Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Swargio Gangadhar Ghosh Thakurer Atmacharit
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
[ বাসরে বন্ধুগণমধ্যে বিতরণ - ]
[ পুনহিত]
স্বর্গীয়
গাধর ঘােষess
আত্মচরিত
কুমার ঘােষ, বি-এ কর্তৃক
সঙ্কলিত ও প্রকাশিত।
c/o রায় যামিনীমােহন ঘােষ, বাহাদুর
ডেপুটী কালেক্টর, আলীপুর ।
আষাঢ়, ১৩৪•
১৬নং টাউসে, রােত, ভবানীপুর,
কালীরা প্রেস হইতে
বিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায়
কর্তৃক মুদ্রিত।
অবতরণিকা •• স্বর্গীয় গঙ্গাধর ঘােষ মহাশয় মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অতি সংক্ষিপ্ত- ভাবে আত্মচরিত রচনা করিয়াছিলেন। তাহার লিখিত এই আত্মচরিত পাঠ করিয়া আমরা তৃপ্তিলাভ করিতে পারি নাই। যে সময় তিনি ইহা লিখিয়াছিলেন, সে সময় তিনি শয্যাশায়ী, তখন মৃত্যুর কালছায়া ধীরে ধীরে তাহাকে আচ্ছন্ন করিতেছিল। নিজের জীবনালেখ্য লিখিবার ইহা উপযুক্ত সময় নহে; এ অবস্থায় কেহই এরূপ ব্ৰত সুসম্পন্ন করিতে পারে না। মৃত্যুশয্যা আলিঙ্গন করিয়াও গঙ্গাধর বাবু যে তাহার “আত্মচরিত” লিখিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, ইহাতে আমরা বিস্মিত হইয়াছি। “আত্মচরিতে” কেহই গঙ্গাধর বাবুর গুণগরিমার পরিচয় পাইবেন । তাহার গুণের কোন কথাই ইহাতে নাই। গঙ্গাধর বাবু আত্ম- প্রশংসা কীৰ্ত্তন সুরুচিবিরুদ্ধ মনে করিয়াছিলেন, আত্মগৌরব প্রকাশ করিতে সঙ্কুচিত হইয়াছিলেন । এই জন্যই গঙ্গাধর বাৰু তাহার গুণাবলী বর্জন করিয়া “আত্মচরিত লিখিয়াছেন। বাস্তবিক গঙ্গাধর বাবু যথার্থ গুণবান, ব্যক্তি ছিলেন, তাঁহার চরিত্র- মাধুর্যে সকলেই মুগ্ধ হইতেন। তাহার অন্তিম সময়ের কয়েকটা কথা চাকমিহির পত্রে প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে পাঠক তঁাহার ধর্ম বিশ্বাসের পরিচয় পাইবেন। গঙ্গাধর বাৰু আঁহার সদগুণরাশি জনসমাজ হইতে প্রচ্ছন্ন রাখিতেন; অতি অল্প লােকেই সেই সকল গুণের কথা জানিতেন। কেহ তাহার জীবনের সকল কথা লিপিবদ্ধ, এবং চরিত্রের বিশ্লেষণ করিয়া একখানা জীবনচয়িত লিখিলে পাঠকের প্রীতিকর হইবে। যিনি অক্লান্ত শ্রম ও অধ্যবসায়ে আত্মােন্নতি সাধন করিয়া- ছিলেন, নিজ চেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠা লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন, জনসমাজের চক্ষুর অন্তরালে পরহিতব্রত গ্রহণ করিতেন, তাহার চরিত-কথা নিশ্চয়ই শিক্ষাপ্রদ হইবে। আশা করি, গঙ্গাধর বাবুর যােগ্য পুত্রগণ মধ্যে কেহ তাহার বিস্তৃত জীবনী লিখিয়া জনসমাজে তাহার গুণের মর্যাদা প্রকাশ করিবেন। শ্রীবৈকুণ্ঠনাথ সােম, চাহমিহির সম্পাদক।
৫%-:::::::
o
সুগায় গঙ্গাপৰ গেম ঠকুর
সুগীয় পর্ণলক্ষী দেব
হইৰে। যিনি অক্লান্ত এ ও অধ্যবসায়ে আত্মােন্নতি সাধন করিয়া- ছিলেন, নিজ চেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠা লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন, জনসমাজের চক্ষুর অন্তরালে পরহিতব্রত গ্রহণ করিতেন, জহার চরিত-কথা নিশ্চয়ই শিক্ষাপ্রদ হইবে। আশা করি, গঙ্গাধর বাবুর ঘােগ্য পুত্রগণ মধ্যে কেহ তাহার বিস্তৃত জীবনী লিখিয়া জনসমাজে তাহার গুণের মর্যাদা প্রকাশ করিবেন। বৈকুণ্ঠনাথ সােম, চানিহির সম্পাদক।
r
স্বর্গীয় গঙ্গাধর ঘোষ ঠাকুর
স্বর্গীয় পূর্ণলক্ষী দেবী
No text on this page.
স্বর্গীয় গঙ্গাধর ধােষ ঠাকুরের আত্মচরিত
বঙ্গজ কায়স্থ জাতির মধ্যে কার্ণ ঘােষ নামে প্রসিদ্ধ কুলীন চন্দ্রদ্বীপে
ছিলেন, তাহার বৃদ্ধ প্রপৌত্র ছয়কড়ির পুত্র কামদেব ঘােষকে যশােহরের
রাজা বিক্রমাদিত্য যশােহর নিয়া কায়স্থ সমাজ স্থাপন করেন (১)। এই
||
(১) “বসন্ত রায় যে সকল বঙ্গজ কায়স্থ কুলীনগণকে বিত্তদান
পূৰ্ব্বক প্রতিষ্ঠা করেন তাহারাই যশােহর সমাজভুক্ত কুলীনগণের আদি
পুরুষ। পশ্চাৎ তাহাদের বংশধরগণের নানাস্থানে বাস পরিবর্তন
ঘটিয়াছে”—বঙ্গীয় সমাজ ১৬৯ পৃঃ। মহাত্মা ধ্রুবানন্দ মিশ্র প্রণীত “কায়স্থ
কারিকা” গ্রন্থে এই সম্বন্ধে এইরূপ বর্ণিত আছে :
ছকড়ী কুলীন শ্রেষ্ঠো নবগুণৈস্তু সংযুতঃ।
মহাকুলমাপ্নোতি চন্দ্রদ্বীপে প্রতিষ্ঠিত।
পুত্রদ্বয়ঞ্চ তত্রৈব মধুকামৌ প্রকীর্তিতে।
যথা দিবাকর তেজো নিৰ্ম্মলং কুলমস্য চ।
তথা মধুকুলীন নবভিগুণকৈযুতঃ।
দ্বারকায়াং কামদেব: শ্রীকৃষ্ণ তনয়াে যথ।।
তৎসমঃ কামঘােষ কুলীনেষু প্রতিষ্ঠিত।
চন্দ্রদ্বীপং পরিত্যজ্য পরিবার সমন্বিত ।
যশরে কামঘােষশ্চ মধু বিক্রমমাযযৌ।
কামস্য পুত্র একশ রত্নাকরাে গুণান্বিত ।
ইহার ভাবার্থ :-ছকড়ি শ্রেষ্ঠ কুলীন, নবগুণ সম্পন্ন, মহাকুলযুক্ত
ও চন্দ্রদ্বীপ বাসী। তাহার দুই পুত্র মধু ও কামদেব। দিবাকরের
আত্মচরিত
কামদের ঘােষের পৌত্র রঘুনাথ ঘােষ ঠাকুর ছিলেন ; যশােহরে তিনি
বাস করিতেন (১)। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞ, বুদ্ধিমান, ও বিচক্ষণ লােক
তেজ যেরূপ নিৰ্ম্মল তদ্রুপ মধুঘােষের কুল নির্মল। দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের
পুত্র যেরূপ কুলীন তদ্রুপ কামদেবও কুলীন বলিয়া প্রতিষ্ঠিত। পরিবার
সহ কাম ঘােষ চন্দ্রদ্বীপ পরিত্যাগ পূর্বক যশােহরে এবং মধু বিক্রমপুরে
বাস করেন। কামদেবের পুত্র রত্নাকর।
অযযাধ্যায়াং দশরথঃ কুলাংশে কুলনায়কঃ।
রত্নাকর থাক্তেয়াে রঘুনাথশ্চ তৎসুতঃ ।
রঘুরেব রঘুজ্ঞেয়াে রত্নাকর সমুদ্ভবঃ।
তদ্বীপধরণী ধন্যা যত্র তত্র স্থিতে রঘু।
কুলীনঞ্চ বিজানীয়াৎ নবভিগুণকৈযুতং।
তথৈব রঘুনাথ কুলীনঃ কুলতিলকঃ ।
কুলীনস্তৎ সমশ্চৈব ন ভূতাে ন ভবিষ্যতি ।
গুণে বাসব সমাে রূপে কৰ্প সন্নিভঃ ।
মানে চ কৌরব সাক্ষাৎ দানে কর্ণ সমােহভবৎ।
সরস্বতী সমা বিদ্বান্ সর্বশাস্ত্র বিশারদ।
বৃহস্পতি সমাে বাগ্মী জ্ঞানে চ শঙ্কর যথা ।
যুদ্ধে অর্জুন তুল্যশ্চ বিচারে রাঘবােপমঃ ।
বিভীষণ সমাে মন্ত্ৰী সৰ্বধৰ্ম্মবিদাম্বর।
দিল্লীশ্বর মন্ত্রিত্বং তথা তেন স্বলভ্যতে ॥
সন্তান সন্ততিস্তস্য যত্ৰ যত্র বসেদধ্রুবং।
তত্র তত্র কুলং তেষাং পতনং নহি বিদ্যতে ।
কায়স্থ কারিকা
ইহার ভাবার্থ:-রঘুনাথ রত্নাকরের পুত্র। তিনি কুলীন নবগুণ
আত্মচরিত ছিলেন ও পার্সি ভাষাতে একজন পণ্ডিত ছিলেন। তিনি দিল্লীর বাদসাহের দরবারে উচ্চপদের কর্মচারী নিযুক্ত হন, অনেক দিন ক্ষমতার সহিত কাৰ্যনিৰ্বাহ করেন। রাজা মানসিংহের সময় যে যশােহরের রাজা প্রতাপাদিত্যের নিতান্ত লাঞ্ছিত হইয়া কাশীধামে কয়েদী অবস্থায় মৃত্যু হয় ইহা ইতিহাসাদি গ্রন্থে অনেকেই অবগত আছেন ; সেই সময় ঐ দেশে রাজবিপ্লব হয় এবং রঘুনাথ ঘােষঠাকুরের মৃত্যু হওয়াতে তৎপুত্র বাণীনাথ ও জগন্নাথ ঘােষঠাকুর (৩) নিরুপায় হইয়া যশােহর ছাড়িয়া সম্পন্ন ও কুলতিলক। ততুল্য কুলীন হয় নাই বা হইবে না। তিনি কন্দর্প তুল্য রূপবান, বাসব সদৃশ গুণবান, কৌরব সদৃশ মহামানী, কর্ণ সম দানশীল, সরস্বতী তুল্য বিদ্বান্, সর্বশাস্ত্রবো, বৃহস্পতি তুল্য বাগ্মী, শঙ্কর সদৃশ জ্ঞানবান্, অর্জুন তুল্য যােদ্ধা রাঘব সদৃশ বিচারক, বিভীষণ তুল্য মন্ত্রী এবং সর্বধর্মজ্ঞ তিনি দিল্লীশ্বরের মন্ত্রীত্বপদ প্রাপ্ত হইলেন। তাহার সন্তানগণ যে যে স্থানে বসবাস করিয়াছেন সেই সেই স্থানে তাহাদিগের কুলের অধােগতি হয় নাই। রঘুনাথ দিল্লীতে অত্যন্ত পীড়িত হন। দিল্লীতে উপযুক্ত চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসিত হইয়াও পীড়ার কোন উপশম না হওয়াতে স্বদেশে ফিরিয়া আসেন। দেশে আসিয়া কতকদিন পরে মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁহার পত্নীও চিরপ্রথানুযায়ী পতির সহমরণে গমন করেন। বাণীনাথজগন্নাথে রঘুনাথস্য আত্মজে রাজবিপ্লবনে নৈব বাজুদেশ সমাগতো । কায়স্থ কারিকা। ইহার ভাবার্থঃ-বাণীনাথ ও জগন্নাথ রঘুনাথের পুত্র। রাজবিপ্লবে বাজুদেশে গমন করেন।
৪
আত্মচরিত
বাজু প্রদেশে আগমন করেন। তখন কাগমারীর জমিদার যাদবেন্দ্র রায়
তঁাহার কন্যাকে উক্ত জগন্নাথ ঘােষের সহিত বিবাহ দেন, ও প্রথমে
ঘােষপুরে ও পরে আদাজান গ্রামে (১) তাহাদের বাড়ী করিয়া দিয়া স্থাপন
সরকার বাজুহা সরকার বরবাকবাদ হইতে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হইয়া
শ্রীহট্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এবং রাজসাহী, বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ জেলার
কতকাংশ লইয়া ঢাকা সহরের দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। বাজু পারস্য শব্দ,
বাহু বা ডানা জ্ঞাপক ; এই সরকারের সমুদায় পরগণার নামেরই শেষে
Tree **** forBlochmann's (reography and History of Bengal.
(১) বাজু সমাজ বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত টাঙ্গাইল
মহকুমা ও ঢাকা জেলার মাণিকগঞ্জ মহকুমা বিস্তৃত। আদাজানের
ঘােষ বংশ পত্রিকায় এই বিষয়ের যে বর্ণনা পদ্যে লিখিত আছে তাহা
নিম্নে উদ্ধত করা গেল,
“যশাের নগরে বাস ভাই দুইজন।
পিতামাতা হীন হয়ে উৎকন্ঠিত মন ।
রাজবিপ্লবনে ছিন্ন ভিন্ন হলো দেশ।
বাণীনাথ জগন্নাথ চিন্তিয়া অশেষ ।
যশাের ত্যজিয়া দেহে চলে বাজুদেশ।
আমডালা নগরেতে করিল প্রবেশ ।
তথাকার অধিকারী ছিল কর বংশ।
ধর্মলেশ নাহি তার বড়ই নৃশংস ॥
পরিচয় দোহাকার পেয়ে সেই কর।
যতনে রাখিল নিয়া আপনার ঘর ।
মনে মনে বিচারিয়া বলে সেই কর।
ভ্রাতৃদ্বয়ের অগ্রভাগে বুড়ি দুই কর।
আত্মচরিত
করেন; এবং প্রায় ২৭ খানি মৌজা যৌতুকস্বরূপ তালুক দেন, তৎপর
জগন্নাথ ঘােষঠাকুরের অনেক সন্তানাদি হয়।
মাের ঘরে দুই কন্যা আছে সুলক্ষণা।
তাদিগেরে পরিণয় কর দুইজনা ।
হলাে দেহে অস্বীকার,
ক্রোধে জলে দুরাচার,
বলে কর শুন মাের বাণী।
যদি বিয়ে না করিবে, তার প্রতিফল পাবে,
পদ্মানদী মধ্যে যাবে প্রাণী।
দুই ভাই হয়ে ব্যস্ত, পলায়ন করে এত্ত,
ধৃত হলাে বাণীনাথ ঘােষ।
কহে কর ধীবরেরে, ছালাতে ভরিয়া এরে,
পদ্মাতে ডুবালে নাহি দোষ ।
নাবিকের অতঃপরে,
বাণীনাথে ধরি করে,
ত্বরা ভরি ছালার ভিতর।
ত্বরিতে তাহাকে নিয়ে, চলে পদ্মানদী বেয়ে,
মধ্যে নিল হইয়ে সত্বর।
বলে শুন মহাশয়,
বিয়ে কল্পে প্রাণ রয়,
নহেত পদ্মায় ডুবাইব।
ভাবে বাণী মনে মন,
করিয়াছি এই পণ,
মরি তবু বিয়ে না করিব।
মেরি ভাই জগন্নাথ,
মিস্ সেই করকি স্যা,
বেটা বেটিকো না দিবে গা বিয়া।
যব তক মহে ওস্কিবংশ, করে ইয়া কৌল ধবংস,
বাণীনাথ পদ্মায়ে রহা গিয়া ।
আত্মচরিত এই জগন্নাথ ঘােষঠাকুরের বংশধরগণ মধ্যে জয়নাথ ঘােষ- ঠাকুর মুর্শিদাবাদের নবাব হুমায়ুনের আমলে দেওয়ান ছিলেন। ধীবরেরা এতগুনি, পাপ তাপ নাহি গণি, ডুবাইল পদ্মায় আমার। জগন্নাথ শুনি মুগ্ধ, হলাে শােকানলে দগ্ধ, প্রেতকাৰ্য্য করিল তাহার । আবুল ফজল লিখিত আকবর নামায় দেখা যায় যে তৎকালে বঙ্গের অধিকাংশ জমিদারই কায়স্থ ছিলেন। পরবর্তীকালে ইছলাম খাঁর বঙ্গ- বিজয় অভিযানে বাজু অঞ্চলের স্বাধীন কায়স্থ জমিদারগণ ইছামতী তীরে পরাজিত হন। জগন্নাথ পলাইয়া গিয়া কাগমারী পরগণার বাফলা গ্রামে উপস্থিত হন। তথাকার জমিদার যাদবেন্দ্র গুহরায় (বর্তমান সন্তোষের রাজবংশের পূর্বপুরুষ) জগন্নাথের পরিচয় পাইয়া জগন্নাথের সহিত তঁাহার কন্যার বিবাহ দেন এবং বাফলাদিগর ( ২৭ খানি গ্রাম) যৌতুক দেন। কিন্তু জগন্নাথ শ্বশুরগৃহে বাস করা শ্রেয় মনে না করিয়া আদাজান গ্রামে আসিয়া বাস করেন। যাদবেন্দ্রের ভ্রাতুষ্পত্র ইন্দ্রনারায়ণ রায় মুসলমানধর্ম গ্রহণ করিয়া ইনাতুল্ল্যা চৌধুরী নাম গ্রহণ করেন এবং ভগিনীপতির যৌতুক সম্পত্তির জন্য খাজানা দাবী করেন। ইহাতে জগন্নাথ অস্বীকৃত হওয়ায় তিনি বাফলাদিগর কাড়িয়া নেন। যৌতুক সম্পত্তির কর দিব না এই স্বীয়মত রক্ষা কল্পে বিশাল সম্পত্তি ( যাহার বর্তমান আয় একলক্ষ টাকার উপর ) ত্যাগ করিয়া নিম্নলিখিত শ্লোক আবৃত্তি করেন। “ঘবনােদুনিবার বিত্তং মে হরতে বলাৎ। বৃদ্ধোহমশ্চৈব পুত্ৰা অপিচ বালকা।
আত্মচরিত ৭ তিনি অত্যন্ত ব্যয়শীল ছিলেন (৪)। এই বংশের অনেক বিজ্ঞ বিজ্ঞ লােক নবাব বাদসাহের সময় ও তৎপর বৃটিশ গবর্ণমেন্টের আমলে বড় বড় পদের সরকারী কাৰ্য্য করিয়াছেন। তাহাদের যাদবেন্দ্র বিহীনেয়ং বাফলা নিলা গতা। অতএব ক গচ্ছামি সহায়গা নাস্তি কুচিৎ।” অতঃপর ইন্দ্রনারায়ণ ভগিনীর অনুরােধে তাহার বাসগ্রাম আদাজান নিষ্কর করিয়া দেন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এই গ্রাম যমুনা গর্ভে বিলীন হয়। (৪) স্বর্গীয় চন্দ্রকান্ত গুহ মৌলিক মহাশয়ের ‘কায়স্থ বংশাবলী’ অবলম্বনে মুর্শিদাবাদের নবাব হুমায়ুন আমলে জয়নাথ ঘােষ ঠাকুর কাৰ্য করেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তিনি পূর্ববর্তী নবাব বাবরজা ও আলীজার সময়ে নবাব সরকারে নিম্নকর্মচারী হইতে ছত্রিশ কারখানার সেরেস্তদারী পদে ও তৎপরে দেওয়ানী পদে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি মুর্শিদাবাদের সাহানগরে, পিতা বিশ্বনাথের নামে এক শিব- লিঙ্গ এবং মাতা সর্বমঙ্গলার নামে এক কালী মূর্তি স্থাপন করেন। তাহা বর্তমানে বিদ্যমান আছে। তাহাকে রাজা উপাধি দিতে চাহিলে তিনি অস্বীকৃত হন এবং তাহার জামাতা গঙ্গাধর রায়কে রাজা উপাধি দিতে অনুরােধ করেন। লােকসমাজে তিনি “লালা জয়নাথ ঘােষ ঠাকুর”— বলিয়া পরিচিত। হুমায়ুন জা রাজা গঙ্গাধরকে পদচ্যুত করেন। “Nawab Walah Jah's son Nwaab Syad Mubaraceli Khan Bahadur Humayun Jah at the age of fouteen ascended the Nizamat throne in succession of his father, When he attained bis majority and cook the management of his offices into his own hands, his first act was to disiniss Raja Gangadhar from the Nizamat Dewanship" ( History of Moorshidabad by Major Walsh. ) .
৮ আত্মচরিত পদগৌরবে এই বংশের ব্যক্তিগণ ধনে মানে সম্মানে (১) নিতান্ত উচ্চস্থান প্রাপ্ত হইয়াছিলেন; এবং মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি স্থানে এই বংশের বড় বড় লােকের কীর্তি সমুদায় বর্তমান আছে। মুর্শিদাবাদে দোতাল দালানের উপরে ঈশ্বরী কালীমাতা স্থাপিত আছেন, তাঁহার সেবাপূজা নির্বাহের জন্য জয়নাথ ঘােষ উপযুক্ত সংস্থান করিয়া গিয়াছেন। ইহাদের ঘােষপুর ও আদাজানের পাকাবাড়ী ও দীঘি পুষ্করিণী এবং যৌতুক প্রাপ্ত তালুকাদি যমুনা নদীতে ভগ্ন হইয়া যাওয়াতে ইহারা ঐ স্থান পরিত্যাগ করিয়া অন্যান্য স্থানে বাড়ী করেন। উক্ত জগন্নাথ- ঘােষ ঠাকুরের পুত্র রমানাথ প্রকাশ শ্যামবল্লভ ঘােষঠাকুরের বৃদ্ধ প্রপৌত্র সদাশিব ঘােষঠাকুরের পৌত্র আমি গঙ্গাধর ঘােষ। আমার পিতা কালীভৈরব ঘােষ। তাঁহার জ্যেষ্ঠ গৌরমােহন ঘােষ ও তাহার জ্যেষ্ঠ জগমােহন ঘােষ ছিলেন। জগমােহন ঘােষ ঠাকুর ক্রোক সরবরাহকার ছিলেন, তাহার অপুত্রকাবস্থায় মৃত্যু হয়। কালীভৈরব ঘােষঠাকুর মহাশয় ওকালতী কাৰ্য্য করেন, কিয়ৎদিন পরে তাহার চক্ষু নষ্ট হওয়াতে ঐ কাৰ্য্য করিতে অক্ষম হন। বাড়ীতে আসিয়া নানা ব্যক্তির মহালাদি ইজারা লইয়া সেই সমুদয় কার্য নির্বাহ করিয়াছেন। গৌরমােহন ঘােষঠাকুর মহাশয় ময়মনসিংহ জেলাতে দীর্ঘকাল সরকারী ওকালতী কাৰ্য্য করিয়াছেন। বহু অর্থ উপার্জন করিয়াছেন ও ভূসম্পত্তি অর্জন করেন। (১) এই বংশের রূপনারায়ণ ঘােষ কর্তৃক লিখিত “দুর্গামঙ্গল” গ্রন্থ পণ্ডিতমণ্ডলী কর্তৃক আদৃত। রূপনারায়ণের বংশধর প্রাণকৃষ্ণ ঘােষ কর্তৃক ১২৩৫ সনে হস্ত লিখিত পুথি বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ পুস্তকাগারে সযত্নে রক্ষিত হইয়াছে।
আত্মচরিত ৯ উভয় ভ্রাতা একান্নভুক্ত এজমালী থাকেন ও আদাজানের বাড়ী নদীভগ্ন হইলে আড়রা গ্রামে বাড়ী করেন, তৎসময় বহু ভূসম্পত্তি অর্জন হয়। প্রথমে উভয় মধ্যে সম্ভাব থাকিলেও পরে উভয় ভ্রাতার মধ্যে সদ্ভাব ছিল না। যাহার অর্জিত • যে ভূসম্পত্তি ছিল, তিনি তাহাই লইয়া পরস্পর পৃথকাঃ ছিলেন। গৌরমােহন ঘােষ ঠাকুরের বহু ভূসম্পত্তি, বহু অর্থ ও পাকা বাড়ীঘর রাখিয়া মৃত্যু হইলে সে সমুদয় সম্পত্তি তাঁহার পুত্র পৌত্রগণ প্রাপ্ত হইয়া বড় লােকের ন্যায় চলিতেন। কালীভৈরব ঘােষ ঠাকুরের সম্পত্তির আয় অল্প। তঁাহার ঔরসজাত আমি (১) সপ্তম পুত্র। আমি ও অন্য দশটা সহােদর ছিলাম। পিতা বর্তমানকাল পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়, এবং ছয় সহােদর বর্তমান ছিলাম, পরে আরও দুই জনের অবিবাহিত অবস্থায় অভাব হওয়াতে চারিজন সহােদর ছিলাম (২)। তৎপর অন্য সকলেরই সন্তান সন্ততি রাখিয়া মৃত্যু হইয়াছে। এক্ষণ সহােদরগণ মধ্যে আমি একাকী এতক বর্তমান আছি। আমাদের মাতা থাকা পর্যন্ত এই চারি সহােদর বহুদিন পর্যন্ত একান্নেই ছিলাম, পরে পৃথক পৃথক্ হই। আমি বর্তমান আছি বটে, বিষহীন সর্পের ন্যায় অক্ষম অবস্থায় আছি। (১) বাঙ্গালা ১২৪৩ সনের ৫ই চৈত্র তারিখ শুক্লা একাদশী তিথিতে টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত আড়রা গ্রামে স্বর্গীয় গঙ্গাধর ঘােয় মহাশয়ের জন্ম হয়। (২) কালীভৈরব ঘােষ ঠাকুরের এগার পুত্র যথারাজমােহন, ললিতমােহন, মদনমােহন, কৃষ্ণমােহন, মহেশ্চন্দ্র, সারদামােহন, গঙ্গাধর, বিদ্যাধর, রামচন্দ্র, একজনের নামকরণের পূর্বে মৃত্যু ও শিবচন্দ্র। ইহা- দের মধ্যে, শেষে মদনমােহন, সারদামােহন, গঙ্গাধর ও বিদ্যাধর জীবিত ছিলেন।
আত্মচরিত আমার পিতা অন্ধ অবস্থায় বাড়ীতেই বাস করিতেন ও নিজ বিষয়াদির উপস্বত্ব যাহা পাইতেন, তারা পরিবারের ভরণপােষণ নিৰ্বাহ করিতে পারিলেও তাহার পুত্রগণের উপযুক্ত শিক্ষার বিষয়ে ব্যয় সঙ্কুল করিতে সমর্থ হইতেন না। আমার সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদ্বয় ময়মন- সিংহ গৌরমােহন ঘােষ জ্যেঠা মহাশয়ের বাসায় থাকিয়া কিছু কিছু লিখাপড়া শিক্ষা করিয়াছেন। আমাকে কোন স্থানে বিদ্যাশিক্ষার জন্য রাখিবেন আমার পিতামাতা তাহার জন্য ব্যস্ত ছিলেন ; সর্বত্রই টাকার দরকার, একবার মাতার খুড়তাত ভ্রাতাগণ (যাহারা রঙ্গপুর ও ভােটমারী চাকুরী করিতেন। সেখানে তাহাদের সঙ্গে পাঠানের জন্য উদ্যোগী হন ও রওনা হই। কিন্তু পথিমধ্যে জ্বর ও রুগ্ন হওয়াতে বাড়ী ফিরিয়া আসি। পরে সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজমােহন ঘােষ, যিনি চাকুরী করার উপযুক্ত ছিলেন, তঁাহার মৃত্যু হয়। তাহার পরবৎসর আমি ময়মনসিংহ জেঠামহাশয়ের সঙ্গে তাহার বাসায় আসি। আমি বাড়ী থাকা সময় পিতা মহাশয় আমার ও ভ্রাতাগণের লিখাপড়া শিক্ষার জন্য একটা সরকার রাখিয়া দিয়াছিলেন, তাহার নিকট বাঙ্গালা লিখাপড়া কিছু শিক্ষা করিয়াছি। তৎপর ময়মনসিংহ আইসার পর গবর্ণমেণ্ট বঙ্গ পাঠশালায় (হার্ডিঞ্জ স্কুলে (১), যেখানে ছাত্রের মাসিক বেতন / আনা মাত্র ছিল। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মুরব্বি থাকিয়া ভর্তি করাইয়া দেন। সেই সময় পাশি লিখাপড়া আদালত কালেক্টরীতে অনেক ব্যবহার ছিল এবং পাশি লিখাপড়ার খরচ লাগিত না। কেবল মৌলবী প্রভৃতির (১) গবর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ তেরটা জেলার সদর ষ্টেশনে তেরটা স্কুল স্থাপন করেন, তাহা হার্ডিঞ্জ স্কুল নামে পরিচিত ছিল। ময়মনসিংহ হার্ডিঞ্জ স্কুল গৃহে এক্ষণ ডিষ্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টার আফিস অবস্থিত।
আত্মচরিত ১১ ; নিকট গরজ করিয়া পড়িলেই পড়া হইত। আমি মৌলবীর নিকট ও যখন যিনি পড়াইতে ভাল বাসিতেন তাহাদের নিকট পার্শি লিখাপড়া শিক্ষা করিতাম এবং বাঙ্গালা পাঠশালায় বাঙ্গালা, ভূগােল, ইতিহাস, ব্যাকরণ, সাহিত্য, হিতােপদেশ, অঙ্ক ইত্যাদি সেই বিদ্যালয়ের পাঠ্য বই পড়িতাম। পাশি নানাব্যক্তির নিকট পাঠ লইতে হইত ও বিশেষ অনুবােধ উপরােধ জানাইয়া খােসামুদী জানাইয়া পড়া বুঝিতে হইত ও শিক্ষা লইতে হইত। দেশের অবস্থা দেখিয়া পাশি পড়িতাম । সময় দেশের অধিকাংশ বালক ইংরেজী স্কুলে ইংরেজী শিক্ষা করিত, সেই জন্য তাহাতেই আমার বেশী রুচি ছিল। আমার অন্য একটা কনিষ্ঠ ভ্রাতা ইংরেজী পড়িত তাহার খরচ চলাই কঠিন ছিল ; সুতরাং খরচের অভাবে আমার ইংরেজী স্কুলে পড়া হইত না, প্রাইভেটরূপে ইহার উহার নিকট পড়া লইতাম। কিছু কিছু ইংরেজী বই শিক্ষা করিতাম কিন্তু প্রতিদিন মুরব্বির ও মৌলবীর তাড়নায় পার্শি শিক্ষা করিলেই হইত না। পার্শির কয়েকখানি বই পড়াতে একরূপ সংস্কার হইয়াছিল, প্রাইভেটরূপে ইংরেজী ইংরেজীস্কুলের ছাত্রদের নিকট পড়িতে হইত। স্কুলে কিছু ইংরেজী পড়িবার জন্য মত প্রকাশ করাতে ব্যয় সংগ্রহ করিতে না পারিয়া মুরব্বী মহাশয়েরা তাহাতে অস্বীকার করিলেন; কাজেই ২৪ খানা বই প্রাইভেট রকমের কিছু কিছু পড়া হইল এই মাত্র। আমার পিতাঠাকুর মহাশয় কাতর হওয়াতে তাহাকে প্রথমতঃ ঢাকা ও সেখানে ভাল ডাক্তার না থাকাতে ময়মনসিংহে নৌকাযােগে আনিয়া চিকিৎসা করাইলাম; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্যবশতঃ বিজয়াদশমীর দিন পিতাঠাকুর মহাশয় পরলােকগমন করেন। আমি উপরােক্ত বাঙ্গালা পাঠশালায় যে বাঙ্গালা পাঠ করি ১২ আত্মচরিত তাহাতে একরকম কচি ছিল। সে সময় শিক্ষাবিভাগের ইনস্পেক্টর (১) রবিন সাহেব এখানে আসিলেন, তিনি আমার ও অন্যান্য বালকদের পড়ার পরীক্ষা করিলেন এবং ঐ বিদ্যালয়ের পড়া শেষ হইয়াছে বলিয়া আমাকে ভাল সার্টিফিকেট দিলেন। কিছুদিন পরে ডিরেক্টর সাহেবের (২) মঞ্জুরি মতে ডেপুটী ইনস্পেক্টর বাবু বৈকুণ্ঠনাথ সেন আমাকে উক্ত স্কুলের তৃতীয় শিক্ষকপদে সামান্য বেতনে ১৮৫৬ সনের ১লা মে তারিখে নিযুক্ত করিলেন (৩)। এই সামান্য বঙ্গ পাঠশালায় আমি অল্প বেতনে সামান্য শিক্ষকের কাৰ্য্য করিলেও আমার (১) আসাম ও পূর্ববঙ্গ বিভাগের ইস্পেক্টর। (২) মিঃ গডন ইয়ং। (৩) শ্ৰীযুক্ত বাবু বৈকুণ্ঠনাথ সেনের প্রদত্ত সার্টিফিকেট হইতে নিয়ে উদ্ধৃত হইল :- "He is a young man of very good abilities, possessing a fair knowledge of the Vernacular Literature, History, Grammar, Geography and Arithmetic. He was selected by Mr. Robinson, the Inspecior of Schouls of the Division for his present appointment from among som: 20 candi. dates who passed an examination before that gentleman and he is favour. ably spoken of by Mr. Kemp, the late Collector who had the management of the school for a long time in his hand." জেলার কালেক্টর Mr. F. B. Kep সাহেবের সার্টিফিকেট নিয়ে উদ্ধৃত হইল :- "This is to certify that Gangadhar Ghosh aged 18 a pupil of the Mymensingh Vernacular school was examined by me on the 8th Septem. ber, 1852. In reading from print and manuscript he was fuent. In History & Geography, his answers were on the whole correct and satisfactory. His theme was well wiitten, matter good and tolerably original."
আত্মচরিত ১৩ পরে নিকট স্বর্গীয় এ, এম, বসু (৪) প্রভৃতি ছাত্রগণ পাঠ করিয়া গিয়াছেন। তাহারা বড় বড় লােক উচ্চ পদে থাকিয়া এদানিকও আমার সন্ধান করিয়াছেন ও বিশেষ আদর করিয়াছেন, ইহা ঐ শিক্ষকতা কাৰ্য্যের পুরস্কার পাইয়াছি। তৎপূর্বে তৎপূৰ্বে ১৮৫৩ সনের ২রা ডিসেম্বর জেলা ময়মনসিংহের কালেক্টরীতে এক একটিন মােহরের গিরি পদে নিযুক্ত ছিলাম। সেই কাজ যাওয়ার পর ১৮৫৭ সনের ১৩ই মে আটিয়ার করােষ আমিনী কাৰ্যে কালেক্টর সাহেব নিযুক্ত করেন। কতদিন ঐ কাৰ্য্য করার পর আমি কালেক্টর সাহেবের নিকট প্রার্থনা করিয়া ঐ কাজ আমার জ্যেষ্ঠ সারদামােহন ঘােষ মহাশয়কে দিয়া আমি অন্যত্র কোন কাজ পাইবার জন্য ময়মনসিংহ টাউনে আসি। ১৮৫৯ সনের ১৭ই আগষ্ট তারিখে ময়মনসিংহ এডিসনেল প্রধান সদর আমিনের কোর্টে ডিক্রিজারির মােহরেরগিরি কার্যে একটিন নিযুক্ত হই এবং ১৮৬০ সনের ১লা মে তারিখে ঐ কৰ্ম্মে বহাল হই। এই সময়ের পূর্ব হইতেই আমি আইন পড়িয়া ওকালতী পরীক্ষা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করি। প্রথমে ঢাকা কমিটীতে ১৮৫৯ সনে পরীক্ষা দেই। ঐ পরীক্ষাতে সম্পূর্ণ লিখিত প্রশ্নের উত্তর ১০০ নম্বর ছিল তাহার মধ্যে ৬০ রাখিতে পারিলেই উর্দ্ধ আদালতের ও ৫০ নম্বর রাখিতে পারিলে মুন্সেফী সদর আমিনী আদালতের ওকাকতী পাশ করা যাইতে পারিত। প্রথমবার যে পরীক্ষা দেই সে বৎসর লিখিত প্রশ্নের উত্তর কাগজ দেখিয়া পরীক্ষকগণ আমাকে ৯৮ নম্বর দেন এবং বাচনিক পরীক্ষায় পাশ (৪) স্বর্গীয় আনন্দমােহন বসু বিষয় কর্মোপলক্ষে, ময়মনসিংহ টাউনে যাইলে, স্বর্গীয় গঙ্গাধর ঘােষঠাকুরের সঙ্গে দেখা করিয়া তাহার স্বাভাবিক বিনয় সহকারে গুরুজনােচিত সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করিতেন।
১৪ আত্মচরিত করেন। কিন্তু সে বৎসর কলিকাতায় প্রকাশ হইল যে প্রশ্নের কাগজ ছাপাখানা হইতে চুরি গিয়াছিল, আমার দুরদৃষ্টৰশতঃ সে বৎসর আমি ও অন্যান্য যাহারা পাশ করিয়াছিলেন, তাহাদিগকে তৎপরের জুলাই মাসে পুনঃ পরীক্ষা করার আদেশ হয়। তদনুসারে পরীক্ষা দিয়াছিলাম কিন্তু আমাকে ১৮৬০ সনের মে মাসে মুন্সেফ সদর আমিনী কোর্টের ওকালতী পরীক্ষোত্তীর্ণ সম্বন্ধে ডিপ্লোমা দেন। তৎপর সনে (১৮৬১ সনে) পুনরায় ডিক্রিজারীর মােহরের থাকাবস্থায় উদ্ধ আদালতের ওকালতী পরীক্ষা দিয়া ১৮৬১ সনের জুলাই মাসে পাশ হই (তৎকালে আমার বয়স ২৪ বৎসর ছিল) এবং সার্টিফিকেট প্রাপ্ত হই। ১৮৬১ সনের ১৩ই নবেম্বর ওকালতী আরম্ভ করি। এদিকে ১৮৬১ সনের ৯ই মে এডিসনেল সবজজের আপিস এবলিস হওয়াতে আমি প্রথমে সদর আমিনী ও মুন্সেফী আদালতের ওকালতী আরম্ভ করি । ২/১ মাস ঐ কাজ করার পরই ঢাকা হইতে আমার বড় আদালতের ওকালতী পাশের সার্টিফিকেট আগত হওয়ায় জেলা ময়মনসিংহের ডিষ্ট্ৰীক্ট জজ ও সমুদয় ডিষ্ট্ৰীক্টকোর্টে ওকালতী করার জন্য জজ সাহেব ১৮৬১ সনে সনদ দেন। কতিপয় দিবস ওকালতী করার পরই ১৮৬১ সনের ৩১শে ডিসেম্বর অত্র জেলার জামালপুরের মুন্সেফের কাজের একটিনীতে নিযুক্ত হই। ১৮৬৩ সনের ২৩শে জানুয়ারী তারিখ পর্যন্ত মুন্সেফের কাৰ্য করি (১)। তৎকালে মুন্সেফদিগের বেতন কম থাকাতে মুন্সেফী কাৰ্য্য পাওয়ার জন্য আর কোন চেষ্টা উদ্যোগ করি নাই। - (১) এই সময় তাহার কাৰ্য্য দেখিয়া Mr. J. c. Dodgson ডিষ্টিক্ট জজ সাহেব হাইকোর্টে যে রিপাের্ট দেন তাহা উদ্ধৃত হইল :- “I sat with the Moonsiff of Pingaah at Jamalpur and beard him decide two suits and saw him write bis decisions in both, I was well আত্মচরিত তৎকালে থাকসংক্রান্ত হাকিমদের হুকুমের বিরুদ্ধে বহু মােকদ্দমা আদালতে উপস্থিত থাকাতে ও আর অধিক মােকদ্দমা আদালতে উপস্থিত করার সম্ভব হওয়াতে ওকালতী কার্যে বহু লাভ বিবেচনা করিয়া পুনরায় মুন্সেফী কাজ পাওয়ার চেষ্টা না করিয়া ওকালতী কাৰ্য্যই করিতে থাকি। ওকালতী কাৰ্য্যের আরম্ভাবধি বহু আপীলের মােকদ্দমা পাইতে থাকি, ক্রমশঃ আমার কাৰ্য্যের প্রতি সকলের বিশ্বাস হওয়াতে আপীলের শ্রেণীর ও জাবেদা শ্রেণীর বহু মােকদ্দমায় আমি উকীল থাকি। আমি মুন্সেফ থাকাবস্থায় আমার একটা বন্ধু—সেই স্থানের ইংরেজী স্কুলের হেড মাষ্টার—অনুগ্রহ করিয়া আমাকে আমার অবসর সময়ে কিছু কিছু ইংরেজী শিক্ষা দিতেন। তৎপর ওকালতী করার সময় আমার পরম বন্ধু বিশ্বনাথ মজুমদার মহাশয় আমাকে নজীর বই পড়াইয়া ইংরেজী শিক্ষা দিতেন, তিনি আমার উপকারের জন্য আমার সঙ্গে সর্বদা ইংরেজী কথা বলিতেন ও বলিতে চাহিতেন। এই ভাবে ইংরেজী ভাষায় কিছু কিছু উন্নতি হইয়াছিল, এবং নজীর পড়িয়া বুঝিবার আমার ক্ষমতা জন্মিয়াছিল। আমার ওকালতী সময় মিঃ মনি সাহেব এই জেলাতে দুইবারে ক্রমে অনেকদিন জজের কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। তিনি বাঙ্গালা হিন্দি সওয়াল জবাব বুঝিতে পারিলেও ইংরেজী বক্তৃতা করা ভালবাসিতেন। আমি ইংরেজী বক্তৃতা করিতে পারি না বলিয়া আমার নিকট দুঃখিত হইতেন, ক্রমে আপীলের pleased with the orderly manner in which his court was held and I found everything in good order." Extract from the Annual report of the Judge of Mymensingh on the Administration of Civil Justice in 1862. Babu Gangadhar Guose is a good officer, he has disposed of 1942 cases during the year, the number of appeals from him has been only ৪i."
আত্মচরিত মােকদ্দমায় আমাকে ইংরেজীতে সওয়াল জবাব করিবার জন্য জজ সাহেব নিতান্ত আবদ্ধ করেন। কিন্তু আমি ইংরেজী বলিতে সর্বদাই লজ্জা বােধ করিতাম, তথাপি সাহেব আমাদ্বারায় ইংরেজী সওয়াল জবাব করাইতেন। কোন একদিন এক মহিষ চুরির আপীলের মােকদ্দমায় আমি সওয়াল জবাব করিতে থাকি তখন আমার পাছে কালীপ্রসন্ন চৌধুরী উকিল মহাশয় ছিলেন, তিনি কিছু কিছু সাহায্য করাতে সাহেব তাহা রহিত করিয়া দিলেন। আমার মনের কথা ইংরেজীতে একরূপ বলিলাম, সাহেব অনেক হাসাহাসি করিলেন তৎপর সাহেব সর্বদা আমাকে ইংরেজী সওয়াল জবাব করিতে বলিতেন, কিন্তু আমি বলিতে পারি না ও মনের ভাব প্রকাশ করিতে পারি না এ জন্য আমার মক্কেলের অনিষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তাহা অনেক সময় না বলিয়া হিন্দীভাষায় কি বঙ্গভাষায় সওয়াল জবাব করিতাম । এদিকে নানা আফিসে ও জমিদার সেরেস্তায় আবশ্যকমত পারস্য ভাষায় দলিলাদি পাঠ করিয়াছি ও আরও অনেক কাৰ্য্য করিয়াছি বটে কিন্তু ক্রমে ঐ ভাষার লিখাপড়া লুপ্ত হওয়াতে তাহার সঙ্গে সঙ্গে ঐ ভাষার লিখাপড়া অনেক ভুলিয়া যাইতে হইল। আমি ওকালতী পাশ করার পূর্বেই এক বিবাহ করি। আমার সেই পত্নীর গর্ভে একটা কন্য সন্তান জন্মিয়াছিল, জন্মিবার অল্পকাল পরেই ঐ কন্যাটীর মৃত্যু হয়, তৎপর আমার সেই স্ত্রীরও অভাৰ হয়। সেই সময় আমার শরীর নিতান্ত শীর্ণ ও রুগ্ন ছিল কিন্তু প্রথম বয়স,বলিয়া তাহাদ্বারায় কাৰ্য্য কর্মের ব্যাঘাত হয় নাই। তথাপি আমি এবং এই বারের অন্যতম উকিল গঙ্গাদাস গুহ পশ্চিম দেশে পরিভ্রমণ করণার্থ ও জলবায়ু পরিবর্তন করণার্থ ময়মনসিংহ হইতে নৌকাযােগে কুষ্টিয়া ও, তথা হইতে রেলে কলিকাতা যাই। কলিকাতা আত্মচরিত কলিকাতাতে কয়েকদিন বাস করি, তৎপর উভয়েই পশ্চিমদেশাভি- মুখে রওনা হইয়া প্রথমতঃ বর্ধমানে বাস করিয়া, বর্ধমানের সমুদয় শােভাসৌন্দৰ্য্য দেখিবার জন্য সেখানে পরিভ্রমণাদি করিতে থাকি। সেখানে বর্ধমানের মহারাজার বাড়ী, গােপালবাগ, চিরিয়াখানা ইত্যাদি ৫৬ দিন দেখিলাম। একদিন রাত্রিতে বাসায় শয়ন করিয়া আছি, এমন সময় গঙ্গাদাস বাবুর (১) ওলাউঠা রােগ হওয়াতে সেখানে ডাক্তার আনিয়া তাহার চিকিৎসা করাই। ঈশ্বর ইচ্ছায় ৩৪ দিন পরে তিনি (১) টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত বেলতা নিবাসী স্বর্গীয় গঙ্গাদাস গুহ ময়মনসিংহে ওকালতী আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গাধর ঘােষ ঠাকুরের সঙ্গে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ হন। গঙ্গাদাস বাবু সুপুরুষ ছিলেন। তিনি কোর্টে যাওয়ার সময় পকেট ঘড়ির সঙ্গে একটা সােনার গার্ড চেন গলায় পরিতেন সেইজন্য সাধারণ লােকে তাহাকে সােনার লণ্ডনের ( পৈতার) উকীল বলিত। তিনিই ময়মনসিংহে প্রথম ইংরেজী- জানা উকীল এবং তাহার ইংরাজী বক্ততা ইংরেজ হাকিমেরা মনোেযােগ- পূৰ্ব্বক শুনিতেন তাহাতে বহু মক্কেল তাহার নিকট যাইতে আরম্ভ করে। ইহাতে প্রাচীন উকীলেরা ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহাকে জব্দ করার জন্য কোন কোন জটীল মােকদ্দমার মারজী ও জবাবের মুশাবিলা (draft) করার জন্য মর্কেলদিগকে তাহার নিকট পাঠান। গঙ্গাদাস বাবু নবীন উকীল, এসব বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিলেন। গঙ্গাধর ঘােষ ঠাকুর মুশাবিদায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। গঙ্গাদাস বাৰু নথীপত্র লইয়া রাত্রিকালে যাইয়া গঙ্গাধর ঘােষ ঠাকুরকে দিয়া মুশাবিদ করাইয়া মকেলদিগকে দিতেন। এই সূত্রেই উভয়ের মধ্যে প্রথম সৌহার্দ সংস্থাপিত হয়।
১৮ আত্মচরিত সুস্থ হওয়ার পর পশ্চিমাঞ্চলে যাইতে সাহসী না হইয়া বাড়ীতে ফিরিয়া আসিবার মনন করেন, সুতরাং আমি তাহাকে বাধা দিতে পারি না জন্য, তিনি ও সঙ্গীয় ২ জন লােকসহ কলিকাতাতে যাই, সেখানে কতিপয় দিবস থাকার পর আমি পশ্চিমে যাইতে না পারিলে নিতান্ত দুঃখ বােধ করিব গঙ্গাদাস বাবুকে তাহা বলি। তিনি আমাকে ছাড়িয়া দিতে অস্বীকার হন, অথচ সঙ্গে দুই জন মাত্র লােক থাকাতে তাহার সঙ্গে একটা ফিরিলে একটা মাত্র আমার সঙ্গে থাকে ; কেবল ঐ একটী লােক লইয়া পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়া অসঙ্গত মনে করিলাম। সেই সময় মুর্শিদাবাদ বহরমপুরে আমার জ্যেষ্ঠতাত ভাই গােবিন্দমােহন ঘােষ (১) কমিশনারের পাশে নেল এসিষ্ট্যান্ট ছিলেন। তাহার সঙ্গে তাঁহার পরিবার ও আমার অগ্রামস্থ কোন কোন লােক ছিল, মনে করিলাম তাহাদের এক জন লইয়া পশ্চিমে যাইব। এই বিষয়ে গঙ্গাদাস বাবু সম্মত হইলেন। আমি সঙ্গীয় লােকসহ বহরমপুর মােকামে রওনা হইয়া সেখানে পহুছিলাম। সেখানে গােবিন্দ বাবুকে ও তাহার সন্তানাদি ও পরিবারবর্গ লােকজন দেখিয়া পরম সন্তোষ শান্তিলাভ করিলাম। সেখানে কয়েকদিন শান্তির সহিত বাস আহারাদি করিলাম, এবং নানাস্থানে ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিলাম। তৎপর গােবিন্দ বাবুর একটা চাপরাশীকে আমার সঙ্গে লইলাম এবং (১), গােবিন্দমােহন ঘােষ পূৰ্বোল্লিখিত গৌরমােহন ঘােষ ঠাকুরের তিনি তৎকালীন কমিশনারের দক্ষিণ হস্ত রূপ ছিলেন ও বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। ময়মনসিংহ থাকা- কালীন ইনিও ৰাহ্মসমাজে যােগ দেন। “ব্রাহ্মসমাজে চল্লিশ বৎসর।” পুত্র ছিলেন।
আত্মচরিত কিন্তু এলাহা- আমার সঙ্গে যে একজন লােক ছিল, এই দুইটা লইয়া পশ্চিমাঞ্চলে নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়া কাশীধামে বাঙ্গালীটোলায় কিয়দ্দিন বাস করিতে লাগিলাম। সেখানে কয়েকদিন বাস করার পর সকলেই বলিতে লাগিল যে কাশীধামে জলবায়ু অপেক্ষা প্রয়াগতীর্থে-এলাহাবাদে বাস করিলে স্বাস্থ্যলাভ হইতে পারে। সেই অনুসারে কতকদিন কাশীবাস করিয়া এলাহাবাদ গমন করি। মােগলসরাই মােকামে রেল- গাড়ীতে উঠিবার কালে একজন বাঙ্গালী ভদ্রলােকের সহিত আমার দেখা হইল। তিনি বলিলেন, এলাহাবাদে এক ডাক্তার বাবুর বাসায় তিনি থাকেন, সেইখানে আমাকে একরাত্রি রাখিতে পারিবেন। আমি অপরিচিত স্থান বলিয়া অনেক ভরসা পাইলাম । বাদের নিকটবর্তী হইলে অনেক প্রয়াগী পাণ্ডা আসিয়া জুটিল, তাহারা আমাকে অনেক আদর করিল, তজ্জন্য আমার সঙ্গীয় বাবু বলিলেন “আমার কথিত ডাক্তার বাবু আপনাকে বাসায় রাখিতে কি বলেন, তাহা বলা যায় না, অতএব আপনি পাণ্ডাদের বাড়ীতেই যান।” তখন আমি বাধ্য হইয়া বাবুরাম রামপ্রসাদের বাড়ীতে যাইতে সম্মত হইলাম। তাহারা আমার কপালে লাল ফোটা দিল, তৎপর ষ্টেশনে পৌছিলে পাণ্ডা গাড়ীভাড়া করিয়া আনিল । আমি কীটগঞ্জ নামক স্থানে যমুনারধারে তাহাদের বাড়ীতে চলিলাম। উক্ত পাণ্ডা তাহাদের কীটগঞ্জের একটা বাড়ীর দুইটা ফটক ছাড়িয়া তৃতীয় ফটকের দ্বিতল ঘরে আমাকে বাসা করিবার স্থান নিরূপণ করিয়া দিল। সেখানে বাস করিতে লাগিলাম, ঐ বাসের স্থান হইতে সময় সময় বাহির হইয়া নানা- স্থানে বেড়াইতাম। কিন্তু যখনই ঘর হইতে বাহিরে বেড়াইতে যাইতাম তখনই পাণ্ডাদের একজন আমার পশ্চাৎবর্তী হইয়া সঙ্গে যাইত। তাহাদের নজরবন্দী কয়েদীর ন্যায় বাস করিতে লাগিলাম। আমি যে আত্মচরিত কীটগঞ্জ মােকামে যমুনার ধারে বাস করিতাম তথা হইতে দারাগঞ্জ হইয়া ত্রিবেণীর ঘাটে যাইতে হয় ; বাসা হইতে ত্রিবেণীর ঘাট প্রায় ৩ মাইল দূরে। তৎকালে আমার শরীর রুগ্ন, শীর্ণ ও দুর্বল ছিল আমি ত্রিবেণীর ঘাটে স্নানাদি করিতে যাইতে কিছু গৌণ করাতে, পাণ্ডাগণ তাহাদের লাভার্থে আমাকে ত্রিবেণীতে স্নান ও তীর্থশ্রাদ্ধ করিবার জন্য বড়ই তাগাদা আরম্ভ করিল। পরে ৮১০ দিনের মধ্যেই স্নান ও তীর্থশ্রাদ্ধাদি শেষ করিলাম। পাণ্ডাদের প্রাপ্য টাকার সংখ্যা লইয়া নানা গােলযােগ হইল, পরে তাহাদের হাতে পড়িয়াছি বলিয়া যে বাবতে যাহা চাহিল প্রায় তাহাই দিলাম। তাহার পরেও অনেক দিন তথায় বাস করিলাম। একদিন দেখিলাম বর্ধমান অঞ্চলের কয়েকজন বাঙ্গালী যাত্রীকে টাকার জন্য কয়েদাবস্থায় রাখিয়াছে, তাহাদের মধ্যে একজন ছুটীয়া পুলিশ ষ্টেসনে যাইয়া পুলিসে এতেলা দেওয়াতে ২। ৩ জন পুলিস আসিয়া তাহাদিগকে রাস্তা হইতে ডাক দেওয়াতে কয়েদী ব্যক্তিগণ ঘর হইতে রাস্তায় আসিল, পুলিস তাহা- দিগকে সঙ্গে লইয়া চলিয়া গেল ও তাহারা কয়েদমুক্ত হইল। তদুপলক্ষে কিছু হাঙ্গামা হইল বটে কিন্তু পাণ্ডাগণ বেশী কিছু করিতে ও অগ্রসর হইতে সাহস পাইল না। এই ঘটনা আমি আমার বসতি দালানের উপরতালা হইতে দেখিয়া নিতান্ত ভয় পাইলাম ও ভীত হইয়া নিতান্ত অশান্তিতে বাস করিতে লাগিলাম। কিন্তু পাণ্ডাগণ মৌখিক নানারকম ভদ্র আলাপ করাতে আমিও সেইভাবেই তাহাদের সহিত ব্যবহার করিতাম ও কথাবার্তা বলিতাম। আমার বাসা হইতে পুলিস ষ্টেসন কিছু দূরে ছিল। তৎকালে একজন মুসলমান দারোগা ছিলেন, তাঁহার তাড়নায় পাণ্ডাগণ আমাকে বেশী কিছু উপদ্রব করিতে সাহসী হইল । তৎপর আর কতক কতক স্থান ভ্রমণ করিয়া কলিকাতায়
प
No-.-..--.nl
शृङ्गा-२४. सन १९२०
আত্মচরিত কীটগঞ্জ মােকামে যমুনার ধারে বাস করিতাম তথা হইতে দারাগঞ্জ হইয়া ত্রিবেণীর ঘাটে যাইতে হয় ; বাসা হইতে ত্রিবেণীর ঘাট প্রায় ৩ মাইল দূরে। তৎকালে আমার শরীর রুগ্ন, শীর্ণ ও দুর্বল ছিল আমি ত্রিবেণীর ঘাটে স্নানাদি করিতে যাইতে কিছু গৌণ করাতে, পাণ্ডাগণ তাহাদের লাভার্থে আমাকে ত্রিবেণীতে স্নান ও তীর্থশ্রাদ্ধ করিবার জন্য বড়ই তাগাদা আরম্ভ করিল। পরে ৮১০ দিনের মধ্যেই স্নান ও তীর্থশ্রাদ্ধাদি শেষ করিলাম। পাণ্ডাদের প্রাপ্য টাকার সংখ্যা লইয়া নানা গেলযােগ হইল, পরে তাহাদের হাতে পড়িয়াছি বলিয়া যে বাবতে যাহা চাহিল প্রায় তাহাই দিলাম। তাহার পরেও অনেক দিন তথায় বাস করিলাম। একদিন দেখিলাম বর্ধমান অঞ্চলের কয়েকজন বাঙ্গালী যাত্রীকে টাকার জন্য কয়েদাবস্থায় রাখিয়াছে, তাহাদের মধ্যে একজন ছুটীয়া পুলিশ ষ্টেসনে যাইয়া পুলিসে এতেলা দেওয়াতে ২। ৩ জন পুলিস আসিয়া তাহাদিগকে রাস্তা হইতে ডাক দেওয়াতে কয়েদী ব্যক্তিগণ ঘর হইতে রাস্তায় আসিল, পুলিস তাহা- দিগকে সঙ্গে লইয়া চলিয়া গেল ও তাহারা কয়েদমুক্ত হইল। তদুপলক্ষে কিছু হাঙ্গামা হইল বটে কিন্তু পাণ্ডাগণ বেশী কিছু করিতে ও অগ্রসর হইতে সাহস পাই না। এই ঘটনা আমি আমার বসতি দালানের উপরতালা হইতে দেখিয়া নিতান্ত ভয় পাইলাম ও ভীত হইয়া নিতান্ত অশান্তিতে বাস করিতে লাগিলাম। কিন্তু পাণ্ডাগণ মৌখিক নানারকম ভদ্র আলাপ করাতে আমিও সেইভাবেই তাহাদের সহিত ব্যবহার করিম ও কথাবার্তা বলিতাম। আমার বাসা হইতে পুলিস ষ্টেসন কিছু দূরে ছিল। তৎকালে একজন মুসলমান দারোগা ছিলেন, তাহার তাড়নায় পাণ্ডাগণ আমাকে বেশী কিছু উপদ্রব করিতে সাহসী হইল । তৎপর আর কত কতক স্থান ভ্রমণ করিয়া কলিকাতায় স্বর্গীয়। পূর্ণলক্ষমা ঘোষ মৃতু-২র। শ্রাবণ, ১৩২৬ সন
No text on this page.
আত্মচরিত আসিলাম। কলিকাতায় কতকদিন বাস করিতেছিলাম, এদিকে আমার মাতাঠাকুরাণী মহাশয়া ও আমার তৎকালের সর্বাগ্রজ ভ্রাতা (১) ( যিনি ময়মনসিংহের জজকোর্টের টেনস্লেটার ছিলেন এবং যিনি আমাকে শ্রদ্ধা করিতেন) আমাকে পুনরায় বিবাহ করাইবার উদ্যোগ করিয়া পাত্রী অন্বেষণে লােক পাঠাইয়া দিলেন, এবং আমাকে নিজ বাড়ীতে আসিবার জন্য বারম্বার পত্র লিখিতে লাগিলেন। আমার আসিতে কিছু গৌণ হইলেও আমি বিদেশ পরিত্যাগ করিয়া বিবাহের জন্য বাধ্য হইয়া পুনরায় নিজ বাড়ী আড়রা মােকামে আসিলাম। বাড়ীতে আসিয়া দেখি মাতাঠাকুরাণী মহাশয়া আমার জন্য ও আমার বিবাহের জন্য নিতান্ত ব্যস্ত। আমার বিবাহের সমুদয় আয়ােজন প্রস্তুত হইয়াছে, পাত্রী আনিবার জন্য লােক প্রেরিত হইল, বিবালে শুভদিন ধার্য্য হইল, নিমন্ত্রিত কুটুম্বস্বজনগণ আমার বাড়ীতে আগত হইলেন। সুতরাং পুনরায় বিবাহ করিলাম। (২) ক্রমে ২৩ বৎসর গত হইল, পশ্চিমদেশে বেড়াইয়া শরীরে যে কিছু উন্নতি লাভ করিয়াছিলাম তাহা আর থাকিল না, সেই জন্য বরিশালের অন্তর্গত নারায়ণপুর গ্রামে স্বরূপচন্দ্র ডাক্তার নিকট চিকিৎসার জন্য গেলাম, সেখানে লালগুড়া নামক ঔষধ সেবন করিতে লাগিলাম, তাহাতে শরীরের উন্নতি বুঝিয়া (১) মদনমােহন ঘােষ ইনি ট্রেনস্লেটার পদ ত্যাগ করিয়া বহুদিন পর্যন্ত মুক্তাগাছার বদান্য জমিদার রাজা জগৎকিশাের আচাৰ্য্য চৌধুরীর ষ্টেটে দেওয়ানী করিয়াছেন। (২) জেলা বাখরগঞ্জের অন্তর্গত আমড়াজুড়ী গ্রাম নিবাসী স্বর্গীয় বৃন্দাবনচন্দ্র বসু ঠাকুর মহাশয়ের কন্যা স্বর্গীয়া পূর্ণলক্ষ্মী দেবীকে বিবাহ করেন।
আত্মচরিত উক্ত ডাক্তারের বাড়ীতে মাসেক বাস করিয়া চিকিৎসা করাইতে লাগিলাম, পরে উক্ত ডাক্তার মহাশয়কে নৌকাযােগে আমার সঙ্গে আনিলাম। ময়মনসিংহ আসার পর আরও কতকদিন চিকিৎসা করাতে আমার শরীরের উন্নতি হইল। সেই হইতেই আমার শারীরিক দুর্বলতা ও শীর্ণতা দূর হইয়া শারীরিক অবস্থা কিছু ভাল হইল। এই সময় আমি ময়মনসিংহ আদালত সমূহে ওকালতী কাৰ্য্য করি, শারীরিক অবস্থা কিছু ভাল হওয়াতে বাসাতে ও কোটে বিস্তর পরিশ্রম করিতে পারিতাম। ইশ্বর ইচ্ছায় আমার একটা পুত্র সন্তান হইল। ক্রমে আমার অপর দুইটা পুত্র ও তিনটী কন্যা জন্মিয়াছে। একটী কন্যার শিশুকালে মৃত্যু হইয়াছিল, অন্য দুইটা কন্যা উপযুক্ত পএ হি দিয়াছি। (১) সেই দুই কন্যার পুত্র কন্যাদি হইয়াছে, তাহারা রীতিমত আপন আপন বাড়ীতেই আছে। উভয় কন্যার স্বামীগণের ভূমি সম্পত্তি আছে, তদ্বারায় তাহাদের সাংসারিক ব্যয় যথানিয়মে নির্বাহ হইয়া থাকে। আমি দীর্ঘকাল ওকালতী কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিতেছি, ভগবানের ইচ্ছায় বড় বড় জমিদার অনেকেই আমার প্রতি ও আমার কাৰ্য্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন (২) ও অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং অদ্যাপি সেই অনু- গ্রহের ত্রুটি হয় নাই। কোন কোন ভূম্যধিকারী মহাশয়েরা আমাকে (১) প্রথমা কন্যা শ্ৰীমতী সৱলার পাবনা জেলার অন্তর্গত খুকনী গ্রামের জমিদার শ্রীযুক্ত তারিণীচরণ মিত্র মজুমদার সহ বিবাহ হইয়াছে অপর কন্যা শ্ৰীমতী জ্ঞানদার টাঙ্গাইল অন্তর্গত দুয়াজানী ( নাগরপুর ) গ্রামের শ্রীযুক্ত গুরুদাস বসু সহ বিবাহ হইয়াছে। (২) তাহার প্রতি বড় বড় জমিদারদের অচল বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত আত্মচরিত মাসিক ও বার্ষিক বেতন দেওয়ার নিয়ম করিয়া রিটেনার করিয়াছেন,(১) সেই সকল ফিস অদ্যাপি পাইতেছি। আমি কোন কোন সময় কলিকাতা যাইয়াও মামলা মােকদ্দমার তদ্বির চালাইয়াছি, তাহাতেও স্বরূপ দুইটা মাত্র ঘটনার উল্লেখ করা গেল। রাজা জগৎকিশােরের মাতা পুণ্যশ্লোকা দয়াবতী স্বর্গীয়া বিদ্যাময়ী দেবী চৌধুরাণী যখন কাশী- বাসের জন্য মুক্তাগাছা ত্যাগ করিয়া যান তখন তিনি ম্যানেজার প্রভৃ- তিকে ষ্টেশনে পাঠাইয়া দিয়া গঙ্গাধর ঘােষ মহাশয়ের বাসায় যাইয়া তাঁহার বিশাল ষ্টেট রক্ষার সম্পূর্ণ ভার ন্যস্ত করিয়া বলেন—“ম্যানেজার ইত্যাদি রহিল কিন্তু জগতের ষ্টেটের সম্পূর্ণ ভার আপনার, কেবল ওকালতী হিসাবে কাজ করিলে চলিবে না, ষ্টেটের সর্বপ্রকার স্বার্থরক্ষা করিতে হইবে।” পুণ্যময়ী দেবীর বাক্য তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রক্ষা করিয়াছিলেন। এক সময়ে তাঁহার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য কলিকাতায় ছিলেন, তখন এনও ইউল কোম্পানীর সিরাজগঞ্জের পাটের কলের সম্পত্তি আম্বা- রিয়ার (বর্তমান হেমনগর) প্রসিদ্ধ জমিদার স্বর্গীয় হেমচন্দ্র চৌধুরী মহাশয় ক্রয় করেন। যদিও উভয় পক্ষের নিযুক্ত বড় বড় এটর্ণী কর্তৃক দলিলের মুশাবিদা হয়, তথাপি হেমবাবুরই সনির্বন্ধ অনুরােধে সে সব মুশাবিদা ও দলিল পত্রাদি গঙ্গাধর ঘােষ ঠাকুরকে দেখিতে হয়। (১) ময়মনসিংহ জেলার বহু জমিদার হইতে তিনি রিটেনার ফিস পাইতেন। তন্মধ্যে মুক্তাগাছার রাজা জগৎকিশাের আচাৰ্য্য চৌধুরী, আম্বারিয়ার বাবু হেমচন্দ্র চৌধুরী, ভবানীপুরের রায় সতীশচন্দ্র চতুধুরিণ বাহাদুর, করােটিয়ার ওয়াজেদ আলী খান পণি, ধলার রায় প্রসন্নকুমার চক্রবর্তী চৌধুরী বাহাদুর, ধনবাড়ীর নবাব নবাবআলী চৌধুরী খান আত্মচরিত আমাকে ফি ও পুরস্কার দেওয়ার সম্বন্ধে উচিত বিবেচনা করি- যাছেন (৮)। এই অবস্থায় আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র (৯) লিখাপড়া শিক্ষা করিয়া বি, এল পাশ করিলে এবং ময়মনসিংহ জেহ্বাতে ওকালতী কার্যে নিয়ােগ হইয়াছে। ক্রমে আমার বয়স বেশী হইতে লাগিলে, আমার হাতের মকেলের কাৰ্য ক্রমে তাহার হাতে অর্পণ করিয়াছি। আমি পরি- মাদি কম করিয়া আমার ঐ পুত্রের প্রতি ক্রমে সমুদয় কার্যভার বাহাদুর, সন্তোষের রাণী দিনমণি চৌধুরাণী, দেলদুয়ারের অনারেবল অলহাজী স্যার আবদুল করিম গজনবী ও মিঃ আবদুল হালিম গজনবীর মাতা ও মাতৃম্বসা স্বর্গীয়া করিমন্নেছা খানুম চৌধুরাণী ও রাহাতন্নেছা খানুম চৌধুরাণী ইত্যাদিই বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। যদিও ইহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জমিদারদের কাৰ্য্য করিতে পারিতেন না তথাপি তাহারাও তাঁহাকে বিশেষ সম্মান ও বিশ্বাস করিতেন। রাজা জগৎকিশােরের উকীল বলিয়া মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য বাহাদুরের কাৰ্য্য করিতেন তথাপি মহারাজা তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন। মহারাজা বাহাদুর যখন দিল্লীর দরবারে যান, তখন গঙ্গাধর ঘােষ ঠাকুর কলি- কাতায় ছিলেন। মহারাজা বাহাদু একজন বন্ধু ও “আপনার লােক” সঙ্গে লইবার জন্য তাহাকে বিশেষ পীড়াপীড়ি করেন। (৮) বিখ্যাত ‘ভুবনময়ী দেব্যা বনাম রামকিশাের আচাৰ্য্য চৌধুরী মােকদ্দমায় তিনি বহুদিন কলিকাতায় থাকিয়া হাইকোর্টে ব্যারিষ্টার- গণকে উপদেশ দিয়াছিলেন ; তাহার হিন্দু আইনের ব্যাখ্যা বহু স্কুলে ব্যারিষ্টারগণ আদরের সহিত গ্রহণ করিতেন। (৯) রায় শশধর ঘােষ বাহাদুর।
আত্মচরিত দিতে লাগিলাম, আমার পরিশ্রমের অনেক লাঘব হইল, ইহাতে আমি বিশেষ আনন্দ লাভ করিয়াছি। আমার দ্বিতীয় পুত্ৰটী আবকারীর সব- ইনস্পেক্টর (১) ও তৃতীয় পুত্র (২) সবডেপুটা কালেক্টর ; ইহারা ভ্রাতাগণ পরস্পর সৌহৃদ্যভাবে স্বীয় স্বীয় কাৰ্যনিৰ্বাহ করে ইহা দেখিয়া আমি আরও সন্তোষ ও তৃপ্তিলাভ করিয়াছি। আমার বেশী বয়স হওয়াতে কতিপয় বৎসর যাবৎ ওকালতীকাৰ্য্য চালান আমার পক্ষে কঠিন হইয়াছে, তজ্জন্য ওকালতী কার্যের যাহা শরীরে সহ পায় তাহাই মাত্র করি। আমার পুত্রগণ কৃতবিদ্য হইয়াছে এবং কাজ কর্ম করিয়া অর্থোপার্জন করে ও তাহাদের পুত্রাদি সন্তানের বিদ্যাশিক্ষা ও ভরণ- পােষণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। ইহারাই আমার প্রধান সম্পতি। আমার পুত্রকন্যাগণের সন্তানাদি হওয়াতে আমার পারিবারিক, ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি হইয়াছে। আমার শরীর নিতান্ত দুর্বল, আমার পুত্রকন্যাগণ ও তাহাদের সন্তান সন্ততি জীবিত থাকাবস্থায় তাহাদিগকে রাখিয়া আমার মৃত্যু হয় ইহাই মনের অভিলাষ, কিন্তু ঈশ্বর ইচ্ছাক্রমে তৎসম্বন্ধে কি ঘটিবে তাহার নিশ্চয় নাই। আমার পত্নী হাপানী ও কাশবােগে সর্বদা কাতর থাকে তাহার শরীর সর্বদা দুৰ্বল, আহারাদি বিষয়ে তাহার বিশেষ অরুচি, তাহার সেবা শুশ্রুষার জন্য সর্বদাই লােকের প্রয়ােজন। আমার বৃদ্ধাবস্থা, এই বৃদ্ধাবস্থায় লােকে স্বীয় পত্নীর দ্বারায় সেবা শুশ্রুষা হইবে বলিয়া অনেক ভরসা করে কিন্তু আমি (১) বাবু করুণামােহন ঘােষ। বর্তমানে আবগারী বিভাগের ইম্পেক্টার। (২) রায় যামিনীমােহন ঘােষ বাহাদুর। বর্তমানে ডেপুটা কালেক্টর।
আত্মচরিত তাহায় দ্বারায় সেবা শুশ্রুষা পাইব দূরের কথা, বরং সর্বদা তাহার রুগ্নাবস্থা ও দুর্বলতা দেখিয়া সর্বদাই মনে দুঃখিত থাকি। আমার স্ত্রীর এই রুগ্নাবস্থা দীর্ঘকাল যাবত আছে। এই রােগ হইতে তাহার মুক্ত হওয়ার আশা নাই। তাহাক নানাস্থানে নিয়া চিকিৎসা করাইলাম নানাপ্রকার তাবিজ কবচ ধারণ ও ব্যবহার করাইলাম কিছুতেই ফল হয় নাই। আমি কাৰ্যকৰ্ম্ম উপলক্ষে নানাস্থানে যাই এবং গৃহে ফিরিয়া আসিয়া অধিকাংশ সময় স্ত্রীকে শয্যাশত ও রুগ্ন দেখিয়া নিতান্ত দুঃখিত হই। কি করি, ইহার মধ্যে আমার বৃদ্ধশরীরে কোন রােগ উপস্থিত হইলে আরও কঠিন অবস্থায় পতিত হইয়া থাকি। পুত্র ও পুত্রবধুগণ নিকটে থাকেন, তাহারাও ঐ অবস্থায় দুঃখিত হইয়া থাকে আমাদের উভয়ের দীর্ঘকালের পীড়ার শুশ্রুষাদি করিয়া কষ্টভােগ করিয়া থাকে। তাহারা কোন কষ্টভােগ করার কথা কিছু বলে না, কিন্তু রােগী ও বৃদ্ধ দীর্ঘজীবি হইলে যে পরিবারবর্গের বিশেষ কষ্ট হয় তাহা সকলেই জানেন। আমার কন্যা দুইটা বিবাহ দেওয়ার পরই তাহাদের ভিন্ন বাড়ী ও ভিন্ন সংসারে যাইয়া ছেলেপিলে লইয়া ব্যস্ত থাকে, তাহাদের পিতামাতার সেবাশুশ্রুষা করার সাধ্য নাই। ফলতঃ আমাদের শুশ্রুষা সম্বন্ধে লােকজনের ও টাকাকড়ির ভরসাই বেশী । আমি যখন মৌলবী প্রভৃতির নিকট পাশি ও বঙ্গ বিদ্যালয়ে পাঠাদি করিতাম, তখন ও তৎপর স্কুলে শিক্ষকতার কাৰ্য করা কালে এখানে হিন্দুধর্মাবলম্বীই অধিক ছিলেন এবং তন্মধ্যে গোঁড়া হিন্দু অনেক লােক ছিলেন। সেই সময় মধ্যে মধ্যে ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী অতি অল্প লােকই ছিলেন, সেই অল্প যাহারা ছিলেন, তাহারা প্রায় সকলেই স্কুল পাঠশালার মাষ্টার পণ্ডিত। প্রতি রবিবার এখানে হেড মাষ্টার আত্মচরিত ভগবানচন্দ্র বসু মহাশয়ের বাসায় সভা হইয়া ব্রাহ্মধর্মের আলােচনা উপাসনা ইত্যাদি হইত এবং কতকদিবস পরে অন্য কোন কোন স্থানেও উপাসনার কাৰ্যাদি হইত। (১) ক্রমে ব্ৰহ্মাপসনার জন্য মন্দির প্রস্তুত হইয়াছিল (২) ও ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী লােকের সংখ্যাও বৃদ্ধি হইয়াছিল, ঐ (১) এ সম্বন্ধে পণ্ডিত শ্ৰীনাথ চন্দ তাঁহার “ব্রাহ্মসমাজে চল্লিশ বৎসর” গ্রন্থে লিখিয়াছেন। “কিছুদিন পরেই (১৮৫৪ সন) ইংরাজী স্কুলের হেডমাষ্টার বাবু ভগবানচন্দ্র বসু মহাশয়ের (স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা) বাসায় সমাজ উঠিয়া যায়। উক্ত ভগবান বাবু, ঈশান বাবু (ঈশানচন্দ্র বিশ্বাস, ইংরাজী স্কুলের মাষ্টার), গােবিন্দ বাবু (গােবিন্দ- চন্দ্র গুহ বাঙ্গালা স্কুলের শিক্ষক) এবং সুয়াপুর নিবাসী বাবু সি- শঙ্কর গুপ্ত সমাজের প্রথম সভ্য ছিলেন। •••তৎকালে আদি ব্রাহ্ম সমাজের পদ্ধতিক্রমে ব্রহ্মোপাসনা হইত এবং তত্ববােধিনী পাঠ ও রাজা রামমােহন রায়ের বৈরাগ্য সঙ্গীত গীত হইত। প্রায় দশ বৎসর কাল এইরূপে সমাজের কার্য নির্বাহ হইত।•••••••••ব্রাহ্মসমাজের কোন নিজস্ব গৃহ ছিল না, কোন সভ্যের বৈঠকখানায় সমাজের কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইত।” (২) “তখন কাছারীর সম্মুখবর্তী বাসাগুলি কেরাণীপাড়া নামে পরিচিত ছিল। ইংরাজী নবিশ বাঙ্গালী কেরাণী মিলিত না, তজ্জন্য ফিরিঙ্গিদিগকে ঐ কর্মে নিযুক্ত করা হইত। উহারা কাছারীর সম্মুখ- বর্তী স্থানে বাসা করিয়া সপরিবারে বাস করিত। ঐ কেরাণীদের একখানি বাঙ্গালা ২০০ টাকা মূল্যে ব্রাহ্ম সমাজের অন্ত ক্রয় করা হইল। এখন সেই স্থানে ঢাকার নবাব সাহেবের বাসা হইয়াছে। ১৮৬৫ সালের ১১ই মার্চ হইতে ঐ স্থানে ব্রহ্মেপসনা হইতে থাকে।”
আত্মচলিত সময় আমিও ঐ ৰাহ্মসমাজে উপাসনার্থ যাইতাম ও উপাসনাদি করিতাম। (১) কিন্তু তৎপরে আমার কুলগুরুঠাকুর মহাশয়ের নিকট ইষ্টম গ্রহণ করিয়া হিন্দুমতে ধৰ্মকাৰ্য্য করিয়া আসিতেছি। বল পাঠশালায় শিক্ষকতা কাৰ্যে নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে ও পরে প্রথমতঃ গােপীকৃষ্ণ সেন মহাশয়ের বাসায় লিখাপড়া চর্চা সম্বন্ধে (২) “ব্রাহ্ম সমাজে চল্লিশ বৎসর” ২৫ ও ২৬ পৃষ্ঠা।) ইহার নিকটবর্তী আর একটী কেরাণীর বাঙ্গালা গঙ্গাধর ঘােষ মহাশয় ক্রয় করিয়া নাটোরের বাসা হইতে উঠিয়া আসেন। এই বাড়ীতেই জীবনের শেষ পৰ্যন্ত যাপন করেন। (১) শ্ৰদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুত কৃষ্ণকুমার মিত্র মহাশয় তাহার আত্মীয় শদাপগুহে বাটীতে থাকিয়া পড়াশুনা করিতেন। তিনি লিখিয়া- ছেন যে আমি এ সব বিষয় (গঙ্গাধর বাবুর ব্রাহ্ম সমাজে যােগদানের বিষয় ) অনেক জানি ও বলিতে পারি। ব্রাহ্ম সমাজের প্রসিদ্ধ প্রচারক মহেশচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয় গঙ্গাধর বাবুর পুরােহিত বংশের ছিলেন এবং তাহার বাসায় থাকিয়া স্কুলে পড়িতেন। তিনি যেদিন তাঁহার উপবীত ত্যাগ করিয়া ঘরের চালের সঙ্গে রাখেন, সেইদিন বাসায় হুলুস্থুল পড়িয়া যায়; কিন্তু গঙ্গাধর ঘােষ মহাশয় কিছুমাত্র বিচলিত হন নাই বা বিরক্তি প্রকাশ করেন নাই। উদার ধর্মমত শেষজীবন পৰ্যন্ত পােষণ করিতেন। (২) কালেক্টরীর সেরেস্তাদার, রামকৃষ্ণ মুন্সি মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি খাজাঞ্জী ছিলেন এবং ব্রাহ্মসমাজের একজন অগ্রণী সভ্য ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মমতের জন্য পিতাকর্তৃক বিশেষ লাঞ্ছিত হন। “তাঁহার নিকট ময়মনসিংহের ব্রাহ্ম সমাজ বিশেষরূপে ঋণী”। তিনি গঙ্গাধর ঘােষ মহাশয়ের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। শেষ জীবনে তিনি ঢাকায় আত্মচরিত সভা হইত। সেখানে রবিবার বিকালবেলায় প্রত্যেকের কৃত রচনাপাঠ এবং তত্ত্ববােধিনী, প্রভাকর, ভাস্কর এবং পূর্ণচন্দ্রোদয় নামক পত্রিকা ও খবরের কাগজ পড়া হইত; এবং কোন কোন বিষয়ে জেদাজেদি করিয়া রচনা করা হইত ও অহা কাগজে ছাপান হইত। গদ্যপদ্য নানারকম লিখাপড়ার চর্চা হইত। কতকদিন পরে স্বর্গীয় কেশবচন্দ্র আচাৰ্য্য চৌধুরী (১) জমিদার মহাশয়ের এখানকার বাসাবাড়ীতে হিত- সাধিনী সভা হইত, সেখানেও ঐরূপ লিখাপড়ার চর্চা হইত। কেবল বাঙ্গালা লেখাপড়ার আলােচনা হইত, সংস্কৃত লিখাপড়া হইত না ; বাস করিতেন। বহু বৎসর পরে একদিন রাত্রি ১০টার সময় গঙ্গাধর বাবুর বৈঠকখানা ঘরে প্রবেশ করেন এবং “গঙ্গাধর কোথায় জিজ্ঞাসা করেন। এই দীর্ঘকায় পুরুষকে উপস্থিত কেহ চিনিত না। একজন গঙ্গাধর বাবু পার্শ্বের ঘরে আহার করিতেছেন বলিয়া জানান এবং অপেক্ষা করিতে বলেন। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে গােপীকৃষ্ণ বাবু আর ঠেলিয়া ভিতরের ঘরে যেখানে গঙ্গাধর বাবু আহার করিতেছিলেন এবং তাহার পুত্র-কন্যা ও পত্নী ছিলেন সেখানে প্রবেশ করেন। ঠাট্টা করিয়া গােপী- বাবু বলিলেন “কি আমি আসাতে জাত গেল না” এবং তাহার অট্টহাসিতে ঘর প্রতিধ্বনিত হয়। ইহাতে সকলেই আশ্চর্যান্বিত হন। তিনি তখন সকলকে গদাধরের সঙ্গে তঁহার কি সম্বন্ধ তাহা বুঝাইয়া দেন। এই ঘটনা হইতেই উভয়ের বন্ধুত্বের পরিমাণ বুঝা যায়। (১) ইনি মুক্তাগাছার অন্যতম জমিদার এবং ময়মনসিংহবারের একজন খ্যাতনামা উকীল ছিলেন। তৎকালে এই নগরের সাহিত্য- সেবিগণের মধ্যে ইনি অগ্রণী ছিলেন। ইহার সংগৃহীত লাইব্রেরীতে বহু দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান্ গ্রন্থ ছিল।
আত্মচরিত যাহার ইচ্ছা ছিল নিজ নিজ ঘরে বসিয়া সংস্কৃত লিখাপড়া করিতেন। সমুদয় সভাতে আমি বিশেষ লিপ্ত ছিলাম, বাঙ্গালা নানাপ্রকার বই ও খবরের কাগজ পাঠ করা ও গদ্য পদ্য রচনা করা আমার নিতান্ত কচি হইয়াছিল। সেই কালের প্রচলিত মতে ঐ ভাবের অনেক রচনা ও কবিতা লেখাপড়া করিতাম, ও অন্যের রচনা পাঠ করিতাম এবং নিয়মিত সময়ে মৌলবীর সাহায্যে পাশি লিখাপড়াও করিতাম। কিন্তু ঐ সকল রচনা ও সভাসমিতিতে সময় কর্তন করাতে আমার সময় নিতান্তই বৃথা নষ্ট হইয়াছে বলিয়া শেষে আমার বিশেষ পরিতাপ, আক্ষেপ ও দুঃখ বােধ হইয়াছিল। ঐ সময় আমার শিক্ষার জন্য উত্তম সময় ছিল। বহু লােকে ইংরেজী, বাঙ্গালা, সংস্কৃত ও অন্যান্য 'ভাষা ও ধর্মসংক্রান্ত নানাপুস্তক পড়িয়া মনুষ্যত্ব লাভ করিয়াছে আমি ঐ ভাবে বৃথা সময় কর্তন করাতে আমার কোন সুশিক্ষা হয় নাই, ইহা আমার সম্বন্ধে সামান্য দুঃখের বিষয় নহে। তখন অর্থবল বেশী না থাকাতে কেবল নানালােকের দলে মিশিয়া বাঙ্গালা লিখাপড়ার চর্চা ও মৌলবীর নিকট পাশি হিন্দি শিক্ষা করা কিছুতেই মূল্যবান বলিয়া মনে হয় না। আমার ঐ সময়, যে বৃথা নষ্ট হইয়াছে সেজন্য আমি বড়ই কষ্টভােগ করিয়া থাকি এবং এই বৃদ্ধকালে ধর্মপুস্তক পাঠের সময় সংস্কৃত গ্রন্থ বুঝিতে না পারিয়া তাহাতেও কষ্টবােধ করিয়া থাকি। আমি যখন স্কুলে শিক্ষকতা (১) ছাড়িয়া এডিসনেল সবজজকোর্টের (১) ১৩ পৃষ্ঠায় স্বর্গীয় আনন্দমােহন বসুর বিষয় লিখিত হইয়াছে। তাঁহার সম্পর্কে একটা ঘটনা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। ১৮৭৫ সালে তিনি ইয়ােরােপ হইতে নানা বিদ্যামণ্ডিত হইয়া ময়মনসিংহ ফিরিয়া আসিলে স্থানীয় স্কুলগুলি পরিদর্শন করেন। সর্বপ্রথমেই আত্মচরিত ডিক্রীজারীর মােহরের হইলাম, সেই সময় আমি মনে মনে নানা চিন্তা করিতে লাগিলাম যে কিছু পার্শি-হিন্দিশিক্ষা ও বাঙ্গালা লেখাপড়া শিক্ষা করিয়া মনুষ্যত্ব লাভ হইল না, এবং অর্থ উপার্জনের কোন উপায় হইল না। আদালত প্রভৃতি গবর্ণমেন্টের আফিস সমুদায় যে কিছু কিছু পার্শি হিন্দি চলন ছিল এবং লিখাপড়ায় ও উকিলদের বাদ প্রতিবাদে চলিতেছিল তাহা ক্রমে উঠিয়া যাইতে লাগিল সুতরাং যে কিছু পার্শি শিখিয়াছি (১) তাহা অকর্মণ্য হইতে লাগিল ইত্যাদি ভাবিয়া চিন্তিয়া এবং মুরব্বিগণের উপদেশ মত একটু পন্থা এই দেখিলাম যে আইন কানুন নজীর ইত্যাদি পাঠ করিয়া ওকালতীর পরীক্ষা দিতে পারিলে ও উকীল হইতে পারিলে কতক পরিমাণ অর্থোপার্জন ও মনুষ্যত্বের পন্থা হইতে পারে, এই বিবেচনা করিয়া অাইনাদি পাঠ করিতে বিশেষ যাত্নিক হইলাম। তৎকালে গবর্ণমেন্ট বিদ্যালয়ে যে তাহার বাল্য-লীলার প্রিয় নিকেতন সেই হার্ডিঞ্জ বঙ্গ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইলেন। তিনি উপস্থিত হইলে শিক্ষকগণ শশব্যন্তে তাহাকে বসিবার জন্য চেয়ার টানিয়া দিলেন কিন্তু তিনি কিছুতেই বসিলেন না; পুনঃপুনঃ অনুরােধ করাতে তিনি বলিলেন উহা আমার শিক্ষক মহাশয়ের আসন, আমি ও আসনে বসিতে পারি না।”—“ব্রাহ্ম সমাজে চল্লিশ বৎসর”। অনেক সময়ে আনন্দমােহন বলিতেন যেদিন অশিক্ষার জন্য গঙ্গাধর বাবু তাহাকে বিশেষ বাধ্য করিয়াছিলেন সেই হইতেই তিনি গণিতে বিশেষ মনােযােগী হন। (১) শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি পাসী অনেক ‘বয়ে মুখস্ত বলিতেন এবং অনেক প্রাচীন দলিল তরজমা ও ব্যাখ্যা শ্রেষ্ঠ মৌলবীদের ব্যয় করিতেন।
আত্মচরিত পৰ্যন্ত বঙ্গ ভাষায় উচ্চশিক্ষা হইতে পারিত, তাহা আমার শিক্ষা হইয়াছে কর্তৃপক্ষ আমাকে ভাল সার্টিফিকেট দিয়াছিলেন সুতরাং ওকালতী পরীক্ষার্থীদিগের মধ্যে গ্রাহ হইলাম। তৎকালে আমার বয়স ২০/২২ বৎসর মাত্র ছিল। পরিশ্রম করিবার বিলক্ষণ ক্ষমতা ছিল, দিবারাত্রি আইনাদি পাঠে মনোেযােগী হইলাম। আইনাদি পাঠ করিয়া ঢাকা কমিটিতে ক্রমে তিনবার পরীক্ষা দিয়। ওকালতীর সাটি- ফিকেট পাইয়াছি, ও তৎপরে যে ওকালতী মুন্সেফী (১) কাৰ্যাদি করি যাছি তৎতাবত কথা আমি ইহার পূর্বেই লিপি করিয়াছি। ইংরেজী জানাতে (২০) ওকালতীর শেষ সময়ে কাৰ্য চালাইতে অনেক অসুবিধা (১৯) নিম্নলিখিত ঘটনায় তিনি মুন্সেফী পদ ত্যাগ করিয়া পুনরায় ওকালতী করিতে বদ্ধপরিকর হন। জামালপুরে মুন্সেফ থাকাকালীন একদিন শারদীয়া পূজার কিছুদিন পূর্বে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করিতেছিলেন। সেই সময় কিছুদূরে স্বর্গীয় হরিচরণ গুহ প্রভৃতি উকিলগণ পূজার সময় মক্কেলদিগের নিকট কে কত হাজার টাকা পাইলেন তাহা আলােচনা করিতেছিলেন। তখনই তিনি মনে করিলেন যে আমি আমার সামান্য ১০০ টাকা মাত্র বেতন লইয়া বাড়ী যাইব আর এই সব উকীলেরা হাজার হাজার টাকা লইয়া বাড়ী যাইবেন। সেই দিনই তিনি জজ সাহেবকে জানাইলেন যে পূজার পর আর তিনি মুন্সেফী করিবেন না। (২০) তিনি যদিও ইংরাজী বক্তৃতা করিতে অভ্যস্ত হইয়াছিলেন না কিন্তু ইংরেজী নজীরের বহি পড়িতেন এবং তাহাতে আইনের কূটপ্রশ্নের যে সব মীমাংসা থাকিত, তাহা বিশেষভাবে আলােচনা করিতেন এবং মুশাবিজাতে তাহা কৌশলে প্রয়ােগ করিতেন।
আকাচরিত ৩৩ হইয়াছিল, কিন্তু ওকালতীর প্রথম ও মধ্য অবস্থায় আমার ঐ ওকালতি কাৰ্য্যের কোন অসুবিধা ছিল না। এই দেশের অনেক জমিদার তালুকদার মহাজন ও সর্বসাধারণ লােকে আমাকে ওকালতি কাৰ্য্যে নিযুক্ত করিতে ত্রুটি করিত না। প্রথম ও মধ্য অবস্থায় অনেক কাৰ্য চালাইয়া লােকের বিশ্বাসভাজন হওয়াতে ওকালতি কাৰ্য্যের শেষা- বস্থায়ও কাজকর্মের অভাব ছিল না (১)। এখন আমার চতুর্থকাল, বার্ধক্য বয়সে বাঁচিয়া আছি। কাৰ্যকৰ্ম্ম করার বিশেষ শক্তি নাই, পান ভােজনাদির রুচি নাই। জীব শরীরে যে সমুদয় সুখদুঃখাদি হয় এই সময়ে তাহার মনে কেবল দুঃখ ভিন্ন কোন সুখ নাই। এই বৃদ্ধশরীর লইয়া দীর্ঘকাল বাঁচিয়া থাকাতে বিড়ম্বনা ভিন্ন সুখের কোন অবস্থাই নাই। শক্তি না থাকিলে লােকের লভ্যের আশার হ্রাস হয় না, কিন্তু অনেকদিন হইতে আমার অর্থ পিপাসা নাই, (২) কোনরূপে নিত্যব্যয় ছিল। ময়মন- (১) মুশাবিদা (drafting) বিষয়ে তাহার অসাধারণ ক্ষমতা প্রাঞ্জল ভাষায় আইনের কূটতর্ক বজায় রাখিয়া মুশাবিদা করিতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাহার কৃত কবুলিয়ত ইত্যাদির মুশাবিদা এখনও অনেক জমিদারের ষ্টেটে প্রচলিত আছে। সিংহ জেলার বহু ষ্টেটের মূল্যবান দলিল যথা—বিভাগপত্র, দানপত্র, তৌলিয়তনাম, উইল ইত্যাদি তাঁহার মুশাবিদায় প্রস্তুত। বহু আইন আদালতে বিচক্ষণ কূটতত্ত্বজ্ঞ ব্যবহারজীবি কর্তৃক সমালােচিত হইয়াও এই সব দলিলে কোন ভুলচুক বাহির হয় নাই, অথচ এই সব দলিলে অবান্তর বা পুনরুক্তি কিছুই নাই। শেষ জীবনে মুশাবিজ ও ব্যবস্থা (consulting practice) তারাও বহু অর্থ উপার্জন করিয়াছেন। (২) প্রকৃত অর্থ ও সম্পত্তি উপার্জন করিলেও তিনি তাহাতে আত্মচরিত চালয়া গেলেই সে বিষয়ে শান্তি পাইতে পারি। কাৰ্যকৰ্ম করার শক্তি না থাকিলেও লােকের চিন্তাশক্তি বিদ্যমান থাকে যাহাদের সৎ- চিন্তা থাকে তাহারা শ্রেষ্ঠ লােক যাহাদের দুষ্টচিন্তা তাহারা অপকৃষ্ট লােক। সংকাৰ্য পুণ্য, অসৎকাৰ্যই পাপ। ঈশ্বর আরাধনা করা সৎকাৰ্য্য ও ইহ পরকালের কাৰ্য্য। পরিবার মধ্যে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পৌত, দৌহিত্র, পুত্রবধূ সকলেই আছেন, এখন মনে এই চিন্তা বেশী হইয়াছে যে আমার ঐ সকল আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কোন দুর্ঘটনা ঘটিয়া আমার কোন শােকতাপ ঘটিলে আমার দুঃখের দশা বেশী হইবে সেইজন্য আমার বােগজনিত বেশী ভােগ না হইয়া সহসা মৃত্যু ঘটে তাহাই আমার পক্ষে সুখের দশা বলিতে হইবে , কিন্তু তাহাও পুণ্যফল ব্যতীত হইতে পারে না (১)। নাপ্ত ছিলেন। ত্রিশ বৎসরের ধােপার্জিত সমুদায় অর্থ ও সম্পত্তির পারিবারিক বিভাগে তিনি একদিনও কুণ্ঠা বােধ করেন নাই। বরং এ বিষয় কেহ আইনের কূটপ্রশ্ন উপস্থিত করিলে বিশেষ অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন। (১) ভগবান পুণ্যাত্মার ঐকান্তিক প্রার্থনা পূর্ণ করিয়াছেন। ত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাহাকে কোনরূপ শােকজি বা বিশেষ রােগগ্রস্ত ইতে হয় নাই।
পরিশিষ্ট (ক)। “স্বগীয় গঙ্গাধর ঘােষের শেষ মুহূর্ত।” (চারুমিহির হইতে উদ্ধত ) বিগত ১০ই খাবণ শুক্রবার শুরু এয়ােদশীতিথিতে বেলা ৩টার সময় ৭৬ বৎসর বয়সে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুর প্রায় একমাস পূর্বে তিনি স্বপ্নে একখানা কালীপূজা করিবার জন্য আদিষ্ট হন এবং তাহা যথাবিহিত সম্পাদিত হয়। মৃত্যুর ২ দিন পূর্বে তিনি তাঁহার পুত্রদিগকে জানাইয়াছিলেন যে তিনি এয়ােদশী তিথিতে নরদেহ ত্যাগ করিবেন। মৃত্যুর দিন বেলা ৩টার সময় অবস্থা খারাপ হওয়াতে আত্মীয়স্বজন সকলে ব্যাকুলচিত্তে ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। এই সময় বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া তিনি সকলকে নিরস্ত হইতে বলিলেন এবং জ্যেষ্ঠ পুত্রকে বলিলেন [ ১ ] অল্প কয়েকদিন হয় তিনি তাহার একটা বিদ্রোহী প্রজাকে পূৰ্বপ্রতিশ্রুতি অনুসারে জমা কমি দিয়াছেন তাহা পুনরায় বৃদ্ধি করিতে নিষেধ করেন। [২] তাঁহার স্বার্থের বিরুদ্ধে একটা লােক তাঁহাকে সাক্ষী মান্য করিয়াছে, তিনি সাক্ষী দিলে সেই লােকটীর প্রতুল হইবে। সেই লােকটার বিষয় যেন তদ্রুপই মীমাংসা করাইয়া দেওয়া হয়। [ ৩ ] তেঁাহার একখানা মানসিক কালীপূজা বাকী আছে, তাহা সম্পন্ন করিতে বলিলেন। এই তিনটা বিষয় বলিবার পর গঙ্গাধর বাবুর স্ত্রী বলিলেন, আমার প্রতি মালা ও নামাবলী পাইবার আদেশ ছিল; তিনি এই কথা বলাতে গঙ্গাধর বাবু বলিলেন এখনও নামাবলী ও মালা পরান হয় আত্মচরিত নাই? তৎক্ষণাৎ নামাবলী গায়ে দেওয়া গেল এবং রুদ্রাক্ষের একটা মালা ডান হাতে পরাইয়া দেওয়া গেল এবং ডান হাতে সঁহার জপের মালা দেওয়া গেল। তিনি জপ করিতে লাগিলেন। যিনি মালা বাহির করিয়াছিলেন তিনি বলিলেন একটা বড় রুদ্রাক্ষের মালা এখানে আছে। তাহাতে কেহ কেহ বলিলেন ঐ মালা পরাইলে বুকে কষ্ট পাইবেন। তখন গঙ্গাধর বাবু বলিলেন উহা হইতে একটী রুদ্রাক্ষ নিয়া মালা করিয়া পরাইয়া দাও, তাহাই করা হইল। [ তখন গঙ্গাধর বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন “কোন ঋণ নাই তাে? তদুত্তরে পুত্রেরা বলিলেন ‘না’ এবং পূর্ব পূৰ্ব দিন পুরােহিত বটু ভৈরব স্তব পড়ার জন্য তাহাকে এবং অন্য একটা ব্রাহ্মণ পূর্ব দিন রাত্রিতে গায়ত্রী জপ করার জন্য তাহাকে গঙ্গাধর বাবুর হাতদিয়া গঙ্গাধর বাবুর স্ত্রী দক্ষিণা দেওয়াইলেন। এবং গলার সােণার একটা মাদুলী পুরােহিতকে গঙ্গাধর বাবুর হাতদ্বারা দেওয়ান হইল।] তৎপর তাহার ডানদিকে একখানি কালীমূর্তি রাখিতে বলিলেন ; বামদিকে পূর্বেই একখানি কালীমূর্তি ছিল। ঐ মুক্তি রাখিলে তিনি বলিলেন “ইতি, ইতি, ইতি’ ইতি, ইতি তারিখ দাও, বিদায়, অবকাশ।” তিনি তখন তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, “বিদায়, অবকাশ।” স্ত্রীর হাত ধরিয়া এবং অন্য দুই পুত্রকে আলিঙ্গন করিয়াও তাহাই বলিলেন। কালীশঙ্কর বাবু তখন উপস্থিত ছিলেন, তাহার হাত ধরিয়া নীরবে কিছুকাল ছিলেন। তৎপর সকলকে বলিলেন, “বিদায় অবকাশ, এই মােকদ্দমার এই অবকাশ, বিদায়।” তৎপর গঙ্গামৃত্তিকা গায়ে লেপন করিয়া রামনাম লিখিতে বলিলেন, তাহাই করা হইল; তৎপর গঙ্গাজল * ৰনীর অন্তত অংশ চাকমিহিরে ভুলক্রমে প্রকাশিত হইয়া- ছিল না।
আত্মচরিত ৩৭ } চাহিয়া পান করিলেন। এই সময় নিকট আত্মীয়স্বজন কেহ কালী, কেহ দুর্গা, কেহ বিশ্বের বলিতেছিলেন। গঙ্গাধর বাবু দক্ষিণ হত তুলিয়া ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া বলিলেন “আগে তলে পরে সব এক বিশ্বেশ্বর, আগে তলে পরে সব এক বিশ্বেশ্বর, আগে তলে পরে সব এক বিশ্বেশ্বর।” তখন সকলেই বিশ্বেশ্বরের নাম বলিতে লাগিলেন। [ তৎপর গঙ্গাধর বাবু বলিলেন “মা, মা, মা, মা আমার ২৯ বৎসর হয় মারা গেছেন”।]* ইহার পর গঙ্গাধর বাবু বাহিরের দিকে চাহিয়া বলিলেন “সন্ধ্যা হইয়াছে নাকি?” জ্যেষ্ঠ পুত্র তদুত্তরে বলিলেন “বেলা ৫টা বাজিয়াছে” তাহাতে তিনি বলিলেন “তবে, এখনও নিতে আসে না’কেন” এই বলিয়া ১ দেড় মিনিট নীরবে ছিলেন। তৎপর সহাস্য বদনে বলিলেন “এই আসিয়াছে”। ইহার পর কিয়ৎকাল জপ করিয়া বলিলেন [ “আসি, আসি, আসি ]* গদাধরের পাদপদ্ম ভরসা।” এবং বামদিকে যে কালীমূর্তি ছিল সেই দিকে চাহিলেন। সেইদিকে চাহিলে পর তিনবার অতি সামান্য খাস কষ্ট হইল। শেষ শ্বাস কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণবায়ু বহির্গত হইল। ইহার পূর্বে কোন শ্বাস কষ্ট বা কখনই গেমার ঘড় ঘড় শব্দাদি কিছুই হয় নাই। বন্ধুগণ হরিসংকীৰ্ত্তন করিয়া শুরু ব্রয়ােদশীর বিমল জ্যোৎস্নায় তাহাকে শ্মশানে নিলেন। শ্মশানে স্নানের সময় দেখা গেল তিনি তখনও কর ধরিয়া জপ করিতেছেন। ব্রহ্মপুত্রের ধারে নশর দেহ বিলীন হইল। ঠিক চিতা নির্বাণের সময় ভগবান যেন দয়া করিয়া এক ফসলা বৃষ্টি দিলেন। চিতা নির্বাণ হইলে পুনরায় জ্যোৎস্না উঠিল, বন্ধুগণ নিঃশকে গৃহে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন।” * বন্ধনীর অন্তর্ভূত অংশ চারুমিহিরে ভুলক্রমে প্রকাশিত হইয়া- ছিল না।
৬ আত্মচরিত [ গঙ্গাধর বাবুর মৃত্যুর পর বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনগণ তাঁহার পুত্রগণ নিকট দয়াপূর্বক শােক ও সহানুভূতি প্রকাশ করিয়া অনেক চিঠি লিখিয়াছেন, তন্মধ্যে নিম্নোক্ত চিঠিখানা প্রকাশিত হইল।] পরিশিষ্ট (খ) বালীগ। পােঃ হিলচিয়া। মা বাবু শশধর ঘােষ তথা ক্রমান্ বাবু করুণামােহন ঘােষ । মেহভাজনেষু- যুক্ত গবর্ণর সাহেবের দরবার উপলক্ষে নসীরাবাদ গিয়াছিলাম, শুনিয়াছিলাম গঙ্গাধর বাবু পীড়িত আছেন কিন্তু তিনি যে তখনি চলিয়া যাইবেন এ জীবনে আর তাহাকে দেখিতে পাইব না এমন মনে করি নাই; তারপর আমি জামালপুর থাকাকালে তাহার পরলােক যাত্রার কথা শুনিতে পাই। তখন অনেক দিনের পর পূর্বশ্বতি জাগিয়া উঠে এবং কিছু আক্ষেপ করি। বাড়ী চলিয়া আসিবার কালে ময়মনসিংহে বিলম্ব করিতে পারি নাই দুতরাং তােমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া আসিতে পারি নাই, এখন বাড়ী আসিয়া তােমাদের পিতৃদেবের স্বর্গা- বােহণ সম্বন্ধে চারুমিহিরে যে বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছে তাহা পাঠ করিয়া আমার মনে যে অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইয়াছে তাহাতে তােমাদিগকে এই পত্র না লিখিয়া থাকিতে পারিলাম না। পিতৃমাতৃবিয়ােগে শােকাতুর হওয়া সকলের পক্ষেই স্বাভাবিক, যে বয়সে ও যে অবস্থায়ই হউক না কেন সংসারে এমন সুহৃদের বিচ্ছেদ আত্মচরিত সহ করিতে কেহই ইচ্ছাপূৰ্ব্বক সম্মত হয় না। তােমরাও অবশ্য এই দারুণ শশাকের আঘাতে ক্লিষ্ট বােধ করিতেছ সন্দেহ নাই। আমি কিন্তু এই শােকাবহ ঘটনার ভিতরে আনন্দ ও আহলাদের বিষয় এত অধিক দেখিতেছি যে তাহার তুলনায় দুঃখরােক নিতান্তই নগণ্য বলিয়া বােধ জরা মরণশীল এই সংসারে সকলকেই মরিতে হইবে কিন্তু তােমা- দের পিতা যে সুখের মরণ মরিয়াছেন এমন মৃত্যু কয়জনের ভাগ্যে ঘটে ? আহা কি শান্তিতে, কি অক্লেশে, কি নিরুদ্বেগে, কি আনন্দ উল্লাসে গঙ্গাধর বাৰু স্বৰ্গযাত্ৰা করিয়াছেন। কেবল ধর্মনিষ্ঠ সাধুসজ্জনের পক্ষেই এরূপ শান্তিপ্রদ সজ্ঞান মৃত্যু সম্ভবপর। গঙ্গাধর বাবু যখন জামালপুরে মুন্সেফ হইয়া গিয়াছিলেন তখন আমি তথাকার স্কুলের ছাত্র ছিলাম। সেকালে আদালতের কাছারী হইত পল্টনে। এখন যে স্থানে মেলা হয় তাহার পশ্চিমে সুন্দর একটা বাঙ্গালা ছিল তাহাতেই মুলেফের কাছারী হইত। একদিন কাছারী বরখাস্ত করিয়া তিনি কয়েকটি উকিলের সঙ্গে আলাপ করিতে করিতে বাসায় যাইতেছিলেন, আমি তখন যাইয়া শ্রীযুক্ত হরিচরণ গুহ উকিল মহাশয়ের কাছে কিছু বলিতেছিলাম, গঙ্গাধর বাৰু তাহা শুনিয়া গুহ মহাশয়কে বলিলেন “বড় মিষ্টি, আপনি ইহার সঙ্গে আরও আলাপ করুন।” আজ এই সকল কথার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশান্ত ও প্রসন্ন মূর্তি বার বার আমার মনে জাগিয়া উঠিতেছে। পরবর্তী জীবনে তাহার সহিত অনেকবার দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ হইয়াছে, সর্বদাই দেখিয়াছি প্রশান্ত ও প্রসন্ন। সংসারে লােভনীয় ও শৃহনীয় সকল সুখ সম্ভোগ করিয়া ধনে জনে সুখ স্বচ্ছন্দে পরিবার পরিপূর্ণ রাখিয়া তিনি পরিণত বয়সে সজ্ঞানে দিব্যধামে চলিয়া গিয়াছেন, পরলােকেও তাহার সেই ‘এক বিশেখর তাঁহাকে পরম সুখে রাখিবেন। তােমাদিগকে সুশিক্ষা দান করিয়া ৪০ আত্মচরিত তােমাদের চরিত্র সুগঠিত করিয়া সর্বোপরি নিজে সংসারযাত্রার কাৰ্য্যে লিপ্ত থাকা কালে নিৰ্ম্মল ও সাধু জীবন যাপন করিয়া তােমাদের সাক্ষাতে যে পবিত্র দৃষ্টান্ত রাখিয়া গিয়াছেন, সে সকল চিন্তা করিলে কি আর আনন্দে উৎফুল্ল না হইয়া শােকে অভিভূত হইতে পার ? “তবে এখনও নিতে আসে না কেন?” “এই আসিয়াছে” এরূপ ভাবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইতে, এরূপভাবে স্ত্রী পুত্রের সহিত প্রফুল্লচিত্তে কোলাকুলী করিয়া বিদায় লইয়া হাসিতে হাসিতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতে কেহকে দেখি নাই। এমন পিতার পুত্রকন্যাগণধ, এমন পতির পত্নী চিরন্যা। এমন মৃত্যু সকলেই আকাঙ্ক্ষা করে। জগদীশ্বর নিকট প্রার্থনা করি, তােমরা তাঁহার আশীর্বাদে সুখে থাক এবং তােমাদের পিতৃদেবের উপযুক্ত কীর্তি স্থাপন কর। তাহার সদৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া জীবনে মরণে উন্নতির পথে অগ্রসর হও। অধিক আর কি লিখিব। আশীর্বাদ করিও তােমাদের পিতা যেরূপ সুখের মরণ মরিয়াছেন, অন্তিমকালে যেন সেইরূপ প্রফুল্ল মনে ও প্রশান্তচিত্তে ইহধাম হইতে বিদায় লইতে পারি। তােমরা তােমাদের পিতার সুসন্তান। আমি ভরসা করি তঁাহার আদেশ ও উপদেশ- সকল তােমরা অকুণ্ঠিতচিত্তে পালন করিবে। তােমাদের ঘনিষ্ঠআত্মীয় বন্ধুবান্ধব অনেক আছেন যাঁহারা এই উপলক্ষে তােমাদিগকে অনেক সানা ও উপদেশ দিবেন। আমি নিসম্পর্কিত ও দূরস্থ বলিয়া এবং আমার সান্তনা ও উপদেশও উল্টা রকমের বলিয়া যদি তােমাদের কাছে সমাদৃত না হয় তাহাতেও আমি দুঃখিত হইব না। আমার কাৰ্য আমি করিয়া সুখী হইলাম। ইতি ১৩১৯ সন, তারিখ রা ভাদ্র। নিয়ত মঙ্গলাকী-একালীকৃষ্ণ ঘােষ।
আদাজানের ঘােষবংশের বংশ পত্রিকা
বীজপুরুষ হইতে
একাদিক্রমে পৰ্যায়
১
মকরন্দ ঘােষ
२
সুভাষিত ঘােষ
চতুভূজ ঘােষ
৪
গঙ্গাধর ঘােষ।
ভানন্দ ঘোেষ
রাম
রাঘব
কালসী
কার্ণ ঘােষ See P. 1
পুপি ঘােষ
সতী
মতি
বিভাকর ঘােষ
১ ভগীরথ ঘােষ
মাঘী
১• ছয়কড়ি ঘােষ See 2.1
১১ কামদেব মােষ See p. 1
১২ রত্নাকর
রত্নাকর শেষ
১৩ ঘুনাথ ঘােষ See PP. 2, 3.
( ৪২ )
পৰ্যায়
১৩
রঘুনাথ
১৪
বাণীনাথ
21 Get See PP.3, 4.
E
রমানাথ প্রকাশ রতীনাথ যদুনাথ রূপনাথ ওরফে
সামবল্লভ (নিঃসন্তান) রূপনারায়ণ See 1. ৪
রামভদ্র প্রকাশ
জানকী বল্লভ
রাঘবরাম প্রকাশ রামবল্লভ
১৭ রুবাভ
কবভ ঘােষ
জয়দেব
গদাধর
অমররাম
১৮ প্রাণক রামশঙ্কর
ঘােষ
১৯ বিশ্বের রাধাকান্ত সদাশিব লােক গােপা।
লােক গােপী ভব মােহনলাল
ঘােষ নাথ কান্ত নাথ
২• জগমােহন
গৌরমােহন
(সরকারী উকিল )
কালীভৈরব ঘােষ
। (উকিল )
পৰ্য্যায়-২ কালীভৈরব ঘােষ ( উকিল ) ৫ ৫০ ধর রাজ গােলক মদন কৃষ্ণ মহেশ্চন্দ্র সারদা গদাধৰ বাৰ বিদ্যা- রাম নামকরণের শিব মােহন মােহন মােহন মােহন মােহন (উকিল) ৫ই চৈত্র, ১২৪৩ চন্দ্ৰ পূৰ্ব্বে মৃত্যু চন্দ্র ১০ই প্রাবণ, ১৩১৯ ১০ | ২২ রায় বাহাদুর শ্রীশশধর শ্ৰীকণামােহন রায় বাহাদুর শ্রীযামিনীমােহন বি-এল (উকিল) (ইস্পেক্টার) • বি-এ, (বি-সি-এস) + ১। ৭| ৮। ১১। ৭। অরবিন্দ পবিত্ৰকুমার জ্যোৎস্না জ্যোতি কল্যাণ অনিল সুকুমার বি-এ সুনীলকুমার সুশীলকুমার সুবীরকুমার বি-এ, (উকিল) প্রকাশ প্রকাশ " পরিমল হরিদাস শিবদাস দেবদাস তারাদাস * শশধর ঘােষ মহাশয়ের কন্যাগণের নাম—৩ ইন্দুমতী, ৪ বিভাবতী, ৫ লীলাবতী, ৬ বীণাপাণি, ৯ ইন্দিরা ও ১২ আলােরাণী। * শ্ৰীকরুণামােহন ঘােষ মহাশয়ের কন্যাগণের নাম—২ রেণুকা, ৩ যুথিকা, ৪ তালিকা ও ৫ নীহারিকা। # শ্ৰীযামিনীমােহন ঘােষ মহাশয়ের কন্যাগণের নাম-২ প্রভাবতী, ৩ ইলাবতী, ৬ নমিতা, ৮ গীতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.