Makardah Saraswat Library, Howrah

Shesher Dabi

Bhattacharya, Nityahari · 2009/07/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শেষের দাবী
শ্রীনিত্যহরি ভট্টাচার্য্য
বরেন্দ্র লাইব্রেরী
সর্ব কায়ের।

বরেন্দ্রনাথ ঘােষ
বরেন্দ্র লাইব্রেরী
২৪, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
চৈত্র, তেরশ একচল্লিশ
—দেড়টাকা-
প্রিন্টার
গােৰিল প্রেস
পুরাণ প্রেস
ম ভীমঘােষ বাইলেন হইতে
২১ বলরাম ঘােষ টি, কলিকাতা।
শরৎকুমার হােড় কর্তৃক শ্রীপূর্ণচন্দ্র মুন্সী ও কালিদাস মুন্সী
এক হইতে ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠা পর্যন্ত। কর্তৃক অবশিষ্টাংশ।

তােমাকে, নিত্য- রাণাঘাট (চৈত্র, ১৩৪১) ভােরে গগণে অরুণ উঠতে কমল মেলেছে খি নবীন আষাঢ় যেমন এসেছে চাতক উঠেছে কি! —রবীনাথ

এই লেখকেরই অভিনব উপন্যাস
রঙিনরাতে
যদি নিজেকেও রঙিন রাতে রাঙাইতে চান—যদি বড়ঘরের
ছেলে মেয়েদের সাথে পরিচিত হতে চান—তবে
রঙিন রাতের প্রতীক্ষায় থাকুন!

১২৪ ১
খুব ছােট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে কোলে করিয়া মীরা স্বামীর পাশে
আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল-“দেখছ মীলা কেমন হাসতে শিখেছে ?”
অসীম তখন টবে বসান গােলাপ গাছের ডালটা একটা কাঠির
সহিত বাধিয়া দিতেছিল, মুখ না তুলিয়া বলিল—“বাঃ, বেশ তাে!
সত্যি ফোলা মুখে হাসলে বেশ দেখায়।
মীরা একটু কৃত্রিম কোপ দেখাইয়া বলিল-না দেখেই মুখ ফিরিয়ে
বলে-বাঃ বেশ তো! কেন, মেয়ে কি আমার এত ফেনা ?
তারপর মেয়ের মুখটা নিজের মুখের কাছে আনিয়া বলিল—চল, আমরা
এখান থেকে চলে যাই। আর কখন ওঁর বাগানে আসব না। তাের
বাবার সঙ্গে আড়ি দিস—বুঝলি ! সাধলে ও ভাব করি নে। কেন,
আমাদের কি একটা মান নেই—কি বলিস? বলিয়া দালানের দিকে মুখ
ফিরাইল।
অসীম ধপ করিয়া মীরার আঁচল চাপিয়া ধরিয়া বলিল—চলে যাই
যে আমার বিনানুমতিতে? তুমি নিজেই বলেছ আমার বাইরে
আর আসবে না। তাহলে এ তােমার বাগান নয়। এব
আর অস্বীকার করূতে পাৰ্বে না। বিনানুমতিতে অপরের বাগানে
প্রবেশ করলে কি দোষ হয় জানাে?
জানি, অনধিকার প্রবেশ করা হয়—এই ত? কিন্তু সে সব বাগানের
টুকবার পথে প্রবেশ নিষেধ” বড় বড় অক্ষরে লেখা থাক।
তা বটে, বেশ যা হ’ একটা আইনের ফাকি বার করেছ। কিন্তু
লেখা থাকুক আর নাই থাকুক না বলে কয়ে পরেরবাগানে ঢুকলেই
অনধিকার প্রবেশ করা হয়। আইনে তাকে বলে “পাস চা।
।

শেষের দাবী
২
উপর বস।
দিল।
আর তার সাজাও বড় কম নয়, কাজেই সাজ না নিয়ে
যাবে কি করে? এখন অপরাধীর মত চুপটি করে ইজি চেয়ারটার
মেয়েকে আমার কোলে দাও-এরও সাজা নেবার ক্ষমতা
আছে কিনা পরীক্ষা করূবাে। তারপর মা ও মেয়ে উভয়কে একে একে
সাজা দেবাে। বলিয়া অসীম মীরার কোল হইতে মীলাকে লইল ও
মীলার আধ ফোটা ফুলের পাপড়ির মত ঠোট দুটী নিজ ঠোট দিয়া
চাপিয়া ধরিল।
মীলা হাসিয়া তাহার বাবার মুখখানি লালাতে ভরিয়া
অসীম বলিল- দ্যাখ, মীলা, তাের মার এখন সাজা হবে, তুই ওখানে
শুয়ে খু। আর তাের মার কাছে যাবিনে—আমার কাছে থাকবি।
তোর মা ভাবে, তুই ওর পেট থেকে হােয়েছিস-ওরই মেয়ে—আমার
কেউ নস্। তাের মা জানে না পেটে ধরলেই শুধু তার হলাে না
বাপেও তাতে দাবী আছে।” তারপর মীরার দিকে চাহিয়া বলিল—
এখান এসে দাড়াও মীরা-চুপটা করে। মনে রেখ, আমি এখন
বিচারক-বলিয়া অসীম মীলাকে ইজি চেয়ারটির উপর শােয়াইয়া দিল।
তারপর মীরাকে হাত ধরিয়া তুলিল ও খুব তাড়াতাড়ি • তাহাকে
বুকের উপর টানিয়া আনিয়া বাহুর বাঁধনে বাঁধিয়া ফেলিল। পরে
বলিল—এখন তােমায় খালি বাঁধা হচ্ছে—আসামী কিনা তাই—এইবার
বিচার হবে—বলিফা স্ত্রীর মুখখানি চুম্বনে চুম্বনে ছাইয়া দিল।
মীর হাসিতে হাসিতে বলিল-ওকি হচ্ছে ? আমার যে প্রাণ
বায় বিচারের ঢের হয়েছে থামো। কি যে করো- ঝিটা যে
দেখতে পাৰে|

শেষের দল অসীম গম্ভীর ভাবে বলিল—বিচারক আসামীর মতে রায় দেয় না। মীরা হাসিতে হাসিতে বলিল—মুখ যে সিদুরে ভরে গ্যাছে-কে হয়েছে, কেমন জব্দ! অসীম তাড়াতাড়ি হাত দিয়া মুখ মুছিয়া ফেলিতে গিয়া সমস্ত মুখ খানা সিন্দুর মাখা হইয়া এক অপরূপ ঐ ধারণ করিল। মীরা হাসিতে লাগিল। পুনরায় অসীম যেমন মীরাকে ধরিতে গেল, সে হাসিতে হাসিতে অপর দিকে সরিয়া গেল। কিন্তু অসীমের হাতটি মীরার যত্নে বাধা খোপায় লাগিয়া গেল। মীরা বলিল—বেশ লােক ত, তুমি আমার চুল খুলে দিলে । অসীম বলিল—চুপ করে দাঁড়াও, আমি ঠিক করে দিচ্ছি, তোমার চেয়ে ভাল হবে। আমার জন্য—আমাকে দেখাবার জন্যই ত চুল ঘুমিয়ে ফিরিয়ে বাঁধ, কিন্তু আমার মনের মত হয় হয় কিনা জান না। তা, আমি আমার মনের মত ঠিক করে নিই। বলিয়া অসীম যেমন খোটা ঘুরাইয়া বসাইতে যাইবে, অমনি তাহার হাত লাগিয়া সানেলিথীর চুল গুল এদিক ওদিক হইয়া গেল। মীরা সামনের চুল গুলি ফাপাইয়া বাঁধিয়াছিল। অসীম বলিল—দেখছ, এ চুল গুলো উচু হয়ে আছে, ভাল করে বসেনি--বলিয়:সেইগুলি হাত দিয়া চাপিয়া দিল। মীরা তাড়াতাড়ি মাথাটা সরাইয়া লইয়া অনুযােম্পূর্ণ স্বরে বলিল -“আমার সব চুল খারাপ করে দিলে! আমি এত যত্ন করে বাঁধলুম -সব ছাই পাশ করে দিলে। অসীম মহা মুন্ধিলে পড়িল, বলিল—তুমি ত বেশ লােক দেখছি। ৮ ৪ শেষের দাবী চুল গুলি উচু হয়েছিল, পেতে দিলুম—আর হ’ল কিনা হল ছাই পাশ কি যে- মুখের কথা শেষ হইতে না দিয়া মীরা বলিল-“ওগুলাে বুঝি উচু চুল—কি বুদ্ধিই তােমার! কত কষ্ট করে ওরকম ফাপিয়ে বাঁধতে হয়। আবার বলা হচ্ছে তােমার চেয়ে ভাল পারি। পরে কৃত্রিম গম্ভীর হইয়া বলিল—“আমার অপরাধের শাস্তি তুমি দিয়েছ—আমি নিয়েছি। এইবার তােমায় শান্তি নিতে হবে-আমার কাছে আমার চুল খারাপ করার দরুণ। শুছছ! যেমন অপরাধী শশানে! আজকে সাড়ে নটার শােতে ক্রাউনে” নিয়ে যেতে হবে-প্রস্তুত হও। বলিয়া মীর স্বামীর দিকে কটাক্ষ পাত করিল। অসীম বলিল—“যাে হুকুম।

অসীম বড় লােকের ছেলে-ব্যাঙ্কে পিতার যে গচ্ছিত টাকা ছিল, তাহার সুদে সংসার যাত্রা নিৰ্বাহ হইত । অসীম খুব ভাল বাণী বাজাইতে পারিত। বিভিন্ন ক্লাবের এ্যামেচার থিয়েটার হইতে প্রায় তাহার ডাক আসিত, কিন্তু মীর। তাহা আদৌ পছন্দ করি না। কখন কখন নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাহাকে মত দিয়ে'হইত, আবার কখন কখন সে অসীমকে এমন বাধা দিত যে সে আদেশ অমান্য করিবার সাহস তাহার হইত না। দিন বেশ কাটিয়া বাইতেছিল। সেবার বন্যায় বাঙ্গালার অনেক স্থান ভাসিয়া গিয়াছিল। দলে দলে ছেলেরা সব রাস্তায় রাস্তায় গান গায়ি ভিক্ষা করিয়া অর্থ সংগ্রহ করিতে লাগি। দেশের দুর্দিনে ছেলেরা কি নিশ্চেষ্ট হইয়া থাকিতে পারে ? তাহাদের প্রাণ কাদিয়া উঠিল—তাহারা দলে দলে বাহির হইয়া পড়িল। অসীমদের পাড়া শেষের দাবী হইতে একটা দল এই কাৰ্যে কোমর বাঁধিয়া নামিয়া পড়িল। তাহারা সকলেই অসীমকে বলিল-“তােমায় ভাই বাঁশী বাজাতে হবে, এতে তোমার ও দায়িত্ব আছে আমাদের মত !” অসীম মীরাকে বলিল। মীরার তেমন ভাল লাগিল ন-উত্তরে বলিল--“কেন, বাঁশী হলে কি আর গান হয় না? ওসব দরকার নেই।” অসীম অনেক কাকুতি মিনতি করিল শেষে মীরা স্বামীর ইচ্ছাতেই সায় দিল। প্রথম দিন দুই বেশ গেল। তৃতীয় দিন তাহাৱা অখ্যাত পল্লীতে যাওয়া স্থির করিল। সেখানে ভদ্রপল্লীর অপেক্ষা অনেক বেশী টাকা উঠিতে পারে। এদিকে যাহা হউক না কেন, দান ধ্যানের দিকে তাহারা নাকি একেবারে মুক্ত হস্ত ! সকালেই অসীম মীরাকে বলিল। মীরা সাফ বলিয়; দিল, “না- তােমায় আর বাশী বাজাতে হবে না। অসীম বুঝাইয়া দিল যে সমাজে থাকিতে গেলে সকলের মতের সঙ্গে একমত হইয়া চলিতে হয়, তাহা না হইলে বড়ই অসুবিধায় পড়িতে হয়। পূর্বে দুইদিন সে গিয়াছে, আজ সে যমি যায়, তাহা হইলে তাহারাত চটিয়া যাইবেই ও তাহাকে পদস্থ হইতে হইল। মীরা কিছুক্ষণ চুপ কমিয়া রহিল, পরে বলিল-“বেশ যাও, কিন্তু সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে।” অনেক রাস্তা ঘুরিয়া ফিরিয়া যখন তাহার চিৎপুর স্ট্রটে পৌছিল, তখন বেলা পাঁচল। অনেকেই উপরের বারান্দা অনেকেই উপরের বারান্দা হইতে দরজার গােড়ায় আলিয়া যাহার যাহা সাধ্য দিতে লাগিল। অসীম গানের সঙ্গে বাঁশী বাজাইয়া চলিয়াছে -বিরাম নাই, ক্ষেপও নাই। একটা

৭
শেষের দাবী
ত্রিতল বাড়ী হইতে একটা যুবতী একেবারে রাস্তায় নামিয়া, আঁচল
হইতে সােনার গহনা, টাকা, পয়সা, ভিক্ষার ঝুলিতে ঢালিয়া দিল।
তারপর বলিল—“আপনাদের উপর থেকে চেঁচিয়ে বাম দাড়ান,
আপনারা এতদূর চলে এলেন। তাড়াতাড়ি করে তেতালার সিড়ি
ভেঙে আসতে হাঁপিয়ে গেছি। বাবা, সিড়ি ত নয় যেন—মনুমে।”
সকলেই দেখিল ২১২২ বৎসরের একটী যুবতী –পরণে একখানি শীল
সাড়ী ও গায়ে সেই রঙের একটী ব্লাউজ। তাহাদের মধ্যে একজন
বলিল—আপনার দেখছি বড় কষ্ট হয়েছে। কি করবাে ? আপনার
কথা শুনতে পেলে কখনাে আমরা চলে আাম না। মৃদুস্বরে একজন
বলিল—মেয়েটার প্রাণ আছে। এত দান এক সঙ্গে কেউ করেনি
তার উপর কষ্ট করে এত দুর ছুটে এসে।
অবিনাশ বলিয়া উঠিল-দরদী না হলে ব্যথা বুঝবে কে? তবু
ভাল যে তাের চোখ আছে।”
অসীম চাহিয়া দেখিলযুবতীর
সহিত তাহার চোখােচাখি হইয়া গেল। যুবতীটা অসীমের দিকে
চাহিয়া বলিল—আজ আমি তেমন কিছু দিতে পারলাম ঝা
একদিন যদি দয়া করে আসেন ত আরও কিছু দিতে পারি। নিজের
জীবনের রিক্ততা এইখান দিয়ে পূরণ করবার একটু চেষ্টা করতে
ইচ্ছা হয়।
অবিনাশ বলিল-বেশ ত! কেন আসবে না। এর এ আর
কষ্ট কি–সামনের শনিবার দিনই আসা যাবে।
আচ্ছা, নমস্কার । আমার নাম সবিতা—বলিয়া অসীমের দিকে
একবার মিগ্ন করুণ চাহনি নিক্ষেপ করিয়া ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল।

রাত্রিতে অসীম মীরাকে তরুণীটীর কথা বলিল-ব্যথিতের জন্য তার কি আকুল আগ্রহ। তার শেষের কথাটী-“জীবনের রিক্ততা এইখান দিয়ে পূরণ করতে একটু ইচ্ছা হয়”—এখনও কাণে বাজছে। বাস্তবিক ওরা দুর্ভাগা, বল মীরা নয় কি? মীরার নারীহৃদয় ক্ষণিকের তরে বিচলিত হইল। তার পরই মনে পড়িল-কুহকিনীর ছলনা-কত সংসার তাহারা ধ্বংসের স্তুপে পরিণত করিয়াছে। তখনি তাহার মন বিজাতীয় ক্রোধে ফুলিয়া উঠিল। সেভাব দমন করিয়া শুধু সে বলিল- হ্যা, ওরা নিজেরাই শুধু দুর্ভাগা নয়, আবার অনেককে দুর্ভাগা করে ! যাক, ওকথা ছেড়ে দাও, আর ক’দিন্ এরকম চলবে? বেশীদিন নয়—আর দু’তিন দিন বােধ হয়। সেদিন ছিল শনিবার। অসীম ঠিক সময়ে গানের আড্ডায় আসিল, কিন্তু শুনিল সেদিন দল বাহির হইবে না। অবিনাশ বলিল—“আজ ত শনিবার, যাবি সেই মেয়েটার কাছে—আর কিছু দেবে বলেছিল।”

শেষের দাবী অসীম বলিল—যেতে হয় তোমরাই যাও--আমাকে আর ডেক না। ? অবিনাশ জিজ্ঞাসা করিল-কেন, সেখানে ত আমরা অন্য কোন অভিপ্রায় নিয়ে বা নিজেদের স্বার্থের জন্য যাচ্ছি না! যাচ্ছি দেশের ৩ দশের জন্য—তাতে আর দোষ কি? দেশের জন্য লােকে কত করছে- আর আমরা এটুকু কষ্ট করতে পারব না। ছিঃ অসীম, তােমার মত শিক্ষিত লােকের মুখে একথা শােভা পায় না। অসীম বলিল-“না না, আমি তা বলছি না—তবে আমার ও জায়গাগুলাে তেমন ভাল লাগে না। পরে ঈষৎ চিন্তা করিয়া বলিল- “বেশ, যাবে চলাে!” অবিনাশ বলিল-“তা ত যাবো, কিন্তু আমারা যে সে দলের লােক তার ত একটা প্রমাণ চাই।” রমেন হাসিয়া বলিল—এই কথা! তা বেশ ত, অসীম না হয় বাণীটাই সঙ্গে নিয়ে চলুক না।” অবিনাশ সােৎসাহে বলিয়া উঠিল—“ঠিক বলেছ রমেন। দেখ অসীম, তােমার বাঁশীটাকে নিয়ে চলে। আজ ত আর গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিনা—কি জানি, আমাদের চেহারা তার মনে না থাকতেও পারে। এই সাশীই আমাদের চিহ্ন। বলিয়া তিনজনে বানর বাহির হইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ পরে তাহারা সবিতার ওখানে গিয়া পৌছিল। নীচেই একটা আধবয়সী জীলােক ছিল। অবিনাশ জিজ্ঞাসা করিল—“সবিতার ঘর কোনটা?* স্ত্রীলােকটা শেষের দাবী দেখাইয়া দিল। অসীম রমেন ও অবিনাশের পশ্চাতে চলিল। তাহারা ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল-অসীম বাহিরের বারান্দায় দাড়াইয়া রহিল। ঘরের সবিতা তখন আয়নার সম্মুখে দাড়াইয়া এলাচিত কেশগুচ্ছের ভিতর অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতেছিল। উহাদের দেখিয়া সবিতা কিছুক্ষণ তাকাইয়া রহিল। অবিনাশ বলিল-আমরা সেদিন এ পাড়ায় ভিক্ষা করতে এসেছিলাম। আপনি বলেছিলেন আর একদিন আসতে-আরাে কিছু দিতে চেষ্টা করবেন—তাই এসেছি। বলিয়া পার্শ্বে তাকাইতেই দেখিল অসীম ঘরের মধ্যে নাই। অবিনাশ বলিয়া উঠিল—রমেন, অসীম কই ? পরে বাহিরে আসিয়া দেখিল অসীম বাঁশী দেখিল অসীম বাঁশী হাতে চুপটা হাতে চুপটা করিয়া দাড়াইয়া রহিয়াছে। আচ্ছা লােক যা হাে ত—আমরা খুঁজছি- বলিয়া অসীমের হাত ধরিয়া ঘরের ভিতর লইয়া গেল। সবিতা তাহাকে দেখিবামাত্র হাসিয়া বলিয়া উঠিল-ওঃ, আপনারা ! আসুন। অবিনাশ বলল—আমি আগেই ত বলেছিলাম, মুখ চিনে রাখা কি সােজা কথা! তাই অসীমকে বলেছিলাম যে তুই বাঁশীটা নিয়ে চল- বাশীতে চিনতে বা মনে করতে পারে। ভালই হয়েছে উনি বাণীটা এনেছেন। সত্যি আমি অনেক বাণী শুনেছি, কিন্তু এত মিষ্ট প্রাণস্পর্শী স্বর কারও মুখে শুনিনি। চমৎকার লেগেছে আমার--দয়া করে যখন বাঁশীটা নিয়ে এসেছেন, তখন একটু শােনাতে হবে। বাঁশী আমি বড় ভালবাসি।

১১ শেষের দাবী অবিনাশ বলিল-“সে আর বেশী কথা কি ? বাজাও তাে অসীম।” অসীম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া তাহাদের কথাবার্তা শুনিতেছিল, পরে বলিল—“আমি ত তেমন ভাল বাজাতে জানি না।” সবিতা অবিলম্বে বলিলনা না, ওকথা বলবেন না, অসীমবাবু। আপনি হয়ত নিজে তা বুঝতে পারেন না। অবিনাশ ও সবিতার পীড়াপীড়িতে বাঁশী বাজাইতে হইল, কিন্তু প্রাণের মধ্যে কি এক অস্বচ্ছলতা অনুভব করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে সবিতা দুইশত টাকার নােট আনিয়া অসীমের হাতে দিয়া বলিল—এই যৎসামান্য দিলাম, মনে কিছু করবেন না। আর অসীমবাবু, অন্য একদিন যদি আপনার অবসর মত বাশী শােনান। বলুন, শশানাবেন ত-আসবেন ? অসীম কোন কথা বলিল না। উত্তরে অবিনাশ বলিলতার জন্য ভাবনা কি? এর জন্য অত মিনতি করবার দরকার করে না—নিশ্চয়ই আসবে। সবিতা আবার বলিল -“বলুন বলুন অসীমবাবু, আপনার মুখে একবার শুনতে চাই। অসীম কিছু না ভাবিয়া অস্বচ্ছল মনে বলিয়া ফেলিল- আচ্ছ। বে।

=
প্রাণের মধ্যে কি এক অস্বচ্ছলতা লইয়া অসীম বাড়ী ফিরিল।
বেলা তখন ছয়টা, মীরা স্বামীর খাবার প্রস্তুত করিতেছিল, তাড়াতাড়ি
কাছে আসিয়া বলিল—আজ যে মুখখান কিরকম দেখাচ্ছে, কি হলাে?
অসীম বলিল--মনটা তেমন ভাল লাগছে নানা মীরা, এসব আমার
ভাল লাগে না।
কি সব ভাল লাগে না? বলিয়া মীরা স্বামীর দিকে ব্যাকুল চিত্তে
চাহিয়া রহিল।
অসীম, বলিল—বােধ হয় মনে আছে সেদিন সেই মেয়েটা বলেছিল,
অন্য একদিন তার ওখানে গেলে আরো বেশ কিছু সে দেবে। তাই
আজ অবিনাশ বলে-চল মেয়েটার ওখানে যাওয়া যা! আমি
আপত্তি করেছিলাম মী—কিন্তু তারা শুনলে না—তাদের পেড়া-
পড়িতে যেতে হলাে। বাঁশটাও হাতে ছিল।
অবিনাশ বললে,

শেষের দাবী ওটাও নিয়ে চল, চিনিয়ে দেবে যে আমরা সেই গানের দলের লােক । গেলাম মীর, সেই বাড়ীতে। তেতলার একটা রি- অবিনাশ ও রমেন সেই ঘরে ঢুকে পড়ল। আমি কেন জানি না সে ঘরে ঢুকতে আপনা হতেই পা থেমে গেল—তারপর অবিনাশ এসে আমাকে ধরে নিয়ে গেল। আমার বাঁশীটা দেখেই সে চিনতে পারলে আমরা কে ? সে আমার বাশর অনেক সুখ্যাতি করে, বাজাতে অনুরােধ করলে। তার উপর অবিনাশ ও অনেক করে বললে—বাজতে হলাে। সে দু’শাে টাকার নােট এনে আমার হাতে দিল ও আর এক দিন বাজাবার জন্য ওঃ! বলিয়া একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া মীরা পাশের ঘরে চলিয়া গেল। রাৱে আহারাদির পর মীরা মীলাকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া শুইয়া পড়িল। অসীম আগেই শুইয়াছিল। অন্যদিন মীলাকে মধ্যস্থ করিয়া স্বামী স্ত্রীতে কত কথাবার্তা হইত। কতদিন ঘুমাইবার ভাণ করিয়া চোখ বুজিয়া বিছানায় পড়িয়া থাকিত। মীরা আসিয়া এমন কিছু করিত যে অসীমকে বাধ্য হইয়া হাসিয়া ফেলিতে হইত। এই ভাবে স্বামী স্ত্রীর দিনগুলি হাসি খেলার মধ্য দিয়া কাটিয়া যাইত। কিন্তু আজ যখন অসীম দেখিল, যে মীরা ঘরে ঢুকিয়া মীলাকে টানিয়া লুইয়া পাশ ফিরিয়া শুইয়া পড়িল, তথন অসীম একটু আশ্চর্য্য হইয়া গেল। তারপরেই মনে হইল দুপুরের সেই ঘটনা শুনিয়া মীরার মনে বোধ হয় কোন রেখা পড়িয়াছে। অসীম মীরা বলিয়া ডাকিল-কি, কোনও উত্তর পাইল না। তারপর বিদ্যুৎবাতিটা আলাইয়া দেখিল মীয়া বাহর মধ্যে মুখ ঢাকিয়া ইয়া আছে। অসীম আবার মী

শেষের দাবী
১৪
বলিয়া ডাকিয়া তাহাকে বুকের উপর টানিয়া লইয়া বলিল—কেন মীরা
—আজ কেন আমার সঙ্গে কথা বলছে না—বল? মীয়া আর থাকিতে
পারিল না, স্বামীর বুকের উপর মুখ গুজিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। অসীম
বলিল—কাঁদছ কেন মীরা ? কি হয়েছে তােমার, বল-ববে না?
তােমায় ত আমি স্বেচ্ছায় কোন কষ্ট দিইনি মীরা।
বলিয়া স্ত্রীর মুখটা হাত দিয়া উচু করিয়া ধরিল।
লক্ষ্মীটি বল ?
মীরা ক্রন্দন জড়িত স্বরে বলিল-কেন তুমি ওখানে গিয়েছিলে
বল ?
অসীম বলিল—এরই জন্য তুমি কাঁদছ? তুমি ত জান মীরা, কোনদিন
কোন কথা তােমার কাছে গােপন করিনি। আমি নিজেই যে আজ
নিজের মনের কাছে অপরাধী হয়েছি—নিজেই যে আজ অসচ্ছলতা
অনুভব করছি। আর বলেছি ত মীরা, আমি স্বেচ্ছায় সেখানে যাই
নি। অবিনাশ জোর করে নিয়ে গেল--শুধু টাকাটার জন্য আমার
সম্পূর্ণ অনিচ্ছায়—শুধু অবিনাশের ইচ্ছায় আজ আমায় সেখানে যেতে
না গো না। বল, আর কখন যাবে না-ওদের দলে মিশবে না?
তুমি ভালমানুষ, ওদের ছলনা তুমি বুঝতে পাবে না-ওরা কুহকিনী।
বল, তুমি আর যাবে না—কক্ষনাে না ?
বেশ মীরা, আমি আর যাব না। সত্যি বলছি আর বাশী নিয়ে
কদের সঙ্গে বেরােব না। বলল মীরা আমায় তুমি ক্ষমা করলে।

শেষের দাবী
অামার নিজের মনে আজ যে আত্মগ্লানি বেজে উঠেছে, তােমার কথায় তা
ধুইয়ে দাও—আমি নিজেই যে আজ স্থির হতে পারছি না।
তারপর স্বামী স্ত্রীর আবার মিলন হইল। কত কথা, মীলাকে লইয়া
কত হাসিখুসী—সবই হইল, কিন্তু মীরার মনে
মীরার মনে যে সন্দেহের
পড়িয়াছিল, মিলনের মধ্যে মুছিয়া আসিলে ও-বিদ্যুতের মত ক্ষণে
ক্ষণে তার স্মৃতি প্রােজ্জ্বল হইয়া উঠিতেছিল।

4 অসীমকে আর ভিক্ষার জন্য বাহির হইতে হইল না-আপনা হইতেই সেই দল ভাঙ্গিয়া গেল। আর কতদিন তাহারা ঘরের খাইয়া বনের মহিষ তাড়াইয়া বেড়াইবে ? তাহাদের ও ত ঘর সংসার আছে,-অন্নচিন্তা আছে। নিজেদেরই লইয়া দেশ ও দশ—নিজেই যদি খাইতে না পাইল, তখন আর কতদিন পরের জন্য প্রাণ কাঁদিবে ? সেদিন দলের অলকেই অবিনাশের বাড়ীতে উপস্থিত ছিল। অবিনাশ বলিল- “Charity begins at home” আরে আমার ভাইটার চাকুরী গেছে, এত বড় সংসার—বাড়ীর লােকেরই দুবেলা অন্ন জোটে না, তখন আর পরের জন্য কতদিন প্রাণ কাঁদেবনা রমেন । রমেন বলিল—সে ত নিশ্চয়ই। তুমি বলছ কি—আর না হলে পালাম না, ঘরের কথা বের করতে হলো। সেদিন দু’টো টাকার গয়নাটা কি অপমানটা না করে গেল। তবু ত যা হােক মুখ বুজে ১৭ শেষের দাবী এতদিন করে গেলাম, মহাশক্ত ছেলে আমি তাই-তােমরা কি জানতে পেরেছিলে ? অবিনাশ বলিল—আহা তা কি আর জানিনে ? ওই যে সেদিন পথে কাবলীওয়ালাটা কি অপমানটাই না করলে, একেবারে গলার চাদর ধরে টানাটানি। শুধু কি তাই বাপ চোদ্দপুরুষ পৰ্যন্ত তুললে।” হরিশ বলিয়া উঠিল—তুমি তখন কোথায় হে? অবিনাশ বলিল—আরে বল কেন? সকালে উঠে ভাবলাম যাই, রাজারটা সেরে আসি। রাস্তায় এসে দেখি তিটে যা যা কাবলী- ওয়ালা কাকে ঘিরে ছিড়ে খাবার যােগাড় করূছে। একটু কাছে এগিয়ে এসে দেখি আমাদের রমেন। বেচারা হাত জোড় করে কি বলছে। আমার তখন এত রাগ হ’লল যে কি বলব! বল হরিশ, বন্ধুর এই রকম অপমান কি সৎ করা যায়? তখনি সমস্ত রক্তটা মাথায় উঠে গেল। গামছাটা কোমরে বেঁধে হাত পাকিয়ে এগিয়ে আত্ব-তখনি আবার মনে হলাে—আহা, বেচারীর সামনে এ সময়ে যাওয়া মানেই তাকে, অপ্রস্তুতে ফেলা। একে ত মহা অপমান, তার ; উপর আমি গেলেই বেচারা মরমে মরে যাবে—না যাওয়াই ভাল। তারপর ওরা টাতে টাতে ওকে কোথায় নিয়ে গেল। আমিও ভাবলাম যদি দৈবাৎ আমাকে দেখতে পায়, তাহলে আর লজ্জার সীমা থাকবে না। কাজেই মনের রাগ মনে চেপেই গা ঢাকা দিতে হ’লল। বল হরিশ,এর চাইতে আর কি করা যায়-হাজার হেক- রমেন এইবার বলিল-বাঃ অবিনাশবহু আহা-গেয়ে ও শেষের দাবী গেলে ভাল, এখন প্যালার কি কিছু আশা কর—না অমনি? বলিহারী ভাই তােমার চোখ দুটো। বলি কখন দেখলে আমায় টানতে টানতে নিয়ে গেল—আর আমি হাত জোড় করে কি বলছি। বলি চোখ বুজে দেখেছিলে, না নেশা করে কান দিয়ে শুনেছিলে ? আচ্ছা বল ত হরিশ, তুমি ত একজন রয়েছ—পেটে যাহােক দু’আঁচড় আছে। না হয় ম্যাটি ক দু’বার ফেলই করেছ—তবু ত যাহোক পড়েছ ? তুমিই বল নং—আমার কি সে সময়ে সেখানে যাওয়া ভাল হ’তাে? তখন ত জানতাম না যে একদিন ওঁরই সামনে হলপ করতে হবে, আর উল্কি অস্বীকার করবেন। এখন দেখছি সামনে হাজির হয়ে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কলিকাল হে—কলিকাল। আবার আমায় বলে কিনা নেশাখাের—নিজে যেন বড় সাধু! রমেন রাগিয়া বলিয়া উঠিল—আমি তা বলে তাের মত চোর নই। অবিনাশ বলিল—খবরদার ছােটলােক-মুখ সামলে কথা ববি বলে দিচ্ছি। রমেন বলিল—কি? মুখ সামলে কথা বলব? সেদিন সেই ছুড়ীটা শশা টাকা দিল, বাড়ী এসেই বলা হলাে—ভাই সর্বনাশ হয়েছে, —সব টাকা পকেট কেটে নিয়েছে। নুতন জামাটাও গেল। আমরা যেন কিছু বুঝিনে-নয়? বাড়ীতে ঢুকেই পকেটটা কাঁচি দিয়ে কেটে এসে একেবারে কেঁদে পড়া হ’ল--এই ত ? দেখ, হরিশ, দেখ, আমাকে একেবারে চোর বলা। আমিই হ’ম এই ভিক্ষের দলের উদ্যোগ, আর আমি কিনা হলাম চোর-

১৯
শেষের দাবী
টাকাগুলাে নিয়ে মিহামিছি বলেছি পকেট কাটা গিয়েছে।
ছােটলেক! বাপের ব্যাটা হবি ত প্রমাণ কর ?
“নিশ্চয় বলবে, এখনাে বছি তুই চুরি করেছিস, শুধু তাই নয়
প্রত্যেক দিন তুই
এখনাে মুখ সালে কথা কও”। বলিয়া অবিনাশ রুখিয়া দাড়াইল
রমেনও ছাড়িবার পাত্র নয়, ঘুসি তুলিল।
হরিশ মধ্যস্থ হইয়া দু’জনকে থামাইয়া বসাইয়া দিল।
রমেন বলিল-হা, বলতে হলে অসীমই শুধু নিঃস্বার্থভাবে বাঁশ
বাজিয়ে গেছে—কোন কিছুর সংসবে আসেনি।
অবিনাশ বলিল--এত করেও চোর বদনাম।”
এই ভাবেই গানের দল ভাঙ্গিয়া গেল।
০
অসীম আর কোথাও যায় না। স্বামী স্ত্রীতে আগের মত হা
গলায়, এটা ওটা নানা ছুতায় প্রেমেৰু মান অভিমানের মধ্য দিয়া কি
ৰশ চলিয়া যাইতেছিল। ক্রমে মীরাও ভাবিল-আমী ত আমার কেচ্ছা
সখানে যাননি, জোর করিয়া তাহারা টানিয়া লইয়া গিয়াছে—তা

শেষের দাবী ততা শুধু টাকাটা আনিবার জন্য। না, আমার স্বামী, আমি যতটা জানি, আর তো কেহ তাকে ততটা জানে না! শিশুর মত তার মন উদার, ও মনে কোন ছাপ কেউ ফেলতে পারে না। ভালবাসা তঁার- প্রশান্ত মহাসাগরের মত সীমাহারা আমাকে তার মধ্যে বেষ্টন করে রেখেছেন। ছিঃ ! সেদিন রাত্রে, আমি তার মনে কত কষ্ট দিয়েছি। এমন সময় “কি ভাবছো মীরা”—বলিয়া অসীম আসিয়া তাহার হাত দুইটা নিজ হাতের মধ্যে লইল। মীরা বলিল-“ওগাে, আমি যে সেদিন রাত্রে তােমার মনে কত ব্যথা দিয়েছি, মিছামিছি সেদিন যে মনে সন্দেহের রেখা টেনেছিলাম । ওগো বল, আমায় ক্ষমা করেছ ? হা মীরা, আমি ক্ষমা করেছি—তুমি আমায় সন্দেহ করেছিলে বলে। এবার তুমিও বল মীরা, আমায় ক্ষমা করেছ—আমি সেখানে গিয়াছিলাম বলে। চুপ করে রইলে কেন, বল? ঘরের মধ্যে মীলা কাঁদিয়া উঠিল। “যাই মেয়ে উঠেছে, বসো--- তাকে নিয়ে আসি।” বলিয়া মীরা ঘরের মধ্যে ছুটিয়া চলিয়া গেল। পাশের বাড়ীর বিরজা সুন্দরী পাড়ার একটা গেজেটু। সকলেই তাহাকে পিসীমা বলিয়া ডাকে। বারান্দার উপর উঠিতে উঠিতে ডাকিলেন—হ্যা বো, তারপর অসীমকে দেখিয়া বলিলেন-ওঃ, বাবা অসীম, বৌ কোথায় ? এই যে পিসীমা, মীলা কাঁদছিল, ঘরের মধ্যে গেছে বলিয়া অসীম মনের দিকে একবার তাকাইয়া দেখিল। পিসীমা ততক্ষণে বারান্দার উপর উঠিয়া দাড়াইয়াছেন। অসীম .

বলিল—“সত্যি পিসীমা, আপনার শরীর দিন দিন কি রয়ে যাচ্ছে বিশ্রী রােগা হয়ে গেছেন।” • আর বাবা বল কেন, বাতে ত যাবার দাখিল হয়েছি। কাশী গেলাম, বাবা বিশ্বনাথের ছিরিচরণ দেখতে, 'কি অসুখটাই না করলো সেখানে। পােড়া অদৃষ্ট এমন যে, বাবা ডেকে ও ডাকলেন না।' “আচ্ছা পিমীমা, কাশীর বিশ্বনাথের আবার ছিরিচরণ তৈরী হয়েছে নাকি? কৈ, আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন ত চরণ ছিল না, শুধু মুখের কথা শেষ হইতে না দিয়া পিসীমা বলিয়া উঠিলেন—“ছিঃ ছিঃ অমন কথা বলিনে পাপ মুখে”। পরে “বাবা বিশ্বনাথ” বলিয়া কপালের কাছে হাতটা তুলিয়া বলিতে লাগিলেন তার মাহাত্ম তুই কি বুঝবি ? সারা কাশীটাই যে তার চরণ। তােদর কি সেই চোখ আছে যে দেখতে পাবি? আবার কিনা সেই নামে ঠাট্টা! ছিঃ ছিঃ ! শুনলেও শরীরের মধ্যে কেমন করে ওঠে” “না পিসীমা—আমি কি ঠাট্টা করছি, আমি জিজ্ঞাসা করছি--তুমি চটে যাচ্ছ কেন ? সেই সময়ে মীরা মীলাকে লইয়া সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। অসীম বলি, পিসীমা তোমাকে ডাকছেন। হ্যা, এই বেলা টিকিট দুখানা কিনে আনি, ওবেলা হয়ত ফুল হয়ে যাবে বলিয়া অসীম বাহির হইয়া গেল। হারে বৌ, এসব শুনি কি? ওমা কোথায় যাবে। সেই জসীম আমাদের-এ কতদিন থেকে হয়েছে ? তুই কি আগে একটুও জাতে পাসিনি ? ছিঃ ছিঃ ছিঃ শেষের দাবী মীরা বুঝিতে পারিল না, কি তাহার স্বামী করিয়াছে, কি সে জানিতে পারে নাই। তাই জিজ্ঞাসা করিল-“কি পিসীমা, আমি ত কিছু বুঝতে পারছি না ?” “ওমা ঘেন্নায় মরে যাই, তুই কিনা আবার লুকোচ্ছিস্?” “সত্যি পিসীমা—আপনার পা দুয়ে দিব্বি করছি-এখনও পর্যন্ত আপনার কথা একটুও বুঝতে পারিনি!” “কেন, তুই কি কিছু শুনিনি?” “কি বিষয়টা আগে বলুন?” বলিয়া মীরা আকুল আগ্রহে চাহিয়া রহিল। “আশ্চৰ্য, তুই মােটেই শুনিনি? কি জানি বাবা! শােন, বলি। হা বৌ, অসীমের বারটান হয়েছে কবে থেকে? আমরা তো একটুও বুঝতে পারিনি-খুব চাপা ছেলে বাবা! আজকাল যেখানে সেখানে যায়--তাদের বাশী শােনায়। সেদিন আবার অবিনাশ আর রমেন ছোড়াকে নিয়ে গিয়েছিল। ছিঃ ছিঃ ! ঘেন্নায় যাই। আবার ওদের লীলা বলে-পিসীমা, ভালবাসা যদি বস্ত হয় তো অসীমবাবুর, কি ভালবাসাটাই না বাসে মীরাকে—নীরা বলতে অজ্ঞান। মুখে আগুন অমন ভালবাসার যে বেশ্যা নিয়ে কেলি কৰে । মীরা ধীরভাবে বলিল—এইবার আপনার কথা বুঝেছি। কিন্তু পিসীম আপনি তো ভুল শুনেছেন, তিনি তো কখনো ওসব জায়গায় যান না হ্যা, একদিন গিয়েছিলেন—অবিনাশবাবুদের সঙ্গে টাকা আনতে অবিনাশবাবুরা একটা ভিক্ষে করার দল তৈরী করেছিলেন, তারাই উকে বাঁশী বাজাতে ডেকে নিয়ে বান। আর সেই বাড়ীতে টাক শেষের দাবী আনতে যাবার সময় তারাই ওঁকে জোর করে নিয়ে যান। তা ছাড়া তো পিসীম উনি একদিনও যাননি। উনিতো কোন কথা আমার কাছে লুকোন না পিসীমাওঁকে আপনি ভুল বুঝঝে না?” “তুই কি করে জালি সে যায় না? পুরুষ মানুষকে কখনও বিশাস করতে নেইহাজার বললে না। তবে শােন; যখন কথা উঠলো বলি—একবার তাের পিসেমশাই ঐ রকম এক জায়গায় গিয়েছি। সে ও বন্ধুদের সঙ্গে—তারপর প্রায়ই মধ্যে মধ্যে যেত—আমায় কিছু বলতাে না। কথাটা ক্রমে ক্রমে আমার কাণে এলো, আমিও কিছু বলাম না। একদিন আমার বাপের বাড়ীর এক ছেলেকে পাঠিয়ে দিলাম, পিছু পিছু যেতে। কোন বাড়ীতে যায়, সে দেশে এসে আমায় বলে। আমি লক্ষ্য করতাম তাের পিসেমশাই দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে বাড়ী ফেরে। ঠিক সন্ধ্যা বেলায় বেরােবার আগে আমার কাছে এসে বলে-বিরাে, আজ গড়ের মাঠের দিকে বেড়াতে যাবাে, রােজ এক জায়গায় বেড়াতে ভাল লাগে না। আমাকে রােজ সে কৈফিয়ং দিত কোথায় সে বােজ বেড়াতে যায়, বুঝতাম শুধু ঐটুকু সে লুকাচ্চে। আর ভালও তো কম বাতো না, রোজ বেরােবার আগে আমার সঙ্গে একবার দেখা করে তবে যেতো। আমি বললাম, হ্যা এস, সকাল সকাল ফিরাে। আমি করলাম্ কি জানি? দশটা বাবার কিছু আগে বাপের বাড়ীর দেশের সেই ছেলেটাকে নিয়ে সেই মাগীটার বাড়ীর সামনে রইলাম। • খানিক পরে দেখি মূর্তিমান বেরুচ্ছেন, আর একটা কাল ভূতের মত মাগী দরজার সামনে দাড়িয়ে। আমি D

শেষের দাবী
২৪
তাড়াতাড়ি গিয়েই তাের পিসেমশায়ের কাণটা ধরে টানতে টানতে
একেবারে গাড়ীর মধ্যে নিয়ে এলাম।
মীরা আর থাকিতে পারিল না, জিজ্ঞাসা করিল—“পিসেমশাইকে
রাস্তার মাঝে কাণ ধরলেন, পিসেমশাই কিছু বললেন না?”
বলবে আবার কি! ভয়ে জড়সড় হয়ে একেবারে কেঁচো। তখন
আবার শীতকাল, বাড়ী এনে সেই রাত্রিতে স্নান করিয়ে, শুদ্ধ করে
তবে ঘরে ঢুকতে দিলাম। সেদিন থেকে তাের পিসেমশায় নাকে কাণে
খৎ দিয়েছিল—আর কখনও যায়নি। তা পােড়া অদৃষ্ট, রাখতে পারলাম
কই? তাই বলছি ও জাতকে একেবারে বিশ্বাস করবি না। যাক
শশা, হা, তােদর আপনার জন ভাবি বলেই বলা—তা-নইলে আমার
আর কি বল ?”
মীরা বলিল—“সে তাে নিশ্চয়!”
“হ্যা, তাই বলি, কি যেন ভুল হয়ে যাচ্ছে, পেটে আসে ত মুখে আসে
গােটা পাচেক টাকা দিতে পারি, বৌ, নাতনীটাকে
একবার দেখতে যাবে। ওই ত মরা হাজা একটা, মনটা মাঝে মাঝে
কেমন করে ওঠে।”
মীরা বাক্স হইতে টাকা আনিয়া দিল। পিসীমা যাইবার সময়
বলিয়া গেলেন-বেঁচে থাক মা, অসীমের যেন তােমার উপরই
মতি থাকে। হ্যা, দে আমার নাতনীকে একবার কোলে নেই। তিনি
মীলাকে একটা চুমু খাইলেন, তারপর আবার মীরার কোলে দিয়া
প্রস্থান করিলেন।

বাড়ী হইতে বাহির হইয়া অসীম কর্ণওয়ালিস থিয়েটারে আসিয়া দু’খানি টিকিট কিনিল। সেখানে অসীমের এক কলেজের বন্ধুর সহিত দেখা হইল। পরস্পর গল্প করিতে করিতে কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট ধরিয়া আসিয়া, বন্ধুটী বিডন স্ট্রীট দিয়া তাহার বাড়ী চলিয়া গেল, অসীম বাসের জন্য দাড়াইয়া রহিল। হঠাৎ একখানি ট্যাক্সি একেবারে অসীমের সামনে আসিয়া থামিল ও ভিতর হইতে বলিতে শােনা গেল—অসীমবাবু বড় বিপদে পড়েছি—দয়া করে যদি আসেন।” পরক্ষণেই উত্তরের প্রতীক্ষা করিয়া একেবারে অসীমের হাত ধরিয়াভিতরে উঠাইয়া লইল। তারপর ড্রাইভারকে বলিল—“চলে চিৎপুর”। অসীম ভাবিবার অবসর পাইল । তারপর যখন সে সবিতার মুখ হইতে কথা কয়টী শুনিল, তখন কিছু বলিবার আগেই সবিতা তাহাকে গাড়ীর ভিতর তুলিয়া লইয়াছে—গাড়ী ও ছাড়িয়া দিয়াছে, সুতরাং প্রথমটা সে বুঝিতে পারিল কি হইল । গাড়ীতে অসীম বলিল—আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, না- কথা শেষ হইতে না হইতেই সবিতা হাসিয়া বলিল-ভয় নেই, আমি ছেলে ধরার মা নই অসীমবাবু। আপনাকে অবশ্য নিয়ে যাচ্ছি এই অধমের বাড়ীতে বড়ই বিপদে পড়েছি কিনা তাই! গাড়ী আসিয়া সেই ত্রিতল বাটীর সম্মুখে থামিল। সবিতা আগেই নামিল, / ~

শেষের দাবী
তারপর অসীমকে বলিল—নামুন, কি ভাবছেন? গাড়ী হইতে অসীমকে
হাত ধরিয়া নামাইতে যাইতেই অসীম বলিল-না, না, আমি নিজেই
নামছি, হাত ধরে নামাতে হবে না, আর কি দরকার তাতো বুঝতে
পারলাম না—আমার বিশেষ কাজ আছে। বলিতে বলিতে অসীম
সবিতার অনুসরণ করিল।
ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াই 'সবিতা বলিল-“চিনতে পারছেন
বােধ হয় সেই ঘর—যে ঘরে বসে একদিন বাঁশী বাজিয়েছিলেন,
যার রেশ এখনও প্রাণের মধ্যে বেঁচে আছে।”
অসীম বলিল—পেরেছি! এইবার তােমার কি কাজ বল ?
ওঃ! কাজ ! হ্যা, নিশ্চয় বধ্ব—আর বলব বলেই ত নিয়ে এলাম
আপনাকে এখানে। আচ্ছা অসীমবাবু, জগতে মানুষ সব সময়—সব
জিনিষই কি প্রত্যাখান করে বলতে পারেন?
আমি তােমার কথা একটুও বুঝতে পারলাম না। ভাল করে না
শুনে উত্তর দেওয়া মুস্কিল।
আচ্ছা ধরুন অসীমবাবু, কেউ যদি তার প্রাণের সমস্ত আবেদন নিয়ে
-আর্তের
গত, ভিখারীর মত—কারও কাছে দাঁড়ায়, আর সেই দাতার
যদি সাধ্যায় হয় তার সে আশা পূরণ করবার—তাহলে কি সে তা
করে না?
বুঝলাম, কিন্তু সব বিষয়ের একটা সীমা আছে। তবে দাতা যদি দেখে
তার সে আশা সীমছাড়া নয়, অথবা কাহারও কিছু ক্ষতি হবে না---
তাহলে তার সে আশা পূরণ করা ত উচিত। যাক, এসব কথা

২৭
শেষের দাবী
কেন ? এখন আসল কথা কি? আমার অনেক কাজ আছে, আমি
এখন যাই ।
অসীমবাবু, আমি ত সেই কাজের জন্য আপনাকে নিয়ে এসেছি।
, না—শুধু কাজ নয়—বুভুক্ষু অার্কের মত ভিক্ষা আছে, আর আপনিই
বলেছেন—সে ভিক্ষা দিতে পারে দাতা, যদি কারো কিছু ক্ষতি না
হয়—বলুন, বলেছেন কিনা ?
বলেছি—কিন্তু আমার কাছে কি ভিক্ষা তােমার ?
হ্যা আছে। আর সে ভিক্ষা আপনি ছাড়া আর কেউ দিতে
পারবেনা-দিলেও প্রাণ অন্যের দেওয়ায় তৃপ্ত হবে না ।
কি তােমার ভিক্ষা বল ?
আগে বলুন, রাখবেন ।
সাধ্যায় হয়তে; রাখব।
অসীমাবু, সেদিনও বলেছি, আজও বলছি--আমি বাঁশী বড়
ভালবাসি, বিশেষ করে আপনার বঁাশীর টান-মনের সমস্ত তীগুলাে
ওলােট পালট করে দেয়-জগতের সব জিনিষ ভুলে মনে হয় আপনার
বাঁশীর স্বরে মিশে যাই। ক্ষমা করবেন অসীমবাবু, আমি তার পরের
দিনই নিজে গিয়ে একটা বাঁশী কিনে এনেছি। আপনাকে অনেক
খুজেছি, কিন্তু কোথাও আপনাকে গাইনি। আজ সকাল থেকে
মনটা ভাল লাগছিল না-গেলাম উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেড়াতে-পথে
অযাচিত ভাবে পেলাম আপনাকে। তাই অসীমবাবু আপনাকে নিয়ে
এলামcযদি দয়া করে আমার-আমার বাঁশীটাকে বাজান। আর
অসীমবাবু, বড় মুস্কিলে পড়ে আপনাকে ডেকে এনেছি--প্রাণের মধ্যে
••

শেষের দাবী
২৮
যে অশান্তি, যে জ্বালা অনুভব করছি, বাশী কেনা থেকে—তার তো
আসান হচ্ছে না, যতক্ষণ না আপনার মুখে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে।
আর সে প্রাণের দাবী নিয়ে যতক্ষণ না আপনার কাছে দাড়াতে পারছি,
ততক্ষণ যে কি জ্বালা, বােধ হয় বােঝাতে পারব না—আপনিও হয়তো
বুঝবেন না।
ওঃ! এই তােমার বড় মুস্কিল, বড় বিপদ ? আমার বিশেষ কাজ
আছে, আমি যাই-আর শুধু শুধু বাঁশীটা কিতে গেলে কেন?
কেন? অসীমবাবু, সে কথা আপনি বুঝবেন না—যাক সে কথা !
আপনি আগেই বলেছেন, সাৰ্যায়ৰ হ'লে আমার আশা পূরণ
করবেন-দয়া করে---দয়া করে বাঁশীটা বাজান—শুধু একবার !
বাড়ী থেকে একটা কাজে বেরিয়েছি-এখনি ফিরতে হবে। তাছাড়া
আমার এখন স্নানাহার হয়নি
মুখের কথা শেষ হইতে না হইতেই সবিতা বলিল—ওঃ! তাই তাে
—আমি একেবারে ভুলে গেছি-ছিঃ ছিঃ।
সবিতা ঝড়ের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। মিনিট কতক
পরে ফিরিয়া আসিয়া, বঁশীটা দেরাজ হইতে বাহির করিতে করিতে
বলিল—আচ্ছা অসীমবাবু, আপনার বাড়ীতে কে কে আছেন?
অসীম বলিল—স্ত্রী ও একটা মেয়ে ছাড়া বাড়ীতে আমার আর
কেউ নেই।
ওবলিয়া সবিতা বাঁশীটা হাতে করিয়া আনিয়া অসীমের হাতে
দিয়া বলিল—দেখুন ত অসীমবাবু, ধাশীটা কেমন, ঠিক আপনার
মত কিনা—

শেষের দাবী কিছুক্ষণ পরে তার ঠেলিয়া একটা উড়িয়া ঠাকুর ফল ও মিষ্টান্ন পরিপূর্ণ একখানি থালা আনিয়া টেবিলের উপর রাখিল। অসীম কি বলিতে যাইতেছিল। তৎপূৰ্বেই সবিতা বলিল-“জানি আমার কোন অধিকার নেই আপনার উপর—তাই অনুরােধ করছি আপনাকে—যদি দয়া করে এটুকু গ্রহণ করেন। আপনার এখন আহার হয়নি—এতক্ষণ যে আপনাকে অভুক্ত অবস্থায় আটকে রেখেছি, তার জন্য আমি বিশেষ লজ্জিত--দয়া করে, দয়া করে যদি না, না, ওসব আমি ভালবাসি না। তা ছাড়া আমি বাজারে খাবার ও যেখানে সেখানে খাই না—আমি চক্ষাম। অসীম চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইতেই, সবিতা ধপ করিয়া পায়ের কাছে বসিয়া পড়িয়া তাহার হাত দুইটা চাপিয়া ধরিল। তারপর তাহার মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া বলিল—আপনি বাড়ী যাবেন জানি, আপনাকে আটকে রাখব , কিন্তু এটুকু দাবীর আশাও কি আমি করতে পারি না-বলুন? তা ছাড়া অসীমবাবু, ঠাকুরকে দিয়ে ভাল জায়গা থেকে খাবার আনিয়েছি। পাছে মনে কিছু ঘৃণার ভাব জাগে—তাই নিজেও স্পর্শ করিনি। নিন্ অসীমবাবু-আ, আর আমাকে মুখের কথা শেষ না হইতে দিয়া অসীম বলিল--আমি তো একথা বলছিনা যে তুমি চুলে খাব নাও সব বলছো কেন? তবে নিন্-বলিয়া সবিতা ডিখানা তুলিয়া অসীমের হাতে দিল- তারপর আবার পায়ের কাছে বসিয়া পড়িল। অসীম বলিল--ওখানে কেন, চেয়ারে উঠে বসাে না। আর এত খাবার কে খাবে—এ কিন্তু ভারী অন্যায়।”

শেষের দাবী অন্যায় কিছু না অসীমবাবু, এখন খেয়ে নিন। অসীম তাহা হইতে কোন রকমে কিছু খাইল-রপর নিজেই পুনরায় বাঁশীটা হাতে লইল ও তাহাতে সাহানার করুণ রাগিণী ধরিল। সবিতা একদৃষ্টে অসীমের মুখের দিকে তাকাইয়াছিল। বাঁশীর প্রতি পর্দায় পর্দায় তাহার মনের—তাহার দেহের সমস্ত শিরা উপশির গুলি মিশাইয়া যাইতে লাগিল। বাঁশী থামিয়া গিয়াছে, সবিতা তখনও আত্মভােলা রহিয়াছে--সে জানিতেও পারে নাই কখন অসীম বাঁশী রাখিয়া উঠিয়া দাড়াইয়াছে। অসীম বলিল—এবার আমি চাম। ওঃ, তুমি যে একেবারে বাঁশীর সুরের সঙ্গে মিশে গিয়েছ? আশ্চৰ্য্য, তুমি বাঁশী এত ভালবাস? সবিতা মুখ তুলিয়া খুব আস্তে আস্তে ধীরভাবে বলিল—হ্যা বাসি— খুব ভালবাসি, আর, আর তার সঙ্গে যার কণ্ঠ থেকে বাঁশী প্রাণ পাচ্ছে —তাকে, তাকেও ভালবাসি। অসীম হাতঘড়ীর দিকে একবার তাকাইয়া দেখিয়া দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল। সবিতাও উঠিয়া দাড়াইল, অসীমের খুব কাছে সাম সানি সরিয়া আসিয়া তাহার হাত দুটা নিজ হাতে লইয়া বলিল- বলুন আবার আসবেন, শুধু বাঁশী শােনাতে—আর কিছুর দাবী আপনার গছে করছি না-ধু এইটুকু দাবী আপনার কাছে। কেন জানিনা, এ দাবী প্রাণের ভিতর থেকে জোর করে জানিয়ে দিবেলুন অসীমবাবু, বলুন আসবেন—বলিয়া আকুল আগ্রহে সে তাহার দিকে তাকাইয়া রহিল। অসীমও তাহার মুখের দিকে একবার তাকাইয়া দেখিল, তারপর আস্তে আস্তে বলিল-যদি সময় পাই ত আসব।

সবিতার নিকট হইতে বাড়ী ফিরিতে পথে অসীম ভাবিল, আজ আর মীরাকে এখানে আসার কথা বলিব না—শুধু শুধু তার ফুলের মত মনটা মলিন হইয়া যাইবে। আনন্দের মাঝে নিরানন্দ আনা উচিত নয়। না, না, ইচ্ছা করিয়া কোন ব্যথা মীরার মনে দিব না। সেদিনও এখানে আসার কথা মীরাকে বলেছিলাম—যার ফলে তার ফুটন্ত ফুলের মত মুখখানা-রৌদ্রে ঝসে শুয়ে পড়ার মত দেখাচ্ছিল। তারপর কি কান্না-না, আমি মীরার চোখে জল দেখতে পাবনা. আর তা ছাড়া আমি তো কোন অসদভিপ্রায় নিয়ে সেখানে যাই নি। আমার মনে ত কোন ছাপ পড়েনি। শুধু বাঁশটা একবার বাজিয়ে চলে এসেছি, তাও তার বিশেষ অনুরােধে । মীরাকে আমি কাদাতে পারব না। তাই বাড়ী ফিরিয়া অসীম মীরাকে বলিল- ফিরতে খুব দেরী হয়ে গেছে মীরা, না? অনেকদিন পরে পখে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলাে—সে ছাড়লো না—তার বাড়ীতে নিয়ে গেল। তাতে আর কি হয়েছে? কিন্তু এত বেলা গেল, চান নেই, খাওয়া নেই, পিতি পলে যে অসুখ কতে পারে। , একদিনের অসুখ করবে না। কি, তুমিও এখন খাওনি? দেখ দেখি, ছিঃ ছিঃ- ছিঃ ছিঃ কিছু নয়, তােমার আগে কোন দিন খাইনি, তবে আজ আর কি করে খাই বল? আর তােমার যদি একদিন বেলা শেষের দাবী করে খেলে চলে—আমারও বােধ হয় চলতে পারে। যা ভেবে আর কি করবে বল? যে রকম ভাবনা উঠলাে তাতে আরাে বেলা যাবে দেখছি। তারপর সন্ধ্যায় উভয়ে বায়স্কোপে চলিয়া গেল। কিন্তু বায়স্কোপ দেখিয়া বাড়ী ফিরিবার পর হইতে, খকিয়া থাকিয়া অসীমের মনের মাঝে কি যেন একটা অস্বস্তির ভাব ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। মনে হইতেছিল মীরার কাছে কেন গােপন করিলাম ! সে সরলা, আমারই উপর একান্ত নির্ভরশীল, বিবাহের পর থেকে কোন দিনও তার কাছে কিছু গােপন করিনি--সেও তাই নিঃসঙ্কোচে বিশ্বাস করে আসছ। বিশ্বাসের কি এই প্রতিদান? না, না, মীরাকে বলিতেই হইবে, শুধু বল নয়, হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে বলতে হবে—মীরা, আজকের ঘটনা তােমার কাছে গােপন করেছিলাম, জীবনে যা আমি কোন দিন করিনি—তা ও আজ করেছি শুধু তােমারই চোখের জলের জন্য, যা আমি দেখতে পারিনে। তােমার ছলছল চোখ, বিষন্ন মুখ, যে আমার মনকে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়—শুধু তোমারই জন্য যে গােপন করেছিলাম। আর আমি ত স্বেচ্ছায় সেখানে যাইনি, সে পথ থেকে নিয়ে গল, বশীটা বাজিয়ে চলে এলাম। ক্ষতি কি মীর? বাস্ত- বিকই সে বাশী বড় ভালবাসে। বাঁশী বন্ধ করেছি, তখনও তারই সুরে ডুবে বসে আছে—এত আনমনা হয়ে গেছে সে। জগতে লােক কত কি করে, কত কি দিয়ে লােককে সুখী করে। আমার একটু বাঁশী শুনে যদি সে অরে তৃপ্তি পায়-ক্ষতি কি? তারপর তার কি করুণ আনা--দীনের মত। कि সফোর্চ, পাছে খাবার স্পর্শ শেষের দাবী করলে আমি না খাই। এসব কি উপেক্ষা করা যায়। আর বাঁশী বাজালে ত চরিত্র কলুষিত হয় না। আচ্ছা, কেন এত দীনতা হীনতা, ভিখারীর মত পায়ের তলায় বসা? বললেই পারত—অসীমবাবু বাঁশীটা বাজান, আমার ভাল লাগে। হয়ত বা বাজাতাম, বা না ও বাজাতাম- তাই কি এত দীনতা ? ঐ দিনই জানতে পেরেছি—প্রকৃতই সে বাঁশী ভালবাসে—বাজিয়েছিলাম তাই, নইলে সত্যই সে প্রাণে ব্যাথা পেত। মানুষকে ব্যথা দেওয়া ত উচিত নয়। তখনই মনে পড়িল, মীরাকে বলা মানেই তার মনে ব্যথা দেওয়া। না, মীর বােধ হয় আর বিশ্বাস করবে না, যখন গােপন করেছি—আরও বেশী ব্যথা সে পাবে। বুঝবে না, কেন তাকে বলিনি? তার চাইতে না বলাই ভাল। আর আছেই বা কি যে বুলব? মনের মধ্যে এই সব আলােচনা করিতে করিতে অসীম ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রে অসীম ঘুমের, ঘােরে স্বপ্ন দেখিল সে বাঁশী বাজাইতেছে, সামনে পায়ের তলায় বসিয়া সবিতা—তাহার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতেছে। অসীম বাশী বাজাইয়া চলিয়াছে, আক্ষেপও নাই। সবিতা আর থাকিতে পারিল না, একেবারে অসীমের পায়ের উপর মুখ রাখিয়া বলিল—ওগো, বাঁশী তােমার থামাও, আর যে পারিনা -আর কত দিন নিষ্ঠুরের মত কাদাবে? অসীম বাঁশী রাখিয়া বলিল -সবিতা তুমি কাঁদছ ? তুমিই ত বলেছ বাঁশী তুমি ভালবাস, তাই ত বাজাচ্ছি—আবার কাঁদছ? বলিয়া অসীম তার হাত ধরিয়া তুলিয়া নিজের পাশটীতে বসাইল। তাহার পর নিজের কাপড় দিয়া সবিতার চোখের জল মুছাইয়া দিল। সৰিতা নিজের মাথাটা অসীমের কাধের শেষের দাবী ৩৪ । উপর এলাইয়া দিয়া বলিল—এইবার বাজাও, আর ক'দিব না। অসীম আবার বাঁশী ধরিল। সবিতা বলিল—বিশ্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাক্ ক্ষতি নাই, শুধু তােমার বাঁশীয় স্বর—তােমার বুকের মধ্যে যেন সীমাবদ্ধ হয় থাকে, আর সে বুকের উপর কাণ পেতে রেখে যেন আমি তাই শুনতে পাই। সে স্বর যেন কোন দিন থেমে না যায়, আর শােনারও যেন কোন দিন বিরাম না হয় । তাই হােক সবিতা—তাই হােক—বলিয়া অসীম তাহাকে নিবীড় আলিঙ্গনে বাধিয়া ফেলিল। সবিতাও সম্পূর্ণভাবে আত্ম সমর্পণ করিল। তখনই অদুরে মীরার মূর্তি ধীরে ধীরে ফুটিয়া উঠিল—তাহার চক্ষে প্রখর জ্যোতিঃ, মুখে শান্ত কমনীয় ভাব-অসীমের দিকে তাকাইয়া আছে । অসীম সে দৃষ্টির দিকে তাকাইতে পারিল না—চোখ বুজিয়া মীরা মীরা বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। অসীমের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। মীরার ও ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল—য় কি? এই যে আমি”—বলিয়া স্বামীর মাথাটা বুকের উপর টানিয়া লইল। অসীম বলিল“উঃ! কি বিশ্রী স্বপ্ন।

কিছুদিন পরে দুপুরে মীরা কার্পেট বুনিতেছিল। এমন সময় পিসীমা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। “আসুন শিসীমা, আসুন-নাতনী ভাল আছে ত? বলিয়া মীরা একখানি আসন পাতিয়া দিল। পিসীমা তাহার বিপুল দেহখানি কোন রকমে আসনের উপর স্থাপন করিতে করিতে বলিলেন-আর কি বেরােবার জো আছে, যে সব পাড়ার ছেলে পিলে। মর আপদ-আমার পেছনে লাগতে আসিস কেন? আমি কি জানি তা—আবার হেবো ছোঁড়াটা বলে কিনা—পিসীমা তুমি ত শুধু আমাদের পিসীমা নও—তুমি আমাদের পাড়ার গেজেট। মীরা হাসিতে হাসিতে বলিল—কি হ’লল পিসীমা। হবে আবার কি? আমার মাথা আর মুণ্ডতের ঢঙ দেখে বাঁচি না।. ভাবলাম, যাই বৌটাকে একবার দেখে আসিয়ােজই আসি আসি মনে করি, তা যে শরীর, আসবার জো জাছে কি? তা নয় এলাম—কোথায় হাড় হাতে ছেলে গুলাে ছিল—কেউ বলে পিসীমা টালার পুলের উপর দিয়ে নাকি ট্রাম যাবে, কেউ বলে এ সপ্তাহে কটা ছােট ছেলে ও বুড়ী মরেছে, কেউ বলে ঢাকায় নূতন ম্যাজিষ্ট্রেট কে এসেছে, আবার রাধার ছেলেটা বলে কিনা, পিসীমা বলতে পার, হেবােরা আজ পটল ভেবেই ঝিঙে ভেজেছে। আঃ মর। আমি কি করে জানৰ ? তুই বৌ?

শেষের দাবী মীরা হাসিতে হাসিতে বলিল—ওরা আপনাকে খুব ভালবাসে কিনা -তাই ওরকম করে। তাের ঢঙের কথা শুনে গা জ্বালা করে, ওরই নাম ভালবাসা—তা তুই বলবি না ত, আর বলবে কে ? ওরে, ভালবাসাটা অত তুচ্ছ জিনিষ নয়, একটু বুঝে সুঝে কথাটা বলতে হয়—দেখাতে হয়। ওই অসীম ছোঁড়াটা মীরা বলতে যেন অজ্ঞান-মারা, মীরা, মীরা। মুখে বলতে ত আর বাধে না, আর পয়সা ও খরচ নেই। তুমিও ভাবলে স্বামী কি ভালবাসাটাই না বাসে,-এর বুঝি আর তুলনা নেই। ওরে, এর পরে এই বুড়ীর কথা বুঝবি। মীরার মুখ মুহুর্তের জন্য বিদায়গামী সূর্যের মত ম্লান হইয়া গেল। তারপর অতি করুণ ভাবে বলিল—পিসীমা, আমি এমনি একথা বলছিলাম, আপনি রাগ করবেন জানলে বলতাম না। না, রাগ করব কেন? আচ্ছা তুই বল, ছেলেগুলাের অন্যায় কিনা ? হা, কি বলছিলি, নাতনী ভাল আছে কিনা?-হ্যা, ভাল আছে। আর ভাল থাকবেই বা না কেন? কারুর ত কিছু ক্ষতি করিনি--বল না ? দু’জনে দুজনকে নিয়ে বেশ মনের আনন্দে আছে। নাতজামাইট আমার বেশ, বাড়ী ছেড়ে কোথাও বেরােয় না—সব সময়ই আমার বুড়ীর সঙ্গে সঙ্গে ফেরে। এই যে সেদিন আমি বললাম-“দেখ বাপু, দিন কতক আমি ওকে নিয়ে যাই, অনেকদিন ত এসেছে—তা বউ কি বলব তােকে, সে বেটা একবারে আমার পাদু’টো জড়িয়ে ধরে কি করে বেললে, তা আর তােকে কি বলব?”- ৩৭ শেষের দাবী “দিদিমা ওকে নিয়ে যান ত আমি বাঁচব না—আমি যে একদিন ওকে ছেড়ে থাকতে পারিনে। দয়া করে দিয়েছেন ত নিয়ে যাচ্ছেন কেন ?” তা আমি বললাম না, এই ওর ঘর, এইখানেই ত থাকবে মাথার সিদুর বজায় রেখে এই ঘরই ও আলো করে থাকবে। কোথায় যাবে? তবে যে কদিন পােড়া প্রাণটা না বেরােয়, মনটা কেমন করে। একটা নাতনী-ভাইটার ও একটা ছেলেপিলে হলাে না। শেষে সে বললে-বেশ দিদিমা, এখন ধানের সময়, ধান উঠে গেলে, আমি নিজে সঙ্গে করে আপনার চরণ দেখতে যাব, আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসব। তা ব বউ, এ শুনে কি কেউ আর কিছু বলতে পারে? তাই বললাম বেশ বাবা, তাই করো, বলিয়া পিসীমা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া আবার বলিলেন-“কি জানিস বউ, বিশ্বাস কিছুতেই নেই—বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে। এত ভালবাসা-বাসি—শেষে অসীমের মত না হয়। তবে বুড়ী আমার খুব শক্ত মেয়ে—আমার নাতনি ত ? আমি বলে দিয়েছি যে, একটু কিছু কোন রকম দেখলেই খুব চোখেচোখী রাখবি, আর প্রতি কথায় কথায় কৈফিয়ং নিবি। পুরুষ মানুষকে কড়া শাননে রাখতে হয়, ওরা হচ্ছে- “মুখের কথা শেষ না হইতেই মীরা বলিল—থা পিসীমা থাক, আর বলতে হবে না, বুঝেছি। বুঝবি না ত কি? অসীম কি ওরকম হতে পারত যদি তুই শাসনে রাখতিস। বলে শাসনে ভুত জব্দ হয় তা, স্বামী ! এখনও তাের চোখ ফুটল না, ধন্যি তাের বুকের পাটা! এই ত রমেনের মা বলছিল—রমেন দেখে এসেছে যে, অসীম কোন চুড়ীকে নিয়ে ট্যাক্সি করে রাস্তায় যায়

৩
ষের দাবী
শ
ওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে। এনে দুপুয়ে, ওম। ঘেন্নায় যাই! ওরে,-
আমার আর কি বনা? ভাবি, দুর ছাই, যা করে করুক, আমার
কি? পােড় প্রাণ কি বােঝে? অমনি বুকের মধ্যে খচ, খচ, করে
ওঠে। হাজার হলেও তােদের যা হােক ভালবাসি চোখের সামনে
এরকম দেখলে কি চুপ করে থাকা যায়, তাই তােরই ভালর জন্যে বলা।
যাক! সব ভাল আছি তো? হাতের নােয়া বজায় থাক, অসীমের
আমার মতি গতি ফিরুক। যাই, আজ আবার দাশুটার শরীর
খারাপ, বোটা একা সব করছে—আর একদিন আসব।
মীর। অন্যমনস্ক ভাবে বলিল-হ, আসবেন।
পিসিমা চলিয়া গেলেন, কিন্তু রাখিয়া গেলেন সন্দেহের রেখা, মীরার
মনে-নদীতটে পলির মত। সত্যি, কেনই বা তার। আমার স্বামীর
বিষয় ওরকম বলে। আজ ছয় বৎসর ত বিবাহ হইয়াছে, এতদিন ত
তার কেহ কিছু বলে নাই! সত্যই কি এর মূলে কিছু নাই ? না,
মুখ দেখলে ত কিছু মনে হয় না! সে যে সরল, সুন্দর ! না, না, এসব
মিছে কথা-সমেন বার দেখতে ভুল হয়েছে, অথবা পিসিমারই শুনতে

শেষের দাবী ভুল হয়েছে। ওগাে, এযে হতেই পারে না—কিন্তু হ্যা, সেদিন সকালে জিজ্ঞাসা করতে বলেন—ও কিছু নয়, বাজে-স্বপ্ন কি কখন সত্যি হয় মীরা? আচ্ছা, লোকে যে বলে, যেটা মনে মনে আলােচনা করা যায়, ঘুমঘােরে সেটাই নাকি স্বপ্নে দেখে। তবে কি তিনি তাই ভেবেছিলেন ? মনের জিনিষ কি স্বরূপে প্রতিফলিত হলাে ? না গাে না, ওগাে আমার স্বামী-হৃদয়দেবতা ! তােমার নিজের কথাই “ও সব কিছু নয়, বাজে”—এগাে, তাই তাই, বাজেই যেন হয়। আমার মনের কবাট নিজ হাতে বন্ধ করে দিয়েছ—তােমার ঐ কথাতে-আর সে কবাট খুলে না। ওগাে যতই ঝড় ঝাটা আসুক, কেহ সে কবাট খুলতে পারবে না—কেবল তুমি-তুমিই পারবে—তােমার একটি কথাতে—তােমার মনের পরিবর্তনে। ওগাে, আর যে আমি কিছু চাইনা—তােমার ভালবাসা যে আমার মনের সব জায়গা দখল করে রেখেছে—আর ত কিছু রাখবার আমার জায়গা নেই। মনটাকে হা করিয়া ফেলিয়া মীরা স্বামীর খাবার করিতে লাগিল। দুপুরে অসীম ব্যাঙ্কে গিয়াছে, টাকার সুদ আনিতে=কিন্তু সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া যায় এখনও বাড়ী ফিরিল না দেখিয়া মীরা উদ্বিগ্ন হইয়া এক একবার বাহিরের দিকে তাকাইয়া দেখিতেছিল। রাত্রি আটটার সময় অসীম বাড়ী ফিরিলে, মীরা জিজ্ঞাসা করিল-“এত দেরী, সেই দুপুরে বেরিয়েছ”? অসীম হাসিয়া মীরার চিবুক ধরিয়া বলিল—টাকাটা নিয়ে আসবার সময় দেখলাম এলবাট হলে বড় মিটিং, তাই শুনে এলাম। তুমি চা খেয়েছ ত মীর-বিকালে ?

শেষের দাবী
৪০
, “এখনি আসছ আসছ বল আর বিকালে চা করিনি। হাতমুখ
ধােও, আমি চায়ের জলটা চায়ে আসি। বলিয়া মীরা প্রস্থান করিল।
মীলা এতক্ষণ ঘুমাইতেছিল, বােধ হয় তার বাবার উপস্থিতিতে
জাগিয়া উঠিল। সেও বােধ হয় জানে—তার বাবা শুধু তার মাকে
নয়—তাকেও আদর করে চুমু খায়। সে নয় প্রতিদানই দিতে পারে
, তা বলে কি আর আদর বােঝে না? না বুঝলে কি আর সে
তার বাবার কোলে চুপ করে থাকে । যেখানে ভাল না লাগে,
সেইখানেই ত সে কাঁদে!
অসীম যখন মীরার সহিত মুখ নাড়িয়া কথা কহিতেছিল, মীলা ত
হাসিয়াই আকুল–কি দেখিল বা বুঝিল সেই জানে, তবে বােধ হয়
ভাবিতেছিল-ওঃ, এসেই আগে মার সঙ্গে কথা, মাকে আদর করা
আর আমাকে শেষে ! আচ্ছা আর একটু বড় হই, বাবা বলে
ডাকতে শিখে ছুঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, তখন দেখবে আপনা হতেই
আমাকে আগে কোলে নিতে হবে, তারপর অন্য সব—এই আমি
বলে দিচ্ছি, দেখে নিও।
অসীম আসিয়া মীলাকে বুকের উপর তুলিয়া লইল। তারপর কত
আদর। কত কথা! মীলা শুনিয়া যাইতেছিল, কেবল মধ্যে মধ্যে
নিজের কচি কচি হাতদুটি মুখের ভিতর পুরিয়া কি এক অক্ষুট উচ্চারণ
করিতেছিল শুধু মীলাই বােঝে—আর যে নিজের কথাতে সেই
অস্ফুট বুলির রূপ দিতে পারে—সেই শুধু কল্পনাতেই বলিতে পারে।
চায়ের পিয়ালা হাতে করিয়া আনিয়া মীরা বলিল-উ, খুব যে
আর খাওয়া হচ্ছে। পােড়ারমুখী, এখন কথাটি নেই। আবার

৪১
শেষের দাবী
হাত দুটো কাঁধের উপর দিয়ে মুখের উপর গাল পেতে রাখা হয়েছে। বাপ
সোহাগী—আমার কোয়ে যত কান্না।
না তুমি বোঝ না! আমার লক্ষ্মী মা-বড় হলে আমায় কত আদর
করবে, বলিয়া অসীম তাকে কোলের উপর বসাইয়া চায়ের কাপ টি
হাতে লইল, তারপর বলিল—সত্যি মীরা, কি করে যে এর উপর আমার
এত মায়া পড়ল, তাই আমি ভাবি? ছেলেবেলা থেকে মেয়ে আমার
তেমন ভাল লাগে না-ছেলে যাহােক তবু ভাল লাগে। তাই ভাবি-
কিসে মনের এত পরিবর্তন করে দিল? সত্যি-বাইরে যতক্ষণ থাকি,
ততক্ষণ এর মুখ মনে পড়ে-কতক্ষণে গিয়ে দেখব। আমি নিজেই
আশ্চর্য হয়ে যাই মীরা।
তাত হবেই! এখন কি আর আমার কথা মনে পড়বে ? এতদিন যে
আমি আছি তাতে মনে পড়বে না, আজ দু’দিনের যে—তার কথাই
খালি মনে পড়বে।
অসীম চা খাইতে গাইতে বলিল—তুমি রাগ করছ, নাকি? ওগাে
তােমার কথা তো সব সময় আমার অন্তরে মাথা। তবু যে মূতন
অতিথি-যে দাবী প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে, তারও ত সম্মান-দাবী রাখা
দরকার মীরা !
আচ্ছা, তুমি চা খাও, আমি এখন খাবারের যােগাড় দেখিগে, বলিয়া
মীর রান্নাঘরের দিকে চলিয়া গেল।
রাত্রিতে মীরা বিছানায় শুইয়া ভাবিতে লাগিল—পিসীমার কথা
জিজ্ঞাসা করিব কিনা? যদি ভাবেন, আমি ওকে সন্দেহ করি••••••
জিজ্ঞাসা করা মানেই ত অবিশ্বাস করা।
শেষে
অণ
|

শেষের দাবী 82 ভাবিয়া চিস্তিয়া মীরা স্থির করিল, জিজ্ঞাসা করাই ভাল অশান্তি, নিজের মনের সঙ্গে । তাই মীরা স্বামীর খুব কাছে সরিয়া আসিয়া তাহার একখানি হাত নিজ হাতের মধ্যে লইয়া বলিল—“জানি তুমি আমায় খুব ভালবাস, তােমার সমস্ত প্রাণ দিয়ে কোন কথা আমার কাছে গােপন করনা, করনা বলেই তােমার মুখে শুনতে চাই যে সেকথা একেবারে মিথ্যা-মােটেই সত্যি নয়। এ অসম্ভব কল্পনার জিনিষকে ওগো কি করে আমি সম্ভব বলে মেনেনি—তার রূপ দিয়ে। , তা পারিনা—যতক্ষণ না তােমার নিজের মুখে শুনতে পাই । অসীম বলিল বেশ, বল কি শুনতে চাও? মীরা খুব ধীর ভাবে বলিল—আজ পিসীমা এসেছিলেন দুপুরে। অনেক কথার পর বললেন, “তুমি নাকি মােটরে করে কাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে! ওগাে, একি কখন বিশ্বাস করা যায়? এও কি আমায় বিশ্বাস করতে হবে ? অসীম খুব ধীরভাবে বলিল—কাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম—বল ? .মীরা বলিল—কোন একজন মেয়ে লােককে নিয়ে ! অসীম কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বলি। মীরা তাহার হাত দু’টি একটু জোর দিয়া চাপিয়া ধরিয়া বসিল-ওগাে বল, এ কি করে বিশ্বাস করি, চুপ করে রইলে কেন—বল ? অসীমের মুখ মীরার মুখের খুব নিকটে—তার ঘন ঘন তপ্ত নিঃশ্বাস : মীরার মুখের উপর আসিয়া আছড়াইয়া পড়িতেছিল। মীরা হঠাৎ চিৎকার করিয়া উঠিলল, কেন প্রাণ আমার দোলাচ্ছ? কেন এত ইতস্ততঃ করছ ? , ৪৬ শেষের দাবী তখনও অসীমের হাত মীরার হাতের মধ্য—তার কপালের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দুইএকগাছি চুলা বাতাসে উড়িয়া অসীমের কপালে পড়িতেছিল। • অসীম খুব ধীরভাবে বলিল—মীরা, এখনও বলছি, জীবনে আমি কোনদিন কোন কিছু তোমার কাছে লুকোই নি, কিন্তু সে দিন গােপন করেছি একটা কথা, শুধু তােমারই জন্য, তােমার চোখের জলের জন্য । বল, বল, থামলে কেন ? তাহলে কি আমায় পিসীমার কথাই বিশ্বাস করতে হবে ? মীর, পিসীমা যা বলেছেন তা ঠিক নয়। সে দিন টিকিট কিনতে গিয়ে সত্যই এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার সঙ্গে বিডিন ঠুট পর্যন্ত এসে সে চলে গেল—আমি বাসের জন্য দাড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল—দেখি সেই যে ভিক্ষা দিয়েছিল-বড় বিপদে পড়েছি বলে সে আমায় গাড়ীতে তুলে নিল। বিপদ কথাটা শুনে ভাবছি -গাড়ী ছেড়ে দিল। তারপর সে তার বাড়ীতে নিয়ে গেল, কিন্তু বিপদ তার কিছু নয় -দেবশী ভালবাসে, একটা বাশী কিনে এনেছিল— সেইটা দিয়ে বাজাতে বলে। আমি রাজী হলাম না—চলে আসছিলাম। তার অনেক কাকুতি-মিনতিতে বাজালাম—কি করব মীরা? সত্যি স্বেচ্ছায় যাইনি, আর গােপন করেছিলাম, আগেও বলেছি, এখনও বলছি -তােমার চোখের জলের জণ্ঠ। মীরা, সেদিন সেখানে টাকা আনতে গিয়েছিলাম শুনে তুমি কেঁদেছিলে—সমস্তক্ষণ তােমায় ছল ছল্ চোখ ওকি, মীরা তুমি দীর্ঘশ্বাস ফেলছ কেন? জসীমের হাত তখনাে মীরার হাতের উপর ছিল-হঠাৎী নিঃশাসের সঙ্গে সঙ্গে হাতটি শিথিল হইয়া গেল। অসীম মীরাগীরা শেষের দাবী 38 বলিয়া ডাকিয়া উত্তর পাইল না—তারপর দেখিল-মীরা মূচ্ছ। গিয়াছে। অসীম চিৎকার করিয়া ঝিকোডাকিল। ঝি জআনিয়া দিতে অসীম মীরার মাথা নিজ কোলের উপর লইয়া মুখে চোখে জল দিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে মীরার একটু জ্ঞান হইল, সে পথশ ফিরিয়া শুইল। অসীম ডাকিল—এখন একটু ভাল বােধ করছ ? বল, বল মীরা? মীরার তখনও ভালভাবে ঘাের কাটে নাই—নীরব রহিল। আরও কিছুক্ষণ হাওয়া ও জল দিবার পর মীরার জ্ঞান হইল—চক্ষু চাহিয়া দেখিল-অসীম মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া হাওয়া করিতেছে। তাহার মাথা অসীমের কোলের উপর। মিনিট খানিক ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া মীরা চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। সেদিন রাত্রের ঘটনার পর হইতে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কেমন যেন একটা মনের ব্যবধান দাড়াইয়া গিয়াছে। জীবনের দৈনন্দিন কাৰ্য্য যেমন করিতে হয়, মীরা তেমনি করিয়া যায়। অসীম আর বাড়ী হইতে বাহির হয় না-সৰ্ব্বদ। মীরার মনকে প্রফুল্ল রাখিবার চেষ্টা করে—কিন্তু মীরার মনের ভিতর শান্তির কালাে মেঘ উঠিয়াছে—ধীরে ধীরে সমস্ত মনটার

৪৫
শেষের দাবী
উপর স্থান করিয়া লইবার চেষ্টা করিতেছে। এখন মীরা মীলাকে
বুকে লইয়া সময় সময় কাঁদে, অসীমের হৃত হইতে পলাইয়া থাকিবার
চেষ্টা করে। কথার মাঝে মীর হাসিলেও—স হাসিতে আগের মত
আর প্রাণ নাই—কথায় আগের মত আর মাদকতা নাই। একদিন
অসীম বলিল—“চল আজ চিত্রায় ভাল বই আছে, দেখে আসি ।
মীরা বলিল—আজ বড় মাথা ধরেছে, তুমি দেখে এসো।
অসীম বলিল—মীর, এখন ও তুমি আমায় ক্ষমা করনি-আমি তাে
আর বাড়ী থেকে বেরােইনে-তােমার কাছে অপরাধী হওয়া থেকে।
কেন বায়স্কোপে যাবে না-বল ? চল মীরা, আমার কথা শােন !
মীরা বলিল—সত্যি আমার মাথা ধরেছে-তুমি যাও !
এততেও তুমি আমায় ক্ষমা করলে না। আমি জানি তুমি
ব্যথা পেয়েছ—সেদিন রাত্রি থেকে তােমার মুখে হাসি নেই—যদিও বা
হাস, সে জোর করেভেতর থেকে কেন এনে। তুমি কথা ফসে
কথার মধ্যে তােমার ক্রন্দনের রূপ ফুটেuঠ। আর দেখতে পাই, তুমি
আমার সামনে থেকে সরে থাক বার চেষ্টা কর। মীরা, আমি নিজেই
আমার মনের উপর অপরাধের বোঝা চাপিয়েছি, আর সেই অসহ্য
বােঝার উপর তুমিও যদি আবার বােঝা চাপাও—তাহলে জগতে
ত আমার কোন সান্তনাই থাকে না। মীরা, মীরা, কথা কও, বল
উঃ !
ক্ষমা করেছ।
মীলাকে দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে মীরা বলিল—আমি ত কিছু
বলছিনেও বিষয় কেন ভুলই।

শেষের দাবী ৪৬ মীরা তুমি একবার বল ক্ষমা করেছি। আর আমার এ ভুল হবেনা। খি আসিয়া মীলাকে লইয়া গেল। অসীম মীরাকে বুকের উপর চাপিয়া ধরিয়া বলিল—চল তবে বায়স্কোপে যাই—আর ত আমাদের পরস্পরে মনের ভিতর কিছু নেই মীরা? অসীমের অনেক পীড়াপীড়িতে মীয়া গেল—কতদিন সে আসিয়াছে, ঠিক এমনি করিয়া স্বামীর পাশে বসিয়াছে, কিন্তু সে বসায় মনে কত আনন্দ, কত উৎসাহ, কত গরিমা—আর আজ ? সেই চিত্রা, সেই স্বামী, তবে কেন মনের মাঝে বিষাদের কালিমা। অসীম মাঝে মাঝে বুঝাইয়া দিতেছে—মীরা হু হা দিতেছে, কিন্তু মন যেন অমানিশার গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়া যাইতেছে। বায়স্কোপ হইতে বাড়ী ফিরিয়া আহারাদির পর উভয়েই শয়ন করিল। মীরার কিছুতেই ঘুম আসিতেছিল না— কল্পনার মধ্যে তাহার মন ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। মীরা ভাবিতে লাগিল— আচ্ছ, কি কৰুে মানুষ ও রকম হয়—এত পরিবর্তন? হয় বইকি, উনি নিজ মুখেই লেছিলেন ঐদিন—“আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই কি করে আমার এত পরিবর্তন হলাে—আর নূতনের সন্মান আগ্নে দেখাতে হয় যে তার দাবী প্রতিষ্ঠা করতে আসছে... তবে আর এ অসম্ভব কি? মেয়ে ত শুধু উপলক্ষ-অন্তরের আসল কথা ঐখান দিয়ে বেরিয়ে পড়ল-চেপে আর কতদিন রাখা যায়। একটু আগা পেলেই কোন না কোন ফাঁকে বেরিয়ে পড়ে। পিসিমা ত ঠিকই বলেছেন-“পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই!” ওগাে, বিশ্বাসের কি এই প্রতিদান তুমি নিজ হাতে দিলে? পিসিমা বলে কত ; ০০০০০

৪৭
শেষের দাবী
চোখের জল দেখতে
ছিলেন—এর পরে বুঝবি, এ বুড়ীর কথা মনে পড়বে!” না পিসিমা,
আমি খুব বুঝেছি—তােমার কথাই ঠিক—আর বুঝেছি বলেই
তােমার কাছে ক্ষমা চাইছি। বলেছিলে...“মীরামীর, আর মীরা ভাৰলে
ক ভালবাসাটাই না বাসে-এর আর তুলনা নেই।”—সত্যিই
এর তুলনা একদিন ত ছিল না—আমি কেন, অনেকেই ত বলতাে—কিন্তু
আজকের এই পরিবর্তনেরও বুঝি তুলনা হয় না আর কারোর সঙ্গে।
মিথ্যা কি কখন চাপা থাকে। তার বরূপ একদিন না একদিন
প্রকাশ হয়ে পড়ে। আচ্ছা সেদিনের কথা বললেন, আর এ দিনের
কথা চাপলেন কেন? উনি বললেন—আমার
পারেন না তাই—শুধু আমার চোখের জলের জন্য-তাই যদি হবে, ওগাে
আজ আমার চোখের জল কি করে রােধ করবে—মার কি দিয়ে
আমার সে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। এ চোখের জল, এ মনের অশান্তি
তুমি কি দিয়ে থামবে? আচ্ছা, পিসিমারও ত স্বামী ও রকম হয়েছিলেন।
পিসীমা বললেন-“আর যান নি-ই দিন থেকে—ইনি, ইনিও
কি ছাড়তে পারেন না! পারেন' শব ৪ -কি জানি হয়ত বা
নাও পারেন।
মীরা একবার ঘুমন্ত স্বামীর মুখের দিকে তাকাইল, তারপর আস্তে
আস্তে মাথাটি স্বামীর পায়ের উপর রাখিয়া আরাে কত কি ভাবিতে
ভাবিতে ঘুমাইয়া পড়িল। জানালা দিয়া এক ঝলক জ্যোৎন্সা তাহার
ঘুমন্ত মুখের উপর পড়িয়া—তাহাকে চুম্বনে চুম্বনে মনের জালা ক্ষণেকের
তরে ভুলাইয়া দিল।

1. . অসীম চলিয়া যাইবার পর সবিতা একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকাইয়া রহিল, যতক্ষণ না অসীম দৃষ্টির অন্তরাল হইয়া গেল—তারপর বাঁশীটা নাড়াচাড়া করিতে করিতে বুকের উপর চাপিয়া ধরিল। বঁাশীই ত তার মুখে প্রাণ পেয়েছে—বাঁশীর স্বরেই তাকে আমায় চিনিয়ে দিয়েছে। বাঁশী, বাঁশী, বঁাশী—কই, বাঁশী নামে ত প্রাণ তৃপ্ত হয় না—তার সঙ্গে যে প্রাণ অন্য কিছু চায়•••একটু, একটু ভালসা! তাহলে বাশীকে ভালবাসিনে—বাসি তার বাদককে ? আরাে তাে অনেকেই বাজায় অনেকেরই বাশী শুনেছি-কই, প্রাণ ত তেমন শােনবার জন্য ব্যগ্র হয়নি, হাহাকার করে ওঠেনি—এর কারণ কি? শুধু কি তার চেহারা। না,চেহারাই বা কি এমন ভাল? রংত খুব ফরসা নয়, শ্যামবর্ণ- মুখশ্রীও মাঝামা, চোখুটি বেশ—তবে বিশেষ কি আছে? অনেক পুরুষের ত এ গৃহপালিয়েছে-তাদের গােলাপের মত রং বশীর মত নাক, পয়সার ছিনিমিনি খেলা-কই প্রাণকে ত টাতে পারিনি—দেহ ত মনের ব্যগ্র আলিঙ্গনে ছুটে যায়নি—হাহাকার করে ওবিহা, উঠেছিল, মৌখিক বাহিরের রূপ নিয়ে, পয়সা আদায়ের জন্য-সম্বন্ধ শুধু পয়সারমনের নয়! কই, অসীমবাবুর পয়সা গাছে কি নেই, কি করেন—তাত খোজ করিনি— —আর কই বা কি, উনি ত এখানে কোনদিন পতঙ্গ হয়ে আসেন নি-আমিই ও জাের করে এনেছি—কেন? প্রাণ কি চায় তার কাছ থেকে। মন ৪১ শেষের দাবী বলছে : ভালবাসারদ-কারুর কাছে পাইনি, অথবা আমিও দিইনি, তাই পাইনি! অসীমবাবুকে ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি কেন বাস বনা? এতদিন বাসবার মত মন পাইনি, আজ পেয়েছে, তাই বেসেছে। কিন্তু অসীমবাবু—তিনি কি বাসবেন—তার ত স্ত্রী আছে—যদি না বাসেন? না বাঙ্গুন আমি বাসব—সমস্ত দিয়ে... ..বাসব কি বেসেছি। ঐ সেদিন ত উষা গাইছিল- আর কারে যদি ভালবাস সখা, আর যদি নাহি ফিরে চাও, তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুঃখ কেন পাই গাে” । তবে তাই অসীমবাবু, তুমি না বাসতে পার—আমি তােমায় বাসি— তাতেই প্রাণে আমার তৃপ্তি। কিন্তু তৃপ্তি কোথায় ? প্রাণ যে চায় তাঁকে, খুব কাছে। না, ওসব কিছু নয়, কবির কল্পনা ! অসীমবাবুকে চাই—খুব কাছে একবারে নিজের করে নিয়ে, তা নইলে প্রাণের মধ্যে এই হাহাকার নিয়ে যে পাগল হয়ে যাক! এত তো ছলাকলা শিখেছি, কতজন ত তাতে নিজেকে একেবারে ভাগ্যবান ,ণে করে—কিন্তু অসীমবাবুকে সে সব দেখতে কেমন যেন লজ্জা হয়—আপনা হতে বেধে যায়! মন বলে ওঠে—“অন্তরের জিনিষ অন্তর দিয়ে টাবি- বাহিক টান ত অন্তুরের নয়” ! কি রকম একটা লজ্জা, বেশ সঙ্কোচ ভাব—আমার বেশ লাগে। প্রথম যে দিন দেখলাম—সকলেই তাে কত কথা বলে, কিন্তু উনি ত একবার চেয়েও দেখলেন না-আপ মনেই বাঁশী বাজিয়ে গেলেন—শুধু শেষে একবার তাকালেন—কোন কথা বলেন না। তারপর যেদিন টাকার জন্য এ বাড়ীতে আবার এলেন, সেতি সেই সঙ্কোচভাব। দু’জনত ঘরে আগেই ঢুকেছিল, শেষের দাবী কিন্তু কই, উনি ত ঘরে ঢােকেন নি! শেষে যখন তারা ঘরের মধ্যে নিয়ে এলাে—কি এক রকম মুখের ভাব-চুপটি করে বসে রইলেন...অনেক বলাতে বাশী বাজালেন। বেশ লোক। বুঝলাম এর আসবার ইচ্ছা ছিল না—ওরাই জোর করে নিয়ে এসেছে। তারপর আজ রাস্তায় দেখা নিয়ে ত এলাম এই ঘরে ! কই, কোন কথা বললে তো ঠেলতে পারলেন না! খাবার ছোঁয়ার কথা বলাতে মুখের ভাব কি রকম করে বললেন “না, আমি ত তা বলছি না, কেন তুমি ওকথা বলছে— তারপর ত আমারই হাতে করে দেওয়া জিনিষ খেলেন, পাছে আমি ব্যথা পাই! না, দরদী ওঁকেই বলা চলে, তা নইলে এত শীঘ্র ব্যথা বুঝবেন কি করে? তারপর সেই এক মধুর কথা, এখনও ত কাণে কাণে ফিরছে...ওখানে পায়ের কাছে কেন, ঐ চেয়ারটায় উঠে বসো।” কেন বলবেন না—নিশ্চই বলবেন, সে অধিকার তার আছে আমাকে বলবার—Tার আমাকেও শুনতে হবে। লাগলেই লােকে বলে থাকেনবে কি তার প্রাণে লেগেছে ? হ্যা, লেগেছে। তবে কেন ওরকম দূরে দূরে চলে যাও, ভাল করেই টেনে নাওনা? ওগাে, আমি যে তােমার জন্য আমার সমস্ত কিছু উন্মুখ করে রেখেছি—নাও. নাও নাও —এমন সময় ইন্দু আসিয়া ঘরে ঢুকিয়া বলিল-“কিলে', কি ক্লাবছিস আপন মনে। দিন দুপুরে যখন তখন ত কৃষ্ণের উদাস ভরা বাঁশী বাজছে—মিলনের বাঁশীটা কবে বাজবে...এদিকে যে আমার রার্ণিকার প্রাণ যায় !--” সবিতা বলিলসময় হলেই বাজকে—তখন শুনতে পাবি অসীম যখন দেখিল মীরার মন হইতে সে ভাব যায় নাই, বরং দিন দিন আরো বেশী করিয়া দূরে সরিয়া থাকিতে চায়, তখন অসীমের মনে কি রকম একটা বিশ্রী রেখা ফুটিয়া উঠিল। একি! দিত কেবল বিমর্ষভাব—মুখে হাসি নেই, আগে কত এটা ওটা ছুতা করিয়া কাছে আম্লিত—আর আজকাল আসা ত দূরের কথা, বরং ডাকিলে পরে ছুত। করিয়া চলিয়া যায়। কেন, কি আমার হয়েছে সেখানে গিয়ে ছিলাম ? তাত অনেকবার বলেছি স্বেচ্ছায় যাইনি-সে নিয়ে গিয়েছে। আর সেখানে গিয়েছি মানে বঁশীটা বাজিয়ে চলে এসেছি—তাও তার অত কাকুতি-মিনতিতে। বেশ, গিয়েছি-যাওয়া অন্যায় হয়েছে—তার জন্য ত অনেক ক্ষমা চেয়েছি—তাতেও কি মার্জনা নেই ? বাড়ী থেকে বেরােনাে পর্যন্ত ছেড়ে দিলাম, তারই মন ভাল রাখার জআমিত সৰ্বান্তকরণে মীরাকে ভালবাসি, তার মন ভাল রাখবার জন্য, তার মুখে হাসি দেখবার জন্য—জগতের সব কিছু আমি যে করতে পারি। কিন্তু মীর! বােঝে কই? সে হাসি, সে প্রাণ খােল। ভাব কই? আচ্ছা, গীরা কি ভাবে—আমি তাকে ভালবাসি ? ছিঃ ছিঃ ; মীরার মন কি করে এ জিনিষ কল্পনায় আনে? আনে ত নিশ্চই—তা নইলে এ ভাব হবে কি করে? তা হল মীরা নিশ্চয় আমায় সন্দেহ করে—কেন এ সন্দেহ ? এ সন্দেহের মধ্য দিয়ে কি আমাদের জীবনকে নিয়ে যেতে হবে ৷ না, এ ভাং নিয়ে তৃ একদিনও আর যাওয়া উচিত নয়! কি করে শেষের দাবী মীরার এ ভুল সন্দেহ ভেঙ্গে দিই? এ কথা তুললেই ত বলে-“ও সব কথা কেন তুলছ, আমি ত ও বিষয় কিছু বলছিনে” না, আই মলার সঙ্গে এ বিষয়ের একটা মীমাংসা করতে হবে—আজই নয়—এখনি, বলিয়া অসীম রান্নাঘরের দিকে গিয়া দেখিল যে মীরা গালে হাত রাখিয়া একমনে কি ভাবিতেছে। মীরা জানিতেও পারল না অসীম আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। অসীমের চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল—শকুন্তলার সেই ছবির দৃশ্য— দুর্বাসার আগমন জানিতে পারে নাই, যার ফলে দুর্বাসার অভিশাপ তাই অসীম যখন দৃঢ় মন লইয়া যাহােক একটা মীমাংসা করিতে আসিয়া- ছিল, তখন অন্যমনস্কতা ও অপরপক্ষের প্রচণ্ড ক্রোধ স্মরণ করিয়া আর সেকথা তখনি তুলিতে ইচ্ছা হইল না, শুধু ধীর ভাবে ডাকিল—মীর। কি ভাবছ, বলনা? মীরা চমকাইয়া উঠিয়া সে ভাব দমন করিয়া বলিল—“কিছু নয়, বড় মাথা ধরেছে—যাই মেয়েটা হয়ত এতক্ষণ উঠে কাদছে, বলিয়া মীরা যেমন রান্নাঘর হইতে বাহির হইতে যাইবে, অমনি অসীম তাহার বাঁ হাতটি ধরিয়া বলিল—“মীল। ঘুমুচ্ছে, আমি এই দেখে আসছি! আচ্ছা সত্যি বলত মীর, কি ভাবছিলে?—আমাকে বল ? মেখের দিকে মুখ রাখিয়া মীরা বলিল—“ভাববার অার কি আছে মাথাটা ধরেছে, তাই এমনি বসেছিলাম অসীম তাহাকে বুকের কাছে টানিয়া হাসিয়া বলিল—কই, আগে ত শয়ত না—আজকাল প্রত্যহই কি মাথা রে? আজই ডাক্তার নিয়ে আলছি। দেখি, মাথার কোনখানটায় ধরেছে বলিয়া অসীম মীরার মাথার উপর মুখ রাখিল।

৫৩
শেষের দাবী
মীরার ভিতর হইতে কান্না বাহির হইয়া আসিতেছিল... এর উপর
আবার হাসি ঠাট্টা কেন—এততেও কি সাধ মিটিল না? ওগাে কেন,
আরি
তত তােমায় কিছু বলছিনে-শুধু নিজের মনে কাঁদবারও কি
অধিকার আর আমার নেই ? তাই মীরা বাহিরে সে ভাব দমন করিয়া
বাহুবাধন হইতে ছাড়াইয়া আসিবার 8েষ্টা করিতে করিতে বলিল রােগ
কখন কি ভাবে আসে কেউ বলতে পারে? আগে ধরতাে না—শুনতে না,
এখন ধরছে--শুনছো!—ছাড়, মেয়েটা অনেকক্ষণ দুধ খায়নি—দুধ খাইয়ে
नि ?
অমীম বলিল—তা মেয়ে উঠুক আগে। ছােট ছেলেপিলে ঘুমুলে
তাকে জাগিয়ে কিছু খাওয়াতে নেই।-আচ্ছা, চল ঐ ঘরেই চাই.
ওখানে বসেই কথা হবে।
কি কথা, এখানেই বলনা?
অসীম বলিল—তুমিত ঐ ঘরে যেতে চাচ্ছিলে—মীলাও বােধ হয়
এতক্ষণ উঠতে পারে-ও ঘরেই চল।
মীরা আর কিছু বলিল না, অসীমের সহিত উপরে শয়ন ঘরে
আসিল।
অসীম বলিল-বস মীরা, ঠিক আমার পাশটিতে, যেমন ক'রে আগে
বতে—এই ধর দিনকতক আগে।
মীরা বলিল—বল তােমার কি বলার আছে, এখনি মেয়ে উঠবে।
অসীম হাসিয়া বলিল—য়ে উঠলে মেয়ের মা তো কাছেই রয়েছে-
তার আর ভাবনা কি বলিয়া অসীম মীরাকে নিজের খুব কাছে টানিয়া
আনিয়া বলিল—“আচ্ছা, মীরা সত্যি করে বলতে, হােমার এ ভাব হবে

শেষের দাবী ৫৪ কেন—সে হাসি কোথায় গেল? তােমার মুখের হাসি যে আমায় জগতের সব জিনিষ ভুলিয়ে রাখে! সে হাসি কেন তুমি লুকালে মীর, বল ? মীরা আর থাকিতে পারিল না—স্বামীর বাহুর উপর মুখ রাখিয়া কাদিয়া ফেলিল—মুখ দিয়া কিছু বলতে পারিল না। অসীম তাহাকে তুলিয়া, নিজ বুকের উপর তাহার মাথা চাপিয়া ধরিয়া বলিল-হা কঁদ মীর, মনটাকে হাল্কা করে ফেল। কিছুক্ষণ উভয়েই নিস্তব্ধ রহিল, তারপর অসীম বলিল—বল মীরা, যদি তােমার মনের কোণে একটু কিছু উঠে থাকে—আমায় ভেঙ্গে ব! দু’জনকেই ধাঁধার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে হবে—তার চাইতে যাতে পথ করে বেরুতে পারি, তার চেষ্টা করা কি উচিত নয় মীরা ? বুঝেছি, তুমি আমায় সন্দেহ করেছ, যেদিন শুনলে সেখানে গিয়েছিলাম তার উপর পিসিমার কথা সেটাকে আরো দৃঢ় করে দিয়েছে—সবই আমার অদৃষ্ট। মীর, মীর! আমি তােমার সামনে যা দিব্যি করতে বলবে—তাই করতে প্রস্তুত আছি...মেয়েকে ছুঁয়ে বলছি বলিয়া অসীম যেমন মীলাকে, স্পর্শ করিতে যাইবে, অমনি মীরা বলিল—না, কখন মেয়েকে ছোঁবে না ওরা নারায়ণ ওদের নিয়ে খেলা নয়” – অসীম বলিল—তাইতে ত ছুতে চাইছি—তবে শোন, আমি এখনও বলছি, সেখানে আমার কিছু নেই, সেখানে গিয়েছিলাম শুধু তার | ফিকিরে পড়ে-আর বাঁশী বাজিয়েছিলাম, আমার সম্পূর্ণ অনিচ্ছায়। যদি * তোমার মনে কোন সন্দেহ জেগে থাকে, তা সম্পূর্ণ ভুল—আমার প্রতি অর্ষিচার করা হবে। এ মনের ভিতর তােমার আসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে শেষের দাবী ৩ গেছে-একেবারে পাথরে মাথার মত...সে মাখা ভাঙ্গবার কারাে সাধ্য নাই।, ভাঙ্গবে, যেদিন ওপারের বাঁশী এসে চুপি চুপি কানে বাজবে। ও সরে নিয়ে যাবার জন্য। আমার প্রতি কেন এ অবিচার কর মীরা? তােমাকে নিয়ে আমি জগতের সব দিক ভুলে আছি—আর কিছু দেখবার আমার অবসর কোথায়? আর তা ছাড়া আমার অভাব কি? তােমার মত স্ত্রী যার, তার ত কিছু অভাব থাকতে পারে না ? দুঃখ হয় মীরা, তুমি আমায় ভুল বুঝলে? বল মীর, আবার আমরা পূর্বের মত জীবন যাপন করব—কোন দ্বিধা, কোন সঙ্কোচ করব না ! মীরা মুখ তুলিয়া বলিল—জানতাম তাই আগে—বুঝিবা আমার মত স্বামীর ভালবাসা কেউ পায়নি—কেউ পাবে না, কিন্তু আর তত আমি তা ভাবতে পারিনে-জেনে শুনে কি করে তা ভাবি ? মনে আমার কত জোর ছিল—কত জোর নিয়ে আমি যে স্বামীর চরিত্র নিয়ে আলােচনা করতাম। সকলকে বলতাম—চরিত্রবান স্বামী পাওয়া কত তপস্যার ফল। কিন্তু সে জোর আজ আর আমার কোথায় অসীম উত্তেজিত হইয়া বলিল—মীরা মীরা, আমাকে ভুল বুঝােনা এখনাে বছি চরিত্রে আমার কোন দাগ পড়েনি, যেমন শুদ্ধ ছিল তেমনি আছে•• তবুও তুমি বিশ্বাস করলে না?-জানিনা এ সন্দেহের পরিনতি কোথায়? মীরা আর কিছু বলিল না, শুধু কোচের একটা হাতল নখ দিয়া খুঁটিতে লাগিল। অসীম বলিল—শােন মরা, আমি; আমি কোনদিন তােমার উপর উত্তেজিত হয়নি, কিন্তু আজকে হয়েছি। কারণ প্রাণে বিশেষ কষ্ট শেষের দাবী পেয়েছি। এ বিশ্বাসের একমাত্র উপায়--আমার মরণ---তা ছাড়া আমি আর কিছু উপায় পাচ্ছি না বলিয়া অসীম ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। মীরা মীলার পাশে তাহার বালিসে মুখ রাখিয়া কতে লাগিল। সেদিন সকাল হইতে অবিশ্রাম বৃষ্টি পড়িতেছে—মাঝে মাঝে মেঘের গুরু গর্জন, বিজলীর ক্ষণিক খেলায় প্রকৃতিকে এক নূতন সাজে সাজাইতেছিল। স্বামী স্ত্রীর মনের মধ্যে বরষার মেঘ একটু একটু করিয়া জমিতেছিল—বড় একটা দু’জনে কথাবার্তা হয় না, হইলেও সে কথা ফাকা-কোন দাম্পত্য প্রণয়ের আর ভাব নাই বরং পূর্ণ বিচ্ছেদের পূর্বসূচনার গন্ধই মাঝে মাঝে ভাসিয়া আসে। ওয়াটার প্রুফটা গায় ফেলিয়া অসীম বাড়ী হইতে বাহির হইয়া মনের মধ্যে উঠিতেছিল—কেন যে সেই গানের দলে গিয়েছিলাম—তা নইলে সেও আমায় জাননা; আমাকেও সেখানে গরে ধাশী বাজাতে হতাে না। তাহলেত কোন গােলই হতো না— মীরা কি সন্দেহ কতে পার। কেন, মীরারই বা সন্দেহ করবার আছে শেষের দাবী ৫৭ কি ? স্বামী স্ত্রী যদি পরস্পরে সন্দেহের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করে- সে সংর সুখের কোথায়? না, মীরার মন থেকে এ সন্দেহ কখন। যাবে না—কিছুতেই না, মিছামিছি এ সন্দেহের বােঝা? না—যদি তাই বইতে হয়, তবে সত্যি বওয়াই ভাল—তবু নিজের মনের কাছে ত তৃপ্তি পাব যে বিনা দোষে সে আমায় সন্দেহ করে না। মনের মধ্যে এই সব ভাঙ্গা গড়া লইয়া, উদভ্রান্তের মত রাস্তা ঘুরিয়া অসীম সবিতার বাড়ীর সামনে আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। মিনিট কতক বাড়ীটির সম্মুখে দাঁড়াইয়া কি ভাবিল ও শেষে খুব তাড়াতাড়ি ভিতরে প্রবেশ করিল। ভিতরে তখন বিভিন্ন ঘর হইতে গান বাজনার আওয়াজ আসিতেছিল। অসীম উপরে উঠিয়া একেবারে ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। সবিতা তখন আরসির সামনে দাঁড়াইয়া রুমালের একটি কোন দিয়া অতি সন্তর্পণে নিজের রক্তিম ওষ্ঠদ্বয় পুছিতেছে। আরসিতে ‘অসীমের প্রতিবিম্ব পড়িবামাত্র সবিতা ফিরিয়া একেবারে ছুটিয়া আসিয়া অসীমের হাত দুটি নিজ হাতে লইল, তারপর বলিল—আজ আমার একি দিন, কার মুখ দেখে উঠেছিলাম—আজ সত্যি অসীমবাবু, সমস্ত দিন প্রাণটা কি রকম করছিল—আপনার জন্য এ ব্যথা তার চরণে বােধ হয় আয়াত করেছিল, তাই তিনি পাঠিয়ে দিলেন। সবিতার পরণে ছিল ছাপা রঙের সিল্কের শাড়ি, সেই রঙের কাঁধের নীচে হাতকাল ঢিলে রা—তাতে আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে তাহার দেহ বর্ণের শুভ্রতা—সেবনের সমস্ত অনুসঙ্গিক নিয়ে। পড়টা মার খানিকটা ভুইয়া, বুকের উপর দিয়া আসিয়া আলী সমেত শেষের দাবী সম্মুখে বুলিয়া রহিয়াছে। পায়ে জরী দেওয়া গিপার—বিদ্যুতৰাতির । আলাে পরিয়া ঝকমক করিতেছে। অসীম মুগ্ধ নেত্রে চাহিয়া ভাবিতে লাগিল—সবিতা দেখিতে মন নয়। কই, দুদিনত এ বাড়ীতে এসেছিলাম, এ রকম ত কোনটি দেখায় নি । সবিতা হাসিয়া বলিল—কি দেখছেন, খারাপ দেখাচ্ছে তাইনা? না, খারাপ কেন দেখাবে—বেশতাে দেখাচ্ছে! আসুন, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? আচ্ছা অসীমবাবু, আপনি ত বাঁশী বাজাতে পারেন ভালগানেও বােধ হয় সেই রকম—কি বলেন? অসীম বলিল--না, গান আমি গাইতে পারিনে, মােটই না—তুমি নিশ্চয় ভাল গাইতে পার ? হ্যা, না—তা পারি-একটু আধটু চেষ্টা করি। আধটু চেষ্টা করি। লােকে ত বলে ভাল লাগে, তবে আপনার কি রকম লাগবে জানিনে। শুনবেন না হয় একটু চেষ্টা করে দেখি। অসীম সবিতার দিকে তাকাইয়া ভাবিতেছিল—লোকে বেশ্যাদের বিষয় কত কি বলে, কিন্তু কই, সবিতার ত সে রকম কিছু নাই- কথাবার্তা বেশ মার্জিত-তাই ভাবিতে ভাবিতে অসীম বলিয়া ফেলিল- “বেশ তাে, গ না।” কোণে একটি টেবিল হারমােনিয়ম ছিল-সবিত। ডালাটি তুলিয়া তাহাতে সুর দিয়া গান ধরিল- “সুন্দর আজি অতিরি-মম গৃহে পরমােৎসব রাতি– সবিতা গান গাহিয়া চলিয়াছে—দৃষ্টি আবদ্ধ অসীমের খের উপর শেষের দাবী -কি করুণ দৃষ্টি, আর অসীম, সেও তাে সবিতার দিকে চাহিয়া। গান মিয়া গিয়াছে, তখনও পরস্পর পরস্পরের দিকে চাহিয়া। ডালাটি বন্ধ করিয়া অসীমের সামনে দাঁড়াইয়া সবিতা বলিল— কি দেখছেন? বলুন কেমন লাগল? অবশ্য আমি আগেই বলে দিচ্ছি অতি যাচ্ছেতাই—তাই কিনা বলুন? অসীম বলিল—সত্যি বলছি, আমার খুব ভাল লেগেছে—তুমি অামার বাশী বলেছ খুব ভাল লাগে—প্রাণস্পশী, আমিও বলছি তােমার গুনে প্রাণ আছে—হৃদস্পশী-- অসীম ভাবিতেছিল—সবিতা এ সব গান কি করিয়া গায় । সে যে শুনিয়াছে এখানে ভালবাসাকে বিশ্র নগ্ন সৌন্দর্য্যের রূপ দিয়া গানের মূৰ্ত্তি ফুটিয়া বাহির হয়। কই, সবিতার ত তার কিছুই নাই—এ গানে যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়—এত ভাব সে কোথা হইতে পায়? বেতাদের ছলাকলাই ত সারভাবের ধার ত তারা পারে না। তখনি মনে হইল না, আমি এখানে তো সে অতিথি হয়ে আসিনি—আমি এসেছি জানা শুনার খাতিরে-তবে? তাই অসীম জিজ্ঞাসা করিল–আচ্ছ, তুমি এ গান কোখেকে শিখলে—এতো এখানকার গান নয়? সবিতা নীচুদিকে মুখ করিয়া খুব আস্তে আস্তে বলিল—আমায় | আপনি নাম ধরে ডাকবেনসবিতা বলে, তাতেই আমি খুব সুখী হব। তারপর অসীমের দিকে চোখ রাখিয়া বলিল—অসীমবাবু আমিও পারতুম—ঠিক আপনাদের মত জোর নিয়ে-হয়ত অপরকে ঐ কথাই জিজ্ঞাসা করতাম—কিন্তু এ জিনিষ তাে হ’ল না—হৃদয়ের রুদ্ধ- আবেগ নিয়ে নিজেই গুমরে মলুম। তাই সময় সময় প্রাণ কেঁদে ওঠে, হাহাকার শেষের দাবী ৬০ করে উঠে—একটু, একটুখানি পরশ পেতে প্রকৃত প্রাণের সঙ্গে। একদিন ভাবতুম, বুঝি জীবনটাকে নিয়ে বেড়াব, অপরদের মত রকম গান গেয়ে-কিন্তু অসীমবাবু, সেতে। হ’ল না—সে কি আমার দোষ- বলুন? সবিতা এতই করুণ ভাবে কথাগুলি বলিতেছিল যে অসীমের মনটা মুহূর্তের মধ্যে কি রকম হইয়া গেল, তাই খুব নরম সুরে অসীম বলিল— দোষত নয় কিন্তু আমি ত ঠিক বুঝতে পারলুম না সবিতা—ভাল করে বল! সবিতা আর থাকিতে পারিল না, একেবারে অসীমের কোলের উপর মুখ নকিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। অসম হতবুদ্ধির মত হইয়া গেল, বলিল—কাদছ কেন সবিতা আমায় বল, যদি আমার সাধ্যায় হয়—দূর করবার চেষ্টা করব। সবিতার মাথার কাপড় খুলিয়া গিয়াছিল—গলার সরু হারের খানিকটা অংশ দেখা যাইতেছিল, অসীম সেটাকে নাড়াচাড়া করিতে করিতে বলিল-ওঠ, সবিতা, শুধু যা তা জিনিষ নিয়ে মন খারাপ করােনা-ওঠ! পাশের ঘরের ঘড়িতে টং টং করিয়া ১০টা বাজিতেই অসীম নিজ হাত ঘড়ির দিকে চাহিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—“তা ক'লে আজ বাই সবিতা! সবিতা অসীমের খুব কাছে আসিয়া এবারে মুখের কাছে মুখ আনিয়া বলিল—আজ রাত্রি হয়ে গেছে যান—আবার কাল আসবেন কোন সময় বলুন? সত্যি আপনাকে খেয়ে আসি সব ভুলে যাই- শেষের দাবী আমার নিজের অস্তি—আমার জীবনের ধারা। মনে হয় আমিও বুঝি অন্যের মত, যেমন তারা সব কিছু তাদের দয়িতকে দিয়েছে—আবার নিয়েছে ও—আদান প্রদানের ফলে ' এক হয়ে গেছে—দু’জনা •জনকে নিয়ে। বাহিরে তখন প্রবলভাবে সারিবর্ষণ চলিতেছিল—প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ। বিদ্যুতের হাসি সারসির কাচের ভিতর দিয়া ঘরের মধ্যে পর্যন্ত উকি দিয়া গেল ও তাহার সহিত গুরুগর্জনে মেঘ ডাকিয়া উঠিল। সবিতা অসীমের খুব কাছে দাঁড়াইয়া কথা বলিতেছিল--হঠাৎ মেঘের গর্জনে, বিজলীর চমকে—সবিতা একটা অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া একেবারে অসীমকে জাপটাইয়া ধরিয়া তাহার বুকের মধ্যে মুখ ঢাকিল। অসীমের মনের সমস্ত তন্ত্ৰীগুলাে ভিতরে লাফালাফি করিয়া উঠিল, ঘন ঘন উষ্ণ নিশ্বাস পড়িতে লাগিল—মাথার মধ্যে পৃথিবী যেন ঘুড়ি উঠিল, স্থান কাল পাত্র সবই তাহার সহিত ঘুরিয়া গেল। সবিতার মাথা তখনও অসীমের বুকের উপর ছিল। অসীম উন্মাদের মত দু’বাহু দিয়া নিবিড়ভাবে তাহাকে বক্ষে চাপিয়া নিজ অধর নীচু করিতে যাইতেছিল তখনি আবার সােজা হইয়া দাঁড়াইয়া বলিল-“সবিতা কেন তুমি আমার পথে দাড়িয়েছিলে-ছিঃ ছিঃ, একি করলাম—আজীবনের ব্রত কি করে এখানে ভাঙলাম। সবিতা তুমি আমার অতি শত্ৰু-না না, তুমি নওশুমি নও বলিতে বলিতে অসীম ঝড়ের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল—সাহা নিশ্চল যুর মত দাড়াইয়া রহিল।

= অসীম উদভ্রান্তের মত হাঁটিতে হাঁটিতে রাত্রি এগারটার সময় বাড়ী ফিরিল। পথে যদি সে সময় কেহ তাহাকে দেখিত, তাহা হইলে ভাবিত হয় অসীম নেশাখাের, নয় পাগল—চ রক্তবর্ণ—তখনও প্রকৃতিস্থ হইতে পারে নাই—এই মন লইয়া সে দরজায় কড়া নাড়িল । মীরা তাড়াতাড়ি আসিতেছিল, উঃ মাগাে বলিয়া পায়ের দিকে একবার চাহিয়া সেই অবস্থায় দরজা খুলিয়া দিল। অসীম বাহির হইতে মীরার যন্ত্রনার আর্তনাদ শুনিয়াছিল-দরজা খুলিতেই দেখিল-মীরার পা হইতে রক্ত ঝড়িতেছে। অসীম চিৎকার করিয়া বলিল—একি হল, কি করে কাটল- একেবারে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, দেখি বলিয়া যেমন অসীম নীচু হইয়া পা দেখিতে যাইবে, মীরা সরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—“ও, কিছু নয়, একটু হোঁচট লেগেছে—চ’ল ওপরে !” অসীম বলিল—না মীরা, ভয়ানক কেটেছে, ওঃ, একেবারে রক্ত ফিনকি দিয়ে পড়ছে বলিয়া পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া পা বধিতে গেল, মীরা বাধিতে দিল না—ওপরে গিয়ে বাঁধছি বলিয়া আগে আগে চলিল। অসীল্পে মন রক্ত দেখিয়া খারাপ হইয়া গিছিল—সেও তাড়াতাড়ি উপরে চলিল। সিড়ির কাছে দেশি এ একটি শিশি ভাঙ্গা—সেইখানে খানিক রক্ত পড়িয়া।

শেষের দাবী ন অসীম বলিল-হোঁচট ত লাগেনি-এই শিশিতে পা কেটে গেছে বলিয়া শিশি ভাঙ্গাটা একপাশে সরাইয়া রাখিল। তাহার পর উপরে মাসিয়া বলিল—“বস এই চেয়ারটায়, দেখি ভিতরে কচি ঢুকে আই আছে কিনা। মীরা আপত্তি করিল-শেষে অসীম জোর করিয়া পা দেখিল ও তাহার ভিতর হইতে একটি কাচের টুকরা বাহির করিয়া তাহাতে টনচার আইডিন লাগাইয়া বাধিয়া দিল। অসীম জিজ্ঞাসা করিল-“ওখানে শিশি ভাঙ্গা ফেললে কে ? “মীরা বলিল—ঝির হাত থেকে তেলের শিশিটা পড়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল, তুলে ত ফেলে দিয়েছিল-ওটা বােধ হয় দেখতে পাইনি। অসীমের ঐ ভাব দেখিয়া, মীরার মনের রুদ্ধ আবেগ গুমরাইয়া উঠিতেছিল-ওগো, এই সামান্য জিনিষ নিয়ে তুমি যে অস্থির হ'তে আমি নিজেই যে লজ্জিত হতাম। এখন ও আছে-কিছুদিন পরে বােধ হয় আর থাকবেনা। অসীম চুপ করিয়া বসিয়া মীরার মুখের দিকে তাকাইয়া ভাবিতেছিল, এইত আমার স্ত্রী—কোন দিকে লক্ষ্য নাই, পাছে একটু দেরী হয়, তাড়াতাড়ি আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল—নিজের পা কাটিয়া রক্ত ঝরিতেছে, ক্ষেপও নাই ? আর আমি। ছিঃ ছিঃ মহাপাতক- বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিদান কি দিলাম? আর ত আমি সে মন নিয়ে মীরার কাছে কিছু শুতে পারব না? মনের আবেগ মনে চাপি, মীর বলিল—বিকালে চা খাওনি, জলে ভিজে ছ, ষ্টোভ জেলে চা করে দিব।

শেষের দাবী ৬৪ অসীম বলিল-না মারা, চা এত রাত্রিতে আর খানা? মারা অসীমের মুখের দিকে চাহিল। অসীমও কিছু বলিল না, শুধু চাহিয়া রহিল। মীর। বলিল--তবে খাবার দেব ? অসীম বলিল-মীরা, আমিয়ামি বিশ্বাসঘাতক—আর-আর আমি তোমার কাছে মাথা তুলতে পারব না পারিনে। কি করব মীরা বল- আমি যে স্থির হতে পাচ্ছিনে—তুমিই পথ বলে দাও ? মীরা সে কথার উত্তর দিল না, শুধু বলিল—রাত হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে নাও অসীম খপ, করিয়া মীরার হাত ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—তুমি, তুমিও ত আমাকে তােমার বুকে আবার টেনে নিতে পারাে। কেন। তুমি আমার সঙ্গে আর হেসে কথা কওনা—সে হাসি কেন তােমার মুখে আর নেই? আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি ফুলের মত পবিত্র ছিলাম, তারপর সন্ধ্যায় তার বাড়ীতে গেলাম—তোমার উপর অভিমান করে। বােধ হয় তখন আমার জ্ঞান ছিলনা, অথবা ক্ষণিকের জন্যই বা পাগল হয়েছিলাম—আমার সব কিছু হারাচ্ছিলাম, তখনি আবার লুপ্ত জ্ঞান ফিরে পেলাম, তাকে যা তা বলে পাগলের মত বেরিয়ে পড়লাম। মীরা, মীরা, মীর। আমার কি হবে? ক্ষার ত আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারিনে ? মীরা শুনিল, কিন্তু সে বিষয় কিছুই বলি না, যেন ওসবে আর তাহার কিছুই হয় না—ওত সেদিনই নিয়াছে। মীরা বলিল-রাত তাে দুইল, এইবার খেয়ে নাও।

শেষের দাবী
অসীম বলিল—না, আজ আর কিছু খাব না। মনের জ্বালা
কিসে শান্ত হয়-তাই, তাই বলে। মীরা !
তারপরেই মনে পড়িল –মীরা এখনও খায়নি—আমি না খেলে
সে সে খায় না, তাই বলিল—“আচ্ছা দাও মীর খাব। |
মীরা খাবার দিল—অসীম তাহা হইতে একটু কিছু মুখ দিয়া উঠিয়া
পড়িল-বলিল, আজ ক্ষিদেও তেমন নেই—তুমি এবার খাও মীরা।
মীরা খাবার ঢাকিয়া রাখিয়া বলিল-আমার আজ শরীরটা খারাপ,
কিছু খাবনা বলিয়া সুইচটি টিপিয়া দিয়া মীলাকে কোলের কাছে টানিয়া
শুইয়া পড়িল।
অসীম মীরাকে বাহবাধনে বাঁধিতে গেল—মীরা অমনি সােজা
হইয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল—“শােন , তােমায় আমি আর কিছু বলতে
চাইনা-বলার অধিকারও আর আমার নেই—কিন্তু এ আমার নিজের
দিক দিয়ে, আমার নারীত্বের দিক দিয়ে তোমায় বলছি, আমার
তােমার ও বাহুর বাঁধনে আমার দেহকে কলুষিত করে না। আর আমি
কিছু চাইছি না, শুধু এইটুকু—এইটুকু ভিক্ষা তােমার কাছে।”
অসীম প্রথমটা থতমত খাইয়া গেল। মীরার দিকে তাকাইয়া
দেখিলগার দৃষ্টি তাহারই মুখের উপর—চক্ষু জলভারাক্রান্ত
ফোটা গাল বহিয়া পড়িতেছে।
অসীমের নিজের অস্তিষ্ক তখন প্রকৃতিস্থ ছিল না।
নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া, ম'। একেবারে ক্ষত বিক্ষত ও ক্লান্ত
হইয়া পড়িয়াছে। মুহূর্তের জন্য সে নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত
হইয়াছিল, কিন্তু তখনি ত আর সে নিজের পূর্ণশক্তি ফিরিয়া পাইয়-
সমস্ত দিন

শেষের দাবী ছিল আবার ত সে সেই মনকে পরাজিত করিয়া নিজের আবাসে ফিরিয়া আসিয়াছে। সে যে জয়ী—কোন দিন যে সে নিজের মনের কাছে পরাজিত হয় নাই—পরাজিতের কল্পনাও কোন দিন আসে নাই- তাই শেষে জয়ী হইয়া আসিলে ও, মুহূর্কের জন্যও যে একবার পরাজিত হইয়াছিল তাই আত্মগ্লানিতে সে যে মরিয়া যাইতেছে। অনুশোচনার জালা, ক্ষতবিক্ষত হৃদয় লইয়া সে তার অতি প্রিয়জনের কাছে তুলিয়া ধরিয়াছে—সান্ত্বনা পাইতেকিন্তু, কিন্তু সে কই? তবে—তবে কিসের আশায় জয়ী হওয়াকার জন্য ? ক্ষত বিক্ষত দেহ-না, না, সে তো তুলে নিলো না, বলে দিল—এ জয়ে গৌরব নেই! জয়ী পুরুষের দুর্বলের কাছে মুহুর্তের জন্য পরাজিত হইয়া, তারপর সে জয়ের মূল্য নেই—পরাজিতের তালিকাতে নাম থাকবে—আর এ জয়ীদের মধ্যে তােমার নাম থাকবে না, পরাজিতদের সঙ্গে তােমার আসন করে নাও। কিন্তু মীরা কি জানে না—জয় পরাজয় সে ত আছেই, কোন দিকে নিয়তির কুটিল চাহনি কেউ বলতে পারে ? আবার সে ওঠ জয়ী হয়ে পরাজিতের গুঞ্জন থেমে যায়—জয়ের বজ্র নিনাদে, জয়ের গৌরবে। তবে কি পাগল হয়ে যাব ? না, না আর পারিনা! চাই শান্তি, চাই সান্ত্বনা ! মীরা ত সাফা জবাব দিয়াছে। তবে তাই হােক। রাজতের নিশানই বেঁধে দিলাম। অসীম আপন মনে ভাবিয়া চলিয়া ছিল, যখন সে মীরার দিকে মন লইয়া তাকাইল—মী, বাহুর মধ্যে মুখ ঢাকিয়া শুইয়া অাছে। অসীম খুব ধীরভাবে বলিলু বেশ বির, আমি তােমায় আর স্পর্শ

৬৭
শেষের দারী
করবনা, আর জ্বালাতন করবন।। এসেছিলাম তােমার কাছে শ্রান্ত
দেহেতুমি ফেলে দিলে—তাই দাও।
মীরা কোন উত্তর দিল না শুধু চোখের জলে বালিসের কৃতক অংশ
জিয়া উঠিল
p
আজ কদিন হইতে স্বামী স্ত্রীর ভিতর মােটেই কথাবার্তা নাই—যে
দ্বার দৈনন্দিন কর্ম করিয়া যায় ।
মীলা তাকাইয়া তাকাইয়া দেখে, বুঝিতে পারে না তাহার বাবা মার
কি হইল? প্রত্যহই ত তাহাকে লইয়া তার বাবা মা একসঙ্গে কত হাসি
খুসি করে কিন্তু আজ কদিন হইতে তাহাদের কি রােগ হইল ? মা তবু
ত কোলেলে সব সময় না হউক তবু ত হাসে, কাদে, আদর করে, কিন্তু
বাবাকে এ ঘরেই ত আর দেখতে পাই না। এ দেখছি মার চাইতে
বাবারই রােগটাই আমার কাজ আদর নিয়ে—সেটা পেলেই
আর আমার কিছু নেই।
অসীম যখন ঘরে ঢুকিল, মীলা হাত পা নাড়িয়া খেলা করিতেছিল।
অন্যদিন সে বাবা আসিলে তাক—আজ বুঝি সে অভিমান করিয়াছে,

শেষের দাবী তাই পাশে টাঙান লাল কাগজের ফুলটার দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া আছে। অসীম হাত ঘড়িটা বাঁধিতে বাধিতে এক একবার শীলার দিকে তাকাইতেছি, ভারপর মীলার মুখে একটি চুমু খাইয়া ঘর হইতে বার হইয়া গেল মীলা আর কতক্ষণ একলা খেলা করে, কিছুক্ষণ পরে কাঁদিয়া উঠিল। অভিমানের পর আদর, তাহারই দ্বারা যাহার উপর সে অভিমান করিয়াছে -সে তো কান্না আসিবেই, সকলের যা হয় তাহারও তাই হইল—এসব বিষয় মীলা তাহার মার দেখিয়া শিখিয়া লইয়াছে। বাড়ী হইতে বাহির হইয়া অসীম সবিতার বাড়ীর দিকে চলিল আজ তিনদিন সে অনেক ভাবিয়াছে, চিন্তা করিয়াছে, কিন্তু মনের শাস্তি ত দূরের কথা, আরো অশান্তি আনিয়াছে। শেষে স্থির করিল সবিতার কাছে ত তবু দুটো মিষ্ট কথা শুনিতে পাইবে, দুটো গান ত শুনিতে পাইবে। মীরা ত সাফই বলিয়া দিয়াছে তােমার স্পর্শে আমার দেহ কলুষিত হবে”—না, আর তার কিছু ভাবিবার নাই, সত্যকেই বরণ করিয়া লইবে—মিথ্যা অপবাদ লইয়া আর বেড়াইবার দরকার নাই। তাই অসীম সােজা আসিয়া অতি পরিচিতের মত সবিতার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল ও একেবারে ঘরে ঢুকিয়া কোচের উপর বসিয়া পড়িল। সবিতা তখন ঘরে ছিল না। টেবিলের উপর একখানি খাত ও পাশে দোয়াত কলম রহিয়াছে। অসীম বুঝিল সবিতা লিপিতেছিল, কারণ খাতাটি তখনও খেলা-পাতার উপর একটি ছত্রের অসমাপ্ত অংশ। অসম টেবিলের সামনে চেয়ারটার শেষের দাবী উপর বসিল। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে পারি অসমাপ্ত, লেখাটির উপর নজর পড়িতেই সে দেখিল—একজায়গায় তাহাই নাম রহিয়াছে। কাহারও কিছু লেখা, তাহার অকাতে, সুতে পড়া অসীম পছন্দ করিত না কিন্তু যখন সে দেশি তাহার নান সবিতার খাতার মধ্যে, তখন সে আশ্চৰ্য্য হইয়া গেল এবং তাহ। দেখিবার জন্য খাতাখানি তুলিয়া লইল। সেই জায়গাটিতে লেখা ও গাে তৃষ্ণায় যে প্রাণ যায়—আর যে কথা কহিবার পর্যন্ত শক্তি নাই—জলপত্র নিয়ে এসে দাড়ালে—এক ফোটা মাত্র জল মুখে দিয়ে তখনি আবার * সরিয়ে নিলে। কিন্তু এর চাইতে যে না দেওয়াও ছিল ভাগ—এতে যে তৃষ্ণা আরাে বেড়ে যায়—আগের চাইতে যে বড় বেশী যন্ত্রণা। অসীম বাবু তুমিত অত নিষ্ঠুর নও-তােমার প্রাণে যে ব্যথা, দরদ-- এই পৰ্য্যন্ত লেখা তাহার পর আর লেখা হয় নাই। অসীমের বিষম কৌতুহল হইল, আরাে বেশী আশ্চর্য্য হইয়া পাতাগুলি উল্টাইয়া দেখিতে লাগিল। প্রথম পাতায় লেখা---- কুয়াশার ঘন অন্ধকার ঠেলেও মানুষের ক্ষীণ দৃষ্টি যায় ও তার মধ্য হইতে আবছায়ার মত ও সে কিছু দেখে আবার নাও বা কিছু দেখতে পারে—তেমনিই ত আমার কাহিনী লেখা! মনে সব নাও থাকতে পারে, তবু যেটুকু মুভ অচ্ছ সেটুকুই বা লিখতে এমন ক্ষতি কি? না, লিখতে এমন ক্ষতি কি--ক্ষতি যা হবার তা হয়েছে- যখনি মা বেরিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর মা নাকি অকুল সাগরে পড়েছিল আমায় নিয়ে—কি করে তার সংসার চলবে? একবার হলে তিনি না হয় না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরতেন—না হয় আত্মহত্যা

৭০
ষের দাবী
কতেন—কিন্তু আমায় নিয়ে হ’ল নাকি মহা ভাবনা—সকল জ্বালা
সবে খন আমার যে একবছর বয়স। চোখের সামনে রে
আমার কচি প্রাণটা বেরিয়ে যাবে তিনি কি করে সহ রুন!
ও পাড়ার মিজেনবাৰু তিনি বিপত্নীক ও নিঃসন্তান—মা তারই বাড়তে
রাধুনীর কাজ নিলেন—শেষে আমাকে নিয়ে গেলেন ও গৃহিনীর পদ
দখল করলেন। দ্বিজেনবাবু থাকতেন হাজারীবাগে, তার ছিল কাঠের
কারবার—অগাধ পয়সা উপার্জন করেছিলেন। দেশে এসেছিলেন
এখানকার বিষয় সম্পত্তি বিক্রয় করবার জন্য-কৰ্ম্মস্থলেই স্থায়ীভাবে
থাকার ইচ্ছা। এখানকার সব কাজ শেষ করে তিনি মাকে ও
আমাকে নিয়ে গেলেন। আমাদের দারিদ্র দেখে বুঝি তার প্রাণ কেঁদে
উঠেছিল। তাই তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন।
অসীম পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে দেখিল, একখানিতে লেখা
রহিয়াছে—তাকেই বাবা বলে ডাকতাম। তখন ত বয়স হয়েছে প্রায়,
পাঁচ বছরভাবতাম আমাদের কত বড় বাড়ী, মার গায় কত গহনা,
আমার ও গায় গহনা-বাবা মা কত ভালবাসে। পাড়ার ছেলেমেয়েদের
সঙ্গে খেলতাম—মনের আনন্দে দিন কাটত
অসীম পাতা উল্টাইল, আর একটি পাতায় লেখু—মেয়ে স্কুল
বাবা অনেক টাকা সাহায্য করেছিসই নেই ভর্তি হলাম—
প্রাণে কত আনন্দ। আর একজায়গায় লেসের সঙ্গে নিজের
অবস্থা বুঝতে পারলুম-আমি কোথায় আছি, সমাজের বুকে
আমার স্থান কতখানি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আর কারুর বাড়ী
যেতাম না-প্রাণ আমার অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, হাঁপিয়ে উঠল-মারে

সেও
• ৭১
শেষের!
অতিষ্ঠ করে তুললো সেই পাড়ার মাতাল, চরিত্রহীন হরেনখ
সলাতন করতাে। কাউকে ত কিছু বলতে পারতাম না মামার
লেবার মুখ কই? একদিন স্কুল
থেকে আসছি, রাস্তায় যে আমার
পথ আগলে দাঁড়াল, তারপর বিশ্রী প্রস্তাব করলাে। এতে নিজের
মনের অশান্তিতে নিজেই জ্বলে যাচ্ছি। তার উপর আবার সেই উপদ্রব
তাকে বললাম, যে চরিত্রহীন মাতাল-তাকে আমি ঘৃণা করি।
উত্তর দিল-বেশ্যার মেয়ের আবার সতীপনা—আর এ টং কদিন ?
অসীম একমনে পড়িয়া যাইতেছে এমন সময় সবিতা ভিজা কাপড়
গায়ের উপর ফেলিয়া সাবানদানি হাতে ঘরের ভিতর প্রবেশ করিতেই
দেখিল-অসীম এক মনে কি পড়িতেছে—তাহারপরই বুঝিল তাহারই
অসমাপ্ত লেখা যা সে একটু আগে রাখিয়া গিয়াছে। সবিতা আশ্চৰ্য্য
হইয়া গেল, মিনিট কতক দাড়াইয়া থাকিয়া বলিল—“আপনি? কতক্ষণ
এসেছেন—আমাকে ডাকেননি কেন ?
অসীম একটু থতমত খাইয়া গেল, তাহারপর বলিল—“হ্যা, একটু
আগে এসেছি।”
ও কি অসীমবাবু, ওসব পড়ছেন কেন? না, না এ কিন্তু আপনার
অন্যায় ।
অসীম বলিল-এ যেত ন্যায় সবিতা স্বীকার করছি। আমি
পড়তান --য়ের পাতায় আমার নামটা দেখে কৌতুহল হ’লতােমার
আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলাম না, তাই পড়লাম—বুঝলাম ব্যথা
ভরা জীবনের কাহিনী তারপর পাতা উল্টাইতে লাগলাম, যেটুকু
বুঝলাম-তাতেই তােমায়

র দাবী
৭২
তাতেই আমার পাগলামী এইত ! আচ্চা বসুন, আমি কাপড়
ছেড়ে চাটা করে নিয়ে আসছি বলিয়া সবিতা ঘর হইতে গুজর
হইয়া ।
=
সবিতলিয়া গেল, অসীমের চোখে ভাসিতে লাগিল—সবিতার
যৌবনের অনাবৃত রূপ, পরিস্ফুট ও সুগঠিত তনু-
অসীমের মনের ভিতর কবির কল্পনার মত অনেক কিছু ভাসিয়া
উঠিল—তারপর খাতায়, তারই হাতের লেখার উপর আমার মনটা
আছড়াইয়া পড়িল।
অসীম পড়িতে লাগিল—না, আর পারলুম না--একেবারে অসহ
হয়ে উঠেছে। মাকে সব কথা বলে কাঁদতে লাগলাম। মা বাবাকে
বলেছিল।
আর এক জায়গায় লেখা—বাবা এখানে এসে এক লেডী হোষ্টেল
রাখলেন ও এখানকার স্কুলে ভৰ্ত্তী করে দিলেন। ব্যাঙ্কে অামার নামে
পনেরো হাজার টাকা রাখলেন। না, তিনি ত ঠিক মেয়ের মতই মানুষ
করেছিলেন—সত্যি করেই ভালবাসতেন। যাবার সময়ের তার
কথাগুলি এখনও কাণে বাজছে—তুমি তােমার জীবন নিজহাতে গড়ে
নিতে চাইছ, তাও নাও-আমি বাধা দেবনা। (ভালুপর আমার মাথায়
হাত দিয়ে বললেন—তােকে আমি মেয়ে জোশি, আর সেই ভাবেই
তােকে এতবড় করে মানুষ করেছি। লেখা পড়া নিয়ে জলে ভাল
মল বুঝে চলাে—আর কিছু বলবার নেই মা। প্রাণ, কেঁদে উঠল,
তখনই মনে হ’ল জগতে আমি আজ একা। পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায়
দিলাম--তিনিও চোখ মুছতে মুছতে বিদায় নিলেন।

শেষের গ অসীম খাতা হাতে করিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, তারপর আর পুর্সিগিল।—একজায়গায় লেখা—কই, আর তো তঁাদে চিঠি পাই আমিও দিই না। তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ শেষ, জানি তার। 'জীবিত কি মৃত? অন্য একপাতায় লেখা-হােষ্টেলে থাকি, স্কুলে যাই। স্কুলে এসরাজ বাজাতে শিখেছি—গান শিখেছি। এখানে রবিবার সানই বেশী হয়—গানে আমার খুব নাম হয়েছে—সকলে ভালবাসে। আর একটি পাতায়-সেকেণ্ড ক্লাসে উঠেছি-মেয়েরা দেখি আমায় দেখে হাসে, ফিস ফিস করে কথা কয়—আমি গেলেই চুপ করে বুঝতাম না। ইচ্ছে বিএ টা পাশ দেব—সেই ভাবেই ত যাচ্ছি। আর একটি পাতায়—মীরকে জিজ্ঞাসা করলাম—কেন আজকাল এরা আমায় দেখলে ওরকম করে? মীরাকে সত্যি ভালবাসি—সেও আমাকে বাসে। স্কুলে এত মেয়ে, তারই সঙ্গে আমার বেশ ভাব- শুধু তাদেরই বাড়ীতে যেতাম—তার মাও আমাকে ঠিক মেয়ের মত দেখেন, ভালবাসেন। জানি মীরা আমার কাছে কিছু লুকাবেন—তাই জিজ্ঞাসা করলাম। প্রথমে সে বল্পে, ও কিছুনা ; আড়ালে কে কি বলে, সে সবের খোজে আগাগের কি দরকার ভাই। কিন্তু এ উত্তরে আমাফৗভুল উদ্বেগ দূর হ’ল না। কেন এরা আমার গালে পাশার সম্বন্ধে কোন কথা বলে-কি করেছি আমি ওদের -কি জানে ওরা আমার ? মীরাকে খুব বেশী কমে ধরাতে, সে ম্লানমুখে বললে, আমি সে কথা এটুও বিশ্বাস করিনি—বলতেও আমার ইচ্ছে করে না। এরা তােমার মায়ের চরিত্র সম্বন্ধে কুৎসা রটনা করে—এত .

ষের দাবী ૧૬ ওরা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগল আর শুনতে পারুম না—যে ভয় ছিল এতদিন তাই প্রকাশ হ’ল। ম-ে ফ্রাই গিয়ে নিকটা আফিম এনে খেয়ে মরি। এই পড়িয়াই অসীমের মনে একটা সংশয় জাগিল—ঐ মীরা কে? মীরাও তাে স্কুলে পড়িত-তবে কি মীরাই ইহার সখী? না, সে সম্ভব না তাহলে এতদিন এ কথা নিশ্চয় শুনতে পাইতাম। মীরা একটা সাধারণ নাম মাত্র। এ নাম কত মেয়েরই ত থাকিতে পারে। তারপর তিনখানা পাতায় কিছু লেখা নাই । পরের পাতায় লেখা- সকালে উঠে বই নিয়ে পড়ছি এমন সময় হােষ্টেল সুপারিন্টেডেন্ট এসে আমার ঘরে ঢুকলেন ও আমাকে আফিস ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি বললেন- সবিতা, আমি অতীব দুঃখের সহিত তােমাকে এ কথাটা বলতে বাধ্য হচ্ছি—তুমি তােমার জন্মের জন্য দায়ী নও, আমরা জানি কিন্তু এখানকার আইন ও শৃঙ্খলার দিক দিয়ে আমরা, তােমাকে আর এ হােষ্টেলে রাখতে পারি না, অবশ্য তােমাকে আমরা তিন দিন সময় দিচ্ছি—তার মধ্যে তুমি অন্যত্র যাবার ব্যবস্থা করতে পারবে নিশ্চয় মাথাটা ঘুরে গেল তার পায় কেঁদে সব(বলরাম। আমার জন্ম কোন দূষণীয় নয় যখন আমার এক বছর ইন আমার বাবা মারা যান, তারপর মা হাজারীবাগে যান। তাদের সকল গৰকা ত্যাগ করে দিয়েছি—জীবনে অন্য আকাক্ষা নিয়ে। আমার জীবনটাকে নষ্ট করে দেবেন না । তিনি বললেন—সবিতা কেন তুমি লুকোচ্ছ? আমরা বিশ্বস্তসূত্রে খবর ৭৫ শেষের পেয়ে সেটা চাই করে নিয়েছি, এরপরে কি করে তােমায় আর রাখি। কপায় নেই, বললাম-বেশ আমি যাব, কিন্তু দয়া করে কিনবেন ক খপর পেলেন—শুধু এই শেষ ভিক্ষা? তিনি বলেন বেশ তাে এর আর কি, তােমায় দেখাচ্ছি বলে ড্রয়ারের ভেতর থেকে দুখানা চিঠি বের করে আমার হাতে দিলেন—দিয়ে বল্লেন, তুমি এখানে। ব, আমি ওপরটা একবার রাউণ্ড দিয়ে আসি। • চিঠির এক পানিতে নাম সই দেখলাম “হরেন, লেখা ছিল- প্রিয় মহাশয়া- আপনাদের হোষ্টেলে সবিতা নামে একটি মেয়ে থাকে ও স্কুলে পড়ে। মেয়েটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও মেধাবী সত্য, কিন্তু হইলে কি হয় সবই যে পণ্ড তার জন্মের জন্য। সে বেশ্যার মেয়ে—এখানে থাকিত। বেশ্যার মেয়ের যা যা গুণ হয় তা থেকে সে মোটেই বঞ্চিত হয় নাই। এখানে থাকিতে সে অনেক হতভাগ্য যুবকের সর্বনাশ করিয়াছে ও আরও করিবার চেষ্টায় ছিল। এর মার একে লেখা পড়া শিখাইয়। অন্য পথে দিবার ইচ্ছা, তাই তাড়াতাড়ি এখান হইতে সরাইয়া কলিকাতায় রাখিয়া আসিল, যাহাতে আপনাদের শাসনে থাকিয়া শুধরাইয়া যায়। আপনাকে স্বাক্ষর ব্যাপার লিখিতে যে কিরকম লজ্জা পাচ্ছি , কি করে জানাইয, শুধু আমার দেশের ভদ্রবংশীয়া ভগ্নীদের জন্য লিখলাম। জামীসরল হৃদয়া, এক সঙ্গে থাকে, মেলামেশা করে—কিন্তু দূষণীয় হওয়া খারাপ, তা থেকে যতটা দূরে থাকিতে পারা যায় ততই মণ। শুভাকাকী “হরেন” যার দাবী ৭৬. { আর একখানি চিঠিতে লেখা- আপনার পত্র পেয়ে অনুসন্ধান করে জানলাম। হ্যা, সবিলে একটি মেয়ে এখানে থাকত। তার বাপ মা, স্বামী-স্ত্রী ভাবেই এখানে থাকে ও ঐ বদনাম আছে। যাক, শরীর কেমন ? চাকরী কৈমন চলছে? পূজার ছুটিতে আপনার ওখাযােবার ইচ্ছা রইল। প্রমীলা চিঠি দুখানা তাড়াতাড়ি নকল করে নিলাম—কাহিনী যখন লিখছি এ দুটোই বা বাদ যায় কেন? তারপর আর এক জায়গায়-উঃ! হরেন কি করে প্রতিহিংসা নিল । মানুষের মানুষ এত শক্ত হয় ?-না, না, শত্রু ত সে নয় --শত্রু আমার মা-কেন সে আমায় বঁচিয়েছিল? আজ মীরা আমার হাত ধরে বল্লে- চল আমার বাড়ীতে, মা ডেকেছেন! বাম—না ভাই, এ মুখ আর তাদের দেখাব না—আমায় ক্ষমা কর। মীরা—সত্যই সে ব্যথা পেয়েছে, সত্যই সে ভালবাসে ! বাড়ীর জন্যই কি কম কষ্ট করতে হয়েছে ? কেউ তো ঘরভাড়া দিতে না। মেয়েমানুষ হায় একা -কত সব প্রশ্ন ককে, তারা কুঞ্চিত করে বলে-না, আমি অভিভাবকশূন্য এক। তার উপর বয়স কম- মােটে নাকি ১৫|১৬-এমন অবস্থায় তারা বাড়ী ভাড়া দিতে থাকে না। অনেক খুঁজে ত বাড়ী-পেলাম—একখানা ঘর—কিন্তু এখানে থাকা দয়, বাড়ীর বুড়োকার উৎপাতে। আমার যৌবন নাকি তাকে পাগল করে দিয়েছে। কিন্তু যাই কোথায়? যেখানে যাব সেইখানেই ত এই

११
শেষের দাবী
উপদ্রব। সহার্য সম্বলহীন একা—সকলেই ত এই সুযােগ অন্বেষণ
-হ্মার এক জায়গায় লেখা—দুদিন ত খুব ভাবছি—শেষে অখ্যাত
পল্লীতে
ঘরভাড়া নেবার ঠিক করলাম। ভাবলাম সেখানে এ উপদ্রব
হবে না ত—একলা থাকব।
তাই নিলাম। দিনত বেশ যাচ্ছে—কারুর সঙ্গে মিশতাম। তারপর
দেখি অনেকেই আমার ঘরে ঢোকে—বলাতে বেরিয়ে যায়।
আর একটা পাতায়—বিবাহ যদি করতে হয়, শিক্ষিত যুবককে
বিবাহ করব, তা নইলে করব না। কিন্তু দেখছি তা হয় না। এ ভাবে
এ অবস্থায় থেকে একা জীবন যাপন করা যায় না। প্রাণ হাহাকার
করে ওঠে—একটু, একটুখানি পরশ পেতে। কেন—কেন আমি বিবাহ
করূতে পারিনে—কিসে আমার আটকায়? কিন্তু সে ভুল আমার
ভেঙ্গে গেল।
আর এক জায়গায় লেখা-এখন সকলের সঙ্গে জানাশুনা হয়েছে-
অনেকেরই ত এ বাড়ীতে পদার্পণ হতো—দেখতাম তারা কেমন আসে
যায়।
আর এক জায়গায়—অনেক শিক্ষিত ভদ্রসান, ক্রমে আমার সঁপে
আলাপ করবার চেষ্টা করে। আমার এ যৌবনটা এমন ভাবে ব্যর্থ
করে রাখবার ভাষা কোন হেতু খুজে পায় না, অথচ আমি এদের মধ্যেই
আছি। কি রহস্য আমার জীবনে ?
আর একখানা পাতায়—অনেককেই ত কেঁদে পৰ্যন্ত বললাম—বিবাহ
করে আমার জীবনটাকে ধন্য করুন—আমার জন্ম কলুষিত নয়। আমি সেই

শেষের দাবী ৭৮ সামাজিক ভাবে-আইন কানুন মেনে, সকলের মত বন্ধনৈর মাঝে যেতে চাই-তারই পূজায়, তারই চরণে, এ দেহ বিলিয়ে দিতে পারি—অভাবে এ দেহ বিলিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু ভদ্রবংশীয় শিক্ষিতেরা এতে রাজী হ’ল না—তারা বলে—বিবাহ আবার কি? পাঁচজনের সামনে, কতকগুলাে বাজে আবােল-তাবােল মন্ত্র পড়ে, সেই এক সঙ্গে থাকলাম, ও সব হচ্ছে ভড়ং-আসল পরষ্পরে ভালবেসে মনের মিলে থাকা। আর এক জায়গায় লেখা—কই, কেউ তাে বিবাহের মধ্যে দিয়ে যেতে রাজী হ’ল না ? তাদের বুঝি সমাজ আছে—তাই তারা সেখানে ट्रिक থাকতে চায়। দুদিনের ভােগ—আমার দেহটাকে তাদের লালসা বহ্নিতে ফেলে ছারখার করতে চায়। তাতে আর ওদের ক্ষতি কি, ওদের ত বহি নিভে যাবে। আর আমাদের পুরুষের পিপাসা মেটাতেই ত আমাদের জন্ম। পিপাসা মিটে গেলে, আর আমাদের সঙ্গে সম্বন্ধ কি ? আমাদের ত আর বাজে মন্ত্র পড়ে নিচ্ছে না? আর এক জায়গায় লেখা-মার কত, কত সহ্য করব! আর ত যুদ্ধ করে পারছি না। জীবনের সব দিকেইত ব্যর্থতা—জন্ম থেকে আজ পৰ্যন্ত...না, আর পারি না ! কে এই জীবন ব্যর্থ করে-কারা? 'কি প্রতিহিংসা নিব- আর এক জায়গায় অনেক ভাবছি; জেব ভেবে কি পাগল হয়ে যাব ! কি করি-আত্মহত্যা কব নাকি? না, তা করব কেনা-ব্যর্থ যখন হ’ল, তাল : কবেই বাক-তবে সে ভােগের উপর দিয়েই হােক। তাদের সেই মনের ময়লা-তাদের ইচ্ছা, বহন করেইনি। ওঃ ভগবান, তাই যদি তোমার অভিপ্রায়—তাই, তাই হােক। - ৭১ শেষের দাবী আর এক খানা পাতায় লেখা-জীবনটাকে ফেলে দিয়েছি, পথের ধূলায়-আবর্জনার মধ্যে। এ পথে যাদের যাবার রাস্তা, চোখে পড়লেই তাদের প্রাণ কেঁদে উঠে—তুলে নেয়, তারপর সময় হলেই চলে যায়। ও রকম ত কতশত ক্ষত বিক্ষতা, পথের ধূলায় পড়ে আছে—দরদীরাই ব্যথা বােঝে। অসীম খাতা হাতে করিয়া সবিতার অদৃষ্টের কথা ভাবিতেছিল- এমন সময় সবিতা ফিয়ােজা রঙের একখানি মাদ্রাজী সাজ পরিয়া, একহাতে চা এর কাপ, অপর হাতে লুচি ও মিষ্টান্ন পরিপূর্ণ একখানি থালা লইয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া অসীমের সামনে দাড়াইয়া বলিল—কি ভাবছেন—পড়ে কি ব্যথা পেলেন ? এখন ভেবে কি করবেন বলুন, দয়া করে এখন উপস্থিতটার দিকে একটু মনােযােগ দিন। হাতে করে দাড়িয়ে থাকলে ত আর তৃপ্তি হবে না ! অসীম চাহিয়া বলিল—হ্যা সবিতা, সত্যিই ভাবছি- তা ভাবুন, এখন লক্ষ্মী ছেলের মত, এগুলি খেয়ে নি, তারপর যত পারে ভাববেন, যদি কিছু আর উপায় থাকেত করবার চেষ্টা করবেন—আমি কিছুতেই বাধা দেব না বলি ! সবিতা চা এর কাপ ও থালা টেবিলের উপর রাখিল। তারপর আলমারী হইতে একটি পরিক্ষার কাচের গ্লাস ঝহির করিয়া তাহাতে জল ঢালিয়া সেখানে রাখিল।

শেষের দাবী
৮২
আমি তা ফুলছিনা, তবে আমি যতক্ষণ থাকি, তুমি ত চা খাওনা
তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম।
সবিতা বলিল -বেশ, আমার খাওয়া দেখতে চান বলিয়া সবিতা
অসীমের উচ্ছিষ্ট ডিসে ও পেয়ালায় যে টুকু চা পড়িয়াছিল, তাহাই
খাইয়া ফেলিল।
অসীম বলি-ওকি, তুমি পাগল নাকি ? আমি কি ওই
বললাম—দেখ দিকিন, ও গুলাে চা এর ময়লা, তলায় পড়ে থাকে—
ও গুলােই খেলে ?
সবিতা শুধু একটু হাসিল, তারপর একটু থামিয়া
বলিল—এরকম
ভাবে জোর করে মনের সঙ্গে প্রসাদ খাবার সৌভাগ্য, আমার ও একদিন
হত-হত নাকি ? কিন্তু সে ব্যর্থ হ’ল কাদের জন্য-কাদের দোষে-
আমার জীবন, আমার নারীত্ব, ব্যর্থ হ’ল-ধ্বংস হয়ে গেল?—তার
জন্য এ দেশের ভদ্র, শিক্ষিতেরাই কি দায়ী নয়—বলুন নয় কিনা?
অসীম বলিল—হ্যা সবিতা আমরাই সম্পূর্ণ দায়ী-
সবিতা বলিতে লাগিল-বড় জ্বালা পেয়েছি, অনেক সহ্য করেছি---
আর পারলাম না তাদের উপর অভিমান করে জলন্ত আগুনে ঝাঁপ
দিলাম—যাক, ছারখার হয়ে যাক আমার নারীত্ব—আমার সব কিছু,
আর তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখুক—দগ্ধ দেহটার উপর পিশাচের
নৃত্য করে করুক।
অসীম বলিল—সবিতা, কিন্তু তুমিত ভুল করলে-তাদের উপর
অভিমান করে--প্রতিশােধ নিতে গিয়ে, তুমি নিজেরই ত ক্ষতি করলে
তাদের ত কিছু ক্ষতি হ’ল না-

৮৩ শেষের দাবী হক, হােক অসীমবাবু। কিন্তু প্রাণটা হাহাকার করা ত থামল না? তারপর—তারপর আপনাকে পেলুম, আপনার বাঁশীর স্বর কাণে কাণে ফিরতে লাগল। গেলাম নীচে 'ভিক্ষে দিতে—নিয়ে এলাম লাজ মুখের স্মৃতি। অসীম একদৃষ্টে সবিতার মুখের দিকে তাকাইয়া শুনিতেছিল। সবিতা বলিয়া যাইতে লাগিল—হ্যা, ঠিকই চিনেছিলাম, এই রকম প্রাণ, চাহনি, নম্রতা। কত কি কাণে কাণে কয়ে যেত, কত ভাবে ভাঙ্গতাম, গড়তাম—নিজের মনের সঙ্গে বেঁধে। তারপর সেদিন পেয়েছিলাম- আমার ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে একটু-একটুখানি প্রাণ, কিন্তু সে প্রাণ ত বিজলী চমকের সঙ্গে সঙ্গেই চলে গেল। আবার সেই ভাঙ্গাগড়া নিয়ে মেতে রইলাম—শুধু ভাবি, ভাঙ্গতে গড়তে—একদিন হয়ত বা প্রাণ প্রতিষ্ঠা হতে পারে। অসীম সবিতাকে দুবাহু দিয়া কাছে টানিয়া বলিল—হ্যা সেদিন এখান থেকে সত্যিই পাগলের মত, ঝড়ের বেগ নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে বেগ তত সে রােধ করে দিল-বাধা পেলাম সেখানে। আমার এত উন্মত্ততা, যুদ্ধ করা—সবই তাে সে ঘৃণাভরে ফেলে দিল! সবিতা, আবার আবার ফিরে আসতে হলো, সেখান থেকে বাধা পেয়ে। সবিতা, এবার তােমারই হাতে আমার এ অবসন্ন দেহ তুলে দিচ্ছি, নিতে চেয়েছ তুমিই বহন করে বেড়াও। সবিতা কিছু বলিল না, চোখ দিয়া টস টস করিয়া জল পড়িতে লগল--অসীলৈকোলে মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল।

শেষের দাবী ৮৪ অসীম বলিল-তাকে বড় ভালবাসি, সে বুঝলেনা, মহা ভুল করলে তার প্রায়শ্চিত্ত আমিই করব। সবিতা, সবিতা তুমি আমায় চেয়েছ তাই নাও, তাই নাও বলিয়া তাহার মাথার উপর মুখ নীচু করিল। বিশ্বস্রষ্টার কি বিচিত্র লীলা! মানুষ পরকে শিক্ষা দেয়, তার দোষ, তার ভুল দেখাইয়া দেয়, কিন্তু নিজেরটা একবার ভাবিয়াও দেখেন—য়ে ভুলের জন্য অপরকে শিক্ষা দিতেছে ; সেই ভুল যে সে নিজেই করিতে যাইতেছে। গভীর রাত্রে অসীম বাড়ী ফিরিল। আর ফিরবেই বা না কেন- আর তাে মীরার ভয় নাই—মীরা যে তাহারই জন্য দু’টি তৃষিত আঁখি উদগ্রীব করিয়া রাখিয়াছে সে ভাবনা নাই—তাই অসীম অনেক রাত্রিতে বাড়ী ফিরিল। মীরা দরজা খুলিয়া দিল—কেহ কোন কথা বলিল না। খানিক পরে মীরা বলিল-খাবার দিয়েছি। অসীম বিছানায় শুইয়া পড়িয়া বলিল--শরীরটা খারাপ, খাবনা। মীরাও কোন কিছু বলিল না, খাবার ঢাকিয়া রাখিয়া শুইয়া পড়িল।

৮৫ শেষের দাবী মীরা দেওয়ালে টাঙান ঘড়িটার দিকে চাহিয়া দেখিল-রাত্রি একটা বাজিয়াছে। রাত্রি একটাই হােক, আর প্রভাতই হােক যখন তাহার খুশী হবে তখন তিনি আসিবেন, মীরার আর রবিবার কি আছে— নেদিন ত চলিয়া গিয়াছে। একদিন ছিল, কোন কারণে ন’টার বেশী হইয়া যাইলে, তিনি বাড়ীতে ঢুকিয়া আপনা হতেই প্রথমে দেরীর কারণ বলিতেন। আমিই ত বাধা দিতাম, আচ্ছা-তাতে আর কি হয়েছে! আর আজ! মীরার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িয়া মাথার বালিস ভিজিয়া যাইতে লাগিল। উঃ এত পরিবর্তন। মীর শুইয়া পড়িয়া কাদিতে লাগিল। অসীম ও তখন অন্যদিকে ফিরিয়া ভাবিতেছিল—সবিতর জীবন, আহা বড় দুঃখী সে। ব্যথাহত হৃদয়ে কত দ্বারে দ্বারে ফিরেছে- সব দ্বারই ত বন্ধ, সকলেই ত তাকে পথে বসিতে বলিয়াছে—কেউ ত এতটুকু আশ্রয় দেয় নাই। সবিতার কথা, সবিতার আলিঙ্গন—না, সবিতা প্রকৃত ভালবাসে, প্রাণের সঙ্গে আমায়। তার সে ব্যথা ভরা কথা, ব্যগ্র আলিঙ্গন-এ যে বুভুক্ষু আৰ্ত্তের মতএতে তো মৌখিকতা থাকতে পারে না। আসবার সময় কি করুণ ছল ছল চাহনি- পিপাসিত অধর—এখনও চোখের সামনে ভাসছে। না—পবিতা প্রকৃত ব্যথা পেয়েছে--আর, আর আমি তার উপর ব্যথা বােঝা চাপাতে পারব না। না, সবিতা ভালবাসে-আমিও, আমিও বাসব—বাসি । স্বামী স্ত্রী পরস্পর যে যার বিভিন্ন চিন্তার মধ্যে ডুবিয়া গেল- তাহার পরনিদ্রাদেবী তাহার এই দুটি সন্তানকে বক্ষ মধ্যে টানিয়া লইলেন।

শেষের দাবী কোথায় সকালে উঠিয়া হাতমুখ ধুইয়া অসীম বাহিরের ঘরে গিয়া বসিল, তাহার পর কি মনে করিয়া উপরে উঠিতেছিল—সিড়ির কাছে ঝির কোলে মীলাকে দেখিয়া কোলে লইল ও পুনরায় বাহিরের ঘরে গিয়া বসিল। ঝি চা দিয়া গেল—অসীম চা খাইতে খাইতে মীলাকে আদর করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে ঝি আসিয়া মীলাকে লইয়া গেল। অসীম কি করিবে কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছিল না। বা যায়, আর বাড়ীতেই বা কি করি এমনি চুপচাপ বসিয়া থাকা যায়। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অসীম, বাড়ী হইতে বাহির হইল এবং সােজ। সবিতার বাড়ী আসিল। ঘরে ঢুকিতেই সবিতা বলিল—আসুন সুপ্রভাত ! অমীম বলিল—সত্যি সুপ্রভাত সবিতা, বলিয়া আরাম কেদারাটার উপর নিজের দেহ এলাইয়া দিল। সবিতা তখন সদ্য ফোটা গোলাপ কয়টি ফুলদানিতে রাখিতেছিল, পুনরায় তাহা হইতে লইয়। অসীমের হাতে দিয়া বলিল—এই নিন, প্রভাতের বাতাসের সঙ্গে গােলাপের গন্ধ লাগবে ভাল। দেখবেন, ডালে বড় বেশী কাটা হাতে যেন না ফোটে। অসীম ফুলগুলি লইয়া বলিল—ভোর ত অনেকক্ষণ হয়েছে সনি আর ভাল জিনিষের গন্ধ কি সময় অসময় লাগে-শেষ গো

৮৭
শেষের দাবী
গন্ধ—সে তাে সব সময়ই ভাল লাগে। তার চেহারাতে প্রথম আকৃষ্ট
হয়--তারপর তার গন্ধ ত আছেই! আর কাঁটা বলছ—ভাল জিনিষটা
একটু দুষ্প্রাপ্য—একটু কষ্ট করে নিতে হয়, নইলে ত সকলেই
নিত-তার ত আর কদর থাকত না। সাবধানে নিতে ত চেষ্টা করবই,
তাতেও যদি কাটা লাগে—বুঝব তার গন্ধ নিচ্ছি, তখন তার কাটাও
সহ্য করতে হবে !
সবিতা বলিল—হ্যা বুঝলুম, কিন্তু অসীমবাবু সব জায়গায় কি এই
নিয়ম খাটে ?
অসীম বলিল—বলতে পারি না, তবে আমার ত এই মত! যাক,
ও কথা ছেড়ে দাও। এখন শােন, আজ চল বায়স্কোপে যাই—পূর্ণয় খুব
ভাল বই আছে।
সবিতা তখন কি ভাবিতেছিল, বলিল—বায়স্কোপে—কি আমায়
সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন ?
অসীম বলিল—হঁা, সঙ্গে করে নিয়ে যাব না কি তােমায় একা যেতে
বধ্ব-আর আমি গিয়ে আগে বসে থাকব ?
, তা বলছিনা—তবে আমাকে পাশে নিয়ে বসে দেখতে অসুবিধা
হবে না ত? হয়ত আপনার জানাশুনো কেউ দেখতে পাবে-তাতে,
তাতে ত আপনার মানসমেতাই বলছিলাম ?
অসীম বলিল-না, না সবিতা সে সবের আমি আর ভয় করি না।
ভয় ছিল, প্রাণে বাজত যার জন্য—সেই যখন জেনেছে—তখন লজ্জা
আর আমার কারুর জন্য নেই ! প্রাণ যেখানে পিপাসিত--সেখানে
লজ্জা ভয় কছু নেই—আছে অন্তর ভরে পান। সবিতা, সবিতা-

শেষের দাবী
আমি তােমায় ভালবাসি—বুঝলুম কিসে জান ? প্রাণ তােমাকে চায়
তােমার সঙ্গে মিশে থাকতে।
সবিতা কিছু লিল না—এক দৃষ্টে অসীমের মুখের দিকে চাহিয়া
রহিল ।
সমস্ত দিন বাড়ীতে এটা ওটা করিয়া কাটাইয়া, আসিবার সময়
অসীম ঝিকে চীৎকার করিয়া বলিল—আজ তাহার দরকার আছে,
রাত্রিতে সে আসিবে না—তাহারা যেন না ভাবে। রাত্রি সাড়ে সাতটার
সময় অসীম সবিতার বাড়ী আসিল।
সবিতা একখানি খদ্দরের সাড়ী পরিয়া হারমােনিয়মের পর্দাগুলি
আপন মনে টিপিয়া যাইতেছিল। অসীম ঘরে ঢুকিয়া বলিল—
বেশ তাে, আপন মনে গেয়ে—নিজেকেই শােনাচ্ছ। কেন, একটু
গলা ছেড়ে গাইলে কি শুনতে পাইনে।
সবিতা হারমােনিয়মের সামনে হইতে উঠিয়া আসিয়া বলিল—
কি করে জানব বলুন যে গলা ছেড়ে গাইলে আপনি আপনার বাড়ী
থেকে শুনতে পাবেন। এবার জানলাম, যখন ওটার কাছে বসব, তখন
হয় চেঁচিয়ে গাইব।
বেশ ভাে-থামলে কেন সবিতা, গাওনা যেটা গাইছিলে-
০

৮৯ শেষের দাবী কিছু গাইনি, এমনি বসে একটা সুর তােলবার চেষ্টা করছিলাম। সবিতা হারমােনিয়মের কাছে বসিয়া সুর ধরিল-অসীম তাহার চেয়ারের একটা হাতলের উপর বসিয়া সবিতার দিকে ঝুকিয়া পড়িল। সবিতা গাহিয়া চলিয়াছে—“কেন মাের গানের ভেলায়, এলেন। প্রভাত বেলায়—হলেনা সুখের সাথী, জীবনের প্রথম দোলায়- রাত্রি সাড়ে আটটা বাজিতেই অসীম বলিল—সবিতা চল, এইবার যাওয়া যাক। সবিতা বলিল—এখনি ? তারপর অসীমের সহিত বাহিরে ট্যাক্সিতে উঠিল। পূর্ণ থিয়েটারে তাহারা প্রথম শ্রেণীর দুখানি আসন দখল করিল বায়স্কোপ তখন হইতেছে—কিন্তু অসীমের মনের ভিতর মাঝে মাঝে কি যেন খচ, খচ, করিয়া বিধিতেছিল। তাহার মনের ভিতর বিদ্যুতের মত মীরার মুখখানি উকি দিতেছিল। এই ত সেদিন সে মীয়াকে এমনি ভাবে পাশে লইয়া বসিয়াছে—সে বসায় কি এক অবর্ণনীয় প্রতি, আর আজও ত সবিতা বসিয়াছে তাহার পাশে-সেই ভাবে —ঠিক সে জিনিষ কই? মুখে যতই সে বলুক লজ্জা ভয় আর কাকুর জন্য নাই, তবু প্রাণের মধ্যে যে জন্মগত বাধা, লজ্জা, অলক্ষ্যে উকি দেয়। ইন্টারভলের সময় তাহারা রেষ্টুরেন্টে ঢুকিল ও সেখান হইতে বাহির হইতেই অসীমের এক বন্ধুর সহিত দেথা হইল। অসীমকে দেখিয়া বলিল-“হ্যালাে অসীম—See you long after—তারপর কি মনে করে আজ এখানে—একেবারে সস্ত্রীক। তারপর সবিতার দিকে তাকাইয়া—ক্ষমা করবেন মিসেস দত- শেষের দাবী আপনার সঙ্গে পরিচয় হবার সৌভাগ্য হয়নি—তাই নিজেই আলাপ করছি—অসীম আমার Class mate ছিল। অসীমের মুখ লজ্জায় রাঙ্গা হইয়া গেল—সে এমন কি প্রতিবাদও করিতে পারিল না যে, না—সে তার স্ত্রী নয়। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধু মহাশয় সবিতার সহিত হাসিয়া হাসিয়া কথা কহিতে আরম্ভ করিয়াছে— যেন সবিতারই সহিত তাহার অনেক দিনের আলাপ-অসীম আর কেহ নয় বা তাহাকে জানেও না অসীমের অস্বস্তি হইতে লাগিল। তারপর বন্ধুটি বলিল—You অসীম, আশা করি একদিন মিসেস দত্তকে নিয়ে আমার বাড়ীতে যাবে বলিয়া একখানি কার্ড সবিতার হাতে দিয়া, প্রথমে তাহার ও শেষে অসীমের সহিত করমর্দন করিয়া মােটরে উঠিল সে চলিয়া গেল কিন্তু তখনও অসীম সেইদিকে চাহিয়া রহিল—কি যে দেখিতেছে—সেই জানেনা ? সবিতা বলিল-বন্ধুর গাড়ীত অনেকক্ষণ অদৃশ্য হয়ে গেছে, কি দেখছেন? অসীম বলিল -না, গাড়ী ত দেখছিনা বলিয়া একবার সবিতার মুখের দিকে তাকাইল, তারপর বলিল--চ আরম্ভ হয়ে গেছে বোধ হয় এতক্ষণ, মিছে আর সবিতা বলিল-হ্যা, বাহিরে আর দাড়িয়ে থেকে কি হবে বরং ভেতরে গিয়ে বসলে, মনটা ওতে ডুবলেও ডুবতে পারে। তারপর পুনরায় তাহারা তাহাদের নির্দিষ্ট জায়গায় আসিয়া বসিল।

শেষের দাবী
বায়স্কোপ ভাঙ্গিয়া যাইতে অসীম সবিতাকে লইয়া তাহার বাড়ী
আসিল। অসীমের মনের মাঝে মেঘের টুকরা ভাসিয়া আসার মত
মাঝে মাঝে বিষাদের তীর বিধিতেছিল-সােজ। সবিতার ঘরে ঢুকিয়া
তাহার বিছানায় গা এলাইয়া দিল।
বাড়ী যাবেন না, বলিয়া সবিতা হাসিয়া অসীমের মুখের দিকে
চাহিল।
অসীম বলিল—না, আজ যে তোমার অতিথি ! কেন—তুমি বাড়ী
যেতে বদ্ধ ?
ন', না তা বল্ কেন ? তবে কিনা, এ যে আমার আশার অতীত
এ যে আমি আমার কল্পনাতে ও আনতে সাহস করিনে-তাই বলছিলাম !
কথার মাঝে হঠাৎ অসীম বলিগ-আচ্ছা সবিতা, লােকে বলে মদ
খেলে প্রফুল্লতা আসে, বিষাদের মেঘ চলে যায়—সে কি সত্যি?
কি করে জানব বলুন, কখন ত খাইনি! কেন খাবেন নাকি?
না, তা বলছিনা,-এমনি জিজ্ঞাসা করছি ।
হঠাৎ আজ মদের কথা মনে উঠল অসীম বাৰু ?
অসীম বলিল—লেখ সবিতা; সত্যি কথা বলতে কি, প্রাণে আজ
আমার তেমন স্ফুৰ্ত্তি নেই—কেন জানি না! তাই মনে পড়ল লােকে
বলে মদে আনন্দ এনে দেয়, সব কিছু জ্বাল! অশান্তি ভুলিয়ে দেয়—তাই
দেখতে ইচ্ছে করে-সেটা সত্যি কি মিথ্যা !
তারপর একটু থামিয়া বলিল—শুনেছি তোমাদের এখানে পাওয়া
- “কটু আনিয়ে দিতে পার দেখব?
অসীমবাবু।

শেষের দাবী
কেন সবিতা?
সত্যি, আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আপনার মনের এত শীঘ্র পরিবর্তন
দেখেE
আশ্চর্য হবার ত কিছু নেই সবিতা-এর চেয়ে বেশী ত আশ্চর্য
হয়ে যেতে হয়—যখন আমার প্রাণ পিপাসিত তােমার বুকের মধু পানের
জন্য, তােমার আলিঙ্গনের জন্য—বল? তাই সবিতা বলছি-জগতে
আশ্চর্য হবার কিছু নেই-সবই সম্ভব।
সবিতা কিছুই বলিল না, শুধু মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল—তাহার
পর বলিল-জানি, জানি, খুব জানি
যাক ও সব কথা ছেড়ে দাও এখন—একখানা গান গাও?
সবিতা কি ভাবিতে ভাবিতে বলিল—আমার গান আপনার ভাল
লাগে ?
বলেছিত তােমার গানে প্রাণ আছে-খুব ভাল লাগে।
তারপর একটু পরে চীৎকার করিয়া বলিল-“সবিতা গান, গাও—আজ
আমার প্রাণে খুব আনন্দ, ঘূর্তি—মনে হচ্ছে কি জান—আমার নূতন
জীবন, চোখে প্রথম আলােক রশ্মি
সবিতা বলিল—দেখবেন, প্রথম আলাে চোখে পড়লে, সে অন্ধ হয়ে
যায় কিছুই দেখতে পায়না অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য বলিয়া হারমােনিয়মের
ডালাটি খুলিল।
অসীম বলিল—সেই বীটা কোথায় সবিতা—দা ওতাে আমিও
বাজাই।
সবিতা গান ধরিল--অসীমও তাহার সহিত বাণীতে সুর দিল। সবিতা

শেষের দাবী
গাহিয়া চলিয়াছে-“আমি জগতের কাছে ঘৃণ্য হয়েছি—তুমি যেন ঘৃণা
করােনা” গান থামিয়া গেলে অসীম বলিল-সবিতা থামলে কেন,
আবার একখানা গাও !
সবিতা আবার গান ধরিল। রাত্রি আড়াইটা বাজিতেই সবিতা
বলিল -আর পারিনে, সারারাত জাগলে আপনার অসুখ করবে—
অভ্যাস ত নেই–
নানা সবিতা, অভ্যাস আমার কোন কিছুরই নেই, ছিলনা—আবার
সবই সহ হবে।
ভােরে ঘুম ভাঙ্গিতেই অসীম দেখিল—সবিতা পায়ের তলাটিতে
শুইয়া আছে, আর একখানি হাত তাহার পায়ের উপর।
ঘর হইতে মীরা স্বামীর কথা কয়টি শুনিয়াছিল—আজ রাত্রে বাড়ী,
আসিবে না, তাহারা যেন না ভাবে। মীরা মন্ত্রবতের মত খানিকক্ষণ
সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া একটি দীর্ঘ
নিঃশ্বাস ফেলিয়া গৃহকাৰ্য্যে মনােনিবেশ করিল। রাত্রি বেলায় ঝি
বলিল—মা, আমি কি শোব তােমার ঘরে, একা ভয় করবে না ত?
মীরা বলিল—না, তুমি তােমার ঘরে শশাও। বিছানায় মীলাকে
বুকের ভিতর টানিয়া লইয়া মীরা কাদিতে লাগিল। মনের রুট

শেষের দাবী ১৪ = আবেগে জলপ্রপাতের মত চোখের জল ঝরিতে লাগিল। চোখের জলে মনটা একটু হাল্কা হইয়া গেলে, মীরা ভাবিতে লাগিল-কেন এমন হলো আমারই কি কোন পাপে? কই, এমন কোন পাপ কিছু ত করিনি মনে পড়ে না? তবে কি অজ্ঞাতে কিছু করেছি—বার জ্বালা এখন দংশাচ্ছে ? এ যে স্বপ্নের অতীত। বিবাহের পর বাবার কাছে যে থাকতাম , উনি ছেড়ে থাকতে পারেন না বলে—আর আজ ? কেন, কিসের আশায় সেখানে ছােটেন-কি অভাব তার। ভালত প্রকৃত বাসতেন—তবে ? চেহারা সত্যিই কি আমি এত কুৎসিত? বেশতো যদি কুৎসিতই হই—কৈ, আজ ত ছ’বছর বিবাহ হইয়াছে এতদিন কি আমার রূপ তার চোখে ধরা পড়েনি? না, না তাত নয়-- তবে কিসের আশায় যান ? বাঁশ-বাশীই ত হ’ল কাল! এই বাঁশীতেই ত আমার সর্বনাশ হয়েছে। অবিনাশবাবু-উঃ! তুমি আমার এত শত্রু !-আমি ত তােমাদের কিছু ক্ষতি করিনি--তবে কেন আমার এ সর্বনাশ করলে ?- , অবিনাশ বাবুরা ত আমার কিছু করেনি—তারা ত গিয়েছিলেন ভিক্ষে করতে--ভিক্ষে করে চলে এলেন—আর তার সঙ্গে সংশ্রব নেই । ওঁদের দোষ কিছু নেই—দোষ সবই আমার অদৃষ্টের ! হ্যা, যৌবন ? কেন যৌবন কি আমার গিয়াছে ?-কই না, সে দিনও ত বলেছিলেন—“মীরা সত্যিই তুমি চির-যৌবনা—তোমার মধ্য চিরবসন্ত-তবে? না, যৌবন আবার কি?-স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসায় যৌবন আবার কি?-হােক সে বিগত যৌবনা, কুৎসিত-তাতে কি আসে যায় ?-প্রাণের টান-প্রকৃত ভালবাসায় সেখানে কিছুর বিচার

শেষের দাবী
করে না—পরস্পরের কাছে সবই যে সুন্দর—তাতেই যে দিশেহারা
থাকে—প্রকৃত ভালবাসায় ত এ বিচ্ছেদ আসে না?—তবে, তবে কি
এতদিন সবই মৌখিক ছিল—ছাই চাপা আগুনের মত—আজ তার নগ্নমূর্তি
প্রকাশ হয়ে পড়ল? মীরার চোখ দিয়া ঝ ঝর্ করিয়া জল পড়িয়া বালিশ
ভিজিয়া যাইতে লাগিল। মীলাকে বুকের উপর চাপিয়া ধরিয়া বলিতে
লাগিল-ওরে সর্বনাশী, কেন তুষ্ট হয়েছিলি—তাের মত অভাগী কেউ
নেই! আগে যে তােকে চোখের আড়াল করতেন না, একমিনিটও
ছেড়ে থাকতে পারতেন না—আর আমাের কথা একবার মনেও
পড়ে না-হয়ত, তাের অস্তিত্বও মনে আসে না ।
সারারাত বিনিদ্র কাটাইয়া-ভােরের বেলায় মীরা ঘুমাইয়া
পড়িল।
সকাল সাতটা বাজিয়া গিয়াছে—ঝি আসিয়া ডাকিল--মা ওঠ,
বাবু এসেছেন।
মীরা ধড়মড়, করিয়া উঠিয়া পড়িল ও দরজা খুলিয়া বাহিরে
আসিল।

শেষের দাবী
.
কিছুক্ষণ পরে অসীম বাহিরের ঘর হইতে উপরে আসিয়া শয়ন কক্ষে
প্রবেশ করিল। মীলা তখন হাত পা নড়িয়া খেলা করিতেছে--
অসীম তাহাকে কোলে লইল ও চুমু খাইতে লাগিল।
মীরা কি একটা করিতে
ঘরে
আসিয়াছিল—মীলাকে অসীমের কোলে
দেখিয়া মনের সুপ্ত ভাবরাশি বুকের মধ্যে তােলপাড় করিয়া উঠিল।
হাতে করিয়া লইয়া যাওয়া বাটিটি হঠাৎ মীরার হাত হইতে
মেঝেতে পড়িয়া গেল—মীরা অপ্রস্তুতে পড়িল।
অসীম বলিল—সাবধানে কাজ করতে হয়--এখুনি কয়ত;পায় ।
পড়ত!
মীরা কিছু বলিল না—শুধু নীরবে নীচুদিকে মুখ করিয়া ঘর হইতে
বাহির হইয়া গেল।
আরাে কিছুক্ষণ মীলাকে আদর করিবার পর, অসীম তাহাকে
পােয়াইয়া দিয়া পুনরায় বাহিরের ঘরে আসিল।
মীরা ঝিকে দিয়া বাহিরের ঘরে চা পাঠাইয়া দিল—অসীম তাহাকে
বলিল-তাের মাকে একবার ডেকে দেব, বিশেষ কাজ আছে, যেন
এনে যায়-
অসীম চা খাইতে লাগিল—মিনিট দশেক কাটিয়া যাইবার পরও
যখন মীরা আসিল না, তখন সে নিজেই উঠিয়া শয়ন ঘরের দিকে চলি।
মীরা সেখানে নাই—তাহার পর রান্নাঘরে আসিয়া দেখিল মীরা হাতের
উপর গাল রাখিয়া কাঁদিতেছে। মীরা জানিতেও পারিল না অসীম
ঘরের দরজায় আসিয়া দাড়াইয়াছে।

১৭
শেষের দাবী
অসীম ডাকিল -মীরা?
মীরা মুখ তুলিল না—কোন উত্তরও দিল না—তেমনি ভাবেই
বসিয়া রহিল। পুনরায় অসীম ডাকিল-মীরা মুখ তেল, তােমায় একটা
কথা বলব।
মীর মুখটি একটু ঘুরাইয়া তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়া চোখদুটি মুছিয়া
পইল, তারপর আস্তে আস্তে চোখ তুলিয়া চাহিল। চোখে তখনও
অস্পষ্ট জলের দাগ, মাথার চুলগুলি কপালের উপর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত
মুখখানিতে বেদনা ও ব্যথার ছাপ আঁকা।
মুখের দিকে চাহিয়া অসীমের মনের রঙ মুহূর্তের মধ্যে বদলাইয়া
গেল। অতীতের কত সব ছবি একের পর একে মানস পটে ফুটিয়া
উঠিল। তাহার ক্ষুব্ধ প্রাণের রুদ্ধ আবেগ হৃদয় দ্বারে আছড়াইয়া পড়িল।
অসীম আর থাকিতে পারিল না—একেবারে ধপ করিয়া মীরার খুব
নিকটে বসিয়া পড়িয়া বলিল—মীরা, মীরা আর যে পারি না। বড়
জ্বালা নিজেও পাচ্ছি তােমাকেও দিচ্ছি! বল, বল মীরা কিসে এ
সালার শান্তি হয়—
মীরা স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকাইয়া রহিল, কোন উত্তর করিল
।
অসীম বলিল—বলবে না? সত্যিই আমি পাপী মীরা! তােমার
ওই পবিত্র মন্দিরে—আর আমার স্থান হয় না জানি—এখন,
আবর্জনাতেই আমার স্থান—অনেক নীচে। কিন্তু মীরা এরজন্য কি আমি
একাই দায়ী? না, না আমিই দায়ী—আমিই দুর্বলতাই ত আমার
পরাজয়!

শেষের দাবী
১৮
মীরা খুব
ধীর ভাবে বলিল—কি বলবে বলছিলে বল ?
মীরা, বলতে এসেছিলাম একটা কথা, কিন্তু সব ত আমার এলো
মেলো হয়ে গেল—তােমার ওই বিষাদ মাখা মুখ দেখে!
মিনিট কতক অসীম স্থির দৃষ্টিতে দাড়াইয়া কি ভাবিল, তারপর
আবার বলিলএমীরা আবার বলছি, এখনাে কি আমায় তুলে নিতে
পার না? পার ! তাই নাওনা—নাও মীরা।
মীরা আর থাকিতে পারিল না ; বলিল—রোজ রােজ বাজে কথা
বকবার আমার সময় নেই—আমার কাজ আছে ! তারপর একটু
থামিয়া—ওগাে কেন, আমি তোমায় কোন বিষয়ে বাধা দিইনি, কোন
কিছু ক্ষতি করিনি—তবে কেন—কেন আমায় এমনি করে জ্বালাও।
এমন সময় ঝি ডাকিল—ম। খুকী থাকছে না, বড় কাদছে !
মীরা উপরে চলিয়া গেল।
অসীম খানিকক্ষণ তাকাইয়া রহিল, তারপর ধীরে ধীরে বাহিরের
ঘরে গিয়া বিছানার উপর নিজ দেহ ভাঙ্গিয়া দিল।
সন্ধ্যা হইতেই অসীম বাড়ী হইতে বাহির হইয়া হাঁটিতে হাঁটিতে
বহুবাজার স্ট্রীটে একটি মদের দোকানের সামনে আসিয়া থমকিয়া
দাঁড়াইল। মিনিটখানিক কি ভাবিল, তাহারপর চারিদিকে একবার

শেষের দাবী চাহিয়া তাড়াতাড়ি ভিতরে প্রবেশ করিল ও পকেট হইতে নােট বাহির করিয়া মদ চাহিল। দোকানদার পাকা ব্যবসায়ী—লােক সে ভালরূপই চিনে—জহুরী জহরৎ চিনে। বুঝিল—পিতৃদায় হইতে উদ্ধার হইয়া, পৈতৃক সম্পত্তি পাইয়া—অথবা হতাশ প্রেমিক, প্রেমবেদনায় কাতর—শােকাতুর চিত্তে সান্ত্বনা পাইতে—অথবা পৃথিবীর এ হেন আশ্চৰ্য্য জিনিষের স্পর্শ হইতে নিজেকে বঞ্চিত না রাখিয়া, রসায়ণ শাস্ত্রের এতবড় বিশেষ দানের মৰ্য্যাদা রাখিতে...তাই জিজ্ঞাসা করিল—বােতল না পাট না গ্লাস ! তবে বােতল নিলে দরে অনেক সুবিধে হবে । অসীমের মাথার মধ্যে তখন ঝিম ঝিম করিতেছিল—মদ না খাইবার পূর্বেই তাহার যেন নেশা ধরিয়াছিল—তাই কোন রকমে বলিল—যা হয় দিন ? বােধ হয় দোকানদারের প্রাণের কোণে দয়া বলিয়া একটুখানি পদার্থ ছিল—তাই বােতল না দিয়া পাটই দিল, কারণ নূতন অভিজ্ঞতায় বেশী দরকার হইবে না—পাট দিলেই যথেষ্ট হইবে। সমস্তটা ত লাগিবেই বাকীটা ঘরে আসিবে, আর তার সঙ্গে পুরা পাটের দাম। আর যখন সে নিজেই তাহার উপর ভর দিয়াছে, তখনত একটু ধর্মের দিক চাহিয়া কাজ করিতে হইবে। জানিয়া শুনিয়া বেশী খরচ করাইয়া আর লাভ কি! তাই পাটের মুখটি খুলিয়া—গেলাসেনিকটা এলিয়া, আগাইয়া দিল— অসীম গেলাসটি হাতে করিয়া কি একটু ভাবিয়া, কোনরকমে খানিকটা গিলিয়া ফেলিল—সর্বশরীর আলা করিতে লাগিল-বাকী ।

শেষের দাবী ১০ ০ ফেলিয়া দিয়া দোকান হইতে বাহির হইয়া পড়িল। দোকানদার মােলায়েম সুরে বলিল—পাটে যে এখনও অনেকটা রয়েছে, নিয়ে যান- অসীম সে কথার কোন উত্তর দিল না, সটান হাঁটিতে হাঁটিতে কার্জন পার্কে আসিয়া একটি গাছের তলায় ঘাসের উপর শুইয়া পড়িল। অসীমের বিবাহিত জীবনের প্রথম হইতে আজ পর্যন্ত, একটির পর একটি করিয়া মনের পাতা চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল—তাহার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। রাত্রি দশটার পর অসীম উঠিতে গিয়া দেখিল-তাহার মাথা ঘুরিতেছে, তাহার সহিত পৃথিবীটাও যেন একটু একটু নড়িতেছে। কোন রকমে পার্কের বাহিরে আসিয়া একখানি ট্যাক্সি করিয়া একেবারে সবিতার বাড়ী আসিল। সবিতা ঘরের দুয়ারের কাছে দাঁড়াইয়া অসীমকে দেখিয়া বলিল- এত রাত্রি, ওকি চোখ লাল কেন? টলছেন যে অসীম জড়িত স্বরে বলিল—না না উলৰ কেন—এইত বেশ সােজ হয়ে দাড়িয়ে আছি ! সবিতা খুব কাছে আসিয়া সামনা সামনি দাড়াইয়া বলিল—কই, আমার দিকে তাকান’ত? অসীম তাহার ঢুলুঢুলু আঁখি সবিতার মুখের উপর নিক্ষেপ করিয়া বলিল-কি, তুমি আমায় পরীক্ষা করছ মদ খেয়েছি কিনা। “হ্যা সবিতা—আজ একটু খেয়েছি, শুধু পরীক্ষা করবার জন্য সত্যি মিথ্যে। সবিতা গম্ভীর ভাবে ডাকিল—অসীম বাবু।

১০১ শেষের দাবী অসীম উত্তর দিল—কি বলছ, এইত কাণ খাড়া করে রইছি ! কিছু বলবার থাকে নিঃসঙ্কোচে বলে ফেল? মীরাও এক মিনিটে, কিছু না ভেবে তার কথা বলে দিয়েছে। আমিও এই চাই—মন হওয়া চাই এই কম সাদা—বুঝলে কিনা? তারপর একটু থামিয়া—সবিতা তােমার ঘরে জল আছে—এক গ্লাস জল দিতে পার ? হাঃ হাঃ, দেখছ আমার কি বুদ্ধি! তােমার ঘরে জল কতদিন খেয়েছি আজ আবার জিজ্ঞাসা করছি জল আছে ? যে তােমার ঘরে জল বড় একট' থাকে না কিংবা তামরা খাওনা-বলিয়া একেবারে সবিতার বিছানার উপর আসিয়া ঢলিয়া পড়িল। সবিতা কোন উত্তর দিল না—শুধু কাচের গ্লাসে এক গ্লাস জল আনিয়া অসীমের মুখের নিকট ধরিল। অসীম এক নিঃশ্বাসে সমস্ত জলটুকু খাইয়া ফেলিয়া বলিল—আঃ বাচালে তুমি --বুক জ্বলে যাচ্ছিল -তেষ্টায় ব্রাহ্মণকে জল দিলে, তােমার যা পুন্যি হবে কি বলব তােমায় । সবিতা ডাকিল—অসীম বাবু! এতদূর নামলেন আপনি? আপনি যে- অসীম হাে হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, তাহারপর বলিল-দেখ সবিতা, চাই দুর্তি, চাই আনন—এ দুটো জিনিষ না থাকলে জগতে মানুষ কি করে যে বাচই, অামি তাই ভাবি- তাহারপর একটু চুপ ক থাকিয়া লাফাইয়া উঠিয়া বলিলা সবিতা, তুমি নাচতে পার ? চন!—নাচবে না ত!মেয়ে জাতটারই ঐ এক দোষ, কথা শােনে না

শেষের দাবী
নেশার ঘােরে কত সব অসংলগ্ন কথা বলিতে বলিতে অসীম
ঝিমাইতে লাগিল।
সবিতা কোন কথার উত্তর দিল না-একদৃষ্টে অসীমের মুখের দিকে
তাকাইয়া রহিল। বুক হইতে একটি নিঃশ্বাস বাহির হইয়া গেল
—অসীমকে হাত ধরিয়া তুলিয়া বসাইয়া গায়ের জামাটি খুলিয়া দিল।
ঢুলুঢুলু আঁখি সবিতার মুখের উপর ফেলিয়া অসাম বলিল আ:
বাঁচালে—তাই বলি এত গরম হচ্ছে কেন ?
সে কথার কোন উত্তর না দিয়া সবিতা বাহিরে গিয়া একটি মগ
ও এক বালতি জল আনিল—তাহারপর হাতে করিয়া জল লইয়া
অসীমের মুখে দিয়া বলিল—মুখটা কুলকুচো করে ফেলুন!
অসীমের তপন নেশা ভাল করিয়াই জমিয়াছিল—সবিতার কথার
কোন প্রতিবাদ করিল না—তাহার হাত হইতে মুখে জল লইয়া
ঝিমাইতে লাগিল—মুখের দুপাশ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
সবিতা বলিল -জলটা মুখ থেকে দয়া করে ফেলে দিন্~! তাহার
পর বিছানার উপর বসিয়া অসীমের মাথাটি নিজ কোলের উপর টানিয়া,
এক হাত দিয়া একটু কং করিয়া ধরিল ও অপর হাতে মগে করিয়া
জল লইয়া, সমস্ত মাথাটি বােয়াইয়া দিয়া নিজ আঁচল দিয়া মাথাটি
মুছাইয়া দিল।
• ৩জড়ত স্বরে অসীম একবার শুধু বলিল—আ: চমৎকার জল
অার আছে ?
, আর নেই- এইবার ঘুমােন-বলিয়া অসীমের মাথাটি বালিসের
. উপর দিয়া, সবিতা মাথায় বাতাস করিতে লাগিল।

শেষের দাবী ! সবিতার আঁখি অসীমের মুখের উপর নিপতিত’ ছিল—তাহার রুদ্ধ অশ্রু এইবার প্রস্রবণের ন্যায় ঝরিয়া পড়িতে লাগিল...না, তাত হলাে —জন্মথেকে আজ পর্যন্ত সবই নিস্ফল, ব্যর্থ!—ওগাে কেন—আমি তাে তােমাকে ওভাবে চাইনি-আমি চেয়েছিলাম তােমার মূর্তি সামনে রেখে পূজা করতে প্রাণ ভরে দেখতে ! কিন্তু কই? নিমেষের মধ্যে সে রূপ লুকিয়ে পিশাচের, নৃত্যে মাতলে!—স্থান, কাল, পাত্র বিশেষে ব্যবস্থা—ওগাে তাই—তাই কি তোমার স্বরূপ বদলে গেল? সবিতার চোখের জল গাল বহিয়া ঝরিয়া, অসীমের মুখের উপর পড়িতে লাগিল। অসীম তখন নিদ্রা দেবীর কোলে তাহার অবসন্ন দেহ লুটাইয়া দিয়া আশ্রয় লইয়াছে—বাহিরের কিছু সে জানিতেও পারিল না যে তাহারই জন্য—কতদিকে, কত অশ্রুফোটা নীরবে ধরার বুকে ঝরিয়া পড়িতেছে so এক সারারাত বিনিদ্রভাবে কাটাইয়া, ভােরের বেলায় সবিতা বিছানার উেপর দেহ এলাইয়া দিল। বেলা তখন আটটা-নালা দিয়া ঝলক রৌদ্র আসিয়া মুখের উপর পড়িতে, সবিতার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল-- অসীম তখনও নিদ্রিত। সবিতা উঠিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল ও গান প্রভৃতি সারিয়া আসিয়া অসীমকে ডাকিল। অসীমে শেষের দাবী ১•৪ ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল—চারিদিকে একবার চাহিয়া চোখদুটি ভাল করিয়া মুছিয়া বলিল—আমি এখানে, ব্যাপার কি বলত সবিতা? সবিতা বলিল—হ্যা, আপনি এখানে—এখন উঠে মুখ হাত ধুন- বেলা অনেক হয়েছে। অসীমের সবই যেন এলােমেলাে হইয়া যাইতে লাগিল—তাহার পর ক্রমে ক্রমে পূৰ্ব্ব রাত্রির সকল ঘটনাই মনে পড়িতে লাগিল। অসীম বলিল-শরীরটা ভারি বিশ্রী লাগছে, কিছু ভাল লাগছে না—কেন মরতে যে খেতে গেলাম ! তাহারপর সবিতার দিকে চাহিয়া বলিল—তােমার চোখ লাল কেন সবিতা? সবিতা সে কথার কোন উত্তর না দিয়া, মুখ ফিরাইয়া বিছানা ঝাড়িতে ঝাড়িতে বলিল-ঘরের বাধারে কলঘর-তারপরই বলিল— আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি, বলিয়া আগে আগে চলিল—অসীমও তাহার অনুসরণ করিল। অসীম কলঘর হইতে আসিবার পূর্বেই সবিতা চা করিয়া টেবিলের উপর ঢাকা দিয়া রাখিল, তাহারপর জানালার নিকট আসিয়া, বাহিরে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। অসীম ঘরে ঢুকিয়া বলিল-এই যে, তুমি একেবারে চা টা রেডি করে রেখেছ। সবিতা শুধু ফিরিয়া দাড়াইল—কোন উত্তর দিল না। অসীম বলিল—আজ হলাে কি তােমার? কোন কথাবার্তা নেই- অসুখ বিসুখ-ক’রল নাকি?

১০৫
শেষের দাবী
সবিতা বলিল-এখন এইটাই চান নাকি ?
অসীম বলিল—কি বলছ সবিতা—তোমার মাথা খারাপ হলে।
নাকি ?
.
চাপা দেওয়া ডিসখানা পেয়ালার উপুর হইতে লইতে লইতে সবিতা
বলিল—এতদিন হয়নি বোধহয় এইবার হবে! যাক্, চা টা জুড়িয়ে
গেল—এইবার খেয়ে নিন্—
তাত নিচ্ছি। কিন্তু সবিতা তুমি যে পাগল হবে -- এই ত আমার
মহা ভাবনা—কি করি বল দিখি?
সবিতা বলিল—আপনার ভাবনা আমার জন্য—আমি আপনার
চা খাইতে খাইতে অসীম বলিল—উপস্থিত তুমি আমার সব
লোকে যাকে ঘৃণা করেছে-তুমি তাকে তােমার বুকে টেনে নিয়েছ
তােমার মধুর ভালবাসা দিয়ে বেঁধে ফেলেছ-- আমিও বন্দী হয়ে
গিয়েছি—তা সত্ত্বেও আবার জিজ্ঞাসা করছ—তুমি আমার কে?
সবিতা একদৃষ্টে তাহার দিকে তাকাইয়া ছিল—তাহার গাল বহিয়া
অশ্রুর ফোটা পড়িতেছিল।
অসীম বলিল-সবিতা কি হলাে তােমার-কাদছ কেন?
সবিতা চোখের জল আঁচল দিয়া মুছিয়া ফেলিয়া বাষ্পরুকণ্ঠে
ডাকিল-অসীমবাবু ! জানি আমি ঠাট্টারই উপযুক্ত—আমাদের
লােকে এর চাইতে আর কিছু আশা করতে পারে না-জানি।
-কিন্তু অসীমবাবু বুভুক্ষু প্রাণ সে তাে মানল না—সে যে আশা করেছিল
অনেক কিছু
-তার সমস্ত সম্ভব অসম্ভব জিনিষকে উপেক্ষা করে

শেষের দাবী শূণ্ঠ আসন সে কতদিন রাখতে পারে ?—তাই সে প্রাণ হাহাকার করে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছিল–মন্দিরের আসনে দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করে—তাকে পূজা করতে—আরাধনা করতে নিজের সব কিছু বিলিয়ে দিতে। কিন্তু কই ? সে যে মহাভুল হলাে—হয় চোখ অন্ধ, হয়েছিল, চিনতে পারিনি—দেবতার আসনে পিশাচ—অথবা মন্দিরের আসনই তৈরী পিশাচের উপাদানে যে যার স্থান চিনে নিয়েছিল যে যার স্থান দখল করল ।তাইতে তার পরাজয়-তাই ক্ষণিকের গােপন হাসি, অশ্রুতে ঝরিয়ে দিল—বুঝিয়ে দিল-ব্যর্থতার অঙ্কুরে সফলতা ফলে না—ফলে ফুলে ব্যর্থতারই রূপ ফোটে। সিগারেটে অগ্নি সংযােগ করিতে করিতে অসীম বলিল—সত্যি সবিতা, তুমি কি পাগল হলে-তুমি যে কি বলছ কিছু বুঝতে পারছ ? মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া সবিতা বলিল—হ্যা খুব পারছি—জন্মাবার পর জ্ঞান হওয়া থেকে বুঝেছি-বুঝছি হাড়ে হাড়ে-কিন্তু বুঝেও অসীমবাবু ঠিক বুঝতে পারিনি। অসীমের এসব হেঁয়ালী আর ভাল লাগিল না। কেবল আজ তার মীরার কথা—মীলার কথা; কত কি সব কাণে কাণে কহিয়া যাইতে লাগিল। তাদের দূরত্ব-অভাব প্রাণের মধ্যে থাকিয়া থাকিয়া ..উমাইয়া দিতেছিল। তাই অসীম এ দিকে আর ততটা মনোেযােগ দিতে পারিল না-শুধু বলিল-ই। কিছুক্ষণ উভয়েই নিস্তব্ধ রহিল, তারপর সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ কল্পি সবিতা বলিল-দাড়িয়ে দাড়িয়ে কি ভাবছেন-

১০৭
শেষের দাবী
১
০
নাভাববার আর কি আছে সবিতা -? সব দিকই যখন রুদ্ধ
তখন আর কি ভাবব? ঘড়িটা কোথায় সবিতা—দাও তাে একটু
বেরােই—
কি করে জানলেন আমি রেখেছি—নাও ত রাখতে পারি?
মাথার উপর চিরুণী টানিতে টানিতে অসীম বলিল-জানি তুমি
ছাড়া আর কেউ তাে আমার কিছুকে টেনে রাখবে না—আর কে
আমার এত হিতাকাক্ষী...বল?
ও! বলিয়া সবিতা ঘড়িটি দেরাজ হইতে বাহির করিয়া আনিয়া
অসীমের হাতে দিল, তাহারপর বলিল--কোথায় যাবেন ?
হাত ঘড়িটি বাঁধিতে বাঁধিতে অসীম বলিল উপস্থিত এখান থেকে
বাড়ী-তারপর সন্ধ্যায় আবার এখানে—বলিয়া অসীম বাড়ী হইতে
বাহির হইয়া পড়িল।
সবিতা আবার আসিয়া সেই মুক্ত গবাক্ষ দিয়া বাহিরের আকাশের
দিকে চাহিয়া রহিল।
দিন যায়। বিচ্ছেদ, তাহার নিজের আসন পূর্ণভাবেই স্বামীস্ত্রীর মাঝে
বিছাইয়াছে। অসীম কোনদিন বা অধিকরাত্রে—কতদিন একেবারেই
বাড়ী আসে না। আজকাল মাঝে মাঝে মদ খাইয়াও বাড়ীতে আসে।

শেষের দাবী
Sot
মীরা নিৰ্বাক-নিস্তব্ধতুষের আগুণের মত অন্তর ছারখার হইয়া
যাইতেছে --অশ্রুকেই সাথী করিয়া চলিয়াছে।
সেদিন শুক্রবার দুপুরে অসীম বৈঠকখানাঘরে শয়ন করিয়া আছে
--এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল--অসীমবাবু আছেন ?
অসীম দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া বলিল—কে ? শরৎবাবু যে
-আসুন—তারপর কি মনে করে ?
শরৎ রুমাল দিয়া মুখ মুছতে মুছতে বলিল—বলেন কেন ?
তারপর সেই যে ডুব মারলেন আর আপনার টিকি পৰ্য্যন্ত দেখা নেই।
এদিকে বাড়ীও চিনিনা—সবিতাকেও জিজ্ঞাসা করি, বলে-জানিনা
বেশী কথাও বলেন, পাগলাটে মেরে গেছে—আর আপনিও যান
, ব্যাপার কি?
, আর যাইনা-বোধহয় আর যাবও না। যাক সেকথা এখন
কি মনে করে বলুন-আর বাড়ী জানলেন কি করে?
শরৎ বলিল—সে যা হােক অনেক কষ্টে জেনেছি—এখন কাল যে
শনিবার টাকাগুলো ত’ তুলতে হবে? আবার যেখানকার টাকা।
সেইখানেই রাখতে হবে-মায় সুদ তস্যসুদ-তার সঙ্গে penalty
(পেনালটি )
অসীম বলিল—না শরৎবাবু-আর রেসেতে যাবনা-যথেষ্ট ক্ষতি
হয়েছে একেবারে পথের ভিখারী হয়েছি।
অসীমের মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া শরৎ বলিল -আপনি শিক্ষিত
লােক আপনাকে বলবার কিছুই নেই, তবু না বলে আর পারলাম না।
কবির সেই ছড়াটা মনে নেই—“যে মাটিতে পড়ে লােক সেই মাটি ধরে,

১৯ শেষের দাবী বারেক নিরাশ হয়ে কে কোথায় ছাড়ে।”--হ্যা বুঝলেন কিনা, খেলতে জানা চাই? খেলে তো সকলেই—কেউ কাঁদে, কেউ হাসে। আনাড়ির মত খেললেইত হলাে না--আগে টিপ, বুঝতে হয়, তাতে প্রথমে কিছু যায় ক্ষতি নেই—শেষে যে বাজী মাৎ। কই, আমার তো loss ( লস) যায়নি—আর ঐ সেদিন যে হারলাম—জানবেন আমার লাভের টাকা। আপনি বলবেন যে আপনার এ কয়দিনে অত টাকা -কিন্তু আমারও ঐ প্রথমে ওর চাইতে ও বেশী গিয়েছিল, কিন্তু আমি আপনার মত নিরাশ হয়নি—কবির ঐ মন্থটি মূল করে রেখেছিলাম। তারপর তিনক্ষেপে loss ( লস) ত’ make up ( মেক আপ ) করে নিলামই with compound interest ( উইথ, কম্পাউণ্ড ইনটারেষ্ট)। শরৎবাবু, আপনার অদৃষ্টে হয়ত বা হয়েছে হোক—আমায় আপনি ক্ষমা করবেন। ব্যাঙ্কের সবই ত’ প্রায় নিঃশেষ—এখন সংসার চলবে কি করে! আমার স্ত্রী তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না —সব রকমেই তার ক্ষতি করলাম—তাকে পথের ভিখারীও করলাম বলিয়া অসীম সােজা হইয়া বসিল। কি যে বলেন অসীমবু কিছুই বুঝতে পারিনে—যাক, এখন উঠুন -একটু ঘুরে আসা যাক-গলাটা শুকিয়ে আসছে বলিয়া অসীমের হাত ধরিয়া তুলিল- রাস্তায় গ্যাস জালিকার সঙ্গে সঙ্গেই দুইবন্ধু বাহির হইয়া, কর্ণওয়ালিস স্ত্রীটের উপর একখানি মদের দোকানের ভিতর প্রবেশ করিল। তাহার পর সেখান হইতে বাহির হইয়া বিডনস্কোয়ারে আসিয়া একটি বেঞ্চের উপর বসিয়া, অনেক পরামর্শের পর স্থির হইল যে-অসীমের হাত খৈয়া শেষের দারী সে জানিয়াছে—তাহার এখন বৃহস্পতির দশা-অৰ্যৰ্থ লাভ আছে— সুতরাং এবারও একটা chance ( চান্স,) নেওয়া দরকার। অসীমের ইচ্ছা না থাকিলেও অন্ততঃ তাহার অনুরোধেও কাল যদি অসীম না যায়, সে নিজে যাইয়া তাহার হইয়া খেলিয়া আসিবে। অসীমের পকেটে চেক বই ছিল—অবশিষ্ট টাকা যাহা ব্যাঙ্কে ছিল তাহাতে সই করিয়া দিয়া, রাত্রি নটায়উভয়েই সবিতার বাড়ী আসিল। শরৎ goodnight ( গুড নাইট ) বলিয়া আর উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল ও অসীম সবিতার ঘরের দিকে মুখ ফিরাইল। সবিতা তখন বিছানার উপর উপুড় হইয়া শুইয়াছিল—পাশে একখানি বাঁধান ফটো রহিয়াছে। আলুলায়িত কুন্তল কেশ, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া মুখের উপর পড়িয়াছে। অসীম দরজা ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতেই, সবিতা পাশ ফিরিয়া দেখিয়া বলিল—আসুন—? তাহার পর খাট হইতে নামিয়া দেহের বসন সংযত করিতে করিতে বলিল- এ কদিন যে একবারাে এলেননা ? ইজি চেয়ারটার উপর নিজ দেহতার এলাইয়া দিয়া অসীম বলিল- মানুষের মনের অবস্থার ওপর তার সব কিছু নির্ভর করে কিনা সবিতা? খােলা চুলগুলি মাথার উপর জড়াইতে জড়াইতে সবিতা একেবারে অসীমের সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—তার মানে? অসীম বলিল—তার মানে অর্থাৎ মনের অবস্থা মােটেই ভাল ছিল না —আর তা ছাড়া তাই! বলিয়া সৰিতা অসীমের মুখের উপর তাহার অাখিটি ১১১ শেষের দাবী -এ বাড়ীতেই ছিলেন। অসীম বলিল—হু, বাড়ীতেই একপাশে ছিলাম। সবিতা বলিল—তাহলে এখন বাড়ীথেকেই আসছেন— না ঠিক বাড়ী থেকে নয়—শরৎবাবু গিয়েছিলেন-বাড়ী থেকে বেরিয়ে, তার সঙ্গে দোকানথেকে একটু ঘুরে। তারপর সবিতা, তােমার কি হলাে -এখনো শুয়ে—রুক্ষুশুক্ষু চুল—এরকম বেশ --? বিছানার উপর হইতে বাধান ফটোখানি হাতে করিয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে সবিতা বলিল—নিজেই বললেন প্রত্যেকের মনের অবস্থার ওপর তার সব কিছু করাটা নির্ভর করে—হ্যা কিনা বলুন- বলিয়া ফটোখানি তুলিয়া রাখিবার জন্য আলমারীর কপাট খুলিল- কিন্তু সবিতা তােমার ত’ একঘেয়ে জীবনের সুত্রপাত অনেকদিন থেকেই চলেছে—আর তার লাভ লােকসানের বিচার অনেক আগেই করে ফেলেছ—এখন নুতনকরে চোখে আর কি ধরা পড়ল ? যাক, কার ফটো ওখান তুলে রাখছ ? ঘাড় ফিরাইয়া সকিতা বলি—আমার স্কুল লাইফের ফটো। কই দেখি—তখন তুমি কি রকম ছিলে বলিয়া অসীম হাত বাড়াইল। ফটোখানি হাতেদিয়া সবিতা বলিল—দেখতে কুৎসিতই—তখন, আর এখন ? •তবে মনের রঙটা এখন একেবারে বদলে গেছে সেটা খুবই সত্যি অসীম ফটোখানি হাতে লইয়া একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিল যেন

শেষের দাবী
১১২
সে ফটো জিনিষটা পূর্বে আর কখন দেখে নাই—তাই সবিতা বলিল
ধ্যান মগ্ন হয়ে গেলেন যে? আচ্ছা বলুন ত, তখনকার চেহারার
সঙ্গে এখন কি অনেক পার্থক্য হয়েছে ?
অসীম বলিল-না-হা হয়েছে -আচ্ছা সবিতা তোমার পাশে,
ওটি কে ?
যে।
কেন, চেনেন না কি ? ওরই নামমীরা।
মীরা? বলিয়া অসীম চমকিয়া উঠিল, তারপর বলিল—তােমার এ
ফটোএ, এখানে কি করে এলো—বল, বল সবিতা।
সবিতা বলিল—অসীম বাবু বলছি, কিন্তু আপনি কি ওকে জানেন ?
হ্যা জানি, খুব জানি—এই মীরাই আমার স্ত্রী !
পথ চলিতে চলিতে সম্মুখে স্বৰ্প দেখিলে পথিকের মুখের
ভাব হয়, সেই ভাবে সবিতা বলিল—আপনার স্ত্রী মীরা— তারপরই
বলিল—অসীম বাবু আমি যখন এখানে স্কুলে পড়তাম-মীরাও পড়ত
আমার সঙ্গে—আর এ ফটো ভােলা হয়েছিল তখন বন্ধুত্বের স্মৃতি
রাখতে।
অসীম বলিল—সবিতা, এই মীরাই আমার স্ত্রী-এই ভুলের জন্য
আজ আমাকে, তোমার হাতে তুলে দিয়েছি --তোমার হাতে দিচ্ছি!
সবিতা নিচুদিকে মুখ করিয়া কি ভাবিতেছিল, উত্তর দিল—কেন,
কি সে তার এমন ভুল হলো—যার জন্য আপনি নিজেকে বিলিয়ে
দিচ্ছেন, নিজের ইচ্ছায় নয়—শুধু অপরের
কি সে ভূল ? সে ভুলে আমার জীবনকে অন্য পথে চালিত
করে আমার জীবনের ধারা বদলে গেল—তােমার মত! তাকে

১১৩
শেষের দাবী
ববিতা বড় ভালবাসিসও বাসে—বাসত, বুঝিবা অত ভালবাসা-বাসি
কেউ কাউকে বাসেনি-বাসবে না...কিন্তু কিন্তু শেষে সে ভূল বুঝলে
স ভাবলে আমি তােমাকে ভালবাসি—বেসেছি। সবিতা তখনও
নচুদিকে মুখ করিয়াছিল। অসীম বলিতেছিল—এখন হয়ত বা কিছু
বলতে পার, কিন্তু আগেত কিছু বলবার ছিল না। তারপর তাকে
বােঝাবার চেষ্টা করলাম অনেক করে, অনেক বললাম—তার সে সন্দেহ
গৈল না--কিছুতেই না—
হঠাৎ সবিতা বলিয়া উঠিল-অসীম বাবু-না-না মীরা, এই মীরাই
আপনার স্ত্রী—ঠিক বলছেন? আচ্ছা মানুষের মতন ত মানুষ হয়! তার
পর একটু থামিয়া আবার বলিল—আচ্ছা অসীম বাবু—মানুষের ভবিষ্যৎ
কি মানুষ নিজ হাতে গড়তে পারে না—যা সত্যি ঘটবে তা কল্পনায় কি
মনের মধ্যে অনেনা?
তারপর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্বরে যেন আপন মনেই বলিল -কই না,
আনেনা ত! আমার নিজেরটায় ত বুঝতে পারছি—আপনারটাও ত
আপনি পারছেন ?
তাহারপর উভয়েই ভিস্তব্ধ—উভয়েই যেন নিজেদের কোন দূর
অতীত কালের পথে ছাড়িয়া দিল।
হঠাৎ সবিতা উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল—বসুন আসছি, বলিয়া উত্তরের
প্রতীক্ষা না করিয়া ঘর ইতে এক রকম ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল।
অসীম আবার ফটোখানির উপর নিজের মনটিকে ফেলিল। যতই
সে মীরার ফটো দেখিতে লাগিল ততই তাহার মন কোথায়, কোন
অতীতে ডুবিয়া যাইতে লাগিল। থাকিয়া থাকিয়া কোথায় যে,
।
৮

শেষের দাবী ১১৪ খচ, করিয়া কি বিধিতেছিল...কি করুণ ভাবে হার দিকে তাকাইয়া আছে। তখনি অসীমের মনে হইল—মীরার ফটো এ বাড়ীতে—না না মীরার স্থান ত এখানে নয় ! যতই সে আমায় ভূল বুঝুক, অবিচার করুক তবু, তবু সে তাে আমার স্ত্রী-সে যে সতী-সে যে সন্তানের মা ! অসীমের মন ততই মীরার দিকে ধাবিত হইতে লাগিল। এই খানিক পূর্বে সে, মীরাকে বাড়ীতে দেখিয়া আসিয়াছে, কিন্তু এখানে তাহার নিশ্চল ছায়া ফটোর ভিতর দেখিয়া তাহার মনের সকল অনুভূতি মীরার সান্নিধ্য পাইবার জন্য হাহাকার করিয়া উঠিল। তাই অসীম মনে মনে বলিল- মীরা, শুধু বলে দাও কি করব কোন পথে যাব, তুমিই শুধু পারবে—বল, বল মীরা! তাহার পরই পাশে সবিতার ফটোর দিকে দৃষ্টি ফেলিল- তারও ত ঐ শান্ত কি করুণ ভাব—কই কোন ত কলুষিত ছাপ নেই- মীরার মুখে, তার মুখে কোথায় প্রভেদ—দুটিইত শুৰ ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে একটি বৃন্তে—একটি তুলিতে গিয়া পাশের পঙ্কে পড়িল—অপরটা হাতে রহিল-মন্দিরের দুয়ারে সাজাইয়া দেওয়া হইল-কেন? সে দোষ কার ? ফুলের-না যে তােলে তার ? যে তােলে তারই ত দোষ ? তারই অসাবধানতার দোষে সে পঙ্কে পড়িল। ফুলের ত কোন দোষ নেই, সেওত তেমনি শুদ্ধ ছিল—আশা ছিল দেবতার চরণ, দেবতার মন্দির, অপর ফুলের মত—কিন্তু সে আশা বিনষ্ট হইল—চয়নিকের নিয়ম হাতে। হঠাৎ ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া অসীম বারান্দার এক কোণে সামনে দাড়াইয়া বলিল-শরৎবা একবার বাহিরে একটি ঘরের

১১৫
শেষের দাবী
অন্ধজড়িত স্বরে শীৎ বলিল—কে, অসীমবাবু? আরে ভেতরে
আসুন না বলিয়া নিজেই বাহিরে আসিয়া অসীমের হাতটি
ধরিল।
p
অসীম বলিল—প্রাণ ওষ্ঠাগতখানিকটা দিন ত—
তা আর হবে না। তখন ত বললাম আরাে খানিকটা নিন্-
ওটুকু আমরা জল খেতে বসে খাই ? আচ্ছা—ও খেদী, বােতলটা একবার
নিয়ে আয় ত—
খেদী নামধারী যে রূপসী বােতল লইয়া আসিল-নাম তাহার খেদী
হইয়া, কাণি হইলেই ঠিক হইত—কারণ নাক তাহার মােটেই খ্যাদা
নয়—ডান চক্ষুটি তাহার নাই-কি উৎকট রােগে নাকি চক্ষুটি নষ্ট হইয়া
গিয়াছে।
রূপসী এক চক্ষু হরিণীর মত, তাহার সমস্ত দৃষ্টিটা অসীমের মুখের
উপর ফেলিয়া বােতলটি তাহার হাতে দিল।
অসীম কোনকথা না বলিয়া ছিপি খুলিয়া মুখের ভিতর খানিকটা
ঢালিয়া ফেলিল—তাহার পর শরতের হাতে বােতলটি দিয়া—চললাম
বলিয়া উত্তরের প্রতীক্ষা না,করিয়া মবিতার ঘরে আসিল।
সবিতা তখন ফটোখানি হাতে লইয়া একদৃষ্টে তাহার দিকে
চাহিয়াছিল। হঠাৎ অসীমের পদশব্দে চমকাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া
বলিল—কোথায় গিয়েছিলেন?
গিয়েছিলাম জালা নেভাতে—কিন্তু তুমি—তুমি কোথায় গিয়েছিলে
সবিতা-
সৰিল কোন উত্তর দিল না—অসীমের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

শেষের দাবী
১১৬
একটা উদগত নিঃশ্বাস চাপিয়া, আলনা হইছে-একখানি কাপড়
টানিয়া
লইয়া সবিতা ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
ঘণ্টা দেড়েক পরে উড়িয়া ঠাকুর অসীমের খাবার আনিয়া দেখিল
অসীম তাকিয়া হেলান দিয়া ঝিমাইতেছে। উড়িয়া ঠাকুর অসীমকে
জানাইয়া দিল যে, তাহার জন্য খাবার আনা হইয়াছে।
তাজড়িত স্বরে অসীম বলিল—কে ? সবিতা
মা’ত ছাদের ওপরে শুয়ে আছে!
চল আমিও যাব, বলিয়া অসীম বাহিরে আসিল ও, কাঠের
সিড়ি দিয়া উপরে উঠিতে গিয়া, টাল সামলাইতে না পারিয়া পড়িয়া
গেল—কপালের খানিকটা কাটিয়া রক্ত ঝরিতে লাগিল।
উড়িয়া ঠাকুরের বােধ হয় First aid ( ফাষ্ট ছেড়) সম্বন্ধে একটু
বিশেষ ভাবেই জ্ঞান ছিল, তাই তাড়াতাড়ি নিজের তৈলাক্ত অপরিষ্কার
গামছাখানি অসীমের মুখের উপর চাপা দিয়া—সিডি দিয়া উপরে উঠিয়া
গেল ও সবিতাকে লইয়া আসিল।
সবিতা নামিয়া আসিয়া দেখিল—অসীম বারান্দার মেঝের উপর
পড়িয়া আছে -ও মুখখানি একখানি গামছা দিয়া ঢাকা।
তাড়াতাড়ি মুখের উপর হইতে গামছাখানি সরাইয়া লইয়া দেখিল
কপাল কাটিয়া গিয়া অঝােরে রক্ত পড়িতেছে।
এা, কেন আমায় ডাকতে পাঠালে না-- একি করলে বল দেখি বলিয়া
সবিতা নিজের আঁচল দিয়া ক্ষত জায়গাটি চাপিয়া ধরি, বা হাত দিয়া
অসীমকে হাত ধরিয়া তুলিয়া-নিজের বুকের উপর তাহার সমস্ত দেহতার
টানিয়া লইয়া আস্তে আস্তে ঘরে গিয়া পালঙ্কের উপর শয়ন করাইয়া দিল।

১১৭ শেষের দাবী তাহার পর দেরাজ হইতে পয়সা বাহির করিয়া ঠাকুরকে বলিল— শিগ্রী বরফ নিয়ে এস, বলিয়া বাহির হইতে জলের পাত্রটি আনিয়া তাড়াতাড়ি নিজের পরিধেয় সাড়ীর কিয়দংশ ছিড়িয়া, জলে ভিজাইয়া অসীমের কপালে ক্ষত স্থানের উপর লাগাইয়া দিল। বা হাতে বাতাস করিতে করিতে, ডান হাতে নিজের পরিধেয় ছিন্ন সাড়ীর কতকটা ভিজাইয়া অসীমের গালে ও মুখের উপর রক্তের দাগ মুছাইয়া দিতে দিতে বলিল—বেশী কি যন্ত্রণা হচ্ছে অসীমবাবু? অসীম চোখ বুজিয়া পড়িয়াছিল—মুখখানাকে বিকৃত করিয়া বলিল উঃ বড় জ্বালা সবিতা—বুক জ্বলে যাচ্ছে! উড়িয়া ঠাকুর ঝড়ের ন্যায় ঘরে ঢুকিয়া প্রায় হাঁপাতে হাঁপাইতে বলিয়া চলিল—এত রাব্লিতে কি বরফ পাওয়া যায়-তবে আমি কিনা তাই...... সবিতা সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া শুধু বলিল—বুঝেছি তুমি এখন যাও-বলিয়া বরফ এক টুকরা লইয়া জলে ধুইয়া ক্ষতস্থানে চাপিয়া ধরিল, তাহার পর নিজের কোলের উপর মাথাটি টানিয়া লইয়া অতি সন্তর্পণে কপালে ব্যাণ্ডেজ বাধিয়া দিল ! অসীম, তখন নেশার ঘােরে তাহার অর্ধনিমীলিত আঁখি সবিতার মুখের উপর ফেলিয়াছিল। একটা বুকফাটা ক্রন্দন বাহির হইয়া আসিতেছিল—সেটাকে সংবরণ করিতে না পারিয়া—সবিতা নিজের মাথাটি অসীমের বুকের উপর এলাইয়া দিল।

সে দিন ছিল কি একটা যোগ—আমাদের সংসার মােহে নিদ্রুিত প্রাণে সাড়া আনিয়া দিবার প্রেরণা। ভুলেও বােধ হয় ভগবানের অস্তিত্ব অনেকের মনে উদয় হয় না—তাই না মাঝে মাঝে এই সব যােগ-যাগের সৃষ্টি ভাগিরথী তীরে অসংখ্য নরনারী স্নানার্থে সমবেত হইয়াছে। একদল যাইতেছে অপর দল আসিতেছে—পরিচিত কাহারও সহিত দেখা হইলে কেহ কেহ দাড়াইয়া পরস্পরে সুখ দুঃখের কথা কহিয়া প্রাণটা একটু হাল্কা করিয়া লইতেছে। যুবতীরা চলিতে চলিতে পরস্পরের গায় অলঙ্কার দেখিতেছে --কাহার গায় কত নুতন ফ্যাসানের কি অলঙ্কার...যুবকের দলও চলিয়াছে মৃদু গুঞ্জন করিতে করিতে—চারিদিক চকিত দৃষ্টি আরাে কত কি? পিসিমাও গঙ্গাস্নানে আসিয়াছেন—মীরাকে সঙ্গে আনিবার অনেক চেষ্টা করিয়াছিলেন—কিন্তু মারা কিছুতেই রাজী হয় নাই, শরীর খারাপ ইত্যাদি অনেক দোহাই দিয়া কাটাইয়া দিয়াছে। স্নান শেষ করিয়া, ঘাটের ধারে একপাশে বসিয়া পিসিম মালাজপ করিতেছেন। সবিতাও গান করিতে আসিয়াছে—তাহার আসিবার মােটই ইচ্ছা ছিল না--কিন্তু উষা প্রভৃতি বাড়ীর অপরারে পীড়াপীড়িতে ও শেষে জলাতনের অঙ্গ বাধ্য হইয়া আসিয়াছে। উষারা সকলেই হেলিয়া দুলিয়া ঘাটে নামিয়া গেল।-সবিতা সকলের পশ্চাতে ছিল --সে

১১৯
শেষের দাবী
আস্তে আস্তে চলিিেছল—সে চলায় চপলতা নাই--যেন জোর
করিয়া অবসন্ন পা দুখানিকে টানিয়া আনা-মুখে চিন্তার গভীর রেখা।
উষা চিৎকার করিয়া বলিল—কি’লল, আসবি না ঐখান থেকেই বাড়ী
ফিরবি-সব তাতেই তাের বাড়াবাড়ি
পিসিমার গােড়াতেই ইহাদের প্রতি নজর পড়িয়াছিল। নাসিক।
কুঞ্চিত করিয়া একপাশে সরিয়া বসিলেন—যেন তাহাদের হাওয়া গায়
না লাগে-
হঠাং পিসিমা ডাকিয়া উঠিলেন -ভবঘা ও ভবো-
ডাক শুনিয়া একটি বর্ষীয়সী বিধবা একটি যুবতীকে সঙ্গে লইয়া
পিসিমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন--দিদি যে, অনেকদিন পরে
দেখা হল—ভাল তাে ?
হাতের মাল ঘুরাইতে ঘুরাইতে পিসিমা বলিলেন—ভাল থাকব সেই
ম’লে। সঙ্গে এটি কে, বউ নাকি---বাঃ, বেশ মুখখানি ত ?
কথাটি সবিতার কাণ যাইতেই ফিরিয়া দেখিল-একটী ঘােড়শী যুবতী
—সত্যই মুখখানি সুন্দর
ভব পিসিমার সহিত কথা কহিতে কহিতে, তাহার পুত্রবধুকে
বলিলেন—নাও বৌমা মাথাটা নিঙড়ে দেরী হয়ে গেল
বৌমা গামছা দিয়া সদ্যস্নান হইতে উঠিয়া আসা ভিজা চুলগুলিকে
নিঙড়াইয়া ফেলিল। 'গামছা হইতে নিঙড়ান মাথার জল—পিসিমার গায়
ও কাপড়ে ছিটকাইয়া পড়িল ।
ছিঃ মা, একটু সরে দাড়িয়েত মাথাটা নিঙড়াতে হয়—দেখছ উনি
জপ করছেন

শেষের দাবী বাঁ হাত দিয়া জলের ছিটা মুছিতে মুছিতে, পিলিমা বলিলেন—তা হােক তা হােক—তাহার পর বৌমার চুলের দিকে তাকাইয়া বলিলেন- বেশ তাে চুলের টাল- ও এখন কি দেখছ দিদি-বিয়ের পর কি চুলই হয়েছিল-মেঝেয় বসলে, আধখানা মেঝে চুল ছড়িয়ে থাকত। তারপর বাপের বাড়ী গেল—যখন নিয়ে এলাম, চুলের আর সে ছিরি নেই— তাহার পর পিসিমার সহিত আরাে দুই একটি কথা কহিয়া ও পিসি- মাকে তাহাদের বাড়ীতে একদিন অবশ্য করিয়া যাইবার কথা বলিয়া, ভব, বৌমার হাত ধরিয়া চলিয়া গেলেন- কত লােক স্নান করিয়া চলিয়া গেল—তাহাদের মনের ময়লা—দেহের পাপ-মা ভাগীরথীর বক্ষে ঢালিয়া দিয়া- উবারা তখনাে স্নান করিতেছিল—সবিতা একটি নিঃশ্বাস ফেলিয়া ঘাটে নামিয়া গেল ও খুব তাড়াতাড়ি স্নান সারিয়া উঠিয়া আসিল। পিসিমার তখনও মালা জপ শেয় হয় নাই। ঘাটে ক্রমশঃ ভীড় বাড়ীতে লাগিল- সবিতা ভীড় ঠেলিয়া যাইবার সময়, সাবধান সত্ত্বেও ভিজা কাপড়ের জল পিসিমার গায়ে ছিটিয়া লাগিল। একবার সবিতার মুখের দিকে ও এক বার নিজের গায় সবিতার ভিজা কাপড় হইতে নিক্ষিপ্ত জলের ছিটার দিকে চাহিলেন—তাহার পর ঈষৎ রুক্ষস্বরে বলিলেন—হ্যা গা কি রকম আক্কেল তােমার-বলি কপালের উপর চোখ দুটো ত রয়েছে—? ওমা, চানটা সেরে নিয়ে ভাবলাম, নামটা এইখানে বসেই সেরে নিই। ঘাটে কে আসবারই যাে নেই যে সব অনাচার—একপাশে সরে বসলাম-তা কি হবার যো আছে ? ইষ্টি দেবতার নাম মুখে-আর যত সব অনাচার, অশুদ্ধ জল গায় ১২১ শেষের দাবী সবিতা একটি কথারও উত্তর দিল না—একদৃষ্টে পিসিমার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল। চাহনি দেখিয়া পিসিমার আপাদ মস্তক জ্বলিয়া উঠিল, বলিলেন : আবার যে ব্যাড, ব্যাড, করে চোখ বের করে বড় দেখা হচ্ছে তখন ও চোখ কোথায় ছিল? একটু মনিষি দেখে পাশ দিয়ে গেলে বুঝি আর গঙ্গা চানের পুণ্যি হতাে না ? সারারাত ফুৰ্ত্তী মেরে, সকালে সব আসবেন গঙ্গা নেয়ে পূণ্যি করতে সবিতা তখনও দাড়াইয়া ভাবিতেছিল—যত সব অনাচার অশুদ্ধ জল গায়—তাহার পর খুব ধীর ভাবে বলিল—গঙ্গা জল কি অশুদ্ধ হয় না? সব তাতেই যে লােকে শুদ্ধ বলে গ্রহণ করে ? আমার আগে যে বউটি মাথা মুছছিলেন, তারও ত মাথার জল আপনার গায় পড়’লকই তাকে - পিসিমা চক্ষু প্রায় কপালের উপর তুলিয়া বলিলেন-কলিকালে হােলো কি ? ওঁর সঙ্গে ওনার তুলনা-বলি কিসে আর কিসে? উনি যাচ্ছেন ঘরের সতীলক্ষ্মী বউএর সঙ্গে তুলনা হতে! ওদের জল গায় লাগলে অনেকে তােরে যায় বলিয়া আর অপেক্ষা না করিয়া আপন মনে বলিতে বলিতে চলিলেন—যাই আবার একটা ডুব দিয়ে আসি-দেখে শুনে কি করে আর এই নিয়ে ঠাকুর দেবতার নাম করি! সবিতা মাটির দিকে মুখ নিচু করিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল- তাহার পর আস্তে আস্তে আসিয়া শ্মশানের ভিতর প্রবেশ করিল। শশানেখেন একটি এয়ােস্ত্রী বৃদ্ধার মৃতদেহ ফুলেরমালায় ঢাকি রাখা হইয়াছিল। মৃতার পাটের আশে পাশে পুত্র, পৌত্র, পৌত্রীরা ঘিরিয়া-আর মৃতার শিয়রের কাছে একটি বৃদ্ধ বসিয়া—তাহার গণ্ড হিয়া । শেষের দাবী ১২২ অশ্রু ঝরিতেছিল ও মাঝে মাঝে কেঁাচার খু! জিয়া চক্ষু মুছিতে ছিলেন—প্রিয়তমার সহিত নশ্বর দেহের বিচ্ছেদ— জীবনের প্রথম যৌবন প্রভাতে, যে অতি সাদরে কালিঙ্গন করে জানাইয়াছিল—সুখে দুঃখে তুমি আমার আমি তোমার—আজ বাষষ্টি বৎসর তা’তে অক্ষরে অক্ষরে পালন হইয়াছে। দুঃখে কাতর দয়িতার মুখটি হাতে করিয়া তুলিয়া ধরিয়া—যে তার প্রেমের মাধূরীতে স্নান করাইয়া, প্রেমের রূপ ফুটাইয়া তুলিত—আজ সে যে অজানা পথে যাত্রা করিল—তার দতিকে জীবনের শেষ প্রান্তে রাশিয়া। জানাইয়া গেল ছাড়লাম শুধু নশ্বর দেহ-মন তােমার মনেই মিশাইয়াছি—স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হয় না— আত্মার মিলন সে যে অবিনশ্বর—তাতে ত বিচ্ছেদ নশ্বরতা নাই — বৃদ্ধ চক্ষু মুছিয়া তার দয়িতার শিয়রের কাছে ঠিক হইয়া বসিল ফটো তােলা হইল। শশ্মান লােকে লােকারণ্য--এয়স্ত্রী নার্থিনীর। অনেকেই মৃতার মাথার সিন্দুর ও পায়ের ধূলা লইতে লাগিল। সবিতা ভিজা কাপড়ে দাড়াইয়া একদৃষ্টে তাকাইয়া দেখিতে লাগিল- তাহার পর আস্তে আস্তে একপাশে বসিয়া পড়িল। সবিতা ভাবিতে লাগিল-জীবনের সায়াহ্নে আসিয়া ও তার ভালবাসার বৃতিতে চোখের জল ফেলিতেছে—অতি আপনার জল বলিয়া! তবুও ও ভাবছে না—এ বিচ্ছেদ ক'দিনের-আমারও ত সায়াহ্ন কাল— কত নারী পায়ের ধুলা, মাথার সিন্দুর লইয়া নিজেদের ভাগ্যবতী মনে করিতেছে-সে যে সতী—সে যে কুলবধু! সেখানে যে ত কিছুর ছাপ নাই—মন্ত হাওয়া বয় না! আর আমার—এ দেহ অবসানে কেহ আনিতেও পারিবে না—ফিরিয়াও দেখিবে না-নাক সিটকাইয়া চলিয়া শেষের দাবী চোখের জল-কাহারও পড়িবে না এক ফোটা—বরং অনাচারের সংখ্যা কমিবে একটা! কত তফাৎ! কই এখনও , মরি নাই—ভিজে কাপড়ের জল একটু ছিটিয়া লাগিয়াছে-তাতেই অশুদ্ধ জল গায়- মা গঙ্গা তিনিও আমার স্পর্শে অশুদ্ধ! আবার চান করিয়া, শুদ্ধ হইয়া তবে অন্য কাজ—তা নইলে যে সবই নিস্ফল। আর তার ও ত মাথার জল গায় লাগিল—লাগিলই বাতাতে ত অনেকে তােরে যায়— কেন? সে যে সতী-কুলবধূ! কেন—কিসে আমার স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়ল কলুষিত দেহের—মনের ময়লার মুখে কি কোন ছাপ পড়ে? কই না—ত দে’তে পাই না—? অথবা পড়ে—কলুষিত আঁখিতে ধরা পড়ে না— উঃ, ব্যর্থতার মধ্যেই যার আমরণের অস্তিত্ব তার ত সব তাতেই ফুলে ফুলে ব্যর্থ,--তা না হইলে গরীবের ঘরের ঐ বউ, হাতে দু গাছ। শুধু শাখা আর আধময়লা একখানি মােটা কাপড়—তার স্পর্শ জলে অনেকে তরে যায়—? আর আমার—এত ত গহনা—কত ভাবে নিজেকে মার্জিত করে রেখেছি—অনেক কিছু আনুসাঙ্গিক দিয়ে—তবুত তার স্বরূপ লুকোতে পারলুম না—? তার ভেতরকার আসল রূপ প্রকাশ করে দিল—সবই ব্যর্থ—আসলে, যে গলদ! যতই ঘস মাজ—সােনায় মুড়িয়ে রাখ। শুধু শাখায় মলিন বসনে—তার স্থান ত অনেক উপরে— মৃগনাভির কস্তুরের মত—অ ৷ হতেই তার সুগন্ধ ঘ্রাণে আসিবে—গিয়া পড়িবে-সে যে আসল রূপ ! সবিতার একবার মনে হইল—যাই গিয়া ঐ জলন্ত চিতাটির উপর ঝাপাইয়া পড়িসব শেষ হয়ে যাক— তখনি মনে হইল-না না, এখনও যে কাজ বাকী-অসমাপ্ত কাজ এখনও যে হাতে।

শেষের দাবী ১২৪ বেলা দ্বিপ্রহর 'উত্তীর্ণ হইয়া গেল—সবিতা তখনাে আপন ভায়ে, বিলাের। কত লােক আসিল গেল, সে জানিতেও পারিল না—সে যে আপন ভাবে বিভাের-আপন উন্মাদনায় চিত্ত বিক্ষিপ্ত বৃদ্ধার পঞ্চভূতের দেহ পঞ্চভূতে মিশিয়াছে—আছে শুধু পড়িয়া, কতকগুলি পােড়া কাঠ-কলসীর টুকরা আর আছে স্মৃতির টুকরা মনের মালায় গাঁথা—তাহাতেই তার অস্তিত্বের প্রমাণহাসি কান্নার প্রতিধ্বনি? শূন্য চিতাটির দিকে একবার তাকাইয়া—একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সবিতা ঘাটের দিকে চলিল—তাহারপর আবার একবার স্নান করিয়া- অবসন্ন দেহটিকে টানিয়া গৃহাভিমুখে লইয়া চলিল। । মানুষের মাথা যখন শয়তানের লীলাক্ষেত্র হয়-তখন সে সবই শয়তানের পরামর্শানুযায়ী করে—নিজের বিবেক বুদ্ধি শয়তানের পরাক্রমে পরাজিত হয়। আবার সেই শয়তানের যখন দুর্বল মুহূর্ত আসিয়া দেখা দেয়-অবসাদে ঢলিয়া পড়ে—তখনই ত বিবেক মাথা খাড়া করিয়া ওঠে— সে কতক্ষণের জন্য—? যতক্ষণ শয়তানের সুপ্ত অব আজ কদিন হইতে অসীম মদের উপর মদ চালাইয়া চলিয়াছে- প্রাণের আলা, হাহাকার নিবারণ করিতে। ব্যাঙ্কের সমূদয় টাকাই রেসে ১২৫ শেষের দাবী গয়াছে—তাহাতে compound interest with penalty (কম্পাউণ্ড ইন্টারেষ্ট উইথ পেনালটি ) হইল না—শেষে মদের ঝোঁকে পৈতৃক বড় খানিকেও বাঁধা রাখিতে হইয়াছে। হিতৈষী বন্ধু শরৎই সব ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে—অসীমকে আর কোন কিছুর জন্য কষ্ট করিতে হয় নাই। কিন্তু এতেও যখন কোন কিছু হইল না-শরৎ বলিল—মানুষের কর্মের উপর তার ফলাফল নির্ভর করে+অর্থাৎ কিনা, তারই সঙ্গে সব কিছু যােগা- যােগ। অসীমের কর্মের দ্বারায় রাশি চক্রের স্থান ঘুরিয়া গিয়াছে। তখন সে দেখিয়াছিল বৃহস্পতির স্থান সপ্তমে ছিল, কিন্তু বর্তমানে ত সে আর তাহা দেখিতেছে না। এখন দিন কতক অসীমকে চুপ করিয়া থাকিতে হইবে —তাহার পর সে দেখিবে—হয় কিনা? তাহা না হইলে সে আর এতদিন কি শিখিল—কি করিল ! এ হইতেই হইবে—দুদিন আগে আর পিছে। তাহার পর হইতে অসীম মদকে অতি প্রিয়জনের আসনে বসাইয়াছে —তাহার কাছেই সম্পূর্ণ ভাবে আত্মসমর্পণ করিয়াছে। সবিতা কত কাদিয়াছেহাত হইতে কাড়িয়া লইয়াছে-কিন্তু কোন ফল হয় নাই। গঙ্গার ঘাট হইতে সবিতা, বাড়ী ফিরিতেই-উষারা আসিয়া এক সঙ্গে ঝাপাইয়া পড়িয়া বলিল—ধন্যি মেয়ে যা হােক বলি মরতে, কোথায় নাগর জোটাতে গিয়েছিলে? ঘরের ভিতর ঢুকিতে ঢুকিতে সবিতা বলিল—গিয়েছিলাম ত, কিন্তু জুটল কই ? ঘরে ঢুকিয়া সবিতা দেখিল—অসীম ঘরে নাই। উড়িয়া ঠাকুর আরসির সামনে দাড়াইয়া, তাহার তৈল সিঞ্চিত কেশ সবিতার চিরুণীর দ্বারা পাতিয়া

শষের দাবী
বসাইতে চেষ্টা করিতেছে। মুখে তখনও অস্পষ্ট গাের দাগ—সবিতাকে,
প্রিয় একটু থতমত থাইয়া গেল।
' সবিতা জিজ্ঞাসা করিল—বাবু কোথায়?
ঠাকু বলিল—আপনি চান করতে যাবার পর, বাবু বেরিয়েছেন—কই,
আর তত দেখিনি।
তা হলে খাননি?
—আপনাদের দুজনের দেরী দেখে, আমি আর কি করব-খেয়ে
নিলাম—
বেশ করেছ-এখন ঘর থেকে যাও, বলিয়া সবিতা ভিজা কাপড়
ছাড়িয়া বিছানার উপর উপুড় হইয়া শুইয়া পড়িল ।
সমস্ত দিন অনাহারে ও ক্লান্ত মনে—সবিতা ঘুমাইয়া পড়িল। স্বপ্নে
সবিতা দেখিল-সেই মৃত এয়ােস্ত্রী বৃন্ধ। তাহার মাথার শিয়রের কাছে
দাড়াইয়া। সবিতাকে মৃদু হাসিয়া বলিল—কি চাস তুই?
সবিতা বলিল—আমি চাই তােমার মত—তােমার মত জীবনকে ধন্য
করতে-
বৃদ্ধ বলিল—কিন্তু সে তাে এখনও দেরী আছে? তাের প্রাণে
অনুতাপের আগুন জ্বলেছে—এখন তােকে অগ্নিশুদ্ধ হতে হবে। প্রাণে
তাের প্রেমের তরু আছে—কিন্তু সে তরুর ত ফুলে ফুলে শাখার প্রসার
হলাে না। তার যে আশে পাশে আবর্জনা—বিষবৃক্ষ। অঙ্কুরেই তার
শােভা নষ্ট হল—আগাছায় তার শােভা মিশিয়ে গেল।
সবিতা বৃদ্ধার পায়ের কাছে আছড়াইয়া পড়িয়া বলিল—মা, মা
আমাকে উনার করুণ- তালা!

শেষে এঁর
১২৭
শেষের দাবী
বুদ্ধাবলিলেন—আয় আমার সঙ্গে, বলিয়া আগে আগে চলিলেন।
সবিতা কত পথ, মাঠ, ঘাট, পাহাড়, পর্বত, অতিক্রম করিয়া চলি,
তাহার পর ক্রমে উপরের দিকে উঠিতে লাগিল।
যাইতে পারিল না—দেখিল সামনে বেড়াজাল—তাহা অতিক্রম করিয়া
যাইবার উপায় নাই। আশে পাশে আরো অনেকে করজোড়ে দাঁড়াইয়া
আছে—চক্ষে সকলেরই অশ্রু বিন্দু
সবিতা চিৎকার করিয়া বলিল-এ যে সামনে বেড়াজাল—আমি যাব
কি করে?
বৃদ্ধা ফিরিয়া দেখিলেন তাহারপর বললেন, আমারই ত ভুল
হয়েছে -তুই যে এখনও শুদ্ধ হসনি-তােকে যে অগ্নিশুদ্ধ হতে হবে, বলিয়া
ফিরিয়া অন্যপথ লইলেন ।
সে পথে ভীষণ জঙ্গল—চারিদিকে ব্যাভ্র, সিংহ ও বিষধর স্বৰ্প ইতস্ততঃ
বিচরণ করিয়া বেড়াইতেছে। সবিতা কোন দিকে তাকাইল না-
আপনমনে বৃদ্ধার অনুসরণ করিতে লাগিল।
বৃদ্ধা পশ্চাং ফিরিয়া দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—-ভয় করছে, না?
এদের চিনতে পারছিস?
সবিতা, বলিল—হ্যা খুব পেরেছি-আমি মার
রয়েছি!
তাহার পর তাহারা জঙ্গলের ভিতর একটি নদীর তীরে আসিয়া
দাড়াইল।
* নদীতে জলের পরিমাণ অপেক্ষা-জলজন্তুর সংখ্যাই বেশী।
কুভীর হার প্রভৃতিতারের উপর-জলের উপর, নিজেদের দেহ ভাসাইয়া
মুখব্যাদন করিয়া বেড়াইতেছে।
যে

শেষের দাবী বৃদ্ধা সবিতার মুখের দিকে একবার তাকাইয়া বলিলেন—এই ক্ষীতে, মনে করতে হবে -পারবি কি? ভয় হচ্ছে নয়? 'সবিতা শুধু বলিল—চাই মুক্তি মা, বলিয়া সেই কুন্তীয় হারের দলের ভিতর ঘটে নামিয়া গেল-কুম্ভীরের দল মুখব্যাদন করিয়া চারিদিকে ঘিরিয়া রহিল। সবিতা তাহাদের ভিতর দাঁড়াইয়া গান সানিয়া, তীরে উঠিয়া আসিল। বৃদ্ধা বলিলেন -হ্যা আজ তুই অগ্নিশুদ্ধ তাের চিত্ত শুদ্ধ হয়েছে বলিয়া এইবার তাহাকে স্পর্শ করিলেন— তাহার মাথায় হাত দিয়া ক্ষণেকের জন্য তাহার দিকে তাকাইয়া—হাত ধরিয়া লইয়া চলিলেন আবার সেই সব পথ অতিক্রম করিয়া উপরে উঠিতে লাগিল কিন্তু এইবার আর সে সব কিছুই দেখিতে পাইল না। বেড়াজাল নাই—আছে নন্দন কানন-ফুলের মালার প্রাচীর-ফুলেরই ফটক—চারিদিকে ফুলের ও ধূপ ধুনার গন্ধ! বৃদ্ধা তাহাকে বুকের কাছটিতে টানিয়া বলিলেন—আয় মা আয়... এমন সময় কাহার স্পর্শে সবিতার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল—চমকিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল-তখনও স্বপ্নঘাের কাটে নাই। অসীমের দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিল—যেন সে পূৰ্বে আর কখন অসীমকে দেখেনাই। তীব্র সুরার গন্ধে গৃহ ভরপুর— সবিতার আঘ্রাণে তখনও যেন সেই ধূপ ধুনার গল্প ভাসিতেচিল-নন্দন কাননে ফুলসভার— কিন্তু হঠাঃ তাহার পরিবর্তে সুরার গন্ধ আসিতেই, সবিতা ফ্যাল ফ্যালরিয়া চাহিয়া বলিল—কই, কোথায় গেল—আবার, আবার কেন ফেলে দিলে- অসীম হােত হােঃ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিল—তুমি দেখছি জেগে ১২৯ শেষের দাবী ই— -? তাহারপর ডান হাতটি সবিতার কাধের উপর রাখিয়া বলিল—সৰিা আমি, আমি— অসীমের উকট হাসির শব্দে সবিতা চমকাইয়া, নিজেকে ততক্ষ প্রকৃতিস্থ করিয়া লইয়াছে—তাহারপর অসীমের মুখের উপর দৃষ্টি রাবিয়া বলিল—বসুন এই সােফায়—পড়ে যাবেন, বলিতে বলিতে সবিতা খাট হইতে নামিয়া পড়িল। অসীম বলিল—না, আমি পড়ে যাবনা সবিতা—তবে তুমিই দেখছি পড়ে যাবে, জেগে জেগে যখন স্বপ্ন দেখছ—বলিয়া বাদিকের পকেট হইতে বােতলটি বাহির করিয়া, গলায় খানিকটা ঢালিয়া ফেলিল। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন ধরণীর বুকে তাহার আসন পাতিয়াছে—তাহার মধ্য হইতে মানবকেও তাহার প্রয়ােজন মত—আধারে আলাের স্থান করিয়া লইতে হইবে। জানালার ভিতর দিয়া জ্যোৎস্নার টুকরা ঘরের মেঝেয় লুটাইয়া পড়িয়াছে। মেঘের সহিত চন্দ্রের খেলা: কখনও বা সহচরীর উপর অভিমান করিয়া মুখ স্নান করিতেছে-তখন ঘরের কিরণ ম্লান, অতিমান হইয়া যাইতেছে। আবার ক্ষণেক পরেই, একটু একটু করিয়া অপরের অভিমান ভাঙ্গিয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িতেছে। নববধুর প্রথম সম্ভাষণের মত-বলি বলি করিয়া বলিতে পারে না—যদিও বা পারে—কতক ভাজিয়া চুরিয়া, কতক আঁখিতে, কতক মনের নীরব ভাষায়—শেষে লজ্জায় রাঙা হইয়া, মুখ ঢাকিয়া সবিতার এই আলাের খেলা বড়ই ভাল লাগিতেছিল—তাই সেইদিকে শেষের দাবী একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিল। ক্ষণিক পূর্বে সেও তত আধারে ঐ ক্লোরমধ্যে মাধিস্থ ছিল। খাটের উপর শুইয়া পড়িয়া অসীম চিৎকার করিয়া বলিল—মনের মধ্যে অন্ধকার আবার বাহিরে সেও তত অন্ধকার—প্রাণ মে হাঁপিয়ে উঠছে সবিতা! আলোকই সবিতা—শিগ্রী আলো জ্বালাে- বাহিরের দিকে তাকাইয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সবিতা বলিল— মনের অন্ধকার কি এ আলােয় যাবে অসীমবাবু -তারপর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্বরে বলিল - যাওয়া ত’ দূরের কথা, আরাে ত তাকে জমাট বাঁধিয়ে আনছেন, বলিয়া সুইচটি টিপিয়া দিল। অসীম বলিল—আঃ, আলো না হলে কি প্রাণ বাচে-অন্ধকারে প্রাণ যেন হাঁফিয়ে উঠেছিল— মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া সবিতা বলিল বেশত, মনের অন্ধকার | ফেলে দিয়ে, আবার সেখানে আলাের আসনই পাতুন্ না? কেন—পারেন নাকি অসীমবাবু? খুব পারেন- বােতল হইতে আবার খানিকটা মুখে ঢালিয়া -অসীম খুব চিৎকার করিয়া হাসিয়া উঠিল, তারপর বলিল—না সবিতা, আর তা হয় না | গিয়েছে, তা আর ফেরান যায় না সবিতা একেবারে অসীমের পায়ের উপর আছড়াইয়া পড়িয়া বলিল - -আমি বলছি অসীমবাবু—আবার হবে যেমন ছিল—শুধু চাই মনের জোর-তার পরিবর্তন তাহার পর দুই-জনেই খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ হই, কোন বেদনা বিধুর ভাষার মধ্যে আত্মসমর্পণ করিল: - ১৩১ শেষের দাবী .gস্টেশন ঘর হইতে একটি গান ভাসিয়া আসিতেছিল—“কোথায় আলো, কোথায় আলো—আকাশধরা কালােয় কালাে—ফিরব না আর ৈ হারান, প্রাণ কান ঘরে— বুঝিবা গায়ক) সম্প্রতি সীতা দেখিয়া আসিয়াছে—ও মূতৃ--শোনা ও শেখা গানটি, অইখানেই তাহার উপস্থিত প্রিয়ার নিকট নিবেদন করিতেছে । -মানুষ নূতনের কিছু সন্ধান পাইল, দেখিলে—নিজেই শুধু উপভােগ করিয়া সুখী হয় না—তৃপ্ত হয় না। সঙ্গে সঙ্গে তার অতি প্রিয়জনকে সে সুখের অংশ দিয়া, আরো বেশী তৃপ্ত হইতে চায়—অন্যথা যে সে আনন্দ অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। তাই বােধহয় গায়ক তাহার ভাঙ্গা গলায়, এই পন্থাই মানিয়া চলিয়াছে—হােক না সে গানে মিলনের মাঝে বিরহ-হােক না সে ক্ষেত্রে বিশেষ-প্রাণ যাহাকে চায়, সেই প্রিয়জনতার কাছে নিবেদনেই তৃপ্তি , গায়কের বােধহয় কবিত্ব শক্তির উপর একটু দখল, ও ভাবপ্রবণতার উপরেও একটু দৃষ্টি ছিল—তাই বোধহয় –“মা হারানাের স্থানে শুধু—“সে হারানাে করিয়াছে ! “সে হারানােয় প্রাণে বড় বেশী ব্যথা, বড় বেশী আঘাত লাগে—সেখানে যে, সব হারানাের অন্ধকার-হাহাকার! “মা হারানােয়”-বুঝিবা অতটা বাজে না, বিশেষ বয়স হইলে—জ্ঞানচক্ষু ফুটিলে অসীম সােজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল—সবিতা, কে গাইছে বলতে পার!—একেবারে প্রাণের কথা! পায়ের উপর হইতে মুখ তুলিয়া আনমােনা ভাবে সবিতা বলিল—বলতে পারিনে! তাহার পর একটু থামিয়া অসীমের মুখের উপর দৃষ্টি রাখিয়া বলিল—অসীমবাবু, দয়া করে একটা কথা রাখবেন—শুধু একটা ভিক্ষা আমি চাইছি-বলুন রাখবেন কিনা?

শেষের দাবী।
১৩২
সবিতার চোখ দিয়া ঝর ঝর করিয়া অশ্রুজল, অসীমের্যর উপর
পড়িতে লাগিল।
অসীম বলিল...কঁদছ কেন—কি বলবে বল
? এ্য, তুমি দেখছি
একেবাছেলেমানুষ
অসীমের পায়ের উপর হাতদুটি রাখিয়া, সবিতা বলি-অসীমবাবু
বলুন মদ আর খাবেন না—শুধু এইটুকু ভিক্ষা আমার বিনিময়ে
বলুন, বলুন?
অসীম উন্মাদের মত উংকট শব্দে হাসিয়া উঠিল, তাহার পর একটি
গভীর নিঃশ্বাসের সঙ্গে ক্লান্তিভরে বলিল—সবিতা তা হয় না—তাহলে
আমি পাগল হয়ে যাব ! তবুওত ততক্ষণের জন্য শান্তি পাই—সব স্মৃতি
ভুলে, মুছে যায়-
সবিতা
বলিল—সব জানি, তবু-তবু আপনাকে ছাড়তে হবে ।
জন্মাবধি আজ পর্যন্ত, এমন কিছু একটু পাইনি—যার স্মৃতি মনের
মাঝে পড়ে থাকবে—নকে সান্ত্বনা দিতে! তবুও জানব, একজনের কাছে
পেয়েছি সেই শুধু এই নগণ্যার অশ্রুজলের নিজের দিকথেকে একটা মস্ত
ত্যাগ করে, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে—পাথেয় দিয়েছে—
অসীম সােজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া বলি—সবিতা তুমি কি নিষ্ঠুর!
ওঃ, নিজের দিকেই কেবল সান্ত্বনা পেতে চাও—কিন্তু আমার দিকটা
একবার ভাবলে না। আমারও যে ঐতে ক্ষণিক সান্ত্বনা !
ত্যাগ করিয়ে সবিতা, তুমি চাইছ এক স্মৃতি রাখবে—আমি চাইছি
আর এক স্মৃতি ভুলতের দহনের জ্বালা অভিীষণ—
তার পর একটু থামিয়া আবার বলিল—যদি জানতে সবিতা এ

শেষের দাবী বুকের গায়ে কি ব্যথা, কিসের আগুণ—যদি বা একটুও অনুভব করতে পারতে হলে বোধ হয় বলতে না—? উঃ, আজ কতদিন হল জান- মীরার মুখখানি দেখিনি—আমার মীলা-না-না সবিতা পাক! ৫, আর না ভােলাই 'ভাল-তাইত ভূলতে চাইছি স্নার কিছুকে স করে- 'ও, বড় জ্বালা-- উদাসভরা দৃষ্টিতে সবিতা বলিল-বুঝি বা জানি, অথবা অনুভব কর বার চেষ্টা করি—আর করি বলেই বলছি না না তুমি কিছু বোঝনি—যদি বুঝে থাক তা ভূল সম্পূর্ণ ভুল। না, তােমার এ ভুলের বােঝা নামিয়ে দিতে হবে—তা না হলে তুমিও শান্তি পাবে না—আমিও না ! একদিন কষ্টটা একটু বেশী হবে তা হােক! শােন সবিতা মন দিয়ে শােন- এই ভুলের বােঝা বয়েই আমাদের সুখের জীবন অশান্তির আগুণে ছারখার হয়ে গেল। সে তুমি কল্পনায় আনতে পারবে না সবিতা বুঝিবা কেউই পারবে না যে ভালবাসা ছিল আমাদের দুজনাই দুজনের বাহুর মধ্যে ঘুমিয়ে ছিলাম, কিন্তু সে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে—দু’জনেরই মাথায় ভুলের বােঝা চাপিয়ে দিল। • দু'জনেরই জীবন বােধ হয় কোন দূর অতীত পাপে অভিশপ্ত ছিল/বশী নিয়ে কোথাও গিয়ে বাজান সে পছন্দ করত না—আমার সর্মণশর বােধ হয় সে জানতে পেরেছিল তাই সাবিত্রীর মত, সত্যবাণের মৃত্যু দিন—তাকে আগলে রাখত, কিন্তু বিধিলিপি তাত ঘটল-তারপর নয় ফিরে পেয়েছিল। আমার অনেক বলাতে সে অনিচ্ছা সত্বে গানে বেরােতে মত দিয়েছিল আপন মনে বাজিয়ে চলে ছিলাম—শুধু তােমার শেষের একটা কথা কাণে গেল—“জীবনের সকলের শেষের দাবী ১৩ঃ রিক্ততা এইখান দিয়ে পূরণ করবার একটা চেষ্টা করি”- মীরার কাছে কোন কথা ত গােপন করতাম না—আর গােপন করবা? তখন ছিলই বা কি? বুঝলাম মীরার তেমন ভাল লাগল না। তারপর সে দিন এখানে এসেছিলাম তাও আমার অনিচ্ছায়—ওদের সকলের পীড়া পীড়িতে জীবনে সেই আমার প্রথম প্রবেশ, এই সব বাড়ীতে—ঘরে ঢুকতে আমার থেমে গেল। বাঁশীও বাজালাম-তােমার--তােমাদের কথাতে—কিন্তু প্রাণের মধ্যে কি এক অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল—কে যেন একটা বিরাট পাথর বুকের উপর চাপ দিয়েছিল—মীরাকে যতক্ষণ না বলতে পেরেছি-ততক্ষণ শান্তি পাচ্ছিলুম না! আমার বাঁশীর সুখ্যাতি ভাল লাগত—কিন্তু এ বাড়ীতে, এ ভাবে সুখ্যাতি ভাল লাগল না। বাড়ী এসেই মীরাকে বললাম --মীরা শেষ পর্যন্ত না শুনে চলে গেল : রাত্রিতে দেখলাম মীরাকে—আমার মীলাকে বুকের কাছে নিয়ে শুয়ে আছে-একটা কথাও আমার সঙ্গে বলল না-বুঝলাম অভিমান হয়েছে- তারপর দেখলাম মীরা কাঁদছে। তাকে অনেক করে বােঝালাম, শেষে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর গানের দলের সঙ্গে যাব না। যেতে আর হল না সবিতা—আপনা হতেই সেই দল • ভেঙ্গে গেল—শুধু আমার জীবনটা ছারখার করবার জন্য সকলে ক্ষণিক : উন্মাদনায় মেতেছিল-- তা না হলে অভিশপ্ত জীবন আরম্ভ হবে কি রে ? আবার দিনত, বেশ যাচ্ছিল-পথে তুমি আমায় বিপদ বলে তুলে নিলে-জানি না শুভ কি অশুভক্ষণে তােমার এখানে তােমার কথায় , খাবার খেলাম -কেন জান? লােকের দুঃখে, ব্যথায় প্রাণটা তখন কেমন করে উঠত-শুধু তারই জন্য! তারই জন্য বাঁশিটাও বাজিয়েছিলাম, . শেষের দাবী কিনেছ তুমি, না বাজালে ব্যথা পাবে ! তোমার বাড়ীথেকে শুধু মনের মধ্যে নিবেরোলাম, তুমি বাঁশী খুব ভালবাস-প্রাণের সঙ্গে। মীরাকে সেদিন তােমার এখানে আসার কথা বললাম না—ভাবলাম তার ছল ছল চোখ হবে—সে কঁাদবে! আমি যে মীরার বিষন্ন মুখ, ছল ছল চোখ দেখতে পারতাম না-তাই তাকে বললাম না। মনে ত আমার তখন অন্য কিছু ছিল না—গােপন করলাম। সেইদিন—সেইদিন প্রথম বিষবৃক্ষের বীজ পুতলাম। রাত্রিতে বায়স্কোপে গেলাম—কিন্তু সর্বক্ষণ অশান্তি অনুভব করতে লাগলাম। মীরা নিঃশঙ্কোচে তাই বিশ্বাস করল, তাইতে বেশী আল পেতে লাগলাম। দিন চলে যাচ্ছিল। পাড়ার কে দেখতে পেয়েছিল—তােমায় আমায় ট্যাক্সিতে। কথাটা মীরার কাণে যায় অন্যভাবে। যাই হােক, বাহ্যিক তােমায় আমায় তাে দেখেছিল। মীরা রাত্রিতে জিজ্ঞাসা করল—আমি সব বললাম—আর কেন যে লুকিয়েছিলাম তাও বল্লাম-মীরা খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে অজ্ঞান হয়ে গেল। তার পর থেকে তার মুখে আর হাসি দেখতে পেলাম না। আমার হাত থেকে আমার সামনে থেকে সে সরে থাকবার চেষ্টা করত। বাড়ীথেকে একেবারে বেরােন ছেড়ে দিলাম—মীরাকে অনেক বােঝালাম, অনেক । তখনাে ত আমি ফুলের মত ছিলাম— এ মনে ত কোন ছাপ সড়নি—মীরা বিশ্বাস করল না। তার উপর অভিমান করে—তাকে এ সন্দেহের পরিণাম বুঝিয়ে দিলাম। তারপর সেই দিনই প্রথম ভূলের বােঝা মাথায় নিলাম। বিবেক শয়তানের বশবর্তী হ’ল, বুঝিয়ে দিল— মিকে অবলম্বনের চাইতে, সত্যকেই আশ্রয় করা সাধাম। ভা!

শেষের দাবী ৫ —কিন্তু সেদিনও একেবারে জ্ঞান বুদ্ধি হারাইনি—মুহূর্তের জন্য সে ভাব হয়েছিল—তখনি তত আবার তােমাকে ছুড়ে ফেলেদিয়ে ছুটে বেসে। কিন্তু সবই নিস্ফল হ’ল-মীরার চোখের তীব্র জ্যোতিতে-প্রাণের মর্মর ভাবেতে, মুখের কথাতে ! আমার বাহুপাশ ছিন্নকরে সে জানিয়ে দিল —আর আমার এ আলিঙ্গনে, স্পর্শে—তার নারীত্ব—তার দেহ যেন কলুষিত না করি ! অনেক ভাবলাম শেষে তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হল- তােমার হাতেই ফেলে দিলাম নিজেকে। তােমার ডায়েরীখানাও চোখের সামনে পড়ল—সঙ্গে সঙ্গে প্রাণকে টানল, ব্যথায় ব্যথা মিশিয়ে—ফলে তােমার হাতেই নিজেকে তুলে দিলাম। কিন্তু কই শান্তি—? শান্তি ত পেলুম না-প্রাণের মধ্যে তীব্র জ্বালা অনুভব করতে লাগলাম। বাড়ার শশাবার ঘরে যেতাম না-পাছে মীরাকে আবার জ্বালাতন করি-দংশনের জালায় আকঁড়ে ধরি— জানিনা তােমার মনে আছে কিনা—তােমায় নিয়ে বায়স্কোপে গিয়েছিলাম-সেখানে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা তােমায়, আমার স্ত্রী বলে পরিচয় নিয়ে গেল—প্রতিবাদ ও করতে পারলাম শুধু নিজের মনেই জ্বলতে লাগলাম। অনেক ভাবলাম—শেষে ৭তির জালা ভােলবার জন্য মদ ধরলাম। বড় জ্বালা সবিতা-বুঝবেনা! শুধু কি তাই-তােমার এখানে এই বাড়ীতে শরতের সঙ্গে বন্ধুত্ব হ'ল- ফলে, রেসে সর্বস্বান্ত হলাম—শেষে বাড়ীটাও পড়’লপথে বসলাম। শুধু কি আমি সবিতা-আমার মীরাকেও বসালাম। সে জানে না যে তাকে শুধু মনােকষ্টে রাখিনি-লোকের কাছে হাস্যাস্পদ করিনি- একেবারে সর্বস্বান্ত করে-সৰ্বরকমে রিক্ত কনেপথে বসিয়েছি! ওঃ! কি করে যে তাদের চলবে—কোথায় দাঁড়াবে তা জানিনে -- আর যে একটু ১০৭ শেষের দাবী কিছু সম্বল নেই, বলিয়া অসীম বালিসের উপর মুখ ঢাকিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া দিয়া সবিতাটি কথারও উত্তর দিল না—শুধু একখানি হাত অসীমের পিঠের উপর রাখিয়া একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। একটু পরে অসীম মুখ তুলিয়া সবিতার হাতদুটি জোর করিয়া চাপিয়া ধরিয়া বলিল—এইবার বুঝলে কেন মদ আমার এত প্রিয়তাকে এত ভালবাসি—তাতে ডুবে আছি—আর থাকতেও চাই ! কি বুঝলে না? শুধু স্মৃতির জালা—তার দংশনের জ্বালা ভুলতে ! তবু’ত কিছুক্ষণের জন্য তাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাই । তাহার পর একটু থামিয়া - উঃ! মীরা, মীলা—তাদের এখন ভুলতে চাইছি—আমার বুকের পাঁজরা খা খা করে ভেঙ্গে দিতে চাইছি! হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া অসীম বলিল—এর জন্য দায়ী কে? তুমি, না আমি, না মীরা -? বল? সবিতা আমি উত্তর চাই? তুমি -তুমিই দায়ী। তুমি পথ থেকে আমায় না নিয়ে এলে ত আমি আসতাম না ! পলে পলে টানলে-ভালবেসে ব্যথার বােঝ। নামিয়ে দিলে আমার কাছে-আমি তুলে নিলাম। মাথায় যে বহু পূর্বেই অন্যবােঝা চাপিয়েছি-ভার সামলাতে পারলাম নবশুদ্ধ নিয়ে পড়লাম, একেবারে পঙ্গু হয়ে । এর জন্য তুমিই নয় সবিতা— বােতল হইতে আরাে খানিকটা মুখে ঢালিয়া অসীম বলিলনা-না- সবিতা তুমিতে’ দায়ী নও—দায়ী আমি নিজে। তুমি ডাকলেও, আমি কেন এসেছিলাম ? ডাকবার’ ত প্রত্যেকেরই অধিকার আছে ? মনটাত আমার-বিবেক'ত আমার কাছে? তুমি বােঝা চাপালেও—মাথায় যার

শেষের দাবী
১৩৮
ফুলের বােঝ—সে কোন সাহসে নেয় আর এক কঠিন বােঝা ! ক্ষমতার
অতিরিক্ত ভার হলেই পড়ে যায় -জেনে-শুনে ইচ্ছে কত প*১.
সবিতা, তুমি নও আমি দায়ী—আমিই একমাত্র দায়ী
কিছুক্ষণ অসীম নিস্তব্ধ হইয়া রহিল, তাহার পর বলিল—আচ্ছা সবিতা,
মীরা কি একটুও দায়ী নয় –একটুখানি ? বলত—? সেইত পরের
কথায় সন্দেহ করে-আমার মনকে তিক্ত করে, মনের শান্তি নষ্ট করে
দিল। সংসারে অশান্তির আগুণ জ্বাললাে-তারপর ঘৃণাভরে ফেলে দিল।
ভুলে গেলাম সব—পাগল হয়ে ঝাপিয়ে পড়লাম।
একট। বুকফাটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া সবিতা উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল—
ব্যাঙ্কে কত হাজার টাকা ছিল অসীমবাবু?
অসীম কি ভাবিতে ভাবিতে বলিল—বোধহয় দশ হাজার
আর বাড়া বাঁধা রাখলেন ক’ নয়?
ছ' হাজার টাকায়?
-ওঃ, বলিয়া সবিতা জানালার গরাদ ধরিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া
রহিল।
হঠাৎ অসীম বলিল-দশ সবিতা, মীরাকে ত দায়ী করতে পারিনে
কিছুতেই না ! আমি যে তার কাছে গোপন করেছিলাম—একবার
বিশ্বাস হারালে তার ওপর ত আর বিশ্বাস আসো-এলেও সন্দেহ যায়
। মীরার তবে দোষ কি—আমি হলেওত করতাম। সে সতী—অসংকে
সে কতদুর ঘৃণা করে তাই দেখাতে চেয়েছিল। হয়ত অনুতাপের দহনে
লতে অবসর দিয়েছিল—আবার তুলে নিতে। আমিই ত বুঝিনি
বােঝবার অবসরও নিইনি। উল্টো বুঝে একেবারে পাৰুে ডুবলাম।

১৩৯ শেষের দাবী সবি অসীমের দিকে মুখ ফিরিয়া বলিল—তাহলে মানলেন, &পনি মি আর কেউ নয়! ভাবছি তাই, বলিয়া অসীম বোতল হইতে আবার খানিকটা মুখে ঢালিল—তাহারপর পাশ ফিরিয়া শুইয়া পড়িল। সবিত! একই ভাবে বাহিরের দিকে তাকাইয়া রহিল। ঘড়ির ঘণ্টার কাটা ঘরের পর ঘর বদল করিয়া চলিল—সবিতার ভ্রুক্ষেপ নাই—সে তখন ভাবনার অকুল সাগরে হাবুডুবু খাইতেছে—কুল কতদূর? পথগামী একখানি মােটরের বিকট হর্ণের শব্দে সবিতা চমকাইয়া উঠিল—কুল পাইল! ঘড়ির দিকে চাহিয়া দেখিল তিনটা বাজিয়াছে। আস্তে আস্তে টেবিলের কাছে আসিয়া, ডায়রীর খাতা হইতে একখানি সাদা পাতা ছিড়িয়া লইয়া সবিতা লিখিল—“আমার বাড়ী বাঁধার টাকা, সুদ সমেত শ্ৰীমতী সবিতা দেবীর হাতে পাঠাইয়া দিলাম। সমস্ত বুঝিয়া লইয়া, আমার বাড়ীর কাগজ পত্র যাহা আছে, ইহার হাতে ফেরত দিবেন । তাহার পর লেখাটি ভাজ করিয়া চাপিয়া শুধু সাদা অংশটি বাহিরে রাখিয়া, অসীমের শিয়রের কাছে আসিয়া মাথায় হাত দিয়া ডাকিল। অসীম তখন নেশা ও তন্দ্রার মধ্যখানে ডুবিয়া আছে—চক্ষু ঈষৎ উন্মােচন করিয়া চাহিল। সবিতা বলিল খানটায় আপনার নামটা লিখুন ত—পারবেন? অসীম নেশার ঘােরে হাসিয়া বলিল—নামটা যদি ভুলে যাও তাই লিখে রাখতে চাও সবিতা ? কিন্তু হাতের লেখা আমার খুবই ভাল, এ আমি বলে দিচ্ছি—এই দেখ বলিয়া অসীম বিছানায় শুইয়া কোন রকমে নিজ নামটি লিখিল।

শেষের দাবী ১৪ ০ কাগজ খানি বাক্সের মধ্যে রাখিয়া—সবি মেঝের উপস, লাইয়া পড়িল। ২৪ বাহিক যাহাকে যত কঠোর দেখায় অন্তরও বোধ হয় তাহার তত কোমল—বুকের নীচে ফনদীর মত অনেক কিছু বহিয়া যায়—প্রাণ সুশীতল করিয়া দেয়...তাই পিসিমাকে বাহ্যিক যতই কঠোর দেখাক না কেন—মুখে যতই অপ্রিয় বলুন না কেন--অন্তরটিও তার ঠিক বিপরীত - মীরাকে তিনি প্রকৃতই ভাল বাসিতেন—কিন্তু ওই বাহ্যিক কঠোরতার রূপটাতে—অন্তরের কোমলতা ঢাকিয়া ফেলিত। কনিষ্ঠ ভ্রাতা দাশুর কর্মস্থল বদলী হওয়ায় তিনি সস্ত্রীক সেইখানেই গিয়াছেন। কলিকাতার বাড়াতে গৃহ দেবতা নারায়ণ আছেন—সুতরাং পিসিমাকে এইখানেই থাকিতে হইয়াছে। আজ আট দিন হইল সাম একেবারে বাঙাস নাই। এতগুলি দিন কাটিয়া গেল, তখনও যখন অসামবাড়ী আসিল না মীরা আহার নিদ্রা ত্যাগ করিল। পিসিমার আর কি কাজ, তিনি প্রায় সর্বক্ষণই মীরার কাছে থাকেন—মীরাকে বুঝান, সানা দেন- তাহাকে বুকে টানিয়া লন। মীরারও প্রাণের জালা কিছুক্ষণের জন্য . উপশম হয়।

০ ১৪১ শেষের দা গ্রহলেতার পূজা সম্পন্ন করাইয়া—পিসিমা মীরার কাছে আসিলেন। মীরা তখন পটী করিয়া বারান্দার উপর বসিয়া আছে । পিসিমা বলিলেন—দ্যাখ, যখন তখন তুই ওই রকম গালে হাত দিয়ে বসে থাকিসনে—যা দেখতে পারিনে তাই—আঃ গেল যা ! ভেবে ভেবে অমন সােণার বর্ণ কালি করে ফেলি, যা চেহারা হয়েছে আরশী দিয়ে মুখখানা একবার দ্যাখ ? তারপর কাল যদি চোখ বুজোও- ঐ একরত্তি মেয়েটার কি দুর্দশা হবে—ভাব দিখিনি? পিসিমার মুখের উপর করুণ দৃষ্টি ফেলিয়া মীরা বলিল—এ’রকমত করেন —যেখানেই থাকুন পরেরদিন যে একবার বাড়ীতে আসেন! আর আজ আট দিন যে পিসিমা—কি হবে পিসিমা, বলিয়া মীরা কঁদিয়া ফেলিল। পিসিমা ধমক দিয়া বলিলেন—দ্যাখ বউ, ক্ষ্যানে অক্ষ্যানে চোখের জল ফেলিসনে-ওতে ভালােরও অকল্যান হয়, বলিয়া একটু চুপ করিলেন- তারপর সেইখানে বসিয়া আস্তে আস্তে মীরার মাথাটি নিজের কোলের উপর লইয়া, হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন-তুই যেমন পাগলী, বােকা মেয়ে তাই যা তা ভাবিস আর কঁদিস—সে কিন্তু দিব্যি মদ খেয়ে এয়ার বন্ধু নিয়ে ফুর্তিতে মেতে আছে—এ, আমি তােক বলে দিচ্ছি। বেশতাে, রমেণকে ত দেখতে পাচ্ছি। হ্যা, আয়রণ cotto চাবী নিয়ে, কি নিয়ে গেল তা দেখতে পেলেন? পিসিমা ও আমি কি দেখব—ওঁরই সব কাগজ পত্র, ব্যাঙ্কের বই থাকে। আমার চাবীটা দিয়ে বল্লেন—খরচের টাকা রইল, বলে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে গেলেন। খােকার মা বললে, বাহিরে মােটরে কে একজন বসে ছিল-বাবু তার সঙ্গে মােটরেকরে চলে গেলেন।

cষর দাবী ১৪২ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া মীরা আবার বলিল -পিসিমা, রমেশ বাবু কতক্ষণে ফিরবেন—তাকে শিগ্রী শিগ্র। ১াসুতে বলে, দিয়েছেন? পিসিমা বলিলেন—হ্যারে হ্যা, আমার নিজের একটা ভাবনা নেই। সে যাবে, দেখবে, তবে আসবে—তারত একটা সময়ের দরকার ! দে, বেটিকে আমার কোলে দিয়ে রান্ন; চড়াগে য–আঃ আমার পােড়া কপালখােকারমা বুঝি এখনও উনুনটায় আঁচে? দেইনি, বলিয়া পিসিমা রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হইলেন। মীর আরাে কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিল-তাহার পর দৈনন্দিন কাৰ্যে মনোনিবেশ করিল । দ্বিপ্রহরে আহারাদির কাজ এইখানেই সমাধা করিয়া, পিসিমা রমেনদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। মালা কোলের উপর গুমাইয়া পড়িয়াছিল- তাহাকে বিছানার উপর শোয়াইয়া দিয়া, মার। মেঝের উপর নিজ দেহ ঢালিয়া দিল। তাহার মনের ভিতর কত কি সম্ভব অসম্ভব রেখা ফুটিয়া উঠিল। -আজ আটদিন তিনি বাড়াতে নাই—পিসিমা বলিলেন, তিনি সেখানে মেতে আছেন -তাই থাকুন যেন এ হাতের নােয়। ..মীরা আর ভাবিতে পারিল না—তাহার চোখ দিয়া ভরা ভাদরের বন্যা দুটিল- সে অ কিছুতেই সেরাধ করিতে পারিল ন! কলিকাতা সহরে কত গাড়ী, মােটর, বাস–প্রত্যহই কত দূর্ঘটনা ঘটে। মাইয়া মাতাল হইলে জ্ঞান থাকে না—ভালমন্দ কিছুইত সে তপন দেখিতে পায় না। যদি রাস্তা পার হইবার সময়—মীরা খুব চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল-না-না ভগবান, এ কখন তুমি করতে পারবে না—পারনা, তার দৃষ্টি শক্তি তুমি ফিরিয়ে দাও ! বাহুর মধ্যে মুখ ঢাকিয়া মীরা ১৪৩ শেষের দাৰ ফুলিয়া ফুলয়া কঁদিতে লাগিল। আলেয়ার মত এক একবার তাহার জীবনের পূৰ্ব্বতি জ্বলিয়া উঠিতেছিল ..কি সুখেরই জীবন ছিল তাদের তারপর কাল বঁশী এল—জীবনকে অন্যপথে নিয়ে গেল। কত কঁদলাম, কত সাধলাম-কিছুত ফল হ’ল না? বিজুলী রেখার মত তখনি মনে পড়িল—তিনিওত সেধেছিলেন? মনে পড়িল—সেই নিশীথরাত্রে—সেই দুটি ব্যগ্রবাহুর আলিঙ্গন--সতে অর্ধপথেই রােধ হয়ে গেল—আমার কথাহে ! তবে-তবে কি ভুল করেছি--? আমার ভুলের জন্যই কি এই পরিণাম—? মীরা বাণবিদ্ধা হরিণীর মত মেঝের উপর পড়িয়া অশ্রু জলে কাতরাইতে লাগিল। কেন—কেন তবে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম? ওগাে আমারই ভুলের জন্য তােমার এই পরিণাম? আমি তো টেনে নিতে পারতাম—আমি তো বেঁধে নিতে পারতাম আমার কর্মের দ্বারা ! এ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত কি দিয়ে করব? সেদিনও বলেছিলেন—তুমিত পার মীর আমার জীবনকে তুলে নিয়ে আবার তেমনি করে গড়ে নিতে, নেবে মীরা? ওগাে, কেন নিইনি! স্বামী স্বামী, এস এস, এবার আমি আমার ভূল বুঝেছি, আমার প্রায়শ্চিত্ত খুব হয়েছে—একবার এস, আমি আমার বুকের মাঝখানে তােমায় লুকিয়ে রাখব আর তােমায় ছেড়ে দেব না। —এমন সময় পিবিআসিয়া ডাকিলেন-ক্লিাে বউ বললাম না— এ বুড়ীর মুখে কেবাক্য, এ কথন নিস্ফল হয় না। সব বলতে পারি, শুধু বলতে পারি না নিজে কবে মরবাে। ওরে, এসব জিনিষের যে ও হতেই হবে। নিজে চোখে দেখেছি, আর কত শত নভেলে পড়েছি। যারা নভেল লেখে তারা কি ঘাস খেয়ে লেখে রে— তারা লােকের জীবনে দেখেছে তবে লিখেছে। যে কাজের যা দস্তুর !

শেষের দাবী
১৪৪
মীরা মুখ চোখ মুছিয়া বাহিরে আসিল ও পিসিমার মুঠর দিকে
তাহিয়া রহিল।
পিসিমা বলিলেন—রমেনও ঠিক তাই বললে !অসীম মদ খেয়ে খাটের
ওপর শুয়ে আছে আর মাগী পাশে বসে কি লিখছে ।—মুখে আগুণ ! তার
আবার লেখা পড়া—জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট হবেন—
মীরা শুধু বলিল—তা হলে তিনি সেইখানেই আছেন ত পিসিমা
রমেন বাবু ঠিক দেখেছেন ত'—
হ্যা রে হঁ ঠিকই দেখেছে—সেও কি নেশাখোর যে নেশাখোরের
চোখ দিয়ে দেখবে—
মীরা কোন উত্তর দিল না শুধু মুক্ত আকাশের দিকে তাকাইয়া রহিল।
নিজের নামে ব্যায়ে যে টাকা ছিল তাহা হইতে উঠাইয়া আনিয়া,
সবিতা অসীমের সই করা কাগজখানির ধারা শরতের মারফত বাড়ী খালাস
করিয়া লইল।
শরৎ ভাবিল-ইহাতে আর তাহার আপত্তি কি? প্রায় অর্ধেক
টাকা ত অসীমকে ভুল বুঝাইয়া লওয়া হইয়াছে—পুনরায় আবার এই
টাকাটা সুদ সমেত। নিজের নামে টাকা দিলে অসীম হয়ত বুঝিতে
পারিত। বাবা, এতদিন তবে কি শিখিল কি করিল— হাতের সামনে
এমন মলে এ যে হেলায় হারায়, তার মত দুর্ভাগা, গাধা আর কেউ নেই

১৪৫ শেষের দাবী তাই শরৎ বলিল -সবিতা তারজন্য তােমায় কিছু ভাবতে -“তুমি যখন বলছ তখন একথা অসীমের কাণে যাবে না। হাজার হল, আমার সঙ্গেও যা হােক বন্ধুত্ব হয়েছে--আর একই সঙ্গে খেলে দুজনেই সর্বস্বান্ত হলাম। কি করব—আমার যে আর নিজের টাকা নেই, তা না হলে আমি নিজেই খালাস করে দিতাম !-বুঝেছ না, টাকা হচ্ছে হাতের ময়লা—যাবে আবার আসবে। হঁ্যা, টাকাটা দিয়েছে কে বললে—ওর এক আত্মীয়কে তিনি সবিতা? বলাম ত তার নামটা এখন বলতে বারণ করেছেন দয়াকরে আর জিজ্ঞাসা করবেন না—আপনার দয়ায় চিরকৃতজ্ঞ থাকব-নমস্কার, বলিয়া সবিতা দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। সকালেই অসীম বাহির হইয়া গিয়াছিল । সবিতা নিজের ঘরে আসিয়া দরজাটি ভেজাইয়া দিল—তাহার পর লিখিবার প্যাডটি ডুয়ার হইতে বাহির করিয়া চিঠি লিখিতে বসিল। কত কি তাহাতে লিখিল-শেষে লেখা শেষ হইলে, আপন মনেই বলিল—মীরা জানিনা যখন চিঠি পাবে, তখন ঘৃণা করবে কি চোখের জল ফেলবে ! দু’য়েরি প্রত্যাশী আমি— তাহার পর চিঠিখানি একখানি খার্শের ভিতর বিয়া—দশহাজার টাকার একখানি চেক মীরার নামটিয়া, তাহার মধ্যে রাখিয়া থাম অটিজা দিল • বাড়ীর কাগজপত্র ও ডায়েরীর খাতাখানি একটি রুমালে বাধিয়া ঝিকে ডাকিয়া বলিল—যা বলেছি মনে আছে ত! যা একটা ট্যাক্সি ঢাক— সবিতা, চিঠিখানি ও রুমালে বাঁধা ডায়েরী ও কাগজপত্রগুলি লইয়া বির সহিত ট্যাক্সিতে উঠিল। মােহন বাগান লেনের একটি বাড়ীর নম্বর = শেষের দাবী ১৪৬ ঝিকে বড়ীটি দেখাইয়া দিয়া বলিল—আমি ওই মােড়ে গাড়ী নিয়ে আছি, তুই যা—আর যা যা বলেছি ঠিক সেইমত করবি- দেরী করিসনে একটুখানি পূরেই ঝি হঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া ট্যাক্সিতে উঠিল। সবিতা ড্রাইভারকে বলিল—চল ! তারপর ঝির হাত ধরিয়া বলিল— ঠিকমত ত কাজ হলো, ওই নামই ত বল্লে -তাকেই দিয়েছিস? যুদ্ধে জয়ী হইয়া আসিয়, বুঝিব: নেপােলিয়নের মুখের ভাব ওরকম হয় নাই—সেই ভাবে ঝি বলিল—ত আর হবে না- এতে সামান্য কাজ, বলে কত বড় বড় কাজ হাসিল করে ফেললাম- তা জানি—এখন কি দেখলি বল, বলিয়া সবিতা তার মুখের দিকে তাকাল। কাপড়ের খুট হইতে একটি পান বাহির করিয়া মুখে ফেলিতে ফেলিতে ঝি বলিল-দেখলাম রোয়াকের উপর একটা ছোট মেয়ে কোলে করে দাড়িয়ে আছে। যা ফটো দেখিয়েছিল, একেবারে হুবাহুব সেই মুখ। জিজ্ঞাসা করলাম এটা কি অসাম বার বাড়া—? স চমকে উঠে কাছে এসে বল্লে, কোথেকে তাছেন? আমি বললাম—আগে বলুন আপনার নাম কি—নাম জিজ্ঞেস করে তবে বলা লছেন। সে বলে-আমার নাম মীরা, আমি তার স্ত্রী, বলে আমার হাতটা চেপে ধরে আবার বসে- বলুন তিনি কেমন আছেন-তার কাছ থেকে আসছেন ? আমি বললাম-ভয় নেই, তিনি ভালই আছেন। তিনিই আমায় পাঠিয়েছেন—আরো বলতে বলেছেন, কাল তিনি আসবেন যদি আপনি না করেন। তারপর তার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে লাগল। ফ ১৪৭ শেষের দাবী বল্পে—জানিনে আপনি কে—যেই হোন শুধু তাকে ববেন, আফজু আমি বুঝেছি—আর আমার এ ভূল কক্ষণ হবে না। আর বেশী কথা বাড়তে দিলাম না চাদরের ভেতর থেকে সেইগুলাে বার করে আর চিঠিখানা শুদ্ধ তার হাতে দিয়ে বল্লাম—আপনাকে অসীম বাবু দিতে দিয়েছেন। তারপরই বল্লাম-শীগ্রী একগ্লাস জল আনুন ত মাথাটা ঘুরে উঠল, বলেই সেইখানে বসে পড়লাম। কেন এমন হলাে—জল আনছি বলে সেগুলো হাতে করেই তাড়াতাড়ি ঘরের ঢুকল-আমিও একেবারে ছুটতে ছুটতে এসে গাড়ীর মধ্যে মুখখানা দেখে সত্যি মনটা কি রকম হয়ে গেল—আহা বেচারী জল এনে কি ভাববে- ভাববে আর কি ভেঙ্কী— যাক কাউকে বলবিনে মনে থাকে যেন । সবিতার নিজেরই অজ্ঞাতে একটা বুকফাটা শ্বাস বাহির হইল বুঝিবা তাহার পাজরা কথানিও তাহার সহিত মােচড় দিয়া উঠিল। মধ্যে তাড়াতাড়ি জলের গ্লাস হাতে করিয়া আনিয়া মীরা আর তাহাকে সেইখানে দেখিতে পাইল না। সদর দরজা পর্যন্ত আসিয়া রাস্তায় মুখ বাড়াইয়া দেখিল—কিন্তু কোথাও দেখিতে না পাইয়া মনটা কি এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় কঁপিয়া উঠিল। তখনাে হাতে তাহার দেওয়া শেষের নারী ১৪৮ রুমালে জড়ান কাগজ পত্রগুলি ছিল। খাম খানির উপর মীরা দেবী। মীরা আপন মনেই বলিল—এ তাে তার হাতের লেখা নয়—এর উপর আর কি শাস্তি দিচ্ছ ভগবান! কম্পিত হস্তে দূরু কুরু বক্ষে মীরা খামখানি ছিড়িয়া ফেলিল-প্রথমেই চোখে পড়িল সাধন মীয়া তােমার ভুলে যাওয়ার মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছি—যাকে ক্লাসে সকলের চাইতে বেশী আপন করে নিয়েছিলে, বেশী ভালবাসতে-আর এখন যাকে সকলের চাইতে বেশী ঘৃণ। করবে—যার চিঠিখানা পড়ে তার স্পর্শ ভেবে তােমার সতীত্বকে হয়ত আঘাত করবে--আমি সেই সবিতা। মীরা যা’ই বা যাই কর -- সবই আমি মাথা পেতে নিলাম। কারণ এখন বুঝেছি, তুমি স—আমি অসতী-তফা স্বর্গ-নরক ! জীবনটা তখন শুধু ব্যথায় ভরা-ব্যর্থ হওয়া মাঝে মাঝে বইছিল। তখনাে এই ভাবে ত জীবনের পরিণতি হয়নি-শুধু বুঝেছিলাম ব্যর্থ মুকুল হয়ত ফুটতে পারে বা নাও পারে। কালির আঁচড় টেনে মনটাকে হাল্কা করবার চেষ্টা করতাম! হাওয়া বিসাক্ত গ্যাস হয়েছেহ ঝলসে, বদলে গেল। কালির আঁচড় টানা অনেকটা অভ্যাসে দাড়িয়েছিল—শেষ পর্ম সবই জুড়ে রাখলাম। তােমার কাছে পাঠালাম, পড়ে পুড়িয়ে ফেলো—ভিক্ষা তােমার কাছে। পরিচয়ের প্রথম সুচনা শুনেছিলে অসীম বাবুর কাছথেকে—ক্রমে সন্দেহ জেগেছিল—শুধু জেনেছিলে একজন পতিতা বলে কিন্তু জানতে নয়, সে আর কেউ নয়--আমি । ভাল তিনি মােটেই বাসেননি অথবা আমাকে চাননি—আর শেষে ১৪১ শেষে ফাক দিনের সেও শুধু ক্ষণিকের বিকার—তােমার উপর অভিমান কভার কিছু নয় ! হঁা, বেসেছিলাম আমি-প্রাণ চেয়েছিল অন্যভাবে-মি যেমন চাও। কিন্তু তা হয় না মীরা—সাধ্য কি আর তােমার জিনিষ নই, তােমার মত মন নিয়ে আমি পূজা করি—করলেও স্থান কাল পাত্রে যে তার রূপ বদলে যাবে—গ্যাছে। ফলে উল্কার মত জ্বলে উঠে, আলেয়ার মত ক্ষণিকে নিবে গেল—যাবে। মনে আছে বােধ হয় সেই ফটো তুমি আমি তুলেছিলাম-আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি রাখবার জন্য, কিন্তু ফল হল শত্রু, মহাশত্রু—স্ত্রীলােকের যার চেয়ে আর শক্ত নেই। কিন্তু মীরা, শক্রই হই আর মিত্রই হই-স্মৃতি-স্মৃতিই। সেইত সব জাগিয়ে দিল সব কিছু ধারা উম্মুখ করে—তা হলে ত জানতে পারতাম না—তুমিই অসীম বাবুর স্ত্রী মীরা! ফটো বাক্টতিই থাকত, সে দিন হাতে করে অতীত জীবনটাকে দেখছিলাম—অসীমবাবুর চোখে পড়ল—পরিচয়ে আপনা হতেই আমার মাথা নিচু হয়ে গেল অসীম বাবুরই কথা—সেটা ঠিকই ভুলের বােঝ প্রথমে তােমরা দুজনে মাথায় নিয়েছিলে। আর সে ভুলটাও বােধ হয় কোন দূর অতীত জীবনের অভিশাপের ক্রিয়া-আর উপলক্ষ্য হতে হয়েছে আমাকে-বাঁশীর স্বর তার সঙ্গে যােগ করে। শুধু তােমাকে এটুকু বলছি বিশ্বাস করে, আর অশ্বাস করাে ভুল করাে না। তার কথা গােড়া থেকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিও এত টুকু দ্বিধা না করে। এটুকু বুঝেছি তিনি মিথ্যা বলেন না, তার মন উদার--আর সেততা তুমি ভাল করেই জান মীরা-শুধু ওই বল্লাম, হয়ত অভিশপ্ত জীবনের ফল ফলবে বলেই তােমার মনের সে বিশ্বাস ওলােট শেষের দাবী আমার ৩ সা পূলবেয়ে দিয়েছিল। এইবার সে ক্রিয়ার অবসান হয়েছে—তােমা মনের পূর্বভাব পাৰে। মীরা আজ তিনি অনুতপ্ত—নিজের ভুল বুঝেছেন -এর সেই ভু বুঝেই তােমাদের স্মৃতির দংশনের জাল। ভূলতে—নিজকে মহা ধ্বংশে পথে নিয়ে চলেছেন-নিজের অস্তিত্ব লোপ করতে । নেই মীরা তা থেকে তাকে বিরত করি -এ সে ক্ষমতার বাহিরে। আ শুধু ফেলতে পারি, তাকে নামাতে পারি ক্ষেত্র বিশেষে তার পরিণাম, তা লাভ লােকসান না দেখে নিজের দিকের শুধু ঔটুকু ক্ষমতা প্রয়ােগ কর কিন্তু মারা তাকে ত আর 'তালবার ক্ষমতা আমার নেই। সে অ: তােমাদের, এ কাজ এখন তােমার—তুমিই শুধু পারবে আবার তা তুলে নিয়ে, তোমার প্রেমের সলিলে স্নান করিয়ে. শুদ্ধ করে তার তার পূর্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত রাখতে। মারা সব পরাধ আমার-আমার নিজের দল সব দিক দি বুঝেছি। আমি সে অসম্ভব যিনিষকে সম্ভব করে নিতে গিয়েছিলাম- নিজের মনের সঙ্গে বেঁধে—কিন্তু তা কি হয়, স্থান কাল পাত্রের যে ক্রি আছে ! মীর, ভাই ক্ষমা করিস—শেষটা তার সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেছি ঝির হাতে দিয়ে এগুলো কৌশলে পাঠালাম। আমার যার নিজের না ব্যাকে টাকা ছিল—সে আমার দেহ বেচার পয়সা নয়-ডায়েরীতেই পাবি -বাড়ী বাধা রেখেছিলেন, তাই দিয়ে খালাস করেছি-আর স্যাঙ্কে ৫ টাকা ছিল তার, তাও নষ্ট করেছিলেন-তারই দরুণ তােমার নামে দশহাজার টাকার চেক পাঠালাম। তোমার নিজের নামে ব্যাঙ্কে ও নয়ডায়েরীতেই পাবি শেষের দাবী দিও। সেই টাকাই রইল, শুধু তার নাম পালটে—তোমার নামে হ'ল। যদি বলো আমার টাকা নেবে কেন? আমার সাধ্য কি তােমায় দেই ভাই--? এটা হচ্ছে আমার জরিমানা—আমার কর্শের প্রায়শ্চিত্ত! কারণ- আমি যে উপলক্ষ্য—আমার কাছে না এলে তাে তার যেত না? অসীম বাবু এখনও এ সবের কিছুই জানেন না—তােমার কাছ থেকেই জানবেন। তােমার কাছে তোমার জিনিষ কালই পাঠাব-সেও এক কৌশলে তুমি বুকের জিনিষ বুকে তুলে নিও ! মীরা আর কোন ভয় নাই-আর আমার ছায়াও তিনি দেখতে পাবেন না—আমিও না তার—এ স্থির নিশ্চয়।আর তার সঙ্গে চাই, তােমার মনের জোর-প্রেমের পূর্ণ আলােক । সকলে ঘৃণা করে—তুইও কি করবি? যা এয়, করিস—সবেরই প্রত্যাশী আমি। “সবিতা” ভােরে উঠি সবিতা স্নান করিয়া লইল। তাহার পর নিজ হস্তে চা করিয়া আনিয়া টেবিলের উপর ঢাকা দিয়া রাখিল। অসীম তখনও ঘুমাইতেছিল-সবিতা শিয়রের কাছে আসিয়া মিনিট কতক মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার পর একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া শের শী ৫ অসীমের শিয়রের কাছে বসিয়া, গায়ের উপর হাতখানি রাখিয়া ডাকিল- সবাবু উচুন, চা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল সবিতার স্পর্শে জসীমের ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল-চোখ চাহিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল—সবিতা এমন স্বপ্ন তুমি ভেঙ্গে দিলে—বেশ তো তার মধ্যে সমাধিস্থ ছিলাম! অসীমের অবিন্যস্ত চুলগুলি হাত দিয়া বসাইতে বসাইতে, হাসিয়া সবিতা বলিল—কি স্বপ্ন দেখছিলেন—রাজা বাদসা হয়েছিলেন, না— , না সবিতা-তাতেও আমার এখন এর চাইতে শান্তি নয়। টাকাতে কি সবিতা মনের অস্থি মজ্জার জ্বালা মেটাতে পারে-নেভাতে পারে? দেখছিলাম কি জান? আমি মরতে যাচ্ছি, কিন্তু মনে হল, না মরার আগে একব। মীরার সঙ্গে দেখা করে যাই—তা না হলে মরণেও ত শান্তি নাই-ই গেলাম মীরার কাছে দেখা করতে। মীরা ঘরের মধ্যে মীলাকে বুকের কাছে নিয়ে শুয়ে আছে। কাছে নিয়ে শুয়ে আছে। আমি আস্তে আস্তে তার বুকের ওপর মাখা রাখতে যাব—মীরা একবার চেয়েই, আমায় তার বুকের ওপর টেনে নিল । বেশ তো ছিলাম সবিতা তার বুকের উপর -কেন তুমি আমায় সে সুখ সমােিথকে নিয়ে এলে ? সবিতা বলিল -কাল্পণক যদি বাবে সত্যিই ঘটে তা হলে কি আপনি খুবই সুখী? বর্তমানে আর কিছু কি পিনার কাম্য থাকে না- যা হবার নয়—যা হয় না, তা নিয়ে আলােচনা করে কোন লাভ নেই!—তাহার পর একটু থামিয়া আবার বলিল—সবিতা তুমি কি পাগল-তুমি জান না-চরিত্রহীন, অসৎকে সে কতদুর স্বণা করে- *

শেষের দাবী
বেশ ধরুন কথায় বলছি—যদি সে আপনাকে আবার বুকে তুলে
নেয়—আগের মত, তাহলে-তাহলে কি আপনি সব কিছু ফেলে দিয়ে
আগের মত হতে পারেন না- জিজ্ঞাসা করছি
তােমার কথার উত্তরে বলছি সবিতা—এখন, এখন মনে আমার
আর কিছু থাকে না—এতাে জ্বালা সব নিমেষেই চলে যায়। বুঝবাে
মীরার গুণে আমার নুতন জীবন-জগতের মাঝে আমিও একজন—আর
কলুষিত জীবন আমার নয়! কিন্তু সবিতা-
যাক মুখ হাত ধুয়ে আসুন—ও চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে—আমি ততক্ষণ
আবার তৈরী করি-
কলার হইতে আসিয়া অসীম দেখিলকেটলীতে জল ফুটিতেছে-
সবিতা গালে হাত দিয়া বসিয়া আছে-
অসীম ডাকিল—সবিতা, এইত এতক্ষণ বেশ কথার ফোয়ারা
ছােটাচ্ছিলে—এরই মধ্যে এতকি ভাবনা এল—একেবারে গালে হাত
দিয়ে বসে—জল ফুটে উথলে যাচ্ছে, লক্ষ্যও নেই—
উদাস ভরা হাসিতে হাসিয়া, কেটলীতে চা দিতে দিতে সবিতা
বলিল—ভাবনার কি কখন কূল কিনারা থাকে অসীম বাবু——সেও যে
সীমা হারা-
অসীম চা খাওয়া শেষ করিয়া সবিতার খুব কাছে সরিয়া আসিয়া
বলিল-দেখ বতা, সব টাকা ত ফুরিয়ে গেছে আরতত একটাও
নেই ! গােটার্ধতক টাকা দিতে পার, বড় বিশেষ দরকার—অবশ্য
তােমার উপর জোর চলে বলেই বলছি।
সবি অসীমের মুখের দিকে খানিকটা চাহিয়া বলিল—আমায়

শেষের দাবী ১৫৪ উপর, আপনার জোর ?-কিসের জোর অসীম বাবু? ভালবেসেছি আপনাকে এই আমার অপরাধ-আর তার বিনিময়ে আপনাকে আমায় টাকা দিয়ে পু’ষতে হঠব—টাকা দিয়ে ভালবাসা কিনতে হবে ! চমৎকার অসীম বাবু- হাতের সিগারেটটি ফেলিয়া দিয়া অসীম বলিল—সবিতা এসব তুমি কি ব’লই আমি বুঝতে পারলাম না। আমি কি তোমাকে তাই বলেছি—? আমার কাছে এখন নেই, উপস্থিতের জন্য চাইলাম—তারপর তোমায় দিয়ে দেব।-এ সব কি কথা তুমি বলছ সবিতা উপস্থিত মানে ?—আপনি আবার শােধ দেবেন কি করে—কি আছে আর আপনার! মুখখানিকে বঞ্চিত করিয়া অসীম বলিল -- আমি তােমার কাছে এ আশা করিনি তুমি তুমিও শেষে-- মুখের কথা এফ না হইতে সবিতা বলিল—আর আমিও আশা করিনি বা ভাবিনি, যে আমাকেই শেষে আপনার নেশার খরচ জোগাতে হবে-যেটাকে আমি অন্তরের সঙ্গে ঘৃণ। করি— দৃষ্টিতে অসীম সবিতার মুখের দিকে তাকাইয়া ডাকিল সবিতা! মাথার উপর কি চুলগুলি জড়াইতে জড়াইতে সবিলিল—বলুন কি বলবেন?—তারপর একটু পামিয়! বলিল- আলবারই বা কি আছে আপনার—সব দিকই ত শেষ করেছেন- চোখের সমস্ত শক্তি সবিতার মুখের উপর ফেলিয়া, কুঞ্চিত ললাটে অসীম বলিল-কি বললে সবিতা—তুমি আমায় ঘৃণা কর? তীব্র

শেষের দা
সবিতা বলিল--না, ঘৃণা আপনার মনুষ্যত্বকে আমি মােটেই করিনে।
ঘৃণা করি আপনার নেশাকে-তার মত্বতাকে—আর তার সঙ্গে তার
1
সেই ভাবেই অসীম বলিল—এখানকার ভালবাসার পরিণাম যে
শেষে এই হয়—এ আমি আগেই জানতাম—এখানকার ধারাই এই
কিন্তু তােমাকে আমি এদের থেকে আলাদা ধরেছিলাম--তাই পরিণামটা
মনেতে উঠে, মনেতেই মিলিয়ে গিয়েছিল মােটেই বুঝতে পারিনি।
বুঝতে আপনি এখন মোটেই পারবেন না-হাজার চেষ্টা করলেও ।
--এর পরে বুঝবেন, যে আমাকে অন্যের থেকে আলাদা ভেবে মােটেই
ভূল করেননি।
আর ভুল করলেন এখন—যেটা ভেবে
এর পরে
হয়ত বা আমার কথা একদিন মনে হতে পারে—বলিয়া সবিতা জানালার
কছে আসিয়া গরাদ ধরিয়া বাহিরে তাকাইয়া রহিল।
অসীম আপন মনে খুব নিম্নস্বরে বলিল—অশুরের সঙ্গে ঘৃণা কর—
সবিতার তখন এ দিকে মন ছিল না—তখন সেই ভাবে বাহিরের
দিকে তাকাইয়া : কিছুক্ষণ পরে যখন সে জানালার কাছ হইতে
ফিরিয়া আসিল তখন অসীমকে আর ঘরের ভিতর দেখিতে পাইল
। সবিতা শরতের ঘরের দিকে গেল—বাড়ীর সবদিক খুজিল—শেষে
নীচে আসি বাস্তার চারিদিক চাহিয়া দেখিল কিন্তু কোথাও অসীমকে
আর দেখিতে পাইল না।
সবিত সেইখানেই বসিয়া পড়িয়া আপন মনেই বলিল—এ কি
করলাম--শেষে সবই যে ব্যর্থ হ’ল--
তাহার পর নিজের ঘরে আসিয়া খাটের উপর আছড়াইয়া পড়িল

শেষের দাবী -চোখের জল বিছানার উপর ঝরিতে লাগিল।মনে ব্যথা দিয়ে শেষে দু’জনাকে আবার মিলিয়ে দেব—তাই এ কৌশল নিয়ে ছিলাম কিন্তু সেততা সম্পূর্ণ হল না— মনে ব্যথাই শুধু নিয়ে গেলেন—মিলন ত হ’ল না! সবিতা ভাবিয়া চলিল—আর কি এখানে আসবেন -না, কক্ষণ না! কোথায় তাকে আর পাব !—একটু আগেই ত স্বপ্নের কথা বললেন—মীরার কাছেও যাবেন না-কাছেও পয়সা নেই- যদি-যদি শেষে মনের জ্বালায় আত্মহত্যা করেন? সবিতা বিছানার উপর পড়িয়া কাতরাইতে লাগিল—শেষে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া একেবারে শরতের ঘরে আসিল—শরৎ তখন ঘরে ছিল না। সবিতা আবার নিজের ঘরে আসিয়া মেঝের উপর লুটাইয়া পড়িল। একবার ভাবিল-ঝিকে পাঠাই—তাহার পরই মনে হইল—মীরা যে আজ তাহারই আশা করিয়া আছে—আমি যে তাহাকে ভরসার সহিত লিখিয়াছি।এখন সেখানে খোঁজ করিতে গেলে যদি মীরা সবিতা শেষে বিচ্ছিন্ন ভাবনা রাশির মধ্যে হাবুডুবু খাইতে লাগিল।

২৮ সবিতার বাড়ী হইতে বাহির হইয়া, অসীম পাগলের মত রাস্তায় চলিতে লাগিল। কোথায় যাইতেছে সে জানে না—তবুও চলিতেছে । সকাল হইতে পেটে আজ একটুও অমৃত পড়ে নাই—তাহার উপর সবিতার সেই বাণীর ঝঙ্কার—অসীমকে একেবারে উন্মাদ করিয়া দিল। সমস্তদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া—মাথার মধ্যে কত এলােমেলাে চিন্তা লইয়া—অসীম একটি পার্কের সামনে আসিয়া দাঁড়াইল। মনের গতি ফিরাইয়া ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিল—কুমারটুলি পার্ক। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়াইয়া রহিল—তাহার পর আবার একটু আগাইতেই দেখিল—আশে পাশে আবার সেই মায়াবিনীর দল—সবিতার মত উঃ, কি ভয়ঙ্কর ওরা মানুষের জীবনটাকে আস্তে আস্তে কোলের কাছে টেনে নেয়, শেষে নিংড়ে মােচড় দিয়ে তাকে শেষ করে শেষে ছুড়ে ফেলে দেয়। না-না ও দিকের ছায়া আর না চোখে পড়ে! অসীম ফিরিয়া আবার পার্কের সামনে আসিয়া দাঁড়াইল। পা দুটি আপনা যেন ক্লান্তিতে অবসন্ন হইয়া আসিতে লাগিল- পার্কের মধ্যে ঢুকিয়া শুইয়া পড়িল— কত কি ভাবিল—কত কি ভাজিল-গলি—মীরা, মীলা— না-না এর আর ভাবাভাবি কিছু নাই! এর একমাত্র, ও ছাড়া আর উপায় নাই-পথ নাই-ভাবনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাব! উঃ, কি ছিলাম কি হলাম—আর শেষে পyইতেই শেষের দাবী ১৫৮ পরিণাম আত্মহত্যা-যেটাকে সকলের চাইতে বেশী ঘৃণা করতাম-- ভয় করতাম ! মা গঙ্গা তােমারই কোলে গিয়ে এ হে জুড়ব- এদংশনের জালা এ অপমানের জ্বালা ভয়ঙ্কর তোর কোল ছাড়া জুড়াবার আর কোথাও জায়গা নাই—আর কেউ বেও না— আবার মীরার ও মীলার মুক্তি ভাসিয়া উঠিল—অসীম ঘাসের উপর মুখ ও জিয়া কাদিতে লাগিল। শেষে ঠিক করিল—না’রবার আগে একবার দেখব—একবার চোরের মত লুকিয়ে তাদের দেখে আসব। —অনেকদিন দেখিনি তাদের—মরেও হয়ত শাস্তি পাব না। সামনে যাব না-তাদের দেখা দেব না—আমি শুধু একটিবার লুকিয়ে দেখব শেষ দেখা-তারপর অসীম লাফাইয়া উঠিল ও খুব তাড়াতাড়ি চলিতে লাগিল। মােহনবাগান লেনের ভিতর ঢুকিতেই অমের মনে হইল—সকলেই যেন তাহাকে দেরি। হাসিতেছে—চাওয়া-চায়ি করিতেছ। অসীম কোন দিকে না তাকাইয়া খুব তাড়াতাড়ি বাড়ার মুখে আসিয়া গড়াইল—সঙ্গে সঙ্গে অতীতের কত কি -কত কথা মনের মধ্যে ভাসিয়া উঠিল— হঠাৎ অসীমের মনে হইল—কে যেন জানালার কাছে দাড়াইয়া ছিল—সৰিয়া গেল। পক্ষণেই কে দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া অর্সামের পায়ের উপর মাথা রাখিল-তাহার পর অসীমের হাত ধরিয়া ভিতরে লইয়া গেল। মী, মীর—আমি যে একেবারে সব রকমে রিক্তআমি যে মাতাল, চরিত্রহীন বলতে বলতে অসীম মেঝের উপরেই মাথা নীচু করিয়া বসিয়া পড়িল, তাহার চোখের জলে সেই স্থান সিক্ত হইয়া

উঠিল।
শেষের দাবী
আর মীরা, তখনও অসীমের একখানি হাত নিজ হাতের
মধ্যে লইয়া—চোক্ষে অশ্রু ফোটা— সেও সেইখানে বসিয়া অসীমের
মাথাটি নিজ কোলের উপর টানিয়া লইয়া বলিতে লাগিল—না গাে না,
তুমি রিক্ত নও—সবই আমাদের আছে আজ আমরা মুক্ত~ মাথায়
ছিল ভূলের বােঝা --তা আমরা দু’জনাই মাথা থেকে নামিয়ে দিয়েছি ।
তাহার পর চোখ মুছিয়া আবার বলিল—আজ যে আমাদের নূতন
জীবন-নূতন করে মিলন! ছিঃ, মিলনের দিনে কি কাঁদতে
আছে?
মীরা, মীরা তুমি জান না-রেসখেলে সব টাকা নষ্ট করেছি-ব্যাঙ্কে
যে আর একপয়সাও নেই!- শেষে বাড়ীটাও পৰ্যন্ত---
অসীম আর বলিতে পারিল না—মীরা কোলের ভিতর মুখ রাখিয়া
ফেঁাপাইয়া ফোপাইয়া কাঁদিতে লাগিল।
মাথার উপর হাত বুলাইতে বুলাইতে মীরা বলিল—বলেছি ত সবই
আবার পেয়েছি নুতন করেনুতন জীবনের সঙ্গে মিলনের সঙ্গে
আগের সবই মিলিয়ে বেশ তাে, ঘরে চল তােমায় দেখাচ্ছি।
বলিয়া স্বামীর অবসন্ন দেহ ভার নিজ বুকের উপর টানিয়া লইয়া ঘরের
ভিতর প্রবেশ করিল। তাহারপর আয়রণচেষ্ট হইতে সবিতার
সব বাহির করিয়া অসীমের হাতে দিয়া, তাহার
পায়ের কাছটিতে বসিয়া পড়িল।
অসীম উদ্বিগ্ন হৃদয়ে দলিলখানি খুলিল—তাহার ভিতর ভাঁজ করা
চেক খানিও ছিল, দেখিয়া বলিল—আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি
না-আমি তাে ঠিক দেখছি মীরা—? এ আবার কি রহস্য--?
ও

শেষের দাবী স্বামীর হাত দুখানি নিজ হাতের মধ্যে লইয়া মীরা বলিল-রহস্য কিছু নয় –! কেউ কারুর জিনিষ নিতে পারে না—নিলেও রাখতে পারে না তাই আমি আবার আমার ত পেলাম—সেও দিয়ে দিল জানিয়ে দিল—সত্যের জয়! তাহার পর হাটুর উপর হাত দুখানি রাখিয়া তাহার উপর চিবুকটি রাখিয়া বলিল—চিঠিখানা পড়, সব বুঝতে পারবে? অসীম চিঠিখানি খুলিয়া পড়িল, তাহার পর বলিল-এ যে আরাে অদ্ভূত—সবই যে রহস্য জালে আবৃত! হবে, তবে কেন সে ও রকম ক’রলকি উদ্দে- যা উদ্দেশ্যই তার থাক-আমার উদ্দেশ্য তােমায় এমনি করে বুকের উপর বেঁধে রাখব—কোথাও যেতে দেব ল—আর তুমিও যেতে পারবে —কেমন কিনা বল? নিশ্চয়-নিশ্চয়-নিশ্চয়!—তারপরই বলিল—সে করেছিল—ভালই করেছিল, তা না হলে তো তােমার ক্ষমা পেতাম না—তােমায়ও এমনি করে বুকে বাঁধতে পারতাম না—বলিয়া মীরার উদগ্রীব তৃষিত অধরের স্কুরিত বাক্যের, নিজ অধর দিয়া পথরােধ করিয়া দিল। মীরা, মীলা—আমার মীলা কোথায়-তাকেও এর মধ্যে সাক্ষী করে বেঁধে নেই। বামীর কাধের উপর নিজ মাথা এলাইয়া দিয়া মীরা বলিল- পিসীমা বেড়াতে নিয়ে গেছেন— তাহার পর স্বামী স্ত্রীতে কত কথা হইল—যে যার মনের রুদ্ধ আসে পরপরের কাছে ঢালিয়া নিঃশেষ করিতে লাগিল-

শেষের দাবী
কিছুক্ষণ পরে পিসীমা আসিয়া মীলাকে কোলে করিয়া বারান্দা হইতে
কহিলেন—কি লাে বউ, বেটাকে নিয়ে আয়তো আমার কাছে কানধরে-
দেখি ব্যাটা কত দুধ ভাত খেয়েছে—নিয়ে আয় শীগ্রী—
অসীম বাহিরে আসিয়া পিসীমার পায়ের উপর মাথা রাখিয়া
বলিল -না, পিসীমা আর শাস্তি দিওনা—শাস্তি আমার যথেষ্ট হয়েছে -
বলিয়া, মীলাকে কোলে লইয়া বুকের উপর চাপিয়া ধরিল।
মীরাও মাথার কাপড়টি একটু টানিয়া দিয়া অসীমের পাশে
আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। মাল। তাহার বাবার কোল হইতে একখানি
হাত তাহার মার কাধে দিয়া—মুখে হাসি ফোটাইয়া–বাবা-মা-মা
বুলির সহিত আরাে কত কি বলিতেছিল—অর্থাৎ দু’জনের মাঝে থেকে
দু’জনকে বেঁধে ধরে রাখলাম—আর ছাড়াছাড়ি হতে পারবে না-
এইবার কিনা আমি আগের চাইতে বড় হয়েছি—অনেকটা বুঝতে
শিখেছি!
সমস্ত দিন উদগ্রীব হইয়া থাকিয়া সন্ধ্যাবেলায় যখন সবিতা শরতের
দেখা পাইল—তখন তাহার পা দুটি চাপিয়া ধরিয়া বলিল-শরৎ বাবু
একবার দেখে আসুন তিনি বাড়ীতে গেছেন কিনা? আর কিছু
আপনাকে করতে হবে না—শুধু এইটুকু আমাকে বলুন—তিনি

শেষের দাবী
কোথায়-বাড়ীতে গেছেন কিনা?—বলিতে বলিতে সবিতা শরতের
পায়ের উপর মুখ রাখিয়া কাঁদিয়া ফেলিল ।
সবিতাকে হাত ধরিয়া তুলিতে তুলিতে শরৎ বলিল-আঃ, তাতে
আর কঁদিবার কি আছে ! সে বাড়ী যাবে না দেখোনিক বাদে
এইখানেই আসবে। এখানকার রস পেলে কি কেউ আর বাড়ী যায়
যেতে পারে!
সবিতা বলিল—না, শরৎবাবু আপনি তাকে জানেন না—তিনি কখন
আর এখানে আসবেন না দয়া করে একবার যা শরৎবাবু—আমি
ভিক্ষা চাইছি—যা যা
শরৎ বলিল—এই ঘুরে এলাম-দেখ দেখি অতখানি পথ এখন
যাওয়া—পেটে কিছু নেই।
শরতের হাত দুটি চাপিয়া ধরিয়া তাহার মুখের উপর করুণ দৃষ্টি
ফেলিয়) সবিতা বলিল-জানি আপনার কষ্ট হবে—তবু আপনার
কাছে ভিক্ষা—শুধু একবার জেনে আসুন তিনি বাড়ীতে আছেন
কিনা? ট্যাক্সিতে যাবেন-ট্যাক্সিতে আসবেন—
সবিতার এত কাকুতি মিনতিতে বুঝিবা শরতের প্রাণে একটু করুণার
উদ্রেক হইল-তাই তাহার নিকট হইতে পাঁচ টাকার নোেটখানি লইয়া
শরৎ প্রস্থান করিল।
অন্ধঘণ্ট। পরে শরৎ যখন ফিরিয়া আসিল সবিতা তখনও
দরজার গােড়ায় বসিয়া। শরতের বিরক্তি সুচক গম্ভীর মুখ দেখিয়া,
সবিত কাছে আসিয়া বলিল বলুন তিনি বাড়ীতে আছেন ত—
শরৎ সবিতার দিকে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল-এত বড়

শেষের দাবী
আস্পর্দা বেটার—বলে কিনা আমার চৌকাট থেকে বেরিয়ে যান
এক্ষুনি, আর কখনাে এ মুখখা আসবেন না -
-আচ্ছা দাড়াও বেটা তেজ চন্দ্র! তােমার এ অপমানের প্রতিশােধ
যদি নিতে না পারি—তবে আমার
সবিতার উদ্দেশ্য অসীম বাড়ীতে গিয়াছে কি না জানিয়া লওয়া।
চকিতে তাহার প্রাণের মধ্যে কিসের এক তুফান খেলিয়া গেল।
অসীম বাড়ীতে গিয়াছে—শুধু এইটুকু জানার উপরেই তাহার কর্মের
ফলাফল। তাই শরতের কথা শেষ না হইতে দিয়া বলিল—তিনি
ততা এখানে নেই—আর চেঁচিয়ে কি করবেন বলুন!—সময় এলে
অপিনিও হয়ত আর এক জনকে ঐ রকম বলবেন -বলিয়া, উত্তরের
প্রতিক্ষা না করিয়া নিজের ঘরের দিকে চলিয়া গেল।
শরৎ মনে মনে গােমরাইতে গােমরাইতে, নিজের নির্দিষ্ট কোটরে
প্রবেশ করিল।
১
পরের দিন সকাল-অসীম মীলাকে কোলে করিয়া উদ্যানে
বেড়াইতেছেমীরাও পাশে পাশে চলিতেছে।
দেখছে গাছগুলাের কি অবস্থা—তারাও কোনটা মরেছে, কোনটা
শুকিয়ে ঝরে পড়ছে—বাগানের কি ঐ হয়েছে—কেন বলত।

শেষের দাবী ১৬০ তাহার পর মুখের কাছে মুখ আনিয়া বলিল—আমি বলব? তােমার অভাবে—তাদের দয়িত কিনা তুমি—তাই!—এইবার বুঝেছ? বাঁ হাতে মীলাকে বুকের উপর বেষ্টন করিয়া, ডান হাতে মীরাকে বুকের কাছে টানিয়া অসীম বলিল-ও, তাই বুঝি তুমি এত শুকিয়ে গেছ মীরা! বেশ তো, এইবার তোমাদের সকলের দয়িত এসেছে =আবার বাগানের শাখা প্রশাখা, লতাপাতার সঙ্গে-তোমারও সেই আগের স্বাস্থ্য, মন সবকিছু জাগিয়ে আমার হৃদয়ে ঢেলে দাও- এমন সময় ঝি ডাকিল-মা কে এসেছে- মীরা তাড়াতাড়ি স্বামীর বুক হইতে মাথা সরাইয়া লইয়া বলিল - দাড়াও আমি আসছি—বলিয়া দালানের দিকে আসিয়া দেখিল—সবিতার বি, যে দলিল ও চিঠি দিয়া অকস্মাৎ অসুহিত হইয়াছিল। আবার তাহাকে দেখিয়া নিজের অজ্ঞাতে বুকটি কাপিয়া উঠিল। মীরাকে নমস্কার করিয়া কাপড়ের তির হইতে একখানি খাম ও কাগজে মোড়। একটা বাশী তাহার হাতে দিয়া বলিল—দিদিমণি কাল রাতে এই চিঠিখানা আর বাটা দিয়ে বাল—সকালে যেন অসীমবাবুর বাড়ী এদুটি জিনিস নিয়ে আসি।আর আমাকে ঘরের সব জিনিষ দিয়ে বয়ে-এ গুলাে পুরণাে হয়েগেছে, তোকে দিলাম, তুই নিস, আমি আবার সব নুতন কিনব। তারপর সকালে উঠে দেখি দিদিমণি ঘরে নেই--অনেকক্ষণ বসে আপনাদের এ গুলো দিতে এলাম।

শেষের বী মীরা কোন কথার উত্তর দিল না--খামখানি ও বাঁশীটি হাতে লইয়া আবার উদ্যানে আসিল। মীলাকে ঘাসের উপর বসাইয়া দিয়া, অসীম তখন একটি গোলাপ গাছের পাশে আর একটা আধ শুকনাে পােকা খাওয়া গাছ—যাহার পাতা প্রায় সবই ঝরিয়া গিয়াছে—শুধু কঙ্কাল সার মূৰ্ত্তিটা লইয়া খাড়া হইয়া আছে তাহার অতীতের অস্তিত্বের প্রমাণ স্বরূপ—তাহা উপড়াইয়া ফেলিতেছিল!—আর ইহাকে প্রয়ােজন কি? ইহাত রূপ, রস, গন্ধের বাহিরে গিয়াছে ! সৌন্দর্য্যের পাশে অসৌন্দর্য্যের স্থিতিসতীর পাশে অসতীর স্থান—আবহাওয়াই দূষনীয় করিয়া তােলে-স্নান করিয়া দেয়। শুকনাে গাছটি এক পাশে ছুড়িয়া ফেলিয়া অসীম বলিল—কে এসেছিল মীরা?-তােমার হাতে ও কি-? দেখবে এস—বলিয়া মীরা খামখানি ছিড়িয়া ফেলিয়া চিঠিখানি বাহির করিল। অসীমও পাশে আসিয়া দাঁড়াইল—দুজনেই পড়িতে লাগিল- মীরা-ভাই চললাম—দংশনের আলা নিবারণ করতে—জানি না, কোথায়—কত দূরে, অথবা সেই পথে—যেখানে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে একেবারে চির নিদ্রা!' অসীম বাবুকে বলিস—তিনিই আমার এক, তিনিই আমার সব-আর, যে ঘৃণার বােঝা তিনি আমার মাথায় ফেলে এসেছেন—সেই আমার পাথেয়—তাইতে আমার জীবনকে ধন্য করেছে। তাঁর স্পর্শ পেয়ে আমার জীবনের ধারা অন্য পথে ঘুরে গেল-না পেলে হয়ত এ জীবনের খেলা-আরাে কত ভাবে-কোথায় খেলত-- কে জানে? তিনিই আমার চোখ খুলে পথ দেখিয়ে-মুক্তির নিশান

'শেষের
শেষের দাবী
১৬৬
উড়িয়ে দিলেন। তাকে শত নমস্কার ! তোকে আগের দিনের দাবীতে
ভালবাসা! মীর বিদায়, বিদায়, চির বিদায়।
সবিতা-
অপর পৃষ্ঠায় লেছিল :—অসীম বাবু আপনিই আমার গুৰু! আমার
এতদিনকার চোখের আঁধার কাটিয়ে দিয়ে—মুক্তির নিশান দেখিয়ে
দিলেন।—আপনাকে শত নমস্কার । মীরার ও আপনার হৃদয়ের নিভৃত
করে শুধু এই ধ্বনি বাজুক—‘অসীম-রা'—তারই সুরে পরস্পরে
বিভাের হয়ে থাকুন-আর কোন বাণী-কোন शा সেখানে না
যায়।-শেষ মুহূর্তে শুধু এটুকু দাবী। আমি চললাম—কোথায় জানি
না! যদি না পারি—চিরনিদ্রা ত আমার হাতে-ওঃ, সেতাে
মহাশান্তি!
-আর অসীমবাবু, বাঁশীর স্বরেই আপনাকে চিনিয়ে দিয়েছিল
তাতেই প্রাণের দাবী জাগিয়েছিল।কিন্তু অসীমবাবু, মন ত শেষে সে
দাবী মানল না—সে যে বিদ্রোহী হয়ে উঠল--তাকে সংযত করা
সাধ্যায়ত্ব হলো—তাই আপনার যা তা আপনাকেই দিলাম-এর নিন।
গুরুচির বিদায়।
সবিতা-
চিঠি শেষ হইলে উভয়েই উভয়ের দিকে তাকাইল—উভয়েরি
অজ্ঞাতে দুটি নিশ্বাস শূন্তে মিলাইয়া গেল।
গেল। কয়েক ফোটা অফ
মীরার চোখ দিয়া গড়াইয়া পড়িল।

১৬৭
শেষের দাবী
জানি, আমি তােমার-তুমি আমার—তবুও তার শেষের দাবী,
তাও ঐ বাণী --এর মাঝে মিশিয়ে আরাে জোর করে জীবনের শেষ ,
মুহূর্ত পর্যন্ত যাব—বলিয়া অসীম মীরাকে বুকের কাছে টানিয়া
তাহার অধরে নিজ অধর দিয়া স্বাক্ষর করিল ।
মীলা এতক্ষণ ঘাসের উপরে বসিয়া তাহার মিনি বিড়ালটির সহিত
খেলা করিতেছিল। হঠাৎ তাহাকে সবলে দু’হাতে চাপিয়া ধরিয়া খিল
খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল—

No text on this page.

শরদাঁত - মতামত - হাইকোর্টের বিচারপতি মাননীয় স্যার মন্মথনাথ মুখােপাধ্যায় কে,টি,-উপন্যাস হিসাবে পুস্তকখানি ভালই হইয়াছে । গল্পটি সহজবােধ্য অথচ মনােহারী—ভাষা সুন্দর—বর্ণনা চাতুর্যেরও যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। অচিরে আধুনিক ঔপন্যাসিকগণের মধ্যে উচ্চস্থান অধিকার করিবেন, ইহাতে আমার সন্দেহ নাই। * রায় বাহাদুর জলধর সেন—“শেষের দাবী’ পড়লাম। আমার বেশ লাগল। ভাষার কসরৎ নেই, অকারণ পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা নেই, কোন গভীর তত্ত্বের গম্ভীর গবেষণা নেই, একেবারে সােজা করে আখ্যান ভাগ বলা হয়েছে । এই জন্য বইখানি আমার কাছে ভাল লেগেছে।

ডাঃ নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত এম,এ,ডি,এল---“শেষের দাবী’ বইখানি পড়িয়া সুখী হইলাম। কল্পনা কুশলতা আছে, ভাষায় দক্ষতা আছে, তাই গল্পটি মনেবম ও সুখপাঠ্য হইয়াছে এই উপাখ্যানে সে কৌতুহল উদ্রেক ও ৰক্ষা কনিয়াছেন তাহা শক্তির পরিচায়ক। অনুরূপা দেবী—তােমার বইখানি পড়ে বেশ ভালই লেগেছে। সব দিক দিয়েই শক্তির পরিচয় যথেষ্টই পেলুম। শ্রীপ্রভাবতী দেবী সরস্বতী—বইখানি বেশ ভালই বেশ ভালই হইয়াছে পাঠকের মনে শেষ পর্যন্ত বেশ একটু আগ্রহ জাগাইয়া রাখে, এবং শেষকালে ছাপ রাখিয়া যায়। এ কৃতিত্ব লেখকের পক্ষে বড় কম নয়। Advance-We have derived immense pleasure by going through the book in question. The pen of the author has flown throughout with remarkable smoothness, and we would like to read similar literatures all the more. Amrita Bazar Patrika - The author...seems to have a clever knack of depicting to some exteut various charactors which are frequently seen in our society. His simple and plain . method of describing the developement of events, would, we are sure, be appreciated by lovers of fiction. He will make his mark as ; rriter of fiction. ভয়দুত-সত্যিকারের সমাজ ও সংসারের দাবী মিটাইবার মত উপাদান ইহার পাতায় পাতায় ছত্রে ছত্রে আছে একথা অত্যন্ত সত্য। সমাজ-লাতি। সবিতার চরিত্রাঙ্কন নিত্যহরি বাবুর সুন্দর সৃষ্টি। ভাষা বেশ জোরালাে, বর্ণনা রচনা নৈপুণ্যও প্রশংসনীয়। অধিনায়কলে --লেখকের এই নবীন সৃষ্টির মধ্যে বাস্তবিকই অনেক নবীনত্ব আছে, যার মাধুৰ্য আমাদের মন্ত্রের মত মুগ্ধ করতে এতটুকু অসক্ষম হয় নি।

No text on this page.

No text on this page.

Shesher Dabi

Author
Bhattacharya, Nityahari
Title
Shesher Dabi
File name
Shesher Dabi
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2009/07/15
Publisher
Barendra Library, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
179
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Shesher Dabi - Story
DLI number
551586
Barcode
4990010021149.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Y34KQkhy7Am
Download PDF

Shesher Dabi