Bally Sadharan Granthagar
Indu
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আট আনা সংস্করণ
[ ৩য় গ্রন্থ]
নবকৃষ্ণ নােম প্রণীত
नावमा
* 112
;
কত
৭৮২ নং হারিসন রােড, কলিকাতা
ফান, ১৩
প্রকাশক
শ্রীসতীপতি ভট্টাচার্য্য
অন্নদ। বুক-ষ্টল
৭৮২ নং হারিসন রোড,
কলিকাতা।
Printed by P. Chakraberty, Manager,
AT THE SHAHITYA SANGHA PRESS,
62-2-1, Beadon Street, Calcutta
উপহাৰ
শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ সিংহ
সুহৃরে--
ভাই না,
তুমি আগ্ৰহ করিয়া আমার বইগুলি ছাপাইয়াছিলে বলিয়া
আমি সাহিত্য-সেবায় যে উৎসাহ পাইয়াছি, তাহারই স্মৃতিচিহ্ন
স্বরূপ এই বইখানি তােমার করে অর্পণ করিলাম।
শ্রীনবকৃষ্ণ ঘােষ।
ভূমিকা
আঠার বৎসর পূর্বে, ইং ৯৯ সালের প্রয়াস পত্রে,
আনস-পরিণয়” নামে একটা ছােট গল্প” লিখিয়াছিলাম ।
সেই গল্পটীর আখ্যানবস্তু অবলম্বনে এই উপন্যাসখানি
রচিত হইল।
১৮ নং কালিদাস সিংহ লেন,
কলিকাতা,
মা, ১০২৩ সাল।
শ্রীনবকৃষ্ণ ঘােষ
উপহারষ্টা
এই গ্রন্থখানি
আমার
দিলাম।
তারিখ
৪
সন
No text on this page.
প্রকাশকের নিবেদন
।
শ্রীনারায়ণের কৃপায় আট আনা সংস্করণের ৩য় গ্রন্থ
“ই” প্রকাশিত হইল। সুলভে , সৎসাহিত্যের প্রচারে-
দ্দেশ্যে—ক্ষুদ্রশক্তি আমরা এই দুরূহ কার্ষে হস্তক্ষেপ করিয়া-
ছিলাম, তখন বুঝিতে পারি নাই আমরা ইহাতে সফলকাম
হইব কিনা। এখন নারায়ণের কৃপা ও সাহিত্য-সুহৃদের
স্নেহ দৃষ্টি এতদুভয়ই আমাদের এই সিরিজের কবচ স্বরূপ
হইয়াছে।
কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেছি যে, যখন আমরা
কাগজের মহার্ঘতার জন্য ইতি-কর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়া
ছিলাম—এই সিরিজ’ আর প্রকাশ করিব কিনা-বুঝিতে
পারিতেছিলাম না, তখন সাহিত্যের একনিষ্ঠসাধক, সুপ্রসিদ্ধ
‘গল্পলহরী” সম্পাদক, এদ্ধেয় সুহৃদর ঐযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু
মহাশয় স্বতঃপ্রণােদিত হইয়া আমাদিগকে উৎসাহিত করিয়া
পুনরায় এই সিরিজ’ প্রকাশে প্রবর্তিত করিয়াছেন; অধিক
কি এই ‘সিরিজে’র ২য় গ্রন্থ “বিদাদা”, যাহা তিনি নিজেই
প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহা তিনি সম্পূর্ণরূপে
স্বার্থত্যাগ করিয়া আমাদের এই সিরিজের অন্তর্ভুক্ত করিয়া
t • ] দেন। র নিকট হইতে এইরূপ উৎসাহ না পাইলে আমরা কপুর কৃতকাৰ্য্য হইতাম বলিতে পারি না। পরিশেষে সাহিত্যানুরাগি-মহােদয়গণের নিকট সানুনয় প্রার্থনা এই যে, উহারা যেন অনুগ্রহ করিয়া এই সিরিজের গ্রাহক হইয়া বঙ্গ-সাহিত্যের বৃদ্ধি সাধন করেন। কাহাকেও অগ্রিম মূল্য দিতে হইবে না, কেবলমাত্র পত্র লিখিয়' গ্রাহক হইবেন। যখন যেখানি, প্রকাশিত হইবে আমর তখনই তাহা ভিঃ পিঃ ডাকে পাঠাইব। এই সংস্করণের ৪থ গ্রন্থ জনপ্রিয় সুলেখক শ্রী যুক্ত যতীন্দ্রনাথ পাল মহাশয়ের মনন- মুগ্ধকর উপন্যাস “সমাজ-বিপ্লব” যন্ত্রস্থ বলিয়া প্রচার করিয়াছিলাম, কিন্তু বিশেষ কারণ বশতঃ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত পতিমােহন ঘােষ মহাশয়ের অতুলনীয় উপন্যাস “স্বর্ণ-মরু” ৪র্থ গ্রন্থ ও যতীন্দ্রবাবুর সমাজ-প্লব” ৫ম গ্রন্থ বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। “স্বর্ণ-মরু” চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহেই প্রকাশিত হইবে। “সমাজ-বিপ্লব” বৈশাখের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত হইবে। , দোল পুর্ণিমা, ১৩২৩ সাল
No text on this page.
BL.
*
ইন্দু ও অজিত ।
Manasi PRESS, CALAUTTA.
প্রথম পরিচ্ছেদ
এ, বি, পাশ করিয়া অজিত কুমার প্রথমে মনে করিয়াছিল
সে তাহাদের নিজগ্রাম দুর্গাপুরেই ডাক্তারী করিবে।
তাহার গুণের পক্ষপাতী আত্মীয় বন্ধুগণ সকলেই তাহাকে
পরামর্শ দিল, কলিকাতায় গিয়া প্রাকৃটিস করিলে তাহার সুযশ :
হইবে—সে তাহার বিদ্যাবুদ্ধির যােগ্য আদর পাইবে। অগত্যা
অজিতের জননী শরৎসুন্দরী তাহার একমাত্র পুত্র অজিতকে,
তাহার ভাবী সুনামের কামনায় কলিকাতায় থাকিয়া ডাক্তারী
ব্যবসায় অবলম্বন করিতে অনুমতি দিলেন ; নতুবা
তাঁহার ইচ্ছা
ছিল না যে অর্থোপার্জনের জন্য অজিত পৈত্রিক ভিটা দাড়িয়া
সহরে গিয়া বাস করে। অজিতের পিতা স্বর্গীয় শিবনারায়ণ
মুখখাপাধ্যায় যে জমিদারী রাখিয়া গিয়াছেন তাহার বাৎসরিক
আয় দশ হাজার টাকা হইবে। সুতরাং অর্থোপার্জনের জন্য
অজিতের প্রবাসে থাকিবার কোনও প্রয়ােজনই ছিল না।
ইন্দু মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের। দুর্গাপুরের বনিয়াদি জমিলার-তাদের দুই বিঘা ভদ্রাসন—বৃহৎ পরিবার। কালবশে পৃথগান্ন হইলেও পুরুষানুক্রমিক দোল-দুর্গোৎসবাদি ক্রিয়াকলাপ, এজমালী দেবােত্তর সম্পত্তির আয় হইতে এখনও একত্রেই অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। সেইজন্য বহিব্বাটী ও ঠাকুর দালান পৃথক হয় নাই। বিষয়াদি ভাগ হইবার সময় অজিতের স্বর্গীয় পিতা, পৈত্রিক বিগ্রহ বাধাকান্তর নিত্য সবার ভার একাই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। সেই বিগ্রহের সেবা ত্যাগ করিয়া যাইতে পারিবেন না বলিয়াই শরৎসুন্দরী অজিতের কলিকাতায় গিয়া ডাক্তারী করিবার প্রস্তাবে প্রথমে আপত্তি করিয়াছিলেন। অবশেষে অজিত প্রতি সপ্তাহেই দেশে আসিতে পারবে কলিকাতা হইতে দুর্গাপুর দুই ঘণ্টার রেলের পথ—এইরূপ বুঝাইলে তিনি শেষে সম্মতি দিলেন। শরৎসুন্দরীর এক জ্ঞাতিভ্রাতা-বিপ্রদাস-সপরিবারে কলি- কাতায় বসা করিয়া থাকিত। বিপ্রদাস পােষ্ট অফিসে সামান্য বেতন-শাইত। বিপ্রদাসের পরিবারের মধ্যে তাহার স্ত্রী সুরমা ও একটী পঞ্চম বর্ষীয়া কন্যা-নীলিম।। শরৎসুন্দরী ভাবিলেন, বিপ্রদাসকে সপরিবারে অজিতের বাসায় রাখিলে, অজিতও যত্নে থাকিবে, বিপ্রদাসেরও বাপা খরচ বাঁচিয়া যাইবে। সেই বন্দোবস্তই হইল। অজিত কলিকাতায় আসিয়া বাদুড় বাগানে ।
প্রথম পরিচ্ছেদ সুকিয়া স্ত্রীটের নিকটেই—একটি গলির মধ্যে বাড়ী ভাড়া করিল। ঐ বাড়ীতে পূৰ্বে ছাত্রদের মেস ছিল। স্কুলে ও কলেজে পড়িবার সময় অজিত পাঁচ বৎসরের অধিককাল ঐ বাড়ীতে বাস করিয়াছিল। মধ্যে প্রায় সাত বৎসর সেই বাড়ীতে জনৈক ভদ্রলােক অধিক ভাড়া দিয়! সপরিবারে বাস করিতেন বলিয়া সেই মে স্থানান্তরিত হয় এবং মেডিকেল কলেজে পাঠ করিবার সময় অজিতকে বহুবাজারে অন্য বাসায় থাকিতে হয়। অজিত কিন্তু বাদুড় বাগানের সেই বাড়ীটির ও নিভৃত পল্লীর প্রতি মমতা ভুলিতে পারে নাই। ডাক্তারী করিতে আসিয়া সেই বাড়ীটি খালি পাইয়া অজিত সেই বাড়ীই ভাড়া করিল এব’ নূতন গাড়ী ঘােড়া, দাস দাসী, পাচক ব্রাহ্মণ রাখিয়া এবং তাহার বংশ-মৰ্য্যাদার ও ডাক্তারের সম্ভ্রমের উপযােগী টেবিল চেয়ারাদি আসবাবে সুসজ্জিত করিয়া ডাক্তারী ব্যবসায় আরম্ভ করিল। বিপ্রদাস সপরিবারে আসিয়া তাহার অভিভাবক স্থানীয় হইয়া রহিল। সেই বাটীতে আসিবার মাসেককাল পরে একদিন 'অজিত তাহার রােগী দেখিবার ক্ষুদ্র কক্ষে বসিয়া খবরের কাগজ দেখিতেছে, এমন সময় হঠাৎ একুট কেনেরী পক্ষা রাস্তার ধারের মুক্ত বাতায়ন দিয়া সেই গিহে প্রবেশ করিয়া কড়ি কাঠের কাছে ঝটপট, করিতে লাগিল এবং সেই সঙ্গে সম্মুখের ইন্দু ক্ষুদ্র এক তলা বাড়ীর জানালায় দাড়াইয়। একটী বালিক। শূন্য পিঞ্জর হস্তে “ঐ উড়ে গেল !” বলিয়া কাতর : অনুচ্চধ্বনি করিয়া উঠিল। অজিত সেই বালিকার মুখের ব্যাকুলতা লক্ষ্য করিয়া ব্যাপার কি তাহা বুঝিতে পারি এবং চকিতের মধ্যে তাহার সেই ক্ষুদ্র কক্ষের খড়খড়ির ও দ্বারের কপাট বন্ধ করিয়া বহুকষ্টে পাখীটিকে ধরিল। পক্ষীটিকে লইয়া বাটার বাহিরে আসিয়া অজিত দেখিল বালিকাটী তখনও উৎকণ্ঠিতভাবে জানালার কাছে খাচা হাতে দাড়াইয়া আছে। অজিত পক্ষীটি লইয়া তাহার দিকে অগ্রসর হইতেই বালিকার মুখে কৃতজ্ঞতা জাজ্বল্যমান হইয়া উঠিল । অজিত নিকটে যাইতেই কিন্তু বালিকা লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়। জানালার নিকট হইতে সরিয়া গেল। অজিতও কিছু সঙ্কুচিত হইয়াছিল ; সে বালিকা মনে করিয়া নিকটে আসিয়াছিল, কিন্তু নিকটদৃষ্টিতে দেখিল বালিকা নহে যৌবন-প্রীময়ী নারী-মূর্তি। অজিত কিয়ৎক্ষণ সেই জানালার কাছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত দখান থাকিয়া ধীরে ধীরে সেই বাড়ীর ঘরে গিয়া কড়া নাড়িল। সেই শব্দ শুনিয়া একটি প্রৌঢ়া বিধবা স্ত্রীলোক ক্ষুদ্র জানালার ভিতর হইতে তাহাকে দেখিলেন এবং পরক্ষণেই ব্যগ্রভাবে দ্বার খুলিয়া দিয়া ফুললেন “এই যে—তুমি পাখীটিকে ধরেছ! বাঁচালে বাবা, নইলে ইন্দু যে কি করত তা বলতে
প্রথম পরিচ্ছেদ
পারি।” অজিত প্রৌঢ়াকে চিনিতে পারিয়া বলিল “আপনারাই
তা হলে এখনাে এ বাড়ীতে আছেন ? ইন্দু কি আপনার
'সেই ছােট মেয়েটি না কি? যে আগে আমাদের বাসায় শিউলী
ফুল কুড়তে যেত ?”
প্রৌঢ়া বলিলেন, “হঁ বাবা, সে-ই ইন্দু। আয় না ইনু
পাখীটা নিয়ে যা।”
ইনু দ্বারের অন্তরাল হইতে হন্তু প্রসারিত করিয়া চাটি
অজিতের সম্মুখে রাখিয়া দিল। অজিত খাঁচার মধ্যে পাখীটি
প্রবেশ করাইয়া দিয়া খাচার দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।
প্রৌঢ়া কন্যাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন “লজ্জা কি ? ছেলে
বেল। ওঁদের বাসায় গিয়ে কত উপদ্রব করতিস, নমস্কার কর।”
ইন্দু ধীরে ধীরে ব্রীড়াবনত বদনে দ্বারের কাছে আসিয়া
অজিতকে ভূমিষ্ঠ হইয়া নমস্কার করিল।
অজিত ৰলিল “থাক থাক্; ইন্দু এত বড় হয়েছে! আমি
জানালার কাছে গিয়ে চিন্তেই পারিনি।”
প্রৌঢ়া উত্তর দিলেন “মেয়ের বাড় কলাগাছের বাড়, বাবা!
আর তোমরা এ বাসা ছেড়ে গিয়েছিলে সেও সাত আট
বছর হতে চলল। তুমিই আবার ডাক্তার হয়ে ঐ বাড়ীতে
এসেছ শুনে খুব খুশী হয়েছি/বাবা! আমাদের আপদে
বিপদে একটা ভরসা হল।”
ইন্দু
অজিত কিছু অপ্রতিভ হইয়া প্রৌঢ়াকে প্রণাম করিয়া
কহিল “এখানে এসেই আপনাদের খবর নেওয়া অার
উচিত ছিল। কিন্তু আপনারাই যে এখনাে এবাড়ীতে আছেন
' জানতুম না বলেই খবর নিইনি। সে জন্যে কিছু মনে
করবেন না।”
প্রৌঢ়। “বেঁচে থাক, রাজা হও। তাতে আর হয়েছে কি,
বাবা ? কাকাতা সহরের ভাড়া বাড়ীতে আজ একজন আছে,
ক। আর একজন অাসছে। আমরা এখানে দশ বার বছর
অছি বলেই পাড়াটাকে আমাদের আপনার বলে মনে করি।”
ইনুর সীমান্তে সির রেখা নাই দেখিয়া অজিত জিজ্ঞাসা
করিল “ইন্দুর বিয়ের সম্বন্ধ টম্বন্ধ আসছে কি?”
প্রৌঢ়া সেই প্রশ্নে প্রথমে যেন একটু চকিত হইয়া
পরে ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন “না বাবা, তেমন ভাল সম্বন্ধ
আসছে কই। আমাদের মত গরীবের ঘরে ত মনের মত
সম্বন্ধ হজে জোঠে না। আর আমাদের কুলীন বামুনের
ঘয়ে মেয়েদের বড় হয়েই বিয়ে হয়।”
অজিত ইতঃপূৰ্ব্বে ইন্দু যে বয়স্থা হইয়াছে সেইরূপ ইঙ্গিত
করাতে অপ্রতিভ হইয়া বলিল—“না, সে কথা বলছি না,-ইন
এমন কি বড় হয়েছে- নয়।”
প্রৌঢ়া। বড় হয়েছে বই কি বাবা।
।
প্রথম পরিচ্ছেদ
অদ্ভুক্ত। তা কি করবেন, আপনাদের আবার কুনের
• হাঙ্গাম; আছে ।
প্রৌঢ়।। না বাব। ভাল ছেলে পেলে ওসব কুলটুল
বাছব না। কুল বাছতে গিয়ে কি মেয়েটাকে জলে ফেলে
দেব ? তা পারব না।
অজ। হাত ঠিক। আচ্ছা ত! হলে এখন অদি।
অনাদের বাড়াতে মামীম। একলা থাকেন, দুপুর বো ৩
গলিতে লোকজন বেশী চলে না। আপনাদের কথাবার্ত হতে
পারবে—আমি মমি মাকে বলে দেব অখন।
এই কথা বলয় অর্জিত নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করিল।
দ্বিতীষ্ম পরিচ্ছেদ
ইন্দুর মা’র সহিত যেদিন অজিতের উক্তরূপ কথোপকথন
হইল, সেই দিনই অপরাহুকালে ছাদে দাঁড়াইয়া অজিতের
মাতুলানী ইন্দুর মার সহিত আলাপ করিলেন। তৎপরদিন ইন্দুর
মা, মধ্যাহ্ কালে আহারাদির পর অজিতদের বাসায় বেড়াইতে
গিয়া, অজিতের মাতুলানীর সহিত সেই আলাপ ঘনিষ্টতায়
পরিণত করিলেন। ইন্দুদের ক্ষুদ্র একতলা বাড়ীর ছাদ অজিতদের
বাড়ীর ছাদ হইতে এবং অজিতের দ্বিতলের শয়ন কক্ষের জানালা
হইতে সমস্তই দেখা যাইত এবং অজিতের বাহিরে বসিবার
কক্ষের জানালার সম্মুখেই ইন্দুদের বাড়ীর ভিতরের ঘরের একটি
জানালা থাকাতে, দিবসের মধ্যে একাধিকবার ই অজিতের
নয়নপথে পড়িত। প্রথমে প্রথমে অজিতের চক্ষে পড়িলে ইন্দু
সঙ্কুচিতা হইত, কিন্তু তাহাতে নিজেই লজ্জিত হইয়া ক্রমে সে
সঙ্কোচভাব ত্যাগ করিল এবং সহজ ভাবেই অজিতের সম্মুখে
বাহির হইত। ক্রমে সেই দো সাক্ষাতে অজিত, এরূপ অভ্যস্ত
হইয়া গেল যে, ইন্দুদের ছাদেরউপর টবের গাছে জল দিবার
সময় অথবা জানালার সম্মুখে পাখীর খাচা ঝুলাইবার সময়
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ইন্দুকে যেদিন অজিত দেখিতে না পাইত সেদিন যেন অজিতের • কি একটা অশান্তি বােধ হইত। ইন্দুদের বাড়ীতে পুরুষ মানুষের মধ্যে একজন মাত্র বৃদ্ধ লােক। ইন্দুর মা তাঁহাকে কাক বলিতেন এবং পাড়ার লােকেরা তাঁহাকে হরিশ ঠাকুর বলিত। হরিশ ঠাকুর ইন্দুদের দোকান বাজার করিত এবং অবসর কালে দ্বারে বসিয়া একটি ডাব। হুকায় তামাকু সেবন করিতে করিতে পল্লীবাসী বালক বৃদ্ধ যুবা যে সম্মুখ দিয়া যাইত তাহারই কুশল জিজ্ঞাসা করিত। হরিশ ঠাকুর মধ্যে মধ্যে অজিতের কাছে আসিয়া বসিত এবং গল্প করিত। তাহার নিকট অজিত কথায় কথায়—বিনা জিজ্ঞাসায়—ইন্দুদের পরিচয় পাইল। ইন্দুর যখন দুই বৎসর বয়স সেই সময়ে ইন্দুর মা—সাবিত্রী—বিধবা হইয়া পিতৃগৃহে আসিয়া বাস করেন। সাবিত্রীর পিত্রালয় বিল্বগ্রামে। পিতার মৃত্যুর পর সাবিত্রী কলিকাতায় আসিয়া বাস করিতেছেন। তঁাহার কিছু সঞ্চিত অর্থ আছে তাহাই সুদে খাটাইয়া, এবং পশমের টুপি, গলাবন্ধ, মােজা, পুথির জুতা, রেশমের ও সুতার লেস, চিকণ, কাজের রুমাল প্রভৃতি প্রস্তুত করিয়া সাবিত্রী সংসারের ব্যয় নির্বাহ করিতেন। ইন্দুকে, কিন্তু তিনি ধনবান লােকের কন্যার মত স্কুলে ও বাড়ীতে উৎকৃষ্ট শিক্ষা দিয়াছেন। ইন্দু ব্যতীত সাবিত্রীর পতিকুলে, অথবা পিতৃকুলে আর কেহ
ইন্দু
আপনার জন নাই। হরিশ ঠাকুর ও হার নিকটাত্মীয় হন।
তাহাদের এক গ্রামে বাস ছিল। সাবিভ্রীর পিতা হরিশ ঠাকুরকে
কনিষ্ঠ সহােদরের ন্যায় স্নেহ করিতেন এবং নিরাশ্রয় বলিয়া
সপরিবারভুক্ত করিয়া লইয়াছিলেন। সাবিত্রীও হরিশ ঠাকুরকে
আপনার পিতৃব্যের মতনই যত্ন করেন, হরিশ ঠাকুরেরও
সাবিত্রী ও ইন্দু ব্যতীত আপনার বলিতে ত্রিসংসারে আর
কেহ নাই। সাবিত্রী ও ইন্দুর সুখ্যাতি হরিশ ঠাকুরের মূখে পরিত
। অজিতের নিকট আসিয়। হরিশ ঠাকুর যেদিন সাবিত্রীর
বুদ্ধি বিবেচনার ও ইন্দুর শিল্পনৈপুণ্যের কথা পাড়িত সে দিন
সেকথা যেন আর ফুরাইত না, এবং অজিতেরও সে কথা শুনিতে
কিছুমাত্র আলস্য বােধ হইত না। সেই সুত্রে উভয়ের মধ্যে
একটা স্নেহ-ভালবাসার বন্ধন আসিয়া পড়িল।
অজিত প্ৰতাহ সকালে ও বৈকালে গাড়ী করিয়া রােগী
দেখিতে বাহির হইত, অথবা সে প্রয়ােজন না থাকিলেও,
বিষয়-বুদ্ধিমান বন্ধুবর্গের পরামর্শে রােগী দেখিবার ব্যপদেশে
একঝর করিয়া গাড়ির সম্মুখের বসিবার আসনে ‘এ, কে,
মুখার্জি এম বি, লেখা একটি বিলাতী চামড়ার ব্যাগ রাখিয়া
কলিকাতার বড় রাস্তা প্রদক্ষিণ করিয়া আসিত। গাড়ীতে
উঠিবার সময় একবার হরিশ থাকার কাছে গিয়া তাহাদের
কুশল জিজ্ঞাসা করা অজিতের নিত্য নৈমিত্তিক অভ্যাসের
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
মধ্যে দাড়াইয়াছিল। একদিন প্রাতে বাহিরে যাইবার সময়
ইরিশ ঠাকুরকে বাড়ীর দ্বারে বসিয়া থাকিতে না দেখিয়া
অজিত বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া ইন্দুদের দ্বারের নিকটে গিয়া
ডাকিল “চাটুৰ্য্যে মশায়, বাড়ী আছেন?”
তাহার গলা পাইয়া সাবিত্রী দরজার পার্শ্বে আসিয়া
বলিলেন, “কাকার পায়ে কাল হোঁচট, লেগে পা টা কি রকম
মুচড়ে গেছে—তাই অজি আর উঠতে পারেন নি।”
অজিত। তাই বটে কাল বিকেল থেকেই তাকে দেখতে
পাইনি। বেশী লাগেনি ত ? চলুন না একবার দেখে আসি?
সাবিত্রী। এস বাবা-লেগেছে বেশীই বােধ হয়।
বাটির ভিতরের সম্মুখের ঘরের ঘের। দালানেই এক
খানি তক্তপোষের উপর হরিশ ঠাকুর শুইয়া ছিল। অজিতকে
দেখিয়াই সে বলিল “এস ভায়া, কাল রাত্তিরে ভারি যাতনা
হচ্ছিল। সাবিত্রীকে ধললাম্ তােমাকে ডেকে পাঠাতে
ওরা বল্লেন-”
সাবিত্রী বাধা দিয়া বলিলেন,-“চুণ হলুদ গরম করে দিয়ে
ছিলুম-মনে করেছিলুম তাতেই কমে যাবে।”
হরিশ সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া বলিল-“ ওঁর
বল্লেন তুমি ত আর টাকা নেব না—রাত্রিরে ডাকা কি ভাল
দেখায় ?”
ইন্দু
সাবিত্রী। না বাবা সে জন্যে নয়—সামান্য অসুখ করলেই ত
আর আমরা ডাক্তার ডাকি না।
অজিত অনুযােগের স্বরে বলিল—“তা না হোক—আমি
যখন কাছে রয়েছি?
সাবিত্রী। তা বটে বাব—তুমি ত আপনার লােকেরই মত,
আমাদের রোজ খোজ খবর নাও—তা কি আর জানি না। এখন
যাতে বুড়ো মানুষ শীগগির সেরে ওঠেন তাই করে বাবা।
অজিত হরিশের পায়ের গ্রন্থি পরীক্ষা করিয়া বলিল “না,
পাটা সামান্য মচকে গিয়ে ফুলে উঠেছে, আমি একটা লােশন
দিচ্ছি, সেইটে দিয়ে বেঁধে রাখলেই সেরে যাবে। আমি আবার
আসব অখন।”
যাতনা পরদিন কমিয়া গেল, কিন্তু ব্যথা কমিল না। অজিত
ব্যাণ্ডেজ বাঁধিয়া দিয়া গেল। হরিশ ঠাকুর দিনের মধ্যে দুইবার
তাহা খুলিয়া ফেলিতেন—নহিলে অশুচি, হইবে। ইন্দু আবার
তাহা বাঁধিয়া দিত। অজিত সে কথা শুনিয়া, প্রশংসমান দৃষ্টিতে
ইন্দুর বাঁধা ব্যাণ্ডেজ দেখিয়া বলিল, শাঁধা ঠিক হয়েছে-
একবার দুর থেকে দেখেই ইন্দু বেশ পরিষ্কার বেঁধেছে ত?”
হরিশঠাকুর বলিল, “দিদি আমার সব কাজই পরিস্কার
কোন কাজ কর্ঘ দুবার দেখাতে হা না।”
অজিতের চিকিৎসা এবং ইরশাষা সত্বেও হরিশঠাকুরের
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
পায়ের বেদনা সারিতে সপ্তাহ কাল লাগিল। সম্পূর্ণ
রূপে
আরােগ্য হইবার কয়েক দিন পরে হরিশঠাকুর একদিন অজিতকে
বলিল, “ভায়া, আমার বড় সাধ তোমাকে একদিন নিমন্ত্রণ করে
খাওয়াই, তা তুমি যদি গরিবদের বাড়ী,
অজিত। বলেন কি? বামুনকে ফলারের লােভ দেখালে
আর রক্ষে আছে! যে দিন বলবেন গিয়ে খেয়ে আসব—তা লুনি
টুচির হাঙ্গাম করবেন না, সকাল লাে দুটী ভাত খাইয়ে দেবেন,
আমার সকাল বেলা মানে দ্বিপ্রহর।
হরশ। তাই হবে ভয়া, তা হলে কালকেই কথা বইল,
কেমন ? বিপ্রদাস বাবুকেও বলতাম কিন্তু উনি যে সকালে কুঠী
যান, ওঁর কি সুবিধে হবে ?
অজিত। না নাম কি করে যাবেন ? আমিই যাবো;
সে জন্যে কিছু মনে করবেন না।
পর দিন হরিশঠাকুরের সহিত একত্রে ভােজনে বসিয়া অজিত
ব্যঞ্জনাদির বাটির শ্রেণী দেখিয়া বলিল—“এর মধ্যে এত বঁধলেন
কি করে?”
সাবিত্রী বলিলেন—“এক বাধিনী বাবা, আমি নিরমিয্যি
তরকারি গুলো বেঁধেছি, মাছের যা কিছু সবই ইনু বেঁধেছে।”
অজিত সমস্ত ব্যঞ্জনই কিছু ছুি অস্বাদ করিল, শেষেমিষ্টান্নের
রেকাবির দিকে চাহিয়া বলিল, “ও সৰ বার খেতে পারবাে না।”
ইন্দু
সাবিত্রী ব্যগ্র হইয়া বলিলেন, “সে কি কথা বাবা! ও সব ত
দোকানের কেনা নয় ; সন্দেশ, ক্ষীরের কদমা, চন্দ্রপুলী, মনােহরা
সবই ইন্দু ঘরে করেছে। একটু একটু খেয়ে দেখ বাবা।”
অজিত আর দ্বিরুক্তি না করিয়া প্রত্যেক মিষ্টান্ন হইতে
কিয়দংশ ভাঙ্গিয়া খাইয়া, একেবারে উঠিয়া পড়িল ।
তাহা দেখিয়া সাবিত্রী বলিয়া উঠিলেন, “ওকি হ’ল বাবা!
আর কিছু খেলে না,রান্নাবান্না কি রকম হয়েছে ? ছেলে
মানুষ বেঁধেছে।”
অজিত আচমন করিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিল, “হবে
অার কি-ছেলে মানুষ গিন্নিদের হারিয়ে দিয়েছে—কোনটাই ত
নিন্দের পেলুম না? সমস্ত জিনিষই ভাল হয়েছে।”
হরিশ ঠাকুর মহা প্রীত হইয়া বলিল “শুধু রান্নায় নয়-
নাতনি আমার শিল্পকাজও খুব ভাল জানে; কেমন ছবি
বুনেছে দেখেছ?” এই কথা বলিয়া অচিমন শেষ করিয়া হরিশ
ঠাকুর গৃহের মধ্য হইতে বুনিবার ফ্রেমে আঁটা মখমলের উপর
রেশমে বোনা একখানি ছবি আনিয়া অজিতের হস্তে দিল।
অজিত সেই সূচীকর্মের চিত্র দেখিয়া যথার্থই বিস্ময়ান্বিত
হইল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরক্তিম ফুলের গুচ্ছ ও পত্রবিশিষ্ট একটি
* উপর বসিয়া একটি কেনেরী পক্ষী একটি স্বর্ণা
পৰু কেনেন্নী বীজের পৰু শখের দিকে নুৰ দৃষ্টিতে চাহিয়া
-
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
আছে। পাখীটি ইন্দুর পােষ পাখীটির অবিকল প্রতিরূপ এবং
গুলি এরূপ সুন্দর ভাবে রংএর শেড মিলাইয়া বােনা
হইয়াছে যে পাখীটিকে ঘন কৃষ্ণবর্ণ মখমলের ভূমিতে যেন জীবন্ত
দেখাইতেছে এবং কেনেরীবীজের শীষটি ও গাছের ডালটি সত্য
বলিয়া ভ্রম হইতেছে। অজিতের মুখ হইতে প্রশংসাধ্বনি স্বতঃই
নিঃসৃত হইল, “চমৎকার! বেশ শিখেছে ত?”
হরিশ বলিল ‘ইনু যে মেমের কাছে শিখেছে, তিনিই
ওর কাজের কত সুখ্যাত করেন। আর সাবিত্রী নিজেও খুব
শিল্প কৰ্ম্ম জানেন, ধানের হার, আলপনা, কাগজের ফুলকাটা,
খয়েরের গহনা গড়া, কাপড়ের ফুলের মালা গাঁথা, আর তাল
ভাল খাবার দাবার তৈরী করার জন্যে আমাদের গ্রামে ওঁর খুব
নাম হয়েছিল।”
অজিত কহিল, “তা আর বুঝতে পারছি না! নৈলে সুধু
স্কুলে কি আর এমন শেখা হয়। আমার ইচ্ছে করছে ছবি
খানা নিয়ে গিয়ে পাঁচ জনকে দেখাই।”
হরিশ হাস্য-বিকশিত মুখে বলিল, “তবে কথাটা বলে ফেলি
ভায়া। ইন্দু যখন ছবি খানা বুনছিল, আমি বললাম অত যে
মেহনত করছ—ওর কি দাম উঠবে। ইন্দু বললে, “না দাদামণি,
এ ছবি বিক্রী করব না।” আমি বললাম, “তকে রুখরে
টাঙ্গাবে ?” ইক্ষু হাঁ কি না, সে কথার কোন উত্তরই দিলে না।
ইন্দু
আমি বললাম “তবে কি কারুকে দেবে নাকি ?” ই
বলে “কাকে অার দেব ?” আমি বললাম “কেন অজিত
বাবুকে দাওনা? যে পাখীর নকল করেছ সেটাত উনিই ধরে
দিয়েছিলেন ; আৰু ডাক্তার মানুষ—আপদে বিপদে উপকার
পাওয়া যেতে পারবে; কিছু মনে করেন ভায়, তখনও ত
তোমার সঙ্গে আলাপ হয় নি। তাতে উত্তর হলো “উনি এ
ছবি নিয়ে কি করবেন, কত ভাল ভাল ছবি কিনে এনেছেন ;
ঐ দেখুন না কত দামী, কি চমৎকার একখানা ছবি দেখ।
যাচ্ছে ; ঐ কথা বলে তোমার বাইরের ঘরের কোণে দাঁড়
করান মােটা গিল্টি করা ফেমে যে ছবিখানা আছে, সে
খানা দেখালে।”
অজিত হাসিয়া বলিল “ও! ঐ র্যাফেলের ম্যাড়ােনার
কাপিখানা ; ওসব মেকেঞ্জী লায়ালের নিলাম থেকে কিনে
এনেছি। ও ত দাম দিলেই পাওয়া যায়, কিন্তু এমন যত্ন
করে ছবি বুনে দেয় কে ? তাহলে আমি ছবিটা নিয়ে
সাবিত্রী বলিলেন, “সে ত আলাদের কথা। কিন্তু বাধানে
হলো না যে!”
‘জত বলিল বাধিয়ে। আমি নেবে অখন। আমার
একজন চেনা ফ্রেমওয়ালা নাই।”
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সাবিত্রী “তবে দে মা ইন্দু, ছবিটা কাঠামো থেকে খুলে দে ?” ইন্দু ছবি খানি খুলিয়া দিলে, অজিত তাহা লইয়া প্রস্থান করিল। সেই দিনই বৈকালে ছাদের ফুলগাছের টবে জল দিতে গিয়া ইন্দু দেখিল অজিতের শয়ন কক্ষের মুক্ত বাতায়নের সম্মুখের দেওয়ালে সুদৃশ্য ফ্রেমে বাঁধাইয়া তাহার কেনের পাখীর ছবিখানি ঝুলিতেছে। বগকক গে অজিতের ফুলগাছের পাখী পুধিবার, সাজ- সজ্জার প্রভৃতি নানা বিষয়ে সখ ছিল। কিন্তু কলিকাতার বাড়ীতে অসিবার পর সেই সব সখ নিবৃত্তি লাভ করে। ডাক্তারের সম্ভ্রম রক্ষার জন্যই সে তাহার বাসাবাটী ছবি, চেয়ার, টেবিল, আলমারী প্রভৃতি আবশ্যকীয় সরঞ্জামে সজ্জিত করিয়াছিল ; নতুবা তাহার সে সকল বিষয়ে যে বিশেষ কোনও আগ্রহ আছে তাহ। কেহ লক্ষ্য করে নাই। কৈশোর অতিক্রম করিবার পূর্বেই একটা নয় তাহার সদা প্রফুল্ল বদনে যেন একটা অকাল গান্তীয্য অনিয়। দেয়। অজিত যে বৎসর প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয়, সেই বৎসরই অজিতের মাতা শরৎসুন্দরী অজিতের নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও একজন স্থানীয় সম্ভ্রান্ত জমিদারের কন্যার সঙ্গে তাহার বিবাহ দেন এবং বিবাহের ছয় মাস পরেই সেই অষ্টমবর্ষীয়া নব বধুর বিচিকা রােগে মৃত্যু হয়। তৎপরে শরৎসুন্দরী তাহার পুণরায় বিবাহ দিবার উদ্যোগ
ইন্দু
করিয়াছিলেন, কিন্তু কিছুতেই অজি ত সম্মত হয় নাই। ৩াহার
জননীর পক্ষ লইয়া তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধুরা তাহাকে ঐ বিষয়ে
অনুরোধ করিলে সে বলিত অল্প বয়সে বিবাহ করিলেই নিজের
সংসার লইয়া বিব্রত হইয়া পড়িতে হয়, দেশের ও দশের
মঙ্গলের জন্য মানব জীবনের উচ্চতর কর্তব্য পালন করিবার
আর শক্তি থাকেনা। তর্ক করিলে, সে ছাড়িত না। শরৎসুন্দরীও
একবার পুত্রের অমতে তাহার বিবাহ দেওয়াতে যে দারুণ
অমঙ্গল ঘটে তাহা স্মরণ করিয়া পুনরায় পুলের প্রতিকূলে
দণ্ডায়মান হইয়। তাহার বিবাহ দিতে সাহস করেন নাই।
তিনি শেষে এই ভাবিয়া মনকে প্রবােধ দিয়াছিলেন যে যদি
অজিতকে সংসারী করা ভগবানের ইচ্ছা থাকে তাহা হইলে
তিনিই তাহাকে সুমতি দিবেন। কিন্তু অজিতের মনে তাহার
বাল্য ও কৈশােরের স্ফুর্তির অভাব, তাহার পাঠাভ্যাস ব্যতীত
অপর কোন বিষয়েই পূর্বের মত কোনও সখ নাই, লক্ষ্য করিয়া
তিনি ক্ষুব্ধ হইতেন।
ইন্দুদের বাটী হইতে আসিয়া সেই কেনেরী পীর ছবিখানি
এটাইবার পর হইতে হঠাৎ অজিতের মনে, তাহার বাল্য ও
কৈশােরের বহুদিন লুপ্ত ‘স যেন নবজীবন লাভ করিয়া সহসা
হইয়া উঠিল। সে মাণিকতলা হইতে ফরমাস দিয়া
প্রত করা বড় বড় টবে বেল জুই, গােলাপ গাছের সারি
১৮
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, তাহার শয়ন কক্ষের সম্মুখের ছাদে, আলিসার উপর' শ্রেণী দিয়া বসাইল; হগ, সাহেবের বাজার হইতে নানা জাতীয় ফার্ণ, ক্রোটন, পাম প্রভৃতি নানা দেশের বাহারি গাছ আনিয়া তাহার বাসার ক্ষুদ্র উঠানকে কুঞ্জবনে পরিণত করিল ; একজন মালী রাখিয়া তাহার সহযােগে অবসরকালে সেই গাছ গুলির পরিচৰ্য্যায় যত্নবান হইল। তাহার নিজের বেশ ভূষার বিবিধ পরিবর্তন ঘটিল এবং তাহার মনের আনন্দ নানা বিষয়ে প্রকট হইয়া উঠিল এবং সে তাহা আত্মীয় পরিজনের অন্তরেও সঞ্চারিত করিল। তাহার সেই অপূর্ব ফুর্তির ও জীবনের গতির পরিবর্তন লক্ষ্য করিয়া তাহার মাতুলানী সুরমা দুর্গাপুরে শরৎসুন্দরীকে পত্র লিখিলেন। শরৎ-সুন্দরী সে সংবাদে আনন্দিত হইলেন, কিন্তু কি কারণে অজিতের মনে সেই পরিবর্তন ঘটিল, নববসন্ত তিরােধানের এতদিন পরে, কেন যে অজিতের নীরস হৃদয়ত সহসা পত্র-পুষ্পে মুঞ্জরিয়া উঠিল, তাহার নীরস জীবনকুঞ্জ শত-পিক-কুহরিত, অযুত-ভ্রমর- ঝঙ্কত হইয়া উঠিল, তাহা সুরমা বা বিপ্রদাস বুঝিতে পারিল না, বােধ হয় অজিত নিজেও তাহার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে নাই। তৎকালে তাহার সে অবসরহিল না-সে তখন নিজের ভাবেই বিভাের।
তৃতীয়পরিচ্ছেদ
একদিন অজিত রােগী দেখিয়া আসিয়া গাড়ি হইতে
নামিতেছে এমন সময় দেখিল একজন বিধবা স্ত্রীলােক বাটী
ভিতর হইতে বাহির হইয়া গেল। অজিত উপরে গিয়!
তাহার মাতুলানী সুরমাকে জিজ্ঞাসা করিল, 'বাড়ীর ভেতর
থেকে কে ও স্ত্রীলোকটা বেরিয়ে গেল মামি মা?
সুরমা অজিতের প্রায় সমবয়স্ক, দুই এক বৎসরের বড়
হইতে পারেন।
সুরমা বলিল, “ও একজন ঘটক ঠাকরুণ।”
অজিত।' এখানে এসেছিল কেন?”
সুরমা। এখানে উনি আরো দু এক দিন এসেছিলেন,
প্রথম দিন এসেছিলেন, তােমার বিয়ের সম্বন্ধ করতে। ত’
তুমি ত আর এখন বিয়ে করবে না, তখন আর তােমার
সে সকল শুনে দরকার কি?
অজিত। তবু শুনি না, কেন এসেছিল ?
এসম। ওদের ইন্দুর একটা সম্বন্ধ আনতে বলেছিলুম,
তাই এসেছিলেন। তা ইন্দুর মার পছন্দ হলো না। ছেলেটা
; পরে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
সওদাগরী জফিসে ৪০ টাকা মাইনে পায়, শ্রীরামপুরে বাড়ী,
তা ইন্দুর মা বলেন ছেলেটি তেমন ভাল লেখা পড়া জানেন,
পাশ, টাস্ করেনি, ওখানে তিনি বিয়ে দেবেন না।
অজিত। তা ত ঠিকই বলেছেন—৪০ টাকা মাইনে
ছেলে পুলে হলে, সংসার গবে কি করে ?
সুরমা। তেমন কিছু দিতে ত পারবেন না ; ওর চেয়ে ভাল
সম্বন্ধ জুটবে কি করে?
অজিত। কেন? সবাই কি টাকাই খোজে, ভাল মেয়ে কি
কেউ চায় না ?
সুরম। মুখে অনেকে চায় বটে, কিন্তু কিন্তু কাজের বেল।
টাকাটাই বড় করে।
অজিত। সবাই তা নয় গো মাগী—এই আমিই যদি বিয়ে
করি ত, টাকা নেব কি মনে করেছ ?
সুরমা। তুমি! তােমার কথা ছেড়ে দাও—তােমার মত
ছেলেকে দশহাজার টাকা দিয়েও যে মেয়ে দেবে, সে জিতবে।
তা তুমি বিয়ে করতে রাজি হও কই ?
অজিত। যদিই হই ?
সুরমা। তাহলে আমরা এবার মাজার ঘরের মেয়ে আনব।
অজিত। সে ত একবার এনেছিলে—আবার কেন ?
রাজার ঘর টর ছেড়ে দিয়ে, খালি মেয়েটিকে আনলে হয় না ?
ইন্দু
সুরমা। তুমি আগে মন ঠিক করত—তারপর সে কথা
ভেবে দেখা যাবে।
অজিত। তা আর ভাবাভাবির দরকার কি মামী—এই
ওদের ইনুকে যদি আমি বিয়ে করতে চাই।
সুরমা। শােন কথা ! তুমি অমন গরিবের ঘরে বিয়ে করতে
যাবে কেন! একবার ঘটকদের বললেই কত ভাল ভাল সম্বন্ধ
এনে ফেলবে!
অজিত,। ও সব কথা ছেড়ে দাও-ইন্দুকে তােমার কি
অপছন্দ হয় ?
সুরমা। ইন্দু মেয়েটি খুবই ভাল-রূপে গুণে ও মেয়ের
জোড়া সহজে মিলবে না, কিন্তু অতবড় মেয়ে আমাদের ঘরে কি
বিয়ে হয় ?
অজিত। আমিও ত আর থােকাটা নই, মামি !
সুরমা। তবু বিয়ের সময় দশজনে দশ কথা বলতে পারে ।
অজিত। তাই বা বলতে দেব কেন ? যদি বিয়ে করি তা
হলে কুটুম্ব জড় করতে, কি ঘটা করতে দেব ভেবেছ নাকি ?
এবার সে সব করলে ত বিয়েই করব না।
সুরমা কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া উত্তর দিল, “আচ্ছা; তুমি
যা ভালবােঝ তাই করো বাপু-বিয়ে করতে রাজি আছ এ
কথা ঠিক ত? তাহলে দিদিকে লিখে পাঠাই ?”
তৃতীয় পরিচ্ছে
অজিত। তা লেখো, এখন আগে ওঁদের জিজ্ঞাসা কর,
কোন আপত্তি আছে কি না।
সুরমা। ওঁদের আবার আপত্তি কি ? এক কুল ভাঙ্গাবার
যা আপত্তি; তা ইন্দুর মা ত আমাকে কতদিন বলেছেন; ভাল
ছেলে পেলে তিনি কুল বাছবেন না।
অজিত। না হয় আবার কথাটা স্পষ্ট করে পেড়ে দেখ।
সেই দিনই মধ্যাহ্নকালে সাৰিত্ৰী অজিতদের বাড়ীতে
বেড়াইতে আসিলে সুরমা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আমাদের
অজিতের সঙ্গে ইন্দুর বিয়ে দেবে দিদি ?”
সেই প্রশ্নে সাবিত্রীর মুখমণ্ডল চকিতে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
কিন্তু পরক্ষণেই যেন আত্মসংবরণ করিয়া তিনি বলিলেন “ইন্দুর
আমার এমন কি কপাল জোর যে অজিতের হাতে পড়বে!”
সুরমা। অজিত নিজেই সে কথা পেড়েছে ; তাহলে
দিদিকে লিখে পাঠাই ?
সাবিত্রী। এ কথার আমি কি উত্তর দেব বােন, এযে আমার
বামন হয়ে চাদে হাত বাড়ান।
সুরন। সেই দিনই দুর্গাপুরে শরৎসুন্দরীকে সকল কথা
প্রকাশ করিয়া পত্র লিখিল। ইলর রূপগুণের কথা, তাহাদের
কৌলীন্যের কথা, অবস্থার কথা, অজিতের প্রস্তাব এবং
সাবিত্রীর সম্মতির কথা সমস্তই বিস্তারিত ভাবে সুশ পেই পত্রে
ইন্দু । শরৎসুন্দরীকে জানাইল। শরৎসুন্দরী তাহাদের একজন বিশ্বস্ত পুরাতন কর্মচারীকে দিয়া নিজ অভিমত বিপ্রদাসকে বলিয়া পাঠাইলেন এবং সুরমাকেও পত্র লিখিলেন। অজিতের পুনরায় বিবাহ করিতে মন হইয়াছে শুনিয়া তিনি কুলদেবতার বড়শােপচারে পূজার ব্যবস্থা করিলেন। যাহাতে শীঘই বিবাহ হয় তাহার বন্দোবস্ত করতে বিপ্রদাসের উপর ভর দিলেন এৰ: অজিত যে কোনরূপ সমারােহ করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছে তাহাতে তিনি কিছুমাত্র অসন্তোষ প্রকাশ করিলেন না। তিনি বলিয়া পাঠাইলেন যাহাতে অজিতের ইচ্ছ। তাই, সেরূপ কাজ করিবার প্রয়োজন নাই—তাহার অজিত সংসারী হউক তাহা হইলে সাধ অাদ করিবার তিনি অন্য সময় অনেক পাইবেন। ভাবী পুত্রবধূর গহনা গড়াইবার ও বিবাহের অনি- বাৰ্য আয়ােজনের জন্য তিনি মুক্তহস্তে ব্যয় করিতে বিপ্রদাসকে অনুমতি দিলেন ও তদুপলক্ষ্যে প্রয়ােজন মত অর্থ পাঠাইবার বন্দোবস্ত করিলেন। যে দিন দুর্গাপুর হইতে শরৎসুন্দরীর পত্র লইয়া লােক আসিল; সেই দিনই অজিতকে বলিয়া সুরমা সেই সু-খবর সাবিত্রীকে জানাইল। সাবিত্রী দুইদিন উৎকণ্ঠিত হইয়াছিলেন এক্ষণে তিনি অনিন্দা ত্যাগ করিতে করিতে সুরমাকে তাহার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাইলেন। বিপ্রদাস ও হরিশ সেই সংবাদ ২ঃ তৃতীয় পরিচ্ছেদ শ্রবণ শাহলাদিত হইল। বিপ্রদাস আগ্রহের সহিত বিবাহের উদ্যোগ করিতে লাগিল--অর্ণকারের দোকানে আপিসের ছুটীর পরে গিয়া যাহাতে সত্বর সমস্ত অলঙ্কার প্রস্তুত হইয়া উঠে তাহার প্রতাহ তাগাদা করিতে লাগিল। পক্ষাধিক কাল পরে বিবাহের দিন স্থির হইল-তৎপূর্বে আর শুভলগ্ন ছিল না। সে কয়দিন আর পূর্বের মত অজিত ইন্দুদের দ্বারে গিয়া হরিণ ঠাকুররে কাছে কুশল জিজ্ঞাসা করিতে পারিল না। হরিশঠাকুর নিজেই দিনের মধ্যে দুই তিনবার অসিয়। অজিতের কাছে তাহার মনের আনন্দ জানাইয়া যাইত। কয়েক দিন পরেই অজিত যে তাহার নাতজামাই হইবে সে শুভ সংবাদ সে পরিচিত ব্যক্তি মাত্রকেই বলিয়া বেড়াইতে লাগিল। ইন্দু সে কয়দিন পূর্বের মত ছাদের উপর বা জানা- লার কাছে অজিতের চক্ষে পড়িল না। অতি বুঝিতে পারিল ইনু ইচ্ছা করিয়াই অন্তরালে থাকে—সে যখন বাড়ী হইতে বাহির হইয়া যায়, সেই অবসরে ইন্দু ছাদের গাছে জল সেচন করে। একদিন অজিত বাহিরে যাইবার কিয়ৎক্ষণ পরেই কোনও প্রয়োজন বশতঃ ফিরিয়া আসিয়া দেখে, ইন্দু গাছে জল দিবার জন্য ছাদে উঠিয়াছে। এই কয়দিনে তাহার দেই- লতা যেন কি এক মন্ত্রশক্তিতে অপূর্ব লাবণ্যে ঝলমল করিতেছে। অজিতের প্রশংসমান অপলক নয়নর সহিত ইন্দুর দৃষ্টি বিনিময় ইন্দু হইতেই সে যেন সরমে এতটুকু হইয়া গেল। তাহার মনে হইল, এ কয়দিন যে অপূৰ্ব পুলকে তাহার মন প্রাণ ভরিয়া উঠিয়াছিল অজিতের মুগ্ধ দৃষ্টি বুঝি তাহার সেই প্রাণের প্রাণে লুকায়িত সেই পুলকরত্নটীর সন্ধান পাইয়া গেল। ইন্দু ছুটিয়া পলাইতে পারিল না—সে লাজ-নম্র মিনতিপূর্ণ কটাক্ষে যেন ক্ষম। চাহিয়া ধীরে ধীরে সরিয়া গেল। অজিতের ইচ্ছা মত, বিবাহের দিন উভয় পক্ষেই কোনও সমারােহ হইল না। কিন্তু অজিতের মাতার ইচ্ছানুসারে বিপ্রদাস গাত্রহরিদ্রা উপলক্ষে ইন্দুকে মূল্যবান বস্ত্রাদি পরিচ্ছদ, সজ্জার বিবিধ উপকরণ ও অলঙ্কারাদি পাঠাইলেন। সাবিত্রীও স্বইচ্ছায় আপনার সাধ্যাতীত ব্যয় করিয়া ইন্দুকে বস্ত্রালঙ্কারাদি এবং অজিতকে তাহার ব্যবহারােপযোগী বরাভরণ ও শষ্যাদি দান করিলেন। অজিত তাহার চারি পাঁচটা নিতান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধুদের মাত্র নিমন্ত্রণ করিল। সাবিত্রীও স্ত্রী অাচার করিবার জন্য তিন ঘর মাত্র প্রতিবেশীদের বাটীতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। বিবাহ কাৰ্য্য নির্বিঘ্নে কিন্তু নিরুৎসবে সম্পন্ন হইল। অজিতের বন্ধুগণ ইন্দুকে দেখিয়া অজিতের প্রতি প্রজাপতি যে নিতান্তই সুপ্রসন্ন একথা একবাক্যে অজিতকে জানাইয়া দিয়া গেল। পরদিন বর-বধূ লইয়া বিপ্রদাস সপরিবারে দুর্গাপুরে যাত্রা করিল।
তুর্থ পরিচ্ছেদ রেলের গাড়ীতেই অজিত অসুস্থ বােধ করিতেছিল, বাটী পৌছিয়া বরবধূ বরণ করিবার সময় সে কোনরূপে আত্ম- সংযম করিয়াছিল, কিন্তু তৎপরেই সে প্রবল জ্বরাক্রান্ত হইয়া শয্যা গ্রহণ করিল। তাহার পর দুইদিন অজিতের অরে সংজ্ঞাশূন্য ভাবেই কাটিয়া গেল। তৎপরদিন জ্বরের সামান্য উপশম হইল কিন্তু একেবারে অরত্যাগ হইল না। ডাক্তার বলিয়া গেলেন জ্বর রেমিটেন্ট, আকার ধারণ করিয়াছে, রােগীকে খুব সাবধানে রাখিতে হইবে, কিন্তু ভয়ের কোনও কারণ নাই। সাবিত্রী যৎসামান্য ফুলশয্যার দ্রব্যসামগ্রী পাঠাইয়াছিলেন—তাহার কবহার হইল না। বরবধূ, দুর্গাপুরের বাটীতে প্রবেশ করিতেই ইন্দুর রূপের একটা প্রশংসা উঠিয়াছিল—সকলেই বলিয়াছিল—“হ্য। বাড়ীর উপরি বউ এসেছে বটে!” অজিতের জননী নববধুর রূপের . সেই প্রশংসা শুনিয়া, আনন্দিত হইয়া প্রশংসাকারিণী আত্মীয়াও, প্রতিবাসিনীদিগকে বলিয়াছিলেন—“আশীর্বাদ কর আমার, অজিতের ঘর যোড়া করে বেঁচে থাকুক।” পরে অজিতের ২৭ ইন্দু জ্বর হওয়াতে আর কেহ নববধূর রূপের দিকে চাহিয়া দেখে নাই। ইন্দুও হরিষে বিষাদিনী—নিতান্ত সঙ্কুচিত হইয়া দিন কাটাইতে লাগিল। সেই দুঃসময়ে ছিদ্রান্বেষীর। বিশেষতঃ ধনাটোর কন্যা জ্ঞাতি-বন্ধুগণ ও মুখরা জ্ঞাতি-কন্যারা নববধূর নানা ক্ৰটী আবিষ্কার করিবার সুযোগ পাইল। কেহ বলিল, দীনদুঃখীর ঘরের মেয়ে নইলে অমন লক্ষ্মীছাড়া বরা হয়?- ফুলশয্যা-শুভকৰ্ম্ম-তাও হ’ল না!” কেহ বা টিপ্পনি কাটিল, “তােমরা বলেছিলে দেখতে ভাল, আমি ত বাপু বৌএর ভাল তেমন কিছু দেখতে পাই না। কেমন যেন বেহায়া বেহায়। চাল চলন।” আর একজন বলিল “ঠাকুরকির এক কথা-- ওর কি অার লজ্জা সরম করবার বয়স আছে? একেবারে গিন্নী হয়ে বাড়ী ঢুকেছে।” প্রথম প্রথম অজিতের জননীর ও ইন্দুর সমক্ষে এরূপ ধরণের কথাবার্তা হইত না, অন্তরালেই হইত। ক্রমে ইন্দুকে শুনাইয়া শেষে শরৎ- সুন্দরীর নিকট প্রকাশ্য ভাবেই একদিন এইরূপ সমালােচনা ব্যক্ত হইল। শরৎসুন্দরীর ননন্দা সম্পর্কীয় একজন বিধবা এক দিন অজিতকে দেখিতে আসিয়া শরৎসুন্দরীকে শুনাইয়া অপর একজন সঙ্গিনীকে সম্ভাষণ • করিয়া বলিল “অত বড়-বৌ জবুস্থ হয়ে বসে থাকে, আর শাশুড়ী রােগ ছেলেকে নিয়ে সারা হচ্ছে এটা কি ভাল দেখায় ? ভাল ঘরের মেয়েদের ২৮
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চাল চলন আক্কেলই আলাদা রকমের।” শরৎসুন্দরীর কণে
সেই কথা যাইতেই তিনি বলিলেন “বৌমার দোষ কি ?
আমিই ওঁকে কিছু করতে দিইনি।” সে উত্তরে সন্তুষ্ঠ। না
হইয়া পূৰ্বোক্তা বর্ণিল সে যেন হ’ল কিন্তু কিরকম অপয়া
বৌ বাপু? কোথা থেকে ছেলের জ্বর নিয়ে এল দেখ দেখি।”
শরৎসুন্দরী সে কথা শুনিয়া বিরক্তির ধরে বলিলেন “অজিতের
আমার জ্বর হয়েছে-আশীর্বাদ কর সেরে যাক--বৌমাকে
নিয়ে টান কেন?” শরৎসুন্দরীর সেই উত্তর শুনিয়া অবধি
জাতিরা নববধুর সম্বন্ধে কোনও অপ্রিয় মন্তব্য প্রকাশ
করিত না। কিন্তু শরৎসুন্দরী ভাবিলেন নববধূকে কাজ
কৰ্ম্ম করিতে দিলেও লোক-নিন্দার ভয়, অথচ তঁাহার বন্ধু-
মাতা নিতান্ত বালিকা হৈ, সুতরাং এই বিপদের সময়
নিশ্চেষ্ট। হইয়া বসিয়া থাকিলেও প্রকাশ্যে না হউক অপ্রকাশ্যে
সকলে ঘঁহার বধূমাতার অপযশ ঘোষণা করিবে! সেইজন্য
তিনি অজিতের সেবা শুশ্রুষার ভার ইন্দুর উপর কিয়দংশ
অৰ্পণ করিলেন। তিনি দিবাভাগে আহারাদি করিতে যাইবার
সময় অজিতের মস্তকে জলপটি করিয়া অডিকলােন দিতে ও
তাহাকে ব্যজন করিতে ইন্দুকে বাইয়া যাইতেন। পরে
যখন দেখিলেন সেই কর্মব্যতীত, চিকিৎসকের আদেশ মত
ঔবধাদি যথাসময়ে সেবন করা শয্যাদি পরিচ্ছন্ন রাখা প্রভৃতি
ইন্দু
কাৰ্যও ইন্দু স্বেচ্ছায় সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতেছে, তখন
তিনি দিবাভাগের রােগীর সেবাশুক্রবার সমস্ত ভারই ইন্দুর
উপর সমর্পণ করিলেন। সপ্তাহেক কাল জ্বর ভােগের পর
যখন অজিতের পীড়ার শঙ্কট কাটিয়া গেল এবং অজিত দিন
দিন আরােগ্যের পথে অগ্রসর হইল, তখন ইন্দুর, অজিতের
কাছে পাকিতে সঙ্কোচ বোধ হইতে লাগিল; শরৎসুন্দরী
* অপর কোন গুরুজন, আসিলেই সে গৃহের বাহিরে যাইত
এবং পুনরায় আদিষ্ট না হইলে আসিত না। কিন্তু ইন্দুর
সেবায় অজিত যে তৃপ্তি পায়—সে গৃহে থাকিলে অজিতের
পীড়া-ক্লিষ্ট মুখ যে প্রসন্নতার ভাব ধারণ করে, তাহা শরৎসুন্দরীর
মেহদৃষ্টি অতিক্রম করে নাই। সেইজন্য ইন্দুকে তিনি নিজেই
মধ্যাহ্নকালে আহারাদি করিতে যাইবার সময় পূর্বের মত
অজিতের গৃহে রাখিয়া যাইতেন। একদিন সেইরূপ অবস্থায়
পড়িয়া, ইন্দু ব্যজন করিতে করিতে অজিতকে তন্দ্রাগত ভাবিয়া
বসনাঞ্চল দিয়া অতি সন্তর্পণে তাহার ললাটের স্বেদ বিন্দু-
গুলি মুছাইয়া দিতেছে, এমন সময় সহসা অজিত নয়ন
মেলিয়া ইন্দুর মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, ইন্দু কি ব্যাকুল ও
করুণ দৃষ্টিতে তাহার রোগশীর্ণ মুখের দিকে অপলক
শয়নে চাহিয়া আছে! অজিত কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া ধীরে ধীনে
বলি“ইন্দু! তুমি এখনো বাতাস করুছ! থাক আর বাতাস
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
করতে হবে না, এখন আর তত গরম বোধ হচ্ছে না।”
সে গৃহে যে পরিচারিকা থাকে সে তখন উপস্থিত নাই
দেখিয়া ইন্দু বলিল, “ঘাম হচ্ছে যে—তুমি ঘুমোও; আমার
২৩ ব্যথা করেনি আর একটু বাতাস করি।” অজিত
আপত্তি করিল না।
অজিত যে দিন পথ্য করিল, সেইদিন শরৎসুন্দরী তঁাহার
দিশাশুড়ী সম্পর্কীয়া ছােটগিন্নীর সহিত মধ্যাহ্নকালে অজিতের
কক্ষে প্রবেশ করিয়া বলিলেন “বউমাকে বিয়ের পর এনে
এতদিন রেখেছি আর রাখাটা ভাল দেখায় না, ওঁর মা মনে
করবেন তিনি গরিব বলে আমরা যা তা করছি। কিন্তু কি
করি বল, অজিতের আমার অত অসুখের সময় ত আর
পাঠাতে পারতুম না? আর বৌমার ও যাবার বড় ইচ্ছে
ছিল বলে বোধ হয় নি। কিন্তু অজিতও আমার বাবা
বাধাকান্তের আশীর্বাদে আজ দুটী পথ্য পেয়েছে—দু চার
iজন বাদেই উঠে হেঁটে বেড়াতে পাবে—এখন আর বৌ-
মাকে রাখাটা ভাল দেখায় না। তাই কাল পাঠিয়ে দেবাে
ঠিক করেছি।”
ছােট গিন্নী বলিলেন, “সেই ভাল, যাত্রাটা বদলে
**ন। কি অশুভক্ষণে পা বাড়িয়েছিল—বাছা আমাদের কি
নাটাপাটাই খেলে।”
ইন্দু
শরৎসুন্দরী। সে কথা আর বলো না দিদি—একদিন
কি অার অামার মাথার ঠিক ছিল---ছেলে নিয়েই ব্যস্ত 'ত
অন্য কিছু দেখব কি? বৌমাকে নিয়ে সাধ অাহাদ করা
দূরে থাকুক, বাছাকে কি আমার ভাল করে খাওয়াতে
দাওয়াতে পেরেছি, না আদর যত্ন করতে পেরেছি।
ছােট গিন্না। তা কি করবে দিদি ? বৌ কি আর তা
বুঝতে পারছে না। যাহােক ডাগর ডােগরটী ত হয়েছে—"
শরৎসুন্দরী। তাই রক্ষে দিদি, নইলে আমি কি একলা
সব দিক সামলাতে পারতুম ? অজিতকে আমার দেখা শু
ওষুধ খাওয়ান সবই ত বৌমাই করেছেন। লােকজন।
দিয়ে কি সে সব ঠিক মত হত। বৌমাকে আমার এক
বার যে কাজটা করতে বলেছি—তা আর দুবার বল
হয়নি, আর কাজ কর্মের ব্যবস্থা কেমন!
ছােটগিন্নী। তা দেখতে পাচ্ছি—বোঁটা তােমার মনের
মতনই হয়েছে—সেটাও একটা বরাতের কথা।
শরৎসুন্দরী। তা নয়? আমার ত রাধাকান্তর সেবার
জন্যে ভিটে ছেড়ে একদিন নড়বার যাে নেই। অজিত
একল। কলকেতায় থাকে। বাছার খাওয়া দাওয়ার ভাবনায়
আমার মনটা সেইখানেই
সেইখানেই পড়ে থাকে। বৌমা কাছে
থাকলে সে ভাবনাটা থাকবে না। এখন যেন আমার
চতুর্থ পরিচ্ছে
অজ—বিপুর বৌ বাসায় থাকে; বৌ মা সেখানে থাকলে তারও
একটা দোসর হয়, আমিও বাঁচি।”
পর দিন মধ্যাহ্নকালে অজিত শয্যার উপর একটি তাকিয়ায়
ঠেস দিয়া বলিনা আছে, এমন সময় বিপ্রদাসের পঞ্চম বর্ষীয়া
কন্যা নীলিমা, এক গাছি কাপড়ের তৈয়ারী কৃত্রিম যুঁই ও রমণ
ফুলের মালা গলায় পরিয়া এবং হন্তে একটা সুসজ্জিত ‘ডলি’ পুতুল
লইয়া আনন্দে নৃত্য করিতে করিতে আসিয়া অজিতকে বলিল,
“দাদা বাবু, কেমন মালা পেয়েছি! কেমন পুতুল দেখছ ?”
অজিত। বাঃ, বেশ মালা ত—চমৎকার পুতুল। কে দিলে?
নীলিমা-বৌদি দিয়েছে। কেন বল দেখি ?
কেন ?
নীলিমা। তুমি আমাকে তােমার সেই চেহারার ছবি দিয়ে
দুলে-মনে আছে ?
ডাক্তারী পাস হইলে সহপাঠী বন্ধুদের সহিত এক সঙ্গে
বসিয়া ফটোগ্রাফ, তুলাইতে গিয়া, ফটোগ্রাফারের সনির্বন্ধ
অনুরােধে পড়িয়া অজিত এককও এক ডজন ফটোগ্রাফ,
জুলাইয়াছিল। কলিকাতার বাসায় সেই ‘ফটোগুলি এখানে
ওখানে পড়িয়া থাকিত। নীলিমা সেই ‘ফটো’ এক খানি
অজিতের নিকট হইতে চাহিয়া লইয়াছিল; অজিতের সে
কথা স্মরণ হইল। .সে বলিল, হ্যা, মনে আছে।”
অজিত।
T
‘,
.
নীলিমা কহিল,“সেই ছবি খানা আমার পুতুলের বাক্সয় ছিল,
দেখেছিলে ত ? সেই ছবিখানা বৌদিকে দিয়েছি। চাইলে কি
। তাই এই সব—ফুলের মালা, পুতুল দিয়েছে। আরাে কত
কি দেবে বলেছে। ছবি নিয়ে কি হবে? তার চেয়ে এ পুতুল
কেমন চমৎকার-নয় ? না বাপু বলবনা;—বৌদি ছবির
কথা বতে বারণ করেছে। যাই, পিসিমাকে দেখাইগে যাই।”
এই কথা বলিয়া নীলিমা ছুটিয়া পলাইয়া গেল।
কিয়ৎক্ষণ পরে ই যখন সাবিত্রীর আদেশে, অন্য দিনের মত,
অজিতকে, ডাক্তার যে বলকারক ঔষধ সেবনের ব্যাবস্থা করিয়া
দিয়াছেন, সেই টনিক সেবন করাইতে আসিল, তখন অজিত
ইনুকে জিজ্ঞাসা করিল, “৬ টার গাড়ীতে যাবার ঠিক হয়েছে
বুঝি?” ইনু আনত-বদনে উত্তর দিল “হু।” অজিত বলিল,
“আমার যেতে যদি ৫৭ দিন দেরী হয়, সেখানে গিয়ে চিঠি
লিখো।” ইন্দু সে কথার কোন উত্তর দিল না দেখিয়া অজিত
আরও কি বলিতে যাইতে ছিল, কিন্তু সেই সময়ে গৃহের বাহিরে
পরিচারিকার পদশব্দ শুনিয়া ইন্দু, অজিতের দিকে একবার
মিনতিপূর্ণ কটাক্ষপাত করিয়া, সে গৃহ হইতে বাহির হইয়া
আইল। পূর্বকথামত সেইদিনই অপরাহ্নকালে, মূল্যবান বসন
ফে সজ্জিত করিয়া ইন্দুকে শরৎসুন্দরী কলিকাতায় মাতৃগৃহে
পাঠাইয়া দিলেন।
৪
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
অজিতের পীড়ার সংবাদ পাইয়া সাবিত্রী নিরতিশয়
দুর্ভাবনায় ছিলেন। ইনু যে দিন অজিতের আরোগ্য-সংবাদ
লইয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসিল, সে দিন আর সাবিত্রীর
অানন্দের সীমা রহিল না। তাহাদের দেশে-বিশ্বগ্রামে
বিবাহাদি শুভ-কৰ্ম্মের পর গ্রামের পীঠস্থানে দেবী সর্বমঙ্গলার
নিকট পূজা দিবার রীতি আছে। কলিকাতায় থাকাতে সেই
রীতি পালন করিবার উপায় নাই, কাজেই সাবিত্রী কন্যা ও
জামাতার মঙ্গলের জন্য কালীঘাটে পূজা দিবার মানস করিয়া
ছিলেন। তদুপরি অজিতের পড়ার সংবাদ পাইয়া তিনি
একান্তমনে মা কালীকে ডাকিয়া ছিলেন “হে মা কালী, অামার
অজিতকে শীগগির সারিয়ে দাও, তােমাকে যােড়শোপচারে
পূজো দেব।” এক্ষণে তিনি, সেই পূজার দ্রব্য সামগ্রী দুই তিন
দিন, ধনিয়া গুছাইয়া লইয়া, হরিশ ঠাকুরকে বলিলেন, “কাকা,
কাল শনিবার আছে, কালই আমরা কালীঘাটে পূজো দিতে
যাব। একখানা গাড়ী ঠিক করে রেখ ত ? সেইখানে রেখে
খাওয়া দাওয়া করে, বিকেলে বাড়ী ফিরব।”
সেই কথা মত সাবিত্রী, তৎপরদিন প্রত্যুষে ইন্দু, হরিশ
ঠাকুর ও তাহাদের ঠিকা কি দামিনী সঙ্গে লইয়া কালীঘাটে
যাইলেন।
কালীঘাটের পথ ঘাটের তখনও উন্নতি হয় নাই,—প্রায় পঁচিশ
ইন্দু,
বৎসর পূর্বের কথা বলিতেছি। কালীঘাটে পৌছিয়া সালঙ্কার।
কন্যার সহিত গাড়ি হইতে অবতরণ করিতেই পাণ্ডারা আসিয়া
তাঁহাদের ঘিরিয়া দাঁড়াইল, এবং সকলেই তাঁহাদের থাকিবার ও
পূজা দিবার সুবন্দোবস্ত করিবার জন্য একবাক্যে আগ্রহ
প্রকাশ করিল। তাহাদের হস্ত হইতে আশু নিষ্কৃতি লাভের
আশায় সাবিত্রী, তাহাদের মধ্যে যাহাকে অপেক্ষাকৃত অল্পভাষী
বলিয়া বােধ হইল, তাহাকে নিযুক্ত করিলেন। তদ্দর্শনে
যাহারা নিরাশ হইল, সেই পাণ্ডাপুবদের মধ্যে যে সকলের
অপেক্ষা মিষ্টকথায় সাবিত্রীকে “মা জননী, মা জননী” বলিয়া
এতক্ষণ তুষ্ট করিতে চেষ্টা করিতেছিল, সে বলল “যাওনা
ওর সঙ্গে, টেরটা পাবে এখন! বেটা আসল গাঁটকাটা দাগী,
চোরের যাও।” সেই কথা শুনিয়া প্রথমােক্ত তথাকথিত
অল্পভাষী পাণ্ডা তাহার কটীদেশে গামছা বঁধিয়া, হুঙ্কার দিয়া
কহিল, “তবে রে পাজী বেটা, আমি গাঁটকাটা, আর তুমি
ধৰ্ম্মপুত্তর যুধিষ্টির! আজ তুই আছিস কি আমি আছি,
খুননাখুনি কব।” তাহাদের মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবার উপক্রম
দেখিয়া সাবিত্রী অন্য একজন পাণ্ডকে বলিলেন, “এস বাবা
তুমি এস, আমাদের এখানথেকে নিয়ে চল।” সেই কথা শুনিয়া
'শসােক্ত পাণ্ডা বলিল, “এস মা এস, তােমরা এদিকে এস।”
এই কথা বলিয়া তাঁহাদের সঙ্গে লইয়া অদুরেই একখানি খড়ের
৩
চতুর্থ পরিচ্ছেদ ছাউনি দোকান ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল—সম্মুখে পূজার সন্দেশাদির-ডালার দোকান, পশ্চাতে যাত্রী থাকিবার সারি সারি ঘর। এদিকে শিকার পলাইয়া যাইতেই পূর্বোক্ত যুযুৎসু পাণ্ডা রণে ভঙ্গ দিয়া সেই দোকান ঘরের সম্মুখে আসিয়া শেষে নিযুক্ত পাণ্ডার সহিত কলহ করিতে প্রবৃত্ত হইল। কিন্তু শেষােক্ত পাণ্ডার পক্ষ লইয়া তালাওয়ালা দোকানদার ঝাঁপের বাঁশ বাহির করিয়া “অায় এগিয়ে আয়, তােকে আজ কুকুর মার। কব,” বলিয়া তাড়া করিতেই সে দ্রুতপদে পলাইয়া গিয়া অন্য যাত্রী শিকারের সন্ধানে সচেষ্ট হইল। তীর্থস্থানে মনের শান্তির জন্য পূজা দিতে আসিয়া পাণ্ডাদের ব্যবহার দর্শনে সাবিত্রী স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিলেন। তাহাকে আশ্বস্ত করিবার জন্য তাহার নির্বাচিত পাণ্ডা বলিল, “এখানে দাঁড়িয়ে কি দেখছে মা ? ভিতরে চলুন, কাপড় চোপড় রেখে গঙ্গাস্নানটা করে নি। কোন চিন্তা করবেন না, আমি সব ঠিক ঠা করে দিচ্ছি। কি কম পূজা দেবেন তা বলুন, আমি ববেম্ভ করি ?” সাবিত্রী বলিলেন তিনি যােড়শােপচারে পূজা দিবেন। সে কথা শুনিয়া আহলাদে উৎফুল্ল হইয়া, দির-বর্ণ দগুলি বিকশিত কৃরিয়া, পাণ্ডা বলিল, “বেশ, বেশ, আমি, এখনি সব ব্যবস্থায় দিচ্ছি ; দেখে নেবেন, আমি মায়ের পূজোর আর দর্শনের এমন ৩৭ সুবন্দোবস্ত করে দেবাে, আমি জাক করে বলতে পারি, আয় কোন ** পাণ্ডার সাধ্যি নেই যে তেমন করে।” পাণ্ডা, তাহার ভ্রাতুস্পুত্রকে যাত্রীদের জিনিষ পত্র বহিয়া দিবার জন্য নিযুক্ত করিয়া, হরিশঠাকুরকে সঙ্গে লইয়া পূজার বন্দোবস্ত করতে সম্মুখের ডালাওয়ালার দোকানে লইয়া গেল। ঢালাওয়ালার সহিত প্রকাশ্যভাবে বন্দোবস্ত করিতে বিলম্ব হইল না; কারণ বন্দোবস্তের হার নির্দিষ্টই ছিল প্রতি মােল আনার ডালায়, পাণ্ডার লাভ পাঁচ আনা, মায়ের পূজার পালাদার হালদারের পাঁচ আনা, ডালাওয়ালা দোকানদারের জিনিষের মূল্য ছাড়া দুই আনা; সুতরাং একটাকা দিলে ডালাদার চারি আনার জিনিস দেয়। তাহা হইতে পূজার পালাদার ব্রাহ্মণেরা পূজাদাতাকে এক আনার প্রসাদ ফেরত দেয়। এক্ষেত্রে সেইরূপ- হারেই বন্দোবস্ত হইল; অবশ্য হরিশঠাকুর সে কথা জানিতে পারিল না,-মনে করিল সাবিত্রী যে কয়টা টাকা দিয়াছিলেন সমস্তই পূজার ডালা খরিদ করিতে ব্যয় হইয়া গেল। আদিগঙ্গায় স্নানান্তে সাবিত্রী নিজে, ও ইন্দুকে দিয়া, পথের উভয়পার্শ্বে উপবিষ্ট কাঙ্গালীদের পয়স। বিতরণ করিয়া আসিতেছেন, এমন সময়ে তাঁহাদের পশ্চাৎ হইতে ঠিকা কি দাক্ষিী বলিল, “দেখ গাে মা, এদিকে দেখ, যে লােকটা আমাদের গাড়ির পেছনে পেছনে আংকোশ পথ ছুটে এল, সে এখন কি চতুর্থ পরিচ্ছেদ রকম ঢং করে বসেছে দেখ!” সাবিত্রী দেখিলেন “সত্যই সেই সবলকায় ও ক্ষিপ্রগতি ভিক্ষুক এক্ষণে পদদ্বয়ে ছিন্নবস্ত্র বাধিয়া তারস্বরে, করুণ-সুরে হাঁকিতেছে, “দোহাই মা ঠাকরুণ, এই খোঁড়া নেংড়াকে একটা পয়সা দিয়ে যা মা ঠাকরুণ। মা কালী আপনার ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভ করবেন মা ঠাকরুণ।” সাবিত্রী সেই ধূর্তকেও বঞ্চিত করিলেন না, তাহাকে একটি পয়সা দিয়া পুনরায় অগ্রসর হইলেন। সেই সময়ে ইন্দুর কাছে একজন শীর্ণকায় ভিক্ষুক আসিয়া বলিল “মা রাজরাণী, গরিব বামুনকে কিছু পেতে দাও মা, আজ তিন দিন অভুক্ত, এই দেখ মা অন্নাভাবে সন্তানের কি দশা হয়েছে দেখ মা জননী” এই কথা বলিয়া সে তাহার উদর ১ঙ্কুচিত করিয়া এরূপ এক গভীর গহ্বরের সৃষ্টি করিল, যে বােধ হইল যেন তাহার উদরের অভ্যন্তর একেবারেই শূন্য--যেন অন্ত্র অবধি হজম হইয়া গিয়াছে। ইন্দু বিস্ময়-বিহল- নেত্রে ভিক্ষুকের সেইকাণ্ড, দেখিতেছিল ; তাহার মুখের ভাব দেখিয়া ইন্দু স্থির করিতে পারিল না, যে সে যথার্থ ই ক্ষুধার্ত কি ঐন্দ্রজালিক। ইন্দু তাহাকে একটি পয়সা দিতে গেল, কিন্তু ভিক্ষুক তাহা গ্রহণ না করিয়া বলিল, “একটা পয়সায় কি হবে মা! এক পয়সায় কি এ জঠর জ্বালা মেটে ?” ইলুর হস্তের পয়সাগুলি সমস্তই বিতরণ করিয়া নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিলু, ৫ সাবিত্রীর নিকট হইতে আর কিছু পয়সা পাইবার মানসে অগ্রসর । হইতেই ভিক্ষুক মনে করিল, ইন্দু বুঝি তাহার কথা শুনিল না, তাহাকে একেবারেই বঞ্চিত করিল; চকিতে তাহার মূর্তির পরিবর্তন ঘটিল, তাহার দেহ ব্ৰহ্মণ্যতেজে কাপিয়া উঠিল, সে বলিল—“কি—দিলি নি! এই পৈতে ছিলাম, তাহলে, একেবারে উচ্ছন্ন যাবি, গয়না পরার গরব বেরিয়ে যাবে, এই আমার মত হাত হবে!” ইনু ভীতিপূর্ণ কণ্ঠে সাবিত্রীকে ডাকিল “মা, ও মা, এদিকে এস না? সাবিত্রী অগ্রসর হইয়া একটু দূরে গিয়া পড়িয়াছিলেন। ইন্দুর কাতর কণ্ঠস্বর শুনিয়া তিনি পশ্চাতে ফিরিলেন। ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ সাবিত্রীকে দেখিয়াই চমকিত হইয়া প্রস্থান করিল। সাবিত্রী তাহার মুখ দেখিতে পাইলেন না। দামিনী ইন্দুর পশ্চাতে ছিল, সেও ভিক্ষুকের কাণ্ড দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল। এক্ষণে সে তাহাকে ডাকিল, “অ বামুন-বামুন!” কিন্তু ব্রাহ্মণ তাহার কথায় কর্ণপাত করিল না,-উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া পলাইল। সাবিত্রী তাহাকে কিছু পয়সা দিয়া সন্তুষ্ট করিবার জন্য ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু তাহার দেখা পাইলেন না। কালীদর্শন ও নকুলেশ্বর দর্শন করিয়া এবং উভয় স্থানেই পূজা দয়া তাহাদের বাসায় প্রত্যাবর্তন করিতে বেলা ১১টা বাজিয়া প। বাসায় আসিয়া সাবিত্রী বন্ধনের আয়ােজন করিলেন এবং ইন্দু ও দামিনী তাঁহার সেই কার্যে সহায়তা করিতে ব্যাপৃত
চতুর্থ পরিচ্ছে
বিহিল। হরিশঠাকুর সেই সময়ে একবার হুকা হন্তে বাসা-
বাড়ীর বাহিরে আসিয়া ডালাদার ব্রাহ্মণের দোকানে বসিয়া
তামাক সেবন করিবার অবসর পাইল। হরিশ আপন মনে
মিঠাইয়া মিঠাইয়া তাম্রকূট সেবন করিতেছে, এমন সময় সেই
ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ, যে দুই ঘণ্টা পূৰ্ব্বে ইন্দুকে অভিসম্পাৎ দিয়া
সাবিত্রীকে দেখি পলায়ন করিয়াছিল, সে গলায় একখানি
উড়ানী বুলাইয়া এবং চটী জুতা , পরিয়া এক নবমূর্তিতে
সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল, এবং হরিশের নিকটে আসিয়া
বলিল—“কর্তা কলকেটা একবার দিন না, দু’টান টেনে যাই।”
হরিশ তাহাকে পূর্বে দেখে নাই—সে বিনা বাক্যব্যয়ে তাহার
হস্তে কলিকাটী দিল। ব্রাহ্মণ হরিশের নিকট বসিল এবং হন্তদ্বারা
হুকার সৃষ্টি করিয়া কলিকাটীতে মৃদু মৃদু টান দিতে দিতে
জিজ্ঞাসা করিল, “মশায়দের থাকা হয় কোথায় ?” হরিশ বলিল,
আমাদের নিবাস বিগ্রামে-এখানে বাদুড়বাগানে বাসা।
ব্রাহ্মণ। বাদুড় বাগানের সরকারী ডাক্তারখানার কাছে
বুঝি ?
হরিশ। হ্যা সেইখানেই—গলির ভেতর।
ব্রাহ্মণ। রাস্তার ওধারের গলিটায় বুঝি ? সেখানে যে,
আমাদের দেশের একজন লােক থাকে। এখানে মা কালীর
পূজো দিতে এসেছেন। সঙ্গে মেয়ে ছেলেরা আছেন না?
৪১
ইন্দু
হরিশ। হ্যা ভাইঝি আছেন, তার মেয়ের কল্যাণেই
পূজো মানা ছিল।
ব্রাহ্মণ। ওঃ, সেই গয়না টয়না পরা মেয়েটি বুঝি ?
দিব্যি মেয়েটি—কি ছেলে পুলে ?
হরিশ। ছেলে পুলে হয়নি, এই সবে বিয়ে হয়েছে-
ওর বিয়ের কল্যাণেই পূজো দিতে আসা হয়েছে।
ব্রাহ্মণ। তা বেশ ; বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে দেখছি
অনেক অলঙ্কার পত্র দিয়েছে।
হরিশ। হা শশুর দুর্গাপুরের জমিদার, আমীর লােক,
নাতজামাইও ডাক্তার-হীরের টুকরাে ছেলে।
ব্রাহ্মণ। বেশ বেশ কোথায় ডাক্তারী করেন ?
হরিশ। ঐ বাদুড়বাগানেই; আমাদের বাড়ির সুমুখেই
তার বাসা-মা দেশেই থাকেন, তাই এখানে আর বাড়ী
করেন নি।
ব্রাহ্মণ। নাত জামাইয়ের তাহলে বাপ নেই ?—নামটি
••
।
কি ?
হরিশ। শ্ৰীমা অজিতকুমার মুখােপাধ্যায়—এম. বি ।
ব্রাহ্মণ। বেশ বেশ, তাহলে আপনাদেরও খরচ পত্র
করতে হয়েছে খুব বােধ হয়; যে দিন কাল পড়েছে।
হরিণ। না, সে সব ওঁরা কিছু চাননি; নানার শ্বাশুড়ী
চতুর্থ পরিচ্ছে দেনা পাওনার কোন কথাই বলেন নি-নাতজামাই নিজে দেখেই পছন্দ করে বলে পাঠান, তাতেই বিয়ে হয়ে গেছে। ওঁরা বনেদি বড়লােক; বাড়ীতে বিগ্রহ আছে, দোল দুর্গোৎ সব-বার মাসে তের পাৰ্বণ লেগেই আছে, তাইত নাত- জামাইয়ের মা ভিটে ছেড়ে এসে ছেলের কাছে থাকতে পারেন না। তবে আমার ভাইঝিও, মেয়ে জামাইকে, আপনার ইচ্ছাতেই, দিতে কসুর করেন নি, সদর সাধ্য খরচ করেছেন ; একটি মেয়ে বই আর ত কেউ নেই, আর অমন রাজার মত জামাই হ’ল । ব্রাহ্মণ। শুনে খুব সুখী হলুম-মশায়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় ভারি সন্তুষ্ট হলুম, মশায়ের নামটি কি বল্লেন ? হরিশ। হরিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ব্রাহ্মণ। বাড়ীর নম্বরটা বল্লেন বুঝি ২৩-নয় ? হরিশ। না ৬এর নম্বর। ব্রাহ্মণ। ওখানে আপনারা বুঝি অল্পদিন আছেন। হরিশ। না, ১০/১১ বছর হয়ে গেছে। ব্রাহ্মণ। আমাদের দেশের লােকটীর সঙ্গে দেখা করতে আমি মধ্যে মধ্যে ওদিকে যাই, কি না ? মশায়কে ওদিকে দেখিনি, তাই জিজ্ঞাসা কছিলুম। এইবার ওদিকে গেলেই মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসব। ৫
हेनर
হরিশ। বেশ ত, যাবেন না; এখন তাহ'লে উঠলাম,
রান্নাবান্নার কতদূর কি হল দেখিগে।
ব্রাহ্মণ কহিল, “আচ্ছা আমিও আসি-নমস্কার।” এই
কথা বলিয়া ব্ৰাণ প্রস্থান করিল। আহারাদি করিয়া
বাটীতে ফিরিতে সেদিন সাবিত্রীদের সন্ধ্যা হইয়া গেল।
৪১
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পরদিন অপরাহুকালে বন্দু ছাদের উপর তাহার ফুল
গাছগুলির টবে জল দিতে উঠিয়া দৈখিল, তাহার রাইবেলের
গাছের যে কুঁড়িটা অনেকদিন ধরিয়া ক্রমশঃ বড় হইতেছিল
সেটা স্ফুটনােম্মুখ হইয়াছে, সেইদিনই সন্ধ্যার পর দুটিবে।
পূৰ্বে নূতন কোনও গাছে গােলাপ বা অন্য কোনও ভাল
ফুল ফুটিলে, সে কখনও কখনও তাহা তুলিয়া খোঁপায় পরিত।
কিন্তু সেদিন সেই বিকশিত-প্রায় সুবৃহৎ রাইবেলটী দেখিয়া,
ইন্দুর সেটীকে তুলিয়) কবরীর শােভাবর্ধন কৰিবার সাধ
হইল না, তাহার নয়ন স্বতঃই সম্মুখস্থ অজিতের রুদ্ধ-বাতায়ন
কক্ষের দিকে ধাবিত হইল। তাহার একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল।
তাহার মনে পড়িল অজিত তাহাকে পত্র লিখিতে বলিয়াছিল,
কিন্তু পাছে ঠাকুরাণী বা অপর কোন গুরুজন নববধুর
সেরূপ আচরণ দেখিয়া কিছু মনে করেন, সেই লজ্জায় ইন্দু,
অজিতের সে অনুরােধ রক্ষা করিতে পারে নাই। সে
ভাবিল হাতে কি অজিত তাহার উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছে।
না-তাহা হইতে পারে না—তিনি ত আর অবুঝ মহেন।
০৫
ইন্দু,
আর দুই চারি দিন পরেই অজিত আসিবে, তাহা হইলেই
সকল সন্দেহ মিটিয়া যাইবে। এ কয়টা দিন কোনও রূপে
কাটাইতে পারিলে হয়। অজিতের কক্ষের সম্মুখের ছাদের
প্রাচীরের উপর শ্রেণীবদ্ধ ভাবে ধন-সন্নিবিষ্ট গোলাপ গাছের
'বড় বড় টব গুলির গাত্রে অস্তগামী তপনের স্বর্ণরশ্মি
আসিয়া পড়িয়াছিল ; ইন্দু উৎসুক নয়নে সেই দিকে চাহিয়া
উপরােক্ত কথা এবং আ-ও কত কথা ভাবিতেছিল ;-এখন
অজিত কি করিতেছে ? এতদিনে হয়ত অজিত শরীরে বল
পাইয়াছে, এবং দুর্গাপুরে তাহাদের বাটীর নিকটেই ক্ষীণকায়া
নদীর ধারে যে বিসর্পিত-গতি সুন্দর পথটী আছে, হয়ত
সেই পথে সান্ধ্য-ভ্রমণ করিতে গিয়াছে ; অজিত কি এখন
তাহার কথা ভাবিতেছে ? এইরূপ কত কথাই ইন্দুর মনে
প্রভাত-স্বপ্নের মত উদিত হইয়া বিলীন হইয়া যাইতেছিল; এমন
সময়ে ইকু শুনিতে পাইল, কে একজনতাহাদের বাড়ীর দ্বারের
কাছে আসিয়া ডাকিতেছে—“হরিশ বার বাড়ী আছেন কি?”
সেই অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিয়া ইন্দু ছাদের প্রাচীরের
অন্তরালে দাড়াইয়া, নিম্নের পথের দিকে চাহিয়া, আগন্তুককে
দেখিল এবং দেখিয়াই যুগপৎ অস্ত ও বিস্মিত হইয়া দ্রুতপদে
Fদ হইতে নামিয়া আসিয়া সাবিত্রীকে বলিল, “দেখ মা-
কাল যে ভিখিরী বামুন কালীঘাটে আমাকে পৈতে ছিড়ে
-
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
।
শাপ দিতে গিয়েছিল—ঠিক তার মতন একজন লােক এসে
‘দাদামনিকে ডাকছে!”
সাবিত্রী মালা জপিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, “সে আবার
কাকার কাছে আসবে কি করতে? আর কে হবে।” এই
কথা বলিয়া তিনি হরিশ ঠাকুরকে ডাকিয়া বলিলেন-“কাকা,
তােমাকে বাইরে কে ডাকছে গাে—দেখে এস ত।”
হরিশ ঠাকুর বাড়ীর ভিতরের ক্ষুদ্র উঠানে একখানি
কাঠের চৌকিতে বসিয়া কৃত্তিবাসী রামায়ণ পাঠ করিতেছিলেন।
অজিত কলিকাতায় না থাকাতে, হরিশ ঠাকুরের মনেও সেই
নবীন সঙ্গীটির অভাবে যেন একটা অবসাদ আসিয়াছিল।
কৃত্তিবাসের সাহচর্যে হরিশ মনের সেই অবসাদ দূর করিবার
চেষ্টা করিতেছিল। সে বলিল, “আমাকে আবার ডাকবে
কে ? কৈ দেখি।” এই কথা বলিয়া হরিশ ঠাকুর বাহিরে
গিয়া সদর দ্বারের অর্গন্ধ মুক্ত করিতেই আমাদের পূর্ব
পরিচিত সেই ভিক্ষুক-ব্রাহ্মণ বিনাবাক্যব্যয়ে বাটীর মধ্যে
প্রবেশ করিল। যে বেশে সে হরিশ ঠাকুরের সহিত আলাপ
করিয়াছিল, আজ তাহার সেই বেশ-নগ্নগাল, গলায় চাদর ও
পায়ে ধূলি-সমাচ্ছন্ন চটী। বাটীতে প্রবেশ করিয়া সে হরিশ
ঠাকুরকে নিতান্ত পরিচিত ভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “এই ,
মশায়—আছেন কেমন ?”
।
১৭
ইন্দু
হরিশ ঠাকুর এত শীঘ্রই কালীঘাটের সেই নব-পরিচিত
বন্ধুটীর সাক্ষাৎ পাইবার প্রত্যাশা করে নাই। সে একটু
বিস্মিত স্বরে বলিল, “মশাই বুঝি দেশের সেই লােকটীর
সঙ্গে দেখা করতে এদিকে এসেছেন ?”
আগন্তুক সম্মিত বদনে উত্তর দিল, “আজ্ঞে হ্যা গাে-তিনি
যে এই বাড়িতেই থাকেন।”
হরিশ আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল “সে কি! এ বাড়ীতে ?
আপনাদের দেশ কোথায় ?”
আগন্তুক স্থিরভাবে উত্তর দিল, “রামকানাইপুর। আমার
নাম ঘনশ্যাম—আমি আপনার ভাইঝির দেওর হই-তাকে
কুন না একবার।”
হরিশ অধিকতর বিস্মিত হইয়া বলিল, “কৈ—সে কথা ত
কাল কিছু বলেন নি ?”
ঘনশ্যাম কহিল, “সব কথা কি একেবারে ভাঙ্গলে চলে
কর্তা—সবুরে মেওয়া ফলে—বৌ ঠাকরুণকে ডাকুন না?”
হরিশঠাকুর আগন্তুকের ভাবগতিক কিছুই বুঝিতে পারিল
। সে সন্দিহান-মনে সাবিত্রীকে গিয়া বলিল, “তােমার
যে দেওর হয় বলছে গেণ! একবার দেখে যাও দেখি।”
হরিশ ঠাকুরের কথা শেষ না হইতেই আগন্তুক বিনা আহ্বানে
স্বয়ং সেখানে আসিয়া সশরীরে হাজির হইল এবং একটা
৪৮
পঞ্চম পরিচে হস্তের অভিনয় করিয়া বলিল, “কিগাে বৌ ঠাকরুণ চিনতে পার ?” ইন্দু, সাবিত্রীর পশ্চাতেই দাড়াইয়া ছিল। আগন্তুককে নিকট-দৃষ্টিতে দেখিব মাত্র ইন্দুর মনে যে সামান্য সন্দেহ ছিল তাহা বিদূরিত হইল ; সে চিনিতে পারিল যে ব্রাহ্মণ আর কেহ নহে—যে পূর্বদিন কালীঘাটে তাহাকে অস্ত্র-শূন্যথায় উদরের গর দেখাইয়। বুভুক্ষিতের ভন করিয়াছি, এ সেই ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ। এক্ষণে তাহার মুখে হাস্য এরূপ বীভৎস দেখাইল যে ইন্দু স্তভাবে গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিল। এদিকে সাবিত্রীও আগন্তুককে দেখিয়া, পথের মধ্যে সহসা উর্ধ-ফণ। বিষধর দেখিলে লোকে যেরূপ আতঙ্কে শিহরিয়া উঠে, সেইরূপ বিভীষিকায় বিবর্ণ ও নির্বাক হইয়া গিয়াছিলেন। তিনি অতি কষ্টে আত্ম-সংবরণ করিয়া কি বলিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু তাহার বাক্য-স্ফুর্তি হইল না। তিনি কেবল “হ” বলিয়া, তাহাকে যে চিনিতে পারিয়াছেন, তাহাই জানাইলেন। ঘনশ্যাম পূৰ্ববং ক্রুর হাসি হাসিয়া বলিল, “বলি, গরিব দেওরকে কি একেবারে ভুলে গেলে গা ? শুনছি বড় ঘরে কুটুম করেছ-মেয়ের শুনছি নাকি অাবার- সাবিত্রী বিদ্যুৎস্পৃষ্টার মত চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, “তুমি, চাও কি। এখানে এসেছ—কি করতে?”
ই
শিকারী বিড়াল নেরূপ করতলগত মূযিককে লইয়া ক্রীছ
করে সেইরূপ ভাবে ঘনশ্যাম ধীরে ধীরে বলিল, “এত দিনের
পর দেখা পাওনা গেল—অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আপনার
জনকে কি এই রকম করে খাতির যত্ন করে ?”
সাবিত্রী সে কথায় কর্ণপাত ন, কারয়। বললেন, “তোমাকে
, জানা আছে ত—কি মতলবে এসছ—সেইটা স্পষ্ট করে বল।”
ঘনশ্যাম চিবাইয়া চিবাইয়া উত্তর দিল, “কথাটা একটু
আড়ালে বললে হয় না?”
সাবিত্রীর মনের বল ফিরিয়া আসিয়াছিল। তিনি স্থির
ভাবে হরিশঠাকুরকে বলিলেন-“কাকা, একটু আড়ালে
যাও ত—কি বলতে চায় শুনি।” হরিশ ঠাকুর এতক্ষণ
অবাক হইয়া উভয়ের কথোপকথন শুনিতেছিল। সাবিত্রীর
কথা শুনিয়া হরিশ ধীরে ধীরে চিন্তিতভাবে বাহিরে
সদর দ্বারের কাছে গেল। হরিশ বাহিরে যাইতেই সাবিত্রী
পুনরায় ঘনশ্যামকে বলিলেন, “কি বাতে এসেছ—বল ?”
ঘনশ্যাম। বলছি গাে-একটু ঠাণ্ডা হওনা-অমন করে
চলতি রেল গাড়ীতে চড়ে দাঁড়ালে কি আর কথা হয় ?
বেশত মাম রাজার হালে আই দেখছি-৬াক্তার জামাই
ক-জমিদার-গিন্নী বেয়ান হয়েছে তােমার ত এখন
পােয়াবারো। তা গরিব দেওরের একটা বিহিত কর।
পঞ্চম পরিচ্ছে
সাবিত্রী। আমি আবার তােমার বিহিত করব কি ?
বিধবা মানুষ-বাবা কিছু রেখে গেছেন, তাই দুমুঠো
খাচ্ছি—মেয়েটাকে মাস করতে পেরেছি। নইলে ত আমাকে
ভেসে বেড়াতে হ’ত-পরের দোরে ভিক্ষে কত হত।
তােমাদের দেশ থেকে এক কাপড়ে চলে এসেছিলুম, ভাৰ
কি খোজ রাখনা ?
ঘনশ্যাম। খোজ সবই রাখি বৌ-ঠাকরুণ-নইলে কি
আর এসেছি ? ত্রিপুরা দাদা কিছু রেখে জান নি, তা জানি,
কিন্তু তোমার বাপ ত বেশ, দুপয়সা রেখে গিয়েছেন শুনেছি।
ভ। তুমি এমনি সরে পড়েছিলে যে তােমার কোনও সম্মানই
করতে পারিনি। যাহােক ম' কালীর দোর ধরে ছিলুম -মা
কালীই সন্ধান করিয়ে দিয়েছেন। তােমার মত, জমিদারণীর
বেয়ান, ডাক্তার জামাইয়ের শাশুড়ী বিদ্যমান থাকতে কি আমার
কালীঘাটে কাঙ্গালী-বত্তি কর। আর ভাল দেখায় ? আমার
বিহিত না করলে আমি এখান থেকে এক পাও নড়ছি না।
সাবিত্রী তাহার ভাবগতিক দেখিয়া বলিলেন, “দু পাঁচ
টাকা চাও ত দিতে পারি, নিয়ে যাও।”
ঘনশ্যাম পূৰ্ব্ববৎ বিকট হাস্যেয় অভিনয় করিয়া বলিল,
“দু পাঁচ শ'য়ের কথা কও, দু পাঁচ টাকা কি ? আমাকে কি
আটাশে ছেলে পেয়েছ বৌঠাকরুণ-ঘনশ্যামকে ফি চেন না ?
ইন্দু
সাবিত্রী। চিনি খুব, কিন্তু অত টাকা আমি পাক
কোথায় ? তােমাকে যথা সৰ্বস্ব দিয়ে কি আমাকে পতে
বসতে বল না কি ?
খনশ্যাম।
পথে বসবে না বৌঠাকরুণ–তা আমি
বেশ জানি। গোয়ালার দুধের দাম যতই কাট না—দুধে .
হাত পড়ে না-জলের ওপর দিয়েই যায়। তুমি কত
টাকার মালিক—তা মােদের গ্রামে গিয়ে জেনে আসিনি
কি মনে করেছ? গয়ন। পরে আর নগদে তুমি টাকার
আণ্ডিল নিয়ে বসে আছ।
সাবিত্রী। গায়ের লােকের অমন বাড়িয়ে বলে থাকে।
যা এনেছি—তাতে কোন রকমে দুমুঠো করে খাচ্ছি ।
আর আজ দশ বছর ধরে সেই টাকাই ভেঙ্গে ত খরচ
করে আসছি ; মেয়ের বিয়েতে খরচ হয়নি? সে টাকার—আর
আছে কি?”
ঘনশ্যাম। ও সব বাজে কঁাদুনী আমি শুনছি না-
পাঁচশ খানি টাকা গুণে না নিয়ে আমি এখান থেকে
উঠছি না। দু পাঁচ টাকার জন্যে কি আর তোমার
কাছে এসেছি? কালীর দোর ধরে আছি—যে দিন দুটো
কা রােজগার না করি, সে দিন তুমি আমায় বাপ করে গাল
দিও। কালীঘাটের কাঙ্গালী বামুনের ব্যবসাটা ভালাে, কিন্তু
1:
পঞ্চম পরিচ্ছে। আর ও কাজ ভাল লাগছে না, এবার আবার দেশে গিয়ে বসব মনে করেছি-তাই তােমার কাছে এসেছি। সাবিত্রী। দেশে যাবে তা যাওনা আমি না হয় রাহা খরচটাও দিয়ে দিচ্ছি। ঘনশ্যাম। বলেছি , পাঁচশ টাকার এক পয়সা কমে সে কাজ হবে না। চক্রবর্তীদের চক্রবর্তীদের ধেনাে জমিট। ধেনাে জমিটা শুনেছি বাকি খাজনার দায়ে নীলামে উঠবে; সেটাকে কিনে নিতেই তিন শ টাকা পড়ে যাবে—নইলে দেশে গিয়ে পেট চালাবাে কি করে ? ঘরের চাল গুলােও ভেঙ্গে পড়ে গেছে, সেগুলােও মেরামত করতে শ খানেক টাকার কমে হবে না। খেদীর বিয়েতেও কোন না শ খানেক যাবে। এই পাঁচ শ টাকা ত চাই-ই- সাবিত্রী। আমি অত টাক। কি ঘরে নিয়ে বসে আছি? যা কিছু আছে, সুদে খাটিয়ে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছি। ঘনশ্যাম। আচ্ছ। নগদ না পার, গয়না পরে যে রকমে পার দাও--তাতে আমার কোনাে আপত্তি নেই। সাবিত্রী কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আচ্ছা আজ যাও, ভেবে দেখি, তার পর জোগাড় করে যা পানি দেবাে।”
ইন্দু
।
ঘনশ্যাম। দেখাে, আমার সঙ্গে ন্যাজে খেলল না, অ
হলেই নিজমুক্তি ধর’ব-জামাই বড়িী গিয়ে হাটে হাঁড়ি
ভাঙ্গবে।
সাবত্রী। তাতে তোমার লাভটা হবে কি-না কি
তােমায় টাকা দেবে?
ঘনশ্যাম। তা না দি’-তোমার মেয়ের ত শ্বশুরবাড়ী
খাওয়ার দফা রফা হয়ে যাবে ?
সাবিত্রী। কেন, আমার মেয়ের দোষটা হ’ল কি ?
জামাই আমার তেমন ছেলে নয়—যে মােদের মত লােকের
লাগানি ভাঙ্গানি তে কাণ দেবে?
বন্যাম। আচ্ছা আমার কথা না শোনে--যার কথা
পিয়াদায় শােনাবে—সেই দিগম্বর গাঙ্গুলীকে এনে হাজির করব?
সাবিত্রী উত্তেজিত স্বরে বলিলেন, “কে দিগম্বর গাঙ্গুলী?
আমি তাকে চক্ষেও দেখিনি—তাকে চিনিনি—জানিনি।”
ঘনশ্যাম। তুমি না চেনাে, আমি ত জানি-অমি ত সে
বিয়ের সাক্ষী আছি।
সাবিত্রী অধিকতর উত্তেজিত হইয়া বলিলেন, “কিসের
বিয়ে-কার বিয়ে। দুধের মেয়েকে নিয়ে তােমাদের দেশ
থেকে চলে এসেছি—কে তােমার কথা বিশ্বাস করবে?
জামাই আমার লেখাপড়া শিখেছে-
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ঘনশ্যাম। জামাই না বিশ্বাস করে-তার মা কবে-
আর জ্ঞাতির করবে—তার গায়ে লােকেরা
লােকেরা কবে।
তাতেও যদি তোমার মেয়েকে ত্যাগ না করে, তা হলে
আদালত আছে-দিগম্বর বুড়ােকে এনে ফৌজদুর জুড়ে
দিয়ে, বাছাধনের পরের বৌ নিয়ে ঘর কর। গুতোর চোটে.
বের করে দেবো; দেখি তুমি মেয়ে দু দুটো বিয়ে দিয়ে
কেমন করে পার পেয়ে যাও।
সেই সময়ে “িকৃত কার একটা অস্ফুট ধ্বনি শুনিয়া
সাবিত্রী পশ্চাতে ফিরিয়া দেখেন ইন্দু থর থর্ করিয়া কাপি-
তেছে-তাহর মুখ পাংবর্ণ হইয়া গিয়াছে। সে যে ঘরের
ভিতর হইতে আবার কখন বাহিরে আসিয়া তাহার পশ্চাতে
দাড়াইয়াছিল, উত্তেজনাবশতঃ সাবিত্রী তাহা লক্ষ্য করেন
এখন ইন্দুকে কঁপিতে দেখিঃ সাবিত্রী স্থভাবে
তাহাকে ধরতে গেলেন। কিন্তু তাহার দেহ স্পর্শ করিতে না
করিতে সে সশব্দে বিগতচেতন হইয়া পড়িয়া গেল। তদ্দর্শনে
সাবিত্রী উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিয়া উঠিলেন, “কাকা শগগির
এস গাে, ইন্দুর আমার কি হলাে গো-কোথা থেকে এ আপদ
এসে জুটলো গো!”
সাবিত্রীর ক্রন্দন শুনিরা হরিশ ঠাকুর ব্যগ্র হইয়াকি
হয়েছে” বলিয়া বাড়ীর ভিতরে দুটিয়া আসিল। মদ, iৱৰ
৫
নাই।
ইন্দু কাছে গড়াইয়া অজিতের পরিচারক গুরুচরণ, হরিশ ঠাকুরের সহিত কথা কহিতেছিল; সাবিত্রীর কাতর কণ্ঠধ্বনি সেও শুনিতে পাইয়াছিল-হরিশ ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে সেও আসিয়া উপস্থিত হইল। বাটীর ঠিক। বি দামিনীও সেই সময়ে তাহার বৈকালের বাসন মাজা ও অন্যান্য গৃহ-কৰ্ম্ম সারিতে আসিয়াছিল। সকলে মিলিয়; ইনু চৈতন্য- সম্পাদনের চেষ্টায় নিযুক্ত হইল। সাবিত্রী, ইন্দুর মস্তক নিজ ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়া, তাহার চোখে ও মুখে জল সেচন করিতে লাগিলেন-দামিনী ব্যজন করিতে লাগিল। ঘনশ্যাম একটু সরিয়া গিয়া, বহিবাটী হইতে ভিতরে প্রবেশ করিবার জারের নিকট, দাড়াইয়াছিল। গুরুচরণ তাহাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ও লােকটা ওখানে দাড়িয়ে কে ?” দাসিনী কিয়ৎক্ষণ ঘনশ্যামের মুখের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিয়া উঠিল, “ওমা! ওকে যে কাল কালীঘাটে দেখেছি! ওইত কাল পেটের খোল আঁতে করলে ফেলে দিদিমণিকে ভয় দেখিয়ে শেষে শাপ মন্দ দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। ও আবার এখানে এসে জুটলো কি করে ? আবার চাদর গলায় দিয়ে, জুতাে পায়ে দিয়ে ভদ্দর লােক সেজেছন!-মরণ আর কি ? ও, এখানে কোথা থেকে এল ?”
স্বাগ, শেখে
পঞ্চম পরিয়ে
সাবিত্রী বলিলেন, “কোথা থেকে এসেছে তা ও-ই জানে,
মেয়েটাকে বুঝি একেবারে মেরে ফেল্লের! যা বাবা গুরুচরণ,
চট্করে একজন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আয়, শেষে কি
মেয়েটা মারা যাবে।
গুরুচরণ সেই কথা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের অনুসন্ধানে
দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল। এদিকে জল সেচন ও ব্যজন
করিতে করিতে কিয়ৎক্ষণ পরে ধীরে ধীরে ইন্দুর সংজ্ঞা
ফিরিয়া আসিলসে চক্ষু উন্মীলন করিল, কিন্তু তাহার
লক্ষ্যহীন চাহনীতে তখনও একটা আতঙ্কের ভাব জাগিয়া ছিল।
ডাক্তার আসিয়া দেখিলেন তাহার জ্ঞান হইয়াছে—তিনি
উত্তেজনা দমন করিবার জন্য একটা ঔষধ লিখিয়া দিয়া
এবং যাহাতে পীড়িতার কোনরূপ মানসিক উত্তেজনা না হয়
সে শান্তিতে ঘুমাইতে পারে, তাহার ব্যবস্থা করিয়া তাহার
দর্শনী লইয়া প্রস্থান কবিলেন। সাবিত্রী, দামিনীর সাহায্যে
ইন্দুকে তুলিয়া গৃহের মধ্যে শষ্যায় শয়ন করাইয়া দিলেন
এবং গুরুচরণকে ঔষধ আনিতে পাঠাইলেন। হরিশঠাকুর
ইন্দুর অবস্থা দেখিয়া এবং আগন্তুকের ব্যবহার ও সাবিত্রীর
সঙ্কোচভাব ও মলিন বদন লক্ষ্য করিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত
হইয়া গিয়াছিল। ইন্দুর জ্ঞান হইতেই হরিশঠাকুর যেন হাঁফ,
ছাড়িয়া বাঁচিল এবং সদর ঘরের কাছে গিয়া, সেইখানে বসিয়া
हेन्द्र
তামাকু সেবন করিতে লাগিল। দানিনী তাহার কাজ সারিয়া
চলিয়া যাইতেই, ইন্দু যে কক্ষে শয়ন ক-িয়া ছিল, সেই কক্ষের
ঘরে ঘনশ্যাম ধীরে ধীরে আসিয়া কহিল, “আমাকে আর
কতক্ষণ খসিয়ে রাখবে? মেয়ে ত ভাল হয়েছে, এই বার আমাকে
যা দেবার দাও—আমি চলে যাই।”
ঘনশ্যামকে দেখিয়া সাবিত্রীর পুনৰ্মার ধৈর্যচ্যুতি হইল।
তিনি বলিলেন, “মেয়েটাকে মেরে ফেলতে বসেছিলে। যাও
এখন যাও, আমাকে আর আলিও না।”
ঘনশ্যাম বলিল, “কে জান্ত, তােমার মেয়ে এসে আমাদের
কথা শুনবে? আমি টাকা না নিয়ে যাচ্ছি না—না দিলে আজই
হাড়াই ডােমাই করে যাবাে।”
ইন্দু তন্দ্রালস ভাবে খইয়া ছিল। পাছে তাহার নিদ্রা
ভঙ্গ হয়—আবার ফিট হয়, এই আশঙ্কায় সাবিত্রী দ্বারের কাছে
আসিয়া নিম্নস্বরে বলিলেন, “শুনলে, ত, টাকা যা আছে সুদে
খাটছে, এখন যাও, আর একদিন এসাে।”
ঘনশ্যামকে সে কথায় কর্ণপাত করিতে না দেখিয়া
সাবিত্রী বলিলেন, “অচ্ছ। দাড়াও যা আছে দিচ্ছি” এই কথা
বলিয়া সাবিত্রী বাক্স হইতে ইনুর শৈশবকালের কয়েক খানা
গহনা ও শতাধিক টাকা ও নােট বাহির করিয়া ঘনশ্যামের
হয়েদিয়া ঝললেন, “এই নিয়ে যাও, এতে দুশ টাকার বেশী
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
হবে, বাকি টাকা। এর পরে এসে নিয়ে যেও। কিন্তু যদি এই
কথা নিয়ে গোল কর, তা হলে আর এক পয়সাও দেবাে না।”
ঘনশ্যাম দন্তপাটি বিকশিত করিয়া বলিল, “রাধামাধব! এ
কথার টু শব্দ যদি আমার মুখ থেকে বেরােয় ত আমার নাক
কেটে দিও। কিন্তু আমি কালই এমনি সময় আসবো, দেরী
করতে পাছিনা, নইলে চক্রবর্তীদের জমিটা হাত ছাড়া হয়ে
যাবে। চুপি চুপি কাল টাক। কটা ফেলে দিলেই আমি দেশে
চলে যাবাে; ভূমি মনের সাথে মেয়ে জামাই নিয়ে স্বচ্ছন্দে
সাধ আহ্বাদ করে। আর কোন্ ** তােমার দরজা মাড়াবে।”
এই কথা বলিতে বলিতে ঘনশ্যাম সেই গহনা, নােট ও টাকা
গুলি উত্তরীয় বস্তু ধীরে ধীরে বাঁধিয়া লইল। সেই সময়ে
গুরুচরণ ঔষধের শিশি লইয়া আসিয়া দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া-
ছিল। তাহাকে দেখিয়া ঘনশ্যাম আর কোনও বাক্যব্যয় না
করিয়া প্রস্থান করিল।
ইন্দুকে একমাত্র ঔষধ সেবন করাইয়া সাবিত্রী তাহার
কাছে বসিয়া রহিলেন। হরিশঠাকুর, ঠিক যে কি ব্যাপার
ঘটিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারিল না; কিন্তু সাবিত্রী স্বতঃপ্রবৃত্ত
হইয়া হরিশকে কোনও কথা বলিলেন না বলিয়া হরিশও সে
বিষয়ে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিল না। তিন ঘণ্টা পরে
ইকে পুনরায় ঔষধ সেবন করাইতে যাইতে ইহুবলিল, “না,
ইন্দু আর ওষুধ কার নেই। সাবিত্রী বলিলেন, “আর এক দাগ খাওনা?” ইন্দু দৃঢ়স্বরে বলিল, “না।” সাবিত্রী দেখিলেন কাল- বৈশাখীর তুমুল ঝড় উঠিবার আগে দিঙমণ্ডল যেরূপ ওমােট হইয়া থাকে ইন্দুর সেই রূপ ভাব। তিনি আর কোনও কথা কহিলেন না। নীরবে ইনুর কাছে শয়ন করিলেন। । .
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
সে রাত্রিতে সাবিত্রীর নিদ্রা হইল না। সুকিয়া স্ট্রটের
গাড়ির শব্দ এবং তাঁহাদের বাটীর সম্মুখের গলিতে পথিকের
পদশব্দ ক্রমশঃ বিরল হইতে বিরলতর হইয়া শেষে একেবারে
থামিয়া গেল। জনকোলাহলময়ী রাজধানী নিস্তব্ধ হইল।
সাবিত্রীর মনে হইল সে রজনীতে সকলেই সুপ্তিমগ্ন কেবল
তিনিই একাকিনী বুঝি জাগ্রতা ; তাঁহার মত দুর্ভাবনা আর
কাহার আছে ! তাহার মত বিষম সমস্যায় আর কে পড়িয়াছে ?
দ্বিপ্রহরের সময় পাহারওয়াল। আসিয়া তাহাদের জানালার
কাছ দিয়া হাঁকিয়া গেল। তিনি তখনও বিনিদ্র-নয়নে পূর্বকথা
ভাবিতেছেন।
সাবিত্রী কুলীন-কন্য। তাঁহার পিতা একজন শাস্ত্রজ্ঞ
অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বহু বিবাহ করিয়া ছিলেন, কিন্তু
শেষে সাবিত্রীর জননীকে বিবাহ করিবার পর আর বিবাহ
করেন নাই—তাহাকে গৃহে আনিয়া সংসারী হইয়া ছিলেন।
দশ বৎসর বয়সের সময় সাবিত্রী মাতৃহারা হয়েন, তদবধি
পিতাই তাঁহাকে মাতার যত্নে ও পিতার দেহে লালন পালন
ইন্দু করেন। তিন সাবিত্রীকে লেখাপড়া শিখাইয়া ছিলেন এবং গৃহ কার্যে ও শিল্পনৈপুণ্যেও বিত্বগ্রামের মধ্যে সাবিত্রীর সমতুল্যা আর কেহ নাই-সাবিত্রীর এই রূপ খ্যাতি হইয়াছিল। সাবিত্রীর পিতা শাস্ত্রজ্ঞানী হইয়াও কিন্তু কৌলীন্যের গৌরব বা মােহ ত্যাগ করিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই বয়স্থ হইলেও সাবিত্রীর বিবাহ হয় নাই। অবশেষে রামকানাইপুরের বিখ্যাত কুলীন ত্রিপুরাচরণ বন্দোপাধ্যায়ের সহিত তিনি সাবিত্রীর বিবাহ দেন। সাবিত্রীর পিতার ইচ্ছা ছিল না যে সাবিত্রী স্বামীর ঘর করিতে যান। কারণ ত্রিপুরাচরণ : তেত্রিশটি বিবাহ করিয়া ছিলেন এবং কৌলীন্য ভিন্ন তাহার অপর কোনও গুণ ছিল না—তিনি কাণ্ডজ্ঞানহীন ও নেশাখাের ছিলেন। সাবিত্রীর রূপে ও গুণের খ্যাতিতে মুগ্ধ হইয়। কিন্তু ত্রিপুরা তাহাকে গৃহে লইয়া গিয়া সংসার করিবার জন্য অতিশয় আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। পিতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাবিত্রী নিজেই স্বামিগৃহে যাইতে চাহিলেন, অগত্যা সাবিত্রীর পিতা তাঁহার প্রাণতুল্যা কন্যাকে স্বামিগৃহে পাঠাইয়া দিলেন। সাবিত্রীর বয়স তখন পঁচিশ বৎসর উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। সাবিত্রীকে গৃহে লইয়া গিয়া ত্রিপুরাচরণ তাহার অপর বত্রিশটি শ্বশুরালয় হইতে অর্থ লইয়া আসিবার ব্যবসায় ছাড়িয়া দিয়া পৌরহিত্য করিয়া কায়ক্লেশে সংসার চালাইতে লাগিলেন। এই রূপে ছয় বর্ষ ষষ্ঠ পরিচ্ছে কাল তিনি সাত্রিীকে লইয়া সংসার করিয়া ছিলেন। সেই সময়েই ত্রিপুরাচরণের গৃহে ইন্দু ভূমিঠা হয়। কন্যা হওয়াতে ত্রিপুরাচরণ নিরতিশয় ক্ষুব্ধ হয়েন এবং ভার্ণ কাদায়ের দুর্ভাবনা হ্রাস করবার জন্য পুনরায় নেশার মাত্রা বৃদ্ধি করেন। গাজা, গুলি, আফিম, ভাঙ.এই চতুবিধ নেশাতেই তিনি পরিপক্ক ছি..ন এবং এইসকল নেশার সঙ্গী ছিল হার—ঘনশ্যাম । ঘশ্যাম পুরাচরণকে গ্রাম সম্পর্কে দাদা বলত, ভু। উভয়ের মধ্যে কোনও শোণিত-সম্বন্ধ ছিল না ; ঘনশ্যামও ব্রাহ্মণ, কিন্তু কুলীন নহে। ইন্দুর বয়স দুখন দেড়বর্ষ এ সেই সময়ে নিকানাইপুরে দিগম্বর গাঙ্গুলী নামে একঙন কুলীন ব্রাহ্মণ দশ বৎসরের বালিকা হইতে পঞ্চাশৰ বয়স্কা পৰ্য্যন্ত এককালীন সাত আটটা কুলীন- কন্যার কুমারী , ম ঘুচাইতে আইসে; দিগম্বর নিজে তখন অশীতিপর বৃদ্ধ। • ঘনশ্যাম সেই সংবাদ পাইয়া ত্রপুরাকে পরামর্শ দি, সেই পাত্রের হস্তে ইনুকে সমর্পণ করিলে ত্রিপুরার ভবিষ্যতে কন্যাদায়ের ভাবনা আর থাকবে না দশ পনর টাকা দিলেই ত্রিপুরা রাজি হইবে এ বিবাহটী তাহার বিশ্বগ্রামের পর বিবাহগুলির সঙ্গে ‘ফাট’ বলিয়া ধরিয়া লইবে; কন্যাপার করিবার এমন সুযােগ ত্রিপুরা আর কখনও পাইবে না, ত্রিপুরা রাজি হইলে ঘনশ্যাম সমস্ত ঠিকঠাক ইন্দু করিয়া দিয়ে। ত্রিপুর; তাহার অনুজপ্রতিম, এক কলিকায় গঞ্জিকা সেবনের ইয়ার ঘশ্যামের কথায় তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল, কিন্তু সাবিত্রী সে কথা বলাতে সাবিত্রী বলিলেন, তিনি প্রাণ থাকতে তাহার দুধের মেয়ের জীবনটাকে কিছুতেই সেইরূপে বৃথা করিতে দিবেন না। সাবিত্রী প্রাণপণে স্বামীর . সেবা করিতেন, এবং তাহাকে নেশা ত্যাগ করাইয়া সৎপথে আনতে সাধ্যমত চেষ্টাও করিয়াছিলেন। প্রথম প্রথম সাবিত্রীর রূপের মোহে এবং সেবায় ও স্বার্থত্যাগে তুষ্ট হইয়া ত্রিপুরা তাহার রিত্র সংশােধন করিতে চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু সারাজীবনের অভ্যাসে ও ঘনশ্যামের সঙ্গদোষে শেষে ত্রিপুরা পুনরায় হাল ছাড়িয়া দিয়াছিল ; সে আর সাবিত্রীর কোন কথাই শুনিত না। এক্ষণে ইদুর বিবাহের এই প্রস্তাব লইয়া সাবিত্রীর সহিত ত্রিপুরার মতান্তর—মনান্তর হইল; ত্রিপুরা সাবিত্রীকে কটুকথা বলিল। সাবিত্রী স্ত্রীলােকের শেষ অস্ত্র- ক্রন্দনের আশ্রয় লইলেন এবং শেষে ভাবিলেন বুঝি তাহারই জয় হইল। কিন্তু সাবিত্রী জানিতেন না যে ঘনশ্যামের পরামর্শে ত্রিপুরা তাহাকে পরাজিত করিবার আর এক উপায় অবলম্বন করিবে। একদিন রাত্রিতে সাবিত্রী ইন্দুকে ক্রোড়ের কাছে লইয়া ঘুমাইয়া ছিলেন। হঠাৎ মধ্যরাত্রে, বাহিরে ইন্দুর উচ্চ ক্রন্দনের শব্দ শুনিয়া, তাহার নিদ্রা ভঙ্গ হইল ; •• ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ তিনি চমকিয়া উঠিয়া ক্রোড়ের কাছে হাত দিয়া দেখেন ইমু সেখানে নাই। তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া গৃহের বাহিরে আসিয়া দেখেন তাহার স্বামী একটী লণ্ঠন অন্ত অগ্রে অগ্রে আসিতেছে এবং পশ্চাতে ঘনশ্যাম ইন্দুকে ক্রোড়ে লইয়া মাসিতেছে ; ইন্দু প্রাণপণ চীৎকারে কাদিতেছে ও হাত পা ছুড়িতেছে। ইহুর অন্নপ্রাশনের সময় সাবিত্রীর পিত। যে চেলীর কাপড়খানি পাঠাইয়া ছিলেন, কে ইন্দুকে সেই কাপড়খানি সরাইয়া দিয়াছে। ঘশ্যাম গৃহের দাওয়ায় অধীরভাবে ক্রন্দন- রতা ইন্দুকে বসাইয়া দিয়া সাবিত্রীকে বলিল, “বৌ-ঠাকরুণ, এই নাও তোমার মেয়ে ; ঘােষালদের বাড়ীতে আজ দুটো মেয়ের সঙ্গে দিগম্বর গাঙ্গুলীর বিয়ে ছিল জানত? সেই ঙ্গে তোমার মেয়েরও বিয়ে দিয়ে এনেছি। এখন কি ক কবে কবে—এখন দাদার সঙ্গে লাঠালাঠিই করে। অর কান্নাকাটিই করে। বিয়ে ত আর ফিরবে না ? কেমন মজা ! আমি এখন অসি তাহলে দাদা”, এই কথা বলিয়া ঘনশ্যাম হাসিতে হাসিতে প্রস্থান করিল। সাবিত্রী, ইন্দুর পরিহিত সেই ক্ষুদ্র চেলীর কাপড়খানি তাহার অঙ্গ হইতে খুলিয়া লইয়া নিষ্ফল ক্রোধে ছিড়িয়া খণ্ড খণ্ড করিলেন, তাহার মস্তকের সিন্দুর জলদিয়া ঘােত করিয়া দিলেন শেষে তাহাকে বক্ষে টানিয়া লইয়া ভূমিতে পড়িয়া মৰ্ম্মদ ইন্দু বেদনায় ধাতল অশ্রুসিক্ত করিতে লাগিলেন। তাহার পরদিন ইন্দুর সেই বিহাহের কোন কথাই সাবিত্রী উত্থাপন করিলেন না। ত্রিপুরা ও সাবিত্রীর ভাবগতিক দেখিয়া সে কথার উথাপন করিতে সাহস পাই না। দিগম্বর গাঙ্গুলী সেই দিনই রামকানাইপুর ত্যাগ করিয়া স্বদেশে ফিরিয়া গেল। এই ঘটনার ছয় মাস পরেই ত্রিপুরা একদিন অসুস্থ অবস্থায় অধিক পরিমাণে গঞ্জিক। সেবন করিয়া কাশিতে কাশতে শ্বাসরুদ্ধ হইয়া ইহলোক হইতে বিদায় লইল। সাবিত্রী তাঁহার দুই বৎসর বয়স্কা কন্যাটীকে লইয়া পিতৃগৃহে ফিরিয়া আসিলেন। সাবিত্রীর বৃদ্ধ পিতা কাকে নিজগৃহে ফিরিয়া পাইয়া স্বর্গ হাতে পাইলেন। কুলীন ব্রাহ্মণের গৃহে কন্যার বৈধব্য অতি সাধারণ ঘটনা, সেজন্য সাবিত্রীর পিতা দুঃখিত হইবার বিশেষ কোনও কারণ দেখিলেন না; তিনি জরাতুর হইয়া পড়িয়া ছিলেন এসময়ে তাঁহার নয়নপুত্তলি কম্মিষ্ঠা কন্যা গৃহে আসিয়া তাঁহার দেবার ভার গ্রহণ করাতে তিনি সন্তুষ্টই হইলেন। সাবিত্রী পিতৃগৃহে আসিয়া, তাঁহার দুগ্ধপােষ্যা কন্যার যে অশীতিপর বৃদ্ধের সঙ্গে তাহার অজ্ঞাতে কৌশল করিয়া তাঁহার স্বামী বিবাহ দিয়াছিলেন, সেই বীভৎস ঘটনার কথা প্রকাশ করিলেন না। রামকানাইপুরে থাকিতেও ঘনশ্যামের মুখে সেই রাত্রিতে যে কথা শুনিয়াছিলেন তাহার পর সাবিত্রীর
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
কাছে অন্য কেহ সেকথার উত্থাপন করে নাই এবং বিত্ৰী সে
সম্বন্ধে কোনও কথা কাহাকে জিজ্ঞাসাও করেন নাই।
এক্ষণে পিতৃগৃহে আসিয়া সাবিত্রী সে কথা মানুপট হইতে
একেবারে মুছিয়া ফেলিবার বাসনা করিলেন। তিনি তাহার
শিশু কন্যার জীবন নূতন করিয়ানিজের মনের মতন করিয়া,
গড়িয়া তুলিবেন স্থির করিলেন। পিতার গৃহে বৃদ্ধপিতা ব্যতীত
তাহার এক বৃদ্ধা পিসিমা ছিলেন; উভয়ের অন্ধের যষ্ঠি স্বরূপ
হইয়া সাবিত্রী কন্যাকে লইয়া পিতৃগৃহে বাস করিতে লাগিলেন।
পাঁচবৎসর শান্তিতে কাটিয়া গেল, তৎপরে সাবিত্রীর পিতৃবিয়ােগ
হইল এবং কয়েকমাস পরেই বৃদ্ধ। পিসিমাও তার অনুগমন
করিলেন। সাবিত্রী এইবার তাহার মনের কল্পনা কাৰ্য্যে পরিণত
কবাির সুযােগ পাইলেন।
তিনি ভাবিলেন হয় ত রামকানাইপুরের কোনও লােক
ঘটনাক্রমে কখনও বিষগ্রামে অাসিয়া উপস্থিত হইতে পারে
এবং তাহা হইলে যে কথা তিনি দুঃস্বপ্নের মত বিত
হইবার চেষ্টা করিতেছেন-ঘটনাক্রমে তাহা প্রকাশ হইয়া
পড়িলেও পড়িতে পারে। তিনি
তিনি স্থির করিলেন সেপ
সম্ভাবনার আশঙ্কা যাহাতে না থাকে—সেই পথ তিনি
মবলম্বন করিবেন। তিনি বিশ্বগ্রাম হইতে কন্যাকে লইয়া
একেবারে নিরুদ্দেশ হইবেন। বিগ্রমে হরিঠাকুর নামে
ই একজন কৃতি নিরীহ, প্রকৃতির ব্রাহ্মণ বাস করিতেন- তাঁহার ব্রিসংসারে আপনার বলিতে কেহই ছিল না। একবার গ্রামে ওলাউঠার ভীষণ প্রাদুর্ভাব হয় এবং সেই মহামারীতে হরিশ ঠাকুরের স্ত্রী, পুত্র, কনা ও জননীর সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যু হয়। সেই সময়ে হরিশ ঠাকুরের কিছুদিন মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। তাহার সেই অবস্থা দেখিয়া সাবিত্রীর পিতা দয়াপরবশ হইয়া হরিশকে নিজ বাটীতে আশ্রয় দেন। তদবধি প্রায় ২৫ বৎ র হ র ঠাকুর সাবিত্রী- দের বাটীতেই বাস করছিল। সাবিনার পিতা যেমন তাহাকে কনিষ্ঠ সহোদরের মত স্নেহ করতেন। হরিশ ও সেইরূপ সাবিত্রীকে অপার কন্যার মত স্নেহ করত ও জননীর মত শ্রদ্ধা করিত। হরিশ সাবিত্রীর নিতান্ত বাধ্য ছিল। সাবিত্রীর মা তা এক জন ধনাট্যের কন্যা ছিলেন- তিনি পিতৃগৃহ হইতে বহু মূল্যবান অলঙ্কার লইয়া স্বামিগৃহে আইসেন এবং সাংবএীর মাতামহ মৃত্যুকালে কন্য। ও জামা- তাকে প্রায় পাঁচ সহস্র টাকার সম্পত্তি দিয়া যান। সাবিত্রীর পিতা জমিদারী:রক্ষার কাট হইতে নিস্কৃতি লাভে জন্য সেই সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া নগদ অর্থে পরিণত করিয় ছিলেন। সাবিত্রী সেই অর্থ ও অলঙ্কারাদি লইয়া, তীর্থ দর্শন করিতে যাইতেছেন এই কা গ্রামের পিতৃ-সঞ্চিত ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ললাকেদের বলিয়া, কলিকাতায় চলিয়া আসিলেন। সাবিত্রী যাহা করিতেন, হরিশ ঠাকুর সে বিষয়ে কখন কোনও আপত্তি বা প্রতিবাদ করিত না—তাহার রণা ছিল সাবিত্রীর মত সুবুদ্ধিমতী নারী আর ত্রিজগতে কেহ নাই- সাবিত্রী কখনও কিছু অন্যায় করিতেই পারেন না। সাবিত্রী বলিলেন—“কাকা, আমরা এখান থেকে বাস তু•ে অন্য যায়গায় না গেলে ইন্দুর, লেখাপড়া শেখানর সুবিধে হবে না, তুমি কাকেও কিছু বলল না। খােলা আমরা কাশী বৃন্দাবন দেখতে যাবাে।” হরিশ ঠাকুর সে কথার কোন প্রতিবাদ না করিয়া সাবিত্রীর আদেশ পালন করিল। সেই অবধি সাবিত্রী কলিকাতায় আসিয়া বাদুড়বাগানে যে ক্ষুদ্র বাটাখানিতে অাছেন, সেই বাটী ভাড়া করিয়া সেইখানেই বাস করিতেছেন। তিনি ইন্দুর সেই শৈশবের বিবাহটাকে বিবাহ বলিয়া মুহূর্তের জন্যও স্বীকার করেন নাই—তিনি ইনুর পুনরায় বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিয়াই কলিকাতায় আইসেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন- সেই ঘটনার কথা তিনি ভিন্ন কেহই জানে নাই তাহা কখনও নিতেও পারিবে না—সুতরাং তাহার পুনরায় বিবাহ দিলে যদি কোনও পাপ হয় সে পাপ তাহারই হইবে। প্রাণাধিকা কন্যার সুখের জন্য সে পাপের যদি পরলােকে ইন্দু কোনও স্তি থাকে, তাহা তিনি অম্লানবদনে সহ করিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ক্রমে যখন ইন্দু বয়স্থ। হইয়া উঠিল এবং অর্থের অভবে, তিনি যেরূপ উচ্চ তিনি যেরূপ উচ্চ আশা করিয়াছিলেন- সেরূপ মনের মত পাত্রের সন্ধান করিতে পারিলেন না, তখন তিনি ভাবিলেন—ইন্দুর না হয় নাই বিবাহ হইল—বিবাহ-না হইলে কি আর মানুষ সুখী হয় না। আর বিবাহ দিলেই কি, সকলে সুখী হয়, কত লোকে যে বালিকা বয়সেই বিধবা হয় ? কুলীন কন্যার বিবাহ ত অনেক সময় পাপের শাস্তি মাত্র, সেরূপ বিবাহ না হওয়াই কি স্ত্রীলােকের পক্ষে সুখের নহে? সাবিত্রীর মনে যখন সেইরূপ নৈরাশ্যজনিত দুঃখবাদের উদয় হইয়াছে, সেই সময়ে অজিত ডাক্তার হইয়া আসিয়া সম্মুখের ৰাটী ভাড়া করিল। তাহার পর সাবিত্রী যখন দেখিলেন অজিত তাহার প্রাণসমা ইনুকে বিবাহ করিতে ইচ্ছুক, তখন সাবিত্রীর মনে কঠোর নৈরাশ্যের পর আশার প্লাবন আসিল—তাহার হৃদয়াকাশে ঘনঘাের কাটিয়া গিয়া শারদাষ্টমীর জ্যোৎস্না ফুটিয়া উঠিল। যেদিন অজিতের জননী, ইন্দুর সহিত অজিতের বিবাহ প্রস্তাবে তাহার সম্মতি জানাইয়া ঠাইলেন, সে দিন সাবিত্রীর কি আনন্দ! অজিতের মত রূপে গুণে সুপাত্র পাওয়া, অজিতের মত সন্ত্রান্ত ধরে ইন্দুর বিবাহ দেওয়া কি কম যৌভাগ্যের কথা ! বিবাহের পর অজিতের আরোগ্য-সংবাদ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ লইয়:, রত্নালঙ্কারে ভূষি হইয়া, যে দিন ইন্দু মাতৃ- সকাশে ফিরিয়া আসি, সে দিন সাবিন্ত্রীর সুখ (যাল কলায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি সর্বমঙ্গ সদায়িনী মা কালীর পূজা দিবার জঙ্ক ব্যগ্র হইলেন। কে জার্মিত মা কালী তাহার আশার গ্রাস মুখের নিকট হইতে কড়িয়া লইবেন? কে জানিত তঁাহার আশাওতি শন্তি সুখে অট্টালিক। বিধ। তার এক নির্মম ফুৎকারে ভাঙ্গিনা চুরিয়া রেণু রেণু হইয়া অকস্মাৎ ধূলায় মিশিয়া যাইবে?' কে জানিত তিনি এ জগতের মধ্যে যার মুখ দর্শন করিতে সর্বাপেক্ষা অনিচ্ছুক, সেই ঘনশ্যাম তঁাহার তাবৎ জীবন বিষময় করিয়া দিবার সেই কালীঘাটে কাঙ্গালী বেশে তাঁহার আগে দাড়াইয়া থাকিবে ! এখন যে সে কঠিন নিয়তির মত তাহার সঙ্গ ছাড়িবে না—পদে পদে তাহার মনের শান্তির ও ইন্দুর ভবিষ্যৎ সুখের হন্তারক হইবে তাহার কোনও সন্দেহ নাই। এখন তাহকে অর্থ দেওরা কেবল অনিবাৰ্য্য বন্যার ক্ষণিক গতিবোধ করিবার অশাৰ বালির বাব বাপ। মাত্র, এ কথা বুঝতে সাবিত্রীর বিল হইল না। কিন্তু সক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ অশ’-ঘনশ্যামের অপততঃ মুখবন্ধ করিবার জন্য তাহাকে অর্থ দিতেই হইবে। তাহারপর কি হইবে তাহা ভাগ্য- বিধাতাই জানেন। ইনুর শৈশবের বিবাহবন্ধন অগ্রাহ জন্য ৭।
ইন্দু
করিয়া তিনি, ধর্মের অমান্য করিয়াছেন বলিয়াই কি তাহার
এই কঠোর শান্তি ? কিন্তু সে কি বিবাহ ? সে যে অধর্মের
পৈশাচিক অভিনয় ; সেই নিষ্ঠুর—অমানুষিক অচার লবন
করিলে কি কোনও পাপ আছে? আর যদি পাপ থাকে সে জন্য
তিনিই দায়ী, তাহার কন্যার ত কোনও অপরাধ নাই—তবে
তাহার এ কঠিন শাস্তির বিভীষিকা কেন ?
এই সকল কথা ভাবিতে ভাবিতে নাহি চক্ষে নিদ্র।
আসিল না। অতীত জীবনের চিত্রগুলি প্রত্যক্ষবৎ একে
একে তাঁহার মনশ্চকে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। পূৰ্ব্বকথা
চিন্তা করিতে করিতে ভবিষ্যতের ভাবনা আসিল; সেই
ভাবনায় তঁাহাকে অভিভূত করিয়া ফেলিল। দুশ্চিন্তায়
অকুল পাথারে পড়িয়া তিনি অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। সেই
অবস্থায় শেষরাত্রে তাহার একবার মাত্র ক্ষণেকের জন্য
ভাবেশ আসিল। সেই সময়ে ইন্দু ভীতি-বিল-কণ্ঠে আর্তনাদ
করিয়া উঠিল। সেই শব্দে সাবিত্রীর তন্দ্রা ভঙ্গ হইল।
সপ্তম পরিচ্ছেদ সাবিত্রী মনে করিয়াছিলেন ইন্দু ঘুমাইয়াছে। বিরাম- 'দায়িণী নিদ্র। সে তাহার মত দুশ্চিন্তীর অসহ যাতনা হইতে ইন্দুকে অব্যাহতি দিয়াছে, একথা ভাবিয়া সাবিত্রী সেই দারুণ দুর্ভাবনার মধ্যেও মনে একটু সন্তোষ অনুভব করিতেছিলেন। কিন্তু সেই অনুমান সাবিত্রীর ভ্রম। ইক্ষু ঘুমায় নাই, সেও নিদ্রাহীনচক্ষে দুর্ভাবনার অন্তর্দাহ নীরবে ভােগ করিতেছিল। পাছে সাবিত্রী তাহার মনের কথা জানিতে পারেন -পাছে সাবিত্রীর নিদ্রার ব্যাঘাত হয়, এই ভয়ে ই নিদ্রালস-ভাবে শয়ন করিয়াছিল। ক্ষোভে, দুঃখে, লজ্জায়, ঘৃণীয় ও নৈরাশ্যের তাড়নায় ইন্দুর হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হইয়া গিয়াছিল, ভবিষ্যৎ-চিন্তায় তাহার হৃদয়ের ক্ষত হইতে প্রাণঘাতী রক্তমােণ হইতেছিল। ইন্দ্র নীরবে সেই 'যাতনা সহ্য করিতেছিল। সে যে ভয়ানক কথা শুনিল তাহা কি সত্য? সত্য না হইলে তাহার জননী, সেই দুবৃত্ত কাঙ্গালী ৰাহ্মণের কথায় ভীতা-সঙ্কুচিত হইয়া যাইবেন কেন? তাহাকে অর্থদ্বারা বশীভূত করিবার চেষ্টা করিবেন কেন-
ইন্দু
তাহাকে প্রশয় দিবেন কেন? সে কথা যদি সত্য হয়--
তাহা হইলে ত তাহার অজিতের সহিত বি এ নিথ।
হইয়া গেল! কিন্তু সে যে ধর্মসাক্ষী করিয়া অজিতকেই
জীবনমরণে একমাত্র পতি বলিয়া বরণ করিয়া লইয়ছে-
তাহার কি হবে ? অজিত তাহাকে গ্রহণ না করলেও
সে ত জীবনে মরণে অজি তকে ত্যাগ করিতে পারিবে না ?
সে যে ইহকাল পরকালের জন্য প্রাণ মন অজিতকে সমর্পণ
করিয়াছে-অজিত যে তাহার প্রাণের প্রাণে চিরদিনের
জন্য জড়াইয়া গিয়াছে—তাহার প্রাণের তার ছিড়িয়া যাইলেও
ত সে বন্ধন ছিড়িবে না। তাহার উপায় কি ? হায়!
তাহার মা তার এ দুৰ্ব্ব কেন হইল-এ সাংঘাতিক কথা
তাহাকে আগে বলেন নাই কেন ? তাহা হইলে ত সে
সাবধান হইতে পারি-কলুষিত মন্দিরে দেবতার পূত-মুক্তি
স্থাপন করিতে সাহসী হইত না। এখন তাহার কর্তব্য
কি? সে এখন কোন সাহসে অজিতের পবিত্র গৃহ কলুষিত
করিতে যাইবে ? অজিত তার ইহজীবন পরজীবনের একমাত্র
দেব-সে অজিতকে পূজা করিতে বাধ্য—কিন্তু অজিত ত
তাহার পূজা গ্রহণ করিতে বাধ্য নহেন ? এ সমস্যার মীমাংসা
কে করিবে? হায়, কেন দেখা হইল ! অজিতের সঙ্গে দেখা
হইবার পূর্বে ত তাহার জীবন একরকমে কাটিয়া যাইতেছিল।
৭৪
।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
জাহার সে উৎসববিহীন জীবনে এ ক্ষণিক সুরে মহাসমারােহ
কেন আসিল ! কিন্তু এ কি ক্ষণিক অজিতের ভালবাসার
স্মৃতি কি ক্ষণিক ? তাহার তুচ্ছ জীবনের নিময়ে অজিতের
সেই কয়দিনের ভালবাসা পাওয়া কি সৌভাগ্যের কথা
নহে ? কিন্তু তার পর? সে যে সেই অমূল্য ভালবাসা
পাইবার যােগা নহে—সে ভালবাসা পাইবার তাহার কোনও
অধিকারই নাই—একথা জানিয়া শুনিয়া কি করিয়া সে সেই
ভালবাসার দাশী করতে যাইবে ? তাহা হইলে অজিতের
শুশুচি দেবমূর্তি যে কর্দমাক্ত-অপবিত্র হইয়া যাইবে-
সে কি প্রাণ থাকিতে তেমন কাজ করিতে পারে? সে কি
এতই স্বার্থপর? সে কি তাহার ss। ৩র এমন অনষ্ট
প্রাণ থাকিতে করিতে পারে? না-কিছুতেই নয়। কিন্তু
তার পর? অজিতকে ছাড়িয়া সে কি লইয়া জীবন ধারণ
করিবে!-ইনু আর ভাবিতে পারিল না; দারুণ উত্তেজনার
পর তাহার দেহে যেমন একটা অবসাদ আসিয়াছিল, এক্ষণে
দুর্ভাবনার পর দুর্ভাবনা, বারিধির অবিশ্রান্ত তরঙ্গভঙ্গের মত
কল্লোলিত হইয়া আসিয়া তাহার মনের উপরও একটা
জড়তা আনিয়া দিল। সে অর্ধনিদ্রিত অজাগরিত ভাবে
সেই ভীষণ রাত্রির প্রথম দুই যম অতিবাহিত করিল।
শেষরাত্রে সাবিত্রীর মত, হনুমও তাবেশ আসিল।
ইন্দু
সেই তন্দ্রাদোকে ইনু স্বপ্ন দেখিল, যেন অবিশ্রান্ত বারিবর্ষণ
হইতেছে ; আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন—মুহুর্মুহু বিদ্যুতের অন্তরেখ।
দিঙমণ্ডলের সেই অন্ধ-তাহসাবরণ চিরিয়া চিরিয়া দুর্যোগের
ভীষণ ভীষণতর করিয়া দেখাইতেছে। সুকিয়াটি জলে
ভরিয়া গিয়াছে—তাহাদের বাটীর সম্মুখের গলিতে নদী
বহিয়া যাইতেছে—তাহাদের গৃহের মধ্যেও যেন আবক্ষ জল
উঠিয়াছে। বাড়ীতে যেন আর জনমানব নাই – একাকিনী।
বাহির হইতে--অজিতদের ছাদের উপর হইতে-যেন অজিত
তাহাকে ডাকিতেছে—“শীগগির চলে এস—তোমাদের বাড়ী
পড়ে যাবে দেরী কোনাে না-রাস্তায় এস।” ইন্দু অন্ধকারে
হাতড়াইতে হাতড়াইতে সেই জলপ্লাবন ভেদ করিয়া পথে বাহির
হইয়া বিদ্যুতের আলােকে দেখিল, অজিত ছাদের উপর হইতে
একখানি বস্ত্র, রজ্জর মত পাকাইয়া ঝুলাইয়া দিয়া, বলিতেছে
*ই কাপড়খানা জোর করে ধর--আমি তােমায় টেনে
তুছি—এস এগিয়ে এস।” ইনু আকণ্ঠ জলরাশি অতিক্রম
করিয়া পথের অপর পারে গিয়া প্রাণপণে সেই বিলম্বিত
বন্ত্রের অগ্রভাগ ধরিয়াছে এবং অজিত তাহাকে টানিয়া
তুলিতেছে। সে প্রায় ছাদের নিকটে উঠিয়াছে—আলিসায়
তাহার মস্তক ঠেকিয়াছে—অজিত তাহাকে পরিবার জন্য হস্ত
প্রসারণ করিয়াছে-জিতের তাহাব মস্তকে স্পর্শ
বেগে নিয়ে বিক্ষিপ্ত
সপ্তম পরিচ্ছে
করিয়াছে ! এমন সময় সেই বস্ত্র ইন্দুর হাতে নিক : হইতে
ছিন্ন হইয়া গেল এবং সে শূন্য হইতে বেগে নিয়ে বিক্ষিপ্ত
হইল ! ইনু অঙ্কে চৎকার করিয়া উঠিল ।
জাগ্রত হইয়া ইন্দু, দেখিল, শ্যার উপর তাহস পার্শ্বে
বসিয়া সাবিত্রী তাহাকে ডাকিতেছেন-“ ! এ ইনু!
কেঁদে উঠলি কেন? কি হয়েছে।” ইন্দুর পাণ্ডু ললাটে
বিন্দু বিন্দু স্বেদকণ। কুটি উঠিছিল—তাহার ঘন ঘন
নিশ্বাস পড়িতেছিল। ম + 1 কণ্ঠ : শুনিয়া ই ন সেই
দুঃস্বপ্নের উৎকট যান। ই নষ্ক; ৩ লাভ করিল।
গৃহমধ্যে ব। এখ, -পথে প্রভা•ে নবারুণছটা
আসিয়াছে দেখিয়া, ইন্দু শয্যার উপর উঠিয়া বাস ও গিয়া,
পূৰ্ব্বদিনের উত্তেজনার প্রক্রিয়া হে, দুতায় একবার
অকৃতকার্য হই পরে দ্বিতীয় উদ্যমে উঠিয়া বস। সাবিত্রী
জিজ্ঞস করিলেন—স্বপ্ন দেখেছি বুঝি।” ইন্দু মৃদুস্বরে
কহিল, “ছ”। ইন্দু আর কোনও কথা বলল না। সাবিত্রী
তাহাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন আছিস কেমন ? এখন না
হয় শুয়ে থা—উঠে কাজ নেই”। ইন্দু বলিল-“না, ভাল
আছি।”. ইন্দু মৌনবলম্বন করিল, “দেখিয়া সাবিত্রীও তাহাকে
আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। তিনি ইনুর প্রকৃতি
বুঝিতেন। তিনি গৃহ কৰ্ম্ম করিতে উঠিয়া গেলেন।
তখন
৭৭
ইন্দু
গৃহকাৰ্য্য সমাপ করিয়া সাবিত্রী সেই কক্ষে ফিরিয়া
আসিয়া দেখেন ইন্দু তাহার গাত্র হইতে শাশুড়ীর দত্ত সমস্ত
অলঙ্কার খলিয়া ফেলিয়াছে এবং বিবাহের সময় শ্বশুরবাহী
হইতে যে সমস্ত মূল্যবান বস্ত্র ও সাজসজ্জার দ্রব্যসামগ্রী ও
অন্যান্য উপহার পাইয়াছিল সেইগুলি সমস্ত তাহার বৃহৎ
তােরঙ্গর মধ্যে গুছাইয়া তুলিতেছে। সাবিত্রী কিয়ৎক্ষণ সেইখানে
দাড়াইয়া স্বয়ে বলিলেন-'ও কি করছি।”
ই সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আজ ত
আবার সে আসবে-তাকে কি দেবে?"
সাবিত্রী বিষঃ বদনে উত্তর দিলেন, “আমার গরনা পত্র
যা কিছু আছে—তাই দিয়ে আর বাকি টাকা দিয়ে মিটিয়ে
ইনু স্থিরভাবে বলিল, “না—আর তাকে কিছু দিও না।”
সাবিত্রী। না দিলে—এখনি গিয়ে ওদের কাছে লাগিয়ে
ভাঙ্গিয়ে একটা গােল বখাবে---শেষে হয়ত ওঁরা তাকে ঘরে
নেবেন না।
ইন্দু পুৰ্ব্ববৎ দৃঢ়ম্বরে কহিল, ওঁরা নিলেও, আমি জেনে শুনে
কোন মুখ নিয়ে সেখানে যাবা? তুমি কি সে পথ রেখেছ?
আগে আমাকে ওকথা বলনি কেন মা? আমি ত আর ছােটটি
নই? • আমি যদি ঘুণাক্ষরে একথা জানতে পারতুম, তাহলে
০
।
সপ্তম পরিচ্ছে
আমি কি তোমাকে এ পাপ করতে—তার এমন সর্বনাশ
করূতে দিতুম ?
সাবিত্রী অাবেগ-কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন, “তুই আর আমাকে
ও কথা বলিসনি ইন্দু! তোর ভালর জন্যই আমি এ কাজ
করেছি—ত কি বুঝছি না।”
ইন্দু। না মা, তুমি আমার ভাল খুঁজতে গিয়ে—এখন
যার ভালতেই অামার ভাল, তার যত ক্ষতি করতে হয় তা
করেই। এখন আর লজ্জা সরমের সময় নেই ম-তাই
মনের কথাটা খুলেই তােমায় বললুম।
সাবিত্রী অশ্রুভারাক্রান্ত নয়নে বলিলেন-“তুই যদি একথা
বলিস-তা হলে তােকে আর কি বােঝাব? কিন্তু তুই সব
কথা আগে শোন, তার পর যা বলতে হয় বলি।” এই কথা
বলিয়া সাবিত্রী সংক্ষেপে পূর্বকথা সমস্ত অকপটে ইন্দুকে
শুনাইলেন। পরে বলিলেন-“এখন তুই-ই বল—এতে আর দোষ
হয়েছে কি? সে কি আর বিয়ে। যা অামি চোখে দেখি নি।
তুই যা জানিস না—তাও কি ঐ ঘনশ্যামের মত লােকের
কথা শুনে বিয়ে বলে মানতে হবে ?”
ইন্দু স্থির ভাবে বলিল—“বাসা যে ওর সঙ্গে ছিলেন
বললে মা-তখন তুমি না মান—আমি না মানি—সমাজ যে ।
মানবে না। ওদের যে বংশগৌরব আছে—মান সম্রম আছে-
ইন্দু
আমার জৰে
।
ধর্মজ্ঞান আছে-মা আছেন—জ্ঞাতিরা আছেন--তুমি কি
জৰে ওকে সে সব ত্যাগ করতে বল? এতটা
ক্ষতি ওর করতে চাও ? না মা আমার ওপর ভালবাসার
মােহ পড়ে সে মতিভ্রম হলেও অ' তোমাকে সে পাপ
আর করতে দেবো না। যা হয়ে গেছে - হয়ে গেছে।”
সাবিত্রী করুণনয়নে কিয়ৎক্ষণর বিষাদক্লষ্ট মুখের
দিকে অপলক নেত্রে চাহিয়া ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করিলেন—
“তা হলে তুই করতে চা কি ?
ইন্দু বারুদ্ধকণ্ঠে আনত বদনে ধীরে ধীরে বলিল—
"চল আমরা এখান থেকে দূরে অন্য কোথাও চলে
যাই—যাতে তিনি আর আমাদের সন্ধান করতে না পারেন,
কি জানি যদি মায়ায় পড়ে ওরও ভুল ভ্রান্তি হয় ওকে
তেমন করে নিজের ক্ষতি আমি প্রাণ থাকতে করূতে দেবাে
না।”
সাবিত্রী দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন-“আমরা
এখান থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেই
গোেল
মিটে যাবে মনে করেছিস ?
ঘনশ্যাম যদি দুর্গাপুরে জ্ঞাতিদের কাছে গিয়ে তিলকে
তাল করে সে কথা বলে দেয়া হলেও কি জামাইয়ের
মাথা হেঁট হবে না?
সপ্তম পরিচ্ছেদ
ইন্দু শিহরিয়া উঠিয়া বলিল, “ও যে এটা করতে পারে
সে কথাটা আমি ভাবিনি মা। ত! হলে
ও Wাতে তা
না বলে; “তা করতেই হবে। ওকে তা হলে টাকা দিতই
হবে; একেবারে বেশী দিও না—কিছু কিছু করে দিয়ে ওকে
হাতে রেখে। যত দিন টাকা হাতে থাকবে, ওকে দিতেই
বে ; এতে যদি শেষে আমাদের ভিক্ষে করতে হয় সেও
না--যেমন পাপ তেমনি তার প্রায়শ্চিত্ত হবে ।
সাবিত্রী বলিলেন, “তা যেন হলো-কিন্তু তাতেও ত সব
গেল মিটবে না? আমরা এখান থেকে চলে গেলে, যদি
- লােকে কোন দুর্নাম রটায়—তাতেও তো জামাইএর মাথা
আরো হেঁট হবে?”
সে কথা শুনিয়া ইন্দুর স্নান মুখ প্রথমে ঘৃণায় আরক্তিম
পরে ভীতিতে পশুবর্ণ হইয়া গেল। সে কিয়ৎক্ষণ ও
পাকিয়া, ভগ্নস্বরে কহিল, “না-তাও যাতে না হয়, এমন কোন
উপায় করে যেতে হবে।, কি করূতে হবে তা তুমি ভেবে
ঠিক কোনাে মা। তাঁর মনে সে রকম সন্দেহ উঠবে না
গ আমি জানি, কিন্তু আর পাঁচ জনে যাতে কিছু বলতে
পারে, তার উপায় করতেই হবে।
সাবিত্রী শেষে আর ধৈৰ্য্য রাখিতে পারিলেন না—তিনি
ক্রন্দন করিতে করিতে বলিলেন, “এ সব যেন হলাে—কি কি
ইন্দু
কতে বছেছিস তা ভেবে দেখেছিস? তাের দশা কি হবে
তা ভাবছি '—কি ছেড়ে যাচ্ছি তা ভাবছি।”
ইন্দু গাঢ়স্বরে উত্তর দিল, “না মাসে ভাবনা ভাববার মনের
বল আমার নেই—আমাকে কঁাদিও না- এইকথা বলিয়া ইনু
উঠিয় বিছানার উপর উপুড় হইয়া শুইয়া পড়িল, তাহা।
নয়ন-দ্বয় হইতে দর দরত ধারায় অশ্রু বিগলিত হইতে লাগিল।
সাবিত্রী তখন আর কিছু বলিলেন না। কিন্তু সকল
আশা ছাড়িয়া দিয়া কলিকাতা হইতে চিরবিদায় লইতে
সাবিত্রীর কিছু মাত্র ইচ্ছা ছিল না।
মাত্র ইচ্ছা ছিল না। তিনি পুনরায়
ইন্দুকে অনেক বুঝাইলেন,-মিনতি, কারােক্তি, ক্রন্দন,
কিছুই বাকি রাখিলেন না; কিন্তু ইন্দুর কিছুতেই মতের
পরিবর্তন হইল না। সাবিত্রা শেষে বুঝিলেন যে জীবনের উপ
ইন্দুর যেরূপ একটা উদাসীন ভাব বা বিতৃষ্ণা আসিয়াছে,
তাহাতে তাহার মতের বিরুদ্ধে দাড়াইলে, হয় ত সে আত্ম
ঘাতিনী হইবে, তখন কন্যাগত-প্রাণ। সাবিত্রী কন্যার ইচ্ছা
পালন করিতেই প্রবৃত্ত হইলেন।
সেই দিন অপরাহকালে ঘনশ্যাম আসিয়। যখন বলিল'.
ঠাকরুণ বাকি টাকাটা ফেলে দাও, তাহলে কালই দেশে
যাই। তােমার অর বা কি? রাজা জামাই হয়ে
মেয়ে জামাই নাতি গতি নিয়ে তােক মজায় থাকবে।”
সপ্তম পরিচ্ছে
সাবিত্রী বাধা দিয়া বলিলেন, “বাকি টাকার অর্ধেক আজ
নিয়ে যাও, আর অর্ধেক একেবারে দেবাে না—টাসে মাসে
দেবাে।”
ঘনশ্যাম। ঐ ত গোল কর বৌ ঠাকরুণ! বলেছিত
পাঁচ শ' টাকার একটি পয়সা ছাড়লে, আমার চলবে না-
মাসে মাসে আবার কেন ?
সাবিত্রী। নইলে তোমাকে বিশ্বাস কি ? তুমি যদি আজ
টাকা নিয়ে গিয়ে, কাল ওদের কাছে যা-তা বলে এস?”
ঘনশ্যাম। রাধামাধব : আমাকে কি তেমনি নেমকহারাম
পেয়েছ ? টাকাটা পেলেই মুখে একেবারে চাবি কুলুপ পড়ে
যাবে—তার পর আর কোনাে বেটার সাধ্যি নেই যে আমার
পেট থেকে একটি কথা বের করে।
সাবিত্রী। তা হলেও আমাকে সাবধান হতে হবে। আমি
মাসে মাসেই তােমাকে টাকা দেবে—পাঁচশ কেন বেশীই
দেবে; কিন্তু যদি সে কথা কোন রকমে প্রকাশ হয় তা হলে
সেই দিন থেকেই টাকা বন্ধ করুব।
**নশ্যাম। তা বেশ—কিন্তু উপস্থিত বাকি তিনশ টাকাটা
দাও, তার পর মাসে মাসে যা দেবার তা দিও।
তামার এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার হতে চললো।
অগত্যা সাবিত্রী গহনায় ও • নগদে, তিন শত টাকাই
ইন্দু
ঘনশ্যামকে দিলেন এবং বলিলেন, সে যতদিন কথাটা প্রকাশ না
করিবে ততদিন তাহাকে মাসে মাসে ১০ টাকা করিয়া দিবেন ।
ঘনশ্যাম কিছু বিস্মিত কিন্তু হৃষ্ট হইয়াই বলিল, “তাহলে
এখানে এসেই টাকাটা নিয়ে যাবাে ?”
সাবিত্রী বলিলেন, 'না, এখানে আর এসাে না-এখানে আমরা
থাকবো না, যেখানে যাবে তার ঠিকানা তােমাকে পরে
জানাবো। কিন্তু সে ঠিকানা যদি কারো কাছে প্রকাশ করে।
তাহলে সেই দিন থেকেই তোমার টাকা বন্ধ কবুব। যদি বল
আমরা যদি ঠিকানা তােমাকে না দিই; তা হলেও তােমার
কিছু ক্ষতি হচ্ছে না—তুমি যা চেয়েছিলে তা ত পেলে ?”
ঘনশ্যাম পূর্ববৎ বিস্মিত হইয়া বলিল, “হ্যা তা পেলাম
বৈ কি—আর তােমার ঠিকানারই বা ভাবনা কি? জামাই
বাবাজির বাসা ত এই সুমুখেই—আর দেশের ঠিকানাও ত
জানা আছে।”
সাবিত্রী এস্তভাবে বলিলেন, “না সেখানে কখনাে
আমাদের কোন কথা জানতে যেতে পারবে না। তাদের বাড়ীর
দরজা যেদিন মাড়াবে সেই দিন থেকে আর এক পয়সা
দেবব না-তা ঠিক নেন। ইন্দু সেখানে যাবে না-আমার
কাছেই থাকবে।”
কথা শুনিয়া নাম অধিকতর বিশিত হইল
সপ্তম পরিচ্ছেদ কিন্তু সে বিষয়ে কোনও কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া বলিল, “তােমার ঠিকানা যদি জানাও তাহলে আ সেখানে যাবার আমার দরকার কি? কিন্তু সাবধান আমার সঙ্গে চালাক করূলেই পাচে পড়বে, তা বলে দিচ্ছি।” এইরূপ শাসাইয়া ঘনশ্যাম সন্দিহান মনে বিদায় লইল। সে স্থির করিয়াছিল, সাবিত্রীর কাছে গুপ্তকথা প্রকাশ করিবার ভয় দেখাইয়া এখন কিছুদিন সে মধ্যে মধ্যে গিয়া যাহা পারে টাকা আদায় করিতে থাকিবে ; তাহার পরে ইন্দু শশুর বাড়ীতে গিয়া দুই এক বৎসর ঘর করিয়া যখন সন্তানবতী হইবে এবং যখন ইন্দুকে ত্যাগ করিলেও তাহাকে গৃহে লইবার জন্য কুল- কলঙ্কের হাত হইতে অব্যাহতি পাওয়া তাহার ঠাকুরাণীর ও স্বামীর পক্ষে অসম্ভব হইবে, সেই সময়ে ইন্দুর পূর্ব- বিবাহের কথা প্রকাশ করিয়া দিবার ভয় দেখাইয়া তাঁহাদের নিকট হইতেও সে প্রচুর অর্থ শােষণ করিতে পারিবে। ইনু স্বমিগৃহে যাইবে না শুনিয়া ঘনশ্যামকে শেষােক্ত সংকর ত্যাগ করিতে হইল। কিন্তু ইনুকে যদি স্বামিগৃহে পাঠাইবে , তবে সাবিত্রী তাহাকে টাকা দিতেছেন কেন? এ প্রশ্নের সদুত্তর সে কিছুতেই খুঁজিয়া পাই না। যদি কন্যাকেই শশুর গৃহে পাঠাইবে না তবে, তাহার শশুরদের অপবাদই হউক বা সমাজে তাদের একমনেই কলহাতে বিজয়
उन्म
আসিয়া যায় ? ইনু যে নিজের নারী-জনের সকল
আশায় জাঞ্জলি দিয়াও, স্বামীর সুনাম রক্ষার জন্য, তাহার
মাতাকে অর্থব্যয় করিতে বাধ্য করিবে, সেই সুধারণা
ঘনশ্যামের মনে তিলার্ধ স্থান পাইল না।
সে ভাবিল
সাবিত্রী ভুল বুঝিয়া তাহাকে টাকা দিয়াছেন, এবং কিছুদিন পরে
তিনি যখন তাহার এম বুঝিতে পারিবেন তখন আর তাহাকে
টাকা দিবেন না। কিন্তু এখনও সাবিত্রীর মনে যে, ইন্দুর
স্বামিগৃহে যাহাতে তাহার পূর্ব-বিবাহের কথাটা প্রকাশ না
হয়, সে আগ্রহ বড়ই প্রবল, সে কথা ঘনশ্যাম বেশ বুঝিতে
পারিয়াছিল। সে স্থির করিল সাবিত্রীর মনের সেই আগ্রহ
এবল বাকিতে থাকিতে তাহার নিকটে যে অর্থ আছে তাহা
যে প্রকারেই হউক নিঃশেষে শােষণ করিতে হইবে। তাহা
হইলেই শেষে দায়ে বাধ্য হইয়া সাবিত্রী কন্যাকে শশুরালয়ে
পাঠাইবেন; এবং ইনু কিছুদিন আমিগৃহে বাস করিলেই
ঘনশ্যাম তাহার খর ও স্বামীর নিকট হইতে অর্থ শােষণ
করিবার সুযােগ পাইবে। সুতরাং প্রথমে সাবিত্রীকে সর্বস্বান্ত
করাই নিতান্ত আবশ্যক বলিয়া ঘনশ্যাম স্থির করিল এবং
তাহারই উপায় চিন্তা করিতে তৎপর হইল।
বনাম বিদায় সইনে সাবিত্রী কলিকাতা হইতে স্থানা-
করিত, ইর উপায় সিক্ত করিতে লাগিলেন। অতি
।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
কলিকাতায় আসিবার পূর্বেই তাহাদের সে বাটী ত্যাগ
করিতে হইবে; সেইজন্য নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাবিত্রীকে
সাবিত্রীকে
সে বিষয়ে সচেষ্ট হইতে হইল, এবং হরিশ ঠাকুরকে সকল কথা
বলিতে হইল। হরিশ ঠাকুর তাহাদের সঙ্কল্পের কথা শুনিয়া
মর্মাহত হইল। ইন্দুর শৈশবের বিবাহের কথাটা হরিশ নিতান্ত
তুচ্ছ ঘটনা বলিয়া গ্রহণ করিল এবং সেইজন্য অজিতকে ত্যাগ
করিয়া-তাহাকে কোনও সংবাদ অরধি না দিয়া-অন্যত্র
যায়। ব্যাপারটা হরিশ নিতান্ত অসঙ্গত ও অনাবশ্যক বলিয়া
বিবেচনা করিল। প্রকৃতপক্ষে অজিতের সহিত চির-বিচ্ছে-
দের সম্ভাবনায় হশিঠাকুর অন্তরে দারুণ আঘাত পাইল।
সাবিত্রীর ইচ্ছায় বাধা দিবার হরিশের ক্ষমতাও ছিল না,
প্রবৃত্তিও ছিল না, সুতরাং সাবিত্রীর সকল আদেশ হরিশ
যন্ত্রচালিত পুত্তলিকার ন্যায় পালন করিতে লাগিল। কিন্তু
হরিশের মনে হইল এইবার সাবিত্রীর বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছে-
তিনি অন্যায় করিতেছেন। হয়ত কিছুদিন পরে ভগবান
সাবিত্রীকে সুমতি দিবেন, তাহা হইলে সাবিত্রীর ও ইন্দর
মনের ভ্রম ঘুছিয়া যাইবে এবং অজিতের সহিত আবার
তাহাদের মিলন হইবে। আপাতত উহার। যাহা বুঝিতেছে
তাহাই করুক।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
ইন্দু, যে দিন দুর্গাপুর হইতে কলিকাতায় আইসে
তাহার পর দিন হইতে অজতের মনে সত্বর সুস্থ ও সবল
হইবার একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা আসিল। তিন চারি
দিনের মধ্যে অজিত তাহাদের বাটীর নিকটস্থ বাকা নদীর
বারে সুন্দর পথটীতে বেড়াইতে আরম্ভ করিল এবং সপ্তাহে
পরেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়াছে এই কথা প্রকাশ করিল।
শরৎসুন্দরী তাহাকে আরও কিছু দিন দুর্গাপুরে থাকিবার
কথা বলাতে, অজিত তাহাকে বুঝাইল তাহার নূতন
প্রাকৃটিসের ক্ষতি হইতেছে এবং কলিকাতার বায়ু পরিবর্তনে
তাহার উপকারই হইবে। পুত্রের কলিকাতায় যাইবার
বিশেষ আগ্রহ দেখিয়া শরৎসুন্দরী আর কোনও আপত্তি
করিলেন না। অজিত দুই দিন পরেই কলিকাতায় যাইবার
দিন স্থির করিয়া বিপ্রদাসকে ষ্টেশনে গাড়ি পাঠাইতে
লিখিয়া পাঠাইল। ইন কলিকাতায় যাইবার পর দিন
মা,
কন্যাকে লইয়া, পিত্রালয়ে গিয়াছি এবং সেখানে
কিছুদিন থাকিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল। শরৎসুন্দরী
৮
অষ্টম পরিচ্ছে বলিয়াছিলেন, মাসেককাল পরেই তিনি শুভ দিন দেখিয়া, অজিতের সঙ্গে ইন্দুকে দুর্গাপুরে যাত্রা বদল করিয়া যাইতে, অনাইবেন। তৎপরে যখন ইন্দু পুনরায় কলিকাতায় যাইবে, সুরমাকেও পিত্রালয় হতে আনাইয়া তিনি ইন্দুর সঙ্গে কলিকাতায় পাঠাইয়া দিবেন! অজিতকে সে কথা শরৎসুন্দরী বলিয়া দিলেন। কলিকাতায় আসিবার দিন অজিতের মনের ঘূৰ্ত্তি জগৎ- সংসারকে তাহার চক্ষে যেন এক নূতন সৌন্দর্য্যে প্রতিভাত করিল। রেলপথের পার্শ্বের চিরপরিচিত শস্য-ক্ষেত্র, প্রান্তর, উদ্যান, গ্রাম, নদী, তড়াগ, পুষ্করিণী গুলি যে এত সুন্দর, তাহা সে এতদিন লক্ষ্য করে নাই কেন, তাহা ভাবিয়া সে আশ্চৰ্যবােধ করিল। ক্রমে যখন ট্রেন কলিকাতায় আসিয়া পঁহুছিল, তখন বাসায় যাইবার জন্য তাহার মন এতই ব্যগ্র মে রাজধানীর জনাকীর্ণ পথের বৈচিত্রময় দৃশ্য তাহার চক্ষের সখ দিয়া ছায়াবাজির মত ভাসিয়া গেল। কিছুতেই তাহার দৃষ্টি আকৃষ্ট হইল না। তাহার মন পড়িয়:ছিল তাহার বাসাবাটীর সম্মুখের সেই ক্ষুদ্র একতলা বাড়ীটীর উপরকখন সে ইন্দুর সান্নিধ্য অনুভব করিবে সেই চিন্তায়। বাসার গল্পে আসিয়া গাড়ি থামিলে কিন্তু অতি ঈদের বাড়ীর দিকে চাহিতে পারি না, পাছে তাহার ঈঙ্গিত ৫১ ইন্দু দর্শন-জানত' অতাধিক আনন্দ সে সহ করিতে না পারে। তাহার মনৰে সেই আনন্দ উপভোগের জন্য প্রস্তুত করিতে সে ধীরে ধীরে আপনার কক্ষে উঠিয়া গেল এবং তাহার পথের বেশ পরিবর্তন করিল। পরে জানালায় আসিয়া দাড়াইতেই তাহার দৃষ্টি স্বতঃই ইন্দুদের বাটীর দিকে ধাবিত হইল এবং চঞ্চল-প্রক্ষণে, জানালার কবটের মধ্য হইতে বা ছাদের প্রাচীরের পার্শ্ব হইতে, দুইটি উৎসুক-চক্ষুর অনু- সন্ধান করিল। হঠাৎ সদর দ্বারের দিকে চাহিতেই, দ্বারে কুলুপ- দেওয়া দেখিয়া অজিত চমকিয়া উঠিল। অজিত ডাকিল “গুরুচরণ।” ভৃত্য গুরুচরণ নিকটে আসিতেই অজিত প্রশ্ন করিল, “ওদের বাড়ীতে চাবি দেওয়া কেন রে?” গুরুচরণ। ঔর। দেশে গেছেন? অজিত। দেশে গেছেন! কবে গেছেন? গুরুচরণ। আজ ভোরে। অজিত। হঠাৎ সেখানে গেলেন যে ? গুরুচরণ। বিয়ে টিয়ে—হলে ওঁদের দেশে সর্বমঙ্গলা ঠাকুর আছেন, তাকে পূজো দিতে হয়, তাই গেছেন। অজিত। কবে আসবেন কিছু বলে গেছেন? চরণ। তা কিছু শুনিনি; বােধ হয় মামাবাবুকে বলে গেছে। ;
অসম পরিচ্ছেদ অজিত। ওরা শুনে ছিলেন কি—আজ আমি আসব ? “শুনেছিলেন বইকি।” এই কথা বলিয়া গুচরণ চলি যাইতেই অজিত নিকটস্থ চেয়ারে বসিয়া পড়িল। বহু আশার পর এই অভাবনীয় নৈরাশ্যে অজিত অভিভূত হইয়া গেল। তাহার আত্মাভিমানে আঘাত লাগিল। আজ সে আসিবে তানিয়াও আজই কি বলিয়া তাহারা চলিয়া গেলেন? এক দিন অপেক্ষা করিলে কি চলিত না? তাহাকে সংবাদ দেওয়াও কি উচিত ছিল না? অজিত চিন্তাকূল-নয়নে সান্ধ্য- গগনের দিকে দৃষ্টিপাত করিল। রক্ত-সন্ধ্যার মেঘমালা যেন তাহার অন্তরের দাবদাহ প্রতিফলিত করিল। সে নৈরাশ্য-বিষ্ণু-হৃদয়ে মাতুলের আপিস হইতে আগমনের প্রতীক্ষায় বসিয়া রহিল। বিপ্রদাস কৰ্ম্মস্থান হইতে আসিয়া অজিতকে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলে, অজিত নিজ হৃদয়ের ব্যগ্রতা যতদূর সম্ভব গােপন করিয়া, তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ওরা কবে আসবেন বলে গেছেন কি?” বিপ্রদাস বলিল, “না, তাত কিছু বলে যান নি। ওঁদের খাওয়াটা বোধ হয় হঠাৎ হল। কাল রাত্তিরে হরিশ- ঠাকুর আমাকে ডেকে আমাদের এখানে বৌমার হােরঙ্গটা রেখে গেলেন; বনে, ওতে গহনা পত্তর সব না। মেনে চোর পাতের অল্প, তাই গান এখানে রেখে গেলেন।
ইন্দু
বাড়ীর চাবি, তােরঙ্গর চাবি টাবি গুলোও রেখে গেছেন,
আর তোমাতে: একখান; চিঠি দিয়ে গেছেন। তােরটায় দামী
গয়না টয়না আছে বলে আমার ঘরে সেটাকে রাখিয়ে
চাবি দিয়ে গিয়েছিলুম। সব তােমার পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
यति।
কবে আসবেন জিঙ্গাসা করেছিলেন কি ?
বিপ্রদাস। না, মনে করেছিলুম সকালে উঠে জিজ্ঞাসা
কবে; তা ভোরেই ওঁ গুরুচরণকে ডেকে বাড়ীর চাবিট।
রেখে চলে গেছেন। ওঁদের দেশে যাওয়া ত সহজ নয়-
রেল থেকে নেমে নৌকায় একবেলা যেতে হয়। শুনেছি এর
পরে বর্ষা এলে, ঝড় তুফান আছে—যেতে পারবেন না।
আর পুজোটাও বোধ হয় মানা ছিল, না গেলে নয়। তাই
তাড়াতাড়ি গেলেন, শীগগিরই ফিরবেন বােধ হয়। এই
কথা বলিয়া বিপ্রদাস প্রস্থান করিল এবং কিয়ৎক্ষণ পরে
ভৃত্যদের দ্বারা ইনর তােরঙ্গটি বহন করাইয়া আনিয়া
অজিতের কক্ষে রাখিয়া তাহার হস্তে চাবিগুলি ও চিঠি-
খানা দিয়া গেল। অজিত ভৃতদের সমক্ষে সে চিঠি পড়িল
, পকেটে রাখিয়া'দিল। আহারাদি সমাপনান্তে ভৃত্যের শয়ন
করিতে যাইলে, অজিত তাহার ক-ঘর বন্ধ করিয়া, কশিত
দয়ে চিঠিখানি বাহির করিয়া দেখিল, তাহার মধ্যে একটা
ক্ষুদ্র চাবি এবং দুইটা মাত্র ছাত্র লেখা একথও কাগজ। লেখা
অষ্টম পরিচ্ছে
অাছে “চারিটি গহনার বাক্সর—তোর মধ্যে বাক আছে-
সেই বক্সে চিঠি আছে-গােপনে পাঠ করিও”
জিত আলােক উজ্জ্বল করিয়া দিয়া তোরঙ্গ খুলিয়া
দেখে, তাহার মধ্যে ইন্দুর বিবাহের সময় যে সমস্ত মূল্যবান
বস্তুদ শরৎসুন্দরী দিয়াছিলেন সেইগুলি স্তরে স্তরে সান
রহিয়াছে। তাহার নিচে গহনার বাক্স ও অপরাপর বিলাস
বাটীর মতে, বিবাহের সময় শরৎসুন্দরী ইন্দুকে
যে সমস্ত অলঙ্কার দিয়াছিলেন, সেগুলি সমস্তই রহিয়াছে, অথচ
ইর মাতা তাহাকে যে সমস্ত গহনা দিয়াছিলেন সেগুলি নাই।
অজিত বিস্মিত হইয়। ভাবিল, এ কেমন হইল ? উহাদের
«িজের গহনা চুরি যাইবার ভয় যদি না থাকে তাহা
হইলে আমাদের দেওয়া গহনাগুলি পরিয়া যাইতে দোষ কি
ছিল ? এগুলি যদি চোরে ডাকাতে লইতে পারে, তাহা
হইলে সে গুলিও কি লইতে পারে না? গহনার বাক্সর
ট্রে খানি তুলিতেই অজিত যাহ। খুঁজিতেছিল, তাহা দেখিতে
পাইল। চিঠিখানির খামের উপর লেখা আছে ‘গোপনীয়।
অজিত ব্যগ্রভাবে চিঠির খাম ছিড়িয়া দেখিল, চিঠিখানি
সাবিত্রীর লেখা। তাহাতে লেখা আছে-
“চিরজীবেষ্ণু
বাবা অজিত, আমরা বড় লিদে দে পড়েই আজ তােমাকে
ইন্দু
ছেড়ে চলেছি। আমাদের খোঁজ কোরো না-খুজলেও
সন্ধান পাকে না। কেন যাচ্ছি, সে কথা জেনে তােমার
মনের কষ্ট কবে না—হয়ত অশান্তিই বাড়বে। তবে এ
কথা বলতে পারি—আমি কন্যাদােহে পড়ে একটা কথা
গোপন রেখে ইন্দুর বিয়ে দিয়েছি। সে জন্যে তােমার কাছে
একটা অপরাধ করেছি।
করেছি। কিন্তু সে কথাটাকে সামান্য
ভেবেই সেটাকে আমি অপরাধ বলেই ধরিনি, তুমিও হয়ত
সেটাকে অপরাধ বলে ধৰ্তে না-আমাকে ক্ষমা করতে।
কিন্তু বিয়ের পরে সে দিন হৎ ইন্দু সে কথাটা জানতে
পেরে আমার অপরাধটাকে এতই বেশী করে তুললে—তাতে
তােনার
এত ক্ষতি হবে মনে করলে যে সে আমার
অপরাধটাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারলে না। তাই
সে আজ তার প্রাণের চেয়ে বড় তােমাকে জন্মের মত ছেড়ে
গিয়ে আমার সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে চলেছে। বুঝতেই
পাছ, তােমাকে ছেড়ে যেতে তার মনের অবস্থা কি রকম হয়েছে
-এখন তাকে হারাবার আগে আমার মরণ হলে বাড়ি।
তােমার মা ঠাকুরুণ ও আর সব আপনার লােকেরা
যখন আমাদের খােজ করবেন, তখন দেশে যাবার সময়
নৌকাডুবি হয়ে গেছি-এই রকম কিছু একটা বলে আমাদের
সুনাম আর নিজের মান খাে। পাছে লােকে সন্দেহ করে
অষ্টম পরিচ্ছেদ
যে “আমরা ইচ্ছা করে নিরুদ্দেশ হচ্ছি, তাই বাঁড়ার জিনিষ
পত্র সব রেখে—-এক মাসের ভাড়া আগে iয়ে যাচ্ছি।
এর পর তুমি জিনিষগুলাে যাকে ইচ্ছা বিলিয়ে দিও-নয়ত
বিক্রয় করে সেই টাকা গরিব দুঃখীদের দান কোরো। তােমার মনে
যে কি কষ্ট দিচ্ছি-তা বুঝতে পারছি। যদি আমার তুচ্ছ
প্রাণটা দিয়েও তোমার সে কষ্ট নিবারণ করতে পারতুম
তা হলে নিশ্চয়ই দিতুম। কিন্তু সে উপায় নেই যে বাবা!
আশীৰ্ব্বাদ করি তুমি রাজ-রাজেশ্বর ইও-অামাদের কথা
ভুলে য;
তোমার শুভাকাঙ্খিনী
শাশুড়ী।”
সেই পত্র পাঠ করিয়। অজিত গুগুত হইয়া গেল। সে
বুঝিতে পারিল ---ব্যাপার কি। সাবিত্রীদের জাত্যংশে
কি কোনও দোষ ছিন? সাকিৰীর নিজের কি কোনও দুর্ণাম
ছিল? না, তাহা হইতেই পারে না। হরিশঠাকুর সারল্যের
অবতার-সে কখনই সে কথা গোপন করিতে পারি না।
অজিত ভাবিয়া কিছুতেই স্থির করিতে পারিল না, সাবিত্রী
তাহার নিকট এমন কি কথা গােপন রাখিয়াছিলেন, যাহা
প্রকাশ করা অপেক্ষা তাহাকে ত্যাগ করাই ই শ্রেয়।
ৰলিয়া বিবেচনা করিল। সে কথা তাহার কাছে প্রকাশ
করিতে এত কুণ্ঠা কেন? . এখন তাহাদের মান অপমান
ইন্দু
।
কি অজিতের মান অপমান নহে- ইন্দুর সুখ দুঃখের জঙ্গ
অজিত কি এখন ন্যায়তঃ ধৰ্ম্মতঃ দয়া নহে? তবে ইন্দু তাহার
সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সকল কথা বলি না কেন? ইন্দু
নিশ্চয়ই তাহাকে ততটা আপনার ভাবে না ? অজিতের
পুনরায় অভিমান হইল। সে সঙ্কল্প করিল আর ইন্দুদের
কথা ভাবিবে ! তেরঙ্গ বন্ধ করয়।
তেরঙ্গ বন্ধ করয়। সে নিদ্রার জন্য
শয্যা গ্রহণ করল! •৫ন্তু নিদ্রা, তাহার মৌখিক আহ্বান
গ্রহণ করল না; চিন্তা তাহাকে সমস্ত রাত্রি জাগাইয়া রাখিল
ক্লিষ্ট করিল।
প্রাতঃকালে অন্যদিনের মত শয্যা তুলিতে আসিয়া গুরু-
চরণ দেখিল অজিত ইন্দুদের বাটীর ছাদের দিকে শূন্য-দৃষ্টিতে
চাহিয়া জানালার কাছে দাড়াইয়া আছে। গুরুচরণকে দেখিয়া
অজিত জিজ্ঞাসা করিল, “হারে—ওরা ত সবে কাল গেছেন,
তবে ছাতের গাছ গুলাে—অমন হ'য়ে শুকিয়ে গেছে কেন
যেন চার পাঁচ দিন জল পায় নি ?
গুরুচরণ বলিল, “চার পাঁচ দিন কি ? বোধ হয় আজ
সাত দিন জল পায় নি।—ওরা গেল শনিবারে কালীঘাটে
গিয়েছিলেন—তার পর দিনই বৌদিদির ভারি অসুখ হয়
কিনা? কালীঘাটের একটা কাঙ্গালী-বামুন এসে কি সব
গােলমাল বাঁধিয়ে ছিল। গণ্ডগােল শুনে আমি গিয়ে দে
অষ্টম পরিচ্ছে
ওবাড়ীর গিন্নী ঠাকরুণ মেয়েটাকে মেরে ফেললে গাে” বলে
কাদছেন আর সেই লোকটাকে বকছেন। আমি পাক্তার ডেকে
দলুম--বৌদিদি পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন; তার জ্ঞান
হলে লোকটাকে কি টাকা গয়া টয় দিয়ে নামা বিদেয় করে
দিলেন। সে দিন থেকে ওব। সবাই যেন কেমন একরকম
হয়ে গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে কথা কইতেন না-বাড়ীর
দরজা দিয়েই রাখত; আর দরিও বে!ধ হয় অসুখ
সেই অবাধ সরে fিতন ৩ ঘ থেকেই বেরুতে না --কে
আর গাছে জল দেবে! অমন অসুখ নিয়ে দেশে এখন না
এই কথা বলিয়া গুরুচরণ ৩, তের শন কক্ষ হইতে
বাহির হইয়া গেল। অং: +ৎক্ষণ সন্তা-মগ্ন থাকিয়া
সহসা ৩ার চেষ্টা ত্যাগ করিয়া—সে অভ্যাস মত
দৈনন্দিন কার্যে নিযুক্ত হইয়া সেই চিন্তা-রাশি হইতে অব্যাহতি
লাভের চেষ্টা করল। কিন্তু সে চেষ্টা বিফল হইল। অজিত
রােগী দেখিতে যাইল—চন্তা তাহার সঙ্গে সঙ্গে ফিরিতে লাগিল।
বাটীতে ফিরিয়া আসিয়া, সে ইন্দুদের বাটীর চাবি খুলিয়া
ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেখে--তক্তপোষ, বাক্স, সিন্দুক, তৈজস
পত্র সমস্তই যথা স্থানে রহিয়াছে। কেনেরী পাখীর শূন্য খাঁচাটা
ঝুলিতেছে—পিঞ্জরের দ্বার মুক্ত ---পাখীটাকে ছাড়িয়া দেওয়া
ইন্দু, হইয়াছে। ইন্দুর বই, খেলনা, ছবি যেখানে যাহা ছিল, ঠিক সেই ভাবেই (রহঃছে। ইদুর শওস্মৃতি-বিজড়িত সেই শূন্য- বাটী যেন অজিতকে গ্রাস করিতে আসিল। সে হরত-পদে সেই বাটী হইতে বহির্গত হইল । ৯
নবম পরিচ্ছেদ
তাহার পর সপ্তাহেক কাল অত কি করিবে তাহা
স্থির করিতে পারিল ন! ইন্দ যে তাহাকে কোন কথা
জানায় নাই--ইন্দুও যে তাকে এ পর কালিতে পারি-
য়াছে—সেই চিন্তা তাহার অভিমানকে জাইয়া রাখিল।
সেই অভিমানের উপর নির্ভর করিয়া অজিত তাহার মনকে
নিত্যই প্রবোধ দিসে আর ইন্দুর কথা ভাবিবে না।
কিন্তু তাহার মন কোন দিনই সে আত্মপ্রতারণায় 'লিত
! শেষে অজিত বুঝিতে পারিল ইন্দুর চিন্তা তাহার হৃদয়-
শােণিতে-অস্থি-মজ্জায় মিশিয়া আছে; সে চিন্তা ত্যাগ করিলে
তাহার জীবনে কোন আস্থা থাকিবে না, সে তাহার
দেশের বা দশের কোন কাজেই আসিবে না—তাহার জীবন
বৃথা হইয়া যাইবে। তখন সে স্থির করিল যেরূপেই হউক
ইন্দুর সন্ধান তাকে করিতেই হইবে। কিন্তু ইয়া যে
ইচ্ছা করিয়াই নিরুদ্দেশ হইয়াছে, সে কথা ত কাহাকেও
বলা যায় না ?-সুতরাং অপরের সাহায্য না লইয়া অজিত
নিজেই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল। অজিত বিষমে ও
ইন্দু রামকানাই পুরে লােক পাঠাইল ; সেখানে ইন্দুদের কোনও সন্ধানই পাও: গেল না। কশিটে ও অপরাপর স্থানে অন্বেষণও বিফল হইল। এরূপে এ ৫ মাস কাটিয়া গেল। ইন্দুদের বাট র ভাড়া দিয়া অজিত সে বাটী নিজের : করেই রাখল। হয়ত ঘটনা, ইদুর। স্বেচ্ছার ফিরিয়া আসিতে পারে - এ আশা অজত ঋণ পোষণ করিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু যতই দিন য. fল ততই সে অাশা অ তর মনে ক্ষ হইতে ণতর হইয়া আসিল। শেষে দেশে যাবার সময় নৌকাডুর আশঙ্কার কথায় অজি ওকে প্রশ্রয় দিতে হইল। স.এ ওই তঁাহার ঠিকা ঝি দামনার কছে, তাহাদের rশ যাইবার সময় ঝড় তুফানের ভয় আছে, একথা এশিয়া গিয়াছিলেন। সাবিত্রীদের ফির: বিলম্ব হয়ে যখন সকলে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছে—সেই সময়ে দামী আসিয়া সেই ঝড় তুফানের ভয়ের কথা অজিদের পরিচারক-মহলে প্রচার করিয়া গিয়াছিল। বিপ্রদাস সেই সন্দেহের কথা শরৎ- সুন্দরীকে জানাইয়া ছিল। শরৎসুপরা সেই সংবাদে মর্মাহত হইয়া অজিতকে লিখিয়া পাঠাইলেন, সে কথায় তিনি বিশ্বাস করিতে চাহেন না-তাহার বধুমাতার নিশ্চয়ই অপর কোনও বিপদ ঘটিয়াছে ; তাহাদের যেন ভাল
নবম পরিচ্ছেদ
করিয়া অনুসন্ধান কর; হয়—যত অর্থ ব্যয় হউক, অনুসন্ধান
করিতেই হইবে। অজিত যখন দেখিল যে গুগর নিজের
নিষ্ফল অন্বেষণে বুথ। কানক্ষেপ হইতেছে মাত্র, তখন সে
বাধ্য হয়। তার বন্ধু সুবোধের নিকট সকল কথা
প্রকাশ করিয়া বলিল এ তাহাকে ইন্দুদের অনুসন্ধান করিয়া
দিবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরােধ করিল। সুবােধ ডিটেকটিভ
ডিপার্টমেন্টে কাজ করি এবং একজন দক্ষ গোয়েন্দা
বলিয়া তাহার খ্যাতি ছিল। অজিত তাহাকে দীর্ঘ অবকাশ
লইতে বলিন্স এব সে জন্য তাহার বেতনাদির যাহা ক্ষতি
হইবে তাহা পূরণ করিয়া দিবার প্রস্তাব করিল। সুবোধ সে
প্রস্তাবে কুষ্ঠিত হওয়াতে, অজিত বলিল--তাই। যদি তাকে
না পাই, তাহলে আমি বুঝতে পাচ্ছি, আমার জীবনটাই বৃথা
হয়ে যাবে। তখন টাকা নিয়ে আমার কি হবে? তুমি ত
জান, টাকার আমার অভাব নেই-তখন শুধু শুধু তোমার
ক্ষতি আমি করতে যাব কেন? তুমি
যদি তাকে
খুজে দিতে পার, তাহলে আমার কি উপকারটা তুমি
করবে তা বুঝতে পারছ ত?
টাকার কথা
কাে
-এ কাজের সুবিধার জন্যে, যত টাকার দরকার হয়
তা অামি দেবাে-য'ত তাকে শাগগির পাওয়া যায়
তুমি তার উপায় কর।”
১১
ইন্দু,
সুবোধ অবশেষে সজিতে অনুরোধ
করিতে
স্বীকৃত হই এবং অজিতকে অশাল
যেপে হউক
তাহার নিরুদ্দিষ্ট। স্ত্রীর সন্ধান করিয়া দিবে ।
অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া সু{ে. প্রথমে, স্য:
যে পত্রখানি রমে.শর নিকট ছিল
ছিল তাহা নিজে পাঠ
করিল. এং গুরুচরণ ও দাম: প্রঃ করিয়া তাহারা
যাহা কিছু জানত তাহ। . তাহাদের মুখে স্বকর্ণে গুলি।
পরে তাহাদিগকে সঙ্গে করিয়া একাধিকবার কালীঘাটে
গিয়া তাহাদের বর্ণিত কাঙ্গাণী-ব্রাহ্মণের অনুসন্ধান করিল।
ডালাওয়ার দোকা-ে এবং
এবং কালাপাটের বহুলোকের
নিকট তত্ত্ব লইয়া সুবোধ অবগত ২
যে, সেই কাঙ্গালী-
ব্রাহ্মণের নাম ঘনশ্যাম এবং সাএীর যে সময় কলিকাত;
ত্যাগ করিয়াছে ঠিক সেই সময় হইতেই তাহাকেও কেহ
কালীঘাটে দেখিতে পায় নাই। কাঘািটে অপর কোনও
সংবাদ না পাইয়া সুবোধ সাবিত্রীর পিত্রালয় বিল্বগ্রামে
গিয়া অনুসন্ধান আরম্ভ করিল। সেখানে গিয়া শুনিল
যে দশ বারো বৎসর পূর্বে সাবিত্রী তাহার বালিকা
কন্যাকে লইয়া তীর্থ দর্শন করিতে গিয়া আর দেশে ফিরেন
নাই—দেশের লােক তাহার আর কোনও সংবাদই জানে
। সাবিত্রীর সেখানে সুখ্যাতিই সকলে করিল- তাহা-
নবম পরিচ্ছে
पद छाडाशन কোনও দেশের বা অপর কোনও
দুর্ণামের কথা বহু অনুসন্ধান করিয়াও সুবোধ আবিষ্কার
করতে পারি না। বন্যাকে বিহু গ্রামের কেহই
।
বিশ্বমে
অনুসন্ধান করা, বীদের রদ্দেশ
হইবার কার কি অব। হ কোথায়
গিয়াছেন
হার কোনও সংবাদ অবগত ইতে না পারিয়া সুবােধ
রামকানাইপুরে যাত্র
সেখানেও সাবিত্রীর।
কেয় শাহেন সে কষ্ট। কেহই বলিতে
পারিল •া।
এবং সবিত্রী স্বামী ত্রিপুরচরণের অপল। সাবিত্রীর
নিজের কিংবা তাঁহাদের বংশে যে এমন কোনও দোষ
ছিল যাহা
প্রকাশ হইবার ভয়ে সাবিত্রীকে তার
বিবাহিত কন্যাকে ই। নিরুদেশ হইতে হয়, সেরূপ
কোন সংবাদই সুবোধ • প্রাপ্ত হই ।
কিন্তু সেখানে
ঘনশ্যামের বাদ • সহজেই মিলিল ।
রামকানাইপুরের
কাছে অনুসন্ধান করিয়, সুবাশ অবগত
হইল যে ন্য ত্রিপুরাচরণের নিত্য সহচর ছিল।
ত্রিপুরাচরণের মৃত্যুর পর ঘণশ্যাশ দৈন্যদশায় পড়িয়া
কলিকাতায় চলিয়া যায়। কলিকাতা হইতে সে মধ্যে মধ্যে
যৎসামান্য টাকা পাঠাইত, তাহাতেই অতি কষ্টে ; তাহার
ইন্দু
-
সংসার চলিত এবং বংশরে দুই একবার মাত্র সে দেশে
আসিত। কি এক্ষণে হঠাৎ তাহার অবস্থার পরিবর্তন ইয়াছে
এবং ন র খাস হইল যে দেশে আসিয়া বাস করিতেছে ।
প্রাণ করিয়াছে ধঃ লাল আগরওয়ালা মে..
কলিকাতায় হাটখােলর একজন মাড়োয়ারী মহাজনের
একমাত্র
অর বিকারে
মৃতপ্রায় হইলে, ঘনশ্যামই
কালীঘাটে স্বস্ত্যয়ন কবিয়। তাহাকে আরোগ্য করে।
তাহাতে সেই মাড়োয়ারী মহাজন ঘনশ্যামকে অনেক টাকা
দিয়াছে এবং এখনো মধ্যে মধ্যে টাকা গহন। যখন যাহ
চাহিতেছে তাহাই দিতেছে। ইহারই মধ্যে ঘনশ্যাম
তিন চার বার তাহার নিকট হইতে টাকা লইয়া আসিয়,
তাহাদের গ্রামের অনেক
অনেক লোকের ধানের জমি কিনিয়,
লইয়াছে, এবং ত্রিপুরাচরণের পরিত্যক্ত ভিটা তাহার স্ত্রীর
নিকট হইতে খরিদ করিয়। সেখানে বাস করিতেছে ।
মা কালী তাহাকে সদ্য সদ্য জমিদার করিয়া দিয়াছেন
বলিয়া সে
এখন কালী-ভক্ত হইয়াছে । ত্রিপুরাচরণের
বাটা সংস্কার করিয়া তাহারই একটী কক্ষে ঘনশ্যাম কালী-প্রতিমা
স্থাপন করিয়াছে এবং প্রচার করিয়াছে কালীমা তহাকে
স্বপ্নদেশ দিয়া নিজেই সেখানে অধিষ্ঠিত। হইয়াছেন।
ত্রিপুরাণে বাটীর সে এখন নাম দিয়াছে “কালী বাড়ী”।
১০
চাপা পড়িয়া নবম পরিচ্ছেদ ইহারই মধ্যে ঘশ্যামের জাগ্রতা কালীর খ্যাতি এরূপ প্রচারিত হইয়াছে যে এম এন্তর হইতে লেকে ৩াহার কলীবাড়ীর পূজা দিতে আসিতেছে। ঘনশ্যাম নিজেই পূজা ও বলিদান করে। কাণী-স্থাপনায় তাহার ইহারই মধ্যে বেশ আয় হইতে আরম্ভ হইয়াছে এবং তাহার পূর্ব দৈন্তের ও চত্রহীনতার লােকের কাছে হার কালীসাধক বলিয়া সুম হইছে। সম্প্রতি তাহার কন্যার মল্লিকপুরের চক্রবর্তীদের বাটাতে বিবাহ হইয়া গিয়াছে এবং তদুপলক্ষে তাহার মুরুব্বী মাড়োয়ারী মহাজনই তাহাকে সেই বিবাহের সমস্ত গহনা ও খরচ দিয়াছে। ঘনশ্যাম নিজে কলকাতার গিয়। সেই সমস্ত লইয়া আসিয়াছিল। ক্রমে অনুসন্ধান করিতে করিতে সুবোধ জানিতে পারিল যে গামকানাইপুরে ঘনশ্যামের মিত্রের অপেক্ষা শত্রুর সংখ্যাই অধিক। ঘনশ্যাম যাহাদের জমি বাকিখাজনার নিলামে ক্রয় করিয়া লইয়াছে বলিয়া,তাহারা সকলেই বনশ্যামের বিপক্ষ। "তদ্ব্যতীত হঠাৎ অবস্থার উন্নতি হওয়াতে সে গ্রামের মাতব্বর ব্যক্তিদের আর এহই করে না, সেই জন্য তাহারা সকলেও ঘন- খামের উপর অসন্তষ্ট। কিন্তু এিপুরাচরণের জ্ঞাতি ত্রৈলােক্য- নাথের সঙ্গেই ঘনশ্যামের বিাদ সর্বাপেক্ষা গুরুতর। জ্ঞাতির ভিটা একজন নিঃসম্পর্কীয় লোক আসিয়া দখল করায় ত্রৈলােক্য ইন্দু, অত্যন্ত মনক্ষু হইয়াছে। সে অনেক আপত্তি করে। ঘঃ খ সে আপত্তি প্রাহ করে নাই ; সে বলিয়াছিল, যখন ত্রিপুরাচরণের স্ত্রী তাহাকে সে বাটী বিক্রয় করিয়াছে, তখন ত্রৈলােক্য আপত্তি করিবার কে ? ত্রৈলােক্যর অর্থাভাব, সুতাং সে মকদ্দম, করিয়া ঘনামের সহিত যুঝিয়া উঠিতে পারি না বলয়। কিছু করিতে পারিতেছে না; কিন্তু সে ঘনশ্যামের উপর বিষম ক্রুদ্ধ হইয়া আছে। অবগত হইয়া সন্দেহ বদ্ধমূল হইল যে সবিহীঃ নিকট হইতে টাক : গহনা লইয়া ঘনশ্যামের কালীঘাট হইতে অন্তর্ধান হওয়ার সহিত সাবিত্রীদের নিরুদ্দেশ হইবার একটা সংসও আছে। কিন্তু ইন্দুর বিবাহ দিবার সময় সাবিত্রী যে এমন কি কথা গােপন করিয়াছিলেন যাহার জন্য সাবিত্রীকে নিরুদ্দেশ হইতে বাধ্য হইয়াছে এবং ঘনশ্যামই বা কি উপায়ে তার নিকট হইতে টাকা আদায় করিয়াছে, তাহার কোনও সংবাদই সুবােধ সংগ্রহ করিতে পারিল না। সুবােধ রামকানাইপুরে নিকট আড়মডাঙ্গায় বাসা লইয়াছিল। রামকানাইপুরে থানা নাই, থান। আড়ম- ডাঙ্গায়। আড়মডাঙ্গার সবইনস্পেক্টার শশধর বাবুর নামে সুবােধ পরিচয় পত্র আনিয়াছিল। শশধর বাবু অতি সজ্জন লােক, তিনি সমস্ত কথা শুনিয়া সুবােধকে আশা দিয়াছিলেন নবম পরিচ্ছেদ যে তাহার দ্বারা যতদুর সাহায্য হইতে পারে তাহ! তিনি করিবেন। সুবোধের মনে ধারণ। হইয়াছিল যে ঘনশ্যাম সাবিত্রীদের ঠিকানা জানে, কিন্তু হয়ত সে কথা সে স্বীকারই করিবে না, এবং সুবোধ যে সেই সংসদ পাইবার জন্য ব্যর্থ, সে কথা পূৰ্ব্বে জানিতে পারিলে, ঘনশ্যাম হত যাহাতে সুবােধ সেই সংবাদ না পায় তাহারই চেষ্টা করবে। সুতরাং ঘনশ্যামকে কি উপায়ে সেই সংবাদ দিতে বাধ্য করতে পারি, সুবােধ তারই চেষ্টা করিতে লাগিল। সুবােধ কলিকাতা হইতে গুরুচরণ ও দানীকে লই। আসিয়া অন্তর হইতে ঘনশ্যামকে দেখাইয়া তাহাদের কথিত | কালীঘাটের সেই কাঙ্গালী-ব্রাহ্মণ এবং ঘনশ্যাম যে একই ব্যক্তি সে বিষয়ে নিশ্চিত হইল। সুবােধর মনে সন্দেহ হইয়াছিল, ঘনশ্যাম যে সকল গহনা তাহার কন্যাকে বিবাহের সময় দিয়াছে সেই গহনা গুলি ইলুর হইতে পারে। দামিনী সেই সমস্ত গহনা দেখিয়াছিল, সেগুলি পুৱায় দেখিলে সে চিনিতে পারিবে এই ভাবিয়া সুবােধ দামিনীকে মল্লিকপুরে পাঠাইল। মল্লিক- পরে একটী প্রকাণ্ড দীর্ঘিকা আছে; সেই দার্বিকায় গ্রামের সকল বাটীর স্ত্রীলােকেরা পান করিতে আইল। দামিনী সেই দীঘির ঘাটে গিয়া মন্ত্রিকপুরের একজন নিম্নজাতীয় পল্লীবধুর সহিত আলাপ করিয়া তাহারই সাহায্যে একদিন ঘনখামের কন্য; দীধি-
ইন্দু
কায় স্নান করিতে আািলে, তাহার গায়ের অলঙ্কার গুলি কৌশলে
দেখিয়া আসিল। সে আসিয়। সুবােধকে বলিল, সমস্ত গহনাই
ইন্দুর, গহনার মত—গলার হার ও হাতের চুড়ি যে ইনুর সে
বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই ; নমুনার বহি দেখিয়া নমুনা
হইতে একটু প্রভেদ করিয়া, ইন্দু সেই গহনা গুলি গড়াইয়াছিল।
বাদুড়বাগানের মতি স্বর্ণকার সেই সমস্ত গহনা গড়িয়াছিল ; সে
দেখিলেই চিনিতে পারিবে। সুবােধ মতি স্বর্ণকারকেও
আড়মডাঙ্গায় আনাইল, এবং কলিকাতায় গিয়া ধনু লাল
আগরওলার অনুসন্ধান করিল ও কালীঘাটে তাহার পুত্রের
মঙ্গলের জন্য ঘনশ্যাম যে স্বস্ত্যয়ন করিবার কথা প্রচার
করিয়াছিল, সে সম্বন্ধেও বিশেষ তত্ব লইল। ঘনশ্যামের
সাবিত্রীর পূর্ববৃত্তান্ত সম্বন্ধে তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিয়াও
সাবিত্রীর নিরুদ্দেশ হইবার কারণ কি এবং ঘনশ্যামকে দেখিয়া,
অথবা তাহার মুখে কোন কথা শুনিয়া, ইন্দু কেন মুচ্ছ।
গিয়াছিল, সে বিষয়ে সুবােধ কোনও সংবাদ পাইল না। শেষে
সুবােধ দেখিল ঘনশ্যামের নিকট হইতে কৌশলে সেই সংবাদ
বাহির করিতে না পারিলে অন্য উপায়ে তাহা জানিবার
সম্ভাবনা নাই। তখন সুবােধ সেই কৌশলই অবলম্বন করিল।
শশধর বার তাহার সহায় হইলেন।
ও
দশম পরিচ্ছেদ
একদিন বৈকালে ঘ.শাম তাহার. “কালীবাড়ী”র সম্মু-
রেয়াকে কয়েক • অনুগত প্রতিবেশীর সহিত
বসিয়া
অন্য দিনের
গঞ্জি। সেবা ও আত্মমহিমা
প্রচার করিতেছিল। তাহার লটে রক্তচনের ত্রিপুণ্ড,
গলায় নক রুদ্রাক্ষে: মা। তাহার কিটে বায়। একজন
করতলে গঞ্জিকা মর্দন করিতেছল। ঘনশ্যান এক এক বার
তাহাকে তাড়া দিয়া বলছে, "কি ছিদাম ছি। লমটা তৈরী
হলো?
নাও, এইবার ককয় চড়য়ে ফেল—বাবাকে
নিবেদন করে নিই,” এবং এক একবার রাসত-বিনিন্দিত
কণ্ঠে, গলদেশের শিরা উপশিরা স্ফীত করিয়া তারস্বরে
গায়িতেছে-
“দে মা অামায় তবিলদারী।
আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী।”
দাম গঞ্জিকার কলিকায় অগ্নি সংযােগ করিয়া বলিল,
দাও গাে দাদাঠাকুর, ধর।” ঘনশ্যাম কলিকাটী একটি
ক্ষুদ্র হকায় বসাইয়া তিন চারিবার সজোরে টান দিয়া,
'১৯
ইন্দু দামকে ' প্রবাদ পাইতে কলিকাটা প্রত্যুপণ করিল। পরে বদগহর হইতে কুণ্ডলীকৃত ধূমােগার করিয়া পুনরায় উচ্চতর কণ্ঠে গায়িল—দে মা আমায় তবিলদারী” ইত্যাদি। দাম সেই সময়ে গঞ্জিকার কলিকা মুষ্টিবদ্ধ হস্ত দ্বারা ধারণ করিয়া এমন এক টান দিল সে কলিকার অগ্নি দীপ- শিখার ন্যায় প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। চণ্ডী গোয়ালা এতক্ষণ লােলুপ দৃষ্টিতে কলিকাটার দিকে চাহিয়া বসিয়াছিল ; এক্ষণে গঞ্জিকা ভস্মসাৎ হওয়াতে সে নৈরাশ্যপীড়িত হইয়া দামকে বলিল -“বলি আচ্ছা লোক ত! এ ককেটাও একেবারে জ্বালিয়ে দিলি। ঢের ঢের গেঁজেল দেখেছি বাপু—কিন্তু এর জুড়ি মেলা ভার—একেবারে রূপচাদ পক্ষী। দু দু ছিলিম সাবাড় কবুলে!” ঘনশ্যামের নেশায় ঘূর্তি আসিয়াছিল। সে উদার ভাবে বলিল---চট কেন হে ঘোষের পাে? এই নাও আর এক ছিলিম বা করে তৈরী করে ফেল। কালী করালবদনি! এই নাও—তার ব্ৰহ্মময়ি!” এই কথা বলিয়া সে তাহার কটাদেশের বস্ত্র হইতে গকিার মােড়ক বাহির করিয়া চণ্ডী ঘােষের সম্মুখে ফেলিয়া দিল। এমন সময় রাসৰ্বৰ মণ্ডল একখানি ক্ষুদ্র খড় হন্তে করিয়া আনিয়া, ঘনশ্যামের পদপ্রান্তে রাখিয়া বলিল,
দশম পরিচ্ছেদ
“ এই নাও দাদা ঠাকুর, তােমার খাড়া নাও। এবার যেদো
কামারকে দিয়ে ধার দিয়ে এনেছি।" এই কথা বলয়।
সে ঘনশ্যামকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল, “দেখো
দাদা ঠাকুর, আমার ভোদার যেন কোন অমঙ্গল না হয়,
আমি মা কালীকে সােণাৱ বাব-পত্তর গড়িয়ে দেব।”
শ্রীদাম জিজ্ঞাসা করা—“কেনরে, হয়েছে কি ?”
রামসর্বস্ব কহিল “ভারে সর্বনেশে কাণ্ড হয়ে গেছে গে।।
আমার ভোদার ব্যাগের সময় মা কালীকে পাঠ। দেব
মেনে ছিলাম, জান ত ? তা আজ সেই পাঠা বলি দিতে
এনে ছিলাম। তা কি আর বলবো গাে, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে
বলিদানে বাধা পড়ে গেছে।”
ঘনশ্যামের নম্মসচিব হরকালী ভট্টাচাৰ্য মদ্য পান করিয়া
ঈষৎ মত্ত হইয়া বসিয়াছিল। সে এক্ষণে কৌতুক অনুভব করিয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “সত্যি নাকি রে! কোপ করেছিল কে ?”
রামসর্বস্ব কহিল, “ত। দাদা ঠাকুর নিজেই করেছিলেন।
আমার বরাত”
হরকালী রহস্যচ্ছলে বলিল, “মুড়িটা ত ঘনশ্যামের পাওনা !
তাই বুঝি কাঁধ ঘেসে কোপ, ঝেড়েছিল রে ?”
রামস সরল ভাবে উত্তর দিল, “আজ কেন হবে?
কাতান খান। ভেত লে। মুড়িটা ডাগর করে কে
১১১
ইন্দু
নিলে ত আমার কোন দুঃখু ছেলনা-উনি কেন, গোটা ধড়টা
মুড়ি ব’লে নিয়ে আমার হাতে খালি লেজ টুকু কেটে দিলেন
। তাতে ত কোন গোল হত না?—পঁঠাটার বলি বেঁধে গিয়ে
ছেলেটার পাছে অমঙ্গল হয়, এই ভাবন।”
হরকাশী। “পঠাটা বুঝি বেড়ে ছিল ?-পাকা গর্দান :
কি সহজে কাটে।
ঘনশ্যাম বলিয়া উঠিল, “আরে না না ভয-সেটা একটা
বেরাল-বাচ্ছা বললেই হয়! সে দিন েের। বাদী কি রকম
পঠাটা বলি দিতে এনেছিল দেখে ছিলে ত?”
দাম বলিল, “উনি দেখেন নি আমি দেখেছি।
সে একটা মস্ত বােকা পঁঠা-বাছুর বললেই হয়।”
ঘনশ্যাম সগর্বে কহিল, “সেটাকে ঐ খড়াতেই এক কোপে
সাবড়ে দিয়েছিলুম-দেখেছিলি ত? ও বেটার মনে কোন গােল
ছিল। নইলে ঐ টুকু বের ছানার মত ছাগলটাকে তিন
তিন কোপ ঝাড়লুম শালার ঘাড়ে একটা আঁচড়ও বল না।”
হরকালী। তা শেষে কি পুঁচিয়ে জবাই করলে না কি ?
ঘনশ্যাম। নইলে করি কি? মন খুলে পুজো দিলে
কি আর এমন ব্যাঘাত হয় ?
রামসর্বস্ব ক্ষুস্বরে কাতরভাবে কহিল, “দোহাই বলছি
দাদা ঠাকুর-আমার মনে কোন ঘোর প্যাচ ছেল না।”
দশম পরিচ্ছেদ বনশ্যাম কহিল, “যা যা বেটা বেকি। অামার কাছে চালাকি করি নি-বেটার টাকায় ছাতা ধরূহে—আর কি না দশ গত পয়সা দিয়ে একটা মাখেগো পঠার বাচ্ছা কালী বাড়িতে বলি দিতে এনেছিলি ? যেমন কর্ম তেমনি ফল। আমার সঙ্গে মা কথা কন তা জনি—অ মার সঙ্গে চালাকি। রামসর্বস জোড়হাত করিয়া কহিল, “দাহাই দাদা ঠাকুর, এবার আমায় বক্ষে কর। আর এমন কাজ কবুব না? এই নাক কান মহি। গোড়া পঠা দেব-এর দুটো রামছাগল এনে হাজির করব—সােণার বিব-পত্তর দেব।” ঘনশ্যাম প্রীও হইয়া কহিল, “আচ্ছ। আচ্ছা, আমি যা বলি ত শাে-ও সব জোড়া পঠ। টঠার হাঙ্গামে অর কাজ নেই- সােণার বিয়াৰ পত্তর দিস আর পূজোর দক্ষিণেটা মােটা করে দিস, তা হলেই হবে—এখন ষা। তারা ব্ৰহ্মময়ী! কি হল যে চণ্ডা, ছিলিটার কত দূর?”, অগত্য রামসর্বস্ব বিদায় লইল। চণ্ডী গােপ ইতিমধ্যে গঞ্জিকা তৈয়ারী করিয়া, ঘনশ্যামকে কথায় কথায় অন্যমনস্ক দেখিয়া, সবেমাত্র গােপনে একবার টান দিয়াছিল। সে শশব্যস্ত হইয়া বলিল, “এই যে কলকে চড়িয়েছি নে পেশাদ করে আমাকেই দেবেন।” সেই সময়ে হরকালী তাহার বর মধ্য হইতে মুকায়িত দেশীয় ময়ের একটা বােতল, বাহির করিয়া নিয়ে
ইন্দু
দেখাইয়া বলিল, “হাদে এদিকে দেখ।” ঘনশ্যাম মছের
নেশায় নূতন দীক্ষিত হইয়াছিল ; হরকালীর কাছেই তাহার
হাতে খড়ি। শিশুরা নূতন খেলনা দেখিলে যেরূপ আহ্বাদে
মত্ত হইয়া উঠে, ঘনশ্যামও সেই মদে বােতলটী দেখিয়া
সেইরূপ ব্যর্থতাবে বলিল, “এনেই ? বেশ, বেশ, এদিকে দাও
কারণ-বারি না টানলে কি কালীসাধনা হয় ?” এই কথা
বলিয়া ঘনশ্যাম মদ্যের বােতলটী ইয়া নাড়িয়া চাড়িয়া বলিল,
“এ কি হে ভট্টা, আধখানাও নেই যে, এর মধ্যে এতটা
সাবাড় করে ফেলেছ ? দাও গেলাসটা দও।” ঘনশ্যামকে
মদ্য পানে ব্যস্ত দেখিয়া হরকালী চণ্ডীর হস্ত হইতে গাজার
কলিকাটা লইয়া টানিবার উদ্যোগ করিতেছিল। কিন্তু ঘনশ্যামের
সেদিকে দৃষ্টি পড়তে সে বলিয়া উঠিল, “ও কি কর হে
চাষ? আমাকে আগে দাও।”
হাকাশী ব্যঙ্গ-পরে বলিল, “এতক্ষণ ত ডাঙ্গা আগলে ছিলে,
এখন জলপথে নেমে, আবার ডাঙ্গার দিকে চাও কেন বাবা ?”
ঘনশ্যাম কহিল, “যাও যাও, মিথ্যে বাজে বােকোনা ভটচাষ
নিয়ে কি করছ?
রাণী হাসিয়া উত্তর দিল, “আমরা বরাবরই উভচর
বকেয়া হাঁস; তুমি বে এই সবে জলে নেবেছ, দুদিক সামলাতে
গাবুবে কেন চাই? মাথায় গুণ চড়বে যে।”
।
১১৫
দশম পরিচেছ।
“আরে মিছে বেল্লিক মাে কোরােনা” এই কথা বলিয়া ঘনশ্যাম
হরকালীর হ হইতে কলিকাটা কাড়িয়া লইল এবং তাহার গুu
ছ’কায় আঁটিয়া বসাইয়া দুই তিনটা টান দিল। পরে পূর্বের মত
বদনাভ্যন্তর হইতে ধূমোগীরণ করিতে করিতে কলিকাটাহকালীর
হন্তে প্রত্যর্পণ করিয়া তারস্বরে হাঁকিল, “তারা ব্ৰহ্মময়ী! শিখে
সৰ্বার্থ সাপিকে! নাও ভায, দুটান টেনে চণ্ডীকে দাও।”
এমন সময়ে রামকানাইপুরের সাত আট জন ভদ্রলোক,
এবং ত্রিপুরাচরণের জ্ঞাতি ত্রৈলােক্যর সহিত সুবােধ সেশনে
সয়া উপস্থিত হইল। দূর হইতে তাহাদের আসিতে দেখিয়া,
শেষ তঃ তাহার পরম শত্রু ত্রৈলোক্য একজন অপরিচিত
¥ক্তকে আনিতেছে দেখিয়া, ঘনশ্যাম কিছু বিস্ময়াবিষ্ট এবং
চাহার নেশার ব্যাঘাত হইবার সম্ভাবনায় বিরক্তও হইল।
নকটে আসিয়া ত্রৈলােক্য অদ্বিারা ঘনশ্যামকে নির্দেশ
ফরিয়া সুবােধকে বলিল, “এই নাম ঘনশ্যাম, এ-ই আমাদের
ভিটেয় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।”
ঘনশ্যাম ভুদ্ধস্বরে বলিল, “ । বেটা হাড়ৰাৰাতে,
ওর বাবার ভিটে। যার ভিটে সে নিয়ে বিক্রী করেছে,
নি তার মাসীমায় কুটুম এসেছেন ভিটে মাৰী করতে।
না আদালত ত খােলা আছে, না একবার নাজিল
রে যখন দেখি, তুই কত বড় বা টো।
ইন্দু :
ত্রৈলোক্যও উত্তেজিত হইয়া বলিল, “ন' যা এসেছে
তার হুড়ে। মামলা বেটা ভণ্ড পৰণ্ড। তারপর আমার সঙ্গে
মামলা করি। তোর পন্ন, অাও না ন ভুনাে ওলা আছে
বসে কি গরিবের মা বাপ নেই ? দর্পহারী মধুসূন এইবার তাের
** ' ' ::। ইনি পুলিশের লােক, পবনে কপা কস্।”
1 ..:::ws. "" ভাবে উত্তর দিল, “পুলিশের লােক তা
হয়েছে কি ? *. নেককে তু বো ছিচকে চোর
ভয় করগে যা।
ই দাই কঁাশ বা গাই-মা কালীর
র ধরে পড়ে আf : ম পুলসের লোকের কি তােয়াক্কা
রাবি ?” পরে সুবে, ; চাহিয়, তাহার ভদ্র:বশ দেখিয়া,
কিছু নম্র ধরে বলিল, ... মশায় বসু। তার। ব্ৰহ্মময়ী
হুকু কথা কইব তা
মহাদেব?? ডরাই নাকি
বলেন মশাই ?
তার ..” মনে করে মায়ের এখা
আসা হয়েছে ?
সুবােধ গম্ভীর জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার না
ধনতাম কহিল,
সুবােধ প্রশ্ন
নিস্তারিণী বাড়ী
নইলে পা
“তুমিই ভবানীপুরের চেলােপটি
বাড়ীতে থাকতে। সত্য কথা বলে
দশম পরিচ্ছে
ঘনশ্যাম চিন্তিত ভাবে বলিল, “আজ্ঞে হ্যা, সেখানে
কিছুদিন ছিলাম বট
সুবোধ কহিল, “তোমার নামে চুীর দাবী আছে। যার
জিনিস সে ধর্মভীরু লােক, বামুনকে হ করে হাত দিতে
চায় না, তাই তোমার যদি কিছু সাই জবাব থাকে
গই জানতে এসেছি।”
ঘনশ্যাম কুঞ্চিত করিয়া কহিল, “কি চুরীকার জিনিস
শুনি ? ব্রাহ্মণের নামে এমন বদনাম! মা কালী করালবদনী
তুমি আছো।”
সুবােধ অবিচলিত ভাবে কহিল, “তােমার মেয়েকে বিয়ের
সময় যে সব গয়না দিয়েছে সে সব চোরাই মাল।”
ঘনশ্যাম সপ্রতিভ ভাবে উত্তর দিল, মিথ্যে কথা। সে
সব গয়না অামাকে ধন্ন লাল আগরওয়ালা দিয়েছে।
সুবােধ কঠোর স্বরে কহিল, “খবরদার। আমার সঙ্গে
नाको করাে না হাতে হাতকড়ি পড়বে—পুলিস মােতায়েন
ছে।” এই কথা বলিয়া অজিত পকেট হইতে এক
হিসিল বাহির করিয়া বাজাইতেই, অপুর
পথিপাশে এক
vাপের অন্তরাল হইতে আমরাঙ্গা থানার চারিজন চৌকীদার
বং একজন রোগা বাহির হইল। তাহাদের দেখিয়া
নিশামের এক কলিকার ইয়ারগণ যে যে দিকে পারিল ধীরে
ইন্দু
ধীরে সরিয়া পড়িল। ঘনশ্যাম কিছু ভীত হইয়া 'নরায় বলি
আমি মিথ্যে বলছি না।”
সুবােধ তাহার কথায় বাধা দিয়া বলিল, “হাটখােলায়
লাল আগরওয়াল বলে কোন মহাজন নেই। আর
তােমার মেয়ের গায়ে যে সব গয়না আছে, সেই সব গয়ন
যার হাতে গড়া সেই সো এসে সনাক্ত করে গেছে।”
ঘনশ্যাম চিন্তিতভাবে উত্তর দিল “আর গয়না সে
আমাকে দিয়েছে।”
সুবােধ। গয়না বাদুড় বাগানের ডাক্তার অজিত মুখুৰ্য্যের স্ত্রীর
ঘনশ্যাম অজিত মুখুৰ্যে কে ? আমি তাকে চিনি না
গয়না আমাদের ত্ৰিপুরাে দাদার মেয়ের।
সুবােধ। সেই ত্রিপুরাচরণের কন্যাকেই অজিত
করেছে।
ঘনশ্যাম বিস্ময়ের ভাণ করিয়া উত্তর দিল, বিলক্ষণ! হি
ঘরের মেয়ের কটা বিয়ে হয়। চার ত এই গায়েই দিগ
গালরী সঙ্গে বিয়ে হয়ে ছিল।
সেই কথা শুনিয়া গ্রামের যে সকল ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থি
ছিল, তাহারা সকলেই বিয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চাহি
দেখিল, এবং জেলােক্য বলিয়া উঠিল, “শোন কথা ! দিগং
গাধুলী ত আজ ১৫/১৬ বছর মারা গেছে। ত্রিপুরাে কাকাও
১১৮
দশম পরিচ্ছেদ
তার মাস খানেক আগেই মারা যান, আর কাকিমা তার
পরেই তার মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ী চলে যান, তবে
এখানে বিয়ে হোল কি করে !
ত্রৈলােক্যর প্রতিবাদে ঘনশ্যাম ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল, “তুই
বেটা খাম তাের তখন গলা টিপলে দুধ বেরোয়, তুই তার
জাবি কি ?”
ত্রৈলােক্য উত্তর দিল, “না আমার তখন বিশ বছর বয়েস,
‘বয়ে হলে আমি টের পেতাম না ?”
ঘনশ্যামের কথা শুনিয়া কাজিরে দুর্ভাগ্যের চিন্তায় সুবােধ,
কিছু বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিল। ত্রৈলোকার কথায় সে একটু
সাহস পাইয়া গ্রামের অপর সকল উপস্থিত ব্যক্তিগণকে
জিজ্ঞাসা করিল, “ক মশায়, আপনারা সে বিয়ের কথা কিছু
জানেন ?”
তাদের মধ্যে একন প্রাচীন ব্যক্তি বলিল, “ত্রিপুরা-
চরণ মারা যাবার শাসছয়েক আগে দিগম্বর গাঙ্গুলী এখানে
একবার পাঁচ সাতটা বিয়ে করে যায় বটে; কিন্তু
ত্রিপুরার কচি মেয়েকেও যে সে বিয়ে করেছিল, ত তখন
শুনি নি।”
ঘনশ্যাম কহিল, “ওঁরা জানবেন কি করে ? •ত্ৰিপুরো দাদা
আমার সঙ্গে পরামর্শ করে লুকিয়ে সে বিয়ে দিয়েছিলেন।
म्मू বৌ ঠাকরুণ কান্নাকাটি করেছিলেন, আর টাকা বাঁচা জন্যে দুধের মেয়েকে আশী পঁচাশী বছরের বুড়াের সঙ্গে দেওয়াও একটা লজ্জার কথা বলে ত্রিপুরােদাদা আর কথা। প্রকাশ করেন নি।” ত্রৈলােক্য উত্তেজিত ভাবে কহিল, “আরে তিনি নাই বা প্রকাশ কবুলেন, বাড়িতে বিয়ে হলে আমরা বাড়ির লােকে টের পেতাম না? খ্যাপার মত যা তা বললেই হল।” ঘনশ্যাম তীব্রভাবে উচ্চকণ্ঠে কহিল, “চোপ, রঙ, খ্যাপ খ্যাপা করিনি। ফের যদি খ্যাপা বলবি ত তুই আছিস আমি আছি ! এবাড়িতে কি বিয়ে হয়েছিল রে বেটা আঁট- কুড়ীর পুত? বিয়ে হয়েছিল দোষালদের বাড়িতে—তা তুই জানবি কি ?” ত্রৈলােক্য সে কথায় কিছু মাত্র আস্থা স্থাপন না করিয়া উত্তর দিল, “আমি জানি কাকিমা যত দিন এখানে ছিলেন, তিনি এক দিনও বাড়িথেকে নড়েন নি। পোষালদের বাড়িতে আবার তিনি কবে মেয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিতে গেলেন ? সব মিথ্যে কথা। এই আমি যাচ্ছি। যই থােষালকে ডেকে আনছি। তার মিথ্যে বলা ভেঙ্গে দিচ্ছি। এই কথা বলিয়া ত্রৈলোক্য দ্রুতপদে ঘোষালদের বাড়ির দিকে প্রস্থান করিল। তদ্দর্শনে নিল ক্রোধে, গণিকার ও মনে দ্বিবিধ নেশায় আরক্তিম চক্ষুর --।
দশম পরিচ্ছেদ
ঘূির্ণিত করিয়া ঘনশ্যাম শাক "দ্দশ করিয়া বলিল, “বেটার
নেহাত মণ ছিটপিটুনি পছু নে।”
সুবােধ এক্ষণ ffত হলে উক্ত বাগবিতণ্ডা শুনিতেছিল।
ইনুর পূর্ব-বিবাহের কথ! য ক +• হথ তাহা হইলে অজিতের
প্রাণে কি ভীষণ পা লা**বে, সেই চিন্তায় সুবােধ মনের
চাঞ্চল্য দমন করিত পতেছিল না। এক্ষণ কিঞ্চিত প্রকৃতি
হইয়া সে ঘনশ্যামকে বলল, “ সে বিয়ে যদি হয়েই থাকে,
তাতেও কিছু মিটছে না। অস্ত্র ও মধুর্যে যখন ত্রিপুরাচরণের
কন্যাকে বিবাহ করে, তখন ত আর দিগম্বর গাঙ্গী বেঁচে ছিল
। অতি না হয় বিপাকে পথে কতেছে। বিধবা বিবাহ ত
আইনে বাধে না? তাহলে অজিতেই স্ত্রীর গয়ন। তুমি চুরী
তােমার কথা সত্য হলেও সে দাবী বজায়
রয়েছে।”
ঘনশ্যাম চিন্তিত ভাবে উত্তর দিল, “বলেছিত, সে মেয়ে নিতে
আমাকে সে গয়না বেচেছে
সুবোধ অবজ্ঞার স্বরে কহিল, “বেচেছে! তুমি টাকা গেলে
কোথা ?”
ঘনশ্যাম সে কথা প্রতিবাদ বিয়া কি বলিতে যাইতেছিল
কিন্তু সুবোধ সে কথায় বাধা দিয়া বলিল, “তুমিত কালীঘাটে
শীৱতি করতে-মিছে কথা বাড়িওনা। অজিতের চাকর
১১
ইন্দু,
আর ত্রিপুরার পরিবারের বাড়ীতে যে দাসী ছিল, তারা দুজনে,
তােমাকে চিনিয়ে দিয়ে গেছে।”
ঘনশ্যাম কিয়ৎক্ষণ শোন থাকিয়া বলিল, “আচ্ছ। সত্যি কথাই
যদি বলি, 'তাতেই বা কি আসে যায় ? বেচেনি, আমাকে
অমনি দিয়েছে—ফেরে পড়ে দিয়েছে, আগেকার বিয়েটার কত।
যদি বলে দিই সেই ভয়ে দিয়েছে-আমার মুখ বন্ধ করবার
জনাে দিয়েছে।”
সুবোধ তাহাই অনুমান করিয়াছিল। কিন্তু সে নিজের
মনােভাব প্রকাশ না করিয়া বলিল, “তোমার মুখবন্ধ যদিই
কলে, তবে অজিতের ঘর করতে গেল না কেন?"
ঘনশ্যাম উত্তর দিল, “সেটা আমিও প্রথমে বুঝতে পারনি।
তার পরে জেনেছি সেটা মেয়েটার খেয়াল । যদি আগের বিয়ের
কথাটা এরপরে জানাজানি হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে নিয়ে ঘর
করেছে বলে অজিত বাবু ফ্যাসাদে পড়ে যাবে ত? তা সেটা
সে চায়না? নিজে মরছে সে ভাল তবু অজিত বাবুর গায়ে
আঁচড়টা লাগতে দেবে না-এই মতলব! সাধে বলে মেয়ে
বুদ্ধি! এমন কি, কথাটা যে অজিতবাবুর কাণে যায় তাও
সে চায় ন'; তাই ত আমকে টাকা গয়না দিয়ে আসছে -
নইলে মেয়েমানুষের হাত দিয়ে জল গলে ?”
সুবোধ কথা দিয়া কথা বহির করিবার আশায় কল,
১২
দশম পরিচ্ছেদ
তা হলে তুমি বলতে চাও যে 'এই টাকাকড়ি গয়না পত্তর
যা তুমি এনেছ—সব সে নিজের ইচ্ছেয় দিয়েছে ? একথা তাকে
আদালতে হাজির করে বলতে পারবে? নইলে অজিত মুখুর্যে
তােমার মুখের কথা শুনেই কি তোমাকে ছেড়ে দেবে মনে
করেছ ?
হাজতে ঠেলবে তা বলে দিচ্ছি।”
ঘনশ্যাম আত্মরক্ষার জন্য যতটুকু প্রয়োজন তাহার অধিক
কোনও কথা প্রকাশ করিতে ইচ্ছুক ছিল না। সে মস্তক কয়ন
করিতে করিতে বলিল, “সে কথা কে গয়ে জিজ্ঞেস করে
আসতে পারেন। তাকে হাজির করতে পারব না।
সুবােধ বিস্মিত ভাবে কহিল, “কেন ? তার নামে যদি
পরােয়ানা বার করি ?
ঘনশ্যাম। রােয়ানাই বের করুন, আর যাই বের করুন
-সে হাজির হতে পারবে না।”
সুবােধ শকিভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “কেন?”
সুবােধের আগ্রহ দেখিয়া ঘনশ্যাম তাহার সেই পরাজয়ের
সময় ও যেন একটা জয়ের উল্লাস অনুভব করিল । সে একটা
বিকটহাস্য দমন করিয়া বলিল, “কেন ? তা সেখানে গেলেই
টের পাবেন ?”
সুবোধ তার মনের আশঙ্কা গােপন করিয়া বলিল, “আচ্ছা
তাই হবে—তাদের ঠিকানা?”
পরাজয়ের
দশম পরিচ্ছেদ
।
ঘনশ্যাম পুনরায় কি?ৎক্ষণ ইতস্তত করিয়া কহিল, “সেই
কথাটাই বলতে বাণে ছিল যখন ছাড়বেন না, সবই
বলতে হ’-তখন সেটাই বা বা'ক থাকে কেন? বলে ফেলি--
তারা কাশীতে, গনেশ মহল্লা–গলিতে --নং বাড়ীতে থাকে।
সই সময়ে ত্রৈলােক্য হাই ফাইতে যংঘােষালকে
সঙ্গে করিয়া আনিয়া বলিল, “এই শুনুন এর মুখে।
মিথ্যে কথা। ওঁদের বীতে যেদিন ওর ভাইজিদের সঙ্গে
দিগম্বর গাঙ্গুলীর বিয়ে হয়, সেই 'দন রাত্তির দুপুরের সময়,
ত্রিপুরে কাকার ক্ষুদে মেয়েটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে করে
নিয়ে ওদের বাড়িতে বিয়ে দিতে হাজির হয়েছিল বটে, কিন্তু সে
মেয়ে জেগে উঠেই আছাড় পাহাড় করে এমন চীৎকার করতে
লাগল—যে দিগম্বর গাঙ্গুলী রেগে আগুন হয়ে ওকে বলে-
নিয়ে যাও মেয়েটাকে এখান থেকে—কট। টাকার জন্যে ঐ
মেয়েকে যদি আমি বিয়ে করি ত আমার নাম দিগম্বর গাঙ্গুলী নয়।
মেয়ের কান্নাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে সবাই ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে
দিয়েছিল। ত্ৰিপুরো কাকা ত বাড়ীর ভেতর মেয়েদের কাছে
যান নি-ও বোধ হয় বাইরে এসে বিয়ে হয়ে গেছে বলে
ফাকি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা কটা হাতিয়েছিল। ওর
অসাধ্যি ত কোন কাজই নেই; তার পরদিনই দিগম্বর এখান
থেকে দেশে ফিরে যায়—বিয়েও হয় নি কিছুই হয় নি। এই
১২০
দশম পরিচ্ছেদ
যদু বাবুকে জিজ্ঞেস করুন। ওঁ ভাইজিরা—যাদের সে
রাত্রে বিয়ে হয়, তাও রয়েছে জিজ্ঞেস করবেন না।”
সেই ক : শু নয়। সুত:পর বক্ষ হইতে যেন, একখানা
গুরুভার পথ। নাম গেল। সে বলি। উঠির-“তা হলে
অজিতের স্ত্রীর গয়না : গুলা সব কয়ে এনেছে ? চুরি
করেনি, ঠকিরে এনেএই কথা!”
৫ৈলােক। ত ন ত ? ওর সবই মিথ্যে।”
ত্রৈলোক্যঃ আপনে পশ্যা ম রুল শুতি হইয়া
দাড়াইয়াছিল। এক্ষণে ত্রৈলোকার বাকে
উন্মত্তবৎ হইয়া উঠি। পগ্র (৪ :'ও সু:13 মাদকতা তাহার
মস্তিষ্কে উঠ: হল.স.ধে দ েদন্ত নিষ্পেষিত করিয়া
ত্রৈলোক্যকে বলল, দে রে বো পাজ ---তুই-ই যত
নষ্টের গোড়া - ডু। তোকে দে শাহ।” এই কথা বলিয়া
চক্ষের পলক ফেলত, 'লিতে সনম, রামসর্বস্ব মণ্ডলের
আনীত সেই শত ডুগ ধুলয়, এলােকর মস্তক লক্ষ্য
করিয়া সজোরে আঘাত করিল। এণাক্য ঈষৎ সরিয়া
গিয়াছিল, খড়গ তার মস্তক লাগিল না, স্কন্ধের উপর
খড়ের অগ্রভাগ মত্ৰ হিত হইল—নতু ত্রৈলােক্যর
মস্তক দ্বিখণ্ডিত হইয়: যত। কিন্তু স্কন্ধের আঘাত এরূপ
গুরুতর হইল যে তাহাতেই, রক্ত কলেবরে জ্ঞানশূন্য হইয়া
ইন্দু ত্রৈলোক্য ভূমিতে পড়িয়া গেল। নিমেষের মধ্যে সুবোধ সনামকে সপটিয়। পবিয়া তাহার (স্থ হইত খড়গ কাড়িয়া মইল এবং গমের :কেরা আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিল। ত্রৈলােক্যর ক্ষতস্থান যথাসাধ্য বন্ধন করিয়া সুশে অবিলছে তাহাকে চিকিৎসার ও তাং-ডাঙ্গায় সরকারী চকৎসয়ে পাঠাইয়া দিল এবং পানির লোকের, রায় * আগতের অপরাধে, নশ্যামকে পরিয়া থানায় ইয়া গেল। পরদিন চিকিৎসালয়ে গির। সুবে; অবত হইল, ত্রৈলোকর অযাত সাংঘাতিক না হইলেও তাহার অরেণ্যং ই, বাদাগিবে । সে যতদিন না আদালতে সাক্ষ্য দিতে সমর্থ হয়, এতদি। ঘন- শ্যামকে হাতে থাকতে হবে। গ্রাশের কানও সঙ্গতিপন্ন লোক ঘনশ্যামের প্রতিভূ থাকিতে সম্মত হয় নাই। এমন কি তাহার বৈবাহিক মল্লিকপুরের চক্রবর্তী ঠাকুর অবধি, তার প্রধঞ্চনার কথা জানিতে পারিয়া, জামিন হতে অস্বীকার করিয়াছে। সেই কথা শুনিয়া সেই দিনই সুবোধ আড়মভাঙ্গা ত্যাগ করিল।
একাদশ পরিচ্ছেদ
*
তৎপর সুবােদ কলকাতায় আসিয়া অজি ওকে সমস্ত
সংবাদ সবগুনে জ্ঞাপন কলি। অত স্থিরভাবে সমস্ত কথা
শুনিয়া ধীরে ধীরে সুবোৰক বা না, তাই, আজই রাত্রের
গাছীতে আমার কশী যেতে হবে--মও সঙ্গে চল।” অজিত
এত সহজ ভাবে কথা বলল সে সুবোধ বুঝিতে পারিল না,
অজিতের অন্তরে কি ভয়ঙ্কর ঝ। বহ:৩ই।
অজিতের বাহিক বৈ দেখি। প্রীত হইয়া সুবোধ বলিল,
“আমি মনে করেছিলুম কাশীতে ওম একলা গেইে হবে, এ
সময়ে আমি আড় ডাঙ্গায় ফিরে গেলে তোমার স্ত্রর গয়নাগুলাে
আর শ্বাশুড়ীর টাকাগুলাের কতক ফিরিয়ে পাবার উপায় করতে
পারতুম। এর পরে সব আদায় না হতে পারে। আর ঘনশ্যামট।
যা করে বসেছে তাতে বছর দুই ত বাছাধনকে ঘর বাস করে
আসতেই হবে-তবে অমি থেকে কর্দমা তার করলে আরাে
কিছু বেশী সাজা দেওয়াতে পারতুম”
সেই কথা শুনিয়া অজিত আর তাহার মনের ভাব গোপন
রাখিতে পারিল না। সে গাঢ়স্বরে বলিল ভাই যার জন্যে ভাবনা
ইন্দু
তাকেই আগে পাই—তার পর য় টাকার কথা বোলাে। সাজ
যিনি যাকে যা দেবার fাই •ে•- সে জন্য আমাদের এখন
ব্যস্ত হবার দরকার নেই- কে আমার সঙ্গে যেতেই
হবে।”
জিতের ব্যগ্রতা ও মুর শঙ্কিত ও বাধিত ভাব লক্ষ্য
করিয়া সুবোধ নি.জর এম বুঝত পারগ এবং সমবেদনায়
চঞ্চল হইয়া অজিতের কথা । কারণ। সেই রাত্রের
পাঞ্জাব মেলে উয়ে কশা বা করাই কর্তব্য বিবেচনা
করিল। অল্প সময়ের মধ্যে উমর প্রয়োজনীয় পরিধেয়
বাদি গুরচরণ যাহ, পানি ওহাই দিল। অজিত প্রচুর
অর্থ সঙ্গে লইল। ঘণ.ম যে বায়াল, ইন্দু কিছুতেই
সাক্ষ্য দিতে আসতে পারবে না, সেই কথাটা, কি এক
অনিশ্চিত অণ, খ.? এ একবার ও করিয়া
লিত। কিন্তু ইংঘে নি. 1 সুit শবদয়। অজিতের
মান রক্ষা করিবার জন্য ব্যর্থ [ছ-সে যে নিজের
চেয়ে অতিকে তলবাসে তাহার অকাট্য প্রমাণ পাইয়া
অজিত আজ ইন্দুকে পুধএ এরূপ ব্যাকুল হইয়া
উঠিয়াছিস যে অপর সে চিন্তাই তাহার মনে যান
পাইতেছিল । সুবোধ সর গাড়িতে নিদ্রা গেল—কি
অজিতের চলে নিশেষের নাও নি আসিল না। এত
একাদশ পরিচ্ছেদ
হইলে মােগলসরাই ষ্টেশনে গাড়ি
বদল করিয়া উভয়ে
যখন কাশীর গাড়িতে উঠিল তখনও অজিতের মুখে কোন
কথাই নাই। সুবােধ তাহার নীরবতার অর্থ বুঝিয়া তাহার
মৌন ভঙ্গ করিবার চেষ্টা করিল না। গাড়ি যখন বারাণসীর
সেতুর উপর আসিল এবং সহযাত্রীদের মধ্যে একজন বলিয়া
উঠিল “ঐ বেণীমাধবের ধ্বজা দেখা যাচ্ছে-জয় বাবা
বিশ্বের”। সেই শব্দে অজিতের, চিন্তাস্রোত ক্ষণকালের
জন্য ভঙ্গ হইল; ঔরঙ্গজেবের মসজিদের গগনস্পর্শী মিনার
বয়ের দিকে স্বতঃই তাহার দৃষ্টি আকৃষ্ট হইল এবং গঙ্গাতীরস্থ
বারাণসী-খামের সৌধজি-শােভিত মনােহারিণী মূর্তি অজিতের
নয়ন সমকে ভাসিয়া উঠিল। সকলে যখন পুনরায় সমস্বরে
“জয় বাবা বিশ্বের” বলিয়া বিশ্বনাথের উদেশে প্রণাম করি,
তখন জিতের মন্তক স্বতঃই বিশ্বনাথের চালােপান্তে এণত
হইল। কিন্তু তাহার মানসফলক হইতে মুহূর্তকালের মধ্যেই
বিশ্বদেবতার মূর্তি অপহৃত হইয়া, পুনরায় ইনুর চিন্তা, সে
স্থান অধিকার করিল। অজিত যতই ইনুর আশয় স্থানের
নিকটস্থ হইতেছে বুঝিতে পারিল ততই তাহার হৃদয় ইর
অধিকতর নিকটস্থ হইবার জন্য ব্যহইয়া উঠিল।
• কাশীতে পৌছিয়া অতি তাহার পিতৃ• সদান
বাবুর বাটীতে গিয়া উঠিল।, সদানন্দ বাবু সরওয়ালা
ছিলেন, কৰ্ম্ম হইতে অবসর লইয়া কাশীবাস করিয়াছেন। তিনিও একজন জমিদার; এক্ষণে এক্ষণে যাহার পুত্রই দেশে জমীদারীর তত্ত্বাবধান করেন। অজিতকে দেখিয়া তিনি পরম অনিন্দিত হইলেন এবং অজিতের ও সুবোধের গান আহারাদির জন্য নিজে ব্যগ্র হইয়া পরিনদিগকে ব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। অজিতের তৎকালে আহারাদি করিবার জন্য কিছুমাত্র ইচ্ছ। ছিল না—কিন্তু সদানন্দ বাবুর আগ্রহ দেখিয়া ও সুবোধের কষ্ট হইবে ভাবিয়া অগতা! উছরে আহারাদি করিল। আহারান্তে অজিত সদানন্দ বাবুকে বলল-“আমাদের এখনি একবার গণেশমহল্লায় যেতে হবে, এসে আপনার সঙ্গে কথা বাৰ্তা ক’ব--কিছু মনে করবেন না—বিশেষ দরকার।” সদানন্দ বাবু বললেন-“তার জন্যে আর কি হয়েছে বাবা, কাজটা সেরেই এস। আমার গাড়িতে যাও—এখানে তােমরা অচেনা লােক-আমার দরােয়ান সঙ্গে যাচ্ছে। অজিত সদানন্দ বাবুর সেই সমেই অনুরােধ রক্ষা করিল। অজিত কাশীতে একাধিক বার আসিয়াছিল-তত্র সদানন্দ বাবুর বারবান এবং সুবােধ সঙ্গে না থাকিলে গণেশমহলায় সাবিত্রীদের যে ঠিকানা ঘনশ্যাম রলিয়া দিয়াছিল, তাহা খুজিয়া বাহির করিতে অজিতকে কষ্ট পাইতে হইত। সেখানে সেখানে বাঙ্গালীদের বাস নাই, হিল- একাদশ পরিচ্ছে স্থানীরাই থাকে। পাছে কোনও পরিচিত লােকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তবিয়াই সাবিত্রী সেইস্থানে বাস? লইয়া ছিলেন ।বাটার দ্বারে পঁহুছিয়া অজিত, 'সুবােধকে সদর রাস্তায় গিয়া গাড়িতে বর্ণিয়া অপেক্ষা করিতে বলিল। বাড়ীটি সদর রাস্তা হইতে দূরে একটি সঙ্কীর্ণ গলির মধ্যে, সেখানে গাড়ি যায় না। দরবানকে বারে অপেক্ষা করিতে বলিয়া অজিত একাকা বাটার মধ্যে প্রবেশ করিল। বাড়ীটী বহু পুরাতন অপরিচ্ছন্ন এবং বায়ু ও আলােক বর্জিত বলিলেই হয়। ত্ব:রের ভিতর প্রবেশ করিয়া অজিত শুনিল, একজন স্ত্রীকে উচ্চ কণ্ঠে বলিতেছে,-“ভাড়া দিতে পাবে না--কৃতে এসেছিলে কেন? আমার কি আর ভাড়াটে জুঠতো না? ভাড়: যে কোখেকে দেবে তাও ত দেখতে পাচ্ছি না—সে দিন ত বাসন কোশন যা কিছু ছেল সব বিক্রী করে দেওর মিনসেকে দিয়ে দিলে। একটা রাঁধুনীগিরি কাজ জুটিয়ে দিলুম --ও করতে গেলে না-* অপর একজন স্ত্রীলােক অনুচ্চস্বরে উত্তর দিল-“ছু দিন সবুর কর মা—ময়ে একটু সেরে উঠুক। ওকে এমন অবস্থায় রেখে কি করে রাখতে যাই বল? তােমার দু টাকা ভাড়া নিয়ে আমি পালাব না-যেমন করে পারি গতর খাটিয়ে শােখ দেবাে-মেয়ে একটু সারলেই- এ
ইন্দু
নিচ্ছে।
প্রথমােক্তা স্ত্রীলােক সে কথায় বাধা দিয়া উচ্চতর
কণ্ঠে কহিল-“ও আর সেরেছে। দেখছি আমার বাড়ীতেই
একটা ভাল মন্দ হবে—আমাকেই শেষে খড়। ফেলার দায়ে
ফেলবে। ভাল
ভাল বক্মারি করে ভাটে রেখেছিলুম
বা হােক। দেখলুম টাকা আছে—দেওর মিনসে এসে
থােক থা টাকা নিয়ে যাচ্ছে, গয়নার পুটুলি বেঁধে
শেষে যে হাড়ি চড়বে না, এমন দশা ধরবে
তা কি করে জানব বল । তাল আপদেই পড়লুম য;
হােক ! কেন বিধবা মানুষের লােকসান কবৃছ বাপু?
উঠে যাও না-কাশীতে কি আর জায়গা নেই -
পুনরায় মৃদুস্বরে উত্তর হইল—'এমন অবস্থায় মেয়েকে নিয়ে
কোথায় যাই মা? নাড়া চাড়া করুলে যা প্রাণ টুকু ধুক ধুক
করছে বাহার আমার, তা-ও বেরিয়ে যাবে। এত দিন
যখন রেখেছ এ মাসটা থাকতে দাও মা।”
অজিত এবার কণ্ঠস্বরে বুঝিতে পারিল, শেষে যিনি কথা
কহিলেন, তিনি সাবিত্রী। অজিতের সর্বশরীর শিহরিয়া
উঠিল। সে কম্পিতকণ্ঠে ডাকিল-“বাড়িতে কে আছেন গা?”
মনের উত্তেজনায় তাহার কণ্ঠস্বর এরূপ বিকৃতি প্রাপ্ত
হইয়াছিল যে সে নিজের বর শুনিয়া নিজেই চমকিয়া
তাহার আধানে' হরিশঠাকুর বাহিরে আসিয়া
উঠল।
একাংশ পরিচ্ছেদ জিজ্ঞাসা করিল—“কে মশায় ? কাকে খুজছেন?” পরে অজিতের মুখের দিকে চাহিতেই আনন্দে ও বিস্ময়ে বলিয়া উঠিল—“কে দাদা, তুমি! অজিত বার! দাড়াও দাদা- খবর দিই--হঠাৎ গেলে মেয়েটা কি সইতে পারবে।” এই কথা বলিয়া হরিশঠাকুর • বাটীর ভিতর প্রবেশ করিল। অজিত দেখিল, হরিশঠাকুরের সেই সদাপ্রফুল্ল মুখে এমন একটা চিন্তাক্লিষ্ট বিষন্নতাব আসিয়াছে এবং তাহার দেহেরও এরূপ একটা পরিবর্তন ঘটিয়াছে, যে তাহাকে অন্য স্থানে হঠাৎ দেখিলে হয় ত অজিত তাহাকে চিনিতেই পারিত না। হরিশঠাকুর বাটীর ভিতর প্রবেশ করিতেই, অজিত শুনিতে পাইল, সাবিত্রী বলিতেছেন--“যাও মা, তােমার পায়ে পড়ি এখন যাও—আর এক সময় এসো-” সম্ভাষিতা স্বীলােক অবজ্ঞার স্বরে জিজ্ঞাসা করিল-“কেন- কে এসেছে?" হরিশঠাকুর অনুচ্চকণ্ঠে উত্তর দিল, “নাত জামাই এসেছেন। পূর্বোক্তা স্ত্রীলােক বলিয়া উঠিল—“ওঃ ভারি তালেবর জামাই কিনা—তাকে আবার লজ্জা। ছুঁড়ির’গায়ে এমন একটু সােণাৱত্তি দিতে পারে নি. যে বিক্রী করে ভাড়ার দুটো টাকা ফেলে দেয়। জামাই এসেছে আসুগ, না, তাতে আমার কি বয়ে গেল। ১০ আমি আজ হয় টাকা নেব, নয় উঠিয়ে তবে ছাড় ব! এই আমি এখানে বসে রইলুম-দেখি কে আমায় ওঠায়।” হরিশঠাকুর সাবিত্রীর সহিত মৃদুস্বরে কি কথা বলিল তাহা অজিত বুঝিতে পারিল না। পরক্ষণেই হরিশ বাহিরে আসিয়া অজিতকে সাদর-দাবান করিল, “এস দাদা এস। আমি এদের যে কত সেধেছি, যে তােমাকে খপর দিই, তা ওঁরা কিছুতেই দিতে দেন নি। যা হােক ভগবান তােমাকে এনে দিয়েছেন, নইলে বড় কষ্টই মনে থেকে যেত, হয়ত দেখাই হত ।” ভগ্নস্বরে এই কথা বলিয়া, মলিন পরিধেয় বস্ত্রের অগ্র- ভাগ দিয়া চক্ষু মুছিতে মুছিতে, হরিশ অগ্রগামী হইয়া অজিতকে খাচার ভিতর লইয়া গেল। বাটীতে প্রবেশ করিয়া সমুখেই ধূমে যশী-মলিন দেওয়াল বিশিষ্ট, বিরল-আলােক একটা একতলা গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া, হরিশ বলিল, “এস দাদা এই ঘরে এস।” সেই গৃহের বাহিরে সঙ্কীর্ণ বারাণ্ডায় একখানি খাটিয়া পাতা রহিয়াছে; তাহার পার্শ্বে একজন কর্ষীয়সী বাঙ্গালী-শ্রীলােক বসিয়াছিল। অজিত পকেট হইতে একখানি দশ টাকার নোেট বাহির করিয়া তাহার সম্মুখে ফেলিয়া দিয়া বলিল, “এই নাও ভাড়-এখন যাও।” মীলােকটা তীব্র দৃষ্টিতে অজিতের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, “আমি আবার ভাঙ্গাতে যাব কোথায়?
একাদশ পরিচ্ছে ভাগিয়ে দাও না?” অজিত উত্তর দিল, “ভাঙ্গাতে হবে না দশ টাকাই তুমি নিও-এখন যাও।” স্ত্রীলোক অজিদের দিকে পুনরায় সন্দেহপূর্ণ কটাক্ষপাত করিয়া পরে অপেক্ষাকৃত নিম্নস্বরে বলিল, “আগাম ভাড়া ঢুকিয়ে রাখলে - বেশ”, এই কথা বলিয়া সে আলোকের সম্মুখে ধরিয়া নােট খনি পরীক্ষা করিতে করিতে মন্থরগমনে ক্ষুদ্র উঠান পার হইয়া উপর-ইলে উঠিয়া গেল। গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া অজিত দেখিল, একপাশে কএকটী মৃত্তিকার হাঁড়ি কলসী, ইট বহির কর দেওয়ালে এক- গাছি দড়ির আলয় কয়েকখানি মলিন বস্ত্র, একটা টিনের ঘােট তােরঙ্গ ও একখানি খাটিয়া ভিন্ন সেই গৃহে আর কোন ও দ্রব্য- সামগ্রী নাই। খাটিয়ার উপর কে একজন শুইয়া আছে এবং খাটিয়ার পাশে দাঁড়াইয়া একজন বিধবা স্ত্রীলােক একখানি পরিস্কৃত ছিন্ন বস্ত্র দিয়া শয়ি তার গান 'ও মলিন শা টাকিয়া দিতেছে। অজিত গৃহে প্রবেশ করিতেই বিধবা বাষ্পকুলকণ্ঠে কহিল, “এরই একধারে বস, বাবা।” এই কথা বলিয়া খাটিয়ার এক পার্শ্বে অশুকে বসিয়ে দিয়া বিধবা সরিয়া ঈাড়াইল । বিধবার কণ্ঠস্বরে অজিত চিনিল যে, তিনিই সাবিত্রী, নতুবা তাহার ও দেহ এরূপ শীর্ণ ও মলিন হইয়া গিয়াছে, যে তাহাকেও সহজে চেনা যায় না। খাটিয়ার দিকে চাহিতেই অজিত যাহা
দেখিল তাহাতে সে সাবিত্রীকে প্রণাম করিতে ভুলিয়া গিয়া
খাটিয়ার এক পার্শ্বে বসিয়া পড়িল। খাটিয়ার উপরে ইলুই শয়ন
করিয়াছিল। অঙ্গিত দেখিল, সুবর্ণলতিকা নিদাঘ রৌদ্রে
শুকাইয়া গিয়াছে, সে তপ্তকাঞ্চন- যেন ডাকিনীর কুহক-শ্বাসে
নিত হইয়াছে সেই সুঠাম বাসন্তী-প্রতিমা যেন শয্যার
সহিত মিশিয়া আছে। তাহার পূর্ব-লাবণ্যের আর কোন
চিহ্ন নাই—কেবল পাণ্ডুরমুখমলে অয়ত চক্ষু দুইটা অল অল
করিতেছে। তাহার মণিবন্ধে শাখা এবং সীমন্তে সিন্দুর বিন্দু
আয়তের চিহু রক্ষা করিয়াছে, নতুবা তাহার অঙ্গে আর কোন
আভরণই নাই। কিয়ৎক্ষণ স্তম্ভিত ভাবে বসিয়া থাকিয়া অজিত
তারে জিজ্ঞাসা করিল-“একেবারে এমন হয়ে গেছে! ডাক্তার
দেখান হয়েছিল কি ?”
হরিশঠাকুর বলিল, “তা আর হ’ল কৈ দাদা। সেই
কলকাতা থেকেই ত ব্যায়ামের সুরু হহলাে—সেই যে
ঘনশ্যামটা আসাতে মুচ্ছা গেলে সেই অবধি ত আর
সালাে না। যখন ডাক্তার দেখাবার টাকা ছিল—তখন
ডাক্তার দেখাবার কথা বললেই বলত, “আমার কিছু হয়
নি—শুধু শুধু ডাক্তার এনে কি হবে ?” তারপর যখন
শয্যেশায়ী হলাে—তখন পেটে খাবার টাকা অবধি
ঘনশ্যামটা বারে বারে এসে নিয়ে গিয়ে ফাক দিয়ে
একাদশ পরিচ্ছে গেছে, তা ডাক্তার আব কি করে? সরকারী ডাক্তার খানা থেকে বলে কয়ে ওষুধ নিয়ে এলাম—তা খেলে -বলে, “আমার আর বেঁচে থেকে কষ্ট পাওয়া বই ত নয়। যা হচ্ছে ভালই হচ্ছে—আমি ওষুধ খাব না।” সাবিত্রী কত কান্নাকাটি করলেন, আমি কত বােঝালাম, কিছুতেই খেলে না। সেই অবধি বাবা বিশ্বেশ্বনের একটু করে চরণামৃত এনে দিই, তাই খাচ্ছে।” অজিত দুৰূবে বলিল, “আমাকে খবর দিলেন না কেন? আমার স্ত্রী-আমার ত একটা কর্তব্য আছে?” হরিশঠাকুর কহিল, “আমি কি বলিনি? তা কি কব ভায়া, আমার কথা শুনলে না। সাবিত্রীকে বললে সাবিত্রী বত ইন্দুকে বল, ইনুকে বললে ই বলত—তােমার শ্রী বলে দাবী কর- বার ওর নাকি অধিকার নেই। তােমার একখানা ঘােট চেহারা ওর মাথার বালিশের নিচে আছে—সেই খানা দিনের • মধ্যে দশবার দেখছে-বার করে দেখছে আর কাছে কিন্তু তােমাকে খবর দেবার কথা বললেই বলত, “না- তা কিছুতেই হবে না। তােমাকে যদি খবরই দিতে দেবে-তা হলে কি আর ঘনশ্যাম যথা সর্ব নিয়ে গিয়ে এক করে ধনে প্রাণে মেরে যৈতে পারত দাদা?”
অজিত রুদ্ধশ্বাসে বলিল, “ঘনশ্যাম মিথ্যা কথা বলে ঠকিয়ে ঐ টাকাগুলাে নিয়ে গেছে তা জানেন কি?” সাবিত্রী চমকিত হইয়। জিজ্ঞাসা করিল,“কি মিথ্যে বাবা?” অজিত কহিল, “ইন্দুর সঙ্গে সেই দিগম্বর গাঙ্গুলীর বিয়ের কথাটা। সে বিয়ে হয় নি—ঐ ঘনশ্যমিই মিছে করে সেই কথা বলে—আপনার স্বামীকে ঠকিয়ে বিয়ের খরচের টাকা নিয়েছিল আর আপনাদেরও এই সর্বনাশ করেছে।” সাবিত্রী উত্তেজিত স্বরে বলিলেন, “য় নি !–সে বিয়ে হয় নি?” অজিত বলিল, “না হয় নিবিয়ে দিতে ঘনশ্যাম নিয়ে গিয়েছিল বটে কিন্তু বিয়ে হয় নি।” সাবিত্রী উন্মতার ন্যায় আপনার মনে পুনরায় বলিলেন,- “হয় নিবিয়ে হয় নি !” পরে . ইনুর দিকে চাহিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চ কণ্ঠে কহিলেন -“অ ইন্দু --ইন্দু! শুনছিস ? ইর নিস্পন্দ চক্ষুপল্লবে পাক পড়িল—তাহার নয়ন- কোণে মুক্তার মত কয়েকটা অশ্রুবিন্দু দেখা দিয়া উপা- থানে ঝরিয়া পড়িল। সাবিত্রী ব্যস্ত হইয়া তাহার শিয়রে আসিয়া তাহাকে ব্যজন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকণ পরে ই তাহার শীর্ণ হস্ত সঞ্চালন করিয়া ব্যজন বন্ধ করিতে একাদশ পৰিছে ইঙ্গিত করিল এবং অজিতের দিকে চাহিয়া কি বলিল- কিন্তু অজিতের কর্ণে তাহার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ছিল না। অজিত ব্যগ্র হইয়া ইন্দুর মুখের কাছে আপনার মন্ত্রক নত করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি বলছ?” ইন্দু ধীরে ধীরে বলিল-পা তুলে ভাল হয়ে বােস না।” অজিত পদদ্বয় খাটিয়ার উপর তুলিয়া বসিতেই, ইন্দু এজিতের পদধূলি লইবার মানসে অহার চরণযুগল হস্ত দ্বারা স্পর্শ করিয়া সেই হন্ত আপনার মন্তকে স্থাপন করিল ; কিন্তু সেই সামান্য আয়াসে, অথবা আয়াসে, অথবা মনের উত্তেজনায় ইর হস্ত কম্পিত হইয়া তাহার মস্তকের উপাধানের উপর শিথিল হইয়া পড়িল। তাহার ললাটের উপর ষেদকণা বিন্দু বিন্দু হইয়া দেখা দিল। অজিত ব্যগ্র হইয়া হরিশ- ঠাকুরকে বলিল, “ভারি কাহিল হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ওষুধ টমুখ না খাইয়ে এখান • থেকে অন্য বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারব না দেখছি। আপনি বাইরে গিয়ে সুবােধকে এক- মন ভাল ডাক্তার-কে পায়,-ডেকে আনতে বলুন দেখি সুবােধ আমার বন্ধু-বড় রাস্তায় গাড়ীতে বসে আছে। বাইরে বােয়ান আছে, তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। অন্য বাড়ীতে মা নিয়ে গেলে সিভিল সার্জনকে আনতে পারব না। সংগির আসতে বলবেন-আচ্ছা আমিই না হয় যাচ্ছি। এই
৩
কথা বলিয়া অজিত উঠিতে যাইতেই ইন্দু তাহার হও
ধরিল এবং ভীত-কণ্ঠে বলিল, “তুমি যেওনা ”
অজিত বলিল, “ভয় কি? এই আসছি।”
ইন্দুর বিশুষ্ক ওধরে করুণ হারেখা ফুটিয়া উঠিল
সে ধীরে ধীরে বলিল, না, এখন আর আমার ভয় কি ?”
পরে কিয়ৎক্ষণ মৌনভাবে অজিতের মুখের দিকে চাহিয়া পুনরায়
কহিল, “আর জন্মে বড় মহাপাতক করেছিলুম তাই তোমাকে
পেয়েও এতদিন প্রাণখুলে তমাকে আমারই বলে ভাবতে অবধি
পারিনি, সে কি কম কষ্ট! যাহােক বিশ্বনাথ এই খানেই সে
মপাতকের শেষ করে দিলেন। এখন আমার ভয়, দুখু, লা
কিছুই নেই।” এই কথা বলিতে বলিতে ইনুর নয়নকোনে
পুনরায় অবিন্দু দেখা দিয়া ঝরিয়া পড়িল।
অজিত রুমাল দিয়া ইন্দুর অশ্রু মুছাইয়া দিয়া গাঢ় স্বরে
বলিল, “আর কথা কয় না—কষ্ট হবে।”
ইলু করুণ কণ্ঠে উত্তর দিল, “আমার আর কষ্ট কি?
তােমাকেই আমি না মেনে—না বুঝে-বড় কষ্ট দিয়েছি-
মা কোরাে। মাকে—দাদামণিকে দেখে শেষের কথা কয়টা
বলিতে গিয়া ইনুর চক্ষু পুনরায় আক্রান্ত হইয়া
আসিল। অজিত ব্যাকুল হইয়া বলিয়া উঠিল, ওসব কি বলছ
তােমাকে সারিয়ে তুলবে, তয় কি?” পরে হরিশের দিকে
একাদশ পরিচ্ছেদ
চাহিয়; ব্যথভাবে কহিল,-“তবে আপনিই যান, সুবােধকে
বলে আসুন, দেরী করবেন না।”
হরিশঠাকুর বাহিরে যাইতেই অজিত দেখিল ইন্দু, অপলক
নেত্রে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া আছে। অজিত ধীরে ধীরে
হার মস্তকে হাত বুলাইতে লাগিল। অজিতের মেহম্পর্শে
ইর ম্লানমুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল—কিযেন এক গভীর তৃপ্তিতে
সে তাহার নয়নপল্লব নিমীলিত করিল।
তারপর?
তাহার পর কি হইল সে কথা না হয় না-ই বলিলাম।
সম্পূর্ণ।
১৪)
No text on this page.
শ্রীনবকৃষ্ণ ঘােষ বি, এ, প্রণীত শান্তি উৎকৃষ্ট স্ত্রীপাঠ্য উপন্যাস। মূল্য দ• মাত্র “যাহারা বলেন, স্ত্রী-স্বাধীনতা, পূর্বরাগ (courtship) প্রভৃতি পাশ্চাত্য আচার ব্যবহার এতদ্দেশে প্রচলিত না থাকায় ভাল উপন্যাসের সৃষ্টি হইতে পারে না তাঁহারা একবার এই উপন্যাস খানি পাঠ করিলেই তাহাদের ভ্ৰমাপনােদন হইবে।”—দর্শক "It is an excellent book depicting with a masterly pen, a striking aspect of a Bengalee family, which will be read with interest by every realer." INDIAN EMPIRE. “লেখকের রচনা কৌশল সুন্দর ; পল্লীগ্রামের জমীদারের অত্যাচার, ঘটকের ব্যবহার, নূতন বড়মানুষের বাবু গিৰি, বরষাত্রীদিগের ব্যবহার প্রভৃতির সুন্দর চিত্র এই পুস্তকে দেখিতে পাওয়া যায়।” –হিতবাদী "We have no hesitation in saying that it will 'prove au interesting an instructive study to its 'readers." A. B. PATRIKA.
১
1 নবকৃষ্ণ বাবুর সর্বজন প্রশংসিত অন্যান্য প্রস্থ
(১) ইলিয়াডের গল্প (সচিত্র) মূল্য •
(২) অডিসির গল্প (চত্র) মূল্য ॥
(৩) তর্পণ (শতাধিক স্বরণীয় বঙ্গসন্তানের জীবন-গাথা ও
৭৫ জনের হাফ-টো চিত্র, মূল্য •
(৪) প্যারীচরণ সরকার কর্মবীরের সচিত্র জীবনী মূল্য ১০
(৫) যিজেন্দ্রলাল (অগীয় ডি, এল, রায়ের সচিত্র জীবন
চরিত) মূল্য ১•
এই সিরিজের গ্রন্থাবলী
১। শুভদৃষ্টি, পতিমােহন ঘােষ প্রণীত।
২। বৰিদাদ, প্রফুচন্দ্র বসু বি, এস, সি, প্রণীত
৩। ইনু,নক 'স বিএ, প্রণীত।
৪। স্বর্ণ-মরু,
*তি ন ঘােৰ প্রণীত।
৫। সমাজ-~ি
যতীন্দ্রনাথ পাল।
নুন !
আবার নুন !!
মায়ের পুকুরের নির্মল কুসুম !
বঙ্গ সাহিত্যে সুপরিচিত জনপ্রিয় লেখক
যতীনাথ পাল প্রণত
বনের লক্ষ্মা
অপূর্ব মনােহর সুন্দর আর একখানি সচিত্র শ্রীপা
পারিবারিক উপকাল। মুল্য ১ ফেড় টাকা।
৩।
(তন ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.