Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Git-upakramanika Vol. 2

Senshrmma, Manilal · 2010/03/2

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

গীত-উপক্রমণিকা
ভিীম খণ্ড
শ্রীমণিলাল সেনশর্মা
প্রবাসী কার্যালয়
১২।২, আপার সাকুলার নােত,
কলিকাতা
১৩৩৮

দাম একটাকা মাত্র
১২০২, আপার সার্কুলার রােড, কলিকাতা, প্রবাসী প্রেস হইতে
শ্রীমাণিকচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত

मृगौ
দ্বিতীয় খণ্ড
প্রথম পরিচ্ছেদ
ক্ষতি কি
তিবিভাগ কিরূপ
তিহিসাবে স্বর-অন্তর
শ্রুতির নাম
ঔড়ব, খাড়ব ও সম্পূর্ণ
ঔড়ব ও খাড়ব রাগের তালিকা
ঔড়ব-সম্পূর্ণ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ঠাট নিরূপণ
ঠাট
ঠাটে রাগরাগিণী
মূচ্ছনার ঔড়ব ও খাড়ব ঠাট
মূৰ্চ্চনার বিকৃত ঠাট
ঠাটের অন্তর্গত রাগরাগিণী
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বাদী, সংবাদী, অনুবাদী ও বিবাদী
০০০
১৭-২২
বিবাদী সুর
বাদী সুর
সংবাদী সুর
তিহিসাবে সংবাদী বাহির করিবার নিয়ম
শুদ্ধ, শালঙ্ক, সকীর্ণ
সমপ্রাকৃতিক রাগরাগিণী

সুচী
গ্রহ ও সিম্বর:
রাগ চিনিবার উপায়
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
প্রচলিত তালের ঠেকা
লয় কি; ঠা, দুন, চৌদুন
প্রচলিত তালসমূহ
ত্রিমাত্রিক ছন্দের তাল
চতুর্মাত্রিক ছন্দের তাল
বিষমপদী তাল
আল-গ্রহ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
স্বর-উৎপত্তি
কথা ও শব্দবিন্যাস
ধ্বনির উৎপত্তি ও কম্পন
ধনির বিভিন্নতা
বায়ুকম্পন
কশনের বিশেষ বিশেষ ভী
গ্রামােফোনের মূল সূত্র
কানের আভ্যন্তরিক কথা
কণ্ঠস্বরের উৎপত্তি
কণ্ঠস্বরের উৎপত্তি সয়ে প্রাচীন মত
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
-पानी
-৪৫
গ্রুপ
খেয়াল
A
पानांन

সুচী
৪৫-৫২,
সপ্তম পরিচ্ছেদ
সঙ্গীত-ইতিহাস
সুর, নৃত্য ও তালের জন্মকথা
ধ্রুপদ ও পাখােয়াজ
মুসলমান রাজত্বকালে সঙ্গীত
খেয়ালের সৃষ্টি
বায়া-তবলার সৃষ্টি
তাসেন
কান
তােড়ী
মল্লার
নট
সার
টপ্পার সৃষ্টি
হীর সৃষ্টি
অষ্টম পরিচ্ছেদ
তানপূরা-পরিচয়
তানপূরা বন্ধন ও ধারণ
হারমােনিয়মে গান করা উচিত নয় কেন
তানপূরা কেন ভাল
নবম পরিচ্ছেদ
স্ব-রহস্য
কম্পনহিসাবে সুরের অনুপাত
কম্পনহিসাবে স্বর-অন্তর
সুরগুলির পরস্পর মিল

সূচী
সাতটি সুর কিরূপে পাই
পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মূল সূত্র
হিন্দুসঙ্গীতে স্বসম্বাদ
৬৮-৭৫
দশম পরিচ্ছেদ
সঙ্গীতে ভাব
গীত-রস
পুষ্প-কল্পনা
সাতটি সুরের বর্ণ
ভৈরবী ও পদ্ম
রাগরাগিণীর বিভাগ

স গীত-উপক্রমণিকা দ্বিতীয় খণ্ড প্রথম পরিচ্ছেদ ‘গীত-উপক্রমণিকা’র প্রথম খণ্ডে বলা হইয়াছে, সাতটি সুরের অন্তর সমান নহে। স সুর হইতে চড়া স সুর পর্যন্ত পাঁচটি পূর্ণান্তর ও দুইটি অৰ্দ্ধন্তরবিশিষ্ট সাতটি সুর আমরা প্রথমে পাইয়া থাকি। পরে, পূর্ণান্তরগুলিকে অৰ্দ্ধান্তেরবিশিষ্ট করিয়া আরও পাঁচটি বিকৃত সুর, মােট বারটি সমান অন্তরবিশিষ্ট সুর পাওয়া গিয়াছে। 17 স রাে র। গে। গ মী প ধাে ব মােন এইরূপ অন্তরবি ভাগই প্রথমে দেখান হইয়াছে। ইহা হারমােনিয়মের কী-বাের্ড ( key-board) অনুযায়ী। কিন্তু তাহা প্রকৃতিগত স্বর-অন্তর নহে। প্রকৃত স্বর-অন্তর কিরূপ এবং ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞগণ কিরূপভাবে স্বর-অন্তর ধরিয়া থাকেন তাহা এখানে দেখাইব। একটা এস্রাজের বা বেহালার বা ঐরূপ ধনুযন্ত্রের স পৰ্দা হইতে অন্য কোন পর্দার উপর না থামিয়া অতি ধীরে চড়ার দিকে যাইতে থাকিলে যে- ধ্বনি বাহির হয় তাহা যেন একটা ধ্বনি-রেখার ন্যায় প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ যে-সকল সুর একটানাভাবে বাজিবে তাহাকে একটা সুরের রেখা মনে হয়। কিন্তু রেখা বলিতে আমরা কি বুঝি? বিদ্যালয়ে শিক্ষকমহাশয় যদি একদিন প্রশ্ন করিয়া বসেন, ‘ওহে, রেখা কি তাহা লিখিয়া দেখাও। তখন খাতায় একটা লম্বা রেখা টানিয়া মাষ্টার মশাই, ইহাকেই রেখা বলে বলাই স্বাভাবিক। কিন্তু রেখা কতকগুলি পর পর সংলগ্ন সূক্ষ্ম বিন্দুর সমষ্টিমাত্র। ধ্বনি-রেখা বলিলেও বুঝিতে হইবে যে, ধ্বনির পর পর সংলগ্ন সূক্ষ্ম বিন্দুর সমষ্টিই ধ্বনি-রেখা। ইহাকে নাদবিন্দুও বলা হয়। কারণ ধ্বনির ক্ষতি কি গীত-উপমণিকা ৮+ অপর নাম নাদ। এই ধনি-বিন্দুকেই শ্রুতি বলে। সাধারণতঃ সুরের সূক্ষ্ম অংশই শ্রুতি বলিয়া কথিত হয় । সমুর হইতে তাহার অষ্টম সুর চড়া স সুর পর্যন্ত যে ধ্বনি-রেখা পাওয়া যায় তাহাকে প্রাচীন সঙ্গীতাচাৰ্যগণ বাইশটি সূক্ষ্ম সমান ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। বাইশটি শ্রুতি ব্যবহার করা কষ্টকর হয় বলিয়া উহ। মােটামুটি সাতটি ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। এই সাতটি ভাগই সাতটি সুর। তাহাদের নাম যথাক্রমে ষড়জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত ও নিষাদ। ইহাদের পরিচয় প্রথম খণ্ডে দেওয়া হইয়াছে। প্রকৃতিগত সাতটি সুর যেভাবে সজ্জিত আছে সেইভাবে সজ্জিত না করিয়া যদি সুরগুলির অন্তর সব সমান করা হয় তবে গীত শ্রুতিমধুর হয় না। সুরগুলি নানা আকারে প্রকাশ করিতে না পারিলে গান করিবার রীতি উত্তম হয় না। এইজন্যই ধ্বনি-রেখা সাতটি সমান ভাগে বিভক্ত হয় নাই। যাই হউক, ধ্বনি-রেখাকে সূক্ষ্ম সমান তিতে ভাগ করিয়া প্রাচীন সঙ্গীতজ্ঞগণ দেখাইয়াছেন যে, স্বাভাবিক স্বরগ্রামে সাতটি সুরের অন্তরগুলির কোনটিতে চারটি, কোনটিতে তিনটি ও কোনটিতে দুইটি শ্রুতি ( ধ্বনি-বিন্দু) রহিয়াছে। স হইতে র-এর অন্তরে চারিটি শ্ৰতি রহিয়াছে। আবার র হইতে গ-এর তিবিভাগ অন্তরে তিন শ্রুতি এবং গ হইতে ম-এর অন্তরে দুই শ্রুতি রহিয়াছে। কিরূপ সেইরূপ ম হইতে প-এর অন্তর চারি শ্রুতি, প হইতে ধ-এর অন্তর চারি শ্রুতি, ধ হইতে ন-এর অন্তর তিন শ্রুতি ও ন হইতে চড়া স-এর অন্তরে দুই শ্রুতি আছে। যথা :--- - স म গ প ন 0 0 0 0 ' ()() () () () ' ) । () () () () 0 0 ' 0 0 () ' () () র গ ম ৪ প 3 ৪ ২ = ২২ গীত-উপক্রমণিকা তিহিসাবে স্বর-অন্তর তিন ভাগে বিভক্ত। যেমন,-বৃহদন্তর, শ্রুতি হিসাবে মধ্যান্তর ও ক্ষুদ্রান্তর। স হইতে র ম প বৃহদন্তর क्ष র হইতে গ মধ্যান্তর ন গ ক্ষুদ্রান্তর ন চড়া স প্রথম খণ্ডের প্রথম পরিচ্ছেদে হারমােনিয়মের কী-বাের্ড অনুযায়ী আমরা বৃহদন্তর ও মধ্যান্তরকে পূর্ণান্তরই জানিয়াছি। হারমােনিয়মের বৃহদন্তর ও মধ্যান্তর সুরগুলি ঈষৎ উঁচু-নীচু করিয়া লইয়াছে। এইজন্য ইহা ভুল। শ্রুতি-হিসাবে স্বরগ্রামই প্রকৃত স্বরগ্রাম। শ্রুতিগুলির এক-একটা নাম আছে। যথা :- শ্রুতির নাম (১) গান্ধার তীব্র। কুমুদ্বতী মন্দা ছন্দোবতী { (৮) (9) রৌদ্ৰী ক্রোধী (৪) I (১০) (১১) (৫) (৩) (৭) দয়াবতী রঞ্জনী মধ্যম বদ্রিক। প্রসারিণী প্রীতি মার্জনী (১২) রতিকা ( (১৩) গীত-উপক্রমণিকা ক্ষিতি (১৪) (৫) (৬) (১৮) পঞ্চম সন্দীপনি আলাপিনী (১৮) মদন্তী (১৯) রােহিণী রম্যা (২১) উগ্ৰা (২২) শােভিনী (২০) - (১৭) নিষাদ রাগরাগিণীতে সব কয়টি সুরই সব সময়ে ব্যবহৃত হয় না। কোন কোন রাগে সাতটি সুরই ব্যবহৃত হইতেছে। কোন কোন রাগে ছয়টি সুর ব্যবহৃত ঔড়ব, খাড়ব ও সম্পূর্ণ হইতেছে, আবার কোন কোন রাগে পাঁচটি সুর ব্যবহৃত হইতেছে। পাঁচ, ছয়, সাত এই তিনটি পর্যায় দ্বারা রাগরাগিণীকে তিনভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। যে সকল রাগে পাঁচটি সুর লাগে, যে-কোন দুইটি সুর একেবারেই লাগে না তাহাকে ঔড়ব বলে। যে সকল রাগে ছয়টি সুর ব্যবহৃত হয় আর যে-কোন একটি সুর একেবারেই লাগে না তাহাকে খাড়ব বলে । আর যে সকল রাগে সাতটি সুরই ব্যবহার করা হয় তাহাকে সম্পূর্ণ বলে। নীচে প্রচলিত ঔড়ব, খাড়ব, রাগরাগিণীর নাম এবং তাহাদের কোন খাড়ব রাগের কোন্ সুর বর্জিত তাহার তালিকা দেওয়া হইল। তালিকা ঔড়ব রাগরাগিণী মধুমাত সারঙ্গ বর্জিত গ, । ม গ, গ, ২) বৃন্দাবনী সারঙ্গ দুর্গেশ্বরী সামন্ত সারঙ্গ দুর্গ। মালকোশ চন্দ্রকৌশ হিন্দোল গ, প র, গীত-উপক্রমণিকা র প বর্জিত A শুভবতী মাল শ্রী ভূপালী ? বাঙ্গালী ম, বেহাগ 4. ধ খাড় রাগরাগিণী বিভাস ম বর্জিত ম } র দেশকার লক্ষ্মী তোেড় নচারী তােড়ী বাহাদুরী তােড়ী সূহা তােড়ী পুরিয়া মারওয়া প : প প ধ কুমারী সাজগিরি সরস্বতী র 5 মেঘ প বসন্ত পঞ্চম বা দীপক বেহাগড়া প র ৯ মতান্তরে সম্পূর্ণ

গীত-উপক্রমণিকা
প
প
অতএব
ললিত
বর্জিত
সােহিনী
এই রাগরাগিণী ছাড়া অন্যান্য প্রচলিত রাগরাগিণীগুলি সম্পূর্ণ-শ্রেণীভুক্ত।
কোন কোন রাগে আরােহণে ঔড়ব আবার অবরােহণে সম্পূর্ণ বা খাড়ব
ঔড়ব-সম্পূর্ণ হইয়া থাকে। যেমন দেশ রাগিণীতে আরােহণে গ, ধ বর্জিত। কাজেই
আরােহণে ঔড়ব, আবার অবরােহণে সব কয়টি সুরই ব্যবহৃত হয়।
সম্পূর্ণ। এইরূপ রাগকে সম্পূর্ণ ই বলা হয়। কারণ কোন-না-কোন সময়ে
সাতটি সুর লাগিতেছে । তবে এইরূপ রাগকে ঔড়ব-সম্পূর্ণ বলা চলে।
খাড়ব রাগেও আরােহণে এবং অবরােহণে বিভিন্নত হয়। যেমন বসন্ত
রাগ খাড়ব। প ব্যবহৃত হয় না। আবার আরােহণে রে সুরটিকে বাদ
দিয়া যায়। কাজেই আরােহণে ঔড়ব ও অবরােহণে খাড়ব। এইজন্য ইহাকে
খাড়বই বলে। ঔড়ব রাগের আরােহণেও ঔড়ব, অবরােহণেও ঔড়বই হইয়া
থাকে, খাড়ব রাগ—খাড়ব-ঔড়ব, খাড়ব-খাড়ব ও ঔড়ব-খাড়ব এই তিন
প্রকারে বিভক্ত হইতে পারে। সম্পূর্ণ রাগ ও এইরূপ পাঁচ ভাগে বিভক্ত
হইতে পারে। যেমন -
আরােহণ অবরোহণ
ঔড়ব ঔড়ব } ঔড়ব
খাড়ব খাড়ব
ঔড়ব খাড়ব খাড়ব
খাড়ব ঔড়ব
সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ
সম্পূর্ণ
সম্পূর্ণ খাড়ব সম্পূর্ণ
ঔড়ব সম্পূর্ণ
সম্পূর্ণ

গীত-উপক্রমণিকা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ঠাট নিরূপণ
মূচ্ছনা বুঝাইতে গিয়া বলা হইয়াছে যে, এক-একটা শুদ্ধস্বর হইতে
তাহার অষ্টম সুর পর্যন্ত ক্রমে আরেহণ ও তাহা হইতে অবরােহণ করাই
মূচ্ছনা। যথা :-
০
স-র - গ + ম-প-- ধন-স:০০
র—গ + ম-প-~~~
ধন+ স-রঃ০
?
ও
গ + ন ---প—ধ-ন+ স র গ .. ইত্যাদি
প্রত্যেকটি মূৰ্চ্চনারই স্বর-অন্তর পৃথক পৃথক হইতেছে। সমূচ্ছনায় তৃতীয়
ও চতুর্থ এবং সপ্তম ও অষ্টম সুর অর্ধন্তির। আবার র মূৰ্চ্চনায় দ্বিতীয়
তৃতীয় এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম সুর অৰ্ধান্তর । এইরূপ প্রত্যেকটি মূচ্ছনাতেই
স্বর-অন্তর পরিবর্তিত হইতেছে । এখন দেখা যাক্,
কোন্ মূৰ্চ্চনায় কি কি
পরিবর্তন হয়।
৫
স মূচ্ছন। :--স-র-গ + ম স - ধন-+ স
(তৃতীয় ও চতুর্থ এবং সপ্তম ও অষ্টম অৰ্ধার )
র মূৰ্চ্চনা :-র-গ+ ম --প-ধ-ন+ স-র
( দ্বিতীয় ও তৃতীয় এবং যষ্ঠ ও সপ্তম অৰ্ধান্তর)
গ মূচ্ছনা :—গ + ম-প-ধ-ন+ স-র-গ
( প্রথম ও দ্বিতীয় এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ অর্থান্তর)
গ;
এখানে আর মূৰ্চ্চনাগুলির অবরােহণ দেওয়া হইল না। আর স্বর-অন্তরগুলি
ণাগুর ও অর্ধন্তর নহে জানিয়াও বুঝিবার পক্ষে সুবিধাজনক বলিয়া স্বর-অন্তরগুলিতে
পূর্ণান্তরের ও অৰ্ধান্তরের চিহ্নই ব্যবহার করা হইয়াছে।

গীত-উপক্রমণিকা
০
০
ম মূচ্ছনা ?--ম-প-ধ-ন+স-র-গ + ম
(চতুর্থ ও পঞ্চম এবং সপ্তম ও অষ্টম অৰ্ধান্তর)
প মূচ্ছনা :প-ধ-ন+স-র-গ+ম-প
(তৃতীয় ও চতুর্থ এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম অৰ্ধান্তর ।
ধ মূচ্ছনা -ধন+ স-র-গ+ম-প-ধ
( দ্বিতীয় ও তৃতীয় এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ অৰ্ধান্তর।
s
.
t
c
ন মূচ্ছনা :-ন+স- র-গ+ ম প ধ ন
( প্রথম ও দ্বিতীয় এবং চতুর্থ ও পঞ্চম অর্ধ’ন্তর)
র মূচ্ছনার র সুরকে যদি স ধরা যায় এবং ঐ মূচ্ছনার ন্যায় দ্বিতীয় ও
তৃতীয় এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম অৰ্ধান্তর করিয়া গ্রাম করি তবে আমরা কোমল গ
(গগা) ও কোমল ন (নােট দুইটি বিকৃত সুর স্বরগ্রামে পাই। কারণ র হইবে
স, গ হইবে র, ম হইবে কোমল গ, কেন না, গ হইতে ম অৰ্দ্ধন্তর। কাজেই
র হইতে অন্তরবিশিষ্ট সুর পাইতে হইবে। কোমল গ, র সুরের অর্থান্তর।
তারপর প হইবে ম; কারণ কোমল গ হইতে ম পূর্ণান্তর। ধ হইবে প,
ন হইবে ধ, স হইবে কোমল ন; ন হইতে স অৰ্ধান্তর। এইজন্য ধ হইবে
অৰ্দ্ধান্তর সুর কোমল ন। তারপর র হইবে । সুতরাং র মূচ্ছনা।
-
র-গ + ম --প-ধ-ন+স-র
০
স -র+গাে - ম - প - ধ +নাে -স
এইরূপ প্রত্যেকটি মূচ্ছনার প্রথম সুরটিকে স ধরিলে নানা বিকৃত সুর
পাওয়া যায়।

গীত-উপক্রমণিকা রাগরাগিণী কি তাহা বুঝাইতে গিয়া বলা হইয়াছে যে, রাগরাগিণী এক একটা বিশেষ বিশেষ স্বরবিন্যাস মাত্র। শুদ্ধ ও বিকৃত সুরগুলি দিয়া এক একটা বিভিন্ন প্রকার স্বরবিন্যাস করা হইয়াছে ও সেই বিভিন্ন স্বরবিন্যাসগুলি চিনিবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করা হইয়াছে। যেমন, সুরের শুদ্ধমধ্যম স্থানে কড়িমধ্যম ব্যবহার করিয়া, অর্থাৎ—স-র—গ-মী+ প - ধন এই শুদ্ধ ছয়টি ও কড়িমধ্যম, মােট সাতটি সুর বিশেষ বিশেষ ভাবে ওলটপালট করিয়া তিনটি স্বরবিন্যাস করা যায়। তাহাদের নাম- ইমন, কল্যাণ ও শঙ্কর। কোন্ কোন্ সুরগুলি উপরােক্ত বাগিণী গুলিতে ব্যবহৃত হয় তাহা যদি লিখিয়া দেখাইতে হয় তবে আমরা এইরূপ ভাবে লিখিব। যথা :- স–র - গ--মী+প : ধন+স রাগরাগিণীতে ব্যবহৃত সুরগুলি এইরূপভাবে পর পর সজ্জিত করিয়া লেখা হইলে তাহাকে আধুনিক হিন্দুসঙ্গীতে ঠাট বলে । উপরে যে ঠাটটি লেখা হইয়াছে, তাহা ইমনের ঠাট। এই ঠাটে যে- সুরগুলি আমরা দেখিতেছি তাহাকে ইমনের কঙ্কাল বলা যায়। এই কঙ্কালগুলি একটি একটি বিশেষ নিয়মে সজ্জিত করিয়া তাহাকে গীত-অলঙ্কার রূপ মাংসচৰ্ম্ম পড়াইলেই, অর্থাৎ অশ, গিট্‌কারী, মীড় প্রভৃতি ব্যবহার করিলেই, ইমন রাগিণীর মূর্তি বা রূপ হইয়া পড়ে। কাজেই ভাবের কথায় রাগরাগিণীর কঙ্কালগুলির সমষ্টিকে ঠাট বলা যায়। বস্তুতঃ, রাগরাগিণীতে ব্যবহৃত সুরগুলির পর পর সজ্জিত সমষ্টিকে ঠাট বলা হয়। র মূচ্ছনার ঠাটে আমরা কোমল গ ও কোমল ন পাইয়াছি। ইহা সিন্ধুর ঠাট। এই ঠাটে যে যে ১া যাকে তাহাদের ওলটপালট স্বরবিন্যাসে সিন্ধু রাগিণীর রূপ হয়। আবার এই ঠাটে সাহানা, বাগেশ্রী ইত্যাদি রাগিণীর রূপ হয়। একজন যদি জিজ্ঞাসা করে যে, বাগেশ্রী রাগিণীতে কি

ঠাটে
রাগরাগিণী
গীত-উপক্রমণিকা
কি সুর ব্যবহৃত হয়? তখন এই বলিলেই হইবে যে, তাহা সিন্ধুর ঠাটে
গাওয়া হয়।
পূৰ্বে বর্ণিত মূচ্ছনাগুলিকে ঠাটে পরিণত করিলে ঐ ঠাটগুলিতে কি কি
রাগরাগিণী প্রস্তুত হয় দেখাইতেছি।
সর—গ + ম-প-ধন+স স-মূচ্ছনার ঠাট বা স্বাভাবিক ঠাট।
এই ঠাটে আলাহিয়া, বেলাবল, কুকুভ, দেবগিরি, ছায়া, ছায়ানট, নট-নারায়ণ,
লুম, শঙ্করাভরণ, ও মল্লার গাওয়া হয়।
র-গ+ম - প -- ধন+স-র
-ন+1
র-মূচ্ছনা
সর+ গাে-ম-প- ধ+নাে-স সিন্ধুর ঠাট
সিন্ধু, সাহানা, বাগেশ্রী, মুখারী, এই ঠাটের অন্তর্গত।
-র-গ গ-মূচ্ছনা
(গ+ ম প ধ ন+স-র-গ
স+রাে - গাে----প+ধােননা--স ভৈরবী ঠাট
ভৈরবী ও আশাবরী এই ঠাটের অন্তর্গত।
ম-প-ধ-ন+স-র-গ+ ম ম-মূচ্ছ না
স-র-গ-মী+প-ধন+ স ইমনের ঠাট
ইমন, কল্যাণ ও শঙ্করা, এই ঠাটে গাওয়া হয়।
তৃপ-ধ-ন+স-র-গ+ম-প প-মূচ্ছন
স-র-গ+ম-প-ধ+নােস
•স কামােদ ঠাট
শুক্লবেলাবল, সরফর্দ, কামােদ, নট-মল্লার, নিশাসাগ, সুরট, দেশ,
গার, তিলককামােদ, পাহাড়ী, খাম্বাজ ও ঝি ঝিট এই ঠাটের অন্তর্গত। তবে
এই সব রাগে শুদ্ধ ন-ও মধ্যে মধ্যে ব্যবহৃত হয়।

গীত-উপক্রমণিকা
১১
ধ-ন+স-র-গ+মপ-ধ
-ন+
ধ-মূচ্ছনা
স+ + গাে-ম-প+ধাে নাে –স কানড়ার ঠাট
দরবারী কান, গান্ধারী, জৌনপুরী, সুখরাই তােড়ী, মুদ্ৰাতােড়ী,
দেশীতােড়ী এই ঠাটের অন্তর্গত।
ন+ স -র-গ+ম-প-ধন নমূৰ্ছনা
স+রাে – গাে -ম+মী - খাে -নো - স অপ্রচলিত ঠাট
এই ঠাটে কোন রাগরাগিণী গাওয়া হয় না, এই জন্য অপ্রচলিত
ঠাট লেখা হইল।
এই যে ঠাট দেখান হইল তাহাকে আবার ঔড়ব ও খাড়ব করিয়া
আমরা অনেক ঠাট পাইতে পারি। তাহাদিগকে মূৰ্চ্চনার ঔড়ব ঠাট ও মূৰ্ছনার ঔ
ও খাড়ব ঠাট
মূচ্ছনার খাড়ব ঠাট বলা হয়। যে-কোন একটি সুর বাদ দিয়া (স সুর ছাড়া)
আমরা প্রত্যেক মূচ্ছনা হইতে ছয়টি করিয়া ঠাট পাইতে পারি। সুতরাং
সাতটি মূচ্ছনায় বিয়াল্লিশটি খাড়ব ঠাট হইতে পারে, তবে এত সব ঠাট সঙ্গীতে
ব্যবহৃত হয় না। কয়েকটি বাছা বাছা ঠাট ব্যবহৃত হয় মাত্র।
নীচে মূচ্ছনার ঔড়ব ঠাট ও মূচ্ছনার খাড়ব ঠাট দেখাইতেছি।
সমূৰ্চ্চনার ঔড়ব ঠাট
স -র-0+ ম-প - ০ -- ন+স
এই ঠাটে বৃন্দাবনী সারঙ্গ গাওয়া হয়।
সমূচ্ছনার খাড়ব ঠাট
সর—গ+ 0-প—ধ—ন+ স
বিভাস ও দেশকার এই ঠাটের অন্তর্গত।
মূচ্ছনার ঔড়ব ঠাট বা খাড়ব ঠাট লইয়া ঠাট-প্রকরণ শেষ নহে।
মূচ্ছনায়
বিকট ঠাট
আরও এক প্রকার ঠাট আছে। তাহাকে মূচ্ছনার বিকৃত ঠাট বলে।

গীত-উপক্রমণিকা
মূচ্ছনার কোন কোন বিকৃত সুরকে বাদ দিয়া সেই সুরের স্থানে অন্য
একটি সুরকে বসাইলে যে ঠাট হইবে তাহাকে মূচ্ছ না বিকৃত ঠাট
বলা হয়। যথা :-~-
গ মূচ্ছনার বিকৃত ঠাট
গ+ম+০-ধাে --ন+সর+গাে --গ
স+রে+গ+ম-পখো-নে+ ন --
ভৈরব রামকেলী ও গুজ্জরী এই ঠাটের অন্তর্গত।
আমরা পাই :-
গ মচ্ছনায়
গ+মপ-ধ---ন+ --
কিন্তু এখানে প-এর স্থানে থাে ব্যবহার করিয়াছি। আবার গাে রটিকে জোর
করিয়া এখানে বসাইয়া দিতেছি। এইরূপ ঠাটই নূস তার বিকৃত ঠাট।
বিকৃত ঠাটেরও আবার মূচ্ছনার বিকৃত ঔড়ব ঠাট বা মূচ্ছনার বিকৃত
খাড়ব ঠাট হইতে পারে। এককথায়, এইভাবে সহস্র সহস্র ঠাট প্রস্তুত
হইতে পারে। কিন্তু হিন্দুসঙ্গীতে মাত্র কয়েকটি ঠাটই ব্যবহৃত হয়।
এখানে প্রচলিত রাগরাগিণীর ঠাট ও জাতির একটা তালিকা
দিতেছি। তাহাতে প্রথম শিক্ষার্থীর বিশেষ সুবিধা হইবে আশা
ঠাটের
অন্তর্গত
রাগরাগিণ
করা যায়।

ঠাটের অন্তর্গত রাগরাগিণী ঠাট জাতি বর্জিত রাগরাগিণী সাতটি শুদ্ধ সম্পূর্ণ আলাহিয়া, বেলাবল, কুকুভ দেবগিরি, ছায়া, ছায়ানট নট-নারায়ণ, লুম, শঙ্করাভরণ, মল্লার ও হেমন্ত খাড়ব বিভাস ও দেশকার ঔড়ব বৃন্দাবনী সারঙ্গ গ, ন সামন্ত সারঙ্গ, দুর্গা শ, ভূপালী ঝিবিট কোমল ন সম্পূর্ণ দুই ন শুক্ল-বেলাবল, সরফর্দা, কামােদ, নট- মল্লার, নিশাসাগ, সুরট, দেশ, গারা, পাহাড়ী, তিলক কামেদ, খাম্বাজ সুর মল্লার --- ঐ খাড়ব র বিহগড়া ঐ ঔড়ব মধুমাত সারঙ্গ : কড়ি ম সম্পূর্ণ ইমন, কল্যাণ ঐ ঔড়ব হিন্দোল কড়ি ম ঔড়ব বেহাগ, মাল দুই ম সম্পূর্ণ বেলাবল, গৌড়-সারঙ্গ, ইমনকল্যাণ, হাম্বীর, কেদারা, প্রাম, ইমনভূপালী, শঙ্করা, * কয়েকটি বাগরাগিণীর ঠাট- নরূপণে সঙ্গীতজ্ঞগণের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ রাগরাগিণী সম্বন্ধে সকলেই প্রায় একমত।

১৪ গীত-উপক্রমণিকা ঠাট জাতি বর্জিত রাগরাগিণী দুই ম ঔড়ব দুর্গেশ্বরী কোমল,গ ও ন সম্পূর্ণ সিন্ধু, সাহানা, বাগেশ্রী, মুখারী খাড়ব প সরস্বতী ঐ ঔড়ব চন্দ্রকৌশ কোমল ন ঔড়ব ঔ শুভারতী কোমল গ ও সম্পূর্ণ ভীমপলশ্রী, রাজ-বিজয় দুই ন কোমল গ, ঐ সিন্ধুড়া, দেওশাখ, বাহার মিয়ামল্লার, আড়ানা জৌনপুরী, গান্ধারী দরবারী কানড়া, সুখরাই তােড়ী মুদ্রাতােড়ী, দেশীতােড়ী সূতােড়ী মালকোশ ঐ খাড়ব ঔড়ব কোমল গ, সম্পূর্ণ নায়কী ধ, দুই ন ঐ খাড়ব র নচারীতােড়ী কোমল র, সম্পূর্ণ ভৈরবী, আশাবরী গ, ধ, ন গীত-উপক্রমণিকা ঠাট জাতি বর্জিত রাগরাগিণী এn কোমল র, সম্পূর্ণ গুজ্জরী গ, ধ, দুই ন ঐ খাড়ব ম লক্ষ্মীতােড়ী দরবারী তােড়ী কোমল র, সম্পূর্ণ গ, ধ, দুই ন কড়ি ম ঐ খাড়ব প। বাহাদুরী তােড়ী কোমল র, ধ সম্পূর্ণ খট, পিলু বারয়। দুই গ ও দুই ন কোমল র ঐ মঙ্গল ঐ খাড়ব প দীপক, ললিত কোমল র, থ, সম্পূর্ণ ভৈরব, রামকেলী দুই ন কোমল র, ধ যােগিয়া, ভাটিয়ারী, কালাংড়া মালবী, মালিগৌরা কোমল র ঐ কডি ম ১৬ গীত-উপক্রমণিকা ঠাট জাতি । বর্জিত রাগরাগিণী কোমল র খাড়ব প পুরিয়া, মারওয়া, জয়ন্ত, সােহিনী কড়ি ম ঐ কুমারী কোমল র প বসন্ত দুই ম 1 । সম্পূর্ণ ঐ পূরবী ধান, জৈী, পুরিয়া, ধান শ্রী, ত্রিবেণী, বৈরাটি, রাগ, পর - কোমল র, ধ, গৌরী, গুণকেলী '? দুই ম কোমল গ, ধ সম্পূর্ণ মুলতানী কড়ি ম কোমল গ, ধ পিলু কোমল ধ খাড়ব র সাজগিরি কড়ি ম গীত-উপক্রমণিক। ১৭ তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাণী, সংবাদী, অনুবাদী, বিবাদী বাদী সুর পূর্বে ঔড়ব ও খাড়ব-শ্রেণী দেখাইতে গিয়া বলিয়াছি যে, কোন কোন রাগে দুইটি এবং কোন কোন রাগে একটি সুর ব্যবহার করা হয় না। এইরূপ বিবাদী সুর সুরই রাগের বর্জিত সুর। বর্জিত সুর রাগরাগিণীতে ব্যবহার করিলে রাগের মাধুৰ্য্য নষ্ট হয়। যেমন ভূপালী রাগিণীতে ম ও নসুর লাগে না। কিন্তু যদি ভূপালীতে এই দুইটি সুর ব্যবহার করা হয় তবে ভূপালীর রূপ থাকিবে না। এই বর্জিত সুরকেই আধুনিক সঙ্গীতে বিবাদী সুর বলা হয়। রাগরাগিণীতে যে সব সুর ব্যবহৃত হয় সেই সুরগুলির মধ্যে যে সুরটির বিশেষ সাহায্য না লইলে রাগের ঠিক রূপ প্রকাশ করা সম্ভবপর হয় না, সেই সুরটিকে বাদী সুর বলে। হিন্দুস্থানী কথায় ইহাকে জান্ বলা হয়। জান্ অর্থ প্রাণ। যে সুরটি রাগের প্রাণস্বরূপ তাহাই বাদী। যেমন—মালকৌশ রাগে ম সুর বাদী! এই মসুরটি প্রধান ও প্রাণস্বরূপ। মসুরের বিশেষ সাহায্য না লইয়া মালকৌশ-এর রূপ প্রকাশ করা অসম্ভব। রাগে ব্যবহৃত সুরগুলির মধ্যে বাদী সুর ব্যতীত যে সুরটি অন্যান্য সংবাদী সুর সুরের মধ্যে অধিক বার ব্যবহৃত হয় তাহাকে সংবাদী সুর বলে। আর বাদী ও অনুবাদী সুর সংবাদী সুর ছাড়া রাগে ব্যবহৃত অন্যান্য সুরগুলিকে অনুবাদী সুর বলা হয়। সাধারণতঃ, রাগরাগিণীতে বাদী সুর বাজার ন্যায়, সংবাদী সুর মন্ত্রীর ন্যায়, অনুবাদী সুর ভূতের ন্যায় এবং বিবাদী সুর শত্রুর ন্যায় বুঝায়। কোন্ রাগে কোটি বাদী সুর সেই বিষয়ে অনেক মতভেদ আছে। তবে সাধারণতঃ কতকগুলি রাগ আছে যাহাদের বাদীসুর সম্বন্ধে সকলেই একমত। যেমন- ১৮ গীত-উপক্রমণিকা র বাদী গ গ। ম দেশ সিন্ধু ভূপালী ইমন্ কল্যা। কেদার মালকৌশ কুমারী যােগিয়া হাম্বীর বিভাস ম প প ন এইরূপ আরও অনেকগুলি রাগরাগিণী আছে যাহাদের বাদী সম্বন্ধেও অনেকেই প্রায় একমত। সাতটি সুর যে ভাবে সজ্জিত রহিয়াছে তাহাতে বেশ একটা মিল দেখিতে পাওয়া যায়। স-র-গ+ ম সুরগুলি ১. ১. ২. অন্তরবিশিষ্ট কিম্বা তিহিসাবে ৪.৩.২ অন্তরবিশিষ্ট। সেইরূপ প ধ ন + স সুরগুলিও ১.২ অন্তরবিশিষ্ট কিম্বা শ্রুতিহিসাবে ৪.৩.২ অন্তরবিশিষ্ট। স রগ + ম পধ+নস ; এখানে স সুরের সঙ্গে প সুরের, র-এর সঙ্গে ধ-এর, গ-এর সঙ্গে ন-এর ও ম-এর সঙ্গে স-এর মিল দেখা যায়। প-কে স ধরিলে ধ হইবে র ন হইবে গ ; ও স হইবে ম। অতএব স = প ; ম = স, মানুষের প্রকৃতিই এইরূপ যে, সর্বদা মিল চায়। রাগরাগিণী সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। রাগরাগিণী সুরের মিলনস্থানে একটু বিশ্রাম করিয়া অগ্রসর হয়। এইরূপ মিলনই রাগরাগিণীর প্রাণ।

১৯ ; গীত-উপক্রমণিকা পূর্বেই বলিয়াছি, রাগে যে সুরটি অধিকবার ব্যবহৃত হয় তাহা বাদী সুর। সংবাদী সম্বন্ধে বলা হইয়াছে যে, বাদী সুরটি ছাড়া অন্যান্য সুরগুলির মধ্যে যে সুরটি বেশী ব্যবহৃত হয় তাহাই সংবাদী, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে দেখিতে গেলে, বাদী সুরের সঙ্গে যে সুরের মিল আছে সেই সুরটি সংবাদী হয়। যেমন পূর্বে দেখাইয়াছি, স=প বা র = ধ; এখানে স বাদী হইলে প সংবাদী বা র বাদী হইলে ধ সংবাদী; এইরূপ প বাদী হইলে স সংবাদী বা ধ বাদী হইলে র সংবাদী হইবে। তিবিভাগ মতে সংবাদী বাহির করিবার রীতি পূৰ্বকাল হইতেই শ্রুতি হিসাবে প্রচলিত। যে সুরটি বাদী হইবে তাহার নয় শ্রুতির পরে দশ শ্রুতিতে বা সংবাদীবাহির তের শ্রুতির পর চৌদ্দ শ্রুতিতে যে সুর থাকিবে তাহাই সংবাদী হইবে। কিন্তু করিবার নিয়ম যদি এই নয় শ্রুতির মধ্যে কোন বর্জিত সুর পড়ে, নয় বা তের শ্রুতি গণনা করিয়া যে সুর পাওয়া যাইবে সেই সুরের পরবর্তী সুরটি সংবাদী হইবে। নীচে বাদী, সংবাদী, অনুবাদীর তালিকা দিতেছি। বাদী সংবাদী অনুবাদী # म ম ও প । র ধ রাগে ব্যবহৃত গ ন ম স অন্যান্য সুরগুলি অনুবাদী ধ র j ন গ বিকৃত সুর বাদী হইলে বিকৃত সুরই সংবাদী হইবে। যে সুরের বিকৃত সুর বাদী, সেই সুরের সংবাদী যে সুর তাহার বিকৃত সুর সংবাদী হইবে। যেমন- গীত-উপক্রমণিকা বাদী সংবাদী অনুবাদী রো মী, ধে । গাে রাগে ব্যবহৃত गौ রাে অন্যান্য সুর অনুবাদী ধাে নাে ৩দ্ধ, শাল, যে রাগে অন্য কোন রাগের মিশ্রণ নাই তাহা শুদ্ধ ; যে রাগ যে- সঙ্কীর্ণ কোন দুইটি রাগের মিশ্রণ হইতে উৎপন্ন তাহা শালঙ্ক এবং যে রাগ তিন বা তততধিক রাগের মিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে তাহাকে সঙ্কীর্ণ বলা হয়। কোটি শুদ্ধ, কোন্‌টি শাল বা কোনটি সঙ্কীর্ণ এই সব সম্বন্ধে প্রাচীন গ্রন্থকারগণের মধ্যেও অনেক মতভেদ দেখা যায়। রাগরাগিণীর শুদ্ধ শালঙ্ক বা সঙ্কীর্ণ শ্রেণীবিভাগ সঠিক ভাবে গঠন করিতে আজ পৰ্যন্ত প্রাচীন বা আধুনিক কোন সঙ্গীতজ্ঞই সক্ষম হন নাই। সূক্ষ্ম ভাবে দেখিতে গেলে প্রায় সব রাগরাগিণীতেই অন্যান্য রাগরাগিণীর ছায়া অল্প- বিস্তর পাওয়া যায়। এখন যেমন আমাদের দেশে দুই বা তিন রাগিণী মিশ্রিত করিয়া গীত বা বাদন করিলে মিশ্র আখ্যা দেওয়া হয়, পূৰ্ব্বকালে এইরূপ রাগের মিশ্রণজনিত রাগিণীকে এক-একটা নাম দেওয়া হইত এবং সেই সব রাগরাগিণীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিবার জন্য এইরূপ শ্রেণীবিভাগের দরকার হইয়া পড়িয়াছিল বলিয়া মনে হয় হিন্দুসঙ্গীতে এই তিনটি সংজ্ঞা আছে বলিয়াই এখানে ইহাদের সম্বন্ধে কিছু বলা হইল। অনেক রাগরাগিণী আছে যাহাদের একটির সঙ্গে আর একটির বেশ সমপ্রাকৃতিক রাগরাগিণী সাদৃশ্য আছে, শুনিলেই মনে হয় দুইটিই প্রায় এক রাগ। ইহাতে আশ্চৰ্য্য হইবার কিছুই নাই। আমরা বিদেশে পরিচিত লােকের মত লােক দেখিয়া থাকি; নিকটে গিয়া বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিলেই আবার বুঝা যায় যে, লােকটি সম্পূর্ণ অপরিচিত। আকারে একরূপ হইলেও প্রকারে তাহার অনেক গীত-উপক্রমণিকা ১) প্রভেদ থাকে। এইরূপ রাগকে, অর্থাৎ যে-যে রাগরাগিণীর সঙ্গে যে-যে রাগ- রাগিণীর সৌসাদৃশ্য আছে তাহাদিগকে সম-প্রাকৃতিক রাগরাগিণী বলা হয়। নীচে সমপ্রাকৃতিক রাগরাগিণীর একটা আলিকা দিতেছি। ভৈরব ও রামকেলী সমপ্রাকৃতিক বাঙ্গালী ও ভাটিয়ারী বিভাস ও দেশকার ভীমপলশ্রী ও রাজবিজয় শ্ৰী, গৌরী ও বৈরাগী মায়ােয়া, পুরিয়া ও জয়ন্ত ইমন ও কল্যাণ ইমনকল্যাণ, কেদারা, হাম্বীর ও শ্যাম খাম্বাজ ও ঝি ঝিট সিন্ধু, কাফি ও সিন্ধুড়া বাগেশী পটমঞ্জরী ও আভিরী ৩) 2) পঞ্চম ও ললিত যে সুর হইতে প্রথম রাগরাগিণী আরম্ভ হয় তাহাকে গ্রহর বলে । গ্রহ ও আর যে সুরে রাগরাগিণী সমাপ্ত হয় তাহাকে ন্যাসস্বর বলা হয়। অধিকাংশ ন্যাসখর রাগরাগিণীর গ্রহ ও ন্যাস স্বরের কোন নিশ্চয়তা নাই। প্রায়ই ষড়জ হইতে উত্থাপিত হইয়া ঐ সুরেই সমাপ্ত হয়। দুই-একটি রাগরাগিণীর পৃথক পৃথক গ্রহ ও স্যাসম্বর পাওয়া যায় মাত্র। এই পৰ্যন্ত যে সমস্ত সূত্র বলা হইল, এই সকল কথা একটু অনুধাবন রাগ চিনিবার করিলেই রাগ চিনিতে পারা যাইবে। প্রথমত, রাগ চিনিতে হইলে দেখিতে * এই তালিকাটি সুপ্রসিদ্ধ সঙ্গীতজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত রায়-দস্তিদার মহাশয়ের নিকট হইতে পাইয়াছি।

২২ গীত-উপক্রমণিকা ? হইবে, যে-গীত বা গৎ হইতেছে তাহা কোন্ জাতীয়, অর্থাৎ তাহা ঔড়ব, খাড়ব, না সম্পূর্ণ। দ্বিতীয়তঃ, তাহার ঠাট কি ? কোন্ কোন্ কড়ি-কোমল ও স্বাভাবিক সুর ব্যবহৃত হইতেছে। তৃতীয়তঃ, সেই গীত বা গতের আরােহণ বা অবরােহণে কোন সুর বর্জিত হইতেছে কি-না। সমপ্রাকৃতিক রাগরাগিণী চিনিতে হইলে ঔড়ব-সম্পূর্ণ, খাড়ব-ঔড়ব ইত্যাদি আবােহণ-অবরােহণের পৰ্যায়গুলির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। চতুর্থতঃ, কোন কোন সুর মীড়সংযােগে উচ্চারিত হইতেছে কি-না। পঞ্চমত, কোন সুর হইতে অন্য কোন বিশেষ সুরে লাফাইয়া যাইতেছে কি-না ও তাহার গ্রহ ও ন্যাসম্বর কি। রাগরাগিণী চিনিতে এই পাঁচটি বিষয় বিশেষ আবশ্যক। রাগরাগিণী সহজে সকলে চিনিতে পারে না। রাগের রূপ কণ্ঠে বা বাদ্যে আয়ত্ত করিতে পারিলেই তাহা চেনা সহজ হইয়া পড়ে। চিত্রাঙ্কণের চিত্র বা রাগরাগিণীর চিত্র দুইটিই প্রায় এক প্রকার। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি পুস্তকে ও পত্রিকায় দেখিতে দেখিতে আমাদের হইয়াছে যে, আমরা তাহা দেখিলেই চিনিয়া লইতে পারি বা কবির প্রতিকৃতি অঙ্কনে যদি কোন শিল্পীর কোন কিছু ভুল থাকে তাহাও আমরা ধরিয়া দিতে পারি, সেইরূপ যে যে-রাগের সঙ্গে পরিচিত তাহা শুনিলেই চিনিয়া লইতে পারে বা নামধাম বলিয়া দিতে পারে। খুব ভাল ভাবে জানা থাকিলে কোন্ কোন্ স্থানে কি ভুল হইতেছে বা কোথায় কোন্ রাগ মিশ্রিত আছে তাহাও বলিয়া দিতে পারা যায়। রাগরাগিণী এক-একটি মূর্তি। চিত্রের মূর্তি দেখিয়া যেমন চিত্রটি চিনিতে পারা যায়, সেইরূপ গীতের বাদ্যের মূর্তি শুনিয়া চিনিতে হয়। চিত্রাঙ্কণের চক্ষু বা সঙ্গীতের কান যেমন তেমন চক্ষু বা কান হইলে চলে না, তাহা বিশেষ শিক্ষিত হওয়া প্রয়ােজন। এমন গীত-উপক্রমণিকা ২৩ চতুর্থ পরিচ্ছেদ প্রচলিত তালের ঠেক। তালপ্রকরণে তাল সম্বন্ধে কতক বলা হইয়াছে। তালে আর একটি কথা লয় কি; ঠা, আছে তাহা লয়। গীতবাদ্যে স্বরের কালসমতা রাখার নাম লয়, অর্থাৎ দুন, চৌদুন ছন্দের লঘু-গুরু ঝোঁকগুলি দেখাইয়া মাত্রার ওজন সূক্ষ্মভাবে সমান রাখার নামই লয়। তালের লয়টুকুই আসল জিনিষ। সঙ্গত কি তাহা বুঝাইতে গিয়া বলা হইয়াছে যে, তালযন্ত্র গীতের সঙ্গে সঙ্গে চলে বলিয়া সঙ্গত নাম হইয়াছে। সঙ্গতের প্রকৃত সংজ্ঞা (definition) এই যে, গীতের লয়ের সঙ্গে বাদ্যের.লয়ের ঐক্য করার নাম সঙ্গত। মাত্ৰাপ্রকরণে মাত্রার গতি বুঝাইতে গিয়া বলা হইয়াছে যে,মাত্রার গতি তিন প্রকার। বিলম্বিত, মধ্য, দ্রুত। লয়ও এইরূপ তিন প্রকারের হয়। দ্রুত লয়ের দ্বিগুণ সময়ে মধ্যলয় হয় এবং মধ্যলয়ের দ্বিগুণ সময়ে বিলম্বিত হয়। যেমন এক সেকেণ্ডকে এক মাত্রা ধরিলে যদি দ্রুত লয় হয় তবে দুই সেকেণ্ডকে এক মাত্রা ধরিলে বিলম্বিত লয় হইবে। চলিত কথায় বিলম্বিত লয়কে ঠা, মধ্যলয়কে দুন ও দ্রুতলয়কে চৌদুন বলে। তালযন্ত্র বাদনে ঠেকা, গ, মহড়া ও তেহাই এই চারিটি সংজ্ঞা আছে। ঠেকা কি তাহা পূর্বেও বলা হইয়াছে যে, গানের ছন্দের অনুরূপ বােলকে ঠেকা বলে। বাদন অধিকতর মিষ্টি করিবার জন্য এক বা ততােধিক বােল এক সঙ্গে অন্তরা, সঞ্চারী ও আভােগে বাজান হয় ; তাহাকে গ বলে। আর ঠেকা বাজাইতে বাজাইতে গদ্ ধরিলে শ্রুতিকটু হয় বলিয়া ঠেকার পর ও গদের পূর্বে কয়েকটি ছােট ছােট বােল বাজান হয় তাহার নাম মহড়া।

২৪
গীত-উপক্রমণিকা
আস্থায়ীর শমে গান শেষ করিবার নিয়ম। গায়কের সঙ্গে সঙ্গে যদি
সাদাসিধা ভাবে বাদনে বিরাম দেয় তবে শ্রুতিমধুর হয় না বলিয়া গান শমে
সমাপ্ত করিবার পূর্বে অন্যরূপ বােল বাজান হয়, তাহাকে তেহাই বলে।
তেহাই সমাপ্তির চিহ্ন। তেহাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে শমে গীত বা বাদ্যের ঐক্য
হইলেই গীত সৰ্বাঙ্গসুন্দর (good finish) হইয়া থাকে।
প্রচলিত তালসমূহ
গীতছন্দ বা তাল
সমপদী
বিষমপদী
ত্রিমাত্রিক
চতুমাত্রিক
দারা
থেষ্টা আঙুখো একতালা চৌতাল
কাহাবুবা কাফ। ফ্রী কাওয়ালী যৎ ঢিমাতেতালা পটল আড়াঠেকা মধ্যমান
তেওরা রূপক পােস্তা ঝাঁপতাল সুরফাত্তা যৎ তেওট আড়া-চৌতাল মধ্যমান
নীচে তালসমূহের ঠেকার বােল দেওয়া যাইতেছে। বােলগুলি মাত্রা
অনুযায়ী পড়িয়াও ছন্দের লঘু-গুরু ঝোকগুলি সঠিকভাবে দিয়া মুখস্থ করিয়া
লইতে হইবে। তাহাতে গীত শিক্ষার পক্ষে বিশেষ সুবিধা হইবে ।
* ওস্তাদ প্রসন্ন বণিক মহাশয়ের নিকট অধিকাংশ বােল পাওয়া গিয়াছে। তাহার
প্রণীত ‘তবলা তরঙ্গিণী’ ও ‘মৃদঙ্গ প্রবেশিকা হইতে অনুমতি অনুসারে কতক বােল এখানে
উদ্ধৃত হইল।

গীত-উপক্রমণিকা ত্রিমাত্রিক ছন্দের তাল দাদরা + 0 । ধিন ধিন তাগ দিন তাগ + ধিগ এ - থা না খেটা + ধা কে টে। না টে। তে টে ধি। না আড়খেমটা - কেটে ধিন্ । ধাগি নাগি ধিন । বা কেটে ধিন্ । ধাগি নাগি নাগি ধিন্ ধিন্ । = একতালা । - ! ধিন ধি । ধা | তিন্ তিন্ । বাগি তেরেকেটে ধিন থা গীত-উপক্রমণিকা ( প্রকারান্তরে ) + । | ধিন ধিন্ না । ধাগে | থুন্ aty কত্তে তেরেকেটে ধিন ধা চৌতাল ২ + ! -- | ধা ধ দিন তা তাগে | দিন তা ৩ তেটে কত। গদি ঘেনে চতুর্মাত্রিক ছন্দের তাল কাহারবা + ০ । । 있 ধ গি গি নে কার্য। + । { ধিগ নাতে কিটি তা। তিগ, নাতে কিটি তা ट्रेनौ + - ধা ধিন ধিন খা पिन গীত-উপক্রমণিকা কাওয়ালী 0 ধা ধি ধিন্ ধা। ধা ধিন্ ধিন ধিন ধা। ধা দিন ধা। ধা দিন দিন । ধিন ধিন || যৎ ( সম্পদী ) + ০ । ধা ধিন ধাগে ধিন । ধাম ধন দিন্ । ঢিমা তেতালা ( পাখোয়াজের ঠেকা) + 0 =ে | | | ধা গে দিন তা { তেটে তা। তেটে দিৎ তা ধা । দিন তা ক তা । | তেটে কতা গেদি ঘেনে বায়তেবলার ঠেকা + | = | ধা ধিন ধিন ধিন ধিন ধা ধা দিন দিন দিন দিন তা। | । ধা ধিন ধিন ধা পটতল + 1 = ধ খা গে দিন ক ২ গীত-উপক্রমণিকা আড়াঠেকা । তা ধিন তা ধিন - | ধিন | - তা ধিন ক- { ধিন্ তা তিন্ মধ্যমা ১ | ধা ধিন্ -- ধা ধিন্ -- । ধা ধা ধিন ----- ধা ধিন্ - | + | ধা ধা ধিন্ ধা ধিন | বা ধিন ধা তিন্ বিষমপদী তাল তেওরা + । { । দিন্ তেটে কতা গেদি যেনে । রূপক { । দেন ঘেনে | ধুমা কেটে । গেদি ঝাঁপতাল (পাথােয়াজের ঠেকা) + । | ধা ধা গে দিন তা গে দিন ।

গীত-উপক্রমণিকা ২৯ বায়া-তবলার ঠেকা । | ধিন ধিন না । ধিন ধিন না । তেৎ না | ধিন্ ধিন্ না সুরফাক্তা + নাগ ধি। ঘেনে না { গ দী। ঘেনে নাগ ॥ যৎ ( বিষমপদী) । । ধা ধা ধিন ধিন । তা দিন ধাগে দিন্ । ধা গে দিন দিন্ । তেওট ত -- { ধিন ধা ধা ধা ধিন ধা ধা দিন তা -- ধিন ধিন ধা ধা ধামার + । এ - ০ | ক ধে টে। ধে টে। ধা { গ দি নে | দি নে। আড়-চৌতাল (পাখােয়াজের ঠেকা) + { । ধা গে ধা मिन তা দি তা ৪ তেটে কত গেদি গেদি ঘেনে।

গীত-উপক্রমণিক। বায়া-তবলার ঠেক। + ০ । { ধিন কেটে | ধিন না ধিন না তেৎ তা ধিন্ ধি ৪ ধিন ধিন্ না । তল-গ্রহ তালের গ্রহ তিন প্রকার। যথা--সম্, অতীত, অনাগত। এখানে তালের গ্রহ অর্থে তালের গ্রহণ বা ধর্ত'। গ্রহণ হইতে গ্রহ হইয়াছে। গীত আরম্ভ হইবার সঙ্গে ঠেকা রাকে, অর্থাৎ গীত আরম্ভ হইবার ঠিক মুহূর্তই ঠেকা ধরাকে সমগ্ৰহ কহে । গীত আরম্ভের পুর্বে ঠেকা ধরিয়া পরে গান ধরিলে তাতীত-গ্রহ হয় । আর গীতারম্ভের পূর্বে গান ধরিয়া পরে ঠেকা ধরিলে অনাগত গ্রহ হয় সাধারণতঃ সমগ্রহেই গীত হইয়া থাকে। প্রথম শিক্ষার্থীর পক্ষে অতীত ও অনাগত গ্রহ ধরিয়া গান করা কঠিন। তবে ইহা জানিয়া রাখিয়া লয় জ্ঞান জন্মিলে পর গান করা কর্ত্তব্য । পঞ্চম পরিচ্ছেদ স্বর-উৎপত্তি কথা ও শব্দ- বিন্যাস আমরা যে সকল কথা বলি তাহা কি ? মনের ভাব অন্যকে বুঝাইবার জন্য আমরা কতকগুলি শব্দ বা ধ্বনিকে নানা ভাবে বিন্যাস করিয়া যখন মুখে বলি তখনই তাহাকে আমরা কথা নাম দিয়া থাকি। অতএব শব্দ- বিন্যাসই কথা। বাঙ্গালী একপ্রকার শব্দবিন্যাস করিয়া কথা বলে, উড়িষ্যা- বাসী অন্য আর একপ্রকার শব্দ-বিন্যাস করিয়া কথা বলে, বা ইংরেজ আর এক বিশেষ প্রকার শব্দবিন্যাস করিয়া কথা বলে। যাহারা যে শব্দ- গীত-উপক্রমণিকা '৩১ বিন্যাসের সঙ্গে পরিচিত তাহারাই তাহা বুঝিতে পারে, অন্যেরা পারে না। ক বলিতে ক ও খ এই দুইটি ধ্বনির সমষ্টি:ক বুঝায়। ইহা হইতেই বুঝা যাইতেছে যে, ধ্বনি হইতেই বর্ণমালার সৃষ্টি হইয়াছে। প্রথমে মানুষ কথা কহিতে শিখিয়াছে এবং তাহার অনেক পরে কথাগুলি অক্ষরে লিখিতে সক্ষম হইয়াছে। পাহাড়িয়া জাতি লিখিতে বা পড়িতে জানে না, কিন্তু কথা কহিয়া মনের ভাব বুঝাইতে পারে। কিন্তু সামনা- সামনি না থাকিলে একজন আর একজনকে কথা বলিতে পারে না। দূরদেশে মনের ভাব প্রকাশ করিতে হইলেই শব্দ হইতে উৎপন্ন বর্ণগুলি লিখিয়া পাঠাইতে হইবে। বর্ণগুলি বুঝাইবার জন্য আমরা কতকগুলি চিহ্ন ব্যবহার করি, তাহাকে অক্ষর বলা হয়। যাহা হউক, এই সমস্ত হইতে ইহা বুঝা যাইতেছে যে, পবনি হইতেই কথার সৃষ্টি হইয়াছে। ধ্বনি হইতে সুরের ও সৃষ্টি হইয়াছে। সুরগুলিও এক একটি শব্দ। একটা খাদ শব্দ, একটা বা চড়া শব্দ, স সুর একটা শব্দ। ধ সুরও একটা চড়া শব্দ। পৃথিবীতে অসংখ্য শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়। তাহা হইতে সাতটি সুর বাহির হইয়াছে এবং এই সাতটি সুর হইতেই সঙ্গীতের সৃষ্টি হইয়াছে। পূর্বে বলা হইয়াছে যে, সুর ও কথা ধ্বনি হইতেই উৎপন্ন হয়। এখন ধ্বনি কিরূপে হয় তাহাই দেখা যাক্। ধ্বনির উৎপত্তি সম্বন্ধে কয়েকটি কথা প্রথম সঙ্গীতশিক্ষর্থীর জানিয়া রাখা উচিত। কোন কিছুতে আঘাত করিলে তাহার অণুপরমাণুতে এক প্রকার কম্পন ধ্বনির উৎপন্ন হয়। তাহা বায়ব সাহায্যে আমাদের কর্ণে প্রবেশ করে ও আমরা শুনিয়া উৎপন্তু ও থাকি। একটা পাতলা বাটিতে আঘাত করিলে শব্দ উৎপন্ন হয়, কিন্তু হাত দিয়া বাটিটা স্পর্শ করিলেই শব্দ তৎক্ষণাৎ থামিয়া যায়। বাটিতে আঘাত করিব- মাত্র বাটির অণুপরমাণুতে যে কম্পন উৎপন্ন হয় তাহা হাতের স্পর্শে থামিয়া যায়, কাজেই শব্দও থামিয়া যায়। বাটিতে আঘাত করিয়া ধীরে ধীরে উহার গায়ে হাত দিলে অনেক সময় উহার কম্পন অনুভব করা যায়। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যায় যে, কম্পন হইতেই ধ্বনির উৎপত্তি। সেতার, এস্রাজ গীত-উপক্রমণিকা ইত্যাদি তারযন্ত্রের তারে আঘাত করিবামাত্র তাহাতে কম্পনের সৃষ্টি হয় ও সেই কম্পন শব্দ উৎপন্ন করে। যন্ত্রের তারের উপরে এক টুকরা কাগজ ভাঁজ করিয়া রাখিয়া বা একটা সুতার ঢিলা আংটি তারটিতে পরাইয়া সেই তারে আঘাত করিলে কাগজের টুকরা বা সুতার আংটী কঁপিয়া উঠিতে দেখা যায়। ইহা হইতেও প্রতিপন্ন হয় যে, আঘাতপ্রাপ্ত পদার্থের কম্পন হইতেই ধ্বনির উৎপত্তি; কম্পনের সংখ্যা যতই বাড়িয়া যাইবে ততই চড়া বা উচ্চ শব্দ হইবে। আর কম্পনের সংখ্যা যতই কম হইবে ততই খাদ শব্দ হইবে। বৈজ্ঞানিকগণ বলেন যে, এক সেকেণ্ডে ষােল-সতেরটি কম্পনের কম কম্পন হইলে আমরা শব্দ শুনিতে পাই না; আর ১৮,০০০ হাজার কম্পনের বেশী কম্পন হইলেও আমরা শব্দ শুনিতে পাই না। এখানে ভ্রমর ও প্রজাপতির দৃষ্টান্ত দেওয়া থাকে। ভ্রমর যখন উড়িতে থাকে তখন শব্দ হয়, কিন্তু প্রজাপতি যখন উড়িতে যায় তখন একটুও শব্দ হয় না। তার কারণ আর কিছুই নহে, প্রজাপতির শরীর খুব হালকা ও পাখা বড়, কাজেই উড়িবার জন্য বা উপরে স্থির থাকিবার জন্য ইহাকে পা খুব বেশী কঁপাইতে হয় না। সেকেণ্ডে যােলটি কম্পনও ইহার পাখা হইতে হয় না। কাজেই আমরা শব্দও শুনিতে পাই না, কিন্তু ভ্রমরের শরীর ভারী, তার উপর পাখা ছােট, কাজেই উড়িবার জন্য বা উপরে স্থির থাকিবার জন্য খুব দ্রুত পাখা নাড়িতে হয় ; কম্পনও বেশী হয় তাই শব্দও হয়। আবার ভ্রমর উপরে উঠিবার সময় চড়া শব্দ হয় ও নীচে নামিবার সময় নীচু খাদ শব্দ হয়। তার কারণ উপরে উঠিবার সময় আরও দ্রুত পাখা নাড়িতে হয়, কম্পনও বেশী হয়, কাজেই শব্দও চড়া হয়। নীচে নামিবার সময় উহাকে পাখা কম নাড়িতে হয়, কম্পনও কম হয়, কাজেই শব্দও খাদ নীচু হয়। তিনটি কারণে ধ্বনির বিভিন্নতা হয়। পূর্বে বলা হইয়াছিল যে, কম্পন যতই বাড়িবে শব্দ ততই চড়া হইবে ও কম্পন যত কম হইবে শব্দ ততই খাদ হইবে। কাজেই কম্পন-সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধিতে ধ্বনি বিভিন্ন ঘটিবে। একটা বাটিতে আস্তে আঘাত করিলেই একপ্রকার ধ্বনি হয়, আবার জোরে আবাত ধ্বনির বিভিন্ন গীত-উপক্রমণিকা বায়ুকম্পন করিলেই অন্যরূপ ধ্বনি হয়। তাহার কারণ জোরে আঘাত করিলে কম্পন- সংখ্যা বাড়িয়া থাকে, কাজেই ধ্বনিও জোর চড়া হয়। আর আস্তে আঘাত করিলে কম্পন-সংখ্যা কম এবং ধ্বনিও মৃদু খাদ হয়। পদার্থভেদেও ধ্বনির বিভিন্নতা হয়। যেমন--কাসার বাটীতে আঘাত করিলেই একপ্রকার শব্দ হইবে আবার কাচের বাটীতে আঘাত করিলেই অন্যরূপ শব্দ উৎপন্ন হইবে। আবার যে-পদার্থে আঘাত করা হয় তাহার আকৃতির বিভিন্নতায় ধ্বনিরও বিভিন্নতা ঘটে। যেমন—পাতলা বাটীতে আঘাত করিলে যেরূপ ধ্বনি হয়, পুরু বাটীর ধ্বনি সেরূপ হয় না। কাজেই কম্পনভেদে, পদার্থভেদে ও পদার্থের গুণভেদে ধ্বনি ভিন্ন ভিন্ন হয়। মাছ জলে থাকে এবং জল ছাড়া হইলে যেমন এক মুহূর্তও তাহাদের চলে না, তেমনই আমরাও বাতাসের মধ্যে থাকি এবং আমাদেরও বাতাস ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না। আমাদের চতুর্দিকে বাতাস, এই বায়ুমণ্ডলই পৃথিবীকে বেষ্টন করিয়া আছে। জলে একটা ঢিল ছুড়িলে যেমন গােলাকৃতি তরঙ্গের সৃষ্টি হয় ও সেই তরঙ্গ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে, সেইরূপ বায়ুতেও গােলাকৃতি তরঙ্গের সৃষ্টি হয় ও সেইরূপ ভাবে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে। ধ্বনি হইলেই বায়ুতে কম্পন হয়। যে-কোন তারযন্ত্রের দুইটি তার এক সুরে বাঁধিয়া এই দুইটি তারের যে-কোন একটি তারে আঘাত করিলে দেখা যায় যে, পাশের এক সুরে বাঁধা তারটি কঁপিতেছে। তাহার কারণ এই যে, যে-তারটিতে আঘাত করা হয় প্রথমে সেই তারটি কঁপিয়া উঠে ও সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ঢেউয়ের সৃষ্টি করে এবং এই বায়ুকম্পন পাশের তারটিকে গিয়া আঘাত করে তাহাতে তারটিতে কম্পনের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারটি যদি একসুরে বাঁধা না থাকে তবে কঁপিবে না। যে-তারটিতে আঘাত করা হইবে, তাহা সেকেণ্ডে যতবার কঁপিবে যদি পাশের তারটিও ততবার কপিতে সমর্থ হয় তবেই কঁপিবে, নতুবা নহে। যে-তারটিকে আঘাত করা হয় সেকেণ্ডে ইহার যত কম্পন হয় বাতাসেও ঠিক ততবার কম্পন হয় এবং ইহা যতবার কম্পিত হয়, কোন তার বা জিনিষকে ততবার কঁপাইয়া তুলে ৩৪ গীত-উপক্রমণিকা ধ্বনি হইবামাত্র বায়ুতে কম্পন হয়। কাজেই আমরা যখন কথা বলি বা গান করি তাহাতেও বাতাসে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এই বায়ুকম্পন আমাদের কানে প্রবেশ করে ও আমরা তাহা শুনিতে পাই। বায়ুকম্পন এত দ্রুত চলে যে, এক সেকেণ্ডে সমগ্র পৃথিবী শতবার ঘুরিয়া আসিতে পারে। বায়ুকম্পন কানে প্রবেশ করিলে আমরা শুনিতে পাই এবং সেই বায়ুকম্পন পৃথিবী ঘুরিয়া আসিতে পারে বটে, কিন্তু আমি এখানে যে কথা বলি তাহা দিল্লীর লােকে শুনিতে পায় না কেন? আমরা সা বলিতেই গােলাকৃতি যে-ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় সেই ঢেউ একটা নির্দিষ্ট বৃত্তমধ্যস্থানের সমস্ত লােকের কানে গিয়া তাহাদিগকে তাহা শুনাইয়া দেয়। কম্পনভেদে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডী আছে। যতই কম্পনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়, সেই ঢেউয়ের বৃত্তও তত বড় হয় এবং আরও অনেক বেশী লােককে তাহা শুনাইতে সমর্থ হয়। ধ্বনির কম্পনভেদে এই যে নির্দিষ্ট গণ্ডী তাহাও আবার বায়ুর উত্তাপের কম- বেশীতে হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। একই সুর সেতার বেহালাতে বা হারমােনিয়মে বাজিতে থাকিলেও প্রত্যেকটিতে একটা বিভিন্নতা থাকে। সেতারের তার যতবার কঁপিতেছে বেহালার তারও ততবার কঁপিতেছে বা হারমােনিয়মের রীডও ঠিক বিশেষ বিশেষ ততবারই কঁপিতেছে অথচ সেতারের ধ্বনি একপ্রকারের ; বেহালার ধ্বনি ভঙ্গী অন্য প্রকারের ; আবার হারমােনিয়মের ধ্বনি এক বিশেষ প্রকারের। এইরূপ হইবার কারণ, সেতারে সা ধ্বনিত হইবার সময় কেবল এক সা সুরই ধ্বনিত হয় না, তাহার সঙ্গে সঙ্গে তাহার উচ্চ সপ্তকের আরও কয়েকটি সুর ক্ষীণভাবে ধ্বনিত হয়। বেহালায় সা ধ্বনিত হইবার সঙ্গে সঙ্গেও উচ্চ সপ্তকের কয়েকটি সুর ক্ষীণভাবে ধ্বনিত হয়, কিন্তু সেতারের স ধ্বনির সঙ্গে যে-সব সুর ধ্বনিত হয় তাহাতে সেই সব সুর ধ্বনিত হয় না, অন্য সুর ধ্বনিত হয়। সেইরূপ হারমােনিয়মের সা সুরের সঙ্গেও উচ্চ সপ্তকের কয়েকটি বিভিন্ন সুর ধ্বনিত হয়। এরূপ মানুষের কণ্ঠ হইতে যে সা সুর বাহির হয় তাহাতে উচ্চ সপ্তকের কয়েকটি বিশেষ বিশেষ সুর ক্ষীণভাবে ধ্বনিত হয়। এই উচ্চ কম্পনের গীত-উপক্রমণিকা সপ্তকের সুরগুলি ধ্বনিত হওয়াতেই কণ্ঠের গাম্ভীর্যের মিষ্টত্ব বা কর্কশত্ব প্রকাশ পায়। উচ্চ সপ্তকের কোন কোন সুর ধ্বনিত হইলে কর্কশত্ব প্রকাশ পায় বা কোন কোন সুর ধ্বনিত কণ্ঠে মিষ্টত্ব বা গাম্ভীৰ্য প্রকাশ পায়। এই সব উচ্চ সপ্তকের সুরগুলি ক্ষীণভাবে ধ্বনিত হয় বলিয়াই কম্পনের সংখ্যা এক হইলেও কম্পনের বিশেষ বিশেষ ভঙ্গী দৃষ্ট হয়। সেতারের ধ্বনি হইতে বাতাসে যেরূপ ঢেউ উৎপন্ন হয় বেহালার ধ্বনি হইতে সেরূপ হয় না বা মানুষের কণ্ঠধ্বনি হইতে যে-ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় তাহাও পৃথক হয়। এই সব বিশেষ ভঙ্গীযুক্ত ঢেউ আমরা ঢেউ আমরা যন্ত্রসাহায্যে দেখিতে পারি, তাহা আঁকিয়া লইতেও পারি। সেতারের একটা গৎ বাজিতে থাকিলে বায়ুমণ্ডলে যে-ঢেউরাশির সৃষ্টি হয় তাহা যন্ত্রসাহায্যে কোন কিছুতে খােদিয়াও লইতে পারা যায়। ইহাই গ্রামােফোন রেকর্ডের (Gramophone Records ) সৃষ্টিকথা। ঢাকের এক দিকের চামড়ায় আঘাত করিলেই অন্য দিকের চামড়া কঁপিয়া উঠে। তাহার কারণ পূৰ্বেই বর্ণিত হইয়াছে, বায়ু কম্পিত হইয়া অন্য দিকের চামড়াকে আঘাত করে ও তাহা কম্পিত হয়। এই কারণেই কাগজ, অ, চামড়া ইত্যাদি পাতলা দ্রব্য মুখের সম্মুখে রাখিয়া কথা বলিলে সেইগুলিও কম্পিত হয়। যদি একটা মােটা নলের এক দিক অভ্র দিয়া আবৃত করিয়া-অনাবৃত মুখের সম্মুখে বসিয়া কথা বলি, গান করি বা কোনরূপ ধ্বনি উৎপন্ন করি, তবে সেই অভ্রটি কঁপিয়া উঠিবে। ধ্বনি হইতে বায়ুমণ্ডলে ঢেউয়ের সৃষ্টি করিবে সেই ঢেউ অভ্রটিকে আঘাত করিবে ও ইহাতে তাহা কম্পিত হইবে। সেই অভ্রটির সঙ্গে যদি সুকৌশলে একটা সূচ সংযুক্ত করিয়া লওয়া যায় তবে সেই সূচটিও অকম্পনের সহিত কম্পিত হইতে থাকিবে। একজন সেতারবাদক যদি সেই নলটির অনাবৃত মুখের সম্মুখে বসিয়া সেতারের একটা গৎ বাজাইতে থাকে তবে সেই সেতারের ধ্বনি হইতে যে ভঙ্গীযুক্ত বায়ুকম্পন হইবে, সূচটিতেও সেই ভঙ্গীযুক্ত কম্পন হইবে। এদিকে একটা থালার এক পিঠে মােম গলাইয়া বেশ পুরু করিয়া লাগাইয়া গ্রামাে- ফোনের মূল সূত্র গীত-উপক্রমণিকা এবং থালার মােম-দেওয়া পিঠ সেই সূচটির সঙ্গে ঠেকাইয়া রাখিয়া থালাটিকে যদি ঘুরাইতে থাকি তবে সূচটির কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে সেই মােমের উপরে আঁচড় পড়িতে থাকিবে। সেতারের ধ্বনি আসিয়া সূচটিকে কখনও কম কম্পিত করিবে, কখনও বেশী, কখনও বা আস্তে কখনও বা জোরে কম্পিত করিতে থাকিবে ও সঙ্গে সঙ্গে যে তরঙ্গায়িত আঁচড় পড়িতে থাকিবে তাহাও কখনও গভীর হইয়া পড়িবে, কখনও বা খুব কম আঁচড় পড়িবে। সেতরের গৎ যে ভঙ্গীযুক্ত তরঙ্গের সৃষ্টি করিবে তাহাই এই আঁচড়ের মধ্যে খােদিত বা অঙ্কিত হইয়া থাকিবে। এই আঁচড়যুক্ত থালাটিই সেতারের গতের রেকর্ড হইবে। গ্রামােফোন রেকর্ডগুলি অবশ্য মােমের তৈয়ারী নয় । ধাতব দ্রব্য দ্বারা তৈয়ার করা হয়। রেকর্ডগুলিতে যে বৃত্তাকার রেখা আছে যাহার উপর গ্রামােফোনের sound box-এর পিনটি ঘুরিতে থাকে সেই রেখার মধ্যেই নানাবিধ ঢেউ খােদিত করা থাকে। এখন রেকর্ড হইতে কিরূপে আমরা পুনরায় গানটি শুনিতে পাইব তাহাই দেখা যাক। যে অচড়গুলি গৎটি বাজাইবার সময় পড়িবে সেই অচড়গুলির উপর দিয়া যদি একটি অভ্র-সংযুক্ত সূচ চালাইয়া দেওয়া যায় তবে সেই খােদিত অসমান ঢেউগুলির উপর দিয়া চলিতে গেলে সূচটিও অসমানভাবেই কম্পিত হইবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সূচ-সংযুক্ত অভ্রটিও অসমান ভাবেই কাপিতে থাকিবে। গৎটি বাজাইবার সময় সেই নলের মুখের অভ্রটি যে ভাবে কম্পিত হইয়াছিল এই সূচসংযুক্ত অভ্রটিকেও সেইরূপ ভাবে কম্পিত করিবে এবং এই কম্পিত ধ্বনির সৃষ্টি করিবে। গৎটি বাজাইবার সময় যেরূপ ধ্বনি হইয়াছিল অবিকল সেইরূপ ধ্বনি উৎপন্ন করিবে এবং তাহা আমরা শুনিতে পাইব। গ্রামােফোনের sound box-এ একটা পাতলা অবৎ জিনিষ থাকে। তাহার সহিত একটা সূচ ( পিন) সংযুক্ত করিয়া দিতে হয়। সেই পিন রেকর্ডের উপর ঘর্ষিত হইলেই রেকর্ডে খােদিত ঢেউ অনুযায়ী শব্দ হয় ও আমরা অবাক হইয়া শুনিতে থাকি। আমরা শুনি এবং কান দ্বারা শুনি। যদি এই প্রশ্ন হয়, ‘কানদ্বারা কি গীত-উপক্রমণিকা করিয়া শুনি ? তবে আমরা একেবারে উত্তর দিই ‘কানই আমাদের শ্রবণ কানের যন্ত্র। কিন্তু কানের ভিতর কি কি জিনিষ আছে জানিয়া রাখিলেই উত্তর দেওয়া আভ্যন্তরিক সহজ হইয়া পড়ে। কানের ভিতরে প্রথমে একটা পাতলা চামড়ার আবরণ আছে। তাহাকে চৰ্ম্মপটহ বলা হয় । তাহার পরে তিনটি হাড়ের টুকরা পাওয়া যায় এবং তাহারও পরে শামুকের মত একটা যন্ত্র পাওয়া যায় ; তাহাকে শম্বুক-যন্ত্র বলে। এস্রাজের এক পাশের তরফের তারগুলি যেমন খাদ সুর হইতে ক্ৰমে উচ্চ সুরে বাঁধা থাকে এই শম্বুক-যন্ত্রের মধ্যেও অতিখাদ সুর হইতে অতিউচ্চ সুরের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তন্ত্রী খাদ হইতে ক্রমে চড়া সুরে পর পর বাঁধা আছে। এই সব তার লােহার বা পিতলের তার নয়। তাহা প্রাকৃতিক তার এবং প্রকৃতি হইতেই মিল অনুসারে বাঁধা। সঙ্গীতে তিন সপ্তক সুরের দরকার হয়। কিন্তু শম্বুক যন্ত্রটিতে চার-পাঁচ শত সপ্তকের অধিক সপ্তকের সুর বাঁধা আছে। একটা ধ্বনি হইবামাত্র বায়ুমণ্ডলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তাহা আসিয়া প্রথম চৰ্ম্মপটহকে কম্পিত করে ও সেই কম্পন হাড়ের টুকরা বাহিয়া শম্বুক-যন্ত্রে যায়। পূর্বে বর্ণিত হইয়াছে যে, এক সুরে বাঁধা তারের একটাকে কাপাইয়া তুলিলেই অন্যান্য তারগুলি কঁপিয়া উঠে। চৰ্ম্মপটহের কম্পন শম্বুক-যন্ত্রে গিয়া তথাকার প্রাকৃতিক নিয়মে বাঁধা তন্ত্রীকে কঁপাইয়া তুলে। সবগুলি তন্ত্রীই কাপিয়া উঠে না। বাহিরের ধ্বনির কম্পনসংখ্যা যত, কম্পনযুক্ত তারকে ততবারই কঁপাইয়া তুলে, তাহাতেই আমাদের শব্দের অনুভূতি হয়। নাক দিয়া সর্বক্ষণ আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া চলিতেছে। এই কণ্ঠস্বরের শ্বাস-প্রশ্বাস একটা নালী দিয়া প্রবাহিত হয়। ইহা গলা হইতে ফুসফুসে উৎপত্তি গিয়াছে, তাহাকে শ্বাসনালী বলে। আরও একটি নালী গলা হইতে পেটে গিয়াছে। আমরা যাহা-কিছু আহার করি তাহা তাহার ভিতর দিয়া পেটে যায়। শ্বাসনালী দিয়াই আমাদের কণ্ঠধ্বনি উৎপন্ন হয়। শ্বাসনালীর মুখ গােল। ইহার মুখে দুইটি পাতলা চামড়া লাগান থাকে। তাহাদিগকে Vocal chords, অর্থাৎ ‘বাতন্তু’ বলা হয়। এই গীত-উপক্রমণিকা কণ্ঠস্বরের উৎপত্তি সম্বন্ধে প্রাচীন দুইটি বাকৃতন্তু সামনাসামনি পড়িয়া থাকে। মন কোনরূপ ধ্বনি করিবার ইচ্ছা করিলেই দুইটি বাতন্তু উঠিয়া দাড়ায়। তখন ফুসফুস হইতে বাতাস আসিয়া ইহাদিগকে কম্পিত করে। এই কম্পন হইতে স্বর উৎপত্তি হয়। কাজেই দেখা যাইতেছে, ফুসফুসের সহায়তায় বাতন্তুর কম্পনই কণ্ঠস্বর উৎপত্তির কারণ। প্রাচীন সঙ্গীত-শাস্ত্রকারগণ কণ্ঠস্বর উৎপত্তি সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে, কোনরূপ ধ্বনি করিবার ইচ্ছা করিলে মন দেহাগ্নিকে আঘাত করে। শরীরে ব্রহ্মগ্রন্থি নামে যে গ্রন্থি আছে এবং তাহাতে যে বায়ু থাকে, দেহাগ্নি গিয়া সেই বায়ুকে উদ্ধদিকে চালনা করে। সেই বায়ু ক্ৰমশঃ উর্ধদিকে আসিয়া যথাক্রমে নাভি, হৃদয়, কণ্ঠ, মস্তক ও বদনে ধ্বনি উৎপন্ন করে। ইউরােপীয় শারী-তত্ত্ববিগণ বলেন যে, বাকৃতন্তুর কম্পনে মস্তক ও বক্ষ কম্পিত হয় এবং ধ্বনি উৎপাদনে সহায়তা করে। কারণ খাদ সুর গাহিবার সময় বুকের উপর হাত রাখিলে বক্ষকম্পন বেশ ভাল করিয়াই টের পাওয়া যায়। কিন্তু নাভির সঙ্গে স্বরের উৎপত্তির কোন সম্বন্ধ আছে কি-না তাহারা এ বিষয়ে কিছুই বলেন না। যাহা হউক, বাতন্তর কম্পন হইতেই কণ্ঠস্বর উৎপন্ন হয় এবং ফুসফুস ও বাতন্তু এই দুইটিই যে কণ্ঠস্বরােৎপাদনের মূল উপাদান এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। মত যষ্ঠ পরিচ্ছেদ গীত-প্রণালী গীত গাহিবার প্রণালী চারি প্রকার, অর্থাৎ চারি প্রকার রীতিতে গান করা হয়। তাহাদের নাম ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা ও আলাপ। ইহাদের বিস্তারিত আলােচনা এখানে করিতেছি। গত ধ্রুপদ খেয়াল টপ্পা আলাপ ধ্রুপদ ধ্রুপদ অতি প্রাচীন। মুনিঋষিগণ ধ্রুপদ গান গাহিতেন। কারণ ধ্রুপদ গান করা এক প্রকার সাধনা। এই গান সর্বদা অভ্যাস করিলে শ্বাস- প্রশ্বাসের ক্রিয়া উত্তম হইয়া থাকে। ধ্রুপদ গানের সময় যে শ্বাস-প্রশ্বাস লওয়া যায়, তাহাতে গায়কের অজ্ঞাতসারে এমন ন্যাসক্রিয়া হয় যে, গায়ক চির-স্বাস্থ্যবান হইয়া দীর্ঘজীবন লাভ করে। দেবতাগণের লীলা ও তাঁহাদের মহিমা কীর্তন, রাজামহারাজগণের যশ- বর্ণনা ও তাহাদের যুদ্ধ-বৰ্ণনাই ধ্রুপদ গানে থাকে। গদ্যে পদ্যে দুই প্রকার ছন্দেই তাহা লিখিত। গানের স্বর-বিন্যাসে এক এক সুরে স্থায়িত্ব অনেক ও গীত গাম্ভীৰ্যপূর্ণ রচনা। ইহাতে গমক, মীড় ও প্রষনের কাজই বেশী হইয়া থাকে। বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত এই তিন প্রকার লয়েই গীত হয়। ধ্রুপদে বাট করিবার রীতি প্রচলিত। এই প্রকার গানের ধীর গতি বলিয়া তাহা উপাসনার বিশেষ উপযােগী। ধ্রুপদে আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভােগ এই চারি তুকে গান হয়। কোন কোন ধ্রুপদ গানে কেবল আস্থায়ী ও অন্তরা এই দুই কলিই দেখা যায়। সমস্ত রাগ-রাগিণীতেই ধ্রুপদ গীত হয়।

৪৩ গীত-উপক্রমণিকা চৌতাল, ধামার, সুরফাক্তা, আড়াচৌতাল, ঝাপতাল, রূপক, তেওরা, ঢিমেতােলা, পটল এই সকল তলেই ধ্রুপদ গান হইয়া থাকে। ধ্রুপদ নানা প্রকার। যথা-ছন্দ, প্রবন্ধ, যুগলবন্ধ ও ধারু। ধ্রুপদ প্রবন্ধ যুগলবন্ধ • যে-ধ্রুপদ গানের মধ্যে ছন্দ এই কথাটির উল্লেখ আছে তাহাকে ছন্দ বলা হয়। যে সকল গানে আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোেগ এই চারি তুকে ভিন্ন ভিন্ন তাল ব্যবহৃত হয় তাহাকে প্রবন্ধ বলে। যে সকল ধ্রুপদ গান দুইজনে এক সঙ্গে গাহিতে হয় ; একজন গান গাহিয়া যায় আর একজন সেই গানের কথা না বলিয়া সুর তাল লয় ঠিক রাখিয়া সারগম্ বলিয়া যায় তাহাই যুগলবন্ধ। আর যে ধ্রুপদে ধারু এই শব্দটির উল্লেখ আছে তাহাকেই ধারু বলা হয়। ধ্রুপদ গাহিবার রীতিও আবার চারি ভাগে বিভক্ত। তাহাদের নাম নওড়র বাণী, ডাগর বাণী, খাণ্ডার বাণী ও গওহর বাণী। গড়হার বাণী আজকাল প্রচলিত। খাণ্ডার বাণী ধ্রুপদও প্রচলিত আছে, অন্য দুই প্রকার বাণী বর্তমানে অপ্রচলিত। খেয়ালের সুর ধ্রুপদ হইতে সংক্ষিপ্ত, ধ্রুপদের স্থায়িত্ব অনেক, কিন্তু খেয়ালে গানের সুরে স্থায়িত্ব কম। কাজেই ধ্রুপদের গতি এক প্রকার আর খেয়ালের গতি অন্য প্রকার। খেয়ালের রচনাও সংক্ষেপ। প্রায় সব খেয়াল গানেই আস্থায়ী ও অন্তরা পৰ্য্যন্ত রচিত হয়। কচিৎ দুই একটা গানে সঞ্চারী আভােগও আছে। খেয়ালের প্রধান অঙ্গ তান্। তান্ অর্থে বিস্তার করা, গানকে স-গমক গিট্‌কারী, কম্পন, আশ, মীড়, ইত্যাদির সাহায্যে সুরের বিস্তার করাই খেয়াল খেয়াল গীত-উপক্রমণিক। গানের বৈশিষ্ট্য। খেয়ালে সুরের কাজ খুব বেশী করিতে হয়। দ্রুত ঐতি- মধুর ভান করা বিশেষ আয়াসসাধ্য। এইজন্য ধ্রুপদ হইতে খেয়াল কঠিন। তেতাল, আড়াঠেকা, তেওট, একতালা মধ্যমান ইত্যাদি তালে খেয়াল গীত হয়। কিন্তু খেয়াল গানে সুরের কাজ অত্যন্ত বেশী করিতে হয় বলিয়া তালের খুব বাঁধাবাঁধি নিয়ম নাই, কোনমতে সম মিলাইতে পারিলেই হয়। কারণ তানকৰ্তব করিতে করিতে তালের দিকে ততটা দৃষ্টি দেওয়া যায় না। আর তালের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিলে সুরের কাজ তত হয় না বলিয়া খেয়ালে তালের প্রাধান্য নাই। খেয়ালে ধ্রুপদের মত সমস্ত রাগরাগিণীই গাওয়া হয়। খেয়াল চারি ভাগে বিভক্ত। যথা :–চতুরঙ্গ, ত্রিবট, কল- কলাওয়ালা ও গুলনক্স। খেয়াল চতুরঙ্গ বিট কল-কলাওয়ালা গুলনম্ন চতুরঙ্গ গানের একটি কলিতে গানের কথা, অন্যটিতে নাদের, তুমদের, দানি, তানা ইত্যাদি অবােধ্য শব্দ, অপরটিতে তেরেকেটে তাক ধা কেটেতাক ইত্যাদি তাল বাদ্যের বােল এবং আর অন্যটিতে সারগম্ থাকে। চতুরঙ্গ শব্দটি গানের কথার মধ্যে থাকিবে। ভিন্ন ভিন্ন বাণীর চারিটি কলিবিশিষ্ট গানকেই চতুরঙ্গ বলা হয়। ত্রিবট গানের তিনটি কলি থাকে। একটিতে গানের কথা ; অন্যটিতে নাদের দের দানি ইত্যাদি শব্দ ও অপরটিতে ধা কেটেতেটে তাক ধিতা ইত্যাদি বাদ্যের বােল থাকে, ইহাকে ত্রিবট বলে। গানের কথায় ত্রিবট শব্দটির উল্লেখ থাকিবে। বিভিন্ন তিন প্রকার বাণীযুক্ত গানকে ত্রিবট বলে। আরবী ভাষায় রচিত মহম্মদের লীলাকীৰ্ত্তন গানকে কল-কলাওয়ালা বলা হয়। যে-গানে গুল শব্দের উল্লেখ আছে তাহাকে গুলনক্স বলা হয়। গান পারস্য ভাষায় রচিত।

আর কয়েকপ্রকার গান আছে তাহা ধ্রুপদ খেয়াল উভয়েরই অন্তর্গত। যথা-তেলেনা, রাগমালা, ও জাড়, বা জাট। দারা, দীম, তুম নাদের ইত্যাদি অবােধ্য শব্দ যোগে যে গান হয় তাহা তেলানা। ইহার অপর নাম তিরানা। একটি গানের মধ্যে অনেকগুলি রাগরাগিণীর সমাবেশ থাকিলে তাহাকে রাগমালা বলে। ইহার অপর নাম সুরসাগর । গানের এক-একটি পদ এক এক ভাষায় রচিত ও গানে অনেক রাগ- রাগিণীর স্বর-বিন্যাস থাকিলে জডি, বা জা বলা হয়। ধ্রুপদ খেয়াল তেলানা রাগমালা জাড়, বা জাট টপ্পা টপ্পাতে খেয়ালের মতই তা ব্যবহৃত হয়, কিন্তু ইহার পৃথক ঢং। গিট্‌কারী খুব বেশী ব্যবহৃত হয়। টপ্পা গান করিতে কণ্ঠসাধনার বিশেষ প্রয়ােজন। এত সুন্দর তান ব্যবহার করিতে হয় যে, মনে হয় উচ্চাঙ্গের টপ্পা খেয়ালের চাইতেও কঠিন। খেয়ালের মত ইহাতে সমস্ত রাগরাগিণী গাওয়া হয় না। টপ্পায় গাম্ভীর্যপূর্ণ রাগরাগিণী গাওয়া হইতে পারে না। ঝি ঝিট, খাম্বাজ, সিন্ধু, কাফি, ভৈরবী, পিলু, বার ওয়া, সুরট, দেশ ইত্যাদি ও কয়েকটি মিশ্রিত হালকা রাগিণীতে টপ্পা গাওয়া হয়। টপ্পার রচনা খেয়ালের মতই সংক্ষিপ্ত। আস্থায়ী ও অন্তরা এই দুই কলিতেই গীত হয়। টপ্পা গীত প্রায় সবই প্রেমসঙ্গীত। কয়েকটি শ্যামা সঙ্গীত ও উচ্চভাবাপন্ন গান দেখা যায়। সচরাচর খেয়ালের তালেই টপ্পা গীত হয়। তবে মধ্যমান তালে টপ্পা-গীতই প্রকৃত টপ্পা। অনেকে বলে খেয়ালের তাল আড়াঠেকা আর টপ্পার তাল মধ্যমান। টপ্পাও তিন প্রকারে বিভক্ত। যথা :—মরী, গজল, খো।

গীত-উপক্রমণিকা ৪৩ টপ্প। ঠুমরী ই গজল খেটা ঠুমরী গান খুব আধুনিক, ইহাতে টপ্পায় ব্যবহৃত রাগরাগিণীই ব্যবহৃত হয়। দাদরা, আদ্ধা, তেতালা, কাহারবা, কাফ। ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তালে গাওয়া হয়। গীতকে অধিকতর শ্রুতিমধুর করিবার জন্য গানের নির্ধারিত রাগরাগিণী ব্যতীত অন্যান্য রাগরাগিণীও তাহাতে অতি সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়। রাগমালাতে অনেক রাগরাগিণীর সমাবেশ থাকে, কিন্তু প্রত্যেকটি রাগের বৈশিষ্ট্য, ঠাট, বাদী-সংবাদী আরােহণ-অবরােহণ দ্বারা রক্ষিত হয়। ঠুংরীতে এ সমস্ত কিছুই ঠিক থাকে না। ইহার কোন বাঁধাবাঁধি নিয়ম নাই। নানা প্রকার সুর-কৌশলের দ্বারা গানে বৈচিত্র্য আনয়ন করাই ইহার কাজ। এই জন্যই ধ্রুপদ খেয়াল হইতে টপ্পা ঠুরী কঠিন মনে হয়। কারণ ইরীর নিত্য নূতন তা দ্বারা সুরে বহুরূপ বৈচিত্র্য আনিতে হইলে কণ্ঠ যথেষ্ট মার্জিত হওয়া আবশ্যক। পারস্য ভাষায় রচিত প্রেমসঙ্গীতকে গজল বলা হয়। ইহা সচরাচর পপাস্তা তালে গীত হয়। খেটা, আড়াখেষ্টা, কাহারবা ইত্যাদি তালের গানই খেমটাশ্রেণীভুক্ত। খো গানে তালের উপর বেশী যতটুকু ঝোক দেওয়া হয়, সুরের উপর ততটুকু ঝোক দেওয়া হয় না। তেলনা, চতুরঙ্গ, ত্রিবট টপ্পাতেও গাওয়া হয়। টপ-খেয়াল নামে আর এক শ্রেণীর গীত আছে, তাহা টপ্পা ও খেয়ালের অপূর্ব মিশ্রণে উৎপন্ন। খেয়ালের রাগ ও টপ্পার রাগ মিশ্রিত করিয়া গীত হইয়া থাকে। যেমন : ভৈরবী বাহার।

৪৪ গীত-উপক্রমণিকা খেয়াল টপ্পা তেলানা ত্রিবট টপ-খেয়াল ইহা ছাড়া আরও কয়েক প্রকার গীত দেখা যায়। যেমন—হােরী বা হােলী, বাউল ও কীৰ্ত্তন। শ্রীকৃষ্ণের দোল-উৎসবের গানকে হােরী বা হােলী বলা হয়। ধ্রুপদে এবং টপ্পায়ই এই শ্রেণীর গীত আছে। ধ্রুপদে ধামার তালে ও টপ্পায় সচরাচর যৎ তালে গীত হয়। বাউল ও কীৰ্ত্তন বাংলার নিজস্ব গীত। অন্যান্য দেশে এই দুই শ্রেণীর গীত দেখা যায় না। এইজন্য ইহাদিগকে ভারতীয় সঙ্গীতে ধরা হয় না। ইহাদের সুর সরল ও ভাবপ্রধান। বাউল গান একতারা, গােপীযন্ত্র এবং খঞ্জনী বা করতাল লইয়া গীত হয়। কীৰ্ত্তনে খােলের সঙ্গত চলে। কীৰ্ত্তনের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এক এক পদের সুর ও তাল উভয়ই পরিবর্তিত হয়। আধ্যাত্মিক ভাবে দেখিতে গেলে বাউল ও কীর্তনের স্থান অনেক উচ্চে। রাগের স্বরবিন্যাসকে পৃথক পৃথক ভাবে আলােচনা করার নাম আলাপ। ধ্রুপদ খেয়াল ও টপ্পার রীতিতে ভিন্ন ভিন্ন আলাপ হয়। আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভােগ এই চারি তুকেই আলাপ হইয়া থাকে, কণ্ঠেও আলাপ করা হয়, আবার যন্ত্রেও আলাপ হইয়া থাকে। অন্তরের প্রেরণায় গায়ক ও বাদক রাগের মূৰ্ত্তি সকলপ্রকার গীত-অলঙ্কার সংযোজন করিয়া গড়িয়া তুলিবে। আলাপে গানের পদ ব্যবহৃত হয় না। আলাপ করিতে তাে তানা, নেরি, তা, তুম্ ইত্যাদি শব্দ দ্বারা রাগের সুকৌশল স্বরবিন্যাস রচনা করিতে হইবে। ইহাতে তালের বন্ধন নাই। কিন্তু স্বরবিন্যাসটিতে কোন ছন্দবন্ধ না থাকিলেও তাহাতে লয় আছে। বিলম্বিত মধ্য ও দ্রুত এই তিন লয়েই আলাপ হইয়া থাকে। কণ্ঠ মার্জিত না থাকিলে ও রাগের স্বরবিন্যাস বিশদভাবে জানা আলাপ গীত-উপক্রমণিকা ৪৫ থাকিলে আলাপ করা সম্ভবপর হয় না। এক এক রাগের অনেক ঢংয়ের গান জানা না থাকিলেও আলাপ বিস্তার করিতে পারা যায় না। এই জন্যই আলাপ সব চেয়ে কঠিন। গীত ধ্রুপদ খেয়াল টপ্পা আলাপ প্রবন্ধ যুগলবন্ধ তেলানা রাগমালা জাড় বা জাট চতুরঙ্গ বিট কওল কলাওয়াল। গুলনক্স তেলানা বিট টপ-খেয়াল , ঠুমরী গজল খেমটা সপ্তম পরিচ্ছেদ সঙ্গীত-ইতিহাস সঙ্গীতের জন্ম কি ভাবে ও কোথা হইতে হইল তাহা খুব গােড়া হইতে সুর, নৃত্য ও তালের জানিতে গেলে দেখা যায় যে, মানুষ হৃদয়ের আবেগে যে অস্পষ্ট শব্দ জন্মকথা উচ্চারণ করে, তাহা হইতেই গীতের ক্রমবিকাশ হইয়াছে। আনন্দ প্রকাশ করিতে গিয়া আমরা অঙ্গভঙ্গী দ্বারা চলিবার ভঙ্গীদ্বারা তাহা প্রকাশ করিয়া থাকি। বালকবালিকাগণ আনন্দিত হইলে লাফালাফি করিয়া তাহা প্রকাশ ৪৬ গীত-উপক্রমণিকা করে। এই অঙ্গভঙ্গী, চলিবার গতি বা লম্ফঝম্ফ একটা সুশৃঙ্খল ভাবে চালিত হইলেই নৃত্য হয় এবং এই সুশৃঙ্খল নিয়মটাই তাল বা ছন্দ। অসভ্য জাতিদের কথা একটু ভাবিয়া দেখিলেই তাহা সহজে বুঝিতে পারা যায়। ইহারা যেরূপ অস্পষ্ট ধ্বনি করিয়া কথা বলে, সভ্য জাতির পূর্বপুরুষ অসভ্য জাতিগণ এইরূপ করিয়াই কথা বলিত। এই অস্পষ্ট ধ্বনি হইতে ক্রমশঃ পরিবর্তন হইয়া আমাদের এইরূপ ভাষায় পরিণত হইয়াছে। অসভ্য জাতিদের মধ্যে নৃত্য-গীত খুব প্রচলিত। প্রায় সমস্ত অসভ্য জাতিই একই সুর ক্রমাগত আবৃত্তি করে মাত্র। সুরের কোন পরিবর্তন নাই সুরের কোন পরিবর্তন নাই। একই সুরে ইহারা নৃত্য করিয়া ঝোঁক্ দিয়া দিয়া গীত করিয়া থাকে। অসভ্য জাতি কোন নির্দিষ্ট নিয়মে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া স্বরবিন্যাস রচনা করিতে পারে না। এইরূপ সঙ্গীত হইতেই সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সাতটি সুর ক্রমে বারটি সুরে পরিণত হইয়াছে এবং নানাপ্রকার স্বরবিন্যাস রচিত হইয়া সঙ্গীত উন্নতি লাভ করিয়াছে। বেদ উৎপত্তির সময় হইতেই সঙ্গীতের উৎপত্তি। বেদ-গান করিতেন। সামবেদ সুর করিয়া পড়িতে হয়। বেদ বহু প্রাচীন, কাজেই সঙ্গীতও অতি প্রাচীন। বেদ উৎপত্তির সময় হইতেই ভারতীয় সঙ্গীতের ক্রমবিকাশ হইয়া আসিতেছে। প্রাচীন সঙ্গীতগ্রন্থে লিখিত আছে যে, দেবাদিদেব মহাদেবই সঙ্গীতের সৃষ্টিকর্তা। মহাদেব ব্রহ্মাকে সঙ্গীত শিক্ষা দেন। ব্রহ্মা পরে ভরত, নারদ, রম্ভা, হুহু ও তুম্বুরু এই পাঁচজনকে সঙ্গীত শিক্ষা দেন। ভরত মুনি দ্বারাই সঙ্গীত ভারতে প্রচারিত হয়। মহাভারতের সময়েও সঙ্গীতের চর্চা বিশেষভাবে হইত। মহাভারতে দেখা যায় যে, পঞ্চপাণ্ডব যখন বভ্রুবাহনের রাজ্যে ছিলেন, তখন অর্জুন মহারাজার কন্যাকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন। ইহা হইতে আরও বুঝিতে পারা যায় যে, তৎসময়ে স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই সঙ্গীত শিক্ষা করিতেন। সেই সময়ে ভগবানের নামকীর্তনের জন্যই সঙ্গীত হইত। ধ্রুপদই আরাধনার উপযােগী। কাজেই তখন ধ্রুপদই ছিল একমাত্র কণ্ঠসঙ্গীত। মৃদঙ্গ বা পাখখায়াজ দিয়াই গীতে সঙ্গত করা হইত। মৃদঙ্গের উৎপত্তি সম্বন্ধে প্রাচীন মুনিঋষিগণ ধ্রুপদ ও কারণ পাখােয়াজ গীত-উপক্রমণিকা ৪৭ গ্রন্থে লিখিত আছে যে, মহাদেব ব্রহ্মাকে সঙ্গীত শিক্ষা দিবার সময় ব্রহ্মার তালজ্ঞান জন্মাইবার জন্য মহাদেব মাটি দিয়া এই যন্ত্রটি তৈয়ার করেন। মাটি হইতে তৈয়ারী হইয়াছে বলিয়াই ইহার নাম মৃদঙ্গ (মৃৎ+ অঙ্গ) হইয়াছে। মৃদঙ্গ পরে কাঠ দিয়া তৈয়ারী হইতে আরম্ভ হয়। তখন ইহার নাম পাখােয়াজ পাকা + আওয়াজ হইতেই পাখখায়াজ শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। পাখােয়াজের আওয়াজ গুরুগম্ভীর । ধ্রুপদ গানও গাম্ভীৰ্যপূর্ণ। সেইজন্য ধ্রুপদ গানে পাখোয়াজ দিয়াই সঙ্গীত করা হয়। এখন মৃদঙ্গ অন্য প্রকারে নির্মিত হইয়াছে। কীৰ্ত্তনগানে ইহা দ্বারা সঙ্গীত হইয়া থাকে। ইহার আধুনিক নাম খােল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে সঙ্গীতের অধঃপতন হইয়াছিল। মুসলমানদের মুসলমান রাজত্বকালে তাহা পুনরায় নবজীবন প্রাপ্ত হয়। মুসলমান রাজত্বের পূর্ব রাজত্বকালে পর্যন্ত ভারতে এক ধ্রুপদই গীত হইয়া আসিতেছিল। পরে ইহাদের সঙ্গীত রাজত্বকালেই সঙ্গীত সমধিক উৎকর্ষলাভ করিয়া নানা ভাবে বিভিন্ন হইয়াছে। পাঠান-রাজ আলাউদ্দীন খিলিজীর সময় হইতেই প্রত্যক্ষভাবে খেয়ালের সৃষ্টি সঙ্গীতের উৎকর্ষ আরম্ভ হয়। আলাউদ্দীনের সময় হইতে গিয়াউদ্দীন তােগলকের সময় পর্যন্ত অর্থাৎ ১২৯৫ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৩৫০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সঙ্গীতের বিশেষ উন্নতি হইয়াছিল। আলাউদ্দীন খিলিজী অত্যন্ত সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন। তাহার দরবারে অনেক সঙ্গীতজ্ঞ থাকিয়া সঙ্গীতচর্চা করিতেন। তন্মধ্যে নায়ক গোপাললাল ও নায়ক আমীর খসূরুই প্রধান। এই দুই জনই তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাস্ত করিয়া নায়ক উপাধি লাভ করেন। ধারু ধ্রুপদ নায়ক গোপাললাল সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। আমীর খসরু তেলানা ও খেয়াল গীতের সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। সেই সময়ে তেলানা ও খেয়াল গীত ভারতীয় সঙ্গীতে স্থান পায় নাই। আমাদের বাউল ও কীর্তনের মত দিল্লীর দেশী গীতরূপে প্রচলিত ছিল। আমীর খসরু সঙ্গীতে রাগরাগিণীর সঙ্গে পারস্য দেশীয় রাগরাগিণী মিশ্রিত ৪৮ গীত-উপক্রমণিকা সময় কতকগুলি রাগরাগিণী সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। এই দুইজন সঙ্গীতজ্ঞই আলাউদ্দীন খিলিজীর সময় হইতে গিয়াসউদ্দীন তােগলকের পৰ্য্যন্ত ছিলেন। আমীর খসরু কেবল খেয়াল গীত-প্রণালী সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন বায়া-তবলার নাই। গীতে সঙ্গত করিবার জন্য যন্ত্রও সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। ধ্রুপদ গীত পাখােয়াজের সঙ্গতেই শ্রুতিমধুর হয়। কারণ দুইটিই গম্ভীরাত্মক। কিন্তু খেয়াল গীতের হালকা গতি হওয়াতে পাথােয়াজের সঙ্গতে তাহা শ্রুতিমধুর হয় না। সেইজন্য পাখোয়াজ ভাঙ্গিয়া আমীর খ ধাঁয়া-তবলার সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। সেই সময় হইতে মােগল সম্রাট হুমায়ুনের রাজত্বকাল পর্যন্ত দুইজন গায়কশ্রেষ্ঠের পরিচয় পাই। একজনের নাম নায়ক বৈজুনাথ ও অপরের নাম রামদাস। নায়ক বৈজুনাথ, বৈজু বাওরা নামে পরিচিত। তিনি অত্যন্ত সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন। বাওরা অর্থে পাগল। তিনি সঙ্গীতে সর্বদা মত্ত থাকিতেন বলিয়া তঁাহাকে বাওরা বলা হইত। রামদাসরচিতও অনেক ধ্রুপদ গীত দেখা যায়। এই দুইজনই ছিলেন তৎকালীন অসাধারণ সঙ্গীতমনীষী। ইহার পরে মােগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে সঙ্গীতের সমধিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। বাস্তবিক ১৫৫৩ খৃঃ অব্দ হইতে ১৬৬০ খৃঃ অব্দ পর্যন্ত সময়ের সঙ্গীতচর্চাই ভারতীয় সঙ্গীতকে নবজীবন দান করে। আর নিজেও সঙ্গীতবিদ্যায় খুব পারদর্শী ছিলেন। তাহার সময়ে বহু সঙ্গীতজ্ঞ সঙ্গীতচর্চা করিতেন। তাহাদের মধ্যে অসাধারণ সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনই সর্বশ্রেষ্ঠ। তানসেন প্রথমে ব্রাহ্মণ-সন্তান ছিলেন। তঁাহার নাম রামতনু। পিতার নাম মকরন্দ পাড়ে। তানসেন বৃন্দাবন নিবাসী অদ্বিতীয় সঙ্গীতজ্ঞ আসেন হরিদাস গােস্বামী মহাশয়ের নিকট সঙ্গীত শিক্ষা করেন। তিনি শের শাহর পুত্র দৌলত খাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলেন বলিয়া তাহার নামে অনেক গান রচনা করিয়া যান। তিনি সঙ্গীত শিক্ষা শেষ করিয়া রেওয়ার রাজা রামচন্দ্র সিংহের সভাগায়ক নিযুক্ত হন। সেখানে তাঁহাকে ‘তানসেন’ উপাধি দেওয়া গীত-উপক্রমণিকা হয়। তান্ কথার অর্থ সুরের বিস্তার আর ‘সেন’ অর্থ চিহ্ন। তানই যাহার চিহ্নস্বরূপ তিনিই তাসেন। রাজারামের সভা হইতে তানসেনকে সম্রাট আকবরের দরবারে আসিতে হয়। তিনি তখন এক মুসলমান রমণীকে বিবাহ করিয়া মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হন ও মীর্জা উপাধি গ্রহণ করেন। তানসেনের মত গায়ক সেই সময়ে কেহ ছিল না। তিনি অসংখ্য গীত রচনা করিয়া গিয়াছেন। সেই সব গীত এখনকার ধ্রুপদ-গায়কদের সর্বপ্রধান অবলম্বন। তিনি যােগিয়া, আশাবরী, দরবারী-কাড়া, আড়ানা, বেহাগড়া, ইত্যাদি বহু রাগ- রাগিণীর সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। তাসেনের সমসাময়িক গায়ক ছিলেন মালবের সিংহাসনচ্যুত সুলতান বজ, বাহাদুর। তিনি গলা চাপিয়া গান করিতেন। এই প্রকার গলা চাপিয়া গান করাকে ‘বজিখাই’ পদ্ধতি বলা হয়। রামদাসের পুত্র সুরদাস, ধোঁধি খা, সুরয খা, শোভন খা, চঁান খা, প্রভৃতি বহু, সঙ্গীতজ্ঞ আবরের সময়ে ছিলেন। জাহাঙ্গীর ও শাজাহানের সময়েও সঙ্গীতের চর্চা। বিশেষভাবে হইয়াছিল। তৎকালে বিলাস সেন, সুরথ সেন, গুণসেন, তান্তরঙ্গ, মানতরঙ্গ, মানদাস, লক্ষ্মণদাস, জানকীদাস, প্রভৃতি বহু খ্যাতনামা সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালেই ভারতীয় সঙ্গীতের অধঃপতন হয়। ঔরঙ্গজেব সঙ্গীতবিদ্বেষী ছিলেন। তিনি রাজসভা হইতে সঙ্গীতজ্ঞগণকে তাড়াইয়া দিয়াছিলেন ও রাজ্য হইতে যাহাতে সঙ্গীত একেবারে লােপ পায় তাহার চেষ্টাও তিনি করিয়াছিলেন। এই সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। একদিন প্রাতে কয়েকজন লােক একটা মৃতদেহ লইয়া যাইতেছিল, ঔরঙ্গজেব তাহা দেখিয়া কে মারা গিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলেন। লােকগুলি উত্তরে বলিল যে, লােকটি একজন বড় সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। শুনিয়া ঔরঙ্গজেব না-কি বলিয়াছিলেন, তাহাকে ভাল করিয়া মাটি চাপা দাও, যেন আবার না উঠিয়া পড়ে। আবার উঠিলেই যত গােল বাধিবে।

গীত-উপক্রমণিকা আলাউদ্দীন খিলিজীর রাজত্বকাল হইতে শাজাহানের রাজত্বকাল পর্যন্ত ভারতীয় সঙ্গীতের কতকগুলি রাগরাগিণীর সঙ্গে নানা রাগরাগিণী ঈষৎ মিশ্রিত করিয়া শ্রেণীবদ্ধ করা হইয়াছিল। আকবর কাড়া রাগিণী শুনিতে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। সেইজন্য তাহার সভা-গায়কগণ কাড়ার সঙ্গে মিশ্রিত করিয়া কাড়াকে আঠার প্রকার করিয়াছেন। কাড়া আকবরের প্রিয় ছিল বলিয়াই ইহার নাম দরবারী-কাড়া হইয়াছে। কাড়ার মত আরও কয়েকটি শ্রুতিমধুর রাগরাগিণীকে প্রাচীন সঙ্গীতাচার্যগণ এইরূপ করিয়া গিয়াছেন। কাড়াকে আঠার প্রকার, তােড়ীকে তের প্রকার, মল্লারকে তের প্রকার, নটকে নয় প্রকার ও সারঙ্গকে সাত প্রকার করা হইয়াছে। ইহাদিগকে যথাক্রমে অষ্টাদশ-কাড়া, ত্রয়ােদশ তােড়ী, এয়ােদশ-মল্লার নব-নট ও সপ্ত-সারঙ্গ বলা হয়। কি কি রাগরাগিণী কোন কোন শ্রেণীভুক্ত তাহ। নিম্নে দেওয়া যাইতেছে। দরবারী-কাড়া, নায়কী-কাড়া, মুদ্রা-কান, কৌশকী-কাড়া, হােসেনী-কাড়া, সুঘরাই-কাড়া, কাফি-কাড়া, শ্যাম-কাড়া, গারা-কাড়া কোহল-কাড়া, টঙ্ক-কানড়া মিয়াকী-জয়জয়ন্তী, আড়ান, বাহার, সাহানা ও বাগে । দরবারী-তােড়ী, বাহাদুরী-তােড়ী, নচারী-তােড়ী, লক্ষী-তােড়ী, খট- তােড়ী, দেশী-তােড়ী, মুদ্রা-তোড়ী, সূহ-তােড়ী, সুঘরাই-তােড়ী, জৌনপুরী- তােড়ী, আশাবরী, গুর্জরী ও গান্ধারী। শুদ্ধ মল্লার, মেঘ, সুরট, দেশ, গোঁড়, জয়-জয়ন্তী, ধূরিয়া-মল্লার, রামদাসী-মল্লার, সুরদাসী-মল্লার, নট-মল্লার, অরুণ-মল্লার, মিয়া-মল্লার ও ঝঝ-মল্লার। নট-নারায়ণ, ছায়ানট, কদম্ব-নট, অরুণ-নট, আহর-নট, কেদার-নট, হাম্বীর-নট, কামােদ-নট ও কল্যাণ নট বৃন্দাবনী-সারঙ্গ, মধুমাত-সারঙ্গ, গৌড়-সারঙ্গ, সামন্ত-সারঙ্গ, বড়হংস- সারঙ্গ, সুর-সারঙ্গ ও মিয়া-সারঙ্গ। কাড়া তোড়া মল্লার নট গীত-উপক্রমণিকা # । মহম্মদ শাহর রাজত্বকালে পুনরায় সঙ্গীতের উত্থান আরম্ভ হয়। সেই সময়ে সদারঙ্গ, অদারঙ্গ প্রভৃতি অদ্বিতীয় গায়কগণ সঙ্গীতের উৎকর্ষ সাধন করেন। সারঙ্গ রচিত অনেক খেয়াল গান আছে। ঐ সময় হইতে খেয়াল গান নবজীবন প্রাপ্ত হয়। জৌনপুরের রাজা সুলতান হােসেন সিকী রচিতও অনেক খেয়াল গান দেখা যায়। বস্তুতঃ, সদারঙ্গ ও সুলতান হােসেন সিকী এই দুইজন সঙ্গীতাচার্যের প্রভাবেই খেয়াল ভারতীয় সঙ্গীতভুক্ত হয়। আমীর খশরু তাহা সৃষ্টি করিলেও সমগ্র ভারতে খেয়াল সে সময়ে প্রচলিত ছিল না। তখন পর্যন্তও তাহা দিল্লীর দেশী গীতরূপে ছিল। এই হিসাবে সদারঙ্গ ও সুলতান হোসেন সিকী খেয়ালের দ্বিতীয় জন্মদাতা। সেই সময়েই গোলাম নবী নামে একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তাঁহার টপ্পার সৃষ্টি স্ত্রীর নাম শােরী মিয়া। শশারী মিয়া ও গােলাম নবী এই দুইজনই টপ্পা গীতের সৃষ্টি করেন। টপ্পা যে রীতিতে গাওয়া হয়, পূর্বে নিম্নশ্রেণীর উষ্ট্ৰচালকগণ এই রীতিতে গান করিত। গােলাম নবী এই পদ্ধতিকে মার্জিত করিয়া ভারতীয় সঙ্গীতভুক্ত করেন। গােলাম নবী:তাহার স্ত্রী শােরী মিয়াকে ইচ্ছা করিয়া বহুদূরে রাখিয়া বিরহ-সঙ্গীত লিখিতেন ও গীতে ভণিতা শােরী মিয়ার নামে দিতেন। তাঁহার অধিকাংশ গানই শােরীর নামে ভণিতা লিখিত। কয়েকটি গান গোলাম নবীর নিজ নামেও দেখা যায়। শশারী মিয়ার নিজের রচিত গানও আছে। তাহাতে মিয়া সম্বােধন করিয়া লেখা হইয়াছে। তাহা সবই শােরীর টপ্পা নামে বিখ্যাত। সেই সময়ে হমদম্ সারসার প্রভৃতি কয়েকজনও শােরীর টপ্পা গীত রচনা করিয়া গিয়াছেন। টপ্পা গীতের সঙ্গেও বয়-তবলার সঙ্গতই হয়। টপ্পার গতিও খেয়াল গীতের মত হালকা। টপ্পার সৃষ্টি মহম্মদ শাহর কালেই, অর্থাৎ ১৭২১ খৃষ্টাব্দের পরে। ইহার অনেক পরে লক্ষে নগরে ঠুমরী গানের সৃষ্টি হইয়াছে। লক্ষ্ণৌর ঠীর সৃষ্টি নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ, প্রথম চুরী গানের সৃষ্টি করেন এবং সনদ ও কদর নামক দুইজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ইহাকে নানাভাবে বিস্তৃত করেন। এই তিন গীত-উপক্রমণিকা জনই ঠুরী গায়ক ও গীত-রচয়িতা ছিলেন। নবাব ওয়াজেদ আলী খুব নৃত্য করিতে পারিতেন। দয়াসখী, কৃপাসখী প্রভৃতি কয়েকজন সঙ্গীত উৎকৃষ্ট ঔরী গান রচনা করিয়া সঙ্গীত-জগতে যশস্বী হইয়াছেন। এই পর্যন্ত কথাচ্ছলে যে কয়েকজন সঙ্গীতবিশারদের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে তাহারা ব্যতীত আরও অনেক সঙ্গীতজ্ঞের গান সঙ্গীতজগতে প্রচলিত আছে। আলাউদ্দীন খিলিজীর সময় হইতে সমস্ত প্রসিদ্ধ গীত-রচয়িতাগণের গান আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে। ওস্তাদগণ তাহাদের রচিত গানই গাহিয়া থাকেন। এইসব গান হিন্দী, পঞ্জাবী, আরবী ও পারসী ভাষায় রচিত। বাংলা ভাষাতেও ঐসব গানের অনুকরণে গীত সৃষ্টি হইয়াছে। মহাত্মা রামমােহন রায়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচাৰ্য্য, কালীভক্ত রামপ্রসাদ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি অনেকের রচিত কতক ধ্রুপদ, খেয়াল আছে। (নিধুবাবুর টপ্পা প্রসিদ্ধ। বাংলাতে শােরী মিয়ার অনুকরণে টপ্পা গীত তিনিই প্রথম সৃষ্টি করেন। নিধুবাবুর প্রকৃত নাম রামনিধি গুপ্ত। রবীন্দ্রনাথের রচিতও কয়েকটি টপ্পা গীত আছে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
তানপূরা-
পরিচয়
তানপূর-পরিচয়
আমাদের দেশে তানপুরার সাহায্যে গীত করিবার রীতি পুরাকাল
হইতেই চলিয়া আসিতেছে, ইহার শুদ্ধ নাম তাম্বুরা। চলিত ভাষায় ইহাকে
তানপুরাই বলা হয়। যাহার মধ্যে তা পরিপূর্ণ তাহাই তাপূরা—এইরূপ
অর্থেই এই নাম ব্যবহৃত হয়।
এখানে তানপূরার অংশগুলির পরিচয়
দিতেছি।
১। এক নম্বর পদার্থটিকে তুম্ব বা বাউল বলা হয়। ইহা শুদ্ধ
লাউয়ের খােলা দিয়া প্রস্তুত করা।

৫৪ গীত-উপক্রমণিকা ২। দুই নম্বর পদার্থটিকে তবলী বলে। ইহা কাঠ দিয়া প্রস্তুত করে এবং ইহা তুম্বের সঙ্গে উত্তমরূপে সংযুক্ত থাকে। ৩। তিন নম্বর পদার্থটি তবলী ও বাউলের সঙ্গে সংলগ্ন, ইহার ভিতর খােল। ইহার নাম ডাণ্ডী । ৪। চার নম্বর পদার্থটি যন্ত্রের খুটি বা কান। তানপূরায় মাত্র চারটি তার থাকে। তারগুলি কানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, এজন্য কানের দরকার হয়। পাঁচ নম্বর পদার্থ হাড়ের বা হাতীর দাত দিয়া তৈয়ারী, ইহার নাম আড়ী। ছয় নম্বর পদার্থটি তবলীর উপর একটি ছােট ঢৌকী, ইহার নাম সােয়ারী। ৭। সাত নম্বর পদার্থটি তুষের সঙ্গে সংযুক্ত। ইহার নাম পন্থি। তারগুলির একটা দিক এই পন্থির সঙ্গে বাঁধিতে হয় এবং ইহারা সােয়ারীর উপর দিয়া আড়ীর মধ্যবর্তী ছিদ্র দিয়া গিয়া কানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। কানগুলি ঘুরাইয়া খাদ ও চড়া সুর বাহির করা হয়। আট নম্বর পদার্থগুলির নাম ন্যাকা। এইগুলি প্রতি তারের সঙ্গে সংলগ্ন, এইগুলি সােয়ারী ও পন্থির মধ্যভাগে তবলীর উপর থাকে। ম্যাকাগুলি ছােট ছােট মারবে। ইহাদের মধ্য ভাগে একটি ছিদ্র আছে। এই ছিদ্র দিয়া তারগুলি প্রবেশ করাইয়া লইতে হয়। সুরের ঈষৎ পরিবর্তন ( খাদে:বা:চড়ায়) করিতে হইলে ম্যাকাগুলির দরকার হয়। তানপূরাতে চারিটি তার থাকে। যাহার কণ্ঠ যেরূপ, অর্থাৎ যে যে-সুরকে খরজ করিয়া গান করে, তানপুরার মধ্যবর্তী দুইটি তার সেই সুরে বাঁধিতে হয়। ‘খরজ পরিবর্তন’ পরিচ্ছেদে বলা হইয়াছে যে, গায়ক এমন একটি সুরকে খরজ করিয়া লইবে, যাহা হইতে খাদের দিকে এবং চড়ার দিকে অনায়াসে যাতায়াত করিতে পারা যায়। যে-সুরটিকে খরজ ধরা হইবে তাহাই মুদারার সা হইবে। খাদের দিকে তাহার পরবর্তী সুরটিই উদারা হইবে এবং খরজের পরবর্তী চড়া স হইতে তারা সপ্তক আরম্ভ হইবে। সাধারণতঃ উদারার তানপুরা বন্ধন ও ধারণ গীত-উপক্রমণিকা মধ্যম ও তাত্মার পঞ্চম সুর গলায় আসিলেই সব গীত করা যায়। আলাপ করিতে উদারার সব কয়টি সুরই কণ্ঠ হইতে উচ্চারণ করিতে হয়। যাহা হউক, কণ্ঠের ওজন অনুযায়ী তানপুরার মধ্যের দুইটি তার মুদারার সা করিয়া লইতে হইবে, এই তার দুইটিকে জুড়ির তার কহে। জুড়ির তার দুইটি লৌহ- নির্মিত হইবে। জুড়ির তার কণ্ঠের ওজনে বাঁধিয়া ইহাদের বামদিকের তারটি খাদপঞ্চমে বাঁধিতে হয়। জুড়ির তার হইবে মুদারার সা আর বামদিকের তারটি হইবে উদারার পা। এই তারটি পিতলের তৈরি হওয়া চাই। ডান- দিকের তারটি জুড়ির খাদের ষড়জ সুরে, অর্থাৎ উদারার স সুরে বাঁধিতে হয়। ইহাও পিতলের মােটা তার হওয়া দরকার। প্রথমে কণ্ঠের ওজন অনুযায়ী মুদারার স জুড়ির তারে বাঁধিতে হয়। তারপর সেই অনুপাতে বামদিকের তারটি উদারার প সুরে ও ডান দিকের তারটি উদারার স সুরে বাঁধিতে হইবে। গান করিবার সময় তানপূরার তুম্ব কোলের উপর রাখিয়া ডানদিকের বঁধের উপর যন্ত্রের ডাণ্ডী রাখিতে হয়। কঁাধের একটু উপর ডান হাতের মধ্যম অঙ্গুলী দিয়া প সুরের তার দুটি স সুরের তারের উপর পর পর আঘাত করিতে হয়। তারের উপর আঘাত যেন খুব জোরে না পড়ে। মৃদু আঘাতেই ভাল আওয়াজ হয়। এস্রাজ, সারেঙ্গী বা বেহালা ইত্যাদির ন্যায় তানপূরা দিয়া সবটি গান বাজাইতে পারা যায় না। গান গাহিবার সময় কেবল ক্রমান্বয়ে তারগুলির উপর আঘাত করিতে হয়। তানপুরা সুর রাখিবার জন্যই কেবল ব্যবহৃত হয়। উচিত নয় প্রভেদ। পূর্বে তিহিসাবে স্বরঅন্তর কিরূপ তাহা দেখান হইয়াছে। তাহাই হারমােনিয়মে প্রকৃত স্বরঅন্তর, কিন্তু হারমােনিয়মের স্বরঅন্তর ও শ্রুতিহিসাবে স্বরঅন্তরের গান করা মধ্যে অনেক তিহিসাবে স্বরঅন্তর তিন ভাগে বিভক্ত যথা :- বৃহদন্তর, মধ্যান্তর ও ক্ষুদ্রান্তর, কিন্তু হারমােনিয়মে বৃহদন্তর ও ক্ষুদ্রান্তরবিশিষ্ট (পূর্ণান্তর ও অৰ্ধান্তর) করিয়া লওয়া হইয়াছে। পাশ্চাত্য সঙ্গীতজ্ঞগণ এক অষ্টকের ধ্বনিরেখাকে তিপ্পান্নটি সূক্ষ্ম অংশে ভাগ করিয়া কেন গীত-উপক্রমণিকা : গ দেখাইয়াছেন যে, স হইতে র-এর অন্তরসংখ্যা ৯; র হইতে গ-এর ৮ হইতে ম-এর ৫; এবং ম হইতে প ৯; প হইতে ধ৮; ধ হইতে ন ৯; ও ন হইতে চড়া স ৫ হইবে। যথা : | ৯ ৫ ৮ ৮ == গ। ম ধ ন। কিন্তু হারমােনিয়ম, অর্গ্যান, পিয়ানো ইত্যাদি যন্ত্রের স্বরগ্রাম উপরােক্ত নিয়ম অনুযায়ী নহে। কোন কারণে ইহাদের সুরগুলিকে কিঞ্চিং এদিক- ওদিক করিয়া কৃত্রিম গ্রাম করিতে হইয়াছে। এক অষ্টকের ধ্বনিরেখাকে তিপ্পান্ন অংশে বিভক্ত করিয়া নিম্নলিখিত স্বরঅন্তরহিসাবে সুর করা হইয়াছে। | ৮ ৪২। ৮. । s র গ। म অতএব দেখা যাইতেছে যে, হারমােনিয়মের সুর কৃত্রিম, প্রকৃত নহে। তার উপর একটি পূর্ণান্তর সমান দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া, অর্থাৎ ৮৫ ভাংশকে দুই ভাগ করিয়া ৪২ ভাগে কড়ি-কোমলের সুর করা হইয়াছে। ইহাতে এই অসুবিধা হইয়াছে যে, কাড়ার ধে। বা গো হারমােনিয়মে সঠিক ভাবে বাজান যায় না। এইরূপ প্রত্যেক রাগরাগিণীতেই একটা-না-একটা ভুল দেখা যায়। আমাদের সঙ্গীতের একটা বিশেষত্ব এই যে, একটা সুর আর একটা সুরের সঙ্গে একটানা ভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু হারমােনিয়মের কাটা কাটা সুর হওয়াতে সুরগুলি পৃথক হইয়া পড়ে। কান যাহা শুনিতে পায় কণ্ঠ তাহাই অজ্ঞাতে অনুসরণ করে। একটা কর্কশ আওয়াজ কানের অতি নিকটে বাজিতে থাকিলে কণ্ঠও কর্কশ হইয়া পড়ে। কাজেই হারমােনিয়মের কৃত্রিম সুর কানের কাছে বাজিতে থাকিলে কণ্ঠও তাহাই অনুসরণ করে ও কণ্ঠে কৃত্রিম সুর বসিয়া যায়। তারপর ভেজাল জিনিষ সর্বদা খাইয়া যেমন খাঁটি জিনিষের স্বাদ গ্রহণ করিবার ক্ষমতা কমিয়া গীত-উপক্রমণিকা যায় সেইরূপ সৰ্ব্বদা হারমােনিয়মের আওয়াজ কানের নিকটে বাজিতে থাকে বলিয়া কোষ্টা প্রকৃত ও কোষ্টা কৃত্রিম সুর তাহা বুঝবার ক্ষমতা থাকে না। তারপর উপর, বাজারে-হারমােনিয়মের আওয়াজ কর্কশ বিলাতী হারমােনিয়মগুলির সুরে কিছু মিষ্টত্ব আছে। কিন্তু তাহাদের মূল্য অত্যন্ত বেশী বলিয়া বাজারের সস্তা কর্কশ আওয়াজযুক্ত হারমােনিয়ম ক্রয় করা হইতেছে। এখন কর্কশ আওয়াজ যুক্ত যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গত করিলে কণ্ঠও কর্কশ হইয়া পড়ে। ধ্রুপদ, খেয়াল ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের গীত হারমােনিয়মের সাহায্যে সুচারুরূপে গাহিতে পারা যায় না। কারণ ঐ সব গানে সুরের কাজ অত্যন্ত বেশী করিতে হয়। গীতের সঙ্গে সঙ্গে হারমােনিয়ম বাজাইয়া এবং তাল দিয়া সুরের কাজ তত করিতে পারা যায় না। আবার যদি অন্য কেহ গীতের সঙ্গে হারমােনিয়ম বাজাইয়া যায় তাহা হইলেও গীত সুমধুর হয় না বা গীতটি পূর্বে একবার গাহিয়া বাদককে শুনাইতে হইবে। এরূপ নানা অবিধা দেখা যায়। কিন্তু তানপুরাতে চারিটি তারে পুনঃ পুনঃ আঘাত দিয়া যাইতে হয় মাত্র। কাজেই তানপূরাতে গায়ক তার নিজের ইচ্ছানুযায়ী গীত করিতে পারেন এবং বাঁ-হাত দিয়া তুম্বের উপর তাল দিতে পারেন। সবচেয়ে ভাল সারেঙ্গী বা বেহালার সঙ্গে সঙ্গত করিয়া গান করা উচিত। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি, নিজে যন্ত্র বাজাইয়া উত্তমরূপে গাওয়া যায় না। অন্য একজন গানের সঙ্গে সঙ্গে বাজাইলে চলিতে পারে; কিন্তু তাহাতে কি অসুবিধা হয় তাহা পূৰ্ব্বে বলিয়াছি। এইজন্য তানপুরার সাহায্যে গান করাই তানপূরা কেন ভাল শ্রেয়। ; অনেকের মনে এই কথা হইবে যে, তানপুরায় মাত্র দুইটি সুর আছে, স ও প; কিন্তু খুব মনােনিবেশ করিয়া দেখিলে দেখা যায় যে, আমরা প্রায় সব কয়টি সুরই পাই। প্রথম পঞ্চমের তারে আঘাত করিলে সুর পঞ্চম হইতে মীড়যােগে ঋখব সুরে অবরােহণ করিয়া পুনঃ প-তে আসিয়া দাঁড়ায়। আবার গীত-উপক্রমণিকা পঞ্চম তারে আঘাত করিয়া জুড়ির তারে আসিলেই ম সুর পাই। তখন পঞ্চমের ভার ষড়জ হইয়া দাড়ায় ও জুড়ির তার মধ্যম হয়। যেন সম একটা মীড়। আবার জুড়ির তার হইতে ষড়জের তারে আঘাত পড়িলেই তাহা স গ র স ধ্বনি করে। প্রত্যেকটি তারই কেবল একটা সুর ধ্বনিত হয় না। যে-সুরে তারটি বাঁধা থাকে, সেই সুরের খাদে ও চড়ায় কয়েকটি সুরই ধ্বনিত করে। একটা তারে আঘাত করিলেই তাহার কম্পনসংখ্যা বাড়িয়া ও কমিয়া দুই-একটা সুর খাদে ও চড়ায় গিয়া ক্রমে শুদ্ধ ও কড়ি-কোমলের সুরগুলি একটানাভাবে ধ্বনিত করে ও শেষে যে-সুরে তারটি বাঁধা থাকে, সেই সুরে আসে ও ক্রমে সুর ক্ষীণ হইয়া মিশিয়া যায়। এইজন্য তানপুরার চারি তার হইতেই আমরা শুদ্ধ ও বিকৃত বারটি সুর পাই। আবার আমরা জানি, স মূল সুর । এক স সুর হইতেই সব সুরের উৎপত্তি। এইজন্য প্রত্যেক সুরের সঙ্গেই স-এর সম্বন্ধ আছে। এ স-কে বঁধিয়া লইলেই চলিতে পারে। যেমন, একতারাতে মাত্র খরজের তারই বাধা আছে। তানপুরার তারগুলি সাধারণতঃ যে আওয়াজ করে তাহা খুব মৃদু হয়। সুর জোর করিবার জন্য প্রত্যেকটি তারে সুতার একটা আংটি পরাইয়া তাহা সােয়ারীর উপর রাখিতে হয়। সুতর আংটিটি এমন স্থানে রাখিতে হইবে যেন তারে আঘাত করিবামাত্র তার সােয়ারীর উপর ঘর্ষিত হয়। তাহাতেই আওয়াজ জোর হয়। এইরূপ করাকে সুর-জোয়ারী করা বলে, প্রথম শিক্ষার্থীর পক্ষে তানপুরা জোয়ারী করিয়া গীত সাধনা করা উচিত নহে। কারণ, জোয়ারী করিলে তানপুরা হইতে ঝঝনে আওয়াজ বাহির হয়। ইহা কর্কশ ধ্বনি। প্রথম শিক্ষার্থীর কণ্ঠ অজ্ঞাতে ঐরূপ ধ্বনি:অনুসরণ করিয়া:কণ্ঠমাধুৰ্য্য নষ্ট করিয়া ফেলে। আমাদের দেশে যন্ত্রনির্মাতাগণও এখনও জানেন না যে, কিরূপে যন্ত্রের আওয়াজ জোরাল করা যায়। পাশ্চাত্য দেশবাসী বলেন যে, সােয়ারী যত শক্ত কাঠের বা জিনিষের হইবে ধ্বনিও ততই মৃদু হইবে। আর মােয়ারী বদি নরম ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রবিশিষ্ট ( porous wood ) কাঠের হয় গীত-উপক্রমণিকা ধ্বনি ততই প্রবল হয় । আমাদের দেশে সােয়ারী শক্ত কাঠ বা হাতীর দাত দিয়া তৈরি হয়, সেইজন্য ধ্বনি মৃদু হয়। শিক্ষার্থীর জন্য উপরােক্ত কাঠ দিয়া মােয়ারী প্রস্তুত করিয়া ব্যবহার করিলে ভাল হয়। আর একটি কথা এই যে, তানপুরার তুম্বটি যত বড় হইবে আওয়াজও তত গমকপূর্ণ হইবে । গমকপূর্ণ তানপুরাই ব্যবহার করিতে হয়। প্রথম শিক্ষার্থীর সুরজ্ঞান জন্মিলে কয়েকটি গান শিখিয়া পরে তানপুরা লইতে হয়। প্রথমেই তানপুরা লওয়া উচিত নহে। হারমােনিয়ম লইয়া গান করিতে হইলে তাহা আস্তে বাজাইয়া গান করা উচিত। যেন গলার স্বরের উপরে হারমােনিয়মের আওয়াজ না উঠে। অনেকে এত জোরে বেলাে ( bellow) করিয়া বাজান যে তাহাতে কণ্ঠস্বর ঢাকিয়া ফেলে। পরে এইরূপ হয় যে, হারমােনিয়ম ছাড়া গলায় আওয়াজই আসে না। হারমােনিয়মের সঙ্গে গান করিতে হইলে গানের দিকে সম্পূর্ণ মন দিয়া গাহিতে হইবে। অনেকে গীত করিতে করিতে নানাবিধ কৌশল করিয়া হারমােনিয়ম বাজাইবার চেষ্টা করেন। তাহাতে এই হয় যে, সুরের দিকে তত মনােযােগ থাকে না এবং গান সুমধুর হয় না। সবচেয়ে ভাল, কোনরূপ যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া গান করা- এইরূপ করিলে যেখানে সেখানে সুচারুরূপে গান করিতে পারা যায়। তানপুরা লইয়া সাধনা করার পূর্বে প্রথমেই দেখিতে হইবে যন্ত্রটির সুর উত্তমভাবে বাঁধা কি-না। তানপুরার বন্ধন খুব ভাল না হইলে সঙ্গত করিয়া সুখ পাওয়া যায় না। তানপুরার তারগুলি বাঁধিয়া চারি তার ধ্বনিত করিলে যদি সুরের রেশ কঁপিতেছে বুঝা যায়, তবে বুঝিতে হইবে যে, সুরের মিল হয় নাই। আর যদি সুরের রেশ অকম্পিত অবস্থায় থাকে তবে বুঝিতে হইবে যে, সুরের সূক্ষ্ম মিল হইয়াছে। তানপুরার বন্ধন শিক্ষা করিতে হইলে বেশ কয়েক দিন সময় লাগে। ওজন মত সুর নিজে নিজে ঠিক করা প্রথমশিক্ষার্থীর পক্ষে খুব কঠিন। তানপূরায় উত্তম সুর বন্ধন থাকিলে ইহার রিন্ ঝিম্ ধ্বনি কানের কাছে যখন বাজিতে থাকে তখন বড়ই আনন্দ পাওয়া যায়। এইজন্য তানপুরার সাহায্যে গান করা উচিত। তানপূরাই ভারতীয় হারমােনিয়ম।

নবম পরিচ্ছেদ বরঅন্তর সর্বপ্রথমে হারমােনিয়মের কী-বাের্ড অনুযায়ী :স্বরঅন্তর দেখান হই- আছে। তারপর দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথমে তিহিসাবে স্বরঅন্তর দেখান হইয়াছে। এখন পাশ্চাত্য মনীষিগণের মতে সূক্ষ্ম স্বরঅন্তর কিরূপ তাহা দেখাইতেছি। প্রতীচ্যের বৈজ্ঞানিকগণ দেখাইয়াছেন যে, স্বাভাবিক স্বরগ্রামকে অতি সূক্ষ্মভাবে দেখিতে গেলে স হইতে র-এর অন্তর যদি ৫১ হয় তবে র হইতে গ-এর অন্তর ৪৬ ও গ হইতে ম-এর অন্তর ২৮ হইবে। কাজেই ম হইতে প-এর অন্তর ৫১। প হইতে ধ-এর অন্তর ৪৬; ধ হইতে ন-এর অন্তর ৫১; এবং ন হইতে চড়া স-এর অন্তর হইবে ২৮। || ৫১ | ৫১ | ২৮ | ৪৬ ২৮ ৪৬ র গ ম। প ধ ন। এই অন্তর-বিভাগ হইতে মােটামুটিভাবেও স্বরতন্তর ধরা হইয়াছে, তাহা পূর্বে বলা হইয়াছে। যেমন— ৮ - স র ম প ন म হিসাবে সুরের অনুপাত কম্পন হইতেই যে সুরের উৎপত্তি তাহা কথাপ্রসঙ্গে পূর্বে বলা হইয়াছে এবং একটা সুরকে নির্দিষ্ট করিয়া চড়ার দিকে যাইতে থাকিলে কম্পন-সংখ্যাও বাড়িয়া যাইবে, ইহাও পূর্বে বলা হইয়াছে। এই নির্দিষ্ট সুর যতবার কম্পন হইতে উৎপন্ন হইবে, এই কম্পন-সংখ্যার দ্বিগুণ কম্পন- সংখ্যায় এমন একটি সুর পাওয়া যায় যাহা সেই নির্দিষ্ট সুরের সঙ্গে একত্র বাজিতে থাকিলে দুইটি সুরই যে বাজিতেছে তাহা বুঝা যাইবে না, অর্থাৎ গীত-উপক্রমণিকা নির্দিষ্ট সুরটি যদি সেকেণ্ডে চব্বিশটি কম্পন হইতে উৎপন্ন হয় তবে আটচল্লিশ বার কম্পন হইতে এমন একটি সুর পাওয়া যাইবে যে, দুইটি সুর একত্র বাজিলে তাহা এক সঙ্গে মিশিয়া যাইবে। আমরা জানি যে, স সুর ও চড়া স বা খাদ স সুর একত্র ধ্বনিত হইলে একসঙ্গে মিশিয়া যায়। র সুর ও চড়া র বা খাদ র সুর অবিকল মিশিয়া যায়। এইরূপ উদারা সপ্তকের সুরগুলি মুদারা সপ্তকের সুরগুলির সঙ্গে ও মুদারা সপ্তকের সঙ্গে তারার সপ্তকের সুরগুলি অবিকল মিশিয়া যায়। এখন পূর্বোক্ত নির্দিষ্ট সুরটি যদি স হয় ও তাহার কম্পন-সংখ্যা চব্বিশ হয় তবে চড়া স সুর আটচল্লিশটি কম্পন হইতে উৎপন্ন হইবে। বৈজ্ঞানিকগণ আবিষ্কার করিয়াছেন যে, স-এর অনুরণন-বেগ এক হইলে চড়া স-এর অনুরণন-বেগ দুই হইবে ও অন্যান্য সুরগুলির অনুরণন নিম্নলিখিত অনুপাতে হইবে। যথাঃ- म র গ ম ধ স ১৪ ১ এই অনুরণন-বেগ অনুযায়ী স-কে চব্বিশ কম্পনযুক্ত ধরিলে অন্যান্য স্বর- কম্পন কত হইবে, তাহা নিম্নে দেওয়া গেল। যথা :- স গ ম প ন म ১৪ 83 ৪০ ৪ সেকেণ্ডে চব্বিশ বার কম্পন হইলেই যে স সুর হইবে তাহা নহে। এখানে অনুপাতটি বুঝাইবার জন্য মাত্র চব্বিশ সংখ্যা লওয়া হইয়াছে! চব্বিশ স-তে ধরিলে অন্যান্য সুরের কম্পন-সংখ্যায় ভগ্নাংশ হয় না। এইজন্যই চব্বিশ হিসাবে স্বর- স-তে ধরা হইয়াছে। সুরের অন্তরগুলি কম্পন-সংখ্যা দিয়াও বিশেষভাবে বুঝান যায়। স হইতে র-এর অন্তর বাহির করিতে হইলে স-এর সংখ্যা দিয়া র-এর গীত-উপক্রমণিকা কম্পন-সংখ্যাকে ভাগ করিলেই চলে। এই নিয়ম অনুসারে স্বরঅন্ত এইরূপ হয়। যথা :- কম্পন সংখ্যা २४-२१ === ২ ব ২৭+৩০ an ৯০ গ -ম ৩০ ৩১ - ৩ 1 ৩২+৩৬ এর ১ ই ও = p ৩৬+৪০ ৪০ + ৪৫ == কে ন- ৪৫ ৪৮ অতএব '। ল? ১। ২ঃ। । । । . = র ম প ধ ন স পরস্পরমিল গ এখানেও তিনপ্রকার অন্তর-শ্রেণী পাওয়া যাইতেছে ও বৃহদান্তর, ও মধ্যান্তর ও ক্ষুদ্রান্তর। সুরগুলির মধ্যে এইরূপ অনুপাত কেন হইল, তাহা কেহ বলিতে পারেন । সুরগুলির মধ্যে একটা সুন্দর মিল দেখা যায়। বাদী-সংবাদী বুঝাইতে কতক বলা হইয়াছে। পূৰ্বে বলিয়াছি, মানুষ মিল চায়। সুরের মিল যে স্থানে তাহা মানুষের কানে মিষ্টি লাগে! সমু স সুরের সঙ্গে চড়া স সুরের সবচেয়ে বেশী মিল। তারপরেই স-এর সঙ্গে প-এর মিল। তারপর ম-এর মিল। তারপর গ এর মিল। এইসব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করিতে হইলে দুইজন শিক্ষার্থী দুইটি তারের যন্ত্র লইয়া পরীক্ষা করিলেই ভাল হয়। দুইটি যন্ত্রই একসুরে বাঁধা, দুইটি তারের যে-কোন একটিতে আঘাত করিলেই অন্য তারটি আপনা হইতেই কঁপিয়া উঠে। ইহাকে sympathetic vibration বলে।

গত-উপক্রমণিকা তারযন্ত্র দুইটি এক সুরে অাছে কি-না দেখিতে হইলে দুইটি যন্ত্র একত্র ঠেকাইয়া রাখিয়া একটি যন্ত্রের তারে একটা সুতার আঙটি পরাইয়া লইতে হইবে ও অন্য যন্ত্রের বাঁধা তারে আঘাত করিতে হইবে। যদি একসুরে দুই যন্ত্র বাঁধা থাকে তবে তার আঙটিটি নড়িয়া উঠিবে। যাহা হউক, একজন একটা যন্ত্রের স সুরই ক্রমাগত ধ্বনিত করিতে থাকিবে। অন্যজন প্রথমে ঐ যন্ত্রে ধ্বনিত স সুরের চড়া স সুর ধ্বনিত করিবে। তাহাতে দেখা যাইবে যে, দুই সুরই প্রায় এক সুরে মিশিয়া গিয়াছে। দ্বিতীয় শিক্ষার্থী চড়া স হইতে অবরােহণ করিয়া ন সুর ধ্বনিত করিলে দেখা যাইবে যে, দুইটি সুরেরই পৃথক পৃথক ও অস্পষ্ট আওয়াজ হইতেছে। প্রথম জনকে ক্রমাগত স সুরই ধ্বনিত করিতে হইবে। দ্বিতীয় জন ধ সুর ধ্বনিত করিলেও পৃথক পৃথক ও অস্পষ্ট আওয়াজ হইবে। পতে আসিলেই দুইটি সুর বেশ নিশিয়া যাইবে ও স্পষ্ট আওয়াজ হইবে। তারপর ম-তে আসিয়াও মিল পাওয়া যাইবে এবং স্পষ্ট আওয়াজও হইবে। তারপর গ-তে অবরােহণ করিলেও বেশ কতক নিল হইবে। আবার এ-তে অস্পষ্ট আওয়াজ হইবে। কাজেই দেখা যাইতেছে যে, স্বাভাবিক গ্রামে প্রথম সস-তে উত্তম মিল, স-প ও সম-তে মধ্যম মিল ও স-গ-তে ভাল মিল দেখা যায়। প্রথমে আমরা স সুর নির্দিষ্ট করি। স-ই মূল সুর, স হইতেই সব সুরের উৎপত্তি। অন্যান্য সুরগুলিকে স সুরের আত্মীয় সুর বলিতে পারি। সাতটি সুর কিরূপে স-কে ঠিক করিয়া আমরা তাহার দ্বিগুণ চড়া স সুরটি পাই, তাহার পরই পাই আমরা প সুর পাই। স সুরের কম্পনের সংখ্যা ও স মুরের কম্পনের সংখ্যা যােগ করিয়া দুই দিয়া ভাগ করিলেই প সুরের কম্পন-সংখ্যা পাই। যেমন - স+স ২৪+৪৮ প; ৩৬ প ২ ৬৪ গীত-উপক্রমণিকা স্বরকম্পন-তালিকাতেও আমরা স সুরের চব্বিশ বার কম্পন হইলে প ছত্রিশ কম্পনযুক্ত হইবে, তাহা দেখিতেছি। প সুর পাইয়া আমরা ইহার পর গ সুর পাই। উপরােক্ত অঙ্ক অনুযায়ী-- = স+প ২৪+৩৬ ৩০ কাজেই গ=৩০ ২ কাজেই স-কে নির্দিষ্ট করিয়া আমরা প্রথমে চড়া স সুর পাই ও পরে গ পাই। আবার চড়া স-কে সুর করিয়া যদি খাদের দিকে তাহার পঞ্চম সুর পর্যন্ত আসি তবে পাই ম সুর। যেমন--স হইতে প-এর অন্তরে তিনটি পূর্ণান্তর একটি অৰ্দ্ধান্তর আছে। স হইতে তাহার খাদে তিনটি পূর্ণান্তর ও একটি অর্থান্তর পরে আমরা ম সুর পাই। মকে খরজবৎ ধরিলে চড়া স ম-এর পঞ্চম হয়। আবার ম+স ৩১+৪৮ ৪০ কাজেই ধ = ৪০ এখানে আমরা ম ও ধ সুর পাইতেছি । বার- স+গ ২৪+৩০ = ২৭ কাজেই র = ২৭ এখানে আমরা র সুরটি পাইতেছি। প-কে খরজ ধরিলে চড়া র সুর প-এর পঞ্চম হয়। পূৰ্বে দেখান হইয়াছে যে, স ও প-তে তিনটি পূর্ণান্তর ও একটি অৰ্ধান্তর পাওয়া যায়। হইতে চড়া র-তেও তিনটি পূর্ণান্তর ও একটি অৰ্ধান্তর আছে। সাধারণত চড়া র-তে ২৭×২= ৫৪ কম্পন হইবে । প গীত-উপক্রমণিকা আবার ২ সুর পাই। পx র ৩৫+৫৪ = ন = ৪৫ কাজেই ন = ৪৫ ২ এখানে আমরা ন র পাইতেছি। সুতরাং দেখা গেল, প্রথমে আমরা স-কে নির্দিষ্ট করিয়া স, প এবং গ পরে ম ও ধ এবং সর্বশেষে র ও ন সুর পাই। এইরূপে আমরা সাতটি সুর পাইয়াছি। পাশ্চাত্য প্রতীচ্যের সঙ্গীতাচাৰ্য্যগণ বলেন যে, ৪: ৫ : ৬ বা ১০ : ১২ : ১৫ সঙ্গীতের অনুপাতযুক্ত স্বর একত্র ধ্বনিত হইলেই কানে মিষ্টি লাগে । মূলসূত্র স গ প এই তিনটি সুরই ৪ ৫ ৬ অনুপাতযুক্ত। যেমন- গ প म প্রত্যেকটি রাশি হইতে ৬ লইয়া গেলে আমরা পাই- ৪ ও ৫ ও ৬, আবার- ম ৪ : ৪৮ প্রত্যেক রাশি হইতে ৮ লইলে ৪ ৫ ৬ হয় । ০ আবার প ন র ৪৫ ৫৪ প্রত্যেক রাশি হইতে ৯ লইলে ৪ : ৫: ৬ হয়। কাজেই দেখা যায়-৪ म ০০ গ প ২০ ২৪ ৩৬ ৪৫ ম ধ म न প ৪ ? ৩০ হিন্দুসঙ্গীতে স্বরসহ গীত-উপক্রমণিকা স : গ : প, স: প, ম : গ, ম : প বা এইরূপ অনুপাতযুক্ত স্বর আমরা অনেক পাই। পাশ্চাত্য সঙ্গীতাচার্যগণ এইরূপ সুরের একত্রিত ধ্বনিকে কর্ড (chord ) বলেন। বাংলাতে স্বরসন্ধি বা স্বরসম্বাদ বলা হয় । কর্ডগুলির উপযুক্ত ব্যবহারকে পাশ্চাত্য দেশে হারমােনি ( harmony) বলা। হয়। এই হারমােনিই পাশ্চাত্য দেশীয় সঙ্গীতের প্রধান অবলম্বন। প্রকৃতপক্ষে, নিরপেক্ষভাবে দেখিলে বুঝা যায়, কর্ডগুলির উপযুক্ত ব্যবহার আমাদের রাগরাগিণীতে সুন্দর ভাবে হয়, তবে পাশ্চাত্য সঙ্গীতাচাৰ্য্য- গণ ইহার উপর যেরূপ জোর দিয়া থাকেন, আমরা তেমন দিই না। সূক্ষ্ম স্বর- অন্তরগুলির আবেগভরা অনুরণনগুলিই আমাদের সঙ্গীতের মাধুৰ্য। সঙ্গীতে দুইটি জিনিষ,একটি মেলােডি ও অপরটি হারমােনি। আমাদের সঙ্গীত মেলােডি-প্রধান। আমাদের সঙ্গীতের বাদী-সংবাদীর মিলনই প্রকৃত স্বরসম্বাদ। একটা রাগরাগিণীতে যদি গ-কে প্রবল করি তবে তাহার পঞ্চম সুর ন-কে প্রবল করিতেই হয়। না হইলে রাগআলাপন প্রাণমাতন হয় না। গ-কে স ধরিলে ন তাহার পঞ্চম হয়। কাজেই এখানে স প অনুপাত। এখানে ইমন দিয়া বুঝান যাক—সঃ ন— ধঃ পঃ মীঃ- গঃ- গমীঃ পঃ নং- ২ঃ পঃ মীঃ গঃ- রঃ নঃ রঃ গঃ- রঃ নঃ বঃ স-ও। ইমন্ রাগিণীর স্বরবিন্যাসের এই টুকরা হইতেই দেখা যায় যে, প্রথম স হইতে ন-কে একটু প্রবল করিয়া গ-কে প্রবলতর করা হইতেছে ও গ হইতে প্রায় লাফ দিয়া ন-তে গিয়া ন-কে প্রবল করিতেছে। এই স্থানটির মাধুৰ্য সুন্দর। আবার গঃ- রঃ নঃ রঃ গঃ- রঃ নঃ রঃ সঃ- স্থানটিতে বারে বারে গ হইতে খাদ ন-তে গিয়া আমাদের প্রাণ মাতাইয়া তুলিতেছে। বেহাগ রাগিণীর সঃ গঃ-ঃ মঃ পঃ- নঃ- নঃ সঃ সঃ নং: নঃ পঃ মীঃ পঃ ••• এইটুকু আমাদের মন যেমন উদাস করিয়া তুলে এমন আর অন্য রাগ- গীত-উপক্রমণিকা রাগিণীতে পারে বলিয়া মনে হয় না। এখানে আমরা সগ পন দুইটি কর্ড সুন্দর পাইতেছি। স হইতে গ-তে বা প হইতে ন-তে মীড়যােগে অবরােহণ করিলেই প্রাণে সুধা বর্ষিত হয়। আবার আমরা যখন এক সুর হইতে কিছু দূরে আরােহণ বা অবরােহণ করি, আমরা হয় সেই সুরের পঞ্চম সুয়ে, চতুর্থ সুরে বা তৃতীয় সুরে, অর্থাৎ সুয়ের মিল যে-সব সুরে আছে সেই সব সুরেই যাই। ইহাই আমাদিগকে আনন্দ দেয়। সাধারণতঃ রাগরাগিণীর অন্তরাতে ম ব প হইতে ন ব স সুরে যাওয়াই বিশেষত্ব। প হইতে ন সুরের অনুপাত ৪: ৫। বাগেশ্রী রাগিণীতে ০ ০ সঃ রঃ মঃ পঃ পঃ নােঃ সঃ রঃ গেঃ - রঃ সঃ মােঃ- ধঃ পঃ নাে:-: গোঃ : মঃ রঃ স-। এখানে নাে হইতে গাে-তে লাফাইয়া গেলে বাগেশ্রী মধুর হয়। নাে সুর গো-এর পঞ্চম বা গাে বাদী হইলে নাে সংবাদী হয়। দুই সুরে এইরূপ মিল আছে বলিয়াই দুইটি সুর একত্র ধ্বনিত হইলেই মাধুৰ্য এইরূপ বাড়িয়া উঠে। যে-যে সুরের সঙ্গে যে-যে সুরের মিল আছে ঐ সব সুর গীতে ধ্বনিত করিয়া আমরা রাগরাগিণীর মাধুৰ্য বাড়াইয়া থাকি। ইহাই হিন্দুসঙ্গীতের প্রকৃত স্বরসম্বাদ।

দশম পরিচ্ছেদ সঙ্গীতে ভাব গীত রস সঙ্গীত একটা ললিত-কলা। কাব্য, চিত্র, ভাস্কৰ্য্য, স্থাপত্য ইত্যাদিও ললিতকলা। ললিতকলায় নানাবিধ রস সৃষ্টি করিতে হয়। নয় প্রকার রস আছে। যেমন- শৃঙ্গার, বীভৎস, হাস্য, ৱেী, বীর, ভয় করুণ, অদ্ভুত, শান্তি, এই রস নয়। -রাষ-গুণাকর ভারতচন্দ্র আদি রস, হাস্য রস, বীভৎস বা ঘৃণাসূচক রস, করুণ, ভয়, বীর রস, অদ্ভুত বা বিস্ময়জনক রস এবং শান্তরস এই নয়প্রকার রস গীত, বাদ্য বা নৃত্যে আবির্ভূত করিতে হয় বলিয়াই সঙ্গীত ললিতকলা। মানুষ অঙ্গের নিকট সহানুভূতি প্রকাশ করিয়া বা অন্যের নিকট হইতে সহানুভূতি পাইয়া সুখানুভব করে। একজন করুণ ভাবে কথা বলিলে শ্রোতার মনেও করুণ ভাব জাগিয়া উঠে। কাব্যে কোন স্থানে করুণ রসাত্মক অভি- ব্যক্তি থাকিলে পাঠকের মনকেও করুণ ভাবাত্মক করিয়া তুলিতে সমর্থ হয়। এইরূপ আমাদের ভাবসৃষ্টিই আমাদের সঙ্গীতের ধর্ম। সঙ্গীতাচাৰ্য্যগণের মতে এক-একটি সুর এক-এক ভাব উৎপন্ন করে। তাঁহারা বলেন- সা—সকল ভাব প্রকাশ করে ; ইহা বিশ্রামের সুর। রেকরুণ ও অনেক সময় উৎসাহসূচক। গা—শান্তিপ্রদ। মা-নিরাশ বা ভয়সূচক সুর। পাবীর ও উত্তেজক। ধা-করুণ শােকসূচক সুর। ;

গীত-উপক্রমণিকা ০ নিরো, বীর ও প্রদর্শক সুর। স সুরে আসিয়া আমরা বিশ্রাম করি। গ্রামের অন্যান্য সুরগুলি হইতে আয়ােহণ-অবরােহণ করিয়া আসিয়া সঃ সঃ নরঃ সঃ - । উচ্চারণ করিয়া থামিয়া যাই। তখন আর অন্য সুরে যাওয়ার ইচ্ছা করে না। কানার মঃ পঃ নোঃ ধােঃ নােঃ- সঃ-ঃ সঃ নোঃ সঃ রঃ- সঃ নটঃ সঃ -রঃ - - ইত্যাদি স্বরবিন্যাসের উৎসাহসূচক সুর বলিয়া মনে হয়। নোঃ- ধঃ পঃ মঃ গঃ রঃ ইত্যাদি দেশরাগিণীর স্বরবিন্যাসে র সুর করুণ ভাব ব্যক্ত করে। সঃ রঃ সঃ রঃ গঃ গঃ মঃ গঃ রঃ গঃ-ঃ গঃ-। এইরূপ স্বরবিন্যাসে গ শান্ত রসাত্মক। স—ঃ গঃ মঃ পঃ-নঃ - সঃ - নঃ - পঃ মীঃ পঃ মঃ - গঃ মঃ পঃ - মঃ গঃ - সঃ • -। এখানে ম পুর নিরাশাসূচক উদাস-করা ভাব-প্রকাশ করিতেছে। সঃ পঃ মঃ গঃ -: গমঃ পঃ : প। এখানে প সুরে দাড়াইতেই মন উত্তেজিত হইয়া উঠে বলিয়া বােধ হয় । সঃ রঃ গঃ পঃ - ধঃ - ধঃ - এইরূপ ভাবে ধ সুরে আসিলে শােকসূচক করুণ ভাব আসিয়া থাকে। ন উচ্চারণ করিলেই স উচ্চারণ করিবার ইচ্ছা হয়। এই জন্যই ন-কে প্রদর্শক সুর বলা হইয়াছে। যাহা হউক, গায়কের মনের অবস্থা যখন যেমন থাকে সুরেও তদনুযায়ী সঙ্গীতে ভাব ভাব আসে। এমন কি, উপরের সুরগুলিকে যেরূপ রসব্যঞ্জক ধরা হইয়াছে, গায়কের মনের ভাবভেদে ইহার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম হইতেও দেখা যায়। সঙ্গীতা- চাৰ্যগণ বলেন যে, রাগরাগিণীগুলি ভিন্ন ভিন্ন ভাব ব্যক্ত করে। হিন্দোলে হৃদয়ে বসন্তের ভাব আসে, মল্লারে বর্ষার ভাব আসে। কিন্তু তাহা প্রমাণ করা যায় না। এই জন্য আমরা তাহা বিশ্বাস করি না। বর্ষাকালে মানুষের গল্প-উপক্রমণিকা স্নায়ুমণ্ডলে কিরূপ স্পন্দন আন্দোলন হয়, তাহা যদি কোন বিজ্ঞানাচার্য্য আবিষ্কার করিতে পারেন, তবে হয় ত ইহা প্রমাণ করা যাইতে পারে যে, মল্লারে বর্ষার ভাব আসে। বর্ষাকালে মজুষের স্নায়ুমণ্ডলীতে যেরূপ স্পন্দন আন্দোলন হয়, মল্লাক্স রাগিণী শুনিয়া মানুষের স্নায়ুতে যদি ঠিক সেইরূপ স্পন্দন হয়, তবেই বুঝিতে হইবে যে, মল্লারে মানবহৃদয়ে বর্ষায় ভাব আসে। যাহা হউক, আমাদের ভারতীয় সঙ্গীতের প্রধান জিনিষ ভাব। আমাদের হিন্দুসঙ্গীতে বিশ্বের ভাব ব্যক্ত করে এবং ইহাই তাহার বিশেষত্ব। স্বর-উৎপত্তি ও বর্ণ-উৎপত্তির সম্বন্ধে আলােচনা করিলে দেখা যায় যে, পুষ্প-কল্পনা* দুইটিতে একটা সুন্দর সাদৃশ্য আছে। স্বর-উৎপত্তিতে দেখান হইয়াছে যে, এক ধ্বনি হইতেই সবগুলি সুরের উৎপত্তি হইয়াছে। আবার শুভ্র জ্যোতির মধ্যে সকল বর্ণই দেখা যায়। সূর্যের রশ্মি সাতটি বর্ণের সমষ্টি। ‘শুভ্র জ্যোতির মধ্যে সকল বর্ণ ই লীন। ঈশ্বর ভক্তির মধ্যে সকল ভাবই লীন শুদ্ধ ধ্বনির মধ্যে সকল সুরই লীন।” সাত সংখ্যাটিই পবিত্র বলিয়া অনেকে মনে করেন। সূর্যের আলােক সাতটি বর্ণের সমষ্টি। সাতটি সুরের সমষ্টি সপ্তক। সাত বারে এক সপ্তাহ। সাতটি গ্রহ। সমস্তই প্রায় সাত সংখ্যায় । যাহা হউক, সুরগুলির মধ্যে আমরা স নির্দিষ্ট করিয়া প ও গ প্রথমেই পাই। ইহাতে বুঝা যায় যে, স, গ ও প এই তিনটি সুর প্রধান। স মূল সুর এবং ইহার পরেই প ও গ-এর স্থান। সাতটি বর্ণের মধ্যে আমরা রক্ত, পীত ও নীল এই তিনটিই প্রধান দেখিতে পাই। এই তিনটি বর্ণের সাহায্যে আমরা সাতটি বর্ণ পাইতে পারি। আবার পূর্ব পরিচ্ছেদে দেখান হইয়াছে যে, স, গ ও প এই তিনটি সুরের সাহায্যে সাতটি সুরই পাইতে পারি। স, গ, প রত্রয়কে যদি সাতটি সুরের বর্ণ শ্রদ্ধেয় সীতাচাৰ্য রায় সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার বাহাদুর মহাশয় এই বিষয়ে গীত-উপক্রমণিকা রক্ত পীত ও নীলবর্ণ ধরা যায়, তবে অন্যান্য সুরগুলি কি বর্ণের হয় তাহা দেখা যাক। পূর্বে দেখান হইয়াছে যে, দুইটি সুরের কম্পন-সংখ্যা একত্র করিয়া আমরা এক-একটি সুর পাইয়াছি। যথা- স+গ ২৪+৩০ = ২৭ = র ২ স-কে রক্ত, গ-কে পীত, প-কে নীলবর্ণ ধরিয়া লইলে র সুর কি বর্ণের হয় দেখা যাউক। স + গ = র; রক্ত+পীত = র; কমলার। ২ এইরূপে-ম = গ+প ম= পীত + নীল ম= সবুজ আবারন = প + র ন = নীল + কমলা ন = বেগুনী ধ = প+ন ধ = নীল+বেগুনী ধ = অতি নীল ( প্রায় কাল) অতএব সাতটি সুরের বর্ণ আমরা পাইতেছি। ধ্বনি = শ্বেত ম = সবুজ র = কমলা (গোলাপী ) পত প= নীল = অতি নীল (কাল) ন = বেগুনী গীত-উপক্রমণিকা ভৈরবী ও পদ্ম এখানে ভৈরবী রাগিণীকে আমরা কোন ফুলের সঙ্গে বা কিরূপ ফুলের সঙ্গে কল্পনা করিতে পারি দেখা যাউক। থােঃ ধোঃ নাে:— খো: প মঃ গােঃ মঃ- { গগঃ রোঃ সঃ সঃ রোঃ গোঃ মঃ মঃ— গো- রো ইহা ভৈরবীর স্বরবিন্যাস। ইহাতে সব কয়টি সুরই ব্যবহৃত হইতেছে। আমরা পাইয়াছি যে, শ্বেতবর্ণে সব কয়টি বর্ণই আছে। “সঃ বঃ গোঃ মঃ – মঃ” হইতে ম-এর প্রাধান্য বুঝিতেছি। ম সবুজ। আবার —প থাে নাে স স রাে গো ম কাজেই এখানে, স আর প একই প্রকার। অতএব রক্তবর্ণ বা নীলবর্ণ যে-কোন একটা বর্ণ ধরা চলে। ধােগাে- রােঃ সঃ— ননা: ধঃ পঃ- গােঃ পঃ মঃ ধােঃ পঃ মঃ গােঃ রােঃ সঃ- এখানে রে। সুর ও স সুরের মিশ্রিত ধ্বনিতে আমরা সুখানুভব করি। রাে গােলাপী। নাে সুরের মত ধাে-ও আমাদের হৃদয় আন্দোলিত করে। ধাে-গাঢ় নীল। ধাে_গো:-এর আরােহণ মধুর হইয়া কানে বাজে। প: মঃ গেঃ- রঃ গাে- সঃ গোঃ- রােঃ অথবা সঃ ধােঃ নােঃ সঃ– গাে:-:-: মঃ গােঃ- এখানে গাে মধুর। গে পীত। দেখা যায়, সবুজ বর্ণের মধ্যে শ্বেত, পীত, গােলাপী, নীল বর্ণের ফুলের সঙ্গে কল্পনা করা চলে। ভাবের কথায় সবুজ বা তদনুরূপ বর্ণের পাতাযুক্ত লতায় বা গাছে শ্বেতবর্ণের ফুল-পীতাভাযুক্ত। এখানে পীতাভা কোরক- গীত কণিকা বিশিষ্ট শ্বেতপদ্ম, গোলাপীপদ্ম বা নীলপও হইতে পারে। ব্যক্তির নির্মল বায়ুতে প্রস্ফুটিত পদ্ম জাতীয় ফুলের সঙ্কে ভৈরবী রাগিণী বিশেষ সাদৃশ্য আছে। সকা বেলা ভৈরবী রাগিণীর আলাপ শুনিলে মনে হয় এ যেন একটা সকাল বেলার পদ্মফুলে তােড়া। এইরূপ প্রতি রাগরাগিণীকেই ফুল বা ফুলের তােড়ার সঙ্গে কল্পনা করা চলে। প্রাচীন সঙ্গীত-গ্রন্থকারগণ রাগরাগিণীগুলিকে একটি বিরাট পরিবারে বিভাগ করিয়া গিয়াছেন। ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন প্রকার বিভাগ, ইহাতে মনে হয় প্রাচীন সঙ্গীতাচার্যগণ কল্পনাতেই এইরূপ বিভাগ করিয়াছিলেন। রাগকে পুরুষ জাতীয় ও রাগিণীকে স্ত্রী জাতীয় বলা হয়। এতদ্ব্যতীত আবার রাগরাগিণীর পুত্র (উপরাগ) ও পুত্রবধূ ( উপরাগিণী) ও তাহাদের সখাসখী এইরূপ বহু- বিভাগ বিধ বিভাগ দেখা যায়। কথিত আছে, ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী। কিন্তু ইহাতেও অনেক ব্যতিক্রম দেখা যায়। ব্রহ্মা, ভরত, হনুমন্ত ও কল্লিনাথ এই চারি জনের চারি মত এই দেশে প্রচলিত। ব্রহ্মা ও কল্লিনাথ মতে ভৈরব, ঐ, বৃহন্নট, দীপক, বসন্ত ও মেষ এই ছয় রাগ। আর ভরত ও হনুমন্ত মতে ভৈরব, ঐ, দীপক, মেঘ, মালকৌশও হিন্দোল। ব্রহ্মা ও কল্লিনাথ মতে রাগবিভাগে সম্পূর্ণ ও খাড়ব জাতীয় রাগই ধরা হইয়াছে। ঔড়ব জাতীয় রাগ ধরা হয় নাই। কিন্তু হনুমন্ত ও ভয়ত মতে দুইটি সম্পূর্ণ, দুইটি খাড়ব, দুইটি ঔড়ব রাগকে রাগ বলা হইয়াছে। এখানে সুন্দর নিয়ম রহিয়াছে। হিন্দুস্থানে হনুমন্ মত মানিয়া থাকেন। আবার কল্লিখের মতে ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী। কিন্তু হনুমন্ মতে হয় রাগ ত্রিশ রাগি। কোন্ কোন্ রাগিণী কোন্ কোন্ রাগের অনুগত এই বিষয়ে প্রাচীন চারি মতই বিভিন্ন। ইহাতে এই মনে হয় যে, এই শ্রেণীৰিাগের কোন ভিত্তি নাই। কিন্তু অনেকেই এই বিভাগ জালিবার.. জয়: আগ্রহ আছে বলিয়া এনে অহ্মার মত ও হনুমন্ত মত দুইটি মতই দেওয়া যাইতেছে।

og গীত-উপক্রমণিকা ভৈরব-ভৈরবী, রামকেলী, গুর্জরী, গুণকেলী, বঙ্গালী ও সৈন্ধবী (সিন্ধু)। -মালশী, ত্রিবণী, গৌরী, বঙ্গালী, মধুমাধবী ও পাহাড়ী। নট-নারায়ণ-কামােদী, আভেরী, কল্যাণী, নাটাকা, সারেঙ্গী ও হাম্বিরা। বসন্ত-হিন্দোলী, ললিতা, দেশী, দেবগিরি, বৈরাটী ও টোড়ী। মেঘমল্লারী, সৌরটা, সাবেরী, গান্ধারী, হরশৃঙ্গারী ও কৌশকী। দীপক—ভূপালী, বিভাষা, কর্ণাটী, বড়হংসিকা, মালবী ও পটমঞ্জরী। হনুমন্ত মতে- ভৈরব-ভৈরবী, বৈরাটী, বঙ্গালী, মধুমাধবী ও সৈন্ধবী। ঐ-মালবী, মাল, ধানশ্রী, বাসন্তী, আশাবরী। মালকৌশ—টোড়ী, গৌরী, গুণকেলী, খাম্বাবতী ও কুকুভা। হিনলালরামকেলী, ললিতা, দেশাঙ্গী, বেলাবলি ও পটমঞ্জরী। টঙ্কা, সৌরটা, গুর্জরী, ভূপালী ও দেশকিরী। দীপক—দেশী, কামােদী, নাটীকা, কেদারী ও কর্ণাটীকা। প্রাচীন সঙ্গীতাচাৰ্য্যগণ রাগরাগিণী গাহিবার ভিন্ন ভিন্ন সময় নির্দিষ্ট করিয়া গিয়াছেন। ওস্তাদদের মধ্যে তাহা বিশেষভাবে প্রচলিত। কোন্ কোন্ রাগরাগিণী কোন্ কোন্ সময়ে গাহিতে হয় নিম্নে তাহা দেওয়া যাইতেছে। দিবা প্রথম প্রহরে গেয়—ভৈরব, রামকেলী, যােগিয়া ভাটায়ারী, কালিঙ্গড়া, বঙ্গালী, মঙ্গল, ভৈরবী, বিভাস ও দেশকার। দিবা দ্বিতীয় প্রহরে গােয়-গুর্জরী, আশাবরী, জৌনপুরী, গান্ধারী, খট, গুণকেলী, আলাহিয়া, কুকুভ, দেবগিরি, সরফর্দা, বেলাবলী, শুক্ল-বেলাবলী, গৌড়-সারঙ্গ, বৃন্দাবন-সারঙ্গ। দিবা তৃতীয় প্রহরে গেয়-ভীমপলঞ্জ, রাজবিজয়, মূলতান। দিবা চতুর্থ প্রহরে গেয়–পূরিয়া, মারওয়া, জয়ন্ত, সাজগিরি, কুমারী, মালী, মালবী, ধান, জৈ, ত্রিবণী, বৈরাগী।

গীত-উপক্রমণিকা
দিবা-রাত্রির সন্ধিকালে—শ্রীরাগ, পূরবী, গৌরী।
রাত্রি প্রথম প্রহরে—ইম, কল্যাণ, ইমনকল্যাণ, ভুপালী, হাম্বির,
কেদারা, শ্যাম, ছায়ানট, নট-নারায়ণ, কামােদ, নিশাসাগ, দেওসাগ।
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে-দরবারী কানাড়া, বাগেশ্রী, সাহানা, আড়ানা,
সিন্ধু, কাফি, সিন্ধুড়া, কাফিসিন্ধু, মুখারী, সরস্বতী, বাহার, জয়জয়ন্তী,
গােড়মল্লার, নিয়মল্লার, সুরট, দেশ, মেঘ, তিলককামােদ, খাম্বাজ, ঝি ঝিট,
লুম, মালকৌশ, চন্দ্রকৌশ, দীপক, পরজ, পিলু, বার ওয়া, শঙ্করা, শঙ্করাভরণ,
বেহাগ।
রাত্রি তৃতীয় প্রহরে-হিন্দোল, বেহাগড়া।
রাত্রি চতুর্থ প্রহরে—সােহিনী।
রাত্রি ও দিবার সন্ধিকালে-ললিত।
ছয়টি
ঋতুতে
ছয়টি রাগ গাহিবার নিয়ম কাছে। যথা-গ্রীষ্মকালে—
দীপক, বর্ষায়—মেঘ, শরতে—ভৈরব, হেমন্তে-মালকৌশ, শীতকালে এরাগ
এবং বসন্তে—হিন্দোল।
প্রথমশিক্ষার্থীর পক্ষে কোন বাঁধাবাঁধি নিয়ম নাই। যে-কোন সময়ে
যে-কোন রাগিণী আলাপ করিতে পারে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Git-upakramanika Vol. 2

Author
Senshrmma, Manilal
Title
Git-upakramanika Vol. 2
File name
Git-upakramanika Vol. 2
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/03/2
Publisher
Sri Manikchandra Das, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
89
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Senshrmma, Manilal
DLI number
511061
Barcode
4990010018243.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XlbzfPh7q8n
Download PDF

Git-upakramanika Vol. 2