Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Apurbba Naibedya

Sen, Debendranath · 2010/04/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

অপুর্ন নৈক্যে।
শীদেবেন্দ্রনাথ সেন
প্রণীত ও প্রকাশিত।
১৭ নং গােয়াবাগান স্ট্রীট-কলিকাত
প্রিন্টার :—শ্ৰীযােগেশচন্দ্র অধিকারী।
মেট্‌কা প্রেসূ
৭৬ নং বলরাম দে স্ট্রীট, কলিকাতা।
৯ সাল ।
মূল্য কাগজ ও মলাটের রতম্য-অনুসারে

No text on this page.

মূল্যের তালিক টাকা। २ কাগজে ১১ এক টাকা। “অশােক-গুচ্ছ”—মুল্য- রেশমী বাধা ২, দুই টাকা, কাপড়ে দেড় টাকা, কাগজে ১২ “গােলাপ-গুচ্ছ”—মূল্য-রেশমী বাধা ২ দুই টাকা, কাপড়ে ॥ দেড় টাকা, কাগজে ১ এক টাকা। “পারিজাত-গুচ্ছ” মূল্য- -রেশমী বাধা দুই টাকা, কাপড়ে ০ টাকা, “শেফালি-গুচ্ছ”—মূল্য—রেশমী বাধা ১৮০ সাত সিকি, কাপড়ে | ০ পাঁচ সিকি, কাগজে ৭০ বার আনা। “অপূর্ব-নৈবেদ্য”- মূল্য—রেশমী বাঁধা ১৮০ সাত সিকি,কাপড়ে • পাচ সিকি, কাগজে ৭০ বার আনা। “অপূৰ্ব্ব-শিশুমঙ্গল”- (মূল্য- রেশমী বাধা রেশমী বাঁধা ১০ পাচ সিকি, পড়ে দ০ বার আনা, কাগজে ॥ আনা। “অপূৰ্ব্ব-ব্রজাঙ্গনা”- মূল্য—রেশমী বাধা ৮০ বার আনা, পড়ে ॥ আট আনা, কাগজে। চারি আনা। “অপূৰ্ব্ব-বীরাঙ্গনা”—মূল্য—রেশমী বাধা ৮০ বার আনা,কাপড়ে আট আনা, কাগজে • ছয় আনা। “হরিমঙ্গল”- মূল্য— আট আনা। “মালঞ্চ কাব্য”—চিত্তরঞ্জন দাস প্রণীত। মূল্য- রেশমী বাধা দেড় টাকা, কাপড়ে , এক টাকা, কাগজে ৮০ বার আনা। “দেবেন্দ্র-মঙ্গল”–শ্রীমোহিতলাল মজুমদার প্রণীত। / এক আনা। '? w,

No text on this page.

© সর্গ।
যাহার বাসন্ত হৃদয় চিরদিনই
লালে লাল অশােক-পুষ্পে রঙ্গিণ,
যাহার যশোনক্ষত্র ও ক্রতারার মত
সাহিত্যাকাশে
জ্বলজ্বল, জ্বলিতেছে,
যিনি অপূৰ্ব্ব সাহিত্য-রসে চিরদিনই রসিক,
যিনি নবীন লেখকদিগের সাহিত্য-গুরু,
ভক্তিদেবী যাহার সুন্দর হৃদয়কে অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্যস্বরূপ,
বিভুপাদপদ্মে অৰ্পণ করিয়াছেন,
সেই ঋষিকল্প মহাপ্রাণ
অক্ষয়চন্দ্র সরকারকে
এই “অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য
উপহারস্বরূপ সাদরে অর্পিত হইল।

No text on this page.

নিবেদন। কাল শারদীয়া পূজার আরম্ভ। শ্রীভগবানের অপার মহিমা- প্রভাবে ও তাহার ভক্ত-মণ্ডলীর আশীর্বাদ-বলে, গত দশ দিনের মধ্যে, আমার প্রণীত ও প্রকাশিত দশ খানি গ্রন্থ মুদ্রিত হইয়া, আজ (৩০এ আশ্বিন—বুধবারে) প্রকাশিত হইল। আমার বন্ধুবর সুকবি প্রবােধচন্দ্র ঘােষ-প্রণীত “দেউল” কাব্যও অদ্য প্রকাশিত হইত ; কিন্তু গ্রন্থখানির আকার কিছু ছােট হইয়াছে বলিয়া, তিনি এক্ষণে প্রকাশ করা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিলেন । সম্ভবতঃ কাব্যখানি ১০/১৫ দিবসের মধ্যেই প্রকাশিত হইবে। যাহাতে গ্রন্থগুলি এই কয় দিবসের মধ্যেই মুদ্রিত হইয়া প্রকাশিত হয়, তজ্জন্য পুত্রপ্রতিম শ্রীমা ভবতারণ সরকার বি, এ-শ্ৰীকৃষ্ণপাঠশালার হেডমাষ্টার—যার পর নাই পরিশ্রম করিয়াছেন। তাহার শরীর অত্যন্ত অসুস্থ ছিল, তথাপি তিনি “একা-একশত হইয়া খাটিয়াছেন। তাঁহার সাহায্য-ব্যতিরেকে এ “অসাধ্য কখনই “সাধ্য হইত না। আশীর্বাদ করি, তিনি সর্বপ্রকার আনন্দের ভাগী হউন। আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধুযুগল, চৈতন্য লাইব্রেরীর অধ্যক্ষ শ্ৰীযুক্ত গৌরহরি সেন মহাশয় ও সাবিত্রী লাইব্রেরীর অধ্যক্ষ শ্ৰীযুক্ত গােবিন্দ চন্দ্র দত্ত, মহাশয়—মুক্তহস্তে, নিজ নিজ লি [ ২ ] ব্রেরীর মাসিক পত্রাদি দিয়া, প্রেসগুলির জন্য কাপি প্রস্তুত করিবার সুবিধা করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহাদের অকৃত্রিম সৌহার্দ- গুণে, এই নয় দশ দিনের মধ্যেই আমার প্রায় সমস্ত গ্রন্থ গুলির কবিতা সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলাম। এজন্য আমি তাঁহাদের কাছে চিরঋণী হইয়া রহিলাম। গত দুই তিন দিবসের মধ্যে Acme প্রেসের আমার বন্ধুরা,কবি চিত্তরঞ্জন দাস, কবি প্রবােধচন্দ্র ঘােষও আমার ফটোর রক্ প্রস্তুত করিয়া ও ছবিগুলি প্রিন্ট করিয়া, আমাকে যারপর নাই সহায়তা করিয়াছেন। তাহাদের কাছেও আমি চিরঋণী হইয়া রহিলাম। বাণী প্রেস, এমের্যান্ড প্রেস, নিউ ইণ্ডিয়া প্রেস, সাণ্ডেল প্রেস, ভিক্টোরিয়া প্রেস, মোফ প্রেস, মোফ, প্রিন্টিং ওয়ার্কও আমার ধন্যবাদের পাত্র। সহৃদয় বন্ধু শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র মিত্র,স্নেহাস্পদ নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,মােহিতমােহন মজুমদার, কৃষ্ণবিহারী গুপ্ত, ভূতনাথ সাহা, নলিনীমােহন ঘােষ, নরেন্দ্রনাথ পাল ও কয়েকটি ছাত্র বিবিধ প্রকারে,আমাকে যথেষ্ট সাহায্যদান করিয়াছেন; এজন্য তাহারাও আমার ধন্যবাদের পাত্র। প্রশ্ন হইতে পারে যে, “অপূৰ্ব শিশুমঙ্গল”, “অপূর্ব নৈবেদ্য” প্রভৃতি “অপূর্ব হইল” কি প্রকারে ? ইহার উত্তরে করযােড়ে নিবেদন করিতেছি,—এই কাব্যগুলির অধিকাংশ কবিতাই শ্রীভগবানের উদ্দেশ্যে বিরচিত হইয়াছে। এইজন্যই তাহারা অপূর্ব! বড় মানুষের ঘরের ঝি চাকরও বড় মানুষ !

[ ৩ ]
“অশােক গুচ্ছ” কাব্যে “স্বর্ণলতা” কবিতার গৌর-চন্দ্রিকাটি
ভ্রমবশতঃ মুদ্রিত না হওয়ায় কবিতা ও পাঠক উভয়েই বিপন্ন
হইয়াছেন। সংক্ষেপে গল্পটি এই-স্বর্ণলতার পিতা ঘাের
মাতাল ছিল। তাহার বালিকা কন্যার হাতে একটি দুআনি
ছিল ; অনুরােধস্বত্ত্বেও, বালিকা সে দু-আনি মাতাল পিতাকে
দেয় নাই,এই জন্য পাষণ্ড পিতা কন্যার বুকে সজোরে
পদাঘাত করে। কন্যা মরিয়া গেল, কিন্তু সে নিজমুখে কন্যা-
হন্তার নাম প্রকাশ করে নাই।
অবকাশ-অভাবে “মালঞ্চের ভূমিকা লিখিয়া উঠিতে
পারি নাই। তা হউক Good wine needs no bush.
গ্রন্থগুলিতে শত শত ক্ৰটী রহিয়া গেল। আশা করি,
সহৃদয় পাঠকপাঠিকারা মার্জনা করিবেন।
বিনীত--
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ সেন।

No text on this page.

সূচীপত্র। পৃষ্ঠা। বিষয়। শ্রীহরির প্রতি শ্রীগৌরাঙ্গের প্রতি ১ ••• ••• ৭ সাবিত্রী উপহার সধবা হােমাগ্নি বিধবা শ্ৰীমতী স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রতি चाना ভারতী ৫ . . ৮ ••• ••• ••• L : ০ .. যমুনা নব তপস্বিনী ১৪ ••• ••• উমা-মঙ্গল ১৫ • • • ১৭ ••• ••• ১৯ ২০ পরিচয় জুলিয়েট মরেণ্ডা বিয়েটস এসেলিগু, দ্রৌপদী ডেডিমন ২০ ••• ••• ২১ ২২ yি বিষয়। পৃষ্ঠা। २४ ৩. এ । ২৫ ভ্রমর রােহিণী ক্লিওপেট। অফিলিয়া কোন বিশ্ব-নিন্দুক সমালােচকের প্রতি অপূৰ্ব্ব কবিতা-রূপসী মা বিবি ••• ২৮ ••• ৩০ ••• । । ৪ কোথা যাও হে তপন ? কবি করুণা-নিধানের প্রতি ভক্তবৰ শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি কবি-ভ্রাতা শ্রীযুক্ত চিত্তরঞ্জন দাসের প্রতি ৪১ ৪৪ লাবণ্য-লতা ••• ৪৬ ৪৮ কবি-ভগ্নী সরােজকুমারী দেবীর প্রতি ••• শান্ত শীল ••• রবীন্দ্র-মঙ্গল কবিবর রবীন্দ্রনাথের প্রতি অপূৰ্ব্ব কবিতা-সুন্দরী কবি কালিদাস রায়ের প্রতি অপূৰ্ব্ব কবিতা-রাণী ফতেগড়ের মা কালী ••• ••• রাজেশ্বর মণ বিষয়। পৃষ্ঠা। ৮s সুন্দর কবি সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি রাজা রামমােহন রায় ৫ ০ ০ ৮৫ সাধুর হাসি ৮৭ ৮৮ ৫০ ০ ••• এ ৫ + ৫ । ১১৩ ১১৪ - সুললিতা রাঙা মেয়ে বাবা মাথােদাস জী যােগমায়া গিরিজা সুন্দরী রাজলক্ষ্মী বঙ্কিমচন্দ্র কোকিল কবির জন্ম ডাক্তার হারাণচন্দ্র দাসের প্রতি গঙ্গাজল বর্ষামঙ্গল সরােজবাসিনী বঙ্গ সাহিত্য-কণ্ঠহার শ্রীযুক্ত বাবু, বলদেব পালিত মহাশয় শ্ৰদ্ধাদেযু পথে যেতে যেতে অপূৰ্ব সােণার মেয়ে চারি কন্যা ৫০০ ১১৮ ১১৯ . . . ১২৯ ১৩১ ১৩৩ রাঙ্গা মেয়ে

পৃষ্ঠা।
•••
১৪০
১৪২
বিষয়।
অপূর্ব রাঙা মেয়ে
টুকটুকে মেয়ে
আমার কবি-ভ্রাতার সাতটী নন্দিনী
অপূৰ্ব টুকটুকে মেয়ে
মেয়ের আদর
পেঁপে সুন্দরী
১৪৫
•••
১৪৬
৬৮।
১৪৮
•••
•
৫

No text on this page.

দেবেথ স• ।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
শ্রীহরির প্রতি।
ওগাে অখিলের স্বামি ! জানি আমি অতি অকিঞ্চন,
চিরদিন, চিরদিন গুণহীন, অধম পাতকী,
ভরসা তােমার দয়া শুধু ! রুক্ষ সেফালীর শাখী
হয় না কি প্রসূন-বৈভবময়, অপূর্ব-শােভন,
হিল্লোলে হিল্লোলে আহা পূর্ণিমার তরল কাঞ্চন
পড়ে যবে তরুশিরে? হিমক্লিষ্ট কাননের পাখী
মাধবের সাড়া পেয়ে, সহকার-আড়ালেতে থাকি,
ঝঙ্কারিয়া উঠে না কি, আলাপিয়া বাসন্তী কূজন ?
হে নাথ, যে অতিতুচ্ছ মৃত্তিকার চুলার উপরে
চুয়ায় গােলাপ-জল, তাও হয় সুরভি, সুন্দর,
পশে গােলাপের বাস যবে তার অন্তর-অন্তরে,
উথলিয়া উঠে তার স্তরে স্তরে লাবণ্য-লহর!
হে অপূর্ব গােলাপী-সৌরভ-উৎস!—আমি হীন মাটী,
তব স্পর্শে হর্ষে হব সুধাসিক্ত, অতি পরিপাটী !

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
শ্রীগৌরাঙ্গের প্রতি।
( ১ )
শুনিয়াছি,-বন হ’তে ধরি আনি বনের ময়না,
চতুর মানব তারে শিখাইতে মানবের ভাষা,
কত না প্রয়াস করে ! বৃথা চেষ্টা—হায় রে দুরাশা!
বন-পাখী গৃহকোণে ধায় ছুটি, প্রসারিয়া ডানা,
শিক্ষা পেতে নিতান্ত নারাজ ! সে যতন, সে সাধনা,
দীক্ষা দিতে তারে, ঘাের বিড়ম্বনা ! পাখী কৰ্ম্মনাশা,
গুরুর সে আকিঞ্চন, অনুযােগ, প্রীতি, ভালবাসা,
বােঝে না, শশানে না কিছু; পাখী ভাবে “এ কি রে লাঞ্ছনা!
পরাজিত গুরু শেষে, পাতে চুপে, কৌশলের জাল ;
বৃহৎ আৱসী আনি, রাখে ধীরে বিহগের পাশে
হেরি নিজ প্রতিবিম্ব, নেচে উঠে উৎসাহে উল্লাসে,
প্রতারিত বন-পাখী।—দর্পণের পিছে, অন্তরাল
হইতে, শিখায় গুরু ! মুগ্ধ পাখী শিখে সেই গান ;
সে ভাবে, গাইছে আরসীর পাখী! আনন্দে অজ্ঞান !
( ২ )
হে প্রভু! হে মহাগুরু ! আমরাও পাখীর মতন,
শিক্ষা, দীক্ষা সকলই, মােহে পড়ি করি অবহেলা ;
তাই তুমি হে চতুর! চুপে আন অদ্ভুত দর্পণ !
হে কৌশলি ! হে মায়াবি ! কে বুঝিবে তােমার এ খেলা ?
•

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
নরদেহ-দর্পণের অন্তরালে, গৌরাঙ্গ সাজিয়া,
কভু
সাজি যিশুখ্রীষ্ট, কভু সাজি গােকুলবিহারী,
আমি সবে শিখাইতে দেবভাষা——যাই বলিহারী ।--
কতই প্রয়াসী তুমি! শিখি মােরা আনন্দে মাতিয়া !
মাতােয়ারা, প্রেমসুধা পান করি, দুবাহু তুলিয়া,
আরসীর প্রতিবিম্বে হেরি আহা নিজের মূরতি,
হই মােরা মন্ত্রমুগ্ধ ! নেত্রে ভায় দেবতার জ্যোতিঃ ;
তােমার শকতি-স্পর্শে, হর্ষে নাচি, গাহিয়া গাহিয়া !
কে শিখিত দেবভাষা, মহাকবি ! তুমি না শিখালে ?
কে নাচিত দেব-নৃত্য, নটবর ! তুমি না নাচালে ?
মা।
তবু ভরিল না চিত্ত ! ঘুরিয়া ঘুরিয়া
কত তীর্থ হেরিলাম ! বন্দিনু পুলকে,
বৈদ্যনাথে ; মুঙ্গেরের সীতাকুণ্ডে গিয়া
কাঁদিলাম চিরদুঃখী জানকীর দুঃখে ;
হেরিনু বিন্ধ্যবাসিনী বিন্ধ্য আরােহিয়া ;
করিলাম পুণ্যস্নান ত্রিবেণী-সঙ্গমে ;
“জয় বিশ্বেশ্বর” বলি ভৈরবে বেড়িয়া,
করিলাম কত নৃত্য ; প্রফুল্ল আশ্রমে,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য । রাধা-শ্যামে নিরখিয়া হইয়া উতলা, গীত-গগাবিন্দের শ্লোক গাহিয়া গাহিয়া ভ্ৰমিলাম কুঞ্জে কুঞ্জে ; পাণ্ডারা আসিয়া গলে পরাইয়া দিল বরগুঞ্জ-মালা। তবু ভরিল না চিত্ত ! সব-তীর্থ-সার, তাই মা, তােমার পাশে, এসেছি আবার। সাবিত্রী। [ আমার পিতৃদেবের স্বর্গারােহণ উপলক্ষে এই কবিতাটি অামার মাতাঠাকুরাণীর পাদপদ্মে উপহার-স্বরূপ অর্পিত হইল। ] গেল রাত্রি, এল দিবা; কি বিচিত্র বিভা ( অন্ধ আমি) মম চক্ষে ধীরে এল নামি। —হে সাবিত্রি, তব নাম বঙ্গের বিধবা, হে বিধবা, সত্যবান্ তােমারই স্বামী! রাশ নাম ডাক নাম দ্বিনাম-ধারিণী হে সাবিত্রি পৌরাণিক, হে বঙ্গ-বিধবা, হেরি তােমা, (অরণ্যেও তুমি রাজরাণী ) বৈভবের পদসেবা ইচ্ছা করে কেবা ? কৃষ্ণা চতুর্দশী নিশি! নির্মম অরাতি কাল-ফণি, সত্যবানে করিল দংশন- হে মৃত্যু, ক’র না স্পর্শও কি সুধু স্মৃতি?

অপূর্ব নৈবেদ্য।
ও কি শুধু একাদশী ব্রত-উদ্যাপন ?
হে কৃতান্ত, সরে যাও–সাবিত্রী সুন্দরী
স্বামি-দেহ বক্ষে করি জাগিছে শর্বরী।
উপহার।
বঙ্গসাহিত্য-কণ্ঠহার কবিবর শ্রীযুক্ত বাবু বলদেব
পালিত মহাশয় শ্রদ্ধাস্পদেষু।
প্রদোষে গায়ক যথা তটিনীর তীরে,
প্রাণের নির্যাস ঢালি গায় ধীরে ধীরে ;
দেহশূন্য প্রেত-প্রায় করি “হায়! হায় !”
নদীবক্ষে সেই সুর ভাসিয়া বেড়ায় ;
ক্ষীণতরক্ষীণতর—অস্ফুট হইয়ে,
নদীর কল্লোলে শেষে যায় মিশাইয়ে ;
আমিও তেমতি, দেব ! সংসার-সাগরে,
গ্রীক-কবি-সােয়া-সম, * কাতর অন্তরে
গাইগাে আসন্ন-গীতি, পরাণ ঢালিয়া ;
কালের তরঙ্গে সুর যাবে মিলাইয়া।
আমি ও আমার সুর এক এবে হায়,
তােমার দেবেন্দ্র, দেব ! নাহি এ ধরায়।
The swan of the Greek poets,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
নয়নের জ্যোতিঃ মাের গিয়াছে নিবিয়া ;
দশন-গহ্বরে হায় গিয়াছে বসিয়া
কঠোর অধর এবে ; অবশ এ কর,
লিখিতে বসিলে পরে কাঁপে থর থর ;
হেরি চরণের গতি কত নর-নারী
স্মের মুখে, ঘৃণা-চোখে, দেয় টিটকারি ;
দয়েল, কোকিল, শ্যামা গিয়াছে উড়িয়া,
অস্থির পিঞ্জর সুধু রয়েছে পড়িয়া ;
চিনিতে নারিবে মােরে হেরিলে সহসা,
শিহরি উঠিবে শেষে হেরিয়ে দুর্দশা ;
;
;
সধবা।
“অশ্রুকণা” পাঠান্তে।
বিধবা সে; আমি তারে ভাল করে চিনি
সবে করে উলুধ্বনি, ছানা তলায়,
‘এয়াে’ সবে দীপ হস্তে কৌতুকে দাড়ায় ;
উৎসব ছাড়িয়া গৃহে চলিল রমণী !
পথে যেতে যেতে, এক অশােকের তলে,
চমকি থমকি বালা দাড়াইল ত্রাসে!
“হে সধবা, কোথা যাও ?” ক যেন রে বলে,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
জ্যোৎস্নার আবছায়ে, মধুর সম্ভাষে!
জ্যোৎস্না কহিল রঙ্গে শ্রীঅঙ্গ জড়ায়ে,
“চল, আলি, আমি তাের বারাণসী চেলি,”
আঁধার কহিল যত্নে, চরণে লুটায়ে,
“আমি ওই চেলির অঞ্চল ঝিলিমিলি।”
অশােক পড়িল ঝরি সীমন্ত-উপরি ;
বাসর জাগিতে হর্ষে ফিরিল সুন্দরী!
হােমাগ্নি।
পূজনীয়া শ্ৰীমতী মােহিনী দেবীর “স্মৃতি”-শীর্ষক কবিতা
পাঠ করিয়া লিখিত।]
কি মন্ত্র শুনালে আজি, বিশ্ববিমােহিনী,
অয়ি যাদুকরী কবি ? এ কি শােকগাথা?
এ তাে নহে বিষ—এ যে সুধা-নিঝরিণী
চন্দন প্রলেপে যেন জুড়াইলে ব্যথা।
দীপ্তমণি-শিখা মাঝে পড়ে গাে যেমতি
পতঙ্গ অনলভ্রমে অপূর্ব হরষে ;
তবু নাহি হয় দগ্ধ ;-আমিও তেমতি
তােমার ও কবিতার জ্বলন্ত পরশে ।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
হে সুন্দর শিক্ষাদাত্রি ! কি অপূর্ব শিক্ষা
পাইলাম—পাইলাম দিব্যচক্ষু আজি !
( গুরুমন্ত্রে শিষ্য যথা পেয়ে নবদীক্ষা
লভে গাে দ্বিজত্ব চারু) একি ভােজবাজী।
বুঝিয়াছি “লােলজিহ্বা দীপ্ত দুঃখানল
নহে, নহে চিত-শুভ্র হােমাগ্নি উজ্জ্বল ?”
চিনেছি ;
বিধবা ।
[ কবিকুল-নেত্রী শ্রীমতী গিরীন্দ্র মােহিনী
দাসীর উদ্দেশে বিরচিত।]
চিনাতে আর হবে না তােমায়।
বঙ্গের বিধবা তুমি আজন্ম-দুঃখিনি !
শ্মশান হইতে আনি এক মুষ্টি চিতানল,
জ্বালিয়ে রেখেছ বক্ষে দিবস যামিনী।
চিনিয়াছি ;
চিনিবার নাহি কিছু বাকি।
স্বামীর চিতার পাশে দাড়ায়ে কৌতুকে,
পবিত্র সে চিতারজঃ, আগ্রহে দু’ভুজে ধরি,
মাখিলে আননে, বক্ষে, চরণে, অলকে।
চিনিয়াছি ; কে না জানে তােমার কাহিনী?
সেই সে প্রয়াগ তীর্থে, ত্রিবেণী সঙ্গমে,
;

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
আগুলফ-লম্বিত কেশ, মুড়াইয়া হেসে হেসে,
পালিলে গাে অনায়াসে সতীত্ব-ধরমে।
;
চিনিয়াছি ; খ্যাতি তব বিশ্বচরাচরে।
শ্মশান-মন্দির-তটে তরঙ্গিণী-তীরে,
রূপকান্তি, সুখশান্তি, বিচিত্র নৈবেদ্যরাশি
ভক্তি ভাবে, বিসজ্জিলে জাহ্নবীর-নীরে।
চিনিয়াছি; ভুলিবার নহে ও মূরতি !
স্বামী সাথে সব সাধ করি বিসর্জন,
বৈশাখের তীব্র তৃষ্ণা, চির নিবৃত্তির তরে
গষে করিলে পান জাহ্নবী-জীবন ।
চিনিয়াছি ; তপস্বিনি, তােমারাে শরীরে,
প্রকাশ পাইছে সব সেই যে লক্ষণ।
সেই ম্লান অধােদৃষ্টি, সেই ক্ষম অঙ্গযষ্টি,
সেই আধ জাগরণে বিহ্বল নয়ন।
চিনিয়াছি; তবে মাের কেন এ ক্রন্দন ?
(হে ভগিনি, এই দেখ মুছিনু নয়ন।)
স্বামীর আছিলে আগে, হে সুন্দরি, এবে তুমি
বিপুল বঙ্গবাসীর আপনার জন !
;
চিনিয়াছি ; তাই বন-তুলসীর মালা
আনিয়াছি তব তরে, দেখ তপস্বিনি।

১
অপূর্ব নৈবেদ্য।
তােমার শ্রীকণ্ঠে উঠি আমারাে এ বনমালা,
ধরিবে অপূর্ব শােভা, হে কবিভগিনি।
শ্ৰীমতী স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রতি।
•
[ তাহার নভেগুলি পাঠ করিয়া।]
বঙ্গবন্ধু,কারাগারে সুচির-বন্দিনী,
দৈবযােগে পায় যদি করিতে ভ্রমণ
মালঞ্চে ; কতই গাে হয় সে সুখিনী !
বকুলে চম্পকে করে অঞ্চল পূরণ,
কুঞ্জে কুঞ্জে ছুটাছুটি করে সােহাগিনী ।
( যেন কোন লীলাময়ী চঞ্চলা তটিনী !)
তােমার মানস-কুঞ্জে ভ্ৰমিয়া ভগিনি,
তেমতি এ হিয়া মোর হয়েছে সুখিনী !
উচ্ছসিনী, উল্লাসিনী, উন্মাদের পারা,
কবি-হিয়া হয় যথা নবীন জীবনে
সাগরােৰ্ম্মি দরশনে ; কিম্বা আত্মহারা,
হেরিয়া অলকানন্দা হিমাদ্রি-ভবনে ;
কিম্বা যথা তীর্থযাত্রী বারাণসী গিয়া,
হেরে অন্নপূর্ণা-মূর্তি অবাক হইয়া !

অপূৰ্ব্ব মৈলে।
আনন্দ।
;
{ গল্পসল্প পাঠ করিয়া।]
চাহি না চামেলি, বেলা, কেতকী, মােতিয়া ;
বিখ্যাত গাজীপুরের গােলাপী আতর ;
চাহি না মৃগকস্তুরী, সৌরভে ক্ষেপিয়া,
আপনি হরিণ যাহে হয় রে কাতর!
আমি চাহি ঝুরু ঝুরু মলয়া-বাহিত,
বন-তুলসীর এই গন্ধ মনােহর ;
সরলা বনদেবীর সােহাগ-রঞ্জিত,
দোপাটির অতি মৃদু সৌরভ সুন্দর !
কুহু-কুহরিত আর অলি-মুখরিত,
নিভৃত কুঞ্জভবনে, বসিয়া বসিয়া,
আমার এ কবি-হিয়া হয় উলসিত,
বন-সারিকার মৃদু সম্ভাষ শুনিয়া !
নিম্নে সুধু ঝাড়, নৃত্য, আলােক, সঙ্গীত ;
আমার এ ছাদ ভাল—জ্যোৎস্না-আকুলিত।
;

১২
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
ভারতী।
আমার কবি-ভগিনী শ্রীমতী স্বর্ণকুমারী দেবী ভারতী-সম্পাদিকার
করকমলে, এই কবিতাটি উপহারস্বরূপ অর্পিত হইল। ]
বসন্তপঞ্চমী নিশি! দেখিনু স্বপন
কি অদ্ভুত ! বসিয়াছে বীরাঙ্গনা-মেলা !
খনার অলকগুচ্ছে তারকার মালা
দুলিছে ; পরিয়া মরি অঙ্গুরি-রতন,
হাসিছে পােশীয়া, * রঙ্গে নাচিছে নয়ন।
বামা এক ( জ্যোতির্ময় স্থির আঁখি-তারা)
আঁকিছে রমলা-মূর্তি না হয়ে আত্মহারা,
হেরিছে অবাক হয়ে মুখর ভুবন !
অন্য বামা করিনেরে করিছে চুম্বন,
ক্রোড়ে ল’য়ে, স্নেহময়ী জননী-মূরতি ।
কোনাে বামা বীণাকণ্ঠে করে গুঞ্জরণ,
অকালে মুঞ্জরী উঠে বসন্ত-ব্রততী !
সব মূৰ্ত্তি হ’ল এক ; মধুর আকৃতি,
একি! একি!—শিয়রেতে বঙ্গের ভারতী।
Portia. + Romola.
Corinne.

অপূর্ব নৈবেদ্য ; যমুনা। | শ্রীমতী কামিনী সেনের “যমুনা-কল্পনা” পাঠ করিয়া মােহিত হই- ছি। স্ত্রীকণ্ঠে এমন সুন্দর সঙ্গীত খুব কম শুনিয়াছি। আমার এই কবিতাটি তাহার করকমলে উপহারস্বরূপ অর্পিত হইল। বলা বাহুল্য, ইহা তাহারই কবিতার ম্লান প্রতিধ্বনি মাত্র।] ধীরে ঊষাকর ধরি, নামিল সুন্দরী, নীল কালিন্দীর নীরে ; আকণ্ঠ ডুবিয়া, বিশ্বের পীরিতি নিল অঞ্জলিতে পূরি; অমৃত করিল পান অবাক হইয়া । সহসা আঁখির জল গেল তার সরি ; হেরিল সে সবিস্ময়ে, বাজিছে বাঁশরী, যমুনা উজান বহে আবেশে শিহরি, শ্যামা-জলে ভেসে গেল গােপিনী-গাগরি ! “কোথায় গাগরি!” বলি চারু চন্দ্রাবলী করে রঙ্গ ; ব্যঙ্গ করে দিয়ে করতালি ; রাধাপদ্ম করে লয়ে, রাধার সহেলি সাজায় শ্যামেরে ; হর্ষে হাসে বনমালী। হে সুন্দরি ! ও কি ওই যমুনা বহিছে ? তােমারি কবিতা ও যে গাহিয়া চলেছে। ;

১৪
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
নব তপস্বিনী।
ঠি
| আমি দেখিতে পাই, বালিকা-কবি শ্ৰীমতী সরােজকুমারী দেবী ও
মতী প্রমীলা বসু, উদাস খেদোক্তিময় কবিতা লিখিয়া থাকেন।
করিলে, চিত্তে যুগপৎ হর্ষ ও বিষাদের উদয় হয়। তাহাদিগকে সম্বােধন
করিয়া এই কবিতাটি রচিত হইল।]
নিবাও নিবাও শীঘ্র ; এত কি আমােদ?
জ্বালিছ সাজের দীপ হয়ে কুতূহলী !
দেখিছ না ? এখনাে যে এক ছাদ রােদ !
উচিত এ উদ্বোধন আইলে গোধূলি ।
দুপুরে কি বাজে সখি, ঝিল্লির নূপুর ?
তুমি কি ভেবেছ ওই বৈকালী যুথিকা
ফুটিয়াছে ? হায় হায় ক্রুর পিপীলিক।
কুসুমের মৰ্ম্মে পশি করেছে আতুর ।
কল্পনার শিল্পশালা নিরালায় বসি,
মধ্যাহ্নে ধরেছ কেন পূরবী রাগিণী ?
থাম থাম ; চিত্রগুলি পড়ে খসি খসি !
রঙে রঙে মেশামিশি আপনা আপনি .
কোথায় চিত্রিব আমি অনঙ্গমােহিনী,
হাদে দেখ, চিত্রিয়াছি শঙ্কর-ঘরণী !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
-মঙ্গল।
[ কবি-ভ্রাতা শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত বাবুর শিশুকন্যার ফোটো-দশনে
এই কবি কয়টি রচিত হইয়াছে।]
চিত্র।
;
এ কি চিত্র ! সৌন্দর্য্যের জাগ্রত প্রতিমা
শােভিছে বালিকা-বেশে; লাবণ্য-লহরী
এলান কুন্তল-জালে রাজিছে আ মরি ।
ফুল্লানেত্রে ফুল্লাধরে একি শ্যামলিমা !
চির-বসন্তের রাজ্য-মহিমা-গরিমা
হয়েছে প্রচার আহা শিশুর হৃদয়ে ।
রাশি রাশি দৃষ্টি-অলি ও রূপ-নিলয়ে
পড়ে গিয়া ; হের দেখ কণ্ঠের ভঙ্গিমা।
জলধি-ভবনে যেন বালিকা কমলা,
এক দৃষ্টে হেরিতেছে, ঝলকে ঝলকে
ঝলসে রতন বিভা! প্রশান্ত, সরল,
শিশু গৌরী হেরে যেন জলদে চমকে
চপলা আকাশ-বালা ; অদূরে শিখিনী
নাচে রঙ্গে; আর্দুনেত্র মেনকা-জননী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
;
২
থাক্ মা, থাক্ মা, তুই কবির শিয়রে,
চির-নব, চির-ঊষা, চির-জ্যোৎস্না-রূপে।
কবি-কর্ণে বাজে শঙ্খ উৎসব-বাসরে--
ভরে যা মাের গেহ দেহ-গন্ধ-ধূপে!
চির-সরলতা তাের, চির-মধুরতা,
বাঁধা পড়িয়াছে এই চিত্রের মাঝারে
ভাগ্যবান্ আমি, তাের চির-প্রফুল্লতা
বিকচ ফুলের সাজি দিতেছে আমারে ।
চির হাসি, চির শান্তি, সংসার-নিদাঘে,
মধুর উজ্জ্বল দৃষ্টি আশঙ্কা সন্দেহে,
থাক্ মা, থাক্ মা, হেথা ; দীপ্ত অনুরাগে,
হােক চির-দুর্গা-পূজা দরিদ্রের গেহে।
কি আনন্দ! চিত্রে বদ্ধ তাের বরতনু ;
দেবেন্দ্র-ভবনে যেন চির-রামধনু !
অয়ি কন্যা, পেয়েছিস্ কি মহিমা তুই
চিত্রমাঝে ! সংসারের শােক তাপ জরা
পশিতে নারিবে তােরে ; অজরা, অমরা,
চিরানন্দ-নিকেতনে লাে আনন্দময়।
ওই তাের তরঙ্গিত কেশের কলাপ,
করিবে আলাপ সদা স্কন্ধ সাথে তাের !

অপূর্ব নৈবেদ্য।
ওই তাের “হেঁসােহার”, যেন চন্দ্ৰচাপ,
নিশি দিন পাবে শােভা গৃহাকাশে মাের,
বিবাহ-রজনী উমা হবে যবে ভোের,
জনক জননী তাের কেঁদে হবে সারা,
কিন্তু মেয়ে, রবি তুই গৃহমাঝে মাের,
চির-কুমারীর রূপে, রূপের ফোয়ারা।
হবে না এ মুখ স্নান, হাস্যগীতি বন্ধ ;
পৰ্বে পর্বে পূজা তুই, ত্রিদিব আনন্দ।
পরিচয়।
১
এত দিন কোথা ছিলি পাগলিনী মেয়ে ?
বসে আছি তোের ওই আশা-পথ চেয়ে !
সুধাংশুমণ্ডলে তুই, ছিলি কি আনন্দময়ি,
চকোরেরা উড়ে যথা সুধা-সর ছেয়ে ?
জ্যোৎস্না-কিরণ মাথে, তুইও তাদের সাথে,
খেলাতে মগন ছিলি গান গেয়ে গেয়ে ?
এত দিন কোথা ছিলি পাগলিনী মেয়ে ?
২
এতদিন কোথা ছিলি পাগলিনী মেয়ে ?
পড়ে আছি তাের ওই আশা-পথ চেয়ে !

১
অপূর্ব নৈবেদ্য ।
অপরার কণ্ঠে যথা, আরক্ত অপরাজিতা,
পারিজাত-লতাগুলি উঠে বেয়ে বেয়ে,
তুইও ইন্দ্রাণী-গলে, হেলে দুলে, কুতূহলে,
ছিলি লগ্ন, মগ্ন দেবী তাের স্পর্শ পেয়ে !
এতদিন কোথা ছিলি পাগলিনী মেয়ে ?
এত দিন কোথা ছিল পাগলিনী মেয়ে ?
পড়ে আছি এই বিশ্বে তাের পথ চেয়ে !
মনে নাই ? তাের সঙ্গে, সপ্ত ঋষি-ধামে রঙ্গে
অরুন্ধতী-পদধূলি মাখিতাম ধেয়ে !
রােহিণী গাহিত গান, মঙ্গল ধরিত তান,
তাের ওই কচি কচি মুখ-পানে চেয়ে !
এত দিন ছিলি কোথা পাগলিনী মেয়ে ?
৪
এত দিন ছিলি কোথা পাগলিনী মেয়ে ?
আছি পড়ে দুনিয়ায় তাের পথ চেয়ে !
শুনিয়া বেসুরা গান, মর্মাহত মাের প্রাণ ;
ফেলেছে ধরার ধূলা প্রাণতন্ত্রী ছেয়ে !
বিশ্বে আনাে সুরপুর, বেসুরা হউক দূর
পুরাতন সঙ্গী আমি, মাের পানে চেয়ে,
গাও গান কল-তান ; লজ্জা কি লাে মেয়ে ?
-

অপূর্ব নৈবেদ্ধ।
;
জুলিয়েট।
লাল, নীল, শ্বেত, পীত স্বর্ণবর্ণরাজি,
পুষ্পেপরি পুষ্প ঢালা, পরতে পরতে ;
শিশির ও জ্যোৎস্না ঢালা সঙ্গীতের স্রোতে ;
কি বিচিত্র সমাবেশ ! এ কি ছায়াবাজী ?
বসন্ত-উৎসব-দিনে, মালাকার সাজি,
কি গড়িলে একচিত্তে অনঙ্গমােহিনী ?
ঘূর্তিময়ী মূর্তি এ যে! স্মর-সােহাগিনী,
ক্লান্ত তুমি ;-ঘুমাও, ঘুমাও, দেবি আজি ।
চুপি চুপি, ধীরে তথা, আসিয়ে মদন,
বিচিত্র সে পুষ্পমূর্তি অবাক নেহারি !
মুগ্ধ স্মর, কর্ণে তার করি উচ্চারণ
অগ্নি মন্ত্র, “উঠ, উঠ” কহিলা ফুকারি-
বিস্ফারি যুগল নেত্র, মূরতি হাসিল,
“আমি জুলিয়েট” বলি, উঠি দাড়াইল।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
মিরেণ্ডা।
দেখিনু অদ্ভুত স্বপ্ন। পূর্ণিমা শর্বরী ;
নিথর শান্তির রাজ্যে সুধাকর হাসে।
সহসা উঠিল ঝড়, তােলপাড় করি
স্বর্গ মর্ত্ত ; ম্লান শশী কপিল তরাসে।
ব্যোম যাদুকর কিন্তু করিয়া জকুটি,
থামাইল ভীম বাত্যা; মেঘ নাট্যশালে,
অদ্ভুত অপ্সর-বাদ্য বাজে তালে তালে।
কি অদ্ভুত! অন্তরীক্ষে নাচে নটনটী ।
আমারাে স্বপ্নের কায়া ব্যোম যাদুকর
দিল কি বদলি ? এ কি চমৎকার হেরি ?
চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেল চন্দ্ৰ-কলেবর ;
দেখা দিল রঙ্গভূমে, এ কোন্ কিন্নরী ?
তুমি কি মিরা ? কিম্বা আকাশের শশী ?
বুঝিব কি ? দৃশ্যে আঁখি গেল যে ঝলসি ।
বিয়েটী।
কল্পনার চিত্রশালা-নিরালায় বসি,
আঁকিতে এ ব্যাপিকারে তুলিনু তুলিকা
হেরিলাম বিভীষিকা !—যেন অগ্নিশিখা
বায়ু-অঙ্গে রঙ্গ ভঙ্গে যাইতেছে মিশি,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
২১
কোথা হতে, ঝটপট, উড়ে এল নুরী ;
সমৃণাল রক্তপদ্ম, বায়ু-স্রোতে ভাসি।
কোথা হ’তে ভৃঙ্গ এল, গুঞ্জরি গুঞ্জরি ;
ঢালি দিল অঙ্গে মাের বােষ বিষ-রাশি।
হেরি এ বিবশা দশা, হাসি উচ্চহাসি,
কে যেন রে নারীকণ্ঠে দিল টিটকারি ।
“আ মরি কি চিত্রকর । যাই বলিহারি !”
দিয়া ঘন করতালি, কহিল সম্ভাষি।
ঘুরে গেল চিত্র আঁকা, হেরি বিভীষিকা ;
উছলি পড়িল রঙ,—ভাঙিল তুলিকা!
রসেলিণ্ড।
বাল শরতের কোথা রজত-নীরদ,
আলােতে বায়ুতে যাহা মিলায় চকিতে?
কোথা সে বাসন্তী ঊষা, পদ-কোকনদ
হেরি যার, ভাসে কুঞ্জ স্বর লহরীতে ?
কোথায় সে নিঝরিণী মুকুর-রূপিণী,
দেখায় যা স্থিরাকাশে নব তারাবলী ?
আবার (সে নবরঙ্গে সতত রঙ্গিণী
রবি-কর মাখি অঙ্গে, নাচে হেলি দুলি!
হেলি দুলি, যেন সবে, করি গলাগলি) ;

२२ অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য। এস এস, কবি চিত্তে, বােস আসি সবে ; চিনিতে কি পারিলে না ? দেখ আঁখি মেলি, তােমাদেরি সখী হেথা ব’সেছে গৌরবে। রসময়ী রসেলিণ্ড রঙ্গিণী সঙ্গিনী ! হাস উষা, ভাস মেঘ, নাচ নিঝরিণি ! দ্রৌপদী | Tyndall. Huxley, Spencer, Darwin- প্রভৃতি জড়বাদীদিগের গ্রন্থ পাঠান্তে । হে প্রকৃতি। যত তােমা নেহারি নেহারি, তত নব নব শােভা চর্মচক্ষে ভায় ! হে দ্রৌপদি । যত তােমা উঘারি উঘারি, নগ্ন করা দূরে থাক, সাটী বেড়ে যায় ! অশােক, চম্পক, পদ্ম, অতসী, কাঞ্চন, অনন্ত সাটীতে ঘেরা, অদ্ভুত ঘাঘরি ! প্রকৃতি সতীর আহা লজ্জা-নিবারণ, অন্তরীক্ষে, চুপে চুপে, যােগান শ্রীহরি। ক্ষম দেবি! অপরাধ, বিশ্বের জননি । মােরা সবে দুঃশাসন, দাম্ভিক অজ্ঞান !

২৩
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
সমুচিত প্রায়শ্চিত্ত !—তপ্ত রক্ত পান
করুক নৈরাশ্য-ভীম, করি জয়ধ্বনি।
মােরা যত কুলাঙ্গার, নিৰ্বাক্ নীরবে,
সভামাঝে, অধােমুখে, বসে আছি সবে।
ডেডিমনা।
ভৃঙ্গ এক, বসি ধীরে, অতসীর পাশে,
কহিল প্রাণের কাণে গুঞ্জরি গুঞ্জরি ;-
“লাে অতসি, বীর আমি, নবীন উল্লাসে,
কান্তারে কান্তারে ভ্ৰমি, আপনা পাশরি !
গােলপ-কেতকী-পদ্ম-দুর্গম-আবাসে,
যথা তথা গতি, আমি ভুবন-বিহারী !
ভাল কি বাসিবে মােরে ?”—মৃদু মন্দ হাসে
কহিল অতসী, “দেব, আমি গাে তােমারি !”
কাঁদি গেল প্রজাপতি বিচিত্র-বরণ ;
এ কেমন পূর্বরাগ অতসী রূপসী ?
যাদুকর ভৃঙ্গ আসি, করি গুঞ্জরণ,
সরল চিত্তের আঁখি দিল কি ঝলসি ?
প্রেমরাজ্যে নহে ইহা অপূর্ব কাহিনী ;
সাক্ষী তার ডেসডিমােনা বিশ্ববিমােহিনী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
ইলা।
| রবীন্দ্র বাবুর “রাজা ও রাণী”পাঠ করিয়া ।
কবিচিত্ত-নন্দনেতে, সুমিত্রা ভামিনী,
ফুল্ল মৃণালিনী যেন, রবির দুলালি !
হে ইলা, হে কুমারের চির সােহাগিনি,
তুই কি লাে অতি মৃদু যূথিকা বৈকালী ?
তুই কি বন-মালতী, কানন-বাসিনি ?
তুই কি লাে ক্ষুদ্র কুন্দ, মল্লিকার আলি ?
-না-ইলা-তুই চির-আনন্দদায়িনী,
শরৎ-মুকুট-শােভা, সুন্দর সেফালি ।
কঠিন কঠোর শাখে জনম লভিলি
জোছনার আবছায়ে, মরম খুলিয়া,
শাদা প্রাণে, রাঙা ঠোটে, হাসিয়া, কাঁদিয়া,
নিশান্তে, অশ্রুর সাথে, ঝরিয়া পড়িলি ?
আমি পান্থ, যেতেছিনু বনপথ দিয়া,
মােয়রা প্রাণে ওই বাস গেল জড়াইয়া ।
•

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
ভ্রমর।
( বঙ্কিমবাবুর “কৃষ্ণকান্তের উইল” পাঠ করিয়া )
ফলফুলে ভরা সেই মালঞ্চ মধুর
স্থানে স্থানে চন্দ্রাতপ শ্যামল পল্লবে ;
কোকিল-কূজনে নাহি বিরহের সুর ;
গরল মাখান নাই কুসুম-আসবে,
মধু পিয়ে প্রাণ কভু হয় না আতুর ;
শিরে ব্যথা নাহি বাজে রবির কিরণে ;
ভ্রমরের গুঞ্জরণে হর্ষ ভরপুর ;
মলয়া ঝটিকা-স্বপ্ন হেরে না স্বপনে !
কে অই দাড়ায়ে হােথা শ্যামাঙ্গিনী ধনী
যেন রে অপরাজিতা সুনীল বসনে !
পুষ্পময়ী এ প্রহরী পুষ্পের উদ্যানে,
অনুপম অপরূপ মালঞ্চ মালিনী।
হে পান্থ, এ পুষ্প-সেবা, দু’চরণে দলি,
ত্যজি এ ভ্রমরকুঞ্জ গেলে কোথা চলি ?
রােহিণী।
হেম শৃঙ্গ।ইন্দ্রধনু বিচিত্র বরণে,
মেঘের কাঞ্চন-দেহ করিছে রঞ্জিত ।
আপনি বাজিয়া উঠে, বিচিত্র বাদনে,
তরু-দেহ, লতারাজি, বায়ু-আন্দোলিত।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
সুখের আবেশে আর মােহের স্বপনে,
তরল পান্থের প্রাণ হইল মােহিত।
বাড়িল রূপের তৃষ্ণা, মধ্যাহ্ন-জীবনে ;
জল-অন্বেষণে পান্থ হইল ধাবিত।
উঠিল তুফান ঘাের!—পৰ্বত বিদারি,
শৃঙ্গ হ’তে, শৃঙ্গান্তরে, নিঝরিণী ছােটে ;
কুহকী অপ্সরী আসি, দু’ভুজ প্রসারি,
পথিকের ক্লান্ত দেহ ধরিল সাপটে !
পান্থ কহে প্রাণ যায়, দাও মােরে জল”
রােহিণী অপ্সরী দিল ঘাের হলাহল।
ক্লিওপেট্রা।
কভু তুমি লােলজিহ্বা বিকট সর্পিণী ;
রাসলীলাময়ী কভু মােহিনী অপ্সরী!
কভু সিংহিনীর বেশ, কভু বা হরিণী,
কি অদ্ভুত বহুরূপী তুই লাে মৈশরি ।
ক্রোধের আগ্নেয়গিরি, হাস্যতরঙ্গিনী !
চাহ এন্টনির পানে যে মূরতি ধরি,
ঝলকে ঝলকে তব, হে বর-রঙ্গিণি,
পাঙ্গে ঝরিয়া পড়ে অপূর্ব মাধুরী
হেরিলা প্রকৃতি দেবী, বসি নীল নভে,
( পলকে বদলে যবে নব কাদম্বিনী)

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
ছড়ায়ে পুচ্ছের জ্যোতিঃ, বিকট উৎসবে,
চলিয়াছে ধূমকেতু-দেব-সম্মার্জনী !
সাপটি সে পুচ্ছগুচ্ছ, কুহকী প্রকৃতি,
আঁকিল এ নারীচিত্র—অপূর্ব মূরতি ,
অফিলিয়া।
এ যে সুকঠিন ধরা, উপল-বন্ধুর ;
ঝরিয়া পড়িলি হেথা, তুইরে শিশির !
অমরার গীতি তুই, মধুর-মধুর ;
পড়িয়া চীৎকার-রাজ্যে হইলি অস্থির।
লাে কপােতি, ঝটিকার হিল্লোলে পড়িয়ে,
( চারিধারে অন্ধকার, দলকে দামিনী !)
দােসলা ক্ষীণডানা, ঝালাপালা হয়ে,
চক্রে চক্রে বিঘূর্ণিত, হারাইলি প্রাণী !
প্রেমের সৌরভ ছিল হৃদয়-কোরকে,
পলকের তরে তবু তুই না জানিলি;
কামিনী কুসুম তুই যামিনী অলকে,
ভাল করে না ফুটিতে ঝরিয়া পড়িলি !
জীবনে কাটিল কীট, হইলি আতুর,
মরণে পাইলি শেষে “মধুর মধুর।” *
"Sweels to the sweet, farewell"! Ham.

২
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
কোনো বিশ্বনিন্দুক সমালােচকের প্রতি।
( চীনদেশের সুবিখ্যাত কবি টুচুর য়াড়, চ্যাং কাব্য হইতে অনূদিত।
তনয়-বৎসলা মাতা হইয়ে বিমুগ্ধ,
চাহেন শিশুর পানে,-স্তনে ঝরে দুগ্ধ !
সে পবিত্র দৃশ্য হের “বেহদ্দ ন্যাকামি।”
সাবাসি হে সাহসিক, তােমার ভাঁড়ামি!
২
শর্করার প্রতি তব কেন এতবােষ ?
শর্করার দোষ নয়,—রসনার দোষ !
বিশ্বচক্ষে যেই পদ্ম মধুর মধুরা,
সেই লাবণ্যের পুষ্পে হেরিছ “ধূতুরা !”
পূর্ণিমা রাত্রিতে হের চড় চড়ে রােদ।
বলিহারি হে রসিক, তব রসবােধ !
সভামাঝে বস্ত্রহীন,—এ কি তব কাণ্ড!
নৃত্য কর !মূৰ্ত্তিমান্ জেপানি কুষ্মাণ্ড !
৪
পূর্বজন্মে ছিলে তুমি শােণিত-শােষক
কোরিয়ার জোঁক বুঝি, হে সমালােচক ?

অপূর্ব নৈবেদ্য।
পায়স পাসে বড়, অমৃতও টক !
মানুষের রক্তবিন্দু মরি কি নােচক।
৫
আঁকা বাঁকা গতি তব কথাগুলি বক্র।
একরত্তি বিষ নাই, কুলােপানা চক্র !
রসনা-ধনুকে তীক্ষ্ণ বচনের তীর ;
ঢাল নাহি, খাঁড়া নাহি,--তবু মহাবীর।
আহা, আহা, কি মধুর তব কথাগুলা,
চাটনির উপযােগী যেন আশুলা !
রাজধানী পেকিনের কাকাতুয়া পাখী,
সাধ যায় সােণার পিঞ্জরে তােমা রাখি।
পিহাে তরঙ্গিণী-তটে, ঝাপটি পালক,
কুলীরক খাও নিত্য হে সুন্দর বক !
হালস্নাহানার কুঞ্জে নাচে স্বর্ণ-পাখী ;
তার প্রতি চাও কেন, লােভ-লুব্ধ আঁখি ?
তুবড়ি ছুড়িয়া ভাব, দাগিয়াছ তােপ।
বজ্রধর! থাম, থাম ;-বােঝা গেছে কোপ!
পরচুলে হে সুন্দর, ঢাকিয়াছ টা ।
ঝুটো চুণি, ঝুটো পান্না—তারি এত জাঁক ?

অপূর্ব নৈবেদ্য
অপূৰ্ব্ব কবিতা-রূপসী।
[ এই কবিতাটি কবিবর শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রমােহন
বাগচীর কবিতা-রূপসীকে সম্বােধন
করিয়া লিখিত হইয়াছে ]
অবাক্‌-বিস্মিত আমি! হে রূপসী বুঝিবারে নারি,
তােমার ও হাবভাব লীলা!
বালিকার মত কভু উচ্ছঙ্খলা ! কভু প্রৌঢ়া নারী
নিয়ম-নির শান্তশীলা।
নারী আলিঙ্গন-সম, কভু ঘাের আনন্দদায়িনী,
সুশীতল চন্দন-পরশ।
পৌষ-ভােরে কভু যেন গঙ্গাস্নান।-বেদনা-কারিণী
ভক্তচিত্তে তবু কি হরষ ।
২
জীবনের মত কভু সুনিবিড় আহলাদ-কারিণী
রবিকরে পূর্ণ-প্রকাশিতা !
মরণের সম কভু সুগভীর মৰ্ম্ম-পরশিনী,
রহস্য-কুঝটি-বিজড়িতা!
বৈশাখী দিবার মত কভু তপ্তকাঞ্চন-মুরতি,
রাধা যেন করিয়াছে মান।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
শারদীয়া পৌর্ণমাসী নিশি সম কভু স্নিগ্ধ অতি,
সুন্দরীর হাসির সমান।
অপূর্ব রূপসী মরি! তােমার মুখর চাহনিতে
থাকে গুপ্ত মরমের কথা,
সেফালি ইঙ্গিতে যথা বলি যায় ঝরিতে ঝরিতে
আপনার সৌরভ-বারতা।
বালবিধবার যেন অতি মৃদু মলিন হাসিতে
থাকে চাপা ঘাের আকুলতা ;
প্রথম ফাল্গুণে যথা থাকে চাপা চাঁপার কলিতে
বসন্তের পূর্ণ মাদকতা !
৪
কভু চির-রঙ্গময়ী, সুন্দরী কবিতা বধূ সাথে,
রবি যেন খেলিছে আবীর।
একি বৃন্দাবনী হাসি !-পিচকারী ধরি দুই হাতে
দুজনেই আনন্দে অধীর !
ভক্ত গােপীবৃন্দ মরি, সারি সারি কদম্বের তলে,
—অঙ্গে শােভে ওড়না, চুনরি।
ময়ুর করিছে নৃত্য !কল্পনা-যমুনা যায় চলে,
চারিধারে লীলার লহরী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
আমি জানি হে সুন্দরি, সতী তুমি, দেবের কুমারী,
কু-বাসনা নাহি তব চিতে।
দৈত্য যারা, হে অপূর্ব অলােক-সামান্যা বরনারী,
নাহি পারে তােমারে বুঝিতে।
হেরি উমা মুখইন্দু,
ধ্যানে বসে ভক্ত হিন্দু।
হাসি, ম্লেচ্ছ ভাবে “পৌত্তলিক”।
কি বুঝিবে গুণপণা তব দেবি !—দুষ্ট অরসিক ?
মা বিবি।
| হুসঙ্গবাদের সুবিখ্যাত ব্যারিষ্টার মিঃ মতিলাল গুপ্ত মহাশয়ের
কনিষ্ঠা কন্যা “নিরুপমকে আমরা আদর করিয়া “মা বিবি” বলিয়া
ডাকি। এই কবিতাটি তাহার করকমলে স্নেহােপহার-স্বরূপ অর্পিত হইল।
অয়ি কন্যা আদরিণী ! সােহাগিনী মা বিবি আমার,
শুভক্ষণে তাের দরশনে,
জেগেছিল অকস্মাৎ চিত্তে মাের যে আহলাদ
সে আহ্লাদ বুঝাব কেমনে?
সহসা বুঝিনু আহা,
বুঝি নাই কভু যাহা,
কি সামগ্রী বিশ্বের সৌন্দৰ্য্য ।
===

অপূর্ব নৈবেদ্য। তুই চির মধুমাস তুই চির কল হাস এ হৃদয় কাঁটাবনে ফাগুনের গােলাপী ঐশ্বৰ্য্য। ২ সহসা ফুটিল যেন হৃদয়ের লতিকা দোলায়, রাশি রাশি “মার্শে নীল” কল্পনা হইল সত্য বুঝিনু মাধুরী তত্ত্ব অমিলেও পাইলাম মিল । পারিজাত-মকরন্দ হান্নাহানার গন্ধ ইতালীর নারিঙ্গি সৌরভ, এ সবারে পরাজয়ি, হয়েছিস তুই অয়ি মূর্তিমতী কি মাধুরী! জয় জয় নারীর গৌরব। আমাদের গৃহঙ্গিণে ছিল এক জীর্ণ শীর্ণ তরু একদিন অকস্মাৎ তাহে, কুহু কুহু রবে ডাকি বসন্তের প্রিয় পাখী ভরি দিল সঙ্গীত-প্রবাহে। লভি সে অপূর্ব চিত্ত আমার এ কবিচিত্ত হইল রে মহাধনশালী । তেমতি দরশে তাের হরষে হ’য়েছি ভাের ! এ কাঙ্গালে করেছি ধনশালী লাে মাের দুলালি! ৪ একদিন হয়েছিনু ক্লান্ত শ্রান্ত গিরি আরােহণে ক্ষুব্ধ চিত্ত চলে না চরণ !

অপূর্ব নৈবেদ্য।
তার পর-অতিদূরে
উঠিয়া সে গিরিচূড়ে
হেরিলাম—এ কি বিমােহন।
ঝর্কর নিঝর শব্দ।
হইলাম লুব্ধ স্তব্ধ !
বন্দী সম বদ্ধ দু’নয়ন ।
তেমতি দরশে তাের আনন্দের নাহি ওর!-
তুমি কি মা মূর্তিমতী ‘আর্কেডিয়া’ নন্দনকানন ?
একদিন ক্লান্ত, শ্রান্ত,
আইনের গ্রন্থগুলি লয়ে,
ব’সেছিনুসশূন্য হিয়া !
হেন কালে-কোথা হতে---
মুক্ত বাতায়ন পথে
প্রজাপতি আইল উড়িয়া।
হেরি সে রঙ্গিন পাখী
হৃদয়ের শুষ্কশখা
ছিল যাহা দুই চক্ষু বুজে
সহসা মেলিল আঁখি—
অয়ি মােহনীয়া পাখী
তেমতি কি ভরি দিলি সবুজে সবুজে ?
মা বিবি, ও মুখচন্দ্র,
ধরি বুকে, আনন্দে অধীর,
আনন দর্পণ মাের হাসে,
পূর্ণচন্দ্রে বুকে নিয়া,
চঞ্চল সরসী হিয়া
নাচে যথা বিজয়-উল্লাসে।

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
হৃদয়-শুকতি-মাঝে
আজি শুভক্ষণে রাজে
প্রীতি-স্বাতি-তারকার জল।
আর কি সে বিন্দু আছে ? মুক্তা তাহে ফলিয়াছে,
নিরুপমা মা আমার, তুই সেই মহামুক্তাফল।
৭
বসন্তের উষা হয়ে থাক মাগাে থাক চিরদিন,
কবি-চিত্ত-নব-অলকায়।
শারদী শৰ্বরী হয়ে,
কহলার সেফালী লয়ে
থাক তুই ফুল্ল জোছনায়।
মানস কালিমা নাশি
ঢাল মাগাে, হয়ে বাঁশী
অফুরন্ত সঙ্গীত-লহরী ;
ছন্দোবন্ধে এ কি গান।
রন্ধ্রে রন্ধে এ কি তান ।
হৃদয়-যমুনা-তটে বাজ তুই দিবা বিভাবরী।
হয়ে শ্যামের বাঁশরী ।

অপূর্ব নৈবে।
কোথা যাও হে তপন ?
১
ঢালিয়া অপূৰ্ব অসংখ্য প্রপাত,
দিনান্তে লুকালে দিবসের নাথ,
ধরা হয় ভাঙি কুন্তর বাঁধ
মুক্তকেশী মহাকালী !
হে রবীন্দ্র ! ঢালি অযুত-তরঙ্গ,
ঢালিলে প্রবাসে আঁধারিয়া বঙ্গ।
হের দেখ দেব, জননী-উৎসঙ্গ
তােমা বিনা আজি খালি ।
২
ঝলসি নয়ন,
হায় এ তিমিরে নাহি তারা শশী,
চারিধারে শুধু সূচিভেদ্য মসী
চমকিছে অসি
অসত্য দুর্ভাগ্য দৈত্যের করে ।
চারিধারে অজি আঁধার জলদ
গরজে গম্ভীরে। গর্জে যেন নদ
পড়িয়া সমুদ্রে কালিয়ার হ্রদ
যেন কালিন্দীর পরে ।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
নহে এ রজনী নয়ন-আনন্দা,
ফোটে না তিমিরে দিব্য নিশিগন্ধা।
প্রকৃতি দুলালী সেফালি ত বন্ধ্যা
অপরূপ অমানিশা।
কেবলি হেথায় জম্বুক-চীৎকার,
পেচকের রব শুনি বার বার,
আলেয়ার হাসি বাড়ায় আঁধার,
পথিক হারায় দিশা।
৪
কোটে না কুমুদী -কোথায় কৌমুদী ?
ফেনিল আঁধার উঠিছে বুদি!
অন্তর-নয়ন রাখিয়াছে রুচি
মুখােসের আবরণ !
এ দীর্ঘ যামিনী কেমনে পােহাবে ?
জোনাকীর পতি আলাে কি বিলাবে ?
ঘরে নাহি বাতি ! কি মেঘান্ধ রাতি!
কোথা যাও হে তপন !
কি বলিব দেব?
সকলি বেঠিক।
এ যে ঝুটা চুণ, এ পান্না অলীক।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
এ বঙ্গেতে নাহি একটি মাণিক,
নাহি নাহি গৃহমণি !
শিরে ওই জ্বলে-ও নহে রতন !
মহাভাব-ভালে চাঁদের কিরণ
ও নহে, ও নহে!—বিকট, বদন
বিষধর ও যে ফণী ।
আপন চরণ-শবদে আপনি
চমকিয়া উঠি।—-ঝিল্লি রণরণি
চারিধারে শুনি ! বঙ্গ-গৃহমণি
কোথা যাও দিনমণি?
তুমি ঢালিয়াছ অযুত
কিরণ
সত্য ও ধৰ্ম্মের ! কোন্ সে রতন
তব প্রভারাশি করেছে গ্রহণ ?
কোন্ সূৰ্য্যকান্ত মণি ?
৭
তুমি এনেছিলে হাস্যময়ী ঊষা,
উজ্জ্বল আলােকে, কুসুমের ভূষা ;
মােরা চক্ষু বুজি, করেছি শুশ্রুষা
আঁধারের, দিনমানে।
নিবিড় বসনে করেছি বন্ধন,
গান্ধারীর মত, মােরা দুনয়ন ;

অপূর্ব নৈবেড়ে।
ঠেলিছি চরণে হীরক-রতন,
চাহিয়া তব পানে।
অভিমানে খেদে তাই কি চলিলে
বঙ্গ পরিহরি ? আঁধার আসিলে
তবে নরনারী বুঝে গাে নিখিলে
রবির কি প্রয়ােজন!
এখন বুঝেছি মৰ্যাদা তােমার
ওহে দিনমণি।—কি ঘাের আঁধার ।
কোথা গেলে দেব ? আলােক-সম্ভার
আন, আন, হে তপন !
ওহে গুরুদেব, মানি তব শিক্ষা,
ওহে ঋষিরাজ, জানি এই দীক্ষা
অপূর্ব সুন্দর!—করিব প্রতীক্ষা
ব্রাহ্ম মুহূর্তের তরে ।
লােহিতে রঞ্জিয়া পূরবগগন,
মহ মহিমায় এস গাে তপন,
প্রতিভা-ঊষার হেরিয়া বদন,
কমল ফুটুক সরে !

3
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
ক্ষম অপরাধ, এ আঁধার আর
ভাল নাহি লাগে। বিকট চীৎকার
ওই শােননা দেব ! করে বারবার
অসত্যের সেনাদল
কিরণে ভাস্বর এস দিনকর ।
নবীন সৌন্দর্য্যে এস হে সুন্দর!
ছাড়ি ছদ্মবেশ, এবার পূজিব
তােমার ও দীপ্তি! কিরণে রঞ্জিত
হৃদয়ের শতদলে।
কবি করুণা-নিধানের প্রতি
হে সুকবি ধন্য তব শিক্ষা, দীক্ষা!—ভাষা ভুজঙ্গিনী,
শুনি তব মুরলীর ধ্বনি,
মন্ত্রমুগ্ধ, চাহিতেছে ফণা তুলি!—অপূর্ব নাগিনী;
শিরে জ্বলে জ্বল জ্বল মণি।
কোন্ সাপুড়িয়া-মন্ত্রে ? কি রহস্যে ? কোন্ তন্ত্রে ?
সাপটিয়া দুই ভুজে কাড়ি নিলে কান্ত মণি-তবু নাচে ফণী
কার বরকান্তি আজি সাজাইবে, বল বল কবি-শিরােমণি ?

অপূৰ্ব নৈবেদ্য।
৪১
২
হেরিতেছি আজি আমি দিব্যনেত্রে,বাজিছে নূপুর ।
কে গাে ওই ললিত-গমনা ?
ললিত চকিত দৃষ্টি, হাব ভাব সকলি মধুর !---
কে গাে ওই হসিত-বদনা ?
হয়েছে, হয়েছে সিদ্ধি, এসেছে এসেছে ঋদ্ধি ;
এসেছেন বাণী বীণাপাণি ওই, লীলাময়ী লাবণ্যের রাণী ।
হে পূজারি! আন আন ফণিমণি অর্ঘ্য তব, যােড় করি পাণি !
।
তবর শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি।
১
;
ভক্তবর! বন্ধুবর ! আজি আমি নিশান্তে জাগিয়া,
স্মরিয়াছি মুরলীধারীরে ;
শ্রীরাধার অলক্তাক্ত দু’চরণে হৃদয় রঞ্জিয়া,
ভাসিয়াছি প্রেম-অশ্রু-নীরে।
লক্ ল লােল-জিহ্বা, অসি-করা, হইয়া উন্মত্ত,
তাণ্ডবিয়া এলােকেশী কালী,
‘মাভৈঃ” “মাভৈঃ” শব্দে হৃদিকুঞ্জে করিয়াছে নৃত্য!
আনন্দে দিয়াছি করতালি
।

B२
অপূৰ্ব নৈবেদ্য।
২
তার স্মরিয়াছি দেব, ভক্তি-প্রীতি-রসের রসিক
শ্রীরামকৃষ্ণের মুখখানি,
সর্বযােগ সাধনায় সিদ্ধ যেই অপূর্ব প্রেমিক ;
অর্চে যারে কোটি কোটি প্রাণী।
সর্ব-ধৰ্ম্ম-সমন্বয় সাধনায় সিদ্ধ হয়ে যিনি,
গীতকীৰ্ত্তি স্বদেশে বিদেশে,
কোটি শিলা হ’তে বেগে ছুটে ধায় কোটি নিঝরিণী,
যাঁহার
মধুর
উপদেশে !
আর স্মরিয়াছি দেব, জ্ঞান-ভক্তি-পদ্মরাগ-খনি,
আর এক বঙ্গ-কৰ্ম্ম-বীরে,
আপনি অভুক্ত হয়ে, উপবাসী, যেই মহাধনী,
স্বর্ণর্থালে সাজাইয়ে ধীরে-
আপনার কর্মফল—সুধা যাহে সতত উছল,
সুস্বাদু, রসাল, ঢল ঢল,
অর্পেন গােবিল-করে!-শ্রীহরি ভুঞ্জেন সেই ফল,
সুধারসে হইয়ে বিহ্বল ।
' ৪
তাজি এ আঁধার-বঙ্গে শমনের কিঙ্করীর সম,
নিশি বসেছিল শবাসনে,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
৪৩
-
ঝাপটি যুগলপক্ষ জটায়ু বিরাট বিহঙ্গম,
স্তব্ধ যেন সুনীল গগুনে !
কে গাে এই কৰ্ম্মবীর ? উলঙ্গিয়া ভক্তির কৃপাণ,
খেদাইল নিশি-ডাকিনীরে-
আবার নিশ্বাস ছাড়ি হাসে বঙ্গ উজ্জ্বল-বয়ান,
স্নান করি কৌমুদীর নীরে !
* –
খালি !
কে গাে এই কৰ্ম্মবীর ? এ গাে নহে ক্রুর প্রহেলিকা,
শিশুও বুঝিবে এ হেঁয়ালি ।
রহস্য-কুঙ্কটি-ঢাকা এ গাে নহে শব্দ-বিভীষিকা,-
শব্দে ভাবে মল্লযুদ্ধ
তুমিই সে কৰ্ম্মবীর, হে হীরেন্দ্র, এ নহে অলীক।
সিদ্ধ আজি তােমার সাধনা !
সর্বস্ব সঁপেছ আহা কৃষ্ণ পদে, অপূর্ব প্রেমিক,
বঙ্গের অপূর্ব ব্রজাঙ্গনা !

৪৪
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
কবিভ্রাতা শ্ৰীযুক্ত চিত্তরঞ্জন
দাসের প্রতি।
১
ছিল তথা চন্দ্রাবলী, ছিল তথা বিশাখা সুন্দরী,
শত শত গােপাঙ্গনা রাস-রস-লীলায়-মগন ।
কিন্তু সেই রাসেশ্বর, মন্ত্রসিদ্ধ যাহার বাঁশরী,
কাড়ি লয় প্রাণমন, গােপীবৃন্দে করিয়া বৰ্জ্জন,
একমাত্র রাধিকার
মুখচন্দ্র
করিয়া
চুম্বন,
করপদ্মে আহা মরি শ্রীরাধার করপদ্ম ধরি,
করী যথা ধরে তার করিণীরে,—রাস ভঙ্গ করি,
গুপ্তকুঞ্জে লীলারস ভুঞ্জিবারে করিল গমন !
তুমি জান কবিবর! লীলাময় দিতে কোন্ শিক্ষা
করিলা এ রাসভঙ্গ অকস্মাৎ ! কোন্ সে দীক্ষায়
করিলা দীক্ষিত বিশ্বে মহাগুরু। এ অগ্নিপরীক্ষা
নহে গাে সামান্য আহা—অপূৰ্ব সে রাস পূর্ণিমায়,
গগন বিদীর্ণ করি, শত গােপ চীৎকারিয়া কহে--
“কোথা গেলে প্রাণেশ্বর ? কোথা গেলে মরি যে বিরহে ?
আত্মত্যাগ মহাব্রতে ছিল ব্ৰতী সেই রাধারাণী ।
পূর্ণভাবে বিশ্বনাথ-পদতলে বিকায়ে আপনা!

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
হয়েছিল নগ্ন, শূন্য ! জয়, জয় দাসীর সাধনা।
রিক্তহস্তে ছিল আহা দাঁড়াইয়া অপূর্ব কল্যাণী,
ভক্তদাস ভগবান্ তাই তারে ক্রোড়ে নিলা টানি !
তাই আজি শত কবি শত স্তবে করিছে বন্দনা ।
শ্রীরাধার ! তাই আজি শতভক্ত করিছে অর্চনা
শ্রীরাধার
। আনি
ফুল,
জ্বালি ধূপ, যােড় করি পাণি !
আত্মত্যাগব্রতে ব্ৰতী তুমিও গাে, হে চিত্তরঞ্জন,
পরার্থের মহাযজ্ঞে আপনারে করেছ আহুতি!
হয়েছে সফল জন্ম, যেন আহা অগুরু চন্দন
দহি দহি যজ্ঞানলে।—যশ তাই, হ’য়ে অগ্রদূতী,
কবিবর । জয়মাল্যে করিয়াছে তােমারে মন ।
বিজয় বাজনা-বাজে ওই শােন প্রাণবিমােহন!
#
যার হৃদে প্রেম নাই, হােক সেই রাজ্যেশ্বর,
তবুও সে দীনদুঃখী, রিক্তহস্ত, পথের ভিখারী।
বিনা এই উপবীত সুব্রাহ্মণ চণ্ডাল পামর,
বিনা এ সঙ্কেত-চিহ্ন বৈষ্ণব অধম ভেকধারী।
বিনা এ সৌরভ-সুধা অনাদৃত অরণ্য-বিহারী
কাটু গােলাপের অখ্যা সমুচিত! কে করে আদর
ধুতুরার ? বিনা এই স্বরসুধা, দীন হীন কাতর জন্ধর,
পিঞ্জরে আবদ্ধ আহা কণ্ঠহীন থাকে শুকসারী।
***

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
বিনা এ উষার হাসি দৈন্যময় বরিষা-দুর্দিন ।
পূজার দালান শূন্য বিনা এই দুর্গার প্রতিমা
তাই কবি সদা বিকশিত তব নয়ন-নলিন।
তাই জাগে চিত্তে তব মধুময়ী বাসন্তী পূর্ণিমা
নিরন্তর কবিবর
বন্ধুবর,
কি আর কহিব ।
আমার এ চিত্ত-সরে সদা রাজে ও মুখ-রাজীব !
লাবণ্যলতা।
১
লােকে বলে “এই বিশ্বে একা তুমি!” হে বিশ্ববিহারী
আমি কিন্তু যেই দিকে চাই,
একি হেরি ? দুটি মূর্তি ! অপরূপ দু’টি নরনারী,
ব্যাপিয়া রয়েছে সব ঠাঁই।
রসালে মাধবীলতা
করে আবেষ্টন যথা,
লীলায়িত লাবণ্য তরঙ্গে,
কৃষ্ণকান্তি !-এ কোন্ লাবণ্যলতা তােমার শ্রীঅঙ্গে ?
এ কোন্ চিরসুন্দরী করিয়াছে তােমারে সুন্দর ?
করস্পর্শে হর্ষে এ বসুধা,
*

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
কোটিদিকে খুলি আহা, কোটি কোটি লাবণ্য-নিৰ্ব্বর,
কোটি ধারে ঢালিতেছে সুধা ?
কার অপরূপ-রূপে,
মােহিনী হইয়া চুপে
শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধে,
হ’য়ে ভাের, চমকিছে সারা বিশ্ব নিবিড় আনন্দে ?
অরূপ এ মহাতরু !-কে গাে তুমি, লাবণ্যের লতা,
বাঁধি তারে সংখ্যাহীন ভুজে,
করিয়াছ রূপবান্ ? তড়াগে মৃণাল হয় যথা,
শােভাময়, ফুটন্ত অম্বুজে।
তােমারই সুধাস্বরে,
বাঁশরীতে সুধা ক্ষরে
তােমারই মৃগনাভি-গন্ধে
সমাকুল সারা বিশ্ব শিহরিছে নিবিড় আনন্দে ।
৪
প্রবীণারে কর তুমি সুযৌবনা—হে চির-যৌবনা !
ভাষা-বীণা তােমারি, ঝঙ্কারে
বেজে উঠে! তব স্পর্শে মরুভূমি হয় সুশােভনা,
লাল নীল কুসুমের হারে ;
ঝিনুকে মুকুতা ফলে ;

৪৮
অপূর্ব নৈবেদ্য।
*
অঙ্গারে হীরক জ্বলে।
শিলা হ’তে অহল্যা যেমতি,
কঙ্কাল হইতে জাগে অপরূপ নারী রূপবতী।
ও তাের সুষমা,
অয়ি শােভা,
অয়ি মনােলােভা,
চির দিন অনুপমা,
চির-মনােরমা ।
ইন্দ্রধন-বর্ণ মাঝে, লাল নীল পীতে
ধবলে, হরিতে,
ক্রোটনে ক্রোটনে আর দোপাটীর মাঝে,
নানাবর্ণে রাজে!
জবাবর্ণ সাঁঝে আর গােলাপী ঊষায়
বহুরূপে ভায়।
কত বেশে কত দেশে, থাক তুমি চুপে,
অয়ি অপরূপে!

অপূৰ্ব নৈবেদ্য।
৪৯
এ নয়ন তাই,
অয়ি শােভা,
অয়ি মনােলােভা,
চির দিন জয়যুক্ত তাের দেখা পাই !
হেরি চিত্র সুবিচিত্র নবজলধরে,
থরে থরে থরে,
নীরবে ফেলেছি আমি নয়নের নাের,
বিহ্বল, বিভাের।
হয়েছি, গােলাপবাগে হেরি বুলবুল,
আনন্দে আকুল !
বলেছি, আপনা হারা, “এ কোন্ রূপসী ?”
হেরিয়া অতসী ।
এই চিত্তে, তাই,
অয়ি শােভা,
অয়ি মনােলােভ,
জেগে উঠে মহােৎসব, তাের দেখা পাই।
তালে তালে নাচে হিয়া, নাচিলে ময়ূর,-
আনন্দে আতুর !
শিশু সম,—রামধনু উঠিলে আকাশে,
ছুটে সে উল্লাসে !
৪

অপূর্ব নৈবেদ্য।
হেরিয়া মুক্তার মালা শ্যাম দূর্বাদলে,
পুলকে উছলে ।
এ কি আনন্দের উৎস বিশ্ব-চরাচরে,
মধুর ঝঝঝরে ।
৪
অনিন্দ্য সুন্দরি,
অয়ি শােভা,
অয়ি মনােলােভা,
এসেছিস কন্যারূপে, ঘর আলাে করি ।
ঢা ঢাল্ ছটা তাের, উজ্জ্বল, মধুর,
ওরে কহিনুর !
হেরি তােরে ওরে নুরী, হীরামন্ পাখী,
জুড়া এ আঁখি !
জীবন-জুড়ান ধন, পরশ রতন,
সৌন্দৰ্য-স্বপন ।
শরীরী লাবণ্য তুই, জীবন্ত হরষ,
অমৃত-পরশ।
আকুল অন্তরে,
অয়ি শােভা,
অয়ি মনােলােভা,
ডাকিতেছি চিরদিন সে চির-সুন্দরে !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
এ সৌন্দৰ্য্য-সাধনার হবে মহাসিদ্ধি ;-
পাব মহাঋদ্ধি।
সে মাহেন্দ্রক্ষণে কন্যা, তােরি মত হেসে,
সুমধুর-বেশে,
যেন গাে দাড়া হরি !-জ্যোৎস্নার বন্যা
তুই মাের কন্যা !
কোটি শশাঙ্কের মেলা, কোটি তরঙ্গের খেলা ।
কি সৌভাগ্য! কবি-চিত্ত-জলধি অকূল,
যােগানন্দ-তুফানে আকুল !
কবি-ভগ্নী সরােজকুমারী
দেবীর প্রতি।
১
তােরে হেরি আজি বােন্! উথলিছে চিতে
অফুরন্ত, অপূৰ্ব আহলাদ ।
সারা বিশ্বে আপনারে বিলাইয়া দিতে,
আজি মাের হইতেছে সাধ।
আয়, ঢালি বিশ্ব-প্রেম, যেমতি তরল হেম
বিশ্ব-অঙ্গে ঢালি দেয়, আপনা পাশরি,
যােগ-মগ্না পৌৰ্ণমাসী শারদী শর্বরী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
২
আশৈশব করেছিস, আপনা পাশরি,
ত্যশিব সুন্দরের ধ্যান ;
তাই তুই হয়েছিস্ অনিন্দ্য সুন্দরী ;
মণিসম জ্বলিছে নয়ান!
যে জন অশােকে বরে, রূপ তার ফাটি পড়ে ;
তাই তুই রূপবতী, অয়ি পুণ্যশ্লোকা !
অশােকে পূজিয়া, তুই অপূর্ব অশােকা!
আমি ভাবি,বুঝি কোন আনন্দ-কাননে,
ছিল তরু বন আলো করি ;
পুষ্পে পুষ্পে, বনলক্ষী-চরণ-চুম্বনে,
উঠিল রে পুলকে শিহরি!
সে অশোক কুঞ্জ হ’তে, ভাসিয়া গৌরবস্রোতে
এসেছিস; ব’সেছি ঘর আলাে করি ।
তুই বুঝি মূর্তিমতী অশােক-সুন্দরী ?
8
শতভাবে, শতরূপে, শত শতদলে,
করেছিস্ হরির অর্চনা,
অনন্তের আরাধনে, অনন্তের বলে,
হয়েছি অনন্ত-যৌবনা ।
পরশি সে পীতবাস, তােরা অঙ্গে চন্দ্রহাস!

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
পরশি হরির দুটি চরণ-কমল,
তুই আজি মূর্তিমতী ফুল্ল শতদল !
তােরে হেরি, আজি বােন্ জাগিছে স্মরণে,
পূর্ব কথা, পূর্ব সুখ, দুঃখ ;
ফুটিয়া উঠিছে ধীরে হৃদয়-দর্পণে,
পরলােক-বাসিনীর মুখ ।
সে যেন এখনাে মােরে, বাঁধিবারে প্রেমডােরে,
প্রসারিছে বাহুযুগ ! চিত্তসরে ভাসে
সে মূরতি, সরসীতে চন্দ্র যথা হাসে !
আজি এই পূতপ্রেমে নাহি কামগন্ধ,
আনন্দে তা পুড়িছে অনলে !
বুঝিয়াছি আত্মত্যাগে কতই আনন্দ।
ঝাঁপাইয়া জলধির জলে
তটিনীর কি আনন্দ! মুক্তপ্রাণ, মুক্তবন্ধ!
লেলিহান অগ্নিমাঝে নিজ দেহ দানে,
কি গভীর রসাস্বাদ কপূরের প্রাণে !
-
আজি কে র’চেছে যেন জ্যোতির্ময়-সেতু,
ইহলােক, পরলােক-মাঝে ।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
.
এসেছেন পিতামাের দরশন হেতু ;
দেবকান্তি, যােগিবর-সাজে ।
মাথায় মুকুট জ্বলে, বরাভয় করতলে,
হাসিছেন মা আমার,
অন্নপূর্ণা-বেশে;
সােদর, সােদরা হাসে, মাের পাশে এসে !
;
স্বজন ও পরজন হয়েছে আপন ;
অপেক্ষা নাহিক উপেক্ষার
মৈত্রী আর মুদিতায় প্লাবিত ভুবন ;
প্রাণে জাগে করুণা অপার !
আমার অজ্ঞাতবক্ষে, গভীর আঁধার কক্ষে,
অকস্মাৎ খুলি গেল রুদ্ধ বাতায়ন ।
একি আনন্দের খেলা,-জ্যোৎস্না-প্লাবন !
=
শান্ত-শীলা।
হেন মুর্তি নাই রে নিখিলে !
কে রে তুই অয়ি শান্তশীলে?
কে রে তুই দেবকান্তি ?
কে রে মূর্তিমতী শান্তি ?
অকস্মাৎ দরশন দিয়ে,
প্রাণ মাের দিলি জুড়াইয়ে।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
মুমূর্ষ পুত্রের যথা জীবন আইলে ফিরে,
স্নেহময়ী মা তাহার ভাসেন আনন্দ-নীরে !
ভেঙ্গে চুরে দেয় তার হৃদয়ের বাঁধ,
এমনি সে দুরন্ত আহলাদ !
তুই বুঝি পূর্ব জন্মে ছিলি মাের কন্যা ?
তাই আজি নর্মদার প্রপাতের বন্যা,
শত শুভ উৰ্ম্মিমালা মাঝে,
ছুটিয়াছে হৃদয়েব মাঝে।
আনন্দের বাষ্পে আজি আকুলিত কু-আঁখি আমার,
এ কি রে বিচিত্র ধূমধার !
চারিধারে আনন্দ-হিল্লোল।
চারিধারে.আনন্দ-কল্লোল !
তাের হেরি অয়ি কন্যা, অয়ি অপরূপে,
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে আর মধুপে মধুপে,
ভরি গেল কল্পনার নন্দনকানন,
আমি যেন হেরিতেছি ফুলের স্বপ্ন !
চারিধারে কুসুমের বাস।
চারিধারে কুসুমের হাস!
হাসিতেছে কবির দুলালি,
গন্ধরাজ, গােলাপ, শেফালী,

অপূর্ব নৈবেদ্য।
এ যেন রে মহােৎসব !—এ যেন রে ফুলের দেয়ালী ?
তাপসের শুভ্র চিন্তা সম,
তাের এ মূরতি অনুপম !
এ কি শান্তি বদনে নয়নে।
এ কি শান্তি যূথি শুভ্র প্রাণে !
নাহি হেথা বৈশাখী ঝটিকা ;
নাহি হেথা, নাহি হেথা সাহারার বহ্নিময়ী শিখা ।
নাহি হেথা কম্বুনাদী অষু-কোলাহল !
এ যে চির প্রশান্ত, শীতল,
ফুলময়ী অলকা-নগরী!
নহে উহা ভীমকান্ত হিমাচল, ধবল-শরীরী।
হেথা শুধু মলয় বাতাস;
মুচকি মুচকি শুধু তরু কোলে কুসুমের হাস!
হেথা নাহি স্বার্থভরা, অভিমান
এ গাে শুধু বিশ্বের কল্যাণ !
এ গাে নহে পাষাণ জমাটু,
চিরবদ্ধ, চিরবদ্ধ যার রুদ্ধ অন্তর-কপাট।
উছলে না উৎস কভু যার শিলা-দেহে,
হাসে না জ্যোৎস্না কভু যার অন্ধ গেছে,
এ নহে, এ নহে !
;

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
এ যে শুধু সুধা ঢল ঢল,
কল কল ছল ছল চারিধারে নিঝরের জল ।
আপনা বিলায়ে আর আপনা বিকায়ে,
ভাঙ্গিয়া মেঘের কারা?
এ যেন রে শ্রাবণের সুধাময়ী ধারা !
করুণার অশ্রুরাশি-মুকুতা ছড়ায়ে,
তরল চন্দন-লেপে ধরারে জুড়ায়ে !
চারিধারে নিঝুম, নিঝুম,
নীল কালিন্দীর নীরে এ যে ফুল্ল জোছনার 'ঘুম !
বশীকরণের মন্ত্রে শান্ত করি ধরণী, আকাশ,
শারদীয়া যামিনীর প্রশান্ত এ কৌমুদী-বিকাশ।
সদা জ্বলে দাউ দাউ চুলি,
শত ধারে শত হস্ত তুলি,
শতস্কন্ধা আকাঙক্ষার এ গাে নহে আকুলি ব্যাকুলি ।
তুফানের চির-অবসান,
বাসনার এ মহা নিৰ্বাণ ।
চিরশান্তি, চিরতৃপ্তি,
স্থির সৌদামিনী দীপ্তি,
যােগীর এ মহাযােগ,-এ মহাপ্রয়াণ ।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
রবীন্দ্র-মঙ্গল।
১
;
হে মহান ! মহাপ্রাণ! বিশ্বপ্রেমে হে মহাপ্রেমিক।
হে রবীন্দ্র ! তােমার উদয়ে
ঘুচিয়াছে সূচীভেদ্য, এ বঙ্গের অাঁধার-অলীক
জ্যোতিচ্ছটা খেলে চারি ধার !
হের দেখ সারি সারি,
জাগিয়াছে নরনারী
আপনি প্রতিভা-ঊষা, লীলাময়ী জ্যোতির্ময়ী বালা,
তােমার শ্ৰীকণ্ঠে, দেব, পরায়েছে স্বয়ম্বর-মালা।
;
২
;
বসন্ত ছিল না বঙ্গে ; হইত না বাসন্ত উৎসব
থাকি থাকি শ্যামা দিত শিস্ ;
ম৷ চন্দনা টিয়া
করিত অস্ফুট কলরব ;
কপােত কূজিত অহর্নিশ ?
বসন্তের প্রিয়পাখী, হে কোকিল, তুমি ডাকি
বসন্তে আনিলে বঙ্গে!--পিকরাজ, সারিসারি পিক
কুহরিছে কুঞ্জে কুঞ্জে ! কি উৎসব ! শিহরিছে দি।
কোনাে ভক্ত দিল বাণী-কমকণ্ঠে যুথিকার মালা ;
অলক্তে রঞ্জিল কেহ পদ ;

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
কোনাে ভক্ত দিল মার দুইভুজে কাঁকণ উজালা ;
তবু মা’র ব্যর্থ মনােরথ !
আনি রক্ত শতদল, পারিজাত, নীলােৎপল,
তুমি যবে হে পূজারি! সাজাইলে মায়ের শ্রীঅঙ্গ,
উছলিল অঙ্গে অঙ্গে লাবণ্যের কি লীলতরঙ্গ ।
৪
ছিল না, ছিল না এই পুণ্যকুঞ্জে উদ্বেল আনন্দ;
বাজিত গাে ঢােল আর কাঁশি ;-
ভাব গােপীবৃন্দ মাঝে আসি তুমি, ঘুচাইয়া ধন্ধ,
ফুকারিয়া বাজাইলে বাঁশী,
হে কাব্যের বংশীধর,
শুনি নাই সুধাস্বর,
কবিতা-কালিন্দী মরি লীলারঙ্গে বহিল উজান ।
ভাব-গােপীবৃন্দ-হৃদে বহিল গাে আনন্দ-তুফান।
বহুদিন হে পূজারি !
মন্দিরের দ্বার ছিল রুদ্ধ!
তুমি আসি খুলিলে কপাট,
আরম্ভিলা মহাপূজা
কি আগ্রহে, হয়ে শুদ্ধ বুদ্ধ!
কি উৎসাহে ভাতিল ললাট।
লভি সে অপূৰ্ব পূজা,
সুপ্রসন্ন শ্বেতভুজা,
দিলা তােমা কুহকিনী বীণা তঁার, আনন্দ-ঝরণা,
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে যার সারা বিশ্ব বিস্ময়ে মগনা !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
কুষ্ঠরােগ-গ্ৰস্তা মরি কোনাে এক অপূর্ব সুন্দরী
পেয়ে পতির আলিঙ্গন,
থাকে যথা ম্রিয়মাণ, কাঁদে যথা গুমরি গুমরি,
বঙ্গভাষা করিত ক্রন্দন !
কোন্ মন্ত্রৌষধি দিয়া,
অঙ্গে হস্ত বুলাইয়া,
কোন্ রসায়ন-রসে, বৈদ্যরাজ, নবধন্বন্তরি!
করিলে এ সুন্দরীরে মরি মরি অনিন্দ্যসুন্দরী।
৭
হে বরেণ্য মহাকবি । তাই মুগ্ধ সারাবঙ্গ আজি,
রচিয়াছে স্বর্ণ-সিংহাসন ।
বাজিছে মঙ্গল-শঙ্খ !-
সাজাইয়া অর্ঘ্যপুষ্পরাজি
চারিধারে পূজা-আয়ােজন !
চারিধারে হুলুধ্বনি,
আনন্দের রণরণি,
রাজ-অভিষেক বাদ্য বাজিতেছে হৃদয়-তােরণে,
বােস, বােস, রাজেশ্বর! এ ভক্তের এ প্রাণ-সিংহাসনে ?
৮
ধর শিরে, হে নৃপতি ! যশের এ মুকুট উজ্জ্বল ;
পর কণ্ঠে মালিকা মধুর।
আজি এ কি কি মহােৎসব! সারা বঙ্গ আনন্দে চঞ্চল,
কলকণ্ঠে ধরিয়াছে সুর !
সূৰ্য্যকান্ত মণিসম,
মধ্যমণি অনুপম,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
৬১
তুমি আজি কি ভাস্বর, ইন্দ্রনীলে, মুকুতাভূষণে,
ঝলকিছে, চমকিছে সভা আজি, রতনে রতনে।
কবিবর রবীন্দ্রনাথের প্রতি।
এ মােহিনী বীণা কোথায় পাইলে ?
ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে প্রাণ কেড়ে নিলে।
হেন স্বর্ণবীণা নাহি রে নিখিলে,-
সুধা-ভরা, ক্ষুধা-হরা !
উল্লাসে, উচ্ছাসে, উছলিছে সুর,
আনন্দ-ঝরণা,
ললিত মধুর ;
এ যেন রতির চরণ-নূপুর !
পরশে শিহরে ধরা!
বাজে ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিণী ;
উর্বশীর যেন বীণা বিমােহিনী ।
সৌন্দৰ্য-নন্দনে সুধা-প্ৰবাহিণী,
লীলায় উছলে চলে ।
এ যেন, গােলাপে শিশির পতন!
পূর্ণিমা রাতির উছল কিরণ !
সেফালীর যেন নিশান্ত-স্বপন,
সৌরত-হিল্লোল ছলে।

অপুর্ব নৈবেদ্য
ওহে কবিবর, ধন্য তব শিক্ষা।
ওহে যােগিবর, ধন্য তব দীক্ষা ।
প্রতিভা তােমার অনল-পরীক্ষা
দিয়া, আজি দীপ্তিময়ী ।
সীতা-সতী-সমা হাসে বরাননী
অনলের ক্রোড়ে!—কাঞ্চন-বরণী
কাঞ্চনের সমা!—সূৰ্য্যকান্ত মণি,
তেজে যেন বিশ্বজয়ী ।
৪
বহুদিন ছিল অহল্যা পাষাণী ,
রামচন্দ্র আসি চরণ-দুখানি
রাখিলা যেমতি, হাসি ঋষিরাণী
চমকিল নিদ্রাভঙ্গে!
পাষাণের সম ছিল যেন জড়
এই বঙ্গভাষা !—বহু দিন পর,
তােমার পরশে ! কঁপি থর থর--
জাগিয়াছে লীলারঙ্গে।
ভাগবতে যার অপূর্ব ভারতী,
ত্রিবক্ৰা কুবুজা পাইল যেমতি
অপরূপ রূপ, অপূৰ্ব সদগতি,
গােবিন্দের আগমনে '

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
ওহে যাদুকর, তেমতি, তেমতি,
শ্রীহীনা এ ভাষা লভিয়াছে গতি,
কুবুজা হয়েছে অতি রূপবতী,
তব কর-পরশনে !
s
পূর্বকালে যথা, সঙ্গীতে, সঙ্গীতে,
সৌধময়ী ট্রয়, উরি আচম্বিতে,
রাজিল সহসা, কিরণ-রাজিতে
উষা যথা হিরন্ময়ী!
ওহে যাদুকর, তােমার সঙ্গীতে,
স্বর্ণ-হৰ্ম্মময়ী, হাসিতে হাসিতে,
এ কোন্ অলকা ভাতিল প্রাচীতে,
কিরণে কিরণময়ী ?
৭
পূৰ্ব্বকালে যথা অযুত তরঙ্গে,
কল্লোল, হিল্লোলে, লীলারঙ্গ-ভঙ্গে,
ত্রিদিব হইতে ভগীরথ-সঙ্গে,
এসেছিলা মন্দাকিনী,
ওহে যাদুকর, তােমার সঙ্গীতে,
নব মন্দাকিনী নেমেছে মহীতে।
চলেছে সাগরে কি লীলা-গতিতে,
কল কল বাহিণী।
* *

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
৮
এ জাহ্নবীতটে এক গাে নেহারি ?
মােহিনী নগরী শােভে সারি সারি,
যেন হাস্যময়ী, রূপময়ী নারী,
নব হরিদ্বার কাশী।
সদা লীলাময়ী, বিলাস-বিভ্রমে
পড়ে সুধানদী তাতুল বিক্রমে,
ক্ষার সাগরের পবিত্র সঙ্গমে,
হাসিয়া ফেনিল হাসি।
বাণীবরপুত্র ! সুধামকরন্দ,
বিভাের হইয়ে, বাণীবক্ষে পিয়ে,
মৃতসঞ্জীবনী, আনন্দের কন্দ,
আনিয়াছ বঙ্গে তুমি !
ভগবানে তাই করিয়া আহ্বান,
তাই এ প্রার্থনা-হ'য়ে আয়ুস্মান,
এক জননীর দুলাল সন্তান,
কিরণ-ছটায় বালার্ক-সমান,
উজলিয়া বঙ্গভূমি!

অপূর্ব নৈবেদ্য।
অপূৰ্ব্ব কবিতা-সুন্দরী।
কবিবর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাসুন্দরীকে সম্বােধন করিয়া লিখিত।
মুখচন্দ্র জ্যোৎস্না ঝরে ! একি রূপ! গালভরা গসি।
কে’ গাে তুমি মানস-সুন্দরী ?
চমকিত, আনন্দিত—রূপে তব সারা বঙ্গবাসী।
রাঙা পরী—অপূর্ব অপ্সরী !
অঙ্গে তব রত্ন চেলী,
করিতেছ নৃত্যকেলি !
কি কুহক ! চরণ ঠমকে
সরা-বক্ষে রাশি রাশি পুপ ফোটে শিহরি পুলকে।
==
२
সকলি সুন্দর তব হে সুন্দরি !একি কণ্ঠসুর ।
হাবভাব সকলি মধুর !
এ কি নৃত্য! বসন্ত-উৎসবরাত্রে মদন-বধূর
বাজে যেন চরণনূপুর
রিনিকি ৰিণিকি রিণি
বাজিতেছে কিঙ্কিণী।
কে গাে তুমি হসিত লােচনা ?
কে গাে তুমি লীলাময়ি! নিতি
নব লীলায় মগনা ?

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
কত সাজে সাজ তুমি, নটী সম, হে কামরূপিণি :
কভু তুমি শীর্ণ-কলেবরা।
যেন সেই অলকার রাহুগ্ৰস্তা যক্ষ-বিরহিণী
রুক্ষমকেশ, পাণ্ডুর-অধরা !
মিলন-আকুলা অয়ি, কভু তুমি হাস্যময়ী,
চিরানন্দা বঙ্গগৃহবধূ !=-
অলি বঁধু পেয়ে যেন কুসুমের মুখে, বুকে, মধু !
৪
রক্ত-কমলের পরে দাঁড়াইয়া কভু তুমি এসে,
দেখা দাও ইন্দিরার সাজে।
ভকতেরে মণি-মুক্তা মরকত দাও হেসে হেসে !
পাদপদ্মে কি মাধুরী রাজে!
ও ললাটে কি মহিমা! ও নয়নে কি গরিমা।
ভক্ত-হিয়া মনানন্দে কাপি,
নেহারে তােমার ওই মুখচন্দ্র-রত্নের ও ঝাঁপি!
৫
মৃগ-কস্তুরীর গন্ধ অঙ্গে তব হে মনােমােহিনী,
কভু ছােটে শেফালির বাস।
হাসুহীনার বাসে কভু তুমি, সৌরভ-রূপিণি,
প্রাণে ঢাল অপূর্বব উল্লাস!

অপূর্ব নৈবেদ্য।
সুরভি নারিঙ্গি-গন্ধ
পেয়ে, চিত্ত-অলি অন্ধ,
ঝঙ্কারিয়া ধায় তব পাশে !-
বােরা-গােলাপী-বাস কভু ছােটে,
উচ্ছাসে উচ্ছাসে ।
অন্নপূর্ণা-বেশে মরি কভু তুমি ওগাে যাদু করি,
দাও পাতে সুস্বাদু পায়স।
পঞ্চাশ ব্যঞ্জন দাও পাতে ঢেলে,—মােচা থােড়, বড়ি,
তাহাও গাে মধুর সরস !
দয়ালু জননীবৎ
তমুজের সরবৎ
হেসে হেসে দাও পিয়াইয়া ।
অন্নপূর্ণে ! সে তুষারে তাপ-তপ্ত ভক্তপ্রাণ
যায় জুড়াইয়া !
৭
ভে অপরি, সদা তুমি হাবভাব-লীলায় মগনা,
তবু তুমি শােভন-চরিত্রা।
নাট্যে গীতে নৃত্যে তুমি কলাবতী-অয়ি বরাঙ্গনা,
সতী সম তবুও পবিত্ৰা ।
কটাক্ষে ইঙ্গিতে তব,
কি মাধুরী অভিনব !

:
অপূর্ব নৈবে।
সুনীতির যমজ ভগিনি।
কুরুচি কবিতা সম নহ তুমি কুল-কলঙ্কিনী।
মদিরা-বিভাের হয়ে, উলঙ্গিনী, কুলটা কবিতা,
ভৈরবী চক্রের যেন নটী,
থেই থেই নৃত্য করে ! কুষ্ঠগ্ৰস্তা, চন্দনচর্চিতা,
ডান হস্তে বিকট করােটী,
নাগপাশ-আলিঙ্গনে,
বিদ্ধ করি লুব্ধ জনে,
শেষে করে জীবন সংহার,
ঘাের হলাহল লিপ্ত স্তনযুগ সেই পুতনার !
জানকী-সাবিত্রী সমা নিরুপমা কবিতা-সুন্দরি,
তুমি কিন্তু পুণ্যের বিকাশ !
ফোঁস ফোঁস্ শব্দময়ী কু-কামনা ক্রুর বিষধরী-
চিত্তে তব নাহি করে বাস!
দেবা সম অহর্নিশ,
বিলাইয়া শুভাশীষ।
পেয়ে তােমা বহু ভাগ্যফলে,
বঙ্গভূমি স্বর্ণভূমি অজি অহা ফুলের ফসলে।
পরিয়া ময়ূরকণ্ঠী, নানা রত্ন আভরণ অঙ্গে,
হে বরাঙ্গি, বাজাইছ বীণা।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
সঞ্জীবন মন্ত্রসিদ্ধ তুমি বুঝি ? তােমার উৎসঙ্গে
উঠি এই চৈতন্য-বিহীনা,
হইয়াছে প্রাণময়ী,
হইয়াছে জ্ঞানময়ী ।
সুমধুরা, আলাপে তৎপরা,
মােহিনী বীণার ফাঁদে নরনারী পড়িতেছে ধরা!
১১
চমকিত, হৃদয়-যমুনা মম বহিছে উজান,
বিমােহিত তব বেণুরবে,
যেন কোন গােপাঙ্গনা, বাঁশী কাড়ি, ধরিয়াছে তান,
কুঞ্জবনে পাইয়া মাধবে।
কি আছে ও বিদাধরে ?
সুধা ঝরে ! মধু ক্ষরে !
প্রাণে আছে মধুর ঝরণা।
পিয়ে সেই মকরন্দ, সারা বঙ্গ আনন্দে মগনা।
কন
কভু তুমি মায়াবিনি, ত্যাগ করি কঙ্কণ কিঙ্কিণী,
অঙ্গে কর ভন্ম-বিলেপন।
করে রুদ্রাক্ষের মালা, সাজ মরি নব তপস্বিনী,
ধন্য তব গেরুয়া বসন!
কোটী কোটী তীর্থে গিয়া,
তীর্থরেণু আহরিয়া,

অপূর্ব নৈবেদ্য
আহরিয়া তীর্থের সলিল,
দাও তুমি ভক্তবৃন্দে প্রসাদের কণা অনাবিল।
সে মহা প্রসাদ লভি, গৃহে গৃহে হয় শত কাশ,
গৃহে গৃহে জগন্নাথপুরী ।
বিস্মিত স্তম্ভিত হয়ে, বুবিবারে নারে বঙ্গবাসী,
কুহকিনি, তােমার চাতুরি !
তােমার কুহক বশে,
অপরূপ সজ্জরসে,
অপরূপ অগ্নিতে, হবিতে,
জ্বলি উঠে দাউ দাউ হােমশিখা, দেখিতে দেখিতে ।
১৪
---
যাহাদের ক্ষীণ দৃষ্টি, কূর যারা, যারা অৰ্বার্চন,
পায় না দেখিতে অঙ্গ-যষ্টি।
তারা ভাবে, তুমি শুধু জড়পিণ্ড, চৈতন্য-বিহীন,
তুমি শুধু শব্দের যষ্টি !
আশৈশব শ্বেতভুজা,
এ দীন ভক্তের পূজা
লভি, তুষ্টা, দিয়াছেন দিব্যদৃষ্টি—হে মনােমােহিনি,
ভাই ও অরূপ রূপে ভাের আমি, কি দিবা যামিনী।

অপূৰ্ব নৈবেদ্ধ।
১৫
আমি হেরি তােমার ও মুখ-চন্দ্র, চরণ-কমল।
বিদাধর, নয়ন-দর্পণ।
প্রতি অঙ্গে কি মাধুরী! লাবণ্যেতে সদা ঢল ঢল,
কলকণ্ঠ সুধার সদন।
পারিজাত-মূলে বসি,
রূপে জিনি পূর্ণশশী,
দেবকন্যা, বিরহ-বিধুরা,
ধরিয়াছে সুর যেন—এ কি গীত মধুর-মধুরা !
প্রতপ্ত কনকোজ্জ্বল৷ এ কি কান্তি ! অতুল, অতুল,
হে সুন্দরি, ওরূপের ভাতি!
শত-চন্দ্র-বিভাসিত, পরি তারা-খচিত দুকূল,
যেন কোন পৌর্ণমাসী রাতি ।
কভু নববধূ-সাজে,
হাসিয়া মধুর লাজে,
দেখা দাও ঘর আলাে করি ।
কভু নটী ! সুচরিতে, তবু তুমি সতী-কুলেশ্বরী।
কভু তুমি দেখা দাও দুর্গারূপে,—দশভুজ দিয়া,
জ্ঞান, ভক্তি, শৌর্য, বীর্য, আনি।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
ভক্তবৃন্দে কর তুমি ধনশালী--শ্রীমুখ হেরিয়া,
জুড়ায় এ দাবদগ্ধ প্রাণী।
আভাসে, ইঙ্গিতে, হেসে,
কি শিক্ষা। সে উপদেশে
নাহি দর্শনিক কঠোরতা ।
সে যেন প্রিয়ার হাসি !–জননীর সুধামাখা কথা।
১৮
নৃত্য!
কত বার শ্যামা সাজি, পাপাসুরে সংহারি লীলায়,
তাণ্ডবিয়া,
করিয়াছ
রণরঙ্গিণীর মরি একি শােভা! ভালে মুখে ভায়
যুগপৎ, সুধাংশু আদিত্য।
বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ সম,
কি উৎসাহ অনুপম
ঢালি দাও ভক্তের হিয়ায় !
বাজাইয়া তুরী, ভেরী, শিখি-সম নাচাও হেলায়।
১৯
কতবার হেরিয়াছি, বহুরূপা হে কালী-করালী,
মুণ্ডমালা,অসি করি দূর,
শিখিপুচ্ছ শিরে ধরি, পীতবাসে, সাজি বনমালী,
বাজাইছ মুরলী মধুর !
রচিয়া রাসমণ্ডল,
ভাব-গােপাঙ্গনা দল

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
বৃন্দাবনে পেয়ে মনচোর,
কই পৌর্ণমাসী নিশি যাপিয়াছে, আনন্দে বিভাের।
পার্থ সারথির সাজে কতদিন দিয়াছ আমারে,
হে যােগিনি, মহাযােগ-শিক্ষা !
হইয়াছে এ ভক্তের শুভক্ষণে, তব গুপ্তদ্বারে,
বিশ্ব-প্রেম-মহামন্ত্রে দীক্ষা ।
“মধুর, অপরাজিতা।
জয় জয় মহাগীতা।
বিসজ্জিয়া অসি ও কামান,
বিশপ্রেম-মহাষজ্ঞে কর কর আত্মবলিদান।”
স্বদেশ-বাৎসল্য ধন্য, ধন্য তব বিশ্ব-প্রেমিকতা,
“ভালবাস ইংরাজে, যবনে,”
“ভালবাস বিশ্বজনে---জয় জয় মঙ্গলবারতা।
“লৌহ-বেড়ি রবে না চরণে।”
“প্রেমরাজ্য-তুলনায়”
কোথায় সাম্রাজ্য হায় ?
“ভারতও হবে বিজয়িনী”-- .
হে কবিতা, একি তব মিষ্ট কথা, সুধা-নিঝরিণী ।
২২
এস মিশি ভাই-ভাই, মিশে যথা বাতাস আকাশে,
ইংরাজ ও মুসলমান, হিন্দু।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
একপ্রাণ হয়ে যাই—কি আনন্দ! গরজি উল্লাসে
উথলি উকি প্রেমসিন্ধু !
কে রবে গােলাম কেনা ?
হয়ে নারায়ণী সেনা,
“বিশ্বপ্রেম বিজয়-পতাকা”
বসাও হিমাদ্রি-শিরে--নীলাকাশে পূর্ণচন্দ্র রাকা ।
তব এ আশ্বাসবাণী বুকে ল’য়ে, কবিতা-সুন্দরি,
আজি তবে নিতেছি বিদায় ।
যে আনন্দ দিয়াছ গাে প্রাণে ঢালি, অতুলন মরি,
প্রতিদানে কি দিব তােমায় ?
ধ্যানের মন্দিরে পশি,
গোবিন্দের কাছে বসি,
যেই পুণ্য এনেছি আহরি ;-
বুঝিয়াছি সেই পুণ্যে, তুমি দেবি, অজর, অমরী ।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
কবি কালিদাস রায়ের প্রতি।
(কুন্দ ও কিসলয় পাঠান্তে )
১
কি আনন্দ! এ যেন রে অকস্মাৎ আইল ফাল্গুন,
অকস্মাৎ বহিল মলয় ।
কি আনন্দ ! কে যেন রে দাউ দাউ জ্বালিল আগুন,
ঘুচাইয়া শীতার্তের ভয়।
নগরের কোলাহলে বুঝি মাের বাহিরায় আয়ু,
হয়েছিনু এত ঝালাপালা ।
তােমার সবুজ কুঞ্জে, গ্রামে আসি, সেবি মুক্ত বায়ু,
হে সুকবি, জুড়াইল জ্বালা।
২
বাত্যাপ্তি পােতযানে আরােহিয়া, সমুদ্র-যাত্রীর
এ যেন রে কুলে আগমন !
বহুবর্ষ কারাগারে রুদ্ধ থাকি, মুক্ত কয়েদীর
এ যেন রে গৃহ-দরশন !
বন্ধ্যার অখ্যাতি লভি, এ যেন রে প্রৌঢ়া রমণীর,
চাদােরা সন্তান-প্রসব !
এ যেন যুগান্তে আহা বৃন্দাবনে, মুরলীধারীর,
পদার্পণ -সেই বংশীরব ।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
তােমার সৌন্দৰ্যকুঞ্জে—যতবার পশি আমি, কবি ।
হেরি তথা শােভা নব নব !
গলাগলি করি তথা হাসে চঁাদ আর বাল রবি।
অফুরন্ত ফুলের বৈভব !
দোয়েলের, কোকিলের কলরব অফুরন্ত মরি,
অফুরন্ত ময়ুর-নাচন!
যাদুকর, এগাে কোন্ মায়াপুরী! দিবা বিভাবরী,
অফুরন্ত আন-স্বপন।
!
৪
তােমার কবিতারাণী মরি মরি অনিন্দ্য সুন্দরী,
মূর্তিমতী ঊষারাণীসমা !
প্রভাত-পবন-স্পর্শে অলঙ্গ কঁপিছে থর থরি,
লাল চেলী একি নিরুপমা।
পদ্মগন্ধ ভুর ভুর মুখে ছােটে! সীমন্তে সিন্দুর,
প্রাচোরা, গালভরা হাসি।
শিশির-মুকুতা-হার কণ্ঠে দোলে ! মধুর, মধুর,
একি শােভা!-লাবণ্যের রাশি
৫
তােমার কবিতারণী মরি মরি অনিন্দ্য সুন্দরী,
মূর্তিমতী শারদী শৰ্বরী।

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
৭
রূপবন্যা জ্যোৎস্না-সম উছলিছে! বিশ্ব আলাে করি,
তরঙ্গিছে ভাবের লহরী!
ভুর ভু মুখে ছােটে, আহা মরি, চিত্ত-বিমােহন,
শেফালীর দুরন্ত সৌরভ।
অরসিক কি বুঝিবে? বােঝে শুধু রসিক-সুজন,
পৌণমাসী নিশির গৌরব।
অপূৰ্ব্ব কবিতা-রাণী।
{ কবিবর অক্ষয়কুমার বড়াল মহাশয়ের কবিতাকে
সম্বােধন করিয়া এই কবিতাটি রচিত হইল। কে না বলিতে,
তাঁহার কবিতা—অপূৰ্ব কবিতারাণী ?]
১
হে বরেণ্যা! হে সুধা! শিরে জ্বলে সােণার মুকুট,
কে গাে তুমি রাজরাজেশ্বরি ?
আপনি প্রণত হয় ভক্তশির, জোড় করপুট,
হেরি তােমা, হে রসুন্দরী!
চন্দ্রের মণ্ডলে যথা ভুলি ক্ষুদ্র লাজ মান গর্ব,
শুক্রতারা হয় আত্মহারা,
হে চির মহিমাময়ি, অজি মাের অহঙ্কার খর্ব ।
বিদ্রোহী ল'ভেছে আজি কারা।

৭৮
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
২
তব যােগ্য ভেট-উপহার কোথা ? কে কবিতা-রাণী,
বুক মাের, প্রাণ মাের খালি।
দীন অপরাধী সম, তাই ভাবি, যুড়ি দুই পাণি,
কি দিব ও শ্রীচরণে ডালি ।
দিবা দেয় দিবামণি-উপহার ধরিত্রী দেবীরে,
দীনা রাত্রি দেয় গাে শিশির।
পথের ভিখারী আমি, কিছু নাই !এসেছি মন্দিরে,
লও দেবি, ভক্ত-অশ্রনীর
রাণী তুমি, তবু কত লীলাময়ী ! যাও অভিসারে,
কৃষ্ণকুঞ্জে, সাজি নব রাধা,-
প্রেমের সে বিকিকিনি কি অদ্ভুত! কে জিনে? কে হারে ?
কে স্বাধীন ? কে নিগড়ে বাঁধা ?
কভু তুমি বঙ্গলক্ষমা, বঙ্গরাণী, হে সিংহবাহিনি !
শ্রীচরণ করিছে লেহন
সুন্দর বনের ব্যাঘ্র !-ফণা তুলি করাল ফণিনী,
আতপ করিছে নিবারণ !
৪
আজি তুমি চিতাভস্ম মাখি অঙ্গে!
কি শােক গভীর ।
অশ্রুবারি ঝরে"অহর্নিশ !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
আলােড়িয়া সুন্দরী এষার আহা শােক-সিন্ধুনীর,
পান করি বিষাদের বিষ, ,
হইয়াছ নীলকণ্ঠ—উমাপতি নীলকণ্ঠ যথা,
কি দুর্ভাগ্য! বুকে চির ক্ষুধা,
আপনি আকণ্ঠ করি বিষপান, জুড়াইলা ব্যথা
এ বঙ্গের, পিয়াইয়া সুধা ।
ফতেগড়ের মা কালী।
শুনিলাম, জাগ্রতা এ কালী! কিন্তু মাতা দয়াময়ী
নাহি চান পশুবলি—মার হিয়া হয় কি পাষাণ?
পত্র, পুষ্প, নারিকেল, ভক্তিভাবে যা কর প্রদান,
তাহাতেই হন, আহা! আনন্দিতা এ আনন্দময়ী!
অয়ি চণ্ডি! রণরঙ্গিণীর সাজে তুমি চিরজয়ী,
তবে কেন বিফলে মা করে শােভে শাণিত কৃপাণ ?
লক্ ল লােল জিহ্বা মিছামিছি কেন লেলিহান ?
পশুরক্তে জুড়াও পিপাসা আজি, চির-তৃষ্ণাময়ি।
হের এই পুষ্ট কাম-ছাগে ! জয় কালি ! জয় কালি ।
দুষ্ট ক্রোধ-মহিষেরে বাঁধিয়াছি যূপকাষ্ঠে আজি ;
খড়গ দিয়া কাটি পাড়ি, দিতেছি মা ও চরণে ডালি ।
রক্ত বহে! পান কর, পান কর, রণচণ্ডী সাজি ।
৮

অপূর্ব নৈবেদ্য।
লোভাসুর নৃত্য করে, মা গাে হের এ হৃদয়-মাঝে ;-
কাট তারে—রক্তপান-পরিহার তােমার কি সাজে ?
রাজেশ্বর-মঙ্গল।
(স্তোত্র)
কি আর ফুকারি! কি আর উচ্চারি! 'ওহে রাজরাজেশ্বর ।
আমি মাত্র বাঁশী, হে ব্রজবিলাসি, তুমিই মুরলীধর।
গাহিতে জানি না, বাজিতে জানি না, আমি শুধু জড়-বেণু !
অধর-পল্লবে ধর আজি মোরে ! বেণুর এ প্রতি রেণু,
হােক প্রীতিময়, হােক্ গীতিময়,ঝরুক অপূর্ব গান,
ঝঙ্কারি উঠুক শতেক পাপিয়া, শত শ্যামা মুগ্ধ-প্রাণ!
এই বিশ্ব হােক নব বৃন্দাবন ! গােপ-গোপী তালে তালে
নাচুক অঙ্গনে, ধরাধরি হাত,-এ মাতালে ও মাতালে।
অঙ্গে পীতধড়া, শিরে শিখিচুড়া, বিশ্ব-বিমােহন বেশে,
নব নারীদের মন কর চুরি, হাব-ভাবে হেসে হেসে।
প্রেমে গর গর, অঙ্গ থর থর, এস এস নদীয়ায়,
দুটি বাহু তুলি, নাচিতে নাচিতে, এস এস গােরারায়।
২
কি দারুণ শীত! কঠিন তুষার ছাইয়া ফেলেছে বিশ্ব।
তরুলতা সব, নীরস, বিবশ, একি নিদারুণ দৃশ্য !

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
ফুল নাহি ফুটে, অলি নাহি ছােটে, পাখী নাহি করে গান,
প্রম-সরোবরে সোহাগ-সরোজ হইয়াছে ঘাের ম্লান।
হে চির-বসন্ত, এস এস আজি, বসন্তকুমারী-বেশে !
রাধা বেশে এস আজি আহলাদিনী বনফুল পরি কেশে ।
তোমার চরণে রজত-নূপুর বাজুক গাে রুনু রুনু ;
শিহরি উঠুক পলকে এ ধরা পুলকে বিহ্বল তনু!
বসােনা গোলাপ ফুটিয়া উঠুক যেন লাবণ্যের ধারা ;
'বউ কথা কও’ ঝঙ্কারি উকি গানের ফোয়ারা পারা !
চির-বসন্তের প্রেম-রাজমাঝে এস বসন্তের রাণি !
জুড়াক ধরিত্রী বুকে ধরি আহা! তব রাঙ্গা পা দুখানি !
এ কি রে দুর্ভিক্ষ ! “হা অন্ন” “হা অন্ন’-রব নাহি ভাল লাগে।
এস নারায়ণ, অন্নপূর্ণারূপে, দাস এই ভিক্ষা মাগে।
চারু শাখা হাতে এস মহাদেবি, ঝলমল, চেলী অঙ্গে ;
ক্ষুধার্তের পাতে সুস্বাদু পায়স ঢাল ঢাল মহারঙ্গে!
ও গাে মেহময়ি, যে অন্ন ভখিলে, চিরতরে মিটে ক্ষুধা,
ওগাে স্নেহময়ী, হাসিয়া হাসিয়া, দাও সেই ভক্তি-সুধা ।
আনন্দ-কিরণে আমা সবাকার হাসুক নয়নতারা ;
ক্ষীণ অঙ্গে মাগাে নাচুক খেলুক উদ্দাম বিদ্যুৎ-ধারা,
প্রমা-সলিলে হইয়ে বিধৌত লাবণ্যে ভাতুক কান্তি ;
জন্ম-বিকল দুরু দুরু হিয়া, লভুক অতুল শান্তি !

৮২
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
চুষি-কাটি দিয়া আর মা আর মা সন্তানে দিনে ফাঁকি;
স্তন্য-সুধা দে’ মা-ঘাের দুর্দশার আর কিছু নাহি বাকি
:
৪
এস বনমালি, হরি-প্রিয়া সাজে কণ্ঠে পরি বনমালা ;
সীমন্তে অশোেক, শ্রবণে কদম, ভুজে অতসীর মালা,
ফুলে ফুলে ফুল্লা এস ফুলময়ি লীলা-পদ্ম ধরি করে,
সঞ্চারিনী কোন বন-ভূমি যেন ;-ফুল শােভে থরে থরে :
যেখানে পা পড়ে, সেইখানেই মরি, ভক্তি-উপবন হয় ।
কুঞ্জে কুঞ্জে আহা! হয় হরি ধ্বনি, নয়নে প্রেমা বয় ।
ওগো হরিপ্রিয়া হাসিয়া হাসিয়া সৃজ রম্য কুঞ্জবন,
চারুচন্দ্রে সাহা বসাইতে মরি পাত প্ৰীতি-সিংহাসন ।
যুগল মূরতি নিরখি নিরখি আমরা জুড়াব আঁখি ;
নাচিব গাহিব আনন্দে মাতিব অনুরাগ অঙ্গে মাখি
সুধাংশুরে হেরি জলধির যথা আনন্দ ধরে না বুকে,
চারুচন্দ্র হেরি প্রেম-বন্যা মরি উথলি উঠিবে সুখে।
ওগাে কমলিনি, সতী-কুলমণি ! হৃদয়-মন্দির-মাঝে,
সতীশের সঙ্গে, উর আসি রঙ্গে, মত্ত-আহ্লাদিনী সাজে।
রাধা-লতা যেন তমালে বেড়িয়া ফুলে ফুলে ফুলময়,
রােহিণী যেন গো সুধা-করে পাই আলােকে আলােকময় :
যুগল মূরতি, দীপ জ্বালি আহা, প্রেমানন্দে নেহারিব ;
আরতি করিয়া সুন্দরী সুন্দরে পুস্পমালে সাজাইব !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
পূর্ণশশী যেন যমুনার জলে দুলিছে নাচিছে মরি।
উষার ললাটে বালার্কের ছটা যেন রে পড়িছে ঝরি।
সােনার অতসী মিশায়ে কৌশলে গেঁথেছে ঝুমুকাহার !
চম্পকের হারে অপরাজিতায় বলিহারি কি বাহার ।
যুগলেতে এক, একেতে যুগল, কি আর বলিব আমি ?
জনমে জনমে, হৃদয়-মন্দিরে, নিশিদিন থেক স্বামি ।
শঙ্খ চক্র গদা, পদ্ম হাতে লয়ে, এস এস হে কেশব ।
চতুভুজ-বেশে ওহে লীলাময় নিনাদি ভৈরব রব।
জ্ঞানভক্তিযােগ, শিক্ষা দাও আসি, মূর্তিমতী গীতা-বেশে ;
মায়াবন্ধ নাথ, প্রেম-অসি দিয়া, কাট আসি হেসে হেসে ;
কিম্বা এস হরি, মুরলী বাজায়ে, ধরিয়া মােহন রূপ ;
নরনারী সব হােক জ্ঞানহারা হেরি রূপ অপরূপ ।
নিজেই দেবতা, নিজেই পূজারি সাজি ভক্ত হরিদাস,
নাচ গাও রঙ্গে বিগ্রহের আগে পরকাশি মহােল্লাস।
জ্ঞাত জ্ঞেয় জ্ঞান, এক হয়ে যাকু, বীজ মাঝে যথা রয়
শাখা ও পল্লব ! (এ কি ভােজ বাজি !) ফল ফুল সমুদয় ।
অরূপে স্বরূপে, জীবব্রহ্মরূপে, ভেদজ্ঞান নাই, নাই !
আমার আমিত্ব ঘুচে যাক্ হরি, তােমার তুমিত্ব পাই !
এস হে সুন্দর, কচি বনলতা,
বালিকা সীতার সাজে ,

৪।
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
নাকেতে বেশর, গলে দোলে হার,
চরণে ঘুঙ্গুর বাজে!
অবনী অবাক, প্রেমেতে বিভাের,
হেরি দুহিতার রূপ ;
কোকিল-কাকলি জিনিয়া বচন,
শুনি নরনারী চুপ !
কিম্বা এস হরি, নন্দের দুলাল,
বাল-গােপালের বেশে;
হরি-কমলের লীলা-খেলা হেরি,
সারা ব্ৰজ উঠে হেসে !
যশােদা মায়ের অঞ্চল ধরিয়া, কভু ঘাের টানাটানি ;
উথলির সাথে চোর বাঁধা পড়ি, কভু যােড়ে দুটী পাণি !
বল কতকাল,—হে শ্যামকিশাের, বহিবে নয়ন-লাের ।
অত্মা-বধূ মাের ঘাের উন্মাদিনী, তব লাগি মনচোর ।
আলু থালু কেশা, বিক্লবা, বিবশা, হইয়াছে ব্রজবালা
যামিনী যে যায়, চাদ যে লুকায়, শুকায় ফুলের মালা !
;
সুন্দর।
হে সুন্দর মনচোর! ধরি ধরি ধরিবারে নারি ।
সপনের জ্যোৎস্নালােকে, আবছায়ে, ইঙ্গিতে আভাসে,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
বুঝি তােমা,তবু তুমি কি সুন্দর! যাই বলিহারি !
সৌন্দর্য্যে -মাধুর্যে তব, মুগ্ধ আমি ; এ তনু উল্লাসে
ভরপুর, সুধাসিক্ত আনন্দের অশ্রুজলে ভাসি।
কি চাতুরী, কি মাধুরী! কামরূপ হে গগনচারী,
হিরন্ময়ী দ্যুতি ধর, কৃষ্ণ মেঘে কুৎসিত নেহারি,
কর তারে ভীম-কান্ত, অপরূপ বিদ্যুৎ-বিকাশে !
অশােভন ঝিনুকের দাগে দাগে, আবিরের রাগে,
ফুটে উঠ! কালাে শিশু,চুপে গিয়া, তাহার সদনে,
দেখা দাও, প্রেমময়ী জননীর মােহন চুম্বনে ;
শ্যামাঙ্গী সতীরে কর গৌরাঙ্গিনী পতির সােহাগে।
আমিও কুৎসিত, নাথ !—এ আবিল সরসী-সলিল,
পূর্ণচন্দ্র ! তব স্পর্শে হােক্ স্বচ্ছ মােহিয়া নিখিল ।
কবি সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি
নরবেশে দয়া তুমি, অশ্রুজলে নেত্র ঢল ঢল,
দু’অধরে ম্লান হাসি,—সেবাব্রতে উৎসর্গ-শরীর,--
নিশান্ত বালেন্দু সম অনুপম ; মরি কি রুচির
পাণ্ডুর বদন-কান্তি! শ্ৰী-অঞ্চল (জননী-অঞ্চল !)
নিশি দিন সচঞ্চল মুছাইতে তপ্ত অশ্রুজল
আৰ্ত্ত আর ব্যথিতের! তােমার ও অ-মুক্তানীর,

৮৬
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
হারি মানে তার কাছে প্রভাতের করুণ শিশির
অরুণ কমল-দলে,—কি মােহন লাবণ্য তরল ।
এ ছবির নাই মূল্য—তব তুল্য নাই মহাপ্রাণ,
তাই ইন্দ্রধনু-বর্ণে রঞ্জিলাম এ উজ্জ্বল ছবি !
হে সুধীন্দ্র, জানি তুমি সুলেখক, সুরসিক কবি,
শত গুণে সুধাসিক্ত ; তবু মাের বিমুগ্ধ নয়ন
নহে লুব্ধ সে সৌরভে,—ছাড়ি জাতি, যুথী ও মল্লিকা,
অলি করে গুঞ্জরণ, হেরি ফুল্ল গােলাপ-কলিকা।
রাজা রামমােহন রায়।
হে রাজেন্দ্র ! শসহরা তমস্বিনী ঘােরা।
একটি নক্ষত্র নাই। আজি এই বঙ্গে;
ভেসে যাই ভেসে যাই ভেসে যাই মােরা
রঙ্গময়ী লালসার চঞ্চল তরঙ্গে।
হাসি মনচোরা হাসি অপাঙ্গে জ্বভঙ্গে,
আনিছে নাস্তিকতা! সুরা রক্তাকারা
পাত্রে ঢালে মুহুর্মুহু ! হয়ে মাতােয়ারা
অধৰ্ম্ম-অঘাের-পন্থী, হের, পিয়ে রঙ্গে!
হে রাজর্ষি । এস এস এ ঘােরা যামিনী
পােহাক্ ! হেরিয়ে, দেব ! ভকতি-উষারে
আবার হাসুক হর্ষে বঙ্গ অভাগিনী।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
৮৭
আন দেৰ জ্ঞানারুণে--সে আলাে-জোয়ারে
স্নান করি, আহা! বঙ্গ বিরহ-বিধুরা,
পতিক্রোড়ে হােক আজি মিলন-মধুরা !
সাধুর হাসি।
পশিয়া শব্দের হাটে, বিপুল বিপণি
খুজিলাম বুঝাইতে সাধুর সুহাসি।
কোথায় উপমা ? শুধু শূন্য শব্দরাশি ।
সৌন্দর্য্যের সাজি হস্তে মােহিনী বরণী
হাসিতেছে! ভক্তিভরে, হইয়ে উল্লাসী,
কহিলাম, “হে ধরিত্রি! কোথা সে সুষমা,
সাধুর হাসির যাহা উজ্জ্বল উপমা ?
হাসিয়া কহিলা দেবী, “সব পুষ্প বাসী!”
দেখাইয়া দিলা মাতা, মধুর ইঙ্গিতে,
একটি উপমা!—এক বালিকা যুবতী
ফিরিয়াছে পিত্রালয়ে ; সহাস্যে ত্বরিতে
ধরিল মায়েরে, বেড়ি সে স্নেহ-মূরতি।
হে সাধু ! মায়ের কণ্ঠ, সংসার ছাড়িয়া
তেমতি কি ধর তুমি, হাসিয়া, হাসিয়া ?

৮৮
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
সুললিতা।
(কোন একটি বিধবা বালিকার প্রতি।)
অপরাজিতার সম ছিলি মনােহরা
ফুলে ফুলে ভরা।
শারদ সেফালী সম একরাশি ফুলে
মুকুলে মুকুলে,
ছিলি তুই ভরপুর অপূর্ব সৌরভে,
অপূর্ব গৌরবে।
বসাের-গােলাপ-সম ফুল্ল বিকশিত
ভ্রমর-ঝংকৃতা,
ছিলি তুই আনন্দিতা, প্রকৃতি-দুহিতা।
অয়ি সুললিতা।
২
রজনীগন্ধার মত উল্লাস আকুলা,
ছিলি রে অতুলা।
কদম্ব-কেশর-সম পূর্ণ পূলকিতা
সদা উচ্ছ্বসিত।
হাসুনাে হানার মত সৌরভ-ঝরণা
ছিলি অতুলনা ;

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
কুঞ্জ-কুরঙ্গীর মত লাবণ্যে অজিতা,
সদা উল্লাসিতা
ছিলি তুই অনিন্দিতা কুন্দ-বিনিন্দিতা,
অয়ি সুললিতা !
সহসা উঠিল ঝড়, বিবা, বিবশা
একি তাের দশা !
স্বর্ণ-প্রজাপতি কেন বসে না অলকে,
যূথিকা-কোরকে ?
বারাণসী চেলী কেন ঝলকে ঝলকে
আর না চমকে ?
যেন কোন হঠ যােগী কপট কৌশলে
ক্রর মায়াবলে,
উচ্চারিল মায়া-মন্ত্র, নলিনী মধুর
হইল ধুতুরা !
৪
ঊষাকালে রাহু যেন রুষি মহারাষে,
আনিল প্রদোষে।
বৃষ্টিপাতে কড় কড় ককা-আঘাতে,
বৈশাখী ঝঞ্ঝাতে !
খসিল আমের ‘বােল’-এ কি গণ্ডগােল !
এ কি হা হা বােল ?

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
কোথা হতে একরাশি পঙ্গপাল আসি,
সব দিল নাশি।
তাকাল বৈধব্য এল ! হইবি, মােহিনি,
যৌবনে যােগিনী!
ধূ ধূ ধূ ধূ ! বালি শুধু, নাহি জলধারা
কি ঘাের সাহারা ?
নিরাশার পারাবার, তরঙ্গ আকুল,
নাহি বুঝি কূল ?
বার মাস, বার মাস বহে অবিরল
তপ্ত আঁখিজল !
কি মেঘান্ধ অমানিশা! একটি তারকা
নাহি যায় দেখা ।
আশার জোনাকি-পাঁতি ও নাহি জলে
এ গগন তলে !
তবে কি এমনি তাের চির দিন যাবে ?
রাতি না পােহাবে ?
এ কুসুমে করিবারে সফলা সরস
নাহি কি বরষা
আধা আঁকা এই ছবি পূর্ণ করিবারে
কে কৌশলী পারে ?

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
আর কি রে আসিবে না বসন্ত-জোয়ার ?
কুসুম-সম্ভার ?
শ্মশান হয়েছে হিয়া ! এ শ্মশানে বাস
তাের বার মাস।
৭
শােন লাে আশার কথা, এ ক্ষত অক্ষয়
নয় নয় নয়।
ইহারও ঔষধি তাছে, অপূর্ব লেপনী,
বিশল্যকরণী !
প্রাণ জুড়াইয়া যায় করিলে লেপন
এ শ্বেত চন্দন।
ধূ ধূ ধূ ধূ মরুতেও বুদিয়া উঠে,
এ ফোয়ারা ছোটে।
কবির আশ্বাস-বাণী, কল্পনা-কাহিনী
নয় লাে নন্দিনী।
৮
নীরব লো তাের কানে সুখ-সাধ-আশা-
প্রণয়ের ভাষা।
তাই যদি হইয়াছে বাসনা-বালাই
পুড়ে হাে ছাই।
জগতের সুখ-সাধ অপূর্ণ অলীক,
সকলি বেঠিক,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
শ্মশানেরে সত্য বলি বুঝেছে যে ঠিক,
সেই সে রসিক।
কর, তবে কর বলি, ত্যজিয়া বাসনা,
শ্মশান-রচনা।
সেই সে শশ্মানে বসি, কর মহা ধ্যান,
মুদিয়া নয়ান ।
হইলে ইন্দ্রিয়-জয়, হবি বিজয়িনী,
শ্মশান-বাসিনী!
বম্ বম্ হর হর-হর হর রবে,
উৎকট উৎসবে,
দিবে দেখা নৃত্যকালী! তাধিয়া তাধিয়া
নাচিয়া নাচিয়া,
হাসিয়া হাসিয়া, তােরে নিবে নিজ কোলে,
আনন্দের দোলে ।
সে শুভ মুহূর্তে দেবী, সে মাহেন্দ্ৰ ক্ষণে,
নব জাগরণে,
জাগিয়া হেরিবি তুই মাতিয়াছে সবে
বসন্ত-উৎসবে।
সারা বিশ্ব দুলিতেছে, আনন্দের দোলে,
মহাকালী-কোলে।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
তখন আবার তুই সীমন্তে মধুর
ধরিস সিন্দুর,
অনিন্দিতা অনিন্দিতা ভুবন-বন্দিতা,
অয়ি সুললিতা ।
রাঙা মেয়ে।
১
তােরে হেরি, রাঙা মেয়ে, আজি আমি নিদ্রায় মগন ;
তুই মম সুখের স্বপন।
ভয় হয় পাছে আসে বুক-ভাঙ্গা চির জাগরণ।
তীব্র রৌদ্রে ধাঁধিয়া নয়ন।
কোথা ছিলি এত দিন দেবকন্যা, আনন্দের খনি ?
নয়ন হারায়ে ছিনু ;—কোথা ছিলি নয়নের মণি ?
২
তােরে হেরি, রাঙা মেয়ে, বুঝেছি যা কভু বুঝি নাই
নারী সৰ্ব্ব সুষমার সার !
চাদের কেবলি জাঁক, গােলাপের কেবলি বড়াই,
ফিকে ইন্দ্রধনুর বাহার!
সৃজিয়া নারীর মূর্তি, হে শ্রীহরি কোন্ ঊষাকালে
হইলে অবাক্ তুমি, নিজে মুগ্ধ নিজ ইন্দ্রজালে ?

৯৪
অপূর্ব নৈবেদ্য ।
তােরে হেরি রাঙা মেয়ে, বুঝিয়াছি আসল সৌন্দর্য্য
চিত্ত মাঝে নাহি পড়ে ধরা !
প্রতিভার তুলিকায় ল’য়ে স্নান বর্ণের ঐশ্বৰ্য্য
সুধু বৃথা অভিনয় করা।
দীপ দরশনে হায়, রুদ্ধ কোনাে গৃহকোণে বসি
হয় না হয় না তৃপ্তি, বিনা আকাশের পূর্ণ শশী ।
৪
তােরে হেরি, রাঙা মেয়ে, বুঝিয়াছি কাব্যের নায়িকা
মিথ্যা খ্যাতি পায় ধরাতলে,
তুই মাগগা চিরসত্য, তারা হয় মিথ্যা বিভীষিকা
বহু ভেদ আসলে নকলে ।
বনবাসে গেলে চলি, সীতা সতী লাবণ্যের রাণী,
কে চায় সোনার সাতা? সোনা নয়, সে শুধু পাষাণী ।
তােরে হেরি, রাঙা মেয়ে, বুঝেছি মা, বিলাস-লালস।
সব ভস্ম, কেবলি তা ছাই!
একমাত্র হােমানল-পবিত্রতা, হরিপদ-আশা ;
হেন আলাে ধরাতলে নাই।
তুই যে মণির শিখা, রাঙা মেয়ে না জানি কেমন
আমার সে নীলমণি, কৃষ্ণধন, অতুল রতন !

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
বাবা মাথােদাসজী।
১
শুভ্র পুষ্পরাজী তুল্য হাসিতেছে আজি
শুক্লা জ্যোৎস্না ; করে ল’য়ে ফুলসাজি
দেবকন্যা ভক্তি আজি হের হাসিতেছে ।
হে মহর্ষি ! ভক্তবৃন্দ আজি ভাসিতেছে
আনন্দ-সলিলে ! শুনি হরিনাম-গান
মত্ত মধুপের সম প্রফুল্লিত-প্রাণ!
বেদপাঠ শুনি আজি অন্তরের ছায়া
হেরিতছি !—মুক্তাকাশে কি বিরাট কায়া
উর দেব উর আজি! এই শিলাসন
আবির্ভাবে তব হােক পূর্বের মতন
শােভাময়, সেই সৌম্য-হাস্য-মূৰ্ত্তি ধরি,
পূজাসনে বসি জপমালা হাতে করি,
তেমতি তন্ময় হয়ে কর আরাধনা ;
আমরা অবাক হয়ে হেরি সে সাধনা।
২
আবার আসিয়া সেই সত্যনিষ্ঠা শিক্ষ।
শিখাইয়া যাও ; কর মহাব্রতে দীক্ষা,
জ্বালি দীপ্ত ধৰ্ম্মকুণ্ড! ভুলি লীলারঙ্গ
পুড়ে হােক ছারখার কাপট্য-তরঙ্গ

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
জ্বলন্ত পাবকে ! দগ্ধ হােক পাপরাশি,
ঘুষুক ধৰ্ম্মের শঙ্খ প্রেম অবিনাশী ।
লােলজিহ্বা অগ্নিশিখা সম নির্ভীকতা,
চিকণ দর্পণ সম সে সহৃদয়তা,
কোথা আজি ? কোথা সেই নিষ্কাম সাধনা।
সমভাবে সকলের মঙ্গল কামনা ?
কোথা সেই নির্লোভি ? কোথা সে আগৰব ?
দেবের দুর্লভ সেই গুণরাশি সর্ব ?
কেন আজি অপ্রকাশ ? যেন অগ্নিরাশি
ভস্মে ঢাকা ! আসি দেব, দেখা দাও হাসি !
হে দেব, কথার ভঙ্গি নাহি জানি আমি।
তুমি সব বুঝিতেছ, হে অন্তরযামি।
কুরূপা কবিতা মাের, অলঙ্কার-ঘটা
কোথা এর ? কোথায় বা সৌন্দর্য্যের ছটা ?
ভক্ত যবে দু’টি পুষ্পে দেবেরে সম্ভাষে,
অনুরাগে তুষ্ট হয়ে ইষ্টদেব হাসে !
অন্ধকার! দীপ নাই! পতির চরণ
সতী যবে করে আনন্দে বন্দন,
পতির নয়নে বহে পুলকের ধারা !
আকুলা ব্যাকুল হয়ে পাগলিনী পারা,
মা কি নাহি ছুটে আসে, আকুল আহ্বানে,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
শিশু যবে “মা” কথাটি মুখে তার আনে?
ওগাে বাবা ! বাণবিদ্ধ হরিণের প্রায়
এসেছি এ পােবন, কোথা তুমি হায় !
৪
;
;
আমারি কুকৰ্ম্ম এই বিষদিগ্ধ বাণ
ছাড়িয়াছে!একি জ্বালা! বাহিরায় প্রাণ।
জননীর দেব ! মত টানি লও তীর
বন্ধ কর, দুই হস্তে চাপিয়া রুধির।
“শান্তি শান্তি” বলি আহা অগুরু চন্দন
দাও ক্ষতে; যাক্ জালা, জুড়া জীবন ।
পায়ে পড়ি; লও, লও, সব দুঃখ হরি’
সংসার-রােগের দেব! তুমি ধন্বন্তরি।
হরিদ্বারে, হৃষীকেশে, কত ঘুরিয়াছি।
কোথা শান্তি ? সুধাবিন্দু কই পাইয়াছি ?
সেই ভাঙ্গা বুক!“সেই বিষন্ন বদন!
উপাধানে মুখ ঢাকি সেই সে ক্রন্দন !
মৰ্ম্মের এ তুষানল নিভে না!—নিভে না।
করি তাই তব দ্বারে আকুল প্রার্থনা !
হে মহর্ষি ! মৃত্যু তব জীবনেতে ছেদ
করে নাই !-ভাগবতে ভগবানে ভেদ
নাই! নাই! তুমি আছ এ দেবমন্দিরে
৭

৯৮
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
মিশাইয়া রাধাকৃষ্ণ-যুগল-শরীরে !
অসীমে অসীম টুকু পাইয়াছে লয় ;
তুমি আজি বিশ্বময় ! তুমি বিষ্ণুময় !
হে দেব, এ কলিপুত্র পাপাসুর রিপু
করে ঘাের অত্যাচার হিরণ্যকশিপু!
কলুষিত আত্মা মম, দারুণ প্রহারে
কাঁদিতেছে ! তােমা বিনা কে আর নিবারে ।
নরসিংহ-রূপে দেব, করি হুহুঙ্কার,
কর কর পাপ দৈত্যে সমূলে সংহার ।
আমার এ দীন আত্মা মুছিয়া নয়ান,
লভুক, লভুক, দেব, লভুক, কল্যাণ।
যােগমায়া।
[ যােগ-মায় একটী বালিকার নাম। তাহাকে উপলক্ষ করিয়া
এই শিবানী-স্তোত্র রচিত হইল।
১
কোথা মা ? কোথা মা ? দেখা দে মা মােরে,
পড়েছি তুফানে বিপদের ঘরে ;
আকুল ব্যাকুল ডাকিতেছি তােরে
কোথা তুই মহামায়া !

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
শান্তি-স্বরূপিণী মূর্তিমতী দয়া,
শক্তি-স্বরূপিণী, চির-সর্বজয়া,
চির-ভয়হরা কোথা মা অভয়া,
দে মা দে মা পদ-ছায়া।
২
অন্তরের দুটী আঁখিতারা মেলি,
চক্ষু বুজি ধ্যানে, ভাবি বুঝি এলি ।
এ কোন্ তামাসা ? একি রঙ্গ কেলি ?
নাহি রূপ! নাহি রূপ ।
নিরাকার শুধু চিদাকাশে ভাসে।
কোথায় মা তুই ? মরি যে তরাসে ;
মহা শূন্য যেন বিহরে উল্লাসে !
এ কি তিমিরের স্তপ ।
অলক্ত-রঞ্জিত কোথা সে চরণ ?
দুটী ভুজ-শােভা কোথা সে কঙ্কণ ?
কোটী চন্দ্র জিনি’ কোথা সে বদন ?
বিম্বাধরে সুধাহাসি !
কমকণ্ঠে কোথা মুকুতার মালা ?
বিদ্যুতের বিভা সমান উজালা ?
মুনি-মনােহরা কোথা মা মঙ্গলা ?
এ যে সুধু ধূমরাশি!

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
৪
অন্ধকারে ক্লান্ত খুলিনু নয়ন।
অমনি চকিতে এ কি দরশন।
আধা ঘুম ঘোরে এ কোন্ স্বপন ?
এ কোন্ বালিকা-রূপ ?
এলি কি জননী দুহিতার বেশে ?
অয়ি মায়াবিনি, মৃদু হেসে হেসে,
ঢালি দিল এ যে চক্ষের নিমেষে
ফুল গােলাপের স্তপ !
৫
রূপের তরঙ্গ পড়ে উছলিয়া।
মেঘের সােপানে চরণ রাখিয়া,
কোন্ ঊষারাণী আইল নামিয়া ?
জয় জয় মহামায়া।
আকুল ধরার মৰ্ম্মে মর্মে মিশি,
জ্যোৎস্নার বন্যা ঢালি দিশি দিশি,
এ কোন্ মধুর পৌর্ণমাসী নিশি ?
জয় জয় যােগমায়া !
বৈশাখী নিদাঘে মরুভূ ভিতর
সহসা ভেদিয়া তাপিত অন্তর,
এ কোন্ মধুর জলের ঝঝর,
কল কল বাহিণী ?

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
এ কোন্ হেমন্তে বাসন্ত-সােহাগ ?
অকাল-বােধনে অশােকের রাগ ?
এ কোন্ রসালে কোকিলের ডাক,
কুহু কুহু ঝঙ্কারিণী ?
৭
;
প্রতি পদক্ষেপে রুণু রুণু বাজে,
মুখর শিঞ্জিনী; মৃদু হাসে, লাজে ।
এ কোন্ কবিতা রূপসীর সাজে,
নয়নে উছলে বাক্ ?
রাজরাজেশ্বরী, কনকের তাজে,
এ কোন্ কবির প্রতিভা বিরাজে ?
এ কোন্ নবাব-কল্পনা-এম্রাজে
মােহিনী সােহিনী রাগ।
কোন্ নীহারিকা তারার মাঝারে ?
কোন্ কহিনুর রত্নের আগারে ?
উজল ধবল মুকুতার হারে,
কোন্ মধ্যমণি ?
এ কোন্ মধুর জন্মাষ্টমী দিনে,
মিলিয়া মিশিয়া নবীন-প্রবীণে,
নগরে নগরে বিপিনে বিপিনে
সুমধুর হরিধ্বনি।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ! এই বিমােহিনী বালিকার রূপে, বুঝি মহামায়া বুঝাইলি চুপে, লাবণ্যের সার অয়ি অপরূপে চিন্ময়ী মূরতি তোর ! আভাসে সঙ্কেতে দেখালি চরণ, ছন্দে ছন্দে যার শক্তি অতুলন, মুনিগণ যার নখ-দরপণ, নেহারে আনন্দে তাের । আধ শশিসম উজল ললাট দু আঁখি বিশাল দুইটী কপাট, আসে যায় যাহে করিয়া উঘাট- শুভ্র চিন্তা ঋষিবালা। বদন কমল অধর বাঁধুলি, দুভুজা মৃণাল, কণ্ঠে বুলবুলি, চরণ পরশে, ধরণীর ধূলি জুড়ায় নিদাঘ-জ্বালা। ১১ জুড়াল নয়ন, জুড়াল পরাণ, কোন্ ভাগ্যবান্, নন্দন বাগান ফুল্ল-পরিজাত করিয়াছে দান গড়িতে এ ফুলদানী ?

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
এ আদর্শে মাগাে মুদিয়া নয়ন,
আবার উৎসাহে আরম্ভিব ধ্যান ।
বৃত্তি করি রােধ করিব নির্মাণ
মানসে এ চিত্রখানি।
১২
চিত্তাকাশে এ কি ? ছুটিতেছে লক্ষ
আনন্দ-কপােত, ঝাপটিয়া পক্ষ,
কৃষ্ণপক্ষ শেষে একি শুক্লপক্ষ ?
মানস-তিমির-হরা !
ঘুচিল মা ভয়, ঘুচিল সংশয়,
ঝটিকার শেষে একি রে উদয়-~-
মূর্তিমতী শান্তি ! জয়, জয়, জয়,
চিরহাসি সুধা-ভরা !
নিদাঘাৰ্ত্ত দীর্ঘ দিবসের শেষে
নীলাম্বরী সাড়ী পরি মৃদু হেসে
এ যে সন্ধ্যারাণী ! বিমােহিনী বেশে।
এ কি অমৃতের বন্যা !
বহু তপস্যায়, পুণ্য-পুঞ্জ-ফলে,
পূৰ্বজনমের সুকৃতির বলে,
আজি সন্ধ্যানারী পাইয়াছে কোলে
কোলভরা এ কি কন্যা ।

১০৪
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
*
১৪
এবার তপস্যা হবে না নিস্ফল
নিরাকার মাঝে সাকারে সম্বল
পেয়েছি পেয়েছি, আঁধারে উজ্জ্বল
এ যে স্থির সৌদামিনী ।
কি আদর্শ আজি এ বালিকা-রূপে,
সঙ্কেতে আভাসে দেখাইলি চুপে ।
জয় যােগমায়া, জয় অপরূপে,
জয় বিশ্ব-বিমােহিনি।
গিরিজা-সুন্দরী।
[ বিশ্বধাত্রী মা দুর্গার মত লাবণ্যময়ী একটী কন্যাকে দেখিঃ
এই কবিতাটী লিখিত হইল। কন্যাটীর নামও
গিরিজাসুন্দরী।]
আয় মা গিরিজা!--নয়নরঞ্জন
গিরিজার মত, সুন্দর বদন,
মুর্তিময়ী প্রভা, বিশ্ব আলােকরা,
পাদপদ্মস্পর্শে জুড়া এ ধরা!
বহুকাল হ’তে আমারাে এ প্রাণী
দাবদগ্ধ মাগাে, শান্তি নাহি জানি ।

;
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
তাই মা তাই মা, শান্তিনিকেতন,
ও তাের সৌন্দৰ্য-ঝরণা শােভন
নিরখি, জুড়াল ক্লান্ত দুটা আঁখি ;
কোকিলের সাড়া পেয়ে জীর্ণ শাখী
মুঞ্জরে যেমতি গুঞ্জরিলে অলি
ফুটে উঠে যথা গােলাপের কলি ?
রবিছবি আর নীরদ প্রকাশে
ইন্দ্রধনু যথা নীলাকাশে হাসে !
তরল কনক-জ্যোৎস্নানীহারে,
শারদী সরসী,
কুমুদ-কলারে
ভরি যায় যথা, মলিন পাণ্ডুর
দুঃখিনী বিধবা, হেরিয়া মধুর
একমাত্র শিশুপুত্রের সুমুখ ?
পায় গাে যেমতি বুকভরা সুখ!
অয়ি কন্যা । আজি হেরি ও বদন
বােধ হইতেছে, আপনার জন
তুই যেন মাের !-তােরে মা নেগরি,
দুটী বিন্দু কেন আনন্দের বারি
দেখা দিল আজি নয়নের কোণে ?
একি মুর্তি হেরি হৃদয়-দর্পণে ?
গাে গিরিজা তুই মাের উমাশশী ।
রূপের প্রভায় নয়ন ঝলসি’

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
গেল গেল মাের!-কল্পনার বলে
আমিও সেজেছি মহা কুতূহলে
জননী মেনকা !
বল্ মা ভবানি,
পাষাণের মেয়ে হলি কি পাষাণী ?
মায়েরে ভুলিয়া, কোথায় না জানি
ছিলি এতদিন। নেত্রে ঝরে পাণি ।
চারি ধারে হেরি আঁধার রজনী,
কোথা ছিলি বল নয়নের মণি ?
আয় মা গিরিজা ! মােহিনী রূপসী
মা আমার তুই, তাের মুখশশী
হেরি মা গাে আমি আনন্দে আকুল।
দুর্লভ দুর্মূল্য ডুমুরের ফুল
পেয়ে যেন, আমি হইয়াছি রাজা !
কল্পতরু তুই জননী গিরিজা ।
ধৰ্ম্ম অর্থ কাম আর মােফল
সকলি যেন মা তাের করল ।
একবার ভাবি তুই মাের কন্যা,
আর বার ভাবি ধন্যা ও বরেণ্যা,
ঈশ্বরী তুই মা রাজরাজেশ্বরী !
রাঙা পা-দুখানি ( ইচ্ছা হয় ) ধরি ;
একবার ভাবি তুই স্নেহপাত্রী,
আর বার ভাবি তুই বিশ্বধাত্রী!

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
১৭
তুই মহাদেবী আমি মূঢ় নর,
কেমনে মা করি সােহাগ আদর ?
যা রে তােরা চলি, যা রে নামরূপ,
আজি অাঁখি ভরি, অতি অপরূপ
হেরিব মায়ের বাসন্তী মূরতি,
পার্বতীর বেশ যােড়শী যুবর্তী
বিকসিত-নেত্রা, হসিত-বয়ানে,
চলেছেন ধীরে শিব-সন্নিধানে।
রঙ্গেছে অধর যেন রে কুঙ্কুম !
সােনালী কপােলে অতসী কুসুম
বিছায়েছে যেন ফুলের বিছানা।
যেন শত অলি, প্রসারিয়া ডানা,
রচিয়াছে চক্র মায়ের কুন্তলে।
মূর্তিময়ী শােভা নেমেছে ভূতলে !
ফুলে ফুলে ফুল্লা পদ্মরাগে জিনি,
লােহিত অশােকে সেজেছে মােহিনী ।
কি শােভা উথলে সিন্ধুবার-হারে !
মুকুতা কলাপ হায় তাহে হারে !
কর্ণিকা কুসুম, কাঞ্চন-বরণ,
আহা মরি মরি মায়ের বদন
করিয়াছে হের আরও সুমােহন।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
;
হিমাদ্রি-শিখর হয়েছে ফুলন্ত,
চারিধারে মরি অকাল-বসন্ত
হাসিছে ; উমার চরণ-পরশে
বিঘলা ধরিত্রী পুলকে হরষে।
হায় কবি! তব একি মহাভুল !
তুমি কি ভেবেছ ভুবনে অতুল
কর্প হইল ভস্ম-অবশেষ
শিবের ললাট-নয়ন-অনলে ?
জান না ?-মায়ের মাধুরী অশেষ
হেরিয়া মােহিত, এই মহাছলে,
ত্যজিল মদন নিজ ফুলধনু
ত্যজিল লজ্জায় নিজ ফুলতলু !
অয়ি কন্যা, অয়ি লাবণ্যের সার,
তােরে হেরি আজি মায়ার বিকার,
জীব-ব্ৰহ্মভেদ, ঘুচেছে আমার !
ঘটাকাশ আজি মিশেছে আকাশে ;
হৃদয়-আঁধার আজি অপসার
অনন্ত উদার জ্যোৎস্না প্রকাশে ।
তুই মা গিরিজা, নয়ন-রঞ্জন,
গিরিজার মত, সুন্দর-বদন,
মূৰ্ত্তিময়ী প্রভা, বিশ্ব আলােকরা,
পাদপস্পর্শে জুড়ালাে ধরা!

অপূর্ব নৈবেদ্ধ।
রাজলক্ষী।
কোনও একটা মা ইন্দিরা সদৃশ পরম রূপবতী
বালিকা দর্শনে এই কবিতাটী রচিত হইল।
কাটীর নামও রাজলক্ষ্মী।”]
মাতঃ রাজলক্ষী রাজরাজেশ্বরি,
তাের সুধাহাসি রূপরাশি মরি
অনিন্দ্য পবিত্র, শোভার নিঝর
কি যে শুভক্ষণে নয়নতােচর
হইল রে আজি। মরি কি রুচির
ঘুচে গেল মাের আঁখির তিমির।
উষা রাঙা মেয়ে অরুণের কন্যা,
ঢালি দিল যেন আলােকের বস্তা ;
নীরবে নিশির নিবিড় আঁধারে
ভরি গেল বিশ্ব আলাের জোয়ারে।
সাগরের নীল ফেন পুরাশি
ভেদ করি মরি, গালভরা হাসি
এসেছেন আহা জননী ইন্দিরা
নাকেতে বেসর কাণে দোলে হীরা।
বদনে এখনও হাসিছে বালে;
কেশের তরঙ্গে নীল নীর বিন্দু

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
এখনও ঝরিছে মায়ের আমার।
অলকে ঝলকে মুকুতার হার।
ভুজে শ্বেত শাখা মরি কি মধুর ;
চরণ পারুলে প্রবাল নূপুর।
রত্নচেলী অঙ্গে করে ঝম,
মােহন বদন, নয়ন উজ্জ্বল।
বাজা তােরা শঙ্খ জয়ধ্বনি কর
কমলার বেশ মরি কি সুন্দর।
যেথায় দাড়ান আমার অম্বুজা
নিত্য সেথা সুখ নিত্য সেথা পূজা।
ও তাের সারল্য মাধুরী মাখানো
পবিত্র হাসিতে কি মধু জড়ানাে
ওই মুখচ্ছৰি কি সুধা লুকানাে
নয়ন উৎপলে, আমি ক্ষুদ্র কবি
কেমনে বণিব ? র্যাফেলের ছবি
মূর্তিমতী হয়ে দাড়ায়ে সম্মুখে
উথলি উঠিছে যেন রে কৌতুকে
অপরূপ এক শােভার ফোয়ারা
বিন্দু বিন্দু ঝরে লাবণ্যের ধারা।
সৌন্দর্য্যের পূত গঙ্গাজল দিয়া
আজি আঁখি দুটি ফেলিনু ধুইয়া ।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
হেন বােধ হয় ধীরি যীরি ধরি
ছায়া যবনিকা যাইতেছে সরি।
আয় মা, আয় মা, তাের বিশ্বরূপ
বিশ্ব-বিমােহন অতি অপরূপ,
হেরিবারে, আমি হয়েছি পাগল
দে দুনয়নে ভক্তির কাজল।
বল, ম', বল, মা কাশীতে আসিয়া
অন্নপূর্ণা রূপ চক্ষে না হেরিয়া
ফিরি যাব ঘরে ? বল, মা, বল, ম:
করিসূনে আর সন্তানে ছলনা ?
ঘাটে আসি হায় পিপাসা আতুর
থাকিব কি ? তৃষা হবে না মা দূর ।
শােভার উদ্যানে বেদানা আঙুর
চারি ধারে তবু মিটিবে না ক্ষুধা
মরে কি মানুষ সঞ্জীবনী সুধা
পান করি? কোথা রাজরাজেশ্বরী
দেখা দে, দেখা দে, দয়া করি উরি
হৃদয় আসনে, বিলম্ব সহেনা
আয় মা, আয় মা, কমল-আসন।।
এই বালিকার সৌন্দর্য্যের শিখা
করিছে দাহন মায়া-যবনিকা।

অপূর্ব নৈবেদ্য।
সে অনলে আজি সেই হােম-বাগে
ভক্তি সজ্জরস ঢালি অনুরাগে
আছি দাড়াইয়া ঘুচেছে কলঙ্ক
আত্মার আমার, বাজাইয়া শৰ
করি জয়ধ্বনি ডাকিতেছি তােরে,
দেখা দে, দেখা দে, দেখা দে মা মােরে ;
এ অনিত্য রূপে হয় না মা তৃপ্তি
নিত্যরূপে তাের প্রকাশিয়া দীপ্তি
দেখা দে মা আজি।
কাণেতে কুণ্ড
রত্নচেলী অঙ্গে করে ঝল, মল;
চরণে নূপুর আনন্দে ঝঙ্কারে,
মধুর বচনে পিকবধূ হারে।
সুমধুর হাসি মধুর বদন,
অক্তরঞ্জিত মধুর চরণ।
যেখানে পা পড়ে ধর হেসে উঠে,
পাদপদ্ম-স্পর্শে পদ্ম ফুল ফোটে।
আয় মা, আয় মা, বরদা অঘুজা !
নিত্য হােক সুখ, নিত্য হােক পূজা।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
বঙ্কিম চন্দ্র।
সেই ফটকের পাশে ভূঙ্গেরে সম্ভাষি,
কহিনু “হে ভৃঙ্গ, তব বিচিত্র পরাণ
জানে না কি শান্তি ? হায়, সারা দিনমান
পুষ্পকুঞ্জে ছুটাছুটি !—তােমারে সাবাসি ।
সাবাসি, হে মধুপ্রিয়, আইল তামসী,
এখনাে যূথীর গৃহে করিছ সন্ধান।
এখনাে নাচিছে তব সতৃষ্ণ নয়ন
সেফালির কুড়ি হেরি ?-হাসিছে অতসী ।
সারাটি দুপুর তুমি বরটির সাথে
করি দ্বন্দ্ব, মকরন্দ ভখিয়াছ সুখে
তীব্ৰহলাহলপূর্ণ আকন্দের পাতে”
( শুনিয়াছি গুণপনা ধুতুরার মুখে )।
কোথায় মৌমাছি ?—মাের ভাঙিল চটক ;
বঙ্কিম বাবুর এ যে গৃহের ফটক !

১১৪
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
;
কোকিল।
( কৰিবর স্বর্গীয় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বহু দিন :
মৌনব্রতী ছিছেন। এই অনুযােগপূর্ণ কবিতাটি তাহাকে লক্ষ্য করিয়া
বিরচিত হইয়াছিল।)
বসন্ত উৎসব আজি ; মুকুলে মুকুলে
মদনের প্রিয়তরু হ’ল ভরপূর ;
ভ্রমরের গুঞ্জরণ বকুলে বকুলে,
উর্বশী ধরেছে যেন বিরহের সুর !
বাসন্তীর লাল নীল দুকূলে দুকূলে
“গুল” বসায়েছে কোন্ শিল্পী সুচতুর ?
হর্ষে ভরা বিশ্ব যেন হেরিছে নিখিলে
প্রথম প্রেমের মরি স্বপন মধুর !
শ্যামা শিসে * প্রাণ আনি ওষ্ঠের আগায় ;
পাপিয়া ঝঙ্কারে, পুষ্প-নেশায় বিভাের ;
দোয়েল নবীন ছন্দে নব গীতি গায়
হে কোকিল, তব প্রাণে কেন ঘুমঘাের ?
জাগ, জাগ ; শুক, সারী—আকাশ বাউল
শুনিতে বাসন্ত গীতি হয়েছে ব্যাকুল ।
;
“শিসে” অর্থাৎ শিস দেয়। ভাই, বাউলের কথায় কেহ রাগ করিও না

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
কবির জন্ম।
( গােবিন্দ বাবুর কুঙ্কুম-কাব্য পাঠ করিয়া।
অহহ মাদকতা ঘাের ! খাইয়ে আঙ্গুর
কুমের, নেশায় হইমু চুর চুর।
জড়াইয়ে গেল বাণী, জড়াইয়ে গেল
দুই চক্ষু; ধীরে নিদ্রা আসি দেখা দিল ;
সুপ্ত আত্মা, কাব্য-মদ-নেশায় আতুর,
দেখিল অদ্ভুত স্বপ্ন, মধুর মধুর !
কারণ-সমুদ্রতটে বিরিঞ্চি বসিয়া
পদ্মাসনে প্রাণিবৃন্দ সৃজিয়া সৃজিয়া
যেন কিছু শ্ৰান্ততবু নাই পরিত্রাণ ;
হে নিয়তি, রাজা তুমি, তুমিই মহান্ ।
নিম ও নিসিন্দা আর ক্ষিপ্ত ডালকুত্তার রুধিরে
সৃজিলা সমালােচক ভাসি' ধাতা নয়নের নীরে !
মুড়াে নটে গাছে মরি অম্রিশাখা জোড়াতাড়া দিয়ে
বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে novelist ফেলিলা সৃজিয়া।
আলুনি কলায় ডা’লে পোড়া ভাত মাখিয়া চুখিয়া
সৃজিলেন বঙ্গ Punch রসােরাজে হাসিয়া হাসিয়া ।
কাক ও জম্বুক-পিত্তে উকিল সৃজিয়া চতুর্মুখ
আদিদেব পাইলেন অম্ল-মধু সুখ ও অসুখ !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
জাঁতা দিয়া চূর্ণ করি কপােতের ক্ষুদ্রদেহখানি,
হংসপুচ্ছ কাণে গোঁজা সৃজিলেন বঙ্গের কেরাণী।
মনু-পৈতা বংশ-কঞ্চি, জড়াইয়া মােরগের ঠ্যাঙে।
সৃজিলেন বঙ্গ-আৰ্য—মচকায় তবু নাই ভাঙ্গে।
লইয়া সারীর গ্রীবা শুকজিহ্বা মেষের পরাণ,
বঙ্গের ম্যাসিনি ধাতা সৃজিলেন, বিচিত্র মহান্ ।
চীৎকারের ভাণ্ডে দিয়া অপরূপ অঙ্গার মশালা,
বাঙ্গালীর মহাকবি, কবিবর, বিধাতা সৃজিলা !
চতুর্মুখ ফিরাইয়া পূর্বদিকে বিরিঞ্চি আবার,
সৃজিলেন অন্য-সৃষ্টি বিচিত্র সে সৃষ্টির ব্যাপার ।
একমুষ্টি তুষানল, আন্ মুষ্টি আতপ তণ্ডুল
লইয়া সৃজিলা ধাতা বঙ্গগৃহে বিধবা অতুল !
লইয়া মাকাল-ফল লবণাক্ত জলধির নীর
সৃজিলা অপূর্ব দেহ হতভাগ্য কুলীন পত্নীর
তার পর আদিদেব সুখ দুঃখে ম্রিয়মাণ প্রাণে
সৃজিতে কবির আত্মা ক্ষণকাল বসিলেন ধ্যানে।
হেরিয়া সে মহাধ্যানে ব্রহ্মাণ্ডের কত শ্রেষ্ঠ প্রাণ
আইল সে মহাতীর্থে, নতচক্ষে, যুগ্ম করি পাণি !
রাধা অসি ঢালি দিল চির-প্রেম চির-অভিমান
জানক। ঢালিরা নিল অমর চিরদুঃখী প্রাণ ;
বসন্তের পুষ্পরাশি ঢালি দিল অনঙ্গ-অঙ্গনা ;
পূর্ণচন্দ্র ঢালি দিল শারদীয় ব্যাকুল জ্যোৎস্না ;
;

অপূৰ্ব্ব নৈবদ্য।
ঊষা দিল অরুণাক্ত অপরূপ প্রসূনের ডালি ;
যানিনী আঁধারপুঞ্জ রাশি রাশি আনি দিল ঢালি ;
অর্পিল মেনকারাণী মাতৃপ্রেম হাসিয়া কাঁদিয়া,
অর্পিল লক্ষণদেব ভ্রাতৃপ্রেম হাসিয়া হাসিয়া---
অর্পিলেন বিশ্বামিত্র ব্রহ্মচর্য চিরজম্মজ্জিত,
বিচিত্র নৈবেদ্যরাশি হেরি ব্রহ্মা হইল স্তম্ভিত!
ল’য়ে সেই সুখ দুঃখ, হাসি কান্না পুণ্য রাশি রাশি
সৃজিলা কবির আত্ম। অপূর্ব সে সৃষ্টি অবিনাশী ।
হে কবি ! তােমার তাই এক চক্ষে হাসিরাশি
আন্ 'চক্ষে জল !
হৃদয়ের এক কোণে অভিমান, অন্য কোণে
মিনতি কেবল ?
প্রভূত সাবিত্রী-তেজ এক হস্তে অন্য কর
শিশু সম ক্ষীণ।
কেহ তােমা দেব ভাবি করে পূজা, কেহ ভাবে
চণ্ডাল শ্রীহীন ।
আজি যদি ক্রুশ দিয়া, বিধে বিশ্ববাসী
তােমার হৃদয়,
হে কবি, কালি গো পাবে মন্দারের মালা, তুমি
জানিহ নিশ্চয়।
= =

অপূর্ব নৈবে।
ডাক্তার হারাণচন্দ্র দাসের প্রতি।
প্রিয়র,
কতবার স্বপ্নে আমি হেরেছি তােমায়,
কেন যে এরূপ হয়, পারি না বলিতে;
ভাল কি বসিলে হায় ! এইরূপ হয় ?
অথবা যাহার নাম উঠিতে বসিতে,
দরিদ্র কাঙাল মুখে
পাই গাে শুনিতে,
স্বপনে হেরিব তারে ইথে কি সংশয় ?
সামান্য লুতিকাতন্তু কাপে রে যখন
প্রান্তদেশে ক্ষুদ্রকীট উড়ে যবে বসে,
অদ্ভুত বিতান হায় ! মানবের মন
কেন না চঞ্চল হবে চিন্তার পরশে ?
যা হাে তাহােক প্রিয়। কারণ তাহার,
কতবার তব মুখ হেরেছি স্বপনে ;
সেই সঙ্গে দিব্যজ্যোতিঃ প্রশান্ত আকার
হেরেছি কক্ষেতে মম অস্ফুট চরণে
করিতেছে ইতস্ততঃ ; হৃদয় আমার
সুধায়, সুধায়, কিন্তু সুধাতে না পারে ;
একদিন ত্যজি ভয় সুধাইল তারে,
“কে তুমি গাে দিব্যজ্যোতিঃ এ কক্ষ মাকর,
করে লয়ে গ্রন্থ এক কর বিচরণ ?”
;

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
১১
সিয়া কহিল মুর্তি, “ধৰ্ম্মদূত আমি
এই দেখ, চক্ষু খােল; বিস্ময়ে তখন
হেরিনু সে গ্রন্থ-মাঝে অদ্ভুত
লিখন
“দয়ালু হারাণচন্দ্র অখিলের স্বামী
সন্তুষ্ট তাহারাে পরে" ; দেখিতে দেখিতে
ডাকিল পাপিয়া, মাের ভাঙ্গিল স্বপন।
কিন্তু এই কথা সদা জাগে মম চিতে,
নিশান্তের স্বপ্ন মিথ্যা নহে কদাচন।
;
গঙ্গাজল।
কি দিব, কি দিব, দেব ? কি দিব তােমায় ?
দেয় বস্তু কি আছে আমার ?
জবাকুসুমের রাশি, চাহি ও চরণে দিতে,
চিত্ত কিন্তু দেয় গাে ধিক্কার ।
তঁাহারি জিনিস লয়ে, উঁরি পদসেবা !
হে পূজারি, ভুলিলে কি তিনি সেই জল ?
কৰ্ম্মযােগী হয়ে কৰ্ম্ম করিবারে চাই,
ফল করি ও পদে অর্পণ
কে কর্মী ? কাহারে দান ? ভেঙে যায় অভিমান
ভাবি, এ যে বৃথা আয়ােজন।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
তুমি কৰ্মী, তুমি ফল, তুমি ফলদাতা!
ক্ষম ভ্ৰম, ক্ষম ভ্ৰম, হে বিশ্ববিধাতা!
জ্ঞানযােগী হয়ে ভাবি--আমিই ঈশ্বর,
আমি আছি এ বিশ্ব ব্যাপিয়া !
অমনি সে অহঙ্কার কর দেব চুরমার !
দুচরণ কণ্টকে বিন্ধিয়া ;
তখন কঁদিয়া বলি, দোহাই দোহাই !
কুকুর হইবে কিসে জগৎ-গোঁসাই ।
ভক্তিযােগে ভক্ত সাজি কণ্ঠী দিয়া গলে
বীজমালা ঘুরায়ে ঘুরায়ে
রাধাকৃষ্ণমূৰ্ত্তি অগ্রে আমি বসি মহর্ষে
শ্রীপূজার নৈবেদ্য সাজায়ে !
তােমার মােহিনী মায়া নারীরূপ ধরি
ভক্তি মুক্তি কাড়ি লয়-শ্রীহরি হরি
আমার আমিত্ব কোথা ? তুমি দেব সব !
আমি শূন্য, আমি কিছু নই ।
তুমি যবে দয়া কর, তবেই পূজিতে পারি ?
নতুবা আমার সাধ্য কই
মাতৰ্গঙ্গে! গঙ্গাজল দে গাে দে গাে মােরে,
সেই গঙ্গাজলে ইচ্ছা পূজিবারে তােরে।
-
?

অপূর্ব নৈবেদ্য।
বর্ষামঙ্গল।
অয়ি শ্যামাঙ্গিনি ধনি, অয়ি বর্ষা করুণারূপিণি।
স্নান নেত্রে দর দর বিগলিত একি বারি ঝরে,
( বিরহিণী ব্ৰজবধূ যেন আহা হয়ে উন্মাদিনী
ঝঙ্কারিছে বীণা, সেই রাগিণীর অক্ষরে অক্ষরে
ভাঙি পড়ে হিয়া তার আহা মরি গলিয়া ঝরিয়া !)
হে বরষা ! হে সুধা-পরশা ! তুমি বসুধার তরে
গােপনে সঞ্চিত করি রেখেছিলে কত না অমিয়া।
সুধাবৃষ্টি, পুষ্পবৃষ্টি শিখিয়াছ বল কার বরে ?
নিবিড় কুন্তলজাল হেরি তব হেমননামােহিনি,
আনন্দে অধীর আজি,
এ কি
নৃত্য ধরেছে শিখিনী ।
একি গান ধরিয়াছে চাতকিনী, মেদুর অম্বরে।
২
তব অদর্শনে দেৰি ! উষ্ণশ্বাসে আকুল ব্যাকুল
ভয়ত্ৰস্তা বসুন্ধরা ছিল আহা দুটি আঁখি বুজে
স্পর্শে তব হর্ষে আহা আজি সে গাে বাসন্ত-দুকূলা,
এ কি পুষ্পময় চেলি ঝিলিমিলি সবুজে সবুজে !
হে মােহিনি ! নীপে নীপে ঢালি দিয়া অমৃত-মদিরা
জাগায়েছ অঙ্গে অঙ্গে অপরূপ অপূর্ব পুলক !
সােহাগে আদরে যত্নে চুম্বি তার শিরা উপশিরা

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
জাগায়েছ যুথিকার অঙ্গে অঙ্গে অযুত কোরক !
প্লাবিয়াছ চারিধার কি সৌরভে। লাবণ্য-জোয়ারে ?
কোলভরা করিয়াছ বসুধারে পুষ্পের সম্ভারে,
রঞ্জিয়াছ পুষ্পে পুষ্পে ধরিত্রীর বিচিত্র অলক ।
বসন্তের রাণী যবে করে ল’য়ে ফুটন্ত গােলাপ,
কুন্তলে অশোকগুচ্ছ, কমকণ্ঠে কর্ণিকার মালা,
হাসিয়া বসন্ত সহ করে চুপে মধুর আলাপ,
সেই দৃশ্যে সারা বিশ্ব হেসে উঠে হইয়া উজালা
শারদীয়া লক্ষী যবে সুসজ্জিতা ধবল কমলে
হয় মহা গৌরবিণী অঙ্গে ধরি জ্যোৎস্না-দুকূল,
ভাবি তারে ঋতুরাণী বসুমতী তিতি অশ্রুজলে,
চালে তার শ্রীচরণে একরাশি শেফালিকা ফুল।
কিন্তু তাহা মহাভুল !---হে বরষা, আমি বেশ জানি,
বাসন্তী শারদী জিনি’ তুমিই গাে ঋতুকুলরাণী,
ঝুমুকা-অপরাজিতা ফুলে তুমি ভুবনে অতুল।
8
গন্ধরাজ-গন্ধে তব সুরভিত সুচারু অধর।
হে বরষা ! ওকি তব হস্তে শােভে ? লাবণ্য-ভাণ্ডার
এ ফুল তো ফুল নয় ! এ যে চির শােভার নিঝর ;
সােরা-গােলাপ জিনি কোথা পেলে এ “গুল আনার”
দশদি আমােদিত করিয়াছ “হানা-হানায়

অপূর্ব নৈবেদ্য।
মুনির মানস টলে তােমার ও কেতকীর বাসে।
তােমার বকুলফুলে, তোমার ও রজনীগন্ধায়
কি যাদু লুকান আছে? মুগ্ধ বিশ্ব অনিন্দ-উল্লাসে।
হউক বসন্তরাণী গৌরাঙ্গিণী—হে শ্যাম বরষা,
স্নিগ্ধোজ্জ্বল শ্যাম কান্তি তবু তব অমৃত-পরশা !
মধুর তিমিরে তব কি রুচির বিদ্যুৎ প্রকাশে
আর্দ্রকেশে আবেশে প্রকৃতির চিত্রশালে বসি
ভূলিকা লইয়। হাতে, ভাবে ভাের অয়ি অপরূপে,
নানাবর্ণে নানাফুলে কর যবে অতুল রূপসী
হে বরষা! আমি তব গুণপনাহেরি চুপে চুপে।
সরােজবাসিনী।
১
এসেছিস্ কন্যারূপে ? আয় মা ইন্দির,
আয় মা আনন্দ-নিঝরিণী
চৌদিকে রটি উঠে, পুলকে অধীরা,
স্থলে পদ্ম, জলে কমলিনী।
আয় চির পৌর্ণমাসী আয় চির হাসিরাশি
আপনি মা
ফুল
সরােজিনা,
তবুও লীলার ছলে সমােজ বাসিনী ।

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
এ কি রূপ ! চিত্রপটে ছবি যেন আঁকা।
বিশ্বশোভা, লাবণ্যের রাণী ।
দুটি ভুজে শােভা পায়, শাদা দুটি শাখা
আল্‌তায় রাঙা পা দু'খানি।
ঝলকে ঝলকে রঙ্গে, রাঙ্গা চেলি নাচে অঙ্গে।
আয় আয় মধুর-মধুর,
রিণিকি-রিণিকি-রিণি-শিঞ্জিনী-নূপুরা !
ময়ূরপুচ্ছের এ কি চির চিকুর !
গােলাপগুচ্ছের এ কি রূপ ।
ঊষাতে সন্ধ্যাতে এ কি মিলন মধুর !
অতুলন—এ কি অপরূপ।
কুন্দেন্দু-ধলা অয়ি, কমল আনন্দময়,
দিলি হাত তারে তারে তারে,
বাজিছে হৃদয়-বীণা ললিত ঝঙ্কারে।
৪
জলধি-মন্থন-কালে অতল হইতে,
তুই যবে উঠিলি সুন্দরি,
অনন্ত নীলাম্বুরাশি ধাঁধিয়া চকিতে
দিক্-চক্র রূপে আলো করি,

অপূৰ্ব নৈবেদ্য।
কৌতুকে আনন্দে ত্রস্ত সুরাসুর শশব্যস্ত
রূপে স্নান ভাবে ভারানাথ
এ কোন্ রজনী-শেষে অপূর্ব প্রভাত !
কোন্ নব নন্দনের ফুল পারিজাত ?
কোন্ রক্তচননের ফুল ?
কোন্ পুণ্যফল ? কোন অমৃত-প্রপাত ?
সুরাসুর ভাবিয়া আকুল ?
দিবসেই কুমুদিনী, হইল রে আহ্লাদিনী।
অকস্মাৎ আরাধনা বিনা
কঙ্কারি উঠিল হর্ষে নারদের বীণা ।
অশােক হইল রাঙা চুম্বিয়া চরণ,
চুম্বি মুখ ফুটিল বকুল !
এ কোন্ মধুর স্বপ্ন? সুখ জাগরণ ?
সুরাসুর ভাবিয়া আকুল !
চাহি তাের মুখ পানে ভাতিল দৈত্যেরাে প্রাণে
একি সত্য !-ভুলি আত্ম-পর,
দেবে করে আলিঙ্গন, ভাবিয়া সােদর।
৭
হে বরাঙ্গি, ছিলি তুই গভীর অতলে,
কোটী কোহিনূর যথা জ্বলে,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
যথা কোটা পদ্মরাগ লােহিতে উছলে
শঙ্খ হাসে অপূর্ব ধবলে
এখনাে বুঝি মা তাই, শ্ৰীঅঙ্গে দেখিতে পাই
চন্দ্রকান্ত, মুকুতা ও মণি !
আপনি গাে চাননি, মণি-শিরােমণি !
এসেছিস কন্যারূপে? আয় তবে আয়,
সন্তানের হৃদয়-মন্দিরে,
মনের কালিমা-রাশি রূপের প্রভায়
ধৌত হােক, হে দেবি অচিরে :
হৃদয়-সরােজ মাঝে, সরােজবাসিনী-সাজে,
নিত্যরূপে দে মা দরশন !
খুলে যাক, ঘুচে যাক বাসনা-বন্ধন!
৯
ঘুচে যাক্ বাসনার বিপদ-বিপাক,
অকিঞ্চনে কর কৃপাদান !
এক হয়ে যাক্ মাগাে, এক হয়ে যাক
ধ্যেয় বস্তু ধ্যানী আর ধ্যান ।
যেমতি নির্বাত স্থলে কম্পহীন দীপ জ্বলে
থাক তুই হে তিমির-হরা !
থাক্ তুই, সুধাপাত্র! চির-সুধা-ভরা !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্ধ।
তাের চন্দ্রমুখ হেরি, সুধাংশুরূপিণি,
ফুটুক এ হৃদি-কুমুদিনী ।
না জানি আসিবে কবে বিশ্ব-আহলাদিনী।
সে শারদী সচন্দ্রা যামিনী।
তাের শ্রীচরণে লুটে আনন্দে উঠুক ফুটে
এ হৃদয়-রক্তকমলিনী,-
কোথা মা কোথা মা তুই সরােজবাসিনী!
----
১১
চির দিন চির দিন আমি লক্ষীছাড়া,
জন্মান্ধের একি অলক্ষণ।
চিনি নি পরশমণি, হ’য়ে জ্ঞানহারা
রত্ন ভাবি কাচেতে যতন !
এবে মাগাে বুঝিয়াছি, ঠেকে মাগগা শিখিয়াছি,
তুলনায় তুচ্ছ ব্ৰহ্মপদ,
কল্পতরু শুধু মাগাে, তাের ওই পদ-কোকনদ।
১২
সেই কল্পতরু-শাখে বরদা শুভদা,
ফলে রাঙা চতুর্বর্গ-ফল ;
তবু সে মাকাল ফল, তাই গাে জ্ঞানদা,
বুঝিয়াছি তাহাও গরল।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
ধনৈশ্বর্য, ঋদ্ধি, সিদ্ধি, সে শুধু দুঃখের বৃদ্ধি।
মায়াবিনি, আর ভুলায়াে না,
তােমারে তােমারি তরে করি মা কামনা।
আত্মপূজা, আত্মজ্ঞান, আর অত্মজয়,
এই তিনে সব আসি জোটে,
আছে যার এই তিন, সে জন অভয়,
বিশ্ব তার পদতলে লােটে।
যার এই তিন নাই, সব তার ভস্ম ছাই,
রাজা নর সেজন ভিখারী।
মাখি ভস্ম ক্ষ্যাপা ভাবে আমি ত্রিপুরারী।
১৪
ফুটুক রজনীগন্ধা, হাসুক সেফালী-
কোটী তারা জ্বলুক আকাশে,
তবু সেই নিশীথিনী ভয়াল করালী,
পূর্ণচন্দ্র যদি নাহি হাসে।
তাই মাগাে তােরে চাই, তুই বিনা গতি নাই,
নারী যথা হয় না মধুর,
বিনা সেই সুলক্ষণ ভালের সিন্দুর।
চক্রে চক্রে চক্রে ফুটাও চক্রিণি !
আনন্দের অফুট’ কমল ;

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
জাগু মা সুষুম্নায় সুপ্তা কুণ্ডলিনী;
স্পর্শে তাের, হরষে চঞ্চল।
সেই সরসীর জলে, সেই ফুল্ল শতদলে
সদা হােস্ সরােজবাসিনী ।
স্থির সৌদামিনী সম সদা সুহাসিনী !
বঙ্গসাহিত্য-কণ্ঠহার শ্রীযুক্ত বাবু বলদেব পালিত
মহাশয় শ্রদ্ধাস্পদেষু।]
প্রদোষে গায়ক যথা তটিনীর তীরে,
প্রাণের নির্যাস ঢালি গায় ধীরে ধীরে ;
দেহশূন্য প্রেতপ্রায় করি “হায়! হায় !”
নদীবক্ষে সেই সুর ভাসিয়া বেড়ায় ;
ক্ষীণতরক্ষীণতর-অস্ফুট হইয়ে,
নদীর কল্লোলে শেষে যায় মিশাইয়ে,
আমিও তেমতি দেব । সংসার-সাগরে,
গ্ৰী-কবি-সােয়া-সম, কাতর অন্তরে
গাই গাে আসন্ন-গীত, পরাণ ঢালিয়া
কালের তরঙ্গে সুর যাবে মিলাইয়া ।
আমিও আমার সুর এক এবে হায়,
তােমার দেবেন্দ্র দেব ! নাহি এ ধরায় ।
•

১৩e
;
*
অপূর্ব নৈবেদ্য ।
নয়নের জ্যোতিঃ মাের গিয়াছে নিবিয়া
দশন-গহ্বরে হায় গিয়াছে বসিয়া
কঠোর অধর এবে ; অবশ এ কর,
লিখিতে বসিলে পরে কঁপে থর থর ;
হেরি চরণের গতি কত নরনারী,
স্মের-মুখে, ঘৃণা-চ’খে, দেয় টিটকারি ;
দয়েল, কোকিল, শ্যামা গিয়াছে উড়িয়া,
অস্থির পিঞ্জর সুধু রয়েছে পড়িয়া।
চিনিতে নারিবে মােরে, হেরিলে সহসা,
শিহরি উঠিবে শেষে হেরিয়ে দুর্দশা
অশরীরী আত্মা আমি, আগমনী-দিনে
শােকের বিজয়া গাই আপনার মনে।
কিন্তু তুমি কবিবর,
যে মদিরা দেছ ঢেলে প্রাণের ভিতর ;
সদ্য-ছিন্ন ছাগমুণ্ড ভূমিতে পড়িয়া
ঊরধে উঠিতে চায় নাচিয়া নাচিয়া
সেই সে মদিরা-যােগে তেমতি আমার
অদ্যাপি এ ক্ষীণ দেহে তাড়িত সঞ্চার !
“রক্তবীজ” সম মম আত্মার ব্যাভার ;
মরে, বাঁচে, নিদ্রা যায়, জাগে রে আবার ।
ধূমমাত্র অবশেষ জীবনের বাতি
রাখি গাে দীপের নীচে ; অমনি ঝটিতি,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
টপ করি শিখা ঝরে--সােপান-উপরি
পা রাখিয়ে নামে যেন স্বর্গ-বিদ্যাধরী ।
সকলি তােমারি গুণে, তাই দেব ও চরণে
থােয়াবে এ দাস আজি “নিঝরিণী”-জলে,
ভকতি-কুসুম আর শ্রদ্ধা-বিল্বদলে।
বিরহিণী কোকশ্রেণী মেখলা ইহার,
বিকল মরাল ইথে দেয় গাে সাঁতার,
ধুতুরা ও রক্তজবা ভাসে ইথে রাত্রি দিবা,
“নিঝরিণী”-জল মাের নয়নের ধার !
তবু দেব,
করিও গ্রহণ পূজা, করিও গ্রহণ,
দিও এ ভকতজনে, দিওগাে চরণ।
পথে যেতে যেতে।
১
পথে যেতে যেতে এক রমণীর রূপ,
নিরখি মুখরচিত্ত বিস্ময়েতে চুপ!
সে নারীর প্রতি অঙ্গে,
জ্যোৎস্না ঝরিছে অঙ্গে।
হেরি তাহা, উড়ে ঘুরে, একি অপরূপ,
এ দুটী চাকোর আঁখি, হইয়া লােলুপ !

অপূর্ব নৈবেদ্য।
২
কহিলাম মনে মনে, “কুসুমেরি হাস
নারী ও বদনে হেরি ; কুসুমেরি বাস।
রূপের তরঙ্গ-ভঙ্গে
হিল্লোল খেলিছে রঙ্গে!
হােলি-পূর্ণিমার যেন উদ্দাম উচ্ছাস !
রাস-মিনীর যেন উদ্দাম উল্লাস!”
রূপে ভাের, ঘরে আসি, “মা মা মা মা” রবে,
নেত্র মুদি, বসিলাম ধ্যানের উৎসবে !
তখনি সে নারী আসি,
সম্মুখে দাঁড়াল হাসি !
কাঙাল নয়ন মাের লাবণ্য-বৈভবে
ভরি গেল ! মনানন্দে দিনু নীরবে ।
৪
কহিলাম “মাগাে বল, কোন্ পুণ্যফলে
পাইলাম দেখা তাের ? পাদপদ্মতলে
পড়িতেছি লুটাইয়া !
বল বল্ মা অভয়া,
কোন্ যােগৰলে, আর কোন্ মন্ত্রবলে ?
আপনি বুঝিতে নারি আপন কৌশলে।”

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
কহিলেন আহলাদিনী “মা মন্ত্র মধুর।
সেই মন্ত্রে আছে বাছা শকতি প্রচুর।
প্রতি নারী-মূৰ্তি মাঝে
আমারি মূরতি রাজে!
কামী, হেরি নারীরূপ, হয় রে লােলুপ ;-
ভক্ত কিন্তু সেইরূপে হেরে বিশ্বরূপ।”
অপূৰ্ব্ব সােনার মেয়ে।
(নর্মদা )
১
আমার সোনার মেয়ে,
তার পানে চেয়ে চেয়ে,
আজি আমি বুঝিয়াছি বেশ,
চঁাচর চিকুর কেশে
নয়ন-ভুলানাে বেশে
নাই, নাই—সৌন্দর্য্যের লেশ।
চাম্পার মতন কান্তি তা শুধু আঁখির ভ্রান্তি !
বিদাধর তাও মাগাে ফাঁকি,
কে তবে রূপসী মেয়ে ? বুঝেছি মা তােরে পেয়ে,
বুঝেছি মা তাের কাছে থাকি।

৩৪
অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
২
যে রূপসী কহিনুর,
তারাে রূপ হয় চুর !
কাঁচ সম ভেঙ্গে চুরে যায়।
চপলা-চমক সম
কান্তি যার অনুপম,
তাও মাগাে আঁধারে মিশায়।
সৌন্দৰ্য-তরঙ্গ হায় !
বরিষা-বুদ্দপ্রায়
মিশাইতে, নাহি থাকে বাকি।
কে তবে রূপসী মেয়ে ? বুঝেছি মা তােরে পেয়ে,
বুঝেছি মা তাের কাছে থাকি।
অলােক-সামান্যা কন্যা, লে। বরেণ্যা, ওগাে ধন্যা,
ওলাে কন্যা শত পুত্র জিনি,
বারে হেরি অনুরাগে,
প্রীতি পবিত্রতা জাগে,
সেই কন্যা ভুবন-মােহিনী !
বিশ্বপ্রেম জেগে উঠে,
আনন্দ-লহরী ছােটে,
ইচ্ছা করে সবে ভালবাসি,
হেরি যার মুখকান্তি,
ঘােচে আত্ম-পর-ভ্রান্তি,
সেই কন্যা লাবণ্যের রাশি।
৪
তােরে হেরি, নমুধন,
দুনয়নে প্রেমাঞ্জন
মাখিয়াছি—যেই দিকে চাই,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
হরিময়, হরিময়,
রামময়, কৃষ্ণময়,
শ্যামময় দেখিবারে পাই।
তাই তুই রূপসী মা,—কি মহিমা! কি গরিমা !
দীপ্তিছটা বদনে প্রকাশে,
দেখ সবে ত্বরা করি, রূপে বিশ্ব আলাে করি,
ভুবনমােহিনী কন্যা হাসে।
চারি কন্যা।
{ সােনার মেয়ে, রাঙামেয়ে, টুকটুকে মেয়ে, ও
ফুলরেণুর প্রতি।]
কুঙ্কটি কুহেলি ঢাকা ধরিত্রীর মত,
আমার কবিতা-বধূ কাঁদিত নিয়ত,
কোথা হতে এলি তােরা অকাল-বসন্ত ?
দারুণ হিমানী-ভরা ঘুচিল হেমন্ত !
ফলতরু, ফুলতরু ছিল আধমরা,
অকস্মাৎ হ’ল তারা, ফল-ফুলে ভরা ।
২
গুঞ্জরিল অলিপুঞ্জ, মুঞ্জরিল শাখী,
লাল শাখে কুহু কুহু কুহরিল পাখী।
নীলিম আকাশ রাজ্য আত্মার মাঝারে ;
ভরি গেল, ভরি গেল পাপিয়া-ঝঙ্কারে।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
মা চন্দনা সারী, তারাও কূজন্য।
কোথা হতে এলি তােরা অকাল-বসন্ত ?
ন
বালিতে গুজিয়া মাথা, গুমরে গুমরে
আমার কবিতা-নদী, তান্তরে অন্তরে,
ফল্প তটিনীর মত বহিত গােপনে,
কোন্ যাদুমন্ত্রে আজি, নব জাগরণে
জাগিয়া উঠিল নদী ? কি লীলা হিল্লোল ?
বঙ্গোপসাগরে যেন দুরন্ত কল্লোল।
৪
কুলীন পত্নীর মত চির-বিরহিণী
আমার কবিতা-বধূ ছিল অনাথিনী,-
অকস্মাৎ আহা যেন সে চিরবিধুরা,
পতি-দরশনে হ’ল মধুর-মধুরা !
আঁখি মুছি, গরবিণী পরিল সিন্দুর,
দরপণে সােহাগিনী বাঁধিল চিকুর ।
কৃষ্ণপক্ষ-নিশি সম, অাঁধার, আঁধার,
ছিল এ কবিতা-বধু ! কালিমার তার,
ছিল না ছিল না অন্ত, তাহার উপরে,
কালাে মেঘ ছেয়েছিল উদাস অম্বরে।

অপূৰ্ব শিশুমঙ্গল।
কোথা হতে পূর্ণচন্দ্র উদিল আকাশে,
প্রফুল্ল-কৌমুদী-স্নাতা নববধু হাসে !
কলঙ্কিনী বারবধূ-সমান দুঃশীলা,
ছিল এ মানস-বধূ, এ কি হেরি লীলা ?
পরিতপ্তা, অভিশপ্তা, নীরবে কাঁদিল
“হা কৃষ্ণ” বলিয়া দুঃখে, নিশ্বাস ছাড়িল।
আজি সে গাে নিরুপমা ! মাের বনমালী
দেবী-পদে বরি তারে, মুছে
দিলা কালী।
৭
কলুষের হঁটে গাঁথা, কুৎসিত মন্দিরে
বিকট সয়তান্দৈত্য, গদা মারি শিরে,
লভিত রে ঘাের পূজা,—আজি শুভদিনে,
সৌন্দর্য্যের পুণ্যকুঞ্জে,
হৃদয়-বিপিনে,
অমল ধবল এক উঠিল দেউল !
হাসিছে মা অন্নপূর্ণা ! ভুবনে অতুল !
রাঙ্গা মেয়ে।
১
দেরে দেখ, চেয়ে !
মােহিনী রাঙা মেয়ে,
ভুবন আলােকরা মােহন রূপ!

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
স্বরগে দেবতারা,
তারাও ভেবে সারা,
দেখেনি কভু তারা এমন রূপ !
আকাশে যত তারা,
হ’য়ে নিমেষ-হারা,
করিছে দরশন, হইয়ে চুপ !
যেন রে মুখ দিয়া,
অমিয়া উথলিয়া,
পড়িছে মার মাের ! এ কি রে রূপ ।
জোছনা পড়ে খসি,
হের রে মুখশশী!
আলােকে ভরি গেল মানস-কূপ !
আয় রে করি পূজা,
এসেছে দশভুজা !
বাজারে শাঁখ, তােরা জ্বাল, রে ধূপ !
কোথা সে সারি সারি, গােকুলে গােপনারী,
কাঁকণ ভুজে বাজে, চরণে মল ;
গলেতে বনমালা,
( যেন রে বনবালা !)
চুলেতে থাকে থাকে বকুল-দল ;
তাদেররা জারি জুরি,
তাদেরাে ভারি ভুরি,
মাের মায়ের কাছে কেবলি ছল ।
৪
কুমকুল-শশী,
অতসী, সু-রূপসী,
পায় গাে সেও লাজ, হেরি এ ফুল !

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
মােহন নীল ফিতা,
চারু অপরাজিতা,
মায়ের তুলনায় নয়ন-শূল !
গােলাপ গরবিণী,
সরসী-সােহাগিনী,
তাদের জাঁক করা কেবলি ভুল।
৫
চরণে ধ্যান রাখি,
নয়ন বুজে থাকি,
তাই দেখিতে পাই এ হেন রূপ ;
বােঝেনা ভােলা আঁখি, “বাহিরে শুধু ফাঁকি”—
তাই রে মুদি আঁখি, হইয়ে চুপ।
জোছনা পড়ে খসি,
আহা কি মুখশশী ।
আলােকে ভরি যায় মানস-কূপ !
=
দেখ রে দেখ, চেয়ে,
মােহিনী রাঙ্গামেয়ে,
ভুবন-আলােকরা মােহনরূপ !
স্বরগে দেবতারা,
তারাও ভেবে সারা,
দেখেনি কভু তারা এমন রূপ!
আয় রে করি পূজা,
এসেছে দশভুজা ;
বাজারে শাঁখ, তােরা জ্বালরে ধূপ!

১৪০
অপূৰ্ব নৈবেদ্য
অপূৰ্ব্ব রাঙা মেয়ে।
(সুরধুনী )
কত সে উপমা দিয়া,
ভাষার তুলিকা নিয়া
কবি আঁকে রমণীর রূপ !
“রাঙারবি-কর-রাশি”, কভু বলে “জ্যোৎস্না হাসি,
কভু বলে কুসুমের স্তুপ !
আমি কিন্তু চুপ করি,
ওরে মাের লাল পরী,
অপরূপ ওলাে রাঙামেয়ে,
অবাক্‌, আপনা-হারা,
ভােলা পাগলের পারা,
থাকি শুধু মুখ-পানে চেয়ে !
২
কি সুধা মাখানাে আছে, কি মধু, জড়ানাে আছে
ওই তাের অনিন্দ্য বদনে
একি সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি। একি লাবণ্যের বৃষ্টি।
হেন রূপ নাহি রে ভুবনে।
শিশু যথা, মার পানে,
জয় যুক্ত দুনয়ানে,
চেয়ে থাকে, মুখ খানি তুলি,
আমি ও মা রাঙামেয়ে, তাের পানে থাকি চেয়ে,
শিশু সম, মায়া বিশ্ব ভুলি।

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
১৪১
অয়ি কন্যা আদরিণী । অয়ি কন্যা সােহাগিনী!
অয়ি কন্যা ভুবনমােহিনী!
আমি ভাবিতাম বৎসে,
আমার কবিতা-উৎসে
অনাবৃষ্টি এসেছে, নন্দিনী,
নিদাঘ সন্তাপে আহা শুকাইয়া গেছে তাহা,–
কিন্তু একি, সে যে মহাভুল
আজি এ নিঝর-অঙ্গে কি লীলা জেগেছে রঙ্গে!
ভাবের তরঙ্গে সমাকুল!
৪
আমি ভাবিতাম কন্যা,
নিবিড় তিমির-বন্যা
প্লাবিয়া ফেলেছে এ অন্তরে।
চন্দ্র তারা কিরীটিনী।
পৌর্ণমাসী নিশীগিনী,
কোথা হ’তে ভাতিল অম্বরে !
হৃদয়-মন্দির-তলে,
উছলি উছলি চলে,
আজি প্রতি কালিন্দীর নীর।
চারিধারে শঙ্খধ্বনি।
চারিধারে হরিধ্বনি !
ঘুচে গেল মানস তিমির।

১৪২
অপূর্ব নৈবেদ্য ।
টুকটুকে মেয়ে।
(রাজলক্ষ্মী )
রিণিকি রিণি,
রিণিকি ঝিনি
চরণে শিঞ্জিনী বাজে রে !
কে এ কন্যা,
আমরি ধন্যা,
হৃদয়-মন্দিরে রাজে রে ?
হাসিছে মরি,
ভাতিছে মরি,
আহা কি অপূর্ব সামজে রে !
২
সিন্দুর ভালে,
বালেন্দু গালে,
আহা মরি কি গাে ভঙ্গিমা।
চৌদিকে ঝরে,
চঞ্চল-চরণ-রক্তিমা।
মধুর ভাষে
একি রে মধু মধুরিমা।
উথলি পড়ে,
•
ভুবন হাসে
ততার ও শােভা,
মানস-লােভা,
শােন্ মা, ত্রিলােক-সুন্দরী।
কি যাদু জানে,
ঢালে গাে প্রাণে,
সুধার ঝরণা ঝরঝরী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য।
ও চাঁদ-পাছে,
চকোর নাচে,
মরি কি পূর্ণিমা শর্বরী।
৪
শােরেশােন্, মনের কোণ,
ঝঙ্কারি, বাজে কিঙ্কিণী ।
মধুর রাজে,
মায়ের চরণ-শিঞ্জিনী
কুঞ্জে কুঞ্জে,
পুঞ্জে পুঞ্জে,
অলিকুল আজি গুঞ্জিনী !
মধুর বাজে
( যেন )
৫
ভুবন লােভা
একি এ শােভ!
ভুবন মােহিনী নন্দিনি,
তােরও পর্শে,
অধীর হর্ষে,
কবিতা পড়েছে বন্দিনী !
পাগল পারা,
আপনা-হারা,
আজি সে নবীন রঙ্গিণী ।
ফুটিল কলি। কবিতা-অলি
হরষে উঠিছে গুঞ্জরি :
এ শীত-অন্তে,
নব বসন্তে,
পুলকিত মন মঞ্জরী।

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য
তরুর কোলে,
লতার দোলে,
নাচে আনন্দ-বল্লরী ।
৭
তার ও রূপে, হেরি মা চুপে,
মম বনমালী সুন্দরে !
জয় রে জয়!
ঘুচিল ভয় !
মা আমার স্বাম-চন্দরে !
এ কি মা কান্তি ! ঘুচিল ভ্রান্তি,--
বিলােকি মম পীতাম্বরে !
এ কি রে রূপ এ কি রে রূপ।
আবীরেতে লালে লাল রে !
কুসুম গুচ্ছে,
ময়ুর-পুচ্ছে,
মা” আমার নন্দলাল রে !
জয় রে জয়!
আর কি ভয় ?
ঘুচিল মানস-জাল রে !

অপূর্ব নৈবেদ্য।
১৪৫
আমার কবি-ভ্রাতার সাতটী নন্দিনী।
আমার কবি-ভ্রাতার সাতটী নন্দিনী,
ডাকিনী, বাঘিনী তারা, বিমাতা রূপিণী !
‘সব খা—খেতে হবে”—দুরন্ত ঝটিকা-রবে,
সারি সারি, ফণা তুলি, দাড়ায় নাগিনী
বিন্ধ্যগিরি এ মিষ্টান্ন, ক্ষীর-নিধি পায়সানু,
আমি বুঝি কুম্ভকর্ণ ? বল্ আদরিণী ।
গুড়ের হাঁড়ীতে পড়ি, এই মাছি যাবে মরি—
সাগরে ডুবিয়া যাবে ক্ষীণ তরঙ্গিণী!
দেখেই তাে চক্ষু স্থির ! হস্তে লয়ে ধনু তীর,
সমরে নেমেছে যেন দানবু-দলনী !
লক্ ল লােল জিহ্বা, যেন ত্রিনয়নী শিবা,-
অসিকরা, ভয়ঙ্করা! কম্পিত অবনী ।
২
আমার কবি-ভ্রাতার সাতটী নন্দিনী,
দেবেন্দ্রের সাত কন্যা, জননী-রূপিণী ।
ব্যাধি মােরে ধরিয়াছে, ছায়া তুল্য কাছে কাছে,
তাই দাঁড়াইয়া আছে ত্রিতাপ-হারিণী ।
বিষাদে সরে না বাণী, কাঁদিছে কোমল প্রাণী,
পাষাণ ভেদিয়া যেন ধায় নিঝরিণী।
১,

অপূর্ব নৈবেদ্য ।
গিয়াছে গিয়াছে জানা,
এই বেদানার দানা,
প্রীতি-কাশ্মীরের-হেন দুচক্ষে দেখিনি।
গান্ধার তাে বহু দূর,
রসে ভরা এ আঙ্গুর,
শ্রদ্ধা-কাবুলের বুঝি বসােহাগিনী ?
অলােক সামান্য ধন্যা, তােরা সাত দেব-কন্যা,
সাত শ্বেতভুজা, সাত ত্রিতন্ত্রী রাদিনী !
মা, ও চুরণ-স্পর্শে
হৃদি-পদ্ম ফোটে হর্ষে,
সাতটী ইন্দিরা তােরা, আনন্দ-রূপিণী,
আমার কবি ভ্রাতার সাতটী নন্দিনী।
.
।
*,
অপূৰ্ব্ব টুকটুকে মেয়ে।
(রাজলক্ষ্মী)
আফ্রিকার মধ্যভাগে ধূ ধূ মরু বালুকার মত
আমার মানসী বধূ ছিল ঘাের তপ্ত,
জুতাশন-তপ্তা ।
ছিল না সবুজ পাতা-চারি ধারে জীর্ণ শীর্ণ তরু,
ঝটিকা-দানবী ছিল তার অনুরক্তা..
ঘাের অনুরক্তা!
অকস্মাৎ কোথা হতেএলি তুই ত্রিলােকু-সুন্দরি ?
পারিজাতে পারিজাতে, রঙ্গিণ হরিৎ পাতে,
মরুভূমি ভরি গেল মরি
*
,

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
১৪।
মুঞ্জরিল কলি, গুঞ্জরিল অলি !
ঝারিয়া ঝঙ্কারিয়া গাহিয়া উঠিল বুলবুলি !
করি কত লীলা, গাহিল কোকিলা
ললিত কাকলি রব তুলি !
দেবেন্দ্রের নন্দনকানন-রূপ ধরি,
কোথা হতে এলি তুই ত্রিলোেক সুন্দরি ?
7
দুর্বাসার শাপে হায় আমার এ মানস-অপ্সরী-
ধূলায় ধূসর-দেহা, ছিল অভিশপ্ত
ঘাের অভিশপ্তা।
বাল-বিধবার মত পরিত না সিন্দুর 'সুন্দরী,
অলক্ষী-ডাইনী ছিল তার অনুরক্তা,
ঘাের অনুরক্ত।
অকস্মাৎ মন্ত্র-সিদ্ধা, এলি তুই অপূর্ব যােগিনী
সহসা ইন্দিরা-সাজে, মানস-অপ্ররী রাজে,
* ' বাজিল রে কঙ্কণ-কিঙ্কিণী।
বাজিছে শিঞ্জিনী, করি রিণি রিণি,
নাচিছে নাচিছে রঙ্গে মূর্তিমতী যেন রে রাগিণী !
ঝলমলে চেলী! করে নৃত্যকেলী,
সুহাসিনী আনন্দ-রূপিণী!
অভিশপ্তা নারী আজি সাজিল রঙ্গিণী,
* কোথা হতে এলি কন্যা, বিশ্ব-বিজয়িনী ?
৮
4
-

১৪
অপূর্ব নৈবেদ্য ।
।
এতদিনে ফলিল কি সুখস্বপ্ন ? ও তাের মাধুরী
বল্ বল্ পেলি কোথা ? অয়ি সুচরিত্রে,
অয়ি সুপবিত্রে
নারদের বীণাযন্ত্রে নাম-সুধা পড়ে ঝরি ঝরি,-
আনিলি হরিয়া তাহা কোন্ সুধাপাত্রে ?
কোন্ সুধাপাত্রে ?
অকস্মাৎ মূর্তিমতী ভক্তি-বেশে আইলি নন্দিনী
সহসা উঠিল বেঁচে-সহসা উঠিল নেচে
আত্মা বধূ, যেন পাগলিনী
মধু হরিধ্বনি! মধু হরিধ্বনি।
হরি-নামামৃত এত কোথা পেলি, ওলাে কুহকিনি ?
ধ্রুব ওই নাচে। তার পাছে পাছে,
নাচে মীরা, প্রেম-উন্মাদিনী
তুই বুঝি অয়ি কন্যে, ভুবন-মােহিনী,
মূর্তিমতী গীতি আহা কৃষ্ণ-বিষয়িণী ?
মেয়র আদর।
কে গাে শিরীষের ফুল ? কে গাে শিশিরের দুল ?
কাহার কোমল প্রাণ ? দয়ার শরীর ?
পরদুখে ঝরে কার দুনয়নে নীর ?

অপূর্ব নৈবেদ্য । মাছ-কোটা দেখে মেয়ে, কেঁদেই অস্থির মাের পুটুমণি, মাের পুটুমণি। ২ কে গাে প্রভাতের রাণী ? কে গাে প্রভাতের রাণী ? গােলাপী ঊষার মত কার মধু মুখ ? প্রভাতে হেরিলে যারে ঘুচে যায় দুখ। (আর) রাঙ্গারবি উকি মারে, বড়ই কৌতুক। মাের পুটুমণি, মাের পুটুমণি। কে গাে বসন্তের রাণী ? কে গাে বসন্তের রাণী ? ললিত লবঙ্গল কার বাহু দুটী ? বদন- চম্পকে শত ফুল আছে ফুটি। (আর) অশােক আঁধর কার হেসে কুটি কুটি ? ‘মাের পুটুমণি, মাের পুটুমণি। ৪ । কে গাে ঝরণার জল ? কে গাে ঝরণার জল? কলকণ্ঠে ঝরে কার সঙ্গীত তরল ? কোকিলের কুহুস্বরে ভুবন পাগল ! কাণ যায় জুড়াইয়া, পরাণ শীতল। মাের পুটুমণি, মাের, পুটুমণি !

অপূৰ্ব নৈবেদ্য ।
*
কোে-মূর্তিমতী বীণা ? কেগাে মূর্তিমতী বীণা ?
ঝঙ্কারে বাজিয়ে উঠে সুর কার নানা ?
(শুনি) ফুল হাসে, পাখী নাচে, নাহি মানে মানা।
(আহ) আপনার ভাবে কন্যা আপনি মগনা!
মাের পুটুমণি, মাের পুটুমণি।
}
কার নাহিরে উপমা ? কার নাহিরে উপমা ?
অপরাজিতার মত নয়ন নীলিমা,
বরণে অতসী-আভা, বদনে চঁাদিমা !
(তাহা) রাজলক্ষী মার কিরা মহিমা গরিমা,
মাের পুটুমণি, মাের পুটুমণি ?
পেঁপে সুন্দরী।
পেঁপে ফল কাটি, আমি হেরিনু বিস্ময়ে-
কচি কচি দুটী হাত, কচি পা দুখানি !
মায়ার ঘােমটা খােলা সােণার বলয়ে
একি শােভা! চুপে বসি হাসে পেঁপেরাণী ।
“বাছা” বলি; আহা মরি, তুলি ক্ষুদ্ৰপাণি

অপূৰ্ব্ব নৈবেদ্য ।
আশীষেন ভক্তপুত্রে ; বিজন আলয়ে
হেরি তারে, দরদর আঁখি দুটী ব’য়ে,
বহিল আনন্দধারা; নাহি সরে বাণী !
তােমরা হেস না রঙ্গে, কঠিন বিজ্ঞানী।
প্রীতি অণুযন্ত্র দিয়া, হেরেছি'এরূপ !
আমার এ শুভ্রকাচ অতি অপরূপ,
তােমাদের কালাে কাচ হারি যায় মানি।
তােমরা কি জাননাক’, মাের সােণা মেয়ে,
অনুরূপে, বিভুরূপে, বিশ্ব আছে ছেয়ে ?

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Apurbba Naibedya

Author
Sen, Debendranath
Title
Apurbba Naibedya
File name
Apurbba Naibedya
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2010/04/3
Publisher
Sri Debendranath Sen, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
174
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bidhaba
DLI number
510851
Barcode
4990010018053.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Y2iOR1jwIKE
Download PDF

Apurbba Naibedya