Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rupkatha

Basu, Monojmohon · 2009/10/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রূপকথা।
( কৌতুক-নাল)
[ ১লা আষাঢ় ১৩১৯ সাল শনিবার, ষ্টার থিয়েটারে প্রথম অভিনীত।]
শ্ৰীমনােজমােহন বসু বি, এল, প্রণীত
৫৬১ নং কলেজ ষ্ট্রীট, ইউনিভারসাল লাইব্রেরী হইতে
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
কলেজস্কোয়ার,
উইকিন্স প্রেসে জে, এন, বসু কর্তৃক মুদ্রিত।
১৩১৯।
মুল্য। চারি আনা মাত্র।

No text on this page.

No text on this page.

Manag Mahau Base.

উপহাব স্বর্গীয় পিতৃদেবের শ্রীচরণ উদ্দেশে

No text on this page.

নিবেদন। রূপকথা লইয়া নাট্যঙ্গ (Pantomime) রচনা ইংরাজি নাট্য- জগতে যথেষ্ট চলিত আছে (Cinderella, Sleeping Beauty, Babes in the Vood ইত্যাদি)। কিন্তু বাঙ্গালায়, রূপকথার উপর প্রতিষ্ঠিত গীতিনাট্য দুই একখানি থাকিলেও, প্যান্টোমাইম নাই। সেই চেষ্টাই করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য যে, গম্ভীর বিষয় লইয়া কৌতুক, কালের অসামঞ্জস্য ( Anachronism) ও অতিরঞ্জন-মূলক বিদ্রুপ, ( অন্যত্র দোষাবহ হইলেও) প্যান্টোমাইমের এইগুলিই প্রধান উপাদান। গল্পটিকে ছলমাত্র করিয়া পঞ্চরঙের আমােদ উপভােগ করাই ইহার উদ্দেশ্য । তাই খাঁটি ইংরাজি প্যান্টোমাইমে আখ্যানবস্তু (Plot) প্রায় থাকে না। কিন্তু বাঙ্গালায় সেরূপ চলে না বলিয়া, বাধ্য হইয়া কতকটা উপাখ্যান ভাগ দিতে হইয়াছে ; এবং তজ্জন্য স্থানে স্থানে প্যান্টোমাইমের অনুপযােগী গুরু ঘটনাবলীও চিত্রিত করিতে ও তদনুরূপ ভাষা ব্যবহার করিতে হইয়াছে। অভিনয়কালে (সময় সংক্ষেপাৰ্থ ) কতক কতক অংশ পরিত্যাগ করিবার ব্যবস্থা করা গিয়াছে।

No text on this page.

পাত্রপাত্রীগণ। পুরুষ। সূত্ৰধার, রাজপুত্র, মন্ত্রিপুত্র, কোটালপুল, সওদাগরপুত্র, বেঙ্গমা, বােস, রাক্ষস, উকিল কৃতান্তকুমার গুহ, দালাল বঙ্গচন্দ্র, চাষা, তেলারাম ওস্তাদ, উড়ে পাণ্ডাগণ, হােটেলের ম্যানেজার, ওয়েটারগণ। স্ত্রী। নটী, রাজকন্যা, বুন্ধুসী, রাক্ষসীরাণী, বেঙ্গমী, বৃদ্ধা, পরীগণ, ঘুম- পাড়ানী মাসীপিসিগণ, রাক্ষসীগণ, কল্পনাকুমারীগণ, অন্যান্য নটীগণ।

No text on this page.

কপকথা।
প্রস্তাবনা।
নাট্যশালা।
নান্দী।
গীত।
রূপকথা রূপকথা রূপকথা
ওগাে শুনবে যদি একটি রূপকথা, ( হাগা শুনবে ?)
তবে কৰ্ম্ম ফেলে দলে দলে ছুটে সবাই এস হেথা ।
গােলমালটি করাে নাক
লক্ষ্মী হয়ে বসে থাক
জেগে বসে মাঝে মাঝে “হু” দিও আর নেড়াে মাথা।
একটি মনে শােন যদি হৃদয় মাঝে দেখবে আলাে,
তুমি যারে ভালবাস সে তােমারে বাসবে ভালাে,
থাকবে না আর ঝগড়া ঝাটি
ঘুচুলে মনের ময়লা মাটি
শুনলে মধুর রূপকথাটি
জুড়িয়ে যাবে প্রাণের ব্যথা।

রূপকথা
[ সূত্ৰধার ও নটীর প্রবেশ ]
নটী। সমাগত সুধীজনে শত নমস্কার।।
আজি এ মধুর রাতি উৎসব আবেশময়ী,
মধুর মল বহে প্রফুল্লি অন্তর।
হাস্যময়ী বসুন্ধরা
উল্লাস তরঙ্গে ভাসে,
খেলিছে মানবহৃদে আনন্দ লহর।
দীপ্তালােক আলােকিত, সমুজ্জ্বল রঙ্গভূমি,
অপূৰ্ব্ব শােভায় মরি সেজেছে কেমন।
মােহন সুচারু সাজে
সুসজ্জিত সভাতল,
পুলকে পূর্ণিত হৃদি সৰ্ব্ব সভাজন।
নাট্যামােদী সুধীবৃন্দ
সমাগত কৃপা করি
পবিত্রিয়া নাট্যশালা শুভ পদার্পণে।
আজি এ মিলন রাতে বল সখা দয়া করি
কি দিয়ে তুষিব মােরা মহামতিজনে।
সুত্র। কি দিয়ে তুষিব সখি, কি আর মােদের আছে ?
দীন নটনটী মােরা বিদিত জগতে।
শুধু দুটো কথা কয়ে, শুধু দুটো গান গেয়ে,
কাটাই প্রহর দুই আনন্দ বিলাতে।
তার পর ঘরে গিয়ে
যদি কারাে কদাচিৎ
আজিকার স্মৃতি রেখা আঁকি থাকে মনে।
মহাভাগ্যফল ভেবে, আপনারে ধন্য মানি,
সেইমাত্র পুরস্কার নটের বনে।
নটী। কিন্তু মনে বাসি ভয়
যদি কে। হয় ভুল,
তুষ্টিদানে ত্রুটি কিছু যদি ঘটে যায়।

রূপকথা.। অভাগ্য কপাল দোষে, হন, রুষ্ট সভাজনে মরমে মরিব সখা, সরমের দায়। সূত্র। কেন সখি, কর ভয়, হারি জিনি নাহি লাজ, সহৃদয় বিচারক দর্শক সুজন। অখ্যাতি বা পুরস্কার ভাগ্যের লিখন যাহা, সমভাবে হাসিমুখে করিব গ্রহণ। হৃদয়ে বাঁধিয়া বল করলাে আপন কাজ, যুক্তকরে ভক্তিভরে স্মরি নটনাথে । যদি মিলে করতালি, কিম্বা দুটো গালাগালি, যাহা পাব আকিঞ্চনে লব শির পেতে। মােদের জনম শুধু তুষিতে মহত জনে, আপনার সুখ-দুঃখ চাপিয়া অন্তরে, পরতরে হাসি কাঁদি পরতরে গাহি গান, হায় রে, নটের ব্যথা কে বুঝে সংসারে। যদি গাে গােপন দুখে হৃদয় বিদারি যায়, বাহিরে প্রকাশ কভু নহে সে জ্বলা। মুছে ফেলি অশ্রুবিন্দু মুখেতে মাখিয়া হাসি নাচি গাহি তুলি রঙ্গে আনন্দের মেলা। তবে কেন মিছে ভয়, এস সখি ত্বরা করি এস গাে বিনােদ বেশে আলােকিয়া প্রাণ। ছন্দোবন্ধে বাঁধি ন গাহ সুমঙ্গল গান, ছুটুক এ ট্যভূমে উল্লাস তুফান। অপরূপ রাগরঙ্গে মােহন বিচিত্র ভঙ্গে সুনিপুণ নাট্যকলা কর প্রকাশিত।

৪
রূপকথা।
গুণগ্রাহী মহাজনে
ভুলি দোষ, গুণ ধরি,
করিবেন শিরােপরি আশীষ বর্ষিত।
নটী। কিন্তু সখা রেখাে মনে,
নুতন বিধান এবে
নব্যবঙ্গ নাট্যভূমে হয়েছে প্রকাশ।
চলিবে না আজি আর সেই রীতি পুরাতনী,
নব যুগে নবভাবে রঙ্গের বিকাশ।
নাট্য-কলা দগ্ধ করি মাখায়ে গর্জন তৈল,
হয়েছে প্রস্তুত আহা অপূৰ্ব্ব ব্যঞ্জন।
ছিন্ন-তন্ত্রী আলাপিনী, কেঁদে মরে বীণাপাণি,
আর ত বাজে না তায় ললিত নিক্কণ ।
নবরসে একাকার,
বিধ্বস্ত সঙ্গীত শাস্ত্র,
লণ্ডভণ্ড ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী
চটুলতা তীব্রস্রোতে
ধুয়ে যায় কাব্যরস,
সং রং ঢংয়ে কিবা বিচিত্র গাঁথনী।
( চারিদিক হইতে নটীগণের প্রবেশ ও সূত্ৰধারকে বেষ্টন করিয়া
নৃত্য গীত)
গীত।
(ওগাে চলবে না, সেত চলবে না, মােটে চলবে না)
চলবে না আর অভিনয়ের সেকেলে বিধান।
হয়েছে নূতন রঙ্গে নূতন ঢঙ্গে থিয়েটারের নিউ ফ্যাসান।
গলা চেরার থাকলে ভয়,
হিরাে সাজা জোটি
রৌদ্ররসের আদ্যশ্রাদ্ধে বসুন্ধরা কম্পমান।
নয়,

রূপকথা ।
নিউ ফ্যাসান, নিউ ফ্যাসান, নিউ ফ্যাসান, নিউ ফ্যাসান
চাটু ছুড়ে নাচের চোটে, তক্তা চিরে আগুন ছােটে,
কুস্তিগিরির কলতেতে লাস্যলীলার অবসান।
দিস্তে গুণে সখির মেলা, চিকুর হেনে আঁখির খেলা
( হেরে ) চুণকামেতে মুচকি হাসি শিউরে ওঠে সরল প্রাণ।
জংলাসুরে গানের বাহার,
লপেটি ক্যা মজেদার,
রাগরাগিণী চকে মেখে, মা বাবাদিনীর পিণ্ডদান।
নিউ ফ্যাসান নিউ ফ্যাসান ইত্যাদি।

No text on this page.

রূপকথা। প্রথম অঞ্জ। প্রথম দৃশ্য। প্রমােদ কানন। ( রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র ও সওদাগরপুত্র ) রাজ। নাঃ, শুধু দিন আসে আর দিন যায়। সেই আলাের পর আঁধার, সেই আঁধারের পর আবার আলাে। সেই রৌদ্রের পর ছায়া, সেই ছায়ার পর আবার রৌদ্র। সেই দিবসে মধ্যাহ্ন ভােজন, সন্ধ্যায় নিস্ফল গল্প, রাত্রে পাশাখেলা ; আবার সকালে উঠে কেবল সেই পুরাতন দিনটার চর্বিত চর্বণ। বড় জোর না হয়, দুটো পশু পক্ষীর উপর শাণিত অস্ত্রের সাহায্যে বিক্রম প্রকাশ। দুর্লভ মনুষ্যজন্ম লাভ করে জীবনটাতে কি এমনই করেই মচে ধরবে বন্ধু ? মন্ত্রী। ভাই, তুমি প্রবল পরাক্রান্ত সসাগরা ধরণীর অধীশ্বরের বংশধর হয়েও যদি এই কথা বল, তবে আমাদের মত গৃহস্থের ছেলের অবস্থাটা একবার ভাব দেখি। মধ্যাহ্ন ভােজনের শত-ব্যঞ্জন- শশাভিত অন্নের থালাটা তােমার জন্যে ত তবু অপেক্ষা করে বসে থাকে। আমাদের যে আবারু, সেইটের সঙ্গে নিয়মিতরূপে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করতে বিস্তর, ঈর্ধনা, বিস্তর তপস্যা করতে হয়। আসল কথাটা আমি দেখছি বন্ধু, দুঃখের একান্ত অভাবটাই হচ্ছে তােমার যথার্থ দুঃখ।

, রূপকথা A কোটা। তা বন্ধু, দুঃখের অভাবটাই কি কম দুঃখ। যে কখনও জন্মে চোখের জল ফেলবার অবকাশ পায় নি, সে কি জীবনে সুখের মৰ্ম্ম বুঝতে পারে ? রাজ। আচ্ছা, তাই না হয় মানলুম। কিন্তু রােগটা নিরাকরণ করলেই ত হ’ল না। তার প্রতিকারের ব্যবস্থাও ত চাই। বল দেখি এই ঐশ্বর্যের সুকোমল কোলে শুয়ে, বাপ মা আত্মীয় স্বজনের স্নেহের বাতাসে লালিত হয়ে, তােমাদের মত মধুময় বন্ধুগণের মাঝখানে থেকে দুঃখের মূর্তিটা দেখতে পাই কোথায় ? ধর না হয়, নিজেকে নির্দয় ভাবে চিমটি কাটতে থাকলে, দৈহিক দুঃখের ঈষৎ একটু আভাষ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার দুঃখ আর কতটুকু যে তাতে আমার এই সুখের সান্নিপাতিকে কিছু উপকার দর্শাবে ! বল ভাই মন্ত্রীপুত্র, তুমি যখন বােগ ধরেছ, তখন তােমাকেই এর চিকিৎসার ব্যবস্থা মন্ত্রী। বন্ধু, সুখের সান্নিপাতিকে নিদানশাস্ত্রে শুনেছি একটা বড় ফলদায়ক ঔষধ আছে। সেটি হচ্ছে একটি উপযুক্ত রকম গৃহিণী। বিশেষতঃ যদি তার জিহ্বার অগ্রভাগটা একটু ধারাল থাকে, তবে পর্বতপ্রমাণ সুখের বােকও নিমেষের মধ্যে গলে যায়। তবে তাতে একটা কেবল গােলমাল আছে যে সময় সময় লােগবিনাশের সঙ্গে সঙ্গে রােগীর অন্তরাত্মাও খাবি খেতে থাকেন। রাজ। তাই ত, সেও ত বড় ভয়ের কথা। তবে কি জীবনটা এমনিই কাটবে বন্ধু ? শুধু অলস, বাসনা আর তার পরিতৃপ্তির - অবসাদ! শুধু নিস্ফল নিস্তরঙ্গ জীবনহৈত প্রাচীরবেষ্টিত পরিখার মধ্যে দিয়েই বহে যাবে? না, না, তা কখনই" হতে দেব না। যুক্তি দাও বন্ধু, কি কর্তব্য।

রূপকথা। min সওদা। দেখ ভাই, আমার বুদ্ধিটা তােমাদের চেয়ে কিছু কম । তবে একটা কথা বলি শুন। দুঃখের মৰ্ম্মই যদি বুঝতে চাও, তবে কি সে হেথায় বসে পাবে ? শক্তিমান সৌভাগ্যশালী ধরণীশ্বরের পুত্র তুমি, এখানে কার সাধ্য দুঃখের ছায়াও তােমাকে দেখায় ? দেখ, আমি সওদাগরের ছেলে। দুনিয়া ঘুরে, দুঃখকে জীবনের সাথী করে, জন্ম কাটান আমার পিতৃপিতামহের ব্যবসা। আমি বলি যদি দুঃখের অপূৰ্ব্ব-দৃষ্ট অপরূপ মূর্তিই দেখতে চাও, তবে চল দেশ ভ্রমণে যাই। জীবনে কোথায় কি আছে না আছে সবই জানবে । রাজ। আঁ তাইত বন্ধু, এ আজ তুমি আমায় কি কথা শােনালে! হৃদয়ের অতি নিভৃত অংশে যেন একটা আধ-ছেড়া তার এতদিন বেসুরাে বাজছিল, তুমি সুনিপুণ অঙ্গুলি সঞ্চালনে তা ঠিক করে দিলে। দেশদেশান্তর ভ্রমণ ! কি মনােরম, কি প্রাণােন্মাদক কথা ! কি মধুময় স্বপ্ন ! আচ্ছা বন্ধু, তুমি ত তােমার আত্মীয় স্বজনদের কাছে অনেক রকম দেশের অনেক অপূৰ্ব্বকথা শুনেছ। বল দেখি বিদেশটা কেমন? সেখানেও কি চঁাদের কিরণে মরা মন জেগে উঠে, সন্ধ্যার বাতাসে ফুলের কুঁড়ি ফোটে, আনন্দে লােক হাসে,আর দুঃখে কাদে? সওদা। তা বােধ হয় সবই হয়। কিন্তু তবু কত অপূৰ্ব্ব জিনিষ আছে, বিধাতার কত কৌশল কত জায়গায় লুকান আছে, তার মাধুৰ্য্য দেখলে বুঝবে না। রাজ। তবে চল ভাই, চার বন্ধুতে বেরিয়ে পড়ি। কূপ-মঙুকের মত ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে, এ নিস্ফল জীবন যাপন আর সহ হচ্ছে না। কি বল ক্ল সুকল, সবাই যেতে প্রস্তুত ত ? মন্ত্রী। আমি ত তাই, চিরদিনই ছায়ার মত তােমার সাথী তবে বাড়ীতে জানলেই বিপদ। বাবা ত আমার বন্দোবস্ত এক রকম } রূপকথা করেই রেখেছেন। আসছে বছর মহারাজের রাজত্ব ৫০ বৎসর পূর্ণ হয়ে জুবিলি হবে; আমার হাতের লেখাটা বেশ ভাল হয়ে উঠেছে বলে বাবা বলেছেন যে সেই উপলক্ষে আমাকে তার আফিসে অণ্ডার সেক্রেটারী করে নেবেন। কোটা। আরে ভাই, বাড়ীতে জানিয়ে কি আর এ সব মতলব কখনও সিদ্ধ হয় ? আমার বাবাও আমাকে এই বছর মহারাজকে বলে ডেপুটি সুপারিনটেণ্ডেণ্টের জন্য নমিনেট করবার চেষ্টা করছেন। তার উপর বিয়ের সম্বন্ধও দুটো একটা আসছে । মন্ত্রী। তবে ভাই, আর বাড়ীতে এ সব কথা জানিয়ে কাজ নেই। মতলব যখন মাথায় এসেছে তখন চল দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়া যাক । কোটা। বেশ, তা হলে হুকুম দাও। স্পেশিয়াল ট্রেণ আর ফ্ল্যাগ সিপের বন্দোবস্ত কর। আর তিন রেজিমেন্ট সৈন্য চলুক। আমি ভাই, তাদের কমাণ্ডার হয়ে যাব । মন্ত্রী। তাই, যদি সৈন্য সামন্ত নিয়ে ঐশ্বৰ্য্য পরিবৃত হয়েই বিদেশ যাওয়া যায় তবে আর নূতন কি হবে ? যেখানে যাব সেখানে রাজপুত্র রাজপুত্ৰই থাকবে। যে দুঃখের মূর্তি দেখতে যাওয়া যাচ্ছে, এত ঐশ্বৰ্য্য দেখলে দুঃখ ত ভয়ে দূরে পলায়ন করবে। যদি যেতে হয় আমি বলি শুধু এই চার বন্ধুতেই যাই। সওদা। তা বেশ কথা। চল শুধু চার বন্ধুতেই যাওয়া যাক। কিন্তু ভাই, শুধু হাতে ত আর আজকাল দেশ ভ্রমণ হয় না। বাবার কাছে শুনেছি যে অনেক টাকা হাতে না থাকলে বিদেশ যাওয়া ঘটে না। রাজ। তাই ত, সেও ত এক সমস্যা বটে। বাড়ীতে যখন জানান হবে না, তখন বেশী টাকাই বা কোথায় পাওয়া যায় ?

==
রূপকথা।
১১
( বচন্দ্র দালালের প্রবেশ।)
বঙ্গ। এ কি কথা কয়েন হুজুর ? টাহার অভাব কি ? এ
গােলাম হাজির থাকতে হুজুরদের টাহার ভাবনা! পায়ের উপর পা
দিয়া পিড়ী পেইতে বইসে থাহেন, টাহা তা চারদিক থেয়েই আসি
পড়বে। হুজুর বৈসে বৈসে মাঝে মাঝে মাত্র দুই একটা সহি
দিবেন।
রাজ। কে বাপু তুমি হিতৈষী? এমন স্নেহভরা উপকারী প্রাণ
নিয়ে এতদিন কোথায় লুকিয়ে বসেছিলে সখা ?
মন্ত্রী। তাই ত, আর অকস্মাৎ সময় বুঝে ঝরে পড়লেই বা
কোখেকে ধন?
হঃ হাঃ হাঃ হাঃ! আমারে চিনলেন না হুজুর, আমারে
চিনলেন না? আমি ত হুজুরদেরই গােলাম।
মন্ত্রী। সত্যি নাকি ? এত বড় দরকারী সংবাদটা ত বাবা,
এতদিন জানতেম না। কবে থেকে গােলাম হলে বল দেখি ?
বঙ্গ। আজ্ঞা, কবে থেহে কি জিজ্ঞাইচেন ? যে দিন এ
বােঙ্গোচন্দ্র জন্মাইছে সেই দিন থেহেই ত সে হুজুরদের গােলাম
হইছে।
মন্ত্রী। আরে বাবারে! তুমি ত দেখছি বাবা আমাদের বহুদিন
পূর্বেই
জন্মেছ। তাহলে কি বিধাতাপুরুষ আমাদের জন্মাবার
পঁয়ত্রিশ বৎসর আগে থেকেই আমাদের গােলাম সৃজন করে ধরাধামে
পাঠিয়েছেন? ভগবানের এত করুণা তা ত জানতেম না।
হঃ হঃ হঃ মুফরা করতিছেন, ছােটকর্তা গােলামের সাথি
মাসকরা করতিছেন
কোটা। যা হােক বাবা, সন্ধান পেলে কোথেকে বল দেখি?

১২
রূপকথা।
নিরিবিলি চারটি বন্ধুতে সুখ দুঃখের কথা কইছিলুম, এমন সময় তুমি
কোথা থেকে অন্তর্যামীর মত আমাদের অভাবের কথা বুঝে অকস্মাৎ
সম্মুখে আবির্ভূত হলে বল দেখি?
বল। হঃ হঃহঃহঃ, আজ্ঞা সন্ধান সুলুকটা রাখাই ত গােলামের
কাজ হুজুর।
পরাণের টান থাকলে কি আর সন্ধানের অভাব হয় ?
খবর আপনিই পৌঁছে যায়। দেহেন নি কোর্তা, এই ভােমরা,
ওই যিনি গুন্ গুন্ গুন্ গুন্ করি ফেরেন, কোন ফুলডায় মধু আছে,
ফুল ফুটতে না ফুটতেই তেনারা জানতি পারেন। ওই শােনেননি
(গীত।)
( বিধুমুখি ) কমল ফুটিলে সরােবরে,
সৌরভ তার ছুটে যায় বাতাসের ভরে । (ওলাে)
মধু লােভে আশে পাশে
মধুকর
কতই আসে,
মধু ফুরালে শেষে যায়লাে ফিরে যে যার ঘরে।
মন্ত্রী। আরে বাঃ, তুমি একটা রত্ন দেখছি যে। বিস্তর গুণ
আছে তােমার।
বঙ্গ। আজ্ঞা হুজুর, দালালি করতি হলে যে কত রকম গুণ থাহা
দরকার তা আর কি এক মুখি জানাতি পারি? এই শােনেন দু এট্টা,
—এক নম্বর গুণ—এই জিহ্বাডারে এমনই দোরস্ত রাখতি হয় যে,
হঠাৎ ভ্রমের বশে এপাশ ওপাশ দিয়ে কোন রকম সত্যি কথাটা
প্যাটের মদ্যি থেহে বার হয়ে যাবার পারে। দু নম্বর গুণ—এই
পৃষ্টদেশডারে তৈল রগরাইয়া রগরাইয়া এম-ই মসৃণ করতি হয় সে
দুই দশটা জুতার ঘায় কিছু দাগ পড়তি না পারে। তিনের নম্বর

রূপকথা। গুণ এই–না, সে আর বলবাে না। হুজুররা ছাওয়াল মনিষ্যি, হুজুরদের কাছে সব কথা বলতি লাজ বাসি। আর এট্ট পরিচয়টা ঘনিষ্ট হলিই সব জানতি পারবেন। সওদা। তা বেশ, এখন আসল কথাটা কি বলছিলে বল দেখি । টাকা সত্যিই দেবে নাকি ? বঙ্গ। আজ্ঞা হঃ, সেই কথাড়াই ত কইতি আলাম। হালফিল এটা দালালি চিঠি সই হইলিই কাৰ্য্যে লাগি। এই দেহেন না চামার- পটির মহাজন বিদুৎ বরণ সাহা, মস্ত ধনী আর বরই মহাশয় ব্যক্তি। টাহা প্রস্তুতই আছে। আষ্ট দিনের মধ্যেই প্যামেন্টো হইব। মন্ত্রী। না না, ও সব চিঠি ফিটি সই করা হবে না। আগে টাকার চেহারাটা দেখা যাক তার পর যা হয় হবে। বঙ্গ। সে কি কোর্তা, চিঠি সই না হইলে কাৰ্যে লাগি কোন ভরসায় ! কোটা। আচ্ছা, এস, আমি চিঠি সই করে দিচ্ছি। নিয়ে এস টাকা। বঙ্গ। ওরে বাবা! তােমারে হ্যালােট কাটাবে কে ধনমনি ? তােমার বাবা জানতি পারলি যে ধরে তুরুম ঠকি ছারি দেবে। অত কড়া জান নয় হুজুর। এই চাবুকটা আশটা পর্যন্ত চলে। ( উকিল কৃতান্তকুমার গুহের প্রবেশ ) আচ্ছা আচ্ছা, চিঠি না হয় নাই সই করবেন। একটা বয়সের এফিডেভিট হলেই আপাততঃ চলতে পারে। রাজ। ও বাবা! র্পাবার কার আবির্ভাব হল? বঙ্গ। আরে এদের চেনেন না হুজুর ? মস্ত উকিল, বংশলােচন গুহর বেটা কৃতান্ত কুমার গুহ। নিবাস ঘুঘুডাঙ্গা। পুরাতন ডাকঘরের

১৪..
রূপকথা ।
?
রাস্তার উপর ভারি জবাের আফিস। সেথায় কত লােকজন
কেরাণী-ম্যাম সাহেবে চিঠি ছাপে। একবার আফিসটা ঘুইরে
আসলিই আর সহি করবার কিছু গােলমাল হবার পারবে না।
মন্ত্রী। বয়সের কি করতে হবে বল্লেন ?
কৃতান্ত। বিশেষ কিছু নয়, বিশেষ কিছু নয়। শুধু একটা এফিডে-
ডিট করা মাত্র যে বয়সটা তেইশ বৎসর। ও কিছুই নয়। কেবল
একটা Formal matter ( ফর্মাল ম্যাটার )।
রাজ। সে কি ? আমার বয়স ত এই সতর পূর্ণ হয়ে আঠারতে
পড়েছে। তেইশ বৎসরের কথা কি বলছেন?
কৃতান্ত। তা হাে, তা হােক। তার জন্যে কিছু আটকাবে না।
পাঁচটা টাকা মাত্র বেশী খরচ। একটা কোষ্ঠী করে নিলেই হবে।
বােধ হয় আফিসে দু এক খানা কোষ্ঠী তৈরি থাকতেও পারে।
আপনার নামটা বসিয়ে দেওয়া মাত্র।
কোটা। আচ্ছা বয়সটা উনিশ কি কুড়ি না বলে, ঠিক তেইশ
বছরই বলতে হবে কেন ?
কৃতান্ত। তাই দস্তুর, এ সব কেসে তাই দস্তুর। আমার আফিসের
সব Clear (ক্লিয়ার) কাজ। খেচখচ রেখে কাজ করা আমার
অভ্যাস নয়। ছােকরাদের বয়সের এফিডেভিট করতে হলে ঐ তেইশ
বৎসরই লেখা যায়। কোনও গােলমালের সম্ভাবনা থাকে না।
বঙ্গ। কিছু ভাবনা করবেন না হুজুর। আপনারা মাত্র চক্ষুবুজে
সই করবেন, আর টাকা টেকে গোঁজবেন। ভারনা চিন্তে যা কিছু
সব আমরা করব।
সওদা। তা হলে আমরা টাকা ধার করছি বঁল সহি করব, আর
সেই টাকাটা আপনারা আমাদের দেবেন?

রূপকথা। কৃতান্ত। হাঁ, তবে পূরাে টাকাটা ঠিক পাবেন না। কিছু খরচ- পত্র কমিশন ইত্যাদি বাদ যাবে। তবে টাকায় অন্ততঃ তিন আনা যাতে আপনাদের হাতে পেঁৗছায় তার জন্যে আমি গ্যারান্টি। তাতে কোনও গােল হবে না। কোটা। ও বাবা! টাকায় তিন আনা আমরা পাব ? আপনাদের মহানুভবতাটা খুব অসাধারণ বটে ত ! কৃতান্ত। বাজারের তাই, রেট। তবে, বাপ মরেছে বলে যদি আর একটা এফিডেভিট করে দেন, তা হলে টাকায় চার পাঁচ আনাও দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের সব Fair transaction (ফেয়ার ট্রান্সন্), কিছু অধৰ্ম্ম পাবেন না। বঙ্গ। কিছু না কিছু না। আহা হা, বাবুর আফিসে সব হতি পারে, কেবল অধৰ্ম্মটি হবার যাে নাই। কৃতান্ত। আর তা ছাড়া আপনাদের আরও একটা সুবিধা করে দিচ্ছি। আপাততঃ আপনাদের হাত খরচের জন্যে একটা খুচরা হ্যাণ্ডনােটে গােটাচল্লিশ পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছি। আপনারা সেই টাকাটা নিয়ে দিনকয়েক আমার ঘুঘুডাঙ্গার বাগানে গিয়ে থাকুন গে। এই বঙ্গচন্দ্র আপনাদের সঙ্গে থাকবে এখন। লােকটা খুব কাৰ্য্যশীল, আপনাদের বেশ আমােদ প্রমােদে রাখবে। বুঝলেন ত ? মন্ত্রী। তা ত একরকম বুঝলেম। কিন্তু মাথাটা কিছু গুলিয়ে যাচ্চে। আপনাদের মহিমাটা ঠিক তলিয়ে সমজাতে পাচ্ছি না। আপনারা কে, সে কথাটা একটু ভাল করে বলুন দেখি। কৃতান্ত। সে কি ? অ-দের চিনলেন না ? হায়! হায়! হায়! হায়! আমাদের চিনিলেন না? তবে প্রকাশ করে বলি, শুনুন-

১৬
রূপকথা।
( খােল করতাল ইত্যাদিসহ গীত )
প্রেম অবতার
আমরা দুজনা
অমূল্য পরশন।
পিরিতি বিলাতে সহর মাঝেতে
হইল রে আগমন।
(ওরে প্রেম নিবি কে ছুটে আয়,
ওরে পুরবাসী সব কোথা গাে তােরা
তােদের ঘটি বাটি নিয়ে ছুটে আয়,
প্রেমের তুফান বহে যায়।)
কৃতান্ত। (মাের) প্রেম-ফাদ মাঝে পড়েছে যে জন
তখনি সেজন ঘাল।
ছাড়ালে না ছাড়ে
দিনে দিনে বাড়ে
যেন মাকড়শার জাল।
পিরিতি আখরে
ডে-বুক মাঝারে
লিখিনু যাহারি কথা।
( অমনি) প্রেম জীয়লের আঠাকাটি খানি
জনমের তরে গাঁথা।
(হের ) কত গৃহবাসী . হয়েছে সন্ন্যাসী
আমারি প্রেমের তরে।
ত্যজি ভিটামাটি কৌপীন আঁটি
সদা ফেরে দ্বারে ঘরে।
( আহা এমন প্রেম কেউ দেখেলি ক
কেউ দেখেনি শােনেনি জানেনি ভাবেনি।

রূপকথা।
১৭
বঙ্গ। (ওগাে) আমারি প্রেমের কমিডাই বা কি
দাদারি ত ছােট ভাই।
রসে ভরপুর
নাবালকের মাথা
চাবায়ে চাবায়ে খাই।
সকলে। (আহা) প্রেমের পাশরা
শিরে ধরে মােরা
বাজারে বিলায়ে যাই।
মমাদের মতন
এ হেন রতন
দুনিয়াতে জোড়া নাই।
( আহা, থাকে যদি একটা দুটো শনিগ্রহের মাঝে,
সারা দুনিয়াতে জোড়া নাই রে।
কেমন হুজুর, এইবার কিছু চিনলেন।
মন্ত্রী। হাঁ বাবা, যতটুকু চিনেছি, তাইতেই প্রাণ ভরে গেছে ।
এখন একটু তফাৎ হয়ে পড়। আমাদের একটু মাথা ঠাণ্ডা করে
ভাবতে দাও।
কৃতান্ত। তা বেশ আপনারা ভাবুন। আমরা আবার খানিক
পরে আসব। তবে মােদ্দা কথা, এর চেয়ে ভাল term ( টার )
কোথাও পাবেন না।
[ কৃতান্ত ও বঙ্গচন্দ্রের প্রস্থান।
ওহে এ সব ব্যাপার কি বল দেখি ? আমার ত দেখে শুনে
বুদ্ধি শুদ্ধি লােপ পেয়েছিল।
মন্ত্রী। আরে বেটারা সব সিদেল চোর, সিদেল চোর। রকম
সকম দেখে বুঝতে পারলে না ?
রাজ। তা হলে আর টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করবার দরকার
নাই। চল আস্তাবল থেকে চুপি চুপ্তি চারটে পক্ষিরাজ ঘােড়া নিয়ে

১৮
রূপকথা ।
তরওয়াল কোমরে বেঁধে বেরিয়ে পড়ি। তারপর কপালে যা আছে
তাই হবে।
মন্ত্রী। বেশ তাই চল। আর চিন্তার প্রয়ােজন নেই।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
২।
সমুদ্র।
পরীগণের গীত।
(মােরা) রঙ্গে ভঙ্গে জলতরঙ্গে ভেসে চলে যাই আপন মনে।
করি কত খেলা, কাটাই বেলা, হাসি গাহি গান বিভাের প্রাণে ॥
পাখা মেলে কভু উড়ে চলে যাই বাতাসে ঢালিয়ে অঙ্গ,
ঝরে গেলে ডানা ঢুকি থিয়েটারে, করিলাে কতই রঙ্গ।
আবার গজালে পাখাগুলি,
থােক থাক্‌ কিছু বাগায়ে গায়ে বাঁধিগাে যতনে পুটুলি,
(তখন) মনের মতন লইয়ে বাহন ভর করি গিয়ে আশমানে।
তৃতীয় দৃশ্য।
( তেপান্তর মাঠ )
(পক্ষিরাজ অশ্বারােহণে রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র ও সওদাগরপুত্র)
( গীত)
শন শন শন্ হাওয়ার ভরে ছুটেছি সব মােড় সওয়ার।
মুক্তাহারে সােনার সাজে পক্ষিরাজের কি বাহার।

রূপকথা
১৯
( সে যে ) ডানা মেলে গ্যালপ চলে ঠেকেনা ভূয়ে পা
হরদম যায়, দম বেজায়, ঘামে না কভু গা।
চাবুক ছুঁতে হয়না মােটে ঈশারাতেই কামকাবার ।
ডিঙ্গিয়ে পাহাড় পুকুর নালা এক লাফেতে নদীর পার।
রাজ। তাইত বন্ধু, এ কোন দেশে এসে পড়লুম। দিগন্তপ্রসারী
মাঠ একদিকে আকাশের সঙ্গে মিশেছে, আর একদিকে দুর্ভেদ্য জঙ্গল।
কোন দিকে যাওয়া যাবে স্থির কর দেখি।
সওদা। আমি বলি সমুদ্র যে দিকে সেই দিকেই যাওয়া যাক।
তারপর পক্ষীরাজের সাহায্যে সমুদ্র পেরিয়ে অন্য দেশে যাওয়া যাবে।
বাবার কাছে শুনেছি সমুদ্রের পরপারে নাকি অনেক অদ্ভুত দেশ আছে।
মন্ত্রী। তা ত বুঝলেম, কিন্তু সমুদ্রের রাস্তাটা নির্ণয় হয় কি করে ?
তিনদিক দিয়ে ত দেখছি তিনটে রাস্তা দেখা যাচ্চে। ঠিক রাস্তাটা
কে বলে দেবে ?
কোটা। পথ বলে দেবার লােকের অভাব কি ? যাকে জিজ্ঞাসা
করা যাবে সেই বলে দেবে।
মন্ত্রী। সেই “যাকেরই” ত অভাব পড়েছে। এই তেপান্তর মাঠের
মধ্যে লােক কোথায় পাই যে জিজ্ঞাসা করব ?
রাজ। ঐ না একটি লােক এদিকে আসছে ? একটু চুপ করে
দাড়াই এস, ও কাছে এলে জিজ্ঞাসা করা যাবে।
( গীত গাহিতে গাহিতে চাষার প্রবেশ )
ও বউ বউ লাে
সােণার ফসল খেতের মাঝে চিক চিকায়ে হাসে।
(ও তাের) কাঁচা সােণার বরণ খানি পরাণডাতে ভাসে।
ও ঝউ বউ লাে।

২৪
রূপকথা ।
সাঁঝের বেলা আশমানেতে লালের ছড়াছড়ি,
( ভাবি ) আলতামাখা পা দুটি তাের কস্তাপেড়ে সাড়ী।
ও বউ বউ লাে ।
বনের ধারে হরিণছানা কচ্ছে ছুটোছুটি,
( দেখে) মনে পড়ে বউরে তাের ডাগর লয়ান দুটি।
ও বউ বউ লাে।
যে ধারেতে চাই রে বউ, যে ধারেতে চাই
(তাের ) মিশিমাখা হাসিখানি দেখতি যেন পাই,
ও বউ বউ লল।
ঢলঢলে তাের মুখের মাঝে নােক কি জবাের,
(আর) চাউনি খানার ধারটা যেন কাস্তেরি ঠোকর ।
ও বউ বউ লাে ।
চাষা। আরে এ কারা গো ? রঙ বেরঙ্গের পােষাকপরা,
পাখাওলা ঘােড়ায় চড়া, চাদপারা চেহারা—কে বটিস গাে তােরা ?
রাজ। ভাই আমরা পথিক। আমাদের সমুদ্রের দিকে যাবার
পথ বলে দিতে পার ?
চাষা। ওরে বাবা! তােরা পথিক বটিস? আমি বলি বুঝি
মনিষ্যি। আরে তাের ঘর কুন দেশকে ?
মন্ত্রী । ঘর আমাদের অনেক দূর। সে খবরে আর কি হবে ?
এখন লক্ষীটির মত সমুদ্রের রাস্তাটি দেখিয়ে দাও দেখি ।
চাষা। আরে সমুদ্র যেয়ে কি করবি বটে? এই আমাদের
গদাই দাদা গিয়েলাে। সে ভারি লােনা জল আর. হিকুচ, তিতাে।
সে জল ত মুখে দিতিই লারবি।

রূপকথা।
কোটা।
আরে বাপু, অত কথায় কাজ কি? পথটা কোন দিকে
শুধু বলে দাও না।
চাষা। পথ ? এই পথের কথা ত জিজ্ঞসচো ?
মন্ত্রী। হাঁ হাঁ, পথ। তােমাদের দেশে কি বাপু, সােজা কথার
সােজা জবাব দেওয়াটা মাথার দিব্যি দিয়ে বারণ করা, আছে ?
চাষা। হাঁ, হাঁ, আমিও ত তাই বলছি বটে। এই পথ ত ?
এই পথের কথাই ত সুধুলে ? ( কিঞ্চিৎ ভাবিয়া ) এই হাদ্দেখ, আমি
ছেলে মানুষ, পথ কুন দিকে তা বল করতি লারব।
[“ও বউ বউ লাে” গীত গাহিতে গাহিতে প্রস্থান।
মন্ত্রী। বেশ বাবা, বউয়ের মহিমাটিত খুব বুঝেছ। কেবল একটা
সামান্য কথা বলবার বেলাই ছেলেমানুষ।
রাজ। আচ্ছা যা’ । ঐ একটি বৃদ্ধা রমণী এই দিকে আসছে।
ও ত আর ছেলে মানুষ নয়। ওকে জিজ্ঞাসা করলেই পথের সন্ধান
পাওয়া যাবে।
(বৃদ্ধার প্রবেশ)
বৃদ্ধা। মরু, মরু, মরু। সাতগুষ্টি যমালয়ে যাক্। তার
মুখে কুড়িকিষ্ঠি মহাব্যাধি হাে। গতরে শুয়া পােক। ধরু।
আ ম ।
রাজ। ওগাে ও বাছা !
বৃদ্ধা। ওলাওঠা হােত্ ওলাওঠা হাে। আমি আধ মন দুধ
মাথায় ঢেলে শ্মশানেশ্বরের পূজো দিই ! আমি মােড়লগিন্নি, আমার
সঙ্গে শয়তানি! আজ মেজকতা বেঁচে থাকলে
( হাউ হাউ রবে ক্রন্দন।)
মন্ত্রী। ওগগা ও মেয়ে ! একটি বার চুপ করে আমাদের

২২
রূপকথা।
চেয়ে
একটা কথা বলে দেবে ? ( বৃদ্ধার ক্রন্দন) ওগগা বাছা !শােননা
একবার।
বৃদ্ধা।
কে রে নাবডিংরে ছােড়া! ঘোড়ায় চড়ে ভদ্রলােকের
মেয়ের ঘাড়ের উপর আসিস ? আ ম ।
দুঃসময় পেয়ে সবাই
মাথায় চড়ে। থাক্ত আজ মেজকত্তা—( ক্রন্দন )
রাজ। ওগগা বাছা! আমরা বিদেশী লােক। সমুদ্র কোন
দিকে দিয়ে যাব শুধু সেইটি বলে দাও।
বৃদ্ধা। হঁা, শিগ্গির মরব বৈ কি! তােরা মরনা, যমের
দক্ষিণ দোরে যা না, কেওড়া তলার ঘাটে গিয়ে শশা না। ওরে তােদের
সবাইকে না দেখে আমি যাচ্ছি না। সাড়ে তিনকুড়ি পেরিয়েছে
আর সাড়ে তিন কুড়ি বছর বাঁচব। মটু মট
দেখছিস কি ?
রাজা। বৃদ্ধাটি কাণে একটু কম শােনে দেখছি।
মন্ত্রী। হাঁ, তবে বিধাতা অবিচার করেন নি? কাণে যে
টুকু কসুর আছে, জিবে সেটা সুদ শুদ্ধ পুষিয়ে গেছে। (উচ্চস্বরে
বৃদ্ধার প্রতি) বলি ও বাছা! আমরা সমুদ্রের দিকে যাব। তা
রাস্তাটি দেখিয়ে দিতে পার ?
বৃদ্ধা। কি আমায় বললি গস্তানী ? ওরে অলপ্পেয়ে ড্যা
মঞ্চে পােয়াতীর পােয়েরা। এত বড় আম্পর্ধা, আমাকে গালাগাল ?
আমি মােড়ল গিন্নি, আমার ভয়ে দশটা আশ পাশের গায়ের বউ
ঝি কাঁপে, আর তােরা কিনা আমার গাঁয়ের কাছে এসে আমার
বুকে বসে দাড়ি ওপড়াস? থাকতত মেজকত্তা ত মুণ্ডু গুলাে
টপাটপ ছিড়ে নিয়ে পুকুরের পাঁকে পুতে রাখতে।
কোটা। আমর মাগী ! ভাল কথা বললে তেড়ে গাল দিতে

রূপকথা !
২৩
****
১৭s
আসে। কি বলব মেয়েমানুষ, নইলে এক কিলে, মাথাটা গুড়িয়ে
দিতুম।
বৃদ্ধা! আহা, এ ছেলেটির কথার তবু ছিরি ছাদ আছে। দেখত
বাবা দেখত, দুধের বাটিটি শেষ করে একটু দুধ মেনি বেরালটার
জন্যে রেখেছিলুম ; কোথেকে কিনা কেলে কুকুরটা এসে
হতচ্ছাড়া হাড়হাবাতে কুকুর মরে না তার সাতগুষ্টি নিপাত যায়
—সেই দুধটা কি না চক্ চক্ করে খেয়ে গেল! তাই তাকে
একটু পেটভরে গাল দেবার জন্যে নিরিবিলি একটিবার মাঠের দিকে
এইচি, আর কোথা থেকে একপাল ঘােড়ায় চড়া ছোঁড়া এসে
সব গালাগাল ভুলিয়ে দিলে ? ওগাে মেজকত্তা গাে, কোথায় আছ
গাে, একবার এসে আমার খােয়ার দেখে যাও গাে।
( কাঁদিতে কাদিতে প্রস্থান।)
রাজ। ব্যাপার ত মন্দ নয়। একটা সােজা কথা কারও কাছে
শুনতে পাওয়া গেল না।
মন্ত্রী। একটা শিক্ষা ত ভাই হল, যে দুনিয়ায় সােজা কথাটা বড়ই
দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। যা হাে’ক, ঐ একটি ভদ্রলােক এই দিকে আসছেন
এইবার আর কোনও গােলযােগ হবে না। একটু নম্রভাবে জিজ্ঞাসা
করলেই পথ জানতে পারা যাবে।
( তানপুরা হস্তে তেলারাম ওস্তাদের প্রবেশ )
তেলা। ( গাহিতে গাহিতে )
আরে শ্যামলিয়া বিনু গইরে
আরে শ্যামলিয়া এ শ্যামলিয়া
মন্ত্রী। নমস্কার মহাশয়! আজ্ঞে, বলতে পারেন সমুদ্রের দিকে
খাবার পথটা কোন দিকে ?

২৪
রূপকথা।
তেলা। আরে এ শ্যামলিয়া-
কোটা। বলি ও মশায়, একবার দয়া করে যদি আমাদের পথটা
দেখিয়ে দেন
তেলা। আচ্ছা বলুন দেখি, ইমনকল্যাণে কড়ি মধ্যম লাগে
কি না ?
মন্ত্রী। আজ্ঞে, তা লাগা কিছুমাত্র আশ্চৰ্য্য নয়। তবে যদি
অনুগ্রহ করে আমাদের সমুদ্রের রাস্তাটা বলবার সুবিধা হয়—
তেলা। নিশ্চয়ই বলব, একি কথা। আপনারা সমজদার গুণী
লােক—আপনাদের বলব না ত কাকে বলব। আচ্ছা ধ্রুপদটা
আপনাদের সাধনা করা আছে বােধ হয় ?
মন্ত্রী। আজ্ঞে, সঙ্গীতশাস্ত্ৰ চৰ্চ্চা করবার এখন কিছু সময়াভাব।
যদি রাস্তাটা দয়া করে দেখিয়ে দেন ত বলুন। নইলে আমরা এগিয়ে
গিয়ে আর কাকেও জিজ্ঞাসা করছি।
তেলা। একি বলছেন মশায়, ছি, ছি, ছি। সঙ্গীত চর্চার
সময়াভাব ? সঙ্গীতের কি সময় অসময় আছে ? আহা, প্রভাতে
ললিত ভৈরবী, মধ্যাহ্নে সারঙ্গ, অপরাহ্নে মুলতান, সন্ধ্যায় পুরবী,
রাত্রে বেহাগ-~-
মন্ত্রী। আর মুমুর্মু কালের জন্য কি ব্যবস্থা বলুন দেখি ? ঘুরে
ঘুরে অর বৃথা বাক্যব্যয় করে প্রাণগুলাে ত কণ্ঠের কাছাকাছি
পৌছেছে। এখন এ সময়ের জন্য কিছু বন্দোবস্ত থাকে ত বলুন।
তেলা। কি পরিশ্রান্ত হয়েছেন, পরিশ্রান্ত হয়েছেন ? তবে
একটা খেয়াল শুনুন।
রাজ। ( জনান্তিকে) আরে শােনই না ভাই, একটা গান।
নইলে ত ছাড়বে না, আর পথও বলে দেবে না।

রূপকথা । ২৫ তেলা। হাঁ হাঁ, উৎকর্ণ হয়ে শ্রবণ করুন, গানটি আমার স্বরচিত। (মােটা গলায় ভঙ্গী সহকারে গীত।) আজি বসন্তে-সন্তে-সন্তে, শিশির অন্তে, ছাড়িয়ে কান্তে বিরহিনী-হিনী, দুখিনী-খিনী-খিনী মাহ ফাগুন, মলয় আগুন গুণ গুণ গুণ ভ্রমরা বাণী। মন্ত্রী। হয়েছে, হয়েছে। সম্বরণ করুন, সম্বরণ করুন। একেবারে শ্রান্তিদূর, অন্তরাত্মা পরিতৃপ্ত, ব্রহ্মতালু পৰ্য্যন্ত সুশীতল। এখন দয়া করে আপনিও পথ দেখুন আমরা পথ দেখি। নমস্কার । তেলা। আরে সেকি হয় ? আপনাদের মত সমজদার লােক যদি আজ ভাগ্যবশে মিলেছে, তবে কি আপনাদের সহজে ছাড়ব ? কিছু দিবস আমার সঙ্গীতাশ্রমে আপনাদের দয়া করে অবস্থান করে । যেতেই হবে। আমি আমার শ্রোতৃবর্গের জন্য প্রত্যহ আশ্রমে উত্তম পায়স পিষ্টকাদি প্রস্তুত করে রাখি, কিন্তু দুঃখের বিষয়, তবুও আশ্রম যে খালি সেই খালি। মুখেরা বলে কি জানেন, যে আমার খাবার খেয়ে তাদের শরীরে যে পরিমাণ রক্ত হয়, আমার গান শুনে তার চেয়ে বেশী রক্ত শুখিয়ে যায় । মন্ত্রী। তা বেশ বেশ। আপনি তা হলে অভ্যর্থনার আয়ােজন করুন গে। আমরা একটু হাওয়া খেয়ে শীঘ্রই আপনার অনুসরণ কচ্ছি। তেলা। যে আজ্ঞে যে আজ্ঞে। আর দেখুন যদি পথে আসতে আসতে আর দু চার জন শ্রোতা যােগাড় করে আনতে পারেন তবে বড়ই ভাল হয়। আমি একটু বেশী করে উজুগ করে রাখব। দেখুন, ঐ যে অশথ গাছটা দেখছেন, ওরই পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে খানিক "

২৬
রূপকথা
দূর গেলেই দেখতে পাবেন লাল রংয়ের বাড়ী। আর তেলারাম
শৰ্ম্মার সঙ্গীতাশ্রম যাকে জিজ্ঞাসা করবেন সেই বলে দেবে।
মন্ত্রী। জিজ্ঞাসা করলে কথার উত্তর দেবার প্রথাটা মশায়দের
দেশে ত বড় দৃষ্ট হচ্ছে না। যা হােক, আপনি নিশ্চিন্ত মনে অগ্রসর
হন, আমরা ঠিক যাচ্ছি।
তেলা। আর লােক নিমন্ত্রণ করার কথাটাও ভুলবেন না।
আমি একটু পরিপাটি রকম আয়ােজন করছি। আমি তবে এগিয়ে
চল্লেম। আবার যন্ত্রতন্ত্রগুলাে বাঁধতে হবে। (সুর ভাঁজিতে ২
প্রস্থান।)
সওদা। বেশ ভাই, বেচারার জিনিষপত্রগুলি শুধু শুধু নষ্ট করবে ?
ওর বাড়ীতে ত আর যাবে না। তবে কেন অনর্থক ওর খরচ
মন্ত্রী। তােমার প্রাণে অত দরদ হয়ে থাকে ত যাও না গান
শুনতে। খাবার জিনিষগুলা না হয় আমরা না খেয়ে ফেলা গেলে,
গরিব দুঃখীরা খাবে। তাই বলে ত আর জান খােয়াতে পারি নি।
ঐ রকম বাজখাঁই আওয়াজ কাণের ভেতর আর বার দুচ্চার প্রবেশ
করলেই কর্ণপটহটি বিদারিত হয়ে মস্তিষ্ক থেকে কর্ণমূল পর্যন্ত দিব্য
একটি সুড়ঙ্গ প্রস্তুত হয়ে যাবে।
রাজ। এদেশে ত আর দুদণ্ড থাকলেই দেখছি আমরা সবাই
পাগল হয়ে যাব। আমি বলি পথ আর কাউকে জিজ্ঞাসা করে কাজ
নেই। যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাই, তারপর অদৃষ্ট যেখানে নিয়ে
যায় সেইখানেই পেঁছিব ।
সওদা। আচ্ছা দাড়াও দাড়াও। এবারে ৩দিক থেকে অনেক
গুলি লােক আসছে। কেউ কেউ অবশ্যই পথ বলে দেবে।

রূপকথা।
২৭
মন্ত্রী। অনেক লােকই আসুক আর একজন লােকই আসুক,
আমি ত আর এ দেশের কাউকে একটি কথাও জিজ্ঞাসা করছি না।
কোটা। না না, এরা বােধ হয় এদেশের লােক নয়। আকার
প্রকার যেন বিভিন্ন রকমের। এরাও বােধ হয় পথিক, হয়ত পথের
সন্ধান মিলতে পারে ।
( উড়ে পাঙাগণের প্রবেশ ও গীত)।
ইপাক সিপাক বাট চালি।
গােড় গলা প্রভু বনমালী।
ডাকুছি তুহ্মে জগড়নাথ,
মিলুনি দোটি পাড়ােত,
ভুখ লাগুছি রে সঁঝ বেলি।
যাত্রী না গুটে কেঁয়াড়ে মিলি।
১ম পাণ্ডা। আরে ইয় অর্শ্ব চড়িকিরি মণিকাঞ্চনক গাপটা পরি
পিলামানে কড় করিছন্তি পরা ?
কোটা। বাপু সকল বলতে পার, সমুদ্রে যাবার রাস্তা কোন্
দিকে ?
২য় পাণ্ডা। সমুদ্র জিব? শ্রীক্ষেত্র জিব? মহাপ্রভু লােকনাথ
দর্শন, বড় পুণ্য অছি, বড় পুণ্য। কলৌ সমুদ্রতীর্থে স্নানদানং পাপ
নাশং শতাশ্বমেধ ফলং। পঞ্চতীর্থ মধ্যে সমুদ্র-তীর্থ ত ভারি হেউচি।
স্বর্গদ্বার ঘাটে স্নান করিকিরি ব্রাহ্মণক গুটে টঙ্কাদান মহাপুণ্য
মহাপুণ্য।
রাজ। কথাগুলাে ত বাপু, সব হৃদয়ঙ্গম হল না। তবে স্বর্গদ্বারে
পৌছানর সম্বন্ধে আপাততঃ বেশী তাড়া নেই। দুদিন দেরী হলেও
বিশেষ ক্ষতিবােধ করব না।

রূপকথা। ১ম পাণ্ডা। আপনঙ্কর ঘর কোটি বাবু ? পণ্ডা কে অছি পরা ? মাের নাম পুরুষােত্তম পণ্ডা (খাতা বাহির করিয়া) ঘর কোটি বল বাবু। মন্ত্রী। আরে বাপু, আমাদের পাণ্ডা টাণ্ডা এখন দরকার নেই। আর আমরা শ্রীক্ষেত্ৰও কেউ সম্প্রতি যাচ্ছি না। ৩য় পণ্ডা। পণ্ডা অছি না পণ্ডা অছি না ? দেখ বাবু, মাের নাম চিন্তামণি পণ্ডা। মাের সাথে আস ত মু সব ঠাকুর ভাল করি দর্শন করাইব। আর যেতে টঙ্কা দিব মু কিছি কথা কহিব না। ( পাণ্ডাগণের পরস্পরের মধ্যে কলহ ও চারি বন্ধুকে বেষ্টন করিয়া “মু উদ্ধব পণ্ডা ; মু অর্জুন পণ্ডা ; মু নিশাকর পণ্ডা” ইত্যাদি বলিয়া নিজের দিকে টানিবার চেষ্টা )। রাজ। ওহে এ ত ভাল বিপদেই পড়া গেল। এদের স্পষ্ট করে বলে দাওনা যে আমাদের এখন পাণ্ডার প্রয়ােজন নেই। সওদা। ওদের যতই স্পষ্ট করে বল, ওদের হাত থেকে শীঘ্র পরিত্রাণ পাবার যাে নেই। কোটা। আরে এই বেটারা, বলছি আমাদের পাণ্ডার দরকার নেই তবু গােল করবি ? ফের একটি কথা কইলে দেব ঘাড়ের উপর ঘােড়া চালিয়ে। :ম পাণ্ডা। আয়ে ইয় বলভদ্র ভাই, ইয়ে গুটে সরকারী মনুষ্য অছি। ভাগি চলি আয়, ভাগি চলি আয় ধকিড়ি কিড়ি। ২য় পাণ্ডা। (যােড়হস্তে ) গোসা করিছ কই, মহাপ্রভু ? টিকা অবধড়, আপনি রাজা মনুষ্য মু ত গুটে মাকড় অছি। আপনঙ্কর মহাজনমানে গোঁসা করিব ত মু জিবি কেয়াড়ে? কিছি ব্রাহ্মণ ভােজুন আজ্ঞা মন্ত্রী। আচ্ছা আচ্ছা আমি ব্রাহ্মণ ভােজনের ব্যবস্থা করছি।

রূপকথা।
২৯
।
দেখ বাপু সকল, আমরা ত টঙ্কা কিছু সঙ্গে করে বেরুইনি। তােমরা
আমাদের বাড়ীতে যেও, সেখানে বেশ পেট ভরে খেতে পাবে।
১ম পাণ্ডা। ঘর কৌটি মহাপ্রভু ?
মন্ত্রী। ঐ যে অশথ গাছটা দেখছ, ওরি পশ্চিমদিক দিয়ে খানিক
দূর গেলেই দেখতে পাবে আমাদের লাল রঙ্গের বাড়ী। সেখানে
গেলে বেশ গানটানও শুনতে পাবে, আর ভােজনটাও প্রচুর রকম
হবে। যাও যাও আর বেশী দেরী করাে না।
পাণ্ডাগণ। জয় মহাজন, জয় প্রভু।
[ প্রস্থান।
রাজ। যাক, আর গােলে কাজ নেই। কাউকে কোন কথা
জিজ্ঞাসা করা দেখছি বৃথা। ঘােড়ার রাশ আলগা দাও। যেদিকে
ইচ্ছা ছুটে যাক্।
[ সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য ।
মহাবন
(পশুগণ কর্তৃক রঙ্গাভিনয় )
( রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র ও সওদাগর পুত্রের প্রবেশ )
রাজ। একি, এযে ভীষণ অরণ্য মধ্যে এসে পড়লুম। চারিদিকেই
লতন্তু পরিব্যাপ্ত মহাকায় বৃক্ষশ্রেণীর ঘন সন্নিবেশ, তার উপর সর্বত্র
কণ্টকে আচ্ছন্ন। কোনও দিক দিয়েই ত পথ দেখছি না বন্ধু।
মন্ত্রী। তাইত ভাই, অদৃষ্টদেবীর উপর নির্ভর করে অজানা পথে

রূপকথা ।
চলতে চলতে এ কোথায় এসে পড়লুম ? ঘােড়াগুলকে ত রাত্রে নিদ্রা
যাবার সময় বাঘে উদরসাৎ করলে। এখন পদদ্বয়ই ভরসা। তার
উপর অন্ধকারও ঘনিয়ে এল। বেশী দূর দৃষ্টি পৰ্যন্ত চলছে না।
কোনও দিকে অগ্রসর হওয়া ত একেবারেই দুঃসাধ্য।
কোটা। রাত্রের মত কোথাও একটা আস্তানা ঠিক করে নাও,
তারপর সকালবেলা পথ খোঁজা যাবে।
সওদা। এই গাছের তলাটা বেশ প্রশস্ত আছে আর একটু
পরিষ্কারও বটে। এস রাত্রিটা এইখানেই কাটান যাক।
কোটা। আমি আসতে আসতে অনেক ফলমূল সংগ্রহ করেছি।
এস সবাই মিলে খাওয়া যাক।
( বৃক্ষতলে সকলের উপবেশন ও ভক্ষণ।)
রাজ। দেখ ভাই, এই শ্বাপদ সংকুল অরণ্যমধ্যে ত নিশ্চিন্ত ভাবে
নিদ্রা যাওয়া কোনক্রমেই বিধেয় নহে। ঘােড়া গুলিকে বাঘের মুখে
দিলুম, শেষে নিজেরাও কি বন্যজন্তুর উদরে প্রবেশ করব। উঃ, কি
সুচিভেদ্য অন্ধকার ! একে অমাবস্যার রাত্রি তায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।
গীত।
মহাঘাের ঘনঘটা গগনে
ঘাের তিমির ভরা, যামিনী ভয়ঙ্করা
অন্ধতমস ঘেরা ভুবনে।
দামিনী দুরু দুরু
মন্ত্র সুভীষণ,
কানন মুখরিত শ্বাপদ গর্জন
ঝঞ্চা বহিছে ঘন,
মত্ত প্রভঞ্জন,
কম্পিত চরাচর সঘনে।

রূপকথা । মন্ত্রী। এস, পালা করে করে এক এক জন রাত্রি জেগে পাহারা দিই। কোন বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই সকলকেই জাগিয়ে দেব। রাজ। আমি ত ভাই যেরূপ ক্লান্ত হইছি, তাতে আমায় জাগান কিছু শক্ত হবে। আমার চোখ জড়িয়ে আসছে, শরীর এলিয়ে পড়ছে আমি শুলেই বােধ হয় অঘােরে ঘুমিয়ে পড়ব। মন্ত্রী। বেশ ভাই তুমি সচ্ছন্দে নিদ্রা যাও। আমরা তিন জনে আজ তিন প্রহরে প্রহরা দিব। কিন্তু এমনটা কেন হচ্ছে বন্ধু ? মৃগয়া করতে গিয়ে কত সময়ে কত পরিশ্রম করেছি, কখন ত আমার এমন অবস্থা হয় নি। আমার যেন কেমন বুক দুরু দুরু করছে, মন চঞ্চল হচ্ছে। যেন একটা অনিশ্চিত অমঙ্গলের ছায়া পড়ে প্রাণটা অবসন্ন বােধ হচ্ছে। মন্ত্রী। ও কিছু নয় ভাই। বহুদিন গৃহছাড়া, তার উপরে পথকষ্ট তাই অমন মনে হচ্ছে। একটু শান্ত ভাবে নিদ্রা গেলেই সমস্ত সেরে যাবে। ( রাজপুত্রের শয়ন ও নিদ্রা ) কোটা। প্রথম রাত্রের পাহারা আমিই দিব, তােমরা দুজনে আপাততঃ ঘুমােয়। সময় হলে জাগিয়ে দিব। মন্ত্রী। কিন্তু ভাই দেখাে সাবধান। রাজপুত্রের যেন নিদ্রা না, ভাঙ্গে। আহা অপরিমেয় সুখে সােহগের মাঝখানে চিরদিন পালিত হয়ে বেচারা আর কতদিন এই দারুণ পথকষ্ট সইতে পারে! ভালয় ভালয় পুনরায় দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলেই মঙ্গল। ( মন্ত্রীপুত্র ও সওদাগরপুলের শয়ন ও নিদ্রা ) কোটা। (পদচারণ করিতে করিতে) প্রকৃতি কি ভয়ঙ্কর মূর্তিই ধারণ করেছে। চারিদিক থেকে বন্যজন্তুর, ভীষণ চিৎকার রূপকথা মেঘগর্জনের সঙ্গে মিশে অরণ্যের ভীষণ ভাবকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। ওকি ! ঐ বটবৃক্ষের শাখার উপর কি নড়ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখতে হ’ল। যদি কোনও হিংস্র প্রাণী হয় ( অগ্রসর হইয়া ) একি! এ যে এক ভয়াবহ অজগর গাছের উপর পাখীর বাসার দিকে যাচ্ছে, আমাদের দিকে ফেরবার আগেই ওকে শেষ করতে হবে। [ দ্রুত প্রস্থান। ( নেপথ্য হইতে) ভাই সব ! শীঘ্র উঠ, শীঘ্র উঠ। রক্ষা কর, রক্ষা কর। বৃহৎ অজগর আমায় আক্রমণ করেছে, শীঘ্র রক্ষা কর। ( মন্ত্রীপুত্র ও সওদাগরপুত্রের গাত্রোত্থান) মন্ত্রী। একি! কে কাতরস্বরে চিৎকার করলে ? বন্ধু কোটাল পুত্রের কণ্ঠস্বর না? কই তাকে দেখতে পাচ্ছি না ত! দেখ বন্ধু, তুমি শীঘ্র ও ধারে যাও, আমি এ ধারে দেখছি। রাজপুত্রকে উঠিও না। আহা, বড় ক্লান্ত হয়ে ঘুমুচ্চে। ( মন্ত্রীপুত্র ও সওদাগরপুত্রের বিভিন্ন দিকে প্রস্থা) ( নেপথ্যে সওদাগরপুত্র ) ভাই মন্ত্রীপুত, গেলাম, গেলাম। রক্ষা কর, ভীষণ সর্পের গ্রাস থেকে আমার বাঁচাও। (মন্ত্রীপুত্রের বেগে প্রবেশ ) মন্ত্রী। কই কোন দিকে ! কোন দিকে! ভয় নাই আমি যাচ্ছি। (বেগে প্রস্থান) ( নেপথ্যে মন্ত্রীপুত্র )। কোথায় রাজপুত্র, কোথায় আছ। আমরা গেলাম, আত্মরক্ষা কর, আত্মরক্ষা কর। ভীষণ সর্প, জন্মের মত বিদায় ( রাজপুত্রের গাত্রোখান ). রাজ। • ( চক্ষুমুছিতে ২) অঁ কে চিৎকার করলে ? ভাই মন্ত্রীপুত্র, কিসের চিৎকার দেখনা। একি কোথায় বন্ধুগণ ! আমাকে একলা - রূপকথা। ৩৩ রেখে সবাই কোথায় গেল? কই কাউকেও ত দেখতে পাচ্ছি না। ( চতুর্দিকে অন্বেষণ) কেউ ত নাই ! কোনও বিপদ হল নাকি। উঃ, কি কালনিদ্রাই আমায় আচ্ছন্ন করেছিল। ( অন্বেষণ) তাইত এ অন্ধকারে কিছুই ত নয়ন গােচর হচ্চে না। (উচ্চরবে) বন্ধুগণ, কোথায় আছ, একবার সাড়া দাও। কই, কেউ ত কথা কইলে না। কি করি ? উঃ, কি একটা তীব্র সন্ সন্ শব্দ হচ্ছে না? ওই যেন কি নড়ছে ! একিএযে বৃহৎ একটা অজগর এই দিকে আসছে ! ( অসি নিষ্কাশিত করিয়া) আসুক, আমার গুরুদত্ত অসি শত্রুশােণিত পান না। করে নিবৃত্ত হবে না। ( অজগরের রাজপুত্রকে আক্রমণ ও তৎকর্তৃক বিনষ্ট) সর্প ত নিহত হল। কিন্তু বন্ধুরা কই ? এই সৰ্পই কি তাদের অদৃশ্য হওয়ার কারণ ? কি জানি কেন মন অত্যন্ত ব্যাকুল হচ্ছে। এ আবার কি, ঝড় উঠলে নাকি ? কি একটা প্রবল সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে ? না না, এযে বৃহৎকায় দুটো পক্ষী আকাশ পথে উড়ে আসছে, তাদেরই পক্ষচালনার শব্দ। সশস্ত্র অবস্থান করাই ভাল। কি জানি যদি আক্রমণ করে। (বেঙ্গমা ও বেঙ্গমীর প্রবেশ ) বেঙ্গমী। না জানি অদৃষ্টে আজ কি আছে। নিঃসহায় শাবকগুলি জীবিত আছে কি দুষ্ট সর্পের উদরেই গেছে তাই ভাবছি। বেঙ্গম। না না, ঐ যে বাছাদের আনন্দ কোলাহল শুনতে পাচ্চি। নিশ্চয় সমস্ত কুশল। দেখ দেখ কি সুন্দর একটি মানুষের ছেলে ব্যাকুল নেত্রে গাছের তলায় দাড়িয়ে আছে । কে তুমি বৎস, এ জনশূন্য মহাবনে তুমি কোথা থেকে এলে ! রাজ। পক্ষীর ন্যায় অবয়ব অথচ মানুষের চেয়ে মিষ্ট কথা, কে

৩৪ ,
রূপকথা।
AN
আপনারা ? আপনারা কি এই বনের অধিষ্ঠাত্রী কোন দেবযােনি ?
যেই হন, আপনাদের করুণস্বর শুনে আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্চে।
আমি বড় বিপন্ন, আমায় সাহায্য করুন।
বেঙ্গমা। তুমি কে তার পরিচয় দাও আর তােমার কি বিপদ
তা বল। সাধ্যায়ত্ত হলে নিশ্চই তােমার সাহায্য করব।
রাজ। আমি অবন্তী রাজের পুত্র। তিন বন্ধুর সঙ্গে অশ্বারােহণে
দেশ ভ্রমণ করতে বেরিয়েছিলুম। পথে নানা দুর্ঘটনায় পড়ি। অশ্বগুলি-
কেও বাঘে নিহত করেছে। তারপর রাত্রে আমরা এই গাছতলায়
শুয়েছিলুম। শুতে না শুতে কেমন এক কালনিদ্রা এসে আমায়
আচ্ছন্ন করেছিল। সহসা একটা করুণ আর্তনাদ শুনে জেগে উঠে
বন্ধুদের কাউকেও দেখতে পাচ্ছি না। তারপর এক বৃহৎ অজগর
এসে আমায় আক্রমণ করে। আমি তাকে অসির সাহায্যে নিহত
করেছি।
বেগম। আঁ তাইত। এই ত সেই দুষ্ট সৰ্প মৃত হয়েছে ।
তাই আজ আমার বাছাগুলিকে নিরাপদ দেখছি। দেখ বৎস, তুমি
এই সৰ্পকে সংহার করে শুধু আত্মরক্ষা কর নি, আমার শাবক গুলিরও
প্রাণরক্ষা করেছ। যদি প্রয়ােজন হয় তবে আমরা প্রাণ দিয়েও
তােমায় সাহায্য করব।
রাজ। তবে দয়া করে শীঘ্র আমার বন্ধুদের সন্ধান করে দিন।
তাদের জন্য আমি অত্যন্ত ব্যাকুল হচ্ছি।
বেঙ্গমা। (মৃতসর্পকে পরীক্ষা করিয়া) রাজপুত, বিপদে ধৈৰ্য্য
অবলম্বন কর। অমঙ্গল সংবাদ শুনে বিচলিত হয়াে না। বােধ হয়
তােমার বন্ধুরা সর্পের উদরেই গেছে।
রাজ। সে কি! বন্ধুগণ সকলেই মৃত ? হা ভগবান, এ কি করলে।

রূপকথা।
কোন মুখে আবার আমি দেশে ফিরে যাব ? দুঃখের মূর্তি দেবার
সাধ করেছিলুম বলে কি দুঃখের মহাসাগরে চিরদিনের জন্য নিক্ষিপ্ত
হলুম। চারজনে একসঙ্গে লালিত হয়েছিলুম, চারজনে একসঙ্গেই মরব।
বন্ধুগণকে ছেড়ে আমি কখনই এ পৃথিবীতে থাকব না।
বেঙ্গমা। রাজপুত্র, ক্ষান্ত হও। নিস্ফল ক্রন্দনে কখনও বিপদের
উপশম হয় না।
এস, উপায় চিন্তা করা যাক।
রাজ। সবই যখন শেষ, তখন আর উপায়ের চিন্তা কি আছে ?
বেঙ্গমা। আশা কখনও ছেড় না। আমি বলছি এখনও উপায়
থাকতে পারে।
রাজ। হা বিধাতা, তাই কি হবে। আবার কি বন্ধুদের দেখতে
পাব ? না না সে যে আমার স্বপ্ন। অথবা দেবতার অসাধ্যই বা কি
আছে ? দয়া করে বলুন আপনি কি আমার বন্ধুদের জীবনদান করতে
পারেন।
বেঙ্গমা। না তা পারিনা। কিন্তু তােমার বন্ধুদের বাঁচান আমার
নিজের অসাধ্য হলেও, যাতে বাঁচতে পারে তার উপায় হয়ত বলতে
তবে সেটা সাধন করা অনেকটা তােমার নিজের হাত ।
রাজ। আপনি শীঘ্র বলুন কি করতে হবে ? সে কাৰ্য্য যতই
বিপদজনক হক না কেন আমি হাস্যমুখে অগ্রসর হব। আর বন্ধুদের
বিচ্ছেদে আমি ত এমনিই প্রাণত্যাগ করছিলুম, না হয় তাদের
উদ্ধারের চেষ্টা করে জীবনদান করব।
বেঙ্গম। তবে মন দিয়ে শুন। এখান থেকে সাতসমুদ্র তের
নদীর পার রাক্ষসের পুরী আছে। সেখানে এমন জিনিষ আছে
যাতে মরা মানুষকে পুনর্জীবিত করা যায়। আমরা তােমায়
রাক্ষসপুরীতে পৌছে দিতে পারি, কিন্তু নিজেরা সে জিনিষ আনতে
পারি ।
০

রূপকথা ।
•
পারিনা। সেটা তােমার নিজের চেষ্টা আর বুদ্ধির বলে আনতে হবে।
তবে তােমাকে আমরা একটা পালক দিব, সেটা সঙ্গে রাখলে রাক্ষসেরা
তােমার কোন অনিষ্ট করতে পারবে না। আবার যখন ফিরে
আসবার জন্যে আমাদের আবশ্যক হবে তখন ঐ পালকের একটুখানি
পুড়িও, তা হলেই আমরা দেখা দেব।
রাজা। বেশ, আপনারা তা হলে আমায় সেখানে পৌঁছে দিন
তারপর সে জিনিষ আনা যদি মানুষের সাধ্য হয় তবে তা নিশ্চয়ই
আনব। আপনাদের আর কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাব, আপনারা
আমার জীবন দিলেন।
বেঙ্গমা। কিছুমাত্র কৃতজ্ঞতা জানাবার প্রয়ােজন নাই। তুমি
আমার সন্তানদের জীবনরক্ষা করেছ। তােমার ঋণের কিঞ্চিৎমাত্র
পরিশােধ করতে পারলেই আমরা ধন্য হব।
রাজ। বন্ধুদের দেহের কি হবে ?
বেঙ্গমা। তুমি চলে গেলে আমি সাপের পেট চিরে তাদের মুণ্ড
গুলি সযত্নে রেখে দিব। তুমি যদি সে জিনিষ আনতে পার, তবে ঐ
মুণ্ড থেকেই আবার তারা প্রাণ পাবে। এই পালক লও আর আমার
পৃষ্ঠে চড়ে বলপূর্বক আমায় ধরে থাক।
( রাজপুত্রকে পালক প্রদান ও তাহাকে পৃষ্ঠে লইয়া উড্ডীয়মান )

রূপকথা।
পঞ্চমদৃশ্য।
রঙ্গপট।
ঘুমপাড়ানী মাসী পিসীগণ।
( আমরা) ঘুমপাড়ানী মাসী পিসী ঘুমের বাড়ী যাই।
বাটা ভােরে পান দিলে গাল ভরে খাই।
মাতিয়ে পাড় দিন দুপুরে দস্যি যত ছেলে
সাজের বেলা সাঙ্গ খেলা চোখটি আসে ঢুলে,
(মােরা) আলগােছেতে খােকাবাবুর মুখে চুমাে খাই।
নূতন প্রেমে মাতােয়ারা যুবক যুবতী
ফিসির ফিসির গল্প করে জেগে কাটায় রাতি,
(মােরা) দূরে থেকে শুধু সেথা আড়িপেতে চাই।
মাথায় টেড়ি ঘুরিয়ে ছড়ি নিশাচরের দল,
তিনটে রেতে ফেরেন ঘরে পা দুটি টলমল,
তাদের চোখেও ভােরের বেলা (করুণ) হাত দুটি বুলাই।
( যে ) আপন নিয়ে তুষ্ট সদা হৃদয়টি সরল
( যার ) নাইক প্রাণে হিজিবিজি নাইক হলাহল,
' (মােরা) তারেই বড় ভালবাসি, তারি কাছে যাই সদাই।
পটক্ষেপণ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
রাক্ষসপুরী।
(বােকস ও বুকুসীর প্রবেশ )
গীত।
ঘুরি ফিরি মােরা আঁধার রাতে।
পিরিতি সারারাতি, দুজনাতে।
বুকুসী। (আহা) মিনসেটি আমার ভারি ভালাে
কলজে জুড়ান ধন আঁখির আলাে,
( তবে ) রাগটা আমার হলে বেশী
মাঝে মাঝে চেলাকাঠে পিঠটা চষি,
( কিন্তু ) ভালবাসি তারে আঁতে আঁতে।
বােস। আমি জানি তা, বুঝি তা ভাল মতে ।
একটু পিঠটা ব্যথা, সেত কথার কথা,
(ঐ) মারের লােতেই ফিরি সাথে সাথে ।
বােস। প্রেয়সী বুন্ধুসী রাণী ! আজ চরতে যাবে কোনদিকে ধনী?
বুকুসী। ( মত্তস্বরে ) বােস প্রাণধন, চরতে যেতে আজ আর মন
চাচ্ছে না। বড় অরুচি প্রাণনাথ, বড় অরুচি। ক্ষুধা নাই, পেট
আইঢাই, রগ টন টন, মাথা বন বন, কিছু ভাল লাগে না। তবে তবে-
এ-এ যদি একটি রসাল গণ্ডারের লেজ পাই তাহলে একটু টুকটাক
করে সঁতে কাটি।

রূপকথা।
wn
বােস। তাই ত প্রেয়সী, এই ভরা বয়েস, এখনই যদি এত
অগ্নিমান্দ্য, তবে এমন করে আর বাঁচবে কদিন ? শরীর ত দিন দিন
খড়কেটি হয়ে যাচ্ছে। তার উপর এই অরুচি ; আহা কবে
আমায় অনাথ করে চলে যাবে। একটা ব্যবস্থা না করলে ত আর
চলছে না। এক কাজ করি। মানুষের দেশে গিয়ে, সেখানে কোন
ভাল কবরেজের কাছে থেকে জালা কতক হজমিগুলি নিয়ে আসি।
দেখি যদি অরুচির কিছু উপশম হয়।
বুকুসী। কবরেজের বড়ীতে কি আর এ অরুচি সারবে প্রাণধন।
তার চেয়ে বরং দু চারটে কবরেজ আস্ত পেটে পুরলে কিছু উপকার
হওয়ার সম্ভাবনা।
বােস। তাইত, এত কবরেজই বা কোথায় পাই ? সহুরে
কবরেজদের আজকাল দর যে ভারি বেশী । সাড়ে দশ আনায় একুশ
রকম বক্কাল সংগ্রহ করে এককড়া ঔষধ হল, তাই বিজ্ঞাপনের জোরে
২||• টাকা সপ্তাহ হিসাবে বিক্রী। কাজেই সৰ্ব্বত্র বড় বড় গাড়ী
ঘােড়াওয়াল। ধন্বন্তরী আর কবিচিন্তামণি, আর দরও বেজায়। তবে
পাড়াগেঁয়ে কবরেজগুলো কতক সময় দরে সস্তা আর দমেও ভারী
হয়। তাই না হয় দুটা একটা যােগাড় করব। নিদেন দুটো চারটে
নেটিভ ডাক্তারও এনে দেব ।
( জনৈক রাক্ষসের প্রবেশ )..
রাক্ষস। সেলাম বােস বাবু, বন্দেগি বুন্ধুসী বিবি। সংবাদ
কুশল ত ?
বোকস। আর ভাই, কুশল আর কেমন করে বলি ? রােজই
বিপদ, চারিদিকেই গােলমাল।

৪০
রূপকথা,
,
রাক্ষস। কেন দাদা, আমরা থাকতে তােমার গােলমাল ? তার
উপর এ হেন গুণবতী বৌদিদি-
বােস। ওই তােমার বৌদিদিটিকে নিয়েই বিপদ, ভাই!
একটা না একটা লেগে আছেই। এই জানত ভাই, সেদিন বন
ভােজনে একটা হাতী গিলতে গিয়ে হাতীর দাঁত গলায় লেগে কি
বিভ্রাটই ঘটিয়েছিল। আবার দেখনা, মাথা ঘুরছে ক্ষিধে নেই,
হয়ত হিষ্টিরিয়াতেই দাড়াবে।
রাক্ষস। কিন্তু শত্রুর মুখে আলকাতরা দিয়ে, দিদিমণির
গতরখানি ত—
বােস। একেবারে পাকাটি, একেবারে পাকাটি। দেখনা, একটু
ফু দিলেই উড়ে যায়।
রাক্ষস। তা দেহটা উড়ুক না উড়ক, প্রাণটা কিন্তু দিদিমণির
চিরদিনই উড়ু উড়ু, বটে। আহা, যেমনি ফুৰ্ত্তিভরা প্রাণ, তেমনি
দেলদরিয়া মেজাজ, কেমন বৌদি ?
বুকুসী।
বলত দাদা, বলত। আহা, ঠাকুরপাে নইলে কি
মেয়েমানুষের কদর কেউ বুঝতে পারে ?
রাক্ষস। না বৌদি, তােমার মহিমা পুরােমাত্রায় বুঝে উঠতে
পারি, এতটা আঙ্কেল এখনও গজায় নি। তবে নিজগুণে যতটা দেখা
দিয়েছ, ততটা দেখেছি।
( রাজপুত্রের প্রবেশ )
--
বােস। রাক্ষস ভাই, রাক্ষস ভাই, এদিকে দেখ, এদিকে দেখ।
কেমন একটা নধর গােলগাল মানুষের বাচ্ছা এই ধারে আসছে।
একি সৌভাগ্য আজ ! কোথায় সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে

রূপকথা । ৪১ গিয়ে খুঁজে খুঁজে মানুষ শিকার কতে হয়, না একেবারে মুখের গােড়ায় আহার। আজ ভােজনের ব্যবস্থাটা কি মজাদারই হবে। রাক্ষস । (ঢােক গিলিতে গিলিতে) হাঁ দাদা, হাঁ দাদা। মাথাটায় মুড়ির ঘণ্ট, আঙ্গুল গুলাের ঝালচচ্চড়ি, পাদুটোর লেগ-রােষ্ট। বৌদি, আজ তােমার নিজের হাতে রাখতে হবে । বুকুসী। হায়, হায়, হায়, হায় ! কেয়া তােফা, কেয়া তােকা, কেয়া আঁখকা বাহার, কেয়া মিঠা সুরত। হায় হায় হায় হায়, এরে পেটে পুরি কি বুকে ধরি, পেটে পুরি কি বুকে ধরি, হায় হায় হায় হায় ! বােস। কথাটা যে কিছু গােলমাল হয়ে পড়ছে প্রেয়সী। এমন পতিব্রতা সতী তুমি, পতি বই আর জান না, তােমার মুখ দিয়ে এমন কথাটা কেন বেরুল ? বুকুসী। হায় হায় হায় হায়, পেটে পুরি কি বুকে ধরি, পেটে পুরি কি বুকে ধরি, হায় হায় হায় হায় ! রাক্ষস। না না, বৌদিদি রহস্য কচ্চে। বৌদিদি একটু প্রেমিকা বটেন, কিন্তু বরাবরই দেখে আসছি যে ওঁর প্রেমের চেয়ে পেটের জালা আরও প্রবল। বৌদি কি আর তুচ্ছ প্রেমের খাতিরে এমন আহারের আশাটা ব্যর্থ করে দেবেন ? ও নিশ্চয়ই রহস্য। বােস। আঁ রহস্য ? বিদ্রুপ ? পরিহাস ? ব্যঙ্গ ? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, তাই বল ভাই, তাই বল। আঃ ধড়ে প্রাণ এল। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। প্রেয়সী আমার শুধু প্রেমিকা নন, রসিকাও বটেন। তা হলে রান্নার উজ্জ্বগ করি ? বুন্ধুসী। হায় হায় হায় হায় ! পেটে পুরি কি বুকে ধরি, পেটে পুরি কি বুকে ধরি। হায় হায় হায় হায় !

৪২
রূপকথা।
বােস। একি বাবা! পরিহাস যে ক্রমেই ঘনীভূত হতে
আরম্ভ হল।
বুকুসী।- না না, বুকেই ধরি, বুকেই ধরি, বুকেই ধরি ।
বােস। কি ! তবে রে সর্বনাশী পাপিয়সী প্রেয়সী, আমি
এমন কালশশী, এত তােকে ভালবাসি, তুই আমার গালে দিয়ে মসী,
কিনা একটা মানুষের তরে হলি উদাসী ? দেখ, রেগে কি করে
বসি ! আন ত রাক্ষস ভাই, একখানা অসি, শালীর নাকটা কেটে
ঝামা ঘসি ।
বুকুসী। আরে যা—যা—-—————যা-যাঃ।
বােস। কি ! এত অপমান, তবু দেহে রহে প্রাণ ; আমি
রেগে হচ্ছি কম্পমান, আজ দুনিয়া করব খান খান, চোখের সামনে
প্রাণেশ্বরী পরকে করে প্রেমদান!
রাক্ষস। আহ দাদা, একটু আস্তে আস্তে। একেবারে অতটা
রাগ কি করতে আছে ? মাথা ঠাণ্ডা কর, মাথা ঠাণ্ডা কর ।
সংসার করতে গেলে অমন মাঝে মাঝে হয়ে থাকে। সুবুদ্ধি লােক কি
আর তাই নিয়ে অত গােলমাল করে ?
বােক্স। না, আমি কিছুতেই রাগ সামলাতে পাচ্ছি না। জান
আমি একটা অসাধারণ কড়া স্বামী ? পত্নীকে অপরের সঙ্গে
প্রেমালাপ করতে দিতে আমি কিছুতেই রাজী হই না! জান তা?
রাক্ষস। বারে ! এত বড় কড়া স্বামী তুমি, তা ত এতদিন
জানতেম না, দাদা! তা যা হােক, কিন্তু বোঁদিদি বেচারার আর
বিশেষ দোষ কি? একে অবলা সরলা কুলবালা, তায় প্রেমে বিহ্বলা,
বােস। সামনে এল ঐ শালা ? কি বল, আঁ?

রূপকথা।
৪৩
রাক্ষস। এই! এই ত দাদা, তবে সবই বুঝেছ। দোষটা
সব ঐ শালার।
বােস। বটে ? তবে দোষটা সব ঐ শালার ?
রাক্ষস। নিশ্চয়, অন্ততঃ আইনে ত তাই বলে।
বােস। সত্যি নাকি ? আইনে কি বলে ভাই ?
রাক্ষস। আইন বলে—এ সব কাজে রমণীর কোন অপরাধ হতে
পারে না। সাজা যা হবে সে ঐ পুরুষ শালাদের।
বােস। বটে বটে, আইন এমন কথা বলে ? তবে ত ভাই,
তােমার বৌদিদিকে এ বিষয়ে কটু কথা বলাটা আমার খুবই বেআইনি
হয়েছে ?
রাক্ষস। দু’শবার বেআইনি। অপরাধ যা কিছু হয়েছে সব
জানবে ঐ শালার ।
বােস। সব ঐ শালার ? তবে দাড়া শালা। আনি একটা
কেঁৎকা, দেখি তুই কেমন হোতা!
( লাঠি আনয়ন ও লাঠি ঘুরাইতে ঘুরাইতে গীত)
বােস।
আরে কে তুই শালা,
(মাের ) ছার কপালে দিলি ঢেলে তেঁতুল গােলা!
রেগে হয়েছি আগুণ,
এখনি করব তরে খুন
বােস ও রাক্ষস। ভেবেছিস মনে কি এ ছেলেখেলা।
বােস। আমার মেজাজটা
জানিস ভারি চটা
বােকস ও রাক্ষস। বাঁচতে যদি চাস তবে শিগগির পালা
( বেটা শিগগির পালা)
বুকুসী। আরে মা-যা-যা-যা-যাঃ, তাের সব আছে'বােঝ,
রেখেদে জারিজুরি মুরদ ভারি, বকিসনে মেলা।
( মিছে ককিসনে মেলা)

৪৪
রূপকথা।
বােস। না, এ আর সহ্য হয় না। ভাই রাক্ষস, তুমি একবার
তােমার বউদিদিকে সামলাও ত। আমি এ ছোঁড়ার মাথাটা কড়মড়
করে চিবিয়ে একঘটি জল খেয়ে ফেলি।
রাজ। দেখ বাপু, আমি বিদেশী। তােমাদের সঙ্গে শুধু শুধু
ঝগড়া কত্তে চাই না। কেন বিনা কারণে আমার সঙ্গে শত্রুতা কচ্চ ?
বােস। বল কি রসিক রতন ! মিষ্টি কথায় প্রাণে যে বরফজল
সিঞ্চন করে দিলে। আমার গৃহিণীর সঙ্গে দিব্য প্রণয়ালাপ ছুটিয়েছেন,
আর অম্লানবদনে বলা হচ্ছে কি না ( মুখ বিকৃত করিয়া) “শুধু শুধু
ঝগড়া কত্তে চাই না”! কোন মুলুকের লােক হে তুমি ?
রাজ। আমি পুনৰ্বার তােমাদের বলছি যে আমি বিপন্ন বিদেশী ।
তােমাদের সঙ্গে শত্রুতা করবার আমার মােটেই ইচ্ছা নাই। আমি
নিজের কাজে এসেছি। কাজ সাঙ্গ হলেই ফিরে যাব।
বােস। ফিরবে আর কোথায় মাণিক ? এই দেশেই ভবলীলা
সাঙ্গ হচ্ছে। ধরত ভাই রাক্ষস, ধরত। বেটাকে ভাগাভাগি করে
চিবুতে আরম্ভ করি। জানিসূনে আমি বােক ?
( রাক্ষস ও বােক্কসের রাজপুত্রকে আক্রমণ )
রাজ। তবে রে বেটা বােক—কস্ ! কিছু বলছি না বলে ? এই
দেখ তােদের যমদ।
(বেঙ্গমার পালক সঞ্চালন)
বােস। ওরে বাবারে, বেটা মন্তর জানেরে। আগুনের হলকা,
আগুনের হলকা।
রাক্ষস। কিছু ভয় নেই দাদা, কিছু ভয় নেই। তুমি সাহস করে
অগ্রসর হও। আমি ঠিক তােমার পিছনে আছি ।
রাজ। তবে ঠাড়া, ঐ পিছনের বেটাকেই আগে ধরছি।

রূপকথা ।
৪৫
।। ।। । ।
।। । । । । । । ।
( রাক্ষসের দিকে পক্ষসঞ্চালন)
রাক্ষস। ওরে বাবারে, মা রে, ছােট মাসীরে ।
[ লম্ফ দিয়া পলায়ন।
বােস। ওরে, আমায় ফেলে কোথায় পালালি রে। ওরে আমায়
ভরসা দিয়ে কোথায় গেলি রে ! দোহাই বাবা বিদেশী, আর পালক
মেরনি বাবা। আমি গুটি গুটি সরছি বাবা। আমার এতদিনের
বুকুসীটিকে নিয়ে যদি সুখী হওত হও বাবা। প্রাণে বেঁচে থাকলে
অমন ঢের বুকুসী জুটবে।
[ পলায়ন।
রাজ। ওহে শােন শােন, যেও না। আমার কথাটাই শােন না।
যাঃ আর কে শােনে !
বুকসী। এই যে ভাই, আমি তােমার কথা শুনব ভাই। কি
বলবে বল না ভাই। আমি যে কাণ পেতে আছি ভাই।
রাজ। (স্বগতঃ ) তাইত, এ আবার এক নূতন বিপদ দেখছি
যে । এবার ত আর পালক নেড়ে কাজ হবে না। কৌশলে উদ্ধার
হতে হবে। আর বিধাতা যদি মনে করেন ত এ হতে আমার
কার্যোদ্ধারও হয়ে যেতে পারে। দেখা যাক কি হয়।
বুকুসী। বলি, ভাবছ কি ভাই ?
রাজ। ভাবছি ? এই ভাবছি তােমার রূপের কথা।
বুন্ধুসী। রূপ ? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, আমার রূপ নিয়েই মিন্সেগুলাে
ম’ল। যে দেখে সেই একেবারে তন্ময় হয়ে যায়। কত লােক
বিবাগী হল, কত লােক জ্যান্তে মরা, আবার কতলােক গলায় দড়ি দেবে
বলে উইল করেছে, তারপর কতলােক কেবল চিঠি লিখে লিখে
পাগল হল—হায়, হায়, শুধু এই রূপখানার জন্যে। বাড়ীতে ভাই

৪৬
রূপকথা।
আমার একটা প্রেমের ডেস্ক আছে, সেটা কেবল ভালবাসার আর
নিরাশ প্রেমের চিঠিতে টৈ টুম্বুল।
রাজ। সে আর আশ্চৰ্য্য কি ভাই। আমি ত পাঁচমিনিট ও রূপ
দেখতে না দেখতেই অজ্ঞান হবার মত হয়েছিলুম। এখনাে দেখনা,
বুকটা ধড়াস ধড়াস কচ্চে ।
বুকুসী। তবে চল ভাই, তােমায় নিয়ে একটু আকাশে উড়ে
আসি। নানা গােলমালে মনটা বড় বিগড়ে গেছে। চল। একটু
হাওয়ায় গা ভাসান দিয়ে প্রাণটাকে চুমরে নিই।
রাজ। উড়ব বৈ কি ভাই, ওড়বার জন্যেইত এসেছি।
একটু সবুর করে। অনেক পথশ্রম করে এলেম, একটু ক্ষুধাতৃষ্ণা দূর
তােমার সঙ্গে প্রাণভরে দুটো ভালমন্দ কথা কই। তারপর
ওড়া যাবে।
বুকুসী। ক্ষুধাতৃষ্ণা ? আহা, এ কথা এতক্ষণ বলনি ভাই। ঐ
দিকে আমার সঙ্গে এস। প্রচুর আহারের আয়ােজন আছে। আমিও
অমনি একটু কিছু মুখে দিই গে। আমার আবার ভাই, পেটটা ভরা
না থাকলে প্রেমটা ভাল আসে না। চল, চল।
[ উভয়ের প্রস্থান।
করি।

রূপকথা।
৪৭
দ্বিতীয় দৃশ্য :
রাক্ষসপুরীর রাজপথ।
“ক্যানিবল হােটেল”
( ম্যানেজার ও ওয়েটার-বয়গণের প্রবেশ ও গীত)
বড়িয়া টিফিন বাবু, বড়িয়া টিফিন
চিখনেসে দেলথােস মাগাে ফিন।
ফরাসী মুলুকা বেঙকা কাবাব,
বৰ্মাকা নাপ্পি যে পেয়ারে নবাব,
(ঔর) আরসােলাকা মােরা ভেজা হয় চীন।
শিরক মগজসে পুডিং পিঠা,
গিরগিটিসে বনায়া চাটনী মিঠা
হাতীকা রােষ্ট, খয়েড ঘােড়কা ডিম।
ওমদা বনা, বহুত তােফা খানা,
রূপিয়ামে হট ডিস শকড় কিসিন্।
( বুন্ধুসী ও রাজপুত্রের প্রবেশ )
ম্যানেজার। আইয়ে বুকুসী বিবি, আইয়ে। খবর আচ্ছা ত ?
বুকুসী। ওহে, আমাদের জন্যে একটা আলাদা ঘরে টেবল পাত
দেখি। আর ভাল ডিস্ কি কি তৈরি আছে তার একটা ফর্দ দাও।
ম্যানেজার। সবই ভাল ডিস্, সবই উৎকৃষ্ট মাল মসলা। আর
আর সমস্ত জিনিষ বিশুদ্ধ সাপের চৰ্বিতে রান্না।
বুকুসী। তবু কি কি রেডি আছে শুনি।
ম্যানেজার। আপনি যা যা ভালবাসেন সবই আছে।

৪৮
রূপকথা :
খুকির ডালনা, ভাদ্ৰবউ ভাজা, শাশুড়ি সড়সড়ি। তা ছাড়া ঠাকুর
মশায়ের এমন উপাদেয় গুড় অম্বল তয়ের হয়েছে যে মুখে দিলে আর
ভুলতে পারবেন না।
বুকুসী। তা বেশ বেশ। তা হলে একটু বেশী করে সাজিয়ে
রেখে দাও। সঙ্গে একটি ফ্রেণ্ড আছে দেখছ ত।
ম্যানেজার। তাই ত, এ ফ্রেণ্ডটি আবার কবে কেড়েছেন।
দিব্যি গােলগাল মােলায়েম চেহারাটি ত। গালদুটিতে অতি পরিপাটি
কাটলেট তৈরি হয়।
বুকুসী। খবরদার, ও সব লােভ দেখিও না। প্রেমের খাতিরে
অনেক সহ্য করে সামলে আছি । ও সব কথা বলে মন খারাপ করে
দিওনা,—খবরদার !
ম্যানেজার। না না, তা নয়। তবে আপনার ত দস্তুর আছে।
যে সময় সময় কিছুদিন ধরে প্রেম করেন, আবার শেষে প্রেমিকের
মুণ্ডটি পেটে পােরেন, তাই বলছি।
বুকুসী। আরে যাও যাও, বেশী বকো না। ভিতরে গিয়ে
জিনিষ পত্র গুলো গরম করােগে। আমরা আধঘণ্টার মধ্যে সব
তৈরি চাই।
ঐ শাশুড়ি-সড়সড়িটা একটু বেশী
একটু বেশী করে রেখে।।
ম্যানেজার। যে আজ্ঞে, যে আজ্ঞে ।
( ম্যানেজার ও ওয়েটারগণের ভিতরে গমন)
বুন্ধুসী। তা হলে ভাই, এখন কি করা যায় বল দেখি?
রাজ। আর ভাই, আমার ত বড় ভাবনা হল। ঐ ত শুনলেম ।
যে কিছুদিন প্রেম করে তােমরা আবার পেটে পাের। তা হলে ত
বড় ভয়ের কথা'।
বুকুসী। আরে না না। সে ভয় আপাততঃ নেই। কিন্তু ভাই

রূপকথা। ৪৯ তুমি যদি যথার্থ প্রেমিক হও, তাহলে কি প্রণয়িনীর পেটে গিয়ে তার শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে যেতে একান্ত গররাজীই হবে। চুম্বন থেকে চৰ্বন, তারপর গলাধঃকরণ,—কেমন সুখের বল দেখি? রাজ। কি জান ভাই, প্রণয় জিনিষটা আমার এখনও তেমন চর্চা করা ঘটে ওঠে নি। হয়ত প্রেমশাস্ত্রটা ভালরকম আয়ত্ত হলে, মনের ভাবটা ঐ প্রকারই হয়ে দঁাড়াতে পারে। কিন্তু যতদিন সেটা না হয়, ততদিন প্রণয়িনীরই হ’ক, কি অপর কারােরই হক, পেটের ভিতর গিয়ে হজম হতে একটু একটু মন কেমন করবে বৈ কি। বুকুসী। তাইত, তাহলে তােমায় দিনকতক ভালকরে প্রেমের মহল দিতে হবে। রাজ। তাঁতে বেশীদিন লাগবে না। তােমার সঙ্গে এই আধঘণ্টা একত্রে থেকেই যতটা এগিয়েছি, তাতে বােধ হয় মাসখানেক তােমার পিছু পিছু ঘুরলেই প্ৰেমশাস্ত্রে আমি একটা রায়চঁাদ প্রেমাদ হয়ে পড়ব। তবে ভাই, তদ্দিন টিকব কি ? বুন্ধুসী। সত্যি কথা যদি বলতে হয় ভাই, সে বিষয়টাতে আমারও কিছু সমস্যা আছে। মন না মতি, খেয়াল কখন কি হয় কে বলতে পারে ? আমার ভাই সাদা কথা। রাজ। তা হলে প্রেম করতে করতে হয়ত অন্যমনস্কে গাল থেকে কি পিঠ থেকে এক আধ গরাস মুখে পুরতেও পার ? বুকূসী। না ভাই, তােমার উপর আমার এখন যে রকম মন পড়েছে, তােমাকে এখন অনেক দিন রেখে রেখে খাব। আপাততঃ তােমার কোনও ভয় নেই। আর যদি ই বা খানিকটা খেয়েই ফেলি, তাহলেও আমাদের এখানে এমন জিনিষ আছে যাতে তােমায় আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারি। ( জিব কাটিয়া) না না, এসব আমি কি বলছি। ৪

রূপকথা।
* ৫। • ** , =
রাজ। বলনা ভাই, বলনা ভাই, কি জিনিষ আছে। (স্বগতঃ )
হা ভগবান! বুঝি এইবার মুখ তুলে চাইলে ।
কথাটা যেমন করে
হ’ক বের করে নিতেই হবে। (প্রকাশ্যে ) বলবে না ভাই, কি
জিনিষ ? এই তােমার ভালবাসা ?
বুকুসী। না ভাই, মাপ কর। সে জিনিষের কথা আমাদের
বিদেশী লােকের কাছে বলবার যাে নেই। হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে
পড়েছিল।
রাজ। ভাই, আমি কি এখনও বিদেশী আছি ? প্রথম দর্শনেই
তােমায় এতটা ভাল বাসলেম, আর তুমি আমায় এখনও পর মনে
কচ্ছ ? তবে কাজ নেই আর প্রেমে। এই আমার মাথাটা তােমার
মুখের ভিতর দিচ্ছি, তুমি মনের সাথে চিবুতে আরম্ভ কর।
বুকুসী। আহা, রাগ কর কেন ভাই ? বলবার কথা হলে কি
আর তােমায় বলতম না ?
রাজ। আমি কি আর কাকেও বলতে যাচ্ছি ? তবে কথাটা
শুনলে মনে একটা ভরসা থাকত, যে যদিই কখনও তােমার ক্ষিধের
সময় আমায় দিয়ে তােমার পেট ভরাবার দরকার হয়, তবে আবার
বেঁচে তােমার মুখ দেখতে পাব। তা যদি সে ভরসা টুকু
দিতেও তােমার আপত্তি থাকে, তবে আর প্রাণে কি করে সুখ
আসবে ভাই ?
বুকুসী। আচ্ছ। বেশ ভাই, তােমায় বলছি।
কিন্তু খবরদার,
কারও কাছে প্রকাশ করাে না। ঐ যে দেখছ সামনে একটা পাহাড়,
ওর তলায় একটা সােনার দরজা আছে। সেই দরজায় এক নিশ্বেসে
সাতবার ঘা দিলেই দরজা আপনিই খুলে যায় । ভিতরে রাজপুরী,
সেখানে আমাদের রাণী বাস করেন। রাজপুরীর ভিতরে একটি
।

রূপকথা।
সােনার কাঠি আর একটি রূপাের কাঠি আছে। রূপপার কাঠি
ছোঁয়ালে লােক মরে যায়, আর সােনার কাঠি ছোঁয়ালে মরা
লােক বাঁচে। এমন কি, মরা লােকের মুণ্ডটা পেলেও তার থেকে
লােক পুনর্জীবিত হয়।
রাজ। (স্বগতঃ ) ভগবান, এতদিনে বুঝি করুণা বর্ষণ
করলে। এখন শেষ রক্ষা হইলেই মঙ্গল। (প্রকাশ্যে ) যা হােক
ভাই, ভাগ্‌গিস কথা গুলো বলে দিলে, তাইতে ভরসা পেলেম।
এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এল। এইবার ধীরে সুস্থে নির্ভয়ে প্রেম
করতে পারব।
বুকুসী। তা হলে ভাই, তুমি একটু এখানে সবুর কর। খানা
টানা সব প্রস্তুত হয়ে এল—অর্থাৎ খানাটা এইখানেই হবে, তবে
সেই সঙ্গে একটু টানার বন্দোবস্ত হলে আমার সুবিধা হয় না।
আমি একটু চটকরে একপিপে বুল হুইস্কির যােগাড় দেখি । এদের
হােটেলে আবার আবকারীর লাইসেন্স নেই। আমার বেশী দেরী
হবে না, আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরছি।
[ প্রস্থান।
রাজ। আর কি! এই সুযােগে এইবার চম্পট দেওয়া যাক।
ঐ ত পাহাড় দেখা যাচ্চে, দেখি অদৃষ্টে কি আছে। জয় দুর্গা !
[ দ্রুত প্রস্থান।

৫২ রূপকথা । তৃতায় দৃশ্য । রাক্ষস রাজপুরী। কক্ষ-মধ্যে রাজকন্যা শায়িতা । ( রাজপুত্রের প্রবেশ ) রাজপুত্র। নীরব জনশূন্যপুবী। মক্ষিকার পক্ষশব্দ মাত্রও নাই। কি গভীর নিস্তব্ধতা! বৃহৎ বৃহৎ খালি ঘরগুলো যেন হা করে গিলতে আসছে। (পরিক্রমণ ) কই কোথাও কাউকে ত দেখতে পাচ্ছি না। একটা রাক্ষস প্রহরী পর্যন্ত নেই। আজ এই অমাবস্যার ঘাের অন্ধকার রাত্রিতে বােধ হয় সমস্ত নিশাচর নিশাচরীই অহার অন্বেষণে বেরিয়েছে। যা হােক, আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধিব পক্ষে নির্জনতাই সুবিধা। (পরিক্রমণ ) একি! পালঙ্কোপরি শায়িতা এ অপূৰ্ব্ব রমণীমূৰ্ত্তি কার? নিদ্রিতা না মৃত? কই, নিশ্বাস প্রশ্বাস বইছে বলে ত অনুমান হচ্ছে না। আহা, এমন কমনীয়া কুসুম- কিঞ্জলকসমা বালিকা কি অকালে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হয়েছে ? হায় হায়, তরুতল বিস্তৃত বৃন্তচুত সেফালিরাশির ন্যায় শুভ্রকান্তি দেহলতিকা যেন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে আছে। প্রাণশূন্যাই ত বটে! মাথার শিয়রে এ দুটি কি ? এই কি সেই বুকুসী কথিত সােণার কাঠি রূপার কাঠি ? এই কি আমার অভীষ্ট বস্তু ? জয় ভগবান, তবে বুঝি আবার বন্ধুদের মুখ দেখতে পার। আপাততঃ এই সােণার কাঠি নিয়ে এই রমণীর দেহস্পৰ্শ করি, দেখি কি ফল হয়। (সােণার কাঠির দ্বারা রাজকন্যাকে স্পর্শ ) রাজকন্যা! ( চক্ষু মুছিতে মুছিতে) একি, কে ঘুম ভাঙ্গালে ? কোথায় আয়ী বুড়ী ? না, এখনও ত প্রভাত হয় নি। আজ এরি

রূপকথা।
মধ্যে কি সবাই চরে ফিরল? একি, তুমি কে? তুমি ত রাক্ষস নও।
কি সুন্দর রমণীয় মুক্তি ! তুমি কি কোন দেবতা ?
রাজপুত্র। না সুন্দরী, আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমায় দাসমাত্র
বিবেচনা করাে।
রাজকন্যা। তুমি মানুষ ? আঁ, মানুষ এত সুন্দর হয় ? কে তুমি,
কোথা থেকে এলে ? আমাকে অসময়ে জাগিয়ে সুষুপ্তির কোল থেকে
টেনে এনে, সহসা চোখের সম্মুখে সুখস্বপ্নের মত কি এক অপূৰ্ব্বদৃষ্ট
মনােরম ছবি ধরে দিলে ।
গীত।
( আমি) আপনা হারায়ে আছি ডুবিয়ে
স্বপন সায়র তলে।
অগাধ গভীর
তা আবেশে
গেছি সকলি ভুলে।
(ওগাে ঘুমঘরে সব ভুলে যে ছি)
সহসা টুটিল
স্বপনের ধাের।
কার আবাহন গানে।
পােহাতে নিশি
কে বাজাৰে বাণী
কি নব আকুল তানে।
(ওগাে) আসি অসময়ে বসিয়ে শিয়রে
ঘুমটি ভাঙ্গালে কে ?
( ওহে সুরূপ সুজন রমণীমােহন ঘুমটি ভাঙ্গালে কে ?)
কোন দেশ হতে কিবা সুর আনি
পরাণে ঢালিলে হে।

৫৪
রূপকথা।
করি পথভূল
(তুমি) কোন গগনের শশী।
কারে বিলাইতে
ভূতলে পড়েছ খন্সি।
রাজপু। (আমি) জীবন তরণী বাহিয়া
চলেছিনু গান গাহিয়া,
নাহি হেরি কুল,
দিশাহারা মত ভাসিয়া।
( মাের তরণী বঁধিতে কেহ না ছিল।)
( সখি ) আজি কোন শুভলগনে,
কিবা অনুকূল পবনে,
( মাের ) সাধের তরণী লাগিল কিনারে,
(তব) চরণ প্রান্তে আসিয়া।
রাজকন্যা। শীঘ্র পরিচয় দাও কে তুমি? কোথা হতে এলে ?
কেন এলে ?
রাজপুত্র। আমার পরিচয় আর অধিক কি দিব ? আমি অবন্তী
দেশের রাজপুত্র। তিন বন্ধুর সঙ্গে দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছিলুম, পথে
তিন জনই সর্প কর্তৃক বিনষ্ট হয়েছে। আমি তাদের পুনর্জীবিত
করবার চেষ্টায় বেঙ্গমা বেঙ্গমী নামক দুটি দেবধর্মী পক্ষীর সাহায্যে
এই দেশে এসেছি। তারপর নানাপ্রকার কথা অবগত হয়ে এখানে
এলেম। কিন্তু তুমি কে সুন্দরী,, এমন দিব্যকান্তি অমরা-দুর্লভ
রূপরাশি নিয়ে এই ভয়াবহ রাক্ষসপুরীতে মৃতপ্রায় শায়িত ছিলে ?
দয়া করে কি তােমার পরিচয় দেবে না ?
রাজকন্যা। আমার পরিচয় আমি নিজেই খুব অল্প জানি। পূর্বে
এই দেশ মানুষের অধিকারে ছিল, এবং আমার পিতা এখানকার

রূপকথা। রাজা ছিলেন। আমার শৈশবাবস্থায় এই রাজ্য রাক্ষসদল কর্তৃক আক্রান্ত হয়। রাক্ষসেরা রাজ্যের সমস্ত লােককে, এমন কি আমার পিতাকেও সপরিবারে মেরে ফেলে। কেবল আমাকে রাক্ষসরাণী পুষবে বলে রেখে দেয়। তাও কবে খেয়ে ফেলে ঠিক নেই। রাজপুত্র। সে কি, মায়া করে পুষেছে, তবে আবার খেয়ে ফেলবার ভয় কেন? রাজকন্যা। রাক্ষসদের শরীরে কি আর দয়া মায়া আছে ? সখ করে পুষেছে, যেদিন সখ ফুরুবে সেই দিনই বিনাশ করবে। আমি রাক্ষসী রাণীকে আয়ী বলি, সে আমাকে নাতিনী বলে, এতদিন ধরে পুষেছে, তবুও সময় সময় লােভে পড়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে খানিকটা খেয়ে ফেলে, আবার সােণার কাঠি দিয়ে বাঁচায়। রাজপুত্র। এখন কি সবাই চরতে গেছে ? রাজকন্যা। হাঁ, সন্ধ্যা হলেই আমাকে রূপার কাঠি ছুইয়ে মেরে রেখে যায়, আবার সমস্ত রাত্রি চরে সকালে ফিরে এসে সােণার কাঠি ছুইয়ে আমায় বাঁচায় । রাজপুত্র। দেখ রাজকন্যা, তােমার কাছে আমি মিথ্যা কথা বলতে পারব না, আমি ঐ সােণার কাঠিই নিয়ে যেতে এসেছি। কিন্তু তা হলে ত তােমাকেও ফেলে যেতে পারি না। সাহস করে বলতে ভরসা হচ্ছে না, কিন্তু যদি তুমি দয়া করে এ হতভাগ্যের সঙ্গে চল, তবে তােমার সেই অনুগ্রহের জন্য আজীবন কৃতজ্ঞতার পুস্পাঞ্জলি দিয়ে তােমায় পূজা করব। রাজকন্যা। তােমাদের দেশে কি এই রকম করেই কথা কয় ? আমারই তুমি প্রাণ রক্ষা করতে যাচ্ছ আর আমাকেই কৃতজ্ঞতা দেখাবে বলছ ?

রূপকথা। রাজপুত্র। তুমি সে কথা বুঝতে পারবে না। তােমাকে একবার চোখে দেখার যা সুখ, মুহুর্তেকের জন্য তােমার সঙ্গে বাস করার যে আনন্দ, তার পক্ষে জীবন বিসর্জনও তুচ্ছ কথা। কৃতজ্ঞতা আমারই দেয়,-তােমার নয়। রাজকন্যা। আমি তােমার মত কথা কইতে জানি না, সুতরাং আর বৈণী কি বলব। কিন্তু প্রাণদাতাকে যদি দেবতার মত জ্ঞান করা উচিত হয়, তবে আজীবন তুমি আমার হৃদয়ের দেবতাই থাকবে। কিন্তু হায়, তােমাকে দেখবার সুখের আশা দুরাশা মাত্র। তুমি এখান থেকে আমায় নিয়ে যেতে পারবে না। রাজপুত্র। কেন পারব না ? আমি ত বেঙ্গমার পালকের বলে। সমস্ত রাক্ষসকেই পরাজয় করতে পারি। রাজকন্যা। বেঙ্গমার পালকটি তােমার কাছে যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ কোন রাক্ষস তােমার অনিষ্ট করতে পারবে না। কিন্তু একটি পালকে একাধিক লােক নিরাপদ হতে পারে না। আমি তােমার সঙ্গে যাবায় চেষ্টা করলে, যদিও রাক্ষসেরা তােমার কোন ক্ষতি করতে, পারবে না বটে, কিন্তু আমাকেও তুমি তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। রাজপুত্র। তবে ত আমার কর্তব্য সম্মুখেই পড়ে রয়েছে। তুমি এই পালকটি নিয়ে নির্ভয়ে সমুদ্রতীরে যাও। সেখানে পালকের একটা অংশ পােড়ালেই বেঙ্গমা পাখীর আবির্ভাব হবে। তুমি তাকে আমার প্রণাম জানিয়ে, তােমাকে আমার বন্ধুদের কাছে নিয়ে যেতে বলল। তারপর সােনার কাঠির সাহায্যে তাদের পুনর্জীবিত করে, তুমি তাদের সঙ্গে দেশে যেও। আর একটি ভিক্ষা—আমার বন্ধু মন্ত্রীপুত্ৰ সৰ্বগুণবান সুরূপ ও সুপ্রেমিক। তুমি তাকে বিবাহ করে সুখী হইয়ে রূপকথা । রাজকন্যা। আর তুমি ? রাজপুত্র। আমার জন্য চিন্তা করাে না। আমি ক্ষত্রিয় সন্তান, এই লৌহদণ্ডসদৃশ সবল বাহুদ্বয়ের সাহায্যে আমি আত্মরক্ষা করব। যদি অপারক হই, তাতেও কোন ক্ষতি নাই। ক্ষত্রিয় সন্তান মরণে দৃকপাত করে না। রাজকন্যা। ছি ছি ছি রাজপুত্র, আমি রাক্ষসদিগের দ্বারা লালিত হয়েছি বলে কি আমাকে রাক্ষসীই মনে করলে ? কি করে এ নিষ্ঠুর অনুরােধ আমায় করতে পারলে? আমার এই অতি তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর রমণীর প্রাণের জন্য তােমার ঐ দেবতুল্য অমূল্য জীবন বিসর্জন দেবে ? ছি ছি ছি ! মরতে কি শুধু ক্ষত্রিয় সন্তানই জানে, রমণী জানে না ? নারীকে কি এতই হীন মনে কর ? রাজপুত্র। না না, নারীকে আমি কখনই হীম মনে করি না। কিন্তু দেখ, সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে, বিপন্ন। রমণীর জন্য আত্মদান করতে পুরুষজাতির একটা আজন্ম অধিকার আছে। তুমি সে অধিকার থেকে আমাকে কেন বঞ্চিত করতে চাও রাজকন্যা ? রাজকন্যা। তবে এস আর তর্কে কাজ নেই। হয় দুজনেই রক্ষা পাবার চেষ্টা করি, নয় দুজনেই একসঙ্গে মরি। রাজপুত্র। বেশ তাই ভাল। বিধাতা যখন সাতসমুদ্র তের নদীর পার থেকে আমায় ঘটনাচক্রে ফেলে তােমার কাছে এনে উপস্থিত করেছেন, তখন আমাদের পরস্পরের জীবনসূত্রে এমনই গ্রন্থি লাগুক যেন তাহা অনন্তকালেও বিচ্ছিন্ন না হয়ে এস রাজকন্যা, এই লও আমার অঙ্করী! 'এল দুজনে ধৰ্ম্মসাক্ষ্য করে প্রতিজ্ঞা করি যে আজ থেকে আমরা অন্ধহীন সংসারস্রোতে একসঙ্গে ভেসে যাব, জীবনে মরণে বিচ্ছিন্ন হব না।

রূপকথা। রাজকন্যা। বেশ, আজ এই জীবনের প্রান্তভাগে এসে, মরণের দ্বারে দাঁড়িয়ে, লজ্জা সরম ভাসিয়ে দিয়ে মুক্তকণ্ঠে ধৰ্ম্মসাক্ষ্য করে প্রতিজ্ঞা করলেম যে আমাদের পরস্পরের অদৃষ্ট আজ থেকে একই সূত্রে গাঁথা হল। রাজপুত্র, এই নাও বরমাল্য। চল এইবার হাত ধরাধরি করে মরণের পথে অগ্রসর হই। রাজপুত্র। আচ্ছা, মরণ ত আছেই। তাকে ত আর সাধ্য- সাধনা করে ডেকে আনতে হবে না। তার আগে একবার আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? দেখিনা ক্ষত্রিয় বাহুর বল কত ? রাজকন্যা। এখন সমুদায় রাক্ষসকুল নিৰ্ম্মল না করতে পারলে, আত্মরক্ষার আর অন্য উপায় নাই। কিন্তু সে ত একরূপ অসম্ভব। তুমি একক কত লােকের সঙ্গে যুদ্ধ করবে ? তবে শুনেছি রাক্ষসদের মৃত্যুরহস্য কোথায় একটা লুকায়িত আছে। সে কথা রাক্ষসী রাণী ভিন্ন অপর কেহ জানে না। আবার সে রহস্য জানতে পারলেও সে মত কাৰ্য করা মনুষের সাধ্যায়ত্ত নয়। রাজপুত্র। আচ্ছা তুমি যদি কোনও কৌশলে সে রহস্য জেনে নিতে পার, তবে মনুষের সাধ্যায় কি না সে চেষ্টা দেখব। তুমি আজই সেটা জানবার চেষ্টা কর। মনে রেখ আমাদের উভয়ের জীবনমরণ তার উপর নির্ভর করছে। (নেপথ্যে কোলাহল ) রাজকন্যা। ঐ যে গােলমাল শােনা যাচ্চে। রাক্ষসেরা ঘরে ফিরে আসছে। রাত্রিও প্রায় প্রভাত হল। তুমি শীঘ্র এই পাশের ছােট ঘরের মধ্যে লুকোও। মানুষের আহারীয় যথেষ্ট খাবার সামগ্রী আছে। তুমি ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর কর। একটু পরে রাক্ষসী রাণী সমুদ্রে স্নান করতে যাবে। 'তখন আবার দেখা হবে। আমায় রূপার কাঠি দিয়ে মেরে রেখে যা।

রূপকথা। রাজপুত্র। বেশ আমি পাশের ঘরে লুকুচ্চি। তুমি কথাটা বের করে নেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করাে। [ রাজকন্যাকে রূপার কাঠি ছোঁয়াইয়া প্রস্থান। ( রাক্ষসীরাণীর প্রবেশ) রা রা। হাউ মাউ ঘঁউ, মনিস্থির গন্ধ পাঁউ, হাউ মাউ খাউ মনিষির গন্ধ পাই। কোথা থেকে মানষের গন্ধ পাওয়া যায় রে ? ওলল নাতনী, ওঠ ওঠ ( রাজকন্যাকে সােনার কাঠি স্পর্শ) কোথা থেকে টাটকা মানুষের গন্ধ আসছে রে ? রাজকন্যা। মানুষের গন্ধ আর কোথা থেকে পাওয়া যাবে ? মানুষের মধ্যে ত এক আমিই আছি। আমাকেই না হয় খাও। রা-রা। আহা বালাই ! তােকে খাব কেন নাতনী ? তাের শত্রুকে খাই। রাজকন্যা। তা মাঝে মাঝে ত লােভ সামলাতে না পেরে খানিকটা করে খেয়ে ফেল। তার চেয়ে না হয় একেবারেই সব আলা চুকিয়ে দাও। রা-রা। আরে না না নাতনী, ওসব কথা বলিস নি। সেদিন কি হয়েছিল জানিস ? আমি শরীর অসুখের জন্যে চরতে যেতে পারি নি। তােকে ঘুম পাড়িয়ে সমস্ত রাত অনাহারে বাড়ী বসেছিলুম। তা সকালবেলা কতকগুলাে শুটকো দড়া দড়া উড়ের মাংস এনে হাজির করলে। সে কিছুতেই অসুখ শরীরে মুখে দিতে পারলুম না। তাই বন, পেটের জ্বালায় তাের ডানহাতটা খেয়ে ফেলেছিলুম। তা আবার ত সােনার কাঠি ঘসে সব ঠিক করে দিলুম। তাের উপর আমার কত মায়া জানিস ত। রাজকন্যা। আচ্ছা আয়ী, তুমি না হয় আমায় মায়া কর। আমায়

রূপকথা।
৬০
যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছ। কিন্তু যখন তুমি মরে যাবে তখন আমার
কি দশা হবে ? আমায় ত এরা দেখবে আর খেয়ে ফেলবে।
রা-রা। আরে সে ভয় নেই, সে ভয় নেই। আমাদের কি আর
মরণ আছে রে বােন ?
রাজকন্যা। সে কি, এই ত কত রাক্ষস মরে গেছে শুনেছি।
মােরও এক এক দিন কত অসুখ করে।
রা-রা। আরে অসুখই করুক আর যাই করুক আমরা শীঘ্র মরি
না। আমাদের মরণ কিসে হয় তা কেউ জানেও না, আর না জানলে
আমাদের মরবার কোন প্রশ্নও নেই।
রাজকন্যা। না, এ কথাত আমার মােটেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
মরবার নাকি আবার কোন নিয়ম আছে।
রা-রা। দূর পাগল মেয়ে, আমি কি তােকে মিছে কথা বলছি।
কাউকে যে সে কথা বলবার নয়, নইলে তােকে বলতুম, আর তুই
বুঝতে পারতিস যে আমাদের মার কত শক্ত।
রাজকস্যা। ৰে শ ত আমায় বুঝিয়েই দাও না। আমি জানলেই
কি তােমাদের মারতে পারব ? আসল কথাটা এই যে ও সব তােমার
মিছে গল্প, আমায় কেবল ভােলাচ্চ।
রা-র। মিছে গল্প ? তবে শুনবি, বলব ? আর তােকে বলতে
ক্ষতিই বা কি? তুই জানলেও সে কাজ করবার তাের ক্ষমতা নেই।
ওসব আর বাজে কথা শুনে কি করব ? তবে বলতে
হয় বলে যাও। কাণ আছে, শুনে যাই।
কান্ধা। দেখ ঐ যে খিড়কির বাগানের পশ্চিম কোনে একটা
পুকুর আছে, তার মধ্যিখানে একটা থাম আছে। সেই থামের ভেতর
একটা কৌটার মধ্যে-না না এসব কথা বলা ঠিক নয়।

রূপকথা।
রাজকন্যা। বেশ বলাে না। আর বলবেই বা কি ! সমস্তই
বাজে কথা তা কি আর আমি বুঝতে পারছি না।
রা-রা। বাজে কথা ? তবে শােন্, সেই কৌটার মধ্যে এক জোড়া
ভােমরা আছে। যদি কেউ এক ডুবে সেই পুকুরের মধ্যে গিয়ে
থামটা ভেঙ্গে, সেই কৌটা তুলে আনতে পারে, আর তুলে এনে ভােমরা
দুটকে এক কোপে এমন করে মারতে পারে যে তাদের এক ফোটা
রক্তও ভূয়ে পড়বে না, তা হলে আমরা সবাই একেবারে - নির্জীব হয়ে
পড়ব। অর্থাৎ একেবারে মরে যাব না, কিন্তু এমন শক্তিহীন হয়ে
পডব যে একটা তুচ্ছ লােকও একলা সমস্ত রাক্ষসকুল নির্মুল করে
যেতে পারবে।
রাজকন্যা। ও বাবা, এর ভেতর এত কথা আছে তা জানতুম
না। এখন একটু একটু বিশ্বাস হচ্ছে বটে।
রা-রা। আচ্ছা তা হলে তুই নিশ্চিন্ত হয়ে বস। আমি চট করে
সমুদ্রে নেযে আসি।
[ রাক্ষসীর প্রস্থান।
রাজকন্যা। ওগাে শীঘ্র রেলরাও। রাক্ষসী গেছে।
( রাজপুত্রের পুনঃপ্রবেশ)
রাজপুত্র । শুনেছি শুনেছি সব শুনেছি ! এখনি পুকুরে ডুব দিতে
চল্লেম। ছাইয়ের উপর রেখে ভােমরা মারব। তা হলে আর রক্ত
ভূযে পড়বে না। যাই তবে রাজকন্যা।
[ বেগে প্রস্থান। রাজকন্যার অপর দিক দিয়া প্রস্থান ।
রাক্ষসীগণের প্রবেশ ।
গীত।
হাই মাই খই হই মাই খাই মনিষির গন্ধ পা
মােদের) খেয়ে উদর ভরেনাক যায়না ক্ষিধুে কি বালাই।

৬২
রূপকথা।
রেতের বেলা ওৎটি পেতে খুজি গাে শিকার,
বুড়াে যুবাে সাদা কালাে দোচোখাে সংহার,
(তবে ) কচি মাথা পেলে পরে মনের সাথে চুষে খাই।
মােদের ফুৰ্ত্তিভরা প্রাণ,
নাইক চিন্তা নাইক আল সদাই লবেজান,
সারানিশি নাচি কুদি দিন দুপুরে নাক ডাকাই।
১ম রাক্ষসী। একি মাথাটা ঘুরচে কেন ? মহুয়াটা কি একটু
বেশী খাওয়া হয়েছে ?
২য়া রাক্ষসী। ওগাে, আমারও যে মাথা ঘােরে ! আমি ত নেশা
করিনি। তবে এক বেটা কোকেন-খােরের মাংস খেয়েছিলুম বটে।
৩য়া রাক্ষ। না, না, এযে হাত পা কাপে। বুক দুরদুর, মাথা
বন বন। ভুমিকম্প হচ্ছে নাকি ?
অন্যান্য রাক্ষস। একি হল একি হল। প্রাণ কেমন কচ্ছে, বুক
ফেটে যাচ্ছে।
ওরে কি হল রে।
[ কোলাহল করিতে করিতে প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
সমুদ্রতীর।
( রাজপুত্র ও রাজকন্যা )
রাজপুত্র।. এস রাজকন্যা, শীঘ্র চলে এস। আজ তােমার দয়াতেই
কার্যোদ্ধার হয়েছে। সমস্ত রাক্ষসকুল এমন শক্তিহীন হয়ে পড়েছে
যে এখন একজন সামান্য বালকেও তাদের বিনষ্ট করে যেতে পারে।

রূপকথা ।
-
রাজকন্যা। আহা, থাক থাক। প্রাণে আর মেরে কাজ নেই।
যদিও এরা আমার পিতাকে মেরে তার রাজ্যধ্বংস করেছে, তথাপি
রাক্ষসীবুড়ীর কাছ থেকে আমি অনেক আদর পেয়েছি।
রাজপুত্র। বেশ তাহলে এদের প্রাণে আর হত্যা করব না।
তবে সবাই এখন নির্জীব হয়ে পয়েছে যে শীঘ্র আর তার মনুষ্য
জাতির অনিষ্ট করতে পারবে না।
রাজকন্যা। তা হলেই হল। আহা, প্রাণে প্রাণে সবাই বেঁচে
থাক।
( রাক্ষসী রাণীর প্রবেশ )
।
।
রা-রা। কি লাে নাতনী, কথা দিয়ে কথা নিলি, জন্মের মতন
মেরে গেলি, বাপকে মারার শােধ দিলি। এইবার সবার প্রাণ তাের
হাতে। বল্ , এখন আমাদের মারবি না রাখবি ?
রাজকন্যা। না, না, আয়ী বুড়ী, তােমাকে কি মারতে পারি ?
তােমার যত্ন আমি কখনই ভুলব না। এখন মন খুলে বিদায় দাও আর
তােমার নাতজামাইকে আশীৰ্বাদ কর।
রা-রা। আঁ, এই আমার নাতজামাই। আহা কি রূপ! কি রূপ!
ঘরের কোণে বসে বসে কোথায় পেলি লাে এমন নাত জামাই ?
রাজকন্যা। এই আয়ীমা, তােমার উদ্দেশ্যেই এদিকে এয়েছিল।
আমি হঠাৎ কুড়িয়ে পেয়ে আঁচলে বেঁধে নিয়েছি।
রা-রা। আহা, রাখ, রাখ । যত্নকরে আঁচলে গিরে দিয়ে
বেঁধে রাখ। আর কি বলব, চললিই যখন, তখন আশীৰ্বাদ করি
দুজনে সুখে থাক্। আয় রে সব রাক্ষস রাক্ষসীরা, আমার নাতনী
আর নাতজামাইকে আশীর্বাদ করে যা।

৬৪ রূপকথা। ( রাক্ষস, বােস, রাক্ষসী, বুন্ধুসী ইত্যাদির প্রবেশ ) ও রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে অভিবাদন। বােস। ওরে বাবা, এ সেই শালা না! রাক্ষস ভাই, রাক্ষস ভাই, দেখ দেখ, শালা রাজকন্যাটিকেও দিব্যি হাতিয়েছে। উঃ শালা যেন প্রেমের বাজবৌরী রে! মেয়েমানুষ দেখেছে কি ছোঁ মেরেছে। রা-রা। সেকি বোস দাদা, তুমি একে চেন না কি ? বােস। বেজায় চিনি দিদি, বেজায় চিনি। হাড়ে হাড়ে চিনি, শিরায় শিরায় চিনি, মজ্জায় মজ্জায় চিনি। রা-রা। কেন কেন, হয়েছে কি ? ইনি কি তােমার কোন অনিষ্ট করেছেন ? বােস। কিছু না কিছু না। অনিষ্ট কি ইনি কারো কৰ্ত্তে পারেন? কেবল রাক্ষসজাতিকে করুণার স্রোতে ভাসিয়ে দেবার ঙ্গেই অনুগ্রহ করে এই দ্বীপে এসেছেন। সবাইকেই ত একরকম জন্মের মত মেরে গেলেন। আর আমার যা উপকার করেছেন- ওগাে বাবাগাে! সে যে বলতে চোখ ফেটে জল আসে গাে ! রাজপুত্র। অমন কচ্ছ কেন ? কচ্ছ কেন ? স্থির হয়ে বলনা আমি কি করেছি। বােস। আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিওনা। দোহাই বাবা বিদেশী ! তােমার ত একটি বেশ নিজের মত টুকটুকেটি জুটেছে। এইবার ক্ষেমা ঘেন্না করে এই গরিবের বুকুসীটি ফিরিয়ে দাওনা ধন। রাজপুত্র। সে কি, আমি ত তােমার বুকুসীর কথা কিছুই জানি না। দেবােধ হয় নেশা টেশ করে কোথাও পড়ে আছে। বােস। কেন বাবা আর যন্ত্রণা বাড়াও ? রাজকন্যার সামনে

রূপকথা।
'।
স্বীকার করতে লজ্জা করছে বুঝি? তা যা হয়ে গেছে, তার জন্যে আর
লজ্জা কি? এখন দয়া করে বল বুক্কসীটী কোথায়।
বুকুসী। ( অগ্রসর হইয়া) এই যে প্রাণেশ্বর, এই যে দাসী
শ্রীচরণে।
বােস। হঁা যাও, আর তােমাকে আদর কৰ্ত্তে হবে না।
তােমার ভালবাসা খুব জেনেছি। এতদিনের প্রেম, আর কিনা একটা
ফুটফুটে ছোঁড়া দেখে সব ভুলে গেলে ?
বুকুসী। আরে দুর মড়া, তােকে কি ভুলতে পারি ? না হয়
আলটপকা এ দিক ও দিক দু এক চকোর প্রেম করে এলুমই বা,
তাই বলে সেই জন্যে কি তােকে ছাড়তে পারি ? জানিস না আমার
সেই পুরাণ গানটা
ভালবাসি কতজনে
যখন যারে ধরে মনে
তবু নাথ, ঐ চরণে, হয়ে আছি চিরদাসী।
রাক্ষস। তা যথার্থ কথা দাদা। বউদিদিটি আমার এদিকে
যাই করুন আর তাই করুন, উনি চিরদিনই তােমা বই আর কারও
নয়।
বােক্স। হ্যা, তাই যদি, তবে ফুটফুটে ছােকরা দেখলেই অমন
করে ঢলে পড়ে কেন ?
তাতে কি হল ? আরে ছি দাদা! তুমি পণ্ডিত লােক
হয়ে এই কথাটা বুঝলে না ? যে রমণী যথার্থ পতিব্রতা হয়, সে দু’শ
লােকের সঙ্গে প্রেম করলেও তার পাতিব্ৰত্য ধৰ্ম্মের বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত
হয় না দাদা, বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত হয় না। খাঁটি সােনা আগুণেই পুড়ুক
আর জলেই পড়ক, যে খাঁটি সেই খাঁটিই থাকে।

রূপকথা।
বােস। বটে ভাই বটে! এমন ? আহা হা, সতীত্ব ধৰ্ম্মের
কি মহিমা! বুকুসীরে ! বুঝি জগতকে পাতিব্ৰত্য শিক্ষা দেবার জন্যেই
তুই ধরাধামে এসেছিলি।
বুকুসী। কিছু শিক্ষা দেবার দরকার নেই প্রাণেশ্বর। যতদিন
জগতে তােমার মত উদার-হৃদয় স্বামী থাকবে, ততদিন আমার মত
পতিতারও অভাব হবে না।
রাক্ষস। তা হলে এস আমরাও এদের আশীর্বাদ করে ঘরে ফিরি।
বােস। এস রাজকন্যা, আশীৰ্ব্বাদ করছি চিরদিন মনের সুখে
থেক, আর বুকসীর মত পতিব্রতা হয়। এস ভাই, তােমাকে আর
কি বলে আশীৰ্বাদ করবে, যেন একটু বেশী দিন বেঁচে থেক, আর
চেহারাটি যেন এমনি লাল টুকটুকেই থাকে। ( জনান্তিকে) উঃ টের
ঢের বিচ্ছু ছেলে দেখেছি বটে বাবা, কিন্তু এমন বেধড়ক বেয়াড়া
আমার বাপের জন্মে দেখিনি।
[ রাক্ষসাদির প্রস্থান।
রাজপুত্র । এস রাজকন্যা, এইবার আমরা আমাদের পরম
উপকারী বন্ধু বেঙ্গমা বেঙ্গমীকে স্মরণ করি।
( পালক বাহির করিয়া দগ্ধ )
(বেঙ্গমা বেঙ্গমীর প্রবেশ )
গীত।
ডাকটি শুনে এলেম ছুটে আকাশে ভেসে।
ঘুচল দুখের অমানিশা সুখ উষা হাসে।
কাজটি হল সারা, (এখন) ফিরে চল ত্বরা,
মিলেছে মনের মতন কেমন রতন মিষ্টি বুকভরা
ভাল থাক, ওগাে সুখে থাক, মনের হরষে।

রূপকথা।
বেঙ্গমা। তােমার সমস্ত বৃত্তান্তই আমরা অবগত আছি। তােমার
কার্যোদ্ধারে আমাদের মনে যে কি অতুল আনন্দ হয়েছে তা আর
একমুখে কি জানাব।
রাজপুত্র। যা হয়েছে তা সমস্তই আপনাদের কৃপায়। না হলে
কাৰ্যোদ্ধার ত দূরে থাক, রাক্ষস পুরীতে আসবার পর্যন্ত আমার
সম্ভাবনা ছিল না।
বেঙ্গমী। তােমার সৎসাহস আর বন্ধুবাৎসল্য গুণেই তুমি এমন
অদ্ভুত কাৰ্য্য করতে সমর্থ হয়েছ। ভগবান তােমায় তার পুরস্কার
কতক দিয়েছেন। আর আজীবন অবিচ্ছিন্ন সুখসম্ভোগে সে পুরস্কার পূর্ণ
চল আবার মানুষের
বেঙ্গমা। এখানে আর অবস্থান বৃথা।
দেশে ফিরে যাই।
[ প্রস্থান
পঞ্চম দৃশ্য।
পৰ্বতগুহা।
( রাজপুত্র, রাজকন্যা, বেঙ্গমা ও বেঙ্গমী)
রাজপু। কতক্ষণে বন্ধুদের মুখগুলি দেখব, কতক্ষণে আবার
তাদের সঙ্গে গলা ধরাধরি করে কথা কইব, মন বড় চঞ্চল হচ্চে।
বেঙ্গমা। এই যে এই গুহার ভিতর পদ্মপত্রে মুড়ে আমি তাদের
মুণ্ডগুলিকে সযত্নে রেখে দিয়েছি। এস তাদের পুনর্জীবিত করবার
ব্যবস্থা করা যাক।

রূপকথা ।
( মুণ্ড বাহির করণ )
রাজ। আহা, মৃত্যুর করাল ছায়া পড়ে বন্ধুদের হাস্যময় সুন্দর
মুখগুলি কি ভয়ঙ্কর মূর্তিই ধারণ করেছে । এ দৃশ্য আর অধিকক্ষণ
দেখা যায় না।
বেঙ্গমা। অধিকক্ষণ দেখবার প্রয়ােজন নাই।
সােনার কাঠি
বের করে সকলকে স্পর্শ কর ।
( রাজপুত্র কর্তৃক বন্ধুগণের মস্তকে সােনার কাঠি স্পর্শ,
সকলের গাত্রোখান।)
তিনবন্ধু। রক্ষা কর, ভ ষণ সর্প, সাবধান রাজপুত্র, আত্মরক্ষা
রাজপুত্র। চুপ চুপ, ভালকরে চোখমেলে চাও, সব সুমঙ্গল,
কোন ভয় নাই।
মন্ত্রী। তাই ত ভাই, ব্যাপারটা কি বল দেখি? আমি ত
এখনও ঠিক করতে পারছি না কতটা স্বপ্ন, কতটা সত্য!
রাজপুত্র। আগে তােমাদের প্রাণদাতা এই
এই দেবপক্ষীদ্বয়কে
প্রণাম কর, তার পর সে সব কথা।
[ সকলের বেঙ্গমা বেঙ্গমীকে প্রণাম করণ ও তাহাদের প্রস্থান।
কোটা। আচ্ছা এইবার বল সাপের ব্যাপারটা কি। আমার
ত বেশ স্পষ্ট মনে হচ্ছে যে এক ভীষণ অজগরের সঙ্গে আমি যুদ্ধে পরাস্ত
হলেম, আর সে আমায় জড়িয়ে গিলতে অরম্ভ করলে। সেটা ত স্বপ্ন
নয়।
• রাজপুত্র। না ভাই, স্বপ্ন নয়। যথার্থই তোমাদের তিনজনকেই
সাপে গিলেছিল। তবে যখন ভগবানের কৃপায় আর এদের সাহায্যে

রূপকথা।
রাক্ষসদের দেশ থেকে সােনার কাঠি এনে তােমাদের আবার বাঁচাতে
পেরেছি, তখন সে ঘটনা একটা দুঃস্বপ্ন মাত্রই মনে করাে, আর স্মৃতি
থেকে সেটা একেবারে বিলুপ্ত করে দাও।
কোটাল। (রাজকন্যাকে দেখাইয়া) এই ইনিই কি তােমার
সােনার কাঠি ?
রাজ। না ভাই, উনি হীরের কাঠি। সােনার কাঠিও ওর
তুলনায় মূল্যহীন। উনি না সাহায্য করলে আমি কিছুই করতে
পারতেম না।
মন্ত্রী। বন্ধু ত হেঁয়ালিতে কথা কইতে লাগল। আপনার
পরিচয়টা আপনি নিজে কি দয়া করে দেবেন না ?
রাজকন্যা। আপনাদের বন্ধু রাক্ষসদেশ জয় করে আমাকে অচ্ছেদ্য
পাশে বন্ধন করে চিরবন্দিনী করে এনেছেন। সুতরাং যুদ্ধের
নিয়মানুসারে আমি ক্রীতদাসী ।
কোটা। বন্ধু, আমি বলছিলেম কি, আর একবার রাক্ষসদের
দেশে গেলে হয় না ?
রাজপুত্র। আর যেয়ে কি করবে ভাই ? রাক্ষসপুরীর শীর্ষমণি
আমি অপহরণ করে এনেছি। এখন দেশ অন্ধকার।
মন্ত্রী। যা হ’ক ভাই, তােমাকে এমন রমণী-রত্ন লাভ করিয়ে
দেবার জন্য আমরা শতবার সাপের পেটে যেতে প্রস্তুত আছি।
কোটা। কিন্তু একেই বলে এক যাত্রায় পৃথক ফল। কেউ
গেলেন সাপের পেটে, কারাে ভাগ্যে পায়েস পিঠে।
রাজপুত্র। কেন ভাই, তােমরা ত সাপের পেটে গিয়ে দিব্যি
আরামে ঘুমুচ্ছিলে, আবার নিদ্রাভঙ্গে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাচ্ছ।
আর আমি -দেখ কত কষ্ট করে, কত ঘুরে, সাত সমুদ্র তের নদীর

রূপকথা পারে রাক্ষসদের মুখের গােড়া পর্যন্ত পেীছে, শেষে এই মায়াবিনীর মায়াডােরে জন্মের মত বাঁধা পড়ে গেলাম। কোটা। তা ভাই, বাঁধা পড়ে যে নেহাত খারাপ আছ, এমন- তরটা ত বােধ হচ্ছে না। রাজপুত্র। কেন, আমার অদৃষ্ট দেখে কি হিংসে হচ্ছে ? কোট। তা সত্যি কথা বলতে কি, একটু একটু হচ্চে বৈ কি। রাজকন্যা। আহা, তােমার এই বন্ধুটির জন্য যদি তােমার সেই প্রেমিকা বুকুসীটিকে আনতে পারতে, তবে বড়ই সুবিধা হত। রাজপুত্র। বুকুসীটিকে আনলে শুধু এ বন্ধুটির কেন, তিনটি বন্ধুর কুলিয়েও বিস্তর বাকী থাকত। তার উদার অনন্ত প্রেম- পারাবারের অগম জলে একটা চুড়ামণিযােগের স্নানকাৰ্য্য সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু সেটিকে ত আর পাওয়া যাচ্চে না, সুতরাং তার জন্যে আর দুঃখ করে কি হবে ? তার চেয়ে চল শীঘ্র করে দেশে ফিরে যাওয়া যাক। তারপর সেখানে গিয়ে বন্ধুগুলির হস্তপদও এমনি করে সােণার শৃঙ্খলে আবন্ধ করে দিয়ে তাদের দেশভ্রমণের বাসনাটাকে জন্মের মত দেশছাড়া করে দেওয়া যাক্। মন্ত্রী। দেশভ্রমণকে নিন্দে করােনা। বেরিয়েছিলে বলেই ত আজ এমন অঙ্কলক্ষী লাভ কৰ্ত্তে সমর্থ হয়েছ। রাজপুত্র। সে ভাই, অদৃষ্টের কথা। আমার অদৃষ্টে যখন উনি নৃত্য কচ্চেন, তখন আমি যদি রাক্ষসদেশে না আসতুম, ত অঙ্কলক্ষীকে নিজে এই সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে গিয়ে আমার গলায় বরমাল্য দিয়ে আসতে হত। আমি এখানে দয়া করে এসে কেবল ওঁর পথকষ্টটা ধাচিয়ে দিলুম। রাজকন্যা। দেখ বন্ধুসকল, কি অবিচারের কথা। তখন আমায় ।

রূপকথা।
ভয় দেখিয়ে বরমাল্যটা ফঁাকি দিয়ে নিয়ে এখন কি রকম জোর
কথা কইচে।
17
মন্ত্রী। কয়ে নিক, কয়ে নিক। প্রথম প্রথম দু একটা জোর
জোর কথা কয়ে নিক। তারপর আজীবন জোরের কথা কইবার
অধিকারটা তােমারই ত দাড়াবে।
রাজপুত্র। কি বন্ধু, ভয় দেখাচ্চ, না কি ? মনে থাকে যেন
তােমাদেরও জোরের কথা কইবার লােক আসছে।
রাজকন্যা। হাঁ চল। সেই যােগাড়ই শীঘ্র করে করা যাকগে।
মন্ত্রী। বেশ, তবে এইবার চল এ পালা সাঙ্গ করে ঘরের ছেলে
ঘরে ফিরে যাই।

৭২
রূপকথা।
(পট পরিবর্তন)
কল্পনা-রাজ্যের উজ্জ্বল দৃশ্য ।
(সমবেত সঙ্গীত )
•
.
আমার কথাটি ফুরুল, নটে গাছটি মুড়ল,
কেন বা নটে মুড়ল তা কে জানে।
কার গরুতে খেয়েছিল কাদের কলাপাত,
কোন বউটো রাখালেরে দেয়নি খেতে ভাত,
সে যে, অনেক দিনের কথা কারাে নাই মনে ।
শুধু, ক্ষুদে পিঁপড়ের চরণেতে এইটি নিবেদন,
কুটুর কুটুর কামড়ােনাকো যাদু বাছাধন,
মিষ্টি খেয়ে পুষ্ট হলে,
বিষটি কেন ধর হুলে,
পেটটি যদি ভরে নাক কামড়ে কি সুখ পাও প্রাণে।
না হয় দুটো মিষ্টি বলে যাওনা সখা ঘরে চলে,
মিষ্টি মুখে শেষটি বল তুষ্ট হলে সবজনে।
যবনিকা

No text on this page.

No text on this page.

Rupkatha

Author
Basu, Monojmohon
Title
Koutuk-natya
File name
Rupkatha
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2009/10/6
Publisher
Surendranath Bandhopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
89
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Kritantakumar Guha
DLI number
513179
Barcode
4990010020181.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XajqD8EM51d
Download PDF

Rupkatha