Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ma Anandamayeer Katha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মা আনন্দময়ীৱ কথা গুগ
No text on this page.
মা আনন্দময়ীৱ কথা অভয়
আনন্দময়ী বিশ্বমন্দির, কিশনপুর,
দেরাদূন হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
পুস্তক পাইবার ঠিকানা :-
(১) শ্ৰীষতীশ চন্দ্র গুহ
১, পার্কসাইড রােড়, কালীঘাট, কলিকাতা
আনন্দময়ী আশ্রম, র, ঢাকা
মাখ-~-১৩৪২
প্রিন্টার—শ্ৰীকালীশঙ্কর বাচি ইণ্ডিয়া ডাইরেক্টরী প্রেস,
১৯নং গুলুওস্তাগর লেন, কলিকাতা।
মা
No text on this page.
মা আনন্দময়ীর কথা
শ্ৰীশ্ৰীমা আনন্দময়ীর সঙ্গ কিছুকাল করিবার পর
আমার মনে কেবলই এই প্রশ্ন আসিতে লাগিল, ইনি
কে? আমি অনেক মহাপুরুষের জীবনেতিহাস ও বাণী
পাঠ করিয়াছি, দুইচার জন সাধকের সঙ্গ করিবারও সুযােগ
হইয়াছে।
আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা এবং বিচার দ্বারা মাকে
ধরিতে চেষ্টা করিলাম। যতই দিন যাইতে লাগিল,
কোনও সামঞ্জস্য পাইলাম না । সময়ে সময়ে বিরক্তি ও
ক্রোধবশতঃ খুবই ঝগড়া করিয়াছি, কিন্তু মায়ের ব্যবহারিক
চরিত্রের সৌন্দৰ্য, উদারতা, মহান্ ভাব এগুলি ক্রমে এমন
একটা আদর্শ আমার চোখের সামনে খাড়া করিল যাহা
আমি অস্বীকার করিতে পারিলাম না। আমার পূর্বের
ধারণা ও মতবাদ শিথিল হইয়া গেল।
মায়ের কাছে গেলে মনে হইতে থাকে-করুণা, পরের
জন্য আপনাকে বিলাইয়া দেওয়া, প্রেম এই সকল ভাব
যেন একটি মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া আসিয়াছে।
२
মা আনন্দময়ীর কথা
বাল্যকাল হইতেই মায়ের চরিত্রে সকল সদ্গুণের
এক অভূতপূর্ব বিকাশ দেখা গিয়াছে। তাহার প্রতি কমে,
প্রতি ভাবে এক অপূর্ব পূর্ণতা এবং অলৌকিক মাধুৰ্য্য
যাহা জীবকে আকর্ষণ করে।
কামক্রোধাদি রিপু এবং রাগান্বেষাদি কখনও মায়ের
শরীরকে আশ্রয় করিয়া অভিব্যক্ত হয় নাই। শুনিয়াছি,
মা যখন লৌকিক পতির সঙ্গে ঘরকন্না করিতেন, পতি
ঐশ্ৰীভােলানাথের কাছে মায়ের এই সহজ নিবৃত্ত ভাব
বড় অদ্ভুত ঠেকিত। “সাংসারিক সুখ ঘটিল না” বলিয়া
কখনও দুঃখ করিতেন। বস্তুতঃ, মায়ের উপর একটা
বিশেষ ভালােবাসা, পূর্ণসত্বময়ী মায়ের অলৌকিক প্রভাব
এবং অপূর্ব সেবা এই তিনই ভােলানাথকে দারান্তর
পরিগ্রহ করিতে নিবৃত্ত করিয়াছিল এবং ধৈৰ্য্যধারণ করিতে
ও কিয়ৎ পরিমাণে শান্ত থাকিতে সমর্থ রাখিয়াছিল।
যখন ভােলানাথের সঙ্গে থাকিতেন তখন মায়ের ভাব কিরূপ
ছিল, এ প্রসঙ্গে মা একদিন বলিয়াছিলেন, “
পির
কাছে পুত্ৰী যেমন থাকে, ভােলানাথের কাছে
আমি তেমনই থাকিতাম।” মায়ের মত এরূপ
নিখুত, নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ইতিহাসে আর পাওয়া যায় নাই
বলিয়াই জানি।
মা আনন্দময়ীর কথা অবিরত বিরুদ্ধ ভাবের নিষ্পেষণে ধরিত্রীদেবীরও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া যায় কিন্তু ধীরতা মূর্তিমতী মা আমার যে ভাবে সহস্র বিক্ষোভের মধ্যে অচল অটল—আপনাতে আপনি বিরাজ করিতেছেন অথচ স্বভাবের প্রেরণায় সকলের জন্য আপনাকে বিলাইয়া দিতেছেন তাহা বর্ণনা করা যায় যে আসিয়া যাহা করিতেছে মায়ের তিলমাত্র বিরক্তি বা অতিষ্ঠ নাই; বুক পাতিয়া দিয়া আছেন। বস্তুতঃ ‘সহন করিতেছেন’ এ কথা মায়ের সম্বন্ধে খাটে না, কারণ কষ্ট থাকিলে তবে তত সহন। মা তাে এক আনন্দের খেলা দেখিয়া যাইতেছেন। যাহারাই মায়ের সঙ্গে একটুও মিশিয়াছেন মায়ের শুদ্ধ, দিব্য, পবিত্র চরিত্র দেখিয়া মাতৃচরণে নিজকে না লুটাইয়া পাবেন নাই। সেখানে মায়ার লেশও নাই। ছােটকালেই এই নির্লিপ্ত ভাব, এই ‘আপনাতে আপনি আছেন’ ভাবের জন্য গর্ভধারিণী মায়ের নিকট ট্যালা, হাবা ইত্যাদি আখা পাইয়াছিলেন। যখন মায়ের কম- জীবন আসিল তাহার সম্পূর্ণ নিষ্কাম, নিঃস্বার্থ সেবাতে ভােলানাথ এবং অন্যান্য পরিজনবর্গ বিশেষ আকৃষ্ট না হইয়া পারেন নাই। এমন কি গার্হস্থ্যজীবনে, কমাদির মধ্যে নানা বিষয় হইতে রসগ্রহণ বা ভােগে সম্পূর্ণ বিরতা
৪
মা আনন্দময়ীর কথা
দেখিয়া মায়ের সমবয়স্কা মেয়েরা মাকে ঠাট্টা করিতে
ছাড়িতেন না। বলিতেন, “এ কি রকম! রস্কস্ নাই।”
অথচ কমের মধ্যে মায়ের সহজ আনন্দের ভাব এবং
হাসিমুখ দেখিয়া সকলেই ভালো না বাসিয়া পারিতেন না।
সর্বদা হাসি মুখ ও প্রসন্ন ভাব দেখিয়া বাজিতপুরে সারদার
মাসীমা মায়ের নাম রাখিয়াছিলেন, “খুসীর মা”।
১৭১৮ বৎসর বয়স হইতে ২৯/৩০ বৎসর বয়স পর্যন্ত
মায়ের শরীর আশ্রয় করিয়া সাধনার নানারূপ অবস্থা
প্রকাশ পায়। সাধনার যত ধারা, যত ভাব সবই প্রকাশ
পাইয়াছিল। সাধন-জগতে এমন কোনও অনুভূতিই নাই
যাহা ‘সাধিকা মায়ের নিকট ধরা পড়িয়াছিল না।
শাস্ত্রাদিতে পাই সাধনার পথে যেমন বিবেক, সদসৎ বিচার,
আকুলতা আসে আবার ভীতি, বিস্ময় এ সকলও আসে।
অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য হইলেও সকল ভাবই মায়ের
কাছে তন্ন তন্ন করিয়াই সাড়া দিয়াছিল।
অষ্টগ্রামে মা প্রথম নামসাধন করিতে আরম্ভ করেন।
ছােট কালে পিতার কাছে হরির মাহাত্ম শুনিয়াছিলেন
তাই নিজে নিজেই হরিনাম করিতে আরম্ভ করিলেন।
যে দিন আরম্ভ করিলেন তার পরের দিন হইতেই নামে
আনন্দের প্রকাশ হইতে লাগিল। এই ভাবে মায়ের
মা আনন্দময়ীর কথা মা সাধন-লীলার শুরু হয়। প্রাণগােপালবাবুকে লিখিত লিপিতে সময়কার অবস্থার কথা কিঞ্চিত্র লিখিয়াছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলি—ঐ সময়ে সাধনার খেলা সুরু লইলেও জন্ম হইতে মায়ের নানাবিধ লােকোত্তর ভাবের প্রকাশ হইত। ছটবেলায় কীৰ্ত্তনাদিতে কখনও মায়ের যে ভাবাবেশ হইত, মায়ের জননী উহা নিদ্ৰা বলিয়া মনে করিতেন। সাধনার ধারাগুলিকে প্রধানতঃ এই চার ভাগে ভাগ করা যায়,ভক্তিযােগ, জ্ঞানযােগ, কর্মযােগ, রাজযােগ। এর মধ্যেই লয়যােগ, মন্ত্রযােগ, হঠযােগ প্রভৃতি আছে। ভক্তিসাধনাও আবার নানারকম আছে। ন্ত্রানুসারে নানাবিধ পূজা এবং অন্যান্য উপাসনার অঙ্গ বৈধী ভক্তির মধ্যে পড়ে। আর আছে নামসাধন ও বৈষ্ণবের ভাব- সাধনা। সাধনার রাজ্যে আরও কত রকম কি আছে সে সকলের বিশেষ বিশ্লেষণ এই আলােচনার বিষয়ীভূত নহে। তবে দেখিতে পাওয়া যায় এই সমুদয়ই মায়ের মধ্যে প্রকাশ পাইয়াছে। বাজিতপুরে যখন প্রবলভাবে সাধনক্রিয়া চলিতেছিল, তখন তন্ত্রোক্ত দেবদেবীপূজা মায়ের দ্বারা যথাবিধি সম্পাদিত হয়। আমরা যে পূজা করি তাহার মধ্যে কত ভুল, কত
মা আনন্দময়ীর কথা
ক্রটী, কত অঙ্গহানি, কত গোঁজামিল থাকে তাহার ইয়ত্তা
নাই। আর মা যে করিতেন তাহা অতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে
সাধিত হইত। পূজার প্রতি ক্রিয়া জীবন্ত হইয়া উঠিত।
প্রথমে মা দেবতার সহিত অভিন্ন হইয়া অর্থাৎ নিজ শরীরে
ক্রিয়াদির দ্বারা দেবতাকে ফুটাইয়া নিজ অঙ্গেই দেবপূজা
সম্পাদন করিতেন (দেবব ভূত্বা দেবং যজেৎ)। তৎপরে
ঐ দেবতাকে শরীর হইতে বহির্গত করিয়া বাহিরে সংস্থাপন
পূৰ্ব্বক পূজা করিতেন। বিচিত্র এই যে, পূজোপকরণ
সমস্তই অলৌকিক ভাবে মায়ের শরীর হইতে সৃষ্ট হইত।
এই পূজাকালে মা সাধারণতঃ দরজা বন্ধ করিয়া
বসিতেন। কেহ কোনও সময় দেখিতে পাইয়া ভয়
পাইয়াছিল শুনিয়াছি।
পূজাদি যখন শেষ হইয়া আসিল অসংখ্য প্রকার আসন,
প্রাণায়াম, মুদ্রা প্রভৃতি যোগক্রিয়া প্রকাশ পাইতে লাগিল।
কত রকমের অনুভূতি তাহা ধারণা হয় না। কত রকমের
রূপদর্শন, লীলাআস্বাদন, জ্যোতিদর্শন, কত বাণীশ্রবণ,
কত প্রকারের আনন্দ, কত রকমের ভাবাবেশ তাহার
সংখ্যা নাই। অষ্টসিদ্ধি প্রভৃতি ঐশ্বর্যেরও বিকাশ হইয়া-
ছিল। সমাধিও অনেক রকম হইতে লাগিল।
জ্ঞানে যখন প্রকাশ হইল তাহারও অবস্থাভেদে সূক্ষম
মা আনন্দময়ীর কথা
তারতম্য আছে। সৃষ্টি কি, কারণ কি, কোন তত্ত্ব কি
এসব তন্ন তন্ন করিরা খুলিয়া গেল। মা এমন অবস্থায়
উপনীত হইলেন যখন (মায়ের ভাষায়) “নিজকে নিয়াই
দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, নিজে নিজেই মশগুল।
সে আনন্দ মুখে প্রকাশ করা যায় না।”
ক্রমে এমন হইল যখন—“যুগপৎ সব ; সগুণ,
নিগুণ; আবার সগুণ, নিগুণের পরেও। একে-
বারে শান্ত অবস্থা। বহু থাকা সত্ত্বেও দেখছি
এক। সবই আছে অথচ কিছুই নাই। কী যে
ভাষায় বলা যায় না।”
মা মৌনী হইয়া গেলেন। এ কেবলমাত্র বাক্যের সংযম
নহে। ভিতর বাহির এক করিয়া মৌনী হইয়া গেলেন।
যেন প্রশান্তি মূর্তিমতী।
আবার উত্তরকালে ঢাকাতে বৈষ্ণবীয় প্রেমের চূড়ান্ত
প্রকাশ হইয়াছিল। “এক অনির্বচনীয় মহাভাবের
উন্মাদনায় আত্মহারা হইয়া বিভাের অবস্থায় কখনও কখনও
প্রহরের পর প্রহর পড়িয়া থাকিতেন।” আবার কীর্তনের
সময় নানারূপ ভাবের বিকাশ হইত। তখন কোনও
লোকাতীত ভাবের প্রবাহ মায়ের শরীরকে আশ্রয় করিয়া
নৃত্য করিয়া চলিয়াছে এরূপ বােধ হইত। শরীর কখনও
৮
মা আনন্দময়ীর কথা
গড়াইত, কখনও প্রেমাবেশে নৃত্য করিত। শ্ৰীমন্ মহা-
প্রভুর মত অশ্রু, কম্প, পুলকাদি সাত্ত্বিক বিকারসকল দেহে
প্রস্ফুটিত হইত। ঐ সময়ে বহু ভক্তের সমাগম হইত।
যাঁহারা মায়ের এই মহাভাবের লীলা দেখিতেন, একেবারে
মজিয়া যাইতেন। কখনও কখনও মায়ের মুখনিঃসৃত সূক্ত
বা স্তোত্র (দেবভাষায়) এক অপরূপ ভাবব্যঞ্জনা আনিয়া
দিয়া ভক্তজনকে মুগ্ধ করিয়া রাখিত। (১)
মায়ের সাধনার অবস্থার কথা কত কহিব ? কয়টাই
বা প্রকাশ পাইয়াছে ? লোকচক্ষুর অগােচরে দ্বাররুদ্ধ
কক্ষে কি কি খেলা হইয়াছিল তাহা ত জানিবার কোনই
উপায় নাই। অনুভূতির রাজ্যের কথা তাে স্বতন্ত্র।
কৃপা করিয়া যতটুক বলেন সেই মাত্র। যতটা বাহিরে
প্রকাশ পাইয়াছে এবং যাহা যাহা বলিয়াছেন তাহাও বিশদ
ব্যাপার, এখানে উল্লেখ বাহুল্য।
আবার কর্মজীবনে ঐকান্তিকী পতিভক্তি, নিজকে
বিলাইয়া দিয়া সেবা এবং অদ্ভুত কর্মতৎপরতা মায়ের
পূর্ণতারই পরিচয় দেয়।
মায়ের এই অশ্রুতপূর্ব সাধনার ইতিহাস হইতে আমরা
মা
(১) শেষের দিকে ভাবাবস্থা এবং যােগাবস্থা গুলি একটি অখণ্ড ভাবের উপর
দিয়া খেলা করিয়া যাইত-মায়ের মুখে এ প্রকার শুনিয়াছি।
মা আনন্দময়ীর কথা
তো মাকে সাধকরূপে পাই না। সাধক হইয়া ও সাধক
নহেন। মায়ের দেহ প্রারব্ধকমফল ভোগের নিমিত্ত হয়
নাই। মা একদিন বলিয়াছিলেন,
“সাধনার একটি স্তরে গেলে পূৰ্ব্বজন্মের স্মৃতি
পাওয়া যায়। এ শরীরের তাে ঐ জাতীয় কিছু
পাওয়ার নয়।”
আবার কখনও বলিয়াছেন,
“এ শরীরটার সাধনার অবস্থাও যা, হাসি-
খেলাও তা, তােদের কাছে এক এক সময় এক
একটা প্রকাশ পায় মাত্র। আমি সব সময় যা
তা-ই আছি।”
ঢাকাতে দিন দিন যখন লােকে আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন
তখন স্বাভাবিক ভাবেই মায়ের বন্ধুত্বের গণ্ডী ভাঙ্গিয়া গেল।
মাতৃরূপে সকলেই পাইতে লাগিলেন। মাথার ঘোষ্টা
আপনিই পড়িয়া যাইত। প্রথম প্রথম ভােলানাথ ইহাতে
নানারূপ আপত্তি করিতেন, কিন্তু ক্রমে দেখিলেন এ বস্তুটি
তঁাহার একমাত্র নহে, সকলের ধন—আপনা আপনিই যাহা
ঘটিবার ঘটিতেছে। ভােলানাথ জানিতেন তাহার স্ত্রী
তঁাহার আদেশ যথাসাধ্য পালন করে, কিন্তু তিনি দেখিলেন
তাহার স্ত্রীর কর্তৃত্ব নাই, তাই তঁাহারও কর্তৃত্ব চলিত না।
মা আনন্দময়ীর কথা
মা বাহিরে আসিলেন, হিমালয়ে দেরাদূনে বহুদিন
রহিলেন। কিন্তু মা তােত এক জায়গায় অল্প লােকের মধ্যে
গণ্ডীবদ্ধভাবে থাকিবেন না। ক্লান্তি নাই, পরিশ্রম নাই,
বিরক্তি নাই, শারীরিক সুবিধা অসুবিধা নাই—তিনি যেখানে
সেখানে ছুটিয়া ছুটিয়া যাইবেনই। কৃপা উচ্চতা, নীচতা,
ঐশ্বৰ্য, দারিদ্র্য কিছুরই অপেক্ষা রাখে না। ব্যবহারিক
জগতে কারও কারও চোখে মায়ের ঘােরাফিরা ভালাে লাগে
হয় ত। তাঁহারা মাকে জানেন না তাই এরূপ হয়।
মায়ের নিত্য এরূপ ছুটাছুটীর কী প্রয়ােজন ! জগন্মাতার
অসীম করুণা ও প্রেম কেহ বুঝিল না।
আমরাই যে মায়ের চরণে উপস্থিত হইয়া ভক্তি, জ্ঞান
প্রার্থনা করি তা নয়, সূক্ষমতর উন্নত স্তরের মহাপুরুষ,
যােগী, ঋষি এরাও কৃপাভিক্ষা করিতে সমাগত হন।
মায়ের মুখে কখনও শুনিয়াছি, কেহ কেহ প্রত্যক্ষও করিয়া-
ছেন। এই জাতীয় ঘটনা মা প্রায় বলিতে চাহেন না,
চাপা দিয়া যান।
মা এখন স্বাভাবিক অবস্থায়ই আছেন। সহজ, শান্ত
ভাব। মধ্যে দেহাশয়ে সাধনাবস্থাগুলি অভিনীত হইয়া
গেছে মাত্র, আগেও যেমন এখনও তেমন। অলৌকিক
বিভূতির ফুরণ এখন প্রায় শান্ত। যে লােকোত্তর সূক্ষম
মা আনন্দময়ীর কথা
১১
ক্রিয়াসমূহ উম্মুক্তির পথে কাৰ্য্য করিত তাহা তেজস্বী
ভাস্করের মত লােকের চক্ষু ঝসাইয়া দিত। এখন মা
উজ্জ্বল হইলেও স্নিগ্ধ।
গুণসমূহ আদর্শরূপে কাহারও চরিত্রে বর্তমান থাকিলে
কিরূপ অভিব্যক্তি ঘটে তাহা পূর্বে জানা ছিল না। মায়ের
চরিত্রে আমরা তাহা দেখিতে পাইতেছি। যত যত মহা-
পুরুষের কথা এ পর্যন্ত পাইয়াছি, এমন কি যাহাদিগকে
ভগবানের অবতায় বলা হয় ভঁহাদিগের কাহারও সহিত
মায়ের সাদৃশ্য নাই। মােট কথা, মায়ের মধ্যে যাহা পাইয়াছি
তাহা অপেক্ষা আদর্শের পূর্ণতর বিকাশ আমি আর পাই
নাই। আমি এ বাহুল্যোক্তি করিতেছি না। আবার
মায়ের উপর গভীর বিশ্বাসের স্পর্ধাও রাখি না। আমি
অত্যন্ত সন্দিগ্ধচিত্ত ব্যক্তি। আমার অবিশ্বাসের এবং
সংশয়ের যে জ্বালা ভােগ করিয়াছি ও করিতেছি তাহা
ডায়েরীতেও সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত করিবার অবসর ঘটে নাই।
তবে সমালােচকের দৃষ্টি নিয় মায়ের সঙ্গে দুই বৎসর
নিরন্তর সঙ্গ করিবার ফলে যেটুক অভিজ্ঞতা সহজ ভাবে
আমার মনে বসিয়া গিয়াছে তাহা হইতেই কথাটি বলিলাম।
মায়ের সহিত একটু মিশিলেই দেখা যায় মায়ের মধ্যে
সুতীক্ষ দৃষ্টি, অপরিমেয় বুদ্ধির সহিত শিশুর সারল্যের এক
মা আনন্দময়ীর কথা
অপূর্ব সমাবেশ ঘটিয়াছে। প্রকৃতি অনন্তমুখী। ভক্তেরা
এক একজন এক এক প্রকার ভাব, অধিকার, গতি লইয়া
মায়ের চরণে উপস্থিত হন। মা একা সকলের মনােজগতের
অধিশ্বরী হইয়া সকলেরটা আলাদা আলাদা ভাবে চালাইতে
ছেন। আবার ব্যবহারিক হিসাবে দেখা যায় মাকে সকলে
মিলিয়া চালাইতেছে। খাওয়াইয়া দিলে খান, ঠাণ্ডা লাগে
বা গরম লাগে বুঝিয়া তদনুরূপ বস্ত্রের ব্যবস্থা ভক্তেরাই
করেন। কথাবার্তায়ও যাহা ইচ্ছা বলি না কেন
মায়ের প্রতিবাদ নাই। এ হিসাবে মা ভক্তদের হাতের
পুতুলমাত্র।
আর একটা জিনিষ আছে যা মায়ের মধ্যেই সম্ভব,
সাধারণ জীবে সম্ভব নহে। উহা অসামান্য আকর্ষণ।
এই আকর্ষণেই এক সময়ে বৃন্দাবনের পশুপাখী পৰ্যন্ত
আত্মহারা হইয়াছিলেন। যদি মায়ের আকর্ষণ না দেখিতাম
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অনুরাগের কাহিনী হয় ত বা অবিশ্বাস
করিতাম। যদিও গােপীগণের মত প্রেম এবং প্রাদাদির
মত ভক্তি মায়ের ভক্তগণের (১) সকলের মধ্যে দেখা যায়
(১) স্বৰ্গাদি হইতে উচ্চতর লােকে মায়ের সহিত ভক্তদের অপূর্ব প্রেমের
খেলা হয় মায়ের মুখে শুনিয়াছি। একদিন তাহার ক্রিয়া এবং গান মায়ের এই
সুল শরীরে পর্যন্ত প্রকাশ পাইয়াছিল।
মা আনন্দময়ীর কথা , কিন্তু মাকে দর্শন করিলেই সকলেই কমবেশী আকর্ষণ অনুভব করেন ইহা অস্বীকার করা যায় না। ঢাকাতে কীৰ্ত্তনকালে মা যখন বসিয়া থাকিতেন ছাগল কুকুর আসিয়া মায়ের কোলে মাথা রাখিয়া শুইয়াছে এরূপ দেখা গিয়াছে। মা দীক্ষা দেন না সত্য, কিন্তু দেখা গিয়াছে বহু ত্রিতাপ- প্রপীড়িত জীব মায়ের চরণে আত্মনিবেদন করিয়া শান্তি লাভ করিয়াছে। অনেকেই মাকে আপন ইষ্টরূপে জানিয়া মায়ের আশ্রয়ে আধ্যাত্মিক নানা অনুভূতি লাভ করিতেছেন, পরমানন্দ লাভের পথে অগ্রসর হইতেছেন। উচ্চাধিকার- সম্পন্ন ব্যক্তিরা মাকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক অনুভূতির মধ্য পাইতেছেন। কেহ ইষ্টদেবতারূপে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, কাহারও নিকট মা প্রেমের এক মধুময় বিগ্রহরূপে প্রকটিতা, আবার কেহ বা মায়ের চরণে আত্মসমর্পণ করিয়া সেই মহান্ সত্তায় ক্রমে আপনাকে মিলাইয়া দিতেছেন। মা কি? এই সম্বন্ধে বিচার করিবার প্রয়ােজন নাই। অনন্তভাবময়ী মায়ের সম্বন্ধে যাহা কিছুই বলা যায় না কেন সবই অসম্পূর্ণ।
১৪
মা আনন্দময়ীর কথা
১৩৪৪ সালের পৌষ মাস হইতে মায়ের সঙ্গ লাভের
সুযােগ লাভ করি।ঐ সময় হইতে যে ডায়েরী লিখিয়া
আসিতেছি তাহা হইতে কিছু উদ্ধৃত করিয়া দিতেছি—
২৫শে পৌষ, ১৩৪৪। 9th January
আনন্দময়ী আশ্রম, কিশনপুর, দেরাদূন।
আজ সন্ধ্যার আগ হইতে রাত্রি সাড়ে এগারােটা
সর্বক্ষণই প্রায় মায়ের কাছে মায়ের কথা শুনিয়াছি। অনেক
অদ্ভুত ব্যাপারও দেখিলাম।
মা কথায় কথায় পুরাতন
কথা সব বলিতেছেন।
তখন মা’র গলায় সব অনেক ভারী ভারী সােনার
গহনা ছিল, হাতেও অনেক চূড়ি ছিল। সে সব অনেক
সময়ে পড়িয়া যাইত আর যে কেহ তাহা তুলিয়া লইত।
কোনও ঠিক্ থাকিত না। আবার একদিন একটি মেয়ে
“আমি মা’র হাতের চুড়ি নিব” এই বলিয়া মা’র হাত লইয়া
সােনার চূড়ি খুলিতে বসিলেন। একাকী! এমন সময়
লােক-জন আসিয়া পড়িল। সবাই হাঁ হাঁ করিয়া আসিল
কিন্তু মা বলিলেন,-
“ও নি না। ফুলের মালা যখন দেওয়া হয়
তখন ত কই কেউ কিছু বলে না!”
মা আনন্দময়ীর কথা
আরও অনেক ঘটনা মা বলিলেন। বেশ রস করিয়া
বলিতেছেন; সকলে হাসিয়া অস্থির, মাও হাসিতেছেন।
তারপরে মা এক lady doctor সেবজীর (সারদা)
কথা বলিলেন। তিনি জ্যোতীশ বাবুর (ভাইজী) নিকট
হইতে উপদেশ (১) লইয়া না যােগ, না সন্ধ্যা-পূজা কেবল
জপ করিতেন। (নৈতিক সবল যথেষ্ট ছিল)। ধ্যানও
। ক্রমে এখন সময়ে সময়ে এরকম ভাব হইতেছে
তাহাতে গলার আওয়াজ ও দেহের সাড় নষ্ট হইয়া যায়।
এই নিয়ে চাকরীর অসুবিধা হয়।
ক্রমে planchet এর কথা হইল। আমি পূৰ্বে একরকম
প্রক্রিয়া করিতাম, স্পর্শমাত্র সাহায্যে টুপী ইত্যাদিকে
নড়াইতাম। মা তাহা ঝুড়ির সাহায্যে করিতে বলিলেন।
করা হইল কিন্তু সুবিধা হইল না। যােগেশদা pencil
ধরিয়া বসিলেন। দাগ পড়িতে লাগিল, কিন্তু লেখা পড়িল
। মা হাস্যকৌতুক করিতে লাগিলেন।
আমার এক মাসী আত্মহত্যা করিয়া
মৃত্যুমুখে পতিত
হইয়াছিলেন। আমি সে সকল কথা বলিলাম। আমার
যে সে সময় আত্মহত্যা করার ঝোঁক হইয়াছিল তাহাও
বলিলাম।
(১) পরে জানা গেল ভাইজী ভঁহাকে দীক্ষা দেন।
মা আনন্দময়ীর কথা
আমি—তখন কি সে ঘাড়ে চেপেছিল ?
মাসে ঘাড়ে চাপে নাই, সেই ভাবটা ঢুকিয়া
গিয়াছিল।
মা আবার বলিতেছেন, “সে এখানেই আছে।” (১)
আমি-কেন?
মা-না হলে তুমি তার কথা বলছ কেন ?
শুইবার সময় হওয়া সত্ত্বেও মা আমায় তাহার কাছে
বসাইয়া রাখিলেন। শেষে দেখি lady doctor হাজির।
মা তাহার সহিত হাসি তামাসা করিতে লাগিলেন।
মা তাহাকে pencil ধরিয়া যােগেশদার মত বসিতে
বলিলেন। বসিতে বসিতেই সেই ভাব হইল। সমুদয়
ইন্দ্রিয়ের কাজ বন্ধ হইল। শ্বাসক্রিয়া আরম্ভ হইল।
এইরূপ অনেকক্ষণ রহিল। চক্ষু অনেকক্ষণ বন্ধ ছিল।
আবার খুলিল। তখন দেখা গেল যে মধ্যে স্থির দৃষ্টি
সংলগ্ন রহিয়াছে। কখনও কথা চলে, কখনও না।
এই ভাবকে কেহ নাকি হিষ্টিরিয়া বলে। আমার তা’
মনে হয় না। মায়ের কথাতেও তাহাই ( উহা যে হিষ্টিরিয়া
নহে) বুঝিলাম।
মেয়েটি একেবারে পবিত্রা, সত্যপরায়ণ। আর সরলা।
(১) মা পরে বলিয়াছেন, মা একটি ছায়া দেখিতে পাইয়াছিলেন।
মা আনন্দময়ীর কথা
১৭
এই তিনটি গুণকে ভিত্তি করিয়া তাহার জীবন গঠিত।
রাত্রে তাহার নাকি ঘুম প্রায় আসেই না, জপ আপনা
আপনি আসিয়া পড়ে।
মেয়েটির এই ভাবের সময়েও মা রঙ্গরস করিতে
লাগিলেন। মা বলিলেন,-
“একেবারে সাচ্চা জিনিষ—ভিতরে অনু-
করণের ভাব একেবারেই নাই, যা অনেকেরই
আছে।
প্রশংসা, প্রতিষ্ঠা, কামনা, নিন্দা, হিংসা
এসব হচ্ছে সােনার ভিতরের খাদ। নাম করতে
করতে ওসব একটু একটু করে কমে যায়। আসল
সােনা বাহির হয়ে পড়ে।”
কথাপ্রসঙ্গে একজন মাতাজীর কথা উঠিল। মা
বলিলেন,-
“তিনি নিজেই বলিয়াছেন, সাধারণ অবস্থা
অপেক্ষা কর্তনে ভাবের সময় তাঁহার ভালো
লাগে, তাহা হইলেই
হইলেই তাঁহার অভাববােধ
আছে।”...
মা—জগতে প্রায়ই সােনাকে পিতল আর
পিতলকে সােনা বলিয়া ভুল হয়। বাহিরের লক্ষণ
২
১৫
মা আনন্দময়ীর কথা
দেখিয়া কিন্তু অনেকটা ধরা যায়। ঠিক মত
হইলে তাহার চালচলন, খাওয়া দাওয়া কথাবার্তা
সবই বদলাইবেই। তবে সবসময় লক্ষণ দেখে
ধরা শক্ত। তােমাদের ভাইজী (জ্যোতীশ বাবু)
হাতের লেখা, কথা, বই এসব দেখিয়াই কে
কেমন লােক বলিয়া দিত।
সেবজী অনেক রাত্রে চলিয়া গেলেন।
১লা মাশ,শনিবার, ১৩৪৪। 15th Tan.3৪
আনন্দময়ী আশ্রম, কিশনপুর,দেরাদুন।
বিছানায় বসিয়া জপাদি করিতে পারা যায় কি না,
বিছানা (কম্বল) শুচি কি না জিজ্ঞাসা করাতে মা কতগুলি
কথা বলিলেন,-
“শুচি এখন জোর করে তাড়াবেও না,
টেনেও আনবে না। যা আসে আসুক, বেরিয়ে
যা। আসলে যাদের মধ্যে ঐ সব সংস্কার আসে
তাদের জন্য।
চিত্তশুদ্ধি না হলে মনশুদ্ধি হয় ?
শুচিটা খারাপ নয়, শুচিবায়ুটা খারাপ।
‘আমি শুদ্ধ ভাবতে ভাবতে শুদ্ধ হয়।
মা আনন্দময়ীর কথা
১৯
সন্ন্যাস মন্ত্রে দেখনা আমি সেই চিন্তা করতে
হয়।”
মা যে কিরকম বুঝিতে পারিতেছি না। মা জীবন্মুক্ত
কি? আমি যে ভাল বুঝিতে পারিতেছি না। খুব
ভালও লাগে না। কেবল একঘেয়ে ভাব। স্থির ভাব।
আমার মন যেন রস চায়। মন তাে এখনও বড়ই চঞ্চল,
বিষয়াভিমুখী। এক এক সময় বাড়ীর কথা মনে পড়ে,
কি মােহ !
বৈশাখ, ১৩৪৫। দেরাদুন।
আমি রায়পুর
গিয়া থাকি। ভােলানাথের small
pox হইয়াছে। মারাত্মক আক্রমণ। আমি রায়পুর
হইতে "ঝে মাঝে কিশনপুরে আশ্রমে আসিয়া দেখিয়া
যাই। মা দেখি যেমন তেমন, ধীর স্থির ভাবে যতটুক
করার করিয়া যাইতেছেন, যতটুক বলার বলিয়া যাইতেছেন।
ভােলানাথ রােগশয্যায় “মা, মা” করিয়া চীৎকার করেন।
সে আকুল চীৎকার !
একদিন কিশনপুর আশ্রমে আসিলাম। আসিয়া
দেখি মা, শঙ্করানন্দ স্বামী প্রভৃতি কথা কহিতেছেন।
তখন পর্যন্ত জানিনা যে পূর্বরাত্রি সাড়ে দশটায় ভােলানাথ
মা আনন্দময়ীর কথা
দেহ ছাড়িয়া দিয়াছেন। তাহা অনুমান পৰ্য্যন্ত করিতে
পারি নাই। কি করিয়া অনুমান করিব? আসিয়া দেখি
মা যথা পূর্বং তথা পরম্। মুখে সেই স্বাভাবিক আনন্দ
প্রতিফলিত—সেই আনন্দের প্রভাব চারিপাশের ভক্তদের
উপর পড়িয়াছে। সাধারণতঃ যেরূপ আলােচনা হয় সেই
সব কথাবার্তাই হইতেছে। পূর্বদিন যে বিশেষ কোনও
ঘটনা ঘটিয়াছে এমন বুঝিবার সাধ্য নাই। যেন কি না
কি হইয়াছে।
যখন ঘটনা শুনিলাম, ভাবিলাম ধন্য মা।
দেহ ছাড়িবার কয়েকদিন পূর্ব হইতেই ভােলানাথের
মুখে খালি “মা, মা,” ধ্বনি শুনা গিয়াছে। মা ও ঠিক
মায়েরই মত সর্বক্ষণ প্রায় তাহার নিকট বসা। সে সময়ে
ভােলানাথের অদ্ভূত সন্তানভাব ফুটিয়া উঠিয়াছিল। শরীর
ছাড়িয়া দেবার দিন ভােলানাথ মায়ের প্রসাদ লইলেন
এবং মায়ের অঙ্গ স্পর্শ করিলেন। ঠিক দেহ ছড়িবার
সময় মা ভােলানাথের ব্রহ্মতালু,
স্পর্শ করিয়া বসিয়া
রহিলেন।
একটা জিনিষ লক্ষ্য করিবার বিষয়, মা ভােলানাথের
দেহত্যাগের ৪৫ দিন পূর্বে বড়দি ( বিধুমুখী দেবী, মায়ের
জাগতিক মাতা) প্রভৃতি যাহারা ছিলেন অনেককেই
মা আনন্দমরীর কথা ২১ দূরে পাঠাইয়া দিলেন। (১) শেষের দিকে মা স্বয়ং শুশ্রুষার ব্যবস্থাগুলি করিয়া দিলেন। চিকিৎসা বিষয়েও অনেক ব্যাপারে মায়ের জ্ঞান দেখিয়া ডাক্তার আশ্চৰ্য্য মানিয়া- ছিলেন। শান্তি, যােগেশ (ব্রহ্মচারী), সদানন্দ, মাসীমা ( মায়ের বােন), ভূপতি প্রভৃতি যাহারা ছিলেন তাঁহার মায়ের নির্দেশ মত কলের পুতুলের ন্যায় দিবারাত্রি সেবা করিয়া গেলেন। কাহারও কাহারও সেবা দেখিয়া বিস্ময় মানিতে হয়। মায়েও বুঝি ছেলের জন্য এতটা করে না ! ভােলানাথের দেহ ত্যাগ প্রসঙ্গে পরে বলিয়াছেন, “ভােলানাথ দেখ ঠিক্ কুম্ভে সন্ন্যাস লওয়ার পরই দেহত্যাগ করিল। জ্যোতীশ ও মানস- সরােবরে সন্ন্যাস লওয়ার পরই দেহ ছাড়িল। মানস-সরােবরে আমার মুখ দিয়া যে সন্ন্যাস মন্ত্র বাহির হইয়াছিল তাহা ভােলানাথকে বলিয়া- ছিলাম। পরে এই কুম্ভে আমি ভােলানাথকে কুম্ভের দিন কুম্ভ-যােগের সময়ে সন্ন্যাসক্রিয়া (১) বড়দিকে পাঠান হইল কেন একথায় মা বলিয়াছেন, “আমি দেখিলাম ভােলানাথ শরীর ছাড়িলে ইনি কান্নাকাটি করিয়া অাশ্রমের ভাব নষ্ট করিবেন, তাই পাঠান হইল।”
মা আনন্দময়ীর কথা
করিতে বলিয়া দেই। সেই অনুসারে ভােলানাথ
কুম্ভের সময়ে সন্ন্যাসের ক্রিয়া বিধিপূৰ্ব্বক
করে।
একবার ভােলানাথ সন্ন্যাস লইবার ইচ্ছা
করিয়া কাশীতে যায়, তখন আমাকে সেখানে
যাইবার জন্য অনুরােধ করিয়া যায়। হাতে পায়ে
ধরিয়াছিল, এমন কি জটা লইয়া পায়ে ঘসিয়াছিল।
আর বলিয়াছিল, “তােমার প্রতি মাতৃভাব যদিও
আমার মনে দৃঢ়ভাবেই আছে তথাপি আমি
কখনও তোমায় সকলের সমক্ষে মা বলিয়া ডাকি
নাই, তখন সন্ন্যাস লইয়া তােমার কাছে ভিক্ষা
লইব ও ‘মা’ বলিয়া প্রকাশ্যে ডাকিব।” শরীর
ছাড়িবার সময় সেটা পূর্ণ হইল। তাই “মা, মা”
বলিয়া ডাকিয়াছিল এবং আমার হাতে খাইল।”
২১শে জ্যৈষ্ঠ, শনিবার। 4th June ৪৪
রায়পুর, দেরাদুন।
আজ ভােলানাথের শরীরত্যাগ উপলক্ষ্যে ভাণ্ডারা
হইবে। সারাদিন নামকীৰ্ত্তন। সকালবেলায়ই কীৰ্ত্তন সুরু।
একজন ভদ্রলােক আসিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করিতে
মা আনন্দময়ীর কথা
ছেন।
;
মা ঘরে যাইবার সিড়ির উপর চওড়া জায়গাটায়
বসিয়া।
ভদ্রলােকমা, সেদিন যে আমার গায়ত্ৰীজপ করতে
বলেছিলেন তার কারণ কি?
মা-দেখ, তুমি পৈতেটা রেখেছ আর কেউ
যদি জিজ্ঞাসা করে তুমি কোন জাত ? তুমি বল
থাক, জামি ব্রাহ্মণ; সুতরাং ব্রাহ্মণের কম টা
একটু রাখা দরকার।
তোমার ফলের দিকে তাকাবার দরকার নেই।
গাছে ফল হাে না হােক, তুমি রােজ একটু করে
জল দিয়ে যাবে। এক দিন না একদিন তুমি
উপকার বুঝবে। হয় ত ভালাে ক'রে করতে
ইচ্ছা হবে। বােজ একটি আধলা করে জমালেও
শেষে অনেক হয়।
আমার কাছে সব ছেলে নিয়ে আসূত। সব
বলে, “দেখ ব্রাহ্মণের ছেলে, সন্ধ্যা করে না এই
সব। আমি বলতাম, “কি হয়েছে, ওদের তাে
দোষ নাই। তােমরা যখন ছেলেদের লেখাপড়া
শিখাও, তখন ছেলেরা পরে টাকা আনবে বা
উন্নতি করবে এরকম একটা ঠিক করে লেখাপড়া
২৪
মা আনন্দময়ীর কথা
শিখাও। ওরাও বুঝতে পারে—অামরা এই
করছি এই জন্য, এই উন্নতি হবে। সেইজন্য
লেখাপড়া ভালাে করে করে। কিন্তু বাপমায়
যখন পৈতা দেয় তখন এ ক'রে কি হবে এ সব
শিখায় না। তাই এরা যে করে না সেটা অতি
ঠিক কথাই। বাপ মার দেখিয়ে দেওয়া উচিত
যেমন লেখাপড়া শিখানাে জাগতিক দিক দিয়ে
কৰ্তব্য তেমন বােজ কিছু তাঁর কাজ করা,
অাখ্যাত্মিক কম করাও কর্তব্য।
মা এইরকম নানা ভাবে বুঝাইয়া শেষে বলিতেছেন,
“অামি ত তােমায় বলেছিলাম এখনও বলছি
( গায়ত্ৰীজপ
করতে)। এখন কর না কর
তােমার ইচ্ছা।”
ভদ্রলােকটি ভ্রষ্টাচার, আচার মানিয়া চলিতে পারিয়া
উঠিবেন না।
মা তোমায় অন্য কোনও নিয়ম মানা চলবে
। তা তুমি যেখানে থাক গায়ত্ৰীটা নিত্য
স্মরণ কোরাে।
ভদ্রলােক চলিয়া যাইবেন, মা তাহাকে ফল দিয়া দিতে
বলিতেছেন।
মা আনন্দময়ীর কথা
বিকালে ভাণ্ডারা শেষ হইয়া গেল। রাত্রি আসিল।
মা সিড়ির উপর সেই স্থানটিতে বসিয়া আছেন। আমি
ও ধারে মায়ের রচিত গানটি গাহিয়া আসিয়া মাকে
জিজ্ঞাসা করিতেছি, “মা, গানটি ঠিক সুরে গাওয়া হয়েছে ?”
=
কাল কোনও ব্রহ্মচারীকে উপলক্ষ্য করিয়া গানটি
নিজে নিজেই রচনা করিয়া গাহিতেছিলেন। গানটি এই
আমি কারে বা এখন ডরি।
আমি বাহিয়া চলেছি তরী।
হােক না কেন তুফান ভারী, ডুববে না হয় তরী,
যা’র যাত্রী তারই তরী, তার ভরসাই করি।
রাত্রে সব ধােওয়া হইয়া গেলে মা খালি পায়ে
খােলা স্থানটিতে বেড়াইতেছেন।
বেড়াইতেছেন। গান ধরিলেন, কী
সুন্দর ।
আমি কি তার সঙ্গছাড়া হই ?
যেজন কাতর প্রাণে ডাকে আমায় মা কই, মা কই।
অারও গান মা গাহিতেছেন, আমিও সঙ্গে সঙ্গে
গাহিতেছি।
রাত্রে মন্দিরের সম্মুখস্থ ছােট্ট নাটমন্দিরে মায়ের
বিছানা করিয়া দেওয়া হইয়াছে। মা শুইয়া শুইয়া এ কথা
মা আনন্দময়ীর কথা
সেকথা বলিতে বলিতে অন্তুত জড়ানাে আওয়াজ করিতে
লাগিলেন। কতকটা “গুণগুণ” এই রকম।
শেষে শঙ্করানন্দ স্বামী ও আমি জিজ্ঞাসা করিলে মা
বলতেছেন, “পুলস্ত(১) কি?”
শঙ্করানন্দ—পুলস্ত একজন ঋষি, ব্ৰহ্মার মানসপুত্র।
মা—আমি পুলস্তু ঋষির সঙ্গে কথা কইছিলাম?
আমি–আচ্ছা মা, আপনি কি এইগুলি খেয়াল করে
বললেন, না আপনা আপনি বেরুল ?
মা’র যে খেয়াল (খেয়াল’ মানে যদি ইচ্ছা হয়) নাই
এবং যা কিছু আপনি বাহির হয়, মনের ক্রিয়া নাই—এই
সব মা ও শঙ্করানন্দ দুইজনেই বুঝাইতে লাগিলেন।
বলিলেন, “সবই স্বাভাবিক।”
আমি কথা কাটাকাটি করিতে লাগিলাম, বলিলাম,
“আমি দুরকম শ্রেণী বলি—১) এক রকম হচ্ছে আপনা
আপনি বাহির হওয়া, যেমন স্তোত্রাদি বাহির হইত, (২)
আর যাহা কলাইয়া লই বলেন (মা এরূপ বলেন তাই
বলিলাম।) না হয় দুটাই স্বাভাবিক হইল; এটা কোন
শ্রেণীর স্বাভাবিক ?”
মা কিছুতেই এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। “আমার
;
(১) মা যেন উচ্চারণ করিলেন 'পুলস্তর।
মা আনন্দময়ীর কথা
সবই স্বাভাবিক, সবই এক” এই সব বাজে ওজোর কহিয়া
কথা উড়াইয়া দিতে লাগিলেন। পরে বলিতেছেন,
“ও যা বলেছে তা ওর পক্ষে ঠিকই, কারণ
বাহির হ'তে অামার কথা ইচ্ছার প্রকাশই মনে
হয়—সাধারণের যা হয়ে থাকে।”
;
কিছুক্ষণ পরে মা দুগসুরের টান ধরিলেন; এবং
একটু বাদে অশ্রুতপূর্ব ভাষায় একটী গান গাহিতে
লাগিলেন। তারপরে ভৈরবীতে গাহিতেছেন, চমৎকার !
গানে ক্রমে সংস্কৃতবহুল ভাষা। (কিছু কিছু টুকিয়াও
রাখা হইল)।
মা—সুরটা যেন গিয়া একেবারে লয় হয়ে গেল,
শেষ স্থান স্পর্শ করল (মা ব্ৰহ্মতালু দেখাইলেন)
তারপরে ক্রমে নীচে কণ্ঠে এসে জিহ্বায় এল ও
শেষে ওষ্ঠে এসে চুপ, করল।
ভাষা সম্বন্ধে বলতেছেন,
‘এ’ ভাষা (পূৰ্ব্বে যে হইতেছিল) জড়াননা
জড়ানাে শােনা গেলেও সেই ভাষার দিক দিয়া
ঠিই আছে।
এরকম আগে হােত, হয় ত কিছু জিজ্ঞাসা
২৮
মা আনন্দময়ীর কথা
করল আমি সেই ভাষায় উত্তর দিচ্ছি। আবার
বলছে—এই কি বলছ? আবার সেই ভাষায়ই
উত্তর দিচ্ছি।
ক্রমে মিশ্রিত সাধারণ ভাষায় কথা বলতে
রজোগুণ, তমােগুণ হত। তাই যখন সবটা
আসেনি তখন কথা জড়ানাে থাকত।”
আমি–আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে অন্য সময় কখনও
এই ভাষায় গান গাইতে বলি, অপনি গাইবেন ?
মা-হা, খেয়াল হ'লে গাইব।
পরদিন রবিবার রাত্রে আমি খাইয়া দাইয়া মায়ের
কাছে বসিলাম। মা নাটমন্দিরে বসিয়া স্বামী শঙ্করানন্দের
সহিত কথা কহিতেছিলেন। স্বামীজি একটু দূরে ছিলেন।
আমি সহসা দেখিলাম, মা’র পিছনে মােটা থাম ধরিয়া
কে দাড়াইয়া। চাদের আলাে পিছন দিকে ছিল তাই
কালােপানা দেখাইতেছিল। দেখিয়া আসিলাম, কেহ
আছে কি না। কেহ নাই। মাকে বলিলাম।
মা বলিলেন, “আমার কাছে ও রকম সব
সময়েই থাকে” (১)
মা একদিন বলিয়াছিলে, "তোমরা ঘর খালি করে দিয়ে গেলেও ঘর খালি
মা আনন্দময়ীর কথা
২০শে আশ্বিন, শুক্রবার। 7th October.
পীতকুভী, হরিদ্বার।
পীতকুঠী গঙ্গার ধারে একখানি বাড়ী। বাড়ীটির সহিত
একেবারে লাগিয়া গঙ্গা চলিয়াছেন, অপরূপ দৃশ্য ! মা যে
ঘরটিতে থাকেন সেটি গঙ্গার দিকে।
ভোরে মায়ের কাছে গিয়া বসিয়াছি। আমি মৌনী
আছি, কিন্তু মা কথা কহিতেছেন, ভাবের আদান প্রদান
চলিয়াছে।
একটু বেলা হইয়াছে। নীরােজবাবুর স্ত্রী ও অন্যান্য
সব ভক্ত আসিয়া বসিয়াছেন। দিল্লী হইতে উপেন্দ্রবাবু
(যিনি শ্ৰীঅরবিন্দের আশ্রমে বহুকাল কাটাইয়াছেন। অন্য
একটি ভদ্রলােককে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছেন। ইনি
উপেন্দ্রবাবুর বন্ধু এবং শ্রীরামঠাকুরের শিষ্য।
মা একথা শুনিয়া সেই ভদ্রলােককে জিজ্ঞাসা
করিতেছেন,
“বাবা কোথায় এখন?”
ভদ্রলােক বলিলেন, “তিনি এখন নােয়াখালিতে।
পাকে না। ঘরে অনেকে থাকে।” মাকে অনেক সময়ে সূক্ষ্মদেহধারীদিগের
সহিত কথা কহিতে ও ভাবের আদান প্রদান করিতে দেখিয়াছি।
মা আনন্দময়ীর কথা
শরীর খারাপ।
লােকের সংস্পর্শে বেশী থাকেন
ক্রমে ঘরের সকলেই চুপ হইলেন। সকলেই বোধ হয়
পরমার্থ চিন্তায় মগ্ন। অনেকেরই চক্ষু নিমীলিত। নবা-
গন্তুক হঠাৎ কান্দিতেছেন। আবার মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম
করিতেছেন। একটি আধ্যাত্মিক ভাব বুঝি সকলকে
সংক্রামিত করিয়াছে।
নীরােদবাবু হঠাৎ আসিয়া বিড়বিড় করিয়া কি মন্ত্র
পড়িয়া চলিয়া গেলেন।
মা একটু বাদে তাহার স্ত্রীকে বলিতেছেন
“মুখে একথণ্ড মিছরি (নাম) রাখবে। একবার
এ গাল আর একবার ও গাল করবে।”
এইবার মাকে খাওয়ান হইবে। মায়ের শরীর অসুস্থ
বলিয়া মাকে সকলের সামনে খাওয়ান হয় না। তাই সকলে
উঠিয়া গেলেন।
লক্ষীমাঈর ভগ্নী তাহার private কথা বলিবেন।
ঘরে একমাত্র আমি। (কথা হিন্দীতে চলিতেছে)
লক্ষমীর ভগ্নী-মা, জপ কত করে করব?
মা—যত বেশী জপ করতে পার ততই ভাল,
এতে বাজে বকাও কমে।
মা আনন্দময়ীর কথা
৩১
লক্ষীর ভগ্নী-মা, ধ্যান কি প্রকারে করব?
ম—তােমার কেমন ধ্যান আসে ?
“মা, সংসার খারাপ লাগে”-লক্ষীর ভগ্নী কন্দিতেছেন।
মা—তুমি
-তুমি ত এখন সংসার ত্যাগ করতে পারছ
। সংসারে থেকেই তােমার যা কিছু করতে
হবে। সংসারে যখন থাকূতে হবে তখন ধৰ্ম্মের
সংসার করা দরকার। সেবা-বৃত্তিতে থাক,
তিনিই ত কম রূপে তােমার কাছে প্রকাশ
পাচ্ছেন। যেমন পানি খেতে খেতে কাজ
কর।
এইবার কখলে যাওয়া হইবে। বাস আসিল। সঙ্গে
স্বামী অখন্দজা, বুনী, সপরিবারে নীরােজবাবু, মন্মথবাবু,
উপেনবাবু, Sinha সাহেবের স্ত্রী প্রভৃতি।
Ramkrishna Mission এ যাওয়া হইল। একটি
বারান্দায় চেয়ারে মাকে বসানাে হইল।
স্বামীজিরা সব আসিয়াছেন। তাঁহার খুব আনন্দিত
হইয়াছেন।
মা বলিতেছেন, “বাবা, এই মেয়েটিকে নিয়ে এলে
এখন”।
মা আনন্দময়ীর কথা
মাকে হাসপাতাল, ডাক্তারখানা, অস্ত্রাপচারের ঘর
প্রভৃতি ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখান হইল।
মা হাসপাতালে গিয়া রােগীদের দেখিয়া বলিতেছেন,-
“এ সব াঁরই এক এক রূপ।”
মা একজন মহারাজকে বলিতেছেন,
“তিনিই এ সব করাচ্ছেন।
অস্ত্রোপচার ঘরে একটি টেবিল আছে। স্বামী
অখণ্ডানন্দজী তাহার কথা মাকে বলিতেছেন,
“এটা যেভাবে ইচ্ছা মােচরান, ঘােরাণ, ফেরান যায় ;
কাটাছেড়ার সুবিধার জন্য এই ব্যবস্থা।
মা বলিলেন, “যার যে দিকে দৃষ্টি। এই সবের
একটা ছাপ তােমার মনে পড়ে রয়েছে, সেটা কি
সহজে যায় ?”
মা মঙ্গলানন্দগিরিজীর আশ্রমে চলিলেন। আশ্রমে
ঢুকিয়াই মা বলিতেছেন, “আছে ত? অাছে ত?”
বাস্তবিকই দেখা গেল তিনি আশ্রমে নাই, দিল্লী
গিয়াছেন। একটু ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখা হইল। একখানি
Group ফটো ভােলা হইল।
মা আনন্দময়ীর কথা। ১ই মাঘ, সােমবার। add January,9. দ্বনােদা’র একটি ধর্মশালা মা সকালবেলা ধর্মশালায় দুতলার উপর বারান্দায় পায়চারী করিতেছেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে আছি। স্থির, শান্ত ও গভীর ভাব। ব্যাস'এ যখন ছিলাম মা’র সহিত কত বব করিয়াছি, চুপ, হইয়া গেলেও কথা কহাইয়াছি। কিন্তু এখন কি একটা গাম্ভীৰ্য মা’র কথা- বার্তা, চলাফেরার মধ্যে অনুব্যাপ্ত রহিয়াছে যে আমি সাহস করিয়া সহজভাবে কথা কহিতে পারিতেছি না। কেমন একটা আকাশপাতাল তফাৎ, কেমন একটা সঙ্কোচ অনুভব করিতে লাগিলাম। অথচ মা প্রশান্ত। ক্রোধ বা অন্য কিছু চাপাভাব নাই। বারান্দায় রেলিং, এর ধারে আমরা দুজনেই দাড়াইয়া আছি। দেখিতে পাইলাম নীচে গঙ্গাচরণবাবু অন্য এক ভদ্র- লােকের সাথে আসিতেছেন। দুইজনেই সাহেবী সুট পরা। দু’জন উপরে আসিলেন। নবাগন্তুক ভদ্রলােক হাতে এক গুচ্ছ জবাফুল লইয়া আসিয়াছেন। আসিয়া মায়ের সামনে দাড়াইয়া আছেন, মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া। দৃষ্টিও লক্ষ্যে সপ্রশ্ন, সকৌতুহল হইয়া শেষে ৩ মা আনন্দময়ীর কথা শান্ত, এক অপূর্ব ভাবে ভাবান্বিত ও স্তব্ধ হইয়া গেছে। কিছু সময় এই ভাবে কাটিলে পর মণিলাল জবাফুলের গুচ্ছটি দিবার জন্য হাত বাড়াইলেন। মাও হাত বাড়াইয়া লইলেন। মায়ের মুখে একটু হাসি দেখা দিল। প্রশান্ত, গম্ভীর মুখের উপর সেই দিব্য হাস্য যে কি অপূর্ব, কি প্রাণস্পর্শী তাহা ভাষায় বর্ণনা করিতে পারি না। মা হাসিতেছেন, যেন একটি শুভ্র প্রভাতে বিস্তীর্ণ বাপীতটে দাড়াইয়া মৃদুপবনে আন্দোলিত জলের মনােরম তরঙ্গশােভা দেখিতেছি। , উপমা ঠিক হইল না। মা হাসিলেন, বুঝি একটি পদ্ম প্রস্ফুটিত হইল। পদ্মটি কিরূপ? না একেবারে শুভ্র। মলিনতার লেশমাত্রও উহাতে নাই। কমলদল- বিকাশও বুঝি মায়ের সেই পবিত্র হাস্যের উপমাস্থল হইতে পারে না। পৌর্ণমাসীর চন্দ্র অতিশয় উজ্জ্বল,স্নিগ্ধ, মনােরম বটে, কিন্তু সকলঙ্ক। মায়ের সহাস্য বদন নিষ্কলঙ্ক। অর্থাৎ কোনও প্রকার ভাববিকার এ পর্যন্ত মায়ের মুখখানিকে স্পর্শ করে নাই যাহার কালিমা লাগিয়া থাকিতে পারে।
মা আনন্দময়ীর কথা
মুখের আকৃতি, সৌন্দৰ্য্য এবং ভাবভঙ্গিমা সমস্তই বিশেষ
বিশেষ শুভাশুভ সংস্কার হইতে আসিয়া থাকে। সংস্কার তাে
দাগ আঁকে, সংস্কারই কালিমা। মায়ের মুখখানিতে যে
ভাব খেলে তাহা দিব্যভাব, কোনও সংস্কার হইতে আসে
নাই, মায়ের মুখের আকৃতিও সংস্কারজন্য গঠিত নহে।
তাই বলি মায়ের মুখচন্দ্র নিষ্কলঙ্ক। মুখে শত ময়লা
লাগিলেও নিষ্কলঙ্ক।
মা হাসিলেন, মনের তারে যে কম্পন চলিতেছিল তাহা
যেন সহসা স্থগিত হইয়া গেল, অন্য এক প্রকারের কম্পন
চলিতে লাগিল। আমাদের মত জীবের মনে মায়ের চরণ
হইতে বিরুদ্ধ দিকে একটা ভাবের স্রোত স্বতঃই চলিতে
থাকে। তখন সহসা সে স্রোত যেন বিপরীত দিকে
বহিতে লাগিল।
মা ফুলের গুচ্ছটি লইয়া গঙ্গাচরণবাবুর হাতে দিলেন।
তিনিও লইয়া মায়ের চরণে পতিত হইলেন।
মা আসিয়া বারান্দায় একস্থানে বসিলেন। অপর
দুইজনও বসিলেন। সকলেই চুপ করিয়া আছেন।
কাহারও মুখে কথা যেন আসিতেছে না। একটু পরে
গঙ্গাচরণবাবু মণিলালকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে বলিলেন।
মণিলাল শ্রীঅরবিন্দ ঘােষের কৃপাপাত্র, ডাক্তার।
মা আনন্দময়ীর কথা
মণিলাল—মা, আমার এজমেঈশ্বরকে অপরােহ্মানুভূতি
করা হবে কি না ?
মা— সহাস্যে) গুরুর আশ্রয় মিলেছে ?
মণিলাল।
মা—তিনি কি বলেছেন?
মণিলাল—তিনি ত আশা দিয়েছেন।
মা–তাহলে আবার জিজ্ঞাসা করছ কেন?
নানাকথা চলিতে লাগিল। শ্রীঅরবিন্দ ব্যাচমের
উপর কি ভাবে পড়িয়া গিয়াছিলেন, তাহাতে পা ভাঙ্গিয়া
যায়। এখন সুস্থ হইতেছেন। এসব কথা হইতেছে। * *
বিকালবেলা। মণিলাল ও তঁাহার কন্যা আসিয়াছেন।
গঙ্গাচরণবাবু পূর্বেই আসিয়াছেন। মায়ের মুখ হইতে
নিঃসৃত অমৃতবাণীর ধারায় শুষ্ক হৃদয় সিক্ত, সঞ্জীবিত
হইতেছে।
গঙ্গাচরণবাবুর বাড়ীর দুটি মেয়ে গান গাহিতেছে,
হরি তােমায় ছেড়ে জীবন ধরে
রইব কেমন করে?
তুমি ধন দিয়েছ, মান দিয়েছ,
প্রাণ নিয়েছ কেড়ে।
(আমার কি কাজ ধনে তােমায় বিনে)
মা আনন্দময়ীর কথা
যখন ভাবে গ'লে ডাকি হা কৃষ্ণ বলে
তুমি অম্নি এস হেলে দুলে
ভবসাগরের তীরে।
(তােমার কালােরূপে আলাে করে)
[ মায়ের হিন্দী কথাগুলি প্রায়ই বাঙ্গলায় অনুবাদ
করিয়া দেওয়া হইল।
মা মণিলালের কন্যাকে গান গাহিতে বলিলেন। মিষ্টি
গলায় সে একটি হিন্দী ভজনগান গাহিল।
মা—অভ্যাসযােগ গীগয় আছে। অভ্যাসযােগ
দ্বারা ক্রমে সদ্ভাব অভ্যস্ত হয়ে যায়। ভুলকো
ভুল হাে যায় তব, তত ঠিক্ হায়।
মা-মণিলালের কন্যার প্রতি) তােমার নাম কি?
কন্যা–চন্দনবালা।
মা—চন্দন কি কাজে লাগে ?
কন্যা-ভগবানের পূজায় লাগে।
মা-তুমি এরকম চন্দন, ভগবানের পূজায়
লাগে ?
মা--গঙ্গাচরণবাবু ও মণিলালের প্রতি) এই সব
ঘােট ঘােট ছেলেমেয়েদের সদ্ভাবের সঙ্গ
মা আনন্দময়ীর কথা
দেওয়া উচিত। কেন না এই বয়স হ'তে সৎসঙ্গ,
সদ্ভাবের মধ্যে থাকূলে ক্রমে ঐ দিকেই
যেতে থাকবে। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়া
বাপ মায়েরই কাজ।
এরকম শিক্ষা চাই, এই যে সংসারের
ভােগ এতে তৃপ্তি নাই, মহারাজ হলেও তৃপ্তি নাই।
ছােট ছেলেমেয়েকে আমি পাঁচটা কতব্য করতে
বলে দেই।
(১) ভগবানের কাছে একটু প্রার্থনা কর।
(২) মা বাপের কথা মান।
(৩) পড়াশুনা কর।
(৪) সত্যকথা বল।
(৫) তারপরে শয়তানি করতে পার।
(মণিলালের কন্যার প্রতি) বল ত কি কি করা
উচিত? সে বলিল।
গঙ্গাচরণবাবু—আমাদের কিছু বলুন। ছােটদের কথা
ত বলেন।
মা—তােমরা এত চাকুরী করছ, একস্থানে
থাকতে হচ্ছে, নিয়মিত কাজ করতে হচ্ছে,এ ভাবে
মাসে মাসে মাহিনা পাও আর নির্দিষ্ট সময় অতীত
মা আনন্দময়ীর কথা
হয়ে গেলে পেন্স মিলে। এরকম ভাবে তার
কাজ করলেও পেন্স মিলে।
কৃপা অনুভবের জন্য নিজের উপরে কৃপা
কর। কত কথাই তাে আমরা শুনি। কথা শুনা
হচ্ছে কোথায় ? যখন কাৰ্য্যে প্রকাশ হবে
তখনই ঠিক্ ঠিক কথা শুনা হ'ল।
এক খেয়াল লক্ষ্য করে চল।
সৎসঙ্গ করতে হয় কারণ সৎসঙ্গের একটা
প্রভাব আছে, সেটা অনুভব করা যাক আর
যাক্।
রৌদ্রে ঘুরে গাছের ছায়ায় বসলে তার প্রভাব
পড়বেই;ঠাণ্ডা লাগবে। তবে মনে কোনও দুশ্চিন্তা
থাকূলে হয়ত সে প্রভাব সে বুঝতেই পারবে না।
আমাদের নিজেদের কিছু করতে
সামনে খাবার, মুখে তুলে দিতে হবে অন্ততঃ।
জনৈক ভক্তস্ত্রীলােকমা, যার নিজের কোনও শক্তি
নাই সে কি করূবে ?
-এই যে বললে, যার কোনও শক্তি নেই
সে কি করবে?'—এই বদ্বার শক্তি কোথা থেকে
হ’ল ? এ শক্তিতেই জপ বা ভজন করতে পার ত?
হবে।
মা আনন্দময়ীর কথা
রাত্রে এক সাধু অনেকগুলি শিষ্যা সহ আসিলেন।
শুনা যায় তিনি নাকি আড়ম্বর করিয়া বেড়ান মাত্র।
মা তাহাকে “কতক্ষণ ভজন কর ?” ইত্যাদি
কহিয়া এমন
জেরা করিতে আরম্ভ করিলেন যে
তাহার মুখ শুকাইয়া গেল। তাড়াতাড়ি সরিয়া
পড়িলেন।
১৬ই ফাৰ্জন (১৩৪৫) মঙ্গলবার। 28.2. 'গু9.
নিবণিমট ওবালানন্দআশ্রম দেওঘর।
মা নির্বাণ মঠে আছেন। বিকাল হইয়াছে। মাকে
মােটরে করিয়া বালানন্দ আশ্রমে লইয়া যাইবার কথা।
মা, ভ্রমর, আমি ও অন্য এক স্বামীজী চলিলাম।
গিয়া দেখি মা যাইবেন বলিয়া আশ্রমের বারান্দায়
বসিবার বন্দোবস্ত করা হইয়াছে। গুরুর একটি আসন
আছে, তাহার পাশে মায়ের জন্য আসন বিছান আছে।
প্রাণগােপাল বাবু, মােহনানন্দজী প্রভৃতি আনন্দে মায়ের
সহিত মিলিত হইলেন। ক্রমে গৃহী ও সাধু অনেক ভক্ত
আসিয়া বসিলেন। সকলে উৎসুক আছেন, মায়ের
অমৃতবাণী শুনিবেন। ‘মহাতাপস’
নামক
পুস্তকের
মা আনন্দময়ীর কথা
১১
রচয়িত্রী হেমলতা দেবী অগ্রসর হইয়া মায়ের সহিত কথা
কহিতে লাগিলেন।
মাকে অনেকে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। মাও
সুন্দর সুন্দর জবাব দিতে লাগিলেন। যতটা স্মরণ হয়
লিখিয়া রাখিতেছি।
-সেই একেরই অনন্ত ভাব, রূপ।
মােহনানন্দজী—একই যদি হয় তবে অনন্ত হয় কি
করে ? এক হলে বহু কি করে হয় তা বুঝতে পারি না।
মা বুঝতে পারার জন্যই ত এই বেশভূষা
নিয়েছ, এই পথে চলেছ। সেটা মুখে বুঝান
যায় না। আমাদের দুই বুদ্ধি রয়েছে কি না; এই
বুদ্ধি দিয়ে যতই তাকে ধরতে যাব, বুঝতে যাব
ততই ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে।
মােহনানন্দজী—তাহলে ভগবান্ দুই চক্ষু দিলেন কেন ?
প্রাণগােপাল বাবু ঐ কথার উত্তর দিলেন। বলিলেন,
“দুই চক্ষু রয়েছে বটে, কিন্তু দুই চক্ষু দুইটা দেখে না,
একটা দেখে।”
মা সদা হাস্যময়ী। হাসি মুখে, কখনও বা হা হা
করিয়া হাস্য লহরী ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করিয়া সমাগত
ভক্তজনমনে অনুরূপ তরঙ্গের সৃষ্টি করিয়া, মধুর ভাবে
৪২
মা আনন্দময়ীর কথা
কথা বলিতেছেন। সকলেই উদগ্র হইয়া রহিয়াছেন মা
কি বলেন। সকলেরই এক লক্ষ্য, এক দৃষ্টি।
মা—হাঁ, চক্ষু দুইটি হলেও দেখে এক।
আর দেখ, এক পা এক পা করে চলে, এক
গ্রাস এক গ্রাস করে খায়, সব সময়েই এক
রয়েছে।
মােহনানন্দজী—মা, দুই চক্ষুতে এক দেখে সত্য, কিন্তু
চক্ষুটা টিপে ধরলে দুইটা ছবি দেখা যায়।
মা—একের মধ্যেই অনন্ত ভাব বলা হ’ল না ?
আর দেখ আমরা বহুর মধ্যে রয়েছি বটে,
কিন্তু ভিতরে সেই জিনিষ রয়েছে। এর মধ্যে
থেকেও আমরা সেই অখণ্ড ভাবের সাড়া পাই।
মন দেখ না, খণ্ড আনন্দ নিয়ে তাে তৃপ্ত থাকুতে
পারে কিন্তু তা ত থাকে না। সৰ্ব্বদাই সে
অখণ্ড আনন্দ চায়। একবারে তো বাদ দেওয়া
নাই। এর মধ্যেই আমরা যে অখণ্ড তা বেশ
বুঝা যায়।
বাহিরের কমে অভাবের নিবৃত্তি হয় না।
এসব যে অভাবের কম। অভাবের কমের
স্বভাবই এই যে সদা সর্বদা অভাব জাগ্রত
৪৩
মা আনন্দময়ীর কথা
করে রাখে। তাই স্বভাবের কর্ম করতে হয়।
এমন বন্ধন নিতে হয় যাতে সব বন্ধন নষ্ট হয়।
বাহিরের দৃষ্টি, বাহিরের ভাব কমিয়ে দিয়ে
অন্তমুখী হয়ে যেতে হয় ?
মােহনানন্দজী—বাহিরে কি তিনি নেই ? বাহিরটাকে
বাদ দিলে হবে কেন ? অন্তরে তাকে পাওয়ার চেষ্টা না
করে বাহিরে তাকে পেতে চেষ্টা করা কি উচিত নয় ?
মা—প্রথমে ভিতরে ঢুকে তার ভাব নিয়ে
বাবার চেষ্টা করতে থাকলে এমন সময় আসে
যখন শুধু ভিতরে নয়, বাহির ভিতরে সেই ভাব
এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
আর বাস্তবিক বাহির ভিতর বলে কোনও
কথাই ত নেই।
কি কথায় মােহনানন্দজী মাকে বলিলেন, “আপনি
ত পূর্ণ !”
মা বলিলেন, “পূর্ণ, তা কি তােমায় বাদ দিয়ে ?”
জনৈক ভক্তের প্রশ্নের উত্তরে মা বলিতেছেন,
“জীব এই যে সৎকম, অসৎকর্ম করে এর
কারণ—এইরূপ করাই জীবের স্বভাব।
আমাদের উচিত ইচ্ছাশক্তি সাহায্যে তাঁকে
৪৪
মা আনন্দময়ীর কথা
পাবার জন্য লেগে যাওয়া। আমাদের ইচ্ছাশক্তি
রয়েছে, ইচ্ছা করে সব কাজ করতে পারা যাচ্ছে,
এর বেলা যদি বলি, তিনি কেন করান না ?
সেটা ঠিক নয় কি না। ইচ্ছা দ্বারা ঠেলেঠুলে
কোনও রকমে গিয়ে একবার স্রোতে পড়তে
পারলেই হ’ল। আর চিন্তা নেই, আপনা আপনি
ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।”
জনৈক বৃদ্ধ এক পাশে বসিয়াছিলেন। তিনি
জিজ্ঞাসা করিলেন, “মা, অহমিকা যায় কিসে ?”
মা বলিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত জগতের মধ্যে থাকা
অহমিকা যেতে চায় না। তাই অহমিকাকে ঐ
দিকে লাগাতে হয়। আমি তাঁর চিন্তা করব,
আমি তার নাম করব এই ভাব রাখতে হয়।
হয় “আমি আমি করতে হয়, তুমি চলে
যায়, আর না হয় তুমি তুমি’ করতে হয়, এতে
আমি চলে যায়। একটা নিয়ে থাকূতে হয়।”
মােহনানন্দজী গান ধরিলেন। চমৎকার গান।
যেমন গলার স্বর, তেমন ভাব। বাস্তবিকই সে গানে
প্রাণকে মাতাইয়া তােলে।
কীতনাদির পরে মা নিৰ্বাণ মঠে ফিরিয়া আসিলেন।
মা আনন্দময়ীর কথা
৪৫
রাত্রে মা বাহিরের বারান্দায় বসিয়া আছেন, আর
ভ্রমর ঠাকুর ঘরে বসিয়া গান গাহিতেছেন। মা বলিলেন,
“জ্যোতীশ ভ্রমরকে দিয়ে বার বার এই গানটা
করাতাে।”
অনন্ত অপার তােমার কে জানে,
তুমি দেখা না দিলে প্রাণে, ধ্যানে, জ্ঞানে!
বাক্যমনাতীত তুমি অনাদি,
সম্ভব, প্রলয়, পালন বিধি ;
প্রাণরূপী ব্ৰহ্ম, আছ প্রাণে।
অজর, অমর, চিন্ময়, সুন্দর,
নিত্য নিরঞ্জন, পাবন হে;
অরূপ, অব্যয়, এক, অদ্বিতীয়,
দিব্য, জ্যোতিঃধর, অমৃত আকর;
তােমার তুলনা প্রভু তুমি হে।
গানটি খুবই ভালো লাগিল।••••••কলিকাতায় ভ্রমর
একবার এই গানটি গাহিয়াছিলেন প্যাণ্ডেলের নীচে,
অনেক লােকের মধ্যে, মায়ের কাছে।
তখনই গানের
গম্ভীর ভাব আমাকে বিশেষরূপে আকর্ষণ করিয়াছিল।
১৬
মা আনন্দময়ীর কথা
১০ই চৈত্র (১৩৪৫) শুক্রবার। , 3,39.
দিল্লী আশ্রম।
বেলা আন্দাজ ৩টা হইবে। মেয়েরা সব আসিয়া
মাকে পাইয়া বসিয়াছেন। মাও আনন্দে কথা কহিতেছেন।
মুখে হাস্য। সে মিষ্ট হাস্য যেন সকলের মনকে
আকর্ষণ করিয়া ক্ষণকালের জন্য একটা আনন্দে ভরপূর
করিয়া রাখিয়াছে।
Dr. J. K. Sen এর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “গুরু
করলেও হয় ?
মালেখাপড়া আপনি করা যায় কিন্তু মাষ্টার
যখন তন্ন তন্ন করে দেখান তখন ঠিক হয়।
বাজে নামে মন খারাপ হয়,মনে অশান্তি আসে,
সেই হিসাবে ভগবানের যে কোনও নাম নিলে
মনে শান্তি আসে এ কথা ঠি। বীজ পাচ্ছি না,
জমী ত পরিষ্কার করছি। সেইজন্য ভগবানের
নাম যেমনে তেমনে নিলেও উপকার আছে।
ঐ ভক্ত—গুরুকে ভগবান্ বলতে বলে কেন?
মা—তিনি তাই-ই ত! তাই বলে। এক
ভগবানই ত গুরু।
মা আনন্দময়ীয় কথা
৪৭
।
ঐ ভক্ত—আচ্ছা, গুরু ত ভগবান, তা হলে যে দীক্ষা
দেয় তাকে ভগবান বলে কেন ?
মা–াঁর তত্ত্ব একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেহ
প্রকাশ করতে পারে না। একমাত্র ত তিনিই।
সেইজন্যই যখন গুরু বলছি, মানুষবুদ্ধি রাখতে
নেই, ঈশ্বরবুদ্ধি রাখতে হয়। পাথর বলে শিব
বলা হয় না, আবার শিব বললে পাথর বলা হয়
। আবরণ পড়ে রয়েছে তাই দেখা যায়
এ আবরণ কাটে গুরুশক্তিতে, গুরুর
দয়াতে।
কে তাহার মামা (কিংবা মামী) সম্বন্ধে কি বলিতেছে।
মা—এই যে মামা মামী এ সব শ্বাস
প্রশ্বাসের সম্বন্ধ। ঘরও শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘর, আর
সম্বন্ধও তাই। শ্বাস চলে গেলে কে মামা, কে
মামী ! সবই ফাঁকা। এ থাকবার জিনিষ নয়,
কিছুই থাকে না। যেমন সূর্য উদয় হ’লসন্ধ্যা
হ’ল, রাত্রি হ’ল ; রকম পর পর পরিবর্তিত
হচ্ছে। গাড়ীতে বসে আছ, ভাবছ যেমন তেমনি
আছ, কিন্তু অনেক চলে আসছ।
নিজের নিজের পথ দেখ, আপনা আপনা পথ
ঐ
মা আনন্দময়ীর কথা
দেখ। আপন ঘরের খবর করা চাই। সেখানে
স্ত্রী নেই, পুরুষ নেই।
এক ভক্ত--তিনি সব খেলনা দিয়ে রেখেছেন।
মা—খেলনা ত মা অনেক রকম আছে। তিনি
কত রকমে খেলে গেছেন। সেই লীলা, সেই খেলা
চিন্তা কর। সেই খেলা নাও যে খেলা নিলে এটা
যে খেলা ত’ ধরা পড়ে।
“হচ্ছে না, হবে না” বলে গা ঢালা দিয়ে থাকতে
নাই। যে দিন যায় আর ফিরে আসে না। একটি
একটি মিনিট করে সময় যাচ্ছে।
খেলার ভিতর দিয়ে খেলা ভাঙতে হয়। যে
খেলার ভিতর দিয়ে খেলা ভাঙে সেই খেলা নিতে
হয়। তােমর সব ময়লা উঠাতে সাবান দাও
তে? সাবানটাও তত ময়লাই। তবে সাবানটা
ঘ’সে তারপরে জল দিয়ে
তুলে ফেলতে হয়।
যেমন একটা কিছু দিয়ে বাসন মাজতে হয়।
শরীরটাও তাে বাসনই।
ঠাকুরের নাম হ’ল তেঁতুল। যতই নাম কর
চিত্তশুদ্ধ হবে। তেঁতুল দিলে ময়লা উঠে যায়।
বাসন পরিষ্কার হলে তাতে পরিষ্কার দেখা যায়।
মা আনন্দময়ীর কথা
৪১
নাম করা হচ্ছে মজা। মেজে স্বরূপ দেখতে
পার। এই জ্ঞান এল। জ্ঞান-গঙ্গা এসে ধুয়ে
দেন। কম টম যা কিছু সব ধুয়ে যায়।
জাগতিকের মধ্যে যা দেখতে পাওয়া যায়
’ই রয়েছে।
( অর্থাৎ জগতত্ত্ব পরমার্থতত্ত্বই
বলিতেছে)।
এক ভক্ত কথায় কথায় বলিলেন, “মন্দ কি ?”
মা-মন্দ কোথায় ? সবই ভাল।
আমাদের মন্দ ভাব, মন্দ দৃষ্টিই মন্দ। আবার
এক জায়গায় গেলে ভাল কথাটাও দাড়ায় না, মন্দ
কথাটাও দাড়ায় না।
কথা প্রসঙ্গে মা বলিতেছেন,
“নাম করাই সৎসঙ্গ। পাঠ, জপ, কীর্তন, চর্চা
সবই সৎসঙ্গের মধ্যে। নামের মধ্যেই সব কিছু
আছে। নাম করতে করতে সব কিছু এসে যায়।
আলুনি আলুনি পড়লে ভাল লাগে না ত?
মশলা পড়লে রস লাগে, না ? বলে, বড় বেশী
খেয়ে ফেলেছি, এত ভাল লেগেছে। এ রকম হওয়া
চাই। ভক্তিশ্রদ্ধা না হলে রস হয় না।
ভক্ত—কত বাধা বিঘ্ন আসে, কি করি ?
৪
মা আনন্দময়ীর কথা
মা-বাধা বিঘ্ন কত কি করে রেখেছি আমরা।
নূতন করে ? আমরাই বাধা বেন্ধে রেখেছি।
খেয়াল রাখতে হয়, “আসুক বাধা আসুক, টব না।
দেহত্ব বুদ্ধিটা মা, না গেলে কিছুরই প্রকাশ হবে
।
তার উপর যখন মন যায় তখন দেহের কিছু
লাগে না। দেহে মন না থাকলে তিনি কাছে,
যতই দেহের উপর মন যায় ততই তিনি দূরে।
দেহের ভােগও করব, ভগবানও আসুক এ কি
করে হয় ?
তিনিই সেজে আছেন বটে কিন্তু বােধ নেই।
খেলা! খেলা বােধ করবার জন্যই ঐ সব খেলা
নিতে হয়—পূজা, পাঠ, চর্চা ইত্যাদি।
সবদা মনে রাখবে ‘হচ্ছে না’—আমার ত্রুটী
তিনি ত ছড়িয়ে রয়েছেন। আমাকে জয় করতে
হ'লে ‘আমি’ দিয়েই আমাকে জয় করতে হয়,
‘আমি’র উপর জোর দিবে। আমি তাঁকে ডাক্ব,
পূজা করব।
কথা শুনলাম আর চলে গেল, এতে হয় না।
একটি (কথা ) আমরা শুনব তাহলে এককে
৫১ মা আনন্দময়ীর কথা পাব। কতই ত বই পুস্তকে পাই। একটি বেছে নিয়ে সংকল্প করতে হয়। ধর্মগ্রন্থাদি পাঠটাঠ করতে হয়, শুনতে হয়। মনের গতি ত সব সময় এক রকম থাকে না ; কোন সময় কোন স্তরে যায় যখন ধরবার শক্তি হয়। কোন সময় কোনটা লেগে যায় তার ঠিক নাই। আমরা সত্যতে, ভাললাতে, বড়তে রয়েছি। এইবার মা সাপের গল্প করিতেছেন। মা বেড়াইতে গিয়াছিলেন। সেখানে পথে সাপ দেখিয়াছিলেন। সকলে সাপের উপর দিয়া চলিয়া গেল, কিন্তু আশ্চর্য কেহ মাড়াইল । মা হাসিয়া হাসিয়া এমন ভাবে গল্পটি করিতেছেন যে তাহা সকলে হৃদয়ের সহিত আনন্দে শুনিতে লাগিলেন। কেহ বলিতেছেন, “শােন্ শশা, মায়ের কথা শােন।” বিকালবেলা মাকে দুর্গাদাসবাবুর বাড়ীতে লইয়া যাওয়া হইল। দুর্গাদাসবাবুর অসুখ, তিনি আসিতে পারিতেছেন মােটর বাড়ীর সামনে খাড়া হইল। দুগ- দাসবাবু বাহিরে আসিয়া কথাবার্তা বলিতে লাগিলেন। ইনি এক বিচিত্র স্বভাবের লােক। হয় ত বলিতেছেন, “মা, পায়ের ধুলাে দিয়ে কৃতার্থ কর।” তা এমন ভাবে বলিবেন—দূর হইতে শুনিলে মনে হয় মাকে কেহ ধমক ।
মা আনন্দময়ীর কথা
দিতেছে। ভাষায় ও ভাবে তিনি মায়ের সহিত রীতিমত
ঝগড়া করেন।
মাকে তিনি বলিলেন, “মা, বাবাকে দেখতে এসছ,
মেয়ের একটু মিছরী নিয়ে আসতে নেই ?”
–মিছরী তােমার মুখেই আছে।
দুর্গাদাসবাবু—মুখে আছে ত?
মা—হাঁ, তা আছে বটে, তবে কথা কইলে
পড়ে যায়। চুপ করে থাকূলে মিছরী মুখ থেকে
পড়ে যায় না।
মা বিদায় লইলেন। সনাতন ধর্ম মন্দিরের সম্মুখে
গাড়ী থামানাে হইল। মা গাড়ীতে বসিয়া রহিলেন।
আমি ও খুকুনীদিদি দেখিতে গেলাম। এত সুন্দর সাজানাে
রহিয়াছে দেখিয়া বড়ই ভালাে লাগিল।
এদিকে হয়েছে কি বিড়লা সাহেব, যিনি এই মন্দির
করিয়াছেন, তার ড্রাইভার মাকে দেখিয়া চিনিতে পারিয়া-
ছেন। কলিকাতায় বিড়লার শিবমন্দিলে বিড়লা সাহেব
যখন মাকে দর্শন করিতে গিয়াছিলেন, ইনি মাকে তখন
দেখেন। ড্রাইভার আসিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন,
“আপনি কলকাতায় বিড়লার মন্দিরে গেছেন ? একজন
মৌনী বাবা (ভােলানাথ ) ছিলেন।” মায়ের কথায় শেষে
মা আনন্দময়ীর কথা
চিনিতে পারিলেন। মাকে নিয়া মন্দির দর্শন করাইবার
জন্য ব্যস্ত হইলেন। তৎক্ষণাৎ এক জোড়া নূতন খড়ম
আনিয়া মাকে লইয়া গেলেন, কারণ মায়ের পায়ে চটী
জুতা ছিল।
আমরা মাকে ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া সব দেখাইলাম। মা
বলিলেন, “বেশ সুন্দর!”
কত সুন্দর সুন্দর ছবি টাঙ্গান রহিয়াছে। উপনিষদ্,
গীতার বাণী, মহাপুরুষদের দোহা দেওয়ালের গায়ে খােদা
আছে।
বিড়লা সাহেব আসিলে মা বলিলেন,
“এই যে সব করেছ, বেশ ভালই করেছ।”
বিড়লাসাহেব—আমি কি করেছি? কিছুই করি নাই।
বাইরে করেছি, ভিতরে কিছুই নাই।
মা—হাঁ, ঠিক্ কথা। তুমি কর নাই, তিনি
করিয়েছেন।
মাকে এইবার কালীবাড়ী লইয়া লইয়া যাওয়া হইল।
পাথরের মন্দিরটি মা ঘুরিয়া দেখিলেন।
৫৪ মা আনন্দময়ীর কথা ২রা জ্যৈষ্ঠ (১৩৪৬) 14th May, আমরা সকালবেলা গঙ্গোত্রী হইতে রওনা হইলাম। দুপরে ভৈরবঘাটে আহারাদি সারিয়া চলিলাম। ধরালুতে বিশ্রাম করিয়া দুই মাইল দূরে ‘হরশিলা’তে আসিয়া অদ্যকার মত বিশ্রাম লইলাম। রাত্রে আহারাদির পর আমি মাকে বলিলাম, “আমার একান্তে কথা আছে। একটি শিবমন্দির আছে। সেখানে মা ও আমি ঈষৎ অন্ধকারে বসিয়া কথা কহিতে লাগিলাম। মাযেরকম বলছি সেরকম করে করবি। আমি-আমি পারব না। দেখতে পাচ্ছি আপনার দ্বারা আমার কোনও উপকারই হয় নি। মা কেমন যেন চুপ হইয়া গেলেন। মনের ক্ষোভে মাকে ঐ সকল কথা বলিলাম বটে, কিন্তু মায়ের চুপ, ভাব দেখিয়া মনে বড়ই অনুতাপ আসিল। কিছুক্ষণ এইভাবে থাকিয়া মা অলৌকিক ভাষায় স্রোত্রাদি উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে দেখি গদ্গদ- ভাবে বলিতেছেন ও সঙ্গে সঙ্গে কান্দিতেছেন। হঠাৎ মা আনন্দময়ীর কথা কান্না দেখিয়া আমি মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, আপনি কি আমার কথায় মনে কষ্ট পেয়ে কাঁদছেন ?” মা কান্দিতে কান্দিতে বলিলেন “না।” তারপরে দেখি হাতজোড় করিয়া বিভাের হইয়া বলিয়া যাইতেছেন। বুঝিলাম প্রেমের ভাব। কিছুক্ষণ পরেই উৰ্দ্ধ দিকে তাকাইয়া, সহাস্য বদন। ঠিক কান্নার পরেই হাসি, এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। বুঝিলাম এ দুঃখের কান্নাও নয়, সুখের হাসিও নয়। এক প্রেম- ভাবেরই দুই প্রকার স্ফুরণ। কান্দিবার সময় গদ্গদকণ্ঠে স্রোত্ৰাদি উচ্চারিত হইতেছিল, সে মাধুৰ্য এক প্রকার। এখন অপূর্ব হাসির সহিত মিশ্রিত হইয়া স্রোত্রাদি স্ফুরিত হইতেছে, এবং অন্য প্রকার মাধুৰ্য আস্বাদন করাইতেছে। যেন একই সঙ্গীত দুই সুরে, দুই তালে গাহিতেছে। মায়ের মুখখানি চোখের জলে, মুখামৃতে আপ্লুত হইয়া পড়ায় মন্ত্রোচ্চারণ কালে দুই একটি ছিটা আমার মুখে আসিয়া লাগিল। যেন স্থির অতলজলের তল হইতে সহসা রহস্যময় প্রেমের বুদবুদ উঠিয়া আসিতেছে আপনাকে বিকশিত করিয়া দিতেছে। এবং
মা আনন্দময়ীর কথা
হঠাৎ চুপ করিলেন। ভাবটি যেমন তেমনই রহিল।
অনেকক্ষণ চুপ, কোথায় যেন ডুবিয়া গেছেন।
ডাকিলাম, “মা?” উত্তর নাই। আবার ডাকিলাম,
উত্তর নাই। আবার ডাকিলাম, “মা, মা, ওমা!”
মা যেন সচেতন হইলে, “আঁ!”
বলিয়াই কোথায় যেন ডুবিয়া গেলেন। আবার
ডাকিলাম, সাড়া নাই। আবার ডাকাডাকির পর
বলিলেন,
আঁা”।
বলিলাম, “চলুন, শুতে চলুন।” কথা যে কানে প্রবেশ
করিল এরূপ মনে হইল না।
আমি- গায়ে হাত দিয়া) মা।
সব
কথা আসিতেছে না, কিন্তু বিরক্তি নাই। যতবার
ডাকিতেছি প্রত্যেকবার সাড়া দিতেছেন, “উ উ ।”
কী করুণ স্বর ! করুণা, স্নেহ, মমতা, প্রেম
মিশ্রিত হইয়া গলিয়া “উ” শব্দটিতে মাখানাে। মা এক
এক বার বলিতেছেন “উ,” যেন একটা অপূর্ব মাধুৰ্য উহা
হইতে ঝরিতেছে। সে মাধুৰ্য বৰ্ণনের আমার সাধ্য নাই।
এটুকু বলিতে পারি, আমার হৃদয়ে যদি এক বিন্দু
মা আনন্দময়ীর কথা
ভক্তি বা প্রেম থাকিত ঐ মাধুর্য্যের সায়র আমার ভাসাইয়া
লইয়া যাইত, ঠাই পাইতাম না।
মায়ের মুখের উপর আলো ফেলিয়া দেখি, চক্ষু মুদ্রিত।
মাকে জাগাইবার জন্য বলিলাম, “মা, চোখ খুলুন না।”
মা চক্ষু খুলিলেন। ঈষৎ আরক্তিম সজল নয়ন, তারা
দুইটি এজগতের কিছুই দেখিতেছে না, কোথায় যেন ডুবিয়
যাইতেছে। সেখানে এ জগতের কোনও কথা বা খবর
পৌছে না। ভাবের গভীরতায় মুখমণ্ডলে এক অপরূপ
ক্রমে যেন ভাব হাল্কা হইয়া আসিতেছে।
মা আপনার ভাবে থাকিয়াই চক্ষু বুজিয়াই করুণ স্বরে
কথার উত্তর দিতেছেন।
বলিলেন, “হিসাব কি আমি দেই ?”
আমি—এখন করে দিন না।
মাসময়ে হবে।
একটু অভিমান আসিল, বলিলাম, “মা, আপনি শুতে
যান, আমি আজ এখানেই থাকব।”
মা—তুইও ওখানেই শুবি চল্।
মা অনিন্দময়ীর কথা
আমি-আমি যাব না।
মা-চল।
আপনার ঘাের এখনও ভাঙে নাই। তাই কিয়ৎক্ষণ
থামিয়া থামিয়া আদর মিশ্রিত অনুনয়ের সুরে “চল্, চল”
বলিতে লাগিলেন। আমি যাব না’ বলিতেছি, মা
তথাপি “চল্ চল্” এরূপ বলিয়াই যাইতেছেন।
শেষে কমলাকান্ত ডাকিতে আসিলেন। মা চলিয়া
গেলেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে গিয়া মা’র কাছেই শুইলাম।
জ্যৈষ্ঠ (১৩৪৬) মাসের মাঝামাঝি মা উত্তরকাশী
ছিলেন। আমি মার কাছ হইতে কলিকাতায় চলিয়া
আসিলাম। মা দুই চার দিনের মধ্যেই কমলাকান্তকে
সঙ্গে লইয়' দেরাদূন চলিয়া আসিলেন।
কলিকাতায় থাকা কালীন মাকে অনেকগুলি চিঠি
লিখিয়াছি। মা প্রায় প্রত্যেকখানিরই উত্তর কমলাকান্তকে
দিয়া লিখাইয়াছেন। উত্তরগুলি পাইয়া বড়ই আনন্দিত ও
আশ্চর্যান্বিত হইয়াছি।
একদিন মনে আছে বিড়লার শিবালয়ে নাটমন্দিরে
পায়চারি করিতেছি, মনে বড়ই হতাশা আসিল। মনের
বেদনা একটি কবিতার মধ্য দিয়া ব্যক্ত করিয়া মায়ের কাছে
পাঠাইয়া দিলাম।
মা আনন্দময়ীর কথা
“একটি কথা সুধাই আমি বারে বারে
যারে তারে,
আমার প্রাণের কথা জানাই আমি কারে ?
আমার এ দুখের বােঝা বইতে নারি,
বুকের শিরা যায় যে ছিড়ে, বড়ই ভারী।
এা আমি, আর কেহ নাই।
হু হু করে প্রাণ ;
আছে কি কেউ, ওরে আছে কি কেউ
আমার ভগবান ?
আমার প্রাণের পারে যে শূন্য আছে
অতল ছোওয়া,
সেখানেতে দুচার ফোঁটা অশ্রু পড়ে
গালের ময়লা ধাওয়া।
শূন্য দেখেও কল্পনা আসে যদি হােত
মনের মতাে
দুখানি চরণ,
তপ্ত অশ্রু পড়ত তাহার পরে,
পারত কি সে অচঞ্চল চরণ লয়ে
পাথর হয়ে
থাকিতে বসিয়া,
মা আনন্দময়ীর কথা
অথবা (তার) বুকের ভিতর সাড়া পড়ে ?
পেয়ে শুভ্র চরণ পরে গরম ফোটা
সে কি ওগাে সরিয়ে নিলে চরণ দুখানি
পাছে লাগে পায়ের পরে ময়লাছিটা ?
তাই কি হ’ল ? তাই কি চরণ নিলে টানি ?
, না, নানা, হয়নি তাহা
তাই কি হয় ? হয়নি আহা !
বলুক গে মন যাহা তাহা।
তাই হ'লে যে নাই কিছু হায়,
ব্যথাই ব্যথা এই দুনিয়ায়!
বুক ফেটে যায়।
একি ভ্রান্তি এ আমারি,
আপন মনকে নয়ন ঠারি ।
পাইনে কেন সাড়া ?
শূন্য যদি পূর্ণ থাকে পাইনে কেন সাড়া ?
মধুর বঁধূ বাজায় বাঁশী সে কি আমায় ছাড়া?
তা হলে মাের কেহ কি নাই ?
পতিত বলে কেহ কি নাই ?
মা অনিন্দময়ীর কথা
একা আমি ? তাই কি, তাই ?
কেউ কি আছে আমার ভগবান,
কে আছে আশ্রয় ?
এ কি শুধুই ডাকাডাকি, কেউ কি আমার নয় ?
তারপরে উত্তর পাইলাম। কমলাকান্ত আমাকে
লিখিতেছেন, “মা খেয়ে দেয়ে শুয়ে শুয়ে মিনিট দশ
পনরর মধ্যে যাহা বল্লেন অবিকল তাই লিখে দেওয়া
হইল। মা বল্লেন, “আবােল বােল যা আমার
ভাষা ।”
পূর্ণরাজ্যে শূন্য দেখলেও লীলার তালে এই
যে দেখা, এই যে রূপ, এই যে ভাব, এই যে
সুন্দর। ভাষার, ভাবের সৌন্দৰ্য কেবল তাের।
একেরই রূপ একেরই অরূপ। ভগবান নাই ?
আছে কি আর কিছু ? চরণ স্মরণ (বা শরণ)
যেখানে পাথরও চঞ্চল সেখানে। হু হু ভাবে
সাড়াটি ত রই কারণ, যাঁর চরণ।
তাঁরই এ গরম ফোঁটা, সরিয়ে আর নিবে
কোথা ? আশার ভাবের বাসা বেঁধে চলতেই হবে
মা আনন্দময়ীর কথা
খেলার তালে। নিরাশার ধারা কভু মনের কোণে
স্থান দিবে না।
ওরে পালা গােপাল! নাই যে আমায়
ছাড়া! এই যে সাড়া, সেটি সর্বক্ষণ রাখবে ধারা,
তবেই ক্রমে পড়বে ধরা—ঐ যে পরাৎপরা—
ভগা, সেই যে একই ; গুণ নিগুণ, সাকার
নিরাকারা।
ঐ যে মধুর তান, আমারই তান, আমারই এ
ফাঁদ—সেই যে নিত্য, আছেন এক ভগবান এক
ভগবান্ !!
৭ই বা ৮ই ভাদ্র হইবে (১৩৪৬)
খেওড়া আশ্রম।
বিকাল বেলা। মা সামনের ছােট ময়দানের
মাঝখানে বসিয়াছেন। কয়েকজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত মাকে
দর্শন করিতে আসিয়াছেন। একজন অগ্রবর্তী হইয়া
মায়ের সহিত বাক্যালাপ করিতে লাগিলেন, অপর সকলে
মুগ্ধ হইয়া শুনিতে লাগিলেন।
মা আনন্দময়ীর কথা
মা-বাবা, কোথা থেকে এলে ?
ব্রাহ্মণ-এক জায়গায় আপৎশান্তির জন্য স্বস্তয়ন
করে এলাম।
মা অজ্ঞবৎ প্রশ্ন করিতেছেন, “বাবা! এ সবে কি
কাজ হয় ?”
ব্রাহ্মণ— মা, ঠিকমত করতে পারলে কাজ হয়
বৈ কি ? যারা উচ্চ সাধক তারা আরও ভাল ক্রিয়া
করতে পারেন।
অভিজ্ঞ পিতার সঙ্গে ক্ষুদ্র বালিকা যেরূপ কথাবাত।
কয় মা সেই ভাবে কথাবাতা কহিতেছেন। আবদার
এবং নিতান্ত বিনয়ের সহিত প্রশ্নাদি করিয়া ব্রাহ্মণকে
বড়াে করিতেছেন ও নিজকে ছােট করিতেছেন। (ব্রাহ্মণ
নিজকে লঘু জ্ঞান করিতেছেন ও মায়ের কথায় সঙ্কুচিত
হইতেছেন, তাই কথা কহিতে মার বিনয়ের সহিত
আবদারের ভাবও প্রকাশ পাইতেছে)।
ব্রাহ্মণ তাই বলিলেন, “আপনাকে দেখবার জন্য কত
লােক এসেছে, আমাকে দেখবার জন্য ত কই লােক
আসে না।”
মা-বাবা গাে ! শুন, মেয়েটাকে সকলে স্নেহ
করে তাই এসেছে। ওরা সকলে মেয়েটাকে
৬৪
মা আনন্দময়ীর কথা
-
নিজের মেয়ে বলে মনে করে তাই এসেছে।
বলে না—নিজের প্রাণের মত ভালােবাসি।
ভাবের সঙ্গে যার মিলে তারে ভালাে লাগে।
তাই সকলে যে এখানে আসে আমি বলব, নিজেরই
কাছে আসে।
ব্রাহ্মণ-কই আমার কাছে ত আসে না।
-অামি বলব, তােমার কাছেই আসে,
কারণ তুমি আমি কি আলাদা নাকি?
ব্রাহ্মণ—আপনি উচা স্তরের, আমরা নীচের স্তরের,
তাই আপনার কাছে আসে।
মা-বাবা, মেয়েকে ওরকম কথা বলে না,
অহঙ্কার বেড়ে যাবে।
সকাম, নিষ্কাম কর্মের কথা উঠিল।
ব্রাহ্মণ—নিষ্কাম কম নাই, ঈশ্বরপ্রীতিতে কমকেই
নিষ্কামকম বলা হয়। কিন্তু ওটাও ত কামনা।
মা-হা, যে কামনায় সব কামনা নষ্ট হয়ে যায়
সেই কামনা।
জনৈক ভক্ত—সংখ্যাজপ না রেখে সদা সর্বদাই জপ
করি, তা কিরকম হয় ?
মা-বাঃ অজপা জপই ত আমরা চাই। সৰ্ব্বা-
মা আনন্দময়ীর কথা।
বস্থাতেই ত শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, জপ যদি
সেই সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে সে ত ভাল
কথা।
নাম ও বীজের পার্থক্য কি এ বিষয়ে কথা উঠিল।
পণ্ডিতকে নাম ও বীজের পার্থক্য জিজ্ঞাসা করিলেন।
পণ্ডিত একরকম বলিলেন। মাও এ বিষয়ে অনেকগুলি
কথা বলিলেন।
( সংক্ষিপ্ত)” নাম জপ যদি অনবরত করা যায়
তাহার ভিতরের ভাবটিই নামীর দর্শন লাভ
করাবে। কারণ, তিনি ত ভাবগ্রাহী। গলাভাবে
তাঁর নাম নিলেই সব আপনা আপনি হয়ে যাবে।
গ্রন্থিটন্থি যা খােলার খুলবে।
নাম নিতে নিতে বীজ ভিতরে স্ফুরিত হতে
পারে এবং এইভাবে সাধককে অগ্রসর করে দিতে
পারে (দেখা যায়)।
আমাদের ষট্চক্র এবং গ্রন্থিটন্থি যে সব
রয়েছে, আমরা যদি বীজমন্ত্র জপ করি বীজমন্ত্র
উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সে সব ঝঙ্কার দেয়। দেখ
বীজমন্ত্রের মধ্যে আলাদা সব রয়েছে অনুস্বার,
৬
মা আনন্দময়ীর কথা।
বিসর্গ, যুক্ত-অক্ষর এই সব। বীজমন্ত্র ঠিভাবে
উচ্চারণ করলে গ্রন্থি থােলার কাজ হ'তে
থাকে।
মােটর উপর নামের দ্বারা গলাভাবে গ্রন্থি
খােলার কাজ হয় আর বীজ দ্বারা ঝঙ্কারে গ্রন্থি
খােলার কাজ হয়।”
মা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের সঙ্গে কি ভাবে কথা কহিতেছেন
তাহা বলি। কথা কহিবার ভঙ্গী ছােট্ট মেয়েটির মত
অথচ এর মধ্যেই এমন সব উচ্চ তত্বের কথা বলিতেছেন
যাহার ধারণা করা পণ্ডিতের পক্ষে মুস্কিল।
মা যখন প্রশ্ন করিতেছেন, বলিতেছেন,
“মেয়ে যেমন আবদার করে বাবাকে জিজ্ঞাসা
করে সেইরকম ভাবে জিজ্ঞাসা করছি।”
কেহ আবার কিছু জিজ্ঞাসা করিলে বলিতেছেন,
“এ সব কথা বাবা বলেই ভাল হয়, আমি
কি বন্ধ ? আমি তাে আবােল-তাবােল বলি;
শাস্ত্র জানি না, লেখা জানি না, পড়া জানি না।”
বৃদ্ধ সংস্কৃতে কিছু শ্লোক বলিলে বলিতেছেন,
“বাবা, মেয়েটাকে তুমি
কি সংস্কৃত
শিখাইছিলা? বাবা, বাঙলায় কও।”
মা আনন্দময়ীর কথা।
মায়ের ঘােট মেয়ের মত মাধুৰ্যপূর্ণ গলগলা ভাবে
সকলে মুগ্ধ হইয়া যাইতেছেন।
মা—দেখ, ভাবটা যদি “তিনি এই ভাব হয়
তা হ'লে যে নামে কেন না ডাক, হবে। গাছ,
গাছ’ ক'রে ডাকূলেও গাছের মধ্য দিয়াই সেই
চৈতন্যসত্তার স্ফুরণ হবে। একমাত্র ত তিনিই।
জলই তরঙ্গাকারে রয়েছে। তরঙ্গটাও ত জল
ছাড়া কিছুই না। কাজেই তরঙ্গের মধ্যে দৃষ্টি
করলে ‘জল’ এই বােধ আসবেই।
কথা কহিতে কহিতে সন্ধ্যা হইল।
18th December, 1939. বেলা আন্দাজ ১১টা।
কলিকাতা। লেকের ধারে একখানি নূতন বাড়ীতে
মা থাকেন। মায়ের কাছে প্রত্যহই বহু ভক্তের সমাগম
হয়। নিত্যই উৎসব। কীতনাদিতেও খুব আনন্দ হয়।
দুতলার উপর একখানি ঘরে মা চৌকীর উপর বসিয়া।
ঘরে অনেকেই আছেন। কথাবাত। চলিতেছে।
একজন—আপনার দয়া হ'লেই হয়।
মা-হা, আপনার দয়া হ'লেই হয়।
আপনি আছেন, আপনার দয়া হ'লেই হয়।
৩৮ মা আনন্দময়ীর কথা একেবারে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাও, ওষুধটা অাছে সঙ্গে সঙ্গে; এখন আর ছাড়তে পার না, ডাক্তার যখন নিযুক্ত হয়েই গেছে। তা না হলে হয় না। ঘরে এসে খেলেই গােল হয়ে যায়, পথ্যােচনেরও বেশ কম হয়। যতীশগুহের মাতা মা, তুমি কথায় কথায় বল, ‘সে’ করবে। ‘সে’ কে মা ? মাতা’র পাশ ফিরবার যায়গা নাই। মা হাসিতেছেন। যতীশগুহের মাতা- সে কি রকম? মাযা রকম দেখতে পাচ্ছ, যা রকম দেখতে পাওয়া যায় না, এই সবই তার রকম। মা হাসিতেছেন, আবার বলিতেছেন, “কি, বাদ দিবে নাকি তােমরা? যে যেমন দেখতে চায়, যে যেমন দেখতে পায় সে তেমনই।••বুঝতে পেরেছ ?” যতীশগুহের মাতা- মা, একরকম না বহুরকম ? মা—যত রকম অাছে। ঐ একরকম বল এক- রকম, বহুরকম বল বহুরকম। যতীশগুহের মাতা- সুন্দর কথা! মা, বেশ লাগে।
না আনন্দময়ীর কথা
;
মা--মুখরােচক, চাইনি! কতক্ষণ বাদেই,
কতক্ষণ আর কি, চলে গেছে।
খুকুনীর পিসীমা মাকে একজনের কথা বলিতেছেন,
“তােমাকে সংসারী অবস্থায় দেখেছিল, তােমার কাছে আতে
চায় কিন্তু সাহস পায় না; ভাবে সংসারীর সাথে তুমি
কথা বলবে কি না কে জানে।”
মা বলিলেন,
“তুমি বােলাে, ইনি একেবারে সংসারী।
বলবে যে, তখন যেমনটি দেখেছিলে, একবিন্দু
এদিক সেদিক হয় নি। শরীরটা বড়, ঘােট।
বিদ্যাকুট, খেওড়া টেওড়ায় আমিও গিয়ে “মেসাে,
মাসী” বেশ করে লাগিয়ে দিয়েছি।
আগে যা, পরেও তা ; যেমন তেমনটি।
‘আগ, পর’ আবার কথা আছে নাকি? যেমন
তেমনটি।...বলা যায় না, না? বলা যায় না সব।
মা হাসিতেছেন, বলিতেছেন, “মােটামুটি বলা যায়।”
অমূল্যচরণ দত্তগুপ্ত ও তঁাহার ভাই অক্ষয়বাবু বসিয়া
আছেন। মা অক্ষয়বাবুকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন,
“বাবা একটু কাণে কম শশানে নাকি?”
অমূল্যবাবু।
৭০
মা আনন্দময়ীর কথা
মাভিতরে ভিতরে শােনা ভাল; বাইরের
কাণে কম শােনে এত ভালই হয়েছে।
বিকাল। মায়ের দরজা খোলা হইয়াছে। ঘরে
অনেক লােক মায়ের দর্শনের জন্য সমবেত।
বীরেন মহারাজ-মা, তােমার মঠটঠ হয়েছে নাকি,
শুনি।
মা-বাঃ কত মঠ হচ্ছে, যাচ্ছে; তার কি ?
এই যে মঠেই আছি। (সকলকে দেখাইয়া) এই যে
এত সব মঠ, গুণতে পার ?
রি ? *
একদিকে মঠ ভাঙ্গছে, একদিকে গড়ছে।
বীরেন-ভাঙ্গে গড়ে কে ?
মাযার ভাঙ্গা গড়ার গরজ সেই ভাঙ্গে
গড়ে।
মা একজন বৃদ্ধকে দেখাইয়া রেবতীবাবুকে (১) বলিলেন,
“বাবাকে বলেছিলাম, বাবা, মিছরি মুখে
রেখাে, গ'লে গ'লে রস পড়বে। তার মানে
নাম ভিতরে রাখবে আর নামরস পান করবে।
দেখি বাবা বাস্তবিকই মিছরি এনে খাচ্ছে।
(১) রেবতীমােহন সেন, শ্রীমৎ বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী মহাশয়ের শিষ্য।
মা আনন্দময়ীর কথা
তা ভালই হয়েছে। এতে সকলের, নাম মনে
রাখতে হয়’ এটা মনে থাকবে।
ah December, 1939.
লেকের ধারে বাড়ী, কলিকাতা।
মা ভক্তগণের সহিত আলাপ করিতেছেন।
বলিতেছেন,
“ছুটাছুটি যদি করতে হয় ঐ (সৎ) সঙ্গের
জন্যই যেন হয়। আর যতটুক ততটুক। যতটুক
লেকের পারে ততটুকই জলের হাওয়া লাগে।”
জনৈকবৃদ্ধ—আমরা ভােগটাই চাই।
মা-কই, ভােগ চাই কই? আমরা ত্যাগই ত
চাই। এত ত্যাগ হওয়ার জিনিষ। আসল ভােগ
চাই কই ? আসল ভােগ্য জিনিষটা আমরা ত্যাগ
করে বসে আছি।
আসল কথা কি বাবা! গুরুপাই হচ্ছেসব।
ঐ ভক্ত—গুরু কি এদের দেখাদেখি খুঁজে নেব, না
তিনি নিজে দেখা দিয়ে কৃপা করবেন ?
মা-দেখাদেখিটা হচ্ছে কেন? যােগাযােগ
কেন হয়ে যাচ্ছে? কাজেই গুরুপাই বলব।
१२
মা আনন্দময়ীর কথা
ঐ ভক্ত—গুরুবাক্য পালন যদি না করতে পারি সেই
ভয়ে শুরু করতে ইচ্ছা হয় না।
মা–পাথর বললে শিব বলা হয় না, শিব
বললে পাথর বলা হয় না। সেই হিসাবে চেষ্টা
তাও গুরুপায় হয়।
ছেলে পেলেরা লেখাপড়া করে। একট,
লেখার দিকে গেছে ত? (বলে) বাঃ বেশ সুন্দর
হয়েছে। পরে ভুল দেখিয়ে দেয়, কেটে দেয়।
গুরুবাক্য পালন করতে পারি না পারি, নেব না’
তা নয়। আশ্রয় আমি নেব, না পারলে তিনি
আমায় গড়িয়ে নেবেন।
..দুৰ্বলতার আশ্রয় নেবে না, নিতে হলে
সবলতার আশ্রয় নেবে।
.
পুরী ও ভুবনেশ্বরে
( সংক্ষিপ্ত)
২১শে মাঘ, রবিবার (4, 2. 40.) সকালবেলা মা
পুরী পেঁছিলেন। মা যেখানে রহিলেন ঐ আশ্রমটি
একেবারে সমুদ্রের তীরে অবস্থিত। মায়ের সঙ্গে দেবীজী
মা আনন্দময়ীর কথা
যােগেশদা (ব্রহ্মচারী), নিশিকান্ত মিত্র (ইনি অনেকদিন
যাবৎ মায়ের আদেশে সংসার ত্যাগ করিয়া সাধন ভজন
করিতেছেন), স্বামী অখণ্ডানন্দজী,
অখণ্ডানন্দজী, পরমানন্দ স্বামী
(শ্রীব্রহ্মজ্ঞমায়ের আশ্রিত, অনেককাল গঙ্গোত্রীতে ছিলেন)
প্রভৃতি অনেকে আছেন। আজকাল পরমানন্দ স্বামী ও
মেজদি (শচীকান্ত ঘােষ মহাশয়ের ভগ্নী) এঁরাই মায়ের
সেবা করেন।
মা প্রত্যহ সমুদ্রের তীরে বেড়ান। বালির উপর
কোনও জায়গায় বসেন। আমরা সকলে ঘিরিয়া বসি।
শিশির রাহা রােজই আসেন। স্বামী পবিত্ৰানন্দ (শ্রীকৃষ্ণা-
নন্দ পরিব্রাজকের আশ্রিত) মাখন লাল গাঙ্গুলি, বীরেন্দ্র
নাথ রায় প্রভৃতিও মাঝে মাঝে আসেন। কড়ার আশ্রমের
সেবানন্দজী সরস্বতীপূজার দিন মাকে তাঁহাদের আশ্রমে
লইয়া গেলেন।
কৃষ্ণা মা (মনােরমা) প্রায় প্রত্যই আসেন। ইনি
খুবই উচ্চ অবস্থার কোন সন্দেহ নাই। বহুকাল সংসার
ছাড়িয়া শান্তি লাভের জন্য ব্যাকুল হইয়া সাধনা
করিতেছেন। মা যখন ঢাকায় ছিলেন তখনই ইনি
মায়ের কাছে আসিতেন। তখন গৃহস্থাশ্রমে হইলেও
ভগবানের জন্য ব্যাকুল ছিলেন এবং সাধনে তীব্র নিষ্ঠা
৭৪
মা আনন্দময়ীর কথা।
ছিল। মার প্রতি এর এতটা আকর্ষণ জন্মিয়াছিল যে
গুরুনিষ্ঠা ভঙ্গ হয় এই ভয়ে মায়ের কাছে আসিতে
চাহিতেন না। কিন্তু ব্যাকুলতা ইহাকে টানিয়া লইয়া
আসিত। আবার আসিয়াও মায়ের দিকে ভালাে করিয়া
তাকাইতেন না এবং স্পর্শ করিতেন না এরূপ হইয়াছে।
এ এক অদ্ভুত প্রেমের লীলা।
কৃষ্ণা মা কাশীতে যখন সাধন করিতেছিলেন
তাহার ভিতরের অনেক কিছু খুলিয়া যায়। দর্শনাদি খুবই
হইতে থাকে। এই সময় মায়ের দর্শন ও বাণী
পাইতেন। কিন্তু ইহাতেও তৃপ্তি পাইলেন না। স্থায়ী
আনন্দ পাইবার জন্য তার বুকের ভিতরটা সর্বদাই
হু হু করিত। ক্রমে আনন্দ আপনা আপনিই পাইতে
লাগিলেন।
মায়ের পুরীতে আসিবার পর কৃষ্ণা মার সহিত যে
অন্তর্জগতে সাক্ষাৎ হইত তাহা মায়ের মুখেও শুনিয়াছি।
একদিনের ঘটনা বলি।
একদিন সকালে কৃষ্ণা মা আসিয়াছেন। মা বলিলেন,
“কাল সারাটি রাত্র তুমি (আমার কাছে)
ছিলে।”
কৃষ্ণা মা চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। বলিলেন,
মা আনন্দময়ীর কথা।
৩৫
“আমি তাে চুপ, করিয়াছিলাম, তা তুমিই আগে কহিয়া
দিলা।”
আমি একান্তে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কি
দেখিয়াছিলেন ?”
মা যতটুকু বলিলেন মােটের উপর তাহা এই
“অনেক ব্যাপার হ’ল। এ শরীরটাকে ক্ষুদ্র
শিশুর আকারে ও পেল। ওর ভাবটা তাজা
একেবারে। ওকে অনেক কিছু বুঝান হ’ল।
সবটাই যে একসত্তা এই তত্ত্ব। ওকে যা যা
বলা হচ্ছে সেটাই ও অন্তরে উপলব্ধি করে নিচ্ছে,
আর ভাবটা কিরকম স্থির দেখা গেল।”
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কোথায় দেখেছিলেন ?
মা বলিলেন, “জায়গা টায়গা খেয়াল নেই,
একটা স্থানে ও আর আমি আছি।”
কৃষ্ণা মা এসকল সম্বন্ধে প্রায় কিছু বলিতে চাহেন না।
আমার আগ্রহ দেখিয়া ঐ রাত্রের ঘটনা খাতায় যা লিখিয়া-
ছিলেন আমায় আনিয়া দিলেন।
বেশ এক ছন্দে লেখা। বলিলেন, আপনা আপনিই
বাহির হইয়াছে। উহা পড়িয়া বুঝিলাম, সেদিন রাত্রে
মায়ের সহিত তাহার এক অপূর্ব লীলা সংঘটিত হইয়াছিল।
মা আনন্দময়ীর কথা
মা তাহাকে জ্যোতির্ময়ী, চিন্ময়ী রূপ সব দেখাইলেন।
তাহাকে লইয়া উদ্দণ্ড নাচিয়া ছিলেন। তাহার পরে
তাহাকে তত্ত্বকথা বুঝাইতে লাগিলেন। “এক হইব
তােমাতে আমাতে।” কৃষ্ণা মা জননীর কৃপাকে অহৈতুকী
কৃপা বলিয়াছেন এবং অশেষ করুণার কথা বিবৃত
করিয়াছেন।
কৃষ্ণা মা আমাকে বলিলেন “পুরীতে আসার পরও
প্রথম দিকে মায়ের উপর আমার একটা অন্য ধারণা ছিল।
মাকে শুধু বড় বলিয়াই জানিতাম। সেদিন রাত্রে মা
আমাকে যাহা বুঝাইলেন সে কথা আগে বহুবার পাইয়াছি
কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করে নাই। ঐ দিন রাত্র হইতে অন্তরে
বুঝিয়াছি। তবে ভাবটি এখনও পাকা হয় নাই।”
মা হয়ত বসিয়া কাহারও সহিত হাসিয়া কথা
কহিতেছেন, কৃষ্ণা মা মা’র পিছনের দিকে বসিয়াও
দেখিতে পান, মা তাঁহার দিকেই সহাস্য বদনে কথা
কহিতেছেন।
কৃষ্ণা মা বর্তমানে কিরূপ নূতন অবস্থার মধ্য দিয়া
চলিতেছেন তাহা শুনিয়া চমৎকৃত হইলাম।
একদিন পুরীতে দুপুর বেলা মা শুইয়া আছেন। সর্দি
লাগিয়াছে। নাক পুছিবার
জন্য একখানি
স্ত্রখণ্ড
মা আনন্দময়ীর কথা।
৭৭
চাহিলেন। দুপরে মাকে এলারে বিশ্রাম দেওয়া হয়।
পরমানন্দ স্বামী দরজা একটু ফাক করিয়া রাখিয়া বাহির
হইতে মার দিকে দৃষ্টি রাখেন, কখন কি দরকার হয়।
সেদিন ঘটনাক্রমে তিনি ছিলেন না। অথচ কেহ (মা
বলিলেন না, সে কে) ঘরে ঢুকিয়া মাকে দড়ি হইতে বস্ত্রখণ্ড
নামাইয়া দিল। পরে দেখা গেল মা’র ব্যবহারের যেখান
আমাদের ছিল সেখানি নাই। অন্য একখানি
কাপড়ের টুকরা রহিয়াছে। তাহাতে হিন্দীতে রামনাম
লেখা।
পুরী হইতে ভুবনেশ্বরে গিয়া আমরা (কয়েকজন )
কয়েকদিন ছিলাম। সেখানেও নানারকম সব ঘটনা ঘটিত।
জটাজুটধারী বৈষ্ণব সাধু (নিম্বার্ক আশ্রমে আমরা ছিলাম,
ঐ সম্প্রদায়ের সাধু) সূক্ষমদেহে মায়ের কাছে আসিতেন।
সূক্ষম জগতের কত লীলা মা বলিতেন। এইজাতীয়
ঘটনা আমি পূর্বে
সবদাই অবিশ্বাস করিতাম, মায়ের
পাল্লায় পড়িয়া আর অবিশ্বাস করিতে পারি কই ?
একদিন পুরী হইতে মেজদি ও অখণ্ডানন্দজী আসিলেন।
মেজদির মুখে একটি ঘটনা শুনিলাম। মেজদি, রাখাল,
সাবিত্রী ( মায়ের ভ্রাতৃবধূ), যতীশগুহের মাতা, বুনিদিদি,
পিসীমা (ঐরূপ ডাকা হয়। এরা সব জগন্নাথদেব দর্শনে
৭৮
মা আনন্দময়ীর কথা।
গিয়াছিলেন। জগন্নাথদেবের স্থলে মায়ের মুর্তি সকলে দেখিতে
পাইলেন। এই দর্শন কিছু সময় ধরিয়া হইয়াছিল। মেজদি
তারপরে মাকে রাজবেশে দেখিতে পাইলেন, মুকুটাদি পরা।
তারপরে কালীমূৰ্ত্তি দেখিলেন।
মায়ের চরণে বার বার প্রণাম করি।
ওঁ তৎসৎ।
শুদ্ধিপত্র
পৃষ্ঠা
পঙক্তি
১১
জ্যোতীশ ও
নীরোদবাবু
কন্দিতেছেন
তাঁহার
তােমার
তারই
জ্যোতীশও
নীরােজবাবু
কান্দিতেছেন
তাহারা
তোমায়
ঠারই
छात्र
৪৫
No text on this page.
No text on this page.