Bally Sadharan Granthagar

Dikkha-tattwa Vol. 1

Thakur, Durgadas · 2010/02/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দীক্ষা-তত্ত্ব।
{ প্রথম খণ্ড)
বারেন্দ্রজ-কুল , ,
শ্ৰীযুক্ত দুর্গাদাস ঠাকুর তত্ত্ব প্রণীত।
(শ্রীযুক্ত রাজা শশিশেথৱেশ্বর রায় বাহাদুর লিখিত
ভূমিকা সম্বলিত।)
কাশীধাম
ব্রাহ্মণ-ক্ষা-সভার আনুকূল্যে
তত্ত্ব প্রকাশ প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ লিমিটেন্ কাৰ্যালয়ের
ত্রিশুল মুদ্রাযন্ত্র
শ্ৰী শ্ৰীশচন্দ্ৰ শৰ্মা কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
মুল} { আট আনা মাৱ ।

No text on this page.

পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত দুর্গাদাস ঠাকুর তত্ত্ব-রত্ন
|"
WAHAMANDAL PRESS, ECIARLS,

No text on this page.

শুদ্ধিপঞ্জ পৃষ্ঠা পংক্তি ২৮ ৬ ২৮ ৪ ঃ বামেরু বামোরু । বহ্নি নিত্য নিত্যা। সাধ্যস্তু হেমতঃ সাধ্যস্তু জপহেমতঃ । অনেক অনেকে । মহাত্ম্যে মাহাত্ম। হইল হইলে। কৰ্মেচ বিজ্ঞানুমোদিত বিজ্ঞানানুমােদিত । ব্ৰহ্মণ ব্রাহ্মণ। করিতে করিতে। নিত্যোৎপন্ন • নিত্যলগ্ন। বরণ করিবে গুরুকে বরণ করিবে। নিবৈব নিত্যৈৰ । ১১ ৪৯ ১১ ৮ ১০

No text on this page.

ভূমিকা
ীক্ষাশকের অর্থে—অনেকে কেবল শক্তি-উপাসনা-
মূলক ইষ্টমন্ত্র গ্রহণ বুঝিয়া থাকেন। তান্ত্রিক পূজা-পদ্ধতি ও
যে বেদমূলক, এ ধারণা অনেকেরই নাই। কেবল ইহাই
নহে, তন্ত্রশাস্ত্র যে বেদ-বহির্ভূত এবং বেদবিরুদ্ধ, এমন কি
উহা যে বৌ-নাস্তিকদের প্রবর্তিত একটা আধুনিক উপাসনা-
পদ্ধতি মাত্র, এরূপ ভ্রমাত্মক ধারণাও, নব্যশিক্ষিতদের
মধ্যে অনেককে পােষণ করিতে দেখা যায়। সাধক-প্রবর
শ্ৰীযুক্ত দুর্গাদাস ঠাকুর মহাশয়ের লেখনী-নিঃসৃত বহু
গবেষণা-পূর্ণ “দীক্ষাতত্ব” পুস্তকখানি সময়ােপযােগী
হইয়াছে; কিন্তু উহার প্রয়ােজনতা সম্যক উপলব্ধি
করিবার পথে, উল্লিখিত প্রমসঙ্কুল ধারণা গুলি, আবর্জনা
স্থানীয় হইয়া ছড়াইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। দুর্গাপূজার সময়
সমাগত হইলে, দীনগৃহস্থের ভাঙ্গা চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন
জন্য, যেমন ঐগৃহপানি গােময়াদি দ্বারা পরিস্কার করা একান্তই
প্রয়ােজন, সেইরূপ, এক্ষেত্রেও এই সকল ভ্ৰম-ধারণার
জঞ্জালরাশি অগ্রে দূর করিতে যত্ন করা অত্যাবশ্যক।
নতুবা আবর্জন মাড়াইয়া ছি ছি” বলিতে বলিতে যেমন
অনেকে মন্দিরের পরিবর্তে পুষ্করিণী ‘অভিমুখে রুদ্ধশ্বসে

২
দৌড়াইতে বাধ্য হয়েন, এক্ষেত্রেও সেরূপ ঘটনা ঘটিবার
সম্পূর্ণ সম্ভাবনা রহিয়াছে। কিন্তু আবর্জনা পরিষ্কার করা
কোন অবস্থাতেই ত’ সুখকর, কাৰ্য্য নহে। কুসংস্কারের
আবর্জনা—বিশেষতঃ তাহা যখন আবার শিক্ষিতজনগণের
হৃদয়ের এককোণে বহুকাল ধরিয়া নিরুপদ্রবে জমিতে দেওয়া
হইয়াছে, তখন ঐ সকলকে পরিষ্কার করিবার জন্য অগ্রসর
হওয়া নিতান্তই দুঃসাহসের কাৰ্য্য, সন্দেহ নাই; কিন্তু পুরাে-
হিত ঠাকুরকে গৃহমার্জনা কাৰ্য্যে নামাইবার সময় এখনও
এদেশে আইসে নাই, কাজেই নিম্নশ্রেণীর সমাজভৃত্যকে
একাজে হাত দিতে হইবে। এ অবস্থায় গত্যন্তর-হীনের
‘কিংকর্তব্য চিন্তায় কালক্ষেপণ নিম্প্রয়ােজন। সম্মার্জনী
হাতে লইয়া গৃহ-জঞ্জাল দূর করিতেই হইবে। কীট, পতঙ্গ,
মাকড়সা, পিপীলিকার প্রাণে আঘাত লাগিবে, চিন্তায়
চিন্তাকুল হইবার সময় এখন নহে।
প্রথমতঃ দেখা আবশ্যক, তন্ত্রশাস্ত্র বেদের অন্তর্ভুত,
কিম্বা উহার বহির্ভূত ? প্রতিপক্ষের প্রধান যুক্তি-তন্ত্র যদি
বেদ-অন্তভুতই হইবে, তাহা হইলে উহাকে বেদ বলিলেই ত’
হয়, সেস্থলে তন্ত্রশাস্ত্র বলিয়া উহার পৃথক একটা নাম দিয়া
রাখিবার প্রয়ােজন কি? এইরূপ তর্ক উপস্থিত করিয়া
তাঁহারা বলেন “অতএব নি বুঝিতে পারা যাইতেছে,
তন্ত্র বেদ-বহির্ভূত।” এসকল কথার অতি সহজ উত্তর
এই যে-স্মৃতিশাস্ত্র যে ক্ষতি-সমুদ্ভুত, ইহা সৰ্ববাদিসম্মত।

তথাপি স্মৃতিশাস্ত্রকে “স্মৃতিশাস্ত্র বলিয়া একটা পৃথক নাম
দিয়া যে রাখা হইয়াছে, ইহা ত’ আম চক্ষুর উপরেই দেখিতে
পাইতেছি। ফলতঃ স্মৃতি বা ধর্মশাস্ত্রের মুলত যেমন বেদে
বিন্যস্ত রহিয়াছে, পুরাণের মূলত যেমন বেদে নিহিত
রহিয়াছে, তন্ত্র বা মন্ত্র-শাস্ত্রের মূলতত্বও তেমনই বেদে
ওতপ্রােতভাবে সংমিশ্রিত হইয়া রহিয়াছে। যেমন সজীব
মানবের দেহ হইতে তাহার হৃদয়, পাকস্থলী ও শ্বাসযন্ত্রকে
পৃথক করিয়া রাখিবার কাহারও শক্তি নাই, তেমনি এ তিনেরও
এককে অন্য হইতে সম্পূর্ণ পৃথক করিয়া বাহিরে
আনিৰার কোনই উপায় নাই। তন্ত্রের উপাসন-পদ্ধতি,
বেদে ও পুরাণে এতই পরিষ্কার ভাবে পৰিট হইয়া রহিয়াছে
যে,তাহা দেখিয়া, উহা যে এই দুই হইতে পৃথক আর
কিছু বস্তু হইতে পারে, আদৌ এরূপ চিন্তা-আমাদের
পরমপূজ্য পূৰ্বপুরুষগণের পবিত্রচিত্তে কখনও এক নিমিষের,
জন্যও স্থান পাইতে পারে নাই। তাহারা, সত্য ত্রেতা,
দ্বাপর যুগ হইতে একাল পৰ্য্যন্ত, মন্ত্রমূলক দেবদেবীর
উপাসনা-পদ্ধতিকে বেদেরই অন্তত জানিয়া,-ইলৌকিক
ইষ্টসাধন-জন্তু যখনই প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছে, তখনই
তাহারা এই উপাসনা পদ্ধতির অনুসরণ করিয়াছেন। তাঁহার
যে ইহলৌকিক মঙ্গলার্থে এবিধ উপাসনা-পদ্ধতির অনুষ্ঠান
সদা সর্বদাই করিতেন—বিশেষতঃ আপৎকালে এই পদ্ধতিই ।
অনুসরণ করা এদেশের সাধয়ণ প্রথা ছিল, যার
।

( ৪ )
প্রকৃষ্ট প্রমাণ বেদ এবং উপনিষদে বিদ্যমান রহিয়াছে।
রামায়ণ, মহাভারত এরং অষ্টাদশ পুরাণের অসংখ্যস্থানে
অসংখ্য আখ্যায়িকার মধ্যে এবিষয়ের ভূরি ভূরি পরিচয়
পাওয়া যায়। দুঃখের বিষয়,এদেশে বেদাধ্যয়ন এখন
বিলুপ্তপ্রার, বেদোক্ত মন্ত্রমূলক যাগযজ্ঞাদি কৰ্ম্মকাণ্ডের
অনুষ্ঠান ইদানীং এদেশে নাই বলিলেই হয়, দুর্বোধ্য বােগ
এবং মন্ত্র শাস্ত্রের চর্চা ত’ বহু দূরের কথা, পুরাণ এবং স্মৃতি-
শাস্ত্রের যথাবিধি পঠন-পাঠন কাৰ্য্যও কদাচিৎ কোথাও হইতে
দেখা বায়। ভ্ৰম-প্রমাদপূর্ণ সুলভ শাস্ত্রগ্রন্থ-প্রকাশের কৃপায়
পল্লবগ্রাহী বিদ্যার ধূলিরাশিতে দশ দিশা ক্রমেই বের
তমসাচ্ছন্ন হইয়া যাইতেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে দয়িত্ববােধ
বিহীন রুদ্ধ-দৃষ্টি উপদেষ্টার দল, সর্বত্রই দিন দিন প্রবল
হইতে প্রবলতর হইয়া উঠিতেছে। ইহার উপরে আবার
ইয়োরােপীয়ান্ প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণের হিন্দুশাস্ত্র সম্বন্ধীয়
উৎকট ও উদ্ভট সিদ্ধান্ত সকল এদেশে অবাধে আমদানী
হইতে থাকিয়া আমাদের অবস্থাকে সমধিক শােচনীয়
করিয়া তুলিতেছে। চারিদিক হইতে এই সকল আপং
আসিয়া পড়িয়া আমাদের সকল শাস্ত্রকেই ধূলিধূসরিত এবং
ঘাের রূপান্তরিত করিয়া উঠাইতেছে। তন্থশাস্ত্রের প্রতি
আক্রমণটা অতিমাত্রায় আসিয়া পড়িয়াছে। তনুশাস্ত্র যে
কিরূপে আক্রান্ত হইয়াছে, এখন তাহাই দেখাইতেছি।
যে দেশে অর্থলােলুপ দোকানদার, রাধাকৃষ্ণের রাসলীলার
ছৰি বলিয়া, স্ত্রীপুরুষের বিকট বীভৎস ভাব বজক চিত্র সকল

( ৫ )
বিক্রয়ার্থ দোকানে খুলিয়া রাখিতে পারে, সেখানে কামো-
দীপক-কথাপূর্ণ কল্পিত কোন পুন্তককে তন্ত্রশান্ত্রের প্রাচীন
পুথি বলিয়া, কোন পুস্তক-সংগ্রাহকের পক্ষে তাহা সাধারশে
উপস্থিত করা কিছুই বিস্ময়ের বিষয় নহে। এইরূপ দুই
একখানি মুদ্রিত বা হস্তলিখিত পুস্তক হয় ত’ আয়ত্ত করিয়া
কোন ইয়ােরােপীয়ান প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিত তাহাকেই
ধরিয়া এবং তাহার ভাষা ও লিখনী দেখিয়া সিদ্ধান্ত
করিয়া থকিবেন,—তন্ত্রশাস্ত্রটা সম্পূর্ণই অতি আধুনিক।
কোন কোন স্থলে এইরূপ যুক্তিজাল ও উপস্থিত করা
হয় যে তন্ত্রোক্ত উপাসনা-পদ্ধতির ছায়া চীন তিব্বত
প্রভৃতি বৌদ্ধধর্ম প্রধান দেশে যখন বহুল পরিমাণে
দেখিতে পাওয়া যাইতেছে, বিশেষত সেই সকল দেশে যখন
এখনও তন্ত্রোক্ত তারাদেবী প্রভৃতির প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত
রহিয়াছে এবং পূজিত হইতেছে, তখন চীনে ও তিব্বতে,
ভারতবর্ষ হইতে বৌদ্ধধর্ম যাইয়া পৌছার সঙ্গে সঙ্গে উহা
তথায় যাইয়া থাকা সম্ভব। আবার কেহ কেহ ইহার
"Torniog to the god Siva, we may note
thut he was adopted by laiter Buddhispa in his
character of Yogi, or Maba yogi. Then, as
the Buddhism of the North very shop became
corrupted with Saivism and its accompaniments,
Saktism, Taptriem, and Magic, so in Northerd
countries various forms of Siva-Buch MA

বিপরীত সিদ্ধান্তও করিয়া থাকেন। তাহাদের মতে চীনাদি দেশ হইতেই তন্ত্রের উপাসনা-পদ্ধতি এদেশে আনীত হইয়াছে ।। যাহাই হউক, এই সকল যুক্তি দেখাইয়াই সিদ্ধান্ত করা হয় যে—বৌদ্ধধর্মের সহিত তন্ত্রশাস্ত্রের কোনরূপ একটা নিগূঢ় সম্বন্ধ রহিয়াছে। এই হতভাগ্য দেশে পর-পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া চলিবার লােকের অপ্রতুল নাই। চিকন কাৰ্য্যেও পরমুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে অনেকে কষ্টবােধ করেন না, বরং ইহাতেই তাহাদের পরমানন্দ। স্বয়ং চিন্তা করিয়া কোনরূপ মীমাংসাতে উপনীত হইতে অনভ্যন্ত এদেশের অনেক ইংরাজী শিক্ষিত যুবক এই সকল অনায়াস- Maha-Kala, Bhairava, Bhimamand of his wife (Parvati, Durga, etc.), are hopoured, and their images are found in temples. Sometimes bloody sacrifices are offered to them." মিঃ বরনেট লিখিতANTIQUITIESqF INDIA দ্রষ্টব্য। "Among the female deities, forms of Tara are cbiedy worshipped, and regarded as Saktis of the Buddhar." চার মনিয়র উইলিয়ম কৃত BUDDHIS দ্রব্যে। of "The Mongoloid races of the North East are responsible for much of the Tantric cults," মিঃ বরনট লিখিত ANTIQUITIES OF INDIAষ্টব্য। = লব্ধ সিদ্ধান্তকেই অকাট্য সত্য বলিয়া এখন মানিয়া লইতে আরম্ভ করিয়াছেন *। গােলাপ ফুলের ডালিতে নিক্ষিপ্ত শুত্র হীরকখণ্ড যেমন স্বীয় স্বাভাবিক উজ্জ্বল প্রভা হারাইয়া চতুম্পা গােলাপ ফুলের গােলাপী রংকেই নিজ-অঙ্গে প্রতিফলিত করিতে থাকে, দুঃখের বিষয়, এই ব্যাপারে কোন * “চীনের বৌদ্ধগণ যেমন বুদ্ধদেবের সহিত নিজদেশের দেবদেবী বা ভূতপ্রেতের পূজা করে, এদেশেও একদিন সেইরূপ পূজা চলিত। বৌদ্ধতন্ত্রের উৎপত্তি মন, বজ্রযান, কালচক্রযান। * বীভৎস বস উপল্লোগের ক্ষমতা রাখেন ত’ এই সকল তন্ত্র পড়িয়া দেখুন।” শ্ৰীযুক্ত ননীগােপাল বন্দ্যোপাধ্যয় সম্পাদিত “ধৰ্ম্মপূজাবিধান” দ্রষ্টব্য। ঐ পুস্তকের আর একস্থানে লিখিত হইয়াছে। “আরও সন্ধান পাওয়া গিয়াছে, ৯০০ বৎসর পূর্বে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ও অভয়াকর গুপ্ত প্রভৃতি কত কত বাঙ্গালার বৌদ্ধ পণ্ডিত, তিব্বতে—নিজে গিয়া বা মিশন পাঠাইয়া, তিববতের ভাষায় বৌদ্ধগ্রন্থ তর্জমা করিয়া, আজ যে তিববতে “grossly idolatrous Boodbism” চলি- তেছে, তাহারই প্রচার করেন, এই সব দেখিয়া শুনিয়া আপ- নারাই বলুন কি মনে হয় ?

( ৮ ) কোন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকেও এই দশা প্রাপ্ত হইতে দেখা ইতেছে। কিন্তু ইহাতে বিস্মিত হইবার বিষয় কিছুই •াই; কারণ—কুঙ্কুটিকা-সমাগমে সুদূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকেও রাত্রন্ধের ন্যায় হস্তস্থিত বস্তুর অস্তিত্ববােধ হারাইয়া “হায় হায়” করিতে হয়। যাহারা পিতা, পিতামহ প্রভৃতি পূৰ্ব্ব- পুরুষগণের আচরিত ধৰ্ম্মকেই নিজেদের রক্ষা-দুর্গ জ্ঞানে ঐ রক্ষার্গের স্ফটিক-কক্ষে বসিয়া আত্মরক্ষা করেন, তাহারা বাহিরের কুঙ্কটিকাতে গৃহত্যাগীদের ন্যায় তাদৃশ ক্লিষ্ট হইয়া পড়েন না, কাজেই তাহাদের সত্যদর্শী দৃষ্টি ও এসময়ে একেবারে নষ্ট হইতে পারে নাই। তাহার তন্ত্র শাস্ত্রকে যে ভাবে দেখিয়া থাকেন, ও যে ভাবে বুঝিয়া থাকেন, তাহাই আশ্রয় কবিয়া, অতঃপর তন্ত্র সম্বন্ধীয় দুই একটি অবশ্য জ্ঞাতব্য বিষয়ে সংক্ষেপে এখানে আলােচনা করিব। তাঁহার তন্ত্রশাস্ত্রকে বেদের মন্ত্রভাগ হইতে পৃথক জ্ঞান করেন না। বেদের সহিত চাক্ষুষ পরিচয়ের সৌভাগ্য অতি অল্পেরই আছে; কিন্তু বেদে যে জ্ঞানকাণ্ড ও কর্ম কাণ্ড বলিয়া দুইটা বিষয় আছে, এ কথা অনেকেই অবগত আছেন। কর্মকাণ্ড ত’ মন্ত্রাদি আবৃত্তি করিয়া দেবদেবীর পূজা-উপাসনার কথা আছেই, পরন্তু জ্ঞানকাণ্ডের উপনিষৎ হইতেও পূজা উপাসনা তথা মন্ত্র-তন্ত্রের অনেক তত্ব আমরা পাইতে পারি। অনন্ত ব্ৰহ্মজ্ঞানের খনি ৰূপ বৃহদারণ্যকো- পনিষদের একস্থানে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে ~খীচ ( ১ ) । মুনির নিকট মধুবিদা জানিবার জন্য অশ্বিনীকুমারদ্বয় উপস্থিত হইলে, মুনিবর বলিলেন—মধুবিদ্যা, অতি গােপনে রক্ষা করবার সামগ্রী। ইহা প্রকাশ করিলে - ইন্দ্রদেব, মাথা কাটিয়া ফেলিবেন বলিয়া তাহাকে শাসন করিয়াছেন। এ জন্য মধুবিদ্যা দান করিতে তিনি অসমর্থ। অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের অনুনয়-বিনয়ে পরে তিনি তাহাদিগকে ঐ মন্ত্রে দীক্ষিত করিয়াছিলেন। এই ঘটনা হইতে ঐ সময়েও যে কোন কোন মন্ত্রবিদ্যা গােপন রাখিবার ব্যবহার ছিল, ইহা বুঝা যাইতেছে। তন্ত্রশাস্ত্রে মন্ত্রগােপন রাখিবার কথা লইয়া যারা কৌতুক করেন, তাঁহারা এ ক্ষেত্রে কি বলিতে চাহেন ? উপনিষৎ হইতে সংস্কৃত বচন উদ্ধত করিলে সাধারণ পাঠকের পক্ষে তাহার অর্থবােধ অসুবিধা হইতে পারে, আশঙ্কায় বৃহদারণ্যকোপনিষদুক্ত এই অংশের সায়নভাষ্যের ইংরাজী অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল *। ইহার পরেও প্রয়াগের পাণিনী কাৰ্যালয় হইতে প্রকাশিত বৃহদারণ্য- কোপনিষদের ইংরাজী অনুবাদ হইতে উদ্ধৃত . "If thou wilt teach this Vidya to any one else. I shall cut off thy hend' thus said Indra to Dadhicha Risi. So Dadhicha was uoder this pledge. Therefore when Arving asked him to teach them this vidya, true to his pledge, Dadbicha refused at first, remio. ding them of the penalty which he would incur," ( ১ ) নিতান্ত নিরুপায় স্থলে, সংস্কৃত বচন উদ্ধৃত না করিয়া যতদূর পারা যায়, এইরূপ ইংৰ্বাজী অনুবাদই উদ্ধৃত করিতে থাকিব। ইংরাজী অক্ষরের চিত্তাকর্ষক-শক্তির গুরুত্ব উপলদ্ধি করিয়াও শাস্ত্রীয় কথার আলােচনাতেও এই হাস্যোদ্দীপক পথ আমাকে অবলম্বন করিতে হইতেছে। বৃহদারণ্যকোপনিষদের এই উক্তির নিকটেই আর একস্থানে “অতিগােপ্য নারায়ণ কবচের” উল্লেখ আছে । সাধারণের জানা আছে—তন্ত্রেই কবচাদির কথা থাকে। বৃহদারণ্যকোপনিষদে “অতিগােপ্য নারায়ণ কবচের উল্লেখ দেখিয়া, অনেক শিক্ষিত যুবকেরই চক্ষুরি হইবে। বৃহদারণ্যকোপনিষদের আরও অনেক স্থানে এবং অন্যান্য উপনিষদেরও অনেক স্থানে ও তাহার ভাষ্যাদিতে এই শ্রেণীর কথা অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। সে সকলের সংক্ষেপে উল্লেখ করিতে হইলেও বৃহদায়তনের একখানি on প্রয়াগের পাণিনী কাৰ্যালয় হইতে প্রকাশিত বৃহদারণ - কোপনিষদের ইংরাজী অনুবাদ হইতে উদ্ধত- • "A Risi seeing this ( Mantra Rig Veda 1. 117. 22 ) sang :-'OhAsvins, Killers of enimies ! you placed & horse's bead Dadhyan the son of Atharvan. In order to keep his promise, he said to you the Science of Madbu (Madhu Vidya ) which was spoken by Visvarupu, the son of Tvastii to ladra and even the secret Narayana Kavacha," (১১) পুস্তক হইয়া পড়ে। ঋগ্বেদের শ্রীসূক্তে দেবীর বা মহা লক্ষ্মী দেবীর স্তবের মধ্যে স্থান বিশেষে যে সকল কথা লিখ। আছে, তাহাই অবিকল উদ্ধৃত করিয়া রুদ্র-যামল তন্ত্রে মুহা- লক্ষ্মীর ধ্যান ও গায়ত্রী কথিত হইয়াছে। অনুসন্ধিৎসুর চক্ষু লইয়া দেখিতে উপস্থিত হইলে, বেদো ? দেবদেবীর স্তবের সহিত তন্ত্রোক্ত ধ্যান, গায়ত্রী ও স্তুবের আশ্চৰ্য সৌসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হইবে। অনেকের চিত্তে এরূপ একটা ভ্রম ধারণা আছে যে—কেবল তন্ত্রেই ছাগ বলিদানের কথা দেখিতে পাওয়া যায়। বেদোক্ত দেব-দেবীর পূজা উপাসনা কার্যে একটি ছাগ নহে, পরন্তু বহু ছাগ ছেনের ব্যবস্থা আছে। কেবল ছাগ নহে, ছাগ অপেক্ষা বৃহদাকারের পশুও ছেদনের যে পদ্ধতি ছিল, তাহাও দেখা যায় । বৃহৎ • "Agui shtoma, or Jyotir-agni-sht ma is the simplest of the Soma liturgies," "On the last of the upasad days a buck goat was sacrificed to Agni-Soma, and during the day of pressing, cattle were offered to Agni (kratupasu or savaniya-pasu ), besides which one or three barren young cows were immolated after the sacrificer's baih. A but was built, in which the householder conducting the sacrifice lived for several days, sometimes even for a year, performing the diksba, or couaecration;

( ১২ ) গষজ্ঞের কথা আলােচনার প্রয়ােজন নাই, বৈদিক যাগ- যজ্ঞের মধ্যে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ অতি ক্ষুদ্র ও সাধারণ। ক্ষুদ্র যাগেই পশু ছেদনের জন্য সাতটা পৃথক্‌ ঘূপকাষ্ঠ মাটিতে প্রােণিত করিবার প্রয়ােজন হইত। এই যজ্ঞে নূনকল্পে ১১টা পছেনের আবশ্যক। এই যজ্ঞের সংক্ষিপ্ত বিবরণ যাহা পদ্ধতি গ্রন্থ হইতে অনুবাদ করিয়া বারনেট সাহেব তঁাহার কৃত ভারতের পুরাতত্ত্ব পুস্তকে প্রকাশ করিয়াছেন, তাহারই কিয়দংশ পাদটীকাতে উদ্ধত করা হইল। ইহা পড়িলে একটা ক্ষুদ্র বৈদিক যজ্ঞেও যে কি বিরাট আয়োজন করিতে হয়, তাহা বুঝিতে পারা যাইবে। এই উদ্ধৃত অংশে “দীক্ষা” “দীক্ষিত” প্রভৃতিশব্দ দেখিয়া ইহাও নিঃসংশয়ে জানিতে পারা যাইবে যে-“দীক্ষা শৰ তান্ত্রিকদেরই কেবল নিজস্ব সামগ্রী নহে, বেদে ও ইহার ব্যবহার আছে। আধুনিক তান্ত্রিক দীক্ষার ন্যায় এক 0 his hair and nails were cut, his food and drink were limited, he carried it staff and the skin of a black no telope, and clasped his lands; one might pronounce his name or touch him; in various respects he was under strict restraint, and he was debarred from connubial relations with his wife, who was lodged in an adjucent but uuder similar conditions, মিরনেট লিখিত ANTIQUITIES or INDIAষ্টব।

( ১৩) দিনেই ইহার কাৰ্য শেষ হয় না। বহুদিন যাবৎ দীক্ষিতদের । কঠোর নিয়ম প্রতিপালন করিতে হয় এবং স্ত্রীর সহিত এক শয্যায় শয়ন হইতে বিরত থাকিতে হয়। বৈদিক বাগাদি অনুষ্ঠান সম্বলিত দীক্ষাকাৰ্যে দীক্ষিতগণকে এতই কঠিন নিয়ম প্রতিপালন করিতে হয় যে—ঐ কাৰ্য্যে উত্তীর্ণ ব্রাহ্মণগণ “দীক্ষিত” বলিয়া পরিচিত হইতেন এবং বহুশত বর্ষ পরে আজিও তাঁহাদের বংশধরগণ,-কান্যকুজে রাজ- পুতনায়, নেপালে এবং কাশ্মীরে, “দীক্ষিত” উপাধি নামের সহিত ধারণ করিয়া আপনাদিগকে গৌরবান্বিত মনে করেন। বেদ ও উপনিষদের বহুস্থানে দীক্ষার যেরূপ গুণকীর্তন রহিয়াছে, তাহাতে দীক্ষিত, আল্পনাকে গৌরবান্বিত মনে নাই বা করিবেন কেন ? মিঃ বরনেট লিখিত ভারত পুরাতত্ত্বের উদ্ধৃত অংশ হইতে আর একটি বিষয়ও আমরা বুঝিতে পারি। তাহা এই- অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৈদিক-যজ্ঞাদিতেও বিপূল আয়ােজন অনুষ্ঠানের প্রয়ােজন হয়। এই সকল কাৰ্য্যে এতই অর্থবল লােকবল ও এতই বলির পশু ইত্যাদি সংগ্রহের আবশ্যক হয় যে, * “সঃ সােম কস্মিন্ প্রতিষ্ঠিত ইতি, দীক্ষায়ামিতি, কস্মিন্ দীক্ষা প্রতিষ্ঠিত-সতে হেব দীক্ষা প্রতিষ্ঠিত”-- ইত্যদি (বৃহদারণ্যকোপনিষৎ।) “দীক্ষা যা সর্বে”—ইত্যাদি। (মুণ্ডকোপনিষৎ।) অমাবস্যায়াং দীক্ষি”—ইত্যাদি। (ছান্দোগগ্যাপনিষৎ।)

( ১৪)
তাহ সকলের পক্ষে সহজসাধ্য নহে। গ্রাম নগর হইতে মুক্তি
ঋষিগণ যখন অরণ্যে যাইয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন,
তখন বাধ্য হইয়া তাহাদিগকে এই সকল আয়ােজন অনুষ্ঠানের
সুলভ ও সহজসাধ্য অনুকল্প অবলম্বন করিতে যে হইয়াছিল,
তাহ বেদের ‘আরণ্যক অংশ হইতে আমরা অতি সুস্পষ্ট
দেখিতে পাইতেছি। অরণ্যবাসী সাধকগণ মনে মনে
মাগযজ্ঞ অনুষ্ঠানের ও কলিদানের চিন্তামাত্র করিয়াই তাহার
সম্পূর্ণ ফল আয়ত্ব করিতে সমর্থ হইতেন *। তন্ত্রোক্ত
বাহ্যিক আয়ােজন পরিশূন্য মানস-পূজার মূলতত্ব এখান
হইতে অঙ্কুরিত হইয়াছে, মনে করিতে বাধা কি ? এই
"Next follow the ARANYAKAS whicb, pot
only by the position wbich they occupy at
the end of the BRAHMANAS, but also by their
character seem to be of a later age again.
Thele object is to sbow bow sacrifices may be
performed by people living in the forest,
without any of the
pomp described in the
BRAHMANAS and the later SUTRAS-by a mere
mental effort. The worshipper had only to
imagine the sacrifice, to go through it in his
memory, and he thus acquired the same merit
as the performer of tedious rites,"
প্রত্নতত্ববিৎ ম্যাক্সমুলার কৃত OaGx of Rs.icios*
গ্রন্থ ষ্ট্য।

( ১৫ ) উৎস হইতে আর একটি অতি গুরুতর এবং অতীব প্রয়াে- জনীয় তত্ত্ব উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছে। তাহা এই—স্থান, কাল ও পাত্র অনুসারে উপাসনা-পদ্ধতির এবং অনুষ্ঠানের সঙ্কোচ-সাধন বেদ-বিধির অনুমােদিত। কলিযুগের প্রারম্ভে, ঋষিগণের বৈঠকে, মহাপুরুষ পরাশর ঋষি কর্তৃক ইহা আরও পরিষ্কারভাবে বিবৃত হইয়াছে । স্মৃতিশাস্ত্রের সংহিতা গ্রন্থগুলি, সকল সময়ের সকল অবস্থার সর্বশ্রেণীর হিন্দুরই যে মান্যের সামগ্রী, একথা সকলকেই নতমস্তকে স্বীকার করিতে হইবে। তথাপি এক একযুগে এক একটি ঋষির সঙ্কলিত ধর্মশাস্ত্র, সেই যুগের দ্বিজ-জাতিলের জন্য বিশেষরূপে, ব্যবস্থিত হইয়া রহিয়াছে। পরাশর সংহিতা কলিযুগের জন্য প্রশস্ত। কলিযুগে ব্রাহ্মণ- গণ ক্ষীণদেহ ও হীনবীৰ্য্য হইয়া, কষ্টসাধ্য চান্দ্রায়ন প্রায়শ্চিত্তাদি অনুষ্ঠানের যােগ্যতা হারাইয়াছেন, কাজেই পরাশর ঋষি তঁাহার সংহিতাতে এই কালের ব্রাহ্মণদের জন্য অনেক লঘু * “অন্যে কৃতযুগে ধৰ্ম্মাতােয়াং দ্বাপরে পরে। অন্তে কলিযুগে নৃণাং যুগৰূপানুসারতঃ॥” “কৃতে তু মানবাে ধৰ্ম্মন্ত্রেতায়াং গৌতমঃ মৃতঃ। পরে শালিখিতৌ কলৌ পারাশরঃ স্মৃতঃ।” “কতে সম্ভাষণাৎ পাপং ত্রেতায়াঞ্চৈব দর্শনাৎ। দ্বাপরে চাপায় কলৌ পততি কণা ॥” (পরাশর-সংহিতা।) ০

প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করিয়াছেন। সংসর্গের পাতিত-দোষ
বাঁচাইয়া চলা এসময়ে, একরূপ অসম্ভব, এজন্য কলিতে
সংসৰ্গ দ্বারায় পাতিত্য ঘটিবার ব্যবস্থা বিদূরিত করিয়া
কেবল কর্মদ্বারাই ব্রাহ্মণ পতিত হইবেন, এরূপ তিনি নির্দিষ্ট
করিয়া দিয়াছেন। কলির প্রাবল্য ঘটিলে, পরাশরের ব্যবস্থা
অনুসারে চলিতে পারাও অনেকের পক্ষে অসম্ভব হইবে
জানিয়া, আমাদের অবলম্বিত উপাসনা-পদ্ধতিকে আরও কিয়ৎ
পরিমাণে শিথিল ও সহজসাধ্য করিয়া দেওয়া হইয়াছে—
ইহা তন্ত্রে দেখা যাইতেছে । কলিযুগে হীনবীৰ্য্য লােকের
জন্য কেবল আমাদের শাকারেরাই যে ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের বিধি-
ব্যবস্থা কতকটা সংক্ষিপ্ত এবং সহজসাধ্য করিয়া দিতে
বাধ্য হইয়াছেন, এরূপ নহে, আয়ুর্বেদোক্ত চিকিৎসা পদ্ধতির
প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেও দেখিতে পাওয়া যায়—প্রাচীন
চরক সংহিতা, সুশ্রত সংহিতাদিতে ঔষধের যে মাত্র। উক্ত
হইয়াছে, একালের লােকের জন্য তাই উপযােগী নহে,
এজন্য বাধ্য হইয়াই তাহার পরিমাণও অনেক হ্রাস করতে
“কলিকীনানা দ্বিজাদীনাং সুরেশ্বরি।
মেধামেধ্য বিচারাণাং ন শুদ্ধি শ্রোহকৰ্ম্মণা
ন সংহিতাদ্যৈঃ স্মৃতিভিবিষ্টসিদ্ধিণাং ভবেৎ।
বিনা স্বাগম-মার্গেন কলৌ নাস্তি গতিঃ প্রিয়ে।”
(মহানিৰ্ব্বাণ তন্ত্র !)

( ১৭ ) হইয়াছে। কেবল তাহাই নহে, একালের অনেক রােগী, আয়ুর্বেদোক্ত বনৌষধি-ঘটিত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘকাল অবকাশ না পাওয়ায়, তন্ত্রোক্ত রস-চিকিৎসার আশ্রয়গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়েন। বে কালের-অলক্ষিত প্রভাবে, আমাদের দিনমানকেও কখনও প্রসারিত, কখন বা সঙ্কুচিত হইয়া থাকিতে হয়, মানবের কর্মশক্তিকে কখনও প্রবর্ধিত কভু বা ক্ষীণতর করে, সেই কালের প্রভাবে সত্য- যুগের বৈদিকী ক্রিয়াকে কলিযুগের সংক্ষিপ্ত তান্ত্রিকী পূজাতে পরিণত হইয়া পড়িতে হইয়াছে দেখিয়া, বিস্মিত বা দুঃখিত হইবার কোনই কারণ নাই। স্থান, কাল ও পাত্র বিচার করিয়া তন্ত্রোক্ত, উপাসনা-পদ্ধতি কেনই যে এসময়ের উপযােগী বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে, সংক্ষেপে সাধারণ ভাবে এ পর্যন্ত তাহারই আলােচনা করা হইল, এক্ষণে উহার ব্যবস্থিত কয়েকটি বিশেষ কথা সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। তান্ত্রিকী পূজা-পদ্ধতিতে যে পাঁচটি উপকরণের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণিত হইয়াছে, তাহা নিতান্ত অপকৃষ্ট বস্তু বলিয়া অনেকের ধারণা। সাধারণতঃ ইহাকে “পঞ্চ-মকার” বলিয়া অভিহিত করা হয়। তন্ত্র-শস্ত্রের ভাষাতে ইহাকে “পঞ্চতত্ত্ব” বলিয়া বর্ণনা করা হইয়া থাকে । তন্ত্রোক্ত পঞ্চতত্বের * মদ্যং মাংসং তথা মৎস্যং মুদ্রাং মৈথুনমেব চ। পঞ্চতত্ত্বমিদং দেবি নিৰ্বাণ-মুক্তি-হেতবে।” {শব্দকল্পদ্রুম অভিধানে উদ্ধৃত-গুপ্তসাধন তন্ত্রের বচন।

( ১৮ ) লাধারণ অর্থ এই-(১) মদ্য, (২) মাংস, (৩) মৎস্য, (৪) মুদ্র এবং ৫) “ম” আদি-অক্ষর-যুক্ত স্ত্রী-পুরুষ-ঘটিত আচরণ বিশেষ। সাধারণ ভাবে দেখিতে উপস্থিত হইলে, এই সকল বস্তুর সহিত দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার সংমিশ্রণ নিতান্তই দৃষ্টিকটু সন্দেহ নাই, কিন্তু কোন্ সময়ে কোন্ স্থানে কি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পূজা-পদ্ধতির মধ্যে এই সকল বিষয়ের সমাবেশ করিবার প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছিল, ইহা একটু নিবিষ্টচিত্তে চিন্তা করিয়া দেখিলে, এসকল কথার প্রতি আমাদের নাসিকা-ভঙ্গী করিবার প্রবৃত্তির অনেক পরিমাণে লাঘব হইতে পারে। আমাদের সম্মুখে হঠাৎ কোন স্ত্রী বা পুরুষ আসিয়া বস্ত্রত্যাগ করিয়া প্রম্পূর্ণ উলঙ্গ হইয়া দাড়াইলে, লজ্জায় আমাদিগকে মুখ ফিরাইতে হয় এবং যে ব্যক্তি ঐরূপ আচরণ করে, তাহাকে আমরা তিরস্কার করিয়া থাকি। কিন্তু শারীরবিদ্যা অনুশীলনকারী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, উপদেষ্টার সম্মুখে বসিয়া, উলঙ্গ স্ত্রী বা পুরুষের দেহের লজ্জাজনক স্থান বিশেষকে যখন পুঙ্খ- পুঙ্খরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে থাকেন, তখন—অন্ত একরূপ অবস্থা উপস্থিত হয়। জগৎসংসারে এইরূপ সকল কাৰ্যেই স্থান, কাল, পাত্রের পার্থক্য অনুসারে দোষ-গুণের বিচার করা হইয়া থাকে। যাহা এক অবস্থায় কাহারও পক্ষে নিতান্ত নিন্দনীয়, তাহাই আবার অন্য অবস্থায় আর একজনের পক্ষে অতিশয় প্রশংসনীয় হইয়া দাঁড়ায়। বৈদিক ক্রিয়াকাও লুপ্ত হইবার পরে কোন্ সময়ে কি কারণে তান্ত্রিক পূজা প্রকরণের প্রচার-বৃদ্ধি এদেশে করিতে হইয়া- ছিল, তাহা একটু চিন্তা করিয়া দেখা আবশ্যক। পর যুগের অবসান কাল পর্যন্ত ক্ষত্রিয় রাজাদের আশ্রয়ে থাকিয়া এদেশের সাধক ব্রাহ্মণগণ নিরুপদ্রবে যাগযজ্ঞাদি কাৰ্য্যেৰ অনুষ্ঠান করিতে পারিতেন। তাহাদের সেই কাৰ্যে, সকল সময়েই, ক্ষত্রিয় রাজগণ যথােচিত সহায়তা করিতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিণাম-ফলে এদেশে ক্ষত্রিয়-শক্তি বিলুপ্ত প্রায় হইয়া পড়িল। উহার কয়েক শত বৎসর পরে, শূদ্র নন্দরাজার সময়ে, ব্রাহ্মণ-বক্ষক ক্ষত্রিয়ের আর একবার বিনাশ- সাধন আরম্ভ হইল। দেশে বিলুপ্ত প্রায় যাহা কিছু ক্ষত্রিয়শক্তি ছিল, তাহাও নিৰ্বাপিত হইল। ইহার কিছুকাল পরে, রাজা অশােকর সময়ে-বৌদ্ধমতের উত্থান সময়ে, এদেশবাসিগণের প্রকৃতি হইতে রজোগুণকে স্থালিত করিয়া মানুষমাত্রকেই অহিংসা-পৰায়ণ বুদ্ধে পরিণত করিবার জন্য বিপুল চেষ্টা আরম্ভ হইল। এই সময় হইতে প্রজোগুণ এবং তাহারই বিকাশ-বীভাব হইতে বঞ্চিত হইয়া ধীরে ধীরে এদেশের পুরুষগণ ক্রমে ঘাের “কাপুরুষ” ভাবাপন্ন হইয়া উঠিতে লাগিলেন। এই সময়ে, এই দুর্দশারই প্রতিকার সাধনাৰ্থে, সাধকগণ, ঋষিগণ এবং তাহাদের অনুগত ব্ৰাহ্মণগণ, এদেশে তান্ত্রিক পূজা-পদ্ধতির বহুলভাবে প্রচার করিবার একান্ত প্রয়ােজন উপলব্ধি করিলেন। . সেই হইতেই এদেশে হিন্দু ( ২০ ) ঘরে ঘরে শক্তি-পূজার একটা প্রবল নবােখিত প্রবাহ আসিয়া ঢালিয়া পড়িল। যে সময়ে এ দেশের অবসাদগ্রস্ত মানুষের প্রকৃতিতে রজোগুণ বৃদ্ধি করিয়া বীরভাব জাগাইয়া তুলিবার আবশ্যক হইয়াছিল, যে সময়ে দেশের কাপুরুষ-ভাবাপন্ন পুরুষকে সত্য সত্য পুরুষে পরিণত করিবার প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছিল, সে সময়ে—এদেশবাসিগণকে বৌদ্ধ-ধৰ্ম্ম- যাজকদিগের প্রদত্ত ভাতের ফেনের পরিবর্তে “ছাগমাংস”, গুড়ের সরবতের পরিবর্তে “সুরা,”—আর পুই শাকের পরিবর্তে “রুইমাছে”ৰ দিকে অঙ্গুলী-নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া, তান্ত্রিক সাধকগণ যে বড়ই একটা গহিত কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, এমন কথা বলা যায় না; বরং ইহাতে তাহাদের বিচার-শক্তির প্রশংসাই করিতে হয়। যাহারা বলিয়া থাকেন--“বোদ্ধধৰ্ম্ম- যাজকদের দ্বারা তান্ত্রিক মত এদেশে প্রবর্তিত হইয়াছে, তাহারা যে কেবল বাহ-দৃষ্টিহীন, তাহাই নহে, তাহার চিন্তাহীন, বিচারহীন এবং ঐতিহাসিক জ্ঞানে দীনাতিদীন কেন না; যে পাঁচটি বস্তু বর্জন করাই, শাক্যসিংহের অনুগত বৌদ্ধদের প্রধান ধৰ্ম্ম, সেই পাঁচটি বস্তুই তান্ত্রিক পূজা- অনার প্রধান উপকরণ। ইহা চক্ষুর উপর দেখিয়া ও যাহারা বৌদ্ধধৰ্ম্ম হইতে তান্ত্রিক-সাধনার উৎপত্তি সিদ্ধান্ত করেন, তাহাদিগকে দৃষ্টিশক্তিহীন ভিন্ন আর কি বলিব ? কেবল একপক্ষে এই পাঁচটি বস্তুর বর্জন এবং অপর পক্ষে • এই পাচটি বস্তুর অতিশয় প্রশংসাবাদ কীৰ্ত্তন দেখিরাই ( ২১ } যে, বৌদ্ধমতের সহিত তান্ত্রিক, উপাসনা-পদ্ধতির ঘাের বিরােধ জানিতে পারা যাইতেছে, তাহাই নহে,—এমন তল্পগ্রন্থ অল্পই দেখিতে পাওয়া যাইবে, যাহার মধ্যে শাক্য- সিংহ-প্রবর্তিত বৌদ্ধমতের প্রতিকূল বাক্য বহুল পরিমাণে দেখিতে না পাওয়া যায়। প্রাতঃস্মরণীয় শঙ্করাচার্য্য দার্শনিক বিচার দ্বারা বৌদ্ধমত খণ্ডন করিয়া তৎকালের ভ্রষ্ট হিন্দু-সমাজে বর্ণাশ্রম-ধর্মের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি বৌদ্ধগণকে হিন্দু করিতে পারেন নাই - এই তন্ত্রোক্ত সাধনা-পদ্ধতিই সেই অসাধারণ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়াছিল। কেবল এদেশে নহে—তিব্বত, চীন প্রভৃতি দেশেও এই তন্ত্রশাস্ত্র সে সময়ে একটা মহৎকাৰ্য্য সাধন করিয়াছিল। সে দেশবাসিগণ যখন, বৌদ্ধধৰ্ম্ম-বিস্তারের প্রভাবে অহিংসা-পরায়ণ হইয়া আমাদের ন্যায় গােবেচারী নিরীহ মানুষে পরিণত হইয়া উঠিয়াছিল এবং তাহাই দেখি। মুসলমানেরা চীন, তিব্বতে যাইয়া সে সকল দেশেও রাজ্য বিস্তার করিয়া ফেলিল, তখন এই অন্ত্রিক উপাসনা-পদ্ধতিই চীনে এবং তিববতে প্রবিষ্ট হইয়া, চীন এবং তিব্বতকে ধ্বংসমুখ হইতে রক্ষা করিয়াছিল * চীনে, জাপানে, * ১২১১ খৃঃ জঙ্গীজ, খাঁ চীন-রাজ্য, কবলিত করিয়া- ছিলেন। তিনি এবং তাঁহার পরে কুবলাই খাঁ চীনে যে অসাধারণ অত্যাচার করিয়াছিলেন, চীন-ইতিহাসে তাহা চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। ১৩৬৮ খৃঃ তারাদেবীর ( ২২ ) - ৰহ্মদেশে, মদেশে, সাইবিরিয়ায় রুধিয়ায়, এমন কি আমেরিকার উত্তরদিকের খানিকটা অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-ভাগে, তন্ত্রোক্তশক্তিসাধনমূলক ধর্ম প্রবর্তিত হইয়াছিল । প্রাচীন গ্রীসেও যে এক সময়ে শিব-শক্তি-উপাসনামূলক তান্ত্রিক সাধনা সমাদৃত হইয়াছিল এবং গ্রীসদেশবাসীরা তান্ত্রিক বিধানে দীক্ষিত হইতেন, তাহার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রবর্তনের পথ-প্রদর্শক বৌদ্ধধর্মযাজকগণ ছিলেন উপাসক চুচুয়ান-চ্যাং নামক জনৈক যুবক সন্ন্যাসী কতকগুলি শিষ্যসহ চীনে আবির্ভূত হইয়া দুর্দান্ত মুসলমানগণকে চীন হইতে বিতাড়িত করেন। এই শাক্ত সন্ন্যাসীর প্রকৃত নাম কি ছিল এবং ইনি কোনও ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী ছিলেন কিম্বা চীন দেশীয় ছিলেন, তাহা এখন স্থির করিবার কোনও উপায় নাই। এই শাক্ত সাধকের প্রতিষ্ঠিত বহু তারাদেবীর মন্দির আজিও চীনের এবং তিব্বতের বহুস্থানে বিদ্যমান রহিয়াছে। এসম্বন্ধে আরও বিবরণ জানিতে ইচ্ছা হইলে—মিঃ রিচথােকেন্ কত CHINA এবং মিঃ লিড়ডেল লিখিত CHINA its Marvel and Mystery গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। * "The phallic symbolism of India is also kdown in North America and in Yuantan মিঃ সি, আর, কভার কৃত THE Rise of MAN দ্রষ্টব্য + "In Qreece we have the same miogling of. original Aryaa mythology with legends borrowed from Asia; the same early super- } t

, পরন্তু ভারতের বিশেষত বাঙ্গালার শাক্ত ব্রাহ্মণগণকেই
উহার মূল-প্রবর্তক বলিয়া জানিতে পারা যায়। আজিও
এই সকল স্থানে তান্ত্রিক সাধনা-মার্গের আচার-অনুষ্ঠান
একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই, পরন্তু অনেক স্থানে এখনও
আকারভেদে উহার বহুল প্রচার দেখিতে পাওয়া যায়।
ইহা কৰিকল্পনার উদ্ভট সিদ্ধান্ত নহে—ইহা একটি অকাট্ট
ঐতিহাসিক সত্য । যাহারা বিলাতী নীল রংএর কাচের
stitious and later belief in a supreme god and
same secret rites.
We do not know
certainly what the secret teaching at these
rites reatly was. Christians who were initiated
say that the emblein sbown was a phallus,
and it seems probable that the initiated
renounced all popular belief in old Gods and
were taught that the only realities were the
male and female principles in nature, in which
the Hindu Chinese and dupanese pbilosopers
equally believed."
ডাক্তার সি, আর, কভার কৃত
THE RISE OF MAN ugasi
* মিঃ জে, ডি, হুকার কৃত HNAI/AYAN JoURNals
গ্রন্থ পাঠে বুঝা যায়-বৌদ্ধধর্মের শুখাদে তান্ত্রিক শক্তি,
উপাসনার বন্যার প্রবাহ পূরিত হইয়াছিল। উহা কেবল
'

চশমা কিছুক্ষণের জন্য চক্ষু হইতে খুলিয়া রাখিয়া নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক তত্ত্বানুসন্ধানের আশ্রয় লইয়া, চীনের, তিববতের ও ভারতের সহস্র বৎসর পূর্বের অবস্থা পর্যালােচনা করিবেন, তাহারাই অতি পরিষ্কারভাবে দেখিতে পাইবেন, মুসলমান-পদদলিত চীন দেশ হইতে মুসলমান-রাজশক্তিকে নিপাতিত করিবার জন্যই বীরবােদ্দীপক শক্তি-উপাসন- পদ্ধতি চীনাদি দেশে এদেশের ব্রাহ্মণ সাধকগণ কর্তৃক প্রবর্তিত হইয়াছিল। “তন্ত্রোক্ত উপাসনা-পদ্ধতি, এদেশের মুসলমান-আধিপত্যকে নিষ্কাশিত করিতে সমর্থ হইল না কেন ?”—এমন প্রশ্ন কাহারও কাহারও মনে উদিত হইতে পারে। একথার উত্তরে আর অধিক কিছু না বলিয়া কেবল মহারাষ্ট্রবীর শিবজী, বাঙ্গালী-বীর রাজা কংশ, রাজা প্রতাপাদিত্য প্রভৃতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেই যথেষ্ট হইবে। ইহারা সকলেই তন্ত্রোক্ত বিধানের শক্তি-সাধক ছিলেন। ইদের এবং এইরূপ আর আর মহাপুরুষগণের সমবেত চেষ্টা, এক সময়ে একস্থানে কেন্দ্রিত হইতে পারিলে, তাহার চীনে নহে, এসিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ডে এখনও একটু রূপান্তরিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়া রহিয়াছে। যথা- "Boodhbism in some form is the predomepating creed, from Siberia apd Kamaschatka to "Ceylon, from the Caspian steppes to Japan, tbroughout China, Burma, Ava, and a part of the Malayan Archipelago.* .

( ২৫) পরিণাম ফল কি হইত, তাহার আলােচনা এখন নিষ্প্রয়ােজন, কিন্তু পৃথকভাবে ইহাদের এক এক জনের অ্যুদয়ের সময়ে প্রত্যেকের পৃথক হুঙ্কার-শব্দে প্রাদেশিক মুসলমান 'রাজ- সিংহাসনগুলি কিরূপ প্রকম্পিত হইতেছিল, দিল্লীর অবস্থা কিরূপ শশাচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল, ইতিহাস তাহার অভ্রান্ত সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। অবসন্ন মুসলমান রাজ-শক্তির সহিত হিন্দু-প্রজাশক্তির সংঘর্ষণ সময়ে, অভাবনীয় ঘটনাচক্রে আর এক নব-বেশধারী অভিনব শক্তি, আর এক দিক হইতে আসিয়া ভারতের রঙ্গভূমে অবতীর্ণ না হইলে—এদেশের ইতিহাস হয় ত’ আজ আর এক মূর্তিতে প্রকটিত হইয়া উঠিত। তান্ত্রিক উপাসনা-পদ্ধতি এদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে, কিছুমাত্র চিহ্ন রাখিতে পারে নাই, এমন কথা বলা যাইতে পারে না। ফলতঃ দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, অর্থঘটিত অবস্থা এবং রাজকীয় শাসন- পদ্ধতি, যেমন দেশের লােকাচরিত ধৰ্ম্মকে ক্রমে রূপান্তরিত করিয়া উঠায়, তেমনি আবার প্রবল ধর্মবিপ্লব দ্বারা রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থা ইত্যাদিরও বিপুল পরিবর্তন সংঘটিত হইয়া থাকে। জগতের প্রত্যেক দেশের ইতিহাসই এই মহান্ তত্ত্ব ঘােষণা করে। নির্জীব হিন্দু জাতিকে সজীব এবং জাগ্রত করিবার জন্য যে সময়ে তান্ত্রিক উপাসনা-পদ্ধতি এদেশে বিস্তৃতরূপে প্রচারের প্রয়ােজন হইয়াছিল, তখন কেবল লােকের রজোগুণ বৃদ্ধি করিবার

( ২৬ )
উদ্দেশ্যে তাহার অনুকূল খাদ্য-সামগ্রী উপাস্য দেবদেবীকে
নিবেদন করিয়া দিবার ব্যবস্থা এদেশে পুনঃ প্রচলন * করিয়াই
দেশ-মঙ্গলকামী সাধকগণ নিশ্চেষ্ট ছিলেন না, পরন্তু চিত্তের
দৌর্বল্য বিদূরিত করিবার জন্য এবং সাহস বৃদ্ধি করিবার
কন্তু গভীর নিশীথে শ্মশানে যাইয়া অথবা পরিত্যক্ত গৃহে
বসিয়া অথবা ভগ্ন মন্দিরে আসন স্থাপন করিয়া ইষ্টদেবতার
উপাসনার সঙ্গে সঙ্গে সাধকের চিত্তবল সঞ্চয়েরও অপরূপ
সুব্যবস্থা তাহার করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। ইংরাজ-জাৰ্মাণ
ফরাসী যুদ্ধের ইতিহাস পড়িবার সময়-স্মরণ হয়, কোথায়
“পুনঃ প্রচলন” কথাটি এই কারণে ব্যবহার করা হইল
যে, অতি প্রাচীনকালে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে বুরা নিবেদন
করিয়া দিবার প্রথা এদেশে বহুল পরিমাণেই প্রচলিত ছিল।
আদি কবি বাল্মীকি ঋষির রচিত রামায়ণে গঙ্গাদেবীর প্রতি
সীতার উক্তি—ইহার সত্যতা সপ্রমাণ করিতেছে-
“মধ্যন্তু সমপ্রাপ্য ভাগীরথ্যানিন্দিতা।
বৈদেহী প্রাঞ্জলীভূত্বা তাং নদীমিদমব্রবীৎ।
পুত্রো দশরথায়ং মহারাজ ধীমত।
নিদেশং পালয়ত্বেনং গঙ্গে ত্বভিক্ষিতঃ ॥
চতুর্দশানি বর্ষাণি সমগ্ৰাষ্য কাননে।
ভ্ৰাত্রা সহ ময়া চৈব পুনঃ প্রত্যাগমিষ্যতি ॥
ততং দেবি মুভগে ক্ষেমেণ পুনরাগতা।
যক্ষ্যে প্রমুদিতা গঙ্গে সৰ্বকামসমৃদ্ধিনি।

( ২৭ )
পড়িয়াছিলাম—আহতের দেহ-পরিশ্রুত রক্তধারা দেখিয়া কোন
কোন সৈনিক পুরুষ মূৰ্জিত হইয়া পড়িয়াছিলেন! আমাদের
একটি আত্মীয়কে ডাক্তারী অস্ত্রচিকিৎসার কষ্টভােগ করিবার
সময়ে, তাহার দেহ-নিঃসৃত রক্তধারা দেখিয়া আমাদের একটি
বন্ধু মূৰ্জিত হইয়া পড়িয়াছিলেন,-এ ঘটনা নিজ-চক্ষে প্রত্যক্ষ
করিয়াছি। দীর্ঘকালব্যাপী বৌদ্ধ রাজাদের অহিংসা-সমর্থক
কঠোর শাসনে বখন এদেশের লােক নিতান্ত ভীরু এবং
কাপুরুষ হইয়া পড়িয়াছিল, সে সময়ে রক্ত দেখিয়া সূচ্ছিত
হওয়া এদেশবাসী সাধারণ লােকদের পক্ষে কিছুমাত্র বিয়ের
বিষয় ছিল না। দেশব্যাপী এই চিত্ত-দৌর্বল্য পীড়াৰ
ত্বং হি ত্রিপথগে দেবি ব্ৰহ্মলােক সমক্ষসে।
ভাৰ্য্যা চ চেদিরাজস্য লােকেহস্মিন্ সম্প্রদৃশ্যসে।
সা ত্বং দেবি নমস্যামি প্রশংসামি চ শােভনে।
প্রাপ্তরাজ্যে নর-ব্যাঘ্রে শিবেন পুনরাগতে ।
গবা শত-সহস্রঞ্চ বাণ্যমঞ্চ পেশল।
ব্রাহ্মণেভ্যো প্রদাস্যামি তব প্রিয়-চিকীর্ষা।
সুরাঘট সহস্রেণ মাংসভূতৌনেন চ।
যক্ষ্যে ব্যাং প্ৰয়তাং দেবি পুরীং পুনরুপাগ
যানি স্বীক-বাসিনি দৈবতানি চ সন্তি হি।
তানি সৰ্বানি বক্ষ্যামি তীর্থান্যায়তনানি চ ।
পুনরেব মহাবাহুম ভাত্রা চ সঙ্গতঃ।
অবােধ্যাং বনবাসা প্রবিশনঘােহনষে

( ২৮ ) প্রতিকারের ঔষধ নিত্য পূজার উপাদান বক্তচন্দনের মধ্যে যদি তান্ত্রিক সাধকগণ আবিষ্কার করিতে পারিয়া থাকেন, তাহা হইলে--আমরা তঁহাদিগের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেই বাধ্য। রক্তচন্দন, রক্তপুষ্পদি, পূজার উপাদান এবং রক্তবর্ণের বসন ও আসন ব্যবহার এবং উপাস্য দেবীকে রক্তবর্ণে বা সিন্দুরে রঞ্জিত করিবার ব্যবস্থা করিয়া তান্ত্রিক সাধকগণ অসাধারণ দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়াছেন। এ সমস্তই তমােভাবাক্রান্ত মানুষকে রজো- ভাবাপন্ন করিয়া উঠাইবার পক্ষে,কাপুৰষকে পুরুষে পরিণত করিয়া তুলিবার পক্ষে প্রচুর সহায়তা করে। এইরূপ চিন্তার দীপালােক হন্তে লইয়া তন্ত্র-রহস্যের গভীর গুহাতে প্রবিষ্ট হইতে উপস্থিত হইলে, তন্ত্রের আরও অনেক বিষয় আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে খুলিয়া পড়িতে পারে। তন্ত্রে বিভিন্ন দেব-দেবীর “যন্ত্র” বলিয়া যে সকল চিত্র দেখা যায়, এসকল চিত্রের অন্তরালে যে যুদ্ধ-সময়ের দুর্গ প্রস্তুত করিবার কৌশল লুক্কায়িত করিয়া রাখা অ নাই, তাহাই বা কে বলিতে পারেন ? তন্ত্রোক্ত “মুদ্রা” আর একটি অতি গুঢ়-রহস্য-পূণ ব্যাপার। দুই হন্তের অঙ্গুলি-সঞ্চালন-ক্ৰম বিশেষ দ্বারা কেবল যে উপাস্য দেবতার আবাহন, বিসর্জন এবং ঘটাদি আধারে স্থাপন কাৰ্যই সুসম্পন্ন করা হয়, ইহার ভিতরে আর . কোন অভিপ্রায় যে লুক্কায়িত রাখা হয় নাই, তাহাই বা কে বদিতে পারেন ? ফ্রীমেশন সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা নূতন * ( ২৯ ) পরিচয় স্থলে পরস্পর সেও (কর মর্দন ) করিবার সময়ে, সাঙ্কেতিক অঙ্গুলি-কম্পন দ্বারা নিজ সম্প্রদায়ের পরিচয় অন্যকে দিয়া থাকেন। চীন দেশে—তন্ত্রোক্ত ভৈরবী- চক্রের রূপান্তরিত অসংখ্য গুপ্তসমিতি (সিক্রেট সােসাইটি) যে কাৰ্য্য সংসাধনজন্য সৃষ্ট হইয়া, আজিও চীন দেশের প্রায় প্রতি পল্লীগ্রামে বিরাজিত রহিয়াছে, তাহাতেও তান্ত্রিক মুদ্রা বা নানারূপ অঙ্গুলীর ভাষা ব্যবহার করা হইয়া থাকে। নিজ সম্প্রদায়ের বুঝিবার সুবিধার্থ সাধারণের অবােধ্য সেরূপ কোন অঙ্গুলির সঙ্কেত, এদেশের তন্ত্রোক্ত মুদ্রাকে আশ্রয় করিয়া যে রহে নাই, তাহাই বা কে বলিতে পারেন? অনেকে তাক্ত পঞ্চ-মকারের মুদ্রাকে টাকা পয়সা অর্থ- ব্যঞ্জক মুদ্রা মনে করিয়া থাকেন। কেহ কেহ পূজার অঙ্গীয় চাউল ভাজা, ছােলা ভাজা, পিষ্টকাদিকেও মুদ্রা বলিয়া থাকেন। বস্তুতঃ অঙ্গুলি-সঙ্কেত মূলক চিহ্ন বিশেষকেই “মুদ্রা” শব্দের তান্ত্রিক অর্থে এখানে গ্রহণ করিতে হইবে। বেদ ও উপনিষদেও এই অর্থেই অনেক স্থানে মুদ্রা শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে *। তন্ত্রোক্ত পঞ্চমকারের পঞ্চম-স্থানীয় বিষয়টির বিস্তৃত আলােচনা, বর্তমান সভ্যতামূলক বিধিব্যবস্থার প্রতি * স্বান্তাম্ভোজাদ্দেববাহ মুদ্রাং দর্শয়িত্ব দেবস্য সকলী- করণাঙ্গুষ্ঠ হৃদয়াৰ্পিণ্যা খান্তে মুদ্রাং নিবেদ্য পাত্ৰাণি চ মূলেন ত্বা রিক্তে পঞ্চামৃতং সংযােজ্য তেন পঞ্চবারং স বাভিসিচ্য নিত্যেন সন্তর্প কল-নাদি-পুরুষসূক্ত-ৰুদ্ৰাধ্যায়ােঘােষণা .

বন্ধকে এখানে করিতে না পারিলেও এপর্যন্ত যে সকল কথা। আলােচনা করা হইল, তাহা হইতেই বুঝিতে পারা যাইবে যে, গুরুত্বর রাষ্ট্রীয় প্রয়ােজনে এক সময়ে এদেশে তান্ত্রিক-পূজা- পদ্ধতির পুনঃ প্রচার করা অত্যাবশ্যক হইয়া উঠিয়াছিল। এস্থলে.একথাও বলা আবশ্যক বােধ করি যে,-তন্ত্রোক্ত সাধন-পদ্ধতির ইহাই একমাত্র লক্ষীভূত বিষয় বলিয়া বিবেচনা করা সঙ্গত হইবে না। দেশবাসী জনসাধারণের রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন সাধন, তন্ত্রোক্ত সাধনা-পদ্ধতির একটি গৌণ উদ্দেশ্য বলিয়া গণ্য করাই সঙ্গত হইবে। হিন্দুর সাধনামার্গ ত্রিমুখ-গামী। ১ম-ইহলৌকিক সুখ-সম্পৎ সপ্রাপ্তি। ২৪—পারলৌকিক সঙ্গতিলাভ; যথা-স্বর্গাদিগনে যােগ্যতা লাভ। ৩--মুক্তি। তান্ত্রিক উপাসনাতে, সাধকের অধিকার- ভতদে, আকাঙ্ক্ষা-ভেদে এবং উপাসনার পদ্ধতি-ভেদে এই ত্রিবিধ অভিলষিত বস্তুই সাধক পাইতে পারেন। এই বাক্যের সত্যতা মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবী-মাহাত্মে ঘােষণা করিতেছে। এই দেবী মাহাত্ম্যকে বাঙ্গলা দেশে “চণ্ডী, পশ্চিম প্রদেশে “সপ্তসতী, কোথাও বা “দুর্গা” বলিয়া অভিহিত করা দেবীমাহাত্ম্য সর্বত্র সৰ্বশ্ৰেণীৰ ব্রাহ্মণের মধ্যে প্রত্যহ পঠিত হইয়া থাকে। এই দেবী- দিনা মূলেন চাভিষিচ্য সৰ্বপূজাং নিবেদ্য দীপং ত্রিভ্রাম্য সনােপ্লাব্য মহানৈবেদ্যপিঠাবরণাপসংস্কৃত্য দর্শয়েৎ। ( বরদোত্তর-তাপনী-উপনিষৎ )

( ৩১ )
মাহাত্মে বর্ণিত আছে-“স্বারােচিষ মন্বন্তরে সুরথ রাজা
শত্রু কর্তৃক বিতাড়িত হইয়া বনে, গমন করিয়াছিলেন।
সমাধি নামক এক বৈশ্যের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়; বৈশ্যের
স্ত্রী-পুত্রগণ তাঁহার সমস্ত ধনসম্পত্তি বলপূর্বক অপহরণ
করিয়া, তাঁহাকে বিদূরিত করিয়া দিয়াছিল। রাজা এবং
সমাধি বৈশ্য, মেধস-মুনির নিকট বাইয়া স্ব স্ব দুঃখজানাইলেন।
মুনি, তাঁহাদের নিকট দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করিয়া,
তাহাদিগকে দেবীর উপাসনা করিতে উপদেশ দিলেন।
তাঁহারা মুনির উপদেশ মত এক নদীতীরে যাইয়া দেবীর
মৃন্ময়ী মূর্তি প্রস্তুত করিয়া পুষ্প, ধূপ, দীপাদি দ্বারা এবং নিজেদের
শরীরের রক্তদ্বারা সংযত-চিত্ত হইয়া দেবীর পূজা করিতে
লাগিলেন। তিন বৎসরব্যাপী পূজার পরে দেবী প্রসন্ন
হইয়া দর্শন দিলেন। বৈশ্য জ্ঞানলাভ করিয়া মুক্ত হইলেন।
রাজা শত্রু জয় করিয়া নিজ রাজ্য আবার অধিকার করিলেন।
অধিকার এবং আকাঙ্ক্ষা-ভেদে একই দেবীর উপাসনা করিয়া
বিপদগ্রস্ত দুই বন্ধুর মধ্যে একজন মুক্তি পাইলেন, আর জনে
ইহলৌকিক সুখ-সম্পদ ও অপহৃত রাজ্য ফিরিয়া পাইলেন।
একটী দেশের সাধারণ প্রজাপুঞ্জ মুক্তিকামী হইতে পারে
না। মৃত্যুর পরে স্বর্গলােকে যাইয়া সুখী হইবার বাসনাও
অল্পলােকেই হৃদয়ে পােষণ করিতে পারে। সাধারণের
আকাঙ্ক্ষা, ইহলৌকিক মুথ-সম্পং সাত। তান্ত্রিক সাধনা-
পদ্ধতিতে, উপরি বর্ণিত ত্রিবিধ বস্তু লাভের সহজ ও সুগম-মার্গ

( ৩২ ) প্রদর্শিত হইলেও সাধারণের আকাঙ্ক্ষিত ইহলৌকিক সুখ- সম্পৎ সুবিধা প্রাপ্তির কথাই অধিক পরিমাণে দেখিতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় অবস্থা-ঘটিত সুবিধাকর পরিবর্তন সাধারণ প্রজাপুঞ্জের সর্বথা বাঞ্ছনীয়। এজন্য উহার অনুকূল চিত্তের অবস্থা, যাহাতে জন সাধারণে আয়ত্ত করিতে পারেন, তান্ত্রিক সাধকগণ তাহার সুব্যবস্থা--তন্ত্রশাস্ত্রের পুথির পৃষ্ঠার মধ্যে অতি সুকৌশলে সমাবেশ করিয়া রাখিয়া দিয়াছেন। বৌদ্ধ রাজগণের এবং তৎপরে মুসলমান পাতসা ও নবাবগণের দৌরাত্ম-ভয়ে অনেক অতি প্রয়ােজনীয় কথাই রহস্যজালে জড়াইয়া তন্ত্রশাস্তুমধ্যে লুকাইয়া রাখিতে হইয়াছে। প্রধানতঃ এই কারণে, তন্ত্রের অনেক স্থলের অনেক কথার প্রকৃত মন্ম উদ্ঘাটন করা বাহিরের লােকের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব কেবল অভিধান এবং ব্যাকরণের সাহায্য লইয়া বুঝিতে চেষ্টা করিলে, অনেক সময় তন্ত্রের কথার মূল তাৎপর্য কিছুই উপলব্ধি হয় না। এই সকল অসুবিধা দূরের জন্যই অভিজ্ঞ গুরুর নিকট, তন্ত্রশাস্ত্র অধ্যয়ন করা অত্যাবশ্যক। তান্ত্রিক দীক্ষাকে, তান্ত্রিক সাধন-মার্গের পথিকের পক্ষে উপরি কথিত অধ্যয়ন আরম্ভ এবং তান্ত্রিকতত্ত্ব অনুশীলনের একটা প্রারম্ভিক কাৰ্য্য বিশেষ বলিয়াই মনে করা উচিত। উপরি বর্ণিত ত্রিবিধ পথিকের ন্যায় এবং ত্রিবিধ গন্তব্য পথের ন্যায়, পথ-প্রদর্শক গুরুও প্রধানতঃ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া রহিয়াছেন, বলা যাইতে পারে। এজন্য মুক্তি- কামী সাধককে মুক্তিগ-প্রদর্শক গুরুর অনুসন্ধান করিতে হইবে, স্বকামী সাধককে স্বর্গাদি পারলৌকিক সদগতিদাতা গুরুর অন্বেষণ করিতে হইবে-আর ইহলৌকিক সুখ-সম্প- উন্নতিকামী সাধককে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সমাজধ- নীতিজ্ঞ গুরুর চরণ আশ্রয় করিতে হইবে। একদিকে যেমন তান্ত্রিক সাধনা-মার্গের শিষ্যের পক্ষে নিজ-অভিলষিত পথের গুরুর অন্বেষণ করিবার প্রয়ােজন, অন্যদিকে আবার তেমনি গুরুর পক্ষ হইতেও শিষ্য-নির্বাচন সম্বন্ধে অনেক বিচার ও চিন্তা করিবার আবশ্যক রহিয়াছে। দীক্ষা-গ্ৰহণার্থীর-কাহার কোন্ বিষয়ে কিরূপ আকাঙ্ক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষিত পথে গমনের স্বাভাবিক যােগ্যতা আছে, না আছে, তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপ বিচার করিয়া দেখিয়া তবেই যথাযােগ্য ব্যক্তিকে যথাযােগ্য গন্তব্যপথ বা ইষ্টমন্ত্র, গুর প্রদান করিবেন; ইহাই হইল তন্ত্রশাস্ত্রের ব্যবস্থা। লােক- ব্যবহার অন্যরূপে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার কুফলও চারিদিকে যথেষ্ট পরিমাণে ফলিতে আরম্ভ হইয়াছে। ইহার আংশিক প্রতিকার-উদ্দেশ্যে দীক্ষাতত্ত্ব পুস্তকে গ্রন্থকার সংক্ষেপে গুরু-শিষ্যের অধিকারিতা ও অনধিকারিতা সম্বন্ধে আলােচনা করিয়াছেন। উহাতে পূৰ্ব্ব-কথিত তিনটি পথের মধ্যে কেবল প্রধান পথের অর্থাৎ মুক্তিমার্গের সাধাপ্রয়াস গুরু শিষ্যের কথা লইয়াই আলােচনা করা হইয়াছে।

তন্ত্রশাস্ত্রের ভাষায় পশ্বাচার, বীরাচার এবং দিব্যাচ
নামে যে তিনটি সাধনা-মার্গ পৃথক করিয়া রাখা হইয়াছে,
তাহ দ্বারা তান্ত্রিক সাধকের তিনটি গন্তব্য পথ আমরা
বুঝিতে পারিতেছি। দিবাচার মার্গের সাধনা-পদ্ধতি
মুক্তিকামীদের জন্য ব্যবস্থিত হইয়াছে। মানব-সমাজের
মঙ্গলার্থে সাত্ত্বিক ভাবাপন্ন উচ্চাঙ্গের সাধকের সর্বদাই জগতে
অবস্থিতি একান্ত প্রয়ােজন। অন্যান্য যুগের ঋষিদের দ্বারা
যে কাৰ্য্য সম্পন্ন হইত, তাহাদের অভাবে এ সময়ে দিব্যাচার,
মার্গাবলম্বী সাধকদের দ্বারা সেই উদ্দেশ্য কতকটা সংসাধিত
হইতে পারে। কিন্তু এসময়ে সমগ্র
হিন্দুজাতি শূদ্ৰত্বের
নিম্নস্তরে আসিয়া নামিয়া পড়িয়াছে, এমন কি—অনেকে
মানবত্ব হায়াইয়া পশুত্বে আসিয়া পৌছিয়াছে। সেই সকল
পশুভাবাপন্ন ব্রাহ্মণকে যদি আবার সাত্ত্বিকভাবাপন্ন
দিব্যাচার-সম্পন্ন সাধক ব্রাহ্মণে উন্নীত করিতে হয়, তাহা
হইলে তাহাদিগকে রজোগুণপ্রধান ক্ষাভবের মধ্য দিয়া,
বীরাচার-মার্গ অতিক্রম করিয়া, দিব্যাটা-সাধন অনুষ্ঠানে
আনিয়া পৌছাইতে হইবে। ইহা বড়ই কঠিন কাৰ্য্য
এবং অসাধারণ শক্তিসম্পন্ন গুরুর উপদেশেই কেবল
ইহা সম্ভব হইতে পারে। এজন্য দিব্যাচা-সাধনার সহায়ক
গুরুর কথা বিশেষরূপে আলোচনা করিয়া “দীক্ষাত*
গ্রন্থলেখক সুদুর-দৃষ্টির পরিচয় দিয়াছেন। কিন্তু এখন
দেশের যেরূপ অবস্থা, তাহাতে তন্ত্রোক্ত অপর দুইটি

' সাধনা-মার্গকেও এ সময়ে আমরা উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখিতে পারি না। মুক্তিকামীদের জীবনব্যাপী সাধনার জন্য যেরূপ দীক্ষাগ্রহণের প্রয়ােজন, ইহলৌকিক-সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মঙ্গলাভীষ্ট সিদ্ধির জন্য সে ভাবে দীক্ষিত হইবার বা মন্ত্রগ্রহণ করিবার প্রয়ােজন হয় না। গ্রামে ভেদ-বমি ইত্যাদি মারীয় উপস্থিত হইল, তাহার প্রতিকারের জন্য শ্মশানকালী কিম্বা বনদুর্গা পূজার অনুষ্ঠান বাঙ্গালা দেশে প্রায় সর্বত্রই করা হইয়া থাকে। বারােয়ারী কালীপূজা এখনও বাঙ্গালার প্রায় সর্বত্রই হইয়া থাকে। এই সকল তান্ত্রিক পূজা- অনুষ্ঠানে, বৈদিক কাৰ্যানুষ্ঠানের ন্যায় যজমানের সংখ্যা একটি মাত্র থাকে না, পরন্তু গ্রামবাসী শত শত ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কৈবর্ত, গােয়ালা এমন কি--অনেক স্থানে গ্রামের মুসলমান অধিবাসীরাও এরূপ পূজা কাৰ্য্যের যজমান স্থানীয় ইয়া, মহা আনন্দে ও সমারােহে এই সকল কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়া থাকেন। রাজনৈতিক সম্বশক্তি সম্বর্ধনের বীজ, এই সকল তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের মধ্যে নিহিত রহিয়াছে। এই দৃষ্টিতে দেখিতে উপস্থিত হইলে, তান্ত্রিক সাধনার তৃতীয় মার্গকে আমরা এ সময়ে কিছুতেই উপেক্ষা করিতে পারি এ সময়ে এ সকল বিষয়ে আলােচনা নিরাপদ নহে, মনে করিয়াই হয় ত' গ্রন্থকার গ্রন্থমধ্যে আদৌ ইহার উল্লেখ পৰ্যন্ত করেন নাই। তাহা না করিলেও তিনি যে তথ্রোক্ত সাধনারূপ মহাবৃক্ষে গত শখতে প্রতিষ্ঠিত মুক্তি

পারলৌকিক সদগতিরূপ উপাদেয় ফলের দিকে অঙ্গুলী-নির্দেশ
করিয়া জনসাধারণের চিত্ত উহাতে আকৃষ্ট করিতে চেষ্টা
করিয়াছেন তাহার ফলে আমাদের ন্যায় নিম্ন শ্রেণীর
মানুষেরা ঐ দিকে যাইয়া ঐরূপ উচ্চস্থানের ফল হাতে পাইতে
না পারিলেও, ইহলৌকিক ইষ্টসিদ্ধিরূপ নীচের ডালের দুই
চারিটা ফুল বা পাতা যদি করায়ত্ত করিতে পারে, তাহাই
বা মন্দ কি? অন্ততঃ এ কারণেও-“তান্ত্রিক সাধনা-মাৰ্গ কি ?”
“দীক্ষা কি?” “ইষ্ট মন্ত্রাদি-গ্রহণ কাৰ্য্য কি?” এ সকল
বিষয়ের গূঢ়তত্ব জানিবার জন্য আমাদের এ সময়ে একটু
যত্নশীল হওয়া আবশ্যক হইয়াছে।
প্রশশিশেখরেশ্বর শর্মা।

দীক্ষা-তত্ত্ব দীক্ষাতত্ত্ব বুঝিতে হইলে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয়ের আলােচনা করিতে হইবে। যথা- ১ম। দীক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তি ও তাৎপৰ্যার্থ। ২য়। দীক্ষার আবশ্যকতা। মন্ত্রশক্তি। ৪র্থ। দীক্ষাধিকারী। ৫ম। গুরুতত্ত্ব। ৬ষ্ঠ। দীক্ষাপদ্ধতি। ৭ম। সাধনতত্ত্ব। ৮ম। বাহপূজা। ৯ম। আচারভেদ প্রভৃতি--- দীক্ষা—(স্ত্রী) দীক্ষ+ভাবে+ অ, স্ত্রিয়া টা। দীক্ষা শব্দের সাধারণ অর্থ—উপনয়ন সংস্কার ও গুরুর নিকট হইতে তন্ত্রোক্ত মন্ত্রগ্রহণ। দীক্ষার তাৎপৰ্যার্থ, যথা- “দীয়তে বিমলং জ্ঞানং ক্ষীয়তে কৰ্ম্মবাসনা। তেন দীক্ষেতি সা প্ৰােক্তা মুনিভিস্তন্ত্রবেদিভিঃ।” যাহাতে বিমল জ্ঞান প্রদান করে ও বদ্বারা কৰ্ম্ম-বাসনা সকল ক্ষয় হয়, তন্ত্রজ্ঞ মুনিগণ তাহাকে দীক্ষা সংজ্ঞায় অভি- হিত করিয়াছেন। অপিচ- “দদাতি দিব্যতাং তাবৎ ক্ষিয়াৎ পাপসন্ততিং । তেন দীক্ষতি বিখ্যাত মুনিভিস্তন্ত্রপারগৈঃ ” দীক্ষা-তত্ব। যারা দিব্যত্ব লাভ ও পাপসমূহ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তন্ত্র- পারদর্শী মুনিগণকর্তৃক তাহা দীক্ষা সংজ্ঞায় বিখ্যাত হইয়াছে। অপিচ- “দিব্যং জ্ঞানং যত দদ্যাৎ কুৰ্য্যাৎ পাপত সক্ষম। তস্মাদ্দীক্ষেতি সা প্ৰােক্তা মুনিভিস্তবেদিভিঃ।” যাহাতে দিব্যজ্ঞান প্রদান করে এবং পাপ ক্ষয় করে, তন্ত্রজ্ঞ মুনিগণ কর্তৃক তাহা দীক্ষা নামে উক্ত হইয়াছে। অতএব বুঝিতে হইবে—দীক্ষাই পাপ-গায়ের এবং দিব্য- জ্ঞান লাভের একমাত্র সহায়। দীক্ষা যে কেবল পাপসংক্ষয় ও তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করে, তাহা নহে; দীক্ষাগ্রহণ দ্বারা মানব ধৰ্ম্ম, অর্থ কাম ও মােক্ষ এই চতুৰ্বিধ ফল লাভ করিয়া থাকে। দীক্ষাগ্রহণ কালীন যে (কামনা করিয়া) সংকল্প করিতে হয়, তন্ত্রোক্ত সেই সংকল্প মন্ত্রেই:আছে-“ধৰ্মার্থ-কাম-মােক্ষ লাভ কামঃ (অমুক) দেবস্য (ঈয়ৎ) সংখ্যক-মন্ত্রোপদেশ-(দীক্ষা) কর্মাহং করিষ্যে”। ইহাদ্বারা বুঝিতে হইবে, মানবের যাহা কিছু প্রার্থনীয় দীক্ষা দ্বারা তৎ সমস্তই লাভ হয় অর্থাৎ “ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ” চতুৰ্ব্বর্গ ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। ২। দীক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা “সৰ্বাশ্রমে দীক্ষায়মাবশ্যকত্বং”। সকল আশ্রমেই দীক্ষাগ্রহণ আবশ্যক।

দীক্ষা-তত্ব। যথা “দীক্ষামূলং জপং সৰ্ব্বং দীক্ষামূলং পরং তপঃ। দীক্ষামাশ্ৰিত্য নিবসেৎ যত্ৰ কুত্রাশ্রমে বস।” দীক্ষাই সমস্ত জপের মূল অর্থাৎ দীক্ষিত না হইয়া কোন মন্ত্রই জপ করিবে না। তপশ্চরণ কাৰ্যেও দীক্ষা মূল, অর্থাৎ অদীক্ষিতের পক্ষে তপস্যা নিষ্ফল। পুরাণে লিখিত আছে, উত্তাপাদী বালক-ধ্রুব যখন বিমাতার দুৰ্ব্বাক্যে মৰ্ম্মাহত হইয়া কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত হন, তখন ভগবান্ হরি, ধ্রুবের উগ্র তপস্যায় দয়া হইয়াও অদীক্ষিত ধ্রুবকে দর্শন দিতে সমর্থ হন না। পরে ভগবানের আজ্ঞায় দেবর্ষি নারদ, ধ্রুবকে বিষ্ণুর মহামন্ত্রে দীক্ষিত করিলে অল্পায়াসেই ধ্রুব, ভগবান্ শ্রীহরির দর্শন লাভে কৃতকৃতার্থ হইয়াছিলেন অতএব যে ব্যক্তি যে কোন আশ্রমেই বাস করুক, দীক্ষার আশ্রয় গ্রহণ-পূৰ্ব্বক তত্তৎ আশ্রমে বাস করিবে। অপরঞ্চ “অদীক্ষিতা যে কুৰ্বন্তি জপ-পূজাদিকা ক্রিয়া। ন ভবন্তি ফলং তেষাং শিলায়ামুপ্তবীজবৎ। অদীক্ষিত ব্যক্তি জপ পূজাদি যে কোন ক্রিয়া করে, তাহার সেই ক্রিয়া প্রস্তরের উপরে বপণ করা বীজের ন্যায় নিষ্ফল হয়। অপরঞ্চ- “দেবি! দীক্ষা-বিহীনস্থ ন সিদ্ধির্ন চ সদগতি। তস্মাৎ সর্বপ্রষনে গুরুণা দীক্ষিতত ভবেৎ ॥”

দীক্ষা-তত্ব। ৪ হে দেবি! দীক্ষাহীন ব্যক্তির মন্ত্রসিদ্ধি অথবা সদগতি কিছুই হয় না। অতএব গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সৰ্ব্ব- প্রযত্নে যথাবিহিত দীক্ষা গ্রহণ করিবে। অপরঞ্চ- “অদীক্ষিতােহপি মরণে রৌরবং নরকং ব্ৰজৎ। অদীক্ষিতস্য মরণে পিশাচত্বং ন মুঞ্চতি। তস্মাদ্দীক্ষাং প্রযত্নেন সদা কুৰ্য্যাচ্চ তান্ত্রিকাৎ ॥” দীক্ষা গ্রহণ না করিয়া মৃত্যু হইলে তাহার রৌরব নামক নরক প্রাপ্তি হয়, এবং তাহার পিশাচত্ব মােন হয় না। (এই জন্য যদি কেহ অদীক্ষিত অবস্থায় অকস্মাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে সম্ভব থাকিলে—মুমূর্ষ ব্যক্তির কর্ণে গুরু দ্বারা মন্ত্র প্রদান পূর্বক তাহাকে নরক হইতে রক্ষা করা হইয়া থাকে।) অতএব যথাসময়ে যত্ন সহকারে তন্ত্রজ্ঞ গুরুর নিকট দীক্ষিত হইবে। তথাচ---(মৎস্য-সূক্তে ) “অদীক্ষিনাং মানাং দোষং শৃণু বরাননে। অনুং বিষ্ঠাসমং তস্য জলং মূত্রসমং স্মৃতম্ । তৎকৃতং তস্য বা শ্রাদ্ধং সৰ্ব্বং যাতি হ্যধােগতিম্।” হে বরাননে। অদীক্ষিত মানবগণের দোষ শ্রবণ কর। দীক্ষাইন ব্যক্তর শৃষ্ট অন্ন বিষ্ঠ,তুল্য এবং জল মূত্রতুল্য।

দীক্ষা-তত্ব।
তাহাদের কৃত শ্রদ্ধ ও তদীয় শ্রাদ্ধ সমস্তই অধােগতি
প্রাপ্ত হয়।
“অদীক্ষিত বামােক কৃতং সৰ্বমর্থকং।
পশুযযানিমবাপ্পেতি দীক্ষাহীনাে নরাে মৃতঃ।”
বামেরু! অদীক্ষিত ব্যক্তির কৃত সমস্ত কাৰ্য্যই পণ্ড হয়।
দীক্ষাহীন নর মরণের পর পশু যােনি লাভ করে।
“সদ্গুরােরাহিত দীক্ষা সৰ্ব্বকৰ্ম্মাণি সাধয়েৎ।”
সদ্গুরু-প্রদত্তা দীক্ষা সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম সাধন করে। অর্থাৎ
দীক্ষা-কামী ব্যক্তি শুভদিনে পবিত্রস্থলে সংযমী হইয়া তন্ত্রোক্ত
বিধানে সদাচার-সম্পন্ন জ্ঞানী গুরু হইতে ক্তভিপূৰ্ব্বক দীক্ষা
গ্রহণ করিলে তাহার সর্বাভীষ্ট সিদ্ধ হয় এবং সকল কর্ম
সুসিদ্ধ হয়।
তথাচ— নবরত্নেশ্বরে)
“সৰ্বাসামপি দীক্ষাণাং মুক্তি ফলমখণ্ডিত।
অবিরােধাবন্ত্যেব প্রাসঙ্গিকন্তু ভুক্তঃ
উপপাতক-লক্ষাণি মহাপাতক-কোট।
ক্ষণাহতি দেবেশি! দীক্ষা হি বিধিনা কৃতা।”
সর্বপ্রকার দীক্ষাতেই মুক্তি ফল লাভ অবশ্যম্ভাবী।
তৎপ্রসঙ্গাধীন মুক্তিফলের অবিােধে অন্য প্রকার ফলভােগও
দীক্ষিত ব্যক্তির হইয়া থাকে। হে দেবেশি! বিধি-পূৰ্ব্বক
দীক্ষা গ্রহণ করিলে তৎক্ষণাৎ বহুল উপপাতক এবং
বহুকোটি মহাপাতক ভষ্মীভূত হয়।

দীক্ষা-তত্ব। এস্থলে যে বিধিপূর্বক দীক্ষা গ্রহণের বিষয় উক্ত হইয়াছে, তাহার কারণ এই যে—স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি, বিধি লঙ্ঘন পূর্বক দীক্ষি হইলে তদ্বারা সুফলের পরিবর্তে কুফল জন্মিয়া থাকে। যথা—“কল্পে দৃষ্ট। তু মন্ত্রং বৈ যাে গৃহ্নাতি নরাধমঃ। মন্বন্তর সহযুে নিষ্কৃতির্নৈব জায়তে।” যে নরাধম গুরুর নিকট দীক্ষিত না হইয়া গ্রন্থাদৃষ্টে মন্ত্র গ্রহণ করে, সে সহস্র মন্বন্তরেও নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারে না। আজ কাল মুদ্রান্ত্রের প্রসাদে বেদ, পুরাণ, তন্ত্র সংহিতা প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ পথে, ঘাটে, হাটে, বাজারে মুদি বাখারী দ্বারাও আলােচিত হইয়া থাকে।' এক দিকে ধর্মগ্রন্থের বহুল প্রচারে যেমন ধর্মগ্রন্থাদির রক্ষা বিধান হইতেছে, তেমনি আবার সেই অমূল্য রত্নগুলি অনধিকারী অজ্ঞ লােকের হন্তে পড়ায় যােগ, যাগ, তন্ত্র, মন্ত্র, প্রভৃতি উপহাসের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। স্থান, কাল, পাত্রানুসারে উপযুক্ত অধিকারী দ্বারা যথাবিধি প্রযুক্ত না হইলে মহামন্ত্রও কার্যকর হয় না। যথা- “গং সর্পিঃ শরীরস্থ ন কৰােত্যঙ্গ-পােষণং। নিতে কর্মসংযুক্তং পুনস্তাসাং তদৌষধ।” গাভীর শরীরস্থ সর্পি দ্বারা তাহার অঙ্গ পােষণ হয় না। বংস-সংঘােগে দুগ্ধ দোহন করিয়া যথাবিহিত মন্থনাদি ক্রিয় দ্বারা ঘৃত বাহির করিলে সেই ঘৃতই আবার সেই গাভীরও পুষ্টিকর ঔষধ স্বরূপে ব্যবহৃত হয়।

দীক্ষা-তত্ত্ব। ৭ এইরূপ প্রত্যেক বিষয়েই বৈধ-ক্রিয়ার অনুষ্ঠান প্রয়ােজন। যদি কেহ বৎস-সংযোগে গাভী দোহন না করিয়া অস্ত্রের সাহায্যে দুগ্ধ বাহির করিতে চেষ্টা করে, তবে দুগ্ধের পরিবর্তে শােণিত নির্গত হইবে। সুতরাং দীক্ষা গ্রহণ সম্বন্ধে ও যথাবিধি কাৰ্য্য না করিয়া যদি কেহ তন্ত্রাদি গ্রন্থ হইতে মন্ত্র বাছিয়া লইয়া স্বয়ং দীক্ষিত হয়, তবে তাহাকে মসিদ্ধি লাভের পরিবর্তে নিয়গামী হইতে হইবে। অন্যান্য শাস্ত্রাদির উপদেশেও গুরুর প্রয়ােজন, গুরুপদেশ ভিন্ন কোন কাৰ্য্যই সিদ্ধ হয় না। তথাপি ভাষার উপর অধিকার জন্মিলে অন্যান্য গ্রন্থের বিষয় কতকটা নিজেও বুঝিতে পারা যায় ; কিন্তু তন্ত্র, জ্যোতিষ, যােগাস্ত্র প্রভৃতি সঙ্কেতিক গ্ৰন্থ কখনও গুরূপদেশ ভিন্ন বুঝিবার উপায় নাই। তন্ত্রোক্ত মন্ত্র সমূহের সংজ্ঞা সাধারণের বােধ্য নহে। ব্যাকরণে বিশেষ বুৎপন্ন হইলেও তন্ত্রজ্ঞ ভিন্ন, মন্ত্রের সাঙ্কেতিক সংজ্ঞা অন্য কেহ বুঝিতে সমর্থ হন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ মায়াবীজ, কামবীজ, রমাবীজ ইত্যাদির উল্লেখ করা যাইতে পারে। তন্ত্রোক্ত মন্ত্রোদ্ধার আরও গুহত। কপূরাদি স্তোত্রে কৌশল ক্রমে ক্রমদ্দক্ষিণা কালীর একাক্ষরী বীজমন্ত্র উদ্ধৃত হইয়াছে। যথা—“কপূর শব্দের মধ্যম ও অন্ত্যবর্ণ এবং স্বর পরিত্যাগ করিয়া তাহাতে ইন্দু ও বামাক্ষী বীজ যােগ কৰিলে এই একাক্ষরী মহামন্ত্র হয়; কালি- কার এই একাক্ষরী মহামন্ত্র অতি শক্তিশালী। এইরূপ অন্যান্য দেবতার বীজ-মন্ত্রও সাঙ্কেতিক নিয়মে উদ্ধৃত হইয়া থাকে।

দীক্ষা-তত্ব।
প্রত্যেক বীজ-মন্ত্রেরই অর্থ আছে। মন্ত্ৰাৰ্থ ও মন্ত্র-চৈতন্যে জ্ঞানহীন
ব্যক্তি জপ দ্বারা কখনও ফল লাভ করিতে পারে না। যথা-
“মার্থং মন্ত্ৰচৈতন্যং যােনিমুদ্রাং ন বেত্তি যঃ।
শতকোটি জপেনাপি তস্য সিদ্ধিন জায়তে।”
(কুলার্ণবে)
মন্ত্রের অর্থ, মন্ত্র-চৈতন্য ও যােনিমুদ্রা যে ব্যক্তি পরিজ্ঞাত
নহে, শতকোটী জপ দ্বারাও সে সিদ্ধিলাভ করিতে পারে না।
এ স্থলে যােনিমুদ্রা অর্থে মন্ত্রোদ্ধার বা মন্ত্রের উৎপত্তি
বুঝিতে হইবে।
কালী, তারাদি দশমহাবিদ্যা, দুর্গা, কৃষ্ণ, গণেশ, শিব
প্রভৃতি প্রত্যেক দেবতার বহু মন্ত্র, তন্ত্রে উক্ত হইয়াছে।
প্রকৃতি-পুরুষাত্মক পরমব্রহ্ম এক হইলেও তিনি প্রয়ােজনা-
নুসারে দেহ রচনা করিয়া থাকেন। বেদ, তন্ত্র, পুরাণ প্রভৃতি
শাস্ত্রে একবাক্যে ইহা স্বীকৃত হইয়াছে।
“অজানেকাং লােহিত-শুক্ল-কৃষ্ণং বহ্নি-প্ৰজা-
সৃজামানা-স্বভাবাং” ইত্যাদি—শ্রুতিঃ )
“নিত্যৈব সা জগন্মুর্তি তয়া সৰ্ব্বমিদং ততং।”
(মার্কণ্ডেয় পুরাণ।)
সেই মহামায়া নিত্যা, এই দৃশ্যমান্ জগৎ তাঁহার প্রকট
মূৰ্ত্তি, মহামায়া কর্তৃক সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত।
যােনিরুৎপত্তিদ্ভব। ইত্যমর।

দীক্ষা-তত্ব। “দেবানাং কাৰ্যসিদ্ধর্থমাবির্ভবতি সা যদা। উৎপন্নেতি তদা লােকে সা নিব্যাপ্যভিধীয়তে।” ( মার্কণ্ডেয়পুরা।) সেই মহামায়া নিত্য হইয়াও দেবতাদিগের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত যখন আবির্ভূত হন, তখন তিনি (কালী দুর্গাদি নানারূপে) উৎপন্না বলিয়া অভিহিত হন। শ্রীমদ্ভগবদগীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীভগবানকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এবং সততযুক্তা যে ভাস্বা পর্যােসতে। যে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যােগবিত্তমাঃ । যে ভক্ত সর্বদা তােমাতে আশক্ত-চিত্ত হইয়া তােমার সাকার রূপের উপাসনা করে, এবং যে ভক্ত অব্যক্ত অক্ষর নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনা করে, তন্মধ্যে কোন্ ভক্ত শ্রেষ্ঠতম ? শ্রীভগবান্ উত্তর করিলেন- “মব্যাবে মনন যে মাং নিত্যযুক্তা উপিসতে। শ্ৰদ্ধয়া পরয়ােপেতান্তে মে যুক্ততম মতাঃ।” “যে বৃক্ষরমনিৰ্দেশ্যমব্যক্তং প্যু পাসতে। তে প্রাপ্তবন্তি মামেব সৰ্ব্বভূত হিতে রতাঃ।” “ক্লেশােহধিকতরস্তেষামব্যাশক্ত-চেতষাং। অব্যক্তা হি গতিদুঃখং দেহবরিবাপ্যতে * দীক্ষা-তত্ব। হয়; পরম শ্রদ্ধা সহকারে যে আমাতে আসক্তচিত্ত হইয়া সতত আমার সাকার রূপের উপাসনা করে, সেই ভক্ত আমার মতে শ্রেষ্ঠতম। যে ব্যক্তি অক্ষর অনিৰ্দেশ্য অব্যক্ত নিরাকার সৰ্বব্যাপী পরমাত্মার উপাসনা করে, সেও আমাকেই প্রাপ্ত তবে দেহাভিমানী ব্যক্তির পক্ষে অব্যাসক্ত-চিত্ত হইয়া নিরাকার পরমাত্মার উপাসনা অধিকতর ক্লেশকর। ইহাদ্বারা বুঝিতে হইবে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ দেহধারী মানবের পক্ষে সাকার রূপের উপাসনাই শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। বেদান্তসারে উপাসনার যে অর্থ নির্দিষ্ট হইয়াছে, তাহাতেও সগুণ ব্রহ্মের চিন্তাই বুঝাইতেছে। যথা- “সগুণ-ব্ৰহ্মবিষয়ক-মানস-ধ্যাপার-রূপানি উপাসনানি।” অর্থাৎসগুণ (সাকা) ব্ৰহ্মবিষয়ক মানস-ব্যাপারকে উপাসনা কহে। তন্ত্রমতে- “নিরাকারাপি সাকারা মায়য়া বহুরূপিণী।” ব্ৰহ্মময়ী আদ্যা প্রকৃতি নিরাকার হইয়াও সাকারা, তিনি আত্মমায়াদ্বারা বহুরূপ (কালী, তারা প্রভৃতি) ধারণ করিয়াছেন। দর্শনমতেও ঐ তন্ত্রোক্ত বাক্য সমর্থিত হই- আছে। যথা- “সাধকানাং হিতার্থায় ব্ৰহ্মণণা রূপকল্পনা”–(শৈবদর্শন) ভক্ত সাধকগণের হিতার্থে ব্ৰহ্ম নানারূপ পরিগ্রহ করিয়াছেন। এস্থলে কেহ কেহ বলিতে পারেন “নিরাকার ঈশ্বর সাধকের -~- হিতার্থে দেহ ধারণ করিয়া একটি রূপ পরিগ্রহ করিলেই পারি- তেন। নানারূপ ধারণ করিয়া মতদ্বৈধে সৃষ্টি করিলেন কেন?” এই স্থলে এই বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, বিভিন্ন ধাতু প্রকৃতির পক্ষে যেমন একরূপ খাদ্য রুচিকর হয় না এব’ এক শ্রেণীর ঔষধ ফলপ্রদ হয় না, বরং ব্যক্তি বিশেষে অনিষ্টকর হয়, একটি কবিতা বা সঙ্গীত যেমন ব্যক্তিভেদে প্রীতিপ্রদ বা অপ্রিয় হয়, তদ্রুপ ভগবানের একমাত্র সাকাররূপ সাকার উপাসকদিগের পক্ষে প্রীতিকর হইবে না বলিয়াই পরমেশ্বর নানারূপ পরিগ্রহ করিয়াছেন। কোন সাধক “ফুল্লেন্দীবর- কান্তিমিন্দুবদনং” কমনীয় কৃষ্ণরূপে মুগ্ধ, আবার কেহ বা করালবদনাং ঘােরাং” মহারৌদ্রী কালীরূপে আসক্ত। ইহাও কচিগত পার্থক্যের ফল। কেহ হয়ত বলিবেন,—মহাভয়ঙ্করী ভীমা কালী-মূর্তি কিরূপে ভক্তের প্রতিদা হইবে? ইহার উত্তর এই—সিংহ-শাবকের নিকট তাহার মাতার দংষ্ট্ৰাকরল ভীষণানন কি ভীতিপ্রদ না প্রিয়? মাতৃমন্ত্রের বীর সাধকের নিকট করালবদনা কালীও তদ্রুপ সুখপ্রসন্ন বদনা বরাভয়ধারিণী দয়াময়ী। ভগবানই সাধকের হিতার্থে বা দেবতাদিগের কার্যসিদ্ধির জন্য বহুরূপ পরিগ্রহ করিয়াছেন, তাই জ্ঞানীসাধক কালী-কৃষ্ণাদিতে ভেদবুদ্ধি পােষণ করেন না। বিশেষতঃ ভেদ- বুদ্ধির সামঞ্জস্য জন্য মহিমুস্তবে পুষ্পদন্ত বলিয়াছেন- দীক্ষা-তত্ব। “ত্রয়ী সাংখ্যং যােগঃ পশুপতিমতং বৈষ্ণবমিতি। প্রভিন্নে প্রস্থানে পরমিদমদঃ পথ্যমিতি চ। রুচীনাং বৈচিত্র্যাজু-কুটিল-নানাপথজুষাং। নৃণামেকো গম্যস্তমসি পয়সামৰ্ণব ইব।” ত্রয়ী (বেদত্রয়), সাংখ্য, যােগ, শৈবমত (তন্ত্রশাস্ত্র , বৈষ্ণব মতাদি প্রথমতঃ পরস্পর প্রভিন্ন পথে প্রস্থান করি- আছে তাই রুচিভেদ হেতু “এইটি সুপথ,” কি “এইটি সুপথ”? বলিয়া মতভেদ ও বিবােধ হয়, কিন্তু হে প্রভাে! সরল কুটিল নানাপথে প্রধাবিত নদনদী সমুহের জল যেমন পরিশেষে একমাত্র মহাসাগরে পতিত হয়, তদ্রুপ সাধকগণ রুচি অনুসারে যে পথেই কেন গমন না করুন পরিশেষে এক- মাত্র অদ্বৈত স্বরূপ তােমাতেই সকলে মিলিত হইবেন অর্থাৎ সকলের গন্তব্য স্থান একমাত্র তুমি। ইহাই বেদ, পুরাণ, তন্ত্রাদি সকল শাস্ত্রের শেষ সিদ্ধান্ত। “দীপাদ্দীপান্তরমিব” একটি দীপ হইতে অন্য একটি দীপ প্রজ্জলিত হইলে উভয় দীপের মধ্যে যেরূপ কোনরূপ প্রভেদ পরিলক্ষিত হয় না, তদ্রুপ ভগবান্ নানামূর্তি পরিগ্রহ করিলেও প্রত্যেক মূর্তিতে কোনরূপ প্রভেদ লক্ষিত হয় না। মূলতঃ সমস্ত সাকার মূৰ্ত্তিই অভেদ। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে—তন্ত্রে কালী, তারা, শিব প্রভৃতি প্রত্যেক মুর্তিরই একাক্ষরী, দ্বক্ষরী, এ্যক্ষরী, পঞ্চাক্ষী দীক্ষা-তত্ত্ব। বড়ক্ষরী প্রভৃতি বহুম রহিয়াছে। তন্মধ্যে সাধকের রাশি নক্ষত্র এবং নামানুসারে গুরুদেব চক্ৰ বিচার করিয়া দীক্ষার্থী শিষ্যকে ষট্‌চক্ৰ-পরিশােধিত মন্ত্রপ্রদান করেন। ষট্‌চক্র-সংশুদ্ধ মহামন্ত্রের শক্তি আমােঘ ও অসীম। মন্ত্রগ্রহণ মাত্রই সাধক সিদ্ধত্ব লাভ করে এবং ঐ সিদ্ধমন্ত্র জপ দ্বারা সাধক ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষ; এই চতুৰ্বর্গ ফল লাভের অধিকারী হয়। সিদ্ধারিচক্ৰ-পরিশােধিত “সুসিদ্ধমন্ত্র” গ্রহণ মাত্রই সাধক সিক্তমন্ত্রী মধ্যে পরিগণিত হইয়া থাকেন। সিদ্ধারি-চক্রে চারিকার মন্ত্রের উল্লেখ আছে যথা——সিদ্ধ, সাধ্য, সুসিদ্ধ ও অরি। এই চতুৰ্বিধ মন্ত্রমধ্যে অরি-মন্ত্র গ্রহণীয় নহে। অন্য ত্রিবিধ মন্ত্রই গ্রহণীয় । তন্মধ্যে—“সিদ্ধং সিধ্যতি কালেন, সাধ্যস্তু হােমতঃ। সুসিদ্ধং গ্রহণদেব, রিপুৰ্ম্মলং নিকৃন্ততি।” অর্থাৎ সিদ্ধমন্ত্র গ্রহণ করিলে সাধক যথাকালে স্বয়ং সিদ্ধ হয়, সাধ্যমন্ত্র জপ হােমাদি দ্বারা সিদ্ধ হয়, সুসিদ্ধ মন্ত্র গ্রহণ মাত্রেই সাধক সিদ্ধত্ব লাভ করে এবং অরিমন্ত্র গ্রহণ করিলে সমূলে ধ্বংশ প্রাপ্ত হয়। এক্ষণে সিদ্ধ-মন্ত্রের শক্তি ও ষটচক্র-বিচারের বিষয় আলােচনা করিয়া পরে স্থান, কাল, পাত্র গুরুত্ব এবং দীক্ষা- পদ্ধতির আলােচনা করিব।

১৪ দীক্ষা-তত্ব। মন্ত্রশক্তি দ্বারাই সাধকগণ অসাধ্য সাধন ও ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ লাভ করিতে সমর্থ হন। এই জন্যই লােকে কোন উৎকট নােগাদি অত্যল্প সময় মধ্যে সহজে আরােগ্য হইলে “মন্ত্র-শক্তির” উপমা দিয়া থাকে। যথা-“মন্ত্র-শক্তির ন্যায় আরােগ্যকর”, ইত্যাদি। মন্ত্রশক্তির উপমা এক্ষণ তালপুকুর গ্রামের ন্যায় সংজ্ঞা মাত্রে পর্যবসিত হইয়াছে। কোন এক পল্লীগ্রামে বৃহৎ পুষ্করিণীতীরে একটি অত্যুচ্চ তালগাছ ছিল। সেই জন্য ঐ গ্রাম তালপুকুর নামে অভিহিত হইত। এক্ষণ কাল-তরঙ্গে ঐ তালগাছ ও পুকুর কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে, তাহার চিহ্নমাত্রও নাই। কিন্তু পরম্পরাগত পূৰ্ব্ব-সংস্কারানুসারে লােকে ঐ গ্রামকে এখনও “তালপুকুর” বলে। মন্ত্রশক্তিরও সেই অবস্থা। উপযুক্ত অধিকারী দ্বারা যথাবিধি প্রয়ােগের অভাবে মন্ত্রশক্তির আর সে প্রভাব নাই। আছে কেবল চিরাগত সংস্কারানুসারে মন্ত্রশক্তির উপমা “মন্ত্র শক্তির ন্যায় ফলপ্রদ। কথায় কথায় লােকে মন্ত্রশক্তির উপমা দেয় বটে, কিন্তু মন্ত্রশক্তিতে আন্তরিক শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস নাই। বরং কেহ মন্ত্রশক্তিতে বিশ্বাস করিলে “অন্ধবিশ্বাস বলিয়া উপহসিত হয়। বস্তুত মন্ত্রশক্তি অন্ধ বিশ্বাস নহে। মন্ত্রশক্তির ক্ষমতা অসীম। মারণ, উচ্চাটন বশীকরণ শান্তি বস্ত্যয়নাদি, নােগাদি উপশম, ধনলাভ, সৌভাগ্যলাভ, প্রভৃতি সাংসারিক বিষয়ের ত কথাই নাই, মন্ত্রশক্তি বলে সাধক পরম দীক্ষা-তত্ব। ১৫ পদ লাভের অধিকারী হইতে পারে। পাশ্চাত্য শিক্ষিত ব্যক্তিগণ শিক্ষার দোষে মন্ত্রশক্তিতে অবিশ্বাস করিতে পারেন বটে, কিন্তু আদিবিদ্বান্ মহর্ষি কপিলদেব যুক্তিদ্বারা নিহত্য- শ্বরের প্রয়ােজনীয়তা অস্বীকার করিয়া থাকিলেও বেদের অপৌরষেয়ত্বে এবং মন্ত্রশক্তিতে তাহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। কপিল, কণাদ, গৌতম, জৈমিনি ও শঙ্করাচার্য প্রভৃতি অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন মনীষিগণ যে মন্ত্রশক্তিতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, সেই মন্ত্রশক্তিকে “অন্ধবিশ্বাস” বলা ধৃষ্টতা মাত্র। বিশ্বস্রষ্টার বিচিত্র কৌশলপূর্ণ অনন্ত গ্রহ নক্ষত্রাদি সমন্বিত বিশাল বিশ্বের নিকট আমরা ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্রতম কটামুকীট মাত্র। সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায় আমরা কি বুঝিব? আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধি যে বিষয় ধারণা করিতে অক্ষম বা যাহা আমাদের বুদ্ধির অবিষয়, তাহাই আমরা “অন্ধবিশ্বাস” বা উপহাসের বিষয় মনে করি। অনেকে আবার প্রত্যক্ষাতিরিক্ত বিষয়ের প্রামাণ্য স্বীকার করে না; কিন্তু বল দেখি-জগতের কয়টি পদার্থ তােমাদের প্রত্যক্ষ । আবার যাহা প্রত্যক্ষ বলিয়া মনে করা যায়, তাহাই কি সব অভ্রান্ত? তবে মন্ত্রশক্তিতে অবিশ্বাস কেন ? মহাতপা ঋষিগণ অনশনে যােগাসনে বসিয়া যে মহামন্ত্র সাধন দ্বারা অমৃতত্ব লাভ করিতেন, অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন যুক্তিবাদী দার্শনিকগণ যে মন্ত্রশক্তিতে দৃঢ়তর বিশ্বাসী ছিলেন, তাহা কখনও অন্ধবিশ্বাস বা উপহাসের বিষয় নহে। যে মন্ত্রশক্তি সর্বশাস্ত্রসম্মত, আজ সেই মন্ত্রশক্তি

দীক্ষা-তত্ত্ব।
প্রতিপাদনের জন্য আমার ন্যায় ক্ষুদ্রবুদ্ধিসম্পন্নকেও যে যুক্তি
প্রদর্শন করিতে যাইতে হইবে, ইহাই আশ্চর্যের বিষয়, কিন্তু
কালানুসারে—যুক্তিবাদীগণের মনস্তুষ্টির জন্য দুই চারিটি যুক্তি
প্রদর্শন না করিয়া উপায় নাই। সেই জন্য মন্ত্রশক্তি সম্বন্ধে
কিঞ্চিৎ আলােচনা করিতে হইবে।
“মননাৎ তায়তে যম্মাৎ
তন্মান্মন্ত্রঃ প্রকীৰ্ত্তিতঃ।
যে বর্ণ-সমষ্টির মনন দ্বারা সাধক সংসার-সমুদ্র হইতে ত্রাণ
পান, তাহাই “মন্ত্র” পদবাচ্য।
মন্ত্র জপ তিন প্রকার, মানস, উপাংশু ও বাচিক। এই
তিন প্রকার জপের মধ্যে মুনস জপকেই মনন বলে। তিন
প্রকার জপের মধ্যে মানস জপই শ্রেষ্ঠ। মনন দ্বারা ক্রিয়া সিদ্ধি
হয়, ইহা অনেকে বিশ্বাস না করিতে পারেন, কিন্তু তাহা
অবিশ্বাস্য নহে। আমরা যাহা কিছু করি, সমস্তই মননের
ফল। ঘট, পট, অট্টালিকা, যন্ত্রাদি যাহা কেন প্রস্তুত
হউক না, তৎসমস্তই মকল্পিত বিষয়ের বহির্বিকাশ মাত্র।
নিত্যাবস্থিত আপ্ত-শব্দের (মন্ত্রের) অনুবাদক ধ্বনিও তােপ
মানস জপের বহির্বিকাশ মাত্র। বিশ্বস্রষ্টা ব্ৰহ্মার অন্তঃকরণেও
সৃষ্টির পূৰ্বে জগদরস্বরূপ জগচ্চিত্রের সূক্ষ্ম রেখাপাত
হইয়াছিল। মনন ভিন্ন কোন কাৰ্যই সম্পন্ন হয় না।
মন্ত্রশক্তির আলােচনা করিতে হইলে শব্দশক্তি, অধিকারী-
ভেদ প্রভৃতি বিষয়ের সংক্ষেপে আলােচনা করা প্রয়ােজন।

দীক্ষা-তত্ত্ব। মন্ত্ৰসমূহ শব্দময় বা শব্দ-সমষ্টি মাত্র। সুতরাং মন্ত্র-শক্তি ও শব্দ-শক্তি মূলত অভিন্ন। অতীন্দ্রিয়-দ্রষ্টা ঋষিগণ শব্দসমুদ্র মন্থন করিয়া, যে অসীম-প্রভাব-সম্পন্ন চতুৰ্ব্বর্গ-সাধক রত্নরাজি উদ্ধার করিয়াছেন, তাহাই মন্ত্র’ সংজ্ঞায় অভিহিত। অতএব অগ্রে শব্দ-শক্তির অলােচনা করিলেই মন্ত্র-শক্তি সম্বন্ধে অনেক দূর অগ্রসর হইতে পারিব। মন্ত্র বা শব্দ দুই প্রকার- বর্ণাত্মক ও ধবন্যাত্মক। বর্ণাত্মক শব্দ, অনাদি-নিধন—নিত্য। ঐ বর্ণাত্মক শব্দ দ্বারা বক্তার হৃদূগত ভাব অন্যের জ্ঞানে আহিত করিবার চেষ্টা বিশেষের অভিব্যক্তিই—ধ্বন্যাত্মক শব্দ। কণ্ঠ তালুকাদ্যভিঘাত-জনিত যে ধ্বনি বিশেষ আমরা শ্রবণ করি, তাহা প্রকৃত শব্দ নহে; তাহা নিত্যাবস্থিত বর্ণাত্মক শব্দের অনুবাদ মাত্র। কেহ কেহ শব্দকে উৎপন্ন-প্রধ্বংসী বলিয়া থাকেন; কিন্তু তাহা প্রকৃত নহে। নিত্যাবস্থিত শব্দের সঙ্কেতাত্মক ধ্বনি-বিশেষই উৎপন্ন-প্ৰধ্বংসী। বস্তুতঃ, শব্দের উৎপত্তিও নাই, ধ্বংস ও নাই। নিত্যাবস্থিত বর্ণাত্মক শব্দ দুই প্রকার,লৌকিক ও আপ্ত; যে বর্ণাত্মক শব্দ, মনুষ্যগণ কণ্ঠধ্বনিতে স্বেচ্ছাপূর্বক আরােহণ করায়, তাহার নাম-“লৌকিক শব্দ।” লৌকিক শব্দ অপ্রমাণ। যাহা অপৌরুষেয়, তাহার নাম “আপ্ত শব্দ।” আপ্ত শব্দ (বেদ ও মন্ত্রাদি) অনাদি-নিধন—নিত্য এবং প্রয়াণ রূপে গণ্য। আপ্ত শব্দ প্রকৃতির সাক্ষাৎ আদেশ। প্রকৃতিতে যে বােধ্য, বােধ ও বােধক—এই তিনটা ভাব স্বততাবিদ্যমান, } ১৮ দীক্ষা-তত্ব। . তন্মধ্যে বােধক ভাবই আপ্ত শব্দ। যথা “স্বৰ্গকামাে যজেত”- স্বৰ্গকামী ব্যক্তি যাগু করিবে। তাৎপৰ্যাৰ্থ এই-স্বর্গ সুখ-বিশেষ, যাগ সৎকাৰ্য-বিশেষ, সুখাভিলাষী ব্যক্তি সৎকাৰ্য্য করিবে। আরও স্পষ্টার্থ–সৎকাৰ্য্য করিলে সুখ হয়, ইহাই প্রকৃতির সাক্ষাৎ আদেশ। এই আপ্ত শব্দ (বেদ) মনুষ্য- রচিত নহে। কোন অতীন্দ্রিয়-দ্রষ্টা ঋষি এই নিত্যাবস্থিত বৈদিক মন্ত্রের প্রকাশক বলিয়া, তিনি এই শ্রুতির ঋষিপদ বাচ্য। সৎকাৰ্য্য করিলে সুখ হয়, অসৎকাৰ্য্য করিলে দুঃখ হয়,—ইহা প্রকৃতির অখণ্ডনীয় বিধি। সুতরাং আপ্ত শব্দ অপৌরুষেয় ; ইহা অন্ধবিশ্বাস নহে। আপ্ত শব্দের অপৌরুষেয়ত্ব ও মন্ত্র-শক্তির প্রবল প্রভাব সহ্বন্ধে কপিল, কণাদ, গৌতম, জৈমিনি প্রভৃতি দার্শনিক মহর্ষিগণ স্ব স্ব দর্শনে নানারূপ যুক্তি-তর্কের অবতারণা করিয়া যেরূপ চিন্তা-শক্তির ও গভীর গবেষণার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন, তাহার বিস্তৃত আলােচনা, এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নহে। তাহার সংক্ষিপ্ত মৰ্ম্ম এস্থলে প্রদান করিব মাত্র। শব্দের অনুবাদক ধ্বনি বায়ুমণ্ডলে প্রতিহত হইয়া তরঙ্গাকারে দূর দূরান্তরে গমন করে। পরিশেষে বায়বীয় পরমাণুর সহিত অনন্তে মিশিয়া যায়। আবার যেমন হােমিও- প্যাথিক ঔষধের পরমাণু-ব্যথিত অঙ্গ স্পর্শ করিয়া ক্রিয়া বিকাশ করে, তজপ ধ্বন্যাত্মক শব্দও বায়বীয় পরমাণুর সহিত মিলিয়া শ্রবণেন্দ্রিয়ের সহায়তায় শ্রোতার স্নায়ুকেন্দ্র স্পর্শ

দীক্ষা-তত্ত্ব।
সমস্ত
করিয়া নানারূপ ক্রিয়া বিকাশ করে। লৌকিক শব্দ
যথারীতি উচ্চারিত হইলে, শ্রোতার চিত্ত-হর্ষ, ক্রোধ, কাম,
অহঙ্কারাদির ভাব উৎপাদন করিয়া থাকে; এবং ঐ
ভাবের উত্তেজনায় স্থূল শরীরে নানারূপ লক্ষণ প্রকাশ পায়।
কেহ কেহ আপত্তি করিবেন—ইহা শব্দ-শক্তি নহে;
শব্দের অর্থবােধ না হইলে হর্যাদির ভাব প্রকাশ পায় না।
এ আপত্তি অসঙ্গত। অর্থ-শকের অনুগত; শব্দ দ্বারাই
অর্থবােধ হয়।
আবার অর্থজ্ঞান না হইলেও কেবল শব্দের
উচ্চারণ-শক্তিতেই হৃদয়ের ভাবান্তর ঘটিয়া থাকে। মনে
করুন—আমরা যাহার ভাষা বুঝি না, এমন কেহ আমাদের
চক্ষুর অন্তরালে যদি ক্রন্দন করে,তবে কি আমাদের হৃদয়
সেই ক্রন্দন-ধ্বনিতে করুণা হয় না? অধিক কি, একটা
মাত্র অর্থহীন “অ” শব্দ তানলয়-সংযােগে উচ্চারিত হইলে,
শ্রোতার হৃদয়-তন্ত্রী তাহার তালে তালে নাচিয়া উঠে।
এমন কি তান-লয়-সংযুক্ত শব্দশক্তি দ্বারা শ্রোতা সংজ্ঞাশূন্য
পর্যন্ত হইয়া থাকে। উৎপন্ন-প্রবংসী লৌকিক শব্দের
শক্তিতে যদি এরূপ ঘটনা সংঘটিত হয়, তবে নিত্যাবস্থিত
আপ্ত-শব্দ বা মন্ত্রশক্তি দ্বারা যে কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটিতে
পারে, তাহা আর অধিক বুঝাইতে হইবে না।
কেহ হয় ত বলিতে পারেন, নিরবয়ব শব্দ-শক্তি কি রূপে
সাবয়ব পদার্থের দ্বারা ক্রিয়া বিকাশ করিতে পারে? ইহার
উত্তর এই,-“ফনােগ্রাফ” (Phonograph) যন্ত্রের নিকট

২৫ দীক্ষা-তত্ত্ব। ; যে কোনও শব্দ উচ্চারণ করিবে, তাহা বায়ুমণ্ডলে প্রতিহত হইয়া ঐ যন্ত্রের অঙ্গ-কিশেষে তাছার ক্রিয়া বিকাশ করে ; অর্থাৎ ফনােগ্রাফের ঘূর্ণায়মান মসৃণ পটে ঐ উচ্চারিত শব্দের প্রতিচিত্র অঙ্কিত হয়। (ক) সুতরাং বুঝিতে হইবে, নিত্যাবস্থিত শব্দ নিৱবয়ব হইলেও তাহার অনুবাদক ধ্বনি নিরবয়ব নহে। নিরবয়ব পদার্থের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না; কিন্তু ধ্বন্যাত্মক শব্দের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। (খ) আবার যখন ইচ্ছা, ফনােগ্রাফ-যন্ত্র পরিচালনা করিলে, ঐ পরিগৃহীত শব্দের অনুরূপ শব্দ উচ্চারিত হয়। (গ) তদ্রুপ সমস্ত শব্দই বায়ু- মণ্ডলে প্রতিহত হইয়া শ্রুতিযন্ত্রের সহায়তায় শ্রোতার মানস-পটে (মস্তিষ্কে) তাহার প্রতিচিত্র অঙ্কিত করে, এবং যে যে শব্দ-শক্তি যে যে ভাবােদ্দীপক, সেই সেই শব্দ-শক্তি মনুষ্যের সেই সেই ভাবােৎপাদক যন্ত্রের মর্মস্থান স্পর্শ করিয়া ঈর্ষা, অমর্ষ, কাম, ক্রোধ, রাগ, দ্বেষাদি উৎপাদন করে। শব্দ-শক্তির প্রভাব জড়পদার্থের উপরেও কম আধিপত্য বিস্তার ন করে না। কবিতা এবং সঙ্গীত—শব্দের ছন্দানুগত রচনা-পারিপাট্য ও তানলয়াত্মক উচ্চারণ-কৌশল বিশেষ। সুতরাং সঙ্গীত ও কবিতা শব্দ-সমষ্টি মাত্র। ছন্দ এবং তান-লয়-সংযুক্ত স্বরগ্রাম নিভ্য এবং জীবদেহের প্রত্যেক যন্ত্রের সহিত নিত্যসম্বন্ধযুক্ত। ছন্দ এবং স্বর-গ্রামের সঙ্কেত-বন্ধন মনুষ্যকৃত হইলে, তাহা কখনই মানব হৃদয়ের উপর এতাদৃশ প্রভাব বিস্তার করিতে দীক্ষা-তত্ত্ব। পারিত না। প্রত্যেক ছন্দ ও তান-লয়-যুক্ত স্বর-সন্ধানের সহিত মানব হৃদয়ের প্রত্যেক গ্রন্থি কেন পরদায় পরদায় বাঁধা। প্রত্যেক স্বর-ঝঙ্কারে মানব-হৃদয় তালে তালে নাচিয়া উঠে; একটু বেসুর বা বেতাল হইলে, অমনি তাহা শ্রুতিকঠোর হয়। প্রত্যেক ছন্দ ও রাগ-রাগিণীর স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন এবং তাহাদের শক্তিও মানব-হৃদয়ের উপর বিভিন্নরূপ ক্রিয়া করে। কাব্য ও সঙ্গীতশাস্ত্রে বিশারদগণ ছন্দ রসাদি কাব্যোপকরণের এবং ষড়জ-মধ্যম-ধৈবতাদি স্বরগ্রামযুক্ত রাগরাগিণীর তাল- লয়ের স্রষ্টা নহেন, আবিষ্কর্তা মাত্র। নিত্যাবস্থিত রাগ-রাগিণীর স্বরূপ আলাপনে যদি এক বিন্দু ইতর-বিশেষ হয় বা তাল ভঙ্গ হয়, তবে তাহা নিতান্ত কর্কশ বােধ হইয়া থাকে। সঙ্গীতের মােহিনী-শক্তির প্রভাব মানব-হৃদয়ের উপর এতই প্রবল যে, বিশুদ্ধ তান-লয়-যুক্ত স্বর-ঝঙ্কারে মানব-চিত্ত তন্ময় হইয়া যায়। সঙ্গীতের মােহিনী শক্তিতে পশু-পক্ষী এবং বিষধর ভুজঙ্গ পৰ্য্যন্ত মুগ্ধ হইয়া থাকে। ইহা অতিরঞ্জিত বা কবি-কল্পনা নহে। পশু-পক্ষী আমাদের ভাষা বুঝে না, কিন্তু তান-লয়-যুক্ত শব্দের সহিত জীব-হৃদয়ের অতি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ; তাই পিঞ্জরাবন্ধ বস্তুবিমণ্ডিত চিরপরাধীন শ্যামা, দৈয়াল, পাপিয়া, কোকিল প্রভৃতি সুকণ্ঠ পাখীগণ সঙ্গীতের স্বর-ঝঙ্কারে আকুল হইয়া রাত্রিকালেও আনন্দোৎফুল্ল-হৃদয়ে গায়কের সুর-লহরীর সহিত কলকণ্ঠ মিলাইয়া কাকলী-লহরীতে শ্রোতার মন মুগ্ধ করে।

२२ দীক্ষা-তত্ত্ব। ) জড়পদার্থের উপরেও শব্দ-শক্তির আধিপত্য সাধারণ নহে। প্রসিদ্ধ কিম্বদন্তী আছে, দিল্লীর বাদসাহের দরবারে তানসন্ ও ব্রজবাওরা (বৈজুবাওরা ) নামক দুইজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তন্মধ্যে তানসাকে বাদসাহ অধিকতর আদর করিতেন, তুল্য-প্রতিদ্বন্দী ব্রজবাওরার পক্ষে তাহা অসহনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। ব্ৰজৰাওয়া গােপনে গােপনে শত্রুতার ভাব পােষণ করিয়া সুযােগ অন্বেষণ করিতেছিল। একদিন ব্রজবাওরা বাদসাহের নিকট প্রকাশ করিল,- তানসান দীপক-রাগের আলাপনে অগ্নি প্রজালিত করিতে পারেন।” বাদসাহ অতিশয় কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তানসাকে দীপক-রাগ গাইতে আদেশ করিলেন। তানসা অতি বিনীত তাবে বাদসাহের নিকট করজোড়ে বলিলেন-“দীপক- রাগ আলাপনে আমার জীবন রক্ষা হইবে না। দীপকের স্বর-ঝঙ্কারে যে অগ্নি উৎপাদিত হইবে, আমি সেই অগ্নিতে ভস্মীভূত হইব।” বাদসাহের কৌতুহল আরও বর্জিত হইল। তিনি দৃঢ়ভাবে আদেশ করিলেন,-“দীপক-রাগ তােমাকে গাইতেই হইবে। অগ্নি প্রজ্বলিত হইলে, আমি তাহা নিৰ্বাপণ করিয়া তােমার জীবন রক্ষা করিব।” তানসা কৃতাঞ্জলিপুটে বলিলেন,-“খােদাব। এ অগ্নি সাধারণ জলে নির্বাপিত হইবে না। যদি ব্রজবাওয়া মেঘ-মল্লার রাগের আলাপনে বারি বর্ষণ করাইতে পারে, তবে অনল নির্বাপিত হইবে।” বাদসাই সােৎসক-নয়নে ব্রজবাওরার প্রতি

দীক্ষা-তত্ব।
দৃষ্টিপাত করিলেন। ব্রজবাওরা বলিল,-“আমি যথাসাধ্য
মেঘমল্লার গাইয়া অনল নির্বাপণের চেষ্টা করিব।” তখন
তানসান্ পঞ্চমে সুর চড়াইয়া দীপক রাগের, আলাপন আরম্ভ
করিলেন। তাহার উচ্চকণ্ঠের সপ্তস্বর-ঝঙ্কারে অনল জ্বলিয়া
উঠিল। ক্রমে অগ্নি তানসানের নিকটবর্তী হইয়া ভীষণ
গর্জন করিতে লাগিল। তানসান কাতর নয়নে ব্রজবাওরাকে
মেঘ-মল্লার গাহিতে ইঙ্গীত করিলেন। ব্রজবাওরা গুরুগম্ভীর
স্বরে মেঘ-মল্লার • আলাপ করিতে লাগিল, কিন্তু তাহার
বিদ্বেষ-কলুষিত চিত্তের কুটিলতায় মেঘ মল্লার পূর্ণাঙ্গ হইল না।
মেঘাড়ম্বর হইল, বর্ষণ হইল না। দেখিতে দেখিতে তানসানের
দেহ ভয়ে পরিণত হইল। সভাস্থ সকলে হাহাকার ধ্বনি
করিতে লাগিলেন।
অধুনা ইহা অবিশ্বাস্য হইলেও “নহমূলা জনশ্রুতিঃ”
জনশ্রুতি একেবারে অমূলক নহে। সুদূর অতীতের ঘটনা
বিশ্বাস করা—না করা,, শ্রোতার ইচ্ছা। অল্পকাল
অল্পকাল পূর্বে
কলিকাতা মহানগরীতে মওলাবক্স নামে একজন অতি
উচ্চশ্রেণীর গায়ক আসিয়াছিলেন। তাঁহার স্বর-মূৰ্চ্চনায়
“ফুলের কুঁড়ি ফুটিয়া উঠিত।”
এ ঘটনা যাহারা প্রত্যক্ষ
করিয়াছেন, তাহাদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন।
প্রত্যেক মন্ত্ৰ-বর্ণ, ছন্দ এব’ তান-লয়-যুক্ত উদাত্তনু-
দাত্তাদি সংযােগে উচ্চারিত বা গীত হইয়া থাকে।
বঙ্গদেশে অধুনা তাহা কেবল বাক্যমত্ৰে পৰ্য্যবসিত হইয়া

দীক্ষা-তত্ব। । থাকিলেও ভারতের অন্যান্য প্রদেশে আজিও বৈদিক-মন্ত্রাদি ছন্দ এবং উদাত্তাদি খর সংবােগে উচ্চারিত হয়। আমরা কেবল দুর্গোৎসবের মহাস্নান মন্ত্রে “হিন্দোল-রাগেন মৃদঙ্গ- বাছেন” ইত্যাদি পাঠ করিয়া “সৰ্ববাদ্যময়ী ঘণ্টা” দ্বারা সমস্ত অভাব পূরণ করিয়া থাকি এবং একদিন যে রাগ-রাগিনী সংযােগে ও বাদ্যযন্ত্রের তালে মন্ত্রসমূহ উচ্চারিত হইত, তাহা প্রমাণিত করি। প্রত্যেক একাক্ষরী বীজ মন্ত্রও ছন এবং উদাত্তাদি স্বর সংযােগে উচ্চারিত হয়। প্রণব মন্ত্রের গায়ত্রী চ্ছন্দ, যথা, “প্রণবের ব্রহ্মঋষি, গায়ত্রীচ্ছদ” এইরূপে প্রত্যেক মন্ত্র ছন্দ ও উদাত্তাদি স্ব-সংঘােগে উচ্চারণের বিধান আছে। বিস্তৃতি ভয়ে তাহার আলােচনা না করিয়া, এস্থলে কেবল প্রণব সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। “অ-উ-ম” এই তিনটী বর্ণের সংযােগে প্রণব মহামন্ত্রের বিকাশ। এই প্রণব মন্ত্র ঈশ্বরের বাচক। যং “ত বাচক: প্রণবঃ”। (পাতঞ্জল সূত্র) প্রণবের আদি বর্ণ “অ” । অ-কারের নানা অর্থ। এ স্থলে অ-কার অর্থে ব্ৰহ্মা, অ কার সগুণাত্মক পৃথিবী ও ঋগ্বেদ স্বরূপ, অ-কার হইতে সৃষ্টি হয়। “উকার” অর্থে বিষ্ণু, উ-কার রজোগুণাত্মক, অন্তরীক্ষ ও যজুৰ্বেদ স্বরূপ, উ:কার হইতে পালন হয়। “ম* কার অর্থে রুদ্র, মাে- গুণাত্মক, স্বর্গ ও সামবেদ স্বরূপ; ম-কার হইতে সংহার দীক্ষা-তত্ব। হয়। নাদ সংজ্ঞক লুপ্ত ম-কার অর্ধমাত্রা; ইহার অধিষ্ঠাতা স্বয়ং ঈশ্বর। সৃষ্টি, স্থিতি-লয়ের কারণ স্বরূপ প্রণবেই জগৎ প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। প্রণবের প্রথম বর্ণ অ-কারকণ্ঠ্যবর্ণ এবং সকল বর্ণের আদি। ইহা কল্পনা-সস্তৃত নহে, মানবশিশুর শব্দোচ্চারণের প্রথম চেষ্টাই “অ...অ।” স্বরযন্ত্র হইতে বহির্গত হইয়া করে নিম্নতম প্রদেশ হইতে “অ” শব্দ প্রথম উদগত হয়। এইজন্য ইহাকে কণ্ঠ্য এবং আদিবৰ্ণ কহে। প্রণবের শেষ বর্ণ “ম কার।” ম-কার ওষ্ঠ্যবর্ণ। অকারাদি বর্ণ—ক হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমে তালু, মূৰ্দ্ধা, দন্ত এবং ওষ্ঠ হইতে প্রাদুর্ভূত হয় বলিয়া অকারাদি বর্ণকে যথাক্রমে কণ্ঠ্য তালব্য, মুদ্ধণ্য, দন্ত্য এবং ওষ্ঠ্য বর্ণ কহে। মকার-ওষ্ঠ্য-বর্ণের শেষ বর্ণ। এক্ষণে বুঝিতে হইবে, প্রণবের এই আদ্যন্ত্যবর্ণ-মধ্যে সমস্ত বর্ণ প্রতিষ্ঠিত। সেইজন্য নানা বর্ণাত্মক ও তাল-লয়-যুক্ত নানা শব্দের একত্র উচ্চারণের পরিণাম-প্রণব। বহু বাদ্যযন্ত্রের স্বরসমষ্টিও প্রণবে পৰ্যবসিত হয়। একটা “তানপুরা” সুর মিল করিয়া নিবিষ্টচিত্তে তাহাতে অঙ্গুলি- সঞ্চালন করিয়া দেখ, তাহা হইতে সুমধুর “অ-উ-ম- “অ উম” ধ্বনি সমুখিত হইতেছে। নয়ন মুদ্রিত করিয়া ক্রমে অঙ্গুলিচালনা করিতে থাক, দেখিবে—“অ উ ম ধ্বনি প্রণবে পর্যবসিত হইয়া প্রণবের শব্দে চতুর্দিক প্রপূরিত হইতেছে। তখন ধ্যান নিমিলিত নেত্রে তন্ময় হইলে মনে হইবে, জল স্থল অন্তরীক্ষ সমস্ত প্রণব-ধ্বনিতে মুখরিত—জগৎ “প্রণবময়।”

দীক্ষা-তত্ব। নানা ভাষাভাষী নানা দিগেশীয় জন-কোলাহল পূর্ণ কোনও বৃহৎ হাটের দুরে থাকিয়া নিবিষ্টচিত্তে ঐ দূরাগত শব্দ শুনিলে বােধ হইবে, অবিরত “অ-উ-ম” “অ-উ-ম” ধ্বনি সমুখিত হইতেছে। সুতরাং যেমন বহু জীবগত জ্ঞানের সমষ্টি পরমাত্মা তপ নিখিল শব্দের একীভূত ভাব প্রণব। সত্ব-রজ-স্তম এই গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থা প্রকৃতি। এই পরিদৃশ্যমান্ বিশ্ব প্রলয়কালে অব্য স্ক্রাবস্থায় প্রকৃতিতে লীন ছিল। সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমপুরুষ পরমেশ্বর “প্রণব” ধ্বনি করিয়া ছিলেন। ঐ প্রণব শব্দ অনাহত মহাচক্রে বিঘুর্ণিত হইয়া প্রকৃতির সাম্য ভঙ্গ করে। প্রকৃতির বৈষম্য হইতেই সৃষ্টি ক্রিয়া আরম্ভ হয়। প্রকৃতির প্রথম উন্মেষে যে তত্ত্ব স্ফুরিত হইয়াছিল, তাহার নাম “মহৎ।” এই মহত্তত্বই শাস্ত্রান্তরের ব্রহ্মা। সৃষ্টির প্রারম্ভে যে প্রণব ধ্বনি হইয়াছিল তাহাই “শব্দব্রহ্ম” বলিয়া অভিহিত। মতান্তরে পরমাণু-সাগর তরঙ্গায়িত কারবার জন্য একটী স্পন্দন-ক্রিয়ার প্রয়ােজন; শব্দই সেই স্পন্দন-ক্রিয়ার নিমিত্ত কারণ, এবং সেই শব্দই “প্রণব”। ভূত-সৃষ্টির পূর্বে পঞ্চতন্মত্রের উৎপত্তি; তন্মধ্যে আকাশ- তন্মাত্ৰই সৰ্বাদি, আকাশ শব্দ-গুণাত্মক। সুতরাং বুঝিতে হইবে—শব্দই জগতের আদি কারণ। যখন বায়ু, জল, চন্দ্র, সূর্য গ্রহ, নক্ষত্রাদি কিছুই ছিলনা, তখন ছিল—কেবল অনাদি শব্দব্রহ্মরূপ “প্রণব।” প্রণবের অ-উ-ম, এই তিন বর্ণের মধ্যে আদি বর্ণ অকারের উচ্চারণ—অষ্টাদশ প্রকার,

দীক্ষা-তত্ব।
२१
দীর্ঘ, উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিৎ, প্লত, হ্রস্ব উদাত্ত, হ্রস্ব অনুদাত্ত,
হ্রস্ব স্বরিৎ, হ্রস্ব পুত, দীর্ঘ উদাত্ত, দীর্ঘ অনুদাত্ত, দীর্ঘ-স্বরিৎ,
দীর্ঘ প্লত। ইহা আবার সানুনাসিক ও নিরনুনাসিক। কিন্তু
আমরা অ-কারের উচ্চারণ একরূপ বৈ জানি না।
যথাবিধি প্রণব জপ-যােগ সাধনের প্রধান উপায়।
এ স্থলে যােগসাধনের একটী নিগুঢ় তত্ত্ব আছে। যােগীগণ
বলেন, মনের একাগ্রতা সাধন করিতে হইলে প্রথমে একেবার
সমস্ত প্রণব মন্ত্র উচ্চারণ না করিয়া প্রণবের আদ্য অক্ষর
“অ-কার” জপ করিতে হইবে, অর্থাৎ পদ্মাসন-বন্ধন পূর্বক
উন্নত অথচ সরলভাবে বসিয়া মস্তক সম্মুখে বক্র করিবে এবং
বক্ষের উপর চিবুক সংলগ্ন করিয়া কণ্ঠের নিম্ন হইতে
প্নত-অনুদাত্ত স্বরে “অ-কার” উচ্চারণ করিতে থাকিবে;
এবং তরঙ্গের ন্যায় গ্রীবা বকু করিয়া অল্পে অল্পে সুর উর্কে
তুলিবে ও প্লত-উদাত্ত অ-কার উচ্চারণ করিবে।
পরিশেষে ক্রমশঃ সুর নামাইয়া প্লত-স্বরিৎ স্বরে অ-কার
উচ্চারণ করিতে থাকিবে। এইরূপে নীচ-সুরের অকার
হইতে অল্পে অল্পে সুর উপরে তুলিলে আপনা হইতেই “উ”
উচ্চারিত হইয়া থাকে। পরে উপর হইতে সুর নামাইবার
সময় পর পতন-কালে অনুনাসিক অ-কার আপনি রত
যাহারা যােগীদিগের মুখে প্রণব-গীতি শুনিয়াহেন
তাহারাই ঐ সুর-সমূহ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছেন। এইরূপ
প্রণব-সাধনের ফলে সাধকের মন একাগ্র হয়, অন্তর

দীক্ষা-তত্ত্ব। বায়ু-পিত্ত ও শুক্র-শােণিত শােধিত হইয়া সাধক দীর্ঘজীবন লাভ করেন এবং সমাধির পূর্বাবস্থার ন্যায় বাহজ্ঞান- পরিশুন্য হইয়া পড়েন। একাগ্রতাই মুক্তির বা নিরবচ্ছিন্ন সুখ লাভের প্রধান সাধক। পুরাতন যােগ-শান্ত্রের কথা লিখিলাম, বলিয়া হয় তাে অনেক উপহাস করিতে পারেন। কিন্তু এখন আর হাসিবার দিন নাই। পূর্বে যে সমস্ত শিক্ষিত ব্যক্তি এ সকল কথা হাসিয়া উড়াইয়া দিতেন, এক্ষণে আবাৰ ভঁহারাই ইহার তত্বোঘাটনের জন্য ভাবিতে বসিয়াছেন। বৈদেশিক পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার পর্যন্ত এ তত্ত্ব উপলব্ধি করিয়াছিলেন। তিনিও প্রণবের অ্যা লিখিয়া গিয়াছেন—“.••(প্রণব) জপ করিয়া দেখ প্রথমে ইহা অসার বােধ হইতে পারে; কিন্তু বাস্তবিক তাহা নয়। যথানিয়মে পুনঃ পুনঃ•••(প্রণব) উচ্চারণ করিলে, মনের একাগ্রতা সাধিত ব্রহ্মরূপ মহা-কেন্দ্রে চিত্ত সন্নিবেশিত হয়।” মনন দ্বারা অন্তঃকমণে নানা ভাবের উদয় হয়। ভাবের আবির্ভাবে ভাবানুরূপ হর্ষ অমর্ষ কাম ক্রোধ প্রভৃতি নানা ভাবের বহির্বিকাশ মানবদেহে পরিলক্ষিত হয়। মনন যে মন্ত্রশক্তির ক্রিয়া বিকাশ হইবে, ইহা অসম্ভব বা নহে। প্রণবের ন্যায় দক্ষিণা কালিকাদি দেবতার মহাশক্তিশালী একাক্ষরী মন্ত্র সমূহেরও ঋষি, ছন্দ এবং তাল-লয়-র সংযােগে

দীক্ষা-তত্ব।
২৯
উচ্চারণের পদ্ধতি আছে। যথা—“অস্ত, মন্ত্র ভৈরব ঋষি-
কুঞ্চিকচ্ছন্দঃ শ্রীমদ্দক্ষিণাকালী দেবত” ইত্যাদি।—দক্ষিণা
কালিকার বীজমন্ত্রের ভৈরব ঋষি (প্রকাশক মহাকাল
ভৈরব), উষ্ণিক ছন্দ, দক্ষিণাকালী দেবতা। কেহ কেহ
মনে করিতে পারেন-একাক্ষরে আবার ছন্দ কি ? কিন্তু
সে ধারণা ভ্রমাত্মক, একটী অ-শব্দ উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিৎ,
পুতাদি স্বর-সংযােগে উচ্চারিত হইতে থাকিলে তাহাতেই
ছন্দের বিকাশ হয়।
প্রত্যেক একাক্ষরী মন্ত্রেও তত্তৎ দেবতার স্বরূপ, শক্তি
ইত্যাদি নিহিত আছে। মন্ত্ৰাৰ্থ-পরিজ্ঞান ভিন্ন তাহা বুঝিতে
পারা যায় না। অন্যান্য মন্ত্র ‘অপেক্ষা বীজমন্ত্রের শক্তি
অধিক, বীজমন্ত্র-মধ্যেও আবার একাক্ষরী মন্ত্র অধিকতর
শক্তিশালী। প্রত্যেক পদার্থের বীজে যেমন তজ্জাতীয়
অনন্তত্ব সূক্ষ্মরূপে অবস্থিত, তদ্রুপ বীজমন্ত্রেও নিখিল-শাস্ত্রে
প্রতিপাদ্য ব্ৰহ্মতত্ব অবস্থিত আছে। বহুশাখাসমন্বিত
বেদরূপ বৃক্ষের মূল গায়ত্রী, প্রণব তাহার বীজ। অর্থাৎ
বেদ-তত্ত্বের প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম, চতুর্বিংশত্যক্ষরা গায়ত্রী মন্ত্রে
প্রতিপন্ন হইয়াছেন। আবার একাক্ষরী বীজ প্রণব
মন্ত্র-সৃষ্টি-স্থিতি-লয়-কৰ্ত্তা পরমেশ্বরের প্রতিপাদক। বৃহৎ
পদার্থের পরমাণু কেন্দ্রীভূত হইলে তাহার শক্তি বৃদ্ধি হয় ;
যেমন সূৰ্য্যালােকের তৈজস-পরমাণু কাচ-খণ্ডের সহায়তায়
কেন্দ্রীভূত হইলে তদ্বারা অগ্নি উৎপাদন করা যায়। কেন্দ্রীভূত

৩৫
দীক্ষা-তত্ব।
ঐশী শক্তি-রূপ বীজমন্ত্রের শক্তিও তদ্রুপ প্রখর। একা
ক্ষরী বীজমন্ত্রের শক্তিতে সাধক ব্ৰহ্মরূপ মহালক্ষ্য ভেদ
করিতে সমর্থ হন। ইহার দৃষ্টান্ত মণ্ডকোপনিষদে বর্ণিত
হইয়াছে। । যথা-
“প্রণববা ধনুঃশরো হাত্মা ব্ৰহ্মতল্লক্ষ্যমুচ্যতে।
অপ্রমত্তেন বেদ্ধব্যং শরবত্তন্ময়াে ভবেৎ।”
প্রণবই ধনু, আত্মাই শর, ব্ৰহ্মই তাহার লক্ষ্য।
জ্ঞানী ব্যক্তিই সেই ব্রহ্মরূপ মহান্ লক্ষ্যভেদ করিতে সমর্থ ।
অপ্রমত্তচিত্তে সেই ব্ৰহ্মরূপ লক্ষ্যবিদ্ধ করিয়া শরবৎ লব্ধপ্রবিষ্ট
আত্মা তন্ময় (ব্ৰহ্মময়) হইয়া যাইবে।
পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে মন্ত্ৰাৰ্থ-পরিজ্ঞান ও মন্ত্র-চৈতন্যের
অভাবে মন্ত্র জপ দ্বারা কোন কাৰ্যই সিদ্ধ হয় না। যেরূপ
প্রণব মন্ত্রের অর্থ কথিত হইয়াছে, তদ্রুপ একাক্ষরী, দ্ব্যক্ষরী,
ক্ষরী প্রভৃতি সমস্ত মন্ত্রেরই অর্থ আছে। প্রত্যেক দেবতার
প্রত্যেক মন্ত্রই তত্তৎ দেবতার গুণ ও স্বরূপ নির্দেশ করিয়াছে।
সমস্ত মন্ত্রের অর্থ প্রকাশ করিলে তারাই একখানি বৃহৎ
গ্রন্থ পূর্ণ হইতে পারে। তজ্জন্য দুই একটী একাক্ষরী মন্ত্রের
অর্থ প্রকাশ করিতেছি।আদ্যা মহাবিদ্যা, দক্ষিণা কালীকার
একাক্ষরী মহামন্ত্রের অর্থ। যথা-
“ধৰ্মার্থদঃ ক-কার সর্বসিদ্ধি প্রদায়ক।
ব্ৰহ্মরূপে ম-কারস্য সগুলাে নিগুণস্য সঃ।
* তেজপুজো -কার ব্রহ্মহত্যাদি নাশক।

দীক্ষা তত্ত্ব। ৩১ দুর্গারূপা ঈ-কার চতুৰ্বর্গ ফলপ্রদাঃ। একাক্ষরী মহাবিদ্যা সৰ্ব্ববিদ্যা স্বরূপিণী।” (কুজিকাতন্ত্র।) ক-কার ধর্ম ও অর্থ দান করেন এবং সর্বসিদ্ধি প্রদান করেন। মকার (ং) ব্ৰহ্মস্বরূপ সগুণ এবং নিগুণ। র-কার তেজ-পুঞ্জ ব্রহ্মহত্যাদি-পাপ নাশক। দুর্গারূপা দীর্ঘ ঈ-কার ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষরূপ চতুৰ্ব্বর্গ ফল প্রদায়িণী। এই বর্ণ চতুষ্টয় সংযুক্ত একাক্ষরী, কালীরূপা মহাবিদ্যা সৰ্ব্ববিদ্যা স্বরূপিণী। স্থূলার্থে মহামন্ত্র গুণময়ী এবং গুণাতীতা ব্রহ্ম- স্বরূপিণী, তেজোময়ী ব্ৰহ্মহত্যাদি পাপ নাশিনী। দুর্গারূপা কালিকাদেবী চতুৰ্বর্গ ফল প্রদান করেন। সুতরাং ব্রহ্মস্বরূপ মহাবিদ্যা কালী সৰ্ববিদ্যা স্বরূপিণী। “হ-কানাে যােগনিদ্রা চ হ-কারঃ পরমাে বিভুঃ । ঈ-কারঃ কামদা মায়া রেফঃ পরশিবাে মতঃ। রেফশ্চৈব মহাদেবি নাদবিন্দু-বিভূষিতঃ। একাক্ষরী মহাবিদ্যা ব্ৰহ্মবিদ্যা স্বরূপিণী।” (কুজিকাতন্ত্র।) হকার যােগনিদ্রা স্বরূপা এবং পরম বিভু স্বরূপ। ঈ-কার কামনা ফল প্রদায়িনী মহামায়া। রেফ পরম মঙ্গলময় শিবরূপ, মহানাদবিন্দু বিভূষিত (চন্দ্রবিন্দুযুক্ত) একাক্ষরী মহাবিদ্যা ...ব্রহ্মবিদ্য, স্বরূপা। এই বীজের নাম মায়াবীজ, ভুবনেশ্বরী ৩২ দীক্ষা-তত্ব। দেবীর এই মায়াবীজ সর্বসিবিদ মহাশক্তি সম্পন্না। এই বীজের শক্তিতে ব্রহ্মা, সৃষ্টি কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে, প্রত্যেক দেবতার বহুসংখ্যক মন্ত্র আছে; তন্মধ্যে রাশি, নক্ষত্র ও নামাক্ষরের সহিত চক্র বিচার করিয়া ষট্‌চক্ৰ-পরিশােধিত মন্ত্র গ্রহণ করিতে হয়। একটি রােগের দশটী ঔষধ আছে; লােগীর আকৃতি প্রকৃতি ও ধাতুগত পার্থক্যানুসারে যেমন এক এক রােগীর পক্ষে এক একটী ঔযধ ফলপ্রদ হয়, তদ্রুপ দীক্ষার্থীর ধাতু প্রকৃতি ভেদে এক এক মন্ত্র—এক এক ব্যক্তির পক্ষে ফলপ্রদ হয়। জন্মরাশি, নক্ষত্র, লগ্নাদি দ্বারাই মানবের ধাতু, প্রকৃতি, আকৃতি প্রভৃতি গঠিত হইয়া থাকে। জ্যোতিত্বের সহিত মানবের আকৃতি, প্রকৃতি প্রভৃতির কিরূপ অভিন্ন সম্বন্ধ তাহা বিস্তারিত লিখিতে হইল গ্রন্থের কলেবর অতিশয় বৃহৎ হইবে, অথচ, নীরস বিষয়ের বিস্তৃত বিবরণ পাঠ করিতে পাঠকগণের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিবে, বিবেচনায় তৎসম্বন্ধে সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। গ্রহ নক্ষত্রাদির সংস্থান ও উদয়াস্ত গতিবিধির সহিত কেবল মানব-দেহাদির কেন সমস্ত দৃশ্যমান জগতের এরূপ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যে একটী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বা একটী পচ্যুতিও গ্রহ-নক্ষত্রাদির গতির সহিত দৃঢ় সম্বন্ধে নিবদ্ধ। সূর্যের গতির প্রতি মুহূর্তে মানবের শ্বাস প্রশ্বাসের গতি পরিবর্তিত হইতেছে। প্রতিমুহূর্তে মানবদেহে বায়ু-পিত্ত-কফের আবির্ভাব যথানিয়মে দীক্ষা-তত্ত্ব। । ঘটিতেছে। এবং ঐ পরিবর্তনের সহিত মানবের মানসিক ক্রিয়ারও পরিবর্তন হয় । • যােগশাস্ত্রান্তর্গত স্বরােদষশাস্ত্রে ইহার বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ হইয়াছে। মানবদেহে ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামে যে প্রধান নাড়ীত্রয় আছে, তন্মধ্যে বামে ইড়া, দক্ষিণে পিঙ্গলা এবং মধ্যে সুষুম্না নাড়ীর অবস্থান। হড়া নাড়ীর সময়ে বাম নাসাতে, পিঙ্গলার সময়ে দক্ষিণ নাসাতে এবং সুষুম্নার সময়ে উভয় নাসাতে শ্বাস প্রবাহিত হয়। বাম, দক্ষিণ ও উভয় নাসাতে শ্বাস প্রবাহের সময় আবার ভূমি, জল, বায়ু, তেজ ও আকাশ, এই পঞ্চতত্ত্বের উদয় হয়। তৎকালে যথানিয়মে নাসিকার অধঃ, উদ্ধ, উভয় পার্শ্ব ও মধ্যস্থল দিয়া শ্বাস-বায়ুর গতি লক্ষিত হয়। ঐ গতি অনুসারেই তত্ত্ব নির্ণয় হইয়া থাকে। তৎসঙ্গে মনের গতি পরিবর্তিত হয়। যথা,-বায়ুতত্ত্বের উদয়কালে যদি কেহ ঐ ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে,-“তুমি একটি বর্ণের নাম কর”—তখন উত্তর দাতা “নীল বর্ণ” বলিবে। অর্থাৎ বায়ুতত্ত্বের বর্ণ “নীল।” তবে চেষ্টা করিয়া বলিলে উত্তরদাতা শ্বেত, রক্ত, পীতাদি ও বলিতে পারে, কিন্তু প্রশ্নমাত্র উত্তর প্রদান করিলে সে নীলবর্ণ ই বলিবে। এইরূপ বহু দৃষ্টান্ত আছে ; সুতরাং বুঝিতে হইবে, গ্রহ নক্ষত্রাদির গতি-বিধির সহিত বিশ্বের গতি- বিধি এক সূত্রে গ্রথিত। তজ্জন্য আমরা জ্যোতিস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপও করিতে সমর্থ নই। জড় পদার্থও ঐ নিয়মের অধীন। বক-পুষ্পদি অনেক বৃক্ষের পত্র দীক্ষা-তত্ব। সূর্যোদয়ের সময় বিকসিত হয়, আবার সূর্যাস্তের সময় মুদিত হয়। ঋতুভেদে পত্র-পুষ্প-ফলাদি উৎপত্তি, স্থিতি ও ধ্বংসাদিও জোতিশ্চক্রের নিয়মাধীন ; সুতরাং বুঝিতে হইবে, জগতের সমস্ত ক্রিয়াই বিধি-নির্দিষ্ট নিয়মে রাশি-নক্ষত্রাদির গতির সহিত দৃঢ় নিয়মে নিবদ্ধ। তজ্জন্য যেমন বিবাহাদি কাৰ্যে জ্যোতিষ- শাস্ত্রের নিয়মানুারে গণ, ঘােটকাদি মিল করিয়া দেখিতে হয়, তদ্রুপ দীক্ষাগ্রহণ কালেও রাশি-নক্ষত্রাদি ষট্‌চক্র দ্বারা দের মন্ত্র, পরিশুদ্ধ করিয়া লইতে হয়। জন্মরাশি, নক্ষত্র, তিথি, লগ্ন ও গ্রহাদির সংস্থান অনুসারে যেরূপ জীবদেহ গঠিত হয়, তদ্রুপ দয়া, ধৈৰ্য্য, ক্ষমা, দেব, কাম, ক্রোধ, লােভাদি হৃদয়ের বৃত্তি নিচয়ও জন্ম-নক্ষত্রাদির অনুগত। সেইজন্যই জীবের রুচিগত পার্থক্য ; সুতরাং বুঝিতে হইবে, বিভিন্নরূপ ধাতু, প্রকৃতি ও রুচি-বিশিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে নানা বর্ণময় মন্ত্রশক্তির ক্রিয়া একরূপ হইতে পারে না। অতএব দীক্ষার্থীর পক্ষে মন্ত্রগ্রহণের পূর্বে উপযুক্ত গুরুদ্বারা রাশি, নক্ষত্র ও নামাক্ষরের সহিত তন্ত্রোক্তবিধানে রাস্তাদি যচক্রের বিচার আবশ্যক। (তন্ত্রোক্ত ষটচক্রের নাম,-রাশিচক্র, নক্ষত্রচক্র, কুলাকুল- চ, সিদ্ধারিচক্র, ঋণীধনীচক্র, অকড়মচক্র। রাশিচক্র মানবের জন্মরাশি যেমন বিভিন্ন মন্ত্রবর্ণেরও রাশি তদ্রুপ বিভিন্ন । যথা—“অ, আ, ই, ঈ ভবেন্মেষ”—ইত্যাদি। অ, আ, ই, ঈ—এই চাৰিবর্ণের মেষরাশি। দীক্ষার্থীর জন্মরাশির

দীক্ষা-তত্ব।
সহিত রাশিচক্রের লিখিত মন্ত্রশির বিচার করিয়া যে মন্ত্র
শুদ্ধ হয়, সেই মন্ত্র প্রদান করিবে। রাশিচক্রের গণনা
যথা,-“স্বরাশেৰ্ম্ম-রান্তং গণনীয়ং বিচক্ষণৈঃ।” দীক্ষার্থীর
নিজ জন্ম-রাশি হইতে মন্ত্রের রাশি পৰ্যন্ত গণনা করিতে হয়।
“লগ্নং ধনং ভ্রাতৃ-বন্ধু-পুত্র-শত্রু-কলকাঃ।
মরণং ধৰ্ম্ম-কম্মে চ ব্যয়া দ্বাদশ-রাশয়ঃ ॥”
জন্মরাশির প্রথম দ্বিতীয়াদি ক্রমে দ্বাদশ পর্যন্ত গণনা
করিয়া ফল নির্দেশকরিতে হইবে।
“নামানুরূপমমতেষাং শুভাশুভ-ফলং লভেং।”
লগ্ন, ধন, ভ্রাতা, বন্ধু, পুত্র, শত্রু, কলত্র, মরণ, ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম,
আয়, ব্যয়, এই দ্বাদশ সংজ্ঞার নামানুরূপ শুভ ও অশুভ
ফল লাভ হইয়া থাকে। অর্থাৎ ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ,--এই
তিনটা খান অশুভ এবং অবশিষ্ট শুভ।
নক্ষত্র-চক্র—প্রত্যেক শ্রেণীতে নয়টী করিয়া তিন
শ্রেণীতে মােট ২৭টা কোষ্ঠ (ঘর) অঙ্কিত করিতে হইবে।
প্রথম কোষ্ঠ হইতে শেষ কোম্ভ পণ্যন্ত প্রত্যেক কোতে
অশ্বিন্যাদিমে রেবতী পৰ্যন্ত সপ্তবিংশতি নক্ষত্রের নাম
লিখিতে হইবে। এবং এই সপ্তবিংশতি নক্ষত্র, চক্রের বিহিত
নিয়মানুসারে দেব, মানুষ ও রাক্ষস এই তিন শ্রেণীর “গণ”
রূপে বিভক্ত হইবে। যপা, দেবগণ, মানুষগণ ও রাক্ষসগণ ।
তৎপর প্রত্যেক ঘরে অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ-এইরূপে নক্ষত্র
চক্রের নিয়মানুসারে স্বর ও ব্যঞ্জন সমবর্ণ লিখি। দীক্ষার্থী

দীক্ষা-তত্ব।
জন্ম-নক্ষত্রের সহিত মন্ত্রবর্ণের প্রথম অক্ষর যে ঘরে পতিত
হইয়াছে, সেই ঘরের লিখিত নক্ষত্রের যথানিয়মে বিচার
করিতে হইবে।
“জন্ম সম্পংবিপৎ ক্ষেমঃ প্রত্যরিঃ সাধকো বধঃ।
মিত্রং পরমমিত্ৰঞ্চ জন্মাদীনি পুনঃ পুনঃ।”
দীক্ষার্থীর জন্মনক্ষত্র হইতে আরম্ভ করিয়া মন্ত্র-নক্ষত্র
পৰ্যন্ত জন্ম, সম্পৎ, বিপৎ, ক্ষেম, প্রত্যরি, সাধক, বধ, মিত্র,
পরম-মিত্র এই নিয়মে পুনঃ পুনঃ গণনা করিবে। যদি জন্ম
নক্ষত্র হইতে মন্ত্র-নক্ষত্র প্রথম, তৃতীয়, পঞ্চম কিম্বা
সপ্তম হয়, তবে তাহা পরিত্যাগ করিবে। অবশিষ্ট ষষ্ঠ, অষ্টম,
দ্বিতীয় চতুর্থ কিম্বা নবম হইলে নক্ষত্র-চক্রে মন্ত্র শুদ্ধ হইবে।
তৎপর দীক্ষার্থীর জন্ম-নক্ষত্র যে ঘরে পতিত হইয়াছে,
ঐ ঘরের লিখিত “গণ” সহ মন্ত্রের প্রথম বর্ণ যে ঘরে
আছে, ঐ ঘরের “গণ” মিলাইয়া যদি স্বজাতি হয়, তবে উত্তম,
ভিন্ন জাতি হইলে মধ্যম এবং রাক্ষসগণের সহিত মানুষগণ
হইলে মৃত্যু ও দেবগণের সহিত রাক্ষসগণের বৈরিতা সংঘটিত
হয়। যথা-
“স্বজাতৌ পরমা প্রীতিমধ্যমা ভিন্নজাতিযু।
রক্ষ-মানুষয়াের্নাশশা বৈরং দানব-দেবয়াের।”
এইরূপে গণনা করিয়া দীক্ষার্থী ও মন্ত্রবর্ণের “গণ” মিল
এবং পূর্বোক্ত নিয়মে নক্ষত্রশুদ্ধ হইলে, নক্ষত্র-চক্রে পরিশুদ্ধ
বলিয়া বুঝিতে হইবে। স্বরাশি ও স্বজন্ম-নক্ষত্র অপরিজ্ঞাত

দীক্ষা-তত্ত্ব।
থাকিলে, দীক্ষার্থীর নামের আদ্যক্ষর গ্রহণ করিয়া রাশিচক্র ও
ও নক্ষত্র চক্ৰ বিচার করিবে। যথা,“স্বরাশিশ্চ নক্ষত্রা-
জ্ঞানে স্বনামাদ্যক্ষর-সম্বন্ধি রাশি নক্ষত্রাদেব গণনীয়ং।”
কুলাকুলচক্র।—ছয়টী রেখাপাত করিয়া পাঁচটী ঘর
অঙ্কিত করিবে। ঐ পাঁচ ঘরের উপরিভাগে, বায়ু, অগ্নি,
ভূ, জল ও আকাশ এই পঞ্চতত্ত্ব লিখিয়া প্রত্যেক তত্ত্বের ঘরে
যথাক্রমে পঞ্চাশৎ বর্ণ—দশ দশটা নিয়মে, লিপিবদ্ধ করিতে
হইবে। যথা,—নিবন্ধে।
“বাগ্নি-ভূ-জলাকাশাঃ পঞ্চাশল্লিপয়ঃ ক্ৰমাৎ।
পঞ্চহ্রস্বাঃ পঞ্চদীর্ঘ বিস্তাঃ সন্ধিসম্ভবাঃ।
কাদয়ঃ পঞ্চ শ য ক্ষ ল স হান্তা: প্রকীর্তিতা।”
বায়ু, অগ্নি, ভূ, জল, আকাশ,-এই পঞ্চভূতময় পঞ্চাশৎ
বর্ণ যথাক্রমে পাচটী হ্রস্ব স্বর, পাঁচটী দীর্ঘস্বর, চারিটী সন্ধ্যক্ষর
(এ ঐ ও ঔ) এবং অনুস্বার, তৎপর ককারাদি হকারান্ত
ব্যঞ্জনবর্ণসমূহ পঞ্চতত্বের ঘরে লিপিবদ্ধ করিবে।
সাধকের নামের আদ্যক্ষর এবং মন্ত্রের আদ্যক্ষর দ্বারা
কুলাকুল বিচার করিতে হইবে। যথা,-
“সাধকস্যাক্ষরং পূৰ্ব্বং মন্ত্রস্যাপি তদক্ষরং।
যদ্যেকভূত-দৈবত্যং জানীয়াৎ স্বকুলং হিতং ।
ভৌমস্ত বারুণং মিত্রং আগ্নেয়াপি মারুতং।
মারুতং পার্থিবানাঞ্চ আগ্নেয়ঞ্চাসে। রিপু)

দীক্ষা-তত্ব। এক কোষ্ঠস্থিত বর্ণ-সমূহকে একভূত বা একদৈবত বলে। মন্ত্রের আদ্যক্ষয় ও সাধকের নামের আদ্যক্ষর যদি এক কোষ্ঠস্থিত (এক দৈবত) হয়, তবে কুলহিত অর্থাৎ সাধকের অনুকুল বলিয়া জানিবে। যদি মন্ত্রাক্ষর ও সাধকের নামাক্ষর একদৈবত না হয়; তবে উক্ত বর্ণদ্বয়ে পরস্পর মিত্রতা থাকিলে সেই মন্ত্র গ্রহণ করিতে পারে ; কিন্তু রিপুকোষ্ঠস্থিত মন্ত্র কখনও গ্রহণ করিবে না। বারুণ- বর্ণ, ভৌম বর্ণের মিত্র ; মারুত-বর্ণ, আগ্নেয়-বর্ণের মিত্র। মারুত বর্ণ, ভৌম-বর্ণের এবং আগ্নেয় বর্ণ, জলবর্ণের বিপু। আকাশ-বর্ণ, সৰ্ববর্ণের মিত্র বলিয়া জানিবে। যথা-রামচন্দ্র নামের আদ্যক্ষর ‘র’ আগ্নেয়-কোষ্ঠস্থিত কোন বীজ-মন্ত্রের আদ্যক্ষর “ক” মারুত-কোষ্ঠস্থিত ; সুতরাং পরস্পর এক ভূত” বা একদৈবত না হইলেও বায়ুর সহিত অগ্নির মিত্রতা হেতু রামচন্দ্র নামক দীক্ষার্থীর পক্ষে ঐ মন্ত্র শুদ্ধ। ঋণীধনী-চক্র। ক্রমে দ্বাদশটী রেখা অঙ্কিত করিয়া সপ্ত রেখা দ্বারা বিভাগ করিলে ছয়টি কোষ্ঠ সমন্বিত ঋণীধনী নামক চক্র অঙ্কিত হইবে। ঐ চক্রের উপরিভাগের একাদশ কোষ্ঠে ক্রমে “কালকালবিয়দগ্নিসমুদ্রবেদ আকাশদহনাং খলু সাধ্যবর্ণাঃ।”

দীক্ষা-তত্ব। ৩৯ ৬ ০ ত ৪ C ৫ | এই একাদশটী সংখ্যাবাচক অঙ্কপাত করিবে। ঐ অঙ্কের নিম্নলিখিত কোষ্ঠস্থিত বর্ণগুলি সাধ্যবর্ণ (মন্ত্রবর্ণ)। এবং সর্বনিম্ন একাদশ কোষ্ঠে ক্রমে- “যুগদ্বিপঞ্চবিয়ম্বরযুকৃশশাঙ্ক ব্যোমব্ধি বেদ-শশিনঃ খলু সাধকাণাঃ।” C ২ ৪ ৪ | ১ ৪ একাদশটা সংখ্যাবাচক অঙ্কপত করিবে। ঐ অঙ্কের উপরিস্থ কোষ্ঠসমূহে যে সমস্ত বর্ণ লিখিত হয় ; তাহাই সাধকাৰ্ণ অর্থাৎ দীক্ষার্থীর বর্ণ। মন্ত্রবর্ণগুলি স্বর ও ব্যঞ্জন ভেদে পৃথক পৃথক্ করিয়া লিথিবে, এবং দীক্ষার্থীর নামের অক্ষরগুলিও স্বর ও ব্যঞ্জন ভেদে পৃথক্‌ পৃথক্‌ লিখিয়া মন্ত্রবর্ণগুলির পার্শ্বে উপরিস্থিত সংখ্যাবাচক অঙ্ক লিখিবে এবং দীক্ষার্থীর নামের অক্ষরগুলির পার্শ্বে নিম্ন-কোষ্ঠস্থিত সংখ্যাবাচক অঙ্কগুলি যথানিয়মে লিখিবে। তৎপর উভয় অঙ্ক ভিন্ন ভিন্ন যােগ দিয়া ৮ দ্বারা ভাগ করিবে; ভাগ করার পর দেখিতে হইবে, মন্ত্রবর্ণ অবশিষ্ট রহিল, তাহা অধিক কি দীক্ষার্থীর অবশিষ্ট বর্ণ অধিক। যদি মন্ত্রবর্ণ “ঋণী” অর্থাৎ অধিক হয়, তবে সেই

দীক্ষা-তখ।
মন্ত্র শুদ্ধ বলিয়া জানিবে; আর যদি দীক্ষার্থীর নামের অবশিষ্ট
বর্ণ অধিক হয়, তবে অশুদ্ধ বলিয়া তাহা গ্রহণ করিবে না।
যদি মন্ত্রবর্ণ ও দীক্ষার্থীর বর্ণ তুল্যসংখ্যক হয়, তবে তাও
গ্রহণীয়; কিন্তু অবশিষ্ট কিছুই না থাকিলে তন্ম গ্রহণে
সাধকের মৃত্যু হয়। অতএব তাহা গ্রহণীয় নহে। যথা,-
“সাধ্যবর্ণান্ স্বরব্যঞ্জন ভেদেন পৃথক্ কৃতান্ ষট্‌
কালাঙ্কৈগুণিতা কৃত্বা, তথা সাধক নামাক্ষরা
স্বরব্যঞ্জনরূপেণ পৃথক্ কৃতান্ যুগ্মরৈঙ্কৈ
গুণিতা কৃত্বা, অষ্টসংখ্যাভি হােভয়াের
সাধ্য-সাধকয়াের্যধিকং তদৃণং যনং, তদ্ধনং।”
এই ভাবে ঋণী ধনী স্থির করিয়া মন্ত্ৰগ্ৰহণ করিবে।
বথা,-তান্তরে---
“মন্ত্রংযদ্যধিকাঙ্কং স্যাৎ তদামন্ত্র জপেৎ সুধীঃ।
সমেহপি চ জপেন্মন্তং ন জপেত্ত ঋণাধিকে।
শূন্যে মৃত্যুং বিজানীয়াত্তস্মাচ্ছন্যং বিবৰ্জয়েৎ।”
ঋণীধনী চক্রের গশনা সম্বন্ধে তন্ত্রান্তরে আরও অনেক
গুলি নিয়ম আছে। তাহাদের ফল প্রায় একরূপ বলিয়া
বিস্তৃতি ভয়ে ঐ গণনার নিয়ম উদ্ধত করা হইল না।
“অ ক থ হ” বা সিদ্ধারি-চক্র।
কল্পদ্রুমে,-যথা,
“পূৰ্ব্বপরায়তং কৃত্বা পঞ্চসূত্রং প্রকল্পয়েৎ।
তথৈব দক্ষিণে দিব্য-ক্রমেণ পঞ্চসূত্ৰকং।

দীক্ষা-তত্ব।
১
যথা মােড়শ কোষ্ঠানি সম্পদ্যন্তে তথা লিখেৎ।”
পূৰ্ব্ব-পশ্চিমে লম্বভাধে পাঁচটী রেখা অঙ্কন করিয়া,
উত্তর-দক্ষিণে লম্বমান পাঁচটী রেখা দ্বারা যােড়শ কোষ্ঠ সমন্বিত
একটী ক্ষেত্র (চ) সম্পাদন করিবে (বিশ্বসারে)—যথা,
“দক্ষিণাবর্তযােগেন কোষ্ঠে বর্ণান লিখেৎ সুধীর।
যেনৈব লিখনং কুৰ্য্যাৎ তেনৈব গণনং স্মৃতং।”
দক্ষিণাবর্তে অকারাদি হকারান্তবর্ণসমূহ ষােড়শ কোষ্ঠে
লিখিতে হইবে এবং যে নিয়মে লিখিত হইবে, সেই নিয়মে
গণনা করিতে হইবে।
“নামাদ্যক্ষরমারভ্য যাবন্ত্রাদিমাক্ষরং।
চতুর্ভিঃ কোষ্ঠৈরেকৈকমিতিকোষ্ঠচতুষ্টয়ং।
পুনঃ কোষ্ঠগ-কোষ্ঠেযু মধ্যতাে নাম আদিত।
সিদ্ধ-সাধ্য-সুসিদ্ধারিঃ ক্ৰমাজজ্ঞেয়া বিচক্ষণৈঃ ॥”
দীক্ষার্থীর নামের আদ্যক্ষর যে কোষ্ঠে থাকে, সেই কোষ্ঠ
হইতে দক্ষিণাবর্তে “সি, সাধ্য, সুসিদ্ধ, অরি,” এই নিয়মে
গণনা আরম্ভ করিয়া, মন্ত্রের আদ্যক্ষর যে কোষ্ঠে আছে, ঐ
কোষ্ঠ পৰ্যন্ত গণনা করিতে হইবে। ঘােড়শ কোষ্ঠের চারি
কোষ্ঠকে এক কোষ্ঠ মনে করিয়া প্রথম গণনা করিবে। যদি
কোষ্ঠগত চারি কোষ্ঠ মধ্যে সাধকের নামাদ্যক্ষর ও মন্ত্রের
আদ্যক্ষর থাকে, তবে তাহাতেও দক্ষিণাবর্তে “সিক, সাধ্য,
সুসিদ্ধ, অরি,”—এইরূপে গণনা করিয়া ফলাফল নির্ণয়
করিবে।

82
দীক্ষা-ও।
পূৰ্বেই প্রসঙ্গাধীন উক্ত হইয়াছে, সিদ্ধকোষ্ঠের মন্ত্র
কালে স্বয়ং সিদ্ধ হয়, সাধ্য মন্ত্র জপ হােমাদি দ্বারা সিদ্ধ হয়,
সুসিদ্ধ মন্ত্র গ্রহণ মাত্রেই সিদ্ধ হয়, এবং অব্লিমন্ত্র গ্রহণে সমূলে
বিনাশপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। অতএব অরিমন্ত্র কখনও গ্রহণ
করিবে না। অপরঞ্চ তন্ত্রান্তরে
“সিদ্ধার্ণা বান্ধবা প্ৰােক্তাঃ সাধ্যাস্তু সেবকা: স্মৃতাঃ।
সুসিদ্ধাঃ পােষ কা জ্ঞেয়া: শত্রবাে ঘাতকাঃ স্মৃতাঃ।”
সিদ্ধমন্ত্র বান্ধব, সাধ্যমন্ত্র সেবক, সুসিদ্ধমন্ত্র পােষক এবং
রিমন্তু ঘাতক বলিয়া জানিবে। নানা তন্ত্রের মতে এ সম্বন্ধে
আরও অনেক বচন আছে, মূলতঃ এক বলিয়া বিস্তৃতি ভয়ে
সে সব বচনাদি উদ্ধত করা হইল না।
অকড়ম-চক্র।
“রেখাদ্বয়ং পূৰ্ব্বাপণে কুৰ্য্যাত্তন্মধ্যতাে যামকুবের ভেদাৎ
মহেশ-রক্ষোধিপতি ক্ৰমেন তির্যক্ তথা বায়ু-হুতাশনেন,
অকারাদি কারান্তা ক্লীব-হীনা লিখেত্ততঃ।”
পূৰ্ব্ব-পশ্চিমে দুইটা রেখা অঙ্কন করিয়া তাহার মধ্যে
উত্তর-দক্ষিণে আর দুইটী রেখা অঙ্কন করিবে। তৎপরে
ঈশনাদি চতুষ্কোণে চারিটী রেখাদ্বারা একটি রাশিচক্র অঙ্কন
t:বে ।
এই চক্রে মেষাদি মীন পৰ্য্যন্ত প্রত্যেক কোষ্ঠে
অকারাদি এক একটী বর্ণ দক্ষিণাবর্তে লিখিতে হইবে।
কেবল ক্লীব-বর্ণ ঋ ঋ ৯ই পরিত্যাগ করিবে। যথা,-
“ঋ ঋ বর্ণ দ্বয়ং ৯ তবি ক্লীবং প্রচক্ষতে”

দীক্ষা-তত্ব।
ঋ ঋ ও ৯। এই বর্ণ চতুষ্টয় ক্লীব সংজ্ঞায় অভিহিত ।
অকারাদি ক্রমে প্রতি কোষ্ঠে এক একটী করিয়া বর্ণ
লিখিলে মেষ রাশির ঘরে “অকড়ম” এই চাৰিটা বর্ণ লিখিত
হয়, সেইজন্য—এই চক্রের নাম অকম-চক্র।
“মেধাদি চাপি মীনাস্তং গণয়েৎ ক্রমশঃ সুধীঃ।
জপু: স্বনামতাে মন্ত্রী যাবস্ত্রাদিমাক্ষরঃ ॥” রত্নাবল্যাং-
“সির-সাধ্য-সুসিদ্ধারী পুনঃ সিদয়ঃ পুনঃ।”
মেষ-রাশির কোষ্ঠ হইতে মীন-রাশির কোষ্ঠ পৰ্য্যন্ত
সাধকের নামের আদ্যক্ষর হইতে মন্ত্রের আদ্যক্ষর পর্যন্ত
সিদ্ধ, সাধ্য, সুসিদ্ধ, অরি.-এই নিয়মে গণনা করিবে। ঐ
রূপ গণনায় মন্ত্রের আদ্যক্ষর যে কোষ্ঠে পতিত হইয়াছে, ঐ
কোষ্ঠ যদি অরি গৃহ হয় তবে ঐ মন্ত্র গ্রহণ করিবে না।
সিদ্ধ, সাধ্য, সুসিদ্ধ কোষ্ঠে মন্ত্রবর্ণ থাকিলে তন্ম গ্রহণ
করিবে। যথা,-
“নবৈক পঞ্চমে সিদ্ধঃ সাধ্য সড় দশযুগ্মকে।
সুসিদ্ধস্ত্রিসপ্তকে রুদ্রে, বেদাষ্টদ্বাদশে রিপুঃ ॥”
এক, পঞ্চম ও নবম কোষ্ঠ সিদ্ধ ; দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও দশম
কোষ্ঠ সাধ্য ; তৃতীয়, সপ্তম ও একাদশ কোষ্ঠ সুসিদ্ধ ; চতুর্থ,
অষ্টম ও দ্বাদশ কোষ্ঠ বিপু।
গােপাল বিষয়ে অকড়ম চক্র শুদ্ধিই বিশেষ প্রয়ােজনীয়।
যথা,—“গােপালেহকড়মঃ স্মৃতঃ।”-“শৈব-বিষয়েহপি।” শৈব
বিষয়েও অকড়ম চক্র শুদ্ধি আবশ্যক।

৪৪ দীক্ষা-তত্ত্ব। সংক্ষেপে ষটচক্রের বিষয় বিবৃত হইল। ষট্‌চক্রেই মন্ত্র বিচার আবশ্যক। তন্মধ্যে বিষয় ভেদে এক একটা চক্রের প্রয়ােজন অধিক। ষটচক্রে শুদ্ধ না হইলেও যে যে বিষয়ে যে যে চক্রের প্রাধান্য ঐ ঐ চক্রে তত্তদ্বিষয়ে মন্ত্র বিচার করিয়া মন্ত্র শুদ্ধ করিতে হইবে। দেবতা ভেদে চক্র বিচারের আবশ্যক, বারাহী তন্ত্রে জামাদিতেও কথিত হইয়াছে “তারাশুদ্ধির্বৈবানাং কোষ্ঠশুদ্ধিঃ শিবস্য চ। রাশিশুদ্ধিস্ত্ৰৈপুরে চ গােপালেহকড়মঃ স্মৃতঃ। অকড়মাে রামচন্দ্রে গণেশে হরচক্ৰকং। কোষ্ঠচক্রং বরাহস্য মহালক্ষ্ম্যাঃ কুলাকুলং। নামাদি চক্ৰ সৰ্ব্বেষাং ভূতচক্রং তথৈবচ। ত্রৈপুরং তারকে শুদ্ধ মন্ত্র জপেদ্ধঃ। । ০ ০ ০ ০ ০ কালিকায়াশ্চ তারা৷স্তারাচক্রং শুভাবহং। ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ এ । ০০ ০ ০ ০ ০ হরচক্ৰে সৰ্বমন্ত্রং ধনাধিক্যে ন চায়েৎ ॥” সমস্ত চক্রেই মন্ত্রশুদ্ধি বিচার করা কর্তব্য। বৈষ্ণবদিগের পক্ষে নক্ষত্র চক্রশুদ্ধি বিশেষ প্রয়ােজন। সিদ্ধারি (অ ক থ হ। চক্ৰ শিবমন্ত্রে রাশিচক্র ত্রিপুরা বিষয়ে, অকড়ম চক্র গােপাল ও রামমন্ত্রে, ঋণীধনী চক্র গাণপত্যে, সিদ্ধচক্র বরাহ মন্ত্রে এবং কুলাকুল চক্র মহালক্ষ্মী দীক্ষা-তত্ত্ব। ৪৫ মন্ত্রে শুদ্ধ হওয়া অত্যাবশ্যক। বিশেষতঃ নামের আদ্যক্ষর লইয়া যে যে চক্রের বিচার করিতে হয়, ঐ ঐ চক্র সমস্ত বিষয়েই শুদ্ধ হওয়া প্রয়ােজন। কালী ও তার বিষয়ে নক্ষত্র চক্রের প্রাধান্য। কিন্তু ঋণীধনী চক্র সমস্ত বিষয়েই বিচার করিতে হইবে। দীক্ষার্থী কখনও ধনাধিক্য ( ধনীমন্ত্রী মন্ত্র গ্রহণ করিবে না। কেহ কেহ প্রশ্ন করিতে পারেন—দীক্ষার্থীর জন্ম-বাশি ও নক্ষত্র আছে, কিন্তু দেবতার বা মন্ত্রের আবার জন্ম-রাশি বা নক্ষত্র কি? ইহার উত্তর—বিশ্বাসীর পক্ষে কঠিন নহে। দেবতাদিগের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত এবং অধর্মের অভ্যুত্থানে এবং ধৰ্ম্মের গ্লানি উপস্থিত হইলেই ভগবান্ দেহ রচনা করিয়া আবির্ভূত হন। সুতরাং আবির্ভাবের দিন যে রাশি যে নক্ষত্র ছিল, তাহাই তত্তদ্রুপের জন্মরাশি ও জন্মনক্ষত্র। যথা,-ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমী দিনে আবিষ্কৃত হন, তজ্জন্য ঐ তিথি “জন্মাষ্টমী” সংজ্ঞায় অভিহিত। শ্রীকৃষ্ণের জন্মরাশি “বৃষ” এবং জন্ম-নক্ষত্র “রােহিণী” এইরূপ সমস্ত মূর্তিরই আবির্ভাবের সময় নির্দিষ্ট আছে। তত্তাবৎ সাধারণের অপরিজ্ঞাত বলিয়া মন্ত্রের আদ্যক্ষর দ্বারা রাশি নক্ষত্র নির্ণয় করিতে হয়। যেহেতু মন্ত্রময় দেবতা, মন্ত্রাৰ্থ ই দেবতার স্বরূপ প্রকাশক। অতএব মন্ত্র ও দেবতা অভেদ। এইরূপ অভেদ-জ্ঞানে জপ, হােম ও পূজাদির বিবরণ তন্ত্রে উক্ত হইয়াছে।

৪৬ দীক্ষা-তত্ব। এস্থলেও কেহ আপত্তি করিতে পারেন—নামাদ্যক্ষর দ্বারা কিরূপে জন্মরাশি ও নক্ষত্র স্থির হইবে? হিন্দুর পক্ষে ইহার উত্তর: সহজ। প্রকৃত হিন্দু কোন কাফেঁই শাস্ত্র লঙ্ঘন করে না।-“নামকরণ” সময় যে গুপ্ত নাম রক্ষিত হয়, রাশি-নক্ষত্রানুসারে তাহার আদ্যক্ষর নির্ণীত হইয়া থাকে। সুতরাং কোন দীক্ষার্থীর রাশি নক্ষত্র অপরিজ্ঞাত থাকিলেও তাহার নামাদ্যক্ষর দ্বারা রাশি বা নক্ষত্র স্থিরীকৃত হওয়া অসম্ভব নহে। সাধক ও সাধ্য উভয় সম্বন্ধেই এ যুক্তি প্রয়ােজ্য। হিন্দুগণ শাস্ত্রানুগামী। শাস্ত্রানুমােদিত কাৰ্যই হিন্দুগণ কৰ্ত্তব্য বলিয়া মনে করে। হিন্দুদিগের প্রত্যেক কার্সই বিজ্ঞানুমােদিত। কিন্তু সমস্ত বিষয়ের সূক্ষ্মতত্ত্ব সাধারণের বােধগম্য নহে। অতীন্দ্রিয়-দ্রষ্টা ঋষিগণ যােগবলে যে সমস্ত বিষয়ের সুক্ষ্মতত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়া হিন্দুধৰ্ম্মের কর্তব্য- রূপে—শাস্ত্রীয় প্রমাণ দ্বারা বিধিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, তৎপ্রতি দ্বিধাবােধ বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হিন্দুর পক্ষে অকৰ্ত্তব্য। তথাপি ধুক্তিবাদীদিগের মনস্তুষ্টির জন্য দুই চারিটা যুক্তি প্রদর্শিত হইল। এক্ষণ অধিকারি-ভেদ সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। (ক) জগতের প্রত্যেক কার্যাই স্থান, কাল, পাত্র ও প্রয়াে- জনানুসারে উৎকৃষ্ট অধিকারী দ্বারা প্রযুক্ত না হইলে তাহা সুসম্পন্ন হয় না। কোন একটা সঙ্গীত, যথানির্দিষ্ট সময়ে সীত-শাস্ত্রজ্ঞ সুক গায়ক দ্বারা রাগরাগিণী ও তালল-- দীক্ষা-তত্ত্ব। সংযােগে গীত হইলে শ্রোতৃবর্গ মন্ত্রমুগ্ধবৎ আত্মহারা হইয়া খাকেন। আবার সেই সঙ্গীত, অনভিজ্ঞ ব্যক্তি দ্বারা অসময়ে গীত হইলে “তুৰ্বিতন্ত্ৰীৰিব তাড্যমান” কর্কশ বলিয়া শ্রোতার বিরক্তি উৎপাদন করে। একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক স্থানকাল ও রােগীর ধাতু-প্রকৃতির অবস্থা বিবেচনায় রােগ নির্ণয় করিয়া যথাবিধি ঔষধ প্রয়ােগ করিলে, অতি সত্বর আরােগ্য-ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আবার অনভিজ্ঞ চিকিৎসক স্থান, কাল বা পাত্রের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া যথেচ্ছরূপে ঔষধ প্রয়ােগ করিলে সুফলের পরিবর্তে রােগীর জীবন-নাশ ঘটে। (খ) অন্যান্য কাৰ্যে যেরূপ স্থান, কাল, পাত্র ও উৎকৃষ্ট অধিকারীর প্রয়ােজন, দীক্ষা সম্বন্ধেও তদ্রুপ স্থান, কাল, পাত্র ও উৎকৃষ্ট অধিকারীর আবশ্যক। আমি বহুদিন পূর্বে কোন মাসিক পত্রিকায়—“অধিকারি-ভেদ” শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লিখিছিলাম, এস্থলে তৎসম্বন্ধে বিস্তৃত আলােচনা করিয়া পুস্তিকার কলেবর বৃদ্ধি করিতে ইচ্ছা করি না, তবে সংক্ষেপে তাহার মর্ম প্রকাশ করিব। আমরা যখন মাতৃগ হইতে ভূমিষ্ঠ হই, তখন আমরা উলঙ্গ অবস্থায় থাকি; যতদিন না লজ্জা এবং কামাক্ত আমাদিগকে মােহাভিভূত করে, ততদিন আমরা নিঃসঙ্কোচে উলঙ্গাবস্থায় সর্বত্র পরিভ্রমণ করি। তৎকালে যুবতী রমণীগণ ঐ নগ্ন মূর্তির প্রতি আদর প্রকাশে ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়া লজ্জাস্থানে, অসঙ্কোচে চুম্বন করিয়া থাকে।

৪৮ দীক্ষা-তত্ব। । আবার যখন আমাদের বাল্যাবস্থা অতীত হয়, যখন যৌবনের বিকট কামান্ধতা দেহকে কলুষিত করে, তখন আবার ঐ রমণীগণ আমাদিগকে দেখিয়া অবগুণ্ঠনে মুখ আবৃত করিয়া স্থান ত্যাগ করে। এমন কি মাতা ভগ্নীগণও আর সেই নগ্ন মূর্তির প্রতি আদর প্রকাশ করেন না। কিন্তু আবার সাধন-সিদ্ধ মহাপুরুষগণ যখন উলঙ্গাবস্থায় নির্বিকার ভাবে বাস করেন, তখন আবার বহু যুবতী কুলনারী নিঃসঙ্কোচে তাহাদের চরণসেবা করিয়া কৃতার্থ হয়। মহাপুরুষ ত্রৈলঙ্গ স্বামী, ভাস্করানন্দ স্বামী প্রভৃতি তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু তুমি বা আমি যদি উলঙ্গ হইয়া রাজপথে বাহির হই, তবে লােকে পাগল বলিয়া উপহাস করিবে, বালকগণ ঢিল মারিবে, পুলিশ প্রহরী সাদরে কারাগৃহের আতিথ্য গ্রহণ করাইবে। ইহার কারণ—তুমি বা আমি উলঙ্গ হইবার অনধিকারী। ত্রৈলঙ্গ স্বামী, ভাস্করানন্দ স্বামী প্রভৃতি মহাপুরুষগণ উলঙ্গ থাকিবার অধিকারী। এক্ষণ দীক্ষা প্রদানের উৎকৃষ্ট অধিকারী (সদ্গুরু) কে ? তৎসম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব। দীক্ষা তিন প্রকার,বৈদিক দীক্ষা, পৌরাণিক দীক্ষা ও তান্ত্রিক দীক্ষা । যুগভেদে এক এক প্রকার দীক্ষার প্রাধান্য। বৈদিক দীক্ষা প্রদানের অধিকারী সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে,—যথা— “বিধিবদঘীত বেদ-বেদাঙ্গত্বেনাপাততােহধিগতাখিল- বেদার্থোহস্মিন্ জন্মনি জন্মান্তরে বা কাম্যনিষিদ্ধ-বৰ্জ্জুন-পুরঃসর দীক্ষা-তত্ব। ০৯ নিত্য-নৈমিত্তিক-প্রায়শ্চিত্তেপাসনাহনুষ্ঠানেন নির্গত-নিখিল- কলুষতয়া নিতান্ত-নিৰ্ম্মল-স্বান্তঃ সাধনতুষ্টয়-সম্পন্নঃ প্রমাতা অধিকারী।” যথাবিধি বেদ-বেদাঙ্গ অধ্যয়নপূর্বক যিনি নিখিল বেদার্থ পরিজ্ঞাত হইয়াছেন এবং ইহ জন্মে বা জন্মান্তরে কাম্য নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম বর্জন পুরঃসর নিত্য নৈমিত্তিক প্রায়শ্চিত্ত উপাসনা দ্বারা সর্ব প্রকার পাপ-বিমুক্ত হইয়া নিতান্ত শুদ্ধান্তঃকরণ এবং অণিমাদি সাধন-চতুষ্টয় সম্পন্ন হইয়াছেন, তিনিই বৈদিক মন্ত্র প্রয়ােগ ও ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী। সত্যাদি যুগে বৈদিক মন্ত্রের অপ্রতিহত প্রভাব ছিল। প্রাচীন ঋষিগণ বৈদিক মন্ত্রের প্রভাবে সাধারণের যাহা অসাধ্য, তাহা অতি সহজে সাধন করিতেন। তজ্জন্য মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ “ভূদেব” পদবাচ্য। ব্ৰহ্মণগণ অদ্যাপি (কেহ কেহ) যে নামের অন্তে “দেবশর্মা” পদ ব্যবহার করেন, তাহার কারণও মন্ত্রজ্ঞতা। যথা- “দেবাধীনা জগৎসৰ্ব্বে মন্ত্রাধীনাঞ্চ দেবতা। তে মন্ত্রাঃ ব্রাহ্মণ জ্ঞাতাঃ তস্মাদু ব্রাহ্মণ দেবতাঃ ॥” সমস্ত জগৎ দেবতার অধীন, দেবতা মন্ত্রের অধীন, ব্রাহ্মণগণ সেই মন্ত্র পরিজ্ঞাত আছেন বলিয়া ব্রাহ্মণও দেবতা সংজ্ঞায় অভিহিত। সত্যাদি যুগে বৈদিক মন্ত্র পূর্ণবীৰ্য-শালী ছিল, বেদোক যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠাতা এবং কর্মের অধিকারীরও অভাব ছিল

দীক্ষা-ত।
; কিন্তু বর্তমান কলিযুগে যেমন বৈদিক জিয়া লুপ্ত, তেমনি
অন্য দিকে বেদোক্ত অধিকারীর অভাবে বৈদিক কৃচ্ছসাধ্য
মাগযজ্ঞাদি ক্রিয়া ও কঠোর যােগ-যাধনাদি অল্পায়ু হীনবীৰ্য্য
ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব বলিয়া, কলিতে শাস্ত্রকর্তাগণ তাত্রিক
মন্তু, তন্ত্রোক্ত ক্রিয়া এবং যােগ প্রভৃতির ব্যবস্থা করিয়াছেন।
যথা,
“নির্বীৰ্য্যা শ্রৌত-জাতীয় বিষহীনােরগা ইব।
সূত্যাদৌ সফলা আসন্ কলৌ তে মৃতকাঃ খৃতাঃ।”
(মহানিৰ্বাণতন্ত্র।)
সত্যাদি যুগে বৈদিক মন্ত্র পূর্ণফল-প্রদ ছিল ; কলিকাতে
বিষহীন সর্পের ন্যায় তাহা শক্তিহীন, এবং মৃতপ্রায়।
আর একটি বচন উদ্ধৃত করিতেছি-
“কলৌ তন্ত্রোদিঅ মন্ত্রাঃ সিদ্ধান্তং ফলপ্রদাঃ ।
শাঃ কর্মেধু সর্বেষু জপ-যজ্ঞ-ক্রিয়াদিযু।”
অর্থ-কলিতে তন্ত্রোক্ত মন্ত্র অতি শীঘ্র সিং ও ফলপ্রদ।
হয় এবং জপযজ্ঞাদি সর্বকর্মেই তন্ত্রোক্ত মন্ত্র প্রশস্ত।
কলিতে তন্ত্রোক্ত মন্ত্র ও মত, প্রশস্ত হইলেও তােক
মন্ত্রের প্রয়ােগে এবং উপদেশে, উপযুক্ত অধিকারীর
প্রয়ােজন। তন্ত্রশাস্ত্র তান্ত্রিক মন্ত্রোপদেষ্টার যােগ্যতা সম্বন্ধে
এইরূপ উক্ত হইয়াছে, যে-
“শাতো দত্তঃ কুলীন বিনীতঃ প্রবেশবান্।
শুদ্ধাচারঃ সুপ্রতিষ্ঠঃ শুচিঃ সুবুদ্ধিমা-

fীক্ষা-তত্ব। আশ্রমী ধ্যান- নিশ্চ তন্ত্র-বিশারদ। নিগ্রহানুগ্রহে শক্তো অরিত্যভিধীয়তে।” শমাদি গুণযুক্ত, তপঃ ক্লেশাদি সহিষ্ণু, কৌলাচার-পরায়ণ, বিনয়শীল, পবিত্র বেশধারী, শুদ্ধাচার সম্পন্ন, যশস্বী, পবিত্র চিত্ত, ক্রিয়াদ, সবুদ্ধিযুক্ত, গৃহস্থাশ্রমী, ঈশ্বরচিন্তা-পরায়ণ, তন্ত্র-মন্ত্ৰ-পারদশী, নিগ্রহ এবং অনুগ্ৰহ করিবার শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিই মন্ত্রোপদেষ্ট গুরুপদবাচ্য। উপরােক্ত লক্ষণাক্রান্ত গুরুর সংখ্যা বিরল হইলে আজও এদেশে একবারে অভাব হয় নাই। যেরূপ ব্যক্তির নিকট দীক্ষা গ্রহণ অকর্তব্য, তাহাও: তন্ত্রে উক্ত হইয়াছে। যথা- “খিত্রী চৈব গলৎকুষ্ঠী নেত্ৰয়ােগী চ বামন। কুনখ খাবদ শ্রীজিতােহধিকাঙ্গিক। হীনাঙ্গ কপট রােগ বশী বহুজৱক। এতৈদোযৈবিনিমুক্তা যঃ স গুরু শিষ্যসন্মতঃ ॥” শ্বেতকুষ্ঠ বা গলিতকুষ্ঠ রােগযুক্ত, নেলােগ, বামন, কুনশী, বন্ত, ত্রৈণ, অধিকাজ, অঙ্গহীন, কপটাচারী, চিরকুল, ৰণ ও বহুভাষী ব্যক্তির নিকট দীক্ষিত হইবে না। এই সমস্ত দোৰ পৰিশূন্য ব্যক্তিই শিষে-গুরু হইবার যােগ্য বৈশম্পায়ন সংহিতায় আছে-অপুত্রা মৃতপুত্র কুজকো বামনস্তথা”—ইত্যাদি বচনেও পুত্র ও মৃতপুত্ৰক (যাহার

দীক্ষা-তত্ব।
বংশ রক্ষার সম্ভাবনা নাই) বামন ও কুষ্ঠরােগ ইত্যাদিও
গুরুর অযােগ্য বলিয়া কথিত হইয়াছে।
নিন্দিত গুরুবিষয়ক আরও অনেক বচন নানা তন্ত্রে উক্ত
হইয়াছে। সে সকল উদ্ধত করিতে হইলে পুস্তিকা বৃহৎ
হইয়া যাইবে, তজ্জন্য তাহা পরিত্যক্ত হইল। যে যে স্থলে
যে যে গুরু প্রসিদ্ধ এবং যে যে ব্যক্তির নিকট হইতে দীক্ষা
গ্রহণ অকৰ্তব্য, তাহাই এক্ষণ আলােচনা করিব। যথা,..
কুলচূড়ামণিতে ;-
“উদাসীনােদাসিনাং বনস্থ বনবাসিনঃ।
যতীনাঞ্চ যতিঃ প্রােক্তো গৃহস্থানাং গুরুগৃহী।
বৈষ্ণবে বৈষ্ণবাে গ্রাহ: শৈবে শৈবস্তথা পুনঃ।
শান্তিকে ত্ৰিতয়ং বিদ্যদ্দীক্ষাস্বামী ন সংশয়ঃ ॥”
উদাসীন উদাসীনকে, বনবাসী বনবাসীকে, যতী যতীকে,
গৃহস্থ গৃহীকে, গুরুপদে বরণ করিবে। বৈষ্ণবের পক্ষে
বৈষ্ণব গুরু, শৈবের শৈব গুরু প্রশস্ত; শাক্ত গুরু-শাক্ত,
বেকুব ও শৈব, এই তিন প্রকার দীক্ষাতেই মন্ত্রদাতা হইতে
পারেন, ইহাতে কোন সংশয় নাই।
বর্তমান সময়ে অনেক সন্ন্যাসি-বেশী বিজ্ঞাপনদাতা বক্তা,
তল-মস্তিষ্ক স্কুলের ছাত্র বা অজ্ঞ গৃহস্থকে বাগবিভূতিতে
ভুলাইয়া. শিষ্য করিয়া থাকেন; কিন্তু অবধূতশ্রমীর
( সন্ন্যাসীর) নিকট গৃহস্থ দীক্ষিত হইতে পারে না।

দীক্ষা-তত্ব। রুদ্ৰজামলে কথিত হইয়াছে--- “ন পত্নীং দীক্ষয়েৎ স্ত্রী, ন পিতা দীক্ষয়েৎ সুতাং । ন পুত্রঞ্চ, তথা ভ্রাতা ভ্রাতরং ন চ দীক্ষয়েৎ ॥” • পতি স্বীয় ভাৰ্যাকে, পিতা পুত্র ও কন্যাকে, ভ্রাতা সহােদর ভ্রাতাকে দীক্ষা প্রদান করিবে না। কিন্তু সিদ্ধমন্ত্র দান সম্বন্ধে এ নিষেধ বচন নহে। কারণ- “সিদ্ধমন্ত্রো যদি পতিদা পত্নীং দীক্ষয়েৎ। শক্তিত্বেন বরারােহে, ন চ সা পুত্রিকা ভবেৎ।” পতি যদি সিদ্ধ মন্ত্রী হন, তবে স্বীয় পত্নীকেও দীক্ষা প্রদান করিতে পারেন; কিন্তু স্বীয় পত্নীকে শক্তিরূপে গ্রহণ করিবেন, অন্যান্য শিষ্যার ন্যায় পুলিকা ভাবে গ্রহণ করিবেন না। তারাদি বিদ্যা বিষয়ে স্বীয় কুলতিলক জ্যেষ্ঠ পুত্রকে দীক্ষা দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু বর্তমানে তাহা দেশাচার বিরুদ্ধ বলিয়া প্রচলন নাই। ব্রহ্মা পুত্র বশিষ্ঠকে দীক্ষা প্রদান করিয়াছিলেন; বশিষ্ঠও তাহার পুত্র পরাশরকে দীক্ষা দান করিয়াছেন। যথা- “ব্ৰহ্মণা কথিতং পূৰ্ব্বং বশিষ্ঠায় মহাত্মনে, বশিঠোহপি পুত্রায় মৎপিত্রে দত্তবান্ স্বয়ং। কুরুক্ষেত্রে মহাতীর্থে সূৰ্যপর্বণি দত্তবান্।” ইত্যাদি (বৈশম্পায়ন সংহিতায় শৌনকের প্রতি ব্যাসের কুচন দ্রষ্টব্য)

স্বপ্নল ম, বিনা বিচারে যথানিয়মে সদ্গুরু হইতে
গ্রহণ করিবে। অর্থাৎ শুরু হইতে উপদিষ্ট না হইলে
অপৰূ মঞ্জও ফুল হয় না। যদি সদ্গুরু পাওয়া না যায়,
তবে জলপূর্ণ কলসে গুরুর প্রাণ প্রতিষ্ঠা পূর্বক বটপত্রে
কুম দ্বারা স্বল্পলব্ধ মন্ত্র লিথিয়া কলসস্থ জলে নিক্ষেপ
করিবে। এবং পশ্চাৎ ঐ বটপত্র মহামন্ত্র উত্তোলন করিয়া
বয়ং তাহা গ্রহণ করিলে দীক্ষা সিদ্ধ হইবে। “ইদত্ত গুরাে-
ভাৰে বােৰং-এই নিয়ম গুরুর অভাবে বুঝিতে হইবে।
কলিযুগে স্ত্রীলােকের নিকটেও দীক্ষামন্ত্র গ্রহণের
ব্যবস্থা আছে।
“সাধ্বী চৈব সদাচার তক্তা জিতেক্রিয়া।
সমার্থতত্ব শীলা পূজনে ।
বােগ্যা ভবেৎ মা হি বিধবা পরিবর্জিতা।”
অর্থ-সাধ্বী, সদাচারসম্পন্ন, গুরুভক্ত, জিতেন্দ্রিয়া,
সর্বপ্রকার মন্ত্রার্থে তত্ব পরিজ্ঞতা, সুশীলা এবং পূজা-
পায় নারী পুরুষােগ্যা; কিন্তু বিধবা যদি উপকার
শালিনীও হন, তথাপি তাহা হইতে দীক্ষা গ্রহণ করিবে
না। এতে বিধৰা শৰে অৰিা (পতিপুত্রহী) নারী
বুঝিৰে। যথা-
বিমাঃ তাৎ ফুয়া পিনু।
নাধিকার যতাে নাৰ্যাঃ সধবা ভক্ত রায়া”

নীত।
যে হেতু, বিধবা নারী পুত্রের কন্যা পিতার এবং সধবা
পতির আদেশে দীক্ষা প্রদান করিতে পারিবে। “বাতনােধি-
কারঃ” অর্থাৎ স্বতন্ত্র হইয়া দীক্ষা প্রদান করিতে
পারিবে না।
“স্ত্রিয়া দীক্ষা শুভ পােকা মাতুশ্যাষ্টগুণাঃ মৃতঃ।”
শ্রীলােক কর্তৃক দীক্ষা শুভফল প্রদান করে, এবং মন্ত্র
গানের অধিকারিণী মাতার নিকট দীক্ষিত হইলে অন্য স্ত্রী
অপেক্ষা অষ্ট গুণফল অধিক হয়।
এক্ষণ প্রশ্ন হইতে পারে যে, পুত্রের নিকট পিতা এবং
মাতা উভয়েই মহাগুরু, তবে পিতা হইতে দীক্ষিত হইতে
পারে না কেন? এবং জ্যেষ্ঠ সহােদর হইতেই বা দীক্ষিত
হওয়ার নিষেধ কেন?
ইহার প্রথম উত্তর এই যে, হিন্দুগণ শাস্ত্রানুগামী। শাস্ত্রের
বিধি-নিষেধই হিন্দুর প্রতিপাল্য। তবে যুক্তিবাদীর মনস্তুষ্টির
জন্য বলিতে হইবে যে, পিতা পুনৰ্ব্বার দারপরিগ্রহ করিলে
অনেক স্থালে বিমাতার কুমন্ত্রণায় পূৰ্ব্বপক্ষের পুত্রাদির প্রতি
মেহন্ত হইয়া দুর্ব্যবহার করিয়া থাকেন। সুতরাং এই
কলিযুগে সেরূপ আশঙ্কিত স্থল আছে বলিয়াই পিতার নিকট
দীক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ হইয়াছে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাও পূজনীয় বটে,
কিন্তু স্বার্থ লইয়া এসময়ে ভ্ৰাতায় ভ্রাতায় বিরােধের আশঙ্কা
আছে, এই হেতুতেই বােধ হয় জ্যেষ্ঠ সহােদর দীক্ষা কাৰ্য্যে
পরিত্যক্ত হইয়াছেন।

দীক্ষা-তৰ।
মাতার তুল্য পুত্রের শুভাকাঙ্খিণী জগতে আর দ্বিতীয়
কেহ নাই। সাধারণ কথায় বলে “কুপুত্র অনেক হয়, কুমাতঃ
কখনও নয়,”—এই জন্যই মাতার দীক্ষা অষ্টগুণ ফলপ্রদ।
দীক্ষা বিষয়ে যেমন উৎকৃষ্ট অধিকারীগুরুর প্রয়ােজন,
তদ্রুপ আবার সংশিষ্যও আবশ্যক। কেবল উৎকৃষ্ট বীজ
হইলেই যে শস্য উত্তম হয়, তাহা নহে; ক্ষেত্রের উৎকর্ষতাও
উত্তম শস্যের কারণ। উর্বর ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট বীজ উপ্ত
হইলে যেমন সুফল প্রসব করে, উষর ক্ষেত্রে তেমন হয় না ।
অতএব সদাচার সম্পন্ন, সচ্চরিত্র, ভক্তিমান্ শিষ্যই দীক্ষা
গ্রহণের অধিকারী। যথা,--
“শান্তো বিনীতঃ শুদ্ধাত্মা শ্রদ্ধাবান্ ধারণক্ষমঃ।
সমর্থশ্চ কুলীন প্রাজ্ঞ সচ্চরিতাে যতিঃ।
এবমাদিগুণৈযুক্ত শিন্তো ভবতি নান্যথা।”
আর এক স্থানে উক্ত হইয়াছে-
“পুণ্যবান্ ধাম্মিকঃ শুদ্ধো গুরুভক্তো জিতেন্দ্রিয়।
শিষযােগ্যো ভবেৎ সাে হি দান-ধ্যান পরায়ণঃ ॥”
শমাদিগুণযুক্ত, বিনয়ী, শুদ্ধাস্তকরণ, শ্রদ্ধাবা, ধারণাশীল,
কর্মক্ষম, সদ্বংশজাত, অভিজ্ঞ, সচ্চরিত্র, সংষত, ধাৰ্মিক,
পুণ্যবান, গুরুভক্ত, জিতেন্দ্রিয়, দাতা এবং ধ্যান-পরায়ণাদি
গুণযুক্ত ব্যক্তিই শিষ্যের যােগ্য।
যে সমস্ত ব্যক্তি দীক্ষা গ্রহণের অযােগ্য, নিয়ে তাহা
প্রদর্শিত হইল। যথা-

দীক্ষা-তত্ব।
“পাপিনে তুরচেষ্টায় শঠায় কৃপশায় চ।
দীনায়চার-শূন্যায় ম-দ্বেষ-পরায় চ।
নিন্দকায় চ মূখায় তীর্থদ্বেষ পরায় চ।
গুরুভক্তি-বিহীনায় ন দেয় মলিনামচ।*
হখাচ আগমসারে-
“অসূয়া মৎসৰগ্ৰস্তা সাদা পৰুষ-বাদিন।
অন্যায়ােপার্জিত-ধনাঃ পরদাতাশ্চ যে
এবস্তৃতা পরিত্যাজ্যাঃ শিষ্যত্বেনােপকল্পিতাঃ।”
উপরি উদ্ধৃত বচনের মর্মার্থ এই যে,
পাপাত্মা, কৰ্ম্মা, বক, কৃপণ অতিদরিদ্র, আচারভ্রষ্ট,
মন্থদ্বেষী নিন্দুক, মুখ, তীর্থদ্বেষী, গুরুভক্তিহীন এবং বিমর্ষ
ব্যক্তিকে মন্ত্র প্রদান করিবে না। অসূয়া ও মাৎসর্যমুক্ত,
কর্কশভাষী, পাপােপার্জিত ধনে ধনবান্ এবং পরস্ত্রীর
ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করিয়া যথাযােগাকে শিষত্বে গ্রহণ করিবে।
তথাচোক্তং সারসংগ্রহে
“সদগুরু স্বাশিতং শিং বর্ষমেক পরীক্ষয়েৎ।”
কাহাকেও শিষ্য করিতে হইলে সদ্গুরু একবৎসর কাল
শিযাের দোষগুণ পরীক্ষা করিবেন।
৯,
“গুরু শিষ্যতা বাপি তয়াের্বৎসর-বাসত।”

দীজাত। প্রথমে শুরু বা শিষ্য কল্পনা করিতে হইলে, উভয়ে এক বৎসর কাল একত্র বাস করিয়া পরস্পর পরস্পরের স্বভাবাদি পরিজ্ঞাত হইবে। বর্তমান সমরে অনেকেই এ সমস্ত বিষয়ে আদৌ লক্ষ্য করে না। অন্যান্য সাধারণ কার্যের ন্যায় প্রােঢ় বা প্রাচীন বয়সে, সামাজিক রীতি রক্ষার্থে অনেকেই যেন তেন প্রকারেন দীক্ষা গ্রহণ করিয়া একটা দায় এড়াইয়া থাকেন। সুতরাং মন্ত্র-গ্রহণের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। তজ্জন্য অনেকে দীক্ষা- গ্রহণ অবশ্য কর্তব্য বলিয়া মনে করে না। দীক্ষা গ্রহণ অবশ্য কর্তব্য বলিয়া মনে না করিলে এবং গুরুর গুরুত্ব উপলব্ধি না করিতে না পারিলেও ভাষান্তর করিয়া গুৰু কথাটাকে আর এক ভাবে এখনকার ললাকে অতি সম্মানের চক্ষে দেখিতে আরম্ভ করিয়াছেন। তাহারা দেখিতেছেন- প্রতােক ধর্মেই গুরুর প্রয়ােজন, গুরু সকল ধর্মেই উপদেষ্টা এবং মাননীয়। খৃষ্টাদিগের ধর্মযাজক বা গুরু বিশেষ মাননীয় ; প্রত্যেক গির্জাতেই এক একজন ধর্গ- যাজক আছেন। তন্মধ্যে ভারতবর্ষের ভূতপূর্ব রাজধানীর (বৰ্ত্তমান বঙ্গের রাজধানী) লর্ড বিসপ প্রধান ধর্মযাজক। তাঁহার সম্মান অসাধারণ, গর্চ বিশপ “হি এক্সেলেন্সি” সম্মান প্রাপ্ত হন, তাহার সাক্ষাতে কোন খৃষ্টান মন্তকে শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করিতে পারেন না। ইংলণ্ডে সম্রাটের

ধর্মযাজক কোরবেরীর আর্কবিসপ মহামান্য। রাজ্যাভিষেক
ক্রিয়া ও রাজমুকুট পরিপ্লান আর্কৰিসপ কর্তৃক সম্পন্ন হয়।
ধৰ্ম্ম-সম্বন্ধীয় কোন আইন তঁাহার অমতে বিধিবদ্ধ হইতে
পারে না। তাঁহাদের সর্বপ্রকার ব্যয় (বৃত্তি) রাজকোষ
হইতে প্রদত্ত হয়।
নােমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের ধর্মযাজক “পােপ
সংজ্ঞায় অভিহিত। পাশ্চত্য সমাজে তাঁহার শক্তি অসীম।
বৌদ্ধধর্মের প্রধান গুরু, সম্প্রদায় ভেদে নানা সংজ্ঞায়
অভিহিত। তিব্বতের বৌদ্ধগুৰু “লাম” অসীম শক্তিশালী।
তিব্বতের শাসনদণ্ড লামার হস্তেই অর্পিত। চীন, জাপান ও
তিব্বত প্রভৃতি দেশবাসী—কোটি কোটী বৌদ্ধ তাহাকে
আজিও বুদ্ধদেবের স্থানীয় জ্ঞানে পূজা করিয়া থাকেন।
মুসলমান-ধর্মের গুরু “পীর” বা মােল্লা নামে অভিহিত।
মােন্নাদিগের অঙ্গুলি-সঙ্কেতে সমস্ত মুসলমানজাতি পরিচালিত।
সমস্ত মুসলমান জাতির গুরু “খলিফা” সংজ্ঞায় প্রসিদ্ধ।
টার্কীর সুলতান নিখিল মুসলমান-জাতির প্রধানতম গুরু
বা খলিফা।
হিন্দুধর্মে দীক্ষাও কেবল পূজনীয় বা মাননীয় নহে।
হিন্দুধর্মে গুরুর আসন ঈশ্বরের তূল্য উচ্চতম। হিন্দুগণ
দীক্ষাদাতা গুরুকে নররূপী ঈশ্বর বলিয়া আরাধনা করেন।
যথা, জ্ঞানার্ণবে-
জন্সহেতু হি পিতয়ে পূজনীয়ে এষতঃ।
ওর্বিষেশতঃ পূজো ধর্মাধর্ম-প্রকি।”

৫ দীক্ষা-ত। পিতামাতা জন্মদাতৃত্ব হেতু পূজনীয়, কিন্তু ধর্মাধর্ম- প্রদর্শক গুরু বিশেষভাবে দেবতাবৎ পূজনীয়। “গুরৌ মনুষ্য-বুদ্ধিন্তু মন্ত্রে চাক্ষর-বুদ্ধিক। প্রতিমা শিলাবৃদ্ধিং কুৰ্ব্বাণাে নরকং ব্ৰজেৎ।” গুরুকে সাধারণ মানব জ্ঞান, মন্ত্রকে বর্ণ-সমষ্টি মাত্র মনে করা এবং দেব-প্রতিমাতে শিলাবুদ্ধি করিলে, তাহার নরকে গমন হয়, অর্থাৎ নিম্ন-গতি হয়। “গুরুঃ পিতা গুরুৰ্মাতা গুরুদেবে গুরুর্গতিঃ। শিবরুষ্টে গুরুতা, গুরুকষ্টে ন কশ্চন।” গুরুই পিতা, গুরুই মাতা দেবতা, ও গুরু সংসারসাগর হইতে একমাত্র উদ্ধর্তা। ঐক্রমে, যথা,- “উৎপাদক-ব্ৰহ্মদাত্রাৰ্গরীয়ান্ ব্ৰহ্মদঃ পিতা। তস্মন্ মতে সততং পিতুরপ্যধিকং গুরুং।” জন্মদাতা পিতা এবং ব্রহ্মাদাতা পিতা উভয়ের মধ্যে ব্ৰহ্মদাতা পিতাই শ্রেষ্ঠ অতএব সৰ্ব্বদা পিতা অপেক্ষা গুরুদেবকে অধিক মনে করিবে। “যস্ত বাদ্বিনির্যাতং বর্ণব্রহ্মময়ং বপুঃ । তারচেন্নাত্র সন্দেহে। নরকার্ণবতঃ ধ্রুবং॥” যাহার বক্তারবিন্দ হইতে বর্ণময় ব্ৰহ্মরূপ শরীর বিনির্গত হয়, তাহার কৃপায় সাধক যে-নরকার্ণব হইতে ত্ৰাণ পাইবে, ইহাতে আর সন্দেহ নাই। ।

দীক্ষা-তত্ব।
“গুরুব্বিশ্বেশ্বরাে সাক্ষাৎ তারকং ব্ৰহ্ম নিশ্চিং ।”
ও সাক্ষাৎ বিশ্বেশ্বর এবং ত্রাণকর্তা ব্রহ্মস্বরূপ, ইহা
নিশ্চিত।
গুরুত্ব সম্বন্ধে নানা তন্ত্রে এবং গুরুগীতায় যাহা উক্ত
হইয়াছে, তারা বুঝিতে পারা যায়, হিন্দুশাস্ত্রে গুরুদেবকে
অদ্বৈত ব্ৰহ্মস্বরূপ কল্পনা করিয়া আরাধনার ব্যবস্থা
করিয়াছেন। কেহ কেহ মনে করেন—গুরুকে ঈশ্বরবং
আরাধনা করার প্রমাণগুলি গু কত ব্যবসায়ীগণ কর্তৃক
প্রক্ষিপ্ত। এই প্রক্ষিপ্তবাদী” ক্ষিপ্তগণের জ্বালায় আজ কাল
ধশাস্ত্রের উপর অজ্ঞ লােকের বিশ্বাস হ্রাস পাইতেছে।
তয় এস্থলে তৎসম্বন্ধে কিঞ্চিৎ অলােচনার প্রয়ােজন,
নচেৎ শাস্ত্রানুগামী নিষ্ঠাবান্ হিন্দুর পক্ষে শিব-শক্তির উক্তি
বরূপ বচন প্রমাণই যথেষ্ট।
কপিল, কণাদ, গােতম প্রভৃতি দর্শনকারগণ, ও বৃহস্পতি,
ব্যাস, পরাশর প্রভৃতি ধৰ্ম্মসংহিতা প্রয়ােজকগণ কেহই
অভ্রান্ত পুরুষ নহেন। মাদৃশ ক্ষুদ্রবৃদ্ধিসম্পন্ন কীটামুকীটের
নিকট তাহারা প্রত্যেকেই মহামহিমান্বিত আদর্শ পুরুষ
হইলেও তাঁহাদের স্ব স্ব রচিত গ্রন্থে অপরের মত খণ্ডন
পূৰ্ব্বক আত্মমত-সংস্থাপনের চেষ্টাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
সুতরাং ভ্ৰম-প্রমাদ-পরিশূন্য ব্যক্তি ভিন্ন কাহাকেও গুরুপদে
বরণ করা যায় না। একমাত্র ব্রহ্মাই ভ্ৰম-প্রমাদ-পরিত
অদ্বিতীয় পুরুষ।
“ব্রহ্মবিং ব্রৰৈ ভৰতি”-ইত্যাদি

দীক্ষা-ত। ক্ষতি অনুসারে ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি ব্রহ্মের তুল্য। তন্ত্রশান্তে ব্রহ্মজ্ঞ গুরু হইতে দীক্ষা গ্রহণের বিধান আছে। অতএব শিষ্য ব্ৰহ্মদ পিতা-গুরুদেবকে ঈশ্বর তুল্য জ্ঞান করিয়া দীক্ষা গ্রহণ করিবে। গুরুবাক্য বেদবাক্য তুল্য অভ্রান্ত মনে করিয়া প্রতি মার্গে পরমা তানুসন্ধানে বত হইবে। নরদেহধারী গুরুর দৃশ্যমান তনু চিন্ময় গুরুর যন্ত্রবিশেষ। নচেৎ-ব্রহ্মর সরসীহােদর (সহস্রদল কমলে) নিত্যোৎপন্ন দ্বাদশদল শ্বেতপদ্মে যে গুরুর স্থান কল্পিত হইয়াছে, তাহার সামঞ্জস্য রক্ষিত হয় না। মৃন্ময় আধারে চিন্ময়ের অবস্থান, তদ্রুপ মানুষী তনুতে চিন্ময় গুরুর অধিষ্ঠান। দেহধারী গুরু লােকাত্তরিত হইলেও শিষ্যের পক্ষে চিন্ময় গুরুর অভাব হয় না। অদ্বৈতবাদী গুরুগীতায় আদ্যন্ত কেবল ব্ৰহ্মস্বরূপ গুরুতৰে পরিপূর্ণ; সুতরাং তাহা হইতে কোন একটা বচন উস্কৃত করিয়া গুরুমাহাত্ম প্রকাশ নিষ্প্রয়ােজন। পাঠক গুরুগীত। পাঠ করিলেই—গুরু যে ব্ৰহ্মস্বরূপ, তাহা বুঝিতে পারিবেন । যদি ব্যবসায়ী গুরু কর্তৃক শিষ্যের নিকট উচ্চস্থান-লাভের আশায় তন্ত্রশাস্ত্রে গুরুত্ব প্রক্ষিপ্ত হইত, তবে:“গুরবে বহবঃ সতি শিষ্য- বিপহাকা:। দুলভং সদ্গুরুর্দেবি! শিষ্য- সাপ-হার।” হে দেবি! শিষ্যের ধনাপহারী গুরু অনেক আছে কি শিষ্যের সন্তাপহারী সশু অতি দুলভ। একথা গীতা স্থান পাইত না।

দীক্ষা-তত্ব। বেদাদিশা, যে পরমাত্মার তফনির্ণয়ে অসমর্থ, সে পথের প্রদর্শক ঈশ্বর ভিন্ন অ•কেহই হইতে পারেন না। সেজন্যই ভগবান্ নররূপী গুরুঘটে আবিভূত হইয়া শিষ্যকে ব্রহ্মমন্ত্রে দীক্ষিত করেন। এই নিমিত্ত তন্ত্রশাস্ত্রে গুরু, মন্ত্র ও আরাধ্য-দেবতাকে ঐক্যজ্ঞান করিয়া উপাসনার বিধান রহিয়াছে। যথা, মুণ্ডমালাতন্ত্রে “দেবতা-গুরু-মন্ত্রাণানৈক্যং সংভাবয়ন্ ধিয়া, তদা সিদ্ধং ভবেন্মন্ত্রং প্রকটে হানিরেব চ।” স্বীয় আরাধ্য-দেবতা, মন্ত্র এবং গুরুকে এক ভাবি। উপাসনা কৰিলে মন্ত্র সিদ্ধ হইবে। নচেৎ ভেদজ্ঞানে সিদ্ধি হানি হয়। এগুলে পার্বতী, শঙ্করকে জিজ্ঞাসা করিলেন- হে প্রভাে। গুরু নরাকৃতি, দেবতা ধ্যান-গম্য, মন্ত্র অরুপ, অতএব ইহাদের ভাবনার ঐক্য বিধান কিরূপে হইবে । মহাদেব উত্তর করিলেন-হে দেবি! গুৰু-মুখামুজ হইতে বীজ-মন্ত্রের উৎপত্তি হয় এবং বীজমন্ত্র হইতে দেবতার প্রকাশ হয়; অতএব জন্মগত একজাতিত্বহেতু পরস্পরের ঐক্যভাৰ এবং সাধন একরূপ। বথা- মাের্জাত মশ্চ মাতা তু দেবতা। এতেষাং ভাব-যােগে দু একসাধনমেবহি।” গুরু শব্দের ব্যুৎপত্তি তন্ত্রশালে অনেক প্রকার। এক মাত্ৰ ৰচন এস্থলে উজত কৰি । -(তন্ত্ৰাণবে)

দীক্ষা-তত্ব।
“গু-শশ্চান্ধকার: স্যাৎ ফু-শস্তম্নিরােধক।
অন্ধকার-নিরোধিত্বৎ গুঞ্জরিত্যভিধীয়তে।”
•-শব্দ-অন্ধকার, রু-শব্দ-অন্ধকার নাশক, অন্ধকার
নিরােধ করেন বলিয়া দীক্ষাদাতা গুরু” শবে অভিহিত
হন। অর্থাৎ অজ্ঞান-তমসাচ্ছন্ন ব্যক্তিকে যিনি ব্রহ্মমস্ত্রোপদেশ
হারা অজ্ঞানান্ধকার বিদূরিত করিয়া জ্ঞানালােকে উদ্ভাষিত
করেন, তিনিই গুরুপদবাচ্য।
অতি গােপনীয় আগমার্থ-তৃত্বানুসন্ধান দ্বারা যিনি দেবতা
ও মন্ত্রকে উদ্বোধিত করেন, রুদ্রাদি দেবস্বরূপে তিনি গুরু
বলিয়া অভিহিত হন। এ এবং মােক্ষ-দাতৃত্ব হেতু গুরু
‘ঐনাথ’ পদবাচ্য। গুরু, পরম গুরু, পরাপর গুরু এবং
পরমেষ্টিগুরুকে প্রণাম করিয়া দেবতাগণের পূজা আরম্ভ
করিতে হয়। কিন্তু গুরু, পরম গুরু, পরাপর গুরু, পরমেষ্টি
গুরুর ভেদাভেদ অনেকে জ্ঞাত নহেন, সেই জন্য তৎসম্বন্ধে
তুষশাস্ত্রের মত প্রদর্শিত হইল। যথা -
“মন্ত্রদাতা গুরুত্রোক্তো মন্তু পরমাে গুরু।
পরাপর-গুরুং হি পরমে-গুরুহং।”
(বৃহন্নীল তন্ত্র।)
অর্থ-প্রকৃতি-পুরুষরূপ শিবশক্তির কথােপকথন-চ্ছলে
উক্ত হইয়াছে-
মন্ত্রদাতা গুরুপদবাচ্য, মন্ত্রময় দেবতা পরম গুরু, শক্তি-
ৰূপা পরাপর গুরু, এবং পরমাত্মারূপ আমি পরমেষ্টি গুরু।

দীক্ষা-তত্ব। ইহার তাৎপৰ্যার্থ এই যে—গুরু, পরমগুরু ইত্যাদি সংজ্ঞাভেদ থাকিলেও প্রকৃতি পুরুষাত্মক ঈশ্বর এবং উপাসিত দেবতার সহিত মন্ত্রদাতা গুরুকে অভেদ-জ্ঞানে তঁাহার বাক্য ভ্রম- প্রমাদ-পরিশূন্য মনে করিয়া সাধন-মার্গে অগ্রসর হইবে। এক্ষণ বুঝিতে হইবে, গুরুকে ব্রহ্মের সহিত অভেদ মনে করিয়া গুরুপ্রদর্শিত মার্গে সাধনাদি করিলে সংসার-সমুদ্র হইতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। নচেৎ মুক্তিলাভের অন্য উপায় নাই। দীক্ষাগ্রহণের কাল। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে প্রত্যেক কার্যে স্থান, কাল পাত্র এবং অধিকারী ভেদে ফলের তারতম্য হয়। দীক্ষার কাল সম্বন্ধে-জ্যোতিষ শাস্ত্রে যাহা লিখিত হইয়াছে, তাহা তন্ত্রানুগত। সুতরাং তন্ত্রশাস্ত্রে দীক্ষার কাল সম্বন্ধে যাহা উক্ত হইয়াছে, তাহাই সংক্ষেপে এস্থলে প্রদর্শিত হইবে। কাল-সম্বন্ধে সংস্কৃত বচনগুলি উদ্ধৃত করিলে তাহা অনেক পাঠকের নিকট নীরস বােধ হইতে পারে । পারে। তজ্জন্য ঐ সমস্ত বচনের বঙ্গানুবাদ মাত্র এস্থলে লিখিত হইল । চৈত্রমাসে দীক্ষা গ্রহণ মঙ্গলজনক বৈশাখে রত্নলাভ, জ্যৈষ্ঠে মরণ, আষাঢ়ে বন্ধুনাশ, শ্রবণে পূর্ণায়ু, ভাদ্রে সন্তান বিনষ্ট, আশ্বিনে রত্নসঞ্চয়, কার্তিকে ও অগ্রহায়ণে মন্ত্রসিদ্ধি, পােষে শত্রুপীড়া, মাঘে মেধা-বিবর্ধন, ফাল্গুনে সৰ্ব্বকামনা-

দীক্ষা-তত্ব।
সিদ্ধি।
মতান্তরে-চৈত্রমাসে দীক্ষা গ্রহণ করিলে দুঃখ
হয়। চৈত্রমাস গােল-বিষয়ে নিষিদ্ধ নহে, অন্যত্র নিষিদ্ধ।
মলমাসে দীক্ষাগ্রহণ করিবে না। দীক্ষা বিষয়ে সৌরমাস
উক্ত, চান্দ্রমাস উক্ত নহে।
রবিবার, সােমবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবারে
দীক্ষা প্রশস্ত ; শনি এবং মঙ্গলবারে দীক্ষাগ্রহণ করিলে যশঃ
ও আয়ুহানি হয়।
তিথি-নিয়ম।
দ্বিতীয়, তৃতীয়া, পঞ্চমী, সপ্তমী, দশমী, একাদশী ও
দ্বাদশী তিথিতে দীক্ষাগ্রহণ করিলে শুভফল হয়। প্রতিপদ,
চতুর্থী, ষষ্ঠী, অষ্টমী, নবমী, ত্রয়ােদশী, চতুর্দশী এবং অমাবস্যা
তিথিতে দীক্ষাগ্রহণে ধৰ্ম্মবৃদ্ধি হইয়া থাকে। সুতরাং দীক্ষা-
সম্বন্ধে পূর্ণিমাতিথি বিশেষ প্রশস্ত।
নক্ষত্র।
ভরণী নক্ষত্রে দীক্ষাগ্রহণে মরণ, কৃত্তিকাতে দুঃখ,
আাতে বন্ধুনাশ, অশ্লেষায় মৃত্যু, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রে পুত্রহানি,
শ্রবণাতে দুঃখ এবং ধনিষ্ঠাতে দারিদ্র হয়। এতদ্ভিন্ন নক্ষত্র
দীক্ষাগ্রহণে প্রশস্ত।
যােগ।
শুভযােগ, সিদ্ধযােগ, আয়ুষ্মন্-যােগ, ধ্রুবযোগ,
প্রীতিযােগ, সৌভাগ্যযােগ, বৃদ্ধিযােগ ও হর্ষণযােগ দীক্ষা
গ্রহণে প্রশস্ত। সর্বপ্রকার মন্ত্রগ্রহণেই এই সকল যােগ
প্রশস্ত। এতদ্ভিন্ন যােগগুলি অপ্রশস্ত।

দীক্ষা-তত্ব। করণ-নির্ণয়। বব, বালব, তৈতিল ও বণিজকরণ -দীক্ষাগ্রহণে প্রশস্ত। ইহা সৰ্ব্ব-তন্ত্রেই উক্ত হইয়াছে। লগ্ন-নির্ণয়। বৃষ, সিংহ, কন্যা, ধনু ও মীনলগ্নে তারা-চ-শুদ্ধ দিনে দীক্ষাগ্রহণ কর্তব্য। বিষ্ণুমন্ত্রে স্থিলগ্ন—অর্থাৎ বৃষ, সিংহ, বৃশ্চিক ও কুম্ভলগ্ন প্রশস্ত। শিবমন্ত্র-গ্রহণে চরলগ্ন-অর্থাৎ মেষ, কর্কট, তুলা ও মকরলগ্ন প্রশস্ত। শক্তিমন্ত্র-গ্রহণে দ্বাত্মক লগ্ন—অর্থাৎ মিথুন, কন্যা, ধনু ও মীন এই সকল লগ্ন প্রশস্ত। অগস্ত্য-সংহিতায় লিখিত হইয়াছে যে,—ত্রি ষষ্ঠ ও একাদশ স্থাৱে পাপগ্রহ ও লগ্ন, চতুর্থ, সপ্তম, দশম, নবম এবং পঞ্চম স্থানে শুভগ্রহ থাকিলে দীক্ষা গ্রহণে শুভফল হইবে। দীক্ষাগ্রহণে বক্ৰহ অনিষ্টকারী, অতএব তাহা পরিত্যাগ করিবে। পক্ষ-নির্ণয়। শুক্লপক্ষে দীক্ষাপ্রশস্ত, কৃষ্ণপক্ষেও পঞ্চমী পর্যন্ত দীক্ষা- গ্রহণ করিতে পারে। অগস্ত্য-সংহিতায় শুক্ল ও কৃষ্ণ উভয় পক্ষেই দীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা আছে। কানােভরে লিখিত আছে যে, যে ব্যক্তি ঐশ্বৰ্য্যকামী, তাহার পক্ষে শুক্লপক্ষ প্রশস্ত এবং মুমুক্ষুর পক্ষে কৃষ্ণপক্ষে দীক্ষাগ্রহণ প্রশস্ত। দীক্ষাবিষয়ে বিহিত কালাদি নির্ণয়। উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ন ও মহাবিষুব-সংক্রান্তিতে এবং চন্দ্র ও সূৰ্য্য গ্রহণে এsক্ষা গ্রহণ প্রশস্ত। ঐ সমস্ত দিনে বার, দীক্ষা-তত্ব। তিথি, নক্ষত্রাদির শুদ্ধাশুদ্ধ বিচার করিবে না। রবি-সংক্রান্তি, যুগাদ্যা-মন্বন্তর এবং" মহাপূজা (দুর্গোৎসবাদি) দিনে তিথি- নক্ষত্রাদির বিচার অনাবশ্যক। দীক্ষাগ্রহণ কাৰ্যে সূৰ্য- গ্রহণের তুল্যকাল পৃথিবীতে আর নাই। শক্তি দীক্ষা গ্রহণে সূর্যগ্রহণ ও বিষ্ণুমন্ত্র গ্রহণে চন্দ্রগ্রহণ প্রশস্ত নহে। কিন্তু ইহা গােপাল বিষয় ও বিদ্যা বিষয়ের ইতর বলিয়া বুঝিবে। সােমবারে অমাবস্যা তিথি ও মঙ্গলবারে চতুর্দশী তিথি হইলে এবং সপ্তমী তিথি রবিবারে হইলে দীক্ষাদি কাৰ্য্যে তাহা শত সূৰ্য-পর্বের তুল্য ফলপ্রদ হয়। মঙ্গলবারে চতুর্থ, বৃহস্পতিবারে অষ্টমী তিথি হইলে, তাহা পর্বের সমতুল্য হয়, অতএব তাহাতে দীক্ষা গ্রহণ প্রশস্ত। দুর্গোৎসবের সময় বিশেষতঃ মহাষ্টমী, অশােকাষ্টমী এবং রামনবমীতে দীক্ষাগ্রহণ প্রশস্ত। কৃপাপূৰ্ব্বক গুরু যদি শিষ্যকে স্বয়ং আহ্বান করিয়া দীক্ষা প্রদান করেন, তবে বার, তিথি, নক্ষত্রাদি বিচার করিবে না। গ্রহণ এবং মহাতীর্থেও কালাকালের বিচার নাই। দীক্ষাস্থান-নির্ণয়। গাে-গৃহে, দেবালয়ে, কাননে, পুণ্যক্ষেত্রে, নদীতীরে, আমলকী ও বিহুমূলে এবং পৰ্বত-শিখরে দীক্ষাগ্রহণ করিবে। গঙ্গাতটে দীক্ষাগ্রহণ করিলে কোটাগুণ ফললাভ হয়।

দীক্ষা-তত্ব। দীক্ষায় নিষিদ্ধ স্থান। গয়াতীর্থে, ভাস্করক্ষেত্রে, বিরজে, চন্দ্ৰ-পৰ্বত চট্টলে, মতঙ্গে এবং কন্যাশ্রমে দীক্ষাগ্রহণ নিষিদ্ধ। কালাশুদ্ধি সময়ে { অকালে) দীক্ষাগ্রহণ করিবে না। দীক্ষা। দীক্ষার পূর্বদিনে বা দীক্ষা-দিনে শিষ্য জ্ঞাতাজ্ঞাত পাপ- ক্ষয়াৰ্থ সঙ্কল্প করিয়া সহস্র গায়ত্রী মন্ত্র জপরূপ প্রায়শ্চিত্ত করিবে। তৎপর পুণ্যাহ বানাদি করিয়া ধৰ্মার্থ-কাম-মােক্ষলাভের জন্য যথাবিহিত দীক্ষাগ্রহণ কার্যে বরণ করিবে। তৎপরে গুরুদেব দীক্ষ-পদ্ধত্যুক্ত কমে যথাবিহিত ঘটস্থাপনাদি পূৰ্ব্বক অভীষ্ট দেবতার মহতী পূজা করিবেন। তৎপর দেয় মন্ত্রের দশসংস্কার করিয়া মন্ত্র-চৈতন্য করিয়া লইতে হইবে। দশসংস্কার বিধান তন্ত্রশাস্ত্রে যেরূপ নির্দিষ্ট আছে, তাহার সার-মৰ্ম্ম এস্থলে প্রদর্শিত হইল। ( গৌতমীয়ে) যথা “না, জীবনং পশ্চাত্তাড়নং বােধনন্তথা অভিষেকেন বিমলীকৰণাপ্যায়নে পুনঃ তর্পণং দীপনং গুপ্তি শৈতা মন্ত্র-সংস্ক্রিয়াঃ।” জনন, জীবন, তাড়ন, বােধন, অভিষেক, বিমলীকরণ, আপ্যায়ন, তর্পণ, দীপন এবং গােপন—এই দৃশটা সংস্কারকে “দশ-সংস্কার” বলে।

দীক্ষা-তত্ব। স্বর্ণ বা তাম্রপাত্রে মাতৃকাবর্ণ (অকারাদি হকারান্ত) কুঙ্কুম, চন্দন বা ভস্ম দ্বারা (বিষয়ভেদে) লিপি করিয়া তাহা হইতে দেয়মন্ত্রের বর্ণগুলি উদ্ধৃত করিয়া পাত্ৰান্তরে লিপি করিবে। ইহার নাম জনন। (১ম) উদ্ধত মন্ত্রবর্ণগুলির প্রত্যেক বর্ণকে প্রণবান্তরিত করিয়া এক এক বর্ণ শতবার ** করিবে। ইহার নাম জীবন। (২) মন্ত্রের বর্ণ সকল পৃথক করিয়া চনেদক দ্বারা কল্লোক্ত বীজমন্ত্রে প্রত্যেক মন্ত্রবর্ণ তাড়ন করিবে। ইহাকে তাড়ন কহে। (৩য়) মন্ত্রবর্ণ সকল পৃথকরূপে লিখিয়া রক্তকরবী পুষ্প দ্বারা প্রত্যেক বর্ণকে দশ দশবার কল্লোক্ত বীজমন্ত্রে হনন করিবে; ইহার নাম বােধন। (৪র্থ) মন্ত্রবর্ণ সকল লিখিয়া, বর্ণ সংখ্যক রক্তকরবী পুষ্প দ্বারা যথাবিহিত বীজমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করিয়া তন্মন্ত্রোক্ত বিধানে অশ্বখ-পত্র দ্বারা মন্ত্রবর্ণ সংখ্যায় অভিষিঋন করিবে। ইহাই অভিষেক। (৫ম) সুষুম্নর মূল ও মধ্যভাগে দেয়মন্ত্র চিন্তা করিয়া জ্যেতির্ম- দ্বারা মলত্রয় দগ্ধ করিবে। ইহা বিমলীকরণ। (৬ষ্ঠ) মন্ত্রবর্ণ সকলকে স্বর্ণদ্বারা কুশজলে অথবা পুষ্পেদকে জ্যোতির্মন্ত্রে আপ্যায়ন করিবে। ইহা আপ্যায়ন। (৭ম)

দীক্ষা-তত্ত্ব।
পূৰ্ব্ব-কথিত জ্যোতিৰ্ম্মন্ত্রে দেয়মন্ত্রের বর্ণ সংখ্যায় জপদ্বারা
তর্পণ করিবে। ইহা তর্পণ! (৮ম),
তারা, মায়া ও রমা মন্ত্রে দেয়মন্ত্রের দীপন করিবে। ইহা
দীপন। (৯ম)
তৎপরে দেৱমন্ত্র জপ করিয়া গােপন করিবে। কদাচ
হা প্রকাশ করিবে না। ইহা গােপন। (১০ম)
এইরূপে দশ-সংস্কার-সংস্কৃত মন্ত্র গ্রহণ করিলে, সাধক
অচিরে অভীষ্ট ফল লাভ করে।
তৎপরে কল্লোক্ত বিধানে হােমকৰ্ম্ম সমাপন করিয়া
ঘৃতান্বিত তিলদ্বারা দীক্ষা-পদ্ধত্যুক্ত ক্রমে আট আট বার
আহুতি প্রদান পূব্বক শিষ্যের শরীরের অধ্ব-বিশশাধন
করিবে। অর্থাৎ পাদতুল হইতে মস্তক পর্যন্ত “শােধয়ামি
কলাব্বানং” ইত্যাদি ক্রমে তত্ত্বাব্বান, লুবনান, বর্ণাধান,
পাদধ্বনি ও মন্ত্রীধ্বান শশাধন করিবে। এই অধ্ব-বিশােধনে
পদতল হইতে মস্তক পৰ্যন্ত, পুনঃ মস্তক হইতে পদত
পর্যন্ত অনুলােম বিলােম শােধন করিতে হইবে।
তৎপরে গুরু, শিষ্য-শরীরে ভূতশুদ্ধি মাতৃকান্যাল, কলান্যাস
করিয়া শিষ্য-হস্তে জল প্রদান পূর্বক বলিবেন, “অমুক মন্ত্র
তে অহং দদানি” শিষ্য “দ” বলিবে। গুরু বলিবেন, “আবয়েঃ-
ল্যফলদো ভবতু”। তৎপরে শিষ্য গুরুর চরণ ধারণ করিয়া
পশ্চিমাভিমুখে উপবেশন করিবে। গুরু পূৰ্বমুখ হইয়া
শাের দক্ষিণ কর্ণে ঋষি-চ্ছন্দ-দেবতা এবং দেয়মন্ত্র তিন বার
।

१२ দীক্ষা-তত্ব। ও বাম কর্ণে একবার শ্রবণ করাইবেন। মন্ত্র-প্রদানকালে শিষ্যের মস্তক বস্ত্র দ্বারা আবৃত করিতে হইবে। শিষ্য গুরুর চরণ ধারণ পূৰ্ব্বক ভূপতিত হইয়া বলিবে, “ত্বৎপ্ৰসাদাদহং দেব কৃতকৃত্যোহস্মি সৰ্ব্বতঃ। মায়ামৃত্যু-মহাপাশাৎ বিমুক্তোহস্মি শিবােহস্মি চ।” হে দেব, আমি তােমার কৃপায় সর্বপ্রকারে কৃতকৃত এবং মায়ামৃত্যু স্বরূপ মহাপাশ হইতে বিমুক্ত হইয়া মঙ্গল- ময় হইলাম। গুরু তৎকালে শিষ্যকে হস্তে ধারণ পূৰ্ব্বক উত্থাপিত করিয়া বলিবেন, “উত্তিষ্ট বৎস! মুক্তোহসি সম্যগাচারবান্ ভবান, কীৰ্ত্তি-শ্ৰ-কান্তি-পুত্ৰায়ু বলাররাগ্যং সদাহস্তু তে।” হে বৎস! উখিত হও তুমি মুক্ত হইয়া সম্যক্ আচারবান হও এবং কীর্তি, লক্ষ্মী, পুত্র, আয়ু, বল, আরােগ্য এবং কান্তি তােমাতে সদাকাল বিদ্যমান্ থাকুক। মন্ত্র ঠিক হইল কি না, তাহা পরীক্ষা করিবার জন্য শিষ্য, গুরু-সমীপে তন্ত্র জপ করিবে। তৎপর দক্ষিণাদি কাৰ্য শেষ করিয়া, দীমিত ব্রাহ্মণ ভােজন করাইবে।

অন্তর্যজন ও বাহপূজার্ম প্রভেদ কি ? হইয়াছে। “উত্তমম ব্রহ্মসম্ভাববা ধ্যানভাবস্তু মধ্যম অধমে জপভাবস্তু বাহপূজাধমাধমঃ।” ব্ৰহ্ম সদ্ভাব সৰ্বোত্তম, ধ্যানভাব মধ্যম জপভাৱ অধম এবং বাহপূজা অধুমাধম। যে অন্তর্যজন ( মানস-পূজা) দ্বারা ব্ৰহ্মজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সেই মানস পূজা যে শ্রেষ্ঠ তাহাতে আর সন্দেহ নাই। তৎপরে ধ্যানভাব, ঈশ্বরে মনােবৃত্তির প্রবাহ উৎপাদন করার নাম ধ্যান,,সেই মননকে মধ্যম বলা জপভাব অর্থাৎ গুরূপদিষ্ট মন্ত্রের পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ সেই জপভাবকে অধম বলিয়া সিদ্ধান্ত করা হইয়াছে। বাহপূজা, গন্ধ পুষ্প, দূৰ্বাক্ষতাদি দ্বারা সাকার রূপের অর্চনা। সেই বাহপূজা অধমাধম বলিয়া পরিকীর্তিত হইয়াছে। এক্ষণে বুঝিতে হইতেছে যে, উত্তমভাব পরিত্যাগ করিয়া “অধমাধম” বাপূজার প্রয়ােজন কি? ইহার উত্তর ই- অধম বা অধমাধম শব্দে নিকৃষ্ট নহে। কোন অট্টালিকার উপরে উঠতে হইলে যেমন নিম্নতম নিম্নতর হইতে ক্রমােচ্চ সােপানে আরােহণ করিতে হয় তদ্রুপ সাধনের সােপানও নিম্নতম হইতে ক্রমােচ্চ। যেমন, অ, আ, ক, খ, শিক্ষা না ৭৪ দীক্ষা-তত্ব। করিলে কাৰ্যালঙ্কার দর্শন বেদাদি অধ্যয়ন করা যায় না, তদ্রুপ বাহপূজার দ্বারা নিৰ্ম্মলচিত্ত না হইলে ধ্যান বা মানস- পৃজার অধিকার জন্মে না। সুতরাং গুরূপদিষ্ট প্রণালীতে বাহ্যপূজা দ্বারা ক্রমে জ্ঞান সােপানে আরােহণ করিতে হইবে। বাহপূজাতে ধ্যান এবং মানস-পূজার বিধান আছে। কিন্তু সে ধ্যান ও মানস পূজার বিধি, আমরা পড়া-পাখীর মত উচ্চারণ করিয়া থাকি মাত্র ; আবার অনেকে ধ্যানের পর মানস-পূজার জন্য একবার চক্ষু মুদ্রিত করিতে হয় বলিয়া চক্ষু মুদ্রিত করেন, মানস-পূজার বিধান অজ্ঞাত থাকা হেতু তাহা পাঠও করেন না। যাহা হউক, আমি এস্থলে অন্তজনের বিধান উদ্ধৃত করিয়া দেখাইব, সে কি অপূর্ব ব্যাপার~-বাহপূজার বিধানানুসারে মূল দেবতার ধ্যান করিয়া নিমীলিত নেত্রে মানসােপচারে অর্চনা করিবে যথা— জ “হৃৎপদ্মমাসনং দদ্যাৎ সহস্রারচুতামৃতঃ। পাদ্যং চরণয়ােদ্দদ্যাৎ মনস্তৃর্ঘ্য নিবেদয়েৎ। তেনামৃতে নাচমূনং স্নানীয়মপি কল্পয়েৎ। আকাশত বসনং গন্ধস্তু গন্ধতত্ত্বকং # চিত্তং প্রকল্পয়েৎ পুষ্পং ধূপং প্রাণান্ প্রকল্পয়েৎ। তেজস্তন্তু দীপাৰ্থে নৈবেদ্যঞ্চ সুধাঘুধিং। অনাহতধ্বনিং ঘণ্টাং বায়ুতত্বঞ্চ চামরং। নৃত্যমিয়িকৰ্ম্মাণি চাঞ্চল্যং মনসস্তথা। পুষ্পং নানাবিধং দদ্যাত্মনােভাবসিদ্ধয়ে।

নীক্ষা-তত্ত্ব।
অমায়মনহষ্কার-মরাগমমদথা ।
অমােহকমদঞ্চ অন্বেষাক্ষোভকে তলা।
অমাৎসর্য্যমলােভঞ্চদশপুষ্প প্রকীর্তিতং ।
অহিংসা পরমং পুষ্পং পুষ্পমিলিয়নিগ্রহঃ।
দয়া ক্ষমা জ্ঞানপুষ্পং পঞ্চ পুষ্পং ততঃ পরং।
ইতি পঞ্চদশপুষ্পে ভাবৰূপেঃ প্রপূজয়েৎ।
কামক্রোধো বিঘ্নকতো বলিং দত্বা জপঞ্চরেৎ
মালা বর্ণময়ী প্ৰােক্তা কুণ্ডলী সূত্রধতি।
সবিন্দুৎ মন্ত্রমুচ্চাৰ্য্য মূলমন্ত্রং সমুচ্চরেৎ
অকাৱাদি লকারান্তঃ অনুলােম ইতিস্মত
পুনর্লকারমারভ্য শ্রীকান্তং মনুং জপেৎ।
সমর্প জপমেতেন সাষ্টাঙ্গং প্রণমেজিয়া।
ইত্যন্তজং কৃত্বা বহিঃ পূজাং সমাচরেৎ।”
স্বীয় হৃদয়পদ্ম আসন স্বরূপে প্রদান করিয়া শির
স্থিত সহস্রদল-কমল-বিগুলিত অমৃতধারায় স্বেষ্টদেবতার
{ পরমেশ্বরীর) চরণযুগল বিধৌত করিবে এবং মনকে *
অর্ঘ্যরূপ কল্পনা করিয়া নিবেদন করিবে।
সহস্রাচ্যুত অমৃত দ্বারা আচমনীয় এবং স্নানীয় প্রদান
* সঙ্কল্প-বিকরাত্মিকান্তঃকরণ-বৃত্তিৰ্মন।

দীক্ষা-তত্ব। করিবে। আকাশতত্ত্বকে বসন এবং ম্যাত্মক গন্ধতত্ত্বকে গন্ধ কল্পনা করিয়া নিবেদন করিবে। যিনি বিশ্বরূপিণী বিশ্বাত্মা তাঁহাকে আকাশতত্ত্ব ভিন্ন আর কোন পদার্থে আবৰিত করিতে পারে ? সুতরাং আকাশই তাহার বসন- রূপে কল্পিত হইয়াছে। চিত্তকে * পুষ্পরূপ কল্পনা করিয়া পাদপদ্মে অৰ্পণ করিবে। পাদপদ্মে চিত্তার্পণ করাই প্রকৃত পুস্পাঞ্জলি। প্রাণাদি পঞ্চবায়ুকে ধূপরূপে কল্পনা করিয়া তেজস্তত্ত্বকে দীপ এবং অনাহতধ্বনিকে ঘণ্টা কল্পনা করিয়া আরতি করিবে। এস্থলে মহাত্মা নানকের মহাপূজার বিষয় মনে পড়িল, “গগনরূপ থালা, চন্দ্র সূৰ্য্য তারকা-দীপাবলী, অনাহহুবাদন্ত ভেরী, কেয়ুসে আরতি তল্ হোয়ে ভবতারণ ? যে, যে ধৰ্ম্মেই থাকুন না কেন মহাত্মাদিগের মূলতত্ত্ব এক। বায়ুতত্ত্বকে চামর কল্পনা করিয়া ব্যজন করিবে। ইন্দ্রিয়- কৰ্ম্ম ও মনের চাঞ্চল্যকে নৃত্যরূপ কল্পনা করিয়া আত্মশুদ্ধির নিমিত্ত নানা ভাবরূপ পুষ্প দ্বারা অর্চনা করিবে। সেই পুষ্পগুলি মায়া, অহঙ্কার, আসক্তি, মত্ততা, মােহ, দম্ভ, দ্বেষ, ক্ষোভ, কুটিলতা, লােভাদি-সাধন-পরিপন্থী এই দশবিধ অন্তরায় পরিত্যাগরূপ দশটী পুষ্প দ্বারা অর্চনা করিবে। আমরা ইহার একটি পুষ্পও কি সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি * নিশ্চয়াত্মিকান্তঃকরণ-বৃত্তিশ্চিত্ত।

দীক্ষা-তত্ব।
৭৭
যে, আমরা অন্তর্যজনে অধিকার লাভ করিব ? ইহার পর
আবার পাঁচটি পরমপুষ্প দ্বারা, পঞ্চপুস্পাঞ্জলি প্রদান করিতে
হইবে। যথা,—অহিংসারূপ পরমপুষ্প, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহরূপ
পরমপুষ্প, দয়া, ক্ষমা এবং জ্ঞানরূপ পরমপুষ্প, ইহার একটা
পুষ্পও ত আমাদের নাই, মা! তবে কি দিয়া তােমার
পূজা করিব? সুতরাং অধমাধম হইলেও বাহপূজা ভিন্ন
আমাদের গত্যন্তর নাই। তৎপরে বিঘ্নকারী কামরূপ ছাগ
এবং ক্রোধরূপ মহিষকে বলিদান করিয়া জপ করিবে।
অকারাদি লকারান্ত বর্ণময়ী কুণ্ডলী-সূত্র থিত পঞ্চাশৎ মালা
অনুলােম বিলােমে এবং বর্গান্ত অষ্টবর্গের সহিত মূলমন্ত্র
যােগ করিয়ঃ মানসে অষ্টোত্তর শত জপ করিবে। এই ত
অন্তর্যজনের বিধান। আমরা কেহ কেহ এই বিধানটি, চক্ষু
মুদ্রিত করিয়া পাঠ করিয়া থাকি মাত্র । তবে কি আমরা
মানস-পূজা করিব না? না, তাহা নহে। “ঘষিতে ঘষিতে
প্রস্তরও ক্ষয় হয়” আমরাও প্রতিদিন পাঠ করিতে করিতে
অভ্যাস বশত: কিছু না কিছু লাভ করিতে পাৰিব।

'বাহ-পূজা।
বাহপূজা গন্ধপুষ্পদি স্থূল পদার্থ দ্বারা সম্পন্ন হয় বটে, কিন্তু
তাহার সূক্ষ্মতত্ত্ব আধ্যাত্মিক। তৎসম্বন্ধে বিস্তৃত আলােচনা
আমি ‘বাহপূজা” শীর্ষক প্রবন্ধে “সাহিত্য-সংবাদ” পত্রিকায়
প্রকাশ করিয়াছিলাম। তাহার পুনরুল্লেখ এস্থলে না
করিয়া সংক্ষেপে তাহার দুই একটি কথার সার মন্ম
প্রকাশ করিব।
মানস-পূজার পর পুনর্ধান করিয়া “দীপাদ্দীপান্তরমিব’
একটি দীপ হইতে অন্য একটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করিয়া
স্থানান্তরে স্থাপন করার ন্যায় স্বহৃদয় হইতে পরমাত্মা-স্বরূপ
ইষ্টদেবকে পুষ্পের সহিত পূজাযন্ত্রে স্থাপন করিবে। ইহার
ভাব এই ;-হৃদয় হইতে ইষ্টদেবকে পূজাযন্ত্রে সংস্থাপন
করিলেও হৃদয়গার শূন্য হয় না, হৃদয়ে পরমাত্মারূপ ইষ্টদেব
যেমন ছিলেন, তেমনি রহিলেন। একটি প্রদীপ হইতে
শত সহস্র প্রদীপ জ্বলিত হইলেও যেমন মূল প্রদীপের
কোনরূপ অপচয় হয় না, অথচ প্রজ্জ্বলিত দীপাবলীর দাহিকা
শক্তি বা ঔজ্জ্বল্যাদি গুণাংশেরও কোন তারতম্য ঘটে না,
তদ্রুপ একমাত্র পরমেশ্বর প্রয়ােজনানুসারে বহুরূপ পরিগ্রহ
করিলেও প্রত্যেক রূপের ঐশ্বৰ্যগুণাদির কোন তারতম্য

দীক্ষা-তত্ত্ব।
হয় না। সেইজন্য এস্থলে দীপাদ্দীপান্তরের উল্লেখ করা
হইয়াছে।
শুম্ভাসুরের সহিত যুদ্ধের সময় দেবী স্বদেহ হইতে
ব্রহ্মাণী বৈষ্ণবী প্রভৃতি বহু শক্তিমূৰ্ত্তি রচনা করিয়া যুদ্ধ
করিতেছিলেন, তৎকালে শুম্ভ দৈত্য বলিয়াছিল, হে দুর্গে।
তুমি অন্যের বল আশ্রয় করিয়া যুদ্ধ করিতেছ, ইহাতে
তােমার গর্বের বিষয় কি? তখন দেবী , হাসিয়া
বলিলেন, “একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা, পশ্যৈ-
তান্ দুষ্ট! ময্যেব বিশন্ত্যো মদ্বিভূতয়ঃ” রে দুষ্ট! এজগতে
আমি ভিন্ন দ্বিতীয় কেহ নাই, দেহ্ আমার বিভূতি-রূপ-সমূহ
পুনঃ আমাতে প্রবিষ্ট হইল। তখন বহুরূপে বিরাজিতা দেবী
একামাত্র যুদ্ধস্থলে রহিলেন।
(মার্কণ্ডেয় চণ্ডী)
বাহপূজাতে “দীপাদ্দীপান্তরমিব” দৃষ্টান্ত দ্বারা এই
আধ্যাত্মিক সূক্ষ্মতত্ব পরিস্ফুট হইয়াছে।
বাহপূজায় নানাবিধ সাকার রূপে ধ্যানেও আধ্যাত্মিক
তত্ত্বের অভাব নাই। আমি “কালীর ধ্যানের আধ্যাত্মিক
ব্যাখ্যা” শীর্ষক প্রবন্ধে “আরতি” পত্রিকায় তৎসম্বন্ধে বিস্তৃত
আলােচনা করিয়াছিলাম, সুতরাং এস্থলে তাহার পুনরুল্লেখ
করিতে বিরত রহিলাম।
ধ্যানের পর পীঠশক্তির পূজা। প্রত্যেক সাকার রূপের
পীঠশক্তির পার্থক্য থাকিলেও প্রধানতঃ কয়েকটি পীঠশক্তির

৮৫ দীক্ষা-তৰ। তমঃ পূজা সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়। যথা,-সত্ত্ব রজঃ আত্মা, অন্তরাত্মা, পরমাত্মা, জ্ঞানাত্মা, ধৰ্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বৰ্য্য, অধৰ্ম্ম অজ্ঞান, অবৈরাগ্য অনৈশ্বৰ্য্য। তন্মধ্যে ধৰ্ম্ম জ্ঞান বৈরাগ্য ঐশ্বৰ্য্য এই চারিটি পীঠশক্তি ভগবানের সিংহাসনের অদূরে মােচ্চভাবে অবস্থিত, এবং অধৰ্ম্ম অজ্ঞান অবৈরাগ্য অনৈশ্বৰ্য্য এই চারিটি পীঠশক্তি ক্রমে নিম্নতর সােপানে অবস্থিত। ইহার আধ্যাত্মিকভাব এই,-ধৰ্ম্মর সাধনায় জ্ঞান উৎপন্ন হয়, জ্ঞানের সাধনা দ্বারা বৈরাগ্যের আবির্ভাব, বৈরাগ্যের সাধনায় ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ হয়। অর্থাৎ অন্তর্মুখীন সাধনা দ্বারা সাধকের উৰ্দ্ধগতি, এবং অধর্মের সাধনায় অজ্ঞানতার উৎপত্তি, অজ্ঞানের প্রভাবে অবৈরাগ্য, অবৈরাগ্য দ্বারা অনৈশ্বৰ্য্য (সংসারাসক্ত ও জীবভাব) প্রাপ্তি ; অর্থাৎ বহির্মুখীন ক্রিয়া দ্বারা জীবের অধােগতি লাভ হয়। নিরাকারবাদী বর্তমান সমালােচকগণের ধারণা সাকারােপাসকগণ “পুতুল-পূজক” এবং অনন্ত অসীম সৰ্বব্যাপী ঈশ্বরের ক্ষুদ্রমূৰ্ত্তি গড়িয়া তাঁহার অনন্তত্ব ভাবের অবমাননা করে। কিন্তু এ ধারণা ভ্রমাত্মক। যদি সাকারােপাসকগণ “পুতুল-পূজক” হইত তবে ঘটে পটে মৃন্ময় মূর্তিতে চিন্ময়ের আবাহন প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রয়ােজন হইত না। যন্ত্রে বা মূর্তিতে আবাহন প্রাণপ্রতিষ্ঠা বাহপূজার প্রধান অঙ্গ। কেহ কেহ হয়’ত বলিবেন, সৰ্বব্যাপী ঈশ্বরের আবার আবাহন বিসর্জন কেন ? ইহার উত্তর এই,--ঈশ্বর সর্বব্যাপী হইলেও ক্রিয়া ভিন্ন তাহার প্রকাশ হয় না। তাই যদি হইত, তবে মৃতদেহে সর্বব্যাপী পরমাত্মার অস্তিত্ব সত্ত্বেও চৈতন্যাদি প্রাণের চিহ্ন প্রকাশ পায় না কেন? কাষ্ঠে অগ্নির অস্তিত্ব থাকিলেও কাষ্ঠদগ্ধ হয় না কেন? আবার ঘর্ষণাদি ক্রিয়াদ্বারা অগ্নির বিকাশ এবং ঐ অগ্নিতে কাষ্ঠখণ্ড ভস্মীভূত হয়। তদ্রুপ বুঝিতে হইবে, আবাহন প্রাণপ্রতিষ্ঠা ভিন্ন জড় মূর্তিতে দেবত্ব প্রকাশ পায় না। সাকারােপাসকগণ যে কেবল ক্ষুদ্র মূৰ্ত্তি গড়িয়া ঈশ্বরের অনন্তত্বের অবমাননা করে, তাহা নহে। সাকারবাদীগণ পুরাণাদি শাস্ত্রে বহু বহুবার উচ্চকণ্ঠে বলিয়াছে “নিত্বেব সা জগন্মৰ্ত্তিন্তয়া সৰ্ব্বমিদং ততং।” তিনি নিত্যা জগন্মুৰ্ত্তি, অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডই তাহার প্রকট (সাকার ) রূপ। তাঁহার দ্বারাই স্থাবর জঙ্গমাত্মক বিশ্ব পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে। শ্রীমদ্ভগবদগীতাতেও অর্জুন ভগবানের সাকার বিশ্বরূপ প্রদর্শন করিয়া বলিয়াছিলেন,-“নান্তং ন মধ্যং ন পুন- স্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর! বিশ্বরূপ।” এই দৃশ্যমান অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ডই তাঁহার বিরাট সাকাররূপ, এবং বিশ্বস্থ চৈতন্যময় পরমাত্মাই তাঁহার নিরাকার ভাব। “দেবানাং কাৰ্যসিদ্ধ্যর্থবির্ভবতি সা যদা। উৎপন্নেতি তদা লােকে সা নিত্যাপ্যভিধীয়তে। হইলেও দেবতাদিগের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত নানারূপে আবিভূতা হন, তখন তাঁহাকে উৎপন্না বলা হয়। তিনি নিত্যবস্তু

৮২
দীক্ষা-তত্ত্ব।
গীতাতেও ভগবান্ বলিয়াছেন,যখন যখন ধৰ্ম্মের গ্লানি
ও অধৰ্ম্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি দুষ্টদিগের বিনাশ
এবং সাধুদিগের পরিত্রাণের জন্য দেহ রচনা করিয়া থাকি ।
এক্ষণ বুঝিতে হইবে, আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটে
সে বিরাট বিশ্বরূপের ধারণা অসম্ভব ; সেইজন্য তাঁহার
উৎপন্নরূপের মধ্যে যেরূপ যাহার প্রিয়, সে সেই রূপের
প্রতিরূপ, গড়িয়া তাহাতে আবাহন ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিয়া
চিন্ময়ের অর্চনা করে। ইহাই কি পুতুল-পূজা? কেহ
কেহ পিতা মাতার প্রতিকৃতি চিত্র করিয়া ভক্তিপূৰ্ব্বক
অর্চনা করে, তাহাতে কি পিতা মাতা অসন্তুষ্ট হন ?
প্রতিচিত্র তদনুরূপ না হইলেও ভাবগ্রাহী ভগবান্ তাহাতে
অসন্তুষ্ট হন না, ভগবান্ কেবল হৃদগত ভক্তি-ভাব-টুকু
গ্রহণ করিয়া থাকেন। বিশ্বকোষ অভিধানে একজন
ব্রাহ্মধর্ম প্রচারকের মত দেখিয়াছি যে,—ক্ষুদ্র সাকার
বিগ্রহ কি অনন্ত বিশ্বের বীজ বা স্রষ্টা হইতে পারে ?
ইহার উত্তর এই,—“অতি ক্ষুদ্র বটবৃক্ষের বীজে যদি বৃহৎ
বটবৃক্ষের অস্তিত্ব থাকিতে পারে, যা অতি ক্ষুদ্র শুক্র
বিন্দুতে অনন্ত মানবজগতের সত্ত্বা বিদ্যমান থাকিতে পারে,
তবে পরিমিত বিশ্ববীজে অনন্ত বিশ্বের অস্তিত্ব অসম্ভব হইবে
কেন? বরং পরমানুভূত সূক্ষ্মবীজে তজ্জাতীয় অনন্তত্বের
সত্ত্বা লুক্কায়িত থাকাই স্বাভাবিক, এবং অভিব্যক্ত নিয়মে
ক্রমবিকাশ প্রাকৃতিক নিয়ম। সুতরাং অঙ্গুষ্ঠ পরিমিত

দীক্ষা-তত্ত্ব। সাকার চিন্ময় বিগ্রহের অর্চনা ( মৃন্ময় মূর্তিতে ) করা পুতুল- পূজা নহে। গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপাদি বাহ্যবস্তুসমূহ বাহপূজার উপকরণ হইলেও তান্ত্রিক উপাসকগণ তন্মধ্যে সূক্ষ্ম পঞ্চ- তত্ত্বের কল্পনা করিয়া থাকেন। নচেৎ বাহপূজার আরতিতে ধূপ, দীপ, ঘণ্টা, জল, বস্ত্র এবং চামরের যে ব্যবস্থা আছে, তৎপরিবর্তে মিষ্টান্নাদি দ্বারাও আরতির বিধান্স হইতে পারিত, কিন্তু সে বিধান নাই। সুতরাং বুঝিতে হইবে, ইর সূক্ষ্ম ভাব পঞ্চতত্ত্বাত্মক। ধূপ, গন্ধ-গুণাত্মক ও ভূমি বা ক্ষিতিতত্ত্ব, জল অপূতত্ত্ব, দীপ তেজস্তত্ত্ব, চামর বায়ুতত্ত্ব, যথা,—“বায়ুত্বঞ্চ চামরং।” বস্তু এবং ঘণ্টা আকাশতত্ত্ব। যথা,-“আকাশতত্ত্বং বসনং।” শব্দগুণাত্মক ঘণ্টা, বাদনেও শব্দগুণাত্মক আকাশতত্ত্ব প্রকাশ পাইতেছে। পুষ্প প্রদান সময়ে পঞ্চপুস্পাঞ্জলি, আরতির পর পঞ্চ- পুস্পাঞ্জলি, পূজা-অন্তে পঞ্চ পুস্পাঞ্জলি প্রদানের বিধান আছে। এতদ্বারা অন্তর্যজনােক্ত অমাদি দশপুপ এবং অহিংসাদি পঞ্চ পরম পুষ্পের ভাব প্রকাশ পাইতেছে। বাহপূজান্তে যে আত্মসমর্পণের বিধান আছে, শ্রীমৎ ভগবদ্গীতােক্ত ফল-কামনা-পরিশূন্য নিষ্কাম কৰ্ম্মের সহিত তাহার অভিন্ন-সম্বন্ধ। বৈদিক সন্ধ্যার আচমন মন্ত্রেও সেই নিষ্কাম কৰ্ম্মের ভাব পরিস্ফুট।

দীক্ষা-তত্ব । আত্মসমর্পণ মন্ত্রের অর্থ এই—“আমি ইহার পূর্বে জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থায়, প্রাণ, বুদ্ধি এবং দেহধর্মের অধিকারে হস্ত দ্বারা, পদ দ্বারা, উদর দ্বারা এবং শিশ্নাদি কৰ্ম্মে- ন্দ্রিয় দ্বারা, যাহা করিয়াছি, যাহা বলিয়াছি, যাহা মনের দ্বারা চিন্তা করিয়াছি, তৎসমস্তই ব্রহ্মে অর্পিত হউক, আমার আত্মাকে ও আমার সম্বন্ধীয় যাহা কিছু আছে তৎ সমস্ত সম্যকরূপে ইষ্টদেবের পাদপদ্মে সমর্পণ করিলাম।” পাঠকগণ! এক্ষণ বুঝুন, বাহপূজা কেবল বাহাড়ম্বর পূর্ণ বা আমায় মিষ্টান্নাদি প্রসাদ ভক্ষণের জন্য নহে। যে বাহ- পূজান্তে এরূপ নিষ্কাম আত্মােৎসর্গের বিধান, সে পূজা অধমাধম হইলেও সংসারাশ্রমী সাধকগণের পক্ষে তাহা অতীব বাঞ্ছনীয়।

তান্ত্রিক ত্রিসন্ধ্যা। বৈদিকসন্ধ্যা ও তান্ত্রিকসন্ধ্যা দীক্ষিত ব্রাহ্মণের পক্ষে যথানুক্রমে করিবার বিধান। ব্রাহ্মণেতর জাতি দীক্ষিত হইলে : কেবল তান্ত্রিক সন্ধ্যার উপাসনাই করিয়া থাকেন। প্রকৃত পক্ষে বৈদিক ও তান্ত্রিক উভয় প্রকার সন্ধ্যার অভিপ্রায় এক। বৈদিকসন্ধ্যা, মন্ত্র বহুল, তান্ত্রিকসন্ধ্যা সংক্ষেপ। উভয় সন্ধ্যাতেই আচমন, মার্জন, তীর্থবাহন, অঘমর্ষণ, সূৰ্যার্ঘ্য প্রদান, তর্পণ, ধ্যান, গায়ত্রী-জপ প্রাণায়ামাদি বিহিত হইয়াছে। কেবল ইষ্টমন্ত্র-জপ তান্ত্রিক সন্ধ্যাতে অধিক দৃষ্ট হয়। বৈদিক সন্ধ্যার আচমন, অন্যান্য বৈদিক ক্রিয়ার প্রারম্ভে যে মন্ত্রে হইয়া থাকে, সেই মন্ত্রেই অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তান্ত্রিক ক্রিয়া সমস্তই তত্ত্বাত্মক। তান্ত্রিক সন্ধ্যার আচমনেও আত্মতত্ত্ব, বিদ্যাতত্ত্ব এবং শিবতত্ত্বের উদ্বোধন বিহিত। তৎপর তীর্থবাহন হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে সূৰ্য্যমণ্ডলে সমস্ত দেব দেবী এবং জৈবপরমাণুর অবস্থান এবং সূৰ্যতেজ ব্ৰহ্ম- তেজ বলিয়াই বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্রে উপাসিত হয়। * গায়ত্রী-মন্ত্রের ব্যাখ্যাতে সূৰ্যতেজ ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ শিব, শক্তি প্রভৃতির উল্লেখ থাকিলেও ব্ৰহ্মতেজোরূপ সূয্যের তেজকেই বুঝায়।

দীক্ষা-তত্ব।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাতে শ্রীভগবান্ বলিয়াছেন,
“যদাদিত্য-গতং তেজঃ
তত্তেজা বিদ্ধি মামকং”
আদিত্য মণ্ডলান্তৰ্গত যে তেজ, তাহা---আমার তেজ
বলিয়া জানিবে।
ব্ৰহ্মস্বরূপ নারায়ণও সূর্যমণ্ডলান্তৰ্বৰ্ত্তী,—যথা—
“ধেয়ঃ সদা সবিতৃ-মণ্ডল-মধ্যবর্তী নারায়ণঃ”
সুতরাং গঙ্গাদি তীর্থ নদ নদীর জল-প্রবাহ, ভারতভূমির
নানা প্রদেশে প্রবাহিত হইতেছে বটে, কিন্তু তীর্থাধিষ্ঠাত্রী-
দেবীর অবস্থান সূৰ্য্যমণ্ডলে, সেইজন্য “সূর্যমণ্ডলাত্তীৰ্থমাবাহ”
বলিয়া সূৰ্য্যমণ্ডল হইতে তীর্থবাহন করিতে হয়।
তৎপরে—অঘমর্ষণ, বামহস্তে জল লইয়া দক্ষিণহস্ত
দ্বারা আচ্ছাদনপূর্বক--কয়েকটি বীজ মন্ত্র উচ্চারণ করিতে
হয়, এবং গলিত জলধারা মূলমন্ত্রে সপ্তবার স্বীয় মস্তকে প্রদান
করিতে হয়, ইহাই তান্ত্রিক মার্জন। তৎপর অবশিষ্ট
জল “ইড়য়াকৃষ্য” বামনাসা-দ্বারা আকর্ষণ করিয়া-“পিঙ্গলয়া
বিবেচ্য দক্ষিণ-নাসা, দ্বারা রেচন করিবে। চিন্তা-
যােগে দেহস্থ কৃষ্ণবর্ণ পাপপুরুষকে একটি বীজমন্ত্র
উচ্চারণপূৰ্ব্বক পুরঃকল্পিত বজুশীলায় নিক্ষেপ করিবে; অর্থাৎ
দেহস্থ পাপকে ধ্বংস করিবে। বৈদিক সন্ধ্যার অঘমর্ষণের
প্রণালী অন্যরূপ হইলেও উভয় সন্ধ্যোপাসনার অঘমর্ষণের
উদ্দেশ্য এক, অর্থাৎ দেহস্থ পাপরাশি ধ্বংস করা।
;

দীক্ষা-তত্ব। ৮৭ তৎপরে উভয় সন্ধ্যাতেই গায়ত্রী মন্ত্রে তিনবার জল প্রদানের বিধান। বৈদিক সন্ধ্যায় । সৰ্বশেষে সূৰ্যার্ঘ্য। দান করিতে হয়, তান্ত্রিক সন্ধ্যায় গায়ত্রী মন্ত্রে জল প্রদানের পরেই সূৰ্য্যের বীজমন্ত্রে সূৰ্যার্ঘ্য-দানের ব্যবস্থা। তৎপরে সূর্যমণ্ডলস্থ স্বেষ্টদেব বা দেবীকে অর্ঘ্য প্রদান করিতে হয় । তৎপরে গায়ত্রী-ধ্যান। প্রাতেঃ, মধ্যাহ্নে ও সায়াহ্নে বৈদিক সন্ধ্যার ধ্যানের ন্যায় ব্রহ্মাণী, বৈষ্ণবী এবং রুদ্রাণী রূপার ধ্যান করিতে হয়, অর্থাৎ সত্ত্ব রজঃ তমঃ ত্রিগুণান্বিতা সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের কারণস্বরূপ পরাৎপরা পরমেশ্বরীর উপাসনাই ত্রিবিধ ধ্যানে পরিস্ফুট। ধ্যানের পর গায়ত্রী জপ, ইহাও উভয় সন্ধ্যাতেই একরূপ। বৈদিক সন্ধ্যাতে গায়ত্রী জপ দ্বারা সূৰ্যতেজ বা ব্ৰহ্মতেজের উপাসনা ; আব তান্ত্রিক গায়ত্রী দ্বারা স্বেষ্টদেব বা দেবীর উপাসনা। “প্রচোদয়াৎ” এবং “ধীমহি” বৈদিক তান্ত্রিক উভয় গায়ত্রীর প্রাণ। গায়ত্রী-তন্ত্রে গায়ত্রীর প্রত্যেক বর্ণের স্বরূপ এবং ব্যাখ্যাদি যেরূপ বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে, তাহা এস্থলে প্রকাশ করিতে হইলে পুস্তিকার কলেবর অতি বৃহৎ হইবে আশঙ্কায়—সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিলাম। গায়ত্রী জপান্তে প্রাণায়াম করাঙ্গদ্যাস পূৰ্ব্বক মূলমন্ত্র জপ করিবে। ইহাই তান্ত্রিক সন্ধ্যায় অধিক। বাহপূজা, তান্ত্রিকসন্ধ্যা অথবা কাম্যজপাদির পূর্বে প্রত্যেকবার প্রাণায়াম বিধেয়। বাহপূজাদি অধমাধম দীক্ষা-তত্ব। বলিয়া যতই হেয় জ্ঞান কেন করা হয় না, কিন্তু এই বাহ- পূজার বিধানে যে সমস্ত আধ্যাত্মিক তত্ত্ব অন্তর্নিহিত আছে, তাহা নিবিষ্টচিত্তে চিন্তা করিয়া দেখিলে, বাহপূজা বা সন্ধ্যা তত অসার মনে হইবে না। সন্ধ্যা এবং বাহ পূজাদি-বিহিত প্রাণায়াম যােগ-সাধনের প্রধান অঙ্গ বা দ্বারস্বরূপ। যােগ- মার্গে প্রবেশ করিতে প্রাণায়াম-সাধন ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। প্রাণায়াম দ্বারা দেহ যােগ-সাধনের উপযােগী হয় ; অধিক কি কেবল প্রাণায়াম দ্বারাই সাধক সিদ্ধি এবং মুক্তি লাভ করিতে সমর্থ হইয়া থাকে। প্রাণায়ামের বিধান যােগশাস্ত্রে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। তন্ত্রশাস্ত্রেও প্রাণায়ামের বিধান পরিস্ফুট। আমি এহলে তন্ত্রোক্ত প্রাণায়ামের বিষয় সংক্ষেপে উল্লেখ করিয়া তান্ত্রিক সন্ধ্যার উপসংহার করিব। “গমনাগমনং বায়াের প্রাণ ধারণ তথা। প্রাণায়াম ইতি প্রােক্তো ঘােগশাস্ত্র-বিশারদৈ”।” প্রাণবায়ুর গমনাগমন এবং ধারণ (কুম্ভক)-কে যােগশাস্ত্র পারদর্শীগণ “প্রাণায়াম” শব্দে অভিহিত করিয়াছেন। অপিচ- “প্রাণবায়ুরিতি খ্যাত আয়াম স্তম্নিরােধক। প্রাণায়াম’ ইতি প্রােক্তোযােগিনাং যােগমুত্তমং।” (গৌতমীয়তন্ত্র।) বায়ুই প্রাণ শব্দে খ্যাত, সেই বায়ুনিরােধের প্রণালী- “প্রাণায়াম” বলিয়া অভিহিত, সেই প্রাণায়াম’ই যােগীদিগের উৎকৃষ্টতর যােগ।. বায়ুনিরােধের প্রণালী যথা-

“সোয়েন্দগ-যু: বিদান মাযাশকে ।
দ্বাবিংশনায়াপা চতুঃসষ্ট্য তু ধবয়ে।”
( গৌতমীয়-তন্ত্র।)
জ্ঞানীগণ দক্ষিণ নাসা' পথে যােঙশমালা দ্বারা বায়ু
চন করিবে, দ্বাত্রিংশং মাত্রা দ্বারা বায়ু, পূরণ করিবে
এ চাষ্টিমাত্রা দ্বারা প্রাণ বায়ুকে ধারণ (কুন্তক ।
করবে। এই পূরণ কুমুক বেঁঢ়করূপ প্রাণায়াম দ্বারা ব্ৰহ্ম
ক্ষাৎকার লাভ করা যায়। বখা,---
প্রাণায়ামং পবং যোগঃ প্রাণায়ামাং পরং ধনং।
পানামা পরং জ্ঞান য়ামাং পরং পঃ।
{ণরামাং পরং তং গণায়গাং পরং পদ।
নাস্তি নাস্তি পুনর্নাস্তি কথিত তব সুরত।
বৎসরা ভ্যাস-যােগেন ব্রহ্ম সাক্ষাদূভবেদ ধ্রুব।”
(শৌতমীয়-তঙ্গ।)
হে সুব্রত।
তােমাকে নিয়ে বলিতেছি, প্রাণায়াম
হইতে উৎকৃষ্ট যােগ উৎকৃষ্ট জ্ঞান, উত্তম তপস্যা, উত্তম
ধন, উত্তম পদ এব উৎকৃষ্টতম তত্ত্ব, আর নাই, আর নাই,
'আর নাই!!! বৎসর কাল বিধিপূৰ্ব্বক প্রাণায়াম অভ্যাস
দ্বারা সাধক নিশ্চয় ব্রহ্ম সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া থাকেন।
যে প্রণালীতে প্রাণবায়ু পূরণ, কুম্ভক ও রেচন করিতে হয়,
তাহা যােগশাস্ত্রে এবং তন্ত্রশাস্ত্রে বিশদ ভাবে উক্ত হইয়াছে,
কিন্তু বিনা গুরূপদেশে যােণাঙ্গ প্রাণায়ামাদি কোন কাৰ্য্যেরই
অনুষ্ঠান করিবে না। গ্রন্থ দষ্টে এ সকল গৃঢ় কাৰ্যানুষ্ঠানে
বতী হইলে সুফলের পরিবর্তে কুল প্রাপ্ত হইতে হয়
।

অনেকে ঐরূপ কার্যে ব্রতী হইয়া উৎকট রােণাক্রাশু, এমন কি মৃত্যুকে পর্যন্ত আলিঙ্গন করিয়াছে। প্রাণায়াম দুই প্রকার, সগর্ভ এবং নিগর্ভ। সগঞ্জ প্রাণায়াম মন্ত্র সংখ্যা জপ দ্বারা ও নিগর্ভ প্রাণায়াম মাত্র। সংখ্যা স্থির দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। “প্রাণায়ামে দ্বিধা প্রােক্তঃ সগৰ্ভচ নিগর্ভকঃ। স মন্ত্র-জাপেন নিগর্ভা মাত্ৰয়া ভবে।” গৌতমীয়-তন্ত্র। প্রাণায়াম দ্বারা কামজ কৰ্ম্মজ সর্বপ্রকার পাপ বিনষ্ট দেহস্থ কফ, পিত্ত ও বায়ুর সমতা হইয়া শরীর যােগােপযােগী হইয়া থাকে। রঘুনন্দন ভট্টাচার্য প্রণীত একাদশী তত্ত্বে-উপবাসানুকল্প- প্রসঙ্গে উক্ত হইয়াছে যে,-দ্বাদশবার প্রাণায়াম করিলে উপবাস সিদ্ধ হয়, সুতরাং বুঝিতে হইবে যাহারা ধর্মের জন্য উপবাস না করিয়া স্বাস্থ্যলাভের জন্য উপবাস করেন, প্রাণায়াম দ্বারা দেহস্থ বক্ষয় জন্য তাহারাও যথাবিধি দ্বাদশ বার প্রাণায়াম করিলে উপবাসের ফললাভ করিতে পারেন। যথা- জপেম্বা প্রাণসংযমান্, কুৰ্যাদ্বাদশসংখ্যকান্ যথাশক্তি ব্ৰতে নর ৷” প্রাণায়ামের পর মূলমন্ত্র জপ করিয়া তীর্থ প্রণাম করিবে। শসম্পূর্ণ ন ব্রাহ্মণ-রক্ষা-সভার আনুকূল্যে প্রকাশিত শ্রাতত্ত্ব।” ইতে কি অভিনব বস্তু আছে ? এবং কেনই বা ইহা হিন্দু মাত্রেরই অবশ্যপাঠ্য বলিয়া নির্ণীত হইয়াছে ? ইহার “উত্তর বিজ্ঞাপ” স্বরূপ দেশপূজ্য শাস্ত্রধ্যাপক ব্রাহ্মণ- পণ্ডিত মণ্ডলীর শতাধিক পত্র মধ্য হইতে কয়েকখানি পত্রের কিয়দংশ নিয়ে উদ্ধৃত হইল। মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত যাদবেশ্বর তর্করত্ন মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “এই দুর্দিনে এইরূপ পুস্তকেরই প্রচার একান্ত আবশ্যক। যিনি সর্বোচ্চ ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া , আবাল্য ব্রাহ্মণণাচিত সদাচার অক্ষুন্ন রাখিয়া ব্রাহ্মণ-জাতির আদর্শ হইয়াছেন, সেই মহাপুরুষ এই গ্রন্থের প্রণয়ন-কর্তা শ্ৰীযুক্ত রাজা শশিশেখরেশ্বরের বাঙ্গালা ভাষার উপরেও যথেষ্ট প্রভুত্ব আছে। পুস্তকের কোন স্থানেই অস্পষ্ট দোষ হয় নাই, তিনি জলের মত সমস্ত তত্ব বুঝাইয়াছেন। শুনিয়াছি তিনি সম্প্রতি অসুস্থ, ভগবানের নিকট সর্বান্তঃকরণে তাহার আরোগ্য ও দীর্ঘজীবন প্রার্থনা করি।”

বিজ্ঞাপন। মহামহোপাধ্যায় শ্ৰীযুক্ত কামাখ্যানাথ তর্কবাগীশ মাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “শ্রাদ্ধতত্ত্ব পাঠ করিয়া প্রীত হইলাম। এই তত্ত্বে শাস্ত্রীয়- প্রমাণ-যুক্তি ও লৌকিকযুক্তি উদ্ভাবিত হইয়াছে। যাহাদিগের আস্তিক্য বুদ্ধি আছে তাহারা শাস্ত্রীয়-প্রমাণ-যুক্তির বশবর্তী হইবেন, যাহাদিগের আস্তিক্য বুদ্ধি কম তাহারাও লৌকিক যুক্তি পরিহার করিতে পারিবেন না। এই পুস্তকখানি সময়ােপযােগী হইয়াছে।” মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত গুরুচরণতর্ক-দর্শনতীর্থ মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “শ্রদ্ধতত্ত্ব নামক সঙ্কলিত পুস্তকখানি পাঠ করিয়াছি। ইহা হইতে সঙ্কলয়িতার অধ্যবসায়ের বিশেষ পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই পুস্তকখানি বর্তমান সময়ের বিশেষ উপযােগী হইয়াছে। ইহাতে সমাজের অনেক উপকার হইতে পারে।” মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত সীতারাম ন্যায়াচাৰ্য শিরােমণি মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “ধৰ্ম্ম বিষয়ে এইরূপ দুই দশ খানা গ্রন্থ বঙ্গভাষায় বিরচিত হইলে, এইরূপ হিন্দুধৰ্ম্মের মহা-প্রলয়ের দিনেও একটু উপকার হয় বলিয়া আমার মনে হয়।” মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ তর্কভূষণ মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “শ্রদ্ধতত্ত্ব’ পাঠ করিয়া বড়ই প্রীতিলাভ করিলাম। পুস্তক- খানির প্রতিপংক্তিতেই রাজাকাহাদুরের সনাতন ধর্মের প্রতি পৰ্যাপ্ত শ্রদ্ধা প্রকটিত হইয়াছে। গ্রন্থকার শ্রাদ্ধ সম্বন্ধে অনেক জানিবার ও ৫ৰিবার বিষয়ের অালােচনা করিয়া- ছেন, এজন্য তিনি সনাতনধৰ্ম্ম-বিশ্বাসী প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙ্গালীর ধন্যবাদাহ।” মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত কৈলাসচন্দ্র কাব্য-ব্যাকরণ- পুরাণ-সাঙ্খতীর্থ মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধৃত “বৰ্তমান সময়ে এতাদৃশ গ্রন্থের বাহুল্য এবং বহুল প্রচার হওয়া একান্ত কাঞ্চনীয়। দুর্বিদ্যা-বিদগ্ধ সন্দিগ্ধচেতাদিগের শাস্বার্থে দৃঢ়প্রত্যয় জন্মাইবার জন্য লেখক এই গ্রন্থে নানা প্রদেশীয় প্রচলিত প্রথাগুলির উল্লেখ করতঃ বহুদর্শিতার পরিচয় দিয়াছেন।” পরিব্রাজকাচাৰ্য পরমহংস শ্রীমং কেশবানন্দ স্বামীজীর পত্র হইতে উদ্ধৃত মায়ান বিনষানলি গারনত্তাসিথ মুন। पठित्वा चेतत् ग्रन्थकतीरं राजाबाहादुरोपाख्य श्रीम- গ্নিময় অনী ময়া হলঃঃ মানবিন্ধা ঘর। प्रागाविर्भूय श्रीमच्छङ्कराचार्याणा बाविसवात् परिचात भार्य- অমল, অলিন খাই মাল-ঠিলাল ন জাভা-যা- पूर्णस्यास्य पार्यसमाजस्य परित्राणाय तस्येव महात्मनः पुन- विर्भवाशा दुराशेय, अता पर्यामदमेव प्रार्थयामहे श्रीम. चारायणा-ममी থান- ৰাহ্মঘল নন মাঝনা অব যুমাৰ্মিাৱাৰ্ম্মি মিয়া ৪মিনি অনিয়ম ঘীনাল অমিয়া বা ভিবিন-সুন থাৱাঘ-সিকান-ঘমায় ঘরোযথ ঘনঘাময়।”

বিজ্ঞাপন। ব্রাহ্মণ-রক্ষা-সভার উদ্যোগে ও আনুকূল্যে সঙ্কলিত-শ্রাদ্ধ- তত্ত্ব, পরকালতত্ত্ব, পুরাণতত্ত্ব, ত্রিসন্ধ্যাতত্ত্ব, দীক্ষাতত্ত্ব, আকি- তত্ত্ব, শ্রীক্ষেত্ৰতত্ব,প্রায়শ্চিত্তত, উদ্বাহতত্ত্ব, বৈদিক-সংস্কারতত্ত্ব, আচার-তত্ত্ব প্রভৃতি গ্রন্থাবলীর বিস্তারিত বিবরণ জানিতে চাহিলে, ঐ ঐ পুস্তকের বিষয়-সূচী-সংযুক্ত বিজ্ঞাপনী দ্রষ্টব্য । দীক্ষাতত্ত্বের মুল • ডাকমাসুল • ; রেজেষ্টারী ডাকে লইলে • অতিরিক্ত। ১০ খানা দীক্ষাতত্ত্ব একযোগে লইতাে ব্যয় সহ মুলা ৫ টাকা। ব্রাহ্মণ-রক্ষা-সভার সহিত সহযােগিতা সম্বন্ধযুক্ত যে সকল ধৰ্ম্মসভা, সংস্কৃত চতুষ্পাঠী এবং পাঠাগার বিনামূল্যে উক্ত সভার পুস্তকাদি পাইয়া থাকেন, তাহারা এক আনা ডাকমালেই “দীক্ষা-তত্ব” পাইবেন। এতৎসম্বন্ধীয় কোন বিষয়ে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকিলে, নাম ঠিকানাযুক্ত একখানি পােষ্টেল খাম বা রিপ্লাইকার্ড সহ কৃপাপূর্বক নিম্নলিখিত স্থানে পত্র লিখিবেন। শ্ৰীশ্ৰীশচন্দ্ৰ শৰ্মা | আর তত্ত্ব-প্রকাশ প্রিন্টিং ওয়ার্কস লিমিটে। ১নং পঞ্চক্রোশী রােড়, নাগােয়া, কাশী । কাৰ্যাধ্যক্ষ।

১। দীক্ষাতত্ত্ব (১ম খণ্ড) পড়িয়া আমার মন্তব্য নিম্নে
লিখিয়া পাঠাইলাম।
২। যে সংখ্যা “ত্রিশূল” পত্রে আমর জিজ্ঞাস্তের উত্তর
প্রকাশ হইবে, ঐ সংখ্যা ত্রিশূল সহ দীক্ষাতত্ত্ব পুস্তকের
২য় খণ্ড, নিম্নলিখিত ঠিকানায় আমার নামে ভি, পি,
রেজেষ্টারী ডাকে প্রেরণ করিলে বাধিত হইব। (বিনা-
মূল্যে ব্রাহ্মণ-রক্ষা-সভার পুস্তক পাইবার যাহারা
অধিকারী, তাহারা “ভি, পি, রেজেষ্টারী” শব্দ কাটিয়া
দিবেন এবং কেবল ডাকমাশুল পাঠাইবেন।)
........
(নাম)
ঠিকানা:
৫৮।

শ্ৰীযুক্ত ব্রাহ্মণ-ক্ষা সভার সম্পাদক।
পুস্তক-প্রকাশ বিভাগ।
১ নং পঞ্চক্রোশী বােড়।
নাগােয়া, কাশী ।
BENARES. U. P.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dikkha-tattwa Vol. 1

Author
Thakur, Durgadas
Title
Dikkha-tattwa Vol. 1
File name
Dikkha-tattwa Vol. 1
Text
OCR done
Citation
1922
Published
2010/02/20
Publisher
Sri Sri Shschandra Sharmma, Kashidham
Language
Sanskrit
Pages
144
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Epic
Keywords
Thakur, Durgadas
DLI number
511030
Barcode
4990010018216.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Wma8Hl02vZR
Download PDF

Dikkha-tattwa Vol. 1