Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rubaiyat-e-hafiz

Islam,nazrul · 2009/12/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

-1. Manchu
--
.
tv
a re -
Reaser
xe saga wa
২১ নন্দকুরটরলোককতা
-
hin

প্রকাশক---কালীকৃষ্ণ চক্রবর্ত্তী
শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী এণ্ড সন্স,
২১, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলকাতা
দুই টাকা
প্রিন্টার—মনােরঞ্জন চক্রবর্ত্তী
কালিকা প্রেস
২১, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা

উপহার

No text on this page.

উঠলাম, বাবা বুলবুল তােমার মৃত্যু-শিয়রে বসে বুবুল-ই- শিরাজ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি, যেদিন অনুবাদ শেষ করে সেদিন তুমি -আমার কাননের বুবুলি-—উড়ে গেছ! যে দেশে গেছ তুমি, সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর ? জানিনা তুমি কোথায় ! যে-লােকেই থাক, তােমার শােক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষ দান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ করাে। তােমার চার বছরের কচি গলায় যে সুর শিখে গেলে, তা ইরানের বুবুলিকেও বিস্ময়ান্বিত করেতুবে। শিরাজের বুবু-কবি হাফিজের কথাতেই তােমাকে স্মরণ করি, “সােনার তাবিজ রূপার সেলেট মানাতন বুকে রে যার, পাথর চাপা দিল বিধি হায়, কবরের শিয়রে তার।

No text on this page.

মুখবন্ধ
আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি সে আজ
ইংরে ১৯১৭ সালের কথা। সইখানে প্রথম
আমার হাফিজের সাথে পরিচয় হয়
আমাদের বাঙালী পল্টনে একজন পাঞ্জাবী মৌলবী
সাহেব থাকতেন।
একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ
থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শােনান।
শুনে নে আমি এমনি, মুগ্ধ হয়ে যাই, যে, সেইদিন
থেকেই তাঁর কাছে ফার্সি ভাষা শিখতে আরম্ভ করি।
ভারই কাছে ক্ৰমে ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত
বিখ্যাত কাব্যই পড়ে ফেলি।
তখন থেকেই
থেকেই আমার হাফিজের “দীওয়া”
অনুবাদের ইচ্ছা হয় । কিন্তু তখনাে কবিতা লিখবার
মত যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি।
এর বৎসর কয়েক পরে হাফিজের দীওয়ান অনুবাদ

মুখবন্ধ
করতে আরম্ভ করি। অবশ্য, তঁার রুবাইয়াৎ নয়-
গজল। বিভিন্ন মাসিক পত্রিকায় তা প্রকাশিতও
হয়েছিল। ত্রিশ পয়ত্রিশটী গজল অনুবাদের পর
আর আমার ধৈর্যে কুলােলনা, এবং ঐখানেই ওর
ইতি হয়ে গেল।
তারপর এস, সি, চক্রবর্তী এণ্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী
মহাশয়ের জোর তাগিদে ওর অনুবাদ শেষ করি।
যেদিন অনুবাদ শেষ হ’লসেদিন আমার খােকা
বুবু চলে গেছে।
আমার জীবনের যে ছিল প্রিয়তম, যা ছিল
শ্রেয়তম তারই নজরানা দিয়ে শিরাজের বুবুল
কবিকে বাঙলায় আমন্ত্রণ করে আনলাম ।
বাঙলার শাসনকর্তা গিয়াসুদ্দিনের আমন্ত্রণকে
ইরানের কবি-সম্রাট হাফিজ উপেক্ষা করেছিলেন।
আমার আহ্বান উপেক্ষিত হয়নি।
যে পথ দিয়ে
আমার পুত্রের জানাজা” (শব-যান ) চলে গেল,
সেই পথ দিয়ে আমার বন্ধু, আমার প্রিয়তম ইরানী
কবি আমার দ্বারে এলেন। আমার চোখের জলে
তাঁর চরণ অভিষিক্ত হল।
অন্যত্র হাফিজের সংক্ষিপ্ত জীবনী দিলাম। যদি

খবন্ধ সময় পাই, এবং পরিপূর্ণ দীওয়ান-ই-হাফিজ অনুবাদ করতে পারি, তখন হাফিজের এবং তার কাব্যের পরিপূর্ণ পরিচয় দিবার চেষ্টা করব । সত্যকার হাফিজকে চিন্তত হলে তাঁর গজল-গান —প্রায় পঞ্চশতাধিক—পড়তে হয়। তঁার রুবাইয়াৎ বা চতুষ্পদী কবিতাগুলি পড়ে মনে হয়, এ যেন তার অবসর সময় কাটানাের জন্যই লেখা। অবশ্য এতেও তঁার সেই দর্শন, সেই প্রেম, সেই শারাব সাকী তেমনি ভাবেই জড়িয়ে আছে। এ যেন তাঁর অতল সমুদ্রের বুদ্বদ-কণা। তবে এ ক্ষুদ্র বিম্ব হলেও এতে সারা আকাশের গ্রহ তারার প্রতিবিম্ব পড়ে একে রামধনু-কণার মত রাঙিয়ে তুলেছে। হয়ত ছােট বলেই এ এত সুন্দর । আমি অরিজিন্যা (মূল) ফাসি হ’তেই এর অনুবাদ করেছি। আমার কাছে যে কয়টী ফাসি দীওয়ান-ই- হাফিজ আছে, তার প্রায় সব কয়টীতেই পচাত্তরটী রুবাইয়াৎ দেখতে অথচ ফার্সি সাহিত্যের বিশ্ববিখ্যাত সমালােচক ব্রাউন সাহেব তাঁর History of Persian Literature 47 catatay forefa নোমানী তঁার “শেয়রুল আজমে” মাত্র ঊনসত্তরটী পাই।

মুখবন্ধ
রুবাইয়াতের উল্লেখ করেছেন । এবং এই দুইজনই,
ফার্সি কবি ও কাব্য সম্বন্ধে authority---বিশেষজ্ঞ।
আমার নিজেরও মনে হয়, ওঁদের ধারণাই ঠিক।
আমি হাফিজের মাত্র দুটী রুবাইয়াৎ বাদ দিয়েছি-
যদিও আরো তিন চারটী বাদ দেওয়া উচিত ছিল।
দুটী রুবাইয়াৎ বাদ দিয়েছি, তার অনুবাদ নিম্নে
দেওয়া হল। সমস্ত রুবাইয়াতের আসল সুরের সঙ্গে
অন্ততঃ এই দুটী রুবাইয়াতের সুরের কোনাে মিল
বেসুরাে ঠেকবে বলে আমি এ দুটীর অনুবাদ
মুখবন্ধেই দিলাম।
যে
নেই।
জমায় না ভিড় অসং এসে,
যেন গাে সৎলোকের দলে।
পশু এবং দানব যত
যায় যেন গাে বনে চলে।
আপন উপার্জনের ঘটায়
হয় না যেন মুগ্ধ কেহ,
আপন জ্ঞানের গর্ব যেন
করে না কেউ কোনাে ছলে।

মুখবন্ধ
কালের মাতা দুনিয়া হতে,
পুত্র, হৃদয় ফিরিয়ে নে তাের
যুক্ত করে দে রে উহার
স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ওর।
হৃদয় রে, তুই হাফিজ, সম
হ’স যদি ওর গন্ধ-লােভী,
তুইও হবি কথায় কথায়
দোষগ্রাহী, অম্‌নি কঠোর।
রুবাইয়াতের আগাগােড়া শারাব, সাকী, হাসি,
আনন্দ, বিরহ ও অশ্রুর মধ্যে এই উপদেশের বদ-সুর
কানে রীতিমত বেখাপা ঠেকে।
তা ছাড়া কালের বা সময়ের মাতাই বা কে,
পিতাই বা কে, কিছু বুঝতে পারা যায় না।
আমার অনুবাদের আটত্রিশ নম্বর রুবাই-ও
প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয়। কেননা প্রথম দুই লাইনের
সাথে শেষের দুই লাইনের কোন মিল নেই, এবং
ওর কোনাে মানে হয় না। দিনের ঔরসে রাত্রি
গর্ভবতী হবেন, এ আর যিনি লিখুন—হাফিজ লিখতে
পারেন না।
১১

গুলি। মুখবন্ধ এইজন্যই ব্রাউন সাহেব বলেছেন, ফার্সি কবিতার সব চেয়ে শুদ্ধ সংস্করণ হচ্ছে-তুরস্কে প্রকাশিত গ্রন্থ তঁার মতে--তুর্কীরা নাকি হিন্দুস্থানী বা ইরানীর মত ভাবপ্রবণ নয়। কাজেই তারা নিজেদের দু দশ লাইন রচনা অন্য বড় কবিদের রচনার সাথে জুড়ে দিতে সাহস করেনি বা পারেনি। অথচ, নাকি ভারতের ও ইরানীর সংগ্রাহকেরা ঐরূপ দুঃসাহসের কাজ করতে, পশ্চাৎপদ নন এবং কাজেও তা করেছেন। এ অনুযােগ হয়ত সত্যই। কেননা আমি দেখেছি, ফার্সি কাব্যের ( ভারতবর্ষে প্রকাশিত ) বিভিন্ন সংস্করণের কবিতার বিভিন্ন রূপ। লাইন, কবিতা উল্টো- পাল্টা ত আছেই, তার ওপর কোনােটাতে সংখ্যায় বেশী কোনােটায় কম কবিতা। অথচ তুরস্ক-সংস্করণ বই সংগ্রহ করাও আমাদের পক্ষে একরূপ অসাধ্য।•• হাফিজকে আমরা-কাব্য-রস-পিপাসুর দল- কবি বলেই সম্মান করি, কবিরূপেই দেখি। তিনি হয়ত বা সুফী দরবেশও ছিলেন। তাঁর কবিতাতেও সে আভাস পাওয়া যায় সত্য। শুনেছি, আমাদের দেশেও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশব সেন প্রভৃতি হাফিজের কবিতা উপাসনা-মন্দিরে আবৃত্তি করতেন।

মুখৰ কবিতা শুধু কবিতাই। তঁার দর্শন আর ওমরখাইয়ামের দর্শন প্রায় এক। এরা সকলেই আনন্দ-বিলাসী । ভোগের আনন্দকেই এরা এই জীবনের চরম আনন্দ বলে স্বীকার করেছেন। ইরানের অধিকাংশ কবিই যে শারাব সাকী নিয়ে দিন কাটাতেন, এও মিথ্যা নয়। তবে, এও মিথ্যা নয় যে, মদিরাকে এরা জীবনে না হোক-কাব্যে প্রেমের আনন্দের প্রতীকরূপেই গ্রহণ করেছিলেন শারাব বলতে এরা বােঝেন—ঈশ্বরের, ভূমার প্রেম, যাহা মদিরার মতই মানুষকে উন্মত্ত করে তােলে। সাকী অর্থাৎ যিনি সেই শারাব পান করান। যিনি। সেই ঐশ্বরিক প্রেমের দিশারী, দেয়াসিনী । লা—সেই ঐশ্বরিক প্রেমের লীলা-নিকেতন। ইরানী কবিদের অধিকাংশই তথাকথিত নাস্তিক- রূপে আখ্যাত হলেও, এরা ঠিক নাস্তিক ছিলেন না। এরা খােদাকে বিশ্বাস কতেন। শুধু স্বর্গ, নরক, রােজ কিয়ামত ( শেষ বিচারের দিন ) প্রভৃতি বিশ্বাস করতেন না। কাজেই শাস্ত্রাচারীর দল এদের উপর এত খাপ্পা ছিলেন। এঁরা সর্বদা নিজেদের “রিদান” পান- মুখবন্ধ বা স্বাধীনচিন্তাকারী, ব্যভিচারী বলে সম্বােধন করতেন। এর জন্য এদের প্রত্যেককেই জীবনে বহু দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছিল। হাফিজের সমস্ত কাব্যের একটী সুর- কায় বেখবর, আজ ফসূলে গুন্ ও তরকে শারাব !” এমন ফুলের ফসলের দিন—আর তুই কিনা শারাব ত্যাগ করে বসে আছিস।...” “ওরে মূঢ় ! আমাকে যারা এই রুবাইয়াৎ অনুবাদে নানারূপে সাহায্য করেছেন, তাঁদের মধ্যে আমার শ্রেয়তম আত্মীয়াধিক বন্ধু বন্ধু গীত-রসিক শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত সরকার অন্যতম। তঁারই অনুরােধে ও উপদেশে এর বহু অসুন্দর লাইন সুন্দরতর হয়ে উঠেছে। যদি এ অনুবাদে কোনাে ক্ৰটী না থাকে, তবে তার সকল প্রশংসা তারই। কলিকাতা ১লা ভাষাঢ়, বিনয়াবনত নজরুল ইলাম রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ

No text on this page.

১
তােমার ছবির ধ্যানে, প্রিয়,
দৃষ্টি আমার পলক-হারা ।
তােমার ঘরে যাওয়ার যে-পথ
পা চলেনা সে-পথ ছাড়া।
হায়, দুনিয়ায় সবার চোখে
নিদ্রা নামে দিব্য সুখে,
আমার চোখেই নেই কি গাে ঘুম,
দগ্ধ হ'ল নয়ন-তারা।

আমার সুখের শত্ৰু হ'তে
লুকিয়ে চলে আয় লো ত্বৱা ।
আয়েশ-সুখের
আমন্ত্রণ আজ,
শাৱাব দিয়ে পাত্র ভৱা ।
ইৰ্য্যারের কুমন্ত্রণায়
কোথায় যাবে, হে মাের ভীরু ?
আমার প্রিয়া ! শােনো শুধু
আমার কথা দুখ-সরা ॥

কল আড়াল তােমার থেকে
যেদিন আমার ভাগ্য-লেখা,
সেদিন হ'তে ফোটেনি আর
আমার ঠোঁটে হাসির রেখা।
কী নিদারুণ সেই বিরহের
বাজল ব্যথা আমার হিয়ায় ;
আমি জানি, আর সে জানে
অন্তবিহারী একা।
।
4
=

আমার সকল ধ্যানে জ্ঞানে
বিচিত্র সে সুরে সুরে
গাহি তােমার বন্দনা-গান,
রাজাধিরাজ, নিখিল জুড়ে !
কী বলেছে তােমার কাছে
মিথ্যা ক'রে আমার নামে :
হিংসুকেরা,—ডালে না আজ
তাইতে আমায় তােমার পুরে ॥

ত
আতে বল পেয়ালা শারাব
পার্শ্বে ব'সে পরাণ-বঁধুর ।
নিঙাড়ি লও পুষ্প-তনু
তাব্দীর অধর-আঙুর।
আহত যে—ক্ষত-ব্যথায়
সােয়াস্তি চায়, চায় সে আরাম
বিষম তােমার হৃদয়-ক্ষত,
ডাকো হাকিম কপট চতুর ॥

ভাবনু, যখন কছ মানা
বন্ধুরা সব আগলে ভাটি
দিলাম ছেড়ে এবার ফুলের
মন্তমে ভাই শাৱাব খাটি।
ফু-বাগিচায় বুলবুলিরা
উঠল গেয়ে, হায় রে বেকুব,
এমন ফাগুন, ফুলের ফসল,
নাইকো শাৱাব ?—সকল মাটি !

বিশ্বে সবাই তীর্থ-পথিক
তােমার পথের কুঞ্জ-গলির ।
ছুটছে নিখিল মক্ষী হয়ে
তােমার আনন-আনারকলির ।
আজকে যদি তােমার থেকে
মুখ ফিরিয়ে রয় পপ কেহ,
কোন্ চোখে কাল দেখবে তােমায়
হায় রে বে-দিল্ সেই মুসাফির !

৮
তােমার আকুল অলক—হানে
গভীর ছায়া রবির করে ।
শুক্লা চতুর্দশীর শশী
তােমার মুকুট, আঁধার হরে ।
ও-কস্তুরী-কালাে কেশের
নিশান ওড়ায় সন্ধ্যাবাণী,
হে'রে ও-মুখ,—উদয়-উষা
পাণ্ডুৱ চাঁদ ডুবে মরে ॥

ভিন্ন থাকার দিন গাে আমার
আজকে পরাণ-প্রিয়ার সাথে ।
বন্ধু নিয়ে খুশীর মউজ—
নেই গে সময় আজকে রাতে ।
কি ফুল র'য়ে সাবধানে আজ,
কাছে যখন নেইকো শারাব ?
, না,—কাছে শাৱাব আছে,
নেইকো প্রিয়াই মন ভােলাতে ॥

আমার পরাণ নিতে যে চায়
ঐ নিঠৱা রূপের পরী,
পরীর মতই রূপেরে সে
রাখে আঁখির আড়াল করি ।
কইনু তাৱে, “তুমি যে কও,
এইত এ-মুখ, কী আর এমন ?
জবাব দিল, “তাইত বলি
লােত করােনা এ
সুরি’ ।”

১১
রক্ত-রাঙা হ’ল হৃদয়
তােমার প্রেমের পাষাণ-ব্যথায় ।
তােমার ও-রূপ জ্ঞান-অগােচর,
পৌছেনাকো দৃষ্টি সেথায়।
জড়িয়ে গেল ভীরু হৃদয়
তােমার আকুল অলক-দামে,
সন্ধ্যা-কালো কেশে বাধা
দেখছি ওরে ছাড়ান দায় ॥

১২ রবি, শশী, জ্যোতিষ্ক সব বান্দা তােমার, জ্যোতির্মতি । যেদিন হ'তে বান্দা হ'ল- পেল আঁধার-হরা জ্যোতি। রাগে অনুরাগে মেশা তােমার রূপের রৌশনীতে চন্দ্ৰ হ’ল স্নিগ্ধ-কিরণ, সুৰ্য হ’ল দীপ্ত অতি ॥

১৩
যেদিন হ'তে হৃদয়-বিহগ
ব্যথার জালে পড়ল ধরা,
সেই হ'তে তার মাথার 'পরে
ঝুলছে ছু রক্ত-ঝৱা ।
ত্যক্ত আমি হাতের কাছের
পেয়ালা-ভরা শবতে, তাই
কতেছি পান পাত্রে ব্যথার
রক্ত আমার হৃদয়-রূৱা ॥

18
আমার করে তােমার অলক
জড়িয়ে বীণার তারের মত ।
এ হৃদি-ভার আমার শুধু
তােমার ঠোঁটে হয় আনত।
চিকণ তােমার ও-মুখখানি
হিয়ার সান্ত্বনা মাের,
সর্বগ্রাসী মাের ক্ষুধার খােরাক
ঐ দেহটুক ? হায় বিধাতঃ !

১৫
তােমার পথে মাের চেয়ে কেউ
সর্বহাৱা নাইকো, প্রিয় ।
আমার চেয়ে তােমার কা
নাই সখি, কেউ অনাত্মীয় ।
তােমার বেণীর শৃঙ্খলে গাে
নিত্য আমি বন্দী কেন ?
মাের চেয়ে কেউ হয়নি পাগল
পিয়ে তােমার প্রেম-অমিয় ॥

১৬
দতে হৃদয় ছতে পরাণ
দক্ষ সদা আমার প্রিয়া ।
তারি মিলন মাগি ঝুরে
ভাগ্য-হত আমার হিয়া ।
গােলাব-ফুলী গাল গাে তাহার,
রূপালী
ফুলকে ভােলায় ফুলমুখী
মিঠে হাসির ছিটে দিয়া ॥
মুখ
,
চিকণ অধর ;

১৭
পরাণ ভরে পিয়াে শাৱা,
জীবন যাহা চিরকালের।
মৃত্যু জরা ভরা জগৎ
ফিরে কেহ আসবেনা ফের।
ফুলের বাহার, গােলাব-কপােল,
গেলাস সাথী মন্ত ইয়ার,
এক লহমার খুশীর তুফান,
এই ত জীবন ভাবনা কিসের ॥

১৮
আয়না তােমার আত্মার গাে
তৱল তােমার ঐ লাবণী ।
সাধ জাগে ঐ ধ্যানের চরণ
করি আমার নয়ন-মণি ।
, না, আমার ভয় করে গো,
নয়ন-পাতার কাঁটায় পাছে
কমল-পায়ে বাজে ব্যথা।
খেয়ানে থাক সারাক্ষণই ।

রঙীন মিলন-গাত্র প্রথম
পান করালে ইমান্দারী ।
নেশায় যখন বুদ হয়েছি
জাল বিছালে অত্যাচার ।
আঁখির সলিল-ধাৱা গো, আর
বুকের আগুন-জ্বালা নিয়ে
তেজাই পােড়াই আপনারে
পথের ধূলি হ'য়ে তারি !
.

২০
t
তােমার মুখের মিল আছে, ফুল,
সাথে সে এক কমল-মুখীৱ ।
যে-ফুল হে'রে দিল, দেওয়ানা,
গন্ধ যথা সদাই খুশীর ।
সাধ জাগে—এক ফুানীতে
রাখি তােরে আর তাহারে,
ফুলে ঠোটে চুম্ব নিতে
লাগবে সুবাস পুষ্প-মদির ।

২১
আপন করে বাঁধতে বুকে
পারেনি কেউ তনু প্রিয়ার
জ্ঞান-বুদ্ধি-বিত্ত মাঝে
বন্ধ থাকে চিত্ত যাহার ।
আমার কথা ই পেলনা
চপল-আঁখি প্রিয়ার কানে
রত্ন-দু সে রইল পড়ে,
কর্ণে কভু উঠলনা আর।

१२
সােৱাই-ভরা রঙীন্ শাৱাব
নিয়ে চলো নদীর তটে
নিৱভিমান প্রাণে ব'সে
অনুরাগেৱ ছায়া-বটে।
সবারই এই জীবন যখন
সেৱে দুটো দিনের রে ভাই
লুট করে নাও হাসির মধু
খুশীর শাৱাব ভৱো ঘটে ।

२७
তোমার হাতের সকল কাজে
হবে শুভ নিরবধি
গ্রিয়, তােমার ভাগ্যবশে
নিয়তির এই নিদেশ যদি
দাও তাহ'লে, পান করে নি
তােমার দেওয়া শিৱী শাৱাব,
হ'লেও হব চির-অমর,
হয়ত ও-মদ সুধা
মদী

২৪ কুঁড়ি আজ কার্না-বাহী বসন্তের এই ফুল- জয় । নার্গিসেরা দল নিয়ে তার পাত্র ৱচে সুৱাৰ আশায় । ধন্য পাে সে-হৃদয়, যে আজ বিম্ব হয়ে মদের ফেনায় উপচে পড়ে শারাব-খানার ভােৱণ-দ্বারের পথের ধুলায় ॥

২৫
জীবনের
কুন্তলেরি পাকে প্রিয়ার
আশয় খােজে আমার পরাণ ।
অভিশপ্ত এই
কারার থেকে চায় যেন ত্রাণ ।
“কী দেবে দাম” শুধায় তাহার
দেহের গেহের রূপ-দুয়ারী,
প্রিয়ার ভুব্ধর তােরণ-তলে
পরাণ দিলাম নজরানা দান

২৬
চাদের মত রূপ গো তােমার
ভৱছে কলঙ্কেরি দাগে ।
অহঙ্কারের সােনার বাজার
ডুবছে ক্রমে ক্রান্তি-কাগে।
লজা অনেক দেছ আমায়,
প্রেম নাকি মাের মিথ্যা-ভাষণ !
আজ ত এখন পড়ল ধরা
কলঙ্ক কোন্ মুখে জাগে ॥

२१
রূপসীৱ
শিকার করে
হৃদয়-বনের শিকারীকে
দেহে তাহার রূপের অধি
অলঙ্কাৱেৱ চমক লিখে।
নার্গিস—যার শিৱে হের
ফুলের রাণীর মুকুট-গর,
নিরাভরণ —তবু তারই
রটে খ্যাতি দিগবিদিকে ।

তােমার ডাকার ও-পথ আছে
ব্যথার কাঁটায় ভ'রে খালি ।
এমন কোনাে নেই মুসাফির
ও-পথ বেয়ে চলবে, আলি।
জ্ঞানের রবি তাম্বর যার,
তুমি জান কে সে সুজন
প্রাণের রূপের পিলসুজে যে
দেয় গাে ব্যথার প্রদীপ জ্বালি ॥

২৯
যেদিন আমায় কবে সুদূর
তােমার থেকে কাল-বিরহ,
পডুবে যতই মনে, ততই
দিন হবে মাের দুর্বিষহ ।
ভুলেই যদি এ চোখ পড়ে
আর-কোনাে রূপসী রূপে,
অন্ধ আমি বইব তােমার
রূপের দাবী অহরহ।

দাও মােৱে ঐ পেঁয়াে মেয়ের
তৈরী খাৰ পুৱান
ক
তাই গিয়ে আজ গুটিয়ে ফেলি
জীবনের এই গালচেখানা।
যদি ধরার মন্দ তালে
দাও ভুলিয়ে মস্ত ক'রে,
জানিয়ে দেবাে এই সৃষ্টির
রহস্যময় সব অজানা।

৩১
পূর্ণ কভু
বিবাগী-
কভু কৱেনাকো
সুন্দর-মুখ দিয়ে আশা।
প্রেমের লাগি’ যে
ভাগ্য তাহার সর্বনাশা ।
প্রিয়া তব লক্ষ্মী সতী
তােমার মনের মূর্তিমতী
প্রেমিক-লের নও তুমি কেউ,
পাওনি প্রিয়া-ভালােবাসা ॥

৩২
মদ-লােভীরে মেলােতী কন,
পান করে এই শাৱাব যারা,
যেমুন মরে তেমনি ক'রে
গারের পারে উঠবে তার।
তাইত আমি সর্বদা ব্রই
শাৱাব এবং প্রিয়ার সাথে,
কবর থেকে উঠব—নিয়ে
এই শাৱাব, এই দিল-পিয়াৱা ।
- - -
। ALL

৩৩
তারি আমি বান্দা গােলাম,
সৌখী যে পিয়াসী।
গলায় যাহার দোলায় বিধি
পাগল প্রেমের শিকলি কঁসি।
প্রেমের এবং প্রেম জানানাের
স্বাদ অ-রসিক
পান করে এ সুরার ধারা
সুর-লােকের রূপ-বিলাসী ।
বুঝবে কিসে ?

৩৪
হয়না ধরার বিভব রাশি
জোর জুলুমে হস্তগত,
আনন্দের এই জীবন-সুধার
পায়নাকো স্বাদ বিষাদ-হত ।
খুঁজছ তুমি পাঁচটা দিনের
দুঃখ ভােগের পরিশ্রমে,
সাত শ’ হাজার বছর ধরে
জল ধরায় খুশী যত !

৩৫
আনন্দ আর হাসি গানের
প্রমত্ততার সময় হলাে,
পেয়ালা, শাবাব, দিল-দরদী,
দিলরুবা নাও, বেরিয়ে চলাে !
কটী ৩য়র এই ত জীবন
তাই ত বলি, ক্ষণেক তরে
জোৱ আঙুরু-রক্ত ঢেলে
পেলাস বাটী রঙিয়ে তােলে।
# PL

৩৬
দবেশ-আমার সামনে এল
ফিরে তােমার সেই বিরহ,
বুকের কাটা ঘায়ে যেন
নুনের ছিটে দুর্বিষহ।
ভয় ছিল, যে, তােমার থেকে
আর কিছুদিন রইব দূরে,
দেখছি শেষে আল আবার
সেই অশুভ দিন অবহ ॥

৩৭
বিষাদ-ক্ষী
অন্তরে মাের
থাকে যেন তােমার নজর,
তৃণ কুটোর পরেও ত গাে
পড়ে রবির প্রভাতী কর ।
যদি তােমার পথের খুলি
হই গাে প্রিয়,নারাজ হয়ে
গা'ল দিওনা ! পাছে শােনে
পথের ধূলি তােমার সে স্বর ।

৩৮
বিশ্বসেরে মে'রেহ’ল
প্রাণের বন্ধু শত্রু শেষে,
কত পথিক পথ হারাল
অবিশ্বাসের গহন দেশে।
পুরুষ-“দিবার ঔরসে গাে
“রাত্রি” নাকি গযুতা,
দেখুলনা যে পুরুষ—হ'ল
কেমনে সে !
%
ধৃত
তি

ক্ষত হৃদয় যেমন চাহে,
হয় যদি গাে, তেমনিটি হােক ।
নয় উড়ে যাক হৃদয়-বিহগ
অলখ-বিহার আত্মার লােক।
আজও খোদার দুপাতে গাে
এতটুকু ভ রাখি,
সকল দুয়ার খুলবে গাে তার
ভাগ্যদেবীর স্বর্ণ অ-শােক ॥

8
কি লাভ, যখন দুষ্ট ভাগ্য
হাসূলনাকে মুখ ফিরিয়ে,
পেলনা দিল
সুখের সােয়াদ,
দিন কাটাল ব্যথাই নিয়ে !
যে ছিল মাের চোখের জ্যোতি,
পুলা আঁখির, গেছে চ'লে।
নয়নমণিই গেল যদি
কি হবে এ নয়ন দিয়ে।

83 সকল কিছুর চেয়ে ভাল সুরাই- যখন কাঁচা বয়েস, প্রণয়-বেদন, মত্ততা, পাপ- যৌবনেরি একাৱ আয়েশ । এই সে তামাম দুনিয়াটাই ববাদ আর খাৱাব-রে ভাই, মন্দ ধরায় মন্দ যাতার প্রমত্ততাই মানায় যে বেশ!

89
আয়ুর মুরু বেয়ে এল ক্ষ্যাপা
প্লাবন আকুল থারায়,
এই ত জীবন-পান-পিয়ালা
তৱাৰ সময় কানায় কানায়।
হুশিয়ার হও সাহেব ! যেন
খুশী হয়ে কালের কুলি
তােমার জীবন-পেহ থেকে
আসবাব সব উঠিয়ে নে’ যায় ॥

83
কই?
জীবন,
আততা ক'রে আঙুল রেখে
প্রিয়ার কালাে পশমী কেশে,
তারে, “দাও গাে
এসেছি অমৃতের দেশে ?”
কইল প্রিয়া, “অলক ছাড়,
তার চেয়ে এই অধরখর !
জোনাকো দীর্ঘজীবন—
ফুর্তি মউ ওড়াও হেসে ?”

88
গেঁথেছি
বিনি কাল কাটল নিশি
একলা জেগে তােমার ব্যথায়,
অশ্রু-মরি হার
নয়ন-পাতার ঝালর-সুতায় ।
ভােমার তরে প্রাণ পােড়ানি
কইতে নারি কারুর কাছে,
আপন মনে তাই সারাদিন
আপন ব্যথা কই আপনায় ॥

২৫ বীৰত্ব শেখ “খয়বরী”-দ্বার- ভগ্ন-কারী “আলি”র কাছে, দান কারে কয় শিখতে হলে “কুম্বরের” ঐ বাদশা আছে। ওৱে হাফিজ, পিয়াসী কি তুই করুণা-বারির তরে ? শাৱাব-সুধার সাকি জানে উৎস তাহার কোন্ কানাচে ॥

৪৬
পরামর্শ
প্রিয়া তােমায় দেছে দাগা ?
বন্ধু পীড়ন সহ্য কর।
আমার
শােন,
সকল ভ'লে শাৱাব ধৱ ।
মতলব হাসিল কর তােমার
খুবসুরতী রতির সাথে,
অন্তর দিওনা তারে
যে তব অযােপ্যর ॥

৪৭
“বাবিলনের” যাদু বুঝি
গুরু তব চটল চোখে,
হা'র মানে ও চোখের কাছে
যাদুকরী সকল লােকের
দুলছে যে ঐ অলক-গুছি
রূপকুমারীর কর্ণমুলে
দুলে যেন হাফিজের এ
কাব্য-মােতির চারপাশে ফের।

৪৮
দেখ রে বিকচ ফুলকুমারীর
রূপ-সুষমার আনন-শােভা,
দেখ বাদলের কাঁদন সাথে
ফুলের হাসি মনােলােতা ।
কিসের এত ঠমক দেখায়
দেবদারু আজ দখণে হাওয়ায়,
রাণীরে কবে বীজন
দোল দিল এই আনন্দ বা ।

89
বুক হতে তার পিরাণ খােলে
শ্যামাঙ্গী ঐ তন্বী যখন,
ঠিক উপমা পাইনে খুঁজে
সে মাধুরী দেখায় কেমন ?
এমনি তরল রূপ গাে তাহার
বুকের তলে হৃদয় দেখায়,
স্বচ্ছ দীঘির কালো জলে
সুডৌল্ পাষাণ-মুড়ি যেমন ।

মােমর বাতি ।
পতন্ত্রে এ
'লেও কি গাে স্মরণ কর ?
আমার কাছে ভালােবেসে
'লে যাওয়া কেমনতর।
তােমার তরে যে বেদনার
কথাৱা বয় এ হৃদে,
জানে শুধু জীবনমরুর
বালুর চর এ রােদ্র-খর ॥

৫১
কে দেখেছে সরল মনের
য়া গাে—ষে দেখব আমি।
আমার মত অনেকে এ
প্রাণ পীড়নের মুক্তিকামী ।
কব কি আর—পরাণ প্রিয়,
তুমিই যদি কপট এত !
আমার মত ভাগ্য সবার
দেখনু সমান বিপথগামী।

৫২
সেই ভালাে মাের—এই শাৱাবের
পিয়ালা দিয়ে ত করি দিল,
যে সাধ আমার পুলনা তা
গাে আজ কব
বাতিল
ধার-করা এ জীবন আমার
বন্দী নিতি
-কারায়,
আজ নিমেষের মুক্তি দেবাে
তালে, ভেঙে কার পাঁচিল ॥
ব

৫৩
আনন্দে ঐ বিহগ-পাখাৱ
শব্দ শুনি অদুর নতে,
কিম্বা গাে ও নম্র-চিতের
ফুলবাগানের খে
হবে।
অথবা ওই মৃদু হাওয়া
তােমার শিরী
ঠোটের ভাষা,
রূপকথা কি শুনছি তবে?

৫8
কাঁদি তােমার বিরহে গাে
বেশী মােমের বাতির চেয়ে,
আরক্ত-থার অশ্রু ঝরে
মদের সােৱাই সম বেয়ে।
আমি গাে পান-পেয়ালা যেন,
হৃদয় যখন কৃপণ হেরি
দূর বাঁশী-বিলাপ শুনি
রক্ত-ধারায় উঠি
ছেয়ে ॥

৫৫
পরাণ-পিয়া ! কাটাই যদি
তােমার সাথে একটা সে রাত,
বসন সম
জড়িয়ে রব
নিমেষ পলক কৱবনা পাত ।
য় কি আমার, যদিই সখি
তার পরদিন মৃত্যু আসে,
পান করেছি অমর-করা
তােমার ঠোঁটের “আব-ই-হায়াত।

৫৬
আলিঙ্গন ও চুম্বন হায়
মরুল তােমার ধেয়ান ক'রে,
তােমার ঠোটে চুম না পেয়ে
পান্না চুনি গেল মরে।
কাহিনী আর বাড়াবনা
অল্পে সারি কল্পকথা,
মল কেহ ফিরে এসে
প্রতীক্ষাতে জীবন ধরে ।

৫৭
দয়িত মাের!
অল্পে এত
ছাড়ুব তােমায় কেমন করি’
মরকত-নীল ও-কেশ-ফঁসে
যতক্ষণ না প্রাণ বিসরি’ ।
লােহিত চুণীর ঠোঁট গাে তােমার
মাের জীবনীশক্তি সে যে,
লক্ষ প্রবাল বিনিময়েও
পাবনা তা দিতে, গােরি!

৫৮
দুঃখ ছাড়া এ-জীবনে
হ’লনা আর কিছুই হাসি,
বিষাদ হ’ল সাথের সাথী
তােমায় দিয়ে আমার এ দিল্ ।
গােপন মনের স্বপন-সাথী
পেলামনা গাে বন্ধু কোননা,
ব্যথাই আমার ব্যথার ব্যথী,
তােমার মতই নিঠুর নিখিল ॥

আমায় এবােধ দেওয়ার তরে, ভােরের হাওয়া, ব'লাে ভাৱে- যে পাষাণীর মন গলেনা আমার শত অশ্রু-ধারে, ‘সুখে তুমি ঘুমাও নিতি দুলে দুলে আৱা-দোলায়, কার নয়নে ঘুম নাহি আর- উদয় কি হয় স্মরণ-পারে ?

to
বিশ্ব
নিখিল
আর কতদিন কবে, প্রিয়,
এ উৎপীড়ন আমায় নিয়ে,
বিনা কারণ
জ্বালাবে ও হৃদয় দিয়ে ।
আশী
দের সম অসি
দুঃসাহসীর কঠোর হাতে,
তােমার হাতে পড়লে তাহা
কবে তা খুন তােমায় প্রিয়ে ॥

w
৬১
কোরান হদি সবাই বলে—
পবিত্র সে বেহেশত নাকি,
মিলবে সেথাই আসল শারাব
তন্বী হুৱী ডাগর-আঁখি !
শাৱাব এবং প্রিয়ায় নিয়ে
দিন কাটে মাের, দােষ কি তাতে ?
বেহেশতে যা হারাম নহে-
মর্ত্যে হবে হারাম তা কি ?

৬২
চন্দ্র সূৰ্য্য রাত্রি দিবা
বিচিত্র সে আবেগ তরে,
ওগাে প্রিয়, দেখি—তােমার
ধূলির 'পরে প্রণাম করে।
হৃদয় আঁখির সাধ হ'তে মাের
করােনা গাে নিৱাশ মােরে,
রইবে দূরে—বসিয়ে আমায়
প্রতীক্ষার ঐ অগ্নি পরে?

৬৩
মদের মত কি আর আছে
ভুলতে ব্যথা, তাতিয়ে তােলার ?
যুদ্ধ করার সাধ জাগে কি
সেনার সাথে এই বেদনার ?
এই ত তােমার কাঁচা মাথা,
এরি মাঝে বাতিল্ শাৱাব ?
কাঁচা সবুজ বয়েসই ত
খুশীর, গানেৱ, পান-পিয়ালার ।

৬২
মুকুল,
পাতার পর্দান
ফুটেই হেরে তােমায় পাছে !
মাতােয়ালা নার্গিস শরমে
তােমায় হেরি মরণ যাচে।
তােমার কাছে রূপের বড়াই
কেমন করে কবে গাে ফুল ?
ফুল পে’ল রূপ চাঁদ চোয়ায়ে,
চাদ পেল রূপ তােমার কাছে!

৬৫
।
আশ্বাসেরই বাণী তােমার
প্রতীক্ষার ঐ দুর সাহারায়
ফিছে আজো, আর কতদিন
ঢাকবে রবি মরুর ধূলায় ?
বাঘের মুখে যাও গো যদি
লালসা আর লােভের বশে,
আখেরে যে শিকার হবে
গােরের হাতে মাটীর তলায় ।

৪৬
তােমার আঁখি-
-জানে যাহা
বঞ্চনা আর ছল চাতুরী,
চমকে বেড়ায় অসি যেন
রণাঙ্গনে ঘুরি’ ঘুরি
তড়িৎ-জ্বালার ও-চোখ ত্বরিত
গােল বাধাবে বঁধুর সাথে,
যে হিয়াতে শিলা ঝরে,
হায় গাে তারি তরে ঝুরি ॥

৬ ৭
দাও এ হাতে—ফুৰ্তি শিকার
করে সদা যে বাজপাখী,
গ্রিয়ার মত প্রিয়ম্বদা
মদ-পিয়ালা দাও গো সাকী ।
কুঞ্চিত ঐ
পাক খেয়েছে শিকলি স
আন পাে তায় দোস্ত, কর
এই দিওয়ানার হস্ত-রাখী
কুন্তল—যা

৬৮
হায় রে, আমার এ বসিব
হ’ত যদি মনের মত ।
কিম্বা গ্রহের চক্র ঘুরে
আবার আমার বন্ধু হত!
পালিয়ে যেত যােবন মাের
যখন হাতের মুঠি হ'তে,
রেকাব সম রাখত ধ'রে
এই জ্বরে
সমুন্নত ॥

৬৯
ফুলমুখী দিল-পিয়ারী
বীণা, বেণু, একটু আড়াল,
এক রেকাবী কাবাব, সাথে
এক পেয়ালি শিরাজী লাল,
ধমনীতে উঠবে জ্ব'লে
লক্লকিয়ে অগ্নিশিখা,
“হাতেমতাই”-এর অনুগ্রহও
চাইনা তখন মুহূর্ত কাল !

ক
শাহী তখতে বসেছে ফুল
দেখনু সেদিন গুল-বাগিচায়,
কইনু শােনন, সত্য যদি
ও তুমি রাজ-মহিমায়,
নিস্পাপ এক কিশাের আমি
জ্বালাও তাৱেই রাত্রি দিব,
তবু তােমার স্পর
পা
চিরন্তনী, আফসাে, হায় !

৭১
বন্দী বোঁটায় কইল কুসুম,
থাকত যদি শক্তি আমার
পালিয়ে যাবার রাস্তা পেলে
পালিয়ে যেতাম দূর বন-পার !
বিনা অপরাধেই মােৱে
এমন করে জ্বালায় যদি,
সত্যিকারের দোষী হ'লে
না জানি সে কত
কি আর !

१२
সেও এ মন-ভাগ্য সম
এনি জালে ঝাঁত যদি,
হ’ত লাখাে খাৱাবী তার
শাবি নিয়ে নিরবধি।
মি মাতাল, প্রেম-বিলাসী,
পাগল, ভুবন-দাহনকারী,
বলে কাছে রটবে কুষশ
তাইত থাকি দুয়ার রােখি ॥

৭৩
ওরে হাফিজ, শেষ ক তাের
কৃত্রিম এই কলমবাজি
হ’ল সময়—খেলা পাতা
ঝোলায় তুলে রাখার আজি ।
রব হয়ে বসার পাল
এবার রে তাের,—আজকে শুধু
শুন্য গেলাস টইটুম্বুর
ক রে ঢেলে শেষ শিরাজী।

তামাম শােদ নুনু-ই-শিরাজ মরমী কবি হাফিজের সংক্ষিপ্ত জীবনী শিরাজ ইরানের মদিনা, পারস্যের তীর্থভূমি। শিরা গরই মােসল্লা নামক স্থানে বিশ্ববিশ্রত কবি হাফিজ, চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জন্মগ্রহণ করেন। ইরানের এক নীশাপুর ( ওমর খাইয়াম-এর জম্মভূমি ) ছাড়া আর কোনাে নগরই শিরাজের মত বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে নাই। ইরাণের প্রায় সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিরই লীলা-নিকেতন এই শিরাজ। ইরানীরা হাফিজকে আদর করিয়া “বুলবুল-ই- শিরাজ” বা শিরাজের বুলি বলিয়া সম্ভাষণ করে। হাফিজকে তাহারা শুধু কবি বলিয়াই ভালাে বাসে না। তাহারা হাফিজকে “লিসান-উ-গায়েব অাতের বাণী ), “জ্জমানউ-আসরার” (রহস্যের মৰ্ম্মসন্ধানী ) বলিয়াই অধিকতর শ্রদ্ধা করে। হাফিজের ৭

বী
কবর আজ ইরানের শুধু জ্ঞানী গুণীজনের শ্রদ্ধার স্থান
নয়, সৰ্বসাধারণের কাছে “দর্গা,” পীরের আস্তানা।
হাফিজের মৃতু্যর একশত বৎসরের মধ্যে তাহার
কোনও জীবনী রচিত হয় নাই। কাজেই তাহার
জীবনের অধিকাংশ ঘটনাই অন্ধকারের নীল মঞ্জুষায়
চির বদ্ধ রহিয়া গিয়াছে। তাহার জন্ম মৃত্যুর
দিন লইয়া ইরানেও তাই নানা মুনির নানা মত।
হাফিজের বন্ধু ও তাহার কবিতা সমূহের (দীওয়ানের )
মালা-কর গুল্-আন্দামের মতে হাফিজের মৃত্যু সাল
+৯১ হিজরি বা ১৩৮৯ খৃষ্টাব্দ। কিন্তু তিনিও কবির
সঠিক জন্ম সাল দিতে পারেন নাই।
হাফিজের পিতা বাহাউদ্দিন ইস্পাহান নগরী
হইতে ব্যবসা উপলক্ষে শিরাজে তাসিয়া বসবাস
করেন। তিনি ব্যবসায় বেশ সমৃদ্ধি লাভ করেন,
কিন্তু মৃত্যু সময়ে সমস্ত ব্যবসা এমন গােলমালে
জড়িত করিয়া রাখিয়া যান, যে, শিশু হাফিজ ও
তাহার
ঐশ্বর্যের কোল হইতে একেবারে
দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে আসিয়া পতিত হন। বাধ্য
হইয়া তখন হাফিজকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া
অর্থোপার্জন করিতে হয়। কোনো কোনাে জীবনী-

বৈী
লেখক বলেন, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে হাফিজকে তঁাহার
মাতা অন্য একজন সঙ্গতিসম্পন্ন বণিকের হাতে সমর্পণ
করেন। সেখানে থাকিয়াই হাফিজ পড়াশুনা করিবার
অবকাশ পানি।
যে প্রকারেই হউক, হাফিজ যে কবি খ্যাতি
লাভ করিবার পূর্বে বিশেষরূপে জ্ঞান অর্জন করিয়া
ছিলেন, তাহা তঁাহার কবিতা পড়িয়াই বুঝা যায়।
হাফিজের আসল নাম শামসুদ্দিন মােহম্মদ।
“হাফিজ” তঁাহার “খলু,” অর্থাৎ কবিতার ভণিতায়
ব্যবহৃত উপ-নাম। যাঁহারা পরিপূর্ণ কোরান কণ্ঠস্থ
করিতে পারেন, তাহাদিগকেই মুসলমানেরা হাফিজ
বলেন। ভাহার জীবনী লেখকগণও বলেন, হাফিজ
তাহার পাঠ্যাবস্থায় কোরান কণ্ঠস্থ করিয়াছিলেন।
তাহার পাঠ্যাবস্থাতেই তিনি স্বভাবদত্ত শক্তিবলে
কবিতা রচনা করিতে আরম্ভ করেন, কিন্তু তাহা
তেমন আদর লাভ করিতে পারে নাই। কিছুদিন
পরে “বাবা-কুহী” নামক শিরাজের উত্তরে পর্বতাে-
পরিস্থ এক দর্গায় (মন্দিরে ) ইমাম আলি নামক
এক দরবেশের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। সেদিন
“বাবা-কুহী”তে সমস্ত রাত্রি ধরিয়া. ধর্মোৎসব চলিতে
৭৭

তাহার বন্ধু
ছিল হাফি ঐ উৎসবে যােগদান করিতে
গিয়াছিলেন। ইমাম আলি হাফিজকে রহস্যময় কোনাে
স্বগীয় খাদ্য খাইতে দেন এবং বলেন, ইহার পরেই
হাফিজ কাব্যলক্ষমীর রহস্যপুরীর সকল ঐশ্বর্যের
অধিকারী হইবেন। ইহা সত্য কিনা জানিনা, কিন্তু
হাফিজের সমস্ত জীবনী লেখকই এই ঘটনার উল্লেখ
করিয়াছেন। শুধু উল্লেখ নয়, বিশ্বাসও করিয়াছেন।
হাফিজ তাহার জীবিত কালে হার কবিতাসমূহ
( দীওয়ান ) সংগ্রহ করিয়া যান নাই।
গু-আন্দামই সর্বপ্রথম তাহার মৃত্যুর পর “দীওয়ান”
আকারে হাফিজের সমস্ত কবিতা সংগ্রহ ও সংগ্রথিত
করেন। কাজেই মনে হয়, হাফিজের পঞ্চশতাধিক
যে কবিতা আমরা এখন পাইয়াছি, তাহা ছাড়াও
অনেক কবিতা হারাইয়া গিয়াছে, বা তিনি সংগ্রহ
করিতে পারেন নাই।
হাফিজ ছিলেন উদাসীন সুফী। তাঁহার নিজের
কবিতার প্রতি তাঁহার মমতাও তেমন ছিলনা।
কবিতা লিখিবার পরই তাহার বন্ধুবান্ধব কেহ সংগ্রহ
না করিয়া রাখিলে তাহা হারাইয়া যাইত। কিন্তু
তাঁহার কবিতার অধিকাংশই গজল-গান বলিয়া, লেখা

যীবনী হইবামাত্র মুখে মুখে গীত হইত। ধৰ্ম্মমন্দির হইতে আরম্ভ করিয়া পান-শালি পর্যন্ত সকল স্থানেই তঁাহার গান আদরের সহিত গীত হইত হাফিজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মত। কূলের পথিক যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গ-লীলা দেখিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল-তলের সন্ধানী ডুবুরী তেমনি তাহার তলদেশে অজস্র মণিমুক্তার সন্ধান পায়। তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নৰ্ত্তন, বিপুল বিশালতা; নিম্নে তেমনি অতল-গভীর প্রশান্তি, মহিমা !••• আকাশের নীল পেয়ালা উপচিয়া আলাের শিরাজী ধরণীতে গড়াইয়া পড়ে, উম্মত্ত ধরণী নাচিয়া নাচিয়া শূন্যে ঘুরিয়া ফেরে। তারকার মণিমাণিক্য- খচিত আকাশ-পেয়ালার সাকীকে কবি ডাকে, শারা ভিক্ষা করে আর গান গায়—“বদেহ, সাকী ময়ে বাকী।” ওগাে সাকী, আয়াে-আরাে শারাব ঢাল।} কিছুই বাকী রাখিওনা। পাত্র উজাড় করিয়া শারাব চাল!••• কেহ কেহ বলেন, হাফিজ অভিমান করিয়াই হার জীবিত কালে বহু বন্ধুবান্ধবের শত সনির্বন্ধ

चौवनी
অনুরােধ সত্ত্বেও তঁাহার কবিতা সমূহ সংগ্রহ করিয়
যান নাই। হাফিজের সময়ে শিরাজের শাসনকর্তা
ছিলেন শাহ আবু
ইসহাক ইঞ্জা। তিনি নিজেও
একজন কবি ও সমঝদার ছিলেন। তিনি হাফিজের
অন্যতম
এবং পৃষ্ঠপােষক ছিলেন।
কিছুদিন পরে শাহ সুজা শিরাজের শাসনকর্তা হন।
সুজা ইমাদ কিরমানী নামক একজন কবির অতিশয়
ভক্ত ছিলেন। এমন কি তিনি হাফিজকে বড় ক
বলিয়াই স্বীকার করিতেন না। শাহ সুজাও নিজে
কবি ছিলেন, এবং তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হাফিজের
সমকক্ষ ছিলেন না। বলিয়াই ইনাকে বড় কবি
বলিয়া হাফিজকে হেয় করিবার প্রয়াস পাইতেন।
একবার শাহ সুজা হাফিজের কবিতার নিন্দাবাদ
করায়, হাফিজ উত্তর দেন, “তবুও আমার এই কবিতা ও
সারা দেশের লােকে কণ্ঠস্থ, প্রশংসা এবং আবৃত্তি করে,
কিন্তু এই নগরে এমন অনেক কবি আছে, যাহাদের
কবিতা এই শহরের সীমা অতিক্রম করিতে পারে না।”
এই উত্তর শুনিয়া শাহ সুজার বুঝিতে বাকি
রহিল না, যে, ইহা তাহাকেই উল্লেখ করিয়া বলা
হইয়াছে। কিন্তু তিনি যতই ক্রোধান্বিত হন, কিছু

জীবন
করিতেও পারিলেন না। ইহার অল্পদিন পরেই
হাফিজের দুই লাইন কবিতা তঁাহার হস্তগত হয়
“গরু মুসলমানী আজ, আন, কে হাফিজ দার
ওয়ায়, আগর আজ, পেয়, ইমরােজ বুয় ফরদায়ে।”
“হাফিজের যে ধৰ্ম্ম, ইহাই যদি মুসলমান ধৰ্ম্ম হয়,
হায়, তাহা হইলে কবে আজকার দিন শেষ হইয়া
কল্য আসিবে।”
t
এই কবিতার সুবিধা লইয়া শাহ সুজা মনস্থ করেন,
হাফিজের বিধৰ্ম্মী বলিয়া বিচার হইবে । এই সংবাদ
পাইয়া হাফিজ অতিশয় সন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন। সেই
সময় সৌভাগ্যক্রমে শিরাজে মৌলানা জায়নুদ্দিন আবু
বকর তায়াবাদি উপস্থিত ছিলেন। হাফিজ গিয়া
তাহার পরামর্শ ভিক্ষা করেন। তিনি হাফিজকে
উহার সহিত আরও এমন দুই লাইন কবিতা জুড়িয়া
দিতে বলেন, যাহার দ্বারা পূর্বের দুই লাইন কবিতার
অর্থ একেবারে উল্টা হইয়া যায় ।

তদনুযায়ী হাফিজ উক্ত কবিতার সঙ্গে নিম্নলিখিত
দুই লাইন কবিতা জুড়িয়া দেন।
“ই হদিস চে খােশ, আমদ্ কে সহরগাহ মি গােফক্ত,
বর দরে ময়কদয়ে বা দফ ও নেয় তরসায়ে।”
“একজন খ্রীষ্টধৰ্ম্মী যখন এক সরাইএর দ্বারে
বসিয়া তাম্বুরা এবং বাঁশী লইয়া এই গান গাহিতেছিল,
তখন সেই প্রাতঃকালে আমার কাছে সে গান কেমন
মজার শুনাইতেছিল।”
ইহার পরে নাস্তিক বলিয়া অভিযুক্ত হইয়া তিনি
শেষের দুই লাইন কবিতা দেখাইয়া বলেন যে, পরিপূর্ণ
কবিতাটী এই। সুতরাং বিচারে তিনি মুক্তি পান।•••
হাফিজ সম্বন্ধে বিশ্ববিজয়ী বীর তৈমুরকে লইয়া
একটী গল্প প্রচলিত আছে। হাফিজের নিম্নলিখিত
দুই লাইন কবিতা জগদ্বিখ্যাত হইয়া গিয়াছে --
“আগর আঁ তুর্কে শিরাজীবেদস্ত, আর দিলে মারা,
বখালে হিন্দুয়শ, বখশ সমরকন্দ, ও বোখারারা।”
A

“যদিই কান্তা শিরাজ-সজনী
ফেরৎ দেয় মাের চোরাই দি ফের,
সমরকন্দ, ও বােখারায় দিই
বদল তার লাল গালের তিলটের।
সেই সময় তৈমুরের সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল
দ,। হাফিজ তাহার প্রিয়ার গালের তিলের জন্য
তৈমুরের সাম্রাজ্য ও রাজধানী বিলাইয়া দিতে চাহেন
শুনিয়া তৈমুর অতিশয় ক্রোধান্বিত হইয়া পারস্য জয়ের
সময় হাফিজকে ডাকিয়া পাঠান। উপায়ান্তর না
দেখিয়া হাফিজ তৈমুরকে বলেন, যে তিনি ভুল শুনিয়া-
ছেন, শেষের লাইনের “সমরকন্দ, বােখারারা”র
পরিবর্তে “দো মন কন্দ, ও সি খােৰ্ম্মারা”
দু’মণ
“আমি তাহার গালের তিলের বদলে
চিনি ও তিন মণ খর্জুর দান করিব।”
কেহ কেহ বলেন, হাফিজ এ উত্তর দেন নাই।
তিনি নাকি দীর্ঘ কুর্ণিশ করিয়া বলিয়াছিলেন, “সম্রাট।
আমি আজকাল এই রকমই অমিতব্যয়ী হইয়া
পড়িয়াছি।” এই উত্তর শুনিয়া তৈমুর এত আনন্দ

লাভ করেন, যে, হাফিজকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে
বহুমূল্য পারিতােষিক প্রদান করেন।
হাফিজের নামে এইরূপ বহু গল্প প্রচলিত আছে,
কিন্তু তাহার অধিকাংশই বিশ্বাসযােগ্য নহে।
হাফিজের কবিতা পড়িয়া একবার মনে হয়, তিনি
উদাসীন সুফী ছিলেন। আবার দুই একটী কবিতা পড়িয়া
মনে হয়, তিনি বুঝি সংসারীও ছিলেন। বিশেষ করিয়া
তাঁহার নিম্নলিখিত কবিতা পড়িয়া মনে হয়, ইহা তঁাহার
কোনাে প্রিয় পুত্রের অকাল মৃত্যুকে উল্লেখ করিয়া
লেখা হইয়াছিল
“দিল দীর্দী কে আঁ ফরুজানা ফজল,
চে দিদূ অন্দর খমে তাকে রঙ্গীন
বজায়ে লওহে সিমিন দর কিনারশ
ফকে বর শের নেহাদশ, লওহে সঙ্গীন
ওরে হৃদয় ! তুই দেখেছিস
পুত্র আমার আমার কোলে
? কি পেয়েছে এই সে রঙীন
গগন-চন্দ্রাতপের তলে।

জীবনী
সােনার তাবিজ রূপার সেলেট
মানতনা বুকে রে যার,
পাথর চাপা দিল বিধি
হায় কবরের সিথানে তার।
১৩৬২ খৃষ্টাব্দের ২৪শে ডিসেম্বর তঁাহার আর
একটী পুত্র সন্তানের মৃত্যু হয়। ইহাও তঁাহার অন্য
এক কবিতা পড়িয়া জানা যায়।
হাফিজের সমস্ত কাব্য “শাখ-ই-নবাত” নামক
কোনাে ইরানী সুন্দরীর স্তব-গানে মুখরিত। অনেকে
বলেন, “শাখ-ই-নবাত,” হাফিজের দেওয়া আদরের
উহার আসল নাম হাফিজ গােপন করিয়া
গিয়াছেন। কোন্ ভাগ্যবতী এই কবির প্রিয় ছিলেন,
কোথায় ছিল তার কুটীর, ইহা লইয়া অনেকে অনেক
জল্পনা কল্পনা করিয়াছেন। রহস্য-সন্ধানীদের কাছে
এই হরিণ-আঁখি সুন্দরী আজো রহস্যের অন্তরালেই
রহিয়া গিয়াছে।
কেহ কেহ বলেন, এই শাখ-ই-নবতের সহিতই
হাফিজের বিবাহ হয় এবং হাফিজের জীবিত কালেই
ভঁাহার মৃত্যু হয়। কিন্তু কোনাে জীবনী লেখকই
একথা নিশ্চিতরূপে বলিতে পারেন নাই।

হাফিজ যৌবনে হয়ত শারাব সাকীর উপাসক
ছিলেন, পরে যে সুফী সাধকরূপে দেশের শ্রদ্ধা আকর্ষণ
করিয়াছিলেন তাহা প্রত্যেক ইরানীই বিশ্বাস করে
তাঁহার মৃত্যু সম্বন্ধে একটী বিস্ময়কর গল্প
যায়। শিলি নােমানী, ব্রাউন সাহেব প্রভৃতি পারস্য
সাহিত্যের সকল অভিজ্ঞ সমালােচকই এই ঘটনার
উল্লেখ করিয়াছেন।
হাফিজের মৃত্যুর
একদল লােক তঁাহার
জানাজা” পড়িতে ( মুসলমানী মতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
করিতে) ও কবর দিতে অসম্মত হয়। হাফিজের
ভক্তদলের সহিত ইহা লইয়া বিসম্বাদের সৃষ্টি হইলে
কয়েকজনের মধ্যস্থতায় উভয় দলের মধ্যে এই সৰ্ত্তে
রফা
হয় যে, হাফিজের সমস্ত কবিতা একত্র করিয়া
একজন লােক তাহার যে কোনাে স্থান খুলিয়া দিবে ;
সেই পৃষ্ঠার প্রথম দুই লাইন কবিতা পড়িয়া হাফিজের
কি ধৰ্ম্ম ছিল তাহা ধরিয়া লওয়া হইবে।
আশ্চর্যের বিষয়, এইরূপে নিম্নলিখিত দুই লাইন
কবিতা পাওয়া গিয়াছিল।
“কদমে দরিগ মদার আজ জানাজয়ে হাফিজ,
কে গরুচে গরুকে গােনাহত, মি রও বেহেত।”

বৈী
“হাফিজের এই শব হ’তে গাে তুলােনাকো চরণ প্রভু
যদিও সে মগ্ন পাপে বেহেশতে সে যাবে তবু !”
ইহার পরে উভয়দল মিলিয়া মহাসমারােহে
হাফিজকে এক আঙুর বাগানে সমাহিত করেন।
সে স্থান আজিও হাফিজিয়া নামে প্রসিদ্ধ।
দেশ বিদেশ হইতে লােক আসিয়া আজও কবির
কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে।
কথিত আছে বাঙ্গলার কোন শাসনকর্তা হাফিজকে
তঁাহার সভায় আমন্ত্রণ করিয়া পাঠান। হাফিজ আসিতে
সম্মতও হইয়াছিলেন। পারস্য উপসাগরের কূলে
আসিয়া যখন তিনি জাহাজে উঠিতে যাইবেন, সেই
সময় ভীষণ ঝড় উঠে। ইহাতে হাফিজ দৈব প্রতিকূল
ভাবিয়া আবার শিরাজে ফিরিয়া আসেন এবং বাঙলার
শাসনকর্তার কাছে
যে কবিতাটী পাঠাইয়া দেন,
তাহার মর্মার্থ এইরূপ ঃ
“আজকে পাঠাই বাঙলায় যে ইরানের এই ইক্ষু-শাখা,
এতেই হবে ভারতের সব তােতার চঞ্চু মিষ্টিমাখা।
দেখ গাে আজ কল্পলােকের কাব্যদূতীর অসম সাহস,
এক বছরের পথ যাবে সে, একটী নিশি যাহার বয়স।”

জীবনী
হাফিজ পারস্য ছাড়িয়া আর কখনাে কোথাও যান
নাই। । স্বদেশ এবং স্ব-পল্লীর প্রতি তাহার অণু-
পরমাণুতে অপূৰ্ব্ব মমতা সঞ্চিত ছিল। বহু কবিতায়
তঁাহার বাস-পল্লী “মােসল্লা” এবং “রােনাবাদের”
খালের প্রশংসা দেখিতে পাওয়া যায়।
হাফিজ নিজের সম্বন্ধে বলিয়া গিয়াছেন
---
“বর সরে তরবতে মা চু গুজরি হিম্মত খাহ,
কে জিয়ারতগহে রিন্দা জাহাঁ খাহেদ শশাদ!”
“আমার গােরের পার্শ্ব দিয়া যেতে চেয়ে আশীস্ তুমি,
এ গাের হবে ধৰ্ম্ম-স্বাধীন নিখিল-প্রেমিক-তীর্থভূমি।”
আজ সত্য সত্যই হাফিজের কবর নিখিলের
প্রেমিকের তীর্থভূমি হইয়া উঠিয়াছে।

কুঞ্জিকা
বে-দি=হৃদয়হীন।
মুসাফির = পথিক।
দাস।
রোশনী= ঔজ্জ্বল্য।
আনারকলি=ডালিম কুঁড়ি
মস্ত = উন্মত্ত।
লহমা=নিমেষ।
ইমানদারী = বিশ্বাস-জনক।
দেওয়ানা পাগল।
.শিরী= মিষ্টি।
কাৰ্ব্বা = রৌপ্যপাত্র।
নার্গিস=Narcissus. এক প্রকার ইরানী ফুল।
ইরানী কবিরা ইহার সহিত সুন্দরীদের
চোখের তুলনা দেন।
নজরানা == উপহার।
দি-পিয়ারা = হৃদয়েশ্বরী।
দি-দরদী-ব্যথার ব্যথী, হৃদয়ের সাথী।
-

কুঞ্জিকা
দি-রুবা= এক প্রকার তারের বাদ্যযন্ত্র।
খয়বরী-দ্বার ভগ্ন-কারী আলী = আলী
আলী হজরত
মােহাম্মদের জামাতা। ইনি সে যুগের
সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন। কথিত আছে,
“খয়বর” প্রদেশ অধিকারের
সময় ইনি
উহার দুর্গ-দ্বার হাত দিয়া ভাঙিয়া ফেলিয়া-
ছিলেন।
কুনবরের বাদশা = আরবের বিখ্যাত
ছিলেন।
বাবিলনের
দু = আরবী
ইরানীরা বলে,
বাবিলনই সকল যাদুর আদি জন্মভূমি।
আব-ই-হায়াত=মৃত-সঞ্জীবনী-সুধা।
গােরি = গৌরবর্ণা তন্বী।
হদিস্ত মােহাম্মদের বাণী।
* বেহেশত=স্বর্গ।
হারাম =নিষিদ্ধ।
৮ শাহী তত্ত== সম্রাটের সিংহাসন।
শিরাজী= শিরাজে প্রস্তুত দ্রাক্ষাসব।
,

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rubaiyat-e-hafiz

Author
Islam,nazrul
Title
Rubaiyat-e-hafiz
File name
Rubaiyat-e-hafiz
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/12/12
Publisher
Kalikrishna Chakraborty, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
116
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Islam,Nazrul
DLI number
513171
Barcode
4990010020173.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XVd4RFWbJ1o
Download PDF

Rubaiyat-e-hafiz