Makardah Saraswat Library, Howrah
Sri Aurobindo Prasange Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
অরকি প্রলতে
শ্রীদিলীপকুমার রায়
Presented by :
:-
Sri Nripendra Narayan Chowdhury and Gitasree Veda Bala
Devi Chowdhurani of Bilasipara- Founders, Visuddhananda
Spiritual Culture Centre-on the 73rd birth anniversary of Sri
Aurobindo, the greatest living Seer of inodern times, in humble
appreciation of the light he has kindled to show the path to
humanity individually and collectively, to blossoin forth into
divinity.
P. K BANERJEE,
Secretary.
ব
দি কালচার পাবলিশার্স
২৫এ, বকুলবাগান রাে, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৯
মূল্য ১
প্রকাশক: তারাপদ পাত্র, দি কালচায় পাবলিশার্স, ২৫এ, বকুলবাগান দে, কলিকাতা।
মুদ্রাকর: শ্রীকামাখ্যাচরণ সেনগুপ্ত, বিচিত্রা প্রেস, ৬৫বি, ধর্মতলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
সুচীপত্র
ঋষি
জ্ঞানী
৪৪
প্রেমী
৮. .
যােগী
১১৫
No text on this page.
মনে ভূমিকা গােড়ায়ই বলে রাখি, শ্রীঅরবিন্দ-প্রসঙ্গে কোনাে প্রশস্তি’ লিখতে যাওয়ার স্পধ। আমার নেই। এ-বইটির নিবন্ধ ক’টিতে আমি চেয়েছি শুধু তাকে আমার অন্তরের সেই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে যে শ্রদ্ধার সরিক মানুষ চায় পাঁচজনের মধ্যে। অবশ্য আরও একটি কথা ব্যক্তিগত ভাবে জানাতে চেয়েছি : যে, শ্রীঅরবিন্দকে ঋষি বলে অঙ্গীকার করাটা শিয্যের গুরুভক্তি জাতীয় উচ্ছাস নয় -এ-প্রত্যয়ের স্বপক্ষে যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। কেবল মনে রাখতে হবে যে, এ সম্পর্কেও যুক্তিগুলি ঠিক প্রমাণ-জাতীয় বস্তু নয় : টেনিসনের কথা 975--"For nothing worthy proving can be proven”-—তবে শ্রীঅরবিন্দের মতন যুগর্ষির সম্বন্ধে শ্রদ্ধা জন- সাধারণের মনে একটু ঔৎসুক্য জাগাতে চাই একথা সানন্দেই স্বীকার করি। আর সেই সূত্রে জানাতে চাই—তেমনিই আনন্দে যে, বাইরে থেকে দেখলে যদিও মনে হওয়া অযৌক্তিক নয় যে, শ্ৰীঅরবিন্দ সেই সনাতনপন্থী নির্জন-বিলাসী বিশ্ববিমুখ তপস্বীরই একটি আধুনিক সংস্কৃত সংস্করণ,—কিন্তু, তার মনস্বিতা ও তপঃশক্তির সঙ্গে যারাই সংস্পর্শে এসেছেন তাদের অনেককেই ক্রমশ মানতে দেখেছি যে যাকে হাল আমলে বলা হয় escapism (পলায়নী বৃত্তি) শ্রীঅরবিনের চিন্তায় ভাবে দর্শনে কাব্যে কর্মপ্রচেষ্টায় কোথাও তার ছোঁয়া লাগে নি। এ বিষয়ে তার দর্শনল জীবনমন্ত্ৰ কৰি নিশিকান্ত তার একটি অপরূপ গানে প্রকাশ করেছেন :
অবিন্দ প্রসঙ্গে
পালাবি কোনখানে তুই ?
বাধনের জাল যে পাতা!
তারে না ছিড়িস যদি
মিছে তাের সাধন সাধা।
(ও আমার বৈরাগী মন, ওরে ভীরু !)
যারে তুই বলিস মায়া
সে যে তাের আপন কায়া।
যেখানে যাবি রে তুই
সে রবে শিরায় গাঁথা।
(ওরে তাের আপন সুতার জাল যে গাধা!)
যারে তুই স্বপন বলিস
তারে ভয় পাস কেন বল?
সে যে তাের আপন স্বপন
তারে তুই ক না সফল।
(ও আমার বৈরাগী মন, ওরে ভীরু !
কী অতল সুপ্তি হ'তে
আপনার স্বপন স্রোতে
স্বপনী দে ভাসিয়ে
জীবনের হাসা কাদা!
(ওয়ে তাের আপন সুতার জাল যে গাঁথা!)
ভূমিকা
জীবনের জাগরণে
সে-বিশাল সুপ্তিরে অন্।
স্বপনের সুরে বাজা
স্বপনীর মর্মেরি গান।
(ও আমার বৈরাগী মন, ওরে ভীরু !)
সুখের আর দুখের মাঝে
যে-গভীর রহস রাজে
জনমে আর মরণে
সে-অমর আছে বাধা।
( ওরে তাের আপন সুতার জাল যে গাঁথা!)
তারে তুই তাে বিকশি’
সব সুখ-দুখের পারে।
সে যে তোর স্বরূপ অসি
ভুলেছিস কেন তারে ?
(ও আমার বৈরাগী মন, ওরে ভীরু !)
কেটে ফেল আপন ধারে
আপনার বাঁধনটারে
দূরে তুই পালাস কেন?
ভেঙে ফেল ভয়ের বাধা।
(ওরে তাের আপন সূতার জাল যে গাথা )
অরবিন্দ প্রসঙ্গে to একপা শ্রীঅরবিন্দ নানা সুরেই বলেছেন, তার Future Poetry-র নানান গভীর ভবিষ্যদ্বাণীতে : যে, ভাবিযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্যের উপর্জাব্য হবে অধ্যাত্ম সত্য ও উপলব্ধি। একটি পত্রে তাই তিনি লিখেছিলেন, “My aim in writing or in encouraging others to write is not personal glory but arrive at the expression of spiritual truth and experience of all kinds in poetry.” অর্থাৎ, “আমি কবিতা লিখি ও অপরকে লিখতে উৎসাহিত করি কোনাে ব্যক্তিগত গরিমার লােভে নয়, কাব্যে আমি চাই সর্ববিধ আত্মিক সত্য ও উপলব্ধির প্রকাশ।” কথাটা অবান্তর নয়। এ সূত্রে আমি জোর দিতে চাচ্ছি এই সত্যটির উপরে যে, শ্রীঅরবিন্দের যোগ চায় প্রকাশmanifestation—সে বিতৃষ্ণাবাদী বা নেপথ্যপন্থী আদৌ নয়—যদিও এই অভিযােগই তার বিরুদ্ধে সব চেয়ে বেশি শোনা যায় আজকের দিনে। কিন্তু একদিন সবাই বুঝবেই বুঝবে যে, তিনি কী বস্তু—যেদিন তিনি আরাে প্রকাশ হবেন তার বিকাশের মধ্যাহ্ন লগ্নে। এখন তাে তার তপসিদ্ধির সবে উদয়লগ্ন। শেষে এ-বইটির নিবন্ধ কয়টির সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলি : “ঋষি” নিবন্ধটি আমার একটি অভিভাষণ-কলিকাতায় “নবীন-সংঘ”- অনুষ্ঠিত শ্রীঅরবিন জনােৎসবে ও খুলনার “ধর্ম সভায়” এই বৎসর পঠিত হয়েছিল। “জ্ঞানী” নিবন্ধটির প্রথমার্ধ “ভারতবর্ষে বেরিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধ পরে লেখা। “প্রেমী” লেখা হয়েছিল বছর দুই আগে, এরও শেষাধ পুনর্লিখিত। “যােগী”–অধ্যাপক ভূমিকা বন্ধুবর শ্রীহরিদাস চৌধুরীর “শ্রীঅরবিন্দের সাধনা” নামে বইটিকে প্রসঙ্গ করে শ্রীঅরবিন্দের “যােগ” সম্বন্ধে সাধ্যমত দু-একটি কথা বলার চেষ্টা। “কবি শ্ৰীঅরবিন্দ” নামে একটি বই পরে লিখার ইচ্ছা রইল। তার কাব্য সম্বন্ধে এত কথা বলবার আছে যে একটি প্রবন্ধে স্থান সংকুলান হয় না। এ বইটি প্রকাশের জন্যে ও নানারূপ উৎসাহ সহায়তার জন্যে আমি বন্ধুর ঐশিশির কুমার মিত্র, তারাপদ পাল, বিশ্বনাথ নাগ শ্রীরামেশ্বর দে-র কাছে ঋণী। এরা উদ্যোগী না হলে বইটি বেরুতে অযথা বিলম্ব হত।
তর্পণ
এনেছ আকাশ-আলো তাহার চিত্তকুঞ্জে তুমি ।
তােগারি বসন্তবরে পুস্পসিন্ধু মোর বন্ধ্যা ভূমি।
জীবনে জানি না যারে-চেতনায় তুমি তার বাণী
ছিলে তােমার শান্ত করাগে। তুমি দিলে আনি,
দুর্লভ নির্ভর-দীক্ষ। বিদ্রোহ-উদ্ধত সুপ্রখর
মনের উষর-চূড়ে। জানিত না কভু যে নিঝর,
নম্রকান্তি স্নিগ্ধ প্রেম তুমি তারে শিখালে তোমার
নীলিম-অনত মেহনেত্র-করুণায়। বন্দনার
মন্দাকিনী নামালে-কঙ্কর যেথা ছিল ছত্রপতি।
তাই তাে উচ্ছিত অভিমান মাের মানিল প্রণতি
রাতুল চরণে তব।
দিনে দিনে তিলে তিলে তুমি
আঁধার-বন্দিনী বনস্থলী মাের তুলিলে কুসুমি
মলয়-দাক্ষিণ্যে তব। আবর্জনা করিলে নিয়ােগ
সুরশস্য-উদ্বোধনে। সহযোগে ভুলালে বিয়োগ।
আশীর্বাদী প্রস্রবণে অনুর্বর বালুকাবিলাসী
গতিহারা প্রাণে মাের বাজালে তােমার প্রতি-বাশি।
অকিঞ্চনে কাঞ্চনের কৃতার্থ উজ্জ্বল উপহার
দিলে কত হে পরশমণীশ্বর। তােমার ঝঙ্কার
কাপিয়া কাপিয়া তাই ধীরে অতি ধীরে•••মর্মমূলে
তর্পণ
D
ঐশ্বর্যের আলোবাণী দিল অনি’ তপস্যা বিপুল
অচিহ্নিত পথে ঋষি, চরণ তােনার অগ্রগামী
অভিযানে পথ কেটে চলিল অশঙ্কে দিনযামী
অন্তহীন ব্যাকুলতা-আলােকের পরম প্রয়ােগে ।
তাই তো সন্ধ্যার কূলে মিলিল তােমার মন্ত্রযোগে
নৰ অরুণিমা-ভাতি--অস্ত-সাগরের পারে যার
অম্বর-ওঙ্কার-ছটা আনিল অলক্ষ্য অঙ্গীকার।
ছন্দহার পেল ছন্দ। তৃষাতুর অধর মানিল •
তৃষার ইঙ্গিতপথে জ্বলে দিশা। অন্তর জানিল
অজানার লীলাভঙ্গি। মিলনের মােহনার ডাক
শুনিতে শিখিল ধীরে। ধূসর বর্ণের অনুরাগ
জালিয়া রঞ্জিত রঙে তুমি দিব্যদ্যতি নিরঞ্জন,
অন্ধ চক্ষে গাঢ় স্নেহে প্রলেপিলে তােমারি অঞ্জন
সুদুর-চাহনি-ভরা।
বৃথা কলরব-সুখােৎসবে
কাটিত অলীক সমারোহে মোর দিন অগৌরবে
মানব-জনম লভি ছিলাম ভুলি’ যে, দেবতার
শরণে নবীন দেবজন্ম-লাভ বিনা নাহি আর
লক্ষ্য এ-জীবনে। বৃথা যশ-মান-ধন-অহংকার
যদি চিরন্তন পানে নাহি ধায় স্বপ্ন-অভিসার।
অন্তরে প্রতীতি ছিল অমুকুলি’-জাদুকর, তারে
তুমি বনস্পতি-রূপ দিলে তব আশিস-ঝঙ্কারে
ঐ অলি প্রসঙ্গে
শাখানেত্রে ফুলমণি উদ্দীপিয়া মাধুরী-প্রদীপ
জ্বালায়ে আমার অনীশ্বর বনে হে আলো-অধিপ!
তারি অগ্ৰদৌত্যে মাের অন্ধকারে কিরণ-কাপন
প্রথম উঠিল জেগে নাশি’ যুগান্তরের বাঁধন
রূপের কৃপাণ-বরে। খুলিল অযুত বাতায়ন
গগন-বঞ্চিত দেবালয়ে মাের, তাই নারায়ণ
জেনেছি তোমারে গুরু ! “বন্ধু” বলি’ দুঃসাহসে তাই
তােমার বদিয়া তব গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা চাই!
তােমার মূরতি-মাঝে চাহে তাই নয়নের তৃষা
হেরিতে অমূর্ত সুধাসুন্দর সঙ্গীরে—চিরদিশা
লাবণ্য-লীলায় যার আপনারি তমিস্রার মাঝে
দেখি অন্তহীন রবিচ্ছবি—যার বহ্নিমন্ত্র বাজে
অঙ্গারের অন্তঃপুরে,-কণ্টকের অন্তরালে যার
অদৃশ্য আনন্দকর পুলিপি লেখে অনিবার,
অন্তরের বৃন্দাবনে রজ হয় যার পদধূলি
মন্থর বিষঃ অাশা অশ্রুধন্য হয়ে ওঠে দুলি'।
তােমারে বরিলে তাই জানি নিষ্ঠা হবে অচঞ্চল,
অরবিন্দ-বাণীবরে স্বপ্নবৃন্তে ফুটিবে কমল।
উৎসর্গ
শ্ৰীযুগল কিশাের বিরলা
বন্ধুবরেষু !
কিরণ যাহার নিত্য রবির দাক্ষিণ্য সম আনে
আকাশের আশীর্বাদ তাপহীন দীপ্তির বিধানে ;
ছায়। যার সুখস্নিগ্ধ আশ্রয়ের সম নেমে আসে ।
মালিন্য বিলুপ্ত যেথা—শুধু শুভশান্তি পরকাশে ;
বরাভয় যার জ্বলে ধ্রুবতারা-নির্দিশা তুফানে,
অনাত্মীয় নক্ষত্রেও চিরাত্মীয় সম কাছে টানে ;
অধৱ-অশোকগীতি গায় দুঃখ-দারুণ দুর্যোগে
মণিসম আভাময় আঁখিমণি উজলি’ বিয়ােগে ;
দুশ্চর তপস্যা যার নীলাম্বরে গণি’ প্রিয়তম
ডেকে আনে ক্লান্ত বুকে সান্ত্বনা-সুগন্ধি মন্ত্রসম ;
অবনীর অভিমানী রাজরাজ হতে পরাধীন
নিঃস্ব ভিখারির তরে জাগে যে অতন্দ্র নিশিদিন ;
বরদ জলদ সম সাগরে গােপদে ভালােবেসে
নিরপেক্ষ করুণার ধারা বরষায় নির্বিশেষে ;
তৃতীয় নয়ন যার ‘জীবে নিত্য দেখে সদাশিব,
‘দেহে দেখে দেবালয়, স্ফুলিঙ্গের বুকে চিরদীপ।
জপিয়া জীবননামে জ্যোতির্মন্দ্রে যার প্রাণশিখা
ঝলকে জীবন-পঙ্কে অরবিন্দ-সুষমা-দীপিকা :-
অরবিন প্রসলে
হারি তর্পণে আমি গেঁথেছি যে ছোট মালাখানি
তব করে সঁপি প্রার্থি : “তুমিও, সুহৃদ, তারে জানি
যেন সেই অজানারে জানাে-যারে বিনা সব জানা
ব্যর্থ হয় যাত্রা সম-নাহি যার তীর্থের ঠিকানা ;
যার হেমপ্রভা বিনা নিভে যায় প্রেম-নীহারিকা,
হয় সূত্ৰসার, স্নান-আনন্দের মন্দার-মালিকা।
স্বভাব-বদান্ত তুমি, তাই তব তরে এই চাই :
দানের নিকষে তব দানেশ্বরে চিনি যেন ভাই
সকল দানের শ্রেষ্ঠ যে-প্রণাম সেই আত্মদানে
তাহারে জানিতে পারাে—বিন্দু যথা নীলসিন্ধু জানে।
গুণমুগ্ধ দিলীপ
১.
শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
No text on this page.
ঋষি আপনারা আমাকে আজ ডেকেছেন শ্রীঅরবিন্দ জন্মােৎসবে পৌরােহিত্য করতে। মামুলি ভাষায় বলতে লোভ হ’ত বৈকি যে এত বড় সম্মানের অমি যোগ্য নই যদি না আমার মনে জাগত এক বিখ্যাত ভক্ত কীর্তনীর তিরস্কার। বছর দুই আগে একদিন তার কীর্তন শুনতে যাই। তার গান শেষ হওয়ার পরে তিনি আমাকে বলেন একটি কীর্তন গাইতে। তাতে আমি বলেছিলাম মামুলি বিনয়ের সুরে : “আপনাকে গান শোনাবার যােগ্যতা আমার কই?” তাতে তিনি আমাকে ধমকে দিয়েছিলেন : “ভগবানের গান ভগবানকেশােনাবে, এতে যােগ্যতার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে?” শ্রী অরবিন্দের কথা বলতে এই কথাই আমার মনে হয়। জীবকে তার দুচ্ছেদ্য বাসনাবন্ধন ছিন্ন করবার শক্তি দিতেই যাদের অবির্ভাব, জীবের মনে প্রাণে হৃদয়ে ভাগবত দীপ্তির আবাহনের জন্যে যাদের তপস্যা, উষর মানস-মতভূমিতে আকাশ-গঙ্গার করুণাকে ডেকে আনিতেই যাদের সাধনা, তাদের যে-পূজা আমরা করি সে-পূজার যোগ্যতা সবারই আছে—কেন না এ-পূজার সব চেয়ে জোরালাে নৈবেদ্য হচ্ছে কৃতজ্ঞতা। ভক্তি বলতে ভরসা পেলাম না যেহেতু সে দুর্লভ পদাৰ্থবহু করুণায় তবে মেলে তার ছিটেফোটা। কৃতজ্ঞতাও সুলভ বস্তু বলি না, কিন্তু কৃতজ্ঞতা থেকেই আমাদের ভাগবত জীবনের সূচনা বলে কৃতজ্ঞতার রসবােধ প্রায়ই ভক্তিকামীর মনে জাগে সব আগে। এই জন্যেই হয়ত যুগে
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
যুগে একথা স্বীকৃত হয়ে এসেছে যে ঋষিকল্প বুগাবতারের পূজার
শ্রেষ্ঠ যােগ্যতা হ’ল কৃতজ্ঞতাই বটে। একটি বিখ্যাত সুফী গজল
মনে পড়ে :
সব ঐস পঢ়া দিয়া তুনে
দিলসে সব কুছ ভুলা দিয়া ভূনে
ক্যা বতা ক্যা লিয়া নয়নে?
ক্যা কহু ময় ক্যা দিয়া নে ?
এমনি স্মরণে জাগালে পরাণ
ভুলালে যা কিছু ছিল স্মরণে।
কী পেয়েছি তার কী গাহিব গান?
কী দিয়েছ হায়, কহি কেমনে?
যারা তঁাদের ভাগীরথী সাধনায় যুগে যুগে অমর্ত্য আলাে
নামিয়ে আনেন মর্ত্যলােকে তাদের অনুকম্পাকে মানুষ তাে
চিরদিন এই কথাই বলে এসেছে—এ ছাড়া আর তার কী-ই বা
বাবার থাকতে পারে ?
তাই অরবিন্দের জ্ঞানপ্রতিভা মণীষা এ সব আলােচনার
ধার দিয়েও আমি যাব না আজ, তার জীবনী নিয়ে আলােচনার
পণ্ডশ্রমও করব না, আরাে এই জন্যে যে এ সম্পর্কে তিনি একবার
আমাকে লিখেছিলেন : “Nobody except
except myself can
write my life--because it has not been on the surface
for man to see”. (আমি ছাড়া কেউ লিখতে পারে না
১৪
আমার জীবনী, কেন না মানুষের দৃষ্টি যে-বহির্লোকে সেখানে মিলবে না তার দিশা)। আমি আজ বলব কয়েকটি কথা শুধু তার ধ্যান- দৃষ্টি সম্বন্ধে যার তর্পণে কবি নিশিকান্ত লিখেছেন (যে-গানটি আমি প্রথমেই গাইলাম আজকের সভায় ):- যেদিন তিমির-বারিধি মণিল তব সাধনার উদয়াদিত্য, জাগিল সোনার সরণী শােভিয়া বসুন্ধরার ধুলার তীর্থ। সেদিন মুক্তি লভিল করাল পাষাণ করার অযুক্ত বন্দী, তব অসিধার চেতনে খসিল অসুর-বাধার রুধির-গ্রন্থি। ধন্য হইল ধরণকমল যুগল চরণ তপনে দীপ্ত, বাজিল বিজয় শঙ্খবিষাণে নবজাগ্রত নিখিল চিত্ত। সুনীল স্ফটিক মূর্ত নয়নে সুদূর সুপ্তি জাগর স্বপ্ন, উদার ললাট অচল অন্ত্রে পূর্ণ শশীর বিকাশ লগ্ন। গগনে পবনে নব উৎসব আলোক ধারায় বহে আনন্দ, মন্ত্রমুগ্ধ জগৎজলধি উপলিয়া তােলে জ্যোতির্মন্দ্র। ধন্য হইল ধরণীকমল যুগল চরণ তপনে দীপ্ত, বাজিল বিজয় শঙ্খবিষণে নবজাগ্রত নিখিল চিত্ত। উধ্ববিজয়ী প্রগতি তােমার জিনিল সৌর শৈল তুষার শুভ্র কুন্তলে দোলে কল্প কল্প বাহিনী গঙ্গা। তব তপস্যা মিটালাে মর্ত্যে ভীষণ মরুর ঊষর তৃষ্ণা ভাসিল অনল-সুধাতরঙ্গে পাতালবাসিনী কামিনী কৃষ্ণা
শ্রীঅরবিন প্রসঙ্গে
ধন্য হইল ধরণীকাল যুগল চরণ তপনে দীপ্ত,
বাজিল বিজয় শঙ্খবিষাণে নবজাগ্রত নিখিল চিত্ত।
যুগের প্রলয় প্রবল অননে হানে সংগ্রাম অবিশ্রান্ত,
তারি মাঝে তুমি ধ্যান-নিমগ্ন, হে নির্বিচল ! হে মহাশান্ত!
তারি মাঝে তুমি বিতরিছ তব শীতল করুণ সলিল বৃষ্টি,
চুম্বনে যার শ্মশান মেদিনী লভে জীবনের নবীন সৃষ্টি ।
ধস্থ হইল ধরণীকমল যুগল চরণ তপনে দীপ্ত,
বাজিল বিজয় শঙ্খবিষণে নবজাগ্রত নিখিল চিত্ত।
তুমি ছাড়া আর কাহারাে কণ্ঠে ধ্বনিয়া ওঠে না অভয় উক্তি,
তুমি ছাড়া আর কেহ তাে আনে না তৃষিতের প্রাণে প্লাবন মুক্তি
হে অখিল গুরু! হে বিশ্বকবি! জপিয়া তােমার পাবক মন্ত্র
বসুধাবক্ষে শত সন্তান বহ্নি-পুলক লতি’ অতন্দ্র।
ধন্য হইল ধরণীকমল যুগলচরণ তপনে দীপ্ত,
বাজিল বিজয় শঙ্খবিষণে নবজাগ্রত নিখিল চিত্ত।
ই
এ গানটি তঁাদের কাছে হয়ত উচ্ছাসভঙ্গিম বলে মনে হবে
যারা শ্রীঅরবিন্দের বিকাশ-মহিমা ও প্রতিভা-দীপ্তির
সুপরিচিত নন।
কিন্তু তাকে দ্রষ্টা ও স্রষ্টা বলে জানবার
সৌভাগ্য যাদের হয়েছে তাদের কাছে একথার অন্তর্নিহিত বন্দনার
সুরটি স্তবেক্তি বলে মনে হতেই পারে না। কেন পারে না
সে সম্বন্ধে দু’চারটে কথাই আজ আমি বলব আপনাদের কাছে
কেবল নিতান্ত বন্ধুভাবে—বক্তাভাবে নয়। অর্থাৎ বলব আমি তার সম্বন্ধে যা উপলব্ধি করেছি তারই কিছুটা-শোনা কথার পুনরাবৃত্তি । ভরসা এই যে এ-শ্রেণীর কথা একটু বেশি ব্যক্তিগত হলেও অশোভন শােনাবার কথা নয়—যেহেতু এর উদ্দেশ্য পূজ্যজনের পূজা—আত্মবিজ্ঞপ্তি নয়। সুরু করব একটি প্রশ্ন থেকেই; এ যুগে আমরা কী চাই দ্রষ্টার মধ্যে—অষ্টার মধ্যে-জ্ঞানীর মধ্যে? এ জিজ্ঞাসার তাগিদে অনেকেরই মনে বোধ হয় এই জবাবই আসবে যে ঋষির মধ্যে সব আগে চাই আমরা মানবিকতার একটা অখণ্ড সুষমা, হার্মনি। এ বিষয়ে যে ভাবে ভেবেছি তারি ইশারায় । কথাটা একটু বিশদ করে বলতে চেষ্টা করি, নিজে ইতিপূর্বে শ্রেষ্ঠ মানবদের কাছে, মহাপুরুষদের কাছে মানুষ প্রায়ই চেয়েছে আঁতির রসধারা, প্রেমের মন্ত্রবাণী, ভক্তির কথামৃত, মাত্ৰ দুচারটি বৈরাগীর কাছে চেয়েছে কঠোর নদীক্ষা। কিন্তু বিশেষ করে আধ্যাত্মিক রাজ্যে মানুষের মূল চাহিদা এ যাবৎ হয়ে এসেছে হৃদয়বুভুক্ষার খােরক, মনের নয়। অবশ্য একথা বলাই বেশি যে মানব-হৃদয়ের একটি শ্রেষ্ঠ আকাঙ্ক। প্রেমই বটে। এ-ও সমান সত্য যে হৃদয়বৃত্তির শ্রেষ্ঠ বিকাশ ভক্তিতে। কিন্তু তবু বলবই যে, এ যুগে আমরা একটু বদলে গিয়েছি যে জন্যে শ্রীঅরবিন্দ আমাদের উপাধি দিয়েছেন “Sons of an age of intellectuality and scepticism and a materialistic denial of spiritual
অরবিন্দ প্রসঙ্গে
trutl”—জীবন-জিজ্ঞাসায় আমরা খানিকটা জ্ঞানের এজেহার না
পেলে যেন, বাচি না। কিন্তু জ্ঞান বলতে আমি বুঝছি না সেই
জাতীয় বাণী যা এ জগতকে “দুঃখলয়ম অশাশ্বতম” বলে বর্জন
ক'রে খুজেছে সেই অমােঘ নেতিবাদের প্রতিকার যার প্রসাদে
এ “অনিত্যম অসুখ লোক”-এ মানুষকে ফের না জন্মাতে হয়।
ভারতের এক সনাতন ভাবধারা চিরদিন বয়েছে এই ঐহিকত।
বর্জনের খাতেই। আমাদের শাস্ত্রে ভূরি ভূরি বিধান রয়েছে কী
করে এই নশ্বর লীলালোক উত্তীর্ণ হয়ে পৌছনাে যায় সেই
অবিনশ্বর অক্ষয় লোকে যেখানে সব বৈতলীলারই অবসান হয়েছে
নিত্য স্থিতিতে—কালীন অবস্থানে। নজর দিয়ে অযথা আমার
অভিভাষণটিকে দীর্থ করার দরকার দেখিনা---কারণ অনৈহিকতা-
otherworldliness শুধু ভারতে নয় সব দেশেই চেয়েছে এই
বিশ্বরূপের রূপলীলা বর্জন ; সব দেশের বৈরাগীই বলেছে যে
মানবজন্মের নিহিতার্থ হ’ল জন্মচক্র থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া :-
“বেদাহমেতমজরং পুরাণং
সর্বাত্মানং সর্বগতং বিভুত্বাৎ।
জন্মনিরােধ প্রবদন্তি যস্য,
ব্ৰহ্মবাদিনােহভিবদন্তি নিত্যম্।”
( আমি জানি সেই সর্বাত্মা সর্বগত সর্বব্যাপ্ত বিভুকে—যার
জ্ঞানকে ব্ৰহ্মবিৎরা জন্মনিবৃত্তির কারণ বলে অভিবাদন করেন।
-শ্বেতাশ্বতর )
••
The Synthesis of Yoga.
১
কিন্তু যতই বলি না কেন, আমাদের মন কিছুতেই পুরােপুরি
মেনে নিতে পারে না এ-ধরণের বিতৃষ্ণাবাদ। কিছুতেই কান দিতে
পারে না এ-ধরণের কথায় যে, জন্মের অন্তিম লক্ষ্য হল জন্মচক্র
থেকে অব্যাহতি পাওয়া। তাকে যতই তুতিয়ে পাতিয়ে বােকই
কেন, সে কিছুতেই সাড়া দিতে পারে না এ-ধরণের বাণীতে
যে, রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-বনি-উচ্ছল এই অফুরন্ত প্রাণ-সমারােহের
একমাত্র লক্ষ্য হল এদের গণ্ডী ডিঙিয়ে কোনাে অরূপ অৱস অগন্ধ
অধ্বনি নিবণিলোকে চিরস্থিতি। তাকে আবহমানকাল নানা
ভাষায় দেওয়া হয়েছে বটে এই 'ভরসাই যে,
“আৱশ্নভুবনাল্লোক: পুনরাতিনােহজুন
মানুপেত তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে”
( বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যত জীব সবাই ফিরে ফিরে আসে জন্মলােকে,
কেবল আমাকে পেলে আর জন্মাতে হয় না)।
কিন্তু এ ভরসায় শুধু যে তার বুক কোন দিনই দশ হাত হ'য়ে
ওঠে নি তাই নয়, চিরটা কালই সে শিরপা তুলে এসেছে এ-জাতীয়
অমােঘ বন্ধ্যাত্বের বরাভয়ে। মানুষ যদি কখনাে
দৈববাণী মনে করে, সে দৈবাৎ-মানে কালে ভদ্রে, বড় জোর
দু-চার জন একপেশে বৈরিগি। এর কারণ আর কিছুই নয় শুধু
এই যে যখন বাইরের কুরুক্ষেত্রে, শ্মশানযাত্রায়, মুষলপবে
মন আমাদের হাহাকার করে ওঠে তখনাে অন্তরের অন্তঃপুরে
একটা আবছা প্রতীতি জাগেই জাগে যে এজগতের হাজার ত্রুটি
গ্লানি থাকলেও দুঃখ শােক আধিব্যাধিই জন্মলীলার গােড়াকার
একে
অবিল প্রসঙ্গে
কৃথা নয়। আমাদের চেতনার উপরতলায় যখন সব আলো নিভে
আসে তখনও অবচেতনার অতলে এ-প্রত্যয় অনিবাণ হ'য়েই অলে
যে, “আনলাবে খল্বিমানি ভূতানি জয়ন্তে, অনিলেন জাতানি
জীবন্তি”—“আনন্দ থেকেই সমস্ত জীব জন্মায়, আনন্দেই তারা
বাঁচে।” শ্রীঅরবিন্দও এই কথাই বলেছেন তার মুগদীক্ষায় যে
বস্তুজগতে আমাদের জন্ম হয়েছে এজন্যে নয় যে বস্তু মিথ্যা, অলীক,
ছায়াবাজি : আমাদের জীবাত্মা এ বাস্তব ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছে
শুধু এই জন্যেই যে বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে আমাদের যে অনুভূতি
উপলব্ধি অভিজ্ঞতা লাভ হয় সে লাভ অন্য কোনো বিকাশ-লীলায়
হতে পারত না। আর, এ কোনাে মনগড়া থিওরি নয়—এ
শ্রীঅরবিন দেখেছেন তার ধ্যানদৃষ্টিতে যার কথা তিনি লিখেছেন
তার The Life Heavens কবিতাটিতে :
I, Earth, have a deeper power than IIcaven;
My lonely sorrow surpasses its rose-joys,
A red and bitter seed of the raptures seven;
My dumbness fills with echoes of a far Voice.
By me the last finite, yearning, strives
To reach the last infinity's unknown,
The Eternal is broken into fleeting lives
And Godhead pent in the mire and stone.
এর অনুবাদ করেছেন সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী :-
আমি পৃথী, স্বর্গ হতে গৃঢ়তম শক্তি আছে আমার অন্তরে,
ঋষি নিরালা বেদনা মাের ওই স্বর্গসুখ হ'তে বহু উর্ধ্বে রাজে, রক্ত-রাঙ্গা মধুতিক্ত পুলক-সাম্রাজ্য সপ্ত মাের মম ধরে, মুক মোর এ-অষ্মায় দূর এক আহ্বানের প্রতিধ্বনি বাজে। আমার জীবনে সে যে অন্তিম সীমান্ত সীমা উদ্যমে বিপুল, চাহে উত্তরিতে কোন্ অজানিত অসীমের দূরতম তীরে, মাের সাথে শাশ্বত যে রূপ ধরে ক্ষণিকের মরণ-সংকুল, মোর বক্ষে বন্দী জাগে পরমপুরুষ পঙ্ক পাষাণেরে ঘিরে। কথাটা কিন্তু ভুল বুঝবেন না। এর মানে নয় যে পৃথিবীট। অতি চমৎকার জায়গা—একেবারে নির্মাত কাটাহীন গোলাপের অমরাবতী। এ জগতে যদি বা কচি দুচারটা সাধু মহাপ্রাণের দেখা পেয়ে মনে একটু ভরসা জাগে—স্বপ্ন ভাঙতেও বিলম্ব হয় না নিদারুণ বাস্তবতার দৌরাত্মে। মীরা কেঁদেছিলেন কি সাধ করে ; “সন্ত দেখ দৌড় আই—জগত দেখ রােই।” শ্রীঅরবিন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এ তাতে তিনি লিখেছিলেন আমাকে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে : “Where do you find in The life Heavens' that the conditions on earth are glorious and suited to the Divine Life ? The Earth is an evolutionary world...most sorrowful, disharmonious, imperfect. Yet” বলছেন তিনি জোর করে—in that imperfection is the urge towards a higher and manysided perfection. It contains the last finite which yet yearns to be the supreme Infinite. God is pent in the সম্বন্ধে, :
শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে ৫; mire ( mire is not glorious, so there is no claiin to 'glory or beauty here ) but that very fact impose's a necessity to break through the prison to a consciousness which is ever rising towards the heights. And so on. That is deeper power' though not a great actual glory or perfection." এ কবিতাটির কোথায় পেলে তুমি এ ইঙ্গিত যে এ পৃথিবীর আবহাওয়া অতি অপরূপ বা দিব্যজীবনের অনুকূল ? এ জগৎটা ক্রমবিকাশশীল•••দারুণ দুঃখে বৈষম্যে খুঁতে ভরা। কিন্তু ঠিক সেই জন্যেই যে সে পেল নিৎ ও বহুমুখী সম্পূর্ণতার প্রেরণা। পৃথিবী হ’ল সীমার চরম সীমা—অথচ তৃষ্ণা তার সর্বোত্তম অসীমের জন্যে। ভগবান বাঁধা পড়েছেন পঙ্কের পঙ্কজালে-পঙ্ক মহিমময় নয়, বটেই তাে কিন্তু সেই জন্যেই না চাই এ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে উধ্বে আরােহণ।” কারণ- বলছেন শ্রীঅরবিন্দ—“দেবলোকগুলি পূর্ণায়ত ও নিখুঁৎ বটে, কিন্তু আদৌ বিকাশশীল নয়—যেহেতু দেবতারা ভর করে আছেন রকমারি স্তরের রকমারি সম্পূর্ণতা ও সিদ্ধির বনেদে।” এ-কথার উত্তরে মায়াবাদীরা যা বলে এসেছেন তার মোট কথাটা হ’ল হাসি তথা কান্না ; হাসি যে,- এ জীবন অমৃতলােক হবে এটা কী ছেলেমানুষি কবিকঙ্কনা! কান্না যে,-“পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্ৰহ্ম পড়ে কাঁদে।” তাই এদের চির-প্রার্থনা হয়ে এসেছে “সংসারদুঃখগহনাৎ জগদীশ রক্ষ— আর মন্ত্র হয়ে এসেছে : ૨૨
“এ জীবনটার দুঃখের গোড়া হ’ল এ জগতে জন্মাননা অতএব
এখানে জন্মাতে চাওয়াটাই সর্বনেশে, কেননা আসক্তির বনেদ
যে সেইখানেই।” আমাদের জীবনব্যাধির এ একটা মামুলি নিদান—
তাই এই বৈরাগ্য ও অনৈহিকতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে
আমাদের নানান অনৈহিকতার বিতৃষ্ণাবাদ। শ্ৰীঅরবিন্দ দিলেন
এর জবাব এই বলে যে এধরণের যুক্তি হল শাঁকের করাত—
দুধারেই কাটে ; মানে, জন্মানাের মধ্যেও যেমন জন্মের প্রতি
আসক্তি লুকিয়ে থাকতে পারে, জন্মাতে না চাওয়ার মধ্যেও তেমনি
একটি না-জন্মানাের প্রতি আসক্তি লুকিয়ে বসবাস করতে পারে :
"Wherefore the attachment to the escape from birth
is one of the idols, which, whoever keeps, the sadhaka
of the Integral Yoga must break. For his yoga is
not limited to the realisation of the transcendent
beyond all worlds by the individual soul, but
embraces also the realisation of the universal 'the
sum total of all souls' and
cannot therefore be
confined to the movement of a personal salvation
and escape.” (Synthesis of Yoga )
অর্থাৎ, খতিয়ে জন্মচক্র থেকে অব্যাহতি চাওয়াও হ’ল একটি
আসক্তি—কাজেই এও
এও সাজে পূর্ণ-যােগপন্থীকে। কারণ
জীবাত্মা বিশ্বাতিগ পরমাত্মাকে লাভ করে মুক্তি লাভ করে যে
যােগবলে সে যােগ তাে আমাদের নয় ; আমাদের যােগযে
অনি প্রসঙ্গে
চায় ঐ সঙ্গে বিশ্বমূর্তি “বিশ্বকর্মা মহাত্মাকে” উপলব্ধি করতে যিনি
“সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট”। সুতরাং ব্যক্তিগত মুক্তির পলায়নী
বাণীতে সে তুষ্ট থাকতে পারে না।
এ কথায় আমাদের আধুনিক মন যে সহজেই সাড়া দিতে
পারে এ বলাই বাহুল্য। কেননা যতই শাস্ত্র আওড়াই, নজির
তব.ক'রে ক্লিষ্ট জীবকে ধাই, কথায় কথায় তাকে পাপের শাস্তি
অনন্ত রৌরব নরক ব’লে বিভীষিকা দেখাই মানুষ কোনদিনই
একপ সর্বান্তঃকরণে মেনে নিতে পারেনি যে জন্ম হ'লে এ
বিশ্বলীলার এমন একটা দুর্ঘটন বা দুর্দৈব যার একমাত্র স্বস্ত্যয়ন
হ'তে পারে নিবণিযজ্ঞের চিত।শয্যায়। কবি গেয়েছেন বটে ;
শুধু দুদিনের খেলা!
ঘুম না ভাঙিতে আঁখি না মেলিতে
দেখিতে দেখিতে ফুরায় বেলা !
আশার ছলনে কত উঠি পড়ি
কত কাদি হাসি, কত ভাঙি গড়ি
না বাঁধিতে ঘর হাটের ভিতর
ভেঙে যায় এই সাধের মেলা।
আমাদের এই দেহ প্রাণ মন
সুখ দুখ এই জীবন মরণ
এও বিধাতার পুতুল খেলা
শুধু গড়া আর ভাঙিয়া ফেলা।
ঋষি
আমরাও তার এ বিলাপে সাড়া দিয়ে এ গান গাই বটে
সময়ে সময়ে—কিন্তু সে কখন? না, আমাদের আত মুহূতে-
দুর্বলতার অন্ধকারে। আলাে নিভলে যে ভয়কে অতি প্রত্যক্ষ
মনে হয়, আলো জ্বললে দেখা যায় তার কোনাে অস্তিত্বই নেই।
তাই যে-বৈরাগী জ্ঞান গাজোয়ারি সুরে বলে “বটেই তাে
এ জীবন দুদিনেরই খেলা বই আর কা? গতির জোয়ার ভাটাই
তো জীবনের পরম অনর্থ— যে-দৃষ্টির চরম ও পরম বাণী
হ'ল ভগবানের সৃষ্টিশীল। জৈবলীলাকে নাকচ করা তার তরফে
খুব জাঁকালো অপৌরুষেয় নজির হাজিরি দিলেও সে সব
নজিরে আমাদের মন শুধু যে আশ্রয় পায় না তাই নয়—
বেশি জোর করলে বেঁকে বসে, বলে—“চাই নে অমনধারা ওষুধ, কেন
সংসারের অধিব্যাধির ধারা সঙিন হলেও এ রােগের এমনতর
ওষুধ যে আরাে সঙিন, ব্যাধি বিকট হলেও তবু সওয়া যায় কিন্তু
চিকিৎসা যদি হয় উৎকট তবে তাকে দূর থেকেই করি দণ্ডবৎ।”
একথা মানতেই হবে যে, এক শ্রেণীর লােক এই উৎকট
অনৈহিকতার মধ্যে দিয়ে এক ধরণের সার্থকতা খুঁজে পেয়ে
থাকেন। কারণ বৈতবাদের লীলালােক বিধৃত রয়েছে এক কালহীন
অদ্বৈত সত্যে—বটেই তো। কিন্তু তবু এই অদ্বৈতও জীবনের
বিবর্তনে (অন্তত বহু দিন ধরে ) স্মৃতি পেয়ে থাকে দ্বৈতেরই
মধ্যে দিয়ে। তাই, বলতেন পরমহংসদেব, “নিত্য লীলা
দুই-ই নিতে হবে, বেলের শাঁসখােল দুই-ই নিতে হয়, নৈলে
ওজনে কম পড়ে।”
२०
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে ঈশােপনিষদেও এ কথার স্বপক্ষে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যারা শুধু, অবিদ্যার উপাসক তারা অন্ধতমসায় ডােবে বটে, কিন্তু যারা বিদ্যার উপাসক তারা ডােবে আরও গভীর অন্ধকারে। শ্ৰীঅরবিন্দ ও এই কথাই বলেছেন বার বার তার প্রায় সব বইয়েই, বিশেষ করে তার দুটি শ্রেষ্ঠ জীবনবেদে : Life Divine Synthesis of Yoga-এ। বলেছেন যে, না, জীবনকে এভাবে বর্জন করে ঐহিকতাকে স্রেফ ছেটে বাদ দিয়ে চলতে গেলে ভগবানকে পুরো- পুরি মানা হয় না-হতে পারে না। কেন না এধরণের বিসর্জনবাদ জ্ঞানের চরমবাণী নয়—এ শ্রেণীর পারলৌকিকতা বড় জোর আমাদের ধ্যানের একটা আংশিক দর্শন মাত্র“তার বেশি নয়, কেন না, "An individual salvation in salvation in heavens beyond careless of the earth is not our highest objective : the liberation and self-fulfilment of others is as much -we might almost say, divine sclf-interest-as Own liberation.” (Synthesis of Yoga ) our concern Our our অর্থাৎ, এ ভূ-লােকের প্রতি উদাসীন থেকে কোনাে সুদূর স্বলোকে স্থিতি লাভ করে যে ব্যক্তিগত মুক্তি সে-মুক্তি আমাদের সর্বোচ্চ লক্ষ নয় : অপরের মুক্তি তথা আত্মসিদ্ধিও আমাদের কাছে তেমনিই অপরিহার্য যেমন অপরিহার্য আমাদের ব্যক্তিগত
জীবণুক্তি। এমন কি এ বললেও বেশি বলা হবে না যে অপরের
মুক্তিলাভ আমাদের দিব্য স্বার্থের অঙ্গীভূত।
এই যে দৃষ্টি, এ শ্রীঅরবিন্দের কাছে কথার কথা নয়—তার
সাধনার একটি উজ্জ্বলতম বিকাশ। কারণ এই দৃষ্টিতেই তিনি
পৌছেছেন তাঁর আর্ষ সাধনায় যার অন্তর্জোতিতে তিনি
দেখতে পেলেন যে :-“The evolutionary endeavour of
Nature has experimented on all lines in order to find
her true way and her whole way towards the
supreme consciousness and the integral knowledge."*
অর্থাৎ, প্রকৃতি মানুষকে বিবর্তনের পথে রওনা করে দিয়েছে
নানা পথের খবর নিয়ে তবে—কেননা নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে
দিয়ে চলে চলে তবে সে পায় পরম চেতনার পথের দিশা
সর্বাঙ্গীণ জ্ঞানের নিত্য ইঙ্গিত।
এই ধরণের যে দৃষ্টি, তাকেই বলছিলাম এ যুগের একটি
মুখ্য তৃষ্ণা। এ যুগের মানুষ পারে না অতীত যুগের কোনাে
একটা কাটা ছাটা বৈরাগ্যের খাতে চলতে তা সে বৈরাগ্য
সাংসারিক ত্রিতাপের যে নিরসনেই কেন না আমাদেরকে
রাতারাতি পৌছে দিক।
এ ধরণের দৃষ্টি কী ভাবে শ্রীঅরবিন্দের ধ্যাননেত্রে ফুটে উঠেছে
তার অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতে করে
ফল হবে ভয়াবহ : মানে আমার অপটু প্রবন্ধে শিশুস্কন্ধে
The Life Divine-"The Evolution of the Spiritual Man"-Breta
তারা প্রসঙ্গে ওঠে দুরূহ। ভর করবে হিমালয়ের ভার। তাই ও অসাধ্য সাধনে আমি এগুব না—নমুনা হিসাবে মাত্র একটি দৃষ্টান্ত দিয়েই ক্ষান্ত হৰ শ্ৰীঅরবিন্দ কী ভাবে জীবনকে দেখতে চেয়েছেন : শুধু গভীর ভাবে নয়—খুঁটিয়ে। তার “দিব্য জীবন” জীবনবেদের তৃতীয় খণ্ড “The Evolution of the Spiritual Man' অধ্যায়ে শ্রীঅরবিন্দ লিখেছেন যে, মানুষের আত্মবিকাশের চারটি মুল চাহিদা আছে যে গুলির হিসেব না রাখলে জীবন সংগ্রামে আগুয়ান হয়ে চলা তার পক্ষে হয়ে এ চারটির বর্ণনা করেছেন তিনি এই ভাবে :- পয়লা নম্বর, তাকে জানতে হবে নিজেকে, আবিষ্কার করতে হবে নিজের সব নিহিত সম্ভাবনার তাগিদকে ( He must know himself and discover and utilise all his potentialities ). কিন্তু এ আত্মজ্ঞানের জন্যে তাকে ডুব দিতে হবে—কোথায়? না, নিজের সত্তার অতল তলে—কেন? না, অনতল বহিঃ- প্রকাশের অতিপ্ৰত্যক্ষ লােকে মিলতে পারে না মানব হৃদয়ের মূল তৃষ্ণার পরম ইঙ্গিত। কাজেই এল দোসরা নম্বর : আমাদের জানতে হবে নেপথ্য তত্ত্ব (occultism) অর্থাৎ রাখতে হবে সেই সব নেপথ্য শক্তির গতিবিধির খবর যারা এ জগতের নানান প্রকাশ্য চালচলনকে নিয়ন্ত্রিত করছে। কিন্তু এই নেপথ্যলােকের পরিচয় পেতে গিয়েই মানুষের পরিচয় হ’ল আনুষ্ঠানিক ধর্মের (religion সঙ্গে যার অভিপ্রায় হচ্ছে “to link the human with the divine and in so doing sublimate the thought ২ and life and flesh so that they may admit the rule of the soul and spirit.” অর্থাৎ, কিনা ধর্ম চাইল মানুষ ও ভগবানের মধ্যে ঘটকালি করে তার মন প্রাণ ও দেহকে ঢেলে সাজাতে রূপান্তরিত করতে, যাতে করে এরা ঠিক মত অন্তরাত্মার হুকুমবরদার হতে পারে। কিন্তু এটা সুসম্পন্ন করতে হলে যে-জ্ঞানের ডাক পড়ে সে কোনাে একটি বিধি বা অনুশাসন (creed) হলে চলবে না, এমন কি কোনাে একপেশাে অতীন্দ্রিয় উদঘাটন (mystic revelation) হলেও না। এর জন্য দেখতে হবে যাতে করে তার চিন্তাশীল মন এই জ্ঞানকে আত্মসাৎ ক'রে ইন্দ্রিয়-জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আত্মবিকাশের কাজে লাগাতে পারে। একেই তিনি বলেছেন তেসরা নম্বর : কিনা দর্শন philosophy. কিন্তু এ-দর্শন যদি হয় য়ুরােপের মানস আতসবাজি তাহলে আর যাই থাকুক না কেন আখের থাকবে না। শেষ রক্ষা করতে হলে দর্শনকে হয়ে উঠতেই হবে আধ্যাত্মিক দর্শন spiritual philosophy : সুতরাং এর পরেই এল চৌঠা নম্বর : আধ্যাত্মিক অনুভব উপলব্ধি spiritual realisation experience. তিন থেকে চার এল কেন ? না কোনাে জ্ঞান বা প্রচেষ্টাই ঠিক মতন ফলপ্রসূ হতে পারে না যতক্ষণ না তারা অনুভব উপলব্ধির কোঠায় রসায়িত হয়ে উজ্জ্বল হয়, চেতনায় অনুষ্যত হতে পারে। তাই”-বলেছেন শ্রীঅরবিন্দ-“ধর্মের গুহতত্বের বা দার্শনিকতার জ্ঞান ও উদ্যমকে আধ্যাত্মিক জগ”ে ফলপ্রসূ করতে হলে চাই আধ্যাত্মিক চেতনাকে উদঘাটিত করে সেই সব শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে অনুভব উপৰূির রাজ্যে আশ্রয় পাওয়া যার ফলে চেতনা হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ, সম্পৎশালী এবং জীবন প্রতিষ্ঠা পায় সেই সব শুভকর্মে যারা আত্মিক সত্যের আত্মীয় বলে গণ্য হতে পারে” :- "But all knowledge and endeavour can reach its fruition only if it is turned into experience and has become a part of the cousciousness and its established operations ; in the spiritual field all this riligious, occult or philosophical knowledge and endeavour must, to bear fruition, end in an opening up of the spiritual consciousness, in experiences that found and continually heighten, expand and enrich that consciousness and in the building of a life and action that is in confornity with the truth of the spirit.' এত দীর্ঘ উদ্ধৃতি না দিলেও হয়ত চলত, কিন্তু এর উদ্দেশ্য শুধু দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানাে কী ধরণের সমগ্রদৃষ্টি অখণ্ডদৃষ্টি অরবিন্দের ধ্যান-নেত্রে উন্মুক্তি লাভ করেছে তার অনন্যতন্ত্র প্রতিভজ্ঞান তথা মহিমােজ্জল মনীষার দিব্যসন্ধানে। আমি বলতে চাইছি যে এই ধরণের দৃষ্টিই আমাদের আধুনিক মনের কাছে শুভ, এরই আলাে আমাদের আধুনিক জীবনের জটিল কাটাৰনে বাতি ধরতে পারে। শুধু “বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর”ণর নীতিতে আমাদের আধুনিক মন পুরােপুরি সাড়া *The Life Divine-Vol. II, pp. 866.
ঋষি দেয়না, দিতে পারেনা। অন্তত আমি নিজে শ্রীঅরবিন্দের প্রতি আকৃষ্ট হই তার এই ধরণের সমগ্র দৃষ্টির মহিমায়। জগতে নানা মনীষীর সঙ্গেই একটু আধটু ঘনিষ্ঠতা হবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, কিন্তু খাঁটি ঋষিদৃষ্টি শ্ৰীঅরবিন্দ ছাড়া অন্য কারুর চোখে দিব্যপ্রভ হয়ে উঠতে আমি দেখিনি। এমন কি এর আগের যুগে পরমহংসদেবের অপরূপ কথামৃতেও এ-ধরণের চিন্তার কোনাে আভাষ পাই না। তার প্রিয় উক্তি মনে পড়ে, “কী হবে জীবনের নানা তত্ত্ব নিয়ে মাথা বকিয়ে ? তুমি লাভ করে ভক্তি যা মানবজীবনের উদ্দেশ্য- আম খেতে এসেছ আম খাও, আমগাছে কত শাখা কত প্রশাখা কত পাতা সে হিসেবে কাজ কী? কথাটা সরলতার দিক দিয়ে শুনতে চমৎকার হলেও অনুসন্ধিৎসু মানুষ কোনদিনই এ-ধরণের অতি সরল সমাধানকে সানন্দে বরণ করেনি —যখন বরণ করতে বাধ্য হয় খুৎ খুৎ করেই করে—অগত্যা under protest. যদি প্রশ্নহীন সরল ভক্তির দিকে ছােটা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত তাহলে হয়ত জীবনের অনেক দুঃখেরই সহজে উপশম হত, কিন্তু হলে হবে কি, আমাদের জীবন বিচিত্র, বহুমুখ তার গতিপ্রবণতা মতিগতি। কাজেই আম খেতে এসে শুধু আমের রসতত্ত্ব ছাড়া আরাে অনেক কিছুই আমাদের জিজ্ঞাসু মনের কাছে অত্যাবশ্যক। শ্ৰীঅরবিন্দ আমাদের এই জিজ্ঞা মনের তৃষ্ণার জলই এনে দিলেন হাতে ক'রে, ক্ষুধার সুধা এনে দিলেন তার অপরূপ ভূয়ােদর্শী দৃষ্টিতপস্যার আবাহনে—যেমন এনে দিয়েছিলেন ভগীরথ তার গাঙ্গ সাধনায়।
অরবিন্দ প্রসঙ্গে কিন্তু তা বলে আমাকে যেন ভুল বুঝবেন না : আমি বলি না এ সব মামুলি মকরধ্বজের কোনাে উপকারিতাই নেই। জীবনে মানুষ যুগে যুগে একই সত্যকে খুঁজে এসেছে তার বিচিত্র জিজ্ঞাসায়, আর সে সত্য আধ্যাত্মিক তত্ত্বই বটে। কিন্তু, বলেছি, জৈবলীলার প্রবণতা এক নয়—বহু। তাই যুগে যুগে সব দেশেই আমরা নানা দিক দিয়ে চেয়েছি পরম সত্যস্বরূপকে। তাছাড়া জিজ্ঞাসার ও যাচাইয়ের কোন একটা সার্থকতা আছেই আছে, নৈলে যুগে যুগে শ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে নচিকেতার জন্ম হত না যে বিলাস ভােগের অশেষ উপকরণ হাতে পেয়েও বলে “ন বিত্তেন তর্পণীয়াে মনুষ” :—বিত্তগৌরবে মানুষের মনুষ্যত্ব তর্পিত হতে পারে না—সে চায় জানতে আরাে জানতে। তার বাঞ্ছিত অমৃত হ’ল আধ্যাত্মিক সত্য : “যােহয়ং বরাে গূঢ়ম- প্রৰিষ্টো নান্যস্তস্মান্নচিকেতা বৃণীতে”--“যে বর গভীরের অন্তর্নিহিত নচিকেতা সেই বর চায়—আর কোনাে বর নয়”। আর সে কেমন জানা? না, নানাদিক থেকে জানা, তন্ন তন্ন করে জানা। এই জন্যেই মানস জিজ্ঞাসার উপযােগিতাকে শ্রীঅরবিন্দ অস্বীকার করেন নি, বরং বলেছেন—বারবারই—যে এ জিজ্ঞাসাও ঠিক পথে চালিত হলে আমাদের পথ চলায় অনেকখানি আলাে দিতে পারে : বলেছেন যে যুক্তি আমাদের উধ্ব প্রগতির সহায় হতে পারে যদি সে আমাদের প্রাণ মনের ও উধ্বলােকের মধ্যে ঘটকালি করতে the "if it (Reason) is a mediator between the life and body and something greater within him." The Life Divine-এর শেষ "The Divine Lake” অধ্যায়, ১৯৫৯ পৃষ্ঠা ৪ per se." কিন্তু মুশকিল হয় কি, যুক্তি তার স্বকীয় সাধনায় একটু আধটু আলাে পেতে না পেতে নিজেকেই ভেবে বসে চরম দিশারি, ভাবে তার দাঁড়িপাল্লায় যে সত্যের ওজন হয় না সে ‘অসিদ্ধ প্রমাণ- ভাবাৎ'। এধরণের একদেশদর্শিতায় মানুষের কেন মুক্তি নেই তার কারণও শ্রীঅরবিন্দ নানা যুক্তির নানা ছন্দে সুরে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সে ব্যাখ্যার সার মর্ম এই যে—“The mind is really a reflector and a medinm and none of its activities originate in theinselves, none cxist অর্থাৎ “মন হ’ল আসলে একটি দর্পণ, বাহন, তার ক্রিয়াকলাপের কিছুই স্বয়ংভব নয়—সে যে স্বয়ংসিদ্ধই নয়।”—নয় বলেই শ্ৰীঅরবিন্দ বারবার বুদ্ধির ভাষাতেই তার সীমানার নির্দেশ দিয়েছেন তার খরদীপ্ত ক্ষুরধার ভঙ্গিমায়, দেখিয়ে দিয়েছেন যুক্তি দিয়েই (কাঁটা দিয়ে কাঁটা তােলা বলতেন না পরমহংসদেব ? ) কেন নির্ভেজাল যুক্তি মানবজাতিকে বেশি দিন প্রগতির ধােরক জোগাতে পারে না :-“Reason by itself cannot long maintain the race in progress.” + কেন না মানুষ তার মানবতার চৌহদ্দি পেরুতে পারে কেবল সর্বাঙ্গীণ অধ্যায়ক সাধনায় :-“A total spiritual direction given to the whole life and the whole nature can alone lift humanity beyond itself." : The Synthesis of Yoga. + The Life Divine. ৩৩ ঐঅনুবি প্রসঙ্গে যখনই এ কিন্তু এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে : যে, শ্রীঅরবিন্দের আধুনিক ধ্যানদৃষ্টি কোনাে সনাতন ধ্যানদৃষ্টিকেই পুরােপুরি অস্বীকার করেনি গায়ের জোরে। তার মধ্যে পাই আমরা একটা বিশ্বভৌন catholicity ঔদার্য—যার গঙ্গোত্রী-প্রেরণা নেমেছে তার তাপস প্রতিভা থেকে। তাই তিনি একদিকে যেমন অতীত সত্যকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পেরেছেন, অন্যদিকে তেমনি আধ্যাত্মিক প্রগতির পথে তার অসম্পূর্ণতাও দেখিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হন নি, নির্দেশের প্রয়োজন হয়েছে। আমাকে একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন যে অতীত মহিমা অতি চমৎকার বস্তু বটে, কিন্তু তাই বলে তার এলাকায় বাঁধা পড়লে চলবে না, অতীত যুগ যতই উজ্জ্বল হােক না কেন ভবিষ্যৎকে হতে হবে উজ্জ্বলতর :—“The tradition of the past is a great thing in its own place, but that is no reasou why we should go repeating the past. A great past should be followed by a greater future." এই ধরণের উদার আধুনিকতা, নির্ভীক সমন্বয়, শ্রদ্ধালু বিশ্লেষণ ও তেজস্বী গভীরতা শ্ৰীঅরবিন্দের বাণীমন্ত্রের প্রতি শ্লোকে কল্লোলিত হয়ে উঠেছে। তাই সে-বাণী এযুগের অনেক নির্ভীক তত্তজিজ্ঞাসুদেরকে এত গভীর ভাবে স্পর্শ করেছে—যার ফলে তারা সাড়া না দিয়ে পারেন না যখন শশানেন : “we do not belong to the past dawns but to the noons of the Future." * The Essays on the Gita. ৩০ ঋষি অতীত যুগের গােধূলির স্মৃতি-সন্তান মােরা নহি অনাগত যুগমধ্যাহ্নের আবাহনে জেগে রহি। শ্রীঅরবিন্দ সম্বন্ধে বলতে গেলে আমাদের মতন অল্পদর্শীর মুখেও বক্তব্য যেন ফুরুতেই চায় না—কেন না তার চিন্তার তহবিল এতই সম্পংশালী যে তা থেকে রত্নমণি আহরণ করা অতি সহজ । তার লেখার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠছে মণিমুক্তার ঝিকিমিকি। কিন্তু আমার আজকের ক্ষুদ্র অভিভাষণ বেচারিকে এ-চয়নের লােভ সামলাতেই হবে, কেন না তার বিরাট প্রতিভার পরিচয় দেওয়া শুধু যে অসম্ভব তাই নয়—তার চিন্তাভাণ্ডারের হাজারাে সম্পদের কোনাে সূচীপত্র প্রস্তুত করাও দুঃসাধ্য। একথা শুনলে দুচার জন বিজ্ঞ সংশয়ী হয়ত হাসবেন—ভক্তের সেই মামুলি উচ্ছাস বলে। কিন্তু সত্যিই যে এ উচ্ছাস নয় তা তারাও বুঝতে পারবেন যদি একটু শ্রদ্ধা নিয়ে শ্রীঅরবিন্দ ভাবমন্দিরে একবার প্রবেশ করেন। তখন বুঝতে পারবেন তারা যে, শ্রীঅরবিন্দের জন্ম শুধু আমাদের মানস-কোষাগারকে আরাে বিত্তশালী করতেই নয়- তার সাধনা আমাদের সংশয়াকুল মনের অন্ধকারে এনে দিল সেই পারমার্থিক আলােকসতত্যর অফুরন্ত পাথেয় যার অনাদরের ফলেই আজকের মানুষ এমন ক্লিষ্ট অবসন্ন, যার অভাবেই মানুষ আজ আসন্ন ধ্বংসের ত্রাসে ত্রস্ত, যার অবসানের জন্যেই আজ সভ্য মানুষের মধ্যে ফের বর্বরতা উঠেছে মাথা চাড়া দিয়ে—“it is the resurgence of the barbarism in ourselves, in zilised man, that is the peril and this sec all we
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
around us.” কিছু দিন আগে এক আমেরিকান রাষ্ট্রনায়ক
এ-টাজিডির কথা বলেছিলেন ঠিকই যে আজকের মানুষের সর্বনাশ
হয়েছে এইজন্যে যে “inan’s mind is spending all its
ingenuity to keep his spirit enslaved."
ঐঅিরবিন্দ আমাদের কাছে এসেছেন এই spirit-এর প্রতিভূ
হয়ে : পারমার্থিক আলাের স্তম্ভরূপে, আত্মিক দিশার দিশারি-
রূপে, চিরন্তন আনন্দের বরদাতারূপে, আন্তর বিশ্বাসের সারথি-
রূপে। 'এ-যুগে মানুষ আজ দিকে দিকে ক্ষিপ্ত রক্তলােলুপ, মিথ্যাই
আজ তার জপমালা—বিশেষ করে রাষ্ট্রতন্ত্রে। তাই তাে সে আজ
এমন নির্লজ্জ হুঙ্কার দিচ্ছে : “বলং বলং বাহুবল”—ঘােষণা করছে :
ভগবান হ’ল মানুষের একটি আদিম কুসংস্কার যার মূল শিকড়
রসপুষ্ট হয় অবচেতন ভয়ের আঁধার রসাতল থেকে। শ্রীঅরবিন্দ
তার দুস্কর তপস্যার মহিমময় দৃষ্টান্তে দেখালেন আমাদের নতুন
করে যে-
"The ascent to the Divinc Life is the human
journey, the work of works, the acceptable sacrifice.
This alone is man's real business in the world and
the justification of his cxistence, without which he
would be only an inscct crawling among other
ephemeral insects on a speck of surface mud and
* The Life Divine-এর শেষ অধ্যায়, ১১৫৯ পৃষ্ঠায়।
৩)
water which has managed to form itself amid the appaling immensities of the physical universe." “মানবজীবনের পরম সাধনা শুধু দিব্যজীবনের অভিসার। বিশ্বলীলায় শুধু এই-ই তার করণীয়—তার জীবনের নিহিতার্থ। এ অর্থ যদি সে খুজে না পায় তা হলে সে হাজারাে কীট পতঙ্গের অন্যতম হয়ে যাপন করে এক শ্রীহীন মলিন পঙ্কিল জীবন—এই বস্তুজগৎ তখন হয়ে ওঠে শুধু এক নিদারুণ মরুভূমির নিরন্ত পরিব্যাপ্তি।” শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পরে এ ভাষায় ভাগবত কথামৃত কেউ আমাদের পান করায় নি এযুগে। কেউ আমাদের সাহস করে বলতে পারে নি এ বৈজ্ঞানিক পাণ্ডিত্যের অজ্ঞতার দাপটে যে, ভগবানকে না জানলে কিছুই জানা হয় না, তাকে না পেলে সর্ব কর্মই হয় অকৃতার্থ, কেবল ভাগবত জীবনই হ’ল মানুষের একমাত্র সাধনা। অবশ্য এ-ধারণা অনেকের মনেই উপ্ত আছে সুপ্ত হয়ে, কিন্তু আমাদের এ নিহিত ঘুমন্ত অনুভবটি জেগে উঠতে মহাপুরুষদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধির সােনার কাঠির অপেক্ষা রাখে। তাই তাে যুগে যুগে যখন ধর্মের গ্লানি হয় তখন অধর্মের অদ্যুত্থানের তামসী রজনীতে তিনি অবতীর্ণ হন যুগাবতারের নবারুণচ্ছটায়। পরমহংস- দেবের অবতরণ আমাদের ভারতে এই শ্রেণীর অবতরণ। কিন্তু হলে হবে কি, সংকীর্ণ বিচার-বুদ্ধির একাধিপত্যের এ-ধুমধাড়াক্কার যুগে পরমহংসদেব ভক্ত-হৃদয়ে সিংহাসন পেলেও মনঃশক্তিমানদের * The Life Divine-Man in the Universe অধ্যায়, ৬৫ পৃষ্ঠা।
শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে মধ্যে বােধ করি তেমন প্রতিষ্ঠা লাভ করেন নি। করার জন্যে তার কোনাে ক্ষতিবৃদ্ধিই হয়নি অবশ্য। পরমহংসদেবের সেই বিখ্যাত কথিকা (parable) আপনাদের তাে জানা আছে? সেই যে কোহিনুর নিয়ে গিয়েছিলেন এক বিক্রয়ার্থী বেগুনওয়ালার কাছে? বেগুনওয়ালা বলল : “এর বদলে বড়জোর দশটি বেগুন দিতে পারি।” তারপর গেলেন তিনি এক কাপড়ওয়ালার কাছে। সে বলল : “এর বদলে বড়জোর দশ থান কাপড় দিতে পারি।” শেষে তিনি এক জহুরির কাছে যেতেই সে হল : “দশ লাখ টাকা দেব।” তাই আজকের দিনে এই পরিভাষায় বড় গলা করেই বলা যায় বৈ কি যে, শ্রীরামকৃষ্ণরূপী হীরকমণিকে যদি বুদ্ধিবাদী বা বৈজ্ঞানিক বেগুনওয়ালারা চিনতে না পেরে বলে ওঁর দাম দশটি বেগুনের বেশি নয় তাহলে তাতে করে হীরকের মহিমা -মঞ্জুর হয়না, হয় শুধু বেগুনওয়ালার সমজদারিয়ানাই নাজেহাল। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য : আমাদের মানস লােকে যে-শ্রেণীর দীপ্তি সহজে প্রতিষ্ঠা পায় সে-শ্রেণীর বিভূতি এ-যুগে শ্রীঅরবিন্দের মধ্যে অপূর্ব আভাময় মহিমায় বিকাশ লাভ করেছে, অন্য কোনাে সাধুসন্ত যুগাবতারের মধ্যেই এ-আভা এমন পূর্ণায়ত হয়ে ওঠে নি। অন্তরাত্মার ভাষা ছন্দ মন্ত্র এমন চিন্ময় হয়ে ওঠেনি অন্য কারুর প্রকাশভঙ্গির মধ্যে দিয়ে কবিত্বে, দর্শনে, বিচারে, বিশ্লেষণে—সর্বোপরি বহু বর্ষব্যাপী নীরব-তপস্যালব্ধ নব-আদিতের কিরণ-সম্পাতে। এ সম্পর্কে একটি ব্যক্তিগত কথা বলেই এখানে ইতি টানবাে। ৩ ঋষি আবাল্য আমি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকেই ডেকেছি এ যুগের দিশারি বলে। তাঁর কথামৃতের প্রতি ভাগ অন্তত পঞ্চাশবার পড়েছি। আপনাদের কাছে এসেছি আজ বন্ধুভাবেই দুটো মনের কথা বলতে, তাই বলিই না কেন একটা কথা এ প্রসঙ্গে। শ্রীঅরবিন্দের “Life Divine” বইটি পড়বার আগে আমি প্রায়ই বলতাম একটা কথা। কথাটা এই যে, যদি আমাদের স্বরাজ লাভ হলে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হন কোনাে বাঙালি ওস্তাদিপন্থী তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে পুলিপপালাও চালান দেবেন এই চার্জে যে আমি বাংলা ভক্তি-সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ বিকাশকে হিন্দুস্থানি ওস্তাদি সঙ্গীতের চেয়ে বড় সৃষ্টি বলে থাকি। তবে এ অক্ষমণীয় অপরাধেও যদি আমাকে তিনি এই বলে সান্ত্বনা দেন : “কী করব বাপু? ল এণ্ড অর্ডার রাখতেই তােমাকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর পাঠাতে হ’ল, তবে কি না আমরা স্বভাবতই দয়ালু, কাজেই তােমাকে একটি মাত্র বই নিতে দেব—কিন্তু একটির বেশি নয়। কী বই সঙ্গে নেবে তুমি ?” তাহলে আমি বলব “শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত।” কিন্তু তবু আমাকে বলতে হবে যে আমার মনে অনেক প্রশ্নের উদয় হ’ত থেকে থেকে, যার কোনাে জবাবই আমি পেতাম না শ্রীরামকৃষ্ণদেবের বাণীর মধ্যে। অবশ্য এ আমি বুঝি যে এসব সংশয়-কুঙ্কুটিকা মুহুর্তে কেটে যাবে অরুণােদয়ে যেমন কাটে অন্ধকার কিন্তু ভগবৎলাভের পথ দুর্গম : অভিসারের বাঁশি শােনা আর অলখ বংশীধারীর দেখা পাওয়া এ দুয়ের মাঝে ব্যবধান সময়ে সময়ে অফুরন্তই মনে হয় অভিসারীর কাছে। এই মধ্যবর্তী
অরবিন্দ প্রসঙ্গে
অবস্থায় তীর্থপথে মানস প্রশ্নের নানা নিরাশার ঝড় তুফান
সময়ে সময়ে হৃদয়ের আলাে দেয় নিভিয়ে ।
তাই সে সময়ে
স্বতই সাধুসন্ত-মহাপুরুষদের বাণীর দিকে মন ছােটে আকুল হয়ে ।
কিন্তু যেহেতু মন তার নিজের এলাকাকে কিছুতেই পুরােপুরি
পেরিয়ে যেতে পারে না সেহেতু তীর্থযাত্রীকে মধ্যপথে নানা
আপ্তবাক্যের কাছে হাত পাততেই হয়।
আমাকে
হয়েছিল। কিন্তু যতই যেতাম এর ওর তার কাছে ততই মন যেন
আরও 'উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে আসত--কেন না মনের তৃষ্ণা তার।
মিটাতে পারতেন না কোনাে অপরােক্ষ উপলব্ধির এজাহারে।
একে ওকে তাকে দেখতাম, আর কেন জানি না মন প্রশ্ন করে
বসত : “আচ্ছা এই যে সব মস্ত মস্ত দিকপাল দেখলে তুমি, যাদের
কথায় এত আনন্দ পেলে আলাে পেলে ব’লে উচ্ছসিত হয়ে উঠলে
তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে চাও বেশ কথা, খুব ভালাে কথা
—কেবল একটা কিন্তু তবু রইল না কি?—তুমি এদের কারুর
কাছে পেলে কি সেই আলাের আলাে যা তুমি আকৈশাের
চেয়ে এসেছ ? মনে হ’ল কি এদের কেউ পেয়েছেন সেই উপলব্ধি
‘যং লব্ধ। চাপরং লাভং মন্ততে নাধিকং ততঃ'—যে লাভের পর আর
কোনাে লাভকে লাভই মনে হয় না ?” অমনি মন মাথা নেড়ে
বাত : “নহে নহে নহে।” এখানে কিন্তু আমাকে ভুল বুঝবেন
মা : গুণীর গানে আবেশ আছে, চিত্রীর ছবিতে পুলক আছে,
চিন্তাশীলের চিন্তায় ভাব আছে, কবির কাব্যে চমক আছে-
বই মানি। ভাগবত সত্যের আংশিক রূপরস এরা সবাই বিতরণ
৪০
করেন—এও জানি। কিন্তু তবু অন্তরাত্মা যখন জাগে তখন এসব মধ্যবর্তী প্রভায়, আংশিক সৌন্দর্যে, তার ক্ষুধা মেটে না, কেন , তখন সে সব ছেড়ে চায় সেই মন্ত্রের উদ্গাতাকে যে বলতে পারে জীমূতমন্ত্রে : “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ”। কিন্তু দুঃখ এই যে এ-শ্রেণীর মহাপুরুষ আমার চোখে পড়ে নি সারা দুনিয়া ঢুড়ে। তাই চম্কে উঠেছিলাম যেদিন দেখলাম শ্রীঅরবিন্দকে ১৯২৪ সালে যেদিন তিনি প্রথম আমাকে বললেন নিশ্চিতির শান্ত সুরে যে ভগবানকেচাইলে পাওয়া যায় এ তিনি জেনেছেন প্রত্যক্ষ অপরােক্ষ অনুভবে।* বিশ্বাস হ’ল মুহূর্তে কেন না তার স্বরে বেজে উঠেছিল সেই সুর যে সুর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, অপরােক্ষ অনুভব বিনা বেজে উঠতে পারে না। তাই আমার বহু অজ্ঞান সত্ত্বেও তার আলোেক মহিমার মর্ম একটু প্রবেশ করেছিল আমার মনের আঁধার অন্তঃপুরে যেখানে লক্ষ জিজ্ঞাসা লক্ষ বাসনা আমাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলত জীবনের সব ঐহিক আনন্দের দেয়ালি নিভিয়ে দিয়ে। তাই তাঁকে বরণ করতে পেরেছিলাম যুগাবতার বলে—যেমন বাল্যে বরণ করেছিলাম শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে। প্রশ্ন আসেনি, তর্ক আসেনি, ভ্রান্তি যে এর পরেও সম্ভব এ শঙ্কাও মনে উদয় হয়নি। কেবল দুঃখ হত যে শ্রীঅরবিন্দকে আমাদের দেশের তত্ত্বজিজ্ঞাসুরা সবাই এনি সহজে আজও অঙ্গীকার করতে পারেন নি। * “তী" বইটিতে শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে লেখকের কথােপকথনের অনুলিপি দ্রষ্টব্য। ১ শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে একদিন পারবেনই এ আমি জানি অবশ্য, কিন্তু তবু যর করুণায় আমার হৃদয়ের আঁধার অতলে নেমেছে আলাের ছটা তাকে সবাই এখুনি এখুনি না মানলে মন দুঃখ পেত প্রথম প্রথম। কিন্তু এখন বুঝেছি যে বড় দীপ্তিকে বড় সত্যকে চিনতে পারা সব সময়ে সহজ হয় না। কেন হয় না সে প্রশ্ন নিয়ে মাথা বকানাে এ তর্পণে একটু অপ্রাসঙ্গিক হবে বলে শুধু এই কথাটি বলেই আমি আজ সমাপ্তি টানব যে, আজকের বৈজ্ঞানিক হাহাকারের যুগে, বুদ্ধির আত্মম্ভরিতার যুগে, আধ্যাত্মিক সত্যে প্রগতিবাদীদের অশ্রদ্ধার যুগে, আমাদের দরকার ছিল এমনিই একজন অপরূপ মন্ত্রঋষির যিনি বুদ্ধিতে, বিদ্যায়, মনীষায়, কবিত্বে, চিন্তাশীলতায় বরেণ্যতমদের অগ্রণী হওয়া সত্ত্বেও শাশ্বত সত্যের সুরে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারেন যে : “ভাবিকালের অতিমানস সত্যের পূজারী পারবে না মনের আদর্শ মনের বিধিবিধান মেনে নিতে, পারবে না নিজের অহংবুদ্ধির জন্যে বা বিশ্বমানবের জন্যে বা সমাজের জন্যে বা রাষ্ট্রের জন্যে বাঁচতে। কারণ সে যে এ সব অর্ধসত্যের উধ্ব লােকের যে সত্য তার সাযুজ্য লাভ করেছে—জেনেছে সেই দিব্য সত্যকে যার জন্যে তার জীবন ধারণ যার ইচ্ছাকে সে অঙ্গীকার করে উদারভাবে নিজের ও সর্বভূতের মধ্যে সেই আলােকের আশ্রয়ে যা বিশ্বাতিগ অর্থাৎ বিশ্বরূপের মধ্যে রূপ নিলেও এ রূপকে ছাড়িয়ে তার পূর্ণ অভিব্যক্তি”- "The gnostic being will not accept the mind's ideals and standards ; he will not be moved to live ; ৪২
ঋষি
for himself, for his ego, or for humanity or for
others or for the community or for the state ; for
he will be aware of something greater than these
half-truths, of the Divine Reality, and it is for that
he will live, for its will in himself and in all, in a
spirit of large universality in the light of the
Transcendence."*
আধুনিক “ইস’-দের এ সংকট বিভ্রান্তির যুগে, স্বার্থহবাধের
এ শােকাবহ প্রতিষ্ঠার যুগে, যান্ত্রিকতার এ সাংঘাতিক যন্ত্রণার
যুগে, বিজ্ঞানের এ দুরন্ত কাপালিকতার যুগে শাশ্বত সত্যের
মৃত্যুহীন মন্ত্রের পুনরবতরণের জন্যে এনি দীপ্ততপঃশক্তিমান
মহাঋষির জীবন-সাধনারই বুঝি দরকার ছিল।
* Gnostic being বলতে শ্রীঅরবিন্দ বােঝেন অদূর ভবিষ্যতের সেই আধ্যাত্মিক
সত্যপ্রতিষ্ঠ মানুষ যে পূর্ণ প্রতিষ্ঠ হবে অতিমানস লােকে আলােয়—যার
অবতরণের জন্যই তার দুশ্চম তপশ্চয়।।
১১
জ্ঞানী
man
শ্রীরামকৃষ্ণ-আশ্রম, কানপুর ১৬. ৮. ৩৮
দিলীপকুমার রায়, পরমশ্ৰদ্ধাস্পদে
আমার সহিত আপনার বাহ্যত কোনাে পরিচয় না থাকলেও
আপনি আমার অপরিচিত নন। আপনার লেখা প্রায়ই পড়ি
ও তা থেকে আলােক পাবার প্রয়াস পাই। আপনাকে দর্শন
করবার, সৌভাগ্যও বহুবার হয়েছে। আপনারা জনসাধারণের
অজানা নন বলেই চিঠিতে আপনাকে একটু কষ্ট দিতে সাহসী
হয়েছি।
আশা করি ত্রুটি নেবেন না। । কিছুদিন আগে
শ্রীঅরবিন্দের একটি উদ্ধৃতি চোখে পড়েছিল। আপনাকে তিনি
লিখেছিলেন : “To me the ultimate value of a
is not to be measured by what he says, nor
by what he does, but by what he becomes."
বড় সুন্দর। স্বতই মনে হয় যে মানুষের ঐ পরিমাপই
যথার্থ-সত্য। কতবার যে এ নিয়ে ভেবেছি ও অন্তরে এর
যাথার্থ্য উপলব্ধি করেছি বলতে পারিনে। তবু দুএকটা প্রশ্ন ওঠে।
কোনাে লােকের শেষ মূল্যultimate value নির্ণয়
করতে হলে দেখতে হবে সে কী হয়ে উঠল—what he
becomes : বেশ কথা। কেবল এক্ষেত্রে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা
করতে ইচ্ছা হয়—একজন কী হয়ে উঠছে বা উঠল তা কী করে
বােঝা যাবে? কী উপায়ে জানব সে কোন্ স্তরে রয়েছে ?
even
৫
छानो কেবল কি নিছক অনুভূতির আলােতেই এটা দেখা যায়, না কল্পনাকে ডাক দিতে হয় ? কিম্বা তার “হয়ে-ওঠার’ becoming-এর—কোনাে বাহ্য প্রকাশ থেকে নিগুঢ় তত্ত্বটি অনুমান করে নিতে হবে ? একজন “যা-হয়ে-উঠল” তার সঙ্গে কি সে “যা-বলছে” “যা-করছে তার কোনাে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাবে না ? এক কথায়, রামশ্যামের কথাবার্তা বা কার্যকলাপ সব বাদ দিয়ে কি তাদের মূল্যনির্ধারণ সম্ভব ? অন্তদৃষ্টির কথা ছেড়ে দিচ্ছি এই জন্যে—যে সাধারণ মানুষের নেই এ-সম্পদ। তারা কী করে কোন্ সূত্র ধরে পৌছবে অপরের আত্ম- রূপান্তরের রহস্যলােকে ? ইতি শ্ৰীঅ— শ্রীঅরবি-অশ্ৰম, পণ্ডিচেরি ২০, অ- করকমলেবু কিছুদিন আগে এক বৎসরের কাছাকাছি হবে—জহরলাল সম্বন্ধে আমি যে-প্রবন্ধটি ভারতবর্ষে লিখি আপনি নিশ্চয় তাতেই শ্রীঅরবিন্দের ঐ উক্তিটি পড়েছেন যে, মানুষের সত্য মূল্য ও শেষ পরিচিতি তার কথায় নয়, এমন কি কাজেও না—তার স্বরূপের যাচাই হ’ল সে কী হয়ে উঠল সেই পরখে। ৪৫ অরবিন্দ প্রসঙ্গে কথাটি আপনার ভালাে লেগেছে জেনে আমারো ভালাে লাগল : আরাে এইজন্যে যে আধুনিক কর্মঘর্ঘর বিজ্ঞাপন-মুখর যুগে এ-পরখের সত্যতা নিত্যই অস্বীকৃত হচ্ছে। মানুষকে আজকের দিনে পনের আনা ক্ষেত্রে সম্মান দেওয়া হয় তার কথা ও কাজ মেপেজুপে। এর মধ্যে একটা বেদনা আছে। সে-বেদনা মানুষের অন্তরাত্মার। কবি ব্রাউ- নিঙের একটি কবিতার কয়েকটি চরণে এর রেশ উঠেছিল বেজে : Not on the vulgar mass Called work must sentence pass Things done that took the eye and had the price, O'er which from level stand, , The low world laid its hand, Found straightway, to its mind, could value in a trice. But all the world's coarse thumb And finger failed to plumb So passed in making up the main account: All instincts immature. All purposes unsure, That weighed not as his work, yet swelled the man's amount : Thoughts hardly to be packed Into a narrow act, Fancies that broke through language and escaped सानो All I could never be All men ignored in me This was I worth to God, whose wheel the pitcher shaped. অনামীতে এর আমি বাংলা করেছি—শেষ স্তবকের যত চিন্তা গহন মূছন সীমাক্ষুন্ন কর্মে বাজিল না উধাও কল্পনা-মর-ভাষা যার পেল না সন্ধান : যত ফুল মনে ফুটিল না নিখিল ফিরিয়া চাহিল না তারি গন্ধমূল্যে মাের নিখিলেশ-নয়নে সম্মান। আপনি যে-প্রশ্ন তুলেছেন তার গােড়াকার কথাটা হ’ল এই গন্ধমূল্যের মর্যাদা-বিচার। প্রশ্ন কঠিন বৈ কি-বুদ্ধির দিক দিয়ে নাগাল পেতে গেলে। অথচ আমাদের গভীর অনুভবলােকে ঋষির এ-উক্তি, কবির এ-আক্ষেপ যে আলোয় আলােময় হয়ে ওঠে একথা অপ্রতিবাদ্য। না উঠলে যুগে যুগে ধ্যানীর, তত্ত্বদর্শীর, ঋবির চরণ- তীর্থে মানুষ “প্ৰণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া” সত্য-সন্ধানে যেত কি? সেদিন আমার এক আত্মীয় এই শ্রেণীর এক প্রশ্ন তুলে আমাকে এমনিই মুস্কিলে ফেলেছিলেন। তার প্রশ্ন ছিল : যুগ যুগ ধরে যােগী ঋষি তাে এতশত এলেন গেলেন—কিন্তু হ’ল কী? তার ভাবখানা : “কর্মী বৈজ্ঞানিক বণিক এদের কাজে ভালাে হােক মন্দ হােক একটা কিছু ঘটছে, কী না দৃশ্যজগতে প্রত্যক্ষ ৪৭
অরবিন্দ প্রসঙ্গে
পট-পরিবতন, ধরা-ছোয়া-যায়-এমনতর বিপ্লবাদির রকশফের
অভিনীত হচ্ছে—কিন্তু দ্রষ্টা মুনি ঋষি এদের আবির্ভাবে কই
তেমনতর কোনাে ফল তাে হাতে-হাতে ফুলছে না ? মিলছে না
তাে হাতে-হাতে নগদ বিদায়।
উপনিষদে বলেছে পনের আনা লােকের চেতনা বহিমুখী
কচিৎ দু-একজন দেখা যায় যারা অন্তরের দিকে দৃষ্টি ফেরান ।*
কাজেই এ দুচারজন ছাড়া কারুর চোখেই বড় একটা পড়ে না
আন্তর অঘটনের প্রত্যক্ষ বিপ্লবগুলির ছবি। এই জন্যেই ইংলণ্ডের
বিখ্যাত মনীষী লােয়েস ডিকিন্সন তার শেষ জীবনে খেদ করে-
fEco5 , "Nothing that is important can be proved."
বহির্মুখী মন, আত্মম্ভরী প্রাণ চলে পাল তুলে বাইরের
উজান টানে। হাজার পাদপ্রদীপের আলােয় হাজার মানুষের
নলীলায় যে-শােরগােল ওঠে সে-সব খতিয়ে প্রায়ই অকিঞ্চিৎকর
(unimportant) হলেও তাদের ফলাফল যে চাক্ষুষ করা যায়
একথার মার নেই। তাদেরকে সপ্রমাণ করা যায় : চোখে
আঙুল দিয়ে দেখানাে যায় যে তারা এল ও কুরুক্ষেত্র ঘটিয়ে
* পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্মাৎ পরং পশ্যতি না।
কশ্চিদ্ধী: প্রত্যগাত্মানযৈক্ষদবৃত্তচক্ষুম্বতত্বচ্ছি । (কঠোপনিষৎ)
ভাবার্থ:-আমাদের ইন্দ্রিয়দ্বার খেলে বাইরের দিকে সহজে, এই-ই বিধাতার
বিধান। তবে এক আধজন ধ্যানীর দৃষ্টি বাহিরে না তাকিয়ে অন্তরের
দিকে তাকায় অমৃতকামী হ'য়ে, আমাদের আত্মিক সত্যস্বরূপকে প্রত্যক্ষ করেন
তারাই।
জ্ঞানী
তবে গেল—প্রায়ই। কিন্তু বুদ্ধ খৃষ্ট চৈতন্য কবীর শ্রীরামকৃষ্ণ
শ্ৰীঅরবিন্দর মত মহামানবদের আবির্ভাবে যে বিপ্লব ঘটে সে
মানুষের গহন অন্তরলােকে। সেখানকার বাত। অনুভবগ্রাহ,
শুদ্ধবুদ্ধিগ্রাহ-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। মানুষের আত্মিক সব অঘটন
মিরাক্লের বেলায়ই এই কথা। তারা অনুভবগম, সাধনলভ্য,
সহৃদয়-হৃদয়সংবেদ্য—কিন্তু যুক্তিতর্কে নিষ্পন্ন হয় না, হতে পারে না।
মানুষের “হয়ে ওঠা” হল এই অতীন্দ্রিয় লোকের অঘটন
—মিরা। তার বলা-কওয়া চলা-ফেরা ধরা-ছোওয়া সবই হ’ল
বাইরের ঘটনা5phenomena : এদের বাটখারা আছে, নিক্তি
আছে—গজকাঠি দিয়ে মাপলে মেলে এদের নাগাল। কিন্তু আন্তর
অনুভবের পরখ করতে হবে অন্য গজকাঠি দিয়ে—কষতে হবে
অনুভবের কষ্টিপাথরে, তবে মিলবে তার হদিশ। শ্ৰীঅরবিন্দ ও
ব্রাউনিং এই কথাই বলেছেন—কেন না একথা তারা অনুভব
করেছেন তাদের চেতনার মর্মকোষে। সেখানকার বাণী হল
অপরােক্ষ অনুভবের বাণী—তার মর্মজ্ঞ হতে হলে সে রাজ্যের
বাসিন্দা হতে হবে—তার দর্শন পেতে হলে চাই তৃতীয় নয়ন
দিব্যদৃষ্টি, নইলে তাদের যাথাতথ্য সম্বন্ধে যতই হাঁকডাক করুন না
কেন, দেখবেন বেশিরভাগ লোেকই মেনে নিতে পারবে না—যেহেতু
বেশিরভাগ-লোকের চেতনা (উপনিষদের ভাষায়) বহির্মুখী।
কিন্তু তা বলে একথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয় যে অনুভবের
গহনলােকে যে-সত্য ফুটে ওঠে বহির্লোকে তার কোনাে ছোঁয়াচই
লাগে না। তা যদি হত, তাহলে জৈবলীলা হয়ে দাড়াত
৪৯
শ্ৰীঅরবিল প্রসঙ্গে একটা অর্থহীন অসংবদ্ধ অবিন্যস্ত ঘটনাস্রাত। অতীন্দ্রিয় লোকের অনুভব-দীপ্তির ছোপ বহির্লোকের ঘটনায় প্রায়ই লাগে—নিরন্তরই বাইরের সঙ্গে ভিতরের চলেছে মালাবদল। যেখানে ভিতরের আলাে ফোটেনি সেখানে বাইরেটাও হয় হীনপ্রভ। একই কথা দুজনের মুখে ফুটে ওঠে। একজনের মুখে তা শােনায় ছায়ার- ছায়া, অন্যজনের মুখে-আলাের-আলাে। বিলাসী পলিটিকাল বক্তা বললেন—“ত্যাগ করাে”-লােকে হেসে উঠল : সর্বত্যাগী মার্টার বললেন—“ত্যাগ করাে”—ছুটল লােক দলে দলে ঘর ছেড়ে। জীবনের এ-রহস্য সবাইকারই চোখে পড়ে—পার্সনালিটির এর নিদান বুদ্ধির কাছে অজ্ঞেয়। একজনের মধ্যে ফোটে অনির্ণেয় আকর্ষণী শক্তি—অন্যের মধ্যে ফোটে না। কেন ? না, একজন এমন কিছু একটা হয়েছে তা সে প্রাক্তনবশেই হােক বা সাধনবলেই হােক)—যা অন্যজনা হয় নি। এই জন্যেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন শশধর তর্কচূড়ামণিকে—“কতার চারাশ পেয়েছ? নৈলে শুনবে কে তােমার কথা ?” চাপরাশ হ’ল এই হয়ে-ওঠা—জীবন- সাধনায় ভগবানের প্রত্যক্ষ আদেশ পাওয়া সে-সাধনা যেদিকেই হােক না কেন। আসল কথা তাই এই হয়ে-ওঠা নিয়ে। এর পরের কথা—আপনার পরের প্রশ্ন—আরাে কঠিন। কী করে বুঝব কে কী হ’ল, কতখানি হল, কারুর আন্তর পরিণতির বাহ্য প্রকাশ দিয়ে তাকে কতখানি বােঝা সম্ভব ইত্যাদি। এক কথায়, আপনি প্রশ্ন তুলেছেন কী ভাবে মানুষের আন্তর পরিণতি ও বিকাশ বাইরে সক্রিয় হয়।
জ্ঞানী এ-কথার সংক্ষেপে উত্তর দেওয়া কঠিন আবরা এই জন্যে যে মানুষের চরিত্র বিচিত্র, প্রকাশভঙ্গি ততােধিক। কেউ কথায় নিজের অনুভবকে বাইরে সংক্রমিত করতে পারে, কেউ বা লেখায়, কেউ বা গানে, কেউ বা রূপরেখায় । এ-সব অবশ্য কর্মের what he does-এর কোঠায় পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রেও প্রণিধানযােগ্য সেটা হল এই বিচিত্র সত্য—যে এ-সব কর্মের মধ্যে দিয়ে কর্মকতার অন্তর অনুভব কোনো না কোনাে উপায়ে সক্রিয় হলেও তার সমগ্র মূল্য—তার সত্তার মূল্য—এ-সবকেও ছাপিয়ে যায়। এই যে surplus-যাকে না মেলে তার বচনে, কর্মে, না শিল্পে, না প্রতিভায়, অথচ যার প্রভাব জীবনের উপর কাজ করে এক রহস্যময় অনির্ণেয় ভঙ্গীতে-কী করে করব তার মাপজোপ? একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক—তাহলে হয়ত আমার বক্তব্যটা একটু প্রাঞ্জলতর হতেও পারে—যদিও (পুনরুক্তি মার্জনীয়) এ-ধরণের বক্তব্য মূলত অনুভবগ্রহ ব'লে খুব সুবােধ্য ক'রে বলা কঠিন। ধরুন একজন বড় গায়কের গান বা বড় চিত্রীর চিত্র। এমন দেখা যায় যে, সে গান কেউ হুবহু নকল করতে পারল, সে- চিত্রের হুবহু কপিও করল আর কেউ। কিন্তু মূল গান বা মূল চিত্রের সমকক্ষ হ'তে পারল না—এ নকল গান, নকল ছবি। কেন এমন হয় ? দেখানাে যেতে পারে—গ্রামােফোন রেকর্ডের সাহায্যে—যে মূল গানের সঙ্গে নকল গানের ভঙ্গি ছন্দ কম্পন সংখ্যার তফাৎ নেই একটুও—অণুবীক্ষণ বা ফটোগ্রাফের সাহায্যে শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে প্রমাণ করা যেতেও হয়ত পারে যে, মূল চিত্রের সঙ্গে নকল চিত্রের মিল নিখুৎ। অথচ তবু বিশেষজ্ঞরা সবাই মানবেন যে এ-দুইয়ের মধ্যে তফাৎ আশমান-জমিন। হতেই হবে। আর এ-হওয়ার কারণ ঐ অব্যক্ত অনির্বচনীয় অপ্রকাশ্য মানুষটির ছোঁয়াচ। বড় নামহের গানে বড় শিল্পীর শিল্পে তার পার্সনালিটির ব্যক্তিস্বরূপের ছােয়াচ লাগল—না লেগেই পারে না—ছােট গায়কের ছােট শিল্পীর নকলের চারদিকে নেই এ-জ্যোতির্মণ্ডল। বড় শিল্পী যা হয়ে উঠেছেন ছােট শিল্পী তা তাে হয়ে উঠতে পারেন নি। সুতরাং মা এ-ও খানিকটা বাহ্য বিচার বৈ কি। কেন না এরও মূল লক্ষ্য হ’ল কৃতকর্মের ওরফে কীর্তির সমগ্র বিচার— হােক না এ বিচারভঙ্গি অন্তর্মুখী, তবু একে কীর্তির বিচারই বলতে হবে—যেহেতু গােটা মানুষটার বিচার না হলেও তার প্রভাবের ইন্দ্রিয়গ্রাহ মূল্যই এখানে কষা হ’ল। এরও পরে আছে। কিন্তু তার কথা যুক্তি- বােধ্য করে প্রকাশ করা আরও কঠিন। তবু একটু আভাষ দিতে চেষ্টা করব। কি জানেন? লৌকিক বিচার হাজার সূক্ষ্মদর্শী মনের বিচার হলেও সে কখনই ইলিয়কে পেরিয়ে যেতে পারে না। এই জন্যেই মনকেও আমাদের দার্শনিকেরা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলেছেন। কেন না মনও কোনাে না কোনাে প্রকাশকে আঁকড়ে তবে পায় অকূলে কূল। কিন্তু পরমার্থ হ’ল মনের এলাকার বাইরে—সে যে অতীন্দ্রিয়। মানুষের বেলায়ও একথা খাটে, কেন না পরমতম যে, সর্বাধার যে জ্ঞানী সে রইল “জনানাং হৃদি সন্নিবিষ্ট”। তাই মানুষ যে-অনুপাতে এই ভাগবত চেতনার সত্তা পাবে সে অনুপাতে যাবেই মনের এলাকা পেরিয়ে না গিয়ে পারে না। এই জন্যেই বলেছে : None but Christ has ever understood Christ : এ-কথার তাৎপর্য এই যে খৃষ্টকে পুরাে বুঝতে হলে তার চেতনার সালােক্য পেতে হলে অন্য ভাষায়, হ’তে হবে নিজেও খৃষ্টto become Christ. এই জন্যে সব আধ্যাত্মিক সাধনারই শেষ কথা হ’ল হওয়া, হয়ে-ওঠা—পাওয়া নয়। একথা সত্য যে কর্মের মধ্যে দিয়েই এই হয়ে-ওঠার সন্ধান মেলে, কিন্তু তাই বলে একথা সত্য নয় যে কীর্তির বাটখারায় কতর ওজন সম্ভবপর। কেন না হয়ে-ওঠার নিগূঢ়তম প্রভাব ফলে তো বুদ্ধিগ্ৰাহ পথে নয় : ফলে-অনুভলোকে, সাক্ষাৎ ছোয়াচে। এই জন্যে প্রেমেরও সুরু ইন্দ্রিয়লােকে বটে কিন্তু সারা-—ঐ অতীন্দ্রিয় অনুভবলােকে—যেখানে এক সত্তার মিলন হয় আর এক সত্তার সঙ্গে, ফলে “দুই মিলাইয়া এক অঙ্গ হয়”। এ-মিলন কী বস্তু তা প্রকাশনীয় নয় হতে পারে না—অথচ এর চেয়ে প্রত্যক্ষ অনুভব অপরােক্ষ অনুভূতি আর কিছু নেই—তাই প্রেম বলুন, ভালোবাস! বলুন, দরদ বলুন, sympathy বলুন-এ যে নামই দিন না কেন—এই আন্তর উপলব্ধির, realisation-এর স্বীকার না হলে কিছুই কৃতার্থ হয় না। এই জন্যেই ভগবান গীতায় বলেছেন :কৃচ্ছু দান তপস্যা কিছুতেই তাকে মেলে না, মেলে কেবল ভক্তিতে প্রেমে—“ভক্ত্যাত্বনন্যয়া শক্য অহমেবংবিধাের্জুন, জ্ঞাতু দ্রষ্টঞ্চ তত্তেন প্রবেষ্ট পরন্তপ।” ভক্তিতে শুধু যে তাকে জানা
খ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
০
ৰা দেখা যায় তাই নয়—তার মধ্যে প্রবেশ করা যায়। এই-ই
হ’ল হয়ে-ওঠা—to become. কোন্ কীর্তি দিয়ে একে মেপে
পাবেন বলুন-কোন্ বচন দিয়ে পাবেন এই আত্মরূপান্তরের রাজ
গুহ্যরস-রহস্যমুত্তমম্ ? কোন প্রকাশে এ পুরাে ধরা দেয় ?
দিতে কি পারে? মানুষ মানুষকে তার মহার্ঘতম অর্থ দেয়
যে-নৈঃশব্দ্যের নিস্তরঙ্গে—যেখান থেকে “বাচো নিবতন্তে অপ্রাপ্য
মনসা সহকাঙাল বচন মন দ্বার হ'তে আসে ফিরে ফিরে ।
আপনি হয়ত বলবেন যে এ-ধরণের কথা একটু যেন ধোঁয়াটে
গোছের। বললে খুব ভুল বলবেন না হয়ত, কেবল একটা কথা
মনে রাখতে হবে : যে, জ্ঞানের বাণী হ’ল উধ্বচেতনার বাণী,
কাজেই নিম্নচেতনার অপারে তাকে ঢালতে গেলে তার কিছুটা
উপছে পড়ে—পড়বেই। ফলে হয় এই যে জ্ঞানের অনেকখানি
নিহিতার্থ ফস্কে যায়। এই জন্যেই জ্ঞানের পরম বাণী, পরম আলো
অধজ্ঞানের রাজ্যে একটু অবিছামতন হয়ে আসে—যুক্তিপ্রাঞ্জল,
সুবোধ্য, সম্পূর্ণ মনে হয় না। কী ভাবে ঝাপসা ঠেকে একটু বলি
শ্রীঅরবিন্দেরই আর একটি বাণী উদ্ধৃত করে ।
$15 Life Divine-49 The Divine and the Undivine
অধ্যায়ে জ্ঞানচিন্তামণি লিখেছেন : (২য় খণ্ড-১৭০ পৃষ্ঠা) :
For without experience of pain we would not get
all the infinite value of the divine delight of which
pain is in travail ; all ignorance is a penumbra which
environs orb of knowledge, every
error is
;
an
৫০
জ্ঞানী significant of the possiblity and the effort of a 'discovery of truth ; every weakness and failure is a first sounding of gulfs of power and potentiality ; all division is intended to enrich by an experience of various swcetness of unification the joy of realised unity. ভাবার্থ বিনা ব্যপ-উপলব্ধি পরমানন্দের অন্তহারা মহিমার মর্ম কে জেনেছে--যে-অনল চিরধারা, ব্যথার দুলাল? জ্ঞান—জ্যোতির্মণ্ডলের মধ্যমণি ; অজ্ঞান উপায়ে তারি কাপে অধ-আলােছায়াধ্বনি। ভ্রান্তি কারে বলে ? সে যে পুরােহিত-সত্যসাধনার : আসন্ন যে-আবির্ভাব—তারি প্রত্যুষের অঙ্গীকার। ক্লৈবব্য, পরাজয়ে জাগে আদিমন্ত্র অহল শক্তির গৃঢ় ওঙ্কারের : চির-অগ্রদূত সে--পরিণতির। বিচ্ছেদ নিয়ত সাধে লাবণ্যের বিচিত্র উচ্ছাসে উল্লাসের উলুধ্বনি—মিলনের সম্ভোগবিলাসে। বলতে চান কি এ-ধরণের জ্ঞানমন্ত্রের মর্মপরিগ্রহ করা সহজ ব্যাপার? না, টলষ্টয়ের কথার প্রতিধ্বনি করে বলবেন যে, যে-বাণী এখনি এখনি সবজনবোধ্য নয় সে নামঞ্জুর ? হয়েছে কি, আমরা অষ্টপ্রহর বাস করি তেল-নুন-লকড়ির রাজ্যে —ইন্দ্রিয়ের হাজারাে মুখর দাবি-দাওয়া মেনে। কাজেই ইন্দ্রিয়- প্রত্যক্ষ সত্যকেই বলি বাস্তব, বাকি সবকে মনে করি স্রেফ, কৰিব অরবিন্দ প্রসঙ্গে বা কল্পনা বা দুর্বোধ্য সুতরাং অকেজো। কিন্তু চেতনার আরোহণ বিনা পারমার্থিক তত্ত্ব বােঝা অসম্ভব—“ন সাম্পরায় প্রতিভাতি বাল”—অবিকশিত বালমনে পরমতত্ত্ব প্রতিভাত হয় না—বহু সাধনায় তবে উধ্বলােকের পানে রুদ্ধ হৃদয়ের বাতায়ন খােল যায়। আর যতক্ষণ খােলা না যায় ততক্ষণ হাজার ধর্মের কাহিনী বলা হোক না কেন কূপমণ্ডুক মন চোর। শশানে না—মাথা নেড়ে বলেও সব আকাশকুসুম অবাস্তব—একমাত্র কূপের বদ্ধ সত্যই হ’ল বাস্তব। তাই সুবোধ্য দুবোধ্যের তর্ক রেখে বলব শুধু আর একটি কথা-শ্ৰীঅরবিন্দ সম্পর্কেই। তার কথাই ফের তুলছি এই জন্যে যে আপনার মূল প্রশ্নটি তারই একটি উদ্ধৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে : যে, “হয়ে-ওঠা” বলতে কী বােঝায়? এ-কথার উত্তর দিতে হলে শ্রীঅরবিন্দের ভাব-ধারার একটু খবর রাখতেই হবে—যেহেতু “হ'য়ে-ওঠার” এ-বাণীটি হচ্ছে তার সাধনার একটি অতি মূল্যবান বাণী—যার পরম পরিণতি হ’ল শ্ৰীঅরবিন্দের পরিভাষায়, “complete transformation of human nature and consciousness”, কি না, মানব-প্রকৃতি তথা চেতনার আমূল রূপান্তর। অবশ্য এ-প্রসঙ্গের বিশদ আলােচনার স্থান এ নয়- আমি কেবল একটু আভাষ দেবার চেষ্টা পাব—কোন্ পথে তার এ-ধরণের মূলসূত্রের ভাষ্য খুঁজতে হবে। শ্রীঅরবিন্দের বরাজ্যে যদি একটু প্রবেশ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন তিনি প্রায়ই বলে থাকেন যে আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকাণ্ড ও মানস-বিশ্লেষণ পরায়ণতার দরকার থাকলেও আমাদের চেতনার জ্ঞানী : বিকাশ-পথে সব চেয়ে বড় সহায় হ’ল আমাদের অন্তরের দিশা; উপলব্ধির বতিকা। আমাকে ১৯৩৫ সালে একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন-“অন্তরের দিশা সক্রিয় হয়ে আমাদেরকে চালাবে এই দিকেই আমার মনের সব চেয়ে জোরালাে সায়” (“I have such a strong penchant for the inner working !") অনুমুখিতার দিকে এ-ভাবে জোর দিয়েছেন তিনি বরাবরই। একটিমাত্র দৃষ্টান্ত দেব শুধু : Life IDivine-এর ৮৯৫ পাতায় তিনি লিখছেন : "It is only by an inner realisation... by an overwhelming experience or by many experiences building up an inner change, by a transmutation of the consciousness, by a liberation of the spirit from its present veil of mind, life and body that there can emerge the spiritual being.” এর ভাবার্থ এই যে আমাদের আধ্যাত্মিক সত্যের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে শুধু অন্তর অনুভবের মধ্যে দিয়ে, উপলব্ধির ভূমিকম্পের মধ্যে দিয়ে, চেতনার রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে, দেহপ্রাণমনের বতমান আড়াল থেকে আমাদের আত্মার উদ্ধারের মধ্যে দিয়ে। তাই তাে অরবিন্দ এত বেশি জোর দেন জ্ঞানের আলাের পরে। কেবল এখানে একটা কথা ভুলবেন না : জ্ঞান বলতে শ্ৰীঅরবিন্দ য়ুরােপীয় বুদ্ধিবাদী দার্শনিক কচকচি বা বৈজ্ঞানিক থিওরির শিশুপাঠ বােঝেন না, বােঝেন যা বুঝতেন প্রাচীন ঋষিরা, সাধকেরা, দ্রষ্টারা : কি না—spiritual experience-
শ্রী অরবিন্দ প্রদে
অধ্যাত্ম উপলব্ধি। তঁার Life IDivine-এর “The Methods
of Vedantic Knowledge” অধ্যায়ে এ-কথাটি তিনি বিশদ ক'রে
বলেছেন: দেখিয়েছেন (পৃ: ১০৪-১০৫, প্রথম খণ্ড) যে,
"The sages of the Veda and Vedanta relied
entirely upon intuition and spiritual experience"
( বেদ, বেদান্তের ঋষিদের একমাত্র উপজীব্য ছিল অধ্যাত্ম
উপলব্ধি )। তাই—বলছেন তিনি—আজকালকার পণ্ডিতেরা
প্রায়ই ভুল করেন যখন তারা উপনিষদের তর্ক ও বিচারের কথা
বলেন বড় গলা করে। কারণ-ভাষ্য দিচ্ছেন তিনি--বৈদিক
যুগে যে সব তর্কাতর্কি হ’ত তাকে বাগ্বিতণ্ডা বললে ভুল হবে
সে সব ছিল আসলে পরস্পরের উপলব্ধির খবর নেওয়া, আমি কি
“জেনেছি” তার সঙ্গে তুমি যা “জেনেছ” সেটা মিলিয়ে নেওয়া,
খুঁটিয়ে দেখা। তাই সে সময়ে একজন জ্ঞানী আর একজনকে
প্রশ্ন করতেন না—“তোমার কী মনে হয়?” প্রশ্ন করতেন :
“তুমি কী জানাে?” উপনিষদের কোথাও যুক্তিতর্কের আমেজ
পাওয়া যায় না—যার জোরে বৈদান্তিক সত্যকে মঞ্জুর করা হল।
( The question asked by one thinker of another is
"What dost thou know ?"-not "What dost thou
think ?” —nor “ To what conclusion has thy reasoning
arrived." Nowhere in the Upanishads do we find
any trace of logical reasoning urged in support
of the truths of the Vedanta.
Vedanta. Intuition, the
सानी com by a ৪৬ pages to have held, must be corrected more perfect intuition ; logical reasoning cannot be its judge. ) এই সব উপলব্ধিই হ’ল শ্ৰীঅরবিন্দের কাছে সব চেয়ে বড় কথা-কারণ এদের মধ্যে দিয়েই মানুষ হয়ে-ওঠে”—ঘটায় প্রকৃতির রূপান্তর। তাই শ্রীঅরবিদ অামাকে আমাকে একটি চিঠিতে লিখেছেন—( আমার “সূর্যমুখী” বইটির পাতায় পাবেন পুরো পত্রটি ) যে আজকের দিনে অনুষ্ঠানিক ধর্ম যে একটু সেকেলে মতন হয়ে পড়েছে তার কারণ আর কিছুই নয়, শুধু, এই যে ধর্মের মধ্যে মানুষ যেন একটা অসম্পূর্ণতা ও অসমগ্রতার আভাস পেতে শুরু করেছে। তাই তিনি বলছেন “all religions are a little oll-colour now." অর্থাৎ, সব ধর্মই কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। কেন এমন হল তার কারণ তিনি নির্দেশ করেছেন এই বলে যে অনুষ্ঠানিক ধর্মের মধ্যে দিয়ে যে-ধরণের আশ্রয় পাওয়া যায় মানুষের অন্তরাত্মা অাজ তার চেয়ে বৃহত্তর অাত্ম- উন্মোচন চাইছে যাতে করে সে পায় এমন কোনাে অনাগত আলাে যাকে তার মন ও হৃদয় সরলরেখায় অনুসরণ করতে পারে। (“It may be the sense of something inadequate or incomplete in the religion itself-the need of a larger opening of the soul into the Light that is being felt, an opening through which the expanding human mind and heart can follow.” ) শ্ৰীঅরবি প্রসঙ্গে একথা তিনি বারবারই বলেছেন। বলেছেন কেন? , আনুষ্ঠানিক ধর্মের আশ্রয় হ’ল ক্রিয়াকাণ্ড—মানে বহির্মুখী ক্রিয়াকাণ্ড। কিন্তু মানুষ যে অধ্যাত্ম আলাে চায় সে-আলাে হল স্বভাব-অন্তমুখী, যার ভাঙচুরে, রসায়নে, কলাকৌশলে ঘটে—প্রথম, অন্তলোকের রূপান্তর, পরে প্রাণমনের রূপান্তর, সবশেষে দেহের। কি না, যা ছিল না তাই হয়ে উঠল। কাজেই দেখছেন তার রূপান্তরের দীক্ষা হ’ল খতিয়ে এই হয়ে-ওঠারই দীক্ষা। মানুষ বিশ্বলীলায়—চাক বা না চাক-নিরন্তরই হয়ে উঠছে বলেই হচ্ছে তার ক্রমপ্রগতি, এ-ও শ্রীঅরবিন্দ বারবারই বলছেন (যার বৈজ্ঞানিক নাম হ’ল ইভলুশন) যেমন ধরুন তার Life Divine-এর ৮৩৫ পৃষ্ঠায় তিনি বলছেন : “It cannot truly be said that there has been no such thing as human progress since man's appearance or even in his rccent ascertainable history ; for however great the ancients...there has been in later developments an increasing subtlety, complexity, manifold development of knowledge and possibility in man's achievements, in his politics, society, life, science, metaphysics, knowledge of all kinds art, literature." আর শুধু যে বহির্জীবনেই এ প্রগতির চিহ্ন দেখা যায়, তা-ই নয়, তার অধ্যাত্মজীবনেও প্রগতি হচ্ছে বৈকি : “Even in his spiritual endeavour,” বলছেন awaf77-"less surprisingly lofty and less massive in জ্ঞানী জীবনে, power of spirituality than that of the ancients, there has been this increasing subtlety, plasticity, sounding of depths, extension of seeking.” অর্থাৎ, “মানুষের আদিম অ্যুদয়ের যুগ থেকে কিংবা হাল আমলের নিণীত ইতিহাসে তার যে কোনাে প্রগতিই হয় নি এমন কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। প্রাচীনরা যত বড়ই হোন না কেন, তাদের পরবর্তী যুগের বিকাশে মানুষের রাষ্ট্রে, সমাজে, বিজ্ঞানে, দর্শনে, সর্ববিধ শিল্প ও সাহিত্যের বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্রে বেড়েছে বই কি তার নানামুখা জ্ঞান ও কতির সম্ভাবনা, এমন কি, তার আধ্যাত্মিক অধ্যবসায়েও সূক্ষ্মতা, নমনীয়তা, নিবিড়তার দিশ তথা সন্ধানের পরিধিও প্রবধমান।” এসব এত করে বলছি কেন না এ-ও হ’ল সেই হয়ে-ওঠারই ব্যাপার, দেখছেন তাে? বিশ্বলীলায় এই রূপান্তরের যুগান্তর চলেছে আবহমানকাল—এই স্তরে স্তরে সাজসজ্জা-প্রসাধন- অনুভবের পট-পরিবতন : জড় বাস্তব জীবন থেকে প্রাণধর্মী জীবন, প্রাণধর্মী জীবন থেকে মনােময় জীবন, মনােময় জীবন থেকে অধ্যাত্ম জীবন-ধাপে ধাপে জীব উঠছে চেতনার আরােহণী বেয়ে যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে। কিন্তু হ'লে হবে কি, মানুষের দৃষ্টি স্বভাব-বহির্মুখী, তাই সে সাজসজ্জার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভুল করে ভেবে বসে যে এ-ই বুঝি আসল কথা, বাইরের এই সব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপীঠ কুচকাওয়াজের ধুমধাড়াক্কার দরুণই বুঝি মানুষ বদলাচ্ছে। কিন্তু তা হয় না—বলছেন শ্রীঅরবিন্দ—কেননা অরবিন্দ প্রসঙ্গে বাইরের তােড়জোড় বদলে মানুষের অন্তর চেতনার রূপান্তর হতে পারে না—এর জন্যে চাই অধ্যাত্ম-শক্তির আবাহন-আত্মিক চিৎপদ্মের মুঞ্জরণ। কেন না আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ যদি না হয় তাহলে তার সত্তার কোনো গভীর স্থায়ী রূপান্তর হ'তেই পারে না। তাই তার life Divine-এ যুগৰ্ষি আমাদেরকে দিয়েছেন সেই দীক্ষা যা মানব প্রকৃতিকে দিব্য প্রকৃতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এ-রূপান্তর না ঘটলে—বলছেন তিনি—মানব-জীবনের বা সমাজের কোনাে স্থায়ী উন্নতি চাওয়াটাই হয়ে দাড়ায় অযৌক্তিক 5500 wat 1177 : "For to hope for a true change of human life without a change of human nature is an irrational and inspiritual proposition ; it is to ask for something unnatural and unreal, an impossible miracle.” ওদেশে এই জনশ্রুতি বহুদিন ধরে র’টে আসছে বটে যে শিক্ষায় হতেপারে চতুর্বর্গ লাভ কিন্তু শ্রীঅরবিন্দ বলছেন যে তাও হবার নয়—কেন না “মানুষ মনে মনে যত আশাই কেন না পোষণ করে থাকুক-কার্যক্ষেত্রে এসে সে ঠেকে ও ঠ’কে শিখেছে যে শুধু শিক্ষা ও বুদ্ধির প্রসাধনের জোরে পারে না নিজের ভোল বদল করতে--এসবের ফলে শুধু তার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আত্মাভিমান খবর রাখে বেশি আর আত্মপ্রতি- ঠার তরফে হাতের কাছে জোরালাে যন্ত্রপাতি পায় বেশি--কিন্তু তার মানবিক অহংকারের কোনাে পরিবর্তনই হয় না।” (১১৬৬ পৃষ্ঠা) কাজেই দেখছেন যে হয়ে-ওঠা যে আসল কথা এটা অন্য নানা দিক থেকে ভাবলেও সঙ্গতই মনে হয়, যদিও নিছক
জ্ঞানী
যুক্তি দিয়ে এ হয়ে-ওঠার অর্গঢ় রহস্যের দিশা মেলে
পুরােপুরি।
কিন্তু তবু যুগে যুগে জীব চেয়েছে এই আত্মরূপান্তরই বটে।
জালালুদ্দিন রুমির একটি বিখ্যাত কবিতা উদ্ধত ক'রেই আজ ইতি
টানব : লক্ষ্য করবে যে এখানে কবি ও মনীষী উভয়েরই বণী দীক্ষা
ও দৃষ্টি একই :-
ধাতুর জীবন ত্যজি’ জাগিলাম সবুজের শোভাযাত্রা,
শ্যামল-কান্তি বিদায়ে বিহগ-জীবনে জনম মিলেছে।
লভেছি চেতন ধীরে ধীরে নর-জীবনের প্রেমবতিয় :
তবে কেন ডরি?-মৃত্যু বিকাশে মাের কবে বাধা দিয়েছে ?
তবু অারবার এ-মাের ধন্য মানবের দেই মরণে
হব দেবদূত-সাপী ; পরে যাব তারাে সীমান্ত রিয়া
অামি অনন্ত-উধাও পান্থ—চিরন্তনের চরণে
আপনা হারায়ে হব চিন্তায় অচিন্ত্য লীলা বরিয়া।
No text on this page.
প্রেমী নী প্রমোদ কুমার সেন করকমলেষু, আপনার “শ্রীঅরবিন্দ” বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল বিখ্যাত ফরাসি চিন্তানায়ক পল ভালেরির একটি সুন্দর কথা। কথাটি তিনি লিখেছিলেন একটি চৈনিক লেখকের বইয়ের ভূমিকায় : "Elle me fait songer a l'aurore, an phenoinane rose qui, par ses tendres nuances, insinuc et annonce l'immense evenement de la naissance d'un jour.” “বইটি তােমার দেয় করিয়ে মনে উষার কথা নরম সােনার প্রথম জাগরণে, রবির উদয় হয় নি যখন আকাশে জাগে যে-সব রঙ অচিনের আভাষে : অনাগতের আবাহনের সুর ধরে চারণী দীপ্তদিনের জন্মযুগের গাইতে আগমনী।” আপনার বইটি পড়তে পড়তে সত্যিই আমার আমার মনে হয়েছে একথা : মনে হয়েছে যে, এ-বইটির সুর হ’ল চারণীর সুর, আগমনীর সুর---আর সে-আগমনী এমন একজন যুগাবতারের যার প্রেমের জ্ঞানের কর্মের আলাের পথ চেয়ে রয়েছে মানুষ অনেকদিন ধরে। কিন্তু হলে হবে কি, এ-যুগ হ’ল আসলে বৈশ্যযুগ— যার আৰ- হাওয়ায় সবচেয়ে বেশি কাটে দুরকম বই : চটকদার ও সাময়িক শ্ৰীঅরবিন প্রসঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক। কেন না এই দ্বিবিধ বইয়েরই বাজার-দর বেশি। তাই শোনা যায় প্রায়ই অমুক অমুক বইয়ের কাটতি হ’ল অসম্ভব কিন্তু ঐ একটি ঋতুর মধ্যে। সীস বদলাতে না বদলাতে ফুল শুধু যে নিষ্প্রভ হয়ে গেল তাই নয়-ব’রে গেল চিরদিনের মতনই। কিংবা এদের উপমা দেওয়া যেতে পারে সেই শ্রেণীর প্রজাপতিদের সঙ্গে যারা ঝম করে চমকে দেয় বটে—কেবল একটি বেলার জন্যে। কিন্তু দুর্দিনের বুকেই সুদিনের পূর্বাভাষ। ভালােরির কথা সত্য : দীপ্ত দিন আগে জানান দেয় “নরম সোনার প্রথম জাগরণে।” আপনার বইটি পড়তে পড়তে একথা উপলব্ধি করা যায় যেন নতুন করে : আরাে আনন্দ হয় ভাবতে যে এ-যুগেও এমন বই কালেভদ্রে বেরােয় যাদের উদ্দেশ্য নয় কোনো ঋতুরঞ্জন করেই ক্ষান্ত থাকা, যাদের উদ্ভব হৃদয়ের গভীর আনন্দ শ্রদ্ধার উৎসমূলে । এ শ্রেণীর বই ক্ষণজীবী নয়। এদের কাটতি কম হতে পারে কিন্তু আবেদন দীঘজীবী। এদের সম্বন্ধেই মনে পড়ে গীতার উধ্ব মূল অধশাখ” বনস্পতির কথা- স্বপন-নভে উৎস যার—ধরণীতলে আনে অলকা-আলো-করুণা ভালােবাসার কলতানে। আপনার বই এই জাতের। তাই মনে ভরসা হয় এ বই লেখার জন্যে আপনাকে তারা অন্তত অভিননন করবে যারা এখনও বিশ্বাস করে যে মানুষের সর্বোচ্চ বিকাশ হ’ল ঐ ঊধমূল অধংশাখ অশ্বথের মতন : জীবনের প্রতি মহৎ বিকাশের মূলাধার মাটিতে হলেও তার প্রেরণা নামে আকাশ থেকেই। তাই তাে বলছিলাম :
প্রেমী এ-বইটি বিশেষ করেই সময়ােপযােগী হয়েছে আজকের দিনে যখন সব চিরন্তন সত্যসাধনা গগনতৃষা শিখরস্বপ্ন শুধু অনাদৃত নয়- উপহসিত, যখন ব্যঙ্গের পিঙ্গল শরজালে সব বড় সাধনা তপস্থা নিষ্ঠার বরাগই লুপ্তপ্রা—যখন হিংসার কুরুক্ষেত্রে প্রেমের, মৈত্রীর, ত্যাগের বাণীকে অলীক বলেই মনে হয় শতকরা নিরানব্বই জন মানুষের কাছে। মনে পড়ে এক বান্ধবীর কথা। সে আজ সতেরাে বছরের কথা—প্রাগে তখন আমি তার অতিথি। তিনি কাউন্টে দুহিতা-কিন্তু আদর্শবাদী ছিলেন স্বভাবে : তাই বিবাহ করেছিলেন এক দরিদ্র সৈনিককে। বলেছিলেন আমাকে : “দিলীপ । য়ুরােপের বাইরের সাজসজ্জা দেখে আজ তােমাদের অনেকেরই চোখ ধাঁধিয়ে গেছে হয়ত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে য়ুরােপ যে কী অসুখী জানাে না। আমাদের শৈশবেও গুরুজনেরা আমাদের মনের মাটিতে এমন অনেক বিশ্বাসের আবাদ করতে পেরেছিলেন যার ফসল ফলেছিল পরে আমাদের যৌবনে। কারণ, এসব বিশ্বাসে তাদের যে-আস্থা ছিল, যে-নির্ভর ছিল, তার অনামা ভরসা আমাদের মনে চারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের অবস্থা কী একবার কল্পনা করতে চেষ্টা করাে। আমরা আজ যেন কোনাে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না আর। ঈশ্বর পরলােক স্বর্গ এসব তত বরখাস্ত হয়ে গেছে কবে। কিন্তু তাতেও খেদ থাকত না যদি ওদের এমন কোনাে বদলি পেতাম যার কোলে অন্তরাত্মা আশ্রয় পায়। আমাদের বিশ্বাসের বনেদে ধরেছে ফাটল। এখন দাড়াই কোথায় বলাে দেখি ?” আমি (ঠাট্টার উদ্দেশ্যে নয় প্রথম যৌবনের সরল উৎসাহেই) অরবিন্দ প্রসঙ্গে বলেছিলাম : “কেন ? আপনাদের কল্পতরু বিজ্ঞানের বৈকুণ্ঠে ভর করে ?” উত্তরে তিনি ম্লান হেসে বলেছিলেন : “বিজ্ঞান দিয়েছে আমাদের অনেক কিছু মানি। কিন্তু যতই তার গুণ গাও না কেন, বিজ্ঞানের এলাকা বৈকুণ্ঠ নয়—মাটিই বটে। মানুষ মাটি বিনা বাঁচতে পারে না এ-ও সত্য, কিন্তু মাটি যার সর্বস্ব তার অখের মাটি। বিজ্ঞান যতই জ্ঞান জ্ঞান করে উচ্ছসিত হয়ে উঠুক না কেন—এ-জ্ঞান পরম জ্ঞান নয়, হতে পারে না, কেন না ওর পথের পাথেয় হ’ল ইহসর্বস্বতা। কিন্তু Man does not live by bread alonc ( মানুষ অন্নসর্বস্ব নয় ) খৃষ্টদেবের একথার মার নেই।” অনস্বীকার্য, সন্দেহ কি ? কিন্তু হলে হবে কি, এযুগে এহেন কথা বলতে সাহস পান যে দু'চারজন বরেণ্য মানুষ তারা সংখ্যায় এত কম যে ইহ- সতার বিরুদ্ধে দাড়াতে পারছেন না কিছুতেই। পারবেন কী করে? অতীন্দ্রিয়ের তপস্যা তাে দূরের কথা, অন্তরের শাশ্বত চিরস্বীকৃত ব্যাপক উপলব্ধিদের মধ্যেও কয়টি আজও আদৃত বলুন দেখি ? অত কথায় কাজ কি, সদা সত্য কথা বলা উচিত এ রাজি- নামায় সই দিতে ক’জন রাজি? সম্প্রতি পড়ছিলাম পােলাণ্ডের সেদিন- কার অধিনায়ক পিলসুডস্কির কথা। রাজসভায় তিনি অস্বীকার করেন শত্রুপক্ষের কোনাে রটনা, বলেন এসব মিথ্যা রটাচ্ছে শুধু পােলাণ্ডের শত্রুরা। কিছুদিন বাদে তিনিও পােলাণ্ডের অধিনায়কত্ব ত্যাগ করেন। তারপর সেই সভাতে গিয়েই নিলজ্জ দম্ভের সুরে বলেন: “বন্ধুগণ ! সেদিন আমি মিথ্যা বলেছিলাম, কেন না সেদিন ছিলাম আমি দেশের প্রতিনিধি-সমষ্টির হিতসাধন যার মন্ত্র। কিন্তু আজ প্রেমী আমি একটি সাধারণ নাগরিক, কাজেই সত্য বলতে পারি আমাদের বিরুদ্ধে যে কথা রটেছিল তা মিথ্যা ছিল না, আমার প্রতিবাদটাই ছিল মিথ্যা। * অর্থাৎ থিওরিতে সত্যকে যতই বড়ে! বলাে না কেন কার্যক্ষেত্রে উনি হলেন অচল টাকা আর কি। এ-ক্ষেত্রে লক্ষ্য করবেন এ-ধরণের কথার পিছনকার ‘সিনিক মনােবৃত্তি। এ-বৃত্তি আজ কত ব্যাপক কত পিৰল সেটা দেখাতে য়ুরােপের একজন মস্ত মানুষের আত্মজীবনীর কথা পাড়ি। আরাে এইজন্যে যে এ বইটি যেন আরাে উজ্জ্বল করে দেখায়, কিছুদিন আগেও কী ধরণের প্রশ্ন জাগত য়ুরোপের শ্রেষ্ঠ মনে। এই ধরণের মনই আজ বিরল হয়ে আসছে, বলেছিলেন বান্ধবী। বইটি হল হ্যাভেলক এলিসের। আপনি জানেন তিনি শুধু একজন মস্ত যৌনতাত্ত্বিক পণ্ডিতই ছিলেন না—ছিলেন ওদেশের একজন মস্ত মানুষ—মনষী, শিল্পী, প্রেমিক। ইনি সেদিন মারা গেছেন। তারপরে এর লেখা আত্মজীবনী বেরােয় যেটি ইনি সমাপ্ত করে রেখে গিয়েছিলেন। ইনি বলছেন বইটির ভূমিকায় : অজ বার্ধক্যের উপান্তে এসে আমি না-চাইতে পাচ্ছি যে-প্রীতি, ভক্তি, পূজা তাতে আমার মাথা নুয়ে পড়েছে শুধু দীনতায় নয়—এ-গরিমার শঙ্কায়। বহু নিষ্ফলতার ভিত্তির উপরেই * "Gentlemen," he said, "the other day I lied to you. I was a public character and I had to lie. Now I am a private indivi. dual and I can tell you the truth. I did engineer the Vilna coup. Gentlemen, good morning !" ( Chapter 32, Inside Europe-Gunther ) শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে সাফল্যের সৌধ গড়ে ওঠে। তার কাছে পরাভব কোথায় যে পরাভবকে অমলই দিল না ? প্রেম ও সরলতার সম্পদ হৃদয়ে বরণ করে চললে এ-জীবনের যা-কিছু ছোও না কেন দেখবে ভাস্বর সুষমায় ঝলকে উঠল।” ব'লে শেযটায় লিখছেন : “I have been a dreainer and an artist, a great dreamer-for that is easy, not a great artist--for that is hard, but still always an artist, whether in the minor art of writing, or the greater art of comprehending, or the supreme art of living, wherein it is something to have tried even if onc fails. So that if I am often sad-for the art of living is finally the art of loving in which one becomes a master too late--I am always content. For I have always been instinctively attracted to what is difficult, even in iny relations with those I have loved." (“আমি চিরদিনই স্বপনী তথা আটিষ্ট—হয় লেখার মত ছােট অর্টে, নয় বােঝার বা বঁাচার মত বড় আর্টে, যে-রাজ্যে ব্যর্থ হলেও চেষ্টা সার্থক। তাই যদিও অনেক সময়েই আমার মন বিবাদে ছেয়ে আসে—কেন না বাচার আর্ট খতিয়ে দাড়ায় প্রেমেরই আট যার অধিকারী হয় মানুষ সবশেষে—তবু আমি কখনই বলি না নিজেকে অকৃতার্থ। কারণ আমার প্রকৃতির চিরকালের ঝোঁক দুরায়ত্তের দিকে—এমন কি যাদের আমি ভালােবেসেছি তাদের সঙ্গে আদান-প্রদানেও।”
হঠাৎ একথাগুলি উদ্ধত করলাম এই জন্যে যে এই art of loving আজ শুধু য়ুরোপে নয় জগতের সর্বত্রই হয়ে উঠছে “দুরায়ত্ত”। হওয়ার একটা কারণ এই যে সত্যিকার প্রেম মুখে বলা যত সহজ জীবনে উপলব্ধি করা ঠিক তত সহজ নয়। সহজ হত যদি না মানুষ আজো অন্ধভাবে বলত, যদি সে আত্মবিকাশের জন্যে সচেতন ভাবে উধ্বশক্তির কাছে হাত পাততে শিখত। কিন্তু মানুষ এযুগে বড় বেশি বহির্মুখী, বড় বেশি হাত পাতে বাইরের কাছে-সঘের কাছে, সমাজের কাছে, যুথবদ্ধ মানুষের মুগ্ধ’লুব্ধ মনের বিধিবিধানের কাছে। তাই যেটুকু আলাে তার অন্তরে ফুটতে চাইছে, ম্লান হয়ে আসছে অন্তরের খোরাক না পেয়ে। আমার ঐ বান্ধবী একথাটি সুন্দর করে বলেছেন সম্প্রতি তাঁর একটি দীর্ঘপত্রে, এই কুরুক্ষেত্র বাধবার কয়েক মাস আগে। লিখছেন তিনি ; “অনেকে বলেন যে এখনকার মন্ত্র হল—প্রত্যেকের সামনে যে-কর্তব্য রয়েছে করা (৫ue chaen fasse pour le mieux ৪on travail) প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজ করে নিজের নিজের বিবেককে মেনে সমাজের ঋণ শুধুক (Que chacun s'acquitte consciencicusement de sa tache ). f 'c97 হবে কি, এ ভাবের বাণী আমাদের মনকে সেই সব ভ্রান্তিবিলাস থেকে মুক্তি দিতে অক্ষম যারা আমাদের অভ্যাসে, কর্মে, স্বভাবে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। তাই তো এত চোখে পড়ে আমাদের বিবেকের দৈনন্দিন পঙ্গুতা, অথচ অন্ধের মতন গড্ডালিকা-প্রবাহে ৭১ অরবিন্দ প্রসঙ্গে গা ভাসান দিয়ে আমরা মনকে প্রবােধ দিই যে, কর্তব্য করা হচ্ছে যথাযথ !” আক্ষেপটি মনে আরো বেজে ওঠে আপনার বইটির প্রসঙ্গে কারণ আপনার লেখায় আপনি নানাভাবেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন এই ট্রাজিডির কথা বিশেষ করে সপ্তদশ অধ্যায়ে যেখানে আপনি অরবিনের নির্ণীত সভ্যতার বিবর্তন ধারার কথা বলেছেন। এইজন্যেই আরাে মনে হয় আপনার বইটির আবির্ভাব হয়েছে যথা সময়ে। আরো একটি কারণে আপনার বইটি আমার ভালাে লেগেছে। সেটি হচ্ছে এই যে বােধকরি এ-যুগে আপনিই সর্বপ্রথম খানিকটা চেষ্টা করেছেন শ্রীঅরবিন্দের যােগারূঢ় সিংহাসনের মহিমা আঁকতে তঁার সমগ্র জীবনের পটভূমিকায়। কথাটা একটু খুলে বল মন্দ নয়। অনেক দিন আগে দেখতাম—যে-কথা ‘তীর্থঙ্করে’ বলবার চেষ্টা করেছি, যদিও সংক্ষেপে লিখতে হয়েছে বলে হয়ত ঠিক মতন বলা হয় নিশ্ৰীঅরবিন্দকে আমার বন্ধুরা প্রায় সবাই শ্রদ্ধা করতেন জাতীয়তার পুরােহিত হিসেবে। কিন্তু তাঁর যােগিরূপকে বেশি শ্রদ্ধা করতে দেখেছিলাম মাত্র একজন বন্ধুকে : সে বিদেশী—কৃষ্ণ- প্রেম ওরফে রােনাল্ড নিক্সন। গত কয় বছরে বাংলাদেশে আমাকে কয়েকবার ফিরতে হয়েছিল আপনি জানেন। এখন হাওয়া একটু ফিরেছে এ-ও চোখে পড়েছিল—অন্তত দু’চারজনও ততা ভাবতে সুরু করেছেন শ্রীঅরবিন্দের যােগটা কি বস্তু—পেতে শােয়, না গায়ে দেয়? কিন্তু এমন বন্ধু খুব কমই পেয়েছি যিনি প্রেমী সত্যি ধরেছেন শ্রীঅরবিন্দের অমৃতসাধনার গুহ মহিমা। তাই আপনার বইটিতে আপনি যে অন্তত উল্লেখ করেছেন এ-মহিমার কথা—যে-মহিমার স্থান তার বিকাশের শিখরলােকে—এজন্যে আপনাকে সাধুবাদ দিতেই হয়। কেন না শ্রীঅরবিন্দকে কবি, বিদ্বান, চারণ এমন কি দার্শনিক বলে সম্মান করাটাও আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। শ্রীমাও একদিন বলেছিলেন একথা যে শ্ৰীঅরবিন্দকে বুঝতে হলে তার কৃতিত্বের বিচারই যথেষ্ট নয়-- সব আগে চাই আধ্যাত্মিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াইলে তাকে আমরা শুধু যে অবান্তর কারণে বড় বলব তাই নয়-বড় করতে গিয়েই করব ছোট। কথাটা গভীর—যদিও এ বস্তুতান্ত্রিক বিজ্ঞানের যুগে আধ্যাত্মিক চেতনার গুণগান করাটা দু:সাহসিক হয়ে উঠেছে। তবু বলতেই হবে যে চেতনার ক্রমবিকাশ মানসলােকেই সমাপ্ত হয় নিহ’তে পারে না, কেন না অধ্যাত্মিক চেতনাই হ’ল মানুষের মুকুটমণি, যোগব্ধ অমৃত-পাথেয়। আমাদের বুদ্ধিবাদী বন্ধুদের অধিকাংশ অবশ্যই এ-কথার প্রতি- বাদ করবেন। তাঁদের কাছে বরেণ্য হ’ল মানস চিন্তার উপাসকেরা —‘ইনটেলেকচুয়াল’ যাদের নাম। কিন্তু মনকেও আমাদের ঋষিরা বলতেন ইন্দ্রিয়—যেহেতু সেও আত্মপ্রতিষ্ঠ নয়—অনেক কিছুর বাহন। মনে আছে, শ্রীঅরবিন্দের কাছে এসে প্রথম প্রথম কেবলই ঘা খেতে হত—কেন না বুদ্ধির অহংকার হ’ল-মরিয়া না মরে রাম বার বার ঠেকবে তবু শিখবে না—ছুটবে অনধিকার চর্চায়। আপনার বইটির নানা স্থানে ইঙ্গিত আছে মানস আললা কেন আমাদের শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে কেন খানিকদূর এগিয়ে দেবার পরে আর এগিয়ে দিতে পারে না। এখন বুদ্ধিকে ক্রমশ মানতেই হবে যে, তার সাম্রাজ্যও চালায় বুদ্ধির উপরওয়ালা কোনো শক্তি। আর মানতে হবে বলেই শ্রীঅরবিন্দকে দার্শনিক ব’লে শ্রদ্ধা জানানােটাও সর্বতােভাবে অসম্পূর্ণ, একদেশ- দশী—যেহেতু তার মূলমন্ত্র তত দার্শনিক নয়—আধ্যাত্মিক ও মান- তীত। এ আধ্যাত্মিক-অতিমানস দৃষ্টিভঙ্গি বলতে তিনি কী বােঝেন সেটা প্রাঞ্জল করে বােঝানাে সহজ নয় এইজন্যে যে এ-যুগের অধিকাংশই ( বিশেষ করে বুদ্ধিবাদীরা) শ্ৰীঅরবিন্দের ভাষায় : "We e are blind with our pride and the pomp of our passions, We are bound in our thoughts where we hold ourselves free. মােদের মত্ত গরব আড়ম্বরে মুগ্ধ দু নয়ন বধি চিন্তা সসীম দিয়ে মােরা মুক্ত আপনায়। আরাে একটা কারণে আপনার বইটি আদরণীয় হবে তাদের কাছে যারা বুদ্ধির অকৃতাৰ্থ জোনকিপনায় তুষ্ট নন। আপনি নানা স্থানেই আভাষ দিয়েছেন যে শ্রীঅরবিন্দ তথাকথিত “intellectual” নন—এমন কি দার্শনিকও না। শ্রীঅরবিন্দ আমাকে নিজেই ঈষদ্ধান্য করে একটি পত্রে লিখেছিলেন : “I never never never was a philosopher”, একথার মানে নয় অবশ্য যে, শ্রীঅরবিন্দ ফিল- সফির বেসাতি করেন নি। ( নিছক ফিলসফির জন্যেই যাদের ক্ষুধা, তার দর্শনে তাদেরও ভূরি-ভােজের ব্যবস্থা রয়েছে অঢেল ) ৭ প্রেমী একথার মানে এই যে, শ্ৰীঅরবিন্দের কেন্দ্রীয় চেতনা এই সব তথাকথিত বুদ্ধিবিচারের বিতণ্ডালােকে সংবদ্ধ নয়—তার দৃষ্টি প্রসারিত এ-সবের বহু ঊর্ধ্বে, তাই তিনি তার ফিলসফিরও প্রেরণা। পেয়েছেন বুদ্ধির চেয়ে ঢের উধ্বলােক থেকে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই বহু লােকের কাছে আপনার বইটি শুধু ব্যর্থ নয়—প্রায় অর্থহীনের সামিল মনে হবে : অর্থাৎ তাদের কাছে যারা (পরমহংসদেবের ভাষায়) পােয়াটেক মনের বাটিতে মাপতে যান মণখানেক দুধ। এই ধরণের বুদ্ধিবাদীরা কেমন করে বুঝবেন বলুন যে, শ্রীঅরবিনের উপাস্য হ’ল সেই জ্ঞান, সেই সন্তা, সেই আদর্শ যা মনের বুদ্ধির নাগালের বাইরে তাে বটেই কল্পনারও বাইরে। কেমন করে মেনে নেবেন যে তাকে বুঝবার কোনাে বুদ্ধিগ্রাহ্য ইন্দ্রিয়- স্বচ্ছন্দ পথই নেই—কেবল একটিমাত্র পথ আছে—ক্রমাগত বার বার নানাসুত্রে উপলব্ধি করা কেন, কি কারণে, মনের কোন্ কোন্ অন্ধকারের দরুন তার অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের মহত্ত্ব আমাদের চোখে পড়ে না। উপনিষদ বলেছে ; “যস্যামতং তস্যমতং মতং যস্য ন বেদ স”—অর্থাৎ যে ভাবে তাকে জেনেছে সেই জানল না, যে জেনেছে যে সে জানে নি সে তবু কতক জানল। শ্রীঅরবিন্দের মহিমা সম্বন্ধেও একথা স্বীকার করা অসম্ভব হবে না যদি আমরা নম্রভাবে এটুকু উপলব্ধি করার কিনারায় আসি যে, চেতনার যে-দীপ্তলােকে তার বসবাস সে লােকের কোনাে খোঁজ খবরই আমরা রাখি না। শ্রীঅরবিন্দকে জানা আমাদের পক্ষে অসম্ভব একথা আপনার বইটির ছত্রে ছত্রে পরিস্ফুট হয়েছে। এই জন্যেই বইটি আমার ৭৫ শ্রীঅরবিন প্রসঙ্গে আরাে ভালাে লেগেছে। আপনি ভূমিকায় ঠিকই বলেছেন : “এক তিনিই তাহার কথা বলিতে পারেন।” কিন্তু তবু আমি বলব যে আপনার বইটির দরকার ছিল। কী তুচ্ছতার কলঙ্ক যে আমরা সগৌরবে দিনের পর দিন বয়ে বেড়াই : রােগে কেঁদে মরি, শশাকে নুয়ে পড়ি, বিরহে ব্যথিয়ে উঠি, নিরাশায় ধুলােয় লুটাই, পদে পদে ভয় কার্পণ্য লালসাকে আঁকড়ে চলি অথচ মুখে বলি—আমরা জনে জনে সত্যের চরম সাধক, অমৃতের পরম পূজারী—এসবই আপনার বইটির পাতায় পাতায় আরাে আলাে করে ফুটে উঠেছে শ্ৰীঅরবিন্দের চরিত্রের দীপ্যমান পটভূমিকায়। তার ত্যাগ, নির্ভীকতা, ভাগবত-ভাবুকতার পাশে আমাদের স্বার্থ, শঙ্কা, একান্ত ঐহিকতার ছবি যেন আরও ধিক্কার দিতে থাকে আমাদের তামসিকতাকে। কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের জীবনের উজ্জ্বলতার এ পরম রূপ ফুটল কোথায় এইটে জান৷ সবচেয়ে কঠিন বলেই জীবনীকারের দায়িত্ব আরাে বেশি এইটে দেখিয়ে দেওযার। রাম শ্যাম যদু হরি হৈ চৈ করতে পারে ছােটকে বড়র মূল্য দিয়ে, বলতে পারে দেশভক্ত শ্রীঅরবিন্দই হচ্ছেন তার ব্যক্তিরূপের পূর্ণতম মহত্তম অভিব্যক্তি, কিন্তু জীবনীকারকে ভাঙতেই হবে স্বল্পদৃষ্টি মানুষের এ-ঠিকে-ভুল। তাকে দেখাতেই হবে যে শ্রীঅরবিন্দের মহত্ত্ব তার দেশাত্মবােধে অঙ্কুরিত হলেও প্রস্ফুটিত হয়েছে পরে—তাঁর যােগজীবনে। কারণ একথা মানলে শ্রীঅরবিনের মহত্তম মহিমাই ঝাপসা থেকে যাবে—তাঁর পরমতম বাণীই থেকে যাবে অনাদৃত। অথচ এযুগে সাধারণ প্রেমী বাঙালির (তথা ভারতীয়ের) এই দিগ্ভ্রমই ঘটেছে। ঘটবেই, কেন সংসারে সাড়ে পনের অনি। মানুষ যখন বহিমু যী তখন সবার কাছে কী করে পরিবেশন করা যাবে অন্তর্মুখিতার আনন্দ- সম্পদ ? শুধু ভাষার অক্ষমতাই তাে নয়, ধারণাশক্তির দুর্বলতা যে ঢের বেশি ব্যাপক, আর ব্যাপক বলেই না সাংঘাতিক! তবু জীবনের মহিমা দুর্বোধ্য। কখন যে কোন্ ছোওয়ায় মনের প্রাণের অন্তরের কোন্ পরীমহল খুলে গিয়ে উদঘাটিত করে অনন্ত সৌন্দর্যের দৃশ্য কেউ কি জানে? তাই পরমহংসদেব বলতেন ভালাে কথা না বুঝলেও শুনে রাখা ভালাে, পরে কাজ হয় সময়ে, যেমন এক বাড়ির কার্নিশে বীজ উড়ে পড়েছিল, অনেকদিন বাদে বাড়িটি পড়ে গেল, তখন সেই বীজ হ’ল বনস্পতি। সত্য। ভালাে কথা যে আলাের সংঘাত, তার ফলে কোথাও না কোথাও আমাদের অজ্ঞাতে স্পন্দন না জেগে পারে? অবশ্য এ ধাক্কার ফলে গভীরে যে-সব নড়চড় হয় তার হদিশ সব সময়ে তখনি তখনি মেলে না কিন্তু পরে যখন হঠাৎ একদিন আসে বিপ্লবের ওলট পালট, দুর্যোগের বিপর্যয়, তখন এ আলাের আবেগও সঞ্চিত জলপ্রপাতের মতন বাঁধ ভেঙে সক্রিয় হয় আচম্বিতে। এই জন্যে সব দেশেই আধ্যাত্মিকতার একটা মস্ত কথা হ’ল যাকে আমরা বলি ‘আপ্তবাক্য, গ্রীকরা বলতেন Logos, খৃষ্টানরা বলেন ‘the Word’--আর তার চেয়েও বড় কথা—সাধুসঙ্গ। সাধুসঙ্গ বলতে সব সময়ে সাধু-সান্নিধ্য বােঝায় না—বােঝয় ভক্তির প্রণালী দিয়ে তার সঙ্গে যােগ। আপনার বইটির মধ্যে দিয়ে এই যােগ আরাে 11
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
সহজে হয়, কেন না শ্ৰীঅরবিন্দের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা অকৃত্রিম।
"He who would make us feel must feel it most."-
কোনাে ভাব চারিয়ে দিতে পারে সে-ই, যে সে ভাবের ভাবুক :
জীবনের প্রতি পদেই মেলে একথার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। তাই তাে
আপনার ভক্তিশ্রদ্ধার আবেশে জাগে ভক্তি শ্রদ্ধা, যেমন প্রাণের
আবেগে জাগে প্রাণাবেগ, গতির আবেগে—গতিনৃত্য।
কেবল একটা কথা আমার সময়ে সময়ে মনে হয়—যদিও এর
কোনাে চারা নেই যে, আপনার বইটি যেমন অনেককে, গভীর
আনন্দ দেবে, তেমনি অনেককে উত্যক্ত করে তুলবে—বিশেষ
করে তাদেরকে যারা চেতনার উধ্ব লােকে ওঠার সাধনা না
করেই বুঝতে চাইবেন তার তত্ত্ব, করতে ছুটবেন তার যাচাই।
এ-সূত্রে একটা কথা মনে হল।
আমার মনে আছে একবার আপনি আমাকে একটি পত্রে
প্রশ্ন করেছিলেন—শ্রীঅরবিন্দের অপূর্ব করুণাকে মৈত্রীকে প্রেমকেও
কেন লােকে এত ভুল বােঝে—কেন এত বেশি লােকে অকারণে
তাঁর সাধনার বিরােধী, আশ্রমের নিন্দাবাদী ?
এর মানে আছে। আমাদের প্রত্যেকেরই মধ্যে দেবতার
সঙ্গে দানবও আছে, শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবদ্রোহিতাকম আর বেশি।
যাদের মধ্যে দেবভাব বেশি—অর্থাৎ যারা সাত্ত্বিক প্রকৃতির মানুষ
তাঁরা বেশি সহজে গ্রহণ করতে পারেন নিষ্কামনার বাণী, নিতে
পারেন এ-নিরভিমান প্রণতির দীক্ষা। কিন্তু এ-প্রকৃতির লােক
তাে সুলভ নয়। বিশেষত এযুগে-যখন অধিকাংশের মধ্যেই
৭
প্রেমী আনুগত্যের চেয়ে ঔদ্ধত্যই বেশি প্রবল। এ-ঔদ্ধত্য, এ-দেব- দ্রোহিতা পাশ্চাত্য শিক্ষায় আরাে ব্যাপক হয়েছে, যার ফলে এমন কি বুদ্ধিজগতের বালখিল্যদের মধ্যেও দেখেছি প্রশ্নহীন আত্মতুষ্ট অন্ধ অহমিকা অথচ তারা একে অহমিকা বলে চিনতেই শিখল না, ভাবল—সত্যনিষ্ঠা। এরা পদে পদে চায় নিজেদের তুচ্ছতার রাজ্যকে—আঁধারের অন্ধকূপকে আলাের আক্রমণ থেকে আগলে রাখতে। ভােগে যারা আসক্ত তারাই ত্যাগের কথায় ডরিয়ে ওঠে—যা বুঝি না তা যে বােধগম্য বস্তুর চেয়েও বড় একথা স্বীকার করতে বাজবে না ? তাছাড়া দেখবেন সাধারণত আমাদের এই দেবদ্রোহিতার পিছনে থাকে একটা আত্মরক্ষার ভাব-self-preservation জাতীয় ত্রস্ত মনােভঙ্গি। থাকবে না কেন বলুন? আঁধারে বাস করে করে সেই আঁধারই যাদের আত্মীয় হয়ে এসেছে—হঠাৎ অনভ্যস্ত সত্যের অনাত্মীয় আলাে দেখলে তারা যে “ভাবে একী বিষম কাণ্ডখানা! সংঘাতে তার ওঠে ওরা রেগে শয়ন ছেড়ে আসে ছুটে বেগে সেই সুযােগে ঘুমের থেকে জেগে লাগে লড়াই মিথ্যা এবং সচায়।” এই জাতীয় সব আঁধার শক্তিসৈন্যদেরকেই শ্রীঅরবিন্দ নাম দিয়েছেন hostile forcess ( মার বা আসুরশক্তি)। অসুর বলতে দশানন কুম্ভকর্ণ বা শুম্ভনিশুম্ভদেরকে বােঝায় না, বােঝায় ৭১ অবিল প্রসঙ্গে দেবদ্রোহী মিথ্যা-শক্তির চক্রীদেরকে। বলেছি, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে এই সব চক্রীর চক্রান্ত—কেবল কম আর বেশি। কিন্তু যাদের মধ্যে এদের সংখ্যাপ্রাধান্য তারা কোথাও দৈবী শক্তি দেখলেই নানা অছিলায় প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে ওরা ভুয়াে-ভ্রান্তি- বিলাস hallucination ইত্যাদি। চরম মাত্রায় এদের রূপ হয় ভয়াবহ—যখন প্রশ্রয় পেতে পেতে এরা হয়ে ওঠে উচণ্ড দানব মেদবৃদ্ধির ভারে হয়ে ওঠে হিংস্র অতিকায় রাক্ষস, ঘাতক। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি না করে যখন এরা ছদ্মবেশে হানা দেয় তখন এরা প্রকৃতপক্ষে আরাে বিপজ্জনক হলেও বাইরে থেকে দেখতে ততটা দানবিক হয়ে ওঠে না। কিন্তু সেটা শুধু স্পর্ধার অক্ষমতায় ইচ্ছার অভাবে নয়। পারলে এরা কংসের মতনই প্রতি কৃষ্ণভক্তের হাতে মাথা কাটত, কিন্তু খােলাখুলি অতটা চণ্ডমূর্তি হওয়াও সহজ কথা নয়। কাজেই আধ্যাত্মিক সত্যের মুখখামুখি হলে এরা আশ্রয় নেয় হাজারাে ছলনা বঞ্চনা চাতুরীর—যার একটা ভােল হল যুক্তি। এ-যুক্তি অঘটনঘটনপটীয়সী বামায়ায় প্রমাণ করবার চেষ্টা পায় যে প্রেম মৈত্রী শান্তি বৈরাগ্য অনাসক্তি এরাই ভ্রান্ত, সংসারে সার হ’ল সঞ্চয় সাবধানতা স্বার্থসিদ্ধি গতিবেগ ও উদ্দাম মত্ততা। কাজেই সত্যসাধকগণ যখন তাঁদের দিব্যদৃষ্টিলব্ধ সত্যের স্বরূপ ফলাও করে ধরেন তাঁদের জীবনগ্রন্থে, তখন রুখে ওঠে এই সব অসত্যপন্থী বা অর্ধসত্যপন্থীর দল, বলে । চিরন্তন বাণী সবই মিথ্যা, দেবতা--কুসংস্কার, প্রেম–দুর্বলতা, অনাসক্তি—ইহবিমুখতা, শান্তিসাধনা—জীবনের রণে ভঙ্গ দেওয়া, প্রেমী যার আধুনিক নামকরণ হয়েছে পলায়নী-বৃত্তি-escapism. আরও কত ঘূক্তি ইঙ্গিত ব্যঙ্গ দিয়ে যে এরা শাশ্বত সত্যকে খর্ব করার চেষ্টা করে না জানে কে ? তাই জগতের দিকে চেয়ে মানুষের অন্তরাত্মা আবহমান কাল গেয়ে এসেছে : “বিশ্বময় দুইটি সেনা পরস্পরে রাঙায় চোখ : পুণ্য সেনা নিজের কব্ পাপের সেনা শত্রু হােক।” গীতায়ও বলেছে এই সব অসত্যচমূর কথা : অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপাে জনাঃ। দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগৰলান্বিতাঃ । কর্শয়ন্তঃ শরীরং ভূতগ্রামমচেতসঃ। মাঞ্চৈবান্তঃ শরীরস্থং তান্ ৰিদ্ধাসুরনিশ্চয়ান্। অর্থাৎ, দম্ভ ও অহংকারবশে রিপুচালিত হয়ে যে অল্পবুদ্ধিরা দেহ- ধিষ্ঠিত ভগবানের অমর্যাদা করে মহােদ্যমে শক্তিমদের উপাসনায় তপস্যা করে তাদেরই নাম অসুর জানবে। আজকের দিনে অনেক আত্মম্ভরী রাষ্ট্রনীতিক পেশীবন্ত তথা বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিমন্তদের সঙ্গে গীতােক্ত অসুরদের সংজ্ঞা যে মিলে যায় সেটা আশা করি আপনিও অনুভব করেছেন ? গীতায় বলছে “দৈবাসুর সম্পদ বিভাগ” অধ্যায়ে যে “এই সব অসুরের এ জগৎকে বলে অনীশ্বর কামজ-মিলন-জাত জীবদের লীলাভূমি, চায় শত কামনার পাশবদ্ধ হয়ে কাড়াকাড়ি করে বাঁচতে, অন্যায় উপায়ে অর্থ সঞ্চয় করে কামক্রোধের খেলার পুতুল হয়ে কাল কাটাতে, ঘােষণা করে আজ আমি এই ধন পেয়েছি কাল পাৰ অন্য
শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
অনেক বনকে, অমুক অমুক শত্রুকে বধ করেছি অমুক অমুককে বধ
করলাম ব'লে, কেননা ঈশ্বর তত আমিই, ভােগী সিদ্ধ বলবান্ সুখী
আমি ছাড়া আর কে ? আমার মতন ধনাঢ্য ও কুলীনই বা আর
কোন্ জন ?”
অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বর।
অপরস্পরসতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্ |
গঃ
আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।
ঈহন্তে কামভােগাৰ্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্।
ইদমদ্য ময়া লৰূমিমং প্রান্স্যে মনােরথম্।
ইদমস্তাদমপি মে ভবিষতি পুনধ নম্ ।
অসৌ ময়া হতঃ শহঁনিষ্যে চাপরানপি
ঈশ্বরােহহমহং ভােগী সিদ্ধোহহং বলবান্ সুখী।
আট্যোহভিজনবানশ্মি কোহন্যোহস্তি সদৃশশা ময়া।
এই সব আসুরিক মিথ্যার বাধাদেরকে লক্ষ্য করেই শ্ৰীঅরবিন্দ
আমাকে একবার লিখেছিলেন :
"If I tolerate a little writing about myself, it is
only to have a sufficient counter-weight in that
amorphous chaos, the public mind, to balance the
hostility that is always aroused by the presence of a
new dynamic Truth in this world of Ignorance.
৮২
প্রেমী অর্থাৎ, আমি নিজের সম্বন্ধে যে একটু আধটু লেখালিখি স’য়ে থাকি সেটা শুধু এই জন্যে যে গণমনের মধ্যে কোনাে নবসতত্যর অভ্যুদয়ে বিরুদ্ধতা জেগে ওঠেই, তাই তার উল্টোদিকে একটুখানি আনুকূল্যের শক্তি বজায় রাখা চাই, গণমন যে আসলে একটি বৈশিষ্ট্যহীন বিশৃঙ্খলতার নৈরাজ্য কিনা। কিন্তু হলে হবে কি, বিশৃঙ্খলতার, অরাজকতারও একটা বিষম মাধ্যাকর্ষণ আছে। তাই তাে সত্যসাধকদেরকে সর্বদেশে সর্বকালে আরাে সংঘবদ্ধ হ’তে হ’ল, এমন কি, ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুকেও, বরণ করে তবে সত্যের পথ সুগম করতে হ’ল পরবর্তীদের জন্যে। এই জন্যেই তাে তাদের আঁধার-রাজ্যে তুলতে হ’ল আলােকস্তম্ভ, বহির্মুখী উত্তেজনার কুরুক্ষেত্রে রচতে হ’ল অন্তর্জ্যোতির দুর্গ। একথা শ্রীঅরবিন্দ বড় সুন্দর করে দেখিয়েছেন তাঁর Life Divine-এর উনশেষ অধ্যায়ে (The Gnostic Being ২০৪৫ পৃষ্ঠা) : “In all spiritual living the inner life is the thing of first importance ; the spiritual man lives always within, and in a world of the Ignorance that refuses to change he has to be in a certain sense separate from it and to guard his inner life against the intrusion and influence of the darker forces of the Ignorance : he is out of the world even when he is within it; if he acts upon it, it is from the fortress of his inner spiritual being where in the ininost শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে sanctuary he is one with the Supreme Existence or the soul and God are alone together." অর্থাৎ, “সর্ববিধ অধ্যাত্মজীবনে অন্তৰ্জীবনই হ'ল মুখ্য কথা; আধ্যাত্মিক মানুষ সর্বদা অস্তমুখী জীবনই যাপন করে থাকেন এবং যে-অজ্ঞানের জগৎ চায় না জ্ঞানের রূপান্তর সে-জগতে তাঁকে একরকম একঘরে হয়েই বাস করতে হয় যাতে করে তিনি অজ্ঞানের কৃষ্ণশক্তিমূর অনধিকার প্রবেশ ও প্রভাব থেকে পারেন নিজের অন্তৰ্জীবনকে রক্ষা করতে ; তাই যখন তিনি এজগতের মধ্যে থাকেন তখনও একরকম বাইরে বাইরেই থাকেন বৈকি; যদি এ-জগতে তিনি কাজ করেনও, করতে বাধ্য হন তাঁর অন্তরের অধ্যাত্ম সত্তার দুর্গ থেকে, যেখানে গহনতম মন্দিরে তিনি বিশ্বাত্মার সালােক- লাভে আপ্তকাম, যেখানে জীব ও শিব মুখখামুখি দাড়িয়ে।” শ্রীঅরবিন্দের অন্তর্জীবনের পরম বাণী বুঝতে হলে সব আগে চাই তাঁর সত্যসাধনার এই বাণীটি ধরতে পারা। এর পরেও তাঁর বলবার অনেক কিছুই আছে, করে দেখাবারও। যেমন ধরুন তাঁর অতিমানসতত্ত্বের নানা ব্যাখ্যা—যেখানে তিনি বলছেন যে অতি- মানস শক্তির অবতরণ হলে অধ্যাত্মসাধকদেরকে আর এভাবে নিরালায় থাকতে হবে না—বহির্মুখী জীবনে তারা ঢের বেশি সহজে নিজেদের ঠাই করে নিতে পারবে ইত্যাদি। কিন্তু সেসবের আভাস দেওয়াও এ-ক্ষুদ্র পত্রে সম্ভব নয়। আমার বক্তব্য আজ এই যে শ্রীঅরবিন্দের পরম মহিমা বুঝতে হলে তাঁর অন্তৰ্জীবনকে না জানলেই নয়।
প্রেমী একথা বলছি আবাে এই জন্যে যে তাঁর উধ্বমুখী ও অন্তর্মুখী জীবনে পারমার্থিক সত্য কি ভাবে অনুসৃত হয়েছে আপনি আপনার বইটিতে তার বেশ আভাস দিয়েছেন যদিও এ-আভাস ঈষদাভাসের বেশি হতে পারে না, কেননা তিনি যে-ক্রমবর্ধমান সংঘাতরাজ্যের মুগাবতার হয়েছেন তাঁর অসাধ্য-সাধনার প্রাণ- পণে, সে-সাধনার রহস্য কতটুকু উদঘাটন করা যায় বলুন দুটো ভাষার ব্যাখ্যায় ? তাঁকে পুরােপুরি বােঝা তো দূরের কথা তার বিস্তীর্ণ অলােকরাজ্যের তালিকরবাহী হতে চাইলেও আগে হতে হবে তাঁর ভাবের ভাবুক—তিনি সে-সত্যের জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছেন চাইতে হবে সে-সত্যের আবাহন—চি- সাধনায়, ক্রিয়াকলাপে, যাগযজ্ঞে। এই আত্মোৎসর্গ যত সম্পূর্ণ হবে ততই বােঝা যাবে যে শ্রী অরবিন্দ এ-য়গে শুধু সত্যজ্ঞানশন মূত’ বিগ্রহ নন তিনি প্রেমেরও ভগীরথ হয়ে তপস্যা করেছেন এই নিষ্করুণ নিরালোক বাসনাপঙ্কিল ত্যভূমিতে, প্রেমের আকাশগঙ্গাকেই ডাক দিতে। একথা বলছি 'আরাে এই জন্যে যে শ্রীঅরবিন্দের চরিত্রে জ্ঞানের উজ্জ্বল দিকটা অনেকেরই চোখে পড়ে, কিন্তু তিনি যে প্রেমেরও মূর্ত বিগ্রহ একথা বুঝতে হলে শুধু তাঁর বহির্জীবনের খবর রাখা যথেষ্ট নয়—হ’তে হবে তাঁর অন্তৰ্জীবনের অালােক জিজ্ঞাসু। তাহলেই বুঝতে পারা যাবে- তাঁর দেশাত্মবােধে তাঁর আশ্চর্য ত্যাগ ও প্রেমের যে-প্রতিভাদীপ্তি এক সময়ে সারা ভারতের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল সে-প্রেম কেন পরমতম বিকাশ লাভ করতে পারত না, যদি তিনি দেশ-সেবায়ই ৮৫
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
••
চিরদিন নিমগ্ন থাকতেন অধ্যাত্মসাধনার ডাক না শুনে যদি
তাঁর অতুলনীয় আত্মবিলুপ্তির ভাব না পৌছত পুরুষােত্তমের চরণে,
যাঁর সম্বন্ধে তিনি স্বয়ং লিখেছেন তাঁর অপরূপ “who” কবিতায় :
All music is only the sound of His laughter
All beauty the smile of His passionate bliss
Our lives are His heart-beats ; our rapture the bridal
Of Radha and Krishna, our love is their kiss.
বাজে যেথায় যত গান সবই তার হাসি কলােচ্ছল
সব মাধুরী তার আনন্দেরি স্মিত সম্ভাষণ ;
মােদের জীবন হৃদিম্পন্দন তার, পুলক—সে কেবল
বাসর রাধাশ্যামের, প্রেম আমাদের-তাদেরি চুম্বন।
এক বিজ্ঞ স্কলার কিছুদিন আগে লিখেছিলেন যে শ্রীঅরবিন্দ
জ্ঞানের আলোেকস্তম্ভ হ'তে পারেন কিন্তু প্রেমের রাজ্যের কঞ্চিও নন।
তাকে দোষ দিই না। মনে পড়ে গীতার কথা ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহস্তি জন্তবঃ
অজ্ঞানাবৃত মানুষ দুঃখ তত পাবেই—এ-পণ্ডিতটি জ্ঞানী নন
কাজেই তার পুঁথিপড়া বিদ্যার মাপজোপে ঠিকে ভুল হবে তাে
বটেই। যাদের দৃষ্টির মূল ভঙ্গিটিই ভ্রান্ত—অর্থাৎ গােড়ায়ই গলদ—
তাদের চোখে কী করে পড়বে যে অন্তঃশীলা প্রেমধারাটি
শ্ৰীঅরবিন্দের জ্ঞানসাধনায় একটি মূল প্রেরণা? বহির্মুখী ফিতে
গজকাঠি দাঁড়িপাল্লা বকযন্ত্রে কি পাওয়া যায় অন্তর্মুখী সত্যের যথার্থ
দিশা?-গরিষ্ঠ মানুষকে কনিষ্ঠেরা কি কোনদিনও পেরেছে চিনতে
?
৬
প্রেমী একটা প্রবচনের আক্ষেপ মনে পড়ে—The world does not know its greatest men. কিন্তু যারা তার চরণতলে বসে দিনের পর দিন তার স্নেহ উপদেশ ও দীক্ষার নির্দেশ পেয়েছেন, দিনের পর দিন তার আশ্চর্য সহিষ্ণুতার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন, যারা দুঃখে দুর্দিনে পেয়েছেন তার সান্তনার গভীর স্পর্শ, নিরাশার গহবরে তার তার বরাভয়, যারা সংসারের হাজারাে অবসাদের অনৈশ্চিত্যের অন্ধকারে পেয়েছেন তার আন্তর প্রদীপ্তির মণিপ্রত্যয়, চ্যুতির গ্লানিকর লগ্নে তার প্রশান্ত ক্ষমা, যারা জীবনযজ্ঞের লক্ষ বিয়ের প্রত্যয়ে পেয়েছেন তার অফুরন্ত ভাপসজ্যোতি, শােকের সংক্রান্তিলগ্নে তাঁর আশীবাণীর উজ্জ্বল রক্ষাকবচ-তাঁরা জানেন শ্ৰীঅরবিনের এ-উক্তি কত সত্য যে, "It is only Divine Love that can bear the burden I have to bear, that all have to bear who have sacrificed everything else to the one aim of mplifting earth out of its darknces towards the Divine." “শুধু দিব্য প্রেমই সে-ভার বহন করতে পারে যা আমাকে বহন করতে হচ্ছে, যা তাদের সবাইকেই বহন করতে হয়, যারা সব ছাড়ে শুধু পৃথিবীকে অন্ধকার থেকে ভগবানের পানে তুলে ধরতে।” আপনার বইটিতে আছে তাঁর এই দিব্য প্রেমের কিঞ্চিৎ আভাস, তাই তাে এ-বইটি সাদৃত হওয়া এত বাঞ্ছনীয় মনে করি, বিশেষ করে এ-যুগে যখন মানুষ সব দিক দিয়েই আত, ক্লিষ্ট, মুহ- মা,যখন অসূর্য মসলােকের হিংস্র অনীকিনীর বৈজ্ঞানিক
অরবিন প্রসঙ্গে
বর্বরতায় সভ্যতার বনেদ পর্যন্ত উঠেছে টলমল করে। এহেন
সময়ে এই শ্রেণীর যােগী কবি জ্ঞানীর মুখেই তাে আমরা শুনতে
চাই প্রেমের এই আকাশবাণী যে, “ভাগবত প্রেম মানবিক প্রেম
নয়,—সে গভীর, বিপুল, গাঢ়মৌন ; আমাদের হতে হবে তেমনি
মৌন যদি আমরা চাই তাকে জানতে, তার ভাবে সাড়া দিতে” :
“The Divine Love, unlike the human, is deep
and vast and silent ; one must become quiet and
wide to be aware of it and reply to it.
"Ile who would bring the heavens here
Must descend himself into clay
And the burden of earthly nature bear
And tread the dolorous way.”
“ধরার অধরা আলােকের বাণী যে বহি আনিতে চায়
ধূলিতলে তাকে আসিতে হবেই নেমে
পৃথীর স্নান প্রকৃতির ভার সহিবে সে করুণায়
অপার বেদনে চলিবে---পারের প্রেমে।”
প্রেমী
পুনশ্চ। সেদিন ফের আইরিশ কবি এ-ই-র কবিতা পড়ছিলাম।
জানেন নিশ্চয়ই ইনি শুধু যে মস্ত কবি ছিলেন তা-ই নন মস্ত
যােগীও। শ্রীঅরবিন্দের কাছে শুনেছি ওদেশে এত বড় spiritual
poet না কি আর জন্মায় নি। এর একটি কবিতায় অাছে ।
“When the spirit wakens
It will not have less
Than the whole of life
For its tenderness."
“অন্তরদীপ যখন জাগে
অল্পতে আর মন কি ভরে ?
কোমলতার আলােয় যে সে
বিশ্বে প্রেমে ছড়িয়ে পড়ে।”
কিন্তু মানুষ ভুল ভাবতে ভালােবাসে, তাই প্রায়ই মনে করে
যে অন্তরের এহেন আলাের দীপ্ত কোমলতা যেন মাটিছাড়া, যেন
অধ্যাত্ম প্রেম ( spiritual love) বলতে বােঝায় স্বপ্নবিলাস
জাতীয় কোনো সোনার হরিণ যাকে বাস্তবীরা কিছুতে মঞ্জুর করতে
পারে না। সাহেবি ভাষায় বলতে গেলে যেন বলা যায় “it does
not mean business,” যেমন গত বছরে আমাকে বলেছিলেন
আমার এক মার্কিন সহযাত্রী ট্রেনে। হঠাৎ কথাটা পুনশ্চ দিয়ে
লিখে ফেলতে সাধ গেল—আরাে এইজন্যে যে দৃষ্টান্ত দিলে
৯
অবিল প্রসঙ্গে শ্রীঅরবিন্দের প্রেম করুণা বা অনুকম্পার এই ব্যাপকতার কথা বােঝ। একটু সহজ হবে। উমার কথা আপনি জানেন- যাকে আমরা হাসি” বলে ডাকতাম। ওর বাবা শ্রীধরণীকুমার বসুকেও জানতেন যিনি ১৯৩৮ সালে বাস উল্টে প'ড়ে আমার চোখের সামনে মারা যান। উমা আমাদের সঙ্গেই ছিল। এসব কথা আমার “ভূস্বর্গ-চঞ্চলে” লিখেছি আপনি পড়েছেন। এ-পরিবারটির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় উমার সূত্রেই। ধরণীদা ওকে দিয়েছিলেন আমার হাতে সঁপে -গান শেখাতে। কী রকম উদার ছিলেন তিনি তা-ও আপনি হয়ত শুনে থাকবেন। তার মৃত্যুর পরে এ সুন্দর পরিবারটির সঙ্গে আমি আরাে জড়িয়ে পড়েছিলাম স্নেহের বন্ধনে—বিশেষ করে আমার এই আশ্চর্য গানের ছাত্রীটির গীতিপ্রতিভা ও স্বভাব- মাধুর্যের টানে। তার স্বভাৰমাধুর্যের কথা আপনি বেশি জানেন না হয়ত কিন্তু তার গান শুনেছেন। কী অপরূপ যে সে গাইত (বিশেষ করে ভক্তির গান) তা-ও আপনার অজানা নেই। এমন, কি গ্রামােফোনেও তার “শ্রীচরণে নিবেদন” “ধু কি আর কহিব আমি” শ্রেণীর ভক্তির গানে হৃদয় ওঠে দুলে। গত বাইশে জানুয়ারি (১৯৪২) সে মারা যায় মাত্র একুশ বৎসর বয়সে—প্রায় ন’মাস শয্যাগত থেকে। রােগশয্যায় ওকে যেন আরো বেশি করে চিনেছিল সবাই-মানতে বাধ্য হয়েছিল ওর অসামান্যতা। সেসব কথা লিখতে যাওয়া এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে-যদিও এধরণের প্রেমী অপরূপ চরিত্রের কথা না-লেখাই শক্ত। কিন্তু এসম্বন্ধে অন্যত্র লিখেছি ব’লে আজ থাক এ প্রসঙ্গ—আমার মূল বক্তব্যেই ফিরে আসি। ওর অসুখ হয় গত মে (১৯৪১) মাসে। ওর খবর প্রায়ই পাঠাতেন শ্ৰীমতী রাণী মৈত্র—যিনি ওর রােগশয্যায় শুশ্রুষাও করতেন সে সময়ে। তিনি আমাকে লেখেন, ও গান শুনতে এত চায়—প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে...ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্ৰীঅরবিন্দ ও শ্ৰীমা ওর খবর নিতেন নিয়মিত। তাদের আশীর্বাদও ওকে পাঠানাে হত। কিন্তু নানা রকম উপসর্গ জুটল —ওর অবস্থাও ক্রমশই খারাপ হতে লাগল। শেষটায় শ্ৰীবিধান রায় মহাশয়কে তার ক'রে যখন উত্তর পেলাম তখন মনে হল, ওর এ-কঠিন অসুখে যদি যাই ওর কাছে, হয়ত ওর মন একটু ভালাে রাখা যেতে পারে গান শুনিয়ে গল্প করে। মেহে ও গানে ওর অভিমানী স্বভাবটি তেনি সাড়া দিত যেমন সাড়া দেয় শিশিরে ভেজা কুড়ি ভােরের আলােয়। কিন্তু গুরুদেবের কাছে এ-প্রস্তাব করলাম বেশ একটু সঙ্কোচের সঙ্গে। কারণ শুনেছিলাম তিনি নাকি আদৌ অনুমোদন করেন না কারুর বাইরে যাওয়া বাধ্য হয়ে অনুমতি দিলেও না। তাই আমি শ্রীঅরবিন্দকে একটু জোর দিয়েই লিখেছিলাম যে তিনি শুধু “অনুমতি দিলে আমি যাব না “অনুমােদন” করলে তবেই যেতে পারি। তিনি ব’লে পাঠালেন I quite approve.” একথাটার উপরে এত জোর দিচ্ছি কেন আশা করি আপনি বুঝতে পারবেন? এসূত্রে আমি শ্রীঅরবিন্দের উদারতার কথাই শ্ৰীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে বলতে চাইছি যে-উদারতার মহিমা আমি নিজে যেন আরাে গভীর- ভাবে উপলব্ধি করেছি তাদের সঙ্গে সংস্পর্শে এসে যারা তার উদার- তাকে কিছুতে বােঝে না—ভাবে যে তিনি বুবি ঠিক তাদের ছন্দেই ভাবেন, চলেন, বলেন, স্বপ্ন দেখেন। কি বলতে চাইছি একটা উদাহরণ দিলে আরাে স্পষ্ট হবে। একজনের কাছে শুনলাম তার যােগ করতে হলে কারুর সঙ্গেই মেলামেশা চলবে না। (তার খুব দোষ দিচ্ছি না, তার ক্ষেত্রে হয়ত বেশি মেলামেশা না করাই ভালাে এই উপদেশই তিনি পেয়েছিলেন) আমি ব্যাকুল হয়ে শ্রীঅরবিন্দকে লিখলাম যে “এ-সাধকটির মতন চুপটি করে মুখটি বুজে ঘরে বন্ধ হয়ে না থাকলে যদি ভগবদ্দর্শন আমার না হয় তাহ'লে এ-জন্মে সম্ভবত নয়নকে আমার উপবাসী থেকেই কাটাতে হবে, তবে জন- শ্রুতি এই যে যেহেতু আপনি একলা থাকেন সেহেতু সিদ্ধান্ত করতেই হবে যে একলা থাকলেই আপনি সবচেয়ে বেশি খুসি হন (০.E.D)। কী করি বলুন দেখি ?” শ্ৰীঅরবিন্দ লিখলেন : “If am living it is not out of a passion for solitude and it would be ridiculous to put forward this purely external circumstance-or X's withdrawnness which is a personal necessity of his sadhana--as if it were the obligatory sign of a high advance in the Yoga or Solitude the aim ; these are simply incidents which none are called out to imitate. So you need not be anxious : Solitude in my room প্রেমী। is not demanded of you, for an ascetic dryness or isolated loneliness cannot be your spiritual destiny since it is not consonant with your swabhaba which is made for joy, largeness, expansion, a comprehensive movement of the lifc-force." কিন্তু শ্ৰীঅরবিন্দের বহুমুখী সমৃদ্ধ উদারতাকে বােঝা সহজ নয়। মানুষ প্রায়ই নিজের মনের ছাঁচে ঢালাই করতে চায় যাদেরকে ভক্তি করে। তাই শ্ৰীঅরবিনকে যে অনেকই , এভাবে নিজের মনের মাপসৈ করে কাটছাট করে গ্রহণ করে তার ব্যাপক ব্যক্তিস্বরূপকে অঙ্গহীন করবেন এতে খুব আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আর একটি মাত্র উদাহরণ দিয়েই ক্ষান্ত হব। একজনের কাছে শুনলাম যে শ্রীঅরবিন্দের যােগে নাকি স্নেহ প্রীতি বন্ধুত্ব অচল। কিন্তু তাকে জিজ্ঞাসা করে জবাব পেলাম । “বন্ধুত্ব বা স্নেহপ্রীতির যে আমার যােগে কোনাে স্থান নেই এমনও নয়...কেবল বেশির ভাগ মানবিক বন্ধুত্বের যে-বনেদ, আমরা চাই হৃদয়বৃত্তির প্রতিষ্ঠা হােক তার চেয়ে কোনাে দৃঢ়তর বনেদের পরে। আসলে বন্ধুত্ব সৌভ্রাত্য প্রীতি—এসবকে আমরা বরণীয় মনে করি বলেই চাই তাদের ছন্দবদল যাতে করে এদের ভরাডুবি হয় দম্ভ অহমিকা ঈর্ষা কৃতঘ্নতা প্রভৃতির সংঘাতে।•••আমাদের যােগ কৃচ্ছ্বপন্থী নয়। তার লক্ষ্য শুদ্ধি—উদাসীন কঠোরতা নয়। যে-সুষমা-হার্মনি—আমাদের অভীপ্সিত তাতে বন্ধুত্ব ও প্রেমের ১৩ অবিল প্রসঙ্গে ঝঙ্কার তাে থাকাই চাই।”—কাজেই তার এসব অশ্বাসের কথা স্মরণ করে তার আশীর্বাণী মাথায় নিয়ে রওনা তো হওয়া গেল। মাদ্রাজে এসে দেখি কি, আমার সহযাত্রী এক প্রিয়দর্শন প্রবীণ মার্কিন ডাক্তার। দেখতে দেখতে আলাপ জমিয়ে নেওয়া গেল। লােকটির মুখচোখে একটা সরল সদাশয়তার ছাপ এমন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল যে ভাব না জমিয়ে উপায় ছিল না। লােকটি যে সত্যিই আদর্শবাদী তার দু’চারটি কথায়ই বুঝতে পারা গেল। নিজের জীবনের অনেক অন্তরঙ্গ কথাও এক নিশ্বাসে বলে ফেললেন। মানুষের মনের পরশ আমার প্রিয়, তাই ভাৰ হ’য়ে গেল আরাে সহজে। আমার হাতে ছিল শ্রীঅরবিন্দের Life Divine: হঠাৎ দেখি তিনি পাতা উল্টোচ্ছেন। অতঃপর দেখা গেল তার কপালে *... nor is friendship or affection excluded from the Yoga... Only we s seek to fouad them on a surer basis than that on which the bulk of human friendships are insecurely founded. It is precisely because we hold friendship, brotherhood, love to be sacred things that we want this change, because we do not want to see them broken at every moment by the movements of the ego, soiled and spoiled and destroyed by the passions, jealousies and treacheries to which the vital is prone. It is to make them sacred and secure that we want them rooted in the soul, founded on the rock of the Divine. Our Yoga is not an ascetic Yoga : it aims at purity but not at a cold austerity. "Friendship and love are indispensable notes in the harmony to which we aspire." (From a letter dated 9. i, i934) প্রেমী। রেখা পড়েছে। ব্যাপার কি জিজ্ঞাসা করতেই ডাক্তার সাহেব বললেন ; জ্ঞানী ও যােগী শ্রীঅরবিন্দের নাম তিনি শুনেছেন অনেক- দিনই কিন্তু—তিনি যে-ধরণের জ্ঞানের বাণী এনেছেন তাতে না কি প্রেমের স্থান নেই এইজন্যেই তার খটকা লেগেছে। “সে কি সাহেব?", বললাম আমি বাধা দিয়ে। এ-ধণের আষাঢ়ে গল্প কার কাছে শুনলে তুমি ? এই দেখ”-বলে life, Divic-এর Ascent of Ilife অধ্যায় থেকে খুলে ধরলাম : (প্রেমের স্বধর্ম হ’ল আদান-প্রদান যাতে দেওয়ার আনন্দ প্রথমটায় থাকে পাওয়ার আনন্দের সমান, কিন্তু শেষটায় হয়ে ওঠে পাওয়ার আনন্দের চেয়েও বড়। কেবল, এটা ঘটে তখনই যখন সে-প্রেম আপন অন্তরের আলাের প্রেরণায় নিজেকে ছাড়িয়ে দীপ্ত হয়ে উঠতে চায় পরম ঐক্যবােধের সার্থকতায়, কাজেই তখন তাকে উপলব্ধি করতেই হয় যে, যাকে সে বলছে ‘পর’ ( নাহ ), সে হ’ল তার অহম্-এর চেয়েও বৃহত্তর ও প্রিয়তর সত্তা-স্বজন।*) *... its ( Love's) true law is to establish an equal commerce in which the joy of giving is equal to the joy of receiving and tends in the end to become greater ; but that is when it is shooting beyond itself under the pressure of the psychic flame to attain to the fulfilment of notutter unity and has therefore to realise that which seemed to it as self as an even greater and dearer self than its own individuality. (THE LIFE DIVINE......vO.. ......2.33) শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে - সাহেবের কেমন যেন এটু ধাঁধা লেগে গেল মনে হল, যদিও মুখে বললেন : “বড়ই চিত্তাকর্ষক••চিত্তাকর্ষক।” আমি হেসে বললাম ; “ও তাে তােমাদের বাধা গৎ বন্ধু which at best means nothing at all." সাহেবও হেসে ফেললেন, বললেন অগত্যা : “আমার বাধছে কেন জানাে? এসব কথা শুনতে সুন্দর হলেও একট। কিন্তু থেকে যায় বলে।” “যথা ?” “তাহলে বলি শােনাে একটু খুলে।” বলে সাহেব বেশ জুৎ করে একটা চুরুট ধরালেন, তারপর শুরু করলেন : “তােমাকে বলেছি আমি চোখের ডাক্তার সার্জন—ছানি কাটি। এ-কাজটা আমি সত্যিই ভালাে কাজ মনে করি, কেন না আমি চাক্ষুষ করেছি—and seeing is believing জানােই তাে—যে এর ফলে কত অন্ধলােক চক্ষুষ্মন হয়েছে। তাই আমার প্রশ্ন এই যে, এই ধরণের প্রত্যক্ষ সেবা-service—দৃষ্টিগম্য প্রেম নিয়ে তােমাদের যােগীরা কারবার করেন কি না? Do they really mean business when they say : 'Love the not-self- তুমি এইমাত্র পড়ে শােনালে?” হাসি একটু পেল বৈ কি। এরা সব কিছুরই চাইবে কাটাহঁাটা প্রমাণ এজেহার! মানুষের মূল্য ধরে এরা তার কীর্তিকলপের ওজনদরে-অন্তবিকাশের, “হ'য়ে-ওঠার খবরকেই মনে করে বাহ, অবান্তর। মনে পড়ল শ্রীঅরবিন্দের একটি কথা : “মানুষ যে = প্রেমী বাস্তবের পিছুটানে এখনাে ঝুকে রয়েছে বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে•• বােকার মতন অবিশ্বাসী হবার ক্ষমতা যে এখনাে তার অপর্যাপ্ত।” কিন্তু উদ্ধৃতিটি দেখিয়ে সাহেবকে আর তাতালাম না, বললাম : “ভগবানের করুণা বলে কিছু মানে কি বন্ধু ?” “মানি”—বলতে না বলতে সাহেব উজিয়ে উঠলেন- “কিন্তু মানি এই জন্যই যে এ-করুণা প্রত্যক্ষ-concrete, it does mean business-কী ভাবে, বলি শােননা। তোমাকে বলেছি আমি ভারতবর্ষেই জন্মাই। তার পরে দেশে—আমেরিকায়–ফিরি শিক্ষার জন্যে। ডাক্তার হলাম। বুঝলাম ধীরে ধীরে খৃষ্টই জগতের একমাত্র ত্রাতা, তার যে-বাণী সে-ই হ’ল পরম বাণী, অর্থাৎ সেবাধর্ম ছাড়া আর পথ নেই মানুষের। তাঁকে ডাকতাম রােজ, দেব ! আমাকে যেখানে হয় পাঠাও দুঃস্থ মানুষের সেবা করতে। যদিও আমি ভারতবর্ষেই ফিরতে চাই কিন্তু তুমি যেখানে পাঠাবে যাব—কেবল—ক্ষমা কোরাে প্রভু আফ্রিকা বাদে। “প্রার্থনা করতে করতে কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারলাম যে এ তাে সচ্চা আত্মসমর্পণ—Thy will be done—নয়। আফ্রিকা "But the human race is still weighted by a certain gravitation towards the physical, it obeys still the pull of our yet unconquered earthmatter... It has, too, still a great capacity for sceptical folly, an immense indolence, an enormous intellectual and spiritual timidity and conservatism when called out of the grooves of habit." (VOL. II, P. 655 ) ৭ অরবি প্রসঙ্গে বাদে কেন! নিজেকে ধিক্কার দিয়ে শেষটায় প্রার্থনা করলাম চোখের জলের নদী বইয়ে দিয়ে—আচ্ছা প্রভু, পাঠাও আফ্রি- কাতেই—যদি তােমার ধম্মে সয়’-হাসলেন বন্ধুবর—কিন্তু জানাে কি বন্ধু, যেদিন অন্তর থেকে এ-প্রার্থনায় সায় এল তার পর দিনই প্রস্তাব এল ভারতবর্ষে মিশনরি ডাক্তার হয়ে যাবার। একেই বলি ভগবানের প্রত্যক্ষ করুণা, কংক্রীট ভালােবাসা। তােমার গুরু এইভাবে ভালােবাসেন কি—দুঃস্থ ক্লিষ্ট আর্ত মানুষের দুঃখে এই রকম প্রত্যক্ষভাবে সাড়া দেন কি ? না ভালােবাসা সম্বন্ধে দুচারটে অনবদ্য বুলি আওড়েই খালাস? শুধু কথায় তাে আর চিড়ে ভেজে না বন্ধু।” কী করি, এখন আমার ঝুলিও ঝাড়তে হ’ল-গুরুদেবের কাহিনীর ঝুলি। কত দুঃখের সময়ে আমরা জনে জনে কতবারই পেয়েছি তার অপরূপ সান্ত্বনা, উপদেশ, জ্ঞানের বাণী—সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি—“দেয়ং পরং কিং ত্বভয়ং সদৈব”—সেই অভয়বাণী : বলি দরিদ্র নির্বিশেষে তার সবাইকে বােঝানাে চিঠির পর চিঠি লিখে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত (শেষাশেষি বােজ তাকে রাত তিনটে চারটে পর্যন্ত জেগে য়ােজ সাত আট ঘণ্টারও বেশি চিঠি লিখতে হত প্রত্যহ কয়েক বৎসর ধরে )—সর্বোপরি, তাঁর স্নেহের কত অনুপম বাণী : “Your friends have treated you badly but be sure our friendship will never fail you."-70 ক্লিষ্ট আর্ত মানুষ শােক তাপ জুড়িয়েছে তার অহৈতুকী স্নেহে, অভয় চরণচ্ছায়ায়-অষ্টলক্ষ্য লগ্নে কত উদ্ভ্রান্তকে দেখিয়েছেন •• প্রেমী চিরলক্ষ্যের দিশা—কত দুর্বলকে আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাশ্বাসকে ভরসা, নিঃসম্বলকে পথের পাথেয়—কত বিত্তহীন অনাদৃতকে গ্রহণ করেছেন চিরজীবনের জন্যে, নির্জীবকে দিয়েছেন জীবনীশক্তি কত গ্নের সংকট বােগে শুধু আশীর্বাণী নয় দিনের পর দিন তার যােগ শক্তি পাঠিয়ে তুলেছেন সারিয়ে—যদিও সব ক্ষেত্রে সারে নি, তবু শিবেরও অসাধ্য রােগেও যে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন নি তিনি, এ-ই কি কম কথা ?”••• সাহেবের মুখচোখে আমার উদ্দীপনার একটু হেঁয়াচ যেন লাগল, বললেন : “বড় ভালাে লাগল বন্ধু এসব কথা শুনে বিশেষ তার ঐ বছরের পর বছর রাত তিনটে চারটে পর্যন্ত জেগে চিঠির পর চিঠি লেখার জন্যে—আর-কিছু মনে কোরাে না বন্ধু রােগীর রােগ সারানাে। আমি ডাক্তার বলে এটা অন্তত বুঝতে পারি। হাসি এল ফের, বললাম মনে মনে : সাধু সাধু, কেবল ঐ সঙ্গে যদি এটাও বুঝতে বন্ধু, যে যা তুমি এখনো বুঝতে পারে না তা-ও সত্য হতে পারে—there are more things in heaven and earth—কিন্তু মুখে এ-ঈষদ্ধাস্য প্রকট করলাম না, বললাম হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় ; “আমি কেন কলকাতা যাচ্ছি জানাে ? আমার এক মৃত বন্ধুর মরণাপন্ন মেয়েকে দেখতে। সে আমার আত্মীয়ও নয়—গানের ছাত্রী। সাংসারিক দিক দিয়ে আমার পরে তার কোনাে দাবি-দাওয়া ছিল না তাে—তবু নির্জনে যােগসাধনা ছেড়ে যে চলেছি তাকে দেখতে, এতে গুরুদেবের শুধু সায় না শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে আশীর্বাদ আছে মনে রেখাে।” মানে হাসি সম্বন্ধে অনেক কথাই বললাম, বললাম কেমন করে বছর দুই আগে বাস উল্টে পড়ে ধরণীদা মারা যান আমার চোখের সামনে। বললাম তার পরের বছরেই ওর একমাত্র ছােট ভাইয়ের মারা যাওয়ার কথা। অথচ কী সহিষ্ণুতা তেজস্বিতা ওর ! কারুর কাছে কি এতটুকু চোখের জল ফেলবে? বললাম ওর গীতি-প্রতিভার কথা, ওর চরিত্রের শুভ্রতার কথা, ওর পরকে আপন করার কথা, সেবাপরায়ণতার কথা—এমন অসামান্য প্রতিভা সত্ত্বেও নিরহংকারের কথা, বললাম ওর কণ্ঠ লাবণ্যের কথা—যা শুনলে অভক্তের মনেও জাগত ভক্তি•••••• সাহেবের মুখচোখ নরম হয়ে এল শুনতে শুনতে, বললেন : “আহা! মেয়েটি যেন সেরে ওঠে।” বলে একটু থেমে : “কিন্তু ওকে জানেন তোমার গুরুদেব ?” “জানেন বলতে সচরাচর মানুষে যা বােঝে সে ভাবে জানেন না, তাকে চোখে কখনাে দেখেন নি, কিন্তু মেহ করেন গভীর ভাবেই। এর আগেও তার অসুখ বিসুখে শুধু আশীর্বাদ নয় তার যােগশক্তির কল্যাণস্পর্শ পাঠিয়েছেন—তার সিমের খবর নিয়েছেন, এখনাে খুটিয়ে নেন—যেমন অবশ্য অন্য অনেক রুগ্নের বেলায়ও নিয়ে থাকেন। অথচ মনে রেখে এ-পরিবারের কেউই তার যােগের কোনাে খবরই রাখে না-হয়ত জানবেও না কোনােদিন, শ্রীঅরবিন্দ তার মহামূল্য সময় থেকে কতখানি ব্যয় করেছেন তাদের রুগ্ন দুঃখী মেয়েটির খবর নিতে—কত ধ্যান করেছেন তাকে সারিয়ে তুলতে-কত অসুখে সে সেরেও উঠেছে তারই শক্তিতে অথচ ভেবেছে সারল ডাক্তারি প্রেমী না— বিদ্যায়, কিন্তু তিনি এপর্যন্ত চান নি যে তারা মানুক তার যােগশক্তি, চিনুক তঁার করুণা। সাহেব খুব স্পষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন, বললেন : “ডাক্তারিতে আর কতটুকু পারে বন্ধু-ভগবানের করুণা না থাকলে ? আমরা তাে উপলক্ষ্যমাত্র—যদিও সায়েন্স এখনাে একথা মানে না। কিন্তু সে যাক, এ-রুগ্ন মেয়েটির জন্যে তোমার গুরুদেব যে তার এতটা . মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন শুনে বড় ভালো লাগল। আরাে এই জন্যে যে ভগবানের করুণার কথা তোমার ছাত্রী আজও জানে কজনই বা জানে বলাে ‘for that matter ? একটু পরে সাহেবই ফের কথা কইলেন : “কিছু মনে কোনাে বন্ধু, আমি শ্রীঅরবিন্দ সম্বন্ধে এই রকমই শুনেছিলাম যে তিনি নিজের মুক্তি নিয়েই ব্যস্ত, তাই একা একা থাকেন। কাজেই মনটা একটু বিযুগ ছিল বৈ কি। কিন্তু এজন্যে এখন আমি সত্যি অনুতপ্ত, বিশ্বাস কোবরা। কারণ যে-গুরু তার নিজের মুক্তির চিন্তা ছেড়ে অতি ক্লিষ্ট দুঃখী মানুষের জন্যে এতটা অনুভব করতে পারেন—তার যােগের জ্ঞান না বুঝলেও তার প্রেমের মহত্ত্ব আমি বুঝতে পারি, তাঁর মিসটিক দীক্ষা না বুবলেও তার হৃদয়বত্তাকে সুন্দর বলে মানতে আমার মন একটুও বাধা পায় না। কারণ খৃষ্টের কাছে আমি এই শিক্ষাই পেয়েছি যে প্রতিবেশীদেরকে আমাদের তেমনি ভালােবাসতে হবে যেমন বাসি আমরা নিজেদেরকে। তাই আমার কাছে সেই জ্ঞানই বরেণ্য কর্মে যার তর্জমা হয় নিস্বার্থ সেবায়, নির্মল প্রেমে।”
অরবিন্দ প্রসঙ্গে
।
“সে কথা সত্য বন্ধু,” বললাম আমি, “কিন্তু তােমার
মনে হয় না কি যে এখানেও একটু ‘কিন্তু থাকতে পারে-
তােমারই ভাষায় ?”
“মানে?”
“মানে, নির্মল প্রেমের তত্ত্ব শুনতে সরল হলেও উপলব্ধি
করা কি কথার কথা মনে করাে তুমি ?”
“ঠিক বুঝলাম না।”
“যাদের প্রেম খানিকটা নির্মল নয় তারা কি নির্মল প্রেম
ঠিক মতন বােঝে মনে করে ? অত কথায় কাজ কি, তােমার
খৃষ্টদেবের দৃষ্টান্তই নেও না। পন্টিয়াস পাইলেট কি তার প্রেমকে
বুঝেছিলেন ? , বুঝলে তাকে ছেড়ে দিতেন ঐসব
রক্তলােলুপদের হাতে ?”
সাহেব মুখ নিচু করে রইলেন। আমি বললাম : “আরাে
স্মরণ করাে ঐ হিংস্র গুণ্ডাদের কথা। তাদের তাে তিনি উপকারই
করতেন সদাসর্বদা। তবু তাদের কাছে তাঁর নিটল স্বচ্ছ প্রেম
এত ঝাপসা ঠেকল কেন যার দরুণ তারা অমন দেবদূতকে মারল
পশুকেও মানুষ যে ভাবে মারে না? কী বলে তারা অমন সুন্দর
মহাপুরুষের মাথায় কাঁটার মুকুট পরিয়ে পারল ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে,
লাঞ্ছনা করতে ?”
“আমি বুঝেছি তুমি কী বলতে চাচ্ছ, কিন্তু
“শােননা,” বললাম আমি, “কয়েক বৎসর আগে আমি নিজে
অরবিন্দের সঙ্গে কত তর্ক যে করতাম জানাে না। আজ সেকথা
প্রেমী
ভাবতেও লজ্জা বােধ করি কিন্তু তর্ক করতাম না বুঝে—গ। টি মেকির
প্রভেদ না চিনে, এইটুকুই আমার সাফাই। তাই মনে করতাম
সে সময়ে যে ভগবানের করুণাও বুঝি একটা কথার কথা, বুঝি
আসলে সে সুদূর উদাসীন—যাকে তোমরা বলে cold. একবার
তাঁকে জিজ্ঞাসাও করেছিলাম একথা ক্ষুব্ধ হয়ে।”
“কী বলেছিলেন তিনি ?” শুধাল ও উৎসুক কণ্ঠে।
“বলেছিলেন যে ভগবানের ভালােবাসা কখনই উদাসীন
হতে পারে না। তবে সে-ভালােবাসা মানুষের ভালােৰান্সার
মতন নয় যে দপ করে জ্বলে উঠেই নিভে যাবে প্রতিদানের
ইন্ধন না পেলে। সে স্বভাবে স্থির, সর্বব্যাপী, স্বয়ংসিদ্ধ—সূর্যের
আলাে যেমন। তাছাড়া তিনি আরাে লিখেছিলেন আমাকে
যে ভগবানের প্রেম এমন কি ব্যক্তিগতও হতে পারে, কেবল
মানুষের গড়পড়তা ব্যক্তিগত প্রেমের মতন আত্মাভিমানী নয়
তার ছন্দ।* বলতে চাও কি তুমি যে এহেন প্রেম গড়পড়তা
মানুষ বুঝতে পারে? তাই বলছিলাম যে এখানেও একটু কিন্তু
* শ্রীঅরবিন্দের মূল চিঠির ভাষা ছিল এই : “Love cannot be cold,
there is no such thing as cold love, but the love of which the Mother
for
speaks is something very pure, fixed and constant :
it does not leap
into fire and sink for want of fuel but is steady and all-embracing and
all-existent like the light of the sun. There is also a divine love, that is
personal but it is not like the ordinary, personal human love dependent
on any return from the person : it is personal but not egoistic."
অবিল প্রসঙ্গে আছে। প্রেম প্রেম ক'রে হুঙ্কার দেওয়া যত সহজ তার ঠিক হঙ্কারটিতে সাড়া দিতে পারা ঠিক তত সহজ কি ?” সাহেব আর তর্ক করলেন না—কিন্তু মনে হ’ল কোথায় তার মনে লেগেছে। লােকটিকে আমার ভালাে লেগেছিল সত্যিই। সে বলেছিল শ্রীঅরবিন্দের দর্শনার্থী হয়ে একবার আসবে। যদি আসে দেখাব তাকে সেই চিঠিটা যেটা এখানে আপনি থাকার সময়ে শ্রীঅরবিন্দ আমাকে লিখেছিলেন। কেন দেখাব জানেন ? তার একটা ধারণা ছিল যেটা সহৃদয় খৃষ্টানদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় : যে, অধ্যাত্মজ্ঞান বুঝি বড়ই শুষ্ক—যেকথা আরও রসালভাবে বলেছেন চৈতন্যচরিতামৃতকার : অরসিক কাক চুষে জ্ঞান নিম্বফলে রসজ্ঞ কোকিল খায় প্রেমাম্র মুকুলে। কিন্তু এধরণের কথার পিছনে আমাদের মন কেমন যেন একটা একপেশাে দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পেয়ে ক্ষুন্ন হয় না কি? যদিও শুনেছি শুষ্ক জ্ঞানী ব’লে এক ধরণের জ্ঞানী আছে কিন্তু তারা যে খাঁটি জ্ঞানী এ-এজাহার দেবে কে? জনশ্রুতি কিছু প্রমাণ নয়। অন্তত আমার মন সহজেই মনে নেয় যেকথা কৃষ্ণ- প্রেম একবার লিখেছিলেন আমাকে : "He who knows and does not love does not know, while he who loves and does not know does not love." যে বলে : সে জানে, শুধু ভালাে নাহি বাসে জেনাে সে আজিও জানে না, পায় নি আলাে। ১০৪
बयो
যে বলে : সে, ভালাে বাসে, শুধু জানে না সে
জেনাে সে আজিও বাসে নি বাসে না ভালাে।
একথা আমার আরাে মনে হয়েছে শ্রীঅরবিন্দের জ্ঞান ও
করুণার স্পর্শ পেয়ে। কত দরদের সঙ্গে কত আদরে কত ধৈর্য
ধরে যে তাকে বােঝাতে দেখেছি অগুন্তিবার আমাদের মতন
অল্পদর্শী অবােধদেরকে—কত স্নিগ্ধ প্রেমের রসে রসিয়ে। এ
কথার দৃষ্টান্ত দিতেই ঐ চিঠিটি উদ্ধৃত করব আরাে এই জন্যে যে
এ পত্রটিতে বড় অপূর্ব হয়ে ফুঠেছে—যুগপৎতার ঋষির দৃষ্টি,
জ্ঞানীর জ্ঞান, প্রেমীর প্রেম। কিন্তু আগে আমার প্রশ্নটা ছিল
কি—বলি সংক্ষেপে। আমি তাকে (৮, ২. ৪২ তারিখে) এক
সুদীর্ঘ পত্র লিখি। তার সারমর্ম এই :
“গুরুদেব
আমার বন্ধু জ্ঞান ঘােষের (৫.২.১৯৪২ তারিখের) চিঠিটি
পাঠালাম। মৃত্যুশয্যায় হাসির যন্ত্রণার কথা সে লিখেছে আমি
জানতে চেয়েছিলাম বলে। আপনি জানেন হাসি বাঁচতে চাইত
। আপনার কাছেই শুনেছি বাঁচতে না চাইলে বাঁচানাে বড়ই
শক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এও তাে আপনি জানেন যে সে বাঁচতে চাইত
যে শুধু নিজের দুঃখে তা নয়। যখন ওর বাবা বেঁচে তখনই
ওর মধ্যে এ-বিষাদ প্রায়ই ছেয়ে আসত লক্ষ্য করেছি। বলত :
জগৎটা মােটেই ভালাে জায়গা নয়। এখানে ভালাে লােক
থাকে যে-দুচারজন তারা দুঃখই পায় বেশি।
তাই এখানে
তাদের না থাকাই ভালাে। এ-জগতের হিংসা ঈর্ষা ক্ষুদ্রতা ও
শ্রীঅরবিল প্রসঙ্গে নিষ্ঠুরতা দেখে সে ভারি বেদনা বােধ করত। আমাকে মাঝে মাঝে হেসে ঠাট্টা করত আমি কাউকে বেশি ভালো বললে। অবশ্য তার মুখে এ সবই মানাতে। নিজে যে স্নেহময়ী, পুষ্পা সত্যনিষ্ঠা—মলিনতায় অসত্যে অপ্রেমে তার গভীর দুঃখবােধ বােঝা যায়। কিন্তু তার কথা বাদ দিলেও তার অভিযােগের মধ্যে কি অনেকটা সত্যও নেই ? মায়াবাদীরাও চিরটাকাল তত এই কথাই বলে এসেছেন প্রকারান্তরে যে এ-জগৎ শুধরােবার নয়, এখানে জন্ম শুধু এই সাধনার জন্যে যাতে করে আর না জন্মাতে হয়—যেমন কঠ বলেছে : ‘স তু তৎ পদমাগােতি যশাদ্ভূয়াে ন জায়তে ‘এমন পদ পাওয়া চাই যার পর আর না ভুগতে হয় জন্মানাের কর্মভােগ’—যেকথা গীতায়ও বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ একটু অন্য ভাষায় যে এ-জগৎ যখন ‘দুঃখালয় অশাশ্বতম্ তখন (অনিত্য অসুখং লােকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্) এ-অনিত্য দুঃখময় জীবনকে চেয়ে কী হবে—আমাকেই চাও একান্ত করে, যেহেতু মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে'—আমাকে পেলে আর জন্মাতে হবে না কোনােদিন। জগতে দিন দিন যে মহামারী কাণ্ড হচ্ছে যেভাবে আসুরিক শক্তির বৃদ্ধি হচ্ছে—যে-রেটে হৃদয়ের সব কোমল বৃত্তি শুকিয়ে যাচ্ছে হিংসার খরতাপে তাতে মনে হয় না কি যে শিশুর মুখে দৈববাণী জাতীয়ই কিছু একটা হয়েছিল হাসির মুখে, যখন ও বলেছিল এ-জগতে ভালাে লােকের না- জন্মানােই ভাললা ? ওর কথা ভাবতে আমার আরও দুঃখ হয় এই জন্যে যে এমন একটি অপূর্ব ফুল এমন নিখুৎ করে যদি প্রেমী বিধাতা গড়লেনই এ খুতে-ভরা জগতে, তখন নিজের হাতে গড়া সে কুড়িটি কার শাপে ঝরে গেল না ফুটতে? ওর গীতি- প্রতিভার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম—মেয়েদের মধ্যে যার জুড়ি আমার তাে অন্তত চোখে পড়ে নি আজ পর্যন্ত কিন্তু এমন ভক্তির গান যে গাইতে পারত, যার আবেদনে অভক্তের মনেও জাগত ভক্তি—তার সে কণ্ঠ এমন নিষ্ঠুরভাবে নীরব করে দিয়ে ভগবানের কোন ইষ্ট সিদ্ধ হ’ল ? শেষে একটা প্রশ্ন জাগে ফিরে ফিরে আমার মনে। ভগবানের করুণায় আমার বিশ্বাস আছে—কিন্তু শুনতে পাই এ-করুণারও কি সর্ত আছে। তা যদি হয় তাহলে একথা মনে করা কি চলে না যে, সারা জগতে হিংসা ও মিথ্যার তুফান যতই ঘুনিয়ে আসছে ভগবানের আলাে ততই যাচ্ছে দুরে সরে ? কারণ এ-হেন পরিবেশে ভগবানের করুণার অবতরণ হবে এ- আশা কি দুরাশা নয় ? মায়াবাদীরা বলেছে—এ জগৎ হ’ল একটা দুঃস্বপ্ন—কাজেই জ্ঞানে না জাগলে এর কাটা মিলতে পারে না। কথাটা কি একেবারেই ভিত্তিহীন? শেষ প্রশ্ন—ভগবানের সত্য কি এ জগতে সত্যিসত্যিই সক্রিয় ? হলে কি আজ দুনিয়াদারিতে মিথ্যাই হত এভাবে সর্বেসর্বা ? যদি বলেন মিথ্যার পিছনে রয়েছে সে-সত্য-নৈলে মিথ্যাও পারত না টিকতে, তাহ'লেও প্রশ্ন থাকে—এ মিথ্যার জগতে বসবাস করেও কি সে-সত্যকে চাক্ষুষ করা সম্ভব? তরী যখন ডুবুডুবু তখনও কাণ্ডারী যদি থাকেন নেপথ্যে তাহলে কী শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে করে সেটা মানুষ বুঝবে যদি নৌকাডুবি থেকে বাঁচার আশা হয় সুদূর পরাহত ?” এর উত্তরে শ্রীঅরবিন্দ যে-দীর্ঘপত্রটি আমাকে লেখেন সেটি এখানে তুলে দিয়ে এ-যাত্ৰা পুনশ্চের ইতি টানি :- Dilip, , The question you have put raises one of the most difficult and complicated of all problems and to deal with it at all adequately would need an answer as long as the longest chapter of the “Life Divine". I can only state my own knowledge founded not on reasoning but on experience that there is such a guidance and that nothing is in vain in this universe. If we look only at outward facts in their surface appearance or if we regard what we see happening around us as definitive, not as processes of a moment in a developing whole, the guidance is not apparent; at most we may see interventions occasional or sometimes frequent. The guidance can become evident only if we go behind appearances and begin to understand the forces at work and the way of their working and their secret significance. After all, real knowledge-even scientific knowledgecomes by going behind the surface phenomena to their hidden processes and causes. It is quite obvious that this world is full of suffering, and afflicted with ১০ প্রেমী transience to a degree that seems to justify the Gita's description of it as "this unhappy and transient world, anityam asukham." The question is whether it is a mere creation of Chance or governed by a mechanical inconscient Law or whether there is a meaning in it and something beyond its present appearance towards which we move. If there is a meaning and if there is something towards which things are evolving, then inevitably there must be a guidance--and that means that a supporting Consciousness and Will is there with which we can come into inner contact. If there is such a Consciousness and Will, it is not likely that it would stultify itself by annulling the world's meaning or turning it into a perpetual or eventual failure. This world has a double aspect. It seems to be based on a material Inconscience and an ignorant mind and life full of that Inconscience ; error and sorrow, death and suffering are the necessary consequence. But there is evidently too a partially sucessful endeavour and an imperfect growth towards Light, Knowledge, Truth, Good, Happiness, Harmony, Beauty,-at least a partial flowering of these things. The meaning of this world must evidently lie in this opposition ; it must be an evolution which is leading or struggling towards higher things out of a first darker appearance. Whatever elevafran epic guidance there is must be given under these conditions of opposition and struggle and must be leading towards that higher state of things. It is leading the individual, certainly, and the world, presumably, towards the higher state, but through the double terms of knowledge and ignorance, light and darkness, death and life, pain and pleasure, happiness and suffering ; none of the terms can be excluded until the higher state is reached and established. It is not and cannot be, ordinarily, a guidance which at once rejects the darker terms, still less a guidance which brings us solely and always nothing but hapiness, success and good fortune. Its main concern is with the growth of our being and consciousness, the growth towards a higher self, towards the Divine, eventually towards a higher Light, Truth and Bliss:; the rest is secondary, sometimes a means, sometimes a result, not a primary purpose. The true sense of the guidance becomes clearer when we can go deep within and see from there more intimately the play of the forces and receive intimations of the Will behind them. The surface mind can get only an imperfect glimpse. When we are in contact with the Divine or in contact with an inner knowledge or vision, we begin to see all the circumstances of our life in the new light and can observe how they all tended without our knowing cerca it towards the growth of our being and consciousness, towards the work we had to do, towards some development that had to be made,--not only what seemed good, fortunate or successful but the struggles, failures, difficulties, upheavals. But with each person the guidance works differently according to his nature, the conditions of his life, his cast of consciousness, his stage of development, his need of further experience. We are not automata but conscious beings and our mentality, our will and its decisions, our attitude to life and demand on it, our motives and movements help to determine our course ; they may lead to much suffering and evil, but through it all the guidance makes use of them for our growth in experience and consequently the development of our being and consciousness. All advance by however devious ways, even in spite of what seems a going backwards or going astray, gathering whatever experience is necessary for the soul's destiny. When we are in close contact with the Divine, a protection can come which helps or directly guides or moves us : it does not throw aside all difficulties, sufferings or dangers, but it carries us through them and out of them-except where for a special purpose there is need of the opposite. It is the same thing though on a larger scale and in a more complex way with the guidance of the qafqan 77657 world movement. That seems to move according to the conditions and laws of forces of the moment through constant vicissitudes, but still there is something in it that drives towards the evolutionary purpose, although it is more difficult to see, understand and follow than in the smaller and more intimate field of the individual consciousness and life. What happens at a particular juncture of the world-action or the life of humanity, however catastrophical, is not ultimately determinative. Here too one has to see not only the outward play of forces in a particular case or at a particular time but also the inner and secret play, the far-off outcome, the event that lies beyond and the Will at work behind it all. Falsehood and Darkness are strong everywhere on the earth, and have always been so and at times they seem to dominate ; but there have also been not only gleams but outbursts of the Light. In the mass of things and the long course of Time, whatever may be the appearances of this or that epoch or movement, the growth of Light is there and the struggle towards better things does not At the present time Falsehood and Darkness have gathered their forces and are extremely powerful; but even if we reject the assertion of the mystics and prophets since early times that such a condition of things must precede the Manifestation cease. ১১২
carat
and is even
a sign of its approach, yet it does not
necessarily indicate the decisive victory- even
temporary-of the Falsehood. It merely means that
the struggle between the Forces is at its acme. The
result may very well be the stronger emergence of
the best that can be : for the world-movement
often works in that way. I leave it at that and
say nothing more.
Hashi had reached a stage of her development
marked by a predominance of the sattwic nature, but
not a strong vital ( which works towards a successful
or fortunate life ) or the opening to a higher light,
-her mental upbringing and surroundings stood
against that and she herself was not ready. The
'early death and much suffering may have been the
result of past (prenatal ) influences or they may
have been chosen by her own psychic being as a
passage towards a higher state for which she was
not yet prepared but towards which she
moving, This and
the
non-fulfilment of her
capacities would be a final tragady if there were
this life alone. As it is she has passed towards the
psychic sleep to prepare for her life to come.
was
February 17, 1942
Sri Aurobindo
No text on this page.
যােগী "Our whole being, soul, mind, sense, heart, will, life, body must consecrate all its energies so entirely and in such a way that it shall become a fit vehicle for the Divine. This is no easy task ; for everything in the world follows the fixed habit which is to it a law and resists a radical change. And no change can be more radical than the revolution attempted in the integral Yoga. Everything in us has constantly to be. called back to the central faith and will and vision. Every thought and impulse has to be reminded in the language of the Upanishad that, "That is the Divine Brahman and not this which men adore."* “আমাদের সমগ্র সত্তার দেহ, মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয়, হৃদয়, অন্তরাত্মা, সংকল্পের সমস্ত শক্তিকে এমন ভাবে উৎসর্গ করা চাই যাতে করে সে হয়ে ওঠে ভগবানের যােগ্য আধার। ব্যাপারটা বড় সােজা নয় যেহেতু এ-জগৎ বদ্ধমূল অভ্যাসের খাতে চলতে চলতে তাকেই গ্রহণ করে বসে স্বধর্ম বলে, ফলে সে আর চায় না কোনো আমূল পরিবর্তন। পূর্ণষােগ যে-ততালপাড় আনতে চায় তার চেয়ে আমূল পরিবর্তন তাে আর কিছুই হতে পারে না। আমাদের মধ্যেকার সব কিছু দিয়ে নিরন্তর আমাদের কেন্দ্রীয় শ্রদ্ধা সংকল্প ও দৃষ্টিকেই ফিরে ফিরে বরণ করা চাই। আমাদের প্রতি চিন্তা প্রতি ঝোককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া চাই—উপনিষদের ভাষায় •••‘তদেব ব্রহ্ম ত্বং বিদ্ধি নেদং ঘদিদমুপসিতে'—তিনিই হলেন ব্রহ্ম, এ ও তা নয় যাদেরকে মানুষ উপাসনা করে।” শ্রীমান আশ্চর্যকুমারেষু, আমার “প্রেমী” নিবন্ধটি পড়ে মনে হচ্ছে তুমি ঠিক বুঝতে পারাে নি এখনাে। নইলে এত আশ্চর্য হয়ে লিখতে না ফের : “শ্রীঅরবিন্দের বাণী এত মর্মস্পশী, তবু কেন যে আমরা—বিশেষ *2fcopa atrotters Synthesis of Yoga--Self-Consecration 074577 1 শ্রীঅরবি প্রসঙ্গে করিয়া শিক্ষিত সম্প্রদায়—তাহাকে বুঝিতে চাহি না, এ-রহস্যের কথা সময়ে সময়ে আমি সত্যই গালে হাত দিয়া ভাবি! তাহার নবলিখিত Synthesis of Yoga-এ সেদিন The Ascent of the Sacrifice অধ্যায়ে পড়িতেছিলাম প্রেম সম্বন্ধে তাঁহার অপূর্ব গভীর বাণীমন্ত্র যে 'Love that is worship is at once an aspiration and a preparation': কী সুন্দর কথা। পড়িতে পড়িতে মন যেন গান গাহিয়া উঠিতে চায় : ‘পূজাব্রত প্রেম সে যে আকাশের দীপ্ত অনুধ্যান পরমের দীক্ষার নিশান। “কিন্তু একথা বলিতে পারে কে—এক বিশুদ্ধ প্রেমিক ছাড়া? অথচ তবু তােকই শ্ৰীঅরবিন্দের প্রেমসাধনার দিকটা বড় কেউ খেয়াল করেন না? কেন করেন না ?কেনই বা মহাযােগীর পূৰ্ণযােগ সম্বন্ধে মনীষীরা কেহই প্রাঞ্জল ভাষায় লেখেন না পাঁচজনের হিতার্থে ? এ-প্রশ্ন কেন করিতেছি জানেন? শুনুন তবে একটু খুলিয়াই বলি। একটি দৃষ্টান্ত দিয়াই শুরু করি। “আপনি জানেন হাড়ে হাড়েই যে এ যুগে গুরুবাদ কথাটি উচ্চারণ করিতে না করিতে উন্নাসিকদের স্বভাব-উন্নত নাসিকা আরও কতখানি সমুচ্চ হইয়া উঠে। আপনার ভূস্বর্গ-চঞ্চল’ পুস্তকে পড়িয়াছি সেই বর্ষীয়সী জ্ঞানময়ীর কথা যিনি আপনার নামে বুদ্ধিংশের অপবাদ দিয়াছিলেন আপনি গুরুবাদ সমর্থন করেন এই অপরাধে। কিন্তু ইহারা কি জানেন শ্রীঅরবিন্দ কী ধরণের বােগ গুরুবাদের পক্ষপাতী ? কখনাে পড়িয়াছেন কি Synthesis of Yoga-এ Four Aids অধ্যায়ে এসম্পর্কে তাঁহার উজ্জ্বল গভীর বাণীমন্ত্র : ...it is necessary that he (the sadhaka of the integral Yoga) should•••cast from himself that exclusive tendency of egoistic mind which cries : 'My God, my Incarnation, my Prophet, my Guru and opposes to it all other realisation in a sectarian or a fanatical spirit.** “যতদূর মনে পড়ে আপনাকে সেই ব্রাহ্ম মহিলাটি তিরস্কার করিয়াছিলেন এই বলিয়া যে গুরুবরণ করিলে আমাদের ব্যক্তি- স্বাতন্ত্রের ভরাডুবি। একথা অস্বীকার করা চলে না যে সংকীর্ণমনা অনেক গুরু (বা কুলগুরু জাতীয় পেশাদার সুবিধাজীবী) এভাবে শিষের স্বাধীন চিন্তা ও বিকাশের অন্তরায় হইয়া থাকেন তাহাদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙিয়া খাওয়ার সুবিধা আছে বলিয়া। কিন্তু সংসারে সব কিছুরই ব্যভিচার আছে, বিকৃতি আছে, অপভ্রংশ আছে—কৃষ্ণপ্রেমের উপমা মনে পড়ে bath-water ময়লা বলিয়া “পুর্ণযােগের সাংকে চাই-ই চাই আত্মাভিমানী মনে হাঁকডাক বর্জন কৰা যে অসহিষ্ণু প্রবণতাবলে : ‘আমার ভগবান, আমার অবতার, আমার দিশারি, আমার গুরু’—বে অন্য সব উপলব্ধিকেই প্রতিপক্ষ দাড় করায় একটা দলাদলির গোড়ামি তাকে পেয়ে বসে ব'লে।” ১১৭
অরবিন্দ প্রসঙ্গে
baby-in-the-tub-কেও তাহার সহিত বিসর্জন দেওয়ার নাম
শিশুমঙ্গল সাধনা নহে।
“এক্ষেত্রে দেখিতে হইবে—সত্য বিধি ও বিশুদ্ধ আদশটি কী।
শ্রীঅরবিন্দ কি ঐ অধ্যায়েই এ-আদর্শ নির্ণয় করিয়া দেন নাই
তাঁহার অপরূপ ঋষিমন্ত্র ঝঙ্কারে
'But the wise Teacher will not seek to impose
himself or his opinions on the passive acceptance of
the receptive mind ; he will throw in only what is
productive and sure as seed which will grow under
the divine fostering within.' He will seek to awaken
much more than to instruct. মেকি গুরুবাদের মনের
কথা যাহাই হৌক, খাঁটি গুরুবাদের অন্তরের কথা আত্মপ্রতিষ্ঠা
নহে, ভগবানের আদেশ পালন : "And it shall also be a
sign of the teacher of the integral Yoga that he
does not arrogate to himself Guru-hood in a humanly
vain and self-exalting spirit. His work, if he has
one, is a trust from above, he himself a channel, a
vessel or a representative. He is a man helping his
* “বিচক্ষণ শুরু কখনই শিষের গ্রহিষ্ণু মনে পরে চড়াও হবেন না,
নিজেকে বা নিজের মতামতকে চাপাবেন না তার ঘাড়ে, তিনি শুধু বুনে যাবেন
সেই বীজ বা অন্তরদেবতার বিনিয়োগে ফসল না ফলিয়ে ছাড়ে না। শেখানাের
চেয়ে লাগানাের দিকেই তাঁর ঝােক।”
১১
যােগ brothers, a child leading children, a Light kindling other lights, an awakened Soul awakening souls, at highest a Power or Presence of the Divine calling to him other powers of the Divine.'* “কী সুন্দর কথা ! আপনার কি মনে হয় না যে শ্রেণীর গভীর বিনম্রতার বাণী সম্বন্ধে আমাদের দেশের মনস্বীদের লিখা উচিত ?” তােমার এ-প্রশ্নের উত্তর আমি অনেকবারই দিয়েছি নানা আলােচনায়। তাই তুমি এ-প্রশ্ন ফের করলে কেন—যখন জানাে যে শ্ৰীঅরবিন্দের তপস্থা ও সাধনার বাণী সম্বন্ধে ভালাে লেখা প্রকাশ হক এ তাঁর প্রতি ভক্তই চাইতে বাধ্য ? কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, “ভালাে লেখা” ভালাে বলেই বিরল, যেহেতু দুরায়ত্ত। গুরুবাদে গুরুর প্রেমের কথা তুলেছ—বলেছও ঠিকই, * “পুর্ণযােগদীক্ষাদাতার অভিজ্ঞান হচ্ছে এই যে তিনি শুরু হতে চাইবেন কোনাে আত্মস্ফীতির অভিমানে যে-অভিমান মানুষের মধ্যে এত ব্যাপক। যদি তাঁর কোনাে কাজ থাকে তবে সে হ’ল উপর-থেকে-পাওয়া আদেশের প্রবতন, তিনি নিজে শুধু একটি প্রণালী,—আধা-প্রতিনিধি। তিনি যেন এসেছেন ভাই হয়ে ভাইয়ের কাজে সহায় হতে, শিশু হয়ে শিশুদের এগিয়ে দিতে, আলাে হয়ে আমরা সব আলাে জ্বালাতে, প্রবুদ্ধ হয়ে আর সবাইকে প্রবুদ্ধ তার শ্রেষ্ঠ বিকাশে তিনি হয়ে ওঠেন একটি বিভূতি, ভাগবত আবির্ভাব—যিনি আসেন ভগবানের আর আর বিভূতিদেরকে ডাক দিতে, কাছে টানতে।”
অরবিল প্রসঙ্গে কেন না গুরুকে আমরা বরণ করতেই পারি না যদি না তিনি প্রেমের—দিব্য প্রেমের প্রতীক না হন। কিন্তু হয়েছে কি জাননা? প্রেম প্রেম করে যে-সব হাঁকডাক দিনদুনিয়ায় আজ সব চেয়ে বেশি মুখর, শ্রীঅরবিন্দের লেখার মধ্যে ঠিক সে-শ্রেণীর প্রেমের প্রশস্তি মিলবে না। তিনি যে চানই না ভক্তের কানে অধসত্যের সহজ মন্ত্র দিয়ে সহজ জয়ধ্বনির সস্তা নগদবিদায়। তাঁর আবির্ভাব এ-যুগে একটা অঘটন, যদিও অঘটন বলেই দৈনন্দিনতার ঘটক যারা তারা চান না তার লেখার সঙ্গে পাঠকসাধারণের ঘটকালি করতে। কেন চান না ?—এই জন্যে যে, তাঁর বাণী পালন করতে হলে শুধু যে অনেক কিছু ছাড়তে হয় তাই নয়, বিনম্র জিজ্ঞাসুর মতনই বিনতির দীক্ষা নিয়ে বিশুদ্ধ সত্যবরণার্থী হয়ে তবে আসতে হয়—নৈলে তাঁর নববাণীবিগ্রহের পূর্ণায়তকান্তির সবটা চোখে পড়া অসম্ভব, কানের ভিতর গেলেও মরমে পশে না এ-আবির্ভাবের বহুমুখী দাবি কমে, জ্ঞানে, ভক্তিতে, আত্মনিবেদনে। তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন। আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান লাভের উপায় তর্ক নয়--প্রণাম। এই সব কারণে আমার মনে হয় তাঁর বিশেষ করে যােগ সম্বন্ধে সহজ ঢঙে দুচারটে কথা বলতে যাওয়ার মধ্যে বিপদও কম না। প্রধান বিপদ এই যে জনসাধারণের কাছে মনরাখা কথা বলতে গেলে তাঁর বাণীবিগ্রহের সত্যরূপের মন রাখা হবে না। কেন হবে না সেটা বুঝতেই পারছ : গােড়ায়ই যেটুকু উদ্ধৃতি দিয়েছি তাতে শ্রীঅরবিন্দ দেখিয়েছেন প্রাঞ্জল ভাষায়ই যে যােগী তাঁর পূর্ণযােগকে (integral Yoga) গ্রহণ করতে হবে শুধু মন দিয়ে তাে নয়—আত্মা, ইন্দ্রিয়, হৃদয়, ইচ্ছাশক্তি, প্রাণশক্তি সবকিছু দিয়ে যে। সবাই জানে, যা হাতে কলমে করে তবে বােঝা যায় তাকে কাগজে কলমে বােঝানাে এক দায়। এধরণের ব্যাখ্যা অসম্ভব বলছি না, বলছি এর সার্থকতা আংশিক; শ্রীঅরবিন্দের যােগ পুরােপুরি বােঝা যায় না--যদি তাঁর যােগের কোনাে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, অপরােক্ষ অনুভব না থাকে। কিন্তু তবু আমি নিজেকেই প্রতিবাদ করব যে এভাবে তার যােগ যারা করেনি তাদের জন্যেও এমন কি তাদের জন্যেই এ-ধরণের আংশিক প্রয়ােজনীয়তা যথেষ্ট আছে। বিজ্ঞান সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটি চমৎকার উপমা মনে পড়ছে : “বড়াে অরণ্যে গাছতলায় শুকনাে পাতা আপনি খ'সে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞান চর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরাে জিনিসগুলি কেবলি ঝরে ঝরে পড়ছে, তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে।” কথাটা সত্য। ওদেশে বিজ্ঞানে যে-শ্রদ্ধার ছোঁয়াচ শেষটায় এমন কি গণমনেও লেগেছে তার ফলে বিজ্ঞানচর্চার একটা অনুকুল আবহাওয়া গ'ড়ে উঠেছে বৈ কি। তাই গুরুপাক বিজ্ঞানতত্ত্বকে লঘুপাক করে, ডাইলিউট করে পরিবেষণ করতে যাওয়ায় বিপদ আছে একথা মেনে নিয়েও বলা যায় যে মাত্রাজ্ঞান পাককৌশল জানলে এ পরিবেষণে সুফল ফলবার সম্ভাবনাও সমূহ। তেমনি শ্রীঅরবিন্দের অতলস্পর্শ যােগবাণী সময়ে সময়ে দুরবগাহ মনে ক্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে হলেও পুণ্যস্নানার্থীদের কাছে সে-তীর্থসলিলে অবতরণ করার প্রয়ােজন আছে, এমন কি এর ফলে যদি প্রায়ই হাবুডুবু খেতে হয় তাহলেও। খােশ-খবরের ঝুটাও ভালাে এ প্রবচনটি পুরাে সত্য না হতেও পারে, কিন্তু ভালাে জিনিসের ক্ষণিক ছোঁয়াচও ভালাে এ-কথার মার নেই। তাছাড়া এ-জাতীয় কথকতা বিজ্ঞানের সম্বন্ধে পপুলার লেখার মতনই একটা শ্রদ্ধার পরিবেশ গড়ে তােলে শ্রদ্ধালুদের মনে একটা সুন্দর গ্রহিষ্ণুতা ও বিনতির আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। মেকি আধ্যাত্মিকতার মেকিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হতে চাই ভালাে কথা—কিন্তু খালি ঐ সবই শােনা অধ্যাত্মজিজ্ঞাসুদের মানস স্বাস্থ্যের অনুকূল নয়—কেন না এতে করে জাতীয় মনে খাঁটি আধ্যাত্মিকতার 'পরে শ্রদ্ধাকেও অঙ্কুরেই বিনাশ করা হয়ে থাকে। পরমহংসদেব বলতেন না—মন ধােপা- ঘরের কাপড়, লালে ছােপাও লাল, নীলে নীল? সত্যসন্ধানের অজুহাতে ক্রমাগত অধ্যাত্মজগতের ব্যভিচার ও বিকৃতির কথাও অহরহ ভাবতে ভাবতে এমন কথা জাতীয় মনে চারিয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক যে আমাদের আধ্যাত্মিকতার বুঝি যােলাে কড়াই কানা। এই শ্রেণীর মনােভাব বড় সর্বনেশে কেন না এরই ফলে মানুষের মনে আধ্যাত্মিক মূল্যজ্ঞানের মূল দৃষ্টিই হয়ে আসে ঝাপসা। অমুক অতিবুদ্ধি পুঁথিপণ্ডিতের সম্বন্ধে শ্রীঅরবিন্দের ব্যঙ্গ স্মরণ করাে : “His ignorance of spiritual values is amazing”. তাই শ্রীঅরবিন্দের যােগ সম্বন্ধে—যােগী শ্ৰীঅরবিন্দ সম্বন্ধে
যােগী
কিছু লেখা যে দরকার এ-বিষয়ে তােমার সঙ্গে আমার মনের
পুরাে সায় আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল লিখবে কে ? Who is to bell the cat বলে
? উপমাটা সুপ্রযুক্ত—কেন না গােড়ায়ই গেয়ে রেখেছি একাজে
বিপদ আছে। তাই অনেক দিন ধরেই আমি বাংলা জ্ঞানপ্রকাশের
জগতে খুজেছি এমন লেখককে যিনি শ্ৰীঅরবিন্দের যােগের
সুব্যাখ্যা করতে সক্ষম। কিন্তু ইংরেজিতে দুএকটি সুব্যাখ্যা আমার
চোখে পড়লেও বাংলায় এ যাবৎ চলতি প্রাঞ্জল ভাষায় কোনাে
সুব্যাখ্যা আমার চোখে পড়ে নি। মানে এমন ব্যাখ্যা যা মন
টানে—আমার “সু” উপমাটি লক্ষ্য কোরাে।
হঠাৎ সেদিন “শ্রীঅরবিন্দের সাধনা” বইখানি হাতে পড়ল।
বইটি সদ্যোজাত-- ১৯৪১ সনে আগস্ট মাসে বেরিয়েছে।
পড়েই মনে হ’ল তােমার পত্রের কথা। তাই ঝটিতি লিখছি
তােমাকে : যদিও আসলে তােমাকে উপলক্ষ্য করে তাদের
জিজ্ঞাসু মনকেই লক্ষ্যবেধ করতে চাই যারা শ্ৰীঅরবিন্দের যােগ
সম্বন্ধে প্রাঞ্জল ভাষায় একটি সুব্যাখ্যা চান। এ-বইটির লেখক
অধ্যাপক শ্রীহরিদাস চৌধুরী নিশ্চয়ই এ-ব্যাখ্যার একজন যােগ্য
লােকযােগ্যতমদের একজন। তাই এবইটি সম্বন্ধে দুচারটি
কথা বলব সংক্ষেপে। সংক্ষেপে বলার এখন সুবিধা এই যে
বইটা বেরিয়ে বাল্যবিস্তারের প্রয়ােজন কিছু কমেছে।
সচরাচর ব্যাখ্যা করতে গেলে ব্যখ্যাকাররা কী করেন
অনেকেই লক্ষ্য করেছেন। আনাতােল ফ্রান্স কোথায় একবার
১২৩
অবিল প্রসঙ্গে বলেছেন যে পাঠক প্রতি বইয়ে তা-ই পড়েন যা তিনি পড়তে চান। ব্যাখ্যাকারদের সম্বন্ধে যে এ-কথা আরাে বেশি খাটে, না জানে কে ? শঙ্কর, গীতার ভাষ্য করবার সময়ে কমকে বুঝলেন এক রকম, ধর স্বামী বুঝলেন আর এক রকম, মধুসূদন সরস্বতী আর এক রকম। প্রত্যেকেই নিজের নিজের থিওরি চাপালেন বেচারি গীতার স্কন্ধে। এটা খানিকটা অপরিহার্য—বিশেষ যদি ব্যাখ্যাকাররা নিজে এক একটি নধর বা উগ্ৰমত পােষণ করেন, যা ছাড়তে তাদেরকে বাজে। কে না জানে বলাে যে আমাদের খুব বদ্ধমূল আইডিয়া গুলি—আগে-থাকতে-গ’ড়ে-ওঠা ধারাগুলি প্রায়ই আমাদের বুদ্ধিকে রঙিয়ে তােলে? কিন্তু এই সব আগে-থাকতে-গ’ড়ে-ওঠা ধাৰণদের (preconceptions) প্রভাব খানিকটা কাটিয়ে কোন অনন্যতন্ত্র ভাবুকের ভাবরাজ্যে প্রবেশ করা অসাধ্য হলেও যে দুঃসাধ্য নয় এ-সত্যের আংশিক প্রমাণ মেলে হরিদাস বাবুর বইটিতে। “আংশিক বিশেষণটিকে পাশ কাটিয়ে যেও না, কারণ একথা সত্য হলেও, শ্রীঅরবিন্দের পূর্ণযােগের ভাবরাজ্যের পূর্ণ মর্ম পরিগ্রহ করতে গেলে ভাষ্যকারকে শ্রীঅরবিনের চেতনায় পৌছতে হবে—কি না শ্রীঅরবিন্দ হতে হবে—কিন্তু তা বলে একথা সত্য নয় যে তার ভাৰরাজ্যের ছিটে ফোটাও একেবারে ব্যর্থ। বলেছি বড় ভাবের একটু আধটু ছোঁওয়াও বাঞ্ছনীয়—ক্ষণমিহসজ্জনসঙ্গতিরেকা ভবতি ভবার্ণব তরণে নৌকা। তাই এধরণের ব্যাখ্যা ব্যাখ্যা হলে তার ।
যােগী নানা অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও শ্রীঅরবিন্দের ভাবরাজ্যের একটা working knowledge-সত্যিই কাজে-আসে-এমন-জ্ঞান—দিতে পারে বৈকি। আর মনে রেখে যে ব্যাখ্যা যখন পড়ি তখন ব্যাখ্যা- কারের এই পারাটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। নৈলে তার যে-যােগের সাধনতত্ত্বের পাঠ দিতে স্বয়ং যােগিরাজকে “Synthesis of Yoga- এর মতন মহাভারত লিখতে হ’ল—যার ভাবতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে Life Divine-এর মতন গ্রন্থের তিনটি সুপুষ্ট খণ্ডের প্রয়ােজন হ’ল, সে-যােগের কোনাে তনুমধ্যা ব্যাখ্যাদেবীকে ভাষার চাতুরীকটাক্ষে করায়ত্ত করা যে সম্ভব নয় এ বলাই বেশি। কিন্তু ঠিক এই জন্যেই যারা শ্রীঅরবিন্দের যােগের বিশ্বাসযােগ্য একটা বর্ণপরিচয় গােছের চান তাদেরকে বলা চলে এ-বইটির আশ্রয় নিতে—অর্থাৎ যারা মূল গ্রন্থের সিন্ধুমন্থন করতে অক্ষম। কিন্তু মনে রেখাে, বলা যে চলে তার একটা প্রধান কারণ এই যে গ্রন্থকার শুধু যে পণ্ডিত ও মেধাবী তাই নয়, শ্ৰীঅরবিন্দের যােগপ্রবেশে তার একটি সহজ অধিকার আছে। আছে বলেই তিনি তার ঐ আগে-থাকতে-গ’ড়ে-তােল ধারণাগুলির ছোঁয়াচ বর্জন করে শ্রীঅরবিন্দের যােগ একট, অবজেক্টিভ ভাবেই দেখতে সক্ষম হয়েছেন। দু-একটা উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। যেমন ধরাে- গ্রন্থকার শ্রীঅরবিন্দের “পূর্ণযােগের সাধন প্রণালী” অধ্যায়ে যেখানে লিখছেন : “আধুনিক যুগে মানবতার ধর্ম (Religion of Humanity) চিন্তানায়কদের মন খুব আকৃষ্ট করিয়াছে। মানুষের কর্মজীবনকে শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে একটা নূতন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়া দেখিবার এবং তাহার কর্মধারাকে একটা নূতন খাতে প্রবাহিত করিবার চেষ্টা হইয়াছে। মানবপ্রেম বা বিশ্বমানবের সেবা বর্তমান পাশ্চাত্য সভ্যতার সর্বোচ্চ আদর্শ, পাশ্চাত্য জাতির কর্মধারা এই আদর্শের যতই বিপরীতমুখী হউক না কেন। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’—ইহাই বর্তমান যুগের মূল মন্ত্র। “কথাটা মহাসত্যের অভিব্যক্তিরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে বটে, কিন্তু ইহার কদৰ্থই হইয়া থাকে বেশি। যদি আমরা উপলব্ধি করি যে মানুষ ভগবানেরই অভিব্যক্তি এবং ভগবৎলীলার কেন্দ্রস্থল, আর তাহাকে অবলম্বন করিয়াই পৃথিবীতে ভগবানের পূর্ণতম আত্মপ্রকাশ সম্ভব, তবে নিশ্চয়ই বলিব সবার উপরে মানুষ সত্য'। কিন্তু যদি মনে করা যায় (প্রতীচী তাহাই মনে করে) দেহমন- প্রাণের সাময়িক সংঘাটরূপে যে-মানুষকে আমরা স্থূলভাবে প্রত্যক্ষ করি সেই মানুষই সবার উপরে সত্য, ভগবান্ বলিয়া অন্য কোনাে সত্তা নাই, মানবীয় বৃত্তিগুলির সম্যক্ উন্মেষ-সাধনই এবং মানুষের সুখসম্ভোগের চরম পরিবর্ধনই জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ, তবে তাহা অজ্ঞানেরই নামান্তর। মানুষ সবার উপরে সত্য কারণ মানুষের অন্তরে ভগবান্ বিরাজ করেন, এবং সেই ভগবানের ঐশ্বর্যকে বাহিরে ফুটাইয়া ভােলাই তাহার জীবনের নিগূঢ় উদ্দেশ্য। এই মহাসত্য বিস্মৃত হইয়া আমরা মানুষকে যখন শুধু মানুষরূপেই দেখি, অন্ধ হৃদয়াবেগে অনুপ্রাণিত হইয়া বিশ্বমানবকে প্ৰেমালিঙ্গনে আবদ্ধ করিতে অগ্রসর হই, তখন
যােগী
আমাদের অহংবুদ্ধি একটা বিশাল প্রসার লাভ করে বটে,
কিন্তু বিনষ্ট হয় না। এই মানবপ্রেম কখনও যােগের অঙ্গ
হইতে পারে না, এবং বিশ্বমানবেরও চরম কল্যাণের হেতু হইতে
পারে না।”
উদ্ধৃতিটি একটু দীর্ঘ হয়ে গেল—কিন্তু এর প্রয়ােজন ছিল।
কারণ আমাদের গড়পড়তা অর্ধজ্ঞানপ্রবণ মনে শ্রীঅরবিন্দের
পূৰ্ণযােগের পূর্ণজ্ঞানের শ্যামনাম যে “কানের ভিতর পশিলেও প্রায়ই
“মরমে পশিতে পায় না বলে তুমি বিস্ময় প্রকাশ করেছ তার
একটা জবাব মিলবে এইখানেই, আর কথাটা একটা বড় কথা।
হয়েছে কি, শ্ৰীঅরবিন্দ বিপুল জৈবলীলাকে আধুনিক পরহিতৈষণা
(altruism) বা আন্তর্জাতিকতার আখড়া হিসেবে দেখেন নি।
দেখেছেন ভগবানের লীলা ও বিভূতির ক্রমপ্রকাশপ্রাঙ্গণ হিসেবেই।
এ-যুগে প্রায়ই দেখবে আধ্যাত্মিক সত্যকে মানবিকতার কাঠগড়ায়
দাঁড় করিয়ে হুকুম করা হয়—বিশেষত পাশ্চাত্য দেশে
“বাপুহে, প্রাণে যদি বাঁচতে চাও, অর্থাৎ আমাদের হাল
আমলের নরনারীর কাছে যদি কলুকে পেতে চাও তবে তিন
সত্যি করে যে তােমার সব ঢেউ এসে শরণ চায়, বরণ চায়,
মরণ চায় শুধু এই মানবিকতার অপ্রশস্ত সরােবরে। ভালাে
চাও তাে তাে হলপ করে বলছি যে তােমার যেসব অনুভূতি
উপলব্ধি দৃষ্টি ধ্যান ছোঁয়াছুয়ি মানবিকতার কাজে না আসবে
তাদের তুমি যে শুধু নাকচ করবে তাই নয়, তাদের
সঙ্গে বেশি কারবার যে-ই করবে তাকেই একঘরে করবে
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
সেকেলে বলে, কানপাতলা ব’লে, সমাজশত্রু (anti-social)
বলে।”
কিন্তু ওদেশ বললেও ভারত কোনাে দিনই বলে নি একথা
যদিও এ-যুগের বিশ্বমানবিক দরদীরা সবাই ভারতের বেদ বেদান্ত
দর্শন তন্ত্রমন্ত্রে এই আধুনিক humanist humanitarian ভাষ্য
করতে গিয়ে ডুবেছেন।
ডুবেছেন কথাটা ভুল বুঝাে না। আমি একথা বলছি না যে
এস মানবিক বৃত্তির কোনাে সার্থকতাই নেই। বিশ্বলীলায় এরা
আমাদের চেতনার আরােহণে এক একটা ধাপের কাজ করে
এটুকু বললে আপত্তি করার কিছু থাকে না। তর্ক ওঠে তখনই
যখন শুনি যে এই বৈশ্বমানবিকতা-দেবীই হলেন এ-যুগের একমাত্র
কল্পতরু, গভীরতম সত্য হ’ল এই-ই, এবং (কিমাশ্চর্যমতঃপর!)
এই কথাই বলেছেন বৈদিক ঋষিরা—আবহমানকাল ।
কোথাও বলেন নি। বলা হয়েছে বটে যে “এষ দেবাে
বিশ্বকর্মা মহাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট ” ( বিশ্বকর্মা মহাত্মা
বুকে বুকেই বিরাজ করেন)। কাজেই জীবে শিবজ্ঞান ভাগবত
চেতনার একটি মূল উপলব্ধি, বটেই তাে। কিন্তু তাই বলে এ
ঠিকে-ভুল করা চলবে না যে এহেন বিশ্বকর্মা মহাত্মার উপলব্ধির
পরে শিবজ্ঞানে জীবসেবা আর মানুষকে মানুষ বলে তার উপকার
করতে ছােটা এদুয়ের ভিতরকার ছন্দ অভিন্ন। কারণ সাধারণত
যে-পরােপকারের গুণগানে আমরা পঞ্চমুখ হয়ে উঠে থাকি
একটু ভেবে দেখলেই দেখতে পাবে যে তার স্থান স্বার্থমগ্ন জীবনের
যােগী উপরে হলেও তার মূল প্রেরণাটা অহংবুদ্ধিই বটে—কি না, আমি পরের উপকার না করলে জগন্নাথের রথ চলবে কার টানে? এই জন্যেই অরবিন্দ বলেছেন : “দান ও পরােপকার প্রায়ই অহং- বুদ্ধি প্রণােদিত হয়ে থাকে.••এমন অনেক মানবহিতৈষী দেখা যায় যারা ভারি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবেন যদি আমাদের আশেপাশে গরিবদুঃখীরা চিরদিন না থাকে—কেন না তাহলে তারা উপকার করবেন কাদের?” আমাদের বৈদিক ঋষিরা একথা মর্মে মর্মে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মন্ত্রদ্রষ্টারা যে-মন্ত্রের দীক্ষা আমাদের দিয়ে গেছেন কান পেতে যদি শােনাে তত শুনতে পাবে যে সে-মন্ত্রের মধ্যে এই altruism বা charity-র সুর কোথাও আধুনিক humanist-humanitarian সুরে বেজে ওঠে নি। তাই তারা “বিশ্বাধিপকে” “সর্বভূতেষু গুঢ়” বা “সর্বভূতান্তরাত্মা” বলার সঙ্গে সঙ্গেই বলেছেন যে সব আগে চাই তাকে জানা- যদি মৃত্যুলােক উত্তীর্ণ হয়ে অমৃতলােকের ছাড়পত্র পেতে হয় :- “তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি নান্য পন্থঃ বিদ্যতে অয়নায়— এছাড়া জীবনের পরমার্থ-লাভের আর পথ নেই, থাকতে পারে না—এ তারা বলেছেন অগুন্তিবার। * But even charity and altruism are often essentially egoistic in their immediate motive... There are philanthropists who would be troubled if the poor were not always with us, for they would then have no field for their charity.... ( VIEWS AND REVIEWS, P. 19, 20) অরবিন্দ প্রসনে : কিন্তু মুশকিল কি জাননা? মুশকিল হচ্ছে উপকার করব বলা যত সহজ করা ঠিক তত সহজ নয়। এইটেই আমাদের মুনিঋষিরা বুঝেছিলেন : অর্থাৎ বুঝেছিলেন যে পারমার্থিক জ্ঞান বিনা যথার্থ স্বার্থসন্ধানও হয় না। একটু চোখ খুলে দেখলে একথা দেখতে পাবে স্পষ্টই, চোখে পড়বে তখন এই বিচিত্র স্বততাবিরােধটি যে, “জগদ্ধিতায় যারা সব চেয়ে বেশি ছােটাছুটি করে বেড়ান তারাই সব চেয়ে ব্যর্থকাম হন জগতের কোনাে স্থায়ী হিতসাধন করতে আর যারা আগে বিশ্ব ডিঙিয়ে বিশ্বকর্মাকে লাভ করেন তারাই শ্রেষ্ঠ বিশ্ববন্ধু হয়ে থাকেন। তাই তাে বৈদিক ঋষিরা পই পই করে মানা করেছেন বন্ধনকে মেনে নিতে, বলেছেন অমৃতকে ছুঁয়ে অমৃত হয়ে তবে বিশ্বকে শােনাতে যে “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্য- বর্ণ তমসঃ পরস্তাৎ”—তমসার পারে সেই আদিত্যবর্ণ মহান্ পুরুষকে আমরা জানি—তােমরা শােননা তার কথা—নৈলে তােমাদের হৰে মহতী বিনষ্টি। কাজেই একথা বললে অন্যায় হবে না যে সর্বভূতে ভগবানকে দেখে যাঁরা “সর্বভূতহিতে রতাঃ” থাকেন তাদের আত্মারাম জীবন্মুক্ত ছন্দের সঙ্গে আধুনিক সমাজহিতৈষী বা দেশ- ভক্তদের বহির্মুখী হিতৈষণার ছন্দের মিল থাকার কথা নয়। আরাে, এটুকু না বুঝলে হবেই হবে গােড়ায় গলদ—আধ্যাত্মিকতার মূল্য- জ্ঞানের তছনছ। যথার্থ আধ্যাত্মিক চেতনার গােড়াকার কথা ভাে তার অধ্যাত্ম-অনুভূতির industrial application নয়, শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক জীবনের ঐকান্তিক লক্ষ্য হল ভগবানে আত্মসমর্পণ। এমন কি খৃষ্টও এই কথাই বলেছিলেন, যেমন ধরাে যখন জনতা যােগ তাকে বলল দেখ, তােমার মা ভাইরা বাইরে দাড়িয়ে—তােমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তখন খৃষ্ট বলে উঠলেন : তখন খৃষ্ট বলে উঠলেন : “আমার ভাই । আমার মা ! কে তারা ? স্বর্গে আমার যে-পিতা আসীন তাঁর ইচ্ছার অনুবর্তী যারা তারাই আমার ভাই-বােন বাপ-মা।** খৃষ্টের কথা তুললাম আমি ইচ্ছে করেই। কারণ বাইলটা মন দিয়ে পড়লে দেখা যায়—যদি অবশ্য তথাকথিত হিতৈষণার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখা যায়—যে ঋষিদের মতন খৃষ্টও বরাবরই সবচেয়ে জোর দিয়েছিলেন ভগবানের আদেশের পর। তাই তিনি বারবারই দুঃখ করেছিলেন যে ভাগবত পরােয়ানা নিয়ে যারা আসে তাদেরকে অজ্ঞান মানুষ মানে না, মানে তাদেরকে যারা স্ব-স্ব-প্রধান; বারবারই জানিয়েছেন যে প্রার্থনীয় হ'ল এই মন্ত্র : Our Father which art in heaven, hallowed be thy name”—“স্বৰ্গাসীন পিতার নামই পুণ্যনাম বলে গণ্য হােক”; বারবারই বলেছেন : “Thou shalt love the Lord thy God with all thy heart and with all thy soul and with all thy mind... And call no man your father upon the carth : for one is your father which is in heaven." + "Who is my mother ? and who are my brethren 1...For whosocver shall do the will of my father which is in heaven, the same is my brother, and sister, and mother." ( ST. MATTHEW--12/50) । “ভগবানই তােমাদের প্রভু তাকেই ভালােবাসবে সর্বান্তঃকরণে-মনে প্রাণে•••এ-জগতে কাউকে পিতা ব'লে ডাকবে না—কারণ তােমার পিতা কেবল একজন--যিনি স্বর্গে আসীন।”
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে আশা করি তুমি আন্দাজ করতে পেরেছ আমি এসব কেন বলছি এত করে। আমি এ সূত্রে দেখাতে চেয়েছি যে শ্রেষ্ঠ অধ্যাত্মবিত্র আবহমানকাল পরমার্থকে দেখেন নি ঐহিকতার তাঁবেদার হিসেবে উল্টো দিকেই তাদের ঝোঁক পড়েছে—সর্বদেশে, সর্বযুগে। কিন্তু হাল আমলে—বিশেষ করে বিজ্ঞানবুদ্ধির অভ্যুদয়ের পর থেকে—যখন শুধু জড়বাদ ও ইন্দ্রিয়জগৎ-ই হয়ে উঠল মানুষের যথাসর্বস্ব, তখন অধ্যাত্ম সাধনার মূল দৃষ্টিভঙ্গিটিকেই নাকচ করার প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠল আধুনিক বিশ্বমানবতার উচ্ছাসলােকে। শ্ৰীঅরবিন্দকে তাই বলতেই হ’ল যে জড়বাদ ও ঐহিকতার মধ্যে সত্য থাকলেও ভাগবত সত্যের প্রামাণিকতার পরীক্ষা হতে পারে না তার কোনাে ঐহিক লক্ষ্যসিদ্ধির আশু বিচারে, কাজেই পূর্ণযােগ হতে পারে না একান্ত মানবলক্ষ্য। তিনি এই কথাটি লিখেছিলেন একটি চিঠিতে বেশ প্রাঞ্জল ভাষায় : যে, “বিশ্বমানবের কাজে আসতেই হবে, এ-ধরণের গােলমেলে কথার আমদানি হয়েছে পশ্চিম থেকে : এর বাণী হ’ল আসলে ধারকরা। বিশ্বমানবের কাজে আসার জন্যে যােগের কোনাে দরকারই নেই, যেহেতু যে কেউ যে কোনাে ক্ষেত্রে যা কিছু করুক না কেন বিশ্বমানবের কোনাে না কোনাে কাজে আসেই আসে।” না—বলছেন তিনি—“যােগের লক্ষ্য ভগবান—বিশ্বমানব নয়।” বন্ধুবর অতিমান অবতরণের কথা তুলেছিলেন বলে শ্রীঅরবিন্দ লিখেছিলেন আরাে : “অতিমানস চেতনা যদি নামে ও মত্যলােকে যােগী প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে অবশ্য মত্য লােকের অনেক ছন্দবদল হবে মর্ত্য-জীবনেরও। কিন্তু মানুষের জীবনে সে-অবতরণের দরুণ যে- তােলপাড় আসবে সেটি হবে তার একটি আংশিক ফল মাত্র আমাদের যােগের একমাত্র উদ্দেশ্য ব’লে সে গণ্য হতে পারে না। পূর্ণমােগের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে শুধু দিব্য চেতনায় বিধৃত হওয়া এবং তাকে জীবনে প্রকাশ করা।” এখানে স্বতই প্রশ্ন ওঠে—যে তাই যদি হয় তাহলে এ-জগতের কী দরকার ছিল ? এ-প্রশ্নের উত্তর শ্রীঅরবিন্দ বহুবার দিয়েছেন তার বহুমুখী জীবনজিজ্ঞাসায়। তার গোড়াকার কথাটা এই যে এ-জগতে ভগবানের লীলা প্রত্যক্ষ করতে হবে তাঁরই অনুজ্ঞায় তাকে উপলব্ধি করে—তাকেই আত্মসমর্পণ করে। প্রেম বলাে কর্ম বলল জ্ঞান বলে সবই পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে তাকে পেলে তবেই *The idea of usefulness to humanity is the old confusion due to second-hand ideas imported from the West. To be useful to humanity there is no need to do Yoga. For everybody who lives the human life is useful to humanity in one way or another... Yoga is directed towards God, not towards Man. If a divine Supramental consciousness and power can be brought down and established in the earth, that would obviously effect an immense change in the earth including humanity and its life, but this effect on humanity will be only one result of the change, it cannot be the whole object of our Yoga. The whole object of our Yoga can only be to live in the divine consciousness and manifest it in life.
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে
নৈলে নয়। বারবারই তিনি বলেছেন যে, ভগবানকে বাদ দিলে
যা-ই করাে না কেন অকৃতার্থই থেকে যাবে—আমাদের নশ্বরতা
শুভদা বরদা হবে কেবল তখনই যখন আমরা অমৃত হব তাতে
তন্ময় হয়ে। আর এই-ই হল আমাদের একটি পরম ও চরম
আপ্তবাক্য :
যে পূর্বদেবা ঋষয় তদ্বিদুঃ
তে তন্ময়া অমৃতা বৈ বভূবুঃ *
শ্ৰীঅরবিন্দ তার পূর্ণযােগে অবশ্য এছাড়াও আরাে অনেক
কথাই বলেছেন—আগেকার দ্রষ্টারা যা দেখেছিলেন সেইখানেই যে
সত্যদৃষ্টির মহাসমাপ্তিপর্ব একথা কদাপি মানেন নি। তিনি বরাবরই
ব’লে এসেছেন যে, আমাদের আগেকার উপলব্ধির সর্বোচ্চ
শিখরকেও ছাড়িয়ে গিয়ে—সর্বোত্তম আনন্দরাজ্যেও উত্তরোত্তর
প্রসার চাইতে হবে।
কিন্তু সে হ’ল পরের কথা। সব আগে শ্রীঅরবিন্দের মূল
মন্ত্রের এই কথাটি মনে, ছ’কে নিতে হবে যে ঐহিক জীবন বিধৃত
পরমার্থেই। মনে রাখতে হবে যে, এখানে তিনি “পূর্বদেব ও
ঋষিদের” সুরেই সুর মিলিয়ে তার নবতন আবিষ্কারে পেয়েছেন
সেই শাশ্বত মন্ত্রসাধনারই মৃত্যুহীন প্রস্বন যে, “Our mortality
is only justified in the light of our immortality ;
our earth can know and be all itself only by opening
* আমাদের আগের দেবতা ও ঋষিরা তাঁকে জেনে আঁতে তন্ময় হয়ে
তবেই অমৃত হয়েছিলেন। (বেতাশ্বত)
১৩০
যােঙ্গী
to the heavens ; the individual can see himself aright
and nse his world divinely only when he has entered
into greater planes of being and seen the light of the
Supreme and lived in the being and power of the
Divine and Eternal."
“মরতা হবে বরদাযে-সুদিনে
মানব তার আপন আলাে-অমৃতে লবে চিনে।
অন্ধকার অবনী তার স্বরূপে অমলিন
স্বয়ং-প্রভা হবে শুধু—যেদিন
অন্তরে সে জানিবে তার যা-কিছু জানিবার।
সেদিন ধরা মেলিবে দল তার
কমলসম অমরাবতী পানে
পরমতম নীলিমা তার অঙ্গীকারি প্রাণে।
ভুবনে নর দিব্যলীলা করিবে বীতশােকে
লভিবে ঠাই উচ্চতর চির-চেতনা-লােকে—
যেথা সে প্রেম-চিন্ময়ের আনন্দ-প্রভাতী
নয়নে করি’ বরণ হবে শরণে তারি সাথী
মিলনে তারি শক্তি লভি’ জীবনে হবে জয়গরবী
স্বপনসুখে কিরণ কবি আঁধার করি’ আলা
জীবনভােরে গাঁথিয়া তারই মন্ত্রমণিমালা।”
এ-কথাগুলি বলে ভালােই হ’ল। আরাে এই জন্যে যে
হাল আমলে অন্তরের এই সব অমৃতবাণীকে বিচার করা হয়
অবিল প্রসঙ্গে তার কয়েকটা বাহ প্রকাশের যাচাই দিয়ে। এভাবে শাশ্বত অমৃতমন্ত্রদের সত্যমূল্য-নির্ধারণ যে হতেই পারে না একথা যােগী শ্রীঅরবিন্দের বহু উজ্জ্বল খণ্ডনের স্বাক্ষরেই আমরা পাই। কিন্তু পেলে হবে কী? নিতে না চাইলে ? আর আর নিতে -চাওয়া মানেই তাে বুঝতে না-চাওয়া—তার যােগদীক্ষার পরম বাণীটি কী। এ-মনােভাব নিয়ে শ্রীঅরবিন্দের শ্রীঅরবিনের সাধনসত্যকে বুঝতে গেলে দুর্বোধ্য লাগবে না? কিন্তু হরিদাস বাবুর বইটি পড়লে বুঝতে পারবে যে সরল জিজ্ঞাসুর ভঙ্গিতে জানতে চাইলে শ্ৰীঅরবিন্দের যােগতত্ত্বের সৰ না হােক অনেক কিছুই সুবােধ্য মনে হয়। তাই তাে বলছিলাম যে এ-ধরণের বইয়ের আত্মপ্রকাশ এ-যুগে বিশেষ বাঞ্ছনীয়। “বিশেষ” বললাম এই জন্যে যে, এ-যুগে আমাদের গ্রহণরীতির ভঙ্গি এত বদলে গেছে যে অধ্যাত্মপথেও আমাদের বিচারবুদ্ধির খানিকটা সায় না পেলে আমরা কেমন যেন স্বস্তি বােধ করি না। কেন না যদিও আমাদের গভীরতম বিকাশের পথে বাতি ধরতে পারে এক অধ্যাত্ম উপলব্ধির আলাে, তবু—বলছেন শ্রীঅরবিন্দ এ পথেও “মানস চিন্তা ও বিচারবুদ্ধির সমর্থনের মূল্য যথেষ্ট থাকে। এমন মানুষ দেখা যায় বটে যারা আন্তর সত্যলোকের সঙ্গে নিবিড় অপরােক্ষ সংস্পর্শে আসতে পারেন, তারা পারেনও উপলব্ধি অন্ত দৃষ্টিকে নিয়ে বেশ সুখে ঘর করতে—কিন্তু তবু সব জড়িয়ে ব্যাপারটাকে দেখতে গেলে বুদ্ধিকে আমল না দিলেই নয়। সর্বোত্তম সত্য যদি হয় আধ্যাত্মিক, তাহ'লেও বুদ্ধির যােগী জানালােনা হওয়া চাই সেই আদিম সত্যের সঙ্গে, বােক চাই তার সঙ্গে জৈবলীলার সম্বন্ধটি কী। অধ্যাত্ম সত্যের সঙ্গে বুদ্ধি আমাদের মুখােমুখি করিয়ে দিতে পারে না বটে, কিন্তু সহায় হতে পারে সে-সত্যের একটা মানস ছক-কাটার কাজে—এই সুত্রে মনের কাছে তার যাথাতথ্যকে প্রাঞ্জল করে দিয়ে। বুদ্ধিকে এভাবে সােজাসুজি সন্ধানের দিকে নিয়োেগ করা যেতে পারে বৈ কি : আর এ-সহায়তার মূল্যও খুবই বেশি।” তাই একথা অকুতােভয়েই বলা চলে যে, বুদ্ধির হাজারাে দোষত্রুটি থাকলেও শ্রীঅরবিন্দের অধ্যাত্মবাণীকে তার বােধগম্য ভাষায় তর্জমা করাটা হবে একটা কাজের মতন কাজ—বিশেষ করে যদি তাঁর গভীর বাণীর কিছুও মাতৃভাষার দৌত্যে আমাদের প্রাণনহলে পৌছে দিতে পারা যায়। গ ১ *...but the support of the reflective and critical reason is also of great importance, if many can dispense with it, because they have a vivid and direct contact with inner realities and are satisfied with experience and insight, yet in the whole movement it is indispensable. If the supreme truth is a spiritual Reality, then the intellect of man needs to know what is the nature of the original Truth and the principle of its relations with the rest of existence, to ourselves and the universe. The intellect is not capable by itself of bringing us into touch with the concrete spiritual reality, but it can help by a menta) formulation of the truth of the Spirit which explains it to the mind and can be applied even in the more direct seeking : this help is of capital im portance. (LIFE DIVINE-VOL. II-PP 890-91) ১৩।
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে হরিদাস বাবুর বইটিতে এই লক্ষ্যসিদ্ধি হয়েছে বলেই মনে হয় যে বইটি আমাদের বাঙালি পাঠকপাঠিকার কাছে বিশেষ আদরণীয় হয়ে উঠবে। অন্তত যারা অন্তৰ্জীবনের তত্ত্বজ্ঞ হতে চা-—শুধু তথ্যজ্ঞই নয়—তাদের কাছে। কেননা এ-বইটির একটি প্রধান গুণ এইখানেই যে অন্ত দৃষ্টির আলাে গ্রন্থকারের স্বচ্ছ বুদ্ধির উল অঙ্গীকারে এর ছত্রে ছত্রে নির্মেঘ হয়ে ফুটে উঠেছে। একটি দৃষ্টান্ত দিই : “পূর্ণযােগী যখন শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য, বিজ্ঞান বা দর্শনের ভূমিতে আসিয়া কাজ করেন তখন সৃষ্টির অপূর্বতায় সত্যদৃষ্টির অভাবনীয় গভীরতায় নবযুগের প্রবর্তন করিতে পারেন। কিন্তু সেইজন্য শিল্প সাহিত্য প্রভৃতিকে অপরিবর্তিতভাবে যােগের অঙ্গরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে না। পূৰ্ণযােগী সঙ্গীতচর্চা করিবেন অথবা সাহিত্যসেবা করিবেন, সাহিত্যরসে অথবা সঙ্গীতের আনন্দে ডুবিয়া থাকিবার জন্য নহে, ভগবানের নিকট উৎসর্গ করিয়া ভগবানেরই সেবা বা উপাসনারূপে।” তােমার হয়ত মনে হতে পারে এ তাে অধ্যাত্মবিদ্যার্থীরা সবাই জানেন। কিন্তু অধ্যাত্মবেশে শুধু উপর উপর জানলেই তাে হবে ভাই ! বলতে কি, জানা হ’ল দীক্ষার প্রথম কথা বর্ণপরিচয়। তার পরের কথা হ’ল মানা-অভিনিবেশ । তারও পরের-প্রাণ টানা-আত্মসমর্পণ। তাই অধ্যাত্মবিদ্যার্থীরা অনেকেই এটা লোক- মুখে শুনে এলেও এটা তারা জেনেছেন খানিকটা তথ্য হিসেবে অর্থাৎ অধ্যাত্মতীর্থযাত্রীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এই রকমই হয়ে ১৩ যােগী এসেছে এই জনশ্রুতির স্বাক্ষরে। শ্রদ্ধা যাদের কাছে সহজ তাদের পক্ষে এই জনশ্রুতি বা আপ্তবাক্যকে গ্রহণ করাও একটু সহজ হয়ে থাকে। কিন্তু তাহ'লেও এটা হ’ল পথচলার মাত্র পয়লা ধাপ। এর পরের ধাপ হ’ল মানা-recognition-যে মত-জীবন-তরুর মূল হ’ল উপবাশ্রয়ী—আর “তাকে যে-ই জেনেছে সে-ই অমৃত হয়েছে।” কিন্তু অমৃত যে শুধু তিনি এটুকু জানলে কিংবা মানলেও চলবে না 01: "So long as one is satisfied with looking through windows, the gain is only initial; one day.one will have to take up the pilgrim's staff and start out to 'journey there where the Reality is for ever manifest and present." হরিদাস বাবুর বইয়ে এই তীর্থযাত্রার আবশ্যিকতা সম্বন্ধে অনেক সারগর্ভ কথাই আছে, না থাকলে বইটির মূল্য এত বেশি হতে পারত না হয়ে দাঁড়াত খানিকটা পিপড়া বুলিরই সামিল। বলেছি তার একটি মস্ত কৃতিত্বই এইখানে যে অধ্যাত্মসত্যে তার যে শুধু মানসিক প্রবেশ আছে তা নয় অন্তর সায় আছে। তুমি জানে। আমরা যখন কোনাে ভালাে বই পড়ি তখন লেখকের এই আর সায়ইsincerity—আমাদের অন্তরকে সবচেয়ে আকৃষ্ট * শুধু ঘরে বসে জানলা দিয়ে অলস প্রেক্ষণে সত্যতীর্থের দিকে ঠায় চেয়ে খুসি থাকলে লাভটা কোনােদিনই শুরুর কোঠা পেরুবে না—একদিন না একদিন সবাইকেই লােটাকম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে সেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশে যেখানে সত্যের সত্য নিৱবগুণ্ঠ ও সদাসজাগ (“অনামী"-তে শ্রীঅরবিন্দের পত্র ৩০৭ পৃষ্ঠা)। ০ অবিল প্রসঙ্গে করে। কেন না মন মনকে টানে বটে, কিন্তু অন্তর সাড়া দেয় কেৰল আন্তরিকতার ডাকে। হরিদাস বাবুর বইটির নানা ব্যাখ্যায় তর্পণে এই ডাকটি বেজে উঠেছে গভীর সুরেই : তিনি শ্রীঅরবিন্দের যােগকে বুঝেছেন শুধু তার মনের মনীষা দিয়ে নয়, প্রাণের তৃষ্ণা দিয়ে, অন্তরের শ্রদ্ধা দিয়ে, সত্তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির বিনতি দিয়ে। আমি তোমাকে বারবারই বলেছি যে শ্রীঅরবিন্দের যােগে যে আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় এখনাে পর্যন্ত তেমন ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে পারেন নি এতে অত আশ্চর্য না হতে, কেন না শ্ৰীঅরবিন্দের যোগকে গ্রহণ করা বেশির ভাগ মনােজগতের বাসিন্দার পক্ষেই কঠিন আরাে এই জন্যে যে শ্রীঅরবিন্দ যে-যােগ চাইছেন সেটা কোনো একটা বস্তুতান্ত্রিক অতিবুদ্ধির দলিল নয়, নয় কোনাে ইস-বর্গীয় ধুমধােকা, এমন কি কোনাে সর্বধর্মসমন্বয় বা সর্বতন্ত্রসার- সঙ্কলন জাতীয় পল্লবগ্রাহিতাও নয়—যার গালভরা নাম হল eclecticism: এ-ধরণের কোনাে মানস-স্বাক্ষরিত জুৎসৈ হাল ফ্যাশনের সহজ ব্যবস্থা দিলে উৎসাহী দীক্ষার্থীরা আসত বানের জলের মতন—“শ্রীঅরবিন্দজীকি জয়” বলতে বলতে। কিন্তু তিনি যে পেয়েছেন এক নব বাণী, নব মন্ত্র, নব সত্য-যার আবাহনে তঁাকে আজও সর্বত্যাগী তপস্যায় ব্রতী থাকতে হয়েছে কত নিন্দা কত কুৎসা, কত ভুলবােঝা, কত ক্ষত ও ক্ষতি স্বীকার করে। তার কাছে আমরা শুনেছি এর জন্যে কত তাকে সইতে হয়েছে, পর্বত- এমাণ বাধাবিপত্তিকে হয়েছে পেরুতে, করতে হয়েছে যুদ্ধ, সইতে হয়েছে ক্ষত ক্ষতি, কাঁটাবনে মরুকারে চলতে হয়েছে পথ কেটে •• ১৫০ যােগ —শুধু ভগবানকে আবাহন করতেই নয়—মানুষের মধ্যে যারা চাইল উধ্বাভিসারের অগ্রদূত হ'তে তাদেরও প্রতিভূ হ'য়ে। সঙ্গে সঙ্গে মানবতার পিছুটানকেও হয়েছে কাটাতে—শুধু হালকা লীলাখেলায় নয় ঐকান্তিকতার কঠোর পণে উপলব্ধি করতে হয়েছে এই সব বাধাবিঘ্ন বিরুদ্ধতার পূর্ণ প্রতাপ—প্রতিহত হতে হয়েছে যে কতবার—ঠেকে তবে শিখতে হয়েছে এ পথে জয়লক্ষ্মীর প্রসাদ, অর্জন করতে হয় কী অতন্দ্র সাধনায়, আর কত দাম দিয়ে। তাই তাে তিনি পেয়েছেন সেই দিব্যজ্ঞামের আলাে যার অন্তরে দিব্যপ্রেমের অমৃত। নৈলে কি তিনি বলতে পারতেন (আনাকে লেখা একটি পত্রে) : “অজস্র দাম দিয়ে তবে এ-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বলেই তােমাদেরকে এত করে বলি আজ :(অন্তরকে দিশারি করে রবিকােল পথেরই পথিক হয়ে চলাে। জেনাে ভগবান আছেন তােমাদের ধারণ করে, তোমাদের সাথের সাথী হয়ে, কাল পূর্ণ হলেই দেখা দেবেন—দুর্গম কঠিন ঘােরালাে পথে পা না-ই বা বাড়ালে। *** এই কথাই আমি বলেছি আমার “প্রেমী” প্রবন্ধে। কারণ এই যে-সুর শােনালাম তার স্নিগ্ধ লিপির গভীর ঝঙ্কারে—এই যে # * It is because of our experience won at tremendous price that we can urge upon you and others : 'Take the psychic attitude, follow the sun-lit path, with the Divine openly or secretly upbearing you if secretly, he will show himself in good time-do not insist on the hard, hampered, round-about and difficult journey.'
অবিল প্রসঙ্গে সনির্বন্ধ অনুরােধ, শুভকামনা, নিজের সাধনার আলােয় অপরের পথ সুগম করবার আকাঙ্ক্ষা এর নাম তাে শুধু জ্ঞানের দিঙ নির্ণয় ৰৰ ভাই—এরই নাম প্রেম—স্বার্থগন্ধহীন পরহিতব্রত প্রেমের পরম ছল। কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের যােগের একটা মস্ত বাণীই হ’ল এই যে প্রেম প্রতিষ্ঠা পায় না জ্ঞানের বনেদ বিনা। কাজেই প্রেম চাইতে হলে জ্ঞানেরও সাধনা অপরিহার্য—যেহেতু জ্ঞানই দেয় সে-দৃষ্টি যে দেখতে পায় প্রেমের পথে কত অগুন্তি বাধা। এ-জ্ঞান যত উধ্বতর লােক থেকে আসে বিশ্বরহস্যের ঘন্ধকার তত ফিকে হয়ে আসে বটে, কিন্তু পূর্ণদৃষ্টি মেলে কেবল তখন যখন প্রকট হয় (শ্রীঅরবিন্দের ভাষায়) (অতিমানস—Supramental লােকের আলাে] এ-সত্যের দিশারি অরবিন্দ নিজে। তিনি বলেন যে এর দিশা বৈদিক যুগের ঋষিরা কিছু কিছু পেয়ে- ছিলেন—কিন্তু এ-যুগের মানুষ এর এ-যুগের মানুষ এর কোনাে খবরই রাখে না। তিনি তার অদ্ভুত সাধনায় এ-সত্যের দিশা তথা আদেশ পেয়েছেন কিন্তু এ-ও জেনেছেন যে এ-সত্যালােক প্রতিভাত হবার পথে এখনাে বাধা আছে-যদিও এর অবতরণ অবশ্যম্ভাবী এ-কথা তিনি বারবারই বলেছেন তার নিঃসংশয় প্রতীতির মন্ত্রমান্ ছন্দে। যারা এ-সত্যের মর্মবাণীটি শুনতে চান তাদেরকে তার লেখা পড়তেই হবে, কেননা শ্রীঅরবিন্দ শুধু যে অনন্যতন্ত্র মন্ত্রর্ষি তাই নয়, অনন্ততন্ত্র ভাষ্যকারও বটেন। কিন্তু যেহেতু তার বিবর্তনবাদের মূল ধারাটি ধরতে হলে তাঁর যােগল এই অতিমানস তত্ত্বের ১২ যােগ ছক কাটতে শিরােমণিত্ব সম্বন্ধে একটা মােটামুটি ধারণা করতেই হয় সেহেতু এসম্বন্ধে ভয়ে ভয়ে একটু আধটু লিখেই ক্ষান্ত হব, কেননা যদি মন দিয়ে একে ধরা-ছোঁয়া যায় না একথা শ্রীঅরবিন্দ বহুবারই বলেছেন—তবু বিশ্বলীলার একটা একটা মনােগ্রাহ হলে এর কিছু হদিশ না দিলেই নয় বুঝে বুদ্ধির পরিভাষায় এ-তত্ত্বের যতটা আভাষ দেওয়া সম্ভব তিনি দিয়েছেন তার স্বর্ণোজ্জ্বল ভাষার অশ্রুতপূর্ব ছন্দে। এসম্বন্ধে প্রথম যেকথা মনে রাখাই চাই সেটা এই যে অতিমানসসিদ্ধি শ্ৰীঅরবিন্দের পূর্ণযােগের মুকুটমণি হলেও এ-সিদ্ধি হ'ল অনেক পরের কথা—সাধকদের এ নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামালেও ক্ষতি নেই, যেহেতু অতিমানসসিদ্ধির জন্যে আকুলি বিকুলি না করেও শ্রীঅরবিন্দের যােগে অনেকখানি অগ্রসর হওয়া সম্ভব। তার কাছে আমরা শুনেছি বারবারই যে ভাগবত জীবন বা ভগবৎ- মিলন অতিমানসসিদ্ধির আগেই হতে পারে। মানুষের চেতনার আরোহণকে তিনি যে দেখেছেন সমগ্র বিশ্বলীলার সুবিস্তীর্ণ পটভূমিকায়। একথাটি হরিদাস বাবু তাঁর “দেশসেবা ও যােগ” নিবন্ধে বেশ পরিস্ফুট করে তুলেছেন। লিখেছেন : “বিশ্বপ্রকৃতি নিজেই এক মহাযােগে নিমগ্না, আর সেই যােগই মানুষের সজ্ঞান সহযােগের মধ্য দিয়া রূপ গ্রহণ করে আত্মসমর্পণ যােগে।” এর ফলে মানুষের চেতনার বিকাশ কোন পথে কী ভাবে হয় ধাপে ধাপে, হরিদাস বাবু আরাে ফুটিয়ে তুলেছেন—তার পুনরুক্তির প্রয়ােজন দেখি না। কেবল শেষের কথাটুকু উদ্ধৃত করি যেখানে তিনি বলেছেন : ১০ শ্রীঅরবি প্রসঙ্গে “যেহেতু আত্মসমর্পণ শ্রীঅরবিন্দের যােগের মূল কথা, আমরা বলিতে পারি যে, এ-যােগ ভগবানের নিজেরই যােগ। ভগবান নিজেই এ-যােগের সাধক, নিজেই ইহার সাধ্য। কাজেই এ-যােগে চেতনার উধ্বগতি হয় ধীরে ধীরে এবং অতিমানসসিদ্ধির অপেক্ষা রেখেই, দিব্যজীবনের গােড়া পত্তন হতে পারে। এক কথায়, ভাগবত জীবন অতিমানসসিদ্ধির অগ্রদূত। কিন্তু তাহলে স্বতই মনে ফের এই প্রশ্নের উদয় হয় যে এই অতিমানসসিদ্ধি ঠিক কী বস্তু? সুপ্রামেণ্টাল নামটা শুনেই পুথিপণ্ডিতদের কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি-“এ তাে অতি সােজা কথা, উনি হচ্ছেন মেন্টালের উপরওয়ালা কোনাে এক উপাধ্যায়”—অর্থাৎ “যতত বাচা নিতন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ” আর কি। কিন্তু এ-ধরণের সত্যপাঠের মধ্যে পাঠ থাকলেও সত্য বলে যাকে আমরা বরণ করতে চাই তার কোনাে পরিচয়ই পাই না। কারণ শ্রীঅরবিন্দের কাছেই শুনেছিমনের উপরওয়ালা তাে একটি নয়—অনেকগুলি। এই সব স্তরের চলন বলন ধরণ- ধারণের বিশদ খবর দেওয়া এপত্রের উদ্দেশ্যও নয়—আমার সাধ্যেরও বাইরে—যদি জানতে চাও যেতে হবে তােমাকে শ্রীঅরবিন্দেরই কাছে। আমি এ-কথা তুললাম কেন বলেছি—শুধু একটা ছক কাটতে। কেবল একটা কথা : মনাতীত স্তর একাধিক বলতে যেন ভেবে বােসাে না যে এদের মধ্যে কোনাে ছোঁয়াছুয়িই হয় না।
যােগী শ্রীঅরবিন্দের কাছে আমরা বহুবারই শুনেছি যে এ-বিশ্বজগতের মধ্যে স্তর বা পংক্তি-ভাগ থাকলেও সে-ভাগ এমন নিরেট নয় যার ফলে এর সঙ্গে ওর সবরকম লেন-দেনেরই পথ বন্ধ। আমার এক ইংরাজবন্ধু এ নিয়ে খুব তীক্ষ্ণভাবে ভাবতেন, মাথা ঘামাতেন। তাতে ১৯৩০ সালে শ্রীঅরবিন্দ তাঁকে লিখেছিলেন একটি দীর্ঘ পত্রে । “If we regard the gradation of worlds or planos as a whole, we see them as a great, connected, complex movement : the higher precipitate their influences on the lower, the lower reacts to the higher and develop or manifest in themselves within their formula something that corresponds to the superior power and its action." কিন্তু তবু মনের ভাষায় বােঝাতে হলে ভাগ-করার আশ্রয় নিতেই হয়, কেন না—শ্রীঅরবিন্দের কাছেই শুনেছি বহুবার যে মনের ধর্মই হ’ল খণ্ড খণ্ড করে তবে বােঝ—এ-ভাবে এক এক করে একে ওকে তাকে না বুঝলে তার কাছে সবই বাপসা থেকে যায় সে কাউকেই ধরেছুয়েও নাগাল পায় না যেন। যাহােক মােটামুটি ছকটা দাড়ায় এই ধরণের : . * এ-বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নানা লোেক বা জগতকে বদি সমগ্রভাবে দেখি তাহলে দেখতে পাব যে এ হ’ল একটি সুসংবদ্ধ বিশ্বপ্রকাশ-জটিল, বহুমুখী। এখানে বড় প্রভাব ফলল, দানা বাঁধল ঘােটর মধ্যে, আবার ছোট সাড়া দিল বড় ছোওয়ায় যাতে করে তার স্বছন্দের স্বরাজের মধ্যে ছায়িত হয়ে উঠল কিছু না কিছু বড় শক্তি বা ক্রিয়া। ১৪৫ শ্রীঅরবিন প্রসঙ্গে ০ ০ ০ প্রদীপ্ত মানস উত্তর মানস অতিমানস Supermind অধিমানস Overmind সম্বুদ্ধ মানস Intuitive Mind Illumined Mind Higher Mind মানস Mind কিন্তু এদের মধ্যে একটু আধটু ছোঁয়াছুয়ি ঘটলেও—এবং একথা সত্য হলেও যে “আমাদের মন নানাদিকেই নিজেকে ছাড়িয়ে যায়” তবু—বলছেন শ্রীঅরবিন্দ—“আমাদের মন তার যুক্তিবিচার দিয়ে এদের সত্যিকার কোনাে নাগালই পায় না। সে পারে বড় জোর একজন দর্শক বা কেরানির মতন এসব উধ্ব- লােকের মতিগতির হিসেব রাখতে, আভাস-ইঙ্গিত টুকে নিতে।”+ কিন্তু তবু এটুকুও সে পারে মানস থেকে অধিমাস পর্যন্ত চৈতন্যলােকের এলাকায়—কেন না এই চৌহদ্দির মধ্যে এসব দৈবী চেতনা আত্মপ্রকাশ করেছে—নিজেকে জানান দিয়েছে—কমবেশি "...there are several directions in which human mind reaches beyond itself, tends towards self-exceeding." (THE LIFE DIVINE- Supermind, Mind and the Overmind Maya.......... 417. ) + "...but at this stage the judgment of reason becomes quite inapplicable, it can only act as an observer or registrar understanding or recording the more luminous intimations, judgments and discriminations of the higher power." ( Ibid. Vol. II--The Ascent Towards Supermind, p. 999.
যােগী প্রত্যক্ষ ভাবে—সােজাসুজি। কিন্তু অতিমানসের বেলায় এটুকুও ঘটেনি যেহেতু এযাবৎ এ-স্তরের সত্যের কোনাে প্রত্যক্ষ প্রকাশ হয় নি আমাদের দেহমনপ্রাণলােকে—নিচের এই সব থাকগুলির মধ্যে দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে যা একটু আধটু ছিটেফোটা এসে পৌছেছে। কিন্তু এটুকু যথেষ্ট নয় এইজন্যে যে অতিমানস তার স্বধর্মে সক্রিয় হতে পারে না যদি না নিজের অনুকূল পরিবেশ, পায়। এই পরিবেশ বিবর্তনে ইভশনে গড়ে উঠছে বটে— এবং তারই নাম হ’ল বিশ্বপ্রকৃতির যােগলীলা এ-ও সত্য—কিন্তু হলে হবে কি, নিচেকার এই সব স্তরের সঙ্গে অতিমানস স্তরের একটা মস্ত প্রভেদ এইখানে যে অধিমানস থেকেই অজ্ঞানের অবিদ্যার গৌরচন্দ্রিকা শুরু হয়েছে, তার নিচের স্তরগুলিতে তাে অজ্ঞানের যাকে বলে একেবারে পালা-গান। কিন্তু অতিমানসে একটুও ছোঁয়া লাগে নি অবিদ্যার, অজ্ঞানের সে ছায়াও মাড়ায় নি। কাজেই অজ্ঞানের এবং অধজ্ঞানের রাজ্যে এই নিষ্কল অপাপবিদ্ধ চেতনার অবতরণ হলে সে-ভার এরা ধারণ করতে পারে না (পরমহংসদেবের উপমা-হাতি নামলে ডােবাটা পারবে কেন সাম্লাতে ?) কিন্তু তবু বিবতন তাে চলছেই অক্লান্ত ছন্দে —সে থামবে কেমন করে? কাজেই ক্রমশ সময় আসছে যখন দেহ, প্রাণ, মানস, উত্তর মানস, প্রবুদ্ধ মানস, সম্বুদ্ধ মানস, অধিমানস সবাই হবে অতিমানস চৈতন্য-প্রবুদ্ধ, অর্থাৎ যখন অতিমানস সত্যের অবতরণ হবে এই সব নিম্নতর স্তরে। হবে কী জন্যে? এই জন্যে যে প্রতি স্তরেই তার উধ্বতর সত্যের বীজ ১৪৭
শ্রীঅরবি প্রসঙ্গে
রয়েছে উপ্ত, আর বিবর্তনের উপরেই ভার—এই সব নিহিত
বীজে মুকুল ফলিয়ে ক্রমশ ফুল ফলের ফসল ফলানাের। কাজেই
অতিমানস সত্যের চাপ ক্রমশই বাড়ছে—বাড়তে বাধ্য—এই সব
নিম্নতর স্তরে। ওদিকে এই সব নিম্নতর স্তরও সাড়া দিচ্ছে—
চাইছে এই উধ্বলােকের স্পন্দন—অবতরণ। কাজেই এখন
সময় এসেছে, বলছেন শ্রীঅরবিন্দ, যখন নামবে এই অতিমানসের
টল। কিন্তু বিচিত্র বিবর্তনের লীলাখেলা—বিশেষ করে এই
উতর সত্যের নিম্নতর লােকে অবতরণের সন্ধিলগ্নে। উপরের
চাপ ও নিচের ডাক এলেই হবে না, চারদিকের পরিবেশকেও
অন্তত খানিকটা তৈরী হতে হবে তাে-প্রকৃতির মধ্যে এতদিনকার
অভ্যাসের ফলে একটা রক্ষণশীলতার বিমুখভাব গড়ে উঠেছে
তাকেও খানিকটা বুঝিয়ে সুঝিয়ে লওয়াতে হবে তাে। আরাে
নানারকম বাধা আছে—নানা বিরুদ্ধ শক্তি, অন্ধকার অসত্যের
বিদ্রোহ—কত কী—যার খবর যােগে মেলে। এই সব কারণেই
উধ্বতর শক্তির ক্রিয়া নিম্নতর লােকে সর্বদাই হলেও প্রত্যক্ষ
ফলপ্রসূ হ'তে সবুর সইতেই হয়।
যেমন ধরাে বস্তুর মধ্যে প্রাণ
নামে তখনই যখন বস্তু হয়ে ওঠে খানিকটা প্রাণধর্মী, প্রাণের
মধ্যে মন নামে তখনই যখন প্রাণী হয়ে ওঠে খানিকটা মননধর্মী।
তেনি এর পরের বিবর্তনের বেলায়ও। ব্যাপারটা কি রকম
জানাে ? সবাই জানেন মধ্যযুগে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মনে
অনেকগুলি আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক সত্যাভাস এসেছিল। কিন্তু
বৈজ্ঞানিকরা বলেন তার আশপাশের মিস্ত্রি ও কারিগররা তখনাে
যােগী যন্ত্রসিদ্ধি লাভ করে নি বলে সেসব অনুভবকে লিওনার্দো বস্তু- জগতে যান্ত্রিক রূপ দিতে পারেন নি—যেমন বিমান। আধ্যাত্মিক লীলার সম্বন্ধেও একথা খাটে অর্থাৎ আমাদের আধারকেও খানিকটা প্রস্তুত হতে হবে বৈকি। তাই আমাদের মনের নিম্নতর থাকগুলি ছেড়ে আমাদেরকে একটু উপর দিকে ধাওয়া করতেই হবে। কিছুই করব না বলে বসে থাকলে ন হি সুপ্ত সিংহস্য প্রবিশন্তি মুখে মৃগা”-“আর কি। আধারকে শুদ্ধতর করতে হবে তাে। কালাের পথ ছেড়ে আলাের পথে পা বাড়তে হবে তাে। মৃত্যু ছেড়ে অমৃতে উত্তীর্ণ হতে চাইতে হবে তাে। যেটুকু আমাদের করণীয় সেটুকু না করলে ভগবানের করুণা আসবে কেন? পাল না খাটালে অনুকূল হাওয়াকে সহায় পাব কী করে? শ্ৰীঅরবিন্দ তাই তার যােগে ডাক দিয়েছেন আমাদেরকে এই আত্মশুদ্ধির দিকেই। বলছেন যে উধ্বতর শক্তি নামতে চায় বটে কিন্তু সে আমাদের ডাকেরও অপেক্ষা রাখে। তাই–বলছেন শ্ৰীঅরবিন্দ-ভাগবত জীবনের জন্যে চাই দু’টি জিনিষ : “a fixed and unfailing aspiration that calls from below and a supreme Grace from above that answers."* করুণা আমাদের আধারকে তৈরি করে বটে—কিন্তু মিথ্যার আবহে নয়- আলােকেরই পরিবেশে। তাই কিছুটা প্রস্তুতি না হলে যে পূর্ণযােগের বনেদ তৈরি হতে পারে না এ তাে স্বতঃসিদ্ধ। * নিচের স্তরে তীব্র ও নির্বিচল অভীর ডাক এবং উপর থেকে পরম করুণার সাড়া (The Mother।
শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে কিন্তু তবু-বলছেন শ্রীঅরবিন্দ—অতিমানসের অবতরণ হ'লে যে নব-মানবজাতি গড়ে উঠবে—কি না অতিমানবসে মানুষেরই বেশ একটি ধােপদুরস্ত চোস্ত সংস্করণ নয়- এ ও তা কাটছাট করে যার একটি বেশ জুৎসৈ ছাঁচ গড়ে উঠল। হরিদাস বাবুর ভাষায়ই বলি : “অতিমানব আর মহামানব এক কথা নয়। মহামানব তিনি যাহার মধ্যে মানবীয় বৃত্তিগুলির চরম উন্মেষ লাভ হইয়াছে। অতি- মানব বলি তাহাকে যাহার সমস্ত সত্তা ভাগবত ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ, দিব্য সুষমীয় মণ্ডিত, যাঁহার জাগ্রত চেতনায় ভগবানের অতিমানস শক্তি প্রতিষ্ঠিত। মহামানব হইলেন শ্রেষ্ঠ মানব : অতিমানব হইলেন মানবরূপী দেবতা। শ্রেষ্ঠ জড়ের সহিত উদ্ভিদের, শ্রেষ্ঠ উদ্ভিদের সহিত পশুর, শ্রেষ্ঠ পশুর সহিত মানুষের যেমন ধর্মগত বৈষম্য আছে, মহামানবের সহিত অতিমানবেরও সেইরূপ পার্থক্য।” জানা কথা অবশ্য—কিন্তু তবু বিশেষ করে অধ্যাত্মতত্ত্বের নানা রূপ রস গন্ধ স্পর্শ শব্দের হাজারাে খুটিনাটির সূক্ষ্ম তত্ত্বটি এমন সুন্দর করে বলা সবাইয়ের সাধ্যায়ত্ত নয়। কারণ এ শুধু জানার ব্যাপার নয়—জানানাের প্রশ্ন এখানে আরাে জরুরি। পরমহংসদেবের কথা মনে নেই—নিজেকে মারতে হলে একটি নরুনই যথেষ্ট, কিন্তু অপরকে মারতে গেলে চাই ঢাল তলােয়ার হাতি হাতিয়ার। অবশ্য বইটি পড়তে পড়তে একথা মনে না হয়েই পারে না যে ব্যাখ্যা আয়তনে একটু অত্যধিক ছােট হয়ে পড়েছে। মানি, শ্ৰীঅরবিন্দের যােগ সম্বন্ধে অনেক জ্ঞাতব্য তত্ত্ব তথা তথ্য বেশ যােগ সুগ্রথিত ও সুপ্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তবু অধ্যাত্মতত্ত্বের যার খাটি তাত্ত্বিক-উৎসাহীতাদের কাছে এ-বইটি তৃষ্ণা যেন বাড়িয়েই দেয়—আরাে জানবার, আরো বুঝবার, আরাে শিখবার। বিশেষ করে এযুগে-যখন সন্ধানী মানুষ ক্রমশই বুঝছে যে মানুষ খতিয়ে মানস জীব নয়—আধ্যাত্মিক জীবই বটে—আর “আধ্যাত্মিক মানুষকে সব আগে আবিষ্কার করতে হবে তার অন্তর্নিহিত অধ্যাত্ম- সত্তাকে, এবং আর পাঁচজনকে এই অন্তর্বিকাশের দিকে এগুবার সহায়তা করাই হ’ল তার অকৃত্রিম জীবসেবা, এ না হলে বাইরের সাহায্য আমাদের একটু আধটু কাজে আসতে পারে বটে কিন্তু তার বেশি না।” যােগ হ’ল এই আধ্যাত্মিক জীবনের সবচেয়ে সুসম্বদ্ধ, বহু- অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা সিড়ি। এই কথাটা আজ মানুষকে জানতে হবে, জানতে হবে যে যােগ আসলে কোনাে রহস্যময় ধোয়াটে বুদ্ধি-পরিপন্থী পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া নয়। শ্রীঅরবিন্দ বলছেন : "In reality there is nothing intrinsically hidden or mystic about Yoga—" atst 3755 "a certain knowledge about the power of the mind over the body and the . । "To discover the spiritual being in himself is the main business of the spiritual man and to help others towards the same evolution is his . real service to the race; till that is done, an outward help can succour and alleviate, but nothing or very little more is possible" (Life Divine The Evolution of the Spiritual Man).
শ্ৰীঅরবি প্রসঙ্গে inner spirit over the mind which are not generally realised and have hitherto been considered by those in the secret too momentous in their consequences for disclosure until men should be trained to use them aright.” শ্রীঅরবিন্দ দেখিয়েছেন কেন এ-শক্তিকে গুহ রাখার প্রয়ােজন ছিল—যােগীরা জ্ঞানী ছিলেন বলেই বৈজ্ঞানিক ডিমাসির পদ্ধতিতে যৌগিক বারুদ-ডিনামাইটের ফেরি করেন নি হাটে বাজারে। তারা যে জানতেন—মানুষ যতদিন না নিরভিমান ও নির্বাসনা হবে ততদিন এসব শক্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা তাদের পক্ষে হবে আগুন নিয়ে খেলা। কিন্তু এখন ক্রমশ এমন সময় আসছে যখন যােগশক্তির আত্মপ্রকাশ হয়ে উঠবে অবশ্যম্ভাবী যখন যােগের আলাে নৈলে মানুষ তার বিবর্তনে এর পরের ধাপে উঠতে পারবে না :— “Yoga must now be revealed to mankind becausc without it mankind cannot take the next step in the human evolution." কিন্তু যােগশক্তিকে এভাবে যথাযথ নিয়ন্ত্রিত করতে হলে চাই যথার্থ দিব্যজ্ঞান-ভাগবত আদেশ। সেই জ্ঞানের আলােয়ই শ্ৰীঅরবিন্দ পথনির্দেশ করেছেন, “আদেশ”-এর ইঙ্গিতপথেই উদঘাটন করতে ব্ৰতী হয়েছেন যােগশক্তির গুহ তত্ত্ব—যদিও সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগতই সাবধান করে দিয়েছেন যােগার্থীকে যে যােগল শক্তিকে কোনাে ছােট আত্মসিদ্ধি স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে দেখলে সর্বনাশ অবধারিত। আর কী আশ্চর্য সহিষ্ণুতার সঙ্গে যে তিনি পরীক্ষা করে যােগী দেখেছেন এ-শক্তির নানা লীলাখেলা সেটা তার যগকে একটু চলে, তার জ্ঞানকে একটু শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ না করলে বুঝতে পারাও সম্ভব নয়। কত দিক থেকে যে তিনি দেখেছেন মানব- জীবনের মূল সমস্যাগুলি আর কী ভাবে যোগের আলােয় বিপথে পথ কেটে চলেছেন তার পরিচয়ই তাে আমরা চাই হরিদাসবাবুর মতন জ্ঞানপিপাসু যােগার্থীর কাছে। তার কাছে আমরা শুনতে চাই—শ্রীঅরবিন্দের যােগে কেন মামুলি যোগের মতন জপতপের কোনাে নির্বিশেষ বিধান নেই–কা ভাবে প্রত্যেককে তার আন্তর নির্দেশে চলে চৈত্যপুরুষের (psychic being-এর) বিচিত্র বিকাশের স্বকীয় ধারাটি আবিষ্কার করতে হয় ; শুনতে চাই পদার্থ- বিজ্ঞানের সঙ্গে আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের যথার্থ সম্বন্ধের কথা-কেমন • করে এ ওকে পূর্ণ করে; শুনতে চাই জ্ঞানের জ্ঞান বলতে কেন আত্মজ্ঞান, ভাগবত-জ্ঞানকেই বোঝায়। বস্তুত লৌকিক জ্ঞান আর পারমার্থিক জ্ঞান দুরকম জ্ঞান আছে বলে যে একটা জনশ্রুতি আছে সেটা ভিত্তিহীন। জ্ঞান দ্বিবিধ নয়, জ্ঞান হল শাশ্বত, অদ্বিতীয়। যুগে যুগে সে-জ্ঞানের মধ্যে নব নব আলােক-বিভূতির সম্পদ আসে সত্য—কিন্তু জ্ঞানের জ্ঞান বলতে বোঝায় পারমার্থিক জ্ঞানই বটে, যেহেতু এ-জ্ঞান লাভ না হলে ব্যবহারিক জ্ঞান, লৌকিক বুদ্ধি, ঘরােয়া বিচক্ষণতা কিছুই কাজে আসে না, ধােপে টেকে না। তাই যুগে যুগে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীরা সবাই বলেছেন যে যােগ ছাড়া কখনই পরমতত্ত্ব লাভ হ'তে পারে না। এই যােগের পদ্ধতি শ্রীঅরবিন্দ তাঁর অসামান্য জীবনের অসামান্য সাধন-পটভূমিকায় অৱৰিন্দ প্রসঙ্গে ; কী ভাবে গড়ে তুলেছেন বহু দীক্ষার্থীর জীবনগ্রন্থি মােচন করবার সঙ্গে সঙ্গে তার আরাে গভীর পরিচয় আমরা চাই হরিদাস বাবুর কাছে : শুনতে চাই শ্রীঅরবিন্দের যােগে বুদ্ধির সঙ্গে শ্রদ্ধার সামঞ্জস্যের কথা, কর্মের সঙ্গে জ্ঞানের রাখীবন্ধনের প্রাণের কথা ; শুনতে চাই বৈরাগ্য কাকে বলে, অনাসক্তিই বা কী জিনিষ, আর কেন বৈরাগ্যের চেয়ে অনাসক্তিই বস্তুলাভের পক্ষে বেশি অনুকূল ; শুনতে চাই রােখালে অনৈহিকতা এমন কি কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়েও মানুষ আত্মজয়ের তপস্যায় কী ভাবে কতখানি লাভ করেছে, আর লক্ষমুখী ঐহিকতার মধ্যে দিয়ে কী ভাবে লােভমােহ- জাতীয় রিপুর চোরাবালিতে ডুবেছে ; শুনতে চাই ভক্তির কোন ছন্দটি অন্তর্মুখীpsychic—নিরাপদ, আর কোনটি বহিরুচ্ছাসী- vital—কাজেই বিপ্নবহুল ; শুনতে চাই তপস্যার আবশ্যিকতা কতদূর পর্যন্ত, আর করুণা কেমন করে তাকে পূর্ণতা দেয় ; শুনতে চাই আত্মসমর্পণের ঠিক ছন্দটি কী আর কেনই বা অলস নিশ্চেষ্টতা মানে বকলমা দেওয়া নয় ; শুনতে চাই শ্রদ্ধার অন্তর্দীপ্তির (faith) সঙ্গে মনগড়া বিশ্বাস ও গোড়ামির (belief এবং dogma) তফাৎ কোথায় ; শুনতে চাই খাটি উপলব্ধিগম্য আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে গতানুগতিক আচারসর্বৰ্ষতা ওরফে মেকি ধর্মশীলতার পার্থক্য কোথায় ; শুনতে চাই ধর্মের উচ্ছাসতন্ত্রতার ফলে কেন আন্তর ধ্যানপ্রতিষ্ঠার শিখর থেকে সে স্খলিত হ’ল ; শুনতে চাই কেন, কী কী অসহিষ্ণুতা ও লােকমুখাপেক্ষিতার ফলে, আনু- ঠানিক ধর্ম সত্যভ্রষ্ট হয়ে অক্ষ্য হয়েও কতখানি সহায় হয়েছিল ১৫ যা মানুষের অস্তজীবনের বিকাশপথে ; শুনতে চাই কেন যান্ত্রিকতা ও শিক্ষার বহির্মুখী কৌশলে ও অসহিষ্ণুভাবে কেটে-হেঁটে সবাইকেই এক ছাচে ঢালাই করবার, এক গোয়ালে মাথা মুড়বার চেষ্টায় মানুষের মুক্তি নেই; শুনতে চাই কেন আধ্যাত্মিক সাধনা বিনা মানুষের চরম সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধানই হতে পারে না এবং কী কী কারণে কেন সব চরম নিষ্পত্তিরই চাবিকাঠি, ঐ আধ্যাত্মিকতারই হাতে :—এক কথায় আমরা তার কাছে শুনতে চাই শ্রীঅরবিন্দের পূর্ণযোগ কেন মানুষের বিকাশে পূর্ণতার আলো ধরে তার বহুমুখী তৃষ্ণা মিটিয়ে—জ্ঞানের, কর্মের, ভক্তির, শিল্পের, সেবার, তপস্যার, ত্যাগের। একথা বলছি আরাে এই জন্যে যে যদিও শ্ৰীঅরবিন্দের যােগের পূর্ণ রহস্যের দিশা পেতে আমরা তারই শরণ নেব, বটেই তাে—কিন্তু তার কাছে আমাদের মতন সাধারণ গড়পড়তা মানুষ কী ধরণের প্রত্যাশা রাখে ও সে-প্রত্যাশা মিটবার সর্ত কী কী—জানতে আমরা মনস্বী যোগাখী সতীর্থের শরণ নিতে পারি বৈ কি—অবর, বাংলা ভাষার জারকে গুরুপাক তত্ত্বদের একটু জানিয়ে নিতে। “যােগার্থী” কথাটা বললাম কেন আশা করি বুঝবে? এই জন্যে যে শুধু জ্ঞানার্থী হলে শ্রীঅরবিন্দের যােগ বােঝা যায় না, যেতে পারে না-যেমন গণিতবিদ্যা না জানলে বােঝা যায় না বিজ্ঞানের উচ্চ তত্ত্বগুলি। হরিদাস বাবুর মতন উজ্জলবুদ্ধি মননশীল ব্যাখ্যাকারের কাছে তাই আমরা অনেক আশা রাখি—কেন না তার মধ্যে পাণ্ডিত্য, আন্তরিকতা ও যােগারূঢ় বুদ্ধির দুলত ত্রিবেণী সঙ্গম হয়েছে- শ্রীঅরবিন্দ প্রসঙ্গে যে-সমাবেশ বড় বড় বিদা, শাস্ত্রকোবিদ ও মহামহোপাধ্যায়ের মধ্যেও দুলভ। একথা এত করে বলছি আরাে এই জন্যে যে এ-যুগে হাল আমলে ডিমাসির এক অতি অসার সস্তামি আমাদেরকে পেয়ে বসেছে যার পরামর্শে তাল ঠুকে আমরা অনেকেই বলা শুরু করেছি যে গভীরতম আধ্যাত্মিক সত্যকেও যাচাই করবে মানুষ তার ডিমাসির হাটের গড়পড়তা বুদ্ধির ফিতে নিয়ে–বিজ্ঞানের দাড়িপাল্লা দিয়ে, আর এরই নাম না কি বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক সভ্যমানবের স্বাধীন চিন্তা-নিরপেক্ষ বিচার! কিন্তু নামকরণে চুক হয়েছে : এরই নাম স্বাধিকারপ্রমত্ততা। কারণ জীবনের পরম জিজ্ঞাসায় অধ্যাত্মিকতার সত্যাসত্য যাচাই করতে হলে হতে হবে ঐ পথেরই পথিক—মানে ভগবানেরই অন্তরঙ্গ, সভ্যতার দেহরক্ষী না। হাল আমলে মানস বুদ্ধির প্রতিপত্তি হয়ে উঠেছে অত্যধিক। কিন্তু এতে আর শানাবে না। মানুষকে মানুষের মতন বাঁচতে হলে আজ হতেই হবে সেই শাশ্বত সত্যের অধিকারী—আর এ-অধিকারের প্রধান সত হ’ল মনের উতর লােকের কাছে আত্মসমর্পণ—কেন না এই-ই হ’ল আলাের সত: “There must be a total and sincere surrender ; there must be an exclusive self-opening to the divine Power; there must be a constant and integral choice of the Truth that is descending."* * আমাদের করতেই হবে পরম ও চরম আত্মসমর্পণ ; আমাদের নিজেদেরকে ১৫ যােগী। . এরই নাম হ’ল যােগ। শ্রীঅরবিন্দের যােগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায় কেন সত্যের সত্য হল আধ্যাত্মিক সত্য, আর কোন সাধনায় সে-সত্যকে লাভ করে মানুষ বিশ্বানুগ হয়েই বিশ্বাতিগকে পেতে পারে ; প্রকৃতিকে অতিক্রম করেই বিশ্বপ্রকৃতির পথনির্দেশ পেতে পারে; শান্তির ধ্রুব- পথেই জীবনের লক্ষ অপূর্ণতা অশান্তি হাহাকারের উপরে পৌছতে পারে তার আলাের স্বরাজ্যে—“যত্র বিশ্বং নিহিতং ভাতি শু” —যেখানে বিশ্বের পরমরূপ শুভ্রতায় উজ্জ্বল। তাই এ অশ্রদ্ধা অজ্ঞান ও নাস্তিকতার যুগে, নিরীশ্বর ভোগের তৃপ্তিহীন দুর্ভোগের যুগে কাঞ্চনকে পদে পদে কাঁচের মূল্যে বিকোবার মূঢ়তার যুগে শ্ৰীঅরবিন্দের মতন মহাযােগীর পূর্ণযেগলব্ধ দিব্যদৃষ্টির কথা যতই • শুনতে পাই ততই ভালাে। কারণ শুধু এই নয় যে “স্বল্পমপ্যস্ত ধর্ম ত্রায়তে মহততা ভয়াৎ” (ধর্মের ছিটেফোটাও মহৎভয় থেকে ত্রাণ করে। কারণ এই যে মানুষ তার ইন্দ্রিয়বােধের জগতে মনের ক্ষণ বাতিতে আর পথ খুঁজে না পেয়ে, হাজারাে প্রাণপ্রবৃত্তির আঁধার তুফানে দিশেহারা হয়ে হারাতে বসেছে জ্ঞানের এই ধ্রুবনির্দেশ, যে :- "A perfected human world cannot be created by men or composed of men who are themselves খুলে ধরতে হবে কেবল সেই দিব্যশক্তির কাছে ; সব সময়ে এবং সব দিক দিয়ে আমাদের অঙ্গীকার করতে হবে শুধু সেই সত্যকে বা নামল বলে। (THE MOTHER) I ১৭ অনি প্রসঙ্গে imperfect. Even if all our actions are scrupulously regulated by education or law or social or political machinery, what will be achieved is a regulated pattern of minds, a fabricated pattern of lives, a cultivated pattern of conduct ; but a conformity of this kind cannot change, cannot re-create the man within, it cannot carve or cut out a perfect soul or a perfect thinking man or a perfect or growing living being. For soul and mind and life are powers of being and can grow but cannot be cut out or made ; an outor process or formation can assist or can express soul and inind and life but cannot create or develop it... This is the first truth that our creative zcal and aspiration have to learn, otherwise all human endeavour is foredoomed to turn in a futile circle and can end only in a success that is a specious failure." (The Life Divine...p. 1112 ) “যে-সব মানুষ নিজেরাই অসম্পূর্ণ তাদের মিলিত চেষ্টায় কোনাে সুসম্পূর্ণ মানবজগৎ গড়ে ওঠা অসম্ভব। শিক্ষা কি নীতি কি সমাজতন্ত্র কি রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে যদি আমাদের প্রতিটি কাজও নিখুভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলেও গড়ে উঠবে বড় জোর একই ধাঁচের সার সার মন, একই ধাঁচের অতিনির্দিষ্ট জীবনধারা, একই our ১৫১ যোগী ধাঁচের সংফ্লুত আচার। কিন্তু এ-ধরণের গতানুগতিকতায় না পারে ভিতরের মানুষটির কোন রূপান্তর হতে, না পারে তার মধ্যে কোনাে নব সৃষ্টি জেগে উঠতে, না পারে কোনাে নিখুৎ মহাপুরুষ কি চিন্তানায়ক কি বিকাশশীল জীবন্ত মানুষ গড়ে উঠতে । কারণ আমাদের অন্তরাত্মা, মন প্রাণ—সবই আমাদের সত্তার বিভিন্ন শক্তির মৃত বিগ্রহ : এরা ধীরে ধীরে পরিণতি লাভ করতে পারে কিন্তু পারে না কাটছাট করে মাপস ফর্মাশি ঢঙে নির্মিত হতে। বাইরের বিধিব্যবস্থা এদেরকে গড়ে তোলার পথে সহায় হতে পারে, কিন্তু পারে না সৃষ্টি করতে কি পুষ্টিসাধন করতে।•••আমাদের সৃজনী উৎসাহ ও অভীপ্সা নিয়ে শুধু তাে ছুটলেই হবে না—সব আগে চাই এ-সত্যটি বােঝা, নৈলে আমাদের সব মানবিক চেষ্টাই ঘুরে মরবে এক ব্যর্থবৃত্তে-খতিয়ে লাভ হবে শুধু এমন এক সাফল্য যা নৈস্ফল্যেরই নামান্তর।”
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.