Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Galpo Saptak Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
Marg on
No text on this page.
গল্প
시영
L
‘ব মাস)
পু,
খগেন্দ্রনাথ মিত্র
बना सपना
প্রকাশক
বৃন্দাবন ধর স্ক্যান্ড সন্স লিমিটেড
অধিকারী—লাভােব লাইব্রেরী
৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা ;
৩৮নং রােড, ঢাকা।
দ্বিতীয় সংস্করণ
১২
বিটার
এমধুসুমন নাগ
আগে সে,
চাকা
डा (' मी बनी • লালুর বরাত সুশান্ত ও শিউনন্দন 08 লাঠির গুণে কারসাজি . .. চন্দনপুরে १ ... বন্ধু বিপত্তি ar - (NTIC ARE Sware PRATES AREfour sorse 'सं. ७ हा Orior भनिमिय -TAR'-' मल (Om
No text on this page.
গাভােয়ান লকড়ি উচিয়ে বললে—সামনে ঐ রহমপুরের
জলা।”
ছইয়ের নীচে শশী বেয়ারার কোলের কাছে বসেছিল
সে সভয়ে সেইদিকে তাকাল। যতদূর দেখা যায়-
কেবল জল; বাতাসে তার বুকে ঢেউ উঠছে, মেঘের ছায়ায়
হয়ে আছে কালাে।
শশ কোন উত্তর দিলে না, একমনে তামাক টানতে লাগল।
বায়ের গরুটিকে একটি ঠেলা দিয়ে ডাইনের গরুটার
ভিজে পিঠের উপর এক ঘা লকুড়ি মেরে, গাড়ােয়ান আবার
বললে-শুনলে বেয়ারার পাে?”
-“কি?”
-সামনে ঐ দেখা যায় রহমপুরের জলা।”
*টেনে চল।”
এই কাদায় গরুর পা যাচ্ছে বসে--
-তবে আস্তে চল।”
—“তােমার জন্য আজকে জান্টা-
রতন শশীর একেবারে কোল ঘেসে স’রে বসল। শী
তার কাঁধে ভারী হাতখানা একবার রেখেই নামিয়ে নিয়ে
গাড়ােয়ানকে বললে—“তাের জা কেউ মারবে না।” তারপর
রতনের হাতখানা ধরে তার দিকে একটু ঝুকে বললে—“ভয়
নেই। চুপ করে বসে থাক।”
“কিন্তু শশীকাকা, তুমি ত একা!”
-“একা কেন? তুইও আমার সঙ্গে লাঠি ধরবি।”
বলে সে মােটা ও ভাঙ্গা গলায় হা-হা করে হেসে উঠল।
তার কালাে মুখে হাতগুলােকে দেখাতে লাগল বড় বড়
মুক্তোর মত।
বতন ফিরে দেখল, শশীর লাল ও বড়
চোক দুটোকে দেখাচ্ছে আরও লাল, আরও বড়।
২
গাড়ােয়ান বললে-সেই দুপুর থেকেই তােমাকে তাড়া
দিলাম—
—“তাের যেমন বুজি। কুটুমবাড়ী থেকে আসবার জন্যে
কেউ মারামারি করে। বিশেষত এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে।
তারা যখন ছাড়বে, তখনই ত আসা দরকার। গাড়ী চালিয়ে
বেটার বুড়ি হয়েছে গরুর মত ।”
রতন বললে—“কাকা, তুমি রহমংপুরের ডাকাতদের দেখেই
কখনও?”
“তারা আমার সামনে বেনােয় না।” বলে সে ককেটা
গাভােয়ানের দিকে বাড়িয়ে বললে-“ধরগগা।”
গাড়ােয়ান কলটো তার হাত থেকে নিতে, সে পাকা
বাঁশের ভারী লাঠিখানাকে একটু নেড়ে-চেড়ে রেখে সামনের
কলার দিকে তাকিয়ে রইল।
বেলা বেশি নেই, যেটুকু আছে জলার ধারে পৌছুতেই
যাবে শেষ হয়ে। মেঘের ছায়াটা কমে হয়ে উঠছে আরও
এক এক সময় মনে হচ্ছে, এই বৃষ্টি আসে। পথের
দু'পাশ থেকে দলে দলে ব্যাঙ, ডাকছে; মাঠে এক এক
জায়গায় দাড়িয়েছে জল। বাঁশঝাড়ের মাথায় মনােছৰে ব'সে
আছে দু-একটা মাছরাঙা। পথে হাঁটুসমান জল-কাদা। তার
উপর দিয়ে রতনদের গাড়ী চলছে কষ্টে ও আন্তে।
না।
•
भाजक এল। হঠাৎ রতন বলে উঠল-শশীকাকা, যদি ডাকাতেরা আমাকে মেরে ফেলে?” মােটা,চওড়া, খসখসে হাতখানা দিয়ে শশী তার পিঠে আস্তে একটা থাবা মেরে বললে-“কে মরে বসে বসে দেখি।••• ওরে ছমির! ঐ বাঁয়ে সেই পােডড বাড়ীটা দেখা যায় না?” —হ।” —“চারধারে চোখ রেখে চল।” রতনের বুক ঢিপঢিপ, করতে লাগল, গলা শুকিয়ে শশী লাঠিখানা বাঁ-পাশ থেকে নিয়ে রাখল ডান পাশে; কোমরের কাপড়টা পরল আরও শক্ত করে ; মাথার লম্বা চুলগুলাে একটু ফুলিয়ে, গোঁফে চাড়া দিয়ে বলে উঠল—“গুরু বল-গুরু বল।” রতন তাকিয়ে দেখল, তাদের শী—তার শশীকাকা- নিজেই যেন ডাকাতের সর্দার। তার হাতের আঙ্গুলগুলােকে দেখাচ্ছে লােহার মােটা গরাদের মত। সে বইয়ে পুরুষ- গরিলার হাত ও বুকের যে ছবি দেখেছে, শশীকাকার হাত দুখানা ও বুকটাকেও লাগছে সেই রকম। তাকে তার ভয় করতে লাগল। গাড়ীখানা তখন এসে পড়েছে এলাটার ধারে ; পথও আর দেখা যায় না। বাঁয়ে দেখা গেল একটা আলাে। বৃষ্টি :
পড়তে শুরু হ’ল সূত্মধারায়। বৃষ্টিখারার, বাতাসের, জলার বুকে
ঢেউয়ের, গাড়ীর চাকার ও গরুর পায়ের শব্দ এবং ব্যাঙের
ডাক, একসঙ্গে মিশে একটা বি কায়ার মত শােনাতে লাগল।
রতন তাকিয়ে দেখলে
দেখলে অন্ধকারে আগুনের ফুলকির মত
এদিকে-ওদিকে জোনাকি ভেসে যাচ্ছে; আর বয়ে মানে মাঝে
জ্বলে উঠছে রক্তজবার মত একটা আলাে•••
গাড়ী চলেছে। দু’পাশে জলা। তার ছল-ছল শব্দ এবার
হয়েছে আরও স্পষ্ট। এই জলাটা পার হলেই একখানা গ্রাম,
তার পরের গ্রামে রতনদের বাড়ী। সেখানে পৌঁছতে হবে রাত
দুপুর। এবার ভয়ে তার দু'চোখে জল এল।
হঠাৎ শণী বাঘের মত গুড়ি মেরে, তার ঠিক সামনে
গিয়ে বসে, সতরঞ্চির তলা থেকে খড়গুলাে পড়পড় করে
ছিডে, তা দিয়ে কি করতে লাগল এবং একবার বলে
উঠল-“ছমির, গাভী কখতে দিস নে। সােজা চালাবি।
শালাদের গন্ধ পাচ্ছি।”
-মাথা যদি বাঁচে, তবে ত?”
—“তুই এক কাজ করবি,গাড়ীর নীচে পালাবি—
কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ সামনে দেখা গেল দুটো
ছায়া-মূর্তি ; সেই সঙ্গে সামনে থেকে কে বলে উঠল
“কোথাকার গাড়ী ?”
ছমির বললে--ময়নাগড়ের।” যাবে কোথায় ? -“নন্দনপুর- —“কার বাড়ী।” হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে শশী বলে উঠল—“তাের এত ধরে দরকার কি?” তার হাতে এইে খড়ের মতাে। সে আবার বললে— সরে যা কিন্তু তৎক্ষণাৎ তার মাথায় পড়ল লাঠি। তবে সবটা লাগল না, আঘাতের খানিকটা লাগল তার মাথার ডান- দিকে। জায়গাটা ফেটে ঝরু করে রক্ত এল বেরিয়ে। ণ তখন হয়ে উঠল আহত বাঘের মত। হাতের মুছােটা ছমিরের শূন্য আসনে ফেলে, তার হাতের কাছে যে মূর্তিটা ছিল, সে তারই কাধে দিলে এক ঘা। তারপর গাভী থেকে লাফ দিয়ে নীচে নেমে, হাঁক দিয়ে বললে-আয় শালারা। শণ বেয়ারা কিন্তু তার কথা শেষ হ'ল না, তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল তিনজন। বৃষ্টি তখন থেমে এসেছে; টানা-বাতাসে মুড়ােটা যোয়া ছেড়ে এলছে। সেই আলােতে চারজনকে দেখাতে লাগল চারটে উন্মত্ত পিশাচের মত! তাদের লাঠি ঘুরছে,
ধুপধাপ আঘাতের শব্দ হচ্ছে। কিন্তু গরু দুটো দাড়িয়ে আছে
স্থির হয়ে যেন কাঠের পুতুল!
হঠাৎ শশীর প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন শুয়ে পড়ল কাদায় ;
একজনের হাত গেল ভেঙ্গে, আর একজনের বাঁ-পারের কানটা
পড়ল কূলে। তারা আর দাড়াল না।
তারা আর দাড়াল না। শশী প্রথমে যাকে
মেরেছিল, সে পালিয়েছিল আগেই।
बनी লাঠি ঘােরাতে ঘােরাতে বলতে লাগল—“আয়।
শশী বেয়ারার উপর লাঠি-বাজি। দেখি, তােদের হিম্মৎ কত।”
কিন্তু তার সঙ্গে যারা লড়বে, তারা তখন জল-কাদা তেলে
আহত শরীরে বহু কষ্টে ছুটছে।
শশী গাড়ীর উপর উঠে দুইয়ের নীচে গিয়ে ডাকল
“রতন—রতন রে। শালাদের ••একি! ছেলে কোথায় গেল?
সে আর একটু ভিতরে ঢুকে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেখে
সতরঞ্চির নীচে একটা অসাড় দেহ। হঠাৎ তার হাত-পা
কাঁপতে লাগল। সে তাড়াতাড়ি সতরঞ্চিখানা সরিয়ে, একেবারে
সেদিকে বুকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেখলে, সে রতন।
সে ডাকল—ও রতনতন। হাঁ-হ-ভয় নেই
ভয় নেই শালারা সব পালিয়েছে। তুই না আমার সঙ্গে লাঠি
রবি বলেছিলি।” তারপর পিছনদিকে মুখ ফিরিয়ে চীৎকার
করে ডাকল—“ছমির। ওরে ছমির।”
৭
লক
তার ডাক জলের উপর দিয়ে বহুদূরে ভেসে গেল; কিন্তু
ছমিরের সাড়া পাওয়া গেল না।
-“সে শালাও পালিয়েছে। যাক—আয় তুই আমার
কাছে সরে বলে সে রতনের হাত ধরে টেনে এনে তাকে
ছইয়ের মুখে বসিয়ে নিজে গিয়ে বসল ছমিরের আসনে।
গরু দুটোকে ঠেলা দিতে যাবে এমন সময় সে আবার বলে
উঠল-“ও কাতরাচ্ছে কে রে? ছমির নাকি। দাতা
দেখি—একটু আগুন জ্বালি।” বলে, সে বাঁ হাতে একমুঠো
খড় টেনে নিল। তার ডান হাতে চোট
তার ডান হাতে চোট লেগেছিল খুব,
মাঝের আঙ্গুলটা বােধ হয় ভেঙ্গেই গেছে।
সে আগুন বেলে দেখে, কাদায় একজন পড়ে আছে। তার
মুখানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
লােকটা আলাে দেখে উঠবার চেষ্টা করল।
শণী তার দিকে তাকিয়েই বলে উঠল—“আরে। এ যে
এক পালা ডাকাত। শালা কি এখনও কামভাবার মতলবে
আছে।
লোকটা জড়িয়ে জড়িয়ে বললে-“দাদাবাঁচাও-শেয়ালে
খাবে—ওরা পালিয়েছে।”
“তুই যে হাসালি। তােকে বাঁচাৰ আমি। একটু
আগেই ত তুই আমার প্রাণ নিতে চেয়েছিলি?
—“
দাদা, বাঁচাও।” বলে সে শণীর পায়ের দিকে
হাত বাড়িয়ে দিল।
—“
হেঁহেঁঠ
—“পারব না, হাঁ ভেঙ্গে-••চোয়ালের হাড়
•••তােমার লাঠি-
-“আমারও মাথা ফেটেছে-হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গেছে-পিঠ
কেটে গেছে—তবুওতাে শালাদের এখনও•••আয়-ওঠ—” বলে
শশী তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে গাড়ীতে শুইয়ে দিতে দিতে
বললে-“খবরদার, নড়া-চড়া করিস নে•••হেঁইয়াে-টক-টক।”
গাড়ী আবার চলতে লাগল।
-বাবা রতন! ভয় করছে না। এ ! কি অন্ধকার।
ছমির শালা পালাল!•••তাের নাম কি রে?•••হেঁই ট-ট-হাে৷”
-মাধব।”
—“তাের এ দুর্মতি হ’ল কেন?”
—“
যেতে পা-ই-নে। উঃ!—মারে।”
! খেতে পানে! এবার জেল হবে। সেখানে
সব রকম খেতে পাবি
-“
দাদা, তােমার পায়ে
রতন বললে-“শশীকাকা, তুমি ওকে কেন তুলে নিলে?”
-“কেন নিলাম। ভা চল বাড়ী গিয়ে দেখবি।”
শীর হাত ও মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে, পিঠটা কন্ করছে।
নাড়া পেয়ে পিঠের ও মাথার ক্ষত দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল।
রতনের নাকে লাগছে রক্তের গন্ধ। ম্লান আলােয় সে শশী ও
মাধবের রক্তমাখা মুখ দেখে, মাঝে মাঝে শিউরে উঠছিল।
শশী যথাশক্তি গরু দুটোকে উত্তেজিত করছে। কোন
রকমে জলাটা পার হতে পারলে হয়।
-“ঘুম পেয়েছে বাবা। মাে তুই
चूब
পায় নি বলে রতন শশীর পিঠে হাত দিল। তার
হাতে লেগে গেল রক্ত। সে বলে উঠল-শশীকাকা, একি।”
হাতটা ছইয়ের গায়ে মুছে ফেল।”
রতন বুঝলে—সেটা জল নয়, রক্ত; বললে—কাকা!
গগির বাবার কাছে চল।”
—“তা নইলে আর কোথায় যাচ্ছি। ঐ তাে সামনে গাঁ,
আলাে দেখা যাচ্ছে।”
একটু পরেই গাড়ী গ্রামে ঢুকল। পথের পাশে বটতলায়
মুদির দোকানে তখনও আলাে জ্বলছে। সেখানে কয়েক জন বসে
গল্প করছিল, তামাক টানছিল। তাদের একজন বলে উঠল
গাড়ী কার?”
-“সিধু ডাক্তারের।”
দোকান থেকে খানিকটা আলাে গিয়ে শশীর পায়ে পড়ল।
একজন বলে উঠল—গাড়ী চালায় কে? শশী না?
-হু।” শশী থামল না, তেমনি গাড়ী চালিয়ে চলল।
গাড়ী যখন গ্রামে পেীছে হুড়মুড় করে সিধু ডাক্তারের
উঠোনে গিয়ে উঠল রাত তখন অনেক। তাদের সাড়া
পেয়ে বাড়ীটা উঠল সচেতন হয়ে। ডাক্তারবাবু আলাে
হাতে বেরিয়ে এলেন। শশী গাড়ী থেকে নামতেই তিনি বলে
উঠলেন—“একি। শশী, তাের মাথায়, মুখে, কাপড়ে রক্ত!
রতন কৈ?”
রক্তের নাম শুনে সকলেই এল ছুটে।
গাড়ীর গরু দুটো না খুলেই, সে রতনকে কোলে করে সিধু ডাক্তারের সামনে নামিয়ে দিয়ে বললে—“এই নাও তােমার ছেলে। আর ঐ গাড়ীতে আছে আমার শালা। পথে ঠ্যাভাড়েদের সঙ্গে মারামারিতে ওর বড় চোট লেগেছে ডাক্তার। চিকিচ্ছে কর” —“তােরও যে চিকিৎসার দরকার। হরিহরে, শীগগিব আয়! চল-চল-” -আরে আগে ওকে বার কর হরিচরণ, আয় ধর” বলে শশী গরু দুটো খুলে গাড়ীখানা উঠোনের একপাশে ঠেলে দিয়ে, হরিচরণের সঙ্গে মাধবকে বার করতে গেল। ডাক্তারবাবু বললেন-“কি লােক। নিজের কথা একটুও ভাবে না! ওঃ! পিঠটাও কেটে হা করে আছে। শশী! তুই ওকে ছেড়ে দে। আয়-চল— -“দাডা রে বাপু।” বলে সে হরিচরণের সঙ্গে মাধবকে ধরাধরি করে এনে বারান্দায় শুইয়ে বললে—“চিকিচ্ছে কর । বলেছিলে সেদিন তােমার একন বিশ্বাসী লােকের দরকার-বাগানের কাজ করবে। এই একে রাখ—-আমার শালা-খেতে পায় নাগরিব- আচ্ছা সে সব পরে হবে—আগে চল।” তারপর ডিসপেনসারি ঘরে গিয়ে তার মাথায় ব্যাণ্ডেজ ১২
বাঁধতে বাঁধতে বললেন,-গণ। তাের শালা ছিল বলে ত
নতাম না।”
-“শালা আমার বরাবরই আছে। দরকার হয় না, তাই
কাউকে বলি না।
ও না থাকলে আজ কাকা-ভাইপােতে বাড়ীই
আসতে পারতাম না! তুমি ওকে রেখ দাদাবাবু-”
ডাক্তারবাবু : পিঠের আঘাতটার চিকিৎসা করতে লাগলেন
“তাের কোন্ কথাটা না রাখি? তবে যে চোট ওর
লেগেছে। আগে বাঁচুক।”
—“কি বলছ? বাঁচবে না। লাঠিটা এত জোরে ?”
-“না, তা বলছি সারুক—
-“তাই বল। চার জান্। অনেক সয়। ও মারা গেলে
আমার বড় দুঃখ হবে ভাই।”
ডাক্তারবাবু মিখদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে তার পিঠের
আঘাতটার চিকিৎসা করতে লাগলেন। মাধবের সঙ্গে শণীর
সম্পর্ক সম্বন্ধে তাঁর মনে একটু সন্দেহ লেগে রইল।
বাবা-ছাদা হয়ে গেলেদু'জনকে বললেন-“শালা-ভগ্নীপতিতে
এবার চুপচাপ শুয়ে থাক। কাল সকালে সব শুনব।
রতন--
কিন্তু পরদিন শশীর আর সাড়া পাওয়া গেল না। সে
শৈশবে একদিন যেমন হঠাৎ তাঁদের বাড়ীতে এসে আশ্রয়
নিয়েছিল, তেমনি হঠাৎ সবার অলক্ষ্যে চলে গেছে। কেবল
পড়ে আছে তার ক্ষত-বিক্ষত দেহটা আর তার নানা স্মৃতি।
ডাক্তারবাবু তার দেহটার পাশে দাড়িয়ে কেঁাচারটে বার
বার চোখ মুছতে লাগলেন।
১৪
লালুর
বরাত
তখন বেলা দুপুর গড়িয়ে গেছে। ডােবার ধারে বাঁশবনের
মাথায় সূৰ্য নামে-নামে। লালু উঠোনের এক কোণে হেঁচ
তলার ছায়ায় বসে বেলের আঠা দিয়ে খবরের কাগজের ঘুড়ির
প্রকাণ্ড লেজ তৈরী করছিল। লেজ হলে বুড়ি উড়তেই
গম না; কেবল নেমে পড়ে।
তার খুড়ােমশায় ডাকলেন-নেলে!”
লালু তাড়াতাড়ি আঙ্গুলের আঠা কাগজে মুছতে মুছতে
উত্তর দিলেযাই; তারপরে ছুটে বারান্দায় উঠে ঘরের
দরজায় দাড়াল।
খুডােমশায় জিজ্ঞাসা করলেন—“কি করছ?” লালু নখ খুটতে খুটতে চুপ করে রইল। খুড়ীমা ঘরের কোণে মাদুর বিছিয়ে কাঁথা সেলাই করছিলেন। লালুর হয়ে তিনি উত্তর দিলেন। বললেন-“কি আবার করবে। যা ডােমশায় চোখ পাকিয়ে বললেন-“আবার ঘুডি। সেদিন যে তােমাকে বারণ করে দিয়েছি, আর ঘুড়ি উড়িও না। মনে নেই, তারা ডাক্তারের ছােট ছেলে পচার সঙ্গে মারা- মারির কথা ?” লালু ঘাভ নেভে জানালেহ।” -“তবে যে আবার ঘুড়ি ওড়াচ্ছ?” —“ঘুড়ি ওড়াই নি ; তৈরী করছিলাম— তার উত্তর শুনে খুড়ীমা হেসে ফেললেন; খুলােমশায় আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। চাদরখানা গলায় তুলতে দুলতে বললেন-“আজ তােমাকে হাটে যেতে হবে; আমি পারব না। আমার এখনই কাছারি যাওয়ার দরকার। কি আনতে হবে তােমার কাকীমার কাছ থেকে শুনে, টাকা নিয়ে রওনা হও” বলে তিনি ঘরের কোণ থেকে হারিকেন-লণ্ঠন ও ছাতা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে নীচে নামলেন। তারপর উঠোনে দাড়িয়ে বললেন-
“দেরী করাে না, এই বেলা যাও। না হলে ফিরতে রাত
হবে বলেই ধানের গােলার পাশ দিয়ে উত্তরদিকে চলে
গেলেন।
দূব থেকে একবার তার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।
বােধ হয় বেগুন ও লঙ্কা ক্ষেতে গরু ঢুকেছিল; তাড়িয়ে দিলেন।
লালুর মনে পড়ল, বাগানের হুড়কোটা কাল সে ভেজে
ফেলেছে। চাকর নিতাই এখনও একটা নূতন হুড়কো তৈরী
কবে নি।
ভাগ্যে খুলােমশায় জানেন না, কার কাজ।
নিতাইকে একটা পয়সা দেবে বলে, ব্যাপারটা চেপে
রেখেছে।
খুড়ীমা বললেন-“নেরে ছোড়া। দাড়িয়ে রইলি কেন?
যেতে হবে না?” বলে তিনি কথা ফেলে উঠলেন।
ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বললেন-“আজ তাের
মাসী আসবে জানিস না?”
“মাসীমা আসবে। কখন ?”
-সন্ধ্যে বেলা। তারা আজ সকালে রওনা হয়েছে।
নৌকোয় আসতে সারাদিনই ও কেটে যায় । যা, জামা গায়ে
দিয়ে আয়-
মাসীমা লালুকে সেবার যাবার সময় একটা টাকা দিয়ে
গিয়েছিলেন। লালু বললে-“ওঃ কেয়া মজা।”
২
১৭
গলক
সে তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে গিয়ে বাঁশের আলনা থেকে
তার জামাটা পেড়ে গায়ে দিল, কোমর আগে থেকেই
বাঁধা ছিল।
খুড়ীমা রান্নাঘর থেকে খালুইটা এনে উঠোনে রেখে আঁচলের
গেরো খুলে একটা টাকা বার করে বললেন-“এই নে—
বেশ ভাল দেখে একটা মাছ আনবি। আর ঐ সঙ্গে দু’পণ
}
পান, আধসের সুপুরী, চার পয়সার খয়ের। আর যদি পাস্
ত সের খানেক আলু কিনি
-“এত সব আনব কিসে?”
“কেন, অত বড় খালুইটাতে ধরবে না? তবে ঐ ঘােট
খালুইটাও নে।”
লালু খুড়ামার হাত থেকে টাকাটা নিল। খুড়ীমা
বললেন—“টাকাটা কাপডের খুটে বেশ ক'রে বেঁধে পেটের
সজে গুজে রাখ।”
“ভয় নেই, হারাবে না।” ব'লে, খালুই দুটো হাতে তুলতেই
লালুর মনে পড়ল, তার ঘুড়ি, লাটাই, ঘুড়ির লেজ, কাগজ,
আধখানা কঁচা বেল, হেমােখানা ছেচতলায় পড়ে আছে।
হেসে দিযে সে কাগজ কাটছিল। সে খালুই দুটো মাটিতে
নামিয়ে তার জিনিসগুলাে টে কী-ঘরের কোণে রেখে এল।
তারপর ছুটে এসে খালুই দুটো হাতে তুলে তেমনি ছুটতে
ছুটতে বেরিয়ে গেল।
গাঁ থেকে ফকিরগঞ্জের হাট দেড় ক্রোশ, মাঝে একটা
নদী। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে-বৃহস্পতি ও রবিবারে।
সেদিন রবিবার। আক্রোশের মাথায় খেয়াঘাট।
পার হয়ে নদীর ধার ধরে ক্রোশটাক গেলেই হাট। দূর থেকে
হাটের ধারে বড় বটগাছটা দেখা যায়। নদী পার হতে
হ'তে হাটের ঘাটের নৌকোগুলােও চোখে পড়ে। হাটের
ওধারেও একটা খেয়া আছে। সেটা দিয়ে হাট কাছে হয় ;
কিন্তু এপারে হাঁটতে হয় ঠিক ওপারের সমান।
অনেক
লালু চলেছে। জোলাপাড়ার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে
নকয়েক জেলা সঙ্গী হল।
তারাও হাটে যাচ্ছে। কেউ নিয়েছে এক মােট নূতন
গামছা, কেউ নিয়েছে সুতাে, কেউ নিয়েছে চাদর।
একজন জিজ্ঞাসা করলে—“কি গাে নালু বাবু। হাটে যাবে
নাকি?”
-“হ”
-“তা একা যে। নিতাই কৈ ?”
—জানিনে--
কোলাটা নিজেদের মধ্যে একজনকে বললে—“বুঝলে গাে
চাচা, মাধববাবু মরার পর ছেলেটার ও হাল হয়েছে।”
-“ছাড়ান দেরে ভাই; ভর নােকের কথা—”
জোলাপাড়ার পর প্রকাণ্ড ধান-ক্ষেত। আলে আলে যেতে
হয়। ক্ষেত পার হলেই খেয়াঘাট , ঘাটের উপর পাটনীর ঘর।
তার সামনে একখানা নৌকোর ভাঙ্গা ছই, কতকগুলাে ছােট
হােট বাঁশ ও একটা গলুই প'ড়ে আছে।
লালু ক্ষেত পার হযে সেখানে গিয়ে দেখলে খেয়া ওপার
থেকে রওনা হয়েছে। জনকয়েক হাটুরে বেসাতি নামিয়ে
বসে গল্প করছিল। লালু তাদের কাছে না ব'সে ভাঙ্গা ছইটার
উপর গিয়ে বসল। খেয়া ভিড়তে এখনও কিছু দেরী।
২০
তারপর খেয়া-নৌকো ঘাটে ভিড়তে না ভিড়তে সে পাড
দিয়ে নীচে নেমে সকলের আগে গিয়ে খেয়ায় উঠল। হাটের
বেলা; দেরী করা চলে না। যাত্রী নিয়ে তখনই খেয়া ছাডল।
খেয়া চলেছে। এদিক-ওদিক দিয়ে ডিঙ্গি ও ব্যাপারিদের
দু’-একখানা বজরা বা পানসী যাওয়া-আসা করছে।
লালু বসেছিল ধারে পা ঝুলিয়ে। পাটনী বললে—“সরে
বস। হাতে দডি দেবে নাকি? ঐ টানে একবার পড়লে নিয়ে
যাবে সেই মহেশপুরের ঘাটে।” কিন্তু লালু পাটনীর কথায়
কান দিল না। পায়ের নীচে দিয়ে নদীর স্রোত যাচ্ছে, দেখে
তার বড় আনন্দ।
পাটনীর ভাই সকলের কাছে পারানির পয়সা আদায়
কবছে। কেউ বলছে-“কাল দেব”, কেউ বলছে—“ফিরতি
বেলা”, কেউ টাক থেকে পয়সা বা’র করছে। লালুর কাছে এসে
সে পয়সা চাইতেই পাটনী বললে—“বােসমশায়ের ভাইয়ের
বেটা।” পাটনীর ভাই লালুর কাছে আর পয়সা চাইলে না।
লালু তার পাশের লােকটির সঙ্গে অনর্গল কথা বলছে।
নদী কোথা থেকে আসে, পাহাড় কি রকম, ষ্টিমার কেমন করে
চলে এবং উড়ােজাহাজ কেমন দেখতে ইত্যাদি ইত্যাদি । তার
অনর্গল বক্তৃতায় পিছন থেকে একটা লােক বলে উঠল—
“তুমি উকিল হবে বাবু।”
শুনে লালুর উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। তার বক্তৃতা
থামে না, লােকগুলাে তার কথায় আর কান দিলে না।
খেয়া পারে পৌছল, কিন্তু টানে ঘাটে ভিড়তে পারল না ,
ভাটিতে কিছু দূর চলে গেল। জায়গাটায় উচু পাড়। তাৰ
গায়ে গাঙশালিখের বাসা। যাত্রীদেরই একজন দাড়ে বসেছিল।
নৌকো উজিয়ে গিয়ে ঘাটে লাগল। তখনও লগি পোঁতা হয়
নি। লালু লাফ দিয়ে ডাঙ্গায় নামতেই নৌকোর উপর থেকে কে
যেন বললে—ওরকম করে নেম না হে। হাত-পা ভাঙ্গবে।”
লালু ফিরে দেখে সেকেণ্ড পণ্ডিত শশধরবাবু। সে জিভ
কেটে পাত দিয়ে তাড়াতাড়ি তীরে উঠে হাটের পথ ধরে চলল।
সামনে একপাল গরু ও ছাগল হাটের দিকে চলেছে।
তাদের কুরে কুরে ধুলাে উড়ছে। সে পথ ছেড়ে মাঠ ভেঙ্গে
ছুটতে ছুটতে তাদের ছাড়িয়ে গেল।
ঐ যে ফকিরগঞ্জের হাটের বড় বটগাছটা দেখা যায়। পথ
দিয়ে নানা রকমের লোেক যাওয়া-আসা করছে। কেউ বেসাতি
নিয়ে যাচ্ছে, কেউ সওদা নিয়ে ফিরছে, কেউ সওদা করতে
চলেছে।
হাঁটটা লালুর চেনা, সে অনেক বার হাটে এসেছে। হাটের
মুখেই সার্কাস হচ্ছিল, এক পয়সার খেলা। ছােট তাঁবু।
কয়েকটি মুসলমান তার বাইরে দাড়িয়ে ডুগডুগি বাজাতে
২২
গ. সক
বাজাতে চীৎকার করে বলছে ভানুমতীর খেল এক পয়সা-
চলে এস।”
তাদের একজন একটা টুপির ভিতর থেকে মুঠো মুঠো
কাগজের সরু ফালি বার করে চিবােচ্ছে; আর বলছে-“নাস্তা,
নাস্তা?” বলেই মুখের ভিতর থেকে একটা কাগজের ভেপু
টেনে বার করছে।
লালুর ইচ্ছে করতে লাগল, সে এক পয়সা দিয়ে ভিতরে
যায়। একটা টাকা ত আছে। সে টাকে হাত দিয়ে টাকাটা
বার করতে গিয়েই চমকে উঠল। টাকা কোথায় গেল?
এ ট্যাকে কি? না, এ টাকেও ত নেই। পকেটে রেখেছে
কি? সে তিনটে পকেটই হাতড়ে দেখলে। , নেই ।
তার বেশ মনে হচ্ছে কাকীমার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে সে
গুজলে ট্যাকে। টাকেই রেখেছিল , টাক ছাড়া সে কোথাও
রাখে নি। সে আবার ট্যাক দুটো ও সেই সঙ্গে জামার পকেট
তিনটে খুঁজলে।
ভয়ে তার বুক ঢিপঢিপ করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।
কি দিয়ে সে হাট করবে ? খুডােমােয় শুনলে রক্ষা
থাকবে না; বলবেন, “একটা টাকা রােজগার করতে ক’ ফোটা
রক্ত জল হয় জান?” টাকাটা সে কোথায় পাবে? পথে পড়েছে
কি? পড়লেও ত পাওয়া যাবে না। তার চোখে জল এল।
সে খালুই সুদ্ধ হাত দুখানা পিছনে দিয়ে টাকাটা পথের চার
বারে খুজতে খুজতে আস্তে আস্তে চলল।
পথে কেবল ধুলাে, গােবর ও শুকনাে কাঁটানটের গাছ।
সাদা জিনিস চোখে পড়লেই তার বুকটা নেচে উঠে।
তাড়াতাড়ি তার কাছে ছুটে যায়। কিন্তু গিয়ে দেখে, সেটা
শামুকের ভাঙ্গা খােলা। তার বুকটা আবার দমে যায়। একটা
টাকা সে কোথায় পাবে? কি করে টাকাটা হারাল? নিশ্চয়ই
পথে কোথাও পড়ে গেছে। খুড়ােমশায় বলবেন, “তুমি
অসাবধান।” তারপরই বেত পড়বে। তার জন্যে একখানা বেত
ভােলা আছে। আবার তার চোখে জল এল। কি করবে সে?
সে ত ইচ্ছে করে হারায় নি চট করে তার মনে
পড়ল মাসীমা ত এবারও যাবার সময় তাকে একটা টাকা দিয়ে
যাবেন। এখন যদি একটা টাকা ধার পায় ত সেই টাকা দিয়ে
খার শােধ দেবে।
সে ঘাড় তুলতেই দেখে তার সামনে সেকেণ্ড পণ্ডিতমশায়।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—“তুমি কি খুঁজছ? হাটে যাও নি?”
লালু ঢােক গিলে বললে-“না স্যার, আমার টাকাটা
—“হারিয়েছ। হারাবারই কথা। তােমার মত চঞ্চলমতি
বালকেরাই অসাবধান হয়। সম্ভবত খেয়াঘাটেই ভােমার
টাকাটি হারিয়ে থাকবে। কোথায় রেখেছিলে?”
=
২৪
-স্ট্যাকে
“না পকেটে। পকেটে টাকা রাখলেই হারায়। সেই
যখন লাফিয়েছিলে তখনই পড়ে গেছে।
দেখ, তােমার
দোষেই এরকম ক্ষতি হ’ল। বাড়ীতে কতখানি অসুবিধার
কারণ হবে বুঝতে পারছ ।”
লালুর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল; বললে-“স্যার,
আমাকে একটা টাকা ধার দেন ; কাল ইস্কুলে শােপ দেব।”
পণ্ডিতমশায় প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করলেন । তারপর
বললেন-“দেখ, আমি দিতে পারি। তবে কিনা,
তবে কিনা, টাকাটি
। আমার নয়। তােমারই খুডােমশায়ের টাকা। আমি কাল কলকাতা যাব। তিনি একটা ওষুধ কিনতে আমাকে কয়েকটি টাকা দিয়েছেন। আমি তাই থেকে তােমায় দিচ্ছি” বলতে বলতে তিনি পেটের উপরের কোচাটা খুললেন । লালু দেখলে, তার খুটে জড়িয়ে বাঁধা একখানি ময়লা কমাল। রুমালের খুটে বাঁধা একখানি পাচ টাকার নোেট, কয়েকটি টাকা ও বেজ গি। তিনি তাই থেকে একটি টাকা বার করে বললেন-“দেখাে বাবা, আমাকে অপদস্থ ক'রাে না।" টাকাটা নিতে লালুর বুক কেঁপে উঠল। তার খুড়ােমশায়ের টাকা। কিন্তু সে ত দিয়ে দেবে। মাসীমার কাছ থেকে আজ রাতের বেলায়ই সে চাইবে। মাসীমা তাকে ভালবাসেন, সেবার সঙ্গেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সে টাকাটা হাতে নিয়ে বললে—“স্যার, টাকাটা আমি ঠিক কাল দেব। কিন্তু আপনার পায়ে পড়ি, খুড়ােমশায়কে বলবেন না।" -“সে বিবেচনা করা যাবে। আজ যে শিক্ষা লাভ করলে, কখনও ভুলাে না। সর্বদা ধীর ও সাবধান হবে।” হ্যা স্যার” বলেই লালু হাটের দিকে ছুটল। কিন্তু সে মনে আর ফুর্তি পেল না। মন্ত হাট। কোথাও কাপড় গামছা দূতত, কোথাও মাছ, কােথাও মুড়ি চিড়ে গুড বাতাসা জিলাপী, কোথাও মাছর- ২)
बासुक
চাটাই, টিন, চিটেড় বিক্রী হচ্ছে। তরি-তরকারিও এসেছে
নানা রকম। হাটের ধারে ধারে দোকান-পার-পান, মসলা-
পাতি, টিনের ছােট আয়না, ঘুনসী, কাকই এমনিতর নানা
জিনিসের। ওদিকে গগাহাটা; তার এধারে কতকগুলাে
গরুর গাড়ী পড়ে আছে। কোথাও মুরগী ও ছাগলের
হাট বসেছে। কোথাও ভিখারীর দল নানান সুরে চীৎকার
করছে। কোথাও বা ব্যাপারিতে ব্যাপারিতে এক গাদা খালি
বস্তা সামনে রেখে তুমুল বচসা করছে। চারধারে ঠেলাঠেলি,
চীৎকার, গােলমাল। লালু খালুই দুটো হাতে নিয়ে ভিডের
মধ্যে ডুবে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সে যখন বেরিয়ে এল, তার খালুই ভর্তি
সওদা। মাছটা বেশ বড় , ওজনে সের দুই হবে। খুঙীমা
যা যা বলেছিলেন, সবই সে কিনেছে। কিনেও বেঁচেছে সাড়ে
তেরো পয়সা।
সে একবার ভাবলে, পয়সাগুলাে পণ্ডিতমশায়কে ফেরত
দেয়। তারপরই মনে পড়ল, খুড়ীমার কাছে হিসাব দেবার
সময়ে ধরা পড়বে।
সে টাকা হারানাের কথা কাউকে বলবে
, এক মাসীমা ছাড়া।
হাটের বাইরে এসে পয়সাগুলাে কেঁচার খুঁটে বেধে নিয়ে
খালুই দুটো দু'হাতে তুলে সে ফিরে চলল।
গ গণ্ডক
বেলা পড়ে এসেছে, নদীর জলে কালাে ছায়া। মাথার
উপর দিয়ে পাখী উড়ে যাচ্ছে; পাড়ের গায়ে গাঙশালিখেরা
কিচির-মিচিব করছে। অনেকেই হাট থেকে ফিরছিল।
সামনে একখানি খালি গরুর গাড়ী ধূলাে উড়িয়ে যাচ্ছিল।
খালুই দুটো ভারী; লালু একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে গাড়ীখানার
পিছনে পৌছে খালুই দুটো তার উপর রেখে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে
হাঁটতে চলল। গাভােয়ানের খেয়াল নেই, সে তার পিছনে যে
লােকটা বসেছিল, তার সঙ্গে গল্পে মশগুল। গত বছর কোন্
কোন্ গাঁয়ে সে গাড়ী নিয়ে গিয়েছিল, কত টাকা রােজগার
করেছিল, তাই নিয়ে আলােচনা করছে।
চলতে চলতে খেয়াঘাট দেখা দিল। দু'চারজন নৌকোয় উঠে
বসেছে , কেউ কেউ উঠছে।
এবার লালুর ভয় হ'ল।
যদি মাসীমা না আসে? সে যত ঠাকুর-দেবতার নাম জানত
সকলকে মনে মনে ডাকতে লাগল। খেয়া ছাড়ে-ছাডে,
এমন সময় সে গিয়ে খেয়ায় উঠল।
এবার সে চুপচাপ
বসে আছে। খেয়াটাতে যাত্রী ও বস্তা, হাঁডি,
প্রভৃতি জিনিস-পত্রে ঠাসাঠাসি। একজন দুটো পাঁঠা নিয়ে
যাচ্ছিল। পাঠা দুটো মাঝে মাঝে “ম্যা-ম্যা” করছে।
খেয়া যত কুলের কাছে আসে লালুর ততই ভয় করে।
কিন্তু ঐ যে একখানা ডিঙি খেয়াঘাটের এধারে কূলে বাঁধা।
২৮
মাঝিরা রান্নার যােগাড় করছে। একজন মশলা বাটছে।
ঐ ডিঙিতেই বােধ হয়•••একবার সে জিজ্ঞাসা করে দেখবে।
খেয়া আবার অঘাটায় গিয়ে পড়ল। দাড় টেনে ডিঙির
পাশ দিয়ে যেতে যেতে পাটনী জিজ্ঞাসা করলে-“কোথাকার
ডিঙি গাে?
মাৰি উত্তর দিলে-কালীডাঙর।”
—“যাবে কোথা?”
—“মহেশপুর।
ও?”
—“মহেশপুর।”
-*এখানে যে?”
-সওয়ারী ছিল।”
লালুর মন আনন্দে নাচছে-মাসীমা এসেছে। পতি
মশায়ের টাকা সে কাল ইস্কুলে গিয়েই দিয়ে দেবে।
তখন সন্ধ্যা লাগে-লাগে। খুলােমশায় আসেন নি। তিনি
আসবেন রাত্রে।
লালু বাড়ীর ভিতরে ঢুকেই দেখে সামনে খুড়ীমা। তিনি
তাকে দেখে বলে উঠলেন—“কিরে! বাড়ী এলি যে?”
লালু বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। সে খালুই দুটো মাটিতে
নামাল।
খুড়ীমা বললেন-“এসব কিনলি কি দিয়ে?"
লালু অবাক হয়ে গেল। তার টাকা হারানাের কথা খুড়ীমা
জানলেন কি করে? পণ্ডিতমশায় ত ফেরেন নি। সে আসবার
সময় তাঁকে নিবাস সার দোকানে বসে তামাক খেতে
দেখেছে; বললে—“টাকা দিয়ে
-“টাকা পেলি কোথায়?”
—“তুমি দিয়েছিলে”
-“আমি ত দিয়েছিলাম। তুই নিয়েছিলি?”
-“ই।”
-“ফের মিছে কথা?
গােলমাল শুনে মাসীমা সেখানে এলেন। তাঁর কোলে
একটি মােটা-সােটা ছেলে। মাসীমা জিজ্ঞাসা করলেন-“কি
হয়েছে?”
লালু মাসীমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে, তাকে যেন
একটু অচেনা ঠেকছে। তিনি যেন ঠিক সেই মাসীমা নন।
মামা এর আগে যখন এসেছিলেন তখন খােকা হয় নি।
ভীমা বললেন-“আমি ওকে বাজারের টাকা দিয়েছি।
উনি টাকাটি ঐ ছেচতলায় রেখে ঘুড়ি-লাটাই ঘরে তুলে খালুই
নিয়ে হাটে গেছেন। •••টাকা পেলি কোথায় বল?”
*সেকেণ্ড পণ্ডিতমশায়ের কাছ থেকে ধার করেছি।”
মাসীমা গালে হাত দিয়ে বলে উঠলেন—“ও বাবা! সেই
নেলাে এমন হয়েছে ।”
খুড়ীমা বললেন—“দেখলে ত! দাড়াও আসুন আজ।”
বলতে বলতে তিনি খালুই দুটো হাতে তুলে নিলেন।
লালু চট্ কবে তার খুড়ীমার পায়ের উপর পড়ে বললে-
“তােমার পায়ে পড়ি কাকীমা, তুমি কাকাকে বলল না। আমি
এবার থেকে খুব সাবধান হব।
live,
-“আচ্ছা, ছাড, পা ছাড়। মনে থাকে যেন।”
লালু ঘাড় নেড়ে বললে-“থাকবে।”
মাসীমা বললেন—“চোড়া এতও জানে—
খুড়ীমা একথার কোন জবাব দিলেন না, জিজ্ঞাসা
করলেন—কত ফিরেছে ?”
—“সাড়ে তেরাে পয়সা।”
-“কাল ইস্কুলে গিয়ে টাকাটা পণ্ডিতমশায়কে ফেরত
দিবি। বাকী পয়সাগুলাে তাের মাসীর হাতে দে।”
লালুর বুকের ভার সব নেমে গেল। তার মনে পড়ল
মাসীমাকে প্রণাম করা হয় নি। সে টপ করে তার মাসীমাব
পায়ে প্রণাম করতেই মাসীমা বললেন—“হয়েছে-হয়েছে।
তাের বুদ্ধি হােক।”
মাসীমার আশীর্বাদটা খচ, ক'রে লালুর বুকে বিধল। কেউ
তাকে ভালবাসে না।
যাহােক, সন্ধ্যা ও পরের সকালটা মাসীমার ছেলেকে নিয়ে
তার বেশ আনন্দেই কাটল। খুড়ীমা খুডােমশায়ের কাছে
ব্যাপারটা প্রকাশ করলেন না।
মাসীমা সেইদিন বিকালেই চলে যাবেন। ইস্কুলে যাবার
সময় লালু বার বার করে বললে—“মাসীমা, আমি না ফিরলে
যেও না।” মাসীমা এই অনুরােধের উত্তরে শুধু একটু হাসলেন।
খুড়ীমা তাকে টাকাটা চুপি চুপি দিয়ে বললেন-“নিয়ে যা।”
লালু লাফাতে লাফাতে ইস্কুলে চলে গেল। আজ বিকালে
সে মাসীমার কাছে একটা টাকা পাবে।
বিকালে ইস্কুল থেকে ফিরে সে দেখে নিই মাসীমাদের
বিছানা ও ট্রাষ্ট মাথায় নিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছে। মাসীমা
ও মেলােমশাই বার-উঠোনে এসে দাড়িয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে
খুড়ােমশায় ও খুড়ীমা।
মাসীমা লালুকে বললেন-“তুই আর ঘাট পর্যন্ত গিয়ে কি
করবি?” বলতে বলতে আঁচলের গেরাে খুলতে লাগলেন।
লালু আনন্দে মাসীমা ও মেসােমশায়ের পায়ের ধূলাে নিয়ে
উঠে দাঁড়াতেই মাসীমা বললেন-“এই নে।”
লালু দেখলে, দুটো পয়সা। সে ছুটে ভিতরে চলে গেল।
মাসীমা চীৎকার করে বললেন—“নিয়ে যা রে, নিয়ে যা-লজ্জা
হয়েছে।•••আচ্ছা, দিদি, তুমিই ওর পয়সা দুটো রাখ।” .
লালুর দু’চোখে জল। সে ঘরে গিয়ে বইগুলাে কেনােসিন
কাঠের সেলফের উপর রেখে, টেকিশালায় গিয়ে ঘুড়িখানা
পেড়ে নিয়ে, তার লেজটা টেনে টেনে ছিড়তে লাগল।
তারপর একবার বেড়ার ফঁাক দিয়ে দেখলে—শেষ-বেলার
রৌদ্রমাখানাে ধানক্ষেতের আল দিয়ে ঐ মাসীমারা চলেছেন
নদীর দিকে।
E- ৪ শান্ত 3 শি ৬ নন্দন শরতের সােনালী রৌদ্রে আকাশ, মেঘ ও ধরণী হয়ে উঠেছে সােনার মত উজ্জল ট্রেনখানা বিন্ধ্যাচল ষ্টেশনে এসে থামল। যাত্রিদল চঞ্চল হয়ে উঠল। শতকণ্ঠে ধ্বনিত হ'ল—য় বিন্ধ্যবাসিনী।” যাত্রীরা নামছে। তাদের পিঠে বােঝ, হাতে লাঠি, মনে দুঃখ ও ভক্তি। বহুদূর থেকে তারা এগুলোকে বয়ে আনছে। শেষের দুটিকে দেবীর চরণে নিবেদন করবে।
সেকেণ্ড ক্লাস কামরা থেকে নামলেন একদল যাত্রী। সংখ্যায় তাঁরা দুজন। তাঁরাও এসেছেন তীর্থে—দেবী ও দৃশ্য দর্শনে। মনে বেদনা ও ভক্তি যদি কিছু থাকে তাও সাড়ম্বরে সকলকেই যাবেন জানিয়ে । তাঁদের পােষাকের বিজাতীয়তা, পারিপাট্য ও পরিচ্ছন্নতা মলিনবেশ যাত্রীদের থেকে তাঁদের করে দিয়েছিল স্বত। তাঁদের মুখে প্রফুল্লতা ও দাম্ভিকতা; ঠোট যেন অবজ্ঞায় একটু বাঁকা। তাদের মধ্যে যিনি প্রৌঢ় তিনি বলে উঠলেন—“চল, আগে পাহাড়টা দেখে আসা যাক- সঙ্গে দুজন মহিলা ছিলেন, তাঁদের ইচ্ছা—আধা-ইচ্ছা আগে গ্রামে গিয়ে দেখে আসবেন—বিন্ধ্যবাসিনীকে। দুটি ছােট ছেলে-মেয়েও ছিল সঙ্গে। মেয়েটির বয়স হবে আট বছর , ছেলেটির হবে বছর বারাে। পেট ভরে ভাল সামগ্রী খেতে পায়; সেইজন্যে তাদের শরীর বেশ পুষ্ট মুখেও রয়েছে । তারা দুজনেই ধরে বসল-“চল, পাহাড়ে।” -হা; মিঃ রায়, চলুন আগে পিকনিক করে আসা যাক। তারপর বলে মিঃ দত্ত মেয়েটির হাত ধরে এনজিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। ;
পাশে দাড়িয়েছিল ভৃত্য ও দ্বারবান। বাকী সকলে মিঃ
দত্তকে অনুসরণ করলে তারাও পিছন পিছন চলতে লাগল
লাঠি-সোটা ইত্যাদি নিয়ে।
প্ল্যাটফরমের দক্ষিণে রেললাইনের পারে মাঠের উপর দিয়ে
বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দিরের দিকে পায়ে-চলা পথ, বামে তারের
বেড়ার পর পাকা রাস্তা। সেটা পার হলে বাজরা-ক্ষেত।
তার মধ্য দিয়ে একটা সরু পথ চলে গেছে পাহাড়ের দিকে।
সকলে তারের বেড়া ডিভােতেই সামনে হাত পেতে দালাল
এক মলিনভর্তি কিশাের। সে একেবারে চাইল—একটা
আনি। তারপর পেটে হাত দিয়ে মুখখানা সঙ্কুচিত করে বলল,-“বড়ি ভূখ।” মেয়েটি—নাম বকুল-রাজপুতানার লক্ষ্মণ সিংহের গল্প শুনেছিল; সে বলে উঠল—“মায় ভুখা ই।” সঙ্গে সঙ্গে উঠল হাসির রােল। মিঃ রায় বললেন-“ভাগাে।” ভিখারী ছেলেটি কিন্তু ভাগল না, তাঁদের পাশে পাশে যেতে লাগল, আর হাত পেতে বলতে লাগল,-“বাবু, একঠো আনি- মিঃ দত্ত বললেন-“গ্যাসকেলটার ‘অ্যামবিশান’ উচু ! যাও।” তিনি হাতের বেতের মােটা লাঠিখানা তুললেন। তবুও ছেলেটির ভাবান্তর দেখা গেল না; ভিক্ষা চাওয়ার পর হুঙ্কার ও ভৎসনালাতেও সে হয়ে গেছে অভ্যন্ত। বলল- “দাও বাবু!” মিঃ রায় লক্ষ্য করলেন, হেডাটার গায়ের রং কালাে, পরণে ময়লা ছেড়া কাপড়, মাথার পিছন দিকে রয়েছে লম্বা টিকি, কিন্তু তার দাঁতগুলাে পালিশ-করা হাতীর দাতের মত ঝকঝকে। সে একেবারে তার পাশে সরে এল। তিনি বললেন—“এই সরে যা— ছেলেটা আর কিছু বললে না। সক পথ। সকলে ফাইলে’ চলেছে। সে গতি শিথিল করে মিঃ রায়ের পিছনে ৭
গ. লক
তাঁর ছেলেটির পাশে পাশে হাত দুলিয়ে চলতে লাগল, আর
মাঝে মাঝে আড়চোখে তার দিকে লাগল তাকাতে।
সম্মুখে শস্যশূন্য রুক্ষ মাঠ। পথটা গেছে তার উপর দিয়ে।
মাঠের ওপারে দেখা যাচ্ছে ব্যিাচল নেই, শােভা নেই,
গাম্ভীৰ্য্যহীন খানিকটা উঁচু জায়গা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত
হয়ে আছে—যেন একটা অধিত্যকা। তার উপর দেখা যাচ্ছে
খান কয়েক সাদা রঙের বাড়ী।
সকলে পথ পেরিয়ে, তারপর বুনাে গাছের ছায়াঢাকা পথ
দিয়ে পাহাড়ের নীচে এসে পৌছলেন।
মিঃ রায়ের ছেলে শান্ত, ভিখারীটাকে জিজ্ঞাসা করল—
“এখানে বাঘ নেই?”
সে ঘাড় নেড়ে বললে না।”
-ভাল্লুক?”
-“না।”
-“হনুমান?”
-“না।”
“তবে কি আছে?”
-“আছে 'মন্দিলগােপালজী-অষ্টভুজা খােকাবাবু,
বড়ি ভুখ।”
-“তবে বাড়ী যা।”
-ঘর দুর আছে।”
—“কতদূর?”
সে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললে-“চুনার।”
-“চুনার। চুনার থেকে তুই এত দূরে এসেছি। বাড়ীতে
কে আছে।”
কৈ নেই।”
মাও নেই, বাবা নেই?
মিঃ রায় বলে উঠলেন-“থােকা, ওরা মিছে কথা বলে। সব
আছে—ঐ কথা বলে ভিক্ষা করে বেড়ায়।•••এই ভাগােশূয়ার।”
মিঃ রায়ের বড় বড় চোখ দুটো হয়ে উঠল আরও বড়।
তাতে দেখা দিল-ঘৃণা ও ক্রোধের আলাে।
ছেলেটারও চোখ দুটো চক্ক্ করছে। সে একবার চেক
গিললে, তার শুকনাে ঠোট দু'খানা একটু কেঁপে উঠল।
সুশান্ত বললে-“তুই বুটা বলছিস?”
“নেহি।”—বলে সে থমকে দাড়াল। তারপর বাঁ-ধারে
একটা ছােট গাছের কাছে গিয়ে লম্বা ও চওড়া পাতাওয়ালা
একটা ডাল ভেজে নিলে।
যাত্রীরা চলেছেন।
পাহাড়ের কাছে পৌছতেই তাঁরা
শুনতে পেলেন কাঁসর-ঘণ্টা বাজছে। ঐ দেখা
পাহাড়ের কোলে একটা মন্দির। আকাশপানে উঠেছে তার উচু চূড়া। দক্ষিণে পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা। গুহার মুখ ঝাপ দিয়ে বন্ধ। তিনধারে পাথর সাজিয়ে প্রাচীর তৈরী করা হয়েছে। রোজ ততক্ষণে প্রখর হয়ে উঠেছে-গায়ে বি ধছে, গলা শুকিয়ে আসছে। গুহাটার একধারে পাথরের উপর থেকে ঝুলছে দু'খানি চীর। গুহাবাসী সে দুটি নিশ্চয়ই রৌদ্রে দিয়েছে শুকোতে। বামে দেখা যাচ্ছে এক আম, গাছপালার ছায়ায় ঢাকা। মিঃ দত্ত বলে উঠলেন—এসব কি সত্যিকারের সাধু?” মিঃ রায় হাসলেন একটু ব্যঙ্গের হালি; তারপর বললেন- “আসলই যােক নকলই হােক, আমরা কিন্তু আর কোথায়ও না গিয়ে সােজ উঠব পাহাডে। কিন্তু পথ কৈ? সে হেড়াটা গেল কোথায়? এই দারােয়ান, তুমি পথ জান?” -না, হুজুর। ; মিঃ দত্ত বললেন-“চলুন তাে। ঐ যে মন্দিরের সামনে কতকগুলাে লােক— পথটা মন্দিরের সামনে দিয়ে পাশে গিয়ে পিছনে ঘুরে এসে সােজা উঠে গেছে পাহাড়ের চুড়ায়। নীচে থেকে উপর অবধি রয়েছে সিড়ি।•••
এক
উপরে উঠতেই শ্রান্ত ললাটে লাগল মৃদু বাতাসের দ্বি
স্পর্শ। এক রকম বাবলা-জাতীয় গাছে ফুল ফুটেছিল হােট
ছােট ও অজ।
তাদের মিঠে মােলায়েম গন্ধে বাতাস
ভরা। চোখে পড়ল প্রস্তরময় বিশাল প্রান্তর।
বামে দূরে কুয়াসা-ঢাকা ছােট হােট পাহাড; সেগুলাের মাথায়
বন। গাছগুলােকে দেখে মনে হচ্ছে, ধরণী যেন শিউরে
উঠেছে। দক্ষিণেও গাঢ় শ্যামলিমার বিস্তার।
পিছনে
শূন্যতা। সম্মুখের দিকটা ক্রমে হয়ে গেছে ঢালু।
যাত্রীরা চলতে লাগল সম্মুখে একটা মন্দিরের দিকে।
সুশান্ত ফিরে দেখল, আবার সেই ভিখারী ছেলেটা ফিরে
এসেছে। তার হাতে একটা পাতার মুকুট। সে সুশান্তর দিকে
মুকুটটা বাড়িয়ে ধরল।
সুশান্তর মা হেসে বললেন-হেড়াটা চালাক। জানে
এমনি পয়সা দেবে না; তাই মুকুট তৈরী করে এনেছে।
সুশান্ত মুকুটটা তার হাত থেকে নিয়ে মাথায় পরল ;
তারপর মিঃ রায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল-“বাবা, এই
দেখ লরেল-পাতার মুকুট।
-“বাঃ! কে দিলে?”
—ঞ্জ।”
—“আবার এসেছে। স্কাউণ্ডেল।”
৪)
মুলার দিকে মুটটা বাড়িয়ে ধরল -বাবা, ওকে একটা পয়সা —“এই, পয়সাটা নিয়ে ভাগ। আবার আসবি তাে- বলে তিনি ঘুষি দেখালেন। দাদার মাথায় মুকুট। বকুল বায়না ধরলে—“আমি চাই।” “একটা মুকুটের দাম এক পয়সা তা জানলে মিঃ রায় হেসে উঠলেন। হোঁটা পয়সা নিয়ে তাদের আগে আগে ছুটছিল। দ্বারবান ও ভৃত্য হাঁকলে—“হে লেউন্ড- সে ফিরে দাড়াল। তারা দুজনে হাতছানিতে তাকে ডাকতে লাগল। সেও এগিয়ে আসতে লাগল। কাছে এলে মিঃ রায় বললেন-“আর একটা তৈরী করে দে—এই খুকীর জন্যে ছেলেটা দেখল বকুলের মুখখানা কঁদো-কঁদো। সে এদিক- ওদিক তাকিয়ে বলল-“পাতা আছে পাহাড়ের নীচে -“নিয়ে এস, পয়সা দেব।” সে দাড়িয়ে কি যেন একটু ভাবল ; তারপর আবার সামনের দিকে দিল ছুট। মিঃ রায় বলে উঠলেন—“শয়তান •••খােকা, তােমার মুকুটটা বােনকে দাও” —“ওটা আমি চাই না বলে বকুল কাদতে লাগল। ০৩
-“চুপ করাে। তােমাকে সত্যিকারের মুকুট কিনে
দেব-দামী মুকুটও তাে পাতার।”
কিন্তু তখন সেই তুচ্ছ বুনােপাতার মুকুটটাই হয়ে উঠেছে
তার কাছে রাজার রত্নমুকুটের চেয়েও দামী।•••
সকলে মন্দিরটার কাছে পৌছে দেখলেন, ছোঁড়াটা সামনের
কূয়ােটার ধারে একখানা শালপাতা ফেলে দিয়ে জল পান
করতে বসল। সামনে দোকানে জিলাপ ভাজা হচ্ছে। তার
গন্ধ আসছে। তারপর এক লাফে পাড় থেকে নেমে সে এক
দিকে দিল ছুট।•••
বেলা তখন দ্বিপ্রহর। প্রকাণ্ড বটগাছটার শীতল ছায়ায়
সকলে কাঁচা শালপাতায় খিচুডি সামনে নিয়ে
নিয়ে বসেছেন।
মাটির পাত্রে রয়েছে কূয়াের শীতল জল। বাতাস বইছে ঠাণ্ডা।
পেটে ক্ষিদে।
বকুল হঠাৎ বলে উঠল-“ঐ যে এসেছে-ঐ যে মুকুট
রয়েছে ওর হাতে—দেশদে” বলতে বলতে ছেলেটার দিকে সে
ছুটে গেল। কারও বাধা-নিষেধ সে মানল না।
ভাই-বােনে মুকুট মাথায় দিয়ে খাচ্ছে।
ভিখারী ছেলেটা বসে আছে কিছু দূরে কুকুরের মত।
মাঝে মাঝে সে পাতের ও গ্রাসদ্ধ হাতটা যখন মুখে উঠছে
তার দিকে তাকাচ্ছে। তার দু চোখে কিনে; সে এক একবার
;
:
ঠোট চাটছে। মিসেস দত্ত তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি
হাসলেন।
সুশান্তর মা বলে উঠলেন—“এই, স'রে যা ওখান থেকে।
••কি রকম করে তাকাচ্ছে দেখ।”
হেড়াটা সরলে না, ফিরে বসলে মাত্র—সে যেন কি
বলতে চায়। কি যেন তাকে সেখানে চেপে ধরে রেখেছে।
মিঃ দত্ত পকেট হাতড়ে একটা পয়সা বার করে তার দিকে
ছুঁড়ে দিয়ে বললেন-“এই নে।”
সে পিছন ফিরে পয়সাটা কুড়িয়ে নিয়ে সেখান থেকে এক
পা এক পা করে সরে যেতে লাগল।
খাদ্যটি হয়েছিল অমৃতসমান। তবুও হাঁড়িতে কিছু অবশিষ্ট
রয়ে গেল।
সুশান্ত বললে—“মা, ছেলেটাকে দাও না—
—“ও হতভাগা তাে এই জইে ঘুরঘুর করছে। কৈ
সে?”
—“ঐ যে। এই—আয়-শুনে যা।”
সে কাছে আসতে সুশান্ত বললে—“আমার মা তােকে
খিচুড়ি দেবে, খাবি?”
সে খিচুড়ির হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে ঠোট চাটতে চাটতে
ঘাড় নেড়ে জানালে, “।”•••
খাওয়া-দাওয়া চুকে গেছে। তাঁদের ফিরবার গাড়ী রাত্রে।
তখন বেলা সবে দুটো। পাঁচটার সময় পাহাড় থেকে নামলেই
হবে। এখন একটু ঘুরে-ফিরে দেখা যাক।
দ্বারবান ও ভৃত্যের দেখবার আগ্রহ ছিল না। তারা
মন্দিরের বারান্দায় গামছা বিছিয়ে ‘নি দেবার যােগাড় করতে
লাগল। ‘পাহাড়-জঙ্গল’ তারা কি দেখবে? ‘মুলুকমে
বহুং' আছে।
মহিলারা বটের বাঁধানাে গােড়াটায় ছায়ায় শুয়ে ক্লান্তি
দূর করতে লাগলেন। বকুলও রইল সেখানে। গাছের
ডালে পাতার আড়ালে শিষ দিচ্ছে টুনটুনি ও বুলবুল; খাদ্যের
খোঁজে ছুটছে কাঠবেড়ালী। এক একবার উঠছে ডেকে।
বুলবুলের শিষ, কাঠবেড়ালীর ডাক ও পাতার মর্মর একসঙ্গে
মিশে শােনাচ্ছে চাপা গানের সুরের মত।
মিঃ রায় ও মিঃ দত্ত চলেছেন চুরুট টানতে টানতে।
সুশান্ত ও ভিখারী ছেলেটা বটগাছটার কাছ থেকে কিছু
দূরে পাথরের পুকুরটার ওপারে একটা পলাশগাছের ছায়ায়
বসে গল্প করছে।
আকাশের নীলসাগরে সাদা রাজহাঁসের সারির মত মেঘগুলাে
যেন ডানায় মুখ লুকিয়ে ঘুমােত ঘুমােত ভাসছে। নীচে
পড়েছে তাদের ছায়া। বাতাসও যেন ভরে হয়েছে আরও
গল
অলস। দূরে-নীচে-শ্যামল বনের শেষে শুকনাে সদা
বালুপ্রান্তরের মধ্যে যেন নিশ্চল হয়ে আছে গঙ্গার ধারাটি-
নীল, বাঁকা। তার বুকে ভাসছে সাদা পাল তুলে দু'খানি
ঘােট নৌকো। মিঃ রায়েরা চলেছেন ওই দৃশ্যের দিকে।•••
সুশান্ত ছেলেটাকে বললে—সত্যি কেউ নেই তাের ?”
-“কৈ নেই।”
—“তােকে কে খেতে দেয়?”
সব দিন খাই না।”
-“খাস না। রাত্রে কোথায় থাকি?”
-“ঐ টিশনে না হয় মন্দিলে।
৪৭
শীতকালে?
আগুনের পাশে।
—“কোথায় আগুন পাস ?
*যেখানে হয়।”
মুশান্ত চুপ করে রইল। তার সামনে নীল কুয়াশায়
ঢাকা পাহাড় ও
সে জিজ্ঞাসা করল- এই
পাহাড়টার পর কি আছে?
-জঙ্গল।
-সেখানে যাওয়া যায়।”
-“হ, রাস্তা আছে। কাঠুরিয়ারা যায়।”
-“তুই আমায় নিয়ে যাবি?”
সে শান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
-“হাসলি যে?”
-তােমার ভর লাগবে।
-“ডর ? হােঃ! বলে কি? জানিস্ নেলসন•••তুই
মূখ।•••তাের নাম কি?”
—“শিউনন্দন।” বলে ছেলেটা বেয়াকুবের মত হাসতে
লাগল।
-ঐ জলে বাঘ আছে? বলল সুশান্ত।
কখন কখন আসে। তােমার বর কোথায় ?
কলকাতা; খুব বড় শহর।” মুশান্ত দেশের গল্প
কেঁদে বসল।
ছেলেটা হাঁ করে শুনতে শুনতে হঠাৎ বলে উঠল--পিয়াস
লাগলাে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কূয়াের দিকে দিলে ।
বেলা পাঁচটা। সারাদিনের রৌদ্রে জমাট ছায়া যেন তরল
হয়ে মাটির উপর গড়িয়ে গড়িয়ে গেছে। গঙ্গাপারে সূৰ্য্য
বসেছে পাটে।
যাত্রীরা যাবার অঙ্গ প্রস্তুত। কিন্তু সুশান্ত কৈ?
সকলে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কাছে সব জায়গায় খুজে
দেখা হ'ল—সে নেই। মিঃ রায়েরা দু'জনে যেদিকে অষ্টভুজার
মন্দিরে গিয়েছিলেন, সেদিকে সে যায় নি ; গেলে দেখা হত।
দ্বারবান ও ভৃত্য ছুটল পূর্ব-পশ্চিমে, মিঃ রায় ও মিঃ দত্ত
চললেন দক্ষিণে।
তারপর পুরাে একটি ঘণ্টা কেটে গেল। তাঁরা চারজনে
ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন ;-সুশান্ত নেই।
তার মা বললেন-“সে পাহাড়ের নীচে গ্রামে বিন্ধ্যবাসিনীর
মন্দিরে যায় নি তাে?”
-না; তেমন কোন লক্ষণ বলতে বলতে মিঃ রায়
চিতার মানে তলিয়ে গেলেন।
৫
:১
মিঃ দত্ত বললেন-“সে হেডাটাই বা কোথায়?”
বকুল বলে উঠল—ঐ যে বসে আছে-
তাঁরা দেখলেন, ভিখারী ছেলেটা মন্দিরের পাশে কয়েকটা
খােটা যাত্রীর কাছে উবু হয়ে বসে আছে।
এদিকে সব কিছুর গায়ে একটু একটু করে সন্ধ্যা ছায়া
মাখিয়ে যাচ্ছে।
মিঃ রায় ছেলেটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে হাতছানিতে
তাকে ডাকলেন-এই শােন্শােন্ জলদি
ছেলেটা যেন অনিচ্ছার সঙ্গে উঠে দাড়িয়ে তার কাছে
এগিয়ে আসতে লাগল।
মি রায়ের ততটুকু দেরীও সইল না; তিনি এগিয়ে যেতে
যেতে ব্যাকুলতার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন-“সেই খােকাবাবুকে
দেখেছি। সেই যাকে মুকুট দিয়েছিলি?”
মিঃ দত্ত এগিয়ে এসে বললেন-“তাকে যদি খুজে আনতে
পারিস”
“বশি দেব।”—বললেন মিঃ রায়।
কিন্তু ছেলেটার বখশিষের প্রতি লােত দেখা গেল না, সে
বলল—এই পাহাড়-জঙ্গলমে কঁহা -”
সেদিন শারদসপ্তমী। সন্ধ্যা তার কোমল আঁচল দিয়ে
চাদখানিকে মুছিয়ে দিল। জ্যোৎস্না উঠল চিকচিক করে,
গলক গাছের পাতায় পড়ল ঝরে, সেখান থেকে পড়ল মাটিতে গলা-রূপাের মত। মিঃ রায় বলে উঠলেন-“এইযাযা; বখশিষ দেব- পেয়া” ইতিমধ্যে তাদের চারধাবে দুটি একটি করে কতকগুলাে লােক জড়াে হল। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল—“তাকে মা বিন্ধ্যবাসিনী নিযেছে। পরসালে এক রাজার লড়কা’-” কথাটা শুনে যাত্রীদের বুকের ভিতর জাগল হাহাকার। দানের চেয়ে গ্রহণের জন্য বিন্ধ্যবাসিনী যে হাত বাড়িয়ে আছেন একথা তাদের বিশ্বাস হ'ল সহজেই। আর তাঁর যত লােভ ধনীর দুলালের উপর। দরিদ্র যারা তাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে আছেন। মিঃ রায়ের স্ত্রী অরুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলেন—মা, ফিরিয়ে দাও—জোড়া পাঁঠা দেব- মিঃ দত্ত ছুটলেন , দ্বারবান, ভৃত্যও আবার ছুটল। দূর থেকে তাদের ডাক ভেসে আসতে লাগল-“সু-শা-স্ত-ও-ও।” একটু রাত হয়েছে। তারা মন্দিরের বারান্দায় ভারাক্রান্ত মনে, অবসন্ন দেহে বসে আছেন। মন্দিরের বুড়াে পুরােহিত দয়াপরবশ হয়ে মনুষ্যজীবনের অসারতা সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন
ও পূর্বজন্মে ছিল যােগী। বিন্ধ্যবাসিনীর কৃপায় দিব্যচক্ষু লাভ
করে সংসারত্যাগী হয়ে আবার যােগাভ্যাস করতে গেছে।
মনে নি”
মা-বাপের মন। তাঁরা চিন্তা করতে লাগলেন-ছেলের
চরিত্রে বৈরাগ্যের, যােগীর কোন লক্ষণ ছিল কি না ? হাঁ-হ
ছিল। সে প্রায়ই নানা অদ্ভুত ও আশ্চৰ্য্য প্রশ্ন করত।
মা ফুলে ফুলে কাদছেন।
পুরােহিত আবার বললেন—“সাধু তুলসীদাস কহে-
সকলে চমকে উঠলেন। তাকিয়ে দেখেন, সামনে বারান্দার
বারে সুশান্ত ও সেই ভিখারী ছেলেটা। তাদের মুখে পড়েছে
স্বচ্ছ জান্না।
মা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মিঃ রায়ও আর
নিজেকে সংযত করতে পারলেন না; তাঁর মনে উঠেছে
আনন্দের ঢেউ।
সকলে ৰ'লে উঠলেন—জয় মা বিবাসিনী।”
কিন্তু মা ও ছেলের দিকে তাকিয়ে ঐ ভিখারী ছেলেটার
চোখে ফুটে উঠেছে ও কি ক্ষুধা। তার চোখের মণি, চোখের
তারা বলছে। তার ঠোঁট দু'খানা হয়ে গেছে ক; তার
মধ্য দিয়ে সাদা দাতগুলাে যাচ্ছে দেখা। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট
চাটছে আর মাঝে মাঝে ঢােক গিলছে-যেন সুমিষ্ট কিসের
স্বাদ গ্রহণ করছে।
মিঃ রায় বলে উঠলেন—“তুই কোথায় ছিলি ?
সুশান্ত তখনও একটু একটু হাঁফাচ্ছিল, বললে-“পাহাড়ের
নীচেটা দেখতে গিয়ে পথ হারিয়েছিলাম।”
কি ভয়ঙ্কর সাহস।”
—“বাবা, ঐ ছেলেটা চেঁচাতে চেঁচাতে নীচে নামছিল।
আমিও ওর নাম ধরে ডাকলাম—শিষ্টনন্দন! ও অমনি সাড়া
দিল। ওর সঙ্গে ফিরে এলাম। না হ'লেমা, তুমি আমার
জন্যে কাঁদছিলে?”
মা উত্তর দিলেন, তার গালে একটা চুমাে দিয়ে।
মিঃ রায় বললেন-“চল—এখনও গাড়ীর সময় আছে।
আজ আর নীচে গিয়ে বিন্ধ্যবাসিনীকে দেখা হবে না।
“কিন্তু আমি যে মানৎ করেছি-
-“ওকালই সেটা দিতে হবে ?
-আচ্ছা।”
তারা সানন্দে চলতে লাগলেন যে দিক দিয়ে পাহাড়ে
উঠেছিলেন তার বিপরীত দিকে। কিছুর গিয়ে বকুল ফিরে
বললে—“বাবা, হেড়াটা আবার আসছে”
—“কে? ওহাে-মিঃ রায় পকেট থেকে একটা চক্চকে
সিকি বার করে বললেন * এই নে তাের বখশিৰ।”
ছেলেটা আগ্রহভরে হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে তার দিকে
তাকাল ; তার চোখ দুটো উল হয়ে উঠল।
কিন্তু তার বেশী মিঃ রায়ের দেবার সামর্থ্য নেই।
ছেলেটা ছুটতে ছুটতে চলে গেল মন্দিরের দিকে।
যাত্রীরাও আবার চললেন। কেউ কারাে দিকে আর ফিরেও
অকাল না।
d
লণ্ঠর গুন লাঠির দীর্ঘ তিনটি বৎসর চেষ্টার পর একটি চাকরি জুটল- কর্মস্থল কলকাতা থেকে বেশি দূর নয়;—পিয়ালী নদীর ধারে এক ইটখােলায়। কর্ম হল কেরানিগিরি ও ইটখােলার খবরদারি। মালিক থাকেন কলকাতায়। তাঁর নানা কাজ। মাসে দু’-একবার ইটখােলা তদারক করতে যান। বললেন—কাজেই গলক সেখানকার যা-কিছু সব করতে হবে তােমাকে; এমন কি, খরিদদারদের কাছ থেকে কখন কখন টাকা আদায়ও। জায়গা তাল; কাজও বেশি নয়।” বললাম—টতে আমি ভয় পাই না, স্যার। -গােড়ায় ও-কথা সকলেই বলে হে। কিন্তু দু'দিন যেতে না যেতেই স’রে পড়ে। সেইজন্যেই এদেশের লােকের উন্নতি হয় না।” ব'লে কর্তা এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমিও পালাব। তারপর আবার বললেন- মন দিয়ে কাজকর্ম করলে ঐ ইটের পাঁজা তােমার কপালে সােনার পাহাড় হয়ে উঠবে।
—আজ্ঞে হ্যা।”
“তােমার জামা-কাপড়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে
টাকা-পয়সা হাতে নেই। সেখানকার খাওয়া-দাওয়ার খরচ
অবশ্য তােমার , আর থাকবার খরচ আমার—ঘরের ভাড়া দিতে
হবে না। সরকারের কাছ থেকে আড়াইটে টাকা না বলে
দিচ্ছি। কাল সকালের গাড়ীতেই রওনা হওয়া চাই।”
-“আজ্ঞে হ্যা।”•••
আমিও কলকাতা ছাড়তে পারলে বাঁচি। বসে বসে
দু’বেলা অল্প ও অন্নদাতার তিরস্কার ভক্ষণের ফলে অজীর্ণতা
দেখা দিয়েছিল। দু'-একজন শুভাকাকী বললে-“সে হ’ল
বাঘ, কুমীর আর ডাকাতের জায়গা।
বললাম—“ক্ষতি কি? সাহেবেরা ওর চেয়ে ভীষণ জায়গায়
গিয়ে টাকা রােজগার করে।” এ যুক্তির বিরুদ্ধে আর আপত্তি
চলে না।
পরদিনই সকালের গাড়ীতে আড়াইটি টাকা সম্বল করে,
একটি ছােট টিনের বাক্স ও হােট একটি বিছানা নিয়ে রওনা
হলাম এবং বােঝা দুটি পালা করে স্বহস্তে ও স্বৰুদ্ধে বয়ে
ইটখােলায় যখন পৌছলাম বেলা তখন দুপুর।
হােট নদী। তার ধারে পাঁচ-ছ'টি পাঁজা। সেলাের
একধারে একখানি খড়ের ঘর। ঘরখানার বেড়া চাটাইয়ের,
থারি বেশ উচু; সামনে হাত দুই চওড়া বারান্দা। বারান্দায়
বসে দুটি লােক একটি কলকে টানছিল।
আমাকে দেখেই তাদের একজন কলকে নামিয়ে জিজ্ঞাসা
করলে-“কি চান?”
আমি পরিচয় দিতেই দু’জনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে
প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল-'এই ঘর, যান ; আমরাও এই
খােলারই লােক।”
বারান্দায় উঠবার জন্যে তিনটি তালের গুড়ি পৈঠার মত
করে বাঁশ দিয়ে বাঁধা ছিল। তার উপর দিয়ে বারান্দায় উঠে
ঘরে ঢুকে দেখি, একধারে একটি বাঁশের খালি মাচা; তার
উপরে বেড়ার গায়ে একটি চৌকো জাফরি-দেওয়া ফোকর বা
জানালা। ঠিক তার উল্টো দিকে তেমনই ধরণের আর একটি
ফোকর। তার নীচে ছিল একটা কলসী, একটা পােড়া হাঁড়ি
ও এক বােঝা কাঠ। সেগুলাে থেকে হাত তিনেক দূরে ছিল
একটি উনুন।
শরীর ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
আহাৰ্য প্রস্তুতের উপায়গুলো দেখে, শরীর যেন আরও ক্লিষ্ট
হয়ে পড়ল। মাচার উপর বিছানাটি ও টিনের বাক্সটি রেখে
ফিরে দেখি, ঘরের দরজায় সেই লোেক দুজন দাড়িয়ে দাড়িয়ে
আমার কাজকর্ম লক্ষ্য করছে।
भागक
বললাম-“বাপু। একটু জল খাওয়াতে পার ?”
তারা একগাল হেসে বললে—“হেঁ হেঁ-গল। জল
এখানে কোথা ?”
-“কি রকম? ঐ যে নদী-
—ওর জল মুখে দিতে পারবেন না—লো।”
-“এখানকার লােকে তবে কিসের জল খায়?”
—“কুয়াের, পুকুরের—আর যেসব জলের নৌকো এই
নদী দিয়ে চলে সেগুলাের।”
ইটখােলায় কূয়াে নেই ?”
আছে। কিন্তু আপনার আগে যিনি এখানে ছিলেন
তিনি ওর মধ্যে একদিন মরে ভাসতে ছিলেন।”
আমার গলাটা আরও শুকিয়ে গেল।
একটু সাহস এনে, জোর করে বললাম-“কি করে তিনি
মারা গেলেন?”
—“দুষ্ট লােকে খুন করেছিল।”
আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল; বললাম । গা কি
বাজার ত আছে?”
-“দু’ক্রোশের মধ্যে নেই।”
বহু গয়ে গ্রামের মুদির দোকানে রাত কাটানাের কথা
পাঠ করেছি। আশা ছিল, স্বপ্নও হিল, কিছু না হলে অন্তত
মুড়ি-মুড়কি খাব, মুদির দোকানে রাত কাটাব। যে রামায়ণ- মহাভারত কখন পড়ি নি, মুদির মুখে তা শুনতে শুনতে ছারপােকাতরা ছেড়া মাদুরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড। কিন্তু সাবানের কেনার মত সব হঠাৎ ফেটে শুন্যে মিশিয়ে গেল। বললাম- “এখন উপায়? ঐ কলসীটায় এক কলসী জল” ওই কলসীতে এখন হাত দেয় কে? এই সাতদিনে ওর মধ্যে সাপে বাসা নিয়েছে। বাদলা এখনও কাটে নি।” সময়টা শরতের শেষ হলেও আকাশ থেকে তখনও মেধভার দূর হয় নি। সেদিনও পথে আসবার সময় একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। শরীরে আমার শক্তির অভাব নেই; জানতাম, মনও সাহসে ভরা। এই দুই কারণে অসমসাহস প্রকাশের ইছাও কখন কখন হত এবং তার ক্ষেত্রাভাবে মনে কিঞ্চিৎ খেদ ছিল। কিন্তু সেদিন যেন কেমন হয়ে গেলাম। শক্তি ও সাহস দেখাবার ক্ষেত্রের মাঝে গিয়ে দাড়াবার আগেই পা দুটো যেন পিছলে যেতে লাগল। মাচার উপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসে বললাম-“তােমাদের দেশে এলাম। জল না খেয়ে তােমাদের সামনে তাকিয়ে মরব।” একজন বললে—“তাই কি আর হয়?” আলাপটা জমিয়ে তাদের ভিজিয়ে নেবার জন্যে বললাম “তােমাদের নামটা ত বললে না।”
একজন বললে-মটু।”
অপরজন বললে-ভূষণে।”
ভূষণাে বললে—এই ঘরে আজ রাতে থাকবেন কি
--“কেন?”
–এর দরজার ঝাপ নেই।
রাতের বেলা কুমীর
ঢুকবে।”
“ঘরে কুমীর ঢুকবে।”
-হ্যা। সেবার একটাকে খেয়েছিল। রাতের বেলা
ওরা জল থেকে উঠে কুলে লুকিয়ে থাকে শেয়াল খাবার
জতে। মানষের ঘর-দোরে উঠে যায় বলে সে আমার
সামনে এসে উবু হয়ে বসল। এবার আমার নজর পড়ল
তার হাতের বাঁশের লাঠিখানার দিকে ;-পেকে লাল হয়ে
গেছে।
মটুয়া বললে—“যাই, একটু জলের যােগাড় দেখি গে।
হলাে যাবি?”
ভূষণে উঠবার উপক্রম করতেই বললাম-“ও আসুক।
তুমি ততক্ষণ বস।”
মটু চলে গেল। বাইরে এতক্ষণ বােদ ছিল। হঠাৎ
মেঘের আড়ালে সূৰ্য ঢাকা পড়ে কেমন একটু অন্ধকার হয়ে
এল। শরীরে আমার যে ক্লান্তি ছিল এবং তৃষ্ণা অনুভব
করছিলাম, কেন জানি না কিছুক্ষণ থেকে তা আর তেমন বুঝতে
পারছিলাম না। বললাম-“ভূষণ, তুমি থাক কোথায়?”
-“এই দিকে।” বলে হাত দিয়ে সে আমার মাথার দিকটা
দেখিয়ে দিলে।
—“এখান থেকে কতদূর?”
তিন ক্রোশ।”
“তিন ক্রোশ। খোেলা ত বস্তু। কিন্তু তুমি কেন
এখানে এসেছিলে?”
-খবর নিতে।”
-“মা কতদূরে জল আনতে গেল ?”
-ওর কথা বাবু। শালা শয়তানের রাজা। হয়ত আর
আসবেই না। এদিকে জল কোথা?”
বেলা ততক্ষণে আরও পড়ে এসেছিল। সেইজতে বাইরের
ছায়াটা আর একটু ঘাের, ঘরের ছায়া আর একটু কালাে হয়ে
উঠল।
ভূষণণা আবার বললে—“আপনি বিছানা পেতে শুয়ে পড়ুন
এই বেলা। সঙ্গে টাকা-কড়ি নেই ত?”
তার চোখের চাহনি যেন আর একটু রুক্ষ হয়ে উঠেছে
লালচে ভাবটাকে মাঝে মাঝে বােধ হচ্ছে লাল।
বললাম-“না, টাকা-কড়ি কিছু নেই।” তার মুখে অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠল। সে এদিক- ওদিক তাকিয়ে বললে—“যাই বাবু, সন্ধ্যে হয়ে এল। পথ- ঘাট ভাল নয়; ঝড-জলও আসতে পারে। অন্ধকার রাত। কাল আবার আসব।” মনে পড়ে গেল, সঙ্গে আমার আলাে নেই, কেবল আছে একটি ঘােট টর্চ। এই জনবিরল নদীতীরে—এই ঘরে, অন্ধকারে কি করে একা বাত্রি কাটাব। বললাম-“ভূষণ, তুমিও আজ এখানে থাক না।” -“সে হয় না, বাবু। ঘরে আমার কেউ নেই। আমারও ক্ষিদে-তেষ্টা আছে।” —“মজুর আর কারিগরদের মােজ ত আমার হাতে। তােমার রােজ বাড়িয়ে দেব।” -“ডবল রােজ ত এখনই আদায় করব।” জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, কেন ? কিন্তু সহসা বাধা পড়ল। জানালা দিয়ে নদীর ওপারের অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। দেখলাম, একখানা বেশ বড় নৌকো ভাটিতে যাচ্ছে। বললাম–ভূষণ, ঐটি হয়ত জলের নৌকো। একবার এগিয়ে দেখ না। -“জলের নৌকো আসবে কাল। ওরা ইট আনতে যাচ্ছে।”
হতাশ হয়ে পড়লাম। সেখানে রাত কাটানাে অসম্ভব ;
অথচ কোথায় যে যাব, তাও বুঝতে পারলাম না। একবার
ভাবলাম, টেশনে চলে যাই। কিন্তু তা হলে পাকা আড়াই
ক্রোশ পথ ভাঙতে হবে। পথে কাদা, রাত অন্ধকার ; দুটো
বাঁশের সাঁকো আছে। সেখান থেকে পড়ে যাওয়ার বা পথ
ভুল হবার সম্ভাবনাও খুব। এখন এই বিপদে একমাত্র সহায
ঐ দুষণ। কিন্তু ওর ব্যবহারে মনুষ্যত্বের কোন চিহ্নই দেখা
নেই না।
ভূষণ উঠে দাঁড়িয়েছিল; আমিও মাচা থেকে নেমে তার
পাশে দাঁড়ালাম। সে ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে গেল
আমিও তার পিছন পিছন গেলাম। পশ্চিম আকাশ জুড়ে মেঘ
করেছিল। অকালসন্ধ্যার ছায়ায় সব আহা হয়েএসেছে।
দূর থেকে একটা হাঁক ভেসে এল। লক্ষ্য করলাম, দুষণ চঞ্চল
হয়ে উঠল।
কিন্তু আমার মনে হ’ল, ও হয়ত মরা আমাদের হদিস
নিচ্ছে; বললাম-“ভূষণ, ঐ মা •••”
সে হেসে বললে-“সেই আশায় থাক, বাবু। আমি
সে বারান্দা থেকে পৈঠায় পা দিল।
আর আমার আশা নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে আমার প্রাণ
বাঁচাবার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। হঠাৎ আমার পরিষ্কার মনে
হ’ল, ভূষণ ও মা ডাকাতের দোসর। দূর থেকে ওকে কে
যেন ইসারা করলে। আমার সঙ্গে মূল্যবান কিছুই নেই;-
আছে কেবল প্রাণটা, অবশ্য তারই মূল্য আমার কাছে এত যে,
বাঁচতে গিয়ে মরতেও পিছ-পা নই। দু আনা পয়সা আর
একখানা পুরানাে কাপড়ের জন্যেও আমাদের দেশের ডাকাতেরা
মানুষ খুন করে।
আমিও ভূষণের পিছন পিছন নেমে গিয়ে বললাম-“ভূষণ,
তুমি যখন থাকবেই না, তখন তােমার বাঁশের লাঠিখানা
আজকের মত আমায় ধার দাও।”
-“বেড়ে কথা বলেছ।”
-“তবুও একটু সাহস হবে।”
-“তুমি লাঠি চালাতে জান ?”
-“পারি কিনা দেখি" বলেই আমি একটানে তার হাত
থেকে লাঠিখানা কেড়ে নিলাম। বেশ ভারী লাঠি।
ভূষণের চোখ দুটো ফসফরাসের মত জ্বলে উঠল ; সে হাত
বাড়িয়ে বললে-“দে লাঠি।”
বললাম-“চুপ। একটি কথা বলেছ কি এই লাঠি দিয়ে
তােমার মাথাটা মাটির হাঁড়ির মত উড়িয়ে ফেলব। দেখছ,
আমার হাতের কজি দুটো
ভূষণের দৃষ্টি ও মুখের চেহারা হয়ে উঠল অসহায়, ক্রুদ্ধ
বাঘের মত। দাতগুলাে এক-একবার কড়কড় করতে লাগল।
বললাম-“ওঠ, ঐ বারান্দায়।”
সে তেমনই দাড়িয়ে রইল।
এক-দুই-তি-
সে বারান্দায় উঠল।
-“ঘরের ভিতর চল
সে ঘরে ঢুকল।
-ঐ বিছানা আর বাক্সটা মাথায় তােল।”
সে একবার আমার দিকে প্ররচোখে তাকিয়ে সে-দুটো
মাথায় তুলে নিল।
-চল আমার আগে আগে।
আমার আগে আগে। কোন শব্দ করলে বা
ছুটলে তােকে মেরে ফেলে, নদীতে ভাসিয়ে দেব।”
নদীর ধারে ধারে পথ। সে আমার আগে আগে চল,
আমি চললাম ঠিক তার পিছন পিছন। সিকি মাইল যেতে না
যেতেই অন্ধকার গাঢ় হয়ে এল ; বাতাস উঠল, মেঘের গায়ে
বিদ্যুৎ ঝিলিক দিতে লাগল। নদীপারে শিয়াল ডেকে উঠল।
আমি টর্চ জ্বাললাম। টর্চের আলােটা রইল ভূষণের পিঠের
উপর।
সে চলে আর মাঝে মাঝে জোরে নিস ফেলে।
মনে হয়, একটা বুনাে মহিষ রাগে ফেস-ফোস করছে; কিন্তু
সে বন্দী।
এবার ডাকলাম-“ভূষণ।”
সে সাড়া দিল না।
ভাবলাম, যে শান্তি দিয়েছি এর উপর আর তাকে অপমান
করতে চাই না।
এমনি করে প্রায় দেড় ক্রোশ পথ পার হয়ে প্রথম
সাকোটার এপারে এসে পৌছলাম। ভূষণ ফিরে দাড়িয়ে
বললে-“বাৰু, আর যেতে পারব না।”
मक
—“তােকে যেতেই হবে।”
--“না, হুজুর। শুধু শুধু আমাকে জেলে দেবেন?”
“কি রকম?”
-“পুলিশ থেকে আমার সাঁকো পার হওয়া বারণ।”
-“মিছে কথা।”
-“ঐ বানা-আলাে জ্বলছে। আমি যাব না।”
—“তুই আমাকে আজ তা হলে মেরে ফেলতি।
-“বেটরে লাগলে হয়ত মরতেন। খুব বেঁচে গেলেন।”
—“ওটা যে থানা তাের কথায় বিশ্বাস করি কেমন
ক'রে ?”
-“হয় না হয়, হাঁক দিন।”
হাঁক দিতে হ’ল না; ওপার থেকেই মােটাগলায় হাঁক শােনা
গেল—“কোন বা।”
ভূষণ তৎক্ষণাৎ সেখানে বসে তার মাথার বােঝা মাটিতে
ফেলে একলাফে অন্ধকারে ডুবে গেল।
আমিও সভয়ে বিছানা ও বাক্সটা হাতে নিয়ে সন্তর্পণে
সাঁকো পার হয়েই দেখি সম্মুখে দুই লাল পাগড়ি। তাদের
হাতে বাঁশের লম্বা লাঠি, গায়ে উর্দি।
আমার বুকের ভার নেমে গেল। তাদের একজন অত্যন্ত
স্কুলকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলে—“তােম কোন্ হায় ?
৩
লক
নিজের দুরবস্থার কথা বর্ণনার পর ষ্টেশনের রাস্তার কথা
জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললে-“সিধা। বহু বাচ গিয়া।
শালা-লােক—তার পরের বিশেষণগুলাে আর বুঝতে পারলাম
। যতদূর পারলাম তাড়াতাড়ি পথ চলতে লাগলাম।
যখন ষ্টেশনে পৌছলাম, রাত তখন ন'টা। আধঘণ্টা
পরেই গাড়ী। পকেটে আগাম মাহিনার কিছু তখনও
অবশিষ্ট ছিল। তাই দিয়ে টিকিট কেটে কর্মস্থল থেকে
সুদীর্ঘ পনেরাে ঘণ্টা পরে কলকাতায় ফিরে এলাম। সেদিন
অন্ন লাগল মিষ্ট
মিষ্ট ; অন্নদাতার
অন্নদাতার ভালাে লাগল বড়
মােলায়েম।
তারপর ত অনেক দিন কেটে গেল। ইটের পাজার
মালিকের দেওয়া সেই আগাম আড়াই টাকা থেকে মাসিক
আঠারাে টাকা হিসেবে একত্রিশ দিনে মাস হলে একদিনের
মাহিনা কেটে নিয়ে বাকি টাকাটা আর ফেরৎ দেওয়া হয় নি।
তা খরচ হয়ে গেছে। সেই ইটের পাঁজাগুলাে কার কপালে
সােনার পাহাড় হয়ে ঠেকেছে, তাও জানি না; কিন্তু ভূষণের
সেই পাকা বাঁশের লাঠিখানা আজও আমি যত্ন করে
রেখেছি।
جه
কারসাজি
দত্তমশায—সাতকড়ি মুখুয্যের মুহুরি বিপ্রদাস দত্ত—কাজে
এসেছেন সেই বেলা এগারােটায়। এখন বাজল সন্ধ্যা সাড়ে
সাতটা।
তঁার সামনে কাঠের হাত-বাক্স, তার উপর খেয়াে-বাঁধানাে
মােটা খাতাখানা খােলা; ডান পাশে সীসের দোয়াত, হাতে
হাঁসের পালকের কলম। হারিকেনটা ছিল সামনে বানচারেক
পুরানাে পাঁজির উপরে একখানা পুরু পিচবাের্ডে বসানাে।
৭০
তেলটা খারাপ, পলতেটাও সম্ভবতঃ কয়দিন কাটা হয় নি। তাই আলাের চেয়ে ধোয়ার প্রাচুর্য বেশি। চিনিটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। দত্তমশায় পলতেটা একবার কমিয়ে আবার তখনই খানিকটা উস্কে দিলেন। ফলে প্রচুর ধােয়া বা’র হয়ে চিনিটার ভিতর ঘুরপাক দিয়ে শিখাটাকে আরও ঢেকে ফেলল। দত্তমশায় তাড়াতাড়ি পলতেটা কমিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, চাকরটাকে ডাকবেন কিনা। কিন্তু আর কতটুকু সময়ই বা কাজ করবেন। রাত হয়ে এল। তার উপর কুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বেশি দেরী করলে আবার সঙ্গী পাবেন না। সেখান থেকে তাঁকে বাড়ী যেতে পথ ভাঙতে হবে পাকা এক ক্রোণ। দত্তমশায়ের হাতে তখন ভুলি দাসীর আড়াই বছরের হিসেব। কার ভাগ্নে মহিম এসে বললে—“বিপ্রদাসবাবু, এই অঙ্কটা কষে দিন্ না, কিছুতেই মিলছে না।” --“যা-যা এখন।” -“আপনার দুটি পায়ে পড়ি। না হলে কাল মার খাব।” -“কাল কষে দেব- -“না, বিপ্রদাসবাবু, আপনার -“রােজ কাজের সময় এসে গােলমাল।” ৭১
মহিম ফলে উঠে টিনা দত্তমশায়ের বাক্সের উপর
রেখে অনুনয়ের সুরে বললে-“
দিদি।”
-“কি অঙ্ক। পাটীগণিত কই? কি বলছে দেখি-
‘এক মহাজন একটা চাষীকে বাৎসরিক সাত টাকা হার সুদে
সাতাশী টাকা ধার দিল। চাষী তাহাকে তিন বৎসর পরে বাকি
সুদে ও আসলে দিল একশত টাকা সাড়ে পাঁচ আনা। তাহা
হইলে মহাজনটি চাষীর নিকট হইতে ইতিমধ্যে কতটাকা মুদ
পাইয়াছিল?
এ ত খুব সােজা অঙ্ক রে! প্রথমে বার করতে হবে-
৭২
বাইরে খড়মের আওয়াজ হতে লাগল-খট-খ। মহিম
চট করে প্লেট ও পাটীগণিত তুলে নিয়ে নিঃশব্দে অদৃশ্য হ'ল।
দত্তমশায় কর গুণতে লাগলেন।
কর্তা ঘরে ঢুকেই হাঁকলেন-“কেদার-কেদারে
কেদার সাড়া দিয়ে একটু পরেই ঘরে ঢুকল। তার বাঁ হাতে
হুকো, ডান হাতে কলকে। কলকেটায় সে ফু দিতে দিতে
আসছিল। কলকের তলা দিয়ে তুলাের পাঁজের মত ধোয়া
বা’র হচ্ছে। তার একটু উড়ে গিয়ে কর্মক্লান্ত দত্তমশায়ের নাকে
ঢুকল। তিনি আরাম বােধ করলেন।
মুখুয্যেমশায় বললেন-“এখানে মহিম এসেছিল না?
—“মহিম ?-আজ্ঞে চলে গেছে।”
—সে ত দেখতেই পাচ্ছি। আজ ক’জনের হিসেব করলে?”
—“হিসেব? ভােলা বিশ্বাস, নরেন হাজরা, সতীশ এই
আর লক্ষ্মীমণির।”
-“মােটে এই ক’জন! ভুলির কি হ'ল?” বলে
মুখুয্যেমশায় কোটা কেদারের হাত থেকে নিয়েটানতে লাগলেন।
“আরম্ভ করেছি। কিন্তু এদিকে রাত
—“রাত আর কতটুকু? তুমি ওদিকে আসবে বেলা
দুপুরে, যাবে সন্ধ্যের বাতি জ্বলতে না বলতে। তােমাকে ত
এর আগে অনেক দিন বলেছিনা পার, ছেড়ে দাও।”
৭
-“আজ্ঞে খেয়া-পারের পথ। রাত হয়ে গেলে সঙ্গী
-“বেশ ছেড়ে দাও। কাজের মধ্যে ত দেখি, মহিমের
সঙ্গে গল্প-”
কথাগুলাে দত্তমশায়ের বুকে গিয়ে বিধল। গল্প তিনি করেন,
সত্যই, কিন্তু দিনের মধ্যে সে পনেরাে-কুড়ি মিনিটের বেশি হবে
না। তিনি এক সময়ে আসামের চা-বাগানে চাকরি করতেন।
ছেলের মন! সেই জঙ্গলের গল্পই শুনতে ভালবাসে। তবে
কখন কখন সে অঙ্কটা করিয়ে নিয়ে যায়, দু'চারটে ইংরেজী
কথারও মানে জিজ্ঞাসা করে। তিনি শুভরীর অঙ্ক ভালই
জানেন , ইংরেজী কথাও দুটো চারটে যে না জানেন এমন নয়।
তবে বড় বড় কথা। ছেলেটাকে তার লাগে ভাল।
সারাদিনই ত খাতার উপর ঘাড় গুজে থাকেন।
থাকেন। কেদারের
দয়া হ'লে, দু'একবার তামাক খাইয়ে যায়। দিনের মধ্যে
দু’চারজন খাতক আসে। তখনই যা দুটো চারটে কথা বলেন,
কিন্তু তাও দুঃখের , সকলেই বলে-কষ্টে আছি।
দেড় বছর আগে তিনি চা-বাগান থেকে এসেছেন। ছেলে-
মেয়েটাকে খেয়েছে কালারে; দেশের জায়গা-জমি গিলেছে
পাঁচভূতে। দুইয়ের কোনটাই আর ফিরে আসবে না। এখন
সম্বল ভিটেটুকু। সংসারে তারা স্বামী-স্ত্রী। মন ভেঙ্গে গেছে,
শরীরও অপটু হয়ে পড়েছে। নূতন আর কিছু করবার উপায়ও
৭১
নেই। তাই এই মাসিক বারাে টাকা মাইনের মুহুরিগিরি।
কিন্তু এ দিনের মধ্যে তিন-চারবার টলমল করে। দত্তমশায়ের
চোখ দুটো কেমন করে উঠল।
কর্তা একগাল ধোয়া ছেড়ে বললেন-“ওটা আজ শেষ
করে যেতে হবে।”
ঘরের পিছনেই বড় রাস্তা। জানালা খােলা ছিল। ঐ
দূরে অন্ধকারে একটা আলাে জ্বলছে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে
দত্তমশায়ের গাঁয়ের যদু ঘােম ডাকলে—“ওগাে দত্তমশায়!
যাবে নাকি? দেয়া চেপে আসছে।”
দত্তমশায় চকিতে একবার কর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে
অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন—“দেরী আছে।”
যদু কথাগুলাে স্পষ্ট শুনতে পেল না; বললে-“তবে এস।
আমরা ঐ যােগেন ঠাকুরের দোকানে ‘প্রেতীক্ষে করছি।
বলাইও যাবে; পিছে আসছে।”
দত্তমশায় আর জবাব না দিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলে ভুলি
দাসীব হিসেব কষতে লাগলেন।
কর্তা বললেন-“আমি যে দ্বিজপর বাগানখানা কিনব
একথাটা যষ্টি জানল কি করে?”
যষ্টি কর্তার এক শরিক; উপস্থিত দত্তমশায়দের গ্রামে
বাস করেন।
৭৫
সক
মশায় বললেন-“আরে, আমি তা জানি নে।”
-“তুমি জান না? আমি যে কিনব একথা এক তুমি
ছাড়া আর কারও জানবার নয়।”
দত্তমশায় নীরব। কর্তার সন্দেহ প্রবল হয়ে উঠল ;
বললেন-“তুমি তলে তলে ওর সঙ্গে যােগ দিয়ে আমার সর্বনাশ
করবার মতলব করেছ ?”
দত্তমশায় বললেন-“দেখুন, আপনি অযথা আমার উপর
সন্দেহ করছেন। যাই হােক, আপনার যখন ইচ্ছা নয় যে, আমি
আপনার এখানে আর কাজ করি, তখন আমাকে জবাব দি।”
মুখুয্যেমশায় চিরকাল লােকের কাতর প্রার্থনা শুনে এসেছেন।
এমন স্পষ্ট জবাব কখনও শােনেন নি। কাজেই ক্রুদ্ধ হয়ে
উঠলেন; বললেন-“বটে••বেশ, যেতে পার।”
দত্তমশায় খাতার উপর কলমটা রেখে বললেন—“আজ
চৌদ্দই আশ্বিন। গত মাসের মাইনে এখনও পাই নি।”
মুখুয্যেমশায় শান্তকণ্ঠে বললেন—“কাল এসে নিয়ে যেয়াে।”
-“দেখুন, আমি আর এখানে আসতে চাই না। আমার
হাতেও কিছু নেই।”—দত্তমশায় জবাব দিলেন।
মুখুয্যেমশায় কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু নিজেকে
সামলে নিয়ে বললেন—“তুমি কি নিয়েছ না-নিয়েছ, আগে
দেখি; তারপর ত হিসাব করে দেব।”
-“এই ৩ খাতা রয়েছে।
আমি একটি পয়সাও
নিই নি।”
—“আজ আমার সময় নেই। কেদারকেদারে—
কেদার বারান্দায় বেড়ার আড়ালে দাড়িয়ে ব্যাপারটা
শুনছিল। সকল কথা লুকিয়ে শােনাই তার স্বভাব। সে ঘরে
ঢুকতেই মুখুয্যেমশায় বললেন—“নরহরিকে চট করে ডেকে
নিয়ে আয় ত।”
কেদার ছুটল। বৃষ্টি তখন আর একটু জোর হয়ে এসেছে।
নরহরির বাড়ী সেখান থেকে খান দুই বাড়ী পরে। সে বাড়ীতেই
ছিল এবং অবিলম্বে এসে উপস্থিত হ'ল—যেন এইটুকুই সে
অপেক্ষা করছিল।
কর্তা বললেন—“ওকে খাতাপত্র বুঝিয়ে দাও।•••নরহরি,
সব বুঝে নে।”
বুঝাবার বিশেষ কিছু ছিল না; দত্তমশায় কয়েক মিনিটের
মধ্যেই নরহরিকে খাতাপত্র বুঝিয়ে বেড়ার গা থেকে উচু কলার
ও চওড়াকফ-ওয়ালা আধময়লা শার্টটা খুলে নিয়ে, ফরাস থেকে
নামলেন। তারপর কাদামাখা ক্যামবিশের জুতাে জোড়া পায়ে
দিয়ে ঘরের কোণ থেকে আলি-দেওয়া ও বাটভাঙ্গা ছাতাটা
হাতে করে বললেন-“আমি যাচ্ছি বাবু।”
কর্তা কোন উত্তর দিলেন না।
৭৭
গল্প সপ্তক
দত্তমশায় নমস্কার করে অন্ধকারে বা'র হয়ে গেলেন।
সৌভাগ্যবশত যােগেন ঠাকুরের খাবারের দোকানে তখনও যদু
ঘােষেরা তার জন্যে প্রতীকে করছিল। তাকে আর একা
বাড়ী যেতে হ’ল না।•••
পরদিন
ঘুম
ভাঙ্গতেই দেখেন, যষ্টি
মুখুয্যের লােক এসে
তাঁকে ডাকছে। লােকটি বললে—“বৰ্তা একবার ডেকেছেন।
তাড়াতাড়ি চলুন।”
দত্তমশায় আন্দাজে বুঝে নিলেন ব্যাপার কি।
সংবাদ সুখের হলেও তার মন সঙ্কুচিত হয়ে গেল। তিনি
দুঃস্থ ব'লে যষ্টিবাবু ডাকেন নি, ডেকেছেন তঁার শরিকের
সর্বনাশ করবার উপায়রূপে তঁাকে ব্যবহার করবেন বলে।
ইচ্ছা না থাকলেও দত্তমশায় তাঁর সঙ্গে দেখা করে এলেন ;
কাজেও বহাল হলেন। কিন্তু সেদিন আর
গেলেন না।
সারাদিন বসে বসে তিনি নিজ জীবনের পুরানাে কথাগুলাে
ভাবতে লাগলেন•••আসামের চা-বাগানে থাকলেই বা ক্ষতি
ছিল কি? সেখানে ত|
সহসা মনে পড়ল, সে-দিন মাইনে পাবার কথা। তখনও
বেলা অনেক আছে। তিনি জামাটা গায়ে দিয়ে জুতাে জোড়া
পরে ছাতাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তারপর যখন
৭,
সাতকডি মুখুয্যের বাড়ী গিয়ে পৌঁছলেন, তখন বেলা চারটে বাজে। সূৰ্য্য বাঁশবনের মাথায় ঢলে পড়েছে। মুখুয্যেমশায় কাছারিঘরেই ছিলেন; তাঁকে দেখেই বললেন -“কি খবর হে।” -“মাইনের টাকা ক'টা—” —“মাইনে? কিসের মাইনে? তুমি কি আজকাল নেশা- টেশা করছ? না যষ্টির সেরেস্তায় কাজে বহাল হয়েই জােচ্চুরি- দত্তমশায় অবাক, বললেন-“আজ্ঞে, একি কথা বলছেন?” -“মাইনে নিয়েও যখন তুমি “মাইনে ত আমি নিই নি।” —“নাও নি ? জোচ্চুরি ? ঐ খাতায় সই রয়েছে কার?” বলে মুখুয্যেমশায় মাইনের খাতাখানা তার ভূতপূর্ব মুহুরির সামনে মেলে ধরলেন। দত্তমশায় বিস্ময়-বিস্ফারিত নয়নে দেখলেন, খাতায় এক মাস চৌদ্দ দিনের মাইনে নিয়ে তিনি সই করে দিয়েছেন- বিপ্রদাস দত্ত। সবই ঠিক-মায় আঁকড়ি ও টানটি পর্যন্ত ঠিক তেমনই হেলে আছে। কাছারিঘরের পাশেই একখানা কাঠ-কুটো রাখবার চালা। তারপর অন্দরের উঠোন। কাঠ-কুটোর ঘরে ভিযে কাছারিঘরের সব কথা শােনা যায়।
গ সক
দত্তমশায় একটা নিশ্বাস ফেলে ঘর থেকে রেরিয়ে এলেন ;
কর্তাকে নমস্কার করতে তার মনে পড়ল না।
পথ দিয়ে চলেছেন। বেলা প'ড়ে আসছে। ছায়া কোথাও
হচ্ছে দীর্ঘতর, কোথাও হচ্ছে আরও ব্যাপক, কোথাও গড়িয়ে
নীচে নেমে গেছে এবং যেখানে ছিল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সেখানে আর
ভেদ নেই—সব মিশে গেছে।
দত্তমশায় মাঠে এসে পড়লেন। দূরে দেখা যায় খেয়া-ঘাট।
খেয়াখানা যাত্রী নিয়ে ধীরে এপারে আসছিল। তাঁর পাশ দিয়ে
পরিচিত দুই-একজন চলে গেল। তিনি তাদের চিনেও
চিনতে পারলেন না।
সূৰ্য্য একেবারে ডুবে গেছে; সব অস্পষ্ট হয়ে এল।
ঘাটও একেবারে সামনে।
হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে ডাকলে—“দত্তমশায়--
দময়
স্বরটা পরিচিত ও মিষ্ট; ফিরে দেখেন, মহিম।
তিনি অবাক হয়ে গেলেন, কয়েক পা এগিয়ে এসে
বললেন-“কি মহিম।”
—“একটু দাড়ান।”
মহিমের বয়স দশ-এগারাে বছর হবে; কিন্তু ভারী সাহসী
ছেলে। পাড়াগাঁয়ে তার বাসনা হবেই বা কেন?
সে কাছে এসে কোমর থেকে কতকগুলাে টাকা ও নােট
বা’র করে বললে-“নি-মামীমা পাঠিয়েছেন।”
দত্তমশায় প্রথমটা বুঝতে পারলেন না; বললেন-“কেন?
কাকে ?
আপনাকে। আপনাকে ওরা টাকা দিলে না। তাই
মামীমা বললেন, গরীবের পাওনা টাকা না দিলে অমঙ্গল হবে।
নিন্” বলে সে দত্তমশায়ের হাতখানা টেনে ধরলে।
দত্তমশায়ের চোখ দুটি জলে ভরে গেল। তিনি প্রথমটা
কথা বলতে পারলেন না। ক্ষণপরেই নিজেকে সংযত করে
গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন-“না বাবা! এ
গ. ক
টাকা আমি নিতে পারি না। তােমার মামীমা মা লক্ষ্মী।
তাঁকে আমার প্রণাম দিও।”
মহিম বললে—“না, সে হবে না। আপনাকে নিতেই
হবে।” বলে সে আবার হাত চেপে ধরলে।
দত্তমশায় চোখ দুটো মুছে বললেন—শার টাকা তাঁকেই
ফিরিয়ে দিও; আর বলল—দত্তমশায় প্রণামী দিয়েছেন।”
—“না নিলে আপনার বাড়ী গিয়ে দিয়ে আসব।”
-না। রাত হয়ে আসছে। চল, তােমাকে এগিয়ে দিই।”
“আমায় এগিয়ে দিতে হবে না। এপথে কতদিন
সন্ধ্যের পর আমি একা এসেছি। নি”
দত্তমশায় মহিমের হাত চেপে ধরে খেয়াঘাটের দিকে
এগােতে এগােতে বললেন এ টাকা নেওয়া বড় অপরাধের।
এ ত আমার প্রাপ্য নয়।”
তার কথাগুলাে শেষ হতে না হতে কারা যেন পিছন থেকে
ছুটতে ছুটতে এসে তাঁর ও মহিমের হাত চেপে ধরে বলে উঠল
—“পেয়েছি! শালা পালাচ্ছে ছেলেটাকে চুরি করে নিয়ে
যাচ্ছে-এই যে টাকাও আছে—
দত্তমশায় চমকে দেখেন, নরহরি ও তিনজন পেয়াদ।
অতঃপর তার ভাগ্যে যে লাঞ্ছনা শুরু হল, তা না বলাই ভাল।
নরহরিরা এসেছিল কর্তার আদেশে। কেদারের স্বভাবসুলভ
গতক
চাপল্যবশে আড়ালে দাড়িয়ে সে গিয়ীঠাকরুণকে মহিমের হাতে
টাকা দিতে দেখে এবং তাদের দু'জনের মধ্যে যে কথাবার্তা
হয়, তাও শােনে। মহিম টাকাগুলাে পেটকাপড়ে গুজে
খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে পুকুরের ধার ধরতেই সে এসে কর্তার
কাছে নালিশ করে। কর্তা দেখলেন, দত্তমশায়কে আরও
খানিকটা শান্তি দেবার চমৎকার সুযোেগ। তবে এবারকার।
শান্তিটা হবে কঠোর। বেটা বৃষ্টির দোসর।
দমশায়কে পুলিশে দেওয়া হ’ল; পুলিশও যথারীতি
তাকে মহকুমায় চালান দিলে। তার নামে অভিযােগ—শিশু
মহিম ও একশ টাকা চুরি। যদিও পাওয়া গেল মাত্র পঁচিশ
টাকা; তাও আবার ছিল মহিমের কাছে।
অপহৃত বস্তুগুলাের একটি ত কথা বলতে পারে।
সাতকড়ি মুখুয্যে মহিমকে বললেন—“খবরদার। কথাগুলাে
যেন মনে থাকে। উকিল জিজ্ঞাসা করলেই বলবি—বিপ্রদাস
আমাকে ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, আর হাকিমকে বলবি হুজুর।”
মহিম বললে—হ।”
নির্দিষ্ট দিনে মামলা উঠল। মজার মামলা; সেইজতে
তা দেখবার জন্য আদালতে লােক ভেঙ্গে পড়ল।
সাতকডি মুখুয্যে মহিমকে জিজ্ঞাসা করলেন—“মনে আছে?”
গলক
-“কি বলবি?”
মহিম পাখীর মত শিখানাে বুলিলে বলে গেল।
থalkilpLIllutiful Ik|
ll||
বেচারা দত্তমহাশয়ের পক্ষে দাঁড়ালেন এক হােকরা উকিল।
যদি লােকটাকে খালাস করা যায়, নাম হবে। নাম হলেই
পসার। উকিলটি হােকরা হলেও চালাক। তিনি এতক্ষণ
কাছারির বাইরে একটা আমগাছের তলায় দাড়িয়ে একটি
লােকের সঙ্গে কি যেন পরামর্শ করছিলেন। লােকটি একখানা
বাড়ীর দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে তাকে কি যেন বলছিল।
সাতকড়ি মুখুয্যের সাক্ষীর অভাব ছিল না। তাদের মধ্যে
:
মহিমও একজন। দমশায়ের উকিল অন্যান্য সাক্ষীকে জেরা
করবার আগে মহিমকে জেরা করতে উঠলেন; কিন্তু মহিমের
মাথা কাঠগড়া ছাড়িয়ে উঠল না। আদালত-সুদ্ধ লােক তাকে
দেখবার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে দাড়াল।
হাকিম পেয়াদাকে বললেন-“ওকে কোলে নিয়ে দাও।”
পেয়াদ মহিমকে কোলে নিয়ে কাঠগড়ায় দাড়াতেই সে
ভয়ে বিস্ময়ে আদালত ঘরের চারধারে একবার তাকিয়ে হাকিমের
দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে।
দত্তমশায়ের উকিল তাকে জেরা করবার উদ্যোগ করতেই
হাকিম নিজেই মহিমকে জিজ্ঞাসা করলেন-“তােমার নাম কি?
-“মহিমকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।”
বিপ্রদাস দত্তকে দেখিয়ে বললেন-“ঐ লােকটাকে চেন?”
মহিম দত্তমশায়ের মান শুদ্ধ মূর্তির দিকে তাকিয়ে বললে-
“হাঁ• স্যার•••হুজুর!”
ও তােমাকে ভুলিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল ?”
-“দত্তমশাই ?•••উনি ত আমাকে ভুলিয়ে নিয়ে যান নি।
মামীমা আমাকে ওঁর হাতে দেবার জন্যে পঁচিশ টাকা
দিয়েছিলেন। আমি তাই দিতে ওর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছিলাম।•••
মামা ওঁকে মাইনে দেন নি কি না।”
আদালত-কক্ষে সহসা কৌতুক ও বিস্ময়ের গুঞ্জন উঠল।
৮৫
হাকিম জিজ্ঞাসা করলেন—“সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছিলে কেন?” —“টাকাগুলাে উনি কিছুতেই নিতে চাইছিলেননা যে•••উনি তখন কাঁদছিলেন; বলছিলেন—এ টাকা আমি নিতে পারি না।” হাকিম আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না; বললেন- “যাও।" মুখুয্যেমশায়ের উকিল বললেন-“হুজুর, ও ছেলেমানুষ।” দত্তমশায়ের উকিল বললেন-“হুজুর, হুকুম দিলে মহিমের মামীমাকেও আদালতে উপস্থিত করতে পারি...” মুখুয্যেমশায়ের উকিল বলে উঠলেন—“সে কি করে হয় ? তিনি পর্দানশীন মহিলা।” সাতকড়ি মুখুয্যে তখন আদালত-কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছেন। দত্তমশায়ের চোখ দুটি জলে ভরে উঠেছে। কাগজের উপর হাকিমের কলম চলছে, লােকে কানাঘুষা করছে, মুখুয্যেমশায়ের উকিল মাথা চুলকোচ্ছেন। মামলার পরিসমাপ্তি ঘটল। দত্তমশায় খালাস পেলেন। মহিমও মাতুলগৃহে ফিরে গেল। কিন্তু তার সেখানে একটু ঠাই হলেও মাতুলের মেহ থেকে সে হ’ল বঞ্চিত। বঞ্চিত হলেও মামীর কাছে তার আদর আরও বাড়ল।
চন্দনপুর
MUISSEURS.
FEPIUSEASIITINUTULEN
ALLETITLEEPI
Y?
হaA
এক টাকা সাড়ে তিন আনার গােলমাল।
আপ ও ডাউন ট্রেনের টিকিট বিক্রয় পাওয়া যাচ্ছে ছাপ্পায়
খানা, কিন্তু মাশুল বাবদ রয়েছে মােট একষট্টি টাকা দশ আনা।
নূতন বদলি হয়ে এসেই গুনােগার। ষ্টেশনটি আবার এমন যে
উল করবার যাে নেই। পান আর মাছে কি হবে? তা ছাড়া
এখন খাবার লােকও ও--
৮৭
খাতা থেকে মুখ না তুলেই ‘ছােটবাবু রঞ্জন চৌধুরী
হাঁকলেন—“এই ফব্রিজ-কত্রি—উ। যেমন মশার ডাক,
তেমনিই ডাকছে বেটার নাক।”
ছােটবাবুর তামাকের অভ্যাস আছে।
পিছনে তার-ঘরের দরজায় ফত্রিঙ্গা কম্বল মুড়ি দিয়ে
ঘুমােচ্ছিল। একে শীতকাল, তার উপর রাত তখন
দুটো। কিছুক্ষণ আগে ডাকগাড়ী পাস হয়েছে; মালগাড়ী-
খানাও এক্ষণে বিঘাটি ষ্টেশন ধরে-ধরে। কাজেই ফত্রিঙ্গা
নিশ্চিন্ত। ছােটবাবু একবার ভাবলেন, নিজেই তামাকটুকু সেজে
নেন। কিন্তু ইচ্ছাটা প্রবল হ’ল না। আবার খাতায় ঠিক
দিতে আরম্ভ করলেন।
“এই ত টিকিটের হিসাব দিব্যি মিলে যাচ্ছে।” সহসা
হােটবাবুর শুক শীর্ণ মুখের উপর দিয়ে একটু বিষাদের হাসি
খেলে গেল। মনে মনে বললেন—“তখন কি জানতাম, একদিন
অ্যাসিষ্ট্যান্ট ষ্টেশন-মাষ্টার হয়ে চন্দনপুর ষ্টেশনেই বদলি
হয়ে আসব। ও। সে কত বছর আগেকার কথা। তখন
এখানে এমন বাঁধানোে প্ল্যাটফরম, পাকা ষ্টেশন-ঘর, ওয়েটিং
রুম কিছুই ছিল না। মাঠের মাঝখানে ছিল একখানা ছােট
খড়ের ঘর, তার চাটাইয়ের নীচে আলকাতরা-মাখানাে বেড়া।
পিছন দিকে পাশাপাশি দুটো খাদ জলে ভরা। সেগুলােতে
;
কলমি আর হেলান। পাড়ের উপর কাশের ঝাড়। খাদের
ওপারে কোয়াটার;—দুটো খাদের মাঝ দিয়ে সেদিকে
যাতায়াতের উচু পথ। তার শেষে একটা বাঁকা নিমগাছ।
প্ল্যাটফরমটা ছিল এত নীচু-ট্রেন থেকে নামবার সময় কয়েক
বার ও পড়তে পড়তে রয়ে গেছি। সে সব দিন আর নেই।
হা-হা-অক্ষয় আর আমি
ফত্রিঙ্গা কম্বলটা গায়ে মাথায় জড়িয়ে নিতে নিতে বললে-
“কি বলছেন? ‘ইপিশ্যাল আছে?”
রঞ্জনবাবুর চমক ভাঙ্গল ; বললেন-“না, একটু তামাক
দিবি বাপ।”
ষ্টেশন থেকে কাঁচা-পাকা সড়ক চলে গেছে সােজা উত্তরে।
সড়কটার দু'পাশে ঝােপঝাড় জঙ্গল। তার মাঝে মাঝে
চারা খেজুর, শিমূল, আম ও বাবলা গাছ নানা ভঙ্গিতে দাড়িয়ে
আছে। সড়কের মাঝে দুটি খাল, গরুর গাড়ীর চাকায় তৈরী
হয়েছে। দু’পাশে মাঠ, মাঠের শেষে গ্রাম। সড়ক ধরে
ক্রোশ দেড়েক ভাঙ্গলেই চন্দনপুরের বিল। বিলটা শেষ
হয়েছে একেবারে অক্ষয়দের গ্রাম মালাড়ার পূবে। ঐ
মালাড়াতেই ছিল রঞ্জনবাবুর মামার বাড়ী।
কত্রিঙ্গা তামাক এনে বললে—“নি বাবু।”
রঞ্জনবাবু কোটা নিয়ে নলচে ধরে একমনে টানতে
লাগলেন; তাঁর বাঁ হাতখানা বইল খাতার উপর। ক্রমে
খোয়ায় তাঁর মুখের চারধার ঢেকে গেল।
অক্ষয়টা-হা-হা-একবার আখক্ষেতে আখ ভাতে
গিয়ে•••কি রে অক্ষয়?—তুই? এই রাতে বসব।
সে কি দাড়িয়ে থাকবি?” শীরঞ্জনবাবু আত্মহারা হয়ে পড়লেন।
HH
অক্ষয় জিজ্ঞাসা করলে—“কবে এসেছিস?”
-“দুটো রাতও কাটে নি। তাের চিঠি পেয়েছিলাম। যা
গােলমাল গেল ক’দিন। উত্তর দেওয়া হয় নি। দেখ দেখি
ভাই কি গ্রহের ফের। সেই চন্দনপুর ষ্টেশনেই এলাম
ছােটবাবু হয়ে। তারপর কি খবর? কিন্তু এই রাত্রে তুই”
;
অক্ষয়ের আপাদমস্তক ঢাকা, কেবল মুখখানি ধােলা।
তার স্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ দুটিকে আরও উজ্জল বােধ
হচ্ছে; বললেন—“রঞ্জন, তাের চুল সবই পেকে গেছে
-“পাকবে না? কত বয়স হ’ল বল দেখি? তা ছাড়া
কিন্তু তাের চেহারা বেশ আছে। বসছিল না কেন?”
অক্ষয় টেবিলের কাছ থেকে হাত কয়েক দূরে সরে গিয়ে
টিকিট-বসের গায়ে হেলান দিয়ে দাড়ালেন। রঞ্জনবাবুর
মনে হ’ল, অক্ষয়ের ব্যবহারে আন্তরিকতা নেই, সে যেন একটু
দূরে সরে গেছে; বললেন-“তামাক খা। ওহহ। আমি
ভুলেই গেছি এই ব অভ্যাসটা তুই করিস নি। হারে অক্ষয়!
বিলের ধারে বটতলায় সেই পােডজা মন্দিরটা এখনও আছে ?
মাঠের ধারের সেই আমগাছ ক'টা? আমাদের মামার ভিটে ?”
অক্ষয় ঘাড় নেড়ে জানালেন। তারপর জিজ্ঞাসা
করলেন-“তুই সপরিবারে এসেছিস?”
-“নাঃ। নূতন জায়গা•••সব দেশে। আমাদের দেশের
কথা তাের মনে পড়ে?”
-“হ। সেই চিডে, গুড়, নারকোল, আর সকলের উপর
কাকিমার যত্ন এখনও ভুলতে পারি নি।”
মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। এরঞ্জনবাবু একটা নিশ্বাস
ফেললেন ; তারপর বললেন-“যখন দেশে যাব ওদের আনতে,
আসবার সময় তাের জন্য চিড়ে, গুড়, নারকোল এনে মালায়
গিয়ে দিয়ে আসব
-“কিন্তু আমি ত ওখানে নেই।”
-“সে কি ? কোথায় আছি ? তাের স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে?”
-“তারা সকলেই আছে। কেবল আমিই চলে
এসেছি।”
এই বয়সে রাগ করে বিরাগী হয়েছি। কার উপর
রাগীর না ছেলের।”
-“কারাে উপরই আমার রাগ নেই। আর থাকতে
পারলাম না।”
-“কোথায় যাচ্ছিস? একি ছেলেমানুষী। সে হবে না-
টিকিট ত আমার হাতে। ছাডছি না। বাড়ী না যাও এখানে
থাক। হতভাগারা এল ব'লে তাের খোঁজে। আমি নিজে
যাব তাের সনে
অক্ষয় একটু হাসলেন; তাঁর মুখে নির্লিপ্ত ভাব।
শীরঞ্জনবাবু বললেন-“কোন গুরু পাকড়েছ বুঝি ?
তিনি কানে মন্ত্র দিয়েছেন—কা তব কান্তা *
ঠিক তখনই টেলিফোন বেজে উঠল—ক্রি-
ক্রিজিং
বাইরে কোথায় কাক ডাকছে। দূরে রেল লাইনের ধার থেকে
একপাল শিয়াল ডেকে উঠল-রাত শেষ হয়ে এল।
০
“দাড়া ভাই, কাজটা সারিভােরের গাড়ীর সময় হ'ল।”
বলে হােটবাবু তাড়াতাড়ি উঠে হাত থেকে কোটা টেবিলের
পায়ায় হেলান দিয়ে রেখে টেলিফোনের কাছে গেলেন।
তারপর কোন ধরে হাঁকলেন—হ্যাকি? লেট হয় নি ।
আসছে? ওরে কৃত্রিঙ্গা—এই ফতে। গাড়ীর ঘণ্টা দে।”
সেখানকার কাজ সেরে টিকিট-বাক্সের দিকে যেতে যেতে বললেন
-“তারপর ব্যাপারটা কি খুলে বলত।” বলে অক্ষয়ের
দিকে চোখ তুলে দেখেন, সেখানে অক্ষয় নেই। এদিক-ওদিক
তাকালেন, কোথাও তাকে দেখতে পেলেন না। দেখলেন
বাইরে যাবার দরজার কাছে বসে কত্ৰিজা তার বিছানাটি
গুটিয়ে নিচ্ছে। এরঞ্জনবাবুর বিস্ময়ের সীমা থাকল না।
ঘরের দুটি দরজা, দুটি জানালাই ত বন্ধ। টিকিট দেবার
স্কুলঘুলিটাও আঁটা।
রঞ্জনবাবু ফহিঙ্গাকে জিজ্ঞাসা
জিজ্ঞাসা করলেন-বাবুটি
কোথায় গেলেন দেখেছিস?”
—“কৌন বাবু?”
-“যে বাবু একটু আগে এসেছিলেন।”
-“কৌন বাবু ঘরমে ঘূষা নেহি-”
রঞ্জনবাবু তাড়াতাড়ি তার-ঘরের মধ্যে গিয়ে ঘরখানা
পরীক্ষা করে এলেন। সেখানেও অক্ষয় নেই।
ফব্রিা ঘণ্টা দিচ্ছে; পয়েন্টসম্যান ফাগু এসে সিগনালের তালার চাবি নিয়ে গেল। রঞ্জনবাবু অন্যমনস্কের মত টিকিট-বাক্সের ডালাটা খুললেন, টিকিট দেবার ঘুলঘুলিটার চাকা সরিয়ে নিলেন। তৎক্ষণাৎ সেখান দিয়ে একখানা কালাে হাত ভিতরে ঢুকল; ওপাশ থেকে হাতের মালিক বললে—“বাবু, যষ্টিপুর সাড়ে তিনখানা- তারপরই শােনা যেতে লাগল টাকা-পয়সার ঝনঝন্ শব্দের সঙ্গে টিকিটের ছাপ দেবার আওয়াজ ঘটাঘটাং-ঘটাং- হাতের মালিক বললেন—“বাবু। দুডাে পয়সা কম নেন। গরীব মানুষ।” —“ধ্যেৎ। কই হে, আর কে আছে। এই সরে যাও ওখান থেকে।” টিকিট দিতে দিতে রঞ্জনবাবু নিজের মনেই বলে উঠলেন—“তখন নিশ্চয়ই আমার তন্দ্রা এসেছিল। তার ঘােরে স্বপ্ন দেখেছিলাম।” স্থির করলেন, অক্ষয়কে তার আগমন-সংবাদ জানিয়ে একখানা চিঠি দেবেন। তবুও তিনি মনে শান্তি পেলেন না। ক্রমে টিকিট দেওয়া শেষ হল। ওদিকে তখন পুব দিক ফরসা হয়ে এসেছে। গাড়ীর হইসিল শােনা গেল। রান- বাবু কমফরটারের উপর মাথায় গােল টুপি চড়িয়ে কলম হাতে ১৮ প্ল্যাটফরমে এসে দাড়ালেন। তাকিয়ে দেখলেন, গাড়ী হােম সিগনাল পার হচ্ছে। ঐ ঝিকমিক করছে ইঞ্জিনের সামনের আলাে। আবার ঘণ্টা পড়ল। দেখতে দেখতে গাড়ী এসে থামল। যাত্রীরা উঠছে, নামছে, ছুটছে, চীৎকার করছে ; দরজা বন্ধ হচ্ছে, খুলছে। চারধারে ব্যস্ততা ও শব্দ। শ্রীরঞ্জনবাৰু গার্ডের গাড়ীর কাছ থেকে মাথার উপর হাত নেড়ে হাঁকলেন- “ঘণ্টা।” ঘণ্টা পড়ল, গার্ড হুইসিল দিতে দিতে লণ্ঠন দোলাতে লাগল, ইঙিন হুইসিল দিয়ে সশব্দে চলতে আরম্ভ করল। রঞ্জনবাবু জন দুই যাত্রীর কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করে ষ্টেশন-ঘরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এদিকে পূবের আলাে ততক্ষণে আকাশ যেয়ে পশ্চিমে পৌছেছে, নীচের অন্ধকার গলে পাতলা হয়ে উবে যাচ্ছে, কিছুরের মানুষকে বেশ চেনা যায়। এরঞ্জনবাবু দেখলেন, একটি যুবক, তার পাশে একটি কিশােরী, তাদের পাশে একজন লােক আসছে। লােকটার মাথায় বিছানা ও ট্রাঙ্ক। তারা সেই ট্রেন থেকেই নেমেছে। তারাও ষ্টেশন-ঘরের দিকে আসছিল। তার গায়েই ষ্টেশন থেকে বার হবার দর।
গ সংক
তারা তিনজনে এরঞ্জনবাবুর কাছাকাছি হতেই তিনি
তাদের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন। দেখেই বলে
উঠলেন—“অক্ষয়ের জামাই না? ঐত ওর পাশে কমলা। আর
ঐযে ওদের রাখাল, মধু। নিশ্চয়ই অক্ষয় এসেছে। আমি
স্বপ্ন দেখি নি। কিন্তু সে পালাল কেন?” তারপর উচুগলায়
বললেন--“বাবাজী যে ভাল ত? মা কমলা
অক্ষয়ের জামাতা বাবাজী ও মেয়ে কমলাও এবার তাঁর
দিকে ভাল করে তাকালে।
জামাতা বাবাজী নমস্কার করে বললে—“আজ্ঞে হাঁ
কমলা তাঁর মেয়ে গৌরীর বয়সী। গৌরী নেই। তিনি বললেন-“কেমন আছ? ভােমার বাবা ত কমলা তাঁর পায়ের ধূলাে নিয়ে সােজা হয়ে দাড়াতেই তিনি দেখলেন, তার দু'চোখে জল টলটল করছে। তিনি বিস্মিত ও ব্যথিত হয়ে বলে উঠলেন—“তাের চোখে জল কেন মা?” জামাতা বাবাজী বললে—“জানেন না? সাতদিন হল আর মশায় স্বর্গারােহণ করেছেন- -“কি?” -“সাতদিন হ'ল মারা গেছেন “কিন্তু আমি যে”—শ্রীরঞ্জনবাবুর মুখ দিয়ে আর একটি কথাও বা'র হ’ল না। ক্ষণিকের জন্য তিনি স্মৃতির মাঝে চেতনা হারিয়ে ফেললেন। সহসা ফত্রিঙ্গার ডাকে ফিরে দেখেন, জামাতা বাবাজীরা তিনজনে গেট পার হয়ে, পথের ধারে একখানা ছইওয়ালা গরুর গাড়ীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি আর সেখানে দাড়ালেন না, ষ্টেশন-ঘরের দিকে চলতে লাগলেন। সেদিন কোয়াটাসে যাবার আগে তিনি একটাকা সাড়ে তিন আনার হদিস পেলেন, কিন্তু অক্ষয়ের সঙ্গে নিশীথে সাক্ষাৎ স্বপ্ন কি সত্য তার মীমাংসা করতে পারলেন না। ৭ ১৭
রবিলটি
রাত তখন এগারােটা হবে—অণ্ডাল সেখান থেকে তখনও
দূর। বাইরে গাঢ় অন্ধকার। তার মধ্যে আগুনের ফুলকির
মত ঝাক ঝাক জোনাকি এবং গ্রামের দু'একটি আলাে ছাড়া
আর কিছুই চোখে পড়ে না। বন্ধুর তবুও ভাল লাগছে।
কে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
তার পাশের যাত্রী একবার বলেছিল—“খােকা, জানালাটা
বন্ধ করে দাও। ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, কয়লার ছড়া
টুকছে।” লােকটা বুড়াে মানুষ-হাঁ, বুড় বৈ কি; ঠাণ্ডায়
ভয়ে জড়সড়। তবে কয়লার গুড়
বন্ধু হঠাৎ চোখ রগড়াতে রগড়াতে গাড়ীর ভিতরে মাথাটা
টেনে আনলে। ঊ! চোখটা জ্বলে গেল, মনে হচ্ছে যেন
লার বীচি পড়েছে।
বন্ধুর সহযাত্রীদের বােধ হয় তখন তা এসেছিল, সেইজন্যে
তারা কেউ তার অবস্থাটা দেখতে পেলে না; কিংবা কেউ
কেউ দেখেও সেদিকে মনােযােগ দিলে না। বন্ধু লােকগুলাের
উপর মনে মনে একটু অসন্তুষ্ট হ’ল। সৌভাগ্যবশতঃ তার
চোখের কয়লা-কণা জলে গলে পাতার কিনারা দিয়ে বাইরে
এল। তার বেশ স্বস্তি বােধ হতে লাগল।
সে আবার বাইরের দিকে মুখ ফেরালে, কিন্তু জানালা
দিয়ে আর মাথা বাড়াল না।
গাড়ী ছুটেছে••এক্সপ্রেস গাড়ী; যেমন শব্দ তেমনই বেগ।
বন্ধুর মনপথ দিয়েও নানা কথা ছুটতে ছুটতে আসছে যাচ্ছে।
তার একবার মনে হল, যদি কলিশন হয়, যদি রেল থেকে
গাড়ী ছিটকে পড়ে, যদি ডাকাতে গাড়ী আক্রমণ করে।
সে তা হলে
তৎক্ষণাৎ তার মনে হল, গাড়ীর গতিবেগ কমে আসছে।
হ—এ যে কমতে কমতে হঠাৎ থেমে গেল। বাইরে
গাঢ় অন্ধকার। লক্ষ ঝি ঝি ডাকছে। বন্ধু উঠে জানালা দিয়ে
মুখ বার করে দেখতে গেল, ব্যাপারখানা কি।
কে যেন পিছন থেকে হঠাৎ তার ঘাড় চেপে ধরলে—
কামরার মধ্যে কে যেন গো-গোঁ শব্দ করছে।
ভয়ে বন্ধুর
হাত-পা ঝিঝিম করতে লাগল। ডাকাত-এ ডাকাত না
হয়ে যায় না। কিন্তু তার কাছে ত বিশেষ কিছুই নেই।
তার আর্থিক অবস্থাটা ডাকাতের কাছে বলবার চেষ্টা করলে,
কিন্তু তার গলা দিয়ে অর বার হ’ল না।
সেই সময় সে অনুভব করলে, তার কানের পাশে যেন
কিসের শীতল স্পর্শ। পিস্তল।
বন্ধু কখন কন কল্পনা করত, সে ডাকাতের হাতে পড়লে,
তাদের সঙ্গে রীতিমত লড়বে। কিন্তু আজ আজকের
পরাজয়ের লজা সে ঢাকবে কি দিয়ে? এরা কাপুর! না
হলে পিছন থেকে-
হঠাৎ কে যেন বলে উঠল—এই যে এখানে-
সেই সঙ্গে ডাকাতটা তার ঘাড় ছেড়ে দিলে। বন্ধু
তাড়াতাড়ি সােজা হয়ে বসল। তার চোখ গিয়ে পড়ল বাইরে।
একি? ষ্টেশন।
সক
পাের্টার হাঁকছে-আসানসােল!”
তাের হয়েছে। অণ্ডাল পিছনে পড়ে আছে। সে এত
ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সে তাড়াতাড়ি পোঁটলাটা হাতে নিয়ে নেমে পড়ল। কিন্তু
তাকে যে এখন আক্কেল-সেলামী দিতে হবে। পকেটে হাত
দিয়ে দেখলে, পয়সা আছে মাত্র দশটি। অণ্ডালের গাড়ী
আসতেও দেরী। এখনই তাকে চেকার ধরবে; তার কাছে
মাল চাইবে।
সে কয়েক পা যেতেই একজন তার পাশ থেকে বললে-
“টিকিট?”
লােকটার গায়ে কালাে কোট, মাথায় কালাে টুপি, গায়ের
রঙ কালাে, চোখের চাহনি ভাল নয়।
বন্ধু বললে-মশায়—
লােকটা চেকার ; হাতের পানচ-যন্ত্রটা উঠিয়ে বললে
টিকিট দেখাও”
“দেখাচ্ছি মশায়, কিন্তু আমি বড় বিপদে পড়েছি”-বলতে
বলতে বন্ধু বুক-পকেট থেকে টিকিটখানা বার করে লােকটির
হাতে দিলে। ভয়ে তার বুক কাঁপছে, তালু শুকিয়ে এসেছে।
লােকটা টিকিটনা উল্টেপাল্টে দেখে বললে-“চল
আমার সঙ্গে-
-“দেখুন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম- -আজকে দণ্ড দিলেই এবার থেকে জেগে থাকবে বন্ধু শুনেছিল, কোন কোন টিকিট চেকার ঘুষ খায়। কিন্তু এ লােকটা সম্বন্ধে সে সঠিক কোন ধারণা করতে পারছে না। লােকটা আড়ে বহরে বিশালদশ পয়সায় এর পেট নিশ্চয়ই ভরে না। আর পয়সা দশটা একে দিলে সে এখান থেকে অণ্ডাল যাবে কি করে? ষ্টেশন থেকেও তার মামার বাড়ী পাকা দু'ক্রোশ; বাসভাড়া দশ পয়সা। লােকটা বন্ধুর হাত ধরে বললে—“চল, চল,•••এই জমাদার বন্ধুর পা দুটো যেন চলে না; সে দুর্বলের মত কয়েক পা যেতেই লােকটা বললে-“তােমার বাড়ী কোথায়? -রামপুর -“অণ্ডলে কোথায় যাবে?” -ফুলকুডি গ্রাম— -ফুলকুড়ি। কোথায়?•••তুই বন্ধা না?” —“আমি-হা-আপনি?" -“চিনতে পারছিস না?” রা?বন্ধুর হাত-পা আনন্দের উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল।
রঘুদা বললেন-“তুই এত বড় হয়েছিস?”
বন্ধুর কেমন লজ্জা বােধ হ'ল; সে ঘাড় নীচু করে রইল।
তারপর বললে-“আপনি আমাকে পুলিশে দিতে যাচ্ছেন?
~
রঘুদা তাকে বললেন-“পুলিশ তােক নিয়ে কি করত?
আমি হয়ত দু-চারটে চড়-চাপড় লাগাতাম। যাক—বড় বেঁচে
গেছি। এখন খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে ওবেলা—
বন্ধু পোঁটলার দিকে তাকিয়ে বললে-“না—এখনই যে
গাড়ী পাব—
-“কেন রে? ওতে কি আছে?”
বন্ধু জড়িতকণ্ঠে বললে—“আমসত্ত্ব।
১০
রঘুনার মত লম্বা চওড়া যােয়ানেরও জিভ রসিয়ে উঠল ;
ঢোক গিলে বললে—“ভয় নেই, আমি কেডে খাব না। চল—
রঘুদা বন্ধুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। বন্ধুর
আপত্তি সেই টানে ভেসে গেল।
সেদিন দুপুরের দিকে বন্ধু আবার রেলে উঠে অণ্ডলের
দিকে চলল। কিন্তু তখন তার পোটলায় আমসত্ব নেই; তার
বদলে তার সঙ্গে এক চাঙারি মিহিদানা ও কাঁচাগােল্লা। একে
দুপুর, তার উপর সঙ্গে এমন দুটি সুখাদ্য। বন্ধু খুব সজাগ
হয়েই বসে রইল। তার চোখ দুটো ঘুরতে লাগল বাইরে,
মন যােরাফেরা করতে লাগল চাঙাড়ির ভিতর।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.