Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prabaser Patra Ed. 2nd

Sen, Nabinchandra · 2010/04/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ভারতের ‘ভ্রমণ-বৃত্তান্তু নবীনচন্দ্র সেন

দ্বিতীয় সংস্কপ
কলিকাতা,
নুঃ *ম অঙ্কুর লেন
", যাণী *
গ. বহ। কয় । মুপি
প্রকাশিত।

বিজ্ঞাপন প্রবাসের পত্রের অধিকাংশ আমার “সাহিত্যে প্রকাশিত হইয়াছিল। এক্ষণে পুনর্মুদ্রিত হইল। পূনা, দণ্ডকারণ্য ও ভারত- রমণীর চিত্র, এই তিন খানি পত্র নূতন প্রকাশিত হইল। কবিবর নবীন বাবু, আমার অনুরােধে, পত্রগুলি মুদ্রিত করিবার অনুমতি দিয়াছেন। সাধারণের জন্য পত্রগুলি লিখিত হয় নাই। নবীন বাবু ভ্ৰমণ-উপলক্ষে যেখানে যাইতেন, সেখান হইতে সহধর্মিণীকে পত্র লিখিতেন। পত্রগুলিও তাড়াতাড়ি লেখা, হয় ত রেলওয়ে ষ্টেশনে ট্রেণের অপেক্ষায় বিশ্রামগৃহে বসিয়া আছেন, এবং পত্র লিখিতেছেন। তবু পত্রগুলি মনােরম হইয়াছে। সাহিত্যের অনেক পাঠক প্রবাসের পত্রের প্রশংসা করিয়াছেন। এক্ষণে প্রবাসের পত্র পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল, আশা আছে, সাদরে পরিগৃহীত হইবে। রা আশ্বিন। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। ১২৯৯। প্রকাশক।

No text on this page.

উৎসর্গ
যাহার উদ্দেশে
প্রবাস হইতে
পত্রগুলি
লিখিত হইয়াছিল,
তাহার নামে
এই
প্রবাসের পত্র,
উৎসর্গ করা হইল।

No text on this page.

সূচীপত্র •••• দার্জিলিঙ্গ বৈদ্যনাথ ৪ ০০ ০ প্রয়াগ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০০ ০ ••• ৭ কানপুর লক্ষে রুড়কি বিচুর লাহাের ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪ ০ . . অমৃতসর ইন্দ্রপ্রস্থ ৩৩ ৫ ০ ০ ০ ০ ০ ৫ . ••• ••• ৩৬ পুরাতন দিল্লী বর্তমান দিল্লী , . ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৩৯ ০ ০ ০ আগ্রা ••• ৪৯ জয়পুর ০ ০ • ••• ৫ ০০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭৫ up । চিতাের ঘােধপুর বরদা বােম্বাই ••• ••• 7 ৮০

২)
০ ০ ০
৯৬
পূনা
দণ্ডকারণ্য
নর্মদা
ভারতরমণীর চিত্র
* * *
৪০০
E
৪০০
১০৬

প্রবাসে পত্র । দার্জিলি | ঈশ্বরের কৃপায় আমার এই বিপদসঙ্কুল জীবনের একটি সুখস্বপ্ন অংশতঃ সফল হইল,—আমি দার্জিলিঙ্গ দেখিলাম। সেই মহিমার মূর্তি হিমাচল দেখিলাম। বাল-সূৰ্য-কিরণে প্রদীপ্ত, তপ্তকাঞ্চনাত কাঞ্চনশৃঙ্গ দেখিলাম, জগতে বুঝি এমন মহান্ দৃশ্য আর নাই! হিমাদ্রি পার্শ্ব ও সানুস্থিত, শৈবিমালায় পুষ্পিত, শীতল-পাদপ-শ্রেণীতে উপবনী- কৃত, দার্জিলিঙ্গের মনােহারী চিত্রখানি নয়ন ভরিয়া দেখিলাম। ততােধিক সুখের কথা, আমার শৈশবসুহৃদ, অভিন্নহৃদয়, সহৃদয়তায় কামিনী-কোমল, উমেশকে দেখিলাম। আর দেখিলাম তাহার উমাকে! স্বামী উমেশ, ভাৰ্য্যা কেদার-কামিনী। “অখণ্ডপুণ্যানাং ফলমিব” না হইলে, বােধ হয়, পতি এমন পত্নী, ও পত্নী এমন পতি লাভ করিতে পারেন না। শৈশব হইতে প্রকৃতির মহাপ্রদর্শনভূমি পাৰ্ব্বতী-মাতার (চট্টগ্রাম) । অঙ্কে যে বিরাজ করিয়াছে, দার্জিলিঙ্গে তাহার পক্ষে দেখিবার অভিনব দৃশ্য, তত কিছুই নাই। গিরিপার্শ্ববাহী রেলওয়ে যেরূপ ঘুরিয়া প্রবাসের পত্র। - ফিরিয়া,স্তরে স্তরে, পৰ্বতের পাদমূল হইতে উর্দ্ধে মেঘমালা ভেদিয়া উঠিয়াছে, নারাজ যেন বক্ষে স্তরে স্তরে উপবীত ধারণ করিয়াছেন, উহাই কেবল দেখিবার যােগ্য। স্থানে স্থানে যখন মৈঘজাল ভেদ করিয়া উর্ধে উঠিলাম, তখন স্থানে স্থানে নীচে কিছুই দেখা যাইতেছিল । জগৎ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। কেবল হিমাদ্রি, অাকাশের সীমা দেখাইয়া, হৃদয়ে যুগপৎ আনন্দ ও আতঙ্ক জন্মাইতে- ছিল। আর দেখিবার যােগ্য, প্রভাত অরুণাললাকে সুবর্ণ-মণ্ডিত কাঞ্চনশৃঙ্গ বা কাঞ্চনজঙ্ঘা। উমেশের উমা সম্বন্ধে আর দু’ চার কথা না লিখিলে, তুমি বিরক্ত হইবে। হিমালয়ের অঙ্কে, উমা-উমেশ-শােভা, এই শরৎকালে সন্দর্শন, আমি আমার জীবনের একটি প্রকৃত দুর্গোৎসব বলিয়া চির দিন মনে রাখিব। দার্জিলিঙ্গ আজ আমার চক্ষে একটি পুণ্যতীর্থ। ঠাকুরাণীটিকে দেখিতে প্রথম অামাদের মধু বাবুর ফুলেশ্বরীর মত বােধ হয়। কিঞ্চিৎ মনােনিবেশ করিয়া দেখিলে, এ ফুলেশ্বরী সম্বন্ধে বলিতে হয়, ? “ওরে প্রিয় ফুল তুলনা যে নাই, কি তুলনা দিব মিছে কি বলিব ? অতুলন তােরে বলিছে সবাই।” এ ফুলেশ্বরীর গাম্ভীৰ্যমাখা ঈষৎ হাসিটুকু, জ্যোৎস্নার কোলে ঈষৎ বিজুলী সঞ্চার,—মধুমাখা মেহটুকু, বৈশ খিী জ্যোৎস্নার অমৃতভরা ভাবটুকু, বুঝি সেই ফুলেশ্বরীতে নাই। তাহার অঙ্কে দুইটি পুত্র-কুসুম বিরাজিত। শ্বরের নিকট প্রার্থনা কর, তাহারা দীর্ঘজীবী হইয়া মাতার উজ্জ্বল মুখ আরাে উজ্জ্বল করুক! আমারও দুই বন্ধুর অদৃষ্টি

HD
बात
२ मा
Mohila Press, Calcutta.

No text on this page.

দাজিলিঙ্গ সমান। আর একটি পুত্র, অঙ্ক শূন্য করিয়া, মাতার ঐ দেবীমূৰ্ত্তিতে বিষাদের ছায়া মাখাইয়া দিয়া, চলিয়া গিয়াছে। পতি-পত্নীর ভালবাসায় অজি দার্জিলিঙ্গ আমার চক্ষে যথার্থই কৈলাস,—দুইটি দিন স্বর্গসুখে অতিবাহিত করিতেছি।

বৈদ্যনাথ। == পথে কয়েক ঘণ্টা কাল বৈদ্যনাথে ছিলাম। শ্রীক্ষেত্র যে দেখিয়াছে, তাহার কাছে বৈদ্যনাথে দেখিবার কিছুই নাই। শ্রীক্ষেত্রের মন্দিরের অনুকরণে একটি প্রাঙ্গণ। মধ্যস্থলে একটি মন্দিরে বৈদ্যনাথ। বলিতে হইবে না যে, তিনি লিঙ্গরূপী। প্রাঙ্গণের চারি দিকে, মন্দিরে নানা দেব দেবী। অধিকাংশই বুদ্ধদেবের মূর্তি, যেখানে বুদ্ধমূর্তি কোনও মতে লুকাইবার যাে নাই, সেখানে তাহার নাম “কাল-ভৈরব” হইয়াছে। বৈদ্যনাথ, দেওঘর বা দেবঘর, অতি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর স্থান বলিয়া শুনিয়াছিলাম, কিন্তু আমার তত ভাল লাগিল না। বৈদ্যনাথে “অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির বাবু ও হার সহােদর মতি বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ইহারা যশােহরের বন্ধু-বেশ আদর করিলেন। প্রাতে তাহারা আহার কইলেন। সেই ঘােরর ব্রাহ্ম দুই ভাই এখন ঘােরতর বৈরাগী ; এখন প্রত্যহ তাহারা পূজা আহি করেন। কলিকাতা ছাড়িয়া, শিশির বাবু বৈদ্যনাথে আশ্রমবাসী হইয়া, সস্ত্রীক নির্জনে থাকেন। দেখিলাম, আমার জীবনের সেই স্বপ্ন, শিশির বাবু কাৰ্যে পরিণত করিয়াছেন। তাহার স্ত্রী রাধেন, তিনি পার্শ্বে বসিয়া “অমৃতবাজারের” সম্পাদকীয় কার্য নির্বাহ করেন। বৈরাগ্য এত দূর যে, ঘরে বসিবার আসন খানি পৰ্যন্ত নাই। খবরের কাগজ বিছাইয়া বসিয়া, অতি তৃপ্তির সহিত, তিন জনে আর করিলাম। তাঁহারা এক জন বৈরাগী সঙ্গে রাখিয়া- ছেন। তিনজনে মিলিয়া, বৈষ্ণব কবিদিগের সেই সকল কবিতা গাহিলেন। কর্ণে অমৃতবর্ষণ হইল, হৃদয় গলিয়া গেল, চক্ষু ছল ছল • “বৈদ্যনাথ। করিতে লাগিল। ভয়ে ভয়ে মিলিয়া এ কীৰ্ত্তন, আমি ত জীবনে ভুলিব না। বৈষ্ণব কবিদিগের কবিতায় কি যে প্রেমামৃত আছে, তাহা যত পান করা যায়, কিছুতেই পিপানা মেটে না। তাহারা গাহিলেন, “দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে তােমারে নয়নে দেখি, বেড়াইয়া ভুজলতা হৃদয়ে হৃদয়ে রাখি।” প্রাণ আকুল হইয়া উঠিল। সেই অবস্থায় দেওঘর ছাড়িলাম।

প্রয়াগ । “স্থানীয় ন্যাশন্যাল কংগ্রেস সভার দুইটি অধিবেশন দেখিতে গিয়াছিলাম। কো-হা-ধারী বাঙ্গালী দাঁড়কাকগুলির মধ্যস্থলে, মরি ! মরি !-কি একটি মূর্তি দেখিলাম। মাথায় উষ্ণীষ, গলায় উড়ানি, গায়ে চাপকান, পরিধানে ধুতি। ইহার নাম-মদনমােহন মালবী। এই ত জাতীয় বেশ। কিন্তু যখন লােকটি কথা কহিতে লাগিলেন, আমার ভ্রম হইল, পশ্চাৎ হইতে বুঝি খ্যাতনামা ডবলিউ, সি, বনার্জি, হায় রে বাঙ্গালী নামের দুর্গতি,ইংরাজি বলিতেছেন। লােকটির প্রতি আমার বড় শ্রদ্ধা হইয়াছিল। কাল হরিমােহনকে সঙ্গে করিয়া, তাঁহাকে দেখিতে যাই। তিনি হরিমােহনদের সহপাঠী ছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা কাল দুই জনে আলাপ করিলাম, যেন দুই জনের প্রাণে প্রাণে মিশিয়া গেল। ইনি সংস্কৃত শাস্ত্রাদিতে পারদর্শী। তাহা ছাড়া অন্য অন্য ভাষাও জানেন ; বাঙ্গালা পর্যন্ত বুঝেন। আমার নাম পূৰ্ব্বে জানিতেন। তিনি স্বধর্মাবলম্বী, সাহিত্যানুরাগী, স্বদেশের ও স্বজাতির মঙ্গলের জন্য সৰ্বস্ব অর্পণ করিয়া সন্ন্যাসী হইতে প্রস্তুত। আমি যখন গীতার উল্লেখ করিলাম, তিনি আনন্দে অধীর হইয়া বলিলেন, তিনি প্রত্যহ প্রাতে এক অধ্যায় গীতা পাঠ করেন। আমাদের উভয়ের হৃদয়ের গতি এক। সেই মহাভারতীয় মহানীতির কেন্দ্রস্থলে যেমন মদনমােহন, পশ্চিমভারতের বর্তমান নীতি-যন্ত্রের কেন্দ্রস্থলে- তেমনই এই মদন- মােহন। ইংলণ্ডের “ওকবৃক্ষ”—অতিশয় সারবান্ বৃক্ষ, কিন্তু ভারতের চন্দনবৃক্ষের সৌরভ তাহাতে নাই। আমি তাহাকে বলিয়া আসিয়াছি যে, আমি তঁাহাতে ইংলণ্ডের “ওকের” সারবত্তার সঙ্গে, ভারতের • চন্দনের সুগন্ধ দেখিবার প্রত্যাশা করি।

কানপুর। •০০r আজ আমি কানপুরে। সৌজন্যতার প্রতিমূৰ্ত্তি, শ্ৰীযুক্ত বাবু মহেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কানপুরের খ্যাতনামা ডাক্তার, আমাকে ষ্টেশন হইতে সাদরে তঁাহার বাড়ীতে লইয়া আসেন। তিনি দাসত্ব- শৃঙ্খল চরণে ঠেলিয়া, এখানে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করিতেছেন, কানপুরে তাহার বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠা। তঁাহার গৃহের নিমুতল ডাক্তারখানা, উপরের প্রকোষ্ঠ সকল আবাসগৃহ। ডাক্তারখানা শুনিয়া তুমি হয় ত কেষ্টার-অয়েল, চিরতা ও কুইনাইন মনে করিয়া নাক সিটকাইতেছ। এ তাহা নহে, মহেন্দ্র বাবুর ডাক্তারখানা একটি ক্ষুদ্র ইন্দ্রালয়। এমন সুন্দর সুসজ্জিত বাঙ্গালীর ডাক্তারখানা কোথাও দেখি নাই। ডাক্তারখানার মধ্যে তাহার বসিবার কক্ষটির গবাক্ষ সকল সুরঞ্জিত চিত্র দৃশ্যাবল্মর দ্বারা সুসজ্জিত! প্রাচীরে চীনদেশীয় নরনারীর বিচিত্র চিত্র সকল শােভিতেছে। কক্ষস্থিত দ্রব্যাদি ঝক ঝক্ করিতেছে! তঁহার সঙ্গে অল্পক্ষণ আলাপের পর এতদূর সমপ্রাণতা হইয়াছে, এবং তিনি এত আদর করিতেছেন যে, আমার কানপুর ছাড়িতে ইচ্ছা করিতেছে না। অন্য প্রাতে কানপুর পরিদর্শনে বাহির হই। প্রথমতঃ গঙ্গার পয়ঃপ্রণালী দর্শন করিয়া নয়ন তৃপ্ত করি। হরিদ্বারে গঙ্গার গর্ভে বাঁধ দিয়া একটি জল-স্রোত সােপানে সােপানে উব্ধ হইতে এই কানপুরে আসিয়া আবার গঙ্গায় পড়িয়াছে। জগৎপ্রাণ হইতে যেন একটি মানব-জীবন-স্রোত উৎপন্ন হইয়া, আবার জগৎ-প্রাণ-গর্ভে বিলীন হইয়া যাইতেছে। এক সােপান হইতে সােপানান্তরে জলরাশি কক্ষের ৮ প্রবাসের পত্র। গৰ্জন করিয়া শ্বেত-কুসুম-নিভ ফেণমালায় বিকীর্ণ হইয়া পড়িতেছে, সে দৃশ্য অতি সুন্দর! তবে তুমি যখন উড়িষ্যার ‘কেনেল’ দেখিয়াছ, তখন তােমার ইহা তত নূতন ও চমৎকার বলিয়া বােধ হইবার কথা নহে? এই ‘কেনেলের স্রোতেবেগে পরিচালিত হইয়া, স্থানে স্থানে যে সকল ময়দার কল চলিতেছে, তাহা কিন্তু তুমি দেখ নাই। কৃষ্ণের একটি মধুমাখা নাম ‘কানাই’ বা ‘কান’, তাহা তুমি জান। বােধ হয় ‘কান’ হইতেই এ স্থানটির নাম কানপুর হইয়াছে। এরূপ পবিত্র স্থান আজ একটি শোকসিন্ধু। সিপাহীবিদ্রোহের সময়ে যেরূপ নৃশংস দৃশ্য সকল এখানে অভিনীত হইয়াছিল, এমন আর কোথাও হয় নাই। বিদ্রোহ আরম্ভ হইলে স্থানীয় ইংরাজ কর্মচারী ও সৈন্যগণ যে স্থানে দুর্গ নির্মান করিয়া একবিংশতি দিবস অতুল সাহসে বিদ্রোহীদিগের প্রতিকূলে আত্মরক্ষা করেন, সে স্থানটি আজ একটি মনােহর পুষ্পোদ্যান। তাহার মধ্যস্থলে উচ্চ সৌধ-চূড়ায় শােভিত কারুকাৰ্য্যশশাভিত একটি গির্জা। তাহার প্রাচীরে শ্বেত ও কৃষ্ণ মৰ্ম্মর প্রস্তরে, আত্মরক্ষায় যাহারা প্রাণ বিসর্জন করেন, তাহাদের আত্মীয় ও সহযোদ্ধারা, তাহাদের স্মরণলিপি লিখিয়া রাখিয়াছেন। মাতা পিতা পুত্রের জন্য কাদিতেছেন, জন্য কাদিতেছেন, ভগিনী ভ্রাতার জন্য কাঁদিতেছেন, অনাথিনী বিধবা পতির জন্য কাঁদিতেছেন। এ সকল শােকলিপি পড়িবার সময়ে, অসম্বরণ বড় কঠিন হইয়া পড়ে। একজন সৈনিক, দুর্গাবদ্ধ, প্রপীড়িত ও পিপাসাতুর রমণী ও শিশুদের জন্য, পার্শ্বস্থিত কূপ হইতে জল আনিতে গিয়া, আহত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাহার শােকলিপির নিম্নে, একটি কৃত্রিম কূপ গির্জার মধ্যে নির্মিত হইয়াছে। ইহার পবিত্র জলে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হইয়া থাকে। আমার ইচ্ছা হইল, এই আত্মবিসর্জনের পবিত্র

No text on this page.

কানপুর “মেমােরিয়াল” গির্জা।
কানপুর “বধঘাট”। ৯
৯ পৃষ্ঠা।

কানপুর । -সলিলে দীক্ষিত হইয়া জীবন সার্থক করি। বেদীর উর্দ্ধে গবাক্ষ শ্রেণীতে নানাবর্ণের কাচে খৃষ্ট-জীবনের নানাবিধ দৃশ্য চিত্রিত রহিয়াছে। অথচ আমরাই পৌত্তলিক! কেন্দ্রস্থলে মহর্ষি খৃষ্টের ক্রুশে মৃত্যুর সেই শােকাবহ দৃশ্য চিত্রিত রহিয়াছে।' এমন পবিত্র শােকচিত্ৰ বুঝি অার নাই। চিত্ৰতলে একটি শ্বেত প্রস্তরের ক্রশ, তিনটি রক্তবর্ণ রত্নে খচিত হইয়া শােভা পাইতেছে। গির্জার বাহিরে একটি সুন্দর সমাধি। যে সকল ইংরাজেরা কানপুরের শেষ যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন, তাহাদের অস্থিরাশি এখানে প্রােথিত রহিয়াছে। যে কূপ হইতে উক্ত সৈনিক জল আনিতে গিয়া বিদ্রোহীদের হস্তে প্রাণত্যাগ করেন, সে কূপটি এখনও সেইরূপ অবস্থায় আছে। তাহার দুই স্থানে এখনও তােপের গােলার চিহু বর্তমান রহিয়াছে। একুশ দিবস যুদ্ধের পর, ইংরাজগণ অনাহারে ও যুদ্ধের উপকরণ অভাবে আত্মরক্ষায় অসমর্থ হইলে, বিদ্রোহনায়ক নানার হস্তে আত্ম- সমর্পণ করেন। নানা তাহাদিগকে 'লক্ষ্ণৌ যাইবার অনুমতি দিলে, তাহারা নৌকাৱােহন করিবামাত্র, বিদ্রোহীগণ তীর হইতে গােলা গুলি বর্ষণ করিয়া, সমস্ত তরণী দগ্ধ ও জলমগ্ন করিয়া দেয়। যে ঘাটে তাহারা নৌকায় উঠেন, তদবধি উহা “বধঘাট” বলিয়া খ্যাত হইয়াছে। এই ঘাটে শিব-শূন্য একটি মন্দির এখনও বিরাজিত রহিয়াছে। মানুষ যখন হিংসাপ্রণােদিত হইয়া পশুত্ব প্রাপ্ত হয়, তখন এরূপ পবিত্র স্থান,-মাতা ভাগিরথীর বক্ষ পৰ্য্যন্ত কলুষিত করিতে শঙ্কিত হয় না। মানুষ-পশুর মত এমন হিংস্র পশু জগতে নাই। এই বধঘাটে দাঁড়াইয়া আমার বােধ হইল, যেন আমি সেই হৃদয়- বিদারক দৃশ্য নয়নে দেখিতেছিলাম। সেই শত শত নর-নারীর ও প্রবাসের পত্র। সুকুমার শিশুর লােদননিনাদ যেন পুণ্যতােয়া জাহ্নবীর বক্ষ প্লাবিত করিয়া, আমার কর্মে প্রবেশ করিতেছিল। পার্শ্বে রজকে সারি বাঁধিয়া কাপড় ধুইতেছিল। আমি ভাবিতেছিলাম, ভারতমাতার বক্ষ হইতে কি কেহ এ কলঙ্ক এইরূপে ধুইয়া ফেলিতে পারে না? সেখান হইতে সৈনিবাসমালা অতিক্রম করিয়া, সবেদাকুঠি দেখিতে যাই। এটি নানার কানপুর অবসি-গৃহ ছিল। গৃহটি এখন ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। ইহার পার্শ্বে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইংরাজদের কানপুরের শেষ যুদ্ধ হয়। তিন দিক হইতে তিনজন খ্যাতনামা সৈন্যাধ্যক্ষ আক্রমণ করিলে, ত্রিবেণীর তরঙ্গতাড়িত তৃণরাশির ন্যায়, সৈন্যাধ্যক্ষবিহীন বিদ্রোহীরা গঙ্গার সেতু বাহিয়া পলাইতে আরম্ভ করে। তখন প্রতিহিংসা-মত্ত ইংরাজেরা তােপের দ্বারা সহস্র সহস্র নর-নারীকে জলমগ্ন করিয়া নিহত করেন। কেবল এক পক্ষেই নৃশংসতার অভিনয় হয় নাই। তাহার পর মহেন্দ্র বাবু স্বয়ং, আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া কানপুরের শাঘাট দেখান। ইহাতে এক দিকে পুরুষ ও অন্য দিকে স্ত্রীলোকদের স্নান করিবার স্থান নির্ধারিত রহিয়াছে। অসংখ্য নর-নারী-অজ একাদশী-গঙ্গায় অবগাহন করিতেছিল। তুমি কাশীর ঘাট দেখিয়াছ। কানপুরের শীর্যঘাট তাহার কাছে অতি ক্ষুদ্র হইলেও, দেধিতে অতি সুন্দর। সম্মুখের মিউনিসিপাল উদ্যানের উপর দিয়া ঘাটের বিলান-শ্রেণী দেখিতে অতি সুন্দর। তাহার পর যাহা দেখিলাম, তাহা এ জীবনে ভুলিব না। একটি গৃহে আবদ্ধ করিয়া, অসংখ্য নর-নারী ও শিশুগণকে নানাসাহেবের অনুচরেরা বধ করিয়া, দুত ও আহত অবস্থায়, তাহাদিগকে পার্শ্বস্থিত একটি কুপে নিক্ষেপ করে। গৃহটি এখন নাই। এরূপ পাপচিহ্ন না

No text on this page.

.
khon
শ্বেতপ্রস্তরনির্মিতা স্বগীয়া দেবী। ১১ পৃষ্ঠা

কানপুর। থাকাই ভাল। তাহার স্থানে একখানি মার্বেল-ফলক মা আছে ; তাহার বক্ষে ‘বধ-গৃহ’ এই কথাটি মাত্র লেখা আছে। আর যে কূপে হত ও মাহতদের নিক্ষেপ করিয়াছিল, তাহার উপর কি বিষাদময়ী মূৰ্ত্তিই স্থাপিত হইয়াছে! একটি অনিন্দ্যসুন্দরী শ্বেতপ্রস্তরনির্মিতা যুগলপক্ষ- বিশিষ্টা স্বর্গীয় দেবী, বক্ষের উপর হস্ত রাখিয়া, করে দুইটি তালের অস্ফুট শাখা ধরিয়া, অপােবদনে কূপের দিকে চহিয়া অবর্ষণ করিতেছেন ! মূর্তিটি জীবন্ত শােক! দেখিলে হৃদরে কি শােক, কি পবিত্রতা সঞ্চারিত হয়, তাহার ভাষা বুঝি নাই। চারি দিকে উচ্চ প্রস্তরের “রেলিংয়ের মধ্যে মূর্তিটি রক্ষিত হইয়াছে। মহেন্দ্র বাবুর কৃপা ভিন্ন অমি উহার ভিতরে প্রবেশ করিতে পারিতাম না। সমস্ত স্থানটি ব্যাপিয়া, এখন একটি বিস্তৃত পুষ্পবৃক্ষশােভিত উদ্যান। এমন হৃদয়স্পর্শী স্থান বুঝি আর জগতে নাই !

লক্ষ্ণৌ। co৯০ co ১ কাল সকালের ট্রেণে লক্ষে গিয়া, একজন ইংরাজের হােটেলে ছিলাম। তাহাকে আড়কাটি করিয়া, কাল সমস্ত দিন নগর দর্শন করিয়াছিলাম। আজ আবার মহেন্দ্র বাবুর বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া তােমাকে পত্র লিখিলাম। ভগবান্ বিশ্বরূপ, তাঁহার বিশ্বও বহুরূপী। কাল মুহূর্তে মুহূর্তে তাহার রূপান্তর করিতেছে। রামচন্দ্রের রাজ্যের নাম কোশল ও রাজধানীর নাম অযােধ্যা ছিল। কালে রাজ্য ও রাজধানী, উভয়ই মােগল-সাম্রাজ্যের ছায়ায় বিলীন হইয়া যায়। ক্রমে সেই মােগল- সাম্রাজ্যে কালের ছায়া পতিত হইলে, রামরাজ্যে যিনি দিল্লীর সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন, তিনি তাঁহার মস্তকোপরি স্বাধীনতার ছত্র উড়াইলেন। তঁাহার রাজ্যের নাম হইল অযােধ্যা, রাজধানী লক্ষ্ণৌ। তঁাহার রাজপ্রাসাদশিরে স্বর্ণছল উড়াইয়া, তাহার নাম রাখিলেন “ছত্র-মঞ্জিল । কালে আবার বৃটিশসিংহ কবলে করিয়া, সেই ছত্রধারীকে ‘মেটিয়াবুরুজে’ বন্দী করিয়া রাখিলেন,—তিনি সেই কারাগার হইতে ‘লক্ষ্ণৌ টপ্পায় কঁদিলেন। ভারত কাদিল, সেই হৃদয়দ্রকারী শােক-সঙ্গীতে চিরদিন কাদিবে। বন্দী ওয়াজিদ আলি সাহার মৃত্যু হইয়াছে ; তাহার সকল যন্ত্রণার শেষ হইয়াছে। লক্ষে সহর আজ অযযাধ্যার নবাবদিগের সমাধিমাত্র। কালে সেই রাজ্যের নাম হইয়াছে “আউ” রাজধানীর নাম “লখ নাও”। ভারতব্যাপী বৃটিশ-ছত্রের ছায়াতে “ছ-মঞ্জিলের” ছত্র বিমলিন হইয়া লুকাইয়া • গিয়াছে।

No text on this page.

.
‘রেসিডেন্সি’ লক্ষে
১৩ পৃষ্ঠা

সঙ্গে। ৩ সিপাহি-বিদ্রোহের সময়ে লক্ষৌও একটি কেন্দ্রস্থান হইয়াছিল। চারি দিক হইতে সহস্র সহস্র বিদ্রোহী লঙ্গেীতে সমবেত হইয়া, যে স্থানে ইংরাজ প্রতিনিধি বা রেসিডেন্ট’ বাস করিতেন, তাহা আক্রমণ করে। এই আবাসস্থানের নাম “রেসিডেন্সি”। স্বল্প সৈন্য এবং এ অঞ্চলের ইংরাজ নরনারী সমবেত হইয়া, ছয় মাস কাল এ স্থান রক্ষা করেন। তাহার পর বহির্ভাগ হইতে ইংরাজ সৈন্য আসিয়া, বিদ্রোহীদিগকে পরাজয় করিয়া, তাহাদিগকে উদ্ধার করে। এই ছয় মাসের দারুণ অবরােধের ইতিহাস, স্থানটির অঙ্গে অঙ্গে অঙ্কিত হইয়া রহিয়াছে। তােপের গােলাঘাতে সমস্ত গৃহাদির ছাদ ধসিয়া গিয়াছে। যে সকল দেওয়াল এখনও দাড়াইয়া আছে, তাহাও তােপের ও বন্দুকের গােলা গুলিতে বাহির দিক্ বােলতার বাসার মত হইয়াছে। ভিতরের দিক্ নর-শােণিতে রঞ্জিত রহিয়াছে। স্ত্রীলােকদিগকে মাটীর ভিতরে ‘তয়খানাতে রাখা হইয়াছিল। তাহার ভিতর পর্যন্ত একটি গােলা গিয়া, একটি রমণীর মস্তক উড়াইয়া লইয়া যায়! সেই গােলার দাগ, রমণীর শােণিতচিহ্, এখনও দেয়ালে আছে। ইংরাজ জাতির মধ্যে ‘হেরি লরেন্সের মত দেবতুল্য ব্যক্তি ভারতে কখন আসেন নাই। তাঁহার হৃদয় ভারতের দুঃখে নিরন্তর দুঃখী ছিল। তাঁহার মত-অনুসারে রাজ্য পরিচালিত হইলে, বিদ্রোহ ঘটিত না। তিনি লক্ষ্ণৌ হইতে পলায়ন করিলে, আজ ভারতে ইংরাজ থাকিত কি না সন্দেহ। কর্তব্যের অনুরােধে তিনি রেসিডেন্সি ছাড়েন নাই। যেখানে তিনি আহত হন, যেখানে সঁহার মৃত্যু হয়, উভয় স্থান এখনও চিহুিত রহিয়াছে। তাহর সমাধির উপর এই কয়েকটি কথা লেখা আছে—“এখানে সার হেল্পি লরেন্স নিদ্রা যাইতেছেন, যিনি আপন কর্তব্য সাধন করিতে যত্ন করিয়াছিলেন।”

১৪ প্রবাসের পত্র কি হৃদয়গ্রাহী কথা! গৃহ সকল সেইরূপ ভগ্ন অবস্থায় রক্ষিত হইয়াছে। স্থানটি একটি উৎকৃষ্ট উদ্যানে পরিণত করা হইয়াছে। তাহার বৃক্ষচ্ছায়ায় কত বীর ও বীরাঙ্গনা নিদ্রা যাইতেছেন। পত্রখানি এই পর্যন্ত লেখা হইবার পর, মহেন্দ্র বাবু বাড়ী ফিরিয়া আসেন, এবং আমাকে সঙ্গে করিয়া বাহির হন; সুতরাং আর লেখা হইল না। পর দিবস বির যাই, সায়াহ্রে অর্ধমৃত অবস্থায় আবার কানপুরে ফিরিয়া আসি। কাল কানপুর হইতে রওনা হইয়া, এইমাত্র ১৯শে মে তারিখে ১টার সময়ে, হরিদ্বার পঁহুছিয়াছি। কাল রাত্রি হইতে আহার হয় নাই। এ দিকে আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ এখানেও কাৰ্তিকী পৌর্ণমাসীর মেলা হইয়া থাকে। পথে ঘাটে ভারতবর্ষের নানাস্থানীয় কুসুমরাশি ফুটিয়া যেমন মন মােহিত করিতেছে, অন্য দিকে বাড়ী ঘর সকল এত অপরিষ্কার করিয়াছে যে, এক মুহূর্ত তিষ্ঠিতে ইচ্ছা করিতেছে না। অতি কষ্টে একটি বাড়ীর ত্রিতলে একটি অষ্টকোণ পায়রার খােপ-বিশেষ কক্ষ পাইয়াছি। নিয়ে সুনীলা ক্ষীণ-কলেবরা মাতৰ্গঙ্গা কুলু কুলু রবে বহিয়া যাইতেছেন, সংখ্যাতীত নর-নারী তাহাতে অবগাহন করিতেছে। অপর পারে হিমাচল, নাট্যশালার যবনিকার মত শশাভা পাইতেছেন। শরীর অবসন্ন, হৃদয়ও তােমাদের পত্র না পাইয়া ডুবিয়া রহিয়াছে ; অতএব এইখানেই শেষ, করিলাম। লাহােরে পঁহুছিয়া, লক্ষ্ণৌ, বিষ্ঠুর ও হরিদ্বারের বর্ণনা করিয়া দীর্ঘ পত্র লিখিব।

'-
ক
সার হেনরি লরেন্সের সমাধি স্থান। ১৪ পৃষ্ঠা।
Mohan Piess, Calcutta

No text on this page.

O০ এক আজ আবার লক্ষ্ণৌর কথা লিখিব। কিন্তু কি লিখিব ? লক্ষে মুসলমানদের শােকসিন্ধু। রেসিডেন্সির কথা পূর্বে লিখিয়াছি। তাহার পাশেই কিঞ্চিৎ দূরে ‘কেশরবাগ। একটি প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণ কল্পনা কর। তাহার চারি পার্শ্বে সারি সারি দ্বিতল ইষ্টকনিৰ্ম্মিত গৃহশ্রেণী। স্থানে স্থানে গােল ও অন্যবিধ ৰাণ্ডা বাহির হইয়াছে। প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে একটি অতি পরিপাটী একতল গৃহ। বিস্তৃত খিলানাবলীর উপর সুরঞ্জিত ছাদ, সারি সারি শােভা পাইতেছে। ইহার নাম বারারী। ইহার চারি দিকে পুষ্পোদ্যান। দিকে ভগ্ন স্নানের ‘হমা, অন্য দিকে একটি জলপ্রণালী, তাহার উপর এক পােল। চারি দিকের অট্টালিকাতে শেখ নবাব ওয়াজিদ আলি সাহার ৩৫০ কি ৪০০ পত্নী থাকিতেন। তাহাদিগকে লইয়া, নবাৰ এই কেশরবাগে’ রস, দোল ইত্যাদি জীবন্ত লীলা করিতেন। ইহাতে স্ত্রীলােক ও নপুংসকগণ ভিন্ন আর কেহ প্রবেশ করিতে পারিত না। এক এক কক্ষে এক একটি অতুলনীয়া রূপসী। পৃথিবীর যত স্থান রমণীর পুপােদ্যান বলিয়া খ্যাত, সর্বত্র হইতে এ ফুল রাশি, নবাব বাহাদুরের ইন্দ্রিয় চরিতার্থ করিবার জন্য সঞ্চিত হইত। যখন ‘কেশরবাগের পুষ্পোদ্যানে রমণীগণ প্রভাতে ও সায়াহে বিচরণ করিতেন, মনে কর দেখি, তখন ফুলের সঙ্গে জীবন্ত ফুল মিশিয়া কি পুৰ্ব্ব শােভাই হইত। কিন্তু ইহাদের অনেকের সঙ্গে, পতি-প্রবরের জীবনে এক দিনও সাক্ষাৎ হইত কি না সন্দেহ। আমি দুই চারিটি প্রবাসের পত্র। প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম। এক একটি কক্ষ, সম্মুখে একটুকু বারাণ্ডা। আমার কাছে স্থানটি বড় আরামের কি আয়েসের যােগ্য বোধ হইল না। এরূপ নরাধম ইন্দ্রিয়পরায়ণের রাজ্য থাকিবে কেন ? বৃটিশ সিংহ বাহাদুর ওয়াজিদ আলিকে রাজ্যচ্যুত করেন। সিপাহি- বিদ্রোহের ইহাও একটি প্রধান কারণ। যাহার উপর এরূপ অত্যাচার হইয়াছে, সিপাহিরা মনে করিয়াছিল, সে অবশ্য তাহাদের সঙ্গে যােগ দিবে। বিদ্রোহের পর ইংরাজ বাহাদুর অযযাধ্যার তালুকদারগণকে কেশরবাগ দিয়াছেন। তঁাহারা কেহ কেহ স্থানে স্থানে গৃহটি সংস্কার করিতেছেন, এবং সামান্য পথিকগণকে ভাড়া দিতেছেন। হায় পার্থিব গৌরবের পরিণাম! অযধার দুর্দান্ত নবাব-পত্নীদিগের বিলাসস্থলে আজ কি না পান্থনিবাস! এক দিক ভাঙ্গিয়া প্রকাণ্ড ‘কেনিং কলেজ স্থাপিত করা হইয়াছে। এক দিকে একটি অতি উচ্চ ‘গেট’ রহিয়াছে। ইহার নাম লক্ষ্মী-দরওয়াজা। প্রস্তুত করিতে লাখ টাকা লাগিয়াছিল। ভাই নাম লক্ষ্মী। অনেক দরিদ্রের ‘লক্ষ্মী’র মূল্য যে লাখ টাকারও অধিক। টাকায় ত তাহার মূল্য হইতে পারে না। তাহার পর ‘বড় ইমামবারা’ দেখিতে যাই। এক পার্শে রুম দেশের অনুকরণে একটি প্রকাণ্ড গেট বা তােরণ। তাহার পর ইমামবারার মূল তােরণ। তাহ পার হইয়া গেলে, এক প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণ। চারি দিকে সারি সারি কক্ষসমন্বিত প্রাচীর। এক পাশে একটি অতি প্রকাণ্ড অতি সুন্দর মসজিদ মধ্যাহ্ন বিকরে ধক ধক্‌ জ্বলিতেছে। প্রাঙ্গণের সম্মুখে ইমামবারা। মধ্যে একটি বিস্তীর্ণ কক্ষ। পৃথিবীতে নাকি এত বড় কক্ষ আর নাই। তাহাতে ইমামবার নির্মাতা জনৈক ভুতপূৰ্ব্ব নবাব সমাধিস্থ রহিয়াছেন। উপরে রক্তবর্ণ প্রস্তরের বারাণ্ডা চারি দিকে শশাভা পাইতেছে । কক্ষে,

===== = = = =
।
]]
স
লক্ষৌ ‘বড় ইমামবারা’
১৬ পৃষ্ঠা
Mohila; l'ress, Calcutta

No text on this page.

কক্ষে। তাহতে বসিয়া নৰ-পুরবাসিনীগণ, নীচে যে কোরাণ পাঠ হইত, তাহ শুনিতেন। বারাণ্ডায় প্রবেশ করিবার ঘর সকল এরূপ ভাবে নির্মিত হইয়াছে যে, একটি গােলক-ধাঁধ। বলিলেও হয়! পথপ্রদর্শক একজন সঙ্গে না থাকিলে, পথ খুঁজিয়া পাওয়া ভার। নবাব-রমণীগণ এখানে নাকি নবাব-পতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলিতেন। কথাটা ঠিক!. দিল্লী হইতে চুরি করিয়া, তাহারা এ রাজ্য স্থাপিত করিয়া- ছিলেন। আর তাহা লুকাইয়া গিয়াছে। জগতের রাজত্ব ও সম্পদ মাত্রই এরূপ লুকাচুরি। একজন চুরি করিয়া রাজ্য ও সম্পত্তির সৃষ্টি করে—যুদ্ধই বল, বাণিজ্যই বল, আর ওকালতিই বল,—তাহা দুই দিন পরে লুকাইয়া যায়। ইহার সুখ বা গৌরব যে স্থাপন করে, সে প্রকৃতই দয়ার পাত্র। মনুষ্যত্বই প্রকৃত সুখ। মানুষের সকলই যায়, মনুষ্যত্ব যায় না। অযযাধ্যার রাজ্য নাই। বাল্মীকির কবিত্ব অমর! তঁাহার পদচিহ্ন অনুসরণ করিয়া, শত শত নর-নারী প্রতি দিন মনুষ্যত্ব লাভ করিতেছে। কি কথায় কি কথা আনিয়া ফেলিলাম। মধ্য কক্ষের দুই পার্শ্বে অষ্টকোণ-সমন্বিত আর দুইটি কক্ষ আছে। তিনটি কক্ষই বহুমূল্য ঝাড় ইত্যাদিতে সজ্জিত। ইহার কিঞ্চিৎ দূরেই ছােট ইমামবারা। এটিও ঠিক বড় ইমামবারার মত। তবে আকৃতিতে ছােট হইলেও, দেখিতে এবং কারুকার্যে এটি অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট। বড় ইমামবারার প্রাঙ্গণ মরুভূমির মত। একটি বৃক্ষচ্ছায়া, একটি ফুলের চারাও নাই। কিন্তু ইহার প্রাঙ্গণে একটি সুন্দর উদ্যান রচিত হওয়াতে, স্থানটি অতীব সুন্দর ও শান্তিপ্রদ বোধ হয়। কেশরবাগের পার্শ্বেই ছ-মঞ্জিল। একটি নহে, পাঁচটি গৃহ লইয়া ভূতপূৰ্ব্ব নবদিগের এই বাসস্থান নির্মিত। প্রধান ভবনটির শীর্ষদেশে একটি স্বর্ণছত্র বিরাজিত। তাই ইহার নাম ছমঞ্জিল।

প্রবাসের পত্র । ধাতুনির্মিত ছত্রটি এখনও শােভিত রহিয়াছে, নিম গােমতীর সলিলে এতিবিম্বিত হইতেছে। কিন্তু সেই ছত্রধর এখন কোথায়? তঁাহার রাজ্যের যে একটি ক্ষুদ্র ছায়া মেটিয়াবুরুজে ছিল, তাহা পৰ্যন্ত বিলুপ্ত হইয়াছে। ছত্র-প্রাসাদের নিয়তলের এক কক্ষ এখন সাধারণ পুস্তকালয়। উতলের কক্ষ সকল শেপুরুষদের কব-ভবন। অন্য একটি গৃহ এখন মিউজিয়ম-এ অঞ্চলের লােক বলে, আজয়ের ধর। আবার বলি, হায় পার্থিব সম্পদের ও গৌরবের পরিণাম। তার পর ‘সাহ-নিজা দেখিতে যাই। এটিও একটি প্রকাণ্ড সমধিৰন। সিপাহিবিদ্রোহের সময়ে এখানে ঘােতর যুদ্ধ হয় বলিয়া, এ স্থানটি এখন বিশেষ বিখ্যাত। এতদ্ভিন্ন (বলা বাহুল্য) লঙ্গেীতে ইংৰাজদিগের পার্ক বা পঞ্চবটী উদ্যান আছে। লেপ্টেনান্ট গবর্ণরের বাড়ী আছে। পুরাতন রাজপ্রাসাদ সকল দেখিয়া আসিয়া, উহা দেখিতে ঠিক যেন একটি কপােতের বাসা বোধ হয়। কয়েকজন ইংরাজকে যেখানে বিদ্রোহের সময়ে হত্যা করা হইয়াছিল, তাহার উপর একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে।

E
-
।
*
‘ছত্রমঞ্জিল লক্ষ্ণৌ
১৮ পৃষ্ঠা

No text on this page.

রুড়কি। - আজ প্রাতে হরিদ্বার হইতে ১২টার সময়ে রুড়কি পহুছি। ডাক-বাঙ্গালাতে যৎকিঞ্চিৎ আহার করিয়া নগরদর্শনে যাই। এইমাত্র ষ্টেশনে আসিয়া, গাড়ীর ঘণ্টা খানিক বিলম্ব দেখিয়া, অপেক্ষাকক্ষে বসিয়া তােমাকে পত্র লিখিতে বসিলাম। চিরদিনই তােমাকে পত্ৰলেখা আমার পক্ষে এক আনন্দ! তথাপি এ দূর দেশ হইতেপত্র লিখিতে যে সুখ বােধ হয়, এমন সুখ বুঝি জগতে অল্পই আছে। পূৰ্ব্বদৃষ্ট স্থান সকলের কথা এখন হাতে রাখিয়া, রুড়কিতে যাহা দেখিলাম, আজ তাহাই লিখিব। সলিলস্বরূপা গঙ্গাদেবীর শক্তি আমাদের পুণ্যশ্লোক পূর্ব পুরুষেরা বুঝিয়াছিলেন। তাই সলিলশক্তির পূজা প্রচলিত করিয়াছেন। তাই বলিয়াছেন,-তাহার শক্তিপ্রভাবে ঐরাবত ভাসিয়া গিয়াছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্যবশতঃ, তাহারা সে শক্তি কাৰ্যে পরিণত করিতে পারিলেন না। • মাতার প্রকৃত পূজা আমরা শিখিলাম না। গীতার কর্মবাদ ঘুচিয়া, দেশে, বেদান্তদর্শনের মায়াবাদ আসিল। সংসার কিছুই নহে, মায়ামাত্র। জীবন কিছুই নহে, নলিনীদলগত জলমাত্র। পড়িয়া গেলেই ভাল। এ শিক্ষাও মহৎ বটে; কিন্তু জ্ঞানের এক অঙ্গমাত্র। আমরা এই এক অঙ্গকে, এই অধ্যাত্মিক জ্ঞানকাণ্ডকে সৰ্বস্ব ভাবিয়া, প্রকৃত কর্মকাণ্ড ভুলিয়া গেলাম। আমরা তাই ডুবিলাম। পশ্চাত্য বিজ্ঞান বুঝিল, যে শক্তি ঐরাবতকে উড়াইতে পারে, তাহার দ্বারা কলের চাকা ঘুরাণ যাইতে পারে। ততােধিক দেখিলেন, দেশে জলাভাবে কৃষি হয় না, ২ প্রবাসেন পত্র। দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হয় ; অথচ জীবনম্বরূপা ভাগীরীর জলরাশি বহিয়া সমুদ্রে পড়িতেছে। যেখানে গঙ্গা প্রথম তাহার জন্মস্থান বা পিত্রালয় হিমাচল হইতে পদতলস্থ সমতল ভূমিতে পড়িয়াছেন, সেখানে গঙ্গার পার্শ্বে হরিদ্বারে গঙ্গা অপেক্ষা গভীরতর করিয়া খাল বা কেনেল কাটিয়া,-এ অঞ্চলে “নহর” বলে, কথাটা বােধ হয় লহরগঙ্গার স্রোত ফিরাইয়া, জলশূন্য স্থানের মধ্যে বহুতর স্রোত বহাইয়া, শেষে কানপুরে লইয়া,পাশ্চাত্য বিজ্ঞান আবার গঙ্গার পূৰ্ব্ব স্রোতে ফেলিলেন। ইহাতে অন্তরবর্তী স্থানসমূহে স্বর্ণ ফলিতেছে। রুড়কিতে কেনেল আলিয়া সােলানী নদীর পার্শ্বে উপস্থিত। নদীর সঙ্গে মিশাইয়া দিলে খালের জলও নদীপথে বহিয়া যাইবে। বিজ্ঞান অদ্ভুত কৌশলে নদীর বক্ষে প্রায় তিন মাইল ব্যাপী এক মহাসেতু নির্মাণ করিয়া,সেতুর উপর দিয়া গঙ্গার লহর বা কেনেল বহাইয়া লইয়াছে। নীচে সােলানী নদী পূর্ব-পশ্চিমে বহিয়া যাইতেছে। সেতুর উপর দিয়া লহর উত্তর দক্ষিণে বহিয়া যাইতেছে।' বর্ষাকালে স্থানটির যে কি শােভা হয় বলা যায় না। ঐরাবতও ভাসিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু কেনেলের দুই পার্শ্বে দুই বিয়াট সিংহমূৰ্ত্তি—ব্রিটিশদিগের জাতীয় চিহ্ন—কুটী করিয়া স্রোতের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। ভগীরথ গঙ্গা আনিয়া- ছিলেন তাহা উপাখ্যান। ব্রিটিশসিংহ যে এ অঞ্চলে গঙ্গা আনিয়াছেন, তাহা স্বচক্ষে দেখিলাম। ঐরাবত ভাসিয়া গিয়াছিল, মাতা এখন ব্রিটিশসিংহের সঙ্কেত অনুসরণ করিয়া প্রবাহিতা হইতেছেন। কেনেলের জলের বেগে, স্থানে স্থানে কল ঘুরিয়া ময়দা পিসিতেছে। এ সকলকে জলের কল বলে। তাই বলিতেছিলাম, পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকেরা যথার্থ শাক্ত। তাহারাই শক্তির প্রকৃত পূজা করিতেছে। আমাদের পূজা কেবল পুতুলপূজাই বটে। আমরা সত্যই অন্তঃসারশূন্য পৌত্তলিক।

করেন। গলিতেছে, কুড়কি। জল সিধা করিলে বাম্প উঠে, জলপাত্রের মুখে আচ্ছাদন থাকিলে, তাহা ঢক ঢক কী, নড়িতে থাকে, একবার উঠে, একবার পড়ে ইহা আবহমান কাল হইতে আমরা দেখিয়া আসিতেছি। পাশ্চাত্য বিজ্ঞান বুঝিল, এ ক্ষুদ্র শক্তিকেও বড় করিয়া মানবের বৃহৎ কাৰ্য্য সাধিত হইতে পারে। জলপাত্রের আচ্ছাদন ঢক ঢক করিয়া নড়িতেছে দেখিয়া, জনৈক পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক, বাষ্পের শক্তির প্রথম আবিষ্কার আজ তাহার উত্তরাধিকারীগণ, সেই বাষ্পের দ্বারা, বৃহৎ বৃহৎ কলের আচ্ছাদন নাড়িয়া, তদ্বারা চক্রের পর চক্র ঘুরাইয়া, স্থলে শকট, জলে অর্ণবযান চালাইতেছেন। রুড়কিতে ইহা দ্বারা কৰ্ম্মকার ও সূত্রধরের কাৰ্য্য করিতেছে। কলে লােহা গড়িতেছে, হেঁছিতেছে, কাটিতেছে, এবং জগতের যাবতীয় লােহার বস্তু নিৰ্মাণ করিতেছে। আবার কলে কাঠ কাটিতেছে, বেঁদা করিতেছে, এবং এইরূপে কাষ্ঠের নানাবিধ উপকরণ প্রস্তুত করিতেছে। কল-ঘর দেখিয়া রুড়কির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দেখিতে যাই। স্থলে একটি গােল কক্ষ, উপরে গুম্বজ, অতি পরিপাটী, তাহার দুই পার্শ্বে দুই গলির দুই সীমায়, আবার দুইটি ঈষৎ গােলাকার কক্ষ। অতি সুরঞ্জিত, ইঞ্জিনিয়ারিং চিত্রাদিতে সজ্জিত'। বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার- দিগের মূর্তি প্রকোষ্ঠকেন্দ্রে এবং চিত্র দেয়ালে শােভিতেছে। গলির দুই পার্শ্বে, ক্লাসে ক্লাসে ছাত্রের বসিয়া বিদ্যাভ্যাস করিতেছে। গৃহটি অতি সুন্দর। আর না। গাড়ী আসিতেছে। ভরসা করি, কাল লাহাের গিয়া তােমাদের পত্র পাইব। মন আকুল বলিয়া কোথাও তিষ্ঠিতে পারিতেছি না। মধ্য- বিচুর। আজ বিটুরের কথা লিখিব। বিযুরে প্রথমে নানা সাহেবের বাড়ী দেখিতে যাই। ইংরাজেরা মহারাষ্ট্র ভয় করিয়া, মহারাষ্ট্রপতি বাজি- রাওকে বিয়ে বন্দী করিয়া রাখেন। নানা ধুন্দুপন্থ বা নানা সাহেব, তাহারই পােষ্যপুত্র ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর, ইংরাজ বাহাদুর তাঁহার বৃত্তির লাঘব করেন, এবং তাহার সহিত না কি অসদ্ব্যবহার করেন। আজিমুল্লা নামক একজন নীচবংশীয় মুসলমান যুবককে ইংরাজ নানার পুত্রের শিক্ষক নিযুক্ত করেন। এই ব্যক্তি শীঘ্র নানার বিশ্বাসভাজন হয়। তঁাহার পক্ষে উকীল হইয়া বৃত্তি বাড়াইবার জন্য, বিলাতে দরবার করিতে যায়। বহুতর অর্থব্যয় করিয়া, বিফল হইয়া দেশে আসিয়া নানাকে বলে যে, ইংলণ্ড একটি ক্ষুদ্র স্থান মাত্র। শীঘ্র নানাকে ভারতবর্ষের সম্রাট করিয়া দিবে। এই পাপিষ্ঠই বিদ্রোহের প্রধান কারণ। তাহার দ্বারাই কানপুরে সেই সকল শশাচনীয় হত্যাকাণ্ড হয়। নানা অতি ধৰ্মাত্মা লােক ছিলেন, তিনি ইহার কিছুই জানিতেন না। বিদ্রোহের সময়ে ইংরাজের নানার বাড়ী তােপে উড়াইয়া দিয়াছিলেন। তঁাহার হাতার প্রাচীর এবং তােরণটি মাত্র এখন অবশিষ্ট আছে। দেখিলে, হৃদয়ে যুগপৎ শােক ও দয়ার উদয় হয়। মহারাষ্ট্রপতির সঙ্গে বহুতর মহারাষ্ট্র এ অঞ্চলে আসিয়াছিল। আজ তাহারা অন্নাভাবে হাহাকার করিতেছে। তাহার পর, ধ্রুব-ঘট দেখিতে যাই। প্রবাদ এখানে ধ্রুব তপস্যা করিয়াছিলেন। • পার্শ্বে একটি প্রাচীন পার্শ্বে একটি প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ বিধৌত করিয়া, গঙ্গা প্রবাহিতা হইতেছেন। এখান হইতে এখান হইতে ঘাটের সারি --- বিচুর। লাগিয়াছে। সত্তি কপৌৰ্ণমাসীর মেলা উপলক্ষে, অদ্য গঙ্গাসলিল- বিধৌত কামিনীকুসুমশশির অতুলনীয় শােভা। ব্ৰহ্মাবত্তের ঘাটে যাই। এখানে একটি লােহার শলাকা প্রস্তর-গ্রথিত রহিয়াছে। ইহাকে ব্রহ্মাবত্তের খুটা বলে। আৰ্যগণ প্রথম যখন ভারতে উপনিবেশ সংস্থাপন করেন, বােধ হয়, এই পৰ্যন্তই ব্রহ্মাবত্তের সীমা ছিল। তাহার পূর্বে অৰ্য্যাবর্ত। শেষ যে ঘাটে লক্ষ্মণ কাদিতে কাদিতে মাতা জানকীকে বনবাসে রাখিয়া চলিয়া যান, যেখানে মহর্ষি বাল্মীকি তাহাকে পাইয়া আশ্রমে লইয়া যান, সেই ঘাট দেখি। স্থানটি দেখিবামাত্র—যদিও দেখিবার কিছুই নাই, একটি সামন্ত ঘাটমাত্র স্মৃতির উচ্ছ্বাসে আমার চক্ষু অশ্রুতে পূর্ণ হইয়া উঠে। তাহার পর, জগতের কবিগুরু মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রম। কবিতার জন্মস্থান, মহাকাব্যের জন্মস্থান, ভারতের অতুলনীয় রামায়ণের জন্মস্থান, রাম- সীতার যে চরিত্রবলে তাহারা চিরদিন দেবদেবীস্বরূপ পূজিত, সেই চরিত্রের জন্মস্থান দেখিয়া যে ভক্তি ও শান্তির উদ্রেক হইল, তাহা ভাষায় প্রকাশ করিবার শক্তি আমার নাই। স্থানটি এখন কথঞ্চিৎ অরণ্য, পিলােয় বৃক্ষে ও তেঁতুল ইত্যাদিতে সমাচ্ছন্ন। গঙ্গার তরঙ্গাভিঘাতে বালুকাস্তর স্থানে স্থানে ক্ষুদ্ৰ পৰ্ব্বতাকার ধারণ করিয়াছে। প্রবাদ, এইরূপ একটি ক্ষুদ্র বালুকাস্তুপে, মহর্ষির আশ্রম কুটীর ছিল। এরূপ পবিত্র স্থানে কোথায় একটি দেবতুল্য মহর্ষিমুর্তি দেখিব, না নিকৃষ্ট লিঙ্গ- উপাসকেরা এক শিবলিঙ্গ স্থাপন করিয়া, তাহার উপর এক সামান্য মন্দির স্থাপন করিয়াছেন। পার্শ্বে যেখানে সীতাদেবীর কুটীর ছিল, সেখানে একটি অতি কদৰ্য্য মূর্তি আছে। কিঞ্চি দূরে একটি ক্ষুদ্র ইষ্টকগৃহে তাহার এবং রামচন্দ্রাদির মূর্তি রক্ষিত হইয়াছে। সীতা- দেবীর শ্বেতপ্রস্তরের মূর্তিটি অতি সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। পবিত্র আশ্রম- প্রবাসের পত্র। প্রবাহিত মুল প্রালিত করিয়া, এখানে শৈলসুতা হইয়াছেন। বাল্মীকি যদি ইংরাজদের কেহ হইতেন, তবে ৰাজ আমরা এখানে বাল্মীকির মূর্তিসমন্বিত একটি প্রকৃত আশ্রম দেখিতাম, এবং পদে পদে কালিদাসের আশ্রমের বর্ণনা মনে পড়িত। বাল্মীকির দুর্ভাগ্য, তিনি আমাদের বাল্মীকি। তথাপি দ্বারভাঙ্গার মহারাজার তাঁহার প্রতি কিঞ্চিৎ কৃপা কটাক্ষ পড়িয়াছে। তিনি তার উপর তালা তুলিয়া, একটি কবুতরের বাসার মত অট্টালিকা নির্মাণ করাইতেছেন। পার্শ্বে একটু পুষ্পেদ্যানও দেখিলাম। গৃহটি দেখিয়া আমার বােধ হইল যে, মহারাজের উদ্দেশ্য যে, উহার চুড়া দূর হইতে দেখা যাইবে, এবং তদ্বারা বাল্মীকির না হউক, তাহার নাম ঘােষিত হইবে। বাল্মীকি এক অমর অদ্বিতীয় মহাকাব্য লিখিয়াও, কোথাও আপনার নাম সন্নিবেশিত করেন নাই। আর মহারাজ যে তঁাহার আশ্রমে সামান্য একটি গৃহ নির্মাণ করিতেছেন, তাহাতেও সর্বাগ্রে নামের জন্য লালায়িত। হায় রে আমাদের দুর্গতি। এ অবধি যত স্থান দেখিয়াছি, কোনও স্থান তােমাকে দেখাইতে ইচ্ছা হয় নাই। কেবল মহর্ষির পবিত্র আশ্রমে দাঁড়াইয়া, জাহ্নবীর দিকে চাহিয়া মনে হইল, তুমি সঙ্গে থাকিলে কত সুখ হইত! অথচ এ পুণ্য তীর্থটি কোনও বিদেশীয় যাত্রিক দর্শন করে না। এ দিকে ভারতবর্ষে এমন ঘর নাই, যেখানে রামায়ণ নাই, যেখানে রামসীতার পূজা নাই। কয় জনে বুঝে, এ পূজা বাল্মীকির অদ্ভুত প্রতিভার ? মহর্ষির কৃপা ভিন্ন আজ রাম-সীতাকে কে চিনিত ?

No text on this page.

“সালেমার বাগ” লাহাের
পৃষ্ঠা
“সালেমার বাগের” আর একটি দৃশ্য

লাহোের। - তােমার পত্রের জন্য ব্যাকুল হইয়া আমি হরিদ্বার কি রুড়কিতে তিষ্ঠি নাই। উৰ্দ্ধশ্বাসে আসিয়া আজ প্রাতে লাহােরে পৌছিয়াছি। লাহােরে প্রথম মিউজিয়ম দেখি। বিশেষ কিছু বলিবার নাই। সম্মুখে বিখ্যাত ঝমঝম তােপ। হিন্দু ও শিখদিগের সময়ের এইটি সাম্রাজ্যের প্রধান লক্ষণ বলিয়া পরিগণিত। ইংরেজদের সঙ্গে চিলেন- ওয়ালার যুদ্ধেও শিখেরা এই প্রকাণ্ড তােপ ব্যবহার করিয়াছিল। তােপটি পিতলের, দেখিতে অতি সুন্দর। তাহার পর সার জন লরেন্সের প্রস্তরের মূর্তি। ইহাকে ইংরাজ ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষের ত্রাণকর্তা বলেন। সিপাহীবিদ্রোহের সময়ে, ইনি পঞ্জাবের লেপ্টনেন্ট গবর্ণর ছিলেন। তাহার নির্ভীকতা ও বুদ্ধিপ্রভাবে পঞ্জাব বিদ্রোহে যােগ দেয় নাই। তাহাতেই কণ্টকের দ্বারা কণ্টক উদ্ধৃত হয়, শিখদের দ্বারা সিপাহিরা পরাভূত হয়। তাঁহার এক হস্তে কলম, অন্য হস্তে তরবার, বীরভাবে দণ্ডায়মান। তাহার পর “সালেমার বাগ” দেখিতে যাই। সম্রাট শাহজাহান এক দিন স্বপ্নে স্বর্গ দেখেন। এ তােমার আমার স্বপ্ন নহে, সম্রাটের স্বপ্ন, তাহা বিফল হইতে পারে না। সেই স্বপ্নদৃষ্ট স্বর্গ সৃষ্টি করিবার জন্য আদেশ প্রচারিত হইল। মুসলমানদের স্বর্গ সপ্তস্তরবিশিষ্ট। তদনুসারে সপ্ত স্তরে সজ্জিত “সালেমার” উদ্যান প্রস্তুত হইল। ইংরাজ রাহাদুর ঘােতর পার্থিব সুখপরায়ণ। অতএব স্বর্গের উপরের সিড়ী ছারি স্তর ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া, নিম্নের তিনটি স্তরমাত্র রক্ষা করিয়াছেন। মরি মরি! কি কল্পনা ! কি দৃশ্য! স্তরে স্তরে এই তিন স্তর ২৬ প্রবাসের পত্র। মাটির ভিতর নামিয়াছে। প্রথম স্তরে ‘গেট পার হইলে, তাজমহলের সম্মুখে যেরূপ জল-প্রণালী আছে সেইরূপ। তাহার দুই পার্শ্বে রাস্তা, রাস্তার দুই দিকে সুফল বৃক্ষের উপবন। তাহার পর একটি সুন্দর বসিবার ঘর, সম্মুখে একটি কৃত্রিম সরােবর। মধ্যস্থলে একটি বসিবার স্থান, অতি সুন্দর। সরােবরের দুই পার্শ্বে উপবন। তৃতীয় স্তরে আবার জল-প্রণালী ও উপবন। প্রণালীতে ও সরােবরে, সর্বত্র সংখ্যাতীত ফোয়ারা খেলিতেছে। স্থানটি কি সুশীতল ও শান্তিপ্রদ। পর দিবস “সাহাদরা” দেখিতে যাই। এটি সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধিগৃহ। শুনিলাম, নুরজাহান ইহা পতিভক্তির নিদর্শনস্বরূপ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। গৃহটি দেখিতে যেন একটি অতি প্রকাণ্ড বৈঠকখানা বাড়ী । কোথাও মুসলমানের সমাধির গুম্বেজ নাই। চারি কোণে বহুতল কক্ষবিশিষ্ট, চারিটি উচ্চ স্তম্ভ। তুমি তাজমহলে এরূপ দেখিয়াছ। তাহার উপর হইতে দুরস্থ লাহােরের ও নিম্নস্থ রাবীনদীর শােভা দেখিতে অতি মনােহর। ফিরিয়া আসিবার সময়, কয়েকটি মসজিদ ও রণজিৎ সিংহের—যাহাকে ইংরাজেরা পঞ্জাবের সিংহ বলেন,—সমাধি দেখিলাম। এটি গৌরবের সমাধি বলিলেও হয়। এই সিংহের ঘরে, হা বিধাতঃ! কি কেবল শৃগাল জন্মিল ? তাঁহার শেষটি আজ কষিয়াতে ভিক্ষা করিয়া জীবনযাপন করিতেছেন। তাহার পর লাহােরের দুর্গ দেখিলাম। যে সকল গৃহে রণজিৎ থাকিতেন, তঁাহার সেই প্রিয় শিখ-মহল এখনও বর্তমান। তুমি হাজারি-আয়না দেখিয়াছ। মনে কর, কতকগুলি কক্ষের ভিতরের প্রাচীর ও ছাদ, ‘সেইরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নার দ্বারা খচিত। একটি গৃহে শিখদিগের নানাবিধ অস্ত্র সজ্জিত রহিয়াছে। তাহাদের বর্ম বা বস্ত্রাণ ও পৃষ্ঠাণ দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। এ গুলি ধাতুময় এবং

a.t.[ཟ]
ཙ༔ ༴ * it༥ ༑ rgཌ
༥ w༽

No text on this page.

লাহাের। ওজনে এক একটি বিশ ত্রিশ সেরের কম হইবে না। এই তার অলঙ্কারের স্বরূপ ব্যবহার করিয়া, যাহারা সেই বিস্ময়কর যুদ্ধ সকল করিয়াছিল, জানি না, তাহারা কি অসাধারণশক্তিসম্পন্ন লােকই ছিল! তাহারা কত প্রকারের অস্ত্র, বন্দুক ও তােপই প্রস্তুত করিয়াছিল! আমার চক্ষে জল আসিল, আর মনে হইল,-“যুবরাজ! আজ সে জাতি কোথায় ? লিখিতে ভুলিয়াছি যে, জাহাঙ্গীরের সমাধি দেখিয়া আসিবার সময়ে, তাঁহার প্রিয়তমা মেহের-উন-নেসা (অর্থ, স্ত্রীজাতির চন্দ্র ) বা নুরজাহান (অর্থ, পৃথিবীর আলােক) সুন্দরীর সমাধি দেখিয়া আসি। তুমি জান, নুরজাহান তখন ভারতবর্ষের অদ্বিতীয়া সুন্দরী ও অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্না রমণী বলিয়া, তাঁহার স্বামী সের আফগানকে বধ করিয়া, জাহাঙ্গীর তাহাকে বিবাহ করেন। একটি গল্প শুনিলাম। এক জন কবি তাঁহাকে দেখিবার জন্য, বহুদূর হইতে আসিয়া, রাজপথের পার্শ্বে দাড়াইয়া আছে। যখন তাহার গাড়ী চলিয়া যায়, সে বলিয়া উঠিল,- খােল আবরণ, বহু দূর হতে এসেছি দেখিতে মুখ। নুরজাহান উত্তর করিলেন, তাও কবিতায়, খুলিলে, ভূতলে তারাগণ পাবে দুখ। এ হেন রমণীরত্নের সমাধিটি ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। দেখিয়া মনে ফে কি কষ্ট হইল, বলিতে পারি না। উপরের কবর পর্যন্ত ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। নিম্নের কক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, রাবীর বন্যাস্রোত প্রবেশ করিয়া, সেখান হইতেও কবরের চিহ্ন পৰ্যন্ত ধুইয়া লইয়া উদিবে চন্দ্রমা, ১৮ প্রবাসের পত্র গিয়াছে। বঙ্কিম বাবু যথার্থই নুরজাহানের মুখে বলিয়াছেন, এ রূপের ছাঁচ কবরের মাটিতে থাকিবে। সেই রূপের, সেই প্রতিভার চিহ্ন বহুদিন লুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু অবস্থার ঘূর্ণচক্রে পড়িয়া এই ভুবনমােহিনী যে পাপে লিপ্ত হইয়াছিলেন, রাবীরও সাধ্য নাই যে, তাহা ইতিহাস হইতে মুছিয়া ফেলে।

অমৃতসর। তােমাকে অমৃতসরের কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। লাহাের হইতে দিল্লী আসিবার সময়ে, পথে অমৃতসর দর্শন করি। প্রতুল তাঁহার একজন মুন্সীকে আমার সঙ্গে দিয়াছিলেন। আমার গাড়ীস্থিত জনৈক পঞ্জাবী যুবক,—পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বি-এ,—উক্ত মুন্সীর কাছে আমার কথা শুনিয়া, বড় আগ্রহের সহিত আমার সঙ্গে আলাপ আরম্ভ করে। তাহার নাম হরিচন্দ। তাহার পিতা ডেপুটী কালেক্টর, ভ্রাতা অমৃতসরের তহশিলদার, সে নিজেও এবার ডেপুটী কালেক্টরী পরীক্ষা দিয়াছে। প্রতুলের বাসায় ঠিক যেন আমি কলিকাতায় ছিলাম। বাঙ্গালা কথা, বাঙ্গালী আহার, বাঙ্গালী ব্যবহার। আমি প্রতুলকে বলিতাম যে, ইহার জন্য আমার পাঞ্জাব আসিয়া কি ফল ? কিন্তু প্রতুল-ভায়ার সময় নাই যে, আমাকে কোনও, পাঞ্জাবীর বাড়ী লইয়া গিয়া, পাঞ্জাবের আচার ব্যবহার দেখান। অতএব এ যুবকের সহিত আমিও আগ্রহের সহিত আলাপ করিলাম। ফল এই হইল, অমৃতসরে গাড়ী পঁহুছিবার পূর্বেই, সে আমাকে পাইয়া বসিল। সে আমাকে সঙ্গে করিয়া, সমস্ত অমৃতসর দর্শন করায়, এবং তাহার বাড়ীতে আহার করায় ;সে আহারে বেশ নূতনত্ব আছে। গােলাকার এক চৌকির উপর বসিলাম, এবং গােলাকার আর এক চৌকিতে রুটী, ডাল, তরকারী এবং মাংস প্রভৃতি আহারীয় সামগ্রী প্রদত্ত হইল। আমি বড় আনন্দে খাইলাম। লােকটি এত ভালবাসা জানাইল যে, গাড়ী ছাড়িবার সময়েও আমার হাত তাহার হাতে গাঁথা ছিল। অথচ এ দিকের বাঙ্গালীরা বলেন প্রবাসের পত্র। ৫ যে, এ দেশস্থ লােকেরা তাঁহাদিগকে ঘৃণা করে ; তাই তাহারা তাহাদের সঙ্গে মিশেন না । অমৃতসরে প্রথমে বিখ্যাত সুবর্ণমন্দির দেখিতে যাই। ইহাকে শিখেরা দরবার সাহেব” বলে। তুমি বেহারের “পাত্তপুরীর” দৃশ্যটি স্মরণ কর। একটি বৃহৎ সবােবর। ইহারই নাম অমৃতসর। তাহার চারি তীরে, সারি সারি দ্বিতল ও ত্রিতল অট্টালিকা। শুনিলাম একটিতে রােগী ভিন্ন আর কেহ প্রবেশ করিতে পারে না; এখানে রােগী ধন্না দিলেই রােগ আরােগ্য হয়। অমৃতসরােবরের মধ্যস্থলে সলিল-গর্ভে সুবর্ণমন্দির, চতুর্থ শিখগুরু রামদাস কর্তৃক ৩০০ শত বৎসর পূর্বে নির্মিত হয়। মন্দিরটি অনতি- বৃহৎ হইলেও, সৌন্দর্যে অতুলনীয়। উহার সুবর্ণে সমাচ্ছন্ন দেহ ও উচ্চ গুজে, মধ্যাহ্বরবিকরে প্রদীপ্ত অগ্নিবৎ ধ ধক্ করিয়া অলিতে- ছিল। নয়ন ঝলসিয়া যাইতেছিল। অন্তর্ভাগও সুবর্ণ কারুকার্যে এবং স্থানে স্থানে মূল্যবান্ পান্না, মরকত, হীরক ইত্যাদি দ্বারা খচিত। স্তম্ভসারি দ্বারা শশাভিত মধ্যকক্ষে, গুরুগগাবিন্দের রচিত গ্রন্থদ্বয় বহুমূল্য আবরণে আচ্ছাদিত রহিয়াছে, এবং বহুমূল্য চামরে উভয় পার্শ্ব হইতে ব্যজনিত হইতেছে। এক দিকে বসিয়া দুই জন গায়ক গাহিতেছে। যাত্রী নর-নারী কক্ষের চারি দিক প্রদক্ষিণ করিতেছে। দ্বিতল গৃহে, গুরু গােবিন্দের যােদ্ধবেশে অশ্বার একটি চিত্র রক্ষিত হইয়াছে। সেখানে রণজিৎ সিংহেরও একটি চিত্র আছে। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের উপরিভাগে, গুরু নানকের একটি মূর্তি স্বর্ণে খােদিত রহিয়াছে। দিকে মৰ্ম্মর সেতু'র দ্বারা মন্দিরটি সরােবরের তীরের সঙ্গে সংযুক্ত রহিয়াছে।' শুনিলাম, জাহাঙ্গীর ও তাহার অদ্বিতীয়া রূপসী পত্নী সুরজাহানের সমাধি ও সালেমার উদ্যান হইতে বহুমূল্য মৰ্ম্মর ও রঙ্গ এক

ICL M
পদ + ক +
অমৃতসর সুবর্ণ মন্দির
পৃষ্ঠা
Johila I'ress, Calcutta.

No text on this page.

অমৃতসর। ইত্যাদি আনিত হইয়া এই মন্দির নিৰ্ম্মিত ও সজ্জিত হইয়াছিল। নুরজাহানের সমাধির বর্তমান দুরবস্থার ইহাই প্রধান কারণ। শুনিয়া আমি দীর্ঘ নিশ্বাস সংবরণ করিতে পারিলাম না। এই ধার্মিক ও বীরপুরুষেরা কিরূপে যে এতাদৃশ হৃদয়হীন কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, আমি বুঝিতে পারিলাম না। শিখদিগের ধৰ্ম্মের স্রষ্টা নানক। ইনিই ইহাদের প্রথম গুরু। গুরু গােবিন্দ দ্বিতীয় গুরু। ইনি ঘােরতর যোদ্ধা ছিলেন। নানক- প্রচারিত ধৰ্ম্মে ও গীতােক্ত ধৰ্ম্মে, আমি বড় প্রভেদ দেখিলাম না। শিখে জাতিভেদ মানে না, আহারসম্বন্ধে কোনও রূপ ধরা-বাঁধা নাই। তাহারা কোনও ধৰ্ম্মের বিদ্বেষী নহে, একমাত্র নারায়ণের উপাসনা করে, এবং গ্রন্থ দু’খানির পূজা করে। আমার ধারণা হইয়াছে যে, গুরু নানক বিলুপ্ত গীতােক্ত ধৰ্ম্মই প্রচার করেন। নানক শিখদিগের কৃষ্ণ, রণজিৎ সিংহ অর্জুন, এবং “যুদ্ধস্ব বিগত জ্বর”ই ইহাদের মূল মন্ত্র। এই মন্ত্র সাধিয়া, ধর্মবলে কৰ্ম্মকে বলবান করিয়া, অমিতপরাক্রমে ইহারা পাঞ্জাবে মােগলসাম্রাজ্যের বক্ষের উপর, শিখরাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন, এবং এই মন্ত্রবলেই, শিখেরা ভারতীয় ইতিহাসে অক্ষয়কীৰ্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন।' মন্দিরদর্শনের পর, আমি ‘গােবিন্দগড় দুর্গ দেখিতে যাই। এই দুর্গ রণজিৎ সিংহ নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। কলিকাতার দুর্গের মত, ইহা দেখিতে একটি প্রসারিত-দল পদ্মের মত তাহার পর নগর দর্শন করি। অমৃতসর নগরও রণজিৎ কর্তৃক স্থাপিত, দেখিতে অতি সুন্দর! একটি দোকানে গিয়া, কিরূপে শাল, প্রস্তুত হয়, তাহা দেখিলাম। স্বতন্ত্র স্থানে আলােয়ান প্রস্তুত হয়। সেই আলােয়ানের উপর, এই সকল দোকানে কারুকার্য করা হয়। এক এক বর্ণের

৩২
প্রবাসের পত্র ৮
সূতা, এক এক জন কারীকরের হাতে। এক জন কারীকর একখানি
শালের ফুলের সর্বত্রে কাল সূতার কাৰ্য করিতেছে, আর এ জন
তাহাতে লাল সূতার কাৰ্য্য করিতেছে। সূচের দ্বারা কি সূক্ষ্মভাবে
এবং কি পরিশ্রমের সহিতই কাৰ্য্য করিতে হয়। একখানি ‘দোয়ােখা
শাল’ দেখিলাম। ইহার দুই পিঠেই রােখ। আমি এরূপ শাল
দেখি নাই। মূল্য ২০ টাকা বলিল।
টাকা বলিল। এরূপ এক জোড়া শাল
লইতে আমার বড়ই ইচ্ছা হইল। কারীকরদের বেতন ৭৮ টাকা
পৰ্যন্ত।
তাহার পর, অমৃতসরের উদ্যান এবং প্রিন্স অব ওয়েলসের জন্য
যে গৃহ নির্মিত হইয়াছিল, তাহা দেখিয়া, অমৃতসর দর্শন শেষ
করিলাম। আমি এখানে ছয় সাত ঘণ্টা মাত্র ছিলাম।
হইতে ২০

ইন্দ্রপ্রস্থ।
দিল্লীর কথা তােমাকে আমি আর নূতন করিয়া কি লিখিব ?
“বিশপ হিবার” হইতে “নীহারিকা”-রচয়িত্রী পর্যন্ত, যিনি দিল্লী আগ্রা
দেখিয়াছেন, তিনিই তাহার বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। তুমিও তাহা
অনেকবার পড়িয়াছ। অতএব দিল্লীর কথা আমি আর নূতন করিয়া
কি লিখিব ? দিল্লী হিন্দু-সাম্রাজ্যের মহাশ্মশান, মুসলমান সাম্রাজ্যের
মহা সমাধি, মহাকালের মহা রঙ্গভূমি। শ্মশানের ছাই উড়িয়া
গিয়াছে, যমুনার পবিত্র জলে প্রক্ষালিত হইয়া গিয়াছে। সমাধির
প্রস্তররাশিতে দিল্লী আজ সমাচ্ছন্ন। বৰ্তমান দিল্লী হইতে পুরাতন
দিল্লী পৰ্যন্ত পঞ্চ ক্রোশ স্থান ব্যাপিয়া, কেবল সমাধির পর সমাধি,
তাহার পর সমাধি। যে দিকে চাহিবে, দেখিতে পাইবে—“ঘােরারাবী,
মহারৌদ্রী, শ্মশানালয়বাসিনী,” ধ্বংসরূপিণী—মহাকালী, দিগম্বরীবেশে
নৃত্য করিয়া বেড়াইতেছেন।
ধ্বংসগত সাম্রাজ্য সকলের ভস্মের
নীরবতার মধ্য হইতে যেন জননীর ঘাের অট্টহাস্য ভাসিয়া উঠিতেছে।
দিল্লীতে পা দিয়াই আমার সেই বাইরণের মহাকাব্য স্মরণ হইল ;-
“দাড়াও ! চরণ তব সাম্রাজ্য ধূলায়।
“দুইটি সাম্রাজ্য নীচে রয়েছে প্রােথিত !”
দিল্লী যত দেখিতে লাগিলাম, তত অন্য একজন কবির আক্ষেপ
মনে পড়িল,
“বীরত্বের গৰ্ব আর প্রভুত্ব বিভব,
“ম্পদ সংসার সব যাহা করে দান,
“অলভ্য মৃত্যুর হায় ! মুখাপেক্ষী সব,
“গৌরবের পথ মাত্র মৃত্যুর সােপান।”
-
-~-

৩৪ এবাসের পক্ষে। । সর্ব প্রথম হিন্দুর শ্মশানের কথা বলিব, কারণ হিন্দু সাম্রাজ্য সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রাচীন। হিন্দু সাম্রাজ্য ভগবান্ কৃষ্ণের কীৰ্ত্তি,-খুঁধিষ্ঠিরের সাম্রাজ্য,-উপন্যাসের কথা নহে, কাব্যকারের সৃষ্টি নহে। ইন্দ্রপ্রস্থের রাশি রাশি ভগ্নাবশেষ, স্তুপাকারে বর্তমান দিল্লীর এক ক্রোশ দক্ষিণে এখনও বৰ্তমান আছে। লােকেরা ইহাকে এখনও ইন্দ্ৰপাট বলে । যুধিষ্ঠিরের রাজপুরীর দুর্গ এখনও বৰ্ত্তমান আছে। বলা বাহুল্য, কালে উহা ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল। প্রথম যবন সম্রাটেরা ইহার সংস্কার করেন। দুর্গের এক কোণে ভগ্ন রাজপুরীর প্রস্তররাশিতে নিৰ্ম্মত, এক উচ্চ মসজিদ এবং তাহার পার্শ্বে আর একটি অতি সুন্দর, গোল, ত্রিতলকক্ষসমন্বিত, স্বল্পায়তন গৃহমাত্র বর্তমান আছে। হিন্দু রাজ- পুরীর প্রস্তরে নির্মিত মুসলমান রাজপুরীও আবার কালে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। দ্বিতীয় গৃহের ত্রিতল কক্ষে বসিয়া, যমুনার শীতল সমীরণ সেবন করিতে করিতে, প্রথম মোগল সম্রাট হুমায়ুন অধ্যয়ন করিতেন। ইহার তৃতীয় সােপান হইতে পড়িয়া তাহার অপমৃত্যু হয়। মােগা রাজ্য তাহার পুত্র প্রাতঃস্মরণীয় আকবর আগ্রায় দুলিয়া লইয়া যান । ইন্দ্রপ্রস্থের দ্বিতীয়বার কপাল ভাঙ্গিল। ইদানীং ইহাতে একটি গ্রাম বসিয়াছে। বহুবিধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইষ্টকগৃহও নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। যেখানে সেই বিচিত্র রাজপুরী, সেই অতুলনীয়, ময়দানবের নির্মিত সভাগৃহ ছিল, অজি সেখানে দরিদ্রের কুটীরসমূহ বিরাজ করিতেছে । ভগবানের সেই অমানুবিক লীলার কেন্দ্রস্থান ইন্দ্রপ্রস্থের এই দশা মসজিদের ছাদের প্রস্তরে বক্ষ রাখিয়া, পুরাতন দুর্গের প্রাচীর দেখিয়া দেখিয়া, শোঁকের ও ভক্তির উচ্ছ্বাসে আমি কাঁদিল। হয় ত, এ স্থানে এখনও সেই নবােত্তমের পদধুলি পড়িয়া আছে,-প্রাদে মত তাহা অঙ্গে মাখিয়া, এই অকিঞ্চিৎকর মানবজীবন সার্থক করি। F

ইন্দ্রপ্রস্থ।
সকলই গিয়াছে, কেবল এখনও দুর্গের পদমুল ভক্তিভরে প্রক্ষালন
কারয়া, যমুনা দেবী শােকে নীরবে বহিয়া যাইতেছেন। আজ
এই পর্যন্ত।

পুরাতন দিল্লী। ইন্দ্রপ্রস্থের কথা লিখিয়াছি। যে অমানুষিক প্রতিভাবলে ভারতে মহাভারত স্থাপিত হইয়াছিল, প্রভাসতীরে অকালে তাহার তিরােধান হইলে, সেই ধৰ্ম্মরাজ্যের ভিত্তি এরূপ দৃঢ়ভাবে ধৰ্ম্মে স্থাপিত হইয়াছিল যে, তাহা কিছু কালের জন্য কিঞ্চিৎ চঞ্চল হইলেও, বহু শতাব্দী ব্যাপিয়া স্থায়ী হইয়া, ভারতে সুখ ও শাস্তির বিধান করিয়াছিল? কালে গীতার ধর্ম লুপ্ত হইল। অনন্ত জ্ঞানসম্পন্ন শাস্ত্রকারদের জ্ঞানী উত্তরাধিকারীগণ, ভারতের শক্তি জাতিভেদ-শৃঙ্খলে দৃঢ়রূপে বাধিলেন। ধর্ম কেবল যাগযজ্ঞে এবং নরহত্যা ও জীবহত্যায় পরিণত হইল। আবার সেই অবস্থা, ‘যখন যখন ঘটে ভারত! ধৰ্ম্মের গ্লানি, অধৰ্ম্মের অভুখান, আপনাকে সৃজি আমি । বিনাশ দুষ্কৃতদের করিতে সাধন, স্থাপন করিতে ধর্ম, করি আমি যুগে যুগে জনম-গ্রহণ।” আবার ভগবান জন্মগ্রহণ করিলেন। ভগবান বুদ্ধদেব এক ফুৎকারে জাতিবন্ধন উড়াইয়া দিয়া, সাম্যগীতে ভারত প্লাবিয়া, গীতার কৰ্ম্মবাদ ঘােষণা করিলেন। ভারত নবজীবন পাইয়া নাচিয়া উঠিল। আবার অশােকের ধৰ্ম্মরাজ্য স্থাপিত হইল। অসংখ্য শৈলস্তম্ভ বৌদ্ধ ধৰ্ম্মনীতি বক্ষে ধারণ করিয়া ভারত ব্যাপিয়া ধম্মরাজ্য ঘােষণা করিল। কিন্তু জুগতের পরিবর্তননীতি অলঙ্ঘ্য। উন্নতি না হইলে অবনতি হইবে। জগৎ স্থির থাকিতে পারে না। আবার জ্ঞান সাধুদের প্ররিত্রাণ,

No text on this page.

.
দিল্লী “কুতুব মিনার।
পৃষ্ঠা
Monila Press, Calcutta.

পুরাতন দিল্লী। এবােজকের হস্তে পড়িয়া, বৌদ্ধধৰ্ম্ম অন্তঃসারশূন্য হইল। ভগবান আবার জন্মগ্রহণ করিলেন। শঙ্করাচাৰ্য অদ্বৈত শৈববাদে ভারত মাতাইয়া তুলিলেন। ভারতে তৃতীয় বার ধর্মসাম্রাজ্য স্থাপিত হইতে চলিল। চৌহান পৃথ্বীরাজ ইহার শক্তি। ইন্দ্রপ্রস্থের চারি ক্রোশ উত্তরে যমুনাতীরে ভঁহার রাজধানী স্থাপিত হইল। তাহারই নাম দিল্লী। পৃথ্বীরাজের দুর্গের প্রাচীরের ভগ্নাবশেষ এখনও বর্তমান আছে। তাহার কীৰ্ত্তীস্তম্ভ বা কুতুব মিনার এখনও বর্তমান আছে। নুন দিল্লীর বহির্ভাগে এখনও তাহার নীতিস্তম্ভ দুইটি বিরাজ করিতেছে। পুরাতত্ত্ববিৎ ইংরাজ বলেন, কুতুব মিনার কুতুবুদ্দিনের নির্মিত। মােগ্লাগণ ইহার সানুদেশে দাড়াইয়া “আজাহার” দিবে বলিয়া নির্মিত হইয়াছিল। হিন্দুরা বলেন পৃথ্বীরাজের কন্যা যমুনা দর্শন করিবেন বলিয়া, এই স্তম্ভ নির্মিত হইয়াছিল। এই দুইটি প্রবাদের কোনটিই ঠিক বলিয়া বােধ হয় না। এই পৰ্বতবৎ উচ্চ স্তম্ভে উঠিলে, কথা কহিবার শক্তি থাকে না। অতএব মােল্লা সাহেবগণ এত সােপান বাহিয়া উঠিয়া যে আজাহার দিতে পারিতেন, এমন বােধ হয় না। বিশেষ পার্শ্বস্থিত বিপুল কারুকার্যখচিত, বিচিত্র, অতুলনীয় হিন্দু দেবালয় ভগ্ন করিয়া, যে মসজিদ নির্মিত হইতেছিল, তাহা শেষ হয় নাই। মসজিদের পূর্বে আজাহারের স্থান নির্মিত হওয়া সম্ভবপর নহে। অন্য দিকে অনতিপরিস্ফুটিতা, কুসুমকোমলা, পৃম্বীরাজ-দুহিতা যমুনাদর্শনের জন্য যে এত সােপান বাহিয়া উঠিতেন, তাহাও সহজে বিশ্বাস করা যায় না। আমার বােধ হয়, চিতােরে যেরূপ কীর্তিস্তম্ভ আছে, ইহাও সেইরূপ কোন বিরাট যুদ্ধের শেষে, পৃথ্বীরাজ কর্তৃক বিজয়ের নিদর্শনস্বরূপ নির্মিত হইয়াছিল। কালে ইহা জীর্ণ হইলে কুতুবুদ্দিন ইহা সংস্কৃত এবং আরবী অক্ষরে শশাভিত প্রবাসের পদ্ধ। করেন। আমার অনুমানের প্রধান কারণ এই যে, চিতােরের কত এই স্তম্ভটি ঠিক একরূপ। বলিয়াছি পৃথ্বীরাজের সাম্রাজ্য স্থাপিত হইতেছিল, কিন্তু হইল না। মহম্মদীয় ধর্মের বৈজয়ন্তী উড়াইয়া, মুসলমান দিগ্বিজয়ীরা ঘন ঘন ভারতের দ্বারে হানা দিতে লাগিলেন ; অনুন দশ বার পৃথ্বীরাজের বাহুবলে পরাজিত হইয়া পলায়ন করিলেন। কিন্তু হায়! হায় ! এমন সময়ে ভারতের চিরকলঙ্ক, চিরসৰ্ব্বনাশের কারণ অন্তর-বিরােবানল জ্বলিয়া উঠিল। পৃধী-শ্রীকাতর, কুলাঙ্গার, কান্যকুজপতি জয়চন্দ্র মহম্মদ ঘােরীর সঙ্গে যােগ দিল। বীরকুলােম পৃথ্বীরাজ রণক্ষেত্রে পতিত হইলেন। ভারতের কপাল বুঝি চিরদিনের জন্য ভাঙ্গিল ; ভারতের শেষ সূৰ্য্য চিরদিনের জন্য অস্তমিত হইল।

বর্তমান দিল্লী। পূৰ্বে তােমাকে যুধিষ্ঠিরের ইন্দ্রপ্রস্থ এবং পৃথ্বীরাজের দিল্লীর কথা লিখিয়াছি। যুধিষ্ঠিরের ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাচীর, বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের একটিমাত্র লৌহ স্তম্ভ, এবং পৃথ্বীরাজের “পিথােরা”-দুর্গের ভগ্নাবশেষমাত্র বর্তমান আছে। ভারতের বক্ষের উপর দিয়া, এমনই সৰ্ব্বধ্বংসী বিপ্লব চলিয়া গিয়াছে যে, পূৰ্ব্বকৃত দেবালয়ের প্রাঙ্গণে যে লৌহস্তম্ভটি আছে, লােকে তাহাকে “ভীমের গদা” বলিত। প্রবাদ, কোনও রাজা তাহার মুল দেখিবার চেষ্টা করেন। তাহাতে স্তম্ভ হইতে রক্ত উঠে এবং স্তম্ভ “ঢিলা” হইয়া যায়। “ঢিল্লী” হইতে দিল্লী” নাম হইয়াছে। কিন্তু স্তম্ভের অঙ্গে যে লিপি খােদিত আছে, তাহা এখন পুরাতত্ত্ববিগণ পড়িয়াছেন। তাহাতে লেখা আছে, রাজা “ধুব” কর্তৃক পনর শত বৎসর পূর্বে ইহা নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। সম্ভবতঃ ইনি বৌদ্ধ রাজা ছিলেন। দিল্লীত উপর দিয়া এমন বিপ্লব গিয়াছে যে, এ ঘটনাটি পৰ্যন্ত দিল্লীর পরুত্তী অধিবাসীগণ কেহ জানিত না। পৃথ্বীরাজের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়। কুতুবুদ্দিন প্রভৃতি প্রথম পাঠান সম্রাটেরা পৃথ্বীরাজের দিল্লীতে রাজধানী রাখেন। এই ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে ঈশ্বরের’নৈতিক রাজ্যের প্রমাণ সৰ্ব্বত্রে বিরাজমান রহিয়াছে। আলাউদ্দিনের পদ্মিনী-উপাখ্যান এবং চিড়ােয়- ধ্বংস শ্রবণ কর। আর এখানে দেখ, সেই আলাউদ্দিন যে প্রকা হিন্দু দেবালয় ভাঙ্গিয়া মসজিদ নির্মাণ করিতেছিল, তাহা অসম্পূর্ণ রহিয়াছে, তাহার রাজবাটী ধরাশায়ী হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। আফগান রাজ্যের জনৈক অধিনায়কের সমাধি, এখন ইংরাজদিগের প্রবাসের পত্র। “ডাকবাঙ্গালীতে পরিণত হইয়াছে। তাহার কবরের প্রস্তরখানি বারাণ্ডায় পড়িয়া রহিয়াছে! হরি! হরি! মানুষ কেমন করিয়া এমন হৃদয়হীনতার কাৰ্য্য করিতে পারে ? ‘টোগলক’ সম্রাটেরা ইহার কিঞ্চিৎ দূরে যমুনাতীরে নুতন দুর্গ ও নগর নির্মাণ করিতেছিলেন। তাহার ভগ্নাবশেষ পড়িয়া রহিয়াছে। “পিপােরা”-গড়ে এক দিকে এক ব্রাহ্মণ ঠাকুর অর্থ উপার্জনের জন্য মন্দির নির্মাণ করিয়া “যােগমায়া” নাম দিয়া এক যােগী পূজা করিতেছেন; পূজার মন্ত্রটিও জানেন না। অন্য দিকে দুটি পুরাতন গােলাকার কক্ষে, ডাকবাঙ্গালা স্থাপিত হইয়াছে। কালের বিচিত্র গতিতে এই মহা বীরভূমির কি পরিবর্তনই ঘটাইয়াছে! ডাকবাঙ্গালাতে বিশ্রাম করিয়া, বর্তমান বা নূতন দিল্লীতে ফিরিয়া আসি। পথে “সপদর জঙ্গের” বিরাট সমাধিমন্দির। তাহার চারি দিকে বিচিত্র- কারুকার্যখচিত আরও অনেকগুলি বহু পুরাতন সমাধিমন্দির বিষন্নভাবে দাঁড়াইয়া আছে। এ সকল পার হইয়া আসিয়া নুতন দিল্লী। আফগান সাম্রাজ্যও, কালে মােগল সাম্রাজ্যের ছাতে বিলুপ্ত হইল। তুমি পড়িয়াছ যে, মােগল সম্রাটেরা যদুবংশের সংশন। প্রথম মােগল সম্রাট বাবর এবং হুমায়ুন অতি বিচক্ষণ লােক ছিলেন। বীরত্ব এবং বিদ্যা একাধারে সম্মিলিত করিয়াছিলেন। যদুবংশের সন্তান বলিয়া হউক, কিম্বা মহাভারতের পুণ্য ঐতিহাসিক ভূমি বলিয়াই হউক, তাহারা বিলুপ্ত ইন্দ্রপ্রস্থে রাজধানী স্থাপন করিলেন। হুমায়ুন শের আফগান কর্তৃক পরাভূত হইয়া মারবারের মরুভূমিতে পলায়নকালে অমরকোটে সম্রাটচুড়ামণি আকবর জন্মগ্রহণ করেন। এই সময়ে হুমায়ুন যে মসজিদ নির্মাণ করিতেছিলেন, সের সা তাহা শেষ করেন। তাহার নাম “কিল্লা কোনা” মসজিদ। তাহার পার্শ্বে একটি উচ্চ

দিল্লী “সপদর জঙ্গের” সমাধি-মনির
৪০
পৃষ্ঠা
Mok.la Press, Calcutta,

No text on this page.

বৰ্ত্তমান দিল্লী। ৪১ ত্রিতল ক্ষুদ্র গৃহ নির্মাণ করেন। তাহার নাম “সের মঞ্জিল”। হুমায়ুন সের শাকে পরাভূত করিয়া রাজ্য পুনরুদ্ধার করিবার পর, ইহাতে তঁাহার পুস্তকালয় স্থাপন করেন। একদা তিনি সর্বোচ্চ কক্ষে বসিয়া নিবিষ্টমনে পড়িতেছেন, এমন সময়ে পার্শ্বস্থিত মসজিদ-শীর্ষ হইতে, ‘মােয়াজিন’ নমাজের সময় বিজ্ঞাপন করিল। হুমায়ুন ব্যস্ত হইয়া যেমন অবতরণ করিতেছিলেন, অমনই পদস্খলিত হইয়া, তৃতীয় সােপান হইতে গড়াইতে গড়াইতে একেবারে নীচে পড়িয়া যান। তাহাতে তাহার অপমৃত্যু ঘটে। তঁাহার কুলতিলক পুত্ৰ আকবর আগ্রাতে দুর্গ ও রাজধানী নিৰ্মাণ করেন, এবং তাহার পুত্র জাহাঙ্গীরও তথায় রাজত্ব করেন। সাহাজাহান, পুনরায় রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তরিত করিয়া, নূতন দিল্লীর দুর্গ ও গৃহাদি নির্মাণ করেন। ইহার সময়েই আগ্রা এবং দিল্লীর দুর্গের বিখ্যাত অট্টালিকা সকল ও “তাজমহল” নির্মিত হয়। স্থাপত্যকাৰ্য্য ইহার সময়ে যেন ভারতবর্যে চরম উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়াছিল। এখন দিল্লীর দুর্গের মৎে চল। প্রথমে “দেওয়ান আম” বা সাধারণ দর্শন- গৃহ। রক্ত প্রস্তর স্তম্ভ সারির উপর একটি সুন্দর গৃহ। তিন দিক খােলা, এক দিকে প্রাচীর, তাহার পশ্চাতে কয়েকটি কক্ষ। কক্ষটির দ্বিতলে, সম্রাটের সিংহাসন থাকিত। এ কক্ষটি শ্বেত মৰ্ম্ম- প্রস্তরের কারুকার্যে খচিত। এখানেই ময়ুরসিংহাসন থাকিত। তাহার নিয়ে একটি শ্বেত মৰ্ম্মরবেদী আছে! তাহার উপর উজির বসিতেন। বেদনপত্রাদি তিনি পাঠ করিয়া এক স্বর্ণপাত্রে রাখিতেন। এবং তাহা রজতশৃঙ্খলে উথিত হইয়া সম্রাটের সম্মুখে উপস্থিত হইত। তাহার পশ্চাতে যমুনাতীরে শ্বেতপ্রস্তরের শ্রেণীবদ্ধ অট্টালিকা শােভা পাইতেছে। কেন্দ্রস্থলে বিখ্যাত “দেওয়ান খাস”। মধ্য প্রবাসের পর। ইহারও তিন দিক খােলা। যমুনার দিকে প্রস্তরের ছিদ্রবিশিষ্ট গবাক। ইহার স্তম্ভ সকল এবং উপরের ছাদ, সুবর্ণে এবং নানাবিধ বর্ণে রঞ্জিত রহিয়াছে। চারি কোণের স্তম্ভের উপর, প্রাচীরে লেখা আছে, “যপি স্বরগ থাকে এই ধরাতলে, এখানে—এখানে—তাহা এখানে কেবল।” তাহার বামপার্শ্বে সেইরূপ কক্ষ সারি, সম্রাটের অন্তঃপুর । কক্ষগুলি অতিক্ষুদ্র, কিন্তু অতি মনােহর। যমুনার দিকে একটি গােল প্রাচীরহীন কক্ষ, গৃহের বহির্ভাগে শশাভা পাইতেছে। স্তম্ভের বিরাম- স্থানে আয়না বসান রহিয়াছে। কিন্তু এই অন্তঃপুরের কক্ষে কি অন্য কোথাও কপাট নাই। বহুমূল্য পুরু পর্দা, প্রত্যেক দ্বারে ঝুলান থাকিত। দেওয়ানখাসের অন্য পার্শ্বে মানের গৃহ। ইহার কক্ষগুলি অতি মনােহর। প্রাচীর এবং ছাদ কাচে সুসজ্জিত! যে দিকে চাহিবে, তােমার শত শত প্রতিবিম্ব দেখিবে। জানি না নুরজাহান প্রভৃতি কত সুন্দরীর প্রতিবিম্বই এ সকল কাচকক্ষে প্রতিভাত হইয়াছে। এক দিকে একটি কক্ষে জল গরম হইয়া প্রণালীপথে অৰ্ম্মরনির্মিত ক্ষুদ্র কুণ্ডে আসিত। ইহাতে সুন্দরীয়া অবগাহন করিতেন। চারি দিকে তাহাদের তৈলমর্দনের এবং আরামের কক্ষ রহিয়াছে। যখন শত শত সুন্দরীরা সম্রাটকে বেষ্টন করিয়া মান করিতেন, কেহ জলে, অর্ধ বা পূর্ণ নিমজ্জিতা, কেহ কক্ষে মদালসে উপবিষ্টা বা অর্ধশায়িতা, কেহ জলক্রীড়া করিতেছেন, কেহ বেড়াইতেছেন, কেহ হাসিতেছেন, কেহ গাহিতেছেন,-কেহ রসালাপ করিতেছেন, মরি মরি! কি রূপের ফোয়ারাই চারি দিকে খেলিতে থাকিত। সম্মুখে আর একটি কক্ষ। তাহার মধ্যস্থলে পদ্মের মত একটি কুণ্ড। তাহাতে গােলাপজল রক্ষিত হইয়া, গৃহ সুবাসিত করিয়া

* *
দিল্লী দেওয়ান খাস”
৪২ পৃষ্ঠা
Mohila Press, Calcutta.

No text on this page.

' বর্তমান দিল্লী। ও রাখিত! এরূপ আরও তিন চারিটি কক্ষ আছে। কে বলিবে, তাহা কি কার্যে ব্যবহৃত হইত। স্নান কক্ষের সম্মুখেই “মতি-মসজিদ”। শ্বেত প্রস্তরে নির্মিত। ইহাতে রঙ্গের কাৰ্য্য নাই, কেবল খেত মর্মরের উপর কারুকাৰ্য। প্রকৃতই ইহা মসজিদের মধ্যে একটি মতি। গৃহটি কি সুন্দর! এখানে সম্রাটকে বেষ্টন করিয়া, অন্তঃপুর- বাসিনীরা নমাজ পড়িতেন। পুরাতন দিল্লী হইতে নূতন দিল্লীতে অসিতে, পথে একটি প্রকাণ্ড সমাধিস্থান দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাতে নিজামদ্দিন নামক জনৈক বিখ্যাত ফকিরের একটি শ্বেতমৰ্ম্মরনিৰ্ম্মিত সমাধি আছে। গৃটি অতি সুন্দর। তাহার কিঞ্চিৎ দূরে একই প্রাঙ্গণে কবি খসরুর সমাধি। ইহাতে তুমি বুঝিবে, মুসলমান সম্রাটেরা কবিদিগের যথেষ্ট সম্মান করিতেন। তাহারই পার্শ্বে মরি! মরি! কি হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য ! যখন মােগলকুলের কংস আরঙ্গজিব, আপন পি সাহাজাহানকে বন্দী করিলেন, তাহার কন্যা জেহানার চিরকৌমাৰ্য ব্রত অবলম্বন করিয়া পিতার সেবার জন্য তাহার সঙ্গে কারাবাসিনী হন। তঁাহার একটি ক্ষুদ্র মর্মর কবর, মধ্যস্থান শ্যামল দূৰ্ব্বাদলে শোভিত। কবরের শীর্ষদেশে একটি শ্বেত মৰ্ম্মরফলকে, তাহার নিজের রচিত একটি কবিতা লিখিত রহিয়াছে ;- করিও না সুসজ্জিত কবর আমার। তৃণ শ্রেষ্ঠ আবরণ দীন-আত্মা জেহানারা সম্রাট-কন্যার।” পিতৃপায়না জেহানারা রমণীদিগের জন্য পিতৃভক্তির এবং পবিত্রতার কি আদর্শই রাখিয়া গিয়াছেন! আমি আকবরের ০ “বহুমুল্য আবরণে প্রবাসের পর। সমাধিকে ভিন্ন, আর কোনও সমাধিকে প্রণাম করি নাই। জেহানারার সমাধিকে আমি ভক্তিভরে প্রণাম করিলাম। স্থানটি দেখিয়া আমার কলুষিত হৃদয়ও যেন পবিত্র হইল। স্থানটা একটি মহাতীর্থ । সমদর্শিনী নীতিতে মহামতি আকবর যে সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়া- ছিলেন, নরাধম আরজিবের দুর্নীতিতে এবং ধর্মোৎপীড়নে, শিবজীর অসিঘাতে, তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িল। দুর্গের বাহিরে প্রকাণ্ড “জুমা মসজিদের গগনস্পর্শী স্তম্ভ-শিরে দাড়াইয়া দিল্লী দর্শন করিলে বােধ হয় যেন মুসলমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস চক্ষের সম্মুখে প্রসারিত রহিয়াছে। হৃদয় কি ঐতিহাসিক স্মৃতিতেই আন্দোলিত হইতে থাকে। মানবের সম্পদ ও গৌরব কি জলবিম্ব বলিয়াই ধারণা হয়। ইচ্ছা করে না যে, সেই স্তম্ভশিরে অধিরােহণ করিয়া আবার সংসারে প্রবেশ করি। পাপমতি আরজিবের সঙ্গে মােগল সাম্রাজ্য ডুবিল। শিবজী তাহার ভিত্তি পৰ্য্যন্ত চঞ্চল করিয়া গিয়াছিলেন। ভারতের অদৃষ্ট-ক্ষেত্র পাণিপথ যুদ্ধক্ষেত্রে, তাহা নাদের সাহার অসিপ্রহারে টুলিয়া পড়িল। নৃসংশ ‘নাদের’ দিল্লী লুণ্ঠন করিয়া, নগরকেন্দ্রস্থলস্থিত এক মসজিদের উপর হইতে, দিল্লীবাসীদের বধাজ্ঞা প্রচার করিল। নরশােণিতে দিল্লী ভাসাইয়া যমুনাকে রক্তবর্ণা করিল। দিল্লী বিলুপ্তপ্রায় হইল। মােগল সাম্রাজ্য শােণিতস্রোতে ভাসিয়া কালসাগরে চিরদিনের জন্য বিলীন হইল। “আহা! কি কুদিবসে গ্রাসিল রাহু, মােন হইল না আরও। “ভাঙ্গিল চুর্ণিল, উলটি পালটি, লুটি নিল যাহা ছিল সারও।” সেই বধভূমি এখন একটি ফোয়ারার দ্বারা চিহুিত আছে। আজ নার না। আজ দিল্লী-দর্শন-কাহিনী শেষ করিব। নরপশু নাদের

৪৪
দিল্লী “জুমা মসজিদ
Mohila. Press, Calcutta.
পৃষ্ঠা

No text on this page.

বর্তমান দিল্লী। ১৫ সাহ দিল্লী লুণ্ঠন করিয়া এবং নরহত্যাস্রোতে দিল্লী ভাসাইয়া কােশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। মােগাজলক্ষ্মী আর মাথা তুলিতে পারিলেন। । তাঁহার ছায়া ক্রমে বৃটিশ বৈজয়ন্তী ছায়াতলে বিলীন হইল। যে ইংরাজ মােগলের ছায়াতে ভারতে বাণিজ্য করিতে আইসে, সে মােগলের সিংহাসনে বসিল। আকবরের উত্তরাধিকারীকে তার বৃত্তিভােগী হইয়া, সামান্য ব্যক্তির মত দিল্লী নগরে বসতি করিতে হইল। ময়ুসিংহাসন নাদের সাহা লইয়া গিয়াছিল, দেওয়ান-আম, দেওয়ানবাস বৃটিশ সৈন্তনিবাস হইল। বৃটিশ রাজ্য ক্রমে বিস্তৃত হইয়া, পাঞ্জাৰ পৰ্য্যন্ত পরিব্যাপ্ত হইল। রণজিৎ সিংহের ভবিষ্যদ্বাণ সত্য হইল। ভারতের মানচিত্র 'লাল হইয়া গেল। কিন্তু রাজার উপর একজন মহারাজা, শক্তিমানের উপর একজন মহাশক্তিমান আছেন। তাহার ইচ্ছা, তাহার শক্তি অজ্য। ঝাসির বী-রাণী লক্ষ্মী’ ৰাই সিংহিনীর মত গর্জন করিয়া বলিলেন,-“মের ঝালী নেহি দেলে।” সিপাহীবিদ্ৰোহানল জ্বলিয়া উঠিল, বৃটিশ, সিংহাসন টল টল করিতে লাগিল। দিল্লী ভারতের যুগযুগান্তরীন রাজধানী। বিদ্রোহীগণ চারি দিক হইতে দিল্লীতে সমবেত হইল। বৃত্তিভােগী বৃদ্ধ মােগল সম্রাটের উত্তরাধিকারীকে, বলে যষ্টির মত দাঁড় করাইয়া, মােগল সাম্রাজ্য বিঘােষিত করিল। শিখ সৈন্য সহায় করিয়া, ইংরাজ দিলী আক্রমণ করিলেন। দিল্লীর চারি দিকে দৃঢ় উচচ প্রাচীর। তাহার বিশাল নগর ব্যয় সকল রুদ্ধ। পার্শ্বস্থিত অনুচ্চ শৈল-শেখর, হইতে ইংরাজ “কাশ্মীর দ্বারের উপর গােল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু দ্বার এত দৃচু যে, প্রায় চারি মাস গেল বর্ষণ করিয়াও তাহ বিনষ্ট করিতে পারিলেন না। প্রশেষে-মৃত্যু সংকল্প করিয়া, কতক সৈন্য বিদ্রোহীদিগের অগ্নিবৃষ্টিপার হইয়া আসিয়া প্রাচীরের তলে পাকার বারুদ রাখিয়া, অখিলবােগ ৪৬ প্রবাসের পত্র পারিত। দ্বারা প্রাচীরের এক স্থলে সুরঙ্গ করিয়া, অমিতপ্রতাপে সেই সুরঙ্গ দিয়া দিল্লী প্রবেশ করিল। বারুদের নির্ঘাতে এবং নির্ঘোষে ভূমিকম্প হইল, দিল্লী কপিল, বিদ্রোহীরা টলিল, পলায়ন করিতে লাগিল। দিল্লী আবার নরশােণিতে প্লাবিত হইতে লাগিল। বিদ্রোহীদিগের নায়ক কেহই ছিল না, প্রকৃত যুদ্ধবিদ্যা কেহই জানিত না। যদি নগরে অবরুদ্ধ হইয়া না থাকিয়া, তাহারা বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করিত ৪০,০০০ বিদ্রোহী এক ফুৎকারে ক্ষুদ্র ইংরাজ সৈন্য উড়াইয়া দিতে সেনাপতি এবং নীতিশূন্য বিদ্রোহীগণ, কর্ণধারশূন্য অর্ণবযানের ন্যায়, এই ঝটিকায় উড়িয়া গেল। বিজয়ী নিকলস, নগর প্রাচীরের উপর দাঁড়াইয়া পলায়নপর বিদ্রোহীদিগের ধ্বংসসাধন করিতেছিলেন, পার্শ্বস্থিত একটি কক্ষে লুকায়িত জনৈক বিদ্রোহীর গুলিতে তিনি পতিত হইলেন। কাশ্মীরদ্বারের অবস্থা ঠিক সেইরূপ ভাবেই রক্ষিত হইয়াছে। ইহার প্রত্যেক তােপের গোলার দাগে, প্রত্যেক ভগ্নাংশে সিপাহীবিদ্রোহের ইতিহাস অঙ্কিত রহিয়াছে। নিকলসন বিজয়ের সময়ে যেখানে পড়িয়াছিলেন, সেই স্থানটিতে একটি স্মৃতিলিপি আছে। শৈলমালার যে শৃঙ্গ হইতে দিল্লীতে গােল বর্ষণ করা হয়, তথায় এখন মনােহর “বিজয়স্তম্ভ” বিরাজ করিতেছে। যুদ্ধে যাহারা পড়িয়াছিলেন, তাহাদের নাম তাহার চারি পার্শ্বে মুদ্রিত রহিয়াছে। অনতিদুরে যে “হিন্দু রাওর” অট্টালিকাতে ইংরাজগণ সমবেত হইয়াছিলেন, এবং যে গৃহে মহিলাগণ রক্ষিত হইয়াছিলেন, তাহা এখনও বিদ্যমান আছে। তাহাদের মধ্যস্থলে ধর্মাশােকের ২,০০০ বৎসর পূর্বের নির্মিত একটি নীতিম্ভ, উপরিউক্ত বীরত্বের নিদর্শনের সঙ্গে ধর্মের প্রতিযােগিতা করিতেছে, এবং নীরবে পার্থিব গৌরব ও সাম্রাজ্যের নশ্বরতা বিজ্ঞাপিত করিতেছে।

দিল্লী “কাশ্মীর-দ্বার” ৪৬ পৃষ্ঠা Mohila Press, Calcutta.

No text on this page.

বর্তমান দিল্লী। ৪৭ দিলীবিজয়ের পর বৃত্তিভােগী সম্রাটের পুত্রগণ প্রাণভয়ে হুমায়ুনের সমাধিতে পলায়ন করিয়াছিলেন। এই বৃহৎ ও শিল্পনৈপুণ্যপূর্ণ সমাধি ইন্দ্রপ্রস্থের নিকটে অবস্থিত। হুমায়ুনের পত্নী হাজি বেগম ইহা নির্মাণ করিতে আরম্ভ করেন, এবং তাঁহার পুত্র সম্রাট আকবর শেষ করেন। সমাধিটি একটি ক্ষুদ্র দুর্গ বলিলেও হয়। ইংরাজ সেনাপতি হডসন ইহা আক্রমণ করেন, এবং আত্মসমর্পণ করিবার জন্য সম্রাটকুমারদিগের কাছে সংবাদ প্রেরণ করেন। জনশ্রুতি এই যে তাহাদের প্রাণের কোনও বিঘ্ন হইবে না বলিয়া আশ্বস্ত করা হইলে, তাঁহারা আত্মসমর্পণ করেন। তখন সেনাপতি হন্ এই শিশুদিগকে দিল্লীদ্বারের কাছে বন্দীভাবে লইয়া গিয়া, স্বহস্তে তাহাদিগকে গুলি করিয়া বধ করেন। নিরপেক্ষ ইতিহাস হড়সনের কৃত কার্যের বিচারে কি রায় প্রকাশ করিবেন জানি । তবে ইহা নিশ্চিত যে এই হড়স হস্তেই জগদ্বিখ্যাত মােগল- সামাজ্যের শেষ ছায়াটি পর্যন্ত বিলুপ্ত হইল। ইহার পর ইংরাজ-রাজ্য দিল্লীতে পুনরভিষিক্ত হইল। মানবের ইতিহাস কি শিক্ষার স্থল ! বিশ্বেশ্বরের বিশ্বরাজ্যের নীতিসমূহ কি দুরদর্শী, কি দুর্লঙ্ঘ্য! তাই বলিয়াছি দিল্লী হিন্দুদিগের মহাশ্মশান; মুসলমানদিগের পাঁচটি সাম্রাজ্য দিল্লীর ধুলাতে বিলীন হইয়া গিয়াছে। একে একে পাঁচটি সাম্রাজ্যের ইতিহাস, পাপের পতন, দুৰ্ব্বলের ধ্বংস, সবলের উত্থান, কর্মহীনের লয়, কৰ্মীর বিজয়, নররাজ্যের নশ্বরতা, সৃষ্টিরাজ্যের অবিনশ্বরতা, অধর্মের ক্ষয়, ধর্মের জয়, দিল্লীর অঙ্গে অঙ্গে অতি রহিয়াছে। পাঁচটি সাম্রাজ্যের ভস্ম অঙ্গে মাখিয়া দিল্লী আজি কি উদাসীন মুর্তিই ধারণ করিয়াছে। এত সাম্রাজ্যের উত্থান পতন, এত বিপ্লব, পৃথিবীতে আর কোনও নগর দর্শন করে নাই, ভারত ভিন্ন পৃথিবীর আর কোনও দেশ দর্শন করে নাই, হিন্দুজাতি ভিন্ন অন্য কোনও জাতি এত বিপ্লবতরঙ্গাভিঘাতে জীবিত ৪৮ বাসের পর। থাকিতে পারে নাই। নােম নাই, গ্রীস নাই, তাহাদের অপেক্ষা প্রাচীন জরত আছে। সেই গােমজাতি, সেই গ্রীকজাতি নাই, কিন্তু তদপেক্ষা পুরাতন হিন্দুজাতি কালাৰশিষ্ট হইয়াও এখন আছে। ভারত পড়ে, ময়ে না। হিন্দুজাতি বলহীন হয়, জীহীন হয় না। কর্মহীন হয়, ধর্মহীন হয় না। ধর্মের সঙ্গে কর্মের যােগ হইলে, আবার মাথা তুলিয়া উঠিবে। ৰাহুবল নয়, ধর্মবল অমর।

No text on this page.

Yr
Par
ta
EA UNION

আগ্রা । পূৰ্ব্ব-পত্রে দিল্লীর কথা শেষ করিয়াছি। দিল্লীতে এক দিন হােটেলে, এবং দুই দিন বন্ধু পূর্ণচন্দ্র মুখােপাধ্যায় কালেজের প্রফেসরের বাসায় ছিলাম ; আহার যােগাইতেন দিল্লীর স্বনামখ্যাত ডাক্তার শ্রীযুক্ত বাবু হেমচন্দ্র সেন। ইহারা দুটি দিন কি যত্নই করেন। দার্জিলিঙ্গে যে সর্দি হইয়াছিল, তাহা দিল্লী পৰ্যন্ত ভুগিতেছিলাম। হেম বাবু খাওয়াইলেন, চিকিৎসা করিলেন, আসিবার সময়ে ঔষধ, সঙ্গে দিলেন। আমি বলিলাম, আমি ঠিক যেন কবি হেম বাবুর “বাঙ্গালীর মেয়ের অবস্থা প্রাপ্ত হইলাম, “খেয়ে যায়, নিয়ে যায়, আর যায় চেয়ে, “হায়! হায়! ওই যায় বাঙ্গালীর মেয়ে।” দিল্লী হইতে আগ্রায় আসি। আগ্রায় প্রথম সেকেন্দরা দেখিতে সেকেন্দরা সম্রাট আকবরের সমাধি, আগ্রা হইতে প মাইল ব্যবধানে অবস্থিত। বাবর ও আকবরের হিন্দুধর্মের প্রতি যে প্রবণতা ছিল, তজ্জন্য গোঁড়া মুসলমানেরা যে তাহাদিগকে কাফের বলিত,-সেকেন্দরা দেখিলে তাহা বিলক্ষণ বলিতে পারা যায় । সেকেন্দরাটি ঠিক যেন একটি হিন্দুর দেবালয়। মুসলমান সমাধির সেই গােলাকার গুম্বেজের চিহুমাত্র নাই। হিন্দু-দেবালয়ের চুড়া স্তরে স্তরে সজ্জিত রহিয়াছে। সকল সমাধিতেই মূল কবর মাটিতে ; তাহা মাটির স্তুপমাত্র। এই শুপের উপরের গৃহে, ঠিক একটি কবরাকৃতি, প্রস্তর কিম্বা ইষ্টকের দ্বারা নির্মিত হয়। এই কবর- কক্ষটি সেকেন্দরাতে বড় অন্ধকার। সম্রাট আকবরের পােক যাই। • ৪ প্রবাসের পত্র। যেমন আড়ম্বরশূন্য ছিল, তাহার কবরও সেইরূপ। তাহা কেবল একটি নির্মল শ্বেত প্রস্তরের বেদীমাত্র। গবর্ণর জেনেবল লর্ড নর্থব্রুক, এক সহস্র টাকা মূল্যের একখানি ছাদ না কি প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। তাহাও শুনিলাম, মােল্লাগণ চুরি করিয়াছেন। অট্টালিকার ত্রিতলে একটি শ্বেতমৰ্ম্মরনিৰ্ম্মিত অতি সুন্দর কক্ষ আছে। ইহাতেও শ্বেতমৰ্ম্মরের একটি কবরাকৃতি আছে। পূৰ্বে দ্বিতল সুবর্ণে ও অন্য বর্ণে রঞ্জিত ও চিত্রিত ছিল। তাহা কালে মলিন হইয়া গেলে, পুনঃসংস্কার করা বহু ব্যয়সাধ্য বলিয়া, ইংরাজরাজ তাহার উপর চুণ-কাম করিয়া দিয়াছেন। সমাধিটি এখন দেখিতে ঠিক যেন শ্বেতবসনাবৃতা শােকাতুরা হিন্দুবিধবা। চারি দিকে প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণ উদ্যানে সজ্জিত ছিল। এখনও দুই চারিটি গাছ ও ফুল আছে । একটি সুন্দর গােলগৃহ সেই প্রাঙ্গণের এক পার্শ্বে এখন ইংরাজদিগের আরামগৃহের কাৰ্য্য করিতেছে। আমি যে দিন দেখিতে যাই, সে দিন বহুতর সৈন্য ও তাহাদের কর্মচারীর বিহার করিতে আসিয়া- ছিলেন। সেকেন্দরা বহুকক্ষবিশিষ্ট। দুই একটি কক্ষে আরও দুই একটি কবর আছে। আকবর মনে করিয়াছিলেন, তাঁহার উদার রাজনীতিবলে হিন্দুমুসলমানকে মিলিত করিয়া যে সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছেন, তাহা অক্ষয় হইবে। কক্ষে কক্ষে তাহার উত্তরাধিকারী- গণের কবর হইবে। তিনি জানিতেন না যে, তিন পুরুষ না যাইতে, আরজিব সেই নীতির বিপৰ্যয় ঘটাইয়া, সেই সাম্রাজ্যের ধ্বংসের পথ পরিষ্কার করিয়া যাইবেন। আজ সেকেন্দরার সমুদয় কক্ষ শূন্য পড়িয়া আছে।' প্রাঙ্গণের বহিভাগে আর একটি প্রাঙ্গণবিশিষ্ট ক্ষুদ্র দ্বিতল অট্টালিকা আছে। শুনিলাম আকবরের মৃত্যুর পর তাঁহার পত্নী, যােধপুররাজকন্যা, যােধ বাই ইহাতে বাস করিতেন। মুসলমানী,

No text on this page.

-~~~
আগ্রা “তাজমহল"
পৃষ্ঠা
Mohila Press, Calcutta.

লাগ্রা। হইবার পরও, রাজপুত মহিষীগণ হিন্দুরমণীর পাতিব্ৰত্য রক্ষা করিতেন। অপরাহ্নে প্রথমতঃ যমুনা পার হইয়া “রাম বাগ” বা “আরাম বাগ” দেখিতে যাই। এটি যমুনার উপর একটি বৃহৎ উদ্যান। যমুনার গর্ভ হইতে ইহার প্রাচীর সরলভাবে উঠিয়াছে। তাহার পর এতমাদদ্দৌলা দেখিতে যাই। এটি নুরজাহানের মাতার এবং পিতার সমাধিগৃহ। সেই ভুবনমােহিনীর জনক জননী পাশাপাশি নিদ্রা যাইতেছেন। সমাধিটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হইলেও, শ্বেতমৰ্ম্মর প্রস্তরের এরূপ সুচারু অট্টালিকা, যেন আর দেখি নাই। ঠিক যেন একটি ছবি। চারি দিকে সুন্দর ফলপুষ্পের উদ্যান এখনও রক্ষিত হইয়াছে। তাহার পর যমুনা পার হইয়া আসিয়া, জগদ্বিখ্যাত তাজমহল এ জীবনে দ্বিতীয় বার দেখিতে যাই। তাজ তুমি দেখিয়াছ, অতএব তাহার কথা আর কি লিখিব ? যিনি, তাজ দেখিয়াছেন, তিনি যিনিই হউন, মােহিত হইয়াছেন। এক জন লিখিয়াছেন, “তাজ প্রকৃতই একটি কবিতা। উহা কেবল স্থাপত্যের একটি বিশুদ্ধ আদর্শ নহে; উহা এরূপ সৃষ্টি যে, তাহাতে কল্পনার পরিতৃপ্তি হয়, কারণ সৌন্দৰ্য্যই উহার বিশেষ লক্ষণ। তুমি কি কখনও আকাশে দুর্গ নির্মাণ করিয়াছ? এই দেখ, একটি আকাশ হইতে মর্ত্যে আনীত হইয়াছে, এবং অনন্তকালের বিস্ময়ের জন্য এখানে স্থাপিত হইয়াছে। তথাপি উহা এমনই লঘুভার, এমনই বায়ুবৎ বােধ হয়, দুর হইতে দেখিলে, উহার গগণস্পর্শী চুড়াবলীসহ এমনই শিশির এবং সূৰ্যালােকে নির্মিত অট্টালিকা, সূর্যকিরণে ফুটনােম্মুখ একটি রজতবিম্ব বলিয়া বােধ হয় যে, উহাকে স্পর্শ করিবার এবং ૯૨ প্রবাসের পুত্র। উহার চূড়াতে চড়িবার পরও, উহা প্রকৃত কি না তােমার সন্দেহ হয়।” স্লীমেন বলেন ;—“তাজদর্শনের পর, আমি আমার স্ত্রীকে অট্টালিকাসম্বন্ধে তাহার মত জিজ্ঞাসা করি। তিনি উত্তর করিলেন, আমি কি মনে করি, তাহা তােমাকে বলিতে পারি না, কারণ এরূপ একটি অট্টালিকা সমালােচনা করিবার শক্তি আমার নাই। তবে আমার হৃদয়ের ভাব তােমাকে বলিতে পারি। এরূপ একটি সমাধি পাইবার জন্য আমি কাল মরিতে পারি।” তাজ দর্শন করিয়া যে পথে তােমাকে লইয়া বেড়াইয়াছিলাম, কেবল সেই পথেই বেড়াইলাম। যে স্থানে তােমাকে লইয়া বসিয়াছিলাম, কেবল সেই স্থানেই বসিলাম। উদ্যানের অন্য পথে যাইতে কি অন্য অংশ দেখিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না। সেই পূৰ্ব্ব-দর্শন-স্মৃতিতে এবং আর এক- খানি মুখের স্মৃতিতে আমি বিহ্বল হইয়া উঠিয়াছিলাম। তাহার পর আগ্রার দুর্গ দেখিতে গেলাম। এই দুর্গ আকবর নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। মুসলমানেরা বলেন, তিনি এই নগরের নাম এ জন্য আকরাবাদ রাখিয়াছিলেন। তাহা হইতে আগ্রা। হিন্দুরা বলেন, “অগ্রব’ ইহার পূর্ব নাম ছিল, তাহা হইতেই আগ্রা। দিল্লীর মত আগ্রাতে ঠিক সেইরূপ দেওয়ানআম, দেওয়ানখাস, শিশমহল, মতিমসজিদ, দুর্গের বাহিরে জুম্মা মসজিদ পৰ্যন্ত আছে। তবে অগ্রার অট্টালিকাগুলি অপেক্ষাকৃত বড়। কিন্তু দিল্লীর অট্টালিকা আমার চক্ষে অপেক্ষাকৃত সুন্দর বােধ হইয়াছিল। গৃহ সকল ঠিক দিল্লীর মত যমুনার তীরে অবস্থিত, ঠিক সেইরূপ- “পড়ি জল নীলে ধবল সৌধ ছবি অনুকারিছে নভ অঞ্জন ও।” দেওয়ান-খাসের ও স্নানাগারের মধ্যবর্তী প্রাঙ্গণে এক পার্শ্বে একটি

আগ্রা দুর্গ
পৃষ্ঠা
Mohila Press, Calcutta,

No text on this page.

অর্থ। কৃষ্ণ এবং অন্য পার্শ্বে অার একটি শ্বেতমৰ্ম্মর আসন রক্ষিত হইয়াছে। আমাদের পাণ্ডা বলিলেন, প্রথমটিতে স্বয়ং আকবর এবং দ্বিতীয়টিতে তাঁহার হিন্দুমন্ত্রী খ্যাতনামা বীরবল বসিয়া সান্ধ্য গগনতলে যমুনার লহরী দেখিতে দেখিতে মন্ত্রণা ও গল্প করিতেন। যাট সূৰ্য্যমল দিল্লী জয় করিয়া প্রথম আসনে বসিলে, আসন মনােদুঃখে বিদীর্ণ হইয়া যায় এবং রক্ত উদগীরণ করে। পাণ্ডা সেই বিদীর্ণ রেখা ও একটি লাল দাগ রক্ত বলিয়া দেখাইলেন। অন্য দিকে অন্তঃপুরকক্ষের সংলগ্ন, রক্তপ্রস্তরে নির্মিত, আর একটি প্রকাণ্ড অন্তঃপুর-মহল আছে। এটি রাজপুতকন্যা যােধা বাইয়ের মহল বলিয়া খ্যাত। তিনি মুসলমান মহিষীগণ হইতে স্বতন্ত্র থাকিতেন এবং এই মুসলমান অন্তঃপুরে হিন্দু আচার ব্যবহার রক্ষা করিতেন। দেওয়ান-খাসে দাঁড়াইয়া যমুনার দিকে চাহিয়া মনে হইল,- “তব জল কল্লোল সহ কত সেনা “নাদিল কোনও দিন সমরে ও। “তব জল বুদবুদ সহ কত রাজা “পরকাশিল, লয় পাইল ও। “আজি সব নীরব রে যমুনে। সব “গত তব বিভৰ কালে ও।” দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া, সুললিত যমুনা-লহরী' বিষাদময়-হৃদয়ে গাহিতে গাহিতে আগ্রা-দর্শন শেষ করিয়া গৃহে ফিরিয়া আসিলাম।

জয়পুর। আগ্রা হইতে আমরা জয়পুর যাই। দিল্লীর ডাক্তার হেম বাবুর জ্যেষ্ঠ সহােদর সংসারচন্দ্র সেন জয়পুরের মহারাজার প্রাইভেট সেক্রেটারী। তাঁহার মন্ত্রীও একজন বাঙ্গালী-কান্তিচন্দ্র মুখােপাধ্যায়। ইহারা উভয়ে জয়পুর স্কুলের শিক্ষক হইতে এরূপ উচ্চ পদ অধিকার করিয়াছেন। আমরা সংসার বাবুর অতিথি হই। যেখানে বাঙ্গালী, সেখানে দুর্গাকালী, সেখানে পাঁঠালী, আর সেখানেই দলাদলি। জয়পুরে পঁহুছিয়াই আমরা প্রথমতঃ রাজবাটী দর্শন করিতে যাই। একটি প্রকাণ্ড নগরের অষ্টম ভাগ বাপিয়া এই রাজবাটী। অতএব ইহার বর্ণনা কি করিব ? ইহা একটি মনােহর হাবলীর উদ্যান বলিলেও হয়। এক পার্শ্বে একটি প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণের চারিদিকে সমুদয় বিচারালয় ও কাৰ্যগৃহ সজ্জিত রহিয়াছে। রাজাদিগের রাজ্যে উচ্চতম কর্মচারীরাও ফরাসে তাকিয়া ঠেস দিয়া বসিয়া, যাবতীয় রাজকাৰ্য্য ও বিচারকার্য নির্বাহ করেন। এখানে আইনকানুনের তত ঘটা নাই, নর-রক্ত-শােষক জলোক। উকিল মােক্তারের হট্টগোল নাই। বিচারকার্য একরূপ মােটামুটি সরল ও সহজভাবে নিষ্পন্ন করা হয়। বৃটিশ রাজ্যের ন্যায়, আইনকানুনের সুবিচার ও সূক্ষ্ম তর্কে পড়িয়া, প্রজাদের প্রাণান্ত হয় না। প্রেমিক বৈষ্ণব কৰি বলিয়াছেন, “পরাণ ছাড়িলে পিরীত না ছাড়ে।” বৃটিশরাজ্যেও ভাই, “পরাণঘড়িলে উকিলে না ছাড়ে।”

জয়পুর। হিন্দুরাজ্যে বিচারকার্য কিরূপ সহজে নিষ্পন্ন হইত, এ সকল স্থান ৫খিলে কতক বুঝিতে পারা যায়। তবে ক্রমে ক্রমে সকলই “লাল” হইয়া যাইতেছে। অন্য প্রাঙ্গণে “দেওয়ান-আম,” তৃতীয় প্রাঙ্গণে “দেওয়ান-খাস,” শ্বেতমৰ্ম্মর প্রস্তরের দুগ্ধ-ফেণ-নিত অমল ধবল শােভায় শােভা পাইতেছে। ইহাদের স্তম্ভের অবসরে, নানা বর্ণের পুরু পর্দা ঝুলান রহিয়াছে এবং গৃহ বহুমূল্য উপকরণে ও স্ফটিক ঝাড়ে সজ্জিত রহিয়াছে। এই দুই গৃহ দেখিলে, দিল্লীর ও আগ্রার দেওয়ান-গৃহ সকল কিরূপ সজ্জিত থাকিত, বুঝিতে পারা যায়। রাজবাটীর কেন্দ্রস্থলে মহারাজার আবাসভবন ‘চন্দ্রমহল। একটি প্রকাণ্ড ত্রিতল অট্টালিকা, বহুমূল্য ইংরাজী উপকরণে সজ্জিত। তাহার পশ্চাতে প্রশস্ত পুষ্পেদ্যান, জলপ্রণালীতে বিভক্ত এবং ফোয়ারাতে শােভিত। উদ্যানের অপর প্রান্তে ‘গােবিন্দজীর মন্দির। বৃন্দাবন হইতে আনীত হইয়া গােবিন্দজী এই রাজপুরী মধ্যে স্থাপিত হন। মূৰ্ত্তিটি কৃষ্ণপ্রস্তর-নির্মিত বড় সুন্দর বলিয়া শুনিলাম। কিন্তু আমি তেমন অসামান্য সৌন্দৰ্য কিছু দেখিলাম না ! পূজক ব্রাহ্মণ বাঙ্গালী। একদল রাজপুতনী বসিয়া কৃষ্ণলীলা কীর্তন করিতেছে, মধ্যস্থলে একজন অর্ধনগ্ন পুরুষ দাঁড়াইয়া ভক্তিভরে নৃত্য করিতেছে। দৃশ্যটি হৃদয়স্পর্শী, অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া দেখিলাম ও শুনিলাম ! তাহার পর মৃত মহারাজা রাম সিংহের বৈঠকখানা দৈখিলাম। উহা এখন বিলিয়ার্ড খেলার গৃহ হইয়াছে। উহার উপকরণে এখন ‘চন্দ্রমহল’ সজ্জিত হইয়াছে। তাহার পর ‘বাদলমহল’।, ইহা একটি বৃহৎ নীল সলিলপূর্ণ সরসীতীরে শােভিত। সম্মুখে উদ্যা, পশ্চাতে খবর। অট্টালিকা সুন্দর, সুশীতল। বর্ষাকালে মহারাজ এনে প্রবাসের পত্র এক দিন দরবার করেন। রাজবাটীর আর এক প্রান্তে ‘হাওয়াই মহল’ বহু তলায় একটি অতি উচ্চ রথের মত শােভা পাইতেছে। বােধ হয় এই অট্টালিকাতে গ্রীষ্মকালে বেশ বাতাস খেলে বলিয়া ইহার নাম ‘হাওয়াই মহল’। মহল হইতে মহলান্তরে এবং রাজ- বাটীর সর্বত্রে বিচরণ করিবার জন্য, আবৃত ইষ্টকনিৰ্ম্মিত পথ সকল শ্বেত লতার মত চারি দিকে নির্মিত হইয়াছে। পুরবাসী অসূৰ্য্যম্পশ্যা রূপসীরা এই সকল পথে সৰ্ব্বত্রে যাতায়াত করেন। মহারাজা যে রাত্রি যে মহিষীর সঙ্গে অতিবাহিত করেন, আদেশ করিলে তিনি সজ্জিতা হইয়া, এই সকল পথে, ‘চন্দ্রমহলের অপর পার্শ্বস্থিত অন্তঃপুর মহল হইতে পােষিতভর্তৃকা হইয়া অভিসারে উপস্থিত হন। তুমি যদি একজন রাজমহিষী হইতে, তবে কি করিতে বল দেখি? অথচ ইহারাই অম্লানবদনে স্বামীর চিতারােহণ করিতেছেন। শুধু তাহা নহে। বর্তমান মহারাজা একজন বৃন্দাবনের ভিখারীমাত্র ছিলেন। সে কথা পরে বলিব। তিনি জয়পুরের সিংহাসন পাইবার পর, যােধপুরের রাজকন্যাকে ইহাদের রাজনীতি অনুসারে বিবাহ করুেন। কিন্তু তিনি তাঁহার পূর্ব স্ত্রীকে, শুনিলাম, সমধিক ভাল বাসে। একদা রাজা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার কিছু যদি বাঞ্ছনীয় থাকে আমাকে বল, তুমি আমায় কখনও কিছু চাই নাই। পতিব্রতা সতী উত্তর করিলেন; “আমার কিছুই বাঞ্ছনীয় নাই। লােকে আশীর্বাদ করে, তাের স্বামী মহারাজা হউক। বিধাতা, আমার স্বামীকে মহারাজা করিয়াছেন, অতএব আমার আর বাঞ্ছনীয় কি হইতে পারে ?” মহারাণী হইয়াও ইহার চরিত্রের কিছুমাত্র রুপান্তর হয় নাই। ইনি রাজার মহিষীভার গ্রহণ না “কয়া, দাসীভাবে পূৰ্ব্ববৎ তাঁহার সেবা করেন। এক পাত্রে আম

৫৬ পৃষ্ঠা
জয়পুর হাওয়াই মহল”
Mohila Press, Calcutta.

No text on this page.

য়পুর। করেন, ছায়ার মত তাহার সঙ্গে থাকেন। সতিনী মহাতেজস্বিনী রাজপুত-কন্যা। গল্প এরূপ যে, মহারাজ এক দিন তাহার কি একটি কথা গ্রাহ্য করেন নাই। বীরবালা লম্ফ দিয়া প্রাচীর হইতে অসি লইয়া নিষ্কাষিত করেন, ভয়ে মহারাজা চণ্ডিকার পদানত হন। এরূপ সপত্নীর ছায়াতে থাকিয়াও, পূৰ্ব্ব পত্নী যে সতীত্বের ও নারীত্বের আদর্শ দেখাইতেছেন, তাহাতে সমস্ত জয়পুর মােহিত। অপরাহ্নে আমরা জয়পুরের শিল্প বিদ্যালয় দেখিতে যাই। মৃত মহারাজা রাম সিংহের এটি একটি মহৎ কীর্তি, তিনিই ইহা স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। এখানে চিত্রের, কাষ্ঠের, পিত্তল, কাসা এবং মাটীর পাত্র ও পুতুল ইত্যাদি নির্মাণের কাৰ্য্য শিক্ষা দেওয়া হইতেছে। শিল্পবিদ্যার বেশ উৎকর্ষ দেখিলাম। একটি কমণ্ডলু কিনিতে আমার বড়ই ইচ্ছা ছিল। তাহারা কিনিতে দিল না। বােধ হয় ভেক লইব বলিয়া ভয় হইয়াছিল । তাহার পর মহারাজের ‘রামবাগ’ দেখিতে যাই। এত বড় এবং মনােহর উদ্যান, বুঝি, আর কোথাও নাই। তাহার এক পার্শ্বে মিঃজিয়ম বা ‘আজবের ঘর’ নির্মিত হইতেছে! এই গৃহটির নির্মাণে লক্ষ টাকা ব্যয়িত হইয়াছে ; ঘর ত নহে, একখানি ছবি। চটি প্রশস্ত দুই তল উচ্চ ‘হল, তাহার তিন পার্শ্বে কক্ষের সারি, পার্শ্বে একটি প্রাঙ্গণ এবং চতুঃপার্শ্বে আবার কক্ষের সারি, 'ল মিশ্রিত নানা বর্ণে সুকৌশলে চিত্রিত। হলের “উপরিস্থ গবাকোঁচে, নানা বর্ণে কৃষ্ণের ব্রজলীলা চিত্রিত । অট্টালিকার প্রাচীরের গায়ে, স্থানে স্থানে মহাভারত ও রামায়ণের নানা দৃশ্য চিত্রিত হইয়াছে। উদ্যানে ফোয়ারা ছুটিছে, চক্রাকারে ঘুরিতেছে; ব্যাণ্ড বাজিতেছে; তালে তালে বইছে প্রবাসের পর রাজপুত সর্দারগণের অশ্ব ছুটিতেছে। এখনও তাহাদের পার্শ্বে তরবারি ঝুলিতেছে, অস্তমিত বীরত্বের ও রাজপুত ইতিহাসের সাক্ষী দিতেছে। গ্যাসের আলােকে, অট্টালিকা ও উদ্যান অপূর্ব শ্ৰী ধারণ করিয়াছিল। মুহূর্ত সেই শােভা নয়ন ভরিয়া দেখিলাম। পর দিবস প্রাতে, হস্তিপৃষ্ঠে, ঐতিহাসিক ‘আম্বের’ দেখিতে গেলাম। জয়পুরের নগরতেরণ পার হইয়াই আম্বেরে প্রবেশ করি। প্রবাদ, আম্বেরে মহামারী হওয়াতে, রাজা জয়সিংহ কর্তৃক তাহার পার্শ্বে জয়পুর নগর স্থাপিত হয়। রাস্তার উভয় পার্শ্বে পুরাতন আম্বেরের ভগ্নাবশেষ পড়িয়া রহিয়াছে। প্রথম একটি প্রশস্ত ঝিল ও তাহার মধ্যস্থলে একটি সুন্দর অট্টালিকা জীর্ণাবস্থায় শােকের মূর্তির মত দণ্ডায়মান দেখিলাম। পশ্চাতে পৰ্বতশ্রেণী। তাহার পর আম্বের-দুর্গের তােরণে প্রবেশ করিয়া, দুর্গে আরােহণ করিতে আরম্ভ করিলাম। আম্বের দুর্গ গিরিশেখরে। তাহার পাদমূলে আর একটি বিল, তাহার মধ্যস্থলে একটি ক্ষুদ্র ফলপুষ্পের উদ্যান কি শােভাই বিকাশ করিতেছে! এই ঝিলের পার্শ্ব বাহিয়া, আ,"রা খ্যাতনামা আম্বের-দুর্গে প্রবেশ করি। প্রথম একটি প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। তাহার চারি পার্শ্বে অশালা ও সৈনিকনিবাস। এক দিকে, দ্বিতল একটি সুন্দর মন্দিরে, যশােরেশ্বরী কালী’ বিরাজ করিতেছেন। প্রতাপাদিত্যকে বন্দী করিয়া আনিবার সময়ে, মানস্নিহে নী. ও বন্দিনী করিয়া আনিয়া তাহার রাজপুরী মধ্যে স্থাপিত করিয়াছেন। আমরা যখন দর্শন করি, তখন পূজা শেষ হইয়াছে। প্রত্যহ । টি অজমুণ্ড মতাকে বলিদান দেওয়া হয়। মাতার সঙ্গে বঙ্গদেশের ১২ নৃশংস জীবহিংসাপাপও এখানে প্রবেশ করিয়াছে। তবে

m
আম্বেরের” দৃশ্য—৫৮ পৃষ্ঠা।
nhilPress. Calcutta.

No text on this page.

ইহারা বীরপুরুষ। ইহাদের বলিদান পদ্ধতি বঙ্গদেশের মত তেমন নিষ্ঠুর ব্যাপার নহে। মানুষ যত কাপুরুষ হয়, ততই নিষ্ঠুর হয়। নিতান্তই বলিদান দিতে হইবে, তাই যেন অনিচ্ছায়, প্রাঙ্গণের এক কোণে এই কাৰ্য্য সমাপন করা হয়। খানিকটা বালির উপর ছাগলটিকে দাড় করাইয়া রাখিয়া, অকস্মাৎ খড়গাঘাতে তাহার মুণ্ডচ্ছেদন করা হয়। রক্তটা বালির উপর মাত্র পড়ে, এবং প্রাঙ্গণভূমি স্পর্শ করিবার পূর্বেই স্থানান্তরিত করা হয়। আমাদের দেশের সেই বাদ্য, সেই নৃত্য, সেই মহিষ পাঁঠার উপর বীরত্ব, সেই ফাঁস, সেই হাঁড়িকাঠ, সেই টানাটানি, সেই পশুত্ব, সেই হৃদয়বিদারক নিষ্ঠুরতা, এখানে নাই। হরি! হরি! ধর্মের নামে জগতে কত অধৰ্ম্মই সাধিত হয়। মানুষ যখন অম্লান বদনে নরবলি, এমন কি পুত্র কন্যা বলি পর্যন্ত দিতে পারে, তখন এই নিৰ্বাক্‌ নিরপরাধ পশুহত্যা তাহাদের হৃদয় স্পর্শ করিবে মন্দিরের পর, দেওয়ান-আম, দেওয়ানখাস, অন্তঃপুর-মহল ইত্যাদি ঠিক দিল্লীর অনুকরণেই সজ্জিত রহিয়াছে। সকলই শ্বেত- স্তরে নির্মিত, শিশমহলটি যেন দিল্লী আগ্রা অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট। একটি কক্ষে কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন ইত্যাদি তীর্থস্থানের দৃশ্য প্রাচীরে ত্রিত রহিয়াছে। চিত্রকর যে বর্তমান শিল্প-বিজ্ঞানে নিতান্ত অটু ছি, এমন বােধ হইল না। ইহারই পার্শ্বে আবার প্রকাণ্ড অন্তঃপুর-মহল। তাহাতে যাবতীয় অন্তঃপুরবাসিনীগণ বাস করি হন। আজ তাহা ব্যাঘ্রের বাসস্থান হইয়াছে। কালের ও মানব অদৃষ্টের কি বিচিত্র গতি! শুনিলাম, ব্যাঘ্রে সম্প্রতি মানুষ মনিরছে। তাই বাঙ্গালী বীরমন্ত্রী, অন্তঃপুর-মহলের প্রবেশব প্রবাসের পত্র। রুদ্ধ করিয়া, অন্তঃপুর-মহলে ব্যাদিগের নিৰ্বিবাদ অধিকার করিয়া দিয়াছেন। বীরকুলভ মানসিংহ এই আম্বের-দুর্গ ও নগর নির্মাণ করেন। যে মানসিংহ কাবুল হইতে বঙ্গদেশের যশোের পর্যন্ত বিজয় করেন, যাহার অসির অগ্রভাগে আক্বরের মােগল সাম্রাজ্য স্থাপিত ছিল, যে আম্বেরের নামে সমস্ত ভারত অসিন্ধু হিমাচল কম্পিত হইত, এবং যাহাকে মােগল সম্রাট আকবর পর্যন্ত ঈর্ষা ও রাগরক্ত নয়নে দর্শন করিতেন, আজ সেই আম্বেরের, সেই মানসিংহের আম্বেরের এই অবস্থা! তঁাহার অন্তঃপুর ব্যাঘ্রপুরে পরিণত হইয়াছে। মানসিংহ তােপের মুখে বীরকুলতিলক প্রতাপ- সিংহকে অপমানের উত্তর দিয়াছিলেন, তােপের মুখে চিতাের ধ্বংস করিয়াছিলেন। আজ চিতােরের যে দশা, তাহার প্রাণ- প্রতিম আম্বেরেরও সেই দশা। কাল মনুষ্য গর্বের ও পাপের কি ভীষণ পরীক্ষক ও দণ্ডবিধাতা! আম্বেরের দুর্গস্থিত রাজবাটীর শীর্ষকক্ষ হইতে, পৰ্বতমালায় বেষ্টিত, ভগ্নগৃহপূর্ণ হত-গৌরর আম্বের, এবং পার্শ্বস্থিত জয়পুর দেখিতে দেখিতে, হৃদয় কি বিষাদে, কি গাম্ভীর্যেই পরিপূর্ণ হইয়াছিল! এখনও শৃঙ্গে শৃঙ্গে দুর্গ বিরাজি । ঠিক যেন প্রাণশূন্য শব, ঠিক যেন বীরপুরুষের দেহ-কঙ্কাল শৃঙ্গে শৃঙ্গে দেখা যাইতেছে। তাহার ভিতর ছিন্ন বন্ত্রে, ভগ্ন অস্ত্রে সজ্জি, কতকগুলি শৃগালকুকুরাধম সৈন্ত আছে। দেখিলে লােকের হ্যা : হইবে। সেই জন্য, এ সকল দুর্গে প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিই শৃঙ্গস্থিত দুর্গমালা, গহ্বরস্থিত মৃত নগরের সমাধি এবং জীবিত নগরের চাকচিক্য দেখিয়া ভাবিলাম, “ভারজে যেমতি পুরাকালে হায় ! শশাভিত আসর আলােকমালায়,

No text on this page.

জস এর
মন্দির” ৬১ পৃষ্ঠা
used t;1
Calcutta.

যেমতি গাইত গীত গায়িকায়, পুরিয়া যামিনী সঙ্গীত সুধায়। সেই নৃত্যগীত রয়েছে সকল, কিন্তু কোথা গেল সেই বীৰ্য্যবল ?” ভাবিতে ভাবিতে চিন্তাবসন্ন হৃদয়ে জয়পুরে ফিরিলাম। জয়পুর বাঙ্গালীর বড় গগৗরবের স্থান। নগরটি অতি সুচারুরূপে নিৰ্মিত ও সজ্জিত। প্রশস্ত রাজপথ সকল জয়পুরকে ঠিক যেন একটি শতরঞ্চ খেলার ঘরের মত বিভক্ত ও সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছে। উত্তর, দক্ষিণ, পূৰ্ব্ব, পশ্চিমে সরল রেখায় রাজপথ সকল সারি সারি ছুটিয়াছে। দুই দিকে একরূপ দ্বিতল গৃহশ্রেণী । কি নগর, কি রাজবাটী, হুগলীর বিদ্যাধর নামক জনৈক জ্যোতিষী এ ণের কল্পনাপ্রসূত। আজও বাঙ্গালী জয়পুরের মন্ত্রী এবং রাজসহায় ; ত' বলিতেছিলাম, জয়পুর বাঙ্গালীর বড় গৌরবের স্থান। মহারাজা জয়সিংহ একজন প্রতিভাসম্পন্ন জ্যোতিষবিৎ ছিলেন। আপন প্রতিভাবলে, নানাবিধ জ্যোতিষ যন্ত্র নির্মাণ করিয়া, ইনি জ্যোতিষ অনুশীলনের জন্য, স্থানে স্থানে মান-মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। দিল্লীর বহির্ভাগে এরূপ একটি অদ্ভুত মন্দির ছিল। এই অধঃপতনের দিনে লােকে ইহার নাম ‘যন্ত্র-মন্ত্র—দিয়াছে। জয়পুর রাজবাটীর এক কোণেও এইরূপ একটি প্রশস্ত মান-মন্দির আছে। জয়সিংহের সিংহাসনে এমনি শৃগাল সকল বসিয়া তাহার অনির্বচনীয় অবমাননা করিয়া আসিতেছেন যে, তাঁহাদের পূর্বপুরুষের এই অদ্বিতীয় অতুলনীয় গৌরবনিদর্শন সকল সৰ্ব্বত্র ধ্বংস হইয়া যাইতেছে। এই হস্তি-মূখদের কাছে এতাদৃশ প্রতিভার সম্মান হইবে কেন? যে অর্থ ইহারা প্রতি বৎসর অকর্মে ব্যয়িত করেন, যে অর্থ বর্তমান প্রবাসের পত্র। ‘রামবাগের’ মিউজিয়মে ব্যয়িত হইতেছে, তাহার ভগ্নাংশমাত্রে এ সকল সংস্কৃত ও রক্ষিত হইতে পারে। এ কথাটা মহারাজাকে বলিতে আমি সংসার বাবুকে বলিয়াছি। তিনি বলিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইয়াছেন। যে উদ্যান নির্মিত হইতেছে, তাহা যদি আম্বেরের দুর্গের পাদমূলে উপত্যকায় নির্মিত হইত, মিউজিয়মটি যদি প্রথমােক্ত ঝিলের কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হইত, তবে পুরাতন আম্বের পুনর্জীবিত হইত, এবং শিল্পের সঙ্গে প্রাকৃতিক শােভা মিলিয়া কি অপূর্ব দৃশ্যেরই সৃষ্টি করিতে পারি। কিন্তু সে সহৃদয়তা, সে সৌন্দৰ্য-জ্ঞান, দেশীয় রাজাদের থাকিবে কেন ? তাহা হইলে তাহারা ভারতীয় রাজা হইতেন না। জয়পুরের বর্তমান মহারাজা কায়েম সিংহ সম্বন্ধে গােটা দুই গল্প বলিব। ইনি জয়পুর রাজ্যের একজন সামান্য সর্দার ছিলেন। জ্যেষ্ঠ সহােদরের সঙ্গে তাহার বিরােধ হয়, এবং তিনি রাজবিচার অগ্রাহ করিয়া যুদ্ধ করেন। তাঁহার জ্যেষ্ঠের সাহায্যার্থ এবং তাহার দমনার্থ রাজসৈন্য প্রেরিত হইলে, ইনি পরাভূত হইয়া পলায়ন করিয়া বৃন্দাবনে যান, এবং সেখানে ভিক্ষুকের মত সস্ত্রীক থাকেন। দিকে অপুত্রক রাজা রাম সিংহ মৃত্যু শয্যায় শায়িত হন, এবং কায়েম সিংহের বীরত্বে এবং তেজস্বিতায় প্রীত হইয়া, তঁহাকে উত্তরাধিকারিত্বে মনােনীত করেন। কায়েম সিংহ, ‘মাধাে সিংহ নাম গ্রহণ করিয়া, জয়পুরের সিংহাসনে আরােহণ করেন। অদৃষ্টের আবর্তনে বৃন্দাবনের ভিক্ষুক জয়পুরের মহারাজা . হইল। তিনি নির্বাসন সময়ে অসাধারণ কষ্টভােগ করিয়াছিলেন। তিনি তাহার গল্প করেন। এখন যাহারা রাজবাটীর এবং তাহার নিজের ভৃত্য ও রাজকর্মচারী, তিনি তাহাদিগকে দেখাইয়া বলেন, অনেক অদ্ভুত জয়পুর। করেন “এই ব্যক্তি ঘুস না পাইলে আমাকে গলায় ধাক্কা দিয়া রাজবাটীতে প্রবেশ করিতে দিত না, এই কর্মচারী ঘুস না পাইলে আমার কারাবাসী সহচরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে দিত না। রাজকর্মচারীদের সকলের দোষ গুণ আমি জানি এবং রাজনীতি সকল কি কৌশলে ব্যর্থ করিতে পারা যায়, আমি তাহাও জানি, অথচ তিনি সিংহাসনে বসিয়া একটি কর্মচারীকেও কৰ্ম্মচ্যুত নাই। একদিন সংসার বাবুকে দেখাইয়া, তাঁহার পরিচারকবর্গের সমক্ষে, সংসার বাবুর ছােট ভাই পূর্ণ বাবুকে বলেন—“তােমার যে এই দাদাটি দেখিতেছ, ইনি বড় সহজ পাত্র নহেন—ইনি স্কুলে আমার শিক্ষক ছিলেন। আমাকে মারিবার জন্য বলিতেন, ‘কায়েম সিংহ! হাত লাও। আরে! মার খানেকে ওয়ান্তে কোই ক্যা হাত লাতায়? আমি প্রাণান্তে হাত বাড়াইতাম না, এবং উনি মারিতে আসিলে, আমি টেবিলের চারিদিকে ঘুরিতাম। উনি তাড়াইয়া তাড়াইয়া আমাকে মারিতেন। আমি এক বার মনে করিতাম, ধরিয়া হাত গুড়া করিয়া দি। এখন করঘােড় করিয়া আমার সমক্ষে দাঁড়াইয়া আছেন। আর এখন যদি আমি বলি, হাত লাও!’-বাপ! কি মারটাই আমাকে মারিয়াছে।” সকলে হাসিতে লাগিল। সংসার বাবুও হাসিয়া বলিলেন- “মহারাজ! আমি যদি জানিতাম তুমি জয়পুরের মহারাজ হইবে, আমি তোমাকে আরও বেশী করিয়া মারিয়া শিক্ষা দিতাম।” দেখিলে, যেমন শিষ্য, তেমনি গুরু কি না? এখন তিনি সংসার বাবুকে ছায়ার মত সঙ্গে রাখেন এবং একজন সামান্য লােকের ন্যায় যখন তখন কান্তি বাবুর বাড়ী যান। এই দুই গল্পে তুমি এক

৬৪
প্রবাসের।
লােকটি কি প্রকার
প্রকার চতুর, তেজস্বী ও সহৃদয়, তাহা বুঝিতে
পারিবে। '
আর কত লিখিব। জয়পুরে দু’দিন রাজভােগ খাইয়াছি, রাজার
গাড়ীতে ও হাতীতে রাজার মত সম্মানে রাজ্য পরিদর্শন করিয়াছি।
মহারাজা যদিও তখন জয়পুরে ছিলেন না, তথাপি রোজ সংসার
বাবুর বাড়ীতে রাজার পাকশালা হইতে আহারীয়
আসিত।
রান্নাতে ঝালটুকু যেন বেশী। ভারতীয় রাজারা দিন দিন স্থানে
অস্থানে যেরূপ অপমানিত হন, ঝাল খাইয়াই সেই ঝাল নিবারণ
করেন। এক দিন মহারাজ গবর্নর জেনারেলের ইভিনিং পাটিতে
গিয়াছেন। আমাদের দেশের একজন বিলাসী, ইংরাজপছন্দ, সাহেবী
ধরণের মহারাজাকে, সেখানে সুরাপান করিতে ও কেক খাইতে
দেখিয়া, সংসার বাবুকে বলিলেন,—“ইহার বাড়ীতে কি খাওয়া
মেলে না? এখানে ঝুটা খাইয়া বেড়াইতেছে কেন?”

পুষ্কর। কাল প্রাতে আজমীর পঁহুছিয়া পুষ্কর দেখিতে যাই। যেমন মনে করিয়াছিলাম, তেমন কিছুই নহে। গোবর্ধনের মত একটি নৈসর্গিক সরােবর মনে কর। গগাবর্ধন হইতে কিঞ্চিৎ বড় হইলেও, দেখিতে তেমন মনােহর নহে। সেইরূপ একটি ঝিল। তাহার দুই পার্শ্বে সারি সারি অট্টালিকা। অন্য দুই দিকে অট্টালিকা- শ্রেণী কিছু বিরল। কিঞ্চিৎ দূরে, চারি দিকে রাজগিরের পাহাড়ের মত পাহাড় তরঙ্গিত ভাবে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। জলের বর্ণ নীল, কিন্তু এত ময়লা যে, ব্রহ্মা তাহার যজ্ঞের উপযােগী মনে করিয়া থাকিলেও, আমি তাহা কোনও মতে স্পর্শ করিতে মনে প্রবৃত্তি জন্মাইতে পারিলাম না। তারাচরণ পচ ডুব দিয়াছেন, যদি কিছু পুণ্য হইয়া থাকে, অবশ্য আমি তাহার অংশ পাইব। কারণ তারাচরণ আমাকে যেরূপ ভালবাসে, স্বর্গের ভাগ দিতেও কখন কাতর হইবে না। পুরের মধ্যস্থলে, একখানি উপলখণ্ডের উপর, জনৈক মকর মহাশয় নিদ্রা যাইতেছিলেন, কি তপস্যা করিতে- ছিলেন, বলিতে পারি না। যজ্ঞ-জলে তাহারও যেন অতৃপ্তি হইয়াছে, কারণ আমরা যতক্ষণ ছিলাম, ততক্ষণ তিনি নিশ্চল ছিলেন একটি ত বারও জলে নামিলেন না। পুষ্কর দর্শন করিয়া, একখানিক্ষুদ্র খাটুলি চড়িয়া, সাবিত্রী দেবীর দর্শনলাভ করিতে পাশ্ববর্তী পৰ্বতে আরােহণ করি। খাটুলি সামান্য দড়ীর বন্ধন, স্থানে স্থানে ঠক ঠক করিয়া পাথরে লাগিতেছিল, আর আমি ভাবিতেছিলাম, ভারতভ্রমণ বুঝি এইখানেই শেষ হইল। v প্রবাসের পত্র। । প্রায় এক ঘণ্টাকাল আরােহণ করিবার পর আমরা মন্দিরে উপস্থিত হইলাম। একটি ক্ষুদ্র মন্দির। দুটি শ্বেত প্রস্তরের মূর্তি-সাবিত্রী ও সরস্বতী। দুটি মূর্তিই যেন জৈন বলিয়া বােধ হইল। পৰ্বত- শিখর হইতে দৃশ্যটি মনােহর, কিন্তু কঠোর । শ্রেণীর পর শ্রেণী বাঁধিয়া বন্ধুর পৰ্বতমালা শােভা পাইতেছে। মধ্যে মধ্যে মাড়ােয়ারের বন্ধুর উপত্যকা, কোথাও বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামে ও শস্যক্ষেত্রে বিচিত্রিত। পাদমূলে পুষ্কর ও বাপীতীরস্থিত নগর, শ্বেত পুষ্পে পুষ্পিত, একটি মনােহর উদ্যানের মত শােভা পাইতেছে । কিন্তু চন্দ্রশেখরের দৃশ্যের কাছে ইহা কিছুই নহে। অবতরণ সময়ে ব্রহ্মার মন্দির দর্শন করি। লােকটি নিতান্ত অরসিক ছিলেন না, তঁাহারও শুক্লপক্ষের ও কৃষ্ণপক্ষের দুই বনিতা। সাবিত্রী দেবীর যজ্ঞে আসিতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব দেখিয়া, তিনি নবযৌবনসম্পন্না ‘বালী’ গায়ত্রী দেবীকে বিবাহ করেন। সাবিত্রী দেবীও আমাদের বঙ্গলক্ষ্মী, তিনি চটিয়া লাল। পাহাড়ে চড়িয়? নব দম্পতীকে অভিশাপ দিলেন যে, তাহার চরণধৌত জল তাহাদের মস্তক পাতিয়া লইতে হইবে। বড় বেজায় কথা ! স্বয়ং ব্রহ্মার যদি এই দশা হয়, তবে আমরা গরিব কোথায় যাই ? মন্দিরে ব্রহ্মার শ্বেতপ্রস্তরের চতুৰ্ম্মখ মূর্তি এবং পার্শ্বে সেই ছােট ঠাকুরাণী। বুড়া এত চোটের পরও নব যৌবনের মায়া ছাড়তে পারে নবং নাই। মােট কথা, পুস্কর সত্যযুগে বােধ ইস একটি শৃতি মনােজ্ঞ ও অতি পবিত্র স্থান ছিল ; শৈলমালাবেষ্টিত এক খণ্ড গভীর নির্মল সলিল দর্পণ, তাহার চারি পার্শ্বে বৃক্ষলতাশােভিত নানাবিধ পক্ষীর কল- গানে মুখরিত, এবং যজ্ঞধূমে সমাচ্ছন্ন, আশ্ৰমাবলী হইতে বেধ্বনি পুর সমুখিত হইতেছে ; দৃশ্যটি না জানি কি পবিত্র, কি হৃদয়গ্রাহী ছিল। যদি ইউরােপীয় কোন জাতির তীর্থ স্থান হইত, তবে পুষ্কর আজ ঠিক সেইরূপ দেখিতে পাইতাম। সেই দৃশ্যটির সৃষ্টি করা বড় বেশী ব্যয়সাধ্যও নহে। ইহার চারি দিকে এখনও কত হিন্দু রাজা আছেন। কিন্তু তাহারা এরূপ মহাপাতক করিবেন কেন ? ফিরিয়া আসিয়া, সন্ধ্যার কিঞ্চিৎ পূৰ্ব্বে, আজমীরস্থ বিখ্যাত ফকিরের দরগা দেখিতে যাই। ইনিই কুক্ষণে আমাদের ভারত- বর্ষে মহম্মদীয় ধর্ম প্রচার করিবার জন্য প্রথম প্রবেশ করেন। পার্শ্বে জৈনদিগের একটি অতি বৃহৎ, অতি প্রশস্ত, এবং মনােহর কারুকার্য্যে খচিত দেবালয় ছিল। মহম্মদ ঘােরি আজ্ঞা প্রচার করেন যে, এই মন্দিরে তিনি জুম্মার নমাজ পড়িবেন। জুম্মার ২ দিন বাকী। ২৷ দিবসের মধ্যে হিন্দুর দেবালয় ভগ্ন করিয়া কথঞ্চিৎ মসজিদের আকৃতি করা হয়। ইহার নাম সেই জন্য ২ দিনের বােপর। সেই দেবালয়ের প্রাচীর, স্তম্ভ, ছাদ, কারুকার্যে এখনও শােভা পাইতেছে। বােধ হয়, এই দেবালয়ের প্রস্তরের দ্বারা পার্শ্বস্থিত দরগা নির্মিত হয়। কবরের চারি দিকে রূপার রেলিং। প্রশস্ত প্রাঙ্গণের এক সীমাতে বাদসাহ আকবর ও সাহাজান নির্মিত মসজি, দেওয়ান-খাস ইত্যাদি গৃহ বর্তমান আছে। প্রবাদ, সমস্ত একটি শিবালয় ছিল। কাপুরুষের বেতাও কাপুরুষ হইয়া থাকে। কালা পাহাড়ের ভয়ে শিব পাতালে প্রবেশ করেন। মুসলমানেরা বলেন, ফকির এই পথে তিরােহিত হইয়াছিলেন। • এই দরগাতে দুটি প্রকাণ্ড তামার ডেক, দুটি ইষ্টকনিৰ্মিত চুল্লির উপর বিরাজ করিতেছে। দেখিতে যেন এক একটি ক্ষুদ্র পুষ্করিণী। ১৫•• ৬৮ প্রবাসের ত্রি। এবং ৯০০ টাকা ব্যয় করিলে ইহার এক একটিতে খিচুড়ী পাক হয়, এবং লােকেরা কম্বল জড়াইয়া ঝাপ দিয়া পডিয়া তাহা লুটিয়া একটি শোক-ইতিহাস ইহার সঙ্গে জড়িত আছে। আলা উদ্দিন চিতাের জয় করিয়া, এক জোড়া রজত-খচিত চন্দনের কপাট, একটি পিত্তলনির্মিত প্রদীপের বৃক্ষ বা ঝাড়, এবং দুইটি নাকাড়া এখানে আনিয়া, তাহার বিজয়পতাকা চিহু-স্বরূপ প্রকাশ্য স্থানে রাখে। তাহা এখনও আছে। অপমানে, অভিমানে, চিতােরাধি- পতি প্রতিজ্ঞা করেন যে, যে পর্যন্ত তাহা উদ্ধার করিতে না পারিবেন, সে পর্যন্ত মেবারেশ্বর আজমীরে প্রবেশ করিবেন না। তিনি বহু যুদ্ধেও এই প্রতিজ্ঞা পালন করিতে পারেন নাই। রাজ- পুতনার সেই সূর্য অস্ত গিয়াছে, তথাপি উদয়পুরের রাণা একবার ইংরাজ কর্তৃক বাধ্য হইয়া এখানে আসিয়াও নগরের বাহিরে ছিলেন, মধ্যে প্রবেশ করেন নাই। রাজপুতানার এই অধঃপতন, হিন্দুধৰ্ম্মের এই দুর্গতি, তারাগড় নীরবে শৈলসানু হইতে চাহিয়া দেখিতেছেন। এ দুর্গ পৃথ্বীরাজ প্রস্তুত করিয়াছিলেন। ইহার তােরণে এখন বৃটিশ বৈজয়ন্তী উড়িতেছে। অদ্য প্রাতে আনা-সাগর দেখিতে যাই! আনা নামক রাজা, নদী স্রোত বন্ধ করিয়া, এই বাগর সৃষ্টি করেন। ইহার তিন দিকে শৈলমালা, এক দিকে উক্ত বাঁধ এ তদুপরি ভগ্ন হিন্দু রাজভবনের উপর মােগদিগের রাজপ্রাসদাবলী বিরাজিত রহিয়াছে। ইহার শ্বেতপ্রস্তরনির্মিত রেওয়ানআমে, জাহাঙ্গীর প্রথম ইংরাজ রাজদূত সার টমাস রােয়ের সঙ্গে কুক্ষণে সাক্ষাৎ করেন। এইরূপে এইখানে পুষ্কর। দুইটি সাম্রাজ্যের ভাবী ইতিহাসের সূত্রপাত হয়, ভারতের দুইটি মহা ঘটনা এখানে আমাদের অদৃষ্টগগনে সঞ্চারিত হয়। সেই সকল শ্বেতপ্রস্তরনিৰ্মিত অট্টালিকাতে এখন কমিসনার বিহার করিতেছেন, এবং তাহাতে সঁহার আফিস ও মিউনিসিপাল আফিস বিরাজ করিতেছে। জগতের কি বিচিত্র গতি। বাদসাহরমণীদের ক্রয়- বিক্রয় করিবার জন্য যে “মিনাবাজার” ছিল, এখন তাহা উদ্যানের কুলির নিবাস। একটি বড় সুন্দর গল্প শুনিলাম। এই উদ্যানের 'ও সাগরের উপরিস্থ এক অনুচ্চ শিখরে রাজপুতনার এজেন্টের উপনিবাস। একদা তিনি এখানে পদার্পণ করিলে, সৌধচূড়ায় তাহার বৈজয়ন্তী উড়িল। কিন্তু ততােধিক উচ্চ শৈলে, হনুমানজীর আস্তানায়, তাহার বৈজয়ন্তী উড়িতেছে। রাজপুরুষ তাহা সহিতে পারিলেন না। তিনি আস্তানার সন্ন্যাসীকে ডাকিয়া বলিলেন যে, রাজপ্রতিনিধির বৈজয়ন্তী অপেক্ষা হনুমানের বৈজয়ন্তী উর্দ্ধে থাকিতে পারিবে না। সন্ন্যাসী হনুমানের চেলা, তাহার কিঞ্চিৎ বীরত্ব থাকিবার কথা। সে বলিল, রাজপ্রতিনিধির অপেক্ষা ঈশ্বরের বৈজয়ন্তী ত উর্ধে উড়িবেই, তাহাতে আবার আশ্চর্যের বিষয় কি ?

চিতাের। এ পত্রে চিতােরের কথা লিখিব। কারণ চিতােরের কথা তুমি শুনিতে বােধ হয় নিতান্ত উৎসুক হইয়া রহিয়াছ। কিন্তু কি লিখিব ? চিতােরের নাম করিতেই আমার হৃদয় শশাকের ও স্মৃতির উচ্ছাসে পূর্ণ হয়, তাহা বলিতে পারি না। নিশীথসময়ে চিতাের ষ্টেশনে উপস্থিত হই। আমাদিগকে ডাক- বাঙ্গালা দেখাইয়া দিবার জন্য, স্টেসনে একটি লােক চাহিলাম। শুনিলাম যে, এই অল্প পথটুকু যাইতেই পথে এত ‘ভেড়িয়া’ (নেকড়া বাঘ) যে, গলায় কামড়াইয়া ত ধরেই, তাহা ছাড়া, “ছােড়তা বি নেহি।” কেহ প্রাণান্তে যাইতে স্বীকার করিল না। ইহাতেই তুমি বুঝিতে পারিবে কি বীরভূমি, কি অরণ্য ও কাপুরুষের বাসভূমি হইয়াছে। কাষে কাষেই সে রাত্রি, ষ্টেসনের মেজেতে পড়িয়া কাটাইলাম। প্রাতে চিতােরহ ‘হাকিমে’র নিকট হইতে হস্তী এবং পাশ লইয়া আমরা দুর্গ দর্শন করিতে যাই। দুর্গপাদমূলে এখনও একটি গ্রাম আছে। এই গ্রামটি পার হইয়া আমরা চিতােরশৈলে আরােহণ করিতে আরম্ভ করি। আরাবলী গিরিশ্রেণী হইতে একটি পর্বত স্বতন্ত্র হইয়া পড়িয়াছে। তাহাই চিতাের দুর্গ। অতি প্রশস্ত পথ, ঘুরিয়া শৈলশেখরে উঠিয়াছে। পর্বতটি রাজগিরের পর্বতের মত প্রস্তরময়। ক্রমে পদ্মদ্বার, হনুমানার, গণেশদ্বার, দুটি ঝুলনদ্বার, সূৰ্য্যদ্বার, সৰ্বশেষে পুরদ্বার অতিক্রম করিয়া, প্রায় এক ঘণ্টাকাল আরােহণের পর, সানুদেশে উপস্থিত হই। সানুদেশ উত্তর দক্ষিণে মাইল তিন দীর্ঘ, এবং এক মাইল সমতলভূমি। ইহার উভয় পার্শ্ব

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চিতার। ৭১ হইতে মধ্যস্থল ঈষৎ নিম্ন। তাহাতে নানা স্থানে জশিয় নির্মিত হইয়াছিল। এই প্রশস্ত সানুদেশ বেষ্টিয়া দুর্গপ্রাচীর এবং প্রাচীরের মধ্যে লক্ষ বীরপুরুষের পুণ্যধাম চিতাের নগর অবস্থিত ছিল। ছিল। এখন তাহার ভগ্নাবশেষে পরিপূর্ণ। চিতাের এখন একটি মহাশ্মশান। &খনও স্থানে স্থানে তৈলকুণ্ড, ঘৃতকুণ্ড ইত্যাদি বর্তমান রহিয়াছে। যুদ্ধের সময় তাহা পূর্ণ রাখা হইত। হায়! হায়! আজ সেই বীরনগর, সেই বীরপুরুষ সকল কোথায় গেল? আমরা প্রথমে মাস পদ্মিনী দেবীর আবাসস্থান দেখিতে যাই। শুনিলাম তাহার চিহুমাত্রও ছিল না। ভূতপূর্ব মহারাজ সজ্জন সিংহ এক জন প্রকৃত সজ্জন ছিলেন। তিনি চিতােরের ঐতিহাসিক স্থান- গুলির পুননির্মাণ করিতেছিলেন। তাঁহার সুযােগ্য উত্তরাধিকারী তাহা বন্ধ করিয়াছেন। সজ্জন সিংহ পদ্মিনীর আবাসস্থানের ভিত্তি খু জিয়া কয়েকটি দেয়াল তুলিয়াছেন এবং কয়েকটি ক্ষুদ্র কক্ষ নির্মাণ করিয়া রাখিয়াছেন। অট্টালিকাশিরে স্ফটিকের নক্ষত্র, সতীত্বের ধ্বজার মত সূৰ্যালােকে ধ ধ করিয়া জ্বলিতেছিল। পার্শ্বে একটি ক্ষুদ্র সরােবরের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহ। পদ্মিনী দেবী তাহাতে ক্রীড়া করিতেন। যে সৌন্দর্যের প্রতিবিম্ব মাত্র দিল্লী উন্মত্ত করিয়াছিল, সেই ঘােরতর শােকনাটক ঘটাইয়াছিল, যাহার জন্য এত বীরগণ যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছিলেন যে, তাঁহাদের উপবীত পরিমাণে ৭৪০ মণ হইয়াছিল ; সেই সৌন্দর্যের এইমাত্র স্মৃতিচিহ্ন চিতােরে বিদ্যমান রহিয়াছে। পদ্মিনী মহল দর্শন করি আমরা ‘কালী মাইর মন্দির দেখি- একটি মৈত প্রস্তরের মূর্তি, তাহার পার্শ্বে একটি কৃষ্ণ প্রস্তরের মূর্তি। প্রথমটি জৈন বলিয়া বােধ হইল। মন্দিরটিও যেন জৈনমন্দিরের ૧૨ প্রবাসের পত্র। প্রস্তুরের দ্বারূ নির্মিত বােধ হইল। মূর্তি দুইটির ইতিহাস কে কিছুই জানে না। এই কুলাঙ্গারদের অপেক্ষা চিতােরের ইতিহাস আমরা অধিক জানি। এই মন্দিরেই সেই টিচোরেশ্বরী কালী ছিলেন। তিনিই স্বপ্ন দেখাইয়াছিলেন-“ময় ভুখা হহ!” হায় মা এখন কি তােমার ক্ষুধা নিবারণ হইয়াছে ? আজ যে চিতােরে কয়েকটি কঙ্কালমাত্র অবশিষ্ট রহিয়াছে। তাহার পর, মীর বাইয়ের নির্মিত মন্দির ও তাহাতে স্থাপিত রাধাকৃষ্ণের মনােহর মূর্তি দর্শন করিয়া, আমরা কুরাণার কীর্তিস্তম্ভে আরােহণ করি। এই স্তম্ভটি আমার কাছে সর্ব প্রশংসিত, কুতুব মিনার বা পৃথ্বীরাজের স্তন্ত অপেক্ষা অধিক মুনােহর বােধ হইল। স্তম্ভটি উপযুপরি নয়টি প্রকোষ্ঠ দ্বারায় নির্মিত। কুতুব মিনারে ক্রমাগত কেবল সােপান বাহিয়া উঠিতে হয়। এই স্তম্ভের এক প্রকোষ্ঠ হইতে অন্য প্রকোষ্ঠে উঠিয়া, প্রকোষ্ঠ প্রদক্ষিণ করিয়া, তাহার পর আবার সােপান আরােহণ করিতে হয়। প্রত্যেক প্রকোষ্ঠের মধ্যস্থলে এক একটি দেব দেবীর মূর্তি বিরাজমান রহিয়াছে। দিল্লীশ্বরকে উপযুপরি পরাজয় করিয়া, মহাবীর কুম্ভরাণা এই কীর্তিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহার পর যে স্থান দর্শন করিলাম, তাহা ভুলিবার নহে। স্থানটির নাম গোমুখী। গিরিপার্শ্বে দেব দেবীর মূর্তিতে পরিপূর্ণ একটি অতি সুন্দর কক্ষ। তাহার পশ্চাৎ পার্শ্ব দিয়া, চন্দ্রশেখরের মন্দাকিনীর মত, দুইটি নিঝরধারা প্রবাহিত হইয়া, সম্মুখস্থ প্রস্তর- নির্মিত সমােবরে পড়িতেছে। বগমপথ বন্ধ করিলেশােবরটির মুখে মুখে জল হয়। সমস্ত স্থানটি বৃক্ষচ্ছায়ায় সমাচ্ছন্ন নির্জন এবং শান্তি প্ৰদ এমন স্থান আমি যেন দেখি নাই। রাজপুরী তল

অনেক
ফিতর।
হইতে একটি গুপ্ত পথ, পৰ্ব্বতের অভ্যন্তর দিয়া এখানে
আসিয়াছে।
রাজমহিষীরা এই পথ দিয়া আসিয়া অবগাহন কতেন এবং
দেব দেবীর পূর্ণ করিতেন। মূখ স্থানদৰ্শক আমাদিগকে বলিল,
এই সুড়ঙ্গের মধ্যে “জোহর” হইত ; যুদ্ধাবশেষে ইহাতেই বীরনারীরা
fড়য়া মরিতেন। আমি তাহা বিশ্বাস করিলাম না।
জিজ্ঞাসার পর বলিল, রাজপুরীর মধ্যে এই সুড়ঙ্গের অন্য মুখ অাছে।
আমরা উর্ধ্বশ্বাসে সেখানে গেলাম। ইহা টড সাহেবের বর্ণনার
সঙ্গে মিলিল।
এই সেই পৰ্বতাভ্যন্তরীণ কক্ষের পথ, যাহাতে
সহস্র সহস্র বীরনারীরা প্রাণ বিসর্জন করিয়া, জগতের বিস্ময়কর
সতীহের এবং সাহসের জলন্ত ও জীবন্ত প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছেন।
তাহার ভিতর প্রবেশ করিবার সাধ্য নাই। শুনিলাম বন্ধ করিয়া
দেওয়া হইয়াছে। আমি এই পবিত্র স্থানকে ভক্তিভরে প্রণাম
করিলাম এবং ললাটে ইহার ধূলা মাখিলাম। এইটি আমাদের একটি
প্রকৃত মহাতীর্থ।
হায়! হায়! কি কুলাঙ্গারেরা, কি হৃদয়হীন নরাধমেরা, কি
শৃগালেরাই সিংহদিগের আসনে বসিয়াছে। যদি এই চিতাের
ইংরাজদিগের কোনও রূপ ঐতিহাসিক ক্ষেত্র হইত, আজ সেই
পদ্মিনীর পবিত্র অবাসগৃহ সেই রাজপুরী, আমরা একটি বৃহৎ
উদ্যানে বিরাজিত দেখিতাম। সেই পবিত্র জোহর-কক্ষ আজ শত
আকাশ-গবাক্ষে আলােকিত হইত, কক্ষটি ঐতিহাসিক চিত্রে সজ্জিত
হইত। আমরা চিত্রে দেখিতাম, সময়ে সময়ে কিরূপে বীরনারীরা
সহজে.এ অগ্নি প্রবেশ করিতেছেন, দেখিতাম, একস্থানে
চিরেশ্বরী কাণপুরস্থ সেই
স্বর্গীয়া দেবীর ন্যায় দাঁড়াইয়া,
জােবদনে লােদন করিতেছেন। চিতােরের অঙ্গে অঙ্গে তাহার

৭ প্রবাসের পর ঐতিহাসিক গৗরব সকল স্বর্ণ-অক্ষরে লিখিত থাকিত। তুমি জাহু প্রতাপসিং প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, যত দিন দিল্লী জয় করিয়া তিনি চিতাের অধিকার করিতে না পারিবেন তত দিন তিনি ‘তৃণে ভিন্ন শয়ন করিবেন না, পত্রে ভিন্ন আহার করিবেন না। শুনিলাম, তাহার অযােগ্য উত্তরাধিকারিগণ এখনও স্বর্ণশয্যার নীচে হণ রাখি শয়ন করেন, স্বর্ণপাত্রের নীচে পত্র রাখিয়া আহার করেন। সেই বীরপ্রতিজ্ঞা এখনও তঁাহারা ভুলেন নাই। তথাপি চিতরের পদ্মিনীর, চিতােরের প্রতাপসিংহের, প্রাণপ্রতিম চিতােরের আজ এই অবস্থা! এটি যে চিতাের, তাহা পথিককে বলিয়া দিবার জন্য একটি অঙ্গুলি নির্দেশমাত্র কোথাও নাই। আছে—ইতিহাসে আছে। তারাচরণ বলিলেন, “রক্তধমনী-বিশিষ্ট প্রস্তর রাশিতেও যেন সেই বীরপুরুষদের শােণিতধারা বর্তমান আছে।” আছে বলিয়াই আমি দরিদ্র দুর্বল বাঙ্গালী এই মহাতীর্থ দর্শন করিতে চিরজীবন লালায়িত ছিলাম। আজ দেখিয়া জীবন সার্থক মনে করলাম। চিতাের অমর, চিতাের উনবিংশ শতাব্দীর কুরুক্ষেত্র। চিতাের ভারতের ভবিষ্যৎ আশা। সে বীরত্ব, সে সতীত্ব ভিন্ন ভারতের অন্য আশা নাই। প্রায় ১টার সময়ে অববােহন করিয়া আসি। উদয়পুরের জনৈক মহারাষ্ট্রীয় কর্মচারীর পাচক মহাশয়, আমাদের পাচক মহাশয়, আমাদের জন্য বীরত্বপূর্ণ আহার প্রস্তুত করিতেছিলেন। এক দিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড চাউল ; অন্য দিকে তদুপযােগী কলাইয়ের ডাল। কোনটাই সিদ্ধ হয় নাই।

যােধপুর। ভগবানের কৃপায় বড় সুখে বড় সম্মানে যােধপুর দর্শন করিয়া আসিলাম। কাল যে কার্ড লিখিয়াছি, তাহাতে জানিয়াছ, যােরর এসিষ্টান্ট সুপারিন্টেন্টে পণ্ডিত জীবানলের সহিত লাহাের যাইবার সময় রেলে সাক্ষাৎ হয়। আর একটি লােক অম্বালার কমিশরিয়েটর ছিলেন। অর্ধ ঘণ্টার আলাপের পর, তাহারা এত প্রীত হন যে, উভয়ে আমাকে অম্বালা ও যােধপুরে যাইতে নিতান্ত অনুরােধ করেন। অম্বালায় যাইতে পারিলাম না যােধপুরে পণ্ডিত জীবানন্দের কাছে টেলিগ্রাফ করি। ষ্টেশনে পৌছিয়া দেখি, রাজার বাঙ্গালী কর্মচারী বাবু হরিশচন্দ্র মিত্র, মাদ্ৰাজ ‘এথিনিয়ম পত্রিকার ভূতপূৰ্ব সম্পাদক, আমার অপেক্ষা করিতেছেন। পণ্ডিতের বাড়ী পঁহুছিয়া দেখি, আমার অভ্যর্থনার জন্য একটি কক্ষ সুন্দররূপে সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি এবং রাজার সুপারিন্টেন্টে হরদয়াল সিংহ -ইনি কাউন্সিলেরও মেম্বর—এক বাড়ীতে থাকেন। ইহারা দু’জন যে কি আদর করিলেন, বলিতে পারি না। দুই বেলা পরিপাটি আহার। বসিতে হয় , আসনে, কিন্তু থাল থাকে একখানি অতি সুন্দর চৌকির উপর। থাল রূপায়, তাহার উপর সমুদর রূপার বাটি সাজান রহিয়াছে। চামচ দিয়া তরকারী লইয়া খাইতে হয়। রান্না পঞ্জাবী ধরণের। কারণ ইহার পদবী। শার সমগ্ন, হরদয়াল সিংহ আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া রাজার ভ্রাতা ও মন্ত্রী কর্ণেল সার প্রতাপ সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ ৭৬ প্রবাসের পর করান। আমরা জানিতাম যে, কেবল কোন কোন সিবিলিয়ানই বুঝি খােসামুদির প্রিয়। কিন্তু দেখিলাম, এ রাজাদের কাছে তাহারা কোথায় লাগে! হরদয়াল সিংহ আমাকে ইহার ইঙ্গিত করিয়াছিলেন। আমি যদিও এ কাৰ্য্যে অনভ্যস্ত, তথাপি সেই সুরে বীণা বাঁধিয়া আলাপ করিলাম। তিনি এত সন্তুষ্ট হন যে, অপরাহে ফিরি। গিয়া তাহার অশ্বারােহী সৈন্যের ব্যায়াম দেখিতে বলেন। আমি নূতন রাজবাটী দেখিতে যাই। সম্মুখের একটি বাড়ীতে—এটিই শ্রেষ্ঠ অট্টালিকা–নিলাম, রাজার উপপত্নী থাকেন এবং রাজা দিন রাত্রি এখানেই পড়িয়া থাকেন। তাহার পশ্চাতে অন্তঃপুর-মহল। তাহার মহিষী কয়েক জন তাহাতে আবদ্ধ আছেন। রাজকার্যের সম্যক্ ভার প্রতাপসিংহের হন্তে, তিনিই প্রকৃত রাজা। নুতন বাড়ী আমাদের চক্ষে কিছুই লাগিল না। তবে নূতন যে একটি কার্যালয়- বাড়ী হইতেছে, তাহা অতি জঁকাল রকমের। ফিরিয়া আসিয়া প্রতাপসিংহের কাছে বসিয়া অশ্বক্রীড়া দেখি। মাড়ওয়ার রাজ্যের সর্দারদিগের শিশুদিগকে পর্যন্ত তিনি অশ্বারােহণে শিক্ষা দিতেছেন। থােকার অপেক্ষা ছােট ছােট শিশুরাও নক্ষত্ৰবেগে ঘােড় ছুটাইতেছে। প্রতাপসিংহকে দেখিলে, রাজপুতকুলতিলক হিন্দুগৌরবসূৰ্য্য প্রতাপ- সিংহকে মনে পড়ে। লােকটি দেখিতে ক্ষুদ্র, কিন্তু তেজ যেন ফুটি৷ পড়িতেছে। শুনিলাম, ইনি জীবন্ত ব্যাঘ্রের দন্ত উৎপাটন করেন! তাহার ডান হাতে এক ব্যাণ্ডেজ এবং ডান পায়ে অন্য ব্যাণ্ডেজ বাঁধা রহিয়াছে। তদ্রুপ, তাহার পারিষদবর্গেরও হস্তে, পদে, চক্ষে, ব্যাণ্ডেজ শােভা পাইতেছে। সকলেই যে হইতে পড়িয়া আহত হইয়াছে। ইহাতেই বুঝিবে যে, ইহারা কিরূপ অশ্বারােহণে ব্ৰতী। সন্ধ্যার পর, জ্যোৎআলােকে বাসে ফিরিয়া আসি।

No text on this page.

34 3
[\.
-
যােধপুর দুর্গাভ্যন্তরীন অন্তঃপুর মহল
৭৭ পৃষ্ঠা

যােধপুর। ৭৭ •দিন প্রাতে যােধপুরের দুর্গ দেখিতে যাই। একটি প্রায় 'চন্দ্রনাথের মঙ-উচ্চ শৈলের সর্বাঙ্গ এবং এক পার্শ্বের উপত্যকা আবৃত করিয়া দুর্গপ্রাচীর চলিয়া গিয়াছে। উপত্যকায়, যােধপুরের গৃহাবলী অসংখ্য হংসমালার মত শােভা পাইতেছে। শৈলশৃঙ্গ ব্যাপিয় দুর্গের অট্টালিকা। এই দুর্গ ও নগর, তুমি জান, যােধসিংহ স্থাপন করিয়াছিলেন। তাই ইহার নাম যােধপুর। শৈলশেখর যেরূপ স্তরে স্তরে উর্দ্ধে উঠিয়াছে, সেই রূপ স্তরে স্তরে অট্টালিকা নির্মিত হইয়াছে ; তলার উপর তলা উঠিয়া, গগনস্পর্শী বিরাট মূর্তি ধারণ করিয়া, মনে যুগপৎ ভয় ও বিস্ময়ের সঞ্চার করিতেছে। ইহার কক্ষগুলি অনতিবিস্তৃত, কারণ তাহারা পুরাতন, কিন্তু সুচিত্রিত ও সুসজ্জিত। তবে ইংরাজি সাজ সজ্জার তত বাড়াবাড়ি নাই। একটি কক্ষে রজত-দোলা রজত-শৃঙ্খলে দুলিতেছে। তাহার পশ্চাতে এক বিরাট আরসি। যখন যোধপুরাধিপতি এই দোলায় দুলিতে থাকেন, ভুবনমােহিনী মহিষীগণ কেহ বা অঙ্কে বসিয়া আছেন, কেহ বা চন্দ্রকে ঘেরিয়া তারামালার মত চারিদিকে দোলা আলাে করিয়া বসিয়া আছেন, কেহ বা অলঙ্কার-ঝনৎকারে কক্ষ পূর্ণ করিয়া তালে তালে দোলাইতেছেন, দুলিতেছে রূপসী, দোলাইতেছে রূপসী, তখন কি প্রতিবিম্বই না জানি আরসীতে প্রতিভাত হয়! ইচ্ছা য়, আরসী হইয়া একবার সে রূপতরঙ্গের প্রতিবিম্বমাত্রও অনুভব করিয়া জীবন সার্থক করি। চটিতেছ না ত? কিন্তু কি নর- কুলাঙ্গারই যোধার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। এ হেন রজপুরীতে তঁাহার তৃপ্তি হইল না। তিনি কতক গুলা অশ্বশালার মত গৃহ নির্মাণ করিয়া, হাতে উপপত্নী লইয়া বিরাজ করিতেছেন, রাজ্যের সনে সম্পFও নাই।

৭৮ এসের পত্র দুর্গদ্বারে কি পবিত্র দৃশ্য ! রাজপত্নীগণ সহমরণে যাইব। এ সময় হস্তে যে চন্দন মাখিয়া স্বামীর শবের সঙ্গে দুর্গের বাহিরে শ্মশানে যাইতেন, দুর্গের বাহির হইবার সময়ে, তাহার দুই পার্শ্বের প্রাচীরে পবিত্র করপদ্মের চিহ্ন রাখিয়া যাইতেন। আমাদের সঙ্গে ‘পাও- নিয়ারের সংবাদদাতা একটি সাহেব ছিলেন। তিনি গণিলেন, এরূপ ৩২টি কর-চিহ্ন আছে। কিন্তু আহা! কি অযত্নে পড়িয়া অাছে। আমাদের হৃদয় ভাঙ্গিয়া গেল। আমি সাহেবটিকে বলিলাম-“তােমার ‘পাওনিয়ার’ পত্রিকা আমাদিগকে অজস্রধারায় গালি দিতে পারে, কিন্তু এই যে পুরাতন ঐতিহাসিক কীৰ্ত্তি ধ্বংস হইয়া যাইতেছে ; এই যে পবিত্র আত্মবিসর্জনের নিদর্শন সকলের একটি টেবলেট মাত্রও নাই, ইহার প্রতি কি তােমাদের কোনও চক্ষু পড়ে না ? কোন্ কোন্ সাধ্বী এরূপে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছেন, তাহাদের নামের একটি তালিকা ও ঘটনার কাল, এ স্থানে কি রাখা কর্তব্য নহে? এ স্থানটি একটি পবিত্র তীর্থের মত কি রক্ষিত হওয়া উচিত নহে? এই দুর্গে কত ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার অঙ্গে কি সে সকল লিখিত থাকা উচিত নহে?” সাহেব লজ্জিত হইয়া বলিলেন, এই প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে তাঁহার সাক্ষাৎ হইল, যে এরূপে তাহার চক্ষু খুলিয়া দিলু। তিনি ১৩ বৎসর ভারতে কাটাইয়াছেন, কই, কেহ ত এরূপ কথা বলেন নাই। তিনি এখয় ভারত ছাড়িয়া যাইতেছেন, তথাপি ইহা ভুলিবেন না। তিনি এত প্রীত হইলেন যে, বরদার সহকারী মন্ত্রীর রাছে, আমার সাহায্যের জন্য, এক ত্রি দিলেন এবং বম্বে গেলে, তেঁাহার সঙ্গে দেখা করিতে অনেক করিয়া বলিলেন। রাত জনৈক উচ্চ কর্মচারী, এরূপ কথা শুনিয়া আমাকে নিমন্ত্রণ করিলেন এবং যাধপুর। এ বিষয়ে তিনি মনােযােগী হইবেন, বলিলেন। তাহার পর সেই ( সহস্র ফুট উচ্চ শৈলশেখরের উপরে অশ্বপদাঘাতে প্রস্তরে অগ্নি- ফুলিঙ্গ তুলিয়া, আমরা রাজার প্রকাণ্ড একখানি যুড়িতে গৃহে ফিরিয়া আসিলাম। আবার সময়ে পণ্ডিত জীবানন্দ, শ্বেত-প্রস্তরের দুই সেট চার পেয়ালা ও রেকাবি দিলেন। তাঁহার এবং হরদয়াল সিংহের ফটোগ্রাফ দিলেন। উক্ত সাহেব এবং হরিশ বাবু রাজার যুড়িতে আমাদিগকে ট্রেণে উঠাইয়া দিলেন। ষ্টেশনে আবার প্রতাপ সিংহের সঙ্গে দেখা। তাহার একজন শরীররক্ষককে দিল্লীর সৈন্য- ব্যায়ামে যােগ দিবার জন্য পাঠাইতে আসিয়াছেন। তিনি আমাকে বলিলেন যে তুমি যােধপুরে অতি অল্প সময় থাকিয়া চলিয়া যাইতেছ, আবার আসিও। আমি বলিলাম, আপনার অনুগ্রহ থাকিলে আসিতে পারি। যাহা লিখিলাম, তাহাতে বুঝিবে, ও সম্মানে ভারতের পশ্চিম প্রান্তে যােধপুর দর্শন করিয়া গেলাম। তারাচরণ বলিতেছেন, আমি লিখিতে ভুলিয়াছি যে, যােধপুর দুর্গে এক সুবর্ণরঞ্জিত কক্ষ ও সুবর্ণ ও রজতে নিৰ্ম্মিত সিংহাসন দেখিয়াছি। কি সুখে বরদা। আমরা জয়পুর হইতে আজমীর, পুষ্কর, চিতাের, এবং যােধপুর- ইহাদের বিষয় পূৰ্ব্বে লিখিয়াছি—দর্শন করিয়া বরদায় যাই। বরদার সহকারী দেওয়ান বা মন্ত্রী, আমাদিগকে তাহার অতিথির মত গ্রহণ করেন। তারাচরণ সঙ্গে বলিয়া, আমি আপা সাহেব রােডের ধৰ্ম্মশালায় অবস্থান করি। সহকারী মন্ত্রী মনিই যশােভাই, আমাকে অনেক অনুযোগ করেন যে, পূর্বে তাহাকে কোনও সংবাদ দিই নাই। তাহা হইলে তিনি আমাদের জন্য যথােচিত বাসস্থান নিয়ােজিত করিয়া রাখিতেন। রাজার গাড়ী, রাজার সিপাই ও কারকুন, আমাদের জন্য নিয়ােজিত হয়। আমরা অতি সম্মানের সহিত বরদা দর্শন করি । বরদায় দেখিবার জিনিস দুই। রাজবাড়ী এবং গুর্জরী। গুর্জর ও গুজরাটের কামিনীকুসুমের সৌন্দর্যের গীত সময়ান্তরে লিখিব। বরদার মহারাজকে গাইকোয়ার বলে। অর্থ, গাভী-রক্ষক। গাে ব্রাহ্মণ এক। অতএব রাজার উপাধি গাভীরক্ষক বলিয়া এক জন ব্যাখ্যা করিলেন। আমার বােধ হয়, মহারাষ্ট্র ভূপবির গা- রক্ষক ছিলেন বলিয়া,, গাইকোয়ার নাম হইয়াছে। তেমনি তাহার মন্ত্রী বা পেশকৃ ছিলেন বলিয়া সেতারা এবং পুণর রাজার নাম পেশােয়া ছি।। শিবজীর উত্তরাধিকারীরা হীনব হইলে, পােশশায়া এবং গাইফোয়ার স্বাধীন নরপতি হন। আমার অনুমান কত দূর সতু, জানি না। বর্তমান রাজার নাম জিয়াজী গাহাের। ভূতপূর্ব গাইকোয়ার জনৈক ‘পলিটিকেলে’র বিষচক্ষে পনে, এবং }

No text on this page.

MYT বরদা। ৮১ তাঁহার চক্রান্তে রাজ্যচ্যুত হইলে, তাহার দূরসম্পর্কীয় একটি দরিদ্র বালককে ইংরাজ গবর্ণমেন্ট এই বৃহৎ রাজ্যের অধিকারী করেন। ইনিই বর্তমান গাইকোয়ার। বরদা হইতে কিঞ্চিৎ দূরে ‘মাখন- পুরা’ রাজবাটী নামক এক বৃহৎ রাজপুরী আছে। খাণ্ডেরাও গাই- কোয়ার এখানে পাশাপাশি দুইটি অট্টালিকা নির্মাণ করেন। বৰ্তমান গাইকোয়ার তাহার পার্শ্বে তিন লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া আর একটি অট্টালিকা নিৰ্মাণ করিয়া এখানে বাস করিতেছেন। নগরের মধ্যে আর এক রাজবাড়ীতে অন্যান্য রাজমহিলারা বস করেন। মাখনপুরার তিনটা অট্টালিকা এক শৃঙ্খলে গাঁথা, এবং অবরিত এক গৃহপথ দিয়া নূতন অট্টালিকা হইতে পুরাতন অট্টালিকাতে যাইতে পারা যায়। পুরাতন দুটি বৈঠকখানা মাত্র, এবং নূতনটি অন্তঃপুর। বহুমূল্য ইংরাজি উপকরণের দ্বারা সকল অট্টালিকা সজ্জিত, বিশেষতঃ অন্তঃপুরমহলের সজ্জা কল্পনাতীত। যে সকল রাজবাড়ী দেখিয়া আসিয়াছি, ইহার তুলনায় কিছুই নহে। আমাদের সৌভাগ্যক্রমে, মহারাজ সস্ত্রীক শৈলবিহারে গিয়াছিলেন । সমুদায় গৃহ জনশূন্য। সহকারী মন্ত্রীর আদেশে, আমরা মহারাজার শয়নকক্ষ পৰ্যন্ত নয়ন ভরিয়া দেখিলাম। দেখিবে কি, যে দিকে নয়ন ফিরাইবে, চক্ষু ঝলসিয়া যাইবে। বােধ হইল, মহারাজা ইউরােপীয়ের মত থাকেন। স্নানাগার পর্যন্ত উৎকৃষ্ট মৰ্ম্মরের ইউরােপীয় উপকরণে সজ্জিত। নরচক্ষে যাহা দেখে নাই, তাহাও আমরা দেখিলাম। একটি কক্ষের প্রাচীরে এক বৃহৎ তৈলচিত্রে কি ভুবনমােহিনী মূৰ্ত্তিই দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। ইনি মহারাজার মৃত রাণী লক্ষ্মীরাই। এই চিত্রখানির প্রতি আমরা বহুক্ষণ নিমেষশূন্য চিত্রবৎ মাইয়া ছিলাম। চিত্রখানি মানুষের বলিয়া ত বোধ হইল ৮২ প্রবাসের পর । কি মুখ, কি চোক, কি শরীরের দীর্ঘগঠন, কি চম্পককোরক- নিত কৰ্ণ, কি অতুলনীয় অঙ্গভঙ্গী, কিছুই যেন মানুষের বলিয়া বােধ হইল না। আমাদের বােধ হইল, যেন একটি রূপের স্বপ্ন দেখিতেছি। মহারাষ্ট্রীয় বেশে চিত্রময়ী ভুষিতা। সম্মুখের কুঞ্চিত কেঁচা, সম্মুখ হইতে বঙ্কিমভাবে পদ মধ্য দিয়া অসাবধানে পশ্চাৎ দিকে পড়িয়া কি শােভারই বিকাশ করিতেছে ! জয়পুরের আয় ৬০ লক্ষ, যােধপুরের ৪০ লক্ষ, এবং বরদার ৷ ক্রোর ! যদি বিধাতা আমাকে বলিতেন, তুমি এ সুন্দরীকে চাহ, কি বরদার সিংহাসন চাহ, আমি অম্লানবদনে এই পার্থিব রাজ্য না চাহিয়া, এই অপার্থিব রূপরাজ্য ভিক্ষা চাহিতাম। ভৃত্যেরা বলিল, চিত্রে কিছুমাত্র অত্যুক্তি নাই। তাহারা তাহাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছে। আবার যেমন রূপ তেমনই মন, তেমনই হৃদয়। ভৃত্যগণ এখনও তাহার জন্য হাহাকার করিতেছে। তিনি একটিমাত্র পুত্র রাখিয়া গিয়াছেন। শিশুটিরও তৈলচিত্র অন্য কক্ষে দেখিলাম। যদিও মার সম্পূর্ণ রূপ পায় নাই, তথাপি মরি! মরি !! কি রূপ! শিশু ত নহে, যেন একটি স্বর্গীয় কুসুমকোরক! কক্ষান্তরে মহারাজার বর্তমান মহিষীর একখানি অসম্পূর্ণ তৈলচিত্র দেখিলাম। তিনিও কিছু কুৎসিতা নহেন। তথাপি এই মােহিনীর ছায়াতে তাহাকে কি কুৎসিতই দেখাইল। ভৃত্যেরাও আমাদের মতের প্রতিপােষণ করিল। এই রমণীরত্নের দৃষ্টিতলে, এবং তাহার শিশুপুত্রের মুখখানি দেখিয়া, মহারাজা যে কি প্রকারে দ্বিতীয় রমণীকে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন, আমি ত বুঝিতে পারি না। কর্মচারীরা বলিলেন, রাজকার্য্যে অধিক পরিশ্রম নিবন্ধন গাইকোয়ারে, শিয়ােরােগ হইয়াছে। তাই তিনি বারম্বার ইউরােপে ও শৈলে শৈলে এমন করিয়া বেড়াইতেছেন।ধ্যে সংবাদ-

No text on this page.

。
10. NIG
“好”4

বরদা। ৮৩ * * পত্রে দেখিয়াছিলাম যে, তিনি উন্মত্ত হইয়াছেন। আমার মতে, কাৰ্য্যাধিক্য ইহার কারণ নয়, এই স্ত্রীবিয়ােগই ইহার কারণ। কিন্তু এ হেন ইন্দ্রপুরীতেও মহারাজার সাধ মিটিল না। আর একটি কি অপূর্ব রাজবাটীই প্রস্তুত হইতেছে ! ইহাতে ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হইয়া গিয়াছে। সম্পূর্ণ হইতে আরও ২৫ লক্ষ লাগিবে। যে ইহার কল্পনা করিয়াছিল, সে এক জন অদ্ভুত কবি। ময়দানব তাহার শিষ্য হইবার যােগ্য নহে। আমি ইহার কি বর্ণনা করিব ? প্রথম একটি প্রকাণ্ড ত্রিতল উচ্চ হল। তাহার পর প্রাঙ্গণ বেষ্টিয়া গাইকোয়ারের বহির্মহল, তাহার পর অন্তঃপুরমহল। এই উভয় মহল, ‘হলের সমান উচ্চ, ত্রিতল। মহলে মহলে প্রাঙ্গণ বেষ্টিয়া অসংখ্য কক্ষ। এক একটি কক্ষ এক একটি গৃহ বলিলেও চলে,-এত প্রশস্ত। চিতােরের ‘কীৰ্ত্তিস্তম্ভের মত একটি স্তম্ভ, ত্রিতল ভেদ করিয়া গগনমার্গে উঠিয়া কি অপূৰ্ব্ব শােভাই ধারণ করিয়াছে ! স্তম্ভটি দশ কি দ্বাদশ তল। তবে, চিতােরের তলায় তলায় মধ্য কক্ষে এক একটি দেব দেবীর মূর্তি আছে। এখানে স্তম্ভাররাহী রমণীদিগের বসিবার জন্য তাহা শূন্য রাখা হইয়াছে। বােধ করি, উপযােগী,উপকরণে সজ্জিত হইবে। এই বৃহৎ অট্টালিকার সমস্ত কক্ষগুলি—এমন কি প্রবেশ পথ পৰ্য্যন্ত-সুবর্ণামিশ্রিত বর্ণে বিচিত্র কৌশলে চিত্রিত হইতেছে। বিলাত হইতে শিল্পকর আসিয়া, ইহার চতুর্দিকে উদ্যান সৃষ্টি করিবে, এবং উপযােগী সজ্জা ও উপকরণ প্রস্তুত করিবে। কাণ্ড খানা কি বুঝিতে পারিলে কি? এই রাজবাটীর নাম “লক্ষ্মীমহল”। কিন্তু যে লক্ষ্মীর জন্য এই অতুলনীয় পার্থিব স্বর্গ সৃষ্ট হইতেছিল, তিনি আজ কোথায় ? প্রজারাও তাহার স্মরণার্থ, নগর মধ্যে একটি ‘ঘটিকাস্তম্ভ’ প্রস্তুত করিয়াছে। আজ সেই লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠে।

বােম্বাই। বরদায় এক দিন মাত্র থাকিয়া আমরা বােম্বাই যাই।" বোম্বাই নাম সম্বন্ধে দুটি প্রবাদ আছে । ৩৫০ বৎসর পূর্বে যখন পৰ্ত্ত গিসেরা এ স্থানটি অধিকার করে, তখন ইহার ‘বুয়ন বাহিয়া'—উৎকৃষ্ট বন্দর- নাম রাখে। তাহা হইতে বােম্বাই হয়। দ্বিতীয় প্রবাদ-মম্বাই বলিয়া এক দেবী ছিলেন। তাহার নাম হইতে ইংরাজের। বােম্বাই বা বম্বে করিয়াছেন। এখনও বােম্বাই শহরের একটি অংশের নাম মম্বাই দেবী আছে। আর একটি অংশের নাম কামদেবী। বেজাইর অংশবিশেষ প্রকৃতই কামদেবীর স্থান সে কথা পরে লিখি। বােম্বাই আমার কাছে শ্যামা ভারতমাতার জিহ্বা বলিয়া বােধ হইয়াছিল। জননীর পশ্চিম তীর ব্যাপিয়া, উত্তর দক্ষিণ ঘাট গিরিমালা দুর্লন প্রাচীরবং শােভা পাইতেছে। এই গিরিশ্রেণীই আমাদের কবিকঙ্গনার সম্বল ‘মালয়াচল। এই শৈলসমাচ্ছন্ন তীর হইতে জিহ্বার মত একটি ভূমিখণ্ড সমুদ্রবক্ষে ভাসমান। শ্যামার জিহ্বা রক্তবর্ণা। শ্যামা ভারতমাতার জিহ্বা শ্যামপত্র-সমাচ্ছন্ন সৌধ ও শৈলমালায় উদ্যানবৎ শােভিত। শ্যামার জিহবার চারি দিকে রক্ত-ফোটা চিত্রিত হইয়া থাকে। এ শ্যামার জিহ্বার চারি দিকে ফোটার মত ক্ষুদ্র শৈল-দ্বীপরাশি নীল সমুদ্রগর্ভে শোভা পাইতেছে। এখন বুঝিলে, বােম্বাই কি মনােহর উপদ্বীপ ? ইহার তিন দিকে সমুদ্র পরিখার মত বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে। এ সমুদ্রে তরঙ্গ নাই, লহরী নাই, গর্জন নাই। শান্ত, স্থির, নীরব। যেন একখানি অনন্ত নীল আবৃসি পড়িয়া রহিয়াছে, তাহার মধ্যে মধ্যে এক একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ বােম্বাই। যেন এক একটি সুন্দর ফুলের মত শােভা পাইতেছে। বােম্বাইর উভয় পার্শ্বে নানা স্থানে সমুদ্র-শাখা ভূমিমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। এ সকল শাখার উপর দিয়া রেলওয়ের দীর্ঘ সেতু নির্মিত হইয়াছে। গাড়ী এই সলিলরাশির উপর দিয়া, উভয় পার্শ্বে সুপারি, তাল, নারিকেল, খর্জুরবৃক্ষশােভিত গিরিমালার মধ্য দিয়া চলিয়া যাইতে, কি চঞ্চল চিত্ত-বিনােদন প্রাকৃতিক শােভাই প্রাণ মন মােহিত করিয়া দেয়। আমরা প্রথমেই জিহ্বার অগ্রভাগস্থ পৰ্বতস্থিত ইংরাজদিগের বসতিস্থান দেখিতে যাই। এই পৰ্বতটির নাম “নেলেবার হিল,” তাহার প্রান্ত সীমাগ্রে শৈবালসমাবৃত হংসের ন্যায়, বােম্বাইয়ের গবর্ণরের রাজপ্রাসাদ সমুদ্রে ভাসিতেছে। এই পৰ্বতটি ইংরাজ- দিগের গৃহাবলীতে সমাচ্ছন্ন। উভয় পার্শ্বের সমুদ্র সকল গৃহ হইতে দেখা যায় ; পর্বতটির সৰ্ব্বত্রে পথমালা এরূপ বিচিত্র কৌশলে নিৰ্ম্মিত হইয়াছে যে, সকল দিকে গাড়ী চলিয়া যায়। রক্তবর্ণ রাজপথসমূহ গিরি-অঙ্গে যেন প্রবালহারাবলীর মত শােভা পাইতেছে। উভয় পার্শ্বে মনােহর সৌধ ও উদ্যানমালা, এবং তাহার বিরাম-স্থান-পথে সমুদ্রের নীল কান্তি দর্শন করিয়া শকটভ্রমণ কি মনােহর। ফিরবার সময়ে এই পৰ্বতস্থিত পার্সিদিগের “নীরব মন্দির” বা সমাধিস্থান দর্শন করি। মূল সমাধিস্থানটি একটি গোলাকার প্রাচীর মাত্র। তাহার অন্তবর্তী স্থানটি চক্রাকারে তিন মণ্ডলে বিভক্ত করা হইয়াছে। কেন্দ্রস্থলে একটি কূপ ; তাহাতে বেষ্টিয়া যে মণ্ডল, তাহাতে শিশুদিগের, তাহার বাহিরের মণ্ডলে রমণীদিগের, তাহার বাহিরের মণ্ডলে পুরুষদিগের শব রক্ষিত হয়। প্রাচীরের এক স্থানে একটি গবাক্ষ আছে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়েরা এই গবাক্ষ পৰ্যন্ত প্রবাসের পত্র শব লইয়া গেলে, সমাধিস্থ দুই জন ভৃত্য এখান হইতে শব ভিতরে লইয়া যায়। তাহারা ভিন্ন অন্য কেহ ভিতরে প্রবেশ করিতে পারে না। তাহার পর শবটির বসন মােচন করিয়া, উপযুক্ত মণ্ডলে রাখিয়া দেয়। অল্পকাল মধ্যেই শকুনে তাহা নিঃশেষ করিলে, ভৃত্যেরা অস্থিসকল মধ্য কূপের গর্ভে ফেলিয়া দেয়। কালে উহা চুণে পরিণত হইয়া, কূপতলস্থ জলপ্রণালী দিয়া পৰ্ব্বতের উপত্যকায় গিয়া, ভূমির সঙ্গে মিশ্রিত হইয়া ভূমির উৰ্ব্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে। মানুষকে এরূপ শকুনের আহাৰ্য্য করা আপাততঃ শুনিতে বড়ই নিষ্ঠুরতা বলিয়া বােধ হয়। তবে চক্ষের উপর পােড়াইয়া ফেলা, কিম্বা ভূমিগর্ভে অসংখ্য কীটের আহার করিয়া দেওয়াও কি নিষ্ঠুরতা নহে ? যখন আর্যজাতিরা কেবল বৈদিক অগ্নির উপাসক মাত্র ছিলেন, তখন দুই ভাগ হইয়া উত্তর কুরু হইতে এক শাখা ভারতে প্রবেশ করেন, অন্য শাখা পারস্য দেশে গমন করেন, ইহারাই পার্সি। ভারতীয় আৰ্যদিগের ধর্মের অনন্ত রূপান্তর ও উন্নতি হইয়াছে। পার্সিরা এখনও অগ্নি উপাসক। উত্তর কুরু শীতপ্রধান দেশ, অতএব অগ্নি তথায় মনুষ্যের প্রধান অবলম্বন, প্রধান দেবতা। শব দাহ করিতে অগ্নির ও ইন্ধনের অপব্যয়, বৃক্ষ-বিরল শীতপ্রধান দেশে সম্ভব নহে। সেই জন্য উত্তর কুরুতে শব এরূপে পশু পক্ষীর আহারের জন্য ফেলিয়া রাখা হইত, ইউরােপে এখনও ভূগর্ভে প্রােথিত করা হইয়া থাকে। পার্সির সেই পূৰ্ব্ব নিয়ম রক্ষিত করিয়া আছেন। ভারতে কাষ্ঠের অভাব নাই, কাযেই এই নিষ্ঠুর নিয়ম পরিবর্তিত হইয়াছে। এরূপে দেশ, কাল ও অবস্থাই মানুষের জাতীয় আচার ব্যবহারের রূপাস্তুরের মূর্ণীভূত কারণ। তদ্ভিন্ন আর একটি গভীর তত্ত্ব পার্সি ও হিন্দুদিগের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার 0)

G
বােম্বাই “নীরব মন্দির” ৮৬ পৃষ্ঠা
Mohila Press, Calcutta.

No text on this page.

বােম্বাই। ৮৭ ভিতরে নিহিত আছে। উভয় জাতির ধর্মনীতির মূল-সৰ্ব্বভূতহিত। শবটি পােড়াইয়া ফেলিলে কি কবর দিলে, আপাততঃ কাহারও হিতসাধন করা হয় না। কালে তাহা ভূমি, জল, ইত্যাদি পঞ্চভূতে বিলীন হইয়া, শস্যাদি উৎপন্ন করিয়া, জীবহিত সাধন করে সত্য, তবে সে বহুকালসাপেক্ষ এবং তত্ত্বটি জটিল। পার্সিদিগের শব তৎক্ষণাৎ পশুপক্ষীর আহার হইয়া প্রত্যক্ষ জীবহিত সাধন করে, এবং অস্থিও কালে ভূমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে। আমি ত মরিয়া গিয়াছি, সুখ দুঃখের অতীত হইয়াছি; অতএব আমার লােষ্ট্রবৎ জীবন দেহটি আহার করিয়া যদি কয়টি প্রাণীর তৃপ্তি হয়, ক্ষতি কি ? দেহটি ধ্বংস করা ও ভূগর্ভে পচিতে দেওয়া অপেক্ষা, এরূপ জীবহিতে নিয়ােজিত হওয়া কি ভাল নহে ? পর দিবস নগর দর্শন করিতে করতে আমরা খ্যাতনামা “হস্তিগুম্ফা দেখিতে যাই। বােম্বাই নগরটি দেখিতে অতি সুন্দর। কলিকাতার মত এমত বৃহৎ অট্টালিকা নাই, তবে অট্টালিকাগুলি বহুতলবিশিষ্ট এবং বড় কবিত্বপূর্ণ। প্রত্যেক গৃহ নানারূপ বারাণ্ডা ও নানারূপ কোণবিশিষ্ট। আকৃতিবৈচিত্র্য বড় মনােহর। বােম্বাই নগরের দুইটি বিশেষ লক্ষণ। অধিকাংশ অট্টালিকার সর্বোচ্চ তলার ছাদ খােলার, এবং ফুল অতি বিরল। সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসে ফুল বাঁচে না, বোধ হয়। সমুদ্ৰানিল সলিলসিক্ত বলিয়া বােম্বাই অঞ্চলে গ্রীষ্মের প্রখরতা নাই, এবং লবণাক্ত বলিয়া শীতেরও প্রবলতা নাই। এই পৌষমাসের মধ্যভাগেও আমরা কিছুমাত্র শীত অনুভব করিলাম না। এ জন্যই কবিরা মলয়াচলকে চির বসন্তের আলয় বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, এবং এই জন্যই মলয়ানিলের এত গুণগান। তবে এ বসও পুষ্পহীন বােধ হইল, এবং এ ৮৮ প্রবাসের পত্র মলয়াচলে চন্দনবৃক্ষ ও ভুজঙ্গ নাই বলিয়া তারাচরণের দৃঢ় বিশ্বাস, মলয়াচল ব্রহ্মদেশে। জানি না, সেই চিরবসন্তের দেশে থাকিয়া তােমার ভায়া কি দারুণ বিরহযন্ত্রণাই ভােগ করিতেছেন। আমরা একখানি ‘জালিবােট ভাড়া করিয়া, সমুদ্রগর্ভস্থ এলিফেন্টা বা হস্তিগুম্ফা-দ্বীপ দেখিতে গেলাম। এই সমুদ্রবিহার আমি এ জীবনে ভুলিব না। স্থানে স্থানে খণ্ড-পৰ্বত সমুদ্রগর্ভে যেন এক একটি দোল কিম্বা এক একখানি রথের মত ভাসিতেছে। তাহার মধ্য দিয়া আমাদের তরণী ধীরে ধীরে চলিয়া যাইতেছে। কোনও খণ্ড-শৈলে ইংরাজরাজ বােম্বাই রক্ষণার্থ অস্ত্রাগার, কোথাও বা, বারুদাগার নির্মাণ করিয়াছেন। শ্বেত অট্টালিকাটি দূর হইতে দেখিলে বােধ হয়, যেন একটি রাজহংস গিরিশিরে বসিয়া সমুদ্র শোভা দেখিতেছে। স্থানে স্থানে যুদ্ধযান এবং বৃহৎ বৃহৎ বাষ্পীয় যান সকল সগর্বে ভাসিতেছে। আমাদের ক্ষুদ্র তরণী হংসিনীর মত তাহার পার্শ্বে ক্রীড়া করিতে করিতে চলিয়াছে। বহু দূর গিয়া পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিলাম—অহহ! কি দৃশ্য ! “দূরে চক্রনিভ তন্বী, তমাল তালের লীলা, কলঙ্ক রেখার মত শােতে লবণম্বুি বেলা।” তমাল দেখি নাই। কিন্তু তালজাতীয়-বৃক্ষশীর্ষ-বন-রাজি-মণ্ডিত, সৌধমালায় বিচিত্রিতা বোম্বাই নগরী কি শােভার ভাণ্ডারই লবণাম্বুতীরে খুলিয়া রাখিয়াছে, এবং কি মনোেহর নীলদর্পণে কি মনোহর মুখমণ্ডলের প্রতিবিম্ব দেখিতেছে! যে ব্যক্তি একবার সমুদ্রগর্ভ হইতে, এই মলয়াবারের তীর সুবঙ্কিম' এবং এই মধ্যাহু রবিকরে “মলয়াচলের-উজ্জ্বল-নীলিমা” নয়ন ভরিয়া দেখিয়াছে, সে কখনও উহা ভুলিতে পারিবে না।

No text on this page.

AVM A Anti- । विमान বােম্বাই। ৫ এলিফেন্টা দ্বীপের পৰ্বতটি বৃক্ষাবলীতে বড় সুন্দররূপে শােতা পাইতেছিল। এই পৰ্ব্বতের কটিদেশে ‘হস্তিগুম্ফা, তাহা হইতে ইহার নাম ‘এন্টো' হইয়াছে। এই গুম্ফা-দ্বারে পুরাকালে একটি প্রস্তরের হস্ত ছিল। সমুদ্রতীর হইতে গুম্ফা পৰ্যন্ত সােপান- শ্রেণী উঠিয়াছে। জনৈক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও তাহার শ্বেতাঙ্গিনী প্রিয়া এখন গুম্ফার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। তাঁহাদের পাশ লইয়া গুম্ফা দর্শন করিতে হয়। দুইটিই বেশ ভদ্রলোক। যদিও বহুতর শ্বেতাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গিনীরা তখন গুফাদারে বিরাজ করিতেছিলেন, কেহ পান করিতেছেন, কেহ ভক্ষণ করিতেছেন, কেহ সমুদ্র শােভার প্রতি চাহিয়া চাহিয়া বৃক্ষ-দোলায় দুলিতেছেন, তথাপি তাহারা আমাদের প্রতি খুব ভদ্রতা দেখাইলেন। পৰ্বতের প্রস্তর বক্ষ কাটিয়া ‘রাজ- গিরের’ শােনভাণ্ডার কক্ষের মত, কিন্তু তদপেক্ষা বড়, একটি কক্ষ নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। কক্ষ, প্রাচীর বড় সুচারুরূপে নিৰ্ম্মিত নহে। ‘বরাবরের’ গুম্ফ। সকল এতদপেক্ষা অনেক উৎকৃষ্ট, অনেক উৎকৃষ্ট, তাহাদের প্রাচীরে মুখ দেখা যায়, এমনি মসৃণ ! তবে কক্ষটির প্রাচীরের গায়ে বহতর হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবী মূৰ্ত্তি স্থাপিতা রহিয়াছে। মূর্তিগুলি তত শিল্পনৈপুণ্যপূর্ণ না হউক, নিতান্ত মন্দ নহে। তাহার পার্শ্বে অসম্পূর্ণ আরও দুই তিনটি ক্ষুদ্র গুফা আছে। আমার বােধ হইল, এই গুম্ফা বৌদ্ধদের কর্তৃক তপস্যার জন্য নির্মিত হইয়াছিল, পরে বৌদ্ধ-বিপ্লবের পর, হিন্দুরা অধিকার করিয়াছেন। তাহার প্রমাণ, দুই স্থানে দুইটি শিবলিঙ্গ বসান হইয়াছে, দেখিলে বেশ উপলব্ধি হয় যে, সেখানে অন্য কোনও মূর্তি ছিল, তাহা উঠাইয়া শিবলিঙ্গ স্থাপিত করা হইয়াছে। গর্তটি লিঙ্গ অপেক্ষা বড়। এই পৰ্ব্বত হইতে চতুর্দিকস্থ সমুদ্রগর্ভে ভাসমান পার্বত্য দ্বীপপুঞ্জ ও সমুদ্রশােভা প্রবাসের পত্র। দেখিলে চোক ফিরাইতে ইচ্ছা করে না। মুহূর্ত এই শােভা দেখিয়া আমরা ফিরিলাম। প্রতিকূল বাতাস নিবন্ধন অর্থ প্রণ আসিলেই সন্ধ্যা হইল, জ্যোৎস্না উঠিল ; পটপরিবর্তন হইয়া জ্যৈাৎস্নাভােসিত পৰ্বত-দ্বীপ-খচিত, সমুদ্রের কি মনােমুগ্ধকর শােভা হইল। মনের আনন্দে সকলে মিলিয়া গাহিতে গাহিতে বােম্বাই ফিরিয়া আসিলাম। গীত যেন আপনি হৃদয় উচ্ছসিত করিয়া বহিতেছে, তরণী যেন সেই গীতের তালে তালে মনের আনন্দে নাচিতেছে। পূৰ্ব্ব দিন মলয়- পৰ্বত-শিরে দাঁড়াইয়া, এই সমুদ্রের দিকে চাহিয়া, আমিও বাইরণের মত স্বপ্ন দেখিতেছিলাম- মলয় বােম্বাই বক্ষে ; বােম্বাই সমুদ্র তীরে ; তথা দাঁড়াইয়া একা দেখি স্বপন, ভারতের সুখসূৰ্য্য আসিবে রে ফিরে। বাইরণের স্বপ্ন ফলিয়াছে ;-গ্রীসের সুখের দিন ফিরিয়াছে। আমার স্বপ্ন ফলিবে কি ?

পূনা • কাল প্রাতে বম্বে ছাড়িয়া অপরাহ্ন ৫টার সময়ে পূনা পঁহুছি। বম্বে দুইটা দিন কি কষ্টে কাটাইয়াছি বলিতে পারি না। তারা- চরণের হিন্দুয়ানীর কল্যাণে যে এক মহারাষ্ট্রীয় হিন্দু হােটেলে উঠিয়াছিলাম, তাহার বিচিত্র নাম পূর্বে লিখিয়াছি। ইনি মহারাষ্ট্রীয় এবং মহারাষ্ট্রীয়দিগের দপ্রবৃত্তির একটি জীবন্ত মূর্তি। সে মূর্তি- খানি দেখিয়াই আমার চমক লাগিয়াছিল। আমি তখনই বুঝিয়া- ছিলাম যে, আমরা এক ব্যাধের ফাদে পড়িয়াছি। তিনি আমাদের অর্থ শােষণ করিবার জন্য জাল পাতিতেছিলেন। আর একটি ভুক্ত- ভােগ্য বাঙ্গালী, তাহার হােটেলে ছিলেন, ইহার কৃপায় আমরা রক্ষা পাই। যাহা হউক, অর্থ না হউক, দুই দিন যাবৎ আমাদের শােণিত শােষিয়া, ইনি ৭০ লইয়া আমাদিগকে ছাড়েন। লইলেন ৭• আনা, খাইতে দিয়াছিলেন ছটাক দুই চাউল, আর খানিকটা মূলার শাক। তাঁহার বিচিত্র হােটেলে যদি আধ ঘণ্টা কালও থাক, তবে সমস্ত দিবসের ভাড়া দিতে হয়। কাযে কাযে আমাদিগকে কাল অনাহারে ছাড়িতে হয়, এবং সমস্ত দিন অনাহারে থাকিতে হয়। যাহা হউক, সেই “নারায়ণ-ভােজন-বস্তি-গৃহ” বা গ্রহ হইতে উদ্ধার পাইয়া, আমি নারায়ণকে ধন্যবাদ দিয়াছিলাম। হােটেল কর্তার নাম নারায়ণ। তিনি আমাদিগকে ভােজন না করিয়া যে গ্রাস- মুক্ত করিয়াছেন, তাহা দুইটি রমণীর এয়ােন্তির জোর বলিতে হইবে। ‘কল্যাণ’ ষ্টেসন হইতে আমরা ঘাট পর্বত বা মলয়াল আরােহণ প্রবাসের পত্র। করিতে আরম্ভ করি। গরজাট ষ্টেসন হইতে দুইখানি এঞ্জিন ট্রেণের অগ্র ও পশ্চাতে সংযােজিত হয়। কখন বা পশ্চাতের এঞ্জিনে টানিয়া আমাদিগকে দেখিতে দেখিতে পৰ্বত সানুদেশে, অর্থাৎ সমুদ্র-উপকূল হইতে ২০০০ ফিট উর্দ্ধে তুলিয়া ফেলে। এই গগনবিহার বিজ্ঞানের একটি চরম গৌরব। কখন বা উচ্চ সেতুর উপর দিয়া, কখন বা গিরিপার্শ্ব বাহিয়া, ট্রেন নক্ষত্র বেগে ছুটিতেছে। যদি এক পা এ-দিক ও-দিক হয়, তবে সহস্র সহস্র ফিট গভীর গিরিগহ্বরে পতিত হইবে। আর কখন বা গিরিগর্ভ ভেদ করিয়া, সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়া, অন্ধকারে ছুটিয়া যাইতেছে। এরূপে ২৫টি সুড়ঙ্গ পার হইয়া আসি । গাড়ীতে আলাে দেওয়া আছে, সুড়ঙ্গে প্রবেশ করিলে ঠিক যেন রাত্রি। এক একটি সুড়ঙ্গ এত দীর্ঘ যে, ট্রেন দুই তিন মিনিট তাহার ভিতর থাকিয়া যায়। রেলপথের দুই দিকের দৃশ্যই বা কত মনােহর। অনন্ত গিরিশ্রেণী স্তবকের পর স্তবকে সজ্জিত রহিয়াছে। সুদূরে কোনও শৃঙ্গে, পুরাতন মহারাষ্ট্র দুর্গের ভগ্নাবশেষ শােভা পাইতেছে। স্থানে স্থানে নিঝর স্রোত নীল-মণি-হারের মত দেখাইতেছে। সেই যে ২০০০ ফিট উপরে উঠিয়াছি, আর আমরা নামি নাই। উপরে উঠিলে রেল প্রায় সমসূত্রে পূনা পৰ্য্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে। অতএব বুঝিতে পারিতেছ যে, পূনা নগর সমুদ্র তীর হইতে ২০০০ ফিট উর্ধে অবস্থিত। এই আকাশের উপর মহারাষ্ট্রের কি বিশাল রাজ্যই অবস্থিত ছিল।' এলাহাবাদের জনৈক ডাক্তার, পূনার জন্য একখানি পরিচয়- পত্র দিয়াছিলেন। আসিয়া দেখিলাম, যাহার নামে পত্র, তিনি এক জন ছাত্র। ইহারা কয়েক জন বাঙ্গালী ছাত্র এখানের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়িতেছেন। তাহাদের ছাত্ৰ-আবাসে বসিয়া তােমার

No text on this page.

کرام গুনা। ১৩ কাছে পত্র লিখিতেছি। তাহারা আমাদের বড় যত্ন করিতেছেন। একটি ছাত্র ভিন্ন এখানে আর বাঙ্গালী নাই । অদ্য প্রাতে প্রথমে পার্বতীর পর্বত আরােহণ করি।যাইবার পথে পৰ্ব্বতের পাদমূলে একটি ঝিল, তাহার মধ্যস্থানে একটি দ্বীপ। ঝিল এখন শুষ্ক, দ্বীপ এখন জঙ্গল। পৰ্বতে উঠিয়া প্রথমেই পাৰ্বতীর মন্দিরে যাই। মধ্যস্থলে রজতনিৰ্মিত শিব। “রজতগিরিনিভং” ধ্যানবাক্যের প্রতিমূর্তি। এক পার্শ্বে স্বর্ণপাৰ্বতী তপ্তকাঞ্চনাভা,” অন্য দিকে সােণার গণেশ। উভয়কে অঙ্কে লইয়া, মহাদেব বিরাজ করিতেছেন। তাহার মহারাষ্ট্র বেশ, মাথায় একটি প্রকাণ্ড পাগড়ি। আমার বােধ হইল—সিদ্ধি, শক্তি এবং নিষ্কামতা, যেন একাধারে এই ত্রিমূর্তিতে বিরাজ করিতেছে। এই ত্রিমূৰ্ত্তির এই ত্রিমূর্তির বা ত্রিশক্তির সাধনা দ্বারা শিবজী মহারাষ্ট্র রাজ্য সৃষ্টি করিয়াছিলেন, মােগল রাজ্যের অধঃপতন ঘটাইয়াছিলেন। এই মহাসাধনা ভুলিয়া, তাহার কাপুরুষ উত্তরাধিকারী বাজিরাও, সেই সাম্রাজ্য হারাইলেন, ভারতকে ইংরাজ-করে তুলিয়া দিলেন। ত্রিমূৰ্ত্তিকে ত্রিমূর্তিকে ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া পার্শ্বস্থিত সৌধশিরে আরােহণ করিলাম। এই মন্দিরের পার্শ্বে, শেষ মহারাষ্ট্রাধিপতি পেশােয়র বাজিরাও পেশােয়র বাজিরাও অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ বর্তমান রহিয়াছে। অদূরে শৈলশেখরে শিবজীর খ্যাত- নামা দুর্গত্রয়-সিংহগড়, রাজগড় এবং রায়গড়—আকাশের গায়ে চিত্রপট দেখাইতেছে; চারি দিকে গিৰিশ্রেণী আকাশে তরঙ্গ খেলিয়া নীরবে দাঁড়াইয়া আছে। ইহাদের প্রত্যেকের অঙ্গে অঙ্গে মহারাষ্ট্রদিগের গৌরবের ও অধঃপতনের ইতিহাস লিখিত রহিয়াছে, একটি পর্বতের কক্ষদেশে “চতুঃসিংহ” মন্দির একটি শ্বেত কুসুমের মত শোভা পাইতেছে। ইহাতেও হর-পাৰ্বতীর মূর্তি মূর্তি আছে।

১৪ প্রবাসের পত্র. । দশমী দিবসে, মহারাষ্ট্রীয়গণ তাহাদের পূজা করিয়া, দেশলুণ্ঠনে এবং . যুদ্ধে যাত্রা করিতেন। আমার কর্ণে যেন সেই বীরকণ্ঠ, সেই “বম বম বর্ষ হর হর” রব স্বপ্নশ্রুত শব্দের ন্যায় প্রবেশ করিতে লাগিল হর হর হর বলে ; কি কাণ্ড করিলে বলে। সেই সিংহনাদ আজি হয়েছে স্বপন! মহারাষ্ট্র ইতিহাস অদ্ভুত যেমন!” শিব-শক্তির মন্দিরের পদমূলে, সেই কির্কির যুদ্ধক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে পেশােয়র রাজমুকুট খসিয়া পড়ে। কাপুরুষ বাজিরাও, প্রাণভয়ে পার্বতীর মন্দিরের একটি কক্ষে বসিয়া, এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাহার অদৃষ্টের পরীক্ষা দেখিতেছিল। ইংরাজদিগের জয় হইলে, সেই কক্ষ হইতে পলায়ন করে, এবং ধৃত হইয়া বিফুরে বন্দী হয়। নানা সাহেব তাহারই পােষ্যপুত্র। সেই হরপার্বতীর, সেই শিব-শক্তির মন্দির এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। কিন্তু মহারাষ্ট্রদিগের শিব (মঙ্গল) ও শক্তি (বীরতা) চিরদিনের জন্য অস্তমিত হইয়াছে। আজ সেই যুদ্ধক্ষেত্রে, হরপার্বতীর মন্দিরের ছায়াতলে, বম্বের গবর্ণরের বাড়ী এবং সৈন্যগৃহাবলী শােভা পাইতেছে। ইহাদের এত দূর অধঃপতন ঘটিয়াছে যে, মন্দিরের পূজক শিবের ধ্যানটি পৰ্যন্ত বলিতে পারিল না, এবং পুরােহিত মহাশয় বলিলেন, মৃত ভাষা সংস্কৃত তিনি কি জন্য শিখিবেন। তিনি ইংরাজীতে আমাদের কাছ হইতে কিছু উশুল করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। এমন অর্থগৃধু, নরপিশাচ আমি যেন আর দেখি নাই। সে তাহাদের জাতীয় ইতিহাসের কিছুই জানে না। আমি তাহাকে সেই জন্য • আনা পয়সা মাত্র দিয়া আপনার ইতিহাসখানি পড়িতে বলিলাম। ছাদ হইতে অবতরণ করিয়া, পার্শ্বস্থিত এক মন্দিরে কৃষ্ণ- পূনা। প্রস্তরনির্মিত কার্তিকের ও অন্য মন্দিরে নারায়ণের চতুভুর মূর্তি দর্শন করি। দেবতারা সকলেই এখন ইংরাজ রাজ্যের বৃত্তিগী বিষ্ণুর মন্দিরে অতি সুন্দর সঙ্গীত হইতেছিল। পূজৰু ব্ৰাহ্মণও একটি অতি সুন্দর ধ্যান বলিলেন। আমি লিখিয়া লইয়াছি। পার্বতীর পৰ্বত হইতে অবরােহণ করিয়া পূনার ‘শিল্প-প্রদর্শনী দেখিতে যাই। প্রদর্শনী কাল বন্ধ হইয়াছে। কর্মচারীগণ প্রথম বলিলেন, আমাদিগকে না দেখিতে দিবেন, না কোন জিনিস কিনিতে দিবেন। দুই এক কথা বলিলে বলিলেন, কি করিবেন, নিয়ম লঙ্ঘন করিতে পারিবেন না। নিতান্ত পক্ষে সম্পাদকের মত চাহি। তাহার পর দু'চার কথা তীব্র বিদ্রুপ শুনিয়াই নিয়মও লঙ্ঘন করিলেন, দেখিতেও দিলেন, কিনিতে দিতেও স্বীকৃত হইলেন। তাহার পর সহর দেখি। দেখিলাম, পেশােয়াদের পুরাতন রাজ- বাটীর একটিতে বৃটিশদিগের পুলিস ষ্টেসন বিরাজ করিতেছে। তাহার পর দুর্গ দেখিতে গেলাম। ঘরদেশে আমাদের জনৈক পুলিস বিরাজিত। বলা বাহুল্য যে আর দেখা হইল না। দেখিবারও কিছু নাই। তাহার পর বাজার দেখিয়া গৃহে আসিলাম। শিবজী আপন গুরুকে দান করিয়া পুণ্য করিয়াছিলেন বলিয়া এ স্থানটির নাম—শুনিলামপূনা হইয়াছে। আজ সেই পূনা নগর, মহারাষ্ট্রীয়দের একটি ঐতিহাসিক মহাশ্মশান। পূনা ‘সাৰ্বজনিক সভাগৃহে, পেশােয়াদিগের জনৈক খ্যাতনামা মন্ত্রীর একখানি চিত্র দেখিলাম। এখন সেই বীর রাজা নাই, সেই গভীর রাজনৈতিক মন্ত্রীও নাই ! মহারাষ্ট্রের ভাগ্যে, ভারতের ভাগ্যে, আবার সে মণিকাঞ্চনের সংযােগ হইবে কি , কে বলিবে ? ভিতরে দণ্ডকারণ্য। পূৰ্বেই লিখিয়াছি, বােম্বাইয়ের “নারায়ণ-ভােজনবন্তি গৃহ” হইতে দুই দিনে উদ্ধার হইয়া পূনায় যাই। পূনার কথা লিখিয়াছি। পূনা হইতে ‘নাসিক’ যাই। পূনার মত নাসিকও মধ্য-ভারতের অধিত্য- কায় ২০০০ ফিট উচ্চে অবস্থিত। কল্যাণ ষ্টেসন হইতে ক্রমশঃ ১৩টি, গিরিসুড়ঙ্গ ভেদ করিয়া, গাড়ী এই অধিত্যকায় তারােহণ করে। কিন্তু একবার উঠিলে অনন্ত সমতল ভূমি। তুমি এত উচ্চ স্থানে উঠিয়াছ বলিয়া বােধ হইবে না। শুধু তাহা নহে, অধিত্যকটি স্বর্ণপ্রসূ। চারি দিকে সুন্দর শস্যক্ষেত্র এবং নিবিড় আম্রবন দেখিলে, ঠিক যেন বঙ্গ দেশ বলিয়া বােধ হয়। ইহার জল বাতাস এত উৎকৃষ্ট যে, একবার নাসিককে ভারতের রাজধানী করিবার প্রস্তাব করা হইয়াছিল। লক্ষ্মণ এখানে সূর্পণখার নাসিকা কাটিয়াছিলেন বলিয়া, স্থানটির নাম “নাসিক” হইয়াছে, বােধ হয়। ষ্টেসন হইতে পাঁচ মাইল ব্যবধানে নাসিক নগর। টোঙ্গায় যাইতে হয়। এখানকার টোঙ্গাণ্ডলি এক নূতন জিনিস। দেখিতে যেন কেনভাসের ছাদওয়ালা টমটম। লাঙ্গলে যেরূপে গরু জুতিয়া থাকে, ইহাতে সেইরূপ দুটি ঘােড়া জুড়িয়া দেয়। কিন্তু নক্ষত্ৰবেগে চলিয়া যায় । আমরা অপরাহ্নুে সিকে গিয়া, পাণ্ডা অমৃতরাম অনন্তরাম সিঙ্গ- রিয়ার বাড়ীতে অতিথি হই, এবং তাহার ভ্রাতৃ বধূ আদা দেবী আমাদের অন্নপূর্ণার কাৰ্য করেন। পর দিবস প্রাতে, প্রথমে গােদাবরী দর্শন করি। গােদাবরীর গর্ভ প্রস্তরময়। তাহা কাটিয়া, দীর্ঘাকৃতি কুগুরাশি সৃষ্টি করা হইয়াছে। কুণ্ডের দুই পার্শ্বে জলের দণ্ডকারণ্য। ; বন্ধ রাখা হইয়াছে। তাহার দ্বারা কুণ্ড হইতে কুণ্ডারে গােবরী স্রোত বহিয়া যাইতেছে। উপর দিয়া লােক এ পার হইতে পা পারে হ্রাকায়াত করিতেছে। তারাচরণ গঙ্গাষ্টক আবৃত্তি করিতে করিতে “তুঙ্গস্তনাস্যালিত” জলে স্নান করিলেন। তাঁহার জন্য ত এক ডুৰ দিলেনই। তাঁহার পিতা, মাতা, সর্বশেষ আজন্ম পতিবিরহিনী পত্নীর জন্যও এক ডুব দিলেন। আমার মাতা নাই, পিতা নাই। তাহারা উভয়ে বৈকুণ্ঠে ; বহুদিন এই অযােগ্য পুত্রের পাপ পুণ্যের অতীত হইয়াছেন। আছেন পত্নী, কিন্তু তাহার স্বামী অবগাহন করিলে, সেই স্বামীর পুণ্যের ভাগী তিনি হইতে পারিবেন কি না, আমার সে বিষয়ে অনেক সন্দেহ আছে। সংসারসমুদ্রে ডুবিয়া ত তাহার জন্য কোন পুণ্য সঞ্চয় করিতে পারি নাই। গােদাবরীতে ডুবিয়া কি পারিব ? তদ্ভিন্ন, এ স্থানের জলের এরূপ বর্ণ যে, তাহা কেবল নিমজ্জিতা সুন্দরীদের “তুঙ্গ স্তন” মাত্র আস্থালিত করিয়া আসিতেছে বলিয়া ত আমার বােধ হইল না। চক্ষের উপর দেখিলাম, কতরূপ ময়লাই এ স্থানে প্রক্ষালিত হইতেছে। এখানে স্নান করিতে আমার কিছুতেই প্রবৃত্তি হইল না। গােদাবরীর অপর পারেই ‘দণ্ডকারণ্য। এখন তাহা একটি ক্ষুদ্র গৃহারণ্য। গােদাবরী পার হইয়া আমরা প্রথম একটি বৃহৎ প্রাঙ্গণসম্বলিত মন্দিরে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার মূর্তি দর্শন করি। প্রবাদ আছে যে, এখানে রামচন্দ্র কুটীর নির্মাণ করিয়া বনবাস করিয়াছিলেন। এই সেই রামায়ণের আরণ্য শােভাপূর্ণ পঞ্চবটী। প্রাঙ্গণে অনেকগুলি উদৱসৰ্বস্ব সন্ন্যাসী বসিয়া রহিয়াছে। এক জন আমাদের সঙ্গে কিঞ্চিৎ রসিকতা করিলেন। তাহার পর আর একটি মন্দিরে যাই। এখানে কৃষ্ণমূৰ্ত্তি স্থাপিত আছে। পাণ্ডা ১৮ প্রবাসের পত্র। । বলিন, এ মন্দিরে যাহা মানস করিব, তাহা পাই । আমি কলিল, আমার কিছুই বাঞ্ছনীয় নাই। নারায়ণ আমাকে যাহা দিয়াছেন, আমি তাহাতেই সুখী। তারাচরণ বলিলেন, কি আমাকে প্রার্থনা করিতে হইবে। তখন আমি প্রার্থনা করিলাম— “প্রভো! আমার নির্মুল তােমার কাৰ্য্যের উপযােগী হউক।” মনে মনে আর একটি প্রার্থনা করিলাম—তাহা বলিব না। তাহার কিঞ্চিৎ দূরে ভূগর্ভে একটি কক্ষে সীতাদেবীর একটি মূর্তি স্থাপিঠা আছে। আমি ইহার ভিতর কষ্টে প্রবেশ করিয়াছিলাম, যেন নিশ্বাস বন্ধ হইয়া আইসে। তারাচরণের সাহস হইল না। মূখ পাণ্ডা বলিল, রামচন্দ্র রাবণের ভয়ে সীতাকে এইখানে লুকাইয়া রাখিতেন। তাহার রামায়ণের জ্ঞানও এই পর্যন্ত। সীতা এখানে অর্ধ ঘণ্টা কাল অবরুদ্ধ থাকিলে, রাবণ সবংশে মরিত না, বাল্মীকিকেও এত শ্ৰম করিতে হইত না। তিনি এখানেই মরিতেন। তাহার পর, প্রায় এক ক্রোশ দূরে পােবন দেখিতে যাই। এবাদ, এখানে তপস্যা করিয়া লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিত-বধের শক্তি লাভ করিয়াছিলেন। এ স্থানটির মত এমন শান্তিপ্রদ স্থান আমি অল্প দেখিয়াছি। আমার বােধ হয়, এইটিই প্রকৃত বাল্মীকি-কল্পনার লীলাভূমি ‘পঞ্চবটী”। এখনও পাঁচটি বট গাছ একস্থান আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে। এখনও তাহার চারি দিকে নানাবিধ বনবৃক্ষ রহিয়াছে, এবং দেখিলে এককালে যে এই অধিত্যকাটি সম্যক অরণ্য ছিল, তাহা বেশ বুঝিতে পারা যায়। অনতিদূরে আরাবলীর শেখরমালা এক পার্শেলাকাশের গায়ে চিত্রের মত দেখা যাইতেছে অন্য দিকে রামায়ণের বর্ণনার সার্থকতা করিয়া, এখনও গােদাবরী দণ্ডকারণ্য। নদী গদগদ রবে শিলা হইতে শিলাস্তরে প্রবাহিত হইছেন। স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র জলপ্রপাত পুষ্পবৃষ্টি করিতেছে। এক পার্ম, নিবিড় অরণ্যময় তীরে নানাবিধ বনফুল ফুটিয়া রহিয়াছে; অন্য পার্শ্বে তৃণশূন্য বন্ধুর পৰ্ব্বতশ্রেণী দৈত্যব্যুহের মত ভীমবেশে দাঁড়াইয়া আছে। এক স্থানে জল কিঞ্চিৎ গভীর। পাণ্ডা বলিলেন, লক্ষ্মণ . এখানে সূর্পনখার নাক কাণ কাটিয়া ফেলিয়াছিলেন। আর এক বিদ্যাবাগীশ ! তিনি এক ক্ষুদ্র গৰ্ত্ত সম্মুখে করিয়া বসিয়াছিলেন। তাহার মতে, রামচন্দ্র রাবণের ভয়ে আসল সীতাকে এই কাঁকড়ার গর্ত দিয়া পাতালে পাঠাইয়াছিলেন। রামায়ণের এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়া একটি পয়সা চাহিলেন। এখানে একটি জলপ্রপাতে আমি বড় প্রতিভরে স্নান করিলাম। জননী শৈলসুতা, নীলমণিহারনিভ সুশীতল বারিধারা আমার মানব দেহে ঢালিয়া দিয়া মন প্রাণ পবিত্র করিলেন।

না। • এক দিন মাত্র নাসিকে থাকিয়া, ছাব্বিশ ঘণ্টা রেলে কাটাইয়া, আমরা অবসন্ন প্রাণে জব্বলপুর পঁহুছি। সেই রাত্রিতেই তারা- চরণ চলিয়া আসেন। পর দিন প্রাতে আমি নর্মদা দর্শন করিতে যাই। জব্বলপুর হইতে এ স্থান এগার মাইল ব্যবধান; পথ অতি সুন্দর এবং ছায়াসমাচ্ছন্ন। প্রথমেই নর্মদার জলপ্রপাত দেখিতে যাই। স্থানীয় লােকেরা ইহাকে ‘ধূমধারা’ বলে। উদ্ধা হইতে নিমে, প্রস্তরগর্ভে বেগে জলধারা পড়িয়া যে জলকণা উৎকীর্ণ করে, তাহা দূর হইতে ঠিক ধূমের মত বােধ হয়। সেই জন্য এই জলপ্রপাতের নাম ধূমধারা হইয়াছে। উভয় পার্শ্বে শ্বেত শৈলশ্রেণী । তাহাদের পাদমূল প্রক্ষালন করিয়া, প্রস্তরগর্ভা নর্মদা প্রবাহিতা। দেখিলেই মেঘদূতের সেই কবিত্বপূর্ণ চরণটি মনে পড়ে। “রেবাং দ্রক্ষপলবিষমে বিন্ধ্যপাদে বিশীর্ণা।” “বিষম উপল মাঝে- বিন্ধ্যপদে শীর্ণ। রেবা করিও দর্শন।” নর্মদার অন্য নাম রেবা, তাহা তুমি জান। অনুমান পঞ্চাশ হস্ত উৰ্দ্ধ হইতে, বহু ধারায় গর্জন করিয়া, নর্মদা ভীষণ বেগে পতিত হইয়া, এই অপূৰ্ব্ব জলপ্রপাত সৃষ্টি করিয়াছেন। নর্মদা যেন অবিরাম সংখ্যাতীত শ্বেতকুকুসুম রাশি বর্ষণ করিয়া বিন্ধ্যপদ পূজা করিতেছেন। অল তুষারবৎ শীতল। তথাপি এই প্রাকৃতিক কবিত্বশ্রোতে অবগাহন না করিয়া আমি থাকিতে পারিলাম না।

নদার জল প্রপাত বা ধূমধারা’
১০০
পৃষ্ঠা

No text on this page.

নর্মদা। ১০১ প্রপাতের নীচে নামিবার সাধ্য নাই। উপরিভাগে বসিয়া মান করিবার সময় আমি স্থির থাকিতে পারিলাম না। স্রোতের গে এত প্রখর, কিন্তু চারি অজুলের অধিক জলের গভীরতা নাই”। ফিরিবার সময়ে, গৌরীশঙ্কর দর্শন করি। জলপ্রপাত হইতে এই মন্দির পর্যন্ত, গিরিমূল অসংখ্য আমলকী, বেল ও নানাবিধ বনজাত ফলবৃক্ষে সমাচ্ছন্ন। দেখিলে, ঋষিদিগের পুরাতন আশ্রমের চিত্র মনে পড়ে। আমি কোনও কোনও ফল খাইয়া দেখিলাম। মন্দিরটি একটি শৃঙ্গে অবস্থিত। মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম—কেশবচন্দ্রের নববিধান ! মধ্যস্থলে বৃষারূঢ়া হরপাৰ্বতী। তাহার উভয় পার্শ্বে স্থানে স্থানে গণপতির সঙ্গে বুদ্ধদেব নীরবে শােভা পাইতেছেন। মন্দিরের প্রাঙ্গণের চারি দিকে, প্রাচীরের মত শ্রেণীবদ্ধ কক্ষমালা। প্রত্যেক কক্ষে এক একটি মূর্তি বিরাজিত। অল্প বেশী সকলেরই ভগ্নাবস্থা। পাণ্ডা ঠাকুর বলিলেন, চৌষট্টি যােগিনী। কিন্তু আমি তাহাতে যােগিনীর গন্ধও দেখিলাম না। আমি দেখিলাম, অধিকাংশই মাহেশ্বরী প্রভৃতি রক্তবীজবধের মহাবিদ্যা দুরবস্থাপন্ন হইয়া পড়িয়া আছেন। মন্দিরটি এক সময়ে গৌরবাপন্ন ছিল, সন্দেহ নাই। এ পর্বতের সানুদেশ হইতে নর্মদার উভয়তীরস্থ শৈলমালা ও উপত্যকার শােভা মননামুগ্ধকর। পৰ্বত হইতে অবতরণ করিয়া আমি ভারতখ্যাত ‘মাৰ্বল-ক’ বা মর্মর পৰ্বত দেখিতে যাই। এখানে নর্মদার উভয়তীরস্থ পৰ্বতই মর্মর, কিন্তু উপরিভাগ তৃণ-গুল্ম-সমাচ্ছন্ন এবং বৃষ্টির দ্বারা বিবর্ণ হইয়াছে। সেরূপ অমল শ্বেতবর্ণ দেখিতে পাওয়া যায় না। জল- প্রপাত হইতে কিঞ্চিৎ দূরে জলপতন বেগে গর্ভস্থ প্রস্তর কাটিয়া একটি দীর্ঘাকার বিচিত্র সবােবর প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছে। যেখানে * ১০২ প্রবাসের পত্র . স্বয়ং প্রকৃতিই শিল্পী, সেখানে তাহার বিচিত্রতা এবং শােভার কথা ফি বলিব ? গবর্ণমেন্ট কর্তৃক এখানে দুটি বাঙ্গালা এবং দুখানি প্লেজার বােট বা আমােদ তরণী রক্ষিত হইয়াছে। তীরস্থিত গৃহ দুইখানি যেন দুখানি ছবি। ডিষ্ট্ৰীক্ট বাঙ্গালাটি এত সুন্দর, এবং স্থানটি এত হৃদয়মুগ্ধকর যে, আমার ইচ্ছা হইল, এখানে তােমাকে লইয়া যদি কিছুদিন থাকিতে পারি! আমি একখানি জালিবােটে নর্মদার গর্ভে বেড়াইতে লাগিলাম। আমি ইহার কি বর্ণনা করিব ? অমল ধবল হইতে ঘাের কৃষ্ণবর্ণ, এবং উভয় বর্ণের সংমিশ্রিত নানা- বর্ণের, মৰ্ম্মরশৈলশ্রেণী উভয় পার্শ্বে সরল ভাবে মধ্যাহ্ রবিকরে কি মহিমাপূর্ণ শােভা ধারণ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। তাহার পদ- তলে ঘুরিয়া ফিরিয়া নীল তরল অমৃতখণ্ডের মত নর্মদার গর্ভস্থ সরসী শােভা পাইতেছে। তাহার উভয় পার্শ্বে নানাবর্ণের মর্মর প্রাচীরের ছায়া সেই নীলদর্পণে প্রতিভাত হইয়া, নানাবর্ণের মেঘমালায় খচিত এক খণ্ড আকাশের মত শশাভা পাইতেছে। স্থানে স্থানে মৰ্ম্মর গর্ভে কি সুন্দর সুন্দর কক্ষই নির্মিত হইয়া রহিয়াছে। কক্ষপ্রাচীর শ্বেত মর্মরের ; কতল নর্মদা সলিলে নীল-মণিময়। স্থানে স্থানে মৰ্ম্মরখণ্ড নর্মদার শ্রোত অবরােধ করিতে চাহিতেছে, যেন গিরি হস্ত প্রসারণ করিয়া রহিয়াছে। আবার স্থানে স্থানে এক এক খণ্ড বিচ্ছিন্ন মৰ্ম্মর নদীগর্ভে ভাসমান। ঠিক যেন প্রকৃতি বিচিত্র বেদী নিৰ্মাণ করিয়া রাখিয়াছেন। এই সলিলখণ্ডে বেড়াইতে বেড়াইতে আমি সৌন্দর্য্যে আত্মহারা হইয়াছিলাম। আমার বােধ হইল, আমি যেন একটি অঙ্গরাপুরীর স্বপ্ন দেখিতেছি। সেখানে সকলই যেন সুন্দর, কোমল, তরল। সেখানে সকলই প্রেম, সহৃদয়তা এবং মহাপ্রাণতা। আমার মনে হইল, এই সলিলখণ্ড বিন্ধ্যাচলের হৃদয়।

”
‘মাৰ্বল-ক’ জব্বলপুর
১০২ পৃষ্ঠা

No text on this page.

- নর্মদা ১০৩ বিন্ধ্যসুতা নর্মদা দুহিতা-প্রেমামৃতে ইহা পূর্ণ করিয়া, কুলু কুলু রবে কঁদিতে কঁদিতে পতিগৃহে চলিয়াছেন। অদূরে জলপ্রপাতের শব্দ এখান হইতে শুনিতে কি মধুর, কি করুণ! অথবা যেন কোন সতী সাধ্বী আকুল হৃদয়ে পতিহৃদয়ে হৃদয় ঢালিতে চলিয়াছেন। সতী যে পথে যাইতেছেন, তাহার উভয় পার্শ্বস্থ সংসার-প্রস্তর-রাশিও যেন নিৰ্ম্মল, পবিত্র ও সুশীতল করিয়া যাইতেছেন। বােম্বাই নগরের পার্শ্বস্থ আরব সমুদ্রে নৌকাবিহার, সে এক দৃশ্য—তাহা মহিমাপূর্ণ, অনন্ত প্রেমের আভাসপূর্ণ। নর্মদার নৌকাবিহার, সে অন্য দৃশ্য—তাহা মাধুৰ্য্যময়, ক্ষুদ্র বালিকার পিতৃপ্রেমের ক্ষুদ্র অথচ গভীর উচ্ছাস। একটি বীর পতির বিরাট হৃদয়, অন্যটি বালিকা নবােঢ়া বধূর ক্ষুদ্র বুক। প্রাণ ভরিয়া নর্মদার এই মােহিনী শােভা সন্দর্শন করিয়া, আসিবার সময়ে, পথে দুর্গাবতীর রাজধানী ‘গড়া’ এবং শৈলশেখরস্থিত তাহার আবাসস্থান ‘মদনমহল’ দেখিয়া, আসি। দুর্গাবতীর নাম তুমি ‘পলাশিতেও পড়িয়াছ । “তথাপি সমরে যেন রাণী দুর্গাবতী।” ইনি পরম রূপসী গােজাতীয় বীরাঙ্গনা ছিলেন। মােগল সম্রাটের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। স্বয়ং অশ্বরােহিণী হইয়া সম্মুখ সমরে অদ্ভুত বীরত্ব দেখাইয়া ভারতবর্ষ তাহার কীর্তিতে পূর্ণিত করিয়াছিলেন। এই দানবদলনীর দুর্গটির একটি মাত্র অট্টালিকা এখনও বর্তমান আছে। উচ্চ শৈলুশৃঙ্গের উপরে একখানি প্রকাণ্ড গােলাকৃতি পাথর। তাহার পার্শ্ব হইতে সরলভাবে প্রাচীর তুলিয়া ১০ঃ প্রবাসের পত্র। - একটি ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহ নির্মিত হইয়াছে। পাথরের এক পাশ্বেও একটি কক্ষ আছে। ইহা শুদ্ধ ধরিলে গৃহটি ত্রিতল। এই গৃহের দ্বিতীয়তল হইতে ‘গড়া’ নগরের দৃশ্য চিত্রিতৰৎ সুন্দর দেখায়। পর্বতটির চতুষ্পর্শে স্থানে স্থানে প্রাকৃতিক গড় বা ঝিল স্ফটিক- খণ্ডের মত শশাভা পাইতেছে। এই সকল গড় হইতে স্থানটির নাম গড়া হইয়াছে। এই ক্ষুদ্র গৃহটি পর্যন্ত এত দিন কালজয়ী হইয়া রহিয়াছে; কিন্তু সেই নিরুপমা সুন্দরী, সেই দিল্লীশ্বরের প্রতিদ্বন্দিনী বীরনারী আজ কোথায়! হায় হায়! দুর্গাবতীর কি চিরদিনের জন্য বিজয়া হইল! আবার কি তাহার বােধন হইবে না ? যে সকল জব্বলপুরে ফিরিয়া শিল্পবিদ্যালয় দেখিতে যাই। ‘ঠগের ইংরাজ সাম্রাজ্যের আরম্ভে, গামছা মােড়া দিয়া সহস্র সহস্র পথিকের প্রাণহত্যা করিয়া ডাকাতি করিত, বৃটিশ শাসনের প্রভাবে আজ তাহার ও তাহাদের সন্তানের এই জব্বলপুরে আবদ্ধ থাকিয়া, অপূৰ্ব শিল্প কাৰ্য সকল করিতেছে। এই বিদ্যালয় হইতে আমাদের তবু শতরঞ্চি ইত্যাদি যাইয়া থাকে। যে হস্ত পঁচিশ ত্রিশ বৎসর। পূর্বে প্রাণসংহারক গামছা মুড়িত, আজ তাহা তাত বুনিতেছে। ইহা অপেক্ষা ইংরাজরাজ্যের অধিক গৌরবের কথা কি হইতে পারে ? ইহার যতই দোষ থাকুক না কেন, আজ ভারতবক্ষে যে সার্ধ শত বৎসরব্যাপী অভিন্ন শাস্তি আসমুদ্রগিরি বিরাজ করিতেছে, ভারতমাতা ইহা কখনও উপভােগ করেন নাই। ইংরাজ-সাম্রাজ্যের এই শান্তি অক্ষয় হউক। সেই রাত্রিতেই এলাহাবাদ রওনা হই। পর দিন প্রতে এখানে। পঁহুছিয়া, ঈশ্বরকে অন্তরের সহিত ধন্যবাদ দিলাম। আমার

‘মদনমহল জব্বলপুর
১০৪
পৃষ্ঠা

No text on this page.

নর্মদা
ভারতভ্রমণবৃত্তান্ত শেষ হইল। কাল প্রাতে কলিকাতা যাইতেছি।
যদি সময় পাই, তােমার স্বজাতীয়দের সম্বন্ধে একখানি পুত্র
কলিকাতা হইতে লিখিব। স্থানবর্ণনায় সে সকল কথা কিছু
লিখিবার অবসর পাই নাই।

ভারত-রমণীর চিত্র তুলনায় সমালােচনা। তােমাকে আমার উত্তর-ভারত-ভ্রমণ সম্বন্ধে আর একখানি পত্র লিখিব বলিয়াছিলাম। তুমি তােমার স্বজাতীয়দের সম্বন্ধে দুই এক কথা অবশ্য শুনিতে চাহিবে। এলাহাবাদ পর্যন্ত কুম্ভোদরীদের তুমি দেখিয়াছ, তাহাদের বেশ-ভূষার কথা অবগত আছ। দিল্লী পর্যন্তও প্রায় সেইরূপ। তবে সে অঞ্চলের রূপসীরা কাপড় একেবারে নাভির নীচে নগ্নতার শেষ সীমায় পরেন না। কিঞ্চিৎ উপরে কিঞ্চিৎ কসিয়া পরেন। উদরটি তত তানপুরার অধােভাগের মত দেখায় না। তাহার পর পঞ্জাব। পঞ্জাবিনীরা বেশ সুন্দরী। প্রকৃত আৰ্য আকৃতি ইহাদেরই আছে। রং যেন ফুটিয়া পড়িতেছে। নাসিকা প্রকৃতই গৃধিনীগঞ্জিত। তবে মুখের রেখাবলী আমাদের চক্ষে কিছু অধিক তীক্ষ্ণ বােধ হয়। তাহাদের পােক—পায়জামা, পিরাণ এবং চাদর। পায়জামা হাঁটু হইতে পা পর্যন্ত পায়ের সঙ্গে আঁটা। হাঁটুর উপর ঢিলা। পিরাণটি প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পড়ে। শুনিলাম, সুন্দরীরা শয়ন করিবার সময় পায়জামা একেবারে খুলিয়া ফেলিয়া কেবল পিরাণটি মাত্র অঙ্গে ধারণ করেন। পিরাণটি ইংলণ্ডীয় ললনাদের নাইট সার্টের কাৰ্য্য করে। বঙ্গ সুন্দরীদের মত ইহাদের পর্দা আছে, তবে অপেক্ষাকৃত ইহার স্বাধীন এবং সে স্বাধীনতায় কিঞ্চিৎ বীরত্ব আছে। বলিব। হরিদ্বার হইতে গাড়ী আসিয়া লুক্সর ষ্টেশনে পঁহুছিল। একটি গল্প ভারত-রমণীর চিত্র। ১০৭ ; এখানে অন্য গাড়িতে যাইতে হয়, এবং তাহা আসিতে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। আমি গাড়ীর পার্শ্বে প্লাটফরমে বেড়াইতেছি। একজন মধ্যবয়স্কা পঞ্চাববাসিনী আমাকে আহ্বান করিলেন। মুখ ফিরাইয়া দেখিলাম, তাহার পার্শ্বে জ্বলন্ত অগ্নিশিখানিভ একটি পূর্ণকিশােরী কন্যা। মুখখানি কি লাবণ্যফুটনােন্মুখ কমলকোরকের শােভার ন্যায় নয়ন মােহিত করিতেছে। অর্ধবয়সী আমার সঙ্গে অসঙ্কুচিতভাবে আলাপ করিলেন। * * * এই নবীন পরিচিতার সঙ্গে বহুক্ষণ বেশ কৌতুকে কাটাইলাম। তাহার পর অন্য গাড়ী আসিয়া পঁহুছিল। আমার গাড়ীতে জিনিস তুলিয়া আমি দ্বারের কাছে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া আছি ; পিঠে কি কোমল হাত লাগিল। ফিরিয়া দেখিলাম, মাতা ও কন্যা। যুবতী বলিলেন,-সাহেব। আমাকে আমার গাড়ীতে তুলিয়া দেও।” আমি আজ্ঞা প্রতিপালন করিলাম। তখন হুকুম হইল,-“আমার বৃদ্ধ পিতাকেও তুলিয়া দিয়া আইস।” আমি বলিলাম,-“আমি তাঁহার বৃদ্ধ পিতাকে কি প্রকারে চিনিব ?” এমন সময়ে বৃদ্ধ আসিয়া স্ত্রীলােকের গাড়ীতে একটা মােট দিয়া ছুটিল। কোনও গাড়ীতে স্থান নাই। বৃদ্ধ, লােকের গােলে পড়িয়া গেল। যুবতী চীৎকার করিয়া হুকুম দিতে লাগিলেন,-“তুমি আমার বাপকে উঠাইয়া দেও।” আমি দেখিলাম, আমার মন্দ হাকিম জোটে নাই। গাড়ীতে স্থান নাই। ষ্টেশনমাষ্টারের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া, আর একখানি গাড়ী বুড়াইয়া লইলাম। তখন বহুতর অন্য লােকের সঙ্গে বৃদ্ধ উঠিল। সুন্দরী আবার আমাকে তলপ দিলেন। বলিলাম—“তােমার বাপ উঠিয়াছে।” প্রশ্ন—“তুমি স্বচক্ষে দেখিয়াছ?” উত্তর-দৈখিয়াছি।” তখন তিনি আমাকে सनिन । শুনিলাম তিনি একজন মহাজনের বনিতা। প্রত্যেক এবাসের পর। ষ্টেশনে আমি বেড়াইবার সময় আমার সঙ্গে আলাপ করিতেন। তিনি জলন্দরে নামিয়া গেলেন, আমি লাহােরে চলিয়া গেলাম। আমি কাশ্মীর যাইবার অবসর পাই নাই। শীতে যাইবারও সুবিধা নাই। অতএব কাশ্মীরকুসুমরাশি আমি বড় একটা দেখি নাই। তবে যাহা দেখিলাম এবং শুনিলাম, তাহাতে সঁহাদের উপর আমার শ্রদ্ধা কিঞ্চিৎ কমিয়াছে। তাহাদের আকৃতিতে কিঞ্চিৎ পুরুষে পুরুষে ভাব, যদিও রং অতুলনীয়; এবং শুনিলাম, তাঁহারা নিতান্ত অপরিষ্কার। সকলে বলিলেন, ইহাদের অপেক্ষা শিমলা-অঞ্চলবাসিনী হিমালয়-কন্যারাই সুন্দরী। ইহাদিগকে পাহাড়িয়া বলে। তাহার একটিমাত্র আমি দেখিতে পাইয়াছিলাম। প্রতুলের বাড়ীর পার্শ্বে একটি পাহাড়িয়া গৃহস্থ বাস করেন। তাঁহার একটি কন্যা সর্বদা প্রাচীরের সে পাশে দাঁড়াইয়া, প্রতুলের দাসীর সঙ্গে কথা কহিত এবং প্রায়ই সে ও তাহার মাতা, নানা কায কৰ্ম্ম করিয়া বেড়াইত। মরি! মরি! কি রূপ! আমি অমন রূপ যেন কখনও দেখি নাই। শুনিলাম, তাহার নাম পার্বতী এবং সে রূপেও ঠিক আমাদের পার্বতী। তাহাকে দেখিয়া আমি বুঝিলাম, আমাদের শাস্ত্রকার কেন আমাদের উমাকে হিমালয়ের কন্যা বলিয়া কল্পনা করিয়াছেন। তাহাকে অসুর এবং সিংহের পিঠে চড়াইয়া দিলে সে একটি জীবন্ত পাৰ্বতী হইবে! রূপে, লাবণ্যে, বর্ণে, শরীরের দৈর্ঘ্যে, সে যেন দক্ষ শিল্পকরের নির্মিত একটি অপূৰ্ব্ব প্রতিমা। দূর হইতে যতদুর বুঝা যাইতেছিল, তাহার , এই প্রথম যৌবন; এবং যে ভাবে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইত, তাহাতে আমার বােধ হইত,-সে একটি ফুল অপেক্ষা তারি হইবে না। মরি! মরি। কি মুখ, কি চোখ, কি নাসিকা, কি বর্ণ, কি ক্ষুদ্র অবয়ব, সর্ব শেষ ভারত-রমণীর চিত্র। ১৯ কি মধুমাখা ঈষৎ হাসি। তাহাকে আমি যতবার দেখিতাম, আমার বােধ হইত, যেন একটি রূপের স্বপ্ন দেখিতেছি। তাহার পােক পুঞ্জাবী রমণীদিগের মত। তবে কখন কখন হিন্দুস্থানীদের মত সাড়ীও পরিতে দেখিতাম। তাহার পর রাজপুতানা যাই। কি জয়পুরের, কি যােধপুরের, কি আজমীরের, কোন স্থানের রাজপুতনী আমি সুন্দরী দেখি নাই। কেবল চিতােরের রমণীরা একরূপ ইহার ব্যতিক্রম। মাড়ওয়ারের রমণীরা সর্বাপেক্ষা রূপহীনা। রাজপুতনীদের পরিধান ঘাঘরা, কাঁচুলী ও ওড়না। ঘাঘরাটিও আবার এক প্রকাণ্ড ব্যাপার, এবং উলঙ্গ না হইয়া যতদূর সাধ্য, তত দূর নাভির নীচে ঘাঘরার সম্মুখটি নামাইয়া পরিয়া থাকে। অতএব কৃশাঙ্গিনীরা ছাড়া অন্য মহিলারা বেহার-অঞ্চল-বাসিনীদের ন্যায় মহােদরী। কাঁচুলীও এরূপ ভাবে পরেন যে, ভারতচন্দ্রের কদম্বের ও দাড়িম্বের নিম্নের এক তৃতীয়াংশ তাহার বাহিরে থাকে, এবং তাহাতে বন্ধনের দাগ থাকে। তাহার পর গুজরাটে চল। বরদার গুর্জরীদের রূপ বর্ণনীয় যে দিক চাহিয়া দেখ, ষ্টেশনের মেথরাণী পৰ্যন্ত নয়ন মােহিত করিয়া দিবে। গুর্জরীর “উরজরঞ্জন” ত আছেই, তাহা ছাড়া ইহাদের মধ্যে তন্বী শ্যামা প্রায় দেখিতে পাইবে না। গাইকোয়ারের মৃত মহিষী লক্ষ্মীবাই হইতে পথের ভিখারিণী পর্যন্ত সকলেই সুন্দরী। ইহারা বেহারের স্ত্রীলােকদের মত সাড়ী পরে, তবে শ্রাদ্ধটি তত নীচে গড়ায় না। কেবল ভারতচন্দ্রের কামদেবের প্রবেশার্থ “নাভি- কুপ” মাত্র অনাবৃত থাকে। মুসলমান সাম্রাজ্যের তরঙ্গ রাজ- খুার দক্ষিণে বড় আসে নাই। মাড়ওয়ার ছাড়িয়া আসিলে নহে।

প্রবাসের পর। অবগুণ্ঠন আসিয়া পড়ে ; তথন আর রমণী, অবগুণ্ঠন মধ্যে বদনচন্দ্র ঢাকিয়া, দর্শকের কৌতুহল বৃদ্ধি করে না। স্ত্রীস্বাধীনতাও ক্রমশঃ এখান হইতে মাথা তুলিয়া উঠিতেছে, দেখা যায়। আর এক-পা, অগ্রসর হইলেই দেখিতে পাইবে, একেবারে চঁাদের হাট। মহারাষ্ট্র- মহিলারা এখন “কামরঙ্গ পরিহরি রণবঙ্গে নাই বা মাতুন, তবে সেই পশ্চাৎ-কেঁচা-আঁটা বসন পরিধান, সেই অবগুণ্ঠনশূন্য প্রফুল্ল পদ্মমুখ, সেই অসঙ্কোচ গমন দেখিলে, ইহারা এক কালে যে রণরঙ্গে মাতিতেন, তাহা বিলক্ষণ বুঝা যায়। মস্তকমুণ্ডিত, পৰ্বতবৎ- পাগড়ী-সজ্জিত, মহারাষ্ট্রীয় পুরুষদিগকে দেখিতে বড় ভাল দেখায় , কিন্তু তাহাদের অঙ্গনার পরম রূপসী। তাহাদের কেবল কপােলদেশটার অস্থিটা যেন কিঞ্চিৎ বেশী পরিদৃশ্যমান। তাহাদের বসনপরিধানের নিয়মটিই কেবল স্বতন্ত্র ; এরূপ নহে; তাহাদের কবরীবন্ধনেও কিঞ্চিৎ নূতনত্ব আছে। কবরী একবেণীবদ্ধ করিয়া তাহা চক্রাকারে পশ্চাৎ দিকে রাখা হয়। মাথার পশ্চাতে যেন একটি চাচর চক্র,প্রেমাসির গ্রন্তি! প্রাণে প্রাণে যে ফিরিয়া আসিয়াছি, সে কেবল তােমার কপালের জোরে। মহারাষ্ট্রীয় সুন্দরীরা সৰ্ব্বত্র অবলীলাক্রমে বিরাজ করেন; কি উদ্যানে, কি বাদ্যস্থানে, তাঁহারা সম্মুখ কেঁাচার অগ্রভাগ বামহস্তে লীলা করিয়া ধরিয়া, পাদুকান্ত চরণে বিচরণ করিয়া বেড়ান। সঙ্গে কিন্তু একটি পুরুষ মানুষ থাকেন। এ দৃশ্য ঘােমটা মধ্য হইতে উকি-বিক্ষেপিনী বঙ্গমহিলাদের ও তাহাদের আড়ে-ঠারে-দৃষ্টি-সঞ্চালনকারী রসিক পুরুষদিগের দেখিবার যােগ্য, শিখিবার মােগ্য। এই পুণ্যবতীদের দর্শনেও মনে কি এক অনির্বচনী#আনন্দ এবং পবিত্রতা সঞ্চারিত হয়। রাজস্থান ছাড়িয়া গেলে আমার বােধ হইল, যেন সম্পূর্ণ একটি ভারত-রমণীর চিত্র ১১১ সৌন্দৰ্যপূর্ণ নুতন জগতে প্রবেশ করিলাম। কবি বলিয়াছেন, যে পর্যন্ত রমণীর হাসিতে আলােকিত না হইয়াছিল, জগৎ অরণ্য ছিল। কথাটা বড় গভীব। আমাদের বঙ্গসমাজ রমণীর হাসিশূন্য, আমাদের জীবন তাই এত উৎসাহহীন, এত আনন্দশূন্য। যবন রাজ্য আমাদের আর যে সকল অনিষ্ট করিয়াছে, তাহা অতি সামান্য। নিপীড়িত হিন্দুধৰ্ম্ম মাথা তুলিয়াছে, ব্যক্তিগত নিপীড়ন সমাজহৃদয় স্পর্শ করে নাই। কিন্তু আমাদের সমাজে এই স্ত্রী-অবরােধস্বরূপ যে অর্ধাঙ্গ বা পক্ষঘাত লােগ সঞ্চার করিয়াছে, তাহার উপসর্গে সমাজ এই সাত শত বৎসর পরেও মাথা তুলিতে পারিল না। কেবল মহারাষ্ট্রীয়দের মধ্যে বলিয়া নহে, পাশীদের মধ্যেও এই পাপ প্রবেশ করে নাই। তাহাদের রমণীরাও রূপে চারিদিক আলােকিত করিয়া সৰ্বত্ৰ বেড়াইয়া বেড়াইতেছে। হিন্দুসুন্দরীরা চম্পকবরণী। পাশী রূপসীদের বর্ণ সদ্যপ্রস্ফুটিত শিশিরসিক্ত পদ্ম ফুলের মত। ইহুদীরা ভিন্ন ইহাদের, তুলনার স্থান আর নাই। ইহাদের সাড়ীই বোেম্বাই সাড়ী। সাড়ীর উপর একটি মলমলের আজানুলম্বিত পিরাণ ; তাহার উপর জ্যাকেট,। ইহারা মাথার চুল ঢাকিয়া একখানা সাদা রুমাল বাঁধিয়া তাহার উপর খোঁপা মাত্র ঢাকিয়া মাথায় কাপড় দিয়া থাকেন। পিরাণের দৈর্ঘ্য এবং কাল চুলে সাদা কাপড়ের বন্ধনটি কেমন আমাদের চক্ষে ভাল লাগে না। আমরা অপরাহ্নে নাসিকে পৌছি। যে পাণ্ডার বাটীতে গিয়া উঠি, তিনি মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ। তাহারা পাঁচ সহােদর। পাঁচটি স্ত্রীই সুন্দরী। আমি মাথা ধুইয়া উপরে যাইতেছি, নীচে ক্ষুদ্র অগ্নিশিখার ন্যায় একটি বালিকা বসিয়া আছে। আমি তাহাকে ডাকিলে সে এক লম্ফ দিয়া আমার বুকে উঠিয়া পা দুখানি দিয়া এবাসের পর। আমার কোমর জড়াইয়া ধরিল, এবং দুখানি ক্ষুদ্র হাতে গলা জড়াইয়া ধরিয়া আমার মুখের উপর মুখ রাখিয়া কি বলিতে লাগিল। বুঝিলাম একটি কথা দকৃষিণা (দক্ষিণা)। তাহার নাম ভ্য। বয়স ছয় সাত বৎসর ; বিবাহ হইয়াছে তিন বৎসর। বালিকা দিনে শ্বশুরবাড়ীতে, রাত্রিতে পিতার বাড়ীতে থাকে। আর একখানি ঈষৎশ্যাম বদন পার্শ্বের কক্ষ হইতে উকি মারিতেছিল। ভগ্গু্যকে তাহাকে ডাকিতে বলিলাম। সে হি হি করিয়া হাসিয়া, বীণার পঞ্চমে ডাকিল—“রুকু ! ইক্রি আ।” রুকু আসিল। তাহার বয়স আট কি নয় বৎসর হইবে! বড় সুন্দরী! তাহাকে আমার কাছে ডাকিয়া আনিলে সে কিঞ্চিৎ সলজ্জ ভাবে দাঁড়াইয়া, অমনি হাত বাড়াইয়া বলিল,-“দকৃষিণা”। অমনি তাহার শ্বাশুড়ী আসিতেছে বলিয়া ছুটিয়া গেল। আমি উপরে গেলে আবার যাইয়া বলিল, “ষিণা”। যাইবার সময় দিব বলিলে বলিল, তাহার শ্বাশুড়ী দেখিবে, সে আসিতে পারিবে না। তাহার পর দুটিতে সিড়ির উপর বসিয়া কত গান গাহিতে লাগিল। আমি কাছে গেলে ভগ,গুটি গলায় জড়াইয়া ধরে, রুকু পলায়। সে এ বাড়ীর পুত্রবধূ। অতএব দেখিলে, ইহাদের মধ্যে বাল্যবিবাহ যেরূপ ভাবে প্রচলিত; শুনিলে সমাজ-সংস্কারকগণ মুচ্ছা যাইবেন। কিন্তু যে পর্যন্ত স্ত্রী-সংস্কার না হইবে, সে পৰ্যন্ত তাঁহাদের সঙ্গে স্বামীর সাক্ষাৎ হয় না। ইচড়ে পাকান ব্যাপার আমাদের বঙ্গদেশের লােকে যেমন মােক্ষ মনে করেন, ইহারা সেরূপ মনে করে না। এই জগই বঙ্গদেশের রমণীরা অকালকুষ্মাণ্ড হইয়া পড়ে। যৌবনের প্রারম্ভে বৃদ্ধা, ফুল ফুটিতে না ফুটিতেই ঝরিয়া পড়ে পতিপত্নীর জীবনের সুখ অঙ্কুরে বিনষ্ট হয় ; তাহাছাড়া .

ভারত-রমণীর চিত্র। সন্তানেরা ক্ষীণপ্রাণ, ও বােগগ্রস্ত হইয়া, পিতামাতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। ভগবান কত দিনে সমাজকে এ পাপের কাল গ্রাস হইতে রক্ষা করিবেন, তাহা তিনিই জানেন। সন্ধ্যার কিঞ্চিৎ পূৰ্বে আহার করিতে বসিলাম। সম্মুখে পাতা দেখিয়া আমি হাসিতেছি দেখিয়া, সুন্দরী তাহা উঠাইয়া লইয়া আমাকে একখানি থালা দিলেন। আমরা খাইতে বসিলাম। সুন্দরী পরিবেশন করিয়া সম্মুখে বসিয়া আমার সঙ্গে আলাপ আরম্ভ করিলেন। এ আলাপ- “সীতা নাড়ে হাত, বানরে নাড়ে মাথা।” তিনি হিন্দি বুঝেন না, আমি মহারাষ্ট্রীয় বুঝি না। প্রেমিক খুড়া গাহিয়াছেন- “নয়নে নয়নে যদি হৃদয়ে হৃদয়ে, মিলে, বালীর বাঁধে রােধে কি হে অসীম সিন্ধু সলিলে ?” দুটি মানব হৃদয় যদি কথা কহিতে চাহে, ভাষা তাহার প্রতিবন্ধকতা করিতে পারে না। আমরা নয়নে নয়নে, হৃদয়ে হৃদয়ে কথা কহিতে লাগিলাম। ঠাকুরাণীটির নাম অম্বা। সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করিলে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন,—“নারায়ণ না দিলে কি করিব?” আমি বলিলাম, নারায়ণের দিবার এখনও বিস্তর সময় পড়িয়া আছে। তিনি আমার নাম ধাম, সর্ব শেষ লক্ষ্মীর কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। আমি, লক্ষ্মীছাড়া হইয়া আসিয়াছি কেন, তাহারও কৈফিয়ৎ চাহিলেন। পুঁটির কথাও অনেক জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি পা ছড়াইয়া সম্মুখে বসিয়া এরূপে ঈষৎ হাসিয়াহাসিয়া, প্রতি- বিস্ফারিতনয়নে চাহিয়া চাহিয়া, বীণার কোমল স্বর-মালা সংমিলিত, করিয়া, আলাপ করিতেছিলেন, আর সময়ে সময়ে আমাকে ১১৪ প্রবাসের পত্র। “চাউল দে! ওয়ারণ দে” ( ভাত দি, ডাল দি) বলিতেছেন। যদিও খাইবার কিছুই ছিল না, তথাপি সে ডাল ভাত কি আনন্দেই আহার করিলাম। শুইলাম। পূনা হইতে দীর্ঘকাল রেলবিহারে শরীর অবসন্ন হইয়াছিল। শুইবা মাত্র নিদ্ৰা আসিল। রাত্রি দশ এগারটা হইবে। নীচে রমণীকন্ঠের ও হাসির মিশ্রিত তরঙ্গ উঠিয়াছে। আমি উঠিয়া একটা প্রয়ােজনে নীচে গেলাম। মরি—কি দৃশ্য ! ইহারা স্বামীকে “ধনী” বলেন। কথাটা সার্থক। এরূপ রূপরত্ন যাহাদের, তাহারা ধনী বই কি? সংসারের সাররত্ন রমণীরত্ন। যাঁহাদের “ধনী” বাড়ী আছেন, তাঁহারা আপন আপন কক্ষে গিয়া ধনভােগ করিতেছেন। তিন সুন্দরীর “ধনী” বাড়ী নাই। ইহারা এক প্রদীপের আলােকে বসিয়া, হাঁটু হইতে পায়ে এ রাত্রিতে তৈল মাখিতেছেন, হাসিতেছেন, গল্প করিতেছেন। রূপ, আনন্দ, বীণার ঝঙ্কার ছড়াইয়া পড়িতেছে। আমি মুহুৰ্ত্ত মাত্ৰ দাঁড়াইয়া এই আনন্দবাজার দেখিলাম, চলিয়া গেলাম। হারা কোনও সঙ্কোচই মনে করিলেন না। তারা- চরণেরও নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছে। কিঞ্চিৎ পরে অস্বাদেবী, তাহার পশ্চাতে প্রদীপ হন্তে অন্য এক সুন্দরী, আমাদের কারে আসিয়া হাসিতে লাগিলেন। না বুঝি হাসি, না বুঝি ভাষা। মহা বিপদে পড়িলাম। তারাচরণের মুখ শুকাইয়া গেল। অম্বা দেবী আমাকে ইঙ্গিত করিয়া আমার বিছানা গুড়াইতে বলিলেন। আমি গুড়াইতেছি, তিনি বিদ্যুৎ ছুটিয়া যাইতে চরণ একখানিতে। তড়িদাহত হইলাম। তিনি একটি চোকুঠারি খুলিলেন, এবং সেখান হইতে একটি বিছানৰ তাড়া টানিতে টানিতে হাসিতে লাগিলেন। সােপানের শীর্ষ-দেশস্থা দীপহস্তা সুন্দরীও হাসিতেছেন; উভয়ের ভারত-রমণীর চিত্র। সে উচ্চ হাসি, সেই উচ্চ রসিকতাপূর্ণ কথা, দুর্ভাগ্যক্রমে কিছুই বুঝিতেছি না। তারাচরণ ভয়ে কাঁপুক, আমি ভাবিলাম, মেয়ে মানুষের কাছে অপ্রস্তুত হইব কেন, দাড়াইয়া সে হাসিতে যােগ দিলাম। তারাচরণ চীৎকার করিতে লাগিল,-“আরে ও বাবু বৈস।” আমি বলিলাম,-“ভয় নাই ; হরনেত্রানল নহে, আমরা কামদেবের মত ভন্ম হইব না।” রমণীদের রঙ্গরসও কিছুই বুঝিতেছি না, কিন্তু তারাচরণ যেন ঠিক দুই ফাঁসিকাষ্ঠের মধ্যে অবস্থিত। দুই দিকে দুই সুন্দরী। পলাইবারও পথ নাই। তাহার অবস্থা দেখিয়া আমার হাসিতে হাসিতে পার্শ্ব ফাটিয়া যাইতেছিল। বােধ হয় রমণীরাও তাহা দেখিয়া হাসিতেছিলেন। আমাদের একতরফা সমাজের কল্যাণভদ্র রমণীর কাছে পড়িলে বাঙ্গলীকে কি বিভ্রাটেই পড়িতে হয়। দেবীরা একটি বালিশ লইয়া বাকী বিছানা ছড়াইয়া ফেলিয়া চলিয়া গেলেন। আমি বলিলাম, “কেমন তারা! ইহাদের “ধনীদের”, আজ বাড়ী না থাকাটা ভাল হয় নাই।” এতক্ষণে তাহার মুখে হাসি আসিল, বিপদ কাটিয়া গেল। সুন্দরীরা নীচে গেলে বােধ হয়, একজন পুরুষ আসিয়া, অতিথি বাড়ীতে আছে, তথাপি এইরূপ হৈ-রৈ করিতেছেন বলিয়া ভৎসনা করিল। তাহার পর গৃহ নীরব হইল। পর দিন অন্ধদেবী আর বড় কাছে ঘেঁসিলেন না। একবার বিষন্নভাবে দূর হইতে দেখা দিয়া, যেন নয়নের ভাবে বলিলেন,-“পােড়ার মুখ! তুমি আমাকে গাল খাওয়াইয়াছ।” এ বেলা প্রদীপধারিণ আমাদের অন্নপূর্ণ হইলেন। তিনি দেবী অপেক্ষা প্রাছনা। আহার করিতেছি, আহা কি দৃশ্য। নীচে একটি বকুলবৃক্ষের তলায় একখানি, মগবত রাখিয়া, একটি গৃহলক্ষ্মী তাহা প্রদক্ষিণ করিতেছেন, এবাসের পর। এবং প্রত্যেকবার ঘুরিয়া আসিয়া, গ্রন্থকে ভক্তিভরে প্রণাম করিতেছেন। তাহার মধ্যম যৌবনের উত্তাল তরঙ্গায়িত রূপ, তাঁহার সেই ভক্তি ও প্রীতিপূর্ণ মুখশ্রী, সেই চক্রাকার প্রমণ, সেই গ্রীবাভঙ্গী, সেই কক্ষ-আন্দোলন, সেই পদসঞ্চালন, আমি এ জীবনে ভুলিব না। তিনি সর্বজ্যেষ্ঠ সহােদরের সহধর্মিণী। গৃহের শ্রেষ্ঠলক্ষ্মী। শুনিলাম, প্রতিদিন এ পরিবারের মঙ্গল কামনা করিয়া, এরূপে সহস্রবার প্রদক্ষিণ করেন। বুঝিলে কি একবার কাণ্ডখানা কি? বঙ্গদেশে এ পবিত্র দৃশ্য এক দিন দেখিতে পাওয়া যাইত। এখন সে স্বর্গ বঙ্গদেশ হইতে লুপ্ত হইয়াছে। বঙ্গসুন্দরীদের স্বামী এখন গুরু নহে, দেবতা নহে, একটি সামান্য শাসনের বস্তু। স্বামীর পরিবার পরম শত্রু। তাহার ধর্ম এখন স্বামীশাসন, *** কি স্বামীর চরিত্র সমালােচন করিতে করিতে দুই চারিবার অঙ্গুলীভঙ্গী, দুই চারিটি সাপের মন্ত্রের মত মন্ত্রপাঠ! এরূপভাবে যদি কাহাকেও একখানি ধর্মগ্রন্থ দুই চারিবার প্রদক্ষিণ করিতে বল, তখনই ডাক্তার ডাকিতে হইবে; মাথায় বরফ ঢালিতে হইবে। আমরা সভ্য হইতেছি, উন্নত হইতেছি, এবং অন্ধকার হইতে আলােকে আসিতেছি। এই সাধ্বীর এই প্রদক্ষিণব্ৰত দেখিয়া, হৃদয় আমার কি পবিত্র, কি মহিমাপূর্ণ হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না। আমাদের এ সকল সীতা সাবিত্রী কোথায় গেল? আহার করিয়া আমরা রওনা হইলাম। কাপড় পরিতেছি, প্রদীপধারিশ বড় কোমল স্নেহময় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তােমরা কি সত্য সত্য, আজই যাইবে ?” আমি বলিলাম,-“তােমাদের বেহের জন্য ধন্যবাদ, আজিই যাইব।” তাহাদের শাশুড়ীর হতে বন্ধুদের জন্য কিঞ্চিৎ দক্ষিণা দিয়া, আমরা বাড়ী হইতে কিঞ্চিৎ দুরে

ভারত-রমণীর চিত্র।
একটি দোকানে একটি ঘটা কিনিলাম। যখন গাড়ীতে উঠিতেছি,
অপর দিকের দোকানে দাঁড়াইয়া কে ?—সেই প্রদীপখারিখ।
। তাহার পর নর্মদা। এখান হইতে অবরােধপ্রথার আর
হইয়াছে। যে পাণ্ডার বাড়ীতে আহার করিলাম, ঘরখানি কুটীর,
কিন্তু কি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পাণ্ডা বলিলেন, আমি সস্ত্রীক থাকিলে
ব্রাহ্মণীরা বাহির হইতেন।
নর্মদা হইতে প্রয়াগ, প্রয়াগ হইতে উষায় হাবড়া পঁহুছিয়া সেতু
বাহিয়া যখন গঙ্গা পার হইতেছি, তখন দেখিলাম, দুই ধারে উষা-
স্বরূপিনী বঙ্গদিগম্বরীগণ অবগাহন করিতেছেন। তখন মনে হইল,-
কে চায় খাইতে মধু বিনা বঙ্গকুসুমে ?
কোথা হেন শতদল,
বুকে করি পরিমল,
থাকে পতিমুখ চেয়ে মধুমাখা সরমে ?
বঙ্গকুল বধু বিনা মধু কোথা কুসুমে ?
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

কবিবর নবীনচন্দ্র সেন প্রণীত গ্রন্থ-সমূহ। ০০০ ১) টাকা ১ ০ ০ ০ . . . ১) টাকা ১ টাকা ০ ০ ০ ৪ ০ ০ e ১া• s ০৫ s . . . ১০০ ১। অৱকাশঞ্জিনী প্রথম ভাগ ২। অবকাশঞ্জিনী দ্বিতীয় ভাগ ৩। পলাশির যুদ্ধ ১• আনা ৪। শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৫। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী ৬। রৈবতক • আনা ৭। কুরুক্ষেত্র ৮। প্রভাস ৯। খৃষ্ট ১০। অমিতাভ বা বুদ্ধ-লীলা ১১। অমৃতাভ বা চৈতন্য-লীলা ১৩ ১২। রঙ্গমতী ১৩। ভানুমতী ১৪। প্রবাসের পত্র (সচিত্র ) ১ টাকা ১৫। আমার জীবন বা স্বরচিত আত্ম জীবনচরিত প্রথম ভাগ છે দ্বিতীয় ভাগ ১৭। তৃতীয় ভাগ ১। চতুর্থ ভাগ পম ভাগ কলিকাতা-২০১নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, শ্ৰীযুক্ত গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের ও অন্যান্য পুস্তকালয়ে পাওয়া যায়। • ১০ t :: ••• a ০ ০ ০ ৪) ত ন ত ত

No text on this page.

No text on this page.

Prabaser Patra Ed. 2nd

Author
Sen, Nabinchandra
Title
Prabaser Patra Ed. 2nd
File name
Prabaser Patra Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2010/04/11
Publisher
Goshtha Bihari, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
196
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Letters
Keywords
Jaypur
DLI number
511271
Barcode
4990010018434.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XqBv8olpcw1
Download PDF

Prabaser Patra Ed. 2nd