Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mogal-bidushi

Bandopadhyay,brajendranath · 2010/04/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মােগল-বিদুষী
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রণীত
মােসলে প্রিন্টিং এণ্ড পাবলিশিং কোম্পানী
লিমিটেড,
২৮৫৯, বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা।
মুল্য ১১ টাক

প্রকাশক
এম, নাসিরউদ্দি
ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও জেনারেল ম্যানেজার
৯৩১এ বহুবাজার ষ্ট্রীট, কলিকাতা
চেরীপ্রেস লিমিটেড হইতে
শ্রীতুলসীচরণ দাস কর্তৃক মুদ্রিত

আত্মকথা মােগলের গৌরব-কাহিনী অধ্যয়নকালে বিদুষী বাদশাহজাদীগণের অপূৰ্ব জীবন-কথা, সাহিত্য-প্রতিভা প্রভৃতির পরিচয় বঙ্গসাহিত্যে প্রকাশ করিবার বাসনা জন্মিয়াছিল ;-‘মােগল-বিদুষী’ তাহারই আংশিক ফল- স্বনামধন্য অগ্রজপ্রতিম শ্ৰীযুক্ত জলধর সেন, প্রবীণ সাহিত্যৰথী শ্ৰীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ বসু, এবং সুলেখক বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত নিশিকান্ত সেন-ইহারা সকলেই এই পুস্তক রচনায় আমাকে প্রভূত সাহায্য করিয়াছেন ; তাহাদের উৎসাহ ও সহায়তা ব্যতীত ‘মােগল-বিদুষী কখনই প্রকাশিত হইত ।• গল্প-সাহিত্যের যাদুকর অগ্রজকল্প শ্ৰীযুক্ত প্রভাত কুমার মুখােপাধ্যায়,বা-এট-ল ও ঐতিহাসিক শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্র- মােহন রায়, বি-এ মহাশয়দ্বয় আমাকে নানা গ্রন্থ-সাহায্যে উৎসাহান্বিত করিয়াছেন। মােসূলে প্রিন্টিং কোম্পানীর সুযােগ্য পরিচালক এ, নাসিরউদ্দিন সাহিবের আগ্রহেই ‘মােগল-বিদুষী’ পুস্তকা- কারে প্রকাশিত হইল। তাহাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। কলিকাতা আরবিট্টারী ক্লাব, ১৪নং পাশীবাগান, শ্ৰীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলিকাতা, ১লা ফাল্গুন, ১৩২৬

সূচী
জে-উন্নিসা
দ
।
•••

সম্পদে-বিপদে সমসহায় সুহৃদর
শ্ৰীযুক্ত গিরীন্দ্রশেখর বসু
করকমলেষুE

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-প্রণীত
ইতিহাস-গ্রন্থাবলী
১) মােগলমুগে প্রীশিক্ষা,
৬খানি চিত-শোভিত মূল্য
(২) বেগম সমরু, ৮থানি চিত্র-শােভিত ,
(৩) বাঙ্গলার বেগম, ২৪ সংস্করণ
প্রাপ্তিস্থান— গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
১৩ ১নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
(2) মুজহা-বহুচিত্র-সুশােভিত
(c) BEGAMS OF BENGAL
প্রাপ্তিস্থান :-মিত্র কোং,
১২২১, অপার সার্কুলার রোেড কলিকাতা

মােগল-বিদুষী
জে উন্নিসা
কবিগায়িয়াছেন -
"The paths of glory lead but to the grave.
নরগরিমার শেষ-শ্মশান-সৈকত।” এ কথার জ্বলন্ত,
সাক্ষী—মােগল-মহিমার মহাশ্মশান ঐ দিল্লী, ঐ আগ্রা ।
এ সেইস্থান যেখানে সম্রাটের পর সম্রাট আপনাদের
মহিমা বিস্তার করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন—যেখানে
সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য কালস্রোতে বাসিফুলমালার মত
ভাসিয়া গিয়াছে। রাবণের চিতার মত এই কীর্তির
শ্মশান, যুগের পর যুগ জ্বলিয়া আসিতেছে,আর কতকাল
ধরিয়া জ্বলিবে কে জানে ?
‘এখানে ছিল না কি ? ঐশ্বর্যে যাহা করিতে পারে,
বিলাস-বাসনা যাহা প্রার্থনা করে, মােগ-মৰ্য্যাদায় যাহা

মােগল-বিদুষী আবশ্যক বিবেচনা করিতে পারে—সে সমস্তই একদিন এখানে পূর্ণভাবেই বিরাজিত ছিল। কিন্তু কিছুই থাকে না—সবই যায় ; থাকে কেবল স্মৃতি। সেই স্মৃতি-চৰ্চাই আমার উদ্দেশ্য। এই, দিল্লী-আগ্রার বাদশাহী-উদ্যান, একদিন যে একটী অতুলনীয় সুষমাময়ী প্রসূনের সুবাসে আমােদিত হইয়াছিল,—যাহার পবিত্র সুরভি এখনও তেমনই স্নিগ্ধ, তেমনই মনােমদ—সেই পবিত্র কুসুমের পরিচয় প্রদানের জন্যই এই প্রয়াস। তিনি আর কেহই নহেন—“রমণীর অলঙ্কার’ শাহানশাহ, আওরংজীব- দুহিতা-জেব-উন্নিসা। [ ২ ] জীবন কথা মােগল-সম্রাট আওরংজীবের জ্যেষ্ঠা কন্যা জেব-উন্নিসা দিলরাস বানু বেগমের গর্ভে, ১৬৩৮. খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই ফেব্রয়ারী, দৌলতাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। হাফিজা মরিয়ম্ নামে জনৈক বিদুষী মহিলার উপর জেবের শৈশব-শিক্ষার ভার অর্পিত হয়। অত্যল্প বয়স হইতেই তাহার জ্ঞানার্জন-স্পৃহা অতীব বলবতী ছিল। তিনি কোরাণ শুনিতে ভালবাসিতেন ; একদিন পিতার নিকট সমস্ত কোরাণখানির আমূল আবৃত্তি করিয়া সকলকে বিস্ময়াবিষ্ট করিয়াছিলেন। কন্যার অনন্যসাধারণ স্মরণ- শক্তি-দর্শনে মুগ্ধ হইয়া, আওরংজীব, বালিকা কন্যাকে ৩০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পারিতােষিক প্রদান করেন ও তাঁহার সুশিক্ষার জন্য কয়েকজন উপযুক্ত শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করিয়া দেন। বলা বাহুল্য, জেব-উন্নিসা এই শিক্ষার সুফল সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করিতে কিছুমাত্র আলস্য করেন নাই। আবৃবী ও ফার্সী উভয় ভাষাতেই তঁাহার যথেষ্ট অধিকার জন্মিয়াছিল ; উভয় ভাষাতেই তিনি লেখনী পরিচালনা [ ৩ ] মােগ-বিদুষী =৯ করিতে পারিতেন। ইহার মধ্যে আবার আরবীয় ধর্ম- তত্বে তিনি ব্যুৎপন্ন ছিলেন। পুত্রকন্যাদিগের মধ্যে সম্রাট তাহার এই বিদুষী ধৰ্ম্মানুরাগিণী কন্যাটীকেই সর্বাপেক্ষা অধিক স্নেহ করিতেন। অধিকাংশ সময়েই জেবের সহিত তাহার ধর্মশাস্ত্রের আলােচনা হইত। ঐ আলােচনা কিরূপ, তাহা জেব-উন্নিসাকে লিখিত, আওরংজীবের একখানি পত্রপাঠে অবগত হওয়া যায়। পত্রখানির কিয়দংশ আরবী ও কিয়দংশ ফার্সীতে লিখিত। “কয়াজ, উল-কওয়ানী” নামক পুথির ৩৬৯ পৃষ্ঠায় ইহার যে নকল দেওয়া হইয়াছে, তাহার মর্মানুবাদ এইরূপ — ( আরূবীতে) “ভগবানকে বন্দনা করিয়া ও প্রেরিত-পুরুষকে (রসুল) প্রণিপাত করিয়া ( লিখিতেছি ) :- খােদার আশীর্বাদ তােমার উপর বর্ষিত হউক। পুণ্যাহ মাস রমজান আসিয়াছে। পরমেশ্বর তােমার উপর উপবাসরূপ কৰ্ত্তব্যের ভার অর্পণ করিয়াছেন। এই মাসে স্বর্গদ্বার উদ্ঘাটিত ও নরকদ্বার রুদ্ধ হয়, বিপ্লবকারী শয়তানেরা কারানিবদ্ধ থাকে। রমজানের ধৰ্ম্মনিয়মাদি প্রতিপালনের জন্য আমরা উভয়েই যেন ভগবানের আশীর্বাদ লাভ করিতে সমর্থ হই। ৪ ] মোগল-বিহু (ফার্সীতে) “বৎসে ! তােমার ও আমার মধ্যে যে পত্ৰ-ব্যবহার হয়, তাহাতে যেন আমাদের আধ্যাত্মিক কল্যাণ সাধিত হইতে পারে। ঐহিক সুখরাশির নেশায় প্রমত্ত মূঢ় মানবের ন্যায় আর কতকাল আমরা পারত্রিক-ব্যাপারে উদাসীন হইয়া, ভগবানের সঙ্গ হইতে দূরে থাকিব? ( আবীতে) একমাত্র ভগবদনুগ্রহই আমাকে সুপথে পরিচালিত করিবার প্রেরণা দান করিতে পারে। সেই প্রকৃত মহান ঈশ্বর বলিয়াছেন—“আমি জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টি করিয়াছি। কাহার প্রভাব, প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্যের তুলনা নাই, জেব-উন্নিসা সেই মহাভাগ্যবান ভারতেশ্বরের আদরিণী কন্যা,-ইচ্ছা করিলে যে কোনরূপ বিলাসব্যসনে আমরণ নিমগ্ন থাকিতে পারিতেন; কিন্তু এই বিদুষী বাদশাহ- দুহিতা সে সকলকে একান্ত অকিঞ্চিৎকর মনে করিয়া, জ্ঞানানুশীলন ও সাহিত্য-চৰ্চ্চাকেই তাঁহার পুণ্যময় জীবনের ব্ৰতরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। পুস্তকাগারে সংগৃহীত ধর্ম ও সাহিত্য-সম্বন্ধীয় বহু গ্রন্থ তঁাহার জ্ঞানার্জন-স্পৃহা ও পবিত্র জীবন-যাপনের সাক্ষ্যস্বরূপ বিদ্যমান ছিল। আবার এই সাহিত্যচর্চা শুধু যে তাহার নিজের মধ্যেই নিবদ্ধ [৫]

মােগল-বিদুষী
}
ছিল, এমন নহে; তিনি নিজেও যেমন সাহিত্যানুরাগিণী,
সাহিত্যিকগণের সাহিত্যানুরাগেরও তেমনই উৎসাহ
দাত্রী। বহু দুঃস্থ লেখক তাঁহার নিকট সাহায্য পাইয়া
সাহিত্য-সেবার সুযােগলাভ
সুযােগলাভ করিতেন। সাহিত্যের
উন্নতিকল্পে জেব, অনেক সুপণ্ডিত মৌলভীকে যােগ্য
বেতনে নূতন পুস্তক-প্রণয়নের জন্য, অথবা তাহার নিজের
ব্যবহারার্থ দুষ্প্রাপ্য হস্তলিখিত পুথির নকল-কার্যের জন্য
নিযুক্ত করিয়াছিলেন। যে সকল লেখক তাহার যত্ন ও
চেষ্টায় যশস্বী হন, তন্মধ্যে মুল্লা সফীউদ্দীন অর্পবেলীর
নাম বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। তিনি আরূবীতে
কোরাণের মহাভাষের অনুবাদ করেন ; এই গ্রন্থের নাম
“জেব-উৎ-তফসির।” সফীউদ্দীন গ্রন্থখানি জেব,
উন্নিসার নামে প্রচার করেন। এইরূপ আরও কয়েকখানি
গ্রন্থ জেবের নামে প্রচলিত; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি
নিজে ঐ সকল গ্রন্থ রচনা করেন নাই। লেখকগণ
কৃতজ্ঞতা-প্রকাশের জন্য তাঁহার নাম ঐ সকল গ্রন্থে
নিবদ্ধ করিয়াছিলেন।
প্রকৃতি জেব-উন্নিসাকে সৌন্দর্যের ললামভূতা করিয়া
সৃষ্টি করিয়াছিলেন। বাহিরের রূপ, আর অন্তরের
পাণ্ডিত্ব ও কবিত্ব-প্রতিভা তাহার অসামান্য গৌরবের

মােগল-বিদুষ্ট
জেব, পত্রাবগুনে
কারণ হইয়াছিল। মােগলের নিভৃত অন্তঃপুরে ঘনঘাের
পর্দান্তরালে বসবাস করিয়াও
বিকশিত, সুরভি-সৌন্দর্যমণ্ডিত গােলাপ পুষ্পের ন্যায়
আপনাকে ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে লুক্কায়িত রাখিতে পারেন
নাই—দেশদেশান্তরে তাহার যশ পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল।
কিন্তু বাদশাহী-অন্তঃপুরের নিভৃত মালঞ্চে
বাদশাহজাদীর মানস-লতিকায় যে সকল কবিতাগুচ্ছের
বিকাশ হইয়াছিল, আজ তাহা কোথায় ? তাহার
অধিকাংশই বিজনবনের স্কুলের মত, লােকচক্ষুর
অন্তরালে ফুটিয়া উঠিয়া ঝরিয়া পড়িয়াছে। ইতিহাসের
পৃষ্ঠায় তাহার ক্ষীণ গন্ধটুকু আছে, পরিচয়ের ছিন্ন সূত্রটুকু
কোথায় হারাইয়া গিয়াছে—খুঁজিয়া বাহির করিবার
উপায় নাই। দেওয়ান-ই-মখফী’তে তাহার রচিত
অনেক কবিতা স্থান পাইয়াছিল সত্য; কিন্তু সে কোন্
‘মখী’ ? কবিরা গুপ্তনাম ধরিয়া যে সকল কবিতা
প্রচার করেন, ফার্সীতে তাহাকে ‘মখফী’ বলে ।
ফার্সী ভাষায় মখফী এক নহে—বহু। বাদশাহজাদীর
হৃদয়ের অতুলনীয় ভাব-সম্পদ কোন্ মখফীর সৃষ্টিপুষ্টি
করিয়াছিল, তাহা আজ কে নিশ্চয় করিয়া বলিবে ?
সম্রাট আওরংজীব, কবিতার পক্ষপাতী ছিলেন না।
[ 5 ]

মােগল-ৰিদুখী এই কারণে কোন কবিই তাহার দরবারে রাজ-অনুগ্রহ লাভ করিতে পারেন নাই; কিন্তু করুণারূপিণী জেবের করুণা হইতে যে তাহারা বঞ্চিত হন নাই, তাহা বলা বাহুল্য। কন্যার করুণার ফন্তু ধারা, আওরংজীবের আমলের সাহিত্যকে এইরূপে সঞ্জীবিত রাখিয়া ধন্য হইয়াছিল। দুঃখের বিষয়, ইতিহাসের নামে কোন কোন উৰ্ব্বর- মস্তিষ্ক কল্পনাজীবী লেখক, এই বিদ্যাচর্চা-নির, নিষ্ঠাবতী,আজীবন কুমারী, নিৰ্ম্মলস্বভাবা জেব-উন্নিসাকে, অসম্ভব কাল্পনিক কাহিনীর নায়িকারূপে চিত্রিত করিয়া জনসাধারণের মনােরঞ্জনের প্রয়াস পাইয়াছেন। বাদশাহী হারেমের কুমারী-কন্যার মত গল্পের উৎকৃষ্ট পাত্রী •আর কি হইতে পারে ? এরূপ চরিত্র সম্বন্ধে যে অতি সহজেই সাধারণের মুখরােচক অবৈপ-প্রেমের অপরূপ কাহিনী সৃষ্ট হইতে পারে! তাহার উপর জেব-উন্নিসা শুধু আজীবন কুমারী নহেন ;-বিদুষী, কবি এবং অসামান্য সৌন্দৰ্য- সম্পশালিনী; অতএব তাহারা শাহজাদী সম্বন্ধে গল্প- রচনার সুবর্ণসুযােগ কিরূপে পরিত্যাগ করিবেন ? বড়ই দুঃখের বিষয়, তাঁহাদের অবাধ-কল্পনার ঘৃণিত তুলিকায়, জেব-উন্নিসার অকলঙ্ক নির্মল মূর্তি থােক মসীবর্ণ চিত্রিত হইয়াছে। [৮] মােগন-বিদুষী ? জেব-উন্নিসা ভ্রাতা মহম্মদ আবরকে নিরতিশয়স্নেহ- চক্ষে দেখিতেন। এই জ্যেষ্ঠা ভগিনীর প্রতি আকৃবরেরও অগাধ বিশ্বাস, অপরিসীম শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। আকবর একখানি পত্রে জেবকে লিখিয়াছেন,—“যাহা তােমার, তাহাই আমার ; এবং যাহা আমার হাতে সৰ্বসময়ে তােমার অধিকার রহিয়াছে। পত্রের অন্যত্র আছে, ‘দৌলৎ ও সাগর মলের জামাতাদিগকে কার্যে নিয়ােগ বা কৰ্ম্মচ্যুত করা, তােমার ইচ্ছাধীন। তােমারই আদেশে আমি তাহাদিগকে কৰ্ম্মচ্যুত করিয়াছি। সমস্ত বিষয়েই তােমার, আদেশ, আমি কোরাণ ও প্রেরিত-পুরুষের ‘হাদীসের’ (Traditions) ন্যায় পবিত্র মনে করিয়া অবশ্য- কৰ্ত্তব্যবােধে প্রতিপালন করি। ভগিনীর কিরূপ স্নেহ ও আন্তরিকতার জন্য আকবর তাহাকে এত শ্রদ্ধা, এত নির্ভর করিতেন, তাহা সহজেই অনুমেয়। এই অকৃত্রিম ভ্রাতৃ- মেহই জেবের কালস্বরূপ হইয়াছিল । আক্বর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইলেন; কিন্তু রাজসৈন্যের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না; আজমীরের নিকট তাহার যে শিবির- সন্নিবেশ হইয়াছিল, তাহা পরিত্যাগ করিয়া তিনি পলায়ন করিলেন। ‘বিদ্রোহের অব্যবহিতপূৰ্ব্বে, ভ্রাতা [১] মােগল-বিদুষী উপর। আকবরকে জেব-উন্নিসা যে সকল গুপ্ত চিঠিপত্র লিখিয়াছিলেন, রাজসৈন্য কর্তৃক শিবির অধিকৃত হইলে (১৬৮১, ১৬ই জানুয়ারী) তৎসমুদয় সম্রাটের করতলগত হইল। অপরাধী পুত্র তাঁহার হস্তচ্যুত ; সুতরাং বিদ্রোহীর সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধে, আওরংজীবের সমস্ত ক্রোধ পতিত হইল—জেব-উন্নিসার ক্রোধান্ধ বাদশাহ, কন্যার সমস্ত সম্পত্তি ও বার্ষিক চারি লক্ষ টাকা বৃত্তি বন্ধ করিয়া তাহাকে আমরণ কালের জন্য সলীমৃগড় দুর্গে বন্দী করিলেন (১৬৮১- ১৭০২)।। তাহার পর সুদীর্ঘ দ্বাবিংশতিবর্ষ স্নেহময়ী কুসুম- কোমলা জেব-উন্নিসাকে ঐ স্থানে বন্দিনীর কঠোর জীবন যাপন করিতে হয়। কারাপ্রাচীরের আবেষ্টনের মধ্যে নিঃসঙ্গ বন্দীদশায় তখন তাহার কবি-চিত্তে বেদনাভরা কত ভাবের উদয় হইত, কত বিষাদগীতি মুকুলিত হইয়া ঝরিয়া পড়িত, তাহার ইয়ত্তা কে করিবে ? মনে হয়, ঐ সময়েই তিনি খেদ করিয়া গায়িয়াছিলেন ? * Alangirnamak গ্রন্থ পাঠে জানা যায় (পৃঃ re৬ % কাশ্মীরে জেব-উন্নিসার একটী পরগণা ছিল। + Masir-t-Alamgiri, p. 204. [ ১৪ ]

নােগশ-বিদুষী
“কঠিন নিগড়ে বদ্ধ, যতদিন চরণ-যুগল,
বন্ধু সবে বৈরী তাের, আর পর আত্মীয়-সকল ।
সুনাম রাখিতে তুই করিবি কি, সব হবে মিছে,
অপমান করিবারে বন্ধু যেগগা ফেরে পিছে পিছে।
এ বিষাদ কারা হতে মুক্তি-তরে বৃথা চেষ্টা তাের,
ওরে মখফী, রাজচক্র নিদারুণ, বিরূপ কঠোর ;
জেনে রাখ, বন্দী তুই, শেষ দিন না আসিলে আর,
নাই নাই, আশা নাই, খুলিবে যে লৌহ-কারাগার।”
(Diwan of Zeb-un-nissa, p. 17).
লৌহদ্বার আর সত্য সত্যই মুক্ত হয় নাই—হইয়াছিল
একদিন, যেদিন মৃত্যুর ভবভয়হারী মহাবল আনন্দময়
বাহু জেব-উন্নিসাকে শান্তিপ্রদ মুক্তিরাজ্যে লইয়া যাইবার
জন্য, প্রসারিত হয় (১৭০২, ২৬ মে)। বাদশাহর সমগ্র
রাজ্য সেদিন শােকভারাক্রান্ত হইয়াছিল, আর যে
বাদশাহ, এতদিন স্বার্থের অমানুষী মায়া ও রাজনীতির
কুটিলচক্রে অপত্য-মেহ ভুলিয়াছিলেন, তিনিও শােকাবেগ
ধারণ করিতে পারেন নাই -প্রাণপ্রতিম প্রিয়কন্যার
মৃত্যু-সংবাদ-শ্রবণে বৃদ্ধ আওরংজীবের পাষাণ চক্ষু ফাটিয়া
অশ্রুধারা বহিয়াছিল।
[১১]
-

মােগল-বিদুষী সম্রাটের দারুণ ক্রোধবশে একটী অমূল্য জীবন অনাদৃতভাবে কারা-প্রাচীরমধ্যে অতিবাহিত হইয়াছিল। এই সুদীর্ঘকাল কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করিতে পারিলে জেব- উন্নিসার জীবন-কাহিনী যে আরও কত সুন্দর হইত, তাহার দীপ্ত প্রতিভা যে আরও কত সৌন্দর্য্যের বিকাশ- সাধন করিত, তাহা কে বলিতে পারে ? যাহার জীবনের বিশিষ্ট সময়ই কঠোর কারাবাসে অতিবাহিত হইয়াছে, তাঁহার ইতিহাস আর কেমন করিয়া ঘটনাবহুল হইবে ? কিন্তু যে অত্যল্পকাল তিনি স্বীয় প্রতিভা-বিকাশের অবসর পাইয়াছিলেন, তাহাও হৃদয়বান হৃদয়বান ব্যক্তিগণ অতুল সম্পদ বলিয়া সাদরে বরণ করিয়া লইবেন, সন্দেহ নাই। তাহার পর বাদশাহজাদীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যে কোনরূপ ক্রটি হয় নাই, তাহা বলা বাহুল্য। এই উপলক্ষে সম্রাট, কন্যার পরলােকগত-আত্মার শান্তি-বিধানের জন্য সৈয়দ আমজাদ খাঁ, শেখ, আতাউল্লা, এবং হাফিজ, খাকে বহু মুদ্রা দান-খয়রাৎ করিতে আদেশ করেন। দিল্লীর কাবুলী-তােরণের বহির্ভাগস্থ, জাহান-আরা-প্রদত্ত, ‘তিস্-হাজারী উদ্যানে জেবকে সমাহিত করা হয় । কিন্তু এখন আর সে সমাধি-ভবনের অস্তিত্ব নাই, [ ২ ]

মােগ-বিদুষী
রাজপুতানা-
মাওয়া রেলপথ-নিৰ্মাণকালে বিনষ্ট হইয়া
গিয়াছে। শবাধার এবং সমাধি-স্তম্ভের খােদিত-লিপি
মােগল-মণি সম্রাট আকবরের সমাধিস্থল সিকান্দ্রায়
স্থানান্তরিত হইয়াছে।
{ ১৩ ]

‘দেওয়ান-ই-মী’ কি জে-উন্নিসার ? মােগল-ইতিহাসপাঠে জানা যায় যে, তৎকাল- প্রচলিত রীতি অনুসারে মােগল-অন্তঃপুরবাসিনীগণ কবিতাদি রচনা করিতেন। কেবল জেব-উন্নিসা নহেন,“সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ও আক্বর-মহিষী সলীমা সুলতান বেগমও ‘মখফী’ ( অর্থাৎ ‘গুপ্তব্যক্তি) নাম ব্যবহার করিয়া বহু ফার্সী কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। বর্তমানে সাধারণতঃ যে ‘দেওয়ান-ই-মখফী’ জেব-উন্নিসার রচনা বলিয়া আমাদের নিকট পরিচিত, তাহা প্রকৃতপক্ষে জেবের লেখনী-প্রসূত কি না, সে বিষয়ে আমাদের ঘাের সন্দেহ আছে। GSTYT 1739 ( Oudh Nawab's Catalogue- Sprenger, p. 480 ) 478 utoa ft (British Museum Cat. of Persian Mss., Dr. Rieu, p. 7.02) উভয়েই জেব-উন্নিসাকে দেওয়ান-ই-মখফীর’ রচয়িত্রী বলিয়াছেন । কিন্তু দেওয়া’-পাঠে একটা কথা স্বতঃই মনে হয়, একজন রাজপরিবারভুক্ত মহিলার নিকট হইতে এরূপ লিখনভঙ্গী ও বক্তব্য-বিষয় প্রকাশ, [ ১৪ ]

মােগল-বিদুষী
ক
করিবার পদ্ধতি কখন আশা করা যায় না; অধিকন্তু এই
‘দেওয়া-ই-মখ ফী’তে এমন কতকগুলি কবিতা স্থান
পাইয়াছে, যাহা পাঠ করিলে স্প্রেঙ্গার ও রিউ সাহেবের
মন্তব্য-সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ হয় ; আমাদের এই উক্তির
সাপক্ষে দু’একটী যুক্তির অবতারণা করিয়া দেখাইব যে,
এগুলি জেব-উন্নিসার রচনা নহে।
‘দেওয়ান-ই-মখ ফী’র অনেকস্থলে দেখা যায়, গ্রন্থকার
খুরাসান-অধিবাসী,-তৎকালে ভারতবর্ষে। অবস্থান
করিতেছিলেন, এবং ভারতবর্ষের উপর তাঁহার খুব কমই
আকর্ষণ ছিল ; যথা :-
“দিল আফতা-ই-মখফী বফ-ই-খুদ আরম্ভ ইস্ত।
বহিন্দ উফতাদা আস্ত, আম্মা খুরাসানস্ত, ইউনানশ, ॥
দরী কিশও জবুনীহাএ তালা নাকিশ, দার।
ও গরু না দর হুনরুমন্দী নবাশ হীচ, মুকসানশ।”
অর্থাৎ,
“মখফীর উন্মত্ত হৃদয় নিজ বিদ্যায় স্বয়ং এরিষ্টটল।
( যদিও) সে হিন্দুস্থানে আসিয়া পড়িয়াছে (কিন্তু)
খুরাসা তাহার পক্ষে গ্রীস।
এই দেশে
তাহার মন্দভাগ্যের অনেক রােগ
(দুৰ্বলতা) উপস্থিত হইয়াছে।
[১৫]
2

মােগল-বিদুষী
তাহা না হইলে, তাহার দক্ষতার (ত) কোনই হ্রাস
হয় নাই।”
=
=
“বুআলী-এ-রােজগার আজ, খুরাসা আমদা।
আজ, পায়, এজাজ, বর দরগাহ-ই-সুলতান্ আমদা।
হয়রতে দাম কে চু আ রব, দরী জুলমাৎ-ই-হিন্দ।
তুতী এ ফিকরম পায়,-শর্কর জে রিজওয়ান আমদা।”
অর্থাৎ,
“আমি বর্তমান যুগের Avicenna (মহাপণ্ডিত),
খুরাসা হইতে আগত।
ভক্তির চরণে সম্রাটের সভায় আসিয়াছি।
আশ্চর্য হইয়াছি যে...[ ? হে ঈশ্বরের মত ?] এই
হিন্দুস্থানের অন্ধকারে।
আমার বুদ্ধিরূপ শুকপক্ষী মিছরীর লােভে স্বর্গ
হইতে আসিয়াছে।”
গ্রন্থকার সম্রাট শাহজাহানের দরবারে প্রবেশলাতে
অসমর্থ হইয়া, দুঃখ করিয়া বলিতেছেন।
“বরূ দ-ই-সুতা-ই-আল হএফ, নাদার কাসে।
তা কে রেসান আজ-ই-মকস আর্কানে-উ।
[ ১৬ ]

মােগল-বিদুষী
সানি সাহিব,-ই-কিরাণ পাদিশাহে-ইনস ও জান্।
আঁকে মুল সা নেহদ বর খৎ ই ফমানে-উ।”
অর্থাৎ
“কি দুঃখ ! এই যুগের সম্রাটের সভায় আমার কেহ
(বন্ধু) নাই।
যে (আমার) প্রার্থনা উহার সভার শ্রুতিগােচর
দ্বিতীয় সাহিব-ই-কিরাণ (= শাহজাহান্) নরজাতি
এবং জিনের সম্রাট।
যাহার আজ্ঞাপত্রের উপর জগৎ (ভক্তিভরে) মস্তক
অবনত করে।”
ইহা হইতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হইতেছে যে, আলােচ্য
‘দেওয়া-ই-মখ ফী’র লেখক ও জেব-উন্নিসা একই
ব্যক্তি নহেন। দেওয়ানের লেখক সম্রাট শাহজাহানের
দরবারে প্রবেশলাভে নিরুপায় হইয়া আক্ষেপ করিতেছেন।
তিনি কখনও জেব-উন্নিসা হইতে পারেন না। পিতামহ
শাহজাহানের দরবারে তাঁহার দ্রৌহিত্রী জেব-উন্নিসার
অবারিতদ্বার ছিল। উদ্ধত অংশ হইতে আরও জানা
যায় যে, দেওয়া-লেখকের জন্মভূমি-খুরাসান; কিন্তু
জেবের জন্মস্থান-দৌলতাবাদ।
[১৭]

মােগল-বিদুষী ‘দেওয়ান-ই-মখ ফীর শেষভাগের কতকগুলি কবিতা হইতে স্পষ্টই. প্রতীয়মান হয় যে, গ্রন্থকার প্রেরিত-পুরুষ মহম্মদের সমাধি দর্শন করিতে গিয়া, তথায় ঐ কবিতাগুলি পাঠ করিয়াছিলেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছেন, কবিতা- রচনায় বিদুষী জেব-উন্নিসার যথেষ্ট পারদর্শিতা ছিল ; এবং কোন কোন লেখকের মতে তিনি একখানি ‘দেওয়ানেরও রচয়িত্রী। বােধ হয়, এই কারণেই বৰ্ত্তমান দেওয়া-ই-মখফী'কেই অনেকে জেব-উন্নিসার রচনা বলিয়া নির্দেশ করেন। এই ‘দেওয়া-ই-মং ফী’র কোন কোনখানিতে এমন কতকগুলি কবিতা সন্নিবিষ্ট , হইয়াছে, যাহা সাধারণতঃ জেবের কবিতা বলিয়া লােকের ধারণা। কলিকাতার এসিয়াটিক সােসাইটীতে রক্ষিত, ডাক্তার রস (Dr. Ross) কর্তৃক সংগৃহীত কতকগুলি পুথির মধ্যে একখানি দেওয়ান-ই-মখফী’ আছে। এই ‘দেওয়ানে’ জেবের রচনা বলিয়া পরিচিত কতকগুলি কবিতা স্থানলাভ করিয়াছে ; তন্মধ্যে একটি এইরূপ- “বেশেকন দস্তে কে খ দ গদ-ই-ইয়ারে না। কু বা-চশমে কে লজ্জংগীর দীদারে না। ( ১৮ ] ;

মােগল-বিদুষী সদ বাহা আখির শুদূ ও হর্ গুন্ বকৰ্কী জা গেরেফৎ। গুঞ্চা-এ-বাঘ-ই-দি-ই-মা জেব, দেস্তারে না।” অর্থাৎ, “সে বাহু ভগ্ন ( ব্যতীত আর কিছুই নহে) যাহা প্রেমিকের কণ্ঠে বেষ্টিত হয় নাই। চক্ষু থাকিতেও অন্ধ যে প্রেমাস্পদকে) দর্শনের রস আস্বাদন করে নাই । শত শত বসন্ত শেষ হইল, এবং প্রত্যেক ফুল মস্তুকে স্থান পাইল। কিন্তু) আমার হৃদয়-উদ্যানের কোরক শিরস্ত্রানের ভুষণ হইল না। কথিত আছে, ইহার উত্তরে একব্যক্তি নিম্নলিখৃিত কবিতাটী রচনা করিয়াছিলেন -- “পীর গুদ জেব-উন-নিসা উ-রা খরিদারে না” অর্থাৎ “জেব-উন্নিসা বৃদ্ধা হইল,কিন্তু তাহার খরিদ্দার জুটিল না।” এক্ষণে জিজ্ঞাস্য, তবে বর্তমান-প্রচলিত “দেওয়ান-ই- মখফীর” গ্রন্থকার কে ? আমাদের মনে হয়, ইহার রচয়িতা গিলান্ প্রদেশে অবস্থিত রশটু নগরের মখফী— জেব-উন্নিসা নহেন। ইনি পারস্যের ফার্স প্রদেশের ন [ ১৯ ].

মেগ-বিদুষী
শাসনকর্তা ইমাম কুলী খাঁর (মৃত্যু ১০৪৩ হিঃ =১৬৩৩ খ্রঃ)
অধীনে কৰ্ম্ম করিতেন,-এবং শাহজাহানের রাজত্বকালে
(১৬২৮-১৬৫৮) ভারতে অবস্থান করিয়াছিলেন। ১২৬৮
হিজরায় কানপুরে, এবং ১২৮৪ হিজরায় লক্ষে নগরীতে
‘দেওয়া-ই-মখফী’ লিথােগ্রাফে মুদ্রিত হয়।
[ জেব-উন্নিসা -জন্ম, দৌলতাবাদ, ১৫ই ফেব্রুয়ারী,
১৬৩৮। মৃত্যু, দিল্লী, ২৬এ মে, ১৭০২ ]
[ ২ ]

জে-উন্নিসা কি কলঙ্কিনী ? সম্রাট আওরংজীবের জ্যেষ্ঠাকন্যা জেব-উন্নিসা কলঙ্ক কাহিনীর মূলে কোন সত্য নিহিত আছে কি না, এক্ষণে তাহাই আমাদের বিচাৰ্য্য। চিরকুমারী, মনস্বিনী জেব-উন্নিসার সহিত আকিল খাঁ বা অন্য কাহারও অবৈধ প্রণয়ের কথা, আওরংজীবের আমলে রচিত কোন ইতিহাসে নাই ; তাহার মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরে লিখিত ইতিহাসেও নাই। সরকারী ইতিহাসে বা রাজকর্মচারী-লিখিত ইতিহাসে, রাজ- অন্তঃপুরের এরূপ কলঙ্ক-কথার স্থান হইতে পারে না ; কেন না, এই শ্রেণীর ইতিহাস হংসের ন্যায় সারগ্রাহী, দোষভাগ পরিত্যাগ করিয়া গুণভাগ গ্রহণ না করিলে তাহাদের উপায় নাই; কিন্তু বে-সরকারী ইতিহাসের (Private History) পক্ষে এ কথা খাটে না। সুতরাং আওরংজীবের আমলের বেসরকারী ইতিহাসের সাক্ষ্য এস্থলে আমরা অসঙ্কোচে পরীক্ষা করিয়া গ্রহণ করিতে পারি। এই শ্রেণীর ঐতিহাসিকগণের মধ্যে ভীমসেন ও = [ ২১ ] মাগল-বিদুষী ঈশ্বরদাস নামক দুইজন হিন্দুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যােগ্য। এই হিন্দু-ঐতিহাসিকদ্বয় মুসলমান রাজ- পরিবারের সম্বন্ধে রাখিয়া-ঢাকিয়া কোন কথা বলেন নাই--স্বাধীনভাবেই ফাসীভাষায় লেখনী পরিচালনা করিয়াছেন; জেব-উন্নিসার প্রেমকাহিনী-বর্ণনায় তাহাদের রচিত ইতিহাস নীরব। তারপর খাফী খার কথা। তিনি আওরংজীবের মৃত্যুর ২৮ বৎসর পরে ইতিহাস প্রণয়ন করেন। ইহার নির্ভীক-লেখনী জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানের লজ্জাজনক কাহিনীও অসঙ্কোচে উদগার করিয়াছে, কিন্তু জেবের চরিত্রে বিন্দুমাত্র কলঙ্ক নিক্ষেপ করে নাই। তেমন কোন দোষের কথা থাকিলে যে খাফী খাঁর লেখনীর মুখে তাহা অপ্রকাশিত থাকিত না, ইহা নিঃসংশয়ে বা যাইতে পারে। আবার ইহারও এক পুরুষ পরে, ‘মাসি-উল-উমরাহ, নামক মােগল-অভিজাতবর্গের জীবন-কাহিনী-সম্বলিত অভিধানের উৎপত্তি। এই অভিধানও জেব-উন্নিসার তথাকথিত কলঙ্ক-কাহিনী কীৰ্ত্তন করিয়া অপক্ষপাত ইতিহাসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে নাই। বলা বাহুল্য, খাফী খার ন্যায়, এই সুবৃহৎ গ্রন্থের লেখকও স্বাধীনভাবে ইতিহাস-চৰ্চা করিয়া গিয়াছেন। অবশিষ্ট রহিল, [ ২২ ]

মোগল-বিদুষী
ইউরােপীয় পৰ্যটক বার্নিয়ার (Bernier) ও মানুষীর
{Manucci) ভ্ৰমণ-কাহিনী। বিদেশী পর্যটকদ্বয়,
বিদেশীর চক্ষু লইয়াই এদেশের পরিচয় লইয়াছেন; সেই
দৃষ্টির মুখে এদেশের ব্যাপার-সকল তাহাদের কাছে যেরূপ
প্রতিভাত হইয়াছে, তাহারা সেইরূপই লিখিয়াছেন,-
আওরংজীব, বা তাহার বংশধরগণের ক্রোধভাজন হইবার
ভয় তাহাদের ছিল না। তাহাৱা ভয় করিয়াও কোন
কথা বলেন নাই; বরং ইহাদের মধ্যে মানুষী, ‘নিরঙ্কুশাঃ
কবয়’ পৰ্য্যায়ভুক্ত বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। মানুষীর
রচিত ‘মােগল ইতিহাস’ রাজ্যসংক্রান্ত এত অধিক কুত্সায়
পূর্ণ যে সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক উইলিয়ম আৰ্তি ( Wm.
Irvine ) entert 167 Chronique Scandaleuse
অর্থাৎ কলঙ্কের কেচ্ছা' নামে অভিহিত করিয়াছেন।
জেব-উন্নিসা চরিত্রে তিল পরিমাণ দোষ পাইলে যে, তিনি
তাহাকে তাল পরিমাণ না করিয়া ছাড়িতেন না, ইহা
নিশ্চয়। তাহার কেচ্ছাতেও কিন্তু জেব-উন্নিসার প্রণয়-
কাহিনীর আভাসমাত্র নাই। এক কথায় ঐ প্রণয়-কাহিনী
সত্য হইলে, উদ্ধত গ্রন্থনিচয়ের একখানিতেও অন্তত
তাহার উল্লেখ থাকিত। তাহা যখন শই, তখন বুঝিতে
হইবে উহা উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত।
[২৩ ]

মােগ-বিহুৰী জেব-উন্নিসার কলঙ্ক-কাহিনী উনবিংশ শতাব্দীর উর্দ-লেখকগণের কুকীর্তি ! আধুনিক উৰ্দ-গ্রন্থকারগণের আখ্যায়িকা ব্যতীত ইহার সন্ধান আর কোথাও পাইবার বিশেষ সম্ভাবনা নাই, এবং সম্ভবতঃ লক্ষে শহরেই ইহার সৃষ্টি! লাহােরের মুনশী আহমদ-উদ্দীন, বি-এ মহাশয়ের “দুবৃরূ-ই-মক্তুম” নামে জেব-উন্নিসার একখানি তথাকথিত জীবন-চরিত বর্তমানে প্রচলিত। এই গ্রন্থেই আমরা জেবের কলঙ্ক-কাহিনীর কথা প্রথম দেখিতে পাই। গ্রন্থকার আবার এই পুস্তকের জন্য মুনশী মহম্মদ- উদ্দীন খালিকের ‘হাইয়াৎ-ই-জেব-উন্নিসা' নামক গ্রন্থ হইতে উপাদান সংগ্রহ করেন। বিবি ওয়েষ্ট-প্রণীত Divan of zeb-an, issa* গ্রন্থের ভূমিকায়, জেবের প্রণয়-কাহিনীর এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে ; কিন্তু উহা লেখিকার মৌলিক গবেষণার ফল নহে—স্পষ্টতঃ মুনশী আহমদ- উদ্দীনের উন্দ গ্রন্থের চর্বিতচর্বণ ! বিবরণটা এইরূপ *১৬৬২ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভে আওরংজীব, অসুস্থ হইয়া পড়েন। চিকিৎসকগণ হাওয়া-পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়ায় # Diwan of Zeb-un-nissa-Mrs. Westbrook. Wisdom of the East Series : 1913. [ ২৪*] মােগ-বিদুষী বাদশাহ, পরিবার, পরিজন ও পারিষদবর্গসহ লাহােরে গমন করেন। উজীর-পুত্র আকিল খাঁ তখন ঐস্থানের শাসনকর্তা। তাঁহার যেমন রূপ, তেমনই বীরত্ব, আবার তেমনই কবিত্বের খ্যাতি। মােগ্যই যােগ্যের কদর বুঝে ; আকিল জেব-উন্নিসার রূপগুণের কথা শুনিয়া পূৰ্বেই তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলেন । এইবার সেই সুদূরের বস্তু নিকটবর্তী। আকিল স্থির থাকিতে পারিলেন না; নগর-রক্ষার ছলে অশ্বারােহণে রাজ- প্রাসাদের চারিদিক পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন— উদ্দেশ্য যদি একবার জেবের সহিত সাক্ষাৎলাভের সুযােগ ঘটে। বলা বাহুল্য, সে সুযােগলাভেরও অধিক বিলম্ব হইল না। একদিন উষাকালে গু-আনার বর্ণের, অর্থাৎ ডালিম ফুলের রং-এর, বস্ত্রশােভিত বাদশাহ-কন্যা প্রাসাদশিরে দণ্ডায়মান হইলেন চারি চক্ষের মিলন হইল। “উভয়েই কবি, অতএব প্রণয়ের মুখবন্ধ গদ্যে সুরু হইতে পারে না, পদ্যেই হইল। আকিল বলিলেন, ‘প্রাসাদ- শিরে রক্তিম স্বপ্ন প্রতিমা প্রকাশ পাইল। জেব-উন্নিসা জবাব দিলেন, অনুনয়-বিনয়, জোর-জবদস্তি, বা, স্বর্ণমুদ্রা, কিছুতেই এ প্রতিমা লভ্য হইবার নহে। [২৫]

মােগল-বিদুষী
“লাহােরই জেব-উন্নিসার মনের মত স্থান; এইস্থানে
তিনি একটী উদ্যানও নির্মাণ করাইতেছিলেন। একদিন
নৰ্ম্ম-সখীগণের সহিত জেব, উদ্যানের একটী মরগৃহের
নির্মাণকাৰ্য্য দেখিতে আসিলে, আকিল মজুরের বেশে
মাথায় চুণ-সুড়কির হাঁড়ি লইয়া হাজির! প্রেমিক-কবি
উজীর-পুত্রের এই প্রেমভিক্ষার বেশ অতি অপূর্ব সন্দেহ
নাই; কিন্তু তিনি নিরুপায়। এই ছদ্মবেশ ধরিয়াই না
কি তাঁহাকে প্রহরীর চক্ষে ধূলি দিয়া উদ্যানে প্রবেশ
করিতে হইয়াছিল। বাদশাহজাদী তখন ‘চৌসার’
খেলায় মত্ত । আকিল নিকটবর্তী হইয়া বলিলেন,
‘তােমার আশায় আমি ধূলিকণার ন্যায় হইয়া সারা পৃথিবী
ঘুরিয়া বেড়াইতেছি।
বলিলেন, ‘তুমি বায়ুর
আকার ধারণ করিলেও আমার কেশাগ্র স্পর্শ করিতে
পারিবে না।
“আকিলের সহিত জেবের ঘন ঘন সাক্ষাৎ হইতে
লাগিল। এ সকল কথা গােপনে থাকিবার নহে,-বিশ্বদূত
জনরবের মারফৎ দিল্লীতে গিয়া আওরংজীবের কর্ণে
উঠিল। বাদশাহ, কালবিলম্ব না করিয়া লাহােরে
পৌছিলেন; স্থির হইল, অবিলম্বে কন্যার বিবাহ দিয়া
গােযােগের অবদান করিবেন। কন্যা পিতাকে জানাইলেন
( ২৬ ]
জেব,

মােগ-বিদুষী
যে, তিনি স্বয়ংবরা হইবেন; অতএব যাহারা তাহার
পাণিপ্রার্থী তাহারা যেন তাহাদের প্রতিকৃতি পাঠাইয়া দেন।
বলা বাহুল্য, জেব, অতঃপর আকিলকেই স্বামিত্বে বরণ
করিবার সক্ষম করেন। আওরংজীব, তদনুসারে
আকিলকে ডাকিয়া পাঠান। কিন্তু জেব-উন্নিসার এক
ব্যর্থ প্রেমিক মধ্য হইতে বিভ্রাট ঘটাইল ; সে আকিলকে
লিখিয়া জানাইল যে, ‘সম্রাট-কন্যার প্রণয়পাত্র হওয়া
ছেলেখেলা নহে। বাদশাহ, সমস্ত ব্যাপার জানিতে
পারিয়াছেন; দিল্লী পৌছিলেই, তুমি তােমার দারুণ
পরিণাম বুঝিতে পারিবে। পত্রপাঠে আকিলের এই
ধারণা হইল যে, বাদশাহ, নিশ্চয়ই তাহাকে কঠোর দণ্ডে
দণ্ডিত করিবার মতলব করিয়াছেন। ইহাতে তাহার চিত্তে
এতই আশঙ্কার সঞ্চার হইয়াছিল যে, তিনি বিবাহে অসম্মত
হইয়া বাদশাহর নিকট পদত্যাগপত্র পাঠাইয়া দিলেন।
গ
“কিন্তু হতভাগ্য আকিল খাঁ জেবকে বিস্মৃত হইতে
পারিলেন না; তাঁহাকে দেখিবার জন্য আবার গােপনে
দিল্লীতে আসিয়া উপস্থিত। আবার উদ্যান-বাটিকায়
উভয়ের সাক্ষাৎ! সংবাদ পাইয়া বাদশাহ, অতর্কিতভাবে
কন্যার নিকট উপস্থিত হইলেন। জেব, পিতাকে আসিতে
২৭ ]

যোগ-বিদুষী
দেখিয়া প্রেমাস্পদকে অবিলম্বে একটী বৃহৎ ডেকের মধ্যে
লুকাইয়া রাখিলেন; কিন্তু চতুর চুড়ামণি বাদশাহর
চক্ষে ধূলি দেওয়া অসম্ভব ; তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,
‘এই ডেকের মধ্যে কি ? জেব, বলিলেন, ‘গরম করিবার
জল। বাশাহ, হুকুম দিলেন, অগ্নিসংযোেগে জল গরম
কর। তৎক্ষণাৎ বাদশাহর হুকুম তামিল করা হইল।
জেব, এই সময় স্বীয় প্রেমিকের জীবন অপেক্ষা আপনার
যশােমানের জন্যই সমধিক ব্যাকুল হইয়াছিলেন।
ডেকের নিকট আসিয়া চুপি চুপি আকিলকে বলিলেন,
‘যদি সত্যসত্যই তুমি আমাকে ভালবাসিয়া থাক, তাহা
হইলে মৌনী হইয়া আমার মান বাঁচাও। আর্কি খ
এইরূপে অনলে সিদ্ধ হইয়া তাঁহার প্রেমের পরীক্ষা
দিলেন। জেব-উন্নিসার একটা কবিতায় আছে,
‘প্রকৃত প্রেমের পরিণাম কি ? (উত্তর) জগতের তৃপ্তির
জন্য আত্মবলিদান। ইহার পর জেব, সলীমগড় দুর্গে
বন্দী হন।” (pp. 14-17).
বিবরণটা যে কতদূর বিশ্বাসযােগ্য, ইহার রচনাপ্রণালী
দেখিলেই তাহা স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। তথাপি ইহার
মুলে কোন ঐতিহাসিক সত্য নিহিত আছে কি না,
বিচার করিয়া দেখা কর্তব্য।
[ ২৮ )

মােগজবিদুষী যাহারা মানুষী (i, 218) ও বার্ণিয়ারের (p. 13) ভ্রমণ-কাহিনী পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারাই জানেন লেখকদ্বয় জেবের পিতৃঘসা জাহান-আরার অবৈধ-প্রেমের একটা বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তাহাতে প্রকাশ, ডেকের মধ্যে লুক্কায়িত জাহান্-আরার প্রণয়ীকে সিদ্ধ করিয়া হত্যা করা হয়। এই বিবরণের সহিত উর্দ- লেখকগণের অত্যাশ্চর্য মিল। প্রকৃত কথা, মানুষী ও বার্ণিয়ার-রচিত ‘উদোর পিণ্ডী’ উক্ত লেখকেরা ‘বুদোর ঘাড়ে চাপাইয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছেন! লােক-মনােরঞ্জনের জন্য এই সকল লেখক রং-এর উপর রং ফলাইয়া ঐতিহাসিক ত্যর অপলাপ করিতে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হন নাই। আকিল খা অবশ্য ঐতিহাসিক ব্যক্তি ; কিন্তু তাহার সম্বন্ধে ইতিহাস যাহা বলে, তাহা এই গল্পের সম্পূর্ণ বিরােধী। তাঁহার পূর্ব নাম, মীর অঙ্কর,-নিবাস পারস্যের খাক, নামক স্থান; কিন্তু তিনি দিল্লার কোন উজীরের পুত্র নহেন। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে আকিল কুমার আওরংজীবের অধীনে কৰ্ম্মগ্রহণ করেন। কুমার যখন দ্বিতীয়বার দাক্ষিণাত্যের শাসকৰ্ত্তা (১৬৫২০ ৫৭ ), আকিল তখন তঁাহার ‘জিলের’ অর্থাৎ অশ্বারােহী পার্বচরের 'পদাভিষিক্ত। ইহার পূর্বেই আকিলের [ ১ ] মােগা-বিহুৰী ১৬৬০ কবিত্বের খ্যাতি হইয়াছিল ; কবিতার ভণিতায় তিনি ‘রাজী’ নাম ব্যবহার করিতেন। দাক্ষিণাত্য ত্যাগ করিয়া সিংহাসন-অধিকারার্থ যুদ্ধাভিযানকালে আওরংজীব, তাহার পরিবারবর্গকে দৌলতাবাদের দুর্গে রাখিয়া যান। ১৬৫৮ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই ফেব্রয়ারী হইতে ডিসেম্বর পৰ্যন্ত প্রায় ১১ মাসকাল তাঁহারা ঐস্থানে অবস্থান করেন। আকিল খাঁ ৬ই ফেক্ৰয়ারী হইতে আওরঙ্গাবাদের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং ১৬৫৮ খ্রীষ্টাব্দের আগষ্ট হইতে প্রায় ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগ পর্যন্ত দৌলতাবাদ- দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের ভারপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। খ্রীষ্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারী তিনি দিল্লীতে গমন করেন এবং তাহার দুই মাস পরেই গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী প্রদেশ—মীয়া-দুয়ারের-ফৌজদার নিযুক্ত হন ; ১৬৬১ খ্ৰীষ্টাব্দের জুলাই মাসে এই পদ অন্য এক ব্যক্তিকে প্রদত্ত হয়। পরবর্তী নভেম্বর মাসে (১৬৬১ খ্রঃ) শারীরিক অসুস্থতানিবন্ধন, আকিল খাঁ কিছুদিনের অবসরের জন্য দরখাস্ত করেন; এই ছুটি মঞ্জুর হইলে, তিনি নগদ ৭৫০ টাকা বৃত্তি পাইয়া কিছুদিন লাহােরে অবস্থান করেন। আকিল খাঁর এই আবেদনপত্রে প্রকাশ তৎকালে তাহার বয়ঃক্রম ৫০ বৎসরের উর্দ্ধ ছিল। [ ৩ ]

মােগল-বিদুষী
কাশ্মীর হইতে প্রত্যাবর্তনকালে আওরংজীব, ১৬৬৩
খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে যখন সপরিবারে লাহাের অতিক্রম
করিতেছিলেন, সেই সময়ে (২রা নভেম্বর) আকিল খাঁ
রাজদর্শনে উপস্থিত হন; সম্রাট তাঁহাকে সমভিব্যাহারে
আনিয়া দরবার-গৃহের দাবােদার পদ (Supdt. of the
Hall of Private Audience) প্রদান করেন (জানুয়ারী
১৬৬৪)। এই সময় আকিল খাঁ যে নিশ্চয়ই সম্রাটের
খুব অনুগ্রহভাজন ছিলেন, তাহা স্পষ্টই বুঝা যায় ;
কারণ ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তাহার পদোন্নতি
হয়, এবং পর বৎসর মে মাসে তিনি সম্রাটের নিকট হইতে
উপহার লাভ করেন। ইহার পরে আকিল খাঁ
ডাকচৌকীর দারােগার ( Postmaster-General ),
পদলাভ করিয়াছিলেন। ১৬৬৯ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে
উক্ত পদ ত্যাগ করার পর সাত বৎসর, অর্থাৎ ১৬৭৬
খ্রষ্টাব্দের অক্টোবর পর্যন্ত, তিনি কিরূপে কোথায় ছিলেন,
তাহা আমাদের নিকট অজ্ঞাত। এই সময়ের পর হইতে
আকিল খাঁ মাসিক ১০০০ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হন এবং
১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে তিনি দ্বিতীয় বখশী’র
( Second Paymaster) পদলাভ করেন। পরিশেষে
১৬৮ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাস হইতে ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দে
[ ৩ ]

মােগল-বিদুষী মৃত্যু পর্যন্ত, আকিল খাঁ দিল্লীর সুবাদারের পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। মৃত্যুর কিছু পূর্বে তিনি এই পদ ত্যাগ করিতে চাহিলে, বাদশাহ, উত্তরে তাহাকে যে স্নেহসূচক পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহা বিদ্যমান আছে। ইহাই সংক্ষেপঃ আকিল খাঁর জীবনের ইতিহাস। তাহা হইলে আমরা নিঃসন্দেহরূপে জানিতে পারিতেছি যে, সম্রাটের আদেশে যুবা আকি খার পূর্ববর্ণিত মৃত্যু-কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা। আওরংজীবের সিংহাসন- অধিকারার্থ যুদ্ধগমনের পূর্বে তাহার পরিবারবর্গ যে দুর্গে আয়লাভ করিয়াছিলেন, (৬ই ফেব্রুয়ারী... ডিসেম্বর ১৬৫৮) তাহার রক্ষণাবেক্ষণের ভার কোন কমবয়স্ক লােকের উপর অর্পিত হওয়া কখনই সম্ভবপর নহে। আর পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, ১৬৬১ খ্রীষ্টাব্দে আকিল ছুটির জন্য যে আবেদনপত্র প্রেরণ করেন, তাহাতে প্রকাশ, তৎকালে তাহার বয়ঃক্রম ৫ বৎসরের উৰ্দ্ধ ; সুতরাং মৃত্যুকালে আকিল খাঁর বয়ঃক্রম যে ৮৫ বৎসরের অধিক হইয়াছিল, তাহা নিঃসন্দেহ। এখন আকিল খাঁর জীবন-বিবরণ হইতে দেখা যাউক, কোন্ কোন্ সময়ে তিনি ও জেব-উন্নিসা একই স্থানে অবস্থান করিয়াছিলেন- [ ৩২ ] ~ মােগল-বিদুষী পৌছেন। (১) ১৬৫৮ খ্ৰীষ্টাব্দে দৌলতাবাদে ন্যূনাধিক ১০ মাসের জন্য। (২) ১৬৬৩ খ্রীষ্টাব্দে লাহােরে এক সপ্তাহের জন্য। (৩) ইহার পর হইতে খ্রষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে পদত্যাগ পর্যন্ত সময় দিল্লী ও আগ্রার রাজদরবারে। (৪) ১৬৮০ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই মে জেব-উন্নিসা দিল্লী হইতে আজমীরে ইহার অনেক পূর্বেই মাড়ওয়ার ও মিবারের সহিত যুদ্ধহেতু বাদশাহ, আকিল খা-সহ আজমীরে আগমন করেন; কাজেই ১৬৮ খ্রষ্টাব্দের মে মাস হইতে ১৬৮১ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাস (বন্দী হওয়া ) পৰ্যন্ত প্রায় ৮ মাস কাল আকিল খাঁ ও জেব-উন্নিসা একই স্থানে অবস্থান করিয়াছিলেন। (৫) ১৬৮ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী হইতে ১৬৯৬ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লীতে। এখন দেখা যাইতেছে যে, যদি বাদশাহর অনুপ- স্থিতিতে আকিল খাঁ ও জেবের মিলন-সংঘটন ও প্রেমালাপ হইয়া থাকে, তবে তাহা প্রথম ও শেষােক্ত সময়ের অবকাশে ঘটিয়াছিল ; কারণ এই সময়ে বাদশাহ অন্যত্র ছিলেন। [ ৩ ] মােগল-বিদুষী আকিল খাঁর রাজকাৰ্য্য হইতে অল্পদিনের জন্য অবসরগ্রহণ এবং লাহােরে অবস্থান (১৬৬১ খ্রীষ্টাব্দ নভেম্বর হইতে ১৬৬৩ অক্টোবর) সম্রাটের নিগ্রহের চিহ্ন হইতে পারে না; কারণ অবসরপ্রাপ্তিকালে আকিল খাঁ নিয়মিত রূপে বাদশাহর নিকট হইতে উপযুক্ত বৃত্তিলাভ করিয়াছিলেন। তবে রাজধানী ও সম্রাটের পারিষদবর্গ হইতে সুদীর্ঘ ১০ বৎসরকাল (১৬৬৯-১৬৭৯) দুরে অবস্থান, এবং এই দশ বৎসরের মধ্যে বিশেষতঃ প্রথম যে ৭ বৎসর সম্রাটের কোনরূপ অনুগ্ৰহলাভে বঞ্চিত হন, তাহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, কোন অজ্ঞাত কারণবশতঃ এই সময়ে তিনি বাদশাহর বিরাগভাজন হইয়াছিলেন। তবে কি ইহা জেব-উন্নিসার সহিত অবৈধ প্রেম- লাপের শাস্তি ? ১৬৮০ খ্রীষ্টাব্দে অর্থাৎ বিদ্রোহী হইবার অনতিপূর্বে, কুমার আর ভগিনী জেবকে এই মর্মে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন ঃ- “সম্রাট এক্ষণে আদেশ প্রচার করিয়াছেন যে, আকিলের মােহরযুক্ত কোন প্যাকেট (aalaa০) প্রাসাদস্থ পুরললনাগণের কক্ষে লইয়া যাওয়া একেবারে নিষিদ্ধ ; কাজেই ইহা সুনিশ্চিত যে, এক্ষণে (আমাকে ?) কাগজ- পত্র বিশেষ বিবেচনা করিয়া পাঠাইতে হইবে।” [ ৩৪ 3 মােগ-বিদুষী • এই আকিলই কি তবে জেব, উন্নিসার প্রণয়াস্পন কবি—আকিল খাঁ রাজী ? না,অামাদের মনে হয়, তাহা নহে। এই সময়ে কুমার অবরের শিবিরে মহম্মদ আকিল নামে একজন মুল্লা অবস্থান করিতেন। ইনিই পরে আক্বরের স্বপক্ষে, আওরংজীবকে সিংহাসন- চ্যুত করিবার জন্য পাঁতি (ফতেয়া) দিয়াছিলেন এবং তাহার ফলে, আকবরের পরাজয়ের পর বাদশাহ, কর্তৃক কারাবদ্ধ হন ও অন্যান্য শান্তিলাভ করেন। জেব-উন্নিসা ধর্মগ্রন্থ কোরাণে বিশেষভাবে ব্যুৎপন্ন ছিলেন ; তাহারই পৃষ্ঠপােষকতায় মুসলমান-ধৰ্ম্মগ্রন্থের কয়েকখানি ভাষ্য রচিত হইয়াছিল ; কাজেই তাঁহার সহিত মুল্লা মহম্মদ আকিলের ন্যায় একজন বিখ্যাত ধর্মতত্ত্বালােচনাকারীর পত্র-ব্যবহার যে কেহ সন্দেহের চক্ষে দেখিত না, তাহা স্বাভাবিক। কুমার আকবরের পত্রের মর্ম এই যে, তাঁহার নিজের মােহরযুক্ত প্যাকেট পাঠাইলে পাছে শহন্তে পতিত হয়, এই কারণে তিনি ভগিনী জেব-উন্নিসাকে যে সমস্ত গােপনীয় পত্র লিখিতেন, তাহা. আকিলের পত্রের মধ্য দিয়া প্রেরিত হইত কেন না, তাহা বিনা বাধাবিয়ে জেবের নিকট পেীছিত। পত্রখানির শেষাংশ হইতে একথা আরও পরিস্ফুট ৩৫ ] • মোগল-বিদুষী হইবে ;-“তােমাকে পত্র লিখিতে বিলম্ব হওয়ার একমাত্র কারণ, ভয় হয়, পাছে আমার পত্র অন্য লােকের ( অপরিচিত লোেক, অর্থাৎ শক্রর) হস্তে পতিত হয়।” যদি কেহ বলিতে চাহেন, কন্যার সহিত কবি আকিল খ রাজীর প্রণয় যড়যন্ত্রের কথা জানিতে পারিয়া বাদশাহ, উভয়ের মধ্যে পত্র-ব্যবহার বন্ধ করিয়া দেন, তাহা হইলে, তাহা একেবারে অযৌক্তিক হইবে; কারণ, এই ব্যাপারের কয়েক মাস পরেই আকিল খাঁ বিশেষ দায়িত্বপূর্ণ দিল্লীর শাসনকর্তার পদলাভ করিয়াছিলেন—এবং পর বৎসরের প্রারম্ভে জেব, বন্দী হইয়া এই দিল্লীতেই প্রেরিতা হন। জেব-উন্নিসা পিতার আদেশে ১৬৮১ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে বন্দী হন; সরকারী ইতিহাসে অতি স্পষ্টই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ভ্রাতা আকবরের বিদ্রোহ- ব্যাপারে লিপ্ত থাকাই তাহার বন্দীত্বের একমাত্র কারণ। জেব-উন্নিসার এই কঠোর কারাবাসকালে যদি কেহ তাঁহাকে ও আকিল খাঁকে লইয়া মনে মনে একটা 'প্রেম-কাব্য রচনা করিতে চাহেন, তাহা হইলে তাহাও কতদূর স্বাভাবিক হইবে, বলা যায় না; কারণ তৎকালে জেব-উন্নিসা ৪৩ বৎসর বয়স্কা প্রৌঢ়া রমণী, এবং আকিল খাঁ তখন ৭২ বৎসরের বৃদ্ধ। [ ৩৬ ] -

মােগল-বিদুষী
--:
ইহার পর আরও একটা ভিত্তিহীন জনরব আছে।
এই অমূলক জনপ্রবাদের সৃষ্টি মহারাষ্ট্র বীর ছত্রপতি
শিবাজীকে লইয়া। প্রকাশ যে, ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই মে
যখন শিবাজী আগ্রায় বাদশাহর নিকট আনীত হন,
সেই সময়ে জেব, প্রথম-দর্শনেই শিবাজীকে মনেপ্রাণ
অৰ্পণ করিয়াছিলেন। প্রণয়িযুগল কেমন করিয়া পরস্পর
অঙ্গুরী-বিনিময় করিয়া বিদায়গ্রহণ করিয়াছিল, ৫০ বৎসর
পূৰ্বে ভূদেব মুখােপাধ্যায়ও ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ উপন্যাসে
তাহা বর্ণনা করেন। ইহা ঐতিহাসিক তত্ত্ব নহে ;-উপন্যাস
মাত্র এবং তাহার মূল্য আজগুবী-জনশ্রুতি। সমসাময়িক
কোন ফার্সী ইতিহাস দূরে থাকুক, মহারাষ্ট্র ভাষায়-
লিখিত শিবাজীর কোন জীবনচরিতকারও বলেন না যে,
একজন বাদশাহজাদী পিতৃরাজধানীতে বন্দী শিবাজীর
দুর্ভাগ্যের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করিয়াছিলেন। অন্য
কোন কারণে না হউক, একমাত্র জেব-উন্নিসার সুশিক্ষা,
সুরুচি ও সৌন্দৰ্যবােধই যে, তাহাকে শিবাজীর ন্যায়
অশিক্ষিত, অভব্য, দক্ষিণী হিন্দুর সহিত প্রেম-বিনিময়ে
বিরত করিত,ইহা স্বাভাবিক। সুতরাং এই কাহিনীটা
কেবল অনৈতিহাসিক নহে, পরন্তু অস্বাভাবিক।
{ ৩৭ ]

গুদন, যে-সকল পুণ্যশীলা, জ্ঞানগরিমাশালিনী মহিয়সী মহিলার নাম মােগল-ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে অঙ্কিত থাকিবার যােগ্য, বেগম গুলবদন্ তাহাদের অন্যতম। তিনি ভারতে মােগল-সাম্রাজ্যের স্থাপয়িতা অক্লান্তকর্মী, অধ্যবসায়শীল সম্রাট বাবরের কন্যা, উত্থান-পতনের বিচিত্র-লীলাস্থলী হুমায়ুনের বৈমাত্রেয় ভগিনী, এবং মােগল-কুলচন্দ্র ‘দিল্লীশ্বনাে বা জগদীশ্বররা বা আখ্যার যােগ্যতম অধিকারী বাদশাহ আকবরের পিতৃম্বসা। গুল- বদনের সুদীর্ঘ জীবন ভূয়ােদর্শনের আদর্শ ; তিনি যথাক্রমে বাবর, হুমায়ুন ও আরমােগলের এই তিন পুরুষের অত্যুদ, ভাগ্যবিপর্যয় এবং প্রতিষ্ঠা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া মানব-জীবনের অপরিসীম অভিজ্ঞতা-সঞ্চয়ের সুযােগ পাইয়াছিলেন। এই অনন্যসুলভ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাহার স্বাভাবিক ধৰ্ম্মানুরাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও স্নেহ- মমতার অপূৰ্ব্ব মিশ্রণ তাহার জীবনকে এক অভাবনীয় বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছে। তিনি হুমায়ূন্-নামা’ নামক যে ইতিহাস রচনা করিয়াছেন, তাহাতে তদীয় জীবনের [ ৩৮ ) মােগৰি অভিজ্ঞতালব্ধ বহু বিষয় স্থান পাইয়াছে ; সুতরাং গুবদনের জীবনী, শুধু ব্যক্তিগত জীবন-কথা নহে—ইতিহাস- মােগল-সাম্রাজ্যের প্রথম ও প্রধান কাহিনী। বাবরের আমলে গুদ আনুমানিক ১৫২৩ খ্রীষ্টাব্দে কাবুলে গুলবদনের জন্ম হয়। তাঁহার পিতা বার তখন কাবুলের একজন ক্ষুদ্র অধিপতি; কিন্তু মহামনা বাবর ঐ ক্ষুদ্ররাজ্যের ক্ষুদ্র বাদশাহ গীরীতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে দিগদিগন্তবিস্তৃত রাজ্য, অতুল ঐশ্বর্যের অক্ষম ভাণ্ডার, স্বর্ণভূমি হিন্দুস্থান একদিন তাহারই ষষ্ঠতম পূর্বপুরুষ তৈমূরের দুর্দান্ত প্রতাপের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল, বীৰ্য্যবান্ বাবর সেই অপূৰ্ব্ব বিশাল রাজ্যটী করতলগত করিবার কল্পনায় বিভাের ছিলেন। শুধু কল্পনায় বিভাের ছিলেন বলিলে ভুল হইবে, কেননা কন্যার জন্মকালে তিনি কাৰ্য্যক্ষেত্রে বহুদূর অগ্রসর-বারবার বিফলপ্রযত্ন বাবর হিন্দুস্থান-বিজয়ের চেষ্টায় ব্যাপৃত। তারপর গুলের বয়ঃক্রম যখন দুই বৎসর, তখন তিনি পরিবারবর্গকে কাবুলে রাখিয়া হিন্দুস্থানে অভিষান করিয়াছেন। এই অভিযানই অবশেষে তাঁহাকে বিজয়-মাল্যে বিভূষিত [ ৩৯ ]

মােগল-বিদুষী
=
করিয়া হিন্দুস্থানের অভিলসিত অধিপতি-পদে বরণ এবং
কাবুলের চিন্তিত ও উৎকণ্ঠিত পরিজনগণকে অভূতপূর্ব
আনন্দে নিমগ্ন করিয়াছিল।
এইস্থানে বাবরের মহিষীবৃন্দের একটু সংক্ষিপ্ত
ইতিহাসের অবতারণা বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হইবে না।
তখন বেগমগণের মধ্যে দিলদার, মাহম, গুরুথ, এবং
মুবারিকা, এই চারিটা বর্তমান। দিদার বেগমের
পাঁচটী সন্তান ;-গুং নামে কন্যা সৰ্ব্বজ্যেষ্ঠা, তারপর
গুচিহরা, তৎপরে পুত্র আবু-নাসির –ইতিহাসে যিনি
হিন্দাল, নামে প্রসিদ্ধ, আবু-নাসিরের পরেই গুদ,
গুলের পরে আওয়ার নামে এক পুত্র।
মহমকে বাবরের পাটরাণী বলা যাইতে পারে।
গর্ভেই বাদশাহর জ্যেষ্ঠপুত্র-সাম্রাজ্যের
উত্তরাধিকারী হুমায়ূনের জন্ম।
সম্রাটের হৃদয়-রাজ্যে
এবং পৌরজনমধ্যে মাহমের অসীম প্রভাব-প্রতিপত্তির
পরিচয় পাওয়া যায়; কিন্তু এই পতিসােহাগিনীর
জীবনে একটা বড় ক্ষোভের কারণ ঘটিয়াছিল—একমাত্র
হুমায়ূন্ ব্যতীত ভঁহার যতগুলি সন্তান জন্মে, একটাও
স্থায়ী হয় নাই-একে একে সবগুলিই শৈশবে মৃত্যু
মখে পতিত হয়। গুলবদন যখন সবে দুই বৎসরের

গােগ-বিলী বালিকা, তখন মহম্ তাহাকে কন্যারূপে গ্রহণ করেন। ইতঃপূৰ্বেই মাহমকে চারিটী সন্তানের বিয়ােগ-বেদনা সহ করিতে হইয়াছিল। সন্তান-বিয়ােগ-বিধুরা জননী স্নেহের ক্ষুধা মিটাইবার জন্যই হউক, অথবা নিজ শিশু- সন্তানের অভাবে দিলদারের গর্ভজাত কন্যাকে পরম- স্নেহে প্রতিপালন করিয়া স্বামীর তৃপ্তিসাধনের জন্যই হউক, গুলকে আপনার অঙ্কে তুলিয়া লইয়া থাকিবেন। কিন্তু ইহাই শেষ নহে, দিলের অন্যতম পুত্র হিন্দাল, যখন চারিদিনের শিশু তখন তাহাকেও তিনি দত্তকরূপে গ্রহণ করেন। মহিষী দিলদারের যে ইহাতে আপত্তি ছিল না, এমন নহে—আপত্তি যথেষ্টই ছিল; কিন্তু তিনি নিরুপায় ;-মাহমের হস্তে গৃহের সময় প্রভুত্ব, তাহার উপর স্বামীর অভিপ্রায় ; সকল দিক বিবেচনা করিয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও সন্তানদ্বয়কে তাঁহার অঙ্কচ্যুত করিতে হইয়াছিল। মহিষী গুখের গর্ভে কামরা, অস্করী, শাহরুখ, সুলতান্ আহমদ ও গুল,ইজার বেগম, এই পাঁচটী সন্তান। বিবি মুবারিকা, ইউসুফজাই-প্রধানের কন্যা। এই পার্বত্য-প্রধান বাবরের আনুগত্যস্বীকার করিয়া তাহারই নিদর্শনস্বরূপ বাবরকে তাঁহার এই রূপলাবণ্যময়ী এ [ ৪১]

মােগল-বিদুষী
•
কন্যারত্ন দান করেন। * ইহার কোনও সন্তানসন্ততি
জন্মে নাই।
বাবরের স্বজনগণ যখন অত্যন্ত চিন্তাকুলচিত্তে
কাবুলে কালহরণ করিতেছিলেন, অমিততেজা, নির্ভীক,
স্থিরধী বাবর তখন হিন্দুস্থানে ঘাের সমরে নিযুক্ত ; কিন্তু
এই পুরুষসিংহের প্রতি ভাগ্যলক্ষ্মী অসম্ভব প্রসন্ন হইয়া
উঠিয়াছিলেন। জয়, জয়, জয়-জয়ের জয় !
পানিপথ, খানুয়া, ঘাগরা--একে একে এই তিন
মহাসমরে বিজয়ী হইয়া তিনি হিন্দুস্থানের ভাগ্যবিধাতৃ-
পদে অধিষ্ঠিত হইলেন। এতদিনে অনেকটা নিশ্চিন্ত
হইবার পর প্রিয়পরিজনের কথা বিশেষ করিয়া তাহার
স্মরণপথে উদিত হইল ; তিনি তাহাদিগকে হিন্দুস্থানে
আসিবার আদেশ দিলেন। কিন্তু তখন কাবুল
হইতে হিন্দুস্থানে আসিবার পথ এখনকার ন্যায় সুগম
ছিল না ;-পথ সুদীর্ঘ, পাহাড়-পর্বত এবং মরুকণ্টকিত।
তাহার উপর নানা কারণে বাবরের আত্মীয়স্বজনগণের
কাবুল পরিত্যাগ করিতে একটু বিলম্ব হইল ; সুতরাং
শুভসম্মিলন আর কোনক্রমেই যথাসময়ে ঘটিয়া উঠিল
;
* 'An Afghan Legend'--H. Beveridge. Asiatic
Quarterly Review-April, 1901 ; Pp. 322-30.
[ ৪২ 1.

মােগল-বি ৬ না। পরিজনগণের মধ্যে বাবরের প্রিয়তমা মহিষী মাহই সকলের অগ্রবর্তিনী হইয়াছিলেন। তিনি আর সকলকে পশ্চাতে রাখিয়া যথাসম্ভব দ্রুতগতি স্বামি-দর্শনে আগমন করেন। বলা বাহুল্য মাহম, গুলবদকে সঙ্গে আনিতে ভুলেন নাই। বাবর ইহাদের যথারীতি সম্বর্ধনা করিয়া আনিবার জন্য পূৰ্বেই ব্যবস্থা করিয়াছিলেন আলিগড়ের নিকট সম্রাট-প্রেরিত লােকজনের সহিত মাহমের সাক্ষাৎ হয়। অতঃপর তিনি যখন আগ্রায় পৌছেন (২৭এ জুন, ১৫২৯) তখন রাত্রি হইয়া গিয়াছে। গভীর রাত্রেই প্রাণাধিক। পত্নীর সহিত বাবরের শুভ- সম্মিলন ঘটিল। কিন্তু চারি বৎসর পূর্বে যে নয়নানন্দ স্নেহের পুত্তলীকে সুদূর কাবুলে দেখিয়া আসেন, তাহার অদর্শনে বাদশাহ, অধীর হইয়া উঠিলেন। মাহম রাত্রি হইবে বলিয়া আগ্রা আসিবার পথে গুলকে আলি- গড়েই রাখিয়া আসিয়াছিলেন। যাহা হউক, পরদিন প্রভাতে পিতা ও পুত্রীর সাক্ষাৎ হইল। পিতাকে যখন গুল পূৰ্বে দেখিয়াছিল, তখন তাহার বয়স সবে দুই—সে অবােধ জ্ঞানহীনা বালিকা মাত্র। বাবরের সম্বন্ধে তাহার কোন ধারণা থাকিলে তাহা অতীব ক্ষীণ অস্পষ্ট হইবারই কথা। এরূপ অপরিচিত-তুল্য পিতার কাছে শিশু-কন্যার [ ৪৩ ] মােগল-বিদুষী পদে পদে একটা সসঙ্কোচ ভয়ের বাধা স্বভাবতঃই উপস্থিত হইয়া থাকে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গুলের সেরূপ কিছুই হয় নাই। দর্শনমাত্র কন্যা পিতৃচরণে লুটাইয়া পড়িল। সন্তানবৎসল পিতা, পরমস্নেহে তাহাকে বক্ষে ধারণ করিয়া প্রশ্নের পর প্রশ্নে অস্থির করিষা তুলিলেন। গুলবদন্ হুমায়ূন্-নামায় লিখিয়াছেন,-পিতার স্নেহপাশে আবদ্ধ হইয়া আমি তখন যে বিমল আনন্দের আস্বাদ পাইয়াছিলাম, জীবনে তদপেক্ষা অধিক আনন্দের কল্পনা করা অসম্ভব। সম্রাট, তাহার পর কিছুদিন মাহম্ ও গুলকে লইয়া আগ্রায় কাটাইলেন। দিনগুলি যে অতীব শান্তি-সুখে অতিবাহিত হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই ; কিন্তু অধিক দিন একস্থানে বাস করা, চিরসঞ্চরণশীল, চঞ্চল- প্রকৃতি সম্রাটের স্বভাববিরুদ্ধ। বিশেষ সেকালের আগ্রার আশপাশের দৃশ্য তাহার নিকট নিরতিশয় অপ্রীতিকর বােধ হইত ; জগদ্বিখ্যাত তাজমহলের অস্তিত্ব তখন আগ্রায় ছিল না। সৌন্দৰ্য্য ও মাধুর্যের উপাসক সম্রাট, ঢোলপুর ও সীীকে মনের মত করিয়া সাজাইয়া তুলিতেছিলেন। তিনি মাহম ও গুলকে লইয়া ঐ দুইস্থান দেখিতে গেলেন। [ ৪ ].

মােগল-বিদুষী সীরীর উদ্যান-বাটিকার একাংশে বসিয়া বাবর আত্মকাহিনী তুজুকৃ’ বচনা করিতেন। এই স্থানে একদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটিল। মাহ ভগবদুপাসনায় মন দিয়াছেন ; ভবনের সম্মুখে গুল, বিমাতা মুবারিকার নিকট অবস্থিত ; হঠাৎ শিশুসুলভ, ক্রীড়াচঞ্চল গুল, বিমাতাকে করাকর্ষণ করিবার জন্য পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করিতে লাগিল। কিছুতেই প্রতিনিবৃত্ত না হওয়ায় মুবারিকাকে কন্যার করাকর্ষণ করিতে হইল। পার্বত্য নন্দিনী মুবারিকার আকর্ষণ যতই মৃদু, যতই কোমল হউক না কেন, তাহা গুলের কোমল বাহুলতার পক্ষে বিষম হইয়াছিল। একখানি অস্থি স্থানচ্যুত হওয়ায় বালিকা চীৎকার চীৎকার করিয়া করিয়া উঠিল। সুখের বিষয়, অবিলম্বে চিকিৎসার ব্যবস্থা হওয়ায় ব্যাপার গুরুতর হইতে পারে নাই ;-গুল, ধীরে ধীরে সুস্থ হইয়া উঠে। এই ঘটনার পর বাবর আর তিলার্ধও সীরীতে অবস্থান করেন নাই। আগ্রায় পৌছিয়াই সম্রাট, শুনিলেন, অবশিষ্ট পরিজন- গণ এতদিনে কাবুল হইতে আসিতেছেন। তিনি স্বয়ং বহুদুর পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া তাহার পরম শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠা ভগিনী খাজাদা বেগম ও অন্যান্য সকলকে ৪৫ ]

মােগল-বিশী
যথাযােগ্য সম্মান ও সমাদরের সহিত অভ্যর্থনা
করিলেন।
কিন্তু দিন শেষ হইয়া আসিয়াছিল। বাদশাহ,
বাবরের চরম আকাঙ্ক্ষা–হিন্দুস্থান-বিজয় শেষ, প্রিয়
আত্মীয়বর্গ নিকটে,-রাজধানীতে সমাগত। প্রাণাধিক
পুত্র হুমায়ূন্ রাজ্যভারগ্রহণের উপযুক্ত। বিদায়-
এইবার বিদায়। বাদশাহর নয়নে কোন্ এক অজানা
দেশের রশ্মিপাত হইয়াছে কে বলিবে ? একদিন তিনি
পরিজনবর্গসহ ‘বাঘ-ই-জা-আফশান্ উদ্যানে উপস্থিত
হইয়া প্রার্থনার পূর্বে ওজু করিবার স্থান দেখিতে
দেখিতে বলিলেন,-“রাজত্ব ও রাজ্যশাসন-রশ্মি আকর্ষণ
করিয়া আমার হৃদয় অবসন্ন। এইবার এই উদ্যানেই
আমি বিশ্রামলাভ করিব।
বাদশাহর বয়স আটচল্লিশ বৎসর ; মধ্য এসিয়া,
সস্তৃত কঠোরশ্রমী এই বীরবরের পক্ষে বার্ধক্যের বহু
বিলম্ব ; পদতলে নিববিজিত ধনধান্যপূর্ণ, সুবিপুল
স্বর্ণভূমি ভারত।
ভারত। কিন্তু তাহার
তাঁহার মুখে ইতিমধ্যে
বিদায়ের এ কি বিষাদময়ী বাণী! পতিপ্রাণা মহিষী
মাহম্ ও অন্যান্য বেগমেরা অশ্রুসংবরণ
করিতে
পারিলেন না। মাহম্ তৎক্ষণাৎ ভগবানের আশীর্বাদ
[ ৪৬ ]

শেখ-বিসুখী
মাগিয়া আশাপূর্ণ মধুর বাক্যে, বাবরকে শান্তি ও সান্ত্বনা
দিলেন।
কিন্তু বাদশাহর শেষের দিন সত্যসত্যই সমীপবর্তী
হইয়াছিল ; তিনি আনন্দের অবিশ্রান্ত কলরলের মধ্যে
থাকিয়া কেমন করিয়া যে নিঃশব্দ পদসঞ্চারী মৃত্যুর আসন্ন
আগমনের আভাস পাইয়াছিলেন, তাহা বলা দুরূহ।
যদিও কঠোর কাৰ্য, সংগ্রাম-সঘর্ষ প্রভৃতি তাঁহার স্বাস্থ্যের
অন্তরায়স্বরূপ হইয়াছিল, তথাপি স্বাস্থ্যভগ্ন হইবার মত
কোন লক্ষণ তাঁহার দেহে প্রকাশ পায় নাই। তিনি স্থান
হইতে স্থানান্তরে পরিভ্রমণ এবং আরব্ধ-কাৰ্য পরিদর্শনাদি
করিয়া সময়ের যথারীতি সদ্ব্যবহার করিতেছিলেন।
তাহার পর তাঁহার মৃত্যুর যে বিবরণ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ
আছে, তাহাকে কোনক্রমেই স্বাস্থ্যহানি-ঘটিত মৃত্যু বলা
যাইতে পারে না,-তাহ বাবরের অপূৰ্ব আত্মবিসর্জন বা
ইচ্ছামৃত্যু!
যাহা হউক, শেষের দিনগুলি সম্রাটের পক্ষে বড়
শান্তিপ্রদ হইতে পারে নাই। একদিন বাদশাহ-পরিবারে
শশাকের এক মর্মভেদী হাহাকার ধ্বনি উঠিল। পুত্র
আওয়ার মীর্জা সম্রাটের স্নেহপূর্ণ কোমল হৃদয়ে শেল
হানিয়া অকালে ইহসংসার হইতে অপসৃত হইল।
।
{ ৪৭ ]

মােগল-বিদুষী শােকাবেগ কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইতে না হইতেই সংবাদ আসিল, সম্রাটের প্রাণাধিক জ্যেষ্ঠপুত্র, সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী, হুমায়ূন্ মীর্জা অসুস্থ অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কট- জনক। উদ্বেগাকুলচিত্তে ত্বরায় বাদশাহ, ও মাহম্ মথুরা পৌছিয়া পীড়িত পুত্রকে সঙ্গে লইয়া আগ্রা ফিরিলেন। হুমায়ূন্ তখন অতি ক্ষীণ, জীবনী-শক্তিহীন ; ঘাের অচেতন অবস্থা হইতে মাঝে মাঝে চেতনার কূলে উত্তীর্ণ হইতেছেন বটে, কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। জীবনের কোন আশা নাই বলিয়া চিকিৎসকগণ তাহাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। পুত্রের অবস্থা দেখিয়া করুণারূপিণী মাহমের স্নেহার্জ কোমল হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছিল। কিন্তু বাদশাহর বিহবলতা দেখিয়া তাহাকে আত্মসংবরণ করিতে হইল। সম্রাটকে সান্ত্বনা দিবার জন্য বলিলেন,-“জাহাপনা, আপনি কেন আমার পুত্রের জন্য আকুল হইতেছেন, ? আপনি বাদশাহ্, আপনার আরও কত পুত্র, তাহাদের মুখ চাহিয়া আপনি আপনার হূদয়কে প্রশান্ত করুন। আমি যে কাতর হইতেছি, তাহার কারণ, আমার সবে এক পুত্র—এই হুমায়ূন্। বাবর বলিলেন,-মহিষী তুমি যাহা বলিতেছ, সব সত্য-আমার আরও পুত্র আছে; কিন্তু তােমার [ ৪৮ ) মােগল-বিদুষী গর্ভজাত এই পুত্রটিকে আমি যত ভালবাসি, এত ভাল, আমি আর কাহাকেও বাসি না। মূমূর্ষ হুমায়ুন সঞ্জীবিত, সুখী, দীর্ঘজীবী হয়, ইহাই আমার প্রার্থনা ; আর পুত্র গণের মধ্যে একমাত্র সে-ই আমার সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়, ইহাই আমার কামনা ; কেননা আমি আর কাহাকেও তাহার সমকক্ষ মনে করি না। বাদশাহ, কোনক্রমেই সান্ত্বনালাভ করিতে পারিলেন না। মৃত্যুর করালছায়াঙ্কিত পুত্রের পাণ্ডুর মুখচ্ছবি নিরীক্ষণ করিতে করিতে তিনি যখন দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছেন, তখন একটী কথা শুনিয়া তিনি যেন অন্ধকার অকুল-পাথারে আশার আলাে দেখিতে পাইলেন। কথাটা এই-হুমায়ূনের যে অবস্থা, তাহাতে একমাত্র ভগবদনুগ্রহ ব্যতীত তাহার রক্ষার আর উপায় নাই। শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্যদানে ভগবানের প্রসন্নতা লাভ করা আবশ্যক। ধর্মপ্রাণ, সরল-বিশ্বাসী বাদশাহ, তৎক্ষণাৎ সঙ্কল্প করিলেন, জীবনের ভুল্য শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য জগতে আর কিছুই নাই,—তিনি আত্ম- জীবন-বিনিময়ে পুত্রের প্রাণরক্ষা করিবেন। ইহাতে বাদশাহর অন্তরঙ্গ হিতৈষিগণের ঘােরতর আপত্তি হইবে, তাহা বলাই বাহুল্য। তাঁহারা বলিলেন,-“জাঁহাপনা, ধনরত্ন মানত করুন, না-হয় ধনভাণ্ডার, কিংবা মণির সেরা [ ৪৯ ] মােগল-বিদুষী যে কহিনুর, পুত্রের জন্য তাহাই উৎসর্গ করুন-আপনার জীবন দান করিবেন না। বাবর শাহ, অচল অটল, কোন কথাই ভঁহার কর্ণে প্রবেশ করিল না। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলিলেন,-“আমার পুত্রের জীবনের সঙ্গে তুলিত হইতে পারে, দুনিয়ায় কি এমন কোন মণি আছে? ইহার আর উত্তর নাই, উপস্থিত সকলে নীরব। বাবর ধীরে ধীরে হুমায়ূনের শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া, তাহার শিবরাদেশে একটিবার স্থির হইয়া দাঁড়াইলেন। তাহার পর গম্ভীরমুখে শষ্যা প্রদক্ষিণ করিতে করিতে একান্ত মনে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন,-হে ভগবান, যদি জীবন দিলে জীবন মিলে, তাহা হইলে আমি বাবর শাহ, পুত্র হুমায়ূনের জন্য আমি আমার জীবন, আমার সত্তা অর্পণ করিলাম। বাবর সিদ্ধকাম হইয়াছিলেন, তৎক্ষণাৎ চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন,-“কৃতকাৰ্য্য হইয়াছি, আমি কৃত- কাৰ্য্য হইয়াছি। পুত্রের ব্যাধি আমি নিজ দেহে গ্রহণ করিতে সমর্থ হইয়াছি। দেখিতে দেখিতে সুস্থকায় বাদশাহ, ব্যাধিগ্রস্ত এবং তাহার মরণাহত নির্জীব পুত্র সজীবিত ও সুস্থ হইলেন। তারপর রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ আহুত হইয়া [ ৫ ] মােগ-বিহী সম্রাটের সমক্ষে উপস্থিত হইলে, তিনি যুবরাজ হুমায়ুনকে তাহাদের হস্তে অর্পণ ও রাজ্যের উত্তরাধিকারী বলিয়া নির্দেশ করিয়া সানন্দে ও সন্তুষ্টচিত্তে চিরশান্তিময় অমর- লােকে প্রস্থান করিলেন (২৬ ডিসেম্বর ১৫৩)। অতৃপ্ত রহিল,-সম্রাটের কীৰ্তিচিত, বিশাল ভারতের রাজ্যভােগ-বাসনা; পড়িয়া রহিল-শােকস্মৃতি-সমাচ্ছন্ন প্রাণপ্রতিমা প্রেয়সী মাহম, বিচ্ছেদকাতর রােরুদ্যমান্ সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়স্বজন। হুমায়ুনের আরােগ্যলাভের অব্যবহিত পরেই যে বাবরের মৃত্যু হইয়াছিল, এ কথা দৃঢ়তার সহিত বলা যায় না। The Sources of the Akbarnama, H. Beveridge, 1. A. S. B. 19i8, p. 470 দ্রষ্টব্য। [ ] মােগলবিদুষী হুমায়ূনের আমলে গুলবদন বাবরের পরলােকগমনের পর হুমায়ুন যখন ভারতের রাজতক্তে সমাসীন হইলেন, তখন তাহার বয়স দ্বাবিংশতি বর্ষ। ইতঃপূর্বে এদেশের অভিনব শান্তিসুখকর আবহাওয়া তাঁহার তরল স্বভাবের উপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করিতে আরম্ভ করিয়াছিল ;তিনি বিলাসী, আলস্যপর- তন্ত্র ও অহিফেনসেবী হইয়াছিলেন। প্রবীণ, চিরসতর্ক, মহাবল বাবরের শৌর্য-বীৰ্য্য ও শাসনের নিকট যে-সকল শত্রুকে অবনতশির হইতে হইয়াছিল, এই তরুণ সম্রাটের শিথিল-শাসনের সুযােগে তাহারা আবার মহােৎসাহে মস্তকোত্তলন করিল। রাজপরিবারেও ঘাের অশান্তির অনল জ্বলিয়া উঠিল। বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কামরা পঞ্জাব, কাবুল, কাহার ও ঘাজনী প্রদেশের অধিকার পাইয়াও সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না,-ভ্রাতার সিংহাসনের প্রতি লােলুপ ঈর্ষাদিগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ফলে হুমায়ূনের রাজ্যলাভ তাহার সুখের হেতু না হইয়া অশান্তি ও বিড়ম্বনায় পর্যবসিত হইল। বস্তুতঃ সিংহাসনারােহণকাল হইতে আরম্ভ করিয়া হুমায়ূনের পরবর্তী জীবনের ইতিহাস -বিপ্লব, বিদ্রোহ, দুর্ঘটনা ও ভাগ্যবিপর্যয়ের শােচনীয় [ ৫২ ]

মােগা-খিী
পুঞ্জীভূত ঘটনায় পরিপূর্ণ। এই সকল দুর্নিমিত্ত ও দুর্দৈবের
দ্রুততর পটক্ষেপণের মধ্যে স্নিগ্ধমধুর, চিত্তবিমােহন
গুলবদ-চরিত্রের সাক্ষাৎলাভের সুযােগ বড় একটা ঘটিয়া
উঠে না। কদাচিৎ কখনও যে ঘটনাসূত্রে বিদ্যুৎ চমকের ন্যায়
তাহার দর্শন এবং পরমুহূর্তেই অদর্শন ঘটে, তখনকার সেই
ক্ষণিক চিত্র পাঠকগণের সম্মুখে প্রতিফলিত করিবার জন্যই
হুমায়ূনের বিধিবিড়ম্বিত, বিঘ্নবহুল জীবনের ঘটনাপরম্পরার
কিঞ্চিৎ ইতিহাস বিবৃত করিতে হইবে।
বাবরের মৃত্যুর পরেও মহিষী মাহম্ কিছুকাল তাহার
মৃতকল্প জীবন লইয়া কোনরূপে সংসা-অরণ্যে বিচরণ
করেন। রাজ্যের নানাস্থানে বিদ্রোহ ও অশান্তির সূচনা
তাহাকে প্রত্যক্ষ করিতে হইয়াছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু
বীরবর বাবরের ভুবলে জিত ও শাসিত রাজ্যের, এবং
তদীয় প্রাণাধিক পুত্রের তেমন কোনও গুরুতর অমঙ্গল
সংঘটিত হইবার পূর্বেই,পতি প্রাণা সাধ্বী স্বামীর অনুসন্ধানে
অদৃশ্যলােকে প্রােণ করিলেন (৮ই মে, ১৫৩৩); সুতরাং
দুর্দৈবের যে দুঃসহ কোপ অতঃপর বাদশাহ-পরিবারকে
ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া দুঃখের অতলতলে নিক্ষেপ করিয়াছিল,
তাহা তাহাকে স্পর্শও করিতে পারে নাই।

वामन-विश्वी তাহার আনন্দের, সহানুভূতির মধুর সম্পর্ক, তাহার কথা কত গভীরভাবে গুলের হৃদয়ে মুদ্রিত ! গুলের মনে পড়ে, পিতার মৃত্যুর অনতিপূৰ্বে ভ্রাতা হুমায়ুন যখন দুরারােগ্য কঠিন রােগে শয্যাগত, অসহনীয় যন্ত্রণায় মুহুর্মুহু বিলুপ্তচেতন, সেই নিদারুণ মুহূর্তেও গুলুকে দেখিয়া তিনি কত স্বস্তি অনুভব করিয়াছিলেন, তাহাকে বক্ষপাশে ধারণ করিতে না পারিয়া কত দুঃখ করিয়াছিলেন। তারপর পিতার মৃত্যু হইল, ক্রমে মাতা মাহও সংসার- রঙ্গমঞ্চ হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করিলেন। শােকে ভ্রাতা ও ভগিনী উভয়েই মুহমান হইয়াছিলেন সন্দেহ নাই ; কিন্তু হুমায়ূন্ গুলকে সান্ত্বনা দিবার জন্য যেন নিজের শােকও বিস্মৃত হইলেন। এত স্নেহ, এত সহানুভূতি কি এ সংসারে সত্যসত্যই দুল্লভ নহে? সুতরাং হুমায়ুন বৈমাত্রেয় ভ্রাতা হইয়াও যে গুলের নিকট সহােদর অপেক্ষা প্রিয়তর হইবেন, আশ্চর্য কি ? যাহা হউক, মাহম্ সংসারপাশ হইতে মুক্ত হইয়া বাঁচিলেন। রাজ্যের চতুর্দিকে এতদিন যে বিদ্রোহের বহ্নি ধূমায়িত হইতেছিল, তাহা দেখিতে দেখিতে করাল লেলি- হান রসনা বিস্তার করিয়া বাদশাহ-পরিবারকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইল। ( ৫৬ ] মােগল-বিদুষী । প্রধানতঃ পাঠানগণকে নিপীড়িত ও পরাজিত করিয়াই মােগল-কুলগৌরব বাবর, হিন্দুস্থানে মােগল-াজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন। সুতরাং বিজিত পাঠানেরা যে মােগলের পরম শত্রুরূপে উপযুক্ত সুযােগের প্রতীক্ষায় দিন গণিতে থাকিবে, তাহার আর বৈচিত্র্য কি ? হুমায়ুনের শাসন শৈথিল্য অচিরে তাহাদের সেই অভিলষিত সুবর্ণসুযােগ বহন করিয়া আনিল। পূৰ্বাঞ্চলে মগধে মহাশক্তিধর চতুরচূড়ামণি শের খ বিক্ষিপ্ত পাঠানগণকে কেন্দ্রীভূত করিয়া আবার তাহাদের ভাগ্যপরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তিনি পূৰ্বেই চুনারের দুর্গ হস্তগত করিয়া বিহারের অধিকার দৃঢ়তর করিয়া তুলিয়াছিলেন। এক্ষণে গৌড় আক্রমণ এবং সীজীগলির গিরিপথ অবরােধ করিলেন। পূৰ্বাঞ্চলে শেরের এইরূপ উত্তরােত্তর ক্ষমতা-মদমত্ততার পরিচয় পাইয়া হুমায়ুন নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিলেন না;--সসৈন্য তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযান করিলেন। চুনার-দুর্গ ই তখন শেরের শৌর্য- প্রকাশের প্রধান অবলম্বন। বাদশাহী-বাহিনী সর্বাগ্রে এই কিল্লাটী অবরােধ করিয়া বসিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই অবরােধ শেরের তেমন কোন ক্ষতি বা অনিষ্টের কারণ না হইয়া বরং বিশেষ ইষ্টের কারণই [ ৫ ] মােগল-বিদুষী হইয়াছিল। হুমায়ূনের সেনাদল যখন চুনার অবরােধে ব্যাপৃত, তখন একদিকে শের খাঁর কৌশলে রােহতাসের সুদৃঢ় গিরিদুর্গ, এবং অপরদিকে তদীয় ভ্রাতা ও পুত্রের বাহুবলে গৌড় অধিকৃত হয়। চুনার-দুর্গ করগত করিয়া হুমায়ূন্ গৌড়াভিমুখে অগ্রসর হইলেন বটে, কিন্তু তাহার পৌছিবার পুর্বেই শের গৌড়ের লুষ্ঠিত ধনরত্নাদি নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে রােহতা-দুর্গে স্থানান্তরিত করিলেন। হুমায়ূ গৌড়নগরে প্রবেশলাভ করিয়া তত্ৰত্য শােভাসম্পদের মােহে এমনই আকৃষ্ট হইয়া- ছিলেন যে, তথা হইতে আর শীঘ্র তাহার নির্গমনের সম্ভাবনা রহিল না। বিলাসপ্রিয় বাদশাহর প্রমােদমগ্ন দিনগুলি যে কোথা দিয়া কেমন করিয়া অতিবাহিত হইতে লাগিল, তাহা যেন তাহার উপলব্ধই হইল না। দুঃখের বিষয়, কিছুকাল এইরূপে অতিবাহিত হইবার পর রাজ- ধানীতে এক বিভ্রাটের সূচনা হইল। হুমায়ূনের শিথিল স্বভাব সম্বন্ধে ইতিমধ্যে অনেক কথাই চারিদিকে প্রচারিত হইয়া পড়িয়াছিল। তাঁহার প্রতি অসন্তুষ্ট কতিপয় আমীর তাঁহার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা হিলালকে সিংহাসনে বসাইবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। হিন্দাল, বিদ্রোহী হইলেন। সংবাদপ্রাপ্তিমাত্র হুমায়ূনের সুখনিদ্রা চকিতে [ ৫৮ ]

মােগল-বিহুৰী
।
ভাঙ্গিয়া গেল,—তিনি অনতিবিলম্বে আগ্রা যাত্রা
করিলেন
কিন্তু উদ্যোগী পুরুষসিংহ শের খাঁও এদিকে নিশ্চিন্ত
ছিলেন না। হুমায়ুনের প্রত্যাগমন-পথে তাঁহার সহিত
যথােপযুক্ত রণসম্ভাষণের আশায় শক্তিসঞ্চয়পূর্বক অপেক্ষা
করিতেছিলেন। এক্ষণে বাদশাহী-বাহিনীকে অগ্রসর
হইতে দেখিয়া বক্সার ও চৌসার নিকট তাহাদের
গতিরােধ করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। শােন পার হইয়াই
হুমায়ুনকে প্রমাদ গণিতে হইল। উপায়ান্তর না দেখিয়া
তিনি সন্ধির প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন। সন্ধির সর্ত
সম্বন্ধে উভয়পক্ষের আলােচনায় কয়েক দিন অতিবাহিত
ইতিমধ্যে একদিন রাত্রিশেষে শের কর্তৃক
অতর্কিতভাবে মােগল-শিবির আক্রান্ত হইল। এই
আক্রমণে অপ্রস্তুত মােগল-বাহিনীর দুর্দশার অন্ত রহিল
;-তাহারা শ্রেণীবদ্ধ হইবার পূর্বেই যুদ্ধের ফলাফল
নির্ণীত হইয়া গেল। অনেকে নিরস্ত্র-অবস্থায় আততায়ীর
তরবারিমুখে--অনেকে নৌসেতু ভগ্ন হওয়ায় সন্নিহিত
নদীগর্ভে প্রাণ হারাইল। হুমায়ূন-পত্নী, চারি সহ
মােগলকুলবধূর সহিত বন্দী হইলেন। কিন্তু শের শত্রু
হইয়াও, মােগল মহিলাগণের সম্বন্ধে যে যথেষ্ট উদারতার
হইল।
[ ৫৯ ]

মােগল-বিদুষী পরিচয় দিয়াছিলেন, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই,—তিনি উত্তরকালে তাহাদিগকে সসম্মানে প্রত্যর্পণ করিয়াছিলেন। নিদ্রোখিত সম্রাট সহসা শত্রুসৈন্যের বিপুল তরঙ্গোচ্ছ্বাস দেখিয়া সমভিব্যাহারী পরিবার-পরিজনের প্রাণ ও মান বাচাইবার জন্য আকুল হইলেন। মহিষীর রক্ষার জন্য তৎ- ক্ষণাৎ খাজা মুজ্জমূকে প্রেরণ করা হইল। কিন্তু তখন শত্রুর রণ-তাণ্ডবের মুখে দাঁড়ায় কাহার সাধ্য ! হুমায়ূন্ আত্মরক্ষার্থ অশ্বপৃষ্ঠ হইতে নদীগর্ভে ঝম্প প্রদান করিলেন। অতুল সুখৈশ্বর্যের অধিকারী, রাজরাজেশ্বর ভারতসম্রাটের বােধ হয় এই সলিল-শয্যাই অন্তিমশয্যা হইত ; কিন্তু বিধাতার কৃপায় এই সময় নিজা নামে জনৈক ভিস্তি বায়ুভরা মশক লইয়া তাহার প্রাণরক্ষাৰ্থ অগ্রসর হইল। এই ভিস্তির প্রদত্ত মশকের আশ্রয়েই হুমায়ূন্ নদী পার হইয়া প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন। সহৃদয় কৃতজ্ঞ সম্রাট ভিস্তির এই উপকারের কথা বিস্মৃত হন নাই। তিনি যথাসময়ে আগ্রায় পৌঁছিয়া দীন- হীন নিজামকে প্রতিশ্রুতিমত অর্ধ দিবসের জন্য হিন্দুস্থানের মহামান্য বাদশাহর চিরগৌরবাহ আসনে বসাইয়া কৃতজ্ঞতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। অর্ধ দিবস ভিস্তি-বাদশাহ, [ ৬ ] মােগ-বিদুষী খােসমেজাজে বহাল তবিয়তে বাদশাহী করিবার অধিকার পাইয়াছিল। হুমায়ূনের এই ব্যবস্থায় যে অনেকেই অবমানিত ও অসন্তুষ্ট হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই; এবং রাজ্য ও রাজনীতির হিসাবে এই নগণ্য ভিস্তিকে এবম্বিধ মান-দান যে অশােভন ও অসঙ্গত তাহাও মিথ্যা নহে; কিন্তু এই ঘটনায় এক মুহূর্তে আমরা যেন অপূর্ব মধুর আরব্য-রজনীর স্বপ্নালােকের সন্ধান পাই;- মুসলমান্মানসলােকের আরাধ্য দেবতা, বাশাহর বাদশাহ, উদার মহৎ হারুণ-অল-রসিদ- চরিত্রের একাংশ আমাদের নয়ন-সম্মুখে উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উ। কিন্তু হুমায়ূন্ চোসার রণক্ষেত্র হইতে এবার বড় ম. পীড়া, বড় অপমান বহন করিয়া ফিরিয়াছিলেন। শুধু যে পরাজয়, পলায়ন, সৈক্ষয় তাহার এই মর্মপীড়ার কারণ তাহা নহে; চৌসার রণতরঙ্গে বাদশাহী হারেমের কতিপয় সুন্দরী তৃণখণ্ডের মত কোথায় যে ভাসিয়া গেল, অনেক অনুসন্ধানেও তাহার নির্ণয় হইল না। এই নিরুদ্দিষ্ট ললনা- গণের মধ্যে হুমায়ূনের পরম স্নেহের শিশুকন্যা আকীকা অন্যতম। এই শিশুকন্যার জন্য সম্রাট বড়ই কাতর হইয়াছিলেন। { ৬১ ; ১৫৩৭ খ্রীষ্টাব্দে হুমায়ুন্ গৌড়ে অভিযান করেন ; আর ১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দে চৌসার যুদ্ধ। সুতরাং দুই বৎসর পরে বাদশাহ, আগ্রা প্রত্যাবর্তন করেন। এই অত্যল্পকালের মধ্যে বাদশাহর মাথার উপর দিয়া অচিন্তিতপূৰ্ব কতই না পরিবর্তনের স্রোত বহিয়া গিয়াছে। হুমায়ূন্ তাহার চির- পরিচিতা প্রাণাধিকা ভগিনী গুলবদনের মুখের দিকে প্রশ্ন- পূর্ণ বিস্মিত-দৃষ্টিতে চাহিলেন—এ কে? তিনি যেন তাহাকে চিনিয়াও চিনিতে পারিলেন না। হুমায়ূ গৌড়-অভিযান- কালে গুলের অবিবাহিতা বালিকা-মূৰ্ত্তি, শিরে কুমারীর তা দেখিয়া গিয়াছিলেন। আর আজ এ যে সদ্যো- প্রস্ফুটিত গােলাপের মত যৌবন-লাবণ্যে ঢল ঢল করিতেছে; শিরে তাহার পরিণীতা রমণীর শিরােভূষণ বস্তুতঃ ইতিমধ্যে চতই-বংশীয় খিজর খাজা খাঁর সহিত গুলের পরিণয়-ক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া গিয়াছিল, তাই বেশ-পরিবর্তন। যাহা হউক, পরমুহূর্তেই হয়ূন্ তাহাকে চিনিতে পারিয়া মেহােদ্বেলিত আকুলকঠে বলিতে লাগিলেন, -গুল প্রবাসে তােমার কথা আমার থাই মনে হইও-আর আমার মন কেমন করত। তােমাকে সঙ্গে লইয়া যাই নাই বলিয়া, আমার কতই না [ ৬ ]

মােগল-বিদুষী
আপশােষের কারণ হইয়াছিল ! কিন্তু তারপর ভাগ্যে যখন
পরাজয় ঘটিল, তখন ভাবিলাম, ভগবান্ যাহা করেন
মঙ্গলের জন্যই। তােমাকে সঙ্গে লইয়া যাইবার ইচ্ছা হয়
নাই বলিয়া তৎক্ষণাৎ আমি করুণাময় খােদাকে শত শত
ধন্যবাদ করিয়াছি। আকীকাকে লইয়া গিয়া কি ভুলই
করিয়াছিলাম। হায়! সেই শিশুর জন্য আমার হৃদয় বিদীর্ণ
হইয়া যাইতেছে।
যাহা হউক অবমানিত ও মৰ্ম্মপীড়িত সম্রাট পরাজয়ের
প্রতিশােধ লইবার জন্য অতঃপর উপযুক্ত আয়ােজন করিয়া-
ছিলেন। ইহার ফলে কনৌজের রণক্ষেত্রে শেরের সহিত
হুমায়ূনের আর একবার সঙ্ঘর্ষ হয় (১৫৪৩, মে)।
বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কামরা আগ্রায় হুমায়ুনের প্রতিনিধি-
বরূপ ছিলেন। তিনি সুসময় বুঝিয়া সৈন্যসামন্তসহ
লাহােরে প্রস্থান করিলেন এবং ভগিনী গুলবদনকে হস্তগত
করিবার অভিপ্রায়ে হুমায়ুনকে বারংবার অনুয়ােধ করিয়া
পত্র লিখিতে লাগিলেন,-আমার বড় অসুখ। দেখিবার
শুনিবার কেহ নাই। অতএব গুলবদকে পত্রপাঠমাত্র
এখানে পাঠাইয়া দিলে আমি যারপরনাই উপকৃত হইব।
ভ্রাতৃবৎসল, সরলমতি হুমায়ূনের হৃদয় গলিয়া গেল। তিনি
তার ছলনা বুঝিতে না পারিয়া, গুলবদকে লাহােরে
[ ৬ ]

মােগবিদুষী
যাইবার অনুরােধ করিলেন। গুলের হৃদয় অভিমানে
পূর্ণ হইয়া উঠিল। হুমায়ুনকে যে তিনি কিরূপ স্নেহের
চক্ষে দেখেন, তাহা এক অন্তর্যামী বই আর কেহ অবগত
নহে। তারপর যে ভ্রাতা-ভ্রাতাকে বিপদকালে সাহায্য
করিয়া নিজের স্বার্থসিদ্ধির পথ দেখে, হুমায়ুন
গুলকে তাহার নিকট যাইতে বলিতেছেন। তিনি
হুমায়ুনকে অনুযােগ করিয়া লিখিলেন,‘ভাই, তুমি যে
কখনও আমাকে তােমার সঙ্গসুখ হইতে বঞ্চিত করিয়া
কামরানের নিকট যাইতে বলিবে, ইহা আমার ধারণারও
অতীত। তা তুমি যাহাই বল না কেন, আমি আশৈশব
যাহাদের অঙ্কে লালিত, বন্ধিত, সেই মাতা, ভগিনী বা
আত্মীয়বর্গকে ছাড়িয়া কোথাও যাইতে পারিব না।”
ভগিনীর প্রতি হুমায়ুনেরও স্নেহ অল্প নহে; তিনি
করুণ স্নেহপূর্ণ ভাষায় গুলকে লিখিলেন,-ভগিনী! তােমর
সঙ্গ পরিহার করা, আদৌ আমার অভিপ্রেত নহে। তবে
কামরা অসুস্থ হইয়া বারবার আমাকে অনুরােধ করি-
তেছে বলিয়াই আমি তােমাকে যাইতে বলিতেছি। বিশেষ
আমি এখন বড়ই বিপন্ন সিংহাসন লইয়া চিন্তিত। এই
বিপদ-সাগর উত্তীর্ণ হইতে পারিলেই আবার তােমাকে
আমার নিকট লইয়া আসিব।
[ ৪ ]

মোগল-বি স্নেহের দায় বড় দায়। ও ভ্রাতার এ দেহের অনুরােধ কেমন করিয়া উপেক্ষা করিবে ? একান্ত অনিচ্ছা সত্বেও তাহাকে কামরানের নিকট লাহাের যাইতে হইল। ওদিকে বিপুল আয়ােজনসত্ত্বেও দৈববিড়ম্বিত হমায়ুন শের খাঁর সহিত আঁটিয়া উঠিতে পারিলেন না। কনৌজের রণাঙ্গন-বাহিনী ‘তরল-তরঙ্গা’ শুটঘাতিনী গঙ্গা সহসা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে, বাদশাহী-বাহিনীকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইলেন। আবার গঙ্গাগর্ভে শত শত সেনার সমরলীলার অবসান হইল। হুমায়ূন্ অল্পসংখ্যক অনুচর- সহচরসহ কোনক্রমে প্রাণ লইয়া ফিরিলেন। ফিরিলেন সত্য, কিন্তু হিন্দুস্থানের রাজসিংহাসন তখন তাঁহার নিকট “নিশার স্বপনসম’ অলীক। হৃতবল সম্রাট প্রবল আততায়ীর আসন্ন গ্রাস হইতে আগ্রা না অসম্ভব জানিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিতে বাধ্য হইলেন। কিন্তু স্থান কোথায় ? মাথা গুজিয়া দাঁড়াইবার মত যৎসামান্য একটু স্থানেরও যে হুমায়ুনের একান্ত অভাব। কাল যিনি আশ্রিতের আশ্রয়-বিশাল বিপুল হিন্দুস্থানের রাজরাজেশ্বর, ভাগ্যবিধাতা,-যাহার অঙ্গুলী-হেলনে শত শত বীর রণাঙ্গনে শির ‘ডারিতে’ সমুৎসুক, বিধির বিধানে [ ৫ ]

মােগৰিদুখী
;
আজ তিনি নিতান্ত নিরাশ্রয়-পথের ফকীর। কিন্তু পথের
ফকীরেরও পথের আশ্রয় নিরাপদ ; হুমায়ুনের পদে পদে
ভয়, পলে পলে বিভীষিকা। শিকার-অন্বেষী ব্যাধের মত
জীঘাংসাপরায়ণ প্রবল অরাতি তাহার অনুবর্তী ;-সম্মুখে
অন্ধকার-পশ্চাতে শের শাহ,!
ভ্রাতৃগণের মধ্যে কামরাই অধিক শক্তিশালী। তিনি
তখন ও লাহাের পরিত্যাগ করেন নাই; কিন্তু তাঁহার আশ্রয়-
গ্রহণ অপেক্ষা অরণ্যবাসও সহস্রগুণে শ্রেয়। ভ্রাতা হইয়াও
তিনি শত্রুর অধম ; সুযােগ এবং সুবিধা পাইলে যে-কোন
মুহূর্তে ভ্রাতার বুকে ছুরি বসাইতে প্রস্তুত। কিন্তু এ দুর্দিনে
তাঁহাকেই হুমায়ূনের মহাআশ্রয় বলিয়া মনে হইল। একে
তাঁহার নিজের এই নিঃসহায় অবস্থা, তাহার উপর হারেমের
মহিলাবর্গ-বিমাতা দিলদার, বৈমাত্রেয় ভগিনী গুচিহরা
প্রভৃতি তাহার স্কন্ধে। আত্মচিন্তা অপেক্ষা পুরললনাগণের
চিন্তাই তখন হুমায়ূনের সমধিক প্রবল হইয়া উঠিয়াছে;
তিনি উন্মাদ মর্মভেদীকণ্ঠে ভ্রাতা হিলালকে ডাকিয়া
বলিলেন,-“ভাই স্নেহের পুত্তলী আকীকাকে হারাইয়া
আমার পরিতাপের সীমা ছিল না। আমি কতবার তােমা-
দিশকে বলিয়াছি, কেন তাহাকে আমি আমার চোখের
উপরে ধরিয়া নিজের হাতে হত্যা করিলাম না ! ভাই,
[ ৬৬ )

মােগল-বিলী
আমার সম্মুখে আবার সেই বিষম সমস্যা উপস্থিত। পথ
বিপদৃশস্কুল ; এই পথে কুল-ললনাগণকে নিরাপদে লইয়া
যাওয়া নিতান্ত দুষ্কর ।
মহিলাগণকে সঙ্গে লইয়া গেলে রক্ষকহীন অবস্থায়
তাঁহাদের শক্তহস্তে পতিত হইবার সম্ভাবনা, হতাশঃ
মর্মপীড়িত হুমায়ূন্ তাই বিমাতা, ভগিনী প্রভৃতিকে হত্যা
করিয়া নিশ্চিন্ত হইতে চাহিতেছেন। হিন্দাল, ভ্রাতার
বিরুদ্ধে একবার বিদ্রোহী হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে ঘটনা-
চক্রে। তিনি প্রকৃতপক্ষে নিষ্ঠুর বা স্নেহ-সহানুভূতিশূন্য
নহেন ; হুমায়ূনের চিত্তবিকার ও তাহার প্রস্তাবের মর্ম
বুঝিতে পারিয়া তিনি অন্তঃপুরবাসিনীবৃন্দের ভার স্বীয়
স্কন্ধে গ্রহণ করিলেন; ভ্রাতাকে অভয় দিয়া বলিলেন,-
জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত আমি ইহাদের জন্য যুঝি,
হৃদয়ের শােণিতদানে আমি ইহাদের প্রাণরক্ষা করিব।
হিন্দালের এই উক্তি শুধু অসার সান্ত্বনাতেই পৰ্য্যবসিত হয়
নাই ; শত্ৰুনিক্ষিপ্ত তীরের শতধারার মধ্য দিয়া তিনি
ললনাবৃন্দকে নিরাপদে লাহাের পৌছাইয়া দেন।
ইহার পর হুমায়ূন্ও লাহােরে আসিয়া কামরানের
শরণাপন্ন হইলেন। কুচক্রী কামরানের মনস্কামনা পূর্ণ
হইল; ভাবিলেন, ভাগ্য এতদিনে সুপ্রসন্ন,-পথের কন্টক
;
| ৬৭ ]

মােগল-বিদুষী
•
আপনই পথ বাহিয়া অনলকুণ্ডে আত্মবিসর্জন করিতে
আসিয়াছে। কিন্তু ধূর্ত কামরান্ বাহিরে সে ভাষের
আভাসমাত্রও প্রকাশ না করিয়া মুখে ভ্রাতৃপ্রেমের পরাকাষ্ঠা
প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। সরল-স্বভাব হুমায়ুন যে
কামরানের ছলনায় ভুলিবেন, তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি ?
তিনি নিশ্চিন্ত মনে তাহার সহিত কৰ্তব্য-সম্বন্ধে মন্ত্রণা
করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অপর ভ্রাতৃদ্বয়-- হিলাল, ও
অঙ্করীও অবশ্য এই মন্ত্রণায় যােগদানের অধিকার হইতে
বঞ্চিত হইলেন না; কিন্তু দিনের পর দিন শুধু মন্ত্রণাই হয়,
শুন্যগর্ভ বাক্সৰ্বস্ব মন্ত্রণা আর কোন শুভফল প্রসব করে
,- হুমায়ূন্ও কোন স্থিরসিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন
না। ভ্রাতৃদ্রোহী রাজ্যলােলুপ কামরান্ পরামর্শদানের
ছলনায় অগ্রজকে লাহােরে ধরিয়া রাখিয়া শত্ৰুকর্তৃক
বিপন্ন করিবার চেষ্টায় ছিলেন। তাহার মনে এইরূপ
দুরভিসন্ধি জাগিতেছিল যে, শের শাহর সহিত এই সুযােগে
সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইয়া পঞ্জাব ও লাহাের হস্তগত করিবেন।
যদি একান্তই তাহাতে অকৃতকার্য হন, তাহা হইলে তখন
কাবুল লইয়া বুঝা-পড়া। কাবুল হুমায়ূনেরই প্রদত্ত
রাজ্য। অনন্যগতি হুমায়ুন্ অতঃপর অবশ্যই উহার জন্য
লালায়িত হইবেন। কিন্তু কাবুলের অধিকার, কামরানের
[ ৬৮ ]

মােগল-বিবী জান কবুল, কিছুতেই তিনি জ্যেষ্ঠকে ছাড়িয়া দিবেন না। মনে এই দুরভিসন্ধি, সুতরাং বৈঠকে কোন প্রকার কাজের কথা উপস্থিত হইলেই কূটতর্ক তুলিয়া তিনি তাহা পণ্ড করিয়া দিতেন। এইরূপ অসার বর্ষণহীন পরামর্শের ঘন- ঘটায় কিছুদিন অতিবাহিত হইবার পর কামরানের মনে যাহা ছিল, তাহাই হইল-হুমায়ুনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী শের শাহ, দিল্লী ও আগ্রা অধিকার করিয়া ক্রমে একেবারে সহিন্দে আসিয়া উপস্থিত। মস্তকোপরি বিপদের কালমেঘ পুঞ্জীভূত। হুমায়ু সহসা চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া প্রমাদ গণিলেন; কিন্তু চিন্তায় আর অবসর নাই। কুদ্ধ শালের গহ্বর হইতে আত্ম- রক্ষার জন্য তাহারই শরণাপন্ন হইতে হইল। তিনি দুত- মুখে শেরকে বলিয়া পাঠাইলেন,-“এই কি ন্যায় ধর্ম । আমি যে সমগ্র হিন্দুস্থান ছাড়িয়া দিয়া আসিলাম। শুধু এইটুকু—এই লাহােরের অধিকার শাহ, আমাকে ছাড়িয়া দিবেন না ? তিনি যে পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছেন তাহাই ওদিক হইতে তাহার বিপুল অধিকারের, আর এদিক হইতে আমার এই ক্ষুদ্র অধিকারের সীমানা নির্ধারিত হউক। in - Humayun.nama, • p. 144 মােগল-বিশী শের গর্জিয়া উঠিয়া মর্মান্তিক বিজপের স্বরে কহিলেন, -কাবুল! কাবুল।-আমি কাবুল কাড়িয়া লই নাই- হুমায়ুনের জন্য রাখিয়া দিয়াছি। অতঃপর ঐ কাবুলেই তাঁহাকে ফিরিতে হইবে। হায় রে ভূ-স্বর্গ!-দেবতুল্য পিতার জীবন মরণ-পণে অর্জিত, মধুর সুন্দর সুদুল্লত হিন্দুস্থান! যার ফুল্ল-কুসুমিত কুঞ্জে, শ্যামশল্পসমাকীর্ণ প্রান্তরে, অমৃতনিস্রাবী নিঝমুলে হুমায়ূন্ এতদিন স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিয়াছেন, বিদায়! ওরে বিদায়!—সেই সােণার দেশ হইতে স্বৰ্গতাড়িত অভিশপ্ত আদমের ন্যায় হুমায়ূনের সুদূর সুকঠোর নির্বাসন। মােগলের উচ্ছেদকামী শের শাহ, রণসাজে সজ্জিত, যে কোন মুহূর্তে তাহাদের উপর বজের ন্যায় সদম্ভে পতিত হইতে পারেন। সুসজ্জিত সুরম্য আবাসভবন, বহুমূল্য দুষ্প্রাপ্য বিলাস-সম্ভার যেখানে যেমন ছিল, পড়িয়া রহিল,- শঙ্কিত সানুচর মােগল-পরিবার লাহাের হইতে স্তভাবে নিক্রান্ত হইলেন। হিন্দুস্থানে অবস্থান একান্ত অসম্ভব দেখিয়া হুমায়ুন বদশান্ যাইবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কাবুলের মধ্য দিয়াই বদশানে যাইবার পথ। সন্দিগ্ধ কামরা শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন—তাঁহার এতদিনের আশঙ্কা বুঝি সত্য- [ ৭৩ ]

মােগল-বিহুৰী
সত্যই কাৰ্যে পরিণত হয়! কাবুলের অতুল শােভা-
সম্পদের পথে উপনীত হইলে তথা হইতে হুমায়ুন কি আর
এক পদও সম্মুখে অগ্রসর হইবেন? কামরা অত্যন্ত
তীব্রভাবে অগ্রজের কথার প্রতিবাদ করিতে লাগিলেন।
যাের বিপদকালে ভ্ৰাতাৰ এইরূপ নিস্মম আচরণে
হুমায়ূন্ অতীব মর্মাহত হইলেন। সম্মিলিত মােগল-বংশীয়-
গণ দেখিতে দেখিতে মনােমালিন্যের ফলে পথিমধ্যে বিভক্ত
হইয়া পড়িল। কাবুলের জন্য একান্ত শঙ্কিত কারা
হুমায়ূনের সঙ্গ পরিহারপূর্বক নিজের সুবিধানুরূপ পথ
ধরিলেন। কনিষ্ঠ অঙ্করী পালিত-মেষশাবকের ন্যায়
নিরাপত্তিতে তাহার অনুবর্তন করিল।
আত্মীয়স্বজন-পরিত্যক্ত, হৃতরাজ্য, হতাশ, ব্যথিতচিত্ত
সম্রাটকে অবশেষে সিন্ধুর মরুপ্রান্তরের পথিক হইতে হয়।
সঙ্গে কতিপয় প্রভুভক্ত বিশ্বস্ত অনুচর।—যাহারা শুধু
সম্পদের পারাবত নহে;-সম্পদে-বিপদে সম্রাটের সম
অনুরাগী, এরূপ কয়েকজন পরীক্ষিত অনুচরসহ তিনি
দীর্ঘকাল মরুভূমির দেশে দেশে, বাত্যা-বিতাড়িত খলিত
বৃক্ষপত্রের ন্যায় বিচরণ করিয়াছিলেন। ইহার বিস্তারিত
বর্ণনায় আমরা পাঠকের চিত্ত ভারাক্রান্ত করিব না।
বর্তমান জীবনবৃত্তের জন্য এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে,

মোগল-বিদুষী এই সময়েই হুমায়ূনের জীবনে চরম অনর্থের আবির্ভাব হয়। দুঃখ ও কষ্ট, বিপ্ন ও বিপত্তি তাহার মূল্যবান্ জীবনটীকে লইয়া যেন কন্দুক-ক্রীড়ায় প্রমত্ত হইয়াছিল। কিন্তু ঘাের দুর্গতির মধ্য দিয়া ভগবানের অদৃশ্য কল্যাণ- মম হস্ত যে মানুষের অভিনন্দনের জন্য কোন্ বরণডাল কিরূপে সাজাইয়া তুলেন, বুঝিয়া উঠা সুকঠিন। হুমায়ূন তাহার দুঃখপূর্ণ মরুপথের প্রান্ত হইতে যে অপার্থিব স্বর্গীয় কুসুম চয়ন করিতে সমর্থ হইলেন, সম্ভবত সুখপূর্ণ রাজপথের পার্শ্বে তাহার সন্ধান মিলিত না। হিলাল, মাতা দিলদারকে লইয়া মুলতানের পাটু নামক স্থানে শিবির সন্নিবেশ করিয়াছেন। হুমায়ূন্ তখন হার সন্নিহিত সিন্ধুপতির আশ্রয় প্রার্থনা করিয়া লাঞ্ছিত ও প্রতারিত। এই সময় একদিন তিনি বিমাতা দিলদারের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া তাহারই পার্শ্বে এক অপরূপ বালিকামূর্তি নিরীক্ষণ করিলেন। ইহার চিত্তহ রূপ- মাধুরী, হুমায়ূনের দাবদগ্ধ তৃষিত জীবনে কোন্ এক অপার্থিব অমৃত-নিঝরের মদিরস্বপ্ন বহন করিয়া আনিয়া- ছিল, কে বলিবে? বান্নাহ, দর্শনমাত্র মুগ্ধ হইলেন। পরে যখম সংবাদ লইয়া জানিলেন, অবস্থা ভাল না হইলেও উত্তম কুলেই বালিকার জম্মু-তাহারই স্বগীয়া জননী আহমের [ ৫ ]

মােগল-বিদুষী
দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়কন্যা, অলভ্যা নহে, তখন তাহার চিত্ত
ঐ চতুর্দশবর্ষীয়া বালিকার জন্য যারপরনাই লুব্ধ হইয়া
উঠিল।
কিন্তু প্রেমের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। রূপমুগ্ধ
প্রেমােন্মত্ত সম্রাট বালিকার দর্শনলাভের জন্য পুনঃ পুনঃ
হিন্দালের শিবিরে উপস্থিত হইয়া হতাশ হইতে লাগিলেন।
শত উপরােধ-অনুরােধসত্ত্বেও সে দ্বিতীয়বার হুমায়ূনের
সমক্ষে উপস্থিত হইতে চাহিল না; এমন কি একদিন
স্পষ্টাক্ষরেই এইরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ করিল যে, তাহার
বাহু যাহার কণ্ঠলগ্ন হইতে সমর্থ, এরূপ ব্যক্তিকে সে
পরিণয়পাশে আবদ্ধ করিতে পারে; কিন্তু এমন কাহাকেও
সে স্বামিত্বে বরণ করিবে না, যাহার বস্ত্রপ্রান্ত স্পর্শ করিতে
তাহার হস্ত পৌছাইবে না। বালিকার এই উক্তি হইতে
উভয়ের অবস্থাগত ও মৰ্য্যাদাগত তারতম্য সূচিত হইতেছে
বলিয়াই মনে হয়।
প্রেমের স্বভাবই বােধ হয় এই, সে বাধা পাইলে
অধিকতর উদ্দাম হইয়া উঠে। বিমাতা দিলদারের শরণাপন্ন
হইয়া প্রেমােন্মত্ত সম্রাট বালিকার জন্য অধীরভাবে দিন
গণিতে লাগিলেন। আশা ও নিরাশার প্রতিকুল ও
অনুকূল তরঙ্গের মধ্যে সুদীর্ঘ চল্লিশ দিন অতিবাহিত
[ ৭৩ ]

মােগল-বিদুষী হইবার পর তাহার মনােরথ পূর্ণ হইল। মহিষী দিলদার বহু আয়াসে বালিকার মন ফিরাইতে সমর্থ হইয়াছিলেন। অতঃপর এই পটমণ্ডপেই বাসর সাজাইয়া উৎকণ্ঠিত বাদশাহর শুভপরিণয়গাৎসব সুসম্পন্ন করা হয় (সেপ্টেম্বর, ১৫৭১)। ইতিহাস প্রসিদ্ধ হামীদা বানুই এই পরিণয় বা প্রণয়- ব্যাপারের নায়িকা, এবং সসাগরা ধরণীর অধীশ্বর চির- স্মরণীয় আকবর শাহ ই এই পরিণয়ের অমৃতময় ফল। কিন্তু এই শুভপরিণয়ের পর সম্রাটের অদৃষ্টাকাশ আরও যােতর মেঘাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল। কামরান্ ও অঙ্করী চিরবিরােধী, কেবল একটামাত্র বৈমাত্রেয় ভ্রাত তাঁহার স্বপক্ষে ছিলেন; এই বিবাহে সেই হিন্দাও তাহার উপর অসন্তুষ্ট হইয়া কন্দাহার চলিয়া গেলেন। সিংহাসন শত্রু- কবলে। বন্ধু-বৈরী। অনুচরদল ছিন্নভিন্ন—আত্মীয়- স্বজন বিমুখ। হায়, এ দুর্দিনে চিরহিতৈষিণী, চিরমেহময়ী ভগিনী গুলবদন্ কোথায় ? রাজপরিবারের এই দুর্দশার দিনে গুদন্ কোথায় অবস্থিতি করিতেছিলেন, ইতিহাসে কোথাও প্রসঙ্গতঃও তাহার উল্লেখ নাই সত্য; কিন্তু তিনি যে কাবুলে ছিলেন, পরবর্তী ঘটনা হইতে তাহা অনুমান করা অসঙ্গত নহে। [ ৭৪ ] মােগল-বিদুষী হুমায়ূনের শাসন শিথিল হইলে, ভ্রাতৃদ্রোহী কামরা সুযােগ বুঝিয়া তাহার বহুদিন-পুষ্ট দুরাকাঙ্ক্ষা কার্যে পরিণত করিতে সচেষ্ট হইলেন। প্রথমেই তিনি হিন্দালের হস্ত হইতে কন্দাহারের অধিকার কাড়িয়া লইলেন এবং তাহার অনুমতি ব্যতীত স্থান ত্যাগ করিবে না, হিন্দালের নিকট এই প্রতিশ্রুতি লইয়া তাহাকে কাবুলে তদীয় মাতৃ- সন্নিধানে প্রেরণ করিলেন। এই সময় কাবুলে (১৫৪৩ খ্রীঃ) হিন্দালের সহিত গুলবদনের সাক্ষাৎ ঘটে। ইহা হইতে অনুমান হয়, গুলবদন্ তথন কাবুলে কামরানের অন্তঃপুর- বাসিনী ; রাজ্যভ্রষ্ট প্রিয়ভ্রাতা হুমায়ূনের দুর্দৈবে, ব্যথিত- চিত্তকে জননী-সেবায় ও পুত্রকন্যপালনে সানাদান করিতেছেন। রাজ্যহারা প্রপীড়িত হুমায়ূন্ হৃতরাজলক্ষ্মী পুনরুদ্ধারের জন্য উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন; কিন্তু বিরল-সুহৃদ ভারতবর্ষ হইতে কি উপায় হইবে ? স্থির হইল, হুমায়ুন দুর্দিনে সাহায্যলাভের আশায় পারস্য-সম্রাট শাহ, তহ মাস্পের শরণাগত হইবেন। পারস্য-গমনের সঙ্কল্প স্থির রাখিয়া হুমায়ুন কোয়েটার সন্নিকটে শাল, মসতং পর্যন্ত অগ্রসর হইলে, হঠাৎ সংবাদ পাইলেন তাহার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা অঙ্করী তাহাকে বন্দী [ ৭৫ ]

মােগল-বিদুষী
করিবার দুরভিসন্ধিতে দুই সহস্র অশ্বারােহী সেনা লইয়া
ধাবিত হইয়াছেন। অনন্যোপায় হুমায়ূন্ পলায়নের সঙ্কল্প
করিলেন; কিন্তু সঙ্গে হামীদা ও এক বৎসরের শিশু
আবর। ইহাদের লইয়া পলাইবার জন্য দ্বিতীয় অশ্বও
তাঁহার ছিল না। সম্রাট একটী অশ্বের জন্য তর্দী বেগের
নিকট নিষ্ফল প্রার্থনা করিয়া অবশেষে হামীদাকে নিজ
অশ্বে তুলিয়া লইয়া পলায়ন করিলেন। রৌদ্রের উত্তাপে
একবর্ষীয় শিশুকে লইয়া যাওয়া নিরাপদ বিবেচিত হইল
না। হুমায়ূন্-নামায় গুলবদন্ লিখিয়াছেন, পলায়নের
এস্ততায় শিশুপুত্র পরিত্যক্ত হইয়াছিল। অঙ্করী আসিয়া
দেখিলেন, পিঞ্জর শূন্য। ভ্রাতৃবৈরী হইলেও অঙ্করী শিশু
ভ্রাতুষ্পত্রের উপর সদয় হইয়া তাহাকে কাহারে স্বীয়
পত্নী সুলতান বেগমের নিকট প্রেরণ করিলেন (১৬ই
ডিসেম্বর ১৫৪৩)। »
হুমায়ুনের দূত চুপী বহাদুর যখন পারস্য-সম্রাটের
নিকট রাজ্যহারা, পুত্রহারা, নিরাশ্রয় ভারতাধিপতির জন্য
আশ্রয় ভিক্ষা করিল,তখন শাহ, তহ মাস্পের বিস্ময়ের অবধি
রহিল না। অদৃষ্টচক্রে, জর গ্রহকোপে রাজাধিরাজ
আজ তাহার দ্বারে ভিখারী! রাজ-অতিথিকে সসম্মানে
অভ্যর্থনা করিবার জন্য শাহ, অবিলম্বে পারস্যের আমীয়-
[ ৭৬ ।

মােগল-বিদুষী ; উমার ও স্বীয় ভ্রাতৃগণকে পাঠাইয়া দিলেন এবং ইহারা রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে উপনীত হইলে, পারস্যরাজ স্বয়ং অশ্বারােহণে অগ্রসর হইয়া ভারতরাজকে আলিঙ্গনপাশে বদ্ধ করিলেন। যতদিন দুর্ভাগ্য-পীড়িত হুমায়ূন্ পারস্য-সাম্রাজ্যে অবস্থান করিয়াছিলেন, শাহ, তহ, মাস্পের সহৃদয়-সৌজন্য ও সদয়-ব্যবহার হইতে বঞ্চিত হন নাই। মহানুভব শাহ, সন্তপ্ত-সম্রাটকে প্রফুল্ল রাখিবার জন্য নিত্য নব আমােদের ব্যবস্থা করিতেন; তন্মধ্যে শিকারের আয়ােজনই অধিক। সুখে দুঃখে সমভাগিনী হামীদা স্বয়ং পুত্রবিচ্ছেদফাতরা হইলেও ক্ষণিকের জন্য মর্মপীড়িত পতির সান্নিধ্য ত্যাগ করিতেন না;-অশ্ব বা উষ্ট্রপৃষ্ঠে দোলায়ােহণে দূর হইতে মৃগয়ার উল্লাস দেখিতেন। পারস্য-সম্রাটের ভগিনী শাহজাদা সুলতানাও অশ্বারােহণে ভ্রাতার পশ্চাতে উপস্থিত থাকিতেন। হামীদার নবীন বয়স, স্বামীর জন্য তাহার সর্বক্লেশ-সহিষ্ণুতা, এবং সর্বোপরি তাহার তরুণ মাতৃহৃদয়ের প্রচ্ছন্ন বেদনা সহৃদয় শাহ, তহ মাস্পের প্রগাঢ় সহানুভূতি আকর্ষণ করিয়াছিল। তিনি ভগিনী সুল- তানাকে বলিয়া দিয়াছিলেন,-মাতার স্নেহে এবং ভগিনীর আদরে বেগমের সন্তোষসাধন করিবে। [ ৭৭ ]

মােগল-বিদুষী
উদার হৃদয় শাহ, বিপন্ন সম্রাটকে বিমুখ করিলেন
; হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার-সাধনে সহায়তা করিবার জন্য
একদল রণনিপুণ সৈন্য দিলেন। এই মহাবল সমর-কুশল
বাহিনী-সাহায্য অস্করীর কবল হইতে কন্দাহার পুনরুদ্ধৃত
হইল--সঙ্গে সঙ্গে কামরানও কাবুলের অধিকার-ভ্রষ্ট
হইলেন (১৫৪৫)। বিজয়-দুন্দুভি-নিনাদে হুমায়ুন
কাবুলে প্রবেশ করিলেন। দীর্ঘকাল পরে গুলবদনের
সহিত সাক্ষাৎ হইল। যাহার কল্যাণের নিমিত্ত অনন্যমনে
শ্রীভগবচ্চরণে নিত্য কাতর প্রার্থনা জানাইয়াছেন, যাহার
ভাগ্যবিপর্যয়ে নিরন্তর নীরবে অশ্রুপাত করিয়াছেন, উদয়-
মুখ মিহিরের ন্যায় আজ সেই জয়শীল ভ্রাতার সাক্ষাৎ
পাইয়া মেহময়ী ভগিনীর কি আনন্দ! গু লিখিয়াছেন,
‘পাঁচ বৎসর দীর্ঘবিচ্ছেদের পর আবার আমরা প্রিয়ভ্রাতা
হুমায়ুনকে পাইয়া আনন্দ-সাগরে ভাসিলাম। অতএব
১৫৪০ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর হইতে ১৫৪৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত পাঁচ
বৎসর কাল গুলবদনের কাবুল-অবস্থানের ইহা অন্ততর
প্রমাণ।
পরাজিত কামরা আপাততঃ অগত্যা হুমায়ূনের বশ্যতা-
স্বীকার করিলেন বটে, কিন্তু ১৫৪৬ খ্রীষ্টাব্দে যখন হুমায়ুন
অঙ্করীর সহিত কাবুল ত্যাগ করিয়া বদখ শান্অভিমুখে
-
[ ৭৮ ]

মােগল-বিদুষী অভিযান করেন, সেই সুযােগে ভ্রাতৃদ্রোহী দুরাকাঙ্ক, দুর্বিনীত কামরান্ রাজভ্রাতার অনিষ্ট-চেষ্টায় পুনরায় বদ্ধ- পরিকর হইলেন,এবং সহসা কাবুলে উপস্থিত হইয়া, বিমাতা দিলদারের গৃহ অধিকার করিয়া, তাঁহাকে অন্যত্র যাইবার আদেশ দিলেন ; কিন্তু এই নির্মম আচরণেও কামরান গুলের সহিত অসদ্ব্যবহার করেন নাই; তিনি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন,-“তুমি স্বচ্ছন্দে এখানেই অবস্থান কর,-মনে করিও ইহা তােমার নিজেরই গৃহ। কামরা কুসুম-সুকোমলা স্নেহময়ী ভগিনীকেই জানিতেন। মমতাময়ী নারী-প্রকৃতির অন্তরালে যে তেজস্বিনী ললনা বাস করিত, কামরা তাহাকে চিনিতেন না। আজ তাঁহার এই অযাচিত অনুগ্রহ-দানে সহসা সে প্রচ্ছন্ন মূর্তি সপ্রকাশ হইয়া বলিল,-“কেন আমি তােমার অনুগ্রহ গ্রহণ করিব। যেখানে আমার মা থাকিবেন, আমিও সেখানেই থাকিব? কামরা এখন আত্মপক্ষ পুষ্ট ও দৃঢ় করিবার জন্য উদ্যোগী ; তাহার বিশ্বাস, গুলবদন্ যদি স্বীয় স্বামী খিজ খাজাকে পত্ৰদ্বারা তাহার পক্ষ-অবলম্বনে অনুরােধ করেন, খ তাহা উপেক্ষা করিতে পারিবেন না। কামরা তখন ভগিনীকে অনুরােধ করিলেন,-“অঙ্করী ও হিন্দাল, যেরূপ আমার ভ্রাতা, খিজর খাজা খাও আমার নিকট সেইরূপ। ; [ ৭৯ ]

মােগল-বিদুষী
আমাকে সাহায্য করিবার ইহাই উপযুক্ত অবসর। কিন্তু
বুদ্ধিমতী গুলবদন্ তাহাতে উত্তর দিলেন যে, এ যাবৎ তিনি
স্বামীকে কখন কোন পত্র লেখেন নাই ;-খ। তাঁহার
হস্তাক্ষরের সহিতও পরিচিত নহেন। এক্ষণে পত্র লিখিলে
তিনি উহা জালপত্র ভাবিতে পারেন। গুল, আরও
বলিলেন,-‘খাঁ যখন অন্যত্র অবস্থান করেন, তখন
পত্রাদি পুত্রকে উদ্দেশ করিয়া লেখেন। এইরূপ
বুঝাইয়া গুলবদন্ স্বয়ং কামরাকেই পত্র লিখিতে
উপদেশ দিলেন। গুলবদনের বয়স এ সময় ন্যূনাধিক ২৫
বৎসর। চাতুরী-বৃদ্ধ কামরা আজ এই সরলা যুবতীর
কাছে কূটবুদ্ধিতে পরাজিত হইলেন। গুলের উপদেশ
সমীচীন বুঝিয়া তিনি অবিলম্বে খাঁর নিকট তদীয় ভ্রাতা
মাহদী সুলতানকে পাঠাইয়া, খাঁকে সসম্মানে কাবুলে
আসিবার জন্য অনুরােধ করিলেন।
গুলবদন্ চিরদিনই হুমায়ূনের প্রতি আন্তরিক স্নেহশীল।
-তাহার প্রকৃত হিতৈষিণী। তিনি ইহার বহুপূৰ্ব্বে বারবার
স্বামীকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন,-তােমার অন্যান্য ভ্রাতৃগণ
কামরানের স্বপক্ষে থাকুক, ক্ষতি নাই; কিন্তু ভগবান্
করুন, কামরানের দলভুক্ত হইবার বাসনা ঘূণাক্ষরেও কখন
যেন তােমার অন্তরে স্থান না পায়। সাবধান ! সহস্রবার
[ ৮ ]

মােগবিদুষী সাবধান! কখনও সম্রাট, হুমায়ূনের পক্ষ ত্যাগ করিও না। খার হৃদয়ে পত্নীর সাবধানবাণী চিরজাগরুক ছিল। কাম- রানের দুরভিসন্ধি ব্যর্থ হইল,-খিজ তাহার অনুরােখ প্রত্যাখ্যান করিলেন। হুমায়ুন সৈন্যসংগ্রহ করিয়া, কামরানের হস্ত হইতে কাবুল পুনরুদ্ধার করিলেন (১৫৪৭, এপ্রিল )। ভীত কামরা হুমায়ূনের নিকট মার্জনা ভিক্ষা করিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন যে, ভবিষ্যতে তার বিপক্ষে কোনরূপ বিরুদ্ধাচরণ করিবেন না; বরং কায়মনােবাক্যে তাহার সহায়তা করি- বেন। মহানুভব বাবরের পুত্র সরল-হৃদয় হুমায়ূন্ পুনঃ পুনঃ প্রতারিত হইয়াও অকৃতজ্ঞ তার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস- স্থাপন করিতে কুণ্ঠিত হইলেন না; বিশেষতঃ বারবার এই দুৰ্বত্তের দুর্ব্যবহার ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সত্ত্বেও হুমায়ুন বিস্মৃত হইতে পারেন নাই—কামরান বাবরের পুত্র ; এবং তাহার স্বর্গগত পিতার আদেশ ‘কামরানের সহিত চিরসদ্ব্যবহার করিও। ১৫৪৮ খ্ৰীষ্টাব্দে সম্রাট-হিলাল, অস্করী ও কামরানের সহিত সৌভ্রাতৃত্ব- বন্ধন দৃঢ় করিবার জন্য তলিকা নামক স্থানে এক মিলন- উৎসবের আয়ােজন করেন। চারিত্রাতা মিলিত হইলে, তিনি বলিয়াছিলেন,--“লাহােরে গুলবদন্ প্রায় বলিত, আমার [ ১ ] মােগল-বিদুষী বড় ইচ্ছা, চারিভ্রাতাকে একবার এক সঙ্গে দেখি’; আজ আমরা প্রাতঃকাল হইতে সকলে একত্র রহিয়াছি; আমার কেবল সেই কথাই মনে হইতেছে। পরাৎপর পরমেশ্বরের ইচ্ছায় আমাদের এই শুভসম্মিলন তাহারই মঙ্গলরাজ্যে অধিষ্ঠিত হউক। অন্তর্যামী জানেন, ভ্রাতৃগণের অনিষ্ট চিন্তা ত দূরের কথা-কোনও মুসলমানের অমঙ্গল-কামনা আমার হৃদয়ের অন্তস্থলে প্রচ্ছন্নভাবে স্থান পায় না। সর্বকল্যাণকর খােদ্য তােমাদিগেরও হৃদয় এমনই পবিত্র ভ্ৰাতৃভাব ও শুভপ্রেরণায় পূর্ণ করুন,--আমাদের আজিকার বন্ধন অটুট ও অক্ষয় হউক!” কিন্তু ব্যর্থ বাসনা! যত্নে, সহৃদয়-ব্যবহারে, কালসৰ্প বরং আপনার ত্রুর-স্বভাব বিস্তৃত হয়, কিন্তু বারবার মার্জনা ও সদয়-ব্যবহার প্রাপ্ত হইয়াও কুটিলমতি কামরান্ কামরা আপনার হিংস্র-প্রকৃতি ত্যাগ করিলেন না। ভ্রাতৃসম্মিলনের কিছুদিন পরে হুমায়ুনের হস্ত হইতে রাজদণ্ড কাড়িয়া লইবার অভিপ্রায়ে কামরা পুনরায় বদ্ধ- পরিকর হইলেন;-ইহাই তাহার শেষ উদ্যম। অতি গােপনে তাহার সৈন্য সংগ্রহ হইতে লাগিল। কিন্তু সে সংবাদ হুমায়ুনের অবিদিত রহিল না; তিনি অবিলম্বে কৃতগ্ন ভ্রাতাকে দমন করিবার জন্য হিন্দালকে সঙ্গে লইয়া [ ২ ]

মােগল-বিলী
যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কামরা রাত্রিযােগে (১৫৫১, ২০এ
নভেম্বর) জিবর নামক স্থানে অতর্কিতভাবে হুমায়ুনের
শিবির আক্রমণ করেন। এই অভাবনীয় বিপদপাতে
হিন্দাল, আত্মপ্রাণ-বিসর্জনে সম্রাটের প্রাণরক্ষা করিয়া-
ছিলেন। সে আত্মদানের করুণ কাহিনী গুলের ভাষায়
আমরা লিপিবদ্ধ করিব -
“সম্রাট-সৈন্য জিবরে উপস্থিত হইলে সংবাদ আসিল,
কামরা রাত্রিযােগে হুমায়ূনের শিবির আক্রমণ করিবেন।
হিন্দাল, অবিলম্বে হুমায়ূন-সমীপে আসিয়া নিবেদন করিলেন,
-‘সর্বোচ্চ ভূমিতে সম্রাটের শিবির সন্নিবিষ্ট হউক এবং
শিশুপুত্র আবর-সহ সম্রাট, সুরক্ষিত হইয়া তথায় অবস্থিতি
করুন।
“সম্রাট, ও ভ্রাতুস্পুত্র সম্বন্ধে এইরূপ সুব্যবস্থা করিয়া
বীরশ্রেষ্ঠ হিন্দাল, একে একে আপন অনুচরবর্গকে আহ্বান
করিয়া বলিলেন,-মনে রাখিও,সম্রাটের হিতার্থে তােমাদের
আজীবনের অনুষ্ঠান, আজিকার একদিনের আত্মােৎসর্গের
সমান। খােদার কৃপায় আজিকার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হইবার পর ধন, মান, প্রভুত্ব-যাহার বাহা কিছু যাজ্ঞা,
আমি অকাতরে তাহা আশাতীতরূপে পূর্ণ করিব। অতঃপর
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতি অধ্যক্ষের স্থান ও কাৰ্য্য নির্দেশ করিয়া
[ ৩ ]

শােপলবিদুষী
রাজভ্রাতা অবিলম্বে আপন অস্ত্র ও বৰ্ম আনিতে আদেশ
প্রদান করিলেন। কিন্তু পরিচ্ছদ-রক্ষক হস্ত প্রসারণ করি-
মাত্র পশ্চাতে হাঁচি পড়িল ; অমঙ্গল-আশঙ্কায় তাহার
আর হাত উঠিল না।
“পরে যখন অস্ত্ৰ বৰ্ম্ম লইয়া রক্ষক হিন্দালের নিকট
উপস্থিত হইল, রাজভ্রাতা তাহার অকারণ বিলম্বের হেতু
অনুযােগ করিলেন। রক্ষক বিলম্বের কারণ আনুপূর্বিক
নিবেদন করিলে, হিন্দাল বলিলেন,-“ছি, ছি, তুমি ভুল
করিয়াছ। অমঙ্গল-আশঙ্কায় নিবৃত্ত না হইয়া তােমার বরং
বলা উচিত ছিল, খােদার আশীর্বাদে আজিকার আত্মদান
যেন সার্থক হয়। উপস্থিত সকলকে সম্বােধন করিয়া
বলিলেন,-বন্ধুগণ! তােমরা সাক্ষী, আমি এখন হইতে
সর্বপ্রকার নিষিদ্ধ ভক্ষ্য ও অন্যায়াচরণ পরিত্যাগ
করিলাম। উপস্থিত বন্ধুগণ সকলে একযােগে আশীৰ্ব্বচন
উচ্চারণ করিলেন। অতঃপর অস্ত্র বর্ম পরিধান করিয়া
পরিখায় পরিখায় উপস্থিত হইয়া সৈনিকগণকে উৎসাহিত
করিতে লাগিলেন। সেই সময় তাহার জনৈক অনুচর
সহসা চীৎকার করিয়া উঠিল, ‘শত্রুদল আমাকে আক্রমণ
করিয়াছে। হিন্দা তৎক্ষণাৎ অশ্ব হইতে অবতরণ
করিয়া বলিলেন,-‘অসিমুখে-বিপন্ন নিজ অনুচরকে যে রক্ষা
[ ৪ ]

মােগল-বিদুষী
না করে, সে কাপুরুষ! কিন্তু তাহার সঙ্গিগণের একজনও
অশ্ব হইতে অবতরণ করিল না। দুইবার শত্রুর আক্রমণ
ব্যর্থ করিয়া রাজভ্রাতা ধরাশায়ী হইলেন।
“মীর বাবা দোস্ত হিন্দালের মৃতদেহ বহন করিয়া
তাঁহার শিবিরবাসে লইয়া গেল। পাছে বাহিনীমধ্যে ভীতি-
সঞ্চার হয়, এই আশঙ্কায় মীর শিবিদ্বারে প্রহরী রাখিয়া
বলিয়া দিল যে, রাজভ্রাতা আহত ; সম্রাটের আদেশ,
কাহারও প্রবেশ নিষেধ। মীর তৎপরে সম্রাটের নিকট
উপস্থিত হইয়া বিষমুখে কহিল,-মীর্জা হিন্দা আহত।
হুমায়ুন তৎক্ষণাৎ অশ্ব আনিতে আদেশ দিয়া বলিলেন,-
‘আমি এখনই তাহাকে দেখিতে যাইব। মীর দৃঢ়স্বরে
বলিল,-“মীর্জার আঘাত সাঙ্ঘাতিক ; সম্রাটের তথায়
যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। সম্রাটের আর বুঝিতে বাকী রহিল
। ব্যথিত হুমায়ূন্ বারবার আত্মসংযমের চেষ্টা করিলেও
ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া তাহার অশ্রুপ্রবাহ ছুটিল। কিন্তু
কর্তব্য শশাকের মুখ চাহে না ; বুক ভাঙ্গিয়া গেলেও সে
তাহার কঠোর দায়িত্ব বিস্মৃত হয় না। অশ্রু মুছিয়া হুমায়ূন
খিজ খাঁর প্রতি আদেশ প্রচার করিলেন,-মীর্জা
হিন্দালের মৃতদেহ তােমার জাগীর জুই-শাহীতে লইয়া গিয়া
সমাধিকাৰ্য্য সম্পন্ন কর।
[ ৮৫ ]

মােগল-বিদুষী “উষ্ট্রের উপর শবাধার স্থাপিত হইলে, খিজ মর্মভেদী বিলাপে দিত্মণ্ডল মুখরিত করিয়া, তাহার মুখরঞ্জু ধরিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। সে হৃদয়বিদারী স্বর সম্রাটের শ্রুতিগােচর হইলে, তিনি বলিয়া পাঠাইলেন, ‘খাঁকে বল-ধৈৰ্য্য বিনা উপায় নাই। এই নিদারুণ শশাকে খার অপেক্ষা আমি অধিকতর মর্মপীড়িত; কিন্তু সম্মুখে শােণিতলােলুপ নিদারুণ শত্রু-কেবল প্রতিশােধ-তৃষ্ণায় অসীম ধৈর্য্যে হৃদয় বাঁধিয়া রাখিয়াছি। যৌবনের পূর্ণ গরিমায়, বীরত্বের শ্রেষ্ঠ মহিমায়, আত্ম- দানের অবিনশ্বর গৌরবে, তেত্রিশ বর্ষ বয়সে মীর্জা হিন্দাল অক্ষয়লােকে প্রয়াণ করিলেন (২০ নভেম্বর, ১৫৫১)। হিন্দালের মহিমময় মৃত্যু সংবাদ যখন কাবুলে গুল- বদনের শ্রুতিমূলে পৌছিল, তখন হৃদয়ভেদী হাহাকার দিত্মণ্ডল বিদীর্ণ করিতে লাগিল। হিন্দাল! হিন্দাল! উদার-হৃদয় চিরস্নেহময় সহােদর, নরত্ব-বীরত্বের আকর হিন্দাল, আর নাই। হায়, সে সুঠাম নয়নাভিরাম মূর্তি আজ পাষাণী মেদিনী: জঠরে চিরনিথর! ছিন্ন-লতিকার ন্যায় শাহজাদী ধরালিঙ্গন করিয়া আকুল কুন্তলে অনিবার অশ্রুজলে কঠিন ধরিত্রীতল সিক্ত করিতে লাগিলেন। গুমরিয়া গুমরিয়া তাহার মর্মরােদন কঠোর পর্বতপ্রদেশ [ ৬ ] মােগল-বিদুষী ; প্রতিধ্বনিত করিল। শৈশবের স্মরণীয় দিনগুলি একে একে তাহার স্মরণপথে উদিত হইতে লাগিল। হায় রে, সে প্রীতিপ্রফুল্ল চক্ষু আছ চিরনিমীলিত। সে হৃদয়-বিকাশী হাসিমাখা আদরের অমিয়-নিঝর অধর চিরনীরব! নিষ্ঠুর কবরভূমির পাষাণ-অবরােধ ভেদ করিয়া, প্রীতির দৃষ্টিতে দীর্ণদগ্ধহৃদয়ে অমৃত সিঞ্চি, সুধাগলিত-স্বরে হিন্দাল, কি আর একটীবার ডাকিবে-গুল! না-না-না! নির্মম শমন সে বীরবক্ষের উপর স্তব্ধ-পাষাণ চাপাইয়া দিয়াছে; সহােদর-স্নেহে আর সে বিশাল বক্ষ স্পন্দিত হইবে না ; আদরের সে মধু-নিঝর আর ছুটিবে না; কাতর প্রার্থনায় চিরঅনুকূল শ্রবণ আজ প্রস্তররুদ্ধ ; গুলের আকুল ক্রন্দন, বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস আর তাহা স্পর্শ করিবে না। হায় হিন্দাল! হায় হিন্দাল,! না জানি কোন্ নির্দয়-হৃদয় এই নিরপরাধ যুবার অঙ্গে অস্ত্রাঘাত করিয়াছে ! হায় খােদ, হিন্দালের পরিবর্তে সাদৎ-ইয়ারকে লইয়া আমায় কেন পুত্রহারা করিলে না ; খিজরুকে লইয়া আমার হৃদয়ে কেন চিরবৈধব্য-বেদনা দিলে না ; আর সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ- বিধান, আমার কেন জীবনান্ত করিলে না। “আয় দরেঘা, আয় দরে, আয় দরেঘা! আফতাব শুদ নিহান্ দ জে ই মেঘ।” ; [ ৮৭ ] মােগল-বিদুষী হায় রে, হায় রে, হায় রে দুঃখ! আমার সূৰ্য্য মেঘের তলে চিরতরে ডুবিয়ে গেল! নিষ্ফল বিলাপে রাজ-অন্তঃপুর ভূকম্পনের আবেগে কম্পিত হইতে লাগিল। হিলাল, চিরনিদ্রায় অভিভূত হইয়া রহিল। এদিকে দুৰ্বত্ত কামরানের প্রতিবিধিৎসার দিন সন্নিকট হইয়া আসিল। হিন্দালের অকাল মৃত্যুতে নিষ্ঠুর নিয়তি নিদারুণ নির্যাতিত সম্রাটের উপর কৃপাকটাক্ষপাত করিলেন। নৈশযুদ্ধে পরাজিত হইয়া কামরা নানাস্থানে পলায়ন করিয়াও আত্মরক্ষা করিতে পারিলেন না ;- ধৃত হইয়া বন্দীরূপে সম্রাট-সমীপে নীত হইলেন। হিন্দালের মৃত্যু ও আপনার প্রতি সহস্ৰ দুৰ্বহারের কথা স্মরণ করিয়াও ক্ষমাশীল সম্রাট, কামরানের প্রতি গুরুতর দণ্ড- বিধান করিতে পারিলেন না--কেবলমাত্র যাবজ্জীবন বন্দী করিয়া রাখিবার আজ্ঞা দিলেন। কিন্তু সম্রাটের সদয়-বিধানে সভাস্থলে অসন্তোষের গুরু- গুঞ্জনধ্বনি উথিত হইল। সমবেত আমীর-উমারা, সন্ত্রান্ত ও মধ্যবিত্তজন, সভাসদ, সৈনিক, কামরানের নির্যাতন-পীড়িত উচ্চনীচ সকলে একবাক্যে বলিল,-“রাজকৰ্তব্য, সাম্রাজ্য শাসন ভ্রাতৃবাৎসল্যের মুখাপেক্ষী নহে। এক্ষেত্রে ভাতার [৮]

মােগ-বিদুষী
প্রতি যদি মমতা করিতে হয়, সম্রাটের সিংহাসন পরিত্যাগ
করাই শ্রেয়। আর যদি রাজপদ বাঞ্ছিত হয়, ভ্রাতৃস্নেহ
বিসর্জন দেওয়াই বিধান। কিচকের সঙ্কীর্ণ গিরিসঙ্কটে
এই দুৰ্বত্ত কামরান্ সম্রাটের পবিত্র মস্তকে কিরূপ
সাঙ্ঘাতিক আঘাত প্রদান করিয়াছিল,তাহা কি স্মরণ নাই ?
আফগানগণের সহিত ষড়যন্ত্র করিয়া এই প্রতারক শঠ,
মীর্জা হিন্দালের প্রাণ-সংহার করিয়াছে। অসংখ্য চঘতাই
ইহারই জন্য মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। কত নিরপরাধ
বালক, রমণী বন্দী হইয়া ধৰ্ম্ম বিসর্জন দিয়াছে ! আমাদের
সন্তান-সন্ততি-রমণীগণের দ্বারা ভবিষ্যতে সে নিষ্ঠুর-নাট্টের
পুনরভিনয় আমরা কদাচ ঘটিতে দিব না। পরলােকে
জহান্নম্ প্রত্যক্ষ করিয়া সকলে শপথ করিতেছি যে, আমা-
দের জীবন, স্ত্রীপুত্র, সৰ্ব্বস্ব সম্রাটের একগাছি কেশরক্ষার্থ
অকাতরে বলি দিব ; কিন্তু মুক্তকণ্ঠে বলিব, কামরান্
সম্রাটের ভাই নয়,-শত্রু!
অতঃপর আর অধিক বাক্যব্যয় না করিয়া সকলে
সমস্বরে বলিয়া উঠিল,-“যে দুৰ্বত্ত ভ্রাতা রাজ্যধ্বংসকারী,
তাহার শিরচ্ছেদই শ্রেয়। কিন্তু নৃপতির নিরতিশয় ভ্রাতৃ-
বৎসল হৃদয়, এই সঙ্গত-বিধানের অনুমােদন করিল না।
অবশেষে দুৰ্বলচিত্ত বাদশাহ, অশান্ত ক্রোধের সে উচ্ছসিত
[ ৮৯ ]

মােগলবিদুষী . গর্জন অবহেলা করিতে না পারিয়া, কামরাকে অন্ধ করিয়া দিবার জন্য সঈদ মুহম্মদের প্রতি আদেশ প্রচার করিলেন। * ভ্রাতৃদ্বন্দ্বের করাল-বহ্নি নির্বাপিত হইলে, হুমায়ুনের তৃষিত চক্ষু কাবুলের গিরি-নিঝর-নন্দিত, তুষার-বলয়িত প্রদেশ হইতে পুনরায় দিল্লী ও আগ্রা অভিমুখে ধাবিত * আবুল ফজলের ‘অক্বরনামার’ উপাদান-সংগ্রহের জন্য সম্রাট, আর আদেশ প্রচার করেন। এই রাজ-অনুজ্ঞায় হুমায়ুনের পান- পাত্র-বাহক জহির ও সম্রাট আকবরের বকাওলবেগী’ ( রন্ধনশালা- পরিদর্শক) বায়াজীদ বীয়াতের স্মৃতিকথা রচিত হইয়াছিল বায়াজীদের ‘তারিখ-ই-হুমায়ুন সম্পূর্ণ হইলে ইহার নয়খানি পুথি লিখিত হয় ; তন্মধ্যে একখানি সম্রাটের পাঠাগারে, তিনখানি কুমার সলীম, মুরাদ ও দানিয়ালকে, একখানি গুলবদনের পাঠাগারে, এবং দুইখানি আবুল ফজলকে প্রদত্ত হয় ; অবশিষ্ট একখানি সম্ভবতঃ গ্রন্থকার স্বয়ং রাখিয়াছিলেন। গুলবদনের হুমায়ূন-নামাও একই উদ্দেশ্যে রাজাদেশে লিখিত হয়, এবং বায়াজীদের ন্যায় ইহারও যে একাধিক পুথি নকল হইয়াছিল, এরূপ অনুমান অসঙ্গত নহে। কিন্তু বৃটিশ মিউজিয়নে রক্ষিত একমাত্র পুথি ব্যতীত, গুলবদনের গ্রন্থের দ্বিতীয় পুথি অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। গভীর পরিতাপের বিষয়, এই একমাত্র পুখি আবার অসম্পূর্ণ—শেষের কয়েক পৃষ্ঠা লুপ্ত। কামরানকে অন্ধ করিয়া দেওয়া পর্যন্ত ঘটনা ইহাতে বিদ্যমান। [ ১ ] মােগল-বিদুষী হইল। ১৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর তিনি দ্বিতীয়বার হিন্দুস্থান-বিজয়ে অগ্রসর হইলেন, এবং পর বৎসর ২৩এ জুলাই দিল্লীতে আপনাকে সম্রাট, বলিয়া ঘােষণা করিলেন। কিন্তু চিরবাঞ্ছিত রাজদণ্ড করগত করিবার কিছুদিন পরেই লােকান্তর হইতে সহসা তাহার আহ্বান আসিল। ১৫৫৬ খ্রষ্টাব্দে, জানুয়ারীর শেষভাগে, একদিন অপরাহ্নে সম্রাট, শের শাহ-প্রতিষ্ঠিত শেরমণ্ডল ভবনে পাঠাগার-পরিদর্শন ও শুক্র গ্রহের উদয়কাল নির্ণয় করিতে গমন করেন। সােপান-অবতরণকালে সহসা পদস্খলিত হইয়া তাহার যে চৈতন্য বিলুপ্ত হয়, তাহা আর ফিরিয়া আসে নাই। দুর্ঘটনার তিন দিন পরে আটচল্লিশ বৎসর বয়সে চিরহতভাগ্য সম্রাট, নিয়তির নির্যাতনাগার ধরাধাম ত্যাগ করিয়া দুঃখ-শােক- তাপের অতীত দেশে চলিয়া গেলেন ;-চিরবৈরী শের মৃত্যুতেও যেন শত্রুতা সাধন করিল। এই নিদারুণ ঘটনার অনতিকাল পূৰ্ব্বে রুমের বাদশাহ, সুলেমানের তুর্কী-রণপােতাধ্যক্ষ সীদী আলী রাজদরবারে অথিতিরূপে অবস্থান করিতেছিলেন। সাম্রাজ্য তখনও সঙ্কট-সঙ্কুল। শূন্য সিংহাসন অধিকার করিবার নিমিত্ত মােগল-শ সুযােগপ্রয়াসী। যুবরাজ আকবর পঞ্জাব প্রদেশে। সীদীর পরামর্শে আরের প্রত্যাবর্তনাবধি [ ৯১ ] মােগল-বিৰী হুমায়ুনের মৃত্যুসংবাদ গােপন রাখা হইল। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতে বহু মিথ্যা-আচরণের অভিনয় হয় ; তন্মধ্যে হুবহু হুমায়ুন সাজিয়া একজন লােক দরবারে বসিতেন। সম্রাটের আরােগ্যলাভের অলীক-সংবাদে প্রজাগণ পুলকিত হইল এবং হাহাকারের পরিবর্তে রাজ্যময় বিপুল আনন্দ- রােল উঠিল। যুবরাজকে প্রচ্ছন্নভাবে পিতৃমৃত্যু জ্ঞাপন করিবার নিমিত্ত সীদী আলী স্বয়ং লাহােরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, আর ইতঃপূর্বে আপনাকে সম্রাট, বলিয়া ঘােষণা করিয়াছেন। [ ২ ] মােগল- বিধা আকবরের রাজ্যকালে গুলবদন শের শাহ, কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হইয়া হুমায়ুন যখন পবন-চালিত ছিন্ন-পত্রের ন্যায় ইতস্ততঃ বিতাড়িত হইতে- ছিলেন, রাজ-অন্তঃপুরিকাগণ তখন ছিন্নহার কুসুমের ন্যায় বিক্ষিপ্ত। দ্বিতীয়বার সিংহাসন লাভ করিয়া, সম্রাট তাহা- দিগকে কাবুল হইতে ভারতে আনিবার সঙ্কল্প করিয়া- ছিলেন; কিন্তু নিষ্ঠুর শমন তাহাকে সে সাধ পূর্ণ করিতে অবসর দেয় নাই। পিতার মৃত্যুর পর বালক আকবর ‘সম্রাট' পদে অভিষিক্ত হইয়া, প্রায় বৎসরাবধি শত্রুদমনে ব্যাপৃত ছিলেন; সুতরাং পুনঃপুনঃ চেষ্টাসত্ত্বেও তিনি তৎকালমধ্যে তাহাদিগকে আনাইতে সমর্থ হন নাই। সিংহাসনে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত হইয়া, তিনি অনতিবিলম্বে তৎকাৰ্য- সাধনার্থ কয়েকজন বিশ্বস্ত আমীরকে কাবুলে প্রেরণ করিলেন। ১৫৫৭ খ্রীষ্টাব্দের প্রথম ভাগে, সম্রাট-জননী হামীদা বানু, গুলবদ, সীমা, হাজী ও গুলচিহরা বেগম, অন্যান্য কর্মচারিগণের মহিলাবর্গসহ পশ্চিম সিওয়ালিকস্থ মান- কোটের রাজশিবিরের নিকট আসিয়া পৌছিলেন। সংবাদ পাইবামাত্র আর প্রিয়সম্মিলনােক্সাসে উৎফুল্লচিত্তে ( ৯৩ ] মােগল-বিশী অগ্রসর হইলেন। শক্রর কঠোর হুঙ্কার, কামানের কুলীশ ঝঙ্কার, অন্ত্রের বিকট ঋণৎকার এক বৎসর নিরন্তর যাহার শ্রবণ-বিবর প্রপীড়িত করিয়াছে, প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর যে তাঁহার পক্ষে কি আনন্দপ্রদ, তাহা ভুক্তভােগী ভিন্ন উপলব্ধি করা অসম্ভব। বিশেষতঃ সম্রাট এখনও বালক, স্বার্থপর সংসারের ছাপাতে হৃদয় এখনও কঠিন হয় নাই। জনগণ-সহ সম্রাট, মানকোট-শিবিরে ফিরিয়া আসিলেন। প্রথমে মানকোট হইতে লাহাের, তৎপরে তথা হইতে ১৫৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর সপরিবারে দিল্লী যাত্রা করিলেন। এ কয়েক মাস সম্ভবতঃ রাজপরিবারবর্গ সম্রাট-শিবিরের সন্নিকটে শিবিরবাসে কালযাপন করিয়াছিলেন। ১৫৫৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে আগমন হইতে ১৫৭৪ খ্রীষ্টাব্দে তীর্থগমন পৰ্যন্ত দীর্ঘ সতর বৎসর কাল, আমাদের এই ক্ষুদ্র আখ্যায়িকার নায়িকা, নিজ জীবনেতিহাসের উপর দুর্ভেদ্য পটক্ষেপন করিয়াছেন। হুমায়ূন্-নামা’-পাঠে অতি অনবহিত পাঠকেরও উপলব্ধ হয় যে, এই আত্মগরিমা-শূন্য রমণী নিজ জীবনকাহিনী সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন—একেবারে নিৰ্বা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এমন কি প্রসঙ্গতঃ সাদৎ- ইয়ার ব্যতীত তিনি তাহার অপর পুত্রকন্যাগণেরও উল্লেখ [ ৯৪ ]

মােগল-বিদুষী
করেন নাই। লােকলােচনান্তরালস্থিত মােগলের অন্তঃপুর
হইতে নিবিড় অবগুণ্ঠনবতী এই রমণীর রমণীয় আখ্যান
শুনিয়া তাঁহার অন্তরের সহিত ঘনিষ্ঠতর পরিচয়ের জন্য
কৌতুহল ব্যাকুল হয়; কিন্তু প্রয়াস পুনঃ পুনঃ নিস্ফল হইয়া
ফিরিয়া আসে। কিন্তু কল্পনা-নেত্রে আমরা দেখিতে পাই যে
নিত্যকর্মের বিরামে তাঁহার অবসরকাল এখন কবিতা-
রচনায়, বিবিধ পুস্তক-পাঠে, সাম্রাজ্যের সংবাদ-আলােচনায়,
কদাচিৎ বা উৎসবানলে অতিবাহিত হইতেছে।
তাহার প্রচ্ছন্নজীবনের যে চিত্রটী আমাদের মানসপটে
সৰ্ব্বাপেক্ষা উজ্জ্বলবর্ণে ফুটিয়া উঠে, তাহা পতিসেবাপরায়ণ
সহধর্মিণীর এবং অপত্যস্নেহময়ী জননীর; কিন্তু এই
বিদুষী প্রতিভাশালিনী রমণীকে কেবলমাত্র কল্যাণময়ী
গৃহদেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত দেখিয়া আমাদের আকাঙ্ক্ষা
পরিতৃপ্ত হয় না। আশৈশব যাহার অন্তশ্চক্ষু এই অপূৰ্ব্ব
দেশের অপূৰ্ব আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, শােভাসৌন্দৰ্য্য,
শিল্পচাতুৰ্য পৰ্যবেক্ষণ করিয়া আসিয়াছে, তৎসম্বন্ধে তাঁহার
চিন্তাধারা কি ভাবে প্রবাহিত হইয়াছিল, তাহা জানিবার
জন্য ইতিহাস-পাঠকের মন স্বতঃই উৎসুক হয়। কিন্তু যতদূর
আবিষ্কৃত হইয়াছে, হুমায়ূন্-নামাতে তাহার ইঙ্গিতমাত্র
পাওয়া যায় না। অন্তঃপুরবাসিনী হইলেও তিনি যে নিরন্তর
[ ৫ ]

মােগল-বিদুষী অবরােধে আবদ্ধ থাকিতেন, তাহা নহে; সম্রাট-শিবির- সন্নিধানে তাঁহার শিবির অতি সম্মানের স্থান অধিকার করিত বলিয়া ইতিহাসে যে উল্লেখ আছে, তাহাতেই অনুমিত হয়, বাহিরের আলােক তাঁহার পক্ষে দুল্লভ ছিল না। সে আলােকে ভারত-মহিলাগণের যে চিত্র এই মনস্বিনীর মানস- নেত্রে উদ্ভাসিত হইত, কে বলিবে তাহা ছায়াপাতমাত্র করিয়াই মিলাইয়া গিয়াছে? ভারতের সতীধৰ্ম্ম, জৌহর- ব্রতের অনুষ্ঠান কি এই পতিপরায়ণা রমণীর হৃদয়ে গভীরতর রেখা অঙ্কিত করে নাই ? গুল, যে কুল অলঙ্কত করিয়াছিলেন, নারীর সতীত্ব তাহার গৌরব,দাম্পত্য-বন্ধনে রমণীর অক্ষুন্ন বিশ্বস্ততা তাহার গর্ব। বাবরের মাতামহী বিজয়ী শক্তকরে বন্দিনী হইলে তিনি বিজেতার জনৈক অনুচরের হস্তে সমর্পিতা হন; কিন্তু তেজস্বিনী আই-দৌলৎ (ইসা-দৌলৎ) তৎক্ষণাৎ সেই অনুচরকে হত্যা করিবার জন্য তাহার পরিচারিকাকে আদেশ দেন। আদেশের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে আই কেবল বলিয়াছিলেন,-“আমি ইউনুস খাঁর ধর্মপত্নী। এই সংবাদ মােগল-মহিলাগণের নিশ্চয়ই অবিদিত ছিল না। গুলও পারিবারিক-ইতিহাসে দেখিয়াছেন, তাহার জাতীয় বহু বন্দিনী-ললনা শত্রুর ( ৯৬ ] মােগল-বিদুষী সহিত পরিণীতা হইয়াছে এবং তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ শত্রুর দেশে পতিসহ সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘর করিতেছে। কিন্তু হিন্দু-মহিলাগণের দাম্পত্যজীবন তৈমূর- বংশােদ্ভব মহিলাগণের আদর্শ হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। রাজ- পুত রমণী বন্দিনী হইবার আশঙ্কায় উল্লাসে জীবন দান করে ; রাজপুতগণ অসম-শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হইলে স্বহস্তে স্ত্রীপুত্রকন্যাগণকে হত্যা করিয়া, মৃত্যুষজ্ঞে জীবনা- হুতি দেয়। শৈশবে পিতৃমুখে গুল, বহুবার এই বিস্ময়কর কাহিনী শুনিয়াছেন; কিন্তু তখন তিনি বালিকা। এখন পতিপুত্রবতী নারী সমাজের কঠিন সমস্যা-সকল উদার- ভাবে গ্রহণ করিতে শিখিয়াছেন তারপর আক্বরের রাজ্যাঙ্কের প্রথম ভাগে বহুবার সেই নিদারুণ মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অভিনয় হইয়াছে। মৃত্যুভ এবং কঠোরতম যন্ত্রণা উপেক্ষা করিয়া হিন্দু-বিধবার স্বেচ্ছায় অগ্নিতে আত্মসমর্পণে, সতীধৰ্ম্মে গৌরবের এই আত্মবিসর্জনে, কে জানে মুসলমান রমণীর হৃদয় শ্রদ্ধায় পুষ্পিত হইয়া উঠিত কি না? ভ্রাতুস্পুত্র আবরের হারেমে রাজপুত-ললনার সমাগমে গুলবদন্ হিন্দু রমণীগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রকৃতি-প্রবৃত্তি প্রভৃতির ঘনিষ্ঠ তর পরিচয় পাইবার সুযােগ পাইয়াছিলেন। কিন্তু ভাষার অনভিজ্ঞতায় সে পক্ষে বিষম অন্তরায় হইয়াছিল। গুল, [ ৯৭ ] মােগল-বিদুষী • যদি সে ভাষা বুঝিতেন, রাজপুত সতীত্ব ও বীরত্বের জ্বলন্ত কাহিনী-শ্রবণে তিনি যে অধিকতর মােহিত হইতেন, সন্দেহ নাই কিন্তু একে দুর্বোধ ভাষা, তাহার উপর এই সকল হিন্দু-রমণী কখন সম্রাটের অন্তঃপুরে মুসলমান-রমণীগণ কর্তৃক সমাদরে গৃহীত হ'ন নাই। তথাপি দাম্পত্য-জীবনে এই হিন্দুবেগমগণের নির্দোষ আচরণ-দর্শনে গুলবদন বুঝিয়াছিলেন যে, জীবনের কর্তব্যােলনে দীক্ষাদান কোন ধর্মেরই নিজস্ব নহে। কিন্তু হিন্দু ও মুসননগণের মধ্যে ভাষা-ধৰ্ম্ম, প্রকৃতি- প্রবৃত্তি সম্পূর্ণ বিভিন্ন হইলেও তীর্থের পবিত্রতা ও তীর্থ- দর্শনের ইতিকৰ্ত্তব্যতা সম্বন্ধে উভয় জাতি সমভাবে অনু- প্রাণিত হইত। অতঃপর যখন গুলবদন্ পুনরায় আমাদের দর্শনপথে পতিত হন, তখন তিনি প্রৌঢ়া রমণী, বয়স প্রায় ৫১ বৎসর-সম্ভবতঃ বিধবা * এবং মুসলমান ধৰ্ম্মের অবশ্য- * গুলবদনের স্বামী, চঘ ভাই-বংশীয় খিজর খাজা খাঁর মৃত্যুকাল সম্বন্ধে ইতিহাস নীরব। যতদুর জানিতে পারা যায়, তিনি হুমায়ুনের সহিত ১৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দুস্থানে আগমন করেন। আবনের সিংহাসন- অধিরােহণের পর (১৫৫৬) কিছুদিন তিনি লাহােরের শাসনভার প্রাপ্ত হইয়া পঞ্জাবে সিকন্দর আফগানের গমনকার্যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন । [ ৯৮ ] মােগল-বিদুষী পালনীয় পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে পুণ্যতীর্থ মক্কাগমনার্থ একান্ত ব্যাকুলা। কিন্তু সম্রাট আকবর তাহাকে বিদায় দিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক ; কেবল এখন-তখন করিয়া দীর্ঘসূত্রতায় কালহরণ করিতেছেন। সম্রাট স্বয়ং এখন ‘হজ-ব্রত পালনের জন্য একান্ত উৎসুক হইয়া- ছিলেন এবং সম্ভবতঃ গুলকে স্বয়ং সঙ্গে লইয়া যাইবার বাসনা ইতস্ততঃ করিতেছিলেন। কিন্তু আপাততঃ হিন্দুস্থান পরিত্যাগ করা তাঁহার পক্ষে সম্ভবপর হইল না ; তীর্থ যা স্ত্রীর বেশে একদল মাযাত্রীর সহিত আগ্রা হইতে কিছু কিন্তু ভাগ্যে তাহার পরাজয় ঘটে। খিজ সুদক্ষ সৈনিক ছিলেন না, এবং রণ-পরিচালনায় হায় দক্ষতা না থাকায় আর কোন দায়িত্বপূর্ণ অভিযানে তাহার নাম দৃষ্ট হয় না। তবে সম্রাটের পিতৃধসা গুলবদনের স্বামী’ রাজ-দরবারে মহাসুখে ও ক্ষত্তিতে সময় অতিবাহিত করিতেন। কোন সময় খিজ সম্রাট আকবরকে বহু অশ্ব উপহার দিয়াছিলেন। ১৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দে আর দিল্লীতে আহত হইলে, খিজর তাহার যথেষ্ট সেবাশুশ্রুষা করিয়াছিলেন। তিনি সামরিক উচ্চপদে উন্নীত, এমন কি এক সময়ে আমীর-উল-উমার' হইয়াছিলেন; কিন্তু ‘আইন-ই- আক্বরীতে মাদারগণের তালিকায় তঁাহার নামােল্লেখ নাই। “তকাৎ-ই-আকবরীতে তিনি পাঁচ-হাজারী প্রধানগণের অন্যতম বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। খিজ সম্বন্ধে ইহার অতিরিক্ত বিবরণ আপাতত ইতিহাসে পাওয়া যায় না। [ ৯৯ ] } মােগল-বিদুষী fণর দূর গমন করা ভিন্ন তাহার ঐকান্তিক কামনাকে তৃপ্তিদান করিতে পারেন নাই। নিজে সফলকাম না হইলেও ইসলাম ধর্মের এই পবিত্র কর্তব্যপালনে-সমুৎসুক ব্যক্তি- গণকে সম্রাট মুক্তহস্তে অর্থসাহায্য করিতেন, এবং প্রতি বৎসর জনৈক যােগ্যব্যক্তিকে অধিনায়ক মনোনীত করিয়া যাত্রীদলের পাথেয় প্রভৃতি নির্বাহের জন্য তাহার হস্তে বিপুল অর্থ ও বহুল দ্রব্যসম্ভার দিতেন। সম্রাট আকবর বৎসর বৎসর তীর্থগমনাকাঙ্ক্ষা এইরূপে তৃপ্ত কারিতে লাগিলেন; কিন্তু গুলকে তীর্থগমনে বিরত রাখা তাহ পক্ষে ক্রমেই দুঃসাধ্য হইয়া উঠিল ; অবশেষে সম্মতি প্রদান করিয়া তিনি পিতৃম্বসার তীর্থযাত্রার সর্বপ্রকার সুব্যবস্থা করিয়া দিলেন। তীর্থগামিনীগণের মধ্যে গুলবদনের আত্মীয়ার সংখ্যাই অধিক। আবুল ফজল, গুলের সহযাত্রীদলের মধ্যে প্রধান মহিলাগণের নামােল্লেখ করিয়াছেন। যাত্রীদলের সমগ্র ব্যয়ভার রাজকোষ হইতে প্রদত্ত হইয়াছিল। গুলের প্রধানা সঙ্গিনী ছিলেন-আবর-পত্নী সলীমা সুলতান্ বেগম। মুসলমান-বিধি অনুসারে সধবা স্ত্রীলােকের তীর্থ- গমন নিষিদ্ধ নহে;-ভাৰ্যার প্রবল আগ্রহ থাকিলে তাঁহাকে তীর্থগমনে তানুমতিদান অপরিহার্য। সম্ভবতঃ " [ ১০০] স। ইজার বেগম মোগল-বিদুখী ঐরূপ নিৰ্বন্ধাতিশষেই সলীমার তীর্থযাত্রা ঘটিয়াছিল। ইহাদের সঙ্গে ছিলেন, আকবরের খুল্লতাত অস্করীর বিধবা- পত্নী সুলতানাম্ ; কামরানের দুই কন্যা—হাজী ও গুল- এবং গুলবদনের পৌত্রী উ-ই-কুলসুম ইনি সাদৎইয়ারের কন্যা কি না উল্লিখিত নাই। তালিকার শেষ নাখিজর খাজা-দুহিতা সলীমা খানম্ গুলবদনের গভজা, তি কন্যা কি না তাহাও অজ্ঞাত। ফতেপুরীরী যাত্রীদলের এক সঙ্গে মিলিত হইবার শুনি নির্দিষ্ট ছিল, এবং ১৫৭৫ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর যাত্রার দিন স্থিরীকৃত হয়। আগ্রা হইতে যাত্রা করিয়া গুলবদনের সহযাত্রিগণ একসঙ্গে সম্মিলিত হইলেন। সাধারণতঃ (মুসলমান) বৎসরের দশম মাসেই তীর্থ- গমনােদ্দেশে যাত্রীদল আগ্রা ত্যাগ করিত; কিন্তু গুলবদন প্রভৃতি সপ্তম মাসেই যাত্রা করিয়াছিলেন ; ইহার কারণ বােধ হয়, মহিলাগণের পক্ষে, ক্লেশ-সহিষ্ণু সাধারণ যাত্রীদের ন্যায় দ্রুতগমন সম্ভবপর নহে। রাজ-আত্মীয়গণকে পথে কিয়দ্র সঙ্গদান করিবার নিমিত্ত সম্রাটের পুত্রদ্বয় সলীম্ ও মুরাদ যাত্রীদলের সহচর হইলেন। কুমারদ্বয়ের বয়ঃক্রম তখন যথাক্রমে পাঁচ ও চারি বৎসর। প্রথম বিশ্রামস্থান অবধি অগ্রসর করিয়া দিয়া যুবরাজ সলীম্ বিদায় লইয়া [১০১) মােগল-বিহুৰী আগ্রায় ফিরিলেন। কথা ছিল, মুরা সুরাট বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিবেন। গুলবদন্ শিশু মুরাকে সে ক্লেশকর ও শ্রমসাধ্য কাৰ্য্য হইতে নিরস্ত করিলেন। যাত্রীদলের প্রকৃত রক্ষণাবেক্ষণের ভার অর্পিত হইয়াছিল-মুহম্মদ বাকী খাঁ কুকা, রূমী খাঁ-প্রমুখ আমীরবর্গের উপর। গুলের বর্ণনাকুশল লিপিচাতুৰ্য্যময়ী লেংথুনী এই অজানিত বিবিপদসঙ্কুল সমুদ্রপথ, অপূর্ব দৃশ্য-দর্শন বা পুণ্যব্রতানুষ্ঠানের কোন বিবরণ লিথিয়া যায় নাই। সুরাট হইতে সমুদ্রযাত্রা নির্দিষ্ট হইয়াছিল সত্য, কিন্তু এই বন্দর তখনসবে বৎসর দুইমাত্র সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়াছে ; তখনও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। পথ বিপদাকীর্ণ, গ্রামবাসী রাজপুতগণ নবীন বন্ধন ছেদন করিবার জন্য সশস্ত্র ফিরিতেছে। সম্ভবতঃ রাজ-আত্মীয়গণকে সম্রাট সৈন্ত- পরিবেষ্টিত হইয়া এক সেনানিবাস হইতে অপর সেনা- নিবাস পর্যন্ত নিরাপদ পথ-অবলম্বনে গমন করিতে হয়। মােগল-সৈন্য তখন রাজপুতকুলতিলক রাণা প্রতাপের বিরুদ্ধে নিযুক্ত; অনুমান হয়, প্রধান যাত্রীদল এই বাহিনী- সহায়ে, অবসাদ-ক্লিষ্ট বক্রপথে গােঙা হইতে আহমদাবাদ, এবং তথা হইতে সম্ভবতঃ জলপথে সুরাট গমন করেন। সমুদ্রপথ সে সময় নিরাপদ থাকিলেও যাত্রীগণকে এক [ ২ ] মােগল-বিদুষী বৎসর বন্দরে বসি। থাকিতে হইয়াছিল। আকবর-নামায় প্রকাশ, সমুদ্রযাত্রার জন্য রাজ-অর্ণবপােত “ইলাহী নির্দিষ্ট ছিল। তদ্ব্যতীত ‘সলীমী’ নামক তুর্কী জাহাজ ভাড়া করা হয়। রাজমহিলাগণ ‘সলীমীতে আরােহণ করিলে, ‘ইলাহী”- আবােহিণীগণের মধ্যে অকারণ পর্তুগীজ জলদস্যু-ভীতি সঞ্চারিত হইয়াছিল। কিন্তু ইহাই বিলম্বের প্রকৃত কারণ বলিয় মনে হয় না। ভারতসাগরে পর্তুগীজগণের তখন অগাধ আধিপত্য ; যথারীতি শুল্ক প্রদান না করিলে জল- যাত্রার অনুমতিপত্র পাওয়া যাইত না। আবার ছাড়পত্র সংগৃহীত হইলেও ত্রাসের অবসান হইত না ; কেন না গুচ্ছাদিত কূপের ন্যায় কখন কখন তন্মধ্যে সাঙ্কেতিক- ভাষায় হত্যার ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন থাকিত। * যাহা হউক, এই অনুমতিপত্রের অভাবই যে বিলম্বের কারণ তাহাতে সন্দেহ নাই।। * See Humiyull-tanı of Gulbadan, p. 72. + পর্তুগীজদিগকে দামানের নিকটস্থিত বুল সার গ্রামখানির অধিকার দিয়া, গুলবদন্ তাহাদের নিকট হইতে তীর্থগমনের আবশ্যক ছাড়পত্র সংগ্রহ করিয়াছিলেন। সম্রাটের আদেশমত তিনি যে এ কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। তীর্থ হইতে প্রত্যাবৃত হইয়া তিনি রাজ-কর্মচারিগণকে প গীদিগের হস্ত হইতে বুলসার { ১৩ ]

মােগল-বিদুষী
মীর হজ, সমস্ত বিম্নবিপত্তির কথা সম্রাটের গােচর
করিলেন। অবিলম্বে সুরাটে উপস্থিত হইয়া যাত্রীদলের
সর্বপ্রকার অসুবিধা দূর করিয়া যাত্রার সুন্দোবস্ত করিবার
নিমিত্ত সম্রাট, ঈদরের ফৌজদার কিলিচ, খাঁকে আদেশ
দিলেন। কিলিচ, কাম্বেবাসী কল্যাণ রায় নামক জনৈক
বণিহ সুরাটে পৌছিয়া তদীয় সহায়তায় । যাত্রীদলের
ছাড়পত্র সংগ্রহ করিয়া দিয়া, যাত্রার সমস্ত বাধাবিপত্তি দূর
করিলেন।
স্থলপথে এই সকল বাধাবিপত্তি হেতু সমুদ্রযাত্রা কা
গুলবদনের এক বৎসর বিলম্ব হইয়া গেল ; অবশে
১৫৭৬ খ্ৰীষ্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর তারিখে পয়গম্বরের পবি
নাম উচ্চারণ করিয়া তীর্থগামিনীগণ জলপথে যাত্রা
করিলেন। সুরাট হইতে এক সঙ্গে যাত্রা করিলেও
মধ্যপথে উভয় পােত বিচ্ছিন্ন হইয়া একখানি আরব
উপসাগর, অন্যখানি পারস্য-উপসাগরের পথে গমন করে।
অভীষ্ট তীর্থে কোত্থানি কোন্ বন্দরে উপস্থিত হইয়াছিল,
তাহার উল্লেখ নাই।
তে
গষে
গ্রাম কাড়িয়া লইতে আদেশ দিয়াছিলেন। Monserrate's
Mongolicae Legationis Commentarius, ed. by.
H, Hosten, p. 625 দ্রষ্টব্য।
+ Akbarnata, iii. 276 .
[১০৪ ]

মােগল-বিদুষী যাহা হউক, গুল দ সহযাত্রীবৃন্দসহ নিরাপদে আরবে উপনীত হইয়া সার্ধ তিন বৎসরকাল তথায় অবস্থিতি করেন। এই দীম সময়ের মধ্যে তাহার চারিবার ‘হজ- ব্রত পালন করি মার সুযােগ হইয়াছিল। কিন্তু এই বহু আয়াসসাধ্য ক্লেশকর বিঘ্নবিপদসঙ্কুল তীর্থ-পৰ্যটনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও নিগূঢ় রহস্য কি, তাহা সমকি হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিলে মনের চিরতৃ- তুর = ঞানস্পৃহা পরিতৃপ্ত হয় না। যীশুর পবিত্রভূমি প্যালেস্টাইন, মুহম্মদের মক্কা, বুদ্ধের গয়া, হিন্দুর বারানসী- বৃন্দাবন কেবল কি বিভিন্ন দেশবাসীর সম্মেলনভূমি বীকিক আচার-ব্যবহার আদান-প্রদানের সাধারণ ক্ষেত্র, অথবা এই তীর্থযাত্রার কোন মহত্তর অভিপ্রায় আছে? কেন এই সৰ্বদেশ-সাধারণ মৃৎবারিগঠিত, বায়ু-বহ্নি ব্যোম- অধিষ্ঠিত স্থান-দর্শনের জন্য এত আকাঙ্ক্ষা, এত আগ্রহ, এত ক্লেশকর উদ্যম ? গৃহসুখ, জীবনের চিরাভ্যস্ত পথ পরি- ত্যাগ করিয়া, কেন অজানিত বিঘ্নবিপদমুখে উল্লাসে আত্ম- সমর্পণ ? আবার:কেনই বা তাহার দুর্বোধ আচার-অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকলাপ সযত্নে পালন? মক্কার তিন ক্রোশ ব্যবধানে * কাবুবেলা, কু, মাশহদ ও মক্কা। { ১৫ ] মােগশ-বিদুষী শ্রবণ ; পার্থনা ; . তীর্থ-পরিচ্ছন্-পরিধান (ইহরাম)+ ; গমনপথে তীর্থ-মাহাত্ম- গান ; সঙ্কল্পসিদ্ধি এবং ত্রুটিহীন। শনের জন্য সকাতর প্রার্থনা ; সেই পবিত্র নিকষকৃষ্ণ প্রস্তর স্পর্শ এবং অভি- বাদন; সপ্তবান পুণ্যময়ী কাবা-পরিক্রমা; পবিত্র ‘সফা’ শৈলে আরােহণ এবং তদুপরি আন্তরিক পার্থনা-সহকারে পরিত্রাতা খােদার পদে আত্মনিবেদন; ‘সফা’ হইতে মাওয়া শৈলে সপ্তবার দ্রুতগমনাগমন; প্রধান মসজিদ সমবেত উপাসনা ও তথায় বিশ্বাসী-সম্প্রদায়ের প্রতি ধৰ্ম্মাপদেশ- অষ্টম ও নবম দিবসে তীর্থে তীর্থে অতঃপর দশাহে মীনাস্তম্ভনিচয়ের উপর লােষ্ট্রনিক্ষেপ পূর্বক সয়তান-নির্যাতন এবং এই দিবসেই পুণ্যময় হজ ক্রিয়া পশু-বলিদান। পর পর এই সকল অনুষ্ঠানের নিগ্ন রহস্য কি, কে বলিবে? মনস্বিনী গুল যে এই সকল শাস্ত্ৰাদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করিয়াছিলেন, তাহা এক প্রকার স্বতঃসিদ্ধ। কেবল তাহাই নহে, দীর্ঘকাল তীর্থ- বাসে তিনি যে মদিনা দর্শন এবং স্থানে স্থানে সাধু মহাখ- + ইহরাম—দুইখানি অথও শ্বেতবস্ত্র ; একখানি কটিদেশ ও অপর- খানি দেহে আবৃত করিতে হয়। দক্ষিণ স্কন্ধ ও মস্তক অনাবৃত থাকে। Hughes' Dict. of Islam que fou ei fryo f1784 Encyclopaedia of Islam, Vol. II, 'a' শব্দ স্রষ্টব্য। [১০৬ ] মােগল-বিদুষী গণের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য দান করিতে গিয়াছিলেন, তাহাও সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কি অপূর্ব প্রেরণায় এই আয়াসসাধ্য আনুষ্ঠানিক আচার-সকল তৎকর্তৃক সম্পন্ন হইয়াছিল, কি অলৌকিক উন্মাদনায় সন্তান-সন্ততি প্রিয়- পরিজনবর্গের মম, অধ্যয়নশীল নিশ্চিন্ত-জীবন পরিহার করিয়া স্বেচ্ছায় সাগ্রহে তীর্থযাত্রার দুঃসহ ক্লেশরাশি বহন করিয়াছিলেন। পবিত্র তীর্থভূমি প্রথম চুম্বন করিয়া চির- ঈপ্সিত দূর মন্দিরশির-দর্শনে এই প্রগাঢ় ভক্তিমতি মহিলার অন্তরে কি ভাবের উদয় হইয়াছিল ; কি ভাবে বিভাের হইয়া সাম্রাজ্যের সুখৈশ্বৰ্য ভুলিয়া সাদ্ধ তিন বৎসর কাল আমাদের বিদুষী বাদশাহজাদী আরবের মরুময় প্রদেশে প্রবাসবাস করিয়াছিলেন—সে অপূৰ্ব্ব হৃদয়-রহস্য আত্ম- গােপনপ্রিয় গুলের সহিত চিরান্তরিত হইয়াছে; কৌতুহলের শত চেষ্টাতেও সে প্রহেলিকা-দ্বার উদঘাটিত হইবে না। ১৫৭৯ খ্রীষ্টাব্দে সহযাত্রীদলসহ গুলবদন্ ভারতাভিমুখে যাত্রা করিলে, পুনর্যাত্রার অধিনায়ক হইয়াছিলেন-খাজা ইয়াহিয়া মীর হজ,। এই অনিশ্চিত বিঘ্নশঙ্কিত বিপদসঙ্কুল পুনর্যাত্রার বিবরণ ঘটনা-বৈচিত্র্যে বিস্ময়কর। প্রথমত এডেনের অনতিদূরে পােতমগ্ন হইয়া যাত্রীদলকে কিছুদিন সেই জনবিরল স্থলে অবস্থান করিতে হয়। তখনকার (১০৭ ] মােগল-বিদুষী ১৫৮০ এডেনে এখনকার মত তৃষ্ণার্তের তৃপ্তিকর বরফ, অনাবৃষ্টির অভাব, এবং বৃটিশরাজের প্রতিষ্ঠা ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, তদানীন্তন শাসনকর্তা যাত্রীদলের সহিত সদ্ব্যবহার করেন নাই,—যদিচ এই বিসদৃশ আচরণের জন্য তিনি স্বীয় প্রভু তুর্কী-অধিপতি তৃতীয় মুরাদের নিকট দণ্ডিত হইয়াছিলেন। কেবল একটিমাত্র সুখকর ঘটনায় এই উত্তপ্ত পৰ্বত- পরিবেষ্টিত স্থলে সুদীর্ঘ প্রবাসপীড়িত যাত্রীদলের নিরাশ তমসাচ্ছন্ন হৃদয়ে পুলকালােক সঞ্চারিত হইয়াছিল। খ্রষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে দেখা গেল, দক্ষিণ দিক হইতে অনুকূল পবনে একখানি জাহাজ আসিতেছে। জাহাজ কাহার, জানিবার জন্য গুলবদ, গুলু-ইজার ও খাজা ইয়াহিয়ার সহিত যুক্তি করিয়া একখানি নৌকা পাঠাইয়া দিলেন। সৌভাগ্যক্রমে সম্রাটের জনৈক কর্মচারী বায়াজীদ বিয়াৎ স্ত্রীপুত্রগণসহ ঐ জাহাজে আরােহী ছিলেন। অনুকুল পবনের দুল্লভ সুযােগ উপেক্ষা করিয়া বায়াজীদ স্বীয় পােতের গতিরােধ করাইয়া, সংবাদ আদান-প্রদান- পূৰ্ব্বক রাজ-পরিবারের অবস্থা-সঙ্কট বুঝিলেন, এবং সম্ভবত ইহারই চেষ্টায় বেগমগণের ভারত-প্রত্যাগমনের জন্য জাহাজের সুব্যবস্থা হইয়াছিল। * J. A. S. B. 1898, p. 315, [ ১০ ] মােগল-বিদুখী - ঠিক কোন্ সময়ে রাজ-পরিবার এডেন ত্যাগ করেন, অথবা কখন তাহারা সুরাটে আসিয়া উপনীত হন, তাহা নিশ্চিতরূপে জ্ঞাত হওয়া যায় না।। আবুল ফজলের মতে ৭ মাস, বদায়ূনীর মতে এক বৎসর, গুলবদকে এডেনে থাকিতে হইয়াছিল। তবে এ কথা নিশ্চয় যে, ১৫৮০ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বায়াজীদের জাহাজ যখন এডেনের সন্নিকটে উপস্থিত হয়, সে সময় যাত্রীদল তথায় স্বদেশ- প্রত্যাগমনের আশায় দিনাতিপাত করিতেছিলেন। প্রত্যাগত যাত্রীদল এডেন হইতে যাত্রা করিয়া সুরাট বন্দরে অবতরণ করিলে, তথায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত আরম্ভ হয়। সম্রাটও তখন রাজধানী হইতে সুদূর জবুলিস্থানে (কাবুলে) অবস্থান করিতেছিলেন। সুতরাং রাজ-পরিবারবর্গ পুনরায় দীর্ঘকালের জন্য সুরাটে অবস্থান করিতে বাধ্য হইলেন। অবশেষে ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে (৯৯০ হিজরা) সকলে ফতেপুর সীরীতে উপনীত হন। + এই প্রসঙ্গে বেভারিজ, মহােদয় ( H. Beveridge) বিস্তৃত আলােচনা করিয়াছেন। Akbarnama, iii. 57o. + আবির ১৫৮১ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই ফেক্ৰয়ারী পঞ্চাব ও কাবুল- গমনােদ্দেশে রাজধানী ত্যাগ করেন, এবং ১লা ডিসেম্বর প্রত্যাবর্তন [ ১০৯ ] মােগনবিদুষী রাজধানী-আগমনের পথে গুলবদন রাজ-পরিবারবর্গ- সহ আজমীরে চিশতী ফকীরদিগের পুণ্যপীঠদর্শনে গমন করেন। তথায় কুমার সলীমের (উত্তরকালে জাহাঙ্গীর) সহিত তাহাদের সাক্ষাৎ হয়। তখন প্রায় প্রত্যহ এক একজন আমীর সম্রাটের অভিবাদন ও সাদর-সম্ভাষণ বহন করিয়া গুলবদসকাশে আগমন করিতেন। অবশেষে ভরতপুর-রাজ্যের খানুয়া নামক স্থানে বেগমদিগের সহিত সম্রাটের সম্মিলন হয় (১৫৮২ এপ্রিল)। ফতেপুর-সীরীতে এক বিসদৃশ ব্যাপার গুলবদনের ভাবতঃ স্থিরচিত্তকে বিচলিত করিল। গুল, দেখিলেন, একোয়াভাইভা নামক জনৈক খ্ৰীষ্টধর্মযাজক কুমার মুরাদকে উক্ত ধৰ্ম্মের নীতি শিক্ষা দিতেছেন। আর যে খ্রীষ্টধর্মের পবিত্র নিদর্শনসমূহের উপর প্রগাঢ় শ্রদ্ধাসম্পন্ন এবং এই ধর্মপ্রাণ বিদ্বান্ মিশনরীকে বিশেষ প্রীতির চক্ষে দেখেন, গুল, ইতঃপূৰ্বে তাহা শুনিয়াছিলেন। একোয়াভাইভা বলেন, * খ্রীষ্টধর্মের প্রতি সম্রাটের এই প্রতিদৃষ্টিতে হামীদ। বানু-প্রমুখ রাজ-আত্মীয়গণ সাতিশয় অপ্রসন্ন হইয়া উঠিলেন, এবং ইহাদের অসন্তোষধ্বনি যে গুলবদন ও # Father Goldie's First Christian Mission to the Great Mughal. [১১] মােগল-ৰিী সম্রাটের হিন্দুপত্নীগণের কণ্ঠনিত বিলাপে পরিবর্ধিত হইয়া- ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। সমগ্র হারেমের প্রতিকূলতায় সম্রাট, একোয়াভাইভাকে আর আশ্রয় দিতে পারিলেন না। বিদায়-গ্রহণকালে পাদ্রী সম্রাটের নিকট হইতে কেবল গােয়া পর্যন্ত গমন করিবার পাথেয় গ্রহণ করিলেন। এই সময়ে হামীদা বানু বেগমের মহলে একজন রুষবাসী পুরুষ ও তাহার স্ত্রী, ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীরূপে সন্তানাদিসহ অবস্থান করিতেছিল। পাদ্রী হামীদার নিকট ইহাদের মুক্তি ভিক্ষা করিলেন। হামীদা প্রথমে অনিচ্ছুক ছিলেন ; কিন্তু সম্রাট, কখনও একোয়াভাইভার প্রার্থনা অগ্রাহ করিতেন না। তীর্থ হইতে প্রত্যাবৃত হইয়া গুলবদন্ আগ্রার রাজ- ভবনে হুমায়ূন্-নামা’ রচনা করিতে আরম্ভ করেন। অন্য কোথাও এই পুস্তক-সম্বন্ধে কোন উল্লেখ না থাকিলেও, গ্রন্থখানি নিজেই আপনার অস্তিত্ব-পরিচয় প্রদান করে। ইহা সাহিত্য-হিসাবে রচিত হয় নাই; আবুল ফজলের ‘আবর-নামার’ উপকরণ-স্বরূপে লিখিত। সাম্রাজ্য বা রাজদরবারের যে-সকল ঘটনা গুল, স্বয়ং জানিতেন বা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হইয়াছিলেন, এ গ্রন্থে তাহাই লিপিবদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু হুমায়ূন্-নামা’ সাহিত্য-রচনার উদ্দেশ্যে [১১] ;

মােগল-বিশী
লিখিত না হইলেও তৎকাল-প্রচলিত রীতি অনুসারে গুল,
বহুল ফার্সী কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। সাহিত্যে যে
তাহার প্রগাঢ় অনুরাগ ও জ্ঞানস্পৃহা অতীব বলবতী ছিল,
তাহা তাহার সংগৃহীত গ্রন্থরাশি ও প্রতিষ্ঠিত পুস্তকাগার
হইতে নিঃসংশয়ে অনুমান করা যায়। মীর মহদী শীরাজী
রচিত ‘তাজকিরতুল,-খওয়াতীনে’ গুলের কোন কবিতার
এই দুইটি চরণ উদ্ধৃত আছে :-
“হর পরী কে উ বা-আশিক-ই-খুদ ইয়ার নীস্ত।
“তু ইয়াকীন্ মীদান্ কে হেচ, অজ, উম ব-খুরদানীন্ত।”
অর্থাৎ, নিজ প্রেমিকের প্রতি বিমুখ পরী! তুমি নিশ্চয়
জানিও যে, কেহই জীবন-রূপ ফল পূর্ণরূপে আস্বাদন করে
। [ অর্থাৎ জীবন নশ্বর, তাহার মধ্যেই যতটুকু পার
সুখভােগ করিয়া লও।}
সাম্রাজ্যের শাসন-সংরক্ষণে বা রাজনৈতিক ব্যাপারে
গুলবদন্ কখন হস্তক্ষেপ করিতেন না। দুর্গাবতী বা
চাঁদ সুতানার ন্যায় অরিহৃদয়ে,অসিমুখে রক্তরেখায় তাহার
নাম কখন লিখিত হয় নাই; কিন্তু দীনদুঃখীর অন্তরে
কৃতজ্ঞতার উজ্জ্বল অক্ষরে করুণাদেবী স্বয়ং যে নাম লিখিয়া-
ছিলেন, তাহা খােদার পুণ্য নামের সহিত নিত্য উচ্চারিত
হইত।
[ ১১২]

মােগ-বি অবােধ-প্রথার প্রচলনে ভারত-মহিলাগণের কাৰ্য্যের পরিধি অতি সঙ্কীর্ণ; কদাচিৎ অন্তঃপুর-নেপথ্যের বহির্ভাগে সংসার-রঙ্গমঞ্চের উপরে তাহাদের গৌরবাভিনয় প্রদর্শিত হয় ; তথাপি এই নেপথ্যাভিনয়ের অলক্ষ্য প্রভাব মানব অন্তরে অন্তরে অনুভব করে ;-গুল, তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থল। বাবর-দুহিতা বালিকা গুন্ পিতার অসীম স্নেহপাত্রী ছিলেন; পরে হুমায়ূনের রাজত্বকালে সুখে-দুখে ভ্রাতৃমুখে স্নেহময়ী ভগিনীর নাম ; অতঃপর ভ্রাতুষ্পত্র আর পিতৃত্বসাকে যে অসীম শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন, ইতিহাসে সে নিদর্শনের অভাব নাই। সম্রাট বহুবার বহুমূল্য রত্ন- রাজি তাহাকে উপহার দিয়াছেন (Bad. ii.332) এবং কখন তাহার কোন উপরােধ উপেক্ষা করিতেন না। গুদ ও সলীমা সুলতানের অনুরােধেই তিনি বিদ্রোহী কুমার সলীমূকে মার্জনা করিয়াছিলেন। কে বলিবে এইরূপ কত গুরুতর ব্যাপারে এই ধর্মপ্রাণ মহিলার অদৃশ্য-প্রভাব উদ্যত অশনির পতনরােধ না করিয়াছে ? পর পর ভারতের দুইজন প্রতাপশালী সম্রাটকে কল্যাণের পথে চালনা করিয়া সাম্রাজ্য ও সংসারের প্রভূত মঙ্গলসাধন করিয়াছে। সংসারে একজাতীয় নারী আছেন যাহাদিগের সাহস ও বীর্যবত্তা বীরকার্যে ব্যক্ত হয় না ;-প্রকাশ পায় মুক {১১৩]

মােগল-বিদুষী
সহিষ্ণুতায় ;-যাঁহাদিগের কাৰ্য্যের অভিব্যক্তি কল্যাণে।
গুন্ সেই শ্রেণীর মহিলা। সূৰ্য্য নীরবে উদয় হন-নীরবে
অস্ত যান; কিন্তু তাহারই আলােকে এই বৈচিত্র্যময়ী সৃষ্টি
মানবের দৃষ্টিগােচর হয়। যে-সকল কীর্তি ইতিহাস গৌরবে
কীৰ্ত্তন করে, গুল, সেরূপ কীৰ্তিশালিনী ছিলেন না; কিন্তু
উদীয়মান মােগল-সাম্রাজ্যের উপর এই বিদুষী মহিলা
হুমায়ূন্-নামায় যে উজ্জ্বল আলােকপাত করিয়াছেন, তাহাই
তাহার জীবনের অপূর্ব গৌরবময়ী কীৰ্ত্তি এবং সেইজন্যই
তিনি ইতিহাসেবিগণের কৃতজ্ঞতা ও অক্ষয় শ্রদ্ধার
অধিকারিণী। গুলবদনের গৌরব-সৌরভ ঐতিহাসিক
জগতকে চিরআমােদিত করিবে।
গুলবদনের আয়ু-সূৰ্য্য জমে ধীরে ধীরে অস্তাচল
অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিল; জীবনালােক ম্লান হইয়া
আসিতেছে। মৃত্যুর
দূরপ্রসারিণী দীর্ঘছায়াপাতে চক্ষু
জ্যোতিহীন; কিন্তু বিশ্বাস, ধর্ম, পুণ্য, পবিত্রতায় তাহার
অন্তরের দীপ্তি উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিতেছে। ইতিমধ্যে
একবারমাত্র ইতিহাসে প্রসঙ্গতঃ তাহার নামােল্লখ দেখা
বায়—গুলের বক্রম তখন ৭• বৎসর। ‘আকবরনামায়
প্রকাশ, সেই সময় তাহার দৌহিত্র মুহম্মদ-ইয়ার সম্রাটের
বিরাগভাজন হইয়া রাজ-দরবার পরিত্যাগ করেন।
;
[ ১১৪ ]

মােগল-বিদুখী ইহার পর আরও ১০ বৎসর কাটিয়া গেল। আ- বরের অর্ধ শতাব্দীব্যাপী রাজ্যের দীর্ঘ দিবাও অবসানপ্রায়। এই সময় গুলের জীবনে কাল-রজনী উদিত হইল। ১৬৩ খ্রষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে অশীতিবর্ষ বয়সে গুল, আগ্রায় শেষ-শয্যা গ্রহণ করিলেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত চিরসঙ্গিনী হামীদা তাহার শয্যাপাশ্বে,-ননদিনীর শুশ্রুষা- ভার আর কাহারও হস্তে দিয়া তিনি নিশ্চিন্ত নহেন। হামীদ। ননদিনীকে আদরে ‘জিউ’ (মহাশয়া) বলিয়া সম্ভাষণ করিতেন। যখন দেখিলেন, অন্তিম-শয্যাশায়িনীর চক্ষে মৃত্যুর করাল-ছায়া ঘনাইয়া আসিতেছে,-রুগ্ন ভগ্নদেহ হইতে চিরমুক্তি লাভ করিবার জন্য জীবনশ্বাস চঞ্চল হইয়াছে, তখন তিনি স্নেহভরে চিরতরে একবার শেষ সম্ভাষণ করিলেন-‘জিউ’? উত্তর না পাইয়া হামীদা পুনরায় নাম ধরিয়া ডাকিলেন—‘গুলবদন্? মুমুষু ধীরে ধীরে চক্ষুরুন্মীলন করিয়া ভগ্নকণ্ঠে বহুকষ্টে বলিলেন- ‘আমি মরিতেছি, তুমি চিরজীবিনী হও। যে চক্ষু মােগল- ভাগ্যরবির প্রাতখান দেখিয়াছিল, তাহা চিরনিমিলিত হইল। পিতৃম্বসার প্রতি অসীম শ্রদ্ধাসম্পন্ন ভারত-সম্রাট কিছু দুর শবাধার বহন করিয়া চলিলেন। নীরব অশ্রুপাত ও [ ১১৫ ]

মােগল-বি
ভাষাহীন দীর্ঘশ্বাস তাঁহার মুক মৰ্ম্মবেদনার পরিচয় দিতে
লাগিল। দেহচ্যুত আত্মার শান্তির নিমিত্ত বৃদ্ধ সম্রাট
সৎকার্যে বহু অর্থব্যয় করিলেন। মৃন্ময় দেহ মৃত্তিকায়
সমাহিত হইল।
কিন্তু ধর্মে প্রগাঢ় নিষ্ঠাবতী, কর্মে কর্তব্যপরায়ণা,
পতিপুত্র-পরিজনে একান্ত স্নেহশালিনী, সহৃদয়-সৌজন্য ও
সারল্যের অবয়বী প্রতিমা গুল, শমনের অন্তঃপুর সমাধির
অভ্যন্তর হইতে কালের নিবিড় আবরণ ভেদ করিয়া
আমাদের মানস-পটে উদিত হন। তখন আমাদের মনে
হয়, যেন চিরপরিচিত সুহৃদকে হারাইয়াছি।
[ ১১৬ )

প্রমাণ-পঞ্জী জে-উন্নিসা :- Padishahnama-Abdul Hamid, ii, 22. Muntakhab-ul-Lubab-Muhammad Hashim Khafi Khan, i. 590. Masir-i-Alamgiri-Saqi Mustaid Khan, pp. 462,538. Alamgirnamah, p. 836. Faiyyas-ul-Qawanin, p. 369. Masir-ul-Umaru, ii. 328, Makhsan-ul-Gharaib. Ahmad Ali Sandilavi (i218 A, H.) Khuda Bakhsh MS., p. 32. Gal-i-rama, f, ii9. History of durangsib-Prof. Jadunath Sarkar, M. A., i, 68-70; iii. 60-62, 416. Catalogue of Persian Mss. in the British Museum by I'r, Rieu, ii, 702b. Studies in Mughal India, Prof. Jadunath Sarkar, M.A, pp.79-90. ‘জেব-উন্নিসা কি কলঙ্কিনী ? অধ্যায়চী এই গ্রন্থে প্রদত্ত Zeb-unnissa প্রবন্ধের অংশবিশেষের সারসঙ্কলন। Bankipur (riental Public Library Catalogue of Mss. Persian Poetry' by Khan Sahib Abdul Muqtadir, iii. 250-1. ‘দেওয়ান-ই-মখফী কি জেব-উন্নিসার? অধ্যায়টী খাঁ সাহিবের রচনা-অবসানে লিখিত ; তিনি দেওয়ানের বিস্তৃত সমালােচন ও পরীক্ষা করিয়াছেন। Beale's Oriental Biographical Dictionary, ed, by Keene, p. 428.

গুলবদন :- Humayun-nama by Gulbadan Begam trans, by A. S. Beveridge, (Oriental Trans, Fund), 1902. গুলবদনের প্রদত্ত তারিখগুলি একটু সাবধানে গ্রহণ করা উচিত। স্থলবিশেষে গুলবদন্ ভ্রাতৃদ্বয় হিন্দাল, ও হুমায়ূনের দোযাদি ঢাকিবার চেষ্টা করিয়াছেন। বিদুষী বেভারিজ-পত্নী-লিখিত হুমায়ূন-নামার Introduction (pp. 1-79) অতি অপূৰ্ব্ব-প্রত্যেক মােগল- ইতিহাস-আলােচনাকারীর অবশ্যপাঠ্য। মৎচিত, গুল বদন প্রবন্ধটা প্রধানতঃ ইহারই সাহায্যে রচিত। Akbar-nama by Abul-Fazl 'Allamtrans, by H. Beveridge. I. C. S. (Bibliotheca Indica), Vol. III. Muntakhab-ut-Tawarikh Abdul Kadir Al Badauni, trans, by W. H. Lowe, Vol. II. Humayun-nama by Bayazid Biyat as trans. by H. Beveridge in . A, S. B., i898)

শ্ৰীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-প্রণীত
মােগল-মুগে শ্রীশিক্ষা
( ইতিহাসচাৰ্য অধ্যাপক শ্ৰীযদুনাথ সরকার, এম-এ,
পি-আর-এস, আই-ই-এলিখিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভুমিকা)
সুন্দর রঙ্গীন্ প্রচ্ছদ-পট এবং বহু-চিত্র সুশশাভিত।
মূল্য দশ আনা।
কে বলে, মােগল-মহিলাগণ অসার আমােদ-প্রমােদ
ও বিলাসে বিভাের হইয়া অত্যন্ত শােচনীয়ভাবে তাহাদের
অশিক্ষিত জীবন যাপন করিতেন ? গ্রন্থকার প্রভূত পরিশ্রমে
ইতিহাসের পৃষ্ঠা হইতে, সুললিত ভাষায়, মােগল-বাদশাহ
জাদীগণের সুশিক্ষা, সাহিত্য-প্রতিভা, সুরুচি প্রভৃতির
পরিচয় এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এরূপ পুস্তক
প্রত্যেক হিন্দু ও মুসলমানের অবশ্যপাঠ্য।
অধ্যাপক শ্রীযােগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার,
বিএঃ-“আমরা ইহা পড়িয়া বিশেষ তৃপ্তিলাভ করিয়াছি,
অনেক নূতন বিষয় শিখিয়াছি। আমরা সকলকেই
অসূৰ্য্যম্পশ্যা মােগল-রমণীদের এই অভিনব চিত্র পড়িতে
অনুরােধ করি।” (ভারতবর্ষ’-ভাদ্র, ১৩২৬)
BENGALEE (d/- 20.7-19) :-"The book is
written in excellent style, is educative and will
be read with absorbing interest."

বেগম সমক ( ঐতিহাসিক চিত্র) ৮খানি সুন্দর হাফটোন চিত্র শশাভিত, মূল্য ॥ [ প্রবীণ সাহিত্যৰথী ভারতবর্ষ’-সম্পাদক শ্রীযুক্ত জলধর সেন-লিখিত ভূমিকা-সম্বলিত।] এই প্রাচ্য-মহিলার অপূর্ব জীবন-কথা ঘটনা বৈচিত্র্যে ও অবস্থা-বিপৰ্যয়ে উপন্যাস-বর্ণিত কাহিনী অপেক্ষাও চিত্তাকর্ষক। বেগম সমরুর অমানুষী প্রতিভা, অসামান্য প্রভুত্ব, অপরিমেয় দানশীলতা, সর্বোপরি রণস্থলে তাহার শৌর্য-বীর্যের কথা পাঠ করিলে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। Bengal Administration Report (19f7-18) প্রসঙ্গে সুবিখ্যাত Independent পত্রের কলিকাতা সংবাদদাতা লিখিয়াছেন, i The Bengal Administration Report issued 4 or 5 days ago is to say the least of it-all gammon! It has no good poetry nor first class literature was produced in Bengal during the year under review despite Tagore. It however appreciated Begam Samru by Mr. Brojendranath Banerji and acknowledges that it is the best book of the year so far as bivgraphies are concerned." (Independent, d/- 31-8-19.)

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mogal-bidushi

Author
Bandopadhyay,brajendranath
Title
Mogal-bidushi
File name
Mogal-bidushi
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2010/04/21
Publisher
M.nasiruddin, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
133
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Sprengar Saheb
DLI number
510503
Barcode
4990010016287.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XHO4cMRAGeB
Download PDF

Mogal-bidushi