Makardah Saraswat Library, Howrah

Sudhar Prem Ed. 1st

Debi, Sri Amala · 2009/08/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুধার প্রেম

No text on this page.

সুধাৱ প্রেম
শ্রীঅমলা দেবী
রঞ্জন পালিশিং হাউস
২৫২ মােহনবাগান মাে
কলিকাতা

প্রথম সংস্করণ—আশ্বিন ১৩৪৭
পুনর্মুদ্রণ-আষাঢ় ১৩৫২
মূল্য দেড় টাকা
শনিরন প্রেস
২২ মােহনবাগান ৰে, কলিকাতা হইতে
সৌরীন্দ্রনাথ দাস কক মুত্রিত ও প্রকাশিত

রায় সাহেব ঘনশ্যাম মিত্র কেঁচো খুঁড়িতে খুড়িতে একটি সাপ বাহির করিলেন। ঘনশ্যামবাবু ব্যবসায়ে উকিল । পরের কেঁচোকে সাপ বানাইয়া শুধু যে এতদিন এতবড় সংসারের গ্রাসাচ্ছাদন নিৰ্বাহ করিয়াছেন, তাহা নহে; পৈতৃক একতলা বাড়ির উপর দোতলা তুলিয়াছেন, জমিদারি ফাদিয়াছেন, ব্যাঙ্ক ব্যালান্স বাড়াইয়াছেন এবং রায় সাহেব হইয়াছেন। কাজেই নিজের সুরক্ষিত সংসারে এক বিষধর সর্পের আবির্ভাব দেখিয়া সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন। ব্যাপারটা এই, একমাত্র পুত্র মনােজকুমার কলিকাতায় মেসে থাকিয়া এম. এ. ও ল পড়ে। ছেলে দেখিতে ও শুনিতে ভালই। বি. এ.-তে ইংরেজীতে প্রথম শ্রেণীর অনার্স পাইয়াছে। আশা করিতেছেন, এম. এ. ও ল ভাল করিয়া পাস করিতে পারিলে মুরুব্বীদের ধরিয়া মুন্সেফিতে বসাইবেন এবং কোন এক ধনী পিতার একমাত্র তনয়ার সহিত বিবাহ দিয়া এতদিন যাহা খরচ করিয়াছেন, সুদে ও আসলে সমস্ত ঘরে ঢুকাইবেন। ভগবান সুরাহাও করিয়াছেন। বৎসরখানেক হইল, এক ধনী মক্কেলের সালে এস্টেটের ভার তাহার হাতে আসিয়াছে। মক্কেলের নাস্তৃত ঘােষ। কন্টাক্টরি করিয়া মানভূম অঞ্চলে জমিদারি কিনিয়াছিলেন, সব বিলি-ব্যবস্থা করিয়া গুছাইয়া বসিতে না বসিতে পরলােকের আসিল। কাজেই পত্নী সুরবালা, কন্যা' মাধুরী ও জনকয়েক ২ সুধার প্রেম বিস্তর ইয়ার-বন্ধুকে একসঙ্গে বেওয়ারিস করিয়া ইহলােক হইতে বিদায় লইতে হইল। প্রজারা সুযােগ বুঝিয়া মাথা চাড়া দিয়া উঠিল, প্রতিবেশী জমিদার জমিদারির সীমানা লইয়া বিরােধ বাধাইল এবং ম্যানেজার ও গােমস্তার বিধবাকে পথে বসাইবার জন্য গােপনে শত্রুপক্ষে যােগ দিল তাহার উপর পিতৃকুল ও শ্বশুরকুল-দুই কুল হইতেই আত্মীয়স্বজনের দল হৈ-হৈ করিয়া আসিয়া হাজির হইয়া সুরবালাকে ঘিরিয়া সমুদ্রমন্থন শুরু করিল। সুরবালা কি করবেন, স্থির করিতে না পারিয়া ঘনশ্যাম বাবুর শরণাপন্ন হইলেন । ঘনশ্যাম আসিয়াই সমস্ত সেরেস্তা ঢালিয়া সাজিলেন। নিজের এক বেকার শ্যালককে ম্যানেজারের গদিতে বসাইলেন। গােমস্তাদের মধ্যে যাহারা আত্মসমর্পণ করিল, তাহাদের বহাল রাখিলেন , কিন্তু যাহারা তিলমাত্র টালমাটাল করিল, তাহাদের বিদায় দিয়া নৃতন লােক নিযুক্ত করিলেন। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য দীর্ঘ দেহ ও লম্বা লাঠি-ধারী পশ্চিম পালােয়ান আমদানি করিলেন এবং সদরে মামলার পর মামলা রুজু করিয়া ছােট বড় সকল শত্রুকে সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিলেন। দেখিতে দেখিতে সমস্ত জমিদারিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা মূর্তিমতী হইয়া উঠিল। প্রতিপক্ষ জমিদার সন্ধির প্রস্তাব করিল ; প্রজারা যথাসম্ভব ভেট ও নজরানা দিয়া আনুগত্য জ্ঞাপন করিল, এবং বেদখল প্রজার দ দখল পাইবার জন্য ঘনশ্যামের দরবারে অনােগােনা শুরু করিল। কাদি কাদি কঁাচা কলা, বস্তা বস্তা সরু চাল, ভাড় ভাড় গাওয়া ঘি ও বড় বড় রুইমাছ কাছারিতে ও উদ্ব ও থাকিলে অন্দরমহলে পেীছিতে লাগিল। এমন কি ঘনশ্যামের কাছে ঘায়েল হইয়া দুই-চারিজন প্রজা অন্দরমহলে জবালার কাছে আপীল করিতে লাগিল। স্বামীর জীবদ্দশায় এ সৌভাগ; বলার কোন দিন হয় নাই ; অতএব ঘনামের প্রতি তাঁহার সুধার প্রেম কৃতজ্ঞতার সীমা রহিল না। বয়স কম হইলে কি করিতেন বলা যায় না, কিন্তু সম্প্রতি চল্লিশ বৎসর বয়স ও চব্বিবহুল দেহ দর্পণের ভিতর হইতে পুনঃ পুনঃ দন্তবিকাশ করিয়া তাহাকে সামলাইয়া দিল। অতএব ঘনশ্যামের ঋণ কি করিয়া শােধ করিতে হইবে, সেই বিষয়ে পরামর্শ করিবার জন্য নৃতন ম্যানেজার শৈলজাবাবুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। শৈলজাকে দেখিলে জমিদারি-সেরেস্তার ম্যানেজার বলিয়া মনে হয় ! নাদুস-নুদুস নন্দদুলাল প্যাটার্নের দেহ, ফর্সা গায়ের রঙ, ফোলা ফোলা গালের মধ্যে মােটা ও চ্যাপ্টা নাক, মাথায় কোকড়া কেঁকড়া চুলে মেয়েদের মত পরিপাটী সি থি। পরিধানে হাফহাতা টুইলের শার্ট, নরুন- পড় ধুতি ও পায়ে অ্যালবার্ট স্লিপার। শৈলজার বুদ্ধি নাই বটে, কিন্তু ব্যবহারে এমনই একটি সহজ ও সরস সারল্য আছে, যাহাতে যে কোন বয়সের স্ত্রী ও পুরুষের অন্তরঙ্গ হইতে তাহার দেরি হয় না। যতদিন বেকার বসিয়া ছিল, গ্রামের ছেলেদের সর্দারি করি, থিয়েটারে ফিমেল পার্ট করিত ( অবশ্য অত্যন্ত মােটা হইয়া উঠিবার পর পারিয়া উঠিত ), স্বামী ও স্ত্রীদের কলহে মধ্যস্থতা করিত, মেয়েদের হুকুম তামিল করিত, এমন কি বর্ণপরিচয়হীন নব বিবাহিত ও বিবাহিতাদের প্রেমপত্র লিখিয়া দিত। এমনই ভাবে আরামে দিন কাটিতেছিল, হঠাৎ শ্যালক- পত্নীর কড়া তাগাদার ফলে ও সুযােগ হাতের কাছে আসায় ঘনশ্যাম তাহাকে মৃত মৃত্যুঞ্জয়ের জমিদারিতে ম্যানেজার-পদে বহাল করিয়া দিলেন। ম্যানেজারির কাজকর্ম আয়ত্ত করিতে শৈলজার দেরি হইতে লাগিল বটে, কিন্তু সুরবালার মন আয়ত্ত করিতে তাহার দেরি হইল না। প্রথমে সুরবালা তাহার সহিত যথারীতি পর্দার অন্তরাল হইতে কথা বলিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার মেয়েলী কণ্ঠস্বর, ছেলেমানুষের মত হাসি কথাবার্তার ধরন দেখিয়া পর্দা বর্জন করিলেন এবং শৈলজা তাহা ৪ সুধার প্রেম দিদি। ‘দিদি বলিয়া সম্বােধন করার পর হইতে তাহাকে নাম ধরিয়া ডাকতে শুরু করিলেন । সুরবালাকে দেখিয়াই শৈলজা ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল ও দুই হাত । দিয়া দুই পায়ের ধূলা মাথায় লইল। সুরবালা বাধা না দিয়া কহিলেন, থাক থাক, দিন দুবেলা প্রণাম করতে হয় না, শৈলজা কহিল, বলেন কি দিদি। আপনার দয়া করে খাচ্ছি বলিয়া দুই হাত বুকের উপর রাখল। সুরবালা সন্তোষের হাসি হাসিয়া কহিলেন, কি যে বলে! স্নেহের সৃহিত কহিলেন, পাগল । দুই চোখ কপালে তুলিয়া শৈলজা কহিল, পাগল। তা হলে তো দেশসুদ্ধ সবাই পাগল ! সব কি বলছে শুনুন- গে দিকি। সুরবালা কৌতুহলের সহিত কহিলেন, কি বলছে? বলছে, মা আমাদের সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা । সুরবাল কোপের ভান করিয়া কহিলেন, হঁ্যা, অন্নপূর্ণা না কি ? কেউ কিছু বলে না, সব তোমার বানানাে। বানানাে? বেশ -বলিয়া শৈলজ গাল ফুলাইয়া চুপ করিয়? বহিল। সুরবালা অন্য কথা পাড়িলেন। কহিলেন, ঘনশ্যামবাবুর সম্বন্ধে কি করা যায় বল দেখি? উনি যা করেছেন, তা শােধ দেওয়া অবশ্য অসম্ভব, তবু তাে কিছু ওঁকে দিতে হবে। শৈলজা কহিল, পাগল হয়েছেন দিদি ! উনি কিছু নেবেন না। বন্ধুর জন্যে করেছেন। বিস্ময়ের সহিত সুরবালা কহিলেন, বন্ধু ! আমাদের কাজকর্ম তেন শুনি, ওঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল ব'লে তাে শুনি নি সুধার প্রেম শল জ; চোখ বুজিয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল, শুধু বন্ধু নয়। দুই চোখ ডাগর করিয়া কহিল, একেবারে হরিহরা, মৃত্যুর খবর শুনে সাত দিন বিছানা ছেডে ওঠেন নি। দিদির তোে হাউহাউ করে কান্না। তােমার দিদি ও ওঁকে জানতেন নাকি ? জানতেন বইকি। প্রায়ই যেতেন যে। ভারি ভালবাসতেন দিদিকে । বউদিদি বলতে অজ্ঞান। ঢােক গিলিয়া কহিল, আর আমাকেও ঠিক নিজের শালার মত স্নেহ করতেন । সুরবালা অন্যমনস্ক ভাবে কহিলেন, তাই নাকি? ভাবিলেন, বাইরে সকলের সঙ্গে কত ভাব, কত ভালবাসা; কিন্তু ঘরে ? একটি দীর্ঘনিশ্বাস মােচন করিয়া কহিলেন, কিন্তু আমার তো একটা কৰ্তব্য আছে। কিছু ওকে না দিলে আমার মন স্থির হবে না। শৈলজা কহিল, কিছুতেই উনি নেবেন না দিদি। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, ওঁর কিসের অভাব ? মাসে প্রায় দু হাজার টাকা সুরবাল দুই চোখ ডাগর করিয়া কহিলেন, দু হাজার টাকা। খুব বড় উকিল তা হলে? ঘাড় নাড়িয়া শৈলজা কহিল, সকলের সেরা উকিল । খেতে নাইতে সময় পান না। একটু থামিয়া কহিল, তার ওপর ছেলে হাকিম হ'লে তো কথাই নেই। বিস্ময়ের সহিত সুরবালা কহিলেন, কার ছেলে? কেন? ওঁর বড় ছেলে, মনােজ। রূপে কাত্তিক, বিদ্যেয় বেরম্পতি, বরাবর ফাস্ট হচ্ছে আর জলপানি পাচ্ছে। সােনার মেডেলের এত একটা মালা, হয়ে গেছে।-বলিয়া দুই হাত দিয়া মাল্যের দৈর্ঘ্য নিয়ে করিল।

৬
সুধার প্রেম
1
সুরবালা কহিল, এত ভাল ছেলে । বয়স কত ?
প্রায় বাইশ বছর ।
ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন না?
দিতে তাে চান।
মনের মত পাচ্ছেন কই । কত রাজা-রাজড়ার
বাড়ি থেকে তাে সম্বন্ধ আসছে। কিন্তু ওদের পছন্দ হচ্ছে না।
পছন্দ হয় তাে মেয়ে হয় না, মেয়ে পছন্দ হয় তাে ঘর হয় না।
সুরবালা একটু ইতস্তত করিয়া কহিলেন, আমার মাধুর সঙ্গে হয় না?
শৈলজা মুখ চোখ ঘুরাইয়া উচ্ছসিত কণ্ঠে কহিল, হয় বলে হয়,
একেবারে হরগৌরী মিলন হয়। বলেন তাে মিত্তির মশায়ের কাছে
কথাটা পেড়ে দেখতে পারি।
সুরবালা গম্ভীর হইয়া কহিলেন, না, এখন কথা পেড়ে কাজ নেই।
তুমি বরং ছেলেটিকে এখানে একবার এনাে। নিজের চোখে আমি
দেখব। তা ছাড়া ছেলে মেয়েও দুজন দুজনকে দেখুক। যদি ওদের
ভাল লাগে, বিয়ে করতে ইচ্ছে হয় তো বিয়ে হবে। হলে টেনে
হিচড়ে একজনকে আর একজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সারাজীবন ধরে
আলাতন-পােড়াতন আমি চাই না।-বলিয়া নিজের ব্যর্থ বিবাহিত
জীবনকে স্মরণ করিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।
সেই দিনই শৈলজা ঘনশ্যামকে সংবাদ দিল । ঘনশ্যাম ইহারই
প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। একে তাে
একে তাে নাবালকের সম্পত্তি দেখিলেই
আইনজীবীদের জিহ্বায় জল ঝরিতে থাকে। তাহার উপর নাবালিকা-
মৃত পিতার একমাত্র কন্যা, তাহার স্বজাতি ও স্বঘর। অতএব কোনমতে
বিবাহ-ফাদে ফেলিতে পারিলে টানিয়া সমস্ত সম্পত্তি ঘরে তুলিতে
রিবেন। ঘনশ্যাম, মনােজ বাড়ি আসিলেই তাহাকে শৈলজার কাছে
ইয়া দিবেন, স্থির করিলেন।

সুধার প্রেম পূজার পর একদিন সকালে ঘনশ্যামবাবু মনােজকে ডাকিয়া যাওয়ার কথা বলিবেন বলিয়া মনে করিতেছেন, এমন সময়ে এক ফ্যাসাদ ঘটিল । ভৃত্য রঘু পােস্ট-অফিস হইতে সকালের ডাক আনিতে গিয়াছিল । তাহার হাতে একটি চৌকোণা খাম দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কার চিঠি রে ? রঘু জবাব দিল, দাদাবাবুর। দেখি ।--বলিয়া খামখানি লইয়া দেখিলেন, পরিষ্কার মেয়েলী ছাদে ইংরেজীতে নাম ও ঠিকানা লেখা! স্ট্যাম্পের ছাপ দেখিয়া বুঝিলেন, চিঠিখানি কলিকাতা হইতে আসিতেছে। মনটা ছাত করিয়া উঠিল। কলিকাতা হইতে কোন্ মেয়েমানুষ মনােজকে চিঠি লিখিতে পারে ? আত্মীয়া তাে নয়ই, হয় বান্ধবী, নয় প্রণয়িনী। দুইই বিপজ্জনক। কারণ বান্ধবী প্রণয়িনী হইতে কতক্ষণ? ডজনখানেক কুহু, দমকা দুই দখিনা বাতাস, ঝলক কয়েক জ্যোৎস্না পার্শ্ববর্তিনীকে যে কোন মুহূর্তে বক্ষবর্তিনী করিতে পারে। অতএব ? শৈলজা-প্রেরিত জমিদারি-সংক্রান্ত চিঠিপত্র দূরে সরাইয়া দিয়া, ঘনশ্যাম চেয়ারে ঠেস দিয়া, কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া, চিন্তিত ও বিরস মুখে বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে রঘুকে দরজার সামনে দিয়া যাইতে দেখিয়া ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তাের দাদাবাবু কোথায় রে ? রঘু কহিল, সাইকেল নিয়ে এখনই বেরিয়ে গেলেন। ঘনশ্যাম কক্ষ হইতে বাহির হইয়া মনােজের শয়নকক্ষের দিকে চলিলেন। কক্ষটি মাঝারি আয়তনের। এক দিকে একটি সাধারণ পালঙ্কে মনােজের বিছানা অত্যন্ত অগােছালােভাবে পাতা ছিল। আর এক দিকে দেওয়াল ঘেঁষিয়া দুইটা পাশাপাশি টেবিলের উপর মনােজের যাবতীয় প্রয়ােজনীয় ব্যবই, খাতা, লেটার-প্যাড, দোয়াত, কলম, আদা সুধার প্রেম চিরুনি, বিলাতী মেমের ছবিওয়ালা ক্যালেণ্ডার, টুথপেস্টের দুমড়ানে টিউব, দাত মাজিবার ব্রাশ ইত্যাদি জড় করা ছিল। ঘনশ্যাম ঘরে ঢুকিয়া সটান টেবিলের কাছে গিয়া বইগুলা খুলিয়া খুলিয়া দেখিতে লাগিলেন। লেটার-প্যাড তন্নতন্ন করিয়া খুজিলেন, খাতাপত্র উল্টাইলেন। শেষে বিছানা হাতড়াইতে লাগিলেন। অবশেষে গদির নীচে হইতে চিঠিখানি টানিয়া বাহির করিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল- ন আর কতদিন সেখানে থাকবে? আমার যে দিন কি করে কাটছে, আমিই জানি। ভারি ভয় হচ্ছে আমার। তুমি আর দেরি করাে না, লক্ষ্মীটি ! শিগগির চলে এস এখানে। মা-বাবার মত নিয়েছ কি ? যত শিগগির বিয়ে হয় ততই ভাল। বাবার মতের জন্যে চিন্তা নেই। তোমারই চিঠি পেয়েই চলে এস, লক্ষ্মীটি ? চুমু নাও -- আর প্রণাম-- চিঠিখানা পড়িয়া ঘনশ্যাম বিছানার উপরেই বসিয়া পড়িলেন। হাতটি কাপিতে লাগিল এবং কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটিয়া উঠিল । ঘাড় নাড়িয়া ক্ষোভের সহিত কহিলেন, যা ভেবেছি তাই। আমার কপালে তেঁতুল গুলেছে বেটা। কপালে করাঘাত করিয়া কহিলেন, আমার অদেষ্ট। সইবে কেন ? ছিঃ ছিঃ, এতবড় জমিদারিটা হাতছাড়া য়ে গেল । হঠাৎ রাগে দাঁত কিড়মিড় করিয়া কহিলেন, হতচ্ছাড়া জয় ! বিয়ে করবেন আমার ছেলেকে। করাচ্ছি বিয়ে। একটি পা হতে দেব না বাড়ি থেকে।বলিয়া রাগে গরগর করিতে করিতে সুধার প্রেম 6 টরটর করিয়া রান্নাঘরে আসিয়া স্ত্রীকে হাঁকিয়া কহিলেন, ওগাে, শুনছ ? একবার শুনে যাও দিকি, এখুনি।-বলিয়া নিজের শয়নকক্ষে আসিয়া একটা চেয়ার টানিয়া গুম হইয়া বসিয়া রহিলেন। ঘনশ্যাম-গৃহিণী ইন্দুমতী সিক্ত হস্ত কাপড়ে মুছিতে মুছিতে আসিয়া সামনে দাড়াইলেন । ঘনশ্যাম চিঠিখানা পত্নীর হাতে দিয়া গাম্ভীয্যের সাহ কহিলেন, পড়। গৃহিণী চিঠিখানি পড়িয়া ঔৎসুক্যের সহিত কহিলেন, কার চিঠি ? কে লিখেছে ? কিছু বুঝতে পারছি না তো! ঘনশ্যাম ক্রুর দৃষ্টিতে পত্নীর দিকে তাকাইয়া ক্রোধােচ্ছাসকে বলে চাপিয়া রাখিয়া চাপা স্বরে কহিলেন, বুঝতে পারছ না কার চিঠি ? তােমার গুণের ছেলে মর, প্রেম করেছে। গৃহিণী ঘাবড়াইয়া গিয়া কহিলেন, সে কি গো? তারপর ঘাড় নাডিয়া কহিলেন, না বাবু, এ আমি বিশ্বাস করি না। কেউ মিথ্যে ক'রে লিখেছে এ কথা । মনু আমার কখনও এ কাজ করতে ঘনশ্যাম ব্যরে সহিত কহিলেন, করতে পারে না। সব জান তো। তুমি ! কড়া গলায় কহিলেন, খুব করতে পারে। 'অার করেছে । এখন কিছু উপায় করতে পার তো করগে, নইলে হয় আমি নিজে দেশান্তরী হব, নয়তে! ওই ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করব। গৃহিণী নাকী সুরে ক্রন্দনের ভান করিয়া কহিলেন, বারে ! আমি কি উপায় করব ? ঘনশ্যাম ধমকাইয়া কহিলেন, উপায় করতে পারবে না তাে অমন ছেলে পেটে ধরেছিলে কেন ? নুন খাইয়ে আঁতুড়ে মেরে ফেলতে পারবি গৃহিণী ঝঙ্কার দিয়া কহিলেন, পেটে ধরেছি বলেই ছেলে কি আর একার? যখন ভাল করে পাস করে, জলপানি পায়, তখন তো সুধার প্রেম বল না ? তখন আমার ছেলে, আমার ছেলে বলে গোঁফ ফকিয়ে ঘুরে বেড়াও। এখন দোষ করেছে কিনা, তাই শুধু আমার একার ছেলে, জায় শুধু আমারই । পারব না আমি কিছু করতে, যা পার তুমি করগে । -বলিয়া চিঠিটা ঘনশ্যামের মুখের উপর নিক্ষেপ করিয়া গৃহিণী সক্রোধে দ্রুতপদে দরজার দিকে চলিলেন। ঘনশ্যাম হাঁকিয়া কহিলেন, দেশান্তরী হব কিন্তু। গৃহিণী জবাব দিলেন, যা ইচ্ছে করগে । ঘনশ্যাম দ্বারের কাছে আসিয়া ডাক দিয়া কহিলেন, শুনছ ? গৃহিণী অনেকটা অগ্রসর হইয়াছিলেন, থামিয়া মুখ ফিরাইয়া কহিলেন, কি বলছ, বল না ? গৃহিণী ফিরিলেন। ঘনশ্যাম শান্ত স্বরে কহিলেন, রাগারাগি করে কিছু ফল হবে না। ভারি বিপদ! উপযুক্ত ছেলে হাতছাড়া হতে বসেছে । যে কোন প্রকারে হােক, ওর মন ফেরাতেই হবে। তুমি মা, তার ওপর মেয়েমানুষ, চোখের জল তােমাদের হাতধরা ; দু ফোটা সময় আর সুযােগ মত ফেলতে পারলে ছেলের মন ভিজবে। আমি ওকে বােঝাতে পারি, ধমক দিতে পারি, কিন্তু তাতে কোন কাজ হবে না। গৃহিণী চুপ করিয়া নীরবে ঘনশ্যামের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। ঘনশ্যাম বলিতে লাগিলেন, এমন কি, আমি কিছু জানতে পেরেছি, সে কথা পর্যন্ত ওর না জানাই ভাল। তুমি বলবে যে, ওর বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে চিঠিখানা পেয়েছ। যেমন করে থােক ওকে বােঝাবে যে, এ মেয়েকে ঘরে আনা চলবে না। এ মেয়ে ঘরে এলে উচ্ছন্ন যেতে জয়ে সবাইকে। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, তুমি ভাল করে ওি। আমি ও অন্যভাবে বােঝাব।' কলকাতা যাওয়া ওর এখন 'রে দিয়ে শৈলর কাছে থাকবার ব্যবস্থা করে দেব। পরীক্ষা এখন মৃধার প্রেম ১১ যাক। তা ছাড়া জমিদারিটা যদি হাতে আসে, পড়াশুনা করবার ওর আর দরকার হবে না, পায়ের ওপর পা দিয়ে সারাজীবন খেতে পারবে। সেই দিন দুপুরবেলায় আহারাদির পর পান চিবাইতে চিবাইতে ইন্দুমতী পুত্রের শয়নকক্ষে পদার্পণ করিলেন। মনােজ একটা ডেক- চেয়ারে অর্ধশায়িত অবস্থায় কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া ভাবিতেছিল। মায়ের পদশব্দ বােধ করি শুনিতে পাইল না। ইন্দুমতী কিছুক্ষণ পুত্রের মুখের পানে তাকাইয়া রহিলেন-মুখ শুষ্ক, বিষন্ন ও চিন্তাকুল। ইন্দুমতীর বুকের ভিতরটা মুচড়াইয়া উঠিল। আহা! ছেলেমানুষ। মেয়েটাকে সত্যিই ভালবাসে। ভাবিলেন, না বাপু ! কাজ নেই বিয়ে শেষে কি হতে কি হবে, কে জানে! হয়তো বিরাগী হয়ে বেরিয়ে যাবে, কি হয়তাে হয়তে-বিষ-ষাট ষাট! কাজ নেই এত হাঙ্গামায়, যা ইচ্ছে ওর করুক। কিন্তু স্বামীর রক্তচক্ষু মনে পড়িয়া ইন্দুমতী বিষম খাইয়া কাসিয়া ফেলিলেন। মনােজ মুখ ফিরাইয়া মাকে দেখিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া কহিল, মা, তুমি বােধ হয় আমার মনের কথা জানতে পার। ইন্দুমতী কাসিতে লাগিলেন। একটু সামলাইয়া চোখ মুছিতে মুছিতে রুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন, কেন বল দেখি? মনােজ কহিল, বলছি, তুমি ব’স আগে বলিয়া ডেক-চেয়ারে তাঁহাকে বসাইয়া দিল। তারপর কুজা হইতে এক গ্লাস জল লইয়া তঁাহার হাতে দিল। ঢকঢক করিয়া জলটা গিলিয়া ইন্দুমতী একটু সুস্থ হইলেন। তারপর অঞ্চল প্রান্তে চোখ মুছিতে মুছিতে বিকল কণ্ঠে কহিলেন, কি বলছিলি তখন ? মনােজ কহিল, বলছিলাম, তুমি আমার মনের কথা জানতে পার। ইন্দুমতী ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, কেন বল দেখি? এতক্ষণ তােমাকেই আমি মনে মনে ডাকছিলাম।

সুধার প্রেম
কেন? আমি কি মরে গেছি যে, মনে মনে ডাকছিলি । চেঁচিয়ে
'ঢাকতে পারি নি ?
আমি আ জ তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম । এমনই তুমি প্রায় বল
যে, কলকাতায় আমার বিপদ-আপদ হলে এখানে বসে জানতে পার।
সেটা সত্যি কি না দেখবার জন্যে তোমাকে মনে মনে খুব ডাকছিলাম :
কিন্তু তুমি পরীক্ষায় পাস করেছ ম।
মনে নে হাসিয়! ইন্দুমতী কহিলেন, কেন এত ডাকছি লি কি
বিপদে পড়েছি ?
মনে একটি চেয়ার টানি? মায়ের কোল ঘেঁষিয়া বসিল : তারপৰু
মায়ের দুইটি হাত নিজের হাতের মধ্যে লইয়া কহিল, ঠিক বিপদ নয় মা।
এক জনকে একটি কথা দিয়েছি। কথা না রাখলে অত্যন্ত অধম হবে,
থচ তােমার মত না হলে কথা রাখতে পারি না ।
ইন্দুমতী বিস্ময় প্রকাশ করিয়া কহিলেন, কাকে আবার কি কথা
দয়েছিস ?
মনােজ ঢোক গিলিয়া কহিল, একটি মেয়েকে বিয়ে করব বলেছি।
ইন্দুমতী নীরস কণ্ঠে কহিলেন, এ কথা তুই বলতে গেলি কেন?
যখন জানিস, তাের নিজের মতে বিয়ে হবে না।
মনােজ মুখ লাল করিয়া ও ভূমিতলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া মৃদু কণ্ঠে
কহিল, মেয়েটিকে আমি ভালবেসেছি মা।
ইন্দুতমী যেন ভাল শুনিতে পাইলেন না, এমনই ভান করিয়া
কহিলেন, কি করেছিস ?
মনােজ সলজ্জ হাসি হাসিয়া কহিল, ভালবেসেছি।
ইন্দুমতী কহিলেন, ভালবেসেছিস তো কি হবে ? ভালবাসলেই
করতে হবে, তার কোন মানে নেই।

সুধার প্রেম মনােজ বিস্মিত কণ্ঠে কহিল, সে কি মা? হ্যা বাবা, তাই। ভালবাসা কদিন থাকে ? বিয়ের আগে আমার এক বন্ধু ছিল ; এত ভালবাসতাম তাকে যে, এক দণ্ড চোখের আড়াল 'লে অস্থির হতাম, একসঙ্গে খেতাম, একসঙ্গে শুতাম- মনােজ পরম বিস্ময়ের সহিত কহিল, সে কি না? পুরুষ বন্ধু? ইন্দুমতী হাসিয়া কহিলেন, দূর বােক! ছেলে ! পুরুস বন্ধু কেন হবে? মেয়েমানুষ, আমার এক পিসী, আমার সমবয়সী, কিন্তু বিয়ে হবার পর কাথায় গেল ভালবাসা, কোথায় গেল বন্ধুত্ব ! এখন বৎসরান্তে একদিন তার কথা মনে পড়ে না। মনােজ প্রতিবাদ করিয়া কহিল, মেয়ে-পুরুষের ভালবাসা অন্য রকমের। ঘাড় নাড়িয়া ইন্দুমতী কহিলেন, তা নয় বাবা। ও ভালবাসা আর ও নকো, একটু মনের কি মতের তারতম্য হলেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নইলে, শােন নি, বিলেতের মেয়ে-পুরুষ আজ এক জন একজনকে ভালবাসছে, কালই তার সঙ্গে চুলােচুলি করে ভেঙ্গে পড়ছে। মনােজ কহিল, সত্যিকার ভালবাসায় তা হয় না মা। ইন্দুমতী হাসিয়া কহিলেন, ভালবাসার আসল-নকল বােঝা যায় নাকি? সবই মনে হয় আসল ! কেঁচোর মধ্যে যে কাটা আছে, তা না বুঝে যারা গেলে, তাদের দুর্দশার আর সীমা থাকে না। মনােজ কহিল, কিন্তু তাকে বিয়ে না করে আমার উপায় নেই মা। —বলিয়া মুখ নীচু করিল । ইন্দুমতী গম্ভীর হইয়া কহিলেন, তা যখন বলছ বাছা, তবে আমিও দেখাই বলিয়া শেমিজের ভিতর হইতে চিঠিখানা বাহির করিয়া কহিলেন, চিঠিটি কার বাছা? বিম্ময়াহত কণ্ঠে মনােজ কহিল, এ চিঠি তুমি কোথায় পেলে মা?

১৪ সুধার প্রেম পেলাম তােমার বিছানার ভেতর থেকে, বিছানা ঝাড়তে বাড়তে । তা এ চিঠিটি কি সেই মেয়ের ? মনােজ ‘ই’-সূচক ঘাড় নাড়িয়া কহিল, তুমি পড়েছ ? ইন্দুমতী স্বীকার করিলেন। মনােজ কহিল, তবে তাে তুমি সবই জানতে পেরেছ মা। আমি কি করব, বল ? ইন্দুমতী গম্ভীর হইয়া কহিলেন, তােমার কিছু করে কাজ নেই বাবা। ও মেয়ের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রেখে না। মনােজ কহিল, সে কি মা? তুমি মেয়েমানুষ হয়ে এই কথা বলছ ? ইন্দুমতী তীক্ষ কণ্ঠে কহিলেন, হ্যা, বাবা। একজন অচেনা পুরুষের সঙ্গে যে মেয়ের এত মেশামেশি করতে বাধে না, তাকে আমার বউ করে ঘরে তুলতে পারব না বাছা। তুমি যাই বল । আমি যে তাকে ধরে আনব বলে কথা দিয়েছি মা। আমরা যতদিন বেঁচে আছি, তােমার কথার দাম কি বাবা? তারই ওপর নির্ভর করে যে মেয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে, তারই বা দাম কি ? ও কথা তুমি বলাে না। সে তােমার ভাবী পুত্রবধূ। ইন্দুমতী দৃঢ় কণ্ঠে কহিলেন, না, সে আমার পুত্রবধূ কখনও হবে না। সেই মেয়ে যদি ঘরে আসে, তােমার বাবা দেশত্যাগী হবেন, আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব। তারপর কণ্ঠ ও চক্ষু দুইই অশ্রুসজল করিয়া কহিলেন, এত করে তােক মানুষ করলাম, সে কি এর জন্যে ? কত সাধ, কত আশা, একটি মনের মত বউ আনব, যে সংসারকে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে তুলেছি, তা তার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ মুদব, সে সাধ সে আশা তুই এমনই করে ভেঙে গুড়াে করে দিতে চাস ? তাের বাবার খাওয়া নেই, ঘুম নেই, দিনরাত খাটছেন, ভাবছেন, ছিঃ মা!

সুধার প্রেম ছেলে উপযুক্ত হবে, সব ভার তার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন, তাকে তুই এমনই করে নিরাশ করবি? ওঁর শরীর বড় খারাপ, বুকের দোষ হয়েছে ; ডাক্তার বলেছে, একটু আঘাত পেলে বাচবেন না। বলিয়া কণ্ঠস্বরকে একেবারে ভাঙিয়া ফেলিয়া অঞ্চলপ্রান্তে চক্ষু মুছিতে লাগিলেন। এতবড় বক্তৃতা এমন করিয়া গুছাইয়া যথারীতি ভাব ও ভঙ্গী সহকারে বলিতে পারিবেন, ইন্দুমতী ভাবেন নাই। অতএব মনে মনে নিজেকে তারিফ করিতে লাগিলেন এবং মনােজের দিকে দুই জলসিক্ত চোখ মেলিয়া তাকাইয়া তাহার উপর বক্তৃতার ফল লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। মনােজ কহিল, সে মেয়েকে দেখ নি মা, তাই 'তার ওপর অবিচার করছ। তার মা নেই, বাবা প্রায় শয্যাশায়ী, আপনার বলতে আর কেউ নেই। একা সংসারের সব ওকে দেখতে হয়, চাকরবাকরদের সামলাতে হয়, হিসেবপত্র রাখতে হয়, অতিথি অভ্যাগতকে আপ্যায়ন করতে হয়, তার ওপর দিনরাত ওর বাবার সেবা করতে হয়। ও মেয়ে যে সংসারেই যাবে মা, ওর হাতে সেই সংসার সুন্দর হয়ে উঠবে। ইন্দুমতী প্রশ্ন করিলেন, ওর আর ভাই বােন কেউ নেই ? মনােজ ঘাড় নাড়িল । ইন্দুমতী কহিলেন, বেশ তাে, ওর বাব। দেখে শুনে একটি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করুন। তা কি করে হবে মা?—বলিয়া মনােজ মুখ নামাইল । খুব হবে বাবা, আজকাল অনেক হচ্ছে। তুই মােট কথা ওর পথে আর পা দিস নি, ভালবাসাটাস সব মিথ্যে, তােকে ফাদে ফেলবার চেষ্টা করছে ওই মেয়ে। মনােজ প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, তা হয় না মা, ও সেসৰ জানে না।

সুধার প্রেম মেয়েটির উপর পুত্রের দরদ দেখিয়া ইন্দুমতীর ক্রোধের উদ্রেক হইল । অধর কুঞ্চিত করিয়া কহিলেন, জানে না। সব জানে । বাপ-বেটীতে ‘পবামর্শ করে এই ফন্দি করেছে । জানে, ভাল ছেলে, অবস্থা ভাল, অমনই তার ঘাড় মটকাবার চেষ্টা ! কলকাতার মেয়ের ক্ষুরে নমস্কার বলিয়া ভক্তি ভরে দুই যুক্ত হস্ত কপালে ঠেকাইলেন। মনােজ চুপ করিয়া চিন্তিত মুখে বসিয়া রহিল । ইন্দুমতী মনাে রে চিন্তিত দেখিয়া আশান্বিত হইয়া উঠিলেন। কহিলেন, তা ছাড়া আজকালকার মেয়ে, স্কুল-কলেজে পড়ে, ট্রামে বাসে একা যাওয়া-আসা করে, সকলের সঙ্গেই আলাপ করে, তা হলে শুধু তোর সঙ্গেই এত ঘনিষ্ঠতা হ'ল কি করে?—বলিয়া সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পুত্রের দিকে তাকাইলেন । ভালবাসার জন্ম-ইতিহাস, আর যাহাকেই হউক, মা-বাবাকে খুলিয়া বলা যায় না । কাজেই মনােজ চুপ করিয়া রহিল। উত্তরের আশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া ইন্দুমতী কহিলেন, আমার মত মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী তাের কেউ নেই। আমি বার বার বলছি, এসব কথা মন থেকে মুছে ফেলে দে। যেমন করেই হােক, ভুল হয়তে করেছিস, কিন্তু তাই বলে সেই ভুলের জের টেনে নিজেও জ্বলিস না, আমাদেরও জ্বালাস না। আমার অনেক সাধ বাছা, তাতে বাদ সাধলে জীবনে কোন দিন সুখী হতে পারবি না, আমি বলে দিচ্ছি । মনােজ গুম হইয়া নতমুখে বসিয়া রহিল। ইন্দুমতী তাহার মাথায় পিঠে হাত বুলাইয়া কহিলেন, কেন এত মন-খারাপ করছিস ? ভাবনা একবারও মনে ঢুকতে দিস না। দেখবি, দুদিন পরে একে বারে ভুলে যাবি। আর এক কাজ কর, তাের বাবা বলছিলেন, কি কাজে এঁকে শৈলর কাছে যেতে হবে। তা ওঁর বদলে তুইই যা। কাজে ডুবে থাকলে মন দুদিনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বার দুই হাই তুলিয়া কহিলেন, যাই সুধার প্রেম ১৭ করিল। একটু গড়িয়ে নিইগে।—বলিয়া উঠিয়া দাড়াইতেই মনােজ কহিল, মা, বাবাকে একবার বলে দেখব? ওঁর হয়তাে অমত না হতেও পারে। পিতৃচরিত্র সম্বন্ধে পুত্রের অভিজ্ঞতা দেখিয়া ইন্দুমতী মনে মনে হাসিলেন। প্রকাশ্যে দুই চোখ কপালে তুলিয়া কহিলেন, সৰ্ব্বনাশ ! এমন কাজ কখন করাে না বাবা। ওঁর একে বুকের দোষ ! ঘুণাক্ষরে এ কথা জানতে পারলে ওঁকে বাঁচানাে দায় হবে । সেই দিনই সন্ধ্যার পর ঘনশ্যামের শয়নকক্ষে মনােজের ডাক পড়িল। "মনােজ মনে মনে সওয়াল-জবাবের খসড়া করিতে করিতে কক্ষে প্রবেশ ক খায় অন্ধকার। এক কোণে একটি লণ্ঠন মৃদুভাবে জ্বলিতেছিল। ঘনশ্যাম বিছানায় শুইয়া ছিলেন। পাশে বসিয়া ঘনশ্যাম- গৃহিণী বােধ করি বুকে হাত বুলাইতেছিলেন। সারা কক্ষে এমনই একটি থমথমে ভাব বিরাজ করিতেছিল যে, মমেজের পদশব্দ স্বতই মৃদু হইয়া আসিল। বিছানার কাছে আসিয়া মাকে মুখের ইঙ্গিতে প্রশ্ন করিল, কি হয়েছে? ইন্দুমতী বাম হাত নিজের বুকে ঠেকাইয়া ফিসফিস করিয়া কহিলেন, বেদনাটা বেড়েছে, ব’স । ঘনশ্যামের দিকে তাকাইয়া কহিলেন, একটু ঘুম এসেছে বােধ হয় । ঘনশ্যাম কথা বলিতে উদ্যত হইয়াছিলেন, কিন্তু গৃহিণীর এই কথার পর আর কথা বলা চলিল না; অতএব চুপ করিয়া গেলেন। কিন্তু গৃহিণীর উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন। ঘুম এসেছে বােধ হয় ! কেন, চুপ করিয়া এমনই বুঝি পড়িয়া থাকা চলে না? মনােজ পিতার শারীরিক অবস্থা দেখিয়া অত্যন্ত ঘাবড়াইয়া গেল। দুপুরবেলায় মায়ের কথা মনে পড়িয়া গেল, বুকের বেদনায় কোন কথা বলিলেই বাঁচানো দায় হইবে । তবে ? ওদিকে সুধার হৃদয়-বেদনা, এদিকে বাবার হৃৎপিণ্ডের বেদনা—দুইই একসঙ্গে চাদিয়া উঠিয়াছে। মনােজ কোন্ দিক সামলাইবে?

সুধার প্রেম
এমন সময় ঘনশ্যাম পাশ ফিরিয়া শুইলেন। ইন্দুমতী কহিলেন,
মনু এসেছে।
ঘনশ্যাম ক্লিষ্ট কণ্ঠে কহিলেন, এসেছে! আয়, আমার কাছে বস্ ।
মনােজ আদেশ পালন করিল। ঘনশ্যাম কহিলেন, মাথায় একটু
হাত বুলিয়ে দে।
মনােজ উৎকণ্ঠার সহিত প্রশ্ন করিল, কখন থেকে হয়েছে ? ঘনশ্যাম
মৃদু কণ্ঠে থামিয়া থামিয়া কহিতে লাগিলেন, হয়েছে মাস কয়েক হ’ল,
তুই তখন কলকাতায় ছিলি। দীনবন্ধু ডাক্তারকে ডেকেছিলাম, তিনি
বললেন, এ সারবে না । মাঝে মাঝে দেখা দেবে, তা পর একদিন,
মরণ-কামড় দেবে আর কি।
মনে কহিল, একবার কলকাতা গিয়ে দেখলে হয় না?
ঘনশ্যাম স্বগত কহিলেন, কলকাতা যাব বইকি! না হলে মজা
হবে কেন ? প্রকাশ্যে ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, কিছু হবে না।
ধন্বন্তরিরও সাধ্য নেই সারাবার। একটু দম লইয়া কহিলেন, সাবধানে
থাকতে হবে, বেশি ভাবনা-চিন্তা করা চলবে না। এমনই ভাবে থাকলে
হয়তাে কিছুদিন টিকে যেতে পারি, কিন্তু
ইন্দুমতী কহিলেন, শৈল যে যেতে বলেছে বলছিলে, তা এ শরীরে
নিজে না গিয়ে মনুকেই পাঠিয়ে দাও। ও তো আইন-টাই সব
শিখেছে, আর একটা পরীক্ষা দিলেই তো পাকা উকিল হবে।
ঘনশ্যাম ক্লান্তভাবে কহিলেন, গেলে তাে খুব ভাল হয়।
জানার তত দরকার নেই। সেখানে গিয়ে বসলেই আপন হতে কাজ
হয়ে যাবে। শৈল তো সব দেখতে শুনতে পারে না, আর কাজ
জানেও না ।
মনােজ কহিল, আমার যে পরীক্ষা-

বাধা দিয়? ঘনশ্যাম কহিলেন, পরীক্ষা এখন থাক। পরের বার দলেও চলবে। কলেজ তো আর যেতে হবে না, ওখান থেকেই তৈরি হতে পারবি, তা ছাড়া জমিদারির কাজ দেখাশুনা করলে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিংটাও হবে। ইন্দুমতী কহিলেন, হ্যা বাছা, তাই যা, আর অমত করিস নি। উনি বেঁচে থাকলে পরীক্ষে তাের পালাবে না। ঘনশ্যাম কহিলেন, কাল কি পরশু চলে যা। কিছু কষ্ট হবে না সেখানে। 'শৈল রয়েছে। তা ছাড়া মৃত্যুঞ্জয়বাবুর স্ত্রী তো একেবারে নাক্ষাৎ লক্ষ্মী। গৃহিণী মনে মনে বােস করি চটিলেন। সাক্ষাৎ লক্ষ্মী, না টেকি। এই বয়সেই তো স্বামীর মাথাটি খাইয়া বসিয়া আছে ! দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সক্ষোভে কহিলেন, লক্ষ্মী আর কি করে বলছ গাে, সিথির সদুরই বজায় রাখতে পারলে না— ঘনশ্যাম কহিলেন, ও বেচারী আর কি করবে বল? মৃত্যুঞ্জয়টা একেবারে মদে ডুবে রইল কিনা, লিভার পচে থসখসে হয়ে গেল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, ভারি বিপদে পড়েছিল বেচারা, চারিদিকে শত্রু, ভাগ্যে গিয়ে পড়েছিলাম, তাই জমিদারি রক্ষা হ’ল ; না হলে প োড়াতে হত ; যাক, ভগবানের ইচ্ছেয় সব সুরাহা হয়েছে। এখনও একটু বাকি, সেইটুকু হলেই আমার ছুটি বলিয়া গভীর ক্লান্তির সহিত চক্ষু মুদিয়া বােধ করি বাকিটুকুর সুরাহার সম্বন্ধে চিন্তা করিতে লাগিলেন। কিন্তু ঘনশ্যাম মৃত্যুঞ্জয়ের কথা ভাবিতে লাগিলেন, ন: তস্য পত্নীর কথা ভাবিতে লাগিলেন, তাহা ঠাহর করিতে না পারিয়া ইন্দুম'.. অস্বস্তির সীমা রহিল না। পরে মাতৃ-আশীৰ্বাদ মস্তকে ও পিতৃ-আশীৰ্বাদ পৃষ্ঠে লইয়া ;

সুধার প্রেম মনােজ পিতৃকৰ্তব্য পালনের জন্য যাত্রা করিল । কিন্তু তৎপূৰ্বে ঘনশ্যাম পত্র দ্বারা শৈলজাকে সমস্ত বিষয় জানাইলেন এবং মনােজকে চোখে চোখে রাখিতে, ও কলিকাতায় যাহাতে চিঠিপত্র লিখিতে না পারে, তাহার ব্যবস্থা করিতে উপদেশ দিলেন। ২ সুধা ও মননজের প্রণয়ােৎপত্তির ইতিহাস যতদূর জানা গিয়াছে, তাহা এই- মফস্বল কলেজে বি. এ. পাস করিয়া কলিকাতায় এম, এ, ও ল পড়িতে আসিবার সময়ে মনােজ সঙ্কল্প করিল যে, কলিকাতায় শুধু পড়াশুনার চর্চা করিলে চলিবে না, রীতিমত প্রেম-চৰ্চাও করিতে হইবে। কিন্তু কলিকাতায় পা দিয়া, ডাঙার মানুষ সমুদ্রে নামিলে যেমন অবস্থা হয়, তাহার অবস্থাও অনেকটা সেই রকম দাড়াইল'। মাথা উচু করিয়া খাড়া দাড়াইয়া থাকিবার জন্যই এমনই কসরৎ করিতে হইল যে, প্রেম-চর্চা দূরে থাক, চারিদিকে একবার চাহিয়া দেখিবার পর্যন্ত সময় বা সামর্থ্য থাকিল না। অবশ্য অভ্যস্ত হইতে বেশি দিন লাগিল না। কলিকাতা- সুলভ চাল-চলন, হাব-ভাব ও কথা-বার্তা আয়ত্ত হইল। মন : কি সুযােগও দুই-একটি করিয়া হাতের কাছে আসিতে লাগিল, কিন্তু কখনও সাহস, কখনও নিপুণতা, কখনও বা নিছক দুর্ভাগ্যের জন্য হাত- ছাড়া হইয়া গেল। যথা-ট্রামে উঠিয়া বসিয়াছে ; অত্যন্ত ভিড় ; একজন সুবেশা সুন্দরী তরুণী ট্রামে উঠিবামাত্র সবার আগেই নিজের জায়গাটা ছাড়িয়া দিয়া মনােজ তরুণীর বসিবার ব্যবস্থা করিল; কিন্তু তরুণী একটু মুচকি হাসিয়া কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা দূরে থাক, একবার সুধার প্রেম ফরিয়া তাকাইয়াও, সে যে তাহারই জন্য দাড়াইয়া দাড়াইয়া কি রকম ঝকানি খাইতেছে, দেখিল না; তাহার উপর, হয়তাে পার্শ্বের যুবকের সঙ্গে-যে গাট হইয়া বসিয়া ছিল, আধ ইঞ্চিও উঠিয়া দাড়ায় নাই- হাসিয়া হাসিয়া আলাপ করিতে লাগিল। কিংবা হয়তো কলেজে তাহাদের ক্লাসের কোন মেয়ে তাহাদেরই ক্লাসের একজন ছেলের সঙ্গে হাস্যমুখে কোন বিষয়ে আলােচনা করিতেছে ; পাশে দাড়াইয়া শুনিতে শুনিতে সাহস করিয়া মনােজ আলােচনায় যােগদান করিবার চেষ্টা করিতেই মেয়েটি ভ্রুকুটি-কুটিল মুখে তাহার দিকে পিছন ফিরিয়া দাড়াইয়া তাহাকে একেবারে বিযুক্ত করিয়া দিল। একবার মনােজ এসপ্ল্যানেড হইতে • কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত একটি মেয়ের সহিত একলা ট্রামে আসিয়াছিল, প্রায় পাশাপাশি বসিয়া থাকিয়াও একটি কথা বলিতে সাহস করে নাই। আর একবার একটি তরুণীর সঙ্গে কথাবার্তার চেষ্টা করিতেই বুকের ভিতরটা এমনই দাপাদাপি শুরু করিয়া দিল যে, অর্ধপথে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়া তরুণীর বিস্ময় ও কৌতুকের উদ্রেক করিয়াছিল। রাস্তায় ও কলেজে বিফ-মনােরথ হইয়া মনোেজ আশেপাশে ভদ্রলোেকদের বাড়িতে হানা দিল। কিন্তু ফলের কোন তারতম্য হইল না। কোন ভদ্রলােক হয়তাে মেসের ছেলে’ এই পরিচয় পাইবামাত্র মুখের উপর দরজা বন্ধ করিয়া দিল । আর যদি বা কোন ভদ্রলােক আপ্যায়িত করিয়া বসাইল তত খোজ করিয়া দেখা গেল, হয় তাহার গৃহে-তরুণী দূরে থাক, স্ত্রীলােকের নামগন্ধ নাই, নয় একটি কালাে কুৎসিত বাড়ী আইবুড়াে মেয়ে ঘাড়ে চাপিবার জন্য ওত পাতিয়া বসিয়া আছে । কবিরা বলেন-প্রেমের দেবতা অন্ধ। কিন্তু মনােজের দৃঢ় বিশ্বাস হইল য়োন্মর দেবতা অন্ধ নহে, একচোখখা। ব্রিটিশ সরকার পর্যন্ত তৃহার কাছে হার মানিয়া যায়। হইলে কলিকাতার ছেলেগুলা, সুধার প্রেম } বাংলা দেশের মুসলমানদের মত বােধ হয় শুধু সংখ্যাধিক্যের জোরেই, স্মত-ননী-সর-দুগ্ধ সব সাবাড় করিতেছে, অথচ মফস্বলের ছেলেদের ভাগ্যে তলানিটুকু পৰ্যন্ত জুটিতেছে না কেন? এ সম্বন্ধে এজিটেশন দরকার, কিন্তু করিবে কাহারা? পশ্চিমবঙ্গের ছেলেগুলি চোখে চশমা আঁটিয়া কুঁজা হইয়া বসিয়া, নােটের পাতা চাটিয়া চাটিয়া শেকৃস্পীয়রের রস-আস্বাদনে এমনই ব্যস্ত যে, আর কোন বিষয়ে তাহাদের ঔৎসুক্য নাই, উৎসাহও নাই। আর পূর্ববঙ্গের ছেলে ওলকে বনি গেলেই তাহার চোখ পাকাইয়া চড়া গলায় বলিয়া উঠিবে, আমাগর কি আবশ্যক? ডাকা মেইল নাই? " গােয়ালন ইষ্টিমার নাই ? কিন্তু বছর দেড় পরে প্রেমের দেবতা বােধ করি প্রসন্ন হইলেন। মনােজ দিন কয়েক হইল আমহাস্ট স্ট্রীটে একটা মেসে উঠিয়া আসিয়াছে। তাহার চোখে পড়িল, প্রতিদিন বেলা সাড়ে নয়টার সময়ে সামনে একটি গলির মুখে মেয়ে-স্কুলের বাস আসিয়া দাঁড়ায়। একটি বছর সতধ বয়সের মেয়ে বেণী দোলাইয়া বইগুলি বুকে চাপিয়া ধরিয়া সহপাঠিনীদের দিকে তাকাইয়া হাসিতে হাসিতে গাড়িতে উঠে। দূর হইতে যতটা বুঝা যায়, মেয়েটির গায়ের রঙ খুব ফর্সা নয়, উজ্জ্বল শ্যাম ; গঠন লম্বা ছিপছিপে ; মুখ চোখ নাক ভালই, অন্তত চলনসই। মনােজ এইখানেই একবার শেষ চেষ্টা করিবে, স্থির করিল। রবিবার ( কারণ সেই দিন মেয়েটির স্কুল থাকে না। সকাল নয়টার সময়ে মনে মনে বাংলা দেশের খ্যাতনামা প্রেমিকদের নাম জপ করিতে করিতে মনােজ সেই গলিতে প্রবেশ করিল। গলির মুখেই একটি বড় দোতলা বাড়ি, তাহার সদর-দরজা বড় রাস্তার উপরে। এই বাড়ির পরেই একটি ছােট দোতলা বাড়ি। বাড়ির সদর-দরজা বন্ধ। খােলা জানালার মাথায় একটি সাইন-বাের্ড, তাহাতে লেখা, হ্যানিমান হােমি ও সুধার প্রেম ২৩ হল, ডাঃ রাঘবচন্দ্র বােস, এইচ. এম. ডি. (ফিল }। অর্থাৎ ডিগ্রীটি স্বদেশী সস্তা মাল নহে, বিদেশ হইতে বহুমূল্যে সংগৃহীত হইয়াছে। মনােজের মন ও বুদ্ধি দুইই একযােগে রায় দিল, মেয়েটি এই বাড়িরই। কিন্তু বাড়িতে ঢুকিবে কি উপায়ে ? জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া ঘরের মধ্যে কাহাকেও দেখা গেল না। মনােজ কি ডাক্তারের উদ্দেশে দরজায় ধাক্কা দিবে? হঠাৎ পিছন হইতে বাজখাই গলায় ‘কি চাই’ প্রশ্ন শুনিয়া মনােজ চমকিয়া মুখ ফিরাইয়া দেখিল, তাহার চেয়েও প্রায় এক হাত লম্বা একজন লােক বুক চিাইয়া, ঠোট দুইটা চাপিয়া, কোটরে-ডােক। ছােট ছােট চোখ দুইটার ধারালো দৃষ্টি তাহার উপর উদ্যত করিয়া, বাড়াইয়া আছে। লােকটার মাথাটা শরীরের অনুপাতে ছোট। ঘােড়) প্যাটার্নের লম্বা মুখ, উচু চোয়াল, বা গাল, সারা মুখটা ব্রণ ও মেচেতায় ভর্তি, বুকটা চ্যাপ্টা, পাঁজরের হাড়গুল এক-একটি কারয় গােনা যায়, হাত দুইট। আজানুলম্বিত বলা চলে, মাথার চুল ছােট ছােট করিয়া ঘঁটা, মুখে দাড়ি ও গোঁফ নাই বলিলেই হয়, পরিধানে খাটো কাপড় মালকেঁচা করিয়া পরা, গা ও পা দুইই খালি। লােকটার বয়স তেইশ- চব্বিশের বেশি হইবে না। মনােজ কোনমতে তােতলাইয়া কহিল, ও, বােগী।-বলিয়া লােকটা পাজাকোলা করিয়া মনােজকে একেবারে ডাক্তারখানায় ঢুকাইয়া একটা চেয়ারে বসাইয়া দিয়া কহিল, বসুন, ডাক্তারবাবু আসছেন।-বলিয়া দেওয়ালে ঝােলানাে একটা মলিন রঙ-চটা পর্দার অন্তরালে অন্তর্হিত হইল। অভ্যর্থনার বহর দেখিয়া মনােজ ঘাবড়াইয়া গেল। ডাক্তার, না ডাকারে সর্দার, কে জানে! মনােজ চারিদিকে সশঙ্ক দৃষ্টি ফেলিয়া ফেলিয়া প্রকৃত অবস্থাটা বুঝিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কক্ষটি দৈর্ঘ্যে ২৪ সুধার প্রেম ; ও প্রস্থে সাত-আট হাতের বেশি হইবে না। এক পাশে দেওয়াল ঘেঁষিয়া দুইটা লম্বা ও সরু কাচের দরজাওয়ালা আলমারি। একটির মধ্যে কলেজের গ্যালারিতে যেমন ভাবে ছাত্রেরা বসে, তেমনই ভাবে ছোট ছোট হােমিওপ্যাথি ঔষধের শিশি সাজানাে রহিয়াছে। একটির মধ্যে রহিয়াছে মােটা মােটা বই। ঔষধের আলমারির পাশে কোণের কাছে একটি টুল ; তাহার উপর একটি কলাই-করা গামলা ; তাহার কিঞ্চিৎ উপরে একটি জলের ট্যাপ ; ট্যাপের গলদেশ হইতে একটি তােয়ালে ঝুলিতেছে । মনােজের সামনেই একটি ছােট টেবিল, অয়েল- ক্লথ দিয়া ঢাকা। তাহার উপর জলের বােতল, ওজন করিবার নিক্তি, ছােট চামচ, কাচি, অয়েল-পেপার প্রভৃতি ডাক্তারের আবশ্যকীয় দ্রব্য সাজামাে রহিয়াছে। টেবিলের ও পাশে একটা ঈজি-চেয়ার, তেল ও ধুলা বসিয়া তাহার আসল বাদামী রঙ কালো হইয়া উঠিয়াছে, ছাউনির উপরও কালো রঙের ছােপ পড়িয়াছে। ঈজি-চেয়ারের পাশেই একটি তেপায়ার উপর খান দুই মােটা মােটা বই ও একটি চশমার খাপ রহিয়াছে। ঈজি-চেয়ার হইতে খাড়া উপরে দেওয়ালের গায়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হানিমান সাহেবের একটি বড় ছবি টাঙানাে রহিয়াছে। ছবির নীচে পেরেক হইতে একটি ফুলের মালা ঝুলিতেছে, ফুলগুলি শুষ্ক ও বিবর্ণ। রােগীদের বসিবার জন্য আরও দুইটি চেয়ার ও একটি বেঞ্চি রহিয়াছে। সাজ-সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র দেখিয়া মননজের মন অনেকটা শান্ত হইল। ডাক্তারখানাই বটে। ওই লােকটি নিশ্চয়ই ডাক্তারের কম্পাউণ্ডার, ডাক্তারকে খবর দিতে ভিতরে গিয়াছে। কিন্তু যে ডাক্তারের কম্পাউণ্ডার সাক্ষাৎ যমদূত, তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকা সুবুদ্ধিসঙ্গত হইবে কি? এমনিই তাে কম্পাউণ্ডারের কবলস্থ হইয়া সুধার প্রেম তাহার অবস্থা কাহিল হইয়া উঠিয়াছে, ইহার উপর স্বয়ং ডাক্তারের হাতে পড়িলে বােধ করি হাঁটিয়া বাড়ি ফিরিতে হইবে না। মনােজ উঠিয়া পড়িবার উপক্ৰম করিল। কিন্তু পুরাপুরি উঠিবার পূর্বেই পর্দা ঠেলিয়া ডাক্তার ও কম্পাউণ্ডারের যুগল মূর্তি একসঙ্গে ঘরে ঢুকিল। ডাক্তারের ডান হাতে লাঠি, বাম হাত কম্পাউণ্ডারের ঘাড়ের উপরে, মুখে যন্ত্রণার চিহ্ন। কম্পাউণ্ডার ঈষৎ নুইয়া দুই হাত দিয়া পিছন দিক হইতে ডাক্তারকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। ডাক্তার খোড়াইয়া খোড়াইয়া ঘরে ঢুকিয়া একবার সােজা হইয়া দাড়াইলেন এবং চারিদিকে চাহিয়া কহিলেন, বাবা বিশু, ঘরটা বড় অগােছালাে হয়ে আছে, আজ একটু কড়াঝাড়ি করাে।-বলিয়া ঈজি-চেয়ারটার সামনে আসিয়া হানিমান সাহেবের উদ্দেশ্যে যুক্তহস্তে প্রণাম করিলেন । তারপর ঈজি-চেয়ারে চিত হইয়া শুইয়া পড়িলেন। বিশু পর্দার অন্তরালে পুনরায় অন্তহিত হইল। রাঘববাবুর বয়স পঞ্চাশ পার হইয়া গিয়াছে। বেঁটে ও কৃশ দেহ; অস্থিসার শীর্ণ মুখ ; গোফ ও দাড়ি পরিষ্কার করিয়া চাছ; গালের উপর একটি আঁচিল, তাহার উপরে কয়েকগাছি চুল খাড়া হইয়া আছে ; চোখের কোণ ও সারা কপাল কুঞ্চনরেখাকীর্ণ; দৃষ্টি ক্লান্ত ও করুণ মাথায় বড় বড় কঁাচা ও পাকা চুল ; গায়ে গলাবন্ধ সাদা জিনের কোট। রাঘববাবু সরকারী চাকুরি করিতেন। বাতের আক্রমণে দেহ বিকল হইয়া পড়ায় বৎসর দুই পূৰ্বে পেন্শন লইতে বাধ্য হন। ম্যালেরিয়ার ভয়ে গ্রামে ফিরিতে সাহস করিলেন না ; কলিকাতায় একটি ছােট বাড়ি ভাড়া করিয়া বাস করিতে লাগিলেন। সংসারে প্রতিপাল্যের সংখ্যা বেশি ছিল না। পত্নী আগেই স্বর্গীয়া হইয়াছিলেন। সন্তানদের মধ্যে এটি মাত্র কন্যা ছাড়া বাকিগুলি পত্নীর আগেই বিদায় লইয়াছিল। •• সুধার প্রেম আর ছিল দূরসম্পর্কের এক ভাগিনেয় এবং গ্রামের এক অনাথা কায়স্থ বিধবা। কাজেই পেন্শন বাবদ যাহা পাইতেন, তাহাতেই সংসার এক রকম করিয়া চলিতে পারিত। তবে কন্যা দিন দিন বিবাহযােগ্য হইয়া উঠিতেছিল অতএব কিঞ্চিৎ আয়বৃদ্ধির জন্য হােমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করা স্থির করিলেন । চাকুরি-জীবনেই এই বিদ্যা কিঞ্চিৎ অর্জন করিয়াছিলেন। তাহাই পরিবর্ধিত ও পরিমাজ্জিত করিয়া লইলেন এবং ডিগ্রী, ঔষধপত্র, আলমারি ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহ করিয়া নিজের বৈঠকখানায় ডিসপেন্সারি বসাইলেন। কিছুক্ষণ পরে খাড়া হইয়া বসিয়া রাঘববাবু নােজকে কহিলেন, কি হয়েছে আপনার? মনােজ এতক্ষণ তাহাই ভাবিতেছিল ; কি রােগ বলিলে ডাক্তারের কাছে ধরা পড়িবার ভয় থাকিবে না, অথচ অনেক দিন ধরিয়া চিকিৎসা চলিতে পারিবে, তাহাই স্থির করিতেছিল। কিন্তু কোনটাই পছন্দসই হইতেছিল না। অর? নাড়ি দেখিলেই রা পড়িবে। পেটের অসুখ? দুই-চার ডােজ ওষুধ খাইলেই সারিয়। উঠিতে হইবে। বুক-ধড়ফড়ানি? যদি যাওয়া-আসা বন্ধ করিয়া দেয় ? মনােজ জবাব দিল, মাথা টনটন করে। ডাক্তার প্রশ্ন করিলেন, কতদিন থেকে হয়েছে? বছর খানেক। কোনটা টনটন করে ? মনােজ ডান হাত মাথায় বুলাইয়া কহিল, সবটাই । চোখ ছােট ও কপাল কুঞ্চিত করিয়া ডাক্তার কহিলেন, সবটাই ? কোন্ দিকটায় বেশি? মনােজ কহিল, ডান দিকটা। বেশ। টনটন করে, না ঝনঝন করে—ঠিক করে বলুন তাে?

সুধার প্রেম
২৭
মনােজ বােকার মত কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া কহিল, ঝনঝন
করে।
ডাক্তার সন্তোষের সহিত ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, আচ্ছা। তাই
বলুন। দিন-রাতের মধ্যে কখন বেশি হয় ?
দিনের বেলায় বেশি হয় ।
তা তো হবেই। সকালে, দুপুরে আর সন্ধ্যার মধ্যে কখন বেশি হয় ?
মনােজ বুদ্ধি খাটাইয়া কহিল, দুপুরে বেশি হয়।
শুলে বেশি হয়, না উঠলে বেশি হয় ?
উঠলে বেশি হয়।
শীতকালে বাড়ে, না গ্রীষ্মকালে বাড়ে ?
গ্রীষ্মকালে ।
ঠাণ্ডা ভাল লাগে, না গরম ভাল লাগে ?
ঠাণ্ডা ভাল লাগে।
অঙ্গুলির ইঙ্গিতে মনোজকে ডাকিয়া রাঘববাবু কহিলেন, এখানে
এস-আসুন।
মনােজ কাছে গেল। রাঘববাবু কহিলেন, বসুন। মনােজ মেঝের
উপর উবু হইয়া বসিল।
রাঘববার আঙুল দিয়া মাথাটি টিপিতে টিপিতে জিজ্ঞাসা করিলেন,
সােয়াস্তি হচ্ছে ?
মনােজ ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, হঁ্যা।
দিকি
মনােজ মুখ তুলিতেই রাঘববাবু তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ সহযোগে
মনে চোখ দুইটি একে একে প্রসারিত করিয়া কহিলেন, চোখে ভাল
দেখতে পান ?
মুখটা তুলুন
!

২৮
সুধার প্রেম
মনােজ ঘাড় নাড়িয়া কহিল, না, ঝাপসা দেখি।
দেখি কানটা।-বলিয়া কানের পাতায় টান দিয়া ভিতরটা দেখিয়া
রাঘববাবু প্রশ্ন করিলেন, কানে পুজ আছে নাকি?
মােজ প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, না।
আচ্ছা। ভয় নেই, ভাল হয়ে যাবেন ; বসুনগে।
এমন সময়ে বিশু আসিয়া দাঁড়াইল। রাঘববাবু তাহাকে বলিলেন,
ওষুধের ব্যাগটা নিয়ে এস দিকি ।
ঔষধ তৈয়ারি করিয়া শিশিতে লেবেল ও দাগ আঁটিতে আঁটিতে
রাঘববাবু প্রশ্ন করিলেন, কি করা হয় ? চাকরি ?
মনােজ কহিল, আজ্ঞে না, পড়াশুনা করি।
ছাত্র ! তা হলে পুরো ফী দিতে হবে না, আদ্ধেক দিলেই হবে।
মােজ বিনীতভাবে প্রশ্ন করিল, কত লাগবে তা হলে ?
গম্ভীরভাবে রাঘববাবু কহিলেন, ফী চার টাকা আর ওষুধের দাম
এক টাকা, মােট পাঁচ টাকা।-বলিয়া ঔষধের শিশি বিশুর হাতে দিয়া
মনােজকে দিবার জন্য ইঙ্গিত করিলেন। বিশু শিশি-হস্তে ডবল মার্চ
করিয়া মনােজের সামনে আসিয়া দাড়াইল ও শিশিটা তাহার হাতে
গুজিয়া দিয়া দক্ষিণ করতল প্রসারিত করিয়া কহিল, টাকা?
মনােজ আমতা আমতা করিয়া রাঘববাবুর উদ্দেশ্যে কহিল, একটু
কম হলে হয় না !
রাঘববাবু কোমল কণ্ঠে কহিলেন, কমই তাে করে দিয়েছি বাবা।
মানে, অনেক দিন ধরে চিকিচ্ছে করাতে হবে কিনা!
বেশ, পরে কিছু সুবিধে করে দেব।
মনােজ ইতস্তত করিয়া বুক-পকেট হইতে মানিব্যাগটি বাহির করিয়া
খুলিয়া উকি মারিয়া দেখিয়া কহিল, খুচরাে নেই, দশ টাকার নােট আছে

সুধার প্রেম তাই নাকি? দেখি-বলিয়া বিশু টুক করিয়া নােটটি তুলিয়া লইয়া বার দুই ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিয়া কহিল, ভাঙিয়ে আনছি। বলিয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। মনােজ তড়াক করিয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়া সভয়ে জিজ্ঞাসা করিল, নিয়ে পালাল নাকি ? রাঘববাবু মৃদু হাসিয়া কহিলেন, না। এখনই আসবে, বসুন । বলিয়া একটি মােটা বই টানিয়া লইয়া তাহাতে দৃষ্টি-সংযােগ করিলেন । মনােজ চুপ করিয়া বসিয়া দরজার দিকে ঘন ঘন তাকাইতে তাকাইতে নিজের অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে লাগিল। হায় হায় ! তাহার অদৃষ্টে প্রেম নাই। না হইলে দশ-দশটা টাকা হাতছাড়া হইয়া গেল, অথচ যে তরুণীর মুখের হাসি ও চোখের চাহনি কাটার মত মনের কানাসিতে বিধিয়া তাহাকে সশরীরে টানিয়া আনিয়াছে, তাহার দেখা মিলিল না। সে কি এই বাড়িতেই আছে ? থাকিলে একবারও কি তাহার মনে হইতেছে, তাহাকে একটি বার দেখিবার জন্য মাত্র কয়েক গজ দূরে, একজন হতভাগ্য কিরূপ ছটফট করিতেছে? যদি তাহা হইত, তবে হয়তাে ওই ছেড়া পর্দার ফাক দিয়া- এমন সময়ে পদশব্দ শুনিয়া দরজার দিকে তাকাইতেই মনােজ দেখিল বিশু প্রবেশ করিতেছে, ডান হাতের বদ্ধমুষ্টি বুকের উপর চাপিয়া ধরা, বাম হাতে একটা শালপাতার ঠোঙা। মনােজের কাছে আসিয়া কহিল, ধরুন। মনােজ একটু ইতস্তত করিতেই ধমকাইয়া কহিল, ধরুন না। মনােজ হাত বাড়াইতেই ঠোঙাটা ধরাইয়া দিয়া সটান টেবিলের কাছে গিয়া দাড়াইল এবং টাকা, আনি, দুয়ানি ইত্যাদি টেবিলে নামাইয়া গনিতে লাগিল। মনােজ কহিল, কি করতে হবে ? বিশু গম্ভীরভাবে কহিল, খান।

সুধার প্রেম
মনােজ বিস্ময়ের সহিত কহিল, সে কি ?
ঠোঙাতে কতকগুলা জিলাপি। মনােজ কহিল, এগুলো আনলেন
কেন ?
বিশু কড়া গলায় কহিল, আনলেন কেন? না আনলে আমাকে
ভাঙানি দিত কিনা! আমার পৈতৃক পেজা যে ! আনলেন কেন?
নিজে গেলেই পারতেন।
রাঘববাবু কহিলেন, উনি তো অন্যায় কিছু বলেন নি ।
ওঁকে অমন
করছ কেন? সত্যি তাে, উনি ওগুলাে নিয়ে কি করবেন ? একে
অসুস্থ শরীর। তুমি বরং এগুলাে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাও আর দামটা
ওকে দিয়ে দাও।
মনােজ লজ্জিতভাবে বিশুকে কহিল, এগুলাে বাড়ির ভেতরেই নিয়ে
আমি নিয়ে কি করব, বলুন? দাম দিতে হবে কেন—সামান্য
জিমিস, ছিঃ ছিঃ !
বেশ তাে, ভালই তো।--বলিয়া বিশু এক লাফে কাছে আসিয়া,
ঠোঙাটা ছিনাইয়া লইয়া, তিন লাফে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
সেই দিনই বেলা তিনটার সময়ে মনােজ আবার রাঘববাবুর
ডিসপেন্সারির সামনে আসিয়া হাজির হইল। দরজা জানালা দুইই বন্ধ।
অতএব উপায় ? মনােজ ‘ডাক্তারবাবু’ বলিয়া বার দুই হাঁক দিতেই
দোতলার খােলা জানালা হইতে মিহি মেয়েলী গলায় প্রশ্ন হইল, কে ?
মমােজ দুই পা পিছাইয়া আসিয়া উপর দিকে তাকাইতেই দেখিল,
একজন ১৫ণী ; খুব সম্ভব তিনি, যিনি দূর হইতে হাস্যর হানিয়া তাহার
মনকে কাবু করিয়াছেন। মনােজের বুকের মধ্যে তাওব-নৃত্য শুরু হইল ।
ও গলাটা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেল। কোনমতে ঢােক গিলিয়া কহিল,
আমি, মানে রােগী।

সুধার প্রেম তরুণী কহিল, একটু দাড়ান, বিশুদাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।-বলিয়া সরিয়া মনােজ দরজার সামনে আসিয়া বড় সাহেবের আফিস-কামরায় চাকুরি-প্রত্যাশী বেকার যুবকের মত মুখ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। হঠাৎ খুক করিয়া কাসির শব্দ। মেয়েলী গলার কাসি ক তরুণী নিজে দরজা খুলিতে আসিয়াছে ? প্রেমার্ত হৃদয়ের করুণ ঐন্দন কি কানে তথা প্রাণে পৌঁছিয়াছে ? মহিমার উদ্ধলােক হইতে ৰামিয়া আসিয়া মহিমময়ী নিজে হাত ধরিয়া অধমকে মর্ত্তের সীমানা পার করিয়া লইতে আসিয়াছে ? খুট করিয়া শব্দ করিয়া দরজা খুলিয়া গল। মনােজ,বিস্ফারিত নয়নে দেখিল, এক জন মেয়েমানুষ, তরুণী য়, বয়স প্রায় ত্রিশ , মাথায় স্বল্প অবগুণ্ঠন ; সীমন্তে সিন্দুর নাই, অথচ চুলে তরঙ্গের ‘আভাস ; গায়ের রঙ প্রায় ফর্সা; টেবাে টেবাে সাল ; নাকটি একটু খাদা; চোখ ছােট ও গােল ; পুরুষের মত মােটা ৪ ; চোখে কৌতুকের দৃষ্টি হানিয়া, ঠোটে মিষ্ট হাসি টানিয়া, মিহি লায় বিনাইয়া বিনাইয়া কহিল, আসুন, বিশুবাবু ঘুমুচ্ছে, দিদিমণি আপনাকে বসতে বললেন।-বলিয়া লজ্জার অস্তিত্ব প্রমাণ করিবার ন্য গায়ের কাপড় এদিকে ওদিকে টানিয়া পিছন ফিরিয়া সটান মন্দরে চলিয়া গেল। মনােজ ফ্যালফ্যাল করিয়া কিছুক্ষণ তাকাইয়া হিল । ৩ারপর একটি সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া ডিপেন্সারিতে আসিয়া ; সিল। কিছুক্ষণ পরেই পাশের ঘরে মেয়েমানুষের কণ্ঠস্বর শােনা গেল, এ বশুবাবু, ওঠ না, ওঠ না গাে ! বিশুবাবুর কর্ণকুহরে কণ্ঠস্বর বােধ করি পেীছিল না। স্বর উচু র্দায় ডাকিল, শুনছ, ও বিশুবাবু! ওঠ না ! এবার শ্নোজড়িত কণ্ঠের উত্তর শােনা গেল, না।

সুধার প্রেম কি গাে ! ভদ্দরনােক বসে রয়েছে। আরও উচু পর্দায়, ও দিদিমণি, উঠছে না বিশুবাবু। দোতলা হইতে বােধ করি দিদিমণি আদেশ দিলেন, কানে জল ঢেলে দাও। আবার নারীকণ্ঠ মিনতি করিয়া কহিল, কানে জল ঢেলে দোব, ওঠ বলছি। বিশু বীরসুলভ কণ্ঠে কহিল, দিয়ে দেখ না মজা। নারীকণ্ঠ আবদারের সুরে কহিল, বা রে! আমি কি করব ? দিদিমণি বলছে যে ! অনতিবিলম্বে দিদিমণির আবির্ভাব ঘটিল ; তীক্ষস্বরে কহিল, তুমি নিজের কাজ করগে, ওকে উঠিয়ে কাজ নেই। বিশু বােধ করি উঠিয়া বসিল, মােলায়েম কণ্ঠে কহিল, আমি জেগেছি তো, এমনিই পড়ে ছিলাম । বেশ করেছিলে।-দিদিমণি বিরক্ত স্বরে কহিল । মনােজ কান পাতিয়া শুনিতেছিল এবং দিদিমণির আবির্ভাব বুঝিতে পারিবামাত্র চেয়ারটা সরাইয়া, ঘাড় বাঁকাইয়া, পর্দার ফাক দিয়া দেখিবার চেষ্টা করিতেছিল। হঠাৎ পর্দাটা পিছন হইতে ঠেলা পাইয়া সামনের দিকে সরিয়া আসিতেই ভাবিল, বােধ হয় বিশুর প্রবেশ ঘটির্বে। অতএব হ্যানিমান সাহেবের দিকে তাকাইয়া তন্ময় হইয়া কর্ণপটহকে বিশ্বম্ভরের বজ্ৰনাদের জন্য প্রস্তুত করিল। অনতিবিলম্বে বজ্রনাদ না হইয়া বীণাধ্বনি হইল, নমস্কার । মনােজ চমকিয়া মুখ ফিরাইয়া দেখিল, তাহার মানসী প্রিয় দুই হাত দূরে দাড়াইয়া। তাড়াতাড়ি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া কহিল, নমস্কার । তরুণী সপ্রতিভ কণ্ঠে কহিল, বাবা তো এখন নীচে নামবেন ন' সুধার প্রেম মনােজ মনে মনে কহিল, নাই বা নামিলেন, তুমি তাে নামিয়াছ । এখন দয়া করিয়া কয়েক পা আগাইয়া আসিয়া এই তৃষিত বক্ষে প্রশ্ন হইল, আপনার কি বিশেষ দরকার ? মনােজ মাথা চুলকাইয়া কহিল, বিশেষ, মানে, ওবেলায় আমি এসেছিলাম। রােগ দেখিয়েছি। একটুখানি জানবার আছে । বলুন, কি জানতে চান ? আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করে এসে বলে দিচ্ছি। মনােজ চিন্তিত মুখে দাড়াইয়া রহিল। কি বলিবে ? বলিবে কি, তােমার বাবার কাছে কিছুই জানিবার নাই, আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর একমাত্র তােমারই কাছে আছে ? তুমিই আমার তাগিদ আসিল, বলুন? মনােজ ঘাবড়াইয়া গিয়া কহিল, বলছি এই যে, কি খাব ? আমি জিজ্ঞেস করে আসছি, আপনি বসুন বলিয়া তরুণী ত্বরিত পদে প্রস্থান করিল। মনােজ বসিল না; খাড়া দাড়াইয়া থাকিয়া মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগিল। হায় হায় ! নির্বোধের মত সুবর্ণ- সুযােগ হেলায় হারাইলাম ! আর হয়তাে আসিবে না। হয় সেই বিড়ালচোখী বিধবাটিকে পাঠাইয়া দিবে, নয় বিশ্বম্ভরকে; এবং তাহাদের মারফৎ খাদ্য ও পানীয়ের ফিরিস্তি শুনিয়া বাড়ি ফিরিতে হইবে। কিন্তু যে কথা বলিবার জন্য আজ দিন পাঁচ-ছয় সমস্ত অন্তরাত্মা ছটফট করিতেছে, সেই কথাটাই বলিতে বাকি রহিল। কলিকাতার ছেলে হইলে কি এমন করিত ? হয়তো বিনাইয়া বিনাইয়া বসাইয়া বসাইয়া এই সুযােগে প্রেমের পিটিশন দাখিল করিয়া ফেলিত। হয়তাে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া প্রেমিকসুলভ পােজে বলিত, আমার রােগ মাথার নহে, বুকের ; সে রােগ তােমার বাবার হােমিওপ্যাথিতে সারিবে না। ০ ৩৪ সুধার প্রেম তারপর প্রিয়ার পুষ্পপেলব হাতখানি চট করিয়া ধরিয়া বুকে চাপিয়া বলিত, সে বােগের একমাত্র ঔষধ তােমার হাতের স্পর্শ। বিশু দুই হাত দিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে প্রবেশ করিয়া গম্ভীর কণ্ঠে কহিল, ওঃ, আপনি ! আমি বলি আর কেউ।-বলিয়া একটা চেয়ারে উবু হইয়া বসিয়া বার কয়েক হাই তুলিয়া, গ-মােড় ভাঙিয়া কহিল, একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুবার জো নেই।-বলিয়া হাত পাতিয়া কহিল, একটা বিড়ি দ্যান দিকি । মনােজ কহিল, বিড়ি তে খাই না। কি খান তা হলে? সিগারেট ? হু, কিন্তু সঙ্গে তাে নেই। মনােজের কণ্ঠস্বর নকল করিয়া বিশু কহিল, সঙ্গে তাে নেই। তবে তাে কেতা হয়ে গেলাম। সঙ্গে তাে পয়সা আছে ?--বলিয়া উঠিয়া দাড়াইল। মনােজ বাম বাহু দিয়া বুক-পকেট চাপিয়া ধরিল, পাছে সকাল- বেলার মত ছিনাইয়া লয় । এবেল। অবশ্য মানিব্যাগে বিশেষ কিছু ছিল ; তবু যাহা ছিল, তাহাও বিশুর হাতে নিশ্চিন্ত হইয়া দেওয়া যায় না। বিশ্বম্ভর কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, দেখি একটা সিকি। যাক, চাহিদা চার আনায় নামিয়াছে। মনােজ ডান হাত পকেটে ঢুকাইয়া মানিব্যাগ হইতে একটি দুয়ানি বাহির করিয়া বিশুর হাতে দিল। বিশু দুয়ানিটি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিয়া কহিল, মাত্র দোয়ানি। ভারী কেপ্পন লােক তাে আপনি ! যাকগে, এতেই হবে এক রকম করে।—বলিয়া নিজের মনে হিসাব করিতে লাগিল, এক বাণ্ডিল বিড়ি, একটা দেশলাই, দোক্তা এক প্যাকেট হৈমীর জন্যে মনােজ বিস্মিত কণ্ঠে কাহল, হৈমী কে ? বিশু খ্যাক করিয়া উঠিল, হৈমী কে! তাও আপনাকে বলতে • সুধার প্রেম ৩৫ হবে নাকি? একটা দোয়ানি দিয়ে এমন কিছু মাথা কিনে রাখেন নি! বলিয়া প্রস্থান করিতে উদ্যত হইয়া আদেশের স্বরে কহিল, আমি না আসা পর্যন্ত বসে থাকবেন। মনােজের মন খুতখুত করিতে লাগিল। ওই মেয়েটির নাম হৈমী নাকি? দিন এক প্যাকেট করিয়া দোক্তা খায় এবং সেই দোক্তার যােগান দেয় বিশ্বম্ভর, এমনই করিয়া রােগীর পকেট মারিয়া ? ওবেলায় জিলাপির ঠোঙা বােধ হয় হৈমবতীর ভােগের জন্য আসিয়াছিল। রাঘব- বাবু কি বিশুকে জামাই করিবার জন্য জিয়াইয়া রাখিয়াছেন নাকি ? তাহা হইলে তো বেশ কথা। প্রেমের প্রতিযােগিতায়, আর যাহারই হউক, বিশুর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া নিরাপদ নয়। তরুণী প্রবেশ করিল। মনােজ উঠিয়া দাড়াইল। তরুণী কহিল, বাবা বললেন, আপনি মাছ মাংস খাবেন না, লঙ্কা খাবেন না। মনােজ কহিল, আচ্ছা। আর মিষ্টি খাবেন না। মনােজ কহিল, বেশ। কিন্তু জিলিপি ? তরুণী ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, জিলিপি বুঝি মিষ্টি নয় ? চোখে চোখ মিলাইয়া মনােজ হৃদয়দ্রাবী হাস্য করিল। তরুণী প্রশ্ন করিল, আপনি বুঝি জিলিপি খেতে ভালবাসেন? করুণ মুখে মনােজ কহিল, হ । তরুণী মৃদু হাসিয়া কহিল, কি করবেন বলুন, যতদিন না সেরে উঠছেন, একটু সাবধানে থাকবেন। কিন্তু বিশুদাদা এখানে ছিল না ? মনােজ জবাব দিল, ছিলেন তাে, এখনই কোথায় গেলেন, কিন্তু আপনিও তাে জিলিপি খেতে ভালবাসেন।

সুধার প্রেম তরুণী মুখ চোখ লাল করিয়া নীরস কণ্ঠে কহিল, না। আচ্ছা, নমস্কার। দয়া করে বিশুদাদা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।-বলিয়া পর্দার অন্তরালে অন্তর্ধান করিল। সেই দিন মেসে ফিরিয়া মনােজ বন্ধুদের টানা-হেঁচড়া সত্ত্বেও সিনেমায় গেল না, ভাতের বদলে কড়কড়ে রুটি খাইল, রাত্রি নয়টা বাজিতে না বাজিতে দরজা বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িল এবং সারারাত্রি ছটফট করিয়া ভােরের দিকে ঘুমাইয়া পড়িয়া স্বপ্ন দেখিল, বিশু তাহার পকেট মারিয়া ছুটিতেছে, সে কিন্তু কিছুতেই দৌড়াইতে পারিতেছে না ; বিধবাটি কাছে দাড়াইয়া ফিক ফিক করিয়া হাসিতেছে। আর রাঘবনন্দিনী? সে রাত্রি দশটা পর্যন্ত রাঘবের পায়ে মালিশ করিল এবং রাত্রি একটা পর্যন্ত জানালার ধারে দাড়াইয়া অদূরবর্তী ডাস্টবিন ও পচা নর্দমার গন্ধ শুকিতে শুকিতে আকাশ-পাতাল ভাবিতে লাগিল, যথা-লােকটির চেহারাটি বেশ ; হাসিটি ভারি মিষ্টি ; একবার চোখখাচোখি হইলে বুকের ভিতরটা কেমন সিরসির করিয়া উঠিয়াছিল। বিশুদাদা যেন কি ? হৈমী অত্যন্ত বাড়াবাড়ি আরম্ভ করিয়াছে। লােকটির কি নাম, কে জানে! বাবা জানেন বােধ হয়। এই বয়সে রােগে ভুগিতেছে, সেইজন্যই বােধ হয় মুখটি শুকাইয়া গিয়াছে ; বাবার ঔষধে নিশ্চয় ভাল হইবে; বাবার ঔষধে বাবার নিজের বােগ কিন্তু সারে না, সেই ডাক্তারী মালিশ আনিতেই হয়। বিশুদাদার কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই, হৈমীকে রান্নাঘরে দিনদুপুরে জিলাপি খাওয়ায়। লােকটি কাল আবার আসিবে কি না, কে জানে! ইত্যাদি। তারপর ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখিল, লােকটি এক ঠোঙা জিলাপি তাহার সামনে ধরিয়া খাইবার জন্য সাধাসাধি করিতেছে, সে কিন্তু কিছুতেই হাত বাড়াইয়া খাইতে পারিতেছে না।

সুধার প্রেম
৩৭
পরদিন বেলা নয়টা বাজিতে না বাজিতে মনােজ রাস্তায় আসিয়া
পায়চারি করিতে লাগিল। তারপর, মেয়ে-স্কুলের গাড়িটাকে আসিতে
দেখিয়া গলিতে ঢুকিয়া পড়িল। একটু যাইতেই দেখিল, রাঘববাবুর
মেয়ে স্কুলে যাইবার জন্য বাহির হইয়াছে। মনােজ কহিল, নমস্কার ।
মেয়েটিও মৃদু হাসিয়া নমস্কার করিল। মনােজ জিজ্ঞাসা করিল, আপনার
বাবা নেমেছেন? মেয়েটি একবার তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া মুখ
নামাইল এবং লজ্জার মুখে জবাব দিল, হ্যা।
মনােজ ডিসপেন্সারিতে যাইয়া দেখিল, রাঘববাবু ঈজি-চেয়ারে চিত
হইয়া শুইয়া বই পড়িতেছেন। মনােজকে দেখিয়া উঠিয়া বসিলেন এবং
বইটি পাশের তেপায়ার উপর রাখিয়া কহিলেন, বসুন, কেমন আছেন
মনােজ চেয়ারে বসিয়া বিনীতভাবে কহিল, খুব ভাল আছি ;
কিন্তু আপনি আমাকে আপনি বলে লজ্জা দেবেন না। আপনার
ছেলের বয়সী আমি
রাঘববাবু প্রীত হইয়া কহিলেন, সত্যিই তাে।
বেঁচে থাকলে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, তােমার বয়সীই হত।
ধর না, আমার সুধাই তো বােধ হয় সতৰােয় পা দিয়েছে।
মনােজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিল, মেয়েটির নাম তাহা হইলে হৈমী নয়,
আজ ?
আমার বড় ছেলে
রাঘববাবু কহিলেন, বাবাজীর নামটি কি?
মনােজ নিজের পুরা নাম বলিল। রাঘববাবু পুলকিত হইয়া
কহিলেন, মিত্র ? একেবারে স্বজাতি, স্বঘর-তা হলে বাবা, তােমার
কাছে ফীটা নেওয়া আমার উচিত হয় নি।
মনােজ কহিল, সে কি! এই আপনার ব্যবসা-
রাঘববাবু কহিলেন, ব্যবসা ঠিক নয়, রিক্রিয়েশন বলতে পার।

৩৮ সুধার প্রেম •• সরকারী চাকরি করতাম, হঠাৎ হ’ল বাত; অকর্মণ্য করে দিলে কাজেই পেন্শন নিয়ে চলে আসতে হ’ল। কাজের মানুষ, রাতদিন কাজ নিয়ে থাকতাম। কাজেই একটা কিছু করে সময় কাটাবার জন্যেই হােমিওপ্যাথি ধরলাম। যাকগে, যা দিয়েছ, দিয়েছ ; আর তােমার কিছু লাগবে না। একটু চুপ করিয়া ভাবিয়া কহিলেন, তােমার বাবার নামটি ? মনােজ কহিল, ঘনশ্যাম মিত্র । কি করেন? উকিল । বেশ বেশ। তােমার আর ভাই বােন আছে তো? ভাই আর নেই, বােন আছে একটি । তাও তার বিয়ে হয়ে গেছে। মা একেবারে একলা- "আমারও তাে তাই। একটি মাত্র মেয়ে, আর তিন কুলে কেউ নেই। বিশু, দূরসম্পর্কের এক বােনের ছেলে, মা বাবা নেই, ছােট থেকেই আমার কাছে আছে। ভেবেছিলাম, মানুষ করে দোব ; তা মানুষ না হয়ে দিন দিন জানােয়ার বনে যাচ্ছে। তাই ভাবি, যদি বেঁচে থাকতেই মেয়েটাকে একটি ভাল ছেলের হাতে দিতে পারি, তবেই ভাল ; না হলে ওর কি যে হবে, তা ভাবতেও আমার ভয় হয় ।-বলিয়া মুখ চিন্তাকুল করিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন। মনােজ সান্ত্বনা দিয়া কহিল, আপনার একমাত্র মেয়ে, একটু চেষ্টা করলেই ভাল ছেলে পেয়ে যাবেন। দেখুন না, আমার একমাত্র বােন, বাবার অত্যন্ত আদরের, একটু চেষ্টা করতেই বেশ একটি ভাল ছেলে জুটে গেল, এম. এ. পাস করে সাবডেপুটি হয়েছে। রাঘববাবু মাথাটি লম্বভাবে দোলাইতে দোলাইতে কহিলেন, চেষ্টা সুধার প্রেম ৩৯ করলেই হবে, কিন্তু আমার তাে এই শরীর, চেষ্টা করবে কে? তা ছাড়া টাকাও আমার নেই।—বলিয়া চোখ হইতে চশমা খুলিয়া কাপড়ের খুট দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। মনােজ কথাটার মােড় ফিরাইবার জন্য কহিল, আপনার ওষুধটা খুব কাজ করেছে। কাল তিনবার খেয়েছি, আজ ব্যথা প্রায় আদ্ধেক কমে গেছে। রাঘববাবু চোখে চশমা পরিয়া, সন্তোষের হাসি হাসিয়া, ধীরে ধীরে বলিতে লাগিলেন, হােমিওপ্যাথি ওষুধে ও রকম কাজ হয় । তবে ঠিক ওষুধ সিলেক্ট করা চাই। আরও দুদিন পরে দেখবে, কিছু থাকবে না। তবে স্থায়ী ফল পেতে হলে, উচ্চতর শক্তির ওষুধ খেতে হবে। তা তুমি বাবা, দিন একবার করে এসে খবর দিয়ে যেও। ওষুধ আমি দোব, দাম লাগবে না। স্বজাতির ছেলে তুমি, একটু টানাটানি করলে হয়তো সম্পর্কও বেরিয়ে যেতে পারে। বাড়ি ফিরিবার সময় মােড়ে বিশুর সহিত মনােজের দেখা হইল। ডান হাতে তরকারির ঝুলি, ঝুলির এক পাশ দিয়া এক টুকরা কুমড়া উকি মারিতেছে ; ডান হাতে একটা ইলিশ মাছ। দেখিবামাত্র কহিল, আজও গেছলেন ? মনােজ ঘাড় নাড়িয়া স্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। বিশু কহিল, কিছু দিয়েছেন? না, ফঁাকি দিয়েছেন? মনােজ চুপ করিয়া থাকিতেই বিশু কহিল, ওঃ, ফাকি দিয়েছেন। জানি আমি। আমি নেই কিনা! বুড়াের ওই রকমই দাতব্য। ওদিকে হাঁড়ি চড়ছে শিকেয় । ফী নিয়ে আসবেন, বুঝলেন ?—বলিয়া গটগট করিয়া দুই পা আগাইয়া গিয়া পিছন ফিরিয়া কহিল, কিছু আছে সঙ্গে ? একটা সিকি ? দোয়ানি ? আছে? দিন তবে, আসুন, কাছে আসুন। মনােজ কাছে গিয়া একটি দুয়ানি বাহির করিয়া দিল, দুয়ানিটি বিশুর জন্যই আনিয়াছিল। বিশু ৪৫ সুধার প্রেম কহিল, ভারি কঞ্জুস আপনি। কেবল দোয়ানি আর দোয়ানি। ভদ্র- লােকের ছেলেকে সিকির কম দেন কি করে ? দুহাত জোড়া দেখতে পাচ্ছেন না? টাকে গুজে দিন। দিন চার পরে একদিন সকালে মনােজ যথাসময়ে রাঘববাবুর বাড়ি গিয়া দেখিল, দরজা বন্ধ। ডিসপেন্সারির জানালাটি খােলা বটে, কিন্তু উকি মারিয়া কাহাকেও দেখিতে পাইল না। বার কয়েক কড়া নাড়িতেই বিশ্বম্ভরের গুরুগম্ভীর আওয়াজ শােনা গেল, কে ? মনােজ জবাব দিল, আমি । বিশু ধমকাইয়া কহিল, আমি কে ? মমােজ জবাব দিল, আমি—মানে, সেই যে -- ওঃ, দোয়ানিবাবু। দাড়ান একটু। মেয়েলী কণ্ঠস্বর শােনা গেল, দাও না বাবু খুলে ! ঝিখস্তর কহিল, দাড়া না, আগে জল খাই, গলাটা জাম হয়ে গেছে। বলিয়া বােধ হয় ঢকঢক করিয়া জল গিলিল। তারপর হুকুম করিল, খুলে দে। দরজা খুলিতেই মনােজ দেখিল, হৈমবতী, মাথায় তেমনই স্বল্প বগুণ্ঠন, চোখে কৌতুক, ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, আসুন, দিদিমণি আজ বাড়িতেই। ডিসপেন্সারির চৌকাঠের উপরে বসিয়া বিশুর বােধ করি প্রাতরাশ চলিতেছিল। একটা থালায় কতকগুলা বাসী রুটি, কতকটা গুড়। হৈমীর হাতে জলের গ্লাস। বিশু কহিল, আজ আর মামা নামবেন না, দোয়ানিটি দিয়ে সরে পড়ুন। মােজ বিস্ময়ের সুরে কহিল, কেন? একটা গােটা রুটি মুখে পুরিয়া বিশু বেপরােয়াভাবে চিবাইতে লাগিল, জবাব দিল না। মনােজ প্রশ্ন করিল, তিনি কি বাড়িতে নেই ?

সুধার প্রেম ৪১ বিশু ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, আছেন। তবে কি শরীর খারাপ ? বিশু গলাধঃকরণ সমাপ্ত করিয়া কহিল, দু আনায় এর বেশি খবর দেওয়া চলবে না। হৈমী আসিয়া কহিল, আচ্ছা কাবলীওয়ালার পাল্লায় পড়েছেন। বাবুর বাতের বেদনাটা বেড়েছে, দিদিমণি সেক দিচ্ছে। হৈমবতীর দিকে চোখ পাকাইয়া তাকাইয়া বিশু কহিল, বললি কেন ? মনােজের দিকে তাকাইয়া কহিল, আজ আর দোয়ানিতে চলছে না, জোড়া ফী লাগবে, আমার আর হৈমীর। এমন সময়ে শুধ। দোতলা হইতে নামিয়া আসিল। তাহাকে দেখি হৈমবতী রান্নাঘরের দিকে প্রস্থান করিল। বিশুও হঠাৎ রুটির থালার প্রতি দৃষ্টিসংযােগ করিল। সুধা তাহার দিকে না তাকাইয়া মনােজকে কহিল, বাবা আপনাকে ডাকছেন, আসুন।-বলিয়া পিছন ফিরিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। মনােজ তাহার অনুসরণ করিবার উপক্ৰম করিতেই বিশু খপ করিয়া তাহার হাত ধরিয়া চাপা স্বরে কহিল, আমাদের ফীটা ? মনােজ সিকিটি বাহির করিয়া তাহার হাতে দিতই সুধা পিছন ফিরিয়া তাকাইয়া কহিল, ও কি হচ্ছে? বিশু যেন তাহার কথা শুনতে পায় নাই, এমনই ভাবে আবার রুটি খাইতে শুরু করিল। মনােজ একটু হাসিয়া সুধার দিকে অগ্রসর হইল । দোতলায় একটি সরু বারান্দার সামনে পাশাপাশি দুইটি ঘর। একটি অপেক্ষাকৃত বড়, আর একটি নেহাত ছােট। বড়টি রাঘববাবুর শয়ন- কক্ষ, ছােটটি সুধার শয়ন ও পাঠ কক্ষ দুইই। দুইটি ঘরের মধ্যে একটি সংযােগ-দ্বার আছে। সুধা মনােজকে রাঘববাবুর শয়নকক্ষে আনিল। রাঘববাবু শুইয়া ছিলেন। উঠিয়া বসিয়া কহিলেন, এস বাবা। একটু দাড়ান।--বলিয়া সুধা পাশের ঘর হইতে একটা চেয়ার

সুধার প্রেম
আনিতেই মনােজ কহিল, আপনি আবার কষ্ট করতে গেলেন কেন?
সুধা কহিল, কষ্ট না করলে আপনি বসবেন কোথায় ? দাড়িয়ে থাকতেন
নাকি ?
মনােজ অপ্রতিভভাবে কহিল, না না, তা নয়, মানে-
সুধা কহিল, বসুন।
রাঘববাবু কহিলেন, ব’স বাবা, কেমন আছ?
ভাল আছি, কিন্তু আপনার কি হয়েছে ?
আমার সেই বাতের বেদনা আবার বেড়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে
এ রকম হয়।
ওষুধপত্তর খান না কেন?
কি ওষুধ খাব?
কেন, হােমিওপ্যাথি ?
মর্থ বিকৃত করিয়া রাঘববাবু কহিলেন, অনেক খেয়েছি বাবা। কিছু
হয় না, ও সেক-মালিশ ছাড়া উপায় নেই। সুধার দিকে তাকাইয়া -
কহিলেন, মা! তুমি পড়গে ; মনােজবাবু তাে রয়েছেন, ওঁর সঙ্গে একটু
গল্পসল্প করি। মনােজের উদ্দেশে কহিলেন, মাস দেড়েক পরেই পরীক্ষা,
* কালও পড়তে পারে নি, আজও সকালটা মাটি হ'ল। স্কুলে যেতেও
পারলে না। তা ছাড়া আমি নিজেও একটু দেখিয়ে শুনিয়ে দিই, তাও
হ’ল না, অবিশ্যি আমি আর কতটুকু পারি ।
মনােজ এই সুযােগে ঝট করিয়া বলিয়া ফেলিল, কি বিষয়ে সাহায্য
দরকার হয় ?—বলিয়া সুধার দিকে তাকাইল। সুধা বােধ করি তাহারই
দিকে তাকাইয়া ছিল ; চোখােচাখি হইতেই মুখ ফিরাইয়া লইল, কিন্তু
জবাব দিল না। জবাব দিলেন রাঘববাবু, ইংরেজীতে
মনােজ কহিল, বলেন তাে, আমি একটু আধটু সাহায্য করতে পারি।
=

সুধার প্রেম ৪৩ আমার তো এম. এ.তে ওইই সাবজেক্ট, বি. এ.তেও মন্দ ফল করি নি, ফাস্ট ক্লাস পেয়েছিলাম । রাঘববাবু বিস্ময় ও পুলক সহকারে কহিলেন, তাই নাকি! তা হলে তাে খুব ভাল হয়, কিন্তু আপনার—মানে, তােমার নিজের কোন ক্ষতি হবে না তাে? মনােজ পুনরায় সুধার পানে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিল, এবারেও দৃষ্টি-বিনিময় ঘটিল। তারপর মনােজ কহিল, ক্ষতি! ক্ষতি কিসের ? আমার পরীক্ষার এখনও অনেক দেরি। তা ছাড়া সন্ধ্যের সময় তে পড়ি না। তখন এসে একটু ঘাড় নাড়িয়া কহিল, কিছু ক্ষতি হবে না, বরং বলিতে ইচ্ছা হইল, প্রচুর লাভ হইবে, কিন্তু চাপিয়া গেল। রাঘববাবু সুধার উদ্দেশে কহিলেন, তােমার শাপে বর হয়ে গেল মা। বি. এ.তে ইংরেজীতে ফাস্ট ক্লাস, দুদিন পরেই এম. এ. হবেন, ওঁর কাছে পড়ে পরীক্ষায় ভাল ফল করতে না পারলে আর কাউকে দোষ দেওয়া চলবে না।-বলিয়া ঘাড়টি নাড়িতে লাগিলেন । সুধা ধীর পদবিক্ষেপে নিজের ঘরে চলিয়া গেল। বেতনভােগী মাস্টার অপেক্ষাও মনােজ নিয়মিত হাজিরা দিতে লাগিল। ইংরেজী ভাষায় সুধার ব্যুৎপত্তি কিরূপ বাড়িতে লাগিল জার্ট। , কিন্তু তাহার হৃদয়ের মধ্যে একটি প্রেমের অঙ্কুর গজাইয়া উঠিয়া দিন দিন বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। কোন দিন মনােজের আসিতে একটু দেরি হইলে সুধা যেরূপ ছটফট করিত, কাজে অকাজে নীচের তলায় আনাগােনা করিত, তাহা যে নিছক পঠনপ্রিয়তার জন্য নহে, তাহা হৈমবতী পৰ্য্যন্ত বুঝিতে পারিত। একদিন সন্ধ্যার পর নীচের তলায় আসিতেই, হৈমী মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল, মাস্টারবাবুর আসতে আজ ভারি দেরি হচ্ছে, না দিদিমণি ? সুধা ধারালাে গলায় জবাব দিল, তাতে ৪৪ সুধার প্রেম তােমার কি ? তুমি নিজের কাজ করগে। হৈমী হাসি চাপিয়া কহিল, না, তাই বলছি। আর মনােজের অবস্থা ? লােকে যেমন শখ করিয়া আফিম খাইতে শেখে, মনােজ তেমনই শখ করিয়া প্রেম করিতে গিয়াছিল। ভাবিয়াছিল, যখন ইচ্ছা এ নেশা ছাড়িয়া দিবে। কিন্তু যত দিন যাইতে লাগিল, ততই নেশা জমিয়া উঠিতে লাগিল। আফিমখােরের আফিমের গুলি যেমন দিন দিন গােলার আকার ধারণ করিতে থাকে, মনােজের অধ্যাপনার সময় ও তেমনই দিন দিন বাড়িতে লাগিল। অহিফেনসেবীর মন যেমন সারাদিন সমস্ত কাজকর্মের মধ্যে অহিফেন-সেবনের ক্ষণটির দিকে সতৃষ্ণ নয়নে তাকাইয়া থাকে, মনােজের মনও তেমনই ভাবে বাড়িতে পড়াশুনা ও কলেজে অধ্যাপকদের বক্তৃতা শ্রবণের মধ্যে অধ্যাপনার সময়টির দিকে তাকাইয়া থাকিত এবং যতক্ষণ অধ্যাপনা চালত, ততক্ষণ তাহার সমস্ত অন্তর মাটির পৃথিবী ছাড়িয়া এক অমৃতলােকে উত্তীর্ণ হইত। সময়- স্রোত ও রক্তস্রোত দুইই বেগে প্রবাহিত হইত; হাতে হাতে ছোওয়া লাগিয়া সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎপ্রবাহ বহিত ; চোখে চোখে চাহনি মিলিয়া মাথার স্নায়ুগুলা সেতারের তারের মত ঝনঝন করিয়া উঠিত, এবং ‘খন অধ্যাপনা শেষ হইত, তখন মিষ্টান্নলােভী মক্ষিকার মত মন কি ভূতেই নড়িতে চাহিত না। তারপর মেসে ফিরিয়া যাহা হউক কিছু মুখে দিয়া, বন্ধুদের এড়াইয়া বিছানায় আসিয়া চিত হইয়া শুইয়া পড়িত বটে, কিন্তু সুধার সঙ্গস্মৃতির টুকরাগুলি বায়ােস্কোপের ছবির মত তাহার মানসচক্ষের সামনে ক্রমাগত পারাপার করিয়া তাহার চোখের ঘুমকে দেশছাড়া করিত। কিছুদিন পরে এমন হইল যে, শুধু কিছুক্ষণের জন্য সুধার সঙ্গ পাইয়া মন তৃপ্ত হইতে চাহিল না, তাহাকে চিরদিনের জন্য একান্তভাবে পাইবার জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিল। খ সুধার প্রেম ৪৫ প্রায় মাস খানেক পরে একদিন পড়াইতে গিয়া মনােজ দেখিল, সুধা পড়িবার ঘরে অনুপস্থিত। টেবিলের উপরে একটি কাগজে লেখা, মাথা ধরেছে, আজ আর পড়ব না, ছাদে যাচ্ছি। মনােজ কিংকর্তব্য চিন্তা করিতে লাগিল। রাঘববাবুর বাতের বেদনা কয়েক দিন আবার বাড়িয়াছে। দরজার কাছে কান পাতিয়া তাহার শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত মাত্রা শুনিয়া বুঝিল, তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। বিশুও এতক্ষণ নিশ্চয়ই রান্নাঘরে হৈমবতীর হৃদয়রাজ্যে হানা দিবার চেষ্টা করিতেছে। অতএব, মনােজ পা টিপিয়া টিপিয়া সরু সিড়ি দিয়া হাতড়াইতে হাতড়াইতে ছাদে উঠিল। নেহাত এক টুকরা ছাদ। এক দিকে একটা জলের ট্যাঙ্ক, তাহারই পাশে দাড়াস) সুধা পাশের বাড়ির দিকে তাকাইয়া ছিল। মনােজ একটু পায়ের শব্দ করিতেই সুধা একবার মুখ ফি, তাকাইয়া আবার দেখিতে লাগিল। মােজ আসিয়া কহি, মাথা ধরেছে ? সুধা ঘাড় নাড়িয়া জালাইল, ধরিয়াছে। দুদিন পরেই পরীক্ষা, একটু পড়লে হত না? সুধা কহিল, না। তা হলে আজ যাই, কি বল ? সুধা আবার ঘাড় নাড়িয়া কহিল, না। তবে কি করব ? যা ইচ্ছে। মনােজ হাসিয়া কহিল, যা ইচ্ছে তা করলে তােমার কি ভাল লাগবে সুধা? সুধা বিদ্যুৎ-গতিতে মুখামুখি হইয়া দুই ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া কহিল, মানে ?

৪৬ সুধার প্রেম মনােজ ঘাবড়াইয়া গিয়া কহিল, মানে, আমার ছাদ থেকে ঝাপ দিতে ইচ্ছে করছে। সুধা বিস্মিত কণ্ঠে কহিল, সে কি ? মনােজ বক্তৃতার সুরে বলিতে লাগিল, হ্যা সুধা, আমার ইচ্ছে হচ্ছে, ছাদ থেকে নীচে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি, হাত পা মাথা ভেঙে একেবারে চেপ্টে যাই। জীবন আমার অসহ্য হয়ে উঠেছে সুধা। সুধা প্রশ্ন করিল, আপনার মাথার যন্ত্রণা আবার বেড়েছে বুঝি? মনােজ মাথা নাড়িয়া কহিল, না না, মাথার যন্ত্রণা নয়, বুকের। বুকে হাত দিয়া কহিল, ঠিক বুকের মাঝখানে। তা হ'. ঝাপ-টাপ না দিয়ে বাবার কাছে যান। তােমার বাবা, কিৎসায় সারবে না সুধা। এ শুধু সারাতে পারে একজন সুধা ক্ষুন্ন স্বরে কহিল, সে আবার কি ? খুব বড় ডাক্তার বুঝি ? সুধার দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া থাকিয়া মনােজ কহিল, হ্যা। সুধা মুখ ফিরাইয়া লইয়া কহিল, বেশ। তার কাছেই যান তা হলে। মননজের ইচ্ছা হইল বলে, তার কাছেই তাে এসেছি সুধা। কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। "শ চুপ করিয়া সম্মুখের অন্ধকারের দিকে তাকাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে কহিল, বেচারী। মনােজ সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, কে সুধা? ওই মেয়েটি।-বলিয়া সুধা মস্তকের ইঙ্গিতে পাশের বাড়ির একটি আলােকোজ্জল কক্ষকে নির্দেশ করিল। মনােজ সেই দিকে তাকাইয়া দেখিল, একটি পালঙ্কে একজন রুগ্ন। স্ত্রীলােক শুইয়া আছে, তাহারই পাশে বসিয়া একজন মধ্যবয়সী মােটাসােটা লােক মেয়েটির বুকে মালিশ সুধার প্রেম ৪৭ করিতেছে। সুধা কহিল, কতদিন থেকে ভুগছে! কেমন সুন্দর চেহারা কেমন হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে খুব ভাব ছিল। বােজ ছাদে এসে কত গল্প করত। আজকাল আর উঠতে পর্যন্ত পারে না। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, ডাক্তার বুঝি জবাব দিয়ে গেছে । মনােজ চুপ করিয়া রহিল। সুধা কহিল, স্বামীটি ভারি ভাল : দিনরাত ওর সেবা করে। আবার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, আমি যদি মরে যেতাম। মনােজ কহিল, ছিঃ সুধা, বলতে নেই। সুধা বিষন্ন কণ্ঠে কহিতে লাগিল, সত্যি বলছি, আমার ভারি ইচ্ছে করে মরতে। বাবার শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে, বােধ হয় বেশি দিন আর বাঁচবেন না। তারপর আমার কি হবে বলতে পারেন ? বিশুদা তাে ওই মানুষ । কেন সুধা, তােমার বিয়ে হবে, বর হবে- সুধা ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, বরটি বুঝি আকাশ থেকে টুপ ক'রে পড়বে, না মনােজবাবু ? মনােজ কহিল, তা হয়তাে পড়তে পারে, বলা তো যায় না! মানে, হয়তাে একদিন হাতের কাছেই হাজির হয়ে যাবে। সুধা নীরস কণ্ঠে কহিল, বাংলা দেশে বর পাওয়া অত সরু নয় মনােজবাবু। পাশের বাড়িতে স্বামীটি মালিশ শেষ করিয়া পত্নীকে উঠাইয়া বসাইল। তারপর একটি পেয়ালা করিয়া জল অথবা দুধ খাওয়াইতে লাগিল। সুধা কহিল, আমার ভারী ইচ্ছে হয়, অমনই করে কারও সেবা পেতে। যন্ত্রণাসূচক স্বরে কহিল, এই যে এত মাথার যন্ত্রণা, এমন কেউ ৪৮ সুধার প্রেম নেই যে, একটু টিপে দেয়।-বলিয়া আলিসার উপর দুই হাত রাখিয়া তাহার মধ্যে মাথাটি গু জিল। মনােজ একেবারে কাছে আসিয়া কহিল, একটু টিপে দোব সুধা? সুধা মাথা না তুলিয়া কহিল, দিন, কিন্তু আপনার আবার বুকের বেদনা- তা হােক সুধা, সে সেরে যাবে এখন।-বলিয়া দুই হাত দিয়া কপালটি আস্তে আস্তে টিপিয়া দিতে লাগিল, জ্বর মাঝখানের ঠিক উপর হইতে কানের গােড়া পর্যন্ত। সুধার চুল হইতে একটি মিষ্ট গন্ধ আসিয়া নাসারন্ধকে আপ্যায়িত করিতে লাগিল ; হাতে লাগিতে লাগিল চুলের কোমল স্পর্শ। দুই-একগাছি চুল আঙুলে লাগিয়া একটু টান পড়িতেই সুধা কহিল, চুল টানছেন কেন? আলগা হয়ে যাবে যে । মনােজ কহিল, না, টানি নি তাে। আকাশে চাঁদ উঠিয়াছিল, ঝিরঝির করিয়া বাতাস বহিতেছিল, কাছেপিঠে গাছ থাকিলে কোকিল বা পাপিয়ার ডাকও হয়তাে শােনা যাইত। ঠিক এই অবস্থায় একজন তরুণীর মাথা টিপিবার সৌভাগ্য । কোন দিন হইবে—মনােজ কি কখনও কল্পনা করিয়াছিল ? যে স্পর্শ-সুখ মনে মনে কল্পনা করিয়া মনােজ কত দিন মাঝরাত্রিতে উত্তেজনায় বিছানা ছানা উঠিয়া সারা বারান্দা, উপর নীচ ঘােড়দৌড় করিয়াছে, কলতলায় বালতি বালতি জল মাথায় ঢালিয়াছে, তাহাই এত সহজে হাতের মুঠার মধ্যে ধরা দিল, ইহা যেন তাহার বিশ্বাস হইতেছিল না। মনে হইল, স্বপ্ন দেখিতেছে নাকি? সামনে চাহিয়া দেখিল, পাশের বাড়ির পত্নী- অনুরক্ত স্বামীটি স্ত্রীকে শােয়াইয়া পাখা করিয়া মশা তাড়াইতে তাড়াইতে মশারি ফেলিতেছে। না না, স্বপ্ন নয়। মনােজ ধীরে ধীরে মুখটি নামাইয়া সুধার মাথার কাছে লইয়া আসিয়া

সুধার প্রেম
৪৯
চুলের গন্ধ শুকিতে লাগিল। একবার ইচ্ছা হইল, গালটি ওই নরম
ভেলভেটের মত চুলের উপর রাখে, কিন্তু ইচ্ছা কার্যে পরিণত করিবার
পূৰ্বেই সুধা হঠাৎ মাথা তুলিতেই মনােজের নাকে ঠোকা লাগিল।
মনােজ উঃ করিয়া উঠিল।
সুধা বিস্মিত কণ্ঠে কহিল, কি হল ?
কিছু না।--বলিয়া মনােজ নাকে হাত বুলাইতে লাগিল ।
সুধা ফিরিয়া দাড়াইয়া কহিল, করছিলেন কি ?
মনােজ অপ্রতিভভাবে কহিল, কিছু না, মানে-দেখছিলাম ।
সুধা প্রশ্ন করিল, কি দেখছিলেন ?
তােমার চুল। ওঃ, তােমার কত চুল সুধা !
সুধা সন্দিগ্ধ স্বরে কহিল, আপনি বুঝি ভাবছেন, এ নকল চুল, না?
আপনি তাে ভারি সাংঘাতিক লােক দেখছি।
মমােজ প্রতিবাদ করিয়া কহিল, তা নয়, আমার দেখতে ভাল
লাগছিল, মানে-
বাধা দিয়া সুধা কহিল, ভাল লাগছিল, না আর কিছু পরীক্ষা করে
দেখছিলেন? কিন্তু সত্যি বলছি, এ আমার আসল চুল। এক এক
গাছি করিয়া চুল টানিয়া টানিয়া কহিল, এই দেখুন, ছিড়ছে না, এখনও
বিশ্বাস হচ্ছে না?
মনােজ কহিল, আমায় বিশ্বাস কর সুধা, আমি পরীক্ষা করি নি,
তােমার চুলের গন্ধ শুকছিলাম। ভারি মিষ্টি গন্ধ ! কিন্তু এমনই ঠুকে
দিলে, নাকটা ঝনঝন করছে!
সুধা মৃদু হাসিয়া কহিল, বেশ হয়েছে। কেন আমার চুলের গন্ধ
চুরি করছিলেন? খুব লেগেছে ? দোব হাত বুলিয়ে ?
মনােজ নাক বাড়াইয়া দিয়া কহিল, দাও।

সুধার প্রেম সুধা নাকে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল। মমােজ কিছুক্ষণ আরামে চোখ মুদিয়া থাকিয়া কহিল, কিন্তু আমার বুকের বেদনাটা কি হবে সুধা ? সুধা কহিল, ওর আর আমি কি করব ? কে যে বড় ডাক্তার আছে, তার কাছে যাবেন। বলেন তাে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিতে পারি। কিন্তু সে বড় ডাক্তার তো তুমিই সুধা। তােমার ওষুধেই আমার বেদনা সারবে। মননজের বক্তব্য বুঝিতে পারিয়া সলজ্জ হাস্যে সুধার মুখ ঝলমল করিয়া উঠিল। কিন্তু না বুঝিবার ভান করিয়া কহিল, বারে! আমি কিসের ডাক্তার! কোথায় পাব আমি ওষুধ ? মনােজ গাঢ় স্বরে কহিল, সুধা, তুমি যদি অনুমতি দাও তাে, আমার নিজের ওষুধ আমি নিজেই ঠিক করে নিতে পারি।-বলিয়া একদৃষ্টে সুধার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল। সুধাও মনােজের মুখের পানে তাকাইল। দুইটি দৃষ্টি যেন পরস্পরকে আলিঙ্গন করিল। সুধা রুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, তাই নাও। মমােজ দুই হাতে সুধাকে আলিঙ্গনবদ্ধ করিয়া তাহার মাথাটি নিজের বুকে চাপিয়া ধরিয়া কহিল, এই আমার অমােঘ ঔষধ -বক্ষ-বেদনা- রণী বটিকা। এক মিনিটে বেদনা আমার ভাল হয়ে গেল সুধা। সুধা চাপা স্বরে কহিল, ছাড় না, দম বন্ধ হয়ে আসছে যে ! মনােজ সুধাকে ছাড়িয়া দিতেই, সুধা এক অদ্ভুত ধরনের হাসি হাসিয়া কহিল, ভারি দুষ্ট, তুমি। মনােজও হাসিয়া কহিল, দুষ্টমি না করলে উপায় কি সুধা? তোমরা যে ভালমানুষির মূল্য দাও না। কিন্তু আমার কথা ফলল তাে? সুধা বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করিল, কি কথা?

সুধার প্রেম সেই যে বলছিলাম, তােমার বরকে তােমার হাতের কাছে পাবে, পেলে তাে ? সেই দিন বাড়ি ফিরিবার সময়ে মনােজের দেহ পাঁচ মাইল বেগে চলিলেও মন পাঁচ শত মাইল বেগে ছুটিতেছিল, কত নূতন, কত আজব কল্পনা-রাজ্যের ভিতর দিয়া। হঠাৎ পিছন হইতে ডাক পড়িল, এই দোয়ানিবাবু! শুনুন। যেন পাহারাওয়ালা ডাক দিল, অ্যাই বােকো। মনােজকে মনের ব্রেক কষিতে হইল। পিছন ফিরিয়া তাকাইয়া দেখিল, লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া বিশু আসিতেছে। নাগাল ধরিয়া বি কহিল, চলুন, রাস্তায় যেতে যেতে বলছি। মননজের দেহের গতি আবার শুরু হইল, কিন্তু মন ঠায় দাড়াইয়া রহিল । বিশু কহিল, মামাকে আর সুধাকে তত খুব হাত করেছেন। একটা কাজ করে দিতে পারেন ? পৃথিবীতে এমন কি কাজ আছে, যাহা বিশ্বম্ভর একা করিতে পারে না, মননজের মত লােকের উপর নির্ভর করিতে হয়? মনােজ কহিল, কি ? বিশু জবাব দিল, হৈমীকে ভালবাসি। মনােজ ইহা অনেক দিন আগেই সন্দেহ করিয়াছিল, কাজেই স্বাভাবিক কণ্ঠে কহিল, বেশ তাে। ওকে বিয়ে করব। করুনগে। বিশু দাত-মুখ খি চাইয়া কহিল, করুনগে! বলবার ভাবনা কি ? মামার মত নিতে হবে না? বিধবা যে ! যেন মাতুলদের মত হইয়া গেলেই বিধবাবিবাহ হিন্দু-সমাজে চালু হইয়া যাইবে। মনােজ কহিল, তা আমাকে কি করতে হবে ?

সুধার প্রেম মামার মত করিয়ে দিতে হবে। আমি বললেই আপনার মামা মত দেবেন, আপনার এ বিশ্বাস হ'ল কি করে ? ভুরু নাচাইয়া, চক্ষু চড়াইয়া, মাথা উচাইয়া বিশু কহিল, বিশ্বাস হবে কেন ? এত বড় ধাড়ী মেয়েকে আপনার কাছে বেওজোর ছেড়ে দিতে পারেন, আর আপনার কথা শুনবেন না? খুব শুনবেন। আপনি বলেই দেখুন না । মনােজ ঢোক গিলিয়া কহিল, রাঘববাবুর বাতের বাড়াবাড়িটা একটু কেটে গেলে হয় না? বিও প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়া কহিল, না না, মামার বাতের বাড়াবাড়ি না মরলে সারবে না। ততদিন বিয়ের জন্যে বসে থাকতে হবে নাকি? তা ছাড়া শিগগির বিয়ে না হলে হৈমী দেশান্তরী হবে বলছে। মনােজ বিশুর মুখের দিকে তাকাইল। গ্যাসের আলাে লাগিয়া ব্রণবহুল তৈলাক্ত মুখ চকচক করিতেছে, কোটরগত চোখ দুইটা জ্বলজ্বল করিতেছে, মােটা মােটা ঠোট দুইটা কাপিতেছে। বিশ্ব ভালবাসিয়াছে হৈমীকে ; হৈমী বিধবা, যৌবনে তাহার ভাটা আসিয়াছে, ভালবাসায় গাঁজ ধরিয়াছে। মনােজও তাে ভালবাসিয়াছে সুধাকে ; সুধা তরুণী ফুল, জীবনবৃন্তে এই তাহার প্রথম মুকুল দেখা দিয়াছে। তাহা হউক, ভালবাসার কি জাতিভেদ, শ্রেণীভেদ আছে? সে ও বিশু দুইজনেই নিখিল-পৃথ্বী-প্রেমিকসজের চারি আনার সভ্য । রাঘববাবুকে বলি বলি করিয়াও মনােজ বলিতে পারিল না। কিন্তু বলার দরকারও হইল না। একদিন রাত্রে বিশ্বকে লইয়া হৈমী উধাও হইয়া গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে উধাও হইল রান্নাঘরের হাঁড়ি, কড়াই, থালা, বাটি, গ্লাস, দুইটি ট্রাঙ্ক-একটি রাঘববাবুর আর একটি সুধার, সুধার প্রেম সুধার এক জোড়া দুল, এক কৌটা পাউডার, এক শিশি মে, এক শিশি এন্সেস ইত্যাদি। পাশের বাড়ির চাকরের মারফত খবর পাইয়া মনােজ আসিয়া হাজির হইল। রাঘববাবু কাতরাইতে কাতরাইতে যাহা জ্ঞাপন করিলেন, তাহার সার মর্ম এই–তাহার খাইয়া বড় হইয়া যে নেমকহারাম তাঁহার মুখের দিকে তাকাইল না, একটা বিধবার মােহে তাহাকে এই অবস্থায় ফেলিয়া চলিয়া গেল, ভগবান তাহার মঙ্গল করিবেন না। পৃথিবীতে কাহারও উপকার করিতে নাই। সুধা কহিল, কি করা যায় বল দেখি? বাবার ওই রকম শরীর, ওঁকে নিয়ে আমি একা একা এই বাড়িতে থাকব কি করে? মনােজ সাহস দিয়া কহিল, ভয় কি? সব ব্যবস্থা করছি আমি। সুধা শােকাৰ্ত্ত কণ্ঠে কহিল, ভাল ভাল শাড়িগুলাে নিয়ে পালাল পােড়ামুখী! নতুন কিনেছিলাম, একবার পরি নি পর্যন্ত। তা ছাড়া দুল জোড়াটা-। সুধার চোখে জল আসিল। তাহার বড় সাধের দুল দুইটি দগ্ধবদনীর কুলার মত কান হইতে দুলিতে থাকিবে, তাহা মা, করিয়া তাহার বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। মনােজ দুঃখ প্রকাশ করিল বটে, কিন্তু সত্য বলিতে কি, তাহার মনে দুঃখ না হইয়া বরং আনন্দই হইতেছিল; এবং সুধা ও তাহার *গ্ন পিতাকে কেবলমাত্র তাহারই স্কন্ধে সপিয়া দিয়া যাওয়ার জন্য বিশু ও হৈমীকে মনােজ মনে মনে আশীর্বাদ করিতেছিল। মনােজকেই সুধাদের সংসারের হাল ধরিতে হইল। জিনিসপত্র দেখিয়া শুনিয়া কিনিয়া আনিল। দিনরাত থাকিবার জন্য একজন বুড়ী ঝি ও রান্না করিবার জন্য একজন ঠাকুর সংগ্রহ করিল এবং নিজে সকালে ও সন্ধ্যায় আসিয়া তদারক করিতে লাগিল।

৫৪ সুধার প্রেম ভালই হইল। কারণ সুধার পরীক্ষা হইয়া গেলেও মনােজের আনাগােনা করার অছিলার অভাব রহিল না। সুধার কড়া তাগিদও ছিল। একদিন না গেলে সুধা রাগ করিত, অভিমান করিত ; একদিন ধমক দিয়াছিল। মেয়েদের ধরনই এই। দেওয়া-নেওয়া ব্যাপারে তাহারা মধ্যপন্থা ভালবাসে না। হয় কিছুই দেয় না, দেওয়ার ভান করে মাত্র ; যখন দেয়, পাত্র উজাড় করিয়া দেয়। অথচ পাওনাটা পুরাপুরি হইল কি না, বুঝিতে পারে না। তাই অনুক্ষণ মনে সন্দেহ জাগে, ভয় হয় ; মান ও অভিমানের অস্ত্র হানিয়া বাকি বকেয়া উসুল করিবার চেষ্টা করে। সুধা মননজের কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়াছিল । তাই মনােজকে একান্তভাবে পাইবার জন্য তাহার মন সর্বক্ষণ ব্যাকুল হইয়া থাকিত। একদিন বলিল, সেই সকালবেলায় একটিবার, সন্ধ্যেবেলায় একটিবার দেখা! সারাদিন আমার কি করে কাটে বল দেখি? তুমি মেছেড়ে এখানে চলে এস। মনােজ কহিল, তা কি হয় ? তােমার বাবা কি বলবেন? বাবা কিছু বলবেন না, বরং সুখী হবেন। উনি কি কিছু বুঝতে পারেন নি ভেবেছ ? ফনাজ চুপ করিয়া রহিল। সুধা একটু সরিয়া দাঁড়াইয়া, মুখ ফিরাইয়া নীরস কণ্ঠে কহিল, ও, এখানে তােমার কষ্ট হবে বুঝি ? মনােজ কাছে ঘেঁষিয়া কহিল, কষ্ট! না সুধা, এখানে এলে আমার স্বর্গলাভ হবে। কিন্তু বাবা হয়তাে কোন্ দিন এসে পড়তে পারেন। সুধা কহিল, এলেই বা! তিনি সব জানতে পারবেন। তার কাছে আর তাে কিছু গােপন করা উচিত নয়।

সুধার প্রেম সুধা, পরীক্ষার পর গিয়ে তঁাদের সব কথা বলব। তারপর তাদের মত নিয়ে মনােজ বাক্যের পরিবর্তে কাৰ্য্যের দ্বারা বক্তব্য বিষয় সুস্পষ্ট করিবার জন্য সুধাকে কাছে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিতেই, সুধা নিজেকে ছাড়াইয়া লইয়া কহিল, যদি তাদের মত না হয় ? মনােজ দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, তাদের মত না হলেও আমার মতি স্থির থাকবে। সুধা ছাড়া আমি বাঁচব না, সুধা। সুধা কাছে সরিয়া আসিয়া মনােজের মুখের দিকে তাকাইয়া কহিল, সত্যি বলছ? সুধাতে তােমার কোন দিন অরুচি হবে না? সুধা, তুমি আমাকে বিশ্বাস কর । মননজের বুকে মাথা রাখিয়া সুধা কহিল, আমার বড় ভয় হয়। দুপুরবেলায় নিজের ছােট ঘরটির জানালার ধারে দাড়াইয়া সুধা আজকাল স্বপ্ন দেখে, একটি সুন্দর ছােট বাড়ি, তাহার নিজের হাতে মনের মত করিয়া সাজানাে ; ঘােট্ট সংসার, সে আর মনােজ, আর হয়তো বাবা, আরআর, একটি পদ্মকলির মত ছােট্ট থােকা, ধবধবে রঙ, মুখ-চোখ ঠিক মননজের মত। একদিন দুপুরবেলায় পাশের বাড়ির মেয়েটি মারা গেল। স্বামী বেচারীর কি কান্না ! গড়াগড়ি দিয়া সারা মেঝেটার ধূলা গায়ে মাখিল, চোখের জলে মােটা গোঁফজোড়া ভিজিয়া ন্যাতা হইয়া গেল। • সন্ধ্যার পর সুধা ছাদে দাড়াইয়া মেয়েটির ঘরের দিকে তাকাইয়া ঘরে আজ আর আলাে জ্বলা হয় নাই। স্বামী বেচারা একটি চাদর গায়ে দিয়া মাতৃহীন শিশুটিকে কোলে লইয়া দোতলার বারান্দায় পায়চারি করিতেছিল। মেয়েটিকে সুধার মনে পড়িল। পাতলা ছিপছিপে গঠন, ফরসা রঙ, কোকড়া কোঁকড়া চুল, ডাগর চোখ। মুখের হাসিটি চমৎকার, একটুতে ছিল।

সুধার প্রেম
খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিত। কেমন এক রকম আবদারী ধরনে
কথা বলিত। আবার হইবে না কেন? স্বামীর কত আদর ! দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রী যে! একদিন বলিয়াছিল, দ্বিতীয় পক্ষ দেখে বিয়ে করবি,
কত আদর দেখবি, চোখের আড় করতে চাইবে না, হেঁটে গেলে বুক
পেতে দেবে। ছােকরা স্বামী গুলাের ভারি অহঙ্কার, চোখ পেতে চেয়েও
দেখতে চায় না।
সুধার গা-ছমছম করিতে লাগিল।
এত সুখ, এত আদর মেয়েটি
কি ভুলিতে পারিয়াছে। হয়তাে এখনও ওখানে ঘুরঘুর করিতেছে,
ও ঘরটিতে আজ আলাে জ্বালা উচিত ছিল। হঠাৎ কাহার স্পর্শে ‘মা
গাে’ বলিয়া চমকিয়া উঠিয়া সুধা পিছন ফিরিয়া তাকাইয়া দেখিল,
মনােজ। কহিল, তুমি ! এমন ভয় পেয়েছিলাম। আজ এত দেরি হ’ল ?
মনােজ কহিল, পড়ছিলাম, পরীক্ষার তো আর দেরি নেই। সুধা
অভিমানের সহিত কহিল, পরীক্ষা! ও, মনে ছিল না। মনােজ সুধাকে
কৃগছে টানিয়া কহিল, রাগ ক'রাে না সুধা। সুধা শুষ্ক স্বরে কহিল, না,
রাগ কিসের! মনটা আমার ভাল নেই। ও বাড়ির বউটি আজ মারা
গেছে।
মনােজ কহিল, তাই নাকি? তা হলে তাে ভদ্রলােকের ভারি
মুশকিল হ’ল দেখছি।
সুধা কহিল, সত্যি। দু-তিনটি ছােট ছােট ছেলেমেয়ে।
মনােজ কহিল, তা হােক, মুশকিল আসান হতেও দেরি হবে না।
জ্ব কুঞ্চিত করিয়া সুধা প্রশ্ন করিল, কেন ?
তৃতীয় পক্ষ তাড়াতাড়ি এসে পড়বেন।
সুধা কহিল, পাগল নাকি! কখনও আর বিয়ে করবে না।
ভারি ভালবাসত বউকে, আমার নিজের চোখে দেখা।
| রাগ

সুধার প্রেম মনােজ জবাব দিল না। সুধা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, আজ ভাবছিলাম। বলিয়া থামিয়া গিয়া লজ্জিত মুখে মৃদু হাসিল। মনােজ কহিল, কি ? সুধা ইতস্তত করিয়া কহিল, ভাবছিলুম, যদি শিগগির মরে যাই, তা হ'লে আর তােমাকে আমার পাওয়া হবে না, ভূত হয়ে চিরদিন হা-হা করে বেড়াব। মনােজ কহিল, তুমি তাে আমাকে পেয়েছ সুধা। আমাদের সত্যিকার বিয়ে হয়ে গেছে, শুধু গােটা কয়েক মন্ত্র পড়া বাকি, তারও আর বেশি দেরি নেই। পরীক্ষাটা হয়ে গেলে আসছে অঘ্রাণেই বিয়ে হবে। তারপর ছিনে জেঁকের মত এমনই কামড়ে পড়ে থাকব যে, টেনেও ছাড়াতে পারবে না। সুধা সেই অন্ধকার ঘরটির দিকে তাকাইয়া কহিল, কে জানে, কপালে কি আছে, ভারি জানতে ইচ্ছে করে। সুধার পরীক্ষার খবর বাহির হইল। প্রথম বিভাগে পাস করিয়াছে। রাঘববাবু খবর শুনিয়া খুব আনন্দিত হইলেন। কহিলেন, মনােজকে রাত্রে নেমন্তন্ন কর, ওর চেষ্টাতেই তাে হল। রাত্রিতে গিয়া মনােজ দেখিল, শুধু সে-ই নিমন্ত্রিত নহে।আর এক ব্যক্তি নিমন্ত্রিত হইয়াছে এবং তাহার আগেই আসিয়া আসর জমাইয়া বসিয়া আছে। খুব সম্ভব পাশের বাড়ির সদ্যবিপত্নীক ভদ্রলােক, পত্নী- বিসর্জনের পর গোঁফজোড়াটিও বিসর্জন দিয়াছে। গায়ে গলাবন্ধ কোট, মাথায় কাঁচা-পাকা চুলে টেড়ি, পায়ে সদ্য-ক্রীত অ্যালবার্ট জুতা। একটা চেয়ারে বসিয়া দরজার দিকে সতর্ক দৃষ্টি পাতিয়া রাখিয়াছে। মনােজকে দেখিয়া ভদ্রলােক উঠিয়া দাড়াইয়া বােকার মত হাসিতে ৭৮ সুধার প্রেম লাগিল। রাঘববাবু মননজের পরিচয় দিয়া, তাহাকে নিজের বিছানায় বসিতে বলিলেন। মনোজ বসিলে ভদ্রলােকও বসিল, কিন্তু তাহার চোখ দুইটা ঘন ঘন দরজার দিকে ফিরিতে লাগিল। সুধা বােধ করি নিজে বঁধিতেছিল। একবার রাঘববাবুকে কি জিজ্ঞাসা করিবার জন্য আসিল। মনােজ লক্ষ্য করিল, আজ তাহার কেশে ও বেশে যেন একটু বিশেষ পারিপাট্য। যে দুল জোড়াটি মনােজ নিজে কিনিয়া দিয়াছে, সেইটি পরিয়াছে, পরনেও সেই শাড়িটি, যেটি মনােজ নিজে পছন্দ করিয়াছিল। সুধা ভদ্রলােককে দেখিয়া নমস্কার করিল এবং মনােজের দিকে একবার তাকাইয়াই মুখ ফিরাইয়া অন্য সকলের অলক্ষ্যে মুচকি হাসিল। মনােজ রাঘববাবুর সঙ্গে কথা কহিতে কহিতে আড়চোখে চাহিয়া দেখিল, ভদ্রলােক সুধার দিকে প্যাটপ্যাট করিয়া তাকাইয়া আছে। বান 7 সুধা রাঘববাবুকে জিজ্ঞাসা করিল, বাবা, তুমি কি ভাত খাবে, না ধান কয়েক লুচি ভেজে দোব ? রাঘববাবু কহিলেন, থাক মা, আর লুচি ভেজে কাজ নেই ; এদের সঙ্গে যা পারি দু মুঠো খাব। সুধা চলিয়া গেল, ভদ্রলােকের দৃষ্টিও দরজা পর্যন্ত তাহাকে অনুসরণ করিল। মনােজ ভাবিতে লাগিল, ভদ্রলােকের এত দৃষ্টি-দাক্ষিণ্য কেন? আর ইহাকে ডাকিয়া আনারই বা কি প্রয়ােজন ? রাঘববাবু কি সুধাকে তৃতীয়-পক্ষ-পদের জন্য উমেদার দাড় করাইতেছেন নাকি ? কাজের অছিলায় উঠিয়া গিয়া মনােজ সটান রান্নাঘরে আসিয়া হাজির হইল। সুধা রান্নাঘরের বারান্দায় একটা স্টোভের উপর তাওয়া চাপাইয়া মাংসের চপ ভাজিতেছিল, মনােজকে দেখিয়া মুচকি হাসিয়া কহিল,

সুধার প্রেম
এই গরমের মধ্যে আবার এলে কেন? চপ খাবে তো ওই প্লেটটা
নয়ে এস।
খাইতে খাইতে মনােজ কহিল, যা পারি খেয়ে নিই বাবা।
ভস্মলােচনকে নেমন্তন্ন করেছ, কাউকে আজ আর কিছু পেতে হবে না,
একাই সব সেঁটে দিয়ে যাবে, মায় তােমাকে পর্যন্ত।
সুধা বিস্মিত মুখে কহিল, ভস্মলােচন! পরক্ষণেই বুঝিতে
পারিয়া কহিল, ও, ভূষণবাবু! ভারি ভালমানুষ, বাবার সঙ্গে আলাপ
হয়েছে।
হঠাৎ আলাপ করবার উদ্দেশ্য? এতদিন তো করে নি
একলা মন টিকছে না, তাই লােকের সঙ্গ খুঁজছেন।
মনােজ রাগত স্বরে কহিল, সঙ্গ খুঁজছেন! পাড়াতে আর সঙ্গ
জুটল না বুঝি? তাই এই বাড়িতে জুটেছে ! ও ঠিক তােমার ওপর
তাক করেছে, আমি বলে দিচ্ছি, যা তােমার দিকে চাচ্ছিল, যেন গিলে
যাবে।
মনােজের রাগ দেখিয়া সুধার হাসি পাইতেছিল। হাসি চাপিয়া
কহিল, চাচ্ছিলেন বুঝি? বুঝতে পারি নি।
মনােজ তীক্ষ্ণ স্বরে কহিল, বুঝতে পার নি খুব ভাগ্যি, না হলে
এতক্ষণ ওর পেটের মধ্যে গিয়ে হজম হয়ে যেতে।
সুধা কহিল, আর তােমার রাগ করে কাজ নেই বাপু। ওঁর সামনে
আর না গেলেই তাে হ’ল ?
মনােজ অপ্রতিভ হইয়া কহিল, না না, যাবে না কেন, নেমন্তন্ন
করেছ যখন? তবে একটু সাবধানে থেকো, বেশি মাখামাখি করাে না।
সুধা এবার রাগ করিয়া কহিল, আমার কি মাখামাখি করবার লােক
নেই নাকি? তােমার যেমন কথা !

সুধার প্রেম বিশ্বম্ভর দিন কয়েক পরে ফিরিয়া আসিল। এক মুসলমান দর্জি বিশুর পাড়াতেই থাকিত। সেই নাকি চোরের উপর বাটপাড়ি করিয়াছে। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর একসঙ্গে শুইয়া ছিল, সকালে উঠিয়া দেখে, হৈমবতী পলাইয়াছে, ঘর একেবারে খালি। রাঘববাবু নাকি আসিবামাত্র দূর হইয়া যাইতে বলিয়াছিলেন, কিন্তু বিশু তাহাতে কর্ণপাত করে নাই ; যেন কিছুই হয় নাই, এমনই ভাব দেখাইয়া নিজের কাজে লাগিয়া গিয়াছে । মনােজকে দেখিয়া বিশু – নাচাইয়া প্রশ্ন করিল, কেমন আছেন? চলছে কেমন ? মনােজ কথার জবাব না দিয়া কহিল, ফিরে এলেন যে? বিশু কড়া চোখে চাহিয়া কহিল, ফিরে এলেন যে ! বললুম তখন মামাকে বলে বিয়ে দিয়ে দিতে। বিয়ে হলে কি মাগী পালাতে পারত? ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে আসতুম।-বলিয়া টানিয়া-আনা-সূচক হস্তভঙ্গী করিল। তারপর কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকাইয়া থাকিয়া প্রবল নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, মেয়েমানুষকে বিশ্বাস করবেন না, বুঝলেন, খবরদার বিশ্বাস করবেন না। মােজ চুপ করিয়া রহিল। বিশু ধমকাইয়া কহিল, কথাটা ভাল লাগছে না বুঝি ? নাসিকা উচাইয়া কহিল, ভাল লাগবে কেন? ভাল কথা কারও ভাল লাগে না আজকাল। দুটো পয়সাতে পারেন ? মনােজ কহিল, পয়সা কি করবেন ? বিশু দুই জ কুঁচকাইয়া কহিল, দুটো পয়সার জন্যে কৈফিয়ৎ ! মনােজ পয়সা দিতেই তাহা টাকে গুজিয়া কহিল, গাঁজা কিনব, গাঁজ খেতে ধরেছি, নেশাতে বুদ হয়ে থাকি দিনরাত, না হলে যে হতভাগীকে ভুলতে পারি না।

সুধার প্রেম
মনােজের পরীক্ষা হইয়া গেল। বাড়ি যাইবার দিন সন্ধ্যায় সুধার
সহিত দেখা করিতে গেল। সুধা তাহার ঘরে ছিল না। মনােজ ছাদে
গিয়া দেখিল, সুধা মুখটি চুন করিয়া জলের ট্যাঙ্কটার পাশে বসিয়া আছে।
মনােজকে দেখিয়া কহিল, এসেছ ! এখানে এস, ব’স বলিয়া একটু
সরিয়া বসিয়া পাশের জায়গাটি আঁচল দিয়া পরিষ্কার করিয়া দিল।
মনােজ কহিল, ও কি হচ্ছে ! কাপড়টা ময়লা করছ কেন?
সুধা কহিল, তা হােক, ব’স। মনােজ বসিতেই সুধা তাহার একটি
হাত নিজের কোলে তুলিয়া লইয়া শুষ্ক স্বরে কহিল, আজই যাবে ?
মনােজ কহিল, হ্যা।
কটায় ট্রেন ?
রাত নটায় ।
তা হলে তাে এখনই চলে যেতে হবে। একটু আগে এলে না কেন?
আমি কতক্ষণ থেকে পথ চেয়ে বসে আছি ।—বলিতে বলিতে গলা
ধরিয়া আসিল।
মনােজ সুধার মুখটি নিজের বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া কহিল,
আরে! কাদছ নাকি? পাগল । একটা জিনিস কিনতে দেরি হয়ে
গেল।
সুধা মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল, কি জিনিস ?
মনােজ বেকার হাতটি দিয়া পকেট হইতে একটি ছােট রঙিন বাক্স
বাহির করিয়া কহিল, কি বল দেখি?
সুধা নিজেকে ছাড়াইয়া লইয়া কহিল, বলছি, আগে দেখি।
মনােজ হাসিয়া কহিল, বারে ! দেখে তো সবাই বলতে পারে,
তুমি আন্দাজ কর তাে দেখি।
খপ করিয়া মননজের হাত হইতে বাক্সটি কাড়িয়া লইয়া খুলিতেই

সুধার প্রেম সুধার মুখ আনন্দে জলজল করিয়া উঠিল । বাক্সটির মধ্যে কালাে ভেলভেটের উপর একটি চমৎকার সােনার আংটি। সুধা কহিল, আমার জন্যে বুঝি ? মনােজ ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, হাঁ। সুধা গম্ভীর হইয়া কহিল, আমাকে পরিয়ে দাও। রাঘববাবুকে প্রণাম করিয়া মনােজ বিদায় লইল। রাঘববাবু কহিলেন, বেশি দিন ভুলে থেকো না বাবা। তােমাকে একদিন না দেখলে মন কেমন করে। যাইবার আগে সুধা কহিল, তােমার একটা প্রণাম পাওনা আছে। বলিয়া মনােজকে প্রণাম করিয়া সুধা কহিল, আমাকে আশীর্বাদ করলে ? মনােজ কহিল, করলাম বইকি। সুধা প্রশ্ন করিল, কি আশীৰ্বাদ করলে ? মনােজ কহিল, করলাম, চমৎকার বর হােক, আমার চেয়ে সুন্দর। সুধা অম্লান চোখ দুইটি মনােজের দিকে স্থিরভাবে রাখিয়া কহিল, তাই করলে বুঝি? তারপর মননজের বুকে মাথা রাখিয়া কহিল, আরও সুন্দর আমি চাই না, আমার এই ভাল। বাহিরের দরজা পর্যন্ত সঙ্গে আসিয়া সুধা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কহিল, বেশি দেরি করল না, যত শিগগির পার ফিরে এস, বুঝলে? মনােজ ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, সে ফিরিবে । বেলা এগারােটার সময়ে মনােজ গন্তব্য স্টেশনে গাড়ি হইতে নামিল। স্টেশনটি ছোট, কিন্তু স্টেশনের মাস্টারটি বৃহৎ। একটা মােটা ও লম্বা সুধার প্রেম পাশ-বালিশের অপােদেশে এক জোড়া পা ও শীর্ষদেশে একটি তিন নম্বরের ফুটবল জুড়িয়া দিলে যেমনটি দেখিতে হয়, মাস্টার মহাশয়ের চেহারাটি অনেকটা সেই রকম। গায়ে কোম্পানির দেওয়া সাদা জিনের গলাবন্ধ কোট, তাহাতে কোম্পানির নাম-লেখা পিতলের বােতাম। পরিধানে ধুতি, কেঁাচাটি দুই ভাজ হইয়া কোমরে গোজা। পায়ে চটি, মাথায় কালাে টুপি, টুপির সামনে মাস্টার মহাশয়ের পদমর্যাদা পালিশ-করা পিতলের অক্ষরে লেখা রহিয়াছে। মাস্টার মহাশয় দরকারী কাগজপত্র লইয়া গার্ডের কামরার দিকে যতদূর সম্ভব দ্রুতবেগে ছুটিতেছিলেন, হঠাৎ মধ্যম শ্রেণীর কামুরা হইতে মনােজকে নামিতে দেখিয়া এক গাল হাসিয়া কহিলেন, এসে গেছেন? দাড়ান, আসছি।-বলিয়া আবার ছুটিলেন । মােজ দাঁড়াইয়া রহিল। গাড়ি চলিয়া গেল। স্টেশন-মাস্টার হেলিতে লিতে আসিয়া কহিলেন, আসুন। আপনি তাে নতুন জমিদার বাবুদের বাড়িতে যাবেন ? মনােজ কহিল, হঁ্যা। আপিসে বসাইয়া স্টেশনমাস্টার কহিলেন, ম্যানেজারবাবু কাল বকেলে এসেছিলেন। সকালে কি কাজ আছে, নিজে আসতে পারবেন না। তবে সব ব্যবস্থা করে গেছেন। গরুর গাড়ি প্রস্তুত, ইচ্ছে করলে তাতেও যেতে পারেন, না হলে হেঁটেও যেতে পারেন। এখান থেকে মাত্র তিন মাইল রাস্তা, রাস্তাও ভাল। ম্যানেজারবাবু বুঝি আপনার আত্মীয় ? মনােজ কহিল, হ্যা, আমার নিজের মামা। মাস্টার মহাশয় ঘাড় কাত করিয়া কহিলেন, নিজের মামা ! তারপর ঘাড়টি আবার সােজা করিয়া বলিতে লাগিলেন, ম্যানেজারবাবু চমৎকার লােক। আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে আমার সঙ্গে, খুব ভাব, পূজোর ৬৪ সুধার প্রেম সময় দু দিন যাত্রা হ’ল, দু দিনই আমাদের নেমন্তন্ন করলেন, ঠিক আসরের মাঝখানে বসিয়ে দিলেন, সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল, ভাবলে, বুঝি জমিদারের নিজের লােক, এমন কি ভীম স্বয়ং এসে বিড়ি চেয়ে খেল মশায় ! সত্যি, চমৎকার লােক, তা সিগারেট-টিগারেট খান নাকি? মনােজ মৃদু হাসিয়া একটি সিগারেট প্যাকেট হইতে বাহির করিয়া দিল। মাস্টার সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে কহিল, ভাল লাগে খেতে, কিন্তু কিছু পাওয়া যায় না এখানে, অজ পাড়াগ। কিনা, বিড়িই খেতে হয়, তা ছাড়া দামও বেশি। এক টানে প্রায় অর্ধেকটা শেষ করিয়া ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, ভয় নেই, ওখানে আজকাল পাওয়া যাচ্ছে, ম্যানেজারবাবু ব্যবস্থা করেছেন। গরুর গাড়িতে বা বিছানা চাপাইয়া দিয়া মনােজ তাহার সঙ্গে সঙ্গে হাটিয়া চলিল । গাড়ােয়ান তাহাকে গাড়িতে চাপিবার জন্য বিস্তর অনুনয়-বিনয় করিয়াছিল, বলিয়াছিল, হটিয়ে নিয়ে গেলে গােমস্তাবাবু আমাকে জান-বাছা’ গাড়বেন হুজুর। মনােজ তাহাকে “কিছু ভয় নাই বলিয়া বার বার অভয় দিবার পর সে গাড়ি জুতিয়াছিল । আধ-পাকা রাস্তা। দুই পাশে বিস্তৃত তৃণহীন কঙ্কময় প্রান্তর, মাঝে মাঝে কুল ও বাবলার ঝােপ, দূর দিগন্তে অস্পষ্ট তরুশ্রেণীর মাথার উপর কলিয়ারির চিমনি হইতে ধূমরেখা সাপের মত কুণ্ডলী পাকাইয়া পাকাইয়া উদ্ধে উঠিতেছে। পশ্চিম দিক প্রান্তে একটি সুদূরবর্তী পাহাড় বিশাল নীল মেঘের মত স্থির হইয়া আছে। মনােজ চিন্তাকুল মুখে সুধার কথা ভাবিতেছিল। প্রায় এক মাস হইল, দেখি নাই। যাইবার জন্য কত মিনতি করিয়া চিঠি লিখিয়াছে। লিখিয়াছে, ভয় করিতেছে। কি হইয়াছে, কে জানে। চিঠিটা বােধ সুধার প্রেম হয় পাইয়াছে। সান্ত্বনা তত দিয়াছি, কিন্তু বাবা-মায়ের মত কোন দিন হইবে বলিয়া মনে হয় না। হউক, সকলের অমতেই বিবাহ করিব। ভাল করিয়া পাস করিতে পারিলে, আর কিছু না হউক, একটা প্রফেসারি জুটিবে, কলিকাতায় একটি ছােট বাড়ি লইয়া সুধাকে লইয়া সংসার পাতিব। যদি কোন দিন বড় হইতে পারি, অনেক টাকা রােজগার করিতে পারি, মা-বাবার ভালবাসা ফিরিয়া পাইতে দেরি হইবে না। একটি ছােট গ্রামের মধ্য দিয়া যাইতে হইল। একটি গ্রাম্য বধূ কলস-কক্ষে পুকুর হইতে জল লইয়া ফিরিতেছিল। মনােজকে দেখিয়া ঘােমটা টানিল। কিন্তু ঘােমটার ফাক দিয়া মনােজ তাহার সুন্দর মুখখানি দেখিতে পাইল, ঠিক সুধার মত মুখের চেহারা। পৃথিবীতে সব মেয়ের চেহারাই এক নাকি ! সুধার সহিত পরিচয় হইবার পর মনােজ যেখানে যত মেয়ে দেখিয়াছে, সকলের মুখেই সুধার মুখের আদল দেখিতে পাইয়াছে। গ্রামটি পার হইতেই রেলপথটি পাশে পড়িল। রেলপথের ধারে উলঙ্গ রাখাল-ছেলের গরু চরাইতেছিল। কিছু দূর যাইয়া রেলরাস্তাটি পার হইতে হইল। গেট বন্ধ ছিল। জমিদারের নাম শুনিতেই গেট খুলিয়া গেল। তারপর কিছু দূর গিয়াই একটা বড় আম-বাগান, তার পরেই একটা প্রকাণ্ড দীঘি, তাহা পার হইলেই নূতন জমিদারের নব- নিম্মিত ত্রিতল অট্টালিকা চোখে পড়িল। কাছারিবাড়ির সামনে আসিয়া গরুর গাড়ি থামিতেই শৈলজা-মামা প্রকাণ্ড গােল-আলুর মত মুখে এক গাল হাসিয়া চটিজুতা ফটফট করিতে করিতে আসিয়া হাজির হইল, কহিল, এসেছিস? হেঁটে এলি যে? মনােজ শৈলজাকে প্রণাম করিয়া কহিল, আপনার গাড়ােয়ানের দোষ নেই, ও বেচারা টানাটানির ত্রুটি করে নি।

সুধার প্রেম শৈলজা গাড়ােয়ানটাকে বাক্স বিছানা যথাস্থানে পৌছাইয়া দিতে আদেশ দিয়া মনােজকে বলিল, আয়। কাছারি-বাড়িটি দোতলা। অনেক দিনের পুরাতন বাড়ি। পূর্বে জমিদারের এই টিই বাসগৃহ ছিল। এখন একতলায় কাছারি ও দোতলায় ম্যানেজারের বাসা হইয়াছে। নৃতন জমিদার নিজের মনের মত নৃতন বাড়ি তৈয়ারি করিয়াছেন। বিকালবেলায় শৈলজা কহিল, জমিদার-গিন্নীর সঙ্গে দেখা করে আসবি চল, অনেক করে বলেছেন। মনােজ কহিল, কি দরকার? বারে ! তা কি হয় ! তুই না হয় চাকরি করিস না, তবু তার বাড়িতে এসেছিস, ভদ্রতার খাতিরেও দেখা করা উচিত। তা ছাড়া খুব স্নেহ করেন আমাকে, নিজের লােকের মত। জমিদারবাড়িতে ঢুকিতেই ম্যানেজারবাবুকে দেখিয়া ঝি-চাকর সকলেই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। একজন চাকর সসম্মানে তাহাদিগকে দোতলার একটা ঘরে লইয়া গিয়া বসাইল। মনােজ লক্ষ্য করিল, তাহাকে দেখিয়া সকলেরই, বিশেষ করিয়া ঝিগুলার মধ্যে, কিসের ইঙ্গিত চোখে চোখে চলাচল করিতেছে। কিছুক্ষণ পরে জমিদার-গৃহিণী সুরবালা কক্ষে প্রবেশ করিলেন। শৈলজা উঠিয়া দাড়াইল এবং হাতে ধরিয়া টানিয়া মনােজকে দাড় করাইয়া দিল। ফিসফিস করিয়া কহিল, প্রণাম করবি, ঠিক আমার মত করে। সুরবালা কাছে আসিতেই শৈলজা ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল এবং উঠিয়া দাড়াইয়া মনােজকে কহিল, প্রণাম কর বাবা। ইনিই আমাদের- বলিয়া মনােজকে ঘাড়ে ধরিয়া প্রণাম করাইল ।

সুধার প্রেম
৬৭
সুরবালা মননজের মাথায় হাত দিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া কহিলেন,
এইটিই ঘনশ্যামবাবুর ছেলে ?
হাত কচলাইতে কচলাইতে শৈলজা কহিল, আজ্ঞে হ্যা, এর কথাই
বলেছিলাম আপনাকে। এম. এ. পরীক্ষা দিয়ে বেড়াতে এসেছে।
মনােজকে ভাল করিয়া নিরীক্ষণ করিয়া সুরবাল কহিলেন, বেশ
করেছ বাবা। ভারি সুখী হলাম তােমাকে দেখে। তােমার কথা
তােমার মামাবাবুর কাছে অনেক দিন থেকে শুনেছি। পরীক্ষা বেশ
হয়েছে তাে?
মনােজ ঘাড় নাড়িয়া কহিল, আজ্ঞে হ্যা।
সুরবালা কহিলেন, এবারেও জলপানি, সােনার মেডেল পাবে তো?
মনােজ মুখ লাল করিয়া কহিল, ঠিক বলতে পারি না।
সুরবালা কহিলেন, ঠিক পাবে তুমি, আমি আশীর্বাদ করছি।
তা ছাড়া বরাবর তাে পেয়েছ। তােমার মামাবাবু বলছিলেন, মেডেলের
নাকি মালা হয়ে গেছে!
মনােজ শৈলজার দিকে কটাক্ষ হানিল, শৈলজা নির্বিকারভাবে
দাড়াইয়া রহিল।
শৈলজাকে উদ্দেশ করিয়া সুরবালা কহিলেন, তােমরা একটু বস,
আমি আসছি।
শৈলজা কহিল, থাক থাক, এখন আর কেন ?
সুরবালা বাধা দিয়া কহিলেন, তা কি হয় ! আজ প্রথম দিন ছেলে
মায়ের বাড়িতে পা দিয়েছে, একটু মিষ্টিমুখ করবে না?—বলিয়া দ্রুতপদে
প্রস্থান করিলেন ।
রাত্রে মনােজ শৈলজাকে কহিল, বাবা বলছিলেন, জমিদারির কি
সব কাজ আমাকে করতে হবে। কালই একটা কাজের ফিরিস্তি দেবেন।

৩৮ সুধার প্রেম যত শিগগির পারি কাজ সেরে আমাকে কলকাতা ফিরতে হবে, বিশেষ শৈলজা মনে মনে হাসিয়া কহিল, বিশেষ কাজটা কি ? মানে কলেজ-সংক্রান্ত কাজ। দু-চারজন প্রফেসারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। তা ছাড়া আবার ল পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। ও, বুঝেছি। তা বাবাজী, কাজ তাে জঞ্জালের মত জমা হয়ে নেই যে, এক মিনিটেই ঝাঁট দিয়ে সাফ করে দেবে। দিনের পর দিন কাজ আসবে। কাজেই, এত শিগগির তােমার যাওয়া হয়ে উঠবে বলে মনে হয় না। মনােজ বিরক্ত মুখে কহিল, দিনের পর দিন যদি কাজ আসে, আর তাই যদি আমাকে সারতে হয়, তা হলে তাে এখানে সারাজীবন থেকে যেতে হবে। শৈলজা মৃদু হাসিয়া কহিল, সারাজীবন না হােক, মাস দুই তাে বটেই। মনােজ ধারালাে কণ্ঠে কহিল, দু মাস আমি থাকতে পারব না মামা, আপনি বরং বাবাকে আসতে লিখুন। পাগল ! তার এই শরীরে কি আসতে বলা যায় ? মনােজ বিরস মুখে বসিয়া রহিল। শৈলজা বলিতে লাগিল, পাড়া- গায়ে তাে কখনও থাকিস নি, তাই মনটা ও রকম ছটফট করছে। দিন কয়েক থাকলেই মন বসে যাবে। তখন আবার এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করবে না। আমাকেই দেখ, না, তাের মামীকে ছেড়ে এক পা নড়তে পারতাম না, কিন্তু আজ দু মাস দিব্যি টিকে রয়েছি। মনােজ নীরব রহিল। শৈলজা একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিতে লাগিল, জমিদারির কাজ এখন হয়তাে তাের ভাল লাগবে না। মনটা সুধার প্রেম কর, একটু বসুক, তারপর করবি। এখন আমার একটি কাজ করে দে দেখি। মনােজ উৎসুক কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, কি কাজ ? কাজ এমন কিছু শক্ত না, তবে আমি সময় করে উঠতে পারছি না বলে বেশ সুবিধে হচ্ছে না। মানে, জমিদারের মেয়েটিকে বােজ সকালে পড়াতে হয়, বেশিক্ষণ নয়, মাত্র ঘণ্টাখানেক, তা তুই বরং সম্প্রতি এই কাজটাই আমি অন্যগুলাে দেখি। মনােজ প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, না মামা। মেয়েমানুষ পড়ানাে আমার কর্ম নয়। শৈলজা দুই চোখ ডাগর করিয়া কহিল, আরে! মেয়েমানুষ আবার কি! নেহাত বাচ্চা মেয়ে । মনােজ কহিল, তা হােক, জমিদারির কাজই আমার ভাল, আপনি নিজে ওসব করুনগে। শৈলজা মুরুব্বিয়ানার সহিত মৃদু হাসিয়া কহিল, পাগল আর কাকে বলে ! এম. এ. পাস করে একটা দুধের মেয়েকে দু পাতা ইংরিজী পড়াতে পারবি না? বেশ, একদিন গিয়ে দেখ, তাে, যদি ভাল না লাগে, তখন ছেড়ে দিবি। তার পরদিন সকালে শৈলজা নিজে মনোেজকে সঙ্গে করিয়া জমিদার বাড়ি লইয়া গেল এবং পড়িবার ঘরে তাহাকে বসাইয়া কহিল, ব’স, মা লক্ষ্মীকে পাঠিয়ে দিতে বলিগে।-বলিয়া অন্দরের মধ্যে চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ পরে সুরবালা সকন্যা প্রবেশ করিলেন। কিন্তু দুধের মেয়ে তাে নয় বয়স পনযাের চেয়ে বেশি, ফরসা রঙ, বাড়ন্ত গড়ন; মুখের গঠন সুশ্রী, কিন্তু ভাব সুধার মত কোমল নয়। ধনীতনয়াসুলভ অহঙ্কারের প্রলেপ সারা মুখে পুরু হইয়া বসিয়া মুখের স্বান্তাবিক পেলবতাকে ৭০ সুধার প্রেম যেন ঢাকিয়া রাখিয়াছে। চোখ দুইটি বড় না হইলেও, সুন্দর ; দৃষ্টি চতুর ও চটুল ; সুদূর আকাশে উড়ন্ত চিলের ডানার মত দুইটি ঠোট দুইটি পাতলা ও ঈষং কুঞ্চিত। পরিধানে রঙিন শাড়ি, সর্বাঙ্গে সােনার গহনা। এই বেশে পাঠকক্ষে প্রবেশ না করিয়া বিবাহ- সভায় প্রবেশ করা চলিত। মেয়েটি ঘরে ঢুকিয়া মনােজের দিকে চট করিয়া এক চোখ চাহিয়া লইয়া মাথা নীচু করিল ; মুখে চাপা হাসি, বােধ করি, ক্ষণেকের জন্য ফুটিয়া উঠিল। তারপর ধীরে ধীরে পা ফেলিয়া সুরবালার পিছু পিছু আসিতে লাগিল। মনােজ লক্ষ্য করিল, একজন ঝি দরজার ফাক দিয়া মুখ বাড়াইয়া, মুখ টিপিয়া হাসিয়া আবার সরিয়া গেল। মেয়েকে চেয়ারে বসাইয়া সুরবালা কহিলেন, এইটি, বাবা, আমার মেয়ে, একমাত্র মেয়ে, আর আমার কেউ নেই। লেখাপড়া বেশি কিছু শেখে নি। শৈলজাবাৰু পড়াচ্ছিলেন। উনি তো আবার সব দিন সময় পান না। তা বাবা, তােমার হাতেই দিচ্ছি, একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নাও। মনােজ শুষ্ক স্বরে জবাব দিল, আমি আর কদিন পড়াতে পারব? বেশি দিন তাে থাকব না এখানে। সুরবালা কহিলেন, যে কদিন পার বাবা। তােমার মত পণ্ডিতের কাছে দুদিন পড়লেই মেয়ে আমার অনেক শিখতে পারবে। মেয়েকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, আমি যাচ্ছি, তুই বেশ মন দিয়ে পড়, মা। লজ্জা কিসের? তাের শৈলজা-মামার নিজের ভাগনে, আপনার লােক। সুরবালা প্রস্থান করিলেন, না দরজার কাছে আড়ি পাতিতে লাগিলেন, বুঝা গেল না। কিন্তু মেয়েটি মুখ গোঁজ করিয়া কঠিনভাবে বসিয়া রহিল। মনােজ টেবিল হইতে একটি বই টানিয়া লইল, ইংরেজী ফাস্ট বুক, বইয়ের

সুধার প্রেম
৭১
প্রথম পাতায় নাম লেখা রহিয়াছে। -মাধুরী। মনােজ মনে মনে কহিল,
নাম আবার মাধুরী! চেহারা তাে মােটেই মধুর বলিয়া মনে হইতেছে
না; বরং টক। নাম ‘মাধুরী’ না হইয়া ‘তিন্তিড়ী’ হওয়া উচিত ছিল।
বইটির দুই-চার পাতা খুলিয়া মনােজ জিজ্ঞাসা করিল, কত দূর পডেছ ?
মেয়েটি একবার তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া চোখ নামাইয়া ধীরে
ধীরে কহিল, ভেড়ার পাতা পর্যন্ত ।
মনােজ ছাত্রীর কঠিন ভাবটিকে কিঞ্চিৎ কোমল করিবার জন্য প্রশ্ন
করিল, ভেড়া দেখেছ ?
মাধুরী চকিতে একবার চাহিয়া ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, হু।
ভেড়ার কতগুলাে শিঙ আছে, বল দেখি?
মাধুরী কহিল, আমাদের দেশে ভেড়ার দুটোর বেশি শিঙ থাকে না।
আপনাদের দেশে বুঝি আরও বেশি থাকে ?
ছাত্রী আশাতিরিক্ত কোমল হইয়া উঠিতেছে দেখিয়া মমােজ গম্ভীর
হইয়া কহিল, না। আচ্ছা, ভেড়ার কি ইংরিজী, বল দেখি?
ঠোঁট উল্টাইয়া মাধুরী জবাব দিল, জানি না।
ভেড়ার ইংরিজী-Ram ; বল—The ram মানে ভেড়াটি।
মাধুরী কহিল, আপনি বলে যান, আমি পড়ে বলব 'খন।
বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া মনােজ সাফ জবাব দিল, আমার এ পােয়বে
না। বাবা! কি দেমাকী মেয়ে ! অহঙ্কারে যেন ফেটে পড়ছে !
কিছুতেই আর বলাতে পারলাম না।
শৈলজা কহিল, দূর ! তুই চিনতে পারিস নি। ভারি ভাল মেয়ে।
প্রথম দিন কিনা, তাই লজ্জা করেছে।
এর পর দেখবি।
আর আমার দেখে কাজ নেই মামা। আপনার ছাত্রী আপনাকেই

৭২
সুধার প্রেম
৩
বাবাজী, তা বললে হবে না। অন্তত গরিব মামার ওপর দয়া
করেও কাজটি তােকে করতে হবে ।
মনােজ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, এখানে পােস্ট-আফিস
নেই ?
শৈলজা সন্দিগ্ধ স্বরে কহিল, কেন বল দেখি? জামাইবাবুকে চিঠি
দিবি নাকি ?
মনােজ ঢােক গিলিয়া কহিল, হ্যা।
শৈলজা জবাব দিল, পােস্ট-আফিস তাে আমাদের এখানে নেই।
আছে বলরামপুরে, এখান থেকে মাইল তিন দূর। যে জমিদারের সঙ্গে
আমাদের মামলা চলছিল, তাদের বাড়ি সেই গায়ে। আমাদের এখানে
পােস্ট-আফিস করবার চেষ্টা করছি আমরা।
একবার যেতে হবে আজ বিকেলে ।
শৈলজা হাত নাড়িয়া কহিল, না না, ওখানে যাস নি। যদি জানতে
পারে, হয়তাে অপমান করে দেবে। বলা তাে যায় না। তা তাের
চিঠি লেখার থাকে তাে লিখে রাখ। আমাদের লােক বােজ যায়।
ফেলে দিয়ে আসবে এখন।
আর যদি কোন চিঠি আসে ?
তাও এনে দেবে।
পরের দিন পড়াইতে গিয়া মনােজ দেখিল, মাধুরী পড়াশুনা কিছুই
তৈয়ারি করে নাই। জিজ্ঞাসা করিতে বলিল, সময় ছিল না।
মনােজ বিস্ময়ের সহিত প্রশ্ন করিল, সময় ছিল না ? কি এমন কাজ
করছিলে ?

সুধার প্রেম
৭৩
মাধুরী তাচ্ছিল্যের সহিত কহিল, কাজ আবার কি? এমনিই।
বলিয়া ঠোট কুঁচকাইল ।
মনােজ কঠিন কণ্ঠে কহিল, এমনিই যদি সময় না পাও তো
পড়াশুনা ছেড়ে দিলেই পার ।
মাধুরী জবাব দিল না। মনােজ কহিল, তােমার সময়ের দাম না
থাকতে পারে, আমার আছে। কাল থেকে আমি আসতে পারব না,
তােমার মাকে বলে।
সুরবালা কক্ষে প্রবেশ করিলেন। কহিলেন, কাল আমাদের এক
বড় প্রজার বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল। সারাদিন সেখানে কাটাতে হল।
মেয়ে আমার কাল কিছু পড়তে পারে নি। আসতে চাইছিল না, তুমি
বকবে বলে। আজকের মত কিছু একে বলাে না বাবা।
সুরবালা চলিয়া গেলে মনােজ কহিল, আমাকে বললেই পারতে।
মিথ্যে রাগ ধরিয়ে দিলে ।
মাধুরী ম্লান মুখে জবাব দিল, আপনি এত রাগবেন, জানব কি করে?
সেদিন পড়াশুনায় বিশেষ গােলযােগ হইল না। দিন কয়েক পরে
মাধুরী একটা শক্ত শব্দ কিছুতেই স্পষ্ট উচ্চারণ করিতে পারিতেছিল না।
মনােজ বিরক্ত হইয়া কহিল, এত পান খাও কেন ? দাতে জিবে এক
ইঞ্চি পুরু পানের ছােপ, উচ্চারণ হবে কি করে?
নীরস স্বরে মাধুরী কহিল, উচ্চারণ হয়ে কাজ নেই। পান ছাড়তে
আমি পারব না।
বইটি সরাইয়া দিয়া মনােজ কহিল, বেশ, তা হলে পড়াশুনা বন্ধ থাক।
মাধুরী কহিল, বেশ তােবলিয়া তড়াক করিয়া লাফাইয়া উঠিয়া
গটগট করিয়া বাহির হইয়া গেল। মনােজ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া
চলিয়া আসিল।

৭৪
সুধার প্রেম
বুদ্ধি ।
মাধুরীকে পড়াইবার সময়ে মনােজের সুধার কথা মনে পড়ে। কত
কত মনোেযােগ ! কত শ্রদ্ধা! পড়াইয়া সাধ মিটিত না।
মাধুরীকে কিছুক্ষণ পড়াইতে না পড়াইতেই মন ক্লান্ত হইয়া আসে।
সেই দিন বিকালে শৈলজা দেখা করিতে গেলে সুরবালা কহিলেন,
ছেলেটির মেজাজ ভাল নয়।
শৈলজা প্রবল প্রতিবাদ করিয়া কহিল, কে বললে আপনাকে ?
চমৎকার মেজাজ। ভারি আমুদে। তবে বাড়ি থেকে কদিন মাত্র
এসেছে কিনা। তা ছাড়া জামাইবাবুর অসুখ দেখে এসেছে, তাই মনটা
একটু খি চড়ে আছে। তার ওপর পরীক্ষার খবর এখনও পায় নি,
বাবাজীর তত শুধু ফাস্ট হলেই চলবে না, একশাের মধ্যে একশােই
পাওয়া চাই। কিছু ভাববেন না আপনি।
সুরবালা কহিলেন, মেয়ে নাকি পান খায় বলে ধমকেছে।
শৈলজা যেন আকাশ হইতে পড়িল ; কহিল, ধমকেছে ! ধমকাবার
ছেলে তো ও নয়। মা লক্ষ্মী বােধ হয় বুঝতে পারে নি।
সুরবালা কহিলেন, মা লক্ষ্মী তােমার ঠিক বুঝেছে। আজ সারাদিন
একটি পান মুখে দেয় নি ।
শৈলজা এক গাল হাসিয়া কহিল, তা হলে তাে বাবাজীকে মা
লক্ষ্মীর
সুরবালা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, হয়তাে ভাল লেগেছে। কিন্তু
তােমার বাবাজীটির ভাল লাগবে কি করে? ও রকম শুধু পড়ালে হবে
। দুজনে একসঙ্গে বেড়াবার ব্যবস্থা কর, তুমি বরং নিজে সঙ্গে যেয়াে।
শৈলজা ঘাড় নাড়িয়া কহিল, বেশ, তাই হবে।
তার পরদিন মনােজকে টানা-হেঁচড়া করিয়া পাঠাইতে হইল। কিন্তু
সেদিন মননজের মন্দ লাগিল না। মাধুরীর দাতগুলি মুক্তার মত ঝকঝক

সুধার প্রেম করিতেছে, এবং যে শব্দটি কাল এত চেষ্টা করিয়াও সে উচ্চারণ করিতে পারে নাই, আজ সেটি সে নিজের চেষ্টাতেই ভাল করিয়া উচ্চারণ করিতে পারিল। মনােজ জিজ্ঞাসা করিল, আজ পান খাও নি ? মাধুরী গম্ভীর মুখে জবাব দিল, , পান ছেড়ে দিয়েছি। মমােজ কহিল, একেবারে ছাড়তে তাে বলি নি, বেশি খেয়াে না। জবাব না দিয়া মাধুরী শুধু ঠোট ফুলাইল। বিকালবেলায় শৈলজা মনােজকে কহিল, চ, বেড়িয়ে আসি। জমিদারবাড়ির পাশ দিয়া যে কঁাচা রাস্তাটি গ্রাম পার হইয়া বরাবর ক্ষুদে নদীর ঘাট পর্যন্ত গিয়াছে, শৈলজা ও মনােজ সেই রাস্তা দিয়া চলিল। জমিদারবাড়ির কাছে আসিয়া শৈলজা কহিল, তুই একটু দাড়া, আমি এখনই আসছি। এবং মনােজকে প্রতিবাদের অবসর না দিয়া দ্রুতপদে জমিদারবাড়ির দিকে প্রস্থান করিল। কিছুক্ষণ পরে শৈলজা ফিরিয়া আসিল, কিন্তু একা নহে, সঙ্গে মাধুরী। মাধুরী ছাই রঙের বুটিদার ঢাকাই শাড়ি পরিয়াছে, গায়ে গাঢ় নীল রঙের সাটিনের ব্লাউজ। ঝকঝকে পালিশ করা নৃতন সেটের গহনা সর্বাঙ্গে ঝলমল করিতেছে। পায়ে আনকোরা নৃতন হিল-তােল জুতা পরিয়া মাধুরী শৈলজার পাছু পাছু খোড়াইয়া খোড়াইয়া আসিতেছে। মনােজ মনে মনে কহিল, সারাদেহে তত সােনায় মুড়িয়া মাছি বসিবার পর্যন্ত জায়গা রাখে নাই, শুধু পা দুইটি বাকি কেন? গাছি করিয়া মল ও পাইজর পরিলেই পারিত, হিল-তােলা জুতার সঙ্গে মানাইত ভাল ! কিন্তু শৈলজা-মামার মতলবটা কি? এই জীবটিকে টানিয়া আনা হইল কেন? পায়ে ফোস্কা পড়িয়া যদি চলিতে না পারে তাে কোলে তুলিবে কে? মামা নিজে, না সে? মনােজ কৃটাক্ষে মাধুরীর দিকে তাকাইয়া দেখিল, অস্তগামী সূৰ্য্যের লাল আলাে কয়েক- ৭৬ সুধার প্রেম পড়িয়া তাহার মুখ টকটকে রাঙা হইয়া উঠিয়াছে ; কানের দুল দুইটি যেন আগুনের তৈয়ারি। ব্লাউজের অবকাশে বুক ও হাতের যতটুকু দেখা যাইতেছে, পালিশ করা শ্বেত পাথরের মত চকচক করিতেছে। মাধুরীর মাধুৰ্য্য না থাক, সৌন্দর্য আছে, বােধ হয় সুধার চেয়েও বেশি বার বার তাকাইয়া দেখিতে ইচ্ছা করে। ক্ষুদে নদীটি সত্যই ক্ষুদ্রকায়। পৃথিবীতে অন্তত ইহার নামের সহিত চেহারার কিছুমাত্র গরমিল নাই। বৎসরের অধিকাংশ সময়েই জল থাকে না, শুধু বর্ষাকালে মাঝে মাঝে ঢল নামে; গেরুয়া রঙের জল দুই তীর উপচাইয়া অনেক দূর পর্যন্ত আগাইয়া যায়। এখনও বেশি জল ছিল না, শুধু একটি ক্ষীণ প্রবাহ এক পাশ ঘেঁষিয়া বহিতেছিল। নদীর বুকে বড় বড় পাথরের চামড়া এখানে ওখানে পড়িয়া আছে। শৈলজা এতটা রাস্তা হাঁটিয়া আসিয়া হাপাইতেছিল। একটা পাথরের উপর বসিয়া পড়িয়া মাধুরীকে কহিল, এইখানে ব’স মা। মনােজকে কহিল, তুই ওইখানটায় ব’স। মনােজ না বসিয়া একটা পাথরের উপর উঠিয়া দাড়াইয়া ওপারের দিকে তাকাইয়া রহিল। ওপারে খাড়া উচু পাড় বর্ষার সময়ে স্রোতের তাড়নায় ভাঙিয়া- চুরিয়া গিয়াছে। পায়ে-চলা সরু পথ নদীর বুক হইতে পাড় বাহিয়া উঠিয়া, ওপারে অনেক দূর গিয়া বােধ হয় ওই দূরের গ্রামটিতে পৌঁছিয়াছে। নদীর ধার হইতে একটু দূরে পথের পাশেই একটা উচু ঢিপি ; তাহার উপর একটা কাঠের অথবা পাথরের ক্রস পোঁতা রহিয়াছে। সেই দিকে হাত বাড়াইয়া মনােজ কহিল, ওটা কি মামা?

সুধার প্রেম
শৈলজা
ওটা এক সা
মনােজ।
শৈলজা
এখানে এক
বনের আমদা।
বড় আর ছােট
বড় বড় বন্দুক
ততা ; দেখবামার স
দাত বের করে হে
দিলে।
শেষে একজন
ঝােপের মধ্যে বাঘটা ।
বন্দুক বাগিয়ে চললেন এগি
অমনই জুতাের শব্দ পেয়ে
মানুষ, বিশেষ করে সাহেব, দে.
গড়াতে লাগল। তাই দেখে ।
করে কাপতে লাগলেন, আর কোম
ডাকতে লাগলেন। বাঘটা বার দুই
চেটে, এক লাফে বড় সাহেবের ওপর
চো-চো ক'রে ছুটল। তাই দেখে ।
ম্য গড়িয়ে পড়লেন। হৈ-হৈ রৈ রৈ ছু
কবি না, কিন্তু সাহেবের তল্লাস পাওয়া গে
কার, ক্রোশ পাঁচেক
দূরে
একটা জঙ্গলের মধ্যে
অ কতকগুলাে হাড়গােড় খুজে পাওয়া গেল
।

কেঁদেছিল ।
আর বিয়ে
মীর কাছে
বরে দেবার
সি।-বলিয়া
পচুপি কহিল,
রে এতখানি হেঁটে
রয়া কহিল, ওরে!
রী জুতা খুলিয়া ফেলিয়া
য়ে মাধুরীর কষ্ট হইতেছিল।
হাতটা ধর, পড়ে যাবে যে।
হল, কি করে ধরি? হাতে কি
নােজের মুখের দিকে তাকাইল।
ফরাইল, এবং অন্যমনস্ক হওয়ার জন্য
মনােজ তাড়াতাড়ি কাছে সরিয়া
মা কহিল, পড়ে যাবে যে। এত গয়না
{ না, কিন্তু মনােজ বুঝিতে পারিল, সব
লর
ত চলিতে মনােজ কহিল, এই পথ দিয়োকে

সুধার প্রেম
৭৯
মাধুরী ঘাড় নাড়িল ।
ওই গায়ে কখনও গেছ?
মাধুরী ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, গিয়াছে।
মনােজ কহিল, কথা কইতে বুঝি কষ্ট হচ্ছে ?
মাধুরী ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, না।
তবে শুধু ঘাড় নাড়ছ কেন? ওঃ, লজ্জা! এত লজ্জা তত বেড়াতে
| এলেই পারতে।
মাধুরী থমকিয়া দাঁড়াইল। মনােজ কহিল, ও কি! দাড়ালে যে?
মাধুরী কহিল, আমি যাব না, ফিরে যাই।
বিস্ময়ের স্বরে মনােজ কহিল, কেন?
মাধুরী অভিমানের সহিত কহিল, আপনি মানা করছেন যে ।
মনােজ অপ্রতিভ হইয়া কহিল, মানা করলুম কখন ? তুমি কথা
লছিলে না বলে আমি ও কথা বললাম। দুদিনের জন্য হলেও আমার
ত্রিী তুমি, আমার কাছে এত লজ্জা করবার তােমার কোন কারণ নেই।
মাধুরী আবার চলিতে লাগিল।
মনােজ কহিল, ওই গায়ে কি তােমাদের কোন আত্মীয় আছেন?
মাধুরী কহিল, না, আমার সইয়ের বাড়ি ওখানে। সইয়ের বাবা
আমাদের প্রজা।
কবরের উপরটা সিমেন্ট দিয়া বাধানাে। তাহার উপর বেশ মজবুত
চাঠের তৈয়ারি একটি ক্রস, আলকাতরা মাখানাে।
কবরটির দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া মনােজ একটি দীর্ঘনিশ্বাস
ফলিয়া কহিল, কোথায় কার মাটি কেনা থাকে, কেউ বলতে পারে না।
াথায় সাত সমুদ্র পারে ইংলণ্ডের এক ছােট্ট গাঁয়ে হয়তাে জন্মেছিল,
তার মরল এসে বাংলা দেশের এক প্রান্তে এক তেপান্তর মাঠের মধ্যে।

সুধার প্রেম দেখিয়ে বলবে, কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, আমিই ধর না, কোথায় জন্মেছি, আর মরব হয়তাে তােমাদের গায়ে, না মাধুরী ? মাধুরী একবার কটাক্ষে মননজের দিকে চাহিল। মনােজ বলিতে লাগিল, সত্যি, কিছু বলা যায় না। আজ তােমার সঙ্গে বেড়াচ্ছি, কাল হয়তাে সকালে শুনবে, মরে গেছি । আমার তাে আর কবর হবে না, সবাই মিলে ধরাধরি করে এনে নদীর ধারে পুড়িয়ে দেবে। কোন চিহ্নই থাকবে না, শুধু পড়ে থাকবে কতকগুলাে পােড় কাঠ আর কয়লা। তাও একদিন ঢল নেমে সব ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। তুমি হয়তাে কোন দিন বেড়াতে এসে হাত বাড়িয়ে ওইখানটায়- মাধুরী সকোপে কহিল, চুপ করুন, ভাল লাগছে না আমার। মনােজ কহিল, ওঃ, ভাল লাগছে না তােমার ! আচ্ছা, চল তা হলে, ফেরা যাক। সূর্য অস্ত গিয়াছিল, একদল কাক কা-কা শব্দ করিয়া দূরের গ্রামটির দিকে ফিরিতেছিল, দিগন্তে অন্ধকার নামিতে শুরু করিয়াছিল। ফিরিয়া আসিয়া মাধুরী ভিজা পায়ে জুতা না পরিয়া শৈলজাকে কহিল, জুতাে দুটো হাতে করে নিয়ে যাই, পা কেটে গেছে । শৈলজা ব্যস্ত হইয়া কহিল, পা কেটে গেছে। নতুন জুতাে কিনা। ৩, মা, তােমাকে নিয়ে যেতে হবে কেন ? মনােজকে কহিল, তুইই নে বাবা। তারপর মনােজকে ইতস্তত করিতে দেখিয়া কহিল, যেই হােক, লেডি তাে। চোখের সামনে তাকে জুতাে বইয়ে শিভালরির শ্রাদ্ধ করিস নি বাবা। মাধুরী অসঙ্কোচে জুতা দুইটি হাতে তুলিয়া দিতেই মনােজ বিরক্ত মুখে কহিল, অনভ্যাসের ফোটা পরা কেন ? মুশকিল।

সুধার প্রেম ১ সুধার চিঠি মনােজ লক্ষ্য করিলে দেখিতে পাইত, মাধুরী মুচকি মুচকি হাসিতেছে। শৈলজা বাড়ি ফিরিয়া সুরবালার কাছে রিপাের্ট করিল, দুইজনে কবর পর্যন্ত বেড়াইতে গিয়াছিল ; মনােঙ্গ হাত ধরিয়া মাধুরীকে পাড়ে উঠাইয়াছিল এবং ফিরিবার সময় সারা রাস্তা মাধুরীর জুতা বহিয়া আনিয়াছিল। রাত্রে শুইয়া মাধুরীর কথাই মনােজের আগে মনে হইল, তাহার আগুনের মত রাঙা টকটকে মুখ, মাখনের মত কোমল স্পর্শ, বিদ্যুৎ- চমকের মত সকোপ কটাক্ষ। কিন্তু জোর করিয়া তাহা সরাইয়া দিয়া মনােজ সুধার কথা ভাবিতে লাগিল। চিঠি কাল নিশ্চয় আসিবে। সুধা এতক্ষণ কি করিতেছে, কে জানে! হয়তাে তাহার ছােট্ট বিছানাটিতে শুইয়া তাহারই কথা ভাবিতেছে। পরীক্ষার ফল বাহির হইলেই সে সুধাকে বিবাহ করিবে। তাহাতে বাবা-মার মত হউক আর নাই হউক। হৃদয়কে উপবাসী রাখিয়া পিতৃভক্তি দেখাইতে আর যেই পারুক, সে পারিবে না । তাহা ছাড়া সুধা তত কাহারও মুখের পানে তাকায় নাই, কোন দ্বিধা করে নাই, নিব্বিচারে নিজেকে নিঃশেষে তাহার হাতে তুলিয়া দিয়াছে। সেই বা কেন, সুকৃতি ও সুনামের মােহে, পিতামাতার স্বার্থসিদ্ধির জন্য, তাহাকে বুকে না তুলিয়া পায়ে ঠেলিবে ? তার পরদিন মনােজকে ঠেলিয়া পাঠাইতে হইল না। পড়িবার রে যাইয়া বসিতেই সুরবালা প্রবেশ করিলেন, হাতে এক থালা খাবার। তাঁহার পিছনে একজন ঝি, তাহার বাম হাতে এক গ্লাস জল, ডান হাতে এক কাপ ধূমায়িত চা। মনােজ কহিল, এ আবার কেন ? এইমাত্র খেয়ে আসছি। সুরবালা সস্নেহে কহিলেন, তা হােক বাবা, খাও।বলিয়া বাম হাত

৮২
সুধার প্রেম
দিয়া ঘােমটাটি একটু টানিলেন। থালা নামাইয়া দিয়া কহিলেন, এখানে
কেমন লাগছে বাবা?
মনােজ খাইতে খাইতে কহিল, ভালই লাগছে।
সুরবালা কণ্ঠস্বর কোমল করিয়া কহিলেন, তা হলে বাবা, দিন
কয়েক থেকেই যাও, আমাদেরও তাে দেখতে ইচ্ছে করে।
হঠাৎ সুরবালার যে তাহাকে দেখিতে ইচ্ছা হইতেছে কেন, তাহা
বুঝিতে না পারিয়া মনােজ চুপ করিয়া রহিল ।
কিছুক্ষণ পরে মাধুরী আসিল। পরিধানে জরিপাড় সাদা ফরাসডাঙার
শাড়ি, গায়ে সাদা সিল্কের ব্লাউজ ; গলায় একগাছি সরু বিছাহার ও
হাতে চারগাছি করিয়া চুড়ি ছাড়া গায়ে আর কোন গহনা নাই।
মনােজ সবিস্ময়ে কহিল, গায়ের এত গয়না কি হল ?
মাধুরী গম্ভীরভাবে জবাব দিল, খুলে ফেলেছি।
মনােজ প্রশ্ন করিল, হঠাৎ খুলে ফেললে কেন ?
ভুরু কুঁচকাইয়া মাধুরী কহিল, বারে! আপনি যে কাল মানা
করলেন।
মনােজ সন্ত্রস্ত হইয়া কহিল, আমার কথা শুনে তুমি খুলে ফেলেছ ?
না, ওসব করাে না, তোমার মা আবার রাগ করবেন। ভাববেন,
কোথাকার কে, দুদিন পড়াতে এসে তার মেয়ের ওপর অযথা উপদ্রব
করছ।
মাধুরী মুচকি হাসিয়া কহিল, আপনি আমার গুরু যে, আপনার
কথা শুনলে মা রাগ করবেন না।
মনােজ ব্যঙ্গের স্বরে কহিল, বল কি ! এত গুরুভক্তি। কাল তাে
জুতাে জোড়াটি স্বচ্ছন্দে হাতে তুলে দিলে ।
মাধুরী হাসি চাপিয়া কহিল, তা কি করব? মামাবাবু বললেন যে।

সুধার প্রেম
চোখ ডাগর করিয়া মনােজ কহিল, ওঃ, তথা মাতুলভক্তি !
সেদিনও সুধার চিঠি আসিল না । মনােজ শৈলজাকে কহিল,
আপনার তত কাজকর্ম বিশেষ কিছু নেই দেখছি, আর থাকলেও আমার
সাহায্যের দরকার হবে বলে মনে হচ্ছে না। তা হলে আমি শুধু শুধু
এখানে বসে থেকে কি করব?
আমি বরং-
শৈলজা বাধা দিয়া কহিল, মাধুরীকে পড়ানোেটা বুঝি আমার কাজ
নয় ?
মনােজ বিরক্ত হইয়া কহিল, সেজন্যে আমার এখানে বসে থাকবার
দরকার দেখছি না।
শৈলজা বিস্মিত স্বরে কহিল, দরকার দেখছিস না মানে ?
মানে আর কি ? ও কাজ যাকে তাকে দিয়ে চলতে পারে ; আমার
থাকবার দরকার নেই
শৈলজা বিদ্রুপের সহিত কহিল, তােরই বা কি এমন জমিদারি লাটে
উঠেছে যে, এখনই ছুটতে হবে ?
মনােজ নীরস কণ্ঠে জবাব দিল, তা আপনার জেনে কি হবে? আমি
কালই চলে যাব।
শৈলজা ব্যস্ত হইয়া কহিল, পাগল নাকি! জামাইবাবু লিখেছেন,
তােমার কোথাও যাবার দরকার নেই। পরীক্ষার পর নাকি তােৰ্মার
শরীর খুব খারাপ হয়েছে। এখানে থেকে শরীর সারলে তবে যাবে।
মনােজ উৎসুক কণ্ঠে কহিল, বাবা বুঝি চিঠি লিখেছেন ? আমার
চিঠির তত জবাব দেন নি !
তােকে আর পৃথক করে চিঠি দেন নি, আমাকেই লিখেছেন।
তা আমিও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছি যে, খুব বেড়াবার ব্যবস্থা করেছি

৮৪ সুধার প্রেম কোন চিন্তা নেই; শরীর তো সারবেই, এমন কি মনের কোন অসুখ থাকলে তাও সেরে যেতে পারে।-বলিয়া মুচকি হাসিল। মনােজ সন্দিগ্ধ স্বরে কহিল, বুঝতে পারলাম না মামা। কি শরীরে, কি মনে কোথাও আমার কিছুমাত্র অসুখ নেই। তবু আপনারা হঠাৎ এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন কেন, বলুন দেখি ? শৈলজা দুই চোখ ডাগর করিয়া কহিল, বলিস কি? ব্যস্ত হব না? আত্মীয়স্বজনের কাজই তাে তাই। লেখাপড়াই শিখেছিস, বুদ্ধি তত তােদের এখনও পাকে নি। মন যা চায়, তাইই করবার জন্যে তােদের ঝোক। তাতে ভাল হবে, না মন্দ হবে, তা বােঝবার ক্ষমতা তােদের হয় নি। মনােজ আশ্চর্য হইয়া কহিল, সে কি মামা? শৈলজা ঘাড় কাত করিয়া, চোখ উল্টাইয়া হাসিয়া কহিল, হ্যা বাবা, তাই। তারপর ঘাড় সােজা করিয়া কহিল, মােটর চালাতে শিখেছিস ? মনােজ হঠাৎ এই প্রশ্নে আশ্চৰ্য্য হইয়া কহিল, কেন? শিখেছি। শৈলজা কহিল, শিখেছিস নাকি? বেশ বেশ, তা হলে আমার কথাটা ধরতে পারবি ঠিক। আচ্ছা, যখন নতুন চালাতে শিখছিলি, তৃখন দেখেছিলি যে, মােটরটার পথের চেয়ে বিপথে চলবারই ঝোঁক বেশি ; নয় কি? তা সেটা কি মােটরের দোষ ?বলিয়া কিছুক্ষণ মনােজের দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া থাকিল। মনােজ চুপ করিয়া রহিল। তারপর শৈলজা আবার বলিতে লাগিল, না, যে চালাচ্ছে তার ? ঠিকমত ঠিয়ারিঙের চাকা ঘােরাতে সে শেখে নি। মনােজ কহিল, মামা, আপনি মোেটর চালাতে জানেন? শৈলজা কহিল, না। শােন, তেমনই তােদর বিদ্যে হয়েছে, কিন্তু সুধার প্রেম ৮৫ * ঘাট। একটু দূরে তাকে ঠিকমত চালাতে এখনও শিখিস নি। তাই সে কাজ করতে হয় আমাদের—মানে মা, বাবা, মামা ও মামীদের। সেদিনও বিকালবেলায় শৈলজা মনােজ ও মাধুরীকে লইয়া বেড়াইতে গেল । আজ আর নদীর ধারে নয়, দীঘির ধারে। উঁচু পাড়ওয়ালা প্রকাণ্ড দীঘি ; কানায় কানায় কালাে জল টলটল করিতেছে। মাঝ- খানটায় বিস্তর পদ্ম ও শালুক ফুটিয়াছে। এক পাড়ে শানবাঁধানাে গ্রামের কতকগুলি মেয়ে জল লইতে আসিয়াছিল। তাহারা ম্যানেজারবাবুকে দেখিয়া ঘােমটা টানিয়া জল লইয়া চলিয়া গেল। শৈলজা মাধুরীকে লইয়া একটা সিড়ির উপর বসিল। মনােজ বসিবার উপক্রম করতেই শৈলজা কহিল, অত দূরে কেন ? কাছেই আয় না। এত লজ্জা কিসের? মনােজ কহিল, লজ্জা কে করছে ? এইখানেই বসি।-বলিয়া সেইখানেই বসিয়া পড়িল । শৈলজা কহিল, দীঘিটা এত বড় ছিল না। এমন বাঁধানাে ঘাটও ছিল না। গ্রামের মেয়েদের নদী থেকে জল আনতে হত। মৃত্যুঞ্জয়বাবু জমিদারি কিনেই অনেক টাকা খরচ করে সকলের আগে এই কাজটি করেছিলেন। মেয়েদের ওপর এত দরদ আজকাল প্রায় দেখা যায় না। প্রাতঃস্মরণীয় লােক।-বলিয়া দীর্ঘশ্বাস-সহকারে বক্তব্য শেষ করি। বাবার কথা মনে পড়িয়া মাধুরীরও দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল, চোখ দুইটি ছলছল করিতে লাগিল। মনােজ পুকুরের জলের দিকে তাকাইয়া রহিল, তাহার মানসিক অবস্থা বুঝা গেল না। কিছুক্ষণ পরে মাধুরী শৈলজাকে কহিল, কত পদ্মফুল ফুটেছে দেখুন! শৈলজা বাৎসল্য-রসার্জ কণ্ঠে কহিল, হ্যা, মা, ফুটেছে বইকি। চাই তােমার পদ্মফুল ?

সুধার প্রেম মনােজ সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া মনে মনে কহিল, ফুল চাই মানে? এখান থেকে হাত বাড়ালেই ফুল পাওয়া যাবে নাকি ? মাধুরী জবাব দিল না। শৈলজা কহিল, চাই তাে বল মা, এখনই আনবার ব্যবস্থা করি। মাধুরী ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, চাই। শৈলজা কহিল, বেশ। মনােজের উদ্দেশ্যে কহিল, যা বাবা, মায়ের জন্যে গােটা কয়েক ফুল এনে দে। মনােজ বিস্মিত কণ্ঠে কহিল, সে কি মামা, এই সন্ধ্যেবেলায় জলে নামব ? কাল দুপুরে স্নান করবার আগে বলবেন, এনে দোব। শৈলজা কহিল, না বাবা, কাল নয়, আজ এখনই এনে দে। মা লক্ষ্মীর ইচ্ছে হয়েছে যখন- মনােজ রুষ্ট স্বরে কহিল, হােক, আমি পারব না।বলিয়া ক্রুদ্ধ দৃষ্টি মাধুরীর উপর নিক্ষেপ করিল। মাধুরী তাহার দিকেই চাহিয়া মুচকি হাসিতেছিল, মনােজ চাহিতেই মুখ ফিরাইয়া লইয়া, কণ্ঠস্বরে অভিমানের আমেজ লাগাইয়া কহিল, থাক মামা, উনি রাগ করছেন। শৈলজা উঠিয়া দাড়াইয়া ক্ষোভের সহিত কহিল, রাগ করছে তাে আমিই যাচ্ছি মা। সাঁতার তাে জানি না, তা ছাড়া এই শরীর, তা হলও একবার চেষ্টা করে দেখি, যা থাকে কপালে।-বলিয়া থপথপ করিয়া একেবারে জলের ধারে গিয়া দাড়াইল। মনােজ ডাকিয়া কহিল, থাক, আপনার গিয়ে কাজ নেই, আমিই যাচ্ছি ; কিন্তু কাল থেকে আমাকে বেড়াতে আসতে ডাকবেন না। বলিয়া জামা জুতা খুলিয়া জলে ঝাপাইয়া পড়িল। একগুচ্ছ মৃণালসহ পদ্মফুল আনিয়া শৈলজার হাতে দিয়া মনােজ চাপাগলায় কহিল, দিনগে আপনার রাজকন্যাকে। তারপর ভিজা সুধার প্রেম কাপড় নিঙড়াইতে নিঙড়াইতে গজগজ করিতে লাগিল, যত সব আবদার! শৈলজা একগাল হাসিয়া কহিল, বাবাজী, মেয়েদের আবদারের জন্যেই তো সংসার। নইলে বনে জঙ্গলে বাস করলেই হত। শৈলজার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া মনােজ কহিল, খুব ভাল হত। এখন এই ভরসন্ধ্যেয় নেয়ে আমার সর্দি হোক। বেশ লােকের কাছে শরীর সারতে পাঠিয়েছেন বাবা! শৈলজা মনােজের কথায় কর্ণপাত না করিয়া মাধুরীর কাছে গিয়া কহিল, এই না মা, একটি পড়বার বরের টেবিলে ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখাে, বাবাজী ফুল ভারি ভালবাসে। ফুলগুলি সযত্নে বুকের কাছে ধরিয়া কপােলে চিবুকে ও ওষ্ঠাধরে তাহাদের স্পর্শ-সুখ উপভােগ করিতে করিতে মাধুরী মনােজের জলসিক্ত স্বাস্থ্যময় সুগঠিত দেহের পানে আড়চোখে চাহিয়া রহিল । মনােজ হাকিয়া কহিল, জুতাে পরব কি করে? জলে নষ্ট হয়ে যাবে যে! শৈলজা কহিল, হাতে করে নিয়ে চল, আমি জামা চাদর নিয়ে যাচ্ছি। মনােজ সরােষ নেত্রে একবার মাধুরীর দিকে তাকাইয়া কহিল, হাতে করে নিয়ে চল! কাল ও যুক্তি ছিল কোথায় ? মাধুরী নিরীহের মত সােজা তাকাইয়া রহিল, ও শৈলজা নিঃশব্দে হাসিতে লাগিল। রাত্রে সুরবালার কাছে রিপাের্ট হইল—মাধুরী মা যেমনই ফুল চাওয়া, বাবাজী অমনই কারও কথা না শুনে ঝপাং করে জলে ঝাপিয়ে পড়ল। সুরবালা এক গাল হাসিয়া কহিলেন, সত্যি ও মা, আমার কি হবে !

৮৮ সুধার প্রেম পরের দিন সকালে মমােজ বিছানা হইতে উঠিতে পারিল না নাক সড়সড় করিতেছে, মাথা দপদপ করিতেছে, হাত-পা টনটন করিতেছে, এবং সমস্ত শরীর ভারী হইয়া আছে। শৈলজা উঠাইতে আসিলে মনােজ ধরা গলায় কহিল, এখন উঠব না, জ্বর হয়েছে বােধ হয়। শৈলজা তাহার গায়ে হাত দিয়া কহিল, পাগল ! জ্বর কোথায় হয়েছে? একটুখানি সর্দি, কাপ কয়েক চা খেলেই সেরে যাবে, ওঠ। মনােজ কহিল, আজ কিন্তু আমি পড়াতে যেতে পারব না, ব'লে দিচ্ছি। শৈলজা কহিল, বেশ। আজ না হয় থাক্‌, আমি খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেদিনও সুধার চিঠি আসিল না। সুধা বােধ হয় অভিমান করিয়াছে, বুঝাইয়া-সুঝাইয়া আর একটি চিঠি দিতে হইবে। বেচারীর ভারি একা একা মনে হইতেছে বােধ হয়। শৈলজা-মামার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলে আর বাড়ি না ফিরিয়া সটান কলিকাতা যাইতে হইবে। কিন্তু সেদিন মনােজের মনের মধ্যে সুধার চিন্তা বেশিক্ষণ আমল পাইল না। যে আবদারী মেয়ের জন্য তাহার দেহের এই দুরবস্থা হইয়াছে, তাহারই চিন্তা মনের মধ্যে বার বার আনাগােনা করিতে লাগিল। পরের দিন সকালে পড়াইতে গিয়া মনােজ দেখিল, পড়িবার ঘরে টেবিলে ফুলদানিতে একটি শুষ্ক প্রায় পদ্মফুল। সুরবালা আসিয়া কহিলেন, ছিঃ বাবা, অমন অবুঝ হতে আছে । মেয়ে আবদার করলে বলেই সন্ধ্যেবেলায় জলে নাবতে হবে ! ওই রকম মেয়ে, ওর আবদার যে কে সারাজীবন ধরে রাখবে বাবা, তাই ভেবে আমার দিনে শান্তি নেই, রাত্রে ঘুম নেই। যাক, শরীরটা একটু ভাল তো বাবা ?

সুধার প্রেম
মনােজ ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, ভাল।
সুরবালা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে টানিয়া টানিয়া কহিতে লাগিলেন, কাল শুনে
আর ভেবে বাঁচি না। ভাবলুম, যাই, একবার ছুটে গিয়ে দেখে আসি।
তা সবাই বারণ করলে। মেয়েকেও খুব ধমকেছি।
ও কি আবদার ।
ভালমানুষের ছেলে বলে তাই, না হলে
এক মুহূর্তে উদ্বেগাকুল কণ্ঠস্বরকে স্বাভাবিক পর্দায় আনিয়া কহিলেন,
মেয়েটাও কাল সারাদিন মুখটি চুন করে বেড়িয়েছে।
মাধুরী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ভাল আছেন ?
মনােজ গম্ভীরভাবে জবাব দিল, হ্যা।-বলিয়া ফুলদানি হইতে ফুলটি
লইয়া একটু নাড়িতেই ফুলের দলগুলি ঝরিয়া পড়িল।
মাধুরী কহিল, কাল বিকেল পর্যন্ত তাজা ছিল। আপনি তাে কাল
এলেন না! শেষের দিকে কণ্ঠস্বর একটু কঁপিয়া উঠিল বােধ হয়। মনােজ
একবার মাধুরীর মুখের দিকে তাকাইয়া মনে মনে কহিল, আবার আবদার
হচ্ছে বলিয়া গম্ভীরভাবে বইটা টানিয়া লইয়া পড়াইতে আরম্ভ করিল ।
দিন দুই পরে শৈলজা এক সময়ে মনােজকে কহিল, হা রে, বলছিলি,
মােটর চালাতে জানিস। সত্যি নাকি ?
মনােজ জবাব দিল, মিথ্যে বলে লাভ?
শৈলজা কহিল, মিথ্যে বলে লাভ অনেক, কিন্তু সে কথা নয়।
চালাতে জানিস তো একদিন মােটরে করে বেড়িয়ে আসা যাবে।
মােটর কোথায় ?
আছে একটা। কৰ্ত্তা কোন এক সাহেবের কাছে কিনেছিলেন।
যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন নাকি নিজেই চালাতেন।
গ্যারেজে বন্ধ আছে।
এখন

৯০ সুধার প্রেম চলে ? চলত বলেই তো শুনেছি। চল না, দেখা যাক। মােটরটা চলিবে বলিয়াই মনে হইল। পরের দিন কাছের শহর হইতে তেল আনানাে হইল, এবং বিকালবেলায় মনােজ মােটর আনিয়া জমিদারবাড়ির সামনে হাজির করিল। শৈলজ। বাড়ির মধ্যে চলিয়া গেল। দেখিতে দেখিতে চারিদিকে ভিড় জমিয়া গেল। আবালবৃদ্ধ- বনিতা যে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, ছুটিয়া আসিল এবং গাড়ি ও গাড়ােয়ান দুইয়ের দিকেই বিস্ময় ও কৌতূহলের সহিত তাকাইয়া রহিল। ভিড়ের মধ্যে কোথাও কোথাও মনােজের ‘অদ্ভুত কৃতিত্বের সম্বন্ধে জল্পনা চলিতে লাগিল। মনােজ শুনিতে পাইল, একটি ছেলে তাহার মাকে প্রশ্ন করিল, উ কে মা ? মা অবলীলাক্রমে উত্তর দিল, বাবুদের জামাই। সেদিন সুরবালা সুদ্ধ সঙ্গী হইলেন। মা ও মেয়ে পিছনের সীটে বসিল, সামনে বসিল মাতুল ও ভাগিনেয়। একজন চাকরকে স্টার্ট দেওয়ার জন্য সঙ্গে লওয়া হইল। ভিড় ঠেলিয়া ধীরে ধীরে গ্রাম পার হইয়া মনােজ গাড়ির গতি বৃদ্ধি যে রাস্তা দিয়া গ্রামে আসিয়াছিল, সেই রাস্তা দিয়া চলিল। যেখানে আসিয়া রাস্তাটি হইতে একটি শাখা স্টেশনের দিকে চলিয়া গিয়াছে, সেখানে গতি একটু কম করিতেই শৈলজা কহিল, সােজা চ। আবার গাড়ি হুহু করিয়া চলিতে লাগিল। পিছন হইতে মাধুরী কহিল, ওই পাহাড়টার কাছে চলুন না মামা। শৈলজা কহিল, ও কি আর এখানে মা ! অনেক দূর। একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে গাড়ি থামাইয়া মনােজ কহিল, আর , এই পৰ্যন্ত। এবার ফেরা যাক। করিল।

সুধার প্রেম ১১ মাধুরী মাকে কহিল, না মা, এখনই না, একটু এখানে বেড়াইগে চল। সুরবালা কহিলেন, আমি আর যাব না মা, তােমরা যাও, আমি গাড়িতে বসি। মাধুরী খালি পায়েই গাড়ি হইতে নামিয়া পড়িল। শৈলজা ত্রস্তভাবে কহিল, খালি পায়ে না মা, চটিটা পরে নাও। মাধুরী আবদারের স্বরে কহিল, না মামা, থাক্‌, খালি পায়েই ভাল লাগবে। মাঠের মধ্য দিয়া তিনজন বহুদূরে চলিয়া গেল। হঠাৎ পায়ের নীচে ফাকর বি ধিয়া রাধুরী ‘উঃ করিয়া উঠিতেই শৈলজা লাফাইয়া কাছে আসিয়া কহিল, কি হ’ল মা? মাধুরী পায়ের তলা হইতে কাকরটি ছাড়াইয়া ফেলিয়া কহিল, কিছু না। মনােজ বিদ্রুপের স্বরে কহিল, খালি পায়েই ভাল লাগছে বােধ হয় । মাধুরী মনােজের উপর সুতীক্ষ কটাক্ষ-শেল নিক্ষেপ করিল, কিন্তু মনােজের নিব্বিকার গাম্ভীর্যের বর্মে তাহা প্রতিহত হইল। আরও কিছু দূর গিয়া মাধুরী আবার ‘উঃ করিয়া উঠিল। শৈলজা বথারীতি ব্যস্তসমস্তভাবে ছুটিয়া আসিল। এবার কাকর নয়, কাটা। শৈলজা নিজের গায়ের চাদর পাতিয়া মাধুরীকে বসাইল। তারপর নােজকে কহিল, আমি তাে উবু হয়ে বসতে পারব না, তুইই দেখ, যদি কঁাটাটা বের করতে পারিস। .. মনােজ উবু হইয়া বসিয়া পায়ে হাত দিতেই মাধুরী মুচকি হাসিল। মনােজ তাহা দেখিতে পাইয়া বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠে কহিল, হাসছ যে? মাধুরী হাসি চাপিয়া কহিল, পায়ে সুড়সুড়ি লাগছে যে । শৈলজা একটু দূরে গিয়া মনােযােগসহকারে আকাশ পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিল।

সুধার প্রেম মনােজ জিজ্ঞাসা করিল, সেফটিপিন আছে, কিংবা মাথার কাটা। মাধুরী শাড়ি হইতে একটি সােনার সেফটিপিন খুলিয়া দিল । মনােজ কাটা তুলিতে তুলিতে কহিল, আমাদের গরিবদের বাড়ির মেয়েরা সােনা পায়ে ঠেকায় না, তােমাদের বড়লােকদের মেয়েদের বুঝি সে নিয়ম নেই, না ? মাধুরী মুখটি স্নান করিয়া কহিল, কি করব, আর অন্য কাটা নেই যে সঙ্গে। কাটা ভােলা হইলে মাধুরী কহিল, দাড়ান । মনােজ কহিল, কেন ? বারে। প্রণাম করব না, পায়ে হাত দিলেন?-বলিয়া মাধুরী মনােজকে প্রণাম করিল। ফিরিয়া আসিয়া শৈলজা কহিল, মাধুরী মার আবার পায়ে কাটা ফুটল। তা বাবাজী আমার সব দিকে ওস্তাদ, টুক করে কাটা বের করে দিলে। মাধুরীর দিকে তাকাইয়া কহিল, একটুও লাগে নি, না মা? মাধুরী লজ্জায় মুখ রাঙা করিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, না। সেদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত মােজ ঘুমাইতে পারিল না। একটি অলক্তকরঞ্জিত শঙ্খধবল চরণের কোমল স্পর্শ তাহার সর্বদেহে মধুবর্ষণ করিতে লাগিল, এবং চরণের মালিক মনের মধ্যে আসর জমকাইয়া বসি। রহিল, বেচারী সুধাকে আমলই দিল না। দিন দুই পরে সুরবালা, শৈলজা ও মনােজকে মধ্যাহ্নভােজনের জন্য নিমন্ত্রণ করিলেন। আহারের সময়ে মাধুরী নিজে পরিবেশন করিল এবং সুরবালা কাছে বসিয়া তদারক করিতে করিতে পুনঃ পুনঃ জানাইতে সুধার প্রেম লাগিলেন যে, সমস্ত খাদ্যদ্রব্য মাধুরী নিজ হাতে প্রস্তুত করিয়াছে, কাহাকেও রান্নাঘরের পাশ মাড়াইতে দেয় নাই। আহারের পরও সুরবালা মনােজকে ছাড়িয়া দিলেন না, বলিলেন, একটু বিশ্রাম করে যাও বাবা। তােমার তাে এখন কোন কাজ নেই। বুড়ী ঝি সঙ্গে করিয়া মনােজকে বিশ্রাম-কক্ষে পৌছাইয়া দিল। মেঝে দামী কার্পেট দিয়া ঢাকা। কক্ষের এক পাশে একটি ঝকঝকে পালিশ করা প্রকাণ্ড পালঙ্কে আনকোরা নৃতন নেটের মশারি ও ধবধবে বিছানা। অন্যান্য সাজসজ্জা ও আসবাবপত্র সবই গৃহকর্তীর অর্থ-প্রাচুর্যের পরিচয় দিতেছে। বুড়ী ঝি একগাল হাসিয়া কহিল, মা দিদিমণির বরের জন্যে নিজের হাতে ঘর সাজিয়েছেন। মনােজ গম্ভীর হইয়া রহিল। বিছানায় শুইয়া মনােজ ভাবিতে লাগিল, সুরবালা কি তাহাকেই মাধুরীর বর ঠিক করিয়াছেন নাকি? তা হইলে তাে সৰ্ব্বনাশ ! সে যে সুধাকে কথা দিয়া আসিয়াছে, এবং সুধা তাহার পথ চাহিয়া বসিয়া আছে। সুধার সহিত যেরূপ ঘনিষ্ঠভাবে সে মিশিয়াছে, তাহার পর সুধাকে ত্যাগ করা তাহার পক্ষে অত্যন্ত অধৰ্ম্মের কাজ হইবে। এমনই করিয়া সুধার চিন্তা ন্যায়-অন্যায়, ধৰ্ম্ম-অধৰ্ম্ম, উচিত-অনুচিতের সরকারী বাধা রাস্তা দিয়া চলিতে লাগিল। একবারও তাহার মনে হইল না, সুধা তাহার জীবনে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়াইয়া গিয়াছে, তাহাকে? না পাইলে জীবন দুৰ্ব্বহ হইয়া উঠিবে। অধিকন্তু এই সুশুভ্র ও সুপরিসর শয্যায় মাধুরীর লজ্জাজড়িত দেহটিকে নিজ দেহের একান্ত সন্নিকটে কল্পনা করিতে তাহার ভালই লাগিল। কি করছেন?—মেয়েলী কণ্ঠের এই প্রশ্ন শুনিয়া মনােজ চমকিয়া চাহিয়া দেখিল, একটি বছর সতরাে বয়সের শ্যামবর্ণ মেয়ে পাশে দাড়াইয়া ১৪ মৃধার প্রেম মৃদু হাস্য করিতেছে। মেয়েটির চেহারা চলনসই। সীমন্তে সিন্দুর ও গায়ে গহনার বাহুল্য দেখিয়া বুঝা যাইতেছে, সে কোন সম্পন্ন গৃহস্থের বধূ। মমােজ শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়া বসিল। মেয়েটি সপ্রতিভভাবে শয্যার এক প্রান্তে বসিয়া কহিল, ঘুমুচ্ছেন নাকি? মনােজ দেওয়ালের দিকে একটু সরিয়া বসিয়া কহিল, না। কিন্তু আপনাকে চিনতে পারলাম না। মেয়েটি মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল, কখনও না দেখলে চিনবেন কি করে ? আমি মাধুরীর সই। মনােজ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, মাধুরী কোথায়? মেয়েটি কহিল, না দেখে থাকতে পারছেন না বুঝি ? মনােজ তাড়াতাড়ি জবাব দিল, না, তা নয়, এমনিই জিজ্ঞাসা করছি। মেয়েটি ঘাড় নাড়িয়া কহিল, বুঝেছি, আর ঢাকবার দরকার নেই। ডেকে আনছি সইকে ।বলিয়া উঠিয়া চলিয়া গেল এবং অনতিবিলম্বে মাধুরীকে লইয়া হাজির হইয়া কহিল, ডাকতেও যেতে হয় নি। সই আমার এইখানেই ঘুরঘুর করছিল। অবস্থা দুজনেরই সমান। মাধুরী কৃত্রিম কোপের সহিত মেয়েটিকে কহিল, কি যা-তা বলছিস? ফাজিল ! মেয়েটি হাসিয়া কহিল, ফাজিল বইকি! যা বলবার জন্যে ছটফট করছিস, তাই শুনিয়ে দিচ্ছি। এর পর আশীর্বাদ করবি আমাকে। মেয়েটি মনােজকে কহিল, তাস খেলতে জানেন? আসুন না, খেলা যাক।-বলিয়া আঁচল হইতে একজোড়া তাস বাহির করিল। ‘চোর-গােলাম’ খেলা চলিতে লাগিল। নিজের খেলার দোষেই হউক, মাধুরী ও তাহার সখীর চৌৰ্য্য ও চাতুর্যের জন্যই হউক, মনােজ প্রতি বারই চোর হইতে লাগিল।

সুধার প্রেম সই হাসিয়া কহিল, আপনি তাে ভারি চোর! মাধুরীর দিকে কাইয়া কহিল, মন চুরি গেছে বলছিলি যে ! ওঁরই কাজ । মাধুরী সকোপে কহিল, দূর ছুড়ী ! যা মুখে আসে তাই বলে ! কিন্তু তাহার মুখ ও চোখ তাহাকে হাতে-হাতে ধরাইয়া দিল। য তাহার প্রিয় সখীর কাছে গােপনে তাহার হৃদয়-দৌর্বল্যের কথা প্ৰকাশ করিয়াছে, সে সম্বন্ধে মনােজের বিন্দুমাত্র সন্দেহ রহিল না। এবং তাহার মন সেই গােপন কথাটির চারিপাশে পুষ্পের কাছে মৌমাছির এত গুঞ্জন করিতে লাগিল। পরদিন ঘনশ্যামবাবুর চিঠি আসিল, মননজের নামে। লিখিয়াছেন, কলিকাতা হইতে খবর আসিয়াছে যে, মনােজ তৃতীয় শ্রেণীতে পাস রিয়াছে। নিয়মিত পড়াশুনা করা সত্ত্বেও পরীক্ষার ফল যে কেন এত [রাপ হইল, তিনি তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। যাহা হউক, 'হার জন্য মননজের মন খারাপ করিবার দরকার নাই। কারণ ওকালতি করিতে হইলে এম. এ. পরীক্ষার ফলাফলে কিছু আসিয়া যাইবে না। মাইন পরীক্ষায় ভাল ফল করিতে পারিলেই হইল। মনােজের এখন বাড়ি ফিরিবার অথবা কলিকাতা যাইবার প্রয়ােজন নাই। কারণ শীঘ্রই বশেষ প্রয়ােজনবশত তাহাকে এখানে আসিতে হইবে। তখন সাক্ষাতে বি বিষয়ে পরামর্শ হইবে। পুনশ্চ লিখিয়াছেন, কলিকাতা হইতে কে রাঘবচন্দ্র বােস মনােজকে চিঠি দিয়াছেন। চিঠিটি পাঠাইয়া দওয়া হইতেছে। সেই চিঠিটি খুলিয়া মনােজ পড়িল, রাঘববাবুর জবানিতে সুধা লিখিতেছে, অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহে সুধার বিবাহ স্থির হইয়াছে, ‘ববাহ-সভায় মনােজের উপস্থিতি প্রার্থনীয়। চিঠি দুইটি হাতে করিয়া মনােজ বিহ্বলের মত বসিয়া রহিল। তাহার সুধার প্রেম চক্ষের সম্মুখে কত যত্নে আঁকা ভবিষ্যতের ছবি লেপিয়া মুছিয়া একাকার হইয়া গেল। কত আশা করিয়াছিল, ভাল করিয়া এম এ. পাস করিয়া কলিকাতায় প্রফেসারি করিবে ও সুধাকে বিবাহ করিয়া সংসার পাতিবে। তৃতীয় শ্রেণীতে পাস করিয়া প্রফেসারি পাওয়ার আশা বাতুলতা। আর সুধা তত দুই দিন পরে পরের স্ত্রী হইবে। ভবিষ্যতে কোন দিন দেখা হইলে সে চিনিবে না, চেনা চলিবে না। কিন্তু সুধা তাহাকে এত সহজে ভুলিল? এত সহজে অন্যের সঙ্গে বিবাহে মত দিতে পারিল ? আসিবার দিন সুধা যে ভাবে তাহার বুকে মুখ রাখিয়া কাদিয়াছিল, ফিরিয়া যাইবার জন্য পুনঃ পুনঃ মিনতি করিয়াছিল, তাহা কি শুধু ছলনা? তাহার পিছনে ভালবাসা ছিল না? হয়তাে ছিল। কিন্তু সুধা কিন্তু সুধা বুদ্ধিমতী, সে জানে, ভালবাসাই জীবনের সব নহে। বাস্তব জীবনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদির তালিকায়, নিমন্ত্রণ-বাড়ির ভােজ-তালিকায় পান- সিগারেটের মত, ভালবাসার কোন স্থান নাই। পাইলে ভাল, না পাইলে বিশেষ ক্ষতি নাই। তাহার মত অপদার্থকে বিবাহ করিয়া কেবল ভালবাসা পাওয়ার চেয়ে হয়তো ভূষণকে বিবাহ করিয়া ভাল কাপড়, ভাল গহনা পাওয়াই সুধা ভাল মনে করিয়াছে। কিন্তু সে নিজে কি এ অবস্থায় অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের উপর নির্ভর করিয়া সুধাকে বিবাহ করিতে পারিত? সুধা তাহাকে এত সহজে নিষ্কৃতি না দিলে তাহাকেই নিঃশব্দে বিদায় লইতে হইত; এবং তাহাতে সুধার বুক হয়তাে হয়তাে ফায়া যাইত, কিন্তু তাহার বুক ফাটিতে চাহিত না, ফাটিলেও মাধুরী রূপ ও রৌপ্যের ঝাল দিয়া তাহা বেমালুম জুড়িয়া দিত। অতএব সুধা তাহাকে ত্যাগ করিয়া তাে ভালই করিয়াছে। কিন্তু এত সহজে ? মাধুরীকে বিবাহ করিলেও সে কি সুধাকে কোন দিন ভুলিতে পারিবে ? জীবনে প্রথম নারীসঙ্গের সুতীব্র অনুভূতি, দুঃসহ আনন্দ যে সুধার কাছে সুধার প্রেম পাইয়াছে, সে যে তাহার সমস্ত চেতনার সঙ্গে জড়াইয়া গিয়াছে। বাহিরের সংসারে হয়তাে সুধার সহিত তাহার কোন সম্পর্ক থাকিবে না, কিন্তু অন্তরাকাশের এক প্রান্তে সুধার স্মৃতি একটি বৃহৎ ও উজ্জ্বল তারকার মত বােধ হয় আমরণ অলিতে থাকিবে। শৈলজা আসিয়া কহিল, কি চিঠি এল রে ? পাস করেছিস? মনােজ বিষন্ন মুখে কহিল, হা, ভাল হয় নি। শৈলজা চোখ মিটকাইয়া, ঘাড় নাড়িয়া কহিল, যাকগে, ওতেই হবে। গিন্নীকে খবর পাঠিয়ে দিইগে। বিকালে শৈলজা মনােজকে সুরবালার সমীপে প্রায় টানিয়া লইয়া গেল। সুরবালা অবিগলিত নয়নে গদগদ কণ্ঠে কহিলেন, ভারি আনন্দ হয়েছে বাবা। এ সময়ে তিনি যদি বেঁচে থাকতেন। শৈলজা কহিল, ওঃ, ভারি সুখী হতেন। বিদ্যেসাগরকে কেতাবেই দেখতে পাওয়া যায়, এ রকম জল-জীয়ন্ত বিদ্যেসাগর দেখতে পাওয়া সােজা কথা নাকি ! কি রকম ফল করেছে! সারা দেশের যত ছেলে পরীক্ষে দিয়েছিল, সক্কলের ওপরে এর নাম, বড় বড় অক্ষরে লেখা। মনােজ লজ্জিত মুখে মাথা নীচু করিল। সুরবালা বিস্ময়-বিস্ফারিত নয়নে কহিলেন, সত্যি! তা হলে তাে এর পর বাবাজী হাকিম হবে ! শৈলজা জবাব দিল, শুধু হাকিম ? হাইকোর্টের জজ হবে' ও, আপনি দেখে নেবেন। সুরবালা কহিলেন, এত আনন্দ হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে, আমার নিজের ছেলে পাস করেছে। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া মনােজকে কহিলেন, হ্যা বাবা, আমার ছেলে হতে তােমার আপত্তি আছে? ৭ Slow সুধার প্রেম মনােজ লজ্জায় অধােবদন হইল। সুরবালা কহিলেন, আমার মাধুরী হয়তাে তােমার যােগ্য নয়, তবু যদি তাকে দয়া করে পায়ে শৈলজা বাধা দিয়া কহিল, ও কি কথা বলছেন দিদি? মাধুরী মাকে ও মাথায় করে নেবে। সুরবালা মনােজের দিকে তাকাইয়া সাগ্রহে কহিলেন, হ্যা বাবা, সত্যি ? মনােজ নীরবে নতমুখে বসিয়া রহিল। মনােজ যাইবার পর সুধার বড় একা একা মনে হইতে লাগিল । যে সংসারের সহিত যুক্ত থাকিয়া সে এতদিন বাড়িয়া উঠিয়াছে, ব্যাঙাচির লেজের মত কখন সেই সংসার তাহার জীবন হইতে খসিয়া পড়িয়াছে, তাহা সে বুঝিতে পারে নাই। এখন সেই সংসারের সহিত পুনরায় যুক্ত হইবার তাহার ইচ্ছা নাই এবং ইচ্ছা থাকিলেও উপায় নাই। তাই সংসারের প্রাত্যহিক কাজগুলিতে পূর্বের মত তাহার মন আশ্রয় পাইল , আনন্দও পাইল না। যে রাজকর্মচারীর স্থানান্তরিত হইবার আদেশ আসিয়াছে, নবাগত ব্যক্তিকে চার্জ বুঝাইয়া দেওয়া পর্যন্ত সে যেমন যওঁর মত নিব্বিকার ও নিলিপ্ত ভাবে কাজ করিয়া যায়, অথচ তাহার মন আগামী কর্মস্থানের দিকে নিবদ্ধ থাকে, সুধাও তেমনই তাহার প্রাক্তন জীবনযাত্রার মধ্যে সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিহীনভাবে তাহার কাজ করিতে লাগিল বটে, কিন্তু তাহার অন্তরাত্মা ভাবী জীবনের দিকে নিনিমেষে তাকাইয়া রহিল সুধার প্রেম মনােজের সহিত পরিচিত হইবার পূর্বে সুধার জীবন সরল ছিল, সহজ ছিল। বাবার সেবা করিত, পড়াশুনা করিত, সংসারের কাজ- কৰ্ম্ম করিত, বিশুর সহিত খুনসুড়ি করিত, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প- গুজব করিত ও খেলা করিত, এবং রাত্রি নয়টা বাজিতে না বাজিতে ঘুমে অসাড় হইয়া পড়িত । আর এখন জীবনে জটিলতা আসিয়াছে ; যেখানে মাত্র বীচিবিভঙ্গ হইত, সেখানে ঘূর্ণির সৃষ্টি হইয়াছে। দিনের বেলায় পড়াশুনা করিতে ভাল লাগে না, বসিয়া বসিয়া দিবাস্বপ্ন দেখে। রাত্রে ঘুম আসিতে চাহে না, কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া চিন্তার জাল বুনিতে বুনিতে রাত্রি শেষ হইয়া যায়। সুধার মানসিক বিপর্যয় রাঘববাবু বুঝিতে পারেন না। বুঝিতে পারিবেনই বা কি করিয়া ? সারা দিন রাত বিছানায় পড়িয়া ঝিমাইতে থাকেন। দিন দিন তাহার দেহের অবস্থা খারাপ হইয়া আসিতেছে। আজকাল নিজে উঠিতে বসিতে পর্যন্ত পারেন না। সুধাই বিছানা হইতে উঠায়, মুখ ধােয়াইয়া দেয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, খাওয়ায়, স্নান করায়, মালিশ করে ও সেক দেয়। তাহার কোন কাজে কিছুমাত্র ত্রুটি থাকে না। তবে হয়তো কাজ করিতে করিতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হইয়া যায়, এক কথার জবাব অন্যভাবে দিয়া বসে। কিন্তু ইহার যে কোন গুরুতর কারণ আছে, তাহা রাঘববাবু ভাবিতে পারেন । ভাবতে পারেন না যে, যে সুধা সাত বৎসর বয়স হইতে সরাে । বৎসর বয়স পর্যন্ত শুদ্ধ তাহারই হৃদয়ের রসে বাড়িয়া উঠিয়াছে, সে আজ হঠাৎ তাহাকে নিপ্রয়ােজন বলিয়া ত্যাগ করিয়া জীবনী-রস আহরণ করিবার জন্য হৃদয়ান্তরে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। মনােজকে তিনি স্নেহের চক্ষে দেখিয়াছেন, কয়েক দিন দেখেন নাই বলিয়া খুতখুত করিয়াছেন, হয়তাে মনে মনে কোন দিন তাহাকে তাহার কন্যার স্বামী সুধার প্রেম ; বলিয়া কল্পনা করিয়াছেন। কিন্তু সে যে তাহার কন্যার জীবনে এত গভীরভাবে শিকড় চালাইয়াছে যে, তাহাকে টানিয়াও ছাড়ানাে যাইবে না, যাইলেও কন্যার জীবন ভাঙিয়া খানখান হইয়া যাইবে, তাহা তিনি বুঝিবেন কি করিয়া ? আজকাল ভূষণ প্রতিদিন সন্ধ্যার পর হাজির হয় এবং রাঘববাবুর সঙ্গে আলাপ ও আলােচনা করিতে করিতে ঘন ঘন দরজার দিকে তাকাইতে থাকে। সুধা মাঝে মাঝে আসিয়া হাজির হয়, কখনও তামাক সাজিয়া দিয়া যায়, কখনও আসিয়া বাবার পিঠের বালিশটা ঠিক করিয়া দিয়া যায়, আবার কোন দিন নিঃশব্দে বসিয়া রঘববাবুর পায়ে মালিশ করিতে করিতে তাহাদের আলােচনা শােনে সেদিন ভূষণের উৎসাহের সীমা থাকে না; সেদিন শুধু মুখ দিয়া নহে, সৰ্বাঙ্গ দিয়া সে কথা বলিতে থাকে। হাত নাড়িয়া, চোখ বড় করিয়া, নাক ফাপাইয়া, জ্ব কুঁচকাইয়া, ভুড়ি দোলাইয়া, কথা যেন আর শেষ হইতে চাহে না নিজের বিষয়-বৈভবের কথা, বংশগৌরবের কথা। কামারপুরের সমস্ত জমিদারিটাই এখন তাহার। অন্যান্য শরিকানী স্বত্ব সব সে নিজে কিনিয়া লইয়াছে। জমিদারির মধ্যে কতকগুলা কয়লাখাদ বাহির হইয়াছে, সাহেব কোম্পানিকে মােটা সেলামি ও রয়ালটিতে সেগুলা সে ইজারা দিয়াছে। এখানে সে এমন নিরীহটির মত বসিয়া গল্প করিতেছে বটে, কিন্তু জমিদারিতে তাহার প্রতাপে ব্যাঘ্র ও বলদ, খাদক ও খাদ্য হইয়াও নাকে নাক ঠেকাইয়া এক ঘাটে জল পান করে। এখানে ভাড়াটে বাড়িতে বাস করিলে কি হইবে, দেশে তাহার চক-মিলাননা বাড়ি দেখিলে চার দণ্ড চাহিয়া থাকিতে হইবে। শুধু কি দেশেই বাড়ি, কোথায় বাড়ি নাই তাহার ? দেওঘর, গিরিডি, ঝাঝা, মধুপুর, শিমুলতলাসব জায়গাতেই এক-একখানা বাড়ি। আর যেমন তেমন সুধার প্রেম ১০১ বাড়ি নয়, ভাল ভাল বাড়ি, মাসে মাসে মােটা বাড়িভাড়া পায়। পুরীতেও একখানা বাড়ি করিবে সে, টাকা মজুত, মনটা একটু মজবুত হইয়া উঠিলেই হয়। রাঘববাবু কোন দিন ঝাঝা গিয়াছেন? বেতত রােগীদের সুইজারল্যাণ্ড। দুই দিন সেখানের জল খাইলেই আর হাওয়া টানিলেই বাতে পঙ্গু রােগীও দৌড়-ঝাঁপ করিতে শুরু করে। রাঘববাবু বিস্ময়াহত কণ্ঠে বলেন, সত্যি নাকি ? সুধাও কৌতূহলাক্রান্ত নয়নে চাহিয়া থাকে, বাবাকে বলে, চল না বাবা । রাঘববাবু সৃক্ষোভে হাসিয়া বলেন, কোথায় পাব মা, এত টাকা? ভূষণ বলে, যাবেন আপনি? টাকার জন্যে ভাববেন না। আমার নিজের বাড়ি, একটি পয়সা ভাড়া লাগবে না। তা ছাড়া খরচপত্র ? ওঃ, সে ব্যবস্থা হবে এখন। ভূষণ সুধার দিকে কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া স্পষ্ট জানাইয়া দেয়, রাঘববাবুকে তাহার পরমাত্মীয় বলিয়া মনে হয়, রাঘববাবুও যেন তাহাকে পর মনে না করেন। তাহা ছাড়া ঝাঝা যখন এত কাছে, এবং রাঘব- বাবুর যখন এত বাত, তখন মনে করাও উচিত নয় । রাঘববাবু অপ্রতিভভাবে বলেন, আপনাকে ভূষণ বাধা দিয়া সবিক্রমে বলিয়া উঠে, আমাকে আপনাকে’ নয়, ‘তােমাকে, বয়সে আমি আপনার চেয়ে অনেক ছােট যে । রাঘববাবু অপরাধীর মত বলেন, তা বটে, তা বটে। তােমাকে তােমাকেও আমার আপনার লােক বলেই মনে হয় । তবে সেজন্যে নয়, মানে, এই শরীরে কেই বা সব ব্যবস্থা করবে, কেই বা সঙ্গে করে নিয়ে যাবে ? ভূষণের উৎসাহ উদ্দাম হইয়া উঠে, কোমর হইতে মাথা পর্যন্ত সুধার প্রেম - . সবটাই প্রবলভাবে আন্দোলিত করিয়া কহে, আমি, আমি সব ব্যবস্থা করব, নিয়ে যাব, কিছু ভয় করতে হবে না আপনাকে। কবে যাবেন বলুন?-বলিয়া এমনই ভাব দেখায়, যেন বলিবামাত্র রাঘববাবুকে কঁাধে তুলিয়া এখনই হাওড়া স্টেশনে হাজির করিয়া দিবে। রাঘববাবু চিন্তিত মুখে বলেন, আমি একটু ভেবে বলব এখন। ভূষণ যেন মুষড়াইয়া যায়, সহজ গলায় বলে, ও, ভাববেন ! তা ভাবুন, মােট কথা, তাড়াতাড়ি জানাবেন । পূজোর মরসুম কিনা, ভাড়াটেদের ভারি ভিড়। সুধা রাঘবকে বলে, বাবা, তােমার পেশনটা কয়েক মাস মনােজই পেৰ্শন আনিবার ব্যবস্থা করিয়াছিল। ভূষণ শুনিতে পাইয়া বগম্ভীর স্বরে বলে, কি ? রাঘববাবু কাচুমাচু হইয়া বলেন, কিছু না, পেশনটা আনবার ব্যবস্থা করতে হবে, কি করে যে যাই, এই শরীর- ভূষণ সক্ষোভে কহে, ও, এই আমাকে আপনার মনে করেন। আমি রয়েছি কি জন্যে ? আমি ব্যবস্থা করব। রাঘববাবু কৃতজ্ঞতার হাসি হাসিয়া কহেন, ভারি উপকার করা হবে তা হলে, আমার যে শরীর ভূষণ বাধা দিয়া বলে, আপনাকে ও কথা বলতে হবে কেন ? সব দেখতে পাচ্ছি যে ! কানা তাে নই, কি বলেন?—বলিয়া সুধার দিকে তাকাইতেই সুধা ঘাড় নাড়িয়া জানায়, না। ভূষণ কহে, তবে? কিছু ভাবনা নেই আপনাদের। আমি যখন আছি আর আপনাদের সঙ্গে যখন আলাপ হয়েছে, তখন সব ব্যবস্থা করব আমি ।-বলিয়া ডান হাতটা বুকে ঠুকিয়া যুগপৎ কন্যা ও পিতার দিকে তাকাইতে থাকে। - সুধার প্রেম ১০৩ পূজা আসিয়া পড়িল। রাঘববাবুর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ভূষণ তাহাদের সমস্ত পূজার খরচ বহন করিল। কহিল, আপনার নিজের ছেলে থাকলে কি করত? আমাকেও তাইই মনে করুন না । সুধা বাবার কাছে খুতখুত করিতে লাগিল, কহিল, ভূষণবাবুর ভারি অন্যায় । আমার জন্যে এত ভাল শাড়ি কেনবার কি দরকার? আমি এ পরতে পারব না বাবা। রাঘববাবু সান্ত্বনা দিয়া কহিলেন, ছিঃ মা, তা করাে না। স্নেহ ক'রে দিয়েছে, তার অপমান করাে না। তােমাকে নিজের বােনের মত মনে করে হয়তাে। সকলের চেয়ে, ঘূৰ্ত্তি হইল বিশুর। পুরা মাপের ফরাসডাঙার ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চটিজুতা, জীবনে পরিয়াছে কিনা সন্দেহ। তাই দিবারাত্র অঙ্গ হইতে তাহাদের নামাইতে চাহিল না এবং সারাদিন চটি- জুতার শব্দে ওভূষণের প্রশংসায় বাড়িসুদ্ধ সকলকে অস্থির করিয়া তুলিল। একদিন মনােজের একটি চিঠি আসিল। চিঠির সারমর্ম এই-সুধার জন্য মনােজের অত্যন্ত মন কেমন করিতেছে। কিছুই ভাল লাগিতেছে । বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গ পৰ্যন্ত বিস্বাদ হইয়া গিয়াছে। সুধা বােধ হয় বেশ মনের আনন্দে দিন কাটাইতেছে। মেয়েদের মন জলের মত, কোন পাত্রে অবলীলাক্রমে আশ্রয় লইতে পারে, পুরাতন পাত্রের কথা একবারও মনে পড়ে না। পুরুষের তথা মননজের মন লােহার মত, যে ছাচের ছাপ একবার পড়ে, তাহা সহজে মুছিতে চায় না। সুধাকে ছাড়া মনােজের চলিবে না, এ কথা সুধা যেন সর্বদা মনে রাখে। সন্ধ্যার পর সুধা কি আজকাল ছাদে যায় ? মনােজও সন্ধ্যার পর ছাদে গিয়া সুধাদের বাড়ির দিকে তাকাইয়া থাকে ( অবশ্য আন্দাজে ); বাতাসে সুধার চুলের গন্ধ ও তারায় সুধার চক্ষের দীপ্তি আবিষ্কার করিবার চেষ্টা ১০৪ সুধার প্রেম করে। সুধা হয়তো জলের ট্যাঙ্কটার পাশে গালে হাত দিয়া বসিয়া কতনয়া শকুন্তলার মত চিন্তায় বিভাের হইয়া থাকে। কিন্তু কাহার চিন্তায়? মনােজের, না অন্য কাহারও? ভূষণবাবু কি আজকাল প্রতি- দিন সন্ধ্যায় আসে? তাহার সহিত সুধা যেন বেশি অন্তরঙ্গতা না করে। দোহাই ! সুধা যেন আর দিন কয়েক কষ্ট করিয়া মনােজকে মনে রাখে। মনােজ শীঘ্রই সুধার উপর ক্ৰোকী পরােয়ানা লইয়া হাজির হইবে। মনােজের চিঠি পড়িয়া সুধা ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ঠিক, ঠিক। আমার ওই রকমই হইয়াছে। প্রেমরােগের বােধ হয় ওই লক্ষণদিবারাত্র চিন্তা, মন খারাপ, বন্ধু-বান্ধব বিষবৎ। বাবার ডাক্তারী শাস্ত্ৰ খুলিলে বােধ হয় ইহার ঔষধ মিলিতে পারে। কিন্তু সে ঔষুধ সুধা কিছুতেই খাইবে না। কারণ এ রােগের যন্ত্রণা থাকিলেও রােগ সারাইতে ইচ্ছা করে না। সুধার মনে পড়ে, যখন নূতন কান ফুটাইয়া ফুল পরিয়াছিল, কানে খুব লাগিত । তবু তাে সুধা ফুল দোলাইতে ছাড়ে নাই। মনােজ বাতাসে তাহার চুলের গন্ধ পায়। তাহার চুলের গন্ধ বুঝি এতদুর যাইতে পারে ! পাগল ! নিশ্চয় পাশের বাড়ির কোন মেয়ে সর্বাঙ্গে এসেন্স ঢালিয়া মনােজের মন ভুলাইবার চেষ্টা করিতেছে। মনােজকে সাবধান করিয়া দিতে হইবে। মনােজের সন্দেহ দেখিয়া সুধার হাসি পায়, ভালও লাগে । তাহার জন্য একজন দিবারাত্র চিন্তা করিতেছে, তাহাকে না দেখিয়া একজনের জীবন বিস্বাদ হইয়া উঠিতেছে, পাছে তাহাকে হারাইতে হয়, এই ভয়ে একজনের উৎকণ্ঠার অন্ত নাই—ভারি ভাল লাগে ইহা ভাবিতে। প্রেমের দেবতা অদ্ভুতকর্মা ব্যক্তি, হঠাৎ একজনের মূল্য আর একজনের কাছে কত অসম্ভবরূপে বাড়াইয়া দেয়। অনেকদিন পরে সুধা সেদিন বিকালবেলায় ছাদে উঠিল। দেখিল, সুধার প্রেম !! ভূষণবাবুর তেতলার ঘর আবার খােলা হইয়াছে। বউটির মৃত্যুর পর অনেকদিন বন্ধ ছিল। একজন বৃদ্ধা সেই ঘরে ঘােরাঘুরি করিতেছে। সুধা শুনিয়াছে, ভূষণবাবুর মা, কাশীতে পুণ্যসঞ্চয় দিন কয়েকের জন্য স্থগিত রাখিয়া, বিপত্নীক পুত্রকে সান্ত্বনা দিতে আসিয়াছেন। বয়স হইলেও শরীর বেশ শক্ত ও পােক্ত, লম্বা দোহার গঠন, মাথার চুল পুরুষের মত ছােট করিয়া ছাটা, কোমর হইতে দেহের উপরের ভাগট সামনের দিকে একটু ঝুকিয়া আছে, একটুখানি খোড়াইতেছেন। তাহাকে দেখিয়া বৃদ্ধা, ঢেকিতে পা দিবার ভঙ্গীতে, আলিসার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিলেন, তুমিই রাঘববাবুর মেয়ে ?—ভূষণ তােমাদের নাম করে। সুধা নমস্কার করিয়া কহিল, আপনি বুঝি ভূষণবাবুর মা ? কবে এলেন? এসেছি দিন কয়েক, বিপদের খবর পেয়ে আসতে হ’ল, ছেলে অনেক করে চিঠি লিখেছিল। হলে বাবা বিশ্বেশ্বরের ছিচরণ ছেড়ে কোথাও নড়তে ইচ্ছে করে না।-বলিয়া বিশ্বেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম করিলেন। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস মােচন করিয়া কহিলেন, ছেলেটার অদেষ্ট! এই বয়েসে দু-দুটো সােনার চাঁদের মত বউ গেল। বলি, হতভাগীদেরও পােড়। কপাল ! এমন সােয়ামী, এমন সােনার সংসার দুদিন ভােগ করতে পেলে না ! সুধা বলিয়া ফেলিল, দেখে শুনে আর একটি বউ আনুন। বৃদ্ধা মৃদু হাস্য করিয়া মাথা নাড়িতে নাড়িতে কহিলেন, তার জন্যই তাে এসেছি মা। ভূষণের কিই বা বয়েস। যেটের কোলে চল্লিশে পা দিয়েছে কি দেয় নি, তা ছাড়া ছেলে তাে হয় নি, সবগুনােই মেয়ে, রাজত্ব কে ভােগ করবে মা? তবে মা, রূপসী মেয়েতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে—বড় ঠুনকো, বড় আবদারী। এবার আর রূপ দেখব না, ১০৬ সুধার প্রেম কিন্তু বেশ শক্ত-পােক্ত মাঝারি গােছের মেয়ে আনব, যে সংসার আর সােয়ামী দুই ঘাড়ে তুলে নিতে পারবে।-বলিয়া সুধার দিকে তাকাইয়া বােধ হয় মনে মনে মাপ-জোপ করিতে লাগিলেন। সুধা মুখ ফিরাইয়া লইয়া মনে মনে কহিল, এ পরের জিনিসে নজর দিয়ে কি হবে মা? তা ছাড়া তােমাদের সংসার কত বড় জানি না, শুধু ঐ স্বামীকেই ঘাড়ে বইবার মত শক্ত-পােক্ত মেয়ে বাংলা দেশে মিলবে কি ? কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া বৃদ্ধা কহিলেন, তােমার মা নেই, না? সুধা ম্লান মুখে ঘাড় নাড়িল । বৃদ্ধা কহিলেন, তাই এখনও বাপের কাছটিতে আছ । বয়েস তাে তােমার কম হয় নি মা। বোধ হয়- সুধা কহিল, সতরাে । বৃদ্ধা কহিলেন, তাই কম কি মা ! আমাদের কালে বারাে বছর পেরােলেই বাপ-মায়ের অনুজল উঠে যেত, আজকাল চব্বিশেও চাড় পড়ে না। তা মা, তােমাকে আমার ভারি ভাল লাগছে। তােমার মত যদি একটি মেয়ে পেতাম। সুধা কথা উল্টাইয়া দিয়া কহিল, ভূষণবাবুর ছােট মেয়েটিকে কে দেখছে ? একজন ঝি। বউমা বেঁচে থাকতেই এই ব্যবস্থা ছিল। নিজের ব্যােগ নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা পড়ে থাকত তত ছেলেপিলে দেখবে কখন ? সুধা কহিল, সত্যি, বেচারী ভারি ভুগত, ভূষণবাবু খুব সেবা করতেন। বৃদ্ধা প্রবলভাবে ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে কহিলেন, সেদিকে আমার ভূষণের ত্রুটি পাবে না মা। বউদের ভারি আদর। এ কি বুড়ী মা যে,

সুধার প্রেম
১০৭
মরে গেলেও মনে পড়বে না।—বলিয়া সক্ষোভে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া
কহিলেন, শুধু সেবা !
কত টাকা খরচ করেছে। আজ পুরী, কাল
ভূবনেশ্বর, তার ওপর এই কলকাতা শহরে মাসে মাসে তিন-চারশাে
টাকা খরচ করে আজ এক বছর ধ'রে ব'সে আছে।
সুধা কহিল, তা আপনারা তাে খুব বড়লােক শুনেছি।
আত্মপ্রসাদ ও গর্বের আভায় বৃদ্ধার খাজ-কাটা মুখও কিঞ্চিৎ মসৃণ
হইয়া উঠিল। কহিল, ঠিকই শুনেছ মা। যদি যাও তাে নিজের চোখেই
দেখতে পাবে। কর্তারা যা রেখে গেছেন, ভূষণ অমন সাতটা বউয়ের
চিকিচ্ছে করালে ও কিছু হবে না, তবু দেখাশুনা করতে হবে মা! ভূষণ
যে ম্যানেজার-গােমস্তার হাতে সব ছেড়ে চুপচাপ বসে আছে।
সুধা কহিল, তা এখন তাে গেলেই পারেন।
বৃদ্ধা হাসিয়া কহিলেন, যাবে না। তবে লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যেতে ছেলের
মন সরছে না। একটি তােমার মত লক্ষ্মী
সুধা বাধা দিয়া কহিল, দেরি হয়ে গেছে, নীচে যাই, বাবা অনেকক্ষণ
একা আছেন।
বৃদ্ধা সস্নেহে কহিলেন, যাও মা। দুপুরবেলা সময় পাও তো
আমাদের বাড়িতে এস না কাল ।
সুধা নীরস কণ্ঠে কহিল, আমার তাে সময় হয় না।
বৃদ্ধা কহিলেন, বেশ, আমিই না হয় যাব মা।
তার পরদিন বিকালবেলায় বৃদ্ধা বেড়াইতে আসিলেন। বিশু হন্তদন্ত
হইয়া ছুটিয়া আসিয়া আগেই খবর দিল, ভূষণবাবুর মা আসছেন। খুব
বড়লােক, বেশ ক'রে খাতির করাে।
সুধা বিরক্ত হইয়া কহিল, এলেই বা। বড়লােক বলে সাষ্টাঙ্গে পড়ে
থাকতে হবে নাকি? যা করবার আমি করব, তুমি নীচে যাও।

১০৮ সুধার প্রেম বিশু কাচুমাচু মুখে কহিল, যাচ্ছি, মানে ভূষণবাবু খুব বড়লােক কিনা, দোয়ানিবাবুর মত কিপটে নয়, একটা টাকা দিয়েছে আমাকে। সুধা আগাইয়া আসিয়া বৃদ্ধাকে অভ্যর্থনা করিল এবং নিজের ঘরে লইয়া গিয়া কহিল, বসুন। বৃদ্ধ। চারিদিকে চাহিয়া কহিলেন, বসছি মা। এসেছি যখন, বসতে হবে বইকি। কিন্তু তােমার বাবার সঙ্গে একবার দেখা করা উচিত নয় কি ? দেখা করবেন? আচ্ছা, আসুন।-বলিয়া সুধা বৃদ্ধাকে লইয়া রাঘব- বাবুর ঘরে প্রবেশ করিল। রাঘববাবু তাকিয়া ঠেস দিয়া চোখ বুজিয়া গড়গড়া টানিতেছিলেন। সুধা মৃদু কণ্ঠে ডাকিল, বাবা! বাঘববাবু চোখ না খুলিয়াই জবাব দিলেন, কি মা? ভূষণবাবুর মা এসেছেন। রাঘববাবু সােজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া কহিলেন, আপনি এসেছেন। বসুন। ওরে সুধা, একটা বসতে কিছু দে মা। ভূষণবাবুর মুখে শুনেছিলাম—ভারি অনুগ্রহ আপনার। ক্ষোভের সহিত কহিলেন, নড়তে পৰ্যন্ত পারি না-না হলে আমারই উচিত দেখা করা, খোঁজ-খবর করা কি করব, ভগবান মেরেছেন বলিয়া মুখটি করুণ করিয়া তুলিলেন। বৃদ্ধা স্ত্রীজনােচিত মৃদু কণ্ঠে কহিলেন, ভূষণের মুখে আপনার প্রশংস আর ধরে না ; বলে, খুব স্নেহ করেন আমাকে—ঠিক বাপের মত। বলিয়া মনে মনে বােধ করি জিব কাটিলেন । রাঘববাবু ঘাড়টি ঈষৎ নাড়িতে নাড়িতে কহিলেন, আমি আর বেশি কি করি! ভূষণের মত ছেলে যার কাছে যাবে, সেই স্নেহ করবে ও রকম সৎ ছেলে আজকাল দেখা যায় না।

সুধার প্রেম ; রাঘববাবুর মুখে ভূষণের প্রশংসা শুনিয়া সুধা বিরক্ত হইল। মনে মনে বলিল, বাবার আজকাল শুধু ভূষণ আর ভূষণ, মননজের নাম পৰ্যন্ত করেন না। বৃদ্ধা একবার সুধার মুখের পানে কটাক্ষে চাহিয়া কণ্ঠস্বর একটু উচ্চগ্রামে চড়াইয়া কহিলেন, বেশ তো। আসুন, বদলাবদলি করি। রাঘববাবু বিস্মিত নয়নে তাকাইলেন। বৃদ্ধা হাসিয়া কহিলেন, আপনারা তাে আমাদের পালটা ঘর, আমার ছেলেটিকে আপনি নিন, আপনার মেয়েটিকে আমায় দিন । এতক্ষণে বৃদ্ধার বক্তব্য বুঝিতে পারিয়া রাঘববাবুর সারা মুখ আনন্দে উজ্জ্বল ও চোখ দুইটি কৃতজ্ঞতায় সজল হইয়া উঠিল ; বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন, গরিবের ওপর এ যে অসম্ভব দয়া ! পুলকিত কণ্ঠে বৃদ্ধা কহিলেন, দয়া নয়, বােস মশাই। আপনার মেয়েটিকে আমার বড় ভাল লেগেছে, ছাড়তে ইচ্ছে করছে না আর। সুধা সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল, মনে হইল, প্রতিবাদ করে; কিন্তু স্ত্রীলােকের চিরন্তন লজ্জা তাহার জিহ্বা চাপিয়া ধরিল। সেই রাত্রে সুধা মনােজকে তাড়া দিয়া চিঠি দিল। দিন দুই পরে-হঠাৎ ঠাণ্ডা লাগিয়া রাঘববাবুর জ্বর আসিল। সামান্য সর্দিজ্বর ভাবিয়া রাঘববাবু নিজেই হােমিওপ্যাথি ঔষধ ব্যবস্থা করিয়া খাইতে লাগিলেন। কিন্তু জর দিন দিন বাড়িতে লাগিল এবং বুকের সর্দি জমাট বাঁধিয়া পাথরের মত শক্ত হইয়া উঠিতে লাগিল। রাঘববাবু সুধাকে কহিলেন, নিমােনিয়া। আর বাচব না মা। সুধা ভূষণকে ডাকাইয়া হাতের কয়েকগাছি চুড়ি তাহাকে দিয়া কহিল, এগুলাে বিক্রি করে দিতে পারেন? ভূষণ আশ্চর্য হইয়া কহিল, কেন ?

১১০ সুধার প্রেম বাবার চিকিৎসা করাতে হবে—হােমিওপ্যাথিতে হবে না। ভূষণ চুড়িগুলা ফিরাইয়া দিয়া তিরস্কারের স্বরে কহিল, ছিঃ সুধা। তােমার বাবার চিকিৎসা করানাে কি শুধু তােমারই দায়িত্ব, আমার নয় ? সুধা নীরস স্বরে কহিল, না না ভূষণবাবু, ওসব কথা ছেড়ে দিন, আমার বাবার দায়িত্ব আমার ওপরেই থাক, আর কারও ভাগ নিয়ে কাজ নেই। ভূষণ প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, বেশ কথা! সব ঠিকঠাক, এখন বলছ, ভাগ নিয়ে কাজ নেই ! দুদিন পরে তাে সবটাই নিতে হবে। যাকগে, এখন ও নিয়ে গােলমাল করে লাভ নেই, তুমি তােমার বাবার কাছে গিয়ে ব’স, আমি ডাক্তার আনছি।-বলিয়া প্রতিবাদের অবসর না দিয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। সুধাও অসুস্থ হইয়া পড়িল। সারাদিন শরীর ম্যাজম্যাজ করে, কিছুই খাইতে ইচ্ছা করে না। হঠাৎ একদিন দুপুরে ভাত খাইতে বসিয়া বমি করিয়া ফেলিল। ঝি মােক্ষদা তাড়াতাড়ি ধরিল ও মুখ ধােয়াইয়া, বিছানায় শােয়াইয়া দিয়া চুপিচুপি কহিল, দিদিমণি, একটা কথা বলব? সুধা তাহার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু নয়নে চাহিল। কি একটু ইতস্তত করিয়া কহিল, তােমার বােগ আমি ধরেছি। সুধা জবাব দিল না, নীরবে চাহিয়া রহিল। মােক্ষদা ফোকলা মুখে ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, তােমার থােকা হবে। সুধা বিস্ময় ও আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিয়া, দুই চোখ ডাগর করিয়া কহিল, তাই নাকি? মােক্ষদ কহিল, হ্যা, আমি এ রকম অনেক দেখেছি—ঠিক বলছি আমি বিবর্ণ মুখে সুধা কহিল, কি হবে মােক্ষদা? এক মুহূর্তে মােক্ষদা দাসিত্বের নীচু ধাপ হইতে সখিত্বের সমপর্যায়ে সুধার প্রেম ১১১ উঠিয়া আসিল; আশ্বাস দিয়া কহিল, কি আবার হবে? দাদাবাবুকে আসতে লিখে দাও। বিয়ে হয়ে গেলে আবার কিসের ভাবনা! সেই রাত্রেই ভূষণের মা রাঘববাবুকে দেখিতে আসিলেন, সঙ্গে ভূষণ । রাঘববাবু চোখ বুজিয়া পড়িয়া ছিলেন। বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন আছেন আজ? রাঘব ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত কণ্ঠে কহিলেন, ভাল নয়, বার্ধক্যের বন্ধু না নিয়ে যাবে না বােধ হয়। বৃদ্ধা আন্দাজে কথাটা বুঝিয়া কহিলেন, এত শিগগির গেলে চলবে কেন? মেয়ের বিয়ে দিয়ে তবে ছুটি। রাঘববাবু কপালে হাত দিয়া কহিলেন, অদৃষ্টে থাকতে হবে। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, সুধারও শরীর ভাল নেই। ভূষণ শতরঞ্জির উপর বসিয়া ছিল, একেবারে ফুটবলের মত লাফাইয়া উঠিয়া হুঙ্কার দিল, ভাল নেই মানে? রাঘববাবু কহিলেন, কি জানি। সারাদিন কিছু খায় নি, এমনই শুয়ে আছে। আচ্ছা, দেখছি আমি ।-বলিয়া ভূষণ সুধার কক্ষে চলিল। ভূষণ যাইতেই বৃদ্ধা কহিলেন, আমার মনে হয়, আশীৰ্বাদটা হয়ে যাওয়াই ভাল, দিন চার পরে ভাল দিন আছে, ভূষণ পাজি দেখেছে। রাঘববাবু কহিলেন, বেশ তাে। বৃদ্ধা কহিলেন, কার্তিক মাসে তো বিয়ে হবে না, অঘ্রাণের গােড়াতেই হবে। তা করতে করতে আপনিও সেরে উঠবেন। দুপুর হইতে সুধা তাহার ঘরটিতে নির্জীবের মত বিছানায় পড়িয়া ছিল। ঘুমায় নাই, ঘুমাইতে পারে নাই। ক্রমাগত চিন্তার বুদ্ধ উঠিয়া তাহার মনকে আন্দোলিত করিয়াছে,একবারও স্থির হইতে ১১২ সুধার প্রেম দেয় নাই। মােক্ষদার রােগনির্ণয় শুনিয়া প্রথমটা সে ঘাবড়াইয়া গিয়াছিল, কিন্তু তাহার পর মােক্ষদার প্রবােধ-বাক্যে তাহার মন সায় দিয়া সান্ত্বনা মানিয়াছিল। সত্যই তাে! ভাবনার কারণ কারণ কি? তাহাদের তত সত্যকার বিবাহ হইয়া গিয়াছে—শুধু গােটা কয়েক মামুলী মন্ত্র পড়া বাকি। দেহ ও মনের একান্ত মিলনই তাে বিবাহ। সেদিক দিয়া তাহাদের কোন ত্রুটি আছে নাকি ? তবে আর লজ্জা কিসের ? হাঁ, ভয় আছে বটে—যদি মনােজ না আসে, যদি তাহাকে চিরদিনের মত ত্যাগ করে ? কিন্তু মনােজ কি তাহা করিবে ? মনােজের মুখের হাসি, চোখের দীপ্তি, আলিঙ্গনের আকুলতা এবং চুম্বনের প্রগাঢ়তা সমস্বরে আশ্বাস দেয়-মনােজ আবার আসিবে। তাহা ছাড়া সেদিন তাে সে চিঠিতে লিখিয়াছে যে, যদি তাহার বাবা ও মার মত না হয়, তাহা হইলেও সে সুধাকে বিবাহ করিবে, সুধা যেন নিশ্চিন্ত থাকে। সুধা তাে নিশ্চিন্তই আছে, কিন্তু আর বেশি দেরি করা উচিত হইতেছে না। সুধা মনােজকে চিঠি লিখিল—বাবার ভারি অসুখ, আমারও অসুখ, পত্রপাঠ চলে এস। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে মােক্ষদা খবর লইতে আসিল। মােক্ষাকে দেখিয়া তাহার লজ্জা করিতে লাগিল—সে যেন তাহার জীবনের একটি অতি গােপন রহস্য জানিয়া ফেলিয়াছে। মােক্ষদা মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল, কেমন আছ গো দিদিমণি? সুধা গম্ভীর মুখে কহিল, ভাল আছি। তারপর চিঠিটি তাহার হাতে দিয়া কহিল, এই চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলে দিও তাে। জান তাে, কেমন করে ফেলতে হয়? মােদা দাত বাহির করিয়া হাসিয়া, ঘাড় কাত করিয়া কহিল, সব জানি দিদিমণি। দাদাবাবুকে নিখলে বুঝি? দাদাবাবু চিঠি পেয়েই চলে আসবে, তুমি কিছু ভেবে নি। মোক্ষদাকে বিদায় দিয়া সুধা সুধার প্রেম আবার ভাবিতে শুরু করিল। মনােজ আসিয়া কি বলিবে, কে জানে! যা দুষ্ট মানুষ, কত কি ঠাট্টা করিবে ! এবারে সে স্পষ্ট বলিবে, আর দেরি নয় বাপু। বাবা-মার মত হােক আর না হােক, বিয়েটা হয়ে যাক। হলে লােকে কি বলবে? বাবা-মাকে এত ভয় কিসের মনােজের ? মনােজ যদি আপত্তি করে তাে সুধা শুনিবে না, চোখের জল টানিয়া বাহির করিবে । তাহা হইলেই মনােজ জব্দ হইবে। একবার সে মুখভার করিয়াছিল বলিয়া মনােজের অস্থিরতার কথা তাহার মনে পড়িল। তাহাকে কাদিতে দেখিলে মনােজ সব করিতে পারে। বিবাহ হইয়া গেলে তাহারা এ বাড়িতে থাকিবে না, অন্য একটা ভাল বাড়ি ভাড়া করিবে। সেখানে কাহারও কর্তৃত্ব চলিবে না, এমন কি মনােজেরও না। একটি কথা বলিতে আসিলে সে এমন ধমক দিবে যে, মনােজ মুখটি চুন করিয়া থাকিবে। তারপর থােক। আসিবে-মনােজের মত সুন্দর, অমনই চঞ্চল, অমনই দুষ্ট। তখন আর মনােজের দিকে মন দেওয়ার সময় থাকিবে না, থােকাই সমস্ত দখল করিয়া বসিবে, থােকারই খবরদারি করিবার জন্য তাহার দিবারাত্র নিশ্বাস ফেলিবার সময় থাকিবে না। এমনই চিন্তা করিতে করিতে কখন দিনের আলাে নিবিয়া আসিল, সুধা তাহা বুঝিতেও পারিল না। মােক্ষদা আসিয়া তাগিদ দিল, ও দিদিমণি ! ওঠ গাে, গা-হাত ধােও। আজ আর ভাল লাগছে না।-বলিয়া সুধা শুইয়াই রহিল । সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট হইয়া উঠিতে লাগিল, এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে যে আনন্দময় সুরটি এতক্ষণ মনের মধ্যে বাজিতেছিল, তাহা থামিয়া গিয়া একটি হতাশাময় সুর বাজিতে লাগিল। যদি মনােজ আর না ফিরিয়া আসে? যদি তাহার হৃদয়ের সমস্ত মধু লুণ্ঠন করিয়া মধুকর পুষ্পস্তরে উড়িয়া যায়, তবে? যাহারা এতক্ষণ তাহাকে সরবে আশ্বাস দিতেছিল, ।

১১৪
সুধার প্রেম
তাহাদের মুখের পানে তাকাইতেই, তাহারা ম্লান ও নত মুখে নীরব হইয়া
রহিল। মনােজ হয়তাে আসিবে না। মনােজ না আসিলে সে কি
করিবে? ভূষণবাবুকে বিবাহ করিবে? ছিঃ ছিঃ! এতবড় অন্যায়,
এতবড় অবিচার সে করিতে পারিবে না। বাবা যাহাই বলুন। কিন্তু
তাহার পর? বাবা যদি সারিয়া না উঠেন, তবে? পৃথিবীতে কেহ
আপনার বলিতে থাকিবে না। সমাজের দুর্যোধনের দল যখন তাহার
শেষ লজ্জাবস্তুটুকু পৰ্যন্ত কাড়িয়া লইবার জন্য টানাটানি করিবে, তখন
সকলে নিব্বিকার দাড়াইয়া দেখিবে, অথবা তারিফ করিবে, তারপর
যেদিন বিষাক্ত ক্ষতের মত সে সমাজের বুকের উপর দগদগ করিতে
থাকিবে, তখন ঘৃণায় ধিক্কার দিবে।
এমন সময়ে কপালের উপর কাহার স্পর্শে চমকিয়া উঠিয়া সুধা
সভয়ে কহিল, কে ?
ভূষণ থতমত খাইয়া কহিল, আমি, মানে ভূষণ।
ভয় কি ?
সুধা উঠিয়া বসিয়া গায়ের কাপড় সামলাইয়া বিরক্তির সহিত কহিল,
হঠাৎ কপালে হাত দিলেন যে ?
ভূষণ লজ্জিতভাবে কহিল, কপালে হাতটা লেগে গেল, অন্ধকার
তা কেমন আছ? শুনলাম শরীর-খারাপ।
সুধা নীরস কণ্ঠে জবাব দিল, কে বললে আমার শরীর-খারাপ ?
ভূষণ ঘাবড়াইয়া গিয়া কহিল, শরীর-খারাপ নয় ?
তােমার বাবা বললেন, আচ্ছা, দেখি জিজ্ঞাসা করে ।
সুধা কহিল, শরীর একটু খারাপ হয়েছিল, এখন ভাল আছি।
ভূষণ যেন কৃতার্থ হইয়া গেল; একমুখ হাসিয়া কহিল, ভাল আছ?
এমনই চিন্তা হয়েছিল।
সুধা ভ্রু কুঁচকাইয়া কহিল, আমার অসুখে আপনার চিন্তা কেন ?
কিনা।

সুধার প্রেম ১১৫ ভূষণ দুই চোখ বড় করিয়া বিস্মিত মুখে কহিল, বা রে ! আমার চিন্তা হবে না! কি বল ! তারপর হাসিয়া কহিল, হেঃ হেঃ, সারাজীবন ধরে চিন্তা করবার ব্যবস্থা করছি। এমন সময়ে বৃদ্ধা আসিয়া হাজির হইয়া উৎকণ্ঠিত স্বরে কহিলেন, কেমন আছ মা? শরীরটা কি খুবই খারাপ? সুধা উঠিয়া দাড়াইয়া মুখ নামাইয়া কহিল, আজ্ঞে না, ভাল আছি। বৃদ্ধা তাহাকে সস্নেহে বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া কহিলেন, মুখটি শুকিয়ে গেছে। একা রাত জাগতে হচ্ছে, তাই বােধ হয় শরীর-খারাপ হচ্ছে। ভূষণ, তুই তাে- বলিতে হই না, ভূষণ সােৎসাহে কহিল, নিশ্চয়ই, আমি আজ থেকেই আসব। সুধা বাধা দিয়া কহিল, না না, কিছু দরকার নেই। রাত জাগতে তাে হয় না। পাশে থেকে ঘুমুই, বাবা দরকার হলে উঠিয়ে দেন। বৃদ্ধা কহিলেন, বেশ। কিন্তু দরকার হলেই বলে মা, লজ্জা করে । ভাল-ভালস্তে দু হাত এক হয়ে গেলেই তােমার বিপদ তত ভূষণকেই ঘাড় পেতে নিতে হবে মা।—বলিয়া ভূষণের দিকে তাকাইয়া কহিলেন, রাঘববাবুর মত হয়েছে। ওই দিনেই আশীর্বাদ হবে। অপ্রত্যাশিত আনন্দে ভূষণের চোখ দুইটা জ্বলিয়া উঠিল, আগ্রহভরা কণ্ঠে কহিল, সত্যি? সুধা কাঠ হইয়া দাড়াইয়া রহিল । বৃদ্ধা কহিলেন, আজ আসি, মা, কাল আবার আসব। ভূষণ মাকে কহিল, মা, শরীরটার সম্বন্ধে একটু বৃদ্ধা পুত্রের অত্যধিক দরদ দেখিয়া বােধ করি ক্ষুন্ন হইলেন, তবু যতদূর সম্ভব স্নেহের সহিত কহিলেন, হ্যা মা, সাবধানে থেকো।

সুধার প্রেম সুধা কাঁদিয়া মাতা ও পুত্রকে বিদায় দিয়া সুধা রাঘববাবুর কাছে আসিয়া বসিল। রাঘববাবু কহিলেন, কিছু খেয়েছিস মা ? সুধা ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, হাঁ। রাঘববাবু কহিলেন, রাত জাগার জন্যেই হয়েছে বােধ হয়। আজ আর রাত জেগে না, আমি তাে এমনই বেশ থাকি। সুধা নীরবে বাবার বুকে হাত বুলাইতে লাগিল। রাঘববাবু কহিলেন, ভূষণের মা আশীর্বাদের দিন স্থির করে গেলেন। সুধা বিরক্তির সহিত কহিল, না বাবা, এখন থাক। তুমি সেরে না উঠলে ওসব কিছু হবে না। রাঘববাবু কন্যার পিঠে একবার হাত বুলাইয়া কহিলেন, আর যদি আমি সেরে না উঠি মা ? তােমাকে এমন অসহায় ফেলে গিয়ে আমি যে মরেও শান্তি পাব না। ফেলিয়া কহিল, না বাবা, ওসব কথা বলাে না, আমার মনে যে কি হচ্ছে!-বলিয়া আঁচলে মুখ চাপিল। দিন দুই পরে। সন্ধ্যার সময়ে সুধা ছাদে একলাটি চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। দুই দিনেই চেহারা শীর্ণ ও মলিন হইয়া গিয়াছে; চোখের কোলে কালি জমিয়াছে, মাথার চুল রুক্ষ ও বিশৃঙ্খল । দেহ ও মন দুইই অত্যন্ত ক্লান্ত। আজ সারাদিন প্রত্যেক মুহূর্ত সে মনােজের আসার আশা করিয়াছে। কত জনের পায়ের শব্দ, গলার স্বর শুনিয়া কত বার সে চমকিয়া উঠিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। মনােজ আজও আসে নাই বা কোন চিঠি দেয় নাই। কাল রাত্রি হইতে রাঘবের অবস্থাও খারাপের দিকে চলিয়াছে। ভূষণ সকালে ডাক্তার ডাকিয়া আনিয়াছিল ; ডাক্তার ঔষধ দিয়াছে, কিন্তু আশা দেয় নাই। সুধার চিন্তার সীমা নাই। মনােজ আসিল না কেন? বাবা-মায়ের মত করিতে পারে নাই, সেইজন্যই বােধ হয় পাছু হটিয়াছে। প্রেম করিবার সময়ে বাপ-মায়ের কথা ছেলেদের সুধার প্রেম ১১৭ ৩ মনে পড়ে না। প্রেমের দায়িত্ব ঘাড়ে পড়িতে আসিলেই বাবা-মাকে ঠেকাইয়া দিয়া গা-ঢাকা দেয়। কিন্তু মনােজ কি অন্য সকলের মত অপদার্থ, হৃদয়হীন ? সুধা তাহা কোন দিন ভাবে নাই, কোন দিন ভাবিতে পারিবে না। আকাশে শুক্লা সপ্তমীর চাদ উঠিয়াছিল, তাহারই স্বল্প আলােকে বাম হাতের অনামিকায় সােনার আংটিটি চিকচিক করিতে লাগিল। সেই দিকে তাকাইয়া সুধার সেই দিনের সন্ধ্যাটির কথা মনে হইল, যেদিন মনােজ তাহাকে আংটিটি পরাইয়া দিয়াছিল। আজও তেমনই সন্ধ্যা, আকাশ তেমনই প্রশান্ত নীল ; আকাশের বুকে তেমনই অগণিত তারা, তেমনই চাদ ; কিন্তু সেদিন হাতে মিলিয়াছিল হাত, হৃদয়ে মিলিয়াছিল হৃদয় ; আর আজ দুইটি হৃদয়ের মাঝে শত ক্রোশের ব্যবধান, হয়তো শত জীবনের ব্যবধান। হঠাৎ সিড়িতে কাহার পদশব্দ শােনা গেল । তবে কি মনােজ আসিয়াছে ? সুধা কান পাতিয়া রহিল। নিশ্চয় তাহার জুতার শব্দ। সুধার বুকের ভিতরে ঘােড়-দৌড় শুরু হইল, সৰ্বশরীর থরথর করিয়া কপিতে লাগিল। সুধা কি করিবে? সুধা কি ছুটিয়া যাইবে ? বলিবে, আসিয়াছ ? এতদিনে মনে পড়িয়াছে ? বুকে ঝাপাইয়া পড়িয়া বলিবে, আমাকে একান্ত করিয়া লও, আমার আর কেহ নাই ? হঠাৎ ঘনঘটা করিয়া অভিমানের মেঘ ঘনাইয়া আসিল। সুধা যাইবে না, এইখানে এমনই করিয়া বসিয়া থাকিবে। কেন মনােজ তাহাকে এত ভাবাইয়াছে? সুধা আঁচলে মুখ ঢাকিয়া বসিয়া রহিল। জুতার শব্দ কাছে আসিয়া থামিল। ইহার পর? জলভরা মেঘ দেখিয়া বারিবর্ষণের আশায় সারা পৃথিবী যেমন উন্মুখ হইয়া উঠে, তেমনই মনােজের স্পর্শের আশায় সুধার সমস্ত শরীর উন্মুখ হইয়া উঠিল। হঠাৎ মেঘ-গর্জনের মতই গলা-খাঁকারির শব্দ হইল।. মনােজ তাে নয়। তবে?

১১৮ সুধার প্রেম সুধা চোখ মেলিয়া দেখিল, তাহার একান্ত কাছে দাড়াইয়া ভূষণ ; তাহার দিকে—শক্ত রােগে অনেক দিন অনশনের পর রােগী অন্নপথ্যের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, ঠিক তেমনই ভাবে তাকাইয়া আছে। কলপ- মাখানাে চুল তেল দিয়া পালিশ করিয়াছে ; দাড়ি-গোঁফ নিৰ্ম্মল করিয়া কামাইয়াছে ; গায়ে আজানুলম্বিত ঝকঝকে তসরের পাঞ্জাবি, এবং পায়ে চকচকে পেটেন্ট লেদারের পাম্প- পরিয়াছে। সুধা ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া ভীত ও সন্ত্রস্ত স্বরে কহিল, আপনি এখানে কেন? ভূষণ হাসিয়া কহিল, আমি ? রাঘববাবুকে দেখতে এসেছি। বেশ তাে, তঁার ঘরে যান। ভূষণ তাহার ফোলা ফোলা চোখের দৃষ্টি যতদূর সম্ভব ঘন করিয়া কহিল, শুধু কি তাকেই দেখতে এসেছি সুধা? তােমাকেও। সুধা শক্ত হইয়া কহিল, আমাকে দেখবার কি দরকার আপনার ? ভূষণ দুই হাতে বুক চাপিয়া, ঘাড় হেলাইয়া, চক্ষে মিনতি ভরিয়া, গাঢ় কণ্ঠে কহিল, তা কি তুমি বােঝ নি সুধা? তােমাকে ভালবাসি যে। সুধা মনে মনে কহিল, ভালবাসা নম্বর দুই, মধুকরের পর মহন্তী, একজন লুণ্ঠন করিয়া পলাইয়াছে, আর একজন পেষণ করিবার জন্য পা বাড়াইয়াছে। জ কুঁচকাইয়া সুধা কহিল, সত্যি ভালবাসেন? আগেকার পােঙ্গেই এক পা আগাইয়া মস্তক আন্দোলিত করিয়া ভূষণ কহিল, সত্যি সুধা। তারপর দুই হাতের আঙুলগুলা বিদারণ-ভঙ্গীতে বাকাইয়া কহিল, যদি বুক চিরে দেখতে পারতাম, দেখতে পেতে সুধা হাসিয়া ফেলিয়া শ্লেষের সহিত কহিল, কার ছবি আঁকা আছে এ বক্ষ মাঝারে, না ভূষণবাবু?

সুধার প্রেম
১১১
ভূষণ হাঁ-সূচক ঘাড় নাড়িল ।
সুধা কহিল, কিন্তু আপনার সেদিনকার স্ত্রীকেও তত খুব ভালবাসতেন
দখেছি। তার ছবিও নিশ্চয় ওখানে আঁকা আছে ?
পােজ পরিত্যাগ করিয়া ভূষণ লজ্জিতভাবে কহিল, তা আছে সুধা।
আর আপনার প্রথম স্ত্রী ? তার ছবি ?
ভূষণ অপ্রতিভ হইয়া কহিল, তাতা—তারও আছে বােধ হয়।
সুধা বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া কহিল, তা হলে তােত আপনার হৃদয়টিতে
আপনি একটি চিত্র-ভবন খােলবার চেষ্টায় আছেন দেখছি। পরক্ষণেই
ম্ভীর হইয়া কহিল, তা বেশ করেছেন ভালবেসেছেন, কিন্তু
. ভূষণ প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, কিন্তু টিন্তু নয় সুধা।
আশীর্বাদের দিন সব ঠিক।
সুধা কহিল, তা হােক, কিন্তু আপনার আগেই যে আর একজন
আমাকে ভালবেসে বসে আছে।
ভূষণ আঁতকাইয়া উঠিয়া কহিল, আর একজন ? কে সে?
কে সে ? ওঃ,
সেই সিটকে ছােড়া তাে?
তাহােক সুধা, তাকে আমি পেরে উঠব।
বলিয়া আস্তিন গুটাইল।
সুধা ফিক করিয়া হাসিয়া কহিল, মল্লযুদ্ধ করবেন নাকি ? কিন্তু
তাতে কোন ফল হবে না ভূষণবাবু, আমিও যে তাকে ভালবাসি।
আর শুধু ভালবাসি কেন, আমাদের বিয়েও হয়ে গেছে।
দুই চোখ কপালে তুলিয়া প্রবল বিস্ময়ের সহিত ভূষণ কহিল, আঁ!
বয়ে হয়ে গেছে। তবে যে রাঘববাবু-
সুধা ধীরে ধীরে কহিল, বাবা জানেন না।
অত্যন্ত অবিশ্বাসের সহিত ভূষণ কহিল, পাগল! তা কি হয়, বাবা
জানবে না, আর মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে।

১২০ সুধার প্রেম সুধা দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, আমি সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আর কাউকে বিয়ে করবার আমার উপায় নেই। ভূষণের মুখের ভাব কঠিন হইয়া উঠিল ; ক্রোধমিশ্রিত স্বরে কহিল, তবে তােমরা ধাপ্পা দিয়ে আমাকে এত দৌড়-ঝাপ করালে কেন? এত পয়সাই বা খরচ করালে কেন? তা ছাড়া মাকে এমন করে ঠকালে কেন? সুধা নীরস কণ্ঠে কহিল, ধাপ্পা আমরা কাউকে দিই নি, ঠকাতেও কাউকে চাই নি। যা কিছু আপনি নিজে হতেই করেছেন। আর খরচ? কত খরচ হয়েছে আপনার, বলুন? ভূষণ নাসিকা উচাইয়া ঝাজালাে স্বরে কহিল, তার হিসেব রেখেছি নাকি ? জান না, কত খরচ হয়েছে ? তােমাদের সমস্ত পূজোর খরচ কে চালিয়েছে ? ডাক্তারের ফী দেবার সময় ছিলে কোথায়? তা ছাড়া ওই বিশে হতভাগা কি কম টাকা নিয়েছে আমার কাছ থেকে। সুধা কহিল, বেশ। আমাকে একটা হিসেব দেবেন। আমি সব আপনাকে দিয়ে দেব। মুখ ভ্যাংচাইয়া ভূষণ কহিল, দিয়ে দেব! টাকার গাছ আছে কিনা বাড়িতে। জানতে কিছু বাকি নেই। হাতের কয়েকগাছি চুড়ি খুলিয়া ভূষণের দিকে বাড়াইয়া দিয়া সুধা কহিল, নিন, আশা করি, এতে আপনার ধার শােধ হবে। ভূষণ হাত নাড়িয়া কহিল, থাক্ থাক্‌, ঢের হয়েছে, আর সাধুগিরি দেখিয়ে কাজ নেই। ব্যঙ্গের স্বরে কহিল, রেখে দাও তােমার ব্যাঙের আধুলি, আখেরে কাজ দেবে, অনেক কষ্ট আছে কিনা কপালে তােমার। সুধা ঈষৎ হাসিয়া কহিল, থাকলেই বা কি করব ভূষণবাবু, উপায় কি? কিন্তু আপনি আর দাড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করছেন কেন?

সুধার প্রেম আর একটি মেয়ে-টেয়ে ঠিক করুনগে। নইলে আশীর্বাদের আয়ােজনটা পণ্ড হয়ে যাবে যে। কড়া গলায় ভূষণ কহিল, তা যাক, তােমাকে তার জন্যে ভাবতে হবে না। ফাজিল মেয়ে কোথাকার! তারপর যাইতে উদ্যত হইয়া আবার ফিরিয়া কহিল, সত্যি তাে? ভূষণ ঘােষ ভারি জেদী লােক- একবার পা বাড়ালে আর মরে গেলেও ফিরবে না কিন্তু। সুধা কহিল, আপনার ফেরবার দরকার হবে না ভূষণবাবু। আমার স্বামী শিগগির এসে পড়বেন। ভূষণ দ্রুকুটি-ভীষণ মুখে কহিল, স্বামী ! ঘাড়ের রক্ত চুষে খেয়ে এর পর স্বামী মোনাে হচ্ছে। স্বামী এর পর আসবেন বইকি। কাজ গােছানাে হয়ে গেছে যে! হাঁকিয়া কহিল, দু পাতা ইংরিজী প'ড়ে উচ্ছন্ন গেছ তােমরা, কিছু অসাধ্যি নেই তােমাদের। সুধা তীব্র চাপা স্বরে কহিল, গােলমাল করবেন না ভূষণবাবু। বাড়ি যান। আপনি আমাদের অনেক উপকার করেছেন, তার জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমাকে বিয়ে করতে না পেরে যদি মনে সত্যি কষ্ট হয়ে থাকে তত মনে করবেন, বিয়ে করেছেন, আমি মরে গেছি। দুদিন সামলে চতুর্থ পক্ষের জন্যে চেষ্টা করবেন। জোটাতেও দেরি হবে না। আর টাকা ? আমি সুদে আসলে সব টাকা আপনার পাঠিয়ে দেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ভূষণ সুধার দিকে অগ্নি-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিল, খুব বক্তিমে হয়েছে। মেয়ের ভাবনা ভূষণ ঘােষ করে না, একবার হাঁক দিলে দুশশা মেয়ে পায়ে লুটিয়ে পড়বে। আর টাকা? টাকা একবার নিয়ে সবাই দেয়, লােক চিনতে বাকি নেই ভূষণ ঘােষের বলিয়া আপন মনে গজগজ করিতে করিতে ভূষণ নামিয়া গেল।

১২২
সুধার প্রেম
তাহার পরদিন বিকালে বিশু হন্তদন্ত হইয়া আসিয়া হাপাইতে
হাঁপাইতে কহিল, ভূষণবাবুরা চলে যাচ্ছে।
সুধা নিজের ঘরে চুপ করিয়া বসিয়া ছিল, কোন জবাব দিল না।
বিশু বলিতে লাগিল, মােটঘাট বাঁধা হচ্ছে, আজ রাত্রেই পালাবে
বােধ হয়।
সুধা শুধু কহিল, বেশ তাে।
বিশু ভাবিয়াছিল, ভূষণের পলায়ন-সংবাদ শুনিয়া সুধা চঞ্চল হইয়া
উঠিবে, কিন্তু তাহার নিৰ্ব্বিকার ভাব দেখিয়া সে দমিয়া গেল। কহিল,
তা হলে বিয়ে হবে না ?
সুধা বিরক্ত হইয়া কহিল, সে ভাবনা তােমাকে ভাবতে হবে না,
তুমি যাও।
বিত কঁচমাচু হইয়া কহিল, যাচ্ছি, কিন্তু ভূষণবাবু এত চ’টে গেল
কেন বল দেখি?
সুধা কহিল, চটার পরিচয় পেলে কি করে?
বিশু মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে কহিল, মানে, একটা টাকা চাইতে
গিছলাম, তাে তেড়ে মারতে এল।
সুধা রুষ্ট স্বরে কহিল, ভদ্রলােকের ছেলে হয়ে যার-তার কাছে ভিক্ষে
করতে লজ্জা করে না ?
বিশু আমতা আমতা করিয়া কহিল, ভিক্ষে তাে নয়, নিজের লােক
বলেই--মানে, সব এমন ঠিক হয়েও যে ভেঙে যাবে, কে জানে!
বলিয়া সরিয়া পড়িল।
নরনারীর মিলন-ব্যাপারে বাধা ও বিঘ্নের বিপুলতা বিশুর মত
জগতে আর কাহাকে বুঝিতে হইতেছে ?
রাঘববাবু সারাদিন আচ্ছন্নের মত পড়িয়া ছিলেন। সন্ধ্যার সময়

মুথার প্রেম সুধা যখন বুকে মালিশ করিতেছিল, তখন ক্ষীণ কণ্ঠে কহিলেন, কেমন আছিস মা? সুধা কহিল, ভাল আছি বাবা। ভূষণ আজ সারাদিন আসে নি, কোন কাজ-টাজ আছে বােধ হয়। সুধা কহিল, ওঁরা সব দেশে চলে গেছেন। রাঘব ঘােলাটে চোখ দুইটি মেলিয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন। সুধা কহিল, দেশে জমিদারির কি কাজ আছে। রাঘববাবু কহিলেন, আবার আসবে তত? সুধা আশ্বাস দিয়া কহিল, আসবেন বইকি? কাজ সেরেই আসবেন। আমাকে বলে গেলেন। রাঘববাবু দুই চোখ বুজিয়া নির্জীব কণ্ঠে কহিলেন, আমাকে একটি বার বলে গেল না! পরের দিন ভােরে রাঘববাবু মারা গেলেন। মৃত্যুর সময়ে কোন কথা বলিতে পারিলেন না; শুধু দুইটি ব্যাকুল নয়ন মেলিয়া কন্যার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। চোখের কোণ হইতে জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল ; ঠোট দুইটি থরথর করিয়া কাপিতে লাগিল; এবং শীর্ণ, শীতল মুষ্টিতে মেয়ের হাতটি তিনি প্রাণপণে ধরিয়া রহিলেন। সুধা নিঃশব্দে নির্নিমেষ নয়নে বাবার মুখের পানে তাকাইয়া রহিল, কাদিল না; শুধু পরম মমতার সহিত রাঘবের মাথায় ও মুখে হাত বুলাইতে লাগিল। তারপর যখন সব শেষ হইয়া গেল, ধীরে ধীরে মৃতের চোখ দুইটি নিমীলিত করিয়া দিয়া সৰ্বাঙ্গ চাদর দিয়া ঢাকিয়া দিল। বিশু দরজার পাশেই বসিয়া বিড়ি টানিতেছিল। সুধা ডাকিয়া কহিল, বিশুদা, সব তাে শেষ হয়ে গেল, পাড়ার সবাইকে খবর দাও।

১২৪ সুধার প্রেম বিশু বিড়িটায় শেষ টান দিয়া কহিল, তাই নাকি? আচ্ছা। বলিয়া হঠাৎ প্রাণপণ চীৎকারে পাড়া প্রকম্পিত করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ওরে বাবা রে ! কি হ’ল রে ! মামা যে আমার মরে গেল রে ! বিশুর এই ব্রাস্টের পর কাহারও বিছানায় শুইয়া থাকা সম্ভব হইল না। একে একে সকলে জুটিতে লাগিল। পাড়ার সৎকার-সমিতি খবর পাইয়া সদলবলে আসিয়া হাজির হইল। সকলের সমবেত চেষ্টায় রাঘববাবুর শেষকৃত্যে কোন ত্রুটি রহিল না। পরের দিন সকালে নিজের ঘরটিতে সুধা চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। তাহার ভাবনার সীমা-পরিসীমা ছিল না। মনােজ আজও আসিল না, আজও বােধ হয় আর সে আসিবে না। কেন আসিবে ? সুধাকে আর কিসের প্রয়ােজন? দিন কয়েক ভালবাসার ভান করিয়া সুধার সর্বনাশ করিয়া সে হয়তো এখন অন্য নারীর পিছনে ছুটাছুটি শুরু করিয়াছে। কিন্তু কি করিবে সে? কোথায় যাইবে? হাতে যাহা কিছু ছিল, বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে সব খরচ হইয়া গিয়াছে। বাড়িওয়ালা বাকি ভাড়ার জন্য আসিয়াছিল, তাহাকে অনেক কষ্টে বিদায় করিয়াছে। মােদাকে দিয়া কোন স্যাকরাকে ডাকিয়া গায়ের গহনা বিক্রয় করিয়া তাহার দেন। শশাধ করিতে হইবে। আর দিন কয়েক পর এ বাড়ি ছাড়িয়া দিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইতে হইবে। ঝি-ঠাকুরকেও বিদায় দিতে হইবে, তারপর মােক্ষদা একটি চিঠি আনিয়া হাতে দিয়া কহিল, বােধ হয় দাদাবাবুর চিঠিদিদিমণি। সুধা নির্বিকারভাবে হাত বাড়াইয়া চিঠিটা লইয়া কোলের উপর রাখিল। মােক্ষদা কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলিয়া গেল। সুধা তেমনই বসিয়া রহিল। মনােজের চিঠিতে কি লেখা আছে, সুধা যেন পড়িয়াই বুঝিল। হয়তাে লিখিয়াছে—মা-বাবার মত নাই বলিয়া সুধার প্রেম ১২৫ আসিতে পারিতেছে না, একমাত্র সন্তান হইয়া মাকে দুঃখ দিতে তাহার মন চাহিতেছে না। অতএব সব দুঃখ সুধাই ভােগ করুক। তারপর বিনাইয়া বিনাইয়া ভালবাসা জানাইয়াছে, এবং কল্পনা ও কবিত্বের যদি বিশেষ মাত্রাধিক্য হইয়া থাকে তাে পরলােকে মিলন হইবে—এই আশা দিয়া ইহলােকে জীবনটা এক রকম করিয়া কাটাইয়া দিবার পরামর্শ দিয়াছে। কিছুক্ষণ পরে চিঠিটা তুলিয়া লইয়া দেখিল, ঠিকানা মননজের হাতের লেখা নহে; তবে কে চিঠি দিল আবার ? খামটা ছিড়িয়া দেখিল, মনােজের চিঠি নয়, মননজের মার চিঠি, লিখিয়াছেন- সুধার চিঠি যথাসময়ে পৌছিয়াছে। পৌছিয়াছে। মনােজ বাড়িতে নাই। বৈষয়িক কাজে অন্যত্র গিয়াছে। সুধার চিঠি তাহার কাছে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। মনােজের কাছে সুধার কথা তিনি শুনিয়াছেন। সুধাকে দেখিতে তাহার খুব ইচ্ছা হয় । ভগবান যদি সব ভাল রাখেন, শীঘ্রই বােধ হয় সে সুযোেগ হইবে। কারণ মনােজের এক জমিদারের একমাত্র কন্যার সহিত বিবাহ স্থির হইয়াছে এবং শীঘ্রই বিবাহ হইবে। বিবাহে সুধা ও তাহার বাবাকে নিশ্চয় আসিতে হইবে। মনােজেরও ইহা একান্ত ইচ্ছা। চিঠি পড়া হইয়া গেল। তবুও সেই চিঠিটার দিকে সুধা অনেকক্ষণ বিহ্বলভাবে তাকাইয়া থাকিল, তারপর সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, যাক, বাঁচা গেল। সকল আশার শেষ হইয়া গেল। তৈলহীন প্রদীপের স্বল্প সলিতাটুকু উস্কাইয়া উস্কাইয়া ক্ষীণ আলােটুকু বাচাইয়া রাখার চেয়ে অন্ধকার ঢের ভাল। আনুক মসীকৃষ্ণ গাঢ় স্নিগ্ধ অন্ধকার, এ জীবন নিঃশেষে তলাইয়া যাক সেই অন্ধকারের মধ্যে ; বাঁচিতে বিন্দুমাত্র সাধ নাই সুধার। •• ১২৬ সুধার প্রেম স্বর্গ। কিন্তু মনােজ? রূপবতী রাজকন্যা ও রাজত্ব পাইয়া একেবারে ভুলিতে পারিল সুধাকে ? সুধার কি হইবে, একবারও ভাবিয়া দেখিল ? একবারও ভাবিল না, ভােজের শেষে উচ্ছিষ্ট কলাপাতার মত পথের কুকুরের ক্ষুন্নিবৃত্তি করা ছাড়া তাহার আর কোন গতি রহিল না? কিন্তু মনােজ তাে অস্বাভাবিক কিছুই করে নাই। নারীর দেহটার উপরেই তো চিরদিন পুরুষের লােভ। পাইলে এক চুমুকে রস রক্ত ও মজ্জা, সব শশাষণ করিয়া লইয়া শুষ্ক দেহটাকে ফেলিয়া দিয়া যায় ; একবার ফিরিয়া তাকাইয়াও দেখে না, কি হইল সেই দেহটার। এই দুনিবার দুরন্ত লােভকে বশে আনিবার জন্য সমাজ তাহাকে আষ্টেপৃষ্ঠে শিকল দিয়া বাঁধে, রাষ্ট্র শাসনদণ্ড চক্ষের সম্মুখে উদ্যত কঢ়ি রাখে। তাই পুরুষের চক্ষে ঘনায় প্রেমা, গড়িয়া উঠে গৃহ, রচিত হয় নারীর ভুলের বেশ করিয়াছে মনােজ তাহাকে ঠকাইয়াছে। যেমন নির্বোধের মত নিজের সর্বস্ব তাহার সামনে মেলিয়া ধরিয়াছিল, তাহার উপযুক্ত শান্তি দিয়াছে সে। শুধু কি শাস্তি? বিবাহে নিমন্ত্রণ করিয়া অপমানও করিয়াছে। ভাবিয়াছে, সুধার তাে কেহ নাই, কিছুই নাই, তাহার আর মান-অপমান কি ? মনােজ শুধু নিষ্ঠুরই নহে, নীচ। সমাজ কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার, এই নীচতার জন্য কোন শাস্তি দিল না, দিল প্রচুর পুরস্কার ; আর মেয়েমানুষ বলিয়া সব শাস্তি হইল সুধার। মনােজকে সুধা যদি আজ হাতের কাছে পাইত, তাহা হইলে হঠাৎ রাগে দেহের রক্তস্রোত মাথার মধ্যে বার কয়েক ঘুরপাক খাইয়া গেল ; সুধা একটা চিঠির কাগজ লইয়া লিখিল নিমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমাদের যাইবার উপায় নাই। আমার কন্যা সুধার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিবাহসম্বন্ধ স্থির হইয়াছে। অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম লগ্নেই বিবাহ হইবে। বিবাহে মনােজ আসিলে সুধার প্রেম ১২৭ অত্যন্ত আনন্দিত হইব। সুধারও আনন্দের সীমা থাকিবে না।••• নিরাঘবন্দ্র বসু সুধা মােক্ষদাকে দিয়া চিঠিটা ডাক-বাক্সে ফেলিতে পাঠাইয়া দিল। মােক্ষদা জিজ্ঞাসা করিল, দাদাবাবু কবে আসবে দিদিমণি? সুধা গম্ভীরভাবে কহিল, জানি না। তাহার ভাব দেখিয়া মােদা আর কিছু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিল না। সন্ধ্যার পর অন্ধকার ঘরে সুধা চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। মনােজের উপর এখন আর তাহার বিন্দুমাত্র ক্রোধ ছিল না, ছিল নিরতিশয় অভিমান। কেন একবার আসিলে না ? আসিয়া যদি বলিতে, আমি আর তােমাকে ভালবাসি না, তাহা হইলে আমি তােমাকে ধরিয়া রাখিতাম না। তােমার সন্তানের জন্য পিতৃত্বের পরিচয়টুকু মাত্র লইয়া তােমাকে মুক্তি দিতাম। তারপর সেই সন্তানকে একদিন মানুষের মত মানুষ করিয়া তােমারই হাতে তুলিয়া দিয়া নিজে জন্মের মত মুক্তি লইতাম। কেন আমাকে সব দিক দিয়া নষ্ট করিয়া দিলে ? হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া সুধা শুনিল, কে বলিতেছে, কিছু ভেবে নি দিদিমণি। চাহিয়া দেখিল, কাছে দাড়াইয়া মােদা। সুধা জবাব দিল না। মােক্ষদা বলিতে লাগিল, নাই বা এল দাদাবাবু ; ভয় কিসের? সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। সুধা বিস্ময়ের সহিত কহিল, কি ? মােক্ষদা একগাল হাসিয়া কহিল, কি আবার! তুমি যেন কিছু বােঝ নি ! এত নেকাপড়া শিখেছ! দুদিনে একেবারে নিখাস হয়ে যাবে। কেউ টেরটি পৰ্যন্ত পাবে না। সুধা এতক্ষণে বুঝিতে পারিয়া গভীর ঘৃণার সহিতু.কহিল, ছিঃ মােক্ষদা, তুমি না মেয়েমানুষ!

১২৮ সুধার প্রেম মােক্ষদা কণ্ঠস্বর অশ্রুতে সঁতসেঁতে করিয়া কহিল, মেয়েমানুষ বলেই তাে বলছি দিদিমণি। মেয়েমানুষ ছাড়া মেয়েমানুষের দুঃখু আর কে বুঝবে, বল? তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে আশ্বাস দিয়া কহিল, কিছু ভয় নেই তােমার। লজ্জাই বা কিসের? আজকাল ভদ্রলােকদের বাড়িতে আকছার হচ্ছে। তারপর কণ্ঠস্বর নিখাদে নামাইয়া কহিল, তবে কিছু খরচ করতে হবে। সুধা তীক্ষ্ণ স্বরে কহিল, আচ্ছা মােদা, তােমার ছেলেমেয়ে আছে? মােক্ষদা কহিল, আছে বইকি দিদিমণি। কিন্তু ছেলে নয়, মেয়ে। পরক্ষণেই কান্নার সুরে কহিল, কিন্তু এমনই পাষাণ মেয়ে যে, মায়ের দিকে চোখ পেড়ে তাকায় না; না হলে কি,এই বুড়াে বয়েসে দাসীবিত্তি করতে হয় দিদিমণি ! যেমন তেমন মেয়ে নয় আমার, কেমন বাবু, কত বাধা দিয়া সুধা কহিল, আমার যা কিছু আছে, সব যদি তােমাকে দিই, তা হলে একটি কাজ করতে পার ? মােক্ষদা বিস্ময়াহত কণ্ঠে কহিল, কি দিদিমণি ? মেয়ের বাড়ি গিয়ে তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়ে আসতে পার ? মােক্ষদা দুই চোখ কপালে তুলিয়া কহিল, ও কি কথা দিদিমণি ? মেয়ে আমাকে নাই বা দেখল, তবু তাে পেটের মেয়ে। আমার দিন এমনই করেই কাটবে, সে আমার সুখে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাক্। তবে আমাকে ও কথা বলছ কেন ? মােক্ষদা হাসিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, দিদিমণির যেমন কথা ! • কিসে আর কিসে! যতক্ষণ পেটে, ততক্ষণ তাে রক্তের ঢেলা। চোখে না দেখলে আর মায়া কিসের? সুধা চুপ করিয়া রহিল। ভাবিল, মােদা বলে কি? দেহের সুধার প্রেম অন্তরালে আছে বলিয়া সন্তানের উপরে মায়া হইবে না? যে অহরহ তাহার সারা অন্তর জুড়িয়া বসিয়া আছে, যাহার স্পর্শ পাইবার জন্য সমস্ত দেহ ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে, যাহার জন্য প্রতিদিন পলে পলে সেহে মন ও সুধায় বুক ভরিয়া উঠিতেছে, যাহার আগমন-বার্তা পাইয়া তাহার সমস্ত জীবন প্রভাতের পদ্মের মত বিকচোন্মুখ হইয়া উঠিয়াছে, তাহার উপর মায়া হইবে না তো হইবে কাহার উপর? মিথ্যা মা হইয়াছে মােদা। মােক্ষদা কহিল, মনটা একটু শক্ত কর দেখি। দুদিন পরে-যেমনটি আগে ছিলে, ঠিক তেমনিটি হয়ে যাবে। তারপর সুধা মােক্ষদার মুখের দিকে তাকাইল। সে বলিয়াই চলিয়াছিল, বিয়ে করবে। সুধা নীরবে তাকাইয়া রহিল। মােক্ষদা বলিতে লাগিল, না হয় চাকরি করবে। কত মেয়েই তাে করছে আজকাল। নেকাপড়া শিখেছ। সুধা জবাব দিল না। মােক্ষদা মুচকি হাসিয়া কহিল, তাও যদি না কর তাে এই মুকী বােষ্টমীর ওপর সব ভার ছেড়ে দিও দিদিমণি। যদি দু মাসের মধ্যে তােমাকে রাজরাণী বানিয়ে না তুলতে পারি তাে, আমার নামে কুকুর পুষাে তুমি। দুই জ কুঁচকাইয়া সন্দিগ্ধ স্বরে কহিল, কি ? মােক্ষা কহিল, রাজরাণী গাে দিদিমণি! ইস্ত্রী তাে পায়ের দাসী। মাথার মণি করে রেখে দেবে বলছে-বাড়ি করে দেবে, কাপড়-গয়না যত চাই দেবে গৃঢ় ক্রোধের সহিত ধারালাে কণ্ঠে সুধা কহিল, আমার জন্যে তােমার যে ঘুম নেই মােদা ! এর মধ্যে খদ্দেরও ঘােগাড় করেছ! তা খদ্দেরটি কে, শুনি? মােক্ষদা মুখ ও চোখ ঘুরাইয়া কহিল, দিদিমণির যেমন কথা!

১৩০ সুধার প্রেম । খদ্দের কি গাে? নাগর । বরের চেয়ে বেশি। কার্তিকের মত চেহারা, দাদাবাবু তার পায়ের নখের যুগ্যিও নয়। পাঁচ-পাঁচখানা বাড়ি শহরে, অঢেল পয়সা। নেকাপড়া-জানা লােক, দু-দুটো পাস। স্ত্রীটা সুন্দরী হলে কি হবে, একেবারে গাে-মুখ, সােনার-বেনের মেয়ে কিনা। বাবুটির পাস-করা মেয়ের ভারি শখ। সেদিন এসে নিজের চোখে তােমাকে দেখে গেছে, আর সব শুনেছেও- সুধা বাধা দিয়া কহিল, ওঃ, তাই নাকি? তুমিই শুনিয়েছ বুঝি? মােকদা গালে হাত দিয়া কহিল, ও কি কথা দিদিমণি ! আমি ও কথা বলতে পারি কাউকে ? ছি ছি, নিদ্দোষীকে এমন করে সুধা ধমক দিয়া কহিল, চুপ কর। তুমি সাংঘাতিক মেয়েমানুষ। সব করতে পার তুমি। তােমার যা কিছু পাওনা আছে, নিয়ে আজই আমার বাড়ি থেকে চলে যেও তুমি। কান্না যেন মােক্ষদার ঠোঁটের ওপাশেই অপেক্ষা করিতেছিল, ভেউভেউ শব্দে বাহির হইয়া আসিল। চোখে অঞ্চল দিয়া অবিকল ধরে মােক্ষ গড়গড় করিয়া যাহা বলিল, তাহার ভাবার্থ এই যে, সে যাহা করিয়াছে, তাহা সুধার ভালর জন্যই। তারপর এক মুহূর্তে অ- সংবরণ করিয়া কলহের স্বরে কহিল, আমি না হয় চলেই যাচ্ছি, কিন্তু কেলেঙ্কারি ঢাকবে কি করে শুনি? ওই পাপ নিয়ে যাবে কোন্ চুলােয় ? সুধা তীব্র চাপা স্বরে কহিল, সেজন্যে তােমাকে ভাবতে হবে না, তুমি যাও। কিন্তু মােদাকে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া দরজার দিকে হাত বাড়াইয়া তীব্রতর কণ্ঠে কহিল, যাও, যাও বলছি। মােক্ষদা সুধার দিকে একবার অগ্নি-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কক্ষ হইতে বাহির হইয়া গেল।

সুধার প্রেম ১৩১ পরদিন সকালে বিশুকে ডাকিয়া সুধা কহিল, বিশুদা, সারাদিন কোথায় ‘ক ? একবারও তােমার টিকিটি পৰ্যন্ত দেখতে পাবার জো নেই। বিও প্রতিবাদের স্বরে কহিল, বাঃ রে ! সারাদিনই তাে বাড়িতে সুধা অভিমানের স্বরে কহিল, একবারও খোজ নাও না, আমি রেছি, না বেঁচে আছি ! বাবা নেই, বাবা নেই, তুমি ছাড়া আমার আর কে পিনার আছে, বল ? বিশু কাচুমাচু মুখে কহিল, খোঁজ নিই তাে মােক্ষদার কাছে। সুধা সক্ষোভে কহিল, আর খোঁজ নেওয়া ! কাল থেকে জ্বর হয়েছে, কবারও জিজ্ঞেস করেছ, কেমন আছি? বিশু অপ্রতিভ মুখে কহিল, জ্বর হয়েছে নাকি? কই, বুড়ী মাগী তাে Pছু বলে নি আমাকে। সদম্ভে কহিল, দাড়াও, দেখাচ্ছি তাকে। লয়া প্রস্থানের উদ্যোগ করিতেই সুধা কহিল, কোথায় পাবে তাকে? { তাে নেই, তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছি আমি। বিশু বিস্ময়ের সহিত কহিল, তাই নাকি? কেন ? সুধা গম্ভীর স্বরে কহিল, ঝি রাখবার পয়সা নেই আমাদের। ঠাকুরও উড়িয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া এ বাড়িও ছেড়ে দিতে হবে, বাড়িওয়ালা যাটিস দিয়েছে। তােমার তাে কোন ভাবনা-চিন্তা নেই, ব'সে ব'সে বল গাঁজা খাচ্ছ আর ঝিমুচ্ছ ! বিশু লজ্জিত মুখে কহিল, ঝিমুই না তাে। কি করতে হবে, বল ? সুধা কহিল, করতে হবে অনেক কিছু, কিন্তু তা পরে করলেও চলবে। প্রতি আমার জন্যে একটু ওষুধ এনে দাও দেখি, আর বুকেরু বেদনার ন্যে একটা মালিশ । যন্ত্রণার ভঙ্গীতে কহিল, সার বুকটা যেন আড়ষ্ট য়ে আছে, নিশ্বাস নিতে পৰ্যন্ত পারছি না।

সুধার প্রেম -", বিশু ভয়ে ভয়ে কহিল, হমিওপ্যাথী ওষুধ সুধা বিরক্তভাবে কহিল, ওতে কিছু হবে না বিশুদ।। যা বল , তাই এনে দাও। ডাক্তারকে বুঝিয়ে বলবে, বুকের অসহ বেদনা, ৫ { ভাল দেখে একটা মালিশ দেন বলিয়া ডাক্তারের ফী ও ঔষধের দই দিয়া তাহাকে বিদায় করিল । অগ্রহায়ণের এক শুভলগ্নে মাধুরীর সহিত মনােজের বিবাহ হই, গেল। জোড়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরিয়া আসার দিন দুই পরে একদিন শয়ন- কক্ষে বসিয়া মনােজ খবরের কাগজ পড়িতেছিল। হঠাৎ একটা খবরের দিকে চাহিবামাত্র চোখ যেন আটকাইয়া গেল। খবরটা এই :-- কলিকাতার-স্ক্রীটের জনৈক। সপ্তদশ বৎসর বয়স্কা অবিবাহিত। তরুণ নাম-সুধানলিনী বােস, মালিশ সেবন করিয়া আত্মহত্যা কৰিয়াছে, দেহ-পরীক্ষায় জানা গিয়াছে, মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখিতে দেখিতে মনােজের চক্ষের সম্মুখে দিনের আলাে নিবিয়া গি; সন্ধ্যার তরল অন্ধকার নামিল, এবং সেই অন্ধকাকে মথিত করিয়া এক নারীকণ্ঠের ক্লান্ত ও করুণ সুর বাজিতে লাগিল, বেশি দেরি করে । বুঝলে? শিগগির ফিরে এস। হঠাৎ কাহার কোমল স্পর্শে ফিরিয়া চাহিয়া মনােজ দেখিল মাধু রূপ ও যৌবনের ঝলকে সৰ্বাঙ্গ ঝলমল করিতেছে, সৌভাগ্যের আ: যেন মুখে চোখে ধরিতে চাহিতেছে না। মাধুরী হাসিয়া মনােজের গ চলিয়া পড়িয়া আবদারের সুরে কহিল, কি পড়ছ গাে? কিছু না বলিয়া মনােজ খবরের কাগজটা হাত দিয়া সবাই মাধুরীকে আলিঙ্গনবদ্ধ করিল।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sudhar Prem Ed. 1st

Author
Debi, Sri Amala
Title
Sudhar Prem Ed. 1st
File name
Sudhar Prem Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/27
Publisher
Ranjan Publishing House, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
Sudhar Prem-Story
DLI number
513358
Barcode
4990010020343.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
WPJOHyulG4v
Download PDF

Sudhar Prem Ed. 1st