Bally Sadharan Granthagar

Mon Na Moti

Bandyopadhyay, Charuchandra · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মন না মতি

No text on this page.

মন না মতি
গরুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
এম, সি, সরকার এণ্ড সন্স
৯০২এ, হারিসন রােড, কলিকাতা
মূল্য ১০ আনা

প্রকাশক-সুধীরচন্দ্র সরকার
৯০২এ, হারিসন রােড, কলিকাতা
6
Copyright reserved to the Publishers.
নিউ আর্টিষ্টিক প্রেস, ১এ, রামকিষণ দাস লেন, কলিকাতা
শ্ৰীশরৎশশী রায় দ্বারা মুদ্রিত

মন না মতি
*;
তাদের পরিচিত বন্ধু- আর আত্মীয়-মহলে দাম্পত্য-প্রণয়ের
আদর্শ ছিলাে পলাশ ডাক্তার আর তার স্ত্রী ব্রততী। তাদের
বিয়ে হয়েছে আজ ছ-বৎসর, কিন্তু বাসর-ঘরের নেশার ঘোর
এখনও তাদের ছাড়ে নি। প্রথম প্রণয়ের রং তখনও তাদের
মনে মনে বেশ ঘােরালাে হয়েই লেগে ছিলাে। দীর্ঘ ছ-বৎসরের
এক বাসের পরও তারা পরস্পরের কাছে পড়া-পুথির মতন
আগ্রহশূন্য ঔৎসুক্যরহিত হয়ে পড়ে নি। সংসারের শত
কাজের মধ্যেও তাদের মন পরস্পরের সঙ্গ লাভের জন্যে উন্মুখ
*য়ে থাকতাে, এত দিন পরেও তাদের সেই আগ্রহ এমন প্রবল
হয়ে ছিলাে যে পরের কাছে ত সেটা প্রকাশ করতে তারা লজ্জা
অনুভব করুততই, তারা নিজের কাছেও লজ্জা পেতো। এখনও

মন না মতি
তাদের চুরি করে’ চাওয়া, ছল করে কাছে আসা, অকারণে
ঝগড়া করে তখনই আবার নিজে সেধে ভাব করার অপর
আনন্দের প্রলােভন একেবারে ঘুচে যায় নি। যাকে আ
ভালােবাসি, যার একটু স্পর্শ লাভের জন্য আমার সব্বা।
উৎসুক হয়ে থাকে, অথচ সমাজবিধি যেখানে দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান
সৃষ্টি করে দুজনকে পৃথক্ করে রাখে, সেখানে সকলের
অলক্ষিতে ঈষৎ একটু স্পর্শের সুযােগ মনকে যে আনন্দ-শিহর
পুলকিত করে তােলে, পলাশ আর ব্রততীর সেই আনন্দ যেন
অক্ষয় হয়ে মনের ভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়ে আছে। তাদের প্রণয়ে
মাধুৰ্য সর্বাবস্থায় চারুত-মণ্ডিত ও নিত্যননবায়মান। ব্রতত
পলাশকে ছেড়ে বাপের বাড়ীতে যেতে পারে না, কোনাে কারণে
দু-চার দিনের জন্য যেতে হলে চোখের জল গােপন করা তার
দায় হয় ; পলাশ রােগী দেখতে যেতে যেতে গাড়ীতে .
ভাবে তার ষ্টেথেস্কোপের মতন ব্রততীকেও যদি পকেটে ভরে
নিয়ে আসতে পারা যেতে ; রােগীর পাশে বসেও তার মন পড়ে
থাকে ব্রততীর কাছে ; একটি রােগী দেখে ফিরে এসে ব্রততী
দেখে সে দোরা রােগী দেখতে যেতে পারতাে না, এতে তার
পসার তেমন জমতে পারছিলাে না। ছােট ছেলেকে মা যেমন
চোখে চোখে আঙ্গুলে রাখে, ব্রততী তেমনি নিরলস স্নেহ দিয়ে
নিজের স্বামীকে আগলে রাখতো; কোন্ খাদ্য কতটুকুন পৰ্য্য
খেলে পলাশের হজম হবে ও অসুখ কবুবে না তার পাহারাদা
ছিলাে তার পত্নী ব্রততী ; কোথাও নিমন্ত্রণ হলে ব্রততী বার বা

মন না মতি করে স্বামীকে সাবধান করে দিতে কোন্ বস্তু কতটুকুন পর্যন্ত সে খাবে ; পলাশ সন্দেশ খেতে খুব ভালাে বাসতে, মিষ্টলােভ স্বামী বেশী মিষ্টান্ন খেয়ে পাছে অস্বল করে বসে এই ভয়ে ব্রততীর অস্বস্তির অন্ত থাকতো না। বন্ধুরা কেউ বেশী খেতে পীড়াপীড়ি করলে পলাশ কাতর হয়ে বলে-“না ভাই, আমার স্ত্রী বেশী খেতে বারণ করে দিয়েছেন।” বন্ধুরা বলে—“আরে, তিনি তাে দেখতে আসছেন না।” পলাশ বলে- “জিজ্ঞাসা করলে তো বলতে হবে।” বন্ধুরা হেসে বলে—“আরে, আমাবে শাস্ত্রে বলে স্ত্রীর কাছে মিথ্যা বলে দোষ নেই।” পলাশ বলে— “তা আমি পারবাে না; তিনি যে আমার সব কথাকেই সত্য বলে’ মনে করেন।” ব্রততীর সামান্য একটু অসুখ কৰূলে পলাশের মনে হ’তে ব্রততী বােধ হয় আর বাঁচবে না, নিজে তো তার চিকিৎসা করূতে পারূততাই না, সে শহরের সকল বড় ডাক্তারকে একত্র জড়ো করে’ মহা হট্টগােল বাধিয়ে তুলতে। পলাশের বন্ধুরা এই-সব কারণে তাকে স্ত্রৈণ বলে’ ঠাট্টা বিদ্রুপ করে, আর পলাশ বিষবৃক্ষের শ্ৰীশ আর কমলমণির দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে’ নিজের আচরণ সমর্থন করে। তার বন্ধুরা হেসে বলে—“শ্রীশ- বাবুকে তার আপিসের লােকেরা স্ত্রৈণ বলেছিল বলে তিনি তাদেরকে নিমন্ত্রণ করে’ খাইয়েছিলেন ; শ্রীশ-বাবুর দৃষ্টান্ত তুমি পুরাপুরি মানাে কই?” পলাশ হেসে বলে-“শ্রীশ-বাবুকে তার আপিসের লােকেরা একবার সুখ্যাতি করে সুখাদ্য আদায় করেছিল; কিন্তু তােমরা আমাকে যে-রকম অহরহ স্ত্রৈণ বলে ;

৪
মন না মতি
সুখ্যাতি করে তাতে তােমাদের খাওয়ানাের ব্যবস্থা কর
হলে তােমাদের সব কটির আজীবনের ভরণ-পােষণের
আমাকেই নিতে হয়।” এই-রকম রঙ্গ-রসিকতার ভিতর ।
পলাশের দাম্পত্য-প্রণয়ের অসাধারণ বিশেষত্ব তার পরিচিত
মধ্যে প্রবাদবাক্যে পরিণত হবার উপক্রম করেছিলাে।
একদিন দুপুরবেলা পলাশ আর ব্রততী একসঙ্গে একখ
উপন্যাস পড়ছিলো। তাতে এক জায়গায় লেখা ছিলাে—প্রতে
মানুষেরই কিছু না কিছু গােপনীয় কথা থাকে যা সে কারাে
কারাে কাছ থেকে গােপন করতে বাধ্য হয়। এই কথা প
ব্রততী বলে—এ-কথা ঠিক নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি প্র;
প্রণয় থাকে তাহলে তাদের কাছে পরস্পরের কিছুই গােপ
থাকতে পারে না। প্রত্যেক মানুষেরই দোষ ত্রুটি আর
সেই-সব মার্জনা করে ভালাে বাসতে না পারলে ছদ্মবে
ভালােবাসার কোনো মূল্য নেই।
এই কথা শুনে পলাশ বলে—তুমি ঠিক কথা বলেছে
স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পরের দণ্ডদাতা বিচারক হয় তা হলে ভয়ে ভ
ঘর করতে হয়, অনেক তুচ্ছ কথা যা প্রকাশ করে বলে তখ
হয়তাে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারতাে, তা মনেরমধ্যে পুষে রাখা
কেবল মাত্র গােপন রাখার জন্যেই অনাসৃষ্টির কারণ হয়ে ওঠে
ব্রততী বলে—স্বামী-স্ত্রীর প্রণয়ের মধ্যে Jealousy এ
জুটলে সেই সন্দেহের আওতায় সমস্ত ভালােবাসা একেবা
নষ্ট হয়ে যায়।

মন না মতি
পলাশ বলে-সন্দেহের মতন অনাসৃষ্টি ঘটাতে মজবুত
আর কিছু না ; সন্দেহ তিলকে তাল করে তােলে। সেই
জন্যে মনে কোনাে সন্দেহ হলে প্রকাশ করে বলে ফেলা ভালাে,
তাতে অনেক গণ্ডগােল পরিষ্কার হয়ে যায়।
ব্রততী বলে-এসাে আজ থেকে একটা কাজ করা যাক ;
আমরা দুজনেই মনের কোনাে ভাব গােপন করে রাখবাে না।
ভালাে-মন্দ যা-কিছু মনে হবে আমরা তা পরস্পরের নিকটে
অকপটে স্বীকার কবুব। এতে আমাদের দুজনেরই অনেক
দোষ ত্রুটি দুৰ্বলতা প্রকাশ পাবে ; কিন্তু তৎসত্ত্বেও সেইসব
ত্রুটি ক্ষমা করে আমরা যদি দুজনে দুজনকে ভালােবাসতে
পারি তাহলেই আমাদের ভালােবাসা সার্থক হবে।
পলাশ হেসে বলে-এ এক নতুন খেলা, হবে মন্দ না।
আজ থেকেই এই খেলা শুরু করা যাক।..আজ আমি একটি
অসাধারণ রােগী দেখে এসেছি ; কোথাকার মােহনপুরের
জমিদারের বিধবা-স্ত্রী—এমন রূপসী আমি কখনো কোথাও
দেখি নিনূরজাহানের ছবির চেয়েও সুন্দরী ! তাকে দেখেই
আমার মনে হলাে তুমি যদি অনি সুন্দরী হতে !...
ব্রততী একটু হেসে বলে—অর্থাৎ কিনা তােমার মনে
হয়েছিলাে এই সুন্দরীটি যদি আমার স্ত্রী হতাে!...
পলাশ হেসে বলে—না, মানুষ বদল করূতে আমি চাই নি,
খােলস বদল করতে চেয়েছিলাম•••
ব্রততী বললে—এ কথা সম্পূর্ণ ঠিক নয় ; সুন্দর সুশ্রী চেহারা

৫ মন না মতি দেখে মানুষের মনে বিস্ময় ও প্রশংসা উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক ;. সেই বিস্ময় ও প্রশংসা যখনই স্বার্থপর হয়ে নিজের ভােগ্য- ব্যক্তির মধ্যে সেই সৌন্দৰ্য্যকে স্থানান্তরিত করতে উৎসুক হয়ে উঠলাে তখনই তার আসলের প্রতি আসক্তি ধরা পড়ে গেছে••• পলাশ ঈষৎ লজ্জিত হয়ে বলে-তুমি যে মস্তবড় মনস্তত্ত্ব-- বিদ দেখছি। ব্রততী হেসে বলে—আরাে মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করবে। দেখবে ? পলাশ আমােদ ও কৌতুক অনুভব করে’ বলে—আচ্ছ। শুনি তাে পণ্ডিত মশায়ের অনুমান-বিদ্যার বাহাদুরী। ব্রততী হাসতে হাসতে বলতে লাগলাে—সেই সুন্দরীকে.••••• পলাশ বলে—সেই সুন্দরীর নামটিও সুন্দর, তার নাম, উল্কা ! সুন্দরীর নাম শুনে অর্থপূর্ণ একটু হাসি হেসে ব্রততী বলে -সেই উল্কা যখন তােমার দৃষ্টি ধাঁধিয়ে মানস-আকাশের উপর দিয়ে কিরণ-রেখা টেনে দিলে, তখন সেই সঞ্চারিণী জ্যোতিঃ- শিখাকে স্বায়ত্ত করবার বাসনা তােমার মনের অন্তস্তলে জাগ্রত হয়েছিলাে বলেই তােমার মনে হয়েছিলাে এ যদি আমার হতে!... পলাশ কি বলতে যাচ্ছিল, ব্রততী তাকে বাধা দিয়ে বলতে লাগলাে-দাড়াও, আমার কথা এখনও শেষ হয় নি। এই স্বার্থপর ইচ্ছা তােমার মনে যদি না হতো তাহলে তুমি আপনা হতে এসেই আমাকে সেই সুন্দরী উস্কার খবর দিতে। তার

মন না মতি
কথা আমাকে বলবে কি বলবে না এই দোমনায় টালমাটাল করে’
এর আগে আমাকে সেই খবর দিতে পারে নি। এখন যখন
মনের কথা খুলে বলার কথা হলাে তখন তুমি ভরসা পেয়ে সেই
কথাকে তােমার মনের গােপন-অন্তরাল থেকে প্রকাশ করতে
পারলে
ব্রততীর কথা শুনে পলাশ কেমন একটা লজ্জা ও সঙ্কোচের
অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলো এবং সেই অস্বস্তি চাপা দেবার
জন্যে উচ্চরবে হাে হাে করে হেসে বলে-তােমার কল্পনা
চমৎকার অঘটনঘটনপটীয়সী ! এখন তােমার কল্পনা রেখে
বইয়ের এই পরিচ্ছেদটা শেষ করে, আমাকে আবার রােগী
দেখতে যেতে হবে।
ব্রততী মুচকি হেসে বলে-কোন্ রােগী ? সেই উল্কা
নাকি ?
পলাশ হেসে বলে-ভয় নেই, উল্কা একবারই দেখা দেয়,
কোথাও স্থায়ী হয়ে থাকে না।
ব্রততী জিজ্ঞাসা করলে-উল্কার রােগটি কি ? বুকের জ্বালা
বুঝি ?
পলাশ গম্ভীর হয়ে বলে—হ্যা, হার্ট-ডিজিজ। তার হার্টের
অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, বেশীদিন বাঁচবে না।
ব্রততী হঠাৎ বলে ফেলে—ওরকম লােকের মরে যাওয়াই
ভালাে।
পলাশ হেসে উঠে বলে-কেন, এরই মধ্যে হিংসে হচ্ছে ?

৮ মন না মতি ব্রততী লজ্জিত হয়ে বলে—না, হিংসের জন্যে আমি বলি নি ; বিধবার বেঁচে থাকায় কেবলই দুঃখ, তাই বল্লাম। পলাশকে আর কোনাে কথা বলার অবসর না দিয়ে ব্রততী বই পড়তে পড়তে যেখানে থেমেছিলো সেখান থেকে আবার পড়তে আরম্ভ করলে। ; পরের দিন সকাল বেলা পলাশ-ডাক্তার গৃহে সমাগত রােগীদিগকে বিনামূল্যে ব্যবস্থা দিতে দিতে ভাবছিলাে আজ আবার উল্কাকে দেখুতে যাবার ডাক আসবে কি ? উল্কা সুন্দরী—অসাধারণ সুন্দরী-মনােরম-চিত্তচমৎকারিণী । তাকে দেখে পলাশের মন মুগ্ধ হয়েছিলাে; কিন্তু তাকে পুন- দর্শনের জন্য উৎসুক হয়ে ওঠবার মতন কোনাে প্রভাব তার মনের উপরে পড়ে নি। কিন্তু ব্রততী রহস্য করেই হােক বা ভুল করে’ই হােক তার মনস্তত্ত্বের যে বিশ্লেষণ করেছিলাে তাতে সে পলাশের মনে এই সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছিলাে যে বাস্তবিকই সে কি উল্কাকে পাবার জন্যে মনের কোথাও একটুও বাসনা গােপন করে রেখেছিলাে? ব্রততীর প্রত্যেকটি কথা ভাবতে ভাবতে তার মনেও এই ধারণা ক্রমশঃ বদ্ধমূল হয়ে উঠছিলো যে সে লালসা-পরবশ হয়েই উল্কাকে মনের মধ্যে স্থান দিয়েছে। সৌন্দর্যের ক্ষণিক মােহ সহজেই তার মন থেকে মুছে যেতে

মন না মতি
৯
পারতাে, কিন্তু ব্রততী রঙ্গ করে যে ভাব তার মগ্নচৈতন্যের মধ্যে
সুপ্ত হয়ে ছিলাে তাকে জাগ্রত করে’ তুলে অনর্থক অনর্থের সূত্রপাত
করে দিয়েছে। পলাশের রােগী দেখায় মন বছিলা না; তার
কেবলই উল্কার কথা মনে হচ্ছিলাে, আবার পরক্ষণেই নিজেকে
নিজে প্রশ্ন করছিলাে-ব্রততী যা বলেছে তা কি সত্যই সত্য?
বেলা যতই বেশী হয়ে উঠতে লাগলাে উস্কার বাড়ী থেকে ডাক
আবার সম্ভাবনা ততই কমে আসতে লাগলো ; এতে পলাশের
মন একবার খুশী বােধ কছিলো—যাক্, ও আপদ না আসাই
ভালাে। কিন্তু এই কথা মনে করার সঙ্গে সঙ্গেই তার মন যেন
একটা মহৎ ক্ষতির সম্ভাবনায় ক্ষুন্ন বিষন্ন হয়ে উঠছিলাে।
যখন প্রায় সব রােগী দেখা শেষ হয়ে এসেছে, পলাশ ডাকে
বেরুবে বলে’ উদযােগ করছে, এমন সময় একজন লােক সেই
ঘরে এসে পলাশকে নমস্কার করলে। পলাশ প্রতিনমস্কার করে’
পকেটে ষ্টেথেস্কোপ গুজে রেখে ওয়েষ্ট-কোটে ঘড়ীর চেন লাগাতে
লাগাতে জিজ্ঞাসা করলে—আপনার কি চাই?
সেই লােকটি বলে—আমি মােহনপুরের জমিদারের বাড়ী
থেকে আসছি ...
মােহনপুরের নাম শুনেই পলাশের মুগ্ধ হৃদয় প্রথমে আনন্দে
নৃত্য করে উঠলাে, এবং পরক্ষণেই একটা কি অনিশ্চিত ভয়ে
আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাে। পলাশ শুষ্কমুখে আগন্তুককে জিজ্ঞাসা
করলো, কি খবর ?
আগন্তুক বলে—বারােটার সময় ডাক্তার সরকার আর

মন না মতি
ব্রাউন আসবেন। রাণী-মা আপনাকে সেই সময় থাকতে
অনুরােধ জানিয়েছেন।
পলাশের প্রথমেই মনে হলাে সে এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান
করবে; কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো রােগীর আহ্বান প্রত্যা-
খ্যান করা তাদের ব্যবসায়রীতিবিরুদ্ধ, তাতে আবার সে ডাক্তার
সরকারের অনুগৃহীত। তার যাওয়াই উচিত। কিন্তু সে
ব্রততীকে জিজ্ঞাসা করে তবে যাবে, সে যদি বারণ করে তবে
সে কিছুতেই যাবে না। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে সেই
আগন্তুককে বলে—আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি এখনি
বছি আমি যেতে পারবে কি না। আপনি আমায় মাপ
করবেন, আমি এখনি আসছি।
এই বলে’ পলাশ বাড়ীর ভিতরে চলে গেলো। পলাশ সিড়ি
দিয়ে উপরে উঠেই দেখলে ব্রততী বারান্দার এক পাশে বঁটি
পেতে বসে’ মােচা খুব মিহি করে কুচিয়ে কুচিয়ে এক কাশি
জলের মধ্যে ফেছে। ব্রততীকে দেখেই পলাশের মন লজ্জার
সঙ্কোচে ভরে উঠলো, সে থমকে দাড়িয়ে ইতস্ততঃ করতে লাগলাে
সে ব্রততীকে উল্কার বাড়ীতে যাবার কথা বলবে কি না।
পলাশ প্রত্যহ ডাকে বেরুবার আগে ব্রততীকে একবার দেখে
যায়। পলাশ প্রাত্যহিক কর্তব্য সম্পাদন করতে এসেছে মনে
করে’ ব্রততী হাসিমাখা মুখ তুলে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করূলে—
বেচ্ছ ? আজ ক’টা ডাক আছে ? ফিতে কত দেরী
হবে।

মন না মতি
যে কি
বলবে তাও ঠিক
পলাশ প্রফুল্লতাশূন্য হাসি হেসে বলে—ডাক তেমন বেশী
নেই, কিন্তু......
উল্কার বাড়ীতে গেলে তার ফিরতে দেরী হবে ;
বাড়ীতে সে যাবেই কি না এই কথা স্থির করতে না পেরে স্ত্রীকে
করতে পারছিল না।
ব্রততী স্বামীর অর্ধসমাপ্ত বাক্য সমাপ্ত করে দিয়ে বলে-
ফিতে দেরী হবে ? কোথাও কন্সাল্টেশান্ আছে বুঝি?
কন্টেশান্? আছে—উল্কার বাড়ীতে ; কিন্তু তার আগে ।
ডাক্তার নিজের বাড়ীতেই স্ত্রীর সঙ্গে কান্টেশান্ করতে
চায়—উল্কার বাড়ীতে সে যাবে কি না এরই পরামর্শ সে স্ত্রীর
কাছে চাইতে এসেছে। এই কথা সে স্ত্রীর কাছে ব্যক্ত কবে
কি না নির্ণয় করবার জন্যে ইতস্ততঃ করতে করতে ব্রততীব
কথার পিঠে বলে’ ফেলো,
কন্টেশান্ আছে আপাতত
তােমার সঙ্গে।
ব্রততী কৌতুক অনুভব করে’ বক্র হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত
করে জিজ্ঞাসা কলে-কোন্ রােগীর কোন্ রােগ সম্বন্ধে
কন্টেশান্?
পলাশের মুখ লাল হয়ে উঠললা; সে কুণ্ঠিত ভাবে বলে
উল্কার বাড়ী থেকে আবার ডাক এসেছে, সেখানে ডাক্তার সরকার
আর ব্রাউনের কন্টেশান্ হবে, ডাক্তার সরকার আমাকে যেতে
বলেছেন। আমি যাবে কি না তাই তােমাকে জিজ্ঞাসা করুতে
এসেছি। তুমি যদি বারণ করাে তবে

১২
মন না মতি
ব্রততী খিলখিল্ করে হেসে উঠে বলে-তুমি কি পাগল
হয়েছে? ঠাট্টা করে কি বলেছি তার জন্যে একেবারে অনুমতি
প্রার্থনা। তুমি সেখানে নিশ্চয়ই যাবে ।
পলাশের মনের উপর থেকে একটা দুর্ভাবনার বােঝা নেমে
গেলো। সে উল্কার বাড়ীতে যাবার জন্যে উৎসুক হয়েই ছিলাে,
এখন ব্রততীর সম্মতিতে সে নিজের মনকে বােঝালে সে নিজে
উৎসুক হয়ে যাচ্ছে না, রােগী দেখতে যেতে হয় বলে যাচ্ছে,
ব্রততী যেতে বলে বলে যাচ্ছে। পলাশ খুশী হয়ে হেসে
বলে—তােমার কথাতে যাচ্ছি, কিন্তু শেষে পণ্ডিতমশায়
মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে বসে যেও না যেন।
ব্রততী কৌতুকভরা স্বরে বললে-তুমি ফিরে এসে মনের
তত্ত্ব বলে তবে না আমি বিশ্লেষণ করবে।
পলাশ হাসিমুখে বলে—তা তাে বলবােই, মনের কথা খুলে
বলতে আমরা দুজনেই তাে সত্যবদ্ধ হয়েছি।•••যাচ্ছি তবে।
ব্রততী চোখে মুখে লীলাভঙ্গীর সঙ্গে প্রীতি উছলে দিয়ে
বলে-এসাে।
পলাশ যখন উল্কার বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছালো তখনাে বারােটা
বাজেনি, অপর ডাক্তারদের আসতে তখনাে দেরী আছে।
লাশ হয় তত উল্কার বাড়ীতে গিয়ে উল্কাকে দেখতে পাবার প্রচ্ছন্ন

মন না মতি
আগ্রহেই একটু সকাল-সকাল সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে।
সে এসে যখন দেখলে ডাক্তারেরা কেউ আসেন নি, এবং আতে
তখনাে একটু দেরীও আছে, তখন তার কেমন একটা অস্পষ্ট
লজ্জা বােধ হতে লাগলাে, তার মনে এই আবছায়া আশঙ্কা হতে
লাগলাে যে উল্কার বাড়ীর সকল লােকেই তাকে বুঝি সন্দেহ
করছে। একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পরই একটি ছােট ছেলে এসে
পলাশকে বললে-~-ডাক্তারবাবু, আপনাকে পিসি-মা উপরে
ডাকছেন।
পলাশের মুখ একেবারে রাঙা হয়ে উঠলো, তার বুক ঢিপ,-
ঢিপ করতে লাগলাে; তার মনে হতে লাগলাে তার এই হৃদয়ের
শব্দ সেখানকার সব লােক শুতে পাচ্ছে।
একদিনের সুন্দরী-সন্দর্শনে তার মনে যে আনন্দ ও প্রশংসা
উদ্রেক হয়েছিলাে তা থেকে তার মনের এতখানি পরিবর্তন হবার
কথা নয়, কিন্তু ব্রততী তার মনের উপর অভাবিত ভাবের
আরােপ করে তাকে প্রতিপদে ভাবিয়ে তুলতে আরম্ভ করেছে ।
পলাশ উপরে গিয়ে যে ঘরে ঢুকলে সেই বৃহৎ ঘরখানি
ইউরােপীয় ড্রয়িংরুমের ধরণে সাজানাে-ঘরের দেয়াল আতা-
রঙে রং করা, ঘরের মেঝে-জোড়া পারস্য দেশের লাল রঙের
গালিচা পাতা, তার উপর আল্তা রঙের রেশমী কাপড়ের গদি
আঁটা দামী বেতের কাউচ, সােফা চেয়ার ঘরের চারিদিকে পাতা
আছে, ঘরের মধ্যস্থলে সােনালী রঙের মার্বেল পাথরের ছােট
একটি টেবিলের উপর নকসা-কাটা বেলােয়ারি-কাচের একটা বড়

১৪
মন না মতি
;
ফুলদানীতে খুব বড় একটা বিবিধ মশুমী ফুলের তােড়া বসানাে
আছে, ঘরের চার কোণে চারটি কোণাচ তেপায়ার উপর ঢাকার
আর কটকের তৈরী রূপার ফুলদানীতেও ফুলের তােড়া শােভা
পাচ্ছে, ঘরের চার দেয়ালে জাপান ভারতবর্ষ আর ইউরােপের
প্রসিদ্ধ চিত্রকরদের আঁকা খান-কয়েক রঙীন ছবি, আর সেইসব
ছবির নীচে কয়েকখানি উৎকৃষ্ট ফটোগ্রাফ, টাঙানাে আছে।
বাহির থেকে ঘরে প্রবেশ করবার দরজার ঠিক উল্টো দিকে
একখানি হেলানাে-চেয়ারের উপর বসে আছে মূর্তিমতী সৌন্দৰ্য্য
উল্কা ; উল্কা বিধবা ; তার বেশবাস সমস্তই সুশুভ্রতার পরণে
রূপালি জরির পাড় দেওয়া ঢাকাই মসলিনের কাপড়, সেই
কাপড়ের যে পাড় আছে তা সহসা জানতে পারা যায় না, নড়া-
চড়াতে জরির উপর আলাে চিমিকিয়ে উঠলেই তবে টের
পাওয়া যায় ; তার গায়ে আদ্ধির কাপড়ের উপর চিকণের ও
সূচের প্রচুর সাদা-কাজ-করা হাতকাটা ব্লাউজ, ব্লাউজের হাত।
বাহুর সঙ্গে একেবারে চোস্ত হয়ে অকুঞ্চিত ভাবে খাপে-খাপে
লেগে আছে ; তার পায়ে কটকের সাদা চামড়ার উপর সাদা
রেশমের ফুল-কাটা চটি জুতাে; বাঁ হাতের অনামিকা
আঙুলে
খুব বড় কোমল হীরার একটি আংটি তার অঙ্গের, একমাত্র
অলঙ্কার। শুক্ল পরিচ্ছদের ফাকে ফাকে দেখা যাচ্ছিলাে তার
শঙ্খের মতন শুভ্র নিটোল গ্রীবা, শ্বেত-পদ্মের মতন কোমল
কমনীয় মুখ আর মৃণালের ন্যায় ক্রম-পৃথুবৰ্ত্তল হাত দুখানি; সে
যেন সৰ্বশুক্লা সরস্বতী ! তার শুভ বিদ্যুত্বর্ণ মুখের উপর নিবিড়

মন না মতি
কৃষ্ণ টানা , দীর্ঘ পক্ষ্মজাল ও চক্ষুতারকা এবং মুখখানি বেষ্টন
করে কৃষ্ণ-কুঞ্চিত চূর্ণ-কুন্তল পরস্পরের বর্ণ-বৈষম্যে পরস্পরকে
সুস্পষ্ট ও সুন্দরতর করে তুলেছে।
পলাশ এই রূপের ফোয়ারার সামনে এসে তার দিকে মুগ্ধ
দৃষ্টিতে তাকিয়ে থকে দাড়িয়ে পড়লাে। উল্কা স্পষ্ট না হেসে
কেবল হাসির আভার আভাসে মুখ উদ্ভাসিত করে তুলে’ লীলা-
ভঙ্গীতে মাথা ঈষৎ নুইয়ে নমস্কারের ইঙ্গিত করে মনােহরণ মধুর
সুরে বলে-বসুন।
বশীকরণ মন্ত্রমুগ্ধ ব্যক্তির ন্যায় পলাশ উল্কার একটি বাক্যের
আঘাতে অবশ হয়ে কোনাে বিচার বিবেচনা করতে না পেরে
যেখানে এসে দাড়িয়েছিলাে সেইখানকারই একটা চেয়ারের উপর
ঝুপ করে বসে পড়লাে। বসেই তার মনে হলো এই রূপবহ্নির
সম্মুখে এক ঘরে একলা সে-অম্‌নি তার মনে পড়ে গেলো
কালিদাসের একটি শ্লোকের একটি চরণ-পতঙ্গবৎ বহ্নিমুখং
বিবিক্ষু! এই শ্লোক-পঙক্তিটি মনে পড়তেই তার মুখ আবার
লাল হয়ে উঠলাে, বুক আবার ধকধক করূতে লাগলাে।
ক্ষণকাল দুজনেই নিৰ্বাক্। নিমেষের নিস্তব্ধতা পলাশের
কাছে প্রলয়ান্তকালের নিঃশব্দ শূন্যতার ন্যায় প্রতীয়মান হতে
লাগলাে। এই সু-দুঃসহ নিস্তব্ধতা থেকে উদ্ধার পাবার চেষ্টা
করে’ পলাশ কোনােমতে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলে--অন্য
ডাক্তারেরা তাে এখনও আসেন নি।
উল্কা শুধু বলেনা।

মন না মতি তা তত পলাশও জানে, সে তাে দেখতেই পাচ্ছে যে, ডাক্তারেরা আসেন নি ; তবু সে যে এই কথা বলেছিলাে তার উদ্দেশ্য উষ্কার সঙ্গে কথােপকথনে প্রবৃত্ত হওয়া; কিন্তু উল্কার এক কথার উত্তরে সে উদ্দেশ্য তােত সিদ্ধ হলাে না। তখন পলাশ আবার প্রশ্ন করলে আপনি কেমন আছেন? উল্কা হেসে বলে—আমি ত ভালােই থাকি, আপনারাই বছেন যে আমি ভালাে নই। উল্কার মুখে ও কি হাসি, না শাণিত ছুরীর উপর প্রদীপ্ত আলােকের ঝলক ? পলাশ স্তম্ভিত হয়ে একেবারে বাক্যহার হয়ে গেলাে। পলাশকে অব্যাহতি দিয়ে বাড়ীর সামনে বেজে উঠলো মােটর-গাড়ীর ভেঁপু আর সেই সঙ্গে-সঙ্গে শুভ্ৰ-চাপকান-ও- পাগড়ি-পরা একজন খামা এসে খবর দিলে-ডাগ,দর সাহেব এসেছেন। পলাশ তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাে এবং বেশী দূর অগ্রসর না হতেই দেখলে ডাক্তার সরকার আর ব্রাউন দুজনেই আছেন। ডাক্তারদের অভ্যর্থনা করে’ পলাশ ঘরের মধ্যে নিয়ে এলো। ডাক্তারেরা রােগিণীকে অভিবাদন করে পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হলেন। ডাক্তারেরা হৃদয়-যন্ত্র পরীক্ষা করবেন বলে উল্কা যখন তুষার-ক্ষেত্রের মতন শুভ্র বক্ষতট উদঘাটিত করে দিলে তখন পলাশের সর্বাঙ্গে রক্তপ্রবাহ ঝিঝিম্ করতে লাগলো।

মন না মতি
১৭
' ডাক্তারের পরীক্ষা করে বলেন—এখন কিছুদিন প্রত্যহ
বক্ষ পরীক্ষা করতে হবে। আমাদের প্রত্যহ আবার দরকার
নেই ; পলাশ-বাবু প্রত্যহ পরীক্ষা করে রিপাের্ট, লিখে রাখবেন,
আর হপ্তায় হপ্তায় আমাদের সেই রিপাের্ট দেখিয়ে আলেই
হবে ; হপ্তার মাঝে যদি কোনো বিশেষ ঘটনা আমাদের
জানানাে উচিত বিবেচনা করেন তাহলে তাও জানাবেন।
ডাক্তার সরকার বলেন—পলাশ-বাবুকে যখন রােজই
আসতে হবে, তখন তাকে রােজ রােজ ভিজি না দিয়ে একটা
মাস-মাইনে ঠিক করে দিলেই হবে।
উল্কা জামার বুকের বােতাম লাগাতে লাগাতে মৃদু হেসে
ঘাড় ঈষৎ নেড়ে এই প্রস্তাবে সম্মতি জানালে ।
পলাশের হৃদয় থেকে এক ঝলক্ রক্ত তার মগজে চড়ে
গেলো। তাকে বােজ এসে উল্কার হৃদয় পরীক্ষা করতে হবে ।
তার প্রথমেই মনে হলাে এই কৰ্ম্ম সে অস্বীকার করবে, কিন্তু অপর
ডাক্তারদের সম্মুখে তার ব্যবসায়-বিরুদ্ধ কথা বলতে মুখে আটকে
গেলাে এবং মাসিক একটা বাঁধা আয় প্রত্যাখ্যান করতেও তার
মন দ্বিধান্বিত হয়ে উঠলাে। পলাশ চুপ করে থাকাতেই সকলে
স্থির করে নিলে পলাশ প্রত্যহ নিয়মিত উল্কার বক্ষ পরীক্ষা
কতে আসবে।
গম্ভীর বিষন্ন মুখে বাড়ী ফিরে এলাে।
পােশাক

১৮
মন না মতি
।
ছাড়তে ছাড়তে সে কেবলই ভাবছিলাে উল্কার কথা। বােজ সে
রােগী দেখে ফিরে এসেই ব্রততীর সঙ্গে আগে দেখা করে, তার
পরে পােশাক ছাড়ে ; আজ সে নিজেকে অপরাধী মনে করে’
ব্রততীর সামনে যেতে সঙ্কোচ বােধ করছিলাে। পলাশের ফিরে
আসার সাড়া পেয়েই ব্রততী পলাশের ঘরে এসে হাসিমুখে
বলে—আজ ফিতে যে অনেক বেলা হয়ে গেলো! দেড়টা
বাজে
পলাশ ব্রততীর দিকে পিছন ফিরে দাড়িয়ে মাথা গলিয়ে
শার্ট খুলে কাঠের আলনায় রাখতে রাখতে বলে-হ্যা,
আমি চট করে নেয়ে আসি, তুমি ভাত বাড়া গে, আমাকে
এখনি আবার বেরুতে হবে, সতুর কলেরা হয়েছে:•••••
ব্রততী ব্যথিত উৎকণ্ঠার স্বরে বলে উঠল—সতু-বাবুর
কলেরা হয়েছে ?
পলাশ শুধু হঁ্যা বলেই তাড়াতাড়ি স্নানের ঘরে চলে গেলাে।
ব্রততী মনে করলে তার স্বামী বন্ধুর পীড়ার উদ্বেগেই বিষন্ন ও
গম্ভীর হয়ে আছে—সত্যেন্দ্র পলাশের বন্ধু।
পলাশ স্নানের ঘরে দরজা বন্ধ করে ঘটার পর ঘটা জল
তুলে’ মাথায় ঢালতে ঢালতে মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবার
চেষ্টা কছিল উল্কার প্রসঙ্গ সে কেমন করে ব্রততীর কাছে
উত্থাপন করবে এবং সে উল্কার নিত্য-পরিচর্যার ভার গ্রহণ
কবে কি না। স্নানের ঘরে অনেকক্ষণ বিলম্ব করে অনেক
ঘটী জল মাথায় ঢেলেও পলাশ মাথা ঠাণ্ডা করে মতি স্থির

মন না মতি
করতে পারলে না। অবশেষে যখন ব্রততী এসে তাকে অনু-
যােগের স্বরে ডেকে বলে—আমাকে ভাত বাড়তে বলে
এসে কতক্ষণ ধরে’ নাইছাে, ভাত যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেলাে...”
তখন পলাশ হতাশার হাতে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে বলে—
এই হয়েছে, চলে যাচ্ছি।
পলাশ এসে খেতে বসলো। কিছুক্ষণ নীরবে খাওয়ার পর
হঠাৎ মুখ তুলে’ পলাশ বলে—উল্কারাণীকে রােজ পরীক্ষা করা
দরকার......
ব্রততী এতক্ষণে বুঝতে পারলে তার স্বামীর মন কিসের
চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে আছে ; সে স্বামীর সঙ্কোচ কাটিয়ে
দেবার জন্যে কোমল স্বরে বলে—আহা! বেচারার এমন
অখ!
স্ত্রীর সহানুভূতিতে সাহস পেয়ে পলাশ বলে~-ডাক্তারের
আমাকেই মাস-মাইনেতে এই ভার নিতে বলছেন...•••
ব্রততী কণ্ঠস্বরে উৎসাহ ঢেলে বলে—সে ত খুব ভালােই।
মাসে একটা বাঁধা আয় দাড়িয়ে যাবে !–মাইনে কত করে
দেবে?
পলাশ মাছের কাটা বাছতে বাছতে বলে—আমার ফি
রােজ আট টাকা হিসাবে ত্রিশ দিনের মাসে দু শ চল্লিশ টাকা
হয়, একত্রিশ দিনে মাস হলে দু শ আট-চল্লিশ টাকা হয় ;
ওরা আমাকে থােক আড়াইশ টাকা করে দেবে, কোনাে
কোনাে দিন দিনে দু-তিনবারও যেতে হতে পারে, কোনাে দিন

মন না মতি
বা রাত্রেও যেতে হতে পারে, তার জন্যে ওরা আর বেশী
ফি দেবে না
ব্রততী উৎসাহ দেখিয়ে বলে-এ ত খুব ভালাে হয়েছে !
পলাশ বলে--আমি এ কাজ নেবাে না ভাবছি।
ব্রততী বিস্ময়ের ভাণ করে বলে-কেন ?
পলাশ বলে--তার সামনে গিয়ে দাড়ালেই আমার সন্দেহ
হয় তার জন্যে আমার মনে লােলুপতা প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে তুমি যে
বলেছো তা কি সত্যি।
ব্রততী হেসে উঠে বলে-তুমি কি পাগল হয়েছে না কি?
আমি ঠাট্টা করে একটা কি কথা বলেছি তাকে মনের মধ্যে
তােলপাড় করে’ ছায়া দেখে মিছামিছি ভূতের ভয় পাচ্ছে।
পলাশের মন থেকে একটা যেন ভার নেমে গেলাে; স্ত্রীর
কথায় তার মনের সন্দেহ তাকে ত পীড়া দিচ্ছিলই, তার
উপর তার দুর্ভাবনা হয়েছিলাে স্ত্রী পাছে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে ;
এই দুই কারণে সে উল্কার কাছে না যেতেই চাইছিলাে, কিন্তু
অন্যদিকে আবার উল্কার মােহ তাকে আকর্ষণ করছিলাে; এই
দোটানার মধ্যে পড়ে পলাশের মন দোল খাচ্ছিলাে; এখন স্ত্রীর
কথায় তার নিজের প্রবলতর ইচ্ছাটাই সমর্থিত হওয়াতে সে মনে
মনে আনন্দিত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচলো। সে বলে--
তা হলে তুমি কি আমাকে এই কাজ নিতে বলো?
ব্রততী কথায় জোর দিয়ে বলে-নিশ্চয়, নেবে বই কি।
পলাশ খুশী হয়ে বললে-মাস-কাবারে থােকে আড়াইশে

মন না মতি
টাকা পেলে সেই টাকা দিয়ে তােমায় এক জোড়া ব্রেসলেট
কিনে দেবাে।
স্বামীর এই কথা শুনে ব্রততীর মনে, যে কথাটা উদয় হলে তা
ব্যক্ত করে বলবে কি না ভাবতে গিয়েই তার মনে পড়লাে তারা
তাে কোনাে কথাই গােপন করূবে না স্থির করেছে,--তাই সে
বলে’ ফেলে—উল্কার কাছে নিত্য যেতে পাওয়ার খুশীর বকশিশ !
পলাশের মন স্ত্রীর কথায় প্রসন্ন হয়ে উঠতে না উঠতে
পরক্ষণেই স্ত্রীর ব্যঙ্গের খােটা খেয়ে আবার অপ্রসন্ন হয়ে উঠল,
এবং ব্রততীর কথার মধ্যে সত্যের আওয়াজ বাজল বলে
পলাশের মন স্ত্রীর উপর বিরক্ত হয়ে গেলাে। সে তাড়াতাড়ি
জলের গেলাস তুলে’ জল খেতে খেতে শুধু বলে।
* ব্রততীর মুখের উপর দিয়ে কুটিল হাসির ঈষৎ আভাস খেলা
করে গেলাে।
পরদিন পলাশ অন্য দিনের চেয়ে একটু সকাল-সকাল রােগী
দেখতে বেরুলো। সকাল থেকেই তার মন উল্কার বাড়ীতে
যাবার জন্যে ছটফট করছিলো; কিন্তু তার এই মনের ব্যগ্রতা
স্পষ্ট করে নিজের কাছে প্রকাশ করলেই সৰ্ত্ত অনুসারে স্ত্রীর
কাছে প্রকাশ করূতে হবে এই ভয়ে সে নিজের কাছেও মনের
প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করতে চাইছিলাে না। উল্কার বাড়ীতে

২২
মন না মতি
•
যাবার জন্যে তার যে কিছুমাত্র তাড়া বা তাগাদা নেই এই কথা
নিজের কাছেই প্রমাণ করবার জন্যে সে প্রথমেই উল্কার বাড়ীতে
গিয়ে অন্য রােগী দেখতে গেলো। দু-তিন বাড়ী ঘুরেই
তার মন এমন অস্থির হয়ে উঠলাে যে সে উল্কার বাড়ীতে না
গিয়ে অন্য বাড়ীতে আর কিছুতেই যেতে পারলাে না। যখন
নিজেকে আর কিছুতেই প্রতারণা করবার উপায় রইলাে না তখনও
সে নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিলাে যে সে তো
আগে তিন বাড়ীর রােগী দেখে তার পর উল্কাকে দেখতে
যাচ্ছে। আর তার কাছে নিত্য একবার তাে যেতেই হবে, তবে
আর আগে পিছেতে তফাৎ কি ?
পলাশ উল্কার বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হতেই একজন চাকর
তাকে একেবারে উপরে নিয়ে গেলাে। পলাশ উল্কার বম্বার
ঘরে ঢুকে দেখলে সৰ্ব্বশুক্লা উল্কা কাকের মতনই একখানা
হেলানাে-চেয়ারে সর্বাঙ্গ এলিয়ে দিয়ে বসে আছে। পলাশ
নীরবে নমস্কার করে দাড়ালাে। উল্কা প্রতিনমস্কার করে
বললে-আসুন, বসুন।
পলাশ একখানা চেয়ারে আড়ষ্ট হয়ে বসে জিজ্ঞাসা করলে
কেমন আছেন ?
উল্কা হেসে উত্তর দিলে-এ প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞাসা করা বৃথা,
এ প্রশ্নের উত্তর তত আপনাকেই দিতে হবে।
পলাশ উঠে দাড়িয়ে কুষ্ঠিত ভাবে বলে—তা হলে হাতটা
একবার দেখতে হয়।

মন না মতি
২৩
উল্কা বাঁ-হাতখানি তুলে’ অগ্রসর করে’ ধরলে।
পলাশ উল্কার কাছে এগিয়ে গিয়ে তার পাশের একখানা
চেয়ারে বসে’ ডান হাতে উল্কার মণিবন্ধ ধরে নাড়ী দেখতে
লাগলো এবং বাঁ হাতের উপর উল্কার কনুইটা রেখে উল্কার
প্রলম্বিত হাতকে একটা অবলম্বন ও আশ্রয় দিলে। পলাশের
হাত থরথর করে কেঁপে উঠল, এবং ডাক্তারের ধমনীতে রক্ত
এমন উষ্ণ হয়ে খরবেগে প্রবাহিত হতে লাগলাে যে সে রােগীর
নাড়ীর গতিবিধি নিজের কম্পিত-অঙ্গুলির তলে ভালাে করে
অনুভব করতেই পারলাে না। নিজের অবস্থার শোচনীয়তা ঢাকা
দেবার জন্যে পলাশ বললে—আপুনার নাড়ীর অবস্থা তো আজ
খুব ভালাে ! আগে নাড়ীর দুবার স্পন্দনের পরই একবার স্পন্দন
হতো না; আজ দেখছি অনেকক্ষণ পরে পরে স্পন্দন এক-একবার
মৃদু হচ্ছে, আগের মতন একেবারে স্থগিত হয়ে থাকছে না•••••
উল্কার মৌন মুখে খুশীর ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলাে।
এইবার উদ্ধার বক্ষ পরীক্ষা করতে হবে। এই কথা মনে
হতেই পলাশ পলাশ-ফুলের মতনই রাঙা হয়ে উঠলো। যে কথা
মনে করতেই তার এই অবস্থা, সেই কথা সে মুখে উচ্চারণ
করে’ বলবে কেমন করে? সে একটু ইতস্ততঃ করে’ ভেবে
দেখলে মুখে সে অমন কথা কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারবে
, তার কণ্ঠনালি চেপে বুজে আসছে, তার স্বর কেঁপে উঠবে
বলে ভয় হচ্ছে। তখন সে পকেট থেকে ষ্টেথেস্কোপ বার
করে তার নলের দুই প্রান্ত কানের ফুটোর মধ্যে সন্নিবেশি

২৪
মন না মতি
করতে প্রবৃত্ত হলাে। এই প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত উপলব্ধি করে উল্কা
মুখ গম্ভীর করে জামার বােতাম খুলতে লাগলাে।
উক্কার বক্ষতট অনাবৃত হয়ে যেতেই পলাশের দুই চক্ষু
বিস্ফারিত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। সে নিজের মুখভাব উল্কার
কাছ থেকে গােপন করবার জন্যে তাড়াতাড়ি উল্কার বুকের
উপর ঝুকে পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হলাে। তার মুখ উল্কার মুখের কাছে
নুয়ে পড়েছে, ষ্টেথেস্কোপের মুখ ধরে তার হাত উষ্কার বুকের
উপর দিয়ে সঞ্চরণ করে’ ফিরছে, এই ব্যাপার সম্বন্ধে তার মন
সজ্ঞান হয়ে উঠতেই পলাশের মুখ রাঙা, কান গরম, নিশ্বাস ঘন
এবং হাত ও হৃদয় কম্পিত হয়ে উঠলাে। পলাশ চকিত দৃষ্টিতে
একবার উল্কার
মুখের দিকে তাকালাে এবং তার মনে হলাে উল্কা
যেন ঈষৎ একটু মুচকি হাসলে। উল্কার মুখে হাসি কল্প।
করে পলাশের মনে হলো উল্কা তার ভাববৈলক্ষণ্য লক্ষ্য করে
মনে মনে হাসছে। এই কথা মনে হতেই ডাক্তারের নিজের
বুকের অবস্থা যেরকম সাংঘাতিক খারাপ হয়ে উঠলাে তাতে তার
রােগীর বুক পরীক্ষা করার আর কোনাে ক্ষমতাই অবশিষ্ট
রইলাে না।
পলাশ তাড়াতাড়ি সােজা হয়ে দাড়িয়ে কান থেকে
ষ্টেথেস্কোপ খুলতে খুলতে বলে—আপনার হার্টের অবস্থাও
আজ ঢের ভালাে•••••• ওষুধে আপনার খুব উপকার হয়েছে।
উল্কা জামার বােতাম দিতে দিতে হাসিমুখে বলে-
হবে।

মন না মতি মুখে আবার হাসি ! পলাশের মনে হলাে উল্কা তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে বিদ্রুপ করছে। পলাশের মনে হলাে সে উল্কার সামনে থেকে পালিয়ে নিজের অপ্রতিভ অবস্থা গােপন করতে পারলে বাঁচে। পলাশ তাড়াতাড়ি নমস্কার করে বললে—তা হলে আজ আমি আসি। উল্কা প্ৰতিনমস্কার করে বলে—আসুন। পলাশ মােটরে গিয়ে উঠলাে, মােটর অন্য রােগীর বাড়ীর দিকে ছুটলাে। গাড়ী উল্কার বাড়ী থেকে যতই দূরে চলে যেতে লাগলাে পলাশের ততই মনে হতে লাগলাে এত তাড়াতাড়ি চলে না এলেই হতাে—আবার সেই কাল এমনি সময়ের—চব্বিশ ঘণ্টার আগে উষ্কাকে দেখতে পাবার আর কোনাে সম্ভাবনা রইলাে না। উত্তাকে দেখবার লােভ পলাশের মনে জাগতেই তার মন সেই ভাবটাকে চাপা দেবার জন্য বলে উঠলাে-কী অপূর্ব সুন্দরী। A thing of beauty is joy for ever !” এই বলে সে নিজেকে প্রতারণা করতে চাইলে যে সে সৌন্দৰ্য-লক্ষ্মীর ভক্ত উপাসক মাত্র। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলাে—উল্কার অসুখ যদি বাড়ে, তা হলে আজকে আবার আমাকে ডাকতে পারে। পরের পীড়া বৃদ্ধির কামনা মনে উদয় হবা মাত্রই সে আবার নিজেকে প্রতারণা করে’ ভৎসনা করলে-চিকিৎসা ব্ৰত ব্যবসা হয়ে উঠলেই মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়ে যায়, পরের পীড়া বৃদ্ধিতে নিজের দু-পয়সা লাভের প্রত্যাশা মনকে হীন করে ফেলে। অভ্যাস- বশে আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে এখানে যতবারই ডাকুক

মন না মতি
i,
আমি ফি একবারের বেশী পাবে না। অতএব এমন রােগীর
ভালাে থাকাই ভালাে, তাতে আমার টানাপােড়েন করার
ঝঞ্চাট পােহাতে হবে না।
পলাশ সমস্ত রােগী দেখা শেষ করে বাড়ীতে ফিরে গিয়েই
ব্রততীর সঙ্গে দেখা করে’ বলে—উস্কার বাড়ীতে গিয়েছিলাম।
স্বামীর এই অকস্মাৎ উক্তি শুনে’ ব্রততী অপ্রতিভ হয়ে
পড়লাে, তার মনের উপর দিয়ে এই কথা বিদ্যুৎ-চমকের মতন
ভেসে গেলাে যে তার স্বামীমনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের কথায় মনে আঘাত
পেয়েছে বলেই তার মনে বারম্বার সেই কথাটা ফিরে
ফিরে আসছে এবং উল্কাকে জড়িয়েই আত্মপ্রকাশ করছে।
স্বামীর মনের এই ক্ষোভ ভুলিয়ে দেবার জন্যে সে বলে-তা
তো এখন রােজই যেতে হবে•••
পলাশ বলে—কিন্তু তার সামনে গেলে আমার মনে হয়
যেন আমারই হার্ট-ডিজিজ, হয়েছে:
ব্রততী পলাশের কথার প্রকৃত অর্থকে আমল না দিয়ে
বলে-
সৌন্দর্যের
সামনে গেলে মনের মধ্যে সম্রম উদ্রেক
হওয়া তাে স্বাভাবিক।
পলাশ অপরাধীর ভাবে স্থলিত বচনে বলে—কিন্তু আমার
এক-এক সময় মনে হয় তােমার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ হয় তো বা ঠিক
ব্রততীর বুকটা কেঁপে উঠলাে। সে চেষ্টা করে মুখে হাসি
ফুটিয়ে বলে—তুমি নেহাৎ ক্ষেপ! ঠাট্টাটাকে সত্যি ভেবে
ভয় পাচ্ছাে !

মন না মতি
পলাশ কাতর স্বরে বলে—ভয় নিতান্তই মিথ্যা নয়
ব্রততী !
ব্রততীর মুখ শুকিয়ে গেলাে; তবু সে মুখে হাসি টেনে এনে
বলে—ভয় সত্য হওয়াও স্বাভাবিক—সে সুন্দরী যুবতী আর
তুমি যুব-পুরুষ। সুন্দরীর প্রতি পুরুষের মন আকৃষ্ট হওয়া
কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়।
পলাশ কুণ্ঠিত স্বরে বলে—কিন্তু......
ব্রততী বলে—এর মধ্যে আর কোনাে কিন্তু নেই। তুমি
বলিষ্ঠচরিত্র, তুমি আমাকে ভালােবাসাে, উল্কাও ভদ্রঘরের বিধবা,
এ অবস্থায় কোনাে আশঙ্কার কথা মনে আসাই অন্যায়।
পলাশ আবার কি বতে যাচ্ছিল। তাকে সেই কথা বলতে
দিয়ে ব্রততী বললে—তুমি স্নান করাে গে, অনেক বেল।
হয়েছে, ভাত জুড়িয়ে যাবে।
পলাশ উন্মনা হয়ে সেখান থেকে চলে গেলাে।
পলাশ প্রত্যহ উল্কার বাড়ীতে উস্কার বক্ষ পরীক্ষা করতে
যায়, এবং সেই যাবার সময়টির প্রতীক্ষায় তার দিবা-রাত্রির
চব্বিশ ঘণ্টার তেইশটি ঘণ্টা উন্মুখ হয়ে থাকে; উল্কার বাড়ী থেকে
চলে আসার পরই পলাশের মন প্রতি মিনিট গুণতে থাকে
আবার সেই কাল কখন যাবার সময় আসবে। রােগীর বক্ষ

মন না মতি পরীক্ষা কবুবার সময় ডাক্তারের নিজের বক্ষ যে-রকম গুরু তালে স্পন্দিত হতে থাকে তাতে ডাক্তারের সন্দেহ হয় তারও বা হৃদয়ের পীড়া উপস্থিত হচ্ছে। পলাশ ব্রততীর কাছে আর নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে বল্‌তে পারে না, তার কেমন সঙ্কোচ ও লজ্জা বােধ হয় । কিন্তু সে নিজের মনকে এই বলে কৈফিয়ৎ দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চায় যে নিত্যকার রােগী দেখার কথা ব্রততীকে আর কি বলবাে ? এক-একটি রােগী সম্বন্ধে ডাক্তারের বিশেষ আগ্রহ হয়ে থাকে, তার কথাও বিশেষ করে কাউকে বলার কোনাে হেতু নেই। উল্কার বাড়ীতে যাবার জন্যে তার যে বিশেষ আগ্রহ হয় সে-কথা তাে সে একদিন ব্রততীকে জানিয়েই রেখেছে, এক কথা বারবার বলারও কোনাে সঙ্গত কারণ দেখা যায় না। এই-রকম আত্ম-প্রবঞ্চনা করে’ আরব্রততীর কাছ থেকে মনের অবস্থা গােপন রেখে এক মাস কেটে গেলো। মাসকাবারে পরের মাসের পয়লা তারিখে পলাশ যখন উল্কাকে পরীক্ষা করে অনিচ্ছাতেই বিদায় নেবার জন্যে নিজের দেহটাকে জোর করে টেনে তুলে উঠে দাড়ালো, তখন উক্কা তার টেবিলের উপরকার রূপার ছােট ঘণ্টাটি বাজিয়ে দরজার দিকে তাকালাে। একজন খানসামা দরজার কাছে এসে দেখা দিতেই উল্কা তাকে বলে- ম্যানেজার-বাবুকে বলােগে, ডাক্তারবাবু যাচ্ছেন। এই কথা শুনেই খানসামা চলে গেলাে। এই উক্তির যে কি অর্থ তা না বুঝে পলাশ একবার উৎসুক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উল্কার

মন না মতি
ও
মুখের দিকে চেয়ে কোনাে উত্তর না পেয়ে কৌতূহলী হয়ে ঘর
থেকে বেরিয়ে চলে গেলাে।
পলাশ যখন গিয়ে তার মােটরে উঠবে বলে’ পা-দানে প
দিয়ে দরজার ভিতর মাথা গলিয়ে দিয়েছে, তখন উল্কার ম্যানেজার
স্থূল দেহ নিয়ে দ্রুতপদে এসে পিছন থেকে ডেকে বলে-
ডাক্তারবাবু, আপনার দক্ষিণাটা......
পলাশ গাড়ীর দরজার ভিতর থেকে মাথা টেনে বার করে
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখুলে ম্যানেজার একতাড়া আকোরা নূতন
নােট হাতে করে তার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে। পলাশ গাড়ীর
পা-দান থেকে পা নামিয়ে ঘুরে দাড়িয়ে হেসে বললে-ওর জন্যে
এত তাড়াতাড়ি কেন? এখন থাক। আমি আমার
পুরস্কার সম্বন্ধে এক সময় রাণীকে বল্‌বাে।
ম্যানেজার বলে—রাণী-মাই আপনাকে এই টাকা দিতে
বলেছিলেন।
পলাশ মােটরের মধ্যে চড়ে বসে’ বললো তা জানি ।
কিন্তু আমি পরে কোনােদিন তাকে আমার প্রার্থনা জানাবো।
পলাশের মােটর অন্য রােগীর বাড়ীর উদ্দেশে ছুটে চলে।
পলাশ বসে বসে ভাবতে লাগলাে—তুচ্ছ আড়াইশােটা টাকা
নিয়ে কি হবে? রাণী যে, সে রাণীর মতন যদি যাচকের প্রার্থনা
পূরণ না করে তবে ঐ যৎকিঞ্চিৎ কাঞ্চনমূল্য নিয়ে কি ফল ?
যে-রকম যত্ন করে আমি তাকে দেখি তাতে বিশেষ রকম পুরস্কার
আমাকে তার দেওয়া উচিত।......উল্কাকে দেখে, তার কাছে

মন না মতি
থেকে আমি যে দুঃখভরা সুখ লাভ করি সেই তাে আমার এক
পুরস্কার-এ আনন্দ তত টাকায় কিতে পাওয়া যায় না।
টাকা তাে অনেক রােগীর কাছে পাই; এ রােগীর কাছ থেকে
যে আনন্দ লাভ করি তা তো দুর্লভ।•••না, আমার লােভ
ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, আমি আর এ বাড়ীতে আসবে না।
আমি কাল এসে একে বলে বিদায় নিয়ে যাবাে।•••
এমনি কতরকম বিরুদ্ধ চিন্তায় পলাশের মন ভরে গিয়ে
ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলাে। সে দায়সারা গােছে অপর রােগীদের
দেখে বাড়ী ফিরে গেলাে।
বাড়ী গিয়ে সে নিত্য যেমন তার দর্শনীর টাকাগুলি ব্রততীর
হাতে সপে দেয়, আজও তেমনি পকেট থেকে টাকা বার করে
করে’ ব্রততীর সামনে রাখতে রাখতে বললে—উল্কা-রাণীর
ম্যানেজার মাইনে দিতে এসেছিলাে, আমি নিই নি।
এই কথা বলে’ পলাশ আর পত্নীর মুখের দিকে তাকাতে
পারলে না, মাথা নীচু করে’ পকেট থেকে খুঁজে খুঁজে টাকা
বার করতে লাগলাে।
ব্রততী স্বামীর দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলে–কেন ?
পলাশের মুখ পলাশ-ফুলের মতন রাঙা হয়ে উঠলাে, সে
একটা ঢােক গিলে মুখ না তুলেই বলে-রাণীর চিকিৎসা করে’
সামান্য মাইনে নেবে? একটা ভালাে রকম কিছু পুরস্কার চাইবে।
ব্রততী কৌতুকভরা হাসি ঠোটের কোণে টিপে ধরে বলে
-কি পুরস্কার চাইবে? স্বয়ং উল্কা-রাণীকেই নাকি ?

মন না মতি
পলাশের মনের মধ্যে যে বাসনাটা প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলাে, যা
তার নিজের কাছেও আত্মপ্রকাশ করতে কুণ্ঠা ও লজ্জা অনুভব
করছিলাে, সেই গােপন বাসনাকে ব্রততী যখন উদঘাটিত করে
তার সামনে প্রকাশ করে’ ধরলে তখন পলাশ তার ভয়ঙ্কর
লােভনীয়তা দেখে চমকে উঠলো। সে গম্ভীর হয়ে থথমে
মুখ তুলে নির্দোষীর প্রতি অন্যায় সন্দেহ করায় ব্যথিত নিরীহের
ভাব ধারণ করে ব্রততীকে বলে—তুমি যখন পদে পদে
আমাকে সন্দেহ করছো, তখন এ কাজ আমি আর করবাে না,
কালই আমি তাদের বলে’..••••
ব্রততী ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলাে—তুমি পাগল হলে দেখছি।
উল্কাকে নিয়ে তোমাকে একটু ঠাট্টা করবারও জো নেই।
লােকের সত্য যেখানে গােপন থাকে, সেখানে খোঁচা খেলে
লােকে চটে; তুমি শুধু-শুধু চটছে কেন বলাে তাে?
এ কথার পর পলাশ একেবারে চুপ করে গেলো।
তো আপনার অন্তরে বেশ বুঝতে পারলে যে ব্রততীর কথা
কতখানি সত্য-সে নিজের অন্তরের অন্তরালে একটি অস্বীকৃত
সত্য গােপন করে রেখেছে বলেই সেখানে ব্রততী খোচা
দিলে সে অস্বস্তি অনুভব করে।
ব্রততী বাস্তবিক সন্দেহ করেছিলাে যে পলাশের মনে উল্কা
সম্বন্ধে একটু দুর্বলতা গােপন আছে, তাই সে ঘুরিয়ে ইঙ্গিতে
তাকে উদাহরণ দেবার ছলে অপরের প্রসঙ্গে নিজের সন্দেহটা
জানিয়ে দিলে। কিন্তু স্বামী বিরক্ত ও দুঃখিত হচ্ছে দেখে
27 )

৩২
মন না মতি
সে প্রতিজ্ঞা সত্ত্বেও নিজের মনের কথা ব্যক্ত করে বলতে
পারলে না। এবং পলাশও নিজেকে স্ত্রীর কাছে অপরাধী
বিবেচনা করছিলাে বলে নিজের মনের কথা প্রকাশ কবুতে
ভয় ও লজ্জা অনুভব কছিলাে।
পলাশ চুপ করে যাওয়াতে ব্রততীও সে প্রসঙ্গ একেবারে
ছেড়ে দিয়ে বলে—তুমি আর দেরী কোরাে না, নাইতে যাও,
আমি টাকাগুলাে তুলে
রেখে আসি।
ব্রততী সেখান থেকে চলে গেলো। স্ত্রীর দৃষ্টি থেকে
অব্যাহতি পেয়ে পলাশ যেন আরাম অনুভব ককূলে। কিন্তু
সঙ্গে সঙ্গে সে লজ্জা ও দুঃখও অনুভব করলে—হায় ! এ কী
হচ্ছে ? যে ব্রততী ছিলাে তার নয়নের আনন্দ, আজ তাকে
নয়নের অন্তরাল করতে পেরে সে আরাম অনুভব করছে?
বাগে উল্কা ! কাল তার কাছে গিয়ে তার সঙ্গে সব সম্পর্ক
চুকিয়ে দিয়ে আবাে।
ব্যথিত হৃদয় নিয়ে পলাশ স্নানাহার করতে গেলো।
পলাশ সমস্ত বিকাল বেলা ও রাত্রির যতক্ষণ জেগে ছিলো
ততক্ষণ ক্রমাগত ভেবে ভেবে এই সঙ্কল্প স্থির করছিলো যে সে
কাল থেকে আর উল্কাকে দেখতে যাবে না; তাদের চিঠি লিখে
জানিয়ে দেবে সে উল্কার চিকিৎসার ভার নিতে পারবে না।

মন না মতি
সে নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাচ্ছে, ব্রততীর কাছে বিশ্বাসঘাতক
হচ্ছে-না, ব্রততীর বিশ্বাস থাকূলে তাে তার বিশ্বাসকে সে হত্যা
করূবে ?—ব্রততী তার উপর বিশ্বাস হারিয়ে বসে আছে।
এত ক্ষতি স্বীকার করছে সে কি লাভের লােভে ? শুধু মরীচিকার
মায়ায় ভুলে সে নিজের আরামের আশ্রয় ভেঙে ফেলে মরু-
ভূমিতে ছুটে বেরুবার উপক্রম করেছে। এই ভ্রান্তির অবসান
কতে হবে।
কিন্তু সকাল হতেই পলাশের মনটা উল্কার বাড়ীতে যাবার
জন্যে উৎসুক হয়ে উঠলাে। বাইরে বেরুবার সময় যতই নিকট
হয়ে আসতে লাগলাে ঔৎসুক্য, তাকে ততই উতলা করে
তুলতে লাগলো। সে যাবে না সঙ্কল্প কখেছিলাে বলেই খাবার
আগ্রহ তার আজ অন্য দিনের চেয়ে বেশী প্রবল হয়ে উঠলো।
অবশেষে যখন সে রােগী দেখতে বেরুলো তখন স্থির করলে
যে আজ এই শেষ উল্কার বাড়ীতে তার যাওয়া—সে গিয়ে নিজে
বিদায় নিয়ে আসবে, চিঠি লিখে বিদায় নেওয়াটা ভদ্রতাসঙ্গত
হবে না।
উল্কার বাড়ীতে আজ আর যাবে না সঙ্কল্প করেছিলাে বলেই
এবং উল্কার সঙ্গে আজই তার শেষ সাক্ষাৎ স্থির করাতেই
পলাশ আজ অন্য দিনের চেয়ে সকাল-সকাল উল্কার বাড়ীতে
গিয়ে উপস্থিত হলো। উল্কার সামনে যেতেই উল্কার রূপ আজ
অন্য দিনের চেয়ে পলাশের চোখে সুন্দরতর হয়ে প্রতিভাত
হলাে। উল্কাকে আর কাল থেকে দেখতে পাবে না মনে হওয়া

৩৪
মন না মতি
মাত্রই উল্কা পলাশের দৃষ্টিতে অপরূপ হয়ে উঠলো। আজ উল্কার
হাসি পলাশের কাছে তার সঙ্কল্পের মরণ ফঁাশির ন্যায় মনে হতে
লাগলাে, উল্কার গ্রবাভঙ্গী পলাশের প্রতিজ্ঞার গ্রীবা ভঙ্গ করে
একেবারে বধ করতে উদ্যত হলাে। পলাশ অবাক হয়ে উষ্কার
দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইলাে—ঘরের ভিতরে প্রবেশ
করতে হবে সে-কথা সে ভুলেই গেলাে।
পলাশকে স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে একদৃষ্টে তাকে দেখতে দেখে
উল্কা হাসিভরা মুখে পলাশকে গ্রীবাভঙ্গীর ইঙ্গিত করে’ ডালে
ঘরে আসুন, ডাক্তারবাবু।
উল্কার কণ্ঠস্বর মধুধারার মতন, শরবতের ঝরনার মতন
পলাশের কানের ভিতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে তাকে উচ্চকিত
করে তুলে। সে অবশের মতন ঘরে গিয়ে ঢুকলাে।
পলাশ প্রত্যহ এসে উল্কাকে প্রশ্ন করে--আজ কেমন
আছেন? কিন্তু আজ সে ঐ প্রশ্ন করতে পারলে না ; কারণ,
আজ সে নিজেই ভালো বােধ কছিলাে না।
পলাশ তার নিত্যকার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি থেকে আজ প্রতি-
নিবৃত্তি রইলো দেখে উল্কা নিজেই বলে—কাল দুপুর রাত্তিরে
বুকটা বড়ো ধড়ফড় করেছিলাে......
পলাশ স্তম্ভিতের মতন উল্কার মুখের দিকে চেয়ে বসে
রইলাে। তাকে নীরব দেখে উল্কা বলতে লাগলাে--একবার
মনে হলাে আপনাকে টেলিফোনে ডাকি ; কিন্তু আবার মনে
করুলাম আপনার ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করবাে•••••

মন না মতি
পলাশ কলের পুতুলের মতন কেবল বলে—কাল অনেক
রাত পর্যন্ত আমি জেগেই ছিলাম।
এই কথা বলে ফেলেই পলাশের মনে হলাে উল্কা যদি তার
জেগে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করে বসে তা হলে সে কি বলবে ?
তাই সে উল্কাকে কোনাে কথা বল্বার অবকাশ না দিয়ে নিজের
কথার পিঠেই তাড়াতাড়ি বলে—তা হলে বুকটা একবার......
উল্ক। মাথা নীচু করে’ বক্ষাবরণ অপসারণ করতে প্রবৃত্ত
হলাে। পলাশের মুখ লাল ও কান গরম হয়ে উঠলো।
উল্কা লজ্জাকুণ্ঠিত দৃষ্টি ঈষৎ তুলে পলাশের দিকে তাকিয়ে
তাকে জানাতে চাইলে যে সে ডাক্তারের পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত
হয়েছে।
পলাশের মনে হলো আজ তে এই তার শেষ পরীক্ষা ; তবে
কেনাে আর অনাবশ্যক প্রলােভনের জালায় ইন্ধন জোগায় ?
কে আর উল্কার চিকিৎসার ভার বহন করতে পারবে না কবুল
জবাব দিয়ে এখনই নিতি নিলেই তাে হয়।
পলাশকে ইতস্ততঃ করতে দেখে উল্কা আবার লজ্জাভর
কুষ্ঠিত দৃষ্টি তুলে পলাশের মুখের দিকে তাকালাে।
সেই দৃষ্টিতে থতােমতাে খেয়ে পলাশ উল্কাকে পরীক্ষা করতে
প্রবৃত্ত হলো, কিন্তু তার মন এমন বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিলাে যে সে যে
কি পরীক্ষা করছে তার কোনাে জ্ঞানই তার ছিলো না।
পলাশ কিছুক্ষণ উল্কার বুকের
উপর ষ্টেথেস্কোপ সঞ্চারণ করে’
গম্ভীর থমথমে হয়ে চেয়ারের উপর বসে পড়লাে।

মন না মতি
উল্কা ডাক্তারের মুখের ভাব দেখে ম্লান মুখে হেসে মধুর স্বয়ে
জিজ্ঞাসা করলে-হার্টের অবস্থা কি খুবই খারাপ ?
পলাশ প্রশ্ন শুনে চম্‌কে উঠে উল্কার দিকে তাকালো।
উবা নিজের কথার জের টেনে বলে—তা হলে আমার
জীবনের মেয়াদ আর কতােক্ষণ ?
এই প্রশ্ন শুনে পলাশের চমক ভাঙলল, সে তাড়াতাড়ি বলে
উঠলাে—না, না, আপনার হার্ট তাে বেশ ভালেই আছে, আপনি
কোনাে আশঙ্কা করবেন না।
উল্কা অবিশ্বাসের ঈষৎ হাসি হেসে বলে-তৰে আপনার
মুখ অমন গম্ভীর শুক্নাে হয়ে গেলাে কেনো?
এই প্রশ্ন শুনে পলাশের মুখ আরো শুকিয়ে উঠলাে। তার
মনে হলাে সে কি এই অবসরে তার বিদায়ের কথাটা বলে
ফেবে? কিন্তু সে বিদায় চাইলে উল্কা যদি কারণ জিজ্ঞাস
করে তখন সে কী বলবে? না, উল্কার কাছে মুখে বিদায় নেওয়া
হবে না, চিঠি লিখেই বিদায় নিতে হবে।
এই সঙ্কল্প স্থির করে নিতে পলাশের যেটুকু বিলম্ব হলে।
তারই মধ্যে উল্কা আবার বলে--যে লােক মরণকে বুকের
মধ্যে নিয়ে আনন্দে আছে, তার কাছ থেকে মরণের খবর
লুকোবার চেষ্টা করবার কোনাে দকার নেই ডাক্তারবাবু।
উল্কার এই কথা শুনে পলাশ হঠাৎ অন্যমনস্ক ভাবে বলে ফেলে
-আপনার মরণের আশঙ্কা যেদিন মনে উদয় হবে তার পরদিন
থেকে আমি আর আপনার বাড়ীতে আসতে পারবাে না জাবেন।

মন না মতি এই কথা বলেই পলাশ আবার চমকে উঠলাে—এ সে কী বলে ফেললে ? সে যে অসতর্ক হয়ে উল্কার কাছ থেকে বিদায় নেবার পথ একেবারে রুদ্ধ করে ফেলে। এই কথার পর সে উল্কার কাছে বিদায় চাইলেই উল্কা নিশ্চয় ভাববে তার জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে বলেই ডাক্তার বিদায় নিচ্ছে। এই কথা মনে হতেই পলাশের মন হর্ষবিষাদে পূর্ণ হয়ে উঠলাে—সে যে উল্কার কাছ থেকে পলায়ন করবে সঙ্কল্প করেছিলো সেই সঙ্কল্প সে আর কখনাে কার্যে পরিণত করতে পারবে না। এতে তার একটু ক্ষোভ হলেও তার আনন্দ হলো বিলক্ষণ উল্কার সঙ্গে বিচ্ছেদে ছেদ বেড়ে গেলো তার নিজের চেষ্ঠায় নয়, দৈব গতিকে ; এখন সে ব্রততীর কাছে ও নিজের কাছে স্বচ্ছন্দে জবাবদিহী কতে পারবে। উল্কা পলাশের কথায় মমতার আবেগের আভাস পেয়ে চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই দেখলে পলাশের মুখে গাম্ভীর্যের উপর আনন্দের উজ্জ্বলতা পড়েছে, হর্ষবিষাদের মিশ্র ভাবে তার মুখ সুন্দর হয়ে উঠেছে। পলাশের মুখের দিকে চেয়ে উল্কার মুখ কিসের জন্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। পলাশও ঐ কথা বলে ফেলে উল্কার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মুখে লজ্জার লালিমা দেখে লজ্জিত হলো এবং তার সামনে থেকে পালাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালাে। পলাশকে গমনােত দেখে উল্কা হেসে বলে—তা হলে কালকে আবার আসবেন তাে? না, আজকেই এই শেষ দেখা, "আর আমারও জীবনের আসন্ন পরিসমাপ্তি ?

মন না মতি
পলাশ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলাে-না না, এখনই সমাপ্তি হলে
চলবে কেননা? আমাকে এখনাে অনেক দিন আসতে হবে।
উল্কা হাসিমুখে বলে—কিন্তু আপনি কি কেবল দাতা হয়েই
আসবেন, আমার কাছ থেকে কিছুই প্রতিগ্রহ করবেন না?
কাল আপনি বেতন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পলাশ লজ্জিত অথচ প্রফুল্ল হয়ে বলে—বিশেষ প্রতিগ্রহ
কবুববা বলেই তাে সামান্যকে প্রত্যাখ্যান করেছি-রাণীর কাছ
থেকে রাণীর মতন পুরস্কার চাই।
এই কথা বলে’ই পলাশের এবং শুনেই উল্কারও এক সঙ্গেই
মনে পড়লো—“আমি তব মালঞ্চের হবে মালাকর !”
উল্কা হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে' বলে—কি পুরস্কার চাই
বলুন।
পলাশ উল্লাসিত স্বরে বললে--বল্বব; যখন পাবার আশা
হবে তখন চাইবো।
উল্কা চোখের কোণ দিয়ে পলাশকে একবার দেখে নিয়ে মুখ
নীচু করে কৌতুকভরা মৃদুস্বরে বললে-দশরথের কাছে
কৈকেয়ীর বর চাওয়ার মতন হবে না তাে শেষকালে ?
ব্রততীর বিদ্রুপের কথা পলাশের মনে পড়ে গেলাে, সে
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে—তা হতে পারে।
হয় বর দিতে
প্রতিশ্রুতি দিন, নয় তো আপনার ভৃত্যকে আজ থেকেই বিদায়
.
দিন।
উল্কা চকিত দৃষ্টি তুলে পলাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে

মন না মতি
-না, না, বিদায় না, বরই দেবো-আপনার যখন খুশী পুরস্কার
চেয়ে নেবেন, কেবল আপনার প্রার্থনা যেনাে আমার দেবার
ক্ষমতার সাধ্যায়ত্ত হয়।
পলাশ উদ্ধার কথার গুঢ়ার্থের দিকে মনােযােগ না করে
আপনার আনন্দেই আত্মহারা হয়ে বলে—রাণীর সাধ্যের তে
সীমা নেই। তাই আমার আশারও সীমা নেই।
এই কথা বলেই পলাশ উল্কার দিকে চেয়ে দেখলে উল্ক।
মুখ নীচু করে বসেছে, তার মুখের যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেটুকু
লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। উল্কাকে লজ্জিত দেখে পলাশও লজ্জা
পেলে এবং তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো।
যখন পলাশ-ডাক্তার গিয়ে গাড়ীতে উঠলাে তখন তার মুখ বেশ
হাwিহাসি।
ম্যানেজার-বাবু পলাশের সেই প্রফুল্লতা দেখে মনে করলে
ধূর্ত ডাক্তারটা বেশ থােক রকম কিছু পুরস্কার বাগিয়ে গেলাে!
পলাশের মন সেদিন আনন্দে এমন আত্মহারা হয়ে পড়েছিলো
যে সে কোনাে রােগীকেই মনােযােগ দিয়ে দেখতে পারলে না।
সে দায় সারা রকমে কাজ শেষ কোরে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে
গেলাে।
=

পলাশ বাড়ী গিয়ে খেতে বসে কিছুক্ষণ নীরবে খাওয়ার পর
হঠাৎ মুখ তুলে ব্রততীতে বলে—আজ আমি উল্কার বাড়ী
থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আসবাে ঠিক করে গিয়েছিলাম...
উল্কার কাছ থেকে পলাশের শেষ বিদায়ের কথা শুনে ও
পরক্ষণেই “গিয়েছিলাম” ক্রিয়ায় অতীত কালের প্রয়ােগ দেখে
ব্রততীর মন আশায় ও হতাশার আশঙ্কায় পূর্ণ হয়ে উঠলাে, সে
ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞাসা করুলৈ—কেনাে, কি হলাে?
পলাশ অপরাধীর তিরস্কার পূর্ণ দৃষ্টি তুলে স্ত্রীর মুখের দিকে
চেয়ে বলে--আমার মন উল্কার দিকে ক্রমশঃই আকৃষ্ট হচ্ছে-
এর জন্যে তুমিই দায়ী—যে ভাব আমার মনের অগােচরে ছিলো,
সেই ভাবের উল্লেখ করে’ করে তুমি আমার মনকে সেই ভাবে
ভাবিত করে তুলেছো; আমার মনের উপর তােমার মন গড়া
ভাব আরােপ করে করে আমার মনে ছাপ মেরে দিয়েছে।
আমি এই দুর্দৈব থেকে অব্যাহতি পাবার চেষ্টা করছিলাম•••
ব্রততী মনে মনে অনুতপ্ত ও শঙ্কিত হয়েও মুথে অগ্রাহের
প্রফুল্লতা দেখিয়ে ঈষৎ হেসে জিজ্ঞাসা করলে—তারপর?
পলাশ বলে—কাল রাত্রে উল্কার খুব বেশী অসুখ করে-
ছিলাে। আজ আমি তার কাছ থেকে বিদায় নেবাে স্থির করে’

মন না মতি
গিয়েছিলাম। কেমন করে এই বিদায় নেবার কথাটা তার
কাছে পাড়বো ভাবছি দেখে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন---
“তা হলে আমার বুঝি আর বাঁচবার আশা নেই ডাক্তারবাবু ?
এই কথার পর আমি বলে ফেল্লাম—“আপনার বাঁচবার আশা
নেই যেদিন মনে হবে, তার পরদিন থেকে আর আমি আসবো
না জানবেন।” এই কথা বলে ফেলে আর আমি তার কাছে
বিদায়ের কথা উত্থাপন করতে পারলাম না—বিদায় চাইলেই
তিনি মনে করতেন তার মরণ আসন্ন, আর নয় তাে আমার
বিদায় নেবার প্রকৃত কারণ তাঁকে খুলে বলতে হতো। এই
উভয়-সঙ্কটে পড়ে আমি বিদায় না নিয়েই চলে এসেছি।
ব্রততী উৎসুক হয়ে স্বামীর সমস্ত কথা শুনে মনের উদ্বেগের
উপর মুখের হাসি চাপা দিয়ে বলে-বেশ করেছে।
তােমার আর অন্য উপায় ছিলাে না। তারপর একটু হাসি
ঠোঁটের কোণে বাঁকিয়ে তুলে বলে-কিন্তু উদ্ধার মরণের
আশঙ্কা থাকলে তার পরদিন থেকে তুমি আর তার বাড়ীতে
যেতে পারবে না এই কথা বলে ফেলাতে তােমার খুব সুবিধাই
হয়ে গেছে—এক ঢিলে দুই পাখী মরেছে—উল্কার কাছ থেকে
বিদায় নেবার পথটি দিব্যি অনায়াসে বন্ধ হয়ে গেলাে আর
উল্কাকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দেওয়াও হলাে যে-ওগাে সুন্দরী, আমি
তােমার রূপ বহ্নির পতঙ্গ।
পলাশ পত্নীর মুখের হাসি দেখে মনে মনে সঙ্কুচিত হয়েও
যেনাে নির্দোষীর উপর অন্যায় দোষারােপ করা হয়েছে এমনি
}== ।

৪২
মন না মতি
ভাব ধারণ করে বলে-তুমিই আমাকে এমন অবস্থায় এনে
ফেলে এখন রঙ্গ দেখ ছো! এর পর যদি আমি উল্কাকে ঐ
কথা ইঙ্গিতের খােলস খুলে স্পষ্ট করে বলি•••
ব্রততী হেসে বলে-ইঙ্গিতকে উলঙ্গ করে ফেললে তাকে
কুৎসিত করে তুলবে, সব কবিত্ব একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে।
পত্নীর এই কথার পর পলাশ আর কোনাে কথা বার
উপায় খুঁজে পেলে না , গম্ভীর হয়ে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ
করে উঠে পড়লাে।

সেইদিন রাত্রে পলাশ ব্রততীর পাশে শুয়ে আছে—তার
দেহই ব্রততীর পাশে পড়ে আছে, কিন্তু তার মন ঘুরছে উল্কার
পাশে। পাছে ব্রততীর সঙ্গে কথা বলতে হয় এই ভয়ে পলাশ
একখানা বই খুলে চেখের সামনে ধরে রেখেছিলাে, কিন্তু চোখের
পিছনে তার মন না থাকাতে তার দৃষ্টিতে লেখার অর্থ ধর।
পড় ছিলাে না।
ব্রততী স্বামীর পাশে আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে থাকতে অস্বস্তি অনুভব
করছিলাে। সে খানিকক্ষণ চুপ করে শুয়ে একটু নড়লো;
কিন্তু তাতেও স্বামীর কোনাে সাড়া না পেয়ে সে একটু চেষ্টা
করে মুখে কথা ফুটিয়ে বলে—রাত যে অনেক হলাে, তুমি
ঘুমােবে কখন ?
পলাশ বই থেকে চোখ না ফিরিয়েই বলে—এই বই খান
নতুন বেরিয়েছে, ডাক্তারির অনেক নতুন তত্ত্ব এর ভিতরে আছে,
সেইগুলি চটপট পড়ে নিতে না পারলে অন্য ডাক্তারদের চেয়ে
আমি পিছে পড়বাে••••••
এই কথার পর ব্রততী স্বামীকে আর কিছু বলতে পারলে
; সে চুপ করে আবার আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে রইলো।
ব্রততীকে চুপ করে থাকতে দেখে পলাশ বলে-তােমার

৪৪
মন না মতি
চোখে আলো লাগছে ? আমি না হয় আলোটা নিবিয়ে দিয়ে
আমার পড়বার ঘরে গিয়ে পড়ি...
ব্রততী স্বামীর পাশে শুয়েও স্বামীকে কাছে পায় নি ; এখন
পলাশের অন্য ঘরে চলে যাবার প্রস্তাব শুনে সে আরও শঙ্কিত
হয়ে তাড়াতাড়ি বলে—না না, আলােতে আমার কিছুমাত্র
ঘুমের ব্যাঘাত হবে না, ঘুমতাে আমার এসেছে, এখনি আমি
ঘুমিয়ে পড়বে।•••...
পলাশ আর কিছু না বলে বইয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে
রইলো। ব্রততীও ঘুমিয়ে পড়ার ভাণ করে’ আড়ষ্ট হয়ে পড়ে
রইলো, কিন্তু ঘুম তার ত্রিসীমানাতেও এলো না।
ঘর নিঃশব্দ। ব্রততী স্বামীর পাঠে মনােযােগ ভঙ্গের ভয়ে
সাহস করে স্বচ্ছন্দে নিশ্বাস ফেলতেও পারছিলাে না; তার
কিন্তু বিশেষ সন্দেহ হচ্ছিলাে যে তার স্বামী হয়তো বইখানা
ঠিক পড়ছে না, বইখানা কেবল তার আর তার স্বামীর মাঝখানে
প্রাচীর হয়ে দাড়িয়ে আছে ! এর আগে হলে সে একটান
মেরে বইখানা দূরে ফেলে দিত; কিন্তু এখন সে অনুভব
কচ্ছিলো স্বামীর উপর জোর খাটাবার অধিকার সে হারিয়েছে।
অনেকক্ষণ অতিবাহিত হয়ে গেলাে। ব্রততীর চোখ
ঘুমের আবেশে এক একবার বুজে আসছে, কিন্তু স্বামীর পাঠ
সমাপ্ত হলে হয়তাে সে স্বামীর সান্নিধ্য লাভ করতে পাবে
এই আশায় চোখের ঘুম জোর করে সরিয়ে দিচ্ছিলাে।
নিস্তব্ধ নিদ্রিত বাড়ী। হঠাৎ সমস্ত বাড়ীকে উচ্চকিত করে
;

মন না মতি
নীচের তলায় টেলিফোনের ঘণ্টা কর্কশ স্বরে কড়ড়ড, কবে
বেজে উঠলো।
ঘণ্টার শব্দ শুনেই পলাশ ব্যস্ত চঞ্চল হয়ে বই
মুড়ে’
বিছানার
উপর বইখানা ফেলে দিলে এবং বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে
বাক্যে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করে, বলে—আঃ
এতাে রাত্রে টেলিফোনে আবার কে ডাকে ?
যদিও পলাশ মুখে বিরক্তি প্রকাশ করলে তথাপি এই অসাময়িক
আহ্বানে তার মন এই আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাে যে হয় তো
বা উল্কার বাড়ী থেকেই এই ডাক এসেছে। টেলিফোনের ঘণ্টার
শব্দ শুনে ব্রততীর মনেও এই আশঙ্কাই ছাৎ করে’ উঠেছিলো,
কাজেই সে তার স্বামীর কথার উত্তরে একটা কথাও বলতে পারলে
না সে জোরে চোখ বুজে এক মনে প্রার্থনা করতে লাগলো—
হে ভগবান্, আমার সন্দেহ যেনাে মিথ্যা হয়। দিন তো আমি
হারিয়েছি, এখন আমার রাতটুকুও কেড়ে নিয়ে না ।
পলাশ ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে গেলো। ব্রততী
স্বামীর প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষায় যেমন শুয়েছিলাে তেমনি আড়ষ্ট
হয়ে শুয়ে থেকে মুহুর্ত গননা করতে লাগলাে।
পলাশ টেলিফোন ধরে’ জিজ্ঞাসা করলে—কে?
পলাশ শুনলে উল্কার ম্যানেজার তাকে শীঘ্র উল্কার বাড়ীতে
যেতে ডাকছেন, উল্কার অসুখ বেড়েছে।
পলাশের মন আনন্দে নৃত্য করে উঠলো; সে আনন্দাপ্লুত
স্বরে বলে—এখনি যাচ্ছি।

মন না মতি পলাশ শয়নকক্ষে ফিরে এসে’ ব্রততীকে কোনাে রকম সম্বােধন না করে বলে-রাণীর বাড়ী থেকে ডাকছে ; রাণীর অসুখ বেড়েছে, আমাকে এখনি যেতে হবে••• ব্রততী যা আশঙ্কা করেছিলাে তাই সত্য হলো দেখে সে আর কোনাে কথা বল্‌তে পারলে না। পলাশ ব্রততীকে নিদ্রিত মনে করে সন্তুষ্ট হয়ে উৎফুল্ল চিত্তে ষ্টেথেস্কোপ পকেটে খুঁজে নিয়ে রাণী উল্কার গৃহে য'ত্রা করবার জন্যে আবার নীচে নেমে গেলাে। নিজের শােফারকে ঘুম থেকে জাগিয়ে মােট ঠিক করে নিয়ে যেতে বিলম্ব হয়ে যাবে বলে পলাশ হেঁটেই বাড়ী থেকে রওনা হলাে, মনে করলে যে রাস্তা থেকে একটা ট্যাব্লি বা গাড়ী ভাড়া করে নেবে। উল্কার বাড়ীতে গিয়ে নাতেই উল্কার ম্যানেজার তাড়াতাড়ি এসে পলাশকে বলে—রাণীমা অত্যন্ত অস্বস্থি বােধ করছেন, তাই আপনাকে অসময়ে ঘুম ভাঙিয়ে কষ্ট দিলাম, কিছু মনে করবেন না। পলাশ ব্যস্ত ভাবে বাড়ীর মধ্যে যেতে যেতে বলেন, আমি জেগেই ছিলাম। রাণীর অসুখের কাছে কি আমার আরামের একটু ব্যাঘাত বড় হতে পারে। পলাশ রােজ উদ্ধার বাড়ীতে আসে ; এ বাড়ীর পথ তার পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো; সে বরাবর উপরে গিয়ে উল্কার বৈঠকখানায় গিয়ে প্রবেশ করলে। দেখলে বিজলী-ঝাড়ের- মন না মতি ৪৭ প্লাবনে ঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে ঘর শূন্য, সেখানে কেউ নেই। পলাশ ঘরে ঢুকে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, কোথায় উল্ক। জাবার ঔৎসুক্যে একজন চাকর-দাসী কাউকে খুজছে, এমন সময় একজন ধবধবে ধােয়া কাপড়ে আবৃতদেহ দাসী এসে সন্ত্রম- সঙ্কুচিত স্বরে বললে--রাণীমা শােবার ঘরে আছেন••• পলাশের মনটা ছ্যাৎ করে উঠলো—আজ সে প্রথম উল্কার শন-কক্ষে প্রবেশ করূতে যাচ্ছে। সে চঞ্চল মনে ও চঞ্চল পদে দাসীর অনুসরণ করে বারান্দা দিয়ে দু-তিনখানি ঘরের পরে একখানি ঘরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাে। দাসী সেই ঘরের দরজার কাছে থেমে দরজায় বিলম্বিত চওড়া হাসিয়া পাড় দেওয়া আবীর রঙের শালের একটা পর্দা সরিয়ে টেনে ধরে এক পাশে সরে দাড়ালো ; পলাশ সেই ইঙ্গিতে বুঝলে এইটি উল্কার শয়ন- কক্ষ। ঘরের ভিতর থেকে স্নিগ্ধ আলােক জ্যোৎস্নার মতন এসে পলাশের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লাে। পলাশ সন্তর্পণে পা টিপে টিপে পায়ের শব্দ না করবার চেষ্টা করতে করতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে। সে ঘরে গিয়ে দাড়াতেই দাসী দরজার পর্দা ফেলে দিয়ে ঘরের এক পাশে গিয়ে দাড়ালাে। পলাশ দেখলে সুপরিসর ঘরের ঠিক মাঝখানে বিচিত্র কারুকার্যখচিত প্রকাণ্ড পালঙ্ক পাতা; তার উপরে ছাদ থেকে লম্বিত লােহার শিকে বিধৃত কাঠের ছত্ৰীতে ফিকে গােলাপী রঙের নেটের মশারি ভােলা আছে ; পালঙ্কের পায়ের দিকে ;

৪৮ মন না মতি ; একটি কাঠের আল্লার উপর কয়েকখানি সূক্ষ্ম সূতার সাদা কাপড়, শেমিজ, ব্লাউজ ও একখানি শাল সুবিন্যস্ত ভাবে রক্ষিত আছে; সেই আলার তলার তক্তার উপর সাদা চামড়ার জুতা নাগরা চটি সজ্জিত আছে; আর দু পাশের খাড়া দাণ্ডার গায়ে আঁটা চক্চকে পিতলের হুক থেকে ঝুলছে একটি ফুলকাটা মেয়েলি ছাতা আর হাত ব্যাগ ; আল্লার পাশে দাড়িয়ে আছে একটা বড়ো আমারী, তার এক পালা কপাটে প্রচুর বাটালির কারুকার্য ও এক পাল্লা কপাটে মােটা কাঁচের আয়না আঁটা, তাতে সমস্ত ঘরের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে ; পালঙ্কের সামনে একখানি মার্বেল পাথরের টেবিল, তার চার পাশ ঢেউ-খেলানে ও ফুলকাটা; সেই টেবিলের উপর লেখবার সরঞ্জাম ব্লটিং-প্যাড, একটি পেন-র্যাকে নানান রকমের সােনার বেড় ও ক্লিপ দেওয়া কাউন্টেন-পেন চারটি, একটা কাঠের কেসের মধ্যে কাগজ খাম, একখানা সােনার কাগজ-কাটা ছুরী, আঠার শিশি, ডাক-টিকিটের আঠা ভেজাবার একটা কাচের ঘূর্ণী বেলন দেওয়া জলের বাটি, ইত্যাদি বহু টুকিটাকি দ্রব্য সাজানো আছে ; পালঙ্কের মাথার দিকে একটা মার্বেল পাথরের গােল ছােটো টেবিলের উপর একটি বিদ্যুতের টেবিল-ল্যাম্প, সবুজ রেশমের ঘােষ্টার তলা থেকে স্নিগ্ধ আলােক বিকীর্ণ করছে। পলাশ ঘরে ঢুকেই একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে গৃহসজ্জা দেখে নিয়েই তার আগ্রহান্বিত উৎসুক দৃষ্টি পালঙ্কের দিকে ফিরিয়ে উল্কার সন্ধান করতে লাগলাে। শুভ্র শয্যার উপর একখানি

মন না মতি
৪
শুভ্র গঙ্গাজলী শাল গায়ে দিয়ে উল্কা শুয়ে আছে ; বিদ্যুতা-
লােকের সবুজ ঘােষ্টার ছায়াটা এসে তার মুখের উপর ফিরােজা
রঙের ফিফিনে পাতলা ওড়নার অচ্ছািদনের মতন পড়েছে।
উল্কা ঘুমিয়ে আছে বা জেগে আছে ঠিক বুঝতে না পেরে পলাশ
পালঙ্কের কাছে এগিয়ে যাবে কি না ভেবে ইতস্ততঃ করছে, এমন
সময় উল্কা স্নিগ্ধ মধুর মৃদু হেসে ক্ষীণ মিষ্ট স্বরে ডাকলে—আসুন
ডাক্তার বাবু, আপনাকে অসময়ে কষ্ট দিলাম।
পলাশ উল্কাকে জাগ্রত জেনে দুই হাত জোড় করে কপালে
ঠেকিয়ে নমস্কার জানিয়ে বলে- আপনার কষ্ট একটুও উপশম
করতে পারলে আমার কষ্টই আমার পুরস্কার হয়ে উঠবে।
পলাশ পালঙ্কের কাছে অগ্রসর হয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে
আপনার কি অসুখ বােধ হচ্ছে ?
দাসী একখানা চেয়ার এনে পালঙ্কের পাশে রাখলে ।
পলাশ তার উপর বলল।
উল্কা বলে—হঠাৎ বুক ধড়ফড় করাতে ঘুম ভেঙে গেলাে ।
আমি মনে করলাম একটু পরেই সেরে যাবে বুঝি ; কিন্তু শেষে
এমন যন্ত্রণা হতে লাগলাে যে কতক্ষণ পরে আমি মুচ্ছায় আচ্ছন্ন
হয়ে পড়ি। তখন ঐ ছােটো ট্যাবলেট ওষুধটা আমাকে খাইয়ে
দেওয়াতে অল্পক্ষণ পরেই আমার জ্ঞান হয় ; এখন আর কোনো
বিশেষ কষ্ট নেই; কেবল বড় দুৰ্বল বােধ হচ্ছে।
পলাশ উল্কার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে—একবার হাতটা
দেখি।
৪

মন না মতি
উল্কা শালের তলা থেকে হাতীর দাতের মতন শুভ্র সুগােল
হাত বাহির করে পলাশের দিকে এগিয়ে দিলে। পলাশ এক
হাতে উল্কার কোমল মণিবন্ধ টিপে ধরে আর এক হাতে পকেট
থেকে সােনার ঘড়ী বাহির করে ঘড়ীর সেকেণ্ড-কাটার চলার
সঙ্গে উল্কার নাড়ীর চল মিলিয়ে দেখতে লাগলো। মিনিট দুই
হাত ধরে নাড়ী দেখে পলাশ ধীরে ধীরে উল্কার হাতখানি শয্যার
উপর সন্তর্পণে রেখে দিলে। তার পর সে পকেট থেকে
ষ্টেথেস্কোপ বাহির করে’ কানে পরাতে লাগলাে। উল্কা এই
ইঙ্গিতের সঙ্কেত বুঝে গায়ের শাল সরিয়ে বক্ষতট অনাবৃত করে’
দিলে। শুভ্র তুষারক্ষেত্রের ন্যায় উল্কার বক্ষতটের উপর পলাশের
লােভলােলুপ দৃষ্টি ও মুখ অবনত হয়ে পড়লাে, সে উল্কার বক্ষ
পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হলাে।
পলাশ অনেকক্ষণ ধরে তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করলে।
তার পর সােজা হয়ে দাড়িয়ে কান থেকে স্টেথেস্কোপ খুলে পকেটে
রাখতে রাখতে বলে—এখন তাে নাড়ী আর হার্টের অবস্থা
বেশ ভালাে।
উল্কা হাসির মধু কথায় মাখিয়ে বলে—তা হলে ডাক্তারের
ভয়ে রােগ পালিয়েছে।
উল্কার এই রসিকতার উত্তরে পলাশের মনে হলাে তা হলে
ডাক্তারকে প্রণয়-পাশে বেঁধে পাশে রেখে দিন না, রােগ আর
কাছে ঘেঁসতে পারবে না।
কিন্তু এই কথা পলাশের কায়মনবাক্য বলতে চাইলে বলেই

মন না মতি
সে আর ঠাট্টাচ্ছলেও একথা উচ্চারণ করতে পালে না, সে মুখ
চোখ রাঙা করে চুপ করে রইলাে।
পলাশকে চুপ করে থাকতে দেখে উল্কাও নিজের রসিকতায়
লজ্জা পেলে এবং নিজের অবিবেচনা সংশােধন করবার জন্যে
বলে-ঐ ওষুধটাতে উপকার হয়েছে বােধ হয় ।
পলাশ বলে—তা হবে। কিন্তু যখনই তােক একটু অসুখ
বােধ হলেই আপনি আমাকে ডাকুতে দ্বিধা বােধ কবেন না।
উল্কা হেসে বলে—কিন্তু রাত-বিরেতে ভাতে ব্যাধের
প্রতি বাল্মীকির শাপের ভয় করে।
উল্কার এই রসিকতায় পলাশের রক্তে আগুন ধরে উঠলো ;
হীরকের পল থেকে যেমন বিবিধ বর্ণের আলােক বিচ্ছুরিত হয়,
তেমনি এই কথার ভিতর থেকে বিবিধ অর্থ বিকীর্ণ হয়ে তার
মন অসম্ভবের নেশায় রঙীন করে তুলে। সে নিজের মনঃ-
পীড়ার ব্যাকুলতা উল্কার কাছ থেকে লুকাবার জন্য বললে—তবে
এখন আমি যাই।
উল্কা এবার গম্ভীর হয়ে বললে—আপনি এখনি চলে যাবেন
; আপনার শােবার ব্যবস্থা ঠিক করা আছে। আমি একটু
সুস্থ বােধ করলে আপনি যাবেন।
তার পর উল্কা দাসীর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললে—নিত্য,
ডাক্তারবাবুকে শােবার-ঘর দেখিয়ে দিগে যা, আর যদুকে ডেকে
দি, সে যেনাে ডাক্তারবাবুর ঘরের সামনে এসে শােয়, রাত্রে
ওঁর যদি কিছু দরকার হয়।

মন না মতি
তার পর আবার পলাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করে উস্কা বলে
-আপনি ঝির সঙ্গে যান, রাত অনেক হয়েছে আপনি শুয়ে
পড়ুন গে••
ঝি নৃত্যকালী দরজার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে পলাশের
নির্গমনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাে। পলাশ ব্যগ্র দৃষ্টিতে
একবার উল্কাকে দেখে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
পলাশ দাসীকে অনুসরণ করে যে ঘরে গেলো সে ঘরখানি
উল্কার শয়নকক্ষের পাশে দুখানি ঘরের পরে ; সুসজ্জিত ঘরে
চক্চকে ছল্পর-খাটের উপর দুগ্ধফেননিভ শয্যা পাতা আছে।
পলাশ ঘরে ঢুকে একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়ে
দাসীকে বলে—তুমি যাও, আমার আর কোনাে দরকার নেই।
দাসী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাে, সে চলে গেলাে।"
তখন পলাশ ইলেটি ক-লাইটের সূইচ টিপে আলাে নিবিয়ে
দিলে। কিন্তু ঘর একেবারে অন্ধকার হয়ে গেলাে না; একটি
স্তিমিতশিখা ক্ষুদ্র ল্যাম্প থেকে ক্ষীণ আলাে ছড়িয়ে ঘরটিকে
আলো-আঁধারের মিশ্রণে রহস্যাবৃত করে তুলে। পলাশ শয্যার
উপর শুয়ে পড়লাে। দুখানা ঘরের পরেই উল্কা শুয়ে আছে ;
উক্কার সঙ্গে এক বাড়ীতে সে রাত্রি যাপন করছে ; পুরাকালের
কাব্য নাটকে কতো অভিসারিকার কাহিনী সে পড়েছে; কিন্তু
তার দরজার সামনে যদুকে পাহারায় শুইয়ে রাখারই বা মানে
কি ? ইত্যাদি চিন্তায় পলাশের আর সমস্ত রাত্রির মধ্যে ঘুম
এলাে না।
••

মন না মতি
ওদিকে ব্রততীর চক্ষেও ঘুম ছিলাে না। এইবার হয় তাে
স্বামী ফিরে আসবে এই প্রতিক্ষণের প্রতীক্ষায় ব্রততী ঘুমাতে
পাছিলাে না। অপেক্ষায় অপেক্ষায় যখন সকাল হয়ে গেলাে
তখন সে শয্যা ছেড়ে উঠে পড়লাে; অনিদ্রায় তার চোখ কবুক
করছিলো, নির্গম-ব্যাকুল অশ্রু চোখের আড়ালে রুদ্ধ রেখে তার
চোখ জ্বালা করছিলাে, অনির্দিষ্ট বেদনায় তার মন টন্ট
কছিলাে।
প্রভাতে পলাশ আবার একবার উল্কাকে পরীক্ষা করে দেখে
বিদায় নিয়ে বাড়ীতে ফিরে এলো। সে তাড়াতাড়ি উপরে গিয়ে
দেখলে ব্রততী স্নান সমাধা করে তার প্রভাতী জলখাবারের
আয়ােজন করছে। ব্রততীকে তার সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিধানের জন্য
সেবায় ব্রতী দেখে পলাশ লজ্জা ও সঙ্কোচ অনুভব করলে এবং
তাড়াতাড়ি বলে—উল্কা রাণীর খুব অসুখ করেছিলো, তাই
রাত্রে আর আসতে পারি নি।
ব্রততীর মন দারুণ সন্দেহে ভরে উঠলাে; পলাশের মুখ
দেখে তার মনে হলো তার স্বামী মিথ্যা বলছে। সে জোর করে
চোখের জল রুদ্ধ রেখে মুখে হাসি টেনে এনে বলে—আবার
এখনই তা হলে যেতে হবে তাে?
ব্রততীর এই কথা পলাশের মনে বিজপের কশাঘাতের মতন
বাজলাে। সে গম্ভীর হয়ে বলে—না, আজ আর যেতে হবে
।
এবং সে সেখান থেকে আস্তে আস্তে অন্যত্র চলে গেলাে।

পলাশ স্ত্রীর বিদ্রুপে লজ্জিত হয়ে বলে ফেলেছিলাে যে সেদিন আর উল্কার বাড়ী যেতে হবে না; এই কথা বলে ফেলাতে উল্কার বাড়ীতে যাওয়া তার পক্ষে বাস্তবিকই অসাধ্য হয়ে পড়লো। সে সেদিন অন্যান্য রােগীদের দেখে উল্কার বাড়ীর সামনে দিয়ে মােটর হাঁকিয়ে চলে এলো, কিন্তু সে একবার নেমে উল্কাকে দেখতে যেতে পারলে না। উল্কার বাড়ীর সামনে মােটর আসতেই সে জোরে জোরে বার দুই মােটরের ভেপু বাজিয়ে দিয়ে ছুটে বেরিয়ে চলে গেলাে, তার মনের সুপ্ত চৈতন্যের মধ্যে এই ইচ্ছা গুপ্ত হয়ে ছিলাে বােধ হয় যে উল্ক। তার মােটরের ভেঁপূর পরিচিত আওয়াজ শুনে’ উচ্চকিত হয়ে তার আগমন প্রতীক্ষা করবে। উল্কার বাড়ীর সামনে দিয়ে এলাে, অথচ সে তার বাড়ীর ভিতরে গেলােনা, এতেই তার মন একদিকে যেমন অত্যন্ত অস্বস্তি ও পীড়া অনুভব করতে লাগলাে, অপর দিকে তেমনি আবার আনন্দও অনুভব করলে যে সে উল্কার বাড়ীর সামনে দিয়ে এসেও উল্কার বাড়ী অতিক্রম করে আসতে পেরেছে। উল্কার প্রতি অত্যধিক অনুরাগে সে যে তার পত্নী ব্রততীর প্রতি অন্যায় আচরণ করে অপরাধী হচ্ছে এই চিন্তা তার মনের ভিতরে ভিতরে তাকে নিরন্তর পীড়া দিচ্ছিলাে, তাই

মন না মতি
৫
আজ সে উল্কার প্রতি বিমুখ হতে পেরে আত্মপ্রসাদ লাভ করূলে ;
সে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিয়ে ভােলাতে চাইলে যে সে
যখন ইচ্ছা করলেই উল্কার বাড়ী না যেয়ে থাকতে পারে তখন
তার ভয় বা লজ্জা পাবার কোনাে কারণই ঘটেনি; তার মনের
মধ্যে যে আতঙ্ক সঞ্চিত হয়ে উঠছে তা ব্রততীর সন্দিগ্ধ চিত্তের
কালাে ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়।
পলাশবাড়ীতে ফিরে এসেই ব্রততীর কাছে গিয়ে নিজের
চরিত্রের সাফাই সাক্ষী স্বরূপ বলে—আজকে আমি উল্কারাণীর
বাড়ীতে যাইনি
ব্রততী হাসিমুখে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে তুমি
মস্ত বাহাদুরী করে এসেছে দেখছি।
স্বামীর মুখে অপ্রতিভ হয়ে গেলাে দেখে ব্রততী তাড়াতাড়ি
আবার বলে—কিন্তু তােমার যাওয়াতে উচিত ছিলে—তুমি
তাকে রােজ দেখতে যাবে এই সৰ্ত্তেই তাে তুমি নিযুক্ত হয়েছে।
পলাশ স্ত্রীর এই কথা শুনে অনেকটা প্রসন্ন হয়ে উঠলো
এবং বলে-নাঃ, আজ আর যাবে না, এইতাে ভাের বেলা
দেখে এসেছি।
ব্রততী স্বামীর কথা শুনে মনে মনে সন্তুষ্ট হয়ে বলে--
আজ বিকাল বেলা যদি আর কোথাও থেকে ডাক না আসে
তা হলে বায়স্কোপে গেলে হয়, অনেক দিন যাওয়া হয়নি।
পলাশ বলে—বিকালে কোথাও থেকে খুব জরুরি ডাক না
এলে আজ আর কোথাও যাবােনা, বায়ােস্কোপেই যাওয়া যাবে ।

মন না মতি
;
পলাশ উল্কার কাছে যাবার প্রলােভন থেকে নিজেকে বাঁচাবার
জন্যে পত্নীর প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করলে।
সেদিন পলাশের কাছে কোনাে কঠিন রােগের জরুরি ডাক
এলাে না ; অন্য যে দু তিনট। ডাক এলো তা তেমন সত্বর দেখা
আবশ্যক নয় বলে সে সকলকেই বলে দিলে আজ আর সে
যেতে পাবে না, কাল যাবে।
বেলা যততই পড়ে আসতে লাগলাে পলাশের মন তততই
ভারাক্রান্ত ও অপ্রসন্ন হয়ে উঠতে লাগলো ; তার মনের তলায়
একটা ক্ষীণ কামনা মাঝে মাঝে উকি মারছিলো যে কোথাও
থেকে একটা খুব জরুরি ডাক এসে পড়ুক এবং সেই সূত্রে সে
ব্রততীর দখল থেকে অব্যাহতি পেয়ে একবার উল্কাকে দেখে
আসতে পারবে।
কিন্তু পলাশের মনস্কামনা পূর্ণ হলো না; এতাে বড়ো
কলকাতা সহরে এমন কোন একটা লােকের এমন কোনাে কঠিন
পীড়া হলাে না যাতে সে পলাশকে তৎক্ষণাৎ যাবার জন্যে ডেকে
পাঠাতে পারে। সে যে আজ সমস্ত দিন উল্কার বাড়ীতে যায়নি
এতে উল্কাই বা কোন্ তাকে ডেকে পাঠালাে ।
অবশেষে পাঁচটা বাজলো। পলাশ ব্রততীকে বলে—এখন
তুমি কাপড় চোপড় পরে নাও।
এতাে দিন ব্রততীর কাছে তার স্বামীর যে সােহাগ ও সঙ্গ
সহজ ও নিত্যপ্রাপ্য ছিলো, আজ সেই আদর ও সঙ্গলাভের
সম্ভাবনা তার কাছে পরম সৌভাগ্যের রূপ ধরে উপস্থিত হলে

মন না মতি
পত্নীর কাছ থেকে তৎপর ও সহজ অনুমতি পেয়ে পলাশ
পুলকিত হয়ে উঠলাে; কিন্তু মনের উল্লাস যথাসম্ভব গােপন রেখে
মুখ গম্ভীর করে টেলিফোনের মুখনলের উপরে হাত চাপা দিয়ে
বলে—ঐ পথ দিয়ে ঘুরে বায়ােস্কোপে গেলেই হবে...•••
ব্রততী
দৃঢ়ম্বরে বলে-না, তুমিই যাও, আমি আর যাবে
; তুমি রােগী দেখতে যাবে, আর আমি বাড়ীর দরজার
গােড়ায় বসে থাকবো, সে আমি পারবাে না।
পলাশ ব্যস্ত হয়ে বলে—তুমি দরজায় বসে থাকবে কেনাে?
আমার সঙ্গে বাড়ীর মধ্যে যাবে-রাণীর সঙ্গে আলাপ করে
আবে.....
ব্রততী বিরক্ত স্বরে বলে উঠলাে-“আমার দায় পড়েছে
কারো, বাড়ীতে যাবার। তুমি ডাক্তার, তােমাকে ডেকে
পাঠিয়েছে তুমি যাও; আমাকে কি কখনাে ডেকেছে যে আমি
যাবাে...
পলাশ অপ্রতিভ হয়ে বলে—তা হলে থাক, আমিও যাবো
•
ব্রততী ফিরে যেতে যেতে হেসে বলে’ গেলােনা, তুমি যাবে
কেনো ? অন্যত্র জায়গা থেকে ডাক এলেও তাে তােমাকে
যেতে হতাে•••
তারপর তার মনে হলাে—আর এ তো শুধু রােগীর ডাক
নয়, রাণীর হুকুম আর প্রাণের টান।কিন্তু এ কথা সে ব্যক্ত
করে স্বামীকে বলতে পারলে না, পাছে তার স্বামী এই কথাকে

মন না মতি
স্ত্রীর অভিমানের তিরস্কার মনে করে। ব্রততীর উল্কাকে একবার
দেখবার প্রলােভন খুব প্রবল হয়েই তার মনে বিরাজ করছে,
কিন্তু সে স্বামীর প্রস্তাবে সম্মত হয়ে উল্কার বাড়ীতে যেতে পারলে
তার আত্মসম্মান আহত হবে বলেও বটে এবং তার স্বামী ও
উল্কা যদি মনে করে যে সে তাদের দুজনকে পাহারা দিতে গেছে
ও তার অযাচিত আগমনে তাদের রসভঙ্গ ঘটলাে এই ভয়েও
বটে।
পলাশ স্ত্রীর কথাকে সহজ সম্মতি অনুমান করে টেলি-
ফোনের মুখনলের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলে-
আমি এখনি যাচ্ছি...
উল্কার উৎফুল্ল মুখের মিষ্ট কথা পলাশের কানে প্রবেশ
করলাে-আচ্ছা...
পলাশ টেলিফোনের মুখনল নামিয়ে আংটার উপর রেখে
দিতেই তার মনে হল—টেলিফোনের আলাপ যেননা একেবারে
কানের কাছে মুখ রেখে কথা বলা!
ও-মুখ মনােরম
শ্রবণে রাখি মম
দুকথা বলে যদি প্রিয় বা প্রিয়তম,
তাতে তাে কণা মধু ফুরাবে না!”
এই কথা মনে হতেই পলাশের মুখ হাসির প্রভায় প্রভাস্বর
হয়ে উঠলাে; সে প্রফুল্ল মুখে গিয়ে মােটরে উঠলাে। মােটর

মন না মতি
তার মনােরথের মতন সম্মুখের পথ পান করতে
করতে
প্রিয়তমার অভিসারে ছুটে চলল।
ব্রততী নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে নিস্ফল বেশভূষা মােচন
করতে প্রবৃত্ত হবা মাত্র তার চোখ দিয়ে হুহু করে অশ্রুধারা
গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো, সে চেষ্টা করেও তা রােধ
করতে পারলে না।
পলাশ তখন উল্কার ঘরে দ্রুতপদে প্রবেশ করে জিজ্ঞাসা
করলে--আবার কি অসুখ বােধ হচ্ছে ?
উল্কা বিচ্ছুরিত হীরক জ্যোতির মতন উজ্জ্বল স্নিগ্ধ হাসিতে
মুখ উদ্ভাসিত করে বলে-অসুখ কিছু না। একলা একলা
সন্ধ্যাবেলা ভালাে লাগছিলাে না, তাই আপনাকে ডেকে
আল্লখ, একটু গল্প করা যাবে। আপনি একেবারে রাত্রে খেয়ে
বাড়ী যাবেন।
দুরাশার সফলতার সম্ভাবনা অনুমান করে’ পলাশের চিত্ত
নৃত্য করে উঠলো।
পলাশ যখন বাড়ীতে ফিরে এলাে তখন রাত এগারােটা।
সে উপরে গিয়ে দেখলে ব্রততী তার খাবার ঠাই করে খাবার
থালা বাটি সব পিতলের ঢাকা দিয়ে ঢেকে আসনের পাশে
মাটিতে বসে একখানা বই পড়ছে। পত্নীকে এতাে রাত্রি
পর্যন্ত তার খাবার আগলে বসে থাকতে দেখে পলাশ লজ্জিত
হলাে। সে অপ্রস্তুত ভাবে পত্নীকে বলে—তুমি এতাে রাত
পর্যন্ত বসে আছাে?

মন না মতি
ব্রততী ম্লান মুখ প্রফুল্ল করে তােলবার চেষ্টা করে বলে—
তােমার খাওয়া না হলে আমি কোন্ দিন আগে শুই ?
পলাশ আবার লজ্জা পেয়ে বললে-কিন্তু আজ রাত অনেক
হয়ে গেছে, তুমি এখনাে খাও নি ?
ব্রততী আবার পলাশকেই পাল্টা প্রশ্ন কলে—তােমার
খাওয়া না হলে আমি কবে আগে খেয়েছি?
পলাশ অধিকতর কুষ্ঠিত হয়ে বলে—আমি আজ আর
খাবাে না; তুমি খেয়ে নাও।
ব্রততীর দৃষ্টিতে প্রথম মুহূর্তে বিস্ময় ও দ্বিতীয় মুহূর্তে বিষাদ
ফুটে উঠলাে; সে স্বামীর মুখের উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে
জিজ্ঞাসা করলে—তুমিকি খেয়ে এসেছো?
পলাশ পত্নীর দৃষ্টি ও প্রশ্নের আঘাতে একেবারে সঙ্কুচিত
হয়ে বললো, রাণী বলেন•••••
ব্রততী মাথা নীচু করে বই মুড়ে নিয়ে উঠতে উঠতে
বলে-আগে একটু খবর দিলে পাতে, তা হলে এই পণ্ডশ্রম
করতাম না।
পলাশ নিতান্ত কুণ্ঠার সহিত বলে—কি করে খবর দি,
আমি সেখানে যাওয়ার পর তিনি বলেন
ব্রততী বইখানাকে তাকের উপর তুলে রাখতে রাখতে
উদাস স্বরে বলে-টলিফোনে ডেকে বলে দিলেই হতো।
পলাশ একেবারে বিব্রত হয়ে আত্মরক্ষার জন্য মিথ্যা কথা
বললে—আমি তাকে দেখে চলে আতে যাচ্ছি, তিনি বলেন

মন না মতি
অনেক রাত হয়ে গেলাে, আপনি এখান থেকে খেয়ে যান,
আমি নিজের হাতে রান্না করে রেখেছি।” তখন তােমার
রান্না হয়ে গেছে, তাই আর খবর দেওয়া আবশ্যক মনে করলাম
। তিনি নিজের হাতে খাবার তৈরি করেছিলেন•••
ব্রততী কণ্ঠস্বরের বিষাদ কৌতুকের সুরে যথাসম্ভব চাপা
দিয়ে বলে—আমিও তাে তােমার খাবার নিজের হাতে তৈরী
কোরেছি।
পলাশ বলে তা তাে তুমি রােজই করাে।
ব্রততী এবার কেবল বলে—ও !
লাশ পত্নীর এই একাক্ষরের উত্তর শুনে অপ্রতিভ হয়ে
তাড়াতাড়ি বলে—রাণীর তৈরী মাছ মাংসের খাবার আমি
না খেলে ফেলা যেতে—কিন্তু এ খাবার তাে তুমি খাবে••
ব্রততী খাবারের ঢাকা তুলে সরিয়ে রেখে, খাবারের খালা
তুলতে তুলতে বল্‌লেহঁা, তা বটে!•••
ব্রততী যথাসম্ভব সহজ পদক্ষেপে ঘর থেকে বাহির হয়ে
গেলাে। রান্নাঘরে গিয়ে চাকর দাসীদের ডেকে স্বামীর জন্য
সযত্নে প্রস্তুত সমস্ত খাদ্য সামগ্রী বণ্টন করে দিয়ে হেঁসেল তুলে
ফেলে।
তার দাসী খেতে বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করলে-মা, তুমি
খাবে নি ?
ব্রততী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে-না, আমার
আজ আর খিদে নেই।

৬৪
মন না মতি
ব্রততী তখনই স্বামীর কাছে যেতে পারলে না, পাছে স্বামী
জিজ্ঞাসা করে তার খাওয়া হয়েছে কি না। সে অন্য ঘরে
অনেকক্ষণ বিলম্ব করে যখন শােবার ঘরে ফিরে এলাে তখন
দেখলে তার স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে, আর তার ঘুমন্ত মুখের উপর
আনন্দ ও লজ্জার আভা মাখানো রয়েছে। ব্রততী দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলে ধীরে ধীরে এসে স্বামীর পাশে শুলো।
শুয়ে শুয়ে ব্রততী নানা কথা ভাবতে লাগলাে। হঠাৎ তার
মনে হলো সে হয়তো অকারণে স্বামীকে সন্দেহ করে নিজেও কষ্ট
পাচ্ছে, স্বামীকেও কষ্ট দিচ্ছে। তার স্বামী এ পর্যন্ত এমন কিছু
অনাচারের পরিচয় দেয় নি যাতে সে এতােদূর কাতর হতে
পারে। ডাক্তারকে ডাক দিলে ডাক্তারকে রােগীর বাড়ী যেতেই
হয়, তা কে জানে সন্ধ্যা আর কে জানে রাত বিরাত! কোনাে
বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে রাত হলে সেখানেই খেয়ে আসতে
অনুরোধ করলে কেউ যদি খেয়ে আসে তাতেও এমন কিছু
অন্যায় করা হয় না, ভদ্রতার খাতিরে সে নিমন্ত্রণ অবশ্যই স্বীকার
এই কথা মনে হতেই ব্রততীর মন প্রসন্ন ও পরিষ্কার হয়ে
উঠলাে। সে পরম প্রীতির আকর্ষণে স্বামীর গায়ে হাত দিয়ে
পাশ ফিরে শুলো ও অল্পক্ষণের মধ্যেই শান্ত নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে ঘুমিয়ে
পড়লাে।

ব্রততী যখন সকাল-বেলায় ঘুম ভেঙে উঠলাে তখন তার
মনের সন্দেহের বােঝা একেবারে নামিয়ে ফেলে সে হাল্কা হয়ে
উঠেছে। সে হাসি মুখে স্বামীকে বলে—দেখাে, কদিন থেকে
অকারণ সন্দেহ করে আমি ভারি কষ্ট পেয়েছি। তুমি ডাক্তার,
রােগীর বাড়ী যাও, এতে কোনাে রকম মন্দ ভেবে আমি যে
বিভীষিকা সৃষ্টি করে তুলছিলাম তার কথা ভাবতে এখন আমার
হাসি পাচ্ছে।
পত্নীর কথার প্রত্যুত্তরে পলাশ কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলতে
পারলে না, সে কেবল একটু হাসলে।
কিন্তু পলাশ স্ত্রীকে নিঃসন্দিগ্ধ দেখে মনে মনে খুসী হয়ে
সেদিন থেকে নিয়মিত দুবেলাই উল্কার বাড়ীতে যেতে আরম্ভ
করলে। যে সকাল বেলা উল্কার কাছে গিয়ে বললে—আমি
মনে করছি আপনাকে দু-বেলাই এসে দেখে যাবাে•••অবশ্য
আপনার যদি কোনাে অসুবিধা না হয়......
উল্কা প্রফুল্ল মুখে বলে—এ তাে অতি উত্তম প্রস্তাব।
আমার অসুবিধা তাে হবেই না, বরং সুবিধাই হবে, আমি সমস্ত
দিন একলাটি থাকি আর কেবলই মনে হয় বুকটা বুঝি ধকধক
করছে ! কিন্তু দুবার আসতে আপনার অসুবিধা হবে না তাে?

মন না মতি
পলাশ একটু আবেগের সহিত বলে উঠলো—আমার
অসুবিধা দুবার আসতে। আমার যে হাজার বার আসতে ইচ্ছা
করে, মন পড়ে থাকে আপনার কাছে। আমি কি কেবল
কর্তব্যের টানেই আসি মনে করেন••••••
উল্কা যেনাে পলাশের ভাবােচ্ছাস কিছুই শুনতে পায়নি এমনি
ভাবে বলে--আপনি যদি এই দিকে আর কোথাও আসেন তা
হলে যখন হােক আমার এখান দিয়েও একবার করে ঘুরে যাবেন।
কথা বলতে বলতে উল্কার মুখ একটু গম্ভীর ও লাল হয়ে
উঠলাে। তাই দেখে পলাশ আর কিছু প্রগতা করতে পালে
কিন্তু সেই দিন থেকে পলাশ নিত্য দুবার উল্কা সন্দর্শনে
আসতে লাগলাে।
পলাশ কোনাে দিন বিকালে আসে, কোনাে দিন বা রাত্রি
করে আসে। সে যখনই আসে তখনই উল্কা তাকে কিছু খেয়ে
যেতে অনুরােধ করে—বিকালে এলে বৈকালী চা ও জলখাবার
এবং রাত্রে এলে রাত্রির আহার। প্রথম দিন সম্মত হবা মাত্র
উল্কা ভৃত্যকে ডেকে বলে-ডাক্তারবাবু হাত ধােবেন।
ভৃত্য ঘর থেকে বেরিয়ে চলে। পলাশও ভৃত্যের অনুসরণ
করে” বাইরে যাবে কি না ইতস্ততঃ করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে
উল্কার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করলে।
উল্কা প্রফুল্ল মুখে বলে-আপনি বসুন, জল এখানেই
আবে। আপনি ডাক্তার মানুষ কতত রােগী ঘেঁটে আসেন•••

মন না মতি
খানসামা ডাক্তারের হাত ধােবার জন্য শতকরা দশ ভাগ
কার্বলিকের সাবান ও জল ডাবর ভােয়ালে নিয়ে এসে উপস্থিত
হলাে।
রূপার সাবান-দানী থেকে সাবান নিয়ে রূপার ঘটীর জলে
রূপার ডাবরে হাত ধুতে ধুতে পলাশ হাসিমুখ উল্কার দিকে
ফিরিয়ে বললে—আপনার এখানে সবই রূপা—শুধু রূপা নয়
সুরূপা ! আমাদের মতন দরিদ্রকে প্রলুব্ধ করে তােলে।
উল্ক স্মিত হাস্য করে’ দাসীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে-
ডাক্তারবাবুর জলখাবার নিয়ে আসতে বলল।
দাসী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে না যেতে একজন খামা
চা ও জলখাবার এনে পলাশের সামনে একটা ছােটো টেবিলের
উপর রাখলে।
পলাশ প্রফুল্ল মুখে বলে-খাবার যে প্রস্তুতই ছিলো
দেখছি! বুভুক্ষিত অতিথির আগমন হবে জেনে আয়ােজন
করাইছিলাে!
উল্কা আবার নীরবে শুধু হাসলে।
তার পর দিন পলাশ মনে কবুলে-বিকাল বেলা যাওয়া ঠিক
হবে না, আবার রাণী জলখাবার হাঙ্গামা করবেন ; বাড়ী ফিরবার
পথে রাত্রে দেখে যাবাে।
রাত্রি করে এসেও পলাশ দেখলে আহাৰ্য প্রস্তুত।
রাণীর আদেশ মাত্র ভৃত্যেরা তার হাত ধােবার জল ও রাত্রের
ভূরি ভােজনের আয়ােজন এনে উপস্থিত করলে। পলাশ বুঝলে
;

মন না মতি
তার আগমনের প্রত্যাশায় বিকালে ও রাত্রে ভােজ্য প্রস্তুতই
থাকে, এবং সে এলেই যে খেতে দিতে হবে তা চাকর-দাসীদের
জানিয়ে রাখা হয়েছে!
তার পরদিন দ্বিপ্রহরে পলাশ উল্কার বাড়ীতে এসে উল্কাকে
দেখে যাবার জন্য বিদায় নিয়ে উঠে হাসিমুখে বলে—এখন যে
বড়াে খেতে বললেন না ?
উল্কা হেসে বলে-খাবার প্রস্তুত আছে। আপনি যদি
সম্মতি দেন তো এখনই খাইয়ে দিতে পারি।
পলাশ হাসিমুখে হতাশার বিষাদ মাখিয়ে বললে-আজ থাক,
বিকালে রাত্রে তাে খাচ্ছিই।
উল্কা হেসে বললো, সকালেও খাওয়ালে বাল্মীকির অভি-
সম্পাত লাগবে!
পলাশ উৎফুল্ল হয়ে বলে-না, তা নয়, ডাক্তারের স্ত্রীর,
বিরহ সহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার অনুগ্রহের উপর অধিক
উপদ্রব করতে সাহস হয় না।
উদ্ধা বললে—তবে আপনাকে অভয় দিচ্ছি, আমার অনুগ্রহ
উপদ্রব-সহ। কাল থেকে সকালেও আপনাকে খেতে হবে।
হয় আপনি স্নান করে বাড়ী থেকে বেরুবেন, নয় এখানে এসে
স্নান করূবেন, আপনার কাপড় জামা চটিজুতা সব আমি সংগ্রহ
করে রাখবাে।
পলাশ প্রফুল্ল মুখে বলে--তা হলে আমাকে একেবারে আপনার
বাড়ীতেই রেখে দিন না—আমি তব মালঞ্চের হবাে মালাকর।

মন না মতি উল্কা প্রফুল্ল মুখেই বললে—না, এতােটা উপদ্রব আর এক- জনের সহ্য হবে না। পলাশ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে উঠলাে-আপনার অনুগ্রহ যে কতােখানি উপদ্রব-সহ তার একদিন পরীক্ষা দিতে হবে। এ কথা যেনাে শুতেই পায় নি এমনি ভাবে উল্কা বলে- তা হলে বলা রইলাে কাল থেকে আপনি দুবেলা যখনই আসবেন এখান থেকে খেয়ে যাবেন। দিনে চার বার খানদুবার বাড়ীতে খাবেন দুবার আমার এখানে খাবেন—ঠিক আধাআধি ভাগ। পলাশ নমস্কার করে বললে—যে আজ্ঞে। রাণীর হুকুম অমান্য করবার সাধ্য আমার নেই। উদ্ধা আর কিছু না বলে কেবল একটু হাসলে। পলাশ ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো।

•
ব্রততী স্বামীর প্রতি সন্দেহ মনে স্থান দেবে না মনে করলেও
সন্দেহ সে মন থেকে তাড়াতে পারছিলো না; আজকাল পলাশ
প্রায় সমস্ত দিনই বাড়ী থাকে না এবং যখন তখন উল্কার বাড়ী
থেকে খেয়ে এসে বলে সে আর বাড়ীতে খাবে না। বিরক্ত
হয়ে একদিন ব্রততী পলাশকে বলে—তুমি কখন কোন দিন
বাড়ীতে খাবে তা যদি নির্দিষ্ট করে স্থির করে বলে যাও তা
হলে আমার আর রােজ রােজ পণ্ডশ্রম করতে হয় না।
পলাশ অপ্রস্তুত হয়ে বলে—তা আমি কেমন করে’ ঠিক
করে’ বল্ববা? আজকাল রাণীর হার্টের অবস্থা এমন হয়েছে যে
কখন যে খারাপ বােধ হয় তার সময় ঠিক নেই; তাই আমারও
সময় নির্দিষ্ট করে যাওয়া ঘটে না, যখন তার অসুখ বােধ হয়
তখনই ডাকূলে যেতে হয়।
ব্রততী কেবল বললেও !
পলাশ পত্নীর সম্মুখ থেকে আস্তে আস্তে সরে’ পড়লাে।
আগে সে স্ত্রীকে ছেড়ে থাকতে পারতাে না, এখন সে স্ত্রীর কাছে
থাকতে পারে না।
সেই দিন রাত্রে পলাশ ও ব্রততীর ঘুম ভাঙিয়ে টেলিফোনের
ঘণ্টা বড়াে জোরে বেজে উঠলাে। ব্রততীর কানে সেই শব্দ
প্রবেশ করতেই তার মন শঙ্কিত হয়ে বলে উঠলো—ঐ রে !
;

মন না মতি
৭১
পলাশ উদ্ধার কাছে যাবার এই সুযােগ উপস্থিত মনে করে
উল্লাসে ব্যস্ত হয়ে শয্যা ত্যাগ করলে।
বাস্তবিক উদ্ধার বাড়ী থেকেই ডাক এসেছে, তাকে এখনই
যেতে হবে।
পলাশ তাড়াতাড়ি কেশবিন্যাস করে ঔষধ ও যন্ত্রপাতির
ব্যাগটা নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাে।
পলাশ উল্কার বাড়ীতে গিয়ে দেখলে বাস্তবিক উল্কার খুব
বেশী রকম অসুখ ; হৃদযন্ত্রের ধকধকানি বেড়েছে, উল্কা প্রায়
মুচ্ছাপন্ন। পলাশ উল্কাকে একটা ইজেক্সা দিয়ে তার নাড়ী
আর ঘড়ী ধরে বসে রইলাে।
অনেকক্ষণ পরে উল্কা একটু প্রকৃতিস্থ হলাে। সে চোখ মেলে
তাকিম পলাশকে দেখে একটু হাসলে। সে কথা বলতে
যাচ্ছিলাে, পলাশ ব্যস্ত হয়ে বলে—আপনি কথা বলবেন না,
চুপ করে শুয়ে থাকুন।
উল্কার সুন্দর অথচ পীড়াক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে
থাকতে পলাশের বাসনা দুর্দম হয়ে উঠলো যে গােলাপের দুখানি
পাপড়ির মতন উল্কার অধরােষ্ঠ থেকে একটি চুম্বনে তার সকল
ক্লেশ শােষণ করে তুলে নিজে নেয়। সে অনেকবার অনেক
রকমে নিজের মনের ভাব উল্কার কাছে প্রকাশ করেছে, কিন্তু
উল্কা একবারও তার কথায় বিরক্তি প্রকাশ করা তাে দূরে থাক,
প্রতিবাদও করে নি ; তাই পলাশের সাহস বেড়ে গিয়েছিলো,
দুরাশা সংযমের সীমা লঙ্ঘন করতে উদ্যত হয়েছিলাে। কিন্তু

१२
মন না মতি
ঘরে চাকর-দাসীরা থাকাতে তার অতৃপ্ত বাসনা তার মর্ম দগ্ধ
করতে লাগলাে।
রাত্রি ভাের হয়ে এসেছে। উল্কার ঘরের পূর্ব দিকের জালা
দিয়ে উষার স্নিগ্ধ গােলাপী আভা এসে উল্কার মুখের উপর
পড়েছে, আর পশ্চিমের জাল্লা দিয়ে কৃষ্ণপক্ষের স্নান জ্যোৎস্না
এসে তার অঙ্গে শয্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঊষার আলােকে
পুলকিত দুটি কুবলয়ের মতন সুন্দর চক্ষু উন্মীলন করে’ উল্কা মৃদু
মধুর স্বরে ডালে-ডাক্তার-বাবু।
পলাশ ঝুঁকে একেবারে উল্কার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে
বলে-কি বলছেন?
উদ্ধা বলে—আমি তাে বুকের মধ্যে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে
পাচ্ছি—“সে যে আসে আসে আসে দিন রজনী।”
পলাশ একটু অনুযােগের স্বরে বললে-অমন অলক্ষুণে কথা
নিয়েও আপনার রসিকতা।
উল্কা ঈষৎ হেসে বললে—অবশ্যম্ভাবীকে অস্বীকার করে তাে
কোননা লাভ নেই। আমি যদি তাকে অভ্যর্থনা না করি তবু
সে জোর করেই আসবে। কারাে কাছে বলে পরাজিত হওয়ার
চেয়ে তাকে ভদ্রতায় পরাজিত করা ভালাে। মৃত্যুকে তাই আমি
অভ্যর্থনা করবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছি, প্রতি মুহূর্তেই তার
অতর্কিত আগমন প্রতীক্ষা করছি। কিন্তু আপনি আমাকে ঋণী
করে রেখে দেবেন না। আপনি কি পুরস্কার চাইবেন বলে-
ছিলেন। সময় থাকতে আমাকে সেটা বলুন।
L

মন না মতি ৭৩ পলাশের মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার আশায় মুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠলাে। সে ব্যগ্র মৃদু স্বরে বললে—আমি রাণীর কাছ থেকে রাণীর মতন পুরস্কার চাই উল্কা হাসিমুখে বলে—আমি তত আপনাকে আগেই বলেছি সাধ্যাতীত না হলে আপনাকে আমার অদেয় কিছুই ; পলাশের প্রাণ উল্লাসে নৃত্য করে উঠলাে, অন্য লােকে শুনতে না পায় এমন মৃদু স্বরে বললে--রাণীর কাছে দীনের প্রার্থনা কেবল রাণীর কর্ণগােচরই করবাে। উল্কা ভৃত্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে-খানসামা, ডাক্তার- বাবুর জন্যে চা তৈরি করে নিয়ে এসাে। তার পর দাসীর দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে-লক্ষ্মী, ডাক্তার বাবু হাত মুখ ধােবেন ; বাথরুমে মাজন নতুন বুরুশ জিবছােলা জল ঠিক করে দাও গে । । ভৃত্য ও দাসী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলাে। তখন উল্কা কৌতুহলােজ্জল দৃষ্টি পলাশের মুখের উপর রেখে হেসে বললেএখন বলুন। পলাশ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলাে। সে বলে—আমি খুব বেশী কিছু চাইবে, অভয় দেন তাে বলি। উল্কার চোখ দুটি কৌতুকে উল্কার মতনই জ্বলে উঠলো, সে হাসিমুখে বললে—আপনাকে আমি অভয় দিচ্ছি...... উল্কার মুখের কথা মিলিয়ে যাবার আগেই পলাশ আবেগ-

৭৪
মন না মতি
ভরে দুই হাতে উল্কার দুই হাত চেপে ধরে’ উন্মত্তের মতন বলে
ফেলে--আমি তােমাকে চাই রাণী, তােমাকে চাই ।
“তােমারে না পেলে আমার এ যাতনা ঘুচিবে না !
গভীর প্রাণের তৃষা মিটিবে না মিটিবে না!" :
পলাশ যে এই রকম কোনাে প্রার্থনা করবে তা উল্কা আগেই
অনুমান করে রেখেছিলাে, তবু পলাশের মুখ থেকে সেই কথা
শােবার বাসনাও তার প্রবল হয়ে উঠেছিলাে। সে পলাশের
প্রার্থনা শুনে আশ্চৰ্য্য বা ক্রুদ্ধ হলাে না, কিন্তু তার মুখে ঊষার
গােলাপী আভা ফুটে উঠলাে। সে ধীরে ধীরে নিজের হাত
পলাশের মুষ্টি থেকে মােচন করে নিলে।
পলাশ আত্মবিহ্বল হয়ে বলে—তবে কি আমার প্রার্থনা
মঞ্জুর হলাে না রাণী ?
উল্কা মুখ লাল ও দৃষ্টি নত করে’ মৃদুস্বরে বলে—মঞ্জুর।
পলাশ অপ্রত্যাশিত লাভের আনন্দে অধীর হয়ে বলে
উঠ লাে-কবে রাণী কবে আমি আমার পুরস্কার পাবাে?
উল্কা লজ্জাভরা দৃষ্টি তুলে বলে—আসছে দোল-পূর্ণিমায় ।
পলাশ আত্মহারা হয়ে উস্কাকে চুম্বন করতে উদ্যত হয়েছে,
দাসী ঘরে প্রবেশ করে বলে—ডাক্তার বাবুর মুখ ধােবার জল
দেওয়া হয়েছে।
উল্কা হাসিতে কৌতুক বিকীর্ণ করে বলেন, মুখ ধুয়ে
আনুন।

মন না মতি
৭৫
পলাশ উঠে যেতে যেতে চাপা স্বরে বলে গেলাে-
।
“এ কি কৌতুক নিত্য-নৃতন
ওগাে কৌতুকময়ী,
আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে
বলিতে দিতেছে কই ?”
উল্কার মুখ লজ্জায় আনন্দে কৌতুকে ঝলমল করতে লাগলো,
কে বলবে যে কিছুক্ষণ আগে তার অসুখের কষ্টে মূচ্ছা হয়েছিলো।

প্রতীক্ষার উদ্বেগ বুকে বহন করে’ পলাশের উনিশ দিন কেটে গেলাে। আজ দোল-পূর্ণিমা। লালসার নেশায় সে সকাল থেকেই বিহ্বল হয়ে আছে। সে দুপ্রহরের সময় উল্কার বাড়ীতে গিয়ে মদির দৃষ্টিতে উল্কার মুখের দিকে চেয়ে বললে—আজ দোল- পূর্ণিমা ! আজ অঙ্গীকৃত বর দিতে হবে। উল্কা লজ্জিত দৃষ্টি নত করে আরক্ত মুখে বলে-আচ্ছা সন্ধ্যার পর নিমন্ত্রণ রইলাে। পলাশ আবেগভরে বলে উঠলাে—কিন্তু আর যে বিলম্ব সহ হয় না! উল্কা কুণ্ঠিত মৃদু স্বরে বললে-সবুরে মেওয়া ফলে ! পলাশ উৎফুল্ল স্বরে বলে—সেই অমৃত ফলের আশাতেই তাে মুহূর্ত গণ ছি ! দয়াই যদি করবে তুমি তবে এত কষ্ট দিলে কেনাে ? উক্কা মৃদু হেসে বললে-সহজপ্রাপ্য বস্তুকে কোনাে লােক সমাদর করে না। পলাশ আত্মবিস্মৃত হয়ে বলে উঠলাে—কিন্তু রূপ লাগি আঁখি ঝুরে, গুণে মন ভাের। প্রতি অঙ্গ লাগি কাদে প্রতি অঙ্গ মাের ।

মন না মতি
৭৭
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মাের কান্দে।
পরাণ পীরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে।
পলাশের ভাবাতিশয্যের প্রলাপ শুনে উল্কার মুখ এমন বিবর্ণ
গম্ভীর হয়ে উঠলো যে পলাশ তা দেখে সুদের লােভে মূল
হারাবার ভয়ে চঞ্চল হয়ে উঠলাে। সে তাড়াতাড়ি উঠে
দাড়িয়ে বললে—এখন তবে যাই, সন্ধ্যার পর আসবাে।
উল্কা অস্ফুট স্বরে বলে—আসবেন।
পলাশ বাড়ী গিয়ে সমস্ত দিন দারুণ অস্বস্তিতে প্রতিক্ষণ
গুণতে লাগলাে। অবশেষে যখন সন্ধ্যা হয়ে এলাে তখন পলাশ
উৎফুল হয়ে বিশেষ রকম প্রসাধনে মনােনিবেশ করলে। খুব,
দামী সুগন্ধ সাবান মেখে স্নান করে নৃতুন জরিপাড় কাপড়,
জালী গেঞ্জি, গরদের পাঞ্জাবী, জরি-পাড় কেঁাচানাে চাদর, পম্প ও
পরিধান করলে ; তার পর জামায় চাদরে রুমালে খুব দামী
এসেন্সের শীকর সংপৃক্ত করে আয়নায় দু-তিনবার মুখ দেখে চুল
আঁচড়ে সে অভিসার-যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাে।
আজ সমস্ত দিন ব্রততীও চঞ্চল ও ম্লান হয়েছিলাে এবং
বারম্বার সে পলাশের গতিবিধি লক্ষ্য করে করে দেখছিলাে;
তার মনের মধ্যে যে একটা উদ্বেগ লুক্কায়িত হয়ে তাকে পীড়া
দিচ্ছে, তা পলাশ একটু মনােযােগ করলেই বুঝতে পারতাে,
কিন্তু উল্কাময়-মানস পলাশের আর কোনাে দিকে মন দেবার
অবসর ছিলাে না।
সন্ধ্যার সময় যখন ব্রততী দেখলে পলাশ বিশেষ মনােযােগের
;

৭৮ মন না মতি সহিত প্রসাধন করতে নিযুক্ত হয়েছে, তখন ব্রততীর মুখ অকস্মাৎ প্রফুল্ল হয়ে উঠলাে; সেও তাড়াতাড়ি গা ধুয়ে নৃতন বসন ভূষণে সজ্জিত হয়ে উৎসব-বেশ ধারণ করলে। এবং হাস্য- বিকশিত মুখে প্রসাধন-রত স্বামীর সামনে গিয়ে দাড়ালাে। পলাশ মাথার চুল বুরুশ করছিলাে, টেবিল-আয়নার ভিতরে প্রফুল্লমুখী পত্নীর প্রতিচ্ছায়া দেখে মুখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞাসা করলে-তুমি কোথায় যাবে? ব্রততীর প্রফুল্ল মুখের উপর দিয়ে সন্দেহ ও আশঙ্কার একটা কালাে ছায়া ভেসে চলে গেলো। পরক্ষণেই সে আবার মুখে হাসি মাখিয়ে বলে-তুমি কোথায় যাচ্ছে। শুনি? পলাশ বলে-আমার এক জায়গায় নেমতন্ন আছে, আজ আর বাড়ীতে খাবাে না, আমার ফিরতে একটু বেশী রাত হতে পারে। পলাশ উঠে হাতীর দাঁতের ব্যাট দেওয়া একটা নূতন ছড়ি হাতে নিয়ে ঘর থেকে গমনােদ্যত হলাে। ব্রততীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেলাে, মুখ ম্লান হতাশা-কাতর হয়ে উঠলো। সে বললে—আজ, দোল-পূর্ণিমা, আজ তুমি বাইরে চলে ? পলাশ একটু ফিরে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে-সন্ধ্যাবেলা আর কেউ গায়ে রং দেবে না, আর আমি তাে মােটরে যাবাে। ব্রততীর বুকে কে যেনাে ভারী পাথর চাপিয়ে তার কণ্ঠবােধ করে দিলে, তার মুখ বেদনাক্লিষ্ট হয়ে উঠলাে। সে একটু ক্ষণ

মন না মতি
নির্বাক হয়ে থেকে ব্যথিত মৃদু স্বরে বলে—আজ আমাদের
বিয়ের দিন !
পলাশ মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে বলে—ও! আমার সে কথা
মনেই ছিলাে না। কিন্তু আর কতােকাল ছেলেমানুষী আর কবিত্বের
ঢং করা যাবে। বিশেষ আজকে আমার নেমতন্ন আছে•••••••
ব্রততীর
মুখ এমন
বিবর্ণ বেদনাতুর হয়ে উঠলাে যে পলাশ
তার প্রতি অনুকম্পাতে ও নিজের আচরণের লজ্জাতে ব্যস্ত হয়ে
বলে—আচ্ছা, আমি ফিরে আসি, তার পর আমাদের বিয়ের
বাৎসরিক অনুষ্ঠান করা যাবে।
ব্রততী প্রস্তর-প্রতিমার মতন নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে রইলো।
পলাশ তার দিকে আর তাকাতে না পেরে কুষ্ঠিত ও ব্যস্ত হয়ে
সেখান থেকে প্রস্থান করলাে।
ব্রততী একলা হতেই তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা ঝাপিয়ে
গড়িয়ে পড়তে লাগলাে।
পলাশের মনটাও একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিলাে, কিন্তু সে
যতােই উল্কার বাড়ীর সন্নিহিত হতে লাগলাে তার মন ততােই
উত্তেজনার নেশায় আবিষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো এবং শীঘ্রই
ব্রততীর অস্তিত্ব মন থেকে মুছে ফেলে উল্কার সঙ্গে প্রথম মিলনের
মাদক মােহ তার সমস্ত মন জুড়ে বসলাে।
পলাশ উদ্ধার বাড়ীর দরজায় নেমেই দেখলে উল্কা-রাণীর
মােটর-গাড়ী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। পলাশের বুকটা
ছ্যাৎ করে উঠলাে-রাণীর অসুখ-বিসুখ করেনি তত ?

৮
মন না মতি
পলাশ বড়ো বড়াে করে পা ফেলে তাড়াতাড়ি উপরে গিয়ে
উঠলাে। দেখলে উল্কা নিত্যকার মতনই রূপালি জড়ি-পাড়
শুভ্র বসন-মণ্ডিত হয়ে জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রির মতন ঝলমল করছে।
পলাশ তাকে দেখেই বলে উঠলাে-
তবু ভালাে। আমার ভয়
হচ্ছিলো অসুখ-বিসুখ করেছে বুঝি বা।
উল্কা হেসে বললে—আজ অসুখ করলে যে সব আমােদ মাটি
হয়ে যেতে ।
পলাশের মন আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। সে ঘরের দুই
দরজায় চাকর ও দাসীদের দাড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্ত হয়ে
বলে—আমি যে আমার পুরস্কার পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে
উঠেছি! আমার হাতে স্বর্গলাভের পথের দুটো কাটা তুমি
দয়া করে সরিয়ে দাও••••••
উল্কা লজ্জিত স্মিতমুখে বলে—আপনি আগে খেয়ে নিন
তবে তাে.........
পলাশ ব্যস্ত হয়ে বলে-না না, তুচ্ছ খাওয়া তাে রােজই
খাচ্ছি, কিন্তু সুদুর্লভ সুখ-মিলন তুমি বিলম্বিত কোরাে না......
উল্কা একটু গম্ভীর ও চঞ্চল হয়ে বলে—আপনি তততক্ষণ
খেয়ে নিন, আমি প্রস্তুত হইগে।
পলাশ ব্যগ্র স্বরে বললে—আমার খাবার জন্যে তােমার
ভাবতে হবে না, তুমি শিগগির প্রস্তুত হয়ে নাওগে।
উল্কা কাউচ, থেকে উঠে দাড়িয়ে বললে-
-আমি আপনার
খাবার সময় কাছে থাকতে পারলাম না, কষ্টি মার্জনা••••••

মন না মতি
পলাশ ব্যস্ত হয়ে উল্কার কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠলো-
তুমি যতাে বিলম্ব কছো তােমার ত্রুটি ততাে অমার্জনীয় হয়ে
উঠছে, তুমি যাও•••••••••
উল্কা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে চাকর-দাসীদের বলে
গেলাে—ডাক্তার-বাবুর খাবার এনে দাও।
উল্কা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই চাকর একজন
ঘরে এসে পলাশকে বলে—হুজুর, খাবার দেওয়া হয়েছে এই
পাশের ঘরে।
পলাশ পাশের ঘরে গিয়ে দেখলে পুরু নরম কার্পেটের
আসনের সামনে রূপার পাত্রে পঞ্চাশ-ব্যঞ্জন পােলাও লুচি
সাজানাে আছে। সে যখন ক্ষুন্ন মনে খেতে বললা তখন রাণী
উল্কার দ্বারােপান্তে যে মােটর-গাড়ী সে দেখে এসেছিলো সেই
র-রয়েস্ কার নিঃশব্দে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।

ব্রততীর বিবাহ হয়েছে ছয় বৎসর। এর আগে কোনাে বৎসর তার বিবাহ-বাসরের বাৎসরিক উৎসব বাদ পড়েনি, পলাশই নিজে উদ্যােগী হয়ে এর আয়ােজন করে এসেছে। আজও সে তার স্বামীকে লুকিয়ে উৎসবের আয়ােজন করেছিলাে, কিন্তু তার স্বামী তাকে হতাশ করে চলে গেছে। তার স্বামী যদি কোথাও কাজে চলে যেতে তা হলে তার এত কষ্ট হতো না, কিন্তু সে যে কোথায় গেছে তা তাে ব্রততী মনে মনে অনুমান করতে পেরেছে, তাই ব্যথায় তার মন কাতর হয়ে উঠেছিলাে। সে তার শােবার ঘরের মেঝেয় আল্পনা দিয়ে তার উপরে আল্পনা-দেওয়া বড় পীড়ি পেতে স্বামীকে বসায় এবং ফুলের মালা গলায় দিয়ে কপালময় চন্দনের বিন্দু থরে থরে এঁকে দেয় ; পলাশও বরাবর তাকে ফুলের মালা পরিয়ে কপালে কনে-চন্দন দিয়ে দিয়েছে, আর তার পরে দুজনে মালাবদল করে’ বিবাহের সুখস্মৃতিকে নূতন করে তুলেছে ; রাত্রে তারা একসঙ্গে এক পাত্র থেকে মধু আস্বাদ করে’ ও ব্রততীর স্বহস্ত-পৰু বিবিধ মিষ্টান্ন আহার করে ফুলশয্যায় রজনী যাপন করেছে পরস্পরের বাহুপাশে বদ্ধ হয়ে ফুলের স্বপ্ন দেখে। আজ তার

মন না মতি
সব আয়ােজন পণ্ড করে, তার আশা নিষ্ফল করে তার স্বামী
অপরের অভিসারে যাত্রা করেছে। সে চোখের জলে ভাসতে
ভাসতে আল্পনা-দেওয়া পীড়ির উপর স্বামীর ফটোগ্রাফের ফ্রেম
বসিয়ে তাকেই মাল্যদান করেছে, আর সেই ফটোগ্রাফের গলা
থেকে খুলে নিয়ে কুঁইফুলের গড়ে’ মালা নিজের গলাতেও
পরেছে। সে স্বামীর ফটোগ্রাফের দুধারে দুটো বাতিদানে
বাতি জ্বেলে দিয়েছে, ধূপ-দানীতে ধূপের ধোঁয়া দিয়েছে, তার
স্বহস্ত প্রস্তুত মিষ্টান্নের ও মধুর পাত্র সে ফটোগ্রাফের সামনে রেখে
দিয়েছে।
সে স্বামীর ফটোগ্রাফের সানে শিথিল হয়ে বসে
আছে, তার দুই হাত জোড় হয়ে কোলের উপরে পড়ে আছে,
আর তার মলিন বিবর্ণ গালের উপর দিয়ে মন্দাকিনী-ধারার
মতন স্বামীপ্রেমে পবিত্র অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে! ব্রততী
মূর্তিমতী বিষন্নতার মতন বসে বসে ভাবছে এই বাৎসরিক
উৎসবে কবে তার স্বামী তাকে কি প্রণয়ের পরিচয় দিয়েছে, কি
আদর করে তার স্বামী ভক্তি ও প্রীতিকে পুরস্কৃত করেছে ;
কিন্তু আজ সে কি পাপে সেই সুখ-স্বর্গ থেকে নির্বাসিত হলো ?
তার স্বামী এতােক্ষণ হয়তো উল্কার বাহুপাশে বদ্ধ হয়ে হাসিমুখে
কতো চাটুবাণীই বছে যা কেবল তারই একার প্রাপ্য বলে
এতােদিন তার ধারণা ছিলাে। এই কথা মনে হতেই তার
মনের সামনে তার স্বামীর ও উষ্কার যে ছবি ফুটে উঠলে তাতে
তার অশ্রুধারা দ্বিগুণ বেগে প্রবাহিত হতে লাগলো।
হঠাৎ কার মৃদু পদশব্দ শুনে অশ্রুসমাচ্ছন্ন চক্ষু দরজার দিকে

৮৪ মন না মতি ;; ফিরিয়ে ব্রততী দেখলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক দেবী- প্রতিমা! সে বিদ্যুৎবর্ণা, তার বেশ-বাস সব সুশু, তার অঙ্গ বেষ্টন করে’ শুভ্র সূক্ষ্ম বস্ত্রের রূপালি জরির পাড় আলো লেগে বিদ্যুল্লতার মতন চকচক কবৃছে! সেই সুন্দরীর পদ পল্লবে সাদা চামড়ার উপর সাদা রেশম ও রূপালি চুমকির কাজ করা, তার হাতে একটি বৃহৎ উজ্জ্বল হীরার আংটি ! তার অঙ্গে আর কোনাে অলঙ্কার নেই, কিন্তু অভূষণা সেই রূপসী সহজ লাবণ্যে ও মাধুর্যে মণ্ডিত হয়ে ঝলমল করছে ! এবং তা নয়ন-কুবলয় থেকে মমতা করুণা আর সমবেদনা যেনো অমৃত 'প্রস্রবনের মতন ক্ষরিত হয়ে পড়ছে। এই অদৃষ্ট পূৰ্বা অপরিচিতা সুন্দরীর প্রতি চকিত দৃষ্টিপাত করেই ব্রততী যা লক্ষ্য করলে তাতেই তার কেমন মনে হলো এই উল্কা! সুন্দরী বটে! ভুবনমনমােহিনীর রূপলাবণ্যে আমার রমণী হৃদয় যদি মুগ্ধ হয়, তবে আর পুরুষের অপরাধ কি ? ব্রততী ভাল করে নিজের মনের ভাব ও চিন্তা গুছিয়ে নেবার আগেই উল্কা মমতা মধুর মৃদু স্বরে ব্রততীকে বলে—বৌদিদি, ঘরে যখন আগুন লেগে সৰ্বস্ব পুড়ে যেতে বসেছে তখন নিশ্চেষ্ট হয়ে চোখের জল ঢেলে সে আগুন কি নেবানো যাবে? তুমি উঠে এসো, চলো আমার বাড়ীতে, সেখানেই তােমার বিবাহ- বাসরের বাৎসরিক উৎসবের ফুলশয্যা আমি পেতে রেখে এসেছি, তুমি তােমার পলাতক স্বামীকে বাহুপাশে বেঁধে হৃদয় মন্দিরে বন্দী করে ফিরিয়ে আনবে চলো। আমি শুনেছিলাম তােমাদের মন না মতি bia বিবাহ হয়েছিলাে দোল-পূর্ণিমায়, তাই আমি বেছে বেছে আজ- কার এই বসন্ত পূর্ণিমায় তােমার স্বামীকে নিমন্ত্রণ করেছি তােমাদের ফুলশয্যা সাজিয়ে। বিলম্ব করবার সময় নেই, এসো ; তােমার স্বামী আমার বাড়ীতে তােমার অপেক্ষা করছেন। উল্ক। এমন মধুর স্বরে মমতা ঢেলে এই কথাগুলি বলে যে সে যখন ব্রততীর হাত ধরে তার চোখের জল মুছিয়ে দিলে তখন ব্রততীর অসাগর আরাে উথলে উঠলো, কিন্তু সে মন্ত্রমুগ্ধার মতন উল্কার আকর্ষণে উঠে তার সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে উল্কার মােটরে উঠলাে। উল্কার মােটর আবার নিঃশব্দে এসে উল্কার বাড়ীর দরজায় ১ দাড়ালো।

পলাশ মানসিক উত্তেজনার জন্য আজ বেশী কিছু খেতে
পারে নি ; সে শীঘ্রই আহার সমাপ্ত করে আবার এসে উল্কার
ড্রয়িংরুমে বসেছে এবং অস্থির চঞ্চল চিত্তে উল্কার আহ্বানের
প্রত্যেকটি মুহূর্ত গুণছে।
একজন দাসী এসে পলাশকে বললে—রাণীমা আপনাকে
শােবার ঘরে যেতে বললেন।
পলাশের প্রাণ অকস্মাৎ আনন্দের আবেগে এমন লাফিয়ে
উঠলাে যে দেহ তার অবশ শিথিল হয়ে গেলাে। সে কম্পিত
হৃদয় চরণ নিয়ে দাসীর অনুসরণ করে চলাে উস্কার শয়নকক্ষে ?
দাসী এক ঘরের দ্বারের কাছে গিয়ে বললে—“এই ঘরে।” এবং
সে সেখান থেকে চলে গেলাে।
পলাশ তাে এ বাড়ীর প্রায় সকল ঘরই চেনে। এটি উল্কার
শয়নকক্ষ! এই ঘরে সে কয়েকবার উল্কাকে চিকিৎসা করতে
গিয়েছে ; এই ঘরের কোথায় কি আবার সরঞ্জাম আছে তা
তার মুখস্থ হৃদয়স্থ হয়ে আছে। ঘরের দ্বারে ফুলের মালার সারি
ঝুলিয়ে দ্বারের পর্দা করা হয়েছে! ঘরের ভিতর অন্ধকার।
পলাশ এক মুহূর্ত থকে দাড়িয়ে, ফুলের মালার ঝালর

মন না মতি সরিয়ে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলো। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে আবার সে একবার থম্‌কে দাড়ালো। ফুল চন্দন ধূপ ধুনা অগুরু গুগগুল লােবান প্রভৃতির সুরভি ঘরের বাতাস ঘন করে তুলেছে, সুগন্ধ যেনাে উস্কার নিশ্বাসের মতন পলাশকে ঘিরে জড়িয়ে ধরলাে। সে বাসনার নেশায় উন্মত্ত হয়ে পালঙ্কের দিকে এগিয়ে চলো। তার পা টছে, বুক কাপছে, দুর্লভ সুখাতিশয্যের বেদনা তার চেতনা হরণ করছে। ঘর অন্ধকার ! উল্কার প্রথম মিলনের লজ্জার রূপ ধরে এই কালো অন্ধকার পলাশের চোখে উষার গােলাপী আভায় রঙীন হয়ে উঠলাে ! ঘরের আলােক নিৰ্বাপিত, জাল্লা দরজা বন্ধ, বাইরের দালানেও আলো নেই। জাল্লার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নার আভাস আর দূরের আলে? যা ভেসে এসে ঘরের অন্ধকারকে ফিকে করে তুলেছিলাে তাতে পলাশ দেখলে পালঙ্কের উপর তার মিলনের জন্য অপেক্ষা করছে এক নারীমুর্তি! সে উল্লাসে সৌভাগ্যে অধীর হয়ে বেলাভূমির উপর সাগর তরঙ্গের মতন ঝাপিয়ে পড়লে পালঙ্কের উপর এবং দুই হাতে সেই প্রতীক্ষমানা নারীকে আলিঙ্গন করে উন্মত্তের মতন তার সর্বাঙ্গে চুম্বন বর্ষণ করতে করতে ভাবাবেশ কম্পিত কণ্ঠে বলতে লাগলাে অদ্য মে সফলং জন্ম, অদ্য মে সফল ক্রিয়া, সঙ্গমং তে লব্ধং পূৰ্বজন্মজ্জিতৈঃ ফলৈঃ। পলাশ অনুভব করলে তার আলিঙ্গনপাশবদ্ধ। পুষ্পভরণা, তার শয্যা পুষ্পময়ী, তার স্পর্শ পুষ্পপেলব । কিন্তু সেই নারী ৮৮ মন না মতি প্রথমমিলন ভীত বেপথুমতী! সেই নারী আপনাকে পুরুষ- বাহুপাশ থেকে মুক্ত করতে চেষ্টিত। পলাশ আলিঙ্গন দৃঢ় করে বলে উঠলাে-অয়ি প্রথমপ্রণয়- ভীতে। আমার এ “রাহুর প্রেম থেকে তােমার অব্যাহতি নেই— “তুই তাে আমার বন্দী সােহাগিনী, বাঁধিয়াছি কারাগারে। প্রাণের শৃঙ্খল দিয়েছি পায়েতে, দেখি কে খুলিতে পারে! তুমি উল্কা! তুমি ক্ষণপ্রভা! তা আমি জানি ! এতাে সুখ-সৌভাগ্য মানুষের চিরদিন থাকতে পারে না, কিন্তু যতােটুকু পাওয়া যায় তাই যথেষ্ট ! এক মুহূর্তও যে আমি তােমাকে বক্ষে ধারণ করতে পেরেছি এই আমার জীবনের চরম লাভ, মরণের পরম পাথেয়। পলাশ দেখলে এই কথা শুন্ মাত্র উল্কা কান্নায় লুটিয়ে পড়লো এবং তার আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হবার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো। উল্কার এই চেষ্টা ও কান্না প্রণয় ক্রীড়া মনে করে পুলকিত হয়ে পলাশ জোর করে মুখে চুম্বন করতে করতে তার উন্মুক্ত বাহুতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে— “আনন্দময়ী মূরতি তুমি। ফুটে আনন্দ বাইতে তােমার, ছুটে আনন্দ চরণ চুমি!”

মন না মতি
৮৯
আনন্দময়ী মূরতি তােমার,
কোন্ দেব তুমি আনিলে দিব?
অমৃত সরস তােমার পরশ
তােমার নয়নে দিব্য বিভা।”
অন্ধকারেই পলাশ অনুভবে বুঝলে তার এই কথা শুনেই উল্কা
তার বাহুপাশ মুক্ত হবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করতে লাগলাে এবং
তার রুদ্ধ রােদন সে কিছুতেই সংবরণ করতে পারছে না।
উল্কা তার আলিঙ্গন ছাড়িয়ে চলে যায় দেখে পলাশ আবার
ভাবাবিষ্ট কণ্ঠে বলে উঠলো—আজ ব্রততীর বিবাহ-দিন, সে
আমার মিলনের জন্যে সজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করছিলাে, কিন্তু
আমি তাকে উপেক্ষা করে তােমার কাছে ছুটে এসেছি।
ব্রততী তােমার চরণের রূপ মাধুর্যের নিছনি হয়ে ধূলায় গড়াগড়ি
যেতে পারে ! তােমার একরাত্রির প্রসাদ অন্য লক্ষ রমণীর
আজীবনের আত্মদানকে তুচ্ছ করে দেয়!
এই কথা শুনবামাত্র পলাশের বাহুপাশ বিচ্ছিন্ন করে উল্ক।
পালঙ্ক থেকে লাফিয়ে পড়ে পলায়নােদ্যত হলো।
উল্কা অন্ধকারে কোন্ দিকে যাচ্ছে স্থির করতে না পেরে
পলাশও এক লক্ষে পালঙ্ক থেকে ভূমিতে অবতরণ করে
বিদ্যুৎ-বাতির চাবি পট করে টিপে দিলে । আর চক্ষের
নিমেষে বিজলী ঝড়ের উজ্জ্বল তীব্র আলােক ঘর ভরে
গেলাে।
অন্ধকারের মধ্যে অকস্মাৎ আলােকোদ্ভাসে ছন্নদৃষ্টি হয়েও

--- মন না মতি ; পলাশ পলায়মানাকে দেখে সবিস্ময় বিরক্তির স্বরে বলে উঠলো ব্রততী ! তুমি! তুমি এখানে ! ব্রততী নিজের কানে স্বামীর মুখে অপর নারীর স্তুতি শুনে ব্যথিত হয়েছিলাে; আরাে বেশী ব্যথিত হয়েছিলো এই জন্য যে তার স্বামী আজ যে সব কবিত্ব-কথা অপরের উদ্দেশ্যে বর্ষণ করছিলাে তা কততদিন তাকেই উদ্দেশ করে বলেছে! সে নিজের ব্যথায় ও স্বামীর লজ্জা পাবার সম্ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে স্বামীর আলিঙ্গনপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করছিলো। সে স্বামীর আদর থেকে পালিয়ে বাঁচবার জন্য পালঙ্ক থেকে নেমে পড়েছিলাে, কিন্তু অপরিচিত ঘরে অন্ধকারে পথ চিনে বাহিরে পালাতে পারার পূর্বেই পলাশ যেই বিজলী-আলাের ঝাড় জেলে দিলে অনি ব্রততী লজ্জায় ভয়ে বেদনায় দুঃখে কাতর হয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে পিছন ফিরে দাড়িয়ে পড়েছিলাে অশ্রু-সমাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে পথ দেখে নিয়ে কম্পিত চরণ টেনে সে পলায়ন করতে পারলাে না, চোখে আলাে-আঁধারি লেগে সে অন্ধপ্রায় অভিভূত হয়ে দাড়িয়ে পড়লাে। কিন্তু স্বামীর বিস্মিত বিরক্ত বচনের আঘাতে তার চেতনা ফিরে এলাে, তার সর্বাঙ্গের পুষ্পভরণ তাকে ধিক্কার ও লজ্জা দিতে লাগলাে; কিন্তু সে নিজের লজ্জার চেয়ে স্বামীর লজ্জা প্রবল ভাবে অনুভব করলে এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে কাতর হয়ে সে স্বামীর পায়ের উপর লুটিয়ে পড়লাে এবং কান্নায় গলে গিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে উঠলাে— আমার অপরাধ হয়েছে, আমাকে তুমি ক্ষমা করো! ;

মন না মতি
পলাশ মুহূৰ্ত্ত মাত্র স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থেকে মরণাধিক লজ্জায়
অভিভূত হয়ে সেই ঘর থেকে বেগে বাহির হয়ে পালালাে, যেনাে
কোনাে ভয়ানক বিপদের তাড়নায় সে পলায়ন করছে।
পলাশ পলায়ন করলো দেখে ব্রততী মাটির উপর লুটিয়ে
পড়লাে এবং তার অশ্রুজলের উৎস উন্মুক্ত হয়ে গেলাে।
ক্ষণকাল পরে স্নান কাতর মুখে উল্কা নিঃশব্দ-পদসঞ্চারে এসে
ব্রততীকে দুই হাতে স্নেহের সহিত ধরলে এবং ব্যথিত কণ্ঠস্বরে
মমতা ও অনুতাপের কাতরতা ঢেলে দিয়ে বলে-বৌদিদি
ওঠো ভাই, আমাকে ক্ষমা করাে......এমন যে হবে আমি তা
আগে বুঝতে পারি নি......
ব্রততী মমতার মধুর আস্বাদ পেয়ে শান্ত হওয়া দূরে থাক
আরাে অধিক উচ্ছাসিত ক্রন্দনে আকুল হয়ে বলে—দিদি, তিনি
লজ্জা পেয়ে অপমানিত হয়ে পালিয়ে গেলেন। তিনি কি আর
কখনাে আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন, না তিনি সহজ ভাবে
আমার সামনে আসতে পারবেন? আর আমিই কি তাকে
আগের মতন শ্রদ্ধা ভক্তি করতে পারবাে, না ভালােবাসতে
পাবাে? এ আমার কী সর্বনাশ হলো! আমি এমন কী পাপ
করেছিলাম।
উল্কা নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে ব্রততীর চোখ মুছিয়ে
দিতে দিতে বলে—তুমি কোনাে পাপ করাে নি বৌদিদি, পাপ
করেছেন তােমার স্বামী, আর অন্যায় করেছি আমি। পাপ
যেনাে ভূমিকম্পের মতন ; পৃথিবীর গােপন অন্তরে কোথায়

৯২
মন না মতি
সামঞ্জস্য ভঙ্গ হয় আর তার কম্পন লাগে কতো দেশে আর কতো
নিরীহ নরনারীশিশু সেই উৎপাতে মারা যায় ; তেমনি পাপ জমে
একজনের চিত্তে, তার ফলভােগ করে নিরপরাধ অপরে। তােমার
স্বামী আমার প্রতি আসক্ত হয়েছেন জেনেই, আমার উচিত
ছিলে। দৃঢ় ভাবে তাকে শাসন করে দেওয়া ; আমি তা করি নি,
হয় তাে বা কৌতুকের বশে আমি তাকে প্রশ্রয় দিয়েছি ; হয়
তো বা আমার মনের অন্তরালেও একটু লালসা গােপন হয়ে
ছিলাে। আমি যে অন্যায় করে অনর্থ ঘটিয়ে তুল্লাম তার
অনুতাপে আমার চিত্ত পুড়ে যাচ্ছে, এর প্রতিকার যে কি করে
হবে তা আমি বুঝতে পারছি না।
উল্কা ব্রততীকে সান্ত্বনার কথা বলে না, বরং ভয়ের কথা
বললে, এতে ব্রততী উল্কার দুঃখ প্রকৃত বলে জেনে সন্তুষ্ট হয়ে
উঠে দাড়িয়ে বলে—তােমার দোষ নেই দিদি, তুমি ভালো
ভেবেই আমাকে এখানে এনেছিলে। আমার অদৃষ্ট মন্দ, আমার
কপাল ভেঙে গেলাে। এখন আমাকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দাও।
উল্কা আদরের স্বরে বললে-চলো, আমি তােমায় বাড়ীতে
পৌছে দিয়ে আসি। তােমার সুখ আমি নষ্ট করেছি। সেই
নষ্ট ধন উদ্ধারের জন্য তুমি আমাকে যা করতে বলবে আমি তাই
ব্রততী চোখ মুছে বলে—আমার সঙ্গে তােমার গিয়ে
কাজ নেই দিদি। তিনি যদি বাড়ীতে গিয়ে থাকেন, তা হলে
তােমাকে আমার সঙ্গে দেখলে তিনি দ্বিগুণ লজ্জা পাবেন ।

মন না মতি
উল্কা বলে—তবে তুমি একলাই যাও। কিন্তু আমাকে
তোমার বন্ধু বলেই তুমি মনে রেখাে।
ব্রততী নীরবে স্নান দৃষ্টিতে উস্কার মুখের দিকে চেয়ে ঘর
থেকে বেরিয়ে চলাে।
উল্কা ব্রততীর হাত ধরে বলে—চলো, তোমাকে গাড়ীতে
ছড়িয়ে দিয়ে আসি।

পলাশ পলাতক। প্রেয়সীকে ধরবার জন্য তাড়াতাড়ি ইলেকূটিক আলাের ঝড় জ্বেলে দিতেই উল্কার স্থানে ব্রততীর আবির্ভাব দেখে এক মুহূর্ত সে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাে যে এ কী মায়ার খেলা। তার পরের মুহূর্তে তার মনে হলাে যে নিশ্চয় ব্রততী গােয়েন্দার মতন তার পিছনে পিছনে ছুটে এসে উল্কার স্থান অধিকার করেছে। এই চিন্তা মনে উদয় হতেই তার মন ব্রততীর প্রতি বিরক্তি ঘৃণা ক্রোধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলাে। কিন্তু তৎপর মুহুর্তেই তার আবার এও মনে হলাে ৫ ব্রততী তার পিছনে পিছনে এতাে দ্রুত এলো কেমন করে? বাড়ীর মােটর- গাড়ী তাে সে নিজে নিয়ে এসেছে ; ট্যাক্‌সি ডেকে আসতে তো দেরী হতো; আর সে কার সঙ্গেই বা এসেছে ? সে যদি এলােই তাে উল্কার স্থান সে গ্রহণ করলে কেমন করে? ব্রততীর আগমন জাতে পেরে উল্কার তো তাকে সতর্ক করে দেবার কথা, কিন্তু উল্কা তত দিব্য নিঃশব্দে অন্তর্হিত হয়েছে। তবে কি এই ব্রততী-বদল উল্কারই কারসাজী!—তবে মুহূর্ত এয়ের মধ্যে এই চিন্তা পলাশের মনের উপর দিয়ে বয়ে যেতেই তার লালসা এমন বীভৎস কুৎসিত মূর্তিতে তার মানস-নেত্রের সম্মুখে এসে উপস্থিত

মন না মতি
হলে যে পলাশ আর ব্রততীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে
না, উল্কার সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনাও তাকে লজ্জা দিয়ে তাড়না
করতে লাগলাে। তখন পলাশ নিজের লালসার কুৎসিত দৃশ্যের
ভয়ে ও লজ্জায় কাতর হয়ে সেখান থেকে পলায়ন করলে। সে
এক রকম ছুটে গিয়ে মােটরে উঠতেই শােফার গাড়ী বাড়ীর
দিকে চালিয়ে দিলে।
পলাশ গাড়ীতে বসে বসে ভাবতে লাগলো কী কুৎসিত
বীভৎস ব্যাপারই ঘটে গেলাে? উঃ কী দারুণ লজ্জা! এই
লজ্জা থেকে কোথায় সে লুকাবে? ব্রততীকে কেমন করে সে
মুখ দেখাবে? গৃহত্যাগ করে কোথাও পালিয়ে গেলে ব্রততীর
ব্যথিত-তিরস্কার-ভরা দৃষ্টি থেকে অব্যাহতি পাওয়া যেতে পারে ;
কিন্তু ঐ লজ্জা ত্মে শুধু ব্রততীর কাছে নয়, তার নিজের কাছেও
(তা সে লজ্জিত, নিজের মনের ধিক্কার থেকে সে পরিত্রাণ পাবে
কি উপায়ে ? আত্মহত্যা ? তাতে তার এই বৰ্তমান দেহটা
নষ্ট হবে, কিন্তু সে তাে যেমনকার তেমনি থেকে যাবে। তার
নিজের কাছ থেকে, ধর্মের কাছ থেকে, ভগবানের কাছ থেকে
পলায়নের পথ তাে কোথাও নেই। তবে এক ব্রততীর কাছ
থেকে পালিয়ে কি হবে? বরং তার হাত থেকে দণ্ড গ্রহণ করলে
ভার লজ্জা অনেক সহনীয় বােধ হবে।-পলাশ এই ভেবে
বাড়ীতেই ফিরে গেলাে।
পলাশবাড়ীতে গিয়েই অনুভব করলে—ব্রততীর গৃহলক্ষ্মী
মূর্তির সেবা যেনাে চারিদিকে মূর্তি ধরে তাকে সমাদর করে

মন না মতি অভ্যর্থনা কবৃছে। এতােদিন সে ব্রততীর সেবায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠাতে ব্রততীর এই কল্যাণীমুর্তি তার মনের সম্মুখে ঝাপসা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিলাে ; তার উপর ব্রততীর সঙ্গে ঘর করাতে তাকে কখনাে দানী কখনাে পাচিকা, কখনাে দাসী-চাকরের প্রতি ক্রুদ্ধা কখনো তার প্রতি অভিমানিনী দেখেছে ; তাতে ব্রততী পলাশের চোখে সাধারণ একজন রমণীর সামিলই হয়ে এসেছিলো। আর সেই সময় উল্কা তার সম্মুখে আবির্ভূত হলে আয়ত্তাতীত। মহীয়সী রাণীর রূপে! যখনই পলাশ উল্কার কাছে গেছে তখনই দেখেছে উল্কা ফিটফাট সুসজ্জিতা, আরাম-কেদারায় ললিত ভঙ্গীতে সমাসীনা! উল্কা রাণী, উল্ক। লাবণ্যময়ী, উকা মহীয়সী । সে যেনাে সংসারের সম্পর্কের বাহিরে, সে যেনো পরীস্থান থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে ! তার ক্ষুধা নাই তৃষ্ণা নাই, রাগ নাই, দ্বেষ নাই; সে শুধু কল্পনা ও কবিত্বে গঠিত, লাবণ্যে ললিত, মহিমায় মণ্ডিত। তার রােগ আছে, কিন্তু সেই রােগে তার শরীরের বাহ্যিক সৌন্দর্যের কিছুমাত্র হানি ঘটায় নি; বরং সেই গােপন আন্তরিক রােগে তার জীবন যে শঙ্কায় ও অনিশ্চয়তায় জড়িত হয়েছিলাে তাতেই তাকে আরাে দুলভ লােভনীয় করে তুলেছিলো। উল্কা এইরূপে লাবণ্যে হাসিতে কৌতুকে ঝলমল করছে, পরমুহূর্তে সে না থাকতে পারে, এই সম্ভাবনাই উল্কাকে অমূল্য অতুল্য করে তুলেছিলো। কিন্তু আজ উল্কা কঠিন আঘাতে তার মােহ ভেঙে দিয়েছে ; মােহমুক্ত দৃষ্টি সে নিজের গৃহের দিকে ফেরাইতেই সে দেখতে পেলে গৃহলক্ষ্মী ব্রততীর মন না মতি কল্যাণী মূর্তি! পলাশ বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করে প্রত্যেক ঘরে বেড়িয়ে বেড়িয়ে ব্রততীর নিপুণ গৃহিনীপনার চিহ্ন দেখতে লাগলাে। ক্রমে সে নিজেদের শয়নকক্ষে গিয়ে উপস্থিত হলাে। দরজার কাছে গিয়েই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাে। দরজার সানে লক্ষ্মীপীড়ির আল্পনা। পলাশ দেবমন্দিরে প্রবেশ করার মতন সন্তর্পণে ঘরের মধ্যে গেলো; সে দেখলে ঘরের মেঝেতে বৌ-বরণ আল্পনার উপর আল্পনা-দেওয়া পীড়ি পাতা আছে, সেই পীড়ির উপর তারই ফটোগ্রাফ ফ্রেমসুদ্ধ বসানাে আছে, সেই ছবির গলায় ফুলের মালা, সেই ছবির সামনে ব্রততীর স্বহস্ত প্রস্তুত আহাৰ্য্য-সম্ভার স্থাপিত ; চারিদিকে ধূপ ধুনা দীপ জ্বলছে। পলাশ দেখেই বুঝলে ব্রততী স্বামীকে না পেয়ে স্বামীর ছবিকে মাল্যচন্দন দিয়ে অর্চনা করেছে এবং নিজের প্রতি পরিবেষণ করেছে! এ যেনে রামচন্দ্রের স্বর্ণসীতা প্রস্তুত করে আর যজ্ঞ উদযাপন করা! পলাশের চোখে জল ছলছল করে উঠলো, লজ্জায় ও অনুশােচনীয় তার চিত্ত বিমথিত হতে লাগলো। আবার ধীরে ধীরে ঘর থেকে বাহির হয়ে এলো।

ব্রততী একাকিনী উল্কার মােটরে ছুটে চলেছে বাড়ীর দিকে ।
কিন্তু বাড়ী ফিরে যেতে তার ভয় করছিলাে। পথের ধারে
আলােগুলাে উল্কাপাতের আলােক-রেখার মতন মােটরের সামনে
এসে যেনাে ছিটকে পিছিয়ে পড়ছে ; ব্রততী আড়ষ্ট হয়ে বসে
তাই দেখছে। সে আকাশ-পাতাল ভাবছিলো—তার স্বামী ।
কি বাড়ীতে ফিরে গেছেন? তিনি কি আর তার কাছে মুখ ।
দেখাতে পারবেন? তিনি লজ্জায় গৃহত্যাগ করে যান নি তত ?
তার চেয়েও ভয়ানক কিছু করে বসেন নি তাে? সে যে ও
গােয়েন্দার মতন তার স্বামীর অভিসারের অনুসরণ করেছিলো ।
এই অপরাধ কি তিনি ক্ষমা করবেন। সেও কি নিজের কাণে
ও চোখে স্বামীর কথা শুনে ও আচরণ দেখে আর তাকে আগের
মতন পরিপূর্ণ বিশ্বাসের সহিত শ্রদ্ধা ভক্তি প্রীতি অর্পণ কতে
পাবে? অকস্মাৎ এ কী সর্বনাশ হয়ে গেলাে? এর চেয়ে
যে তার স্বামীর অধিকতর পাপাচরণও তার কাছে গােপন থাকা
:লা ছিলাে?
মােটর যতো ছুটে এগিয়ে চলেছিলাে ব্রততীর বুক ততাে

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mon Na Moti

Author
Bandyopadhyay, Charuchandra
Title
Mon Na Moti
File name
Mon Na Moti
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2009/08/6
Publisher
Sudhirchandra Sarkar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
106
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Other Genres.
Keywords
Mon Na Moti - Story
DLI number
512943
Barcode
4990010019968.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
XqfpdYj7cBW
Download PDF

Mon Na Moti