মময়ী মা আমার, গুরুব্রহ্ম—যুগলমূর্তি মহাশ্মশানের মধ্যস্থলে ! এর নাম যদি শ্মশান হয়, তবে কৈবল্যধাম কারে বলে মা? হ্যা মা! তা বুঝি নয়?-শ্মশানে তােকে যখন তখন পাওয়া যায় না, কৈবল্যধামে দুই নিয়তই থাকিস! এই জন্যই শ্মশান পৃথিবীতে থাকে, হঁ্যা মা!-না?। ভৈরব। (স্বগত) হাঁ! এই বার বেস জ্ঞানী বিজ্ঞ ভক্তের মত কথাবার্তা হচ্ছে, আর সে কোলের ছেলেটি নাই। (সহাস্যে ভৈরবকে দেখাইয়া) তােমার গুরুদেবকে জিজ্ঞাসা কর । ভৈরব। (গঙ্গেশের প্রতি) বুঝলে!-ওঁর সে কথা বলতে লজ্জা করে ! কৈবল্য ধাম ওঁর নিত্য বাসস্থান, আর শ্মশান ওঁর প্রমােদ উদ্যান! বুঝলে কি না?—এটা ওঁর বাগান-বাড়ী !! গঙ্গেশ। (কৌতুহলে ও ব্যগ্রতায়) কেন বাবা! বাগান-বাড়ী কেন ? ভৈরব। বুঝলে না?এখানে এসে যে ওঁকে ফল বিলাতে হয়! ঐ শুলে না! “যেমন বীজ তার তৈনি তরু” । গঙ্গেশ। তুমি কিসের বীজ পুতেছ বাবা ! ভৈরব। এখন যে তার গাছ হয়েছে, ফুল ফুটেছে, বীজ যে আর বীজ নাই, তা দেখাব কি করে? গঙ্গেশ। আচ্ছা বাবা! কত দিনে এ বীজে গাছ হয়। ভৈরব। বাবা। শ্মশানের মাটী ত সব জায়গায় সমান নয়? যে গুলো গঙ্গার ধারে ধারে পড়ে, সে গুলাে শীঘ্র শীঘ্র রস পায়, শীঘ্র শীঘ্র গাছ হয়; আর যে গুলাে চিতার উপরে ছাই ভস্মের গাদার মধ্যে ছুটে পড়ে, সে গুলাের শত জন্মেও কিছু হয় না। গঙ্গেশ। তােমার হাত ত খুব ঠিক্ বাবা!
১১২ গঙ্গেশ। ভৈরব। ভৈরব। ওরে!-আমি কি করব রে ! ঝড় বাতাসে যে উড়িয়ে নিয়ে ফেলে; এই দেখনা—তুই ই কোথায় গিয়ে পড়েছিলি। গঙ্গেশ। হ বাবা! ভাল কথা মনে হ’ল; আমার তুমি কি বীজ পুতেছিলে? তা ত বললাম রে!—তােৰু বীজের গাছে ফুল পর্যন্ত ফুটে উঠেছে, এখন ফল ফলেই দেখতে পাবি—কিসের বীজ। গঙ্গেশ। কি ফল ফ’বে বাবা? ভৈরব। আমি কোন ফলের নাম করব গঙ্গেশ? এযে একাধারেই-কল্প- তরু-কল্পলতা, এমন ফল জগতে নাই, যা এতে না ফলে! গঙ্গেশ। হাঁ বাবা! তবে যে মা বলে—যেমন বীজ তার তেমনি তরু!! ভৈরব। খুব শীঘ্র ফুল ফুটেছে, তাইতে মা ও কথা বলেছেন। গঙ্গেশ। তবে বাবা ! আমার বীজ তুমি জলের ধারে ফেলে দিয়েছিলে। আমিও ত তাই বলি-নইলে কি আর এত হাবুডুবু খাই ? তা হােক বাবা, তুমি বীজেরও নাম করতে পারূলে না, ফলেরও নাম করতে পারে না! ও-যে কি গাছ, কি লতা, আমি ত তার কিছুই বুঝে উঠতে পালাম না। ভৈরব। ওরে!—বুঝতে পারা যায় না বলেই ত ওঁর নাম কল্পতরু কল্পলতা। ঔ ফল দেখে, গাছ কি লতা তাই ই বুঝবার উপায় নাই—তা তুই কিসের গাছ-কিসের লতা বুঝবি কি করে? গঙ্গেশ। বুঝিয়ে দেও না! ভৈরব। আরে ছাই! আমিই বুঝতে পারলাম না-তা তােরে বুঝাব কি করে? মা। কেমন! গুরু হওয়ার ফল দেখ ! ভৈরব। ও মা! এ ফলও ঐ কল্পতরুরই! (গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া) গঙ্গেশ! আমি ত বাবা! পালাম্ না, তােমার মাকে একবার জিজ্ঞাসা কর ! গঙ্গেশ। হাঁ মা!-তুই কিসের লতা—কিসের গাছ মা? মা। ( সহাস্যে দুই হাত দেখাইয়া) ও বাবা! আমি নিজেও তা বুঝি না।
সপ্তম দৃশ্য।
ভৈরব। (সহাস্যে) গঙ্গেশ! এইবার বুঝলে ত ?
গঙ্গেশ। হাঁ ! তা বুঝেছি! গুৰু আর দেবতা, দুইয়েরই ত স্বরূপ এক।
তা যাই হােক বাবা! ফল দেখে যার গাছ ঠিক করা যায় না,
অমন ফল আমি চাই না। আমার ফুল ফুটেছে সেই ভাল!
মায়ের বাগানের ফুল তুলে মায়ের গলায় মালা গেঁথে, দেব, ফল
নিয়ে আমি কি ক’ব বাবা ?
(সহাস্যে) বাপরে!-ফুলেই যে রস পায়-
ফলে কি সে ফিরে চায় ?
(ভৈরবের প্রতি) গুরুদেব! বুঝব আজ কেমন গুরু।
ভৈরব। আমিও আজ বুঝে নেব-তুমি কেমন কল্পতরু !!
মা।
আমি ত গাছে ধরে বসে আছি, তুমি যে হাতে করে পেড়ে
দেবে!
ভৈরব। হাতে যা পাব, তাই ত পাড়ব ?
গণেশ। কেন মা ! গাছ থেকে পেকে পড়ে না?
ভৈরব। তাের ত তাই পড়েছে দেখছি।
(সস্নেহে মায়ের চতুভুজ দেখাইয়া )
ৰাবা! কল্পতরু কল্পলতা যা ইচ্ছা তাই বল,
ঐ দেখ—চতুঃশাখা-চতুভুজে চতুৰ্বর্গ ফল।
গঙ্গেশ। ( মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া ) চতুৰ্ব্বৰ্গ কি মা?
জিজ্ঞাসা কর-গুরুদেবকে।
গঙ্গেশ। (ভৈরবের হাত ধরিয়া) কি বাবা! চতুৰ্ব্বর্গ কারে বলে বাবা?
ভৈরব। গঙ্গেশ! ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মোক্ষ এই জীবের চতুৰ্বর্গ-( একে
একে মায়ের হাত দেখাইয়া) এই দেখ, বাবা-মায়ের ডান
দিকের এই নীচের হাত, এই হাত মায়ের বরের হাত। ধর্মের
সিদ্ধি মায়ের বর, এই হাতেই তা ঘটে বাপ! এ হাতে মা কে
বর দেন, তার উপরে আর কাও হাত নাই।
গঙ্গেশ। কারও হাত নাই ?
১১ গদেশ । মা। না- বাবা ! গুরুদেবের হাত আছে। ভৈরব। (দক্ষিণের উৰ্দ্ধ কর দেখাইয়া) ঐ দেখ, বাবা!-সে হাতও ঐ ওঁরই হাত! হাতের উপরে হাত কেবল এ সংসারে এক মাত্র ওঁরই আছে। শিষ্য যখন বড় ভয় পায়, গুরু তখন অভয় দেন, ওঁর হাতের উপরেও তখন সে হাত ওঠে—সে কেবল বাবা! উপরের ঐ হাতের জোরে! তাই জীবের যা কিছু অর্থ পুরুষার্থ পরমার্থ তার সিদ্ধি কেবল মায়ের উগ্ধ হস্তে। আর দেখ, বাবা? বঁ-দিকের উপরের হাতে ঐ যে খগ, ঐ হাতেই মায়ের প্রলয় কাণ্ড! মায়ের খেলার ভাণ্ড-এ ব্রহ্মাণ্ড ঐ হাতেই খণ্ড খণ্ড হয়। যার যেমন কাম, তার তেমনি সিদ্ধি। একই কাম অসুরের নিকটে কুবৃত্তি দুৰ্ব্বত্তি, আবার দেবতার নিকটে স্বপদপ্রবৃত্তি। তাই মা আমার, ঐ এক খঙ্গেই কামের দুই বৃত্তিরই ব্যবস্থা করেছেন। কুবৃত্তি কামের ফলে দৈত্যকুলে মহাপ্রলয়, আবার সুবৃত্তি কামের ফলেই দেবকুলে অভ্যুদয় । বিভীষিকা মায়ের ঐ হাতেই সব পালায়! কারু ঐ হাতেই ভয় বাড়ে, কাৰু, ঐ হাতেই ভয় ছাড়ে! দেখলে বাবা! যেমন আজ তােমার ঘটল !!-ভয়ের কামনা, অভয়ের কামনা, দুইই একেবারে সিদ্ধ হল। গঙ্গেশ। বাবা! ভয়ের কামনা, অভয়ের কামনা, এ বই কি আর'- কামনা নাই ? ভৈরব। আর কি কামনা থাকে বাপ! গঙ্গেশ। কেন বাবা! অভয়ার কামনা ? ভৈরব। (সহাস্যে) সে কামনা যার ফলে বাপ। তার ফল ও হাতে নয়। গঙ্গেশ। কোন্ হাতে বাবা? ভৈরব। মায়ের বাঁ-দিকের ঐ নীচের হাতে ঐ সে ফল ঝুলছে দেখ। গঙ্গেশ। ঐ টাই কি সেই—শেষ ফল ? ভৈরব। ঐ টাই শেষ ফল! গঙ্গেশ। আচ্ছা ফল বাবা! ওটা ফল ?-না, প্রতিফল? ।।
সপ্তম দৃশ্য।
ভৈরব। লােকে ওটাকে প্রতিফল বলেই বােকে; কিন্তু বাবা! ঐটাই
জেনে-চরম ফল! প্রতিফল হলেও কিন্তু ওটাতে মায়ের
প্রীতিই ফল ; মায়ের প্রতি প্রীতি হলে জীবেরও ঐ শেষ ফল !!
গঙ্গেশ। তা বাবা! মা অমন করে হাতে ঝুলিয়ে রেখেছেন কেন?
ভৈরব। দেখলে আর কেউ-ও ফল চাৰে না বলে!
গঙ্গেশ। দেখেও যদি কেউ চায় ?
ভৈরৰ। যে চায়, সে পায় ; যে পায়, সে আর পায় নয়, অমনি গিয়ে হাতে
ওঠে-তাইত বাবা ! হাতে ধরে অমন করে সােহাগ করা!
এই জন্যই ত ব’লছি-মায়ের প্রীতিই ওর চরম ফল, ঐ ফলেই
জীবের মাে ফলে !!
গঙ্গেল। ও বাবা! মােক ফলে ! মােদা ফলে না?
অমন মােক্ষে ফল নাই আমার মােদাকে ভুলে ;
ওর প্রতি ফলে প্রতিফল তাই ফল ছেড়ে রই ফুলে।
তা যার ফলে তার ফলুক বাবা! আমি ত ওর একটাও চাই না ?
( মায়ের দিকে চাহিয়া)।
আমি ত তা আগেই বলেছি মা! •
ফলে আমার কাজ নাই মা! ফুলেই আমি ভুলে রই।
স্থান দে ঐ চরণকমলে; মধুপানে মত্ত হই!!
( চরণতলে পতন )
(ভৈরবের প্রতি) এই দেখলে?—তখনই আমি বলেছিলাম।
ভৈরব। আমিও ত তা বুঝেছিলাম। তা-শ্রীমুখের আজ্ঞা কি কখনও
মিথ্যা হয় ?
এখন তুমি আজ্ঞা দিলেই যে আমি পালাই।
ভৈরব। আজ্ঞা—পেলেই আজ্ঞা দেই।
আজ্ঞা দেব কি? ওযে, আবার পায়ে গড়িয়ে পড়ল।
ভৈরব। (সহাস্যে) ঈ বেলা আর ছাড়াতে পার না? না!
মা।
তা কি আর নিজের বুকে হাত দিয়ে বােঝ না ?
মা।.
ভৈরব। না-আমার আর তাতে ক্ষতি বই বৃদ্ধি নাই! গঙ্গেশকে শীঘ্র শী ডেকে তুলে বাড়ী পাঠাই। (সহাস্যে) এইবার বুঝি-নিজের ভাণ্ডারে হাত পড়েছে ? ভৈরব। না-মা!-না, সত্য বলছি—ও বেটাকে আমি পায়ের তলায় পড়ে থাকতে দিচ্ছি না! ওটা আমি কাৰু একেবারেই সইতে পারি না! মা। মা। তবে এখনও দেখ!-আপন ভাল চাও যদি, তবে শীঘ্র গঙ্গেশকে ডেকে তেল ! ভৈরব। এই ডাকি। গঙ্গেশ-গঙ্গেশ! ( গায়ে ঝাঁকি। গঙ্গেশ। (উঠিয়া মায়ের চরণতলে উপবেশন ) ভৈরব। হারে গঙ্গেশ! ফল চানে ত তুই কি খেয়ে বাঁচবি ? গঙ্গেশ। (ভৈরবের প্রতি মুখ ফিরাইয়া) আমার যে ফল আছে বাবা! তা তুমিও কথন পাও নাই! (ঝাপিয়া মায়ের কোলে উঠিয়া দুই হাতে মায়ের দুই স্তন ধরিয়া) এই দেখ—আমার দুই ফল! চার ফলের আমি ধার ধারি না। (অতি ব্যগ্রভাবে স্তন্যপান)। (গঙ্গেশকে জড়াইয়া ধরিয়া) বাপরে! ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর, আমার এই ফলের প্রসাদপ্রার্থী, কিন্তু প্রাপ্তি কাও ঘটে কি না। তুই আজ মানবকুলে জীব হয়েও সেই শিব-মৌভাগ্য অতিক্রম ক’বুলি, ধন্য বাবা ! তােৰ সাধনার বল ! ধন্যরে তােৰ গুরুবল !! ভৈরব। (উচ্চস্বরে ) আর-ধন্ত দীনদয়াময়ি!—ধন্ত তােমার করুণার বল। গঙ্গেশ। মা! ব্ৰহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর যে, স্বয়ং ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ; আর আমি যে মা। তোৰু অনাথ অসহায় পথের কাঙ্গাল মা-হারা ছেলে!! মা। ( স্বহস্তে গঙ্গেশের মুখ তুলিয়া) বাবা! আমার এ সােহাগ পেতে হলে ব্ৰহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরকেও এমনি করে, ধূলায় গড়াগড়ি দিয়ে পথের কাঙ্গাল সাজতে হয় ; নইলে কি আর বাবা! আমার সাধক দীনহীন হয়ে পথে পথে কেঁদে বেড়ায়? একবার নয় - দুবার নয়, তুইও বাবা ! শত শত বার সেই পথের কাঙ্গাল হয়ে সপ্তম দৃশ্য। ১১৭ দিনরাত্রি পথে পথে-মা-মা!” বলে কেঁদে বেড়িয়েছিস, সেই ফলেই ত এ দুই ফল আজ তাের ভাগ্যে ঘটল !! এখন আর কি চাস বল বাবা! আমায় শীঘ্র শীঘ্র যেতে হবে; ঐ দেখ, রাত্রি প্রভাত হয়ে এল! এ পর তুই আর আমাকে দেখতে পাবি না, যা চা’স বাবা! এই বেলা তা বলে নে !! গঙ্গেশ। কেন মা?-দিনের আলোতে সব দেখা যায়, আর তােকই কেন দেখা যায় না । বাবা! যে আলােতে সব দেখা যায়, সে আলােতে আমাকে . দেখা যায় না;--যে আলােতে আমাকে দেখা যায়, সে আলােতেও সব দেখা যায় না। সে আলােতে আমিই কেবল একমাত্র আমি থাকি, আর-“দুই বলতে কিছু থাকে না, সবই আমাতে ডুবে যায় !! গঙ্গেশ। ওমা! এই জন্যেই বুঝি—অমাবস্যার মহানিশায় সকল লােক ঘুমিয়ে গেলে তুই তখন একা আসি? মা ! তখন বুঝি তাের ঘুম ভাঙ্গে?-তাই.তখন তুই জেগে উঠি। হ্যা বাবা!-হা! তাই ঠিক! হরৈ গঙ্গেশ। আর কি চা’স বল বাবা! আমি এই এখনই পালাব । গঙ্গেশ। (অভিমান দৃষ্টিতে) হঁা মা! তুমি পালিয়ে যাবে? আমি তােমার পায়ে পড়ে মাথা কুটব। ভৈরব। গঙ্গেশ। ঠিক। ঠিক! ঐ-মন্ত্র ! ( সবিস্ময়ে স্বগত) হায়! হায়! হায়! আমি ক’বলেম কি ?—একেই রক্ষা নাই, তায় আবার ধরিয়ে দিলাম। মা। ঐ জন্যেই ত বলেছিলাম-দেবার সময়ে ত আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না? ভৈরব। তুমি যে সব ভুলিয়ে দেও, তা ত আর বােঝ না। -না! এইবার মনে করে দিচ্ছি। ওর আর যা বাকি আছে, তা শীঘ্র শীঘ্র সেরে দেও! আমি এখনই চলে যাব। গঙ্গেশ। (কঁদিতে কাদিতে) আমি তাহলে বাবার পায়ে পড়ে কাঁদব ! D ঠিক! মা।
১১৮ ( শশব্যস্তে ও সভয়ে গঙ্গেশের হাত ধরিয়া) না বাবা! তুই রক্ষা কর! এও বরং ভাল ছিল, বরং ভাল ছিল, তা হলে আর আমার অব্যাহতি নাই! নিজের যা ইচ্ছা করতে পারি, কিন্তু গুরুকে দেখে ভয়ে মরি!! না বাবা গঙ্গেশ! কি চাস বল।আর কি কিছু চাওয়ার আছে ? গঙ্গেশ। তোমার কি আর কিছু দেওয়ার আছে মা। মা। বাবা! জীব ত কোন দূরের কথা, শিবের সৌভাগ্যের উপরে উঠেছ। আর ত কিছু দেবার নাই । এখন বাবা! বাড়ী যাও।আমি আমার স্থানে যাই। গঙ্গেশ। ও মা! সে যে এখান হতে অনেক দুর! আমি একা যাব, কি করে? মা। ( সহাস্যে) বাবা। আবার সময় একা এয়েছিলে কি করে ? গঙ্গেশ। মা! তখন যে আমি মা-হারা ছেলে ছিলাম, এখন যে আমি মায়ের ছেলে হয়েছি। যখন আমার সে মা ছিল, তখন ত মা । মা আমাকে কখন একা যেতে দেয় নাই ! তুই মা! আজ কোন্ প্রাণ ধ'রে এ প্রান্ধুরে আমায় একা ফেলে চলে যাবি? হ্যা মা!-তুই কেমন মা?-মা! ভয় কি বাবা! গুরুদেব তােমার সঙ্গে গিয়ে রেখে আবেন। ভৈরব। গঙ্গেশ! আর কেন আমি সঙ্গে যাব? আমার যতদূর পৌছিয়ে দেবার, তা ত আমি দিয়েছি, এখন ওঁর যেখানে ইচ্চা কোলের ছেলে কোলে করে আপন ইচ্ছায় চলে যান। মা। হরে গঙ্গেশ! তাের গুরুদেব যে কি বলেন? ওঁর সঙ্গে যাবি?-না-আমার সঙ্গে যাবি? গঙ্গেশ। মা ! উনি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন, আমি তােমার কোলে চড়ে যাব। ভৈরব। এ-বেটা যেন রাজকুমার !! গঙ্গেশ। ও বাবা! ছি!-ও কি বললে? তুমি আমায় রাজরাজেশ্বরীর কুমার না ব'লে, রাজকুমার কেন বলে ? ম।
সপ্তম দৃশ্য।
১১৯
ভৈরব। আমি আর একবার বলে কি ক’ৰ গঙ্গেশ! সে কথা তাের পক্ষে
লক্ষবার !!!
(ভৈরবের মুখের দিকে চাহিয়া ) চল—ভৈরব ! যেতে হবে,
আমার ছেলের আব্দার !!
ভৈরব। ছেলেরও আব্দার, মায়েরও সােহাগ!
মা।
তােমারই বা কম কি ?
চল!-চল!-গুরুদেব হয়েছ, আগে
আগে পথ দেখাও।
ভৈরব। হাঁ মা! তা ঠিক। এ এ কলিযুগের গুরুদক্ষিণা এইরূপই
ঘটে থাকে ! এস মা!—এস ! ছেলের মামা-বাড়ী তােমায়
দেখিয়ে নিয়ে আসি! (ভৈরবের গমন)।
চল গঙ্গেশ!—চল!-(গঙ্গেশকে কোলে তুলিয়া ভৈরবের
সঙ্গে সঙ্গে মায়ের প্রস্থান)
অষ্টম
দৃশ্য।
প্রস্তর পথে অগ্রবর্তী ভৈরব---
পশ্চাতে গঙ্গেশকে কোলে করিয়া মা।
ভৈরব। ( যাইতে যাইতে) হাঁরে গঙ্গেশ! আজ বড় সােহাগটা বেড়েছে।
নামতে আর ইচ্ছা হচ্ছে না-না ?
গঙ্গেশ। তা বাবা! উঠলে তােমারও নামতে ইচ্ছা হত না। একবার
একবার নামতে ইচ্ছা হচ্ছে কেবল মায়ের চরণতল চেয়ে।
ভৈরব। না বাবা! রক্ষা কর! তােমার নেমে কাষ নাই! তুমি
কোলের ধন কোলেই থাক ।
গঙ্গেশ। তবে আমি এই নামূলেম।
ভৈরব। ওরে! নারে না, এখনও অনেকদুর আছে, হেঁটে
যেতে
পাবি না।
মা।
ভৈরব ! তােমার সােহাগও ত কম নয়?
ভৈরব। কি ক’ব মা! নিজে হাতে তুলে দিয়েছি, এখন নামাই কি
করে? (গঙ্গেশের প্রতি) হা গদেশ! আমার কোলে
আসবি রে !
গঙ্গেশ। কেন? চরণে কি আর স্থান নাই?
ভৈরব। আমার কাছে এলেই বেটার যত ভাবের ফুৰ্ত্তি ওঠে।
গঙ্গেশ। কি ক’ব বাবা! ত্রিশূল দেখে যে ভয় করে।
ভৈরব। খাড়া-ধরা হাতখানা ঐ মাথার উপর দুলছে, তা দেখে তাের
ভয় হয় না, ভয় হয়—কেবল আমার ত্রিশূল দেখে!
গঙ্গেশ। ও বাবা! খাড়া যে আমার মায়ের হাতে।
ভৈরব। আচ্ছা ! আচ্ছা! তা বুঝেছি! খুব মা পেয়েছি।
গঙ্গেশ। তুমি যেমন দিয়েছ !
ভৈরব। সে বেলায় মায়ে পােয় দুজনেরই এক সুর! মা। তুমি যে নিজে সুরেশ্বর। ভৈরব। সে কথা থাক মা ! আর কথা কইবার সময় নাই, সম্মুখে ঐ গঙ্গেশের মামার বাড়ী, রাত্রিও প্রায় শেষ হয়ে এল! গঙ্গেশ। ছি বাবা! আগে জালে তােমাকে আমি আগে যেতে দিতাম না, এ মধ্যেই তােমার এত পথ সব ফুরিয়ে গেল? ভৈরব। গঙ্গেশ রে! কোলে চড়ে থাকলে অনিই বােধ হয় ! গঙ্গেশ। তা বাবা। যদি তােমার এত পরিশ্রমই হয়ে থাকে, তকে একটু ব’সই না কেন? ভৈরব। হঁা! . তা হলেই চূড়ান্তটা হয়। প্রাতঃকালে তােমার মামা মামীর সঙ্গে দেখা করে একবেলা থেকে খেয়ে দেয়ে গেলেই ভাল হয়না? গঙ্গে। না বাবা?-না, যা খাবার তা আমিই খেয়েছি, প্রাণ থাকতে আমি কখন সে বাড়ীতে তােমাদের খেতে বলতে পারব না। (গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া) বাবা ! আর কেন তবে? এই ত মামার বাড়ীতে এলে, এখন আমাকে বিদায় দাও। গঙ্গেশ। ( কঁদিতে দিতে কোল হইতে ঝাঁপিয়া মাটীতে পড়িয়া মায়ের চরণ ধরিয়া) মা! আমাকে একা রেখে চলে যাবি? আজ মা! আবার আমি মা-হারা হব ? মা! সঙ্গে যদি নিয়ে যাবি, তবে আজ কেন দেখা দিলি? ম! দুঃখে ত আমার দুঃখ ছিল না! দুঃখ ত মা ! তারই হয়, সুখের মুখ যে দেখে। আমি অগ্নির কীট অগ্নিতেই ছিলাম, আজ কেন মা ! জলে ফেললি? ফেললি জলে, না হয় জলেই ডুবিয়ে রাখ, তা না, আবার আছাড় দিয়ে তৃপ্তবালির আছাড় দিয়ে তপ্তবালির উপরে ফেলে আজ এখন মা! কোথা পালা? এতদিন অগ্নির তাপ সুখে সহ করেছি, আজ যে মা। আর রৌদ্রতপ্ত বালির তাপও সহ হবে না। শ্রীচরণ-কমল-দলের সুশীতল ছায়া ছেড়ে আজ যে মা! আমার বুক ফেটে যাবে ! মাগাে ! এই কি মা?
১২২ ; তাের ভালবাসা ? এই কি মা ! তাের কোলে করে সােহাগ করা ? এই কি মা ! তাে মা-হারা সন্তানের প্রতি দয়া মা? হ মা! আমি কি এনি হতভাগা যে, যে মা আমার মা হয়, সেই মাই এনি করে পালায়? হ মা ! এতদিন আমার এ মাসে মা ছিল, আজ যে আমার তাও গেল! আজ যে তুই বই আর আমার মা নাই মা! তুই ফেলে গেলে আজ আমি দাড়াই কোথায় ?—ডাকি করে ? মা! আমার আর কেউ নাই মা !! মা। ( দুই হাতে গঙ্গেশকে তুলিয়া স্বহস্তে গঙ্গেশের অশ্রুমােচন করিতে করিতে) কঁদি না বাপ! যার কেউ নাই, তার আমি আছি ; যার কেউ আছে, তার আমি নাই; এই বুঝে “কেউ নাই” বলে যদি দুঃখ করতে হয় ত দুঃখ কর, যদি আহলাদ করতে হয় ত আহলাদ কর । গঙ্গেশ। (মায়ের দুটি হাত ধরিয়া) কেউ নাই যার, তুমি আছ তার, এ চেয়ে আর আহলাদের কথা কি ! কিন্তু যার কেউ নাই আর তুমিও নাই, তার দুঃখ কত বড় মা? কেন বাবা ! আমি ত আছি ! গঙ্গেশ। তা ত মা! এতকালও ছিলে, পরেও থাকবে। আমি যদি দেখতেই না পেলাম,-মা বলে ডাকতেই না পেলাম, “তকে তােমার থাকা, আর না থাকা, আমার পক্ষে ত দুইই সমান ? মা। কেন বাবা! তুমি মা বলে ডাকলেই আমি এসে দেখা দেব। গঙ্গেশ। মা! তুমি চলে গেলে, তােমাকে দেখতে না পেলেই আমার তখন রাগ হবে, আমি তখন ডাক্ব কি করে? মা। আচ্ছা, বাবা !. তুই ডাকতে না পারি, গুরুদেবকে গিয়ে । বলি ! ভৈরব। ", হ! এ সরকারী মুটে ত ভৈরবঘাটেই বসে আছে, যাবার সময় খুব করে শিখিয়ে দিয়ে যাও ! ও-বেটাদের দীক্ষা দিয়ে গুরুর অব্যাহতি নাই, সাধনায় অব্যাহতি নাই, সিদ্ধির পরেও অষ্টম দৃশ্য । না। অব্যাহতি নাই। গুরুগিরি না-বকুমারি ! এমন হকুমজারিও করেছ মা! কবে কোষ্টা কোথায় মল-কোথায় পল- ভা’নে বলতে বয়ে গেল, বঁয়ে বলতে ডানে এল, কখন কোটার কি ঘটল, একেই ত এই ভাবনাতেই দিনরাত্রি ঘুম নাই, তার পর আবার হুকুম—“যখন না পারিস গুরুকে ডাকি!” সে সব হবে না রে গঙ্গেশ! যা করতে হয়, এই বেলা করে নে। ভালা ভৈরব ! ভাল ভাল । ভৈরব । তােমার ভাল ! ভাল বই কি? অামার যে প্রাণ ঝাল- পাকা তা বােঝে কে ?—দিনরাত্রি পাল পাল ডাক ছাড়ছি, তবুও ত অব্যাহতি নাই। ( সহাস্যে) এমন শিষ্য আর দুটি একটি যুটুলে তােমাকে দেখছি ভৈরবঘাট ছাড়াবে। ভৈরব। কি জানি মা ! গুরুদক্ষিণা কত দূরে গড়াবে, তা তুমিই জান! কত লােকে গুরু হয়ে কত দক্ষিণা পায়, আর আমি কেবল একাল সেকাল দক্ষিণাই দিতে আছি ! গঙ্গেশ। বাবা! দক্ষিণা বুঝি তুমিই নেবে? আমাদের কি? দক্ষিণ ত তােমারই হাতে, তুমি আর তা নেবে কি? ভৈরব। আমি না হয় না-ই নিলাম, তারা নিলেও যে নিস্তার পাই। তাও ত বেটার! নিতে পারিস না। গঙ্গেশ। ( কৃতাঞ্জলিপুটে ) যতটুকু দিয়েছ বাবা! তার উপরে ত আর অধিকার নাই। ভৈরব। ওরে ! নারে না, যতটুকু দিয়েছি গঙ্গেশ! তার উপরেও অধিক—আর নাই । মা। গঙ্গেশ! বাপ! এখন কথা রাখ! রাত্রি শেষ হয়েছে, ঐ দেখ— পূৰ্বদিক আলো হয়ে উঠছে। গঙ্গেশ। (মায়ের দুখানি হাত ধরিয়া ) মা! আমার যে, সকল দিক আঁধার হয়ে আসছে! মা! ভুবনন্ধকারহর চন্দ্রচূড়-হৃদয়চন্দ্রমা মা তুমি, তবে রইল ১২৪ গদেশ। মা। হৃদয়ান্ধকার বহিরন্ধকার আজ আমার সকল অন্ধকার ঘুচে গিয়েছে, মা! তুমি অন্তর্হিত হতে না হতে সে অন্ধকারে আবার আমাকে এখনই বুঝি ঘিরে ধরে মা! ভয় নাই বাবা! বাহিরে আমি না থাকলেও হৃদয়ে তােমার স্থির রইলাম, যখন আমাকে ধ্যান কবে, ধ্যান করবে, তখনই বাপ! দেখতে পাবে। গঙ্গেশ। ( মায়ের দুটি হাত ধরিয়া) সত্য বলছি মা। ভৈরব। হারে পাগলা! করিস্ কি?-সত্যসনাতনীকে সত্য ক’রস? গঙ্গেশ। এই না বাবা! তুমিই বল্লে –“সে সব কিছু হবে না, যা করতে হয় তা এই বেলা করে নে।” ভৈরব। তাই বুঝি ঐ সত্য কােচ্ছ মাকে ? গঙ্গেশ। আচ্ছা; তবে থাক; না, মা! তা তােমার ব'লে কাজ নাই, আমি একবার চোক্ বুজে দেখি—সত্য সত্যই তােমাকে পাওয়া যায় কি না ? (চক্ষুর্মুদ্রণ ও ধ্যান) ভৈরব। (সহাস্যে) এইত শীঘ্র শীঘ্র যাওয়ার ব্যবস্থাটা হ’ল দেখছি। মা। ( সহাস্যে । তুমিই ত এ গােলটা বাধালে! আমি না হয় একবার সত্য করেই ৰাম ! ভৈরব। একবার কেন ? তােমার ত মা ! সহস্রবার সত্য ফ’রতেও আপত্তি হয় না! সত্য যখন উটিয়ে যায়, তখন কিন্তু মিথ্যাবাদী হতে হয়-কথায় কথায় আমাকে!! মা। ( সহাস্যে) তা--মধ্যস্থ থাকার ফলই এই। ভৈরব। মধ্যস্থ না থেকে কি করব? তােমার আদিও নাই, অন্তও নাই, অনাদি অনন্ত স্বরুপ, থাকার মধ্যে আছে কেবল এক মধ্য ; যে এ সংসারে থাকবে, সেই মধ্যস্থ থাকতে বাধ্য !! থাক, এখন সে কথা থাক, গঙ্গেশকে শীঘ্র ঘ্ৰ বিদায় দাও মা! সত্য সত্যই বলেছ ভৈরব! বিদায় ত নয়, এ এক বিলক্ষণ দায়। দেখি-একবার ডেকে দেখি!—গঙ্গেশ !-গঙ্গেশ ।- মা।
মা।
অষ্টম দৃশ্য।
ভৈরব। (স্বগত) ই! ওর দায় পড়েছে কথা কইতে ।
ভৈরব! ব্যাপার ত ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠল, অন্তরে ও যে ভাবে
আমায় টানছে, এই দেখ আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে। তুমি শীঘ্র
ও ধ্যান ভেঙ্গে দেও। আর বিলম্ব করো না।
ভৈরব। তুমি কেন ওর অন্তরের রূপ সম্বরণ কর না মা!
হায়! হায়! সে যে কি দায়, তা যে মায়ের প্রাণ বই আর কেউ
বােঝে না রে। আমি কেমন কাম কাঁদিয়ে বাছকে মূর্মিত
করে ফেলব? দেখি—আমিও অন্তরের রূপ সম্বরণ করি, তুমিও
শীঘ্র ডেকে তােল। তােমার মুর্তি সম্মুখে দেখলে আমার অভাবেও
ও বিচলিত হবে না। (একটু দূরে অবস্থিতি )
তৈরব! গঙ্গেশ-গঙ্গেশ ।-
গঙ্গেশ। (সুপ্তোখিতের ন্যায় সচকিতে চাহিয়া ) কৈ? বাবা! আমার
মা কোথায় ?
ভৈরব। কেন বাবা! অন্তরে কি দেখতে পাও নাই?
গঙ্গেশ। দেখছিলাম ত বাবা! দেখতে দেখতে মা যে আমার বিদ্যুতের মত
ছুটে পালাল।
ভৈরব। (মায়ের দিকে তজ্জনী নির্দেশ করিয়া) ঐ দেখ দেখি—সেই
তিনিই কি ?
গঙ্গেশ। ( ছুটে গিয়া মায়ের হাত ধরিয়া) হ্যা মা! পালাচ্ছিলে?
(গঙ্গেশের মুখ ধরিয়া) না বাবা!-না ! তােমায় না বলে
পালাতাম না! কেমন ?—তুমি চোক বুজে ত আমায় দেখতে
পেলে?
গঙ্গেশ। হা মা! তা ত পেয়েছি, তা তুমি অমন করে ছুটে পালালে
কেন মা?
কি করব বাবা! নইলে যে তুমি চোক মেলে আর আমার
দিকেও ফিরে চাও না!
গঙ্গেশ। তথন ত এমন করে পালাবি না মা?
১২৬ গঙ্গেশ । মা । বাবা! তুমি যতক্ষণ ছেড়ে ন'দেবে ততক্ষণ আর পালাতে পাব না। আর কতক্ষণেরই বা ছাড়াছাড়ি বাবা! আমি শীঘ্রই তােমায় নিয়ে যাব! আরও আমার অনেক ছেলে আছে, গণেশ ! তুমি, কয়েক দিন পৃথিবীতে থেকে তাদিগকে আমার পথ দেখিয়ে দিয়ে এস! এইত হ’ল বাবা! ছেড়ে দেও, এখন আমি আসি। ভৈরব। হারে গঙ্গেশ! এত কথা জিজ্ঞাসা কলি, তােৰু সে মার কথা ত একবারও জি কলি না ? মা। (তীব্র দৃষ্টিতে ভৈরবের দিকে চাহিয়া) এই নাও! • আবার, আরম্ভ করূলে ! ভৈরব। তুমিই বা কোন্ উপসংহার ক’রূলে মা ! যা যা করতে হবে, তুমিই একেবারে সব বলে দাও না! গঙ্গেশ। ও বাবা! আর কি আমার সে মা আছে ? আজ যে সে মায় শ্যামায় এক হয়েছে, আমার এ মার মাঝে (তর্জনী নির্দেশ করিয়া ) সে মা ঐ যে থেকে থেকে উকি দিচ্ছে । ভৈরব। (গঙ্গেশের প্রতি জনান্তিকে) তাের ঐ মায়ের মাঝে আরও অনেক মা আছে রে গঙ্গেশ! দেখতে চাস ত এই সময় যায় ! ( ইঙ্গিতে দুই হস্তে দশ অঙ্গুলী প্রদর্শন ) গঙ্গেশ। ( মায়ের দুটি হাত ধরিয়া) ও মা! বাবা ব’ছে—তােমার মধ্যে আরও নাকি অনেক মা আছে ? ভৈরব। আঃ-আভাগের বেটা ! ( সহাস্যে) কেন ? তুই কি সে সব দেখতে চা’দ ? গঙ্গেশ। হ্যা মা! দেখা না-একবার ! ( সহাস্যে ভৈরবের প্রতি চাহিয়া ) গুরু যদি কারু হয়, তবে যেন . এমনিই হয়! হাঁ ভৈরব! এটা যে ক্রমদীক্ষা, এ ত তােমার কায, । আমি কেন ? ভৈরব। দীক্ষা যদি দীক্ষা হয়, তবে মা! দীক্ষার পর আর দীক্ষা নাই । ক্রমদীক্ষা নয় মা!-ওটা কেবল ক্রমভিক্ষা। আমি ত মা! নিজে
অষ্টম দৃশ্য।
১২৭
ভিক্ষুক, অন্নপূর্ণ। নিজে না এলে সে ভিক্ষা দেয় কে ? তাই মা !
ও আমার কাষ নয়, তােমারই কায।
( গঙ্গেশের প্রতি) কোন্ কোন্ মা দেবে বাবা!
গঙ্গেশ। মা! তোমার বাবার যজ্ঞে যেতে আমার বাবাকে যে সব মা
দেখিয়েছিলে, সেই গুলি একবার দেখাও না মা।
মা ।
গঙ্গেশ ! এই তবে দেখ আমার ব্রহ্মবিভূতি-বিদ্যা-রূপ !
উর্ধে অষ্টদিকে তারা প্রভৃতি অষ্ট মহাবিদ্যার এবং
শূন্য কক্ষে কমলাত্মিকার আবির্ভাব )
মা।
( ক্রমশঃ উর্ধে তজ্জনী নির্দেশ করিয়া )
গঙ্গেশ!
ঐ দেখ—ঐ অগ্নিকোণে ঐ আমার সেই তারামূৰ্ত্তি ।
'ঐ দেখ দক্ষিণে আমার ঘােড়শী-স্বরূপ-ঘূৰ্ত্তি ।
নৈঋত কোণে চেয়ে দেখ—এই আমি ভুবনেশ্বরী।
পশ্চিমে ঐ দেখ—আমি ভৈরবী ভবসুন্দরী।
বায়ুকোণে এই আমি ছিন্নমস্তা ভয়ঙ্করী।
ভয় নাই বাপ! সে ছিন্নমস্তক আমিই দেখ হাতে ধরি।
উত্তরে ঐ ধূমাবতী বিধবারূপ-ধারিণী ।
ঈশানে বগলা আমি শকুল-সংস্তম্ভিনী ।
পূর্বদিকে মাতঙ্গী ঐ আমারই নবমী কলা।
শূন্যকক্ষে দশমীরূপ ঐ দেখ ব’সে কমলা ।
আর এই,-সবর্বরূপের আদ্যা আমি সেই অনাদ্যা মহাবিদ্যা।
বহু জন্মের আরাধ্যা তাের হয়েছি সাধনে সাধ্যা।
অন্যে পরে কা কথা আর ? সদাশিবের দুরারাধ্যা।
তবু বাপ। মা-নামের পাশে তুই আমায় করেছি বাধ্য।
গঙ্গেশ।
অজ-এই আমি তো সেই মা শ্যামা ব’সেছি তােয় কোলে করে।
ভৈরব।
(তর্জনী নির্দেশ করিয়া গঙ্গেশের প্রতি)
ত্রিনয়নের নয়নের ধন দেখরে বাপ! আজ নয়ন ভরে।
গঙ্গেশ। উর্ধে ( দশদিগন্তে চাহিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে)
আমরি! মরি! মাগাে আমার! যেদিকে চাই সেই দিকেই মা ।
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে নানারূপে আমারই মা।
এই-দেখছি দেছি শ্যামাঙ্গিনী, হ’চ্ছ। আবার হেমাঙ্গিনী।
এই দেখছি মা রক্তবস্ত্রা, অমনি দেখি উলাঙ্গিনী।
এই যে মা ! তাের বেণীবন্ধ, আবার দেখি মুক্তকেশে।
এই দেখি কুটীভঙ্গী, আবার দেখি আছ। হেসে।
এই দেখি মা ! তীক্ষ্ণ অসি শােভিছে বাম কনােপরে।
এই দেখি মা ! জপের মালা ঘুছে ঐ দক্ষিণ করে ।
এই দেখি মা। সিংহাসনে, আবার দেখি পদ্মাসনে।
আবার দেখি ঘোর শশ্মশানে নাচছ ! শব-শিবাসনে।
এই দেখি কিশােরী মাগাে ! হ’চ্ছ। আবার যােড়শী।
অমনি ভীমা ধূমাবতী, অমনি রমা রূপসী ॥
এই দেখি মা ! দৈত্যের জিহ্বা ধরেছ ঐ বাম করে।
আবার দেখি দক্ষিণ হস্তে অভয় দিচ্ছ! অমরে।
এই দেখি মেতেছ মাগাে ! শত্রুর সনে সমরে।
আবার দেখি পুত্রস্নেহে ঝ’রূছে দুধ, ঐ পয়ােধরে।
এই দেখি মা ত্রিনয়নে চন্দ্র সূৰ্য্য অগ্নি জ্বলে।
আবার দেখি সেই নয়নে করুণা কটাক্ষ গলে।
এই দেখি রাজরাজেশ্বরী ঐশ্বর্যের তাের নাই মা! সীমা।
তােৰু-আসন তলে স্থান পেয়ে শিব ব্রহ্মা বিষ্ণুর হয় গরিমা।
অষ্টম
দৃশ্য।
১২৯
আবার দেখি সেই মা তুমি ঘাের শ্মশানে একাকিনী।
কোন্ ছেলের কোথায় কি হ’ল, ধাচ্ছ! যেন উন্মাদিনী।
এমন মা নইলে কি মাগাে ! গঙ্গেশ তােকে মা বলে ?
সুধু কেবল গঙ্গেশ নয় মা! গঙ্গাধর ঐ পদতলে ।
আবার,-চরণ-নখরে মাগাে ! কত চন্দ্র বিরাজ করে।
একবার,চরণ তুলে দে মা ! পদে কত শিব চন্দ্র ধরে !!
( মায়ের বিভূতি-রূপ সম্বরণ)
গঙ্গেশ। (মায়ের নিকটে আসিয়া )
এই না আবার সেই আমার মা, এই না আমার শ্যামা মা !
( মায়ের দিকে চাহিয়া ) হামা!
এই কি সব ফুরিয়ে গেল ? আর কি তােমার রূপ নাই মা ?
ভৈরব। হরে অবােধ ! বলিস কি রে ?
মা।
রূপ গুণের অতীতা আমি, তবু’রূপ মাের ভুবন-ময়।
যার যেরূপ সাধনা, আমার তার কাছে সেই রূপের উদয়।
তবুও বাপ্ ! তাের, বিশেষ করে দিচ্ছি আবার আজ এই বলে।
যত দেবি, মায়ের স্বরূপ স্বর্গ পাতাল ভূমণ্ডলে ।
এ মা, সে মা, যত দেখিস, সকল মা ই সেই আমি মা।
যাকে দেখবি ভাবি আমায়, জানি আমি ই হই রে সে মা।
গঙ্গেশ! বাপ! তবে এখন আমি আসি! যাও!-তুমি তোমার
মামী-মার কাছে যাও!-দেখে বাবা ! সে মাও আমি
(মায়ের অন্তর্ধান) (মায়ের লক্ষ্যে ভৈরবের প্রণাম)
গঙ্গেশ। হায়! মা আমার কোথা গেলি! মাগাে!-আমার আর মা নাই ।
( পতন ও মূচ্ছ।)
.
গঙ্গেশ। ভৈরব। (দ্রুতপদে গঙ্গেশের নিকটে গিয়া মস্তকে চরণ স্পর্শ ) গঙ্গেশ। (জাগিয়া উঠিয়া ) তাইত বলি-আর কেন মায়ের কথা মনে পড়ে না?—আর কেন মায়ের কথা প্রাণে জাগে না? বাবা! মার জন্যে আমি একটুও কঁদব না, তুমি আমার কাছে থাক। ভৈরব। (স্বগত) এই নাও! বেটা এইবার সেরেছে! বেটা ত পালিয়ে বাঁচল, আমি এখন কি করি? ও মামার কাছে ধরে না নিয়ে যায়, তা হলে যে রক্ষা পাই ! (প্রকাশ্যে ) গঙ্গেশ! আমি যেখানেই কেন না থাকি বাপ! জেনাে-তােমার কাছেই আছি। গঙ্গেশ! আর কি তােমার বাকি রইল বাপ! ব্রহ্মা বিষ্ণু মহে- শ্বরের ভাগ্যে কখন যা ঘটে না, আজ বাবা! তােমার ভাগ্যে তাই ঘটুল, এর উপরে আর কি বল? যত যত জন্মান্তরে তােমার যত সাধনা সঞ্চয় হয়েছে, তার প্রতি বারের সকল গুরুই জেনে গঙ্গেশ! আমারই মূর্তি! এ কাল সে কাল চিরকাল বাপ! আমি মহাকাল তােমাকে কোলে করেই বসে আছি। এইবার যার ছেলে তার কোলে দিয়ে আমি অবসর পেলাম!-তােমার কল্যাণে মাকে দেখে আমিও বাপ আজ ধন্য হলেম !! যাও-গঙ্গেশ! বাড়ীতে যাও!—আমিও এখন চললাম- ! গঙ্গেশ! । ইহলােকে পরলােকে বাপ! তােমার আর কোন ভয় নাই ! এই-ত্রিশূল ধরে তােমার তরে সঙ্গে সঙ্গে ফিরব সদাই। আমি বাপ। বিজয়-ভৈরব, আমার বিজয় তােমায় দিয়ে বাজাব মার বিজয় ডঙ্কা এ ত্রিসংসার পূরিয়ে ৷ আসবে যে দিন, শেষের সে দিন, দীনদয়াময়ী নেবেন কোলে। আমিও সে দিন আসব রে বাপ! “জয় মা !” বলে যেয়াে চলে !! গঙ্গেশ! বাপ! তবে আমি আসি এখন। গঙ্গেশ। ( কৃতাঞ্জলিপুটে ) G
অষ্টম দৃশ্য।
১৩১
কর-চরণকৃতং বাক-কায়জং কৰ্ম্মজং বা
শ্রবণ-নয়নজং বা মানসং বাপরাধং।
বিদিতমবিদিতং বা সমেতৎ ক্ষম
জয় জয় করুণাব্ধে দেবদেব প্রসীদ।
( ভূতলে সাষ্টাঙ্গ-প্রণাম, ভৈরবের অন্তর্ধান, প্রণামান্তে
উঠিয়া দুই বাহু ঊর্ধে তুলিয়া তালে তালে
নৃত্য করিতে করিতে )
গুরুব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বরঃ।
গুরু রেব পরং পূজ্যো নাস্তি পূজ্যো গুরােঃ পরঃ।
অভীষ্ট-দেবে রুষ্টে চ রক্ষণে সক্ষমাে গুরু।
ন সমর্থ গুরৌ রুষ্টে রক্ষণে সর্বদেবতাঃ ।
( গান ১৮)।
জয় জয় জয়, জয় বিজয়-ভৈরব ভব শন্তো ।
জয় শন্তো শিব শঙ্কর,শিব শন্তো শিব শন্তো !!
জয় বিশ্বেশ্বর নিঃস্বেশ্বর সর্বেশ্বর শন্তো !
জয় গঙ্গাধর শঙ্কাহর গৌরীবর শন্তো !!
জয় খণ্ডিতবিধু-মণ্ডিতজট দিকপটধর শন্তো !
জয় তাণ্ডবনট-পণ্ডিত ভটদণ্ডিত-যম শন্তো !!
জয় সর্বাগম-নিগমযন্ত্র-মন্ত্ৰাকর শন্তো।
জয় দক্ষান্ধক-কামাক লােকান্তক শন্তো !!
জয় সর্ববিজয় সর্বজয়
মৃত্যুঞ্জয় শন্তো ।
জয় জয়, শিবচন্দ্র-পরম-মদ-গুরু-শন্তো !!
(গীতান্তে )—যাই! গুরুদেবের আজ্ঞা পালন করি গিয়ে যাই।
মায়েব নাম গাই গিয়ে! আমি নাকি মা হারা ছেলে, আমার মা
১৩২
আছে কি না, যাই একবার দেখাই গিয়ে!-না, তা হলে আর
আমােদ কি হল? আমাকে খুব সাবধান হয়ে থাকতে হবে,
কোন বেটা যাতে কিছু না টের পায়, তাই করতে হবে। আমি
যেমন গঙ্গেশ ছিলাম, ঠিক তেমনিই হতে হবে। যাই দেখি
আগে, ওরাই কি করে? যাই-মায়ের নাটক ত শেষ হ’ল, এখন
একবার মংয়ার নাটক দেখি গিয়ে! যাচ্ছি ত, মামীমার হাতে,
মামীমার পাতে আজ যদি দুটো প্রসাদ পাই, তবেই না বুঝি
সিদ্ধি আর সাধনা-এই ত এ সংসারের শেষ সিদ্ধান্ত। তা হােক
মামাও আমার সিদ্ধান্ত, আমিও আজ সিদ্ধান্ত! দেখি-মামীমা
এখন কি সিদ্ধান্ত করেন। আমার মা হন কি না?
( গান ১৯)।
আমি যদি ছেলে হই, কে, মা না হয়ে থাকতে পারে।
ঘরে ঘরে আমারই মা, নাছছে সেজে বারে বারে।
কি দিদীমা কি পিসীমা, কি মাসীমা কি মামীমা,
কি খুড়ীমা কি জ্যেঠীমা
ঐ বেটীই মা ত্রিসংসারে।
দিদীমা হয় মা-বাবার মা, খুড়ী জ্যেঠী ভাই গুলাের মা,
ভগিনীও হয় ভাগিনের মা,
(ও সব আমার মায়েরই নাম ঘুরে ফিরে।
খুড়ী জেঠী পিসী মাসী, সকল মা ই যার এলােকেশী,
তা মা নাই শুনে পায় হাসি,
মার এ মায়া বলি কারে।
নবম দৃশ্য।
-
ভবদেব সিদ্ধান্তের বাটী।
গৃহমধ্যে কুশাসনে ভবদেব সিদ্ধান্ত আসীন।
ভবদেব। ( অনেকক্ষণ চিন্তার পর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া) হ জগদম্বে !
আজ আমার এ কোন পাপে কি ঘটালে মা ! পুরুষানুক্রমে ত মা !
আমার এ টোল আছে, কখনও ত মা ! এমন বিপদ ঘটে নাই।
দুই দুইটা ব্রাহ্মণ সন্তানের অকস্মাৎ এমন অপঘাত দণ্ড কখন ত
মা! শুনিও নাই—দেখিও নাই। এ ব্যাপার দৈবই হােক, আর
ভৌতিকই হােক সে সকল একটা উপলক্ষ্য বই ত নয়! মূলে
সকল ফলাফলেরই ত বিধাত্রী তুমি! আহা! বাছা দুটোর আর
বঁছবার আশা নাই। ছাত্রের মধ্যে ঐ দুইটিই আমার, শাস্ত্রে ভাল
ছিল। আহা! হরিদাস, নারায়ণ, বঙ্কিম, এদের আঘাতই বা কি
গুরুতর! বাছাদের আমার উঠে ব’বার সাধ্য নাই, মেরুদণ্ড গুলাে
যেন একেবারে চূর্ণ হয়ে ভেঙ্গে গিয়েছে! ঘরভেঙ্গে পড়েও ত এ
দশা ঘটে নাই। ঘরের চাল এক একখানা বিশ পঁচিশ হাত দূরে
গিয়ে পড়েছে, এ অবস্থায় ঘর চাপাই বা পড়বে কি করে? সে
চালগুলো বেড়াগুলােরই কি একটা বাঁশ, একটা খুটা, একটা খড়
আস্ত আছে ? ছেড়াগুলাে সব ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে পড়েছিল,
তবুও পথের মধ্যে ধরে এমনি করে আছড়িয়েছে যে, কোন
টার হাড়গােড় আর কিছু নাই! হায়! হায়! হতভাগা ছোঁড়াটা
গঙ্গেশ; না আছে বাপ, না আছে মা, ভালই হােক মন্দই হক
যাই হােক ছিল একটা ভূতের মত এইখানে পড়ে, সেটার ত
কোন সন্ধানও পাওয়া যাচ্ছে না! উড়িয়েই নিয়ে গেল,—কি
চুড়েই কোথাও ফেলে দিল ? কি যে করল,কি যে হল,
ভেবে ত কোন দিশা পাচ্ছি না, মুক্তকেশী চুড়ীটাত “ভাই
!
১৪ গঙ্গেণ। ভাই” করে পথে পথে কেঁদে বেড়াচ্ছে, সেটাকেও কিছুতে থামাতে পারছি না। হাজগদীশ্বরি ক’লে কি মা? ( কিয়ৎক্ষণ চিন্তার পরে)-গঙ্গেশটা ত কান্ টোলের ঘরেই ছিল, তার কথা ওদের যাকে জিজ্ঞাসা করছি, সেই ব’ছে- গঙ্গেশ কা’ টোলে যায় নাই। কিন্তু গঙ্গেশের কথা বলতেই ওদের মুখ কেন অমন করে শুকিয়ে আসছে, তাও ত কিছু বুঝতে পাছি না! হা ধৰ্ম্ম। আজ এ কি পাপে কি ঘটল! আমি এমন কি পাপ করেছিলাম—যার প্রতিফল এই হ’ল! আহা গঙ্গেশ! বাছা আমার রে ! এক দিনও তােকে ভাল মুখে কথা বলি নাই।একদিনও তােকে আদর যত্ন সােহাগ করি নাই। তার উপরে ছাত্রগুলাের গাল মন্দ-মা ধই বা কত খেয়েছি! ভেবেছিলাম—আমার পুত্র সন্তান নাই, তা হ'তে আমার নাম রক্ষা হবে, তুই শাস্ত্রে পণ্ডিত হবি, তােহ’তে আমার পূর্ব- পুরুষের কীর্তিকলাপ রক্ষা হবে। আহা বাছা আমার রে ! জন্মের মত কোথা গেলি? আর তােক দেখতে পাব না! (কিছুক্ষণ পরে)—হায়! হায়! তবুও কি মন মানে ? থেকে থেকে গঙ্গেশের কথাই মনে উঠছে। বাছার আমার আজ না জানি-কোথায় এতক্ষণ কি দশাই ঘটেছে। আমি যদি দিন রাত্রি অমন অবজ্ঞা অশ্রদ্ধা তাড়না না করে কাছে রাখতাম, অন্ততঃ এ বাড়ীতেও থাকতে দিতাম, তা হলে বুঝি বাছার আমার আর আজ এ দশা ঘটত না! হায়! হায়! সেই পাপেই কি এ সব হ'ল ? অনাথ অসহায় শরণাগত পিতৃ- মাতৃ-হীন বালক, গােষ্ঠী শুদ্ধ একত্র হয়ে কত অত্যাচারই না তার উপরে করেছি।-এ অনুতাপও যাবার নয়! নাতা তার ভালাের জন্যই করেছি, তবে তাতে আমার মন্দ হবে কেন? “ধৰ্ম্ম সূক্ষ্ম গতিঃ কি জানি আজ কিসে কি হ’ল! যা হবার তা ত হয়েছে, এখন একটা সন্ধানই বা পাই কি করে ? মুক্ত কেশী ত পথে পথে কেঁদেই বেড়াচ্ছে, সেও ত কোন সন্ধান নবম দৃশ্য। আচ্ছা-মুক্তকেশী যে, ব’ছিল—যখন ঐ রকম দুড় হয়, তখন সে একবার ছাদে উঠেছিল; বলছিল- টোলের ঘরের উপরে দেখলে-একটা পা টোলের ঘরে, কটা পা মণ্ডপ ঘরে, দুই ঘরে দুই পা দিয়ে আকাশ যুড়ে আছে কি যেন একটা ভয়ঙ্করমূর্তি ! সে কথাটা কি ? র কথায় বিশ্বাসও করা যায় না? • ভয় পেয়েই হয় ত কি ভাবতে ভাবতে কি দেখে বসেছে, সে যাই হােক যখন মুক্তকেশী ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে এসে আছড়িয়ে পড়ল, তখনও যদি উঠে দেখতাম-কি, তা হলেও হয়ত অনেকটা বুঝতে পাতাম। (কপালে ঘা দিয়া) হায় ! হয়। বুঝে ত আমি সবই ক’তাম!-হয় ত নিজের প্রাণটি পর্যন্ত হাবাতাম! কিছুই কিছু নয় মা! যা ঘটুবার তাই অষ্টে ঘটে, কাব সাধ্য তা খণ্ডন করে। নেপথ্যে (উচ্চৈঃস্বরে )—বাবা !-ও বাবা!-গঙ্গেশকে এই পেয়েছি। মণ্ডপঘরের কোণে এসে চুপ করে বসে কি ভাবছে। আর কাছে! ভবদেব। (নেপথ্যাভিমুখে )—হবে মুক্তকেশী ! সে কি বে !-গজেশ মণ্ডপে বসে আছে আর তাের কেউ দেখি নাই ? ( মুক্তকেশীর প্রবেশ) মুক্তকেশী। না বাবা! আমি কোথাও না পেয়ে মণ্ডপে এসে মায়ের আসনে মাথা কুটছিলাম, গঙ্গেশ অনি পশ্চিমের কোণ থেকে “হু! হ!” করে উঠল; তাকিয়ে দেখি—গঙ্গেশ। বাবা! তুমি শীগগির এস, হয়ত আবার তােমার ভয়ে এখনি উঠে পালাবে। ভবদেব। (উঠিতে উঠিতে) দুর্গে! বঁাচালে মা! এমন সঙ্কটও মানুষের হয় ? চল ত মুক্তকেশী! দেখি কোথায় ? মুক্তকেশী। এই এস বাবা! ( মুক্তকেশীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ভবদেবের প্রস্থান) গঙ্গেশ। ( শশব্যস্তে অপর্ণা ও বরদার প্রবেশ) বরদা। (সবিস্ময়ে) কৈ মা ! বাবা ত এখানে নাই, মুক্তকেশীও এখানে নাই, তবে বুঝি মণ্ডপে গিয়েছে। এস।আমরাও যাই! (অগ্রসর হইতে হইতেই) না-মা ! আর যেতে হবে না! (নেপথ্যাভিমুখে তর্জনী নির্দেশ করিয়া) ঐ দেখ -গঙ্গেশের হাত ধরে নিয়ে বাবা এইখানেই আসছেন । L । ( ভবদেব, গঙ্গেশ ও মুক্তকেশীর প্রবেশ) ভৰদেব। (আসনে বসিয়া গঙ্গেশকে নিকটে বসাইয়া) হয়ে গঙ্গে। বল দেখি-কা’ রাত্রে তুই কোথায় ছিলি ? গঙ্গেশ। রা’ দুপুর পর্যন্ত মামা! আমি টোলেই ছিলাম। ভবদেব। তার পর ? গঙ্গেশ। (অপােবদনে নিরুত্তর) ভবদেব। কি রে ! কি ?-কথা বলছি না যে? গঙ্গেশ। নামামা! তােমাদের তা শুনে কায নাই। ভবদেব। আরে! বল না—কি হয়েছে ? গঙ্গেশ। না—মামা তোমার পায়ে ধরি, তা তুমি শুন না। ভবদেব। বই কেন, কি হয়েছে? আমি শুনলে দোষ কি? ভয় নাই ? আমি কিছু বলব না, তুই সত্য কথাই বল! গঙ্গেশ। সে কথা তােমার শুনে কায কি মামা ? ভবদেব। আছে আমার কাষ, তুই বল না ! গঙ্গেশ। নিতান্তই শুনবে মামা! তবে শােন!-রাতৃ দুপুরের পর ভূতনাথদাদা আর কাশীনাথদাদা আমাকে তামাক খাওয়ার আগুন এনে দিতে বললে; আমি তথন ক’কে হাতে ক'রে পাড়ার ভিতর, গাঁয়ের ভিতর আগুন খুজতে বেরুলাম! ভবদেব। কেন? ঘরে আগুন ছিল না ? গঙ্গেশ। না মামা! মালসার আগুন তখন নিতে গিয়েছিল। ?
নবম দৃশ্য।
ভবদেব। মালার আগুনই যেন নিভে গিয়েছিল, প্রদীপ ত ছিল?
গঙ্গেশ। না, মামা ! তাও ছিল না, হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে
প্রদীপটাও নিভিয়ে দিয়েছিল।
ভবদেব। দমকা বাতাস, কখন এল রে ! আমিও ত রাত দুপুর পর্যন্ত
ঘরে বসে পুথি লিখছিলাম, দমকা বাতাস এলে কি আর আমি
জাতে পাতাম না?
গঙ্গেশ। কি জানি মামা!—প’ড়ো দাদারাই ব’প্লে-দমকা বাতাস; আমার
ত বােধ হ’ল না যে, সে বাতাস বাইরে থেকে এসেছে। হঠাৎ
প্রদীপটা দপ করে নিভে গেল, যেন কেউ হাতের থাবা দিয়ে
নিভিয়ে দিল।
ভবদেব। তুই নিজে দেখেছিলি?
গঙ্গেশ। হাঁ মামা ! আমি নিজেই বসে বসে দেখছিলাম।
ভবদেব। আচ্ছা, তার পর?
গঙ্গেশ। তার পর মামা | আমি যখন গাঁ ঘুরে এলাম, পাড়া ঘুরে এলাম,
কোথাও একটু আগুন পেলাম না, কত ডাকেও কেউ একটা
কথা কইল, না, তখন আর কি করব? ফিরে এসে আবার
পড়াে-দাদাদের ব’লাম। ভূতনাথদাদা আমায় বল্লে-যা,-শীগগির
যা-যেখান থেকে পারিস আগুন নিয়ে আয়। আমি তখন
আর কি ক’ব ? কোথাও কিছু দেখতে না পেয়ে মাঠে নালাম।
সেখান থেকে দেখলাম-গ্রামের মধ্যে এদিকে ওদিকে কোথাও
আর আগুন নাই, কেবল ভৈরবঘাটে একটা চিতা জ্বলছে, পড়াে-
দাদাদের কাছে এসে আবার সে কথাও বললাম, ভূতনাথদাদা
আমাকে বল্লে –যা!—তবে সেইখান থেকেই আগুন নিয়ে আয়।
তাই শুনে বঙ্কিমদাদা আমায় একবার ধারণ করল ; না গেলে মা’র
ধাে’র ক’ব ব’লে ভূতনাথদাদা তােমার নাম করে কত ভয়
দেখাতে লাগল। তাই শুনে আমি ক’লকে হাতে করে শ্মশানে
গেলাম। সেখান থেকে ঘুরে আসতেই আমার রা’ত পুইয়ে
গেল, তাই আমি ভয়ে ভয়ে মণ্ডপে এসে চুপ করে বসে
ব কাছিলাম। এখন ছােদিদী গিয়ে মার আসনে মাথা কুটতে লাগল, তাইতে আমি ই-ই” করে বারণ করছিলাম। ভবদেব। কি অত্যাচার! কি দৌরাত্ম! (অপর্ণার মুখের দিকে চাহিয়া ) একে কাল অমাবস্যার মহানিশ মঙ্গলবার, তার উপরে ভৈরব- বাটের শ্মশান ;-তায় আবার সেই জ্বলন্তচিতা থেকে আগুন আতে হবে এই ছেলেকে ! বেটারা সব কি পাষণ্ড! নরাধম ! কি নবপিশাচ! এ বেটারা মানুষ?-না অসুর ?- -রাক্ষস ? আমি আমার ছাত্র বলে ভাতা-বেষ্টাদের কোন দোষ নাই, দোষ যত সব গঙ্গেশের ; এখন ত দেছি- ঐ বেটারাই আমার সকল আপদের মূল।-ওদের পাপেই আজ এ সর্বনাশ ঘটেছে! বেটারা নিজেও মরুল, আমাকেও মাল!! মুক্তকেশী। বাবা! বল্লে ত তুমি কথা শােন না? আবার উটে আমার উপরে রাগ কর। তােমার ও ছাত্রগুলি ত নয়, এক একটি ব্ৰহ্মদৈত্য, আর এক একটি ব্রহ্মরাক্ষস !! ভবদেব। যা হবার তা হয়েছে মা! আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত খুব হয়েছে ! আজকার এই একবেলা বেটাদের এক এক মুটো ভাত দেও, তারপর এখনি আমি এক এক খানা গােরুর গাড়ী করে সব বেটাকে দূর করে দিচ্ছি। বেটাদের ম’রতে হয়, আপন আপন বাড়ীতে গিয়ে মরুক। এখানে মলে ওদের ছোঁবে কে ? ফেলবে কে?-বেটারা ঘাের নারকী—মহাপাতকী। অপর্ণা। (মুখ ঝাঁকা দিয়া) এই এক দণ্ডের মধ্যেই ঘোর নারকী মহাপাতকী সব হয়ে উঠল! একটু থেকে একটু হলেই দুর্বাসার মত নাকের আগায় রাগ লেগেই আছে । আহা ! বাছাদের আমার এই দুঃসময়ে তুমি তাড়িয়ে দেবে? ওরা গেলে আমার সংসার চলবে কিসে? ভবদেব। (রুক্ষস্বরে) তােমার সংসার নিয়ে তুমি থাক ! ছাত্র আমি মায়ের মণ্ডপে বলি দেই। . এমন সব D নবম দৃশ্য। অপর্ণা। তা দেবে বই কি? গঙ্গেশ তােমার বেঁচে থাক। অমন্ ভাল মানুষটি ত আর হবে না ! বর। সে কি মা! তুমি বল কি? এখনও গঙ্গেশের দোষ দেও। পােড়াকপাল করি, ছারকপাল কৰি, অমন সব ছাত্রের জেওন্ত মুখে আগুন জেলে দিতে হয়। ডাক্রা-ঘাটে-পড়ারা, মানুষের ছান ভূতের ছা? বামুনের ছেলে যে সব এমন অসুর, এমন রাক্ষস হয়, এও ত কখন শুনি নাই। ঘটেপড়াদের যা হয়েছে- তা খুব হয়েছে। এখন মা করুন্ - ড্যাকরারা একেবারে গােল্লায় যাক, তা হলেই আপদ চুকে যায়। ‘মুক্তকেশী। আচ্ছা-মা! গঙ্গেশেরই যেন মা নাই, বাপ নাই, ওই যেন অমন নষ্ট দুষ্ট; বল দেখি মা!-তােমার পেটে যদি ছেলে থাকৃত, আর সে যদি অমন হত, তবে কি তুমি ঐ সকল রাক্ষসের হাতে তাকে এনি করে ধরে দিতে পারতে ? ধৰ্ম্মের দিকে তাকিয়ে কথা বলে মা !! অপর্ণা। আ ম ! পােড়ার মুখীরে, কথায় কথায় আমাকে ধম দেখাতে আসেন! খাচ্ছিস্ পছিস কাদের দিয়ে, তার একটা হিসাব পাস ? বরদা। অমন খাওয়ার চেয়ে ছাই খাওয়া ভাল। অপর্ণা। আচ্ছা, এখন হতে হবে তাই খা’! মুক্তকেশী। তা খেতে হয় খাব, তবুও তােমার ও-সব ছাত্রের মুখে আগুন দিতে যাব না ! ভবদেব। (বরদা ও মুক্তকেশীর প্রতি) চুপ কর মা! তেরা আর ও-পাগলের সঙ্গে এমন করে বকাবকি করিস্ কেন ? এখন ঐ চণ্ডাল ক-টাকে ডেকে এনে এক এক মুটো যা দিবি, তা দিয়ে দূর করে দে। মুক্তকেশী। (বরদার প্রতি) দিদি ! তুমি ততক্ষণ জায়গা কর, আমি ও-ঘাটেপড়াদের ডেকে আনি। (প্রস্থান) বরদা। (স্থান করিয়া প্রত্যেকের জলপাত্র দিয়া ভবদেবের প্রতি) বাবা! তোমার আর গণেশের খাবার জায়গাও এই খানেই করব? ভবদেব। ( বিরক্তি স্বরে) কর!-আর যাব কোন্ চুলােয় ?
১৪০ গণেশ। বরদা। (কুশাসন পাতিয়া ভবদেবের ও তাঁহার নিকটে গঙ্গেশের আহারের স্থান করিয়া অপর্ণার প্রতি) মা! যাও-তুমি ভাত নিয়ে এস। ( সক্রোধে অপর্ণার প্রস্থান ও কিছুক্ষণ পরে বারে বারে ভাতের থালা লইয়া কমে—ভবদেব ও গঙ্গেশের সম্মুখে এবং নারায়ণ, হরিদাস ও বঙ্কিমের আহার-স্থানে স্থাপন )। নেপথ্যেও দিদি!-ড্যাদের একটাকেও ধ'রে তুলবার উপায় নাই। এ সব মাদুরে তুলে মরা-ফেলা করে নিয়ে যেতে হবে। আমি একা টাতে পারব না, দিদি !-তুমি শীগগির এস ! ভবদেব। কি অপদ! নিৰ্বংশের বেটারা মরেও মরে না ! যা-বরদা-যা- দুই বােনে ধরে টেনে নিয়ে আয়। আমি আর ও বেটাদের ছোঁব না। বরদা। কি বালাই রে! বালাই ! তবে যাই- [ প্রস্থান।] ( কিছুক্ষণ পরে বরদা ও মুক্তকেশী কর্তৃক হুড়হুড়, শব্দে মাদুর ধরিয়া টানিতে টানিতে বঙ্কিম, হরিদাস ও নারায়ণকে আনয়ন)। ববদা। (অপর্ণার প্রতি নেপথ্যাভিমুখে) নেও মা! যা দেবে, এদের শীগগির শীগগির দুটো দুটো দিয়ে যাও! ভূতনেথে আর কাশীনেথে দুই ড্যাকরা পশ্চিমের বাবান্দায় খাবি খাচ্ছে, এখন যদি মরে, তবে আর কারুও খাওয়া হবে না ! অপর্ণা। (অন্ন হস্তে প্রবেশ করিয়া) তা হলেই তােরা দু-বােনে বাঁচি। মুক্তকেশী। আমরা দু-বােনে কেন ? এক তুমি ছাড়া আর সকলেই বাঁচে। (অপর্ণার নীরবে অন্ন ব্যঞ্জন পরিবেশন ) বঙ্কিম। (পাশ ফিরিতে গিয়া) ও বাবা গাে-মলৈ !-ম’লে!- নারায়ণ। সেরেছে রে বাবা!সেরেছে!
বরদা। কি না? নবম দৃশ্য। ১৪১ হরিদাস। কি অবারে মরবারে আচিলাম রে বাবা! মুই না ওরে পায়ুমু! অ ছড়-দিদি ! কি দোরে লাগচি? মােরা ত মরে লাগচি। (স্বগত) নাগ!এখন যত শীগির পার ? তা ত বুঝলাম, তাে৷ এখন দয়া করে উঠে উঠে পাতের গােড়ায় বসে খেয়ে কৃতার্থ করতে পারবে হরিদাস। হ-বদিদি ! কেম্বাই ওড়বারে পামু? তুমি নি'মােগরুগগা আতে দবা ? বরদা। (স্বগত) আমি আর হাতে ধরে কি ক’ব? যিনি ঘাড়ে ধবার 'তিনিই ধরেছেন। ভবদেব। তোরা ধরে ধরে উঠিয়ে বসিয়ে দে। ( বরদা ও মুক্তকেশী কর্তৃক তিনজনকে ধরিয়া উঠাইয়া বসান এবং তিন জনেরই গঙ্গেশের প্রতি সভয় দৃষ্টিক্ষেপ।) ( ভবদেব আসনে উপবেশন পূর্বক) গঙ্গেশ!-ব’স রে ! (গঙ্গেশের উপবেশন, সকলের ভােজন আরম্ভ এবং পঞ্চদেবতাকে অন্ন না দিয়া, গণ্ডুষ গ্রহণ না করিয়াই গঙ্গেশের ভােজনারম্ভ) ভবদেব। (গঙ্গেশের প্রতি) হা হতভাগা ! গলায় পৈতে দিয়ে বেড়াতে পার, ব্রাহ্মণের সঙ্গে এক পঁক্তিতে খেতে বসতে পার, পঞ্চদেব- তাকে অন্ন দিতে গণ্ডুষ নিতে পার না? এই সকল কুপােষ্য পােষণ করে করেই আমি রসাতলে গেলাম—এমন সকল চণ্ডা- লের সঙ্গে এক ঘরে বাস করে, এক পক্তিতে আহার করে আর আমি উৎস যাব না? দুর হ হতভাগা! আজ থেকে তুইও দূর হয়ে যা! তােকে যত ভালবাসব ভাবি, তুই ততই এনি এমনি এক একটা করে বসি যে—যাতে আর তাের মুখ দেখতে ইচ্ছা হয় না! (অপর্ণার প্রস্থান)। বরদা। মাছ নিয়ে এস মা! ( একটু পরে থালায় করিয়া মাছ লইয়া অপর্ণার প্রবেশ, ক্রমে ভবদেব, নারায়ণ, হরিদাস ও বঙ্কিমের পাতে সকল
৪২
মাছ পরিবেশন করিয়া পরিশেষে বিরক্তির সহিত মাছের
কাঁটাগুলি লইয়া গঙ্গেশের থালায় নিক্ষেপ) .
গঙ্গেশ। (হাসিতে হাসিতে অপর্ণার মুখের দিকে চাহিয়া) মামীমা
আমি ত গঙ্গা নই,-গঙ্গেশ; তােমার এ পিতৃ-অস্থি গুলি আমায়
না দিয়ে গঙ্গায় দিলেই ত পারতে।
ভবদেব। (সক্রোধে গঙ্গেশের মুখের দিকে চাহিয়া )
দুব ই গরু !
গঙ্গেশ। (হুঙ্কার করিয়া হাসিতে হাসিতে লাফ দিয়া উঠিয়া গড়াইয়া
ভবদেবের সম্মুখে হাত নাড়িয়া মাথা ঝাকাইতে ঝাঁকাইতে)
কিং গবি গােত্বমুতাগবি গােত্বং?
চে গবি গােত্বমনর্থক মুক্তং।
অগবি চ গােত্বং যদি ভবদিষ্টং,
ভবতি ভবত্যপি সম্প্রতি গােত্বং।
?
ভবদেব। (ভাত ছাড়িঘা হাত তুলিয়া সবিস্ময়ে গঙ্গেশের মুখের দিকে
চাহিয়া) কি বলি রে গঙ্গেশ? কি ? কি ? কি ? অবাির বলত।
গঙ্গেশ। (পুনঃ শ্লোক পাঠ)
ভবদেব। ( ঈষৎ হাসিতে হাসিতে সানন্দে 'সবিস্ময়ে সকৌতুকে)
হারে! কি বলি, বুঝিয়ে দিতে পারিস? আমি ত কিছুই বুঝতে
পালাম না!
গঙ্গেশ। বুঝেছ কি না, তাও বুঝেছি; তবু বলি,-বলি-মামা! আমাকে গক
বললে কেন ? তুমি ত নৈয়ায়িক, গােত্ব কাকে বলে তা ত নিজেও
বােঝ! বলি গোর ধর্ম গােত্ব, সে কি গাে-তেই থাকে ?-না, অব
কিছুতেও থাকে? গােতে যদি গােত্ব থাকে, তাহলে আমি
মামা ! গরু নই, আমি তোমার ভাগিনে; আমাকে অনর্থক কেন
গরু বললে? আর যদি গরু না হলেও তাতে গােত্ব থাকে এমনই
হয়, তবে ত মামা ! আমিও যেমন গক, তুমিও তাই।
নবম দৃশ্য। ১৪৩ ( সকলের সবিস্ময়ে পরস্পর মুখাবলােকন) ভবদেব। (তাড়াতাড়ি ভাত ছাড়িয়া হাত ধুইয়া উঠিয়া গঙ্গেশের হাত ধরিয়া ভয়-ভক্তি গদ্গদ স্বরে) ওরে গঙ্গেশ! সব বুঝেছি, বল রে বল বাপু! কোথায় কি পেলি?-কোথায় তাের কি ঘটল ? গঙ্গেশ। (ভবদেবের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া নিরুত্তর) ভবদেব। (দুই হাতে গঙ্গেশের দুই হাত ধরিয়া কাতর স্বরে) যা করেছি ক্ষমা ক! বাপ! বল গঙ্গেশ! কোথায় কি পেলি? আমার মাথা খা, বল বল !! গঙ্গেশ। (নীরবে অশ্রু বিসর্জন ) মুক্তকেশী। ( তজ্জনী নির্দেশ করিয়া) ও বাবা ! দেখ-দেখ ! গঙ্গে কাছে। ভবদেব। ওরে গঙ্গেশ-বল বে বল!আর বিলম্ব করিস্ না বাপ! এক নিমেষ আমার এক যুগ বােধ হচ্ছে। আমার প্রাণ থেকে ডেকে ধ’ছে-কালকার এ অমাবস্যার মহানিশা কেবল তাের জন্যই এসছিল, নিশ্চয় কাল ভৈরবঘাটে ভৈরবের কৃপায় তাে এ সিদ্ধি ঘটেছে বাপ! জন্মজন্মান্তরের কোন্ সিদ্ধ পুরুষ তুই শাপভ্রষ্ট হয়ে কেবল আমায় কৃতার্থ ক’তে এয়েছিস্ ! আমি জান্তা —তুই আমাদেরই মহামায়ার ছেলে, এতদিনে বুঝলাম বাপ! তুই যে মহামায়ার ছেলে!! মহামায়ার দয়া ‘ভিন্ন এ মহামায়া ভেদ করে কার সাধ্য ? হারে গঙ্গেশ! তুই যে মা-হারা ছেলে। এত দিনে কি মা পেলি রে বাপ! বল্ গঙ্গেশ! ব বল! এ সৌভা- গ্যের সুথভােগে আর যে বিলম্ব সহ্য হয় না। এক দিনের জন্যও যদি তুই আমার নিকটে ঋণী হয়ে থাকিস, তবে বাবা! সে ঋণ, পরিশােধ এখনই ক! গঙ্গেশ! দোহাই তাের মা মহামায়ার। কি হয়েছে—ব! ব!!-আমি তাের সাক্ষাতে এখনি মাথা ভেঙ্গে ম’ব বা! যদি তুই তা না বলিস! মুক্তকেশী। (কাতর স্বরে) দেখ, গঙ্গেশ! বাবা কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন,
১৪৪
গঙ্গেণ।
বল না ভাইটি। আমাদের কাছে ; তুই ত ভাই! আমার কথা
শুনি!-(গঙ্গেশের হস্ত ধারণ)
গজেশ। (সানন্দে হাত তুলিয়া নাচিতে নাচিতে সুর ধরিয়া)
শবশিব-হৃদয়-সয়ােজ-নিহিত-দক্ষিণ-ফ্ররণা
জয়তি কাপি সা মধুর-মধুর-হসিতাননা দিসনা লােলরসনা।
ভবদেব। (গদগদ কণ্ঠে) আমরি মরি মাগাে! গঙ্গেশের কণ্ঠে এ কি
মৃত্যলীলা মা !!
গঙ্গেশ। (সুর ধরিয়া করতালী দিয়া নাচিতে নাচিতে )
গান। (২০)
জয় জয় জয় জয় বিজয়-ভৈরবী ভবদারা-
জয় তারা, জয় তারা,জয় তারা, জয় তারা।
জয় ভক্ত-ভুবন-জীবনধন—চরণাম্বুজ সারা।
জয় স্নিগ্ধোজ্জ্বল-জলদদাম-গলিতকান্তি-ধারা।
জয় চরণাম্বুজচুম্বি-চতুরকুন্তল-কুল-ভারা।
জয় কণ্ঠবিধি-জঘন-মণ্ডি-মুণ্ডাবলি-হারা।
জয় বিশ্বধর-রঞ্জি-মধুর-রুধিরাসব-ধারা।
জয় মাধ্বীর-ঘূর্ণিত-ঘন-নয়নত্রয়—তারা
জয় করুণাঘন-নয়নপাত-খণ্ডিত-যমকারা ॥
জয় তারা-ধ্বনি-মাত্রাতর-দীনাশ্রিত-পারা।
জয় জয় শিবচন্দ্র-হৃদয়-নৃত্যচরণ-চারা ।
(গীতান্তে উৰ্দ্ধবাহু হইয়া “জয় মা ! জয় মা।” ধ্বনি করিতে
করিতে তালে তালে উদ্ভ্রান্ত নৃত্য)
!
নবম দৃশ্য।
১৫
ভবদেব। (ছাত্রগণের প্রতি) ওরে গণ্ডমূর্খ পাষণ্ডের দল! একবার চেয়ে
দেখ,আমার গণেশের মুক্তি। আমরি মরি! আজ আর আমার
গঙ্গেশ, গঙ্গেশ নাই—যেন বাবকরূপী গঙ্গাধর !!
মুক্তকেশী।(ভীত স্বরে) ও বাবা! গজেশ কেন অমন করে? গদেশের
আজ 'এ কি হল!
ভবদেব। ও মা! গঙ্গেশের আজ যা হয়েছে, তা যে তােদের বাবাও
বােকে নাই।
গদেশ, (ছাত্রগণের প্রতি চাহিয়া) পড়াে দাদা! তােমরাই আমার
জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধু ছিলে। ভয় কি ভাই! ভৈরবদূত ভূতের
হাতের কিল খেয়েছ, তােমাদের শরীর ত বস্ত্র হয়ে গিয়েছে।
তাতে আর দুঃখ কর কেন? বাবার আমার নিগ্রহও অনুগ্রহ।
যে বৈদ্যনাথের দূত তােমাদের দেহ স্পর্শ করেছেন, এইবার ভাই।
ভব-রােগও সেরে যাবে। বার বার এইবার উঠে একবার বল
দেখি ভাই-জয় জয় জয় মায়ের জয় !!
(উল্লম্ফন দিয়া এক এক জনের বাহুধারণ)
( সকলের সভয়ে গঙ্গেশের মুখ নিরীক্ষণ ও বিনা কষ্টে গাত্রোত্থান
এবং সবিস্ময়ে পরস্পরের মুখাবলােকন)
গঙ্গেশ। বল ভাই!-জুয় মায়ের জয় !!
সকলে। (সােল্লাসে) জয় মায়ের জয়!—জয় মায়ের জয় !!
ভবদেব। ( সকলের দিকে চাহিয়া) আ মরি! মরি! কি দৈবশক্তি।
অপর্ণা। (ব্যগ্রভাবে গঙ্গেশের দুই হাত ধরিয়া) বাবা আমার ! ভূতনাথ
কাশীনাথ ওদুটোকে বাঁচিয়ে দে বাবা!—আমার মাথা খা’!
গঙ্গেশ। তা বুঝেছি, বাবা আমার এই জন্যই ওদুটোকে এখনও রেখেছেন।
(নাচিতে নাচিতে সবেগে প্রস্থান ও নেপথ্যে ধ্বনি)—ভূতনাথ
দাদা! কাশীনাথ দাদা! ওঠ, রে ভাই! ওঠ, রে ওঠ!-আহা !
গায়ে বড় ব্যথা হয়েছে, মনে কিছু করিস নে দাদা! মা-বাবা ধরে
মারুলে, আর রাখে কে ভাই! একবার প্রাণের কপাট খুলে
“জয় তারা বলে ডা দেখি দা! তোদের সকল অালা, সকল
যন্ত্রণা এখনি ভাই! দূরে যাবে! এই আমি হাত ধরেছি—ওঠ,
দেখি দাদা!
নেপথ্যে-(ভূতনাথ ও কাশীনাথের “জয় তারায় তারা” ধ্বনি)।
( কাশীনাথ ও ভূতনাথকে সঙ্গে লইয়া নাছিতে নাচিতে
গঙ্গেশের প্রবেশ )
বরদা । ও মা! কি হবে গো !-এ দুটো যে একেবারে মরে ছিল! হাঁ রে,
গঙ্গেশ! তুই কোথা থেকে কি শিখে এলি ?-
গঙ্গেশ। আমি ত শিখেছি দিদি ! তোমরাও একবার শিখে নেও!
( অপর্ণার মুখের দিকে চাহিয়া ভূতনাথ ও কাশীনাথের হাত
ধরিয়া) মামী মা! এই নেও তােমার ভূতনাথ, এই নেও তােমার
কাশীনাথ !তারপর মামীমা ! সকলকেই ত সারালেম, 'এখন
তােমায় সারাই কি করে ?
( কৃতাঞ্জলিপুটে) মাগো ! এইবার তুমি মা হও মা! আমি দুষ্ট
দুরাত্মা ছেলে, একবার দুষ্ট ছেলের দুষ্ট : মা হয়ে দাড়াও মা!
(অপর্ণার সম্মুখে কৃতাঞ্জলিপুটে চক্ষুঃমুদ্রিত করিয়া ধ্যানাবস্থান)
( দুলিতে দুলিতে আপনা হইতে অপর্ণার অবগুণ্ঠনাপসরণ ও
কেশমােচন এবং উৰ্দ্ধদৃষ্টিতে দেহান্দোলন)
বরদা ও মুক্তকেশী। (সভয়ে ভবদেবের প্রতি) ও বাবা! ঐ দেখ-মা
যে কেমন করে!
ভবদেব। (হস্ত সঙ্কেতে উভয়কে বারণ করিয়া) দেখি—রাখ, !
গঙ্গেশ। (চক্ষু মেলিয়া অপর্ণার দিকে চাহিয়) এইবার—ম আমার ।
জয় মা !জয় মা !জয় মা !! (নৃত্য)
অপর্ণা। (গম্ভীরস্বরে ) গঙ্গেশ-আজই তােমা হবার দিন ।
নে-মায়ের কোলে ওঠ!-( উভয় বাহু প্রসারণ)
।
নবম দৃশ্য।
১৪৭
গঙ্গেশ। (দুইবাহু উর্কে তুলিয়া ঝাঁপিয়া অপর্ণার কোলে উত্থান
এবং আবেগে অপর্ণার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বুকের মধ্যে
মুখ রাখিয়া )—মা!-মা-মা!
অপর্ণা। (দক্ষিণহস্তে গঙ্গেশের মুখ তুলিয়া) কত তাড়না করেছি
বাপ-কত দুঃখ দিয়েছি বাপ! তা বলে কিছু মনে করিস না !
আমার, ও—সবই কেবল তােকে পরীক্ষা করু
ভবদেব। গঙ্গেশ রে! মহাবিদ্যার বিদ্যালয়ে এ পরীক্ষায় আজ তুই ই
কেবল উত্তীর্ণ হ’লি।
গঙ্গেশ!, মামীমা।
আর ত মামীমা ব’তে পারিনা, আজ থেকে
কেবল মা ব’!-
অপর্ণা। গঙ্গেশ রে! আমিও আজ থেকে কেবল তােরই মা হব।
মুক্তকেশী। ওমা! আমরা কে কোথা যাব?
অপর্ণা। তােরাও গঙ্গেশের সঙ্গে সঙ্গে মা বলে ডাকি!--(গঙ্গেশের
প্রতি) গঙ্গেশ রে ! অনেক দিন তােরে কোলে করে সাধ
পূরে কিছু খাওয়াইনি রে! তাের সাধনা পূর্ণ হ’লআজ আমার
সাধনা পূর্ণ কর বাপ, !– বরদার প্রতি) বরদা! যা ত মা ।
রান্নাঘরে-বাছার আমার কিছু খাওয়া হয়নি, যা থাকে ঘরে, শীগগির
নিয়ে আয়, !(বরদার প্রস্থান ও অন্নব্যঞ্জনাদি লইয়া প্রবেশ )
বরদা। এই নেও মা!
অপর্ণা। তুই ধরে থাক্, আমি গঙ্গেশকে খাওয়াই। (বরদার হস্তস্থিত
পাত্র হইতে অনুগ্রহণ পূর্বক গঙ্গেশের মুখে দিতে উদ্যম )
গঙ্গেশ। (হাসিয়া মাথা ঘুরাইতে ঘুরাইতে) কর কি মা? মামা
রয়েছেন এখানে-এক সূৰ্যে দুইবার আহার ।
অপর্ণা। আমি বলছি-তােকে খেতে হবে।
গঙ্গেশ। সেটা হচ্ছে না মা!
অপর্ণা। কেন? আমি দিচ্ছি, খাবি না?
গঙ্গেশ। দিচ্ছ কৈ মা !
অপর্ণা। (হস্ত প্রদর্শন করিয়া) কেন? এই ত দিচ্ছি।
গদেশ। ও দেওয়া কি দেওয়া না ? মা যাকে মা । খেতে দে,
তার কি আবার চিবিয়ে খেতে হয় ?
অপর্ণা। (সহাস্যে) সাধনায় সিদ্ধ হয়েও সাধ কি আর মিটুল না রে।
গঙ্গেশ। মা! সাধ মিটুলনা, এই ত সিদ্ধি।
ভবদেব। আ মরি মরি! কি অপূর্ণ পূর্ণ-সিদ্ধি !!
গঙ্গেশ। বাবা! মা যে আমার অন্নপূর্ণা, এ সাধনার সিদ্ধি কেবল তুমি
বই আর কেউ বুঝবার নাই।
ভবদেব। বাপরে!-আজ বুঝলাম, কিন্তু পাব কবে, তা তুই ই জানি।
গঙ্গেশ। বাবা ! কল্পলতার মুলে বসে “কি পাব” তাই ভাবিছ কেবল,
কি চাবে তুমি চাও না! তাই পাবার আছে অনেক ফল !!
মুক্তকেশী। গঙ্গেশ রে! কি খাবি এখন? বল না ভাইটি ! সেইটি বল।
গঙ্গেশ। (বরদার হস্তস্থিত পাত্র হইতে অন্ন লইয়া অপর্ণার মুখে
দিয়া হাসিতে হাসিতে একে একে তর্জনী নির্দেশ করিয়া)
বরদা মা দিচ্ছেন, আবার, খাচ্ছেন ঐ অপর্ণা মা ।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন আবার হাসছেন মুক্তকেশী মা।।
এই নে বাপ! তাের সাধের প্রসাদ !-(চর্বিত প্রসাদ প্রদান)
গঙ্গেশ। (হাত পাতিয়া প্রসাদ লইয়া ভবদেবের মুখের দিকে চাহিয়া)-
অামার পঞ্চ-দেবতা বাবা! এই দেখে নেও এক দেবতা।
এই বেলা আজ বলে দেও। ত, কোন দেবতায় দেব তা ॥
ভবদেব। বাপ্ রে ! তাের যে পঞ্চদেবতা ঘুচে গেছে, জ ত আমি তখনও
f
অপর্ণা।
জানি না।
গঙ্গেশ। (প্রসাদ মুখে দিয়া হাসিয়া হাসিয়া করতালি দিতে দিতে )
সেই মা আমার এই মা আজ, এই মা আমার সেই মা।
কোন্ মা তুমি, সে সব কথায়, কায কি আমার ? ও মা! মা ।
যে মা ইচ্ছা সে মা হও মা! সকল মা ই আজ গঙ্গেশের মা।
১৪৯
নবম দৃশ্য ।
মা তুমি মা! ছেলেরও মা, বাবারও মা, আমার মা।
কি দিদী-মা, কি মাসী-মা, কি মামীমা সবই মা।
ঘরে মা অপর্ণা আমার অন্নপূর্ণা সংসারের মা।
এই মা ই আমার বাবার বুকে মুক্তকেশী হর-মা।
দ্বিভুজা আর দশভুজা চতুর্ভুজা আমারই মা।
যে দিকে চাই, আমারই মা, আমারই মা-আমারই মা ।
আমারই মা, আমারই মা, আ মরি মা, আ মরি মা।
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে আমারই মায়ের গরিমা।
তপনে মার প্রভাশক্তি, গগনে মায়ের মহিমা।
চন্দ্রমায় চন্দ্রিকা মা মাের, অণুতে মা অণিমা।
পবনে মা বেগশক্তি, দহনে মাে দাহিকা মা।
জলে মায়ের শীতলতা, মধুরে মার মধুরিমা।
ধরিত্রীর ধারণা শক্তি, জগদ্ধাত্রী আমারই মা।
বিধাতার বিধাত্রী শক্তি, বিষ্ণুর স্থিতি-শক্তি মা।
মহারুদ্রের মহারৌদ্রী মহাশক্তি সেই আমার মা।
ব্ৰহ্মলােকে সাবিত্রী মা, বৈকুণ্ঠবাসিনী রমা।
কৈলাস-ধামে, বাবার বামে, আমার মা ই সেই গৌরী উমা।
বার সেই—গােলােকধামে, শ্যামের বামে, রাসেশ্বরী আমারই মা ॥
কৈৰল্যের সেই নিত্যলীলায় লীলাময়ী আমারই মা-
মহাকালের হৃৎকমলে তালে তালে নাচছে শ্যামা।
শিবের বামে, জীবের বামে, আমারই সেই এক ই মা।
সর্বত্র সম-দক্ষিণা, বামা হয়েও নন্ মা বামা।
গঙ্গেশ।
শক্তি-স্বরূপিণী মা মাের জীবেরও মা শিবেরও মা।
কি জীব, কি শিব, দুইই হন শব, কোলে যদি না করেন মা।
জননে জননী মা মাের, ধারণে হন ধাত্রী মা।
কারণে মা ক্রিয়াশক্তি, কাৰ্যে ফল-বিধাত্রী মা।
জীবনে জীবনী শক্তি, মৃত্যুরূপা মরণে মা।
সাধনায় সাধনা, মুক্তি-দানে মুক্তকেশী মা।
কোলের ছেলে, কোলে করে, দোলে মা মাের, কি সুষমা !
অপিন কোলে, আপনি দোলে, আনন্দ-হিল্লোলে মা।
অাপন মুখে, আপন নাম ঐ, গেয়ে বেড়ায় আমারই মা।
মায়ের, কেবা অাপন, কেবা হয় পর, আর কিছু নাই সবই যে মা!
কোন্ মা তুমি, কে মা তুমি, সে কথায় আর কায কি মা?
যে মা, সে মা, হও মা! তুমি, বল্তে দেও মা! “জয় মা শ্যামা।”
গঙ্গেশের আজ, যে দিকে চাই, ব্ৰহ্মাণ্ড-ময় সব ই মা।
মা! তুমি আর মা হবে কি ? মা ই ছিলে মা ! মা ই আছ মা!!
ভবদেব। আমরি মরি! কি তত্ত্ববােধ। তত্ত্বময়ী জেগেছেন যার—
(এইরূপেই তার5) শিবতত্বে জীবতত্বে আত্মতত্বে একাকার।
ছাত্রগণ। পায়ে ধরি ভাই গঙ্গেশ! আমাদের অপরাধ ক্ষমা কর।
এখন,—কি করব তাই, ব’লে দে, ভাই! আমরাও যে
তাের নই রে পর।
গঙ্গেশ। ভাইরে—আর কি কর বিদ্যার সাধন, মহাবিদ্যা মাকে ভুলে।
যাত্রা কর সেই পরীক্ষায়-তারা-নামের নিশান তুলে।
তারা বিদ্যা, তারা শিক্ষা, তারা বিশ্ববিদ্যালয়।
শাস্ত্র তারা, ছাত্র তারা, স্বয়ং গুরু তারাময়।
নবম দৃশ্য।
যত দেখ দর্শন শাস্ত্র, (ও) তারার দর্শন কিছুতেই নয়।
ওর- সব অদর্শন, যদি আমার তারা মায়ের দর্শন না হয়।
তারা-পদাথুজ-প্রান্তে যারা করে তারা-লয়।
এই রাতেই তারা দেখে, যায় রে তারা তা আলয়।
তারা-মায়ের মায়া ব’লব কি ভাই! হলে পরে মহাপ্রলয়।
শব হয়, এ সব, তবু সে সব—ভাইকে মা মাের কোলে লয়।
তাই এই সময় ভাই। সময় থাকতে বল জয় জয় তারার জয়।
যে বলে সেই তারার জয় জয়, সেই করে সে তারার জয়।
তাই—তারার জয়ে তারার জয় নাই, কেবল তারার ছেলের জয়।
অধিকন্তু, তারার জয়ে—তারা হয় রে মৃত্যুঞ্জয় !!
ভবদেব। গণেশ রে!
আমার কান্ ত গেল, কালত এল, বল ত রে “জয় কালীর জয়”
আজ, সবাই মিলে, কালী ব’লে, ঘুচাই রে বাপ! কালের ভয়।
আমি-মনে প্রাণে ধানে জ্ঞানে সংসার বই আর ভাবি নাই;
পণ্ডা বিদ্যায় পণ্ডিত হয়ে মহাবিদ্যায় ভুলেছি তাই।
হায় রে সংসার! তােমায় আমি সার করে সেই সারাৎসারা
তত্বময়ী, তারা—ধনে, মত্ত হয়ে হলেম হারা।
আমি মাকে ভুলেছি তবু ভুলে যান নাই মা আমায়
তাই ত—গঙ্গেশের এ সিদ্ধি কেবল আমায় উদ্ধার করার উপায়।
দীন-তারিণীর কৃপাদৃষ্টি দীনের ভাগ্যেই শশাভা পায় ;
দিন গেল , দীন কর মা, লুঠিয়ে পড়ি রাঙা পায়।
(গলৈশের প্রতি গঙ্গেশ রে!
আমি—এমন দিন ত আর পাব না, তুই রে মায়ের বর-পুত্র।
কাটল রে তাে হ’তে আমার শত জন্মের কৰ্ম্ম-সূত্র।
গণেশ।
(বাহু প্রসারণ করিয়া)
আয়রে বাপ! আয়! কোলে করি, প্রাণ খুলে গা-
জয় মায়ের জয়”।
গঙ্গেশ। (ঝাপ দিয়া ভবদেবের কোলে উঠিয়া-করতালী দিয়া)-
জয় মায়ের জয়, জয় মায়ের জয়,
জয় মায়ের জয়, জয় মায়ের জয়!!!
( করতালী দিয়া নাচিতে নাচিতে ভবদেব ও গঙ্গেশকে
প্রদক্ষিণ করিয়া সমস্বরে)।
জয় মায়ের জয়, জয় মায়ের জয়,
জয় মায়ের জয়, জয় মায়ের জয়!!!
( গান ২১)।
বৃথা কেন আর ? সংসার সংসার,
তারা-পদ সার কর রে ;
তার-চরণ-তরী ধর ধর রে--
গেয়ে তারা-নামের সারি,
ভবার্ণবে তর তর রে।
দু-বাহু প্রসারি,
দারা পরিজন,-
সহায় স্বজন,
প্রয়ােজন পরিহর রে--
কেবল, কর প্রিয়জন
তারা-ভক্ত জন,
বিনা সে জন, সব পর রে।
ওরে, মায়ার মায়া ভুলে, মায়ের মায়া-ফুলে
হার গেঁথে গলে পর রে-
তুলে, মায়ের নামে তান,
গেয়ে মা-মা-গান,
জুড়াও প্রাণ, যাতনা হর রে-
নবম দৃশ্য
০
মুখে ‘তারা তারা বলে, তারা-পদ-তলে
নয়নতারা স্থির কর রে।
ত্রিনয়নের নয়ন-তারায়,
দ্বিনয়নের তারায়,
তারাকারা ধারা ধর রে।
ওরে, সবাই আছে আর, তারা নাই রে যার
হয় সে অন্ধ নিরন্তর রে—
সে যে থাকতে নয়নতারা,
দিনে দেখে তারা,
(তারায় বহে)-দুখের ধারা ঝর ঝর রে—
হ'লে- নয়ন-তারা-হারা
চন্দ্র সূৰ্য্য তারা,
তারাও না হয় নয়ন-গােচর রে
তেমনি, তারা হারাইলেই, তারা হারাইলে,
তখন, আঁধার এ চরাচর রে।
ওরে, তারার তারা তারা, তারা-হারা তারা,
যারা—তারা-হারা তারা রাখে রে ;
তারাই ধরেছিল তারা, তারায় তারায় যারা,
তারা-রূপ-মাধুরী দেখে রে—
যাদের গুরুদত্ত তারা,
তত্ত্বময়ী-তারা-
রূপ-সুধাতে মত্ত থাকে রে ;-
তারা হইয়ে উন্মত্ত,
সদা করে নৃত্য ;
শিবচন্দ্র ! সে তাল ধর রে।
০
( গান গাহিতে গাহিতে সকলের প্রস্থান)।
দশম দৃশ্য।
;
ভৈরবীর প্রবেশ ।
ভৈরবী। (সবিস্ময়ে)। এ কি স্বপ্ন না কুহক'? মায়া না মােহ ? নাটক
ইন্দ্রজাল? এতক্ষণ এ কি দেখলাম? কি শুনলাম্ ? সত্যই কি
ভারতভূমির কণ্ঠ-রত্ন বহুকালের সেই গঙ্গেশ আবার আজ ফিরে
এল? না, তাও ত হবার নয়। গঙ্গেশ যেখানে গিয়েছে, সেখান
থেকে ত কেউ কখন ফিরে আসে না। তবে এ কি অসম্ভব
সম্ভাবনা, অঘটন-সঘটনা! অথবা এ মায়াময় সংসারে আর অসম্ভবই.
বা কি আছে ? অঘটনই বা কি আছে ?-মায়ের মায়া ত আমার
চিরকালই অঘটনঘটনপটীয়সী। তার কাছে আর অঘটন কি ?
(কিয়ৎক্ষণ পরে)—অহা ! কি ভ্রান্তি আমার ! অঘটনই বা
কারে বলি? এ যে আমার মায়ের মায়া ! জীব হয়েও গঙ্গেশ
সেই শিবারাধ্য পাদপদ্মের অধিকারী হ’লযার মায়ায় ; তার মায়ায়
আবার অঘটন-ঘূটন কি?
মর্ত্য-ভূমির মৃত্যু-দাস মানব হ’ল মৃত্যুঞ্জয়!
সেই গঙ্গেশের এ দৃশ্য আজ, এতে আর একটা কি বিস্ময় ?
যার সাধনায় যে হয় সিদ্ধ, সেই ত পায় তার স্বরূপ,
সিদ্ধির ফলে সাধ্য সাধক—দুই ই তখন একরূপ।
দেহ আত্মা কি মন প্রাণ—সকলই যার কেবল মা-ময়,
মা-নামের তরঙ্গ যার ত্রিভুবনে সদা বয়।
জীবনে, মরণ, কিম্বা জাগরণে, স্বপনে,
সমানভাবে প্রাণের স্রোত যার ছুটেছে মার চরণে।
মায়ের ধ্যানে, মায়ের জ্ঞানে, মায়ের নাম মহিমা গানে,
যার, মন মেতেছে, প্রাণ মেতেছে, মা-নামের মধুময় তানে
ক
দশম দৃশ্য।
তার যে-মায়ের রূপে মত্ত নয়ন, নৃত্য করে রসনা,
কেবল, শবাসনা লােল রসনা দিগবসনার ঘােষণা।
ও যার-উৰ্দ্ধ-তারার উর্দ্ধে কেবল উৰ্ধতারা-তারারূপ,
সে যে—অর্ধ-তারায় দেখে অর্ধ-তারা-অর্ধ-হর-রূপ।
তার যে-অৰ্ধ হ'লেও নয়ন-তারায় পূর্ণতা-রূপের উদয়,
তারা-উৰ্দ্ধ হলেই অন্ধ হয়ে পূর্ণ করেন তার সে হৃদয়।
নিয়ে অর্ধ রেখে মায়ের ঊর্ধ-অর্ধে লয় প্রলয়,
সেই লয়ে যার লয় ঘটেছে, সেই জিনেছে সেই প্রলয়।
নিম্ন-অন্ধে মায়ার প্রলয়, উৰ্দ্ধ-অন্ধে মায়ের লয়,
তাই-উৰ্দ্ধ-তারায় দেখেন বাবা, ঊর্ধে তারা-রূপের উদয়।
মায়ের ছেলে হয় রে যারা, উর্ধ-তারা তাদেরই হয়,
আত্ম-রূপের অর্ধ, তারা উৰ্দ্ধ-অৰ্ধে করে লয়।
সেই ঊর্ধে মিশেছে গঙ্গেশ, রুদ্ধ নাই আর কোন লােক,
তাই না সেকৈবল্যর শােভায় পূর্ণ আজ এ মর্ত্যলােক।
যে শক্তিতে ধ্যান-ধারণায় মায়ের উদয় হয় সংসারে,
সেই শক্তিতেই মায়ের ছেলে, ভালে দেখা দেয় তারে।
একই শক্তি, একই স্বরূপ,—আধা ছেলে, আধা মা,
সেই শক্তির স্বরূপে ডুবলেই জীবের হয় জীব-সীমা।
সেই জীবত্ব পরিহরি গঙ্গেশে আর গঙ্গাধরে,
ভেদ ঘুচেছে মুক্তকেশীর চরণ হৃদয়ে ধরে।
মার চরণের সঙ্গে সঙ্গে তাই গঙ্গেশের এ আবির্ভাব,
অসম্ভব নয়, অসম্ভব নয়, ধ্যান-ধারণার এই স্বভাব।
গলেশ। ভৈরবঘাটে সিদ্ধপীঠে এই না! সিদ্ধির পরিচয় , এই গুণেই ত সিদ্ধ-পীঠে সাধূলে শীঘ্র সিদ্ধি হয়। হায় হায়! গদেশের সেই জন্মস্থান, সেই সিদ্ধপীঠ, সেই গঙ্গাতীর, সেই ভৈরবঘাট-সেই সবই ত এখনও গঙ্গেশের সাধন-সিদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কিন্তু হায়! এক গদেশের অভাবে আজ সবই যেন অন্ধকার। সেই শত শত চিতা আজও মহানিশার মহাশ্মশান উদ্দীপিত করে জ্বলছে, আজও গঙ্গার উভয় তট এই আলােকে আলােকিত হচ্ছে কিন্তু ভৈরব-ঘাট। তােমার প্রাণের অন্তস্তলে যে অঙ্গার-যুপ স্তরে স্তরে বদ্ধ হয়েছে, কার সাধ্য আর তার অপনােদন করে? ভৈরব-ঘাট ! একা তুমি কেন ?-আমি ত এই দিন-রাত্রি ভারতের ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যে ঘাটে যাই, সেই ঘাটেই কেবল মরা মরা মরা বই আর কথা নাই! ভার- তের শ্মশানে আজ জীবিত আর কেউ আসে না। যদিও কখন কেউ আসে, জীবিত আর ফিরে যায় না। যে আসে, সে একেবারেই আসে, যে যায় সে একেবারেই যায়। হায়, হায়! গঙ্গাধরের প্রিয়শিষ্য সেই গঙ্গেশের লীলাভূমি ভৈরব-ঘাটের আজ এই দৃশ্য ! সেই ত তন্ত্র, সেই ত মন্ত্র, সেই ত গুরু, সেই ত মা, সেই ত এই সাধনার সিদ্ধি, সেই ত মায়ের মহিমা। সেই জপ তপ, শিক্ষা দীক্ষা, সেই শম দম, সেই নিয়ম, সেই কুলাচার, সেই যােগাচার, সেই বীরাচার বীরবিক্রম। সেই ত ভারত কর্মক্ষেত্র, সেই ত সেই ব্রাহ্মণ আজ, যেন, ধৰ্ম্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে শয়িত বীরেন্দ্র সাজ। সবই গেছে, সবই আছে, কিন্তু সবই শবাকার, হুঙ্কার টঙ্কার গেছে, আছে মাত্র হাহাকার। মহামন্ত্র শরাসনে ঘুড়ি আত্ম-মনঃশর, সন্ধান -শিক্ষাদাতা মহেশ্বর। আকর্ণ-পূর্ণ ;
১৫৭
দশম দৃশ্য।
লক্ষ্য কেবল যােগী ঋষির অলক্ষ্য মার শ্রীচরণ,
অলক্ষ্যে সেই লক্ষ্য বেধি হত যাদের মহারণ।
তন্ময়তা-সিদ্ধি কেবল হত যায় কৈবল্য মরণ,
আৰ্যকুল-কুলাচারে শশাভিত যে রণাঙ্গন।
সে রণে হয় অগ্রসর আজ, নাই রে সে বীর, নাই সহায়,
যার অভাবে বঙ্গভূমি! রঙ্গভূমি তুমি হায় !!
হায় রে !
মায়াতীত নিত্যধাম চিন্ময় কৈবল্য-লােকে,
শিবলােক, ব্ৰহ্মলােক, বৈকুণ্ঠ কি গােলােকে।
কি মায়ামরীচিকা
এ ব্ৰহ্মাণ্ড-ভবনে,
সপ্ত-স্বর্গ সপ্ত-পাতাল চতুর্দশ-ভুবনে।
সাগর সাগরান্তরে, দ্বীপ হতে দ্বীপান্তরে,
ধরাধর-শিরে কিম্বা শ্মশানে, কি প্রান্তরে।
নদ-নদীতটে, ফঠে, বনে, কিম্বা ভবনে,
ধ্যানে জ্ঞানে যােগে যাগে পূজনে কি হবনে।
ত্রিদেব ত্রিমুর্তি ধরি যে মূর্তির সাধনে,
ত্রিশক্তিসম্পন্ন বিশ্ব-সৃষ্টি-স্থিতি-নিধনে।
সুরাসুর সিদ্ধ সাধ্য গন্ধর্ব কি বিদ্যাধর,
কিন্নর কি নর যক্ষ রক্ষঃ সর্ব চরাচর ;
}
যােগী জ্ঞানী কৰ্মী ভক্ত নিষ্কাম সাধক সাধিকা,
যে সাধনে সাধিছেন সৰ্বার্থ-সাধিকা।
গদেশ।
পর-ব্ৰহ্ম-দম্পতির সেই মন্ত্র-মুৰ্ত্তি যন্ত্র,
আর এখন জাগে না, যেন যন্ত্রী বিনা যন্ত্র।
সবাই বলে “জাগাে,তারা! জাগাে কুলকুণ্ডলিনি !”
যেন, জেগে আছে তারা সবাই,কেবল ঘুমাইছেন তিনি।
ব্ৰহ্মা, হ’তে তৃণস্তম্ব যিনি বিশ্বব্যাপিনী,
ব্ৰহ্মাণ্ডময় সৰ্ব্বভূতে নিত্য জাগ্রৎ-স্বরূপিণী ।
চিৎ-শক্তি-স্বরূপে যিনি পরমাত্ম-রূপিণী,
জীবে শিবে সঞ্জীবনী : সমান অন্তর্যামিনী।
এক পলকের জ্বভঙ্গে যার কোটীবিশ্ব ভস্মসাৎ হয়,
কোলের ছেলে কোলে তুলে করেন মা মাের মহাপ্রলয়।
সৃষ্টিকালে প্রসবিত্রী আদ্যাশক্তি মা আমার,
প্রসব করেন কত কোটী ব্রহ্মাণ্ড, নাই সংখ্যা তার।
স্থিতিকালে সেই মা আমার আবার জগদ্ধাত্রী হন,
স্তন্যদানে অনুদানে রাখেন এই অগণ্য ভুবন।
সেই মা আমার ঘুমিয়ে আছেন, (আর) জেগে আছেন এরা সব,
যেন, চিন্ময়ী মা মরে গেছেন, জেগে উঠেছেন যত শব !!
তাই বলি—ঘুমান নাই চৈতন্যময়ী, ঘুমাইবার নন তিনি,
তার ঘুমাবার অবসর নাই, ত্রিজগজ্জননী যিনি।
{
সৃষ্টিচক্রে পরতঃপর উন্নত এই জীবকুলে,
ডাকেন মা প্রসারি বাহু, নেবেন বলে কোলে তুলে।
দশম দৃশ্য। ১৫৯ মায়া-মােহে সমাচ্ছন্ন জীব নিদ্রিত তাকে ভুলে, আবার,-আপন স্বপন মাকে দেখায়, শাখার ফল সব পাকায় মুলে। জেগে আছেন জগন্ময়ী, তায়জাগাবার নাই প্রয়ােজন, জেগেছ কি স্বপন দেখছ—তাই দে রে, জগজ্জন। মুলে ত মা আছেন জেগে, মুলে যে জাগে নাই কেহ, জাগত যদি, থাকত না আর—‘আমার দেহ, আমার গেহ। মা যাঁদের জেগেছিলেন- হয় ত মন্ত্র সিদ্ধ হবে, না হয় হবে দেহ-পাত, এই প্রতিজ্ঞা যাদের প্রাণে দিত সদা ঘাত প্রতিঘাত। তাদেরই সব বংশধর সেই মন্ত্রে আজ দীক্ষা শিক্ষা, কৰ্ম্ম-ফলে ধৰ্ম্ম ভুলে করিছে দাসত্ব-ভিক্ষা। বিবেক-বৈরাগ্য-বলে গেছে রে সে বীরাচার, ধৰ্ম্মে কর্মে মর্মে মর্মে ঘিরেছে ঘাের পশ্বাচার। তবুও-সাধক হ'তে সাধ করে সব, নাম শুনেছিস্ ! পঞ্চ মকার, সাধনার সাধনাই তােদের তাই, ভাবি না সে পঞ্চ ম কার ? গুরু-দত্ত ব্ৰহ্মতত্ত্ব মনে প্রাণে পায় না স্থান, সেই হয়েছে গুরু-ধাম তার, যার যেখানে কৰ্ম্ম-স্থান। নাই সে সন্ধান, নাই সে চেষ্টা, নাই সে উদ্যম, অধ্যবসায়, আপনি যদি আসেন গুরু, তবেই থাকে ব্যবসায়। বলিহারি সাধক। তােমার বলিহারি সাধনা। সংসারের সাধ ছেড়ে একবার সাধনারে সাধ না ! সত্য বটে শিবের আজ্ঞা-গৃহস্থ-আশ্রমেও সিদ্ধি, কিন্তু, তাই বলে বলেন নাই তন্ত্র, করতে কেবল ধনবৃদ্ধি।
।
সংসার ছেড়ে বিশ্বব্যাপী ব্ৰহ্ম-তত্ত্বের অভ্যুদয়,
সিদ্ধ হলে, তখন আবার সংসারই হয় ব্ৰহ্ম-ময়।
অত দূর-পথ ঘুরে আসতে কলির জীবের সাধ্য নাই,
সংসার হতেই ব্ৰহ্ম-দৃষ্টি করূতে তন্ত্র বলেন তাই।
সেই সংসারে সাধক যারা, গৃহী হয়েও হন সন্ন্যাসী,
সেই বৈরাগ্য যাদের প্রাণে, গৃহেও তারা শাশান-বাসী।
দেহ সকল—শব-কঙ্কাল, জীব সকল হয় শিবরূপ,
ইন্দ্রিয় সব সিদ্ধ সাধ্য ; স্বয়ং মন ভৈরব স্বরূপ।
বালকের দল-বটুক ভৈরব, বালিকা-দল যােগিনী,
জগন্মাতা কালিকা মাের—গৃহে গৃহে জননী।
এই সংসার-শ্মশানে মুক্ত সাধক বদ্ধ-পদ্মাসনে,
সিদ্ধ হয়ে, বদ্ধ মুক্ত—দুইকে রাখেন একাসনে।
হায় রে সে জ্ঞান, হায় রে সে ধ্যান, হায় রে সিদ্ধি কাধনা।
হায় রে সেই বিবেক-বৈরাগ্য, গুরু-বাক্য-ধারণা।
ভাতে গেলে, মনে হয় আজ, সেই কি ভারত এই কি হয় ?
বশিষ্ঠ-ব্যাস-বিশ্বামিত্রের মন্ত্র সিদ্ধি এই ধরায় ?
যার—সঘনে গগনাঙ্গনে উঠত ধ্বনি ‘জয়তারা,
সেই ভারত সেই তারা-হারা; —তাই রে আজ এ তারা-হারা
তাঁরা ছিলেন তারা-কুমার, তাই উঠেছেন তারার কোলে,
এখন-তাদের কুলকুমার যত, তারাই প'ড়ে ধরা-তলে।
গেছেন তারা, আছেন তারা, তাই বলি রে তারা-কুমার।
তাদের—নয়ন-তারা ছিলেন তারা; বল্ দেখি রে, তাের কার ?
১v দশম দৃশ্য। একটি নয় রে, দুটি নয় রে, ব’ ক টি? কোটী কোটী, উঠেছে মার কটি-টে, এখন তােরা আছিস ক টি ? নির্বাপিত প্রদীপে আজ—দুর্গন্ধ বর্তিকা সার। তাইকুলােজ্জল সেই কুল-যজ্ঞে অবশেষ সব কুলাঙ্গার !! মহানিদ্রায় নিদ্রিত সব, তাই যেন এ মহাশ্মশান; আর যােগে নাই, আর যাগে নাই,তাই জাগে নাই আৰ্যস্থা সে ত, ইচ্ছাময়ী মায়ের ইচ্ছায়, যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন কেবল একটা মাত্ৰ-শেষ কথা এই ব’বার আছে। তাই এখনও বলি এই শােন- খণ্ডিতে এ ভবভােগ, ছাড় নাস্তিকতা-রােগ, ধর মহামন্ত্র-যােগ, কর সিদ্ধি সাধনা। ছাড়ি সংসার-পাপ-বাসনা, সার কর মা শবাসনা, বিনা মায়ের উপাসনা, ঘুচিবে না বেদনা। জ্ঞান বল’! বিজ্ঞান বল! ধ্যান বল! গান বল! ব্ৰহ্মময়ীর মন্ত্র-বল, বিনা কিছু হবে না। বিনা মন্ত্রে বিনা তন্ত্রে, বিনা কুণ্ডলিনী-যন্ত্রে, বীণা যেন বিনা তন্ত্রে, কোন রব রবে না । অত্রিনেত্র ত্রিলােচন, অচতুর্মুখ চতুরানন, অচতুভুজ নারায়ণ, গুরু-ব্রহ্ম-ধারণা। সত্য! গুরু মর্ত্য-মূর্তি, তবু নিত্য-ব্ৰহ্মস্ফুৰ্ত্তি, কর তাঁর চরণে ভক্তি, ধর তঁার করুণা ।
গদেশ।
বিনা শুরু কর্ণধার,
ভর্ণবে নাই উদ্ধার,
হােক না ভক্তি শতধার, যদি গুরুর দাস না-
বিনা গুরু-কৃপা-কটাক্ষ, হন না কেন সহস্রাক্ষ ?
দেন না দেখা বিরূপাক্ষ—হৃৎকমল-আসনা ।
জেনাে ক্ষেপা,
গুরুর কৃপায় মায়ের কৃপা, যে বলে সে
সকল ক্ষেপার বাবার বাবা, বলেছেন, তাই শােন না
জগদম্বার কৃপা হলে, তবে গুরুর দর্শন মিলে
নইলে জীবের চেষ্টা ফলে, শিবের দর্শন জেনাে না।
সদগুরু-বল চাও রে যদি,
ডাক মাকে নিরবধি,
তবে যদি কৃপানিধি, করেন কৃপা নইলে না।
তখন—গুরুর দেহে তারিতে জীব, কৈলাস হ’তে আসিবেন শিব,
তবে জীব তুই হবি রে শিব, ঘুচবে ভব-যাতনা ।
তাই-মহা-নিদ্রা মনে করি, মােহ-নিদ্রা পরিহরি,
মহাবিদ্যা-মন্ত্র ধরি, মহা-যাত্ৰা হর না!
যদি মুক্তি চাও ভবে,
নাই অন্যগতি তবে,
“জয় মা মুক্তকেশী” রবে, সে পদাশ্রয় কর না।
জাগ রে! জাগ রে! জাগ। “জয় জননি?” বলে ডাক,
এ কাল-রাত্রি জেগে থাক, “জয় কালীর জয়” বল না।
আর হবে না কালের ভয়, কালের কাল সেই মৃত্যুঞ্জয়,
স্বয়ং ব’বেন দিয়ে অভয়, “অভয়-ধামে চল না ”
দশম দৃশ্য। গান-(২২) “জয় জয় কালী,”—বলে কর-তালী, দিয়ে চল কুল-কাননে। কালী-নাম-মহামন্ত্র-স্মরণে- যথাকুল-কল্পতরু মুলে-কুল-গুরু কালী-কল্প-লতা-মিলনে। - জীবের - ধৰ্ম্ম অর্থ কাম- মােক্ষ-ফল-ধাম, কালী-নামকুসুমে যে বনে- নিত্য-ব্ৰহ্মানন্দ নিত্য-মকরন্দ পানে মত্ত সাধক সঘনে। ও যার যে রস পানে জীব, জীবনে হয় শিব, আর না যায় সে, জনন মরণে- সেই ধন্য নামের সুধা, হরে ভবের ক্ষুধা, মুক্তি, মুক্তকেশীর অণে। ওরে প্রাণের কপাট খুলে, দু-টী বাহু তুলে, “জয় মা তারা” বলে বদনে মায়ের কোলের ছেলে সেজে আয় রে! নেচে নেচে, দেখবি যদি মাকে নয়নে। ও সেই- ত্রিনয়নের ধনে, দেখে দ্বি-নয়নে, জীবের আশা মিটে কেমনে? তাই- আয়, মা! মনােবনে, মনােময় নয়নে, দেখি শিবের) মনের নিধি মনে মনে। সম্পূর্ণ।
গঙ্গেশের গীতাবলীর সুর ও তাল। গান একতালা। ২ যৎ স ৬ ৪ যৎ কারফা ৬ যৎ ৭ ৮ যৎ ৬ গৌরী বিভাস পাহাড়ী কীৰ্ত্তনের সুর পিলু সিন্ধু কীৰ্ত্তনের সুর ভৈরবী সিন্ধু ভৈরবী খাম্বাজ রামকেলী অহং আলেয়া পিলু কালেংড়া সুরট মিশ্র কীৰ্ত্তনের সুর ঐ রামপ্রসাদী যৎ ত ১২ একতালা ১৮ যৎ ১৪ খেটা কয়ালী একতালা ১৬। ১৭ ১৮ ১৯ যৎ কীৰ্ত্তনের সুর 삶 산상 একলা ভৈরব ঐ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.