Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rupayan Ed. 1st

Hossen, Shahadat · 2010/03/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রূপায়ণ
শাহাদাৎ হোসেন
দাম বার আনা,

প্রকাশক :
দি গ্রেট ইষ্টার্ণ লাইব্রেরীর পক্ষে
আবদুর রহিম খান,
১৫নং কলেজ স্কোয়ার,
কলিকাতা
[ সর্বস্বত্ব প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত ]
প্রথম সংস্করণ
১৩৪০
ঢাকা,
নবাবপুর নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে
শ্রীকালাচঁাদ বসাকদ্বারা মুদ্রিত

কল্যাণীয়
শ্ৰীমান মােল্লা নাসিরুল হক
কল্যাণীয়েষু

No text on this page.

রূপায়ণ বেরুলাে। যে গল্পগুলো বিভিন্ন মাসিকে
বেরিয়েছিল, সেইগুলিই একত্র কোরে রূপায়ণের সৃষ্টি
হােল। এখন বাংলার পাঠক সমাজ একে সাদরে বরণ
কোরে নিলেই আমার শ্রম সার্থক হয়। ইতি
আশ্বিন, ১৩৪ •
পণ্ডিতপােল, হাড়ােয়া,
২৪ পরগণা
শাহাদাৎ হােসেন

No text on this page.

রূপায়ণ
প্রতিশােধ
১
বসিল।
পা হইতে মাথা পর্যন্ত সর্বাঙ্গে পাটের ফেঁসে মাখিয়া সন্ধ্যার পর
মুঙলী তাহাদের কুলী লাইনের ছােট্ট দরখানিতে আসিয়া ‘গোঁজ’ হইয়া
ঘরের এক কোণে ছেড়া মাদুরের উপর ঝংক শুইয়া ছিল।
জিজ্ঞাসা করিল, কি হয়েছে রে মুঙলী।
মুঙলী উত্তর দিল না। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুজিয়া গুম হইয়া
বসিয়া রহিল।
ঝংরুর মনে কেমন যেন একটা খটকা লাগিল। মুঙলীর কি তবে
অসুখ করিয়াছে।

রূপায়ন জ্বরাক্রান্ত দেহখানি লইয়া সে টলিতে টলিতে মুঙলীর কাছে উঠিয়া আসিল। তাহার গায়ে হাত দিয়া ডাকিল, মুঙলী—ও মুঙলী ! মুঙলী মাথা তুলিয়া একবার ঝংরুর মুখের পানে চাহিল। ঝংরু বিস্মিত হইয়া দেখিল, তাহার চোখ দুইটী জবা ফুলের মত লাল হইয়া উঠিয়াছে। তাহার মনের কোণে একটা প্রবল সন্দেহ চাগাড় দিয়া উঠিল। সে বুঝি আবার কিছু বলতে চাহিতেছিল, কিন্তু মুঙলী তাহাকে সে অবসর দিল না, তাহার হাত ধরিয়া বিছানার উপর লইয়া গিয়া পুনরায় শােয়াইয়া দিল। কিন্তু শােয়াইয়া দিলেও ঝংরু স্থির থাকিতে পারিল । জিজ্ঞাসা করিল কি হেয়েছে মুঙলী। -কিছু হয়নি, তুই চুপ কোয়ে’ ‘শাে’ । ঝংৰু মুঙলীর কথায় বিশ্বাস করিতে পারিল না। তাহার চোখ মুখ দেখিয়া সে স্পষ্টই বুঝিল, একটা কিছু অঘটন নিশ্চয়ই ঘটিয়াছে, তাই সে মুঙলীর বাধা না মানিয়া বলিয়া উঠিল, কিছু হয়নি তবে অমন কোরে আছিস কেন? মুঙলী একটা ধমক দিয়া বলিয়া উঠিল, তুই চুপ কোরে’ শুবি, না বগ, বগ, কোরে’ অসুখ বাড়াবি ? ক্ষুব্ধ অভিমানে ঝংক পাশ ফিরিয়া শুইল। ছােট্ট ঘরখানির জমাট আঁধারের মধ্যে মুঙলী কিছুক্ষণ নিস্পন্দ ভাবে বসিয়া রহিল। তাহার পর আস্তে আস্তে উঠিয়া কেরােসিনের ল্যাম্পটী জ্বালাইয়া একখানি দাতভাঙা চিরুণীর সাহায্যে চুলের ফেসসা ছাড়াইতে বসিল। ২ রূপায়ণ ভাের সাড়ে পাঁচটার ‘ভে। ঝংকর ঘুম ভাঙাইয়া দিল। তাহার জ্বর তখন একেবারেই ছাড়িয়া গিয়াছে। শরীরটা বেশ হাল্কা হাল্কা বােধ হইতেছে। তাই উঠিয়া বসিয়া মুঙলীকে জাগাইতে আরম্ভ করিল। মুঙলী পাশ ফিরিয়া শুইল মাত্ৰ-কোন সাড়া দিল না; শেষে অনেক ডাকাডাকির পর বিরক্তিভরে জানাইয়া দিল—সে ‘কাজে’ যাইবে না। রাত্রির সন্দেহটা ঝংরুর মনে আবার প্রবল হইয়া দেখা দিল, কিন্তু কোন উচ্চ বাচ্য করিল না, মনের মধ্যে সম্ভব-অসম্ভব অনেক কিছু তােলা-পাড়া করিতে করিতে সে পুনরায় বিছানার উপর দেহ ঢালিয়া দিল। যখন ঘুম ভাঙিল, তথন আটটা বাজিয়া গিয়াছে। পাশ ফিরিয়া দেখিল, মুণ্ডলী নাই । তাহার মনের সন্দেহের ভাব যেন অনেকখানি নামিয়া গেল। মনে মনে ভাবিল, কারাে সঙ্গে বােধ হয় ঝগড়া-বচসা হইয়াছিল, কিম্বা শরীরটা তত ভাল ছিল না, তাই মুঙলী কাল অমন করিয়াছিল, এখন বােধ হয় সে-সব গ্লানি কাটিয়া গিয়াছে—তাই আবার কাজে গিয়াছে। ঝংৰু উঠিয়া বসিল। ঠিক সেই সময় সর্দার শ্যামলাল ঘরের ভিতর ঢুকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, মুঙলী কোথায় রে ঝংক! ঝংরু বিস্ময়-দৃষ্টিতে শ্যামলালের মুখের পানে চাহিয়া বলিল, কেন- সে যে কাজে গিয়েছে। -কোথায় কাজে গিয়েছে? এই ত আমি সারা ‘কল’ তাকে খুঁজে এলুম। } কাপায়ণ == ঝংরুর বুকের ভিতরটা চঞ্চল হইয়া উঠিল। শ্যামলাল বিশেষ ব্যগ্রতা দেখাইয়া বলিল, কোথায় গিয়েছে শীগগির বল—আমি আর দাঁড়াতে পাচ্ছি না। বড় সাহেব এখনই একবার তাকে কুটীতে ডেকে পাঠিয়েছে। বড় সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে। তা আবার কুটীতে ! এতক্ষণে সমস্ত ব্যাপারটা ঝংকর সামনে পরিষ্কার হইয়া গেল। তাহার দুই চক্ষু আগুনের মত ধ ধক্ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। সেই জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সে শ্যামলালের মুখের পানে চাহিল। ইচ্ছা--দৃষ্টি-আগুনে তাহাকে পুড়াইয়া ভস্ম করিয়া দেয়। শ্যামলাল ঝংরুর এই দৃষ্টির অর্থ যে না বুঝিল, তাহা নয়। কিন্তু সেজন্য সে মোটেই পরােয়া করিল না। উপরন্তু বেশ একটা ধম্‌কানির সঙ্গে পুনরায় বলিয়া উঠিল, বড় ভ্যাব, ড্যাব, কোরে’ চেয়ে আছিস যে ? কোথায় গিয়েছে—ব শীগগির । ঝংরুর মনে হইল, সেই মুহূর্তেই পাষণ্ডের মুণ্ডুটা টানিয়া ছিড়িয়া তাহার ‘সর্দার জীবনের শেষ করিয়া দেয়, কিন্তু সহসা অতখানি করা ভরসায় কুলাইল না। তাই গম্ভীর ভাবে জবাব দিল-জানি না। -ওরে বেটা জঙলী, নিজের ভাল বুঝিস না। তাকে এখুনি পাঠিয়ে দে, তাের কপাল ফিরবে। এবার আর ঝংরু চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। বাঘের মত লাফাইয়া উঠিয়া সর্দারের টুটি চাপিয়া ধরিল। কিন্তু কয়দিনের জ্বরে তাহার শরীর কাবু হইয়া পড়িয়াছিল, কাজেই অল্প কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর সর্দারেরর হাতে তাহার পরাজয় ঘটিল। সে ভূতল আশ্রয় করিল। ক ৪ রূপায়ণ কিন্তু তাই বলিয়া সর্দারের রাগ থামিল না। ভূতলশায়ী ঝংককে সে যতক্ষণ পারিল, কিল, চড়, লাথি বসাইল। তাহার পর বুঝি অপারগ হইয়া সে-স্থান ত্যাগ করিল। যাইবার সময় শাসাইয়া গেল, তাহাকে সম্মুখে রাখিয়াই সে মুঙলীর সর্বনাশ করিবে, তবে তাহার নাম ‘শ্যাম বারুই। ধস্তাধস্তি ও প্রহারের ফলে দুৰ্বল ঝংরু একেবারে নির্জীব হইয়া পড়িয়াছিল—উঠিবার সামর্থ্য ছিল না। বহুক্ষণ পরে মুঙলী আসিয়া যখন তাহাকে ডাক দিল, তখন যেন তাহার চৈতন্য হইল। সে চোখ মেলিয়া চাহিল। মুঙলী জিজ্ঞাসা করিল, অমন কোরে’ পােড়ে আছিস কেন, কি হােয়েছে ? ঝরু উত্তর দিল না। মুঙলীর মুখের পানে একবার চাহিল মাত্র। মুঙলী আবার জিজ্ঞাসা করিল, কেউ এসেছিল ? হুবলিয়া ঝংরু মাটিতে মুখ গুজিয়া দিল। ঝংরু সেই অবস্থাতেই উত্তর দিলসর্দার। ঘটনাটা পরিষ্কার হইয়া গেল। মুঙলী সবই বুঝিল।

রূপায়ণ সাত বৎসর আগে পেটের দায়ে হাজারীবাগের এক পাহাড়ী ‘বন্তী হইতে মুঙলীকে লইয়া ঝংকু বাংলা দেশে চলিয়া আসে এবং সেই হইতে এপর্যন্ত তাহারা স্বামী-স্ত্রীতে ‘গতাের’ খাটাইয়া বাংলার বুকেই কায়ক্লেশে দিনপাত করিয়া আসিতেছে। অবশ্য এই সাত বৎসর এক জায়গাতেই যে তাহারা বসবাস করিয়াছে, তাহা নহে। যখন যেখানে কাজের সুবিধা পাইয়াছে, তখন সেইখানে গিয়াই বাস করিয়াছে। চটকলের এই কুণী লাইনে তাহাদের বসবাস আরম্ভ হইয়াছে-গত দুই মাস হইতে। নানারকম অসুবিধা এবং অত্যধিক পরিশ্রম সত্ত্বেও এই পার্বত্য দম্পতি এখানে অন্যান্য স্থানের অপেক্ষা সুখে স্বচ্ছন্দেই দিন কাটাইতেছিল। কারণ, চটকলে যে উপার্জন হইত, তাহাতে দু'বেলা ইহারা পেট ভরিয়া খাইতে পাইত। প্রথম যখন ইহারা বাংলা দেশে আসে, তখন মুঙলীর বয়স পনেরাে আর ঝংরুর বাইশ। সুদীর্ঘকাল বাংলা দেশে বাস করার এবং বাঙালীর সঙ্গে একান্ত ঘনিষ্ট ভাবে মেলামেশার ফলে ইহারা এখন আচার-ব্যবহারে কথাবার্তায় একেবারেই ‘বাঙালী’ হইয়া উঠিয়াছে। জঙলী ভাবটা মােল আনা না হউক, বারাে আনা রকম কাটিয়া গিয়াছে। চটকলে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিন পরে মুঙলীর উপর বড় সাহেবের কুদৃষ্টি পড়ে। কলের মজুরণীদের প্রায় সকলেই ( অবশ্য যাহাদের দেহে যৌবনের ছাপ আছে) এই বড় সাহেবের লালসার থােক যােগাইয়াছে। কোনরূপ আপত্তি করা দূরে থাক, মােটা মােটা বখসি লইয়া ও দরকার ইলে পুনরায় হুজুরে ‘এত্তেলা দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া সগর্বে গৃহে রূপায়ণ ফিরিয়াছে; কাজেই সাহেবের লালসার ক্ষুধা দমিত না হইয়া উত্তরােত্তর বাড়িয়াই গিয়াছে। মুঙুলীকে প্রথম দেখার পর দিন হইতেই সাহেব তাহাকে হাত করিবার সুযােগ খুঁজিতেছিল; কিন্তু মুঙলী তাহাকে সে সুযােগ দেয় নাই। সে সাধ্যমত তাহার নিকট হইতে দূরে সরিয়া থাকিতে চেষ্টা করিত। কারণ সাহেবের কীর্তি-কথা সে সমস্তই শুনিয়াছিল। কিন্তু কাল সে আর নিজেকে সামলাইতে পারে নাই। কল হইতে বাহির হইতেই দুর্ভাগ্যক্রমে সে হঠাৎ সাহেবের সম্মুখে পড়িয়া যায়, সাহেবও সুযােগ বুঝিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরে; কিন্তু বেশীদূর অগ্রসর হইতে পারে নাই। চারিদিকে লােকজন, কাজেই সাহেব একবার মুচকি হাসিয়া হাত ছাড়িয়া দিয়া বলিল, রাঢ় ডস্ বাজে মেরা কোঠীমে মােলাকাট করে। মুঙলীর দেহের সমস্ত রক্ত তখন মাথায় উঠিয়া জমাট বাঁধিয়া গিয়াছিল। যন্ত্রচালিতের মত সে লাইনের দিকে অগ্রসর হইল। সকালে উঠিয়াই মুঙলী ঘর হইতে চলিয়া গিয়াছিল। সে বুঝিয়াছিল -রাত্রিতে যখন সাহেবের কুঠীতে যায় নাই, তখন সাহেব সকালে আসিয়া নিশ্চয়ই তাহার খোঁজ করিবে এবং কলের মধ্যে দেখিতে না পাইলে এ-পূৰ্য্যন্তও লােক পাঠাইবে। তাই উপদ্রব এড়াইবার জন্য সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ঘর হইতে বাহির হইয়া কুলী লাইনের সীমার বাহিরে এক নির্জন ঝােপের আড়ালে চুপ করিয়া বনিয়াছিল। বেলা ১টা। মুঙলী ঝংরুকে ভাত খাওয়াইয়া, নিজের ভাত বাড়িয়া সবেমাত্র বসিবার উদ্যোগ করিতেছে, এমন সময় বড় জমাদার অসিয়া ডাক দিল-ঝংরু।

রূপায়ণ ঝংক শুইয়াছিল। উঠিয়া বসিল। জমাদার গম্ভীর কণ্ঠে কহিল, বড়! সা আভি তুমকো বােলা রহেঁ-জদি আও। ঝংকর মাথায় সাঁওতালী রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল। সে উঠিয়া দড়ািইল। ঘরের কোণ হইতে বহুদিনের অব্যবহৃত দীর্ঘ শালের লাঠিটি তুলিয়া লইয়া বলিল, চল্। মুঙলী এতক্ষণ ভাতের কাসিটী সন্মুখ হইতে সরাইয়া রাখিয়া জড়ের মত নিস্পন্দ হইয়া বসিয়াছিল। এখন লাঠিহস্তে রুদ্রমূৰ্তি ঝংরুকে ঘর হইতে বাহির হইতে দেখিয়া সহসা যেন তাহার চৈতন্য ফিরিয়া আসিল। সে ক্ষিপ্রগতিতে উঠিয়া লাঠিটী ধরিয়া ফেলিল এবং তিরস্কারের দৃষ্টিতে ঝংরুর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, লাঠি নিয়ে কোথায় যাস? ঝংরুর উদ্দীপ্ত ক্রোধ সহসা ধাক্কা খাইয়া দমিয়া গেল। তাহার হাতের মুষ্টি শিথিল হইয়া আসিল। মুঙলী লাঠি গাছটী কাড়িয়া লইয়া যথাস্থানে রাখিয়া দিল। ঝংরু, কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কি যেন ভাবিয়া লইল, তাহার পর জমাদারকে বলিল,-চল্। ঝংরু চলিয়া গেল। মুঙলী দরজায় দাঁড়াইয়া যতক্ষণ তাহাকে দেখা গেল, এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিল। তারপর দরজা বন্ধ করিয়া বাহির হইয়া পড়িল। ৮ রূপায়ণ সমস্ত দিন আর কেহ মুঙলীর কোন সন্ধান পাইল না। সাহেবের লােক তিন চারিবার আসিয়া খোঁজ করিয়া ফিরিয়া গেল। শেষে হতাশ হইয়া সাহেবকে সংবাদ দিল—মুঙলী পলাইয়াছে। রাত্রি :২টা। মুঙলী আসিয়া ঘরের সম্মুখে দাঁড়াইল। দেখিল দরজা পূর্বের মতই বাহির হইতে তালা বন্ধ আছে, তবে কি ঝংক ফিরে নাই ? তাহার বুকের ভিতরটায় যেন কেমন করিয়া উঠিল। সে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া কি যেন ভাবিতে লাগিল। সহসা তাহার দৃষ্টি পড়িল দরজার সম্মুখে--সেখানে কি যেন একটা পড়িয়া আছে। অন্ধকারে ঠিক ধারণা করিতে না পারিয়া সে দুই পা অগ্রসর হইল। একি! এযে মানুষ। আশায়, উৎকণ্ঠায় তাহার বুকের ভিতরটায় দুরু দুরু করিয়া উঠিল। আরও নিকটে গিয়া সে ভাল করিয়া দেখিতে লাগিল। কিন্তু যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার হৃৎস্পন্দন থামিয়া যাইবার উপক্রম হইল। ঝংরুর শব! তবে কি সত্যই সব শেষ হইয়াছে। মুঙলীর বুকের ভিতরকার নিরুদ্ধ ক্রন্দন বাহিরে ফাটিয়া পড়িতে চাহিল। কোনও রূপে আত্মসম্বরণ করিয়া সে ঝংরুর মুখের কাছে মুখ লইয়া দেখিল, নিশ্বাস প্রশ্বাস বহিতেছে কিনা। ! তবে শব নয়—এখনও আছে ! মুঙলীর প্রাণে আশার সঞ্চার হইল সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলিয়া ঘরে ঢুকিল এবং দীপ জ্বলিয়া পুনরায় বাহিরে আসিল। একি! মুঙলী চমকিয়া উঠিল। ঝংরুর সর্বাঙ্গে বেতের দাগ, স্থানে স্থানে কাটিয়া রক্ত বাহির হইয়াছে। মুঙলীর দু'চোখ ফাটিয়া জল এযে

রূপায়ণ
আসিল। নিজের উপর তাহার ক্রোধ চড়িয়া উঠিল।
কেন সে ঝংরুকে
খালি হাতে পাঠাইয়াছিল, কেন তাহার হাতের লাঠি কাড়িয়া লইয়াছিল ?
তাহা না করিলে ত এ সৰ্ব্বনাশ ঘটিত না। লাঠি হাতে থাকিলে যে
যমরাজও ঝংরুর কাছে ঘেঁসিতে পারে না।
মুঙলী মাথায় হাত দিয়া আহতের শিয়রে বসিয়া পড়িল।
ধীরে ধীরে ঝংরুর চৈতন্য ফিরিয়া আসিতেছিল। সে চক্ষু মেলিয়া
চাহিল। আৰ্ত্তকণ্ঠে ডাকিল, মুঙলী।
মুঙলী জবাব দিল না। শিয়রে বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার তপ্ত ললাটে
স্নেহস্পৰ্শ বুলাইতে লাগিল।
কিছুক্ষণ কাটিয়া গেলে মুঙলী মৃদু স্নেহকণ্ঠে বলিল, ঘরে গিয়ে শুবি
চল, এখানে থাকলে কেউ আবার দেখে ফেলবে।
সত্যিই ত !
সহসা যেন ঝংরুর ঘাের কাটিয়া গেল। তখনি উঠিয়া মুঙলীর কঁাধে
ভর করিয়া সে টলিতে টলিতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল।
কিন্তু ঘুম কাহারও হইল না। উদ্বেগ, আশঙ্কার মধ্য দিয়া ঘন্টার
পর ঘন্টা কাটিয়া যাইতে লাগিল। রাত্রিও দেখিতে দেখিতে শেষ হইতে
চলিল। সহসা মুঙলী বলিয়া উঠিল, চল—আমরা এখান থেকে
পালাই।
-কোথায় ?
==
একটা টানা নিঃশ্বাস ছাড়িয়া ঝংকু বলিল, দেশে! দেশে গিয়ে কি
খাবি ?
-আগে যা’ খেতুম, তাই খাব--আবার কি খাব ?

রূপায়ণ
তাহার কণ্ঠস্বরে যেন একটু বিরক্তি ফুটিয়া উঠিল।
পূৰ্ব্ববৎ হতাশার সুরে ঝংকু বলিল, আগে খেতিস বনে জঙ্গলে শীকার
কোরে এখন
বাধা দিয়া মুঙলী বলিল, এখন কি বনে-জঙ্গলে শীকার ফুরিয়ে গিয়েছে,
না বর্শা ভোতা হােয়েছে ?
সহসা ঝংক উঠিয়া বসিল। তাহার দেহের বেদনা, মর্মন্তুদ যন্ত্রণা
সমস্তই যেন মন্ত্রবলে কোথায় উড়িয়া গেল। সে মুঙলীর হাত চাপিয়া
ধরিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল পারবি ?
দৃঢ়স্বরে মুঙলী উত্তর করিল, কেন পারবােনা,—খুব পারব।
-তবে চল—এই রাত্রেই—এখনই।
দুর্দিনের বন্ধু লাঠিগাছটা হাতে লইয়া সেই রাতেই ঝংরু মুঙলী-সঙ্গে
কুলী লাইন ত্যাগ করিল।
১১

রূপায়ণ তিন বৎসর পরের কথা। হাজারীবাগের জঙ্গলের ধার দিয়া এক বন্দুকধারী সাহেব দ্রুতপদে পথ অতিক্রম করিতেছে। শীকার করিতে জঙ্গলে আসিয়া সাহেব সঙ্গী ও পথ দুই-ই হারাইয়া বসিয়াছে। সূর্য তখন অস্তে গিয়াছে। সন্ধ্যার কালো ছায়া ধীরে ধীরে ঘনাইয়া আসিতেছে। রাত্রি আসিবার পূর্বেই কোন বস্তী’তে গিয়া আশ্রয় লইতে হইবে। নচেৎ এই নির্জন জঙ্গল-সীমান্তে হিংস্র জন্তুর হাতে প্রাণ হারাইতে হইবে। চাখেই পাহাড়। পাহাড়ের ওপারে সাঁওতাল-বস্তী দেখা যাইতেছে। ঐ বস্তাতে গিয়াই আশ্রয় লইতে হইবে। সাহেব যথাসাধ্য দ্রুতগতিতে চলিয়াছে। সহসা বনভূমি কম্পিত করিয়া এক ভীষণ গর্জন উঠিল। সর্বনাশ ! এ যে বাঘের গর্জন! এস্ত চকিত নেত্রে সাহেব একবার চতুর্দিকে চাহিল, কিন্তু কোথাও কিছু দেখিতে পাইল না। বন্দুকটী সােজা করিয়া ধরিয়া সে গতি আরও দ্রুত করিয়া দিল। আবার সেই গর্জন! সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বােপের আড়াল হইতে এক ভীষণকায় ব্যাঘ্র সাক্ষাৎ মৃত্যুর মত সাহেবের উপর আসিয়া পড়িল। ঠিক সেই সময় পাহাড়ের তলদেশ হইতে একখানি শাণিত বর্শা বিদ্যুতের মত আসিয়া বাঘের বক্ষ ভেদ করিল। শীকার ছাড়িয়া বাঘ নিজেই শীকার হইয়া মাটীতে লুটাইয়া পড়িল। সাহেব মৃচ্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল। অল্পক্ষণ-পরে যখন তাহার চৈতন্য সঞ্চার হইল, তখন চোখ মেলিয়া দেখিল, এক সাঁওতাল যুবতী পর্ণপুটে জল লইয়া তাহার মুখে ঢালিয়া দিতেছে। যুবতীর মুখের পানে চাহিতেই রূপায়ণ সাহেবের মাথা ঘুরিয়া গেল। অতিমাত্র বিস্ময়ে বলিয়া উঠিল, you you-that- মুঙলী পূৰ্বেই সাহেবকে চিনিয়া লইয়াছিল। তাই ভাষা না বুঝিলেও হাবভাবে মুহূর্তের মধ্যে তাহার মনের কথা বুঝিয়া লইয়া বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, হাঁ সাহেব, থামাে। আমি সেই মুঙলী হঠাৎ থামিয়া গেল। কে যেন তাহার মুখ চাপিয়া ধরিল। বিপন্নকে লজ্জা দিতে অসভ্য বন্য রমণীর বিবেকও বুঝি বাধা পাইল। সাবে আর তাহার মুখের পানে চাহিতে পারিল না। নিদারুণ ঘৃণায়, লজ্জায় সে চক্ষু মুদ্রিত করিল। এদিকে আঁধার ঘনীভূত হইয়া আসিল। মুঙলী সাহেবকে বলিল, চল সাহেব আমাদের ঘরে চল। তােমার কোন ভয় নেই, আমরা তােমার কোন অনিষ্ট কোব না। সকালে উঠে যেখানে ইচ্ছা তুমি চোলে যেময়। রাত্রিতে এখানে থাকলে আবার বাঘের হতে পপড়বে। সাহেব উঠিয়া বসিল। বাঘের আক্রমণে মুর্ভূিত হইয়া পড়িলেও সে আদৌ আঘাত পায় নাই। মুঙলী বাঘকে সে অবসরই দেয় নাই। সাহেবকে উঠিতে দেখিয়া মুঙলী বাঘের পেট হইতে বর্শাটা টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া আগে আগে চলিল। সাহেব নীরবে নতমস্তকে তাহার পিছু পিছু চলিল। কুটরের সম্মুখে পৌছিয়া মুঙলী হাকিল, সর্দার, বাত্তি দেখা রে ! ঝংক আলাে লইয়া বাহিরে আসিল। দেখিল-মুঙলীর পশ্চাতে একজন অপরিচিত আগন্তুক। সে অগ্রসর হইয়া আলােটা আগন্তুকের মুখের কাছে ধরিল। অমনি মুহূর্তের মধ্যে তাহার কর্ণমূল পর্যন্ত সমস্ত মুখখানি লাল হইয়া উঠিল। চোখ দুইটা হিংস্র বাঘের চোখের মত ধক

রূপায়ণ
ধ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। মুঙলী তাহার ভাব বুঝিয়া একটা ধমক দিয়া
বলিল, তুই ‘বাউরা হেয়েছিস সর্দার, ও যে অতিন্থ !
রাত্রিতে বন্য ফলমূল খাওয়াইয়া মুঙলী সাহেবকে বাঘছাল বিছাইয়া
শুইতে দিল। সাহেব শুইয়া পড়িয়া আপন মনে বলিয়া উঠিল, A
revenge indeed-but wonderful revenge !
১৪

সন্ধি আকাশস্পর্শী আরাবল্লীর পাদমূলে ঝরণার পাশে দাঁড়াইয়া দুইটা বালক বালিকা। বালকের বয়স দশের অনধিক, বালিকা এয়ােদশী কিশােরী। দীপ্ত দ্বিপ্রহর। খর রৌদ্রে ঝলসিতা প্রকৃতি অগ্নিশ্বাসে ধুকিয়া মরিতেছে। আকাশে বাতাসে তরল জ্বালা, তীব্র দাহে দিগ্বধূর কম মুখে তাম্র দীপ্তি ফুটিয়া উঠিয়াছে। বালক, বালিকাকে গৃহে ফিরিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল। তাহার কাপড় ধরিয়া টানিল, হাত ধরিয়া হেঁচকা দিল। বালিকা তবু নড়িল না। কিন্তু বালক নিরস্ত হইবার নয়। তাহার পীড়াপীড়ি উত্তরােত্তর বাড়িয়াই চলিল। বালিকা বিরক্ত হইয়া ধমক দিল। অভিমানে বালকের মুখখানি ভার হইল, চক্ষু ছলছল করিয়া উঠিল। মুহূর্তে বালিকার অন্তরের বিরক্তি গলিয়া জল হইয়া গেল। সস্নেহে বালককে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া তাহার মুখ চুম্বন করিয়া বলিল, লক্ষ্মীটা আমার- কেঁদোনা-একটুখানি দাঁড়াও। এক্ষুনি তােমায় নিয়ে যাব, এখন। *

রূপায়ণ
কয়েক
অভিমানী বালক চোখ মুছিতে মুছিতে অনুযোগের সুরে বলিল, আমার
ক্ষিদে পায় না বুঝি ?
বালিকার সারা মুখখানি সহসা ব্যথায় করুণ হইয়া উঠিল
মুহূৰ্ত্ত মুখে কথা ফুটিল না। একটু পরে যেন জোর করিয়া নিজেকে
সালাইয়া লইয়া বলিল, আমাকে একটু জল খেতে দেবে না ভাই! একটু
দাড়াও-এক টোক জল খেয়ে নিই।
সে এক পদ অগ্রসর হইয়া অঞ্জলি ভরিয়া ঝরণার জল পান করিল।
কিন্তু এক টোক নয়,যতক্ষণ পারিল, অঞ্জলির পর অঞ্জলি ভরিয়া আকৎ
জল পান করিল। তাহার পর বেশ যেন একটু সবল হইয়া প্রফুল্ল মুখে
বালকের হাত ধরিয়া বলিল, চলল।
উভয়ে পার্বত্য পথ অতিক্রম করিয়া ধীরে ধীরে গৃহাভিমুখে অগ্রসর
হইল

রূপায়ণ মােগল-সম্রাট আকবর চিতাের অধিকার করিয়া বসিয়াছেন। পরাজিত হৃতরাজ্য রাণা প্রতাপ আরাবলীর দুর্গম পাদমূলে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। সঙ্গে স্ত্রী রাণী, কন্যা অশ্রুমতী, পুত্র অমরসিংহ এবং চল্লিশজন বিশ্বস্ত প্রভুভক্ত অনুচর। উদ্দেশ্য—সংগােপনে শক্তি সঞ্চয় করিয়া প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি চিতােরের পুনরুদ্ধার করিবেন। এই মহদুদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি সৰ্ব্বস্ব-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এমন কি নিজের জীবন পর্যন্ত পণ করিয়া বসিয়াছেন। সংসারে এমন কোন কঠোরতা বা ত্যাগ-তপস্যা নাই -এই অভীতি মহাকাৰ্য্যের জন্য যাহা তিনি বরণ করিতে না পারেন। অনাহারে অনিদ্রায় দুর্বিসহ শারীরিক ও মানসিক ক্লেশ সহ করিয়া তিনি এই কঠোর ব্রত উদ্যাপনের জন্য বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। চোখের সম্মুখে প্রাণের প্রাণ পুত্ৰ অন্নাভাবে মুচ্ছিত, নয়ন- পুত্তলী কন্যা অর্ধমৃত, রাজরাজেশ্বরী সহধর্মিনী অসহ কঠোর ব্রতের কঙ্কাল প্রতিচ্ছবি;-তথাপি সঙ্কল্পে অটল, কৃচ্ছ সাধনার মহাযােগী তিনি, জীবনের মহাব্রতকে দৃঢ়রূপে আঁকড়িয়া ধরিয়া মহা-সাধনার পথে অগ্রসর হইয়াছেন। সূৰ্য্য পশ্চিমাকাশে ঈষৎ ঢলিয়া পড়িয়াছে। পরিশ্রান্ত ক্লান্ত মহারাণ। কুটীর সম্মুখে ফিরিয়া অজিনাসনে স্তব্ধ হইয়া বসিলেন। স্বভাব-গম্ভীর শৌৰ্য্যদীপ্ত মুখমণ্ডল বিষাদের গাঢ়চ্ছায়ায় পরিমান। উৎকণ্ঠিত স্বরে রাণী জিজ্ঞাসা করিলেন, কি সংবাদ। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া রাণা উত্তর করিলেন, সংবাদ বড়ই অশুভ।মােগল আমাদের সন্ধান পেয়েছে। শীঘ্রই তারা আরাবল্লীমুখে অভিযান কোরবে বােলে প্রস্তুত হােচ্ছে।

রূপায়ণ রাণীর উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাইল। জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহোলে এখন কি কোবে ? —তা-ই ভাবছি। নিকটে আশ্রয়ের উপযুক্ত স্থানও নেই। অথচ এখানে থেকে মােগলের সম্মুখীন হওয়ার মত শক্তিও নেই। রাণী স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। তঁাহারও মুখে চিন্তার গভীর ছায়া ঘনাইয়া আসিল। ঠিক সেই সময়ে পূর্বোক্ত বালক-বালিকা ক্লান্ত ঘর্মাক্ত কলেবরে সেইখানে আসিয়া দেখা দিল। ইহারা অমরসিংহ ও অশ্ৰুমতী। রাণ ও রাণী উভয়েই মুখ তুলিয়া চাহিলেন। পুত্র-কন্যার মুখের পানে চাহিয়া তাহাদের হারানাে বাহ্যজ্ঞান যেন আবার ফিরিয়া আসিল। অমর দুই বাহুতে জননীর ক১ বেষ্টন করিয়া বলিল, খেতে দাওনা মা, ক্ষিদে পেয়েছে যে ! রাণী পুত্রের মুখের পানে চাহিলেন। রাণাও চাহিলেন। উভয়েরই দৃষ্টি করুণ--বেদনায় ছল-ছল। অশ্রুমতী সে-দৃষ্টির অর্থ বুঝিল। অমরের বাহু-বেষ্টন হইতে জননীকে মুক্ত করিয়া বলিল, চল, খাবে চল। বালক উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। অশ্রুমতী তাহার হাত ধরিয়া কুটীর-মধ্যে প্রবেশ করিল। ঘরে আহাৰ্য্য নাই, কাজেই কোন বন্দোবওও হয় নাই। অমরের কথায় পিতামাতার মনে যে দুঃখ-বেদনার অতল সিন্ধু দুলিয়া উঠিয়াছে, অশ্রুমতী তাহা বুঝিয়াছিল ; তাই আর সেখানে নূতন করিয়া ঝড়ের সৃষ্টি করিয়া সে অমরকে দূরে সরাইয়া লইয়া গেল। কন্যার মনােভাব বুঝিতে পিতামাতারও বাকী রহিল না। অসহ বেদনায় তাঁহাদের চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইবার উপক্রম হইল। ১৮ রূপায়ণ কিছুক্ষণ পর্যন্ত দুইজনেই নীরব। অবশেষে রাণা গম্ভীর কণ্ঠে ডাকিলেন, রাণি । রাণী বিস্ফারিত দৃষ্টি তুলিয়া স্বামীর মুখপানে চাহিলেন। রাণ। আবার বলিলেন, রাণি, আমি সন্ধি কোবাে। রাণী উত্তর দিলেন না—বুঝি দিতে পারিলেন না। পূৰ্ব্ববৎ রাণীর মুখের পানে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। এমন কথা আর কোনদিনই তিনি স্বামীর মুখে শুনেন নাই। বুঝি শুনিবার কল্পনাও করেন নাই। কাজেই তাহার বিস্ময়ের অবধি রহিল না। অবশ্য কেন যে এই অসঙ্গত বাণী রাণার মুখ হইতে নির্গত হইল, তাহা বুঝিতে তাহার আদৌ বিলম্ব হইল না। কিন্তু আজ ত নূতন করিয়া এ-“কেন’র উদ্ভব হয় নাই, রাজ্য হারাইয়া পথচারী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ত এ-ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক হইয়াছে। এমন দিনও ত গিয়াছে—যেদিন ক্ষুধার তাড়না সহ্য করিতে না পারিয়া অমর মুচ্ছিত হইয়া ধূলায় লুটাইয়াছে, অশ্রু উথনশক্তি রহিত হইয়া এলাইয়া পড়িয়াছে। সেদিনও ত রাণার মুখ দিয়া এমন কথা বাহির হয় নাই। কিন্তু আজ ?—তবে সত্যই কি এতদিন পরে হিমালয় টলিল ? কথাটা তাহার নিকট একটা দুর্বোধ রহস্য বলিয়া মনে হইল। কিন্তু রহস্যের মায়াবরণ শীঘ্রই অপসারিত হইল। রাণা বলিতে লাগিলেন, আমি অনেক সহ কোরেছি রাণি, কিন্তু সহেরও একটা সীমা আছে। আর পারি না। অদম্য উদ্যম, দুৰ্বার অধ্যবসায় নিয়ে সারা জীবন আমি লোড়ে এসেছি--কারণ, তখন আশা ছিল, ভরসা ছিল- চিতােরের যাহােক একটা কিনারা কোরবাে। কিন্তু এখন সে-আশা, সে-ভরসা আকাশ-কুসুমের মত মিলিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে উদ্যম, রূপায়ণ অধ্যবসায়ও অন্তর্হিত হােয়েছে। তবে আর সহ কোরুবাে কিসের বলে ? সহ্য করবার সে প্রেরণা আর আমার মধ্যে নেই, আমি পারবাে না। আমি সন্ধি কোবো। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া রাণী কি যেন বলিতে যাইতেছিলেন, এমন সময় চঞ্চল আনন্দ-নৃত্যে কুটীর হইতে বাহির হইয়া অমর তঁাহার গলা জড়াইয়া ধরিল। মুখের উপর মুখ রাখিয়া উচ্ছসিত কণ্ঠে বলিল, দিদি আজ খুব কোরে পেট ভরে খাইয়ে দিয়েছে। রাত্তিরে আর কিছু খেতে হবে না। হ্যা মা, এত খাবার দিদি কোথায় পেলে ? অবােধ শিশু বুঝি না, এ-রহস্য তাহারই মত মাতারও অজ্ঞাত। অমরের কথায় মাতা-পিতা উভয়েই বিস্মিত হইয়া তাহার মুখপানে চাহিলেন। আহাৰ্য্য যাহা কিছু ছিল, রাত্রিতে সমস্তই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে, তবে কেমন করিয়া অশ্রু ইহাকে পেট ভরিয়া খাওয়াইয়া দিল। ঘটনাটা তাহাদের কাছে একটা মস্ত হেঁয়ালীর মত বােধ হইল। পুত্রের কথার কোন উত্তরই তাহারা দিতে পারিলেন না। কিন্তু উত্তর পাওয়া না পাওয়ার জন্য অমরের অত মাথা ব্যথা ছিল । উপস্থিত প্রয়ােজন শেষ হইয়াছে, অনর্থক বােবার মত বসিয়া থাকা তাহার আর সহ্য হইল না। তাই জননীর উত্তরের অপেক্ষা করিয়া নাচিতে নাচিতে সে কুটীর-সীমান্ত ছাড়াইয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। রাণা গম্ভীরকণ্ঠে ডাকিলেন, রাণি। -কি ! -অশ্রুকে একবার ডাক ত’।

রূপায়ণ - আমার বােধ হয় কাল রাত্রি থেকে সে অনাহারে আছে। আজকের উপবাস অনিবাৰ্য জেনে নিজে অনাহারে থেকে বোধ হয় সে অমরের জন্য এই খাবার লুকিয়ে রেখেছিল। এ কাজ অশ্রুমতীর পক্ষে যে আদৌ অসম্ভব নয়, রাণী তাহা বুঝিলেন। তাহার মনটা সন্দেহ-দোলায় দুলিয়া উঠিল। ডাকিলেন, অশ্রু। কিন্তু উত্তর আসিল না। আবার ডাকিলেন। উত্তরের প্রত্যাশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করিলেন। তথাপি উত্তর মিলিল না। উদ্বিগ্ন চিত্তে রাণী কুটীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। রাণ যাহা সন্দেহ করিয়াছিলেন, তাহাই ঠিক। রাত্রি হইতেই অশুমতী অনাহারে আছে। তাহাকে যে আহাৰ্য্য দেওয়া হইয়াছিল, তাহ না খাইয়া সত্যই সে অমরের জন্য সযত্নে রক্ষা করিয়াছিল। কারণ, সে নিশ্চিত বুঝিয়াছিল, কাল সপরিবারে উপবাস ভিন্ন গত্যন্তর নাই। কিন্তু অমর ত উপবাসের ক্লেশ সহ করিতে পারিবে না, ক্ষুদ্র বালক ক্ষুধায় কাতর হইয়া সৰ্ব্বাগ্রে তাহারই কাছে আসিয়া খাইতে চাহিবে। তাহার সেই ম্লান মুখ, কাতর কণ্ঠস্বর কল্পনা করিয়া ভ্ৰাতৃগতপ্রাণ ভগিনীর প্রাণ আকুল হইয়া উঠিয়াছিল, আহাৰ্য্য মুখে তুলিতে গিয়াও পারে নাই। তাই দুঃসহ ক্ষুধার ক্লেশ সহ্য করিয়া সমস্ত খাদ্য সে অমরের জন্য তুলিয়া রাখিয়াছিল। পাছে পিতা-মাতা তাহার এই অনাহারের কথা জানিতে পারেন, এই ভয়ে তাহাদের সম্মুখে সে কিছুমাত্র ব্যাকুলতা প্রকাশ করে নাই বা গৃহে একবিন্দু জলও গ্রহণ করে নাই। দ্বিপ্রহরে ক্ষুধার তাড়না একান্ত অসহ্য হইয়া উঠিয়াছিল বলিয়াই সে ঝরণার জলে পেট ভরিয়া আসিয়াছিল। ভাবিয়াছিল, ইহাতেই কোনও প্রকারে আজিকার দিনটা কাটাইয়া দিবে।

রূপায়ণ উঠিল। রাণী কুটীর-মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন অশ্রু নির্জীবের মত ভূমিতে লুটাইয়া আছে। তাহার বুকের ভিতরটা দুরু দুরু করিয়া কঁপিয়া উঠিল। ডাকিলেন, অশ্রু। অপেক্ষাকৃত ক্ষীণকণ্ঠে অশ্রুমতী উত্তর দিল, মা! রাণী কন্যার শিয়রে বসিয়া তাহার মাথাটা কোলের উপর তুলিয়া লইয়া মুখের উপর মুখ রাখিয়া পুনরায় ডাকিলেন অ-মা ! অশ্রুমতী চক্ষু মেলিয়া চাহিল। রাণী আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, বড় কি ক্ষিদে পেয়েছে মা? কন্যার মুখে শুষ্ক হাসির একটা ম্লান দীপ্তি ক্ষণিকের জন্য ফুটিয়। সে উত্তর দিল, না মা, আমার একটুও ক্ষিদে পায়নি। তবে অমন কোরে আছ কেন মা। -আমার অসুখ কোরছে। রাণী নীরবে তাহার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। তাহার পর সহসা জিজ্ঞাসা করিলেন, অমর কি খেয়ে গেল? অশ্রুমতী চুপ করিয়া রহিল। রাণী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, বল মা, তাকে কি খেতে দিলে? একটু যেন ভয়ে-ভয়ে অশ্রুমতী বলিল, কাল থেকে আমার অসুখ- অসুখ কোছিল, তাই কিছু খেতে পারিনি। সেই খাবার ছিল, তাই অমরকে খাইয়ে দিয়েছি। রাণীর দুই চক্ষু বাহিয়া দরদর ধারে অশ্রু নামিয়া আসিল। এদিকে রাণীর বিলম্ব দেখিয়া রাণা অতিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন। স্থির থাকিতে না পারিয়া প্রকৃত অবস্থা জানিবার জন্য তিনি কুটীর-মধ্যে প্রবেশ করিলেন।

রূপায়ণ অনতিবিলম্বে সমস্ত রহস্যই প্রকাশ হইয়া পড়িল। একটা মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া রাণা বলিলেন, সাধে কি সন্ধির কথা তুলেছিলাম রাণী, এ দৃশ্য যে আর বলিতে বলিতে সহসা যেন রাণার কণ্ঠবােধ হইয়া আসিল। তিনি অর্ধপথেই থামিয়া গেলেন। রাণী কোন কথা না বলিয়া নীরবে কন্যার চোখে মুখে মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মত দাঁড়াইয়া থাকিয়া রাণা হঠাৎ যেন উন্মাদের মত বলিয়া উঠিলেন, আমি চলুম রাণী, যতক্ষণ না ফিরি একে ধােরে রেখাে-মােঝতে দিও না। আমি খাবার আনতে চোলুন—খাবার আন্‌তে চোলুম। রাণা দ্রুতবেগে কুটীর হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন। রাণী অর্দোন্মাদ স্বামীর গন্তব্য পথের পানে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন। মুখ দিয়া একটী কথাও বাহির হইল না।

রূপায়ণ সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে অশ্রুমতী একটু যেন সুস্থ হইয়া উঠিল। অবসন্ন কাটিয়া যাওয়ায় সে উঠিয়া বসিল। রাণীরও বুকের উপর হইতে যেন একটা গুরুতর পাষাণ-ভার নামিয়া গেল। তিনি শােয়াস্তির নিশ্বাস ফেলিলেন। এতক্ষণ অনন্তচিত্তা হইয়া তিনি কন্যার শিয়রে বসিয়া তাহার সেবায় নিযুক্ত ছিলেন। স্বামী কোথায় গেলেন, কি করিলেন, ফিরিয়া আসিলেন কিনা এ চিন্তার অবসর তাহার আদৌ হয় নাই। এখন কন্যাকে একটু সুস্থ দেখিয়া হঠাৎ তাঁহার স্বামীর কথা মনে পড়িয়া গেল। কিন্তু কি করিবেন, কেমন করিয়া খোঁজ লইবেন, নিকটে তেমন কেহ নাই যে, তাহাকে ডাকিয়া খোঁজ করিতে বলিবেন। এক উদ্বেগ না যাইতে দ্বিতীয় উদ্বেগ আসিয়া তাহার মনকে অস্থির করিয়া তুলিল। এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল, মা । রাণী উৎকর্ণ হইলেন। আবার সেই কণ্ঠস্বর । ‘ব্যস্ত-সমস্ত’ ভাবে উঠিয়া দাড়াইতেই রাণী দেখিলেন, সম্মুখে বলবন্ত সিংহ। তাহার হাতে ভূর্জপত্রে খাদ্য-সামগ্রী। বিনীত স্বরে বলিল, মা, খুকুমণির খাবার। আনন্দে কৃতজ্ঞতায় রাণীর সমগ্র অন্তর্দেশ ভরিয়া উঠিল। কয়েক মুহূর্ত তাঁহার মুখে কথা ফুটিল না। শেষে জিজ্ঞাসা করিলেন, রাণা কোথায় ? -তা’ত জানি না মা ! তবে মনে হয় তিনিও আহাৰ্য্য সংগ্রহে বেরিয়েছেন। -তুমি যে আহাৰ্য্য এনেছ, তা কি তিনি জানেন না ? ২৪ রূপায়ণ -না মা, তা কেমন কোরে জাবেন। দেখলুম পাগলের মত তিনি অ-পথ বি-পথ ভেঙে চোলেছেন। জিজ্ঞাসা কোরে জানলুম, খুকুমণি দু’দিন অনাহারে, কথা কইবার শক্তি নাই, তাই তার জন্য আহাৰ্য্য সংগ্রহে চোলেছেন। -তুমি তাকে ফিরালে না কেন? -কেমন কোরে ফিরাব মা! আমার কাছে ত আহাৰ্য্য মজুদ ছিল । তা যদি থাকতাে, তাহােলে আর আমি তাকে যেতে দিতুম না। তিনি চোলে যেতে ভালুম, কি জানি তিনি সংগ্রহ কোতে পারেন কি পারেন তার ত ঠিক নাই, যদি বিফল হন, তা হােলে ত সর্বনাশ হবে। সাত পাঁচ ভেবে তখন নিজেই বেরিয়ে পােড় লুম। শেষ পর্যন্ত ভগবান মুখ রেখেছেন মা ! ভীল-পাড়ার ভিতর থেকে তিনি এই খাবারটুকু মিলিয়ে দিয়েছেন। বলবন্ত! তােমাকে আশীর্বাদ করবার ভাষা আমার নেই। এ সুকৃতির পুরস্কার স্বয়ং ভগবানই তোমায় দেবেন। এখন যাও বাপ, এতই যদি কোরেছ, তবে আর শেষটুকু বাকী থাকে কেন? তােমার রাণাকে খুঁজে এনে দাও। মেয়ের অবস্থা দেখে তিনি পাগলের মত ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছেন। লক্ষ্যহারা দিক্-ভ্রান্তের মত এতক্ষণ কোথায় কি কোরূছেন, কার দ্বারে গিয়ে হাত পাতছেন,—কিছুই বুঝতে পারছি না। চারদিকে শত্রু, এর ভিতর বাধা দিয়া বলবন্ত বলিল, আর বলতে হবে না মা, আমি এখুনি যাচ্ছি। যেখান থেকে পারি, তাকে খুঁজে আছি। দ্বিতীয় আদেশের অপেক্ষা না করিয়া বলবন্ত দ্রুতবেগে কুটীর হইতে বাহির হইয়া গেল।

রূপায়ন রাণী কিন্তু নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন না। তাঁহার মন নিরতিশয় উচাটন হইয়া উঠিল। চারিদিকে শত্রুর চর ঘুরিতেছে। নিঃসহায় একক স্বামী উন্মাদের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়াছেন। যদি কোনও প্রকারে অজ্ঞাত আশঙ্কায় তাহার সর্বশরীর কণ্টকিত হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি পত্ৰসমেত খাদ্যসামগ্রী অশ্ৰুমতীর সম্মুখে ধরিয়া দিয়া তিনি নিজেও ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন। অসহ ক্ষুধার ক্লেশ সহ্য করিতে না পারিয়া অশ্রুমতীর সর্বশরীর ঝিম ঝিম্ করিতেছিল। মাঝে মাঝে চক্ষু আঁধার হইয়া আসিতেছিল। অতি কষ্টে সােজা হইয়া বসিয়া সে আহাৰ্য্যগুলি কোলের কাছে টানিয়া লইল। ঠিক সেই সময়ে বাহিরে অপরিচিত কণ্ঠের স্বর শােনা গেল। অশ্রুমতী উৎকর্ণ হইল। আবার সেই স্বর। অশ্রুমতী বুঝিল, অতিথি। তাহার আর আহার হইল না। কোন প্রকারে উঠিয়া অজিন আসনখানি হাতে লইয়া বাহিরে আসিল। এবং যথারীতি অতিথির সম্বর্ধনা করিয়া তাহাকে বসিতে দিল। অতিথি আসন গ্রহণ করিয়া দুই একটী প্রশ্নে অশ্রুমতীর পরিচয় জানিয়া লইল। উপস্থিত তাহার পিতামাতা যে গৃহে নাই, ইহাও জানিতে তাহার বাকী রহিল না। প্রশ্নোত্তর শেষ হইলে অতিথি জানাইল, সে ক্ষুধার্ত। সমস্ত দিন তাহার আহার হয় নাই। অশ্রুমতী টলিতে টলিতে কুটীর-মধ্যে পুনঃ প্রবেশ করিল এবং তাহার জীবন রক্ষার একমাত্র উপায় আহাৰ্য্য সামগ্রীগুলি আনিয়া অতিথির সম্মুখে ধরিয়া দিল।

পায়ণ অতিথি আহারে বসিল। অমতী গৃহের ভিতর যাইবার জন্য এক পা এক পা করিয়া অগ্রসর হইল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিয়া উঠিল না। দরজা পর্যন্ত যাইয়াই অতি-শ্রান্তিতে সে বসিয়া পড়িল এবং পরক্ষণে সেইখানেই লুটাইয়া পড়িল। অতিথি আহারে বসিলেও এদিকে তাহার লক্ষ্য ছিল। হঠাৎ অশ্রু- মতীকে লুটাইয়া পড়িতে দেখিয়া সে আহার ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। -অশ্রু। সহসা উদাত্ত আকুল কণ্ঠে ধ্বনিয়া উঠিল অশ্রু। বিস্মিত অতিথি বিস্ফারিত দৃষ্টি তুলিয়া সম্মুখে চাহিল। দেখিল, দীর্ঘ গুম্ফশ্মশােভিত এক বিরাট পুরুষ। হস্তে ভূর্জপত্ৰে আহাৰ্য্য বস্তু। প্রথম দৃষ্টিতেই অতিথি মহারাণা প্রতাপকে চিনিল। শ্রদ্ধা ও সন্ত্ৰমে তাহার মনটা যেন নত হইয়া আসিল। রাণা কিন্তু অতিথিকে লক্ষ্য করিলেন না। দ্রুতপদে কুটীরের দার পৰ্য্যন্ত আসিয়াই তিনি থমকিয়া দাড়াইলেন। এ কি! অশ্রু। এখানে! এমন অবস্থায় ! তাহার বুক ফাটিয়া কান্না জাগিল। গভীর আর্তকণ্ঠে ডাকিলেন, অ-মা আমার! কোথায় অশ্রু ? কে উত্তর দিবে ? শৈল-প্রকৃতির পাষাণ-বুকে সে আর্তস্বর প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া আসিল। গ সন্ধ্যার ছায়া তখন নিবিড় হইয়া আসিয়াছে। স্তব্ধ শোকাহত মহারাণা কন্যার শব-পার্শ্বে বসিয়া নীরবে অশ্রু বিসর্জন করিতেছেন। অতিথি কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া পশ্চাৎ হইতে আর্দ্র গম্ভীর কণ্ঠে ডাকিল, মহারাণ! ২৭ রূপায়ণ মহারাণা মুখ তুলিয়া চাহিলেন। দৃষ্টি করুণ-সজল। কিন্তু পর- ক্ষণেই তাহার দুই চক্ষু অস্বাভাবিকরূপে বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। অতিমাত্র বিস্ময়ে তিনি অভিভূতের মত বলিয়া উঠিলেন, সম্রাট। উত্তর হইল, আর সম্রাট নই—অতিথি। মহারাণা, এ দৈবের নির্বন্ধ -খণ্ডন করবার উপায় নাই। অতিথির ছদ্মবেশ ধােরে আমিই এই সােনার প্রতিমাকে অকালে মৃত্যুর হাতে তুলে দিয়েছি, বুঝতে পারিনি যে এ অভুক্ত ছিল। মহারাণা, আমার প্রায়শ্চিত্ত ? মহারাণার বক্ষ ভেদ করিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস উঠিল। কিছুক্ষণ নীরব , থাকিয়া তিনি গভীর কণ্ঠে ডাকিলেন, সম্রাট, বাধা দিয়া সম্রাট বলিলেন, বোলেছি ত ভাই, আর আমি সম্রাট নই- অতিথি। ও সম্বােধনে আর আমায় লজ্জা দেবেন না। মহারাণা উঠিয়া দাড়াইলেন। বলিলেন, উত্তম—আসন গ্রহণ করুন। -কোরবে, কিন্তু তার পূর্বে আমি একটা প্রতিশ্রুতি চাই। আর একবার মহারাণা প্রতাপের বিস্মিত দৃষ্টি সম্রাট আকবরের মুখের উপর নিবদ্ধ হইল। জিজ্ঞাসা করিলেন, কি প্রতিশ্রুতি ? -প্রতিশ্রুতি চাই যে আপনি আমার প্রার্থনা পূর্ণ কোরূবেন। প্রার্থনা ! রাণার প্রদীপ্ত ললাটে চিন্তার রেখা ফুটিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ নীরবে কি চিন্তা করিয়া অবশেষে বলিয়া উঠিলেন, উত্তম, কি প্রার্থনা বলুন। -প্রার্থনা আপনার বন্ধুত্ব—আপনার হৃদয়। মুহূর্তের মধ্যে কি যেন একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল। মহারাণা ডাকিয়া উঠিলেন, সম্রাট। -আর সম্রাট নই-ভাই। মহারাণা,প্রতাপসিংহ। ২৪ রূপায়ণ বলিতে বলিতে সম্রাট বাহু-বেষ্টনে রাণাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিলেন। রাণাও প্রতি-আলিঙ্গন দিয়া তাহার প্রতিশ্রুতি পালন করিলেন। নির্জন শৈলের পাষাণ-ক্রোড়ে চিতাের-কুললক্ষ্মীর শবপার্শ্বে ভারতের দুই শ্রেষ্ঠ শক্তির আকস্মিক সম্মিলন। অপূৰ্ব্ব-অভিনব কল্পনাতীত। আকাশে সন্ধ্যাতারা হাসিল। তাহার মৌন আশীর্বাদ আলিঙ্গনবদ্ধ সেই যুগল বিরাট পুরুষের মাথার উপর নীরব ধারে নানিয়া আসিল।

ইজ্জতের দায় নায়েবের অসহ অত্যাচার সহ্য করিয়া জ্বরে পুঁকিতে ধুকিতে হাতেম যখন গৃহে ফিরিল, তখন দিবালােকের শেষ রশ্মি গাছের মাথা হইতে সরিয়া গিয়াছে। স্ত্রী জরিনা অনাহারে অনিদ্রায় দুই হাত তুলিয়া খােদার কাছে দোয়া মাঙিতেছিল, তাই স্বামীকে পাঁচিলের দরজায় পা দিতে দেখিয়াই তাহার বুকখানা যেন দশ হাত হইয়া উঠিল। সে এক রকম ছুটিয়া বােয়াক হইতে উঠানে আসিয়া পড়িল। কিন্তু আসিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার মুখ শুকাইয়া গেল। যাহা আশঙ্কা করিয়াছিল, ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে। স্বামীর সর্বশরীরে নির্মম অত্যাচারের জ্বলন্ত চিহ্ন ফুটিয়া আছে। জরিনা তাড়াতাড়ি তাহাকে ধরিয়া কোন রকমে ঘরের মধ্যে লইয়া শােয়াইয়া দিল । তিন বৎসরের উপযুপরি অজন্মার ফলে সমস্ত পরগণায় হাহাকার জাগিয়া উঠিয়াছে। দিন-মজুর যাহারা, তাহাদের ত কথাই নাই; দুই দশ বিঘা জমিজমা যাহারা রাখে, তাহাদের অবস্থাও মর্মান্তিক। হাতেম এই শেষােক্ত শ্রেণীরই পল্লী-গৃহস্থ। তিন বৎসরের দৈব-বিড়ম্বনায় সে রূপায়ণ সৰ্বস্বান্ত—পেটের ভাত জোটাতেই পারিতেছে না, জমীদারের দাবী পূরণ করিবে কোথা হইতে ? অবস্থা সকলেরই সমান, দুই পাঁচ বিঘা জমী বন্ধক রাখিয়া যে টাকার যােগাড় করিবে, সে উপায়ও নাই কাজেই তিন বৎসরের মধ্যে খাজনা বাবদ একটী পাই পয়সাও দেওয়া সম্ভব হইয়া উঠে নাই। এদিকে দুর্দান্ত জমীদার, ততধিক দুর্দান্ত তাহার নায়েব। এ অবস্থায় সচরাচর যাহা ঘটিয়া থাকে, তাহাই ঘটিয়াছে। গত দুই দিন ধরিয়া হাতেম, নায়েবের হুকুমে কাছারীতে আবদ্ধ ছিল। মারপিট অত্যাচারও তাহার উপর যথেষ্ট চলিয়াছিল। শেষে তিন দিনের মধ্যে যেমন করিয়াই হউক, হাল খাজনা পৰ্যন্ত শােধ দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া সে প্রাণ লইয়া বাড়ী ফিরিয়াছে। রাত্রি প্রায় একটার সময় হাতেমের ঘুম ভাঙিয়া গেল। জ্বরের প্রকোপ তখন অনেকখানি কমিয়া আসিয়াছিল। সে চোখ মেলিয়া দেখিল ঘরের মধ্যে তখনও মিট মিট করিয়া আলাে জ্বলিতেছে—আর জরিনা শিয়রে বসিয়া তাহার কপালে হাত বুলাইতেছে। সে কাতর কণ্ঠে ডাকিল,-জরিনা। অ- কি! -তুমি এখনও জেগে বোসে আছ ? -হা--তুমি ঘুমােও। রাত জাগলে আবার জ্বর বাড়বে। —আর বাড়বে ! একটা টানা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া হাতেম অতিকষ্টে পাশ ফিরিয়া শুইল। জরিনা নীরবে স্বামীর বেদনা-ক্লিষ্ট পীড়িত মুখের পানে চাহিয়া রহিল। কি একটা কথা বলিতে গিয়াও বলিতে পারিল না, বুঝি কান্নায় তাহার কণ্ঠরােধ হইয়া আসিল।

রূপায়ণ
অনেকক্ষণ পর্যন্ত উভয়েই নীরব। শেষে হাতেম আৰ্ত্তকণ্ঠে আবার
ডাকিয়া উঠিল-জরিনা!
জরিনা পূৰ্ব্ববৎ উত্তর দিল-কি!
-এখান থেকে চোলে যেতে পারবে ?
-ওসব কথা এখন থাক। ও নিয়ে আর এখন মাথা ঘামিয়ে
দরকার নেই। আগে ভাল হােয়ে ওঠো, তারপর যা হর করা যাবে।
—ভাল হহয়ে উঠবে।
কথাটা শ্লেষাত্মক বটে, কিন্তু বড় করুণ এবং হাতেমের কণ্ঠে তাহ!
আর্তনাদের মত ফুটিয়া উঠিল। জরিনার দুই চক্ষে বড় বড় দুইটা অশ্রুর
ফোটা ম্লান দীপালােকে মুক্তা বিন্দুর মত ঝকিয়া উঠিল। সে কথা
বলিতে পারিল না।
হাতেম আবার জিজ্ঞাসা করিল–কিছু বােলে না যে?
করুণ কণ্ঠে জরিনা বলিল—কি।
—এখান থেকে চোলে যেতে পারবে ? আর সহ কোতে পারি না।
-তা-ই যদি ভাল মনে কর,তাহােলে যাবনা কেন ? কিন্তু এখন
সে কথা থাক,-একটু ঘুমােও, কাল সকালে উঠে যাহােক একটা ঠিক
করা যাবে।
-বেশ সেই ভাল।
হাতেম চুপ করিল। জরিনা পূর্বের মতই শিয়রে বসিয়া তাহার
কপালে হাত বুলাইতে লাগিল ।

রূপায়ণ হাতেম পিতৃমাতৃহীন এবং নিঃসন্তান। কাজেই তাহার সংসারে সে এবং জরিনা ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তি কেহ ছিল না। নিঃসন্তান হওয়াটা তাহার পক্ষে বিধাতার অভিসম্পাত কি আশীৰ্বাদ তাহা বুঝিয়া উঠাটা ঠিক সহজ ব্যাপার ছিল না। কারণ, এ সম্পর্কে তাহাদের উভয়কেই যেন উদাসীন বলিয়া মনে হইত। পুত্রকন্যা হইলে তাহারা যে বিশেষ সুখী হইত কিম্বা না হওয়ার দরুণ এখন যে বিশেষ দুংখিত, তাহাদের কথা-বার্তায় আচার-ব্যবহারে বা চাল-চলনে তাহা মােটেই বুঝা যায় না। পিতার আমলের যে দুই দশ বিঘা জমি ছিল, তাহাই ‘চাষবাস’ করিয়া হাতেম কোনও রকমে দিনপাত করিত। পরিশ্রমে কোন দিন সে ‘পিছ-পাও’ ছিল না। স্বাস্থ্য-সুন্দর সবল দেহখানিই ছিল তার সম্বল এবং সেই ‘সম্বলের বলেই সে অহােরাত্র অসুরের মত পরিশ্রম করিয়া যাইত। জরিনাও ছিল পতির উপযুক্ত পত্নী। তাহার যৌবন-সুন্দর সুগােল সুঠাম অথচ বলিষ্ঠ দেহে স্বামীরই মত অসাধারণ কর্মশক্তি নিহিত ছিল। কাঠ-চেলা, ধান-ভানা হইতে আরম্ভ করিয়া ঘর-সংসারের সমস্ত খুঁটী নাটী কাজই সে নিজের হাতে করিয়া যাইত। এ-সবের জন্য হাতেমকে আদৌ মাথা ঘামাইতে বা বেগ পাইতে হইত না। শুধু মাঠের কাজ লইয়াই সে ব্যস্ত থাকিত। সমস্ত দিনের হাড়-ভাঙা খাটুনীর পর সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত দেহখানি লইয়া সে যখন বাড়ী ফিরিত, তখন দেখিত ধরে মাটীর প্রদীপ জ্বালাইয়া তাহারই প্রতীক্ষায় সন্ধ্যালক্ষ্মীর মত দ্বারপার্শ্বে দাড়াইয়া জরিনা। কোমল লাবণ্যে ঢলঢল সেই হাসি হাসি রূপায়ণ মুখখানি-স্নিগ্ধ শান্ত দৃষ্টিমাখা, সুনীল-সায়রে-ফোটা সেই কমল আঁখি দু’টী••••••হাতেমের সর্ব ক্লান্তি সর্ব অবসাদ মুহূর্তের মধ্যে যেন যাদুমন্ত্রে কোথায় উড়িয়া যাইত। অভিনব আনন্দ-প্রেরণায় তাহার সমস্ত দেহ-মন যেন উজ্জীবিত হইয়া উঠিত। এই ভাবে দিন কাটিতেছিল। সহসা অজন্মা-রাক্ষসী আসিয়া তাহার বিকট মুখ ব্যাদান করিয়া বসিল। শান্তিময় সংসার-জীবনের উপর প্রলয়-ঝঞ্চার ঝঙ্কার-রােল বাজিয়া উঠিল। খানিকটা বেলা হইয়াছে। হাতেম বিছানা হইতে উঠিয়া বাহিরে রােয়াকের উপর আসিয়া বসিয়াছে, এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল, হাতেম বাড়ী আছ ? —আমি শান্তিরাম, একবার বাইরে এস ত। জ্বর ছাড়িয়া গিয়াছিল বটে, কিন্তু সর্বাঙ্গে প্রহারের বেদনা একটুও কমে নাই। কাজেই বেশী চলা-ফেরা করা হাতেমের পক্ষে বিশেষ কষ্টসাধ্য ছিল। তথাপি সে আগন্তুককে ফিরাইয়া দিতে পারিল না। এটা একেবারেই তাহার স্বভাব-বিরুদ্ধ। সে জবাব দিল, বােসদ দাদা যাচ্ছি। কথা শেষ করিয়াই হাতেম উঠিবার উপক্রম করিল। জরিনা নিকটেই দাঁড়াইয়াছিল। বাধা দিয়া বলিল, ওগাে, এই দেহ নিয়ে আর যায় না। বােলে দাও-অন্য সময় গিয়ে দেখা কোরে আবাে। হাতেম একটা শুষ্ক ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল, বাড়ী পর্যন্ত কষ্ট কোরে এসেছে, দেখা না-করাটা কি ভাল দেখায় ? তাহার পর একটু রূপায়ণ খানি থামিয়া বলিল, তুমি সেই ছোেট লাঠিটা এনে দাও দেখি, একটা কিছুতে ভর না দিলে যেতে পারবাে না। রাগে অভিমানে মুখখানি ভার করিয়া জরিনা বলিল, তবু যেতে হবে ? পূৰ্ব্ববৎ হাসিয়া হাতেম বলিল, কি কোরূবাে জরি, মানুষ বাড়ীতে এসেছে- বাধা দিয়া জরিনা বলিয়া উঠিল, থাক্‌ হােয়েছে, আর বােলতে হবে না। ছােট লাঠি গাছটী আনিয়া স্বামীর পাশে রাখিয়া সে ক্ষুব্ধ অভিমানে রান্না ঘরের দিকে চলিয়া গেল। হাতেম আর একবার ম্লান হাসি হাসিল। তাহার পর লাঠির উপর ভর দিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া বাহিরে গেল। কিছুক্ষণ পরে জরিনা রান্নাঘর হইতে স্বামীর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইল। সে উৎকর্ণ হইল। সুস্পষ্টরূপে শুনিতে পাইল-হারামজাদা, শয়তান, পাজী ! জরিনা রান্নাঘর হইতে ছুটিয়া বাহিরে—একেবারে পাঁচিলের দরজার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। উকি মারিয়া দেখিল, আগন্তুক তখনও দাড়াইয়া। তাহার মুখে একটা হিংস্র ক্রুর হাসি। বাঘের মত গর্জন করিয়া হাতেম বলিয়া উঠিল, এখনও দূর হ বছি, নইলে তাের মুণ্ডু ছিড়ে নেব। আচ্ছা- সেই ক্রুর হাসি মুখে লইয়া আগন্তুক ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। হাতেম ঠিক দরজার সম্মুখেই দাড়াইয়াছিল। জরিনা তাহার হাত ধরিয়া ভিতরে টানিয়া আনিল। মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহা রক্তের মত লাল হইয়া উঠিয়াছে, চোখ দুইটী আগুনের গোলার মত ধক রূপায়ণ ধ করিয়া জ্বলিতেছে। হাত দুইটা দৃঢ়ভাবে মুষ্টিবদ্ধ। চিরশান্ত সহন- শীল স্বামীর এই উন্মাদ মূর্তি দেখিয়া জরিনার চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইতে চাহিল। কোনরূপে আত্মসংবরণ করিয়া সে তাহাকে ধরিয়া ঘরের দিকে লইয়া চলিল । হাতেমও আপত্তিমাত্র না করিয়া যন্ত্র- চালিতের মত পত্নীর সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বােয়াকে গিয়া উঠিল। রােয়াকে উঠিয়াই হাতেম আধ-ভাঙা জলচৌকীখানির উপর মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। ভিতরে গিয়া শুইতে বলায় সে ঘাড় নাড়িয়া অসম্মতি জানাইল। একদিন নয়, দুইদিন নয়-- আজ দীর্ঘ দশ বৎসর কাল জরিনা স্বামীর ঘর করিতেছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একদিন এক মুহূর্তের জন্যও সে স্বামীকে রাগিতে বা রূঢ় কথা বলিতে দেখে নাই বা শােনে নাই। স্বামী যে রাগ করিতে বা রূঢ় কথা বলিতে পারে বা জানে, এ ধারণাই তাহার ছিল না। আজিকার এ অভিজ্ঞতা তাহার পক্ষে একান্ত আকস্মিক–অপ্রত্যাশিত। ইহা তাহার মনের মধ্যে একটা আসন্ন অমঙ্গলের গুরু-আশঙ্কা জাগাইয়া তুলিল। সে বেশ বুঝিতে পারি, সামান্য কারণে এ হিমাচল টলে নাই; নিশ্চয় একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটিয়াছে। কিন্তু সে ‘কিছু যে কি, তাহা সে ধারণায় আনিতে পারিল না। স্বামীর পাশে বসিয়া ধীরে ধীরে তাহার চুলে হাত বুলাইতে বুলাইতে সে সহানুভূতি-ভরা কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, কি হয়েছিল, ওকে অমন কোরে বােছিলে কেন? হাতেম উত্তর দিল না। একটা মর্মভেদী দীর্ঘ শ্বাসের সঙ্গে একবার হশব্দ করিল মাত্র।

রূপায়ণ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জরিনা পুনরায় জিজ্ঞাসা করি, ও বােছিল কি ? হাতেম সহসা মাথা তুলিয়া স্ত্রীর মুখের পানে চাহিল। উন্মাদের মত বলিয়া উঠিল—জরি, এখনি এখান থেকে চল। আর দেরী না, এক লহমাও না। বলিতে বলিতে একটা অস্বাভাবিক উত্তেজনার বশে সে উঠিয়া দাড়াইল। জরিনা যেন থতমত খাইয়া গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আত্মসম্বরণ করিয়া স্বামীর ডান হাতখানি চাপিয়া ধরিয়া বলিল, কি হয়েছে খুলে বল, আমি যে কিছুই বুঝতে পাছি না। -বুঝতে পারূছে না? নায়েবের দূত এসেছিল—তােমাকে নায়েবের কাছে পাঠিয়ে দেবার জন্য উপদেশ দিতে। তা যদি দিতে পারি, তবেই আমার রেহাই, নইলে বুকে বাশ ডডালে, মুখে রক্ত তুলে আমাকে শেষ কোবে-বুঝলে ? বলিতে বলিতে হাতেমের দুই চোখে শীকার-লােলুপ বাঘের হিংস্র দীপ্তি ফুটিয়া উঠিল জরিনা স্বামীর উত্তরের শেষ পর্যন্ত শুনিতে পাইল না। তাহার মাথার ভিতর এক সঙ্গে সহস্র ঝিল্লী ডাকিয়া উঠিল। সর্বশরীর অসাড় হইয়া আসিল। সে সেইখানেই মেঝের উপর বসিয়া পড়িল। হাতেম কিন্তু তাহার দিকে লক্ষ্য করিল না। সে যেন উন্মাদ। মাতালের মত টলিতে টলিতে ঘরের মধ্যে গিয়া সামান্য আসবাবপত্র যাহা কিছু ছিল, বাহিরে টানিয়া ফেলিতে আরম্ভ করিল। তাহার পর একটা বিকৃত আর্ত-চীৎকারে একান্ত অবসাদভারে মাটীতে লুটাইয়া । পড়িল।

রূপায়ণ দুই প্রহরের কিছু আগে কাছারীর জন কয়েক পাইক আসিয়া বাড়ীর সম্মুখে হাঁক ডাক জুড়িয়া দিতে হাতেম চক্ষু মেলিয়া চাহিল। তাহার সমস্ত শরীর তখন ঝিম্ ঝিম্ করিতেছে। এতক্ষণ সে ঘুমাইয়াছিল কি জাগিয়াছিল, কিছুই যেন ঠিক করিয়া উঠিতে পারিল না। সকাল বেলা-কার ঘটনাটা তাহার কাছে একটা স্বপ্নের মত মনে হইলে লাগিল। কিন্তু এসব বিষয় চিন্তা করিবার তাহার বিশেষ অবসর ঘটিল না। পাইক- দের হাঁকাহাঁকি তাহার চিন্তার মাঝে ব্যাঘাত ঘটাইতে লাগিল। সে প্রথমটা ঠিক করিতে পারিল না, বাহিরে কিসের হাঁকাহাঁকি বা গণ্ডগােল চলিতেছে; কিন্তু যখন সুস্পষ্টরূপে শুনিতে পাইল যে, কাহারা তাহার নাম ধরিয়া ডাকাডাকি করিতেছে, তখন সে আর শুইয়া থাকিতে পারিল না। ধীরে ধীরে উঠিয়া ঘরের বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। পাঁচিলের দরজা খােলা ছিল। সেই খােলা দ্বারপথে বােয়াক হইতে নীচু হইয়া উকি মারিতেই হাতেমের ভ্রম ঘুচিয়া গেল। অল্পক্ষণ পূর্বে যেটাকে সে স্বপ্ন মনে করিতেছিল, সেইটাই এখন কঠোর বাস্তবের মুৰ্ত্তি লইয়া তাহার চক্ষুর সম্মুখে ফুটিয়া উঠিল। মুহূর্তের মধ্যে তাহার ভিতরের সুপ্ত সিংহ গর্জিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে কি যেন এক যাদুমন্ত্রে তাহার দেহের সর্ব অবসাদ গ্লানি কোথায় উড়িয়া গেল। অসহ ক্রোধে সে চালের ‘বা’ হইতে বাঁশের লাঠিটা পাড়িয়া তাহাকে সজোরে মেঝের উপর ঠুকিয়া এক লাফে উঠানের মাঝখানে গিয়া পড়িল। অকস্মাৎ ঝড়ের মত আসিয়া জরিনা দুই বাহু বিস্তার করিয়া তাহার গতিপথ রােধ করিয়া দাড়াইল। হাতেম গৰ্জন করিয়া ৩ত রূপায়ণ বলিল, পথ ছাড় জরিনা—আজ আমারি একদিন কি ওদেরি একদিন। জরিনাও মরিয়া হইয়া আসিয়াছিল। সে যথাশক্তি লাঠিসমেত স্বামীর হাতখানি চাপিয়া ধরিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, না তুমি যেতে পাবে না, —আমি যেতে দেব না। জরিনার কথা শেষ হইতে না হইতেই পাঁচ সাতজন পাইক ‘হুড় হড় করিয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। জরিনা এতদূর কল্পনাও করে নাই। কাজেই বে-ইজ্জতির ভয়ে সে স্বামীর সম্মুখ হইতে সরিয়া দাঁড়াইল। হাতেম ‘মরিয়া হইয়া পাইকদিগকে লক্ষ্য করিয়া তাহার যমদণ্ড-সদৃশ লাঠি তুলিল, কিন্তু জরিনার নিষেধ-ইঙ্গিতে সেই উত্তোলিত লাঠি পর- মুহুর্তেই নামিয়া আসিল। কেশরী বাগুরাবদ্ধ হইল। পাইকদল আর কাল বিলম্ব না করিয়া বিজয় গর্বে বন্দীকে লইয়া কাছারীর উদ্দেশে যাত্ৰা করিল। জরিনা দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া সমস্তই দেখিল। বাধা দিল না বা সাহায্যের জন্য কাহাকেও চীৎকার করিয়া ডাকিল না। নিরপেক্ষ দশকের ন্যায় সমস্তই নীরবে দেখিল। আজ চক্ষু তাহার মরুভূমি, সেখানে একবিন্দু জল নাই; মুখে তাহার অসীম ঔদাস্য, মমতা বা অনুকম্পার ছায়া মাত্র সেখানে নাই। আর অন্তর? সেখানে বুঝি শূন্য নৈরাশ্যের অসীম ছায়া, আশার অস্পষ্ট ক্ষীণ আলাে-রেখাও বুঝি চিরতরে মুছিয়া গিয়াছে।

রূপায়ণ 3 গ্রামের সকলেই প্রায় শশব্যস্ত। হাতেমের উপর যে অত্যাচার হইয়াছে এবং এখনও হইতেছে, সে অত্যাচার যে-কোন মুহূর্তে যে-কোন লোকের উপর যে হইতে পারে, একথা গ্রামের ছেলে মেয়ে বুড়ো সকলেই বুঝিল। কাজেই সকলেই সশঙ্ক এবং পাছে কোন রকম দোষ ঘাড়ের উপর আসিয়া পড়ে, এই ভয়ে হাততমের উপর এতখানি অত্যাচার হওয়া সত্বেও কেহ তাহার হইয়া মুখে ‘রা’ শব্দটী উচ্চারণ করিল না। এমন কি দু’পর বেলায় এই অমানুষিক কাণ্ড হইয়া যাওয়ার পরও তাহার স্ত্রীর কি অবস্থা হইল—সে মরিল কি বাঁচিল, এ খবরটাও কেহ লইল না। কে জানে যদি হিত করিতে গিয়া বিপরীত ঘটিয়া বসে। * সন্ধ্যা অনেকক্ষণ কাটিয়া গিয়াছে। বেশ একটু রাত্রি হইয়া আসিয়াছে। হঠাৎ একটা গােঙানির সঙ্গে অস্ফুট আৰ্ত্ত চীৎকার শুনিয়া জনৈক পথ চতি প্রতিবেশী পাঁচিলের খােল। দরজা দিয়া হাতেমের বাড়ীর মধ্যে ভয়ে ভয়ে একবার উকি মারিল। কিন্তু উকি মারিয়া যাহা দেথিল, তাহাতে সে আর স্থির থাকতে না পারিয়া ছুটিয়া বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল। উঠানের মাঝখানে দাউ দাউ করিয়া আগুণ জ্বলিতেছে, আর সেই আগুণের ভিতর হইতেই গােঙানির সঙ্গে অস্ফুট আর্তনাদ শোনা যাইতেছে। ইজ্জৎ রক্ষার কোন উপায় না দেখিয়া জরিনা কেরােশিনের আগুণে আত্মাহুতি দিয়াছে। প্রতিবেশী উচ্চ চীৎকারে সকলকে ডাকিয়া প্রাণপণ চেষ্টায় আগুণ নিভাইয়া ফেলিল বটে; কিন্তু অভাগিনীকে আর ফিরিয়া পাওয়া গেল না। আগুণ নিভিবার 3 রূপায়ণ পূৰ্বেই তাহার পুণ্য আত্মা কলুষ দৃষ্টির সীমা ছাড়াইয়া বহুদূরে চলিয়া গেল। মুহূর্তের মধ্যে একথা গ্রামময় রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র পল্লী একটা অজ্ঞাত আশঙ্কায় যেন শিহরিয়া উঠিল। রাত্রি প্রায় দ্বিপ্রহরের সময় দুইজন পাইক হাতেমকে বাড়ীতে পৌছাইয়া দিল। সংবাদ শুনিয়া নায়েব স্বেচ্ছায় তাহাকে মুক্তি দিয়াছে। দিবেই বা কেন, যাহার জন্য এত করা, সে-ই যখন চলিয়া গেল, তখন আর ইহাকে আটকাইয়া রাখায় লাভ কি ? হাতেম ধীরে ধীরে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া উঠানের মাঝখানে যেখানে জরিনার শবদেহ ঘেরিয়া প্রতিবেশীরা বসিয়াছিল, সেইখানে গিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর বিস্ফারিত নির্নিমেষ দৃষ্টিতে পত্নীর বিকৃত মুখের পানে চাহিল। সহসা একটা আর্ত চীৎকারে উপস্থিত সকলেই চমকিয়া উঠিল। যখন চমক ভাঙিল, তখন দেখিল, উন্মাদ হাতেম মৃত। পত্নীর দগ্ধ শব বুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে। ৭১ প্রায়শ্চিত্ত বন্দেমাতরম। কলিকাতার——ীটের দীনেশদের প্রাসাদতুল্য বাড়ীর দো-তালার ঘরে দীনেশ ও তাহার বন্ধু রশীদ কি একটা তর্কে মশগুল ছিল, এমন সময়ে বাহিরে রাস্তার উপর সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হইল—বন্দেমাতরম! দীনেশ তাড়াতাড়ি উঠিয়া জানালার ধারে গিয়া দাঁড়াইল। প্রায় পাঁচ শত সুশিক্ষিত সত্যাগ্রহী শ্রেণীবদ্ধ হইয়া চলিয়াছে। তাহাদের বুকে অদম্য উৎসাহ, মুখে অনন্য দৃঢ়তা, চোখে প্রশান্ত ভাস্বর দীপ্তি। রাস্তার দুই পার্শ্বে ভিড় করিয়া লােক জমিয়াছে—মুক্তি-সংগ্রামের সেই অজেয় সৈনিকদলকে অভিনন্দন দিতে, প্রাণের অর্ঘ্য নিবেদন করিতে । একা দেখিয়া দীনেশের বােধ হয় তৃপ্তি হইল না। তাই রশীদকে ডাকিয়া কহিল,-আরে দেখুলে না, শীগগির এসস, চোলে গেল যে। ঔদাস্তের সুরে রশীদ উত্তর দিল, যাকগে। সে যেমন বসিয়া ছিল, তেমনি বসিয়া রহিল। দীনেশ আর তাহাকে ডাকিল না। সে দেখিতে লাগিল—মুক্তি-সংগ্রামের যাত্রীদলের সেই ৪২ রূপায়ণ প্রাণস্পর্শী অপূর্ব শশাভাযাত্রা। তাহার দৃষ্টি সম্রমে পরিপূর্ণ, অন্তর ভাব-প্রেরণায় ভরপুর। শোভাযাত্রা চলিয়া গেল। দূরে-দূরে-আরাে দূরে। যখন দৃষ্টি পথের একেবারে বাহিরে গিয়া পড়িল, তখন দীনেশ তাহার পূৰ্ব্বস্থানে আসিয়া আসন গ্রহণ করিয়া অনুযােগের সুরে বন্ধুকে বলিল, তােমার সঙ্গে আজ ঝগড়া কোরূববা আমি। একটু যেন ম্লান হাসি হাসিয়া রশীদ বলিল, কেন? -কেন, তা আবার জিজ্ঞাসা কোছ? দেশের মধ্যে এত বড় একটা ব্যাপার আরম্ভ হােয়েছে, আর তার প্রতি তােমার এতটুকু সহানুভূতি নেই ? -কেমন কোরে জালে- সহানুভূতি নেই ? -এততেও জাতে বাকী থাকে? ঘরের পাশ দিয়ে সব চোলে গেল, আর তুমি একবার চোখ তুলে চেয়ে দেখা দরকার বােলে মনে কোলে না। রশীদ পূর্বের মতই শুষ্ক হাসি হাসিয়া বলিল, চোখ তুলে চাইলেই বুঝি সহানুভূতি দেখানো হয় আর না চাইলেই কথাটা শেষ না করিয়াই হঠাৎ কি ভাবিয়া রশীদ বলিয়া উঠিল, যাক, এ নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই ভাই, এখন অন্য কথা বলল। দীনেশ নাছােড়বান্দা। সে বলিয়া উঠিল, অমন ধামা চাপা দেওয়া চোবে না। তােমার কি argument আছে দেখাও, প্রমাণ করে যে এই movement এর প্রতি তােমার সহানুভূতি আছে। -না হয় মনে করাে নেই। অমন অসঙ্গত কথাই বা মনে কোবে কেন ভাই- রূপায়ণ রশীদ ও দীনেশ উভয়েরই দৃষ্টি ঘরের দরজার পথে নিবদ্ধ হইল। সহসা দীনেশ এক প্রকার লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, এই যে দিদি, দেখােত দিদি, কি অন্যায়। সােজাসুজি বােলে বােল কিনা না হয় মনে করাে নেই ? বােলতে একটু আটকালােও না। দিদি তাঁহার স্বাভাবিক গম্ভীর মুখখানি তুলিয়া রশীদের পানে চাহিলেন, তাহার পর বলিলেন, ঠিকই ত ভাই, এমন কথা কি মুখে তুলে বােলতে আছে ? রশীদ প্রথমটা যেন একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল। পরে কোন রকমে সে ভাবটা কাটাইয়া বলিল, কি কোরূবব, ও যে নাছােড়বান্দা। -তাতে তাে ওর দোষ দেওয়া যায় না ভাই, কাজ দেখেই মানুষ মানুষের অন্তরের বিচার করে। আমি ওঘর থেকে সবই দেখেছি। processionটা যখন এলাে, তখন ও ছুটে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালাে, কিন্তু তুমি রইলে চুপটী কোরে বােসে। এর জন্য যদিও তােমার ভিতরে sympathyর অভাব বুঝে থাকে, তাহােলে ত ওকে দোষী করা হলে না। —দোষী তত করিনি। শুধু ওর জুলুমের চোটে কথাটা বলতে বাধ্য হােয়েছি। কথাটা শেষ করিয়া রশীদ একবার দিদির মুখের পানে চাহিল। কিন্তু পরক্ষণেই আপনা হইতেই যেন তাহার মাথাটা নীচু হইয়া আসিল। দিদি বলিলেন, যাক, তাহােলে আর বাড়াবাড়ি-ঝগড়া ঝাটি কোরে কাজ নেই। দীনেশ বলিয়া উঠিল, ঝগড়া আমি কোরবই—যদি না ও-কথাটা প্রত্যাহার করে। 33

রূপায়ণ
দিদি আবার একটু হাসিলেন। তাহার পর রশীদকে বলিলেন, আচ্ছা
ভাই, তুমি কথাটা প্রত্যাহারই করাে নইলে ও পাগল ত শুনবে না।
-বেশ, তাই হােক, আমি প্রত্যাহার কোছি।
-আমিও মাপ চাইছি
বলিয়াই দীনেশ আসন হইতে উঠিয়া হাত বাড়াইল।
রশীদ ও
বাড়াইল।
বন্ধুতে বন্ধুতে করমর্দন হইয়া সকল তর্ক বিতর্ক ও ঝগড়া
ঋটির অবসান হইল।
ক
a৫

রূপায়ণ দীনেশ ও রশীদের বন্ধুত্ব ছেলেবেলা হইতে। জ্ঞানােন্মষের সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের মধ্যে যে পরিচয় ও বন্ধুত্বের সঞ্চার হইয়াছিল, সেই পরিচয় ও বন্ধুত্ব আজ গাঢ় হইয়া এই দুইটা ভিন্ন ধৰ্মী ও ভিন্ন সম্প্রদায়ের ছেলেকে যেন অভিন্ন করিয়া তুলিয়াছে। পাশাপাশি দুইখানি বাড়ীতে এই দুইটী পরিবারের বাস, সুতরাং দীনেশ ও রশীদ ছাড়া পরিবার দুইটীর প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। তবে দীনেশ ও রশীদের মধ্যে যে পরিচয়, সে পরিচয়ের সহিত অন্য কাহারও পরিচয়ের তুলনা হয় না। দীনেশের পিতা অবসরপ্রাপ্ত ডিষ্ট্ৰীক্ট, জজ, তাহার সন্তান-সন্ততির মধ্যে কমলা ( দিদি) ও পুত্র দীনেশ। আর রশীদের পিতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা এ্যাডভােকেট। রশীদ-ই তঁহার একমাত্র সন্তান। সুতরাং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা বিলাস-ব্যসনের কোন অভাবই এই দুই পরিবারের কাহাকেও কোনদিন অনুভব করিতে হয় নাই। তবে এই পরিপূর্ণ মুখের মধ্যেও দীনেশের পিতার অন্তরের নিভৃত কোণে অনুকূল বায়ু- সংযােগে সময়ে সময়ে অশান্তির আগুণ জ্বলিয়া উঠিত। সে অশান্তির কারণ-কমলা। পিতা একান্ত আধুনিক ধরণে কমলাকে মানুষ করিয়াছিলেন, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তাহাকে যােগ্য পাত্রে সমর্পণ করিয়াছিলেন। বিধির নিৰ্বন্ধে বৎসর না ফিরিতেই তাহার কপাল ভাঙিয়া যায়। আজ ছয়মাস হইল হিন্দু বিধবার অভিশপ্ত জীবন লইয়া সে পিতার বক্ষঃশেল হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে।

রূপায়ণ কমলা দীনেশের অপেক্ষা মাত্র দুই বৎসরের বড়। কাজেই কনিষ্ঠের নিকট হইতে কোন দিনই সে জ্যেষ্ঠার ন্যায্য প্রাপ্য সম্মান আদায় করিয়া লইতে পারে নাই। ছেলে বেলা হইতেই সখা-সখী বা খেলার সাথীর মতই তাহারা ক্ষণেক ‘আড়ি ক্ষণেক ভাবের মধ্য দিয়া বাড়িয়া উঠিয়া ছিল। বড় বােন বা ছােট ভাই বলিয়া কাহারও মধ্যে কোন দিন উচু নীচু ভাবের উপদ্রব হয় নাই। উপরন্তু অনাবিল সখ্যের ফলে তাহাদের পবিত্র সম্পর্ক বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মধুর হইতে মধুরতর হইয়া উঠিয়াছিল। তবে ইদানীং-বৈধব্যের পর হইতে কমলার একটু পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। তাহার সে হাসিমাখা মুখ আর ছিল না। সেখানে গাম্ভীর্যের ছায়া ঘনাইয়া আসিয়াছিল। কৌতুকচঞ্চল চটুল দৃষ্টি ধীর শান্ত ভাস্বর দীপ্তিময় হইয়া উঠিয়াছিল । বাহিরের সমস্ত সৌন্দৰ্য্যকে অন্তরের মধ্যে টানিয়া কেন্দ্রীভূত করিয়া সে যেন নিজেকে আত্মসমাহিত করিবার প্রয়াস পাইতেছিল। দীনেশ এ সব দিকে বিশেষ লক্ষ্য করিত না। পূর্বের সেই সহজ সরল মুক্ত প্রাণ লইয়া সে দিদির সঙ্গে আলাপ করিত, অনুযােগ তুলিত,মান-অভিমানের পালা গাহিতেও ছাড়িত না। কিন্তু তাই বলিয়া সে যে কিছু বুঝিত না, তাহা নহে; তবে সেগুলিকে সে আমল দিত না। কিন্তু দীনেশ আমল না দিলেও রশীদ দিত। কমলার এ ভাবান্তর সে ভালরূপেই লক্ষ্য করিয়াছিল এবং ইহার সম্যক কারণ নির্ণয় করিয়াছিল। অবশ্য ইহার জন্য রশীদকে লােক-চরিত্রাভিজ্ঞতার দিক দিয়া খুব বড় রকমের একটা সাটিফিকেট দেওয়া চলে না, কারণ সে দীনেশ অপেক্ষা বয়সে দুই বৎসরের বড়-দীনেশ কুড়ীতে ৪৭ রূপায়ণ আর সে বাইশে। কাজেই তাহার অভিজ্ঞতাটা একটু বেশী হওয়াই স্বাভাবিক। বেলা ১২টা। পড়িবার ঘরে বইগুলি গুছাইয়া রশীদ দীনেশকে ডাকিবার জন্য জানালা খুলিল। কিন্তু যাহা দেখিল, তাহাতে দীনেশকে ডাকা আর তাহার পক্ষে সম্ভব হইল না। জানালা খুলিতেই তাহার চোখে পড়িল—নিজের শুইবার ঘরে মেঝের উপর নতজানু যুক্তকরে বসিয়া কমলা। সম্মুখে তাহার পরলোকগতা জননীর সুবৃহৎ তৈলচিত্র। ধ্যানমূৰ্ত্তির মত সে বাহ্যজ্ঞানশূন্য। চক্ষের প্রশান্ত ভাস্বর দৃষ্টি সম্মুখের চিত্রপটের উপর নিবদ্ধ,—নির্নিমেষ অচপল। দুই গণ্ড বাহিয়া ধারায় ধারায় মুক্তার নিঝর নামিতেছে। রশীদ স্তম্ভিতের মত দাঁড়াইয়া অপলকনেত্রে সেই ধ্যানমূর্তির পানে চাহিয়া রহিল। সে-ও বুঝি বাহ জ্ঞান হারাইয়া ফেলিল। অনেকক্ষণ পরে সহসা যেন তাহার চৈতন্য ফিরিয়া আসিল। নিজকে সংযত করিয়া নিঃশকে জানালা বন্ধ করিয়া সে বই হাতে বাহির হইয়া পড়িল। ৪৮ রূপায়ণ সংযম মানুষকে দেবতা করিয়া তােলে বটে, কিন্তু তাহা একান্তই সাধনা-সাপেক্ষ। সাধনা না থাকিলে সংযমে অটল থাকা একেবারেই অসম্ভব। এই জন্যই দেখা যায়, যিনি যতই কেন গুণী মনীষী হউন না, একমাত্র সাধক ব্যতীত প্রলােভনের সম্মুখে কেহই নিজেকে পদস্খলন হইতে বাঁচাইয়া রাখিতে পারে না। দেহের ক্ষুধা মানুষকে উন্মাদ করিয়া তােলে। সকল শিক্ষা, জ্ঞান ও ধৈর্য্যের উপরে সে তাহার সর্বগ্রাসী প্রভাবকে বিস্তার করিয়া বসে। তাহার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র উপায়—সাধন-লব্ধ কঠোর সংযম। সে সাধনালব্ধ সংযম কমলার ছিল না। বিবেকের শাসনে যতটুকু সংযম রক্ষা করা সম্ভব, মাত্র ততটুকুই ছিল কমলার সম্বল। তাই বিধবা হইয়া ব্রহ্মচারিণীর সকল আচার নিষ্ঠাকে মানিয়া চলিলেও দেহের অদম্য ক্ষুধাকে সে সহস্র চেষ্টায়ও চাপিয়া মারিতে পারে নাই। তাহার দেহ ও মনের মধ্যে রাত্রিদিন অবিশ্রান্ত দ্বন্দ্ব চলিত। বিবেকের কশাঘাতে সে তাহার সর্বনাশী ক্ষুধাকে জর্জরিত ও নিস্তেজ করিবার প্রয়াণ পাইত। কিন্তু তাহা কি সম্ভব? অবশ্য এই অন্তর্বিদ্রোহের কথা কমলা সাধ্যমত কাহাকেও জানিতে বাহিরে সে ছিল স্নেহ-মমতার প্রতিমূর্তি, মিষ্ট প্রিয় সম্ভাষণ ব্যতীত তাহার মুখ দিয়া অন্য কোন কথাই বাহির হইত না। সময়ে সময়ে রশীদ ও দীনেশকে সে তিরস্কার করিত বটে, কিন্তু সে স্নেহের তিরস্কার। মাতৃম্বরূপিনী জোষ্ঠা ভগিনীর অনাবিল স্নেহ ও মমতাই সে তিরস্কারের মধ্য দিয়া ফুটিয়া উঠিত। ৪ রূপায়ণ সন্ধ্যার পর দীনেশ বেড়াইয়া বাড়ী ফিরিল। নিজের ঘরে না গিয়া সে একেবারে সােজা কমলার ঘরে গিয়া ডাকিল, দিদি। কমলা তখন জানালার ধারে বসিয়া উদাস দৃষ্টিতে বাহিরের দিকে চাহিয়া ছিল। দীনেশের গলার স্বর শুনিতেই তাহার যেন চমক ভাঙিল। উত্তর দিল, কি। -তুমি volunteer list এ নাম দিয়েছ ? ঘরের মধ্যে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলাে জ্বলিতেছিল। সে আলােকে কমলা দীনেশের মুখের পানে চাহিয়া দেখিল তাহার চোখ ও মুখ দিয়া আনন্দ ও উৎসাহ যেন ফাটিয়া পড়িতেছে। কমলা জিজ্ঞাসা করিল, তুই কি কোরে জালি ? কাগজে পড়লুম যে! কাল সবশুদ্ধ ২০ জন মেয়ে মহিলা আইন- অমান্য কমিটীতে স্বেচ্ছাসেবকের তালিকায় নাম দিয়েছে। তার ভিতর তােমার নামও বােয়েছে। -আমার নামের আর কোন মেয়ের বুঝি আর কোল্কাতায় থাকতে নেই ? -বা-রে ! আমাদের বাড়ীর ঠিকানা রােয়েছে যে। —সব তত জানাই হােয়ে গেছে দেখছি, তবে আর জিজ্ঞাসা কো- ছিস কেন? বেশ একটু গম্ভীর হইয়া দীনেশ বলিল, আমাকে না জানিয়ে নামটা দিয়ে ভাল করােনি দিদি। আর দিলেই যদি, তবে সঙ্গে সঙ্গে আমার নামটীও দিলে না কেন ? —সে কিরে! তুই কি মেয়েদের দলে ভিড়বি নাকি? কথাটা শেষ করিয়া কমলা একটা গম্ভীর হাসি হাসিল।

রূপায়ণ
সিড়িতে রশীদের গলার স্বর শােনা গেল-দীনেশ, আছ নাকি
দীনেশ উত্তর দিল, হ, এসো।
রশীদ ঘরে ঢুকিতেই দীনেশ বলিয়া উঠিল, দেখাে ত ভাই, কি
'অন্যায়!
-কি অন্যায় ?
—আমাদের না জানিয়ে উনি স্বেচ্ছাসেবক দলে নাম লিখিয়েছেন।
রশীদের মুখখানা সহসা অস্বাভাবিকরূপে গম্ভীর হইয়া উঠিল। হঠাৎ
সে কোন উত্তর দিতে পারিল না ।
দীনেশ আবার বলিল, কেমন—অন্যায় নয় ?
-হুতা' অন্যায় বই কি?
কথাটা যেন দীনেশ রশীদের মুখ হইতে জোর করিয়া আদায় করিয়া
নইলে উত্তর দিবার মত অবস্থা বা ইচ্ছা তাহার মােটেই ছিল
সইল।
কমলা রশীদের এই ভাবান্তর সুস্পষ্টরূপে লক্ষ্য করিল। তাই তাহাকে
উড়াইয়া দিবার জন্য বলিয়া উঠিল, আচ্ছা, স্বীকার করলুম, অন্যায়ই
হােয়েছে।
শুধু স্বীকার কোলে হবে না-শাস্তি নিতে হবে।
কমলা একটু হাসিল। জিজ্ঞাসা করিল, কি শাস্তি ?
—আমাদের দু’টোকেও তােমার পিছনে পিছনে টেনে নিয়ে যেতে
হবে।
-ও--এই শাস্তি ?
কমলা আবার একটু হাসিল। তাহার পর বলিল, বেশ, ফরম্ নিয়ে
এস, সই কোরে দাও, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

রূপায়ণ
—ফরম্ এখন আবার পাই কোথায় ?-আচ্ছা, তােমরা একটু
বােসস। আমি এখনই নিয়ে আসছি। পাশেই অফিস ত !
দীনেশ ঝড়ের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। রশীদ ও কমলা
উভয়েই স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।
এই নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়া কিছুক্ষণ কাটিয়া গেল। সহসা রশীদ
জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কি সত্যই যাচ্ছ ?
গম্ভীর ভাবে কমলা উত্তর করিল, হাঁ।
-কেন ?
-ডাক এসেছে। তা ছাড়া আমার নিজেরও প্রয়ােজন হােয়েছে।
একটুখানি থামিয়া কমল। আবার বলিল, আচ্ছা রশীদ, তুমি আর
আমায় দিদি বলাে না কেন?
রশীদ মাথা নীচু করিল, কোন উত্তর দিল না। কমলা আবার
বলিল, এতে আমার কিছু যাবে আসবে না, কিন্তু তুমি নিজকে অনেক
খানি দূরে সরিয়ে ফেলবে, আর বােধ হয় ফেলেছও। যদি আমার
ধারণা সত্য হয়, তাহলে যাতে ভবিষ্যতে আরও দূরে সসারে না যাও
এবং যতটুকু গিয়েছ, ততটুকু আবার ফিরে আসতে পার, তার জন্য
চেষ্টা করাে।
কমলার কথা শেষ হতে না হইতেই দীনেশ দুইখানি ফর লইয়া
হাঁপাইতে হাঁপাইতে ঘরের মধ্যে আসিয়া বলিল, এই নাও এনেছি।
কমলার মুখে সেই গম্ভীর হাসি। বলিল, fill up করাে।
দীনেশ তাড়াতাড়ি ফরম্ fill up করিয়া নাম সই করিয়া কমলার
হাতে দিল। তাহার পর রশীদকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তুমি চুপটী
কোরে রইলে যে, নাও লেখ।

রূপায়ণ
কমলা ধীরভাবে বলিল, ওরটা এখন থাক্‌, তােমারটাই আগে
যা।
-কেন ?
-সকলকেই যে একদিনে এক সঙ্গে দিতে হবে, এমন কি কথা
আছে ? ওরটা না হয় কাল যাবে।
-না তা হবে না। এক সঙ্গেই যাক। আমি যার জন্য দুখানা
ফরম নিয়ে এলুম।
-একখানা pending রইল—কাল হবে। এখন তুই যা কাপড়
চোপড় ছাড়গে। আমারও একটু হেঁসেলে যেতে হবে।
কমলা উঠিয়া ধীর পদে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। দীনেশ
ব্যাপারটা ঠিক বুঝিতে না পারিয়া যেন হতভম্ব হইয়া গেল। কিছুক্ষণ
চুপ করিয়া থাকিয়া রশীদকে জিজ্ঞাসা করিল, কি হয়েছে ভাই !
-একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া রশীদ উত্তর দিল, কিছু না।

রূপায়ণ ৪ সমগ্র দেশে মহাত্মা গান্ধীর লবণ আইন অমান্যের সাড়া জাগিয়া উঠিয়াছে। দলে দলে নরনারী স্বেচ্ছাসেবক শ্রেণীভুক্ত হইয়া কেন্দ্রে কেন্দ্রে লবণ আইন অমান্য করিতে আরম্ভ করিয়াছে। -কেন্দ্রে উপর্যুপরি দুইজন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় কমলার উপর সেখানকার সত্যাগ্রহ পরিচালনার ভার অর্পিত হইয়াছে। আজ পাঁচদিন ধরিয়া কমলা অসীম সাহস, ধৈৰ্য্য ও দক্ষতার সহিত তাহার গুরু কৰ্তব্য সম্পাদন করিয়া চলিয়াছে। ক্লান্তি নাই, অবসাদ নাই, বিশ্রাম নাই। দলের পর দল স্বেচ্ছাসেবক গ্রেপ্তার হইতেছে, আবার নূতন দল আসিয়া তাহাদের স্থান পূরণ করিতেছে। কমলা মায়ের স্নেহে, ভগ্নীর মমতায় পুরাতন দলকে বিদায় দিয়া নূতন দলকে অভ্যর্থনা করিয়া লইতেছে সত্যাগ্রহ কেন্দ্র যেন তাহার নিজের ঘর বাড়ী। যুগ-যুগান্তর ধরিয়া সে যেন সেখানকার স্নেহময়ী জননী, মমতাময়ী ভগিনী। দ্বিপ্রহরের পর কমলা আহারান্তে শিবিরে একটু বিশ্রাম করিতেছে। এমন সময়ে বহু কণ্ঠের বন্দেমাতরম্ ধ্বনি চারিদিকে একটা সাড়া জাগাইয়া দিল। কমলার বিশ্রাম লওয়া হইল না। উঠিয়া বাহিরে গিয়া দেখিল, প্রায় ২৫ জন নুতন স্বেচ্ছাসেবক শিবির দ্বারে উপস্থিত। গম্ভীর স্নেহ- হাস্যে একে একে সকলকেই সে অভ্যর্থনা করিয়া লইল। সৰ্বশেষে যাহাকে অভ্যর্থনা করিল, সে রশীদ। স্বাভাবিক গম্ভীর হাসি হাসিয়া কমলা বলিল, এসেছ ? কিন্তু পাবে ত? এ যে বড় কঠোর কর্তব্য। মান হাস্যে রশীদ উত্তর করিল, এই কঠোর কর্তব্যের আমারও প্রয়ােজন হােয়েছে। ৫৪ রূপায়ণ কমলা এ ইঙ্গিত বুঝিল কি না জানি না, তবে সে আর কোন প্রশ্ন না করিয়া স্বেচ্ছাসেবকগণকে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রামের আদেশ দিয়া ধীর পদে শিবিরে প্রবেশ করিল। বৈকালে যথারীতি লবণ তৈয়ারী আরম্ভ হইল। কিন্তু আজ আর পুলিশ বড় বেশী সময় দিল না। জল ফুটাইবার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারা বর পাকড় শুরু করিয়া দিল। ধ্বস্তাধ্বস্তি ও গ্রেপ্ততারের ধূম পড়িয়া গেল। কমলা বসিয়া বসিয়া একটা হাঁড়িতে লবণ-জল জ্বাল দিতেছিল। সেখানে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তাহাকে ঘেরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। পুলিশ আসিয়া যখন স্বেচ্ছাসেবকগণকে হটাইয়া দিবার জন্য টানাটানি ও ধ্বস্তাধ্বস্তি করিতে লাগিল, সেই সময়ে হুড়াহুড়ির মধ্যে কমলা ধাক্কা খাইয়া সেই তপ্ত লবণ-জল-পূর্ণ হাঁড়ির উপর গিয়া পড়িল। ফলে হাঁড়ি ভাঙিয়া তাহার ভিতরের আগুণ-জলে কমলার চোখ মুখ ও বুক সাংঘাতিক রূপে দগ্ধ হইয়া গেল। মুহূর্তের ভিতরে এই কাণ্ড ঘটায় কেহই রক্ষার কোন উপায় করিতে পারিল না। সকলে ধরাধরি করিয়া কমলাকে শিবির মধ্যে লইয়া গেল।

রূপায়ণ
!
পাঁচদিন পরের কথা। মেডিক্যাল কলেজের Female ward-এ
একখানি খাটের উপর কমলা চক্ষু মুদ্রিত করিয়া পড়িয়া আছে। পার্শ্বে
তাহার পিতা ও কনিষ্ঠ দীনেশ সজল নেত্রে বসিয়া। কমলার জীবনের
আশা নাই। ডাক্তার শেষ কথা বলিয়া দিয়াছে। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-
স্বজন সকলেই একে একে দেখিয়া শুনিয়া বিদায় লইয়া গিয়াছে। মাত্র
রক্তের মমতায় বাঁধা পিতা ও সহােদর এখন পর্যন্ত তাহাকে আশুলিয়া
বসিয়া আছে।
অনেকক্ষণ পরে কমলা চক্ষু মেলিল। স্বপ্লেখিতের মত বলিয়া
উঠিল, রশীদ
ক্রন্দন-কম্পিত কণ্ঠে দীনেশ বলিল, ভােরে খবর গিয়েছে। এখনই
এসে পােড়বে।
রােগিনী যেন একটু আশ্বস্ত হইয়া চক্ষু মুদ্রিত করিল। ঠিক সেই
সময়ে রশীদ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া করুণ কণ্ঠে ডাকিল, দিদি।
রােগিনী আবার চক্ষু মেলিল। রশীদের পানে চাহিল। সহসা
তাহার সারা মুখখানিতে একটা প্রসন্ন হাসির দীপ্তি ফুটিয়া উঠিল। সে
পিতা ও দীনেশকে বাহিরে অপেক্ষা করিতে ইঙ্গিত করিল।
তাহারা চলিয়া গেলে কমলা ডাকিল, রশীদ।
দিদি !
ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ?
-যথাসাধ্য কোরেছি। নইলে এমন নিঃসঙ্কোচে ছােট ভাইটীর মত
দিদি বােলে তোমার ডাকে আজ সাড়া দিতে পারতুম না।

রূপায়ণ কমলার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে আবার বলিল, একটা কথা তােমাকে না বােলে গেলে আজ মরণেও আমার শান্তি হবে না। এতদিন গােপন কোরে এসেছি, আজ প্রকাশের সময় হয়েছে। শােন ভাই! ভুল তুমিই এক। কররানি, আমিও কোরেছিলুম । আজিকার এ-মৃত্যু আমার সেই ভুলেরই প্রায়শ্চিত্ত। মুহূর্তের মধ্যে রশীদের অন্তরের স্মৃতির সমুদ্র মথিত করিয়া জাগিয়া উঠিল কমলার সে দিনের সেই অদৃষ্টপূৰ্ব্ব ধ্যানমূৰ্ত্তি। নির্জন কক্ষে জননীর তৈল-চিত্রের সম্মুখে নতজানু যুক্তকরা ব্ৰহ্মচর্যের সেই ভাব-গম্ভীর প্রতিচ্ছবি। এতদিনে রহস্যটা তাহার সম্মুখে পরিষ্কার হইয়া গেল। তাহার দুই চক্ষে অশ্রুর সমুদ্র উথলিয়া উঠিল। কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল। অনেকক্ষণ পরে সে ডাকিল, দিদি। –ভাই! --আমাকে মার্জনা করাে। —মার্জনা অনেক আগেই কোরেছি ভাই, এখন আশীৰ্ব্বাদ করি, আমার এই মরণ-প্রায়শ্চিত্ত তােমার জীবনকে শুদ্ধ-সুন্দর আনন্দময় করুক। রােগিনী বিদগ্ধ শীর্ণ হাতখানি রশীদের মাথার উপর রাখিতে গেল, কিন্তু পারিল না। অবশ শিথিল হইয়া তাহা উপাধানেই ঢলিয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার সর্বশরীর একবার অস্বাভাবিকরূপে কাপিয়া উঠিল। রশীদ ক্রন্দনাবেগে প্রায়বরুদ্ধ কণ্ঠে ডাকিল, দিদি, দিদি। দীনেশও পিতার সঙ্গে ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, দিদি! স্থবির পিতার আকুল কণ্ঠ ফাটিয়া ধ্বনিত হইল, মা। কোথায় দিদি, কোথায় মা, কে উত্তর দিবে! মর্মাহত শােকাত্ত- কণ্ঠের ব্যাকুল বিলাপ নিস্তব্ধ কক্ষের বায়ুস্তরে মিলাইয়া গেল। ৪৭ চরিত্রহী কলেজে পড়িবার সময়েই চরিত্রহীন বলিয়া লতিফের একটা দুর্নাম রটিয়া গিয়াছিল। তাই বি-এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হইয়া যখন সে ঘরে আসিয়া বসিল, তখন অভিভাবক হইতে আত্মীয় বন্ধু-বান্ধব সকলেই তাহার উপর বিরূপ হইয়া উঠিল। পড়াশুনায় চিরকালই লতিফ ভাল ছেলে। প্রবেশিকা ও আই-এ পরীক্ষায় সে বিশেষ প্রশংসার সহিত উত্তীর্ণ হইয়াছিল। বি-এটাও যে হাসিতে হাসিতে পাশ করিবে, এ ধারণাটাও সকলের মনে বদ্ধমূল ছিল। কিন্তু হঠাৎ সে ধারণা উল্টাইয়া দিয়া লতিফ ফেল করিয়া ঘরে আসিয়া বসিল। সকলেই বিশ্বাস করিল, চরিত্রহীনতাই লতিফের অকৃতকাৰ্য্যতার একমাত্র কারণ এবং এই বিশ্বাসের ফলে সকলেই তাহার উপর অন্তরে অন্তরে চটিয়া গেল। দুর্নামটা রটিয়াছিল বৎসর খানেক পূর্বে তাহারই স্বগ্রামবাসী সহপাঠী সামাদের মারফতে। সামাদ লতিফের সহিত একই মেসে থাকিয়া একই কলেজে একই ক্লাশে অধ্যয়ন করিত। লতিফের প্রতি একটা নীচ হিংসা সে বরাবরই অন্তরে অন্তরে পােষণ করিয়া আসিয়াছিল। ইহার একমাত্র কারণ সৰ্ব্ব লােকমুখে লতিফের প্রশংসা। ভাল ছেলে বলিয়া লােকে শতমুখে লতিফের সুখ্যাতি করিত, ইহা সামাদের সহ হইত না।

রূপায়ণ খুঁটী নাটি দোষ ত্রুটী পাইলেই সে লতিফকে বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয় মহলে ‘খাটো করিবার চেষ্টা পাইত। কিন্তু উহাতে বিশেষ কোন ফল হইত না। লতিফের প্রতি কাহারও অন্তরের শ্রদ্ধা বা স্নেহ তাহাতে এতটুকু হ্রাস পাইত না। এই ভাবেই দিন কাটিয়া যাইতেছিল। শেষে এমন একটা অভাবনীয় ব্যাপার ঘটিয়া গেল, যাহাতে লতিফের প্রতি লােকের অন্তরের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তি টলিয়া গেল। দেশে আত্মীয়- স্বজন ও অভিভাবকগণ প্রথম প্রথম কথাটা বিশ্বাস করিতে পারেন নাই, কিন্তু সামাদ যখন তাহাদের নিকট প্রমাণের উপর প্রমাণ আনিয়া উপস্থিত করিতে লাগিল তখন আর সেটাকে 'বাজে কথা বলিয়া তাঁহারা উড়াইয়া দিতে পারিলেন না। কিন্তু না পারিলেও লতিফকে তাহারা কলেজ ছাড়াইয়া বাড়ীতে আনিয়া বসাইয়া রাখিলেন না। কারণ তখনও পর্যন্ত তাঁহাদের এ বিশ্বাসটুকু ছিল যে, লতিফ যাহাই করুক না কেন, পড়াশুনার বেলায় সে ঠিক আছে এবং প্রবেশিকা ও আই-এর মতই বি-এর গণ্ডীটাও হেলায় পার হইয়া যাইবে এবং এই বিশ্বাসের ফলেই তাহাকে কলেজ না ছাড়াইয়া বিশেষরূপে সাবধান করিয়া তখনকার মত তাহারা নিরস্ত হইলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল ফলিল বিপরীত। তখন সকলেই হাড়ে হাড়ে চটিয়া উঠিলেন। বাড়ীতে পা দিতেই সকলের মুখ ভার ভার দেখিয়া লতিফ ব্যাপারটা কতক পরিমাণে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার পর দুই এক দিন পরেই যখন জানিতে পারিল যে, তাহার পড়াশুনা এইখানেই শেষ, তখন তাহার মনটা হঠাৎ যেন বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। ব্যাপারটা যে এতদূর আসিয়া গড়াইবে, তাহা সে কোন দিন কল্পনাও করিতে পারে নাই। মনে মনে পিতার উপর এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহার ধারণাকে অন্তরের মধ্যে বদ্ধমূল

রূপায়ণ
করিবার পক্ষে যে সমস্ত আত্মীয় স্বজন সাহায্য করিয়াছিল, তাহাদের
উপর সে মর্মে মর্মে চটিয়া উঠিল, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করিল না।
এই ভাবে প্রায় সপ্তাহ খানেক কাটিয়া গেলে সহসা একদিন
কলিকাতা হইতে এক পত্ৰ আসিল। পত্র পাইয়া
পত্র পাইয়া লতিফ আর কাল
বিলম্ব করিল না। কাহাকেও কিছু না বলিয়া সেই দিনই বৈকালে সে
কলিকাতা রওয়ানা হইয়া পড়িল।

রূপায়ণ ২ কলিকাতার এক দরিদ্র পল্লীতে একখানি খােলার ঘরে ভাঙা তক্তা পােষে ছেড়া মাদুরের উপর মৃত্যুশয্যায় শায়িত এক প্রৌড়া নারী, আর তাহার শিয়রে অশ্রুসজলচোখে বসিয়া এক চতুর্দশী কিশােরী। ক্ষীণকণ্ঠে রমণী ডাকিল, সাজেদা ! -মা! -লতিফ এলাে না! -এখনই আসবেন, চিঠি পেতে বােধ হয় দেয়ী হােয়েছে তাই সাজেদার কথা শেষ না হইতেই লতিফ ঘরের মধ্যে আসিয়া দেখা দিল। সাজেদার মলিন মুখখানি উজ্জ্বল হইয়া উঠিল -কি হহয়েছে সাজেদা ! এমন অবস্থা কেন? বলিতে বলিতে লতিফ রােগিণীর শয্যাপার্শ্বে বসিয়া তাহার কপালে হাত দিল। সাজেদা বলিল, আপনি চোলে যাওয়ার পর দিন রাত্রে হঠাৎ কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে থাকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই কেঁপে জ্বর আসে। তার পর ক্রমে ক্রমে এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। সাজেদার কথা শেষ হইতেই রােগিণী ক্ষীণতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, কে সাজেদা! সাজেদার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই লতিফ বলিয়া উঠিল, আমি লতিফ। রােগিণীর চোখ দুইটা সহসা যেন অস্বাভাবিকরূপে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি কি একটা কথা বলিতে গেলেন কিন্তু পারিলেন না।

রূপায়ণ লতিফ তাঁহার মুখের কাছে মুখ লইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ডাক্তার ডাকবাে কি ? রােগিণী ইঙ্গিতে নিষেধ করিলেন। লতিফ আর বিশেষ জেদাজেদি করিল না। সে অবস্থা দেখিয়া বেশ বুঝিয়া লইয়াছিল, এখন আর ডাক্তার ডাকিয়া কোন লাভ নাই--শেষ নিশ্বাস পড়িতে যা বাকী। অনেকক্ষণ পরে রােগিণী ডাকিলেন, সাজেদা। তাহার স্বর আরও ক্ষীণ। সাজেদা তাঁহার মুখের উপর মুখ লইয়া করুণ কণ্ঠে ডাকিল, মা ! রােগিণী কথা বলিলেন না, ধীরে ধীরে কন্যার একখানি হাত ধরিয়া লতিফের হাতের উপর রাখিলেন। তাহার পর উপরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কি ইঙ্গিত করিলেন। লতিফ ও সাজেদা উভয়েরই চক্ষু অশ্রুতে ভরিয়া উঠিল। জল-ভরা চোখ মুছিয়া যখন তাহারা রােগিণীর মুখের পানে চাহিল, তখন সব শেষ হইয়া গিয়াছে। সাজেদা আর্তনাদ করিয়া মৃতার বুকের উপর লুটাইয়া পড়িল। আর লতিফ ?—অটল পাষাণ মূর্তির মত বসিয়া স্থির দৃষ্টে জীবন নাট্যের সেই শােচনীয় দৃশ্য দেখিতে লাগিল।

রূপায়ণ এক বৎসর পূৰ্বে কলেজ হইতে মেসে ফিরিবার পথে এই বাড়ীর সম্মুখেই সাজেদার সহিত লতিফের প্রথম পরিচয় হয়। তিন মাসের বাড়ী ভাড়া বাকী পড়িয়াছিল, আদায় করিতে না পারায় বাড়ীওয়ালা তাহাদিগকে বাড়ী হইতে রাস্তায় বাহির করিয়া দিয়াছিল। সেই সূত্রে বহু কৌতূহলী দর্শক ‘মজা’ দেখিবার জন্য বাড়ীর সম্মুখে জটলা করিতেছিল। লতিফও ছিল এই জটলাকারীদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন দেখিল ‘বেনিয়া বাড়ীওয়ালা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করিতে করিতে বােরকাপরিহিতা মা ও মেয়েকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিল, তখন সে আর স্থির থাকিতে পারিল না। সেইখানেই বাড়ীওয়ালার সঙ্গে একটা রফা করিয়া এই অসহায় স্ত্রীলােক দুইটীকে লজ্জা ও অপমানের হাত হইতে বঁাচাইয়া দিল এবং সেই দিন হইতে তাহাদের সমস্ত দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের স্কন্ধে তুলিয়া লইল। এই ব্যাপারে লতিফকে বেশ একটু বেগ পাইতে হইয়াছিল। বাড়ী হইতে তাহার খরচের জন্য মাসিক বরাদ্দ আসিত ৩৫ টাকা, কিন্তু তাহাতে ত নিজের ও এই অনাথাদের খরচ কুলানাে সম্ভব নয় ; কাজেই নিজের পড়ার ক্ষতি করিয়া তাহাকে সকালে সন্ধ্যায় মাসে ৩০, টাকা আয়ের টিউশনি যােগাড় করিয়া লইতে হইয়াছিল। বলা বাহুল্য, এই টিউশনি’ই তাহার পরীক্ষায় অকৃতকাৰ্য্যতার একমাত্র কারণ। অনুসন্ধিৎসু সামাদের চোখে ব্যাপারটা অতি অল্প দিনের ভিতরেই ধরা পড়িয়াছিল এবং ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, অত্যন্ত কুৎসিত ভাবেই সে ঘটানাটাকে রাষ্ট্র করিয়া দিয়াছিল। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। * রূপায়ণ সমস্ত ব্যয়ভার যদিও লতিফ বহন করিত, তথাপি যতদিন মা বাঁচিয়া ছিলেন, ততদিন সাজেদা তাহার অনেকখানি ভরসা রাখিত এবং সেটা স্বাভাবিকই। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর সে সম্পূর্ণরূপে লতিফের গলায় আসিয়া পড়িল। আগে চিন্তা ছিল কেবল মাত্র ভরণপােষণের, এখন তাহার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের চিন্তাও আসিয়া জুটিল। একাকিনী সাজেদাকে সেই আত্মীয়-স্বজন-পরিশূন্য গৃহে রাখিয়া লতিফ কেমন করিয়া নিশ্চিন্ত মনে মেসে আসিয়া বাস করিবে । অগত্যা তাহাকে বাড়ীওয়ালার সঙ্গে বন্দোবস্ত করিয়া সেই বাড়ীতেই আর একখানি ঘর ভাড়া লইয়া বাস করিতে হইল। টিউশনিটা বজায় ছিল। সকাল সন্ধ্যায় সেখানে পড়াইয়া লতিফ সমস্ত দিন চাকুরীর সন্ধানে ঘুরিতে আরম্ভ করিয়া দিল। ফলে অল্প দিনের ভিতরেই একটা বন্দোবস্তও হইয়া গেল। সে কতকটা নিশ্চিন্ত হইয়া বসিল। কিন্তু সে নিশ্চিন্ত হইলেও বাড়ীর অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের মনের ভিতর অশান্তির আগুন ধোঁয়াইয়া উঠিতেছিল। তাহারা লতিফ ও সাজেদার এই আত্মীয়তাটাকে বড় ভাল চোখে দেখিল না। ভিতরে ভিতরে নানা রকম কানাঘুষা আরম্ভ করিয়া দিল এবং সুযােগ পাইলেই কথা প্রসঙ্গে উভয়ের প্রতি কুৎসিত বিদ্রুপ-বাণ নিক্ষেপ করিতে লাগিল। লতিফ যতদূর সম্ভব এসব প্রসঙ্গ এড়াইয়া চলিবার চেষ্টা করিত। সে সুযােগও তাহার ছিল যথেষ্ট। কারণ, দিনের বেলাটা প্রায়ই সে বাহিরে থাকিত, আর রাত্রিতেও কাহারও সঙ্গে তাহার বড় একটা দেখা সাক্ষাৎ হইত না। হইলে ও কেহ আলাপ জমাইবার সুযােগ ঘটাইতে পারিত না। কিন্তু মুশকিল হইয়াছিল সাজেদাকে লইয়া। সে ত বাড়ী ছাড়িয়া অন্যত্র ৩৪ রূপণ যাইতে পাইত না। কাজেই কুৎসা ও পর চচ্চপ্রিয় মেয়েরা আসিয়া সমস্ত দিন কথার ঘায়ে তাহাকে উত্যক্ত করিয়া তুলিত। তাহাদের কথার প্রতিবাদ করিবার সম্বল তাহার কিছু ছিল না, কাজেই নীরবে মুখ বঁজিয়া সব কিছুই সহ্য করিতে হইত। কিন্তু ধৈর্য্যেরও একটা সীমা আছে, ক্রমে ক্রমে সে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। রাত্রি প্রায় নয়টা। লতিফ আহারে বসিয়াছে, সাজেদা তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া। অন্যদিন সাজেদা ভাত তরকারী সমস্ত দস্তরখানের উপর সাজাইয়া রাখিয়া নিজের ঘরে চলিয়া যায়, আজ আর তাহা করে নাই। এই ব্যতিক্রম দেখিয়া লতিফের মনে কেমন যেন সন্দেহ হইল। সে মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমাকে কি কিছু বােলবে সাজেদা ? সাজেদা আজ পর্যন্ত নিজে উপচিকা হইয়া লতিফকে কোন কথা বলে নাই, আজ বলিতে আসিয়াছিল। কিন্তু বলি-বলি করিয়া লজ্জা ও সঙ্কোচে তাহার মুখের কথা মুখেই রহিয়া গিয়াছিল। এখন সুযােগ পাইয়া বলিল, হা। লতিফ জিজ্ঞাসা করিল, কি ? সাজেদা নতমুখে রহিয়াই বলিল, এ বাড়ীতে ত আর থাকা যায় না। তাহার স্বর বড় করুণ, বড় মৰ্ম্মস্পশী । লতিফ সব বুঝিল, কিন্তু হঠাৎ কোন উত্তর দিল না। নীরবে আহার শেষ করিয়া যাইতে লাগিল। অনেকক্ষণ পরে বলিল, আর একটা দিন কোন রকমে কাটাও, কাল বিকেলেই আমি আফিস ফে বাড়ী খুঁজতে বেরুবাে। সাজেদা মনে মনে সন্তুষ্ট হইয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল। - রূপায়ণ ৪ সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। রান্নাবান্না শেষ করিয়া সবেমাত্র সাজেদা নিজের ঘরে গিয়া বসিয়াছে, এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল, বাড়ীতে কেউ আছেন? সাজেদা জানালা দিয়া চাহিয়া দেখিল ধুতি চাদর পরিহিত কে একজন লােক বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে। লােকটাকে কোন দিন সে দেখিয়াছে এমন মনে হয় না। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া লােকটী আবার ডাকিল, বাড়ীতে কে আছেন, আমি লতিফ সাহেবের কাছ থেকে আসছি। কি একটা অমঙ্গলের আশঙ্কায় সাজেদার বুকের ভিতরটায় দুরু দুরু করিয়া উঠিল! সে আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। জানালার কাছে উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কি খবর বলুন। আগন্তুক বলিতে লাগিল, ইটালিতে বাড়ী পাওয়া গিয়াছে। লতিফ সাহেব আমাকে পাঠিয়েছেন, জিনিসপত্র নিয়ে আমার সঙ্গে চলুন। সাজেদা ভাবিল, এ কেমন কথা। এই অপরিচিত লােকের সঙ্গে যাইব কেমন করিয়া ? সে জিজ্ঞাসা করিল তিনি কোথায় ? —তিনি সেই বাড়ীতেই আছেন, এখন আসতে পারবেন না। নিজে দেখে শুনে সব সাফ সুরা করাচ্ছেন। সাজেদা ইতস্ততঃ করিতে লাগিল, কি করিবে। একবার ভাবিল তাহাকে আসিতে বলিয়া দিই, কিন্তু পরক্ষণেই আশঙ্কা জাগিল, যদি রাগ করেন। দুই একবার তােনা মােনা’ করিয়া শেষ পর্যন্ত সে যাওয়াই স্থির করিল এবং আগন্তুককে গাড়ী ডাকিতে বলিয়া জিনিসপত্র রূপায়ণ গুছাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। অতঃপর গাড়ী আসিলে মালপত্র লইয়া গাড়ীতে গিয়া উঠিয়া বসিল। রাত্রি প্রায় ১০টার সময় কলিকাতার অলিতে গলিতে বাড়ী খুঁজিয়া হয়রান হইয়া লতিফ বাসায় ফিরিল, কিন্তু ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার মুখ হইতে কথা সরিল না। প্রথমটা সে হতবুদ্ধির মত ‘কাট’ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার পর জিজ্ঞাসা করিয়া অন্য ভাড়াটিয়াদের মুখে যখন সকল কথা শুনিল, তখন সেইখানেই মেবোর উপর মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। ৬৭ রূপয়ন লতিফের হঠাৎ বাড়ী হইতে চলিয়া আসার ফলে সেখানকার সকলেই ধারণা করিয়া লইল, এই হতভাগা ছােকরার’ উদ্ধারের আর কোন উপায়ই নাই, সে একেবারেই গােল্লায় গিয়াছে। কিন্তু অন্য লােকে যাহাই বলুক না কেন, লতিফের বাপের মন পুত্রের উদ্ধারের আশায় একেবারে জলাঞ্জলি দিতে পারে নাই। তিনি তলে তলে মেয়েটাকে ( সাজেদাকে) সরাইয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন, তাঁহার এ চেষ্টায় সহায় হইল সামাদ। লতিফের চলিয়া আসার কয়েকদিন পরে সামাদও কলিকাতা আসিল। সাজেদারা যে বাড়ীতে বাস করিত, সামাদ তাহা জানিত। সুতরাং খোঁজাখুঁজির আর প্রয়ােজন হইল না। দু একদিনের মধ্যেই সে সেই বাড়ীর একটা বদমাইস লােককে হাত করিয়া ফেলিল। বহুদিন হইতে সাজেদার উপর এই লােকটীর কু-দৃষ্টি পড়িয়াছিল, কিন্তু সুযােগের অভাবে কিছুই করিয়া উঠিতে পারে নাই। সুতরাং সামাদের কথায় সে অতি সহজেই রাজী হইল। কথাবার্তা ঠিক হইল যে, সে সামাদকে সকল সংবাদ যােগাইবে, আর সামাদ কৌশলে সাজেদাকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া আনিয়া তাহার হাতে তুলিয়া দিবে। এই বন্দোবস্ত অনুসারে লােক টী সমস্ত খবরই সামাদকে যােগাইত। লতিফের অফিস ফের বাড়ী খুঁজিতে যাওয়ার সংবাদ সে-ই তাহাকে দিয়াছিল। সাজেদা দিনের বেলায় বাড়ীর অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা-প্রসঙ্গে কথাটা বলিয়া ফেলিয়াছিল, কাজেই গােপনীয় হইলেও কথাটা এই গুপ্তচরের কানে গিয়া উঠিয়াছিল। খবর পাইয়াই সামাদ সুযােগ ধরিয়াছিল এবং রূপায়ণ সন্ধ্যার পর মিথ্যা কথায় ভুলাইয়া সংসার জ্ঞানহীনা সরলা সাজেদাকে বাড়ীর বাহির করিয়া লইয়া গিয়াছিল। লতিফ কতক্ষণ যে হতভম্ব হইয়া বসিয়াছিল, তাহা সে জানে না, হঠাৎ কে একজন পিছন দিক হইতে স্নেহকণ্ঠে কহিল, আর ভেবে কি হবে বাবা, যা হবার হয়ে গিয়েছে, কেন আর ভেবে ভেবে নিজের দেহটা মাটী করবে? লতিফ পিছন ফিরিয়া দেখিল, সেই বাড়ীরই একজন বৃদ্ধ ভাড়াটীয়া । সে লােকটাকে চিনিত, এ-বাড়ীর মধ্যে একমাত্র এই লােকটারই কাছে সময়ে অসময়ে সে দুই একটী মিষ্ট কথা শুনিতে পাইত। তাই ব্যথায় ব্যথী দেখিয়া লতিফ তাহার পানে করুণ ছল ছল নেত্রে চাহিয়া রহিল। বৃদ্ধ আবার বলিল, ওঠ, আর এখানে বসে থাকে না, আজ আমার ওখানেই থাকবে চল। লতিফ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর সহসা জিজ্ঞাসা করিল,--আপনি কি লােকটাকে দেখেছিলেন ? -দেখেছিলুম, কিন্তু বুড়াে মানুষ অতটা ঠাওর করতে পারি নি। কথাটা শেষ করিয়াই বৃদ্ধ সহসা উৎফুল হইয়া বলিয়া উঠিল, হ। হয়েছে পুটু তাকে চেনে, সে-ও গাড়ীর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে দেখলুম। বলা বাহুল্য, পুটু সামাদের গুপ্তচর ব্যতীত আর কেহ নয়। ঘরে যদি আললা থাকিত, তাহা হইলে বৃদ্ধ দেখিতে পাইত, লতিফের চোখ মুখ অস্বাভাবিকরূপে লাল হইয়া উঠিয়াছে, অতিমাত্র উত্তেজনায় তাহার সর্বশরীর কঁপিতেছে।

রূপায়ণ মুহূর্ত পরেই সে উঠিয়া দাঁড়াইল। আপনি যান, আমি একবার বাহিরে যাব। —এত রাত্রে কোথায় যাবে বাবা, কাল সকালে যা হয় কোরাে। আজকের মত-- বৃদ্ধকে কথা শেষ করিতে না দিয়াই লতিফ বলিয়া উঠিল, না, এখনই যেতে হবে। আপনি ভাববেন না, আমি একটু পরেই ফিরে আসব। লতিফ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। পুটুকে লতিফ ভাল করিয়াই চেনে। শুধু সেই বা কেন? পাড়ার সকলেরই কাছে গুণ্ডামী ও বদমায়েশীর জন্য সে বিশেষভাবে পরিচিত। সাজেদার প্রতি তাহার যে একটা লোলুপ দৃষ্টি পড়িয়াছিল, এ সন্দেহ লতিফের মনে পূর্বেই জাগিয়াছিল। কিন্তু বিশেষ কোন প্রমাণ না পাইলে ত কিছু করা যায় না, কাজেই সে উচ্চবাচ্য করে নাই। আজ সে সন্দেহ তাহার মনের ভিতর বদ্ধমূল হইয়া গেল। সে স্থির বিশ্বাস করিল, ইহা পুটুরই কাজ। সাজেদার সর্বনাশ করিবার জন্যই সে এই কৌশল করিয়াছে। সুতরাং শয়তানকে সমুচিত শিক্ষা দিতে হইবে। বাহিরে আসিয়া রাস্তার মােড় ফিরিতেই লতিফ দেখিল পুটু হন্ হন্ করিয়া বাড়ীর দিকে ফিরিতেছে। নিকটে আসিতেই লতিফ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, দাঁড়াও। পুটু চমকিত হইয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। লতিফের মূর্তি দেখিয়া সে যেন একটু দমিয়া গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সামলাইয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কি হয়েছে । বকণ্ঠে লতিফ জিজ্ঞাসা করিল, তাকে কোথায় রেখে এসেছিস্? ৭০

রূপায়ণ
;
কিছুই জানে না; মুখে এমনি বিস্ময়ের ভাব ফুটাইয়া পুটু জিজ্ঞাসা
করিল, কাকে ?
পূৰ্ব্ববৎ স্বরে উত্তর হইল, সাজেদাকে।
পাগল নাকি! বলিয়া পুটু সাজোরে লতিফের নিকট হইতে হাত
ছাড়াইয়া লইতে চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। উপরন্তু চেষ্টার সঙ্গে
সঙ্গেই এই জ্ঞানটা তাহার ভাল রূপেই জন্মাইয়া গেল যে, লতিফের বজ্রমুষ্টি
হইতে নিজেকে মুক্ত করা তাহার পক্ষে মােটেই সহজ সাধ্য নয়।
লতিফ পুনরায় ধমক দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, এখনও বল, নইলে
তােকে খুন করব।
পুটু আর জোর করিল না। তৎপরিবর্তে কৃত্রিম বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা
করিল, আপনি কি বলছেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না; আপনারই
লোক এসে ত তাকে নিয়ে গেল
আমার লােক, না তাের চর।
পূৰ্ব্ববৎ ভাবে পুঁটু বলিল, আপনি আশ্চৰ্য্য করলেন দেখছি।
তাহার পর সহসা ক্রোধের ভাব দেখাইয়া বলিল, দেখুন, এরকম
ভাবে আপনি রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে অপমান করবেন না, ভাল হবে
বলছি।
লতিফ একটা ক্রুর হাসি হাসিল, তাহার পর বলিল, করলে কি
করবি ?
তাহার ভাব দেখিয়া পুটু আর কিছু বলিল না। বলিবার প্রয়ােজনও
হইল না। লতিফ কি ভাবিয়া সহসা তাহার হাত ছাড়িয়া দিয়া
বলিল, যা
পুটু একবার তাহার মুখের পানে চাহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে
৭১

রূপায়ণ বাড়ীর দিকে চলিয়া গেল। লতিফও মিনিট পাঁচেকের জন্য এদিক ওদিক ঘুরিয়া অবশেষে নিজের অন্ধকার ঘরটীতে গিয়া গুম হইয়া বসিয়া রহিল। নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করিবার জন্যই পুঁটু অত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরিয়াছিল। কিন্তু যখন বুঝিল, সব জানাজানি হইয়া গিয়াছে, আর ঢাকা দেওয়া চলিবে না, তখন সে রাত্রির মধ্যেই সাজেদাকে সরাইয়া ফেলিবার মতলব করিল, কি জানি, বিলম্ব হইলে যদি খুঁ জিয়া বাহির করে। সে বাসায় আসিয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিল তাহার পর আস্তে আস্তে উঠিয়া আসিয়া লতিফের ঘরের মধ্যে উকি মারিল। অন্ধকার ঘর কিছুই দেখা গেল না। সে সন্তর্পণে রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল। লতিফ অন্ধকার ঘরের মধ্যে বসিয়া এই সুযােগেরই অপেক্ষা করিতেছিল; এবং এই জন্যই সে তখন পুটুকে ধরিয়াও ছাড়িয়া দিয়াছিল। এখন সময় বুঝিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া সে অলক্ষ্যে পুটুর অনুসরণ করিল। বেলেঘাটা অঞ্চলে এক দুর্গম গলির মধ্যে একখানি খােলার ঘরের দরজার সম্মুখে গিয়া পুটু দাড়াইয়া পড়িল। চকিতের মধ্যে একবার চারিদিক দেখিয়া লইয়া দরজায় ধাক্কা দিল। লতিফ তখন অন্ধকারের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া সরিয়া দাঁড়াইয়াছে। দরজা ভিতর হইতে খুলিয়া গেল। পুটু ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। সাজেদা খুবই বুঝিতে পারিয়াছিল। কিন্তু নিরুপায় সে, কি করিবে। ঘরে ঢুকিয়াই পুটু বলিল, এখানে থাকা হবে না। অন্য জায়গায় ঘর ঠিক করেছি এখনই যেতে হবে। —আমি যাব না। ৭২ রূপায়ণ } -না গেলে এখানে পচে মরতে হবে। —তা-ই মরব। -ধমক দিয়া পুটু বলিল ও সব ন্যাকামি রাখ। যা বলছি, তাই কর। —আমি পারব না। –এখনও ভালয় ভালয় বলছি চল, নইলে এর পর চুলের মুটী ধরে নিয়ে যাব। মরিয়া হইয়া সাজেদা সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিল, তুমি যদি অমন করে আমায় বিরক্ত কর, তা হলে আমি চেঁচিয়ে পাড়ার লােক জমা করব। তবেরে হারামজাদী, বলিয়া নিতান্ত অতর্কিত ভাবে পুটু ছুটিয়া গিয়া সাজেদার গলা টিপিয়া ধরিল। লতিফ ততক্ষণ দরজার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইয়াছিল। হঠাৎ এই আক্রমণ দেখিয়া সে আর স্থির থাকিতে পারিল না। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াই বাঘের মত পুটুর উপর লাফাইয়া পড়িল। অতর্কিত আক্রমণে পুটু ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া গেল। সে দেখিল সাক্ষৎ যমের মত আসিয়া লতিফ তাহার উপর পড়িয়াছে। সে সাজেদাকে ছাড়িয়া দিল। লতিফ রুদ্র গর্জনে হাঁকিয়া কহিল, বেরাে শয়তান, এখনই বেরিয়ে যা এখান থেকে। পুটু পিছু হটিয়া দরজার সম্মুখে আসিল, এবং পর মুহূর্তেই কোমর হইতে এক তীক্ষ্ণধার ছােরা বাহির করিয়া লতিফের পৃষ্ঠদেশ লক্ষ্য করিল। সাজেদা তাহাকে দেখিতে পাইয়া হুঁ হুঁ করিয়া যেমন বাধা দিতে অগ্রসর হইল, অমনি সেই ছােরা আমূল তাহার বুকের মধ্যে গিয়া বসিল। সে সেই খানেই মেঝের উপর লুটাইয়া পড়িল। সাত দিন পরের কথা। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটী ঘরে রূপায়ণ মুমূর্ষ সাজেদার শয্যা পার্শ্বে বসিয়া লতিফ। তাহার চক্ষু দুইটী জবা ফুলের মত লাল। মুখ শুষ্ক, চুল রুক্ষ এলােমেলাে, দেখিলেই উন্মাদ বলিয়া মনে হয়। অনেকক্ষণ পরে সে ডাকিল, সাজেদা। সাজেদা একবার চক্ষু মেলিয়া চাহিল, অনেকক্ষণ পরে অতি কষ্টে বলিল, আমি—যাই, আমাকে মার পাশে উঃ। সে আবার নীরব হইল। লতিফের চক্ষে অশ্রু নাই, আছে আগুন, সেই আগুনে সে যেন কাহাকে দগ্ধ করিতে চায়। কিছুক্ষণ পরে সে আবার ডাকিল, সাজেদা। সাজেদা উত্তর দিল না। তাহার চোখ দুইটী অল্প একটু বিস্ফারিত হইল, ঠোট দুইটা ঈষৎ নড়িয়া উঠিল। তাহার পর সব শেষ। অসহ অন্তৰ্দাহে আগ্নেয়গিরি ফাটিয়া গেল। লতিফের রক্ত চক্ষু ফাটিয়া অশ্রুর অনল ধরা ছুটিল। ৭৪ বিপর্যয় যােল পার হইয়া লতিফা যে দিন সতেরােয় পা দিল, ঠিক সেই দিনই তাহার প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল বাহির হইল। সে প্রশংসার সহিত প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হইয়াছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব—আসিবার মত যাহারা, তাহাদের প্রায় সকলেই এই শুভ সংবাদ শুনিয়া তাহাকে Congratulate করিতে আসিল। আসিল না কেবল একজন সঈদ। কিন্তু তাহাকেই লতিফা সকলের আগে আশা করিয়াছিল। সাজ মধুর হাস্যে সারা বিকালটা লতিফা শুভার্থীগণের অভিনন্দন গ্রহণ করিল। কেহ জানিতেও পারিল না যে, তাহার সেই হাসির অন্তরালে স্লানিমার ক্ষীণ ছায়া লুকাইয়া আছে,-অনাগত একান্ত আপনার জনের অভাবে একটা দুঃসহ ব্যথা তাহার মনের কোণে গুমরিয়া ফিরিতেছে। সকলকে বিদায় দিয়া লতিফা ছাদের উপর গিয়া একখানি বেতের চেয়ার লইয়া বসিয়া পড়িল। তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়াছে। লতিফা উদাস দৃষ্টিতে উপরের দিকে চাহিতেই সহসা পরিচিত কণ্ঠস্বরে বিচলিত হইয়া উঠিল। সে উৎকর্ণ হইল। পর মুহূর্তেই সিড়িতে জুতার শব্দ

রূপায়ণ
শুনিয়া আকুল প্রতীক্ষায় সেই দিকে চাহিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার
বুকের ভিতর আশা-নিরাশার, উৎকণ্ঠা-আকুলতার তুমুল দ্বন্দ্ব বাধিয়া
গেল।
কিন্তু মুহূর্ত পরেই সকল দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাইয়া সঈদ লতিফার
সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। সারা মুখখানিতে হাসির দীপ্তি ফুটাইয়া
বলিল, বখসিস দেবার ভয়ে ছাদে এসে লুকিয়েছ বুঝি ?
লতিফা গম্ভীর ভাবে বলিল—হু।
সঈদ লতিফার এ গাম্ভীৰ্য্যকে আদৌ আমল দিল না। পূর্বের
মতই হাসিয়া কহিল, কিন্তু ধরা যখন পােড়েছ তখন তা আর
দিয়ে পারছ না।
আমি কারাে ভয়ে লুকুতেও আসিনি, ধরাও পড়িনি।
লতিফার স্বর আগের মতই গম্ভীর।
Self-Contradiction ! Self-Contradiction !!
সঈদ একটা উচ্চ হাসির রােল তুলিল। পরে আবার বলিল,
এই একটু আগেই আমার কাছে স্বীকার কোরেছ—বখসিস্ দেবার
ভয়ে ছাদে পালিয়ে এসেছ।
লতিফার গাম্ভীর্যের বাধ যেন একটু ধ্বসিয়া পড়িল। এই প্রাণখােলা
সাদা মানুষটীর উপর রাগ অভিমান করিয়া সে কোন দিনই জয়ী
হইতে পারে নাই, আজও বুঝি পারিল না। বলিল, বেশ কোরেছি,
স্বীকার কোরেছি। আমার খুসী।
তেমনি আনন্দ-হাশ্যে সঈদ বলিল, শুধু তােমার খুসী হােলে তাে হবে
না, আমাকেও যে খুসী কোরতে হবে।
সমস্ত দিন কাটিয়ে—এখন রাত্রির বেলায় এসে হাজির হলেন—

রূপায়ণ
ওঁকে খুশী করূতে হবে। না এলেই তাে চোতে, কে আসতে
“মাথার কিরে দিয়েছিল ?
কথাটা শেষ করিয়া কৃত্রিম রাগে লতিফা অন্য দিকে মুখ ফিরাইল।
-ও-দেরীর জন্য বুঝি বখসিস্ Forfiet হােয়ে গেছে? বেশ
Late fine দিচ্ছি, তা হােলে ত হবে ?
—আর Late fine দিতে হবে না। বাপরে বাপ! এমন কুড়ে
মানুষও থাকে। এইটুকু আসবেন, তা দিনটা শেষ না কোরে
আসতে পারলেন না। একলাটা আমাকে কি মুশকিলে পােড়তে
হয়েছিল জানাে?
-না জানলেও একটু একটু বুঝতে পারছি বই কি! তা যখন
সকলের শেষে—“সভাশেষে নিশান্তের শশাঙ্ক সমান” এসে পােড়েছি, তখন
“মহারাণী”—
বাধা দিয়া লতিফা বলিল, আর কবিতা কোরতে হবে না, কোথায়
থাকা হয়েছিল এতক্ষণ?
-মিটিংএ।
—মিটিংএ ।
--হ মিটিংএ, শিউরে উঠলে যে?
-না আর মিটিং ফিটিংএ যেয়ো না।
লতিফার কণ্ঠস্বরে অনুজ্ঞার আভাস সুস্পষ্টরূপে ফুটিয়া উঠিল।
একটু হাসিয়া সঈদ জিজ্ঞাসা করিল, কেন?
—কেন আবার ? কেন কথার কোন জবাব আছে নাকি ?
-জবাব নিশ্চয়ই আছে। তবে তুমি যদি না বল, সে অন্য কথা।
কিন্তু না বােলেও আমি বােধ হয় বুঝতে পেরেছি।
৭৭

রূপায়ণ
-
-কি বুঝেছ ?
-ধোরে নিয়ে যাবে।
–ছাই বুঝেছ। ধােরে নিয়ে যাবে তাতে আমার কি ?
—একেবারে যে কিছু নয় তা-ই বা কেমন কোরে বলি।
-“কিছু ত ‘কিছু’-বেশ! আমি আর তােমার সঙ্গে বােকৃতে
পারি না। এত কথাও মানুষ শিখে রাখে—বাবা রে বাবা!
হঠাৎ নীচে হইতে ডাক পড়িল, লতি!
লতিফা ত্ৰস্তে উঠিয়া বলিল, মা ডাকছেন, চলল নীচে যাই।
কথাবার্তা অর্ধপথেই থামিয়া গেল ! সঈদ উঠিয়া দাঁড়াইল। পরে
ধীরে ধীরে উভয়ে সিড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া গেল।
৭৮

রূপায়ন সঈদ লতিফার দূর সম্পর্কীয় ভাই। তবে ছেলেবেলা হইতে উভয়ে একসঙ্গে লালিত-পালিত ও বর্ধিত হওয়াতে তাহাদের মধ্যে যে ব্যৰধানটুর থাকা উচিত ছিল, তাহা মােটেই ছিল না। সঈদের পিতা কোন সওদাগরী অফিসে কাজ করিতেন। কিন্তু যে বেতন তিনি পাইতেন, কলিকাতা শহরে পৃথক বাড়ী ভাড়া করিয়া সপরিবারে বাস করার পক্ষে তাহা যথেষ্ট ছিল না। কাজেই লতিফার পিতার অংশীদার স্বরূপে তাহার সহিত একই বাড়ীতে বাস করিতে তিনি বাধ্য হইয়াছিলেন। এই সূত্রে সঈদ ও লতিফার ঘনিষ্টতার সূত্রপাত হয়। প্রথম সাক্ষাতে সঈদ লতিফাকে খেলার সাথী রূপেই গ্রহণ করিয়াছিল। কিন্তু সে বেশী দিনের জন্য নয়। একটু বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সম্পর্ক উল্টাইয়া তাহারা গুরু-শিষ্যার পর্যায়ে আসিয়া দাঁড়ায়। আর আজ ?—আজ তাহাদের সে সম্পর্ক অটুট আছে বটে, কিন্তু তাহারই অন্তরালে উভয়ের মনের গােপন কোণে আর এক নবতন সম্পর্কের মঙ্গল আভাস তাহাদের চিত্তকে আনন্দ-সজাগ করিয়া তুলিয়াছে। মাস কয়েক হইল সঈদ এম-এ পাশ করিয়াছে, এবং সুবিধামত কোন চাকুরী যােগাড় করিতে না পারায় উপস্থিতের জন্য এক ধনী গৃহস্থের বাড়ীতে টিউশনী শুরু করিয়াছে। একটু অর্থ-স্বাচ্ছল্য হওয়ায় সঈদের পিতা আজ মাস দুই হইল নিকটেই একটা পৃথক বাড়ী লইয়া সপরিবারে সেখানে উঠিয়া গিয়াছেন। কিন্তু উঠিয়া গেলেও সঈদ ও লতিফার মধ্যে ছাড়াছাড়ি মােটেই হয় নাই। সঈদ ভাত খাইত বাড়ীতে আর কুলী ফেলিত লতিফার কাছে—এই ছিল তাহার অবস্থা।

রূপায়ণ ইদানীং-মাসখানেক হইতে সঈদ একটু বেশীমাত্রায় স্বদেশী হইয়া পড়িয়াছে। খদ্দর-পরা হইতে আরম্ভ করিয়া মিটিংএ মিটিংএ গরম গরম বক্তৃতা দেওয়া পর্যন্ত অনেক কাজই সে করিতে আরম্ভ করিয়াছে। লতিফা কিন্তু এটা বড় একটা পছন্দ করিত না। কি জানি যদি বিপদ ঘটিয়া বসে! লতিফার কোমল প্রাণ আজও পর্যন্ত ততখানি আঘাত সহ করিবার মত দৃঢ়তা বা শক্তি অর্জন করিতে পারে নাই। লতিফার বাপ-মা-ও যে এটা খুব পছন্দ করিতেন, তাহা নহে। কারণ, তাহারাও সঈদকে জামাই করিবার মােল আনা আশা অন্তরে-অন্তরে পােষণ করিতেছিলেন। এক মাস পরের কথা। বেলা প্রায় বারােটার সময় লতিফার মা লতিফার ঘরের রুদ্ধ দরজা ঠেলিয়া ভিতরে ঢুকিয়া রূঢ়স্বরে কহিলেন, বলি তাের কাণ্ডকারখানাটা কি বলতে লতি! খেতে দেতে হবে, না রাতদিন ‘গুম’ হােয়ে বিছানায় পােড়ে থাকলে পেট ভােব ? লতিফা বালিশে মুখ গুজিয়া পড়িয়া ছিল। সেই অবস্থাতেই উত্তর দিল, আমি খাব না। কন্যার অবস্থা দেখিয়া এবং তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া মায়ের রাগ গলিয়া জল হইয়া গেল। তাহার চক্ষু ফাটিয়া কান্না আসিল। কিছুদিন হইতে তিনি কন্যার ভাবান্তর লক্ষ্য করিয়া আসিতেছিলেন এবং তাহার কারণও সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার ধারণা ছিল, এটা বেশীদিন স্থায়ী হইবে না। প্রথম প্রথম এই রকমটাই হইয়া থাকে। কিছুদিন গেলে আবার সব ঠিক হইয়া যাইবে। সেই জন্য এ-পর্যন্ত কন্যার এই মনােবিকৃতিকে তিনি ধমকাইয়া ধাকাইয়া সােজা করিবার কাপায়ণ চেষ্টা করিয়া আসিয়াছেন, আদৌ তাহাকে আমল দেন নাই। কিন্তু আজ যাহা দেখিলেন, যাহা বুঝিলেন, তাহাতে তাহার সে-ধারণা একেবারেই উল্টাইয়া গেল। কন্যাকে তিরস্কার করিতে গিয়া তিনি নিজে কাঁদিয়া ফেলিলেন। কয়েক মুহূর্ত তাঁহার মুখে কথা ফুটিল না। একটুখানি সামলাইয়া লইয়া তিনি কন্যার পাশে বসিয়া আস্তে আস্তে তাহার গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন। তাহার পর শান্ত মেহকণ্ঠে বলিলেন, কি কোরূবে মা! সে তাে বুঝুলেও বুঝবে না, বারণও শুনবে না। নিজের যা খুশী তাই কোরে বেড়াবে। এমন কোরে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে পােড়ে থাকূলে যদি সে ফিতত, তাহােলে না হয় থাকতে; কিন্তু তা তো সে ফিবে না। তবে আর মিছিমিছি নিজের দেহটাকে মাটী কোরে লাভ কি ? লতিফা আর কোন উত্তর দিল না। যেমন ছিল, তেমনি পড়িয়া রহিল। মা আবার বলিলেন, আমি তাকে লােকমারফতে বােলে পাঠিয়েছি, চিঠি লিখে পৰ্য্যন্ত বারণ কোরেছি, যাতে ওসব ঝঞ্চাটে আর পা না দেয়, কিন্তু কিছুতেই ত সে শুক্ল না। শেষকালে নিমিষের জন্য একবার দেখা কোতে অনুরোধ কোরে লিখে পাঠালুম, তা-ও এলাে না। তবে আর সহসা নীচে পরিচিত কলকণ্ঠে ধ্বনিয়া উঠিল, চাচী-আম্মা। কথা শেষ না করিয়াই লতিফার মা উঠিয়া দাড়াইলেন। উচ্চকণ্ঠে কহিলেন, উপরে এসো। লতিফা বিপরীত দিকে পাশ ফিরিয়া শুইল । সঈদ উপরে উঠিয়া একেবারে সরাসরি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। হাসিমুখে কহিল, কাজের বড় ভিড় চাচী-অম্মা! মােটেই সময় কোরে

রূপায়ণ
উঠতে পারি না। আজ এই পথেই বাড়ী ফিরছিলুম, তাই একবার
এলুম।
কথা বলিতে বলিতে একখানি চেয়ার টানিয়া লইয়া সে বসিয়া
পড়িল।
লতিফার মা একটু অনুযোগের সুরে বলিলেন, তা আর এলে কেন?
এলেই ত পারূতে বাছা!
তেমনি হাসিমুখে সঈদ বলিল, তুমি রাগ কোরেছ চাচী-আম্মা !
কেন? দেশের কাজে যদি দশদিন তােমাদের ছেড়ে থাকি, তাতে
রাগ কোরূবে কেন ?
-কি জানি বাছা, এ কেমন দেশের কাজ ! আপন জনের সঙ্গে
একটীবার দেখা করবারও সময় পাওয়া যায় না। বুঝি না বাপু ওসব !
সঈদের মুখে আবার হাসি! বলিল, আচ্ছা তােমায় একদিন ভাল
কোরে বুঝিয়ে দেব--তাহলে ত হবে? কিন্তু খবরদার তখন আর
আমার উপর রাগ কোতে পাবে না।
সেই সরল সুন্দর হাসিমাখা মুখ, উজ্জ্বল চক্ষু, মুখে কথার ফোয়ারা !
লতিফার মা’র রাগ প্রসন্নতায় গলিয়া পড়িল। বলিলেন, আচ্ছা দেখা
যাবে। এখন একটু ঠাণ্ডা হও দিকিন। পেটে কিছু পড়েনি বােধ হয়।
যথেষ্ট পােড়েছে। সকালে যে নাস্তার বহর চোলেছে, তাতে
সন্ধ্যার আগে আর ক্ষিদের সাড়া পাওয়া যাবে বােলে ত মনে হয় না।
তবে একটু পানি খেতে হবে। রােদের চোটে গলাটা একেবারে শুকিয়ে
গেছে।
-আচ্ছা তুমি বােসাে, আমি পানি আছি
লতিফার মা চলিয়া গেলেন।

রূপায়ণ
ঘরে ঢুকিয়াই সঈদ লতিফাকে লক্ষ্য করিয়াছিল। কিন্তু কথা
বলিবার সুযোগ হয় নাই। চাচী-আম্মা চলিয়া গেলে জিজ্ঞাসা করিল,
লতি, অমন কোরে শুয়ে আছো কেন?
সঙ্গে সঙ্গে সে চেয়ারখানা একটু আগাইয়া লইয়া বসিল।
লতিফা বিপরীত দিকে ফিরিয়াই উত্তর করিল, শরীর ভাল না।
-শরীর ভাল না! কি হােয়েছে।
লতিফা কোন উত্তর দিল না।
সঈদ আবার বলিল, কি হােয়েছে বলাে না। আমার কাজ আছে যে,
বেশীক্ষণ বােসতে পারবাে না।
-আমি কি বােতে বােছি।
লতিফার অন্তরটা যে অভিমানের ঘন মেঘে ছাইয়া আছে, সঈদ
তাহা ভালরূপেই বুঝিল ; কিন্তু তাহার অভিমান বা
রাগকে সে
কোনদিনই আমল দেয় নাই। হাসির বাতাসেই উড়াইয়া দিয়াছে।
কাজেই আজও আমল দিল না। একগাল হাসিয়া কহিল, " বােছ না
বটে, কিন্তু না বােললেও আমি বােছি। আর
হঠাৎ লতিফার মা হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া বলিল, কি সর্বনাশ
কোলি বাছা, শেষে নিজেও মলি, আমাদেরও মেরে গেলি।
বিস্মিত দৃষ্টিতে চাচী-আম্মার মুখের পানে চাহিয়া সঈদ জিজ্ঞাসা
করিল, কি হােয়েছে চাচী-আম্মা! কি সর্বনাশ কোরেছি।
--আর “কি সর্বনাশ কোরেছি। বাড়ীতে যে পুলিশ এসেছে
হতভাগা ছেলে!
সঈদের মুখখানা সহসা ভাস্বর হইয়া উঠিল। একটুখানি হাসিয়া বলিল,
তা’তে সৰ্ব্বনাশ’ কি হােলল চাচী-আম্মা! এ তাে পরম আনন্দের কথা।

রূপায়ণ
লতিফা ততক্ষণ বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়াছে। সঈদ বলিতে
লাগিল, আমার সৌভাগ্য যে এতদিনে আমার জেলে যাওয়ার সুযােগ
হােয়েছে। যাক—পুলিশ কোথায় ?
-তোদের বাড়ীতে আর কোথায় ?
-আমাদের বাড়ীতে। তােমায় খবর দিলে কে ?
-সেই হাংলা চাকরটা তােকে খুঁজতে এসেছিল।
—তা’কে কি বোলে দিলে?
বন্দুম এখানে আসেনি।
-অধ্যায় কোরেছ চাচী-আম্মা ! কেন মিথ্যা কথা বােলতে গেলে।
না,যদিও বা
খানিকক্ষণ বােসতুম, তা আর হােতে দিলে না।
এখুনি উঠিয়ে তবে ছাড়লে।
সে চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
চাচী-আম্মা তাহার সম্মুখে আসিয়া বাধা দিয়া কহিলেন, সে কি!
কোথায় যাবি ?
-কেন-বাড়ী ?
-বাড়ী? পুলিশ যে এখনাে ােের অপেক্ষায় বসে আছে ?
—আছে বােলেই ত যাচ্ছি চাচী।
তাহার মুখে গম্ভীর হাস্য, চক্ষে প্রশান্ত উজ্জ্বল দৃষ্টি। লতিফার মা’র
বাধা দিবার সাহস হইল না। সে ধীর পদ-বিক্ষেপে ঘর হইতে বাহির
হইয়া গেল।
লতিফার মা তাহার গতিপথ পানে এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন।
লতিফা আবার বালিশে মুখ গু জিয়া পড়িল।

রূপায়ণ বিচারে সঈদের দুই বৎসরের কারাদণ্ড হইল। বিপুল বন্দেমাতরম্ ও জয়ধ্বনির মধ্যে দেশবাসী তাহাকে কারার পথে বিদায় দিয়া ঘরে ফিরিল। সমগ্ৰ কলিকাতা শহরে তথা সারা বাংলাদেশে সঈদের জয়জয়কার পড়িয়া গেল। তাহার নাম ললাকের মুখে মুখে ফিরিতে লাগিল। সকলেই শত মুখে তাহার ত্যাগ, কর্মনিষ্ঠা ও স্বদেশ-প্রাণতার প্রশংসা করিল। কিন্তু এই প্রশংসা-বাণী ও জয়জয়কার লতিফার কানে হাহাকারের মত বাজিয়া উঠিল। বিচার-ফল শুনিবামাত্র দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সেই যে সে বিছানার উপর উপুড় হইয়া পড়িল, সমস্ত রাত্রির মধ্যে আর কেহ তাহাকে তুলিতে পারিল না। লতিফার মা-বাপ মহাসমস্যায় পড়িলেন। এক আধ দিন নয়, দুইটা দুইটা বৎসর। কেমন করিয়া মেয়েকে আইবুড়ো করিয়া রাখিবেন। কাজেই নিরুপায় হইয়া এক দিকে তাঁহারা মেয়েকে বুঝাইয়া পাড়াইয়া শান্ত করিতে লাগিলেন এবং অন্যদিকে তলে তলে পাত্রের সন্ধানে মন দিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাত্র মিলিল। ছেলেটা বি-এ পর্যন্ত পড়িয়াছিল। পড়াশুনা ছাড়িয়া এখন শেয়ার মার্কেটে দালালী করিতেছে। উপার্জনও বেশ দুই পয়সা আছে। তবে একটা দোষ তাহার তিন কুলে কেহ নাই। কিন্তু লতিফার বাপ এ দোষটাকে দোষ বলিয়া আদৌ মনে করিলেন না। বরং সুবিধাই বুঝিলেন। মেয়েকে ঝঞ্জাট পােয়াইতে হইবে না। ৮ পায়ণ লতিফা কোন আপত্তিও করিল না, যথাসময়ে বিবাহ হইয়া গেল। আগ্রহও দেখাইল না। দুই বৎসর পরের কথা। সদ্য-জেলমুক্ত সঈ ট্রাম হইতে নামিয়া বাড়ীর পথ ধরিয়াছে। সহসা বাম দিকের গলিতে অস্ফুট আর্ত চীৎকার শুনিয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইল। আবার সে আর্তস্বর গুমরিয়া উঠিল। কৌতুহলী হইয়া সে গলির মধ্যে প্রবেশ করিয়া যে বাড়ী হইতে শব্দ আসিতেছিল, তাহার দরজার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। দরজার সম্মুখেই উজ্জ্বল গ্যাসের আলাে, বাড়ীর সম্মুখের উঠানটা পরিষ্কার দেখা যাইতেছে। দরজার সম্মুখে দাঁড়াইয়া সঈদ কাণ পাতিয়া সুস্পষ্ট শুনিতে পাইল, কে কাহাকে কিল চড় লাথি দিয়া বেদম প্রহার করিতেছে। প্রহার-শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই আৰ্ত্ত গুমরণ ধ্বনিয়া উঠিতেছে। সঈদ কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। কি করিবে স্থির করিতে না পারিয়া ইতস্ততঃ করিতেছে, এমন সময় দেখিতে পাইল ঘরের ভিতর হইতে একটা লােক একজন স্ত্রীলােকের গলা ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিয়া উঠানে আনিয়া ফেলিল, তাহার পর তাহার কোমরে সজোরে গােটা দুই লাথি বসাইয়া দিল। রমণীর বুক ফাটিয়া আর্তস্বর বাহির হইল। সঈদ আর নিজেকে সামলাইতে পারিল না। উন্মাদের মত যাইয়া লােকটার গলা টিপিয়া ধরিয়া তাহার নাসিকা-লক্ষ্যে বজ্রমুষ্টি তুলিল। -দোহাই—মেরাে না-উনি আমার স্বামী। বিস্মিত সঈদ পিছু হটিয়া আহতার মুখের পানে চাহিল। পরক্ষণেই অন্ধকার-পথে সর্পদষ্ট পথিকের মত সে আঁকাইয়া উঠিল—এ কি। লতিফা।

রূপায়ণ
নিখিল সংসার কুমােরর চাকের মত সঈদের চোখের উপর ঘুরিতে
লাগিল।
লােকটা তাহার পাশেই দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া টলিতেছিল,
তাহার মুখ দিয়া ভৰু ভর করিয়া মদের গন্ধ বাহির হইতেছিল।
সঈদের দিকে চাহিয়া একটা বিশ্রী মুখভঙ্গী করিয়া বলিল, কি বাবা,
পছন্দ হােয়ে গেল নাকি!
সঈদের পিঠে কে যেন সহস্র
চাবুক একসঙ্গে বসাইয়া দিল।
আর মুহূর্তকালও সে এ-নরকে তিষ্ঠাইতে পারিল না। নীরবে নতমস্তকে
সে দরজা পার হইয়া গলিতে গিয়া পড়িল।

দিন-মজুলের জীবনপঞ্জী মধু ছিল একটু ‘হাবা-জাবা' গােছের মানুষ। সমস্ত দিন হাড়-ভাঙা খাটুনী খাটিত, মাথার ঘাম পায়ে ফেনিত, কিন্তু মজুরী পাইত যােল আনার জায়গায় ছয় আনা কি আট আনা। যাহারা তাহাকে দিয়া কাজ করাইত, তাহারা তাহার বােকামীর সুযােগ যােল আনা রকমেই গ্রহণ করিত। তাই কোন দিন হিসাব ভুল করিয়া, কোন দিন বা ‘হার কমাইয়া ন্যায্য পাওনা আধা-আধি বা দশ আনা ছ’ আনা করিয়া মধুকে বিদায় দিত। মধুও ‘টু’ শব্দটী না করিয়া যাহা পাইত, তাহাই হাতে করিয়া ঘরে ফিরিত । এতটুকু আপত্তি কেহ কোন দিন তাহার মুখ হইতে শুনিতে পায় নাই। অসন্তোষের গ্লানিমা তাহার সদা-প্রফুল্ল মুখ- খানিকে দিনেকের তরেও আঁধার করিতে পারে নাই। সে যেন নির্বিকার নির্লোভ। যে হাসিমুখ লইয়া সে বাড়ী হইতে বাহির হইত, সেই হাসিমুখ লইয়াই আবার বাড়ী ফিরিত,-তা কিছু পা’ক চাই না পা’ক। পাওয়া না পাওয়ার বা তাহার কম-বেশী তারতম্যের জন্য কোন মাথা-ব্যথাই যেন তাহার ছিল না। কিন্তু স্ত্রী রঙিলা ছিল ঠিক ইহার বিপরীত। সে চতুরা-বুদ্ধিমতী। প্রত্যেক জিনিসের কড়ায় গণ্ডায়—খুটীনটী হিসাব তাহার চাই-ই চাই। ৮৮ রূপায়ণ স্বামী সমস্ত দিন কি করিল না করিল,-কি কাজ কত ‘হারে কতখানি করিয়া আসিল ; সন্ধ্যার পর সে সমস্তই হিসাব লইত এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর দেওয়া পয়সা গণিয়া ন্যায্য পাওনার হিসাব মিলাইত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রাপ্ত পয়সার সঙ্গে প্রত্যহই তাহার হিসাবের গরমিল হইত। অনেক চেষ্টা করিয়াও সে এই ব্যতিক্রম দূর করিতে পারি না। ক্ষোভে দুঃখে বকিয়া ঝকিয়া ‘মাথামুড়’ খুঁড়িয়া সে একাকার করিত। মধু কিন্তু নির্বিকার। রঙিলার হাতে মজুরীর কড়ি সঁপিয়া দিয়া খরশান’ সাজিয়া সে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই খেলাে হুকায় টানের পর টান চড়াইত। এমনি করিয়া দিনের পর দিন কাটিয়া চলিয়াছিল এই ডােম-দম্পতীর। সন্ধ্যার পর দরকারী কাজকর্ম সারিয়া একলাটা রঙিলা ঘােট ঘরখানির রােয়কে পা ছড়াইয়া বসিয়া আছে। অন্য দিন হইলে এতক্ষণ সে রান্নাবান্না লইয়া ব্যস্ত থাকিত, কিন্তু আজ ঘরে চাল বাড়ন্ত। মজুরীর পয়সা লইয়া মধু চাল ডাল কিনিয়া আনিবে, তবেই হাঁড়ি চড়িবে । কাজেই স্বামীর আসা-পথ চাহিয়া বসিয়া থাকা ছাড়া উপায় কি? আজ পাঁচ বৎসর হইল ব্রঙিলা এ-ঘরে ঘরকন্না করিতে আসিয়াছে। এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে আজ প্রথম তাহার ঘরে চাল বাড়ন্ত। হাবা- জাবা স্বামী হইলেও নিজের বুদ্ধিতে সে তাহাকে বেশ গুছাইয়া গাছাইয়া’ই এতদিন চালাইয়া আসিয়াছে। কোন দিন এতটুকু অভাবের মধ্যে পড়িতে দেয় নাই বা নিজেও পড়ে নাই। কিন্তু আজ তাহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। তবে ইহার জন্য তাহার দুঃখ করিবার কিছুই নাই। কারণ এ-ঘটনায় তাহার নিজের বা স্বামীর কাহারও কোন হাত নাই। এটা নিতান্তই দৈব। গত সাত দিনের বর্ষার ফলে কাজ কর্ম একেবারেই বন্ধ! দিন-মজুরের ঘরে কত চাল ধান জমা থাকে যে, পুরাপুরি সাতটা রূপায়ণ দিন দুইজন লােক নিষ্কৰ্ম্মা বসিয়া খাইতে পারে। কাজেই আজ সকাল হইতেই রঙিলার ঘরে চাল বাড়ন্ত। সকালে অভুক্ত স্বামী কাজে বাহির হইয়া গিয়াছে, এখনও ফিরে নাই। কাজেই রঙিলা আকুল প্রতীক্ষায় তাহার পথপানে চাহিয়া বসিয়া আছে। দেখিতে দেখিতে রাত্রি প্রায় দুই দণ্ড হইয়া গেল। রঙিলা চঞ্চল হইয়া উঠিল। অন্ধকার রাত্রি। কে জানে কোথায়- সহসা পরিচিত কণ্ঠস্বরে তাহার সকল উদ্বেগের অবসান হইল। প্রসন্ন হাস্যে সারা মুখখানি ভরিয়া উঠিল। মধু ডাকিল, রঙি । তাহার স্বর আনন্দ-গদগদ। মনের আনন্দ মনে চাপিয়া কণ্ঠস্বরে একটু বিরক্তি ফুটাইয়া রঙিলা বলিল, রাত দুপুর না হলে বুঝি আর বাড়ীর কথা মনে পড়ে না ? মধু কোন উত্তর দিল না। সরাসরি বােয়াকে উঠিয়া একেবারে রঙিলার সম্মুখে আসিয়া বসিয়া পড়িল। পাশেই কেরােসিনের ডিব জলিতেছিল। তাহার আলােকে রঙিলা দেখিল, স্বামীর সারা মুখখানিতে পুলকের বন্যা খেলিয়া চলিয়াছে। তাহারও বুকের ভিতরটা আনন্দে উদ্বেল হইয়া উঠিল। কিন্তু যথাসাধ্য নিজেকে দমন করিয়া সে রাগের ছলা করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, এত রাত কোথায় থাকা হােয়েছিল শুনি? একগাল হাসিয়া মধু বলিল, আগে কি এনেছি দেখ, তারপর আমায় বকি এখন। সে কাপড়ের ‘খুট’ হইতে একটা নাকচাবি খুলিয়া রঙিলাকে দেখাইয়া বলিল,-কেমন, এইবার ?—হি-হি-হি! একবার আড়চোখে চাহিয়া মুচকি হাসিয়া রঙিলা বলিল, থাক রূপায়ণ আর দেখাতে হবে না, এখন চাল ডাল কি এনেছ দাও দিকি। রান্নাবান্না আর হবে কখন? মুহূর্তে মধুর সারা মুখখানি ছাইএর মত সাদা হইয়া গেল। সৰ্ব্বনাশ! এখন উপায় ! নাকচাবি কিনিতে মজুরীর চৌদ্দ আনা পয়সাই যে সে খরচ করিয়া আসিয়াছে। চাল ডালের কথা যে তাহার মনেই ছিল না, এখন উপায় ! সে ফ্যা ফ্যা করিয়া রঙিলার মুখের পানে চাহিয়া রহিল। রঙিলা সব বুঝিল। রাগে তাহার পা হইতে মাথা পর্যন্ত জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু পরক্ষণেই এই তদতপ্রাণ আপন-ভােলা সরল মানুষটীর দুর্লভ ভালবাসার কথা স্মরণ করিয়া যুগপৎ শ্রদ্ধা ও করুণায় তাহার প্রাণ ভরিয়া উঠিল। কিন্তু প্রাণের কথা সে প্রাণেই চাপিল। স্বামীকে সে তিরস্কার বা সমাদর কিছুই করিল না। ধীরে ধীরে উঠিয়া ঘরের মধ্যে গিয়া মাদুর পাতিয়া শুইয়া পড়িল। মধু অনেকক্ষণ হতভম্বের মত একই ভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার পর গত্যন্তর নাই দেখিয়া সেইখানেই—বােয়াকের উপর গামছা পাতিয়া তাহার উপর ক্লান্ত দেহখানি ঢালিয়া দিল রূপয়ন ‘সখ’ বলিতে রঙিলার বিশেষ কিছুই ছিল না। সেই জন্য ভাল কাপড় বা গয়না গাঁটীর জন্য কোনও দিনই সে মধুর কাছে কোন অনুযােগ করিত না। মােটা ‘কস্ত। পেড়ে শাড়ী আর দুই হাতে গাছ। কাচের চুড়ী হইলেই তাহার যথেষ্ট হইত। তাহাতেই সে সন্তুষ্ট থাকিত। মধুও এ-সম্পর্কে এক প্রকার নিশ্চিন্ত উদাসীন ছিল। গায়ে পড়িয়া—যাচিয়া কোন দিনই সে রঙিলাকে কিছু আনিয়া দিত না। অবশ্য বিনা হুকুমে পয়সা খরচ করিলে পাছে রঙিলা রাগ করে—বকাবকি করে। নইলে তাহাকে মনের মতনটী করিয়া সাজাইবার ইচ্ছা যে মধুর ছিল না তাহা নহে। কিছুদিন আগে বাজারে কীৰ্ত্তন শুনিতে গিয়া মধু কীৰ্ত্তনওয়ালীর নাকে একটা সুন্দর নাকচাবি দেখিয়া আসিয়াছিল। উজ্জ্বল আলােকে নাক চাবির কল্যাণে কীৰ্ত্তনওয়ালীকে কি সুন্দরই না মানাইয়াছিল। বাড়ী ফিরিবার পথে মধুর মনে হইল, এনি একটা নাকচাবি যদি সে তাহার রঙিলাকে আনিয়া দিতে পারিত। বাড়ী আসিয়া মধু কল্পনাটাকে আর মনের মধ্যে চাপিয়া রাখিতে পারিল না। সরাসরি রঙিলাকে বলিয়া বসিল। রঙি, তুই নাকচাবি পরবি? রঙিলা ঠাট্টার সুরে বলিল, পিেরবাে বই কি, এনেছ নাকি ? সারা মুখ খানিতে হাসি ভরিয়া মধু বলিল, না আনিনি,তুই যদি বলি তাহােলে এনে দিই। রঙিলা আগের মতই রহস্য করিয়া বলিল, ও—এই কথা! আমি মনে কোছি বুঝি এনে টেনে আমায় পােরুতে বেলছ। ।

পায়ণ বুদ্ধি-শুদ্ধির বিশেষ অভাব থাকিলেও মধু এ ঠাট্টাটা বুঝিয়াছিল এবং সেই জন্যই রঙিলাকে নাকচাবি উপহার দিবার একটা উপায় সে খুজিয়াছিল। কিন্তু উপায় কি হইবে? কোন দিন ছয় আনা, কোন দিন দশ আনা, কোন দিন বা বারাে আনা,-এই ত তাহার রােজগার। ইহা দিয়া ত নাক চাবি কেনা চলে না। দুই দিনের বা তিন দিনের মজুরী জমাইয়া যে একাজ করিবে, তাহারও উপায় নাই। বাড়ী ফিরিয়াই দিনের দিন রঙির হাতে সব ধরিয়া দিতে হয়, নাকচাৰি কিনিবে বলিয়া তাহার নিকট হইতে আর কিছু চাহিয়া লওয়া চলে না ; কাজেই ইচ্ছা সত্ত্বেও মধু এতদিন কিছু করিয়া উঠিতে পারে নাই। শেষে সুযােগ ঘটিন বাদলে। সাত দিনের একটানা বর্ষায় মধুর মত অনেকের ঘরেই চাল বাড়ন্ত হইয়া উঠিয়াছিল। অনেকেই নিরুপায় হইয়া এটা সেটা বেচিয়া বন্ধক দিয়া পেটের উপায় করিতেছিল। এই অনেকের ভিতরই একজনের নিকট হইতে মধু তাহার বড় সাধের নাক- চাবিটী খরিদ করিয়াছিল। কাজের ফেরৎ বাজার করিতে যাইয়া সে সমস্ত পুঁজি নিঃশেষ করিয়া এই বাজার করিয়া; ঘরে ফিরিয়াছিল । ফল যাহা দাঁড়াইয়াছিল, আগেই বলিয়াছি। ; রাত্রি দুই প্রহর পর্যন্ত মাদুরের উপর এপাশ ওপাশ করিয়া শেষ পৰ্যন্ত অসহ্য হওয়ায় রঙিলা উঠিয়া বাহিরে আসিল। স্নিগ্ধ-শুভ্র চাদেব আলােয় নিখিল সংসার তখন হাসিতেছে। রােয়াকে গামছার বিছানা পাতিয়া মধু অঘােরে নিদ্রা যাইতেছে। পাশের কেলােশনের ডিবাটী জ্বলিয়া জ্বলিয়া কখন নিভিয়া গিয়াছে। রঙিলা আস্তে আস্তে মধুর শিয়রে

রূপায়ণ
আসিয়া বসিয়া পড়িল। একদৃষ্টে তাহার ঘুমন্ত মুখের পানে কিছুক্ষণ
চাহিয়া থাকিয়া অবশেষে ধীরে ধীরে তাহার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল।
কোমল স্নেহস্পর্শে ঘুম ভাঙিতেই মধু চমকিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া
বসিল। তাহার পর রঙিলার মুখের পানে চাহিয়াই কি জানি কেন
মুখখানি নীচু করিল।
রঙিলা কোমল কণ্ঠে বলিল, ঘরে চলল। ঠাণ্ডা লাগবে। মধু
দ্বিরুক্তি করিল না। আস্তে আস্তে উঠিয়া ঘরে গেল। রঙিলাও তাহার
অনুবর্তিনী হইল।
শুইয়া পড়িয়া রঙিলা বলিল, এমন বােকামী কি কোতে আছে?
ঘরে চাল ‘বাড়ন্ত’-ও না হয় দু’দিন পরেই আনতে। তাড়াতাড়ির ত
কিছুই ছিল না।
রঙিলার কণ্ঠস্বরে ক্রোধের পরিবর্তে স্নেহ ও কোমলতা পূর্ণমাত্রায়
ফুটিয়া উঠিল।
মধু চুপ করিয়া রহিল।
রঙিলা আবার বলিল, কাল সকালে কি খেয়ে বেরুবে বল দিকি
এখন! আজ সমস্ত দিন-রাত্তির উপােস গেল, কালও সারাটা দিন
যাবে।
এরকম কোরে কি মানুষ বাঁচে। কোন্ দিন দেখুছি-
রঙিলার স্বর ধরিয়া আসিল। অলক্ষিতে চোখের কোণে জল আসিয়া
পড়িল।
এবার আর মধু চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। এতক্ষণ সে
বিপরীত দিকে মুখ করিয়া শুইয়া ছিল। এবার রঙিলার দিকে ফিরিয়া
তাহার গায়ে হাত বুলাতে বুলাইতে কহিল, তুই রাগ করিসনি রঙি,
আর কক্ষনাে আমি এমন কাজ কোবাে না।
১৪

রূপায়ণ
রঙিলার দুঃখ যেন শতগুণ বাড়িয়া উঠিল। সে কোপাইয়া কাদিয়া
উঠিল। মধু তাহাকে বুকের ভিতর টানিয়া লইয়া পিঠে স্নেহের পরশ
বুলাইতে বুলাইতে বলিল, আমায় মাফ ক রঙি!

রূপায়ণ তিন মাস পরের কথা। অনেকখানি রাত্রি হইয়াছে। রান্না বান্না শেষ করিয়া রঙিলা মধুর অপেক্ষায় বসিয়া আছে। উৎকণ্ঠায় আশঙ্কায় তাহার বুকের ভিতরটা চিব চিব করিতেছে। কাজে গিয়া কোন দিনই ত এত রাত করে না। তবে আজ কেন এমন হইল? রঙিলা ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন কারণই খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিল না। কাজেই তাহার উদ্বেগ-আশঙ্কা উত্তরােত্তর বাড়িয়াই চলিল। চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে না পারিয়া সে ‘ঘর-বার’ আরম্ভ করিয়া দিল। অবশেষে মধু দেখা দিল। কিন্তু সম্পূর্ণ নূতন মূর্তিতে। সে মূর্তি রঙিলার কাছে একেবারেই অপরিচিত। বােয়াকে উঠিয়াই একটা ‘টাল’ খাইয়া মধু ডাকিল, রঙি! তাহার স্বর অর্ধজড়িত। রঙিলা অগ্রসর হইয়া তাহাকে ধরিতে যাইয়াই সহসা দুই পা পিছাইয়া আসিল। একটা পচা গন্ধে তাহার যেন নিশ্বাস আটকাইবার উপক্রম হইল। সে নাকে কাপড় দিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। মধু আবার বলিল, মাদুরটা পেতে দে ত রঙি! কথা শেষ হইবার পূর্বেই সে ভূতল আশ্রয় করিল। রঙিলা সব বুঝিল। দুঃখে রাগে তাহার চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইল। রাত্রির শেষ প্রহরে নেশা ছুটিয়া গেলে মধু উঠিয়া বসিল। একপাশে মেজের উপর রঙিলা উপুড় হইয়া পড়িয়া আছে। তখনও সে ঘুমের রূপায়ণ ঘােরে এক একবার ফুলিয়া উঠিতেছিল। মধুর বুঝিতে বাকী রহিল না যে সমস্ত রাত্রি রঙিলা কাঁদিয়া কাটাইয়াছে। খানিকক্ষণ সে একদৃষ্টে তাহার পানে চাহিয়া রহিল। তাহার পর ধীরে ধীরে উঠিয়া তাহার নিকটে গেল। গায়ে হাত দিয়া ডাকিল, রঙি । রঙিলা ‘উ’ করিয়া একবার সাড়া দিয়া আবার চুপ করিল। মধু পুনরায় ডাকিল। সাড়া নাই। আবার ডাকিল। আবার—আবার। অনেক ডাকাডাকি নাড়ানাড়ির পর রঙিলা উঠিয়া বসিল। মিনতিভরা কণ্ঠে মধু বলিল, এক ঘটী জল দে রঙি, পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। রঙিলা কোন কথা না বলিয়া উঠিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পরে এক ঘটী জল আনিয়া মধুর সামনে রাখিয়া ঘরের ভিতর গিয়া শুইয়া পড়িল। মধুর নেশান ঘাের যদিও তখনও একটু-আধটু ছিল, তথাপি নিজের অবস্থাটা সে সম্যকরূপেই বুঝিতে পারিল। পয়সা কত অবশিষ্ট আছে দেখিবার জন্য সে তাড়াতাড়ি কাপড়ের খুট খুলিল। কিন্তু যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার চক্ষু-তকা উর্ধে উঠিল। সৰ্ব্বনাশ! এক পয়সাও যে নাই! সকালে রঙিলাকে সে কি জবাব দিবে। তখন ভােরের পাখী ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছে। সহকর্মী শয়তানদের পাল্লায় পড়িয়া মধু আজ তাড়ির আড্ডায় ঢুকিয়া- ছিল এবং সমস্ত দিন হাড়ভাঙা খাটুনীর ফলে যাহা কিছু পাইয়াছিল, সমস্তই সেখানে বিসর্জন দিয়া রিক্ত হস্তে ঘরে ফিরিয়াছিল। তাহার পর যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। সকালে উঠিয়া রঙিলা যতদূর সম্ভব মধুর উপর এক হাত লইল। তাহার পর রাগ একটু পড়িয়া আসিলে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া অনেক ৭

রূপায়ণ
বুঝাইয়া আর ও ‘গােরক্ত’ না খাইবার জন্য স্বামীকে মাথার দিব্য দিয়া
কাজে বিদায় দিল।
কিন্তু সে রাত্রিতে আবার ঠিক সেই অবস্থা। মধু টলিতে টলিতে
আসিয়া নােয়কের উপর পড়িয়া গান ধরিল-“কোন্ ঘাটে চান কলি
কানাই গাছ। কোথা হারালি !”
ক্ষোভে, অপমানে, লজ্জায় রঙিলা মরিয়া হইয়া উঠিল।

রূপায়ণ ৪ দু’টী মাস কাটিয়া গিয়াছে। ছেড়া মাদুরের উপর রঙিলা লুটাইয়া পড়িয়া আছে। তাহার দেহ শীর্ণ, হাড় কয়খানি মাত্র অবশিষ্ট আছে। চোখ দুইটী কোটরের মধ্যে ঢুকিয়া গিয়াছে। সহসা দেখিলে প্রেতিনী-ভ্রমে মনে আশঙ্কার সঞ্চার হয়। বাঘ যেমন একবার নর-রক্তের স্বাদ পাইলে উন্মত্ত হইয়া উঠে, মধুর অবস্থাও হইয়াছিল ঠিক তদ্রুপ। সেই যে প্রথম দিন তাড়ি খাইয়া সে মাতাল হইয়া ঘরে ফিরিয়াছিল, সেই হইতে নেশার মজা এমনভাবে তাহাকে পাইয়া বসিয়াছিল যে, কিছুতেই সে আর নিজেকে ফিরাইয়া লইতে পারে নাই। প্রথম প্রথম দুই একদিন রঙিলার বকুনির ভয়ে সে আজ্ঞায় যাইতে একটু-আধটু ইতস্ততঃ করিত বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তাহাও করিত না। ফলে প্রত্যহ রাত্রিতেই সে ‘চুরচুরে’ মাতাল হইয়া ঘরে ফিরিত। মজুরী কোন দিন একেবারেই নিঃশেষ হইয়া যাইত, কোন দিন বা দুই চারিটী পয়সা অবশিষ্ট থাকিত। কিন্তু দিন-মজুরের সংসার এই ভাবে কয়দিন চলে। রঙিলা বকিয়া ঝকিয়া কাঁদিয়া কাটিয়া কত কি করিয়া দেখিল ; কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। শেষে সে হাল ছাড়িয়া দিল। অনাহারে অর্ধাহারে একেই তাহার শরীর ভাঙিয়া আসিয়াছিল, তাহার উপর আবার দুশ্চিন্তা। সে জ্বরে পড়িল। ঔষধ নাই, পথ্য নাই, কেহ দেখিবার নাই, পিপাসায় ছাতি ফাটিয়া গেলেও মুখে একটু জল দিবার কেহ নাই; দিনে দিনে তাহার অবস্থা অতিমাত্রায় শশাচনীয় হইয়া উঠিল।

রূপায়ণ মধু প্রত্যহ অনেক রাত্রে একবার করিয়া বাড়ী আসে বটে, কিন্তু তখন সে বুদ’ মাতাল। কিছু দেখিবার বা শনিবার মত অবস্থা তখন তাহার মােটেই থাকে না। নিতান্ত যে দিন একটু খাড়া থাকে, সে দিন একবার ডাকিয়া সাড়া লয়-রঙি। এই পর্যন্ত। পূর্বে মধু কাজে যাইত রঙিলার মুখ চাহিয়া,-তাহাকে সুখী করিবার জন্য ; আর এখন যায় গাড়ির আড়ার রসদ সংগ্রহের জন্য ! রঙিলা খাইল কি না খাইল, পরিল কি না পরিল, মরিল কি বঁচিল ;—তাহা দেখিবার অবসর এখন আর তাহার নাই। এখন তাড়ি পাহলেই তাহার সব কাজ মিটিল। পেটে কিছু পড়ক চাই না পড়ুক। এক মাসের উপর হইতে চলিল, রঙিলা জ্বরে পড়িয়াছে। চিকিৎসা- পত্র দূরের কথা, দুই পয়সার সাগু মিছরি আনিয়াও মধু কোন দিন তাহার ‘তত্ব লয় না। এতদিন যে রঙিলা বাচিয়া আছে, তাহা কেবল প্রতিবেশিনী ষষ্ঠীর মা’র কল্যাণে। সেই দয়াপরবশ হইয়া মাঝে মাঝে সাগুটা মিছরিটা দুধটা-আষ্টা’ দিয়া এক একবার দেখিয়া শুনিয়া যায়। মধু বাড়ী ফিরিয়া ঘরের দরজার পাশে দাঁড়াইয়া ডাকিল, রঙি ! সাড়া নাই। সে আস্তে আস্তে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। বিদঘুটে অন্ধকার, কিছুই দেখিতে পাইল না। হাড়াইয়া হাতড়াইয়া দিয়াশলাই সংগ্রহ করিয়া কোন রকমে কেরােসিনের ডিবাটা জালিল। কিন্তু রঙিলার মুখের পানে চাহিতেই তাহার গায়ে কাঁটা দিয়া উঠিল। দীর্ঘ একমাস পরে আজ সে রঙিলার কাছে আসিয়াছে। Soo

রূপায়ণ
আজিকার পাওনা বড় সুবিধাজনক হয় নাই। পেটে বেশী কিছু
পড়িতে পায় নাই ; কাজেই মাথাটা অনেকটা ঠিক ছিল। অনেকক্ষণ
মধু একদৃষ্টে রঙিলার মুখের পানে চাহিয়া রহিল, তাহার পর ডাকিল,
রঙি!
তাহার আওয়াজ ধরা।
রঙিলা উত্তর দিল না। মধু আবার ডাকিল। রঙিলা চোখ মেলিয়া
চাহিল। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই আবার ধীরে ধীরে মুদিয়া আসিল। দুইটী
অশ্রুবিন্দু দুই গণ্ডে নামিয়া আসিল। সে-অশ্রুবিন্দু বুঝি বা তাহার
হৃদয়ের পুঞ্জীভূত অনন্ত বেদনার প্রতিভূ। মধুর বুকের ভিতরটা কঁপিয়া
উঠিল।
স্তব্ধ অভিভূতের মত মধু বসিয়া রহিল। অনেকক্ষণ পরে আবার
ডাকিল, রঙি!
স্বর করুণ-ক্রন্দন-কম্পিত।
উত্তর নাই।
সে রােগিনীর কপালে হাত দিল। ডাকিল, রঙি
রঙিলার সর্বশরীর মুহূর্তের জন্য একবার কঁপিয়া উঠিল। চক্ষু
দুইটা হঠাৎ বিস্ফারিত হইয়া উৰ্দ্ধদৃষ্টি হইল এবং পরক্ষণেই আবার মুদিয়া
আসিল।
সব শেষ!
আর্ত চীৎকার মধুর বুকের ভিতর গুমরিয়া উঠিল।
যথারীতি রঙিলার সৎকার করিয়া মধু বাড়ী ফিরিল। কিন্তু ঘরে
উঠিল না। উঠানে দাঁড়াইয়া এক দৃষ্টে ঘরের পানে চাহিয়া রহিল।
১৩১

;
পায়ণ
।।
অনেকক্ষণ কাটিল। । শেষে একটা বুক-ভাঙা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া
মনস্কে পথে বাহির হইয়া পড়িল।
সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিয়াছে। কাজ কৰ্ম্ম সারিয়া সকলেই যরের পথে
ফিরিয়াছে। আর মধু? উদ্ভ্রান্ত-দিশাহারা। কোথায় চলিয়াছে-
সে-ই জানে।
চলিতে চলিতে মধু আড্ডার সম্মুখে আসিয়া পৌছিল। সহকর্মীরা
তখন সেখানে আসর জমাইয়া বসিয়াছে। একজন বলিয়া উঠিল, এই যে
ইয়ার।-এসে পােড়েছ। অরে এস এস !
আর একজন এক ‘খােপ’ তাড়ি লইয়া একেবারে তাহার সম্মুখে
আসিয়া দাঁড়াইল। অপরূপ ভঙিমায় কহিল, এক পাত্তর টেনে নাও ত
। ধন। মাগের শােক -
রসিকতা শেষ না হইতেই মধু ভরা--খােপ’ ছিনাইয়া লইয়া সজোরে
লােকটার মাথায় বসাইয়া দিল। সৰ্ব্বাঙ্গে তাড়ি মাখিয়া রক্তাক্ত শিরে
সে সেইখানেই লুটাইয়া পড়িল।
মধু তাহার পানে আর ফিরিয়াও চাহিল না। সে যেমন চলিয়াছিল,
তেমনই চলিল। কোথায়--কতদূরে—সে-ই জানে !
১০২

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rupayan Ed. 1st

Author
Hossen, Shahadat
Title
Rupayan Ed. 1st
File name
Rupayan Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2010/03/30
Publisher
Abdur Rahim Khan
Language
Sanskrit
Pages
118
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Hossen, Shahadat
DLI number
511326
Barcode
4990010018484.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Xb5AEuCKtsF
Download PDF

Rupayan Ed. 1st