Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Pancha Ratna
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
li Hue, liv
Apprord Test Root for me
E Shoals m Wein Bangal
- ৫% or 1, 1993
পঞ্চরত্ন
ARUN
24?11
৪।
NO
' !! 11 Act.)
১১.।। )
w
যােগন্দ্রনাথ সরকার সঙ্কলিত
সিট বুকু সােলাই,
নং কৰে ।
UDAYNARUINPUR ** SY!4 RU?4L LIBRARY
না'
৫. [মুল আনা
বাদ
stress
deon NA
এক-একেচ চৌধুরী,
৩৪নং গেট, কবিতা।
প্রিন্টার-এ, মূখা িবি-
এ কে, এলিয়ে।
SANGA
০১৮
Eatd 134*
১৪
সূচী
বিষয়
बामप्यास्त
বিলার
হেলাল
৮ শিবনাথ শা
বৰীনাথ ঠাকুর
যােচীনাথ বৰু
বীনাথ ঠাকুর
বিপিন পাল
৫
বচি-
অশ্বিনীমার
০ ০ ০
No text on this page.
"" " "\rur, low ใน
TE
ก!!^*!
IU PE Act
- เ: : 1 ) )
রাজা রামমােহন রায় ৪৭৭৮ •!' 'r Act, ... ০৮ nour, How do । . HOVL RAH রামমােহন তুঙ্গ গিরি যে জল বৃষ্টি ঝটিকা সহিয়া যুগ যুগ দণ্ডায়মান থাকে, তাহা কি শুন্যকে আয় করিয়া ? কখনই নহে। তাহা সুদৃঢ় ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত, এবং যে সকল আভ্যন্তরীণ ধাতুপুঞ্জের সংঘাত দ্বারা তাহার দেহ গঠিত, সে সকল ধাতুপুঞ্জও ঘন-নিবিষ্ট এই জন্য; অন্তিম গিরি কখনই দণ্ডায়মান থাকিতে পারি না। গিরি যে দাড়াইয়া আছে, তাহা নিরন্তর সংগ্রাম করিয়া; নিরন্তর বর্ষার জলধারা তাহার অঙ্গ-সজিকে শিথিল করিতেছে, তাহার দৈহিক ধাতু সকলকে ধৌত করিয়া লইয়া যাইতেছে, বহুল শিলাখকে অশনি-নিনাদে শৃঙ্গ হইতে পাদদেশে পাতিত করিতেছে, চক্ষের নিমিষে তক-লতার সৌন্দৰ্য সকলই হরণ করিয়া লইতেছে; আবার কখনও বা ভীষণ ভূকম্পে ঐ গিরিদেহ বিদাৰিত হইয়া জ্বালামুখী প্রকাশ পাইতেছে; শত শত বন- প্রদেশ ভগ্ন ও বিশ্লিষ্ট হইয়া নেত্রের অগােচর হইয়া যাই-
পক
তেছে; কোথাও বা প্রচণ্ড গ্রীষের সমর দাবানল প্রবলিত
হইয়া, দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, অবিভ্রান্ত
অলিয়া, সুদূরপ্রসারী অরণ্যানী সকলকে ভস্মীভূত করিতেছে।
গিরির জীবন কি সংগ্রামের জীবন। কিন্তু এই সংগ্রামের
মধ্যেও গিরি দণ্ডায়মান আছে; শীতাতপ সহিয়া বিধাতার
কাজ করিতেছে; গিরির ভিত্তি দৃঢ়, গিরির দেহের বন্ধন দৃঢ়
বলিয়া। এ জগতে একজন মহামনা ব্যক্তিকে আমার এই
গিরির সহিত তুলনা করিতে ইচ্ছা হয়। কোন্ গিরি এমন
আছে বাহায় শীতাতপের সহিত সংগ্রাম নাই। তেমনি কোন্
মহৎ চরিত্র এমন আছে বিবিধ প্রতিকূল অবস্থার সহিত
বাহায় সংঘর্ষণ নাই। আবার কোন্ গিরি এমন আছে যে
নিজের আভ্যন্তরীণ দৃঢ়তার গুণে দণ্ডায়মান নয়। তেমনি
কোন মহৎ চরিত্রই বা এমন আছে যাহা আভ্যন্তরীণ
উপাদান সকলের গুণেই মহৎ নয়?
এ জগতে বিনি উঠেন তিনি সাধারণের মধ্যে জন্মিয়া,
সাধারণের মধ্যেই বাড়িয়া, সাধারণের উপরে মস্তক তুলিয়া
দাড়ান; তিনি আভ্যন্তরীণ মাল মশলার সাহায্যেই বড়
হইয়া থাকেন। কুম্মাও যেমন যার সাহায্যে মাচার উপরে
উঠে, তেমনি কোন্ কাপুরুষ, কোন্ অলস শ্রমকাতর মানুষ,
কোন্ হীনতো নতজানু মানুষ, কোন্ অবিবাসী ক্ষীণ-শক্তি
মানুষ, কেবল মাত্র অপরের সাহায্যে এ জগতে এত মহত্ব
লাভ করিয়াছে? এ জগতে উঠিয়া, পড়িয়া, বহিয়া, সহিয়া,
রামমােহন ভাঙ্গিয়া, গড়িয়া, কাদিয়া, কাটিয়া মানুষ হইতে হয়; “না পস্থা বিদ্যতে অয়নায় মনুষ্যত্ব বা মহত্ব লাভের অন্ত রাস্তা নাই। ঈশ্বর মানুষের সহিত চুক্তি করিয়া অল্প আয়াসে মহত্ব প্রদান করেন না। আমি এরূপ একটি মহৎ চরিত্রের আলােচনা করিতে যাইতেছি। তিনি রামমােহন রায়। নচিকেতা তাহার পিতাকে বলিয়াছিলেন,—“ শনামেমি প্রথমঃ”, আমি শত- জনের মধ্যে প্রথম হইতে চাই। রামমােহন রায় যে কালে জন্মিয়াছিলেন, সে সময়ে এদেশবাসীদিগের ভিতরে লক্ষের মধ্যে—লকের কেন, কোটির মধ্যে—তিনি প্রথম হইয়া- ছিলেন বলিলে কি অত্যুক্তি হয়। সে কালের লােকের কথাই বা বলি কেন? তঁাহার জন্মের পর এই ত শত বৎসর অতীত হইয়াছে, কে তাহার স্থান অধিকার করিতে পারিয়াছে? কে প্রকৃত মহত্ত্বগুণে তাঁহার ত্রিসীমার মধ্যে আসিতে পারিয়াছে। বলিতে কি, শঙ্করের পর এরূপ মনস্বী ও তেজৰী পুরুষ আর কয়জন এদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন ? উঁহার প্রদীপ্ত দিবালােকের নিকটে আমরা কি খছােত নহি? আমরা কি সেই প্রদীপ্ত ধূমকেতুর পুচ্ছ-লগ্ন জ্যোতিকণিকা-মাত্র নহি। কিন্তু রামমােহন রায় যে লক্ষের মধ্যে এক হইয়া দাড়াইলেন, তাহা কিরূপে? যেরূপ ফু গিরিরাজির মধ্যে অত্যুন্নত গিরি দণ্ডায়মান থাকে, তেমনি যে সাধারণ পর প্রজাপুঞ্জের মধ্যে তিনি উন্নত-শিরা হইয়া উঠিয়াছিলেন তাহা কোন্ গুণে? তাহা পূৰ্বোল্লিখিতগিরিদেহের ন্যায় আভ্যন্ত- রীণ উপাদান সকলের সাহায্যে। এইরূপ কতকগুলি চরিত্রগত উপাদানের উল্লেখ করিব। প্রথম উপাদান তাহার অন্তর্নিহিত অসাধারণ মানবাত্মার মহত্ব-জ্ঞান। মানবের আত্মাকে তিনি অতি পবিত্র চক্ষে দেখিতেন; মনে করিতেন, এই মানবাত্মা সেই বিশ্বাত্মারই অঙ্গীভূত; তাঁহা হইতে উৎপন্ন; তাঁহ-দ্বারা বিস্তৃত এবং তাঁহাকে প্রাপ্ত হওয়াই ইহার নিয়তি; ইহার আশা ও শক্তি অসীম। সকল প্রকার সামাজিক দাসত্ব ও রাজনৈতিক অত্যাচার ও দাসত্বকে তিনি এই জন্য অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন; কারণ তারা মানবাত্মা শৃঙ্খলিত, শক্তিহীন, ও আত্ম-মহত্বজ্ঞানে বঞ্চিত হয়। এই কারণে পৃথিবীর যে কোন বিভাগে লােকে স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করিত, তাহারই সহিত তাঁহার হৃদয়ের যােগ হইত; এবং স্বাধীনতা- লাভ-প্রয়াসে কোনও জাতি অকৃতকার্য হইতেছে জানিলে তিনি মর্মাহত হইতেন। ইটালীয়ানগণ অনেক চেষ্টার পর যখন অঞ্জীয়াবাসিগণের নিকট পরাস্ত হইল, তখন সেই সংবাদে রামমােহন রায় কলিকাতাতে শয্যাস্থ হইলেন , নিমন্ত্রণ-রক্ষা করিতে পারিলেন না। অপর দিকে স্পেনে যখন নিয়ম-তন্ত্র প্রণালী প্রতিষ্ঠিত হইল, তখন তিনি আনন্দে কলিকাতা টাউনহলে ভােজ দিলেন। তাঁহার উর্ধতন কর্ম- ;
রামমােহন
চারী ডিগবী সাহেব লিখিয়াছেন যে, তাহার নিকট কর্ম
করিবার সময় ডিগবী অনেকবার দেখিয়াছেন যে, রামমােহন
রায় ফরাসী বিপ্লবের বিবরণ জানিবার জন্য ব্যগ্রতা সহকারে
বিলাতী ডাকের অপেক্ষা করিয়া থাকিতেন; যদি দেখিতেন
যে, স্বাধীনতা পক্ষের পরাজয় হইতেছে, তাহা হইলে দরদর
ধারে তাঁহার দু কপােলে অশ্রুধারা বহিত। কুমারী কলেট
বলিয়াছেন যে, ইংলণ্ড গমন কালে গুড, হােপ অন্তরীপে
জাহাজে পডিয়া গিয়া রামমােহন রায়ের পা ভাঙ্গিয়া গিয়া-
ছিল। কিন্তু যখন তিনি দেখিলেন যে, ফরাসী জাহাজে
স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন হইয়াছে, তখন সেই ভগ্নপদ
লইয়াই সেই জাহাজে গিয়া সেই পতাকাকে অভিবাদন করি-
বার জন্য ব্যগ্র হইলেন। তাহার জাহাজের কাপ্তেন অনেক
নিষেধ করিলেন; সে নিষেধ তিনি কোন মতেই শুনিলেন
; ভগ্নপদে অতিকষ্টে ফরাসী জাহাজে গিয়া সেই পতাকাকে
অভিবাদন করিলেন। আসিবার সময় ফ্রান্সের জয়ধ্বনি
করিতে করিতে আসিলেন।
তাঁহার ইংলণ্ড-বাস-কালে, ১৮৩১ সালে পার্লামেন্ট,
মহাসভাতে সুপ্রসিদ্ধ Reform Billএর বিচার উপস্থিত
হয়। ঐ আইনের দ্বারা ইংলণ্ডের প্রজাবর্গের স্বাধীনতার
ক্ষেত্র বিস্তৃত করিবার প্রস্তাব হয়। রামমােহন রায় সেই
প্রস্তাবে আপনাকে এতদূর নিক্ষেপ করিয়াছিলেন যে, প্রকাশ্য
ভাবে বলিয়াছিলেন, ঐ আইন বিধিবদ্ধ না হইলে তিনি
;
ইংলতের অধিকারে আর থাকিবেন না; তাহার পৈতৃক ও
স্বােপার্জিত সমুদয় সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া স্বাধীনতার কীড়া-
ভূমি আমেরিকাতে গিয়া বাস করিবেন। কি স্বাধীনতা-
প্রিয়তা। কি মানবাত্মার মহত্ত্বজ্ঞান।
এই মানবাত্মার মহত্ব-জ্ঞান আর একদিকে অসাধারণ
আমৰ্যাদা জ্ঞানের আকার ধারণ করিয়াছিল। তাহার
চরিত্রের এমনি একটা প্রভাব ছিল, এমনি একটা মহা-
পুরুষােচিত গাম্ভীৰ্য্য ছিল যে, তাঁহাকে কোনও ঘােট কাজের
জন্য অনুরােধ করিতে সাহসী হওয়া দূরে থাকুক, তাহার
বন্ধু বান্ধব তাহার সমীপে ছােট কথার অবতারণা করিতেও
সাহসী হইতেন না। তাঁহার বন্ধু উইলিয়াম এডাম্
একদিনের একটা ঘটনার বিবরণ লিখিয়া রাখিয়া গিয়াছেন,
তাহা সকলেরই পাঠ করা উচিত। ঘটনাটি এই-জ্যৈষ্ঠ
মাসের দারুণ গ্রীষ্মের সময় একদিন অপরাহে, রামমােহন
রায় হঠাৎ এডামের ভবনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এ
দেখিলেন—তাঁহার মুখে ভয়ানক উত্তেজনার চিহ্ন। দেখিয়া
তাঁহার ভয় হইল। রামমােহন রায় বলিলেন,-“তুমি
যদি কিছু মনে না কর, আমার গায়ের উপরকার পরিচ্ছদ
খুলি।” পরিচ্ছদ উন্মােচন করিয়া বলিলেন,-“জল!
ল।” রায় জল দেওয়া হইল। জলপান করিয়া একটু
সুস্থ হইয়া বলিলেন,—“আমার জীবনের সর্ব প্রধান
আঘাত ও প্রধান দুঃখ আজ পাইয়াছি। বিশ মিট
মামমােহন
আজ আমাকে এই বলিয়া প্রলােভন দেখাইয়াছেন যে,
খ্রীষ্টধর্ষ অবলম্বন করিলে আমার পদ আরও বড় হইবে।
ছিঃ! ছিঃ। আমাকে এত ঘােটলােক মনে করে। এডাম
বলিয়াছেন,—ইহার পরে রামমােহন রায় আর বিশপ
মিলটনের মুখদর্শন করেন নাই।” বৈষয়িক সুখের
প্রলােভন দেখাইয়া ৰ্মে প্রবৃত্ত করা,—ইহা তাঁহার চক্ষে
অমার্জনীয় অপরাধ, অসহনীয় অপমান বলিয়া গণ্য
হইয়াছিল।
কেবল ইহা নহে, মানবাত্মার মহান অs
নিহিত ছিল বলিয়াই তাঁহার স্বাবলম্বন-শক্তি অপরিসীম
ছিল। নিজের গৃঢ় আত্ম-শক্তিতে এত দূর বিশ্বাস ছিল যে,
কিছুতেই তাহাকে কেহ দমাইতে পারিত না ; কোনও বি
বা বাধা তাহাকে অকাৰ্যসাধনে বিমুখ বা নিরুদ্যম করিতে
পারিত না। যাহা একবার করণীয় বলিয়া অনুভব করিতেন,
ইতে তাহাকে ধরিতেন; এবং পূর্ণমাত্রায় তাহা না
করিয়া নিরস্ত হইতেন না। বুল ডগ নামক কুকুরের এইরূপ
খ্যাতি আছে যে, সে একবার যে প্রাণীকে কামড়াইয়া ধরে,
নিজের দেহকে মস্তক হইতে বিচ্ছিন্ন করিলেও সে কামড়
ছাড়ে না। রামমােহন রায়ের বমুটি বুল ডগের কামড়ের
স্যায় ছিল; তাহার অভীষ্ট কাৰ্য হইতে কিছুতেই তাহাকে
বিচলিত করিতে পারি না। বরং সে পথে যতই বি
উপস্থিত হইত, ততই তাহার বীর-হৃদয় আনন্দিত হইত।
ঘােড়দৌড়ের ঘােড় যেমন সম্মুখে বেড়া দেখিলে আনন্দিত হয় যে, উল্লম্ফন ও উন্ননের উপযুক্ত কিছু পাওয়া গিয়াছে, তেমনি তাহার নির্ভীক হৃদয় বি-বাধা দেখিয়া আনন্দিত হইত যে, উল্লম্ফন ও উলঞ্জনের উপযুক্ত কিছু আছে। বিঃ দেখিয়া হঠিয়া যাওয়া, ভয় প্রদর্শনে ভীত হওয়া, প্রাণভয়ে কাতর হওয়া, লােকের প্রতিকূলতা বশতঃ সংকল্পিত অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করা, তিনি কাপুরুষতা ও নিজ শক্তির অবমাননা বলিয়া মনে করিতেন। ব্যাপ্টিষ্ট, মিশনের মিরিগণ যখন তাহার প্রণীত কোন পুস্তক আপনাদের ছাপাখানায় মুদ্রিত করিতে অস্বীকৃত হইলেন, তখন তিনি নিজে মূদ্রাযন্ত্র ক্রয় করিয়া, নিজের গ্রন্থ তাহাতে মুদ্রিত করিয়া তবে ছাড়ি লেন। ঋছ মিশনারী এলেকজাণ্ডার ডাফ যখন তাহার আহ্বানে কলিকাতাতে উপস্থিত হইলেন এবং প্রথম মিশনারী স্কুল স্থাপনের পথে সুমহৎ বিপ্ন দেখিয়া তাহার শরণাপন্ন হইলেন; যখন সহরের ভদ্রলােকেরা এমনি বিরােধী হইলেন যে, স্কুলের জন্য দেশীয় বিভাগে একটি বাড়ী ভাড়া করা ও পড়িবার জন্য বালক সংগ্রহ করা ডাফের পক্ষে কঠিন হইয়া উঠিল, তখন রামমােহন রায়কে এই বিন্ন বাধার কথা জানাইলে তিনি ডাকের স্কুল বসাইবার ভার স্বয়ং গ্রহণ করিলেন। তিনি ত কিছুতেই পিছ-পা হইবার লােক ছিলেন না। স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া ব্ৰহ্মসভার পূর্বাশ্রিত ফিরিঙ্গী কমল বসুর বাড়ী ফের স্কুলের জন্য স্থির করিয়া
রামমােহন
দিলেন; এবং আপনার বন্ধুবান্ধবের পরিবার হইতে প্রথম
ছয়টি ছাত্র সংগ্রহ করিয়া আনিলেন। ইহা করিয়াও নিরন্ত
হইলেন না; স্কুল খুলিবার দিন নিজে উপস্থিত হইয়া
বালকদিগকে উৎসাহিত করিলেন; এবং তৎপরে সর্বদা
গিয়া স্কুলের কাৰ্য পরিদর্শন দ্বারা ও পরামর্শ-দানাদি দ্বারা
ডাফকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। তিনি বিলাত গমনার্থ
উদ্যত হইলে তাঁহার প্রতিপক্ষগণ তাঁহাকে জাতিচ্যুত
করিবার ও পৈতৃক সম্পত্তিতে বঞ্চিত করিবার ভয় প্রদর্শন
করিতে লাগিলেন। তিনি স্বীয় অভীষ্ট সাধনে প্রতিজ্ঞারূঢ়
হইয়া নিজের সহিত যাইবার জন্য পাচক ব্রাহ্মণ ও হিন্দু
ভৃত্য সংগ্রহ করিলেন। যে সময়ে সমুদ্রে পা বাড়াইলেই
জাতিচ্যুত হইবার ভয় ছিল, সে সময় বিলাত গমনের জন্য
পাচক ব্রাহ্মণ ও হিন্দু ভৃত্য সংগ্রহ করা কিরূপ কঠিন কাজ
ছিল, সহজেই অনুমিত হইতে পারে। তাহাতেও তিনি
পশ্চাদপদ হইলেন না। যিনি ষােড়শ বর্ষ বয়সে পিতা
কর্তৃক গৃহতাড়িত হইয়াও স্বীয় সংকল্প ত্যাগ করেন নাই,
তাহার পক্ষে ইহা কিছুই বিচিত্র ছিল না।
মানবাত্মার মহত্ব যে জানে না, স্বাবলম্বন শক্তি তাহার
আসে না। এ জগতে মানুষ আপনার ঘর আপনি রচনা
করে। তুমি বড় হইয়া দাঁড়াইবে, কি হােট হইয়া থাকিবে
তাহা তােমারই হাতে। বিপ্ন বাধা, পাপ প্রলােভন, জীবনের
সমস্যা, সকলেরই পথে উপস্থিত হয় ; তাহার উপরে উঠা
;
•
বা নীচে পড়িয়া যাওয়া, ইহার উপর বড় বা ছােট হওয়া
নির্ভর করে। রামমােহন রায় উপরে উঠিয়াছিলেন, এই
কন্তু তিনি বড়; আর তুমি আমি নীচে পড়িয়া যাই, এই
জন্য আমরা ছােট। তিনি যে উপরে উঠিয়া ছিলেন
তাহার ভিতরকার কথা—নিজের শক্তি-সামর্থ্যে ও
মানবাত্মার মহত্বে অপরাজিত বিশ্বাস।
কিন্তু তাঁহার প্রকৃতিতে কি বিরুদ্ধগুণ সকলের
সমাবেশই ছিল! এই উৎকট মানবাত্মার মহত্ত্বজ্ঞান ও
তজনিত স্বাধীনতা-প্রবৃত্তির পার্ধেই প্রগাঢ় সাধুভক্তি
বিদ্যমান ছিল। তিনি মানবাত্মার মহত্ত্ব ঘােণর জন্য
ধর্মবিষয়েও মানবের বিচারশক্তিকে পূর্ণ অধিকার দিলেন
কিন্তু তাহা করিতে গিয়া অতীত হইতে একেবারে পা তুলিয়া
লইতে পারিলেন না। যুক্তিকে শাস্ত্রানুসারিণী করিবার
জ, অথবা শাস্ত্রকে যুক্তির অনুগামী করিবার জন্য, কতই
শক্তি ও শ্রম ব্যয় করিলেন। তিনি যে কালে প্রাদুর্ভূত
হইয়াছিলেন, সে সময়ে ফরাসী বিপ্লবের তরঙ্গাঘাতে সমুদয়
দেশ কম্পিত হইতেছিল। সে সময়ে এক শ্রেণীর মানুষ
দেখা দিয়াছিল, যাহারা শাৰিধি, গুরু পুরােহিত প্রভৃতিকে
পরিত্যাগ করিয়া মানবের চিন্তাকে স্বাধীন ভাবে ও
অসঙ্কোচে জীবনের সর্বৰিছাগে প্রসারিত হইতে দিবার
জন্য ব্যয় হইয়াছিল। ইহারা ধর্মে সংশয় ও নাস্তিকতাবাদ
অবলম্বন করিয়াছিল। রামমােহন রায় ইংলতে ও জাল
রামমােহন দেশে এই শ্রেণীর অনেক মানুষ দেখিয়াছিলেন। তাহাদের নমূনা এ দেশেও কিছু কিছু দেখিয়া গিয়াছিলেন। তিনি ইহাদিগকে দেখিয়া অবজ্ঞাতে মুখ ফিরাইয়াছিলেন। প্রকাশ্যভাৰে বলিয়াছিলেন, “আমি যদি কখনও পরিবার পরিজনকে ইউরােপে আনি, এই শ্রেণীর লােকের সহিত কখনই আমার পুত্র কন্যাদিগকে পরিচিত হইতে দিব না।” তিনি স্বাধীন চিন্তাকে অনেক দূরে ছুটিতে দিতে প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু তাহা বগাবিহীন অষের ন্যায় নহে; পরন্তু সদ ইব সাথে সারথির সদশের ন্যায়, ভক্তির লাগাম মুখে দিয়া, শাস্ত্র ও সাধুজনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাখিয়া। এই সাধু-ভক্তি বা Reverence তাহার চরিত্রের দ্বিতীয় উপাদান ছিল। তৃতীয় উপাদান-সকল মহাজনের কাৰ্যের মূলে যাহা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা তাঁহারও কাৰ্য্যের মূলে ছিল। তাহা এই—“যতেধৰ্ম গুতােজয়া”—এই বিশ্বাস। অর্থাৎ ইহা অনুভব করা যে, এই ভৌতিক জগৎ যেমন দুর্ভেদ্য কাৰ্য- কারণ-শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তেমনি মানবের জীবন ও মানবসমাজ দুল্য ধর্মনিয়মের যারা শাসিত। এক মহাশক্তি বা মহতী ইচ্ছা হইতে মানব-জীবন ও মানবসমাজ উদ্ভূত হইয়াছে, সেই মহতী ইচ্ছার দ্বারা বিধৃত হইতেছে, সেই ইচ্ছা ও সেই শক্তির দ্বারা মঙ্গলের পথে নীত হইতেছে। স সেতু বিবৃতি রেবাং লােকানাং অসভেদায়”, তিনিই সেতুম্বরূপ হইয়া সকলকে ধারণ করিতেছেন। মানব-জীবন তাহারই শাসনা- ধীন, সুতরাং এখানে ধর্মের জয় অনিবার্য। যাহা সত্য বলিয়া বুঝি, ধর্ম বলিয়া যাহা অনুভব করি, তাহার অনুসরণ করা আমাদের একমাত্র কর্তব্য ; ফলাফল সেই ধাবহ পরম পুরুষের হতে। এই সুদৃঢ় বিশ্বাস, এই মহৎ ভাব হইতেই সকল ধর্ম-বীরের বীরত্ব উৎপন্ন হইয়াছে। রাম- মােহন রায়ের বীরত্বও ইহা হইতে উঠিয়াছিল। সে বীরত্বের কথা যখন স্মরণ করি, তখন হৃদয় স্তম্ভিত হয়। বর্তমান কালে যাঁহারা তাহারই প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হইয়াছেন, তাঁহারই বাণী ধরিয়া সংস্কারক দলে নাম লিখাইয়াছেন, তাহাদের মুখ কত সময় বিষাদে ম্লান দেখিতেছি; তাহাদের মুখে নিরাশার ভাষা কতবার শুনিতেছি। কেহ বলিতেছেন, “কই, একেশ্বরের অর্চনা ত দেশে স্থাপিত হইল না।” কেহ বলিতেছেন, আমরা কয়জন মরিয়া গেলে আর ইহার নাম গন্ধও থাকিবে না,” ইত্যাদি; যেন তাহারাই ধর্ম বিধানের হর্তা কর্তা বিধাতা। যখন এই সব ভাবি, অমনি রামমােহন রায়ের কথা স্মরণ হয়, দুই ছবিতে কি প্রভেদ। ইহারা সহস্র সহ সমভাবাপন্ন ব্যক্তির দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়াও সাহসকে রাখিতে পারিতেছেন না, আর রামমােহন রায় একাকী দণ্ডায়মান হইয়া কি সাহসে যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তাঁহার বন্ধুগণ শত্রু হইল; সজিগণ ছাড়িয়া গেল; অনুগত ব্যক্তিগণ বিশ্বাসঘাতক হইয়া বৈরীদলে প্রবেশপূর্বক তাঁহাকে নিৰ্যা- রামমােহন তন করিতে প্রবৃত্ত হইল; এরূপ অবস্থাতেও যে দুই চারি জন ইউরােপীয় প্রচারক তাঁহাকে বন্ধুভাবে আলিঙ্গন করিয়া- ছিলেন তাহার হাকে ত্যাগ করিলেন; ধর্মসভার সভ্যগণ তাহার প্রাণনাশ পৰ্য্যন্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল; তাহাকে সশস্ত্র হইয়া বেড়াইতে হইল; অধিক কি, তাহার নিজের জননী কুচক্রী লােকের পরামর্শে তাহাকে বিষয় হইতে বঞ্চিত করিবার জন্য মােকদ্দমা উপস্থিত করিলেন; জনৈক রাজা তাঁহাকে বহু বৎসর ধরিয়া মােকমার পর মােক তুলিয়া কষ্ট দিলেন; বিপক্ষগণ তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্রের নামে মিথ্যা মােক তুলিয়া তাহাকে কারাগারে নিক্ষেপ করি- বার প্রয়াস পাইলেন। বল, আমাদের কাহার জীবনে এরূপ নিৰ্যাতন ঘটিয়াছে ? কে এরূপ একাকী ও অশরণ হইয়াছি। অথচ ইহাতে তাহাকে একদিনের জন্যও ভীত অথবা স্বীয় কাৰ্য হইতে পরায়ুখ করিতে পারে নাই। তিনি এই সকলের মধ্যে অবিচলিত থাকিয়া বলিলেন-“এমন দিন আসিতেছে, যখন আমার নির্যাতনকারিগণের বংশধরগণ আমাকে দেশের হিতৈষী বন্ধু বলিয়া ধন্যবাদ করিবে-ধর্মের জয় হইবেই হইবে।” ঐরূপ অবস্থাতে এরূপ বলিতে পারাই মহত্ত্ব। সকল প্রতিকূলতার উপরে উঠিয়া দাড়াইতে পারাই মহত্ব। অসংখ্য গােলাগুলির মধ্যে অবিচলিত চিত্তে অগ্রসর হইয়া সত্যের নিশান প্রােথিত করিতে পারাই বীর। এই বীরত্বের পশ্চাতে ধর্মরাজ্যের বিধাতা ধৰ্মাবহ পরম পুরুষের ধর্ম-
১
শাসনে অৰিচলিত বিশ্বাস ছিল। তত্তির এরূপ বীর জীবনে
আসে না।
ইহা হইতেই তাহার চরিত্রের আর একটি উপাদান
উৎপন্ন হইয়াছিল—তাহা আপনার জীবনকে শক্তি সমুদয়কে
ঈশ্বরের ন্যস্ত সম্পত্তি বলিয়া অনুভব করা। আমার মানসিক
বৃত্তি দেহের বল, লৌকিক ও সামাজিক সুবিধা,সবই মঙ্গলময়
পুরুষের গচ্ছিত ধন, তাঁহার ইচ্ছানুসারে ব্যয় হইবার জন্য,
তাঁহারই প্রিয় কাৰ্যসাধনের জন্য,—এই ভাব। ইহা ব্যতীত
কোনও মহাজনের জীবন মহৎ হয় নাই; কোনও মানুষ এ
জগতে মহৎ কাৰ্য্য করিতে সমর্থ হন নাই। সকল মহামনা
মানুষের জীবনে এক অপূর্ব বাধ্যতার ভাব দেখা গিয়াছে।
কে যেন তাহাদিগকেবলপূর্বক ধরিয়া কাজ করাইয়া লইয়াছে;
বাধ্য করিয়া খাটাইয়াছে; তাহারা অনুভব করিয়াছেন যে,
তাঁহার যাহা করিতেছেন, তাহা না করিয়া পার নাই।
সেন্ট পল একস্থলে বলিয়াছেন, “The love of Christ
constraineth me,—অর্থাৎ যীশুর প্রেম আমাকে বাধ্য
করিতেছে।” কেবল পলই যে এই প্রকার বাধ্যতা অনুভব
করিয়াছিলেন, তাহা নহে। প্রত্যেক মহামনা মানুষ এইরূপ
বাধ্যতা অনুভব করিয়াছিলেন। এই যে জীবনের ভিতরে
দায়িত্বজ্ঞান, এই যে অস্ফুট কিন্তু নিরন্তরােদ্বেলিত বাধ্যতা-
আন, ইহা ভিন্ন কে কবে বড় হইয়াছে? কে কবে বজ্রমুষ্টিতে
কাৰ্য্য করিয়াছে। কে কবে বীরের ন্যায় সংগ্রাম-ক্ষেত্রে
রামমােহন
গড়াইয়াছে। রামমােহন রায় ভাবিয়াছিলেন, যে যাহা
বলে বলুক, যে যাহা করে করুক, লােকে দেখুক আর
না দেখুক, আমার জীবনের পূর্ণতা আমি লাভ করি,
আমার প্রতি যে কাৰ্যভার পড়িয়াছে তাহা আমি সাধন
করিয়া যাই। তুমি আমি যদি বিশ্বাসে বা প্রেমে এতটা
ধরিতে পারিতাম, তাহা হইলে আমরাও বীরের রায় কাজ
করিয়া যাইতে পারিতাম। এই দায়িত্ব-আন হইতেই
তাঁহার চরিত্রের আর একটি গুণ ফুটিয়াছিল। তিনি যে
কাজে হাত দিতেন তাহা পূর্ণাঙ্গ না করিয়া হাড়িতেন না।
যাহা করিবেন বলিয়া ধরিতেন তাহা সম্পন্ন করিতেন।
বালকের ন্যায় লঘুভাবে কাজে হাত দেওয়া, অর্ধেক মন দিয়া
সে কাৰ্য্য করা, স্বল্প প্রতিবন্ধক দেখিয়াই নিরস্ত হওয়া, ইহা
তাঁহার প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ছিল। তিনি ১৮১৭ সালে সহমরণের
বিরুদ্ধে সমর ঘােষণা করিলেন, সভাসমিতিতে সেই বিচার
চলিল, গ্রন্থের পর গ্রন্থ প্রকাশিত হইতে লাগিল; সহমরণ
স্থলে বলপ্রয়ােগালি
করে, কি না, দেখিবার জন্য বন্ধু বান্ধবকে
শ্মশানে প্রেরণ করিতে লাগিলেন; লর্ড উইলিয় বেটিকে
বিধিমতে সাহায্য ও উৎসাহ দান দ্বারা সবল করিতে লাগি-
লেন; বহুজনের স্বাক্ষর করাইয়া সহমরণনিবারণা আবেদন
পত্র আগােচরে প্রেরণ করিলেন। অবশেষে ১৮২৯ সালে
রাজবিধি দ্বারা সহমরণ নিবারিত হইলে লর্ড উইলিয়ম
বেটিকে বাদ করিয়া এক অভিনন্দনপত্র প্রেরণ করিলেন;
;
এবং সহমরণের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করিবার উদ্দেশে উক্ত
আইনের বিরােধীদিগের আপত্তি খণ্ডন করিয়া এক পুস্তক
প্রকাশ করিলেন। পরিশেষে পাছে তাহাদের প্রার্থনা ইংলতে
গ্রাহ হয়, সে পথে বাধা দিবার জন্য, ঐ আইনপক্ষীয়দিগের
এক ধন্যবাদ-পত্ৰ পকেটে লইয়া ইংলণ্ডে যাত্রা করিলেন।
কিছু করিতে অবশিষ্ট রাখিলেন না।
দ্বিতীয়ত, এদেশীয়দিগের উন্নতির জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার
প্রয়ােজন-এই বিশ্বাস যখন জন্মিল, তখন ১৮১৬ সালে বন্ধুর
ডেভিড় হেয়ারের সঙ্গে সম্মিলিত হইয়া, একটি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর
ইংরাজী স্কুল স্থাপনের আয়ােজন করিলেন। ১৮১৭ সালে
স্কুল স্থাপিত হইল বটে, কিন্তু নানা ঘটনাচক্রে তাহার পরি-
চালন কাৰ্য তাহার হস্তের বাহিরে গেল; তিনি বাহিরে
থাকিয়াও যথাসাধ্য সাহায্য করিতে লাগিলেন। তৎপরে
যখন জানিলেন, ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির ফল
আশানুরূপ হইতেছে না, তখন ১৮২২ সালে তিনি নিজের
মনের মত ইংরাজী শিক্ষা দিবার জন্য একটি স্কুল
স্থাপিত করিলেন এবং প্রধানতঃ নিজের ব্যয়ে চালাইতে
লাগিলেন। ১৮২৩ সালে গভর্ণর-জেনারেল লর্ড আমহাষ্টের
গবর্ণমেণ্ট একটি শিক্ষা কমিটি গঠিত করিয়া তাহাদের হস্তে,
কলিকাতাতে একটি সংস্কৃত কলেজ স্থাপনপূর্বক, প্রাচ্য শিক্ষা
বিস্তারের ভার দিলেন। তখন রামমােহন রায় স্থির থাকিতে
পারিলেন না। গবর্ণমেন্টের প্রাচ্য নীতির শ্রম প্রদর্শন করিয়া
রামমােহন
ও ইংরাজী শিক্ষা বিস্তারের প্রয়ােজনীয় প্রতিপন্ন করিয়া,
গভর্নর-জেনারেলকে এক পত্র লিখিলেন। এইরূপে তাহার
সাধ্যে যতটুকু ছিল করিতে অবশিষ্ট রাখিলেন না।
ধৰ্ম সংস্কারের চেষ্টাতে প্রবৃত্ত হইয়া কি করিয়াছিলেন
তাহার ত কথাই নাই। ১৬ বৎসর বয়সের সময় যে পতাকা
উড্ডীন করিলেন, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তাহা উড্ডীন রাখিতে
ত্রুটি করেন নাই। ইহাকেই ভঁহার জীবনের সর্ববধান
কাৰ্য করিয়াছিলেন। ইহার জন্যই উপনিষদের অনুবাদ,
ইহার জন্যই আত্মীয়-সভা স্থাপন, ইহার জন্যই বাইবেলের
অনুবাদ, ইহার জন্যই খ্ৰীষ্টীয় পাদরীদিগের সহিত বাগ-যুদ্ধ,
ইহার জন্যই খ্ৰীষ্টীয়দিগের প্রতি নিবেদন, ইহার জন্যই
ইউনিটেরিয়ান কমিটি সংগঠন, ইহার জন্যই এডাম সাহেবের
উপাসনালয় স্থাপন, অবশেষে ইহার জন্যই ১৮২৮ সালে
ব্ৰহ্মসভা স্থাপন, তাহার গৃহ নির্মাণ, সেই গৃহ হতে
অর্পণ, ১৮৩০ সালের জানুয়ারী মাসে তাহাতে সােপালনার
প্রতিষ্ঠা। কোনও কাজে হাত দিয়া তিনি আধখানা করিয়া
কাত হন নাই।
তৎপরে, যেমন তাঁহার ঈশ্বরে অবিচলিত বিশ্বাস ছিল
তেমনি মানবের প্রতি উদার প্রেম ছিল। বরং ইহা বলা
যাইতে পারে যে, ঈশ্বর-প্রীতি অপেক্ষা মানব-প্রতিই অধিক
পরিমাণে আঁহার কাব্যের চালক ও পােষক ছিল। বর্তমান
সময়ে যত উদার তত্ত্ব মানব বদয়ে প্রতিভাত হইয়াছে,
১৮ পঞ্চর তন্মধ্যে মানব জাতির একত্ব একটি অদ্ভুত তত্ত্ব। যতই বিভিন্ন জাতির ইতিবৃত্ত ও সাহিত্যাদি আলােচিত হইতেছে, যতই যাতায়াতের সুবিধা হইয়া বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ ও বিভিন্ন জাতির সহিত সংমিশ্রণ বৃদ্ধি পাইতেছে, যতই বাণিজ্য সূত্রে জগতের জাতিসকল পরস্পরের সহিত স্বার্থ ও আত্মীয়তার বন্ধনে বদ্ধ হইতেছে, ততই এই তত্ত্বটি মানবচিত্তে জাগিয়া উঠিতেছে। জগতের জাতিসকল জানিতে পারিতেছেন, সমস্ত জগতের মানবকুল এক সূত্রে গ্রথিত। রামমােহন রায় আর এক দিক্ দিয়া এই তত্ত্বে উপনীত হইয়াছিলেন। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ অনুশীলন করিয়া জানিয়া- ছিলেন যে, জগতের জাতিসকলের বিভিন্নতার মধ্যে প্রকৃতিগত একতা প্রচ্ছন্ন আছে, এবং বিধাতা সকল জাতির মধ্যে আপনাকে অভিব্যক্ত করিয়াছেন; তাঁহার অভিব্যক্তি কোনও এক বিশেষ জাতির মধ্যে আবদ্ধ নহে। এই উদার সার্বভৌমিক ভাব হইতে তাহার উদার সার্বজনীন প্রেম উৎপন্ন হইয়াছিল। তিনি স্বজাতি, স্বদেশ ও সমগ্র জগতের নরনারীর দুঃখ সহিতে পারেন নাই, সেইজন্য দুকর নরসেবা এতে আপনাকে নিয়ােগ করিয়াছিলেন। ইহা হইতেই তাঁহার জীবনের একটী মূলমন্ত্র উঠিয়াছিল, সেটা এই- “The service of man is the service of God, অর্থাৎ মানবের সেবাই ঈশ্বরের সেবা।” এইটা তাঁহার মুখে শুনা যাইত। তবে তাঁহার বিশেষত্ব এই ছিল যে, ;
রামমােহন হার মানব-প্রীতি অপরাপর অনেক মহাজনের মানব- প্রীতির ন্যায় সঙ্কীর্ণ আকার ধারণ করে নাই। তিনি যে সর্বদেশের ও সকল জাতির নরনারীর দুঃখে দুঃখী হইতেন, সকল দেশের রাজনীতির প্রতি এত দৃষ্টি রাখিতেন, যে কোনও জাতির যে কোনও উন্নতির দ্বার উন্মুক্ত হইলে যে এত আনন্দিত হইতেন, তাহার ভিতরকার কথা এই ছিল যে, তাহার প্রেম সমগ্ৰ জগতকে আলিঙ্গন করিয়াছিল। এই কারণেইতিনি এরূপ ধর্মের অন্বেষণে বাহির হইয়াছিলেন যাহা সমগ্র জগতের সমুদয় মানব-সমাজকে একসূত্রে বাঁধিবে। এই সার্বজনীন ও সার্বভৌমিক ধর্মের চিন্তা নিরন্তর তাহার হৃদয়ে বাস করিত। আমার বােধ হয়, এই স্বাভাবিক মানব-প্রেমের জন্যই তাহার সন্ন্যাস ধর্মের প্রতি এত বিরাগ ছিল। তিনি ব্রহ্ম- জ্ঞানী হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু অদ্বৈতবাদী হন নাই। তিনি তাহার ধর্মকে বেদান্ত প্রতিপাদ্য ধৰ্ম্ম বলিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাহাকে গৃহীর ধৰ্ম্ম করিয়া রাখিতে চাহিয়াছিলেন। হাতে ধৰ্ম্মসাধকের অস্বাভাবিক কিছুমাত্র ছিল না। সর্বদা দেখিতে পাই, প্রচলিত ধর্মের কোন কোন সাধক বিশেষতঃ ধর্মপ্রচারকগণ, আপনাদিগকে ধাৰ্মিক দেখাইবার অন্য কতই ব্যর্থ হন। গৈরিক ধারণ করিয়া, মালা কমণ্ডলু লইয়া, গৃহ পরিবারত্যাগ করিয়া, কতরূপে মানুষকে বলেন, “তােমরা যেরূপ, আমরা সেরূপ নই; তােময়াসংসারী, আমরা
বিরাগী ; তােমরা ভােগী, আমরা যােগী ; তােমরা আসক্ত,
আমরা ত্যাগী” ইত্যাদি। রামমােহন রায়ের মতি গতি
যেন ঠিক ইহার বিপরীত ছিল। তিনি উপদেশ লিখিয়া
অপরকে দিয়া পড়াইতেন; গ্রন্থ লিখিয়া কোনও শিষ্যকে
পড়াইয়া তাহার নামে ছাপিতেন; একদিনও আচার্যের
আসনে বসেন নাই; আহারে, ব্যবহারে, আলাপে, সামান্য
মানবের গায় থাকিতে প্রয়াস পাইতেন। ইংলও বাসকালে
পদস্থ বন্ধুদিগের অনুরােধে বঙ্গভূমিতে নাট্যাভিনয় দেখিতে
যাইতেন; সুপ্রসিদ্ধ অভিনেত্রী Fanny Kemble এর অভি-
নয়ে তুষ্ট হইয়া তাহাকে কালিদাসের শকুন্তলার অনুবাদ ও
আপনার প্রণীত ধর্মগ্রন্থসকল উপহার দিয়াছিলেন। এক
ইংরাজ দম্পতী তাঁহার নামে আপনাদের শিশুপুত্রের নামকরণ
করিয়াছিলেন; রাজা শত প্রকার বড় বড় কাৰ্য্যের ব্যস্ততার
মধ্যেও সেই শিশু বন্ধুকে দেখিবার জন্য মধ্যে মধ্যে তাহার
খেলার ঘরে গিয়া প্রবেশ করিতেন, এবং তাহার জননীকে
আনলিত করিতেন। কলিকাতা বাসকালে বালক দেবে-
নাথ ঠাকুর প্রভৃতিকে লইয়া গাছে দোলা টাঙ্গাইয়া তাঁহাদের
সহিত দোল খাইতেন। এ সকল কেমন স্বাভাবিক। কেমন
সুন্দর। কেমন মানবীয় ভাবসম্পন্ন।ইহার মধ্যে ধর্ম সাধকের
বিকৃত মূখভঙ্গী, বি ও তিক্ত বদন, নিৰ্দোৰ আমােদের
এতি জকুটি, এ সকল কিছুই নাই। অপর দিকে মানব প্রেম
হইতেই তাহার চিত্তে নারী জাতির প্রতি স্বাভাবিক প্রীতি ও
রামমােহন
এ উঠিয়াছিল। সেই ধর্মবীর ও কবীর নারীগণের
সমকে বালকের ন্যায় নম্র ওপ্রেমে আর্জ হইতেন। যেখানেই
বাইতেন স্ত্রীগণ তাহার পক্ষপাতিনী হইতেন। যৌবনের
প্রারম্ভে তিব্বতের নারীগণ তাঁহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছিলেন।
শেষ দশায় মৃত্যুশয্যায়, একজন ইংরাজ রমণী, কুমারী হেয়ার,
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কন্যার ন্যায়, তাহার জন্য করিয়াছিলেন।
প্রাণবায়ু যখন তাহার শ্রান্ত কলেবরকে পরিত্যাগ করিল,
তখন ডাক্তার এলিন্ ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখেন, কুমারী
হেয়ার অধীর হইয়া কাঁদিতেছেন। মানুষকে যিনি
এত ভালবাসিতেন, মানুষ কেন তাঁহাকে ভালবাসিবে না?
প্রেমে প্রেম চিনে, নারীহৃদয় স্বভাবতঃ প্রেমিক, সুতরাং
নারীগণ প্রেমিক মানুষকে চিনিতে পারেন।
জীবনের মহালক্ষ্য সাধনের জন্য রামমােহন রায়ের
ব্যগ্রতার কথা বলিয়াছি; সে বিষয়ে তাহার চিত্তের একা-
তার বিষয় এখনও বলিতে বাকী আছে। তাহা বলিয়াই
প্রবন্ধের উপসংহার করিতেছি। সে কি একাগ্রতা। যে সময়ে
তিনি জন্মিয়াছিলেন সে সময়ে সৰ্ববিভাগে ভাঙ্গিয়া গড়িবার
চেষ্টা চলিতেছিল। ইংরাজ রাজগণ তখন প্রায় সকল বিষয়েই
অজ্ঞ ছিলেন , সুতরাং সৰ্ববিভাগে সকল বিষয়ে তাহাদিগকে
এদেশীয় চতুর সহকারীদের উপর নির্ভর করিতে হইত। এই
কারণে সেই সময়ে চতুর মানুষের পক্ষে প্রভূত ধন উপার্জনের
দ্বার উন্মুক্ত ছিল। এই কারণে তৎকালে দেশীয় সমাজে
।
দেখিতে দেখিতে ক্রোড়পতি লক্ষপতি হওয়া একটা দৈনিক ঘটনার মধ্যে হইয়া উঠিয়াছিল; এবং ধনাগমের বাসনা লিত অনলের ন্যায় শত শত হৃদয়ে বলিতেছিল। বিষয় সম্পত্তি, বিষয় সম্পত্তি, ইহা লােকের ধ্যানে জ্ঞানে প্রবেশ করিয়াছিল। অতৃপ্ত ও অতপণীয় ভােগলালসা সর্বত্র অনির্বাণ অনলের ন্যায় বাড়িতেছিল। ইহার মধ্যে রাম- মােহন রায় দেখা দিলেন। তিনি ১৮০৩ সাল হইতে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ইংরাজ গবর্ণমেন্টের অধীনে বিষয় কাৰ্য্য করিয়া- ছিলেন। বিষয় কাৰ্য্যে থাকিয়াও অবসর কাল, তাহার জীবনের প্রধান কাৰ্য যে ধৰ্ম-সংস্কার, তাহারই চিন্তা ও আয়ােজনে যাপন করিতেন। রঙ্গপুরে নানা সম্প্রদায়ের লােকের সহিত বিচার উপস্থিত করিয়া দেশব্যাপী অন্দোলন তুলিয়া দিলেন। ১৮১৪ সালে যেই ডিগবী সাহেব ছুটি লইয়া গেলেন, অমনি তিনিও চাকুরি ছাড়িলেন। কলি- কাতাতে আসিয়া বসিয়া কি নিজের মােপার্জিত অর্থ মুখে ভােগ করিতে পারিতেন না? তাহা করিলেন না। করিলেন কি, না বেদান্তের অনুবাদ, সত্য ধর্মের প্রচার, সহমরণ নিবারণ প্রভৃতি কাৰ্যে মুক্ত হন্তে সেই ধনের রাশি রাশি ব্যয়। কোন কোন গ্রন্থ তিনি তিন ভাষায় অনুবাদ করিয়া প্রচার করিয়াছেন। ১৮৩০ সালের মধ্যে তিনি এমনি নিঃস্ব হইয়া পড়িলেন যে, দিল্লীর সম্রাটের উকীল হইয়া ইউরােপে যাইতে হইল। ইংলতে
EN 1A RURAL
* Lidyni. Iniur, low wh
2013
In Act.
1'
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রামমােহন २७ গিয়া তাহার গ্রন্থাবলী পুনর্মুদ্রিত করিতে ও এদেশীয় প্রজাদিগের স্বত্ব ও অধিকার রক্ষার জন্য গ্রন্থ মুদ্রিত করিতে একেবারে নির্ধন হইয়া পড়িলেন। কুমারী কলেট বলিয়াছেন, দারিদ্র্যের তাড়না তাহার অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ। স্বকাৰ্য্য সাধনে কি চিত্তের একাগ্রতা ! কেবল তাহা নহে, শুনিলে কৌতুক বােধ হয়, তিনি রঙ্গভূমিতে, নৃত্যাগারে, সুহৃ-গােষ্ঠীতে যেখানে গিয়াছেন, লােকে দেখিয়া আশ্চৰ্যা- বিত হইয়াছে যে, কিয়ৎক্ষণ পরেই অন্যমনস্ক হইয়া তিনি এক কোণে, কোনও বন্ধুর সহিত ধর্মবিষয়ক প্রসঙ্গ ও বিচার উপস্থিত করিয়া তাহাতেই মগ্ন আছেন। স্বীয় লক্ষ্য সাধনে কি আবেশ। কি নেশা। সর্বত্র একই চিন্তা, সর্বত্র একই প্রধান প্রসঙ্গ, সর্বত্র একই প্রধান আলােচনা,-তাহা মানবের ধর্মভাবের ও ধর্ম জীবনের উন্নতি। বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগরের চরিত্রে যাহা সর্বপ্রধান গুণ—যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালী-জীবনের জড়ত্ব, সবলে ভেদ করিয়া, একমাত্র নিজের গতি-বেগ-প্রাবল্যে কঠিন প্রতি কূলতাব বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া—হিন্দুদের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে—ককণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত
পার ম্যকের অভিমূখে আপনার দৃঢ়নিষ্ট একা একক
জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন, আমি যদি
তাহার সেই গুণকীর্তন করিতে বিরত হই, তবে আমার
কর্তব্য একেবারেই অসম্পন্ন থাকিয়া যায়। কারণ,
বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত আলােচনা করিয়া দেখিলে এই
কথাটি বারংবার মনে উদয় হয় যে, তিনি যে বাঙালী
বড়লােক ছিলেন, তাহা নহে; তিনি যে রীতিমত হিন্দু
ছিলেন, তাহা নহে;—তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশী
বড় ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন। বিদ্যাসাগরের
জীবনীতে এই অনন্যসুলভ মনুষ্যত্বের প্রাচুৰ্যই সর্বোচ্চ
গৌরবের বিষয়। তাহার সেই পর্বতপ্রমাণ চরিত্ৰমাহাত্ম্য
তাহারই কৃতকীর্তিকেও খর্ব করিয়া রাখিয়াছে।
তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা কখন
সাহিত্যসম্পদে ঐশ্বৰ্যশালিনী হইয়া উঠে, যদি এই ভাষা
অক্ষয় ভাবজননীরূপে মানবসভ্যতার ধাত্রীগণের ও মাতৃগণের
মধ্যে গণ্য হয়, যদি এই ভাষা পৃথিবীর শােকদুঃখের মধ্যে
এক নূতন সানাস্থল-সংসারের তুচ্ছতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের
মধ্যে এক মহত্ত্বের আদর্শলােক, দৈনন্দিন মানবজীবনের
অবসাদ ও অস্বাস্থ্যের মধ্যে সৌন্দর্যের এক নিভৃত নিকুঞ্জবন
রচনা করিতে পারে, তবেই তাহার এই কীর্তি তাঁহার
উপযুক্ত গৌরব লাভ করিতে পারিবে।
বাংলাভাষার বিকাশে বিদ্যাসাগরের প্রভাব কিরূপ
। w বিসাগর কাৰ্য করিয়াছে, এখানে তাহা স্পষ্ট করিয়া নির্দেশ করা বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্যসাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথমে বাংলাগদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ভাষা যে কেবল ভাবের একটা আধারমাত্র নহে, তাহার মধ্যে যেন-তেন-প্রকারেণ কতকগুলা বক্তব্যবিষয় পূরিয়া দিলেই যে কর্তব্য সমাপন হয় না, বিদ্যাসাগর দৃষ্টান্ত- দ্বারা তাহাই প্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন যে, যতটুকু বক্তব্য, তাহা সরল করিয়া, সুন্দর করিয়া এবং সুল করিয়া ব্যক্ত করিতে হইবে। আজিকার দিনে এ কাজটিকে তেমন বৃহৎ বলিয়া মনে হইবে না, কিন্তু সমাজ- বন্ধন যেমন মনুষ্যত্ব-বিকাশের পক্ষে অত্যাবশ্যক, তেনি ভাষাকে কলাবন্ধনের দ্বারা সুন্দররূপে সংযমিত না করিলে, সে ভাষা হইতে কদাচ প্রকৃত সাহিত্যের উদ্ভব হইতে পারে । সৈন্যদলের দ্বারা যুদ্ধ সম্ভব, কেবলমাত্র জনতার দ্বারা নহে ,জনতা নিজেকেই নিজে খণ্ডিত-প্রতিহত করিতে থাকে, তাহাকে চালনা করাই কঠিন। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, অপরিচ্ছন্ন এবং সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ গতি এবং কাৰ্যকুশলতা দান করিয়াছেন—এখন তাহার দ্বারা অনেক সেনাপতি তাৰপ্রকাশের কঠিন বাধাসকল পরাহত করিয়া সাহিত্যের পঞ্চম নব নব ক্ষেত্র আবিষ্কার ও অধিকার করিয়া লইতে পারেন- কিন্তু যিনি এই সেনানীর রচনাকর্তা, যুদ্ধজয়ের যশােভাগ সর্বপ্রথমে তাঁহাকেই দিতে হয়। বাংলাভাষাকে পূৰ্বপ্ৰচলিত অনাবশ্যক সমাসাড়ম্বরভার হইতে মুক্ত করিয়া, তাহার পদগুলির মধ্যে অংশযােজনার অনিয়ম স্থাপন করিয়া, বিদ্যাসাগর যে বাংলাগদ্যকে কেবল মাত্র সর্বপ্রকার ব্যবহারযােগ্য করিয়াই ক্ষান্ত ছিলেন, তাহা নহে, তিনি তাহাকে শােভন করিবার জন্য সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া, তাহার গতির মধ্যে একটি অনভিলক্ষ্য ছন্দঃস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া বিদ্যাসাগর বাংলাগদ্যকে সৌন্দৰ্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। গ্রাম্যপাণ্ডিত্য এবং গ্রাম্যবর্বরতা, উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযােগী আৰ্যভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপুর্বে বাংলাগদ্যের যে অবস্থা ছিল, তাহা আলােচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষাগঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টি- ক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিভাসম্পন্ন বলিয়া বিদ্যাসাগরের সম্মান নহে। বিশেষতঃ বিদ্যাসাগর যাহার উপর আপন প্রতিভা প্রয়ােগ করিয়াছিলেন, তাহা প্রবহমাণ, পরিবর্তনশীল। ভাষা নদীস্রোতের মত—তাহার উপরে কাহারাে নাম খুদিয়া রাখা বিদ্যাসাগর যায় না। মনে হয়, যেন সে চিরকাল এবং সর্বত্র স্বভাবতই এইভাবে প্রবাহিত হইয়া আসিতেছে। বাস্তবিক সে যে কোন্ কোন্ নিঝরধারায় গঠিত ও পরিপুষ্ট, তাহা নির্ণয় করিতে হইলে উজানমুখে গিয়া পুরাবৃত্তের দুর্গম গিরিশিখরে অনােহণ করিতে হয়। বিশেষ গ্রন্থ অথবা চিত্র অথবা মূর্তি চিরকাল আপনার স্বাতন্ত্র্যরক্ষা করিয়া আপন রচনাকর্তাকে স্মরণ করাইয়া দেয়, কিন্তু ভাষা হােট-বড় অসংখ্য লােকের নিকট হইতে জীবনলাভ করিতে করিতে ব্যাপ্ত হইয়া পূর্ব ইতিহাস বিস্মৃত হইয়া চলিয়া যায়, বিশেষরূপে কাহারাে নাম ঘােষণা করে না। কিন্তু সেজন্য আক্ষেপ করিবার প্রয়ােজন নাই; কারণ, বিদ্যাসাগরের গৌরব কেবলমাত্র তাঁহার প্রতিভার উপর নির্ভর করিতেছে না। প্রতি মানুষের সমস্তটা নহে, তাহা মানুষের একাংশ- মাত্র। প্রতিভা মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের মত, আর মনুষ্যত্ব চরিত্রের দিবালােক, তাহা সর্বব্যাপী ও স্থির। প্রতিভা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ—আর, মনুষ্য জীবনের সকল মুহুর্তেই সকল কার্যেই আপনাকে ব্যক্ত করিতে থাকে। প্রতিভা অনেক সময়ে বিদ্যুতের ন্যায় আপনার আংশিকতা- বশতই লােকচক্ষে তীব্রতররূপে আঘাত করে এবং চরিত্রমহত্ত্ব আপনার ব্যাপকতাগুণেই প্রতিভা অপেক্ষা মানতর বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কিন্তু চরিত্রের শ্রেষ্ঠতাই যে যথার্থ শ্রেষ্ঠত, বিয়া দেখিলে সে বিষয়ে কাহারাে সংশয় থাকিতে পারে না। ভাষা, প্রন্তর অথবা চিত্রপটের দ্বারা সত্য এবং সৌন্দৰ্য্য প্রকাশ করা ক্ষমতার কাৰ্য, সন্দেহ নাই, তাহাতে বিচিত্র বাধা অতিক্রম এবং অসামান্য নৈপুণ্য প্রয়ােগ করিতে হয়। কিন্তু নিজের সমগ্র জীবনের দ্বারা সেই সত্য ও সৌন্দৰ্য্য প্রকাশ করা তদপেক্ষা আরাে বেশী দুরূহ, তাহাতে পদে পদে কঠিনতর বাধা অতিক্রম করিতে হয় এবং তাহাতে স্বাভাবিক সূক্ষ বােধশক্তি ও নৈপুণ্য, সংযম ও বল অধিকতর আবশ্যক এই চরিত্ররচনার প্রতি কোনাে সাম্প্রদায়িক শাস্ত্র মানিয়া চলে না। প্রকৃত কবির কবিত্ব যেমন অলঙ্কারশাস্ত্রের অতীত, অথচ বিশ্বহৃদয়ের মধ্যে বিথিরচিত নিগুঢনিহিত এক অলিখিত অলঙ্কারশাস্ত্রের কোন নিয়মের সহিত তাহার স্বভাবতঃ কোন বিরােধ হয় না, তেমনি যাহারা যথার্থ মনুষ্য, তাহাদের শাস্ত্র তাঁহাদের অন্তরের মধ্যে, অথচ বিশ্বব্যাপী মনুষ্যত্বের সমস্ত নিত্যবিধানগুলির সঙ্গে সে শাস্ত্র আপনি মিলিয়া যায়। অতএব, অন্যান্য প্রতিভায় যেমন “ওরিজিন্যালিটি” অর্থাৎ অনন্যতন্ত্র প্রকাশ পায়, মহচ্চরিত্র- বিকাশেও সেইরূপ অনন্যতন্ত্রতার প্রয়ােজন হয়। অনেকে বিদ্যাসাগরের অনন্য প্রতি ছিল না বলিয়া আভাস দিয়া থাকেন; তাঁহারা জানেন, অনন্যতত্ব কেবল সাহিত্যে
বিদ্যাসাগর
এবং শিল্পে, বিজ্ঞানে এবং দর্শনেই প্রকাশ পাইয়া থাকে।
বিদ্যাসাগর এই অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে
নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফুট করিয়া যে
এক অসামান্য অন্যতত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা বাংলার
ইতিহাসে অতিশয় বিরল। এত বিরল যে, এক শতাব্দীর
মধ্যে কেবল আর দুইএক জনের নাম মনে পড়ে এবং
তাঁহাদের মধ্যে রামমােহন রায় সর্বশ্রেষ্ঠ।
অনতন্ত্রতা শব্দটা শুনিবামাত্র তাহাকে সঙ্কীর্ণতা বলিয়া
ভ্রম হইতে পারে; মনে হইতে পারে, তাহা ব্যক্তিগত
বিশেষত্ব, সাধারণের সহিত তাহার যােগ নাই। কিন্তু সে
কথা যথার্থ নহে। বস্তুতঃ আমরা নিয়মের শৃঙ্খলে, জটিল
কৃত্রিমতার বন্ধনে এতই জড়িত ও আচ্ছন্ন হইয়া থাকি যে,
আমরা সমাজের কল-চালিত পুলের মত হইয়া যাই;
অধিকাংশ কাজই সংস্কারাধীনে অন্ধভাবে সম্পন্ন করি ; নিজ
কাহাকে বলে, জানি না, জানিবার আবশ্যকতা রাৰি না।
আমাদের ভিতরকার আসল মানুষটি জন্মাবধি মৃত্যুকাল
পৰ্যন্ত প্রায় সুপ্তভাবেই কাটাইয়া দেয়, তাহার স্থানে কাজ
করে একটা নিয়ম-বাঁধা যন্ত্র। যাহাদের মধ্যে মনুষ্যরে
পরিমাণ অধিক, চিরাগত প্রথা ও অভ্যাসের কড় আচ্ছাদনে
তাঁহাদের সেই প্রবল শক্তিকে চাপা দিয়া রাখিতে পারে না।
ইহারাই নিজের চরিত্রপুরীর মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার
প্রাপ্ত হন। অন্তর মনুষ্যদের এই স্বাধীনতার নামই
পর
নিজ। এই নিজস্ব ব্যক্তভাবে ব্যক্তিবিশেষের, কিন্তু নিগুঢ়--
ভাবে সমস্ত মানবের। মহৎ ব্যক্তিরা এই নিজত্বপ্রভাবে
একদিকে স্বতন্ত্র,একক, অন্যদিকে সমস্ত মানবজাতির
সবর্ণ-সহােদর। আমাদের দেশে রামমােহন রায় এবং
বিদ্যাসাগর উভয়ের জীবনেই ইহার পরিচয় পাওয়া যায়।
একদিকে যেমন তাঁহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপরদিকে
য়ুরােপীয় প্রকৃতির সহিত তাঁহাদের চরিত্রের বিস্তার নিকট
সাদৃশ্য দেখিতে পাই। অথচ তাহা অনুকরণগত সাদৃশ্য
নহে। বেশভূষায়, আচার-ব্যবহারে তাহারা সম্পূর্ণ বাঙালী
ছিলেন; স্বজাতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে তাহাদের সমতুল্য কেহ ছিল
; স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূলপত্তন তঁাহারাই
করিয়া গিয়াছেন—অথচ নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা,
লােকহিতৈষা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাহারা
বিশেষরূপে য়ুরােপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন।
য়ুরােপীয়দের তুচ্ছ বাহ্য অনুকরণের প্রতি তাঁহারা যে
অবজ্ঞাপ্রকাশ করিয়াছেন, তাহাতেও তাঁহাদের যুবােপীয়-
সুলভ গভীর আত্মসম্মানবােধের পরিচয় পাওয়া যায়।
য়ুরােপীয় কেন, সরল সত্যপ্রিয় সাঁওতালেরাও যে অংশে
মনুষ্যত্বে ভূষিত, সেই অংশে বিদ্যাসাগর তাঁহার স্বজাতীয়
বাঙালীর অপেক্ষা সাঁওতালের সহিত আপনার অন্তরের
যথার্থ ঐক্য অনুভব করিতেন।
মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চৰ্য ব্যতিক্রম
বিদ্যাসাগর হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালী নিৰ্মাণ করিতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন। কি নিয়মে বড়লােকের অত্যুত্থান হয়, তাহা সকল দেশেই রহস্যময়—আমাদের এই ক্ষুদ্ৰকৰ্মা ভীরুহৃদয়ের দেশে সে রহস্য দ্বিগুণতর দুর্ভেদ্য। বিদ্যাসাগরের চরিত্রসৃষ্টিও রহস্যাবৃত—কিন্তু ইহা দেখা যায়, সে চরিত্রের ছাঁচ ছিল ভাল। ঈশ্বরচন্দ্রের পূর্বপুরুষের মধ্যে মহত্বের উপকরণ প্রচুরপরিমাণে সঞ্চিত ছিল। বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত আলােচনা করিলে প্রথমেই তাঁহার পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। লােকটি অনন্যসাধারণ ছিলেন, তাহাতে সন্দেহ- মাত্র নাই। মেদিনীপুর জেলায় বনমালিপুরে তাহার পৈতৃক বাসস্থান ছিল। তাঁহার পিতার মৃত্যুর পরে বিষয়বিভাগ লইয়া সহােদরদের সহিত মনান্তর হওয়ায় তিনি সংসারত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। বহুকাল পরে তর্কভূষণ দেশে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন, তাঁহার স্ত্রী দুর্গাদেবী ভাশুর ও দেবরগণের অনাদরে প্রথমে শ্বশুরালয় হইতে বীরসিংহগ্রামে পিত্রালয়ে, পরে সেখানেও ভ্রাতা ও ভ্রাতৃজায়ার লাঞ্ছনায় বৃদ্ধপিতার সাহায্যে পিতৃভবনের অনতিদূরে এক কুটীরে বাস করিয়া, চরকা কাটিয়া দুই পুত্র ও চারি কন্যা সহ বহুকষ্টে দিনপাত করিতেছেন। তর্কভূষণ ভ্রাতাদের আচরণ শুনিয়া নিজের
স্বত্ব ও তাঁহাদের সংশ্রব ত্যাগ করিয়া ভিনগ্রামে দারি
অবলম্বন করিয়া রহিলেন। কিন্তু যাঁহার স্বভাবের মধ্যে
মহ আছে, দারিদ্র্যে তাহাকে দরিদ্র করিতে পারে না।
বিদ্যাসাগর স্বয়ং তাঁহার পিতামহের যে চরিত্র বর্ণনা করিয়া-
হেন, স্থানে স্থানে তাহা উদ্ধৃত করিতে ইচ্ছা করি।
“তিনি নিরতিশয় তেজস্বী ছিলেন; কোন অংশে কাহারও
নিকট অবনত হইয়া চলিতে, অথবা কোনপ্রকারে অনাদর বা
অবমাননা সহ্য করিতে পারিতেন না। তিনি সকল স্থলে,
সকল বিষয়ে, স্বীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন,
অন্যদীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তন, তদীয় স্বভাব ও অভ্যাসের
সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। উপকারপ্রত্যাশায়, অথবা অন্য
কোনও কারণে, তিনি কখনও পরের উপাসনা বা আনুগত্য
করিতে পারেন নাই।”
ইহা হইতেই বুঝিতে পারা যাইতেছে, একান্নবর্তী পরি-
বারে কেন এই অগ্নিখশুটিকে ধরিয়া রাখিতে পারে নাই।
তাহারা পাঁচ সহােদর ছিলেন, কিন্তু তিনি একাই নীহারিকা-
চক্র হইতে বিচ্ছিন্ন জ্যোতিকের মত আপন বেগে বাহিরে
বিক্ষিপ্ত হইয়াছিলেন। একান্নবর্তী পরিবারের বহুভারাক্রান্ত
যত্রেও তাহার কঠিন চরিত্র পেষণ করিয়া দিতে পারে
নাই।
“তাহার শ্যালক রামসুন্দর বিদ্যাভূষণ গ্রামের প্রধান
রচিত বিগত ৩১ পূজা।
বিদ্যাসাগর বলিয়া পরিগণিত এবং সাতিশয় গর্বিত ও উদ্ধতাৰ ছিলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন, ভগিনীপতি রামজয় তাঁহার অনুগত হইয়া থাকিবেন। কিন্তু, তাহার ভগিনীপতি কিরূপ প্রকৃতির লােক, তাহা বুঝিতে পারিলে, তিনি সেরূপ মনে করিতে পারিতেন না। রামজয় রামসুন্দরের অনুগত হইয়া না চলিলে, রামসুন্দর নানাপ্রকারে তাঁহাকে জব্দ করিবেন, অনেকে তাহাকে এই ভয় দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু রামজয়, কোনও কারণে, ভয় পাইবার লােক ছিলেন না; তিনি স্পষ্টবাক্যে বলিতেন, বরং বাসত্যাগ করিব, তথাপি শালার অনুগত হইয়া চলিতে পারিব না। শ্যালকের আক্রোশে, ভঁহাকে সময়ে সময়ে প্রকৃতভাবে, এক- ঘরিয়া হইয়া থাকিতে ও নানাপ্রকার অত্যাচার-উপদ্রব সহ করিতে হইত; তিনি তাহাতে ক্ষুব্ধ বা চলচিত্ত হইতেন না।” তাহার তেজস্বিতার উদাহরণস্বরূপে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, জমিদার যখন তাহাদের বীরসিংহগ্রামের নূতন বাবাটী নিষ্কর ব্রহ্মোর করিয়া দিবেন মানস করিয়াছিলেন, তখন রামজয় দানগ্রহণ করিতে সম্মত হন নাই। গ্রামের অনেকেই বসতবাটী নাখেরাজ করিবার জন্য তাহাকে অনেক উপদেশ দিয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারও অনুরােধ রক্ষা করেন নাই। এমন লােকের পক্ষে দারিও মহৈাৰ্য্য, * রচিত বিদ্যাসাগরিত, ৩ পৃষ্ঠা।
ছিলেন;
ইহাতে সঁহার স্বাভাবিক সম্পদ জাজ্বল্যমান করিয়া
তােলে।
কিন্তু তর্কভূষণ যে আপন স্বাতন্ত্রগর্বে সর্বসাধারণকে
অবজ্ঞা করিয়া দূরে থাকিতেন, তাহা নহে। বিদ্যাসাগর
বলেন, “তর্কভূষণমহাশয় নিরতিশয় অমায়িক ও নিরহঙ্কার
কি ছােট, কি বড়, সর্ববিধ লােকের সহিত,
সমবে সদয় ও সাদর ব্যবহার করিতেন। पिनि
যাহাদিগকে কপটাচারী মনে করিতেন, তাঁহাদের সহিত
সাধ্যপক্ষে আলাপ করিতেন না। তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন,
কেহ রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবেন, ইহা ভাবিয়া, স্পষ্টকথা বলিতে
ভীত বা সঙ্কুচিত হইতেন না। তিনি যেমন স্পষ্টবাদী,
তেমনই যথার্থবাদী ছিলেন। কাহারও ভয়ে বা অনুরােধে,
অথবা অন্য কোনও কারণে, তিনি কখনও কোনও বিষয়ে
অযথা নির্দেশ করেন নাই। তিনি যাহাদিগকে আচরণে
অত্র দেখিতেন, তাহাদিগকেই ভদ্র বলিয়া গণ্য করিতেন ,
আর যাহাদিগকে আচরণে অভ দেখিতেন, বিদ্বান, ধনবান্
ও ক্ষমতাপন্ন হইলেও, তাহাদিগকে ভদ্রলােক বলিয়া জ্ঞান
করিতেন না।
এদিকে তর্কভূষণমহাশয়ের বল এবং সাহসও আশ্চৰ্য্য
ছিল। সর্বদাই তাহার হস্তে একখানি লৌহদণ্ড থাকিত।
*স চন্দ্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত, পৃষ্ঠা।
+ তি বিদ্যাসাগরচরিত, ৩২ পৃষ্ঠা।
বিসাগর তখন দস্যভয়ে অনেকে একত্র না হইয়া স্থানান্তরে যাইতে পারিত না, কিন্তু তিনি একা এই লৌহদণ্ডহন্তে অকুতােভয়ে সর্বত্র যাতায়াত করিতেন; এমন কি, দুইচারিবার আক্রান্ত হইয়া দস্যদিগকে উপযুক্তরূপ শিক্ষা দিয়াছিলেন। একুশ বৎসর বয়সে একবার তিনি এক ভালুকের সম্মুখে পড়িয়া- ছিলেন। “ভালুক নখরহারে সঁহার সর্বশরীর ক্ষতবিক্ষত করিতে লাগিল, তিনিও অবিশ্রান্ত লৌহষ্টি প্রহার করিতে লাগিলেন। ভালুক ক্রমে নিস্তেজ হইয়া পড়িলে, তিনি, তদীয় উদরে উপর্যুপরি পদাঘাত করিয়া, তাহার প্রাণসংহার করিলেন।” । অবশেষে শােণিতক্ষত বিক্ষতদেহে চারিক্রোশ পথ হাঁটিয়া মেদিনীপুরে এক আত্মীয়ের গৃহে শয্যা আশ্রয় করেন ;-দুইমাস পরে সুস্থ হইয়া বাড়ী ফিরিতে পারেন। আর একটিমাত্র ঘটনা উল্লেখ করিলে তর্কভূষণের চরিত্র- চিত্র সম্পূর্ণ হইবে। ১৭৪২ শকের ১২ই আশ্বিন মঙ্গলবারে বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অদূরে কোমরগঞ্জে মধ্যাহ্নে হাট করিতে গিয়াছিলেন। রামজয় তর্কভূষণ তাঁহাকে ঘরের একটি শুভসংবাদ দিতে বাহির হইয়াছিলেন। পথের মধ্যে পুত্রের সহিত দেখা হইলে বলিলেন, “একটি এড়ে বাছুর হয়েছে।” শুনিয়া ঠাকুরদাস ধরে আসিয়া গােয়ালের অভিমূখে গমন করিতেছিলেন; তর্কভূষণ হাসিয়া কহিলেন, * স্বরচিত বিসাগরচয়িত।
ওদিকে নয়, এদিকে এস”বলিয়া সূতিকাগৃহে লইয়া
নবপ্রসূত শিও ঈরচন্দ্রকে নির্দেশ করিয়া দেখাইলেন।
এই কৌতুকহাস্যরশিপাতে রামজয়ের বলিষ্ঠ উন্নতচরিত্র
আমাদের নিকট প্রভাতের গিরিশিখরের ন্যায় রমণীয় বােধ
হইতেছে। এই হাস্যময় তেজোময় নির্ভীক ঋজুস্বভাব
পুরুষের মত আদর্শ বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল না হইলে
বাঙালির মধ্যে পৌরুষের অভাব হইত না। আমরা তাহার
চরিত্রবর্ণনা বিস্তারিতরূপে উদ্ধৃত করিলাম, তাহার কারণ,
এই দরিদ্র ব্রাহ্মণ তাহার পৌত্রকে আর কোন সম্পত্তি দান
করিতে পারেন নাই, কেবল যে অক্ষয়সম্পদের উত্তরাধিকার
বন্টন একমাত্র ভগবানের হতে, সেই চরিত্ৰমাহাত্ম্য অখণ্ডভাবে
তাহার জ্যেষ্ঠ পৌত্রের অংশে রাখিয়া গিয়াছিলেন।
পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও সাধারণ লােক ছিলেন
। যখন তাঁহার বয়স ১৪১৫ বৎসর, এবং যখন তাঁহার
মা দুর্গাদেবী চরকায় সূতা কাটিয়া একাকিনী তাহার দুই
পুত্র এবং চারি কন্যার ভরণপােষণে প্রবৃত্ত ছিলেন, তখন
ঠাকুরদাস উপার্জনের চেষ্টায় কলিকাতায় প্রস্থান করিলেন।
কলিকাতায় আসিয়া প্রথমে তিনি তাঁহার আত্মীয়
জগন্মােহন তর্কালঙ্কারের বাড়ীতে উঠিলেন। ইংরাজি
শিখিলে সওদাগর সাহেবদের হৌসে কাজ জুটিতে পারিবে
জানিয়া, প্রত্যহ সন্ধ্যাবেলায় এক শিপূসরকারের বাড়ী
ইংরাজি শিখিতে যাইতেন। যখন বাড়ী ফিরিতেন, তখন
বিতাসাগর
তর্কালঙ্কারের বাড়ীতে উপরিলােকের আহায়ের কাণ্ড শেষ
হইয়া যাইত, সুতরাং তাহাকে রাত্রে অনাহারে থাকিতে
হইত। অবশেষে তিনি তাহার শিক্ষকের এক আত্মীয়ের
বাড়ী আশ্রয় লইলেন। আশ্রয়দাতার দারিদ্র্যনিবন্ধন এক
একদিন তাহাকে সমদিন উপবাসী থাকিতে হইত। একদিন
ক্ষুধার জ্বালায় তাহার যথাসৰ্বৰ একখানি পিতলের থালা ও
একটি ঘােট ঘটি কাঁসারির দোকানে বেচিতে গিয়াছিলেন।
কাঁসারিরা তাহার পাচসিকা দর স্থির করিয়াছিল, কিন্তু
কিনিতে সম্মত হইল না; বলিল, অজানিত লােকের নিকট
হইতে পুরাণ বাসন কিনিয়া মাঝে মাঝে বড ফোদে পড়িতে
হয়।
আর একদিন ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলিবার অভিপ্রায়ে মধ্যাহ্নে
ঠাকুরদাস বাসা হইতে বাহির হইয়া পথে পথে ভ্রমণ করিতে
লাগিলেন। “বড়বাজার হইতে ঠঠনিয়া পৰ্যন্ত গিয়া এত
অভিভূত হইলেন যে, আর তাহার চলিবার ক্ষমতা রহিল
না। কিঞ্চিৎ পরেই তিনি এক দোকানের সম্মুখে উপস্থিত
ও দণ্ডায়মান হইলেন; দেখিলেন, এক মধ্যবয়স্কা বিধবা নারী
ঐ দোকানে বসিয়া মুড়িমুড়কি বেচিতেছেন। তাহাকে
দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া, ঐ খ্রীলােক জিজ্ঞাসা করিলেন,
বাবাঠাকুর, দাঁড়াইয়া আছ কেন? ঠাকুরদাস তৃষ্ণার উল্লেখ
করিয়া, পানার্থে জল প্রার্থনা করিলেন। তিনি, সাদর ও
সহােদর সুত্র বিদ্যায়ত্ব প্রণীত বিদ্যাসাগরীৰচয়িত।
সস্নেহৰাকে, ঠাকুরদাসকে বসিতে বলিলেন, এবং ব্রাহ্মণের
ছেলেকে শুধু জল দেওয়া অবিধেয়, এই বিবেচনা করিয়া,
কিছু মুড়কি ও জল দিলেন। ঠাকুরদাস, যেরূপ ব্যগ্র হইয়া,
মুড়কিগুলি খাইলেন, তাহা একদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া, ঐ
শ্ৰীলােক জিজ্ঞাসা করিলেন, বাবাঠাকুর, আজ বুঝি তােমার
খাওয়া হয় নাই? তিনি বলিলেন, না মা, আজ আমি, এখন
পৰ্যন্ত কিছু খাই নাই। তখন সেই স্ত্রীলােক ঠাকুরদাসকে
বলিলেন, বাবাঠাকুর, জল খাইয়াে না, একটু অপেক্ষা কর।
এই বলিয়া নিকটবর্তী গােয়ালার দোকান হইতে, সত্বর দই
কিনিয়া আনিলেন, এবং আরও মুড়কি দিয়া, ঠাকুরদাসকে
পেট ভরিয়া কলার করাইলেন; পরে তাঁহার মূখে সমস্ত
অবগত হইয়া, জিন্ করিয়া বলিয়া দিলেন, যেদিন তােমার
এরূপ ঘটিবে, এখানে আসিয়া ফলার করিয়া যাইবে।”
এইরূপ কষ্টে কিছু ইংরাজি শিখিয়া ঠাকুরদাস প্রথমে
মাসিক দুই টাকা ও তাহার দুই তিন বৎসর পরে মাসিক
পাঁচটাকা বেতন উপার্জন করিতে লাগিলেন। অবশেষে
জননী দুর্গাদেবী যখন শুনিলে, তাহার ঠাকুরদাসের মাসিক
আট টাকা মাহিয়ানা হইয়াছে, তখন তাহার আজাদের সীমা
রহিল না এবং ঠাকুরদাসের সেই তেইশ চব্বিশ বৎসর বয়সে
গােটনিবাসী রামকান্ত তর্কবাগীশের দ্বিতীয়া কন্যা ভগবতী
দেবীর সহিত তাহার বিবাহ দিলেন।
* রচিত বিসাগরিত, ১০ পৃষ্ঠা।
বিদ্যাসাগর বঙ্গদেশের সৌভাগ্যক্রমে এই ভগবতী দেবী এক অসামান্যা রমণী ছিলেন। শ্রীযুক্ত চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের রচিত বিদ্যাসাগরগ্রন্থে এই দেবীমূর্তি প্রকাশিত হইয়াছে। অধিকাংশ প্রতিমূর্তিই অধিকক্ষণ দেখিবার দরকার হয় না, তাহা যেন মুহূর্তকালের মধ্যেই নিঃশেষিত হইয়া যায়। তাহা নিপুণ হইতে পারে, সুন্দর হইতে পারে, তথাপি তাহার মধ্যে চিনিবেশের যথােচিত স্থান পাওয়া যায় না, চিত্রপটের উপরিতলেই দৃষ্টির প্রসর পর্যবসিত হইয়া যায়। কিন্তু ভগবতী দেবীর এই পবিত্র মুখশ্রীর গভীরতা এবং উদারতা বহুক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়াও শেষ করিতে পারা যায় না। উন্নত ললাটে তাহার বুদ্ধির প্রসার, সুদূরদর্শী মেহবর্ষী আয়ত নেত্র, সরল সুগঠিত নাসিকা, দয়াপূর্ণ ওষ্ঠাধর, দৃঢ়তাপূর্ণ চিবুক, এবং সমস্ত মুখের একটি মহিমময় সুসংযত সৌন্দৰ্য্য দর্শকের হৃদয়কে বহু দূরে এবং বহু উর্ধে আকর্ষণ করিয়া লইয়া যায়-এবং ইহাও বুঝিতে পারি, ভক্তিবৃত্তির চরিতার্থসাধনের জন্য বিদ্যাসাগরকে এই মাতৃদেবী ব্যতীত কোনাে পৌরাণিক দেবীপ্রতিমার মন্দিরে প্রবেশ করিতে হয় নাই। ভগবতী দেবীর অকুণ্ঠিত দয়া তাঁহার গ্রাম, পল্লী, প্রতিবেশীকে নিয়ত অভিষিক্ত করিয়া রাখিত। রােগার্তের সেবা, ক্ষুধার্তকে অনুদান এবং শােকাতুরের দুঃখে শােক- প্রকাশ করা তাঁহার নিত্যনিয়মিত কার্য ছিল। অগ্নিদাহে
পর
বীরসিংহগ্রামের বাসস্থান ভস্মীভূত হইয়া গেলে বিদ্যাসাগর
যখন তাহার জননীদেবীকে কলিকাতায় লইয়া যাইবার
চেষ্টা করেন, তিনি বলিলেন, “যে সকল দরিদ্রলােকের
সন্তানগণ এখানে ভােজন করিয়া বীরসিংহবিদ্যালয়ে অধ্যয়ন
করে, আমি এখান পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে প্রস্থান
করিলে তাহারা কি খাইয়া স্কুলে অধ্যয়ন করিবে?”
দয়াবৃত্তি আরাে অনেক রমণীর মধ্যে দেখা যায়; কিন্তু
ভগবতী দেবীর দয়ার মধ্যে একটি অসাধারণত্ব ছিল, তাহা
কোনােকার সঙ্কীর্ণ সংস্কারের দ্বারা বদ্ধ ছিল না। সাধারণ
লােকের দয়া দিয়াশলাই-শলাকার মত কেবল বিশেষরূপ
সংঘর্ষেই বলিয়া উঠে এবং তাহা অভ্যাস ও লােকাচারের
ক্ষুদ্র বাক্সের মধ্যেই বদ্ধ। কিন্তু ভগবতী দেবীর হৃদয়,
সূৰ্য্যের ব্যায়, আপনার বুদ্ধি-উজ্জ্বল দয়ারশ্মি স্বভাবতই
চতুর্দিকে বিকীর্ণ করিয়া দিত, শাস্ত্র বা প্রথাসংঘর্ষের অপেক্ষা
করি না। বিদ্যাসাগরের তৃতীয় সহােদর শচন্দ্র বিদ্যারত্ব
মহাশয় তাহার ভ্রাতার জীবনচরিতে লিখিয়াছেন যে,
একবার বিদ্যাসাগর তাহার জননীকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন,
“বৎসরের মধ্যে একদিন পূজা করিয়া ৬৭ শত টাকা বৃথা
ব্যয় করা ভাল, কি গ্রামের নিরুপায় অনাথ লােকদিগকে
ঐ টাকা অবস্থানুসারে মাসে মাসে কিছু কিছু সাহায্য করা
ভাল?” ইহা শুনিয়া জননীদেবী উত্তর করেন, গ্রামের
* সহোর পুত্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগলীনচরিত, ২•• পৃষ্ঠা।
বিদ্যাসাগর
১১
দরিদ্র নিরুপায় লােক প্রত্যহ খাইতে পাইলে পূজা করিবার
আবশ্যক নাই।” এ কথাটি সহজ কথা নহে,—তাঁহার
নির্মলবুদ্ধি এবং উজ্জ্বল দয়া প্রাচীন সংস্কারের মােহারণ যে
এমন অনায়াসে বর্জন করিতে পারে, ইহা আমার নিকট
বড় বিস্ময়কর বােধ হয়। লৌকিকপ্রথার বন্ধন রমণীর
কাছে যেমন দৃঢ়, এমন আর কাহার কাছে? অথচ কি
আশ্চৰ্য্যস্বাভাবিক চিশক্তির দ্বারা তিনি জড়তাময় প্রথাভিত্তি
ভেদ করিয়া নিত্যজ্যোতির্ময় অনন্ত বিধৰ্মাকাশের মধ্যে
উত্তীর্ণ হইলেন। এ কথা তাঁহার কাছে এত সহজ বােধ
হইল কি করিয়া যে, মনুষ্যের সেবাই যথার্থ দেবতার পূজা ?
তাহার কারণ, সকল সংহিতা অপেক্ষা প্রাচীনতম সংহিতা
তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে স্পষ্টাক্ষরে লিখিত ছিল।
সিবিলিয়া হরিসাহেব যখন কাৰ্যোপলক্ষ্যে মেদিনী-
পুরজেলায় গমন করেন, তখন ভগবতী দেবী তাহাকে স্বনামে
পত্র পাঠাইয়া বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছিলেন;
তৎসম্বন্ধে তাহার তৃতীয়পুত্র শম্ভুচন্দ্র নিম্নলিখিত বর্ণনা প্রকাশ
করিয়াছেন ;-জননীদেবী সাহেবের ভােজনসময়ে উপস্থিত
থাকিয়া তাহাকে ভােজন করাইয়াছিলেন। তাহাতে সাহেব
আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন যে, অতি বৃদ্ধা হিন্দুস্ত্রীলােক
সাহেবের ভােজনসময়ে চেয়ারে উপবিষ্ট হইয়া কথাবার্তা
কহিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সাহেব হিন্দুর মত জননীকে
ভূমিষ্ঠ হইয়া মাতৃভাবে অভিবাদন করেন। তদনন্তর নানা
৫২
পঞ্চরত্ব
বিষয়ের কথাবার্তা হইল। জননীদেবী প্রবীণ হিন্দু স্ত্রীলােক
তথাপি তাঁহার স্বভাব অতি উদার, মন অতিশয় উন্নত এবং
মনে কিছুমাত্র কুসংস্কার নাই। কি ধনশালী কি দরিদ্র, কি
বিদ্বান্ কি মূর্খ, কি উচ্চজাতীয় কি নীচজাতীয়, কি পুরুষ কি
স্ত্রী, কি হিন্দুধর্মাবলম্বী কি অন্যথৰ্মাবলী, সকলেরই প্রতি
সমদৃষ্টি।”
বিদ্যাসাগর তাহার বর্ণপরিচয় প্রথমভাগে গােপাল নামক
একটি সুবােধ ছেলের দৃষ্টান্ত দিয়াছেন, তাহাকে বাপমায়ে
যাহা বলে, সে তাহাই করে। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র নিজে যখন
সেই গােপালের বয়সী ছিলেন, তখন গােপালের অপেক্ষা
কোনাে কোনাে অংশে রাখালের সঙ্গেই তাহার অধিকতর
সাদৃশ্য দেখা যাইত। পিতার কথা পালন করা দূরে থাক,
পিতা যাহা বলিতেন, তিনি ঠিক তাহার উল্টা করিয়া
বসিতেন। শম্ভুচন্দ্র লিখিয়াছেন—“পিতা তাঁহার স্বভাব
বুঝিয়া চলিতেন। যেদিন শাদাব না থাকিত, সেদিন
বলিতেন, আজ ভাল কাপড় পরিয়া কলেজে যাইতে হইবে;
তিনি হঠাৎ বলিতেন, না, আজ ময়লা কাপড় পরিয়া
যাইব। যেদিন বলিতেন, আজ স্নান করিতে হইবে;
শ্রবণমাত্ৰ দাদা বলিতেন যে, আজ স্নান করিব না; পিতা
প্রহার করিয়াও স্নান করাইতে পারিতেন না। সঙ্গে
করিয়া ট্যাকশালের ঘাটে নামাইয়া দিলেও গড়াইয়া
•
সহোদর শচন্দ্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত, ১৯ পৃষ্ঠা।
বিদ্যাসাগর ৩ থাকিতেন। পিতা চড়চাপড় মারিয়া জোর করিয়া স্নান করাইতেন।” পাঁচ ছয় বৎসর বয়সের সময় যখন গ্রামের পাঠশালায় পড়িতে যাইতেন, তখন প্রতিবেশী মথুর মণ্ডলের স্ত্রীকে রাগা- ইয়া দিবার জন্য যে প্রকার সভ্যবিগর্হিত উপদ্রব তিনি করি- তেন, বর্ণপরিচয়ের সর্বজননিন্দিত রাখাল বেচারাও বােধ করি এমন কাজ কখনাে করে নাই। নিরীহ বাংলাদেশে গােপালের মত সুবােধ ছেলের অভাব নাই। এই ক্ষীণতেজ দেশে রাখাল এবং তাহার জীবনী লেখক ঈশ্বরচন্দ্রের মত দুর্দান্ত ছেলের প্রাদুর্ভাব হইলে বাঙালী জাতির শীর্ণচরিত্রের অপবাদ ঘুচিয়া যাইতে পারে। সুবােধ ছেলেগুলি পাস্ করিয়া ভাল চাকরি-বাকরি ও বিবাহ- কালে প্রচুর পণ লাভ করে, সন্দেহ নাই, কিন্তু দুষ্ট অবাধ্য অশান্ত ছেলেগুলির কাছে স্বদেশের জন্য অনেক আশা করা যায়। বহুকাল পূর্বে একদা নবদ্বীপের শচীমাতার এক প্রবল দুরন্ত ছেলে এই আশা পূর্ণ করিয়াছিলেন। কিন্তু একটা বিষয়ে রাখালের সহিত তাহার জীবনচরিত- লেখকের সাদৃশ্য ছিল না। রাখাল পড়িতে যাইবার সময় পথে খেলা করে, মিছামিছি দেরি করিয়া, সকলের শেষে পাঠশালায় যায়। কিন্তু পড়াশুনায় বালক ঈশ্বরচন্দ্রের কিছুমাত্র শৈথিল্য ছিল না। যে প্রবল জিদের সহিত তিনি পিতার আদেশ ও নিষেধের বিপরীত কাজ করিতে প্রবৃত্ত : হইতেন, সেই দুর্গম জিদের সহিত তিনি পড়িতে যাইতেন। সেও তাহার প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে নিজের জিরক্ষা। সূত্র একগুয়ে ছেলেটি মাথায় এক মস্ত ছাততুলিয়া তাহাদের বড়বাজারের বাসা হইতে পটলডাঙায় সংস্কৃত কলেজে যাত্রা করিতেন; লােকে মনে করিত, একটা হাত চলিয়া যাইতেছে। এই দুর্জয় বালকের শরীরটি খর্ব, শীর্ণ; মাথাটা প্রকাণ্ড;- স্কুলের ছেলেরা সেইজন্য তাহাকে যরে কৈ ও তাহার অপ- ভ্রংশে করে জৈ বলিয়া ক্ষ্যাপাইত; তিনি তখন ভােলা ছিলেন, রাগিয়া কথা কহিতে পারিতেন না। এই বালক রাত্রি দশটার সময় শুইতে যাইতেন। পিতাকে বলিয়া যাইতেন, রাত্রি দুইপ্রহরের সময় তাহাকে জাগাইয়া দিতে। পিতা আর্শাণিগির্জার ঘডিতে বানােটা বাজিলেই ঈশ্বরচন্দ্রকে জাগাইতেন, বালক অবশিষ্ট রাত্রি জাগিয়া পড়া করিতেন। ইহাও একগুয়ে ছেলের নিজের শরীরের প্রতি জি। শরীরও তাহার প্রতিশোেধ তুলিতে ছাড়িত না। মাঝে মাঝে সাংঘাতিক পীড়া হইয়াছিল, কিন্তু পীডার শাসন তাহাকে পরাভূত করিতে পারে নাই। ইহার উপরে গৃহকর্মও অনেক ছিল। বাসায় তাহার পিতা ও মধ্যমভ্রাতা ছিলেন। দাসদাসী ছিল না। ঈশ্বরচন্দ্র দুইবেলা সকলের রন্ধনাদি কাৰ্য করিতেন। সহােদর শচন্দ্র তাহার বর্ণনা করিয়াছেন। প্রত্যুষে নিজাভঙ্গ * সহােদয় এ বিদ্যায়ত্ব প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত।
বিদ্যাসাগর ৪৫ হইলে ঈশ্বরচন্দ্র কিয়ৎক্ষণ পুস্তক আবৃত্তি করিয়া গঙ্গার ঘাটে স্নান করিয়া কাশীনাথ বাবুর বাজারে বাটামাছ ও আলুপটল- তরকারী ক্রয় করিয়া আনিতেন। বাটুনা বাটিয়া উনা ধরাইয়া রন্ধন করিতেন। বাসায় তাহারা চারিজন খাইতেন। আহারের পর উচ্ছিষ্ট মুক্ত ও বাসন ধৌত করিয়া তবে পড়িতে যাইবার অবসর পাইতেন। পাক করিতে করিতে ও স্কুলে যাইবার সময় পথে চলিতে চলিতে পাঠানুশীলন করিতেন। এই ত অবস্থা! এদিকে দুটির সময় যখন জল খাইতে যাইতেন, তখন স্কুলের ছাত্র যাহারা উপস্থিত থাকিত, তাহা- দিগকে মিষ্টায় খাওয়াইতেন। স্কুল হইতে মাসিক যে বৃত্তি পাইতেন, ইহাতেই তাহা ব্যয় হইত। আবার, দৰােয়ানের নিকট ধার করিয়া দরিদ্র ছাত্রদিগকে নূতন বস্ত্র কিনিয়া দিতেন। পূজার ছুটির পর দেশে গিয়া “দেশস্থ যে সকল লােকের দিনপাত হওয়া দুষ্কর দেখিতেন, তাহাদিগকে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে ক্ষান্ত থাকিতেন না। অত্যন্ত লােকের পরিধেয় বস্ত্র না থাকিলে, গামছা পরিধান করিয়া নিজের বস্ত্রগুলি তাহাদিগকে বিতরণ করিতেন।” যে অবস্থায় মানুষ নিজের নিকট নিজে প্রধান দয়ার পাত্ত, সে অবস্থায় ঈশ্বরচন্দ্র অন্যকে দয়া করিয়াছেন। তাহার জীবনে প্রথম হইতে ইহাই দেখা যায় যে, তাঁহার চরিত্র সহায় শচন্দ্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগৱজীবনচরিত, ৩ পৃষ্ঠা।
সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগতই যুদ্ধ করিয়া জয়- লাভ করিয়াছে। তাহার মত অবস্থাপন্ন ছাত্রের পক্ষে বিদ্যালাভ করা পরম দুঃসাধ্য, কিন্তু এই গ্রাম্যবালক শীর্ণ খর্বদেহ এবং প্রকাণ্ড মাথা লইয়া আশ্চৰ্য্য অল্পকালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর-উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছেন। তাঁহার মত দরিদ্রাবস্থার লােকের পক্ষে দান করা, দয়া করা, বড় কঠিন, কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন, নিজের কোন প্রকার অসচ্ছলতায় তাঁহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহৈশ্বৰ্যশালী রাজা-রায়- বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই, এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন। কলেজ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া বিদ্যাসাগর প্রথমে ফোট উইলিয়ম কলেজের প্রধান পণ্ডিত ও পরে সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিষ্টান্ট সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত হন। এই কাৰ্য্যোপ- লক্ষ্যে তিনি যে সকল ইংরাজ প্রধান কর্মচারীদের সংস্রবে আসিয়াছিলেন, সকলেরই পরম শ্রদ্ধা ও প্রীতি-ভাজন হইয়া- ছিলেন। আমাদের দেশে প্রায় অনেকেই নিজের এবং স্বদেশের মর্যাদা নষ্ট করিয়া ইংরাজের অনুগ্রইলাভ করেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর সাহেবের হস্ত হইতে শিৰােগা লইবার জন্য কখন মাথা নত করেন নাই; তিনি আমাদের দেশের ইংরাজপ্রসাদগর্বিত সাহেবানুজীবীদের মত আত্মাবমাননার বিদ্যাসাগর ৪৭ মূল্যে বিক্রীত সম্মান ক্রয় করিতে চেষ্টা করেন নাই। একটা উদাহরণে তাহার প্রমাণ হইবে।একবার তিনি কাৰ্য্যোপ- লক্ষ্যে হিন্দুকলেজের প্রিন্সিপল কা-সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলেন। সভ্যতাভিমানী সাহেব তাহার বুট- বেষ্টিত দুই পা টেবিলের উপরে উদ্ধগামী করিয়া দিয়া বাঙালী ভদ্রলােকের সহিত ভদ্রতারক্ষা করা বাহুল্য বােধ করিয়াছিলেন। কিছুদিন পরে ঐ কাসাহেব কাৰ্যবশতঃ সংস্কৃতকলেজে বিদ্যাসাগরের সহিত দেখা করিতে আসিলে, বিদ্যাসাগর চটিজুতাসমেত তাঁহার সর্বজনবলনীয় চরণযুগল টেবিলের উপর প্রসারিত করিয়া এই অহঙ্কত ইংরাজ অভ্যা- গতের সহিত আলাপ করিলেন। বােধ করি শুনিয়া কেহ বিস্মিত হইবেন না, সাহেব নিজের এই অবিকল অনুকরণ দেখিয়া সন্তোষলাভ করেন নাই। ইতিমধ্যে কলেজের কার্যপ্রণালীসম্বন্ধে তাহার সহিত কর্তৃপক্ষের মনান্তর হওয়ায় ঈশ্বরচন্দ্র কর্মত্যাগ করিলেন। সম্পাদক রসময় দত্ত এবং শিক্ষাসমাজের অধ্যক্ষ ময়েটু সাহেব অনেক উপরােধ-অনুরােধ করিয়াও কিছুতেই তাঁহার পণ ভঙ্গ করিতে পারিলেন না। আত্মীয়-বান্ধবেরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তােমার চলিবে কি করিয়া? তিনি বলিলেন, আলুপটল বেচিয়া, মুদির দোকান করিয়া দিন চালাইব। তখন বাসায় প্রায় কুড়িটি বালককে তিনি অল্পবক্স দিয়া অধ্যয়ন করাইতেছিলেন—তাহাদের কাহাকেও বিদায় পর করিলেন না। তাঁহার পিতা পূর্বে চাকরি করিতেন- বিদ্যাসাগরের সবিশেষ অনুরােধে কাৰ্যত্যাগ করিয়া বাড়ী বসিয়া সংসারখরচের টাকা পাইতেছিলেন। বিদ্যাসাগর কাজ ছাড়িয়া দিয়া প্রতিমাসে ধার করিয়া পঞ্চাশটাকা বাড়ী পাঠাইতে লাগিলেন। এই সময় ময়েটু সাহেবের অনুরােধে বিদ্যাসাগর কাপ্তেন্-ব্যাঙ্ক নামক একজন ইংরাজকে কয়েক মাস বাংলা ও হিন্দী শিখাইতেন। সাহেব যখন মাসিক পঞ্চাশ টাকা হিসাবে বেতন দিতে গেলেন, তিনি বলিলেন, আপনি ময়েটু সাহেবের বন্ধু এবং ময়েটু সাহেব আমার বন্ধু- আপনার কাছে আমি বেতন সইতে পারি না। ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের সাহিত্য- অধ্যাপক ও ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে উক্ত কলেজের প্রিন্সিপল-পদে নিযুক্ত হন। আট বৎসর দক্ষতার সহিত কাজ করিয়া শিক্ষাবিভাগের নবীন কর্তা এক কণ সিবিলিয়ানের সহিত মতান্তর হইতে থাকায় ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে তিনি কর্মত্যাগ করেন। বিদ্যাসাগর স্বভাবতই সম্পূর্ণ স্বাধীনতন্ত্রের লোেক ছিলেন ; অব্যাহতভাবে আপন ইচ্ছা চালনা করিতে পাইলে তবে তিনি কাজ করিতে পারিতেন; উপরিতন কর্তৃপক্ষের মতের দ্বারা কোনরূপ প্রতিঘাত প্রাপ্ত হইলে তদনুসারে আপন সঙ্করের প্রবাহ তিলমাত্র পরিবর্তন করিতে পারিতেন । কর্মনীতির নিয়মে ইহা তাহার পক্ষে প্রশংসনীয় ছিল , কিন্তু বিধাতা তাহাকে একাধিপত্য করিবার জন্য বিদ্যাসাগর : পাঠাইয়াছিলেন; অধীনে কাজ চালাইবার গুণগুলি তাহাকে দেন নাই। উপযুক্ত অধীনস্থ কর্মচারী বাংলাদেশে যথেষ্ট আছে,—বিদ্যাসাগরকে দিয়া তাহাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করা বিধাতা অনাবশ্যক ও অসঙ্গত বােধ করিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃতকলেজে নিযুক্ত, তখন কলেজের কাজকর্মের মধ্যে থাকিয়াও এক প্রচণ্ড সমাজসংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। একদিন বীরসিংহবাটীর চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া ঈশ্বরচন্দ্র তাঁহার পিতার সহিত বীরসিংহ-স্কুলসম্বন্ধে আলােচনা করিতেছিলেন, এমন সময় তাহার মাতা নােদন করিতে করিতে চণ্ডীমণ্ডপে আসিয়া একটি বালিকার বৈধব্য- সংঘটনেব উল্লেখ কবিয়া তাহাকে বলিলেন, তুই এতদিন এত শাস্ত্র পডিলি, তাহাতে বিধবার কি কোন উপায় নাই ? মাতার পুত্র উপায় অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইলেন। স্ত্রীজাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের বিশেষ স্নেহ ও ভক্তি ছিল। ইহাও তাঁহার সুমহৎ পৌরুষের একটি প্রধান লক্ষণ। সাধারণত আমরা স্ত্রীজাতির প্রতি ঈর্ষাবিশিষ্ট; অবলা স্ত্রীলােকের সুখ-স্বাস্থ্য-স্বচ্ছন্দতা আমাদের নিকট পরম পরিহাসের বিষয়, প্রহসনের উপকরণ। আমাদের ক্ষুদ্র ও কাপুরুষতার অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে ইহাও একটি। বিদ্যাসাগর শৈশবে জগন্দুর্লভবাবুর বাসায় আশ্রয় পাইয়াছিলেন। জগদ্দলতের কনিষ্ঠা ভগিনী রাইমণির সহােদর শচন্দ্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত, ১১• পৃষ্ঠা সম্বন্ধে তিনি স্বরচিত জীবনবৃত্তান্তে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা এস্থলে উদ্ধৃত করা যাইতে পারে –“রাইমণির অদ্ভুত মেহ ও যত্ন আমি কম্মিকালেও বিস্মৃত হইতে পারিব না। তাঁহার একমাত্র পুত্র গােপালচন্দ্র ঘােষ আমার প্রায় সমবয়স্ক ছিলেন। পুত্রের উপর জননীর যেরূপ মেহ ও যত্ন থাকা উচিত ও আবশ্যক, গােপালচন্দ্রের উপর রাইমণির মেহ ও যত্ন তদপেক্ষা অধিকতর ছিল, তাহার সংশয় নাই। কিন্তু আমার আন্তরিক দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, মেহ ও যত্নবিষয়ে আমায় ও গােপালে রাইমণির অণুমাত্র বিভিন্নভাব ছিল না। ফল কথা এই, স্নেহ, দয়া, সৌজন্য, অমায়িকতা, সদ্বিবেচনা প্রভৃতি সগুণবিষয়ে, রাইমণির সমকক্ষ খ্রীলােক এ পর্যন্ত আমার নয়নগােচর হয় নাই। এই দয়াময়ীর সৌম্যমূর্তি আমার হৃদয়মন্দিরে দেবীমূর্তির ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হইয়া বিরাজমান রহিয়াছে। প্রসঙ্গক্রমে হার কথা উত্থাপিত হইলে তদীয় অপ্রতিম- গুণের কীৰ্ত্তন করিতে করিতে অশ্রুপাত না করিয়া থাকিতে পারি না। আমি ব্রীজাতির পক্ষপাতী বলিয়া অনেকে নির্দেশ করিয়া থাকেন। আমার বােধ হয়, সে নির্দেশ গত নহে। যে ব্যক্তি রাইমণির মেহ, দয়া, সৌজন্য প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করিয়াছে এবং ঐ সমস্ত সদ্গুণের ফলভােগী হইয়াছে, সে যদি স্ত্রীজাতির পক্ষপাতী না হয়, তাহা হইলে, তাহার তুল্য কত পামর ভূমণ্ডলে নাই।”
বিদ্যাসাগর
স্ত্রীজাতির স্নেহ-দয়া-সৌজন্য হইতে বঞ্চিত হইয়াছে,
আমাদের মধ্যে এমন হতভাগ্য কয়জন আছে। কিন্তু
ক্ষুদ্র হৃদয়ের স্বভাব এই যে, সে যে পরিমাণে অযাচিত
উপকার প্রাপ্ত হয়, সেই পরিমাণে অকৃতজ্ঞ হইয়া উঠে।
যাহা কিছু সহজেই পায়, তাহাই আপনার প্রাপ্য বলিয়া
জানে; নিজের দিক হইতে যে কিছুমাত্র দেয় আছে,
তাহা সহজেই ভুলিয়া যায়।
বিদ্যাসাগর প্রথমতঃ বেথুনসাহেবের সহায়তা করিয়া
বঙ্গদেশে খ্রীশিক্ষার সূচনা ও বিস্তার করিয়া দেন।
অবশেষে যখন তিনি বালবিধবাদের দুঃখে ব্যথিত হইয়া
বিধবাবিবাহপ্রচলনের চেষ্টা করেন, তখন দেশের মধ্যে
সংস্কৃতশ্লোক ও বাংলা গালি মিশ্রিত এক তুমূল কলকোলাহল
উখিত হইল। সেই মুষলধারে শাস্ত্র ও গালিবর্ষণের মধ্যে
এই ব্রাহ্মণবীর বিজয়ী হইয়া বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ
করিলেন এবং তাহা রাজবিধিসম্মত করিয়া লইলেন।
বিদ্যাসাগর এই সময়ে আরাে একটি ক্ষুদ্র সামাজিক
যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন, এস্থলে তাহারও সংক্ষেপে
উল্লেখ আবশ্যক। তখন সংস্কৃতকলেজে কেবল ব্রাণেরই
প্রবেশ ছিল, সেখানে শূদ্রেরা সংস্কৃত পড়িতে পাইত না।
বিদ্যাসাগর সকল বাধা অতিক্রম করিয়া শুদিগকে সংস্কৃত
কলেজে বিদ্যাশিক্ষার অধিকার দান করেন।
সংস্কৃতকলেজের কর্ম ঘড়িয়া দিবার পর বিদ্যাসাগরের
প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটাৰ ইষ্টিশ। বাঙালীর নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ- স্থাপন এই প্রথম। আমাদের দেশে ইংরাজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যাসাগর- কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল। যিনি দরিদ্র ছিলেন, তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন; যিনি লােকাচাররক্ষক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি লােকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন, এবং সংস্কৃতবিদ্যায় যাহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না, তিনিই ইংরাজিবিদ্যাকে প্রকৃতপ্রস্তাবে দেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন। বিদ্যাসাগর তাহার জীবনের অবশিষ্টকাল এই স্কুল ও কলেজটিকে একাগ্রচিত্তে প্রাণাধিকবঙ্গে পালন করিয়া, দীনদরিদ্র নােগীর সেবা করিয়া, অকৃতজ্ঞদিগকে মার্জনা করিয়া, বন্ধুবান্ধবদিগকে অপরিমেয় সেহে অভিষিক্ত করিয়া, আপন পুষ্পকোমল এবং বজ্রকঠিন বক্ষে দুঃসহ বেদনাশল্য বহন করিয়া, আপন আত্মনির্ভরপর উন্নত-বলিষ্ঠ চরিত্রের মহান্ আদর্শ বাঙালীজাতির মনে চিরাঙ্কিত করিয়া দিয়া ১২৯৮ সালের ১৩ই শ্রাবণ রাত্রে ইহলােক হইতে অপত হইয়া গেলেন। বিদ্যাসাগর বঙ্গদেশে তাহার অক্ষয় দয়ার জন্য বিখ্যাত। কারণ, দয়াবৃত্তি আমাদের আপাতপ্রবণ বাঙালীহৃদয়কে বিদ্যাসাগর যত শীল প্রশংসায় বিচলিত করিতে পারে, এমন আর কিছুই নহে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের দয়ায় কেবল বাঙালীজনলভ হৃদয়ের কোমলতা প্রকাশ পায়, তাহা নহে, তাহাতে বাঙালীহুলভ চরিত্রের বললিতারও পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁহার দয়া কেবল একটা প্রবৃত্তির ক্ষণিক উত্তেজনামাত্র নহে, তাহার মধ্যে একটা সচেষ্ট আত্মশক্তির অচল কর্তৃক সর্বদা বিরাজ করিত বলিয়াই তাহা এমন মহিমশালিনী। এ দয়া অন্যের কষ্টলাঘবের চেষ্টায় আপনাকে কঠিন কষ্টে ফেলিতে মুহূর্তকালের জন্য কুষ্ঠিত হইত না। সংস্কৃতকলেজে কাজ করিবার সময় ব্যাকরণ- অধ্যাপকের পদ শূন্য হইলে বিদ্যাসাগর তারানাথ তর্কবাচস্পতির জন্য মার্শালসাহেবকে অনুরােধ করেন। সাহেব বলিলেন, তাহার চারি লইবার ইচ্ছা আছে কি না, অগ্রে জানা আবশ্যক। শুনিয়া বিদ্যাসাগর সেইদিনেই ত্রিশক্রোশ পথ দূরে কালনায় তর্কবাচস্পতির চতুপাঠী- অভিমূখে পদব্রজে যাত্রা করিলেন। পরদিন তর্কবাচস্পতির সম্মতি ও তাহার প্রশংসাপত্রগুলি লইয়া পুনরায় পদব্রজে যথাসময়ে সাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়েন। পরের উপকারকার্যে তিনি আপনার সমস্ত বল ও উৎসাহ প্রয়ােগ করিতেন। ইহার মধ্যেও তাহার আজন্মকালের একটা জিদ প্রকাশ পাইত। সাধারণতঃ আমাদের দয়ার মধ্যে এই * সহােদর - বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত।
পর জি না থাকাতে তাহা সঙ্কীর্ণ ও বরকল হইয়া বিশীর্ণ হইয়া যায়, তাহা পৌরুষমহত্ব লাভ করে না। কারণ, দয়া বিশেষরূপে স্ত্রীলােকের নহে; প্রকৃত দয়া যথার্থ পুরুষেরই ধৰ্ম। দয়ার বিধান পূর্ণরূপে পালন করিতে হইলে দৃঢ় বীৰ্য্য এবং কঠিন অধ্যবসায় আবশ্যক, তাহাতে অনেকসময় সুদূরব্যাপী সুদীর্ঘ কর্মপ্রণালী অনুসরণ করিয়া চলিতে হয় ; তাহা কেবল ক্ষণকালের আত্মত্যাগের দ্বারা প্রবৃত্তির উচ্ছসিনিবৃত্তি এবং হৃদয়ের ভালােঘব করা নহে; তাহা দীর্ঘকাল ধরিয়া নানা উপায়ে নানা বাধা অতিক্রম করিয়া দুরূহ উদ্দেশ্যসিদ্ধির অপেক্ষা রাখে। একবার গর্মেন্টের কোন অত্যুৎসাহী ভৃত্য জাহানাবাদ- মহকুমায় ইকাষ্ট্যান্ন ধাৰ্য্যের জন্য উপস্থিত হন। আয়ের স্বল্পতাযুক্ত যে সকল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইনকাট্যাক্সের অধীনে আসিতে পারে, গবর্মেন্টের এই সুচতুর শিকারী তাহাদের দুইতিনজনের নাম একত্র করিয়া ট্যান্সের জালে বন্ধ করিতে ছিলেন। বিদ্যাসাগর ইহা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ খড়ারগ্রামে অ্যাসেসবাবুর নিকটে আসিয়া আপত্তিপ্রকাশ করেন। বাবুটি তাহাতে কর্ণপাত না করিয়া অভিযােগকারীদিগকে ধমক দিয়া বাধ্য করিলেন। বিদ্যাসাগর অবিলম্বে কলিকাতায় আসিয়া লেফটেনেন্ট গবর্ণরের নিকট বাদী হইলেন। কেটেনেন্ট গৰৰমানের কানের হাসি- বের করেন। বিদ্যাসাগর রিমনের
বিদ্যাসাগর
সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ব্যবসায়ীদের তাপত্র পরীক্ষা করিয়া
বেড়াইতে লাগিলেন—এইরূপে দুইমাসকাল অনমনা ও
অনন্তকা হইয়ী তিনি এই অধ্যায় নিবারণে কৃতকাৰ্য্য
হইয়াছিলেন।
বিদ্যাসাগরের জীবনে এরূপ দৃষ্টান্ত আরাে অনেক দেওয়া
যাইতে পারে। কিন্তু এরূপ দৃষ্টান্ত বাংলায় অন্যত্র হইতে
সংগ্রহ করা হয়। আমাদের হৃদয় অত্যন্ত কোমল বলিয়া
আমরা প্রচার করিয়া থাকি, কিন্তু আমরা কোনাে ঝাটে
যাইতে চাহি না। এই অলস শান্তিপ্রিয়তা আমাদিগকে
অনেক সময়েই স্বার্থপর নিষ্ঠুরতায় অবতীর্ণ করে। একজন
জাহাজীগােরা কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া মজ্জমান ব্যক্তির
পশ্চাতে জলে ঝাঁপ দিয়া পডে; কিন্তু একখানা নৌকা
যেখানে বিপন্ন, অন্য নৌকাগুলি তাহার কিছুমাত্র সাহায্য
চেষ্টা না করিয়া চলিয়া যায়, এরূপ ঘটনা আমাদের দেশে
সর্বদাই নিতে পাই। দয়ার সহিত বীর্যের সম্মিলন না
হইলে সে দয়া অনেকস্থলেই অকিঞ্চিৎকর হইয়া থাকে।
কেবল যে সঙ্কট এবং অধ্যবসায়ের ক্ষেত্রে আমাদের
অন্তঃপুচারিণী দয়া প্রবেশ করিতে চাহে না, তাহা নহে।
সামাজিক কৃত্রিম চিতারকার নিয়মলবনও তাহার পক্ষে
দুঃসাধ্য। আমি জানি, কোন এক গ্রাম্যমেলায় এক বিদেশী
ব্রাহ্মণের মৃত্যু হইলে ঘৃণা করিয়া কেহই তাহার অন্ত্যেষ্টি-
मराज मय विधवा व विधानागानोरमाविछ।
সৎকারের ব্যবস্থা করে নাই; অবশেষে, তাহার অনুপস্থিত আত্মীয়পরিজনের অন্তরে চিরশােকশল্য নিহিত করিয়া ডােমের দ্বারা মৃতদেহ শ্মশানে শৃগালকুকুরের মুখে ফেলিয়া আসা হয়। আমরা অতি সহজেই ‘আহা উহু' এবং অশ্রু পাত করিতে পারি, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে পরােপকারের পথে আমরা সহ স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম বাধার দ্বারা পদে পদে প্রতিহত । বিদ্যাসাগরের কারুণ্য বলিষ্ঠ, পুরুষােচিত ; এই জন্য তাহা সরল এবং নির্বিকার ; তাহা কোথাও সূক্ষ্ম তর্ক তুলিত না, নাসিকাকুঞ্চন করিত না, বসন তুলিয়া ধরিত ; একেবারে দ্রুতপদে, ঋজুরেখায়, নিঃশঙ্কে, নিঃসঙ্কোচে আপন কার্যে গিয়া প্রবৃত্ত হইত। রােগের বীভৎস মলিনতা তাহাকে কখন রােগীর নিকট হইতে দূরে রাখে নাই। এমন কি, কৰ্মাটারে এক মেথরজাতীয় স্ত্রীলােক ওলাউঠায় আক্রান্ত হইলে বিদ্যাসাগর স্বয়ং তাহার কুটীরে উপস্থিত থাকিয়া স্বহস্তে তাহার সেবা করিতে কুষ্ঠিত হন নাই। বর্ধমানসকালে তিনি তাহার প্রতিবেশী দরিদ্র মুসলমান- গণকে আত্মীয়নির্বিশেষে যত্ন করিয়াছিলেন। এই ঘটনাশ্রবণে আমাদের হৃদয় যে ভক্তিতে উচ্ছসিত হইয়া উঠে, তাহা বিদ্যাসাগরের দয়া অনুভব করিয়া নহে—কিন্তু তাহার মধ্য হইতে যে একটি নিঃসঙ্কোচ বলিষ্ঠ মনুষত্ব পরিস্ফুট হইয়া উঠে, তাহা দেখিয়া আমাদের এই নীচজাতির প্রতি চিত্যন্ত ঘৃণাপ্রবণ মনও আপন বিদ্যাসাগর নিগুঢ় মানবধবশতঃ ভক্তিতে আকৃষ্ট না হইয়া থাকিতে পারে না। তাহার কারুণ্যের মধ্যে যে পৌরুষের লক্ষণ ছিল, তাহার অনেক উদাহরণ দেখা যায়। আমাদের দেশে আমরা যাহাদিগকে ভালমানুষ অমায়িকপ্রকৃতি বলিয়া প্রশংসা করি, সাধারণতঃ তাহাদের চক্ষুলজ্জা বেশী। অর্থাৎ কৰ্তব্যস্থলে তাহারা কাহাকেও বেদনা দিতে পারেন না। বিদ্যাসাগরের দয়ায় সেই কাপুরুষতা ছিল না। ঈশ্বরচন্দ্র যখন কলেজের ছাত্র ছিলেন, তখন তাহাদের বেদান্ত- অধ্যাপক শচন্দ্র বাচস্পতির সহিত তাঁহার বিশেষ প্রতি বন্ধন ছিল। বাচস্পতিমহাশয় বৃদ্ধবয়সে পুনরায় দারপরিগ্রহ করিবার ইচ্ছা করিয়া তাহার প্রিয়তম ছাত্রের মত জিজ্ঞাসা করিলে ঈশ্বরচন্দ্র প্রবল আপত্তি প্রকাশ করিলেন। বারংবার কাকুতিমিনতি করা সত্ত্বেও তিনি মত পরিবর্তন করিলেন না। তখন বাচস্পতিমহাশয় ঈশ্বরচন্দ্রের নিষেধে কর্ণপাত না করিয়া এক সুন্দরী বালিকাকে বিবাহপুৰ্ব্বক তাহাকে আত বৈধব্যের তটদেশে আনয়ন করিলেন। শ্ৰীযুক্ত চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাহার বিদ্যাসাগর গ্রন্থে এই ব্যাপারের যে পরিণাম বৰ্ণন করিয়াছেন, তাহা এই হলে উদ্ভূত করি :- “বাচস্পতিমহাশয় ঈশ্বরচন্দ্রের হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘তােমার মাকে দেখিয়া যাও'। এই বলিয়া দাসীকে নৰ-
৫৮
বধূর অবগুণ্ঠন উন্মােচন করিতে বলিলেন। তখন বাচস্পতি
মহাশয়ের নববিবাহিতা পত্নীকে দেখিয়া ঈশ্বরচন্দ্র অঞ
সংবরণ করিতে পারিলেন না। সেই জননীস্থানীয় বালি-
কাকে দর্শন করিয়া ও এই বালিকার পরিণাম চিন্তা করিয়া
বালকের ন্যায় নােদন করিতে লাগিলেন। তখন বাচস্পতি
মহাশয় ‘অকল্যাণ করিস না রে' বলিয়া তাঁহাকে লইয়া
বাহিরবাটীতে আসিলেন এবং নানাপ্রকার শাস্ত্রীয় উপদেশের
দ্বারা ঈশ্বরচন্দ্রের মনের উত্তেজনা ও হৃদয়ের আবেগ রােধ
করিতে ও তাহাকে শান্ত করিতে প্রয়াস পাইতে লাগিলেন।
এইরূপ বহুবিধ প্রবােধবাক্যে শান্ত করিতে প্রয়াস পাইয়া
শেষে ঈশ্বরচন্দ্রকে কিঞ্চিৎ জল খাইতে অনুরােধ করিলেন।
কিন্তু পাষাণতুল্য-কঠিনপ্রতিজ্ঞা-পরায়ণ ঈশ্বরচন্দ্র জলযােগ
করিতে সম্পূর্ণরূপে অসম্মত হইয়া বলিলেন, ‘এ ভিটায় আর
কখনও জলস্পর্শ করিব না।”
বিদ্যাসাগরের হৃদয়বৃত্তির মধ্যে যে বলিষ্ঠতা দেখা যায়,
তাহার বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যেও তাহার পরিপূর্ণ প্রভাব প্রকাশ
পায়। যথার্থ সবলতার সঙ্গে সঙ্গেই একটা সুবৃহৎ সরলতা
থাকে।
এই সরলতা কেবল মতামতে নহে, লােকব্যবহারেও
প্রকাশ পায়। বিদ্যাসাগর পিতৃদর্শনে কাশীতে গমন করিলে
সেখানকার অর্থলােলুপ কতকগুলি ব্রাহ্মণ তাহাকে টাকার
জন্য ধরিয়া-পড়িয়া ছিল। বিদ্যাসাগর তাহাদের অবস্থা ও
বিদ্যাসাগর e অভাব দৃষ্টে তাহাদিগকে দয়া অথবা ভক্তির পাত্র বলিয়া জ্ঞান করেন নাই, সেইজন্য তৎক্ষণাৎ অকপটচিত্তে উত্তর দিলেন,-“এখানে আছেন বলিয়া আপনাদিগকে যদি আমি ভক্তি বা শ্রদ্ধা করিয়া বিশ্বের বলিয়া মান্য করি, তাহা হইলে আমার মত নরাধম আর নাই।” ইহা শুনিয়া কাশীর ব্রাহ্মণেরা ক্ৰোধান্ধ হইয়া বলেন, “তবে আপনি কি মানেন? বিদ্যাসাগর উত্তর করিলেন,—“আমার বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা উপস্থিত এই পিতৃদেব ও জননীদেবী বিরাজমান।” যে বিদ্যাসাগর হীনতমশ্রেণীর লােকেরও দুঃখমােচনে কুণ্ঠিত হইতেন না, তিনি কৃত্রিম কপটভক্তি দেখাইয়া কাশীর ব্রাহ্মণের প্রার্থনা পূর্ণ করিতে পারিলেন না। ইহাই বলিষ্ঠ সরলতা, ইহাই যথার্থ পৌরুষ। নিজের অশনবসনেও বিদ্যাসাগরের একটি অটল সরলতা ছিল এবং সেই সরলতার মধ্যেও দৃঢ় বলের পরিচয় পাওয়া যায়। পূৰ্বেই দৃষ্টান্ত দেখান গিয়াছে, নিজের তিল- মাত্র সম্মান রক্ষার প্রতিও তাঁহার লেশমাত্র শৈথিল্য ছিল । আমরা সাধারণত প্রবল সাহেবী অথবা প্রচুর নবাবী দেখাইয়া সম্মানলাভের চেষ্টা করিয়া থাকি। কিন্তু আড় ধরের চাপল্য বিদ্যাসাগরের উন্নত-কঠোর আত্মসম্মানকে কখন স্পর্শ করিতে পারি না। দূষণহীন সারল্যই * সহােদর শচন্দ্র বিদ্যার প্রণীত বিদ্যাসাগরজীবনচরিত।
তাঁহার রাজভূষণ ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র যখন কলিকাতায় অধ্যয়ন করিতেন, তখন তাহার দরিদ্র জননীদেবী চরকাসূতা কাটিয়া পুত্রদ্বযের বস্ত্র প্রস্তুত করিয়া কলিকাতায় পাঠাই- সেই মােটাকাপড়, সেই মাতৃস্নেহমণ্ডিত দারিদ্র্য তিনি চিরকাল সগৌরবে সর্বাঙ্গে ধারণ করিয়া- ছিলেন। তাঁহার বন্ধু তদানীন্তন লেফটেনেন্ট গবর্ণর হালিডেসাহেব তাহাকে রাজসাক্ষাতের উপযুক্ত সাত করিয়া আসিতে অনুবােধ করেন। বন্ধুর অনুরােধে বিদ্যাসাগর কেবল দুই একদিন চোগা-চাপকান পরিয়া সাহেবের সহিত দেখা করিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু সে লজ্জা আর সহ করিতে পারিলেন না; বলিলেন, “আমাকে যদি এই বেশে আসিতে হয়, তবে এখানে আর আমি আসিতে পারিব না।” হালিডে তাঁহাকে তাঁহার অভ্যস্তবেশে আসিতে অনুমতি দিলেন। ব্রাহ্মণপণ্ডিত যে চটিজুতা ও মােটা ধুতিচাদর পরিয়া সৰ্বত্ৰ সন্মানলাভ করেন, বিদ্যাসাগর রাজদ্বারেও তাহা ত্যাগ করিবার আবশ্যকতা বােধ করেন নাই। তাঁহার নিজের সমাজে যখন ইহাই ভবেশ, তখন তিনি অন্য সমাজে অন্য বেশ পরিয়া আপন সমাজের ও সেই সঙ্গে আপনার অবমাননা করিতে চাহেন নাই। শাদা ধুতি ও শাদা চাদরকে ঈশ্বরচন্দ্র যে গৌরব অর্পণ করিয়াছিলেন, আমাদের বর্তমান রাজাদের ছদ্মবেশ ,পরিয়া আমরা | মহােদর পুত্র বিদ্যার অধীত বিদ্যাসাগজীবনচরিত।
বিভাসাগর ; আপনাদিগকে সে গৌরব দিতে পারি না; বরঞ্চ এই কৃষ্ণ- চর্শের উপর দ্বিগুণতর কৃষ্ণকলঙ্ক লেপন করি। আমাদের এই অমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মত এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না। কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাডিয়া যায়, মানব-ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গােপনে কৌশলে বঙ্গ- ভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন। সেইজন্য বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাহার স্বজাতির দোসর কেহ ছিল না। এদেশে তিনি তাঁহার সমযােগ্য সহযােগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভােগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন, চারিদিকের জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কাৰ্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই;—তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন, আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না ; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না ; ভূরিপরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহঙ্কার দেখাই পরিতৃপ্ত থাকি, যােগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ক্রটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ ;
পঞ্চম
করিতে থাকি।পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের
অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া
আমাদের পলিটিক্স, এবং নিজের বাকচাতুৰ্যে নিজের প্রতি
ভক্তিবিহবল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।
এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির
প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিকার ছিল। কারণ,
তিনি সর্ববিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন।
বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গলের পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই
শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে—বিদ্যাসাগর সেইরূপ
বয়ােবৃদ্ধিসহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর তাজাল
হইতে ক্রমশঃই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উথান করিয়াছিলেন ।
সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফলদান
করিতেন; কিন্তু আমাদের শতসহস্র ক্ষণজীবী সভাসমিতির
ঝিল্লীঝঙ্কার হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিলেন। ক্ষুধিত-পীড়িত
অনাথ-অসহায়দের জন্য আজ তিনি বর্তমান নাই,কিন্তু
তাহার মহৎ চরিত্রের যে অক্ষয়বট তিনি বঙ্গভূমিতে রােপণ
করিয়া গিয়াছেন, তাহার তলদেশ সমস্ত বাঙ্গালীজাতির
তীর্থস্থান হইয়াছে। আমরা সেইখানে আসিয়া আমাদের
তুচ্ছতা, জুতা, নিষ্ফল আড়ম্বর ভুলিয়া, সূক্ষ্মতম তর্কজাল
এবং স্থূলতম জড়ই বিচ্ছিন্ন করিয়া সরল, সবল, অটল
মাহাত্ম্যের শিক্ষা লাভ করিয়া যাইব। আজ আমরা বিদ্যা-
সাগরকে কেবল বিদ্যা ও দয়ার আধার বলিয়া জানি। এই
No text on this page.
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার যহেলাল বৃহৎ পৃথিবীর সংৰে আসিয়া যতই আমরা মানুষ হইয়া উঠিব, যতই আমরা পুরুষের মত দুর্গম-বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে থাকিব, বিচিত্র শৌর্য- বীমহত্বের সহিত যতই আমাদের প্রত্যক্ষ সন্নিহিতভাবে পরিচয় হইবে, ততই আমরা নিজের অন্তরের মধ্যে অনুভব করিতে থাকিব যে, দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাহার অজেয় পৌষ, তাহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব; এবং যতই তাহা অনুভব করিব, ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে, এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙ্গালীর জাতীয়জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে। (পরিবজিত) মহেন্দ্রলাল হাওড়ার নয় ক্রোশ পশ্চিমে পাপাড়া নামক একটা ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দের ২রা নভেম্বর, এই স্থানে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয়ের জন্ম হয়। তাহার পিতার নাম তারকনাথ সরকার। আপনাদিগের সামান্য ভূসম্পত্তির উপর নির্ভর করিয়া, তিনি জীবিকা নির্বাহ করিতেন। অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে তাহার মৃত্যু হয়। সরকার মহাশয়ের পিতার সাংসারিক অবস্থা ভাল ছিল না। পল্লীগ্রামে কোনরূপে অব সংগ্রহ হইত।
বৈধব্যের পর তাহার জননীকে শিত পুত্র দুইটা সঙ্গে লইয়া, কলিকাতায় আপনার ভ্রাতৃগণের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। মাতুলালয়েই ডাক্তার সরকার মহাশয়ের শিক্ষা আরব্ধ হয়। প্রথম বয়সে মাল পরিবারে তিনি যে উপকার লাভ করিয়াছিলেন, তাহা তিনি কৃতজ্ঞচিতে স্মরণ করিতেন। প্রথমে কিছুদিন একটী বাঙ্গালা পাঠ- শালায় শিক্ষালাভ করিয়া, তিনি ঠাকুরদাস দেব নামক তাঁহাদিগের প্রতিবাসী কোন ভদ্রলােকের নিকট ইংরাজী পডিতে আরম্ভ করেন। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ডাজার সরকার মহাশয় তাঁহাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতেন। ঠাকুরদাস বাবুর পরিবারস্থ ব্যক্তিগণকে তিনি আজীবন আত্ম-পরিবারভুক্ত ব্যক্তিগণের ন্যায় স্নেহ করিয়া আসিয়াছেন। আনুমানিক ৭ বৎসর বয়সের সময় সরকার মহাশয় অধ্যয়নৰ্থ হেয়ার স্কুলে প্রবেশ করেন। মহাত্মা হেয়ার তখন জীবিত ছিলেন। স্বগীয় উমাচরণ মিত্র সেই সময় হেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং খ্যাতনামা ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি এখানে অধ্যাপনা করিতেন। উমাচরণ বাবুর আবৃত্তি-প্রণালী অতি অপূর্ব ছিল। অবকাশ-কালে বা শ্রেণীতে অধ্যাপনের সময় তিনি যখন সেক্সপিয়ার, মিল্টন্ প্রভৃতির গ্রন্থ হইতে কোন অংশ আবৃত্তি করিতেন, ডাক্তার সরকার মহাশয় भावनांन নিয়শ্রেণী হইতে উদগতচিত্তে আহ এবণ করিতেন। পঠিত অংশের অর্থ বুঝিতে না পারিলেও, পুনঃ পুনঃ তাহা শ্রবণ করিতে তাহার ইচ্ছা হইত এবং নিজের নিয়শ্রেণীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাঠ্যপুস্তক তিনি উমাচরণ বাবুর অনুকরণে পাঠ করিতে চেষ্টা করিতেন। এই সময় হইতেই শেক্সপিয়ার ও মিল্টনের প্রতি তাঁহার আজীবনব্যাপী অনুরাগ উদ্ভূত হয়। যাহারা ডাক্তার সরকারের বক্তৃতা শ্রবণ করিয়াছেন, তাঁহারা একবাক্যে তাহার উচ্চারণ প্রণালীর প্রশংসা করিয়া থাকেন। বাল্যকাল হইতে উমাচরণ বাবুর অনুকরণে আবৃত্তি সম্বন্ধে মনােযােগ করাতেই তিনি এই গুণ লাভ করিয়াছিলেন। হেয়ার স্কুলে অধ্যয়নের সময়ই তিনি একজন বিশেষ মেধাবী ছাত্র বলিয়া পরিচিত হন; শিক্ষকগণ তাঁহার ব্যবহারে আন্তরিক সন্তুষ্ট ছিলেন। তাহার হেয়ার স্কুলের সহপাঠীদিগের মধ্যে প্রসিদ্ধ নাটককার স্বর্গীয় দীনবন্ধু মিত্রের নাম উল্লেখযােগ্য। উমাচরণ বাবুর পর (Mr. Twentyman) মিষ্টার টোয়েন্টম্যান্ নামক একজন সাহেব হেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। ডাক্তার সরকার তাঁহার বিশেষ প্রিয়- পাত্র ছিলেন। মিঃ টোয়েটীম্যান অনেক সময় তাঁহার লিখিত অনুশীলন এবং রচনা সগৌরবে উট শ্রেণীর ছাত্র- দিগকে পাঠ করিয়া শুনাইতেন। ১৮৪৮৪৯ টানে ডাক্তার সরকার, হেয়ার স্কুল হইতে জুনিয়ার স্কলারশিপ
বৃত্তি প্রাপ্ত হয়, হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন। সে
বৎসরের পরীক্ষায় তিনিই প্রথম হইয়াছিলেন। সুপরিচিত
নাম সাইক্লিফ সাহেব তখন হিন্দু কলেজের অন্যতম
শিক্ষক ছিলেন। তিনি ডাক্তার সরকারকে বিশেষ নেই
করিতেন এবং মিষ্টার টোয়েন্টম্যানের ন্যায় তিনিও তাঁহার
লিখিত প্রশ্নের উত্তরসমূহ আপনার বন্ধুদিগকে দেখাইতেন।
হিন্দুকলেজ তখন বঙ্গদেশের মধ্যে একটী অত্যুত্ত্ব
বিদ্যালয় বলিয়া পরিচিত ছিল; সুতরাং ডাক্তার সরকার
মেডিকেল কলেজে প্রবেশের পূর্বে এদেশে সাহিত্য
ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে যতদূর উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হওয়া
সম্ভব, তাহা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই উচ্চশিক্ষার গুণেই
তিনি জীবনে এত উন্নতি করিতে এবং পরিণামে চিকিৎসা
ব্যবসায়ী হইয়াও, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকল্টীর
সভাপতি হইতে পারিয়াছিলেন। জার সরকারের
হিন্দুকলেজের সহাখ্যায়িগণের মধ্যে স্বনামপ্রসিদ্ধ বিচারপতি
গীয় দ্বারকানাথ মিত্রের নাম উল্লেখযােগ্য। উভয়েই
কলেজের মধ্যে বিশেষ প্রতিভাবান্ ছাত্র বলিয়া পরিচিত
ছিলেন এবং উত্তরকালে উভয়ের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুতা সঞ্জাত
হইয়াছিল। ডাক্তার সরকার বিজ্ঞানসভার উদ্যোগ করিলে
বারকানাথ বাবু তাহাতে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করিয়া-
ছিলেন এবং স্বয়ং এক হাজার টাকা চাঁদা স্বাক্ষর করিয়া-
ছিলেন। হিন্দুকলেজে পাঠাবস্থায় ডাক্তার সরকার একটা
যহেতাল
অসাধারণ গুণ লাভ করিয়াছিলেন। বাঙ্গালীদিগের মধ্যে
তিনি একজন বিশেষ অধ্যয়নশীল ব্যক্তি বলিয়া পরিচিত
হন। আহার, নিদ্রা প্রভৃতির সময় বাদ দিলে তাহাকে অতি
অল্পক্ষণই পুস্তকবিহিত দেখিতে পাওয়া যাইত। নিজের
ব্যবসায়সংশ্লিষ্ট পুস্তক ব্যতীত অন্যান্য এত গ্রন্থ তিনি পাঠ
করিয়াছিলেন যে, বাঙ্গালীদের মধ্যে অতি অল্প লােককেই
তাঁহার সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। হিন্দুকলেজ হইতে
এই অধ্যয়নাসক্তি তাঁহার হৃদয়ে সঞ্জাত হয়। সাহিত্য,
ইতিহাস বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ক প্রচুর
গ্রন্থ তিনি এই সময় পাঠ করিয়াছিলেন। বাল্যজাত এই
অধ্যয়নস্পৃহা কমে তাহার এরূপ প্রকৃতিগত হইয়া দাঁড়াইয়া-
ছিল যে, নােগশয্যায় শয়ন করিয়াও তিনি অধ্যয়ন হইতে
নিবৃত্ত থাকিতে পারিতেন না।
ডাক্তার সরকার হিন্দুকলেজ হইতে সিনিয়ার বৃত্তি লাভ
করিয়া, ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করেন।
মেডিকেল কলেজে তখন ডাঃ ফেরার, পালি,ডি প্রভৃতি
অনেক খ্যাতনামা অধ্যাপক অধ্যাপনা করিতেন। ডাক্তার
সরকার ইহাদিগের সকলেরই, বিশেষতঃ চকুৰােগ চিকিৎসক
ডাক্তার আর্চার এবং প্রসিদ্ধনামা ডাক্তার ফেরারের একান্ত
মেহতাজন হইয়াছিলেন। মেডিকেল কলেজে তিনি একজন
বিশেষ প্রতিষ্ঠাভাজন ছাত্র ছিলেন। শারীরবিদ্যা, উক্তি
বিদ্যা, ভৈষজ্য এবং ধাত্রীবিদ্যা প্রতি বিবিধ বিষয়ে তিনি
। বৃত্তি ও স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। হিন্দু কলেজে রীতিমত শিক্ষালাভ করিয়া যাওয়াতে, মেডিকেল কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থী ছাত্রদিগের অপেক্ষা হার অনেক বিষয়ে সুবিধা হইয়াছিল। যে সকল বিষয় বুঝিতে হইলে গণিত ও বিজ্ঞা- নের সাহায্য আবশ্যক, তাহা তিনি অপেক্ষাকৃত অরায়াসে বুঝিতে পারিতেন। তাঁহার ছাত্রাবস্থার একটা গল্প নিয়ে প্রদত্ত হইল। কলেজের তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময়, একবার তিনি তাঁহার কোন পীড়িত আত্মীয়কে লইয়া চক্ষুরােগ চিকিৎসার স্থানে গমন করেন। তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীতে চক্ষু রােগের চিকিৎসা শিক্ষা দেওয়া হইত না। ডাক্তার আর্চার পঞ্চম বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্রদিগকে লইয়া চকুত-ঘটিত আণুবীক্ষণিক শরীরতত্ত্ব (Microscopic anatomy of the eye) সম্বন্ধে আলােচনা করিতেছিলেন। প্রায় কোন ছাত্রই তঁাহার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিতে- ছিলেন না। হঠাৎ ডাক্তার সরকারের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে, তিনি ডাঃ আর্চারের একটা প্রশ্নের উত্তর দিলেন। ডাঃ আর্চার তঁহাকে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করিলেন, এবং তাঁহার নিকট সন্তোষজনক উত্তর প্রাপ্ত হইয়া ও ডাক্তার সর- কার যে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র তাহা অবগত হইয়া, একান্ত বিস্মিত ও শ্ৰীত হইলেন। এই দিন হইতে ডাক্তার আর্চার সরকার মহাশয়কে আন্তরিক মেহ করিতে আরম্ভ করিলেন। পঞ্চম বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্রেরা পরে ডাক্তার সরকারকে কথায় মহেলাল কথায় বলেন যে, আলােক-বিজ্ঞান (Light) সম্বন্ধে উপযুক্ত শিক্ষার অভাবেই উহারা চক্ষু রােগের চিকিৎসা প্রণালী বুঝিতে পারিতেছেন না। তিনি যদি আলােক-বিজ্ঞান সম্বন্ধে তাঁহাদিগকে উপদেশ দেন, তাহা হইলে বিশেষ উপকার হয়। ডাক্তার সরকার তাঁহাদিগের প্রস্তাবে সাত হইলেন এবং কলেজের অধ্যক্ষের অনুমতি গ্রহণ করিয়া আলােক” সম্বন্ধে কয়েকটা বক্তৃতা করিলেন। সেই বৎসরেই তিনি “Adaptation of the human eye to distance” নামে একটা বক্তৃতা করেন। ইহাই প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহার বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা সমূহের প্রথম। তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র হইয়া পঞ্চম বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্রদিগকে উপদেশ প্রদান করা বড় সাধারণ ক্ষমতার পরিচায়ক ও অল্প গৌরবের বিষয় নহে। কিন্তু যাঁহারা ভাবী জীবনে কোনরূপ মহত্ত্ব প্রদর্শন করেন, তরুণ বয়সে তাহাদিগের প্রকৃতিতে এইরূপ অনন্যসুলভ শক্তি প্রায়ই লক্ষিত হইয়া থাকে। মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষায় ডাক্তার সরকার প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। সুপরিচিত নামা স্বর্গীয় ডাক্তার জগবন্ধু ব ও তিনি এক সঙ্গে ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে এম, ডি, উপাধি লাভ করেন। এই পরীক্ষায় ডাক্তার সরকার প্রথম এবং জগবন্ধু বাৰু দ্বিতীয় হইয়াছিলেন। মেডিকেল কলেজ হইতে উত্তীর্ণ অঙ্গ ঘষে কায় ডাক্তার সরকারও প্রথমে হ্যালােপ্যাথিমতে চিকিৎসা কার্বে প্রবৃত্ত হন। কলেজ হইতে প্রতিষ্ঠার সহিত বহির্গত হওয়াতে এবং কলেজের অধ্যাপকগণের আস্থাভাজন হওয়াতে, অল্পদিনের মধ্যেই ব্যবসায়ে তাঁহার উন্নতি লক্ষিত হইয়া- ছিল। ডাক্তার ফেরার তাঁহাকে এরূপ নেহ করিতেন যে, Bengal Branch of the British Medical Association নামক সভা প্রতিষ্ঠার সময় বয়ােজ্যষ্ঠ অনেক য়ুরােপীয় ডাক্তারকেও পরিত্যাগ করিয়া তিনি তাঁহাকে উদ্যোগ-সভার সভাপতি করেন। সভা প্রতিষ্ঠিত হইলে ডাক্তার সরকার প্রথম কয়েকবৎসর তাহার সম্পাদক করিয়া পরে তাহার ভাইস প্রেসিডেন্ট হইয়াছিলেন। হােমিওপ্যাথি তখন এদেশে সম্পূর্ণ নূতন ছিল। ডাক্তার (Berigny) বেরিণী অৱদিন মাত্র এদেশে আসিয়াছিলেন। বাঙ্গালীর মধ্যে কেবল ওয়েলিংটন স্কোয়ারের দত্ত পরিবারস্থ স্বর্গীয় বাবু রাজেন্দ্র দত্তই হােমিও- প্যাথির অলােচনা করিতেন; এবং তাঁহার দ্বারা চিকিৎসিত হই উপকার লাভ করাতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ও হােমিও- প্যাথিতে এবান্ হইয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়েই ডাক্তার সরকারকে হমিওপ্যাথির আলােচনার জন্য অনুরােধ করিতেন। কিন্তু তিনি তাঁহাদের কথায় কর্ণপাত করা দূরে থাকুক, বরং তাহাদিগকে অবৈজ্ঞানিক মতের সমর্থক বলিয়া উপহাস করিতেন। ব্রিটি মেডিকেল ফ্ল্যাসােসিয়েশনের প্রথম অধিবেশনে তিনি হােমিওপ্যাথির সম্বন্ধে অনেক
पश्यनान
উপহাস ও কটুক্তি পৰ্য্যন্ত করিয়াছিলেন। এই সময়
Morgan's Philosophy of Homeopathy atre are
সমালােচনার জন্য তাহার হস্তগত হয়। তার সরকারের
মন হােমিওপ্যাথির প্রতি এরূপ বিৰে ভাবাপন্ন ছিল
যে, তিনি পুস্তকখানি পাইবামাত্র বলিলেন, “ইহা ত
বিজ্ঞানমূলক নয়, এই মুহূর্তেই ইহার সমালােচনা করিয়া
দিতেছি। কিন্তু তিনি যতই পুস্তক খানি পাঠ করিতে
লাগিলেন, ততই বুঝিতে পারিলেন যে, হােমিওপ্যাথি
অযুক্তিমূলক এবং অবৈজ্ঞানিক নহে; তাহার মূলে সত্য
নিহিত আছে। ইহারই সমকালে রাজেন্দ্র বাবুর চেষ্টায়
কতকগুলি উৎকট রোেগ হােমিওপ্যাথি চিকিৎসায় আনােগ্য
হয়, ইহা তিনি দেখিতে পান। তাঁহার নিজের মাতুলও
কঠিন শূল বেদনা হইতে রাজেন্দ্র বাবুর চেষ্টায় নিষ্কৃতি লাভ
তখন আর অবিশ্বাসের কারণ রহিল না। ক্রমে
তিনি যতই হােমিওপ্যাথি সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও আলােচনা
করিতে লাগিলেন, ততই তাঁহার বিশ্বাস দৃঢ়ীভূত হইতে
লাগিল। অবশেষে ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে ব্রিটিস মেডিকেল সভায়
প্রদত্ত একটি বক্তৃতায় তিনি, হােমিওপ্যাথি যে যুক্তিমূলক
এবং তিনি নিজে যে ইহাতে আস্থাবান, ইহা সাধারণের
সমক্ষে ব্যক্ত করিলেন। তাঁহার সমব্যবসায়ী এবং আয়-
গণের মধ্যে এই বক্তৃতায় বিশেষ আন্দোলন উপস্থিত হইল।
অপ্রচলিত এবং উপহার্য মতের পরিণােষক হয় তিনি
করেন।
পর
;
নিজের ভাবী উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করিলেন, অনেকেই
এইরূপ বলিতে লাগিলেন। ডাক্তার ফেরার ছাত্রাবস্থা
হইতে সরকার মহাশয়কে অত্যন্ত মেহ করিতেন ; এক দিন
সাক্ষাৎ হইলে তিনি তাহাকে সস্নেহে বলিলেন,-সরকার,
তুমি একি করিতেছে, তুমি ব্যবসায়ে নূতন প্রবৃত্ত হইয়াছ,
ইহাতে তােমার কি ক্ষতি হইবে, তাহা কি তুমি বুঝিতে
পারিতেছ না ? ডাক্তার সরকার তাহাকে বিনীতভাবে
বলিলেন, “ব্যায়ে আমার ক্ষতি হইতে পারে; কিন্তু
যখন হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রকৃষ্টতর বলিয়া আমার
বিলাস জন্মিয়াছে, তখন তাহার সমর্থন এবং অবলম্বন না
করিলে আমার পক্ষে অন্যায় কাৰ্য্য হইবে।” ডাক্তার
ফেরার বলিলেন,—এ কথার উপর আমার কোন কথা
নাই; কিন্তু এখনও বিবেচনা করিয়া দেখ, অগ্রপশ্চাৎ না
ভাবিয়া কোন কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইও না।” এইরূপ আরও
অনেকে স্পষ্টভাবে এবং ইঙ্গিতে তাঁহাকে হােমিওপ্যাথি
চিকিৎসা হইতে নিবৃত্ত হইতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু
ডাক্তার সরকার তাহাতে বিচলিত হইলেন না। সত্য
প্রচার করিতে যাইয়া নিজের অদৃষ্টে যাহা হয় হইবে,
এইরূপ স্থির করিয়া তিনি হােমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা
করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ভগবানের কৃপায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত
হইলেন না। তিনি যেমন হােমিওপ্যাথিকে রক্ষা করিয়া-
হেন, হােমিওপ্যাথিও তেমনই তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছে।
মহেলাল তাহার পূর্বে রীতিমত চিকিৎসাশাস্ত্রে অভিজ্ঞ অপর কোন ব্যক্তি এদেশে হােমিওপ্যাথির আলােচনা করেন নাই। হােমিওপ্যাথি যে হাতুড়িয়া চিকিৎসা নহে, ইহা তিনিই প্রতিপাদন করিয়াছেন। এদেশে হােমিওপ্যাথির প্রচারের জন্য স্বর্গীয় রাজে দত্তের, তাহার এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাম স্মরণীয় হইবে। চিকিৎসা সম্বন্ধে ডাক্তার সরকার মহাশয় যে প্রতিষ্ঠা এবং সুযশ লাভ করিয়াছিলেন, তা উল্লেখ করা নিয়ে- জন। তাহার সমকালবর্তী চিকিৎসকদিগের মধ্যে তিনি একজন অগ্রগণ্য। সার রিচার্ড গার্থ ও অনারেবল গিবস এর ন্যায় সম্রান্ত ও উচ্চপদস্থ ইংরাজ, এবং বঙ্গদেশের শীর্ষস্থানীয় কত রাজা মহারাজ তাঁহার চিকিৎসায় উপকার লাভ করিয়াছেন। তিনি গৃহে দরিদিগের জন্য দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তাহার নামে আকৃষ্ট হইয়া কোন কোন দিন দুইশতেরও অধিক রােগী তাহার দ্বারে সমাগত হইয়াছে। সুস্থাবস্থায় তিনি এতে ৬টা হইতে ১০টার পর পর্যন্তও নিজে বসিয়া তাহাদিগকে ব্যবস্থা দিয়াছেন এবং ঔষধ বিতরণ করিয়াছেন। তিনি উত্ৰ- প্রকৃতি ও কটুভাষী চিকিৎসক বলিয়া কাহারও কাহারও নিকট পরিচিত; কিন্তু উগ্রতাই তাঁহার প্রকৃতি নহে। নােগ হইয়া চিকিৎসকের ব্ৰত গ্ৰহণ করিতে আসিলেই তিনি বিরক্ত হইতেন। তিনি বলিতেন,—“নাের চিকিৎস
কের নিকট আপনার প্রকৃতি, শারীরিক অবস্থা, মােগের
লক্ষণ সময়ই বলিতে পারেন, কিন্তু এ ঔষধ না দিয়া
ও ঔষধ দেওয়া যায় কি না, এটা আহার করিলে কি
ক্ষতি? এরূপ প্রশ্ন করিবার তাহার অধিকার নাই।
চিকিৎসা এবং পথ্য, সকল বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে চিকিৎসকের
উপর নির্ভর করাই তঁাহার কর্তব্য।” এ সম্বন্ধে তিনি
নিয়লিখিত গল্পটা বলিয়াছেন :-
“একবার কোন পড়ি ইংরাজ মহিলা চিকিৎসার জন্য
তাঁহার স্বামীর সঙ্গে আমার নিকট আসিয়াছিলেন।
মহিলাটা বানােগে বিকলাঙ্গ ও চলচ্ছক্তি-বহিত হইয়া
কষ্ট পাইতেছিলেন। চিকিৎসার ঐটা হয় নাই; জলবায়ু
পরিবর্তনের দ্বারা উপকার হইবে, এই আশায় তাহার
স্বামী তাহাকে অষ্ট্রেলিয়া পৰ্যত লইয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু
কিছুতেই কিছু হয় নাই; শেষে নিরাশ হইয়া আমার
নিকট আসিয়াছিলেন। আমি সমস্ত অবস্থা শুনিয়া,
পড়িত মহিলাটাকে বলিলাম, আমার দ্বারা আপনার
চিকিৎসার সুবিধা হইবে না। আমি যে ব্যবস্থা করিব,
আপনি অনুসারে চলিতে পারিবেন না।” পড়ি এবং
তাহার স্বামী কাতরনে বলিলেন, “সে কি ? আমরা
যখন আপনার নিকট আসিয়াছি, তখন সম্পূর্ণরূপেই
আপনার মতে চলিব, তাহাতে সন্দেহ নাই। আমি
মহিলাদীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হ্মপনি কি আহা
.
মহেলাল
করেন ?” তিনি মাংস, ডিম ও পিষ্টকাদির নাম করিলেন।
আমি বলিলাম, “এ সকলের কিছুই হইবে না। সাত দিন
কেবল ঢাপাটা (একপ্রকার রুটী) এবং মুগের ডাল খাইয়া
থাকিতে হইবে, তাহার পর বুঝিয়া ঔষধ দিব।” মহিলাটা
বলিলেন, “হায়। তাহা হইলে আমি মারা যাইব।” আমি
বলিলাম, “আমি ত পূর্বেই বলিয়াছি, আমার ব্যবস্থায়
আপনার সুবিধা হইবে না। আমি চিকিৎসা করিলে এই
রূপই করিব। এখন আপনার যেরূপ ইচ্ছা করিতে পারেন।”
মহিলাটা অগত্যা স্বীকৃত হইয়া গেলেন। সাত দিন পরে
যখন তিনি ফিরিয়া আসিলেন, তখন তাহার শরীর অনেক
সুস্থ। স্বামীর স্কন্ধে ভর দিয়া তিনি নিজে উপরে আসিলেন
এবং আনন্দের সহিত বলিলেন যে, আমার ব্যবস্থায় তাঁহার
অনেক উপকার হইয়াছে। আমি বলিলাম, “উত্তম। আর
সাত দিন ঐরূপে চলুন।” মহিলাটা বলিলেন, “সেকি।
আমাকে ঔষধ দিবেন না, কেবল এই রূপে রাখিবেন?”
আমি বলিলাম, “না, আপাততঃ এইরূপ চলুন, পরে ঔষধের
বিষয় বিবেচনা করিব।” মাসাধিককাল এইরূপ ব্যবস্থার
এবং আহারাদির সামান্য পরিবর্তন দ্বারা মহিলাটা ক্রমশঃ
সম্পূর্ণ সুস্থ হইলেন। বিদায়-গ্রহণের দিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করিয়া শেষে বলিলেন, ডাক্তার। আমার হল এই যে
আমাকে একবিন্দু ঔষধ না দিয়া আপনি আমায় আনােগ্য
afacuta i (Doctor! I am sorry you bave cured
me without a drop of medicine). ডাজার সরকার
বলিতেন—“চিকিৎসকের উপর এইরূপ আস্থা এবং সম্পূর্ণ
নির্ভর করাই কৰ্ত্তব্য। ইহা না করিলে চিকিৎসককে ডাকিয়া
তাঁহার প্রতি কৃপাপ্রদর্শনের আবশ্যকতা নাই।”
ম্যালােপ্যাথি-মতের চিকিৎসা হইতে ডাক্তার সরকার
কিরূপে হােমিওপ্যাথি-মতে চিকিৎসা কাৰ্যে প্রণােদিত
হইয়াছিলেন, আমরা তাহার উল্লেখ করিয়াছি। সত্যানুরাগ
এবং বিশ্বাসের জন্য ঘঁহারা ধর্মমত পরিবর্তন করেন,
তাঁহাদিগকে যে নির্যাতন ভােগ করিতে হয়, ইহা সকলেরই
পরিচিত। ভাজার সরকারকেও চিকিৎসা বিষয়ে মত
পরিবর্তনের জন্য বহু ক্লেশ সই করিতে হইয়াছিল।
যিনি স্বদেশীয়দিগের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার জন্য সর্বা-
পেক্ষা অধিক চেষ্টা এবং সর্বাপেক্ষা অধিক স্বার্থত্যাগ
করিয়াছেন, কিরূপে তাহার নিজের চিত্ত বিজ্ঞানের দিকে
আকৃষ্ট হইয়াছিল, তাহা অবগত হইতে সকলেরই কৌতুহল
হওয়া স্বাভাবিক। বাল্যকাল হইতেই ডাক্তার সরকারের
প্রকৃতি অনুসন্ধানেচ্ছু ও কৌতুহল-পরবশ ছিল। প্রত্যেক
ঘটনার কাৰ্য-কারণ-সম্ব নির্ণয় করিতে তিনি সর্বদাই
অগ্রসর হইতেন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময় তিনি
তৎকালপ্রচলিত কোন কোন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ পাঠ করিয়া-
ছিলেন। একদিন তাহার কনিষ্ঠ মাহুল মহাশয় রেভারেণ্ড,
মিনারের Tour through Creation নামক একখানি
মহেলাল পুস্তক পাঠের জন্য আনয়ন করেন। ইহাতে নানাবিধ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আলােচিত ছিল। ডাক্তার সরকার তাঁহার স্বাভাবিক অধ্যয়ন-স্পৃহার সহিত পুস্তকখানি পাঠ ও আয়ত্ত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। যতই তিনি পাঠ করিতে লাগিলেন, ততই তাঁহার কৌতুহল বর্ধিত ও জ্ঞানলালসা উদ্দীপিত হইতে লাগিল। সৃষ্ট পদার্থ সমূহের বহুত্ব ও বিশালত্ব এবং জগৎস্রষ্টার অনুপমশক্তি ও কৌশল চিন্তা করিয়া, তাহার তরুণ হৃদয় বিস্ময়ে অভিভূতু হইল। পুস্তক খানির এক স্থলে সূৰ্য্য সম্বন্ধে সার উইলিয়াম হার্সেলের মত উদ্ধৃত করিয়া লিখিত ছিল যে, “আমাদিগের বাসভূমি এই পৃথিবী যেমন সূর্যের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করিতেছে, তেমনই এই গ্রহ, উপগ্রহ সম্বলিত সৌরজগৎ অন্য কোন বৃহত্তর সূর্যের এবং তাহাও হয়ত অপর কোন মহাসূৰ্য্যের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করিতেছে।” ডাক্তার সরকার মহাশয় বলেন, “যখন আমি এই অংশটী পাঠ করিলাম, তখন আমার মনের ভাব যে কিরূপ হইয়াছিল, তাহা এক্ষণে প্রকাশ করিবার আমার সাধ্য নাই। আমার মনে হইল, জগত্তত্বের একটা গূঢ় রহস্য আমার নিকট সহসা প্রকাশিত হইল। সূৰ্য্য যদি বৃহত্তর সূৰ্য্যের এবং তাহাও যদি তদপেক্ষা আরও বৃহৎ কোন সূর্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করে, তবে এই সমগ্ৰ ব্ৰহ্মাণ্ড হয়ত সেই অনশক্তি, মহামহিমাময় জগৎ- স্রষ্টার সিংহাসনের চতুর্দিকে ভ্রমণ করিতেছে। ভাবের উচ্ছাসে আমি নির্বাক হইলাম এবং মনের সেই অবস্থায় নগ্নপদে ও নগ্নদেহে মাতুল মহাশয়দিগের গৃহ হইতে লেবু- তলার দিন পর্যন্ত অনবরত পদচারণ করিতে লাগিলাম। আমাকে সে অবস্থায় দেখিলে লােকে বায়ুনােগগ্রস্ত বলিয়া মনে করিত। সেই দিন হইতে বিজ্ঞানের প্রতি আমার যে অনুরাগ এবং বিজ্ঞানের সাহায্যে জগৎষ্টার মহিমা অবগত হইবার জন্য আমার যে আকাঙা জন্মিয়াছে, তাহা একদিনের জন্যও হ্রাসপ্রাপ্ত হয় নাই। বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধা হইবে ভাবিয়াই ডাক্তার সরকার মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করিয়াছিলেন। কলেজ ত্যাগের পর হইতে শেষ বয়স পর্যন্ত তিনি সাধ্যানুসারে বিজ্ঞান শীলনে নিযুক্ত ছিলেন। কোন স্থানে বিজ্ঞানের চর্চা হইতেছে দেখিলে, তিনি আনন্দলাভকরিতেন। বিজ্ঞানসভা প্রতিষ্ঠিত হইবার পূর্বে তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পাঁচশত টাকা মূল্যের যন্ত্রাদি দান করিয়াছিলেন। তাঁহার বাল্যলব্ধ বিজ্ঞানানুরাগের ফল ভারতীয় বিজ্ঞান সভা”। ইহাই তাহার জীবনের শ্রেষ্ঠতম কাৰ্য্য এবং ইহারই জন্য তাহার নাম চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। ১৮৭০ খৃষ্টাব্দের ৩রা জানুয়ারি বিজ্ঞান সভার অনুষ্ঠান পত্র প্রথম প্রচারিত হয়, এবং ছয় বৎসরের অবিশ্রাম চেষ্টা ও পরিশ্রমের পর ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দের ১৯ জুলাই ইহা প্রকাশ্য- ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গের তৎকালীন লেফটেনান্ট গবর্নর
घरखनान
সার রিচার্ড টেম্পল প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং
কলিকাতার প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ সভাস্থলে উপস্থিত
থাকিয়া প্রতিষ্ঠাকাৰ্য্যে সহায়তা করিয়া ছিলেন। বিজ্ঞান
সভার প্রথম সুহৃদ ও উৎসাহদাতৃগণের মধ্যে ডাক্তার
সরকার স্বর্গীয় কৃষ্ণদাস পাল মহাশয়ের নাম সর্বাপেক্ষা
কৃতজ্ঞতার সহিত উল্লেখ করিতেন।
বিজ্ঞান সভার প্রতিষ্ঠা করিয়া ডাক্তার সরকার যেমন
তাহার মন্তিফবত্তার পরিচয় দিয়াছেন, বৈদ্যনাথের নিরায়
কুষ্ঠ রােগদিগের জন্য আশ্রয় নির্মাণ করিয়া দিয়া, তিনি
তেমনি তাহার হৃদয়তার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন।
বৈদ্যনাথের কৃপায় পড়া আনােগ্য হইবার আশায় ভারত
বর্ষের নানা স্থান হইতে কুষ্ঠ রােগিগণ বৈদ্যনাথে আসিয়া
থাকে। আশ্রয়ের অভাবে ইহাদিগকে পূর্বে মর্মান্তিক
ক্লেশে কালযাপন করিতে হইত। বৃক্ষতলে, নদীতীরে বা
রাজপথে তাহাদিগকে শীত,গ্রীষ্ম, বর্ষা সব সময় বাস করিতে
হইত, এবং অনেক হতভাগ্য সেই অবস্থায় শৃগাল, কুকুরের
দংশন সহ করিয়া প্রাণত্যাগ করিত। বৈদ্যনাথবাসী
স্বগীয় রাজনারায়ণ বসু এবং বৈদ্যনাথ মন্দিরের অন্যতম
পুৰােহিত স্বর্গীয় গিরিজানন্দ দত্ত প্রভৃতি স্থানীয় কয়েক
জন ভদ্রলোেক কুষ্ঠ রােগীদিগের জন্য একটি গৃহ নির্মাণের
উদ্যোগী ছিলেন। ডাক্তার সরকার তাঁহাদিগের মধ্যে
একজনের নিকট সমন্ত অবস্থা অবগত হইয়, এবং দুই
হাজার টাকা হইলে একটী গৃহ নির্মিত হইতে পারে শুনিয়া নিজেই এই টাকা প্রদান করিতে স্বীকার করিয়াছিলেন। ১৮৯২ সালের জুলাই মাসে সার চালস ইলিয়ট এই গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ১৮৯৫ সালের আগষ্ট মাসে বার- বঙ্গের মহারাজা কর্তৃক ইহা প্রকাশ্যভাবে উন্মুক্ত হয়। ডাক্তার সরকার প্রথমে ২০০০ টাকা দিতে স্বীকৃত হইয়া- ছিলেন, কিন্তু কমে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করিয়া ২৪ জন নােগীর উপযুক্ত অতি সুন্দর দুইটা গৃহ নিৰ্মাণ করিয়া দিয়াছেন। হতভাগ্য কুষ্ঠ মােগিগণ এতদিন নিরাশ্রয় অবস্থায় আকাশতলে দিনপাত করিত, আজ তাহারা পরম মুখে সুন্দর অট্টালিকায় বাস করিতেছে। ডাক্তার সরকারের অভিপ্রায় অনুসারে এবং দেওঘরবাসিদিগের সম্মতিক্রমে, এই গৃহ তাহার সহধর্মিনীর নামানুসারে “বৈদ্যনাথ রাজ- কুমারী কুষ্ঠাশ্রম” নামে অভিহিত হইয়াছে। নিজের ব্যবসায়েও ডাক্তার সরকার অনেক সময় যে উদারতা ও মহাপ্রাণ প্রদর্শন করিতেন, তাহা তাঁহার সম প্রতিষ্ঠাবান্ চিকিৎসকদিগের মধ্যে দুর্লভ। বন্ধু, বান্ধবদিগের কথা দূরে থাকুক, যাঁহারা বিজ্ঞান সভায় কখনও কিছু এক- কালীন দান করিয়াছেন, কেবল এইমাত্র সম্পর্কে তিনি তাঁহাদিগের অনেকের নিকট এক কপর্দক গ্রহণ করিতেন না। কেহ প্রকৃতই বিপদগ্রন্থ এবং তাঁহার দ্বারা তাঁহার উপকার হইবার সম্ভাবনা বুঝিলে, ডাক্তার
बाश्नान
১
সরকার সাধ্যানুসারে তাহার উপকার করিতে কখন পামুখ
হইতেন না।
তাহার কাব্য কেবল তাহার নিজের ব্যবসায়ের মধ্যে
আবদ্ধ ছিল না। তিনি একাধারে চিকিৎসক, বক্তা এবং
লেখক। রাজনীতি, শিক্ষা, সমাজ-সংস্কার নানা বিষয়ে তিনি
মাতৃভূমির সেবার জন্য, নিজের রসনা ও লেখনী নিয়ােজিত
করিয়াছিলেন। অবলম্বিত ব্যবসায়েও যেমন, বক্তৃতা শক্তিতে
এবং লিপি কৌশলেও তেমনই, তিনি তাহার স্বদেশীয়দিগের
মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি। তাঁহার সম্পাদিত চিকিৎসা
সম্বন্ধীয় পত্রিকার প্রবন্ধসমূহ য়ুরােপীয় ও আমেরিকা দেশীয়
চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকাসমূহে সাদরে উদ্ভূত হইত।
নিজের বিদ্যা ও বুদ্ধিবলে ডাক্তার সরকার স্বদেশে ও
বিদেশে যে সম্মান লাভ করিয়াছেন তাহা সাধারণের পক্ষে
সুলভ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁহাকে D, L, উপাধিতে ভূষিত
করিয়াছিলেন। রাজপুরুষগণও তাঁহাকে সম্মানিত করিতে
ক্রটী করেন নাই; লর্ড রিপণ তাহাকে c. I, E, উপাধি
প্রদান করিয়াছিলেন।
নিরক্ষর সমাজে জন্মগ্রহণ করিয়া এবং প্রতিকূল অবস্থার
সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া এরূপ উন্নতি ও মৰ্য্যাদাপাভ পৃথিবীর
যে কোন দেশেই স্মরণীয় ও গৌরবজনক।
আমরা ডাক্তার সরকারের অনেক গুণের উল্লেখ করি-
মাহি। কিন্তু যে গুণের জন্য তিনি তাঁহার স্বদেশীয়গণের
২
আদর্শস্বরূপ, তাহার আললাচনা করা হয় নাই। ইহা
তাঁহার বিদ্যানুরাগ। সাধারণতঃ আমাদিগের দেশে বি-
বিদ্যালয়ের পরীক্ষা-দান সম্পূর্ণ হইলেই পাঠ সমাপ্ত হয়।
নিজের অবলম্বিত ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট কাৰ্য্য এবং সংবাদপত্র
পাঠ, ইহাতেই আমাদিগের অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তির
সময় অতিবাহিত হয়। কিন্তু ডাক্তার সরকার ছাত্রাবস্থার
ন্যায় চিরদিনই পূর্ণমাত্রায় শিক্ষার্থী ছিলেন। সাহিত্য,
বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, যে কোন বিষয়ে হউক, ইংরাজীতে
কোন নূতন গ্রন্থ প্রকাশিত হইলে, তাহা ক্রয় এবং পাঠ না
করিলে তিনি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিতেন না। প্রবীণ
বয়সে রীতিমত শিক্ষক রাখিয়া তিনি ফরাসী ও পারসীক
ভাষা শিক্ষা করেন। নিজের জ্ঞান পিপাসা চরিতার্থ
করিবার জন্য তিনি নিজের পুস্তকালয়ে প্রায় এক লক্ষ
টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন।
যে দেশে লক্ষপতির গৃহে
একটা
ভূগােলক বা একখানি মানচিত্র দুর্লভ, সে দেশে দরিদ্রের
সন্তানের পক্ষে নিজের উপার্জন হইতে পুস্তকালয়ের জন্য এক
লক্ষ টাকা ব্যয় বড় সহজ কথা নয়। তাহার জ্ঞান-পিপাসা
যে কিরূপ প্রবল, এই একটা মাত্র প্রমাণ হইতেই তাহা
প্রতীত হইতে পারে। বিদ্যাসাগর মহাশয় ভিন্ন তাহার
সহিত এদেশে এ বিষয়ে আর কাহারও তুলনা হয় না।
তাঁহার বিদ্যাগের সঙ্গে তাঁহার বিজ্ঞানের জন্য স্বার্থ
ত্যাগও উল্লেখযােগ্য। বিজ্ঞান সভার জন্য তিনি যে কিরূপ
যহেলাল
আত্মবিসর্জন করিয়াছিলেন, অতি অল্প লােকই তাহা অবগত
আছেন। বিজ্ঞান সভায় উপদেশ দিতে প্রস্তুত হইবার জন্য
তাঁহাকে অধ্যয়নে যে সময় ব্যয় করিতে হইত, তাহা নিজের
ব্যবসায়ে নিয়ােগ করিলে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতে
পারিতেন। যেদিন তাহার বক্তৃতার দিন নির্দিষ্ট থাকিত,
সেদিন সহ মুদ্রা দিলেও তিনি চিকিৎসাকার্যে গমন
করিতেন না।
ডাক্তার সরকারের কোন দোষের বিষয় আমরা এ পর্যন্ত
উল্লেখ করি নাই। মানবজন্ম ধারণ করিয়া দোষশূন্য হওয়া
সহজ নহে। তিনিও দোষবিরহিত ছিলেন না। স্বভাবতঃ,
তাহার প্রকৃতি অতি উগ্র এবং অসহিষ্ণু ছিল; কুপিত হইলে
তিনি আত্মসম্বরণ করিতে পারিতেন না। অপ্রিয়ভাষী না
হইয়াও সে সত্য বলিতে পারা যায়, তাহা তিনি অনেক
সময় বিস্মৃত হইতেন। সামান্য মিষ্টভাষণের অভাবে তিনি
কোন কোন সময়ে লােকের মবেদনার কারণ হইয়াছেন
এবং স্বাবলম্বনে অভ্যস্ত হওয়াতে তিনি অন্যের সহিত
সম্মিলিত হইয়া কাৰ্য্য করিতে পারিতেন না। কিন্তু
তাঁহার প্রকৃতিতে গুণের ভাগ এত অধিক যে, তাহাদের
সহিত তুলনায় এই সকল দোষ অতি সামান্য বলিয়াই
বিবেচিত হয়। তাঁহার দোষ ছিল সত্য, কিন্তু স্বার্থ
পবতা, পরশ্রীকাতরতা, চাটুকারিতা প্রভৃতি নীচতার
সম্পর্ক তাহাতে আদৌ ছিল না। বাহিরের কক্ষ এবং
-
সহজ-কোপন স্বভাবের অভ্যন্তরে তাহার প্রকৃতিতে আত্মীয়-
স্বজন এবং বন্ধুদিগের প্রতি অতি মধুর, স্নিগ্ধভাব লক্ষিত
হইত। তাহার কোন বন্ধু তাহাকে একবার বলিয়াছিলেন,
“আপনার প্রকৃতি নারিকেলের মত; বাহিরে কর্কশ আবরণ,
কিন্তু অভ্যন্তরে মধুর সলিল।” বাস্তবিকও কথাটা ঠিক।
দোৰ, গুণ সমস্ত লইয়া মনে হয়, তাঁহার ন্যায় ব্যক্তি বাঙ্গালা
দেশে এ পর্যন্ত অতি অল্পই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। প্রতিকূল
অবস্থার সহিত তাহার সংগ্রাম, তাহার বিদ্যানুরাগ, তাঁহার
স্বাবলম্বন, তাহার স্বার্থত্যাগ এবং তাঁহার তেজস্বিতা তাহার
স্বদেশীয়গণের আদর্শরূপ। ব্রাহ্মণের বংশে জন্মগ্রহণ
করিলেও ব্রাহ্মণপাচিত এই সকল গুণ তাহাতে প্রভূত
পরিমাণে বিদ্যমান ছিল। ১৯০৪ খুঃ অব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে
৭১ বৎসর বয়সে তিনি ইহলোেক পরিত্যাগ করেন। তাঁহার
হৃদয়ে ঈশ্বরে বিশ্বাস পূর্ণমাত্রায় ছিল। ঈশ্বরের নাম
করিতে করিতেই তিনি মহানিদ্রার ক্রোড়ে বিশ্রাম লাভ
করেন। ভগবান্ করুন, বঙ্গীয় যুবকগণ যেন তাহার প্রদর্শিত
মার্গ অনুসরণ করিয়া স্বদেশ ও স্বজাতির মুখােজ্জল
করিতে পারেন।
ج 1
itpiUr
,
no . دودله را -
14 .2074
//
۳۰۰ !
i'r Act,
اد : ام X
t বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বঙ্কিমচন্দ্র
যে কালে বঙ্কিমের নবীনা প্রতিভা লক্ষ্মীরূপে সুধাভাণ্ড হন্তে
লইয়া বাংলাদেশের সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন তখনকার
প্রাচীন লােকেরা বঙ্কিমের রচনাকে সসম্মান আনন্দের
সহিত অভ্যর্থনা করেন নাই।
সেদিন বঙ্কিমকে বিস্তর উপহাস, বিজপ, গ্লানি সহ
করিতে হইয়াছিল। তাহার উপর একদল লােকের সুতীব্র
বিদ্বেষ ছিল, এবং ক্ষুদ্র যে লেখকসম্প্রদায় তাঁহার অনু-
করণের বৃথা চেষ্টা করিত, তাহারাই আপন ঋণ গােপন
করিবার প্রয়াসে তাহাকে সর্বাপেক্ষা অধিক গালি দিত।
আবার এখনকার যে নূতন পাঠক ও লেখকসম্প্রদায়
উদ্ভূত হইয়াছেন তাহারাও বঙ্কিমের পরিপূর্ণ প্রভাব হৃদয়ের
মধ্যে অনুভব করিবার অবকাশ পান নাই। তাহারা
বঙ্কিমের গঠিত সাহিত্যভূমিতেই একেবারে ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন,
বঙ্কিমের নিকট যে হারা কতরূপে কতভাবে ঋণী
তাহার হিসাব বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া তাঁহারা দেখিতে
পাইতেছেন না।
কিন্তু বর্তমান লেখকের সৌভাগ্যক্রমে আমাদের সহিত
যখন বঙ্কিমের প্রথম সাক্ষাৎকার হয়, তখন সাহিত্য প্রভৃতি
সম্বন্ধে কোনরূপ পূৰ্ব্বসংস্কার আমাদের মনে বদ্ধমূল হইয়া
যায় নাই এবং বর্তমান কালের নূতন ভাব-প্রবাহও আমাদের নিকট অপরিচিত অনভ্যস্ত ছিল। তখন বঙ্গ-সাহিত্যের যেমন প্রাতঃসন্ধ্যা উপস্থিত, আমাদের সেইরূপ বয়ঃসন্ধি- কাল। বমি বঙ্গসাহিত্যে প্রভাতের সূর্যোদয় বিকাশ করিলেন, আমাদের হৃদ্ধ সেই প্রথম উদ্ঘাটিত হইল। পূর্বে কি ছিল এবং পরে কি পাইলাম, তাহা হুইকালের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া আমরা এক মুহূর্তেই অনুভব করিতে পারিলাম। কোথায় গেল সেই অন্ধকার, সেই একাকার, সেই সুপ্তি, কোথায় গেল সেই বিজয়বসন্ত, সেই গােলেব- কালি, সেই বালক-ভুলানাে কথা—কোথা হইতে আসিল এত আলােক, এত আশা, এত সঙ্গীত, এত বৈচিত্র্য! বঙ্গ- দর্শন যেন তখন আষাঢ়ের প্রথম বর্ষার মত “সমাগত রাজবল্পত নির।” এবং মুষলধারে ভাববর্ষণে বঙ্গ- সাহিত্যের পূর্ববাহিণী পশ্চিমবাহিনী সমস্ত নদী নিঝরিণী অকস্মাৎ পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া যৌবনের আনন্দবেগে ধাবিত হইতে লাগিল। কত কাব্যনাটক, উপন্যাস, কত প্রবন্ধ, কত সমালােচনা, কত মাসিকপত্র, কত সংবাদপত্র বঙ্গভূমিকে জাগ্রত প্রভাতকলরবে মুখরিত করিয়া তুলিল। বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল। আমরা কিশােরকালে বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে ভাবের সেই নবসমাগমের মহােৎসব দেখিয়াছিলাম; সমস্ত দেশ ব্যাপ্ত করিয়া যে একটি আশার আনন্দ নূতন হিল্লোলিত হইয়াছিল, বচিত্র তাহ অনুভব করিয়াছিলাম; সেইজন্য আজ মধ্যে মধ্যে নৈরা উপস্থিত হয়। মনে হয়, সেদিন হৃদয়ে যে অপরি- মেয় আশার সঞ্চার হইয়াছিল, তদনুরূপ ফললাভ করিতে পারি নাই। সে জীবনের বেগ আর নাই। কিন্তু এ নৈরা। অনেকটা অমূলক। প্রথম সমাগমের প্রবল উচ্ছাস কখনও স্থায়ী হইতে পারে না। সেই নব আনন্দ, নবীন আশার স্মৃতির সহিত বর্তমানের তুলনা করাই অন্যায়। বিবাহের প্রথম দিনে যে রাগিণীতে বংশীধ্বনি হয়, সে রাগিণী চির- দিনের নহে। সেদিন কেবল অবিমিশ্র আনন্দ এবং আশা, তাহার পর হইতে বিচিত্র কর্তব্যমিশ্রিত দুঃখ, ক্ষুদ্র বাধাবিপ্ন, আবর্তিত বিরহমিলন—তাহার পর হইতে গভীর গভীরভাবে নানাপথ বাহিয়া নানা শােকতাপ অতিক্রম করিয়া সংসারপথে অগ্রসর হইতে হইবে, প্রতিদিন আর নহবৎ বাজিবে না। তথাপি সেই একদিনের উৎসবের স্মৃতি কঠোর কর্তব্যপথে চিরদিন আনন্দ সঞ্চার করে। বঙ্কিমচন্দ্র স্বহস্তে বঙ্গভাষার সহিত যে দিন নবযৌবন- প্রাপ্ত ভাবের পরিণয় সাধন করাইয়াছিলেন, সেই দিনের সর্বব্যাপী প্রফুল্লতা এবং আনন্দ উৎসব আমাদের মনে আছে। সেদিন আর নাই। আজ নানা লেখা, নানা মত, নানা আলােচনা আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। আজ কোন দিন বা ভাবের স্রোত মন্দ হইয়া আসে, কোন দিন বা অপেক্ষাকৃত পরিপুষ্ট হইয়া উঠে।
এইরূপ হইয়া থাকে এবং এইরূপই হওয়া আবশ্যক। কিত কাহার প্রসাদে এরূপ হওয়া সম্ভব হইল সে কথা স্মরণ করিতে হইবে। আমরা আত্মাভিমানে সর্বদাই তাহা ভুলিয়া যাই। ভুলিয়া যে যাই তাহার প্রথম প্রমাণ, রামমােহন রায়কে আমাদের বর্তমান বঙ্গদেশের নির্মাণকর্তা বলিয়া আমরা জানি না। কি রাজনীতি, কি বিদ্যাশিক্ষা, কি সমাজ, কি ভাষা, আধুনিক বঙ্গদেশে এমন কিছুই নাই, রামমােহন রায় স্বহস্তে যাহার সূত্রপাত করিয়া যান নাই। এমন কি, আজ প্রাচীন শাল্লালােচনার প্রতি দেশের যে এক নূতন উৎসাহ দেখা যাইতেছে, রামমােহন রায় তাহারও পথপ্রদর্শক। যখন নবশিক্ষাভিমানে স্বভাবতই পুরাতন শাস্ত্রের প্রতি অবজ্ঞা জন্মিবার সম্ভাবনা, তখন রামমােহন রায় সাধারণের অনধিগম্য বিস্মৃতপ্রায় বেদপুরাণতন্ত্র হইতে সারােদ্ধার করিয়া প্রাচীন শাস্ত্রের গৌরব উজ্জ্বল রাখিয়াছিলেন। বঙ্গদেশ অন্ত সেই নামমােহন রায়ের নিকট কিছুতেই হৃদয়ের সহিত কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতে চাহে না। রাম মােহন বঙ্গসাহিত্যকে গ্রাণিস্তরের উপর স্থাপন করিয়া নিমজ্জন দশা হইতে উন্নত করিয়া তুলিয়াছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র তাহারই উপর প্রতিভার প্রবাহ ঢালিয়া শুর- বদ্ধ পলি-মৃত্তিকা নেপণ করিয়া গিয়াছেন। আজ বাংলা- ভাষা কেবল দৃঢ় বাসযােগ্য নহে, উর্বরা শস্যশ্যামলা
বঙ্কিমচ
হইয়া উঠিয়াছে। বাসভূমি যথার্থ মাতৃভূমি হইয়াছে। এখন
আমাদের মনের খাদ্য প্রায় ঘরের দ্বারেই কলিয়া উঠিতেছে।
মাতৃভাষার বন্ধ্য দশা ঘুচাইয়া যিনি তাহাকে এমন
গৌরবশালিনী করিয়া তুলিয়াছেন, তিনি বাঙালীর যে কি
মহৎ কি চিরস্থায়ী উপকার করিয়াছেন, সেকথা যদি কাহাকেও
বুঝাইবার আবশ্যক হয় তবে তদপেক্ষা দুর্ভাগ্য আর কিছুই
নাই। তৎপূর্বে বাংলাকে কেহ শ্রদ্ধাসহকারে দেখি না।
সংস্কৃত পণ্ডিতেরা তাহাকে গ্রাম্য এবং ইংরাজি পণ্ডিতেরা
বর্বর জ্ঞান করিতেন। বাংলা ভাষায় যে কীর্তি উপার্জন
করা যাইতে পারে সে কথা তাহাদের স্বপ্নের অগােচর ছিল।
এই জন্য কেবল স্ত্রীলােক ও বালকের জন্য অনুগ্রহপূর্বক
দেশীয় ভাষায় তাহারা সরল পাঠ্যপুস্তক রচনা করিতেন।
সেই সকল পুস্তকের সরলতা ও পাঠযােগ্যতা সম্বন্ধে যাহাদের
জানিবার ইচ্ছা আছে, তাঁহারা রেভারেণ্ড, কৃষ্ণমােহন বন্দ্যো-
পাধ্যায়-রচিত পূর্ধ্বতন এণ্টেন্স-পাঠ্য .বাংলাগ্রন্থে দন্তক্ষুট
করিবার চেষ্টা করিয়া দেখিবেন। অসম্মানিত বঙ্গভাষাও
তখন অত্যন্ত দীন মলিনভাবে কালযাপন করিত। তাহার
মধ্যে যে কতটা সৌন্দৰ্য, কতটা মহিমা প্রচ্ছন্ন ছিল, তাহা
তাহার দারিদ্র্য ভেদ করিয়া ফুর্তি পাইত না। যেখানে
মাতৃভাষায় এত অবহেলা, সেখানে মানবজীবনের একতা
শূন্যতা দৈন্য কেহই দূর করিতে পারে না।
এমন সময়ে তখনকার শিক্ষিতশ্রেষ্ঠ বঙ্কিমচন্দ্র আপনার
৩। সমস্ত শিক্ষা, সমস্ত অনুরাগ, সমস্ত প্রতিভা, উপহার লইয়া সেই সঙ্কুচি বঙ্গভাষার চরণে সমর্পণ করিলেন; তখনকার কালে কি যে অসামান্য কাজ করিলেন, তাহা তাহারই প্রসাদে আজিকার দিনে আমরা সম্পূর্ণ অনুমান করিতে পারি । তখন তাহার অপেক্ষা অনেক অরশিক্ষিত প্রতিভাহীন ব্যক্তি ইংরাজিতে দুইছত্র লিখিয়া অভিমানে স্ফীত হইয়া উঠিতেন। ইংরাজি সমুদ্রে ভঁহারা যে কাঠবিড়ালীর মত বালির বাঁধ নির্মাণ করিতেছেন, সেটুকু বুঝিবার শক্তিও তাহাদের ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র যে সেই অভিমান, সেই খ্যাতির সম্ভাবনা অকাতরে পরিত্যাগ করিয়া তখনকার বিদ্বজ্জনের অবজ্ঞাত বিষয়ে আপনার সমস্ত শক্তি নিয়ােগ করিলেন, ইহা অপেক্ষা বীরদের পরিচয় আর কি হইতে পারে। সম্পূর্ণ ক্ষমতাসত্ত্বেও আপন সমযােগ্য লােকের উৎসাহ এবং তাহাদের নিকট প্রতিপত্তির প্রলােভন পরিত্যাগ করিয়া, একটি অপরীক্ষিত অপরিচিত অনাদৃত অন্ধকার পথে আপন নবীন জীবনের সমত আশা-উদ্যম-ক্ষমতাকে প্রেরণ করা, কত বিশ্বাস এবং কত সাহসের বলে হয়, তাহার পরিমাণ করা সহজ নহে। কেবল তাহাই নহে। তিনি আপনার শিক্ষাগর্বে বঙ্গ- ভাষার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিলেন না, একেবারেই শ্রদ্ধা প্রকাশ করিলেন। যত কিছু আশা, আকাকা, সৌন্দৰ্য্য, বচিত্র ১ প্রেম, মহত্ব, তক্তি, স্বদেশানুরাগ, শিক্ষিত পরিণত বুদ্ধির মৃত কিছু শিক্ষালব্ধ চিন্তাজাত ধন রত্ন, সমস্তই অকুণ্ঠিতভাবে বঙ্গ- ভাষার হস্তে অৰ্পণ করিলেন। পরম সৌভাগ্যগর্বে সেই অনাদর-মলিন ভাষার মুখে সহসা অপূর্ব লক্ষ্মী প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিল। তখন পুর্বে যাহারা অবহেলা করিয়াছিলেন, তাঁহারা বঙ্গ- ভাষার যৌবন-সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হইয়া একে একে নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন। বঙ্গসাহিত্য প্রতিদিন গৌরবে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল। বঙ্কিম যে গুরুতর ভার লইয়াছিলেন তাহা অন্য কাহারও পক্ষে দুঃসাধ্য হইত। প্রথমতঃ, তখন বঙ্গভাষা যে অবস্থায় ছিল, তাহাকে যে শিক্ষিত ব্যক্তির সকল প্রকার ভাবপ্রকাশে নিযুক্ত করা যাইতে পারে, ইহা বিশ্বাস ও আবিষ্কার করা বিশেষ ক্ষমতার কাৰ্য। দ্বিতীয়ত, যেখানে সাহিত্যের মধ্যে কোন আদর্শ নাই, যেখানে পাঠক অসামান্য উৎকর্ষের প্রত্যাশাই করে না, যেখানে লেখক অবহেলাভরে লেখে এবং পাঠক অনুগ্রহের সহিত পাঠ করে, যেখানে অল্প ভাল লিখিলেই বাহবা পাওয়া যায় এবং মন্দ লিখিলেও কেহ নিন্দা করা বাহুল্য বিবেচনা করে, সেখানে কেবল আপনার অন্তরন্থিত উন্নত আদর্শকে সর্বদা সম্মুখে বর্তমান রাখি, সামান্য পরিশ্রমে সুলভ খ্যাতিলাভের প্রলােভন সরণ করিয়া, অশ্রান্ত যত্নে অপ্রতিহত উদ্যমে দুর্গম পরিপূর্ণতায় ર পর পথে অগ্রসর হওয়া অসাধারণ মাহাত্মের কর্ম। চতুর্দিক- ব্যাপী উৎসাহহীন জীবনহীন জড়দের মত এমন গুরুভার আর কিছু নাই; তাহার নিয়ত প্রবল ভারাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করিয়া উঠা যে, কত নিরলস চেষ্টা ও বলের কর্ম তাহা এখনকার সাহিত্যব্যবসায়ীরাও কতকটা বুঝিতে পারেন; তখন যে আরও কত কঠিন ছিল তাহা কষ্টে অনুমান করিতে হয়। সর্বত্রই যখন শৈথিল্য এবং সে শৈথিল্য যখন নিন্দিত হয় না তখন আপনাকে নিয়মব্রতে বন্ধ করা মহাসত্ত্বলােকের দ্বারাই সম্ভব। বমি আপনার অন্তরের সেই আদর্শ অবলম্বন করিয়া প্রতিভাবলে যে কাৰ্য করিলেন তাহা অত্যাশ্চর্য্য। দর্শনের পূর্ববর্তী এবং তাহার পরবর্তী বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে যে উচ্চনীচ তাহা অপরিমিত। দার্জিলিং হইতে যাহারা কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরমালা দেখিয়াছেন, তাহারা জানেন সেই অভ্রভেদী শৈলসম্রাটের উদয়রবিরসিমুজ্জ্বল তুষারকিরীট চতুর্দিকের নিস্তব্ধ গিরিপারিষদবর্গের কত উন্ধে সমুখিত হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী বঙ্গসাহিত্য সেইরূপ আকস্মিক অত্যুন্নতি লাভ করিয়াছে; একবার সেইটি নিরীক্ষণ এবং পরিমাণ করিয়া দেখিলেই বঙ্কিমের প্রতিভার প্রভূত বল সহজে অনুমান করা যাইবে। বঙ্কিম নিজে বঙ্গভাষাকে যে শ্রদ্ধা অর্পণ করিয়াছেন, অনেও তাহাকে সেইরূপ শ্রদ্ধা করিবে, ইহাই তিনি প্রত্যাশা ;
বমিচন্দ্র
করিতেন। পূর্ব অভ্যাসবশতঃ সাহিত্যের সহিত যদি কেহ
ছেলেখেলা করিতে আসিত, তবে বঙ্কিম তাহার প্রতি এমন
দণ্ড বিধান করিতেন যে, দ্বিতীয়বার সেরূপ স্পর্ধা দেখাইতে
সে আর সাহস করিত না।
তখন সময় আরাে কঠিন ছিল। বঙ্কিম নিজে দেশব্যাপী
একটি ভাবের আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছিলেন। সেই
আন্দোলনের প্রভাবে কত চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল, এবং
আপন ক্ষমতার সীমা উপলব্ধি করিতে না পারিয়া কত
লােকে যে এক লক্ষে লেখক হইবার চেষ্টা করিয়াছিল তাহার
সংখ্যা নাই। লেখার প্রয়াস জাগিয়া উঠিয়াছে অথচ
লেখার উচ্চ আদর্শ তখন দাড়াইয়া যায় নাই। সেই সময়
সব্যসাচী বঙ্কিম এক হস্ত গঠনকার্যে এক হস্ত নিবারণকাৰ্য্যে
নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন। একদিকে অগ্নি জ্বালাইয়া রাখিতে-
ছিলেন আর একদিকে ধূম এবং ভস্মরাশি দূর করিবার ভার
নিজেই লইয়াছিলেন।
রচনা এবং সমালােচনা এই উভয় কাৰ্যের ভার বঙ্কিম
একাকী গ্রহণ করাতেই বঙ্গসাহিত্য এত সত্বর এমন দ্রুত
পরিণতি লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিল।
এই দুষ্কর ব্ৰতানুষ্ঠানের যে ফল তাহাও তাহাকে ভােগ
করিতে হইয়াছিল। মনে আছে, বঙ্গদর্শনে যখন তিনি
সমালােচক পদে আসীন ছিলেন, তখন তাহার ক্ষুদ্র শত্রুর
সংখ্যা অল্প ছিল না। শত শত অযােগ্য লােক তাঁহাকে
: ঈর্ষা করিত এবং তাহার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিতে ছাড়িত না। কণ্টক যতই ক্ষুদ্র হৌক তাহার বিদ্ধ করিবার ক্ষমতা আছে; এবং কল্পনাপ্রবল লেখকদিগের বেদনাবােবও সাধারণের অপেক্ষা কিছু অধিক। ছােট ঘােট দংশনগুলি যে বঙ্কিমকে লাগিত না, তাহা নহে, কিন্তু কিছুতেই তিনি কর্তব্যে পরামুখ হন নাই। তাঁহার অজেয় বল, কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস ছিল। তিনি জানিতেন বর্তমানের কোন উপদ্রব তাহার মহিমাকে আচ্ছন্ন করিতে পারিবে না, সমস্ত ক্ষুদ্র শত্রুর ব্যুহ হইতে তিনি অনায়াসে নিষ্ক্রমণ করিতে পারিবেন। এইজন্য চিরকাল তিনি অম্লানমুখে বীরদর্পে অগ্রসর হইয়াছেন; কোন দিন তাঁহাকে রথবেগ খর্ব করিতে হয় নাই। সাহিত্যের মধ্যে দুই শ্রেণীর যােগী দেখা যায়, ধ্যান- যােগ এবং কর্মযােগী। ধ্যানযােগ একান্তমনে বিরলে ভাবের চর্চা করেন, তাঁহার রচনাগুলি সংসারী লােকের পক্ষে যেন উরি-পাওনা—যেন যথালাভের মত। কিন্তু বঙ্কিম সাহিত্যে কৰ্মযােগী ছিলেন। তাঁহার প্রতিভা আপনাতে আপনি স্থিরভাবে পর্যাপ্ত ছিল না। সাহিত্যের যেখানে যাহা কিছু অভাব ছিল সর্বত্রই তিনি আপনার বিপুল বল এবং আনন্দ লইয়া খাবমান হইতেন। কি কাব্য, কি বিজ্ঞান, কি ইতিহাস কি ধর্মতত্ত্ব, যেখানে যখনই তাহাকে বচিত্র আবশ্যক হইত, সেখানে তখনই তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হইয়া দেখা দিতেন। নবীন বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে সকল বিষয়েই আদর্শ স্থাপন করিয়া যাওয়া তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। বিপন্ন বঙ্গভাষা আৰ্তরে যেখানেই তাঁহাকে আহ্বান করিয়াছে সেইখানেই তিনি প্রসন্ন চতুভুজ মূর্তিতে দর্শন দিয়াছেন। কিন্তু তিনি যে কেবল অভয় দিতেন, সানা দিতেন, অভাব পূর্ণ করিতেন, তাহা নহে, তিনি দর্পহারীও ছিলেন। এখন যাঁহারা বঙ্গসাহিত্যের সারথ্য স্বীকার করিতে চান, তঁাহারা দিনে নিশীথে বঙ্গদেশকে অত্যুক্তিপূর্ণ তিবাক্যে নিয়ত প্রসন্ন রাখিতে চেষ্টা করেন কিন্তু বঙ্কিমের বাণী কেবল তিবাদিনী ছিল না, খগধারিণীও ছিল। বঙ্গদেশ যদি অসাড় প্রাণহীন না হইত, তবে কৃষ্ণচরিত্রে বর্তমান পতিত হিন্দুসমাজ ও বিকৃত হিন্দুধর্মের উপর যে অস্ত্রাঘাত আছে, সে আঘাতে বেদনাবােধ এবং কথঞ্চিৎ চেতনা লাভ করিত। বঙ্কিমের ন্যায় তেজস্বী প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি ব্যতীত আর কেহই লােকাচার দেশাচারের বিরুদ্ধে এরূপ নির্ভীক স্পষ্ট উচ্চারণে আপন মত প্রকাশ করিতে সাহস করিত না। এমন কি, বঙ্কিম প্রাচীন হিন্দুশান্ত্রের প্রতি ঐতিহাসিক বিচার প্রয়ােগ করিয়া তাহার সার এবং অসার ভাগ পৃথকী- করণ, তাহার প্রামাণ্য এবং অপ্রামাণ্য অংশের বিশ্লেষণ, এমন নিঃসঙ্কোচে করিয়াছেন যে এখনকার দিনে তাহার তুলনা পাওয়া কঠিন।
বিশেষতঃ দুই শত্রুর মাঝখান দিয়া তাহাকে পথ কাটিয়া চলিতে হইয়াছে। একদিকে, আঁহারা অবতার মানেন না তাঁহারা কৃষ্ণের প্রতি দেবনােপে বিপক্ষ হইয়া দাড়ান। অন্যদিকে যাঁহারা শাস্ত্রের প্রত্যেক অক্ষর এবং লােকাচারের প্রত্যেক প্রথাকে অভ্রান্ত বলিয়া জ্ঞান করেন তাঁহারাও, বিচারের লৌহাস্ত্র দ্বারা শাস্ত্রের মধ্য হইতে কাটিয়া কাটিয়া কুঁদিয়া কুঁদিয়া মহত্তম মনুষের আদর্শ অনুসারে দেবতাগঠন কাৰ্যে বড় প্রসন্ন হন নাই। এরূপ অবস্থায় অন্য কেহ হইলে কোন এক পক্ষকে সর্বতােভাবে আপন দলে পাইতে ইচ্ছা করিতেন। কিন্তু সাহিত্য-মহারথী বঙ্কিম দক্ষিণে বামে উভয় পক্ষের প্রতিই তীব্ধ শরচালন করিয়া অকুষ্ঠিতভাবে অগ্রসর হইয়াছেন তাহার নিজের প্রতিভা কেবল তাহার একমাত্র সহায় ছিল। তিনি যাহা বিশ্বাস করিয়াছেন তাহা স্পষ্ট ব্যক্ত করিয়াছেন—বাচাতুরী দ্বারা আপনাকে বা অন্যকে বঞ্চনা করেন নাই। কল্পনা এবং কাল্পনিক দুইয়ের মধ্যে একটি মস্ত প্রভেদ আছে। যথার্থ কল্পনা, যুক্তি সংযম এবং সত্যের দ্বারা সুনির্দিষ্ট আকারবদ্ধকাল্পনিকতার মধ্যে সত্যের ভাণ আছে মাত্র কিন্তু তাহা অদ্ভুত আতিশয্যে অসঙ্গতরূপে স্ফীতকায়। তাহার মধ্যে যেটুকু আলােকের লেশ আছে, ধূমের অংশ তাহার শতগুণ। যাহাদের ক্ষমতা অল্প, তাহারা সাহিত্যের প্রায় এই প্ৰধুমিত কাল্পনিকতার আশ্রয় লইয়া থাকে—কারণ,
বমিট
;
ইহা দেখিতে প্রকাণ্ড কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত লঘু। এক
শ্রেণীর পাঠকেরা এইরূপ ভূমিপরিমাণ কৃত্রিম কাল্পনিকতার
নৈপুণ্যে মুগ্ধ এবং অভিভূত হইয়া পড়েন এবং দুর্ভাগ্যক্রমে
বাংলায় সেই শ্রেণীর পাঠক বিরল নহে।
এইরূপ অপরিমিত অসংযত কল্পনার দেশে বঙ্কিমের ন্যায়
আদর্শ আমাদের পক্ষে অত্যন্ত মূল্যবান। কৃষ্ণচরিত্রে উদ্দাম
ভাবের আবেগে ভঁহার কল্পনা কোথাও উচ্ছল হইয়া
ছুটিয়া যায় নাই। প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত সর্বত্রই তিনি
পদে পদে আসরণপূর্বক যুক্তির সুনির্দিষ্ট পথ অবলম্বন
করিয়া চলিয়াছেন। যাহা লিখিয়াছেন, তাহাতে সঁহার
প্রতিভা প্রকাশ পাইয়াছে; যাহা লিখেন নাই, তাহাতেও
তাঁহার অল্প ক্ষমতা প্রকাশ পায় নাই।
বিশেষতঃ বিষয়টি এমন যে, ইহা কোন সাধারণ বাঙালী
লেখকের হস্তে পডিলে তিনি এই অযােগে বিস্তর হরিহরি,
মমিরি, হায় হায়, অশ্রুপাত ও প্রবল অঙ্গভঙ্গী করিতেন
এবং কল্পনার উচ্ছসি, ভাবের আবেগ এবং হৃদয়াতিশয্য
প্রকাশ করিবার এমন অমুকুল অবসর কখনই ছাড়িতেন না;
সুবিচারিত তর্ক দ্বারা, সুকঠিন সত্য নির্ণয়ের স্পৃহা দ্বারা পদে
পদে আপন লেখনীকে বাধা দিতেন না; সর্বনিগম্য সরল
পথ ছাড়িয়া দিয়া সূক্ষ্মবুদ্ধি দ্বারা অকপােলকল্পিত একটা নূতন
আবিষ্কারকেই সর্বপ্রাধান্য দিয়া তাহাকেই বাচুৰ্যে এবং
কানাকুহকে সমাচ্ছন্ন করিয়া তুলিছেন, এবং নিজের বিশ্বাস
পর
ও ভাষাকে যথাসাধ্য টানিয়া বুনিয়া আশে পাশে দীর্ঘ করিয়া
অধিক পরিমাণ লােককে আপন মতের জালে আকর্ষণ
করিতে চেষ্টা করিতেন।
বস্তুতঃ আমাদের শাস্ত্র হইতে ইতিহাস উদ্ধারের দুরূহ
ভার কেবল বঙ্কিম লইতে পারিতেন। এক দিকে হিন্দু-
শান্ত্রের প্রকৃত মৰ্ম্মগ্রহণে য়ুরােপীয়গণের অক্ষমতা, অন্যদিকে
শাগত প্রমাণের নিরপেক্ষ বিচার সম্বন্ধে হিন্দুদিগের সঙ্কোচ;
একদিকে রীতিমত পরিচয়ের অভাব, অন্যদিকে অতিপরিচয়-
জনিত অভ্যাস এবং সংস্কারের অন্ধতা; যথার্থ ইতিহাসটিকে
এই উভয়সঙ্কটের মাঝখান হইতে উদ্ধার করিতে হইবে।
দেশানুরাগের সাহায্যে শারে অন্তরে প্রবেশ করিতে হইবে
এবং সত্যানুরাগের সাহায্যে তাহার অমূলক অংশ পরিত্যাগ
করিতে হইবে। যে বর ইঙ্গিতে লেখনীকে বেগ দিতে
হইবে, সেই বলার আকর্ষণে তাহাকে সর্বদা সংষত করিতে
হইবে। এই সকল ক্ষমতাসামঞ্জস্য বঙ্কিমের ছিল। সেই
জন্য মৃত্যুর অনতিপূর্বে তিনি যখন প্রাচীন বেদ পুরাণ সংগ্রহ
করিয়া প্রস্তুত হইয়া বসিয়াছিলেন, তখন বঙ্গসাহিত্যের বড়
আশার কারণ ছিল, কিন্তু মৃত্যু সে আশা সফল হইতে দিল
, এবং আমাদের ভাগ্যে যাহা অসম্পন্ন রহিয়া গেল, তাহা
যে কবে সমাধা হইবে কেহই বলিতে পারে না।
বঙ্কিম এই যে সর্বপ্রকার আতিশয্য এবং অসঙ্গতি
হইতে আপনাকে রক্ষা করিয়া গিয়াছেন ইহা তাঁহার
বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিভার প্রকৃতিগত। যে কেহ তাহার রচনা পড়িয়াছেন, সকলেই জানেন বঙ্কিম হাস্যরসে সুরসিক ছিলেন। পরিষ্কার মুক্তির আলােকের দ্বারা সমস্ত আতিশয্যও অসঙ্গতি প্রকাশ হইয়া পড়ে হাস্যরস সেই কিরণেরই একটি রশ্মি। কতদূর পর্যন্ত গেলে একটি ব্যাপার হাস্যজনক হইয়া উঠে, তাহা সকলে অনুভব করিতে পারে না; কিন্তু যাঁহারা হাস্য- রসরসিক তাহাদের অন্তঃকরণে একটি বােধশক্তি আছে, যারা তাঁহারা সকল সময়ে নিজের না হইলেও অপরের কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার, এবং চরিত্রের মধ্যে সুসঙ্গতির সূৱ সীমাটুকু সহজে নির্ণয় করিতে পারেন। নিৰ্ম্মল সংযত হাস্য বঙ্কিমই সর্বপ্রথমে বঙ্গসাহিত্যে আনয়ন করেন। তৎপূর্বে বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসকে অন্য রসের সহিত এক পংক্তিতে বসিতে দেওয়া হইত না। সে নিয়াসনে বসিয়া শ্ৰব্য অশ্রাব্য ভাষায় ভাড়ামি করিয়া সভাজনের মনােরঞ্জন করিত। আদিরসেরই সহিত যেন তাহার কোন একটি সর্বউপদ্রবসহ বিশেষ কুটুম্বিতার সম্পর্ক ছিল এবং ঐ রসটাকেই সর্বপ্রকারে পড়ন ও আন্দোলন করিয়া তাহার অধিকাংশ পরিহাস বিক্রপ প্রকাশ পাইত। এই প্রগলভ বিদূষকটি যতই প্রিয়পাত্র থাক, কখনও সম্মানের অধিকারী ছিল না। যেখানে গভীরভাবে কোন বিষয়ের আলােচনা হইত সেখানে হাষের চপলতা সর্বপ্রষছে পরিহার করা হইত।
পঞ্চরত্ব বঙ্কিম সর্বপ্রথমে হাস্যরসকে সাহিত্যের উচ্চ শ্রেণীতে উন্নীত করেন। তিনিই প্রথমে দেখাইয়া দেন যে, কেবল প্রহসনের সীমার মধ্যে হাস্যরস বদ্ধ নহে; উজ্জল ও হাস্য সকল বিষয়কেই আলােকিত করিয়া তুলিতে পারে। তিনিই প্রথম দৃষ্টান্তের দ্বারা প্রমাণ করাইয়া দেন যে, এই হাস্য- জ্যোতির সংস্পর্শে কোন বিষয়ের গভীরতার গৌরব হ্রাস হয় না, কেবল তাহার সৌন্দৰ্য্য এবং রমণীয়তা বৃদ্ধি হয়, তাহার সর্বাংশের প্রাণ এবং গতি যেন সুস্পষ্টরূপে দীপ্যমান হইয়া উঠে। যে বঙ্কিম বঙ্গসাহিত্যের গভীরতা হইতে অক্ষর উৎস উন্মুক্ত করিয়াছেন, সেই বঙ্কিম আনন্দের উদয়শিখর হইতে নব-জাগ্রত বঙ্গসাহিত্যের উপর হাস্যের আলােক বিকীর্ণ করিয়া দিয়াছেন। কেবল অসঙ্গতি নহে, সুরুচি এবং শিষ্টতার সীমা নির্ণয় করিতেও একটি স্বাভাবিক সূ বােধশক্তির আবশ্যক। মাঝে মাঝে অনেক বলিষ্ঠ প্রতিভার মধ্যে সেই বােধশক্তির অভাব দেখা যায়। কিন্তু বঙ্কিমের প্রতিভায় বল এবং সৌকুমাৰ্যের একটি সুন্দর সম্মিশ্রণ ছিল। নারীজাতির প্রতি যথার্থ বীরপুরুষের মনে যেরূপ একটি সসম্ভ্রম সম্মানের ভাব থাকে, তেমনই সুরুচি এবং শীলতার প্রতি বঙ্কিমের বলিষ্ঠ বুদ্ধির একটি ভদ্রোচিত বীৰােচিত প্রতিপূর্ণ শ্রদ্ধা ছিল। বঙ্কিমের রচনা তাহার সাক্ষ্য। বর্তমান লেখক যে দিন প্রথম বঙ্কিমকে দেখিয়াছিল, সেদিন একটি ঘটনা ঘটে
বঙ্কিমচন্দ্র
যাহাতে বঙ্কিমের এই স্বাভাবিক সুরুচিপ্রিয়তার প্রমাণ
পাওয়া যায়।
সেদিন লেখকের আত্মীয় পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত শৌরী-
মােহন ঠাকুর মহােদয়ের নিমন্ত্রণে তাঁহাদের মরকুয়ে
কলেজ-রিয়ুনিয়ন্ নামক মিলনসভা বসিয়াছিল। ঠিক
কত দিনের কথা ভাল স্মরণ নাই কিন্তু আমি তখন
বালক ছিলাম। সেদিন সেখানে আমার অপরিচিত বহুতর
যশস্বী লােকের সমাগম হইয়াছিল। সেই বুধমণ্ডলীর
মধ্যে একটি ঋজু দীর্ঘকায় উজ্জ্বলকৌতুকপ্রফুল্লমুখ গুধারী
প্রৌঢ় পুরুষ চাপকানপরিহিত বক্ষের উপর দুই হন্ত আবদ্ধ
করিয়া দাড়াইয়াছিলেন। দেখিবামাত্রই যেন তাহাকে
সকলের হইতে স্বতন্ত্র এবং আত্মসমাহিত ৰলিয়া বােধ হইল।
আর সকলে জনতার অংশ, কেবল তিনি যেন একাকী
একজন। সেদিন আর কাহার পরিচয় জানিবার জন্য
আমার কোনরূপ প্রয়াস জন্মে নাই, কিন্তু তাহাকে দেখিয়া
তৎক্ষণাৎ আমি এবং আমার একটি আত্মীয় সঙ্গী একসঙ্গেই
কৌতূহলী হইয়া উঠিলাম। সন্ধান লইয়া জানিলাম তিনিই
আমাদের বহুদিনের অভিলষিতদর্শন, লােকবিত বঙ্কিম
বাবু। মনে আছে প্রথম দর্শনেই তাহার মুখশ্রীতে প্রতিভার
প্রখরতা এবং বলিষ্ঠতা এবং সর্বােক হইতে তাহার একটি
সুদূর স্বাতন্ত্রভাব আমার মনে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছিল।
তাহার পর অনেক বার তাহার সাক্ষাৎলাভ করিয়াছি,
পর
তাঁহার নিকট অনেক উৎসাহ এবং উপদেশ প্রাপ্ত হইয়াছি,
এবং তাঁহার মুখশ্রী মেহের কোমলহান্তে অত্যন্ত কমনীয়
হইতে দেখিয়াছি, কিন্তু প্রথম দর্শনে সেই যে তাঁহার মুখের
উদ্যত খড়ের ন্যায় একটি উজ্জ্বল মুতী অবলতা দেখিতে
পাইয়াছিলাম, তাহা আজ পর্যন্ত বিস্মৃত হই নাই।
সেই উৎসব উপলক্ষে একটি ঘরে একজন সংস্কৃতজ্ঞ
পণ্ডিত দেশানুরাগমূলক স্বরচিত সংস্কৃত শ্লোক পাঠ এবং
তাহার ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। বঙ্কিম একপ্রান্তে দাড়াইয়া
শুনিতেছিলেন। পণ্ডিত মহাশয় সহসা একটি শ্লোকে পতিত
ভারতসন্তানকে লক্ষ্য করিয়া একটা অত্যন্ত
অত্যন্ত সেকেলে
পণ্ডিতী রসিকতা প্রয়ােগ করিলেন, সে রস কিঞ্চিৎ বীভৎস
হইয়া উঠিল। বঙ্কিম তৎক্ষণাৎ একান্ত সঙ্কুচিত হইয়া
দক্ষিণ করতলে মুখের নিম্নদ্ধ ঢাকিয়া পার্শ্ববর্তী আর দিয়া
দ্রুতবেগে অন্য ঘরে পলায়ন করিলেন।
বঙ্কিমের সেই সঙ্কোচ পলায়ন-দৃশ্যটি অদ্যাবধি আমার
মনে মুদ্রাঙ্কিত হইয়া আছে।
বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে, ঈশ্বর গুপ্ত যখন
সাহিত্যগুরু ছিলেন,বমি তখন তাঁহার শিষ্যশ্রেণীর মধ্যে
গণ্য ছিলেন। সে সময়কার সাহিত্য অন্য যে কোন
প্রকার শিক্ষা দিতে সমর্থ হৌক, ঠিক সুরুচি শিক্ষার উপযােগী
ছিল না। সে সময়কার অসংযত বাকযুদ্ধ এবং আন্দোলনের
মধ্যে দীক্ষিত ও বর্ধিত হইয়া ইতরতার প্রতি বিদ্বেষ,
বঙ্কিমচন্দ্র সুচির প্রতি শ্রদ্ধা এবং শ্লীলতা সম্বন্ধে অক্ষু বেদনাবােধ রক্ষা করা যে, কি আশ্চর্য ব্যাপার তাহা সকলেই বুঝিতে পারিবেন। দীনবন্ধুও বঙ্কিমের সমসাময়িক এবং তাহার বান্ধব ছিলেন কিন্তু তাহার লেখায় অন্য ক্ষমতা প্রকাশ হইলেও তাহাতে বঙ্কিমের প্রতিভার এই ব্রাহ্মণপাচিত চিতা দেখা যায় নাই। তাঁহার রচনা হইতে ঈশ্বর গুপ্তের সময়ের ছাপ কালক্রমে ধৌত হইতে পারে নাই। আমাদের মধ্যে যাহারা সাহিত্যব্যবসায়ী তাঁহার বঙ্কিমের কাছে যে কি চিরঋণে আবদ্ধ তাহা যেন কোন কালে বিস্মৃত না হন। এতদিন আমাদের বঙ্গভাষা কেবল একতারা যন্ত্রের মত এক তারে বাঁধা ছিল, কেবল সহ সুরে ধর্ম সঙ্কীৰ্ত্তন করিবার উপযােগী ছিল; বঙ্কিম স্বহস্তে তাহাতে এক একটি করিয়া তার চড়াইয়া আজ তাহাকে বীণাযন্ত্রে পরিণত করিয়া তুলিয়াছেন। পূর্বে যাহাতে কেবল স্থানীয় গ্রাম্যম্বর বাজিত, আজ তাহা বিশ্বসভায় শুনাইবার উপযুক্ত ধ্রুবপদ অঙ্গের কলাবতী রাগিণী আলাপ করিবার যােগ্য হইয়া উঠিয়াছে। সেই তাঁহার সহ- সম্পূর্ণ স্নেহপালিত ক্রোড়সঙ্গিনী বঙ্গভাষা আজ বঙ্কিমের জন্য অন্তরের সহিত নােদন করিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু তিনি এই শােকেচ্ছাসের অতীত শান্তিধামে দুর জীবনযজের অবসানে নির্বিকার নিরাময় বিশ্রাম লাভ করিয়াছেন। মৃত্যুর পরে তাঁহার মুখে একটি কোমল
১০:
এস, একটি সর্বদুঃখতাপহীন গভীর প্রশান্তি উদ্ভাসিত
হইয়া উঠিয়াছিল—যেন জীবনের মধ্যাহ্নরৌদ্রদ কঠিন
সংসারতল হইতে
মৃত্যু তাহাকে স্নেহ-শীতল জননীক্রোড়ে
তুলিয়া লইয়াছে। আজ আমাদের বিলাপ পরিতাপ
তাঁহাকে স্পর্শ করিতেছে না, আমাদের ভক্তি-উপহার গ্রহণ
করিবার জন্য সেই প্রতিজ্যোতির্ময় সৌম্য প্রসন্নমূর্তি
এখানে উপস্থিত নাই। আমাদের এই শােক এই ভক্তি
কেবল আমাদেরই কল্যাণের জ। বঙ্কিম সাহিত্যক্ষেত্রে
যে আদর্শ স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, এই শােকে এই ভক্তিতে
সেই আদর্শপ্রতিমা আমাদের অন্তরে উজ্জ্বল এবং স্থায়ীরূপে
প্রতিষ্ঠিত হৌক। প্রস্তরের মূর্তি স্থাপনের অর্থ এবং সামর্থ্য
আমাদের যদি না থাকে, তবে একবার তাহার মহত্ত্ব সর্বতাে-
ভাবে মনের মধ্যে উপলব্ধি করিয়া তাঁহাকে আমাদের
হৃদয়ের স্মরণস্তম্ভে স্থায়ী করিয়া রাখি। ইংরেজ এবং
ইরেজের আইন চিরস্থায়ী নহে; রাজনৈতিক, ধর্মনৈতিক,
সমাজনৈতিক মতামত সহস্রবার পরিবর্তিত হইতে পারে;
যে সকল ঘটনা এবং যে সকল অনুষ্ঠান আজ সর্বপ্রধান
বলিয়া বােধ হইতেছে এবং যাহার উন্মাদনার কোলাহলে
সমাজের খ্যাতিহীন শব্দহীন কর্তব্যগুলিকে নগণ্য বলিয়া
ধারণা হইতেছে, কাল তাহার স্মৃতিমাত্র চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট
থাকিতে না পারে; কিন্তু যিনি আমাদের মাতৃভাষাকে
সর্বপ্রকার ভাবপ্রকাশের অনুকুল করিয়া গিয়াছেন তিনি
বমিট এই হতভাগ্য দরিদ্র দেশকে একটি অমূল্য চিরসম্পদ দান করিয়াছেন। তিনি স্থায়ী জাতীয় উন্নতির একমাত্র মূল উপায় স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। তিনিই আমাদের নিকট যথার্থ শশাকের মধ্যে সানা, অবনতির মধ্যে আশা, শান্তির মধ্যে উৎসাহ এবং দারিদ্র্যের শূন্যতার মধ্যে চির-সৌন্দর্যের অক্ষয় আর উদ্ঘাটিত করিয়া দিয়াছেন। আমাদিগের মধ্যে যাহা কিছু অমর এবং আমাদিগকে যাহা কিছু অমর করিবে, সেই সকল মহাশক্তিকে ধারণ করিবার, পােষণ করিবার, প্রকাশ করিবার, এবং সর্বত্র প্রচার করিবার এক মাত্র উপায় যে মাতৃভাষা তাহাকেই তিনি বলবতী এবং মহীয়সী করিয়াছেন। রচনাবিশেষের সমালােচনা ভ্রান্ত হইতে পারে—আমা- দিগের নিকট যাহা প্রশংসিত কালক্রমে শিক্ষা, রুচি এবং অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের উত্তর পুরুষের নিকট তাহা নিতি এবং উপেক্ষিত হইতে পারে, কিন্তু বমি বঙ্গভাষার ক্ষমতা এবং বঙ্গসাহিত্যের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছেন; তিনি ভগীরথের রায় সার্থনা করিয়া বঙ্গসাহিত্যে ভাব- মন্দাকিনীর অবতারণ করিয়াছেন এবং সেই পুণ্যস্রোতস্পর্শে জভপাশ মােচন করিয়া আমাদের প্রাচীন জন্মরাশিকে সঞ্জীবিত করিয়া তুলিয়াছেন, ইহা কেবল সাময়িক মত নহে, এ কথা কোন বিশেষ তর্ক বা রুচির উপর নির্ভর করিতেছে , ইহা একটা ঐতিহাসিক সত্য।
এই কথা স্মরণে মূদ্রিত করিয়া সেই বাংলা লেখকদিগের গুরু, বাংলা পাঠকদিগের সুহৃদ, এবং সুজলা সুফলা মলয়জ- শীতলা বঙ্গভূমির মাতৃবৎসল প্রতিভাশালী সন্তানের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করি, যিনি জীবনের সায়া আসিবার পূর্বেই, নূতন অবকাশে নূতন উদ্যমে নূতন কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার প্রারম্ভেই, আপনার অপরিয়ান প্রতিভারখি সংহরণ করিয়া, বঙ্গসাহিত্যাকাশ ক্ষীণতর জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর হতে সমর্পণপূর্বক গত শতাব্দীর বর্ষশেষের পশ্চিম দিগন্তসীমায় অকালে অস্তমিত হইলেন। অশ্বিনীকুমার বঙ্গ-গৌরব অশ্বিনীকুমার আর ইহজগতে নাই। বাঙালী যে কি রত্ন হারাইয়াছে, বঙ্গ-জননী যে কতদূর ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন, তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। অশ্বিনীকুমার কে? তিনি কি ছিলেন ? সংক্ষেপে বলিতে গেলে তিনি বাংলার একজন যথার্থ ও অনন্যসাধারণ লােক- নায়ক ছিলেন। অশ্বিনীকুমার শিক্ষিত, কিন্তু কোনও বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; সবা, কিন্তু দৈবীপ্রতিভাসম্পন্ন বাগ্মী ছিলেন । সুললিত বাক্য যােজনা করিয়া তিনি বহু লােককে উপদেশ দিতে পারিতেন, কিন্তু শব্দ ও ভাবের বন্যা দুটাইয়া অশ্বিনীকুমার দত্ত
No text on this page.
১৭
;
অশ্বিনীকুমার
তাহাদিগকে আত্মহারা করিয়া ক্ষেপাইয়া তুলিতে পারিতেন
। তিনি সাহিত্যিক,—তাঁহার ‘ভক্তিযােগ বাংলাভাষার
একখানি অতি উৎকৃষ্ট স্থ; কিন্তু যে সাহিত্য-সৃষ্টির দ্বারা
সমাজে নূতন আদর্শ ও নূতন উৎসাহ ফুটিয়া উঠে, সে সৃষ্টি-
শক্তি হার ছিল না। তিনি দরিদ্র ছিলেন না, পিতৃদত্ত
সম্পত্তির দ্বারা তাহার সাংসারিক সচ্ছলতা সম্পাদিত হইত,
কিন্তু যতটা ধনের অধিকারী হইলে, সেই বনের শক্তিতে
লােকে সমাজপতি হইয়া উঠে, অশ্বিনীকুমারের সে বিভব ছিল
। বি, এল, পাশ করিয়া অশ্বিনীকুমার কিছুদিন ওকালতি
করিয়াছিলেন; সে দিকে মনােনিবেশ করিলে তিনি আধুনিক
ব্যবহারজীবিগণের অগ্রণীদলভুক্ত হইতে পারিতেন না যে,
এমনও মনে হয় না। কিন্তু অশ্বিনীকুমার সে দিকে বিধিমত
চেষ্টা করেন নাই। সুতরাং বড় উকীল কৌন্সিলী হইয়াও
ললাকে সমাজে যে প্রতিপত্তি ও প্রভাব লাভ করে, অশ্বিনী-
কুমার তাহা পান নাই। সরকারী কৰ্মে কৃতিত্বের দ্বারাও
সমাজে এক জাতীয় নেতৃত্বলাভ করা যায়। অশ্বিনীকুমারের
পিতা উচ্চ রাজকর্মচারী ছিলেন; ইচ্ছা করিলে অশ্বিনী-
কুমারও সহজেই একটা ডেপুটিগিরি জুটাইতে পারিতেন,
আর তাহার বিদ্যার ও চরিত্রের গুণে রাজকার্যে তিনি যে
খুবই কৃতিত্ব এবং উন্নতি লাভ করিতে পারিতেন, সে বিষয়েও
বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু অশ্বিনীকুমার এ সকলের
কিছুই করেন নাই। যে গুণ থাকিলে, যে কর্ম ও কৃতি
•
পর
বলে, সচরাচর আমাদের মধ্যে লোেকনেতৃত্বলাভ হয় অশ্বিনী-
কুমার তাহার কিছুরই দাবী করিতে পারেন না। তথাপি,
তাহার মত এমন সত্য ও সাচ্চা লােক-নায়ক বাংলার
প্রসিদ্ধ কখিগণের মধ্যে অতি অল্পই দেখা যায়।
ফলতঃ আমার মনে হয় যে, আমাদের চিত্রনায়ক
অনেক আছেন, কিন্তু লােকনায়ক নাই। কেহ বজা; কেহ
কবি ; কেহ মসীজীবী; কেহ ব্যবহারজীবী; কেহ বা ধনে,
কেহ বা পদে বড়। এই সকল লােকে মিলিয়া দেশের
মনের গতি ও কর্মের আদর্শ বদলাইয়া দিয়াছেন ও
দিতেছেন। ইহারা না থাকিলে বাংলা আজ যেখানে গিয়া
দাড়াইয়াছে, সেখানে যাইতে পারি না। ইহারা দেশের
প্রাণতা বাড়াইয়া দিয়াছেন, লােক-চরিত্রকে উদার ও উন্নত
করিয়াছেন। কিন্তু ইহারা কেহই, সত্য অর্থে, লােকনায়ক
নহেন। লােকে ইহাদের পুস্তক আনন্দ করিয়া পড়ে,
ইহাদের বক্তৃতা আগ্ৰহ করিয়া শােন, ইহাদের গুণগান
প্রাণ খুলিয়া করে; ইহাদিগকে সভাসমিতিতে উচ্চ আসনে
লইয়া গিয়া বসায়, পথে দেখা হইলে সসমে ইহাদিগকে
পথ ছাড়িয়া দেয়; দেশহিতকর অনুষ্ঠানাদিতে ইহাদিগকে
আদর করিয়া পৌরহিত্যে বরণ করে। এ সকলই করে;
করে না কেবল সত্যভাবে, ইহাদের অনুবর্তন। যতদিন
লােকের মনের সঙ্গে ইহাদের কথা মিলিয়া যায়, লােকের
ভাবের সঙ্গে ইহাদের উপদেশ মিশ খায়, লােকে যাহা
অশ্বিনীকুমার
আপনা হইতে চাহে যতদিন ইহারা সে পথে নিজেরা চলিতে
ও তাহাদিগকে চালাইতে রাজি থাকেন, ততদিন ইহাদিগকে
সকলে মাথায় করিয়া রাখে। কিন্তু মতভেদ উপস্থিত
হইলেই ইহাদিগকে অবলীলাক্রমে, সরাসরিভাবে, ছাড়িয়া
আসিতেও দ্বিধা-বােকরে না। ইহাকে প্রকৃত লােকনায়কত্ব
বলে না, বা বলা সঙ্গত নহে।
প্রকৃত লােকনায়ক এদেশে ক্রমে লােপ পাইয়া
যাইতেছে। এক সময়ে, হিন্দু ও মুসলমান-সমাজে, যে
জাতীয় লােকনায়ক স্বচক্ষে দেখিয়াছি, তাহা আর আজ
দেখিতে পাই না। ইহার প্রধান কারণ এই যে, আমাদের
আধুনিক শিক্ষাতে আমাদিগকে দেশের লােকের প্রাণ
হইতে ক্রমশঃই যেন দূরে লইয়া গিয়া ফেলিতেছে।
প্রথমতঃ আমাদের পিতৃপিতামহেরা যে ভাবে আপন আপন
গ্রামের সঙ্গে একাত্ম হইয়া বাস করিতেন, আমরা আর তাহা
করি না। তাহারাও সময় সময়, বিষয়-কর্মের খাতিরে গ্রাম
ছাড়িয়া দূরদূরান্তরে বাস করিতেন বটে, কিন্তু অনেক স্থলেই
তাঁহাদের স্ত্রীপুত্রের গ্রামেই থাকিতেন। যেক্ষেত্রে তাহারা
পরিবার সঙ্গে লইয়া কর্মস্থলে যাইতেন, সেখানেও গ্রামের
সমাজের সঙ্গে তাঁহাদের প্রাণগত, অন্তরঙ্গ যােগ কখনও নষ্ট
হইত না। বিদেশে প্রবাসে তাহারা অশেষ কেশ স্বীকার
করিয়া যে অর্থ উপার্জন করিতেন, গ্রামে আসিয়া, আপনার
আক্ষয়কুটু, প্রতিবেশী ও বন্ধুবর্গের মধ্যেই সে অর্থ ব্যয়
করিতেন। পরােক্ষভাবে দশে তাঁহাদের অর্থের ভাগ ও
ভােগী হইত; সাক্ষাৎভাবে তাঁহারা তাহাদের প্রতিপত্তি ও
প্রতিষ্ঠার দ্বারা সময়ে অসময়ে অনেক সাহায্যলাভ করিতেন।
বিবাহ ও শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া-কর্মে, দোলদুর্গোৎসবাদি নৈমিত্তিক
পূজাপার্বণে, নিত্য দেবসেবা ও অতিথিসের ভিতর দিয়া
গ্রামের লােকের সঙ্গে তাহাদের একটা নিকট সম্বন্ধ জমাট
হইয়া যাইত। আর এই জন্য তাহারা যেখানে যাইয়া
বাড়াইতেন, শত শত লােক সেখানে যাইয়া তাহাদের
পৃষ্টপােষক হইয়া দাড়াইত। তাঁহারা যে কাজ করিতে
যাইতেন, সকলে সে কাজে রত হইত। তাহারা যে পথ
দেখাইতেন, সকলে বিনা ওজরে, বিনা বিচারে, সে পথ ধরিয়া
চলিত। তখন দেশে সত্যকার লােক-নেতৃত্ব ছিল। ইহারাই
সেকালে প্রকৃত লােক-নায়ক ছিলেন।
আর আজ ‘তে হি নাে দিবসঃ গতা। সে দিনও
নাই—সে সমাজও নাই। লােকে লেখাপড়া শিখিয়া, যাহারা
লেখাপড়া জানে না তাহাদের নিকট হইতে পৃথক হইয়া
পড়ে। আমাদের দেশে শিক্ষিত’ ও ‘অশিক্ষিতে’, ‘বি’
ও ‘অস্ত্রের মধ্যে এককালে এ সাংঘাতিক ব্যবধান ছিল না।
গ্রামের বিদ্যাভূষণ বা তর্কসিদ্ধান্ত বা ন্যায়ালঙ্কার মহাশয়ের
বাড়ীতে আপামর সাধারণ সকলের অবাধ গতিবিধি ছিল।
তাঁহার চতুষ্পাঠীতে, যখন তিনি শিষ্যমণ্ডলী-বেষ্টিত হইয়া
ব্যাকরণ বা স্মৃতি বা ন্যায়ের অধ্যাপনা করাইতেন, তখনও
১১১ बचिनौश्यांव গ্রামের চাষী ও ব্যবসায়ীরা তাঁহার কাছে যাইয়া নীরবে বসিয়া থাকিত এবং তাহার তামাদি সাজিয়া, তাঁহার সেবায় নিযুক্ত হইত। তাহাদের সঙ্গে তাঁহার বিদ্যার ব্যবধান যাই থাকুক না কেন, প্রাণের ব্যবধান বড় বেশী ছিল না। আর এই একপ্রাণতা নিবন্ধন, দেশের আপামর সাধারণে এ সকল উদারচরিত ব্রাহ্মণের শাস্ত্রজ্ঞান লাভ না করিয়াও, তাহাদের চরিত্রের প্রভাবে, কথাবার্তার গুণে অনেকটা সুশিক্ষিত হইয়া উঠিত। এ শিক্ষা স্কুল-পাঠশালায় মিলে না ; আমরা একটু আধটু লেখাপড়া শিখিয়া, চিন্তায়, ভাবে, আদর্শে, অভ্যাসে, সকল বিষয়ে দেশের লােক হইতে এতটা পৃথক হইয়া পড়িয়াছি যে, তাহাদের কথা আমাদের মিষ্ট লাগে না, আমাদের কথাও তাহাদের বােধগম্য হয় না। তাহাদের আমােদপ্রমোদে আমরা গা ঢালিয়া দিতে পারি না। আমাদের উৎসব-ব্যসনাদিতেও তাহারা আমাদের কাছে ঘেষিতে পারে না। আমাদের বাড়ীতে তাহারা সাহস করিয়া আসে না, আমরাও আমাদের ক্রিয়াকর্মে তাহাদিগকে আদর করিয়া ডাকি না। ইংরেজকে তাহারা যে ভাবে দেখে, যেরূপ সম্মান করে, আমাদিগকেও প্রায় সেইরূপই করে। আর এই জন্য দেশের লােকে যেমন ইংরেজের শাসন মানিয়া চলে, কিন্তু আপনা হইতেই প্রাণের টানে সরকারের অনুবর্তন করে না, আমাদের আন্দোলন- আলােচনাদিতেও এখন দেশের লােকে ঠিক ঐ ভাবেই ১১৫ পঞ্চরত্ব এই বে-সরকারী স্কুল-কলেজের প্রতিষ্ঠাতৃগণের প্রায় অপর সকলেই, এগুলিকে জীবিকা-উপার্জনের একটী প্রশস্ত উপায়- রূপে গ্রহণ করেন। কিন্তু অশ্বিনীকুমার তাহা করেন নাই। সে প্রয়ােজনও তাঁহার ছিল না। ফলতঃ আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পরে, অশ্বিনীকুমারের মত আর কেহ এতটা নিঃস্বার্থভাবে স্বদেশীয়দিগের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা প্রচার কবিবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হন নাই। এইজন্য আজ পর্যন্ত অশ্বিনীকুমারের স্কুল ও কলেজের পরিচালনা- কাৰ্যে কোনও প্রকারের ব্যবসাদারীর পরিচয় পাওয়া যায় নাই। অশ্বিনীকুমার লােকশিক্ষার জন্য বহু বৎসর ধরিয়া আপনার সময়, শক্তি এবং অর্থ অকাতরে দান করিয়াছেন, কখন তাহার এক কপর্দকেরও প্রতিদানের প্রত্যাশা করেন নাই। এই জন্যই বােধ হয় তাহার শিক্ষার ও চরিত্রের প্রভাব এ দেশের, বিশেষতঃ পূর্ববঙ্গের, ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত যুবকমণ্ডলীর মধ্যে এতটা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। স্কুল ও কলেজ খুলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট গ্রন্থাবলী পডাইয়াই যুবকগণের শিক্ষার কাজ শেষ হইল, অশ্বিনীকুমার কখন এমনটা মনে করিতেন না। শিষ্যদের চরিত্রগঠনের জন্যও তিনি সর্বদা প্রাণপণ চেষ্টা করিতেন। চরিত্রগঠনের উপায় কেবলমাত্র উপদেশ নহে, কিন্তু সদনুষ্ঠান। অশ্বিনীকুমার আপনার স্কুল ও কলেজের যুবকমণ্ডলীর মধ্যে ক্রমে ক্রমে বিবিধ সনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা করিতে আরম্ভ করেন। চরিত্র-
অশ্বিনীকুমার
গঠনের মূলে পরার্থপরতাসাধন। লােকসেবার ভিতর দিয়া
যে ভাবে ও যে পরিমাণে এই পরার্থপরতা সাধন করিতে
পারা যায়, আর কোনও উপাযে তাহা পারা যায় না।
অশ্বিনীকুমারের শিষেরা দল বাঁধিয়া আর্তজনের সেবায়
নিযুক্ত হইতেন। বহুদিন হইতেই বরিশালে মাঝে মাঝে
বিচিকার নিরতিশয় প্রাদুর্ভাব হইয়া থাকে। অখিনী-
কুমারের স্কুল এবং কলেজের যুবকেরা সে সব সময়ে জাতি-
বর্ণনির্বিশেষে লােকের ঘরে ঘরে যাইয়া রােগীর বা
করিয়াছেন। মামলা-মােকদ্দমা উপলক্ষে পল্লীগ্রাম হইতে
বহুলােক সর্বদাই বরিশালে যাতায়াত করে। বরিশাল
মুসলমান-প্রধান স্থান। সহরের এই সকল অভ্যাগতদিগের
মধ্যে মুসলমানদিগের সংখ্যাই বেশী। ইহারা সহরে
আসিয়া মােসাফেরখানায় বা হােটেলে আশ্রয় লইয়া থাকে।
এই সকল হােটেলে স্বাস্থ্যরক্ষার কোন ব্যবস্থাই যে নাই,
ইহা বলা বাহুল্য মাত্র ; বিশেষতঃ আপনার পরিবার
পরিজন হইতে দূরে আসিয়া এরূপ বন্ধুহীন স্থানে বিচিকা
দ্বারা আক্রান্ত হইলে লােকের কত না দুর্গতি হয়, ইহা
সহজেই অনুমান করা যায়। অশ্বিনীকুমারের শিরাে
সর্বদা নিতান্ত আপনার জনের মত এই সকল অসহায়
রােগীর সেবা করিয়া আসিয়াছেন। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য এবং
কায়স্থ সন্তানেরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করিয়া ইহাদিগের মল
মূত্র পরিষ্কার করিয়াছেন। অশ্বিনীকুমার এবং তাঁহার
পর বন্ধুবৰ্গ অকাতরে এই সকল বিপন্ন লােকের ঔষধ এবং পথ্যাদির ব্যবস্থা দিয়াছেন। বরিশালের এই সেবকদল অনেক বন্ধুহীন লােকের মৃতদেহের সৎকার পর্যন্ত করিয়া- ছেন। অশ্বিনীকুমারের শিষেরা বিপন্ন নােগীর অজষা করিতে যাইয়া কখন কোন দিন কোন প্রকারের জাতিবর্ণের বিচার করেন নাই। আকালে, অন্নকষ্টে, হিন্দুমুসলমান- নির্বিশেষে ইহারা দেশের এবং বিদেশের সম্পন্ন লােকদিগের নিকট হইতে দ্বারে দ্বারে অর্থ ভিক্ষা করিয়া বিপন্ন জনের ক্ষুন্নিবারণের উপায় করিয়া দিয়াছেন। অশ্বিনীকুমারের লােকসেবা কেবল যে শহরে আবদ্ধ ছিল তাহা নহে। বহু দিন হইতে অশ্বিনীকুমারের স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়া পড়িয়া- ছিল। কতকটা নিজের শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য, আর কতকটা আপনার বিষয়ক উপলক্ষেও তিনি আপনার জেলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নৌকাযােগে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। এই সকল সফরের সময় দেশের গরীব লােকেরা সর্বদাই নানা বিষয়ে তাহার সাহায্য এবং সেবা পাইয়া আসিয়াছে; অশ্বিনী- কুমারের নৌকা কোথাও লাগিয়াছে শুনিলেই সে স্থানের গরীব লােকেরা আপন আপন শরীর-মনের বােঝা লইয়া নিতান্ত আপনার জন ভাবিয়া তাহার নিকটে যাইয়া উপস্থিত হইত। নােগী ঔষধ চায়, দরিদ্র অর্থ চায়, জিজ্ঞাসু উপদেশ চায়, আর যাহার চাহিবার কিছু নাই, সেও তাঁহাকে চক্ষে দেখিয়া কেবল মাত্র কৃতার্থ হইবার জন্য তাঁহার কাছে যাইয়া
১১।
অশ্বিনীকুমার
উপস্থিত হইত। সকলের অভাব বা প্রার্থনা যে তিনি
সর্বদা পূরণ করিতে পারিতেন, তাহা নহে। ভগবানের
নিকটেও মানুষ সর্বদা কত কি চায়, কিন্তু যাহা চায় তাহাই
যে পায়, এমন নহে; তথাপি ঈপ্সিতলাভ না হইলেও
তাহাদের প্রাণে শান্তিলাভ হইয়া থাকে। অশ্বিনীকুমারের
সম্বন্ধেও কতকটা তাহাই হইত। সকলের প্রার্থনা পূরণ
করা তাঁহার সাধ্যাতীত, কোন মানুষই তাহা পারে না।
তবে মিষ্ট কথায়, মেহসিক্ত সম্ভাষণে, অন্তরের সহানুভূতি ও
সমবেদনা দিয়া সকল মানুষই অপর মানুষের প্রাণটা ঠাণ্ডা
করিয়া দিতে পারে। অশ্বিনীকুমার এটী সৰ্ব্বদাই করিতেন।
এই জন্য বরিশালের জনসাধারণের সঙ্গে বহুদিন হইতে
তাঁহার একটা গভীর প্রাণের যােগ গডিয়া উঠিয়াছিল।
কি সহজ উপায়ে, তিনি লােকের মনােরঞ্জন করিতেন,
আমাদের পক্ষে অনেক সময় তাহা কল্পনা করিয়া উঠাও
অসম্ভব হইয়া পড়ে। একটা সামান্য ঘটনার কথা মনে
পড়িল। সে বেশী দিনের কথা নয়; স্বদেশী আন্দোলনের
তখন খুব প্রাদুর্ভাব। বরিশালে একটা অতি বিস্তৃত ও
স্বল্পবিস্তর সঙ্গতিসম্পন্ন নমঃশূদ্র-সমাজ আছে। ইহাদের
মধ্যে কেহ কেহ খৃষ্টীয়ান হইয়া গিয়াছে; কেহ কেহ লেখা-
পড়াও শিখিয়াছে। এই সকল সূত্রে পাশ্চাত্য সাম্যবাদের
প্রভাবও কিয়ৎ পরিমাণে এই নমঃশূদ্র-সমাজে প্রবেশ
করিয়াছে। নমঃশূদ্রেরা কোনও বিষয়েই দেশের অপরাপর
••
১১৮
শূদ্রগণ অপেক্ষা হীন নহে; অথচ ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ
প্রভৃতি উচ্চতর শ্রেণীর লােকেরা স্বচ্ছন্দে অপর শূদ্রদের
জল গ্রহণ করেন; নমঃশূদ্রের জল গ্রহণ করেন না। নমঃ-
শূদ্রেরা এজন্য আপনাদিগকে অযথা অপমানিত মনে করিয়া
এই প্রথার বিরুদ্ধে একটা প্রবল আন্দোলন জাগাইয়া
তুলিয়াছেন। স্বদেশীর মুখে নমঃশূদ্রদের এই আন্দোলনটা
বেশ বাড়িয়া উঠে। দেশীদলের আত্মবিরােধ বাধাইবার
জন্য স্বদেশীর বিরােধীগণ নমঃশূদ্রদিগের এই আন্দোলনে
নানা ভাবে ইন্ধন প্রদান করিতে আরম্ভ করে। বরিশালের
একজন নিষ্ঠাবান্ স্বদেশসেবককে কেহ বলেন যে, “বাবুরা ত
বন্দে মাতরম্' বলিয়া ভাই ভাই একঠাই করিয়াছেন, কিন্তু
তােমাদিগকে নমঃশূদ্র বলিয়া ঘৃণা করেন কেন? ভদ্রসমাজে
তােমাদের জল চলে না, হুকা চলে না, তবুও তােমরা তাহাদের
ভাই; কথাটা মন্দ নয়।” এ কথা শুনিয়া এই ব্যক্তির
মনে একটা খট্কা বাধিয়া যায়। সে সময়ে অশ্বিনীবাবু
সেই অঞ্চলেই উপস্থিত ছিলেন। আপনার সন্দেহ মিটাইবার
জন্য এই নমঃশূদ্র স্বদেশসেবক অশ্বিনীকুমারের নিকট যাইয়া
উপস্থিত হইলেন। অশ্বিনীকুমারের সঙ্গে তাঁহার পূর্বে
সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। অশ্বিনীকুমার আপনার নৌকায়
নিজের শয্যার উপরে বসিয়া ছিলেন। শয্যার নিকটেই
একটা ফরাশ পাতা ছিল। নমঃশূদ্ৰটী অশ্বিনীকুমারের
প্রকোষ্ঠের দ্বারদেশে যাইয়া তাহাকে নমস্কার করিলেন;
১১৮ অশ্বিনীকুমার অশ্বিনীকুমারও অমনি দাড়াইয়া অভ্যাগতকে প্ৰতিনমস্কার করিলেন এবং সেই প্রকোষ্ঠের ভিতরে তাঁহাকে ডাকিয়া তাঁহার পরিচয় লইয়া তাহার সঙ্গে যাইয়া সেই ফরাশে বসিলেন। তারপর অশ্বিনীকুমার তাহার প্রয়ােজন জানিতে চাহিলে নমঃশূদ্ৰটী বলিলেন-“বাবু আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছিলাম, কিন্তু তাহা জিজ্ঞাসা করা এক্ষণে অনাবশ্যক; আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পাই- য়াছি। আপনি যখন আমাকে লইয়া এক বিছানায় বসিয়া কথা কহিয়াছেন তাহাতেই বুঝিয়াছি, বন্দে মাতরম্' সত্য এবং আমরা আপনাদের ভাই।” ঘটনাটী অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু ইহাতে কি সহজ, কি সামান্য ও স্বাভাবিক উপায়ে অখিনী- কুমার বরিশালে সৰ্বসাধারণের চিত্তের উপর আপনার এই অনন্যপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য বিস্তার করিয়াছিলেন, ইহা বুঝিতে পারা যায়। সাধারণতঃ অশ্বিনীকুমার হিন্দুসমাজের সমস্ত বিধি- নিষেধের পরিপােষক ছিলেন, কিন্তু কর্তব্যের প্রেরণায় তিনি সকল সংস্কারের গণ্ডী কাটাইয়া উঠিতেন। জাতিভেদের বিরুদ্ধে তিনি কখনও বক্তৃতা দেন নাই, কিন্তু সামাজিক কর্তব্য এবং মানবের কল্যাণের জন্য অনেক স্থলেই তিনি জাতিভেদ প্রথার গ্রন্থি শিথিল করিয়াছিলেন। তাহার শিক্ষার ফলে, কলেরা অন্য মহামারীর প্রকোপের সময়, তাহার বিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ, উচ্চনীচ জাতিনিৰ্বিচারে, পীড়িতের T ১২ পঞ্চর সেবা ক্রষার ভার গ্রহণ করিয়া থাকে। এমন অনেক স্থলে দেখিয়াছি, কুলীন ব্রাক্ষ্মণ সন্তানেরা, বিন্দুমাত্র দ্বিধাবা সঙ্কোচ করিয়া, স্বহস্তে নীচজাতীয় মােগীর বিছানাদি, মলমূত্রাদি পৰ্যন্ত, পরিষ্কার করিয়াছে; এমন কি সময়ে সময়ে, লােকা- ভাব ঘটিলে, অস্পৃশ্য চালাদির মৃতদেহও আপন স্কন্ধে বহিয়া সৎকার করিয়া আসিয়াছে। দুর্ভিক্ষ এবং মন্বন্তরে সময়, হিন্দু ও মুসলমান দুঃস্থ ব্যক্তিগণ তুল্যভাবে অশ্বিনী- কুমারের সেবা পাইয়া আসিয়াছে। তাহাদের কাছে তিনি একজন প্রসিদ্ধ বাগ্মী, ম্যাজিস্ট্রেটের সহচর বা কমিশনয়ের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন না; তাহারা তাহাকে তাহাদেরই একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু, দুর্দিনের সহায়, এবং দুঃখে কষ্টে একান্ত প্রিয়- জন বলিয়াই জানিত। অগাধ অর্থ দিয়া নহে, বাগ্মিকের মােহিনী শক্তিবলেও নহে, জ্ঞানগরিমার প্রভাবেও নহে, কিন্তু জনসাধারণের সহিত চিন্তায়, ভাবে ও কাৰ্য্যে সম্পূর্ণ এক হইয়া যাওয়াই যথার্থ জননায়কের বিশেষত্ব। আমরা এদেশে একমাত্র অশ্বিনীকুমারের লােকনেতৃত্বেই ইহার কতকটা আভাস পাইয়া থাকি। বহু বৎসরের নিঃস্বার্থ সামাজিক সেবাই জনসাধারণের হৃদয়-মন্দিরে তাহার জন্য এক অক্ষয় স্বর্ণ-সিংহাসনের প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। পরিবর্জিত। ? । : 1:। Act, » । । । । 18%AAY •3dayn- Now li
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.