Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shraddhiki
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দ্দিকী
অর্থাৎ
খাদ্ধবাসরে বিবৃত কতিপয় সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত
শ্রী'কামিনী রায় বি, এ প্রণীত।
প্রকাশক
সুধীরকুমার সেন বি, এ।
কলিকা।
{
ইরাজী ১৯১৩।
No text on this page.
ভূমিকা = গত কয়েক বৎসরের মধ্যে লেখিকার জীবনের উপর দিয়া বার বার মৃত্যু ও শশাকের ঝটিকা প্লাবন বহিয়া গিয়াছে। শ্রদ্ধবাসরে শােকা মুছিতে মুছিতে বন্ধুগণের সহিত সম্মিলিত হইয়া, পরলােকগত প্রিয়জনের গুণ স্মরণ ও বর্ণনের ভার একাধিকবার এই অযােগ্য জনের উপর ন্যস্ত হইয়াছে। এই কৰ্তব্য করিতে গিয়া শশাকের বেদনা কিঞ্চিৎ লাঘব হইয়াছে, মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য্যের স্মৃতি এক শান্ত প্রীতির ধারায় সন্তপ্ত চিত্ত সিক্ত করিয়াছে। সর্ব প্রথমে স্বামীর অনুরােধ ক্রমে প্রিয়তমা কন্যা সরযূর জীবন, দুরস্থ ও নিঃসম্পর্কিত ব্যক্তির ন্যায়, লিখিয়া দিই। উহা সঞ্জীবনী পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। অতঃপর স্নেহাস্পদ ভ্রাতা যতীন্দ্র মােহনের এবং তৎপর পূজ্যপাদ পিতৃদেবের এবং, অবশেষে, জীবন পথের সহযাত্রী যাহাকে পাইয়াছিলাম, তাহারও শ্রাদ্ধকৃত্য সম্পাদন করিতে হইল। পিতৃদেবের জীবনের সমুদয় ঘটনা সংগ্রহ করিয়া একখানি বিস্তৃত জীবন চরিত লিখিবার অভিপ্রায় ছিল বলিয়া, বন্ধুগণের অনুরােধ সত্ত্বেও শ্রাদ্ধ বাসরে পঠিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ তৎকালে পুস্তিকাকারে মুদ্রিত ও বন্ধুগণের মধ্যে বিতরিত হয় নাই। কিন্তু প্রায় পাঁচ বৎসর কাল অতীত হইয়া গেল, অথচ অভীষ্ট সিদ্ধির দিকে একটুও অগ্রসর হইতে পারি নাই। এদিকে তাঁহার প্রতি বিশেষ ভক্তিমান্ কোন কোন পুরাতন বন্ধু ও বর্তমান কালের অনেক যুবক তাহার জীবনের কথা জানিবার জন্য আমার নিকট উপস্থিত হইতেছেন। তাঁহাদের [ y• ] জন্য এবং বিশেষ ভাবে আমার পিতৃপরিবারের ও আমার নিজের সন্তানগণের জন্য, ঐ সংক্ষিপ্ত বিবরণই মুদ্রিত করিতে প্রবৃত্ত হই। উহা যন্ত্রস্থ হইবার পরে ক্রমে অন্যান্য জীবনগুলিও দিতে ইচ্ছা হইল। মনে হইল, সন্তান গণের অভিভাবকরূপে তাহাদের জন্য তাহাদের পৈত্রিক সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করিতেছি ; তাহাদের অপর যে বহুমূল্য উত্তরা- ধিকার রহিয়াছে, তাহাও রক্ষা করা আমার একান্ত কর্তব্য। এই জন্য আমার পিতা ও ভ্রাতার সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্তের সঙ্গে তাহাদের পিতা ও ভগিনীর জীবনকথা গ্রথিত করিয়া দিলাম । বলা বাহুল্য যে, আমার স্বামীর ঘটনাবহুল জীবনের সম্পূর্ণতর কাহিনী, তাহার আকস্মিক মৃত্যুর পরে, চতুর্দশ দিবসের মধ্যে লিখিয়া উঠা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই বেদনাবিমূঢ় অবস্থায় কোন প্রকারে জীবনের স্থূল কথা গুলি লিপিবদ্ধ হইয়া শ্রাদ্ধবাসরে উপাসনান্তে পাঠ করিবার জন্য পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের হস্তে অর্পিত হয়, তিনিই উহা পাঠ করেন। উহার আরম্ভােগ আমার ভগিনী সংকলন করেন। পিতৃদেবের চরিতের প্রথমাংশটুকুও তাহার রচনা। সম্প্রতি বিবরণগুলি পুরাতন পত্রিকাদি হইতে উদ্ধরণ কালে আবশ্যক বােধে দুই এক স্থলে সামান্য পরিবর্তন ও পরিবর্জন সাধিত হইল। গ্রথিত চরিত্রগুলি দুই ভিন্ন পরিবারের হইলেও মৎসূত্রে ঘনিষ্ট সম্বন্ধে সম্বদ্ধ। এই দুই পরিবারের কথা আমার সন্তানগণের অতি আপন ও অতি প্রিয়। আশা করি তাহাদের ভবিষ্যদ গৃহে ও ভবিষ্যদ বংশেও ইহা চিরদিন আদৃত হইবে। কিন্তু এই পুস্তিকা, এই নির্দিষ্ট পরিধির বাহিরে গিয়া, যে সর্বাংশে সাধারণের প্রীতিপ্রদ হইবে, তাহা আশা করিতে পারি না। কোনও সময়ে হয়তাে কাহারও কাছে এই ক্ষুদ্র বিবরণগুলি বড়ই অপূর্ণ মনে হইবে ; দোষের কথার উল্লেখ নাই বলিয়া, এগুলি অর্ধ সত্য [ • ] বলিয়া সন্দেহ জন্মিবে। তখন মনে রাখিতে হইবে, যে, এগুলি লােকান্তরিত প্রিয়জনের উদ্দেশে শ্রদ্ধার অঞ্জলিমাত্র। যাহারা আমাদের কাছে আর কিছুরই ভিখারী নহেন, যাহারা আমাদের সেবা ও পরিচর্যার অতীত স্থানে পৌঁহুছিয়াছেন, তাহাদিগকে হৃদয়ের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা দিবার জন্যই আমরা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করি। সেদিন কাহারও জীবনের দোষ, ত্রুটি বা অপরাধের হিসাব লইবার দিন নহে। মানুষ যখন অপূর্ণ, তখন তাহার জীবনে ত্রুটি থাকিবেই থাকিবে; কিন্তু সেগুলি সাধারণের নিকট বা বংশধরগণের নিকট বিবৃত করিয়া কোন ফল নাই। যাহা সুন্দর, যাহা মহৎ তাহারই জ্ঞানে ও চিন্তনে আনন্দ। আরও একটি কথা ।(মৃত্যু যখন প্রিয়জনকে কাড়িয়া লয়, তখনই, জীবন হইতে কতখানি প্রেম, কতখানি আনন্দ হারাইলাম, একবার ভাল করিয়া বুঝিতে পারি। চরিত্রের যে মহত্ত্ব, যে সৌন্দৰ্য, হৃদয়ের যে প্রীতি ও সহানুভূতি, আত্মত্যাগের কঠোরতার সহিত আত্মবিস্মৃতির যে অপূৰ্ব্ব মধুরতা, অতি নৈকট্যবশতঃ দেখিয়াও দেখি নাই, নিত্য ব্যবহৃত বস্তুর ন্যায় যাহা বড়ই অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল, মৃত্যুর বিদ্যুতালােকে শােকার ভিতর দিয়া, তাহা আমাদের সম্মুখে উজ্জল হইয়া প্রকাশ পায়। এই জন্য বিচ্ছেদও শশাকের মধ্যেই আমরা প্রিয়জনের প্রকৃত মূর্তি দেখিয়া, তাঁহাদিগকে ভাল করিয়া চিনিয়া লই। জীবনে তাহা- দিগকে পদে পদে অবিচার করিয়া, মৃত্যুর পর অনুতাপ, অশ্রুপাত ও গুণ স্মরণ দ্বারা কৃত অপরাধের কিঞ্চিৎ প্রায়শ্চিত্ত করিতে চেষ্টা করি। জীবনের আদর্শে জীবন গড়িয়া উঠে। উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্ব- পুরুষগণের পুণ্য চরিত্র ভবিষ্যদ্বংশের নিজস্ব সম্পত্তি হউক, তাহাদের মহত্ত্বের ভিত্তির উপর ইহাদের সুন্দর সুদৃঢ় জীবন-সৌধ উখিত হউক, এবং কেবল ইহাদের মধ্যে নহে, কেবল দুই একটি পরিবারে নহে, বহু পরিবারে, বহু দূরে, বৃহত্তর ক্ষেত্রে এই সকল চরিত্রের
[ ৩ ]
সৌন্দৰ্য্য ও কল্যাণকর প্রভাব বিস্তীর্ণ হউক, সিদ্ধিদাতা পরমেশ্বরের নিকট
এই প্রার্থনা।
হাজারিবাগ,
১লা বৈশাখ ১৩১৯
১০ই এপ্রিল ১৯১২।
কামিনী রায়
শ্রাদ্ধিকী। , স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন । ইংরাজী ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে জানুয়ারীর শেষভাগে, বাঙ্গালা ১২৫১ সনের মাঘী সপ্তমীর দিনে*বাখরগঞ্জ জেলার বাসণ্ডা গ্রামে, বৈদ্যকুলে, এক শাক্ত পরিবারে আমার পিতৃদেব চণ্ডীচরণ সেনের জন্ম হয়। তাঁহার পিতার নাম নিমচাদ সেন ও তাহার মাতার নাম গৌরী ছিল। তাঁহার পিতামহ রামরতন সেন ধনশালী ছিলেন না। ভাবী বংশধরগণের জন্য তিনি ধন সম্পত্তি রাখিয়া যান নাই । কিন্তু তাহার চরিত্রগত ধৰ্ম্মনিষ্ঠা জিতেন্দ্রিয়তা, নিঃস্বার্থতা প্রভৃতি সদ্গুণের উত্তরাধিকার তিনি তাহা- দিগকে দিয়া গিয়াছিলেন। তিনি কখনও কাহারও চাকরী করেন নাই, সামান্য পৈত্রিক সম্পত্তি দ্বারাই তাহার ও তাঁহার ভাতার পরিবার প্রতিপালন হইত। তাহাদের ভূসম্পত্তির বার্ষিক আয় ১৫০ টাকার অধিক ছিলনা, তাহাও নগদ ১৫০ টাকা নহে। জীবিকানির্বাহ- পযােগী ধান্যাদি ও তদ্ব্যতীত ৬০/৭০ টাকা নগদ প্রজাদিগের নিকট হইতে পাইতেন। পরিবারস্থ সকলের পরিধেয়, বন্ধনাৰ্থ লবণ তৈল ধত ইত্যাদি এই টাকার দ্বারা ক্রয় হইত। বসত বাটীর বৃক্ষাদি হইতে কাঠ, পুষ্করিণী অথবা গ্রামস্থ ছােট ছােট নদী বা খাল হইতে মৎস্য, বাটা সংলগ্ন উদ্যান হইতে শাক সবজী ও ফুলফল সংগৃহীত হইত। এখন ২ দ্ধিকী। যাহা আয়াসলভ্য ও দুৰ্ম্মল্য, শতাধিক বৎসর পূর্বে তাহা বিনামূল্যে ও অল্পায়াসে পাওয়া যাইত। এই জন্য শতাব্দী পূৰ্বে পল্লীবাসী দরিদ্র ভদ্র পরিবারে যে শান্তি, সুনীতি ও স্বচ্ছতা নিত্য বিরাজ করিত, বর্তমান কালে তাহা কল্পনার বিষয় হইয়া দাড়াইয়াছে। আমাদের পিতামহ দেব ও অতি নিষ্ঠাবান্ ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। জপ তপঃ ব্রত উপবাস এবং তীর্থ পর্যটন তাহার জীবনের প্রধান কার্য্য ছিল। পিতামহী দেবীকে পিতা মহাশয় সর্বদাই রমণীকুলের রত্ন বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। গৌরী দেবী প্রথম বয়সে অনেক গুলি শিশুসন্তান হারাইয়া ছিলেন; আমাদের পিতা চণ্ডীচরণ, তাহাদের শেষ বয়সের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ও একমাত্র পুত্র। তাহাদের আর ও তিনটি কন্যা ছিলেন, তাহারা ইহা হইতে বয়সে অনেক বড়। কনিষ্ঠ সন্তান বলিয়া তিনি অতি আদরের ধন ছিলেন। গৌরী দেবী ও তাহার স্বামীর দেবদেবীর প্রতি স্বাভাবিক ভক্তি শােকতাপে আর ও গাঢ়তা লাভ করিয়াছিল। পুত্র কন্যাদিগের মঙ্গলােদ্দেশ্যে ইহারা সর্বদাই কঠিন ব্রত উপবাসাদি অনুষ্ঠান করিতেন। ইহাতেই পিতামহ দেবের লৌহবৎ কঠিন শরীর ও শেষ জীবনে একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল । পিতৃদেব জন্মিবার দুই বৎসর পূর্ব হইতে পিতামহী দেবী দীর্ঘায়ুঃ পুত্র কামনা করিয়া, প্রত্যহ চণ্ডীপাঠ শ্রবণ করিতেন। তাহাতেই এই পুত্র জন্মিবা- মাত্র আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের স্ত্রীলােকেরা বলিলেন, চণ্ডীপাঠ শ্রবণের পুণ্যফলে আপনি পুত্র সন্তান লাভ করিয়াছেন, অতএব পুত্রের নাম চণ্ডী চরণ রাখিবেন। তদনুসারে সদ্যপ্রসূত বালক চণ্ডীচরণ নাম প্রাপ্ত হইলেন। শৈশব কাল হইতে তাহার শরীর এত দুর্বল ছিল, যে পিত মাতা কখনও আশা করেন নাই যে তিনি দীর্ঘজীবী হইবেন। কোন অন্যায় কার্য করিতে অথবা কৰ্তব্য লঘন করিতে পিতামহী দেবী অত্যন্ত স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। ৩ ভীত হইতেন। স্ত্রীলােকদের মধ্যে যদি কেহ কখন কোন কাৰ্য্য সিদ্ধির জন্য মিথ্যা কথা বলিতে অনুরােধ করিতেন, তাহা হইলে তিনি তৎক্ষণাৎ বলিতেন, আমার একটি মাত্র পুত্র, আমি কোন পাপ সঞ্চয় করিয়া ইহার অমল করিব না। পিতামাতার অতিরিক্ত আদর পাইয়া বালক চণ্ডীচরণ অতিশয় দুর্দান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। গ্রামে তাঁহার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির যেমন প্রশংসা ছিল, বালসুলভ চপলতার ও তদ্রুপ অখ্যাতি ছিল। কিন্তু পড়াশুনায় বাল্য কাল হইতেই তাহার অনুরাগ ছিল, তাহার হস্তাক্ষরও অতি সুন্দর ছিল। তিনি প্রথমে গ্রাম্য পাঠশালায় পড়িতেন, পরে ইংরাজী শিক্ষালাভের জন্য বরিশাল যাওয়া আবশ্যক হইল। পিতামহী দেবী বলিলেন একমাত্র পুত্র দূরে পাঠাইয়া শূন্য গৃহে কিরূপে থাকিব? গৃহে একটি বধু থাকিলে গৃহ আর শূন্য বােধ হইবে না বলিয়া, পিতামহদেব স্বগ্রামস্থ চন্দ্রমােহন দাস- মুশ্রীব মহাশয়ের সপ্তমবর্ষীয়া কন্যার সহিত পুত্রের বিবাহ দিলেন। জননীর স্নেহ ভাগিনী বলিয়া এই বালিকাকে ভঁহার বালকস্বামী অতিশয় ঈৰ্য্যা করিতেন এবং সুবিধা পাইলে অত্যাচার করিতেও ছাড়িতেন না। বাল্য বিবাহের অনেক কুফলের মধ্যে এই আর একটি কুফলের কথা পিতা মহাশয় প্রায়ই উল্লেখ করিতেন। ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে তিনি বরিশালের গবর্ণমেন্ট স্কুলে প্রেরিত হন; ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে তাহার মাতৃ বিয়ােগ ঘটে। অল্প বয়সে মাতৃহীন হইলেও তাহার হৃদয়ে মাতার স্মৃতি চির দিন উজ্জ্বল ছিল। পিতামহী দেবী ক্ষীণালী ক্ষুদ্রাকৃতি ও গৌরবর্ণা ছিলেন, কোন বন্ধু পত্নীর এইরূপ চেহারা দেখিয়া পিতা মহাশয় তাহাকে মা বলিয়া সম্বােধন করিতেন। মাতার কথা বলিতে হইলে, ‘পূর্ণলক্ষ্মী, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা ইত্যাদি উপমা ব্যবহার করিতেন।
১ দ্ধিকী। ১৮৫৭ হইতে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি বরিশালে তাহার ভগিনীপতি আনন্দচন্দ্র সেনের বাসায় থাকিয়া বিদ্যাভ্যাস করেন। এখানে তাঁহার সঙ্গীদিগের মধ্যে ভাল লােক কেহ ছিলেন না। সে সময়ে সুরাপানাদি কতকগুলি জঘন্য কাৰ্য কেহ জঘন্য বলিয়া মনে করিতেন না, সুতরাং নীতি সম্বন্ধে পরিষ্কার জ্ঞান এবং দুর্নীতির প্রতি তাহার বিজাতীয় ঘৃণা, যাহা উত্তর কালে দেখা গিয়াছে, তাহা তখন ছিল কি না জানা যায় না। কিন্তু জনক জননীর ভক্তিপ্রবণতা তাহাতে আশৈশব দৃষ্ট হইয়াছে। প্রাতঃ কালে উঠিয়া প্রতিদিন দুর্গানাম জপ করিতেন, কোন স্থান হইতে অন্যত্র যাইতে হইলে দুর্গানাম স্মরণ না করিয়া বাহির হইতেন না ।* তাহার নিজের মুখে শুনিয়াছি, দুর্গা পূজাদি উপলক্ষে কেহ তাহাকে টাকা উপহার দিলে, তিনি তার দেবদেবীসম্বন্ধীয় পুস্তক ক্রয় করিতেন। এই সকল পুস্তকের অংশ বিশেষ সর্বদা কণ্ঠস্থ করিতে ও পরে আবৃত্তি করিতে ভাল বাসিতেন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার তিন বৎসরের মধ্যেই তৎকাল প্রচলিত হিন্দুধর্মের উপরে তাহার অনাস্থা উপস্থিত হইল। তৎকালে পূজনীয় রামতনু লাহিড়ী বরিশালে তাহার একজন শিক্ষক ছিলেন। শ্রদ্ধেয় গিরিশচন্দ্র মজুমদার প্রভৃতি পুরাতন ব্রহ্মগণ যখন বরিশালে ব্রাহ্ম-ধর্ম প্রচার করিতে ছিলেন, পিতা মহাশয় তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। সেই সময় হইতেই তিনি ব্রাহ্মদিগের সহিত উৎসাহ সহকারে যােগ দিতে আরম্ভ করিয়া ছিলেন। নির্ভীকচেতা সংস্কারক দুর্গামােহন দাসের সহিত বােধ হয় এই খানেই তাহার প্রসম সাক্ষাৎ হয় এবং বােধ হয় এই খানেই তাহাদের আমরণস্থায়ি সৌহার্দ্যের সূত্রপাত হয়। দুর্গামােহন বাবু এই সময়ে বরিশালে ওকালতী আরম্ভ করিয়া ছিলেন। ১৮৬৩ সালে বরিশাল স্কুল হইতে এণ্টন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। এক বৎসর কলিকাতায় সিবিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যয়ন করেন। তৎপরে উক্ত কলেজ পরিত্যাগ পূর্বক Free Church Institution এ ভর্তি হন। অতঃপর কতকটা শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ কতকটা অর্থাভাবে তঁহাকে সে কলেজ ও ছাড়িয়া বাড়ী যাইতে হয়। তিনি কলিকাতা অবস্থান কালে দুর্গামােহন দাসের জ্যেষ্ঠাগ্রজ, হাইকোর্টের উকীল কালী মােহন দাস মহাশয়ের বাটীতে থাকিয়া পড়িতেন এবং কবিবর হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রসন্নকুমার ঠাকুর মহাশয়ের সাহায্যে কলেজের বেতন চালাইতেন। কালী মােহন বাবুর বাসা হইতে পদব্রজে কলেজে যাতায়াত করিতে করিতে তাঁহার স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইয়াছিল। কয়েক মাস স্বগ্রামে পিতার নিকট থাকিয়া তিনি ঢাকায় যাইয়া একটি বৃত্তি বা scholarship যােগাড় করিয়া, Lower Grade Pleadership পরীক্ষা দিবেন এই সংকল্প করিলেন। কিন্তু ঢাকায় আসিয়া অনেক চেষ্টা করিয়া ও scholarship পাইলেন না। এই সময়ে তার একজন আত্মীয় কলিকাতায় তাহার জন্য একটা চাকরীর যােগাড় করেন। তাঁহার সে চাকরী লইবার ইচ্ছা ছিল না, কারণ তাহাতে অসৎ সংসর্গে পড়িবার সম্ভাবনা ছিল। সেইজন্য যাহাতে ঢাকা থাকিয়া পড়িতে পারেন, অথচ কোন কাজ পাইতে পারেন তাহার জন্য অনেক চেষ্টা করিলেন। কোন মতেই কৃতকাৰ্য্য না হইয়া, অবশেষে কলিকাতায় গিয়া পূর্বোক্ত চাকরী লওয়াই স্থির করিলেন। কলিকাতা যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া, ষ্টীমার কোন সময়ে যাইবে জানিবার জন্য, নদীঘাটে উপস্থিত হইলেন, শুনিলেন সেদিন ষ্টীমার যাইবে না, অন্যমনস্ক ভাবে নদীঘাটে বেড়াইতে লাগিলেন, হঠাৎ লিবিংষ্টোন (Mr. Livingstone) সাহেবের বাড়ীর দিকে দৃষ্টি পড়িল। Livingstone সাহেব খুব ভওআলাপী লােক, শােনা ছিল; তাহার সহিত একবার আলাপ করিয়া দ্ধিকী। আসিতে ইচ্ছা হইল। ইহার পূর্বে ইহাদের মধ্যে কখন কথাবার্তা হয় নাই। দুই চারি কথার পরই সাহেব তাহাকে বলিলেন, “আমি বাঙ্গালা শিখিতে চাই, আপনি যদি আমাকে শিখাইতে পারেন, আমি আপনাকে মাসিক ১৫ টাকা বেতন দিতে প্রস্তুত আছি।” পিতা মহাশয় তৎক্ষণাৎ এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। তাঁহার আর কলিকাতা যাইবার আবশ্যক হইল না, লিবিংষ্টোন সাহেবের সুপারিসিতে বঁহার আর একটি স্থানে শিক্ষকতা (tutorship) জুটিয়া গেল। পিতা মহাশয় এই ঘটনাটিকে উল্লেখ করিয়া সৰ্ব্বদাই পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ দিতেন। উত্তরকালে ঘটনাটি তাহার নিকট পরমেশ্বরের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ (direct interven tion) বলিয়া মনে হইত। এই ঘটনা না ঘটিলে খুব সম্ভবতঃ তিনি কুসং. সর্গে পড়িতেন এবং তাঁহার সংসারিক ওআধ্যাত্মিক সকল প্রকার উন্নতির পথ রুদ্ধ হইত । সেই সময়ে এই ঘটনাটি উল্লেখ করিয়া দৈনন্দিন fafarcu fafatiga,-"I have adopted a new course of life ; I have accepted a private tuition. I was induced to accept this post rather from the desire of enjoying good company than from any love of money.” “জীবনে এক নূতন পথ ধরিলাম, একটি শিক্ষকতা কাৰ্য্য গ্রহণ করিলাম। অর্থ লােভে নহে কিন্তু সাধুসঙ্গ লাভের আকাঙ্ক্ষায় এই কার্যে প্রণােদিত হইয়াছি। ইংরাজীতে লিখিত তাহার দৈনন্দিন লিপি হইতে এই সময়ে তাহার প্রাত্যাহিক কার্য্যের নিম্নলিখিত তালিকা দেখা যায়। Morning. Morning prayer, Study, Tuition and Prayer after bathing Noon. Study. Afternoon, Tuition Evening 7-7-30 Prayer.
স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। Night. 8-12-30 Study Study includes all secular and religious studies as well as attending the Law Class. প্রাতঃকালে, সন্ধ্যাকালে এবং আনান্তে প্রার্থনার নিয়ম আজীবন রক্ষা করিয়াছেন। কেবল পাঠ্যাবস্থায়ই যে ১২টা ১২টা রাত্রি জাগিয়া গ্রন্থ পাঠ করিয়াছেন তাহা নহে, আমি বড় হইয়া ও তাঁহাকে মাঝে মাঝে এরূপ অধ্যয়নমগ্ন দেখিয়াছি। ১৮৬৭ হইতে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা নগরীতে অবস্থান করেন। এই সময়ের দৈনন্দিন লিপি পাঠে জানা যায় যে তিনি দারিদ্রের কশাঘাতে বড়ই প্রপীড়িত হইয়াছিলেন। কখনও বা দুই একটি Private tuition পাইতেন, কখনও আবার তাহা থাকিত । লিভিংষ্টোন সাহেবের জন্য বাঙ্গালা পুস্তক ইংরাজীতে অনুবাদ করিয়াও কিছু অর্থ উপার্জন করিয়াছেন। তিনি যে এই সময়ে কেবল আইন সম্বন্ধীয় পুস্তকই পড়িতেন তাহা নহে। জীবনী, ইতিহাস, দর্শন ও ধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় পুস্তক লাইব্রেরীতে যাহা পাইতেন, সকলই তিনি পড়িতেন। ১৮৬৮ সালে Lower Grade Pleadership ও ১৮৬১ সনে Higher Grade Pleadership পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন। এই সময়ে ঢাকাস্থ ব্রাহ্মমণ্ডলীর সহিত তাহার ঘনিষ্ঠতা জন্মিল। পূজনীয় বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামীর প্রতি তাঁহার অগাধ ভক্তি ছিল। তাঁহার দৈনিক পুস্তকে দেখা যায়, এক রাত্রিতে তিনি বিজয় বাবুর সহিত একত্র সঙ্গীত ও উপাসনাদি করিয়াছেন, এই স্বপ্ন দেখিয়াও আনন্দ বােধ করিয়াছিলেন । ১৮৭০ সনের ২৫শে মাঘ (৬ই ফেব্রুয়ারী) তিনি বিজয় বাবুর নিকট ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হইলেন। শ্ৰীযুক্ত বঙ্গচন্দ্র রায় মহাশয় তাঁহাকে ও শ্রাদ্দিকী। আর তিনজন যুবককে দীক্ষাৰ্থ উপস্থিত করিয়াছিলেন। এই দীক্ষা দিনের সবিশেষ বর্ণনা এঁহার দৈনন্দিন লিপিতে পাওয়া যায়। এই সময়ে তাঁহার পিতৃদেব রােগ শয্যায় শায়িত ছিলেন। তাঁহার প্রকাশ্য ভাবে হিন্দুধর্ম বর্জন ও ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের সংবাদে রুগ্ন বৃদ্ধ জনক কিরূপ ব্যথিত হইবেন, এই চিন্তা দীক্ষাকালেও বারবার তাহাকে আক্রমণ করিতেছিল। কিন্তু সেই দিনকার দৈনিক লিপিতেই তিনি লিখিয়াছেন, “যিনি পিতার পিতা এবং মাতার মাতা, যিনি দুঃখ বিপদ ও প্রলােভনে আমাকে রক্ষা করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি আমার যে বিশ্বাস তাহা কি পার্থিব পিতার অশ্রুজলে ভাসিয়া যাইতে দিব ?” দীক্ষার পর হইতে তিনি মনে অনেকটা শান্তি পাইয়া ছিলেন। অর্থকষ্ট আর পূর্বের ন্যায় তাঁহাকে অভিভূত করিতে পারে নাই। দীক্ষার পরদিনই তাহার দৈনন্দিন লিপিতে লিখিয়াছেন,-Early in the morning I got up from bed with a sense of great responsibility which had fallen upon me, owing to my having taken the vow (of দীক্ষা ) on the preceding day. “প্রাতঃকালে একটা গুরুতর দায়িত্ব বোধ লইয়াই শয্যা হইতে উত্থান করিলাম। পূৰ্ব্বীরাত্রে দীক্ষা কালে যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করিয়াছি ইহা তাহারই ফল।” এই সময়ে আচার্য নির্বাচন উপলক্ষে ব্রাহ্মদের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ হয়। পিতা মহাশয় ইহাতে বড়ই দুঃখিত হইয়াছিলেন। পূৰ্বেতো অনেকবার এইরূপ হইয়াছে, কিন্তু তখন তাহার মতাে ব্যথিত হয় নাই এবার তবে কেন এমন হইল? এই প্রশ্নের মীমাংসা নিজেই করিয়াছেন। "Nothing is dear to us unless we purchase it at a good price. Religion is precious to us when we purchase it at the sacrifice of ties of blood”. “যাহা অধিক মূল্য দিয়া স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। ক্রয় না করি, তাহা মূল্যবান জ্ঞান করি না, ( তাহার আদর করি না)। ধৰ্ম্মের বিনিময়ে যখন রক্তের বন্ধন বিসৰ্জন করিতে হয় (অর্থাৎ আত্মীয় স্বজন হইতে বিচ্ছিন্ন হইতে হয় তখনই ধৰ্ম্ম আমাদের নিকট বহুমূল্য এখন তিনি সর্বদাই উপাসনা, সভা, সঙ্গত, ব্ৰহ্মমন্দির—যেখানে পরমেশ্বরের নাম কীৰ্ত্তন হইত, সেই খানেই যাইতেন। প্রায়ই বিজয় বাবুর গৃহে উপাসনায় যােগদান করিতেন। এই সময়ে আত্মােন্নতির বিশেষ চেষ্টা ছিল ; দারিদ্র ও দুর্ভাবনা কখন ও বা কিছু অভিভূত করিত, কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ব্ৰহ্মকৃপায় আবার পরমেশ্বরের উপর নির্ভরের ভাব আসিত। অনেক নূতন তত্ত্বলাভ ও নূতন ভাবের উন্মেষ এই সময়ে হয়। এক স্থানে লিখিয়াছেন “The religion, which has been purchased by the tears of my father, shall be strictly followed by me, at any cost and any sacrifice." “আমার পিতার অশ্রু দিয়া যে ধৰ্ম্ম ক্রয় করিয়াছি, সে ধর্মের জন্য সকল কষ্ট, সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করিব।” ইহার কিছু দিন পরে তাহার দীক্ষার সংবাদ তাঁহার পিতার কর্ণ- গােচর হইল। বৃদ্ধ রােগশয্যাশায়ী পিতা, পুত্রের হিন্দুধর্ম ত্যাগের সংবাদ পাইয়া ক্ষিপ্তপ্রায় হইলেন। এই দুঃসংবাদ পুত্রের হৃদয়ে শেলের ন্যায় বিদ্ধ হইল, তখন সংকল্প করিলেন পিতাকে লইয়া সুদূর পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রা করিবেন। আত্মীয়বর্গ হইতে দূরে লইয়া গিয়া প্রাণপণে তাঁহার সেবা শুশ্রুষা করিয়া তাহার ব্যথিত হৃদয় শীতল করিবেন, ইহাই তাহার উদ্দেশ্য। ছিল। এই অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য তিনি প্রাণপণে উপার্জনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। পশ্চিমাঞ্চলে ওকালতী করিবেন এই অভিপ্রায়ে পারসী ও উর্দু পড়িতে আরম্ভ করিলেন।
এদ্ধিকী তাঁহার পিতার পীড়া ক্রমশ বৃদ্ধি হইতে লাগিল; এদিকে ঢাকাতে আইন ব্যবসায়ের বড় সুবিধা হইতেছেনা, দেখিয়া, ১৮৭০ সালে,Higher Grade Pleadership উত্তীর্ণ হইবার কিছুদিন পরে, বরিশাল অসিলেন। পিতার ব্যধি দুরারােগ্য ও মৃত্যু সন্নিকট মনে করিয়া, কিছু দিনের জন্য বাসাগ্রামে আসিয়াছিলেন, কিন্তু পিতার মৃত্যুকালে তথায় উপস্থিত থাকিলে পাছে কোন পৌত্তলিক অনুষ্ঠানে যােগ দিতে হয়, সেই ভয়ে, সত্বর বরিশালে ফিরিয়া গেলেন। ১৮৭১ সনের ১৫ই জানুয়ারী পিতামহদেবের মৃত্যু হয়। পিতা মহাশয় স্বগ্রামে আসিয়া প্রচলিত রীতি অনুসারে শ্রদ্ধাদি অনুষ্ঠান করিতে অস্বীকৃত হওয়াতে, আমার মাতৃদেবী শ্বশুরের মুখাগ্নি হইতে শ্রদ্ধ পর্যন্তু সমস্তই করিলেন। পিতামহাশয় বরিশালে থাকিয়া হবিষ্যের নিয়ম মাত্র পালন করিয়া, ব্রাহ্মমতে শ্রাদ্ধ করিলেন এবং হিন্দুসমাজ কর্তৃক বর্জিত হইলেন। এই সময়ে তাঁহাকে নানা প্রকার অত্যাচার ও উৎপীড়ন সহ করিতে হইয়াছিল। হিন্দুধর্ম ত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া তাঁহার পাচক ও ভৃত্য তাহার চাকরী ছাড়িয়া চলিয়া যায়। কিছু দিন পর্যন্ত তিনি ধােপ। ও নাপিত পৰ্য্যন্ত পান নাই। ১৮৭১ সালের আগষ্ট মাসে তিনি তাঁহার পত্নী ও শিশু কন্যা দ্বয়কে আনিবার জন্য স্বগ্রাম বসণ্ডা গমন করেন। গ্রামস্থ লােকেরা সকলে মিলিয়া বলিলেন, আমরা বিধৰ্মীর নৌকা ঘাটে লাগাইতে দিব না, স্ত্রীর সহিত দেখা না করিয়া ফিরিয়া যান,ভাল, নচেৎ নৌকা ডুবাইয়া দিব”। তাহারা মাতৃদেবীকেও নানাবিধ ভয় ও প্রলােভন দেখাইতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি উভয়ই অগ্রাহ্য করিয়া তাহার স্বামীর সহিত বরিশালে আসিলেন। এই সময় হইতেই পিতা মহাশয়ের গৃহধর্ম আরম্ভ হইল। তাহার গৃহে প্রতিদিনই ঈশ্বরের উপাসনা হইত। তিনি তাঁহার সপ্তমবর্ষীয়া বালিকা স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন । ১১ কন্যাকে একখানি “উপাসনা প্রণালী” দিয়া উপাসনা পদ্ধতি শিখাইতেন। তিনি শুদ্ধরূপে গান গাহিতে পারিতেন না তথাপি সঙ্গীত তঁহার অতিশয় প্রিয় ছিল। সৰ্ব্বদাই ব্যাকুল প্রাণে নিজের সুরে গান ধরিতেন। গ্রাম হইতে আসিয়া “আমি হে তব কৃপার ভিখারী” এই নামটি প্রতিদিনই শুনিতাম। “ওহে দীননাথ কর আশীৰ্বাদ” ও শুনিতাম। “যেন এরসনা করে হে ঘােষণা, সত্যের মহিমা জীবণে মরণে” বাবা খুব উৎসাহের সহিত গাহিতেন, সঙ্গে সঙ্গে আমিও তদনুরূপ উৎসাহে যােগ দিতাম। এই গানটি তাঁহার তত বেসুরা হইত না। “নিত্য উপাসনা ইন্দ্রিয় দমন পর উপকায় বৈরাগ্য সাধন” এই কয়েকটি তিনি জীবনে নিয়তই সাধন করিতে চেষ্টা করিতেন। উকীল অবস্থায় তাহার দৈনিক পুস্তকে একদিকে যেমন আত্মানুসন্ধান ও আত্মােন্নতির চেষ্টা দেখা যায়, অপর দিকে সেইরূপ দারিদ্রের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামের পরিচয় পাই। একদিন লিখিয়াছেন, “গত কয়েক মাসের আয়ব্যয় দেখিয়া মনে হয়, ভবিষ্যতে অনাহারে মরিতে হইবে। যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না থাকিত, আমি এতদিনে পাগল হইয়া যাইতাম। ভবিষ্যতে কি আছে জানিনা, তবে যে সর্বশক্তিমান্ ঈশ্বর জীবনের নানা পরীক্ষায় আমায় উত্তীর্ণ করিয়া আনিয়াছেন, তিনি আমাকে কদাপি পরিত্যাগ করিবেন না”। ১৮৭৩ সনের মার্চ মাসে বরিশালে একজন অতিরিক্ত মুন্সেফ নিয়াে- গের আবশ্যক হয়। পিতা মহাশয়ও তাঁহার সমাবস্থ চারি পাঁচ জন নূতন উকীল ঐ কার্যের জন্য দরখাস্ত করেন। সকলেই তাহাদের বার্ষিক আয় ও বিদ্যার কথা লিখিয়াছিলেন। কেহ লিখিলেন বৎসরে ৬০০, কেহ ১২০০ কেহ ১৮০০। পিতা মহাশয় সমস্ত বৎসর যাহা দ্দিকী। পাইয়াছেন, হিসাব করিয়া ঠিক তাহাই লিখিয়াছিলেন। উহা ১২ ভাগ করিলে মাসকরা অতি সামান্যই পড়ে। বিদ্যা সম্বন্ধেও সেইরূপ। অন্যের হিন্দী, উর্দ, সংস্কৃত, ফারসী প্রভৃতি অনেক ভাষা জানেন বলিয়া লিখিলেন, পিতা মহাশয় তখন অল্প উর্দ, শিখিতেছিলেন, ঐ ভাষা জানেন লিখিলে তাঁহার সুবিধা হইবারই কথা, কিন্তু তিনি কেবল ইংরাজী ও বাঙ্গালার কথা লিখিলেন। ডিষ্ট্রিক্ট জজ তাহার চরিত্রগুণে পূর্ব হইতেই তাহাকে ভাল বাসিতেন, এই আশ্চর্য সত্যবাদিতা দেখিয়া তিনি মুগ্ধ হইলেন এবং তাহাকেই মনােনয়ন করিলেন। ১৮৭৩ সনের মার্চের ৩০শে তারিখ তিনি লিখিয়াছেন “আজ আমার জীবনের স্মরণীয় দিন, যদি ঈশ্বর করেন, ইহা স্মরণীয় দিন হইবে। “If goel would make it such.” ইহার মধ্যে তাহার বিশ্বস্ত হৃদয় খানি প্রতিফলিত রহিয়াছে। ২১শে মার্চ তারিখ তিনি বাখরগঞ্জের অতিরিক্ত মুন্সেফের পদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অতঃপর তাহাকে পিরােজপুরের মুন্সেফ হইয়া যাইতে হয়। ৩১শে মে সেখানে কাৰ্য্যভার গ্রহণ করিলেন, আর ৮ই জুন তথায় ব্রাহ্ম- সমাজ প্রতিষ্ঠা করিলেন। প্রতি রবিবার তাহার বৈঠকখানায় আহুত ও সমাগত ভদ্রলােক দিগকে লইয়া উপাসনা হইত। ২৮শে জুন লিখিয়াছেন, “আমার অধ্যয়নে অবহেলা হইতেছে। প্রতিজ্ঞা করিলাম, এখন হইতে আবার রীতিমত পড়াশুনা করিব। সকালে দর্শন শাস্ত্র, বিকালে আইন এবং রাত্রে রাজনৈতিক বিষয় পাঠ করিব।” পিরােজপুরের কাজ হইতে অবসর পাইয়া, পিতা মহাশয় আবার বরিশালে আসিলেন। তাঁহার বন্ধু ও মুরুব্বি Mr. Morris তখন হাইকোর্টের আসিয়াছেন এবং Mr. Tottenham বরিশালের জজ হইয়াছেন, ইনিও পিতৃদেবের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, ইহার সুপারিস পত্রাদি অগীয় চণ্ডীচরণ সেন। লইয়া কলিকাতায় আসিলেন। এই সময়ে অভাব ও ভবিষ্যতের ভাবনা সত্ত্বে ও ধর্মসংস্কারের চিন্তা ও চেষ্টার বিরাম ছিল না। কিছুদিন কলিকাতায় থাকিয়া দিনাজপুরের অন্তর্গত ঠাকুর গায়ে একটি মুন্সেফি পাইলেন। তখন পরিবার ভক্তিভাজন কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত “ভারতাশ্রমে রাখিয়া একাকী কাৰ্য্য স্থানে গেলেন। তাঁহার ধর্মগুরু ও বন্ধু বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহাশয় তৎকালে “ভারতাশ্রমে ছিলেন। এই স্থানে অন্যান্য প্রচারকদিগের সহিত পিতা মহাশয়ের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা স্থাপিত হইল। ১৮৭৪ সনের মে মাসে পিতৃদেব স্থায়ী মুন্সেফের পদে নিযুক্ত হইয়া ২৪ পরগণার অন্তর্গত বারুইপুর যান। হরিনাভিতে তখন পূজনীয় পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় শিক্ষকতা কাৰ্য্য করিতেন, এই সময়ে তাঁহার সহিত পিতৃদেবের পরিচয় ও বন্ধুত্ব জন্মে। বারুইপুর হইতে তিনি পাবনা জেলার মহকুমা সাহাজাদপুর বদলী হন। এই স্থানে যাইবার পূর্বে ১৮৭৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে কলিকাতা আসিয়া জেষ্ঠা কন্যাকে মিস এত্রুয়েড প্রতিষ্ঠিত হিমহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়া যান। সাহাজাদ পুরে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তাহার মােহরের নাজির পদপ্রার্থী হইলে পর, health cetificate এর জন্য তাহাকে পাবনার সিবিল সার্জনের নিকট যাইতে হয়। উক্ত সিবিল সার্জন প্রথমতঃ স্বাস্থ্য ভাল নয় বলিয়া ঐ ব্যক্তিকে certificate দিতে অস্বীকার করেন, কিন্তু কিছু ঘুষ পাইয়া পরে certificate দেন। পিতা মহাশয় এই অবৈধ কার্যের কথা জানিতে পারিয়া চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না, ডিষ্ট্রিক্ট জজের নিকট উত্তেজিতভাবে এই কাষের কথা লিখিয়া পাঠাইলেন। হিতে বিপরীত হইল। যে অন্যায় করিয়াছে ১৪ শ্রাদ্ধিকী। তাহার কিছুই হইল না, পরন্তু একজন সামান্য মুন্সেফ, জজ সাহেবের বন্ধু ও স্বজাতীয়, উচ্চ বেতন ধারী ডাক্তারকে এমন গুরুতর অপরাধে অপরাধী করিতেছে এই আস্পর্ধা জজের অসহ হইল। তিনি পিতা মহাশয়ের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলেন এবং মিথ্যা অভিযােগের দায়ে যাহাতে তিনি গুরুতর শাস্তি পান তাহা করিলেন। যেব্যক্তি ঘুষ দিয়াছিলেন তিনি নিজে এবং সাহাজাদপুরের অন্য মুন্সেফ জজের ভয়ে, অথবা প্রতিকামনায়, পূর্বে পিতা মহাশয়কে যাহা বলিয়াছিলেন সমুদয় অস্বীকার করিয়া বসিলেন। এই সময়ের দৈনিক বিবরণ খুঁজিয়া পাই নাই, কিন্তু এইসময়টি যে তাহার বিশেষ সঙ্কট ও দুশ্চিন্তার সময় ছিল, তাহা জানিতে পারিয়াছিলাম, কারণ ইহার জন্য তাঁহাকে কলিকাতা আসিতে হয়। সেই বাল্যকালের কথা যতটুকু স্মরণ হয়, তাহাতে এই ধারণা জন্মিয়াছে, যে, তাঁহার পূর্ব বন্ধু Justice Morris প্রভৃতির অনুগ্রহেই তাঁহার চাকরী বজায় রহিল, তিনি কেবল তিরস্কৃত ও স্থানান্তরিত হইলেন। অতঃপর মাণিকগঞ্জে আসিলেন। এখানে আসিয়া তিনি উকীল দিগের মধ্যে ব্যবসায়গত দুর্ণীতি দেখিতে পাইলেন এবং শাস্তি দ্বারা এই দুর্ণীতির সংশােধনের জন্য (to make an example) একজন উকীলের ওকালতী ব্যবসা বন্ধ করিয়া দিলেন, অর্থাৎ তাহাকে disbar করিলেন। এই কাৰ্য্য দ্বারা তিনি অনেকের বিদ্বেষ ভাজন হইয়াছিলেন। এই খানেই প্রথম ভিক্ষা ব্যবসায়ী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের দূষিত জীবনের দিকে তাঁহার দৃষ্টি পতিত হয়। শ্রমক্ষম অথচ শ্রম-বিমুখ, ধর্মের নামে দুর্ণীতিপরায়ণ, কদাচারী এই শ্রেণীর লােককে যাহাতে ভিক্ষা দিয়া প্রশ্রয় দেওয়া না হয়, তদর্থে একখানি মুদ্রিত পত্র বাহির করিলেন এবং নিজের বাটীতে বৃদ্ধ রুগ্ন ভগ্ন ৰা অসমর্থ ব্যক্তি ভিন্ন আর কাহাকেও ভিক্ষা দেওয়া হইবে না, এই নিয়ম করিলেন। এই স্থানে অবস্থান কালে ভদ্রনামধারী অনেকে তাহার স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। প্রতি বিরক্ত হইলেও দেশের প্রজাসাধারণ তাঁহার সদ্বিচারের নিয়ত প্রশংসা করিত। এই খানে বৎসর কাল তাঁহার জ্যেষ্ঠা কন্যার শিক্ষার ভার তিনি সম্পূর্ণতঃ স্বহস্তে রাখিয়াছিলেন । যে কারণেই হউক তাঁহার অন্য কোন সন্তানের এই সৌভাগ্য হয় নাই। প্রাতঃকালে উপাসনাদি সমাপন করিয়া তিনি আমাকে নিকটে ডাকিতেন এবং নানাবিধ সগ্রন্থ হইতে উৎ কৃষ্ট অংশ সকল একখানি খাতাতে উদ্ধৃত করাইতেনও তাহার অর্থ বলিয়া দিতেন। এই সকল অংশ কণ্ঠস্থ করিয়া পর দিবস তাহাব নিকট আবৃত্তি করিতে হইত। প্রধানতঃ বাইবেল ও Conway's Sacred Anthology নামক পুস্তকে সংগৃহীত নানা দেশের ধর্ম ও নীতি গ্রন্থের বিশেষ বিশেষ বাক্যাবলী এইরূপে শিক্ষা দিতেন। এতদ্ভিন্ন ইংরাজী সাহিত্য ও ব্যাকরণ, পাটীগণিত ও জ্যামিতি রীতিমত রীতিমত পড়াইতেন। ইতিহাস অধিকাংশ সময়ে মুখে মুখে বলিতেন। দ্বিপ্রহরে নিযুক্ত রাখিবার জন্য অনুবাদ ও Parsing এর যথেষ্ট কাজ দিয়া যাইতেন। কাছারী হইতে আসিয়া মুখ হাত ধুইয়া, যখন জলযােগ করিতেন, তখন আমাকে কাছে সঁড় করাইয়া সেদিনকার নির্দিষ্ট যে পাঠ তাহা পরীক্ষা করিতেন। এতদ্ভিন্ন Morning and Evening Meditations নামক পুস্তক হইতে একটি করিয়া কবিতা বা ধৰ্ম্ম সঙ্গীত মুখস্থ বলাইতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বন্ধু বান্ধবদিগকে লইয়া তিনি কোন সৎ- প্রসঙ্গের আলােচনা করিতেন, এবং তৎপরে সকলকে লইয়া উপাসনা করিতেন। উপাসনা কালে কোন একটি বিশেষ বিষয়ে কিছু উপদেশ দিতেন। এই নিয়ম তাহার গৃহে তাহার জীবনের শেষ দেড় মাস কালই কেবল রক্ষিত হয় নাই। মানিকগঞ্জ হইতে তিনি পুনরায় ঠাকুরগাঁয়ে এবং তথা হইতে দ্ধিকী। জলপাইগুড়ি প্রেরিত হন। জলপাইগুড়িতে গিয়া তিনি অতিশয় উৎসাহের সহিত ব্রাহ্মধর্মপ্রচারে প্রবৃত্ত হন। এই সময় কুচবিহার-বিবাহ লইয়া ব্রাহ্মসমাজে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইয়া, উন্নতিশীল ব্ৰাক্ষসমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছিল। পিতা মহাশয় সাধারণ-সমাজ প্রতিষ্ঠাতৃগণের সঙ্গে ছিলেন। ইতি পূৰ্বে কেশবচন্দ্র সেনের প্রতি তাঁহার যেমন অপরিমেয় ভক্তি ছিল, এখন তদনুরূপই অশ্রদ্ধার উদয় হইল। তিনি তীব্র ভাষায় তাঁহার কার্যের প্রতিবাদ করিলেন। শেষ বয়সে সেই অসংযত ভাব ও ভাষা স্মরণ করিয়া তিনি অনুশােচনা করিয়াছেন। সাম- যিক উত্তেজনা ও অসদ্ভাব চিরদিন থাকেনা। কেশবচন্দ্র সেনের প্রকৃত মহত্ত্ব ও তাঁহার ধর্মভাব পিতৃদেবের ন্যায় উদারচেতা ব্যক্তি কখনই অস্বীকার করিতে পারেন না। কিন্তু কতকগুলি বিষয়ে কেশব বাবু প্রমুখ ব্যক্তিগণের সহিত তাহার পূর্ব হইতেই মতভেদ ছিল। তাহার একটি স্ত্রীজাতির উচ্চশিক্ষা ও সামজিক অধিকারাদি সম্বন্ধে। জ্ঞানকে তিনি চিরদিন স্থির গভীর অনুরাগের সহিত পূজা করিয়াছেন, তাহা কেবল পুরুষের অর্জনীয় মনে করিয়া তিনি সুখী হইতে পারেন নাই। জ্ঞান নারীর মন কঠোর করে, একথা শুনিলেই তিনি বলিতেন, তবে কি জ্ঞানী পুরুষ অজ্ঞান পুরুষ হইতে হৃদয়ের বৃত্তিতে হীনতর? একদিন দৃষ্টান্ত স্থলে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বন্ধু আনন্দমােহন বসু আম হইতে অনেক বেশী জ্ঞানী, একজন বড় গণিতজ্ঞ (Mathematician), আমি কি তাহার চেয়ে কোমল প্রকৃতির লােক?” তিনি জ্ঞানকেই মানুষ্যত্বের প্রধান উপকরণ ও অজ্ঞানতাকে কুসংস্কার ও কদাচারের প্রস্তুতি বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। স্বীয় কন্যাদিগের সুশিক্ষার জন্য তিনি যে পরিমান সময় শক্তি ও অর্থব্যয় করিয়াছেন, তাহার অবস্থায় আর কেহ সেরূপ করিয়াছেন কি না জানি না। যখন কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ে স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। স্ত্রীলােকদিগের জন্য বি, এ, পরীক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয় নাই, তিনি তখন হইতে স্বীয় কন্যাকে বি, এ, পৰ্য্যন্ত পড়াইবার অভিলাষ পােষণ করিয়া আসিতেছিলেন। তাই বলিয়া বি, এ, পাশ করা শিক্ষার চরম পরিচয়, এমন কথা কোন কালে মনে করেন নাই। বরং বি, এ এবং এম, এ উপাধিধারিগণের অধিকাংশেরই বিদ্যার অগভীরতা দেখিয়া আক্ষেপ করিতেন। জ্ঞানানুরাগের সহিত চিন্তা অধ্যয়নও আত্মােৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা মিলিত হইলে, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে, এবং বিশ্ব বিদ্যালয়ের উপাধি শশাভিত না হইয়াও, বিদ্যালাভ করা যায়, নিজের জীবনেই তাহা দেখিয়া গিয়াছেন। জলপাইগুড়ি অবস্থান কালে তিনি ছুটি পাইলেই রঙ্গপুর ও সৈদপুর প্রভৃতি স্থানে প্রচার করিতে যাইতেন। সৈদপুর ব্রাহ্ম সমাজ তাহারি স্থাপিত। জলপাইগুড়িতে বালিকা বিদ্যালয়ের অনেক উন্নতি করিয়া ছিলেন। এখানে নিম্ন শ্রেণীর দরিদ্র বালকদিগের জন্য একটি স্কুলও খুলিয়াছিলেন, তাহা বােধ হয় বেশী দিন স্থায়ী হয় নাই। জলপাইগুড়ি হইতে ত্রিপুরার অন্তর্গত মােরাদনগর বদলী হন। সেখানেও একটি ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিয়া আসেন। তথা হইতে যশােহর গিয়া ছাত্রদিগের জন্য একটি সাপ্তাহিক উপাসনা-সভা স্থাপন করেন। এই খানেই তিনি তাঁহার Discourse on Education শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। যশােহরের অস্বাস্থ্যকর জল বায়ুতে নিজে ও পরিবারস্থ প্রায় সকলেই ম্যালেরিয়াক্রান্ত হওয়াতে,তিনি ১৮৮০সনের ডিসেম্বর মাসে ছুটী লইয়া স্বীয় জন্মস্থান বাখরগঞ্জে আসেন, এবং চেষ্টা পূৰ্ব্বক বরিশালেরই মুন্সেফ হন। কিন্তু যশােহর বাসের ফলে তাহার চতুর্থ কন্যাটিকে আড়াই বৎসর বয়সে হারাইতে হয়। এই তঁাহার ও তাঁহার সহধর্মিণীর প্রথম সন্তান শােক।
১৮ শ্রাদ্ধিকী। বরিশালে তাঁহার পূৰ্ব্ব বন্ধুগণ তখনও বাস করিতেছিলেন। পূৰ্ব্বে, অভাবের দিনে, তিনি সমস্ত প্রাণ মন ঢালিয়া, কাজ করিবার সুবিধা পান নাই, এবার আসিয়া নানাবিধ কার্যে নিযুক্ত হইলেন। তাঁহার পুরাতন বন্ধু গিরিশচন্দ্র মজুমদার মহাশয়ের পত্নী স্বগৃহে এবং ব্রাহ্মিকা- সমাজে সুন্দর উপাসনা করিতেন, পিতা মহাশয় তাঁহাকে প্রচারিকা ব্ৰতে দীক্ষিত করিলেন, এবং ব্রাহ্মসমাজের বেদীতে াঁহাকে বসিবার অধিকার দেওয়াইলেন। বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সভ্যদিগের মধ্যে দুই এক জন বৃদ্ধ এই কাৰ্য্যের ঘােরতর প্রতিবাদ করিলেন। ইহার ফলাফল সম্বন্ধেও সংশয় ও ভয় যথেষ্টই ছিল, কিন্তু ফল ভালই হইল। পর বৎসর মাঘােৎসবে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ কমিটী মনােরমা দেবীকে এক দিন কলিকাতা সমাজের বেদী গ্রহণ করিতে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন। নারীজাতির অধিকার সম্বন্ধে কেবল মতের উদারতা নহে, তাহাদিগকে সকল উচ্চাধিকার দিবার একান্ত আকাক্ষা, ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আকাঙ্ক্ষাকে কাৰ্য্যে পরিণত করিবার দুর্লভ সাহস, তাহার মধ্যে ছিল। এই সময়ে বালক বালিকাদের জন্য একটি রবিবাসরীর বিদ্যালয় (Sunday School) স্থাপন করিলেন। তখন পর্যন্ত কলিকাতায় আমাদের বর্তমান Sunday School বা রবিবাসরীয় নীতি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় নাই। ১৮৮৩ সনে প্রথম বাঙ্গালা রচনায় মনোেযােগী হইলেন। প্রথম প্রথম কন্যার দ্বারা রচনা সংশােধন করাইয়া লইতেন, ক্রমে ভাষা আয়ত্ত হইয়া আসিল। তাহার প্রথম রচিত প্রবন্ধগুলি ঐতিহাসিক। অতঃপর জীবন গতি নির্ণয়’ নামক দার্শনিক পুস্তিকা রচনা করেন। এই বৎসরের মধ্য ভাগে তিনি সংস্কৃত পড়িতে আরম্ভ করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই শিক্ষ- কের সাহায্যে সংস্কৃত বাল্মীকির রামায়ণ খানি পড়িয়া ফেলেন। শিশুকালে স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারত পড়িয়াছিলেন। নিজের গৃহে প্রত্যেক সন্তানকেই শৈশবে রামায়ণ মহাভারত কিনিয়া পড়িতে দিয়া- ছেন। বাস্তবিক এই দুই গ্রন্থের প্রতি তাঁহার আশ্চর্য ভালবাসা ছিল। সংস্কৃত রামায়ণ পাঠের পর একখানি বিদ্রুপাত্মক কাব্য রচনা করিয়া ছিলেন, তাহার নাম ‘লঙ্কাকাণ্ড'। উহাতে রামায়ণে উড়িখিত কতগুলি নামের অন্তরালে তৎকালিক ইংরাজ শাসনাধীন বঙ্গের অবস্থা বর্ণনা করিয়াছেন।* অনেকেই এই পুস্তক খানির নূতনত্বেরও রসিকতার প্রশংসা করিয়াছেন। ১৮৮৪ সনে ‘টকাকার কুটীর’ নাম দিয়া Uncle Tom's Cabin অনুবাদ করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহার আশ্চর্য লিখিবার শক্তি ছিল। যাহা ধরিতেন তাড়াতাড়ি শেষ করিতেন। অনেকক্ষণ বসিয়া, ভাবিয়া চিন্তিয়া, শব্দ বাছিয়া লিখিবার জন্য সময় ব্যয় করিতেন , এবং অপরকে এরূপ করিতে দেখিলে বিরক্ত হইতেন। টমকাকার কুটীর লিখিতে লিখিতে তাহার মনে হইল, মিসেস বিচার ষ্টো তাহার এই গ্রন্থ রচনা করিয়া আমেরিকার দাসত্ব প্রথার জঘন্যতা তাঁহার সরস চিত্রে যেরূপ করিয়া দেখাইয়াছিলেন, সেইরূপ করিয়া এদেশের কুপ্রথাও কুশাসন সকলের চক্ষে আঙ্গুল দিয়া দেখাইবার জন্য ঐতিহাসিক উপন্যাস আবশ্যক। এই চিন্তা হইতে তাহার ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার সূত্রপাত হয়। এতদর্থে তিনি নানা স্থান হইতে ঐতিহাসিক গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়া পাঠ করিয়াছিলেন। ১৮৮১ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে তিনি মেদিনীপুরে বদলি হইলেন। ‘টমকাকার কুটীর’ মােদিনীপুরে সম্পূর্ণ হয়। এই অনুবাদ কাৰ্য শেষ করিয়া তিনি মহারাজ নন্দকুমার’ লিখিতে আরম্ভ করিলেন। এই পুস্তকের স্থানে অস্থানে তিনি ঐতিহাসিক তত্ত্ব সন্নিবেশ করিবার চেষ্টা করিয়া ছেন। Calutta Public Library হইতে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসন ২ এদ্ধিকী। কালের কাগজ পত্র ভাল করিয়া অধ্যয়ন করিবার জন্য এবং পুস্তক রচনার যথেষ্ট অবসর পাইবার ইচ্ছায়, তিনি ১৮৮৫ সনের আগষ্ট মাসে দীর্ঘ ছুটী (furlough) লইয়া কলিকাতায় আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন। মেদিনীপুর অবস্থান কালে স্থানীয় ব্রাহ্মদের সহিত তাঁহার বিশেষ সৌহার্দ্য জন্মে। সেখানে প্রতি বুধবার সমাজে আচার্যের কাৰ্য্য করিয়া ছেন এবং নিকটবর্তী এক বৈষ্ণব সমাজে আহুত হইয়া প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গিয়াছেন। ‘মহারাজ নন্দকুমারের’ পরে দেওয়ান গঙ্গাগােবিন্দ সিংহ রচনা করেন, উহা ১৮৮৬ সনে প্রকাশিত হয়। অতঃপর ‘অযযাধ্যার বেগম’ ও ‘মুদ্রা যন্ত্রের স্বাধীনতা প্রদাতা। ১৮৮৮ সনে ‘ঝান্সির রাণী’ প্রকাশিত হয় ইহার অনেক বৎসর পরে ১৮৯৫ সনে ‘এই কি রামের অযযাধ্যা’?—লেখা হয়। এই সকল পুস্তকের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের সহিত ধর্ম ও নীতি প্রচার। নন্দকুমারাদি লিখিয়া তিনি অচিরাৎ গবর্ণমেন্ট কর্তৃক দণ্ডিত হইয়াছিলেন।* ভারতবর্ষের একখানি সৰ্বাঙ্গসুন্দর ইতিহাস লিখিবার সাধ তাঁহার বহুকাল হইতেই ছিল। এতদর্থে তিনি বহুদিন ধরিয়া বহুব্যয়ে পুরাতন ঐতিহাসিক গ্রন্থ সকল সংগ্রহ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার সে অভিলাষ পূর্ণ হয় নাই। ধারাবাহিকরূপে তাহার জীবনের প্রত্যেক ঘটনা লিখিবার অবসর আজ নাই। তিনি মুন্সেফ ও সবজজের পদে থাকিয়া কিরূপ ক্ষিপ্র কারিতার সহিত কাৰ্য্য করিতেন, ন্যায়ও সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাকিয়া স্বাধীনও নির্ভীকভাবে বিচার করিতেন, অনেকে তাহ। বিদিত আছেন। দুইটি মােকদ্দমা উপলক্ষে তাঁহার স্বাধীনতাও নির্ভীকতার বিশেষ প্রশংসা শুনিয়াছি। একটি যখন তিনি মজঃফরপুরে সবজজ। এই মােকদ্দমায় স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। ২১ দ্বারভাঙ্গার মহারাজ এক পক্ষে ছিলেন। প্রতিপক্ষ Advocate General Sir Charles Paul কে আনাইয়াছিলেন । দ্বিতীয় মােকদ্দমা গড়গাছা Trenching ground বিষয়ক। এখানেও অর্থবল লােকবল ও আইনের কুটতর্ক জাল সূক্ষ্ম ন্যায় বিচারের নিকট পরাস্ত হইয়াছিল। যশােহর ও নদীয়া থাকিতে বিধবাদিগের সম্পত্তি সম্বন্ধে তাহাকে অনেক মােকদ্দমার বিচার করিতে হয় । ইহাতে হিন্দু বাল্যবিধবা দিগের চরিত্র সম্বন্ধে তাহার অন্য প্রকার ধারণা জন্মে। অথচ তাহাদিগের হীনতার জন্য তিনি তাহাদিগকে দোষী সাব্যস্ত না করিয়া সমাজকেই এজন্য দায়ী মনে করিতেন। তাঁহার উক্ত ধারণা তিনি তাহার এক রায়ে প্রকাশ করিয়া দেশের অনেকেরই বিরাগ ভাজন হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তাহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হন নাই। সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলিতে তিনি সঙ্কুচিত হইতেন না। তিনি আর একজন জ্ঞানী পুরুষের ন্যায় বলিতে পারিতেন, Let truth lead where it will” erti Let Justice reign though the Heavens fall. বাস্তবিক তাহার চরিত্রে সর্বপ্রধান এবং সর্বাগ্রে উল্লেখ যােগ্য বিশেষত্ব তাঁহার তেজস্বিতা। এমন তেজস্বী পুরুষ সচরাচর দেখা যায় । তাঁহার তেজঃশক্তি তাহার কথা ও কার্যের মধ্য দিয়া সতত প্রকাশ পাইয়াছে। কর্তব্য জ্ঞান অনেকের থাকে, কৰ্তব্য করিবার অভিলাষও অনেকের আছে, কিন্তু যে তেজস্বিতা এই জ্ঞানও ইচ্ছাকে কাৰ্যকরী করে ও সফলতা দেয়, তাহা সকলের মধ্যে পাওয়া যায় না, পিতা মহাশয়ের মধ্যে তাহা দেখিয়াছি। যাহা ভাল বুঝিয়াছেন, তৎক্ষণাৎ ধরিয়াছেন, যাহধরিয়াছেন, তাহা করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছেন। কৃরি-কি- -করি বলিয়াসহস্রবার ইতস্ততঃ করা তাহার প্রকৃতি বিরুদ্ধ ছিল।
२३ এদ্ধিকা। এই তেজস্বিতা ও ক্ষিপ্ৰকারিতার সঙ্গে আশ্চৰ্য্য ভক্তি বিশ্বাসও ব্যাকু- লতা তাঁহাতে ছিল। সর্বদা শিশুর ন্যায় অকপট ব্যাকুল প্রাণে কাৰ্য্য সিদ্ধির জন্য প্রার্থনা করিয়াছেন। প্রতিদিন কাছারী যাইবার পূর্বে কয়েক মিনিট বসিয়া প্রার্থনা করিয়া যাইতেন, যেন বিচার কাৰ্য্য ন্যায়ানু মােদিত হয়, যেন ভ্রম প্রমাদ না ঘটে। শেষ কথা কয়টি যেন এখনও শুনিতেছি, “হে পিতঃ শুভ বুদ্ধি দাও, শুভ বুদ্ধি দাও, শুভ বুদ্ধি দাও।” সে কি ব্যাকুলতা! তাঁহার জ্ঞানার্জন স্পৃহা চিরদিন বলবতী ছিল। প্রথম বয়সে অর্থাভাবে কতগুলি বিষয় অধ্যয়ন করিতে পারেন নাই বলিয়া আক্ষেপ করিতেন। ঢাকায় যখন ওকালতীর জন্য পড়িতেন, তখন তথাকার লাইব্রেরীতে বােধ্য ও অবােধ্য সকল বই একবার করিয়া পড়িবার চেষ্টা করিয়াছেন, এবং অনেকগুলি ভালরূপে অধ্যয়ন করিয়াছেন। যখন চাকরী করিতেন, দিনে সময়াভাব বলিয়া, রাত্রিকালে পুস্তক পাঠ করিতেন। শেষ বয়সে রাত্রে পড়িতেন না, কিন্তু বিনা অধ্যয়নে তাঁহার এক দিনও যায় নাই। তাহার সংসার খরচের মধ্যে গ্রন্থ ক্রয় একটি প্রধান খরচ ছিল। কেবল যে নূতন গ্রন্থ ক্রয় করিতেন তাহাই নহে, পুরাতন ও দুল্লভ ঐতিহাসিক গ্রন্থাদির জন্য নানা পুস্তকালয়ে যাইতেন। পুরাতন পুস্তক বিক্রেতৃগণ তাঁহাকে খুব চিনিত ও লাভের আশায় বাড়ীতে আসিয়া প্রয়ােজনীয় অপ্রয়ােজনীয় নানা বই দেখাইত। গত বৎসর পৰ্য্যন্তও বিলাত হইতে বহুব্যয়ে নূতন নূতন পুস্তক আনাইয়াছেন। ১৯০১ সালে তাঁহার জ্যেষ্ঠ জামাতা পীড়িত হইলে, যখন তাঁহাকে লইয়া ওয়ান্টেয়ার (Waltair) যান, তখন সেখানে টেলেগু ভাষা শিখিতে আরম্ভ করেন। যাহা নিজে অধ্যয়ন করিতেন, তাহা অপরকে, বিশেষ সন্তানদিগকে স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। জানাইবার জন্য একান্ত উৎসুক হইতেন। এমন কি, অনেক সময়ে তাহাদের বয়সও বুদ্ধির পক্ষে অধ্যেয় বিষয় দুবেশ্য হইলেও সহজে ছাড়িতেন না; ইহাতে সন্তানদিগের মধ্যে কাহারও উপকার হইয়াছে, কাহারও অপকার। তিনি জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান প্রচার জীবনের শ্রেষ্ঠ কৰ্তব্য মনে করিতেন। তাঁহার ইচ্ছা ছিল যে তাঁহার কন্যারা গৃহে বসিয়া ঐতিহাসিক ও দার্শনিক গ্রন্থ সকল রচনা করেন। একদিন তাঁহার এই কন্যা বলিয়াছিলেন, “বই লেখা সকলের কাজ নহে, সকলের সে শক্তি থাকে না।” তিনি বলিলেন, “শক্তি থাকে না, শক্তি আসে। মানুষ যাহা ইচ্ছা করে, তাহাই করিতে পারে। আমি বলিতে পারি, আমি যদি ইচ্ছা করি, এখন লাটিন ভাষায় কবিতা লিখিতে পারিব।” আমরা সকলে হাসিলাম, তিনি ইহাতে হাসির কিছু দেখিলেন না। তাঁহার সহকর্মচারিগণ ধৰ্ম্মভেদও মতভেদ সত্ত্বেও তাঁহাকে শ্রদ্ধা না করিয়া পারেন নাই। তিনি যখন যেখানে গিয়াছেন, প্রায় সকলের সঙ্গেই তাঁহার সদ্ভাব জন্মিয়াছে। তিনি সরলও স্পষ্টবাদী ছিলেন, লােকের মন যােগাইয়া কথা বলিতে জানিতেন না। “ন ক্ৰয়াৎ সত্যং অপ্রিয়ম্” এই শাস্ত্ৰবাক্য সত্যের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ বশতঃই পালন করিতে পারেন নাই। তথাপি তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাও ভালবাসা পাইয়াছেন। সকলে তাঁহাকে ‘পাগলা চণ্ডী’ বলিয়া তাঁহার সত্যবাদিতাও অকুতােভয়তারই সাক্ষ্য দিয়াছে । সকল প্রকার দেশ হিতকর কাৰ্য্যে তাঁহার উৎসাহও অনুরাগ, যােগও সহানুভূতি ছিল। যেখানে গিয়াছেন ধৰ্ম্মও সমাজ সংস্কার কার্যে আত্মনিয়ােগ না করিয়া পারেন নাই; দুর্ণীতিও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিজশক্তি যথাসাধ্য প্রয়ােগ করিয়াছেন। যৌবনে এই ভাব অনেকের মধ্যেই লক্ষিত হয়, কিন্তু বার্ধক্যের সঙ্গে ২৪ দ্ধি। এদেশে, হয়তাে সৰ্ব্ব দেশেই, সাধারণ লােক সকল বিষয়ে একটু রক্ষণশীল, একটু পশ্চাৎপদ হয়। পিতৃদেব যে নিগড় একবার ভাঙ্গিয়াছেন, সে নিগড় আর পায়ে তুলিয়া লয়েন নাই, যাহা কুসংস্কারও কদাচার বলিয়া জীবনের আরম্ভে বুঝিয়াছিলেন, তাহা বার্ধক্যেও সেই চক্ষেই দেখিতেন; চল্লিশের পর দৃষ্টি ক্ষীণ হয় নাই। তিনি নিজ মতের অস্থিরতা ও অগভীরতাকে উদারতা নাম দিয়া, সকলের সহিত ঐক্য প্রকাশ করিতে কদাপি ব্যস্ত হন নাই। ব্রাহ্মধর্মের প্রতিও ব্রাহ্মসমাজের প্রতিও তাঁহার অনুরাগ চির দিন সমান ছিল। শেষ জীবন ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে নিয়ােগ করিবার বিশেষ আকাঙ্ক্ষা ছিল, এই আকাঙ্ক্ষা-প্রণােদিত হইয়া দুইবার মান্দ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে গিয়া- ছেন। পীড়ার প্রাক্কাল পর্যন্ত ভবানীপুর ব্রাহ্মসমাজে সাপ্তাহিক উপাসনার কাৰ্য্য করিয়াছেন, শয্যাশায়ী হইয়াও যাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছেন। অথচ তাঁহাতে একদেশ-দর্শিতা বা সঙ্কীর্ণতা ছিলনা। হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ও মুসলমান ধৰ্ম্মের যেখানে যাহা সুন্দর পাইয়াছেন তাহা সাদরে গ্রহণ করিয়াছেন; ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মের আদর্শানুসারে তাঁহার ছিল ‘সত্যং শাস্ত্রম্। খৃষ্টধর্মের উপর এবং খৃষ্টানদিগের উপর অনেকের বিজাতীয় বিদ্বেষ দেখা যায় ; তিনি ইতিহাসজ্ঞ ও জীবন চরিত্র পাঠে বিশেষ অনুরাগী ছিলেন ; খৃষ্টান মিশনারীরা যে ঈশ্বরের কৃপার যন্ত্রস্বরূপ হইয়া, এদেশে আসিয়া আমাদিগের শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন, তাহা জানিতেন এবং মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেন। "Render unto Cæsar the things which be Cesar's” আমার বাল্যকালে আমাকে এই বাক্যটি মুখস্থ করাইয়াছিলেন, নিজের কাৰ্যেও এই উপদেশ পালন করিতেন। মহম্মদের প্রতি তাঁহার অনুরাগ কম ছিল না। তাহার মত বিশ্বাস ও প্রচারের কথা কিছু বলা হইল, কিন্তু তাহার দয়া ও দানশীলতার কথা বাহিরের সকলে জানে না। তাহার রুক্ষ ও কোপন স্বভাবের নিম্নে যে কি স্নেহশীল প্রকৃতি ছিল, তাহা তাঁহার নিতান্ত ;
স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। •• আত্মীয় স্বজনদেরও সকল সময়ে মনে থাকিত না। যখন বরিশালে উকীল ছিলেন এবং কোন প্রকারে, অতি কষ্টে পরিবার পালন করিতে ছিলেন, সেই সময়ে অর্থাৎ ১৮৭২ সনের শেষ অথবা ১৮৭৩ সনের আরম্ভে, তিনি হিন্দু সমাজ হইতে পলায়মানা ও ব্রাহ্ম সমাজের আশ্রয় প্রার্থিনী একটি বাল বিধবাকে গৃহে স্থান দান করিয়া ভরণ পােষণ করিয়াছেন। জলপাইগুড়ি অবস্থান কালে আর একটি বিধবাকে গৃহে রাখিয়া কিছুকাল পরে পাত্রস্থ করিয়াছিলেন। জনৈক বিধবা আত্মীয়াকে কয়েক বৎসর হইতে স্বগৃহে আনিয়া রাখিয়াছিলেন; ইহার সহিত একত্ৰ থাকিতে সন্তানগণ পাছে অসন্তুষ্ট হন, এই জন্য বাটীর এক পার্শ্বে তাহার জন্য স্বতন্ত্র গৃহ নিৰ্মাণ করিয়া দিয়াছেন। রােগ শয্যায় শুনিয়াছিলেন উক্ত আত্মী- যার একটি বিধবা কন্যা তাহার আশ্রয়ে আসিতেছে ; নির্দিষ্ট সময় উত্তীর্ণ হইয়া গেলে সেই বালিকার জন্য তাহার মাতা অপেক্ষা তাঁহারই অধিক ভাবনা দেখা গিয়াছে ; তিনি তাহার পৌছখবর না পাওয়া পর্যন্ত সুস্থির হইতে পারেন নাই। আর একটি নিঃসম্পকিতা, সমাজ ত্যক্ত। বিধবা শেষ বয়সে আসিয়া তাহার গৃহে স্থান ভিক্ষা করাতে তিনি তাহাকেও গৃহে স্থান দিয়াছেন। সন্তানগণের সুশিক্ষার জন্য তিনি অনেক করিয়াছেন, এবং তাহার আকাক্ষানুরূপ ফল না দেখিয়া দারুণ ক্লেশ ভােগ করিয়াছেন। তাঁহার পুত্রগণ অনেক সময়ে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, যে অন্য গৃহে জন্মিলে হয়তো তাঁহারা এত ধিক্কার না শুনিয়া, বরং প্রশংসা লাভ করিতেন। এ কথাও ঠিক। তিনি নিজের জীবনেও তৃপ্তি লাভ করেন নাই, সন্তান দিগের আচরণও ঠিক হার মনের মত হয় নাই, কারণ তাঁহার আশা ও আদর্শ অতিশয় উচ্চছিল। তিন বৎসর পূর্বে তিনি টলষ্টয় প্রণীত চল্লিশ বৎসর’ নামক একখানি উপন্যাস অনুবাদ করেন।
২৬ দ্দিকী। গত ১৯০৩ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁহার তৃতীয়া কন্যা প্রেমকুম অকালে ইহলােক পরিত্যাগ করেন। এই ঘটনায় বাহিরে তাহার কোন পরিবর্তন না ঘটিলেও অন্তরে বিষম আঘাত লাগিয়াছিল, তিনি নীরবে সে ব্যথা বহন করিয়া আসিতেছিলেন। অবশেষে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারী তাঁহার নব পরিণীত জ্যেষ্ঠ পুত্র যতীন্দ্রমােহনের জীবনলীলা সাঙ্গ হইল। এই আঘাত তাঁহার ভগ্ন, জীর্ণ শরীরে আর সহিল না। তিন মাস নীরবে শােক চাপিয়া,পুত্রের কাজকর্ম দেখিতেছিলেন; চতুর্থ মাসে কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হইলেন। এই রােগের যন্ত্রণাও নীরবে সহ্য করিয়া, ঠিক পুত্রের মৃত্যুর চারি মাস পরে, ১০ই জুন সন্ধ্যাকালে তিনি সকল রােগ শােক ও মৃত্যুর অতীত ধামে গমন করিলেন। রােগ শয্যায় পরলােক সম্বন্ধে অনেক কথা বলিতে ইচ্ছা করিতেন কিন্তু দুর্বলতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারিতেন না। তাঁহার সহধম্মিণী আজীবন তাঁহার সেবা করিয়া আসিয়াছেন, পুত্র শােকে তিনিও নিতান্ত ভগ্ন হইয়াছিলেন, এই অবস্থায়ও তাঁহাকে নিজের সেবায় নিযুক্ত দেখিরা সময়ে সময়ে অশ্রুপাত করিয়াছেন। সন্তানদিগকে নিজের জন্য রাত্রি জাগরণ করিতে দেখিলে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিতেন। অনেকবার বলিয়াছেন, “আমার জন্য কেন এত কষ্ট করিতেছ? আমার জীবনে যদি আর কাজ না থাকে, আমাকে বাঁচাইতে পারিবে না। এখনও যদি পরমেশ্বরের কোন কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হয়, তিনি আমাকে জীবিত রাখিবেন।” ১৮ বেলতলা রােড কালীঘাট, কলিকাতা। ১৭ই জুন, ১৯০৬ ।
পরিশিষ্ট
শ্রাদ্ধ বাসরে পঠিত স্বর্গীয় পিতৃদেবের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে উল্লিখিত
কয়েকটি ঘটনা সম্বন্ধীয় কথা :-
জন্ম তারিখ ও বংশাদি।
এই জীবনী লিখিবার সময় পিতৃদেবের জন্মতারিখ নির্ণয় করিবার
অবসর হয় নাই। পরে অনুসন্ধানে জানিয়াছি, বাঙ্গলা ১২৫১ সনের ২রা
মাঘ, মঙ্গলবার, ইংরাজী ১৪ই জানুয়ারী, শুক্লপক্ষের সপ্তমী ও ১৮ই মাঘ
বৃহস্পতিবার, ইংরাজী ৩০ জানুয়ারী, কৃষ্ণ পক্ষের সপ্তমী ছিল। কোন
পক্ষে তাহার জন্ম হইয়াছিল এখনও জানি না। কিন্তু তিনি ইংরাজী
১৯০০ সনের ১৬ই জানুয়ারী তারিখে, পঞ্চান্ন বৎসর বয়স পূর্ণ হইল
বলিয়া গবর্ণমেন্টের চাকরী হইতে অবসর গ্রহণ করেন। বােধ হয়
তাঁহার জন্ম জানুয়ারী মাসের প্রথমার্ধে হইয়াছিল বলিয়াই তিনি
জানিতেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় পৃষ্ঠার লিখিত বিবরণ পিতৃদেব কর্তৃক আর আত্ম
জীবনী হইতে প্রাপ্ত। উক্ত জীবনী দুই তিন পৃষ্ঠার অধিক লিখিত
হয় নাই।
পিতামহ দেবের উৰ্দ্ধতন পাঁচ জন পূর্ব-পুরুষের নাম—
রামেশ্বর সেন
রামনারায়ণ সেন
বাসুদেব সেন
কৃষ্ণদেব সেন
রামরতন সেন
২৮ শ্রাদ্ধিকী। কৃষ্ণদেব নে বাসণ্ডা গ্রামে বিবাহ করিয়া, এই গ্রামে আসিয়া বাস করিতে থাকেন। তৎপূর্বে তার পিতা পিতামহাদি বেলতখান ও তাহারও পূর্বে মাইলারায় বাস করিতেন। উভয় গ্রামই বাখরগঞ্জে। পিতা মহাশয়ের মুখে শৈশবে শুনিয়াছি, তাঁহার বংশের আদিস্থান ঢাকা জেলার অন্তর্গত পুরাতন রাজনগরের নিকট পােড়াগাছা নামক গ্রামে ছিল। কৃষ্ণদেব সেনের চারি পুত্র। তন্মধ্যে তিন পুত্রের বংশ অদ্যাবধি বাসণ্ডা গ্রামে বর্তমান। রামরতন ও রামচন্দ্র এই দুই ভ্রাতা একত্র বাস করিতেন। রামচন্দ্রের মৃত্যুর পর রামরতনের পুত্র, আমাদের পিতা- মহদেব নিমচাঁদ, সোদর নির্বিশেষে দুই খুল্লতাত পুত্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন পালন করিয়া বহুকাল তাহাদিগকে লইয়া এক গৃহে একান্নে বাস করেন। মধ্যে কিছুকালের জন্য দুই পরিবার পৃথক হইয়া যায়, কিন্তু পিতামহী দেবীর মৃত্যুর পর পিতামহ তাঁহার বালক পুত্র ও বালিকা পুত্রবধূ লইয়া আবার তাঁহাদিগের সহিত মিলিত হন। মেহ-প্রবণ, উদায় চিত্ত, ক্ষমাশীল পিতামহ দেবের এই কাজটি তাঁহার নিজের ও পুত্র বধূর বহু দুঃখ, দারিদ্র ও নির্যাতনের কারণ হইয়াছিল। একান্নবত্তি পরিবারে শ্রম বিভাগ বশতঃ সুবিধা যথেষ্ট, কিন্তু অশান্তি ও নিরীহ জনের প্রতি অত্যাচার তদপেক্ষা অনেক অধিক। বালিকা বধূর প্রতি বালক স্বামীর অত্যাচার। বালক চণ্ডীচরণ পূজা পৰ্বাহ উপলক্ষে নিমন্ত্রিত হইয়া যখন শ্বশুর গৃহে যাইতেন, তখন সেখানে বালিকা বধূর যত্ন রক্ষিত পুত্তলাদি ও অন্যান্য খেলান দরজার উপরিস্থ তাকের উপর সজ্জিত দেখিতেন। কখনও বা দেখিতেন, বালিকার হাতের গাঁথা বকুল ফুলের দীর্ঘ মালা স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। কৃষ্ণাদি মৃন্ময় ঠাকুরের গলায় ঝুলিতেছে। তিনি মালাগুলি বালিকার মাতামহীর নিকট তৎক্ষণাৎ চাহিয়া লইতেন এবং অল্পকাল মধ্যেই ক্রীড়াচ্ছলে শতছিন্ন করিতেন। বাক্স খেলনাদির জন্য নিজের বাড়ী ফিরিয়া গিয়া বাহানা ধরিতেন। তাঁহার উৎপাতে অস্থির হইয়া তাঁহার পিতাকে অবিলম্বে বৈবাহিকের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে হইত, “বেহাই, আপনার জামাই এখানে কি খেলনা দেখিয়া গিয়াছে, তাহার জন্য সকলকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছে, বাড়ীতে তিষ্ঠা দায়।” জামাতার স্বভাব জানিতেন, অবিলম্বে কন্যাকে মিষ্ট কথায় ভুলাইয়া, কখনও বা কাদাইয়া, তাহার খেলনাটি দিয়া জামাতাকে তুষ্ট রাখিতেন। বলা বাহুল্য যে খেলনাটি বালকের চঞ্চল হস্তে অল্পক্ষণেই ভগ্ন ও চূর্ণ হইত। বালিকা যখন শ্বশুর গৃহে যাইতেন, গৃহিণী রাত্রিকালে আপনার এক পার্শ্বে পুত্র ও অপর পার্শ্বে বধূকে লইয়া শয়ন করিতেন। কিন্তু তাহার নিদ্রাকর্ষণ হইলেই বালক উঠিয়া আসিয়া বালিকাকে ইচ্ছামত প্রহার করিয়া আবার গিয়া নিজ স্থান অধিকার করিতেন। পূজা পৰ্বাদিউপলক্ষে সুন্দর এক জোড়া কাপড়ের এক খানি বর ও এক খানি বধু পাইতেন, বর দুই চারি দিনে আপনার বস্ত্র খানি ছিড়িয়া খুঁড়িয়া, বাক্স খুলিয়া বধূর খানি দখল করিতেন। অথচ বালকের শৈশবের ব্যবহৃত সােণার বাজু ভাঙ্গিয়া মাতা বন্ধুর জন্য এক খানি গহনা গড়াইয়াছিলেন বলিয়া বালক বার বার “আমার বাজু আনিয়া দাও” বলিয়া, তাঁহাকে বড়ই অস্থির করিয়া তুলিয়াছিলেন। আমের দিনে বালিকা সাধ মিটাইয়া আম খাইবেন বলিয়া, তাঁহার পিতা তাঁহাকে শ্বশুর গৃহে যাইতে দিতেন না। শত্রু দেবী দুঃখ করিতেন, “বউকে বাড়ীর গাছের বড় বড় আম খাওয়াইতে পারিলাম না।”—কখন ভাল ও বড় বাছিয়া কয়েকটি আম লুকাইয়া রাখিয়া বধূকে কিছু কালের ৩. শ্রাদ্ধিকী। জন্য নিজ গৃহে আনাইতেন। শ্বশুর বা খুড়-শ্বশুরের কোলে উঠিয়াই বন্ধু আসিতেন, অন্য যান বাহনের আবশ্যক হইত না। বন্ধু আসিলে শ্বাশুড়ী বলিতেন,-“এস মা, এমন বড় আম দিব, তােমার হাতে ধরিবে না।” আম আনিতে গিয়া দেখিতেন, সর্বনাশ! ছেলে লুকাইয়া লুকাইয়া সব খাইয়া ফেলিয়াছে। তখন নিজ ললাটে করাঘাত করিতেন। বালক উল্লাসের সহিত বলিতেন,—“আমাকে ফাঁকি দিবে?” উত্তর কালে এ সকল গল্প মাতৃদেবীর ও পিতৃদেবের যথেষ্ট আমােদ বিধান করিত, কিন্তু বাল্যকালে মাতৃদেবীর পক্ষে এগুলি নিশ্চয়ই বিশেষ আমােদ জনক হয় নাই। বাল্য জীবনে পিতৃ মাতৃ প্রভাব। জন্মভূমি নামক একখানি পত্রিকার ১৮৯৬ সনে পিতৃদেবের এক সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশিত হয়, তাহার প্রথমাংশ বৰ্তমান জীবনীর প্রথমাং- শের সম্পূর্ণ অনুরূপ। বােধ হয় এই বিবরণ লিখিবার পূর্বে লেখক পিতা মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহার নিজের মুখেই অনেক কথা শুনিয়া গিয়াছিলেন। উহার এক স্থানে আছে- “ধর্মভীরু পিতা মাতার সদৃষ্টান্তই চণ্ডী বাবুর চরিত্র গঠন করিয়াছে। নতুবা চণ্ডী বাবু যে গ্রামে জন্মিয়াছেন সে গ্রামটী সুরাপানের জন্য প্রসিদ্ধ। অন্যান্য স্থানে মদ বােতলে বােতলে বিক্রয় হয়, কিন্তু চণ্ডী বাবু যে গ্রামে জন্মিয়াছেন সেখানে, চণ্ডী বাবুর বাল্যকালে কলসে কলসে মদ্য বিক্রয় হইত। চণ্ডী বাবুর আত্মীয় স্বজন প্রায় সকলেই সুরাপায়ী ছিলেন। কিন্তু বাল্যকালে চণ্ডী বাবুর মাতা পুত্রকে বলিতেন যে, তুমি মদ খাইলে আমি গলায় দড়ি দিয়া মরিব। ইহাতেই চণ্ডী বাবু সুরার প্রলােভন হইতে নির্মূক্ত ছিলেন।”
স্বগীয় চণ্ডীচরণ সেন । ৩১ আমার বিবাহের পর দিবস উপাসনান্তে পিতা মহাশয় আমাকে যে উপদেশ দিয়াছিলেন, তাহার মর্ম এই :- “আমি আমার পিতার নিকট একটি ধন পাইয়াছি, তাহা তােমাকে দিতে চাই, তুমি তাহা যত্নে রক্ষা করিবে। সেটি প্রাতঃকালে সন্ধ্যকালে বা কোথাও যাত্রাকালে দেবতার নাম স্মরণ। দুর্গা নাম না লইয়া আমার পিতা কোন কাজ আরম্ভ করিতেন না, বা গৃহ হইতে এক পদ নিষ্ক্রান্ত হইতেন না। তুমিও যাহাকে দেবতা বলিয়া জান, সকল উদ্যোগের পূর্বে তাঁহাকে স্মরণ করিবে, সকল সঙ্কটে তাঁহাকে ডাকিবে।” কালীমােহন বাবুর বাসা ও Free Church Institution কালীমােহন বাবুর বাসা ভবানীপুরে, কালীঘাটের নিকটস্থ বেলতলা নামক স্থান। আশ্চর্য ঘটনা সূত্রে কালীমােহন বাবুর বাড়ীর সন্নিকটেই উত্তর কালে পিতা মহাশয়ের ভবন নির্মিত হইয়াছে। বেলতলা হইতে পদব্রজে নিমতলা ঘাট প্রায় ৬ মাইল রাস্তা প্রতিদিন যাতায়াত সহজ ব্যাপার নহে। সামান্য ঘটনার জীবনব্যাপী ফল। কালাচাদ নামে কালীমােহন বাবুর বাড়ীতে কে একটি ভদ্র লােক থাকিতেন। বােধ হয় লােকটি কালীমােহন বাবুর মােহরের ছিলেন। এই ব্যক্তি সুরাপায়ী ছিলেন, অনেকবার মত্ত অবস্থায় রাস্তার পার্শ্বে নর্দমায় পড়িয়া থাকিতেন। পিতা মহাশয় বহুবার আমাদিগকে বলিয়া- ছেন, “যদি ঈশ্বরের বিশেষ কৃপায় সেদিন Livingstone সাহেবের সহিত দেখা না হইত, যদি ঢাকা ছাড়িবার অভিপ্রায় ত্যাগ না করিতাম, কমে এদ্ধিকী। উকীল, মুন্সেফ ও সবজজ হইবার সুযােগ ঘটিত না, অল্প আয়ে কালী মােহন বাবুর মােহরেরগিরি করিয়া কালাচঁাদের সংসর্গে কালাদের দশাই ঘটিত।” আমার ভগিনীর জন্ম। বাঙ্গলা ১২৭৮ সনের ৬ই আষাঢ়, ইংরাজী ১৮৭১ সনের জুন মাসে আমার ভগিনী যামিনীর জন্ম হয়, সুতরাং পিতৃদেব যখন আমাদিগকে জন্ম গ্রাম হইতে লইয়া আসেন, তখন তাহার বয়স মাত্র আড়াই মাস, আমার বয়স প্রায় সাত বৎসর। পিতামহ দেব পূর্ণ দেড় বৎসর কাল বাতব্যাধি বা পক্ষাঘাত রােগে শয্যাগত ছিলেন। রােগের প্রথম অবস্থায় তাঁহার বুদ্ধি পরিষ্কার ছিল, কিন্তু তাহার একাৰ্দ্ধ যেমন সম্পূর্ণ অসাড় হইয়া যাইতে লাগিল, বুদ্ধিও সেইরূপ জড়তা প্রাপ্ত হইল। কোন কোন বিষয়ে বুদ্ধিমানের মত কথা কহিতেন বটে কিন্তু আর কতগুলি বিষয়ে শিশুর মত অবস্থা হইয়াছিল । এই দেড় বৎসর কাল আহার নিদ্রা বিস্মৃত হইয়া মাতৃদেবী দিবানিশি শ্বশুরের পরিচর্যা করিয়াছেন। আমার তিন পিতৃস্ব স্ব স্ব শ্বশুরালয়ে থাকিতেন, যদি বা কদাচিৎ পিত্রালয়ে আসিতেন, পিতার শারীরিক ও মানসিক বিকৃত ও শােচনীয় দশা দেখিয়া কেবল বিলাপ পরিতাপই করিতেন, সেবা করা দূরে থাকুক ঘৃণায় বহুক্ষণ নিকটেও থাকিতে পারিতেন না। বস্তুতঃ বৃদ্ধের একমাত্র পুত্রবধূ ছাড়া প্রাণ দিয়া সেবা যত্ন করিবার আর কেহ ছিল না। তাঁহার মৃত্যুর পূর্বের শেষ কয়েক মাস কিরূপ শারীরিক অবস্থা লইয়া বধু এই কঠিন সেবাব্রত উদ্যাপন করিয়াছেন, মনে করিলে বিস্মিত হইতে হয়। অথচ কেবল শশুরের সেবাই তাহার একমাত্র কাৰ্য ছিল না, একলা তাহাকে খুড় স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। শশুরের সংসারের বন্ধনাদি সমুদয় গৃহ কাৰ্য্য সম্পাদন করিতে হইয়াছে। তাহার শ্বশুরের মৃত্যুর রাত্রে মাঘ মাসের দারুণ শীতে, নদীতে স্নান করিয়া আকেশে আর্ভবসনে তাহাকেই স্বহস্তে শ্বশুরের মুখে অগ্নি সংযােগ করিতে হয়। এক মাস কাল এক বেলা হবিষ্যান্ন খাইয়া, তাঁহাকেই পুত্র স্থানীয় হইয়া রীতিমত শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিতে হয়। তখন শিশু ছিলাম, এই সেবা ও কৃচ্ছ সাধনের গুরুত্ব যথারূপ অনুভব করিতে পারি নাই। মাতৃদেবীর তখনকার শারীরিক অবস্থা এবং সেই সেবা-পরায়ণতা ও কর্তব্য নিষ্ঠা এখন অতুলনা বলিয়া মনে হয়। মনে হয়, এই জননীর এই সময়ের সন্তান বলিয়াই কৰ্তব্য পালনে এবং সেবাকাৰ্য্য ভগিনী যামিনীর এমন তৎপরতা। সাধারণ লোকের মধ্যে পিতা মহাশয়ের সুখ্যাতি। তাঁহার গুণগানপূর্ণ ও লেখকের কৃতজ্ঞতাসূচক এক খানি বেনামী চিঠিতে এই অদ্ভুত পদ্য দেখিয়াছিলাম। “বুদ্ধে ( বুদ্ধ্যা?) যেন বৃহস্পতি, বিচারেতে দাশরথি ধর্মে যেন ধর্মের নন্দন, দীন প্রতি দয়া অতি প্রজার কল্যাণে মতি নামা সেন চণ্ডীচরণ।” চাপরাসী পেয়াদা ও বাড়ীর ভৃত্যাদির নিকটও শুনিতাম, যে, সাধারণ লােকে পিতা মহাশয়ের বিচারের সর্বদা সুখ্যাতি করে। হুকা টানিতে টানিতে কড়া তামাকের সঙ্গে তুলনা করিয়া যখন চাষারা বলিত, হাকিম বড় কড়া, তখন প্রশংসাচ্ছলেই সে কথা বলিত।
কন্যাদিগের শিক্ষা সম্বন্ধে পিতৃদেবের মত ও কাৰ্য, শক্তি সময় ও অর্থদান। হিন্দু মহিলা বিদ্যালয় এবং বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় উভয় স্থানেরই সকল বালিকার পিতা হইতে আমার পিতার আর্থিক অবস্থা অস্বচ্ছল ছিল, তাহা আমি সেই বয়সেই সবিশেষ জানিতাম ও বুঝিতাম। অবশ্য পিতৃমাতৃ হীন যে কয়েকটি বয়স্থ বাল্য-বিধবা ছিলেন, তাঁহাদের কথা ভিন্ন। তাহাদের কেহ বা বিদ্যালয়ের হিতার্থিনী কোন ইংরাজ রমণীর সাহায্যে, অনেকেই বদান্যবর দুর্গমােহন দাসের, কেহ বা আনন্দমােহন বসুর অর্থে ও স্নেহে প্রতিপালিত ও শিক্ষাপ্রাপ্ত হইতে ছিলেন। আজ কাল বোর্ডিং স্কুলের বেতনের পরিমাণ কিছু হ্রাস হইয়াছে। মিস্ এক্রয়েডের (Miss Akroyd) প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে মাসিক কুড়ি বাইশ টাকা দিতে হইত। ইংরাজ বালিকাদের অনুরূপ ডজন হিসাবে পরিচ্ছদাদি দিতে ও এককালীন অনেক ব্যয় হইত, এতদ্ভিন্ন খুচরা খরচও কত গুলি ছিল। জুতা মােজা ও বস্ত্রের সংখ্যা সম্বন্ধে কঠিন নিয়ম না থাকাতে, ইদানীং অনেক গরীব ব্রাহ্ম অল্প ব্যয়ে কন্যার সুশিক্ষা বিধান করিতে সমর্থ হইয়াছেন। কিন্তু আমাদের বাল্যে আমাদিগকে অনেকটা ইংরাজ বালিকাদের অনুকরণে চলিতে হইয়াছে। আমরা বেথুন বিদ্যালয়ে আসিবার পর হিন্দু বালিকাদের দেখাদেখি জুতা মােজা সম্বন্ধীয় কড়া নিয়ম আপনারাই শিথিল করিয়া মেম শিক্ষয়িত্রীগণও বেথুন স্কুলে আসিয়া আর তাহাতে বিশেষ আপত্তি করেন নাই। তথাপি আমরা হিসাব করিয়া দেখিয়াছি, পিতা মহাশয় তাঁহার প্রথম তিন কন্যার শিক্ষার জন্য যত ব্যয় করিয়াছেন, পুত্রদের এদেশীয় শিক্ষার ব্যয় তাহা হইতে অনেক কম করিয়াছেন। পুত্রদের বিলাতের শিক্ষার ব্যয় তিনি নিজে বহন করেন নাই, তাহার দ্বিতীয় কন্যা করিয়াছেন, সুতরাং সে ব্যয়ের কথা ধর্তব্য নহে। ফেলি।
স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। অর্থ ব্যয় হইতেও পিতা মহাশয়ের শারীরিক ও মানসিক ক্লেশ অধিক হইয়াছে। আমাকে ছুটীতে বাড়ী লইয়া যাইতে ও পরে স্কুলে পৌছাইতে তাঁহাকে সময়ে সময়ে বড়ই কষ্ট ভােগ করিতে হইয়াছে। এতৎসম্পর্কে ছুটীর দরখাস্ত করিয়া উপরিস্থ জজের সঙ্গে চটাচটিও হইয়াছে। একবার বরিশাল হইতে আমাকে কলিকাতা পৌছাইবার জন্য বরিশালের তদানী- স্তন জজের নিকট ছুটীর দরখাস্ত যখন নামঞ্জুর হইল, তখন তিনি হাইকোর্টে ছুটীর জন্য আবেদন করিলেন। এই আবেদন জজের হাতে দিলে তাহা প্রেরিত হইবে না, জানিতেন, সেই জন্য সরকারী নিয়মের ব্যতিক্রম করিয়া, স্বয়ং উহা প্রেরণ করিলেন। আবেদনে প্রবেশিকা পরীক্ষোত্তীর্ণ কন্যার কলেজে যাইবার কথা ও দূর ও দুর্গম পথে পিতার সঙ্গে যাইবার আবশ্যকতা পরিষ্কার করিয়া লেখা ছিল। হাইকোর্টের জজেরা চির দিনই বেথুন বিদ্যালয়ের হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, তাঁহারা অবি লম্বে পিতা মহাশয়ের ছুটী মঞ্জুর করিয়া বরিশালের জজের নিকট হুকুম পাঠাইলেন, এবং দরখাস্ত খানি কেন উক্ত জজ সাহেবের হস্ত হইয়া আইসে নাই, তাহার কৈফিয়ৎ তলব করিলেন। বলা বাহুল্য, স্থানীয় জজ ইহাতে পিতা মহাশয়ের প্রতি বিষম রুষ্ট হইলেন এবং অতঃপর সর্বদাই তাঁহার অনিষ্ট চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এই প্রসঙ্গে আর একটী গল্প মনে পড়িতেছে। আমাদের সন্তান- গণের শুনিয়া আমােদ, বােধ হইবে। যেবার আমি মাইনর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই, সেই বার বেথুন স্কুল কমিটীতে পরীক্ষার ফলাফল সম্বন্ধে যখন কথাবার্তা হইতেছে, তখন Justice Jackson জিজ্ঞাসা করিলেন, “কামিনী সেন কাহার কন্যা ?” দুর্গামােহন বাবু বলিলেন, “চণ্ডীচরণ সেনের কন্যা।” প্রশ্ন কর্তা হাসিয়া বলিলেন, “কোন চণ্ডী ? আমার চণ্ডী?” এই সময়ে English Department, Justice Jacksonএর হাতে ছিল, সেই জন্যই তিনি পিতা মহাশয়কে ‘আমার চণ্ডী” বলিলেন।
শ্রাদ্ধিকী। কিন্তু ইহার ভিতরে পিতা মহাশয়ের প্রতি তাঁহার বিশেষ সন্তোষ প্রকাশ পাইতেছিল। বরিশালের জজ কেন দরখাস্ত মঞ্জুর করেন নাই, তাহার একটি কারণ ছিল। পিতা মহাশয় তিন দিনের ছুটী চাহিয়াছিলেন ; সঙ্গে এক রবিবার ও একটা কি পৰ্ব উপলক্ষে একদিন কাছারী বন্ধ থাকিবে,সৰ্ব্বশুদ্ধ এই পাঁচ দিনের মধ্যে তিনি কলিকাতা গিয়া ফিরিয়া আসিবেন, এই কথা জানা- ইয়াছিলেন। সেকালে খুলনা ও যশােহরের ভিতর দিয়া রেলের রাস্তা হয় নাই। নৌকাযােগে পাঁচ দিনের কমে কলিকাতা আসা সম্ভব ছিল । বাদাবনের ভিতর দিয়া আসিতে আসিতে আবার ভাটার সময় নৌকা কাদার ভিতরে হয়তাে অর্ধেক দিন অচল হইয়া থাকিত। জজ সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন “যেখানে যাইতে আসিতে দশ দিন লাগে, সেখানে পাঁচ দিনের ছুটীতে কিরূপে চলিবে ?” পিতা মহাশয় বলিলেন, “আমি পাঁচ। দিনের মধ্যে ফিরিয়া আসিব অঙ্গীকার করিতেছি, আপনি কেবল অনুমতি করুন।” জজ রাগিয়া উঠিলেন, এমন অসম্ভব কথা তাহার বিশ্বাস হইল , ছুটী মঞ্জুর করিলেন না। পিতা মহাশয় রাস্তা সংক্ষেপ করিবার জন্য অনেকটা বৰ্ত্তমান রেল ও ষ্টীমারের পথ ধরিয়াই আসিতেন,বরাবর নৌকায় আসিতেন না। বরিশাল হইতে খুলনা পর্যন্ত বড় নদী দিয়া আসিয়া, তথা হইতে সংকীর্ণতর পথে যশােহরের বন্দিয়া গ্রাম পর্যন্ত আসিতেন ও সেখানে নৌকা রাখিয়া ছেকড়া গাড়ীতে যশােহর গিয়া এক বেলা বিশ্রাম ও আহারাদি করিয়া লইতেন, এবং আবার ডাক গাড়ী নামধেয় এক অপূৰ্ব্ব ছেকড়া গাড়ীতে চড়িয়া যশােহর হইতে বনগ্রাম দিয়া চাকদহ ষ্টেশনে আসিতেন। চাকদহে ট্রেণে উঠিয়া শিয়ালদহ গিয়া নামিতেন, এবং আমাদিগকে স্কুলে পৌছা- ইয়া, সেই দিন কোন বন্ধু গৃহে আহার করিয়া, রাত্রের টেণে আবার রওনা হইতেন। ইহাতেই দশ দিনের স্থানে পাঁচ দিনে যাতা- স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। । য়াত সম্পন্ন হইত। কিন্তু ইহাতে পিতৃদেবের কষ্টের সীমা থাকিত । ইতিপূর্বে আর একবার ১৮৭৬ সনের ডিসেম্বর মাসে পিতা মহাশয়ের সহিত পাঁচ দিনে কলিকাতায় আসিয়াছিলাম, সে যাত্রার কথা বেশ স্মরণ আছে এবং চিরদিন থাকিবে। আমি দশ বৎসর বয়সে হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে গিয়া কেবল মাত্র ছয় মাস কাল তথায় ছিলাম। মিস এক্রয়েডের (Miss Akroyd) সহিত বেভারিজ সাহেবের (Mr. H. Beveridge, I.C.s.) বিবাহ হইয়া গেলে, আর ছয় মাস কাল সে স্কুল ছিল, পরে উঠিয়া যায়। মাতৃদেবী পীড়িত হওয়াতে ঐ ঘটনার পূর্বেই পিতা মহাশয় আমাকে মানিকগঞ্জ লইয়া আসেন। এখানে পিতা মহাশয়ের তত্ত্বাবধানে গৃহ শিক্ষকের নিকট কয়েক মাস এবং পূর্ণ এক বৎসর কাল সম্পূর্ণতঃ পিতা মহাশয়ের নিকট পড়া শুনা করিতে হয়। এই বৎসরের শেষে অক্টোবর মাসে পিতা মহাশয় সপরিবার জন্ম স্থানে আসিলেন। গত পাঁচ বৎসরের মধ্যে মাতাঠাকুরাণী আর স্বগ্রামে গিয়া বাস করেন নাই। ইতি মধ্যে তাঁহার আর একটী কন্যা ও পুত্র জন্ম গ্রহণ করিয়াছে। পুত্রের জন্মের পরই পিতা মহাশয়ের ইচ্ছা হইল পৈতৃক ভিটায় নূতন বাটী নিৰ্মাণ করিয়া পিতার নাম রক্ষা করিবেন। এই বাটী নির্মাণ কালে তাঁহাকে অনেক কষ্ট ও অর্থ ব্যয় স্বীকার করিতে হইয়াছে। গ্রামবাসী জনৈক জমীদার ব্রহ্মজ্ঞানীকে দেশে থাকিতে দেওয়া হইবে না বলিয়া, আমাদের নূতন আট-চালার চাল রাতারাতি স্থানান্তর করিয়া জলসাৎ অথবা অগ্নিসাৎ করিয়াছিলেন। পিতা মহাশয় আবার চাল করাইলেন এবং যাহাতে এইরূপ অত্যাচার না হইতে পারে তন্নিমিত্ত বিচারালয়ে আবেদন করিলে পর, আদালত এই ব্যক্তির নিকট ১০০০ টাকার মুচেলকা লইয়া এই ব্যক্তিকে শান্তি রক্ষা করিতে বাধ্য করিলেন।
, দ্ধিকী। এই বৎসরই বাখরগঞ্জে ভয়ানক ঝড় ও বন্যা হইয়া ভােলা, দক্ষিণ সাবাজপুর প্রভৃতি স্থানে বহু লোক ধনে প্রাণে নষ্ট হয়। আমার জন্মের কিছু দিন পূর্বে প্রসিদ্ধ আশ্বিনের ঝড়, এবং উক্ত ঘটনার দ্বাদশ বৎসর পরে আবার এই কার্তিকের ঝড় উপস্থিত হইয়া লক্ষ প্রাণীর প্রাণ হরণ করে এবং শত শত গৃহে শােকের হাহাকার রাখিয়া যায়। ঝড়ের রাত্রে আমরা বাসণ্ডা গ্রামে নব নির্মিত গৃহে শায়িত ছিলাম। ঝটিকার প্রকোপ দেখিয়া সকলেই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলাম। বাড়ীর চাল একবার পুড়িয়া গিয়াছিল, মনে হইল এবার উড়িবে । এক কথা হইতে অন্য কথায় আসিয়া পড়িলাম। হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ের পুরাতন ছাত্রীগণ ও আর কয়েকটি নূতন ছাত্রী লইয়া, স্ত্রীশিক্ষানুরাগী, বদান্যবর দুর্গামােহন দাস ও আনন্দমােহন বসু মহাশয়ের যত্ন ও অর্থ সাহায্যে ও অবলাবান্ধব নামে সুপরিচিত, সকল দুৰ্বল জনের হিতৈষী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের উৎসাহ ও অন্যবিধ আনুকূল্যে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। প্রতিষ্ঠার দিন হইতেই দুর্গামােহন বাবু, ক্রমাগত পিতা মহাশয়কে পত্র লিখিতে ছিলেন যেন আমাকে শীঘ্রই স্কুলে পাঠান হয়। পিতা মহাশয় আমার দুই কনিষ্ঠা ভগিনী ও শিশু ভ্রাতার সহিত আমার মাতৃদেবীকে বাসা গ্রামে রাখিয়া আমাকে বঙ্গ-মহিলা-বিদ্যালয়ে বাের্ডার করিয়া দিবার জন্য কলিকাতা লইয়া আসিলেন। পিতা মহাশয়ের সহিত এই প্রথমবার দীর্ঘপথ একত্র বাহির হইলাম। মাতৃদেবী হইতে যে ছয় মাস দূরে ছিলাম, বড়ই কষ্ট বােধ করিয়াছি; যেমন মা তেমন আমি, পরস্পরের জন্য অনেক কাদিয়াছি। পিতার জন্য সেরূপ কোন কষ্ট বােধ করি নাই। অল্প বয়সের সন্তান বলিয়া আমার শৈশবে পিতা তাঁহার গুরু জনদের সমক্ষে আমার প্রতি কোন প্রকার যত্ন বা বাৎসল্য প্রকাশ স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। করিতে লজ্জা বােধ করিতেন, আমিও তাঁহার ত্রিমায় যাইতাম না। অপরিচিত পিতা যে কয়েক দিন বাটীতে থাকিতেন, আমি মাতার শয়ন কক্ষ পরিত্যাগ করিয়া, ঠাকুর দাদার বক্ষঃ আরাে দৃঢ় করিয়া আশ্রয় করিতাম। সুতরাং আত্মীয় স্বজনের অসাক্ষাতেও পিতা আমাকে ডাকিবার বা আদর করিবার অবসর পান নাই। সাত বৎসর পিতাকে ভীতি ও বিদ্বেষের চক্ষে দেখিয়া, তৎপরে যখন একেবারে তাহার আশ্রয়ে আসিয়া পড়িলাম, তখন বৈর ভাব দূর হইল বটে, কিন্তু গৃঢ়প্রবিষ্ট, দৃঢ় মূল ভীতি ভাব সহজে গেলনা। আমার আর সকল ভাই ভগিনীর প্রতি পিতৃদেবের যেরূপ বাৎসল্যব্যবহার ছিল এবং তাহার নিকট তাহারা যেরূপ নিঃসঙ্কোচে কথা বলিয়াছে ও আবদার করিয়াছে, আমার জীবনে সেরূপ কখনই হয় নাই। আমার সহিত পিতৃদেবের চিরকালই গুরু শিষ্য সম্বন্ধের ন্যায় একটা সুদূর ও সংযত ভাব ছিল। আমি কখন পিতার কোলে বসিয়াছি, বা তাহার স্নেহ-চুম্বন পাইয়াছি, এরূপ মনে পড়ে । উত্তর কালে আমার বিকলাঙ্গ কনিষ্ঠ সন্তানটিকে তাহার আড়াই মাস বয়স হইতে দুই বৎসর কাল পিতা মহাশয় তাহার নিকটে রাখিয়া- ছিলেন। একদা এই শিশুর নানাপ্রকার অত্যাচারের কথা উল্লেখ করিয়া পিতৃদেব ওয়ান্টেয়ার (Waltair) হইতে আমাকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন,“তােমার শৈশবে আমি তােমাকে বড় অনাদর করিয়াছি, তােমার সন্তান তাহার শােধ লইতেছে, আমি তোমার প্রাপ্য compound interest সহ পরিশােধ করিতেছি।” সত্য সত্যই এই শিশু সম্বন্ধে তিনি আশ্চর্য্য মেহ, স্বপ্রকৃতির বিপরীত ধৈৰ্য্য ও নারীসুলভ সহিষ্ণুতা দেখাইয়াছেন। আমার দ্বাদশ বৎসরে বাসণ্ডা হইতে কলিকাতা যাত্রার কথা বলিতে ছিলাম। সেই কথাই এখন বলি। পথে আমি মাতার জন্য কাদিয়া অস্থির হইতাম। পিতা মহাশয় আমাকে নানা কথা বলিয়া ভুলাইতে শ্রাদ্ধিকী। চেষ্টা করিতেন। প্রায় সমস্ত ক্ষণই নানা সদগ্রন্থ হইতে বিশিষ্ট অংশ পড়িতে দিতেন এবং তাহার অর্থ বুঝাইয়া দিতেন। স্কুলে গিয়া পাছে আমার রুচি ও অভ্যাস তাঁহার আকাঙ্ক্ষানুরূপ না হয়, এই ভয়ে যেন সর্বদা ভাত ছিলেন। এই কয়েক দিন সাজসজ্জা ও বিলাসিতা, বাহিরের সভ্যতা ও আড়ম্বরের বিরুদ্ধে কথায় যতদূর সাবধান করা যায় তাহা করিতে ক্রুটী করেন নাই। স্কুলে কিরূপ ব্যবহার করিব ; পাঠাদিতে অধিক অনুরক্ত ও খেলা গল্প ও লঘু আমাে দের বিরােধী দেখিয়া, সমবয়স্কার। বিদ্রুপ করিলে,তাহাদিগকে কি বলিব ; এবং আপনার মনকেই বা কি বলিয়া দৃঢ় রাখিব এ সকল কথা বিশেষ করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন। তাহার নিজের এক খানি নােট বুক ছিল, তাহা বাহির করিয়া আমাকে দিয়া লিখাইলেন— My life mission is higher than that of my school companions.--আমার জীবনের উদ্দেশ্য আমার সহপাঠিনীদিগের অপেক্ষা উচ্চতর। এবং এই কথাই সৰ্ব্বদা মনে রাখিতে অনুরােধ করিলেন। এই চিন্তাটি আমার মনে মুদ্রিত করিয়া, অত্মাভিমান বা অহঙ্কার নহে, কিন্তু জীবনের গুরুত্ব ও দায়িত্ব জ্ঞান উন্মেষ করিয়া দেওয়াই তাহার অভিপ্রায় ছিল। আমি সবিশেষ চিন্তা না করিয়া, বিনা বাক্য ব্যয়ে, তঁাহার আদেশ মত কথাটি লিখিয়া দিয়াছিলাম ; কিন্তু উহা আমার বাল্য ও যৌবনের সকল সুখের কণ্টক হইয়া আমাকে কেবলই যন্ত্রণা দিয়াছে। দুঃস্বপ্নের মত এখনও মাঝে মাঝে উহা আমাকে মুহূর্তের জন্য পীড়া দিয়া যায়। জলপথে পিতা মহাশয় স্বহস্তে রন্ধন করিতেন, কারণ আমাদের সঙ্গে কোন ভৃত্য ছিল না। এ পর্যন্ত বন্ধন গৃহে প্রবেশ করিতে পিতার অনুমতি পাই নাই বলিয়া বন্ধন কার্যে একান্ত অপটু ছিলাম। স্কুলে আসিয়া সঙ্গিনীদিগের সহিত প্রথম তরকারী কুটিতে ও বঁধিতে শিখি। ;
স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। ৪১ আমার সুশিক্ষা বিধান ও চরিত্র গঠন বিষয়ে পিতা মহাশয়ের সজাগ ভাবের আরও দুই একটি দৃষ্টান্ত দিয়া এই প্রসঙ্গ শেষ করিব। আমাকে কলিকাতা রাখিয়া মানিকগঞ্জ ফিরিয়া গিয়া, Lila Ada নামে এক ইহুদী বালিকার জীবন বৃত্তান্ত কোথায় পড়িয়াছিলেন। তাহার দৈনন্দিন লিপিতে আত্মচরিত্র গঠনােপযােগী কুড়িটি কি বাইশটি প্রতিজ্ঞা ছিল, সে গুলি অবিলম্বে নকল করাইয়া আমাকে-চিঠীর ভিভরে পাঠাইয়া দিলেন। সময়াভাবে স্বহস্তে অতটা লিখিতে পারেন নাই বলিয়া গৃহাগত কোন ব্রাহ্ম অতিথির দ্বারা উহা লিখাইয়া লইয়া ছিলেন। উক্ত লেখক পরে উদ্ধত অংশ অনুবাদ করিয়া ঢাকার বঙ্গবন্ধু কাগজে উহা মুদ্রিত করিয়াছিলেন, পিতা মহাশয় তাহার ও এক কাপি আমাকে পাঠাইয়া ছিলেন। এই সময়ে ঢাকা হইতে কোন কোন ব্রাহ্ম পিতা মহাশয়ের নিকট গিয়াছিলেন। তাঁহারা কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের মতানুবর্তিরূপে ইংরাজী ধরণের বােডিং স্কুল ও স্ত্রীজাতির উচ্চ শিক্ষার বিরােধী ছিলেন। তাহারা বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়ের কুশিক্ষার উদাহরণ স্বরূপ একদিন বলিয়াছিলেন যে তথাকার ছাত্রীরা ব্রাহ্ম ধৰ্ম ও ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারকদিগের প্রতি যথেষ্ট ভক্তি প্রকাশ করেন না, বরঞ্চ উপহাস করেন। কথাগুলির কোন মূল ছিল কি না জানি না। কিন্তু একথা শুনিয়াই পিতা মহাশয় আমাকে তীব্র ভৎসনা করিয়া এক পত্র লিখিলেন, এবং বুঝাইলেন যে, মহাত্মা কেশবচন্দ্র এবং তাহার অনুগামী প্রচারকগণ ভক্তির পাত্র ও নমস্য, কদাপি উপহাস্য নহেন। আমি ইতিমধ্যে উচ্চ প্রাথমিক (Upper Primary) পরীক্ষায়, প্রেসিডেন্সি সার্কেলে প্রথম স্থানীয় হইয়া দুই বৎসরের জন্য মাসিক দুই টাকা বৃত্তির স্থলে,কেবল ১০টাকা মাত্র পুরস্কার পাইয়াছিলাম ;-দ্বারকা নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছাত্রী, বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়ের বালিকারা অনেকগুলি বৃত্তি অধিকার করিয়াছিলেন বলিয়া, কোন ইনস্পেক্টর এই ব্যবস্থা ৪২ শ্রাদ্ধিকী। দিয়াছিলেন। পিতা মহাশয়, পূর্বোক্ত পত্রে, এই দশ টাকা ব্রাহ্ম প্রচারকদিগের সাহায্যার্থ দান করিবার জন্য আদেশ করিয়া পাঠাইলেন। দুঃখের বিষয় পত্র পাইবার পূর্বেই আমার শিক্ষয়িত্রী ৭ টাকা দিয়া আমাকে দুই খানি বই কিনিয়া দিয়াছিলেন এবং বাকী ৩ টাকা আমি দুর্ভিক্ষে দান করিয়াছিলাম। পিতা মহাশয় শুনিয়া লিখিলেন, “তােমার যত বই লাগে আমি কিনিয়া দিব, তােমার নিজের টাকা সে জন্য খরচ করিবার আবশ্যকতা ছিল না। আমাকে তিনি যেমন পুস্তক কিনিয়া দিতে পারিতেন, সেইরূপ তিনি প্রচার ভাণ্ডারেও দান করিতে পারিতেন এবং যথাসাধ্য করিতেন ও,কেবল আমার হৃদয়ে প্রচার কার্যের জন্য সহানুভূতি ও দানের ইচ্ছা জাগ্রত করিবার অভিপ্রায়েই ঐরূপ লিখিয়াছিলেন। অথচ প্রচারকগণের অগ্রণী মহাত্মা কেশবচন্দ্র সেনের স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধীয় মতকে অনুদার বলিতে তিনি সঙ্কুচিত হইতেন না। বৎসরকাল পূর্বে মানিকগঞ্জেই একদিন বলিতেছিলেন,“কেশব বাবু বলেন, মেয়েদের গণিত শিখাইবার আবশ্যক নাই, আর Logic বা ন্যায় শাস্ত্র না শিখাইয়া বরং Rhetoric অর্থাৎ অলঙ্কার শাস্ত্র শিখাইলে লাভ আছে। কিন্তু এটা বড় ভুল। গণিত ও ন্যায় শাস্ত্র না পড়িলে বুদ্ধি পরিষ্কার হইবে কিসে ?” মনােবৃত্তি সকলের উৎকর্ষ সাধন ও জ্ঞান জনিত বিমল আনন্দ সম্ভোগ এই দুই উদ্দেশ্যে তিনি কন্যাদিগের পক্ষে জ্ঞান বাঞ্ছনীয় মনে করিতেন। তাহাদিগের জন্য অর্থকরী বিদ্যার আবশ্যকতা তিনি বহু কাল স্বীকার করেন নাই। কন্যারা চাকরী করে, বা চিকিৎসাদি ব্যবসার দ্বারা অর্থোপার্জন করে, তাহা ইচ্ছা করিতেন না। ডাক্তারী শিক্ষা সম্বন্ধে পূর্বে তাঁহার বিশেষ অমত ছিল। যখন দুর্গামােহন দাস মহাশয়, ১৮৮২ সনে, তাঁহার দ্বিতীয়া কন্যাকে ডাক্তারী শিখাইবার জন্য মাদ্রাজ প্রেরণ করেন, তখন পিতৃদেব এই পুরাতন বন্ধুর বহু অনুবােধ ও আমার একান্ত আগ্রহ সত্ত্বেও আমাকে তথায় পাঠাইতে স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন। সম্মত হইলেন না। দুর্গামােহন বাবুকে কি লিখিয়াছিলেন জানি না। আমাকে লিখিলেন, “আমার কন্যারা ডাক্তারী ব্যবসায় করিবে না।” সান্ত্বনাচ্ছলে আর একটু লিখিলেন—“তাহারা শরীরের চিকিৎসক না হইয়া মনের চিকিৎসক হইবে, গৃহে বসিয়া সগ্রন্থ রচনা করিবে।” তিনি মহারাজ নন্দকুমারাদি লিখিয়া গবর্ণনেন্টের অপ্রীতিভাজন হন। ১৮৮৬ সনের আগষ্ট মাসে তাহার promotion বা পদোন্নতির পরিবর্তে তাঁহার নিম্নস্থ কয়েকজনকে তাহার উপরে তুলিয়া দেওয়া হয়। তিনি ইহাতে আপনাকে অযথা দণ্ডিত ও অপমানিত বােধ করিয়া তৎক্ষণাৎ পদত্যাগের পত্র পাঠাইয়া দিলেন। ঠিক এই সময়ে বেথুন কলেজের Beste Lady Superintendent Miss Lipscombe fapte pf চলিয়া যান, কুমারী চন্দ্রমুখী বসু এম, এ, অস্থায়ী ভাবে Lady Superintendent নিযুক্ত হন এবং চন্দ্রমুখী বস্তুর স্থান পূর্ণ করিবার জন্য পিতৃবন্ধু দুৰ্গামােহন বাবু ও পণ্ডিত মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন, বেথুন কমিটীর এই দুই সভ্য আমাকে বিশেষ ভাবে আহবান করেন। আমি এই পদ গ্রহণে পিতৃদেবের অনুমতি প্রার্থনা করিয়া তাহাকে পত্র লিখিলাম। তিনি তখন কৃষ্ণনগরে, আমি কলিকাতায় । চিরদিন স্বচ্ছল অবস্থার মধ্যে সযত্নপালিতা কন্যাকে পাছে দারিদ্ৰকষ্ট ভােগ করিতে হয় এই ভয়ে পিতা যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার মর্ম এই :-“তােমাকে লেখা পড়া শিখাই- য়াছি, চাকরী করিয়া খাইবে বলিয়া নহে। তুমি চাকরী করিবে একথা আমার মনে করিতেও ক্লেশ হয়। কিন্তু আমি নিজে চাকরী ছাড়িয়াছি, এতকাল তােমাকে যে ভাবে রাখিয়াছি, আর সে ভাবে রাখিতে পারি, এমন সাধ্য হইবে না; তােমার কোন অভাব দেখাও কষ্টকর হইবে। কাজেই আর তোমার চাকরী করা সম্বন্ধে আপত্তি করিতে পারিতেছি । তুমি নিজের আয়ে অন্ততঃ নিজের অভাব সকল দূর করিতে পারিবে।”
৪৪ শ্রাদ্দিকী। আমি শিক্ষকতা কাৰ্য্য গ্রহণ করিলাম। এদিকে বন্ধুগণের পরামর্শে ও আমার মাতাঠাকুরাণীর অনুরােধে পিতা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিলেন। কিছুকাল পরে গবর্ণমেণ্ট তাঁহাকে তাঁহার পূর্বস্থানে উন্নীত করিয়া দিলেন। চারি বৎসর পরে ১৮৯০ সনে তাঁহার দ্বিতীয়া কন্যার দৃঢ় নিৰ্বন্ধতা, আমার ইচ্ছা এবং দুর্গামােহন বাবুর অনুমােদন এই তিন শক্তির একত্র সম্মিলনে ডাক্তারী শিক্ষা সম্বন্ধে পিতা মহাশয়ের ভয় ও কতগুলি সংশয় মন্দীভূত হয় এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি আমার ভগিনী যামিনীকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হইতে অনুমতি দান করেন। একাজের জন্য তাঁহাকে ভবিষ্যতে অনুতাপ করিতে হয় নাই। আমার অপর সহােদর প্রেমকুসুমও বি, এ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া বেথুন কলেজ, ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় ও এলাহাবাদ ] Girls' Crossthwaite Schoolএ শিক্ষকতা করেন। ‘লঙ্কাকাণ্ড’ যখন মুদ্রিত হয়, তখন রমেশচন্দ্র দত্ত, বরিশালের ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। তিনি মধ্যে মধ্যে পিতা মহাশয়ের বাসায় আসিয়া সাহিত্যাদি বিষয়ে আলাপ করিতেন এবং আমার মাতৃ ঠাকুরাণীর স্বহস্তকৃত পিষ্টকাদি পরম পরিতােষের সহিত ভােজন করিতেন। লঙ্কা কাণ্ডে ইংরাজ গবর্ণমেন্টকে বিদ্রুপ করা হইয়াছে দেখিয়া এবং উহা পিতা মহাশয়েরই রচিত এই অনুমান করিয়া, তিনি পিতা মহাশয়ের বাসায় আসিয়া তাহার সব পুস্তকের আলমারী দেখিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। পুস্তক গুলির শক্ত মলাট ছিল না বােধ হয় সেই জন্যই আলমারীতে স্থান পায় নাই। দত্ত মহাশয়ের ঐ বই একখানিও পাইলেন না, কিন্তু পরামর্শ দিয়া গেলেন যেন বইগুলি নষ্ট করিয়া ফেলা হয়। তখনকার দিনে ঐ বই প্রজা বা রাজা কোন পক্ষের অসম্ভব উৎপাদন করিত এমন মনে হয় না। উহাতে হাস্যোদ্দীপক বিদ্রুপ ছিল, বিদ্রোহভাবের উদ্দীপক কিছুই ছিল না। আমি কলিকাতায় ইহার কয়েকখণ্ড লইয়া স্বর্গীয় চণ্ডীচরণ সেন আসি, তৎকালে জনকতক রসজ্ঞ কৃতবিদ্য লােক উহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। পিতা মহাশয় পুস্তিকা খানি নষ্ট করেন নাই, প্রচার করিয়া ছিলেন, কিন্তু উহা এখন আর পাওয়া যায় না। সাময়িক ঘটনাবলীর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল বলিয়া, একালে সকলের পক্ষে উহার রসবােধ সম্ভব নহে।
No text on this page.
ট স্বর্গীয় যতীন্দ্রমোহন সেন।
No text on this page.
স্বর্গীয় যতীন্দ্রমােহন সেন ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল, বাঙ্গালা ১২৮৩ সনের ৯ই বৈশাখ তারিখে, ঢাকার অন্তর্গত মাণিকগঞ্জে যতীন্দ্রমােহনের জন্ম হয়। তৎকালে পিতা মহাশয় ঐ স্থানের মুসেফ ছিলেন। উপযুপরি আমরা তিনটা কন্যা জন্মিয়াছিলাম, এ জন্য তিনি ও মাতা ঠাকুরাণী একান্ত মনে একটী পুত্র সন্তান কামনা করিতে ছিলেন। এই সন্তানের জন্মে তাহাদের ও আমাদের আনন্দের সীমা রহিল না। এখন পর্যন্তও সেই আনন্দস্মৃতি আমার মনে উজ্জ্বল ভাবে জাগিতেছে। সে কি আনন্দ, কি উৎসব। পিতা মহাশয় স্থানীয় ভদ্রলােকদিগের গৃহে গৃহে সন্দেশাদি মিষ্ট দ্রব্য প্রেরণ করিলেন, নিকটস্থ গ্রাম সমূহে লােক প্রেরণ করিয়া শত শত দরিদ্রকে আহ্বান পূর্বক বহু যত্নে, পরিতোষ বিধানে ভােজন করাইলেন। এক প্রধান জ্যোতিষী পণ্ডিতের দ্বারা প্রাচীন প্রথানুসারে নবজাত শিশুর পঞ্চাশ হস্ত দীর্ঘ এক জন্ম পত্রিকা লিখিত হইল। হইতে শিশুর ভবিষ্যৎ মহত্ত্ব ও দীর্ঘ জীবনের কথা সূচিত ছিল। ব্রাহ্ম পদ্ধতি অনুসারে শিশুর জাতকৰ্ম্মানুষ্ঠান সম্পাদন করিবার জন্য ঢাকা হইতে ব্রাহ্মবন্ধুগণ আহত হইয়া আসিয়াছিলেন। তাঁহাদিগের সহিত একত্র উপাসনা কীৰ্ত্তন ও সদালােচনায় কিছুকাল আনন্দে অতিবাহিত হইল। ভূমিষ্ঠ হইয়া অবধি যতীন্দ্রমােহন পিতা মাতা আত্মীয়স্বজন এবং ভৃত্যবর্গের অতিশয় আদর যত্ন পাইতে লাগিলেন। মফঃস্বলে হাকিমের ছেলে হইলে যে দোষ ঘটে, যতীন্দ্রমােহনের ও তাহা ঘটিল, অর্থাৎ তাহার ৪ শ্রাদ্ধিকা। ইচ্ছা ও আবার একটু অতিরিক্ত প্রশ্রয় পাইল। এদিকে পিতামহাশয় আপনার মনের মত করিয়া তাহার ভবিষ্যৎ কল্পনা করিতে লাগিলেন, এবং কিসে সে আশানুরূপ শিক্ষালাভ করিয়া সংসারে একজন বড় লােক হইতে পারে, তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। তিনি অল্পকালে অনেক শিখাইয়া তাহাকে নানা গুণে জ্ঞানে ভূষিত দেখিতে ইচ্ছা করিতেন ; কাজেই স্বেচ্ছাপ্রবণ বালকের পক্ষে শাসন ক্রমে একটু কঠিন হইয়া উঠিতে লাগিল; উহা তাহার ভাল লাগিত না, উহাতে পড়া শুনায় মনােনিবেশ অধিক না হইয়া বরং অল্প হইতে লাগিল। আর একটা ফল এই হইল যে, পিতার প্রতি আন্তরিক ভক্তি সত্ত্বেও কাৰ্যতঃ অনেক সময়ে অবাধ্যতা প্রকাশ পাইতে লাগিল। তাহার উন্নতির জন্য পিতা মহাশয়ের চেষ্টা ও আনুকূল্য একটু কম হইলে হয়তাে তাহার নিজের চেষ্টা আর একটু অধিক হইত। সকলের ধারণা হইল যে পড়া শুনায় বালকের কিছুমাত্র অনুরাগ নাই। পরে দেখা গিয়াছে যে ইহা ঠিক নহে। জীবন চরিত ও ইতিহাস পাঠে যতীন্দ্রমােহনের যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। ইতি- হাসের কথা মুখে মুখে বালক বালিকাদিগকে বলিবার তাহার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়াছি। উচ্চাঙ্গের উপন্যাসাদি পাঠ করিয়া তাহার শিক্ষা ও সৌন্দৰ্য্য গ্রহণ করিবার ক্ষমতাও বেশ ছিল। নানা কারণে তাহার জ্ঞানানুশীলন পিতার আশানুরূপ হইতে পারে নাই। তাহার একটা কারণ এই যে বাল্যকাল হইতেই পরিবারের কতকটা ভার ও ভাবনা যেন আপনা আপনি আসিয়া তাহার স্কন্ধে পড়িয়াছিল। যে খাটিতে চায় তাহাকে সকলে খাটায় ; আমরাও তাহাকে খাটাইয়াছি; এ সম্বন্ধে আর কোন আইন নাই। আমাদের কনিষ্ঠ হইলেও বাড়ীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বলিয়া যতীন্দ্রকে, আগে পিতার অনুপস্থিতিতে এবং পরে তাহার সম্মুখে, পরিবারের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করিতে হইয়াছে। যে বয়সে বালকেরা পড়া শুনা বাদে কেবল খেলিয়া বেড়ায়; সংসারের কোন ধারই ধারে না, ;
স্বর্গীয় যতীন্দ্রমােহন সেন। সেই বয়স হইতে অতিরিক্ত আদরে বর্ধিত স্বেচ্ছাপ্রবণ এই বালক মাতা, ভগিনী ও ভ্রাতাদের জন্য আপনার সুখ সুবিধা উৎসর্গ করিতে শিখিয়াছিল। এতদ্ভিন্ন আর একটা কারণ এই যে পুস্তকগত জ্ঞান হইতে কৰ্ম্মগত জ্ঞানের দিকে তাহার আকর্ষণ অধিক ছিল। এতৎসম্পর্কে তাহার পর্যবেক্ষণ ও অভিনিবেশ যথেষ্ট ছিল ; শিক্ষা ও সাহায্য পাইলে তাহার মানসিক শক্তি সকল এই বিশেষ দিকে বিকশিত হইতে পারিত সন্দেহ নাই। সৌন্দর্য্য বােধ, সৌন্দৰ্য্য প্রিয়তা ও শিল্পানুরাগের পরিচয় তাহাতে অনেক প্রকারে পাওয়া যাইত। যাহা হউক, যতীন্দ্রমােহন বি, এ পর্যন্ত পাশ করিয়া ছিলেন। কয়েক বার বি, এল পরীক্ষার জন্য চেষ্টা করিয়াছেন কিন্তু কৃতকার্য হন নাই। পড়া শুনা হইতে বৈষয়িক কার্যে তাহার মনােনিবেশ অধিক হইত। এই বাড়ীখানি ( ৯৮ বেলতলা বােড) তাহার স্মৃতিতে পূর্ণ। ১৯২০ বৎসর বয়সে কেবল নিজের তত্ত্বাবধানে এই বাড়ী খানি তিনি নির্মাণ করাইয়া- ছেন। কত রৌদ্র তঁাহার অনাহার ও অল্পাহার ক্লিষ্ট শরীরের উপর দিয়া গিয়াছে, দিনের পর দিন মাসের পর মাস তাহাকে কি দুরন্ত পরিশ্রমই এজন্য করিতে হইয়াছে। এ গৃহের এমন একখানি ভাল আসবাব নাই যাহা যতি নিজে বাজার ঘুরিয়া ঘুরিয়া বাছিয়া কিনিয়া আনেন নাই। কেবল এ বাড়ীর জন্য ও এ পরিবারের জন্যই খাটিয়াছেন, তাহা নহে, অন্যের জন্যও যতীন্দ্র অনেক শ্রম করিয়াছেন, অনেক সময় দিয়াছেন। তাহার সাহায্য যেখানে আবশ্যক হইয়াছে তিনি দিতে কুণ্ঠিত হন নাই; বাহুল্য ভয়ে এক একটা করিয়া তাহার উল্লেখ করা গেল না। পরের চাকরী না করিয়া স্বাধীন ভাবে জীবিকা উপার্জনের ইচ্ছ। প্রবল ছিল, এই জন্য চৌরঙ্গীতে দোকান দিয়াছিলেন। এই দোকানই তাহার অকাল মৃত্যুর কারণ হইল। এই দোকান স্থায়ী ও লাভজনক করিবার জন্য দিবা রাত্রি কঠিন পরিশ্রম করিয়াছেন। বেলা ৯টার সময় এদ্ধিকী। ; ; অল্প কিছু আহার করিয়া যাইতেন, ৭টার পূর্বে ফিরিতেন না; রাত্রেও চিন্তা ও শ্রমের বিরাম ছিল না। অবিশ্রাম পরিশ্রমের ফলে শরীর ভাঙ্গিয়া আসিল, জ্বর হইতে লাগিল, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ ছিল না। জ্বর লইয়া স্নানাহার করিতেন ও নিয়ম মত দোকানে যাইতেন। মানুষের শরীরে কত সহ্য হয়, ক্রমে রােগ দৃঢ় হইল, শরীরের বল মনের শক্তি পরাজয় মানিল ; তিনি যখন আর উঠিতে পারেন না, তখন শয্যাশায়ী হইলেন। ডাক্তারেরা স্থান পরিবর্তন পরামর্শ দিলেন। কত অনিচ্ছার সহিত প্রথমবার কলিকাতা ত্যাগ করিলেন। প্রথম কিছু দিন গিরিধি, পরে ওয়ালটেয়ার ও অবশেষে নেপালে গিয়াছিলেন। ওয়ালটেয়ারে জানা গেল তাহার Pleurisy হইয়াছে। এই রােগের ক্রমিক বৃদ্ধিতে গত ফেব্রুয়ারী মাসের ১০ই তারিখ শনিবার সন্ধ্যাকালে তাহার জীবন- লীলা শেষ হইল । গত বৈশাখ মাসে মহা সমারােহে কুমিল্লা সহরে ত্রিপুরার রাজার দেওয়ান শ্ৰীযুক্ত বাবু শরচ্চন্দ্র বসু মহাশয়ের কন্যার সহিত যতীন্দ্রমােহনের বিবাহ হয়। বৎসর না ঘুরিতে নববধূ বৈধব্য প্রাপ্ত হইলেন। নূতন ঘর গড়িতে না গড়িতে ভাঙ্গিয়া পড়িল। পিতা মাতার প্রতি যতীন্দ্রমােহনের গভীর ভক্তি ছিল। তাহার বিবাহিত জীবন বেশী দিনের ছিল না, তবু বাঁচিয়া থাকিলে তিনি কিরূপ গৃহস্থ হইতেন, তাহার আভাস পাওয়া গিয়াছে। বিবাহের পূর্বে কন্যা নির্বাচন সম্বন্ধে বলিতেন, “এ গৃহের যিনি একতা রক্ষা করিতে পারিবেন এমন বধূ চাই।” বিবাহের পর ভাই ভাই পৃথক্ হয় তাহা ইচ্ছা করি । বাস্তবিক পারিবারিক বন্ধন পূর্বকালের মত অক্ষুন্ন রাখিবার চেষ্টা তাহার প্রত্যেক কাজে প্রকাশ পাইত। রােগ শয্যায় শুইয়াও নববধূকে গৃহে শান্তি ও প্রীতি রক্ষার উপায় সর্বদা বলিয়া দিতেন। বলিতেন, ..তুমি সর্বদা আত্ম-বিস্মৃতি ও নিম্বার্থতা সাধন কর। ইহাতে তােমার স্বর্গীয় যতীন্দ্রমােহন সেন যদি সুখ সুবিধা নষ্ট হয়, হউক।” “তুমি কেবল আমার জন্য খাটিয়া সুখ বােধ কর, ইহা ঠিক নহে, সকলের জন্য খাটিতে হইবে। দিবা রাত্রি খাটিয়া তুমি যদি অসুস্থ হও, তাহাও ভাল।” মাতার সেবায় পত্নীর একটু ত্রুটি হইলে বড়ই মর্মপীড়িত হইতেন। তাঁহার সুশীলা পত্নীর এ বিষয়ে যে ইচ্ছাপূৰ্ব্বক ত্রুটি হইত তাহা নহে, তাহার সেবা করিয়া অন্যের সেবায় তাহার সময়ের অভাব ঘটিত। স্বামীর জন্য ব্যস্ততাবশতঃ তিনি তাড়াতাড়ি শ্বাশুড়ীর কাজে যাইতে পারিতেন না। বােগ শয্যায় শুইয়া অনেক দিন বলিয়াছেন, “মার আহারের পর তাহাকে পান ঘেঁচিয়া দিবার কথা, আমার বােজ মনে হয়, তোমার হয় না কেন?” তিনি বৃদ্ধা মা তাকে কোন কাজে যাইতে দিতে চাহিতেন না। পুত্রবৎসলা জননী পুত্রের জন্য কিছু করিতে পারিলে সুখ বােধ করিতেন,কিন্তু পুত্র তাহাতে অস্থির হইয়া উঠিতেন। “মা, তুমি আমার জন্য রাত্রি জাগিবে তত এই আমি উঠিয়া বসিলাম।” মাতা নিরস্ত হইয়া শয্যায় যাইতেন। নিজের আসন্ন মৃত্যুর বােধ হয় আভাস পাইয়া ছিলেন, তাই পত্নীকে বলিয়া গিয়া- ছেন, “আমার মৃত্যুর পর আমার বৃদ্ধ পিতা মাতা যতদিন জীবিত থাকেন ততদিন তাঁহাদের নিকট থাকিয়া তাহাদের সেবা করিও, তাহার পরে ইচ্ছা হয় পিত্রালয়ে গিয়া থাকিও।” যতীন্দ্রমােহনের বড় “শুচিবায়ু” ছিল। সকলের হাতে খাইতে পারিতেন না, সকল স্থানে বসিতে পারিতেন না, অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্নতা দেখিলে বিরক্ত হইতেন, অথচ রােগীর সেবায় কখন ত্রুটি হয় নাই। অতিথি সেবাতে তাহার আন্তরিক অনুরাগ ছিল। এখন আমাদের মধ্যে পূর্বকালের মত অতিথি সেবা নাই বলিয়া আক্ষেপ করিতেন। বাহিরের লােকের সহিত যতীন্দ্রমােহনের ব্যবহার সৌজন্য,অমায়িকতা ও উদারতা পূর্ণ ছিল। একটি অপরিচিত ভদ্রলােকের সহিত কোন কাৰ্যানুবােধে আমার কথাবার্তা হইতেছিল; আমি কি কাজ চাই ;
৪ ব্ধিকী। তাহাকে বুঝাইয়া দিয়া পরে বলিলাম, “কাজ যাহা আমি করাইব, টাকা কড়ির কথা আমার ভ্রাতা যতীন্দ্রমােহনের সঙ্গে আপনি ঠিক করিবেন।” ভদ্রলােকটীর মুখ যেন প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, যেন অপরিচিত স্থান পরিচিত হইয়া উঠিল, বলিলেন “তাহার সহিত একদিন আমার আলাপ হইয়াছে, তিনি বড় অমায়িক ভদ্রলােক।” ন্যায়পরতা ও দো পাওন। সম্বন্ধে এমন পরিষ্কার আচরণ আমি অল্প যুবকেরই দেখিয়াছি। কাহারও এক পয়সা পাওনা থাকিলে তাহা ভূলিতেন না। নিতান্ত আপনার লােকের কাছেও যদি প্রয়ােজন বশতঃ সামান্য কিছু লইয়াছেন, তাহা আবার পরে কড়ায় ক্রান্তিতে শোধ করিয়া- ছেন; যাহাকে দিয়াছেন তিনি হয়তাে না লইতে হইলেই সুখী হইতেন, এবং লইতে সঙ্কুচিত হইয়াছেন, কিন্তু যতীন্দ্রমােহন এমন ছেলে ছিলেন যে কাহারও কাছে ঋণী থাকিবেন। বিপন্নকে সাহায্য করিবার জন্য তাঁহার হৃদয় সর্বদা প্রস্তুত ছিল। পাঠাবস্থায় এবং পরেও পিতা মাতার অজ্ঞাতসারে এবং কখনও বা তাঁহাদের অনিচ্ছায় অনেককে টাকা ধার দিয়া বিপদ মুক্ত করিয়াছেন। যতীন্দ্রের মুখের কথায় বা চিঠির ভাষায় তাহার স্নেহশীল হৃদয়ের পরিচয় কেহ পায় নাই। বরং তাহার মনে মুখে চিরদিন বিরােধ ছিল। যাহাকে বেশী ভালবাসিতেন তাহার সহিত বেশী আবদার করিতেন, কথায় কথায় অভিমান ও ক্রোধ প্রকাশ করিতেন, ইহা যে সর্বথা কৃত্রিম তাহা বুঝিতে দিতেন না। আপনাকে ভুল বুঝাইয়া যেন একটু আমােদ অনুভব করিতেন। এই জন্য প্রিয়জনকে অনেক সময় অসুখী করিয়া- ছেন এবং ফলে আপনিও অসুখী হইয়াছেন। এই একটী তাহার কটি ছিল, অন্যথা তাহার জীবন নিস্বার্থতা, বিলাসহীনতা ও পরিশ্রমশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল। যাহা কিছু করিয়াছেন পরিবারের জন্য বা অপরের শ করিয়য়াছেন। নিজে ভাল খাইব, ভাল পরিব, ভাল থাকিব, সভ্য স্বর্গীয় যতীন্দ্রমােহন সেন। সমাজে গিয়া দশজনের এক জন হইয়া বসিব, এভাৰ এক দিনের জন্যও তাহাতে দেখি নাই। এই বয়সেই সাদা ধুতি ধরিয়াছিলেন। কবে পাড় ওয়ালা ধুতি পরিতেন যেন মনেই পড়ে না। প্রার্থনাশীলতা তাহাতে ছিল। প্রতিদিন ঈশ্বর স্মরণ করিয়া উত্থান করিতেন, প্রতিদিন কৰ্ম্মস্থানে যাইবার পূর্বে প্রার্থনা করিয়া যাইতেন। পত্নীর নিকট বলিতেন, “যখনই ভাবনা চিন্তাও বিপদ আসিয়াছে, প্রার্থনা করিয়াছি, প্রার্থনার পর সকল বিপদ যেন কাটিয়া গিয়াছে।” পুৰ্বে বলিয়াছি, সৌন্দর্য্য বােধ ও সৌন্দর্যের প্রতি তাহার বিশেষ অনুরাগ ছিল। এই সৌন্দর্য্য কেবল মানুষের দেহে, প্রকৃতির মুখে, শিল্পে ও সাহিত্যেই দেখিতেন, তাহা নহে, মানব চরিত্রে এই সৌন্দৰ্য্য খুজিতেন ও পাইলে তাহার পূজা করিতেন। নেপালে থাকিতে তথাকার কোনও সম্ভ্রান্ত মহিলার গুণ কাহিনী শুনিয়া তাঁহাকে সমস্ত হৃদয়ের সহিত ভক্তি করিতে শিখিয়াছিলেন। ঘটনাক্রমে এক দিন কোনও ভদ্র লােকের নিকট তাহার গুরুতর নিন্দার কথা শুনিলেন। ইহাতে তিনি এমন মর্মা- হত হইলেন,যে তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিলেন, “আমি কেন নেপালে আসিয়া- ছিলাম? আমার ইচ্ছা হইতেছে আমি এখনই এদেশ হইতে চলিয়া যাই।” ভদ্রলােকটী অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন, “আপনার মনে এত আঘাত লাগিবে জানিলে আমি একথা আপনাকে কখনও শুনাইতাম না।” কোনও বন্ধুকে তিনি অত্যন্ত ভাল বাসিতেন এবং সর্বস্ব দিয়া বিশ্বাস করিতে পারিতেন। ঘটনাচক্রে এই বিশ্বাস ভঙ্গ হয়, ইহাতে তঁাহার সরল স্নেহপ্রবণ হৃদয়ে যে কি আঘাত লাগিয়াছিল, তাহা বর্ণনাতীত ক্রমে এই ব্যথার তীব্রতা দূর হইল, তখন ধীরভাবে তাহার আচরণের সমালােচনা করিতেন এবং জীবনসংগ্রামে পড়িয়া মানুষের নৈতিক আদর্শ খর্ব হয় বলিয়া তাহার দোষ ক্ষালন করিতেন। পরশ্রী কাতরতা তাহাতে ছিল না বলিলে যথেষ্ট হয় না, তাহার পক্ষে ।
দ্ধিক। উহা অসম্ভব ছিল। ব্যবসায়িগণের মধ্যে প্রতিযােগিতার ভাব প্রবল হইয়া পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ আনয়ন করে, একে অপরের ক্ষতি করি- বার জন্য প্রয়াস পায়। তিনি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে লক্ষ্য করিয়া বলি- তেন, “অমুকের ভাল হইলে আমার কিছু দুঃখ নাই, যাহার ভাল হয় হউক, আমার ক্ষতি না হইলেই আমার পক্ষে যথেষ্ট।” অসম্পূর্ণ জীবনের প্রায় সকলই অসম্পূর্ণ রহিয়া গিয়াছে। তাহার জীবনের সদ্গুণ সকল পূর্ণ বিকাশ লাভ করিবার যথেষ্ট অবসর পায় নাই। আশা ও আকাঙ্ক্ষা কাৰ্যে পরিস্ফুট হইতে পারে নাই। তাহার প্রাণের কতকগুলি গভীর ভাব তিনি যত্নে লুকাইয়া রাখিয়াছেন; অতি অল্পই আমরা ধরিতে পারিয়াছি। আমরা পরিবারস্থ এবং নিকটস্থ জনেরাও তাহার কৃত্রিম ক্রোধ ও অভিমানের দ্বারা প্রতারিত হইয়া, তাহার নিঃস্বার্থ নিরাসক্ত হৃদয় খানির দিকে সকল সময় চাহি নাই, তাহার সেবা লইয়াছি, পরিবর্তে সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা দিই নাই। রােগ- শয্যায় শুইয়া একদিন বলিয়াছেন, “আমার কিছুর জন্য আসক্তি নাই মরিতে আমার কোন কষ্ট হইবে না।” আমরা স্বপ্নেও জানিতাম না এত শীঘ্র তঁাহাকে হারাইতে হইবে; কিন্তু তিনি বুঝিয়াছিলেন, বুঝিয়া ভীত বা দুঃখিত হন নাই। শশাকের মধ্যে ইহা বিশেষ সান্ত্বনা। বিশ্ব- জননীর ক্রোড়ে তাহার সকল শক্তি ও সকল সদ্ব ত্তি সার্থকতা লাভ ১৮ বেলতলা রােড, কালীঘাট, কলিকাতা। ৫ই মার্চ, ১৯০৬।
স্বর্গীয়া সরযুবালা ঘােষ।
No text on this page.
সরযু বালা। শৈশব সরযুবালা রঙ্গপুরের বর্তমান জজ ঐ যুক্ত কেদারনাথ রায় ও লোক- গতা সৌদামিনী দেবীর জ্যেষ্ঠা কন্যা। ১৮৮০ খৃষ্টাব্দে ৯ই জানুয়ারী,বাকী- পুরে তাহার জন্ম হয়। তাহার শৈশব মূৰ্ত্তি যাহা মনে পড়ে, তাহা বড়ই মধুর । পিতার অতিশয় আদরের শিশু, যে কেহ কাছে ডাকে তাহারই নিকট নির্ভয়ে উপস্থিত হয়, মুখে একটু সলজ্জ হাস্য, বড় বড় উজ্জ্বল চক্ষু দুটি সরলতা ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ। আর একটু বড় হইলে পর এই বিশ্বাস ও নির্ভীকতার স্থলে তাহার চক্ষে মুখে একটু ভীরুতা প্রকাশ পাইত। ক্ষুদ্র বালিকা ঠাট্টা তামাসা বুঝিত না। কেহ তাহাকে কাপড় পরাইভে গিয়া একটি আলপিন দেখাইয়া বলিলেন, “এইটি তােমার গায়ে লাগা- ইয়া দিব।” বালিকা জিজ্ঞাসা করিল, কিরূপে লাগাইবে? উত্তরে শুনিল, নােড়া দিয়া গায়ে ঠুকিয়া দিতে হইবে। আর বিলম্ব না করিয়া বালিকা রান্না ঘর হইতে নােড়া লইয়া আসিল। সকলের অতিশয় আদরের হইলেও সরযূকে অনেক সময়ে অসাবধ-- নতার ও বিশৃঙ্খলতার জন্য মাতার নিকট তিরস্কৃত হইতে দেখা গিয়াছে। এমন আগ্রহ ও ত্রাসের সহিত মাতার আদেশ পালন করিতে যাইতেন যে, প্রায়ই হিতে বিপরীত ঘটিত। অতি সাবধানে মাতার আয়না খানি আনিতে গেলেন, ত্রাস বশতঃই সে খানি হস্তুচ্যুত হইয়া চুর্ণ শ্রাদ্ধিকী। হইল । মাতাকে সন্তুষ্ট করিবার আশায় তাড়াতাড়ি কোন কাজ করিতে গেলেন, দৌড়াইতে দৌড়াইতে এমন আছাড় খাইলেন যে, সে কাজতো হইলই না, মাতার কাজ আরও বাড়িয়া গেল। স্নেহময়ী জননী কন্যার যে বিশৃঙ্খলতা ও অসাবধানতা দেখিয়া দুঃখিত ও চিন্তিত হইতেন, বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সে ত্রুটি গুলি একেবারে দূর হইয়া তাহার স্থানে যে শৃঙ্খলা, কাৰ্যপটুতা ও সর্তকতা সরযুর চরিত্রে বিকশিত হইয়াছিল, তাহা দেখিয়া সকলেই তাহার প্রশংসা করিতেন। তাহার শৈশব ইতিহাসের আর একটা স্মরণীয় বিষয় গীত বায়ে তাঁহার রুচি। তাঁহার পিতৃবন্ধুগণ অনেকেই তাহার কোমলকণ্ঠ নিঃসৃত সঙ্গীত শুনিয়াছেন। তাহার কণ্ঠ মিষ্ট ছিল, গান গাহিতে বলিলে ওজন আপত্তি না করিয়া যেমন পারিতেন সেইরূপ গাহিয়া বন্ধুবৰ্গকে সুখী করিতেন। অতি অল্প বয়স হইতেই বাধ্যতা ও অপরকে সন্তুষ্ট করিবার চেষ্টা তাহাতে সুন্দর পরিস্ফুট হইয়াছিল। মাতৃ বিয়ােগ একাদশ বর্ষ বয়ঃক্রমকালে সরযুর মাতৃ বিয়ােগ ঘটে। এই সময় হইতেই বালিকা গৃহিণীতে দীক্ষিত হইয়াছিলেন, একথা বলিলে বড় অত্যুক্তি হয় না। এই সময় হইতেই তাহার আত্ম-নিগ্রহ ও পরসেবা শিক্ষার আরম্ভ। একটা একটী করিয়া মাতৃহীন পরিবারের প্রাত্যাহিক ঘটনা বিবৃত করিতে হইলে স্থানে কুলাইবে না। যাহার কেদারনাথ রায়ের পুত্র কন্যাদিগকে মাতৃ বিয়ােগের পর দেখিয়াছেন, তাঁহাদের মনে অনেক কথা এখনও জাগিতেছে। পত্নীর মৃত্যুর কিছুকাল পরেই রায় মহাশয়ের বহুকালের এক বিশ্বস্ত পরিচারিকার মৃত্যু হয়। ইহাতে ছােট দুইটি শিশু চারুবালা ও স্বর্গীয়া সরষবালা ঘােষ। সত্যেন্দ্রের ভার প্রধানতঃ সরযুর হাতেই পড়ে। ইহার অল্প পরে সরযূর অগ্রজদ্বয় জ্ঞানেন্দ্র ও যতীন্দ্র শিক্ষার্থ বিলাত গমন করিলে পিতা কন্যা- একে শিক্ষার জন্য বেথুন স্কুলে বাের্ডিংএ রাখিতে বাধ্য হন। এখানেও সরযু দিদির কর্তব্যে শৈথিল্য করেন নাই। পাঠ্যাবস্থা। স্কুলে অবস্থান কালে তিনি নিৰ্বিরোেধ স্বভাব, সরলতা, সত্যবাদিতা ও বাধ্যতা দ্বারা শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্ৰী সকলেরই স্নেহ আকর্ষণ করিয়া- ছিলেন। বাল্যে পড়া শুনায় তঁাহার বুদ্ধি কিম্বা স্মরণ শক্তি খুব তীক্ষ্ণ ছিল না, কিন্তু অধ্যবসায় ও পরিশ্রম এবং অল্প বয়স হইতে কৰ্ত্তব্যনিষ্ঠা অসাধারণ থাকায় তিনি যে কাজ ধরিয়াছেন, তাহা সুসম্পন্ন করিয়া ছাড়িয়াছেন। স্মৃতিশক্তি প্রখর নহে, কিছু বুঝিতে অনেক বিলম্ব ঘটে, বাল্যকালে একথা বলিয়া অনেক দুঃখ করিতেন; কিন্তু অধ্যবসায়ের ফল দর্শন করিয়া ক্রমে আপনার প্রতি তাঁহার দৃঢ় নির্ভরের ভাব সঞ্জাত ও বর্ধিত হইতে থাকে। আর বয়ােবৃদ্ধির আর বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে বুদ্ধি শক্তিও বেশ তীকুতা লাভ করে। সরযূ বেথুন স্কুলে থাকিয়া ১৮৯৭ সনে এনট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হইলেন। তিনি এফ, এ, পড়িবেন এই সঙ্কল্প করিয়া- ছিলেন, কিন্তু সেই বৎসর মার্চ মাসের শেষভাগ হইতে তাহার তৃতীয় ভাতা যােগেন্দ্রনাথ ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন; তজ্জন্য গ্রীষ্ম অবকা-- শের পর হইতে আগষ্ট মাস পর্যন্ত তিনি বেথুন স্কুলে ডেস্কলার ( day scholar ) থাকেন এবং তৎপরে প্রায় দুই বৎসর কাল ভ্রাতার সেবায় নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে পড়া শুনার চিন্তা একেবারে পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হন। কিছুকাল পড়া শুনা ছাড়িয়া দিলে অনেকেরই পাঠাদিতে এমন দ্ধিকী। = অনভ্যাস ও অরুচি জন্মিয়া যায় যে, আর তাহারা নিয়মিত অধ্যয়নাদিতে মনােনিবেশ করিতে পারে না। সরযুর সেইরূপ ঘটে নাই। তিনি ৯৭ সনে এনট্রান্স দিয়া প্রায় তিন বৎসর পরে আবার এফ, এ, দিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন, এমন সময় তাহার বিবাহ ও বিলাত গমন ঘটে। যখন পুনরায় পড়া আরম্ভ করেন, তখন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইবার যথেষ্ট সময় ছিল না; কেহ জিজ্ঞাসা করিলেন, “পারিবেতাে?” বলিলেন, “পড়িলেই পারিব।” এই প্রসঙ্গে তাহার জ্ঞান পিপাসার আর একটু পরিচয় দিতে হইবে। বিলাতে গিয়া তিনি নিউনহাম কলেজে (New) ham College) পড়িবেন বলিয়া তথাকার প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়াছি- লেন। কিন্তু তৎপূৰ্বে স্বাস্থ্য ভঙ্গ হওয়াতে ভালরূপ পড়তে পারেন নাই এবং সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ হন নাই। নূতন কিছু শিক্ষা লাভ হইল না, অতএব বিলাতযাত্র। মিথ্যা হইল, এই চিন্তা তাহাকে বড়ই কষ্ট দিত। তিনি সঙ্কল্প করিয়া গিয়াছিলেন, কিছু শিখিয়া আসিবেন। কি শিখিয়া আসিয়াছিলেন,পরে প্রকাশ পাইবে। বিলাত হইতে আসিয়া বলিয়াছেন, *এখনও যদি কলেজে গিয়া পড়িতে পারিতাম তাে পড়িতাম। বেশী পড়িলে কিছুই ভাল বুঝা যায় না। লােকে বলে, সাহিত্য লইয়া থাক। সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ করিতেও উচ্চ শিক্ষার প্রয়ােজন।” সরযু জ্ঞানের জন্য জ্ঞান খুজিতেন, উহাকে অন্য কোন উদ্দেশ্যের উপায় করেন নাই, কাজেই বিবাহের পর তিনি জ্ঞান লাভের জন্য বিশেষ ব্যাকুলতা প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। সরযু সাধারণব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্গত নীতিবিদ্যালয়ের এক জন পুরাতন ছাত্রী। নীতি বিদ্যালয়ের পূর্বতন শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীগণ তাহার সুস্বভাবের সাক্ষ্য দিবেন। নীতি বিদ্যালয়ে যে দিন নীতি বিষয়ক যে আখ্যায়িকা শুনিয়া আসিয়াছেন, তাহা স্কুলে অথবা গৃহে আসিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তঁাহার সে খাতাখানি আজিও খুজিলে পাওয়া স্বর্গীয় সরযূবালা ঘােষ যায়। কি বাজনায়, কি সঙ্গীতে, কি জ্ঞান-বিষয়ক, কি নীতি-বিষয়ক শিক্ষায় এমন আগ্রহ ও উন্মুখত সচরাচর দৃষ্ট হয় না। ভাল কথা শুনা এবং পক্ষীর ন্যায় সে গুলি আবৃত্তি করা, কিছু কঠিন কাজ নহে, কিন্তু যে টুকু শিক্ষা পাওয়া যায়, সেটুকু জীবনে আয়ত্ত করাই সাধনা সাপেক্ষ। সরযু যখন যে উপদেশ পাইয়াছেন, তাহা মনে রাখিয়া নীরবে তাহা কাৰ্য্যে পরিণত করিতে সর্বদা প্রয়াস পাইতেন। ভ্রাতৃসেবা এনট্রান্স পরীক্ষা দিয়া সরযু তাঁহার পিতার কর্ম স্থান পাবনাতে আসিয়াছিলেন। ইহার আড়াই বৎসর পূর্বে তাহার পিতা পুনরায় দার পরিগ্রহ করিয়াছিলেন, সুতরাং গৃহ কর্ম কিম্বা অন্য কোন কর্মে ব্যস্ত হইবার তাহার বিশেষ প্রয়ােজন ছিল না। তিনি ইচ্ছা করিয়াই গৃহ কৰ্ম্মে এবং নবজাত ভগিনীর পরিচর্যায় সাহায্য করিতেন। যিনি সরযূ ও তাঁহার ভাই ভগিনীদের মাতৃপদে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, তিনি সরযূর সরলতা ও সদ্ব্যবহারে একান্ত মুগ্ধ ছিলেন। বস্তুতঃ সরযূর প্রতি তাহার এতাহার প্রতি সরযুর চিরদিনই অকৃত্রিম সম্ভাব ও ভালবাসা ছিল । ১৮৯৭ সনের মার্চ মাসের শেষ ভাগে যােগেন পীড়িত হইল। সন্তান বৎসল পিতা পুত্রকে হঠাৎ কঠিন রােগে আক্রান্ত দেখিয়া নিতান্ত অস্থির হইয়া পড়িলেন। পাবনায় নানাপ্রকার চিকিৎসায় কোন ফল হইতেছে না দেখিয়া, কলিকাতার সুবিজ্ঞ চিকিৎসকদিগের দ্বারা চিকিৎসা করাইতে সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু তিনি কৰ্ম্ম বা কর্ম স্থান ছাড়িয়া যাইতে অসমর্থ, সমুদয় পরিবার কলিকাতায় রাখা বহুব্যয়সাধ্য, কাহার উপর প্রাণাধিক রুগ্ন পুত্রের ভার দিয়া তাহাকে কলিকাতায় রাখিবেন ভাবিয়া ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। কোন আত্মীয় এতৎ শ্রাদ্ধিকী। সম্পর্কে লিখিয়াছেন, “আমরা জানিতাম, মাতাই সন্তান স্নেহে উন্মাদিনী, কিন্তু এ গৃহে পিতা সন্তান বাৎসল্যে আত্মহারা।” কথাটিতে একটুও অত্যুক্তি নাই। তিনি সন্তানবাৎসল্যে আত্মহারা, কেবল তাহাই নহে, যে তাহার রুগ্ন সন্তানের সেবার ভার গ্রহণ করিবে সেও সম্পূর্ণ আত্মহারা হউক, তিনি এরূপ ইচ্ছা করিতেন। অনির্দিষ্ট ও অনিয়মিত খাটুনির উপর তাহার বিশ্বাস আদৌ নাই। অনন্য কৰ্ম্মা, অনন্য চিন্ত হইয়া কেহ যােগেনকে লইয়া থাকিতে প্রস্তুত না হইলে, তাহার মন প্রবােধ মানে না। এই অবস্থায় সরযূ যােগেনের ভার লইয়া কলিকাতা যাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার পড়া শুনার ক্ষতি হবে না?” সরযূ বলিলেন, “যােগেনের চেয়ে কি পড়া শুনা বেশী ?” কলিকাতা মাতামহের গৃহে অবস্থান কালে যােগেনের সেবায় সরযুর সমস্ত সময় নিয়ােগ করিবার আবশ্যকতা না হওয়াতে, তিনি কিছু দিন দৈনিক ছাত্রী (day scholar) রূপে কলেজে পড়িতেছিলেন,কিন্তু ডাক্তার- গণ যােগেনকে কিছু দিন মধুপুরে রাখিতে পরামর্শ দেওয়ায় সরযূ সেপ্টে- স্বর মাসে মাতার সহিত যােগেন ও তৎকনিষ্ঠ ভাই ভগিনীদিগকে লইয়া মধুপুর যাত্রা করেন। এখানে যােগেনের সেবা-শুশ্রুষার ভার তিনিই প্রধানতঃ বহন করিতে লাগিলেন। তিনি প্রত্যহ রােগীর অবস্থা লিপিবদ্ধ করিতেন, স্বহস্তে নির্দিষ্ট সময়ে ঔষধ পথ্য বিধান করিতেন এবং রােগীকে সঙ্গে লইয়া দুই বেলা বেড়াইতে বাহির হইতেন। দ্বিপ্রহরে রােগীর পক্ষে নিদ্রা নিষিদ্ধ ছিল, তখন তাহাকে লইয়া খেলা করিতেন। ইহার ভিতরে ভিতরে শিশু ভগিনীকে লইয়া আমােদ করিতেও যথেষ্ট অবসর হইত। যাহারা বাড়ীতে আসিত, তাহাদের সহিত ভদ্রতা করিতে ত্রুটি হইত না। অসুস্থ মাতা পদ ব্ৰজে চলিতে সক্ষম ছিলেন না। যে সকল মহিলা তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন, ভদ্রতার নিয়ম রক্ষার জন্য স্বর্গীয়া সরযুবালা ঘোষ। সরষু ছােট ভাই বােনকে লইয়া তাঁহাদের সহিত প্রতি সাক্ষাৎকার করিয়া আসিতেন। অথচ যে বিশেষ কৰ্তব্য ভার পিতার নিকট গ্রহণ করিয়া- ছিলেন, সে ভার যাহাতে সম্যক্ পালন করিতে পারেন,যাহাতে শুশ্রুষাতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি, অনবধানতা বা শৈথিল্য না হয়, সে বিষয়ে সর্বদা সাবধান থাকিতেন। সরযূ কর্তব্য পরায়ণা এবং অভিমানিনী ছিলেন, তাই যাহা করিতেন তাহা নিখুত করিতে চেষ্টা করিতেন। মধুপুরে তিন মাস অব- স্থানের পরও রােগের উপশম না দেখিয়া,ডাক্তারগণ যােগেনকে এক মাস সমুদ্রে রাখিবার জন্য পরামর্শ দিলেন। বাবু কেদারনাথ রায় পণ করিয়াছি- লেন, চিকিৎসার জুটিতে যােগেনকে মরিতে দিবেন না। তিনি তাহাকে সমুদ্র-যানে কলম্বাে পাঠাইতে কৃতসংকল্প হইলেন, কিন্তু নিজে সঙ্গে যাইতে অক্ষম, কি করেন ভাবিতে লাগিলেন। এই সময়ে সর সঙ্গে যাইবার জন্য প্রার্থনা জানাইলেন এবং সরযূই সৰ্ব্বথা উপযুক্ত শুশ্রুষাকারিণী ও সঙ্গিনী সাব্যস্ত হইলেন। সঙ্গে একজন নিকট আত্মীয় বালকবালিকার অভিভাবকরূপে চলিলেন। জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া যােগেনের অবস্থা শঙ্কটজনক হইল। সে সময়ের কথা সেই আত্মীয় ব্যক্তির ভাষায় নিম্নে প্রদত্ত হইল। “জাহাজে এবং কলম্বাে নগরে অবস্থান কালে সরযু সকল শ্রেণীর লােককে অতি মধুর ব্যবহারে আপ্যায়িত করিয়াছিলেন। নানা শ্রেণীর লােকের সহিত পরিচিত হইয়াছেন, অথচ সৰ্ব্বত্র আত্মমর্যাদা এবং সম্মান রক্ষা করিতে সক্ষম হইয়াছেন। মাতার অভাবে পিতার দ্বারা এরূপ সুশিক্ষা, অতি অল্প কন্যার ভাগ্যেই হইয়া থাকে। যে দিন কলম্বাের ইয়ােরােপীয় হােটেলে যােগেনের জীবন সংশয় উপস্থিত হয়, সেই অবস্থায় সেই হােটেল হইতে বহিষ্কৃত হইয়া আমরা কলম্বাের জেনারেল হাস্পাতালে আশ্রয় লই; সেই দিনকার সহিষ্ণুতা, ধৈৰ্য্য এবং সাহস বাস্তবিকই আঠার বৎসরের বালিকার পক্ষে অতুলনীয়। সেই বিষম অবস্থার কথা শ্রাদ্ধিকী। মনে করিতে এখনও প্রাণ আতঙ্কিত হয়। এক্ষেত্রে সরযূকে মূর্তিমতী নির্ভীকতা ও সহিষ্ণুতারূপে দেখিয়াছিলাম। “কলম্বাে অবস্থানকালে অনেকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়, তন্মধ্যে তথাকার সিভিলিয়ান, রেজিষ্ট্রার জেনারেল মিঃ অরুনাচল এবং তাহার পত্মী, বৌদ্ধ অনাথাশ্রম ও বৌদ্ধ বালিকা বােডিং স্কুলের তত্ত্বাব- ধায়িকা মিসেস হিলিংস এবং মিলিটারী ডাক্তারের বিধবা পত্মী মিসেস বীটি ও টেকনিকাল স্কুলের সুপারিন্টেন্টের পত্মী মিসেস হিউম্যান, বৌদ্ধধর্ম প্রচারক মাননীয় ধৰ্ম্মপাল এবং তাহার মাতা ও ভগিনীর অকৃত্রিম স্নেহ সরযু লাভ করিয়াছিলেন। চিদাদােলাম ভ্রাতৃদ্বয় এবং পিটার ডি আৰু ও মিঃ চণ্ডীরাম সরযূকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিতেন।” জেনারেল হাস্পাতালে দুইটি শুক্ৰষাকারিণী রােগীর সেবার জন্য নিযুক্ত ছিলেন। তাহা দেখিয়া সরযূর অভিলাষ হইয়াছিল যে, রােগীর সেবায় জীবনপাত করিবেন। কলম্বাে বাসকালে সরযু প্রতি সপ্তাহে একবার পত্র ও দুইবার তার যােগে ব্যাকুল পিতাকে যােগেনের সংবাদ জানাইতেন। পত্র লিখিবার সময় তাহাকে অনেক বুদ্ধি খাটাইতে হইত। তাঁহার পিতা অল্পেই অস্থির হইয়া পড়েন, বিদেশ হইতে প্রত্যেক খুটি নাটি লিখিয়া তাহাকে অস্থির করিয়া লাভ নাই, যথেষ্ট বিপদেরই সম্ভাবনা আছে, ইহা বুঝিয়া তিনি পত্রের ভাব ও ভাষাতে যথেষ্ট সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করিতেন। অবস্থানুসারে যাহা কৰ্তব্য, সকলই অবিলম্বে করিতেন ও করাইতেন, কিন্তু নিজের কাৰ্য দ | বা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় কাহারও নিকট দিতে ব্যস্ত হইতেন না। অনেক কথা গােপন রাখিতেন, সে সকল পরে প্রকাশ পাইত। এমন কি, যে আত্মীয় ব্যক্তিকে অভিভাবকরূপে সঙ্গে পাঠান হইয়াছিল, তিনি অনেক সময় ভীত হইয়া নানাপ্রকার ভয়ের কারণ দেখাইতেন, কিন্তু তাহার পরে স্বর্গীয়া সরযূবালা ঘােষ আবার লিখিতেন যে সরযু সুবুদ্ধি এবং সৎসাহসের সহিত কাৰ্য্য করিয়া তাহাকে ও সাহসিক করিয়া তুলিয়াছেন। এক মাসের জন্য যাইয়া প্রায় তিন মাস কাটিয়া গেল। আশার প্ররােচনায় পিতা তাহাদিগকে আরও কিছুকাল কলম্বাে রাখিতে ইচ্ছুক হইলেন। তাহার হাসপাতাল ছাড়িয়া আসিয়া, সমুদ্রের ধারে একখানি বাড়ী করিয়া রহিলেন, সরষু গৃহিণীপণা করিতে লাগিলেন। গৃহিণীর কার্যে সরযু সুদক্ষ ছিলেন। এই বিদেশেও চাকর খাটাইতে, আহারা- দির বন্দোবস্ত করিতেও রুগ্নের পথ্য দিতে কোন দিন কোন ত্রুটি হয় নাই, কোন অসুবিধা বা বিশৃঙ্খলা ঘটে নাই। মাঝে মাঝে অতিথি সেবাও হইয়াছে। সমুদ্রের বাতাসে সাত মাস থাকিয়াও বােগ সারিল । ইতিমধ্যে কৃতান্ত অতর্কিত পদে কেদারনাথ রায়ের গৃহে প্রবেশ করিয়া তাহার প্রথম পক্ষের কনিষ্ঠা কন্যা অতি আদরের ধন চারু বালাকে হরণ করিয়া লইল। সরযু মায়ের মত যত্নে আশৈশব চারুর তত্ত্বাবধান করিয়াছেন, বিদেশে অকস্মাৎ তাহার মৃত্যু সংবাদ পাইয়া অত্যন্ত আঘাত পাইলেন সন্দেহ নাই; কিন্তু এই বেদনা অতি নীরবে বহন করিয়া, অতি ধীর ভাবে যােগেনের সেবা কাৰ্যে রত রহিলেন। এক ঘণ্টার জন্যও যােগেনের কলম্বাে প্রবাস কালে তাহার অনেক বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা জন্মিয়া ছিল, লােক চরিত্র অনেকটা বুঝিতে শিখিয়াছিলেন। তাঁহার পত্রাদি পড়িয়া এবং দেশে ফিরিলে প ভ্রাতার সেবা কাৰ্যে তাহার শি: +, কোন ব্যাঘাত জন্মিয়াছে মনে করা সম্পূর্ণ ভূল। প্রকৃত শিক্ষার্থী জ্ঞান আহরণে সমর্থ হয়। “পুথি গত বিদ্যা” সাঙ্গ করিয়া এই জন্য পাশ্চা51 প্রদেশে লােকে দেশ পৰ্য্যটনে বহির্গত হয়। যােগেনের পীড়ার উপশম না হওয়াতে তত্ৰত্য ডাক্তার সাহেটে । জন কম .. ৬, * ৩ শ্রাদ্ধিকী। উপদেশ মত সরযু ভ্রাতাকে লইয়া দেশে প্রত্যাগমন করিলেন। এখানে আসিয়াও সেই নিরন্তর শুশ্রুষা চলিতে লাগিল। নবেম্বর মাসে সমুদয় পরিবার যােগেনকে লইয়া আবার মধুপুরে গেলেন। দুই মাস তথায় থাকিয়া সরযুর পিতার কর্মস্থল বাঁকুড়ায় আসিলেন। বােগ যত পুরাতন হইতে লাগিল, সেবা কাৰ্য্য তত কঠিন হইয়া আসিল। পিতার একমাত্র চিন্তা যােগেন, সরযূর একমাত্র ব্রত ডাক্তার কবিরাজের নির্দেশ অনুসারে ঔষধ পথ্য দিয়া এবং নানা উপায়ে তাহার রােগ কষ্ট প্রশমিত করিয়া, নির্বাণোন্মুখ জীবন প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত রাখা। কনিষ্ঠা ভগিনী প্রিয়বালা এবং বিলাত প্রত্যাগত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জ্ঞানেন্দ্র নাথ রাত্রি জাগরণাদি কাৰ্য্যে সাহায্য করিতেন। কিন্তু পিতার নিকট সকল বিষয়ে তিনিই দায়ী ছিলেন বলিয়া,অন্যকে দিয়া বেশী কিছু করাইতে চাহি-- তেন না; পিতাও আর কাহাকেও রুয়ের ভার দিয়া তত নিশ্চিন্ত বােধ করিতেন না। ১৮৯৯ সনের ১৯এ জুলাই, যােগেন দিদিকে দীর্ঘ বিশ্রাম দিয়া, পিতার সকল আশা ও চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া, চতুর্দশ বর্ষ বয়ম কালে ভবলীলা সাঙ্গ করেন। সরযু মাতার ন্যায় ধৈৰ্য্য ধরিয়া, ছায়ার ন্যায় সঙ্গে সঙ্গে থাকিয়া এতকাল যাহার পরিচর্যা করিয়াছেন, তাহার বিয়ােগ দুঃখ অতি ধীর ভাবে বহন করিলেন । বিবাহের ও বিলাত যাত্রার উদ্যোগ। নভেল নাটক পড়িয়া অনেক বালিকা অল্প বয়সে অত্যন্ত পাকিয়া যায়। বাল্যকালে সরযু শিক্ষক বা অভিভাবক দিগের মত না জানিয়া কোন বই পড়িতেন না, এবং কোন দিন সমবয়স্কা দিগের সহিত বেশী মিশিতেন না, সুতরাং কুরুচি পূর্ণ আলাপাদিতেও যােগ দিতেন না। সেই জন্যই সংসারের অনেক বিষয়ে তিনি শিশুর ন্যায় অনভিজ্ঞ এবং নির্দোষ ছিলেন। বিবাহের কথা অনেককাল তাহার মনে স্থান পায় নাই।
স্বর্গীয়া সরযূবালা যােব । তাহার সপ্তদশ বৎসর অতিক্রমের পর কোন যুবক তাহার পাণি প্রার্থী হইয়া তাঁহার পিতার নিকট তাহার বিবাহের প্রস্তাব করেন। সরযু সে কথা শুনিয়া তাহাকে বলিয়াছিলেন, “আমি পড়াশুনা করিতেছি, আপনিও করুন, আমাদের বিবাহের সময় হয় নাই। কয়েক বৎসর পরে এবিষয়ে বিবেচনা করা যাইবে।” তখনও যুবক উপার্জনক্ষম ছিলেন না, এবং পাঠ্যাবস্থা সম্পূর্ণ শেষ করেন নাই। ভ্রাতার পীড়া বশত: একদিকে পড়া শুনা, অন্য দিকে বিবাহের প্রস্তাব উভয়ই স্তগিত থাকে। আর একটা কারণে সেই অল্প বয়সেই বুদ্ধিমতী বালিকা বিবাহ করিবেন কি না, সে বিষয়ে সংশয়া কুল ছিলেন। সেটি তাঁহার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য। তাঁহার শরীরে কোন রােগ না থাকিলেও, অনেকে মনে করিত এবং তিনি নিজেও ভয় করিতেন যে, হয়ত বা তিনি জননীর রােগের উত্তরা- ধিকারিণী হইবেন। পিতার নিকট পত্রে লিখিয়াছেন, “আমার যেরূপ স্বাস্থ্য তাহাতে আমার বিবাহ করা উচিত হইবে কি না বুঝিতে পারিতেছি না।” যােগনের মৃত্যুর পর তিনি আবার জ্ঞানার্জন এবং পিতা মাতা ভাইভগিনীর সেবা জীবনের লক্ষ্য করিলেন। মনে মনে স্থির করি- লেন, এফ, এ, পরীক্ষা দিয়া পরে মেডিকাল কলেজে গিয়া ডাক্তারি শিখি- বেন। তিনি স্থির চিত্তে আবার এফ, এ, পরীক্ষা দিবেন বলিয়া অধ্যয়- নাদিতে নিযুক্ত হইলেন বটে, কিন্তু তাঁহার পিতার মন সুস্থির হইল না; তিনি সর্বস্ব পণ করিয়া কন্যার জন্য একটা সৎপাত্র আহরণে উদ্যোগী হই- লেন। তাহার নিমন্ত্রণে লক্ষৌ বাসী স্বর্গীয় গােপালচন্দ্র ঘােষের পুত্র,বিলাত প্রত্যাগত তদানীন্তন সিটি কলেজের অন্যতম অধ্যাপক, শ্ৰযুক্ত বিমলচন্দ্র ঘােষ ১৯০০ সনের পূজার ছুটীর শেষভাগে বাঁকুড়ায় আগমন করেন। ইনি পূর্বেই সরযূর সম্বন্ধে অনেক কথা শুনিয়াছিলেন, নিকটে আসিয়া তাহার গুণগ্রাম দর্শনে একেবারে মুগ্ধ হইয়া গেলেন। সপ্তাহ পরেই আবার তিনি বাঁকুড়ায় আসিলেন এবং সরযুর নিকট বিবাহ প্রস্তাব উপস্থিত শ্রাদ্ধিকী। করিলেন। সরফুর মন তখন বিবাহের জন্য প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু মেহময় পিতার এবং বিবাহার্থী যুবকের নির্বন্ধাতিশয়হেতু তাঁহাদের ইচ্ছায় মত প্রদান করিলেন। বিমলচন্দ্র নিজে অধ্যাপনা কার্যে নিযুক্ত থাকিয়া আবার চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়ন করিতে ছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুত হইলেন সরযুর অধ্যয়নাদি ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রতি বন্ধক হওয়া দূরে থাকুক, সাধ্যমত সাহায্য করিবেন। ভালবাসার সহিত জ্ঞানার্জনে স্বাধীনতা ও সেবাব্রতে সাহায্য লাভের আশা সামান্য আকর্ষণ নহে। এই প্রসঙ্গে সরলা, পবিত্র হৃদয়া সরযূর সম্বন্ধে আর একটি কথা বলা আবশ্যক। বিমলচন্দ্র বিবাহের প্রস্তাব করিবা মাত্র তিনি তাঁহাকে দুইটী কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। আপনি জানেন, কি রােগে আমার মাতার মৃত্যু হইয়াছে ? আপনি জানেন আর এক ব্যক্তির সহিত আমার বিবাহের সম্বন্ধ হইয়াছিল ? এই দুই বিষয় যুবক সবিশেষ পরিজ্ঞাত আছেন, একথা জানিয়া তবে তাঁহার অপর কথা শুনিতে স্বীকৃত হইলেন। এখানে আরও একটা কথা উল্লেখ যােগ্য। বিমল চন্দ্রের দ্বিতীয়বার আগমনের দুই তিন দিন পূৰ্বেই শ্রীযুক্ত কেদারনাথ রায়ের গৃহে একটা অতি শােকাবহ ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের কনিষ্ঠা কন্যাটী চিকিৎসকের অজ্ঞতায়, Deptheria রােগে এক সপ্তাহ ভুগিয়া প্রাণ হারায়। সরযু বালা অনুজা প্রিয়বালার সহিত শেষ দিনে শিশুর সেই ভীষণ রােগের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সাক্ষী থাকিয়', তাহার শুশ্রুষায় নিযুক্ত ছিলেন। সন্তানের আকস্মিক ও ভয়ানক মৃত্যুতে জননীর হৃদয় শশাকে পরিপূর্ণ, তিনি সর্বান্তঃকরণে সরযুর কল্যাণাকাজিনী হইলেও এই সময়ে কোন আনন্দ কোলাহলে যােগদান করা তাহার পক্ষে অস্বভাবিক ও অসম্ভব । সরযুর পিতা সরযুর ভবিষ্য সুখ চিন্তা করিয়া এই সময়ে কন্যার বিবাহ দেওয়া নিজের কর্তব্য বিবেচনা করিলেন, কিন্তু সরয নিজে মাতার কথা ভাবিয়া স্বর্গীয়া সরযুবালা ঘােষ। ১ বিবাহের প্রস্তাবে কাণ দিতে সঙ্কোচ বােধ করিতেছিলেন। তিনি পিতাকে বলিয়াছিলেন, “মার তাে এই অবস্থা, এখন এসব ব্যাপার কেন?” বর বিলাত গিয়া চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়ন করিবেন, এইরূপ প্রস্তাব করিয়া ছিলেন। ইণ্ডিয়ান মেডিকেল সাব্বিসে প্রবেশ করিতে হইলে বিমলচন্দ্রের আর কাল বিলম্ব না করিয়া, এক মাসের মধ্যেই বিলাত যাওয়া আবশ্যক, এই কারণে, যত শীঘ্র সম্ভব কেদারনাথ রায় বিবাহ দিয়া কন্যা ও জামাতাকে বিলাত পাঠাইতে প্রস্তত হইলেন। তিনি কন্যার বিবাহের এবং বিলাত বাসের যােগ্য বস্ত্রাদি তৈয়ারি ও অন্যান্য সকল আয়ােজন করিবার জন্য কলিকাতা যাইবেন স্থির করিলেন। সরযু তাহাকে বলিলেন, “বাবা, এখন মাকে ফেলিয়া তােমার কোথাও যাওয়া উচিত নহে, তুমি এখানে থাক, আমিই কলিকাতা গিয়া সব করাইতেছি।” পবিত্র হৃদয়া বালিকা নিঃসঙ্কোচে আপনার বিবাহের উদ্যোগ করিতে কলিকাতা গেলেন! প্রসঙ্গ ক্রমে আর একটা কথা বলিতে হইল। সরযুর ও তাহার বরের বিলাত যাইতে এবং তথায় থাকিতে অনেক অর্থব্যয় হইবে মনে করিয়া, সরযূ বিলাত যাইবার প্রস্তাবে প্রথমতঃ কিছুতেই স্বীকৃত হন নাই। তিনি মনে করিতেন ইহাতে তাহার বিমাতার ও শিশু ভাই ভগিনী গুলির প্রতি পিতার কর্তব্যের ত্রুটি হইবে। বিমাতা ও বৈমাত্রেয় ভাই ভগিনীর প্রতি এই সুবিচার ও নিঃস্বার্থ ভালবাসার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। যখন তঁাহার বর বলিলেন যে এই অর্থ তিনি ঋণস্বরূপ গ্রহণ করিতেছেন, কেবল তখনি সংশয়াকুল চিত্তে বিলাত যাইতে প্রস্তুত হইলেন। বিমাতার সহিত সরযুর ব্যবহার সবিস্তার লিখিবার অবসর নাই। তাঁহাদের মধ্যে যে এত সদ্ভাব ছিল, তাহা সরযুর গুণেই সম্ভব হইয়াছিল। পাছে মার মনে একটু আঘাত লাগে, এই আশঙ্কায় কি স্কুলে অবস্থান কালে, কি কলম্বো থাকিতে, কি বিলাত হইতে, কি রােগের অবস্থায় १२ শ্ৰান্ধি কী। •• দার্জিলিং হইতে, তিনি পিতাকে যেমন নিয়মিত পত্র লিখিতেন, মাতাকে ও সেইরূপ লিখিতেন ; কোন বার অবসর অভাবে লিখিতে না পারিলে পিতার পত্রে বিশেষ করিয়া সে বিষয় উল্লেখ করিতেন। কখনও লিখিতেন, “এই চিঠি মাকে দেখাইবে।” কোমল প্রাণ না হইলে পরের ব্যথা এত কে ভাবে ? নিজের সম্বন্ধে কোন কথা ইচ্ছা পূর্বক মাতার নিকট কখনও গােপন করেন নাই, পরের নিষেধ না থাকিলে বা পরের ক্ষতির সম্ভবনা না থাকিলে, সকল কথা খুলিয়া বলিতেন। তাঁহার মাতা তাহার এই সরলতায় তাহার নিকট বিক্রীত ছিলেন। অনেক বিষয় তাঁহাদের রুচিও ভাবের ঐক্য ছিল ; উভয়েই বাহ্যিক সৌজন্য হইতে আন্তরিক সদ্ভাব ও সরলতার পক্ষপাতী ছিলেন। সেই জন্য তাঁহাদের মধ্যে কোন দিন মনােমালিন্য ঘটে নাই; একে অপরকে বুঝিতে ক্ষণেকের ভুল হইলে পরক্ষণেই সে ভুলের অপনােদন হইত। পিতার প্রতি সরযুর অসাধারণ ভক্তির কথা না বলিলে কথাই ঠিক বলা হয় না। সরযূকে পিতা যেমন প্রাণাপেক্ষা অধিক স্নেহ করিতেন, সরযু ও পিতার জন্য তেমনি অকাতরে প্রাণ দিতে পারিতেন। পিতাকে অসুখী দেখিলে সরযুর প্রাণে সুখ থাকিত না। পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা সরযূর পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব ছিল। তাঁহার সকল চিন্তা সকল চেষ্টার উপরে ছিল পিতাকে সুখী করিবার চেষ্টা। বাঁকুড়া সহরে ১৯০০ সনের ২৩ শে ডিসেম্বর, মহা সমারােহে সরযূর বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হইল। সরযুর পিতার বন্ধুবান্ধবগণের অনেকেই সরযুর গুণগ্রাহী ছিলেন ; বহু লোকের স্নেহাশীৰ্বাদ লইয়া তিনি নৃতন পথের পথিক হইলেন। সরযু সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের ক্রোড়ে আজন্ম বৰ্দ্ধিত, বিমলচন্দ্র নববিধানসমাজভুক্ত । সরযু বিবাহের আপনার মত ও বিশ্বাস, ও পুরাতন শিক্ষক ও আত্মীয় গণকে অস্বীকার করিতে প্রস্তুত ছিলেন না। শুভানুষ্ঠানে উভয় সমাজের লােকেই সরযুর কোনও ;
স্বর্গীয়া সরযূবালা ঘােষ। ৭৩ নিমন্ত্রিত হইয়া আসিয়াছিলেন। তার ইচ্ছা এবং অনুরােধ বশতই তাঁহার পিতা উভয় দিকেরই প্রচারক দিয়া বিবাহের পৌরােহিত্য কাৰ্য্য করাইয়াছিলেন। ধৰ্ম্মাভিমান, অনুদারতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ক্ষণে- কের জন্য বিবাহ সভার শান্তি ও সৌন্দৰ্য্য কিয়ৎ পরিমাণে নষ্ট করিয়াছিল বটে, কিন্তু কন্যার মনের বল কিছুতে নষ্ট করিতে পারে নাই। বিলাত বাস বিবাহের কয়েক দিন পরে ২৯শে তারিখ বর কন্যা বিলাত যাত্ৰা করি লেন। বিলাত গিয়া সরযু যাহার সহিত পরিচিত হইয়াছেন, কি ভারত- বাসী কি ইংরাজ, সকলেই শ্রদ্ধা লাভ করিয়াছেন। তিনি দেশে ফিরিলে পরও সিবিলিয়ান মিঃ ঘরপুরিয়া, পণ্ডিতবর মিঃ পরঞ্জপপ্য প্রভৃতি এবং কয়েকটি ইংরাজ মহিলা মাঝে মাঝে পত্র লিখিয়া তাঁহার সংবাদ লইতেন। পত্নীকে সর্বত্র আদৃতা ও প্রশংসিতা দেখিয়া স্বামীর আনন্দের সীমা রহিল না। लिनि সরযুর পিতাকে এতৎসঙ্গে লিখিলেন I am proud of my wife”। নবদম্পতি কেম্বি জে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন। চিকিৎসা ও শুশ্রুষা বিদ্যা শিক্ষা করিবার ইচ্ছায় সরযূ বিলাত গমন করেন, কিন্তু বিলাত যাত্রার কয়েক মাস পরেই তাহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হয়। এ কথাও, পিতা চিন্তিত হইবেন বলিয়া, পিতার নিকট কিছুকাল গােপন রাখেন। জুন মাসে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য সমুদ্র তীরস্থ Torquay নামক স্থানে গিয়া কিছু দিন বাস করিয়া লণ্ডনে প্রত্যাবর্তন করেন। তথায় তাঁহার পিতার ইচ্ছানুসারে তাঁহার স্বামী তাঁহাকে সার রিচার্ড ডগলাস পাওয়েলের নিকট লইয়া যান। উক্ত প্রসিদ্ধ চিকিৎসক সরযুকে পরীক্ষা করিয়া তংকালে রােগের সঞ্চার অনুভব করিলেন না, কিন্তু বলিলেন যক্ষ্মা রোগ সঞ্চারের আশঙ্কা আছে বটে, ইহাকে খুবই সাবধানে থাকিতে শ্রাদ্ধিকী। হইবে। কঠিন পরিশ্রম ও দুশ্চিন্তা বর্জন, সর্বদা বিশুদ্ধ বাতাসে বাস ও সহজ জীৰ্য পুষ্টিকর আহার, চিত্ত প্রফুল্ল রাখিবার জন্য কোনও সহজ কাজ, ইত্যাদি ব্যবস্থা দিলেন, এবং শীত আরম্ভ হইবার পূর্বেই বিলাত পরিত্যাগ করিতে বলিলেন। সরযুর চিরপােষিত আকাঙ্ক্ষা চিকিৎসা বিদ্যা কিম্বা শুশ্রুষা কাৰ্য্য শিক্ষা করেন। ডাক্তার তাঁহার আগ্রহাতিশয় জানিয়া ও ক্লাপহাম (Clapham) হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়িকা ডাক্তার মেকল সরযুর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে প্রতিশ্রুত আছেন শুনিয়া, তাহাকে ধাত্রী বিদ্যা ও শুশ্রুষা বিদ্যা শিখিতে অনুমতি দিলেন। তদনুসারে তিন মাস কাল হাসপাতালে থাকিয়া সরযূ উক্ত দুই বিষয়ে অনুশীলন করিয়া পরীক্ষা দিলেন, এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া প্রশংসা পত্র লাভ করিলেন। যে তিন মাস ক্লাপহামে শিক্ষা লাভে অতিবাহিত হইয়াছে, এ তিন মাস সরযুর বড়ই সুখে কাটিয়াছে। তিনি দেশে ফিরিয়া সে সময়ের অনেক কথা মাতাকে বলিতেন এবং বলিয়া সুখ বােধ করিতেন। সরযুর দেশে ফিরিবার সময়ে তাহাকে একাকী আসিতে হইয়াছিল। বিলাতে জাহাজে না উঠিয়া, মার্সেল হইতে তাঁহাকে উঠিতে হয়, সে পৰ্য্যন্ত তাঁহার সঙ্গে তাঁহার স্বামীর আসিবার সুবিধা হয় নাই। একা- কিনী, অল্প বয়স্কা সম্পূর্ণ বিদেশীয়া রমণীর পক্ষে পথে বিপদের সম্ভাবনা কম ছিল না। ঈশ্বরাশীর্বাদে সকল বিপদ কাটাইয়া তিনি নিরা- পদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। নবেম্বরের শেষ ভাগে তিনি বােম্বাই পৌছিয়া, প্রথমে শ্বাশুড়ীর নিকট লক্ষে গিয়া, পরে বাঁকুড়ার আসিলেন। তখন তাহার বাহ আকৃতিতে রােগের কোন চিহু লক্ষিত হয় নাই। কিন্তু সেই সময়েই তাঁহাকে আহারাদি বিষয়ে একটু সাবধান বােধ হইত। জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল যে তাহার একটু অজীর্ণ দোষ উপস্থিত হইয়াছে। সুনিয়মে এবং সুপথ্যে এই দোষ শীঘ্র দূর হইবে সকলেই এইরূপ আশা করিতে লাগিলেন। মাঝে কিছু দিন একটু স্বর্গীয়া সরযুবালা ঘােষ। ভাল বােধ হইল। ইংরাজী নববর্ষের আরম্ভে তিনি কনিষ্ঠ ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথের টীল কাটাইবার জন্য তাহাকে লইয়া কিছু দিন কলিকাতা ডাক্তার নীলরতন সরকারের গৃহে আসিয়া রহিলেন। এই খানে থাকিতে একবার উদরাময় অতিশয় বৃদ্ধি পাইয়াছিল, কিন্তু কেহ তাহা সন্দেহের চক্ষে দেখেন নাই। জানুয়ারি মাসের মধ্যভাগে ভাইকে লইয়া বাঁকুড়া ফিরিলেন, তদবধি আহারাদি সম্বন্ধে আরও সতর্ক হইলেন। অতঃপর তিনি বিলাতে যাহা শিক্ষা করিয়া আসিয়াছেন, তাহার পরিচয় দিবার এক সুযােগ উপস্থিত হইল, তিনি আগ্রহের সহিত এই সুযােগের ব্যবহার করিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে তাহার একটী ভ্রাতার জন্ম হইল, তিনি তখন মাতার সেবা এবং ভ্রাতার রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত হইলেন। মাতা নানা কারণে প্রথমে আপত্তি করিয়াছিলেন, কিন্তু শুশ্রষা কার্যে তাহার আন্তরিক প্রীতি এবং যােগ্যতা দেখিয়া আর তাহাতে বাধা দিলেন না। যখন শারীরিক ক্লেশে মাতা নিতান্ত ক্লিষ্ট এবং অবসন্ন, তখন সরযুর স্নেহার্জ কণ্ঠের দুই একটা কথা শুনিলে তিনি সকল ক্লেশ ভুলিয়া যাইতেন। মাতার অনুপস্থিতিতে গৃহপরিদর্শনের ভারও তাহার উপর পড়িয়াছিল। এ কাৰ্যে সরযুবালা একটুও প্রীতি। বােধ করিতেন না, বরং প্রায়ই বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। তিনি যেরূপ ইচ্ছা করিতেন, ভৃত্যদিগকে সেরূপ করিতে না দেখিলে তাহার একটু ক্রোধের সঞ্চার হইত। এই কোপন স্বভাবের পরিচয় পাইয়া তাঁহার মাতার সন্দেহ হইল যে তাঁহার শরীর নিশ্চয়ই অসুস্থ। এই সময় হইতে ডাক্তারকে অধিক সতর্কতার সহিত তাহার রােগ পরীক্ষা করিতে অনুরােধ করা গেল। প্রথমে উদরাময়ের যথাসাধ্য চিকিৎসা করিয়া যখন কোন উপকার হইল না, তখন ডাক্তারের সন্দেহ হইল যে ইহা যক্ষ্মা রােগের উপসর্গ। শরীর পরীক্ষা করিয়া তাহার সন্দেহ দৃঢ়তর হইল। তখন সরযুকে দার্জিলিং পাঠাইবার বন্দোবস্ত করা গেল।
৭৬ শ্রাদ্বিক। সরযু যাইবার পূর্বে ডাক্তার নীলরতন সরকার তাঁহাকে নিজ গৃহে রাখিয়া কিছুকাল পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন। তিনিও ডাক্তার ওয়াটসের সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইলেন। সরযু স্বভাবতঃই কৃশদেহ। ছিলেন, তাহার উপর পেটের পীড়ায় শরীরে বলসঞ্চারপথ রুদ্ধ, অতএব ডাক্তারগণ সম্পূর্ণ আরােগ্যের অংশ মনে স্থান দিতে পারিলেন না। এই অবস্থায় কয়েক বৎসর বঁচাইয়া রাখিবার একমাত্র উপায় বিশুদ্ধ পার্বত্য বাতাসে স্থাপন, এই বলিয়া দার্জিলিং রাখিতেই সকলে পরামর্শ দিলেন । এপ্রেল মাসের মধ্যভাগে ক'নষ্ঠা প্রিয়বালাব সহিত দার্জিলিং গেলেন। প্রথম কয়েক মাস আশাতীত উন্নতি দেখিয়া আত্মীয়- গণ অতিশয় আনন্দিত হইলেন, কিন্তু বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে কাশি ও জ্বর বাড়িতে লাগিল। জুলাই মাসের শেষভাগে পীড়ার সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পাইল। ভগিনী প্রিয়বালা পাণপণে তাঁহার সেবা করিতে লাগিলেন। রােগের যন্ত্রণা ক্রমে বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আরােগ্যের আশা নাই জানিয়া, একে একে সহোদরগণ ও পিতা মাতাকে দেখিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তাঁহার তত্ত্বাবধানের জন্য ছুটি লইয়া গিয়া দার্জিলিঙ্গে বাস করিতে লাগিলেন, পূজার ছুটিতে পিত। গিয়া তাহার কাছে রহিলেন, মাতা কয়েক দিনের জন্য জন্মের শােধ তাহাকে দেখিয়া আসিলেন। মৃত্যুর দেড় মাস পূর্বে যখন লিখিবার শক্তি গত প্রায়, তখনও সৰ্ব্ব কনিষ্ঠ ভ্রাতার পীড়ার সংবাদ পাইয়া মাতাকে শুশ্রুষা সম্বন্ধে নানা পরামর্শ দিয়া এক খানি পত্র লিখিয়াছিলেন; এই শিশুটির জন্যই মাতা শেষ এক মাস দার্জিলিং যাইয়া তাহার সহিত একত্র বাস করিতে পারেন নাই, শিশু দিগকে কলিকাতায় রাখিয়া কয়েক দিনের জন্য মাত্র গিয়াছিলেন। দার্জিলিং চলিয়া আসিবার পরই সরযূ জ্যেষ্ঠ শিশু ভ্রাতাকে লক্ষ্য করিয়া লিখিয়া ছিলেন “ডােম্বল দাসকে একবার দেখিতে ইচ্ছা করে”। গত সেপ্টেম্বর মাসেই একটী ভ্রাতার জন্ম দিনে স্বর্গীয়া সরযূবালা ঘােব। ৭৭. পিতাকে লিখিয়াছিলেন; “রাজুর জন্ম দিন ভুলি নাই।” ইহার জন্য কিছু খেলানা ও কিনিয়া রাখিয়াছিলেন। শিশু ভাই বােন গুলিকে তিনি বড়ই স্নেহ করিতেন। তাহারাও তাঁহার বড় অনুগত ছিল। ব্রাহ্মধর্মপ্রচারক শ্ৰীযুক্ত প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ও ডাক্তার নীলরতন, সরকার উভয় মহাত্মাই সরযূর ইচ্ছা শুনিয়া দার্জিলিং গিয়া তাহাকে দেখিয়া আসিয়াছেন। সরযু অনেককে ভাল বাসিতেন, অনেকে সরযূকে ভালবাসিয়া সুখী হইয়াছেন। তাঁহার পিতা তাহার জন্য অতিমাত্র শােকাৰ্ত্ত হইবেন, জানিতেন, এবং কেবল সেই জন্যই আরােগ্য লাভে যত্ন করিতেন। মৃত্যু যখন নিশ্চয় জানিলেন, তখন পিতাকে বলিলেন, “তুমি মিথ্যা আশা পােষণ করিও না। আমি জানি আমি আর সারিয়া উঠিব না; আমি মরিতে ভয় করি না; মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি; আমি চাই তুমিও আমার বিচ্ছেদ সহ করিবার জন্য প্রস্তুত হও।” সেই স্নেহমমতাময়ী মধুর প্রতিমা আমরা জন্মের শােধ বিদায় দিয়াছি। শেষ দুই মাস রােগের ভীষণ যন্ত্রণা ভােগ করিয়া ৪ঠা নবেম্বরের প্রত্যুষ কালে তাঁহার নির্মল আত্মা অনন্তশান্তি লাভ করিয়াছে। তিনি ইহ- লােক হইতে পরলােকের অধিক যােগ্য ছিলেন, জগন্মাতা স্বর্গীয় কুসুম স্বর্গোদ্যানে লইয়া গেলেন। সরযূ অল্প কালই সংসারে রহিলেন। তাঁহার সুন্দর চরিত্রের সকল দিক পূর্ণ বিকশিত হইবার পূর্বেই তিনি সংসার হইতে অবস্ত হই- লেন। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে কর্তব্য নিষ্ঠা, নিঃস্বার্থতা, ন্যায়পরায়ণতা, পিতৃভক্তি, পরসেবাদি অনেক মহগুণের বিশেষ পরিচয় দিয়া গিয়াছেন। সকল গুলির দৃষ্টান্ত হয়ত দিতে পারিলাম না। যিনি তাহার সহিত বহুদিবস বাস করিবার সুবিধা পাইয়াছেন তাহার মনে সরযূর চরিত্রের যে চিত্ৰ থাকিবে তাহা ভাষায় অঙ্কিত করা সহজ নহে। তথাপি সরযুর বিশেষত্বের উল্লেখ আবশ্যক। } ৭৮ শ্রাদ্ধিকী। তাঁহার অধ্যয়নের ইচ্ছা প্রবল ছিল এবং অধ্যয়নীয় বিষয়ে রুচি উৎকৃষ্ট ছিল। সেলাই কার্যে তাঁহার আশ্চর্য্য নিপুণতা ছিল। একবার দেখিলেই অতি কঠিন সেলাই সকল শিখিয়া যাইতে পারিতেন। ইচ্ছা পূর্বক দর্জির কাজ শিখিয়াছিলেন। যখন সকলের সঙ্গে গল্প করিতেছেন, তখন যাহাতে একটা কাজ হয়, সেই জন্য হাতে কিছু সেলাই রাখিতেন। এই সঙ্গে তাঁহার এক প্রধান গুণ, সময়ের মূল্য জ্ঞান উল্লেখ করা যাইতেছে। সরযূ সময় নষ্ট করিতে কষ্ট বােধ করিতেন। অসুস্থতা হেতু নিদ্রা বা বিশ্রাম ভিন্ন অন্য সময় বিনা কাজে কাটাইতেন না। পরিবারের মধ্যে তাহার সেবা পরায়ণতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু পরিবারের বাহিরেও সুবিধা পাইলেই কিছু করি- তেন। বাঁকুড়ার কোন প্রাচীন য়ুরােপীয় মহিলা বাইসিকেল হইতে পড়িয়া এক খানি বাহু ভাঙ্গিয়া ফেলেন। সরযু সংবাদ পাইবামাত্র পিতার গাড়ি লইয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইলেন এবং উক্ত মহিলাকে গাড়ীতে তুলিয়া তাঁহার বাড়ীতে পৌছাইয়া দিলেন। যতক্ষণ ডাক্তারগণ তাঁহার হাড় জুড়িতে ছিলেন, ততক্ষণ কাছে থাকিয়া সকল কাজের সাহায্য করিলেন। সকালে এই ঘটনা ঘটে, সরযু পীড়িতা রমণীকে আহারাদি দিয়া অনেকটা সুস্থ দেখিয়া, বেলা দুই ঘটিকার সময় বাড়ী ফিরিয়া আসেন। কলিকাতা আত্মীয়দিগের বাটীতে অবস্থান কালে যগ' 'ধ্য বাটীর মহিলাদিগের সাহায্য করিতেন। কেহ সেলাই শিখিতে আসিলে, বিরক্তি প্রকাশ না করিয়া, সময়ে অসময়ে তাহাকে শিখাইতে আরম্ভ করিতেন। সরযুর ঈশ্বর ভক্তিও গভীর ছিল। বাহিরে কোন আড়ম্বর ছিল না বটে, কিন্তু তাহার নীরবতায় ও সঙ্গীতে এই ভক্তিভাব উচ্ছসিত দেখা
স্বর্গীয়া সরবালাঘােষ
৭
যাইত। নিয়মিত দৈনিক উপাসনায় যােগদান করিতেন, প্রতি সপ্তাহে
সমাজে উপস্থিত থাকিতেন, এবং সমাজকে ভাল বাসিতেন। নৈতিক
উচ্ছঙ্খলা, মতের অনুদারতা অথবা গহিত মত প্রচলিত দেখিলে, মনে
মনে ব্যথা অনুভব করিতেন।
রঙ্গপুর,
৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৮২
No text on this page.
স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়।
No text on this page.
স্বর্গীয় কেদারনাথ রায় কেদারনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেবীনাথের শৈশবেই মৃত্যু হয়। শােক বিলা মাতা কাশীধামে গিয়া, ভাবী সন্তান যাহাতে দীর্ঘজীবী হন সেইজন্য কেদারনাথ দেবতার নিকট মানস করেন। পুত্র জন্মগ্রহণ করিলে তাহার নাম সেই জন্যই কেদারনাথ রাখিয়াছিলেন। কেদারনাথ রায় ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৭ শে ডিসেম্বর, ঢাকা জেলার অন্তর্গত রঘুনাথপুরে, মাতুলগৃহে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা মহেশদাস রায়গুপ্ত ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামের বিখ্যাত রায় বংশােদ্ভব ছিলেন। তিনি রামপুর বােয়ালিয়ার জজ আদালতে মহাপেজের কাজ (Record Keeper} করিতেন। সেখানে তাহার যথেষ্ট প্রতি- পত্তি ছিল। জমীদারী সংক্রান্ত বিষয়েও তাহার বেশ অভিজ্ঞতা ছিল। গবর্ণমেন্টের চাকুরী করিয়াও তিনি নিজেই তাহার পৈত্রিক জমীদারীর তত্ত্বাবধান করিতেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, তাহার পরিবারের ও পুত্রের কোন বিষয়ে কষ্ট ছিল না। সুয়াপুর গ্রামে রায়দের বাটীতেই বালকদের শিক্ষার জন্য একটি সামান্য বিদ্যালয় ছিল। কেদারনাথ এই খানেই তাহার প্রথম জীবনের শিক্ষালাভ করেন। স্কুলের শিক্ষকটি ব্ৰাহ্মভাবাপন্ন ছিলেন। পড়া- শুনায় কেদারনাথের অত্যন্ত অধ্যবসায় ছিল, এবং হিন্দুধৰ্ম্মেও এই সময় তাহার বিশেষ আস্থা ছিল। তিনি গল্প করিয়াছেন যে, অঙ্কে এই সময়ে তিনি বিশেষ নিপুণ ছিলেন না; সেইজন্য অঙ্কের সময় আসলেই দুর্গানাম জপ করিতে আরম্ভ করিতেন এবং শ্লেট ভরিয়া কেবল দুর্গানামই লিখিতেন। • শ্রাদ্ধিকী। । গ্রামের স্কুল পরিত্যাগ করিয়া, তিনি কিছু দিন ঢাকায় পােগােস স্কুলে ও কিছু দিন তত্ৰত্য কলেজিয়েট স্কুলে যথাক্রমে বিদ্যাভ্যাস করেন। এই সময় তাহার আত্মীয় বরদাকিঙ্কর রায় উকীল মহাশয়ের বাসায় তিনি থাকিতেন। সেখানে অন্যান্য দশ বারটি ছাত্রের সহিত এক প্রকোষ্ঠে থাকিয়া, যৎসামান্য আহাৰ্য খাইয়া দিনপাত করিতেন। তাঁহার পিতার নিকট হইতে পুস্তকাদি ক্রয়, স্কুলের বেতন ও অন্য সমুদয় খরচের জন্য ১০ টাকা পাইতেন। ইহার পর কিছু দিন এক ছাত্রাবাসে ও ছিলেন। সেখানে কলেরা রােগে আক্রান্ত হইবার পর তাঁহার পিতা আসিয়া তাহাকে নিজ কর্মস্থান রামপুর বােয়ালিয়াতে লইয়া যান। ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে মত্ত নিবাসী ৩ দুর্গাপ্রসাদ সেনের কন্যা সৌদামিনী দেবীর সহিত তাহার বিবাহ হয়। ১৮৬৯খ্রীষ্টাব্দে কেদারনাথ রামপুরবােয়া- লিয়া হইতে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া মাসিক ১০ টাকা বৃত্তি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুসারে তৎকালে কেহই যােল বৎসরের পূর্বে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে পারিত না। কেদারনাথ বুদ্ধিমান ছাত্র ছিলেন বলিয়া, শিক্ষকের দুই বৎসর বয়স বাড়াইয়া, চৌদ্দ বৎসরেই তাহাকে দিয়া পরীক্ষা দেওয়ান। ১৮৬৪ সনের আশ্বিন মাসে, পূজার ছুটী উপলক্ষে মহেশদাস রায় সপরিবারে পদ্মা নদী দিয়া নৌকাযােগে বাড়ী যাইতেছি- লেন। বিখ্যাত ঝড়ের রাত্রে তাহার নৌকা জলমগ্ন হইল, তিনি পত্নী ও পুত্রসহ রক্ষা পাইলেন, কিন্তু তাহার সঙ্গে অর্থ ও জিনিষপত্র যাহা কিছু ছিল সমস্তই নষ্ট হইল। এই সঙ্গে কেদারনাথের জন্মপত্ৰকাখানিও যায়। কোষ্ঠিখানি সম্মুখে না থাকাতে, দুই বৎসর বয়স বাড়াইতে কেদারনাথের পিতা ভিন্ন আর কাহারও কোন আপত্তি হইল না। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি এফ,এ, পায়ের জন্য কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে প্রেবিত হন। শৈশবকাল হইতে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত তাঁহার হিন্দুধর্শে স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। ৮ বিশেষ আস্থা ছিল। ১৮৬৮ সাল হইতে হিন্দুধর্মে বিশ্বাস হ্রাস হইতে আরম্ভ হয়। ঢাকায় অবস্থান কালে শ্ৰীযুক্ত বিহারীলাল সেন, শ্ৰীযুক্ত অম্বিকাচরণ সেন প্রভৃতি কতিপয় ব্রাহ্মযুবকের সহিত তাহার হৃদ্যতা হয়। ইহারা উৎসাহী ব্রাহ্মধৰ্ম্মানুরাগী ছিলেন, তাঁহাদের সহিত ব্রাহ্ম- সমাজে যাইয়া তাহারও ব্রাহ্মধৰ্ম্মের দিকে মন আকৃষ্ট হয়। ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ তখন অসামান্য প্রভাবে কাজ করিতেছিল। ঢাকা কলেজের অধিকাংশ ছাত্রই ব্রাহ্মসমাজে ও বঙ্গচন্দ্র রায় মহাশয়ের সঙ্গত সভায় যােগদান করিতেন! কেদারনাথও শীঘ্রই ব্রাহ্মধৰ্ম্মের সত্যতা অনুভব করিয়া ১৮৭১ সালে প্রকাশ্যভাবে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হইলেন। কেদারনাথের পরিবার হিন্দু সমাজে পদমর্যাদায় অগ্রগণ্য ছিলেন । তাহার কনিষ্ঠ পিতৃব্য শ্রীনাথ রায় তখন ঢাকার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাঁহারা সকলেই তাহার এই কাৰ্যে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুন্ন হইলেন। “ঢাকা প্রকাশ” ও “হিন্দুহিতৈষিণী” সংবাদ পত্র দ্বয়ে ব্রাহ্মদিগের তীব্র সমালােচনা চলিতে লাগিল। তাঁহার পিতা মর্মাহত হইয়া কাশীধামে যাত্রা করিতে স্থিরসংকল্প হইলেন। সঙ্গে কেদারনাথকে লইয়া গিয়া বেনারস কলেজে ভর্তি করিয়া দিবার ইচ্ছা ছিল। তাঁহার বিশ্বাস ছিল যে, পুত্রকে কাশী- ধামে নিজের কাছে রাখিতে পারিলে, তাহার মতিগতি ফিরাইতে পারি- বেন। কিন্তু কলেজের প্রিন্সিপালই এই বিষয়ে প্রধান অন্তরায় হইলেন। বৃত্তিপ্রাপ্ত ভাল ছাত্র ছিলেন বলিয়া, তিনি কেদারনাথকে কলেজ ছাড়িতে দিলেন না। কেদারনাথের মাতা এই সময়ে বধূ, একটি পুত্র ও একটি কন্যা লইয়া সুয়াপুর গ্রামে বাস করিতেছিলেন। মাতার ইতিপূর্বেই মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়াছিল, তিনি গৃহকৰ্ম্ম কিছুই তত্ত্বাবধান করিতেন না, বালিকা সৌদামিনীই এই সময়ে প্রকৃত পক্ষে গৃহকত্রী ছিলেন। স্বামীর নিকট হইতে চিঠী পাওয়া ও চিঠী লেখার জন্য তাঁহাকে গ্রামে অনেক লাঞ্ছনা দ্ধিকী। ও তিরস্কার সহ করিতে হইয়াছে। কিন্তু এ সকল অত্যাচার তিনি অম্লানবদনে সহ করিয়াছেন। ১৮৭১ সালের একটি ঘটনা এইস্থলে উল্লেযােগ্য। এই সময়ে ব্রাহ্ম- যুবকদের মধ্যে শ্ৰীযুক্ত বিহারীলাল সেন ও শ্রীযুক্ত অম্বিকাচরণ সেন জাতিভেদের মূলে সবলে কুঠারাঘাত করিবার উদ্দেশ্যে, একদিন প্রকাশ্য- ভাবে কতিপয় মুসলমানের সহিত একত্রে আহারাদি করিলেন। হিন্দু সমাজের নেতৃগণ এই ঘটনাতে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া ইহাদের ও যাহারা অতঃপর ইহাদের সহিত একত্রে আহার করিলেন, সকলকে সমাজচ্যুত করিলেন। কেদারনাথের কলিকাতাস্থ আত্মীয়, যাহার গৃহে তিনি এই সময় অবস্থান করিতেছিলেন, তাঁহাকে উহার গৃহ পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র যাইতে বললেন। তিনি তখন অনন্যোপায় হইয়া শ্ৰীযুক্ত অম্বিকাচরণ সেনদের ৩৩নং মুসলমানপাড়ার ছাত্রাবাসে আশ্রয় লইলেন। তাঁহার পিতা সংবাদ পাইয়াই কলিকাতায় আসিয়া তাহাকে প্রায়- শ্চিত্ত করিয়া হিন্দু হইতে অনুরােধ করিলেন; কিন্তু বিফচেষ্ট হইয়া ভগ্নহৃদয়ে কাশীতে ফিরিয়া গিয়া, অনতিকাল পরেই ইহলোেক পরি- ত্যাগ করিলেন । এই সময়ে কেদারনাথ এফ এ দিয়া ছুটাতে দেশে যাইতেছিলেন, তাঁহার পিতৃব্য শ্রীনাথ রায় ও সবজজ পদ প্রাপ্ত হইয়া ঢাকায় যাইতে- ছিলেন। গােয়ালন্দে উভয়ের সহিত উভয়ের দেখা হইল, এবং পিতৃব্য তাঁহাকে পিতৃশ্রাদ্ধ করাইবার জন্য সঙ্গে করিয়া সুয়াপুরে আসিলেন। পিতৃ শােকাৰ্ত্ত কেদারনাথ কোন কথা কহিলেন না, রীতিমত হবিষ্যাদি করিতে লাগিলেন। শ্রীনাথ রায় বাড়ী আসিয়াই কেদারনাথের প্রায়শ্চিত্তের সব বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। তাঁহার অভিপ্রায় ছিল কেদারনাথকে দিয়া প্রায়শ্চিত্ত করাইয়া, তাঁহার দ্বারাই হিন্দুমতে পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। করাইবেন। ব্রাহ্মণ পুরােহিতেরা প্রায়শ্চিত্তের সমুদয় আয়ােজন করিয়া তাঁহার প্রতীক্ষা করিতেছেন, তাঁহার পিতৃব্য তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইয়া- ছেন, কেদারনাথের দেখা নাই। অনেক ডাকাডাকির পর আসিয়া উপস্থিত হইলেন, সকলে তাহাকে নির্দিষ্ট আসনে ধরিয়া বসা- ইতে গেলেন, তিনি সবলে আসন ও পূজার উপকরণাদি উল্টাইয়া ফেলিয়া দ্রুতপদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ইহাতে তাহার পিতৃব্য মহাশয় অতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন, কারণ তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদিগকে আনাইতে যথেষ্ট অর্থব্যয় করিয়াছিলেন। শ্রদ্ধের পূৰ্ব্ব রাত্রি ভাের না হইতে হইতেই স্ত্রীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, তাঁহার নিকট বিদায় লইয়া বাটী হইতে পলায়ন করিলেন। সঙ্গে কয়েক আনা পয়সা ও একখানি ছুরী সম্বল। চুরী লইবার অর্থ এই যে, কেহ তাহাকে ধরিয়া লইয়া যাইবার চেষ্টা করিলে ছুরী দ্বারা নিজকে আহত করিবেন, তাহা হইলেই তাহারা ছাড়িয়া দিবে। কতকদূর নির্বিঘ্নে আসিয়া নদীতীরে উপস্থিত হইলেন। সেখানে এক নৌকার মাঝিকে বলিলেন, আমাকে চাকা লইয়া চল। মাঝি তাঁহাকে দেখিয়াই চিনিয়াছে, সে বলিল “আপনাকে ধরিয়া লইয়া যাইবার জন্য চতুর্দিকে লােক ছুটিয়াছে, বাড়ী ফিরিয়া যাউন।” কিন্তু কেদারনাথকে নিতান্তই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিয়া সে তাহাকে তাহার আত্মীয় বরদাকিঙ্কর রায় মহাশয়ের বাটীতে পৌছাইয়া দিবে বলিল। নৌকা ঘাটে আসিবামাত্রই কেদারনাথ আত্মীয়ের বাটীতে প্রবেশ না করিয়া, সেখান হইতে অন্যত্র চলিয়া গেলেন। কেহই তাহার সন্ধান পাইল না, সুতরাং তাহার দ্বারা আর হিন্দুমতে পিতৃশ্রাদ্ধ করান গেল না। এইবারে এফ,এ, পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হইলেন বটে, কিন্তু বৃত্তি পাইলেন না। তাঁহার পিতৃব্য তাহার খরচ বন্ধ করিয়া দিলেন। তাহাদের জমিদারীর আয় নিতান্ত কম না হইলেও অধিকাংশ দেবসেবা ও অন্যান্য শ্রাদ্ধিকী। খরচ বাবত কাটিয়া লওয়া হইত। মাত্র ৮ টাকা তাহার স্ত্রী সংসারের খরচের জন্য পাইতেন। এই দারিদ্র্যের সময় প্রচারক শ্ৰীযুক্ত কান্তিচন্দ্র মিত্র তাহাকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছিলেন। তাঁহারই পরামর্শানুসারে কেদারনাথ Calthedal Mission Collegeএ বি, এ, পাঠের জন্য ভর্তি হইলেন। শ্রদ্ধেয় কান্তি বাবু ভিক্ষা করিয়া কোন প্রকারে তাহার খরচ চালাইতে লাগিলেন। কেদারনাথ ছেলে পড়াইয়া কিছু উপার্জন করিতেন, ইহা কান্তি বাবুর হাতে দিতেন। তিনি চারি মাস এই ভাবেই কাটিয়া গেল। অতঃপর তাহার মাতামহী দেবী ঘটনাক্রমে এই সকল সংবাদ জানিতে পারিয়া, নিতান্ত অস্থির হইয়া উঠিলেন এবং পুত্র গুরুদাস দাস-গুপ্তকে বলিলেন, “কেদার অনাহারে কষ্ট পাইতেছে, আমি মুখে অন্ন তুলিব না।” যতক্ষণ না টাকা পঠান হইল, বৃদ্ধা সত্য সত্যই অনাহারে রহিলেন। মাতার অনুরােধে গুরুদাস বাবু ভাগিনেয়ের খরচের জন্য মাসিক ২০ টাকা করিয়া পাঠাইতে লাগি- লেন। কেদারনাথের পিতৃব্য এ সংবাদে বিরক্ত হইলেন; তিনি মনে করিয়াছিলেন, আর্থিক কষ্ট সহ্য করিতে না পারিয়া, কেদারনাথ পুনরায় হিন্দু সমাজে প্রবেশ করিবেন। হিন্দুমতে পিতৃশ্রাদ্ধ করিতে অসম্মত হওয়ার পর হইতে আত্মীয়স্বজন কেদারনাথকে সমাজচ্যুত করিয়া দিলেন। তাহাদের অত্যাচার শুদ্ধ কেদারনাথের উপরই পর্যবসিত হয় নাই, তাহার স্ত্রী সৌদামিনীকেও এজন্য উৎপীড়িত হইতে হইয়াছে। কতকটা সৌদামিনীকে এই উৎপীড়ন হইতে রক্ষা করিবার জন্য এবং কতকটা মিঃ ক্রুট ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালরূপে বদলী হইয়া আসাতে, ১৮৭৩ সনে কেদারনাথ কলিকাতা ছাড়িয়া ঢাকায় চতুর্থ বার্ষিক শ্রেণীতে আসিয়া ভর্তি হইলেন। ঢাকা আসিয়া তিনি উন্মাদগ্ৰস্তা জননী ও বালিকা পত্নী লইয়া সংসার পাতিলেন। আয় ছিল মাতুলদত্ত মাসিক ২০১ টাকা ও জমিদারী স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। ৮১ হইতে ৮ টাকা। ইহা হইতে বাড়ী ভাড়া ১০ টাকা, চাকরাণীর বেতন ৩ টাকা, কলেজের ফি ৫ টাকা দিয়া যাহা অবশিষ্ট থাকি, তারা তিনটি প্রাণীর গ্রাসাচ্ছাদন চালাইতে হইত। কিন্তু বিবেককে অক্ষুন্ন রাখিয়া স্বাধীন ভাবে চলিতে পারিতেছিলেন, ঈশ্বরে নির্ভর করিয়া পরস্পরের জন্য পরস্পর খাটিতেছিলেন, উভয়ের প্রতি উভয়ের গভীর প্রেম ছিল, সুতরাং এই তরুণ দম্পতি দারিদ্র্যের মধ্যেও পরম সুখী ছিলেন। জীবনের শেষ দিনে কেদারনাথ ঐ সময়ের কথা উল্লেখ #fag Farfetcofecata, "This was the best and happiest period of our life. এই অবস্থায় একদিন তরকারীর অভাবে উঠান হইতে কচি কচি ঘাস তুলিয়া শাকের ন্যায় রন্ধন করিয়া ইহরা পরম তৃপ্তির সহিত আহার করিয়াছিলেন। লিখিয়া গিয়াছেন, “I commend these trials and struggles to my children and grand children. Probably none of them will have to pass through my experiences. but if any one comes to distress during the period of his education, he may remember my struggles and take courage to fight out his battles." তিনি নিজে বি, এ, পরীক্ষার জন্য পড়িতে লাগিলেন, পত্নীকে ঢাকার শ্রীবিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়া দিলেন এবং পত্নীর যাহাতে সুশিক্ষা লাভ হয় তৎপক্ষে যথাসাধ্য সহায়তা করিতে লাগিলেন। ১৮৭৪ অব্দে বি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কলেজিয়েট স্কুলে ৩০ টাকা বেতনে Ist Asst. Teacher পদে নিযুক্ত হইলেন। ঐ বৎসর তাহার প্রথম পুত্র জ্ঞানেন্দ্র- নাথের এবং ইহার পর বৎসর তাহার দ্বিতীয় পুত্র যতীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। ১৮৭৬ সনে এম, এ, ও ১৮৭৭ সনে বি, এল, পরীক্ষা দিলেন। এই তিন বৎসর পরিবার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খরচও বাড়িয়া- ছিল, কিছু ঋণও হইয়াছিল। অথচ সে অবস্থায়ও অন্য দুঃস্থ পরিবারকে শাকি। সাহায্য করি, সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন। ঢাকায় যে বাটীতে ছিলেন, সে বাটীতে সােহাগদল পরিবারকে প্রশস্ত ঘর খানি দিয়া, আপনারা এক খানি ছােট ঘরে বাস করিতেন। সে সময়ে সে পরিবারের অন্যত্র থাকি বার স্থান ছিল না। তাহার বাটীতে থাকিতে থাকতেই এই পরিবারের জ্যেষ্ঠ। কন্যার সহিত যুক্ত অম্বিকাচরণ সেনের (Mr. A.C. Sen) সহিত বিবাহ স্থির হয়। ইহারা অন্যত্র উঠিয়া গেলে, যথাক্রমে আর দুইটি ব্রাহ্ম পরিবারকে এই দরিদ্র দম্পতি নিজ বাটীতে আশ্রয় দিয়া- ছিলেন। পরের জন্য কষ্ট স্বীকার করিতে কেদারনাথ কোন দিন পরাজুখ ছিলেন না। নারী জাতির প্রতি তাঁহার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল, তাহার আচার ও ব্যবহারে তাঁহাদের প্রতি কি রূপ সম্রম ও সৌজন্য প্রকাশ পাইত, তাহা তঁাহার বন্ধুবান্ধবেরা সকলেই লক্ষ্য করিয়াছেন। ব্রাহ্মসমাজে যাহাতে দুর্ণীতি প্রবেশ করিতে না পারে. ঢাকা বাসকালে সে বিষয়ে যথেষ্ট মনােযােগী ছিলেন। পতিত। নারীরা যাতে সংশােধিত জীবন যাপন করিতে পারেন তৎপক্ষে অনেক সহায়তা করিতেন। বি, এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া তিনি রঙ্গপুরে গিয়া ওকালতী আরম্ভ করিলেন। তাহার মাতুল গুরদাস বাবু, সেখানে একজন মােক্তার ছিলেন, তাঁহার বাড়ীতেই গিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তাহার আয় ১০০ টাকার অধিক ছিল না। উহা কখন নিজে রাখিতেন, কখন বা মাতুলের হান্তে দিতেন। ঢাকায় অবস্থান কালো গৃহে যে পারিবারিক উপাসনা আরম্ভ হইয়াছিল, মাতুলালয়ে তাহ। নিয়মিতরূপে রক্ষা করিতে পারেন ন্যই। সেখানে বাধ্য হইয়া হিন্দু আচার ও জাতি- ভেদ মানিয়া চলিতে হইত। এই অবস্থায় সৌদামিনী কিছু ভাত হইলেন এবং তাহার নিকট সম্পর্কীয় বাবু বিহারীলাল সেনকে পত্র লিখিলেন। ইনি সৌদামিনীর যেমন আত্মীয় ছিলেন, সেইরুপ তাঁহার স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। স্বাম'রও ধৰ্ম্মবন্ধু ছিলেন। ইহার আগমনে উভয়ে বিশেষ উপকৃত হইলেন। সৌভাগ্যক্রমে এই সময়েই, মিঃ বেভারিজের বিশেষ সহায়তায়, কেদারনাথ অস্থায়ীরূপে মুন্সেফার্যে নিযুক্ত হইলেন এবং ১৮৭৯ ১নের অক্টোবর মাসে স্থায়ী মুন্সেফের পদ প্রাপ্ত হইলেন। স্থায়ী হইয়া কিছুদিন নেলফা- মারী থাকিয়া, বাঁকাপুর বদলী হইলেন। এইখানে তাহার ধৰ্ম্মজীবন বিকাশের অনুকূল অবস্থা উপস্থিত হইল। শ্ৰীযুক্ত প্রকাশচন্দ্র রায়ের সহিত এইখানেই তাঁহার সৌহার্দ্য জন্মে। এই সময় হইতে জীবনের শেষ দিবস পৰ্যন্ত ঈশ্বর নিষ্ঠা, উপাসনা, পরিবারের, সমাজের ও দেশের সেবার আকাঙ্ক্ষা তাহার প্রাণে দিন দিন অধিকতররূপে বর্ধিত হইতে ছিল। তিনি যখন বাকীপুর ছিলেন, তখন আচাৰ্য কেশবচন্দ্র কয়েক- জন প্রচারকসহ তথায় গমন করেন এবং তাহার গৃহে থাকিয়া বাকীপুরে প্রচার কার্য সম্পন্ন করেন। কেদারনাথ বহুদিন ধরিয়া, বহুযত্নে অতিথি- গণের সেবা করেন। উত্তরকালে ইনি সাধারণ সমাজের একজন উৎসাহী সভ্য হইলেও পূর্ব পূৰ্ব্ব প্রচারক বন্ধুদের সহিত সদ্ভাব রক্ষা করিতেন। বাকীপুর হইতে তিনি হাবড়া বদলি হন। তিনি কলিকাতায় বাস, করিতেন এবং হাবড়ায় গিয়া আফিস করিতেন। Bengal Tenancy Act লিখিয়া তিনি হঠাৎ তাঁহার উপস্থিত জজ সাহেবের বিদ্বেষভাজন হইলেন। ইহার ফলে তাহাকে পাবনা বদলী হইতে হয়। যতদূর জানা গিয়াছে, চাকুরী গ্রহণ করিয়া অবধি এবং ১৮৮৭ সনে পাবনা বদলী হওয়া পর্যন্ত, গৃহে বা কর্মক্ষেত্রে তাহার কোন অসুখ বা অশান্তি ছিল না। যে আয় ছিল সেই আয়ের মধ্যে পাঁচ ছয়টি পুত্রকন্যা লইয়া খে স্বচ্ছন্দে বাস করিতেন ও নানাবিষয়ে নানাপ্রকার বন্ধুবান্ধব- দিগের সাহায্য করিতেন। শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর ক্রফট সাহেব ইহাকে বিশেষ স্নেহ করিতেন, সুতরাং তাঁহার সহিত সৰ্ব্বদাই দেখা সাক্ষাৎ - ২ শ্রাদ্ধিকা। করিতে যাইতেন; এই সুযােগে শিক্ষাবিভাগে তঁাহার যে সকল বন্ধু- বান্ধব ছিলেন, তাহাদের প্রতি অবিচারাদি হইলে তাহারা তাহা জানা- ইতে পারিতেন। কাহারও চাকুরী করিয়া দেওয়া, কাহারও চাকুরীর দরখাস্ত লিখিয়া দেওয়া, অবিচার বা অত্যাচারের প্রতিবিধানাৰ্থ আবেদ- নাদি প্রেরণ করা, বন্ধুদের মধ্যে মনােবাদ ঘটিলে তাহা মিটাইয়া শান্তি সংস্থাপন করা তাঁহার নিত্যকর্ম ছিল। তাহার মিষ্ট ভাষা ও শিষ্ট ব্যবহারে সকলেই মুগ্ধ হইতেন। ১৮৮৮ সনে তিনি Statutory Civil Service পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন। জজ ব্যাস্পিনীর সহিত মনােবাদের পর তিনি বুঝিয়াছিলেন যে মুন্সেফ থাকিলে তাহাকে আরও নিগ্রহ ভােগ করিতে হইবে। কতকটা এই ভয়ে এবং কতকটা আপনার দুর্দমনীয় উচ্চাভিলাষ বশতঃ এই পরীক্ষা দিয়া অবস্থার উন্নতি সাধনে অগ্রসর হন। এ বিষয়ে তিনি Sir Alfred Croft হইতে যথেষ্ট সহানুভূতি ও আনুকূল্য লাভ করিয়াছিলেন। Statutory Civilian হইবার পর তিনি পদ মৰ্য্যাদা রক্ষার জন্য ইংরাজী পােষাক পরিধান ও ইংরাজী ধরণে বাস করিতে আরম্ভ করি- লেন। ইহাতে ক্রমে ব্যয় বাড়িতে লাগিল। এই সময়েই তাহার পিতৃব্য, কলিকাতা Small Cause Courtএর জজ, শ্রীনাথ রায় অকালে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। ইহাতে কিছুকাল কাশীবাসিনী পিতামহীদেবীর খরচ এবং পিতৃব্য পরিবার সংসৃষ্ট আরও কোন কোন খরচ তাহাকে বহন করিতে হইয়াছিল। Statutory Civilian হইয়া তাহাকে প্রথমতঃ Asst. Magistrate রূপে কৃষ্ণনগর যাইতে হয়। এই স্থানে তাহার চতুর্থ পুত্রের জন্ম হয় এবং তাহার পত্নী সৌদামিনী ম্যালেরিয়া রােগে আক্রান্ত হন; ক্রমে এই রােগ হইতে দুশ্চিকিৎস্য যক্ষ্মা রােগ জন্মে। কৃষ্ণনগর হইতে শিয়ালদহে ও পরে আলিপুরে Joint স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। । Magistrate নিযুক্ত হন। দিবসে কাছারীর কাজ করিয়া বিকালে ও রাত্রে রুগ্না পত্নীর সেবা করিতেন, নিদ্রা ও বিশ্রাম অতি অল্পই হইত। দেড় বৎসরের সেবা, যত্ন ও বহু ব্যয়সাধ্য চিকিৎসার পর ১৮৯১ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি তাহার আবাল্য সহচরী ও সহধর্মিণী সৌদামিনী দেবীকে হারাইলেন। এত দিনের কঠিন পরিশ্রমে তাঁহার স্বাস্থ্য চির- দিনের মত ভগ্ন হইল। পত্নী বিয়ােগের পর সন্তানদিগের শিক্ষাদানই তিনি জীবনের প্রধান ব্রতরূপে গ্রহণ করিলেন। পত্নীর চিকিৎসার জন্য তিনি ঋণজালে জড়িত হইয়া ছিলেন, তাঁহার তৎকালে যে বেতন ছিল তাহা দ্বারা উভয় পুত্রকে বিলাতে শিক্ষাদান তাঁহার মত লােকের পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব হইলেও তিনি একসঙ্গে দুই পুত্রকে বিলাত পাঠাইয়া দিলেন। এই দুষ্কর কাৰ্য্য, করিতে গিয়া তিনি নিজের মস্তকে কি পরিমাণ ঋণ, চিন্তা, পরিশ্রম ও দারিদ্র্যের ভার তুলিয়া লইয়াছিলেন, তাহা বর্ণনাতীত। প্রথমতঃ তাঁহার কন্যায় বেথুন কলেজে দিয়া, অপর শিশুদ্বয়কে তাহাদের মাতুলের নিকট রাখিয়া, নিজের কর্মস্থানে একাকী গেলেন। ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া কিরূপ খাটিতেন, তাহা শুনিলে অবাক হইতে হয়। মাঝে মাঝে চলৎশক্তিহীন হইতেন, ভৃত্যেরা তাহাকে বহন করিয়া এজলাসে বসাইয়া দিত, কখন, ৰাতে হাত অবশ হইয়া যাইত, অপরকে দিয়া রায় লিখাইয়া কষ্টে সহি করিতেন। অর্থাভাবে ছুটা লইতে সাহস হইত না। কিন্তু এমন এক সময় আসিল যখন একেবারে শয্যাশায়ী হইলেন, তখন ছুটা না লইয়া পারিলেন না। এই রােগ ভােগের পর পারিবারিক সুখ, প্রীতি ও সহানুভূতির জন্য তাহার আবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্মিল। ১৮৯৪ সনের আগষ্ট মাসে তিনি দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করিলেন। কিন্তু পরিবার মধ্যে রােগের আতিশয্য এবং ঘন ঘন মৃত্যুর তাড়নায় সাংসারিক সুখ তাঁহার ভাগ্যে অল্পই ঘটিয়াছে। রােগ শােক ও দারিদ্র্যের সহিত ১৪ শ্রাদ্ধিকী। তিনি দিনের পর দিন, বৎসরের পর বৎসর, কিরূপ সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া এস্থানে অসম্ভব। এই সকল বিপদের মধ্যে তিনি কিরূপ নিস্বার্থ ও গভীর প্রেম, অতুলনীয় সন্তান-বাৎসল্য, আশ্চর্য সেবাপরায়ণতা ও কঠিন কৰ্তব্য নিষ্ঠা দেখাইয়া গিয়াছেন, তাহা তাহার পরিবারস্থ ও পরিবার সংসৃষ্ট ব্যক্তিরাই জানেন। যে কেহ তাহার সহিত অধিক দিন বাস না করিয়াছে এবং তাহাকে ভাল করিয়া না বুঝিয়াছে, তাহার নিকট তাঁহার সন্তান বাৎসল্য ও কর্তব্য নিষ্ঠা অনেক সময়ে উন্মত্ততা বলিয়া বােধ হইয়াছে। তাহার প্রথম পক্ষের তিনটি সন্তান একে একে তাহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া দিয়া গিয়াছে। সর্বাগ্রে একাদশবর্ষীয়া প্রিয়তমা কন্যা চারুবালা অল্প দিনের জ্বরে প্রাণ হারায় । ইহার জন্য তিনি যেরূপ শােকাৰ্ত্ত হইয়াছিলেন, পুরুষেতাে কথাই নাই, স্ত্রীলােকের মধ্যে ও এরূপ শােক বিহ্বলতা সচরাচর দেখা যায় না। এই ঘটনার বৎসরাধিক কাল পূৰ্ব্ব হইতে তাঁহার তৃতীয় পুত্র যােগেন্দ্রনাথ ম্যালেরিয়া রােগে ভুগিতেছিল। তাহাকে নানাস্থানে বায়ু পরিবর্তনের জন্য পাঠাইয়া বিফল চেষ্ট হইয়া, অবশেষে জ্যেষ্ঠা কন্যা সরযুবালা ও বাবু বিহারীলাল সেনের সহিত তাহাকে সাত মাস কলম্বােতে রাখিয়াছিলেন। সেখানে প্রথম হস্পাতালে, পরে সমুদ্রতীরে বাড়ী করিয়া রাখিতে বহুল অর্থব্যয় হইত, সুতরাং ঋণের উপর ঋণ স্তুপীকৃত হইতে লাগিল। আড়াই বৎসরের সংগ্রামের পর মৃত্যুর জয় হইল, তিনি চতুর্দশবর্ষীয় পুত্র হারাই- লেন। ইহার পরও কঠিন রােগ ও মৃত্যু তাহার গৃহ অনেকবার অন্ধকার করিয়াছে। ১৯০০ ডিসেম্বর মাসে তিনি জ্যেষ্ঠা কন্যা সরযূবালাকে বিবাহ দিয়া ডাক্তারি শিখিবার জন্য জামাতার সহিত তাঁহাকে বিলাত প্রেরণ পূৰ্ব্বক উভয়ের সমুদয় ব্যয়ভার গ্রহণ করিলেন। এই সুশীলা কনা তথা হইতে পীড়িত হইয়া দেশে ফিরিলেন এবং সকল চেষ্টা ও চিকিৎসা ব্যর্থ করিয়া ১৯০২ সনের নবেম্বর মাসে স্বর্গারােহণ করিলেন। কন্যাদিগের স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। শক্ষার জন্য তিনি অকাতরে ব্যয় করিয়াছেন এবং সমারােহের সহিত তাহাদের বিবাহ দিয়াছেন, রােগের সময় যে কত ব্যয় করিয়াছেন তাহার তো কথাই নাই। তাহার কোন কোন বন্ধু বলিতেন, যে, ইহার বিশ্বাস টাকা আর ঔষধের বলেই জগৎ হইতে মৃত্যুকে দূর করিয়া দেওয়া যায়। রােগীর সেবা ও বিপন্নের কার্যোদ্ধার করিবার সময় কেদারনাথের সময়ের জ্ঞান থাকিত না, দিন রাত্রির প্রভেদ থাকিত না, ক্ষুধা নিদ্রা বােধ দূর হইত। কিন্তু অন্য সময় নিয়মপরায়ণতা, যথাকাল কম্মিতা, ও শৃঙ্খলা বিষয়ে আদর্শস্থানীয় ছিলেন। পরিবারস্থ কেহ সময় মত কাজ করিতেছে না দেখিলে, তিনি অসহ্য কষ্ট বােধ করিতেন, এবং ক্রোধ প্রকাশ করিতেন। সন্তানদিগকে সময় মত স্নানাহার করাইবার জন্য তিনি ঘণ্টার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন; পাঠের ঘন্টা, স্নানের ঘণ্টা, আহারের ঘণ্টা, দিনে অনেক বার বাড়ীতে ঘন্টা বাজিত। সরকারী কাৰ্য্য হইতে অবসৃত হইবার পর সন্তানদিগের শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দিকে কিছুদিন মন দিতে পারিয়াছিলেন। নিজে তিনি প্রত্যুষে উঠিতেন এবং যে সময়ে যে কাজ, সেই সময়ে সেই কাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে আসিয়া বসিয়া থাকিতেন। ৬ টায়, ১০ টায় ও বিকালে ৪ টার সময় তাঁহার পূৰ্বে কেহ টেবিলে আসতে পারে নাই। বৃহস্পতিবার বিলাতে চিঠী যাইবার দিন। তিনি রবিবার বিলাতের চিঠী পাইয়াই সেই দিন, অথবা সােম মঙ্গলবারের মধ্যে বিলাতের চিঠী লিখিয়া রাখিতেন, ভয়, পাছে Mailday তে কোন বিশেষ প্রতিবন্ধক আসে এবং সময় মত চিঠী না যায়। প্রায় সব business letters নির্দিষ্ট সময়ের বহু পূর্বে type করিয়া রাখিতেন। চিত্রী পত্ৰ, দরকারী কাগজ সকল সময়ে গুছাইয়া ফাইল করিয়া রাখিতেন। তাঁহার মত হিসাব রাখিতে কেহ পারিত না, অথচ তাহার মত ব্যয়শীল লােকও সচরাচর দেখা যায় না।
শ্রাদ্ধিক। তিনি আইনে সুপণ্ডিত ছিলেন, সকলেই স্বীকার করেন। সরকারী কাজ তিনি চিরদিন দক্ষতার সহিত করিয়া আসিয়াছেন। বিচারাসনে, বসিয়া তিনি এক ধৰ্ম্মরাজ বিধাতা ব্যতীত কাহাকেও ভয় করিতেন না। তিনি একদিকে যেমন স্বাধীনচেতা ছিলেন, অপরদিকে তেমনি দয়ালু ও ধর্মভীরু ছিলেন, কোন্ পক্ষে ন্যায় ও ধৰ্ম্ম বুঝিবার জন্য চিন্তা, অধ্যয়ন ও পরিশ্রমে কোন দিন বিমুখ ছিলেন না। দায়রার মােকদ্দমা উপলক্ষে তিনি কাছারিতে বাতি জ্বালিয়া ৮টা ৯টা পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়াছেন, বাড়ীতে জাগরণ করিয়া রাত্রি ২টা পর্যন্ত বসিয়া রায় লিখিয়াছেন। তাহাকে কাৰ্যদক্ষ জানিয়াই যেখানে বেশী কাজ গবর্নমেন্ট সেখানে তাহাকে পাঠাইয়াছেন। জজরূপে তিনি প্রায় সর্বদাই ডবল ডিষ্ট্ৰীক্ট পাইয়াছেন, যেমন পাবনা-বগুড়া, রঙ্গপুর-জলপাইগুড়ি, যশােহর-খুলনা বীরভুম-দুমকা। যখন যেখানে গিয়াছেন, অধীনস্থ কর্মচারিগণকে এক- দিকে শাসন করিয়াছেন, কাজ শিখাইয়াছেন, দুর্ণীতি দেখিলে তিরস্কার করিয়াছেন বা শাস্তিও দিয়াছেন, অপর দিকে যােগ্য ব্যক্তিকে সর্বদা পদোন্নতি দিয়া উৎসাহিত করিয়াছেন, অযােগ্যের প্রতিও অবিচার হইলে তাহার প্রতিবিধান করিয়াছেন, এবং সকলের বেদনায় ব্যথিত হইয়াছেন। তিনি খাটিতে ও জানিতেন, খাটাইতে ও জানিতেন। কোন কোন স্থানে দেখা গিয়াছে, দুর্ণীতিপরায়ণ অথবা অযােগ্য কৰ্ম্ম- চারী উহার আগমনমাত্রেই কাৰ্য্য হইতে ছুটী লইয়াছে। এইরূপ দুই চারিটি লােক ভিন্ন বদলী হইবার সময় সকলেই উহার জন্য হায় হায় করিয়াছে। যখন যে জেলায় থাকিয়াছেন, উকীল মুন্সেফ, ডেপুটী, সক জজ প্রভৃতি সকলেই তাঁহার সৌজন্যে মুগ্ধ হইতেন। তাহার ভদ্রতা কেবল পদস্থ ব্যক্তির জন্যই ছিল না, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে তিনি সকলের সহিত মিষ্টালাপ করিতেন। তাহার কর্তব্যনিষ্ঠা তাহাকে অনেক সময় লােকের ও গবর্ণমেন্টের স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। অপ্রিয় করিয়াছে। জজরূপে তিনি আপনাকে জেলার নাবালক জমি- দারগণের অভিভাবক বলিয়া জানিতেন। এই সকল নাবালকের সম্পত্তি ও অর্থের সর্বদাই অপব্যবহার ঘটে। কেবল আত্মীয় স্বজন ও জমীদারী গােমস্তারাই ইহাদের অর্থ শােষণ করে তাহা নহে, সরকারী কর্মচারী ও উচ্চপদস্থ রাজপুরুষগণের অনবধানতা হেতু এবং কখন কখন তাহা- দের জ্ঞাতসারে এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্যও ইহাদিগের অনেক অর্থের অযথা ব্যয় হয়। এই সকল নিবারণ করিতে গিয়া, তিনি যে কেবল ঐ প্রকৃ- তির লােকের চক্ষুশূল হইয়া ছিলেন তাহাই নহে, গবর্ণমেন্টের নিকট ও যথেষ্ট তিরষ্কার ও লাঞ্ছনা প্রাপ্ত হইয়াছেন। পরের হিত করিতে গিয়া তিনি নিজে বিশেষরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন। যাহাদিগের মঙ্গলের জন্য তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করিয়াছেন, তাহারাও তাহার প্রতিকূলতা করিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। কোন নাবালক জমীদারের সুশিক্ষার জন্য পিতার ন্যায় চিন্তা, চেষ্টা ও পরিশ্রম করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার সে চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই। স্বাধীনচিত্ততার জন্য তিনি উপরিস্থ রাজপুরুষদিগের বিরাগভাজন হইয়াছিলেন। জন্মপত্রিকা হারাইয়া যাওয়াতে তাহার বয়স দুই বৎসর বাড়াইয়া, শিক্ষকেরা তাহাকে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য উপস্থিত করেন। চাকুরী লইবার দুই বৎসর পরে, তিনি মাতুলের অনুরােধক্রমে, ঐ ভুল সংশােধিত করেন। মাতুলালয়ে তঁাহার জন্ম হয়, মাতুল গুরুদাস দাস গুপ্ত নিজে রঙ্গপুরের ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট affidavit করেন যে ১৮৫৫ সনের ডিসেম্বর মাসে কেদারনাথ রায় জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালের গবর্ণমেন্ট উহা স্বীকার করেন, এবং Service Bookএ পচিশ বৎসরের অধিককাল তাঁহার বয়স ঐরূপ ধরা হয়। ইদানীং তাহার উপরিস্থ রাজপুরুষগণ তাহাকে কিরূপে সরাইবেন তাহাই খুজিতেছিলেন; তাঁহারা ৩০ বৎসর পূর্বের কাগজ পত্র খুজিয়া ও ৩৯ বৎসরের University Calendar ১৮ দ্ধিকী উদঘাটন করিয়া, তাঁহার বয়স ইচ্ছানুসারে ঠিক করিয়া লইলেন ও পর- বর্তী সংশােধন অগ্রাহ্য করিলেন। সুতরাং ৫৩ বৎসর বয়সেই কেদারনাথ রায় কাৰ্য্য হইতে অবস্ত হইলেন। ৫৫ বৎসর বয়সের পরও সুদক্ষ বিচা- রকগণ extension পাইয়া থাকেন; কেদারনাথ রায় extension চাহিয়া পাইলেন না। গবর্ণমেন্টের এই অবিচার তাঁহার মর্মান্তিক হইয়াছিল । ৩২ বৎসর শরীর মনের সমুদয় শক্তি দিয়া, যে গবর্ণমেন্টের জন্য খাটিলেন তাহাদের এই বিচার ! গত ২১শে ডিসেম্বর, চাকুরীর শেষ দিনে স্মৃতিপুস্তকে লিখিতেছেন—“The best virtue of a Judge is independence and courage. His Majesty's Judge fears 110 body, not even the King. The principle must be preached even if we die for it. It will be transmitted to my children." *I pray for the people of Birbhum among whom I have worked for nearly two years. Oh God, forgive me for any wrong I may have done them. Bless them with Thy grace. May there be no enemies here and may they all prosper. God, give me new light for new work." তাঁহার কৰ্মশীল জীবন নিশ্চেষ্ট থাকিবার নহে। ২২শে তারিখের প্রার্থনা এইরূপ-"Oh Merciful. give peace and rest, open a new field for and give me light and strength.” ইহার কিছুদিন পরে fafatiga "Find nothing in which I can make myself useful." কিন্তু এই অবসাদের মধ্যেও অনেক কাজ হাতে লইয়াছিলেন। চিরকালই ব্রাহ্মধর্ম প্রচার ও ব্রাহ্মসমাজের সেবায় me: me স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। ১১ আত্মােৎসর্গ করিবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। কলিকাতায় আসিয়া দেখিলেন, ভবানীপুর ব্রাহ্মসমাজ ঋণগ্রস্ত, সিটীকলেজ ঋণগ্রস্ত। তিনি এই ঋণ পরিশােধাৰ্থ আপনার শক্তি ও সময় নিয়ােগ করিতে প্রস্তুত হইলেন। লিখিয়া বা বক্তৃতা দিয়া ধৰ্ম প্রচার করিবার শক্তি সকলের থাকেন। কিন্তু যাঁহারা নীতি ও ধর্মপ্রচার করেন, অর্থ, পরিশ্রম, সহানুভূতি ও সৎপরামর্শ দিয়া সেই সকল ব্যক্তি বা সমাজকে সাহায্য করিলেও গৌণভাবে নীতি ও ধর্মের প্রচার হয়। এভাবে তিনি চির- কালই ব্রাহ্মধৰ্ম্মের প্রচার করিয়াছেন। এখন আরও একাগ্রতার সহিত করিতে আরম্ভ করিলেন । অথচ তাহার আদর্শ এত উচ্চ ছিল, তাহার খাটিবার আগ্রহ এত অধিক ছিল, যে নিজের প্রতি সৰ্ব্বদাই অসন্তুষ্ট থাকি- তেন। “My life has been a failure,” একথা প্রায়ই তাঁহার মুখে শােনা যাইত এবং কথাটি যখন বলিতেন, দুই চক্ষু জলে ভরিয়া আসিত। অবসরপ্রাপ্তির পর ব্রাহ্মসমাজের যে বিভাগ হইতে যে কাজের জন্য 'তাহাকে আহ্বান করা হইত, তিনি সন্তুষ্টচিত্তে সেই কাৰ্যে মন দিতেন। তাঁহার স্বাস্থ্য বহুকাল হইতে ভগ্ন, কিন্তু তাহার শরীর কোন দিন তাহাকে কোন কাজ হইতে ফিরাইতে পারে নাই ; তাঁহার মন তাহার ভগ্ন শরীর দিয়া সকলই করাইতে পারিত। দেশহিতকর সকল অনুষ্ঠানের সহিত তাহার গভীর সহানুভূতি গবর্নমেন্টের ভৃত্য বলিয়া সকল সময়ে সকল কাজে যােগ দিতে পারিতেন না, কিন্তু রাজপুরুষদের নিকটও ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলিতে কখন ভীত হন নাই। Sir Bamfyide Fuller এর সঙ্গে একবার ঢাকায় দেখা করিতে যান এবং কথা প্রসঙ্গে বলেন, “If Your Hononr would allow ine, I would advise Your Honour not to adopt repressive measures." Sir Bamflylde afacaq"But Mr.
এদ্ধিকী। Roy, I am human." Mr. Roy falcata "A Lieutenant Governor ought to be more than human" কেদারনাথের পরিশ্রমশীলতা ও অদম্য কাৰ্যোৎসাহ হার চরিত্রের বিশেষত্ব ছিল। একদিন একঘণ্টা কেহ তাহাকে সময় নষ্ট করিতে দেখে নাই। সর্বদাই কিছু না কিছু কাজ করিতেন, অথবা কাজের কথা ভাবিতেন, ভবিষ্যতের করণীয় কাৰ্য্য সূক্ষ্মানুসূক্ষ্মরূপে বিচার করিয়া, স্থির করিয়া রাখিতেন। নিদ্রাকাল ভিন্ন তাহার চিন্তার বিরাম ছিল না। তাহার এমনই অভ্যাস ছিল যে, ছােট বড় কোন কাজই তিনি পরে করিব বলিয়া ফেলিয়া রাখিতে পারিতেন না। এই জন্য, একটু দূরে গেলে, তাহার চিঠী, পত্র, তাকিদ ও টেলিগ্রাফে বাড়ী পূর্ণ হইত। তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র সিবিল সাৰ্বিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াও যখন স্বাস্থ্যের জন্ঠ চাকুরী লাভে বঞ্চিত হইলেন, তখন টেলিগ্রাফেই তাহার প্রায় হাজার টাকা খরচ হয়। সে সময়ে তিনি বিলাতের কত লােককে কত পত্র লিখিয়া- ছেন, এবং পুত্ৰকেই বা কত লিখিয়াছেন। মনে আছে, mail dayর পূৰ্ব্ব সন্ধ্যায় চিঠি লিখিতে বসিয়া ভােরে আসিয়া বিছানায় শুইয়াছেন। প্রতিবন্ধকতা চিরদিনই তাহার অধ্যবসায়কে দ্বিগুণ প্রবল করিয়াছে। তাঁহার অধ্যবসায়ের ফলে তিনি নিজে সামান্য শিক্ষকের পদ হইতে ক্রমে জেলার অজ হইয়াছেন এবং তাহার দ্বিতীয় পুত্র স্বাস্থ্যের ক্রটিতে Civil Service হারাইলেও Provincial Service এ গৃহীত হইয়াছেন। ‘মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পতন’, তাঁহার মন্ত্র ছিল। যাহা চাহিতেন তাহা না পাওয়া পর্যন্ত সংগ্রামে নিরস্ত হইতেন না। নিজের অধ্যবসায়, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও উচ্চাভিলাষ ছিল বটে, কিন্তু নিজের জন্য কিছুই করিতেন না। পরিবারের সুখ, পরিবারের, সমা- জের বা দেশের গৌরব তাহার সকল চেষ্টার লক্ষ্য ছিল। এত উপার্জন করিতেন, কিন্তু নিজ হাতে করিয়া নিজের জন্য কিছু ব্যয় করিতে পারি- স্বগীয় কেদারনাথ রায়। তেন না। আহার বিহার পরিচ্ছদ সম্বন্ধে আশ্চৰ্য উদাসীনতা ছিল। তিনি নিজের পাদুকা বা পরিচ্ছদ কখন নিজে দেখিয়া শুনিয়া কিনিয়াছেন, বা করাইয়াছেন এরূপ দেখি নাই। জুতা ছিড়িয়া গেলে পুত্র বা পত্নী লক্ষ্য করিয়া আবার আনাইয়া দিয়াছেন। নূতন পরিচ্ছদ পাইলেই বলিয়াছেন, আমার এত কাপড়ের কি দরকার, ছেলেদের দাও। কিন্তু বাড়ীর লােকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিলে এবং সুসজ্জিত হইলে আনন্দ অনুভব করিতেন। সন্তানদিগের সামান্য অভাব দেখিলে অসহ কষ্ট পাইতেন। আহারাদি সম্বন্ধে উদাসীনতা আরও বিস্ময়কর ছিল। সম্মুখে যাহা দেওয়া যাইত, সুস্বাদু হউক বা না হউক, বিনা বাক্যব্যয়ে নিঃশেষ করিতেন, অথচ কেহ যত্ন পূর্বক খাওয়াইলে সন্তুষ্ট হইতেন এবং নিজে অতিথিকে ষােড়শােপচারে ভােজন করাইয়া সুখ বােধ করিতেন। অতিথি অভ্যাগতের প্রতি তাঁহার বিশেষ যত্ন ছিল। সাধ্যমত পরের উপকার করিয়াও তিনি মনে করিতেন পুত্রকন্যাদি ভিন্ন আর কাহারও জন্য কিছু করেন নাই। যে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিয়া যােড়শ বৎসর বয়সে ধন জন গৃহ পরিবার পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক শুন্য হন্তে পথে বাহির হইয়াছিলেন, সেই ধর্মের জন্য পরিণত বয়সে যথেষ্ট সময় ও শক্তি দান করিতে পারিলেন না বলিয়া সর্বদাই আক্ষেপ করিতেন। অথচ ধৰ্ম্মনিষ্ঠ গৃহস্থের সকল কর্তব্যই করিতেন। ব্রাহ্মসমাজ দরিদ্র, তাই ব্ৰহ্ম-সমাজকে ধর্ম প্রচারের সাহায্যার্থ অন্যূন ৫০০০ টাকা দিয়া যাইবেন, ৬ বৎসর পূর্বে এইরূপ উইল করেন। ইহার এক বৎসর পূর্বে তাহার পৈত্রিক জমদারীর নিজাংশ বিক্রয় করিয়া তিনি ২৪০০০ টাকা পাইয়াছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কয়েক দিবস পূর্বে তাহার পত্নীর নিকট এইরূপ বলিয়াছিলেন যে, তাহার ইচ্ছা তাহার সমুদয় সম্পত্তির আয় তাঁহার পুত্র কন্যা যতদিন অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকে, কেবল ততদিন বা নিতান্ত প্রয়ােজনীয় চাকুরী অথবা কোন ব্যবসায় গ্রহণ পৰ্যন্ত ভােগ করুক।
স্বর্গীয় কেদারনাথ রায়। যখন সকলেই আপন জীবিকা অর্জনে সমর্থ হইবে তথন সমুদয় সম্পত্তি ব্রাহ্মসমাজের হউক। পুরাতন উইল অগ্রাহ্য করিয়া, শেষ দিনে যে উইল লিখিতে বসিয়াছিলেন, তাহা শেষ হয় নাই এবং তাহাতে কাহাকে কি দিয়া যাইতেন, তাহাও জানিবার উপায় নাই। তবে তাহার তৃতীয় para এইরূপ । "Property I value, main!y, as a means of educating my children and settling them in life and, partly, as enabling my wiſe, children, and dependents to live in comfort and competence, in the sense of freedom from want, but not in luxury, and the surplus of the income from it, if any, should go to the benefit of the public and service of God. My executors should remember this wish and should try to administer my estate according to it with intelligence and wisdom." ইহার পরেই উক্ত উইলে নিজের বহু দুঃখদারিদ্র্য-উৎসাহ অধ্যবসায় পূর্ণ জীবনের অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, তাহাও শেষ হয় নাই। সেই দিন অপরাহ্বে কর্তব্যনিষ্ঠ স্বামী পত্নীর স্বাস্থ্য শােধনের জন্য তাহাকে বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করাইতে গিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। বুঝি জ্ঞাতসারে স্বজনবর্গের নিকট বিদায় লইতে তাহার কোমল স্নেহময় প্রাণে বড়ই ব্যথা লাগিত, বুঝি শিশুসন্তানদিগের অসহায় অবস্থা স্মরণ করিয়া বড়ই ভীত হইতেন, তাই মৃত্যু অতর্কিতভাবে তাঁহাকে ছিনিয়া লইল। ঘােড়শ বর্ষ হইতে প্রায় চুয়ান্ন বৎসর বয়স পর্যন্ত যিনি আলস্য বা বিশ্রাম জানেন নাই, কর্তব্যের পদে যিনি প্রতি মুহূর্ত আত্মসুখ বলি দিতে প্রস্তুত ছিলেন, অতিশয় স্নেহ যাহার পারিবারিক জীবন দুঃখময় করিয়াছিল, যিনি প্রতিদিন ভক্তি ও ব্যাকুলতার সহিত ভগবানকে
দ্ধিকী
।
ডাকিতেন, ভগবান তাহার সকল দুঃখ কষ্ট লােগ শােক ভয় ভাবনার
অবসান করিয়াছেন। তিনি সকলের সেবা করিয়া গেলেন, কাহারও
সেবা লইবার অবসর পাইলেন না, যাহারা পড়িয়া রহিল, ইহাই তাহা-
দিগের বিশেষ ক্ষোভ।
৪২ হাজরা রােড,
বালীগঞ্জ, কলিকাতা
৯ই নবেম্বর, ১৯০৯
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.