Library

Sabuj Patra Year 5 1918

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বৈশাখ, ১৩২৫
সবুজ পত্র
সম্পাদক
শ্রীপ্রমথ চৌধুরী
1.
{} ৫০,
বার্ষিক মূল্য দুই টাকা ছয় আনা।
সবুজ পত্ৰ কাৰ্যালয়, ৩ নং হেস্ট্রিট,
কলিকাতা।

banga
কলিকাতা।
৩ মং হেডিস ঐট
প্রমথ চৌধুরী এম, এ, যার-ম্যাটল কর্তৃক
প্রকাশিত।
874425
S18
কলিকাতা।
উইকলী নােটস প্রিন্টিং ওয়ার্ক,
৩ নং হেষ্টিংস ষ্ট্রট।
সারদা প্রসাদ দাস দ্বারা মুতি।

বর্ণানুক্রমিক সূচী। (বৈশাখ-আশ্বিন ) ১৩২৫ সন । পৃষ্ঠা। । । । ৫। । • ৮ বিষয়। Indian Literature Pramatha Chaudhuri ১৮৯ একটি সত্যি গল্প (গল্প) সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী ২৯৯ “এতো বড় কিম্বা “কিছু নয়”, বীরবল ২৫৪ কালাে মেয়ে (কবিতা) স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৬২ সন্তোষচন্দ্র মজুমদার ছিন্ন পত্র (কবিতা) স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ... ছােট কালীবাবু তেপাটি, কবিতা, শ্রী প্রমথ চৌধুরী ২৬০ ছােট গল্প (গল্প) প্রমথ চৌধুরী ২৩৪ দু-দুবার (গল্প):.. অবিশ্বপতি চৌধুরী দেশের কথা ••• প্রমথ চৌধুরী নব-বিদ্যালয় ৫ ••.. ১৮, ১৩৩, ৩৮০ নববর্ষ। ঐবিশ্বপতি চৌধুরী নবীন সাহিত্যিক এবরদাচরণ গুপ্ত প প • বীরবল ৪৯, ১০, ২৩, ৩৩৭ প্রমথ চৌধুরী ••• ২৮৭ প্রাকটিকাল কিরণশঙ্কর রায় ••• বই পড়া। প্রমথ চৌধুরী বন্ধু (গল্প) • । • ০ ।। . ১৫ পার ১৯৯ এবীয়েশ্বর মজুমদার ।।

০ পৃষ্ঠা। 7 ••• ৩৭ অতুলচন্দ্র গুপ্ত হরপ্রসাদ বাগচী ঐ সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী স্যার রবীন্দ্রনথ ঠাকুর । ১১৭ বিষয়। বাঙ্গালীর শিক্ষা বিবাহের পণ ••• ভারতবর্ষঃ মানসী মূৰ্ত্তি মুক্তি (কবিতা) • রবীন্দ্রনাথের পত্র রােম শাস্ত্র ও স্বাধীনতা। সমুদ্রের তাক (গল্প) সাহিত্যের জাতরক্ষা চন্দ্রনাথ বসুর পত্র । ৩৬১, ... ••• ••• ২৭৪ • শ্ৰীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত শ্রদয়ালচন্দ্র ঘােষ সুরেশচন্দ্র চক্রবর্ত্তী সুরেশচন্দ্র চক্রবর্ত্তী ••• ১৭৫ ২২২, ৩৪৮ ••• •••

মুক্তি।
ডাক্তারে যা বলে বলুক না কো,
রাখো রাখাে খুলে রাখো,
শিওরের ঐ জালা দুটো,-গায়ে লাগু হাওয়া।
ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।
তিতে কড়া কত ওষুধ খেলেম এ জীবনে,
দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে।
বেঁচে থাকা, সেই যেন এক রােগ ;
কত রকম কবিরাজী, কতই মুষ্টিযােগ,
একটু মাত্র অসাবধানেই বিষম কৰ্ম্মভোগ।
এইটে ভালো, ঐটে মন্দ, যে যা বলে সবার কথা মেনে,
নামিয়ে
চক্ষু, মাথায় ঘােমটা টেনে,
বাইশ বছর কাটিয়ে দিলেম এই তোমাদের ঘরে।
তাই ত ঘরে পরে,
সবাই আমায় বল্লে, লক্ষী সতী,
ভালো মানুষ অতি।
এ সংসারে এসেছিলেম ন বছরের মেয়ে,
অর পরে এই পরিবারের দীর্ঘ গলি বেয়ে

সবুজ পত্র
বৈশাখ, ১৩২৫
দশের ইচ্ছা বােঝাই-করা এই জীবনটা টেনে টেনে শেষে
পেীছিনু আজ পথের প্রান্তে এসে।
সুখের দুখের কথা,
একটুখানি ভাব এমন সময় ছিল কোথা?
এই জীবনটা ভালো, কিম্বা মন্দ, কিম্বা যা-হােক একটা-কিছু,
সে কথাটা বুঝব কখন, দেখব কখন ভেবে আগু পিছু।
একটানা এক ক্লান্ত সুরে
কাজের চাকা চলচে ঘুরে ঘুরে।
বাইশ বছর রয়েছি সেই এক চাকাতেই বাঁধা,
পাকের ঘোরে আঁধা।
জানি নাই ত আমি যে কি, জানি নাই এ বৃহৎ বসুন্ধরা
কি অর্থে যে ভরা !
শুনি নাই ত মানুষের কি বাণী
মহাকালের বীণায় বাজে। আমি কেবল জানি,
রাধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাধা,
বাইশ বছর এক-চাকাতেই বাধা।
মনে হচ্ছে সেই চাকাটা—ঐ যে থামল যেন ;
থামুক তবে। আবার ওষুধ কেন ?
বসন্তকাল বাইশ বছর এসেছিল বনের আঙিনায়।
গন্ধে বিােেল দক্ষিণ বায়
দিয়েছিল জলস্থলে মৰ্ম্ম-দোলায় দোল ;

স, প্রথম সংখ্যা
হেঁকেছিল, “খোলরে দুয়ার খােল!”
সে যে কখন আসত যেত জানতে পেতেম না যে।
হয় ত মনের মাঝে
সঙ্গোপনে দিত নাড়া; হয় ত ঘরের কাজে
আচম্বিতে ভুল
ঘটাত ; হয় ত বাজত বুকে
জন্মান্তরের ব্যথা; কারণ-ভোলা দুঃখে সুখে
হয় ত পরাণ রইত চেয়ে যেন রে কার পায়ের শব্দ শুনে,
বিহ্বল ফাল্গুনে।
তুমি আসতে আপিস থেকে, যেতে সন্ধ্যাবেলায়
পাড়ায় কোথা সতরঞ্চ খেলায়।
থাক সে কথা।
আজকে কেন মনে আসে প্রাণের যত ক্ষণিক ব্যাকুলতা!
প্রথম আমার জীবনে এই বাইশ বছর পরে
বসন্তকাল এসেছে মাের ঘরে।
জল দিয়ে চেয়ে আকাশ পানে
আনন্দে আজ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে প্রাণে
আমি নারী, আমি মহীয়সী,
আমার সুরে সুর বেঁধেছে জ্যোৎস্না-বীণায় নিদ্রাবিহীন শশী।
আমি নইলে মিথ্যা হ'ত সন্ধ্যা-তারা ওঠা,
মিথ্যা হ’ত কাননে ফুল-ফোটা।
বাইশ বছর ধরে
মনে ছিল বন্দী আমি অনন্তকাল তােমাদের এই ঘরে।

সবুজ পত্র
বৈশাখ, ১৩২৫
দুঃখ তবু ছিল না তার তরে,
অসাড় মনে দিন কেটেচে, আরো কাত আরো বঁাচলে পরে।
যেথায় যত জ্ঞাতি
লক্ষী বলে কয়ে আমার খ্যাতি ;
এই জীবনে সেই যেন মাের পরম সার্থকতা
ঘরের কোণে পাঁচের মুখের কথা !
আজকে কখন মাের
কাটল ধাঁধন-ডাের।
জনম মরণ এক হয়েচে ঐ যে অকূল বিরাট মোহনায়,
ঐ অতলে কোথায় মিলে যায়,
ভাড়ার-ঘরের দেওয়াল যত
একটু ফেনার মত।
এতদিনে প্রথম যেন বাজে
বিয়ের বাশি বিশ্ব-আকাশ মাঝে।
তুচ্ছ বাইশ বছর আমার ঘরের কোণের ধূলায় পড়ে থাক।
মরণ বাসরঘরে আমায় যে দিয়েচে ডাক
দ্বারে আমার প্রার্থী সে যে, নয় সে কেবল প্রভু,
হেলা আমায় করবে না সে কভু !
চায় সে আমার কাছে
আমার মাঝে গভীর গােপন যে সুধারস আছে।
গ্রহতারার সভার মাঝখানে সে
ঐ যে আমার মুখে চেয়ে দাড়িয়ে হােথায় রইল নিৰ্ণিমেষে।

৫ম বৰ, প্রথম সংখ্যা
মুক্তি
মধুর ভুবন, মধুর আমি নারী,
মধুর মরণ, ওগাে আমার অনন্ত ভিখারী!
দাও, খুলে দাও দ্বার,
ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাবার !
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভারতবর্ষ। ( মানসী মুর্তি ) #ঃ যে দিন জলধি-গর্ভ হ'তে ভারতভূমি আপনার মস্তক উত্তোলন করলেন সে দিন বুঝি অন্তরীক্ষে অন্তরীক্ষে দেবতারা সহর্ষে আনন্দ ধ্বনি করে তার আবাহন করেছিলেন—আকাশ পথে দিব্যাঙ্গনায়। বিচরণ করতে করতে থেমে গিয়ে তাদের আনন্দ-পুলকিত আঁখি নত করে একবার চেয়ে দেখেছিলেন—গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষ রক্ষ শূন্যপথে সব মিলিত হয়ে কৌতূহলোদ্দীপ্ত চিত্তে জোড়-করে এ ধরিত্রীর পানে চেয়ে প্রণত হয়েছিল। সে দিন উর্ধে অধেঃ, পূর্বে পশ্চিমে ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল যে এই ভারতবর্ষে বিশ্বমানবের এক মহালীলা সংঘটিত হবে। তারপর কে জানে কতযুগ ধরে লােকচক্ষুর অন্তরালে জগৎ জননী ভারতভূমি, আপনার অন্তর বাহির অতুল ঐশ্বর্যে ভরে তুলেছিলেন- আপনার লােভাতুর সন্তানদিগকে আপনার বুকে ভূলিয়ে আবার জন্যে। পদতলে তার সফেন-তরঙ্গ পাগল সিন্ধুর অতল তলে কোটি কোটি শুক্তি-হৃদয় মুক্তায় মুক্তায় ভরে উঠল--খনিতে খনিতে কত মণি ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ভারতবর্ষ মাণিক্য লালসাময় জ্যোতি বিকীরণ করে’ চক মক্ করে উঠল-কল- নাদিনী গঙ্গা, সিন্ধু, কাবেরীর তীরে তীরে স্নিগ্ধ-শ্যামল বৃক্ষ-তল সুস্নিগ্ধ ছায়ায় ছায়ায় ভরে গেল-বসুমতী আপনার বুক চিরে অনন্ত স্নেহরসে অভিষিক্ত অপৰ্যাপ্ত অন্নদান করবার জন্যে প্রস্তুত হলেন। তারপর কে জানে কোন সুদূর অতীতের একদিন, কোন্ এক চিরতুষারাবৃত, চিরকুয়াশাচ্ছন্ন দেশে জগত-জননী ভারত মাতার প্রথম আহ্বান গিয়ে পৌছিল। মানুষের স্মৃতির পটে বিলুপ্তপ্রায় সেই অভিযান-কাহিনী কে জানে ? কে জানে কত মরুর নিষ্ঠুর বক্ষের উপর দিয়ে, কত কত পৰ্বত মালার দুরারােহ অভ্র-চুম্বিত চূড়া অতিক্রম করে’, কত গহনঘন কান্তারে গোপন পথ খুঁজে খুঁজে, কত বৎসর পরে এই কল-নাদিনী নদী-সিক্ত ছায়া-স্নিগ্ধ জগন্মাতার শ্যামল-বুকে নিবিড় নীল আকাশের তলে পেঁৗছে গিয়েছিল, মানব সভ্যতার সেই প্রথম পুরােহিতের দল-উন্নতশির, প্রশস্তললাট, বিশাল, তেজো- পুঞ্জ দৃষ্টি, সরল সবল কলেবর। মানব সভ্যতার প্রথম পুরােহিত ব্রাহ্মণ-বেশে জগন্মাতার বুকে এই বিশ্বমানবের মহালীলার প্রাঙ্গনে প্রবেশ করল। গs আজ আমি আমার মানস নয়নে দেখতে পাই যে সেই চিরতুষার- বৃত চিরকুয়াশাচ্ছন্ন দেশ ছেড়ে যে দিন সেই সিন্ধুতীরে তাঁদের চোখের সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ সামনে পূর্ব-দিগন্ত কনক রাগে রঞ্জিত করে’, জবাকুসুম-সংকাশ কাশ্যপেয় মহাদ্যুতি ধীরে ধীরে দিক-চক্ৰবালের নীচ থেকে আপনাকে তুললেন, সে দিন কি এক অভূতপূর্বব বিস্ময়ে তাদের চিত্ত মন প্রাণ সব ভরে উঠেছিল। সেই মহাদ্যুতির করস্পর্শে পৃথিবীর অন্ধকার দূর হ’ল। মানুষের মনের অন্ধকার দূর হবার সূত্রপাত হ’ল সে দিন, বিশ্বমানব ইতিহাসের সে এক জ্যোতির্মণ্ডিত চিরস্মরণীয় দিন। হিন্দুর সেই একদিন গিয়েছে যে দিন পঞ্চনদতীর-ভূমে বনে বনে তাপস-কবির আন্দোচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে সাম গান শুনে তরু লতা মুঞ্জরিত হয়ে উঠত—বৃক্ষে বল্লরিতে ফুল ফুটে উঠত। সেই ছায়া- সুনিবিড় বনে বনে সারা দ্বিপ্রহর আর মধুপ-গুঞ্জনের বিরাম নেই– বনকপােতের প্রাণ-উদাস করা ডাকের আর অন্ত নেই—বৃক্ষতলে শুষ্ক পত্রপুঞ্জে মৰ্ম্মর ধ্বনি তুলে সর সর করে বাতাসের আনাগােনার আর বিরতি নেই ;-সেই বনভবনে শান্তি-সমাকুল পর্ণকুটীরে কত কত ঋষি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করবার জন্যে ধ্যান নিরত। হিন্দুর জীবনের ইতিহাসে সেই একদিন গিয়েছে। ধীরে ধীরে-ধীরে ধীরে মানুষ আপনাকে চিল--আপনার অধিকার বুঝল। আনন্দে বিশ্বাসে শ্রদ্ধায় তাদের সকল হৃদয় ভরে উঠল। তাদের কণ্ঠ-সঙ্গীত পঞ্চনদের তীরে তীরে ছায়া সুনিবিড় ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ভারতবর্ষ বনে বনে অনন্ত আকাশকে মুখরিত পুলকিত আকুলিত করে তুলল। আপন প্রাণের অদম্য আনন্দ-উচ্ছাসে তারা পরস্পর পরস্পরকে আলিঙ্গন করুলে। অন্ন আপনাকে বহু করলেন-প্রজা বহু হ’ল। পল্লী প্রতিষ্ঠা হ'ল—নগর নগরী বিনির্মিত হ'ল—জ্য গঠিত হল— সাম্রাজ্য স্থাপিত হল। মানুষ আত্মবলে আপনাকে জয়যুক্ত করে ভগবানকে সার্থক করে তুলল। * তারপর কত যুগ ধরে এই জগন্মাতার বুকের উপর একে একে লীলা হ'য়ে গেল—কত জ্ঞানশক্তি—ঐশ্বৰ্য্য সম্পদ—কত মহত্ব গৌরব--কত ঘাত প্রতিঘাত, শাস্তি সংগ্রাম-কত রক্তস্রোত কত প্রীতি ধারার ভিতর দিয়ে দিয়ে, বসুন্ধরা তাঁর সন্তানদিগকে নিয়ে চললেন- হিন্দুর সে-জীবনের কাহিনী আজ মানবের স্মৃতিতে বিলুপ্তপ্রায়। অনন্ত অতীতের মসীময় অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনীপ্রভাতে, ইতিহাস যখন বিস্মৃতির করাল-কবল হতে মানুষের লীলাধারাকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে ঊষার ক্ষীণ আলোকে লেখনী হস্তে বদ্ধপরিকর হ’ল—তখনও সেই সুদূর অতীতের আধ-আলো আধ-অন্ধকারের মধ্যে তার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় যে আলেখ্য লিখিত হ’ল তাতে দেখি তখনও হিন্দুর গৌরবের দিন গত হয় নি। তারপর ধীরে ধীরে দিনে দিনে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আলেখ্য-রাজি স্পষ্ট হ’তে স্পষ্টতর হতে লাগল—তখনও সবুখ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ হিন্দুর গৌরবের দিন গত হয় নি। তারি একদিন—আজ মনে পড়ে আসমুদ্র হিমাচল ভারতের নরনারী একপ্রাণে অশোকের ছত্ৰ-পতাকা- তলে সমবেত হয়েছিল। সে দিন দিকে দিকে ভারতের বাণী বহন করে লােক্ ছুটল। উত্তুঙ্গ ভুধর তাদের গতি রোধ করূতে পারুল না। অকূল পরাবারের উত্তাল তরঙ্গ-মালা তাদের পথ করে দিলে। অমৃতের সন্ধান পেয়ে সে দিনের হিন্দুরা সে-অমৃত নিয়ে বিশ্ববাসীর দ্বারে দ্বারে ফিরুল। তারপর তেমনি আর একদিন উজ্জয়িনীর কনক-পুরীতে জগন্মাতা হিন্দুর সভ্যতার যে এক অভ্রভেদী মন্দির গড়ে তুলেছিলেন—ঐশ্বৰ্য্য গৌরব, জ্ঞান, শক্তি দিয়ে ভরে তুলেছিলেন—সে কাহিনী আজও হিন্দুর মনে সহস্র নৈরাশ্যের অন্ধকারের মাঝে স্বর্ণরেখার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আজ আমি মানস-নয়নে দেখতে পাই—সেই সুবর্ণপুরী উজ্জয়িনী—সেই উজ্জয়িনীর পথে পথে নরনারী কলহাস্যে গতিলাস্যে নির্ভীক উন্নতশিরে বিচরণ করছে—পথ-পাশে পাশে সহস্র বিপণিতে পণ্যরাজির আর অন্ত নেই—সেদিন বাতাসে বাতাসে ক্ষুব্ধ হাহাকারের পরিবর্তে আনন্দোচ্ছ্বসিত কলহাস্য-আকাশে আকাশে ভিন্ন দীর্ঘশ্বাসের পরিবর্তে তৃপ্তির সুখান্বিত হিল্লোল—মানুষের অন্তরে অন্তরে মৃত্যুর পরিবর্তে, অনন্ত দুরাশা, দুর্দমনীয় আকাঙক্ষা পোষণ করবার শক্তি। মানস-নয়নে আমি দেখতে পাই-সে দিন উজ্জয়িনীর অসংখ্য চতুষ্পঠীতে কত কত দিক দেশ হতে কত নরনারী এসে জগন্মাতা ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ভারতবর্ষ চরণে শিষ্য বেশে তার অনন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকে দু'এক খানি রত্ন নিয়ে আপনাকে ধন্য মনে করছে—নগর নগরীতে সে দিন উৎসবের আর শেষ নেই—পল্লীতে পল্লীতে শিশুদের কলরবের আর শ্রান্তি নেই-শস্য-শ্যামল সহস্র পল্লীর পাশে পাশে অগণ্য নদীতে নদীতে কল কল ছল ছল হাস্যের আর বিরতি নেই। স্বর্ণ-সিংহাসনে হিন্দু সম্রাট স্বর্ণ ছত্র তলে স্বর্ণ দণ্ড করে, দুষ্টের শাসন ও শিষ্টের পালন করছেন। রাজসভা হিন্দুর জ্ঞানে শক্তিতে শ্রদ্ধায় প্রীতিতে অলঙ্কৃত-রাজভাণ্ডার মুক্তহস্ত-ধরিত্রীর এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পৰ্যন্ত দেবতার আশীর্বাদে সমুজ্জ্বল। সে দিনের ছবি আমি মানস-নয়নে দেখি আর কোথা হতে দুই বিন্দু অশ্রুজলে আমার আঁখিপাত সিক্ত হয়ে ওঠে। ম তারপর আরও একদিন—শুধু একদিন কেন!—আরও কতদিন কত বর্ষ—কত শতাব্দী—এই জগন্মাতার বুকে হিন্দু জ্ঞানে ঐশ্বর্য্যে, শক্তিতে, ভক্তিতে, কৰ্ম্মে, ভােগে আপনাকে সার্থক করে তুলেছিল। সেই অতীতকালে তরঙ্গোচ্ছাসিত অকূল পিরবারের বুকে মুক্তপক্ষ বিহঙ্গমের মতে শুভ্র পাল তুলে হিন্দুর অর্ণবতরণী কত কত পণ্য-সম্ভার জ্ঞান-সম্ভার নিয়ে দিগন্তের পরপারে কত কত দেশে ছুটল—কত কত দেশ হতে অর্ণবযান সপ্তসিন্ধু পার হয়ে, কত কত ঐশ্বৰ্য্য সম্পদ—কত কত ভক্তি প্রতি নিয়ে হিন্দুর বন্দরে বন্দরে এসে লাগল। কত যুগ ধরে হিন্দু এক হাতে শক্তি আরেক হাতে প্রেম—একদিকে কর্ম আর একদিকে জ্ঞান—একদিকে ঐশ্বৰ্য্য আর একদিকে মুক্তি নিয়ে, ১৪ সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ আপনাকে জান্স ও বিশ্ববাসীকে জানাল। তারপর ধীরে ধীরে হিন্দুর লীলার দিন ফুরিয়ে এল। জগন্মাতার দ্বিতীয় আহ্বান কোন এক নবনি কাতির অন্তরে গিয়ে বাজল। হিন্দুকুশের পরপারে একি গুঞ্জন-ধ্বনি আজ শুনি! যবনিকার অন্তরাল হ’তে কত লক্ষ লােকের উৎসাহ-কলরব-প্রাণের হুঙ্কার আজ হিমাদ্রির বিরাট পঞ্জর ভেদ করে’, মৃদু গুঞ্জনের মতো এ-পারের আকাশ বাতাসকে চঞ্চল কল। কাণ পাত—ঐ কি শােনা যায় - প্রবল কোলাহলের মধ্য হতে মাঝে মাঝে প্রবলতর হুঙ্কারে ধ্বনিত হচ্ছে--“লায় লা হায় লাল্লা মহম্মদ রসুলাল্লা” ! গহণ তিমিরাবৃত নিশীথের ব্যত্যাবিক্ষুব্ধ তরঙ্গ সংক্ষুব্ধ সিন্ধুর উর্মিমালার মতো কোন্ নবীন জাতি আজ অদম্য প্রাণের বেগে আপনাকে আর আপনার মধ্যে ধরে রাখতে পারছে না। তাকে বেরুতে হবে-বেরুতে হবে আজ আকুল স্রোতস্বিনীর মতো হিমাদ্রির বক্ষ বিদীর্ণ করে’-কানন কান্তার, পল্লী, নগরী, মরু, গিরি ভাসিয়ে নিয়ে—আপনারই প্রাণের বেগে গতির আনন্দে-আনন্দের আতিশয্যে। ধীরে ধীরে গুঞ্জন- ধ্বনি স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হ’ল-আরও স্পষ্ট—আরও স্পষ্ট তারপর একদিন হিমাদ্রির বিরাট পঞ্জর ভেদ করে’—অর্ধচন্দ্র আঁকা বিজয় বৈজয়ন্তী পতাকা উড়িয়ে-উন্মুক্ত-কৃপাণ লক্ষ লােক-জগত- পিতার নাম হুঙ্কার করতে করতে সিন্ধুর তীরে তীরে শার্দ লের মতো দেখা দিল। কৃপাণে কৃপাণে সংঘাত হ'ল—শুলে শূলে সংঘর্ষ হ’ল- ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ভারতবর্ষ অশ্বখুররাথিত ধূলিতে মেদিনী আচ্ছন্ন হ’ল-বিজয়ীর বিজয় হুঙ্কারে বিজিতের নিরাশা-চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রপীড়িত হ’ল। মানব- শােণিতে ধরণী রঞ্জিত!-নদনদীর লোহিতাক্ত কলেবরে—হিন্দুর গৌরব সূৰ্য্য ধীরে ধীরে অস্তমিত। মানব-সভ্যতার দ্বিতীয় পুরােহিত ক্ষত্রিয় বেশে জগন্মাতার বুকে বিশ্বমানবের মহালীলা প্রাঙ্গনে প্রবেশ করল। তারপর সপ্ত শতাব্দী ধরে এই দুই মহাজাতি বিরােধে মিলনে, শান্তিতে সংগ্রামে, ভয়ে ভক্তিতে পরস্পর পরস্পরের কাছে আপনাকে পরিচিত করতে করূতে চলল-পরস্পর পরস্পরকে জয় করূতে করতে চল। তাই এই সপ্ত শতাব্দী ধরে কখনও মহাকালীর তাণ্ডবনৃত্যে দিগ দিগন্তে বজ্ৰশিখা ছড়িয়ে গেল—মেদিনী কম্পমান হল—দেবালয় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ধুলিতে মিশেয়ে গেল—মানব রুধিরে বসুন্ধরা রঞ্জিত হ’ল ;-আবার কখনও বরাভয়কর জগতজননীর প্রশান্ত হাস্যে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে বনে বনে ফুল ফুটুল-বিহঙ্গ কাকলীতে কাননভূমি মুখরিত হ’ল-দিগন্তপ্রসারী শ্যামাঙ্গিনীর বুকে বুকে শ্যামশস্য আপনার মায়া বিছিয়ে দিল—শান্তির প্রলেপে যত ব্যথা সব মুছে গেল। ধীরে ধীরে মন্দিরের পাশে পাশে মসজিদ নির্মিত হল—হিন্দুর অন্তরে অন্তরে মুসলমান ফকিরের জন্য আসন পাতা হ’ল। ধীরে ধীরে এই দুই মহাজাতি—হিন্দু মুসলমান—পরস্পর পরস্পরকে চিনল। বুঝল তারা যে এমন একটা স্থান আছে যেখানে তাদের বিরাট ঐক্য—বুঝল তার ১৬ সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ যে সব প্রথমে তারা মানুষ—আর মানুষ মানুষের কাছে যা চায় সেটা সংগ্রামের মধ্যে নেই—অবজ্ঞার মধ্যে নেই—বিচ্ছেদের মধ্যে নেই, আছে সেটা প্রীতির মধ্যে মিলনের মধ্যে শান্তির মধ্যে, মানুষের বিরোধ সে দু'দিনের মানুষের প্রেম সে অনন্ত। যারা একদিন উদ্ধত-হৃদয়ে উম্মুক্ত কৃপান নিয়ে জয় করতে এলাে তারা ধীরে ধীরে পরাজয় মানল—যারা একদিন শত্রুর বেশে জগন্মাতার বুকে তাণ্ডব- নৃত্য করুলে তাদেকে আর একদিন অনন্তস্নেহে অভিষিক্ত করে’ জগন্মাতা আপনার সন্তান করে নিলেন। সহসা আজ সিন্ধুর কল কল ছল ছল দ্বিগুনতর হয়ে উঠল কেন! সেদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে হিন্দু মুসলমান বিস্মিত হয়ে দেখল পশ্চিম-দিক চক্ৰবালে পারাবার-বুক তরণীতে তরণীতে ছেয়ে গেছে। পালে পালে প্রভঞ্জনের হাওয়া তাদের, ক্ষুধার্ত শ্যেন পক্ষীর মতো সা সা করে’ ছুটিয়ে চলেছে—হিমাদ্রি সমান তরঙ্গের বক্ষ বিদীর্ণ করে’ করে’-শুভ্র ফেন- পুঞ্জে-পুঞ্জে বারিধি-হৃদয় আচ্ছাদিত করে’ করে ছুটে আসছে সহস্র তরণী তাদেরি পানে। ধীরে ধীরে কখন গোধূলী আপনার স্বর্ণাঞ্চল খানি টেনে নিয়ে দূর দিগন্তের গায়ে মিশিয়ে গেল—ধীরে ধীরে সন্ধ্যারাণী এসে দিবসের শেষরশ্মি রেখাটুকু আপনার অসিত অঞ্চলে মুছে নিলেন—তখন সেই আধআলো আধঅন্ধকারের মাঝে সহস্র তরণী এসে তটে লাগল। হিন্দু মুসলমান বিস্মিত হয়ে দেখল সেই সহস্র তরণীতে এক নবীন মনুষ-শ্বেতবর্ণ—নীলচক্ষু—পিঙ্গলকেশ কৌতুহলোদ্দীপ্ত তারা জিজ্ঞেস করল—“তােমরা কে ?”

৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ভারতবর্ষ “আমরা বণিক।” “তোমাদের পণ্য সম্ভার কি ?” “পণ্য আমাদের নূতন প্রাণের নবীন উৎসাহ –তরুণ হৃদয়ের অনন্ত দুর্নিবার আশা আকাঙ্খা—তপ্ত রক্তস্রোত-প্রবাহিত ধমণীর দুরন্ত কৰ্ম্ম- পিপাসা—ধরিত্রীর সন্তান আমরা—সপ্তসিন্দুর মানসপুত্র আমরা।” হিন্দু মুসলমান বলে—“তােমাদের পণ্য আমরা জানি না। তাতে আমাদের কোন প্রয়ােজন নেই। তবে এ জগন্মাতার দেশ—সবার অবারিত দ্বার। এসো-তােমারও স্থানের অভাব হবে না।” বিদেশী বণিক তার পণ্য সম্ভার নিয়ে কূলে অবতরণ করল। মানব-সভ্যতার তৃতীয় পুরােহিত বৈশ্যবেশে এ জগন্মাতার কূলে বিশ্বমানবের মহালীলা প্রাঙ্গনে প্রবেশ করল। * * তারপর যখন রজনী প্রভাত হল তখন সেই বিদেশী বণিকের একদল চমৎকৃত হয়ে দেখচে যে তাদের অজ্ঞাতসারে—কখন তাদের লােহার তুলাদণ্ড সােনার রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এখন এই যে তিন মহাজাতি-এই যে হিন্দু মুসলমান ক্রিশ্চিয়ান -এই যে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য—এই তিন মহাজাতিকে মন্থন করে’ কত হলাহলের পর কবে কোন্ অমৃত উঠবে তা কে জানে? তবে অমৃত যে একদিন উঠবেই সে-বিষয়ে কোন সংশয় নেই। শ্রীসুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী 3.? ২. 3067 ৪। 7/j.60 . 5410UTAT নব-বিদ্যালয়। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীচরণেষু- } ক্যাটালগ ঘাট। যাদের অভ্যাস আছে, তারাই জানে যে এমন সব বই আছে যার নাম পড়েই তা পড়তে লােভ হয়। আপনি আমাকে যে ফরাসী বইখানি পাঠিয়েছেন, সেখানি হচ্ছে ঐ জাতের। “নব-বিদ্যালয়”, এই নাম পড়েই, এই বইয়ে অনেক নূতন সত্যের সাক্ষাৎ লাভ করবার আশা আমার মনে জেগে উঠল ; এবং শুনে সুখী হবেন যে, বইখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করে সে আশায় আমি নিরাশ হই নি। আমাদের দেশের স্কুলকলেজের প্রতি আমরা অনেকেই যে অসন্তুষ্ট—তার প্রমাণ ত আমাদের লেখায় বক্তৃতায় নিত্যই পাওয়া যায়। আমাদের স্কুলকলেজে আমাদের ছেলেরা যে মানুষ হচ্ছে না, এ কথা ত ঘরে বাইরে দু'বেলা শুনতে পাই ; কিন্তু কি করলে যে তা হবে, সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা বড় বেশি লােকের মাথায় নেই। তা যদি থাকত, তাহলে আমাদের এমন কথা শুনতে হত না যে, ইংরাজি পড়েই বাঙালীর ম্যালেরিয়া হয়েছে। এর পর ছেলেদের স্কুলকলেজ ছাড়িয়ে আবার পাঠশালা ও টোলে পাঠাবার প্রস্তাব দেশহিতৈষী লােকেরা যে করবেন, তাতে আর আশ্চর্য কি? এ প্রস্তাব ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ১৯ খুব পেট্রিয়টিক হতে পারে, কিন্তু মােটেই কাজের নয় ; কেননা শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর হওয়ার একমাত্র উপায় যে পশ্চাৎপদ হওয়া, এ বিশ্বাস যাদের আছে তারাও সে বিশ্বাস অনুসারে নিজেরা কাজ করতে প্রস্তুত ন। সভা-সমিতিতে স্কুলকলেজের উপর ঝাল ঝেড়ে আমরা নিজেদের ছেলেদের আবার সেই স্কুলকলেজেই পাঠাই। ফল কথা এই যে, যে ভাবে শিক্ষা চলছে সে ভাবে তা চলা উচিত নয়—এ কথা বলায় ততক্ষণ কোনই লাভ নেই, যতক্ষণ না কি করে তা চালানাে উচিত, সে কথা আমরা বলতে পারি। সে কথা যে আমরা বলতে পারি নে, তার কারণ শিক্ষা সম্বন্ধে আমরা যেমন অজ্ঞ তেমনি উদাসীন। ( ২ ) ইউরোপেও আজকাল সে দেশের সনাতন শিক্ষা-পদ্ধতির প্রতি অনেকেই অসন্তুষ্ট। সেই অসন্তোষের ফলে বেলজিয়ম, জৰ্ম্মাণী, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশে গুটিকয়েক নব-বিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই বইখানিতে এর মধ্যে একটি স্কুলের শিক্ষার প্রকরণ-পদ্ধতির আমূল বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এতে যা আছে তা মামুলি স্কুলের আনাড়ি সমালােচনা নয়। আসলে এতে সরকারি শিক্ষার এক বর্ণও সমালােচনা নেই। গ্রন্থকার স্বয়ং একটি নব-বিদ্যালয়ের স্রষ্টা এবং সর্বেসর্বা কৰ্ত্তা। তিনি সুইজারল্যাণ্ডের শিক্ষকমণ্ডলী কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে, তার স্কুলের উদ্দেশ্য এবং উপায় সম্বন্ধে মুখে যে-সকল কথা বলেছেন, সেই সকল কথা একত্র করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ গ্রন্থকারের একটু পরিচয় দিই। ইনি ছিলেন বেলজিয়ামের নব-ইউনিভারসিটির একজন অধ্যাপক । এর নাম Faria de Vasconcellos ; শিক্ষাই এর ধৰ্ম্ম, শিক্ষাই এর কৰ্ম্ম, এবং স্বজাতির শিক্ষার উন্নতিকল্পেই ইনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। প্রফেসর ফারিয়া ১৯১২ খৃষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বেলজিয়ামে ব্রিজ নামক গ্রামে তার এই নব-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। জর্মাণরা বেলজিয়াম অধিকার করবার পর এ স্কুল বন্ধ হয়, এবং প্রফেসর ফারিয়া জেনেভায় নির্বাসিত হন। তার অপরাধ, তিনি বিশ্বমানবের সাম্য-মৈত্রী ও স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, এবং সেই বিশ্বাসের উপরেই তিনি তার নব-শিক্ষার পদ্ধতি গড়ে তােলেন। তার মতে--এই যুগযুগান্তরের সভ্যতার ফলে মানুষ তার আদিম পশুত্ব হতে অনেকটা মুক্তিলাভ করেছে, এবং তার দৃঢ় ধারণা যে মানুষের সঙ্গে মানুষের মারামারি কাটাকাটির মুলে যা আছে তা মানবধৰ্ম্ম নয়—পশু প্রবৃত্তি। মানুষের অন্তরে তার আদিম হিংস্রতা আজও লুপ্ত হয় নি—শুধু সুপ্ত হয়ে রয়েছে। যে শিক্ষার বলে মানুষের ভেদবুদ্ধি প্রবল হয়, সে শিক্ষার ফলে মানুষের আদিম পশুত্ব জেগে ওঠে, এবং nationalism প্রভৃতি কথার সাহায্যে ছেলেদের অন্তরে সেই সুপ্ত ব্যাঘ্ৰকেই জাগ্রত করে তোলা। হয়; সুতরাং শিক্ষার মন্দির থেকে ও সকল শব্দ বহিষ্কৃত করে দেওয়াই কৰ্ত্তব্য। তার স্কুলের ছেলেদের মনে তিনি বিদেশী ও বিজাতির প্রতি মৈত্রীর ভাব উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিলেন ; তার ফলে তিনি বলেন-তারা মানুষ হয়েছে, অথচ কাপুরুষ হয় নি। প্রমাণ, শত্রুর আক্রমণ থেকে স্বজাতি ও স্বদেশকে রক্ষা করবার জন্য তার স্কুলের বড়ছেলেরা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। নিজে পশু না হলে যে, পশুর ;

৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নববিদ্যালয় ২১ বিরুদ্ধে দাড়ান যায় না—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন, যদিচ অনেক বুদ্ধি- মান লােকের মত তাই। বেলজিয়ামের উপর জৰ্ম্মাণী যে নিষ্ঠুর ও প্রচণ্ড আঘাত করেছে, তাতে প্রফেসার ফারিয়ার উক্ত বিশ্বাস ঘা খেয়েছে-- কিন্তু ভাঙ্গা দূরে যাক, টলেও নি। যে সময়ে জন্মাণর। সমগ্ৰ বেল- জিয়ামকে পদদলিত পীড়িত ও বিধ্বস্ত করছিল, সেই সময়ে তিনি জেনেভা-সহরে এই কথা বলেন - “এ দুর্দিনেও মানবসভ্যতার প্রতি আমাদের আস্থা এবং শ্রদ্ধা সমান অটল রয়েছে। আমি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি যে,—ব্যক্তির উপরে, জাতির উপরেও, মানবাত্মা বলে একটি পদার্থ আছে। এই যুদ্ধের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা ও বীভৎস অত্যাচারেও মানুষের আত্মার প্রদীপ কখনও নির্বাপিত হবে না; সে অক্ষয় প্রদীপের চিরবর্ধমান শিখা যুগের পর যুগে যত ঊর্ধে আরোহণ করবে, বশ্ব- মানবের জীবনের পথ তত আলোকিত হয়ে উঠবে। এর পর বোধহয় এ কথা স্পষ্ট করে বলার দরকার নেই যে, প্রফেসার ফারিয়া একজন ঘোর Idealist; কিন্তু তার থেকে যদি কেউ মনে করেন যে তিনি একজন খেয়ালি লােক, এবং তার স্কুল হচ্ছে একটি খামখেয়ালি ব্যাপার,-তাহলে তিনি নিতান্তই ভুল করবেন। এই ছােট্ট বইখানির ভিতর তিনি শিক্ষা সম্বন্ধে যে অগাধ জ্ঞান ও অসাধারণ অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন, তা দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। শিক্ষা জিনিসটে তিনি কবির চোখ দিয়েও দেখেন নি, দার্শনিকের চোখে দিয়েও নয়। সনাতন শিক্ষাপদ্ধতির বিরুদ্ধে তার অভিযোেগই এই যে, সে পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নয়,-ও হচ্ছে আসলে একটি আন্দাজি ব্যাপার। প্রচলিত শিক্ষা, শিশু ও বালকের শরীর মন ও २२ সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ চরিত্রের সম্যক জ্ঞানের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই, সে-শিক্ষার রীতি হচ্ছে মনোজগতের অন্ধকারে ঢিল মারা। যে সত্য প্রমাণিত ও পরীক্ষিত, সেই সত্যের উপরেই তিনি তার নব-শিক্ষাপদ্ধতির প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর স্কুলে ছেলেদের দৈহিক মানসিক ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হত, কিন্তু ধৰ্ম্ম-শিক্ষা দেওয়া হত না। প্রফেসর ফারিয়া পাতায় পাতায় মানবাত্মার উল্লেখ করেছেন; কিন্তু মানবাত্মা বলতে তিনি বোঝেন--মানুষের সেই ব্যবহারিক আত্মা, যার পরিচয় পাওয়া যায় পৃথিবীর দর্শনে, বিজ্ঞানে, কাব্যে, আর্টে, শিল্পে, বাণিজ্যে, সমাজে ও রাষ্ট্রে। তদতিরিক্ত অপর আত্মার সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ নীরব ; সে আত্মার অস্তিত্বে তিনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এ বিশ্বাস তিনি করে যে, সে বস্তুকে শিক্ষা দেওয়া-আর যাই হোক—তার সাধ্য নয়। অর্থাৎ reality-র জ্ঞানের সাহায্যে দেহে মনে ও. চরিত্রে সুস্থ সবল সক্রিয় ও সক্ষম মানুষ গড়ে তোলাই হচ্ছে তার ideal, এবং একমাত্র এই ideal-এরই তিনি ভক্ত। এবং এই ধর্মের সাধনপদ্ধতিই হচ্ছে তাঁর শিক্ষাপদ্ধতি। ইমারত গাঁথুতে হলে মানুষের পক্ষে সব আগে তার গোড়াপত্তন করা আবশ্যক, এবং তার জন্য চাই জায়গা বাছা। প্রফেসর ফারিয়ার মতে যিনি একটি নব-বিদ্যালয় স্থাপন করতে চান, তাঁর প্রথম কর্তব্য হচ্ছে ঐ জায়গা বাছাই করা। এই সহজ কথাটা যে মানুষে ভুলে যায়, তার পরিচয় ত আমরা নিত্যই পাই। আমরা যেখানে ৫ম বৰ, প্রথম সংখা নব-বিদ্যালয় একটু ফাঁক পাই, সেইখানেই স্কুল বসিয়ে দিই। গাছ পোতবার সময়ও আমরা এর চাইতে ঢের বেশি সতর্ক হই ; যেন গাছের জীবন মানুষের জীবনের চাইতে বেশি মূল্যবান। প্রফেসার ফারিয়ার শিক্ষা-বিজ্ঞানের প্রথম সূত্র এই যে, স্কুলের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে পল্লীগ্রাম, সহর নয়। সহর নামক ইটের পর্বতের গুহায় অজন্ম বাস করে মানবসন্তান যে, দেহ মন ও চরিত্রে পূর্ণ-শ্র পূর্ণ-শক্তি লাভ করবার সুযােগ পায় না,—এ কথা আমরা যােল- আনা মানলেও অনেকে এক কড়াও মানে না। খােলা আকাশের তলায় পরিষ্কার আলো ও বাতাসের মধ্যে বাস করাই যে ছোট ছেলের শরীরের পক্ষে স্বাস্থ্যকর ও মনের পক্ষে শ্রেয়স্কর, এ কথা বুঝতে যাদের দেরি লাগে, তঁাদের জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, তারা কি স্বচ্ছন্দচিত্তে তঁাদের ছেলেদের খনির গর্ভে মানুষ হতে দিতে স্বীকৃত হবেন,—হোক সে খনি বিজুলি বাতিতে আলােকিত আর বিজুলি পাখায় ব্যজনিত ? ছােট ছেলের পক্ষে সহর একটি কারাগার মাত্র, সে কারাগারে আমরা যে তাদের বন্ধ করে রাখতে কুণ্ঠিত হই নে, তার কারণ আমাদের শিক্ষা-পদ্ধতি হচ্ছে আসলে জেলের পদ্ধতি। সচরাচর স্কুল যে জেলখানার আদর্শেই গঠিত হয়, এ দুয়ের সাদৃশ্যের প্রতি নজর দিলে সকলেই তা প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। এই জেলখানা থেকে ছেলেদের উদ্ধার করার মানসেই ইউরােপে এই সব নববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্বাধীনতাই হচ্ছে এই সব স্কুলের মূলমন্ত্র ; কেননা এদের কর্তৃপক্ষের। এই মহা সত্যের আবিষ্কার করেছেন যে, অবাধ স্বাধীনতার মধ্যেই মানুষ তার মনুষ্যত্ব লাভ করে, অর্থাৎ ঐ অবস্থাতেই তার দেহ মন ও চরিত্রের পূর্ণ অভিব্যক্তি হয় ; এবং বলা ২৪ সৰু পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ বাহুল্য যে, ছোট ছেলেও মানুষ,কেননা বৃদ্ধত্ব ও মনুষ্যত্ব এক বস্তু নয়। স্বচ্ছন্দে চলবার ফেরবার দৌড়বার লাফাবার জন্য ছেলেদের পক্ষে যে মাঠ চাই, এ কথা যে আজকাল অনেকেই মানে তার প্রমাণ, সহুরে স্কুলও খেলার মাঠের জন্য লালায়িত। ছেলেরা কিন্তু শুধু জমির উপর ছুটোছুটি করেই সন্তুষ্ট থাকে না, তারা গাছে চড়তে চায়, জলে নামতে চায়। একমাত্র স্থলচর হয়ে তাদের সুখ নেই, মাঝে মাঝে খেচর ও জলচর হতে পারলেই তারা অানন্দে থাকে । স্বাধীনতা তাদের দেওয়া একান্ত আবশ্যক। কিন্তু সহরের খেলার মাঠে তারা সাঁতার কাটতে পারে না, ভালেও চড়তে পারে না। সুতরাং স্কুল সেই জায়গাতেই হওয়া উচিত যেখানে মাঠ আছে, গাছ আছে, জল আছে। আমরা সকলেই জানি যে, মানবজাতি তার শৈশবে প্রকৃতির কোলেই লালিতপালিত হয়েছে ; সুতরাং মানব-শিশুর পক্ষে প্রকৃতির কোলেই মানুষ হওয়া স্বাভাবিক ;-কেননা যারা ছােট ছেলের মনের খবর রাখেন তারাই জানেন যে, আদিম মানবের সঙ্গে তাদের প্রকৃতির একটা মজ্জাগত মিল আছে। মানবজাতি যেমন প্রকৃতির সঙ্গে কারবার করে, যুগের পর যুগ ধরে, দেখে এবং ঠেকে শিখে সভ্য হয়েছে ; শিশুকেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে মানুষ হতে হবে; এই হচ্ছে নব-বিদ্যালয়ের স্রষ্টাদের মত। প্রকৃতির হাত ধরে এবং প্রকৃতিকে হাতে ধরেই মানুষের মন যে সজ্ঞান এবং সক্রিয় হয়ে ওঠে, এই বিশ্বাসের বলেই নব-বিদ্যালয়ের নব-শিক্ষাপদ্ধতি রচিত হয়েছে। যখন মানসিক শিক্ষার অধ্যায়ে এসে পড়ব, তখন সে পদ্ধতির মুনত্ব ও সার্থকতার পরিচয় দেব। এস্থলে এস্থলে এইটুকু বলেই যথেষ্ট ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নব-বিদ্যালয় । দৃঢ়মত। হবে যে, শিক্ষার এই নব-পন্থীদের মতে সহুরে স্কুলে তাদের পদ্ধতি অনুসারে শিক্ষা দেওয়া একেবারেই অসম্ভব ; সুতরাং স্কুলের স্বস্থান হচ্ছে সহরের বাইরে। স্কুলের আস্তানা সহরের বাইরে হলেও বহুদূরে হওয়া উচিত নয়- এই হচ্ছে প্রফেসর ফারিয়ার মত। তার স্কুল ছিল ব্রাসেলস থেকে পঞ্চাশ মিনিটের রেলের পথ। স্কুল যে একটি বড় সহরের এক ঘণ্টার রেলপথের বাইরে হওয়া উচিত নয়—এ বিষয়ে তিনি অবশ্য একটি নূতন কথা, সুতরাং এ বিষয়ে তার কি বক্তব্য আছে শোনা যাক। তিনি বলেন- “লােকালয়ের বাইরে স্কুল স্থাপন করার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমরা আমাদের ছেলেদের একটা বড় সহরের সংস্পর্শ থেকে একেবারে দূরে রাখতে চাই ;—কি রাজধানী নামক সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে মানুষের হৃদয়মনের শিক্ষার জন্য যে অতুল ঐশ্বৰ্য্য সঞ্চিত রয়েছে, টলস্টয়ের মত তা প্রত্যাখ্যান করতে চাই। এ কথাটা আমি খুব স্পষ্ট করে খুব উঁচু গলায় বলতে চাই যে, এই প্রকৃতির কোলে ফিরে আসার অর্থ আমাদের কাছে এ নয় যে, আমরা বনবাসের কোনরূপ অপূৰ্ব্ব মাহাত্ম্য কিম্বা দৈবী-শক্তিতে বিশ্বাস করি। সেরকম অদ্ভুত বিশ্বাস যে আমাদের নেই—এ কথাটা পরিষ্কার করে বলা আবশ্যক, কেননা প্রায়ই দেখতে পাই যে, এমন লোেক ঢের আছেন যাঁদের ধারণা যে আমাদের নববিদ্যালয়ের প্রধান গুণই এই যে, আমরা সহরের সয়তানের বেড়াজাল ছিড়ে পালিয়ে এসেছি। লােকালয়-বহিভূত মাঠের মধ্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করবার সুফল যে কি, অ পূর্বেই বলেছি; কিন্তু সহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখবার সুফল থেকেও আমরা ছেলেদের বঞ্চিত করতে চাই নে।” ;

বৈশাখ, ১৩২৫ আমাদের ভাষায় বলতে হলে, ব্রহ্মচর্য্য ও বানপ্রস্থ যে একই আশ্রম, প্রফেসর ফারিয়া এ কথা মানে না। তার মতে শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষকে সংসার থেকে পালাতে শেখাননা নয়, তার জন্য তাকে প্রস্তুত করা। প্রথম আশ্রমের সার্থকতা হচ্ছে মানুষকে তার দ্বিতীয় আশ্রমের উপযােগী করায়। স্কুল সন্ন্যাসীর আশ্রমও নয়, ভিক্ষুর মঠও নয়। এদের মতে বিদ্যালয় হচ্ছে সংসার-রঙ্গালয়ের নেপথ্যশালা। জীবন নাটকের অভিনয় সকলকেই করতে হবে, সে নাটক ট্রাজেডিই হােক আর কমেডিই হােক; সেই অভিনয় ভাল করে সুন্দর করে করুতে শেখানােটাই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য,—সুতরাং সে শিক্ষাশাল। প্রথমে নেপথ্যেই রাখা দরকার। শিক্ষানবিশীর যুগে সামাজিক জীবনের যবনিকার অন্তরালে যাবার এও একটা কারণ। এখন দেখা যাক, সহরের সঙ্গে স্কুলের সম্পর্কটা নিকট হওয়ায় ছেলেদের কি লাভ। মানুষের যুগযুগান্তরের জ্ঞানকর্মের ফল প্রতি দেশে বড় বড় সহরেই সঞ্চিত রয়েছে ; তারপর যে উপাদানের সাহায্যে জ্ঞান ও কর্ম বৃদ্ধি লাভ করে, সে উপাদানও ঐ বড় বড় সহরেই সংগৃহীত হয়। একটি বিষয়ের এখানে উল্লেখ করা দরকার। এই নব-শিক্ষার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে বস্তু,-বই নয়। নববিদ্যালয়ে বইয়ের শিক্ষা ছেলেদের বস্তুজ্ঞানের অনুসরণ করে। এই কারণেই Museum, Zoo, Botanical Gardens প্রভৃতিতে নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের ঘন ঘন যাতায়াত করতে হয়, এবং বলা বাহুল্য এ সব জিনিস বড় সহরেই থাকে—পাড়াগাঁয়ে থাকে না। তারপর নব- শিক্ষকের দল, ছেলেদের ভাল ছবি দেখানাে এবং কনসার্ট শােনাননা তাদের সৌন্দৰ্য-জ্ঞান এবং সহৃদয়তার অনুশীলনের জন্য একান্ত ;

৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নষ-বিদ্যালয় প্রয়ােজন মনে করেন, এবং উঁচুদরের ছবি দেখতে হলে, উঁচুদরের গানবাজনা শুনতে হলে, সহর ব্যতীত গত্যন্তর নেই। দেশের বড় বড় বক্তাদের বক্তৃতা শােনাও এঁদের মতে শিক্ষার একটি প্রধান উপায়। ছেলেরা বড় হলে যে-সামাজিক জীবনে প্রবেশ করবে, সেই সামাজিক জীবনের সকল উচ্চ অঙ্গের সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই তাদের সাক্ষাৎ পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। ছাপার অক্ষরের ভিতর দিয়ে সে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয় না। সংক্ষেপে, প্রফেসার ফারিয়ার বক্তব্য এই যে,-একদিকে যেমন সামাজিক জীবনের যত কিছু কদৰ্যতা ও হীনতা সহরে পুঞ্জীভূত হয়েছে, অপর দিকে তেমনি সে জীবনের যত কিছু সৌন্দৰ্য্য ও মহত্ত্ব ঐ সহরেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সুতরাং সহরের পাপ ও কদর্যতা থেকে ছেলেদের দূরে রাখবার জন্য ছেলে- দের সহরের বাইরে রাখা যেমন দরকার; সভ্যতার মহত্ত্ব ও ঐশ্বর্য্যের সঙ্গে তাদের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ করবার জন্য ছেলেদের সহরের সন্নিকটে রাখাও তেমনি দরকার। আর এক কথা। আমি পূর্বে বলেছি যে, স্বাধীনতাই হচ্ছে নব- বিদ্যালয়ের মূলমন্ত্র। তাই এ শ্রেণীর স্কুলের শাসনতন্ত্র হচ্ছে স্বায়ত্ত শাসন। স্কুলের শাসন সংরক্ষণ সবই ছেলেদের হাতে,—এমন কি ছেলেদের পঞ্চায়তে মাষ্টারদের কোন স্থান নেই। প্রফেসার ফারিয়া এই ছাত্ৰশাসনতন্ত্রের লম্বা বর্ণনা করেছেন। সে সব কথা বারান্তরে বলব। এ ক্ষেত্রে এইটুকু বলা দরকার যে, স্বায়ত্ত শাসন বজায় রাখবার জন্য স্কুলের পক্ষে সহরের কাছ ঘেঁসে থাকা দরকার। কেনাকাটি হাটবাজার ত ছেলেদেরই করতে হয়—তা ছাড়া দরকার পড়লে উকীলের পরামর্শ, এঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নেওয়া প্রভৃতি প্রাপ্ত বৈশাখ, ১৩২৫ বয়স্ক লােকদের কাজও ছেলেদেরই করতে হয়। সহরের বিরাট কর্মজীবনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে, এবেলা ওবেলা তাদের সহরে যাতায়াত করতে হয়। স্কুলের বিষয়কৰ্ম্মের ভার ছেলেদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য তাদের স্বাবলম্বন শেখানো। ( ৪ ) এই নব-বিদ্যালয়ের আর একটি নিয়ম আছে, যেটি আমার কাছে ভারি নূতন লাগল। এ স্কুল অবশ্য বাের্ডিং স্কুল, কিন্তু তা হলেও এ স্কুলে সস্ত্রীক হেডমাষ্টার ছাড়া অপর কোনও মাষ্টারকে থাকবার স্থান দেওয়া হয় না। এর প্রথম কারণ, এ স্কুল পরিবারের আদর্শে গড়। ছেলেরা এ স্কুলে যথার্থই গুরুগৃহে বাস করে, গুরু এবং গুরু- পত্নীই তাদের পিতৃমাতৃস্থানীয়। সংসারে আমরা যেমন এক পরি- বারের ভিতর আর এক পরিবারকে স্থান দিতে স্বতঃই নারাজ। কেননা ও দুয়ে ভাল করে খাপ খাওয়া যায় না; তেমনি এই নব- বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের একের বেশী গুরুকে সেখানে স্থান দিতে নারা—কেননা, এই পারিবারিক স্কুলে নানা গুরুকে একত্র রাখলে তাদের পরস্পরকে খাপ খাওয়ানাে যায় না। প্রফেসার ফারিয়া বলেন, পূর্ব অভিজ্ঞতার ফলেই তিনি এই নিয়ম করতে বাধ্য হয়েছেন। একাধিক মাষ্টারকে একান্নবর্তী করবার ফলে দুটি একটি নব-বিদ্যালয় ভেঙ্গে গেছে। অনেক সন্ন্যাসীতে যে গাজন নষ্ট হয়- এ হচ্ছে তার কাছে পরীক্ষিত সত্য। তাঁর বিশ্বাস পাঁচটি মাষ্টারকে একত্র রাখলে তাদের ভিতর দলাদলির সৃষ্টি হতে বাধ্য। এ বিষয়ে ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ২৯ ভাললােক মন্দলোকের কোন কথা নেই। মানুষ যতই ভাল থােক , তার ধাত বলে একটা জিনিস আছে—এবং অনেক স্থলে মতে মিললেও, পাঁচজনের ধাতে মেলে না। এবং পাঁচজনে যত কাছা- কাছি যত ঘেঁষাঘেঁসি করে থাকে, তাদের পরস্পরের ধাতু-বৈষম্য তত ফুটে ওঠে। প্রফেসার ফারিয়া বলেন—যে ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের বিদ্বেষ প্ৰকাষ্ঠ-বিরােধে না দাড়ায়, সে ক্ষেত্রে তা প্রচ্ছন্ন অবস্থায়ই থাকে এবং প্রচ্ছন্ন বিষের মত তা অলক্ষিতে স্কুলদেহকে জর্জরিত করে। এই কারণে স্বয়ং প্রফেসর ফারিয়া ব্যতীত তার স্কুলের সকল মাষ্টারই ব্রাসেলসে বাস করতেন—অতএব ব্রাসেলস হাতের গোড়ায় না থাকলে এ স্কুল চলত না। যদি বলেন, যে-গাঁয়ে স্কুল সেই গাঁয়েই মাষ্টারদের আলাদা বাসা করে দিলেই ত হত, ব্রাসেলস পাঠাবার কি দরকার ছিল?-তার উত্তর, তার নব-বিদ্যালয় ক্রোরপতির স্কুল নয়। এদের নব-শিক্ষা- পদ্ধতি কাৰ্যে পরিণত করবার জন্য নব-বিদ্যালয়ে বহু মাষ্টার এবং অতি উঁচুদরের মাষ্টার চাই-কেননা প্রফেসর ফারিয়া বলেন, স্কুলের ভালমন্দ, যার চালায় তাদেরই উপর নির্ভর করে, নিয়মা- বলীর উপর নয়। তাঁর ৩৫টি ছেলের স্কুলে ১৭টি মাষ্টার ছিল, এবং এদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে এক একটি গণ্যমান্য ব্যক্তি। স্কুলের তহবিলে লাখ দুলাখ টাকা না থাকলে এ দরের মাষ্টারদের সব বাঁধা মাইনের চাকর করে রাখা যায় না। এর প্রায় প্রত্যেকেই ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। হপ্তায় একদিন অধিদিন এসে এঁরা ছেলেদের শিক্ষা দিয়ে যেতেন। এ কাজ তারা আহলাদের সঙ্গেই করতেন, কেননা সহরে ছদিন সকাল সন্ধ্যে কাজ করে একদিন গাছ-

বৈশাখ, ১৩২৫
পালা ফুলফলের দেশে গিয়ে দিনমান ঘােট ছেলেদের নিয়ে কাটানতে
এঁরা অতিশয় আনন্দ বােধ করতেন। এই পালায় পালায়
পড়াতে স্কুলের কোনই ক্ষতি হত না; কেননা নব-বিদ্যালয়ে এক
দিনে পাঁচ বিষয় পড়াবার নিয়ম নেই। একদিনে একটি, বড় জোর
দুটি বিষয় পড়ানাে হয়, তার বেশী নয়।
আজ এই পর্যন্ত। ক্রমে অবসর মত, এই নব-বিদ্যালয়ের
সবিশেষ পরিচয় দেব।
রাচি
১•১১১৭
প্রমথ চৌধুরী।

“অচলায়তন” নাটক হিন্দুধর্ম ও হিন্দু সমাজকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যেই লিখিত হইয়াছে, অনেকের এইরূপ ধারণা। এ দেশের দৈনিক ও মাসিক পত্রিকায় কিছুদিন ধরিয়া এ সম্বন্ধে যে ভাবে আলাে- চনা চলিয়াছিল, তাহাতে লােকের এরূপ ধারণা হওয়া অস্বাভাবিক নহে। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে নাট্যকলার আজও কিছুমাত্র উন্নতি হয় নাই। বড় নাটক অভিনয় করিবার মত অভিনেতা দেশে দুর্লভ। উপযুক্ত দর্শকও সুলভ নয়। কাজেই নাটকের যথার্থ অর্থ বুঝিতে পারার যা প্রধান সহায়, অভিনয়, তাহা হইতে আমরা বঞ্চিত আছি। কাজেই সম্প্রতি অচলায়তনকে কিছু সংক্ষিপ্ত করিয়া বিচিত্রা' ক্লাবে “গুরু” নাম দিয়া অভিনয়ের যে উদ্যোগ হইতেছে, তাহার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। একটু ভাবিয়া দেখিলেই বােঝা যায়—ইহার নাম “গুরু” হওয়াই উচিত--“অচলায়তন” ইহার negative দিকের নাম। গুরু বলিলে কি বােয়-তাহার কৰ্ম্ম কি? তিনি বাহির হইতে যে কিছু আনিয়া দেন তাহা নহে, আমাদের মধ্যে যাহা অব্যক্ত হইয়া আছে তাহাকেই তিনি বাহির করিয়া আনেন। মানবের অন্তরে যে অগ্নি প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে, গুরু নিজের প্রাণের অগ্নিশিখার স্পর্শে সবুজ পর বৈশাখ, ১৩২৫ তাহাকে প্রদীপ্ত করিয়া দেন। আমাদের মধ্যে যে অগ্নি নিস্তেজ হইয়া আছে তাহাকে উদ্দীপ্ত করিয়া দিবার জন্য, গুরুর প্রয়ােজন। চারিদিকের বস্তুপুঞ্জ আমাদের নীচের দিকে টানে। প্রাণ আপনার ভিতর আহুতি দিয়া ‘টি’ পুড়াইয়া শরীরকে উত্তপ্ত রাখিতেছে- নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তাহার অনবরত চেষ্টা, বহির্জগতের যে একটি চাপ আছে, যাহার চেষ্টা তাহাকে বিধ্বস্ত করা, তাহার বিরুদ্ধে নিজেকে খাড়া রাখা। পৃথিবী আমাদের টানিতেছে শােয়াইয়া দিবার জন্য। আমরা যে খাড়া হইয়া আছি, চলিতেছি, সে প্রাণের জোরে। নিশ্চেষ্ট হওয়া কি না, সমস্ত জড়ের সহিত মিলিয়া যাওয়া। জড়জগৎ বৃহৎ, আমরা ক্ষুদ্র। সুতরাং জড়ের সঙ্গে প্রাণের এই জোঝজুঝি একান্ত কষ্টকর। যে প্রচণ্ড শক্তি নিশ্চেষ্টতার দিকে টানিতেছে তাহার কাছে আপনাকে ছাড়িয়া দিলে বিশ্রাম পাই। মাটিতে শয়ন করি, তাহাতে আমাদের আরাম হয়। প্রাণের ধর্ম ইহার উল্টা। প্রাণ আপনাকে স্বীয় শক্তির দ্বারা নিশ্চেষ্ট হইতে নিরন্তর রক্ষা করিতেছে। শিখার ধর্ম এ নহে যে একবার তাহাকে জ্বালাইয়া দেওয়া হইল, আর সব হইয়া গেল ; নিত্য নিয়তই তাহাকে চেষ্টার দ্বারা নিজেকে রক্ষা করিতে হয়, তাহার সেই চেষ্টাই আলােক, তাহাই জ্যোতিরূপে আমাদের কাছে প্রকাশমান। কেবলি পুড়িতেছে, চলিতেছে, বাড়িতেছে, উঠিতেছে--বিপুল জড়- জগতের মধ্য হইতে নিজেকে উদ্ধার করিতেছে—এই প্রকাণ্ড উদ্যম, ইহাই প্রাণ। এই যুদ্ধে প্রাণ এক একবার পরাভবের দিকে যায়। আগুনও জ্বলিতে জ্বলিতে বারবার পরাভষের দিকে যায়। যে ব্যক্তি তাহার উপরকার এ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ৩ ছাই ঝরাইয়া দেয়, সে ত নূতন কিছু দেয় না, সে ভিতরের অগুনকে বাহির করিয়া আনে মাত্র। আত্মার প্রাণশক্তি যখন আরামের ছাই চাপা পড়ে, তখন সেই আরামকে দূর করিবার জন্য আসেন গুরু। ইন্ধন আপনাকে জ্বালাইয়া রাখিবার জন্য যদি চেষ্টা না করে, তবে তা নিবিয়া যায়। নিবিয়া যাওয়াটাই সহ অবস্থা, আরামের অবস্থা। শুরু মানুষই হউন,আর দেবতাই হউন, ঘা দিয়া দুঃখ দিয়া, অামাদের ভিতরকার যে তেজ স্নান হইয়া আসিতেছিল তাহাকে উদ্দীপ্ত করিয়া দেন। আধ্যাত্মিক প্রদীপটি যাহাদের অন্তরে স্নান হইয়া যাইতেছিল, তাহারা সেই গুরুর অপেক্ষা, জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারে করিতে ছিল—যিনি খোঁচাদিয়া, আঘাত করিয়া তাহাকে জ্বালাইয়া তােলেন। চেষ্টার অভাবই জড়ত, প্রাণ মানুষের ভিতরের স্বতঃচেষ্টা। কিন্তু সব বিষয়ে, নব নব চেষ্টার সাহায্যে যদি প্রাণকে টিকিয়া থাকিতে হয়, তাতে ব্যাপার বড় কঠিন হয়। আমাদের প্রতিদিনই যদি খড়কুট। দিয়া ঘর তৈয়ারি করিতে হইত,শয়ন করিতে হইলে তুলা ধুনিয়া তােষক প্রস্তুত করিতে হইত, তৃষ্ণা পাইলেই কূপ খনন করিতে হইত, তাহা হইলে অবশ্য মনে হইতে পারিত, প্রাণের ক্রিয়া খুব প্রবলভাবে চলিতেছে। কিন্তু এ-অবস্থা চলতে পারে না। প্রাণের ধৰ্ম্ম নিয়ত চলা কিন্তু আমাদের শক্তি পরিমিত বলিয়া সে শক্তিকে আমাদের বাঁচাইয়া চলিতে হয়। পলিতা যদি আগাগোড়া জ্বলে তবে তাহার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। প্রদীপ ততটুকুই জ্বলে যাহাতে আলাে হয়, যাহা না জলিলে তাহার চলে না। প্রাণ তেমনিই ব্যবস্থার দ্বারা শক্তির অতিব্যয় নিবারণ করে।

সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ শক্তির অপব্যয় এমনি করিয়া সমাজে প্রথা জিনিসটির উৎপত্তি হইয়াছে। প্রত্যেক বার আমাদের যদি ভাবিতে হইত, দেখা হইলে গুরুজনদের সঙ্গে কি ব্যবহার করিব- শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য কোনও দিন ডিগবাজী খাইলাম কোনও দিন বা জিহ্বা বাহির করিলাম—তবে বড়ই মুস্কিল হইত। তাই বাঁধা নিয়ম হইল প্রণাম করা। মানুষ বাড়ী তৈয়ারি করিয়া রাখিয়া দেয়, পুত্র পৌত্রাদি ক্ৰমে ভােগদখলের জন্য। নিবারণের জন্য প্রাণকে এইরূপ নিয়ম বাঁধিয়া দিতে হইয়াছে, অর্থাৎ সামাজিক কল গড়িতে হইয়াছে। সামাজিক বিষয়ে যত কিছু তর্ক সে হইতেছে—জড়ের সহিত কারবারে, কলৰস্তুকে যতটা স্বীকার করিয়াছি, তাহার পরিমাণ উচিত কি না, এই লইয়া। আপনার ভিতর হইতে যে চেষ্টা, প্রাণ, সেই চেষ্টাকে তুমি কত দূর মানিবে, এই লইয়া তর্ক। প্রাণকে যদি বড় জায়গাতেও ঘুম পাড়াইয়া রাখি, সকল জায়গাতেই যদি ধাঁধা নিয়মে চলি, তবে চলাই হয় না। যে জাতি সুদূর অতীতের লােকাচার, দেশাচার, মনু পরাশর, এইসকলের উপর সব বিষয়ের বরাত দিয়া নিশ্চিন্ত থাকে, সে নিশ্চেষ্ট নিস্ক্রিয় তামসিক হইয়া যায়, তাহার অধঃপতন কে ঠেকাইবে। আমাদের সব বাধা, এমন কি ধর্ম এবং আচারও বাঁধা হইয়া গিয়াছে। আমরা নিজে যাহা কিছু করিতে পারিতাম, তাহার বরাত দেওয়া রহিল, সংহিতা স্মৃতির উপর। আমার চলায় প্রয়ােজন নাই -এক জায়গায় ঘানির মত ঘােরাই হইল আমার চলা। নিয়ম যখন অতিরিক্ত হইয়া উঠে, তখন প্রাণের সার্থকতা চলিয়া যায়। মানুষ তখন ভস্মাচ্ছন্ন আগুনের মত হইয়া উঠে। সে যখন জড়ের সহিত, ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা আপনার আশপাশের সহিত, বনিবনাও করিয়া চলিতে চায়, তখন তাহার চলার পথে বাধা আসে। গুরু আপনার প্রচুর প্রাণশক্তি লইয়া আসেন, এই বাধা দূর করিয়া দিবার জন্য। অতএব “অচলায়তনের” অর্থ সুস্পষ্ট। ইতিপুর্বের “রাজা” নাটকে ব্যক্তিবিশেষের কথা ছিল—“সুদর্শনা” কি করিয়া অন্ধকার হইতে বাহির হইয়া আসিল। “অচলায়তন” সমাজের কথা, অনেকের কথা। এইখানেই সমস্যা। পরস্পরের সহিত পরস্পরের যােগ যেখানে বিচিত্র সেখানে প্রত্যেকের জন্য নূতন করিয়া ভাবা সম্ভব নহে। মানুষের প্রয়ােজন বশ্বতঃই মানুষকে সামাজিক কল তৈয়ারি করিতে হইয়াছে। আমাদের সুবিধা হয় বলিয়া যদি প্রাণের সব কাজের ভার কলের উপর দিই, তাহা হইলে যাহার কাজ দাসত্ব করা, সে হয় প্রভু। ইতিহাসে দেখা যায় রােমকেরা যখন তাহাদের দাসদের উপর সব কাজের বরাত দিতে লাগিল, তখন তাহারা তাহাদের হইয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল, তাহাদের উপর প্রভুত্ব করিতে লাগিল। বড় বড় সমাজের পতন এমন করিয়াই হয়। সমাজের যখন অবনতি হয় তখন সে কল অর্থাৎ organisation-এর উপর সব বরাত দেয়। তাহার তেল যত মরে, বল যতই কমে, সে ততই কলের উপর বরাত দিয়া নিজের শক্তি বাঁচাইতে চায়। হয়ত ভারতবর্ষও এই কাজ করিয়াছে। যতই তাহার দুর্গতি ঘনাইয়া আসিয়াছে, ততই কলের উপর বরাত দিয়া প্রাণশক্তিকে সে নিশ্চেষ্ট করিয়া তুলিয়াছে।

৭ বৈশাখ, ১৩২৫ নিজের শক্তিকে প্রয়ােগ করিবার দিকেই প্রাণের উদ্যম, এবং তাহাতেই তাহার আত্মরক্ষা। ছােট ছেলে চেচাইবে, কাঁদিবে, দৌড়াইবে, এ তাহার পক্ষে ভাল। কিন্তু ধাত্রীর পক্ষে ইহা বিষম অসুবিধা জনক। ধাত্রী সেইজন্য কখন কখনও আফিম খাওয়াইয়া ছেলেকে ঝিমাইয়া রাখে। যাহার পরের ভার লয়,ইহাতে তাহাদের খুবই সুবিধা। সমাজের ধাত্রী দেখে, যেখানে প্রাণ প্রবল, সেখানে নিয়ম শাসনের ব্যতিক্রম ঘটে। কাজেই তাহাদের কসিয়া বাঁধিয়া, কিম্বা আফিমের ড্যালা খাওয়াইয়া নিস্তেজ করিয়া রাখিতে তাহার চেষ্টা হয়। বৌদ্ধ যুগের সময় হয়ত এদেশে প্রাণের একটু চাঞ্চল্য আসিয়াছিল—তাহার পর আমাদের রঘুনন্দনের দল সমাজকে আচারের বড় একটি আফিমের ডালা খাওয়াইয়া নিশ্চিন্ত হইলেন। কোনও বিধির কারণ জিজ্ঞাসা করিবে না, কিন্তু উত্তর শিয়রে শুইবে ; পশ্চিমে বসিবে না ইত্যাদি। আমাদের দুর্গতির হয়ত এ এক অথবা হয়ত পােলিটিক্যাল কারণে আমরা দুর্বল হইয়া গিয়াছিলাম—এবং ক্লান্ত মানুষকে শােয়ান সহজ ; যে সবল, যাহার তেজ আছে, তাহাকে পাড়িয়া ফেলা সহজ নহে। তাই রঘুনন্দনের দল যখন চিন্তা না করা, দ্বিধা না করার মশারিদের বিছানা করিয়া দিলেন, তখন শুইয়া পড়িলাম। হয় প্রাণ আপনিই নিশ্চেষ্ট হইয়া আসিয়াছিল বলিয়া ইহা ঘটিল, নচেৎ কর্তৃপক্ষ তাহাকে কমানো দরকার মনে করিয়াছিলেন বলিয়া এইরূপ হইল। গুরুর কাজ হইতেছে, কল যত আরাম দিক, তাহার হাত হইতে মানুষকে উদ্ধার করা। তিনি জানেন, সচেতন প্রাণই বল, জড়ের কাছে সে যেখানে জয়ী, সেইখানেই তাহার সার্থকতা, তাই যথার্থ গুরু ৫ বর্ণ, এখন সংখ্যা বিপ্লবকে বহন করিয়া আসেন। লোকে তাহাকে শত্রু বলিয়া জ্ঞান করে। লােকে মনে করে বাঁধা মন্ত্র যিনি কানে দেন, তিনিই গুরু। কিন্তু মানবের গুরু রুদ্ধদ্বার ভাঙ্গিয়া, বিপ্লবের বাহনে আসেন—তিনি সেই কথা বলিতে আসেন যাহা আমরা সহজে মানিব না, শুনিব না। গুরু আসা গুরুতর ব্যাপার। বিধাতা যখন আমাদের প্রার্থনা শােনেন “যম্ভং তন্নয়াসুৰ” যা ভদ্র তাই দাও--তখন তিনি দুই হাতে মশাল লইয়া আসেন—বড় ভয়ানক সে কাল। যিনি বলিয়াছেন “যুগে যুগে সম্ভবামি” তিনি যখন আসেন, তখন দেশে দেশে হাহাকার পড়িয়া যায়, সেদিন দারুণ দুঃখের দিন! তাহারও অপমানের দুঃখের শেষ নাই। যখন আরামে আছি, তখন যে আরাম ভাঙ্গিতে আসে তাহাকে লাঞ্ছিত হইতেই হয়। প্রাণ নিজেকে আঁকড়াইয়া থাকে—মমি'র সঙ্গে যে বীজ ছিল, ৩৪ হাজার বৎসর পরেও অনুকুল অবস্থার মধ্যে পড়িবামাত্র তাহা সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল। মানুষের ভিতর যে প্রাণশক্তি আছে তাহাও সহজে মরিতে চায় না। বাধা নিয়মের দাসত্ব করিতে করিতে, বিশ্বের সহিত অব্যবহিত ভাবে আনন্দের যে যােগ, তাহা পাইবার ব্যাকুলতা সমাজের অন্তরে মরিয়া যায়—তবুও তাহার মধ্যে এক একজন থাকিয়া যায়, প্রত্যক্ষ ভাবে নিজের প্রাণকে সকলের সঙ্গে যােগযুক্ত করিবার ব্যথা যাহাদের কিছুতে মরে না। পঞ্চক সেই ব্যক্তি—যাহার প্রাণ মরিয়াও মরিতে চাহে না, চতুর্দিক হইতে পিষ্ট হইয়াও যে বাঁচিয়া থাকে। “অচলায়তন” তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারে না—মন্ত্র আওড়াইতে গিয়া তাহার মুখ হইতে গান বাহির হইয়া পড়ে।

সবু পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ সমাজে যখন এই শ্রেণীর দুই একটি মানুষ দেখা দেয় তখনই বুঝিতে হইবে, গুরুর অাগমনের পথ প্রস্তুত হইতেছে। দেশে যখন, এমন সকল লােক উঠিতে থাকেন যাঁহারা বলেন “আমি বাঁধা মত মানিব না,কিন্তু আমার ভিতর যে বিচার বুদ্ধি আছে তাহাকে মানিব” তখন বুঝিতে হইবে গুরু অসিহস্তে আসিতেছেন—দশের চিত্তের চাঞ্চল্য, প্রাণের বেদনা, তাহারই আভাস দেয়। হঠাৎ একটা স্থলে দরজা খােলে, প্রাণবায়ুর স্পর্শে সকলের চিত্ত অল্পে অল্পে দোদুল্যমান হইতে থাকে। ক্রমে গুরু আসেন। গ্রীষ্মে সব শুকাইয়া গিয়াছে। নিজের ভিতর হইতে জোগাইবার রস আর নাই—সব তলানিতে গিয়া ঠেকিয়াছে। তখন সমস্ত বিশ্ব ব্যাকুল হইয়া বলিতে থাকে এস’ ‘এস'। অমনি গুরু আসেন তাঁহার বজ্র লইয়া, বিদ্যুৎ লইয়া। সরসতায় তিনি আকাশ ভরিয়া দেন। যাহারা মরিয়াছিল তাহারা বাঁচিয়া ওঠে, পীতবর্ণ শ্যামল হইয়া ওঠে, জরা নবীন যৌবনে পরিণত হয়। এই ঘটনা মানুষের জীবনের মধ্যেও দেখিতে পাই। সমাজ যখন কল, ধৰ্ম্ম যখন আচার- মাত্র, তখন সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া সেন গুরু। প্রাচীর নীচের চিত্ত আকাশ ভরিয়া যখন পূর্ণতার ঋতু আসেন, তখন তাহাকে ঠেকাইবে কে, তাহার ত কোনও সীমা নাই। লোহার দরজায় ঘা দিতে দিতে মনে হয়, বৃথা। এই চেষ্টা। দরজাকে মুষ্টি আঘাত করিয়া হস্ত শুধু রক্তাক্ত হইতে থাকে। চেষ্টা অবশ্য জীবনের একটা লক্ষণ। কিন্তু এখানে ঠেলিয়া, ওখানে ভাঙ্গিয়া কিছু করা বড় শক্ত। আমাদের মধ্যে যাহারা বড়, তাহারা গলা ভাঙ্গিয়া মরিলেন, কিন্তু দরজা একটু ফাক করা আর হইয়া উঠিতেছে না। আকাশ চেষ্টা। রুদ্ধ ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা ! ভরা পূর্ণতা লইয়া গুরু আসুন—পড়ুক আকাশ ভাঙ্গিয়া বজ্র—সব এক মুহুর্তে ঠিক হইয়া যাইবে। অনেক দিনের এই দুর্গ, মন ইহাকে মানিতে চায়, বুদ্ধিকে ইহা আছন্ন করে। পুনরাবৃত্তির পথে ফুলি দেওয়া গরুর মত চলিয়াছি, এই দুর্গতি হইতে বাচাইবার কান্না কবে উঠিবে আমাদের জীবনে নিশ্চেষ্টতা সবদিক হইতে আমাদের আক্রমণ করিয়াছে। প্রাণশক্তি কমিয়া আসিয়াছে, কাটা ফুটিলে তাহা যে বিষাক্ত ক্ষত হইয়া দাড়াইবে তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি? গােড়ায় যে প্রাণশক্তিকে নিশ্চেষ্ট করিয়া ফেলিয়াছি, সেখানে যখন জোয়ার আসিবে তখনই সব সার্থক হইবে। মূলে, অধ্যাত্মিক জীবনে, প্রচুর প্রাণধারা বর্ষণ করিয়া গুরু আমাদের রক্ষা করিবেন। হাজার রূপ ধরিয়া তিনি আসিবেন। হৃদয়ে হৃদয়ে তিনি বাস করিতেছেন- “বিশ্বকর্মা মহাত্মা”—তিনি মহাত্মা, সকলের আত্মার মধ্যে তিনি কাজ করিতেছেন, সকল মনুষ্যের মধ্যে তিনি “নিবিষ্টঃ।” তিনি যখন আসেন তখন আত্মায় আত্মায় জাগরণের মন্ত্র উচ্চারিত হয়,–একাজ কোনও একজনের সাধ্য নহে। বসন্ত ঋতুর মত সব দিক দিয়া সকলকে তিনি পত্রপুষ্পে ভরিয়া দেন, বর্ষার মত সমস্ত তিনি প্লাবিত করিয়া দেন। ইহাই ‘অচলায়তনের বাণী। সন্তোষ চন্দ্র মজুমদার। - নববর্ষ। মূতনপন্থীদের বিরুদ্ধে পুরাতনপন্থীদের তরফ থেকে এই একটা প্রকাণ্ড অপবাদ ক্রমাগত আসে যে, তারা প্রাচীনের আদর জানে না; এ অপবাদ বড় কম অপবাদ নয়। প্রাচীনই ত সত্য, সেই ত আবহ- মান কাল থেকে চলে আসছে, এবং সেইই ত সৃষ্টির শেষদিন অবধি সমস্ত বাধাকে তফাতে ঠেলে দিয়ে সজোরে দাড়িয়ে থাকবে। বড় সত্য যস্মিন পক্ষে, তস্মিন পক্ষে জনার্দন না থেকে যে যেতে পারে , সে কথা নূতনপন্থীদের অবিদিত নেই। তবু তারা নূতনকে এত করে চায় কেন?—সকল অকাট্য যুক্তির সমস্ত আটক ভেঙ্গে নূতনত্বের বাণ যে আজ আমাদের মধ্যে ভীষণভাবে গর্জে উঠেছে,-সমস্ত ভেঙ্গে চুরমার করে দেবার জন্যে,আর চোখের সুমুখে প্রতিদণ্ডে যে তার জলােচ্ছাস মাটির বাঁধের প্রত্যেক পরমাণুকে কাঁপিয়ে তুলছে, একি তবে সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড একটা ?-না, তা নয়। জগতে তারাই তত সংরক্ষণশীল, যারা মূতনকে যত বেশী করে আমল দেয় ; আর তারাই সকলের চেয়ে পুরাতনকে চাইতে শিখেছে, যারা প্রতিক্ষণে তাদের সাদর অভ্যর্থনার রঙীণ নিশান আর দেবদারুর সবুজ পত্র সজ্জিত করে রেখেছে, নিত্যনূতনকে আদর করে গ্রহণ করবার জন্যে। হে নববর্ষ, প্রাচীনের উপাসক আমরা তাই তােমাকে সাদরে আহ্বান করছি—তুমি এস।

৪১ ধাপছাড়া কিছু। আমাদের নূতন অবশ্য আদবেই তা নয়, বরং ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা নববর্ষ কোনও প্রাচীন ব্যক্তি ৯০ বৎসর বয়সে এমন একটা রােগের দ্বারা আক্রান্ত হন যার নাম তিনি জীবনে কখন শােনেন নি, এবং সেই একই কারণে সে রােগের ঔষধের কোন তল্লাস তিনি সমস্ত বৈশাস্ত্র তন্ন তন্ন করে খুজেও পান নি। কোন আধুনিক ডাক্তার , তার জন্যে ইংরেজী ঔষধের ব্যবস্থা করায় তিনি বলেছিলেন, “বাপু হে ! আজকালকার ওষুধগুলো দিয়ে আমার প্রাচীনত্ব নষ্ট কোরে না”; তাইতে আধুনিক ডাক্তারটি উত্তর করেন,—“মশাই, আপনার প্রাচীনত্ব যাতে আরাে পাকা হতে পারে, অর্থাৎ আরও দশ বছর বেঁচে থেকে আপনি যাতে মরবার সময় বলে যেতে পারেন যে পুরাে- পুরি century up করেছি, তারি বন্দোবস্ত করছি। আমার নতুন ওষুধ আপনার প্রাচীনত্বকে আরাে প্রাচীন হবার অবসর দিচ্ছে মাত্র নষ্ট করছে না।” আমরাও প্রাচীনপন্থীদের ডাক্তারবাবুর মত- করে ভরসা দিচ্ছি, তাদের পুরাতন যাতে আনাভি-শুভ্র-শ্মশ্রুরাজী পরিশােভিত হয়ে যুগ যুগ ধরে আপনাকে পলে পলে, দণ্ডে দণ্ডে পুরাতন হতে পুরাতনতর করে তুলতে পারে, তারি চেষ্টা করছি। আর সেইজন্যেই পুরাতনের রাজদরবারে নূতনের দূতকে সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এত ঘন ঘন পাঠান হচ্ছে ; এতে পুরাতনের রাজত্ব দৃঢ় হয়ে উঠবে, তার শক্তি আরাে অক্ষুন্ন হবে—এতে ভয়ের কোন কারণ কবিবর দ্বিজেন্দ্রলাল আমাদের বলে গেছেন একটা নতুন কিছু করতে (অবশ্য ব্যঙ্গ করে)। এখানে নতুন কিছু” অর্থে সৃষ্টিছাড়া কিছু, অর্থাৎ যা জগতের কোনকিছুর সঙ্গে খাপ খায় না—একটা নেই।

৪২ সৰু পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ • আমার বােধ হয় এ জগতে কিছু যদি খাপছাড়া বদনামের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে ত সে আমাদেরই মূতন। সেই ত পুরাতনকে বর্তমানের সঙ্গে তাল রেখে চলবার ক্রমাগত সাহায্য করে আসছে ; সেই ত কালকের জগতকে আজকের জগতের সমস্ত পরিবর্তনের সঙ্গে পা ফেলে চলতে, হাত ধরে শিখিয়ে দিচ্ছে ; সেই ত তাকে প্রতিক্ষণে খাপছাড়া হতে দিচ্ছে না। সমস্ত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আজও তাকে সৃষ্টিছাড়া হবার সমস্ত আশঙ্কা, সমস্ত সম্ভাবনার হাত হতে, সেই ত মা’র মত করে আগলে রেখে দিয়েছে। তাই আমরা আজ প্রাচীনের জীর্ণ দেউলের সর্বোচ্চ পৈঠার উপর পঁড়িয়ে নবীনকে সাদরে আহ্বান করছি, আমাদের প্রাচীনকে মহিমান্বিত করে তোেল। বার জন্যে। হে নবীন ! তুমিই ত প্ৰাচীনের সমস্ত তালুক মুলুক আজ পর্যন্ত সমান ভাবে রক্ষা করে আসছে, বিশ্বস্ত কর্মচারীর মত। তুমিই ত প্রাচীনকে আজও নিঃস্ব হবার সমস্ত সম্ভাবনা হতে বাঁচিয়ে রেখেছ, তাই তােমার উপাসক আমরা নিজেদের সকলের চেয়ে সংরক্ষণবাদী বলে গর্ব করে থাকি। তাই তােমাকে যারা ভালবাসে, তাদের আমরা সকলের চেয়ে প্রাচীন-ভক্ত বলে শ্রদ্ধা করি। নবীনের ঐ সুক্ষম গোঁফের ফাকে ফাকে কত বড় প্রাচীনতার গাম্ভীৰ্য যে লুকিয়ে রয়েছে, তা যদি সকলে দেখতে পেতো, তাহলে নবীনের জন্যে ঘরে ঘরে উৎসব জেগে উঠতো, তার আগমনের পথ কুসুমাস্তৃত হয়ে উঠতাে। যা অপরিচিত তাইত নূতন, যাকে চিনতে যত বেশী দেরি হয় সে তত বেশী মূতন ; আর পূরাতন সেই, যাকে দেখলেই চিনতে পারি। আজকের এই যুগে আমরা কি চিনিনা বেশী করে জাতিভেদ-বিদ্বেষকে ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা জাতিভেদ-প্রিয়তার চেয়ে ? আমরা কি চিনিনা, বিধবাবিবাহকে একাদশী- তত্ত্বের গৃঢ়তার চেয়ে ? আমরা কি চিনিনা বঙ্কিম বাবুকে তর্কপঞ্চাননের মুণ্ডিতমস্তকপরিশোভিত বিশাল বপুর চেয়ে ? এরাই কি আমাদের হৃদয়ের সমস্ত অর্গল একে একে খুলে দিয়ে একেবারে তার অন্তস্তলে অতি বড় পরিচিতের মত প্রবেশ করেনি ? আর অন্যগুলো বাইরে রাজপথে দাঁড়িয়ে কড়া নেড়ে নেড়ে একে একে ফিরে যাচ্ছে নাকি ?- তবে পুরাতন কে ? হে নবীন ! তুমিই পুরাতন। তুমিই ত প্রতিক্ষণে যা-কিছু নূতন আছে তাকে আমাদের কাছে পুরাতন করে তুলছে। তুমিই ত যা-কিছু অপরিচিত তাকে পরিচিত করে তুলছে। হে নববর্ষ! তাই তােমাকে প্রাচীনের তরফ থেকে অভিনন্দন দিচ্ছি, তুমি গ্রহণ কর। হে প্রাচীন ! হে চিরন্তন। তোমার আগমনী তাই আজ আকুল কণ্ঠে গাইছি ; তােমার পূজার অর্ঘ্য তাই এত ভক্তি এত শ্রদ্ধার সঙ্গে রচনা করছি-তুমি এস। তােমার আগমনে সমস্ত দেশ জেগে উঠুক,—তা টুটে, আলস্য অবসাদ জড়তা দূরে ঠেলে দিয়ে। ঐবিশ্বপতি চৌধুরী।

পত্র। শ্ৰীমান চিরকিশাের কল্যাণীয়েষু, তুমি যে আমার প্রিয়শিষ্য, লােকে বলে তার প্রধান কারণ তােমার রূপ আছে। তােমার প্রতি আমার প্রীতির প্রধান কারণ ঐ না হলেও যে প্রথম কারণ, এ কথা অস্বীকার করা আমি মােটেই আবশ্যক মনে করিনে। আমি জীবনের অর্ধেকের চাইতে বেশী পথ পার হয়ে এসেছি, এবং চোখ চেয়ে চলা আমার চিরদিনের অভ্যাস। কিন্তু এত দিনেও পথিমধ্যে এ সত্যের আমি সাক্ষাৎ পাই নি যে, রূপের অভাবেই গুণের পরিচয়। রূপ যে একটা গুণ, এবং অসামান্য গুণ—এ কথা অস্বীকার করবার জন্য এত লােক যে কেন এত উৎসুক, তার সন্ধান আমি আজও পেলুম না।' রূপ হচ্ছে বিধাতার নিজের হাতের লেখা পরিচয়পত্র,—তা সে জড়েরই থােক, আর জীবেরই হােক। শুধু তাই নয়, ও পত্র হচ্ছে, ইংরাজিতে যাকে বলে খােলা- চিঠি। ভগবান বিশ্বমানবের চোখের সুমুখে তা ধরে দিয়েছেন—সে সুপারিস অগ্রাহ্য করার ভিতর বিনয় নেই, বিচার নেই-আছে শুধু হয় অন্ধতা নয় পরশ্রীকাতরতা। দাড়াও, এ কথা শুনে একেবারে উৎফুল্ল হয়ে উঠে না। ভগবান মানুষকে যা দিয়েছেন, তার যথেষ্ট মৰ্যাদা থাকলেও—মানুষ নিজে যা পর ৪৫ ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা গুরু। দিতে পারে, মানুষের কাছে তার মুল্য ঢের বেশী। রূপ শুধু পূর্ব- রাগের জন্ম দেয়, কিন্তু যে সব কারণে সে রাগ অনুরাগে পরিণত হয়, তার সংখ্যা অসংখ্য ; কেননা এ ক্ষেত্রে মানুষের প্রবৃত্তির চাইতে তার প্রকৃতি প্রবল। প্রবৃত্তি মুহূর্তের, প্রকৃতি চিরদিনের। তুমি যে আমার প্রিয়শিষ্য, তার বিশেষ কারণ, তুমি একাধারে আমার শিষ্য ও কথাটা একটু নতুন শোনাচ্ছে। কিন্তু তা বলে কি করা যাবে ? কথাটা যে সত্য ! সত্যকথা ত চিরদিনই নতুন শােনায়। সত্যের ধর্মই ত এই যে, তা কখনও পুরােণো হয় না, কিন্তু মানুষকে তা যুগে যুগে নতুন করে চিনতে হয়। এই নিয়েই ত যত মুস্কিল। সে যাই হােক, গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ যে মনের কারবারে পরস্পরের আদান প্রদানের সম্বন্ধ, এ ব্যাপার এতই প্রত্যক্ষ যে, তা কাউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার দরকার নেই। গুরু যদি হন শুধু বক্তা, আর শিষ্য শুধু শ্রোতা-তাহলে পৃথিবীতে গ্রামােফোনের তুল্য আর দ্বিতীয় গুরু নেই। যদি পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ থাকে যেখানে গুরু কালা আর শিষ বােবা, তাহলে আর যিনিই হন, তুমি আমি সে দেশের লােক নই। কে কার কাছ থেকে মনের খােক কতটা আদায় করতে পারে, এই নিয়ে যেখানে পরস্পরের রেষারেষি জেগে ওঠে, সেইখানেই গুরুশিষের সম্বন্ধ পাকা। তুমি তর্ক করে, প্রতিবাদ করে, আপত্তি জানিয়ে, উপদেশ দিয়ে আমাকে অস্থির করে তােলে,-এই গুণেই ত তুমি আমার প্রিয়শিষ্য। তুমি আমাকে প্রবন্ধ লেখা থেকে ক্ষান্ত হতে অনুরােধ করেছ। এ অনুবােধ আমি আদেশ হিসেবে শিরােধার্য্য করছি। আমার মনেও কিছুকাল হতে প্রবন্ধের প্রতি বিরতি জন্মেছে। তার কারণ ৪. সৰু পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ } প্রবন্ধ জিনিসটে সাহিত্য কিনা, এই নিয়ে আমি এদানিক মাথা বকাচ্ছিলুম, কিন্তু কোনও একটা স্থিরসিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি নি; এমন সময়ে তােমার একটি কথায় আমার সকল দ্বিধা দূর করে দিলে। তুমি লিখেছ—“প্রবন্ধ স্ত্রীলােকে পড়ে না, পড়তে চায় না, পড়তে পারে না এবং পড়লে কাতর হয়ে পড়ে।” এ কথা যে সত্য, তা অস্বীকার করবার জো নেই। প্রবন্ধ জিনিসটি জ্যামিতির প্রতিজ্ঞার ছাঁচে ঢালাই করা; এবং ইউক্লিড আর যারই হন- —স্ত্রীলোকের প্রিয় লেখক নন। ও-জাতির কাছে আসল বস্তুই হচ্ছে ১. E. D.-তার প্রমাণ-প্রয়ােগ যেমন অবান্তর, তেমনি বিরক্তিকর। ভাল কথা, ইউক্লিড সম্বন্ধে সেদিন কোন্ একখানা বইয়ে একটা কথা পড়ছিলুম, যা শুনে তুমি না হেসে থাকতে পারবে । ও ভদ্রলোক স্ত্রীলােকের বেশ ধারণ করে থাকতেন। এর কারণ শুনলে আরও আশ্চর্য হয়ে যাবে। ইউক্লিড ছিলেন মেগারার অধিবাসী। তখন মেগারার সঙ্গে আথেন্সের ঘাের শত্রুতা চলছিল। মেগারার লােকের আথেন্সে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল, সে নিষেধ অমান্য করে কেউ আথেন্সে দেখা দিলে তার প্রাণদণ্ড হত। ইউক্লিড কিন্তু নিজের প্রাণের চাইতে তার গুরু সক্রেটিসের মুখের কথা এত বেশী বহুমুল্য মনে করতেন, যে তিনি মেয়ে সেজে রাত্রিযােগে আথেন্সে যাতায়াত করতেন। তার রূপের গুণে গুণে তার ছদ্মবেশ কখনও ধরা পড়ে নি। এমন অভিসারিকার কথা এ দেশে কেউ কখন পড়েছে, শুনেছে? এর পর তাঁর মন থেকে যে ঐ সব ভীষণ প্রতিজ্ঞা বেরবে তাতে আর আশ্চর্য কি। ইউক্লিড নারীবেশই ধারণ করুন আর যাই করুন, যে লেখার ভিতর ইউক্লিডের রূপ আছে, তা মেয়ে- ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা পত্র ৪৭ ভােলানাে লেখা নয় । অতএব দাঁড়াল এই যে, প্রবন্ধের স্থান- সাহিত্যের না হােক-বাংলা সাহিত্যের বাইরে। তুমি একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছ, সে হচ্ছে এই যে, আমার প্রবন্ধ এদেশের অনেক পুরুষেও পড়ে না, পড়তে চায় না, পড়তে পারে না, এবং পড়লে কাতর হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে প্রবন্ধ কার জন্য লেখা ? তার সন্ধান আমি সম্প্রতি পেয়েছি। কোনও সমালােচক লিখেছেন যে, আমার হাত থেকে যা বেরয় তা হচ্ছে সব “চক্চকে খেলনা”। অর্থাৎ আমার লেখা আসলে ছেলে ভােলানাে। এই সমালােচনাই প্রমাণ যে আমার লেখা সার্থক হয়েছে—কেননা বাংলাদেশে আমার লেখার খােদ্দেরের অভাব হবে না। সে যাই হােক, তােমার কথায় প্রবন্ধ লেখায় না হয় খতম দিলুম- তারপর কি লিখব ? কবিতা ? গদ্যের অসি ছেড়ে পদ্যের বাঁশি ধরব? সাহিত্যের স্কুলে এরকম ডবল-প্রমােশন পেতে কার না লোভ হয়, কিন্তু এ বয়েসেও ও-লােভ যে সম্বরণ করতে না শিখেছে, তার হাত থেকে-অসি বাঁশী ত বড় জিনিস-কলমও কেড়ে নেওয়া উচিত। পঞ্চান্ন বৎসরের লােককেও যে ধরে বেঁধে অসিধারী করা যায়, তার প্রমান ত আজ নানাদেশে পাওয়া-যাচ্ছে। কিন্তু Conscrip. tion-এর সাহায্যে মানুষকে যে বংশীধারী করা যায়, এর প্রমাণ আজও মেলে নি। এর কারণ হিংসা করবার ক্ষমতা বুড়োহাড়েও থাকে, কিন্তু আনন্দ দেবার শক্তি যৌবনেরই সহোদর। দেখাে, কে কি লিখবে তার চেয়ে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে কে কি পড়বে। তুমি কি পড়ে এই গ্রীষ্মের ছুটি কাটাবে, সে বিষয়ে আমার ৪৮ বৈশাখ, ১৩২৫ পরামর্শ চেয়েছে। আমি বলি, যে লেখার রূপ নেই তা তুমি পড়ােনা, হােক না সে লেখা ওজনে ভারি। তুমি যদি রচনার রূপ উপভোেগ করতে শেখাে, তাহলেই তুমি মনোজগতে মুক্তপুরুষ হয়ে যাবে। চণ্ডীদাস বলেছেন- “রজকিণীরূপ কিশােরী স্বরূপ কামগন্ধ নাহি তায়” তার কথা অবলম্বন করে আমি বলছি যে, যে রূপের ভিতর কামগন্ধ নেই, সে রূপের সন্ধান শুধু অর্টে পাওয়া যায়। অবশ্য এ স্থলে “কাম” শব্দ তার কোনও সঙ্কীর্ণ অর্থে বুঝলে চলবে না। রূপ মানুষের কামনার বহির্ভূত, সেই রূপ যে চিনতে শিখেছে, একমাত্র সে-ই রসের স্বরূপের সাক্ষাৎ পায়। বলা বাহুল্য একই লেখা এক- জনের কাছে কামগন্ধে ভুরভুর করতে পারে, কিন্তু আর একতনের কাছে তার ভিতর কামের নামগন্ধও না থাকতে পারে। সেটা নির্ভর করে কার মন কোথায় আছে তার উপর-কামলােকে না রূপলােকে ? কিন্তু যুদ্ধের অবস্থা যে রকম সঙ্গীন হয়ে দাড়াচ্ছে তাতে করে কি লিখব কি পড়ব তার চেয়ে ঢের বেশী ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে এই যে, দেশে আর লেখাপড়া করা চলবে কিনা? এ কথা আমরা সকলেই জানি যে, দেশে যখন মহামারি দেখা দেয়, তখন লােকে পুজো সরস্বতীর করে না, করে রক্ষাকালীর; অর্থাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবার মানুষে সহজ উপায় বার করেছে—মৃত্যুরই উপাসনা করা। আত্মরক্ষার এ প্রচেষ্টা নিরর্থক বলে কোনও লাভ নেই, কেননা, এ চেষ্টার মুলে যা আছে তা হচ্ছে মানুষের প্রতিষ্ঠিত। প্রজ্ঞা নয়,-বিচলিত হৃদয়।

৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা পত্র ৪১ আজ আমাদের পশ্চিম আকাশে রক্তসন্ধ্যা দেখা দিয়েছে। যে সমরানল সমগ্র ইউরােপে ও অর্ধেক এসিয়াতে ব্যাপ্ত হয়ে পড়েছে ; সে আগুন শুনছি আমাদের ঘরেও লাগবার সম্ভাবনা; এবং সে সম্ভাবনাও সুদূর নয়, কেননা যে যুগে বাস্প আর বিদ্যুৎ হয়েছে মানুষের বাহন, সে যুগে ‘দূর’ শব্দের কোনও জানা শােনা মানে নেই। এ সকল দুর্নিমিত্ত দেখে আমরা সকলেই ভীত না হয়ে পড়ি, ত্রস্ত হয়ে উঠেছি। তাদৃশ ভীত না হবার কারণ, আমরা আমাদের চিরকেলে অভ্যাসবশত সাপকে লতা বলে মনকে প্রবােধ দিচ্ছি, যদিচ আমরা সকলেই জানি, লতা বললেও সাপ সাপই থাকে এবং তার কামড়ে মানুষ মরে। আর জৰ্ম্মাণি যে সে সাপ নয়, একেবারে অজগর। এ অবস্থায় আমাদের কি কৰ্ত্তব্য তা বলে দেবার ভার রইল, আমাদের পলিটিকাল নেতাদের হাতে। “যার কৰ্ম্ম তারে সাজে, অন্যলােকে লাঠি বাজে” এ কথা যদি সত্য হয়--এবং এ কথা যে সত্য তা এক পলিটিসিয়ান ছাড়া আর কে অস্বীকার করবে--তাহলে দেশের লােককে তাদের কর্তব্যতা সম্বন্ধে উপদেশ দেওয়া হতে, আমাদের নিরস্ত থাকাই শ্রেয়। কেননা সাহিত্যের কাজ, কাউকে কর্তব্য শেখানাে নয়, সকলকে আনন্দ দেওয়া। এ পর্যন্ত বােধহয় আমরা সকলেই একমত। তারপর প্রশ্ন ওঠে এ অবস্থায় সরস্বতীর সেবকদের পক্ষে কি করা কর্ত্তব্য। প্রথমেই মনে হয় এ সমস্যার সহজ মীমাংসা হচ্ছে সাহিত্যের দোকানপাট তুলে দেওয়া। এই আসন্ন বিপদের দিনে আমরা লিখতে পারি, কিন্তু সে লেখা পড়বে কে? কিন্তু দোয়াত কলমের সংস্রব না হয় আমরা ত্যাগ করলুম, তাই বলে কি দেশশুদ্ধ লােকের পক্ষে পুথির সবুক পর বৈশাখ, ১৩২৫ সংস্পর্শ ত্যাগ করা সঙ্গত হবে ? ঝড় বলো, ভূমিকম্প বলাে, বন্যা বলে, এ সব ব্যাপার অতি ভীষণ হলেও ক্ষণস্থায়ী, আর সাহিত্য অতি সুকুমার হলেও চিরস্থায়ী। সুতরাং দুর্দিনেও তা অপরিহার্য। তবে সুদিনের সাহিত্য ও দুর্দিনের সাহিত্য অবশ্য এক নয়। গেটে বলেন, দেশে যখন মহামারি উপস্থিত হয় তখন লােকের পড়া উচিত টনিক সাহিত্য। এ উপদেশ যখন গেটের তখন, আমাদের সকলকে তা মাথা পেতে নিতে হবে। তবে সাহিত্য সম্বন্ধে “টনিক” বিশেষণের সার্থকতা কি তা আন্দাজ করতে পারলেও দুকথায় বুঝিয়ে বলা অসম্ভব। তবে কোন সাহিত্য যে টনিক নয়, সে কথা বলা তেমন শক্ত নয়। প্রথমত আমাদের চলতি সাহিত্যের কথা ধরা যাক। যে সাহিত্যের দিনে দুবার জন্ম হয়, সংবাদ পত্রের স্তন্তে আর বক্তৃতার মঞ্চে, আর যার নাম পলিটিকাল সাহিত্য, তা অবশ্য মােটেই টনিক নয়। সে সাহিত্যের যে রস, তা আমাদের অলঙ্কার শাস্ত্রের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে রস মিশ্র এবং লােকে বলে তা বিলেতি। করুণ রসের “সােডার” সঙ্গে বীররসের “আসিড মিশিয়ে তা তৈরি করতে হয়। তাই পলিটিকাল সাহিত্য প্রথমত আপাদমস্তক ফেনিল, তার পর সে সাহিত্য উথলে ওঠে অথচ তার ভিতর তাপ নেই, ফেঁাস ফোস করে অথচ তার ভিতর প্রাণ নেই। সে সাহিত্য যে এতটা লােকপ্রিয় তার কারণ, ও ফেন গলাধঃকরণ করবার সময়, ভােত্তার ভিতরটা ক্ষণিকের জন্য চিনচিন করে ওঠে, আর সে মনে করে জিনিসটা ভয়ঙ্কর অগ্নিবর্ধক। বলা বাহুল্য ও ধারণা একটা ভ্রান্তি মাত্র। অথচ আমাদের রাজনীতি, দেশের মনের অগ্নিমান্দ্যের অন্য ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা কোনও টনিক অদ্যাবধি তৈরি করতে পারে নি। ও সাহিত্যের যা কিছু হেরফের সে শুধু ঐ দুই বস্তুর মাত্রা নিয়ে। আমাদের পলিটি- কসের যে দুদল হয়েছে তার কারণ এদের এক দলের সাহিত্যে সােডার ভাগ বেশী, আর এক দলের সাহিত্যে আসিডের। আজকের দিনে এ সাহিত্য যে রূপধারণ করেছে তাতে মানুষকে চাঙ্গা করা দূরে থাক, দ্বিগুণ দমিয়ে দেয়। এই রক্ত-সন্ধ্যার করাল আলােকে আমাদের সকল অক্ষমতা, সকল দৈন্য, আরও বেশী করে ফুটে উঠছে। অমনি আমাদের পলিটিকাল সাহিত্য, আমাদের দুরবস্থার ছবি নৈরাশ্যের কালীতে একে সকলের চোখের সুমুখে ধরে দিচ্ছে। আমাদের ইতিহাস যদি অন্যরূপ হত তাহলে আমরা যে অন্যরূপ হতে পারতুম, এই কথাটা নানাসুরে নানাছদে বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা অন্যরূপ হলে যে আমাদের ইতিহাস অন্যরূপ হতে পারত, এমন কি এখনও হতে পারে, এ কথাটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। ইতিহাস যে মানুষ গড়ে তা আমরা সকলেই জানি,—কিন্তু আমাদের এটাও জানা উচিত যে মানুষেও ইতিহাস গড়ে। এ সত্য যদি আমরা উপেক্ষা না করতুম, তাহলে ইতিহাস আমাদের গড়ত না, আমরা ইতিহাস গড়হুম। মানুষের জীবন কতক অংশে অদৃষ্ট ও কতক অংশে পুরুষকারের অধীন। যে সাহিত্য পুরুষকারের গুণ গায় তাই টনিক, আর যা অদৃষ্টের দোষ দেয় তাই আন্টি-টনিক। সুতরাং টনিক সাহিত্যের সন্ধানে আমাদের বর্তমানের দৈনিক সাহিত্যের বাইরে যেতে হবে। এবং আমরা ভারতবর্ষের অতীতের যত দূরদেশে যাব, তত বেশী টনিক সাহিত্যের সাক্ষাৎ পাব। বৈদিক সাহিত্যের সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচয় নেই, কিন্তু সে বৈশাখ, ১৩২ সাহিত্যের যে দুটি একটি বাণী আমার কানে এসে পৌচেছে তার তুল্য টনিক কথা ভূভারতে আর নেই। গায়ত্রী মন্ত্রের মত, আত্মার বল- কারক মন্ত্র বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ। ওর ভিতর কোনও রূপ ভিক্ষা, প্রার্থনা, দরবার, কিম্বা আবদারের নামমাত্র নেই। মানুষের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বরেণ্য বস্তু যে আলােক, বাইরের এবং ভিতরের, এ সত্য যদি আমরা বিস্মৃত না হতুম তাহলে আমাদের এ দুর্দশা হত । তার পর প্রাচীন যুগের আগাগােড়া সংস্কৃত সাহিত্য টনিক, তা সে ধর্মশাস্ত্রই হােক আর মােক্ষশাস্ত্রই হােক। গীতা যে, ক্ষুদ্র হৃদয় দৌর্বল্যের প্রশ্রয় দেয় না—তা সকলেই জানেন। মনুও যে দেন , তার পরিচয় মনুসংহিতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে দেখতে পাবেন। সেকালে যিনি বাণপ্রস্থ অবলম্বন করুতেন তাঁর মহাপ্রস্থানের দুঃসাহিসকতার কথা কল্পনা করতেও আমাদের রােমাঞ্চ হয়। এমন কি, সংস্কৃত কামশাস্ত্রে যে কামের চর্চার কথা আছে তা করতে পারে শুধু সেই লােক - যার হৃদয় পাষাণে আর দেহ ইস্পাতে গড়া। ও সাহিত্য অবশ্য টনিক নয়, একেবারে বিষবড়ি ! হয়ত অনেকে বলবেন, এ সব শাস্ত্র সাহিত্যই নয়। তথাস্তু । অতঃপর সাহিত্যেই আসা যাক। মহাভারত যে টনিক এ বিষয়ে বােধহয় দ্বিমত নেই। রামায়ণ অবশ্য মহাভারতের সমশ্রেণীর কাব্য নয়। এ কাব্য আৰ্য্য- সভ্যতার সঙ্গে অনাৰ্য্য সভ্যতার সংঘর্ষের কাহিণী। এই সংঘর্ষে অবশ্য আৰ্যসভ্যতাই জয়ী হয়েছিল, কিন্তু এ কাব্যের অন্তরে উত্তরাপথের টনিক সভ্যতার সঙ্গে দক্ষিণাপথের অটনিক সভ্যতার স্পর্শের প্রথম ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা পত্র পরিচয় পাওয়া যায়। সংস্কৃত সাহিত্যে এই সূত্রে sentimentalism প্রবেশ লাভ করে। ইতিহাস ছেড়ে দিয়ে যথার্থ কাব্যের রাজ্যে এলেও আমরা ঐ একই সত্যের পরিচয় পাই যে—সংস্কৃত কাব্য যত প্রাচীন তত টনিক, এবং যত অর্বাচীন তত অস্বাস্থ্যকর। ভাসের নাটকের সঙ্গে জয়দেবের পদাবলীর তুলনা করলে এ সত্য সকলের কাছেই প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবে। সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিমধ্যের ইতিহাস এই অধঃপতনের ইতিহাস। যুগের পর যুগে তার দুর্বলতা যে উত্তরােত্তর বেড়েই চলেছে, একই শ্রেণীর পূৰ্বাপর কাব্যের তুলনা করলে তার প্রমাণ অসংখ্য পাওয়া যায়। শকুন্তলার রসের সঙ্গে উত্তররাম চরিতের রসের সেই প্রভেদ, হৃদয়ের রক্তের সঙ্গে চোখের জলের যে প্রভেদ। অমরুশতক মকরধ্বজ কি জানি নে—কিন্তু ভর্তৃহরির শতকের প্রতি শ্লোক যে staychnine- এর পিল তাতে আর সন্দেহ নেই। এক কথায় মন্দাকিনীর জল টনিক, ভোগবতীর নয়। আর সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীন কাব্যের সঙ্গে অর্বাচীন কাব্যের সেই প্রভেদ, মন্দাকিনীর সঙ্গে ভােগবতীর যে প্রভেদ। আমার কথা ভুল বুঝোনা। আমি এ কথা বলতে চাইনে যে, যে লেখা টনিক নয় তা সাহিত্য নয়। তাহলে ত বাংলা ভাষার বারো আনা লেখা সাহিত্যের বাইরে পড়ে যায়। আমার বক্তব্য এই যে, যে সাহিত্য টনিক নয়—মহামারীর প্রকোপের ভিতর তার পঠন পাঠন সমীচীন নয় ; অবশ্য যদি গেটের মত আমরা মান্য করি। আমি নিজে যে ও মত সম্পূর্ণ গ্রাহ করি নে, তার প্রমাণ, যুদ্ধের নাম শোনবামাত্রই, প্রথম কথা যা আমার মনে পড়ে গেল, সে হচ্ছে সবুজ পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম। এই যে মানব সভ্যতার শেষ কথা তা আমি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি। এই বিরাট হত্যাকাণ্ডেও আমার এ বিশ্বাস টলাতে পারে নি, কেননা এ ব্যাপার এই সত্যেরই প্রমাণ দিচ্ছে যে, মানুষ আজও তার পূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করে নি। নর সংস্কৃত-বানর কিম্বা বানর নরের অপভ্রংশ এ নিয়ে জীবতত্ত্ববিদদের মধ্যে আজও তর্ক চলছে। তাত্ত্বিক ও তার্কিকদের কথা ছেড়ে দিলেও আমরা সাদা চোখে স্পষ্ট দেখতে পাই, মানুষেও মর্কটে আকৃতিগত ও প্রকৃতিগত যথেষ্ট মিল আছে। মর্কটের ভিতর মনুষ্যত্ব আছে কি না জানি নে— কিন্তু মানুষের ভিতর যে মর্কটত্ব আছে তা অস্বীকার করবার জো নেই। মানুষে মানুষে যা প্রভেদ, সে হচ্ছে প্রধানত এই মনুষ্যত্ব ও মর্কটত্বের অনুপাত নিয়ে। “অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম” এ হচ্ছে পূর্ণ মনুষ্যত্বের বাণী, অতএব আমাদের অন্তর্নিহিত মর্কট সে বাণীকে অবজ্ঞা করে’ উপহাস করে বলে, ও হচ্ছে দুর্বলের ধর্ম। এ অভিযােগ যে মিথ্যা তার প্রমাণ, যে যুগে ভারতবর্ষ এই ধৰ্ম্ম অঙ্গীকার করেছিল সেই হচ্ছে ভারতবর্ষের অপূর্ব শক্তির যুগ। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিল্পে কলায়, সাম্রাজ্যে ও বাণিজ্যে ভারতবর্ষের বৌদ্ধযুগের কৃতিত্বের আর তুলনা নেই। তার কারণ, শুধু রণক্ষেত্রে নয়, জীবনের সকলক্ষেত্রে যারা বীর তারা ছাড়া আর কেউ ও ধর্ম যথার্থ গ্রহণ ও পালন করূতে পারে না। কেননা ও ধৰ্ম্ম অনুসরণ করবার ভিতর যে বীরত্ব, তা ক্ষণিকের নয় চিরজীবনের। সে বীর্যের অন্তরে অগাধ করুণা আর অটল ধৈৰ্য্য সমান থাকা চাই বৌদ্ধধর্ম যে বীরের ধর্ম, সে জ্ঞান আদি বৌদ্ধদের পূর্ণমাত্রায় ছিল সেইজন্যে তাদের কথা-সাহিত্যের নাম “অবদান” অর্থাৎ বীর কাহিনী ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা পত্র এ সাহিত্য আমি পূৰ্বে কখনও শ্রদ্ধাভরে পড়ি নি,কেননা জাতকমালার সঙ্গে যৎসামান্য পরিচয় থেকে আমার মনে একটা ধারণা জমেছিল যে ও হচ্ছে ছােটছেলের সাহিত্য। কিন্তু সেই জাতকমাল। সে দিন আবার পড়তে গিয়ে তার ভিতর এক মহাবস্তুর সাক্ষাৎ লাভ করেছি, সে হচ্ছে মানুষের আত্মনির্ভরতার মহত্ব। বৌদ্ধযুগ যে শক্তির যুগ, তার কারণ বৌদ্ধ-ধৰ্ম্ম মানুষকে তার আত্মশক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করূতে শিখিয়েছিল। শাক্যসিংহ যে, মানুষের হাতেগড়া মানুষের পায়ের বেড়ি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তাদের হাতের কড়া ও খুলে দিয়েছিলেন তার ধর্মপুত্রের দেবতার কাছেও হাতজোড় করতেন না। তাদের চিরনির্ভর মূল ছিল, নিজের ধর্ম বল ও নিজের কৰ্ম্মবল। তুমি ভাবছ আমি আজ কি একটা খেয়ালের মাথায় বৌদ্ধদের আকাশে তুলে দিচ্ছি। এ সব যে আমার কল্পনা নয় তার প্রমাণ স্বরূপ তােমাকে সংক্ষেপে সুপারগ জাতকের গল্পটি বলছি। পুরাকালে ভারতবর্ষে একটি মহাসত্ব পরমনিপুমতি নৌ-সারথি ছিলেন। তার যাত্রাসিদ্ধির গুণে লােকসমাজে তিনি সুপারগ নামে প্রসিদ্ধ হন। কোনও এক সময়ে কোনও এক সময়ে সুবর্ণভূমির বণিকগণ সাগরপারে যাবার সংকল্প করে সুপারগের দ্বারস্থ হন। বার্ধক্যবশত তখন তার দেহ জরাশিথিল হয়ে পড়েছিল, দৃষ্টিক্ষীণ হয়ে এসেছিল, স্মৃতিশক্তির হ্রাস হয়েছিল, বলে’ প্রথমে তিনি মহাসমুদ্র যাত্রা করতে স্বীকৃত হন নি; নিজের জীবনের ভয়ে নয়, যাত্রীর বিপদ আশঙ্কা করে। বণিক- গণের নিবন্ধাতিশয্য অতিক্রম করতে না পেরে অবশেষে তিনি ভরুকচ্ছ হতে মহাসমুদ্র যাত্রা করলেন। দিনটা ভালয় ভালয় কেটে গেল, সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে উঠল প্রচণ্ড ঝড়। সে ঝড়ের বর্ণনা এত সুন্দর বৈশাখ, ১৩২৫ যে তা অনুবাদ করবার লােভ সম্বরণ করা কঠিন কিন্তু এখন তার সময় নেই। সে বর্ণনা তুমি জাতকমালায় পড়ে দেখাে। এই ঝড়ের মধ্যে সাংঘাত্রিকেরা কে কি করলেন শােনাে- “নিজ নিজ সত্ত্বগুণ অনুসারে কেউ বা বাসদীন হয়ে পড়ল, কেউ বা বিষাদমুক, কেউ বা স্বদেবতার নিকট প্রাণ যাচ্চা করূতে লাগল, কেউ বা ধীরভাবে অবস্থিতি করতে লাগল, কেউ বা প্রতিকারের চেষ্টায় ব্যাপৃত হল।” তখন যারা ভয়বিষাদে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল সুপারগ তাদের সম্বােধন করে বললেন- * যায় মহাসমুদ্রে অবতরণ করে তাদের কাছে এইরূপ ঔৎপাতিকক্ষোভ পরিক্লেশ মোটেই অাশ্চৰ্যজনক ঘটনা নয় ;-অএব তােমরা বৃথা বিষাদকে আশ্রয় করে না। বিষাদ, বিপদের প্রতিকারবিধি নয়—সুতরাং দীনচেতা হওয়ায় কোনও লাভ নেই। যারা ধীর কেবলমাত্র তারাই কাৰ্য্যউদ্ধারে দক্ষ, কেন না তারা কৃচ্ছসাধনের দ্বারা কৃচ্ছ অবস্থা হতে উদ্ধারলাভ করে। তােমরা সকলে বিষাদ দৈন্ত পরিহার করে এ বিপদ হতে যাতে উদ্ধার পাওয়া যায় সেই সকল কার্যে হস্তক্ষেপ করাে। যে প্রাজ্ঞ তার ধৈৰ্যজ্বলিত তেজ সৰ্বার্থসিদ্ধি- লাভে অগ্ৰহন্ত। ঝড় কিন্তু উত্তরােত্তর প্রচণ্ড হতে প্রচণ্ডতর হয়ে উঠল শেষে যখন সকলে প্রাণের আশা ত্যাগ করূতে বাধ্য হল তখন সাংঘাত্রিকেরা “কেউ বা রােদন করতে লাগল, কেউ বা কখন বিলাপ, কখন চিৎকার করতে লাগল, কেউ বা ভয়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে জড় পদার্থের মত অবস্থিতি করতে লাগল, কেউ বা ভয়কাতরচিত্তে ইন্দ্রকে প্রণাম করতে লাগল, কেউ বা আদিত্যকে কেউ বা বস্তুকে কেউ বা বায়ুকে কেউ বা সমুদ্রকে। কেউ বা মন্ত্র জপ করুতে প্রবৃত্ত হ’লঅপর অনেকে বিচিত্র আকারে বিধিমত প্রকারে ৫ বৰ, প্রথম সং প দেবীকে প্রণাম করতে লাগল। কেউ বা সুপারগের নিকট উপস্থিত হয়ে তার কাছে আক্ষেপ কতে লাগল।” এই ব্যাপার দেখে সুপারগ সাংঘাত্রিকদের সম্বােধন করে বললেন “তােমরা মুহুর্তের জন্য ধৈর্য্য ধরে থাকো উদ্ধারের একটা উপায়ের কথা আমার মনে হয়েছে।” এই বলে তিনি দক্ষিণ জানু নৌকাবক্ষে স্থাপন করে নৌকাকে প্রণাম করে এই শ্লোক উচ্চারণ করলেন- “আমি আমার আত্মাকে যতই স্মরণ করছি, ততই আমার স্মরণ হচ্ছে যে যত দিন থেকে আমার জ্ঞান হয়েছে, আমি কখনও প্রাণীহিংসার চিন্তাও মনের মধ্যে স্থান দিই নি। এই সত্যবাক্যবলে ও আমার সেই পুণ্যের বলে এই নৌকা বড়বার মুখহতে প্রতিনিবৃত্ত হউক। অমনি বায়ুর বেগ মন্দীভূত হল, নৌকা বড়বার মুখ হতে প্রতি- নিবৃত্ত হয়ে, মহাসমুদ্রের বক্ষে, নির্মল আকাশে রাজহংসীর মত শোভা পেতে লাগল। সাহিত্য এর চাইতে আর কত বেশী টনিক হতে পারে ? এই যুদ্ধের ঝড় যদি ভারতবর্ষের ঘাড়ে এসে পড়ে, তাহলে ভারতবাসীদের অবস্থা যে ঐ সাংঘাত্রিকদের মতই হবে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, আমাদের কপালে অমন সুপারগ মিলবে কি না? আজ এইখানেই শেষ করি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। ২৬শে এপ্রিল ১৯১৮ বীরবল।

দেশের কথা। গত বৎসরের সর্বপ্রধান রাজনৈতিক ঘটনা হচ্ছে, মন্টেগু সাহেবের ভারতবর্ষে পদার্পণ। তাঁর আগমনে, আমাদের পলিটিকাল আত্মা যে কি রকম উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে আমাদের শিক্ষিত সমাজের অতিমাত্র চঞ্চলতায় ও মুখরতায়। কিন্তু আজ যখন সােরগােল মাতামাতি অনেকটা কমে এসেছে, তখন একটু ধীরভাবে ভেবে দেখা যাক ব্যাপারটা হ’ল কি। মন্টেগু সাহেব এসেছিলেন বােধহয় আমাদের পলিটিকাল জ্ঞান এগজামিন করবার জন্যে। তিনি আমাদের কাছে থেকে তার প্রশ্নের লিখিত জবাব আর মুখের জবাব, দুইই নিয়েছেন। শুনতে পাই vivaতে আমাদের অধিকাংশ নেতাই একদম ফেল করেছেন—কিন্তু লিখিত জবাবে সকলেই ফার্স্টক্লাস পাস করেছেন। Problem কষতে আমাদের তুল্য আর কে আছে তা সে জ্যামিতিরই হােক আর রাজনীতিরই হােক। কিন্তু আমার বিশ্বাস যে এ পরীক্ষায় জবাবগুলি সব যদি একত্র করে ছাপানাে যায়, তাহলে এমন একখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হবে, যা পড়ে আমরা চিরজীবন হাতে পাব ; এক কথায় ও গ্রন্থ হবে নব-ভারতবর্ষের নবকথা সরিৎসাগর। সে যাই হােক, মন্টেগু সাহেবের আগমনের একটা মস্ত সুফল ফলেছে। আমরা আমাদের পলিটিকাল দাবীর আরজি প্রস্তুত করতে ৫ম ব, প্রথম সংখ্যা দেশের কথা বাধ্য হবার দরুণ, আমাদের নিতান্ত অস্পষ্ট পলিটিকাল মনােভাবকে স্পষ্ট করতে বাধ্য হয়েছি। এ একটি মহালাভ। আমরা জানি সকলেই জানি যে, আমাদের পলিটিক্সের নানা দলের কে কি চা। এর ভিতর থেকে একটি খুব মােটা সত্য বেরিয়ে পড়েছে, সে হচ্ছে- স্বরজি শব্দের অর্থ বাংলা একভাবে বোঝে, আর বাকি ভারতবর্ষ আর একভাবে বােঝে ;—অবশ্য যদি ধরে নেওয়া যায় যে অন্য প্রদেশের পলিটিকাল নেতারা স্ব স্ব প্রদেশের যথার্থ মুখপাত্র। বাঙ্গালীর সঙ্গে বাকি ভারতবাসীদের এ বিষয়ে মনের অমিল এতটা বেশী যে, অমিলের মুল কোথায় তা একটু তলিয়ে দেখবার চেষ্টা করা কর্তব্য। আমাদের স্বরাজ হচ্ছে ইংরাজি self-governmentএর ভাষায় অনুবাদ, অতএব-home-rule এরও অনুবাদ-কেন না ও দুই একই বস্তু, তফাৎ যা তা ভাষায়। একটির ভাষা সাধু, আর একটি অসাধু। এ কথা শুনে অবশ্য শুনে অবশ্য ও দুই দলই প্রতিবাদ করে উঠবেন। তারা বলবেন, ও দুই সমাসের আভিধানিক অর্থ এক হলেও, ব্যঞ্জনার প্রভেদ ঢের। কিন্তু এ দুই পক্ষের প্রতি নজর দিলেই দেখা যায় যে উভয়ের প্রভেদ, ব্যঞ্জনার নয়—ব্যক্তির। তথাপি স্বরাজ অর্থে যে ভারতবর্ষের নানাদেশে, নানাদিলে, নানালােকে নানা বস্তু বোঝে, তার দেদার দলিল মন্টেগু সাহেবের সেরেস্তায় পাওয়া যাবে। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, আমাদের প্রতি দলের পকেটে এক একটি নিজস্ব মনগড়া স্বরাজ আছে; অথবা সকলের মুখে ও পদ থাকলেও, কারও মনে ও পদার্থ নেই। বোধহয় এই কারণে শেষটা পত কংগ্রেসে সকল এদেশের সকল নেতা এক হয়ে কংগ্রেস-লীগের মুসাবিদা গ্রাহ করেছেন। এ কথা সবাই জানেন। কিন্তু এ কথা হয়ত সবাই জানেন না যে, সৰু পত্র বৈশাখ, ১৩২৫ এ ব্যাপারে একমাত্র প্রতিবাদী হয়েছিল বাংলা। কংগ্রেসের গ্রীনরুমে যদের প্রবেশাধিকার আছে তারাই জানেন যে, সেখানে কোনও বাঙ্গালী, কংগ্রেস লীগের দুহাতে গড়া স্বরাজ মাথা পেতে নিতে পারেন নি ; কেননা তা গ্রাহ করে নেবার কোনও বৈধ কারণ নেই। স্বরাজের প্রথম অরিজি বড়লাট সভার উনিশ জন দেশীসভ্য দস্তখত করে ভারত- গভর্ণমেন্টের নিকট পেশ করেন। সে আরজি অবশ্য একটা খসড়া বই আর কিছুই নয়, কেননা সে আরজি রাতারাতি তৈরি করতে হয়েছিল, সবদিক ভেবেচিন্তে একটা পাকা দলিল তৈরি করবার তাদের অবসর ছিল না ; অন্ততঃ এই ত তাদের কৈফিয়ৎ। সেই খসড়াই একটু আধটু বদলসদল করে নিয়ে কংগ্রেস-লীগ আত্মসাৎ করেছেন। সুতরাং এ দুয়ের প্রভেদ যা, তা উনিশ বিশ। অথচ কংগ্রেস এই জিনিসই শিরোধার্য করে নিলেন, ; শুধু তাই নয়, আমাদের বােঝাতে চেষ্টা করলেন যে এমনটি আর হয় নি, হবে না, হতে পারে না। সূত্রে শ্রীযুক্ত বাল গঙ্গাধর তিলক রাজনৈতিক দর্শনের একটি নুতন তত্ব আমাদের শিক্ষা দেবার প্রয়াস পেয়েছিলেন। তিনি কংগ্রেসের উচ্চমঞ্চে দাঁড়িয়ে ঝাড়া একঘণ্টা ধরে আমাদের মনে এই কথা বসিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন যে,-মানুষে যখন তার বাসগৃহ তৈরি করে, তখন সে গৃহ ভিৎ থেকে গেঁথে তুলতে হয়; কিন্তু কোনও জাতি যখন তার বাসগৃহ তৈরি করতে চায়, তখন সে গৃহ ছাদ থেকে গেঁথে নামাতে হয়। আমাদের পলিটিকাল আগা গােড়াতে অত উচ্চ না হলেও ক্ষতি নেই। অপর কোনও ক্ষেত্রে অপর কোনও ব্যক্তি এ রকম কথা বললে আমরা তা রসিকতা মনে করতে পারতুম। কিন্তু এ রসিকতা নয় -এ হচ্ছে সেকেলে পলিটিক্‌সের একটা মােটা কথা;

৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা দেশের কথা আছে ; এর অর্থ হচ্ছে শাসনতন্ত্র জাতির পক্ষে নিজে গড়ে তােলবার জিনিস নয়, কিন্তু উপর থেকে তার মাথায় চাপিয়ে দেবার জিনিস। রাজনীতির এ আদর্শ বাঙ্গালী গ্রাহ্য করতে পারে না কেননা না তা তার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। বাঙ্গালীর কাছে ন্যাশনালিজমের অর্থ হচ্ছে জাতির স্বধৰ্ম্মের চর্চা, এবং সেই শাসনতন্ত্রই ঈপিত ও বরণীয়, যার অন্তরে একটি বিশেষ জাতির স্বধৰ্ম্ম পুর্ণবিকশিত হয়ে ওঠবার পূর্ণ অবসর পায়। অতএব প্রতি দেশের স্বাধীন স্বাতন্ত্রই তার শাসনালিজমের অটল ভিত্তি। দেশের মত বলে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব নেই, কিন্তু জাতির মতি বলে একটি জিনিস আছে। এক একটা জাতির মনের এক একটা বিশেষ গতি এবং সে গতির এক একটা বিশেষ লক্ষ্য আছে। বাঙ্গালী জাতির মতির পরিচয়, রামমােহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলার যত মহাপুরুষদের কথায় ও কাজে পাওয়া যাবে। স্বাধীনতা শব্দের অর্থ আমাদের কাছে কেবলমাত্র রাজনীতিগত নয়- কিন্তু তার চাইতে ঢের বেশী উদার, ঢের বেশী ব্যাপক। আমরা জীবনে ও মনে সমান মুক্তির প্রয়াসী। তাই আমাদের রাজনীতি আমাদের জীবনবেদের বহির্ভুত নয়, অন্তভূত,-এবং একাংশ মাত্র। বাঙ্গালীদের কাছে একটা বিশেষরকম শাসনতন্ত্র জাতীয় জীবনের কৃতার্থতার লক্ষ্য নয়, উপায় মাত্র। কিন্তু কংগ্রেস ও লীগ আপােষ মীমাংসা করে, জোড়াতাড়া দিয়ে, যে স্বরাজের আদর্শ খাড়া করলেন, তাতে প্রতি প্রদেশের প্রতি জাতির স্ব-বস্তুটি চাপা পড়ে গেল। এতে পলিটিকাল বুদ্ধিরই যে কি পরিচয় দেওয়া হল, তাও বােঝা কঠিন। এ সত্যও কি সুস্পষ্ট নয় যে, গােটা ভারতবর্ষের যুক্তরাজ্য প্রতি প্রদেশের স্বাধীন স্বাতন্ত্রের উপরেই সুপ্রতিষ্ঠিত সব পরে বৈশাখ, ১৩২৫ হবে, এবং অন্য কোনও উপায়ে হবে না। অথচ বাংলার সকল নেতাই ঐ অদ্ভুত রায়ে সায় দিলেন ও সই দিলেন। এর পরেও লােকে বলে বাঙ্গালীর discipline এর জ্ঞান নেই। বাঙ্গালী নেতারা অপর প্রদেশের নেতাদের দ্বারা যত সহজে নীত হন, এমন আর কেউ হয় না। বাঙ্গালীর আশার কথা এই যে, তারা জাতি হিসাবে সহজে কারও দ্বারা নীত হয় না। আমার বিশ্বাস আমার এ কথায় সকল বাঙ্গালীই সায় দেবেন যে, অামাদের ঘর আমরা নিজহাতে নীচে থেকেই গেঁথে তুলতে চাই, উপর থেকে গেঁথে নামাতে চাই নে। আশা করি, আমাদের নেতারা এই সত্য মনে রাখবেন যে, যেখানে গোড়ায় মিল নেই, সেখানে গোঁজা মিলন দিয়ে কোনও লাভ নেই, শেষটা ভুগতেই হবে। নিজের ideal ভ্রষ্ট হলেই মানুষের সকল কাৰ্য্য নষ্ট হয়, কেননা ideal-এর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ তার আত্মশক্তি হারায়। ( ২ ) আমি আগে এক সময় বলেছি যে, আমাদের স্বরাজ লাভের কথা শুধু ঘরের কথা নয়—বাইরেরও কথা, এবং তা যতটা না ঘরের কথা তার চাইতে ঢের বেশী বাইরের কথা। দেখা যাক এ কথাটা সত্য কি না। যে সাত লাভের জন্য শিক্ষিই ভারতবাসী আজ লালায়িত সে স্বরাজ যে ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূত ও অঙ্গীভূত হবে—এ কথা ত সৰ্ববাদীসন্মত। এছাড়া অপর কোনরূপ স্বরাজের আমরা কল্পনাও ৫ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা দেশের কথা করতে পারি নে ; যদি কেউ পারেন, তাহলে তার কল্পনাশক্তি কোনরূপ জ্ঞানের দ্বারা সংযত বা বুদ্ধির দ্বারা নিয়মিত নয়। যার কাছে স্বরাজ্য ও স্বপ্নরাজ্য একই বস্তু তার সঙ্গে বাক্যব্যয় করা বৃথা। অতএব, এ কথা নির্ভয়ে বলা যেতে পারে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের উপরেই নির্ভর করবে, এবং সে ভবিষ্যৎ বর্তমান যুদ্ধের ফলাফলের উপরেই নির্ভর করছে। এক কথায়, পৃথিবী জুড়ে যে মহানাটকের অভিনয় হচ্ছে-আমরা এই তিন চার বছর ধরে তারই একটি ক্ষুদ্র গর্ভাঙ্ক অভিনয় করে আসছি, এবং সেই নাটকের যবনিক না পড়া পর্যন্ত আমাদের অভিনয়ের সার্থকতা আমরা টের পাব না। এই মহানাটকের শেষাঙ্ক এই দেশে অভিনীত হবারও শুনছি একটা সম্ভাবনা ঘটেছে। সুতরাং এ যুদ্ধের ভিতরকার কথাটা আবার তোলা যাক। গত চল্লিশ বৎসরের জৰ্ম্মাণ মতিগতির সঙ্গে যার কিছুমাত্র পরিচয় আছে তিনিই জানেন যে, বিশ্বমানবের উপর প্রভুত্ব লাভ করাই হচ্ছে Imperial Germany-র রাজনীতির উদ্দেশ্য, এবং তার রণনীতি হচ্ছে সেই উদ্দেশ্যসাধনের উপায় । বৰ্তমান জৰ্ম্মাণ দর্শন এই রাজনীতির উত্তরসাধক, এবং অৰ্মাণ বিজ্ঞান এই রণনীতির ক্রীতদাস। কথায়, এ যুদ্ধ সকল জাতির ন্যাসনলিজিমের বিরুদ্ধে জৰ্ম্মাণ ইম্পিরিয়া- লিজমের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যদি জৰ্ম্মাণী জয়লাভ করে, তাহলে পৃথিবী হতে আসনলজিমের নাম পর্যন্ত লােপ পাবে, এবং যে স্বরাজের দিকে আমরা দেশসুদ্ধ লােক হাত বাড়িয়েছি, এবং যা আশু আমাদের হাতে আসবার সম্ভাবনা আছে তা গন্ধর্বপুরীর মত এক নিমেষে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। এ কথা আমি আমার জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি A

বৈশাখ, ১৩৫
বলে,-আমার মতে আমাদের সকলকে সকলরকম দ্বিধা সঙ্কোচ ত্যাগ
করে স্বদেশরক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। একমাত্র কামনার বলে স্বরাজ
লাভ করা যায় না,-তার পিছনে থাকা চাই জাতির মহৎ কর্মফল।
আমাদের শাস্ত্রে বলে, স্বর্গরাজ্যের ভােগের মেয়াদ—মানুষের পূৰ্ব্বা-
জ্জিত পুণ্যের উপর নির্ভর করে। স্বরাজলাভ আর স্বদেশরক্ষা
যে একই বস্তুর এ পিঠ ও পিঠ, এ কথা সকলেই স্বীকার করেন;
তবে তার কোনটি সদর আর কোনটি
মফঃস্বল, এই নিয়ে দেখতে পাচ্ছি
মতভেদ আছে। এর কোনটি আগে কোনটি পরে, এই নিয়ে
আমাদের পলিটিকাল দলে এমন একটা তর্ক বেধেছে, যার ফলে
ভ্রাতৃবিরোধ, বন্ধু-বিচ্ছে, গুরুশিষ্যে মনান্তর প্রভৃতি
প্রভৃতি ঘটবার
উপক্রম হয়েছে। বীজ আগে না বৃক্ষ আগে, তৈলাধার পাত্র না
পত্ৰাধার তৈল, এ সব শ্যায়ের তর্কে যে বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া হয় না,
এমন কথা আমি বলি নে। ওরও সময় আছে, কিন্তু আজকের দিন
সে সময় নয়। কাল হয়ত আমাদের জাতীয় শক্তির পরিচয় দিতে
হবে, এবং সে পরীক্ষার জন্য আজ আমাদের, অন্ততঃ মনে প্রস্তুত
হওয়া উচিত।
}
১লা মে ১৯১৮।
শ্রীপ্রমথ চৌধুরী।

বাঙ্গালীর শিক্ষা। ( ১ ) কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতির গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য সরকারী কমিশন বসিয়াছে। সাগরপার হইতে গুণী জ্ঞানী সত্যের আসিয়া মন্ত্রণা সভায় বসিয়াছেন। লর্ভকর্জনের তৈরী কাঠামের উপর আমাদের বিশ্মবিদ্যালয়ের বর্তমান মুর্তিটী, অনেকটা যার নিজের হাতে গড়া, সাগরের এ পারের লােক হইলেও ঐ সভায় তাহাকেও স্থান দেওয়া হইয়াছে। এবং দুই কোটী বাঙ্গালী মুসলমানের স্বার্থের হিসাবে কোন ভুলচুক না হয়, তাহার দৃষ্টির জন্য আলিগড় হইতে উচ্চ গণিতজ্ঞ মুসলমান পণ্ডিত সভাসদ হইয়া আসিয়াছেন। আশা ও আশঙ্কায় শিক্ষিত বাঙ্গালীর মন অনেকটা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। এই সুযোগে বাঙ্গালীর শিক্ষার দু একটা মােটা সমস্যার আলোচনা করা যাক। কি প্রাচীন কি আধুনিক সমস্ত সভ্য সমাজেই শিক্ষা ব্যাপারটা লইয়া নানা রকম সমস্যা উঠিয়াছে। শিক্ষার লক্ষ্য কি হওয়া উচিত, আর সে লক্ষ্যে পৌঁছিবার সুব্যবস্থাই বা কি এ দুই বিষয়েই যথেষ্ট মত ভেদ আছে। এবৎ দুইটী রাশিই যদি অব্যবস্থত হয়, তবে তাহাদের সমবায়ে কেমন জটিল বৈচিত্রের সৃষ্টি হয়, তাহা গণিতের সাহায্য ব্যতীতও সহলেই বােঝা যায়। আর এ বিষয়ে মতভেদ ও অতি সং পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ • স্বাভাবিক; বরং মতের প্রকার ভেদ কিছু কম হইলেই বিস্ময়ের কারণ হইত। একে তাে শিক্ষা জিনিসটী, তা তার প্রণালী সে রকমই হােক, অনেকটাই অজানা মাটিতে বীজ ছড়াইয়া ফসলের আশায় বসিয়া থাকার মত। কোন জমিতে যে কেমন বীজে কোন ফল ফলিবে তাহ পূর্ব হইতে নিশ্চয় জানিবার উপায় নাই। যে পথে চলিয়া বৈদ্য চিকিৎসক হয় বসিয়া নিন্দুক লোকে রটায়, সেই ঠেকিয়া শেখার পথটা এখানে অনেকটা সঙ্কীর্ণ, কেননা এক জমিতে দুইবার বীজ বুনিবার উপায় নাই। এবং শিক্ষার তত্ত্ব ও শিষ্যের মনস্তত্ব সম্বন্ধে প্রচুর পুথি ও পাণ্ডিত্য থাকা স্বত্বেও, যে-মন লইয়া শিক্ষককে কাজ করিতে হয়, কোনও বৈজ্ঞানিক আচার্যের যন্ত্রের মধ্যে তাহা ধরা দেয় না। সমস্ত মনস্তত্বই সাধারণ মনের তত্ত্ব, অর্থাৎ যে মন কল্পনায় আছে কিন্তু বস্তুগত্যা নাই। আর শিক্ষকের কারবার হইল বিশেষ মনকে লইয়া, যাহা এই নিয়মের জগতে প্রায় খাপছাড়া অনিয়ম, যাহার বিকাশ ও বিকারের রীতি দর্শন শাস্ত্রের ভাষায় গুহাস্থিত ও দুয়ে। সেই জন্য দেখা যায় অতি-অবৈজ্ঞানিক সেকেলে ধরণের শিক্ষাপ্রণালীর মধ্য দিয়াও মানুষের মন বিকশিত হইয়া ওঠে, আবার অত্যন্ত টাকা বৈজ্ঞানিক প্রণালী ও ইহার সনাতন জড়তায় ঠেকিয়া ব্যর্থ হইয়া যায়। কানেই কোনও প্রণালীনিই ফলটা প্ৰবৰ্ত্তকের আশানুযায়ী বা নিন্দুকের ভবিষ্যৎ বাণীর অনুরূপ পুরাপুরি রকমে ফলে না। সুতরাং শিক্ষার প্রণালী লইয়া তর্কে কোনও পক্ষেই একবারে হতাশ হইবার কারণ নাই। কেননা ফলের কষ্টিপাথরে প্রণালীকে কষিয়া এমন কিছু দেখা যায় না, যাহাতে তার্কিককে নিরুত্তর করিতে পারা যায়।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ৪ ( ২ ) তারপর শিক্ষার লক্ষ্যের মধ্যে একটা নিত্য চিরস্থির অংশ হয়তো বা আছে। কিন্তু চিরকালই নানা নৈমিত্তিক লক্ষ্য, কখনও জীবন যুদ্ধের টাটকা রক্তে রঙ্গিন হইয়া, কখনও বা কেবল অস্থিরতার চাঞ্চল্যেই মানুষের দৃষ্টিকে তাদের দিকেই টানিয়া রাখিয়াছে। কখনও সমাজ, কখনও রাষ্ট্র, কখনও ধন, কখনও শক্তি, কখনও বাক- পটুতা, কখনও বা কেবল জীবিকা, শিক্ষার একমাত্র অন্তত প্রধান লক্ষ্য বলিয়া মানুষে প্রচার করিয়াছে। এবং ইহাদের কোনটিই মানুষের কাছে তাচ্ছিল্যের সামগ্রী না হওয়াতে সকলের দাবীই মানুষ উপস্থিতমত মাথা নােয়াইয়া স্বীকার করিয়াছে। সুতরাং শিক্ষার লক্ষ্য সম্বন্ধে তর্কেও কোন পক্ষেরই একবারে অজয় পত্র লিখিয়া দিবার মত, পরাজিত হইবার আশঙ্কা নাই। কিন্তু এ সকল তত্ত্ব ও তর্ক সব দেশের ও সব কালের সাধারণ সমস্যা, বাঙ্গলা-মাসিকের পণ্ডিতদিগের ভাষায় ‘বিশ্ব সমস্যা'। পণ্ডিতগণের উপরেই ইহাদের নিরাপনের ভার দিয়া নিশ্চিন্ত মনে বাঙ্গালীর বর্তমান উচ্চ শিক্ষার দুই একটা বিশেষ সমস্যার আলোচনা শুরু করা যাউক। ( ৩ ) বাঙ্গলা দেশের স্কুল কলেজে হালে যে শিক্ষা চলিতেছে, সে সম্বন্ধে একটা বিষয়ে সকলেই প্রায় একমত। সকল পক্ষই বলিতেছেন এ শিক্ষা যথার্থ শিক্ষা নয় ; যেমনটা হওয়া উচিত এ শিক্ষা তেমন শিক্ষা নয়। কিন্তু অসন্তোষ সাধারণ হইলেও অসন্তুষ্টির মূল এক • সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ নয়। আর সেই ভিন্ন ।ভন্ন মূল হইতেই আমাদের বর্তমান শিক্ষা- প্রণালী লইয়া নানা মতভেদের শাখা, কখনও পাতা কখনও কাটা মেলিতেছে। এ দেশের শিক্ষা লইয়া যাহারা চিন্তা করেন এবং চিন্তা না করিলেও কথা বলেন তাদের মধ্যে সব চেয়ে প্রবল পক্ষ হইলেন দেশশাসক আমলাতন্ত্রের সভ্যের, এবং তাহাদেরি জ্ঞাতি কুটুম্ব ভারতপ্রবাসী ব্রিটিশ বণিক সম্প্রদায়। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি দানের দরবারে, স্কুলের পুরস্কার বিতরণ সভায়, নিজেদের ভােজের মজলিসে আমাদের শিক্ষার গলদ যে কোথায় তা বেশ স্পষ্ট কথাতেই ব্যক্ত করেন। তারা বলেন এই যে, বাঙ্গালীর ছেলেরা সেক্সপীয়র মিণ্টন পড়িতেছে, বার্ক মিল মুখস্থ করিতেছে, লিবিগ ফ্যারাডের তত্ত্ব ঘটিতেছে, এসব একবারে নিরর্থক ও নিস্ফল। এসব ছেলেরা ত স্কুল কলেজ হইতে বাহির হইয়া ওকালতি ডাক্তারির বাজারে ভিড় করিবে, না হয় মুনসেফী ডিপুটীগিরির উমেদারীতে ফিরিবে, আর অধিকাংশই সরকারী ও সওদাগরী আফিসের কেরাণীগিরিতে ভর্তি হইবে। ইহাদের জন্য এ শিক্ষা কেন ? ধান কলাই যার লক্ষ্য সে কেন গােলাপের কেয়ারীতে পরিশ্রম করে ? অর্থাৎ দেশব্যাপী ব্যবহার ও বাণিজ্যের যে কল চলিতেছে, তার চাকা গুলিকে স্বচ্ছন্দে ও বিনা বাধায় চালাইয়া লইবার মত মজুর, মিস্ত্রী, বড় জোর ফোরম্যান মিকানিকের উপযােগী যে শিক্ষা, তাহাই হইল বাঙ্গালীর যথেষ্ট এবং যথার্থ শিক্ষা। ইহার জন্য ‘স্যামন ফ্ল্যাগনিষ্টেশের সৌন্দৰ্য ৪ গাম্ভীর্যের অনুশীলন প্রয়ােজন হয় না; বড় সাহেবের মনঃপুত চলতি ইংরেজিতে কাজের চিঠি মুবিদা করিতে জানাটাই ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা বেশী দরকার। আর সেই পত্র রচনায় মিল্টনের ভাষা কোনও সাহায্য ত করেই না, বরং বিদেশীকে বিপথেই লইয়া যায়। সুতরাং আমাদের স্কুল কলেজের প্রচলিত শিক্ষা যেমন অনুপযােগী তেমনি ফালতো। আর শিক্ষার এই বাহুল্যটা যদি কেবল নিলই হইত তবুও সে এক রকম ছিল। কিন্তু ইহার কিছু ফল ও ফলে, এবং আশঙ্কার কথা এই যে ফলটা সমস্তই কুফল। পশ্চিমের সাহিত্য বিজ্ঞান, দর্শণ ইতিহাস মুখস্থ করিয়া পূব দেশের লােকদের মাথা ঠিক থাকে না। পশ্চিম যে পশ্চিম এবং পূব যে পূব এই সাধারণ জ্ঞানটাও লােপ হয়। এবং যে সকল দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক তত্ত্বকথা পশ্চিমের পণ্ডিতেরা পশ্চিম দেশের জন্যই প্রচার করিয়াছেন এই অত্যন্ত পূর্ব দেশেও এরা হাতে কলমে সে গুলির প্রয়ােগ দেখিতে চায়। এই সকল তত্ত্ব কথায় ‘মানুষ’ শব্দের অর্থ যে পশ্চিম দেশীয় শ্বেত-বর্ণের মানুষ এ সহজ কথাটা ইহারা বুঝিতে পারে না। যতই কেন জিয়গ্রাফি মুখস্থ করুক না ল্যাটিচুড লঙ্গিচুডের জ্ঞানটা ইহাদের কিছুতেই পাকা হয় না। ফলে নিজেদের অবস্থায় ইহারা অসন্তুষ্ট হইয়া উঠে। এমন কি যে শাসকসম্প্রদায় এই দেড়শ বছর ধরিয়া নিশ্চল শান্তির মধ্যে পূর্ব দেশের লোেকদের পক্ষে যতটা সম্ভব ইহাদিগকে সেই উন্নতির পথে অতি সন্তর্পণে, সতর্ক পদক্ষেপে ধীরে ধীরে হাত ধরিয়া লইয়া চলিয়াছেন, তাহাদের উপরেও ইহারা ক্ষণে ক্ষণে বিরাগের ভাব দেখায় ; উন্নতির গতি মন্থরতায় অসহিষ্ণু হইয়া মনে করে ছাড়া পাইলে বুঝি আরও একটু দ্রুত চলিতে পারে। এবং শাসনের কলটা যে নিজেরা ইঞ্জিনিয়ার হইয়া চালাইতেও বা পারে এমন কল্পনাও, ইহাদের মনে আসিয়াছে। এমন কি কলটা এ রকম না জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ হইয়া অন্য রকম হইলেও একবারে অচল হয় না এমন কথাও ইহার। বলিতে সুরু করিয়াছে। এ সকলি যে বাহুল্য শিক্ষার বিত্বত ফল তাহাতে সন্দেহ মাত্র নাই। ( ৪ ) " দেশের লােক বলে, এবং বলিতে সাহস না করিলে মনে ভাবে, শিক্ষাটা যে কেবল বর্তমানকে লক্ষ্য করিয়াই দিতে হইবে সেই বা কোন স্থিরসিদ্ধান্ত। বর্তমানে আমরা ছোট কিন্তু ভবিষ্যতে বড় হইবার আকাঙক্ষা রাখি। শিক্ষাটা সেই ঈপিত ভবিষ্যতের অনুকুল করিয়াই আরম্ভ হােক না। আর জীবিকার জন্য যে টুকু দরকার শিক্ষার পরিমাণ যে, ঠিক সেই টুকুই হইবে এ ব্যবস্থা ত অপর কোন দেশে দেখা যায় না। আমাদের শাসক সম্প্রদায়ের অনেকেই নিজের দেশে যে শিক্ষা পাইয়া আসেন, প্রাচীন গ্রীস রােমের সাহিত্য ইতিহাসই ত তাহার প্রধান উপকরণ। এদেশে যে কাজে তাহাদের জীবিকা অর্জন হইতেছে সে কাজে ঐ শিক্ষা কতটা সাহায্য করে এ প্রশ্ন সহজেই মনে আসে। আফিসের বাহিরেও কেরাণী কেরাণীই থাকিবে এত বড় দাবী স্বীকার করিয়া লওয়া ত সহজ নয়। প্রকার সঙ্গে রাজকর্মচারীদের এ দেশের উপযােগী শিক্ষার আদর্শের এই প্রভেদ, ইহাই হইল আমাদের শিক্ষার প্রথম সমস্যা; যাকে বলা যায় শিক্ষার রাজনৈতিক সমস্যা। রাজপুরুষেয় দেখেন আমাদের বর্তমান, আমরা গবি আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা চান সেই শক্ষা যেটা বর্তমান শাসননীতি ও অন্যান্য নীতির অনুকূল। আমরা ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ৩ কামনা করি এমন শিক্ষ। যেটা ভবিষ্যকেই আমাদের নিকটে আনে। তঁাদের দৃষ্টি এক দিকে, আমাদের চোখ অন্য দিকে। আমাদের রাজপুরুষেরা যে আমাদের ভবিষ্যৎটাকে একবারে অস্বীকার করেন এমন কথা বলি না। কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্বীকার করিতে হয় যে তাদের অনেকে আমাদের যে একটা ভবিষ্যৎ থাকিতে পারে, যেটা বর্তমানের চেয়ে অন্য রকম, হয়ত মহত্তর এবং বৃহত্তর, এ কথা প্রকাশ্যেই বলেন। তবে সেই সঙ্গে তারা বলেন সে ভবিষ্যৎ এতই সুদূর ভবিষ্যৎ যে তার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া কোনও বুদ্ধিমান লােকই বর্তমানের গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রিত করিতে পারে না। ভবিষ্যৎ এখনও স্বপ্নলােকের কল্পনাতেই আছে, জাগ্রত লােকের বস্তু জগতে তার স্থান নাই। অর্থাৎ যেটী পারমার্থিক ভাবে আছে, কিন্তু ব্যবহারিক হিসাবে নাই। সুতরাং তাকে কথায় স্বীকার করিলে ক্ষতি নাই, কিন্তু কাজে স্বীকার করা নিবুদ্ধি ও অকেজো লােকের লক্ষণ। শিক্ষার এই রাজনৈতিক সমস্যাটা অতি জটিল ও ব্যাপক। এই ব্যাপক সমস্যা হইতে আমাদের বর্তমান শিক্ষানীতির ছােট, বড়, কঠিন, সুকঠিন নানা রকম সমস্যার আবির্ভাব হইয়াছে, এবং দিন দিন হইতেছে। ইহার ফলে কর্তৃপক্ষের আমাদের কথা বােঝেন না; আমরা তাদের কাজে আশঙ্কিত হইয়া উঠি। আমরা বলি আমাদের গরীব দেশ, শিক্ষাটা যথাসম্ভব স্বল্পব্যয়সাধ্য করা হােক; তারা ভাবেন সন্তু অর্থ যে খেলো ইহাদের সে জ্ঞান ত নাই। দেশে স্কুল কলেজ বাড়িতেছে, পড়ুয়া তার চেয়েও বাড়িতেছে, ;

৭৪ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ আমরা উৎফুল্ল হইয়া ভাবি শিক্ষার বিস্তার হইতেছে ; কর্তৃপক্ষ শিহরিয়া বলেন এ সব ছেলে বাহির হইয়া করিবে কি, সরকারী ও সওদাগরী আফিসে কেরাণীগিরি আর ত খালি নাই। যা থােক এই রাজনৈতিক সমস্যার মীমাংসার উপায় শিক্ষানীতির মধ্যে নাই। এ জটিলতার নিবৃত্তি শিক্ষাতত্ত্ববিদের এলাকার বাহিরে। দেশ বিদেশের পণ্ডিত একসঙ্গে করিলেও এ প্রশ্নের উত্তর মিলিবে । কেননা এ সমস্যার মীমাংসা হইবে শিক্ষানীতি ক্ষেত্রের বাহিরে, রাজনীতির ক্ষেত্রে। সুতরাং আর পুঁথি না বাড়াইয়া সমস্যাস্তরে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ( ৬ ) আমাদের শিক্ষার দ্বিতীয় সমস্যা হইল অন্নসমস্যা। দেশের অনেকে প্রচলিত শিক্ষার উপর এইজন্য বিরক্ত যে, সে শিক্ষা শিক্ষিত বাঙ্গালীর অন্ন সংস্থানের যথেষ্ট ব্যবস্থা করিতে পারিতেছে না। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষা পাইয়া ছেলেরা যেকয়টা চাকরী ও ব্যবসায়ের উপযুক্ত হইয়া বাহির হয় তাহার সংখ্যা অতি সামান্য, এবং ঐ শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙ্গালীর অনুপাতে সে সংখ্যা দিন দিনই কমিয়া আসিতেছে। ফলে শিক্ষিত বাঙ্গালীর ঘরে অন্নাভাব প্রতিদিন বাড়িয়া চলিয়াছে, এবং বর্তমানেই তাহার মুর্তিটা যেমন ভীষণ হইয়া উঠিয়াছে, তাহাতে ভবিষ্যৎ ভাবিয়া শিহরিয়া উঠিতে হয়। দেশের শিক্ষা যদি শিক্ষিতের এই অম-সমস্যার একটা মীমাংসা করিতে না পারে তবে তাহা ব্যর্থ শিক্ষা, যাহার পরিবর্তন না হইলে দেশের মঙ্গল নাই।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালার শিক্ষা বাঙ্গলা দেশের এই অন্নাভাব অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এ সমস্যা যে দিন দিন উৎকট হইয়া উঠিতেছে সেদিকে চক্ষু বুজিয়া কোনও লাভ নাই। এবং ইহার একটা ব্যবস্থা না হইলে যে জাতিরও মঙ্গল নাই তাহাও নিশ্চিত সত্য। ইংরেজ পণ্ডিত হার্বাট স্পেন্সার,-যার একটা অভ্যাস ছিল সকলের জানা অত্যন্ত সাধারণ তথ্য হইতে গভীর তত্ত্ব কথার নিষ্কাশনের চেষ্টা করা,—তার একখানি সুপরিচিত গ্রন্থের একটী অধ্যায়, তিনি এই বলিয়া আরম্ভ করিয়াছেন যে, জীবের কোন কাজ করিবার পূর্বে তার বঁচিয়া থাকা প্রয়ােজন ; সুতরাং যে বিধিব্যবস্থা তাহাকে বাঁচাইয়া রাখে তাহার দাবী, যে সকল বিধিব্যবস্থা, তাহাকে আর সব কাজের উপযুক্ত করে, তাহাদের চেয়ে প্রবল। শিক্ষিত বাঙ্গালীর অন্নাভাব মােচনের ব্যবস্থা যে আর না করিলেই নয় এ কথা সমর্থনের জন্য জীববিদ্যার এই আদিতত্ত্বে যাইবার প্রয়ােজন হয় না। আজ বাঙ্গলা দেশের শিক্ষিত শ্রেণীর ঘরে ঘরে দারিদ্র্য যে কেমন করিয়া জীবনকে ক্ষয় করিতেছে, স্বাস্থ্যকে বিদায় দিতেছে, দেহ মনের সমস্ত স্ফুর্তি ও আনন্দকে পিষিয়া মারিতেছে, মনুষ্যত্বকে পাহাড় প্রমাণ ভারের নীচে চাপা দিতেছে, তাহা দেখিলে স্বয়ং মােহ মুগরের কবিও অনর্থের অর্থ যে কি তাহা, নিত্য না থােক অন্তত মাঝে মাঝে, ভাবিয়া দেখিবার উপদেশ দিতেন। কিন্তু আমাদের অন্নসমস্যা এমন কঠিন হইয়া উঠিয়াছে বলিয়াই আমাদের সতর্কতার প্রয়ােজন। অসংগ্রহকে জাতির সমস্ত চেষ্টা ও প্রতিভার কেবল প্রথম নয় প্রধান লক্ষ্য করিয়া এই সমস্যার একটা উত্তর খুঁজিবার প্রলোভন স্বাভাবিক। কিন্তু রােগনাশের উৎসাহে সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ রােগীর প্রাণান্ত ঠিক চিকিৎসা নয়, যদিও সুনিপুণ অস্ত্র-চিকিৎসার প্রবল সাফল্যে চিকিৎসিতের মৃত্যুসংবদ মধ্যে মধ্যে শােনা যায়। বাঙ্গালীর এ কথা ভুলিলে চলিবে না যে কেবল অম্নে জীব বাঁচে কিন্তু জাতি বাঁচে না। ( ৭ ) অন্ন সংস্থানের নিক্তিতে ওজন করিয়া স্কুল কলেজের প্রচলিত শিক্ষাকে ঝুটা সাব্যস্তের চেষ্টা পণ্ডশ্রম। কেননা প্রকৃত কথা এই যে ছাত্রের জীবিকা অর্জনের সুবিধা করিয়া দেওয়া এ শিক্ষার লক্ষ্যই নয় এবং হওয়া উচিত নয় । এ লক্ষ্য কি তাহা একবার ‘সবুজপত্রে’ আলোচনার চেষ্টা করিয়াছি, সুতরাং পুনরুক্তির অধিকার নাই। শিক্ষার লক্ষ্য শিক্ষা দেওয়া, ছাত্রকে শিক্ষিত করা। কিন্তু শিক্ষিত অশিক্ষিত অন্নে সকলেরই সমান প্রয়োজন। সুতরাং সমাজে ও রাষ্ট্রে শিক্ষিতেরও অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা চাই। এই শিক্ষিত শ্রেণীই হইল সমাজের মধ্যমণি, সমাজ বৃক্ষের অমৃত ফল। ইহাকে বাঁচাইয়া রাখিতে না পারিলে জাতির বর্তমান প্রাণ-হীন, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমাদের দেশের সমস্যা এই যে, শিক্ষিত শ্রেণীর অন্ন-সংগ্রহের পথ যথেষ্ট মুক্ত নাই। নাই। কেন নাই, সে আলোচনা নাই করিলাম। কিন্তু সমস্যা এ নয় যে, যে শিক্ষা দেওয়া হইতেছে তাহা শিষ্যের জীবিকা অর্জনকেই লক্ষ্য করিয়া দেওয়া হইতেছে না। প্রচলিত শিক্ষার যে সমালোচনার কথা বলিতেছি তার প্রধান কথা এই যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেরা এমন শিক্ষা পাইতেছে না। যাহাতে চাকুরী, ডাক্তারী, ওকালতির রুদ্ধ প্রায় সঙ্কীর্ণ গলিতে আর 7 ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ভীড় না করিয়া, শিল্প বাণিজ্যের প্রশস্ত রাজপথে অল্প সংগ্রহের চেষ্টায় বাহির হইতে পারে। এই সমালােচনার মধ্যে যে সত্য আছে তাহা অস্বীকার করি না। কিন্তু সেই সত্যের আড়ালে গোটা কয়েক বড় বড় মিথ্যা সব সময়েই উঁকি ঝুকি মারিতেছে। তাহাদের তাড়াইতে না পারিলে এই সত্যের প্রকৃত চেহারাটা প্রকাশ হইবে না। ( ৮ ) ; প্রথম, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প বাণিজ্যের যে শিক্ষা দিবে তাহা তার সাধারণ সাহিত্য বিজ্ঞান শিক্ষার পরিবর্তে নয়; ঐ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলেদের জন্যই বিশেষ শিক্ষা। যারা মনে করেন প্রথম ভাগের সঙ্গে সঙ্গে দুই একটা হাতের কাজ শিখাইতে আরম্ভ করিলেই দেশের দারিদ্র্য সমস্যার মীমাংসা হইবে, তাদের সরল বিশ্বাসে অবশ্য মুগ্ধ হইতে হয়, কিন্তু বর্তমান জগতের শিল্প বাণিজ্য বিষয়টা কি, তাহার অস্পষ্ট ধারণাও তাদের আছে কি না তাহাতেও সন্দেহ না করিয়া উপায় থাকে না। যে সব জাতি দেশের শিল্প বাণিজ্যকে দেশের উচ্চ শিক্ষা হইতে পৃথক করিয়া বুঝিয়াছিল, শিল্প বাণিজ্য শিক্ষাকে উচ্চ শিক্ষা হইতে স্বতন্ত্র চালান যায় ভাবিয়াছিল, আজ পৃথিবীর শিল্প বাণিজ্যের দৌড়ে তারা যে দিন দিন পিছাইয়াই পড়িতেছে তাহা ত আর কাহারও অজ্ঞাত নাই। দেশের উচ্চ শিক্ষাকে সংকীর্ণ করিয়া শিল্প বাণিজ্য গড়িয়া তােলার কল্পনা, আহার বন্ধ করিয়া কেবল কুস্তিতে শরীর গড়ার চেষ্টার মতই ভয়ানক।

৭৮ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৪ দেশের উচ্চ ( ৯ ) আচাৰ্য হেলমূহােলৎস একবার গর্ব করিয়া বলিয়াছিলেন অৰ্মাণ বৈজ্ঞানিক সত্যের সন্ধান করে, সে সত্য ঘরকন্নার কাজে লাগিবে কিনা সে চিন্তা তার নয়। আজ জার্মাশিতে কি সুর বাজিতেছে জানিনা। কিন্তু এটা নিশ্চয় যে, জ্ঞানের এই নিষ্কাম সাধনা বন্ধ হইলে ক্রুপের কারখানাও বেশী দিন খােলা থাকিবে না। আর যে শিল্প বাণিজ্যে উচ্চ শিক্ষার প্রয়ােজন হয় না শিক্ষিতকেও তাহাতেই রত করান, এই পৃথিবী জোড়া প্রতিযােগিতার যুগে, সমাজ নীতির কথা দূরে থাকুক, কেবলমাত্র ধন বিজ্ঞানের চোখও যে কত বড় অপব্যয় ; তাহাতে যে অসমস্যার সমাধান না হইয়া কেবল জটিলতার বৃদ্ধিই হয়, তাহা অল্প চিন্তাতেও বােঝা যায় । শােনা যায় অবস্থা বিশেষে বাঘও নাকি ধান খায়। কিন্তু সেটা ব্যাঘ্র সমাজের সে খুব উৎসাহের কারণ তাহা প্রবাদও বলে না। মনু ব্রাহ্মণের যে বৈশ্য বৃত্তির ব্যবস্থা দিয়াছেন তাহা অদ্ধিৰ্ম আনন্দের কারণ নয়। বাঙ্গলাদেশের যে মুষ্ঠিমেয় লােক এখন উচ্চ শিক্ষা পাইতেছে তারও অর্ধেককে সে পথ হইতে ফিরাইয়া আন, দেশে শিল্প বাণিজ্য প্রতিষ্ঠার উপায় নয়। সে পথ হইল দেশের উচ্চ শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করিয়া, এ যুগের শিল্প বাণিজ্যের যে বিশেষ শিক্ষা, যাহা কেবল উচ্চ শিক্ষিতের পক্ষেই সম্ভব, দেশে তাহার ব্যবস্থা করা। ( ১০ ) দ্বিতীয় কথা কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয় ছেলেদের পুথিগত এমন কি ল্যাবহাটারীতে পরীক্ষাগত শিল্প ও বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করিলেই ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা নাই। বাঙ্গলাদেশ দেখিতে দেখিতে শিল্পশালায় ও বাণিজ্যাগারে ভরিয়া উঠিবে এমন দুরাশার কোনও সঙ্গত কারণ নাই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা দিতে পারে, কিন্তু সে শিক্ষাকে সফল করিবার উপায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে সে শিক্ষার সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে দেশের লােকের, হয়ত বা দেশের রাজার উদ্যম বা নিশ্চেষ্টতার উপর। অন্ন সমস্যার জন্য দায়ী তার প্রচলিত শিক্ষা নয় ; এবং কেবল শিক্ষার বদল ঘটাইয়া সে সমস্যার পুরণও সম্ভব নয়। বেশ মনে আছে যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বি, এস, সি পড়াইবার প্রথম আয়োজন হয় তখন অনেকে ভাবিয়াছিলেন যে আর ভাবনা নাই। নাই। এই সব বিজ্ঞানে-কৃতবিদ্য ছেলেরা দেশে বৈজ্ঞানিক শিল্পের প্রতিষ্ঠা করিয়া অন্নাভাবের একটা কিনারা করিবে। আজ এম, এস, সি ; বি এল এ বাঙ্গলার সব উকীল লাইব্রেরী ভর্তি হইয়া উঠিল। ছেলেরা বিজ্ঞান শিখিল বটে, কিন্তু সে শিক্ষাকে দেশের সমাজ ও দেশের রাষ্ট্র কাজে লাগাইবার কোনও ব্যবস্থাই করিতে পারিল না। তারপর শেষ কথা কিন্তু সব চেয়ে যেটা বড় কথা, তা এই। উচ্চ শিক্ষায় যার অধিকার আছে তাকে সে শিক্ষা হইতে বঞ্চিত করার অধিকার সমাজ বা রাষ্ট্র কাহারও নাই। এখানে উচ্চ শিক্ষিতের জীবিকা উপার্জনের পথে বিবাহুল্যের কথা তোলা নিল, কেননা জীবিকার অধিকারের চেয়ে এ অধিকারের দাবী কিছু কম নয়। কালেই সে পথের মাপে উচ্চ শিক্ষার ইচ্ছামত প্রসার বা সংকোচ ঘটান চলে না। কথা এই, আর কোনও ফল বা নিষ্ফলতার প্রমাণে উচ্চ শিক্ষার বিচার হয় না; ঐ শিক্ষাই সে শিক্ষার চরম ফল। কেরাণীরও উচ্চশিক্ষা বিফল নয়, যদিও কেরাণীগিরিতে তা কাজে সবুৰ পৰ জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ লাগে না। কারখানার মালিকেরও সে শিক্ষা অনাবশ্যক নয়, যদিও তার অভাবে টাকা উপার্জনের কোনাে অসুবিধা হয় না। জাতির শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ, এ শিক্ষার অধিকারী কত লােকের সে জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার সাফল্যের পরীক্ষা কত বেশী সংখ্যক অধিকারীর কাছে সে শিক্ষা সহজ লভ্য হয়। মানুষের জন্যই জীবিকা, জীবিকার জন্য মানুষ নয়। জীবিকার মাপে উচ্চ শিক্ষাকে কাটিয়া খাটো করার প্রস্তাব বিছানার মাপে শরীরকে ছাঁটার প্রস্তাবের মতই সুবুদ্ধির পরিচায়ক। তা যত উচ্চ রাজকর্মচারীই সে প্রস্তাব করুন না কেন, আর যত বড় পণ্ডিতই তার সমর্থন করুন না কেন। ( ১১ ) শিক্ষামন্দিরের বাহিরে আমাদের দেশে শিক্ষা লইয়া যে সব সমস্যা তার কতক কতক দেখা গেল। এইবার বহিরাঙ্গন পার হইয়া মন্দিরের ভিতরে আসা যাক। বর্তমানের প্রচলিত শিক্ষাকে যখন কেবল শিক্ষার মাপেই ওজন করি, কেবল জ্ঞান, ভাব ও রুচির আলােতেই তাকে পরখ করি, তখনও দেখি এ শিক্ষায় আমরা কেহই সন্তুষ্ট নই ; এবং এখানেও অসন্তোষের কারণ এক নয় ভিন্ন ভিন্ন। দেশে একদল আছেন যাঁর হালে চলতি শিক্ষার উপর এইজ বিরক্ত যে তাঁরা যখন স্কুল কলেজে পড়িতেন তখন শিক্ষাটা যে রকম পাকা হইত এখনকার ছেলেদের শিক্ষা সে রকম হইতেছে না। দুই শিক্ষার তফাত কোথায়, এবং বর্তমানের শিক্ষা কোনখানে কাঁচা ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা তাহার অনুসন্ধান করিলে, কথার হেরফের বাদে যাহা বাহির হইয়া পড়ে তাহা এই ;- পূৰ্ব্বকার দিনে ইংরেজি, অর্থাৎ ইংরেজি ভাষা শিক্ষাটা যেমন পাকা রকমের হইত এখনকার ছেলেদের ইংরেজি শিক্ষা তার কাছেই ঘেসিতে পারে না। তখন শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শব্দ শিখিবার জন্য অভিধান মুখস্থ করিত, ‘গ্রামার’ ‘ইডিয়ামে’ নিভূল হইবার জন্য প্রাণ পৰ্য্যন্ত পণ করিত, ষ্টাইল’ দোরস্ত করিবার জন্য বেঞ্জান হইতে স্যামুয়েল জনসন্ পৰ্য্যন্ত কারাে লেখাই কণ্ঠস্থ করিতে বাকী রাথিত । আর ফলও ফলিত চেষ্টার অনুরূপ। এই সব কৃতবিদ্য লােকের মুখের ইংরেজি শুনিয়া বড় বড় সাহেবদেরও চমক লাগিত; নাম না দিয়া খবরের কাগজে লেখা বাহির করিলে বাঙ্গালীর লেখা না সাহেবের লেখা এ লইয়া তর্ক উঠিত। আর আজ দুই ছত্র নির্ভুল ইংরেজি লিখিতে বি এ পাশ ছেলে গলধর্ম হইয়া উঠে। শিক্ষার অবনতি আর বলে কাকে। উঁচুদরের ইংরেজি শেখাই উচ্চশিক্ষা কি না এ প্রশ্ন তােলা অবশ্য নিরর্থক। কেননা সে সম্বন্ধে এঁদের মনে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা নাই তবে খুব চাপাচাপি করিয়া ধরিলে এদের মধ্যে কেহ কেহ সংশয়ীদের একবারে নিরুত্তর করিবার জন্য এই শিক্ষার দুই একটা অবান্তর মাহাত্ম্যও কীৰ্ত্তণ করেন। তারা বলেন আমাদের বর্তমানে যা কিছু উন্নতি তার মূলই ত ঐ ইংরেজি অর্থাৎ ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, এবং ঐ ভাষাই হইল বিচ্ছিন ভারতবর্ষের ঐক্যসূত্র। কিন্তু ইহার পরেই কোন ইংরেজি ইতিহাস আগাগােড়া মুখস্থের উপর বক্তার বর্তমান পাণ্ডিত্য খ্যাতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা, এমনি গম্ভীরভাবে সে কথার শুরু হয় + ৮২ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ যে আমাদের বর্তমান উন্নতির অর্থ তাদের মত পণ্ডিত লােকের আবির্ভাব না আর ও কিছু, এবং ভারতর্ষের ঐক্য ইংরেজি ‘ইডিয়ামের ঠিক কতটা বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করে, অথবা কোনাে কোনাে বৈদিক যজ্ঞের মন্ত্রোচ্চারণের মত হ্রস্বদীর্ঘের বিন্দুমাত্র গােল ঘটিলেই সর্বনাশ, সে সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসার আর সাহসই হয় না। আমাদের দেশের ঠিক এই দলটিই বাঙ্গালীর স্কুল কলেজে বাঙ্গলা ভাষার শিক্ষা দিবার প্রস্তাবে একবারে চমকিয়া উঠিয়াছেন। চমকাই- বারই কথা। শিক্ষার অর্থই হইল ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ; তাকেই যদি খর্ব করা যায় তবে শিক্ষার আর বাকী থাকে কি ? কেননা সাহিত্য বল, ইতিহাস বল, দর্শণ বল, বিজ্ঞান বল, সবই হইল উপলক্ষ্য। যেমন কথাচ্ছলে নীতি শিক্ষা, এও তেমনি নানা ছলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা। নিতান্ত সক্ষমীছাড়া ভিন্ন পথের মােহে বাড়ীর কথাটাই আর কার ভূল হয়। এদের মধ্যে যারা কলেজের অধ্যাপক তারা আরও কঠিন প্রশ্ন তুলিয়াছেন। কুপারের কবিতার সৌন্দৰ্য্য, কি অ্যাডিশনের রসিকতার রস তারা বাঙ্গলা ভাষায় ছেলেদের বুঝাইবেন কেমন করিয়া ? সমস্যা গুরুতর। যে সব পুঁথিতে ঐ সৌন্দর্য্যের বিশ্লেষণ ও রসিকতার ব্যাখ্যা আছে সেগুলিও যে ইংরেজি ভাষাতেই লেখা। আর এ কথাও ঠিক অনেক ইংরেজ লেখকের কবিত্ব ও রসিকতা আমরা ভক্তিভরে গলাধঃকরণ করিতেছি, মাতৃভাষার শাদা চোখে দেখিলে যে ভক্তি নাও টিকিতে পারে। প্রমাণ, য়ুরােপ মহাদেশের লােকেরা, যাঁরা যাঁরা ভাষা শিখিবার উপায় স্বরূপে নহে, সাহিত্য হিসাবেই ইংরেজি সাহিত্য পড়েন তারা হয়ত সে সব লেখকের নামও শােনেন নাই। এমন কি খােদ ইংলণ্ডেই ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা তাঁদের অনেকে অচল হইয়া উঠিলেন। আমাদের নিষ্ঠা কিন্তু অটল। যাক এই পরিবর্তনভীরু অতীতপন্থীদের কথা ছাড়িয়া দেই। এঁরা নিজেদের ইংরেজি জ্ঞানের যতই বড়াই করুন না কেন, গত শতাব্দীর প্রথমে যারা এ দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রচলনে বাধা দিয়াছিলেন এঁরা তাদেরি বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি সংস্করণ। সংস্কৃত পড়িলেই চিত্তে জড়তা আসে, আর ইংরেজি শিখিলেই মন স্বাধীন হয়। কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠি বর্ষ বয়সে এ উপকথা বাঙ্গলা দেশের বালককেও বিশ্বাস করা কঠিন। ( ১২ ) বাঙ্গলা দেশের স্কুল কলেজের বর্তমান শিক্ষায় বাঙ্গালী যে আর, সন্তুষ্ট থাকিতে পারিতেছে না, তাহার মুলে অতীত নয় ভবিষ্যৎ। আগেকার দিনের ইংরেজি শিক্ষার পাকা গাঁথনির সঙ্গে তুলনা হালের শিক্ষার উপর আমাদের বিরক্তির কারণ নয়। কারণ হইল বর্তমান পৃথিবীর জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভাব, কলার রাজ্যে অদূর ভবিষ্যতে বাঙ্গালীর শক্তি ও কৃতিত্বের যে একটা ছবি কতক অস্পষ্ট কতক স্পষ্ট হইয়া এ যুগের বাঙ্গালীর চোখের সম্মুখে ফুটিয়া উঠিয়াছে সে শক্তির উদ্বোধনে ও কৃতিত্বের সহায়তায় দেশের প্রচলিত শিক্ষার সামর্থ্যের অভাব। বর্তমানের উপর আমাদের সমস্ত বিরাগেরই মুল এইখানে। যা কিছু এই ভবিষ্যতের প্রতিকূল তা আমাদের অসহ। যাহা এর অনুকুল নয় তাহা আমাদের চোখে মূল্যহীন। বিশুদ্ধ ইংরেজির অনর্গল বক্তৃতায় বড় সাহেবের চমক লাগাইবার লােভ আমরা এক রকম শবু পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ ছাড়িয়াই দিয়াছি। আমরা ভাবিতেছি সেইদিনের কথা যেদিন বাঙ্গলা ভাষায় বাঙ্গালী কি ভাবে এবং লেখে তাহার খবর না রাখিলে বড় সাহেবের দেশের বড় পণ্ডিতেরও চলিবে না। বাহিরের লােকের কাণে এ কথা নিশ্চয়ই ভিত্তিহীন গর্বের মত শুনাইবে। কিন্তু অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে আজ শিক্ষিত বাঙ্গালীর ইহাই অন্তরের কথা এবং সেই কারণেই বাঙ্গালীর শিক্ষার প্রধান কথা। ( ১৩ ) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীল মােহরে যারা advancement of learning ‘জ্ঞানের প্রসার’ ছাপ বসাইয়া ছিলেন advancement কথাটার কি অর্থ তাদের মনে ছিল বলা কঠিন। অবশ্য আমরা জানি বেকনের যে পুথির নাম হইতে কথাটি লওয়া, সে পুথির প্রতিপাদ্য হইল, কেমন করিয়া নূতন জ্ঞানের আবিষ্কারে জ্ঞানের পরিধি বিস্তার হয়। কিন্তু এও জানি যে পশ্চিমের অনেক কথা পূর্ব দেশে আসিলে অর্থের বদল হয়। সুতরাং অসম্ভব নয় যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সীলমোহরে ঐ কথাটার আদি অভিপ্রেত অর্থ, জ্ঞানের প্রসার’ নয় জ্ঞানের প্রচার। জ্ঞানের সীমা বিস্তার নয়, পূর্ণদেশের অন্ধকারে পশ্চিমের আলােক বিস্তার। সে যাই হােক এ কথা নিশ্চয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল কলেজে যে শিক্ষা আর হইল তাহার একমাত্র লক্ষ্য ইংরেজি সাহিত্য ও ইংরেজি ভাষার সাহায্যে আধুনিক য়ুরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানের বার্তা দেশের মধ্যে প্রচার করা ; বাঙ্গালীকে এই নূতন সাহিত্য ও নূতন জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করা। এই জ্ঞান ও বিদ্যা পরের হাত হইতে লওয়াই যে চরম সার্থকতা নয়, ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ৮ ইহাকে সত্যভাবে গ্রহণ করিতে হইলে যে ইহাকে বহন করিতে জানিতে হয়, ইহাকে সৃষ্টি করিতে না জানিলে যে ইহাকে আপনও করা যায় না এ কথা তখন বাঙ্গালীর মনে হয় নাই ; মনে হইবার কথাও নয়। সে দিন ইংরেজি শিক্ষা দেশের মধ্যে আসিয়াছিল দেবতার দানের মত। আমরা ভাবিয়াছিলাম ইহাকে স্বীকার করিয়া ঘরে তোলার নামই অমৃতত্বের অধিকার। এ যে স্বর্গের মন্দাকিনী নয় পাতালের ভােগবতী, ইহাকে যে মাটি খুঁড়িয়া তুলিতে হয়, আর যে মাটি খুঁড়িতে না জানে ইহা যে তার কাছে অমৃত নয়, কেবলই তোলা জল, কখনও ঘােলা কখনও কিছু নির্মল, সে কথা বুঝিবার তখনও সময় হয় নাই। তাই যে শিক্ষার লক্ষই হইল অন্যের বিষ্কৃত জ্ঞান, অন্যের সৃষ্ট রস, অন্যের আহৃত বিদ্যা কেবলি নিশ্চেষ্ট ভাবে গ্রহণ করান, তাহাকেও অামরা পরম সমাদরে সমস্ত মন দিয়া বরণ করিয়া লইলাম। কিন্তু বিধাতার আশীর্বাদে এ শিক্ষাতেও বাঙ্গালীর মন বেশী দিন নিশ্চেষ্ট থাকিল না। আমাদের মনের যে অংশটা পূর্ব হইতেই সচল ছিল, সেই ভাষা ও সাহিত্যের দিক, এই নূতন শিক্ষা ও ভাবের স্পর্শে নব বসন্তের সাড়া দিল। নব-যুগের অভিনব ভাব প্রকাশের উপযােগী শক্তিশালী, সৌন্দৰ্য্যময় ভাষা আমরা গড়িয়া তুলিলাম। বাজাের নবীন সাহিত্য আমাদের আশা ও আকাঙক্ষা প্রকাশ ও পুষ্ট করিতে লাগিল। তবুও এই সাহিত্যকে পরীক্ষা করিলেই নূতন শিক্ষা প্রণালীর অবশ্যম্ভাবী ফল হাতে হাতে ধরা পড়ে। দেখা যায় কাব্য ও রসসাহিত্যবাদে এ সাহিত্যের বেশীর ভাগই অনুবাদ ও সঙ্কলনের সাহিত্য। যে তৈরী ভাব ও চিন্ত। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালীর কাছে আসিয়াছে তাহাকেই বাঙ্গলা পােষাকে দেশের কাছে ৫ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ দাড় করান মাত্র। আমাদের সে যুগের শ্রেষ্ঠ লেখকেরাও য়ুরােপীয় জ্ঞানে বিজ্ঞানের অতি সাধারণকথা ইংরেজি পুথি হইতে সঙ্কলন করিয়া প্রকাশ করিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিতেন না। সে যুগই ছিল প্রচারের যুগ। বঙ্কিমের ‘বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের কথা আজ আমরা ভুলিয়া গিয়াছি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের এই সব অতি সাধারণ কথার সংগ্রহও বাঙ্গালী সেদিন ‘বিষ বৃক্ষের লেখনীর অযোগ্য মনে করে নাই। এদেশে ইংরেজি শিক্ষার সর্বপ্রথম যুগে যে অতি-মানুষ- বাঙ্গালী, প্রাচ্য সভ্যতার শিখরে দাড়াইয়া মােহহীন চক্ষুতে পশ্চিমের সভ্যতাকে পরীক্ষা করিয়াছিলেন, নিজের জাতির সম্পর্কে আধুনিক য়ুরােপের জ্ঞান বিজ্ঞানের উপর তার কোথায় লােভ ছিল তাহার পরিষ্কার ইঙ্গিত তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। রাজা রামমোহন রায় এ দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রচলন সম্বন্ধে লর্ড আমহাষ্টকে যে পত্র লেখেন তাহাতে দুইটা কথা খুব সুস্পষ্ট। প্রথম বাঙ্গালী জাতির বুদ্ধি ও মানসিক ক্ষমতায় তিনি বিন্দুমাত্র সন্দেহ দেখান নাই। দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রচলনে তাহার লক্ষ্য ছিল বাঙ্গালীর বুদ্ধির ধারাকে এমন পথে প্রবাহিত করান যাতে জ্ঞানের ভূমি সরস ও উর্বর হয়। দ্বিতীয়ত তিনি চাহিয়াছিলেন যুবরাপের জ্ঞান বিজ্ঞানের বৃক্ষটীকে শিকড়শুদ্ধ দেশের মাটিতে রােপণ করিতে (planting in Asia the arts and sciences of Modern Europe') যেখানে আমাদের মনের রসে ও রৌদ্রে, এ দেশেই সে গাছে নব কিশলয় দেখা দিবে, মূতন ফুলে ও নূতন ফলে মানুষের সভ্যতার শােভা ও সম্পদ বাড়াইবে। কিন্তু যে ইংরেজি শিক্ষা দেশে আরম্ভ হইল তাহা রামমােহনের ঈপিত ।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ৮৭ শিক্ষা নয়। ইহার লক্ষ্য য়ুরােপের জ্ঞানের বৃক্ষ এদেশে রােপণ করা নয় ; সেদেশ হইতে কিছু ফুল, ফল, পাতা আনিয়া এদেশের লােকের চোখের সম্মুখে ধরা। যাহাতে ঘর সাজান যায়, কিন্তু বাগান করা চলে না। আর সে ঘরের সজ্জাও নিত্য মূতন ধার করিয়া আনিতে হয়, কেননা জ্ঞানের তােল ফুল পাতাও এক রাত্রিতেই বাসি হইয়া যায়। ( ১৪ ) এ পত্রের পর একশ বছর অতীত হইতে চলিল। আজ বাঙ্গালী অন্তরের মধ্যে নিঃসন্দেহ অনুভৱ করিতেছি রাজা রামমােহন স্বজাতির মানসিক শক্তিতে যে বিশ্বাস দেখাইয়াছিলেন তাহা অত্যুক্তি নয়। আজ সাহিত্যে, চিন্তায়, বিজ্ঞানে বাঙ্গালীর সৃষ্টির বিশ্ব মানবের সভ্যতার সভায় স্থান পাইতেছে, এবং আমরা বুঝিতেছি ইহা কেবল সাফল্যের সূচনা মাত্র। এই সামান্য সফলতার প্রারকে বৃহৎ পরিণতির দিকে লইয়া যাইবার শক্তি এ জাতির মধ্যে আছে। কিন্তু সেজন্ট প্রয়ােজন এ শক্তিকে পূর্ণ ভাবে জাগাইয়া তোলা। ইহাকে সংহত করিয়া সৃষ্টির পথে, মুক্তির দিকে ছাড়িয়া দেওয়া। ইহাই হইল আমাদের শিক্ষার বিশেষ উচ্চ শিক্ষার প্রকৃত কাজ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সমস্যাও এই খানেই। আজ বাঙ্গালীর প্রয়ােজন সেই শিক্ষায় যাতে জাতির বুদ্ধি ও প্রতিভা আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রাণের স্পন্ধনে স্পন্দিত হইয়া উঠে। নিজের প্রাণে সেই প্রাণের স্পর্শ পায়, যার সঞ্জীবনী রস মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাকে বাঁচাইয়া রাখিয়া নিত্য নূতন ফলপুষ্পে তার দেহকে মণ্ডিত করিতেছে।

৮৮ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলিতেছে সেই প্রথম কালের প্রাচীন শিক্ষা, প্রাণের সঙ্গে যার কোনও সম্মন্ধ নাই, কাঠের মুক্তি লইয়াই যার কারবার। বাঙ্গালীর মনের শক্তিকে জাগাইয়া তুলিয়া জ্ঞানের রাতে ছাড়িয়া দেওয়া যার লক্ষ্য নয়, যার উদ্দেশ্য হইল বাঙ্গালীকে ঘরে বসাইয়া জ্ঞান রাজ্যের, ছাপা ছবি তাহার চোখের সম্মুখে ধরিয়া রাখা। আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকশালায় অন্ন পাকের আগুনের প্রয়ােজন, কিন্তু তার হাতে কেবল আছে টিনের কৌটার তৈরীখাবার পরিবেশনের সরঞ্জাম। স্পষ্ট করিয়া বলিয়া ফেলাই ভাল এখনকার দিনে আম'দের বিশ্ব- বিদ্যালয়ের ছেলেদের জন্য রাজার দেশ হইতে যে সব অধ্যাপকের আমদানী হইতেছে তাহারা এ যুগে বাঙ্গলা দেশে যে শিক্ষার প্রয়োজন সে শিক্ষা দিবার অধিকারী নহেন। তাহার সহজ কারণ য়ুরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানের সঙ্গে তাদের প্রাণের যথার্থ যােগ নাই। কেন না য়ুরােপের চিন্তার রাজ্যে তারা কেহ ভাবুক নহেন, বিজ্ঞানের রাজ্যে কেহ কর্মী নহেন। পাশ্চাত্য বিদ্যার ফেরিওয়ালাকেও গুরুর আসনে বসাইয়া যে দন আমরা ফল পাইয়াছি সে যুগ চলিয়া গিয়াছে। এখন চাই শিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয়। দেশী বা বিদেশী আজ বাঙ্গালীর আচাৰ্য্য হইবার কেবল তারই অধিকার, চিন্তার রাজ্যে যিনি নূতন ভাবনা ভাবিতে পারেন, জ্ঞানের আকাশে নূন আলো যার চোখে পড়ে। এই আচাৰ্যদের সাহায্যেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষাকে সফল ও সঙ্গীর করিবার একমাত্র উপায়। ইহার অভাবে বড় বাড়ী, ভাল আসবাব, এমন কি বহুমুল্য যন্ত্রপাতি সকলি বৃথা। আর এইটী ঘটিলে ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বাঙ্গালীর শিক্ষা ৮৯ সকল অভাবের মধ্যেও আমাদের শিক্ষারও প্রাণ ও শক্তিলাভে বিলম্ব ঘটিবে না। নূতন সৃষ্টির বেদনার পুলকে বাঙ্গালীর মন চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। কাব্যে কলায়, সাহিত্যে বিজ্ঞানে মূতন রস, নূতন ভাব, নূতন জ্ঞানের দিকে তার চিত্ত উন্মুখ। এই নব জাগ্ৰত সৃষ্টিরশক্তিকে সার্থকতার পথে লইয়া যাইবার যাহা সহায় সেই শিক্ষাই এ যুগে বাঙ্গালীর প্রকৃত শিক্ষা। পরের পণ্যে মহাজনী আমরা অনেক দিন করিলাম। এখন শিল্পশালার দরজায় আসিয়া দাড়াইয়াছি। কি শিল্প বাণিজ্যে, কি ভাবে চিন্তায় দোকানদারী করিয়া তৃপ্তির দিন আমাদের চলিয়া গিয়াছে। বৃহৎকে আমরা বরণ করিয়াছি, অল্পে আমাদের সুখ নাই। স্বল্পতুষ্টির প্রবল প্রলােভন হইতে মানবসভ্যতার বিধাতা বাঙ্গালী জাতিকে রক্ষা করিবেন। শ্ৰীঅতুল চন্দ্র গুপ্ত।

বিবাহের পণ।* -::: আজকাল মস্ত একটা সােরগোলের তর্কের বিষয় হচ্ছে, বিবাহের পণ। যেখানে সেখানে যার তার মুখে শোনা যায় যে, সমাজে যতগুলি কুরীতি ও কুসংস্কার আছে সবগুলি মিলে আমাদের ততটা সর্বনাশ করে না যতটা করে এই এক বিবাহের পণ। গদ্যে, পদ্যে, নাটকে, নভেলে, সব রকম সাহিত্যেই এ বিষয় নিয়ে খুব একটা আলোচনা চলছে ; রঙ্গমঞ্চের মাফতেও লােকের মনটাকে সুরাহায় অনিবার চেষ্টা করা হচ্ছে ; আর যেই থেকে থেকে দুই একটা কুমারী পরিধেয় সাড়ীর সঙ্গে কেরােসিন তৈল এবং অগ্নির সংযােগ করে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হচ্ছেন, অম্নি এক একটা তুমুল হৈ চৈঃ উঠছে এবং এমন কি সেই হিড়িকে দু চারটী উৎসাহী যুবক কাগজে স্বাক্ষর করে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হচ্ছেন যে তারা বিবাহে পণ নেবেন না। কিন্তু এত লেখালেখির ফল যে কি হচ্ছে তা আমিও জানি, আর সব বাঙ্গালীরাও জানেন। বিবাহে পণ নেওয়া আমরা সকলেই বলি মন্দ কাজ, কিন্তু প্রতি কারের চেষ্টাটা আমার মনে হয় যেন গােড়া কেটে আগায় কাল দেওয়ার মত। * এ বিষয়ে গত কার্তিকের “উপাসনা” পত্রিকায় একটি অতি জোরাল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, যা আমি সকলকে পড়তে অনুরােধ করি। প্রবন্ধের নাম, একটি ভাষায় কথা। লেখক অতুলচন্দ্র দত্ত। এত সাদা কথা এত সিধে ভাবে বলার ক্ষমতা মাসিকপত্র লেখকদের মধ্যে নিত্য দেখা যায় না। সম্পাদক।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বিবাহের পণ বিবাহের সময় কেন যে পণের কথা ওঠে তা অনেকেই ভেবে দেখেন না, মনে করেন যে দেশের শিক্ষিত যুবকেরা একটু সৎসাহস প্রদর্শন করে যেমন তেমন পাচপেচে রকমের মেয়েদের, শিক্ষিতা কি অশিক্ষিতা সুন্দরী কি কুৎসিতা ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য ক'রে, কেবল হাত পা আস্ত আছে এইটুকুমাত্র দেখে, বিবাহ করলেই এই উৎপাত থেকে দেশটা মুক্ত হবে। মেয়ের বাপেরা এবং অপুত্রকেরা বুঝতেই পারেন না যে, ছেলেগুলো লেখাপড়া শিখে এত নীচপ্রবৃত্তি হয়ে যাচ্ছে কেন, যে তাদের এবং তাদের বন্ধুবর্গের কুলে শীলে উৎকৃষ্ট। মেয়েদের বিবাহ কৰ্ত্তে ইতস্ততঃ করে। অনেকে আবার কল্পনার চক্ষে অতীতের সৌন্দৰ্য্য দর্শন করে কেবল এই বলে আক্ষেপ করেন যে “আহ সেকালে আমাদের বাপ পিতামহের আমলে কোনই হাঙ্গামা ছিলনা, বিয়েতে জোর ৫১ পণ ছিল, তাও বরের কুলের উচ্চতা অনুসারে দেওয়া হত—আজকাল কুলের খোজে কাজ নাই, দাও কেবল টাকা আর টাকা। অধিকন্তু কাগজে সহিকরা ছেলেদের কামড় আরও বিষাক্ততার পণ নেন না বটে কিন্তু এত বেশী খুঁতখুঁতে মন নিয়ে আসরে নামেন যে, হয় মেয়েদের ডানাকাটা পরী হতে হবে, তাতেও বোধ হয় কুলাবে না—কিম্বা তাদের অভি- ভাবকদের ঐশ্বর্যের বাতাসটা এ রকম বওয়া উচিত যে বর যেন কেবলমাত্র ব্রণ দ্বারা অনুমান কৰ্তে পারেন যে, এস্থলে দরকশাকশি করেও, যা চাওয়া যেতে পারে তার অপেক্ষা বেশী পাবেন। অতএব সকলেরি ভাবা উচিত যে এ কু-প্রথা আমাদের দেশে কেন এল এবং এর প্রতিকারই বা কি। সত্যযুগ, স্বর্ণযুগ ; এমন কি সকল বিষয়ে আদর্শ-যুগ। সে যুগে ৯২ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২ কোনও কষ্ট ছিল না, সুতরাং সে যুগের কথা ছেড়ে দেওয়া যাক । কিন্তু এই যে পঞ্চাশ ষাট বৎসর পূর্বে এ প্রথার ততটা চল ছিল না তার কারণ কি ? যতদূর আমার মনে হয় এর প্রধান কারণ দুইটি প্রথম খাদ্যদ্রব্যের প্রচুরতা, দ্বিতীয় বাল্যবিবাহ। সেকালে বিবাহের সময় স্বামীকে ভাবতে হত না যে সে স্ত্রীপুত্ৰাদিকে খাওয়াবে কি করে, আর কন্যার পিতাকেও ভাবতে হত না যে জামাতা যদি উপার্জন না করেন তা হলে পুত্রা আর পৌত্রাদির খাওয়ার কি ব্যবস্থা হবে। খাওয়া পরার অভাব না থাকায় সহজেই বাল্যবিবাহ প্রচলিত হবার সুযােগ উপস্থিত হ'ল; এবং বালক বালিকা-বিবাহ চলিত হওয়ার দরুণ বর অপেক্ষা বরের ঘরের খবরের আবশ্যকতা বেশী হ’ল এবং বরের বিদ্যা অপেক্ষা স্বাস্থ্যটা বেশী লক্ষ্যের বিষয় হ'ল। জাতিকুল মাপ- কাটি হওয়াতে সমাজে বর কন্যার দর ছেলে মেয়ে হিসাবে সমান ছিল বিবাহের বাজারে ছেলে বলে বরের বিশেষ একটা মূল্য ছিল না এবং কন্যার বিবাহ দিয়ে স্বচ্ছন্দে তাকে ও তার ছেলেমেয়েদের খাওয়াবার সামর্থ্য থাকার জন্য, কন্যার পিতার নিকট কন্যার জন্ম পাপের ভােগ বলে মনে হত না। ছেলেবেলাতে ছেলেমেয়ের বিবাহ হয়ে গেল, তারপর যার কপালে যে ছেলে যেমন কৃতী হল। কারও স্বামী বা মুখ হ’ল, কারও স্বামী বা পণ্ডিতগ্রগণ্য হ’ল। কোনও কালে কোনও দেশের স্ত্রীপুরুষের সংখ্যায় যে বিশেষ বৈষম্য আছে তা মনে করা ভুল-হয়ত বিশেষ কারণবশতঃ সাময়িক কিছু প্রভেদ থাকতে পারে কিন্তু অচিরেই তা স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়। অন্তত আমার মনে হয় না, যে বাংলাদেশে এই সব অসুবিধার হেতু, ছেলেমেয়ের সংখ্যার বৈষম্য। বহুবিবাহ যখন প্রচলিত ছিল তখন স্ত্রীলোকের ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বিবাহের পণ সংখ্যা পুরুষদের সংখ্যা অপেক্ষা দশ বিশগুণ বেশী ছিল না, এবং আজকাল যে, পাত্রের এই অভাব তা census রিপোর্ট দেখলেই বােঝা যাবে যে এ মনে করা ভুল যে, পুরুষের সংখ্যা মেয়ের সংখ্যা অপেক্ষা কম। আজকাল যে বাল্যবিবাহ প্রচলিত নাই তার কারণ এ নয় যে বাঙ্গালীর নৈতিক জীবনের খুব উন্নতি হয়েছে, বরং তার কারণ এই যে অসমস্যা এমন উৎকট হয়ে উঠেছে যে ছেলেদের কতকটা উপার্জনের রাস্তায় এগিয়ে না দিয়ে বিবাহ দিতে বরের বাপও ইতস্তত করেন এবং কন্যার পিতাও তেমন ছেলেকে সুপাত্র মনে করেন না। বাল্যবিবাহ ও জাতিকুলের কালে যতগুলি সুপাত্র ছিল ততগুলিই সুপাত্রী ছিল, সুতরাং বিবাহে কোনও গােল ছিল না। আজকাল পাত্রের সংখ্যার অল্পতা না থাকলেও সুপাত্রের অত্যন্ত অভাব। আমাদের দেশের মেয়ের কোনও দাম বাড়ে নি, এমন কি বড়লোকের অশিক্ষিত মেয়েও গরীবের শিক্ষিত মেয়ের অপেক্ষা বাঞ্ছনীয়া-অথচ পক্ষান্তরে কতকগুলি ছেলের, তাদের উপার্জন ক্ষমতা অনুসারে বা উপাধির অম্লাধিক্য হিসাবে মূল্য বেড়েছে। সকল কন্যার পিতার ইচ্ছা যে এমন পাত্রে মেয়েকে দেন যে তা অন্ততঃ অন্ন- বস্ত্রের ক্লেশ না থাকে, কিন্তু দিনকাল দেখে এবং চাকরী-ডাক্তারী ওকালীগত প্রাণ বাঙ্গালীদের অবস্থা দেখে তারা কেবল বিশ্ব- বিদ্যালয়ের ছাপধারী ছেলেগুলিকেই সুপাত্র মনে করেন। সব মেয়েরই বিবাহ দিতে হবে অথচ তাদের মধ্যে সমাজ এমন কোনও জিনিস দেখতে শেখেনি যাতে করে একটী মেয়ে আর একটা মেয়ে অপেক্ষা বন্ধু হিসাবে অধিক বাঞ্ছনীয়া হয়। বেশী লেখাপড়া শেখা অনেক স্থলে দোষের মধ্যেই গণ্য হয়। রূপের অবশ্য একটু সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ A দাম আছে কিন্তু তাও খুব বেশী নহে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে বিবাহযােগ্যা মেয়ে অনেক কিন্তু জামাতা কর্তে পারা যায় এমন পাত্র কম। অত এব ঐ কয়টী সুপাত্রের জন্য মেয়ের বাপদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় এবং তারা নিজেরাই দাম বাড়িয়ে দেন। একজন উপাধিকারী পাত্রের সহিত যে কন্যার পিতা ৫০ মাহিনা পান তিনিও বিবাহ দিতে উৎসুক, যিনি ৫০০, পান তিনিও আগ্র- হাম্বিত আর যিনি হয়ত ৫ ০ ০ ০ রােজগার করেন তিনিও সুশিক্ষিত বলে তাকে জামাতারূপে পেতে ইচ্ছুক। ছেলে এ অবস্থায় নিলামে চড়ে; এবং এই তিন জনের ডাকাডাকিতে ছেলের দাম এত বেশী চড়ে যায় যে প্রথমােক্ত লোকের বসতবাটী বন্ধক পড়ে। একটু অনুধাবন করে দেখলেই বুঝতে পারা যাবে যে, বরপণটা প্রত্যক্ষভাবে বরের বাপ স্পষ্টতঃ চাইলেও কন্যার পিতারাই জোর করে দিকে দেন। আমাদের দেশে যখন বিবাহ কোর্টশিপ করে হয় না, এবং যখন বরের পিতা বা অভিভাবক বধু বাছাই করে থাকেন, আর মেয়েরা যখন সকলেই এক দরের, এমন অবস্থায় কোনও কারণ আছে কি, যে কন্যার পিতা যে টাকাটা জোর করে দিচ্ছেন তা কেন ফেলে দেওয়া হবে, বা বরের পিতা কেন একজন বড় কুটুম্ব কৰ্বেন না। ব্যাপার এমন ত নয় যে ছেলের বিবাহ না দিয়ে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হচ্ছে, তবে তিনি নিজের মনােম স্থানে বিবাহ দেবেন না কেন? এ অবস্থা যে-কোনও দেশের পক্ষে অতি দুর্ভাগ্যের অবস্থা বলতে হবে যখন খাওয়াতে পার্ব না মনে করে লােক বিবাহ করে না, এবং সন্তানাদি জন্মালে আরও কষ্ট বাড়বে মনে করে, লােকে কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করে তাতে বাধা দেয়। কিন্তু প্রায় দেশই যখন ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বিবাহের পণ ৯৫ এইরূপ দুর্ভাগ্যক্লিষ্ট এবং ভারতবর্ষও যখন তা হতে মুক্ত নয় তখন বিবাহও যে অর্থনীতি দ্বারা শাসিত হবে তার আর আশ্চর্য কি? বিবাহের পর সন্তানাদি হলে তাদের কি খাওয়াব এবং তাদের শিক্ষা প্রভৃতির ব্যয় কোথা হতে আসবে এই সব ভেবে ছেলের বাপ আর ছেলের বিবাহ অল্প বয়সে দেন না। এই মনে করে যে, পাশকরা জামাত অন্ততঃ করে খেতে পারবে, কন্যার পিতার পাত্র সন্ধান করতে করতে কন্যার বালিকা অবস্থা উত্তীর্ণ হয় এবং পিতাও বিবাহের পর একরূপ সর্বস্বান্ত হন। এর প্রতিকার কিন্তু হাহুতাশ নয়, সভা সমিতি বক্তৃতা নয়, এমন কি ছেলের কিম্বা ছেলের বাপের “পণ চাহিব না” এইরূপ প্রতিজ্ঞাও নয়। শ্ৰীমতীরা আত্মহত্যা করে তাদের পিতাদের সম্পত্তি রক্ষা করেন বটে কিন্তু সামাজিক লাভ যে তাতে কতদুর হয় ঠিক বলা যায় না—প্রত্যুত আমার মনে হয় যে সাধারণ লােকেরা এই অপরিপকবুদ্ধি বালিকাদের বাহবা দিয়ে এবং তাদের কাৰ্যের অনুমােন করে সমাজকে দুর্বল করছেন এবং একটা নুতন প্রকারের সংক্রামক ব্যাধির সৃষ্টি করূচ্ছেন। এরূপ স্থলে খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে যে তবে উপায় কি ? যে কয়টী উপায় আমার নিকট সমীচীন মনে হয় তা এইখানে লিছি। ১। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপের মুল্য কমানাে। যতদিন বিশ্ববিদ্যা- লয়ের মার্কামারা লােকেরা অপরের অপেক্ষা সহজে জীবিকা অর্জন কতে পারবে ততদিন উপাধির দাম কন্যার পিতাকে নগদ গুণে দিতেই হবে। পাসের মূল্য পূর্বাপেক্ষা কমেছে বলে মনে হয়, এবং আজকাল অনেকে শুধু পাসকরার তুলনায় চাকরে ছেলেকে বেী পছন্দ করেন। আজকাল যে রকম চাকরির বাজার তাতে পাসের দাম ৯৬ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ . ক্রমশঃ কমবে। এর মূল্য দ্রুত কমাতে হলে উচ্চ শিক্ষার আরও প্রসার হওয়া আবশ্যক। আশুবাবুর আমলে যে বেশী ছেলে পাস হচ্ছিল তাতে দেশের অন্য কোনও উপকার হােক বা নাই হােক, শুধু পাস করা ছেলেই যে সুপাত্র এই ভুলধারনা অনেকটা দূর হচ্ছিল। যখন সকলে দেখবে যে অনেক পাস করা ছেলে উদরাম্নের সংস্থানে অপারগ তখন লােকে উপার্জনক্ষম ছেলেদেরই সুপাত্র মনে করবে—তা তারা যে কোনও সদুপায়েই উপার্জন করুক না কেন। কতকগুলি লােক অবশ্য চিরকাল থাকবেন যারা কেবল বিদ্যা দেখেই কন্যার বিবাহ দেবেন, কিন্তু সাধারণতঃ কন্যার পিতা এইটুকু দেখবেন যে এমন পাত্রে মেয়ে দিচ্ছেন যে তার অমবস্ত্রের কষ্ট না হয়। ২। প্রচুর সংখ্যায় উপার্জনক্ষম সুপাত্রের সৃষ্টি এবং কেবলমাত্র কয়েকটী ব্যবসায়কে সম্মানের চক্ষে না দেখা। কৃষি বাণিজ্য ইত্যাদি অনেক ছেলেদের অবলম্বন করতে হবে, লােকেদের মন থেকে এ সব কার্য্যের হীনতা সম্বন্ধে যে ভুলধারণা আছে তাহা অপসৃত করতে হবে, এবং তাদের দেখাতে হবে যে এ সব কাৰ্য যারা করে তাদের অমবস্ত্রের সংস্থান কেবলমাত্র পাসকরা ছেলে অপেক্ষা সহজে হয়। মােট কথা কন্যার পিতাদের জানতে হবে যে এ সব উপায়ে উপার্জন ক্ষম ছেলেরাও সুপাত্র। ৩। সুপাত্রীর সৃষ্টি। আজকাল মুড়ী মিছরির এক দর। কি রকমের শিক্ষা মেয়েদের দেওয়া উচিত তা এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু যে কোনও শিক্ষাপ্রণালী অনুসৃত হ'ক না কেন মেয়েদের সুশিক্ষিত করা উচিত এবং সাধারণকেও এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া কর্তব্য যে ঐ সুশিক্ষিত পাত্রীগুলি অপেক্ষাকৃত অপাত্রী, অতএব ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা বিবাহের পণ ৯৭ অধিকতর বাঞ্ছনীয়। ছেলেদেরও পরােক্ষভাবে এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত যে তারা যেন এ জ্ঞান লাভ করে যে জীবন কৃতার্থ কন্ট্রে হ'লে ঐ শিক্ষিত সুপাত্রীই লাভ কৰ্ত্তে হবে। এরূপ অবস্থা উপস্থিত হলে বিবাহের আগ্রহটা উভয় পক্ষের হবে এবং পাত্রের মুল্য নিয়ে যে একটা অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাও দূর হবে। কেউ কেউ বলতে পারেন যে এক সুপাত্রেই রক্ষা নেই, আবার সুপাত্রী সৃষ্টি আর সুপাত্রীর জ্ঞান-এতে মেয়ের কেনা বেচা আরম্ভ হয়ে কুরীতিটা আরও ভয়ঙ্কর মুর্তি ধারণ কৰ্বে। বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু তা নয়, একটু ভেবে দেখলেই সকলে দেখতে পাবেন যে মেয়ের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দাম কমবে। আগ্রা ১৩ই মার্চ শ্রীহরপ্রসাদ বাগচী। ১৯১৮ নবীন সাহিত্যিক। “বয়সে বালক বচনে নয় সে ছেলেকে মন্দ সকলে কয়” সাহিত্যের আসরে ঠিক এ কথাটী না হলেও মাঝে মাঝে এবম্বিধ মন্তব্য শােনা গিয়ে থাকে। এবং পূর্বপক্ষ এ মন্তব্যের নিরাসকল্পে বিভিন্ন সাহিত্য থেকে অনেকানেক সাহিত্যিকের নজির এনে হাজির করলেও সমালোচকের মন তাতে ভেজে না! বরং উল্টো বিপত্তিই দাঁড়ায়। কারণ, তত্তৎ সাহিত্যক্ষেত্রে সেই সব লেখক নাকি এক এক জন “অবতার” কাজেই তাদের পক্ষে যা “লীলাখেলা, সাধারণ সাহিত্যিকের পক্ষে তা নিশ্চয়ই দূষণীয়। আমার মন কিন্তু এতে সায় দেয় না। সামাজিক সার্থকতা ওর যাই আর যতই থাক না, সাহিত্যক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস উক্ত শ্লোকাংশ নিতান্ত নিরর্থক এবং অপ্রয়ােজনীয়। বচন-বিন্যাসমাত্রকে সাহিত্য সৃজন, আর সাহিত্যকে সর্বথা সামাজিক পদার্থ বলে ধরে নেওয়াতেই আমাদের ওরূপ ভুল হয়ে থাকে। সাহিত্য যদি স্থান, কাল এবং সমাজকে অতিক্রম করে সুদূরকে সন্নিহিত করবার, অজানাকে প্রকাশ করবার, অবহেলিতকে অনুরঞ্জিত করবার সঙ্কেত না জানত ; মানুষের ভবিষ্যতের আশার নীহারিকাকে যদি আকার দিতে না ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা নবীন সাহিত্যিক ১৯ পারত, শতেক পাকে তা যদি বর্তমানের বস্তুতন্ত্রতার বজ্র আঁটুনীতেই বাঁধা পড়ে থাকত-তবে তার যে বিশেষ আদর হতে সমাজে, এমন ত আমার বােধ হয় না। কারণ, ওরূপ বস্তুতন্ত্র সাহিত্যের ত্রিবিদ্যা ত জাতি বর্ণ নির্বিশেষে ঘরে ঘরে কাগজে কলমে না হােক কায়মনাে- বাক্যে আবালবৃদ্ধবণিতা আমরা সবাই সাধন করে আছি। অভিজ্ঞতা সাহিত্য-সৃষ্টির পক্ষে প্রয়ােজন সন্দেহ নেই ;-কিন্তু অনুভূতিই হয়েছে সাহিত্যের প্রাণ। বেদমন্ত্রে যতক্ষণ না মৃৎ-প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, ততক্ষণ তা যেমন নিতান্ত জড়সমষ্টিমাত্র, তীক্ষ্ণ অনুভূতির প্রেরণায় অনুপ্রাণিত না হওয়া পর্যন্ত সাহিত্য-সৃজন- প্রয়াসও তেম্নি কথার কথা। অস্থি-সমাবেশপরিশূন্য জীবের অস্তিত্ব অসম্ভব নয় ; কিন্তু চেতনালেশ-পরিহীন প্রাণীর কল্পনাও অসঙ্গত। অধিকাংশ স্থলে সাহিত্যের সমালােচনার ছলে আমরা অভিজ্ঞ- তার মাপকাটীতে তার জড়-দেহটারই জরীপ করে থাকি ; তারি ফলে, নির্ভুল সমালােচনাও অনেক সময়ে নিরর্থক হয়ে পড়ে। অনুভূতি পদার্থ টী আমাদের নিত্য-নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতার সাথে কোনো আপেক্ষিক অনুপাত রক্ষা করে চলে না। তা যদি চলত, তা হলে সামাজিক উপন্যাস কেবল সমাজপতি মহাশয়দের হাত থেকে বেরুত ; অবিনাশ বাবুও হয়ত “বার্ষিক উপন্যাস লিখতেন না; আর, দ্বিজেন্দ্রলালের জীবন “রায় আর “রিপাের্ট” লিখেই কেটে যেত - অন্ততঃ রাণাপ্রতাপ, মেবার পতন, দুর্গাদাসের মত নাট্টসাহিত্য তার অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হতো না। সাহিত্য বৈষয়িক-অভিজ্ঞতা-গত-প্রাণ নয় বলেই এ ক্ষেত্রে বয়সের বিচার নেই। “নবীন-সাহিত্যিক”, “প্রবীন-সাহিত্যিক আদি করে সৰু পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ কথাগুলো নিতান্তই নিরর্থক। সাহিত্যে দাদা মশাই-এর লম্বাই চৌড়াই ও যেমন নিষিদ্ধ, খোকা বাবুর চঁাদ ধরাবার আব্দারও তেম্নি অচল। “অমৃতং বালভাষিতং” সাহিত্য-বিচারে এ কথা খাটে না। কারণ সাহিত্য ত “ভাষিত হয় না। আর, “শতংবদ, একং মালিখ” এ যুগ্ম অনুজ্ঞার যুক্তিযুক্ততা সম্বন্ধে আশা করি সবাই নিঃসন্দেহ। সত্য এবং সতেজ অনুভূতির দ্বারা উদ্দীপ্ত না হলে সাহিত্যিক অভিব্যক্তি কখনো স্বাভাবিক বা হৃদয়গ্রাহী হতে পারে না। পঞ্চাশেদ্ধে তৃতীয় পক্ষে যােড়ষীর পাণিপীড়ণ করে’ অলঙ্কারের শিঞ্জিনীতে প্রীতির অভিনন্দনের অভাব দূর করার প্রয়াস যেমন নিতান্তই পণ্ডশ্রম, অনুভূতির পরশ মনির অভাবে অভিজ্ঞতার ইট পাটকেল দিয়ে সাহিত্য-সৃষ্টির আশাও ঠিক তেম্নি বিড়ম্বনা। এ বিড়ম্বনার অবতারণা যারা করেন পাঠক-সাধারণের বিদ্যাবুদ্ধি সম্বন্ধে তঁাদের ধারণা নিশ্চয়ই খুব উচ্চ অঙ্গের নয়। এবং উক্ত আনাড়ি সম্প্রদায়কে কিঞ্চিৎ “আক্কেল দেবার” অভি প্ৰায়েই সাহিত্য সৃষ্টির নামে তারা নিত্য নূতন “সাহিত্য-পাঠ” রচনা করে থাকেন। পরের অজ্ঞতাকে অবশ্য স্বীকাৰ্য, আর নিজের বুদ্ধিকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে’ নিয়েই তার সাহিত্যের ক্ষেত্র তত্ত্ব উদ্যানে মনােনিবেশ করেন। ফলে, তাদের অনায়ত দৃষ্টির সম্মুখে সাহিত্যের প্রসার স্বতঃই ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে। “শিক্ষা” জিনিসটা অত্যন্ত দরকারী-তাতে আর সন্দেহ কি ? দেশ যাতে সুশিক্ষিত হয় ; দেশের লােকের মতিগতি রীতি-নীতি যাতে বিপথগামী না হতে পারে ; দেশের স্ত্রীপুরুষ ছেলে বুড়ো সবই যাতে স্বেচ্ছায় কর্তব্য পালনে উন্মুখ হয়ে ওঠে। এককথায়, দেশের যেখানে যেমনটী হওয়া উচিত যেখানে ঠিক তেমনটী যাতে ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখা নবীন সাহিত্যিক গড়ে ওঠে, আর যেখানে যা নিষিদ্ধ হওয়া দরকার, সেখান থেকে তা উঠে যায় যাতে, এমনতর শিক্ষার সূত্রপাত এবং অনুষ্ঠান যে, দেশের মনিষিগণের লক্ষ্য হওয়া উচিত—এ কথা সজ্ঞানে অস্বীকার করা চলে । কিন্তু মানুষের অভাব এত বহুবিধ, প্রতিভা এত বহুমুখী আর প্রকৃতি এতই বিচিত্র যে দেশের সমুদয় সাহিত্য প্রচেষ্টাই যে সেই একই সাধারণ সূত্রের অনুবর্তী হবে—এমন আশা করাও সমীচীন হবে না। সাহিত্য আর সমাজে ত’ গুরুশিষ্য সম্বন্ধ নয়। সাহিত্য রসিকের সাথে সমপ্রাণতা স্থাপনাই হয়েছে সাহিত্যিকের চিরদিনের লক্ষ্য। নিবিড় আলিঙ্গনে পাঠকের প্রাণে প্রাণে অনুভূতির আনন্দ এবং সম- বেদনার আবেগ ছড়িয়ে দেওয়াই ত’ সাহিত্যিকের কাজ। যে নব চেতনার উৎস সাহিত্যিকের প্রাণে উচ্ছাসিত হয়ে ওঠে, ভাষার সহায়তায় তাকে দিকে দিকে দেশে দেশে প্রেরণই হয়েছে সাহিত্যিকের সাধনা। যে ভাবনায় সাহিত্যিক বিভাের তা অপরের পক্ষে অভাবনীয় নয়, অচিন্ত্যও নয়; এমন কি অনেকের কাছে অননুভূত পূৰ্বও না হতে পারে !–এই ভরসাই ত সাহিত্যিককে মুখর করে তোলে। নিজের অনুভূতিকে পরের কাছে যাচাই করবারও যে একটা আগ্রহ আছে। সেই আগ্রহের ঐকান্তিকতাতেই ত’ সাহিত্য-সাধকের মানস- মুৰ্ত্তি তার লেখার ভিতরে বিকশিত হয়ে ওঠে। লেখক সেখানে গুরু নয়, উপদেষ্টা নয়—সখা! লেখক আর পাঠক উভয়েই সেখানে সাহিত্য-সেবী। লেখক আর পাঠকের এই যে ঐক্যবিধান এই খানেই সাহিত্যের সার্থকতা । সাহিত্য থেকে যদি কখনাে সমাজের কোন উপকার হয় তা হলে তা এই পথেই আসবে। তার সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ অগ্রদূত হবে-আর আগমনী গাইবে তারাই যারা চির-নবীন চির- কিশাের। আর যারা এর ঘাটি আগলে রাখবে—হোক না তার প্রবীণ হােক না তারা বিজ্ঞকিন্তু সাহিত্যক তারা আদৌ নয়। শ্রীবরদ। চরণ গুপ্ত। * পত্র। শ্ৰীমন চিরকিশাের- কল্যাণীয়েষু। একটা খবরের মত খবর দিয়ে এ চিঠিটে শুরু করতে পারছি নে, কেননা দেশ বিদেশের সংবাদ পত্র ঘেঁটে এমন কোনও সংবাদ খুঁজে পেলুম না, যাতে করে মানুষের পিলে চমকে দেওয়া যায়। তারপর জনরবের কলরবও অনেকটা নীরব হয়ে এসেছে। গেলবার তােমাকে যখন চিঠি লিখি, তখন একটি বিজুলি-বাৰ্তার ধাক্কায়, দেশের সুস্থ শরীর অতিশয় ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল ; এবং সে ব্যস্ততার ছােয়াচ যে আমার গায়েও লেগেছিল, তার পরিচয় ত ঐ পত্রেই পেয়েছ। সুস্থ শরীরে কে আর টনিকের খোঁজে ফেরে ? কিন্তু শুনে সুখী হবে যে, নব ভারতের ভূতপূৰ্ব্ব রাজধানী, এই কলিকাতা মহানগরীতে আমরা সবাই আবার প্রকৃতিস্থ হয়েছি। এ সহরে একটা হুজুগ নিয়ে লােকে বেশী দিন কাটাতে পারে না, আমাদের নিত্য নতুন গুজব চাই। আপাততঃ নতুন গুজবের অভাবে, আমরা সকলে সুবােধছেলের মত নিজ নিজ কাজে মনােনিবেশ করেছি। রাজনীতিকেরা মন দিয়েছেন অর্থসংগ্রহে আমরা সাহিত্যিকেরা, বাক্য সংগ্রহে। এর কারণ ভারতবর্ষের বায়ুকোণে

১০৪
সবুজ পত্র
জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫
যে ঝড়ো-মেঘ দেখা দিয়েছিল, তা এক নিমেষে কেটে গেছে।
মেঘ যে কেটে যাবে, তা আমাদের বােঝা উচিত ছিল, কেননা “মানুষ
আমরা নহিত মেষ”। আমরা যে তা বুঝিনি তার কারণ আমরা
কবির কথাকে গানের দরবারে আদর করি-প্রাণের কারবারে
আমল দিই নে।
সে যাই হােক এখন জানা যাচ্ছে যে, এ দেশের উপর জর্মাণ
বাটপাড়ির কথাটা হচ্ছে একেবারে উদ্ভট। কিম্বদন্তির ভিতর যতটুকু
ইতিহাস থাকে ওগুজবের ভিতর তার বেশী আর কিছু নেই। তাই
যদি হয়, তাহলে আমাদের এই নীল আকাশে ঐ লাল মেঘের ইন্দ্রজাল
রচনা করবার কি দরকার ছিল। ঘরপােড়া-গরু সিঁদুরেমেঘ দেখলে
যে ভয় পায়—এ প্রবাদ কি ইংরেজিতে নেই ? তবে লাভের মধ্যে
এই যে, এই ধাক্কায় আমাদের মনটা একটা বড় রকম ঝাঁকুনি খেয়েছে
এবং আশা করি সেই সঙ্গে কতকটা সচেতনও হয়েছে।
অতঃপর শুনছি এ যুদ্ধের হয় এসপার নয় ওসপার ভারতবর্ষের
বায়ুকোণে নয়—ফ্রান্সের ঈশানকোণেই হবে।
এ ভবিষ্যদ্বাণী খুব
সম্ভবতঃ খাটবে। ইউরােপের অনেক বড় বড় যুদ্ধ বিগ্রহের যাহয়
একটা হেস্তনেস্ত ইতিপূর্বে বহুবার ঐ কোণেই হয়ে গেছে। এযুদ্ধ
এতটা অপু যে, পূৰ্ব্ব পূর্ব যুদ্ধের নজির, অনেকের মতে এক্ষেত্রে
খাটবে না। বিশেষতঃ এই যখন পৃথিবীর শেষ যুদ্ধ। এযুদ্ধের
আকার যে বিপুল, তা ত সকলেই জানে এবং অনেকে বলে এর
অতুল। এ লড়াই মাটির উপরে হলেও মাটির জন্য নয়।
সুদৃষ্টিতে এ ব্যাপার দেহের সঙ্গে দেহের সংঘর্ষ বলে বােধ হলেও,
সূক্ষদৃষ্টিতে ধরা পড়ে যে এ হচ্ছে আত্মার সঙ্গে আত্মার লড়াই।
উদ্দেশ্যও অতুল।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা পত্র আত্মার জয় যে দেহের জয়ের উপর নির্ভর করে এ সংস্কার অবশ্য আমাদের নেই। আমাদের ধারণা দেহের পরাজয়েই আত্মার জয়। কিন্তু জৰ্মাণরা উল্টো বােঝে। এই দেহাত্মবাদীদের মতে বাহুবলই আত্মবল। তাই তােপের মুখ দিয়ে তারা তাদের culture প্রচার করতে চায়। এ দেশের আর্য-সমাজের আমিষের দল নিজেদের বলেন, culture party কিন্তু নিরামিষের দল তাদের বলেন vulture party। ইউরােপের আৰ্য-সমাজেও জর্মাণ হচ্ছে নিজেদের মতে culture-এর দল, এবং অপরের মতে vulture-এর দল। অৰ্ম্মাণ-ইগল যে মহা-শকুন, এ দম্ভ জৰ্ম্মাণরাও করে থাকেন। অতএব এ যুদ্ধ যে, জৰ্ম্মাণীর culture ওরফে vulture-এর বিরুদ্ধে বিশ্বমানবের আত্মরক্ষার যুদ্ধ, এ কথা মেনে নিতে কোনই আপত্তি নেই। তবে এ যুদ্ধ মানুষের স্বাধীনতার যুদ্ধ বলেই যে মানুষের শেষ যুদ্ধ-–এরূপ অনুমান করবার কোনও কারণ নেই। এ যুদ্ধের ফলে যদি বিশ্বমানবের স্বাধীনতার সত্ত্বসাব্যস্ত হয়ে যায়, তারপর আর একটা যুদ্ধ হবে, বিশ্বমানবের সাম্যের সত্ত্বসাব্যস্তের জন্য—তারপর আর একটা যুদ্ধ হবে বিশ্বমানবের মৈত্রির জন্য। সেইটে হবে শেষ যুদ্ধ, কেননা তারপর পৃথিবীতে যুদ্ধ করবার আর কোনও লােক থাকবে না। এবং সেই সুযােগে বুদ্ধদেবের শেষ অবতার ভগবান মৈত্রেয় ভূভারতে অবতীর্ণ হবেন। থিওজফিষ্টরা যে ঘােষণা করছেন যে, তিনি ইতিমধ্যে দক্ষিণ-মথুরায় ভূমিষ্ঠ হয়ে এখন গােকুলে বাড়ছেন—সে সুসমাচার মােটেই বিশ্বাস্য নয়। তুমি ভাবছ যে আমি নেহাৎ বাজে বকছি। অবশ্য অই কই এ যুদ্ধের নাম মুখে আনবা মত, মানুষে যে বেজায় বাজে বকতে আরম্ভ ১৪ সবুজ পদ্ধ জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ করে, তার এক লাইব্রেরী প্রমাণ আমি যেখানে বলো, সেই সাহিত্যের আদালতে দাখিল করে দিতে পারি। তার দেদার দলিল আমার ঘরেই মজুত আছে। যদি জিজ্ঞাসা করো, এই সব বাজে বকুনি পয়সা খরচ করে সংগ্রহ করবার প্রয়ােজন কি ? বলছি। ইতিহাস মাত্রেই যে উপন্যাস এবং উপন্যাস মাত্রেই যে ইতিহাস এ আমার চিরকেলে বিশ্বাস। এবং এ বিশ্বাসের অন্তত প্রথম পদটা সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য, আমাদের চোখের সুমুখে, দিনের পর দিন, ইতিহাস যে কি পদ্ধতিতে তৈরি করা হচ্ছে তার প্রমাণ জড় করছি। এত খেলাপ এজাহার মানুষে বােধ হয় আদালতেও দেয় না। তবে বৈজ্ঞানিক- ইতিহাস যে কাঠালের আমসত্ত সে জ্ঞান এক বৈজ্ঞানিক ছাড়া আর সকলেরই আছে। এতেই বঁাচাও। অৰ্ম্মাণ দেশে Treitsche যে এত লােকমান্য এবং তার ইতিহাস যে এত লােকপ্রিয়, তার একমাত্র কারণ তিনি ছিলেন জন্মকাল। কারও কথা তার কাণে ঢেকে নি বলে তার কথা জৰ্ম্মাণির সকলের কাণে ঢুকেছে। শুধু ঢোকে নি, কাণের ভিতর দিয়ে মরমে পশেছে, আকুল করে জর্মাণের প্রাণ। তিনি যদি fact-এর বড় একটা ধার ধারতেন তাহলে কি তিনি অমন ইতিহাস রচনা করতে পারূতেন? দেখতে পাচ্ছ এক কথা থেকে আর এক কথায় গিয়ে পড়লুম। চিঠি লেখার দোষই এই যে, তা লিখতে লিখতে লেখার খেই হােিয় যায়। আমি যা বলতে চেয়েছিলুম সে হচ্ছে এই যে, এযুদ্ধ যে ক্ষেত্রেই পঞ্চত্ব পাক, অতীতে ইউরােপের অনেক যুদ্ধেরই ঐ ফ্রান্স ও প্রাণীর সীমান্ত প্রদেশেই গাের হয়েছে। সেকালের যুদ্ধ জমির স্য করা হত বলে সেকালের ইতিহাস জিওগ্রাফীর উপরেই গড়ে ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা পর উঠেছে। অন্ততঃ পােনের’শ বছর ধরে ফ্রান্স ও জৰ্ম্মাণীর ঐ মধ্যদেশ নিয়ে কত জাতি যে কত লড়াই করেছে তার আর লেখালেখি নেই। ঐ প্রদেশ মানুষের এত রক্ত পান করেছে যে ওদেশে যে আঙ্গুর ফলে তার মদের রং আজও লাল ; আর সে মদ উদরস্থ করুলেই মানুষের মাথায় খুন চড়ে যায়। ইউরােপের মধ্যযুগে এই মধ্যদেশে জাতিতে জাতিতে যে কি রক্তারক্তি করেছে তার বিপর্যয় কাহিনী মধ্যযুগের যে কোন ইতিহাসে দেখতে পাবে। সে বিবরণ এত কুটিল আর এত জটিল যে তাকে সরল করবার ক্ষমতা আমার নেই। যুগ যুগ ধরে মানুষে মানুষে এই কোস্তাকুস্তির কারণ কি ? ফ্রান্স ও জৰ্ম্মাণীর বিচ্ছেদের একটি সরল রেখা বার করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থাৎ তারা কাগজে কলমে নয় ঢাল তলােয়ারে, যার সমাধান করবার এ যাবৎ বৃথা চেষ্টা করেছে, সে হচ্ছে একটি জ্যামিতির সমস্যা। এর থেকে স্পষ্টই প্রমাণ হয় যে সংসারের কোন সমস্যার সরল মীমাংসা করবার চেষ্টা থেকেই যত মারাত্মক জটিলতার উদ্ভব হয়। আর মানুষ যে সরল পথ খোজে তার জন্য দায়ী তিনি, যিনি মানুষকে সরল রেখার সন্ধান দিয়েছেন, অর্থাৎ ইউক্লিড। ভাল কথা ইউক্লিডের নাম করতেই মনে পড়ে গেল যে, ইউক্লিডের রচনায় রূপ নেই একথা বলায়, আমার জনৈক অতি নিরীহ বন্ধু মহা রাগান্বিত হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন যে, যে-রূপের ভিতর কাম গন্ধের নামগন্ধ পর্যন্ত নেই, সে রূপের সাক্ষাৎ একমাত্র জ্যামিতির ভিতরেই পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য আমার বন্ধুটি হচ্ছেন একজন পাকা জ্যামিতিক। “জ্যামিতিক” শব্দটি কলাপের ব্যাকরণে কি হয় কি না জানি নে, কিন্তু আলাপের ব্যাকরণে তা প্রসিদ্ধ হয়েছে।

১০ শবু পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ অতএব ওশব্দটি প্রবন্ধে না চল্লেও, পত্রে চলে। অন্ততঃ এ কথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, জ্যামিতিক শব্দ বাংলাভাষায় না থাকলেও জ্যামিতিক লােক বাংলাদেশে ঢের আছে, এমন কি শিশুদের মধ্যেও ওদলের অভাব নেই। ত্রিশমাস বয়েসের আমার একটি ভ্রাতুস্পুত্র, এই মিনিট খানেক আগে, আমার সােণার ঘড়িটি নিয়ে মেজের উপরে ঘড়ি পেতে, বৃত্তকে চতুষ্কোন করবার চেষ্টা করছিল। আমি বাধা না দিলে, সে সমস্যার সে যে অতি সহজেই সমাধান করত সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া থেকে তাকে নিরস্ত করায় সে যে কেঁদে পাড়া মাথায় করছে তাতেও তার দোষ দেওয়া যায় না। ছােট ছেলেদের স্বভাবই এই যে তাদের কোনও স্বভাব নেই। তারা বড়দের যা করতে দেখে তাই করতে শেখে। আমরা যখন ভারতবর্ষের যেখানে যা কিছু গোল আছে তাকে চৌকোষ করতে উদ্যত হই, আর আমাদের গুরুজনেরা সে কাৰ্যে বাধা দেন, তখন আমরা কান্না ছাড়া আর কি করি। আমার জ্যামিতিক বন্ধুকে আমি এই কারণে মান্য করি যে তিনি, কোন কিছুরই আকার বদলাতে চান না। আকারের উপরে তার ভক্তি এত নৈসর্গিক যে তিনি মনে করেন যে, দ্রব্যের গুণ তার অাকারের উপরেই নির্ভর করে। রসগোল্লার সঙ্গে জিবে-গজার স্বাদের পার্থক্যের একমাত্র কারণ যে, প্রথমটির আকার জ্যামিতির এবং দ্বিতীয়টির Conic-section-এর অন্তভূত, তার একথা অবশ্য আমি মানিনে। কিন্তু একথা আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে তিনি এক বিষয়ে আমার চোখ ফুটিয়ে দিয়েছেন। ইউক্লিডের জ্যামিতি যে বিজ্ঞান নয়,-আট, এ জ্ঞান আমি তঁার প্রসাদে লাভ করেছি। এ ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা কথা শুনে লোকে চাই কি হাসতেও পারে, অতএব দেখা যাক এর স্বপক্ষে কি কি যুক্তি আছে। আমরা সকলেই জানি, আর্ট হচ্ছে সেই বস্তু যা প্রকৃতির হাতে নেই এবং যা মানুষে নিজের মন ও নিজের হাত, এ দুয়ের সহযােগে গড়ে তোলে। ইউক্লিড যা সব নিয়ে কারবার করেন তার কোন মুর্তিই প্রকৃতির রাজ্যে কুত্রাপি কারও দৃষ্টিগােচর হয়নি। যে সরল রেখা হচ্ছে তার শাস্ত্রের অর্ধেক সম্বল, সে রেখা—এ বিশ্বে কোথায়ও নেই; আর এ পৃথিবীতে যেখানে ওরেখার সাক্ষাৎ পাবে সেখানেই বুঝতে হবে যে তা মানুষের হাতে গড়া। তারপর ত্রিভুজ চতুভুজ পৃথিবীতে নানা আকারের থাকলেও সম-ত্রিকোণ সম-চতুষ্কোণ প্রভৃতি প্রকৃতির ভাণ্ডারে আদপে নেই। ওসব আকার মানুষে অাগে কল্পনা করে তারপরে রচনা করেছে। প্রকৃতি যা অসম্পূর্ণ রেখেছেন তাকে সম্পূর্ণ করাই মানুষের আসল কাজ। পৃথিবীতে যা আছে সে সব হচ্ছে আগাগােড়া বিষম। আর ইউক্লিড যেসব ত্রিকোণ চতুষ্কোণের মৰ্ম্মোদ্ধার করেছেন, সে সব হয় সম, নয় অসম, কিন্তু একটিও বিষম নয়। বিজ্ঞান খোঁজে fact অর্থাৎ বস্তুর স্বরূপ, কিন্তু আর্ট চায় তার সুরুপ। সুতরাং যা কুটিল, আর্ট তাকে সরল করে নেয়, যা বিষম তাকে সুষম করে নেয়-যা বিবাদী তাকে সম্বাদী, অনুবাদী করে নেয় ; এক কথায় সকল বিরােধের সমন্বয় করে, তার সামঞ্জস্য ঘটায়। কথা যদি সত্য হয়, তাহলে শুধু আমি নই সবাই স্বীকার করুত বাধ্য যে ইউক্লিডের জ্যামিতি, আথেন্সের পার্থিননের মত, ফিডিয়াসের ভিনাসের মত একটি অপূৰ্ব্ব ও অবিনশ্বর work of art। প্রত্যুদা-. হণের দ্বারা এর আর একটি প্রমাণ দিচ্ছি। হলে ইউক্লিড ভেঙ্গে ১১০ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ এক রকম বৈজ্ঞানিক জ্যামিতি তৈরি করা হয়েছে। সে জ্যামিতি দেখলে যে, ভদ্র-সন্তানের গায়ে জ্বর আসে, তার কারণ তাতে মাল ঢের বেশী থাকতে পারে কিন্তু গড়ন মােটেই নেই। ইউক্লিডের প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম প্রতিজ্ঞা গর্দভের কাছে সেতু হতে পারে, কিন্তু মানুষের কাছে তা পিরামিডেরই মানসী-মুৰ্ত্তি এবং তা আর্ট হিসেবে পিরামিডের মতই উচ্চ। আর এক কথা ইউক্লিডের জ্যামিতি যে গ্রীসের সকল আর্টের স্বগােত্র, তার কারণ সে-সকল অটের ভিতরেও জ্যামিতি আছে। পার্থিননের সকল রেখাই সরল রেখা এবং তা আকারে চতুষ্কোণ এবং তার সকল ভূষণ ত্রিকোণ, অবশ্য সম-ত্রকোণ আর অসম ত্রিকোণ, বিষম নয়। গ্রীকদের এ জ্ঞান ছিল যে আকাশই বস্তুকে রূপ দেয় তাই গ্রীসের স্থাপত্যে, রেখা ও রেখার মধ্যে যথেষ্ট অবকাশ আছে অর্থাৎ আকাশের স্থান আছে। মানুষের বন্ধুর দেহটাকে যতটা সরল রেখার কাছাকাছি আনা যায় গ্রীক-ভাস্করেরা তা করতে ক্রটি করেন নি। গ্রীসের Statue-এর দেহকে সত্যসত্যই দেহযষ্ঠি বলা যায়। আমাদের দেশের ভাস্কর্য্যে দেহের যে অঙ্গ উন্নত তাকে আরও উন্নত করা হয়েছে আর যে অঙ্গ অবনত তাকে আরও অবনত করা হয়েছে। অর্থাৎ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক জাতিভেদ অস্বাভাবিক রকম ফুটিয়ে তােলা ও পিটিয়ে ফেলা হয়েছে। উঁচু-নীচুর জ্ঞান আমাদের তুল্য আর কোন জাতের আছে ? গ্রীসের ভাস্কর্যের পদ্ধতি ঠিক এর সে দেশের শিল্পীরা দেহের সুষমা ও সামঞ্জস্য সম্পূর্ণ করবার জন্য য় অসম তাকে সম করে তুলেছে আর যা বিষম তাকে অসম করেছে। অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাম্য ও মৈত্রর উপরেই যে দেহের সৌন্দৰ্য্য উল্টো।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা পত্র নির্ভর করে এ সন্ধান তারা জানত। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগের আর্ট অবশ্য গ্রীসের পথেও চলেনি, ভারতবর্ষের পথেও নয়। যুগের শিল্পীদের Motto হচ্ছে যদৃষ্টং তল্লিখিতং। অর্থাৎ তারা আর্টকে বস্তুতন্ত্র করতে গিয়ে নিজের হয়ে পড়েছেন অপদার্থ যন্ত্র। ইউক্লিডের জ্যামিতিকে যে, লােকে একনজরে আর্ট বলে চিনতে পারে না, তার কারণ অপর সকল আর্টের উপাদান হচ্ছে ক্ষিতি, আর তার আর্টের উপাদান আকাশ। ইউক্লিডের হাতে যা ধরা পড়েছে সে সব হচ্ছে ত্রিদল চতুর্দল আকাশকুসুম। সুতরাং তার রচনা শুধু আর্ট নয়, চরম আর্ট। তিনি যে, ত্রিকোণ চতুষ্কোণ বৃত্ত প্রভৃতি নির্মাণ করেছেন—তার উদ্দেশ্য হচ্ছে অসীমকে সসীম করা। ঐ সব ত্রিভুজ চতুর্ভূজের ভিতর অসীম আকাশ এমন নিখুত ভাবে সসীম হয়ে রয়েছে যে তার একটি বিন্দু নড়চড় করলে তার রূপের সর্ববশ হয়। জ্যামিতিকে আর্ট বলায় আমি ওবস্তুকে খেলো করছি নে। মানুষে কেন যে আর্টকে, দর্শন বিজ্ঞান প্রভৃতির নীচে আসন দিতে এত ব্যস্ত তার রহস্য আমি আজও উদ্ধার করতে পারিনি। এব্যাপার আমার কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য, কেননা মানুষের ব্যবহারে দেখতে পাই যে, যে বিজ্ঞান দর্শনের ভিতর আর্ট আছে, সেই বিজ্ঞান দর্শনই মানুষকে মুগ্ধ করে। প্লোটার দর্শন যে আগাগোড়া আট তা দর্শনজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই জানেন। তার আর্ট আবার ইউক্লিডের সহােদর। প্লোটার prototypes সব চিদাকাশের মন্দার পারিজাত বই আর কিছুই নয়। একটা স্বদেশ উদাহরণও নেওয়া যাক। শঙ্করের দর্শন যে দেশে বিদেশে এত মান্য পেয়েছে তার একমাত্র কারণ, তার আর্ট। যে গুণে কালিদাসের কবি সংস্কৃত কাব্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পদার্থ সেই একই গুণে শঙ্করের ১১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ সবুজ পত্র দর্শন, সংস্কৃত দর্শন সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পদার্থ, এবং অলঙ্কার শাস্ত্রে সে গুণের নাম হচ্ছে প্রসাদ গুণ। বলা বাহুল্য স্বচ্ছতা হচ্ছে আটের সৃষ্টি। পৃথিবীর সকল জিনিষই অপরিষ্কার, মানুষ নিজের মন ও নিজের হাত এই দুয়ের সহযোগে যা অপরিস্কার তা পরিষ্কার করে নেয়—সেই পরিষ্কৃত পদার্থের নামই স্বচ্ছ। কিন্তু চিন্তার ধারা স্বচ্ছ হলেই যে গভীর হতে হবে এমন কোনই কথা নেই। বরং সচরাচর দেখতে পাই লোকের বিশ্বাস যে, যে-বস্তু যত ঘঘালা তা তত গভীর। মানুষে হেগেলের চিন্তাকে যে এত গভীর মনে করে, তার প্রধান কারণ সে চিন্তার ধারা আগাগােড়া কাদাগেলা। যে মনােভাব থেকে মানুষে রঙকে স্বচ্ছ করে, সেই একই মনােভাব থেকে মানুষে রেখাকে সরল করে। সুতরাং রচনার ভিতর যেখানে স্বচ্ছতা আছে সেখানে ঋজু তার সাক্ষাৎ পাবার আশা করা যায়। শঙ্কর এ বিষয়ে আমাদের নিরাশ করেন না। তাঁর মনও জ্যামিতির ছাঁচে ঢালা। তার চিন্তা একটা সরল রেখা ধরে চলে বলে তার সঙ্গে সঙ্গে চলা এত সহজ। এ চলার যা আনন্দ সে হচ্ছে পুরােপুরি আর্ট উপভােগ করবার আনন্দ। তাঁর অনুগামী হয়ে আমরা কি ইন্দ্রিয়- গ্রাহ্য কি অতীন্দ্রিয় কোনরূপ জ্ঞানের পথে কিছুমাত্র অগ্রসর হইনে। প্রথমত তিনি এই বহুরূপী বিশ্বকে মায়া বলে, অর্থাৎ তার রূপ বাদ দিয়ে জিনিসটিকে বেজায় স্বচ্ছ করে নিয়েছেন। তারপর তার যুক্তি একটা সরলরেখা ধরে শেষটা এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌছায় যার স্থিতি আছে অথচ ব্যাপ্তি নেই অর্থাৎ বিন্দুতে। শঙ্করভাষের প্রধান গুণ যে তার আর্ট, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সে ভাষের সঙ্গে উপনিষদের তুলনা করলে। উপনিষদে যা আছে সে হচ্ছে নিছক poetry, অর্থাৎ তার ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা পত্র ১১৩ সীমারেখাও স্পষ্ট নয় তার বর্ণও স্বচ্ছ নয়। অনন্তের ছায়ায় তা আবছায়া। অসীমের দেশে তার সীমারেখা বিলিন। এক কথায়, উপনিষদ ইংরেজিতে যাকে বলে রােমান্টিক আর তার ভাষ্য ক্লাসিক। আর এ দুয়ের মূল প্রভেদটা এই যে, ক্লাসিক-সাহিত্য রেখাবদ্ধ আর রােমান্টিক-সাহিত্য বর্ণবিদ্ধ, অর্থাৎ ক্লাসিক-সাহিত্য জ্যামিতির অন্তভূত, আর রােমান্টিক তার অতিরিক্ত। এই কারণে হৃদয়াবেগ চিরকালই রােমান্টিক এবং আর্ট চিরকালই ক্লাসিক। এ দুয়ের উদ্দেশ্য ও সম্পূর্ণ বিপরীত। Poetry-র উদ্দেশ্য সসীমকে অসীম করা, আর আর্টের উদ্দেশ্য অসীমকে সসীম করা। মানুষে অবশ্য চিরকাল এই দুইকে মেলাতে চেষ্টা করে আসছে, এবং এই দুয়ের মিলনে যা জন্মলাভ করে--তাই হচ্ছে যথার্থ কাব্য। তবে কোনও কবির তুলিতে রেখা ফোটে ভাল আর কোনও কবির তুলিতে রঙ, কাব্যে কাব্যে এই যা প্রভেদ। এর পর এ কথা নিশ্চিন্তমনে বলা যায় যে, দর্শন বিজ্ঞানের স্থান কবিতা ও অর্টের উপরে নয়, কেননা বিজ্ঞান যে কনিষ্ঠ-আর্ট এবং দর্শন যে বৃদ্ধ-কবিতা—এ সত্য যদি প্রমাণ করতে না পেরে থাকি ত এতক্ষণ মিছে বকলুম কেন ? কোথা থেকে শুরু করেছিলুম আর কোথায় এসে পড়লুম। যুদ্ধ থেকে একেবারে কবিত্বে। এ পত্রে আমার লেখা যে সরলরেখায় চলেছে—তা বলতে পারিনে, তবে এর গােড়ার সঙ্গে আগা যে হাের করেও মেলানাে যায় না তা নয়। গােড়ায় বলেছি যে, এ যুদ্ধ হচ্ছে আত্মার সঙ্গে আত্মার যুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আত্মা অর্থে জাতীয় আত্মা বুঝতে হবে। তাহলেই দেখতে পাবে যে, এ হচ্ছে বিকৃত অৰ্মাণ-য়ােমাণ্টিক আত্মার সঙ্গে প্রকৃত ল্যাটিন-ক্লাসিক আত্মার ১১৪ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ লড়াই। ক্লাসিক ফ্রান্স তার সীমান্ত রেখা বজায় রাখতে চেষ্টা করছে—রােমান্টিক জৰ্ম্মাণি তার নিজের সীমা অতিক্রম করতে চেষ্টা করছে। শুধু দেশের সীমা নয়, ওর্মাণী ইতিমধ্যেই নীতির সীমা, লজিকের সীমা, সামাজিকতার সীমা, এক কথায় সভ্যতার সকল সীমা হুঙ্কার ছেড়ে এক লম্ফে অতিক্রম করেছে। জৰ্ম্মাণীর জাতীয়-আত্মাকে ঠেলেঠুলে এখন যদি তার স্বদেহে অর্থাৎ স্বদেশে পােরা না যায় তাহলে পৃথিবীতে সভ্যতা বলে আর কোনও জিনিস থাকবে না। কেননা সভ্যতা হচ্ছে মানুষের জীবন ধারণের আর্ট–অতএব তা বাইরের ও ভিতরের নানাবিধ সীমারেখায় আবদ্ধ। সভাতা জিনিসটেই ক্লাসিক এবং ইউরােপের ল্যাটিন জাতিই তার যথার্থ উত্তরাধিকারী। আশা করি তারা সে অম্বয়াগত সম্পত্তি বর্বরতার হাত থেকে এ যাত্রা রক্ষা করতে পারবে। ও বস্তু রক্ষা করবার অন্তত প্রাণপণ চেষ্টা করা যে সভ্য-সমাজের কর্তব্য, সে বিষয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। ছেলেবেলায় সংস্কৃত ক্লাসিকে পড়েছি যে হর্ষবর্ধন—“হুন'ন হন্তুং প্রতিচ্যাং দিশিং জগাম”। হর্ষচরিতের ঐ একটি টুকরােই আমার মনে আছে—কেননা সে বয়েসেও বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার ঐ অভিযানের জীবন্ত ছবি আমার চোখের সুমুখে ফুটে উঠেছিল এবং আজও তার রঙ জ্বলে যায়নি। বর্বরতার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়াটাই সভ্যতার সব চেয়ে সুন্দর দেহভঙ্গি। জানি, এ সব কথা শুনে লােকে বলবে-“বীরবলের কথা ছেড়ে দাও-ও ত মার্কামারা ফরাসি-ভক্ত।” এ খ্যাতি প্রত্যাখ্যান করতে আমি কিছুমাত্র ব্যগ্র নই। লোকে বলে আমার শরীরে ভক্তির লেশ নেই, অতএব আমার ফরাসি-ভক্তির খ্যাতি, “খােল খবরের ঝুটোও ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা পত্র ভাল” হিসেবে গ্রাহ। খাঁটি কথা এই যে, ফরাসীদের প্রতি আমার ভক্তি নেই—প্রীতি আছে, তার কারণ ফরাসীরা দেবতা নয় মানুষ। মানুষের পক্ষে মানুষ হওয়ার চাইতে আর বড় কৃতীত্ব নেই, কেননা তা হওয়া ভারি শক্ত। জৰ্ম্মণরা মানুষ না হয়ে অতিমানুষ হতে গিয়েই অমানুষ হয়ে পড়েছে। সে যাই হােক, আমার কথা তুমি ভুল বুঝো না। আমি রােমান্টিক মনােভাবকে বর্বরতা বলছি নে। ক্লাসিক মন রেখাপাত করে, রােমান্টিক মন তার অন্তরে বর্ণ বিন্যাস করে। এর প্রথমটির ভিতর দ্বিতীয়টি অনুপ্রবিষ্ট না হলে, কি সমাজ কি সাহিত্য কিছুই ঐশ্বৰ্য্য লাভ করে না। তবে এ কথা ভুললে চলবে না যে, শুধু রেখায় ছবি আঁকা যায়, শুধু রঙে যায় না। অতএব সুস্থ মনের প্রথম কাজ হচ্ছে কাঠাম গড়া ও খাড়া রাখা। সুবুদ্ধি কাঠাম তৈরি করে সুহৃদয় তার ভিতর রঙ ভরে দেয়। কিন্তু যে হৃদয়াবেগ আর্টের হাতে গড়া সুঠাম কাঠাম ভেঙ্গে ফেলতে চায়,সেই হৃদয়াবেগই বৰ্ব্বর, কেননা তা অন্ধ। আজকের দিনে জৰ্ম্মাণির জাতীয়-আত্মা রূপান্ধ তার এত প্রবল প্রমাণ দিচ্ছে যে, সে আত্মাকে আর্টিষ্টিক অর্থাৎ সভ্য বলা অসম্ভব। রােমান্টিক আত্ম। বিপথে গেলেই তা মারাত্মক হয়ে দাড়ায়—অর ও মনােভাবের উদ্ভান্ত হবার দিকে একটা সহজ প্রবণতা আছে। রােমান্টিক আত্মার ছােটবার খােলা রাস্তা হচ্ছে, উপরের দিকে—আশে পাশে নয়। তার চোখ আকাশ ছেড়ে মাটির উপর পড়লেই সে স্থলে আগুণ জ্বলে। সে যাই হােক, আমার জ্যামি- তিক বন্ধু বলেন যে, ইউক্লিডের জ্ঞান থাকলে জৰ্মাণরা সমস্ত পৃথিবীকে জাণীর অন্তর্ভূত করবার চেষ্টা করত না, কেননা ও চেষ্টা হচ্ছে একটা বিরাট বৃত্তকে একটা ক্ষুদ্র চতুষ্কোণের মধ্যে অন্তর্নিবিষ্ট করবার চেষ্টা।

সৰু পৰ
জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫
ঢের বাজে বকেছি, এইখানেই দাড়ি টানা যাক, নইলে আমার
বাচালতা পত্র ব্যবহারের সকল সীমা লঙ্ঘন করবে। এ লেখায় এত
ফঁক থেকে গেল যে, তােমার বুদ্ধির ছুরি, এর গায়ে যেখানে খুসি
অনায়াসে চালাতে পারবে। তবে বুদ্ধির ছুরি না চালিয়ে যদি এ
পত্রের গায়ে বুদ্ধির আলো ফেলে তাহলে হয়ত দেখতে পাবে এর
এক আধটা ফাক দিয়ে এক আধটা সত্য উঁকিঝুকি মারছে।
২৬শে মে ১৯১৮
বীরবল।

রবীন্দ্রনাথের পত্র। * [ সম্প্রতি Lonis Chadourne নামক জনৈক ফরাসি লেখক, ফরাসি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের Gardener-এর একটি অতি সুন্দর সমালােচনা লিখেছেন। সে প্রবন্ধের ইংরাজি অনুবাদ জুন মাসের Modern Review-য়ে প্রকাশিত হবে। সমালােচক একস্থলে বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথের প্রথম বয়েসের কবিতার ভিতর, despair এবং resignation-এর সুর আদপেই নেই। সাতাশ বৎসর পূৰ্বে “মানসী” পড়ে, আমি রবীন্দ্রনাথকে যে পত্র লিখি তাতে এই কথা ছিল, যে মানসীর মধ্যে একটা despair এবং resignation-এর সুর আছে। সে পত্রের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ যে পত্র লেখেন—সেখানি আজ প্রকাশ করছি, এই বিশ্বাসে যে এ বিষয়ে কবির নিজের মুখের কথার একটা বিশেষ মূল্য আছে। দ্বিতীয় পত্রে প্রথম পত্রের জের চলে এসেছে বলে, এই সঙ্গে সেখানিও প্রকাশ করছি। প্রমথ চৌধুরী।] ভাই প্রমথ। এই খানিকক্ষণ হল তােমার চিঠি পেলুম। সেদিন কলকাতার চিঠিতে তােমার কনভােকেশনে উপস্থিতির খবর পেয়ে আমি ঠাওরে- ছিলুম তবে বুঝি তুমি এখনাে কলকাতায় আছ এবং আমার পত্ৰখণ্ড তােমাদের হরিপুরের মাঠে মারা গেল। কিন্তু তােমার চিঠিতে জানা গেল, আমার চিঠি রক্তে পেয়েছে এবং তৎপরিবর্তে সেখানকার মাঠে ১৮ সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ বাঘ বাহ প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগুলো মারা পড়ছে। আমি এখানে আমার সামনের এই সবকটা জানলা খুলে দিয়ে, এখানকার দুপুরের রোদ্রে বড় বড় গাছওয়ালা কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে পাড়াগাঁয়ের অনতিব্যস্ত লােক চলাচলের প্রতি, অনিমেষ নেত্র নিহিত রেখে এমনি অন্যমনস্ক উড়ে উড়াে ভাবে থাকি যে, একটু মনঃসংযােগ করে একটা ভদ্ররকম প্রমাণসই চিঠি যে লিখব তার সামর্থ্য নেই। এই ক্ষুদ্রায়তন কাগজে দুটো চারটে অসংলগ্ন কথা লিখে কোনমতে সাঙ্গ করে দিতে হয়। এখানকার বাতাসে এবং বাহদৃশ্যে এমন একটা আলস্য, ঔদাস্য, বৈরাগ্য অথচ এমন একটা মাধুৰ্য আছে যে আমার মন, কিছুতে নিবিষ্ট হয়ে আছে কি বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে কিছু বুঝতে পারচি নে। মানসী সম্বন্ধে যে লিখেছ, যে তার মধ্যে একটা Despair এবং Resignation-এর ভাব প্রবল, সেই কথাটা আমি ভাবছিলুম। প্রতিদিনই আমি দেখতে পাচ্ছি নিজের রচনা এবং নিজের মনসম্বন্ধে সমালােচনা করা ভারি কঠিন। আমি বের করতে চেষ্টা করছিলুম এই Despair এবং Resignation-এর মূলটা কোনখানে। আমার চরিত্রের কোনখানে সেই কেন্দ্রস্থল আছে যেখানে গিয়ে আমার সমস্তটার একটা পরিষ্কার মানে পাওয়া যায়। কড়ি ও কোমলের সমালােচনায় আশু যখন বলেছিলেন, জীবনের প্রতি দৃঢ় আসক্তিই আমার কবিত্বের - মুলমন্ত্র, তখন হঠাৎ একবার মনে হয়েছিল হতেও পারে। আমার অনেকগুলাে লেখা তাতে করে পরিস্ফুট হয় বটে। কিন্তু এখন আর তা মনে হয় না। এখন এক একবার মনে হয় আমার মধ্যে দুটো বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব চলচে। একটা আমাকে সর্বদা বিশ্রাম এবং পরিসমাপ্তির দিকে আহ্বান করছে, আর একটা আমাকে কিছুতে ৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের পত্র বিশ্রাম করতে দিচ্ছে না। আমার ভারতবর্ষীয় শান্ত প্রকৃতিকে য়ুরােপের চাঞ্চল্য সর্বদা আঘাত করচে—সেইজন্যে একদিকে বেদনা আর একদিকে বৈরাগ্য । একদিকে কবিতা আর একদিকে ফিলজফি। একদিকে দেশের প্রতি ভালবাসা আর একদিকে দেশ- হিতৈষিতার প্রতি উপহাস। একদিকে কর্মের প্রতি আসক্তি আর একদিকে চিন্তার প্রতি আকর্ষণ। এইজন্যে সবশুদ্ধ জড়িয়ে একটা নিস্ফলতা এবং ঔদাস্য। এটা তােমার কি রকম মনে হয় ? তুমি কি ভাবে দেখ সেটা আমাকে একটু পরিষ্কার করে লিখো-তােমাদের দ্বারা আমার নিজেকে Objectively দেখতে ইচ্ছে করে। নিজের মধ্যে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করা দুরাশা-কারণ আমার প্রতিমুহূর্তই আমার নিজের কাছে এমনি জীবন্ত এবং বলবান, যে, মােটের উপরে আমি যে কি তা দেখতে পাইনে। কখনো আশা কখনাে নৈরাশ্য কখনাে গর্ব কখনাে গ্লানি অনুভব করি কিন্তু নিজের ঠিক পরিমাণটা পাইনে। আমি যখন আমার কাব্য সমালােচনা করতে চেষ্টা করি তখন বর্তমান মুহূর্তটাই ক্রিটিক হয়ে বসেন কিন্তু তার কথা কিছুমাত্র বিশ্বাসযােগ্য নয়, তােমরা যখন সমালােচনা কর তখন আমার পূর্বের সঙ্গে পর এবং একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দেখতে পার। Bashkirtseff-এর Journal আমিও পড়ছি-মন্দ লাগছে না কিন্তু মােটের উপরে কষ্টকর ঠেকচে। এর থেকে মাঝে মাঝে অনেকগুলাে কথা মনে আসে—কিন্তু যেটুকু স্থান অবশিষ্ট আছে তার মধ্যে আর সে সকল উত্থাপন করা যেতে পারে না -অত এক আজ বিদায়। ২৯ জানুয়ারি ১৮৯৮। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সবুজ পত্র জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ ভাই প্রমথ ! হঠাৎ আজ প্রাতঃকালে আমার দক্ষিণ কাধে বাতের মত হয়েছে—মাথা এবং হাত নাড়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে-এবং পৃষ্ঠদেশ যাকে সর্বদাই পশ্চাতে ফেলে রেখেছি-যাকে চক্ষেও দেখিনে—বহু পরিশ্রমের পর চৌকিতে ঠেসান দেবার সময় ব্যতীত, যার অস্তিত্ব কখনাে অনুভব করা যায় না সেই সর্বপশ্চাদ্বৰ্ত্তী পৃষ্ঠদেশই আপনাকে চেতনা রাজ্যের একাধিপতি করে রেখেছে। তােমাকে এই যে ক’ লাইন চিঠি লিখলুম এর মধ্যে অনেক মুখভঙ্গী এবং আর্তনাদ অব্যক্ত ভাবে প্রচ্ছন্ন আছে। বর্তমান এই ব্যাধিটার তুলনায় মানসীর সমস্ত ঔদাস্ত এবং নৈরাশ্য অত্যন্ত মিথ্যা এবং নিতান্ত সৌখীন বলে মনে হচ্চে। পিঠ এবং কঁধকে হৃদয় এবং আত্মার চেয়ে অনেক বেশী মনে হচ্চে। অতএব আজ মানসীসম্বন্ধে ঠিক সমালােচনাটা আমার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতে পারে না। ভাল করে ভেবে দেখতে গেলে মানসীর ভালবাসার অংশটুকুই কাব্য-কথা-বড় রকমের সুন্দর রকমের খেলা মাত্র-ওর আসল সত্যি কথাটুকু হচ্ছে এই যে, মানুষ কি চায় তা কিছু জানে না—এক ঘটি জল চায়, কি আধখানা বেল চায়, জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে না, আমি এমন অবস্থায় মনের সঙ্গে আপষে বােঝাপড়া করে কল্পনার কল্পবৃক্ষের মায়াফল পাড়বার চেষ্টা করচি। জানি, সত্য একে নিতান্ত অসন্তোষজনক, তার উপরে আবার রূঢ়ভাবে মানব-মনের মুখের উপর সর্বদা জবাব করে—তাই ধ্যানভরে কল্পনা-সিদ্ধ হবার চেষ্টা করা যাচ্চে-কল্পনার কাছ থেকেও পুরো ফল পাওয়া যায় না কিন্তু সত্যের চেয়ে সে ঢের বেশ আজ্ঞা- বহ। তাই অন্যেই সাধ যায় “সত্য যদি হত কল্পনা-আমি দুটো ৫ম বর্ষ, নিতীয় সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের পত্র যদি এক করতে পারতুম। অর্থাৎ আমি যদি ঈশ্বর হতে পারতুম ! মানুষের মনে ঈশ্বরের মত অসীম আকাঙক্ষা আছে, কিন্তু ঈশ্বরের মত অসীম ক্ষমতা নেই—কেউ বা বলচে, আছে বলে বহির্জগতে চেষ্টা করে বেড়াচ্চে-কেউ বা জানে, নেই-তাই আকাঙক্ষার রাজ্যে বসেই অর্ধ-নিরাশ্বাস ভাবে কল্পনা পুত্তলী গড়িয়ে তাকে পূজো করচে। একেই বল ভালবাসা? আমার ভালবাসার লােক কই? আমি ভালবাসি অনেককে—কিন্তু মানসীতে যাকে খাড়া করেচি সে মানসেই আছে, সে artist-এর হাতে রচিত ঈশ্বরের প্রথম অসম্পূর্ণ প্রতিমা। ক্রমে সম্পূর্ণ হবে কি ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ছিন্ন পত্র।
ঃ-
ক যখন দেবতা হয়ে জুড়ে বসে পূজার বেদী,
মন্দিরে তার পাষাণ প্রাচীর অভ্রভেদী
চতুর্দিকেই থাকে ঘিরে ;
তারি মধ্যে জীবন যখন শুকিয়ে আসে ধীরে ধীরে,
পায়না আলো, পায়না বাতাস, পায়না ফাকা, পায়না কোনাে রস,
কেবল টাকা, কেবল সে পায় যশ,
তখন সে কোন্ মােহের পাকে
মরণদশা ঘটেছে তার, সেই কথাটাই ভুলে থাকে।
আমি ছিলেম জড়িয়ে পড়ে সেই বিপাকের ফাসে
বৃহৎ সর্বনাশে
হারিয়ে ছিলেম বিশ্বজগৎ খানি।
নীল আকাশের সােণার বাণী
সকাল সাঝের বীণার তারে
পৌছতনা মাের বাতায়ন দ্বারে।
ঋতুর পরে আস্ত ঋতু শুধু কেবল পঞ্জিকারি পাতে,
আমার আঙিনাতে
আন্ত না তার রঙিন পাতার ফুলের নিমন্ত্রণ।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা
ছিন্ন পত্র
অন্তরে মাের লুকিয়ে ছিল কি যে সে ক্রন্দন
জানব এমন পাই নি অবকাশ ।
প্রাণের উপবাস
সঙ্গোপনে বহন করে’ কৰ্ম্মরথে
সমারোহে চলতেছিলেম নিস্ফলতার মরুপথে।
তিনটে চারটে সভা ছিল জুড়ে আমার কাঁধ ;
দৈনিকে আর সাপ্তাহিকে ছাড়তে হত নকল সিংহনাদ ;
বীড় কুঞ্জে মীটিং হলে আমি হতেম বক্তা ;
রিপাের্ট লিখতে হত তক্তা তক্তা;
যুদ্ধ হ’ত সেনেট সিণ্ডিকেটে,
তার উপরে আপিস আছে, এমনি করে কেবল খেটে খেটে
দিন রাত্রি যেত কোথায় দিয়ে।
বন্ধুরা সব বলত, “কচি কি এ?
মারা যাবে শেষে”।
আমি বলতেম হেসে,
“কি করি ভাই, খাটুতে কি হয় সাধে ?
একটু যদি ঢিল দিয়েছি অমনি গলদ বাধে,
কাজ বেড়ে যায় কারো-
কি করি তার উপায় বলতে পারে ?
বিশ্বকর্মার সদর আপিস ছিল যেন আমার পরেই ন্যস্ত,
অহােরাত্রি এমনি আমার ভাবটা ব্যতিব্যস্ত।

১২
সঃ পল
জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫
সে দিন তখন দু' তিন রাত্রি ধরে
গত সনের রিপাের্ট খানা লিখেচি খুব জোরে।
বাছাই হবে নতুন সনের সেক্রেটারি
হপ্তা তিনেক মরতে হবে ভােট কুড়ােতে তরি।
শীতের দিনে যেমন পত্র ভার
খসিয়ে ফেলে গাছগুলাে সব কেবল শাখা সার,
আমার হ’ল তেমনি দশা ;
সকাল হতে সন্ধ্যা-নাগাদ এক টেবিলেই বসা;
কেবল পত্র রওনা করা,
কেবল শুকিয়ে মরা।
খবর আসে “খাবার তৈরি”, নিইনে কথা কাণে,
আবার যদি খবর আনে,
বলি ক্রোধের ভরে
“মরি এমন নেই অবসর, খাওয়া ত থাক পরে”।
বেলা যখন আড়াইটে প্রায়, নিঝুম হ’ল পাড়া,
আর সকলে স্তব্ধ কেবল গোটাপাঁচেক চড়ই পাখী ছাড়া;
এমন সময় বেহারাটা ভকের পত্র নিয়ে
হাতে গেল দিয়ে।
জরুরি কোন্ কাজের চিঠি ভেবে
খুলে দেখি বঁকা লাইন, কঁাচা আখর চলচে উঠে নেবে,
নাইক দাড়ি কমা,
শেষ লাইনে নাম লেখা আর মনােরমা।

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা
ভিন্ন পত্র
আর হল না পড়া,
মনে হ’ল কোন বিধবার ভিক্ষাপত্র মিথ্যা কথায় গড়া,
চিঠি খানা ছিড়ে ফেলে আবার লাগি কাজে।
এমনি করে কোন অতলের মাঝে
হপ্তা তিনেক গেল ডুবে।
‘সূৰ্য্য ওঠে পশ্চিমে কি পূবে,
সেই কথাটাই ভুলে গেচি, চলচি এমন চোটে।
এমন সময় ভোটে
আমার হল হার,
শত্ৰুদলে আসন আমার করলে অধিকার ;
তাহার পরে খালি
কাগজ পত্রে চলল গালাগালি।
কাজের মাঝে অনেকটা ফাঁক হঠাৎ পড়ল হাতে,
সেটা নিয়ে কি কব তাই ভাবৃচি বসে আরাম কেদারাতে;
এমন সময় হঠাৎ দখিন পবন ভরে
ছেড়া চিঠির টুকরো এসে পড়ল আমার কোলের পরে।
অন্য মনে হাতে তুলে
এই কথাটা পড়ল চোখে, “মনুরে কি গেছ এখন ভুলে”।
মনু ? আমার মনােরমা? ছেলেবেলার সেই মনু কি এই ?
অনি হঠাৎ এক নিমেষেই
সকল শুষ্ণ ভরে,
হারিয়ে-যাওয়া বসন্ত মাের বন্যা হয়ে ডুবিয়ে দিল মােরে।

১২
সবুজ পত্র
জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫
সেই ত আমার অনেক কালের পড়োশিনী,
পায়ে পায়ে বাজাত মল রিনি ঝিনি।
সেই ত আমার এই জনমের ভাের-গগনের তারা
অসীম হতে এসেচে পথহারা;
সেই ত আমার শিশুকালের শিউলি ফুলের কোলে
শুভ্র শিশির দোলে ;
সেই ত আমার মুগ্ধ চোখের প্রথম আলো,
এই ভুবনের সকল ভালোর প্রথম ভালো।
মনে পড়ে, ঘুমের থেকে যেমনি জেগে ওঠা
অমনি ওদের বাড়ীর পানে ছােটা।
ওরি সঙ্গে সুরু হ’ত দিনের প্রথম খেলা ;
মনে পড়ে, পিঠের পরে চুলটি মেলা
সেই আনন্দ মুৰ্ত্তি খানি, স্নিগ্ধ ডাগর আঁখি,
কণ্ঠ তাহার সুধায় মাখামাখি।
অসীম ধৈর্য্যে সইত সে মাের হাজার অত্যাচার,
সকল কথায় মাত ম হার।
উঠে গাছের আড়ালেতে দোল খেতেম জোরে,
ভয় দেখাতেম পড়ি-পড়ি করে,
কঁদো-কাঁদো কণ্ঠে তাহার করুণ মিনতি সে,
ভুলতে পারি কি সে?
মনে পড়ে নীরব ব্যাথা তার,
বাবার কাছে যখন খেতেম মার

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা
ছিন্ন পত্র
১২।
ফেলেচে সে কত চোখের জল,
মাের অপরাধ ঢাকা দিতে খুঁজত কত ছল।
আরো কিছু বড় হলে
আমার কাছে নিত সে তার বাংলা পড়া বলে।
নাটা তার কেবল যেত বেধে,
তাই নিয়ে মোর একটু হাসি সইত না সে, উঠত লাজে কেঁদে।
আমার হাতে মােটা মােটা ইংরাজি বই দেখে
ভাত মনে গেছে যেন কোন্ আকাশে ঠেকে
রাশীকৃত মাের বিদ্যার বােঝ।
কিছু সব বিষম কঠিন, আমার কাছে যেন নেহাৎ সােজা।
হেন কালে হঠাৎ সেবার,
দশমীতে দ্বারিগ্রামে ঠাকুর ভাসান দেবার
রাস্তা নিয়ে দুই পক্ষের চাকর দরােয়ানে
বকাবকি লাঠালাঠি বেধে গেল গলির মধ্যখানে।
তাই নিয়ে শেষ বাবার সঙ্গে মনুর বাবার বাধূল মকদ্দমা,
কেউ কাহারে ককূলে না আর ক্ষমা।
দুয়ার মােদের বন্ধ হল,
আকাশ যেন কালাে মেঘে অন্ধ হল,
হঠাৎ এল কোন দশমী সঙ্গে নিয়ে ঝার গর্জন,
মাের প্রতিমার হল’ বিসর্জন।

সবুজ পত্র
জ্যৈষ্ঠ, ১৩২
দেখা শােনা ঘুচল যখন, এলেম যখন দূরে,
তখন প্রথম শুনতে পেলেম কোন্ প্রভাতী সুরে
প্রাণের বীণা বেজেছিল কাহার হাতে।
নিবিড় বেদনাতে
মুখখানি তার উঠল ফুটে আঁধার পটে সন্ধ্যা-তারার মত ;
একই সঙ্গে জানিয়ে দিলে সে যে আমার কত,
সে যে আমার কতখানিই নয় ।
প্রেমের শিখা জ্বলল তখন, নিবল যখন চোখের পরিচয়।
কত বছর গেল চলে
আবার গ্রামে গিয়েছিলেম পরীক্ষা পাস হ'লে।
গিয়ে দেখি, ওদের বাড়ী কিনেছে কোন পাটের কুঠিয়াল,
হ’ল অনেক কাল।
বিয়ে করে মনুর স্বামী
কোন দেশে যে নিয়ে গেছে, ঠিকানা তার খুঁজে না পাই আমি।
সেই মনু আজ এত কালের অজ্ঞাতবাস টুটে,
কোন কথাটি পাঠাল তার পত্রপুটে?
কোন্ বেদনা দিল তারে নিষ্ঠুর সংসার
মৃত্যু সে কি ? ক্ষতি সে কি ? সে কি অত্যাচার ?
কেবল কি তার বাল্য সবার কাছে
হৃদয় ব্যথার সানা তার আছে ?
ছি, চিঠির বাকি
বিশ্বমাঝে কোথায় আছে, খুঁজে পাব নাকি ?

৫ম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা
ছিন্ন পত্র
মনুরে কি গেছ ভুলে ?
এ প্রশ্ন কি অনন্ত কাল রইবে দুলে
মাের জগতের চোখের পাতায় একটা ফোটা চোখের জলের মত ।
কত চিঠির জবাব লিখব কত,
এই কথাটির জবাব শুধু নিত্য বুকে জ্বলবে বহ্নিশিখা
অক্ষরেতে হবে না আর লিখা।
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৭

No text on this page.

নব-বিদ্যালয়। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীচরণেষু। ( ৫ ) } আজ আমি শরীরচর্চা সম্বন্ধে নব-বিদ্যালয়ের প্রকরণ-পদ্ধতির কিঞ্চিৎ পরিচয় দেব। আগে থাকতেই বলে রাখি—এ পত্রে মুলের চাইতে টীকাভাষ্য ঢের বেশী হবে, কেননা শরীরের কথাটা এদেশে শুধু বিদ্যালয়ের কথা নয়-লােকালয়েরও কথা। ছেলেবেলায় বে ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে আমরা মানুষ হয়েছি, তার ওষুধের প্রতি শিশির গায়ে, একালের অনেক ওষুধের শিশির গায়ে যেমন বড় বড় লাল হরফে poison ছাপানাে থাকে, তেমনি বড় আর তেমনি লাল হরফে ছাপানো থাকৃত, “শরীরমাদ্যং খন্দু ধর্মসাধনং”। এ বচন শাস্ত্রীয় কি উদ্ভট তা জানিনে, কিন্তু ঐ ক’টি কথা আমার মনের মধ্যে একেবারে লাল কালিতে ছেপে গিয়েছে, তার কারণ দশ থেকে চৌদ্দ বৎসর বয়স পর্যন্ত, এই চার বৎসর ধরে ঐ বাক্যটি আমার চোখের সুমুখে প্রতিনিয়ত ছিল। “শরীরমাদ্যং থলু ধর্মসাধনং”—এ ধৰ্ম্মজ্ঞান আর দেশ লােকের মনে জমেছে। তবে উক্ত ধৰ্ম্মের সাধন-পজাতি যে কি, সে ১৩৪ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ বিষয়ে আমাদের তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই। নিত্যনিয়মিত ওষুধ খাওয়া যে বলাধানের সদুপায় নয়-এ সম্বন্ধে বােধহয় এক ঔষধ বিক্রেতা ছাড়া আর সকলেই একমত। কিন্তু সদুপায়টা যে কি, তা জানবার জন্য শারীর-বিজ্ঞানের কিঞ্চিৎ জ্ঞান সঞ্চয় করা প্রয়ােজন। আমি কিঞ্চিৎ বিশেষণটি ইচ্ছে করেই লাগিয়েছি, কেননা এক্ষেত্রে সাধারণ জ্ঞানের মূল্য বিজ্ঞানের চাইতে নিতান্ত কম নয়। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের মতে, আজকালকার ভাষায় যাকে বলে দেহের অনুশীলন—তার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের শক্তি ও সৌন্দৰ্য্য লাভ করা সৌন্দৰ্য্য জিনিষটে যে শক্তির উপর নির্ভর করে, এ বিষয়ে সকল প্রাচীন সভ্যতাই একমত। রূপ—তা সে দেহেরই হােক আর মনেরই হােক, ভাবেরই হােক আর ভাষারই হােক,—আকারের উপরেই যে নির্ভর করে, এবং আকারের সঙ্গতি ও সৌষ্ঠব যে স্বাস্থ্য ও বলের উপরেই নির্ভর করে, এই হচ্ছে ক্লাসিক মত। দেহের শক্তি ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তােলাই যে দেহচর্চার মুখ্য উদ্দেশ্য—একথা এ-কালেও বােধহয় বেশীর ভাগ লােক স্বীকার করেন। অতএব সে উদ্দেশ্যসাধনের সদুপায় কি, এই হচ্ছে শিক্ষার প্রথম সমস্যা। কেননা এ পৃথিবীতে দেহই হচ্ছে প্রাণের ভিত্তি। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের মতে, এর সর্বপ্রধান উপায় হচ্ছে ছেলেদের স্নান আহার নিদ্রার একটা সুব্যবস্থা করা। প্রথমে ঘুমের কথাটাই ধরা যাক। নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের নয় থেকে এগারাে ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা ঘুমতে দেওয়া হয়। তাদের মতে এর কম হলে ছেলেদের স্বাস্থ ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় বজায় থাকে না। দিনে যদি ভাল করে জেগে থাকতে হয় তাহলে রাত্তিরে যে ভাল করে ঘুমনাে দরকার, এ বিষয়ে আমি নিজে সাক্ষী দিতে পারি। রাত জেগে পড়ার ফলে ছেলেরা যে দেহমনে ঝিমিয়ে পড়ে, এই প্রত্যক্ষ সত্যকে অগ্রাহ্য না করলে-বাঙ্গালী জাতটা আমার বিশ্বাস এর চাইতে ঢের বেশ সজাগ হতে পারত। তারপর নব-বিদ্যালয়ে ছেলেদের শোবার ঘরের দুয়াের-জানালা কখনও বন্ধ করা হয় না। এ বিষয়ে শীতগ্রীষ্মের কোনও তফাৎ নেই। আমাদের এই গরম দেশে আমরা শুধু দরজা-জানালা নয় শাশি পৰ্যন্ত এটে শুই ; ঠাণ্ডা লাগবার আমাদের এতই ভয়। কিন্তু রুদ্ধ-ঘরের বদ্ধ-বায়ুর ভিতর মানুষ হওয়ায় আমাদের ছেলেমেয়েদের বাল্যে সর্দিকাশি কামাইও যায় না, কমও হয় না; তারপরে যৌবনে হয় তাদের ক্ষয়কাশ। বাংলাদেশের এই রাজধানীতে রাজক্ষমার প্রতাপ—বিশেষতঃ মেয়েমহলে—যে দিনের পর দিন কিরকম বেড়ে চলেছে, তার সন্ধান যে-কোনও ডাক্তাকবিরাজের কাছে পাবেন। অবরােধ-প্রথায় যে মানুষের শ্বাসরােধ করে, তার প্রমাণ আমাদের ঘরে ঘরে পাওয়া যায়। আলোহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে শুধু মানুষ মারবার জন্ম,–এরূপ বিশ্বাস করায় ভগবানের উপরেও সুবিচার করা হয় না, নিজের বুদ্ধিরও পরিচয় দেওয়া হয় না। দুয়োর বন্ধ করলেই যে মানুষে তার ভিতর বন্দী হয়-এ জ্ঞান থাকলে, আমরা আমাদের বাসাগরকে কারাগার করে তুলতুম না। বাহিরকে বাহির করে রাখলেই ঘর হয়ে পড়ে কবর। দিবারাত্র খােলা হাওয়ার ভিতর বড় হলে, শরীর যে কত সুস্থ ও কত বলিষ্ঠ হয়, তার পরিচয় ঐ নব- বিদ্যালয়েই পাওয়া গেছে। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন যে, তার স্কুলের সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ ছেলেরা এক বৎসর দ্বারমুক্ত ঘরে ঘুমতে অভ্যস্ত হবার ফলে, তাদের শীতগ্ৰীষ্ম সহ্য করবার শক্তি এতটা বেড়ে গেছে যে, তাদের মধ্যে অনেকে, দেশ যখন বরফে জমে যায়, সে সময়ও রাত্তিরে সখ করে মাঠের ভিতর তাঁবু খাটিয়ে তার নীচে শোয়, এবং তাতে তাদের নিউমােনিয়া ত বড় কথা—শ্লেষ্মাও প্রকুপিত হয় না। এ একটা কম বড় শিক্ষা নয় ; কেননা সকলেই জানেন যে, অকাতরে শীত গ্রীষ্ম সহ্য করবার শক্তির নামই তিতীক্ষা। আর যাতে করে তিতীক্ষা আমাদের অঙ্গের ভূষণ হয়, তার জন্য ত সকলেই চীৎকার করছেন। আর একটি কথা। নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের গ্রীষ্মকালে দিনে ঘুমতে দেওয়া হয়। সে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের “মা দিবাং স্বপি” এ নিষেধ মেনে চলতে হয় না। তার কর্তৃপক্ষদের মতে ছেলেদের পক্ষে শুধু গ্রীষ্মকালে নয়, সকল কালেই, দিনে অন্ততঃ খানিকক্ষণের জন্য চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা নিতান্ত দরকার, নচেৎ বড় হলে তারা পুরােপুরি খাড়া হয়ে দাড়াতে পারে না। অস্থিতত্ত্ববিদেরা আবিষ্কার করেছেন যে, বারো চৌদ্দ বয়েসের আগে ছেলেদের পিঠের দাড় মজবুত হয় না, সুতরাং সে বয়েসে দিনভর দেহের বােঝা বইতে হলে তাদের মেরু- দণ্ডটা বেঁকে যায়, নুয়ে পড়ে। অধিকাংশ লােকের পৃষ্ঠদণ্ড যে ঋজু নয়, তা সভ্যসমাজের দিকে দৃষ্টিপাত কলেই নজরে পড়ে। দেহের এরূপ বঙ্কিম ভঙ্গীটা সুদৃশ্য ত নয়ই, স্বাস্থ্যকরও নয়। আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা পৃষ্ঠদণ্ডকে ঋজু করা এতই আবশ্যক মনে করতেন যে, তার জন্য তঁাদের হঠযোগের সব ভীষণ প্রক্রিয়া অভ্যাস করতে হত। সময় থাকতে দিনদুপুরে একটু শুয়ে নিলে যদি সেই সুফল লাভ করা যায়, তাহলে তা যে করা কর্তব্য এ বিষয়ে আশা করি দ্বিমত নেই।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ১৩৭ ( ৬ ) নিদ্রার পরই ওঠে আহারের কথা। কথায় বলে-“আহারনি।” যত বাড়াও তত বাড়ে। এ কথার অর্থও দুই কমানো সমান কর্তব্য। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের। এর প্রথম অংশ গ্রাহ্য করেন, শেষ অংশ করেন না। তাঁদের মতে ছেলেরা যত ঘুমােয় ঘুমক, কিন্তু তাদের ভোজনের একটা সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া কৰ্ত্তব্য। সভ্যসমাজের বেশীর ভাগ লােক যে মরে অতিভােজনের ফলে,-উপবাসে নয়,-এ জ্ঞান যদি সাধারণ লােকের থাকত, তাহলে পৃথিবীর রোগ শোক অনেকটা কমে আস্ত। আমাদের দেশে এ জ্ঞানের বিশেষ দরকার আছে, কেননা আমরা আর যাই হই, জাত হিসেবে মিতাহারী নই। ভারতবর্ষের ইতিহাস আমাদের পেটের মধ্যেই পাওয়া যায়। আৰ্য্য মুসলমান ও ইংরাজের, আর কিছু না হোক, আহার আমরা যুগপরম্প- রায় উদরস্থ করেছি। কাচকলা সিদ্ধ আদি করে কোপ্তা কাবাব চপ কটলেট সবই আমাদের সমান ভক্ষ্য। পেটে খেলে পিঠে সয়, এ প্রবাদের জন্ম বাঙলাদেশে। অনেকে বলেন যে এতে বাঙালী জাতি তার assinilation-এর শক্তির পরিচয় দেয় ; শুধু তাই নয়, যারা স্বদেশী ডাল রুটির সাহায্যে জীবন ধারণ করে, তাদের আমরা ছাতুখাের বলে অবজ্ঞা করি। আমাদের রসনা বিদেশী ভাষা যেরূপ অনায়াসে আত্মসাৎ করে, আমাদের উদর বিদেশী আহারও তদ্রুপ অনায়াসে আত্মসাৎ করে। নানা প্রকারের চর্ধ চোষ্য লেহ পেয়ের রসাস্বাদন করায় সম্ভবত ক্ষতি নেই, কিন্তু তার পরিমাণ একটা সীমার ভিতর আবদ্ধ রাখা স্বাস্থ্যনীতির হিসেবে নিতান্ত প্রয়োজন। Assimilation-এর শক্তি তার প্রবৃত্তির সঙ্গে খাপে খাপে মিলে যায় না। জীর্ণ করবার শক্তির ১৩ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ চাইতে আমাদের ভোজন করবার প্রবৃত্তি ঢের বেশী হওয়ায়, বাঙালীর যুবকদের হয় মন্দাগ্নি, আর প্রৌঢ়দের বহুমুত্র। বহু লােকের দেখতে পাই একটা ধারণা আছে যে, ও দুই রােগের দ্বারা বাঙালী তার চিন্তাশীল- তার পরিচয় দেয়। সে ধারণা নিতান্তই ভুল। উদর ও মস্তিষ্ক এক অঙ্গ নয়, এবং এক প্রকৃতির অঙ্গ নয়। এর একটি নিরেট, আর একটি ফাপা ; অতএব এ দুয়ের ক্ষুধাও এক নয়, খােরাকও এক নয়। অধমটির খােরাক কম জোগালে উত্তমটির শক্তি বাড়ে। আমার বিশ্বাস এই ঔদরিকতাই আমাদের সকল দুর্ববলতার মূল কারণ। আমরা জাতকে জাত যে এতটা স্ত্রী-শাসিত--সেও ঐ পেটের দায়ে। শুনতে পাই অপর দেশের স্ত্রীলোকে পুরুষদের হৃদয় তুষ্ট করে তাদের পােষ মানায়—কিন্তু দেখতে পাই এদেশের স্ত্রীজাতি পুরুষদের উদর পুষ্ট করে তাদের বাগ মানায়। রন্ধনই এ দেশে দাম্পত্যের প্রধান বন্ধন। এই সব কারণে, আমার মতে সর্বপ্রথমে আমাদের আহার- বিজ্ঞানের চর্চা করা দরকার; এবং এ শিক্ষা স্কুল থেকে শুরু হওয়াই কর্তব্য। বাল্যকালে অপরিমিত আহার করলে, যৌবনে দুষ্ট ক্ষুধাকে আর শিষ্ট করা যায় না। দেশভেদে জাতির খাদ্যাখাদ্যের ভেদ হয়। সুতরাং বেলজিয়ামের স্কুলের আহারের ব্যবস্থা আমাদের স্কুলে নাও চলতে পারে; তবে আমরা যখন সৰ্ব্বভূক, তখন এই কথাটা আমাদের জানা দরকার যে, নব- বিদ্যালয়ে ছেলেদের মাংসভক্ষণ নিষেধ। এ স্কুলে দুধ ঘি আটা, ফল মূল ও শাক সবজিই ছেলেদের প্রধান আহার।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ( ৭ ) নব-বিদ্যালয়ে স্নান প্রাতঃকৃত্য এবং সায়ংকৃত্য। সেখানে ছেলেদের দিনে দুবার নাইতে হয়, সকালে ঘরে ও বিকালে পুকুরে। বারােমাস সকলের পক্ষে ঠাণ্ডা জলেরই ব্যবস্থা। গরম জল ওষুধের মত ডাক্তারের প্রিক্রিন ব্যতীত কাউকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। সাতার-কাটার সুফলে এঁদের বিশ্বাস এত অগাধ যে, সকল ছেলেকেই সাঁতার শিখতে হয়, এবং নিত্য অভ্যাস করতে হয়। সহুরে ছাড়া এদেশের আর সকল ছেলেদের অবগাহন-স্নান একটা নিত্যনৈমিত্তিক কৰ্ম্ম, সুতরাং এ বিষয়ে এঁদের কাছে আমাদের কিছু শেখবার নেই-একটা জিনিস ছাড়া; নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের নেয়ে উঠে গা মুছতে দেওয়া হয় না। রােদে হাওয়ায় তাদের গায়ের জল গায়েই শুকোয়। অর্থাৎ তাদের দেহ থেকে এক ভূতকে আর দুই দিয়ে তাড়ান হয়,এতে নাকি সে দেহের পঞ্চভূতে মিশিয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেকটা কমে আসে। ছেলেরা যাতে করে পুরােদস্তুর sun-dried হয়, তার জন্য সুনান্তে তাদের দিগম্বর অবস্থায় থাকতে হয়, কেননা এ বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষদের বিশ্বাস যে, শরীরের কোন অঙ্গকেই অষ্টপ্রহর অসূৰ্য্যম্পশ্য করে রাখা সঙ্গত নয়। এ কথাটার বিশেষ করে উল্লেখ করবার কারণ, সমাজ-দেহের অর্ধাঙ্গকে অসূৰ্য্যম্পশ্য করে রাখায় সে দেহ যে সুস্থ থাকে, এ বিশ্বাস কোন কোনও জাতের আছে। সেই সর্বনেশে ধারণাকে দূর কতে হলে, আললহাওয়ার গুণকীৰ্ত্তন ফাঁক পেলেই করা উচিত। ডােরকৌপীন ধারণ করলে রক্তমাংসের শরীর যে ইস্পাত হয়ে ওঠে, তার কারণ সে শয়কে রােদে পুড়িয়ে জলে ভােবানােনা হয়।

সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ ( ৮ ) স্নান, আহার, নিদ্রা-এ সকলের কাজ হচ্ছে শরীর রক্ষা করা। শরীরকে বলিষ্ঠ ও সক্রিয় করবার জন্য আরও পাঁচরকম উপায় অবলম্বন করতে হয়। সে সকল উপায় মােটামুটি চার শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। (১) খেলা। (২) দৌড় ঝাপ (Sports)। (৩) ব্যায়াম (Gymnastics)। (৪) কাজ। খেলা সম্বন্ধে প্রধান বক্তব্য এই যে, যে শিশু যত খেলতে ভাল- বাসে, সে শিশু তত সুস্থ। সুতরাং তার খেলায় বাধা দেওয়ার অর্থ তার দেহমনের শক্তির স্ফুর্তিতে বাধা দেওয়া। শিশুরা দেহের শক্তি ব্যয় করেই যে তা সুদসুদ্ধ আদায় করে, এ কথা দেহজ্ঞানী মাত্রেই জানেন। কিন্তু খেলে বেড়ালে মনেরও যে উপকার হয়, সে বিষয়ে সকলে নিঃসন্দেহ নন। অথচ ওদিকে একটু মনােযােগ করলে সকলেই দেখতে পাবেন যে, খেলার ভিতর বুদ্ধি খেলাবার ঢের অবসর আছে। এমন একটা খেলার দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক—যা পৃথিবীর সকল দেশের সকল ছেলেরাই যুগ যুগ ধরে খেলে আসছে। লুকোচুরি খেলা হচ্ছে বিশ্ব-শিশুর নিত্য লীলা। বলা বাহুল্য এ খেলার প্রসাদে অনুসন্ধিৎসা গবেষণা, সমীক্ষা পরীক্ষা, দিকদর্শন পরিদর্শন প্রভৃতি মহামুল্য চিত্তবৃত্তির সম্যক অনুশীলন হয়। বৈজ্ঞানিক সত্যের আবিষ্কারের জন্য এ ক’টি ছাড়া আর কোন চিৎশক্তির প্রয়ােজন হয়?—সত্যকথা বলতে, পৃথিবীর মহা মহা বৈজ্ঞানিক দার্শনিকেরা ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ১৪১ সত্যের সঙ্গে লুকোচুরি ছাড়া আর কি খেলছেন? ছেলেবেলায় ছেলেদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে লুকোচুরি খেললে, আমরা বড় হলে বিশ্বের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে লুকোচুরি খেলতে পারব। যাঁরা দর্শনবিজ্ঞানের ধার ধারেন না, তাদের পক্ষেও এ খেলায় অভ্যস্ত হওয়া একান্ত প্রয়ােজন। সামাজিক জীবনে মানুষে লুকোচুরি ছাড়া আর কি খেলে ? রাসায় প্রজায়, প্রভু ভৃত্যে, স্ত্রী পুরুষে 'চিরদিন ত ঐ খেলাই খেলে আসছে ;—অতএব দাড়াল এই যে, শিশুদের খেলায় বাধা দেওয়া শিক্ষকের পক্ষে অকৰ্ত্তব্য। তারপর তাদের কোনরূপ খেলা শেখানােও শিক্ষকের কর্তব্য নয়। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন, শিশুদের খেলা একটু লক্ষ্য করে দেখলেই দেখা যায় যে, তারা নিত্য নতুন খেলা খেলে। তারা কল্পনা-রাজ্যের অধিবাসী বলে, এ বিষয়ে তাদের উদ্ভাবনী শক্তি অসীম। তাদের কল্পনাকে তারা এবেলা ওবেলা খেলার রাজ্যে বাস্তব করে তােলে। এতেই তাদের আর্টিষ্টিক শক্তির চরিতার্থতা। সুতরাং খেলার ক্ষেত্রে তাদের একেবারে ছেড়ে দিলে আমরা যে তাদের শরীরকে জখম করি, শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে তাদের বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিকে ভোঁতা করি—আর্টিষ্টিক শক্তিকে চেপে দিই। এ সব কথা যদি সত্য হয়, তাহলে :- উঠ শিশু মুখ ধােও, পর নিজ বেশ, আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ” এই শ্লোকটি হতে পাঠেতে” শব্দটি বহিস্কৃত করে দিয়ে তার স্থলে “খেলায় বসিয়ে দেওয়া সঙ্গত। ভােরের বেলায় শিশুরাও যদি সাদা কাগজের উপর কালির আঁচড়ের প্রতি মনােনিবেশ করে, তাহলে কার জন্যই বা “পাখী সব করে রব” আর কিসের জন্যই বা ১৪২ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ “কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল” ? রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে বলে কি শিক্ষকদেরও শিশুর পলি লয়ে যেতে হবে স্কুলে ? Analogy-র বলে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হলে যে উল্টো উৎপত্তি হয়, তার প্রমাণ—স্কুলেও পাচন চলে। নব-বিদ্যালয়ে সব রকমের গাছপালা আছে,—শুধু বেত নেই। সে যাই হােক, ভগবানের সৃষ্টির সকল জিনিসের ভিতর যে একটা যােগাযােগ আছে—সে জ্ঞান আমরা হারালেও, শিশুরা হারায় না; তাই তারা আলাে বাতাস পাখী ফুল সকলের সঙ্গে যােগ রেখেই আনন্দ পায়, আর সেই আনন্দই তাদের জীবনীশক্তিকে বিকশিত করে। ( 9 ) এত গেল খেলার প্রথম অধ্যায়। শিশুর চরিত্র সম্পূর্ণ স্বাধীন, সুতরাং তার খেলাও সম্পূর্ণ স্বচ্ছন্দ। বালকের খেলার প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিভিন্ন। শিশুর খেলা ব্যক্তি- গত, বালকের খেলা সামাজিক। শৈশব অতিক্রম করবার পর ছেলেদের মনে যখন সমাজের জ্ঞান জন্মায়—তখন তারা দলবদ্ধ হয়ে খেলে। এ সব খেলার আগাগােড়া ধরাবাধা নিয়ম আছে। টেনিস, ফুটবল, ক্রিকেট প্রভৃতি হচ্ছে সব সামাজিক খেলা—অর্থাৎ- দশে মিলে নিয়ম মেনে এ সব খেলা খেলতে হয়। এ সব খেলার প্রধান গুণ যে এতে ছেলেদের চরিত্রগঠনের সহায়তা করে। ব্যায়ামে শুধু শরীর গড়ে, কিন্তু এ শ্রেণীর খেলায় ছেলেদের মনে নীতির বীজ বুনে দেয়। এই শ্রেণীর খেলা হচ্ছে, নব-বিদ্যালয়ের নীতিশিক্ষায় একটি ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় প্রধান অঙ্গ। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা উপদেশ দিয়ে নীতিশিক্ষা দেওয়ায় মােটেই বিশ্বাস করেন না। তারা বলেন, বহুকালের অভি তার ফলে একথা তারা জোর করে বল্‌তে পারেন যে, নীতির উপদেশ দেওয়াটা যে শুধু ব্যর্থ তাই নয়, ছেলেদের পক্ষে তা বিশেষ ক্ষতিকর। এতে শুধু একটা নতুন দুর্ণীতির শিক্ষা দেওয়া হয়, এবং তার নাম হচ্ছে “নৈতিক জ্যাঠামি।” এঁদের মতে নৈতিক জীবনের মুলে আছে Collective sense,-অর্থাৎ সেই জ্ঞান, যার ফলে প্রতি লােক নিজেকে সমাজদেহের একটি অঙ্গ বলে মনে করে। এবং যে উপায়ে এই জ্ঞান, এই অনুভূতি বাড়ানাে যেতে পারে, সেই উপায়ই হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার যথার্থ উপায় ;-বক্তৃতা নয়, নীতিপাঠ নয়, মারপিট নয়। এই সব খেলার ভিতর দিয়ে ছেলেরা নিয়মের মাহাত্ম্য বুঝতে শেখে, দশজনের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখে, কাৰ্য উদ্ধারের জন্য স্বেচ্ছায় স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে শেখে। অতএব ফুটবল প্রভৃতি খেলা সকল ছেলেরই শুধু দেহের নয়, আত্মার উন্নতি লাভের জন্য খেলা কর্তব্য। আইন মুখস্থ করতে নয়, স্বেচ্ছায় মানতে শেখবার সূত্রপাত ঐ খেলার মাঠেই হয়। ( ১০ ) খেলার পর আসে দৌড়ঝাপ-ইংরাজিতে যাকে বলে sports। খেলার সঙ্গে এর প্রভেদ এই যে, শরীরের এক একটি বিশেষ ক্রিয়ার এই উপায়ে অনুশীলন করা হয়। দৌড়নাে লাফানাে সকল খেলারই অঙ্গ, কি কি দৌড় কি লাফ কোনও খেলারই একমাত্র অথবা মুখ্য ১১ আষাঢ়, ১৩২৫ কৰ্ম্ম নয়। খেলাতে দেহের সকল শক্তির একত্রে প্রয়ােগ দরকার। কিন্তু sports-এর উদ্দেশ্য, দৌড়বার শক্তি লাফাবার শক্তি প্রভৃতিকে আলাদা করে নিয়ে, সেই শক্তিকে বিশেষ করে বাড়িয়ে তােলা। এতে শরীরের যে শুধু এক একটা বিশেষ ক্ষমতা বেড়ে ওঠে তাই নয়, এতে ছেলেদের সাহসও বাড়ে। এর শিক্ষা হচ্ছে দেহের শক্তির সীমা উত্তরােত্তর অতিক্রম করবার শিক্ষা। সুতরাং এ শিক্ষার ভিতর পদে পদে বিপদ আছে। এই বিপদকে উপেক্ষা করতে শেখবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের সাহস আপনাহতেই বেড়ে যায়। সুতরাং sports ছেলেদের শরীর মন দুই একসঙ্গে গড়ে তােলে। নব- বিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছরের নীচে ছেলেদের sports শিখতে দেওয়া হয় । এ কথাটা আমাদের মনে রাখা উচিত, কেননা শিক্ষা বিষয়ে আমাদের আর ত্বর সয় না—সে শিক্ষা শরীরেরই হােক আর মনেরই ( ১১ ) সব শেষে আসে ব্যায়াম শিক্ষা। এ শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহের প্রতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্বতন্ত্রভাবে বলিষ্ঠ কর, এবং সেই সঙ্গে সমগ্র দেহটাকে শক্তিশালী করা। একালের ব্যায়াম হচ্ছে পুরােমাত্রায় বৈজ্ঞানিক, অর্থাৎ তা দেহের বিশেষ জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেকালের ব্যায়াম অনেক স্থলে মারাত্মক হত--কেননা কোনও একটা বিশেষ অঙ্গের মাংস বাড়াতে এবং পেশি ফোলাতে গিয়ে, অনেক স্থলে সমস্ত দেহটাকে একেবারে জখম করে ফেলা হত। অবৈজ্ঞানিক এ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নব-বিদ্যালয় ১৪ ব্যায়ামচর্চার ফলে, অনেকে লাভের মধ্যে হৃদরােগ শ্বাসরােগ প্রভৃতি অর্জন করতেন। সমুদয়ের সঙ্গে অবয়বের যােগ যে কতটা ঘনিষ্ঠ, এবং সে যােগসূত্র যে প্রাণ—এই জ্ঞানের অভাববশতঃই পালােয়নের হয় স্বল্পায়ু, আর বাজিকরেরা পঙ্গু। Horizontal Bar-য়ে পাক খেয়ে খেয়ে শরীর যে দড়ি পাকিয়ে যায়, আর Parallel Bar-য়ে পালায় পালায় “ফড়িং” ও “ময়ুর”-বৃত্তির সাধনা করে, তীরের মত শরীর যে ধনুকের মত হয়ে যায়, এ আমার চোখে দেখা। বৈজ্ঞানিক ব্যায়ামের চর্চায় অষ্টাবক্র হবার কোনই সম্ভাবনা নেই। এ ব্যায়ামের প্রকরণপদ্ধতি সব Ling, Muller এবং Hebert-এর বইয়ে দেখতে পাবেন। সংক্ষেপে, যে ব্যায়ামকে Swedish Drill বলা হয়-সে হচ্ছে Ling-এর আবিষ্কৃত পদ্ধতি। Muller এবং Hebert তারই সংশােধিত সংস্করণ বার করেছেন। এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞসুতরাং এ ক্ষেত্রে বেশী বাক্যব্যয় করা আমার পক্ষে অমার্জনীয় অনধিকারচর্চা। তবে এই ব্যায়াম শিক্ষা দেবার পদ্ধতি সম্বন্ধে দু- এক কথা বলা আবশ্যক। নব-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ- দের মতে, এর শিক্ষক হওয়া উচিত ডাক্তার। প্রথমত, এতে প্রাণায়াম আছে ; আর গুরুর অসাক্ষাতে প্রাণায়াম করলে যে মুখে রক্ত ওঠে, তার প্রমাণ আমার জানত অনেক ভদ্রসন্তান যােগ অভ্যাস করতে গিয়ে পেয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ, এর ক্রিয়াগুলি নিতান্ত নীরা, কেননা এ খেলা নয়—পুরােদস্তুর শিক্ষা। নীরস বলে এ ব্যায়াম বিরক্তিকর হবার সম্ভাবনা, সুতরাং শিক্ষকের পক্ষে এর প্রতি ক্রিয়ার সার্থকতা আগে থাকতে ছেলেদের বুঝিয়ে দেওয়া কর্তব্য। হাত-পা পাগলের মত উল্টোপাল্টাভাবে কেন নাড়ছি, তার অর্থ বুঝতে ১৪ সবুৰ পৰ আষাঢ়, ১৩২৫ সে হাত পা মানুষে মনের খুশিতে নাড়ে। ব্যায়ামটা পুরােপুরি শরীরের শিক্ষা হলেও-ঐ সঙ্গে শরীর-বিজ্ঞানেরও মােটামুটি কথা নব-বিদ্যালয়ের ছেলেরা শেখে। অধ্যাপক ফারিয়ার মতে খেলাধুলাে, দৌড়ঝাঁপ, ব্যায়াম, প্রাণায়াম সবই খালি গায়ে করা কর্তব্য। এর সার্থকতা যে কি, তা আমি বলতে পারিনে, ডাক্তারে বলতে পারেন। তবে এ গরম দেশে দেহমুক্ত করলে আমরা যে মুক্তিলাভ করি, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। ( ১২ ) ছেলেদের হাতের কাজ শেখানো যে শিক্ষার একটা প্রধান অঙ্গ, এই হচ্ছে একালের শিক্ষা-বৈজ্ঞানিকদের একটা পাকা মত। নব- বিদ্যালয়ে ছেলেদের মুর্তি গড়তে, নক্সা আঁকতে, বই বাঁধতে, বেত বুনুতে, কামার কুমাের ও ছুতোরের কাজ করতে শেখানো হয়। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন, এ শিক্ষার উদ্দেশ্য ছেলেদের কামার কুমোর ছুতাের প্রভৃতি বানানাে নয়। তাঁর মতে এ সব শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহকে সক্ষম ও সক্রিয় করা। কর্মের প্রবৃত্তি ছােট ছেলের দেহ ও মনে অতিমাত্রায় থাকে। তারা একটা কিছু না করে দুদণ্ড, স্থির থাকতে পারে না। এই কৰ্ম্মপ্রবৃত্তিকে সুপথে চালানাে শিক্ষকের একটি প্রধান কর্তব্য। এ সব কাজে হাত দিয়ে ছেলেরা যে শুধু আনন্দ পায় তাই নয়, সেই সঙ্গে তারা যে হস্তকৌশল লাভ করে, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তার যথেষ্ট প্রয়ােজন ও সার্থকতা আছে। দ্বিতীয়ত, এই সব কাজের চর্চায় তাদের বুদ্ধিবৃত্তির বিশেষ চর্চা হয়।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা নং-বিস্যালয় ১৪৭ এর ফলে তাদের নিরীক্ষণ করার শক্তি, তুলনা করবার শক্তি, কল্পনা শক্তি, গড়বার শক্তি, রূপজ্ঞান, আকারের জ্ঞান, পরিমাণের জ্ঞান, মাত্রার জ্ঞান, সংখ্যার জ্ঞান, পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। অধ্যাপক ফারিয়া বলেন যে, শিশুদের অবশ্য ও সব কাজ শেখানাে যায় না, সুতরাং তাদের কাদা দিয়ে আল বাঁধতে, ঘর তৈরি করতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া কর্তব্য। সে ঘর তারা ক্রমান্বয়ে ভালবে ও গড়বে—কেননা শিশুমাত্রেই অব্যবস্থিতচিত্ত। এ চিত্তকে ব্যবস্থিত করবার চেষ্টা যেমন ব্যর্থ, তেমনি ক্ষতিকর, কেননা এই সব বিরােধী মনােভাবের সংঘর্ষেই তাদের আত্মার প্রদীপ জ্বলে ওঠে। যারা ছােট- ছেলেদের এই ধুলােমাটির সংস্রব হতে আলগোছ করে, ভদ্রলােক করতে চান, অধ্যাপক ফারিয়া তাদের একটা সত্য স্মরণ রাখতে বলেন। সে হচ্ছে এই যে, এ পৃথিবীতে মাটি আর জল হচ্ছে ছােট ছেলের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। সুতরাং তাদের জল না ছুতে দিলে, ধুলো না নাড়তে দিলে, ও দুয়ে মিলিয়ে কাদা না করতে দিলে, প্রিয়বস্তুর বিরহে তারা শরীর-মনে শুকিয়ে যায়। এ স্থলে বয়স্ক লােকদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে যে, এ পৃথিবীতে মাটি ও জলের চাইতে মহামুল্য বস্তু আর কি আছে? মানুষের সকল কর্মের মূল উপাদান হচ্ছে ক্ষিতি আর অপূ, সুতরাং শিশুরা এ পৃথিবীতে এসে প্রথমে তারই পরিচয় লাভ করতে ব্ৰতী হয়। ঐখান থেকেই তাদের জীবনব্ৰত-উদযাপনের ( ১৩ ) নব-বিদ্যালয়ের ছেলেদের কৃষিকৰ্ম্মও শেখানো হয়। মানুষের আদিম কর্মক্ষেত্র, কৃষকের ক্ষেত্র,-শিল্প-জীবির কারখানা নয়। সুতাং २.

১০৮ সবুজ প আষাঢ়, ১২৫ ছেলেদের কর্মক্ষমতা সৰ্বাঙ্গসুন্দর করতে হলে, তাদের অল্প-বিস্তর কৃষিকৰ্ম্ম শেখানােও দরকার। লাঙ্গল চলে, কোদাল পড়লে শরীর যে বলিষ্ঠ হয়, সে কথা বলা বাহুল্য ; সুতরাং এ অধ্যবসায়ে মন ও চরিত্রের কি উপকার হয়, সংক্ষেপে তারই উল্লেখ করছি। কারখানায় আমরা জড়-পদার্থ নিয়ে কারবার করি, কিন্তু মাঠে আমাদের সজীব পদার্থের সঙ্গে কারবার করতে হয়। বীজ বােনা থেকে ধান পাকা পর্ষন্ত আগাগোড়া একটা জীবনের অভিনয় চলে। জীব-তত্ত্বের প্রথম অধ্যায় মানুষে ঐ শস্যক্ষেত্রেই পাঠ করতে পারে। এই সূত্রে আমরা যে জীবনের ক্রমবিকাশের জ্ঞানলাভ করি, শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে সে জীবন যে আমরা রক্ষা করতে পারি, সংশােধিত করতে পারি, পরিবর্ধিত করতে পারি, সে জ্ঞানও লাভ করি; এক কথায় এই সূত্রে আমরা আত্মজ্ঞানও লাভ করি। তার পর মাঠে কাজ কর দরুণ, ছেলের নানা গাছপালা ফুল ফল কীট পতঙ্গ জীবজন্তুর সাক্ষাৎ পরিচয় লাভ করে। শুধু তাদের আকৃতি নয়, তাদের প্রকৃতিরও পরিচয় পায়। এই উপায়ে তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার দিনের পর দিন পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই জ্ঞানের ভিত্তির উপরেই তাদের কেতাবি বিজ্ঞানের শিক্ষা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। গাছপালা জীবজন্তুর সঙ্গে যে ছেলের সাক্ষাৎ পরিচয় আছে—বটানি, জুওলজির কথা তার কাছে আর শুধু বইয়ের কথা নয়—জীবনের কথা। কৃষি-কর্মের আর একটি মহৎ ফল এই যে, ছেলেরা হাতেকলমে ও-কাজ করূলে বড় বয়েসে কৃষিজীবিদের প্রতি আর অবজ্ঞা করে অলস ভদ্রসন্তানেরা নিম্ন-শ্রেণীর লােকদের যে অবজ্ঞার চোখে দেখে, তার প্রধান কারণ যে, কৃষিকার্য্যের ভিতর যে কি মহত্ব ও মনুষ্যত্ব

ব, তৃতীয় সংখা
ম-বিদ্যালয়
আছে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। যে ছেলে ও-কাজ নিজে হাতে
করতে চেষ্টা করেছে, সে ছেলে চিরজীবন কৃষি-জীবিদের মনে মনে
শ্রদ্ধা করবে। সামাজিক হিসেবে এও একটা কম লাভ নয়। আজ
এই পর্যন্ত। বারান্তরে শরীর ছেড়ে মনের শিক্ষার নবপদ্ধতির বিষয়
অালোচনা করা যাবে।
শ্রীপ্রমথ চৌধুরী।

দু-দুবার। ছেলেবেলায় খিড়কী পুকুরের ঘাটের পাশে পাশগাদায় যে সব কচুগাছ জন্মাত তারি কচিপাতা ছিড়ে পুকুরের জলে চুবিয়ে নিয়ে যখন দেখতুম তার উপরে জলের দাগ একটুও ধরেনি তখন ভারী আনন্দ হােতাে; কিন্তু বিবাহিত-জীবনের পানাপুকুরের মধ্যে মনটাকে দু-দুবার চুবিয়ে ধরেও আজ এই ৬০ বৎসর বয়সে তাকে ডেঙ্গায় তুলে নিয়ে যখন দেখি তার উপরে উক্ত জীবনের একটুও দাগ লেগে নেই, তখন ঠিক ছেলেবেলাকার মত আনন্দ হয় কিনা বলতে পারি না। আমার বয়স আজ ৬০ কি তার চেয়েও দু এক বছর বেশী হবে কিন্তু এখনও আমি নিজেকে যুবা বলে মনে করি। এই কথা আমি আমার একজন অন্তরঙ্গ বন্ধুর কাছে বলেছিলুম, তিনি ত হেসেই খুন, তারপর হাসির বেগটা একটু থামলে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এ কেমন করে হতে পারে ?” এই কি করে হতে পারার জবাব দেওয়াটাই শক্ত। আজও পাঠককে যে এর জবাব দিতে পারবাে বলে ত মনে হয় না তবে গল্পটা শেষ অবধি পড়ে তারা যদি আপনা হতে এর জবাব পেয়ে যান ত ভাই-নচেৎ নাচার। আমার প্রথমবার বিবাহ হয় গ্রামের মাইনর স্কুলের তৃতীয় শিক্ষক হরকালিবাবুর প্রথমা কন্যা নীরদাসুন্দরীর সঙ্গে। ছেলে- বেলা থেকেই বিবাহ না করাটার উপর আমার কেমন একটা ঝোঁক ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা দু-দুবার ছিল আর এই ঝোঁকটার জন্যে যদি কাউকে দায়ী করতে পারা যায় ত সে আমাদের গ্রাম্য-ইংরেজী স্কুলের নব্য-হেডমাষ্টার মশাই রমেশ বাবুকে। তিনি উক্ত জিনিসটার উপর কেন যে এত খড়গহস্ত ছিলেন তা তিনিই জানতেন, তবে এর অপকারিতা সম্বন্ধে তিনি যে সব কথা বলতেন তা থেকে এইটুকু বােঝা যেতাে যে তার মতে ওজিনিসটা মানুষের স্বাধীনতার মুলে খুব জবর গােচের একটা ঘা দেয় আর সেই ঘা মানুষের পা দুটোকে একবারে জন্মের মত খোড়া করে দেয়- তার চলবার শক্তি একবারে বন্ধ হয়ে যায়। কথাটা আর কারুর মনের উপর ছাপ কাটতে পেরিছিল কিনা জানি না তবে আমার মনের উপর যে একবারে কোদাই কেটে দিয়ে ছিল সে কথা জোর করেই বলতে পারি। যখন নিজের স্বাধীনতাকে বাঁচাবার জন্যে তার চারিদিকে নানারূপ সংকল্পের পরিখা ও প্রাকার তৈরি করছি সেই সময় দিগ্বিজয়ী বীরের মত মা তাঁর সমস্ত ব্ৰহ্মাস্ত্র সঙ্গে নিয়ে একবারে সিংহদ্বারের সুমুখে এসে হাজির। এই কথা নিয়ে মার সঙ্গে প্রায়ই আমার গােল বাধতাে কিন্তু এ পর্যন্ত কোন পক্ষই ডিক্রী পায় নি। সেদিনও মার সঙ্গে আমার একই কথা নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছিল মাঝখানে হঠাৎ আমি বলে উঠলুম, “দেখ মা, আমি যখন বলেছি বিয়ে করব না তখন কখনই করব না তা তুমি কাঁদ কাট আর যাই করনা কেন।” এই ব্যাপারের কিছুদিন পর একদিন বৈকালে বাইরে বেরুবার জন্তে কাপড় ছাড়ছি এমন সময় বাবা এসে হাজির—“দেখ নিরু আজ আর বাইরে বেরিয়ে কাজ নেই হরকলি বাবুরা তােমাকে আশীর্বাদ করতে আসবেন।” * অাখাঢ়, ১৩৫৫ বাবা ছিলেন সেই দলের লােক যারা যুক্তির চাইতে জিদকেই বড় আসন দেয়। জিদ জিনিষটা তবেই নাকি দাড়াতে পারে যদি তার বিপক্ষতাচরণ করবার মত জিনিস সে পায়—নইলে তার অস্তিত্বই যে থাকে না। কিন্তু এটা ত আর কেউ আশা করতে পারে যে পৃথিবীর প্রত্যেক জিনিসটাই তাদের মতের সঙ্গে আস্তিন গুটিয়ে ঘুমােঘুসি করবে, কাজেই জিদকে তার কাজ করবার অবসর দোবার জন্যে এই সব লােককে অনেক সময় করতে হয় কিনা, যেখানে নিজের মতের সঙ্গে পরের মতের মিল রয়েছে সেখানে পরের মতকে উন্টোতে পেরে নিজের মতকেই ধা করে উল্টে নিয়ে জিদকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আমার বিবাহের জন্যে বাবার কোন দিন একটুও গা দেখিনি বরং বরাবর এলাকাড়াই লক্ষ্য করে এসেছি, আজ হঠাৎ আমার বিয়ের জন্যে তার মাথাব্যথা দেখে আমি প্রথমটা কিছু অবাক হয়ে গেছলুম কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলুম মারই জয় হােলাে ; আমার অত সতর্কতা সত্বেও দুর্গের কোন এক গুপ্তঘার আবিষ্কার করে ফেলে বিজয়ী বীর যেদিন সত্য সত্যই আমার দুর্গের মধ্যে প্রবেশ লাভ করলে, সেদিন তার হাতে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমি দ্বিতীয় উপায় দেখলুম না। আমরা যেটাকে চাই না সেটার সম্বন্ধে বেশী চিন্তাও করি না আর আমরা যেটাকে নিয়ে বেশী চিন্তা করি না-সেটার আবির্ভাব যত নূতনত্ব, যত মােহ এনে দেয় ; আমরা আগে থেকেই যেটাকে মনে মনে এঁচে রেখে দিই তার আবির্ভব ততটা মােহ বা ততটা মূতনত্ব এনে দিতে পারে না। আমি বিবাহ করব ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা দু-দুবার বলেই যােক বা যে কারণেই হােক স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে মনে মনে কোনদিন বিশেষ কোন ধারণা আনবার চেষ্টা করিনি, যা নাকি শতকরা নিরেনব্বই জন করে থাকে যৌবনে প্রথম পদার্পণ করবার সঙ্গে সঙ্গে। তাই একটি ১১ বৎসরের সুগােল, সুন্দর ছােট মেয়ে তার পা-ভরা আল আর সিতে-ভরা সিঁদুর নিয়ে আমার একলা শােয়া খাটের একটি ধারে সমস্ত দেহটা কাপড়ে আর লজ্জায় ঢেকে নিয়ে যেদিন প্রথম শয়ন করতে এল, সেদিন সমস্ত দেহটা কণ্টকিত হয়ে উঠেছিল একটা অভূতপূর্ব অব্যক্ত পুলকভরে। আমার বিবাহের মধ্যে একটুখানি নূতনত্ব ছিল সেটা হচ্ছে এই যে, বাবা কন্যাপক্ষের কাছ থেকে এক কপর্দকও গ্রহণ করেন নি। লােকে এ সম্বন্ধে কিছু বল্লেই তিনি বলতেন “দরিদ্র ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ টাকার চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান।” পাড়ার লােকে কিন্তু বাবার উপর অত্যন্ত চটে উঠেছিল—তাদের মতে এ কাজটা অত্যন্ত খারাপ হয়েছিল কেননা এতে করে পাত্রের বাজার নেবে যাবার সম্ভাবনা ছিল যথেষ্ট। সবের মধ্যে থেকেই মানুষ নিজের জন্যে খানিকটা সান্ত্বনা খুঁজে নেয়—তা না হলে সে বাঁচতে পারে না। যেখানে সত্যি সান্ত্বনা নেই সেখানেও তারা কোন না কোন উপায়ে একটা সান্ত্বনার খুঁটি খাড়া করে তােলে, তাকে ভর করে দাড়িয়ে থাকবার জন্যে, তা না হলে সে যে মুখ থুবড়ে পড়বে। আমিও তাই করলুম। এই এত বড় একটা সঙ্কল্পের বাঁধ যেদিন বাবারূপ ভাগ্য-দেবতার একটি তর্জনী হেলনে নদীর বালুচরের মত ধস ভেঙ্গে পড়ল, সেদিন নৈরাশ্যের সেই দুকুলহারা অমত অলরাশির মধ্যে সান্তনার একটা তক্তা যদি খুঁজে ১৫৪ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩৫ স পাই তারি জন্যে হাতড়ে বেড়াতে লাগলুম; পেতে বেশী দেরী হহলো না ; বিনাপণে বিবাহ, দরিদ্র ব্রাহ্মণের দায়ােন্ধার-এই ত ভেসে যাবার মত তক্তা রয়েছে! আমি ডুবলুম না। দরিদ্রের দায়োদ্ধার, এটা কম সান্ত্বনা নয়। এই চিন্তাটাকে জপমালা করে চোক কান বুজে বিয়ে করে ফেললুম। এতে ফল হােলাে এই যে, স্ত্রী সম্বন্ধে মনে মনে কোন ছবি আঁকতে গেলেই আমি সেই সব রং আর সেই সব রেখাগুলােই কেবল তার মুখে বিশেষ করে ফলিয়ে তুলতুম, যেগুলো তার মনের কৃতজ্ঞতাকেই কেবল মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারে—আর কোন ভাবকে নয়। সে যে চিরকাল আমার কাছে কেনা হয়ে থাকবে, আর তার বাপের প্রতি আমাদের দয়ার কথা ভেবে আমাকে দেবতার মত করে পূজা করবে খুব শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে, স্ত্রীর সম্বন্ধে কিছু ধারণা করতে গেলেই এই কথাটাই প্রথমে মনের মধ্যে বেজে উঠতে। এমনি ধারণা নিয়ে নীরদাকে ঘরে এনে তুললুম, আর অতি সাবধানে এবং সতর্কতার সঙ্গে তার সঙ্গে এমন ভাবে মিশতে লাগলুম, যাতে তার এই ধ্যান-মাধুরী কোন দিন না ভেঙ্গে যেতে পারে। আমার প্রত্যেক ব্যবহারের মধ্যে এমন একটা ভাব থাকতে যা নাকি কেবল তার মনের মধ্যে কৃতজ্ঞতার যে অংশটা আছে তাকেই নাড়া দিতে পারে—আর কিছুকেই নয়। নীরদা মেয়েটি যে কেমন তা ঠিক করে বলা শক্ত, তবে এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় তার মধ্যে নিজস্ব বলে কিছু ছিল না বা তাকে নিজস্ব কিছু সঞ্চয় করতে দেওয়া হয় নি, তার বাপের বাড়ীর তরফ থেকে। বাপের বাড়ীর পক্ষে এটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল সন্দেহ নেই। মেয়েদের যদি কোন একটা দিক থেকে ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা হু-দুবার গােড়ে তােলা হয় তাহলে ত আর ভাঙ্গবার জো থাকে না, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্বশুরবাড়ী গিয়ে তাদের নিজেকে ভেঙ্গে একবারে চুরমার করে ফেলবার দরকার হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তাদের যদি কেবল তাগাড় আর ইট সুরকীর মত বেতৈরী অবস্থাতে ফেলে রাখা হয় তাহলে সেগুলােকে এক করে নিয়ে তাদের দিয়ে নূতন ইমারত বেশ সহজে তৈরী করে তুলতে পারা যায়, শ্বশুরবাড়ীর ইঞ্জিনিয়ারের নির্দেশ মত। মােট কথা আমি তাকে গড়ে তােলবার মত বেতৈরী অবস্থাতেই পেয়েছিলাম আর তৈরী করতেও কসুর করি নি। আমার দেবতা হবার সাধ, সে খুব মিটিয়েছিল তার কৃতজ্ঞতার অঞ্জলী ক্রমাগত তার উপকারকের চরণে উৎসর্গ করে। পুতুল নাচের পুতুলগুলাে যেমন তাদের হাত পা ততক্ষণই নাড়তে পারে যতক্ষণ পিছন থেকে একজন সে গুলােকে নড়িয়ে দেয়, নীরদার জীবনটা হয়েছিল অনেকটা সেই রকম। তার নিজের ইচ্ছা বলে কোন বালাই ছিল না-আমার সম্বন্ধেও নয়। আমার বােধ হয়, যৌবন তার নিজের গুরুভারে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে খোজে এমন একজনকে যার উপর নিজের দায়িত্বের বােঝা খানিকটা চাপিয়ে দিয়ে সে নিজে কতক হাল্কা হতে পারে- না হলে সে নিজের চাপে নিজেই মাটির সঙ্গে বসে যাবে যে। দেবতা হবার সাধ যেদিন মিটলাে তার নূতনত্বের চটক যে-দিন গিল্টিকর মরা সােপর মত দিন দিন ম্লান হয়ে আসতে লাগলাে সে- দিন বুঝলুম সব উল্টো পাল্টা হয়ে গেছে। বিবাহের কয়েক বৎসর পরে আমার পাণ-দোষটা ধরেছিল। আমার বােধ হয় মানুষের প্রবৃত্তিগুলাে এমন ভাবে সাজান থাকে যে .

সবুজ পত্র
আষাঢ়, ১৩২৫
একটা অন্যগুলাের পথ আটকে রেখে দেয়, কাজেই একটা যদি হেঁাছট
খেয়ে পড়ে ত অন্য যে-গুলো তাকে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে থাকে সেগুলােও
টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। যেদিন প্রথম সংযমের
বাঁধ ভেঙ্গে গেল সেদিন থেকে এইটেই আমি বাবর লক্ষ করে
আসছি যে একে একে অনেকগুলাে সংযমই তার সঙ্গে আলগা হয়ে
আসছে।
আমি যে মদ খেতে শুরু করেছি এ কথাটা বাবা এবং মা’র কাছে
যথাসম্ভব লুকোবার চেষ্টা করতুম কিন্তু নীরদার কাছে কোন দিন
সাবধান হই নি বা সাবধান হবার কোন দরকার বোধ করি নি।
যে তার কিছু মনে করবার আছে একথা কোন দিন মনেই আসে
নি। হাজার হােক আমি স্বামী আর সে স্ত্রী।
লােকে কথায় বলে অন্যায় কখন চাপ থাকে না--আমার ন্যায়ও
বেশী দিন চাপা রইল না-পাড়াময় কানাঘুসো হয়ে গেল!
সে-দিন সন্ধ্যার সময় কি একটা কাজে নিজের ঘরের দিকে
যাচ্ছিলুম, বারান্দা থেকে শুনতে পেলুম ঘরের ভিতর ওবাড়ীর টেপী
নীরদাকে বলছে-
“তা তুই যদি এতদিন টের পেয়েছিস ত বারণ করিস নি কেন ?
ধন্যি মেয়ে যা হােক তুই।”
“তা নাকি আবার বারণ করা যায়।”
“কেন যায় না, আমরা হলে ত বকে ঝোকে অন্নাথ্য করতুম আর
তুই বারণ করতে পারবি নি।”
“না তা পারবে না।”
“সে কি রে, তা না হলে দিন দিন যে বেড়ে উঠবে।”

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা “তা কি করবো ? আমার কোন কথা বলা কি উচিত ? আমি মেয়ে মানুষ ভালমন্দ কি বুঝি বল।” “মদ খাওয়াটা ভাল কি মন্দ তা তুই বুঝিস নে ; এ নূতন কথা বটে।” কি জানি কেন নীরদার কথাগুলাে সে-দিন তত ভাল লাগলো না। যেটাকে এতদিন খাটী ভক্তির সুর বলে মনে হােতাে, আজ কি জানি কেন তার মধ্যে নিরপেক্ষতার সুর মিশ্র হয়ে রয়েছে বলে কানে বাতে লাগলো। এই ঘটনার কিছু দিন পর এক দিন কোন দরকারে সুরেশবাবুদের বাড়ীতে তাকে ডাকতে গেছি-ইনি আমাদের ওখানের একজন পুরাণে উকিল। ইনিই আমাকে সুরাদেবীর মন্দিরের স্বর্ণদ্বার দেখিয়ে দিয়ে ছিলেন। সুরেশবাবুদের বাড়ীতে প্রবেশ করেই উঠান থেকে শুনতে পেলুম সুরেশবাবুর স্ত্রী তীব্র-স্বরে বলছেন--“দেখ অমন করে যদি ঢলাঢলি কর ত আমি সংসার করতে পারবো না; ভেবে দেখ দেখি কি ছিলে আর কি হয়েছ ; লোকে তােমাকে কত ভাল বলত, কত সুখ্যাতি করত আর এখন কি হয়েছ। তারপর মেয়েটা দিন দিন কলা গাছের মত বেড়ে উঠছে সেটা কি চোখ মেলে একবার দেখেছ। সংসারের খরচ দিন দিন কত বেড়ে উঠছে সে খবরটা কি রাখ? অমন করে সবাবি করলে শেষকালে ছেলেগুলাের হাত ধরে পথে গিয়ে দাড়াতে হবে যে।” এক একটা লােক থাকে তাদের গলা বেশ মিঠে কিন্তু আগাগোড় বে-সুরা। এই সব লােকের গান ততক্ষণই ভাল লাগে যতক্ষণ না কোন যন্ত্রের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে নেওয়া হয়। নীরদার ব্যবহারের

১
প।
লা,১৪২৪
মধ্যে মিষ্টতা ছিল বটে কিন্তু তার মধ্যে সুর ছিল না আদবেই, তাই
আজ যখন সুরেশবাবুর স্ত্রীর এই সুরে-বসান যন্ত্রের সঙ্গে তাকে
মিলিয়ে নিলুম তখন তা খাপছাড়া বলে মনে হতে লাগলো।
কথাগুলাে তীব্র বটে কিন্তু কেমন সুর রয়েছে, কেমন রেশওয়ালা
আর নীরদার সেদিনকার কথাগুলো নরম বটে কিন্তু কত বেসুরা কত
ফাফা। মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা অভাবের বেদনা বেজে
উঠলো। এইটেকেই যে আমি খুঁজে আসছি। এইটেকেই যৌবন
যে তার সুদৃঢ় বাহু দুটোকে বাড়িয়ে হাতড়ে হাতড়ে বেড়িয়েছে এতদিন
ধরে, আর এইটেকে পায় নি বলেই যে তার যত অবসাদ যত বৈরাগ্য।
বাড়ী ফিরলুম-রাত্রে নীরদা এসে যখন তার নির্দিষ্ট জায়গাটি
দখল করে শুলো তখন মধ্যের ব্যাবধানটা চোখের সুমুখে সহসা যেন
যােজন-ব্যাপী হয়ে দাড়ালো। এ যে অনেক দূরের জিনিস, এ যে
দু’কুল হারা নদীর পরপারের ঝাপসা গাছপালা ; ঘাটে তরীও ত
নেই যে সেগুলোকে নিকটের জিনিস করে নিই।—আবেগ ভরে
ডাকলুম-“নীরদা”।
সেই দূর থেকে অনেক দূর থেকে এলােমেলো বাতাসে ভাসা
আবছা উত্তর “কেন” ?
“কেন নয় নীরদা আরো বড় করে উত্তর দাও।”
নীরা নীরব।
“আমি মদ খেয়েছি, তুমি বকবে না নীরদা!”
“কেন বেকবো ?
“কেন বেকবে?” তোমার স্বামী উচ্ছন্নয় যাবে আর তুমি তাকে

যে , তৃতীয় সংখ্যা দু-দুবার 6 বেকবে না, তাকে বারণ করবে না, তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে না। কথা কও না যে !” “আমি কি বলবো?” আমার কান্না পেতে লাগলাে কোন কথা বললুম না-বুঝলুম অার ফেরাবার উপায় নেই। নিজেই আমি তাকে দূর করে দিয়েছি নিজেই আমি তার এবং আমার মাঝখানে এমন একটা দুর্ল প্রাচীর গেঁথে তুলেছি যা ডিঙ্গিয়ে আসার মত ক্ষমতা তার আদবেই নেই। এমনি করে এই দূরের জিনিষটিকে কাছে আনবার ব্যর্থ চেষ্টার বিড়ম্বনার ফাক দিয়ে আরও দশ বার বৎসর গলে চলে গেল। তারপর কি জানি কার ইসারায় এই দুরের জিনিসটি সহসা একদিন এত দূরে চলে গেল যে তার চিহু পৰ্যন্ত আর খুজে পাওয়া গেল না। নীরদ চলে যেতে সমস্ত শরীরটায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখলুম কোন খানটায় সে তার অভাব রেখে গেছে। বুকে হাত দিলুম; না সেখানে ত কোন নুতন অভাব নেই; মাথায় হাত দিলুম-সেখানেও তাই, কিন্তু পায়ে হাত দিতে সৰ্বাঙ্গ শিউরে উঠল ; এই খানেই যে সে তার সমস্ত অভাব রেখে গেছে। পা-টেপবার লোকের অভাবই ত সে তার চলে যাবার পথের মধ্যে রেখে গেছে। বুকে হাত বুলোর অভাব পূরণ করবার জন্যে সে আসে নি, তাই সেখানটার অভাব আগেও যেমন ছিল এখনও ঠিক তেমনিই রয়ে গেছে একটুও এদিক ওদিক হয়নি। আমার জীবনে এই প্রথম যৌবনারস্তু। এই প্রথম যৌবন তার রত্নসিংহাসন বুকের মাঝখানে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এনে বসিয়ে দিয়ে গেল, আর সঙ্গে কোথা হতে ধূপ ধুনা জ্বলে উঠলাে এক জনকে বরণ করে নেবার জন্যে সেই মসনদের কিংখাপের উপর। ;

সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ বলতে ভুলে গেছি—ইতিমধ্যে বাবা স্বর্গারােহণ করেছেন। মা আবার নূতন করে কনের সন্ধান আরম্ভ করে দিলেন তঁায় ৫০ বৎসরের তরুণ ছেলেটির জন্য, আর তার ৫০ বৎসরের তরুণ ছেলেটি চুপ করে থেকে তার সম্মতি জানিয়ে দিলে তরুণ ছেলেটিরই মত করে। ফুলশয্যার রাত্রেই ষোড়শী স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলুম, “তুমি আমাকে - ভালবাস।” কথাটা বড়ই অসংলগ্ন হয়েছিল সন্দেহ নেই কিন্তু আমি নাচার। কমলা উত্তর দিয়েছিল, “হ্যা” । দিন কাটতে লাগলো; এবার মনে মনে স্থির করেছিলুম পা-টাকে যথাসম্ভব গুটিয়ে রাখবে, যাতে এবার আর সে পা দেখতে না পায় কিন্তু এটা তখন বুদ্ধিতে আসে নি যে, পা বাদ দিলেও বুক ছাড়া অন্য আরও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে যার উপর মানুষ খুব স্বচ্ছন্দে চড়ে বসতে পারে। কমলা পা দেখতে পায় নি সন্দেহ নেই কিন্তু সে বুকও দেখতে পায় নি, সে দেখে ফেলেছিল কেবল পাকাচুলে ভরা গোল মাথাটা আর সেই খানেই সে তার চিরদিনের আসন খানি টেনে নিয়ে গিয়ে খুব নিশ্চিন্ত ভাবে বসিয়ে দিয়েছিল। এক কথায় দোজ-পক্ষের পরিবার যেমন হয়ে থাকে কমলা তার চেয়ে একটু কমও হয় নি একটু বেশীও হয় নি। নেশা করার দরুণ পায়ের তরফ থেকে নীরদা কোন কথা বলতে সাহসই করে নি আর মাথার তরফ থেকে কমলা যা বলেছিল তার বিষ তার নিজের রাজত্ব থেকে আরম্ভ করে নীরদার রাজত্ব পর্যন্ত চারিয়ে গেছলাে। কিছু-না-বলার ভিতর দিয়ে নীরদ। নিজেকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল—আর কমলা যা বলেছিল তার তীব্রতা আমাকেই দূর করে দিয়েছিল তার কাছ থেকে, বড়লোকের ফরোয়ানের মত করে।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা দু-দুবার এমনি করে এই চড়া মনিবের হাতে আমাকে ১০টি বৎসর পূরা- দমে থাকতে হয়েছিল নীরবে সমস্ত সহ্য করে। তারপর সেও একদিন চলে গেল অভাব রেখে দিয়ে মাথার উপরটাতে। সেখানটা সত্য সত্যই তার অভাবে বড় খালি খালি ঠেকতে লাগলো। অনেক দিন কয়েদের মধ্যে থেকে হঠাৎ স্বাধীনতা পেয়ে কয়েদীর যে অবস্থা হয় এও অনেকটা সেই রকম। আজও যৌবনের রত্নসিংহাসন তেমনি করেই খালি হয়ে পড়ে রয়েছে দেবীর অভাবে। ধূপ ধুনা দিনের পর দিন কেবল ছাই হয়েই মরছে সিংহাসনের চারিদিকে তার কুণ্ডলিকৃত সুগন্ধী ধূমপাশি ছড়িয়ে ছড়িয়ে। ঘণ্টা বাজছে, আরতী-প্রদীপ জ্বলে জ্বলে নিভে যাচ্ছে। পুষ্প-সম্ভার পুষ্পপাত্রে উন্মুখ হয়ে রয়েছে কার চরণ স্পর্শের মানসে। পায়ের সেবা আমার হয়ে গেছে—মাথার সেবাও মন্দ হয় নি কিন্তু বুকের সেবা আজও বাকী রয়েছে। হুকুম করবার সাধ আমার মিটেছে; হুকুম তামিল করবার সখও পূর্ণ হয়েছে; কিন্তু আব্দার শােনবার সাধ আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। ঐবিশ্বপতি চৌধুরী।

কালাে-মেয়ে।
মরচে-পড়া গরাদে ঐ, ভাঙা জালাখানি ;
পাশের বাড়ির কালাে-মেয়ে নন্দরাণী
ঐখানেতে বসে থাকে একা,
শুকনাে নদীর ঘাটে যেন বিনা কাজে নৌকোখানি ঠেকা।
বছর বছর করে ক্রমে
বয়স উঠচে জমে।
বর জোটে না, চিন্তিত তার বাপ ;
সমস্ত পরিবারের নিত্য মনস্তাপ
দীর্ঘশ্বাসের ঘূর্ণিহাওয়ায় আছে যেন ঘিরে
দিবস রাত্রি কালাে মেয়েটিরে।
সামনে বাড়ির নীচের তলায় আমি থাকি “মে”-এ ;
বহুকষ্টে শেষে
কালেজেতে পার হয়েচি একটা পরীক্ষায়।
আর কি চলা যায়
এমন করে এগজামিনের লগি ঠেলে ঠেলে ?
দুই বেলাতেই পড়িয়ে ছেলে
একটা বেলা খেয়েচি আপেটা।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা
কালাে-মেয়ে
ভিক্ষা করা সেটা
সইত না এক-বারে,
তবু গেছি প্রিন্সিপালের দ্বারে
বিনি মাইনেয়, নেহাৎ পক্ষে, অধা মাইনেয়, ভর্তি হবার জন্যে।
এক সময়ে মনে ছিল আধেক রাজ্য এবং রাজার কষে
পাবার আমার ছিল দাবী,
মনে ছিল ধন মানের রুদ্ধ ঘরের সােণার চাবি
জন্মকালে বিধি যেন দিয়েছিলেন রেখে
আমার গােপন শক্তিমাঝে ঢােকে।
আজকে দেখি নববঙ্গে
শক্তিটা মাের ঢাকাই রইল, চাবিটা তার সঙ্গে।
মনে হচ্ছে ময়না পাখীর খাচায়
অদৃষ্ট তার দারুণ রঙ্গে ময়ুরটাকে নাচায় ;
পদে পদে পুচ্ছে বাধে লােহার শলা,
কোন্ কৃপণের রচনা এই নাট্যকলা ?
কোথায় মুক্ত অরণ্যানি, কোথায় মত্ত বাদল মেঘের ভেরী ?
এ কি বাঁধন রাখুল আমায় ঘেরি ?
ঘুরে ঘুরে উমেদারির ব্যর্থ আশে
শুকিয়ে মরি রােদুরে আর উপবাসে।
প্রাণটা হাঁপায়, মাথা ঘােরে,
তক্তপোসে শুয়ে পড়ি ধপাস করে।

১১৪
সবুজ পত্র
আষাঢ়, ১৩২৫
***
হাত-পাখাটার বাতাস খেতে খেতে
হঠাৎ আমার চোখ পড়ে যায় উপরেতে,
মরচে-পড়া গরাদে ঐ, ভাঙা জালাখানি,
বসে আছে পাশের বাড়ির কালো-মেয়ে নন্দরাণী।
মনে হয় যে রােদের পরে বৃষ্টিভরা থমকে-যাওয়া মেঘে
' ক্লান্ত পরাণ জুড়িয়ে গেল কালো পরশ লেগে।
আমি যে ওর হৃদয়খানি চোখের পরে স্পষ্ট দেখি আঁকা ;
ও যেন জুই ফুলের বাগান সন্ধাছায়ায় ঢাকা
একটুখানি চঁাদের রেখা কৃষ্ণপক্ষে স্তব্ধ নিশীথ রাতে
কালো জলের গহন কিনারাতে।
লাজুক ভীরু ঝরণখানি ঝিরি ঝিরি
কালো পাথর বেয়ে বেয়ে লুকিয়ে ঝরে ধীরি ধরি।
রাতজাগা এক পাখী,
মৃদু করুণ কাকুতি তার তারার মাঝে মিলায় থাকি থাকি।
ও যেন কোন্ ভােরের স্বপন কান্নাভরা,
ঘন ঘুমের নীলাঞ্চলের বাঁধন দিয়ে ধরা।
রাখাল ছেলের সঙ্গে বসে বটের ছায়ে
ছেলেবেলায় বাঁশের বাঁশি বাজিয়েছিলেম গাঁয়ে।
সেই বাঁশিটির টান
ছুটির দিনে হঠাৎ কেমন আকুল করুল প্রাণ।
আমি ছাড়া সকল ছেলেই গেছে যে যার দেশে,
একলা থাকি “মেস-এ।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা
কালো-মেয়ে
সকাল সাঝে মাঝে মাঝে বাজাই ঘরের কোণে
মেঠো গানের সুর যা ছিল মনে।
ঐ যে ওদের কালো-মেয়ে নন্দরাণী
যেমনতর ওর ঐ ভাঙা জালাখানি,
যেখানে ওর কালো চোখের তারা
কালো আকাশতলে দিশাহারা ;
যেখানে ওর এলােচুলের স্তরে স্তরে
বাতাস এসে করত খেলা আলসভরে ;
যেখানে ওর গভীর মনের নীরব কথাখানি
আপন দোসর খুঁজে পেত আলোর নীরব বাণী ;
তেমনি আমার বাঁশের বাঁশি আপনা-ভোলা,
চারদিকে মোর চাপা দেয়াল, ঐ বাঁশিটি আমার জানলা খােলা।
ঐখানেতেই গুটিকয়েক তান
ঐ মেয়েটির সঙ্গে আমার ঘুচিয়ে দিত অসীম ব্যবধান।
এ সংসারে অচেনাদের ছায়ার মতন আনাগােনা,
কেবল বাঁশির সুরের দেশে দুই অজানার রইল জানাশোনা।
যে কথাটা কান্না হয়ে বোবার মতন ঘুরে বেড়ায় বুকে
উঠল ফুটে বাঁশির মুখে।
বাঁশির ধারেই একটু আলো, একটুখানি হাওয়া,
যে-পাওয়াটি যায় না দেখা স্পর্শ-অতীত একটুকু সেই-পাওয়া।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্র্যাকটিকাল। #ঃ । ইংরেজি লেখকের বইতেই পড়েছি যে ইংরেজ ideaকে অবিশ্বাস #67 105_"The philosopher proceeds from the abstract to the concrete. The Englishman starts with the concrete and may or, more probably, may not arrive at the abstract.........he mistrusts education. For education teaches how to think in general and that isn't what he wants or believes in......... Hence his contempt and even indignation for individuals or nations who are moved by ideas. He cannot endure the profession that a man is moved by high motives The words "hypocrite" "humbug' "sentimentalist" spring readily to his lips.........for intellect he has little use, except so for as it issues in practical results. He will forgive a man for being intelligent if he makes a fortune but hardly otherwise'-mois ইংরেজরা হচ্ছে ইংরেজিতে যাকে বলে, প্রাকটিকাল জাত। দীর্ঘকাল ইংরেজের সহিত সহবাসের ফলে practical এবং efficient হবার একটা প্রবল আকাক্ষা আমাদের মনে জেগে উঠেছে। যদি ভীষণ কাজের ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা প্র্যাকটিকাল লােক হওয়াটা আমাদের একেবারে আদর্শ না হয়ে উঠত তা হলে ভয় পাবার কোন কারণ ছিল না—কিন্তু এ কথা অস্বীকার করবার জো নেই যে কাজ সম্বন্ধে আমাদের উৎসাহটা তার স্বাভাবিক মাত্রা একেবারে পেরিয়ে গেছে। ইংরেজের কাছ থেকে কাজের তানেক গুণগান শুনে শুনে এবং অকেজো বলে অনেক খোটা খেয়ে খেয়ে ঐ কাজের লােক হওয়াটাই আমরা আমাদের চরম আদর্শ বলে ধরে নিয়েছি। কিছু দিন পূর্বে শিক্ষা-কমিশন যখন এদেশের অধ্যাপকদের কাছ থেকে শিক্ষা-প্রণালী সম্বন্ধে তাদের মতামত চেয়েছিলেন তখন শিক্ষার আদর্শ অর্থাৎ জাতীয় আদর্শ যে কি হওয়া উচিত, সে বিষয় আমাদের চিন্তা করতে হয়েছিল। এ কথা গোপন করা অসম্ভব যে তাতে আমরা বেশ একটু বিপন্ন বোধ করেছিলুম, কারণ বহুকাল ধরে অন্ন ভিন্ন অন্য কোন চিন্তা না করাতে, চিন্তা করাটা আমাদের অনভ্যাস হয়ে পড়েছে। বিশ্ব বিদ্যালয় বই নির্বাচন করেন, আমরা সে গুলো দাগ দিয়ে, নােট লিখিয়ে মুখস্থের জন্য তৈরী করে দি। Shakespeare সম্বন্ধে Dowden কি চিন্তা করেন, Raleigh কি বলেন, Hazlitt কি বলেন, আর আমাদের “An Experienced Professor”ই বা কি লেখেন, এই সব দেখে শুনে যা হোক একটা নোট লেখাই। Cowper পড়াই-Sofa কবিতার বিশেষত্ব কি তা বােঝাই, John Gilpin-এর রসিকতা সম্বন্ধে এমন একটা নােট দি যা মুখস্থ করতে গিয়ে ছেলেদের মন করুণরসে আপ্লুত হয়ে ওঠে। তারপরে মাসকাবারে মাইনে নিয়ে মেয়ের বিয়ের দেনার মুদটা শোধ করবার চেষ্টা করি। এমনি করে দেশের শিক্ষাকে বহন করে আমরা চলি-এর মধ্যে হঠাৎ কেউ যদি জিজ্ঞেস করে যে Shakespeare ১৬৮ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ পড়াও কেন, Cowper পড়ে লাভ কি তখন ভেবে কুল পাই নে। তবু মনে একটা ক্ষীণ আশা থাকে যে পুরোনাে নোট দেখলে Cowper's place in the English literature 781* 4761 কিছু পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি কোন অস্বাভাবিক কৌতুহলী ব্যক্তি প্রশ্ন করেন যে শিক্ষার প্রয়োজন কি শিক্ষার আদর্শ ই বা কি, তখন হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরােয় প্রকৃত শিক্ষা যে কি মুল্যবান বস্তু তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না, শিক্ষাই মানুষকে নিম্ন-প্রাণীদের সহিত পৃথক করাইয়া দেয় ইহা চোরে চুরি করিতে পারে না” ইত্যাদি। ছাত্রদের প্রবন্ধ সংশোধন করতে গিয়ে এ কথাটা এতবার বলেছি যে ও-কথাটা না বলে থাকা একটু কষ্টকর। কিন্তু শিক্ষা কমিশনের মর্জির কথা বলা যায় না তারা হয়ত ঠিক এ রকম উত্তর চান নি এই সন্দেহে . আমরা অন্য উত্তর দেওয়াই স্থির করলুম। নিজেদের শিক্ষার কথা স্মরণ করে শিক্ষার উপর আমাদের কোনই শ্রদ্ধা ছিল না, তা ছাড়া দেখেছি যে শিক্ষার ফলে আর যাই হোক সকলের ভাগ্যে গাড়িঘােড়া চড়া চলে না। অতএব বলুম--আর কিচ্ছ, নয়, আমাদের দেশে এই কাব্য সাহিত্য দর্শন, abstract science, প্রভৃতি যা পড়ান হচ্ছিল তা বন্ধ করে দাও, এতে কোন লাভই হয় না। এই সমস্ত স্কুল কলেজ উঠিয়ে দিয়ে কেবল technical college কর এবং সবাইকে জোর 763 techenical science (mete 67** খেয়ে বাঁচবে; কলকাতার বাড়ীওয়ালার তাগাদা সহ্য করতে হবে না এবং মেয়ে বিয়ে দিতে কষ্ট পাবে না। যারা এই রকম উত্তর দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেক বৈদান্তিক, দার্শনিক, সাহিত্যের অধ্যাপক, নীতিশিক্ষার উৎসাহী এবং মােটামুটি আধ্যাত্মিক ব্যক্তি আছেন।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা প্র্যাকটিকাল অধ্যাপকেরা শিক্ষার বিষয় যে দেশের ঠিক মনােভাবই প্রকাশ করেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। যেদিন ইয়ােরােপ বাষ্প-দৈত্যটাকে বশ করবার মন্ত্র লাভ কলে, সেদিন এসিয়া পড়ল একদম পিছিয়ে। আর ইয়ােরােপের বাণিজ্য- তরীতে নীলসাগর ভরে গেল, দেশ দেশান্তর থেকে মণি মুক্তা সঞ্চয় করে ইয়ােরোপের অধিবাসীরা তাদের মাতৃভূমিকে সমৃদ্ধ ও সুসজ্জিত করলে। তার শতন্ত্রী কামান, তার দ্রব্য সম্ভার, তার রণতরী, তার আত্মশ্লাঘা, তার অসীম প্রতাপ আমাদের চমক লাগিয়ে দিল। আমরা ভাবলুম ইয়ােরােপ যখন বাণিজ্য-লব্ধ অর্থ দ্বারা বড় হয়েছে অতএব আমরা যদি বড় হতে চাই তবে আমাদেরও ব্যবসা বাণিজ্য করতে হবে-ও ভিন্ন উপায় নাই। অতএব দূর করে দাও তােমার সাহিত্য, তোমার কাব্য, তােমার দর্শন। যাতে করে আমরা জাতকে জাত কামার কি তাতি হয়ে উঠতে পারি তাই কর। এমনি করেই ইয়ােরাপের দৃষ্টান্ত আমাদের মনকে বিগড়ে দিচ্ছে। খবরের কাগজে বক্তৃতায় আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আমাদের গর্বের ত অন্ত নেই অথচ দেখি ভবিষ্যৎ আদর্শ স্থির করবার বেলায় সবাই বলেন রেখে দাও তোমার আধ্যাত্মিকতা, ওই করেই ত এই হয়েছে, এখন কি করে একদিন সমস্ত পৃথিবীর সকল বাজার আমরা একচেটে করব সেই কথা ভাব। সবাই বলছি দেশের লােককে কাজের লােক করে তুলতে হবে। এই ত দেখতে পাচ্ছি ব্যবসা শেখাবার জন্যে বিশ্ব- বিদ্যালয় নূতন আয়োজন করা স্থির করেছে। এই অর্থের প্রয়োজন এবং সেই নিমিত্ত ব্যবসার প্রয়ােজনকে আমি অবহেলা করছি না কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করি পাট কেনাবেচার কৌশল শেখা উচ্চ শিক্ষার সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ একটা অঙ্গ না কি ? পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশে তিসির ও ভুসির কিরূপ চাহিদা ( demand) তাই জানা কি মনুষ্যত্ব লাভের জন্য একান্ত প্রয়োজন? আধ্যাত্মিক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করবেন খেতেই যদি না পেলে তবে বাঁচবে কি করে—আমি বলব খাওয়াটা আমি ভুলছি না এবং মানুষের পক্ষে ওটা ভােলাও সহজ নয়, কিন্তু যেটা ভােলা সহজ সেটা হচ্ছে এই যে আহাৰ্য্য সঞ্চয়টাই মানব জীবনের চরম উদ্দেশ্য নয়। বহুদিন হতে ইংরেজী শিখে আসছি এবং Shakespeare, Buke পড়ছি, হঠাৎ উপদেশ শুনলুম যে ওসব পড়া, সময়ের অপব্যয় মাত্র, ওতে কাজের কোন সুবিধাই হয় না। তার চেয়ে ইংরেজী বিশুদ্ধ ভাবে বলতে শিখলে চাকরী প্রভৃতির সুবিধা হত। অমনি দেখলুম সিনেটে প্রস্তাব হয়েছে যে, ইংরেজী বিশুদ্ধ উচ্চারণের জন্য একটা ডিপ্লোমা দেওয়া হােক। সিণ্ডিকেট এই উচ্চারণের বিশুদ্ধতার প্রয়ােজন এমন করে অনুভব করলেন এবং সাধারণ লােক- দের এ বিষয়ে এত অযােগ্য মনে করলেন যে, তারা নিয়ম করলেন, গ্র্যাজুয়েট ভিন্ন অপর কেউ এ পরীক্ষা দিতে পারবে না। বিশ্ব- বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বােধ করি এই বিশ্বাস যে, Photo বলতেই কোথায় accent দিতে হয় আর Photography বলতেই বা কোথায় দিতে হয়, এটা যে একটা বিশেষ বিদ্যা কেবল তা নয়—এ বিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া কর্তব্য। তবে কথা এই যে, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কর্তাব্যক্তি এ পরীক্ষা দিয়ে জনসাধারণকে উৎসাহিত না করেন তবে খুব সম্ভবত দেশের লােক ও ডিপ্লোমায় মােহিত হবে না, কারণ ইংরাজি ভাষায় জবান-দুরস্ত করার দিকে মানুষের মন আর নেই।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা প্রাকটিকাল ১৭১ কিছুদিন হল আমরা যখন প্রাথমিক শিক্ষার কথা ভাবতে শুরু করেছিলাম তখন মনে করেছিলাম যে, দেশের লােককে খানিকটে chemistry botany, শিখিয়ে দিলেই দেশ উদ্ধার হয়ে যাবে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল culture নয় agriculture। কিন্তু মানুষ কি কেবল ফসল-উৎপাদনের ও কাপড়-তৈরীর কল ? মানুষের মনুষ্যত্ব কি এতই সুলভ যে, তা লাভের জন্য কোন চেষ্টারই প্রয়ােজন নেই। আজ অনেক দিন ধরে ইয়ােরােপে প্রাথমিক শিক্ষা চলে এসেছে কিন্তু দেখা গেল তাতে বিশেষ কোন ফল হল না। এবং এ বিষয়ে সে দেশের দু একজন লেখকের লেখায় অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। বিলাতের ও আমাদের দেশের নিম্নশ্রেণীর লােকের মধ্যে যে তফাৎ আছে তা অনেকেই জানেন—ইংলণ্ডের জনসাধারণের একটা fasstta 3605-“Let's all go down the Strand and have a bannana ; কলা পৃথিবীর অবশ্য সকল দেশের লােকেই খায় এবং আমরা সম্ভবত বেশীই খাই, কিন্তু তাই বলে এদেশের নির- ক্ষরেরাও ওব্যাপারটাকে সঙ্গীতের বিষয় করে তােলে নি। এই যে আমাদের নিরক্ষরদের মনের একটু স্বাভাবিক উচ্চতা, ও আভিজাত্য আছে তার কারণ কি? অথচ দেখতে পাই যে, বিলিতি কৃষকেরা বৈজ্ঞা- নিক উপায়ে যে সব আলু কফি উৎপাদন করে তা উৎপাদন করা আমাদের দেশের কৃষকের অসাধ্য। তার কারণ এই যে, যদিও ভারতবর্ষের কৃষক জানেন যে, কোন জমিতে কোন সার দিতে হয়, তারা জানে যে অযযাধ্যা নগরে রামচন্দ্র একদিন পিতৃসত্য পালন করবার জন্যে রাজমুকুট ত্যাগ করে বনবাসে গিয়েছিলেন—মাবণের 7) ১৭২ সবুজ পুত্র আষাঢ়, ১৩২৫ অশােক বনে বন্দিনী সীতার কাহিনীও তারা শুনেছে-রামচন্দ্রের পিতৃভক্তি, সীতার সতীত্ব, অর্জুনের শোৰ্য তাদের কাছে কাহিনী মাত্র নয়—তাদের স্মৃতি অলক্ষ্যে তাদের মনকে যুগপৎ কোমল ও উজ্জ্বল করে তুলেছে। তাই এত যে পঙ্কিলতা তবু হরিসংকীৰ্ত্তনে লােক জোটে; যাত্রাগানে, ধ্রুব-উপাখ্যান ভালই লাগে। বিশ্ববিদ্যা- লয়ের শিক্ষাই হােক আর প্রাথমিক শিক্ষাই হােক ব্যবসার সঙ্কীর্ণ আদর্শে শিক্ষাকে ছােট করে দিলে, দেশের মঙ্গল হবে না, কারণ তাতে দেশের মন ক্রমশ ইতর হয়ে পড়বে। কাজের একটা ভীষণ আদর্শ চোখের সামনে রাখতে যে কেবল শিক্ষার আদর্শকে ছােট করে দিয়েছি তা নয়—বাংলাদেশের মনে সকল ব্যাপারেই একটা আক্ষেপ উঠেছে যে, এখানে লেখক পাওয়া যায়, কবি ত খুবই সুলভ, বক্তা সবাই, কিন্তু যাকে বলে practical, business-man তা পাওয়া সহজ নয়। আক্ষেপ করে এই কথা বলি যে, এই যে এত বড় স্বদেশীর ঢেউটা এল,-কি হল তাতে? আর দেখ দেখি বােম্বাই, মিল বসিয়ে কেমন লাভ করছে, বাঙ্গালী বক্তৃতা দিলে গান গাইলে, বাস হয়ে গেল সব। এই সব লােক হয়ত একদিন এই বলে আক্ষেপ করবেন যে, সূর্যের আলাে ধরে তারা তাদের গাস্থ্যের চুললটি জ্বালাতে পারছেন না। এই practical efficiency প্রভৃতির মােহ যতদিন ধরেছে, ততদিন থেকে যেমন কাজের উপর শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে অমনি আফিসের উপর শ্রদ্ধাও বেড়ে গেছে। আফিল আমাদের মন হরণ করেছে কারণ আমরা ভাবি যে, ঐ আফিস করার গুণেই ইংরেৎ এত বড়। অথচ এই efficiency-টাই বা কি? দশটা থেকে পাঁচটা ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা প্র্যাকটিকাল শদা খাত থেকে কালো খাতায় কখনও বা কাল কালীতে কখনও বা লাল কালীতে নকল করা এবং এইটেই খুব শৃঙ্খলার সহিত করার নামই ত 'efficiency, আর practical মানে যে কাজ করা কঠিন তাতে হাত না দেওয়া। কাজের চেয়ে কাজের শৃঙ্খলাই যে বড় একথা স্বীকার করা কঠিন, তবুও দেখছি শিক্ষাগুণে efficiency- আদর্শে আমরা ভারি মােহিত হয়েছি। Idealism নয়, vision নয় efficiency এবং practical হওয়া আমাদের জাতীয় আদর্শ হয়ে উঠেছে। Idealism-কে আমরা অশ্রদ্ধা করতে শিখেছি- নেতাদের বলছি Idea দিয়ে কি হবে—Practical কিছু বলতে পার ত বল, লেখককে বলছি ম্যালেরিয়া কিসে দূর হয় সেই কথা লেখ, না হলে ছেড়ে দেও তােমার লেখনী। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিভাগ হতে, আফিস বড়। অধ্যাপক এবং কেরাণীর সংখ্যা প্রায় সমান। কলেজে দেখতে পাই আফিস সুচারুরূপে চালানই হচ্ছে অধ্যক্ষের প্রধান কর্তব্য। আফিসের বড়বাবু হওয়ার যােগ্যতাই সব চেয়ে বড় যােগ্যতা। রাজনীতি ক্ষেত্রে দেখছি যে, যারা বিশ ত্রিশ বৎসর নিপুণ ভাবে চেয়ার সাজিয়ে এসেছেন, চাঁদা আদায় করেছেন অথবা চাদোয়া খাটিয়েছেন, তাঁরা বলছেন তাঁরাই নেতা কারণ তারা practical ! কলেজেও প্রধান কেরাণীর প্রতাপ অধ্যক্ষের চেয়ে কম নয়। স্কুলে Plain living and high thinking সম্বন্ধে অনেক প্রবন্ধ লিখেছি—চাণক্য-শ্লোকে অর্থের অনর্থতা সম্বন্ধে অনেক উপদেশ পেয়েছি এবং জাতীয় আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে অনেক বক্তৃতা শুনেছি, অথচ আমাদের মনে ভাবী-ভারতবর্ষের যে আদর্শ গড়ে ১ঃ সবুৰ পৰ উঠেছে, সে হচ্ছে এমন একটা ভারতবর্ষ, যাতে শুধু কাপড় বোনা হচ্ছে, জুতাে তৈরী হচ্ছে—চার পাঁচ তলা বাড়িতে, কলের চিমনীতে আকাশ ঢাকা যার সমস্ত দেহট। চা, পাটের বিজ্ঞাপনে একেবারে আবৃত-সাহিত্য দর্শন যেখানে নির্বাসিত, অকেজো বিজ্ঞান যেখানে অপমানিত। আর দেশের লােক Stock Exchange ভিড় করে দিব্বি সুখে জীবনযাপন করছে, আর আমাদের ছেলের স্কুলে কলেজে første og Type-writing orta Book-keeping ! কিন্তু উপবাসের দিনে যাই মনে করি না কেন, এ আদর্শ আমাদের দেশে চলবে না। যে আত্মা অজর অমর, যে আত্মা অমৃতের অধিকারী, তাকে বিনষ্ট করে মানুষকে একটা সস্তা জিনিষ উৎপাদনের কলে পরিণত করতে ভারতবর্ষ সজ্ঞানে কখনও রাজী হবে না। পৃথিবীর সমস্ত বাজার একচেটে করবার প্রলােভনও যদি দেখাও তবু একথা ভারতবর্ষের জাতীয় আত্মা কখনই স্বীকার করবে না যে, দেবতাদের মধ্যে কুবেরই বড়, আর জাতির মধ্যে বৈশ্যই শ্রেষ্ঠ। শকিরণশঙ্কর রায়।

সমুদ্রের ডাক। *ঃ সাঁইত্রিশ বৎসর বয়সে দক্ষিণা যখন পুত্র সন্তান প্রসব করলে তখন তাদের সেই এতদিনকার বিষাদঘেরা কুটীর খানি আনন্দের অলোতে হেসে উঠল। সাগরের কিনারে তাদের কুটীর। আবহমান- কাল থেকেই ত নীলাম্বুরাশি উচ্ছসিত—সৃষ্টি হতেই ত তার তরঙ্গমালা কল কল ছল ছল মুখর—আজও তাই। তবে সে তরঙ্গমালার কল কল ধ্বনিতে আজ এত আনন্দ-মদিরা ঢেলে দিলে কে ? নীলাম্বুরাশির সে উচ্ছ্বাস আজ এত হাস্য-মুখরিত হয়ে উঠল কেন? কুটীরের আশে পাশে তানবৃক্ষের সারি। বাতাসে তালবৃন্ত থির থির করে কঁপছে—কিন্তু তা আজ এত উল্লাস-যুক্ত হ’ল কোন্ মন্ত্রে ? দক্ষিণা যখন তার সায়ত্রিশ বৎসর বয়সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল তখন এমনি করে মৎসজীবীর সেই নির্জন শান্ত অথচ বিষাদমাখা কুটীর খানি, আকাশ বাতাস দশদিক ভরে একেবারে হেসে উঠল। দক্ষিণ যখন পুত্র সন্তানটি প্রসব করলে তখন শ্ৰীমন্তের হৃদয়খানি ভক্তিতে ভরে উঠল এবং তারই আলােক তার চক্ষু দুটিকে উদ্ভাসিত করে তুলল। দেবতার দয়া তার অন্তরের অন্তস্থলে গিয়ে স্পর্শ করে মন্তের জীবনকে এক মুহূর্তে কৃতার্থ করে দিল। জোড়করে আকাশের পানে চেয়ে গদগদভাষে শ্ৰীমন্ত বলল-“দেখাে ঠাকুর। আমার থােকাকে যেন বাঁচিয়ে রেখ-দেখাে যেন আকাশের চাঁদ হাতে বু পা আধাঢ়, ১৩২৫ – দিয়ে আবার তা কেড়ে নিয়ো না”—মন্তের মুখে আর কথা সরল না —তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল—অন্তরের ভাব, ভাষা খুঁজে পেলে না। যথাসময়ে অন্নপ্রাশনের সঙ্গে শিশুর নামকরণ হয়ে গেল। দেবতার দান বলে তার নাম রাখা হ’ল প্রসাদ'। যেদিন শিশু প্রথম আধ আধ কথায় মা ও বাবা ডাকতে শিখল, সেদিন দক্ষিণ ও মন্তের বুকের ভিতরটা আশায় আনন্দে কেঁপে উঠল—এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখের সামনে একটা নতুন জগৎ খুলে গেল। যে জগতে পিতৃ-মাতৃ হৃদয়ে এত স্নেহ এত ভালবাসা—সে-জগতের ত কঠোর হবার অবসর নেই। যে সংসারে শিশু রয়েছে—তার আধ আধ কথা রয়েছে- কালো চোখের হাসিমাখা দৃষ্টি রয়েছে—সে সংসারের ত নির্মম হবার সাহস নেই। শ্ৰীমন্তের মরুভূমির মতো সংসার এক মুহূর্তে যেন মন্দাকিণীর প্রবাহে মদল শােভিত হয়ে গেল। আর সে ক্লান্তি নেই, দুঃখ নেই, দৈস্য নেই-আর সে ব্যর্থতা নেই। শিশুর আনন্দ- ময় স্পর্শে সমস্তই ধন্য ও সার্থক হয়ে উঠল। প্রতিদিনের কাজগুলো যা এতদিন শ্ৰীমন্ত ও দক্ষিণাৰ কঁাধে ভূতের বোঝার মতো চেপে তাদের জীবনকে এখানে সেখানে নির্মম ভাবে টেনে নিয়ে বেড়াত, সেভার শুধু একটা মাত্র শিশুর আবির্ভাবে একেবারে লঘু হয়ে গেল। শ্ৰীমন্ত যখন জাল কাঁধে নিয়ে মাছ মারুতে যায় তখন তার হৃদয়টা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতােই আজকাল নৃত্য করূতে থাকে-ক্রীমন্ত তখন ভাবে যে এই দিনমানব্যাপী পরিশ্রমের যে পুরস্কার, সে-পুরস্কার এ পরিশ্রমের তুলনায় অনেক বেশী। সে পুরস্কার একটি ক্ষুদ্র শিশুর স্পর্শ—একটি ক্ষুদ্র শিশুর মুখে বাবা- ডাক। দক্ষিণা যখন রন্ধনে যায় তখন আর সে তা যন্ত্রবং সম্পাদন এম , তৃতীয় সংখ্যা সমুদ্রের ডাক করে না। বন্ধনের প্রতি ব্যঞ্জনটি যে, একটি ক্ষুদ্র শিশুর আনন্দের সামগ্রী হবে। সমস্ত দিনটার দিকে চেয়ে দক্ষিণার আর মরুভূমি বলে মনে হয় না। সমস্ত দিনমান যে সে অনেকগুলো মেহের কাজের অধিকারিণী। শিশুকে স্নান করান-আহার করান-ঘুম পাড়ান তা যে দক্ষিণাকেই করতে হবে। ধন্য ভগবান! যিনি শিশুকে অসহায় করে এখানে এনেছেন। পিতামাতা একটি ক্ষুদ্র শিশুর কাছ থেকে যে কতখানি আনন্দ কুড়িয়ে নেয়—তা শিশুও বােঝে না আর পিতামাতাও জানে না। প্রসাদ ধীরে ধীরে ছ' বছরে পড়ল। একদিন রাতে ঘরের ভিতরে অসহ্য গরম বোধ হওয়ায় দক্ষিণ ঘরের দাওয়ায় একখানি মাদুর বিছিয়ে শয়ন করেছে। পাশে প্রসাদ। ভোরের মুখে দক্ষিণার ঘুম ভেঙে গেল। তখন একটি মাত্র কাক ডেকেছে-সমুদ্রের আর আকাশের যেখানে মিলন হয়েছে সেখানে কেবল একটি মাত্র রেখা শুভ্র হয়ে উঠেছে। মন্ত তারও আগে জাল নিয়ে বেরিয়ে গেছে। দক্ষিণা তাড়াতাড়ি উঠতে যাচ্ছে, হঠাৎ তার চোখ পড়ে গেল প্রসাদের মুখের উপর। দক্ষিণার আর ওঠা হ’ল না। প্রসাদকে ত সে এমন কোন দিন দেখে নি! নিদ্রিত শিশুর হাত দুটো সন্তর্পনে তার বুকের ওপর ন্যস্ত। চোখ দুটো ফুলের পাপড়ির মতো নিমীলিত। আর ঠোট দুখানিতে একটী মৃদু অতি মৃদু হাসির রেখা। দক্ষিণা কি প্রসাদকে আর কোন দিন নিদ্রিত অবস্থায় দেখে নি ?দেখেছে; কিন্তু সে-প্রসাদে আর এ-প্রসাদে যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। আর কি কোন দিন সে প্রসাদকে সতে দেখে নি?দেখেছে; কিন্তু সে হাসিতে আর অন্ধকার এই

১৭৮
সবুজ পত্র
আষাঢ়, ১৩৫
ক্ষুদ্র পিতা
নিদ্রিত শিশুর মৃদু হাসি টুকুতে যে কি প্রভেদ তা দক্ষিণা বলতে
পারে না—কিন্তু সে-হাসি আর এ-হাসি এক নয়। এ কি দক্ষিণার
পুত্ৰ-না কোন দেবশিশু!
এ কি এই ক্ষুদ্র পৃথিবীর
মাতার স্নেহাবদ্ধ সন্তান-না: অনন্ত আকাশের কোন জীব ! এ কি
মত্তের মানুষ-না স্বর্গের দেবতা ! দক্ষিণার কেমন ভয় করতে
লাগল। তাড়াতাড়ি ডাল—“প্রসাদ, প্রসাদ।”
দক্ষিণার ডাকে যখন প্রসাদের ঘুম ভেঙে গেল তখন সে চারদিকে
চেয়ে যেন প্রথম কিছুই বুঝতে পারল না, তারপর হঠাৎ তার মাকে
দেখতে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল—“জানিস্ মা ভারি একটা
মজার স্বপ্ন দেখছিলাম।
দক্ষিণ শিশুকে বক্ষে চেপে তার দুই গালে হাত বুলিয়ে বুঝল
এ তারই প্রসাদ বটে—জিজ্ঞেস কল—“কি স্বপ্ন বাবা
“ভারি মজার স্বপ্ন মা! সে কি যেন কেমন—একদিন যেন
আমি খেলছিলাম-সেখানে সবাই আছে মান অনঙ্গ বৈকোণ্ঠে।
শশী তারক—সবাই। হঠাৎ দেখি কেউ নেই। একলা আমি খালি
দাঁড়িয়ে আছি—আর আমার সামনে মা খালি নীল—আর নীল—আর
আর সেখানে থেকে কে যেন খালি ডাকছে-‘প্রসাদ প্রসাদ,
আমি উত্তর দিতে যাই আর পারি না-হাঁটুতে যাই হাঁটতেই পারি
না। আচ্ছা স্বপ্নে এ রকম হয় কেন মা? হাঁটতে গেলে হাঁটতে
পারি না—কথা বলতে পারি না?”
“কি জানি বাবা কেমন করে বলব স্বপ্নে কেন ওরকম হয়।”
“তারপর আরও কত যেন কিসব আমার মনেই নেই।
যেন সুন্দর সুন্দর দেশ—কত ঘর বাড়ী-ফুল ফল—কত যেন কি।
নীল !

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা সমুদ্রের ডাক সে এমন সুন্দর-সব বুঝি পরীদের দেশ—পরীদের দেশ কোথায় মা “কি জানি বাবা তাদের দেশ কোথায় তা ত কেউ জানে না। তারা থাকে আকাশে—আকাশে আকাশেই ঘুরে বেড়ায়—তাদের দেশ কোথায় তা ত কেউ জানে না।” প্রসাদ সন্দেহাকুল চিত্তে আকাশের দিকে চেয়ে দেখল। শিশুর চোখে পড়ল শুধুই আকাশ-অনন্ত শূন্য—আর কিছুই না। শিশু একটু ম্রিয়মান হ’ল। হয় পরীদের দেশ কোথায় তা কেউই জানে না । সেদিন রাত্রিতে ভীষণ তুফান উঠল। কালাে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল—থেকে থেকে বিদ্যুৎ তাদের গায়ে দাঁত বসিয়ে দিতে লাগল। দিগন্তের পর থেকে সাঁ সাঁ করে বাতাস ছুটুল-সেই বাতাসের নাড়া খেয়ে লক্ষ্য ঢেউ যেন লক্ষ নিদ্রিত অজগরের মতো জেগে উঠে, তাদের লক্ষ্য ক্রদ্ধ ফণা তুলে বেলাভূমে আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। অন্ধ্রপ্রহর রাত থাকতে জল ঝড় থেমে গিয়ে, প্রকৃতি শান্তমুর্তি ধারণ করূল। দক্ষিণার যখন ঘুম ভাঙল তখন পূর্বদিকে ক্ষীণ উষার আলাে দেখা দিয়েছে—আঁধার তখনাে গাছে গাছে, তাদের ডাল পালার পাশে পাশে, ঘর বাড়ীর কোণে কোণে আশ্রয় খুঁজে আরোও কিছুকাল আবার প্রয়াস পাচ্ছিল। দক্ষিণা উঠে ছড়া দিয়ে উঠান ঝাট দিল। তখন চারদিক যেশ ফরসা হয়ে এসেছে। দক্ষিণা গিয়ে প্রসাদকে ডেকে তুলল- বলল-“কাল রাতে ঝড় হয়ে গিয়েছে—চল, ঝিনুক কুড়ুতে যাবি নে?” প্রতি ঝড়ের শেষে সমুদ্রের প্রচণ্ড তরঙ্গাবাতে যেসব মরা ২৪ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ ঝিনুক ইত্যাদি বেলা-ভূমে পড়ে থাকত দক্ষিণ তা কুড়িয়ে বেশ দু’ পয়সা উপায় করত। কখনও কখনও বা দু' একটা বড় শঙ্খ বা কড়িও মিলে যেত। তা অবস্থাপন্ন গৃহস্থেরা বেশ দাম দিয়ে কিনে নিত। দক্ষিণ তাড়াতাড়ি প্রসাদকে কাপড় পরিয়ে দিল। তারপর কুটীরের দরজাটি টেনে দিয়ে মাতা এবং পুত্রে বের হয়ে পড়ল। ছােট বড় নানা রঙের নানা আকৃতির ঝিনুকে যখন দক্ষিণার ঝাকাটী পূর্ণ হয়ে উঠল তখন সমুদ্রগর্ভস্থিত সূর্যের ক্রুদ্ধ রশ্মিগুলো পূৰ্বদিগন্তে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত মেঘমালা তীরের মতো ভেদ করে’, উর্কে নীলিমায় আপনাদের ছড়িয়ে দিয়েছে। ঝিনুক কুড়ােতে কুড়ােতে তারা সমুদ্রের ধারে ধারে অনেকদূর গিয়ে পড়েছিল। ফিরবার পথও সেই সমুদ্রের ধারে ধারে। দক্ষিণা বাম কাকালে ঝিনুকপূর্ণ ঝকাটী বহন করে, দক্ষিণ হস্তে প্রসাদের ক্ষুদ্র হস্তটী ধারণ করে ছেলের সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ী ফিরে চল। মাতা পুত্রে কথোপকথন করতে করতে চলছিল আর শিশুর চঞ্চল চোখ দুটী এদিক সেদিক ফিরছিল। একবার প্রসাদ সমুদ্রের দিকে চেয়ে দেখে, তারপর বলে উঠল—“দেখ দেখ মা কেমন একখানা জাহাজ কতদূর দিয়ে ছুটে চলেছে”—কিন্তু পরক্ষণেই তার উত্তোলিত অঙ্গুলি সঁাত দিয়ে কামড়ে ধরে একেবারে দাড়িয়ে গেল—শিশু যেন কি স্মরণ করবার চেষ্টা করতে লাগল। সহসা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল—“মা জানিস?” দক্ষিণাও প্রসাদের সঙ্গে সঙ্গে দাড়িয়ে গিয়েছিল—বলল-“কি বাবা ?” “সেই যে সেদিনকার স্বপ্ন।

৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা সমুদ্রের ডাক ১১ “ছ। বাবা” “খালি নীল—আর নীল--আর নীল।” “হঁ বাবা” শিশু তার ক্ষুদ্র হস্তের ক্ষুদ্র অঙ্গুলি সমুদ্রের দিকে প্রসার করে ব—“সে যেন ঐ রকম মা।” “ছি ছি বাবা স্বপ্ন সব মিথ্যে।স্বপ্নের কথা মনে করে রাখুতে নেই।” দক্ষিণ! প্রসাদকে টেনে নিয়ে গৃহ-অভিমুখে অগ্রসর হ’ল। শিশুও অন্যমনস্ক ভাবে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে চল। সে মনে ভাবলে হায়। স্বপ্ন সব মিথ্যে এমন মজার জিনিসগুলো মিথ্যে হয় কেন ? এই ভেবে সে অত্যন্ত ক্ষুন্ন হ’ল। সে দিন বেলা এগারটা বেজে গিয়েছে। গ্রামের উপকণ্ঠে যে মস্ত ছাতিম গাছটা ছাতার মত ডাল বিস্তার করে পাতা বিছিয়ে দিব্যি ছায়া করে দাড়িয়ে আছে, সেখানে তখনকার মতাে খেলা। ধুলাে সাঙ্গ করে ছেলেরা যে যার মতাে গৃহে ফিরেছে। কিন্তু প্রসাদের আর সেদিন দেখা নেই। দক্ষিণ রান্না শেষ করে তেলের বাটী নিয়ে প্রসাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। ধীরে ধীরে যখন উঠানের কোণের ডালিম গাছটার ছায়া তার গায় গায় মিশে গেল অথচ প্রসাদ ফিল না তখন দক্ষিণ তার খোঁজে চল। দক্ষিণা সহজেই মনে করল যে প্রসাদ হয়ত আর কোন বালকের সঙ্গে তাদের বাড়ীতে গিয়েছে। কিন্তু যখন সমস্ত প্রতিবেশীদের বাড়ীতে ঘুরে ঘুরে প্রসাদের খোজ মিলল না তখন তার মার মন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। কিন্তু দক্ষিণা আবার মনে করল যে হয়ত প্রসাদ এতক্ষণ ঘরে ফিরেছে।

मंचन বাবা,১৩৫ এই মনে করে দক্ষিণা দ্রুতপদে গৃহে প্রত্যাবর্তন করুল। না,-কুটীরের দ্বার তেমনি রুদ্ধ। কেউ কোথাও নেই। আশে পাশে কোন খানে প্রসাদ থাকতে পারে মনে করে দক্ষিণা উচ্চৈঃস্বরে ডাকল “প্রসাদ প্রসাদ, কোন উত্তর নেই। প্রসাদ ফেরে নি। স্ত্রস্তপদে দক্ষিণ আবার বাটী থেকে বহির্গত হ’ল। আবার পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল। কোথাও প্রসাদ নেই। এমনি করে যখন দক্ষিণা চতুর্থবার গৃহ থেকে গৃহান্তরে কেঁদে কেঁদে প্রসাদের খোঁজ করে বেড়াচ্ছিল তখন একটি ছােটছেলে দক্ষিণাকে বল যে, প্রসাদ খেলার মাঝখানে ছাতিমতলা থেকে চলে গিয়েছিল আর তার যদ্দর মনে পড়ে তাতে সে প্রসাদকে ছাতিমতলা থেকে যে পথটী সমুদ্রের দিকে গিয়েছে সেই পথ ধরে তাকে যেতে দেখেছে। দক্ষিণা মুহূৰ্ত মাত্র অপেক্ষা না করে দেবতার কাছে নানা মানত করতে করতে চলল। ছাতিমতলায় এসে দেখল সে স্থান জনশূন্য। দক্ষিণা সেখান থেকে যে-পথ সমুদ্রের দিকে গিয়েছে সেই পথ ধরে চলল। কিছুকালের মধ্যে দক্ষিণ সমুদ্রের ধারে এসে উপস্থিত হ'ল। সেখানে এসে সে ইতঃস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যা দেখল তাতে তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। দক্ষিণা দেখল সমুদ্রের ধারে একখানে বঝাউ আর নারিকেল গাছে একটী কুঞ্জের মতে সৃষ্ট হয়েছে—আর সেখানে প্রসাদ একটি ঝাউয়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। মধ্যাহ্ন-সুৰ্য্য-উদ্দীপ্ত-আকাশ সমুদ্রকে একটা অতি মনােরম চোখজুড়ন নীল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। গত রাত্রির ঝা-তাড়িত উর্মিমালা এখনও যেন তাদের তাল সামলিয়ে উঠতে পারে নিতাই ব, তৃতীয় সংখ্যা ১৮৩ তখনও তারা গর্জে গর্জে বেলাভূমে এসে প্রতিহত হয়ে ফিরছিল। আর তারই উপকূলে ছায়া-সুনিবিড় কুঞ্জতলে ক্ষুদ্র শিশু আপনার ক্ষুদ্র দুটী হাতে ক্ষুদ্র দুটী হাট জড়িয়ে ধরে বসে বসে তাই দেখছিল ; শিশু পলকহীন—নির্বাক-নিস্তব্ধ। দক্ষিণা তাড়াতাড়ি অগ্রসর হয়ে প্রসাদকে কি ভৎসনা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রসাদ মানুষের পায়ের শব্দ শুনে চমকে চেয়ে দেখল, তারপর মাকে দেখে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরুল ও উত্তেজিত ভাবে বললে—“মা মা শুছিস কি মা?” শিশুকণ্ঠের মা-ডাকে মাতার মনের ক্রোধ মুহূর্তে চোখের জলে পরিণত হয়ে গেল। দক্ষিণা প্রসাদকে বক্ষে তুলে নিয়ে মুখচুম্বন করে' জিজ্ঞেস করল-“কি বাবা ?” প্রসাদ তেমনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল—“ঐ শােন শােন মা সমুদ্র কেবলি ডাকছে-‘প্রসাদ প্রসাদ। শুনিস না কি মা তুই ?” শিশুর কথা শুনে দক্ষিণার বুক দুরুদুর করে কেঁপে উঠল। কোন অজ্ঞাত আশঙ্কার আশু সম্ভাবনায় তার চিত্ত মন প্রাণ থিম হয়ে উঠল। দক্ষিণা বলল-“ছিঃ বাবা পাগলামি করে না। সমুদ্র কি ডাকতে পারে। ও যে ঢেউয়ের শব্দ।” দক্ষিণা প্রসাদকে কোলে নিয়ে বাড়ী ফিল। এর পর থেকে সুযােগ পেলেই প্রসাদ সেই ঝাউকুঞ্জতলে গিয়ে বসে একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকত। এই ক্ষুদ্র শিশুটী সমস্ত খেলাধূলা ফেলে, একা একা সমুদ্রের দিকে চেয়ে কি ভাবে তা কে আনে? সিন্ধুর ছলছলয়িত কলৰােল সে ক্ষুদ্র স্বদয়ের পরতে পরতে কোন ভাবের তুরঙ্গ তুলে যায় তা কে বলতে পারে? কে আনে ১৮৪, সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ কোন রহস্যের যবনিকা ভেদ করে কোন্ স্বপ্নের সন্ধানে শিশু তার কালো চোখের নিৰ্ম্মল দৃষ্টি সীমাহীন দিগন্তে বন্ধ করে সিন্ধুকূলে বসে থাকে। কেউ জানে না। শিশু কি জানে ? কে জানে শিশু জানে কি না। কিন্তু তবুও শিশু যায়। একা একা—সমস্ত ছেড়ে খেলাধুলো হাসি-গল্প সমস্ত পরিত্যাগ করে’ শিশু যায়, সেই ঝাউকুঞ্জ- তলে আপনাকে ভুলিয়ে দিতে—ভাসিয়ে দিতে—ডুবিয়ে দিতে। ক্রমে ক্রমে দক্ষিণা যখন জানল যে, প্রসাদ খেলবার নামে প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রের ধারে গিয়ে একা একা বসে থাকে, তখন সে প্রসাদকে প্রথমে মিষ্টি কথায় তারপর ভৎসনায় ও অবশেষে ভয়প্রদর্শনে সেখানে যেতে নিরস্ত করতে চেষ্টা করুল কিন্তু যখন দেখল কিছুতেই কিছু হ’ল না তখন দক্ষিণা হতাশ হয়ে শ্ৰীমন্তকে একে একে সব কথা বলল। এর পর থেকে প্রসাদের বাহুমূল ও কণ্ঠদেশ ত্রিকোণ চতুষ্কোণ ঢেলেকাকৃতি নানা বর্ণের নানা রকমের কবজে ও তাবিজে ভরে উঠতে লাগল। কত জনের কত মন্ত্র ঔষধী ইত্যাদির ছড়াছড়ি হতে লাগল। কিন্তু প্রসাদের মনের কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। ফাক পেলেই সে ঐ ঝাউকুঞ্জতলে গিয়ে একলা সমুদ্রের দিকে পলক- হীন নেত্রে চেয়ে থাকে--বুঝি কান পেতে কি শুনতে থাকে। এই রকমে যখন কিছুতেই কিছু হল না—তখন শ্ৰীমন্ত ও দক্ষিণ পরামর্শ কতে বসল। অনেক কথাবার্তার পর ঠিক হল যে, দক্ষিণ প্রসাদকে নিয়ে তার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে গিয়ে কিছুদিন থাকবে। সে আত্মীয়ের বাড়ী সমুদ্রের উপকূল থেকে দশ ক্রোশ দূরে। আর শ্ৰীমন্ত মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে প্রসাদকে দেখে আসবে। তারপর ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা সমুদ্রের ডাক ১৮৫ একটি শুভদিন দেখে দক্ষিণা ও প্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত সেই আত্মীয়ের বাড়ীতে ছেলেকে রেখে তার নির্জন কুটীরখানিতে ফিরে এল। পৃথিবীর বুকে পুরােণাে দাগ মিশিয়ে নতুন দাগ বসিয়ে দশ বছর কেটে গেল। শ্ৰীমন্ত যখন একদিন দক্ষিণা ও প্রসাদকে সেই আত্মী- য়ের বাড়ী থেকে ফিরিয়ে আনতে গেল তখন প্রসাদের ছেলেবেলার খেয়ালের কথা সবাই ভুলেছে-ভােলে নি শুধু দক্ষিণা। তাই দক্ষিণা যখন শ্ৰীমন্তকে সে-কথা স্মরণ করিয়ে দিল—তখন দক্ষিণা যে নিতান্তই একটা পাগলী সেই কথাটাই শ্ৰীমন্ত তাকে বুঝিয়ে দিল। আরও বুঝিয়ে দিল যে শ্রীমন্তের এখন বয়েস হয়েছে—কবে পর- পারের ডাক আসবে তার ঠিক নেই—প্রসাদকে পৈতৃক ব্যবসাটা ত শিখতে হবে—খাওয়া পরার উপায়টা ত করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই শুভদিন দেখে প্রসাদ ও দক্ষিণা শ্ৰীমন্তের সঙ্গে আবার তাদের সমুদ্রের ধারে কুঁড়ে ঘরটিতে ফিরে এল। দক্ষিণা হৃষ্ট হয়ে দেখৃল যে সমুদ্র দেখে প্রসাদের কোনই ভাবান্তর হল না। তিন মাসের মধ্যে মন্তের শিক্ষায় প্রসাদ একজন পাকা মাঝি হয়ে উঠল —জাল টানতে, দাড় ফেলতে, পাল খাটাতে প্রসাদের সমকক্ষ 'আর কেউই সেই ধীবরপল্লীতে রইল না। সেদিন বৈশাখী পূর্ণিমা। রাত্রির এমন রূপ আর কেউ কখনও দেখেনি। লক্ষ পরী বুঝি সেদিন আকাশপথে তাদের প্রিয়ের উদ্দেশে অভিসারে বেরিয়েছিল—আর তাদের লক্ষ গা থেকে বুঝি রূপাের স্বচ্ছ তরল রাগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল—তাদের লক্ষ হৃদয়ের প্রেমের অনুভব বুঝি আকাশে বাতাসে পৃথিবীর জলে স্থলে বিছিয়ে ১৮ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১২৫ যাচ্ছিল তাদের দু’লক্ষ পায়ের নূপুরের “যে-গান কানে যায় না শােনা”—তাই বুঝি দিগন্তের গায়ে গায়ে মাতলামি করে ফিরছিল। সেদিন রাত্রির খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন প্রসাদের কাঁধে জাল চাপিয়ে আপনার কাধে দাড়, পাল ও পাল তুলবার খুঁটিটা নিয়ে শ্ৰীমন্ত গৃহ থেকে বের হল তখন পূর্ণিমার পূর্ণ চাদ আকাশে অনেক খানি উঠে গেছে। তারা দুজনে সমুদ্রের কিনারে এসে তাদের তিন খণ্ড লম্বা পুরু তক্তায় বাঁধা ভেলাটা ডাঙ্গা থেকে জলে নামিয়ে দিল। তারপর পাল খাটাবার খুঁটিটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে পাল খাটিয়ে দিল—ভেলা অনুকূল-বাতাসে তরতরিয়ে দিগন্তের পানে যেন উড়ে গেল-ভেলার পিছন দিকটায় প্রসাদ বৈঠা হাতে তার মাথা ঠিক রাখতে লাগল আর তার আগায় বসে শ্ৰীমন্ত জালটা গুছিয়ে রাখতে লাগল। সেদিন সাগরে রূপপার ও রূপের বান ডেকেছিল। দুধের চাইতেও সাদা রূপাের পাত গায় জড়িয়ে রূপসী ঊর্মিবালারা চি-চিক ঝিক-ঝিক করছিল-খিল খিল করে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল। তীরের গাছগুলো যখন ঝাপসা হয়ে এল তখন ভেলার পাল নামিয়ে নেওয়া হল। তারপর ভেলার পিছন দিকটায় বসে প্রসাদ একটু একটু করে বৈঠা মারতে লাগল আর গলুইয়ের কাছে স্তুপাকৃতি করা জালটা শ্ৰীমন্ত, ভাজ খুলে খুলে জলে নামিয়ে দিতে লাগল। “জানিস প্রসাদ, পূর্ণিমে রাত্তিরে যেমন জলে গলদা চিংড়ি পড়ে তেমন আর কখনও না। আর চাদনী রাত যদি মেঘলা মেঘলা হয় তবে কাকড়ার লেখাজোকা নেই। শ্রীমন্ত লাল ফেলতে ফেলতে ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা সমুদ্রের ডাক ১৮৭ অজস্র ব’কে যাচ্ছিল আর প্রসাদ তাই নির্বাক হয়ে শুনে যাচ্ছিল। “জানিস রে প্রসাদ সেই যেবার আমি তাের মাকে বিয়ে করলাম- সেই সেবার যে এই খালটাতে কোথা থেকে এক পাল হাঙ্গর এসে পড়ল— “প্রসাদ প্রসাদ” প্রসাদের কানে এসে বাজল কে যেন ঠিক তার পিছন থেকে তাকে ডাকল—“প্রসাদ প্রসাদ”। প্রসাদ চমকে পিছন ফিরে চেয়ে দেখল। কই, কেউ ত নেই! প্রসাদের সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। প্রসাদের মনে পড়ে গেল একটা বহু দিনের কথা—বহুদিনের স্বপ্ন—বহুদিনের আকাঙ্গা। দশ বছর ধরে যার ওপরে বিস্মৃতির কালাে পর্দা পড়েছিল তা এক মুহূর্তে কোথায় সব ছিন্ন ভিন্ন করে বেরিয়ে এলাে মুক্ত স্পষ্ট উজ্জ্বল। প্রসাদ মন্তের দিকে ফিরে দেখল। বৃদ্ধ তেমনি আপন মনে জাল ফেলছিল আর কত কালের কত কথা বলে’ বলে যাচ্ছিল। “প্রসাদ প্রসাদ।” প্রসাদ ফিরে চাইল। সহস্র সহস্র তরুণীর মতো অজস্র ঊর্মিবালার কল কল ছল ছল হাসি-ঐ যে তারাই ডাকছে-“প্ৰসাদ প্রসাদ।” চাদের আলােয় চিক মিক্‌ করে উঠে ঐ যে তাদের তলিত তনু বিভঙ্গিত করে তাদের কমক৪ে ডাকছে-“প্রসাদ প্রসাদ।” ঐ যে সহস্র কিশােরীর কলহাসির মতে, সহস্র রূপসীর রূপরাশির মতাে মাদকতা ছড়িয়ে দিয়ে ডাকছে—“প্রসাদ প্রসাদ।” এ তাদের কিসের আমন্ত্রণ ? কোথায় নেবে তারা? সিন্ধুর কোন অতল তলে ? কোন্ রহস্য যবনিকার অন্তরালে ? ঐ যে তরঙ্গটি ভেলার গায়ে প্রতিহত হয়ে ফিরে গেল সে ডাকল—“প্রসাদ প্রসাদ।” ঐ যে লহরীটি বহুদুর হতে দৌড়ে এসে ভেলার কিনারে কিনারে লুটিয়ে গেল, সে ডাকল—“প্রসাদ প্রসাদ।” প্রসাদ শ্রীমন্তের দিকে চেয়ে २८ ১৮৮ সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ দেখল। বৃদ্ধ তেমনি তার দিকে পিঠ ফিরে জাল ফেলছিল। প্রসাদ ধীরে ধীরে নিঃশব্দে তার হাতের বৈঠাটী ভেলার ওপরে রেখে দিল। তারপর ধীরে ধীরে তার দু পা জলে নামিয়ে দিল। ধীরে ধীরে ভেলার কাঠ ধরে আপনাকে জলে নামিয়ে দিল। কোমর, বুক, ক), চিবুক, নাসিকা, চক্ষু, ললাট, মস্তক, মস্তকের কেশরাশি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। দ্বিগুণ উৎসাহে লক্ষ লক্ষ ঊর্মিবালার। চিকচিক ঝিক-ঝিক করে উঠল—যেখানটায় সাগরের বুক চিরে প্রসাদের সমস্ত শরীরটা অদৃশ্য হয়ে গেল সেখানটার উপর দিয়ে মহা ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল আর খিলখিল করে হাসতে লাগল। “বৈঠে ঠেলছিস না ক্যান রে প্রসাদ ?” যখন প্রসাদের কোন উত্তর মিলল না, তখন শ্ৰীমন্ত মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখল-দেখল শুধু শূন্য–প্রসাদ যেখানটায় বসে ছিল সেখানটা শূন্য-সমস্ত ভেলাটাই শু-শুধুই শ্ৰীমন্ত—আর কেউ নেই। মুহূর্তে শ্ৰীমন্তের হৃদয় থেকে একটা তপ্ত আগুনের ঝলক উঠে তার সমস্ত শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেল। মন্তের হাত থেকে তালের দড়ি খসে পড়ল। মন্ত্রমুগ্ধের মতাে উঠে দাড়িয়ে সংজ্ঞালুপ্ত চোখ দুটো দিয়ে প্রসাদ যেখানটায় বসে ছিল সেখানটায় অর্থহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। মর্মভেদী চীৎকার করে একবার খালি প্রসাদ” বলে ডেকে ভেলার উপরে পড়ে গেল। উত্তরে লক্ষ ঊর্মিবালায় চাদের কিরণে চিকমিক করে লক্ষ নিধুরা তরুণীর মতাে ভেলার আশে পাশে প্রতিহত হয়ে খিল খিল করে হাসতে লাগল আর কৌতুক করে’ ডাকতে লাগল—“প্রসাদ প্রসাদ !” সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী।

INDIAN LITERATURE. BY PRAMATIIA CHAUDHURI. [ বিলাতের বিখ্যাত সংবাদপত্র Manchester Guardian-য়ের সম্পাদকের অনুরােধে ভারতবর্ষের সাহিত্য সম্বন্ধে আমি একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ লিখি। সে প্রবন্ধটি সম্প্রতি উক্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। Manchester Guardian এদেশে দু-চারখানির বেশী আসে না, সুতরাং আমার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে অনেকেই সে প্রবন্ধ পড়বার সুযােগ পান নি। তাদের দৃষ্টির জন্যই আমি সেই প্রবন্ধটি “সবুজ পত্রে প্রকাশ করছি। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন যে, ইংরাজি প্রবন্ধ বাংলা কাগজে ছাপানাে কি সঙ্গত ? তার উত্তর- আমার ইংরাজি লেখা, আমি নিজে বাংলায় অনুবাদ করতে পারিনে। বাংলায় লিখুলে ও-প্রবন্ধ আমি অন্যরকম করে লিখতুম, সুতরাং ওটি অনুবাদ করতে বসলে আমার হাতে ওর চেহারা একেবারে বদলে যাবে। তা ছাড়া “সবুজ পত্রের অধিকাংশ পাঠকই ইংরাজি ভাষার সঙ্গে বিশেষ পরিচিত, সম্ভবত বাংলার চাইতে বেশী পরিচিত,—সুতরাং সে পত্রের মধ্যে এ প্রবন্ধটি নির্ভয়ে প্রক্ষিপ্ত করা যেতে পারে। প্রমথ চৌধুরী। INDIAN literature is the creation of the Hinda mind, and so to understand that literature it is necese sary to have some knowledge of the thought and institutions of ancient India, as all the roots of our আষাঢ়, ১৩২৫ social and spiritual life are deeply embedded in our past. The complete history of India has yet to be written, but its culture-history has been fully preserved in the pages of Sanskrit literature—a literature which is as vast as it is comprehensive, practically embracing the whole sphere of human thought and imagination. The earliest chapter of our literature, known as the Vedas, is a collection of hymns addressed to gods--that is to say, personified forces of naturewhich express the sentiments of joy and wonder, of reverence and awe born of the living contact of the human mind with the external universe. For freshness of feeling and vigour of expression, there is nothing in any literature which can be compared with these. In them we find also the earliest attempts of the human mind to lift the veil of phenomena and peer into the Reality which is the ultimate basis of all that exists. The Vedas have ever been looked upon by our people as the eternal source of their spiritual and social existence. One thing is certain, that these first words of India indicated the direction in which the Hindu mind was to move, and determined the character of the laws which were to give shape and form to Hindu society, as well as of the philosophy which was to mould Hindu psychology. If the earlier portion of the Vedas was a collection *** yota 7 roata fabtasta ১৯১ of hymns, the later portion was a manual of rituals. The Shastras (codes of conduct) and the Vedanta, which represent the two opposite poles of the Hindu mind-the practical and the speculative,-were respectively evolved from the prose and the poetry of the Vedas. THE SHASTRAS. The teaching of the Shastras is, that laws were not made by any legislator, human or divine, but are self-existent, and as such are eternal and immutable; and that therefore man's duty consists in unquestioning submission to them. A virtuous life means nothing more nor less than a life consecrated to the performance of one's social duties. The dividing line between law and morals was not clearly drawn, and one ran into the other. Our people's social consciousness was broken in to this doctrine, and in the result, the willingness to subordinate one's individual self to the social self has become almost instinctive with us. The Vedanta philosophy is the complete antithesis of this doctrine. It deliberately and completely turned its back on the social life of man, and set itself to solve the problem of the individual soul. “I and my Father are one," sums up the central doctriņe of the Vedanta. According to this philosophy, man's salvation depends neither on work nor on faith ; it সবুজ পত্র wat, sore lies in the realisation of the truth that the human soul is one with the divine. He who realises the God in him is the only free man, and as such is above all social rules. The paradox that man is socially bound but spiritually free, dominated the classical mind of India; and the tragedy of Indian history consists in this utter divorce of life from thought. This Vedic literature was a sealed book to the masses, the real people of India, and was open only to the ruling race, the Aryan conquerors, of whose genius it was the product. What really formed, or transformed, the psychology of the people at large, was the story of the lives of the Aryans of the heroic age, recorded in the two great epics of India, the Ramayana and the Mahabharata. These are tales of heroic deeds and noble endeavours, and the outstanding feature of the epic characters is their moral grandeur. These two epics also happen to be the unfailing source of all subsequent Sanskrit literature. Generation after generation of poets, dramatists, and story-tellers have drawn both their inspiration and their material from them. It is not necessary for me to dwell at length on later Sanskrit literature, bocause, in spite of all its high excellence, it has had little or no influence on either the form or the spirit of our modern literature. It could not influence life, because it was too far removed from life. We admire ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা Prenta fastiasta it, but do not imitate it. It is urbane but conventional, elegant but stiff; it has form but no movement, it has colour but no warmth; in a word, it is as refined as it is bloodless. It seems that the spirit of the Shastras-the legal spirit-had taken possession of its soul, and crushed out its vitality. The latter. day products of Sanskrit literature show that the spirit of India stood in urgent need of thorough renovation, 11. The invasion of the Mohammedans, which took place in the eleventh century A.D., gave the deathblow to the classical civilisation of India, and along with it to the decaying Sanskrit literature. Two hun. dred years did not pass before India saw the birth of a new literature-the vernacular literature. As its language shows, this literature was popular in its origin, and had, whether in spirit or form, little or no connection with the classical. The so-called Prakrit, or popular literature of the previous age was, however, even more artificial than the Sanskrit, and had nothing popular whatever about it. The new literature came out of a new religious movement, in which another side of the soul of our people is revealed the emotional. During the course of ages Brabminio institutions had become so rigid and Brahminió thought so abstract, that they bad practically ceased st >8 সবুজ প state, sort to be human. On the other hand, the mind of the people had become intensely humanised by the influence of Buddhism, whose great teaching of infinite compassion for all sentiment creatures had sunk deep into the soul of the nation. The simple doctrine of the fatherhood of God and the brotherhood of man, which the Mohammedans introduced into India, appears to have stirred the soul of the people to its depths, for we find that in the fourteenth century, in almost every part of India, religious reformers rose in protest against the empty formalism and the dry intellectualism of Brahminio orthodoxy. In this age. Vaishnavism, the oldest monotheistic creed of India, was revived throughout the length and breadth of the country. Neo-Vaishnavism, with its doctrines of a personal God, incarnation, divine grace, and salvation by faith, bears a close and striking resemblance to Christianity. As a romantic spiritual movement which set a new and supreme value on human emotions, it caused a simultaneous deepening and heightening of the emotional nature of our people. And the poets of this age poured out their emotions, social and religious, in language which is as simple as it is fervent. III. With the British conquest of India, there opens & new chapter of our psychology. In English litera- ৫ম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা forta fubtracta ture our people discovered a new mental hemisphere, a new world of knowledge-the knowledge of the facts of this world, -and a dormant faculty of our soul awoke into life. What the German philosopher's call the “will to know,” suddenly manifested itself amongst our people in all its freshness and vigour. The Indian mind showed no hostility--not even the faintest-towards the message of science; on the contrary, our fathers displayed an extraordinary eagerness to acquire and spread the new learning which came from the West. The opening years of the nineteenth century thus saw the birth of a new literature, largely and deeply influenced by Western thought and Western feeling. The first half of the last century did not produce any permanent literature, because it was an experimental age-an age of textbooks and translations. If we take the example of Bengal, we find that her period of literary apprenticeship came to an end with the close of the first century of British rule. The birth of this literature, which is at once modern and national, was synchronous with the assumption of the government of India by the Crown. Our new literature is the expression of our new psychology, into the composition of which elements both European and Indian equally enter. I know of no process by which these can be separated, because সবুজ পত্র আষাঢ়, ১৩২৫ the human mind is not a chemical compound which admits of either quantitative or qualitative analysis. But we shall not go very far astray if we say that, what is modern in our literature bas its root in modern Europe, and what is national in ancient India. Spiritually we all hark back to the Vedanta Philo. sophy, because Europe has not succeeded in robbing us of our sense of the Beyond. We welcome the science of modern Europe, but not its philosophy. We would sooner believe that all iş spirit, than that all is matter. But we seek to modernise the ancient thought--that is to say, we would apply the doctrines of man's spiritual freedom to his social life. Europe has simply taught us to bridge the ancient gulf between Indian thought and Indian life. Rabindranath Tagore incarnate's in himself the whole spirit of the age, and in his works Europe can find all the heights and depths of our new psychology. But whilst European readers of his writings can easily recognise what is Western in thought and feeling therein, they fail to realise that his religious consciousness is inspired by the Vedanta, and that his lyrics are informed by the spirit of Vaishnava poetry. Our new literature at its best shows that in it the East and West bave not only met, but have inter. penetrated each other. Manchester Gunrdian, March 28, 1918.

বই পড়া। -* প্রবন্ধ আমি লিখি এবং সম্ভবত যত লেখা উচিত তার চাইতে বেশিই লিখি, কিন্তু সে প্রবন্ধ সৰ্বজনসমক্ষে পাঠ করতে আমি , স্বভাবতই সঙ্কুচিত হই। লােকে বলে আমার প্রবন্ধ কেউ পড়ে না। যে প্রবন্ধ লোকে স্বেচ্ছায় পড়ে না, সে প্রবন্ধ অপরকে পড়ে শােনানটা অবশ্য অত্যাচার শ্রোতাদের উপর করারই সামিল। এ সত্ত্বেও আমি আপনাদের অনুরোধে আজ যে একটি প্রবন্ধ পাঠ করতে প্রস্তুত হয়েছি তার কারণ, লাইব্রেরি সম্বন্ধে কথা কইবার আমার কিঞ্চিৎ অধিকার আছে। কিছুদিন পূর্বে সাহিত্য’ পত্রে আমার সম্বন্ধে এই মন্তব্য প্রকাশিত হয় যে, আমি একজন “উদাসীন গ্রন্থকীট”। এর অর্থ, কোনও কোনও লােক যেমন সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে বনে গমন করেন, আমিও তেমনি সংসারের প্রতি বীতরাগ হয়ে লাইব্রেরিতে আশ্রয় নিয়েছি। পুস্তকাগারের অভ্যন্তরে আমি যে আজীবন সমাধিস্থ হয়ে রয়েছি, এ জ্ঞান আমার অবশ্য ইতিপূর্বে ছিল না। সে যাই হােক, আমার আ-কৈশোের বন্ধু শ্ৰীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতির দত্ত এই সার্টিফিকেটের বলে এ ক্ষেত্রে বই পড়া সম্বন্ধে দু’চার কথা বতে • কটেজ লাইব্রেরি ও ভবানীপুর ইনষ্টিটিউটের সাহিত্য-শাখার অধিবেশনে ১৯১৮ সনের ১৯শে মে তারিখে পঠিত।

সবুজ পত্র শ্রাবণ, ১৩২৫ সাহসী হয়েছি। লাইব্রেরিতে বইয়ের গুণগান করাটা আমার বিশ্বাস অসঙ্গত হবে না। ( ২ ) আজকের সভায় যে দু'চার কথা বলব, সে আলাপের ভাষায় ও আলাপের ভাবে,—অর্থাৎ তাতে কাজের কথার চাইতে বাজে কথা ঢের বেশী থাকবে। এই বিংশ শতাব্দীতে লাইব্রেরির সার্থকতা এবং উপকারিতা সম্বন্ধে বিশেষ কোনও কথা বলবার কি প্রয়ােজন আছে ? এ সম্বন্ধে যা বক্তব্য তা ইতিপূৰ্ব্বে হাজার বার কি বলা হয় নি ? তবে বই পড়ার অভ্যাসটা যে বদ-অভ্যাস নয়, এ কথাটা সমাজকে এ যুগে মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দেওয়া আবশ্যক ; কেননা মানুষে এ কালে বই পড়ে না—পড়ে সংবাদপত্র। এ যুগে সভ্য সমাজ ভোরে উঠে করে দু’টি কাজ—এক চা-পান আর সংবাদপত্র পাঠ। একটি বিলাতি কবি চায়ের সম্বন্ধে বলেছেন যে “A cup that cheers but not inebriates”—অর্থাৎ চা-পান করলে নেশা হয় না। অথচ ফুৰ্ত্তি হয়। চা-পান করূলে নেশা না হোক, চা-পানের নেশা হয়। সংবাদপত্র সম্বন্ধেও ঐ একই কথা খাটে। তারপর অতিরিক্ত চা পানের ফলে মানুষের যেমন আহারে অরুচি হয়—অতিরিক্ত সংবাদপত্র পাঠের ফলেও মানুষের তেমনি সাহিত্যে অরুচি হয়। আমরা দেশ লােক আজকের দিনে এই মানসিক মন্দাগিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। সুতরাং সাহিত্যচর্চা করবার প্রথাটা যে সভ্যতার একটা প্রধান অঙ্গ, এই সত্যটার চারদিকে আজ প্রদক্ষিণ করবার সংকল্প করেছি।

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া ২০১ ( ৩ ) কাব্যচর্চা না করলে মানুষে জীবনের একটা বড় আনন্দ থেকে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত হয়। এ আনন্দের ভাণ্ডার সর্বসাধারণের ভােগের জন্য সঞ্চিত রয়েছে। সুতরাং কোনও সভ্যজাতি কস্মিকালে তার দিকে পিঠ ফেরায় নি-এদেশেও নয়, বিদেশেও নয়। বরং যে জাতির যত বেশী লােক যত বেশী বই পড়ে, সে জাতি যে তত সভ্য,-এমন কথা বললে বােধহয় অন্যায় কথা বলা হয় না। নিদ্রা কলহে দিন- যাপন করার চাইতে কাব্যচর্চায় কালাতিপাত করা যে প্রশংসনীয়, এমন কথা সংস্কৃতেই আছে। সংস্কৃত কবির সকলকেই সংসার-বিষ- বৃক্ষের অমৃততাপম ফল কাব্যামৃতের রসাস্বাদ করবার উপদেশ দিলেও সেকালে সে উপদেশ কেউ গ্রাহ্য করতেন কিনা, সে বিষয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে,—কিছুদিন পূর্বে আমারও ছিল। কেননা নিজের কলমের কালি, লেখকেরা যে অমৃত বলে চালিয়ে দিতে সদাই উৎসুক, তার পরিচয় একালেও পাওয়া যায়। কিন্তু একালেও আমরা যখন ও-সব কথায় ভুলিনে, তখন সেকালেও সম্ভবত কেউ ভুলতেন না, কেননা সেকালে সমজদারের সংখ্যা একালের চাইতে ঢের বেশী ছিল। কিন্তু আমি সম্প্রতি আবিষ্কার করেছি যে, হিন্দুযুগে বই পড়াটা নাগরিক- দের মধ্যে একটা মস্ত বড় ফ্যাসান ছিল। এ স্থলে বলা আবশ্যক যে, “নাগরিক” বলতে সেকালে সেই শ্রেণীর জীব বােঝাত—একালে ইংরাজিতে যাকে man-about-town বলে। বাংলাভাষায় ওর কোনও নাম নেই, কেননা বাংলাদেশে ও জাত নেই। ও বালাই যে, নেই, সেটা অবশ্য সুখের বিষয়।

সবুজ পত্র খাবণ, ১৩২৫ ( ৪ ) যদি অনুমতি করেন ত এই সুযােগে প্রাচীন ভারতবর্ষের নাগরিক সভ্যতার কিঞ্চিৎ পরিচয় দিই। সেকালে এদেশে যেমন একদল ত্যাগী-পুরুষ ছিলেন, তেমনি আর একদল ভােগী-পুরুষও ছিলেন। ভারতবর্ষের আরণ্যক-ধর্মের সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় আমাদের সকলেরই আছে, কিন্তু তার নাগরিক ধর্মের ক্রিয়াকলাপ আমাদের অনেকের কাছেই অবিদিত। এর ফলে ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতার ধারণাটা আমাদের মনে নিতান্ত একপেশে হয়ে উঠেছে। সে সভ্যতার শুধু আত্মার নয় দেহের সন্ধানটাও আমাদের নেওয়া কর্তব্য, নচেৎ তার স্বরূপের সাক্ষাৎ আমরা পাব না। সেকালের নাগরিকদের মতিগতি রীতি-নীতির আদ্যোপান্ত বিবরণ পাওয়া যায়-কামসুত্রে। এ গ্রস্থ রচিত হয়েছিল অন্ততঃ দেড় হাজার বৎসর পূর্বে, এবং এ গ্রন্থের রচ- য়িত হচ্ছেন ন্যায়দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার স্বয়ং বাৎস্যায়ন, অতএব কামসূত্রের বর্ণনা আমরা সত্য বলেই গ্রাহ্য করতে বাধ্য ; বিশেষতঃ সূত্র যখন সংস্কৃত সাহিত্যে শাস্ত্র হিসেবেই চিরকাল গণ্য ও মান্য হয়ে এসেছে। আমি উক্ত গ্রন্থ থেকে নাগরিকদের গৃহসজ্জার আংশিক বর্ণনা এখানে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি। “বাহিরের বাসগৃহেও অতি শুভ্র চাদরপাতা একটি শয্যা থাকিবে, এবং তাহার উপর দুইটি অতি সুন্দর বালিশ রাখিতে হইবে। তাহার পার্শে থাকিবে প্রতিশয্যিকা। এবং তাহার শিরােভাগে কূৰ্চ্চস্থান ও বেদিকা স্থাপিত করিবে। সেই বেদিকার উপর, রাত্রিশেষ অনুলেপন, মাল্য, সিথরগুক, সৌগন্ধিকপূটিকা, মাতুলুঙ্গত্বক, তাম্বুল প্রভৃতি রক্ষিত হইবে। ভূমিতে থাকিবে পতংগ্রহ। ভিত্তিগাত্রে নাগ- ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড় দম্ভাবসক্ত বীণা। চিত্রফলক। বর্তিকা-সমুদগকঃ। এবং যে কোনও পুস্তক।” উপরােক্ত বর্ণনা একটু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে-কেননা এর অনেক শব্দই বাংলাভাষায় প্রচলিত নেই। আমি কতকটা টীকা ও কতকটা অভিধানের সাহায্যে ঐ সকল অপরিচিত শব্দের বাচ্য পদার্থের যে পরিচয় লাভ করেছি, তা আপনাদের জানাচ্ছি। প্রতি- শয্যিকার অর্থ ক্ষুদ্ৰ পৰ্য, ভাষায় যাকে বলে খাটিয়া। এ খাটিয়া অবশ্য নাগরিকরা নিজেদের গঙ্গাযাত্রার জন্য প্রস্তুত রাখতেন না। তার মাথার গােড়ায় থাকত কূৰ্চ্চস্থান। কূৰ্চ্চ শব্দের সাক্ষাৎ আমি কোনও অভিধানে পাই নি। তবে টীকাকার বলেন, শয্যার শিরাে- ভাগে ইষ্টদেবতার আসনের নাম কূৰ্চ্চ। আত্মবান নাগরিকেরা ইষ্টদেবতার স্মরণ ও প্রণাম না করে শয়নগ্রহণ করতেন না। সুতরাং কূর্চ হচ্ছে একপ্রকার ব্রাকেট। সেকালের এই বিলাসী সম্প্রদায়—আমরা যাকে বলি নীতি, তার ধার এক কড়াও ধারতেন ;কিন্তু দেবতার ধার ষােল আনা ধারতেন। এ ব্যাপার অবশ্য অপূৰ্ব নয়। একালেও দেখা যায় মানুষের প্রতি অত্যাহিত অত্যাচার করবার সময় মানুষে ইষ্টদেবতাকে ঘন ঘন স্মরণ ও প্রণাম করে। যাক ও সব কথা। এখন দেখা যাক বেদিকা বস্তুটি কি ? বেদিকাতে যত প্রকার দ্ৰব্য রাখবার ব্যবস্থা আছে, তাতে মনে হয় ও হচ্ছে টেবিল। এবং টীকাকারের বর্ণনা থেকে বােঝা যায় যে, এ অনুমান ভুল নয়। তিনি বলেন বেদিকা ভিত্তিসংলগ্ন, হস্তপরিমিত চতুষ্কোণ এবং কৃতকুট্টিম—অর্থাৎ inlaid। অনুলেপন দ্রব্যটি হয় চন্দন, নয় মেয়েরা যাকে বলে রূপটান, তাই। মাল্য অবশ্য ফুলের ২৪ সবুজ পত্র এ বণ, ১৩২৫ মালা। কি ফুল তার উল্লেখ নেই, কিন্তু ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, আর যাই হােক গাঁদা নয় ; কেননা তারা বর্ণগন্ধের সৌকুমাৰ্য বুঝতেন। সিকথকরওক হচ্ছে—মোমের কোটা। সেকালে নাগরিকেরা, ঠোট আগে মােম দিয়ে পালিস করে নিয়ে, তারপর তাতে আলতা মাখতেন। সৌগন্ধিকপুটিকা হচ্ছে- ইংরাজিতে যাকে বলে powder-box। বােতল না হয়ে বাক্স হবার কারণ, সেকালে অধিকাংশ গন্ধদ্রব্য চূর্ণ আকারেই ব্যবহৃত হত। দেয়াল ছেড়ে ঘরের মেজের দিকে দৃষ্টিপাত করূলে প্রথমেই চোখে পড়ে পতংগ্রহ, অর্থাৎ পিকদানী। তারপর চোখ তুললে নজরে পড়ে, ভিত্তি- সংলগ্ন হস্তিদন্তে বিলম্বিত বীণা। টীকাকার বলেন সে বীণা আবার “নিচোল-অবগুণ্ঠিতা”। বাংলার অনেক পদ্যলেখকদের ধারণা নিচোল অর্থে শাড়ী। “শাড়ীপরা বীণা”র অবশ্য কোনও মানে নেই। নিচোল অর্থে গেলাপ। জয়দেব যে শ্রীরাধিকাকে বলেছিলেন “শীলয় নীল নিচোলং” তার অর্থ “নীলরঙের একটি ঘেরাটোপ পর”। ইংরাজি ভাষায় ওর তর্জমা হচ্ছে—put on a dark blue cloak। এখন আবার প্রকৃত প্রস্তাবে ফিরে আসা যাক। তারপর পাই চিত্র- ফলক। সংস্কৃত কাব্যের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়, পুরাকালে ছবি কাঠের উপরে আঁকা হত, কাপড়ের উপরে নয়। বর্তিকা সমুগকের অর্থ তুলি ও রঙ রাখবার বাক্স। তারপর বই। নাগরিকদের গৃহের এবং দেহের এই সাজসজ্জার বর্ণনা বুঝতে পারবেন তারা কি চরিত্রের লােক ছিলেন। তারপর প্রশ্ন ওঠে, বই নিয়ে এ প্রকৃতির লোকেরা কি করতেন? কেন নাগরিকেরা আর যাই হন, তারা যে সব উদাসীন গ্রন্থকীট ছিলেন না, সে বিষয়ে ৫ম বৰ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া আর কোনও সন্দেহ নেই। পুস্তক কি তবে এদের গৃহসজ্জার জন্য রক্ষিত হত, যেমন আজকাল কোন কোন ধনীলোকের গৃহে হয় ? এ সন্দেহ দৃঢ় হয়ে আসে, যখন টীকাকারের মুখে শুনতে পাই যে “এই সকল বীণাদিদ্রব্য সর্বদা উপঘাতের অর্থাৎ ব্যবহার করিয়া নষ্ট করিবার জন্য নহে। কেবল বাসগৃহের শােভা সম্পাদনার্থ ভিত্তি নিহিত হস্তিদন্তে ঝুলাইয়া রাখিতে হইবে। কালে ভদ্রে কখনাে প্রয়ােজন হইলে তাহা সেখান হইতে নামাইতে হবে।” পূর্বোক্ত সন্দেহের আরও কারণ আছে। সূত্রকার যখন বলেছেন—যঃ কশ্চিৎ পুস্তক, অর্থাৎ “যা হােক একটা বই”,তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে যে সে বই, আর যে কারণেই হােক, পড়বার জন্য রাখা হত না। কিন্তু টীকাকার আমাদের এ সন্দেহ ভঞ্জন করেছেন। তার কথা এই যঃ কশ্চিৎ এটি সামান্য নির্দেশ হইলেও, তখনকার যে-কোনও কাব্য তাহাই পড়িবার জন্য রাখিবে, ইহাই যে সূত্ৰকারের উপদেশ, তাহা স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে।” টীকাকারের এ সিদ্ধান্ত আমি গ্রাহ্য করি। বীণা ও পুস্তক দুই সরস্বতীর দান হলেও,—ও দুই গ্রহণ করবার সমান শক্তি এক দেহে প্রায় থাকে না। বীণাবাদন বিশেষ সাধনাসাধ্য, পুস্তকপঠন অপেক্ষাকৃত ঢের সহজ। সুতরাং বই পড়ার অধিকার যত লােকের আছে, বীণা বাজাবার অধিকার তার সিকির সিকি লােকেরও নেই। এই কারণে সকলকে জোর করে বিদ্যাশিক্ষা দেবার ব্যবস্থা এ যুগের সফল সভ্য দেশেই আছে—কিন্তু কাউকে জোর করে সঙ্গীতশিক্ষা দেবার ব্যবস্থা কোনও অসভ্য দেশেও নেই। অতএব নাগরিকেরা বীণা দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখতেন বলে যে পুঁথির ডুরি খুলতেন না, এরূপ সবুজ পত্র শ্রাবণ, ১৩৫ নেই। । অনুমান করা অসঙ্গত হবে। সে যাই হোক, টীকাকার বলেছেন “যে-সে বই নয়, তখনকার বই”; এই উক্তিই প্রমাণ যে, সে বই পড়া হত। যে বই এখনকার নয় কিন্তু সেকালের, যাকে ইংরাজিতে বলে classics, তা ভদ্রসমাজে অনেক লােক ঘরে রাখে পড়বার জন্য নয়, দেখবার জন্য । কিন্তু হলের বই লেকে পড়বার জন্যই সংগ্রহ করে, কেননা অপর কোনও. উদ্দেশ্যে তা গৃহজাত করবার কোনরূপ সামাজিক দায় এক কথা। আমরা বর্তমান ইউরােপের সভ্য সমাজেও দেখুঁতে পাই যে, “এখনকার” বই পড়া সে সমাজের সভ্যদের ফ্যাসানের একটি প্রধান অঙ্গ। Anatole France-এর টাটকা বই পড়ি নি, এ কথা বলতে প্যারিসের নাগরিকেরা যাদৃশ লজ্জিত হবেন, সম্ভবত Kipling-এর কোনও সদ্য প্রসূত বই পড়ি নি বলতে লণ্ডনের নাগরিকেরাও তাদৃশ লজ্জিত হবেন ; যদিচ Anatole France-এর লেখা যেমন সুপাঠ্য, Kipling-এর লেখা তেমনি অপাঠ্য। এ কথা আমি আন্দাজে বছিনে। বিলেতে একটি ব্যারিস্টারের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। জনমৰ তিনি মাসে দশ বিশ হাজার টাকা রােজগার করূতেন। অত না থােক, যা রটে তা কিছু বটেই ত। এই থেকেই আপনারা অনুমান করতে পারেন তিনি ছিলেন কত বড় লােক। এত বড় লােক হয়েও তিনি একদিন আমার কাছে, Oscar Wilde-এর বই পড়েন নি, এই কথাটা স্বীকার করতে এতটা মুখ কাচুমাচু করূতে লাগলেন, যতটা চোরডাকাতরাও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে guilty plead করতে সচরাচর করে না। অথচ তার অপরাধটা কি ?--Oscar Wilde-এর বই পড়েন নি, এই ত? ও সব বই পড়েছি স্বীকার করতে আমরা লজ্জিত হই। শেষটা তিনি ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া এর জন্য আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিতে সুরু করলেন। তিনি বললেন যে, আইনের অশেষ নজির উদরস্থ করতেই তঁার দিন কেটে গিয়েছে, সাহিত্য পড়বার তিনি অবসর পান নি। বলা বাহুল্য এ রকম ব্যক্তিকে এদেশে আমরা একসঙ্গে রাজনীতির নেতা এবং সাহিত্যের শাসক করে তুলতুম। কিন্তু সাহিত্যের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, এ কথা কবুল করুতে তিনি যে এতটা লজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন তার কারণ, তার এ জ্ঞান ছিল যে তিনি যত বড় আইনজ্ঞই হোন, আর যত টাকাই করুন, তার দেশে ভদ্রসমাজে কেউ তাকে বিদগ্ধজন বলে মন্ত করবে না। সংস্কৃত বিদগ্ধ শব্দের প্রতিশব্দ cultured। বাৎস্যায়ন যাকে নাগরিক বলেন, টীকাকার তাকে বিদগ্ধ নামে অভিহিত করেন। থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, এদেশে পূরাকালে culture জিনিসটা ছিল নাগরিকতার একটা প্রধান গুণ। এ স্থলে বলা আবশ্যক যে, একালে আমরা যাকে সভ্য বলি, সেকালে তাকে নাগরিক বলত। অপরপক্ষে সংস্কৃত ভাষায় গ্রাম্যতা এবং অসভ্যতা পৰ্য্যায়-শব্দ-ইংরাজিতে যাকে বলে synonyms, ( ৫ ) এর উত্তরে হয়ত অনেকে এই কথা বলবেন যে, সেকালে বই পড়াটা ছিল বিলাসের একটা অঙ্গ। বাৎস্যায়নই যখন আমার প্রধান সাক্ষী, তখন এ অভিযোগের প্রতিবাদ করা আমার পক্ষে কঠিন। এ যুগে অবশ্য আমরা সাহিত্যচর্চাটা বিলাসের অঙ্গ বলে মনে করিনে, ও সবুই পজ শ্রাবণ, ১৩২৫ চর্চা থেকে আমরা ঐহিক এবং পরত্রিক নানারূপ ফললাভের প্রত্যাশা রাখি। আপনারা সকলেই জানেন যে, সংস্কৃত সাহিত্যে “মাল্য চন্দন বনিতা” এ তিন একসঙ্গেই যায়, এবং ও তিনই ছিল এক পৰ্যায়ভুক্ত। কিন্তু আমাদের কাছে মাল্যচনের সামিল, বনিতাও নয়, কবিতাও নয়। কাজেই আমাদের চোখে সেকালের নাগরিক সমাজের রীতিনীতি অবশ্য দৃষ্টিকটু ঠেকে। কেননা আমাদের চোখের পিছনে আছে আমাদের মন, এবং আমাদের মনের পিছনে আছে আমাদের বর্তমান সামাজিক বুদ্ধি। এই কারণেই প্রাচীন সমাজের প্রতি সুবিচার করতে হলে, সে সমাজকে ঐতিহাসিকের চোখ দিয়ে দেখা কৰ্ত্তব্য। তাই আমি উদাসীন গ্রন্থকীট হিসেবে নাগরিকদের উক্তরূপ সাহিত্যচর্চার ফলাফল একটুখানি আলােচনা করে দেখতে চাই। বলা বাহুল্য ঐতিহাসিক হতে হলে প্রথমত বর্তমানের প্রতি উদাসীন হওয়া চাই, দ্বিতীয়ত প্রাচীন গ্রন্থের কীট হওয়া চাই। আরও অনেক হওয়া চাই,—কিন্তু ও দুটি না হলে নয় । যে সমাজে কাব্যচর্চা হচ্ছে বিলাসের একটি অঙ্গ, সে সমাজ যে সভ্য-এই হচ্ছে আমার প্রথম বক্তব্য। য মনের বস্তু তা উপভােগ করবার ক্ষমতা বর্বর জাতির মধ্যে নেই, ভোগ অর্থে তারা বােঝে কেবলমাত্র দৈহিক প্রবৃত্তির চরিতার্থতা। ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তি পশুরাও করে, এবং তা ছাড়া আর কিছু করে না। অপরপক্ষে যে সমাজের আয়েসীর দলও কাব্যকলার আদর করে, সে সমাজ সভ্যতার অনেক সিড়ি ভেঙ্গেছে। সভ্যতা জিনিসটে কি, এ প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞাসা করলে দু’ কথায় তার উত্তর দেওয়া শক্ত। কেননা যুগভেদে ও দেশ ভেদে পৃথিবীতে সভ্যতা নানা-মূর্তি ধারণ করে দেখা দিয়েছে, এবং ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া সে যাই } কোন সভ্যতাই একেবারে নিরাবিল নয় ; সকল সভ্যতার ভিতরই যথেষ্ট পাপ ও যথেষ্ট পাক আছে। নীতির দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে সভ্যতা ও অসভ্যতার প্রভেদ যে আকাশপাতাল, এ কথা নির্ভয়ে বলা যায় না। তবে মানুষের কৃতীত্বের মাপে যাচাই করতে গেলে, দেখতে পাওয়া যায় যে জ্ঞানে বিজ্ঞানে কাব্যকলায় শিল্পে বাণিজ্যে সভ্যজাতি ও অসভ্যজাতির মধ্যে সাত সমুদ্র তের নদীর ব্যবধান। জনৈক ফরাসী লেখক বলেছেন যে, যিনিই মানবের ইতিহাস চর্চা করেছেন, তিনিই জানেন যে মানুষকে ভাল করবার চেস্টা বৃথা। এ হচ্ছে অবশ্য ক্ষুব্ধ মনের ক্রদ্ধ কথা, অতএব বেদবাক্য হিসেবে গ্র হ্য নয়। হােক, এ কথার উত্তরে আমি বলি যে মানুষকে ভাল না করা যাক, ভদ্র করা যায়। পৃথিবীতে সুনীতির চাইতে সুরুচি কিছু কম দুর্লভ পদার্থ নয়। পুরাকালে সাহিত্যের চর্চা মানুষকে নীতিবান না করলেও রুচিবান করত। সমাজের পক্ষে এও একটা কম লাভ নয়। ধরে নেওয়া যাক সেকালের নাগরিক সমাজ কাব্যকে মনের বেশভূষার উপকরণ হিসেবে দেখত। তারা যে হিসাবে ওষ্ঠে যাবক ধারণ করতেন সেই হিসাবেই কণ্ঠে শ্লোক ধারণ করতেন। এ অনুমান নিতান্ত অমুলক নয়। সংস্কৃত ভাষায় একটি নাতি শ্লোকসংগ্রহ আছে, যার নাম “বিদগ্ধ মুখমণ্ডন”। ওরকম নামকরণের ফলে কাব্য অবশ্য রঙের কোঠায় পড়ে যায়। সে যাই হােক, নাগরিকদের বই পড়া যে একেবারে ভস্মে ঘি ঢালার সামিল ছিল না, এবং তাদের বৈদগ্ধ্য যে তাদের মনুষ্যত্ব অনেকটা রক্ষা করেছিল, একটি উদাহরণের সাহায্যে তার প্রমাণ দিচ্ছি। চরিত্রহীন অথচ কলাকুশল নাগরিকদের সেকালে সাধারণ সংজ্ঞা ছিল “বিট”। এই ঝিটের একটি ছবি আমরা সংগ পল শ্রাবণ, ১৩ মৃচ্ছকটিকে দেখতে পাই। ঐ নাটকের রাজশ্যালক শকারের সঙ্গে বিটের তুলনা করলেই নিরক্ষর ও বিদগ্ধ জনের প্রকৃতির তারতম্য স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। উভয়েই সমান বিলাস-ভক্ত, কিন্তু শকার পশু আর বিট সুজন।শকারের ব্যবহার দেখলে ও কথা শুনলে তাকে অর্ধচন্দ্র দিতে হাত নিসপিস করে, অপরপক্ষে বিটের ব্যবহারের সৌজন্য, ভাষার আভিজাত্য, মনের সরসতা এত বেশী যে, তাকে সাদর সম্ভাষণ করে ঘরে এনে বসাতে ইচ্ছে যায়—দু’দণ্ড আলাপ করবার জন্য। বৈদগ্ধ্য যে একটি সামাজিক গুণ, এ কথা অস্বীকার করায় সত্যের অপলাপ করা হবে। মার্জিত রুচি, পরিস্কৃত বুদ্ধি, সংযত ভাষা ও বিনীত ব্যবহার মানুষকে চিরকাল মুগ্ধ করে এসেছে এবং সম্ভবত চিরকাল করবে। এ সকল বস্তু সমাজকে উন্নত না হােক অলঙ্কৃত করে। এবং এ সকল গুণ কাব্য ও কলার চর্চা ব্যতীত রক্তমাংসের শরীরে আপনা হতে ফুটে ওঠে না। তবে এ কথা ঠিক যে, প্রাচীন সভ্যতা এ সকল গুণের যতটা মুল্য দিত, আমরা ততটা দিই নে। তার কারণ সে কালের সভ্যতা ছিল aristocratic, আর এ কালের সভ্যতা হতে চাচ্ছে democratic. সেকালে তারা চাইতেন আকার,-আমরা চাই বস্তু। তারা দেখছেন মানুষের ব্যবহার, আমরা দেখতে চাই তার ভিতরটা। তারা ছিলেন রূপ ভক্ত, আমরা গুণলুব্ধ। ক্লাসিক সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক সাহিত্যের তুলনা করলে এ প্রভেদ সকলেরি চোখে ধরা পড়বে। এ যুগের সাহিত্যমাত্রেই রােমান্টিক, অর্থাৎ তাতে আর্টের ভাগ কম এবং আত্মার ভাগ বেশী। এর কারণ, এ যুগের কবিরা কাব্যে আত্মপ্রকাশ করেন। এ যুগের কবি জনগণের প্রতিনিধিও নন মুখপাত্রও নন, সুতরাং সে কবির মন নিজের মন,-লৌকিক মনও নয়, সামাজিক ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া মনও নয়। আর সেকালের কবিরা সামাজিকদের মনােরঞ্জন করতে চেষ্টা করতেন। সেকালের সামাজিকেরা কলাবিৎ ছিলেন বলে, সেকালের কবিরা মচনায় বস্তুর অপেক্ষা তার আকারের দিকেই বেশী মনােযােগ দিতে বাধ্য হতেন। সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রে দেখতে পাই, কবি কি বললেন, তার চাইতে কি ভাবে বলেন তার মর্যাদা টের বেশী। সুতরাং নাগরিকদের কাব্যচর্চার ফলে প্রাচীন সাহিত্য যে আর্টিষ্টিক হয়েছে, এ কথা নির্ভয়ে বলা যেতে পারে। এই সব কারণে আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে নাগরিকদের কাব্যচর্চা একেবারে নিস্ফল হয় নি, কেননা তার গুণে ক্লাসিক সাহিত্য অসামান্য সুষমা ও সামঞ্জস্য লাভ করেছে। কাব্যে আর্টের মুল্য যে কত বড়, সে আলোচনায় আজ প্রবৃত্ত হব না, কেননা সে আলোচনা দু’ কথায় শেষ করবার জো নেই। বহু যুক্তি বহু তর্কের সাহায্যে ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেননা আমি পূর্বেই বলেছি এ যুগের ডিমোক্রাটিক আত্মা আর্টকে উপেক্ষা করে, অবজ্ঞা করে, সম্ভবত মনে মনে হিংসাও করে,-বােধহয় এই কারণে যে, অটের গায়ে আভিজাত্যের ছাপ চিরস্থায়ীরূপে বিরাজ করে। অথচ ডিমােক্র্যাসির এ সত্য সর্বদা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, লৌকিক মন বস্তুগত বলেই তা materialism-এর দিকে সহজেই ঝোকে। বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য আর্টের চর্চা আবশ্যক। ( ৬ ) বই পড়ার সখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সখ হলেও, আমি কাউকে সথ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাই নে। প্রথমত সে পরামর্শ সবুজ পত্র শ্রবণ, ১৩২৫ কেউ গ্রাহ্য করবেন না, কেননা আমরা জাত হিসেবে সৌখীন নই- দ্বিতীয়ত অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন, কেননা আমাদের এখন ঠিক সখ করবার সময় নয়। আমাদের এই রােগ শােক দুঃখ দারিদ্র্যের দেশে জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সে জীবনকে সুন্দর করা মহৎ করার প্রস্তাব, অনেকের কাছেই নিরর্থক এবং সম্ভবত নির্মমও ঠেকবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভােগ করতে আজ প্রস্তুত নই, কিন্তু শিক্ষার ফললাভের জন্য আমরা সকলেই উদ্বাহু। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষা আমাদের গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দুই দূর করবে। এ আশা সম্ভবত দুরাশা- কিন্তু তাহলেও আমরা তা ত্যাগ করতে পারিনে, কেননা আমাদের উদ্ধারের অন্য কোনও সদুপায় আমরা চোখের সুমুখে দেখতে পাই নে। শিক্ষার মাহাত্মে আমিও বিশ্বাস করি, এবং যিনিই যা বলুন সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। লােকে যে তা সন্দেহ করে, তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনও নগদ বাজারদর নেই। এই কারণেই ডিমােক্রাসি সাহিত্যের সার্থকতা বােঝে না, বােঝে শুধু অর্থের সার্থকতা। ডিমােক্রসির গুরুরা চেয়েছিলেন সকলকে সমান করতে, কিন্তু তাদের শিষেরা তাদের কথা উল্টো বুঝে প্রতিজনেই হতে চায় বড়মানুষ। একটি বিশিষ্ট অভিজাত সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েও, ইংরাজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ডিমােক্রাসীর গুণগুলি আয়ত্ত করতে না পারি, তার দোষগুলি আত্মসাৎ করছি। এর কারণও স্পষ্ট। ব্যাধিই সংক্রামক,-স্বাস্থ্য নয়। আমাদের শিক্ষিত সমাজের লােলুপ দৃষ্টি আজ অর্থের উপরেই পড়ে রয়েছে, সুতরাং সাহিত্যচর্চার সুফল ৰষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া সম্বন্ধে আমরা অনেকেই সন্দিহান। যারা হাজারখানা Law-report, কেননা, তাঁরা একখানা কাব্যগ্রন্থও কিতে প্রস্তুত নন, কেননা তাতে ব্যবসার কোনও সুসার নেই। নজির বা আউড়ে কবিতা আবৃত্তি, করলে মামলা যে দাড়িয়ে হারতে হবে—সেত জানা কথা। কিন্তু যে কথা জলে শশানে না—তার যে কোনও মূল্য নেই, এইটেই হচ্ছে পেশা- দারদের মহাভ্রান্তি। জ্ঞানের ভাণ্ডার যে ধনের ভাণ্ডর নয়, এ সত্য ত প্রত্যক্ষ কিন্তু সমান প্রত্যক্ষ না হলেও এও সমান সত্য নয় যে, এ যুগে যে জাতির জ্ঞানের শূন্য, সে জাতির ভাণ্ডার ধনের ঊড়েও ভবানী। তারপর যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানেও বড় নয়—কেননা ধনের সৃষ্টি যেমন আনসাপেক্ষ, তেমনি জ্ঞানের সৃষ্টিও মনসাপেক্ষ। এবং মানুষের মনকে সবল সচল সরাগ ও সমৃদ্ধ করবার ভার আজকের দিনে সাহিত্যের উপর ন্যস্ত হয়েছে। কেননা মানুষের দর্শন বিজ্ঞান ধর্ম নীতি অনুরাগ বিরাগ আশা নৈরাশ্য, তার অন্তরের স্বপ্ন ও সত্য—এই সকলের সমবায়ে সাহিত্যের জন্ম। অপরাপর শাস্ত্রের ভিতর যা আছে, সে সব হচ্ছে মানুষের মনের ভগ্নাংশ; তার পুরাে মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় শুধু সাহিত্যে। দর্শন বিজ্ঞান ইত্যাদি সব হচ্ছে মন-গঙ্গার তােলা জল—তার পূর্ণ স্রোত আবহমান কাল সাহিত্যের ভিতরই সােল্লাসে সবেগে বয়ে চলেছে ; এবং সেই গঙ্গাতে অবগাহন করেই আমরা আমাদের সকল পাপ হতে মুক্ত অতএব দাড়াল এই যে, আমাদের বই পড়তেই হবে—কেনন বইপড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। ধর্মের চর্চা চাই কি মন্দিরে করা চলে, দর্শনের চর্চা গুহায়, নীতির চর্চা ঘরে, এবং সবুজ পত্র প্রাণ, শ্রবণ, ১৩২৫ বিজ্ঞানের চর্চা যাদুঘরে; কিন্তু সাহিত্যের চর্চার জন্য চাই লাইব্রেরি। ও চর্চা মানুষে কারখানাতেও করতে পারে না—চিড়িয়াখানাতেও নয়। এ সব কথা যদি সত্য হয়—তাহলে আমাদের মানতেই হবে যে, লাইব্রেরির মধ্যেই আমাদের জাত মানুষ হবে। সেইজন্য আমরা যত বেশি লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার আমার মনে হয় এদেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয়, এবং স্কুলকলেজের চাইতে কিছু বেশি। এ কথা শুনে অনেকে চমকে উঠবেন, কেউ কেউ আবার হেসেও উঠবেন। কিন্তু আমি জানি আমি রসিকতাও করছি নে, অদ্ভুত কথাও বলছি নে ; যদিচ এ বিষয়ে লােকমত যে আমার মতের সম- রেখায় চলে না, সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। অতএব আমার কথার আমি কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য। আমার বক্তব্য আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি, তার সত্যমিথ্যার বিচার আপনারা করবেন। সে বিচারে আমার কথা যদি না টেকে, তাহলে তা রসিকতা হিসেবেই গ্রাহ করবেন। আমার বিশ্বাস শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। অশিক্ষিত লােমাত্রেই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যার দাতার অভাব নেই, এমন কি এক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই; এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিন্ত থাকি—এই বিশ্বাসে যে, সেখান থেকে তারা এতটা বিছার ধন লাভ করে ফিরে আসবে, যার সুদে তারা বাকী জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে।

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক। মনােরাজ্যেও দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহিতার কথাটা একেবারেই ভুলে যাই | এ সত্য ভুলে না গেলে আমরা বুঝতুম যে, শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষা দান করায় নয়, কিন্তু ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন—মনােরাজ্যের ঐশ্বর্য্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার কৌতুহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, তার জ্ঞান-পিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন-এর বেশি আর কিছু পারেন না। যিনি যথার্থ গুরু, তিনি শিষ্যের আত্মাকে উদ্বোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে মুক্ত এবং ব্যক্ত করে তােলেন। সেই শক্তির বলে, সে নিজের মন নিজে গড়ে তোলে, নিজের অভিমত বিদ্যা নিজে অর্জন করে। বিদ্যার সাধন শিষ্যকে নিজে করতে হয়। গুরু উত্তরসাধক মাত্র। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি ঠিক উল্টো। সেখানে ছেলেদের বিদ্যে গেলানো হয়, তারা তা জীর্ণ করতে পারুক আর না পারুক। এর ফলে ছেলেরা শারিক ও মানসিক মন্দাগ্নিতে জীর্ণ শীর্ণ হয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে। একটা জানাশােনা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক। আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন যারা শিশুসন্তানকে ক্রমান্বয়ে গরুর দুধ গেলানােটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষার ও বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন। গােদুগ্ধ অবশ্য: অতিশয় উপাদেয় পদার্থ, কিন্তু তার উপকারিতা যে ভােক্তার জীর্ণ করবার শক্তির উপর নির্ভর করে, এ জ্ঞান ও শ্রেণীর মাতৃকুলের নেই। তাদের বিশ্বাস ও বস্তু পেটে সৰু পত্র এব, ১৩২ গেলেই উপকার হবে। কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে, তাহলে সে যে ব্যাদড়া ছেলে, সে বিষয়ে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে । অতএব তখন তাকে ধরে বেঁধে জোর জবরদস্তি দুধ খাওয়ানাের ব্যবস্থা করা হয়। শেষটা সে যখন এই দুগ্ধপান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করবার জন্য মাথা নাড়তে, হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করে—তখন স্নেহময়ী মাতা বলেন-“আমার মাথা খাও, মরামুখ দেখাে, এই ঢােক, আর এক ঢোক, আর এক ঢোক” ইত্যাদি। মাতার উদ্দেশ্য যে খুব সাধু সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই—কিন্তু এ বিষয়েও কোন সন্দেহ নেই যে, উক্ত বলাকওয়ার ফলে মা শুধু ছেলের যকৃতের মাথা খান, এবং ঢোকের পর ঢোকে তার মরামুখ দেখবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন। আমাদের স্কুলকলেজের শিক্ষাপদ্ধতিটাও ঐ একই ধরণের। এর ফলে কত ছেলের সুস্থ সবল মন যে infantile liver-য়ে গতাসু হচ্ছে—তা বলা কঠিন। কেননা দেহের মৃত্যুর রেজিষ্টারি রাখা হয়, আত্মার মৃত্যুর হয় না। আমরা কিন্তু এই আত্মার অপমৃত্যুতে ভীত হওয়া দূরে থাক, উৎফুল্ল হয়ে উঠি। আমরা ভাবি দেশে যত ছেলে পাস হচ্ছে তত শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে ; পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া যে একবস্তু নয়, এ সত্য স্বীকার করতে আমরা কুষ্টিত হই। শিক্ষাশাস্ত্রের একজন জগদ্বিখ্যাত ফরাসী শাস্ত্রী বলেছেন যে, এক সময়ে ফরাসীদেশে শিক্ষা-পতি এতই বেয়াড়া ছিল যে, সে যুগে France was saved by her idlers;

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া ৩ অর্থাৎ যারা পাস করতে পারে নি, কিন্তু চায় নি, তারাই ফ্রান্সকে রক্ষা করেছে। এর কারণ, হয় তাদের মনের বল ছিল বলে কলেগের শিক্ষা তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল ; নয় সে শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছি। বলেই তাদের মনের বল বজায় ছিল। তাই এই স্কুল পালানো ছেলেদের দল থেকে, সে যুগের ফুান্সের যত কৃতকর্মা লোকের আবির্ভাব হয়েছিল। সে যুগে ফান্সে কিরকম শিক্ষা দেওয়া হত তা আমার জানা নেই, তবুও আমি জোর করে বলতে পারি যে, এ যুগে আমাদের স্কুলকলেজে শিক্ষার যে রীতি চছে, তার চাইতে সে শিক্ষাপদ্ধতি কখনই নিকৃষ্ট ছিল না। সকলেই জানেন যে, বিদ্যালয়ে মাষ্টার মহাশয়ের। নােট দেন, এবং সেই নােট মুখস্থ করে ছেলেরা হয় পাস। এর জুড়ি আর একটি ব্যাপারও আমাদের দেশে দেখা যায়। এদেশে একদল বাজিকর আছে, যারা বন্দুকের গুলি থেকে আরম্ভ করে উত্তরােত্তর কামানের গোলা পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে। তারপর একে একে সবগুলি উগলে দেয়। এর ভিতর যে অসাধারণ কৌশল আছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গেল। আর ওগলানো দর্শকের কাছে তামাসা হলেও-বাজিকরের কাছে তা প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ ব্যাপার। ও কারদানি করা তার পক্ষে যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি অপকারী। বলা বাহুল্য, সে বেচারা ঐ লোহার গােলা-গুলির এক কণাও জীর্ণ করতে পারে না। আমাদের ছেলেরাও তেমনি নােটনামক গুরুদত্ত নানা আকারের ও নানা প্রকারের গোলা-গুলি বিদ্যালয়ে গলাধঃকরণ করে পরীক্ষালয়ে তা উদগীরণ করে দেয়। এর জন্য সমাজ তাদের বাহব দেয় দিক, কিন্তু মনে যেন না ভাবে যে এতে জাতির প্রাণশক্তি ২১৮ সবুজ পত্র লাবণ, ১৩২৫ বাড়ছে। স্কুলকলেজের শিক্ষা যে অনেকাংশে ব্যর্থ, সে বিষয়ে প্রায় অধিকাংশ লােকই একমত। আমি বলি শুধু ব্যর্থ নয়, অনেক স্থলে মারাত্মক ; কেননা আমাদের স্কুলকলেজ ছেলেদের স্ব-শিক্ষিত হবার যে সুযোগ দেয় না, শুধু তাই নয়—স্বশিক্ষিত হবার শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে। আমাদের শিক্ষা-যন্ত্রের মধ্যে যে যুবক নিষ্পেষিত হয়ে বেরিয়ে আসে—তার আপনার বলতে আর বেশি কিছু থাকে না, যদি না তার প্রাণ অত্যন্ত কড়া হয়। সৌভাগ্যের বিষয় এই ক্ষীণপ্রাণ জাতির মধ্যেও জনকতক এমন কঠিন প্রাণের লােক আছে, এহেন শিক্ষা পদ্ধতিও যাদের মনকে জখম করতেও একেবারে বধ করতে পারে না। আমি লাইব্রেরিকে স্কুলকলেজের উপরে স্থান দেই এই কারণে যে, এ স্বলে লােকে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দ চিত্তে স্ব-শিক্ষিত হবার সুযােগ পায় ; প্রতি লোক তার স্বীয়শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুলকলেজ বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে, সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি পুর্বে বলেছি যে, লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয় ; তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে একরকম মনের হাসপাতাল। ( ৮ ) অতঃপর আপনার জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, “বই পড়ার পর নিয়ে এ ওকালতি করবার, বিশেষতঃ প্রাচীন নজির দেখাবার কি ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া ২১৯ প্রয়ােজন ছিল ? বই পড়া যে ভাল, তা কে না মানে ?” আমার উত্তর—সকলে মুখে মানলেও, কাজে মানে না। মুসলমান ধর্মে মানব আতি দুই ভাগে বিভক্ত—এক যারা কেতাবি, আরেক যারা তা নয়। বাংলার শিক্ষিত সমাজ যে পূৰ্ব্বদলভুক্ত নয়, এ কথা নির্ভয়ে বলা যায় না। আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় মােটের উপর বাধ্য না হলে বই স্পর্শ করেন না। ছেলেরা যে নােট পড়ে এবং ছেলের বাপের যে নজির পড়েন, সে দুইই বাধ্য হয়ে—অর্থাৎ পেটের দায়ে। সেইজম্য সাহিত্যচর্চা দেশে একরকম নেই বললেই হয়, কেননা সাহিত্য সাক্ষাৎভাবে উদরপূর্তির কাজে লাগে না। বাধ্য হয়ে বই পড়ায় আমরা এতটা অভ্যস্ত হয়েছি যে, কেউ স্বেচ্ছায় বই পড়লে আমরা তাকে নিষ্কর্মার দলেই ফেলে দিই। অথচ একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না, যে জিনিস স্বেচ্ছায় না করা যায়, তাতে মানুষের মনের সন্তোষ নেই। একমাত্র উদরপূর্তিতে মানুষের সম্পূর্ণ মনস্তুষ্টি হয় না। একথা আমরা সকলেই জানি যে, উদরের দাবী রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচে না; কিন্তু একথা আমরা সকলে মানি নে যে, মনের দাবী রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচে না। দেহরক্ষা অবশ্য সকলেরি কর্তব্য, কিন্তু আত্মরক্ষাও অকর্তব্য নয়। মানবের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে যে, মানুষের প্রাণ মনের সম্পর্ক যত হারায়, ততই তা দুর্বল হয়ে পড়ে। গানকে সজাগ ও সবল রাখতে না পারলে, জাতির প্রাণ যথার্থ স্ফুৰ্ত্তিলাভ করে না। তারপর যে জাতি যত নিরানন্দ, সে জাতি তত নিৰ্জ্জীব। একমাত্র আনন্দের স্পর্শেই মানুষের মনপ্রাণ সজীব সতেজ ও সরাগ হয়ে ওঠে। সুতরাং সাহিত্যচর্চার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সরু পত্র আবশ, ১২৫ অর্থ হচ্ছে জাতির জীবনীশক্তির হ্রাস করা, অতএব কোনও নীতির অনুসারেই তা কর্তব্য হতে পারে না,—অর্থনীতিরও নয় ধৰ্ম্মনীতিরও ; কাবাতে যে আমাদের অরুচি ধরেছে, সে অবশ্য আমাদের দোষ নয়,-আমাদের শিক্ষার দোষ। যার আনন্দ নেই, সে নির্জীব—একথা যেমন সত্য ; যে নির্জীব, তারও যে আনন্দ নেই—সে কথাও তেমনি সত্য। আমাদের শিক্ষাই আমাদের নির্জীব করেছে। জাতীয় আত্মরক্ষার জন্য এ শিক্ষার উল্টো টান যে আমাদের টানতে হবে, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। এই বিশ্বাসের বলেই আমি স্বেচ্ছায় সাহিত্যচর্চার স্বপক্ষে এত বাক্যব্যয় করলুম। সে বাক্যে আপনাদের মনােরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছি কিনা জানি না। সম্ভবত হই নি ; কেননা আমাদের দুরবস্থার কথা যখন স্মরণ করি, তখন খালি কোমল সুরে আলাপ করা আর চলে না ; মনের আক্ষেপ প্রকাশ করতে মাঝে মাঝেই কড়ি লাগাতে হয়। আপনাদের কাছে আমার আর একটি নিবেদন আছে। প্রবন্ধে প্রাচীন যুগের নাগরিক সভ্যতার উল্লেখটা, কতকটা ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হয়েছে। এ কাজ আমি বিদ্যে দেখাবার অন্য করি নি, পুথি বাড়াবার জন্যও করি নি। এই ডিমােক্রাটিক যুগে aristocratic সভ্যতার স্মৃতি-রক্ষার উদ্দেশ্যেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি। আমার মতে এ যুগের বাঙ্গালীর আদর্শ হওয়া উচিত প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা, কেননা এ উচ্চ আশা অথবা দুরাশা আমি গােপনে মনে পােষণ করি যে, প্রাচীন ইউরােপে Athens যে স্থান অধিকার করেছিল, ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষে বাংলা সেই গান ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা বই পড়া অধিকার করবে। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার বিশেষত্ব এই যে, তা ছিল একাধারে democratic এবং aristocratic; অর্থাৎ সে সভ্যতা ছিল সামাজিক জীবনে democratic, এবং মানসিক জীবনে aristocratic,—সেই কারণেই গ্রীক সাহিত্য এত অপূর্ব, এত অমুল্য। সে সাহিত্যে আত্মার সঙ্গে আর্টের কোনও বিচ্ছেদ নেই, বরং দু’য়ের মিলন এত ঘনিষ্ঠ যে, বুদ্ধিবলে তা বিশ্লিষ্ট করা কঠিন। আমাদের কৰ্মীর দল যেমন একদিকে বাংলায় ডিমােক্রাসী গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন, তেমনি আর একদিকে আমাদেরও পক্ষে মনের aristocracy গড়ে তােলবার চেষ্টা করা কর্তব্য। এর জন্য চাই সকলের পক্ষে কাব্য-কলার চর্চা। গুণী ও গুণজ্ঞ উভয়ের মনের মিলন না হলে, কাব্য-কলার আভিজাত্য রক্ষা করা অসম্ভব। সাহিত্য-চৰ্চ্চা করে দেশসুদ্ধ লােক গুণজ্ঞ হয়ে উঠুক—এই হচ্ছে দেশের লােকের কাছে আমার সনির্বন্ধ প্রার্থনা। প্রমথ চৌধুরী।

সাহিত্যের জাতরক্ষা। ভৌগলিক সীমানা আর যেখানেই থাক না কেন, তিনটী রাজ্যে কিন্তু তার কোন অস্তিত্ব নেই, অর্থাৎ চিন্তার রাজ্যে, ভাবের রাজ্যে, ও রসের রাজ্যে। আর এই চিন্তা, ভাব ও রস—এ তিনটী হচ্ছে সাহিত্যের সম্পত্তি। সুতরাং এ কথা বললে বােধ হয় অযৌক্তিক হবে না যে, সাহিত্য-সাম্রাজ্যের এমন কোন একটা বাধা “ফ্রন্টিয়ার” নেই, যেটা কোন দিনই ভাঙা চলবে না। কিন্তু এমন অনেকে আছেন যারা মনে করেন যে, ওটা একটা ডাহা বাজে কথা ও মিছে কথা। আর সেইজন্যে এই অনেকের মধ্যে কেউ কেউ বাংলা সাহিত্যের জাতরক্ষার একটা হুজুগ বর্তমানে তুলেছেন। কারণ বর্তমান বাংলা-সাহিত্য নাকি কালাপানিফো ম্লেচ্ছভাবাপন্ন। এ সাহিত্যের কেঁাচার নীচে দিয়ে নাকি প্যাণ্টালুনের পা বেরিয়ে পড়েছে দেখা যাচ্ছে-জামার ভিতর থেকে নাকি নেকটাই কলার উচু হয়ে উঠেছে বােঝা যাচ্ছে। বাঙালী কবি নাকি এমন সব কবিতা লিখছেন, যা বিদেশীরা কোনরকম ভাষ্যের সাহায্য না নিয়েই সােজাসুজি বিনি মেহনতে বুঝতে পারছেন। সুতরাং একথাত মানতেই হবে যে, বাঙালী কবির কাব্য বাঙালীর জাতীয় সাহিত্য নয়—সেটা হচ্ছে বিদেশী সাহিত্য। অতএব বাঙালী জাতির মঙ্গলের জন্য তার ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা সাহিত্যের জাতরক্ষার একটা ব্যবস্থা হওয়া নিতান্তই দরকার। ভারতবর্ষের মাটির এমনি গুণ। আমরা যে-সময়টায় বেঁচে আছি, সে সময়ের বাংলা-সাহিত্য বললে প্রথমত ও প্রধানত রবীন্দ্রনাথকেই বোঝায়—এ কথাটা বললে অনেকের আরামের ব্যাঘাত ঘটবে জানি, কিন্তু আশা করি এটা মিথ্যা প্রলাপ নয়। এই রবীন্দ্রনাথের রচনা নাকি সব বিদেশী ; কারণ তাঁর লেখা নাকি অতি সহজে ইংরেজিতে অনুবাদ করা যায়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, তা ইংরাজিরই অনুবাদ। সেদিন আমার এক বাংলাভাষাভিজ্ঞ জাপানী বন্ধু বলছিলেন যে, শ্ৰীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা অতি সহজে জাপানীতে অনুবাদ করা যায়—সুতরাং তার লেখা যে জাপানী-সাহিত্যের অন্তর্গত, তার কোন ভুল নেই। কিছুদিন পূর্বে আমার এক তামিল বন্ধু বলছিলেন যে, (ইনিও বেশ বাংলা জানেন) বঙ্কিমের নভেলগুলো জলের মতাে তামিলে অনুবাদ করা যায়। সুতরাং বঙ্কিম প্রকৃতপক্ষে বাংলা-সাহিত্য রচনা করেন নি—তিনি সেবা করেছেন আসলে তামিল-সাহিত্যের। অতএব এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান বাংলা-সাহিত্য বলে কোন পদার্থই নেই। তার কিছুটা ইংরেজি, কিছুটা জাপানী, কিছুটা তামিল—আর বাকীটা হিন্দি, মারাঠি, ফারসী, ফরাসী, ইটালিয়ান ও রাশিয়ান মিশিয়ে। মধুসূদন যে খাটী জার্মান ভাষায় মেঘনাদবধ রচনা করেছেন, সেটা ত আমরা সবাই জানি। আশ্চৰ্য্য অামাদের সাহিত্যিকদের শক্তি ও আত্ম- ত্যাগ ! এতদিন ধরে তঁারা কায়-মন-প্রাণে পরের সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে গেলেন। আর অপূৰ্ব আমরা ‘রি ভ্যান উইঙ্কলে নব সংস্করণ-লগে থেকেও তাদের এ প্রতারণাটা ধরতে ৪২৪ সবুজ পত্র লাবণ, ১৩২৫ পারলেম না। তারা সম্পদ দিয়ে গেলেন পরকে, আর শ্রদ্ধা নিয়ে গেলেন আমাদের। যাহােক, এতদিনে সৎ-সমালােচকের দৃষ্টির গুণে তাদের এ প্রবঞ্চনাটা আজ ধরা পড়ে গেল -মন্দের ভাল ! তাই আমরা আজ আমাদের সাহিত্যের জাতরক্ষার্থে বদ্ধপরিকর হয়েছি- ভারতবর্ষের সনাতন মাটির এমনি গুণ! এখানে কিছুই নতুন হবার জোটি নেই! কিন্তু মুস্কিলের কথা এই যে, ভারতবর্ষের মাটী যতটা স্থিতিশীল, ভারতবাসীর মনটা ততটা নয়। আর যে জিনিসটা সাহিত্যিক গড়ে তােলে, সেটা দেশের মাটি নয়—দশের মন। আর এই মন জিনিসটা গতিশীল। কিন্তু সে গতি নিরেট পাকা সড়কের মতাে নয়—সেটা হচ্ছে তরল উজ্জ্বল স্রোতস্বিনীর মতো—কাজেই এ গতিতে ভাঙাগড়া আছে—আর যেখানে ভাঙাগড়া আছে সেখানেই পরিবর্তন আছে—এক রূপ থেকে আর এক রূপে, এক ভাব থেকে আর এক ভাবে, এক সুর থেকে আর এক সুরে। আর যেহেতু সাহিত্য জিনিসটা জাতীয় মনের দর্পণস্বরূপ, সেজন্যে সেখানে যে যুগে যুগে জাতীয় মনের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবিম্ব পড়বে, সেটা লজিকের পাতা না উলটিয়েও বলা যায়; কেননা মনকে ফাকি দিয়ে আর যাই করা যাক-কাব্যও লেখা যায় না, সাহিত্যও গড়া যায় না। সুতরাং দাড়াল এই যে, আমাদের সাহিত্যকে যদি একটা বিশিষ্ট ভাব বিশিষ্ট রূপ বিশিষ্ট সুরের মাঝে আবদ্ধ রাখতে চাই, তবে আমা- দের জাতীয় মনটাকে আবদ্ধ করে রাখতে হবে। সে মনে যেন নব নব ভাব, নব নব সুর, নব নব চিন্তা না জাগে; নবীন প্রাণের নব অনুরাগকে আমাদের অবজ্ঞার ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখতে শিখতে ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা হবে—নইলে আমাদের প্রাণ যে আমাদের মনকে ভুলিয়ে নিয়ে কোন পথে ছুটবে তার বিন্দুমাত্র ঠিক নেই। আর প্রাণ ছাড়া মন নেই- যদি ও বা থাকে, সে মন জীবন্ত সাহিত্য গড়তে পারে না। কারণ সাহিত্যিকের প্রাণ দিয়েই তার সাহিত্য প্রাণবান—মন জোগায় শুধু তার দেহ। সুতরাং আমাদের পুরাতন সাহিত্যকে সনাতন করে তুলতে চাইলে প্রথমত আমাদের জাতীয় প্রাণটাকে নষ্ট করে আমাদের সাহিত্যিক- দের প্রাণ-মরা হতে হবে। সাহিত্যিকরা প্রাণ-মরা হলে তাদের চারপাশে “সনাতন জড়তার দেয়াল এক রাত্তিরে মাথা উঁচু করে দাড়াবে। আর সেই “সনাতন জড়তার দেয়ালের মধ্যে সাহিত্যই বল আর যাই বল, সব সনাতন হয়ে উঠবে আপনাআপনি—তার জন্যে আর কাউকেই কিছু করতে হবে না। কিন্তু যতক্ষণ মানুষের ভিতরে একটুও প্রাণ আছে, ততক্ষণ তা হবার উপায় নেই। প্রাণের একটা মহৎ দোষ এই যে, সে চলতে চায়; কারণ এই চলাই তার সত্য—আর সেই জন্যে এই চলার মধ্য দিয়ে সে চারিদিকে আনন্দের বান ডাকিয়ে যায়। আর মানুষের যা কিছু সত্য সৃষ্টি—তার সাহিত্যিক জীবনেই হােক বা তার কৰ্ম্ম-জীবনেই হােক, তার জন্ম এই আনন্দের মধ্যে। প্রাণের এমনি একটী মহৎ দোষ আছে বলেই আমাদের দেশের যােগী ঋষিরা-অবশ্য “অপ্রাচীন দার্শনিক যুগের”—প্রাণের উপরে এমন খড়গহস্ত। তারা প্রাণকে কায়দা করবার কত কত উপায় বের করেছেন ; কারণ প্রাণ যতদিন আছে ততদিন নিৰ্বাণ নেই। কেননা প্রাণকে না মারতে পারলে জগৎটা নিরানন্দ হয়ে ওঠে না। আর জগৎটা নিরানন্দ হয়ে না উঠলে নির্বাণেরও কোন মূল্য থাকে না।

সবুজ পত্র শ্রাবণ, ১৩২৫ কিন্তু প্রাণকে কৈবল্য পাইয়ে দেবার পথে একটি মস্ত বাধা সৃষ্টি করে রেখেছেন স্বয়ং ভগবান। সেটি হচ্ছে জীবজগতের আত্মরক্ষার দুর্বার ইচ্ছা—instinct. এখন আমরা পুরাতনকে সনাতন করে রাখতে পারব কি না, তা নির্ভর করবে মানুষের এই আত্মরক্ষার instinct এবং সাহিত্যের জাতরক্ষা অভিলাষী সমালােচকের বুদ্ধিবিচার-এ দুয়ের মধ্যে কে জয়ী হবে, তার উপরে। এ দুয়ের মধ্যে যে সংগ্রাম—সে সংগ্রামের ফলাফল সম্বন্ধে আমাদের কিন্তু বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা ভয় নেই। প্রাণের জোরে বুদ্ধিকে একদিন উদার হয়ে উঠতেই হবে। তখন সে বুঝবে যে একটা জাতির প্রতিভা যে সাহিত্য গড়ে তােলে, তাই তার জাতীয় সাহিত্য। নইলে শেক্সপীয়র শেলী ও ‘শ’ তিন জনের রচনাই ইংরেজী-সাহিত্য বলে গ্রাহ্য হত না। কারণ এঁদের তিন জনের মধ্যে যেটুকু মিল আছে সেটুকু হচ্ছে এই যে, তিন জনের রচনাই ইংরেজি ভাষায় লেখা। এ ছাড়া আর যদি কিছু মিল থাকে তবে বুদ্ধির চোখে দূরবীণ লাগিয়েও সে মিলটা ধরা যায় কি না সন্দেহ। ( ২ ) আসল কথা হচ্ছে এই যে, কোন জাতিরই জাতীয় সাহিত্যের জাত বলে কোন বস্তু নেই, সুতরাং তা রক্ষা করবারও কোন সমস্যা নেই। একটা জাতি যতদিন ধরে বেঁচে থাকে, ততদিন ধরে তার সাহিত্যই রচিত হতে হতে চলে। যুগে যুগে একটা জাতির মনের কথা প্রাণের ব্যথা হৃদয়ের সুখ দুঃখ আবেগ আকাঙ্খার পরিবর্তন নানা নৈসর্গিক ও ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা ২২। তাই। অনৈসর্গিক কারণে হতে হতে চলেছে—আর তার সাহিত্যে তারই ছাপ পড়ছে। সুতরাং একটা জাতীর জীবনে বিশেষ কোন সন তারিখ পর্যন্ত দাগ দিয়ে বলা চলে না যে সেই পর্যন্ত তার সাহিত্য জাতীয়, তার পর যা’—তা’ পরদেশী। “জাতীয় সাহিত্য সম্বন্ধে আসল প্রশ্ন সেটা-“জাতীয় কি না ?” তা নয়—কিন্তু—“সাহিত্য কি না ?”- কারণ সব পছই যেমন কাব্য নয়, তেমনি সব লেখাই সাহিত্য নয়। সুতরাং আজ আমাদের প্রশ্ন এ নয় যে, “আমাদের সাহিত্য জাত রক্ষা করে চলেছে কি না ?”—আমাদের প্রশ্ন এই যে “আমাদের জাতি সাহিত্য রচনা করে চলেছে কি না ?” কিন্তু আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের সাহিত্য কোন্ সন পর্যন্ত জাতীয়, তার একটা হিসেব নিকেশ এর মধ্যেই করে ফেলেছেন। তারা বলতে শুরু করেছেন, যে বাংলা ভাষায় ফুল ফল আকাশ বাতাস চঁদ চকোর দিয়ে যদি কোন কাব্য রচনা হয়, তবে সেটা হবে নিতান্ত বিদেশী ; এবং বাঙ্গালী কবি যদি অনন্তের দিকে মুখ করে বসে থাকেন, তবে তার কাব্যে জাতীয়তার প্রাণান্ত হবে-কারণ অনন্তের আলাে আর দিগন্তের বাতাসটা নাকি বাংলা ভাষার প্রাণে সয় না। অর্থাৎ এরা বলতে চান যে, মানুষের মুখের ভাষা তার প্রাণের আশার চাইতে বড় যেমন অনেকে বলে থাকেন যে মনুসংহিতার মূল মানুষের জীবনের গতি- ভঙ্গিমার চাইতে সত্য। আসল কথা হচ্ছে এই যে, অনন্তের আলাে ও দিগন্তের বাতাস বাঙ্গালী কবির অন্তরে তার মােহিনী রূপ ফেলেছে কিনা—তা যদি ফেলে থাকে তবে বাংলা ভাষায় তা মােহন হয়ে ফুটবেই। কারণ ভাষা মানুষের—মানুষ ভাষার নয়। মানুষই ভাষার জন্ম দিয়েছে আপনার আত্মার শক্তিতে—মানুষই শব্দে অর্থ দিয়েছে = সবুজ পল শাবণ, ১৩২৫ } আপনার তপঃ প্রভাবে-মানুষই অর্থকে মন্ত্রে পরিণত করেছে আপনার উগ্র তপস্যায়। ভাষা মানুষের জন্ম দেয় নিতার প্রাণেরও না, মনেরও না, হৃদয়েরও না। এই কথাটা আমাদের আজ ভাল করে বুঝতে হবে যে, যে-কোন যুগের চাইতে অনন্তকাল অনেক বড়—আর সে অনন্ত কালে মানুষের জীবনে কতরকম সম্ভব অসম্ভব ঘটতে পারে তার পরিমাণ কেউ দিতে পারে না—তার অনুমান কেউ করতে পারে না। আমা: দের বুঝতে হবে যে, যে কোন জাতি, যে-কোন সমাজ, যে-কোন নেশানের চাইতে প্রত্যেক মানুষ অনেক বড়–নইলে জাৰ্মাণীর ষ্টেট আইডিয়া হত সমাজ-সমস্যার শেষ ও শ্রেষ্ঠ মীমাংসা। আবার যে- কোন মানুষের চাইতে প্রত্যেক কবি বড়–নইলে এ পৃথিবীতে সবার চাইতে তাজ্জব ব্যাপার হত—ইংলিশ নেশানের মতো একটা নেশানের পক্ষে শেক্সপীয়রকে জন্ম দেওয়া। সুতরাং যে-কোন কবির চারপাশে তার জাতীয়তার দোহাই দিয়ে গণ্ডি টানলে, সেই কবিকেই আমরা ছােট করব—'তার জাতিকে বড় করতে পারব না। কিন্তু সাহিত্যে জাত বাঁচিয়ে চলার দল আজ এই বলে আব্দার ধরেছেন যে, আমাদের যদি কাব্য লিখতে হয়, তবে সেকাব্য লিখতে হবে বৃন্দাবনের,তা সে জিওগ্রাফির বৃন্দাবনই হােক, বা স্ব- বৃন্দাবনই হােক; আমাদের যদি গান বাঁধতে হয়, তবে সে গান হওয়া চাই রাধাকৃষ্ণের—তা সে রাধাকৃষ্ণ পৌরাণিকই হােক বা আধ্যা- ত্মিকই হােক; যদি নাটক লিখতে হয় ত শ্রীরাধার মানভঞ্জন-বড় জোর সুভদ্রাহরণ। কিন্তু রাধাকৃষ্ণই বাঙ্গালী কবির অন্তরে চিরটা কাল, সত্য হয়ে থাকবে সৃষ্টির কোন্ নিয়মানুসারে, সেটা অবশ্য আমাদের ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা এ পর্যন্ত এঁরা বালিয়ে দেন নি। আর রাধাকৃষ্ণ চিরটা কাল যে কেন নায়কনায়িকার স্থান মৌরসি পাট্টা করে বসে থাকবেন, তাও বােঝা যায় না অবশ্য একটা কারণ ছাড়া। সেটা হচ্ছে এই যে, এঁরা দুজনেই পুরাতন। আর পুরাতনের প্রতি সনাতন মনের টান চিরকালই দেখা যায়। কিন্তু মানুষ নিজে একদিন যা’ তৈরি করেছে, তা’ দিয়ে আর একদিন তাকেই আবদ্ধ করতে চাওয়ার মতাে মুখত মানুষের জীবনে আর কিছু নেই। যাহােক, এদের এই মতের বিরুদ্ধে আমাদের কথা বলতেই হবে, নইলে আমরাও হব সেই চীনেম্যানের সামিল—যে বলেছিল যে তার মাথাটা আর চীনে-মাথা নেই, সেটা হয়ে গেছে বিদেশী মাথা—কেননা সেমাথা থেকে টিকি কেটে ফেলা হয়েছে। চীনেম্যানের বুদ্ধি তাকে বােঝবার অবসর দেয় নি যে, তার মাথার ওপরেই চীনে-টিকি গজিয়ে- ছিল তার টিকির আগায় চীনে-মাথা গজায় নি। কোন মানুষ দুইমুহূর্ত এক লােক নয়। দু’মুহূৰ্ত্ত এক হলেও দু’ দিন এক নয়—দু’ দিন এক হলেও দু' বছর এক নয়। দেহের ত কথাই নেই--সেটা আমাদের চর্মচক্ষেই ধরা পড়ে—কিন্তু তার অন্তরও পলে পলে তিলে তিলে নূতন হয়ে উঠছে-নব নব কল্পনা নব নব আশা আকাঙ্খা দিয়ে—নব নব বেদনার মধ্যে দিয়ে। কেননা মানুষের জীবনের রাগ এক নয়--সহস্র। মানুষের অন্তর-দেবতার জীবনপথে অভিযান হয় সহস্র রাগিণতে বাণী বাজিয়ে-গহস্র পর পর প্রাবণ, ১৭৫ রঙের নিশান উড়িয়ে, এর সত্যতা প্রতিপন্ন করার জন্য বােধহয় প্রমাণের দরকার নেই। কারণ এ সব আমাদের দেখা কথা wote Facts. সত্ত্বেও যদি কেউ উপরের কথায় আপত্তি তোলেন, তবে এই বললেই যথেষ্ট হবে যে, তিনি নিতান্তই একজন তার্কিক—আর কিছু নন্। মানুষের সম্বন্ধে এই কথাটা যেমন সত্য, একটা জাতি বা সমাজের পক্ষেও এটা ঠিক তেমনি সত্য। এই যে আমরা বাঙালী জাতি--আমরা অৰ্য না অনাৰ্য, মঙ্গোল না দ্রাবিড়–না সবগুলো মিশিয়ে একটা কিছু সে সম্বন্ধে কোন থিওরি খাড়া করবার অধিকার আছে মাত্র এক নৃতত্ত্ববিদের। কিন্তু এমন যদি ব্রাহ্মণ আজ বাংলাদেশে থাকেন, যিনি বুক ঠুকে সাহস করে বলতে পারেন যে, তার ধমনীর প্রত্যেক বিন্দু শােণিত আৰ্য-শােণিত—তবে সেই বাঙালী ব্রাহ্মণের সঙ্গে সেকালের আৰ্য ব্রাহ্মণ ঋষ্যশৃঙ্গের যে মিলটা পাওয়া যাবে, সেটা হচ্ছে এই যে, তারা দু'জনেই মানুষ। কিন্তু যেহেতু মানুষ গরু গাধা নয়, সেই জন্যে আজকার এই মানুষ আর সে দিনের সেই মানুষের মধ্যে ভিতরের দিকটায় একটা প্রকাণ্ড অমিল দাঁড়িয়ে গেছে সে এমনি অমিল যে এদের এক জনের কথা আর এক জনের বুঝতে হলে একছত্র কথার পঞ্চাশ পত্র টীকা না হলে চলে না। পাঁচ দু'শ বছর আগেকার বাঙালী আর আজকের বাঙালী এক নয়। পাঁচ ছ শ বছর আগের বাঙালী চণ্ডীদাস বিদ্যাপতির জন্ম দিয়েছে। আর আজকের আমরা যে চণ্ডীদাস বা বিদ্যাপতি নই, তা সাময়িক পত্রিকার কোন কোন কবিতাতে স্পষ্ট করে লেখা থাকে দেখতে পাওয়া যায়—যার চোখ আছে তিনিই সেটা পড়তে পারেন। এখন যে ব্য, চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের সতরক্ষা এই যে একটা মানুষের বা সমাজের বা জাতির পরিবর্তন—তা কেন হয়, বা কেমন করে হয়, এ প্রবন্ধে সেটা আলোচনা করবার দরকার নেই। এ প্রবন্ধে এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে এ-পরিবর্তন ঘটে - এ সম্বন্ধে আর কোন ভুল নেই। নদীর মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তার স্রোতহীন জল শৈবালদলে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তখন আর সেখানে কল কল ছল ছল তান ওঠে না,- ওঠে শুধু মণ্ডুককুলের ঐক্যতান সঙ্গীত। এতাে গেল নদীর কথা। তেমনি মানুষের জীবনের যে-কোন রসকে আবদ্ধ করে রাখলে তা কিছু দিনের মধ্যেই হয়ে ওঠে তাড়ি। আর সে তাড়ি পান করে মানুষে যে লীলাখেলা করে, তা আর যাই হােক আধ্যাত্মিক মােটেই নয়। সুতরাং কোন এক যুগের মানুষের অনুভূত কোন এক বিশেষ রসকে সনাতন করে তােলায় মানুষের বিপদ আছে। তাই এমন যে বৈষ্ণব- ধৰ্ম্ম-সে বৈষ্ণবধর্মের সতত্ত্বও মেতে গিয়ে, হয়ে দাড়াল আদিরস। আর এই আদিরসের রঙে রঙীন হয়ে বৈষ্ণব-ধৰ্ম্মের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যে ছবি ফুটে উঠল, তার রস হাস্যও নয় করুণও নয়—তার রস বীভৎস। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের কোন বিশেষ অনুভূতিকে মানুষের পক্ষে সনাতন করে তুলতে কেউ-ই পারেন না—কারণ তা সনাতন করে তুলতে পারার অর্থ ভগবানের এ সৃষ্টি-লীলার অবসান। তাই স্বয়ং বুদ্ধদেব তা পারেন নি—স্বয়ং খৃষ্টদেবও কৃতকার্য হন নি। প্রমাণ—এই দুই মহা পুরুষের আজকালকার শিষ্যরা। সুতরাং যখন মানুষের, সমাজের, জাতির পরিবর্তন হচ্ছে— মানুষের জীবন-দেবতার লীলা-বিলাসের পরিবর্তন হচ্ছে-যুগে যুগে তার অন্তরে নব নব আকর্ষণ সত্য হয়ে উঠে আনন্দের ডাক তাকে - * * ২২ সবুজপত্র আবণ, ১৩২৫ নব নব পথে আহ্বান করছে—তখন তারই রচিত সাহিত্যে একই রকমের রস, একই রকমের সুর, একই রকমের ভঙ্গী চিরন্তন করে রাখবার চেষ্টাটা যে কেবল বিজ্ঞানসম্মতই নয় তা নয়—সেটা সহজ জ্ঞানসম্মতও নয়। বর্তমানের মানুষকে অস্বীকার করে যদি আমরা তার অতীতকেই বড় করে তুলি, তবে সামাজিক জীবনে যেমন আমাদের মিলেছে ভণ্ডামি-তেমনি সাহিত্যিক বা কবির কাছ থেকে আমাদের যা মিলবে সে হচ্ছে রসহীন, ছােড়, আর কিছু নয়-বড় জোর শক্তিশালী যারা তাদের হাতে গড়ে উঠবে চাকচিক্য- ময় প্রাণহীন প্রতিমা। কারণ মিথ্যা যেখানে, সেখানে মানুষ আনন্দ পেতে পারে না --আর যেখানে সে নিজে আনন্দ পায় না, সেখানে সে অপরকে আনন্দ দিতে কিছুতেই পারে না—মরে গেলেও নয়। সুতরাং আজ যাঁরা বৈষ্ণব-সাহিত্যকে আদর্শ করে তুলে, মনে করছেন যে তারা বাঙালী জাতিকে একটা মহত্ত্বের পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন--তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলার সাহিত্যিকদের একটা মস্ত মিথ্যা পথই দেখিয়ে দিচ্ছেন। এদের একটা কথা মনে রাখা উচিত যে, যেটা চলে আসছে সেটাই যদি চিরকাল চলে আসে, তবে আজ যেটা চলে আসছে সেটাও চলে আসতে পারত না । ( ৪ ) এই সব কথা মনে করেই আমরা বাংলার নবীন ও তরুণ যাঁরা তাদের আজ এই একটা সাবধানের ইঙ্গিত করা কর্তব্য বলে মনে করছি যে, তাদের মধ্যে যাঁরা বীণাপাণির মন্দিরে আপনার জীবনের , চতুর্থ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা সত্য খুঁজে পেয়েছেন-বীণাপাণির বীণার তানে যাদের মন মজেছে- তারা যেন সে বীণাপাণির মন্দিরে প্রবেশ করেন-আপনার জীবন দেবতার সত্য অর্ধ নিয়ে, কোন অতীতকে নিয়ে নয়—তা সে অতীত যত বড়ই হােক, যত মহানই হােক, যত লােভনীয়ই হােক। সাহি- ত্যিক জীবনে সফলতা লাভের একই পন্থা-আপনার অন্তরের সত্য। সাহিত্যিকের আপনার জীবনের সত্যের মধ্যেই সেই ফুলগুলি ফুটে ওঠে—যে ফুল দিয়ে বীণাপাণি নিভৃতে বসে তার জন্যে বিজয়মাল্য রচনা করেন। এ পথের পথিকের আর কোন পন্থা নেই। শুধু এ পথেরই বা বলি কেন—কোন পথের পথিকেরই অন্য পন্থা নেই-- নামঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায়। আজ বাংলার মানুষকে তহ্বান করে আমরা বছি যে, তারা যেন বাঙালীর মিথ্যা জাতীয়তার নামে আপনার ভিতরের মানুষকে খাটো না করেন। তারা যেন না ভোলেন যে, বাহিরের জগতে আমরা বাঙালী কিন্তু মনের জগতে আমরা মানুষ। সামাজিক জীবনে ত মানুষ আপনার চারদিকে গণ্ডী টাতে বাধ্য-নইলে সংসার চলে না। কিন্তু মনের জগতে তার অসীম স্বাধীনতা। মনের জগতের এই স্বাধীনতার সংকোচ যেন তারা কোন দিনই না ঘটান। দেশভেদে, জাতিভেদে, আচারভেদে, বর্ণভেদ, ধর্মভেদেও মানুষে মানুষে হরে অন্ত নেই-কিন্তু আমরা এই মনের জগত চিরকাল উন্মুক্ত রেখে যেন আশা করতে পারি যে বাহিরের সহস্র অমিল সত্বেও বিশ্ববাসীর একদিন এখানে মিলন হবে। শ্রীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী।

ছােট গল্প। আমরা পাঁচজনে মিলে, এই যুদ্ধ নিয়ে বক-যুদ্ধ করছিলুম। সুপ্রসন্ন হঠাৎ তর্কে ক্ষান্ত দিয়ে, একখানি বাঙলা বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগলেন। আমরা তার পড়ায় বাধা দিলুম না। আমরা জানতুম যে তার সঙ্গে কারও মতের মিল হচ্ছে না বলে, তিনি বিরক্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় তাকে ফের আলােচনার ভিতর টেনে আনতে গেলে, তিনি মহা চটে যেতেন। আমি বরাবর লক্ষ্য করে আছি যে, এই যুদ্ধ নিয়ে কথা কইতে গেলেই নিতান্ত নিরীহ ব্যক্তির অন্তরেও বীররসের সঞ্চার হয়, শেষটা তর্ক একটা মারামারি ব্যাপারে পরিণত হয়। সুতরাং আমি কথাটা উল্টে নেবার মনে মনে একটা সদুপায় খুঁজছি, এমন সময় সুপ্রসন্ন হঠাৎ আবার বইখানা টেবিলের উপর সজোরে নিক্ষেপ করে, বলে উঠলেন-Nonsense. কথাটা এত চেঁচিয়ে বললেন, যে তাতে আমরা সকলেই একটু চমকে উঠলুম। আমি বলুম “কি nonsense হে”? সুপ্রসন্ন বললেন- -“তােমাদের এই বাংলা বইয়ে যা লেখা হয় তাই। সাধে ভদ্র- লোকে বাংলা পড়ে না। এই বইখানা খুলেই দেখি লেখক বছেন, ছােট গল্প প্রথমত ছােট হওয়া চাই, তারপর তা গল্প হওয়া চাই। কি চমৎকার definition। এর পরেও লােকে বলে বাঙালীর শরীরে লজিক নেই।”

ম ৰা, চতুর্থ সংখ্যা ছোট গল্প . অমুকুল এই শুনে একটু হেসে উত্তর করলেন, -“ওহে অত চটো কেন? দেখছ না লেখক নিজের নাম রেখেছেন বীরবল'। ঐ থেকেই তােমার বােঝা উচিত ছিল যে ও যাচ্ছে রসিকতা।” —“তোমরা যাকে বলে। রসিকতা আমি তাকেই বলি nonsense. একটা জোড়া কথাকে ভেঙ্গে বলায় মানুষে যে কি বুদ্ধির পরিচয় দেয় তা আমার বুদ্ধির অগম্য।” এ শুনে প্রশান্ত আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। তিনি ভুরু কুচকে বললেন, —“তােমার বুদ্ধির অগম্য হলেই যে তা আর সকলের বুদ্ধির অগম্য হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। বীরবলের ও কথা nonsenseও নয় রসিকতাও নয়—ষোল আনা সাচ্চা কথা।” যে যা, বলত প্রশান্ত তার প্রতিবাদ করুত; এই ছিল তার চিরকেলে স্বভাব। সুতরাং সে সুপ্রসন্ন ও অনুকুল দু’জনের দ্বিমতকে এক বাণে বিদ্ধ করায়, আমরা মােটেই আশ্চর্য হলুম না। বরং নিজের মতকে সে কি করে প্রতিষ্ঠা করে তাই শােনবার আগ্রহ, আমার মনে জেগে উঠল। তর্কের মূখে প্রশান্ত অনেক নতুন কথা বলত। তাই আমি বন্ধুম- -দেখাে প্রশান্ত, রসিকতাকে যে সত্য কথা মনে করে রসজ্ঞান তারও নেই।” পিঠ পিঠ জবাব এলাে— সত্য কথাকে যে রসিকতা মনে করে সত্যজ্ঞান তারও নেই।” -“মানলুম। তারপর ওর সত্যিটি কোনখানে বুঝিয়ে দাও হে ?”

সবুজ পত্র শ্রাবণ, ১৩৫ —«খীরবলের কথাটা একবার উল্টে নেওয়া যাক। তাহলে দাড়ায় এই যে—“ছােট গল্প হচ্ছে সেই পদার্থ, যা প্রথমত ছােট নয়, দ্বিতীয়ত গল্প নয়। তা যদি হয় ত, Kant-এর শুদ্ধ বুদ্ধির সুবিচারও ছােট গল্প।” এ কথা শুনে আমরা অবশ্য হেসে উঠলুম, কিন্তু সুপ্রসন্ন আরও অপ্রসন্ন হয়ে বললেন-“তােমার যে রকম বুদ্ধি তাতে তোমার বাংলা লেখক হওয়া উচিত। Nonsense-কে উল্টে নিলেই যে তা Sense হয় এ তত্ত্ব কোন্ লজিকে পেয়েছে, গ্রীক না জাৰ্ম্মাণ ? ছােট শব্দের নিজের কোনও অর্থ নেই, ও হচ্ছে একটা আপেক্ষিক শব্দ, অন্য কিছুর সঙ্গে মেপে না নিলে ওর মানে পাওয়া যায় না।” —“তাহলে War and Peace-এর চেহারা চোখের সুমুখে রাখলে Anna Karenina-কে ছোট গল্প বলতে হবে। আর রাজসিংহের পাশে বসিয়ে দিলেই বিষবৃক্ষ ছােট গল্প হয়ে যাবে। একই কথার যে আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা মানে হয়, এইটে ভুলে গেলেই মানুষের মাথা ঘুলিয়ে যায়। গণিতে “ছোট” শব্দ relative ও লজিকে Correlative; fax ntfecus ut positive." -“তাহলে তোমার মতে ছোট গল্পের ঠিক মাপটা কি ?” -“এক ফৰ্ম্মা। যার দেহ এক ফৰ্ম্মায় আঁটে না, তা বড় গল্প হতে পারে কিন্তু তা ছােট গল্প নয়।” -“তােমার কথা গ্রাহ্য করবার পক্ষে বাধা হচ্ছে এই, যে ফাও সব এক মাপের নয়। ওর ভিতরও আট-পেজি, বারো-পেলি, যােল- পেজি আছে।”

মৰ, চতুর্থ সংখ্যা হােট গল্প —“ছন্দও আট মাত্রার, বারো মাত্রার, ষােল মাত্রার হয়ে থাকে, অতএব যদি বলা যায় যে পদ্য ছন্দের সীমানা টপকে গেলে, তা গদ্য না হতে পারে কিন্তু তা পদ্য হয় না, তাহলে সে কথাও তােমাদের কাছে গ্ৰাহ নয়।” সুপ্রসন্ন তর্কের এ পেচের কাটান হাতের গােড়ায় খুঁজে না পেয়ে বনে- --আচ্ছা তা যেন হল। গল্প, গল্প হওয়া উচিত এ কথা বলে বীরবল কি তীক্ষ-বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। আমরা জানতে চাই গল্প কাকে বলে ?” প্রশান্ত অতি প্রশান্ত ভাবে উত্তর করলেন- -“গল্প হচ্ছে সেই জিনিস যা আমরা করতে জানি নে।” -“শুতে ত জানি?” —“সে বিষয়েও আমার বিশেষ সন্দেহ আছে। তােমরা ভালবাসে শুধু বর্ণনা আর বক্তৃতা, যার ভিতর গল্প ফোটা দূরে যা শুধু চাপা পড়ে যায়। বড় গল্পের তোড়া বাঁধতে হলে হয়ত তার ভিতর দেদার পাতা পুরে দিতে হয়। কিন্তু ছােট গল্প হওয়া উচিত ঠিক একটি ফুলের মত, বর্ণনা ও বক্তৃতার লতাপাতার তার ভিতর স্থান নেই।” —“দেখাে প্রশান্ত, উপমা যুক্তি নয়। যারা উপমা দিয়ে কথা বলে, তাদের কাছ থেকে আমরা বস্তুর কোনও জ্ঞানলাভ করি নে, লাভ করি শুধু উপমারই জ্ঞান। তােমার ঐ ফুল পাতা রাখখা, এখন বল দেখি, ছোট গল্পের প্রাণ কি ?” -“টাজেডি।” -“কেন কমেডি নয় কেন?

২৩৮ সবুজ পত্র —“এই কারণে, যে টাজেডি অল্পক্ষণের মধ্যেই হয়ে যায়-যথা, খুন জখম মৃত্যু ইত্যাদি, আর কমেডির অভিনয় ত সারা জীবন ধরেই হচ্ছে।” অমুকুল এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এইবার বললেন-- —“আমার মত ঠিক উল্টো। জীবনের অধিকাংশ মুহুর্তই হচ্ছে কমিক। কিন্তু সেই মুহূর্ত গুলোকেই এক সঙ্গে ঠিক দিলে তবে বােঝা যায় যে ব্যাপারটা আগাগোড়া ট্রাজিক। পৃথিবীতে যা ছােট তাই কমিক আর যা বড় তাই টাজিক।” “জীবনটা টাজিক কি কমিক এ তর্ক উঠলে যে প্রথমে তা কমিক হবে আর শেষটা ট্রাজিক হতেও পারে এ কথা আমি জানতুম। তারপর ঐ ত হচ্ছে সকল দর্শনের আসল সমস্যা। আর কোনও দর্শনই অদ্যাবধি যখন তার মীমাংসা করতে পারে নি তখন আমরা যে হাত হাত তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করব, সে ভরসাও আমার ছিল না। আলােচনা, যুদ্ধ থেকে গল্পে এসে পড়ায় একটু হাঁপছেড়ে বেঁচে ছিলুম, তাই দর্শনের একটা ঘােরতর তর্ক হতে নিষ্কৃতি পাবার জন্য আমি এই বলে উভয় পক্ষের আপোষ মীমাংসা করে দিলুম যে‘টাজি-কমেডিই হচ্ছে ছােট গল্পের প্রাণ। প্রফেসর এতক্ষণ আমাদের তর্কে যােগ দেন নি ; নীরবে একমনে আমাদের কথা শুনছিলেন। অতঃপর তিনি ঈষৎ হাস্য করে বললেন- “প্রশান্তর কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে ছােট গল্প আমারই লেখা উচিত, কেননা আমার মুখে গল্প ছোট হতে বাধ্য। আমার বর্ণনা করবার শক্তি নেই, আর বক্তৃতা করবার প্রবৃত্তি নেই। এই ত গেল প্রথম কথা। তারপর জীবনটাকে আমি টাজেডিও, মনে করি নে, কমেডিও মনে করি নে; কারণ আমার মতে সংসারটা হচ্ছে একসঙ্গে ও 4 ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ছােট গল্প ২৩৯ দুই। ও দুই হচ্ছে একই জিনিসের এ-পিঠ আর ও-পিঠ। এখন আমার নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলতে যাচ্ছি। তােমরা দেখে। প্রথমে তা ছােট হয় কি না, আর দ্বিতীয়ত তা গল্প হয় কি না। এই- টুকু ভরা আমি দিতে পারি যে, তা ছাপূলে আট পেজের কম হবে না, ষােলো পেজেরও বেশি হবে না—বারো পেজের কাছ ঘেঁসেই থাকবে। তবে তা এক ‘সবুজ পত্র ছাড়া আর কোন কাগজ ছাপতে রাজি হবে কি না, বলতে পারি নে। কেননা তার গায়ে ভাষার কোনও পােষাক থাকবে না। ভাষা জিনিসটে যদি আমার ঠোটের গোড়ায় থাকত তাহলে আমি আঁকও কম না, গল্পও লিখতুম না, ওকালতি কতুম। আর তাহলে আমার টাকারও এত টানাটানি হত না। সে যাহােক এখন গল্প শোনাে।” প্রফেসারের কথা। আমি যে বছর B. Sc. পাশ করি সেই বছর পূজোর ছুটিতে বাড়ী গিয়ে জ্বরে পড়ি। সে জ্বর আর দু'তিন মাসের মধ্যে গা থেকে বেমালুম ঝেড়ে ফেলতে পারলুম না। দেখলুম, চণ্ডীদাসের অন্তরের পরিতি বেয়াধির মত, আমার গায়ের জ্বর শুধু “থাকিয়া থাকিয়া জাগিয়া ওঠে জ্বালার নাহিক ওর।” শেষটা স্থির করলুম চেঞ্জে যাব। কোথায়, জানো?—উত্তরবঙ্গে! ম্যালেরিয়ার পিঠস্থানে। এর কারণ তখন বাবা সেখানে ছিলেন, এবং ভাল হাওয়ার চাইতে ভাল খাওয়ার উপর আমার বেশি ভরসা ছিল। এ বিশ্বাস আমার পৈতৃক। বাবার জীবনের প্রধান সখ ছিল আহার। তিনি ওষুধে বিশ্বাস করতেন ২৪১ সবুজ পত্র এবণ, ১৩২৫ কিন্তু পথ্যে বিশ্বাস করতেন না, সুতরাং বাবার আশ্রয় নেওয়াই সঙ্গত মনে করলুম। জানতুম তঁার আশ্রয়ে জ্বর বিষম হলেও সাবু খেতে হবে না। একদিন রাত দুপুরে রাণাঘাট থেকে একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেণে উত্তরাভিমুখে যাত্রা করলুম। মেল ছেড়ে প্যাসেঞ্জার ধরবার একটু কারণ ছিল। একে ডিসেম্বর মাস তার উপর আমার শরীর অসুস্থ তাই এক পাল অপরিচিত লোকের সঙ্গে ঘেষাঘেসি করে অতটা পথ যাবার প্রবৃত্তি হ’ল না। জানতুম যে প্যাসেঞ্জারে গেলে সম্ভবত একটা পূরে। সেকেণ্ড ক্লাস কমপার্টমেন্ট আমার একার ভােগেই আসবে। আর তাও যদি না হয় ত গাড়ীতে যে লম্বা হয়ে শুতে পারব, আর কোনও গার্ড ডাইভার গোছের ইংরেজের সঙ্গে একত্র যে যেতে হবে না, এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলুম। এর একটা আশা ফলেছিল, আর একটা ফলে নি। আমি লম্বা হয়ে শুতে পেরেছিলুম কিন্তু ঘুমতে পাই নি। গাড়ীতে একটা বুড়াে সাহেব ছিল, সে রাত চারটে পৰ্যন্ত অর্থাৎ যতক্ষণ হোঁস ছিল, ততক্ষণ শুধু মদ চালালে। তার দেহের গড়নটা নিতান্ত অদ্ভুত, কোমর থেকে গলা পর্যন্ত ঠিক বােতলের মত। মদ খেয়েই তার শরীরটা বােতলের মত হয়েছে, কিম্বা তার শরীরটা বােতলের মত বলে মদ সে খায়, এ সমস্যার মীমাংসা আমি করতে পারলুম না। যারা দেহের গঠন ও ক্রিয়ার সম্বন্ধ নির্ণয় করে, এProblem-টা তাদের জন্য, অর্থাৎ ফিজিওলজিষ্টদের জন্য রেখে দিলুম। যাক এ সব কথা। আমার সঙ্গে বৃদ্ধটি কোনরূপ অভদ্রতা করে নি, বরং দেখবামাত্রই আমার প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হয়ে, সে ভদ্রলােক এতটা মাখামাখি করবার চেষ্টা করে- ছিল, যে আমি জেগে থেকেও ঘুমিয়ে পড়বার ভাণ করলুম। মাতাল জামি ব, চতুর্থ সংখ্যা ছোট গল্প ২৪১ পূর্বে কখনও এত হাতের গােড়ায়, আর এতক্ষণ ধরে দেখি নি, সুতরাং এই তার খাটি নমুনা কি না বলতে পারি নে। সে ভদ্রলোক পালায় পালায় হাসছিল ও কাদছিল। হাসছিল—বিড় বিড় করে কি বকে, আর কাঁদছিল, পরলােকগত। সহধৰ্ম্মিণীর গুণ কীৰ্ত্তণ করে। সে যাত্রা গাড়ীতে প্রথমেই মানব-জীবনের এই ট্রাজি-কমেডির পরিচয় লাভ করলুম। আমার পক্ষে এই মাতলামির অভিনয়টা কিন্তু ঠিক কমেডি বলে’ বােধ হয় নি। দুর্বল শরীরে শীতের রাত্তিরে রাত্রি-জাগরণটা ঠাট্টার কথা নয়, বিশেষত সে জাগরণের অংশীদার যখন এমন লোক যার সর্বাঙ্গ দিয়ে মদের গন্ধ অবিরাম ছুটছে। মানুষ যখন ব্যারাম থেকে সবে সেরে ওঠে তখন তার সকল ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ হয়, বিশেষত ঘ্রাণেন্দ্রিয়। আমারও তাই হয়েছিল। ফলে জ্বর আসবার মুখে যে রকম গা পাক দেয়, মাথা ঘোরে আমার ঠিক সেই রকম হয়েছিল। ঘ্রাণে যে অন্ধ ভােজনের ফল হয় এ সত্যের সে রাত্তিরে আমি নাকে মুখে প্রমাণ পাই। পরদিন ভােরের বেলায় শীতে হি হি করতে করতে ষ্টীমারে পদ্মা পার হলুম। সারায় গিয়ে এবার যে গাড়ীতে চড়লুম তাতে জনপ্রাণী ছিল না। আগের রাত্তিরের পাপ সেইখানেই বিদেয় হল। মনে মনে বললুম বাঁচলুম। যদিচ বিনা নেশায় মানুষটা কি রকম তা দেখবার ঈষৎ কৌতুহল ছিল। সাদা চোখে হয়ত সে আমার দিকে কটমটিয়ে চাইত। শুনেছি নেশার অনুরাগ খোয়ারিতে রাগে দাড়ায়। সে যাই হােক, গাড়ী চলতে লাগল, কিন্তু সে এমনি ভাবে যে, গমস্থানে পৌছবার অন্য যেন তার কোনও তাড়া নেই। ট্রেণ প্রতি ষ্টেশনে থেমে জিরিয়ে, একপেট জল খেয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীরে সুস্থে ঘর ঘটা করে অগ্রসর হতে লাগল। আমি সাহিত্যিক হ'লে, এই সবুজ পত্র প্রাবণ, ১৩২ ফঁাকে উত্তরবঙ্গের মাঠ-ঘাট, জলবায়ু, গাছপালার একটা লম্বা বর্ণনা লিখতে পারতুম। কিন্তু সত্যিকথা বলতে গেলে, আমার চোখে এ সব কিছুই পড়ে নি; আর যদি পড়ে থাকে ত মনে কিছুই ঢেকে নি, কেননা কি যে দেখেছিলুম তার বিন্দু বিসর্গ কিছুই মনে নেই। মনে এইমাত্র আছে যে, আমি গাড়ীতে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। একটা গােলমাল শুনে জেগে উঠে দেখি, গাড়ী হিলি ষ্টেশনে পৌচেছে— আর বেলা তখন একটা। চোখ তাকিয়ে দেখি, একদল মুটে হুড়মুড় করে এসে গাড়ীর ভিতর ঢুকে এক রাশ বাক্স ও তোরেঙ্গে ঘর ছেয়ে ফেলে। সেই সব বাক্স ও তোরঙ্গের উপর বড় বড় কালির অক্ষরে লেখা ছিল Mr. A. Dav. দেখে আমার প্রাণে ভয় ঢুকে গেল, এই মনে করে, যে রাটে ত একটা সাহেবে জ্বালিয়েছে দিনটা হয়ত আর একটা সাহেবে জ্বালাবে, সম্ভবত বেশিই জ্বালাবে, কেননা আগন্তুক যে সরকারি সাহেব তার সাক্ষী, তার চারাশ ধারী পেয়দা, সুমুখেই হাজির ছিল। আমি ভয়ে ভয়ে বেঞ্চির এক কোণে জড়সড় হয়ে বসলুম। স্বীকার করছি আমি বীরপুরুষ নই। অতপর যিনি কামরায় প্রবেশ করলেন তাকে দেখে আমি ভীত হই চকিত হয়ে গেলুম। তার নাম মিষ্টার Day না হয়ে মিষ্টার Night হলেই ঠিক হ’ত। আমরা বাঙালীরা শুনতে পাই মােঙ্গল দ্রাবিড় জাত। কথাটা সম্ভবত ঠিক, কেননা আমাদের অধিকাংশ লোকের চেহারায় মঙ্গোলিয়ানের রঙের বেশ একটু আমেজ আছে। কিন্তু পাকা মাদ্রাজি রঙ শুধু দু'চার জনের মধ্যেই পাওয়া যায়। Mr. - Day সেই দু’চার জনের একজন। আমি কিন্তু তার রঙ দেখে অবাক ১ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ছােট গল্প ২৪৩ হই নি, চেহারা দেখে চমকে গিয়েছিলুম। এ দেশে ঢের শ্যামবর্ণ লোক আছে যারা অতি সুপুরুষ, কিন্তু এই হ্যাটকোট ধারী যে কোন জাতীয় জীব তা বলা কঠিন। মানুষের সঙ্গে ভাটার যে কতটা সাদৃত থাকতে পারে ইতিপূর্বে তার ঢাক্ষুস পরিচয় কখনই পাই নি। সেই দৈর্ঘ্য প্রস্থে প্রায় সমান লােকটির, গা হাত পা মাথা চোখ গাল সবই ছিল গোলাকার। তারপর তার সর্বাঙ্গ তঁার কোট পেন্টালুনের ভিতর দিয়ে ফেটে বেরুচ্ছিল। কোট পেন্টালুন, কাপড়ের,—তার দেহ যে তঁার চামড়া ফেটে বেরয় নি, এই আশ্চর্য্য। তাকে দেখে আমার শুধু কোলাবেঙের কথা মনে পড়তে লাগল, আর আমি হা করে তাঁর দিকে চেয়ে রইলুম। যা অসামান্য তাই মানুষের চোখকে টানে, তা সে সু-রূপই হােক আর কু-রূপই হােক। একটু পরেই আম’র হেঁস হল, যে ব্যবহারটা আমার পক্ষে অভদ্রতা হচ্ছে। অমনি আমি তার সুগােল নিটোল বপু থেকে চোখ তুলে নিয়ে অন্য দিকে চাইলুম। অন্ধকারের পর আলাে দেখলে লােকের মন যেমন এক নিমিষে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, আমারও ঠিক তাই হল। এবার যা চোখে পড়ল, তা সত্য সত্যই আলাে—সে রূপ, আলাের মতই উজ্জ্বল, আলাের মতই প্রসন্ন। Mr. Day-র সঙ্গে দুটি কিশােরীও যে গাড়ীতে উঠেছিলেন, প্রথমে তা লক্ষ্য করি নি। এখন দেখলুম তার একটি Mr. Day-র ঈষৎ সংক্ষিপ্ত শাড়ী বাঁধাই সংস্করণ। এর বেশি আর কিছু বলতে চাইনে। Weismann যাই বলুন বাপের রূপ সন্তানে বর্তায়, তা সে-রূপ সােপাজ্জিতই হােক আর অম্বয়াগতই থােক। অপরটির রূপ বর্ণনা করা আমার পক্ষে অসাধ্য ; কেননা আমি পূর্বেই বলেছি যে, আমার চোখে ও মনে সেই মুহূর্তে যা চিরদিনের মত ছেপে গেল, সে হচ্ছে ২৪ সবুজ পত্র শাবণ, ১৩২ একটা আলাের অনুভূতি। এর বেশি আমি আর কিছু বলতে পারি নে। আমি যদি চিরজীবন আঁক না কষে কবিতা লিখতুম, তাহলে হয়ত তার চেহারা কথায় এঁকে তােমাদের চোখের সুমুখে ধরে দিতে পারতুম। আমার মনে হল সে আপাদ-মস্তক বিদ্যুৎ দিয়ে গড়া, তার চোখের কোণ থেকে, তার আঙ্গুলের ডগা দিয়ে, অবিশ্রান্ত বিদ্যুৎ ঠিকরে বেরুচ্ছিল। Leyden Jar-এর সঙ্গে স্ত্রীলােকের তুলনা দেওয়াটা যদি সাহিত্যে চলত, তাহলে ঐ এক কথাতেই আমি সব বুঝিয়ে দিতুম। সাদা কথায় বলতে গেলে, প্রাণের চেহারা তার চোখ-মুখ তার অঙ্গ-ভঙ্গী তার বেশভূষা সকলের ভিতর দিয়ে অবাধে ফুটে বেরচ্ছিল। সেই একদিনের জন্য আমি বিশ্বাস করেছিলুম যে, অধ্যাপক জে, সি, বােসের কথা সত্য,প্রাণ আর বিদ্যুৎ একই পদার্থ। এই উচ্ছ্বাস থেকে তোমরা অনুমান করছ, যে আমি প্রথম দর্শনেই তার ভালবাসায় পড়ে গেলুম। ভালবাসা কাকে বলে তা জানি নে, তবে এই পৰ্যন্ত বলতে পারি, যে সেই মুহুর্তে আমার বুকের ভিতর একটি নূতন জানালা খুলে গেল, আর সেই দ্বার দিয়ে আমি একটা নূতন জগত আবিষ্কার করলুম, যে জগতের আলােয় মােহ আছে, বাতাসে মদ আছে। এই থেকেই আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারবে। আমার বিশ্বাস আমি যদি কৰি হতুম তাহলে তােমরা যাকে ভালবাসা বলো, তা আমার মনে অত শীগগির জন্মাতো না। যারা ছেলেবেলা থেকে কাব্যচর্চা করে তারা ও জিনিসের টীকে নেয়। আমাদের মত চিরজীবন আক-কষা লােকদেরই ও রােগ চট্ করে পেয়ে বসে। মাপ করে, একটু বক্তৃতা করে ফেললুম, তোমাদের কাছে সাফাই হবার জন্য। এখন শােননা তারপর কি হল। .

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ছোট গল্প Mr. Day আমার সঙ্গে কথপােকথন শুরু করে দিলেন এবং সেই ছলে আমার আদ্যোপান্ত পরিচয় নিলেন। মেয়ে দুটি আমাদের কথা- বাৰ্তা অবশ্য শুছিল, স্থূলাঙ্গীটি মনোযােগ সহকারে, আর অপরটি আপাতদৃষ্টিতে অন্যমনস্ক আমি আপাতদৃষ্টিতে বলছি এই কারণে যে, এ আমার এক একটা কথায় তার চোখের হাসি সাড়া দিচ্ছিল। আমার নাম কিশােরীরঞ্জন, এ কথা শুনে বিদ্যুৎ তার চোখের কোণে চিকমিক করতে লাগল, তার ঠোটের উপর লুকোচুরি খেলতে লাগল। স্কুলাঙ্গীটি কিন্তু আসল কাজের কথাগুলো হাঁ করে গিছিল। আমার বাবা যে পাটের কারবার করেন, আমি যে বিশ্ববিদ্যা- লয়ের মার্কামার ছেলে তারপর অবিবাহিত, তারপর জাতিতে কায়স্থ, এ খবর গুলাে বুঝলুম সে তার বুকের নােট বুকে টুকে নিচ্ছে। আমাদের সাংসারিক অবস্থা যে কি রকম, সে কথা জিজ্ঞাসা করবার বােধ হয় Mr. Day-র প্রয়োজন হয় নি। হয়ত তিনি আমার বাবাকে নামে জানতেন, নয়ত তিনি আমার বেশভূষার পারিপাট্য, আসবাবপত্রের আভিজাত্য থেকে অনুমান করতে পেরেছিলেন, যে আমাদের সংসারে আর যে বস্তুরই অভাব থাক—অম্নবস্ত্রের অভাব নেই। সুতরাৎ আমি বাবার এক ছেলে ও ফাষ্ট ডিভিসনে B. Sc. পাশ করেছি, এ সংবাদ পেয়ে তিনি আমার প্রতি হঠাৎ অতিশয় অনুরক্ত হয়ে পড়লেন। আগের রাত্তিরে বুড়াে সাহেবটি যে পরিমাণ হয়েছিলেন তার চাইতে এক চুল কম নয়। মদ মে এ দুনিয়ায় কত রকমের আছে, এ যাত্রায় তার জ্ঞান আমার ক্রমে বেড়ে যেতে লাগল। এর পর তাঁর পরিচয় তিনি নিজে হতেই দিলেন। সে পরিচয় তিনি খুব লম্বা করে দিয়েছিলেন, আমি তা দু’ কথায় বলছি। তিনিও ২৪ শ্রাবণ, ১৩২৫ কায়স্থ, তিনিও B. A. পাশ। এখন তিনি গভর্ণমেন্টের একজন 75 677621-Settlement Officer i কিন্তু যে কথা তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার করে বলেছিলেন, সে হচ্ছে এই যে, তিনি বিলেত- ফেরৎ নন, ব্রাহ্ম ও নন, পাকা হিন্দু; তবে তিনি শিক্ষিত লােক বলে স্ত্রী-শিক্ষায় বিশ্বাস করেন এবং বাল্যবিবাহে বিশ্বাস করেন না। 5781779 fofa reformer 29-reformed Hindui (116867 লেখাপড়া শিখিয়েছেন, জুতো মােজা পরতে শিখিয়েছেন, এবং এই সব শিক্ষা দেবার জন্য বড় করে রেখেছেন, এতদিনও বিবাহ দেন নি। তবে পয়লা নম্বরের পাশকরা ছেলে পেলে এখন মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি আছেন। একথা শুনে আমি তার দিকে চাইলুম, কার দিকে অবশ্য বলবার দরকার নেই। অমনি তার মুখে আলাে ফুটে উঠল, কিন্তু তার ভিতর কি যেন একটা মানে ছিল, যা আমি ঠিক ধরতে পারলুম না। আমার মনে হল সে আলোর অন্তরে ছিল অপার রহস্য, আর অগাধ মায়া। এক কথায়, আরতির আলােতে প্রতিমার চেহারা যে রকম দেখায়—সেই হাসির আলােতে তার চেহারা ঠিক তেমনি দেখাচ্ছিল। শরীর যার রুগ্ন সে পরের মায়া চায় এবং একটুতেই মনে করে অনেকখানি পায়। এই সূত্রে আমি একটা মস্তবড় সত্য আবি- স্কার করে ফেললুম, সে হচ্ছে এই যে, স্ত্রীলােকে বলকে ভক্তি করে কিন্তু ভালবাসে দুলকে। সে যাই হােক, আমি মনে মনে তার গলায় মালা দিলুম, আর তার আকার ইঙ্গিতে বুঝলুম, সেও তার প্রতিদান করলে। এই মানসিক গান্ধর্ব বিবাহকে সামাজিক ব্রাহ্ম বিবাহে পরিণত কবুতে যে বৃথায় কালক্ষেপ করব না, সে বিষয়েও কৃতসংকল্প হলুম। দুটির মধ্যে ৫ম বর্ষ, তুর্থ সংখ্যা ছােট গল্প সুন্দরীটিই যে বয়ঃজ্যেষ্ঠা সে বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ ছিল । যদি জিজ্ঞাসা করে যে, দুই বােনের ভিতর চেহারার প্রভেদ এত বেশি কেন ? তার উত্তর—একটি হয়েছে মায়ের মত আর একটি বাপের মত। এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে অবশ্য আমাকে differential calculus-এর আঁক কষতে হয় নি। আমি ও মিষ্টার দে দুজনেই হলদিবাড়ী নামলুম। দে সাহেবের ঐ ছিল কর্মস্থল এবং বাবাও তার ব্যবসার কি তদ্বিরের জন্য সে সময়ে ঐখানেই উপস্থিত ছিলেন। ষ্টেশনে যখন আমি দে সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছি—তখন সেই সুন্দরীর দিকে চেয়ে দেখি, সে মুখে হাসির রেখা পর্যন্ত নেই। যে চোখ এতক্ষণ বিদ্যুতের মত চঞ্চল ছিল, সে চোখ এখন তারার মত স্থির হয়ে রয়েছে, আর তার ভিতরে কি একটা বিষাদ, একটা নৈরাশ্যের কালো ছায়া পড়েছে। সে দৃষ্টি যখন আমার চোখের উপর পড়ল, তখন আমার মনে হল, তা যেন স্পষ্টাক্ষরে বলে “আমি এ জীবনে তােমাকে আর ভুলতে পারব না; আশা করি তুমিও আমাকে মনে রাখবে।” মানুষের চোখে যে কথা কয় একথা আমি আগে জানতুম । অতঃপর আমি চোখ নীচু করে করে সেখান থেকে চলে এলুম। তারপর যা হ’লশােনন। আমি এ বিয়েতে বাবার মত করালুম। আমি তার একমাত্র ছেলে, তার উপর আবার ভালো ছেলে ; সুতরাং বাবা আমার ইচ্ছা পূর্ণ করতে দ্বিধা করলেন না। প্রস্তাবটা অবশ্য বরের পক্ষ থেকেই উত্থাপন করা হল। উভয় পক্ষের ভিতর মামুলি কথাবার্তা চলল। তারপর আমরা একদিন সেজেগুজে মেয়ে দেখতে . শবু পত্র এবণ, ১৩৫ গেলুম। মেয়ে আমি আগে দেখলেও বাবা ত দেখেন নি। তা ছাড়া রীত রক্ষে বলেও ত একটা জিনিস আছে। দে সাহেবের বাড়ীতে আমরা উপস্থিত হবার পর, খানিকক্ষণ বাদেই একটি মেয়েকে সাজিয়ে গুলিয়ে আমাদের মুখে এনে হাজির করা হল। সে এসে দাড়াবামাত্র আমার চোখে বিদ্যুতের আলো নয় বুকে বিদ্যুতের ধাক্কা লাগল। এ সে নয়-অটি। সাজগােজের ভিতর তার কদৰ্যতা জোর করে ঠেলে বেরিয়েছিল। আমি যদি তার সেদিনকার মুর্তির বর্ণনা করি, তাহলে নিষ্ঠুর কথা বলব। তার কথা তাই থাক। আমি এ ধাক্কায় এতটা স্তম্ভিত হয়ে গেলুম যে, কাঠের পুতুলের মত অবাক হয়ে দাড়িয়ে রইলুম। পর্দার আড়াল থেকে পাশের ঘরে একটি মেয়ে বােধহয় আমার ঐ অবস্থা দেখে খিল খিল করে হেসে উঠল। আমার বুঝতে বাকী রইল না—সে হাসি কার। আমি যদি কবি হতুম—তাহলে সেই মুহূর্তে বলতুম “ধরণী দ্বিধা হও আমি তােমার মধ্যে প্রবেশ করি।” ব্যাপার কি হয়েছিল জানো, যে মেয়েটিকে আমাকে দেখানাে হয়েছিল, সে হচ্ছে দে-সাহেবের অবিবাহিতা কন্যা আর যাকে পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছিল সে হচ্ছে দে বাহাদুরের বিবাহিতা স্ত্রী, অবশ্য দ্বিতীয় পক্ষের। বলা বাহুল্য আমি এ বিবাহ করতে কিছুতেই রাজি হলুম না, যদিচ বাবা বিরক্ত হলেন, দে-সাহেব রাগ করলেন, আর দেশশুদ্ধ লােক আমার নিন্দা করতে লাগল। এ ঘটনার হপ্তা খানেক বাদে ডাকে একখানি চিঠি পেলুম। লেখা স্ত্রী-হস্তের। সে চিঠি এই ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ছোট গল্প ৪৯ “যদি আমার প্রতি তােমার কোনরূপ মায়া থাকে, তাহলে তুমি ঐ বিবাহ করো, নচেৎ এ পরিবারে আমার তেষ্টানাে ভার হবে। কিশােরী এ চিঠি পেয়ে আমার সংকল্প ক্ষণিকের জন্য টলেছিল ; কিন্তু ভেবে দেখলুম ও কাজ করা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কেননা দুজনেই এক ঘরের লােক এবং দুজনের সঙ্গেই আমার সম্বন্ধ রাখতে হবে এবং সে দুই মিথ্যাভাবে। নিজের মন যাচিয়ে বুঝলুম, চিরজীবন এ অভিনয় করা আমার পক্ষে অসাধ্য। এই হচ্ছে আমার গল্প--এখন তােমরা স্থির কর যে, এ ট্রাজেডি, কি কমেডি, কিম্বা এক সঙ্গে ও দুই। . প্রফেসর এই বলে থামলে, অনুকুল হেসে বললে- —“অবশ্য কমেডি। ইংরাজিতে যাকে বলে Comedy of Errors.” প্রশান্ত গম্ভীর ভাবে বললেন- —“মােটেই নয়, এ শুধু ট্রাজেডি নয় একেবারে চতুরঙ্গ ট্রাজেডি।” ঐ চতুরঙ্গ বিশেষণের সার্থকতা কি প্রশ্ন করাতে তিনি উত্তর করলেন, “স্ত্রী কিশােরী আর প্রোফেসার কিশােরী এই দুই কিশােরীর পক্ষে ব্যাপারটা যে কি ট্রাজিক তা ত সকলেই বুঝতে পারছ। আর এটা বােঝাও শক্ত নয়, যে দে-সাহেবের মনের শান্তিও চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে গেল, আর তার মেয়ের হয় আর বিয়ে হল না, নয় কোনও বাঁদরের সঙ্গে হল।” প্রফেসর এর জবাবে বললেন, “শ্রীমতীর জন্য দুঃখ করবার সবুজ পত্র শাবণ, ১৩২৫ কিছু নেই, তার আমার চাইতে ঢের ভাল বরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তার স্বামী এখন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট, আর সে আমার দ্বিগুণ মাইনে পায়। কথাটা হয় ত তােমরা বিশ্বাস করছ না কিন্তু ঘটনা তাই। দে বাহাদুর দশ হাজার টাকা পণ দিয়ে একটি M. A.-এর সঙ্গে তার বিবাহ দেন, তার পরে সাহেব সুবােকে ধরে, তাকে ডেপুটি করে দেন। আমার সঙ্গে বিয়ে হলে তাকে খালি পায়ে বেড়াতে হত, এখন সে দু’বেলা জুতো মােজা পরছে। তার পর বলা বাহুল্য, যে দে-বাহাদুরের যে রকম আকৃতি প্রকৃতি, তাতে করে তিনি ট্রাজেডি দূরে থাক কোনও কমেডিরও নায়ক হতে পারেন না, তার যথার্থ স্থান হচ্ছে প্রহসনের মধ্যে।” —“আচ্ছ। তা হলে তােমাদের দুজনের পক্ষে ত ঘটনাটা ট্রাজিক ?” —“কি করে জানলে? অপর কিশােরীর বিষয় ত তুমি কিছুই জানো না, আর আমার মনের খবরই বা তুমি কি রাখাে?” “আচ্ছা ধরে নিচ্ছি যে, অপরটির পক্ষে ব্যাপারটা হয়েছে comedy, খুব সম্ভবত তাই—কেননা তা নইলে তোমার দুর্দশা দেখে সে খিল খিল করে হেসে উঠবে কেন ? কিন্তু তােমার পক্ষে যে এটা টাজেডি, তার প্রমাণ, তুমি অদ্যাবধি বিবাহ করো নি।” —“বিবাহ করা আর না করা, এ দুটোর মধ্যে কোনটা বড় ট্রাজেডি ত। যখন জানিনে, তখন ধরে নেওয়া যাক-করাটাই হচ্ছে comedy. যদিচ বিবাহটা কমেডির শেষ অঙ্ক বলেই নাটকে প্রসিদ্ধ। সে যাই হােক আমি যে বিয়ে করি নি তার কারণ—টাকার অভাব। “বটে! তুমি যে মাইনে পাও তাতে আর দশজন ছেলে পিলে নিয়ে ত দিব্যি ঘর সংসার করছে।”

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা ছােট গল্প “তা ঠিক। আমার পক্ষে তা করা কেন সম্ভব নয়, তা বলছি। বছর কয়েক আগে বোধ হয় জানাে, যে, পাটের কারবারে একটা বড় গোছের মার খেয়ে বাবার ধন ও প্রাণ দুই এক সঙ্গে যায়। ফলে আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ি। তারপর এই চাকরিতে ঢুকে মা’র অনুরােধে বিয়ে করতে রাজি হলুম। ব্যাপারটা অনেক দূর এগিয়ে এসেছিল, আমি অবশ্য মেয়ে দেখি নি কিন্তু পাকা দেখাও হয়ে গিয়েছিল। এমন সময়ে আবার এক খানি চিঠি পেলুম, লেখা সেই স্ত্রী হস্তের। সে চিঠির মােদ্দা কথা এই যে, লেখিকা বিধবা হয়েছেন এবং সেই সঙ্গে কপর্দক শূন্য। দে সাহেব তার উইলে তার স্ত্রীকে এক কড়াও দিয়ে যান নি। তাঁর চিরজীবনের সঞ্চিত ঘুষের টাকা তিনি তার কন্যারত্নকে দিয়ে গিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে খোরপোষের মামলা করা কর্তব্য কি না, সে বিষয়ে তিনি আমার পরামর্শ চেয়ে ছিলেন। আমি প্রত্যুত্তরে মামলা করা থেকে নিবৃত্ত করে, সংসারের ভার নিজের ঘাড়ে নিয়েছি। ভেবে দেখো দেখি, যে গল্পটা তােমাদের বললুম, সেটা আদালতে কি বি আকারে দেখা দিত। বলা বাহুল্য, এর পর আমার বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙ্গে দিলুম, মা বিরক্ত হলেন, কন্যা পক্ষ রাগ করলেন, 'দেশশুদ্ধ লােক নিন্দে করতে লাগল কিন্তু আমি তাতে টলুম না। কেননা দু’সংসার চালাবার মত রােজ- গার আমার নেই। —“দেখো তুমি অদ্ভুত কথা বলছ, একটি হিন্দু বিধবার আর কি লাগে, মাসে দশ টাকা হলেই ত চলে যায়, তা আর তুমি দিতে পারে না ? “যদি দশ টাকায় হতাে তাহলে আমি পাকা দেখার পর বিয়ে

সবুজ পত্র
এব, ১৩২৫
ভেঙ্গে দিয়ে সমাজে দুর্ণামেরভাগী হতুম না। সে একা নয়, তার বাপ
মা আছে, তারা যে হতদরিদ্র তা বোধ হয়, তাদের দে-সাহেবকে
কন্যাদান থেকেই বুঝতে পারে। তারপর আমি যে ঘটনার উল্লেখ
করেছি তার সাত মাস পরে তার যে কন্যাসন্তান হয় সে এখন বড় হয়ে
উঠছে। এই সবকটির অম্নবন্ত্রের সংস্থান আমাকেই করতে হয়, আর
তা অবশ্য দশ টাকায় হয় না।”
অনুকূল
জিজ্ঞাসা করলেন,--
-“তার রূপ আজও কি আলোর মত জ্বলছে ?”
“বলতে পারি নে, কেননা তার সঙ্গে সেই ট্রেণে ছাড়া আমার
আর সাক্ষাৎ হয় নি।
-“কি বলছ, তুমি তার গােনাগুষ্ঠি খাইয়ে পরিয়ে রাখছ আর সে
তােমার সঙ্গে একবারও সাক্ষাৎ করে নি ?"
—“একবার কেন, বহুবার সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিল কিন্তু আমি
করি নি।”
অনুকূল হেসে বললে, “পাছে ‘নেশার অনুরাগ খোয়ারির রাগে
পরিণত হয় এই ভয়ে বুঝি?”
–“না তার কন্যাটি পাছে তার দিদির মত দেখতে হয় এই ভয়ে।”
শেষে আমি বললুম, “প্রফেসার তােমার গল্প উৎরেছে। তুমি
করতে চাইলে বিয়ে তা হ’ল না, কিন্তু বিয়ের দায়টা পড়ল তােমার
ঘাড়ে। এ ব্যাপার যদি টাজি-কমেডি না হয়, ত ট্রাজি-কমেডি কাকে
বলে তা আমি জানি নে”।
সুপ্রসন্ন বলে-

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা
ছােট গল্প
-“তা হতে পারে, কিন্তু এ গল্প ছােট গল্প হয় নি, কেননা, এতক্ষণে
ষোলপেজ পেরিয়ে গেল।”
প্রশান্ত অমনি বলে উঠল যে-
“তা যদি হয়ে থাকে ত সে প্রফেসারের গল্প বলার দোষে নয়-
তােমাদের জেরা আর সওয়াল জবাবের গুণে।”
প্রফেসর হেসে বললেন—“প্রশান্ত যা বলছে তা ঠিক, শুধু
“তোমাদের” বদলে “আমাদের ব্যবহার করলে তার বক্তব্যটা ব্যাকরণ
।
শুদ্ধ হত।
প্রমথ চৌধুরী।
১, ৪

“এত্তো বড়” কিম্বা “কিছু নয়”। আমার একটি আড়াই বছরের ভ্রাতুস্পুত্র আছেন যার নাম, “ছােট- কালী বাবু।” তিনি যে লােককে চেনেন না, তাকে বলেন—“কেউ নয়,” আর যে জিনিষ জানেন না তাকে বলেন-“কিছু নয়।” যখন শুনি, আমাদের পলিটিক্সের একদল বলছেন, Reform-scheme "75 নয়,” তখন আমার ছােট কালী বাবুর কথা মনে পড়ে যায়। আমর ভ্রাতুস্পুত্রটির আর একটি গুণ আছে। কোন জিনিষ তার হাতে এলে, তিনি বুক ফুলিয়ে এবং গলা মােটা করে বলেন, “এত্তো বড়”—তা সে বস্তু যতই ছােট হােক। যখন শুনি আমাদের পলি- টিক্সের আর এক দল বলছেন, Reform-scheme, “এত্তো বড়, তখনও আমার ছােট কালী বাবুর কথা মনে পড়ে। পলিটিক্সের জগতে, আমরা আজও সাবালক হই নি, কিন্তু তাই বলে আমাদের পলিটিক্সের বড়বাবুরা যে সব ছােট কালী বাবু এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। সুতরাং এদের এই সব মৎফরকা মত প্রকাশের নিশ্চয়ই অপর কারণ আছে।

৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা টীকা-টিপ্পনি ( ৪ ) সে কারণ হচ্ছে। যুদ্ধজ্বর।” Reformsclheme-ও বার হ’ল আর সঙ্গে সঙ্গে দেশে যুদ্ধজ্বরও এসে পড়ল। এ জ্বরে ধরলে মানুষে বেহেস হয়। সুতরাং এই জ্বরের প্রকোপে উক্ত Scheme সম্বন্ধে যা বলা কওয়া হয়েছে, তা ধৰ্তব্যের মধ্যেই নয়। কেন না সে সময়ে বক্তাদের কারও মাথার ঠিক ছিল না। ( ৫ ) এ জ্বর যে আমাদের পলিটিসিয়ানদের গায়েই বেশি করে ফুটে উঠে ছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে,-Bengal Provincial Conference-এর সেদিনকার অধিবেশনে। সে সভার temperature সেদিন দেখতে দেখতে ১০৫ ডিগ্রীর উপরে উঠে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সে ক্ষেত্রে কারও কারও জ্বর যে বিকারে গিয়ে দাড়িয়েছিল তার পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের বক্তৃতায়। শুনতে পাই এদেশের জনৈক অতি-বক্তা নাকি বলেছিলেন, যে“স্বরাজ” তিনি President Wilson- এর কাছে চেয়ে নেবেন। এ রকম প্রলাপ অবশ্য বাংলা দেশে কেউ সজ্ঞানে বকতে পারে না, কেননা বাঙালীতে ও কাঙালীতে কিঞ্চিৎ প্রভেদ আছে। ৫ ( ৬ ) এই যুদ্ধজয়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পাচ্ছি দু-দলেরই মাথা অনেকটা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। যারা আগে বলেছিলেন কিছু নয়, তারা এখন বলছেন, না, কিছু বটে', আর যারা আগে বলেছিলেন সবুজ পত্র শ্রাবণ, ১৩২৫ ‘এত্তো বড়, তারা এখন বলছেন—‘ন ত্যাত্তো বড় নয়। এখন যদি উভয় পক্ষ একত্র হয়ে এ বিষয়ে হিসাব মােকাবিলা করেন, ত আমার বিশ্বাস উভয় পক্ষই দেখতে পাবেন যে তাদের পরস্পরের মধ্যে বিশেষ কোনও গরমিল নেই। সুতরাং বামমার্গ এবং দক্ষিণ মার্গের পলিটি- সিয়ানদের নিকট আমাদের সানুনয় অনুরোধ এই যে, তারা এই ফাঁকে তাদের আড়াআড়ির তাড়াতাড়ি একটা আপােষ মীমাংসা করে নি। এ সুযােগ কোন পক্ষেরই হারানো উচিত নয়, কেননা যুদ্ধ-জ্বরের আবার relapse হয় এবং তা হলে, ব্যাপার হয়ে ওঠে একেবারে মারাত্মক। ( ৭ ) কিন্তু আমাদের এ প্রার্থনায় কোন পক্ষ যে কর্ণপাত করবেন, সে বিষয়ে বড় একটা ভরসা নেই। এরা বলবেন, পলিটিক্স শুধু হিসেব নিকেশের কথা নয়, ও হচ্ছে আসলে হৃদয়ের কথা। যাদের মধ্যে বুকের মিল নেই, তাদের মধ্যে মুখের মিল কদিন থাকবে? ( ৮ ) হৃদয়ের দোহাই দিলে এ দেশে নির্বুদ্ধিতার সাতখুন মাপ। হৃদয়টা আমাদের দেশে “এত্তো বড়” জিনিষ যার মাথা নেই তার মাথা- ব্যথার কথা শুনলে আমরা অবশ্য হাসি কিন্তু যার বুক নেই তার বুকের ব্যাথার কথা শুনলে আমরা কাদি। এই আমাদের স্বভাব, আর এই জন্যেই ত এদেশে কোনও কাজের কথা বলা এত কঠিন। হৃদয় পদার্থটা অবশ্য খুব ভাল জিনিষ ; এবং উদরের চাইতে ঢের উঁচুদরের জিনিষ এবং উদর যে অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে মস্তক বলে পরিচয় দিতে চায়, তাও অস্বীকার করবার যাে নেই। কিন্তু মস্তকের সঙ্গে হৃদয়ের একটা ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা টীকা-টিপ্পনি २०१ মস্তপ্রভেদ আছে। মানুষের মাথায় দুটো চোখ আছে, বুকে একটাও নেই। হৃদয় অন্ধ, অতএব যে যত অন্ধ সে যে তত হৃদয়বান এই হচ্ছে লোক- মত। এ মতের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা, কেননা সে তর্ক লোকে কানে তুলবে না। এ কথা কে না জানে যে, “বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর। ( 9 ) তবে কৃষ্ণ-প্রাপ্তি ও স্বরাজ-প্রাপ্তির উপায় এক কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবসর অাছে। তারপর পলিটিক্সে আমরা যাকে হৃদয়- বেগ বলি, সে চাঞ্চল্যের মূল হৃদয়ে কি মস্তকে তাও ঠিক জানা নেই। আমরা যে আজ তিনপুরুষ ধরে পলিটিক্সের বিলিতি মদ্য পান করে আছি সে কথা ত আর অস্বীকার করা চলে না। সুতরাং আমাদের এই পলিটিকাল ছটফটানির মূলে হৃদয়ের লালরক্তই বা কতখানি আছে আর বিলাতের লালপানীই বা কতখানি আছে, অর্থাৎ বুকের ব্যাথাই বা কতখানি আছে, আর বইয়ের কথাই বা কতখানি আছে তা কে জোর করে বলতে পারে ? (১০) তন্ত্রশাস্ত্রে বলে,—“নাভিষেকাৎ বিনা কোলঃ কেবলং মদ্য সেবনা” এ কথা যে রাজতন্ত্র সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সত্য, সে বিষয়ে অবশ্য কোনই সন্দেহ নেই। এতকাল আমরা বিলাতি পলিটিক্সের শুধু মদ্যপান করে এসেছি এইবার Reform-scheme-এর প্রসাদে সে পলিটিক্সে অামরা অভিষিক্ত হব। এ শুধু যথালাভ নয়- মহালাভ। এর কারণ, এ তন্ত্রে ২৫৮ সবুজ পত্র শাবণ, ১৩২৫ অভিষেকের আমাদের পক্ষে প্রয়োজন আছে। পেটিয়টিজম ধৰ্ম হতে পারে, কিন্তু পলিটিক্স হচ্ছে কর্ম, এবং অপরাপর কর্মের ন্যায় এ কর্মেও কৃতীত্ব লাভ করবার জন্য কিঞ্চিৎ শিক্ষা দীক্ষার দরকার। তা ছাড়া ডিমােক্রাসি স্বদেশী মাল নয়—আহেল বিলাতি জিনিস, এবং এ বস্তুর এতদিন আমরা শুধু কাগজে কলমে চর্চা করে এসেছি—এখন হাতে কলমে চর্চা করবার দিন এসেছে। ( ১১ ) এই অভিষেক কথাটাই ত যত গােল বাধিয়েছে। বামাচারী ও দক্ষিণচারীদের যত মারামারি সে সবই ত এ Scheme-য়ে ঐ বস্তুর অস্তি নাস্তি নিয়ে। কিন্তু এ নিয়ে অতি তুষ্ট কিম্বা অতি রুষ্ট হবার কোনও কারণ ত আমি দেখতে পাই নে। অতিতুষ্ট দলকে জিজ্ঞাসা করি, তারা কি মনে ভাবছেন যে, এই Scheme-এর প্রসাদে তারা , অর্ধেক রাজ্য ও রাজকন্যা লাভ করেছেন? আর অতিরুষ্ট দলকে জিজ্ঞাসা করি, তারা কি মনে ভেবেছিলেন যে, ইংরাজ-রাজ, এই সুযােগে ভারতবাসীকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করে, একছুটে “বাণপ্রস্থ” অবলম্বন করবেন ? (১২) যারা রূপকথার রাজ্যে কিম্বা পৌরাণিক যুগে বাস করে না, তাদের বক্তব্য এই যে, Reform-scheme, আকাশের চাদও নয় দিল্লীর লাড্ডও নয়, কিন্তু এমন জিনিষ যার সাহায্যে আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবন গড়ে তােলবার সুযােগ পাব। ভুলে, গেলে চল্‌বে না, যে স্বরাজ যখন আমরা উত্তরাধিকারীসতে লাভ ৫ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা টীকা-টিপ্পনি। করি নি, তখন তা আমাদের অর্জন করতে হবে। এবং এ অর্জন সাধনা অতএব সময়সাপেক্ষ। ( ১৩ ) সে যাই হােক এই Reform-Scheme-এর দৌলতে আর কিছু হােক আমরা অন্তত একটা বিদ্যে শিখব। এই যুদ্ধের কৃপায় আমরা যেমন জিওগ্রাফি শিখেছি, এই Reform-এর কৃপায় আমরা তেমনি Constitutional Law শিখুব। তারপর যুদ্ধের ফলে আমাদের ঘরে ঘরে যেমন সব বড় বড় general তৈরি হয়ে উঠেছে, এই Reform-এর ফলে ঘরে ঘরে সব বড় বড় constitution builders তৈরি হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই উকিলের আপিসে ও Bar Library তে দু’চার জন “এত্তো বড়” constitution builder দেখা দিয়েছেন। জাতির পক্ষে এটা কি একটা কম লাভ! অতএব “এতো বড় কথাটা কিছুতেই বলা যায় না যে Reforn-schenme—“কিছু নয়”। বীরবল।

ছােট কালীবাবু।
( তেপাটি ) *
লােকে বলে আঁকা ছেলে ছােট কালীবাবু,
অপিচ বয়েস তার আড়াই বছর।
কেঁচা ধরে চলে যবে সেজে ফুলবাবু,
লােকে বলে বাঁকা ছেলে ছােট কালীবাবু।
ব্যামাে হলে ব্রাণ্ডি খায়, খায় নাকো সাবু,
সুরে গায় তালে নাচে, হাসে চরাচর,
লােকে বলে পাকা ছেলে ছােট কালীবাবু,
যদি বয়েস তার আড়াই বছর।
শ্ৰীপ্রমথ চৌধুরী।
ফরাসী কবিতা Triolet-এর ছাঁচে ঢালাই করে আমি এক সময়ে গুটি
ছয়েক পন্থ রচনা করি এবং তার নাম দিই তেপাটি। সে সকল তেপাটিতে
Triolet-এর ঠিক গড়নটি বজায় রাখতে পারি নি। হাত দুই জমির ভিতর
কুঁচিমােড়া ভাঙ্গা যে কি কঠিন ব্যাপার, তা যিনি কখনাে কসরৎ করেছেন তিনিই
জানেন। তেপাটি লেখাও হচ্ছে লেখনীর একটা কসরৎ। Triolet অষ্টপদী
কবিতা। এই আট পদের ভিতর, প্রথম পদটি ধুয়ে হিসেবে আর দু’বার, আর
দ্বিতীয় পদটি আর একবার দেখা দেয়। তা ছাড়া এ পদ্যের ভিতর শুধু একজোড়া
মিল আছে। প্রথম তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম আর সপ্তম পদ একসঙ্গে মেলে; বাকী
তিন পদ একসঙ্গে মেলে। বলা বাহুল্য এ কবিতার ভাব ভাষা দুই নেহাৎ হাল্কা
হওয়া চাই।

ভাদ্র, ১৩২৫
সবুজ পত্র
সম্পাদক
প্রমথ চৌধুরী
বার্ষিক মূল্য দুই টাকা হয় আনা।
সবুজ পত্ৰ কাৰ্যালয়, ৩ নং হেসে জাট,
কলিকাল।

কলিকাতা।
৩ নং হেষ্টিল ৮ট।
প্রমথ চৌধুরী এম, এ, যার-ম্যাট-ল কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা।
উইফুলী নােটস প্রিন্টিং ওয়ার্ক
৩ নং হেষ্টিংস টি।
সারদা প্রসাদ গাস আর মুদ্রিত।

পত্র। শ্ৰীমান চিরকিশাের কল্যাণীয়েষু। তােমার চিঠির জবাব অনেক দিন হ’ল লিখে রেখেছি, কিন্তু কতক- গুলি দৈব-ঘটনার ধাক্কায় এতদূর অব্যবস্থিত চিত্ত হয়ে পড়েছিলুম যে, এতদিন সে জবাব তােমাকে পাঠাতে পারি নি। ব্যাপার যা ঘটেছিল বলছি। প্রথমে আবিভূত হ’ল—Reform Scheme, তার পিঠ পিঠ এল—ভূমিকম্প,তারপর দু'দিন না যেতেই ঘাড়েপড়ল—যুদ্ধজর,তার- পর দেখা দিল অকাল-নিদাঘ। এ জ্বরে যে আমি শয্যাশায়ী হয়ে ছিলুম, সে কথা বলাই বাহুল্য। যে বিপদ দেশশুদ্ধ লােক মাথা পেতে নিয়েছে, আমি যে তা আমার দেহকে স্পর্শ করতে দেব না, আমার প্রকৃতি ততটা অসামাজিক নয়। এই যুদ্ধজরে ছুঁলে মানুষের যে মাথা ঘুলিয়ে যায়, সেকথা ভুক্তভােগী মাত্রেই জানেন। এর উপর যদি আবার এই সব আকস্মিক উপদ্রবের কাৰ্য-কারণ ও ফলাফল নিয়ে ঘরে বাইরে ঘাের ও ভাের তর্ক করতে হয়, তাহলে মানুষের মাথার অবস্থা যে কি রকম হয় তা সহজেই বুঝতে পারে। ও অব- স্থায় চিঠি ডাকে দেওয়া প্রভৃতি ছােটখাটো সামাজিক কর্তব্যগুলি ব্যক্তিবিশেষ যদি মাসাবধি কাল উপেক্ষা করে, তাহলে তার বড় একটা দোষ দেওয়া যায় না।

২৬ সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ আমরা এই মাসখানেক ধরে’ কি কি বিষয় নিয়ে কোন কোন তর্ক করেছি, সংক্ষেপে তার পরিচয় দিচ্ছি। এই আষাঢ়ে গ্রীষ্ম ভূঁইফুড়ে উঠেছে কিনা, অর্থাৎ তা ভুমিকম্পের ফল কিনা, অথবা দেশের এতটা গা গরম হবার কারণ এই কিনা যে, আমাদের মাতৃভূমির গায়েও যুদ্ধজর হয়েছে, তারপর ভূমিকম্পটা জ্বর আসবার আগে পৃথিবীর দেহের কাঁপুনি মাত্র, না আর কিছু, এই সব গুরুতর সমস্যা নিয়ে আমার চারপাশে দিনের পর দিন রাতের পর রাত নানারূপ বৈজ্ঞানিক, অ-বৈজ্ঞানিক এবং অতি-বৈজ্ঞানিক আলােচনা চলেছে। এবং আমাকে তাতে বরাবর যােগদান করতে হয়েছে। এ সকল বিষয়ে নীরব থাকলে আমি যে স্বদেশ ও জাতির ভাল মন্দ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন, সে বিষয়ে অবশ্য কারও মনে আর কোনও সন্দেহ থাকত না। তর্কে অবশ্য এ সকল সমস্যার কোনও কালে মীমাংসা হয় না, এবং হ'তে পারে না। অতএব এবং অতঃপর তােটে স্থির হয়ে গেল, যে Reform Scheme-এর জন্ম হচ্ছে এই সব নৈসর্গিক এবং অনৈসর্গিক উৎপাতের কারণ। বৌদ্ধশাস্ত্রে পড়েছ ত যে, বুদ্ধদেবের জন্মের সময় জম্বুদ্বীপে কি প্রলয় ব্যাপার ঘটেছিল, দেখতে না দেখৃতে সব পর্বত হয়ে গিয়েছিল হ্রদ আর সব হ্রদ হয়ে গিয়েছিল পর্বত। অত এব সর্বজনসম্মতিক্রমে দাড়াল এই যে, এই অকাল-নিদাঘের কারণ যুদ্ধজর—এই যুদ্ধজ্বরের কারণ ভূমিকম্প এবং এই ভূমিকম্পের কারণ Reform Scheme, কেননা ঐ Scheme সম্বন্ধে বাসুকী অসম্মতিসূচক মাথা নেড়েছেন। এর কারণও স্পষ্ট, “শেষ” যে Extremist, সে কথা যে কোনও অভিধানে যাচিয়ে নিতে পারো।

ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা সে যাইহােক, এই Reform Scheme-এর স্পর্শে আমাদের মনের দেশে যে একটা বেজায় ভূমিকম্প হয়েছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এর ফলে আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা প্রকাণ্ড ফাট ধরেছে এবং তার ভিতর দিয়ে বেরচ্ছে এখন অনর্গল ধােয়া। আমার জনৈক রাসায়নিক বন্ধু বলেন, সে ধোয়া Poisonous gas ! যে ধোঁয়ায় আমাদের দেশ আজ ছেয়ে ফেলেছে, তা বিষাক্ত হােক আর না হােক, তা যে আমাদের চোখে ঢুকেছে তার আর সন্দেহ নেই, কেননা আমরা কোন জিনিষই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি নে, কাজেই সে চোখ কেবলই রগড়াচ্ছি, আর লাল করছি। এই ত আমাদের অবস্থা। আসল কথা এই, এই কলিকাতা মহানগরীতে আমার যা হয় একটা হুজুগ না নিয়ে বেশি দিন থাকতে পারি নে। যদি একটা টাকা হুজুগের মাল বাইরে থেকে না আসে, তাহলে আমরা তা ঘরে বসে বানাই। ঐ হচ্ছে একমাত্র স্বদেশী industry, যাতে আমরা সম্পূর্ণ কৃতীত্ব লাভ করেছি। আমাদের ধারণা, আমাদের জাতীয় জীবন গঠনের পক্ষে হুজুগ হচ্ছে একটা প্রধান উপায়। সম্প্রতি একটা হুজুগের অভাবে আমরা একটু মিইয়ে যাচ্ছিলুম, এমন সময় আমাদের কপাল গুণে Reform Scheme আমাদের হাতে এসে পড়ল, অমনি তাই নিয়ে আমরা একটা মহা খােলযােগ বাধিয়ে দিয়েছি। এ হুজুগে যে আমিও মাতি নি, সে কথা বললে মিথ্যা কথা বলা হবে। আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের এমন একটি সন্ধিস্থলে এসে দাড়িয়েছি, যে ক্ষেত্রে আমাদের ভবিষ্যত অনেকটা স্থির হয়ে যাবে।

সবুজ পত্র ভা, ১০২ এ অবস্থায় ভয়ের কথাও ঢের আছে, ভরসার কথাও ঢের আছে, সুতরাং এ ক্ষেত্রে যাদের চিত্ত বলে একটা পদার্থ আছে তাদের চিত্ত- চাঞ্চল্য ঘটা নিতান্তই স্বাভাবিক। সাহিত্যে অমরা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের পক্ষপাতী হ'লেও ব্যবহারিক জীবনে জাতিগত প্রাণ ; কেননা আমাদের জাতি বলে কোনও একটা জিনিষ নেই। সাহিত্য জগতে অবশ্য এমন সব মুক্ত পুরুষের সাক্ষাৎ পাওয়া গেছে, যারা স্বদেশের খণ্ডপ্রলয়ের মধ্যেও নির্বিকার চিত্তে কাব্যকলার চর্চা করে গেছেন, যথা-Leonards da Vince এবং Gothe, কিন্তু এরা হচ্ছেন মনােজগতের স্বলোকের অধিবাসী, আর আমরা হচ্ছি তুচ্ছ ভূ- লােকের। সুতরাং তাদের পক্ষে যা শোভা পায়, আমাদের পক্ষে তা ধৃষ্টতা মাত্র। ভাগবতে দেখতে পাই, শুকদেব রাজা পরীক্ষিতকে বলেছিলেন যে, যে সকল ব্যক্তির ঐশ্বৰ্য্য আছে অর্থাৎ ঈশ্বরের বিভূতি আছে, তাদের কাৰ্যকলাপ সাধারণ লোকের পক্ষে অনুকরণীয় নয়। “যােগস্থ কুরু কৰ্ম্মাণি সঙ্গ ত্যক্তা ধনঞ্জয়”-এ উপদেশ অর্জুনের জন্য, তােমার আমার জন্য নয়। চিত্তবৃত্তি নিরােধ করা আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক নয় –অতএব কৰ্ত্তব্যও নয়। ফরাসী কবি Theophile Gautier-এর কাব্য আমার নিকট চিরদিনই আদরের সামগ্রী; তবুও তার Emaux et Camées-এর গৌরচন্দ্রিকা আমার কাছেও চক্ষুশূল। ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দের রাষ্ট্রবিপ্লবের মধ্যে যিনি প্যারিসে বসে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভাবে স্ত্রীজাতির কর- চরণ-বসন-ভূষণের বিষয় কবিতা রচনা করেছিলেন, তিনি অবশ্য এক জন অতি বাহাদুর লােক। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি যে নিজকে Geethe- ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পত্র ২৬৭ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, ঐ কথাটাই আমার কানে খারাপ লাগে। কেননা কবি হিসেবে Gautier-এর সঙ্গে Gothe-এর সেই প্রভেদ কাব্য হিসেবে Mademoiselle de Maupin-এর সঙ্গে Faust-এর যে প্রভেদ। সুতরাং Goethe-র পক্ষে যে ঔদাসিন্য স্বাভাবিক Gautier-এর পক্ষে তা নিতান্তই কৃত্রিম। এই কারণে ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে বিজয়ী জৰ্ম্মাণ সৈন্য কর্তৃক অবরুদ্ধ প্যারিসে বন্দী হয়ে Gautier-র মন্ত্র-শিষ্য Banville যে সব Idylles Prussiennes রচনা করে- ছিলেন, আমার কাছে আজকের দিনে তার গুরুর কবিতার চাইতে তা ঢের বেশি উপাদেয় । এ সকল কবিতা Banville-এর বুকের তাজা রক্তে ছােপানাে কিন্তু তাতে করে সে সব কবিতার সৌন্দৰ্য্য কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি,কেননা তার ভিতর অতিরঞ্জিত কিছুই নেই। যে রক্তে তার কবিতা রঞ্জিত, সে রক্ত হচ্ছে কবির বুকের রক্ত ; সাধারণ লােকের নয়, সুতরাং হিংসায় তা বিকৃত নয়, মদে তা কলুষিত নয়। Banville নিজেকে কাব্য-রাজ্যের বাজিকর বলে পরিচয় দিয়েছেন। সেই বাজি কর এক্ষেত্রে বেদনার বলে যাদুকর হয়ে উঠেছেন। এই সব কবিতা এত যে মর্মস্পর্শীতার কারণ Banville মানুষের মনের কথা দেবতার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিজীত ফ্রান্সের শােক যার অন্তরে বিজয়ী শ্লোকে পরিণত হয়েছে, তার প্রাণের বেদনা বিশ্বমানবের চির- আনন্দের সামগ্রী হয়ে রয়েছে। তবে সাহিত্যিকদের পক্ষে পলিটিক্স সম্বন্ধে উদাসীন হওয়া অসম্ভব হলেও নির্লিপ্ত থাকা যে কর্তব্য Gautier-এর একথা আমি মান্য করি। Banville-র চিত্তচাঞ্চল্য কাব্য-জগতে যে স্থির সৌদামিনী হয়েছে, তার কারণ তার রাগ বিরাগ, আঁর আশা নৈরাশ্য, তাঁর হাসি ২৬৮ সৰু পত্র ভা, ৩২. এর প্রথমটি কান্নার মুলে ছিল পেট্রিয়টিজম-পলিটিক্স নয়। সাহিত্যের বিষয় হলেও দ্বিতীয়টি নয়। পেটি অটিজ ও পলিটিক্স, যে এক বস্তু নয়, তার প্রমাণ,-নিত্য দেখতে পাওয়া যায় যে, যার দেহে পেটিয়টিজমের লেশমাত্র নেই, তিনিও পলিটিক্সের দরবারে উচ্চ আসন অধিকার করছেন। অনেকের ধারণা, পলিটিক্স পাকা করতে হলে পেটিয়টিজমকে দূরে রাখা কর্তব্য। একথা যদি সত্য হয় তাহ'লে এ কথাও সত্য যে পেটি অটিজমের ধর্মরক্ষা করতে হলে পলিটিক্সকে দূরে রাখা কর্তব্য। এ কথার ত ভুল নেই যে, পলিটিক্স পেট্রিয়টিমের ধর্মকে কর্মকাণ্ডে পরিণত করে। একমাত্র শাসন-যন্ত্রের পরিবর্তন ঘটালে প্রাচীন সমাজ যদি রাতারাতি নবীন হয়ে উঠত, তাহলে আর ভাবনা ছিল না। সাহিত্যের ভাবনা পলিটিক্সের ভাবনার চাইতে ঢের বেশি গুরুতর—কেননা সাহিত্যের কাজ হচ্ছে প্রাচীনকে নবীন করা। সে যাইহােক সরস্বতীর সেবক- দের পক্ষে রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকাই কর্তব্য। সাহিত্যিকেরা যােগদান করলে পলিটিক্সেরও বিপদ সাহিত্যেরও ক্ষতি। সাহিত্যিকেরা পলিটিকসে কি গােল বাধান সে সম্বন্ধে নানা পলিটি- সিয়ান নানা কথা বলেছেন, সে সব কথার পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নেই। তাদের সকল কথার সারমর্ম এই যে, পলিটিকসের আসরে সাহিত্যিকের আসা পলিটিক্স ব্যবসায়ীদের কাছে তদ্রুপ ভয়াবহ, জুরির বাক্সে স্কুল মাষ্টারের বসা আইন ব্যবসায়ীদের কাছে যদ্রুপ ভয়াবহ। তবে যে পলিটিসিয়ানরা সাহিত্যিকদের দলে টানবার জন্য সময়ে সময়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, তার কারণ সারস্বতদের হাতে কলম নামক একটি বস্তু আছে, ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পত্র যা নাকি অস্ত্র হিসেবে তলােয়ারের চাইতেও জয়। কলমের মুখ তলােয়ারের চাইতে বেশি ধারালাে হোক আর না হােক এ যুগে অসিজীবীর চাইতে মসিজীবীর প্রতাপ বেশি বই কম নয়। পুরাকালে রাজনীতির লড়াই রাজায় রাজায় হ’ত, সুতরাং রাজার অস্ত্র তরবারীই ছিল সে কালের প্রধান অস্ত্র ; একালে রাজনীতির লড়াই হয় রাজায় প্রজায়, সুতরাং প্রজার অস্ত্র কলমই হচ্ছে একালের প্রধান অস্ত্র। এই কারণে পলিটিসিয়ানরা সাহিত্যিকদের এলেম চান্ না—চান শুধু তাদের কলম। কিন্তু কলম হচ্ছে সেই জাতীয় জিনিষ যা কাউকে ধার দেওয়া সম্বন্ধে শাস্ত্রে নিষেধ আছে। এ বিষয়ে শাস্ত্র বচন এই যে- “লেখনী পুস্তিকা রাম পরহস্তে গতাগতা। কদাচিৎ পুনরায়ত ভ্ৰষ্টা মুষ্টা চ চুম্বিতা।” এই কারণেও পলিটিকসের হাটে বাজারে কলম আমাদের সামূলে রাখাই কর্তব্য। কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে এই যে, পলিটিকসের রাজ্য আমাদের দেশ নয়। ওদেশে গেলে আমাদের জাত যায়, কেননা আমাদের যা ধর্ম, ওরাজ্যে তার চর্চা কর যো নেই। ওদেশে টিকে থাকতে হলে সর্বপ্রথমে নিজের মনকে পরের মতের ছাই চাপ দিতে হয়। পলিটিকাল জগতে এক অদ্বৈতবাদ ছাড়া অপর কোনও বাদ চলে না। যে দলেই যাও দেখতে পাবে নেতারা নিজেদের বলছেন “সােহহং” আর নীতরা তাদের বলছেন “তত্বমসি।” আমা- দের পক্ষে অবশ্য অদ্বৈতবাদী হওয়া অসম্ভব, কেননা আমাদের মনের २१. সৰু পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ যত কারবার সে সবই এই বহুরূপী বিশ্বের সঙ্গে, আর সেই কারণেই আমরা বহুবাদী। তারপর, পরের মতে সায় দিয়ে আমরা আমাদের মনের স্বাধীনতা হারাতে প্রস্তুত নই। কেননা স্বাতন্ত্রের চর্চাটা আমাদের একটা বদ-অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রতিলােক তার নিজের স্বাধীনতা না হারালে সমগ্ৰজাতি যে তার স্বাধীনতা লাভ করে না, যে গণিতের সাহায্যে এই সিদ্ধান্তে পৌছানাে যায়, সে শাস্ত্রে আমাদের দখল নেই। সে যাই হােক পলিটিকসে এমন অনেক কথা বলতে হয়, যার অর্থের সন্ধান নিতে গেলে ওক্ষেত্রে অনর্থ ঘটে। তারপর পলিটিকসে স্বপক্ষ-বৎসল্য ও বিপক্ষ-বিদ্বেষ কিঞ্চিৎ অতি মাত্রায় চর্চা করতে হয়, নচেৎ দল বাঁধা যায় না। এ ক্ষেত্রে উদারতা দুর্বলতা এবং নিরপেক্ষতা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই গণ্য। পলিটিকসের ক্ষেত্রে সাহিত্যিককে যে কতদূর লাঞ্ছিত গঞ্জিত, পীড়িত ও বিড়ম্বিত হতে হয়, ইতিহাসে তার একটি মস্ত বড় উদাহরণ আছেবেচারা Cicero! তার লাঞ্ছনা যিশুখৃষ্ট জন্মাবার পূৰ্বে শুরু হয়েছে, আজও তার শেষ হলো না; রােমের জের এখন জর্মাণী টানছে। অথচ Cicero-র অপরাধ কি ?—তিনি থেকে থেকেই সাহিত্য চর্চা ছেড়ে দিয়ে মোমের Republic রক্ষা করতে প্রাণপণ বাক্যব্যয় করতেন। ফলে সে Republicও রক্ষা হয় নি এবং সাহিত্যের republic-এও তিনি যথাযোগ্য স্থান পান নি। পলিটিক্‌- সের শাস্তিভােগের হাত থেকে তিনি আত্মহত্যা করেও নিষ্কৃতি লাভ করেন নি। পলিটিকসের চর্চা ত দেশশুদ্ধ লােকে করে, এমন কি এ ক্ষেত্রে রাম-শ্যাম-হরি ত জ্যেষ্ঠ অধিকারী বলেই গণ্য। তবে Cicero-র উপর নানা দেশের নানা-লােকের নানা-ভাষায় নানারকম ৩ ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পর ২৭১ কটু কথার কারণ কি ? কারণ এই যে, এ চর্চায় তিনি স্বাধিকার প্রমত্ততার পরিচয় দিয়েছেন, ভগবান তাঁকে অসাধারণ বাকশক্তি দান করেছিলেন, সেই শক্তি তিনি পলিটিকসে অপব্যয় করেছিলেন। এ পাপের প্রায়শ্চিত্য তাই তাঁকে অদ্যাবধি করতে হচ্ছে। আন্টনীর ধর্মপত্নী Fulvia, Cicero-র ছিন্নমস্তকের মুখে নিষ্টিবন নিক্ষেপ করে যে স্বামীভক্তির পরিচয় দিয়েছিল, আজকের দিনে অসংখ্য জৰ্ম্মাণ পণ্ডিত তাদের লেখনীর নিষ্ঠিবন Cicero-র প্রেতাত্মার গায়ে নিক্ষেপ করে, সেই স্বামী ভক্তির পরিচয় দিচ্ছেন। অবশ্য এঁদের স্বামী আন্টনি নন-Cesar, জাৰ্মাণদেশে যিনি Kaiser রূপ ধারণ করেছেন। এইখানেই থামা যাক, নচেৎ তুমি বলবে আমি শুধু বিদ্যে দেখাচ্ছি। অবশ্য ও অপরাধের ভয়ে নিরস্ত হবার কোনরূপ কারণ নেই। পলিটিসিয়ানরা যদি মাঠে ঘাটে চিৎকার করে তাদের অবিদ্যা জাহির করতে কুণ্ঠিত না হন, তাহলে আমরাই বা আমাদের বিদ্যে জাহির করতে কুণ্ঠিত হব কেন? থামা উচিত এই কারণে যে, কলিকাতা সহরের হাল পলিটিকসের সূত্রে, সেকালের রােম এবং একালের প্যারিসের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের কথা পেড়ে আমি বিদ্যের পরিচয় দিতে পারি কিন্তু বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছি নে। তা ছাড়া কোথায় Cicero আর কোথায় আমরা। তার হাতে মিল ভাষার বিদ্যুন্মণ্ডিত বক্স, আর আমাদের হাতে আছে টিনের ঝুমঝুমি। তবে আমার বক্তব্য এই যে, আমরা যখন ইউরােপীয় সভ্য- তার প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি, তখন সাহিত্য বিভাগ অপরাপর বিভাগ থেকে অনতিবিলম্বে পৃথক হওয়াই কর্তব্য।

সবু। পত্র ভাদ্র, ১৩২ অপর জাতের পক্ষে যাই হোক আমাদের মনের উপর পলিটিকসের ধাক্কা মাঝে মাঝেই আসা চাই-নইলে আমরা কাব্য পড়তে পারি কিন্তু গড়তে পারব না। আমাদের সমাজ এতই একঘেয়ে, এতই জড়ভরত যে, সে সমাজ নিত্য নতুন ঘা দিয়ে আমাদের মনকে জাগ্রত রাখে না, আর কাব্য-কলাও ঝিমন্ত মনের সৃষ্টি নয়। পলিটিকসের উত্তেজনা ক্ষণিক হলেও উত্তেজনা ত বটে, অতএব স্বল্পমাত্রায় ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী। উপকারী। পলিটিক্স সম্বন্ধে আমাদের পক্ষে যা অকৰ্ত্তব্য সে হচ্ছে ও-বিষয়ে কিছু লেখা। কেননা এ বিষয়ে কলম চালাতে গেলে style•এর মাথা গেলে style-এর মাথা খেতে হবে। পলি- টিক্স লিখুতে হবে প্রথমত ইংরাজিতে, তারপর খবরের কাগজের ভাবে ও ভাষায়। কাগজি ভাবে যে গোড়া ভাব এবং কাগজি-ইংরাজি যে পাতি-ইংরাজি, তার পরিচয় লাভ করতে বেশীদূর যেতে হবে না, “বেঙ্গলী” কিম্বা “অমৃতবাজার পত্রিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই এ সত্যের সাক্ষাৎ মিলবে। মন্টেগু সাহেবের রিপাের্ট নিয়ে আমাদের শিক্ষিত সমাজে এত যে মতভেদ ঘটেছে তার সব প্রধান কারণ—সে রিপাের্ট খাটি ইংরাজিতে লেখা। অপর পক্ষে “রউলট কমিশন”-এর রিপাের্ট সম্বন্ধে যে আমাদের শিক্ষিত সমাজে দু’মত নেই, তার কারণ- সে রিপাের্ট পাতি-ইংরাজিতে লেখা। এই সব কারণে, অতঃপর এই Reform Scheme-এর হুজুগ থেকে আলগা হতে চাই। কিন্তু যা চাই তাই কি ঘটে? পলিটিকসেরও একটা নেশা আছে, আর সে নেশায় যে একবার মেতেছে তার পক্ষে ও জিনিষ ছাড়া বড় কঠিন। একটি বাংলা গানের অস্থায়ী আমার মনে চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছে, তার কারণ—গানটির

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা
२१७
কথাগুলি যেমন pathetic, তার সুরও তেমনি উচ্চ অঙ্গের
একেবারে মালকোষ !
সে গানের প্রথম পদ এই
“ছাড়ব বললে কি ছাড়া যায় !
এ ত কাক নয়, কোকিল নয়,
যে হুস করলে উড়ে যায় ।
এ কবিতায় অবশ্য স্ত্রী-পুরুষের ভালবাসার কথা বলা হয়েছে কিন্তু
তাতে কিছু আসে যায় না—কেননা ভালবাসা মাত্রই নেশা, আর
নেশা মাত্রেরই একটা মৌতাত আছে।
২০শে আগষ্ট, ১৯১৮ খৃঃ।
বীরবল।

শাস্ত্র ও স্বাধীনতা। বিশ্বসৃষ্টির পর বিধাতা পুরুষ এক জোড়া মানুষের মাথায় প্রকাণ্ড কেতাবের বােঝা চাপাইয়া ধরাতলে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন, এরূপ বিশ্বাস যাঁহারা করিতে পারেন, তাহাদের পক্ষে শাস্ত্র জিনিসটা এক ভাবে খুবই সহজবােধ্য। তবে এরূপ সহজবাদীদের দলে ভিড়িতে অতি বড় ভুতভক্তও এখন বােধ হয় একটু পশ্চাদপদ, কারণ শাস্ত্র সম্বন্ধে এরূপ ধারণা আদি ও অকৃত্রিম হইলেও ইহা একেবারে নিরেট খেয়ালের কোটাতেই ঠাসা, জ্ঞান ও যুক্তির মুক্ত বাতাস তাহাতে একটুও লাগিবার জো নাই। কিন্তু এদিকে কালের এমনি প্রভাব, কোন প্রকার গােড়ামিই এখন আর নিজের অটল অন্ধতার উপর খাড়া থাকিয়াই তৃপ্ত নয়, যুক্তি তর্কের খােল পথে কোন রকমে একটু চলিবার আশায় বেজায় ব্যর্থ, তা সহজ গতিতেই হােক, আর তিক ভাবেই হােক। মানুষ ও কেতাবী শাস্ত্র বিশ্বস্রষ্টার যমজ সন্তান, এইরূপ মত যদি কোথাও কাহারও থাকে, তবে সেটার আমরা কিছুমাত্র সম্বর্ধনা না করিয়া বিদায় দিতে পারি। কি রক্ষণশীল কি উদারনীতিক, সকল তাকিকই বােধ হয় এই মতটির পক্ষ হইয়া ওকালতি করিতে এখন কুষ্ঠিত। মনুষ্যসৃষ্টির প্রক্রিয়ায় আধুনিক অভিব্যাক্তিবাদ মানি আর না মানি, তাহাতেই বা এ বিষয়ে কি আসে যায়। মানুষ জীবপৰ্য্যায়ের ম , পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীনতা ২৭৫ শেষ পরিণতিই হােক, কিংবা কোন এডাম ও ইভের বংশধরই হােক, মানুষ যে একেবারে পুথি বগলে করিয়া ধরাধামে অবতীর্ণ হয় নাই, এটা একটা মস্ত তর্ক বিতর্ক করিয়া বুঝিবার জিনিস নয়। অন্য দেশের শাস্ত্র প্রায় কথঞ্চিৎ একেলে—অনেকের গায়ে সন-তারিখের মার্কা মারা—সহজাত্য লইয়া তাহারা মানুষের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করিতেই পারে না। আমাদের বেদ লইয়াই বােধ হয় কিছু গণ্ডগােল। পণ্ডিতেরা এই বেদকে অপৌরুষেয় বলেন, এবং অপেক্ষাকৃত আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান, তন্ত্র, মন্ত্র, পুরাণকে একমাত্র বেদেরই সন্তান সন্ততি বলিয়া প্রচার করেন। বেদে ভারতীয় সকল শাস্ত্র বিজ্ঞানের উদ্ভব কিনা ইহা ভাবিবার এখন আমাদের দরকার নাই। বেদের উদ্ভবটীই কি এইটই এখন জ্ঞাতব্য। বেদ অপৌরুষেয় মানে যদি এই হয় যে ওটা মানুষের রচনা নয়, বিধাতৃদেব স্বয়ং উহা ভূর্জপত্রে লিখিয়া আদি মানবের লাইব্রেরীতে রাখিয়াছিলেন, তবে সেটা এই আলােচনার একটা অন্তরায়ের মত হইয়া দাড়ায় বটে। কিন্তু এরূপ মতটা আমরা এখন ধর্তব্যের মধ্যে আনিতে প্রস্তুত নহি, শুধু পাল্টা জবাবে এইটুকুই বলিব, আগে বিধাতৃদেবের ভাষাটাই কি ঠিক হােক তারপর ও-কথা শােনা যাইবে। শুধু বৈদিক সংস্কৃতেই যে বিধাতা সাহিত্য বা ধর্ম- চর্চা করিতেন, এটা আজও কিছুমাত্র প্রমাণ করা হয় নাই। কাজেই ও মতটা এখন মুলতুবিই রহিল। তবে এটাই কি ঠিক নয় যে, শাস্ত্র মানুষ গড়ে নাই—মানুষই শাস্ত্র গড়িয়াছে। বিধাতা মানবসৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই অমনি টোল খুলিয়া বসেন নাই এবং নবজাত জীবটিকেও আগে শাস্ত্রের বেত্রাঘাতে ভা, ১৩২৫ গড়িয়া পিটিয়া তারপর কাৰ্য্যক্ষেত্রে পাঠান নাই। বিধাতা শুধু ভারতবর্ষেরই বিধাতা নহেন, এবং তাহার টোল যদি থাকে, সেটা শুধু বৈদিক-সংস্কৃতচর্চারই কেন্দ্র হইতে পারে না। অপৌরুষেয়ের অর্থটা অমন করিয়া খাটাইতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। সুধীজন অবশ্যই জ্ঞান ও যুক্তির সহিত মিলাইয়া ইহার অন্য অর্থও করিতে পারেন, করিয়াও থাকেন। কিন্তু এখনও যাঁহারা চাদে বুড়ীর চরকা কাটায়, কি সাপের মাথায় ধরিত্রীর অবস্থানে অটল বিশ্বাস রাখিয়াছেন, তাহাদের কথা অবশ্যই স্বতন্ত্র। কেহ হয়ত মনে করিবেন এমন সাদা কথা লইয়া এত কালি কলমের খরচ কেন! আমরাও বলি ঐটাই ত ক্ষোভ ! 3 ( ২ ) অনেকে এ কথা অবশ্যই বলিতে পারেন,-বেদ ত কেতাব নয়, বেদ হইল জ্ঞান। কেতাব পরে হইয়াছে এবং সেটা অবশ্যই মানুষের লেখা। এবং জ্ঞানকে অপৌরুষেয় বলা চলে। বেশ, কিন্তু এই জ্ঞান মানুষের ভিতর গজাইল কেমন করিয়া ? শাস্ত্রান্তরে আছে, মানুষ যেমনই জ্ঞান বৃক্ষের নিষিদ্ধ ফলটি ভক্ষণ করিল, অমনি তাহার মনে জ্ঞানের বেদনা জাগিয়া উঠিল। কিন্তু এ জ্ঞান বােধ হয় বৈদিক জ্ঞান নয়। কারণ এ জ্ঞানে হইল মানুষের খতন, বৈদিক জ্ঞানে হইল মানুষের উন্নয়ন। পতনই হাে’ক, আর উন্নয়নই হাে’ক এই বিভিন্ন জ্ঞানগুলো কি তড়িবিকাশের মত সহসা মানুষের অন্তরে ঢুকিয়াছিল ? এবং সে গুলাে কি একেবারে পূর্ণ শাস্ত্রের আকার ধরিয়া মানুষের মনে পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছিল ? যদি তাই হয়, তবু সে শাস্ত্ৰ বুঝিয়াছিল কে? অবশ্যই মানুষের মন। তা হইলেই শাস্ত্র আসার আগেই ৩ ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীনতা মানুষের মনের সৃষ্টি মানিতেই হইবে। আর মনের সঙ্গে মনের পূর্ণ স্বাধীনতা তখন ত থাকিবেই। অতএব যে ভাবেই হোক মানুষের স্বাধীন মনই শাস্ত্র গড়িয়া তুলিয়াছে, শাস্ত্রজ্ঞান প্রথমেই মানুষের মন গড়িতে বসে নাই। কিন্তু জ্ঞানের আগমন সম্বন্ধে কথাটা এখনও ঘোলাটে রহিয়াছে। সত্যই কি মনুষ্যসৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই মনুষ্য মনে পূর্ণ দিব্যজ্ঞান একেবারে হঠাৎ আসিয়া উদিত হইয়াছিল। মানুষের মনটা কি জহু মুনির মত সমগ্ৰ জ্ঞান-মন্দাকিনী এক গণ্ডষে পান করিয়াছিল? জহু মুনির গঙ্গা গলাধঃকরণের গল্পটা অবশ্যই পৌরাণিক, প্রামাণিক নয়। এমন করিয়া মনুষ্য-মনের জ্ঞান লাভের মতটাকেও পুরাণের কোঠাতেই ফেলা চলে, কিন্তু প্রমাণের কাছ ঘেঁসিয়াও আনা যায় না। কারণ এটাও নিতান্ত অজগুবি ও গাজুরি বলিয়াই ঠেকে। মানুষের বর্তমান ও অতীত ইতিহাস ইহার পক্ষে কোনই সাক্ষ্য দেয় না। সমগ্র জ্ঞানের কথা দূরে থাক, একটি বিশেষ জ্ঞানও মানুষ বহু সাধনার পরই লাভ করে। এ সত্যের কোন একটা বিশেষ উদাহরণ দিবার দরকারই নাই, ইহা মানুষের জীবনে নিয়তই ঘটিতেছে। শুধু ব্যষ্টি জীবনেই নয়, সমষ্ঠি জীবনেও। কত ব্যক্তি-পরম্পরার সাধনার ফলে তবে একটি জ্ঞান পরিস্ফুট হয়। কত পুরুষ-পরম্পরার চেষ্টায় তবে একটি জাতীয় সংস্কার গড়িয়া ওঠে। তবে কেমন করিয়া বলিব মানব সৃষ্টির আদিতে সমস্ত জ্ঞানগুলো এখনকার কল-টেপা বৈদ্যুতিক আলাের মত-মানুষের মনে একেবারে এক চোটে দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া- ছিল। মানুষের আর যাহাই বদলাক, তাহার প্রকৃতিটী ডিগবাজি খাওয়ার মত কখনই উলটাইতে পারে না।

২৭৮ সবুজ পত্র ভা, ১৩২৫ মানব মনে জ্ঞান কখনাে এমন করিয়া একেবারে আসে নাই আর সেটা কোন যুগেই নিঃশেষে আসিবার জিনিসও নয়। জ্ঞানের একে বারে আসাটা অনেকের কাছে অসম্ভব ঠেকিলেও, তাহার নিঃশেষে আসাটা তাহারা আবার অসম্ভব রকমই বিশ্বাস করেন। তাহাদের দৃঢ় ধারণা ভগবান কোন অজ্ঞাত অতীতেই তাহার জ্ঞান ভাণ্ডারের যাহা কিছু সব মানুষকে দিয়া ফেলিয়াছেন, এখন তিনি যেন সম্পূর্ণ রিক্ত- হস্ত। অতীতের প্রতি একটা একান্ত ভক্তি ছাড়া এই ধারণার কি অন্য কোন ভিত্তি আছে। অতীতের প্রতি ভক্তি অবশ্যই ভাল জিনিস, কিন্তু সেটাকে এমন গরহিসেবী খেয়ালে বাড়াইয়া তোলা নিশ্চয়ই ভাল জিনিস নয়। ভারতের বেদ গড়িতে কোন কাল্পনিক অতীতে ভগবানের জ্ঞান-ভাণ্ডারটা সব উজাড় হইয়া গেল, এরূপ ধারণায় বেদের গৌরব বাড়ে কি না সন্দেহ, জ্ঞানের গৌরব ত নিশ্চয়ই বাড়ে না। গােট। কত খণ্ড আলোক—তাহার সংখ্যাও যতই কেন হােক না— সূর্য্যের জ্যোতির কাছে যে নিতান্ত ক্ষুদ্র, এটা কে না স্বীকার করিবে ? একটি পরিমিত জ্ঞানকে আত্মস্থ করা অপেক্ষা কি অনন্ত জ্ঞানে উদ্ভাসিত হওয়! বেশী গৌরব নয় ? কি প্রাকৃতিক জ্ঞান, কি অধ্যাত্ম জ্ঞান, কোন জ্ঞানই কোন দেশ কাল পাত্রে পর্যবসিত হইতে পারে না। দুয়েরই ক্রমবিকাশ আছে, ক্রমােন্নতি আছে। তবে দুয়ের বিকাশ ও উন্নতি অবশ্যই সব সময়ে ও সব যায়গায় সমান বেগে চলিতে থাকে না। কোন একটি বিশেষ যুগে বা বিশেষ স্থলে এই দুয়ের কোন একটির বিশেষ উম্মেষ যে ঘটে, এ কথা অবশ্যই মানি। কিন্তু সেই বিশেষ জ্ঞানের বিশেষ উন্মেষের সঙ্গে তাহা যে একেবারে শেষ হইয়া যায়, ইহা নিশ্চয়ই মানিবার মত ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীন ২৭৯ নয়। ভারতবর্ষ অধ্যাত্ম জ্ঞানের দেশ, য়ুরোপ প্রাকৃত জ্ঞানের কেন্দ্র অথবা অতীতে অধ্যাত্ম জ্ঞানের চর্চা বেশী হইয়াছিল, এখন প্রাকৃতিক জ্ঞানের উপরেই মানুষের বেশী ঝোক-এ রকম তর্ক কতকটা হয়ত চলিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে প্রাকৃতিক জ্ঞানটা য়ুরােপ একেবারে বিশ্বের ভাণ্ডার ঝাড়িয়া আনিয়াছে, বলা যদি নিতান্ত অসম্ভব ও অস্বা- ভাবিক হয়, তবে অতীত ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম জ্ঞানের উপর সর্বগ্রাসী দাবিটাকেই বা কেমন করিয়া নিতান্ত সম্ভব ও স্বাভাবিক রকমে খাড়া করা যায় ? ( ৩ ) এখন তর্ক উঠিতে পারে, সকল জ্ঞানই কি তবে অনুশীলন- সাপেক্ষ। তাহাই যদি হয়, তবে মহাপুরুষদের বিশেষত্ব কি ? তঁাহারা ত আর বহু গবেষণা ও আলােচনা দ্বারা জ্ঞান লাভ করেন নাই। দেশের পূর্বসঞ্চিত জ্ঞানগুলাে ঘষা মাজা করাই ত তাহাদের জীবনের কাজ ছিল না। তাহারা ছিলেন মহাগিরির অভ্রভেদী চুড়ার মত। স্বর্গের নবতর কল্যাণতর আলােকেই তাহাদের ললাটদেশ উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল, মর্তের বহু আয়াসপুষ্ট ঝাড়লণ্ঠনের বাতিতে নয়। তাহারা ধুলা কাদা ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে জ্ঞানরত্নের টুকরা-টাকরা সংগ্রহ করেন নাই, আকাশ হইতে অজস্রধারে এই রত্নবৃষ্টি তাহাদের চারিধারে পড়িয়াছিল। অনুশীলনের অবিরাম আঘাতে তাহারা জ্ঞান-মন্দিরের দরজাটা একটু একটু করিয়া থােলেম নাই, তাহা মুহূর্ত মধ্যেই সরিয়াছিল—তাহাদের যােগমন্ত্রের প্রভাবে। যােগ না হইয়াও ২৮. সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ যােগ মানি, এবং যােগের এই মাহাত্ম্যেও অবিশ্বাস নাই। কিন্তু মহাপুরুষ বা যােগী যে একটা নিতান্ত অসম্ভব রকম আকাশকুসুম জাতীয় জিনিস এটা কখনই মনে হয় না। মহাপুরুষকে যদি ধবল- গিরি বলি, তবে হার সমসাময়িক মানবসমষ্টিকে হিমাচলের সঙ্গে তুলনা করিব—পুরাণের পাখাওয়ালা মৈনাকের সঙ্গে যাহারা তাহাকে সমশ্রেণী করিতে চাহেন, তাহাদের সহিত একমত হইতে পারি না। পাহাড়ের সঙ্গে পাহাড়ের শৃঙ্গের একাত্মতা উড়াইয়া দিলে একটা কাল্পনিক খেয়ালই সৃষ্ট হয়, সেটা আর সত্যকার জিনিস থাকে না। মহাপুরুষ-মহীরুহের মাথাটা আকাশ স্পর্শ করিতে পারে, কিন্তু তাহার শিকড়টা থাকে মাটির ভিতরেই। তাহার পত্রের মুখ স্বর্গের বাতাস হইতে অনেক পুষ্টিকর খাদ্য পায় বটে কিন্তু মাটির রসে তাহার বড় কম বর্ধন করে না। কৃষ্ণ বা খৃষ্ট জুলু বা কাফ্রীর মধ্যে জন্মান নাই। মহাপুরুষ তাহার দেশকে উচ্চে তােলেন সত্য কিন্তু তাহার নিজের দেশই আবার তাহার উচ্চতা পরিমিত করে। আর পৃথিবীতে ধবল- গিরি যেমন একমাত্র পর্বতশৃঙ্গ নয়, তেমনই কোন বিশেষ দেশের মহাপুরুষের মধ্যেই মহাপুরুষত্বের খতম হয় না। মহাপুরুষের আবি- ভাব ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সকল কালেই ঘটিতে পারে। সেই আবির্ভাবের সঙ্গে কত শাস্ত্রমতেরও বিবর্তনের ও বিসর্জনের সম্ভাবনা। জ্ঞানীই বল, আর যােগীই বল, সকলেই নিজ নিজ সমাজ-ক্ষেত্রেই ফুটিয়া ওঠেন, আকাশকুসুমের পায়ে কাহাকেও ফেলা চলে না। ইহারা নব নব জ্ঞানের সৌরভে ধরিত্রী বক্ষ আমােদিত করেন বটে, কিন্তু সে সৌরভের সম্পর্ক শুধু নন্দনের পারিজাতের সঙ্গেই নয় ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীনতা ক্রমিক অনুশীলনে দেশের মধ্যে যে জ্ঞানের আবাদ হইয়াছিল, তাহার গন্ধও সেই মরে পুষ্পের সৌরভে বহুল পরিমাণে সেরিভিত। ফল কথা, জ্ঞানের আবির্ভাবের মধ্যে কখনবা একটি আকস্মিক দৈব ক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকিলেও ক্রমবিকাশের পদ্ধতিটা সেই সঙ্গে না মানিবার জো নাই। জ্ঞানের এই দৈব ও মর্ত্য বিকাশ এক বিশেষ দেশ কাল পাত্রের বিশেষ গণ্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ নয়, ধরাবক্ষে মানুষের স্থিতি যতদিন, ততদিনই ইহার প্রক্রিয়া সর্বত্র চলিতে থাকিবে। এই বিকাশ-ক্রিয়ার মুলে যে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা চিরদিনই বিদ্যমান, ইহা বলাই বাহুল্য। কারণ বিকাশ স্থবিরত্বে সম্ভবে না, ইচ্ছার গতিশীলতা হইতেই যে ইহার উদ্ভব। ( ৪ ) তবে স্বাধীন মতের নাম শুনিলেই আমরা অতিকাইয়া উঠি কেন? পুরাতন বন্ধনের অচলতার মধ্যে মানুষ বেশ একটা আরাম পায়। নূতনকে মানুষ স্বভাবত একটু সন্দেহের চক্ষে দেখে। যাহার সঙ্গে বহুদিন ঘরকন্না করিয়াছি, তাহাকে মানুষ যতটা বিশ্বাস করিতে পারে, একজন নুতন অতিথিকে ততটা বিশ্বাস করিতে চায় না। পুরাতন কতকটা নিশ্চিত, ইহার মধ্যে একটা শান্ত নিশ্চিত। আছেই। আবার নূতনের সঙ্গে একটা উদ্বেগ ও আশঙ্কা জড়ানাে। তাই নূতন অনেকেরই দু-চক্ষের বিষ। মূতনকে বিশ্বাস করা দুরে থাক, তাহাকে পরখ করিবার ইচ্ছাটাই অনেকে দাবিয়া রাখে। তাহা হইলেও এমন সময় আসে যখন ঐ পুরাতন নিশ্চিন্ত শান্তিটিই মানুষের মনের উপর একটা বােকর মত হইয়া দাড়ায়। সে তখন ২৮ ভাদ্র, ১৩২ একটু চিন্তা করিবার স্বাধীনতার জন্য ব্যস্ত হয়। শেষে সে বুঝিতে পারে, যাহাকে সে বিষ বলিয়া ভাবিয়াছে তাহারই মধ্যে অমৃতরূপে তাহার নব জীবনের বীজই বিদ্যমান। নূতন মাত্রকেই আমরা অশুভ মনে করিব কেন? আর এই মূতনের জননী যে মানব-মনের স্বাধীনতা, তাহাকেই বা শত্ৰু বলিয়া ভাবিব কেন ? যদি শত্রুর কথাই তােল, তবে দেখিবে নূতন পুরাতন উভয়ের মধ্যে সে ওং পাতিয়া থাকিতে পারে। পুরাতনের বন্ধনে কিছু না কিছু জড়ত্বের জাল রচনা করে আবার নূতন স্বাধীনতার মধ্যেও কিছু উচ্ছ, ঙ্খলতা থাকিবার সম্ভাবনা। অবিমিশ্র মঙ্গল কোনটাই নয় অথচ দুই-ই আমাদের চাই। যখন দুই-ই আমাদের দরকার তখন উভয়ের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য খুঁজিতেই হয়। কিন্তু এই সামঞ্জস্য করার ভার ত আর পুরাতন শাস্ত্রের ঘাড়ে চাপানো যায় না। পুরাতন শাস্ত্র নিজে ত এখন কতকগুলাে কালির আঁচড় মাত্র, তা সেটা ভুজ্জপত্রেই থাকুক, আর ফুলিস্কেপেই পড়ুক। এই কালির আঁচড়ের সঙ্গে যখন আমাদের জ্ঞানের সংযােগ ঘটে, তখনই না তাহার গৌরব আমরা বুঝতে পারি। আর স্বাধীনতা জিনিসটি কি, তাহাত আমরা নিজেদের জীবনে পদে পদে বুঝিতেছি। মানুষ যখন শাস্ত্র ও স্বাধীনতা দুই-ই বােঝে, তখন মানুষের পক্ষে উভয়ের একটা সামঞ্জস্য সাধন করা অসম্ভব নয়। অসম্ভব ত নয়-ই, বরং মানুষ এরূপ একটা কিছু না করিয়া থাকিতে পারে না। যাঁহারা নূতনের প্রচারক তাহারা ত একটা সামঞ্জস্যের চেষ্টায় ফিরিবেন-ই, কিন্তু পুরাতনের উপাসকেরা-ই কি এ বিষয়ে একেবারে উদাসীন?

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীনতা কথাটা শুনিতে একটু হেঁয়ালীর মতই ঠেকে। নিরেট শাস্ত্রাধীন- তার মধ্যে আবার সামঞ্জস্যের স্থান কোথায় ! সামঞ্জস্য ত নূতনকে লইয়া, এই নূতনকে অমল দিলেই যাঁহাদের ধর্মচ্যুতি ঘটে, তাহাদের সামঞ্জস্যে প্রয়ােজন কি ? তাহাদের ধর্মে ইহার প্রয়ােজন না থাকুক, কিন্তু তাহাদের কৰ্ম্ম অনেক সময় এই প্রয়ােজনকে ছাড়াইয়া উঠিতে পারে না। শাস্ত্র না বদলাক, সময় যে বদলায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অবস্থার পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী। আবার অবস্থার অনুযায়ী একটু ব্যবস্থার বদল না করিলেই বা চলে কৈ? হাজার বৎসরের বিধিগুলো এখনকার অবস্থার সঙ্গে কি ষােল আনা খাপ খাওয়ান যায় ? তাই অবস্থার গতিকে শাস্ত্রপন্থীরও পক্ষে সজ্ঞানেই হােক আর অজ্ঞানেই হােক পুরাতনের সঙ্গে এই নূতনের একটু সমন্বয় করা অপৰিহাৰ্য্য হইয়া পড়ে। তবে তাহার সমন্বয়টা চলে একটু বেনামি রকমে। পুরাতনের সঙ্গে নূতন বিধির সংযােগ করা তাহার পক্ষে অধৰ্ম্ম হইলেও, পুরাতনকে মাজিয়া ঘষিয়া একটা নূতন জলুস দিতে তিনি পিছ পা হন না। তাহার শাস্ত্রের অক্ষরগুলাে যেমন, তেমনই থাকে বটে, কিন্তু তাহার অর্থটি, তাহার ব্যাখ্যা, ভাষ্য টীকা টিপ্পনির মুখে বেশ একটু ওলট পালট খায়। তবে এই চেষ্টা অনেক সময় সম্যক ফলবতী হয় না। অবস্থার একটু আধটু অদল বদলে এটুকুতে কিছু কাজ দেখিতে পারে কিন্তু অবস্থাটা যখন কালপ্রভাবে বড় বেশী ফারাক হইয়া দাড়ায়, তখন আর ঐ বেনামি সমন্বয়ের ছিটে-ফোটায় কিছুই শানায় না।

২৮৪ সবুজ পত্র ভা, ১৩২৫ ( ৫ ) যাঁহারা স্বাধীনতার প্রচারক, শাস্ত্রপন্থীরা তাহাদের উপর বড় সদয় নহেন। ইহাদের উক্তিগুলো শাস্ত্রপন্থীরা অনেক সময় নিজেদের সুবিধা মত বেশ একটু একপেশে রকমেই ব্যাখ্যা করেন। ইহাদের কথার অবিভক্ত ভাবটা না বুঝিয়া তাহার বিভক্ত শব্দগুলােই যেন বেশী নাড়াচাড়া করা হয়। তাই অনেক সময় এই সব আলােচনার মধ্যে ব্যখ্যাতার উপলব্ধি অপেক্ষা যেন আক্রোশই বেশী প্রকাশ পায়। শাস্ত্রপন্থীদের শাস্ত্রের স্থান বুঝি স্বয়ং ভগবানের চেয়েও উচ্চে। শাস্ত্রের উপর কোন রকম একটু মৃদু আলোচনার আঁচও ইহার সহ্য করিতে অপারগ। কাহারও ভাবভঙ্গীতে শাস্ত্রের প্রতি একটু অবশ্যতা দেখিলেই তাহারা বেজায় খাপ্পা হইয়া পড়েন। এই অবশ্যতার কারণটা কি এবং সেটা বাস্তবিক বিবেচ্য কি না, এ সব দেখিবার তাহাদের অবসরই থাকে না। তাই তাহাদের পাল্টা জবাবে যুক্তি ততটা থাকে , যতটা থাকে হয় ভাবের ফোয়ারা, নয় গালি-গলাজের নর্দামা। এই ফোয়ারা বা নর্দমার বেগ কোন সমাজকে ক্ষণিক টানিয়া লইয়া যাইতে পারে কিন্তু সে খুব বেশী দূর নয়। কারণ শাস্ত্র-গৌরবের, যে একটু অংশ তাহারা নষ্ট করিতে বসিয়াছে মনে করেন তাহার পুন- রুদ্ধারের যথার্থ পথ ত আর ইহাতে একটুও বাড়ে না বরং ক্রমে মরিয়াই আসে। শাস্ত্রপন্থীদের অভিধানে স্বাধীনতা মানে--একেবারে উদ্দাম উচ্ছ। জ্বলতা। শাস্ত্রের প্রতি অবশ্যতার হ্রাস মানে বেদ, পুরাণ, তন্ত্রমন্ত্র, রীতিনীতি, আচার পদ্ধতি একেবারে সবগুলো সাপটাইয়া অগ্নিকুণ্ডে বিসর্জন। স্বাধীনতা জিনিসটা কি বাস্তবিক এমনই বিকট। যখন ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা শাস্ত্র ও স্বাধীনতা ২৮৫ আমাদের আত্মাপুরুষ কোন একটা জড়ত্ব বা দাসত্বের বন্ধন ছিড়িতে উদ্যত, তখন তাহার সেই উদ্যমটায় অল্পাধিক একটা বিপ্লবের ভাব থাকিতে পারে স্বীকার করি, কিন্তু সেইটাই ত আর স্বাধীনতার চিরন্তন মুৰ্ত্তি নয়। যে শাস্ত্রটা বর্তমানে মানবাত্মার প্রসারণে অন্তরায় ঘটায়, মানবের স্বাধীন ইচ্ছা সেটাকে না ছাটিয়া থাকিতে পারে না। কিন্তু তাহা বলিয়াই আমরা অতীত হইতে যাহা কিছু পাইয়াছি তাহাকে নির্মুলে ধ্বংস করাই স্বাধীনতার কাজ নয়। যদি কখন কোন স্বাধীনতা এমন প্রলয়ের আকারে দেখা দেয়, তবে তাহারও বিলয় অচিরেই ঘটে। এবং আবার সেই মৃত্যুঞ্জয় অবিনাশী অতীত মূতন কল্যাণের রূপে আমাদের সম্মুখে আবিভূত হয়। স্বাধীনতার কার শাস্ত্রকে বিলুপ্ত করা নয়, শাস্ত্রকে আত্মস্থ করা। শাস্ত্র যখন আমার জ্ঞানের ভিতর থাকে না, থাকে শুধু কেতাবের অক্ষরে, দশের কথায় ও দেশের প্রথায় তখন তাহা আমার মনে ভয় ও ভক্তির উদ্রেক করিলেও যথার্থ আমার জিনিস হয় না। যখন তাহাকে আমি আমার নিজের সাধনা ও উপলব্ধির মধ্যে লাভ করি, তখনই সে আমার হয়। স্বাধীনতা শাস্ত্রকে বাদ দিতে চায় না, কথা ও প্রথা বহুকাল ধরিয়া তাহার উপর যে একটি পুরু জাল বুনিয়াছে, সেইটাকে সরাইয়া তাহার আসল মুর্তিটি দেখিতে চায়। এই দেখিবার ফলে তাহাতে যদি কোন অমঙ্গল বা অসঙ্গতির লক্ষণ ধরা পড়ে স্বাধীনতা তখনই তাহাকে ভালিয়া গড়িতে কোমর বাঁধে, নহিলে শাস্ত্র দেখিলেই তাহার মাথায় মুগুর মারা, স্বাধীনতার এমন ডাকাতী পেশা নয়। এমন যথেচ্ছ ভাবে মুগুর মারিতে গেলে সে আঘাত কি আমাদের স্বাধীন জ্ঞানের নিজের গায়েও কতকটা পড়ে না। আমাদের স্বাধীন ৩ ২৮৬ সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ জ্ঞানের ভিতরে কি পূর্বসঞ্চিত শাস্ত্রজ্ঞান নিহিত নাই ? অতীতে যুগ যুগান্তর ধরিয়া যে জ্ঞান সঞ্চিত হইয়াছে তাহাকে বাদ দিলে মানবের স্বাধীন জ্ঞানের আর থাকে কি? সেটা ত তখন আদি মানবের একটা অপরিস্ফুট আবছায়া রকমের সংস্কারে পরিণত হয়। তাহার পরিধি অতি ক্ষুদ্র, তাহার চিন্তাশক্তি অতি তুচ্ছ। ক্রমশঃ বিকসিত, বিবর্ধিত ও সঞ্চিত জ্ঞানের সাহচর্যেই না সেই স্বাধীন জ্ঞান আজ এমন পরি- পুষ্ট। যে জাতির মধ্যে সমষ্ঠিগত জ্ঞান বর্ধিত ও সঞ্চিত হয় নাই, তাহার ব্যক্তিগত স্বাধীন জ্ঞানও অতি অপরিণত। পূর্বব সঞ্চিত জ্ঞান- সমষ্ঠি দ্বারাই আমাদের ব্যষ্টি-জ্ঞানের উৎকর্ষ পরিমিত হয়। তবে স্বাধীন জ্ঞানকে একটা উদ্ভট কিছু বলিয়া আমাদের মনে করিবার কি কারণ আছে ? আমাদের স্বাধীন জ্ঞান ত আর পূর্ব-দ্ধ শাস্ত্র জ্ঞানের একান্ত সম্পর্ক বিরহিত একটা কিস্তৃত কিমাকার জিনিস নয়। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের শাস্ত্রজ্ঞান ও স্বাধীন জ্ঞানের মধ্যে একটা বিরােধের ভাব দেখা দিলেও, বাস্তবিক তাহারা উভয়ে উভয়ের শত্রু নয়। তাহারা পরস্পরের পরিপােষণই করিয়া থাকে। এই পরিপোষণের পথ খােলা থাকিলে, বিরোধের ভাব কখনই থাকিতে পারে না। আমাদের এই কথা হইতে বােধহয় কেহই এমন বুঝিবেন না যে আমরা স্বাধীন মত মাত্রকেই বরণ করিয়া লইতে বলিতেছি, মানবের কল্যাণের জন্য যেমন শাস্ত্রজ্ঞানের দরকার, তেমনই তাহার কল্যাণের জন্যই স্বাধীন জ্ঞানের দাবিটাও অগ্রাহ নয়, ইহাই আমাদের বক্তব্য। ক্রয়ালচন্দ্র ঘােষ।

পয়ার। ঃঃ- কবিবর শ্ৰীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সু-করকমলেষু- সবিনয় নিবেদন, সেদিন “বিচিত্রায়” যখন ছন্দের আলােচনা হয়, তখন সে আলো- চনায় যে আমি যোগদান করি নি, তার প্রথম কারণসভার একটেরে বসেছিলুম বলে, আপনার বক্তব্য সকল কথা আমার কর্ণগােচর হয় নি, এবং তার দ্বিতীয় কারণ ওবিচারে আমি অনধিকারী। এ কথা আমি বিনয় করে বলছি নে। এ বিষয়ে আমার শক্তির অভাবের পরিচয় আমি আটের অপর একটি ক্ষেত্রে বহুকাল পূৰ্ব্বে লাভ করি। আমার তালজ্ঞান যদি সহজ হত, তাহলে আমি একজন চলনসই গাইয়ে হতে পারতুম; কেননা আমি তাল-কাণা হলেও সুর-কাল। নই,-এবং সুয় ভগবান শুধু আমার কানে নয় কণ্ঠেও দিয়েছিলেন। আমার এমন একদিন গিয়েছে যখন, আমি আর সব কাজকর্ম ছেড়ে গানঅভ্যাস করবার চেষ্টা করেছি এবং সে চেষ্টার ফলে সুরকে কায়দা করে আনতে অল্প-বিস্তর কৃতকাৰ্যও হয়েছিলুম। কিন্তু একদিন আমার একটি পাখোয়ানি বন্ধু আমাকে বেতাল সিদ্ধ গায়ক’ বলাতে চিরদিনের মত সঙ্গীতের চর্চা ত্যাগ করতে বাধ্য হই। অতএব এ কথা স্বীকার ;

২৮৮ সরু পত্র ভাদ্র, ১৩২ করূতে আমি কিছুমাত্র কুণ্ঠিত নই যে, ছন্দ সম্বন্ধে আমার অশিক্ষিত কিম্বা শিক্ষিত কোনরূপ পটুত্ব নেই। কবিতা আমি ছন্দের দিকে নজর রেখে পড়ি নে। তবে এমন সব কৰি আছেন, যাদের কবিতার ছন্দ অতিশয় অন্যমনস্ক লোকেরও চোখ এড়িয়ে যায় না—যথা ভারতচন্দ্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইত্যাদি। এদের লেখা পড়েই কবিতায় ছন্দের মাহাত্ম সম্বন্ধে আমার চোখ ফুটেছে। এ অবস্থায় আপনার অনুরোধে আমি কেন যে অনধিকার চর্চা করতে উদ্যত হয়েছি তারও কৈফিয়ৎ দিচ্ছি। সেদিনকার সভায় আমার পার্শ্ববর্তী কোনও ভদ্রলােক আমার মৌনতা, আপনাদের মতের সম্মতির লক্ষণ বলে ধরে ন্ েনি। তিনি বলেন যে, আমি পয়ার ত্রিপদীর ভক্ত বলে ওক্ষেত্রে নীরব ছিলুম। এ কথা বলার অর্থ এই যে, যার বিষয়ে দুটো ভাল কথা বলবার নেই তার বিষয়ে চুপ করে থাকাই শ্রেয়। আমি পয়ার ত্রিপদীর ভক্ত কি না সে হচ্ছে স্বতন্ত্র কথা, তবে বাংলার ঐ দুই মামুলি ছন্দের স্বপক্ষে যে কিছু বলবার নেই, এ কথা আমি বিনা ওজরে স্বীকার করে নিতে পারি নে। সুতরাং আমি এই সুযোগে পয়ার ত্রিপদীর পক্ষ থেকে একটু ওকালতী করতে চাই। বলা বাহুল্য ছন্দ সম্বন্ধে আমি যাব। সে উপচাল হিসেবে গণ্য করতে হবে—অর্থাৎ তা গ্রাহ্য করা আর না করা সম্পূর্ণ খেলোয়াড়- দের হাত। আমি পয়ার ত্রিপদীর বিরােধী নই, কেননা আমি কোনও ছন্দেরই বিরােধী নই। সকল ছন্দেরই এক একটা বিশেষ মূল্য, বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ সার্থকতা আছে। আমি কোনও art-for- কেই অবজ্ঞা করিনে ; এবং প্রতিটিকেই আর্টের রাজ্যের চিরস্থায়ী ব, পঞ্চম সংখ্যা পার ২৮৯ সম্পদ বলে মনে করি। শুনতে পাই এই জড়জগতের শক্তি ও পর- মাণুর পুঁজি বাড়েও না কমেও না, প্রকৃতির ও মুলধন অনাদি ও অনন্ত। চোখের সুমুখে আমরা যে হ্রাস বৃদ্ধি দেখতে পাই তার কারণ বিশ্বের একদিকে যেমন শিকস্তি হয় আর একদিকে তেমনি পয়স্তি হয় । এর এক অংশে যখন কিছু যােগ হয়, তখন বুঝতে হবে আর এক অংশে ঠিক ততখানি বিয়ােগ হয়েছে। সমগ্রটার পরিমাণ ও ওজন চিরকালই সমান থেকে যায়। কিন্তু মনােজগতের হিসেবটা এর ঠিক উল্টো। জড়জগৎটা আমাদের পড়ে পাওয়া আর মনো- জগৎটা আমাদের হাতে গড়া। সে জগৎটা শুধু বেড়েই চলেছে আর সে যােগের গুণে। মানুষের জ্ঞানের সম্বল, চিন্তার ধারা, অনু- ভূতির প্রসার যে যুগের পর যুগে বেড়ে চলেছে সে বিষয়ে বােধহয় দ্বিমত নেই। তার কারণ এক যুপের মনের ধনের সঙ্গে আর এক যুগের মনের ধনের যােগ হচ্ছে। এস্থলে অনেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে, পূৰ্ব্বজ্ঞান, পূৰ্বচিন্তা কি সব বজায় থাকে, না ও সব বস্তু ক্রমান্বয়ে বাতিল হয়ে যাচ্ছে এবং নূতন জ্ঞান নুতন চিন্তা পুরাতনকে সরিয়ে দিয়ে তার স্থান অধিকার কছে ? এর উত্তরে আমি বলি—পুরাতনই নূতনের জন্মদাতা; সুতরাং তার যা যথার্থ সম্পদ নুতন তা উত্তরাধিকারী সত্ত্বে লাভ করে। মূতন কতক পরি- মাণ পুরাতনেরই জের টেনে চলে—এ সত্ত্বেও আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে, দর্শন বিজ্ঞান ধম্মমত নীতিমত প্রভৃতি কখনও রূপে চির- স্থায়ী হতে পারে না, এ সবারই অস্তিত্ব কালের অধীন। একমাত্র আই কালের অধীন নয়। যাকে আমরা আঃ বলি তা আপাদ-মস্তক একটি সম্পূর্ণ সৃষ্টি বলে তা আর হ্রাস-বৃদ্ধির অধীন নয়। Venus de সবুজ পত্র ভা, ১ A Milo, তাজমহল, শকুন্তলা ও হামলেট প্রভৃতি প্রতিটি একটি সম্পূর্ণ সর্বাঙ্গ সুন্দর মানসী সৃষ্টি, ওর উপর আর মানুষের খোদকারি চলে না। মানুষে নূতন সৃষ্টি যে করতে পারে শুধু তাই নয়—সে যদি প্রাণে নয় মনেও বেঁচে থাকতে চায়, তাহলে মনের দেশে সে নিত্য নূতন সৃষ্টি করতে বাধ্য। কিন্তু যা আট তা মানুষের চির-আনন্দের সামগ্রী। thing of beauty is a joy for ever-এ কথা যেমন সুন্দর, তেমনি সত্য। মানুষে যে শুধু আর্ট সৃষ্টি করে তাই নয়—সেই সঙ্গে কতকগুলি art-form-ও সৃষ্টি করে। এবং অটের মত এই আট-ফরমগুলোও মানুষের চির-সম্পদ। এই সব চিরাগত art-form-কে সানন্দে বরণ করে নেওয়ায় মানুষে আত্মার দৈন্য নয়—শক্তিরই পরিচয় দেয়। মানুষে যাকে ভাষা বলে সেও একটি ant-form ছাড়া আর কিছুই নয়, আত্ম- প্রকাশের একটি বিশিষ্ট উপায়। এই ভাষার ছাঁচে নিজের মন ঢালাই করতে কোনও কবি অদ্যাবধি আপত্তিও করেন নি, ব্যাথাও বোধ করেন নি। এ ছাচ একটি প্রকাণ্ড ছাচ বলে লোকে এটিকে উঁচ বলে চিনতেই পারে না, অথচ ভাষা ভাবের ছাচ বই আর কিছুই নয়। তর্ক অবশ্য ওঠে ছােটখাটো ঘঁাচ নিয়ে—যেমন গ্রীসের নাটকের ছাঁচ, আমাদের দেশের রাগরাগিণীর ছাঁচ, আর সকল দেশের কবিতার ছন্দের ছাঁচ। এই সব সঙ্কীর্ণ ছাচ যে গুণী লোকের প্রতিভাকে চেপে মারে নি-তার প্রমাণ Eschylus,Sophocles Euripides প্রভৃতি পৃথিবীর সর্বাগ্রগণ্য নাটককারেরাও ঐ একই ছাঁচে তাদের সকল মন, সকল প্রাণ, সকল জ্ঞান, সকল ধ্যান ঢেলে দিয়ে এক একটি অপূর্ব সুন্দর-মূর্তি গড়ে তুলেছেন, অথচ এদের একের প্রতিভা অপরের ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পয়ার প্রতিভার স্বজাতি নয়। Aschylus-এর সঙ্গে Euripides-এর তফাৎটা কতদূর তার পরিচয় Aristophanes-এর Frogs-এ পাবেন। এঁদের জ্যেষ্ঠটি দক্ষিণ মার্গের, কনিষ্ঠটি বাম মার্গের এবং মধ্যমটি মধ্যপথের চরম কবি। ভরসা করে চরম কবি বলছি এই জন্যে, অনুবাদে যাঁদের রচনা এত চমৎকার, তাদের মূল রচনার সৌন্দর্য্যের নিশ্চয়ই আর তুলনা নেই। এই লম্বা ভূমিকাই প্রমাণ যে, এক্ষেত্রে আমি প্রকৃত প্রস্তাবে উপস্থিত হতে পিছ-পা হচ্ছি, কারণ ছন্দের উপর হস্তক্ষেপ করতে আমি স্বতঃই নারাজ। সংক্ষেপে আমার বক্তব্য এই যে, ছন্দের বাঁধাবাঁধি নিয়মকে আমি কবিতা রচনার শত্রু নয়—মিত্র হিসেবেই গণ্য করি। আমি ইতিপূৰ্ব্বে আমার মত দু’ছত্রে প্রকাশ করেছি। আমি লিখেছি- ভালবাসি সনেটের কঠিন বন্ধন, শিল্পী যাহা মুক্তি লভে অপরে ক্রন্দন। একথা আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। আমার মনের কথা, আমার সনেটের অন্তরে যে মুক্তি নয়—সুপ্তি লাভ করেছে, তার কারণ আমি ছন্দ-শিল্পী নই। আপনার হাতে ঐ একই জিনিস চতুর্দশ-দল ফুলের মত ফুটে উঠত। পয়ার ত্রিপদী যে ছন্দশিল্পীদের তেমন প্রিয় নয় তার কারণ এদের বন্ধন কড়া নয়—ঢিলে। এক হিসেবে এদুই verseform-এর ঐ সহ ঢিলেঢালা ভাবটা দোষেরও বটে গুণেরও বটে। আনাড়ির হাতে এ দুই-ই যেমন অচল,গুণীর হাতে আবার তা তেমনি সচল। কেন তা পরে বলছি।

সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ পয়ার বাংলা কাব্যের শুধু বাঁধ সড়ক নয়—একেবারে বড় রাস্তা, সাধুভাষায় যাকে বলে রাগ-পথ। কাব্যের এ রকম রাজ-পথ সকল ভাষাতেই আছে। গ্রীকের Hexametre, সংস্কৃতের অনুষ্টপ, patata Alexandrine, Seatroa lambic-pentametre-4 সবই হচ্ছে পয়ারের স্বজাতি। এক আধ মাত্রার কমবেশিতে কিছু যায় আসে না-এ সব ছন্দের ভিতর একটা মস্ত বড় মিল আছে। এ সব ছন্দই চরণে চরণ মিলিয়ে চলে এবং এদের প্রত্যেকের প্রতি চরণটি কিঞ্চিৎ লম্বা। এর একটি কারণ এ সব ছন্দের জন্ম গদ্যের জন্মের বহুপূর্বে হয়েছিল। সভ্যতার আদিযুগে এই শ্রেণীর পদ্যই ছিল মানুষের সকল প্রকার ভাব প্রকাশের প্রধান উপায়। এরি সাহায্যে মানুষকে গল্প বলতে হত, জ্ঞান বিতরণ করতে হত, রাগ বিরাগ প্রকাশ করতে হত। কিন্তু এ সব ছন্দ হচ্ছে প্রধানত আখ্যায়িকারই বাহন। একটানা একটা লম্বা গল্প বলে যাবার জন্য এই হচ্ছে কাব্যের সনাতন পথ। এ সব ছন্দে মানুষের মন চলতে পারে, এমন কি ছুটতেও পারে কিন্তু নাচতে পারে না, অন্তত সহজে ত নয়-ই। অবের এ বাহনের যে শুধু পিঠ চৌড়া তা নয় - এর গতিও ধীর, ললিত। এ ছন্দের ভিতর space এবং repoge দুই-ই যথেষ্ট পরিমাণে আছে। সেই কারণে অদ্যাবধি পৃথিবীর সকল দেশেই কবিরা ভাবের দীর্ঘযাত্রা করতে হলে ঐ প্রশস্ত পথই অবলম্বন করেন। এ সব ছন্দের তাল হচ্ছে চৌতাল ধামারের ঘরের। পয়ারের তাল ঢিমে বলে আনাড়ির হাতে । প্রায় গদ্য হয়ে যায়- অপরপক্ষে গুণীর হাতে তার ধ্বনি মৃদঙ্গের পরং-এর মত জমাট ও ।

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পন্থা। ভরাট হয়ে ওঠে। উদাহরণ—রবীন্দ্রনাথের মেঘদূত। এ পয়র কালিদাসের মন্দাকান্তার অনুরণনে ভরপুর। এ ছন্দ ইচ্ছামত দ্রুত ও বিলম্বিত করা যায়—অবশ্য এর অবিরল ঘন ভাবটি বজায় রেখে, নচেৎ এর স্বরূপটি বজায় থাকে না। এই কারণে যদিচ ভাবপ্রকাশের একটি নতুন ও সােজা পথ—গদ্য বেরিয়েছে তবুও কাব্যের এই আদি ছদ আজও সশরীরে বর্তমান হয়েছে। গদ্যেরও অবশ্য rhythm আছে কিন্তু metre নেই। এই metre-এর অভাবেই গদ্য এশ্রেণীর পদ্যের মত সাকার হয়ে উঠতে পারে না এবং art হিসেবে সেইজন্য গদ্যের স্থান আজও পদ্যের নীচে। আমি পূর্বে বলেছি পয়ার প্রভৃতি চোতাল ধামারের ঘরের তাল। ও তালে ভাষাকে নাচান যায় না- কিন্তু ঐ তালকে আড় করে নিলে, ভেঙ্গে নিলে যং খেমটা সবই পাওয়া যায়। সুতরাং পয়ার প্রভৃতি ছন্দ যেমন metre-এর বন্ধন মুক্ত হয়ে একদিকে গদ্যে পরিণত হয়েছে অপর দিকে তেমনি metre- এর ভাঙ্গচুরে নানা ছন্দে পরিণত হয়েছে। সকল ছন্দের কুলের খবর আমি জানিনে কিন্তু পয়ার ত্রিপদী ভেঙ্গে ও আড় করে যে নানা ছন্দ গড়া যায় তার পরিচয় ভারতচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যথেষ্ট পাওয়া যায়। অতএব দাড়াল এই যে, পয়ার ত্রিপদী যে নিজগুণে বেঁচে আছে—তাই নয়, ঐ মুল ছন্দ থেকে নানা ছন্দের উদ্ভবও হয়েছে। আমার একথা যদি সত্য হয়, তাহলে পয়ার ত্রিপদীকে কাব্যরাজ্য হ'তে নির্বাসিত করে দেবার দিন আজও আসে নি। ভবিষ্যতে কি হয় তা বলা যায় না।

২৯৪ ভাদ্র, ১৩২৫ কিন্তু এখন দেখছি আমার এ ওকালতিটে একদম বাজে খাটুনি হয়েছে। আমি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হয়েছি যে, পয়ার ত্রিপদীকে মানে মানে বিদায় দেবার কথা কেউ মুখে আনা দূরে থাক মনেও আনে নি। শুনছি, তর্ক উঠেছে এই নিয়ে যে, চলতি বাংলা কথাকে পয়ারের ভিতর খাপ খাওয়ানো যায় কি না। এর জবাব দিতে হলে পয়ারের শুধু চরিত্র নয় জীবনচরিত ও ঈষৎ আলােচনা করা দরকার। আমি পূর্বেই বলেছি এ জাতের ছন্দ সকল ভাষাতেই আছে এবং সকল ভাষারই সেটি শুধু পুরাতন নয় সনাতন ছন্দ। প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে এ ছন্দ গড়লে কে ? এর উত্তরে অনেকে বলবেন—“জাতীয় প্রতিভা।” আমার মতে ও উত্তর—“জানি না” বলারই সামিল। কেন জৰ্ম্মাণ পণ্ডিতরা যাই বলুন—“জাতীয় প্রতিভা” বলে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব নেই। প্রতিভা শুধু দুচার জনের থাকে, এবং জনগণের মধ্যে সকলযুগে সকলদেশে যা পুরাে মাত্রায় থাকে তা হচ্ছে প্রতিভা-বিদ্বেষ। জাতীয় নির্বুদ্ধিতাই জাতিকে বিশিষ্টতা দেয়, কেননা প্রতি জাতের একটা বিশেষ রকম নিবুদ্ধি আছে। জাৰ্মাণরা যাকে বলে “জাতীয় অহং”—তার পরিচয় পাওয়া যায় শুধু জাতীয় অহঙ্কারে। এবং যার জন্য যে জাতির লজ্জিত হওয়া উচিত, তাই নিয়ে সে জাতি গৌরব করে। এর প্রমাণ এক জাতির হামবড়ামি অন্য জাতির কাছে চির দিনই—যেমন হাস্যাস্পদ তেমনি বিরক্তিকর। বাল্মীকির মুখে “শ্লোক” যেমন একদিন হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিল তেমনি অপর সকল জাতির ভিতরও কোনও না কোনও কবির মুখেই এসব ছন্দ অকস্মাৎ জন্ম লাভ করেছে। এশ্রেণীর ছন্দকে এই হিসাবে জাতীয় ছন্দ বলা যায় ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা পার ২৯৫ যে এপথ একের দ্বারা আবিষ্কৃত হলেও বহু কবির পায়ে পায়ে তা কাব্যের বড় রাস্তা হয়ে দাড়িয়েছে। সুতরাং এস্থলে আসল জিজ্ঞাস্য হচ্ছে—এ সব ছন্দ কেন অপরের কাছে এ ভাবে গ্রাহ্য হয়েছে। এর একমাত্র উত্তর, এ সব ছন্দের জাতীয় ভাষার সঙ্গে ওজনেও পরিমাণে একটা স্বাভাবিক মিল আছে অর্থাৎ ভাষার শব্দরাশি এই সব ছন্দের ভিতর আরামে এবং খাপে খাপে বসে যেতে পারে। এ কথা যদি সত্য হয় তাহলে বাংলা কথার যে বাংলার পয়ারের ভিতর স্থান হবে না, এ হতেই পারে না। তবে এ রকম সন্দেহ যে লােকের মনে জাগে তার কারণ, আমাদের এ কালের মুখের কথার সঙ্গে সেকালের পথের কথার সম্পূর্ণ মিল নেই। পয়ারের নাম উচ্চারণ করবামাত্র আমাদের চোখের সুমুখে এসে দাঁড়ান কৃত্তিবাস ও কাশিদাস। আমাদের চলতি ভাষায় হয়ত কাশিদাসী পয়ার লেখা না যেতে পারে কিন্তু তাই বলে পয়ার কেন লেখা যাবে না তা বুঝতে পারি নে। মুখের কথাকে আমি পয়ারস্থ করতে পারি নে, কিন্তু আপনি ও রবীন্দ্রনাথ যে ইচ্ছা করলেই পারেন সে বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নাই। পয়ার বলতে আমরা সাধারণ লোকে কি বুঝি? সেই ছন্দ—যার প্রতি পদে চৌদ্দটি করে অক্ষর থাকে। পয়ারের পয়ারত্ব যদি অক্ষরের সংখ্যার উপরেই নির্ভর করে তাহলে বলা বাহুল্য নানা রকম মাত্রায় ও ছন্দকে চালানো যেতে পারে। শুধু চার মাত্রা নয়, তিন মাত্রা, পাঁচ মাত্রার তালেও পয়ারকে খেলানাে যায়। অর্থাৎ আমরা কাওয়ালি ছাড়া—একতালা, ঝাপতাল এমন কি যৎও লাগিয়ে দিতে পারি। তা যে পারি তার প্রমাণ, রবীন্দ্রনাথের চুল-প্রবন্ধে পাবেন। পয়ারের আকার যে অক্ষরগত তার কারণ, বাংলা ভাষার অধিকাংশ শব্দ হয় ভাদ্র, ১৩২৫ দু’অক্ষরের নয় তিন অক্ষরের, বড় জোর চার অক্ষরের, তার বেশি নয়। সুতরাং চৌদ্দ অক্ষরের পদের অভ্যন্তরে আমাদের অধিকাংশ শব্দই অক্লেশে পাশাপাশি বসে যায়। পয়ারের রূপ যে অক্ষরের উপর নির্ভর করে এ কথা যে সকলে মানেন না, তার কারণ বাংলা শব্দের অক্ষরের আকারের সঙ্গে মাত্রার ওজন মেলে না। বাংলা শব্দের হয় মধ্যে, নয় শেষে হসন্ত থাকায় দুই অক্ষরের শব্দের মাত্র দেড় এবং তিন অক্ষরের আড়াই। এবং তাল জিনিসটে যখন মাত্রাগত তখন অক্ষর গুণে পয়ার লিখুলে ছন্দ যে বেতালা হয়ে যাবার সম্ভাবা সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু এ গরমিল কবির কোনও ক্ষতি করে না। কেননা কবি অক্ষর গুণেও কবিতা লেখেন না, মাত্রা গুণেও নয়। তার রচনা আপনা হতেই ছন্দে পড়ে যায়, কেননা তিনি যখন কবিতা লেখেন তখন তার কানে—ছন্দের পুরো সুরটা বাজতে থাকে,—তিনি মাত্রার সঙ্গে মাত্র। জুড়ে পদ্য রচনা করেন না। অর্থাৎ কবির মন প্রাণ থেকে যা বেরয় তা গােটা ভাবেই বেরয়, আমরা সেই গােটা জিনিসটিকে পরে ভাগ করে তার গড়নের সন্ধান পাই। আর যিনি কবি নন্ অর্থাৎ যঁর অন্তরে ছন্দ নেই তিনি অক্ষর গুণেই লিখুন আর মাত্রা গুণেই লিখুন তাঁর হাত থেকে যা বেরবে তার হয়ত তাল পাওয়া যাবে না, আর যদি তাল পাওয়া যায় ত সুর পাওয়া যাবে না। অন্য লোকে লাঠি বাজে” বলে “যার কৰ্ম্ম তারে সাজে” না, এমন কথা কেউ বলতে পারেন না। মাত্রার হেরফের করে কবি ছন্দের সম্পূর্ণতা রক্ষা করেন। মাত্রার কম বেশীর হিসেব তখনই চোখে পড়ে যখন আমরা প্রতি শব্দটিকে আলাদা করে দেখি—কিন্তু একটি পুরো ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা ২৯৭ পদকে একটি ধ্বনি হিসেবে দেখলে ও জিনিস আমাদের নজরেই পড়ে না। তারপর আর একটি প্রশ্ন ওঠে। যদি পয়ারকে মাত্রাগত ছন্দ হিসেবে গ্রাহ্য করতে হয় এবং কাশিদাসী পয়ারকেই আদর্শ পয়ার হিসেবে গণ্য করতে হয় তাহলে সে পয়ারের ভিতর মুখের কথাকে বেমালুম খাপ খাওয়া যায় কি না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখিয়ে দিয়ছেন যে পয়ারের তাল কাওয়ালি অর্থাৎ চারটি পদে এ ছন্দ সম্পূর্ণ। তিনি আরও বলেন যে, এ ছন্দের ভাগ চারটি হলেও ঝোক দুটি মাত্র। সুতরাং একে আট মাত্রার দ্বিপদী ছন্দ বলা যেতে পারে। হসন্তের গুণে প্রতি বাংলা শব্দের একটি নিজস্ব ঝোঁক আছে--সুতরাং এ সন্দেহ সহজেই মনে উদয় হয়, যে এত ঝোক ওয়ালা শব্দকে কি করে ঐ দুই ঝোকের ছন্দে বসিয়ে দেওয়া যায়। তারা ত প্রত্যেকেই নিজের ঝোকে ঠেলে ঠেলে উঠবে এবং এদের কারও ঝোক মধ্যে কারও ঝোক শেষে। বাংলা কথার ঝোঁক বেশি আর টান কম ; আর সাধুশব্দের টান বেশি ঝােক কম। সুতরাং কারও কারও মতে পয়ারের মত সটান ছন্দে সাধুশব্দেরই ন্যায্য অধিকার আছে—বাংলা কথার নেই। এর উত্তরে আমার বক্তব্য যে, যার পদে পদে ঝোক নেই, তাকে ছন্দ নামে অভিহিত করা যায় না। কাশিদাসী পয়ার গাওয়া যায় কিন্তু পড়া যায় না। যে পয়ার পড়বার জন্য রচিত হবে তাতে সাধুশব্দ চলবে না, কেননা সে শব্দের ঝোঁক নেই। ঝোঁক আর টান দুইয়ে মিলে এক না হলে ছন্দ হয় না। স্রোতের জল একটান। অথচ হিল্লোলিত অর্থাৎ সে জল সটান চলে কিন্তু ঝেকে ঝোঁকে। যে জলের ঝোক নেই—তার :

২৯৮ সবুজ পত্র তাত্র, ১৩২৫ গতিও নেই তার একটানা চেহারাটা শুধু অচলতার লক্ষণ। সুতরাং ঝোকপ্রধান বলে বাংলা শব্দ কেন উদার ছন্দের মধ্যে স্থান পাবে না বুঝতে পারছি নে। ইংরাজি শব্দও ত সব ঝোঁকপ্রধান, তৎসত্ত্বেও Iambic pentametre-এর মধ্যে তারা সজোরে বসে রয়েছে। বাংলা শব্দ যদি আট মাত্রার তাল অর্থাৎ মধ্যমানে পড়তে রাজি না হয় তাতে কিছু আসে যায় না-কাওয়ালি ঠুংরিতে ঠিক বসে যাবে। সুতরাং মুখের কথায় সেকেলে পয়ার লেখা না গেলেও, তার চাইতে ঢের বেশি স্রোতস্বতী ছন্দে লেখা যাবে। আমার এ সব কথা আমি কাউকে গ্রাহ করতে বলিনে, কেননা আমি জানি যে, আমি ভাদ্র মাসে জন্মায় নি। তবে কোনো বিষয়ে যখন একটা তর্ক ওঠে তখন সে বিষয়টাকে শুধু ভিতর থেকে নয় বাইরে থেকে দেখারও একটা সার্থকতা আছে, এই বিশ্বাসে আমি ছন্দসম্বন্ধে out-sider হিসাবেই আপনার অনুরোেধ মত এ আলাে- চনায় যােগদান করতে সাহসী হয়েছি। ইতি প্রমথনাথ চৌধুরী।

একটি সত্যি গল্প। উচ্ছল উদ্দাম পার্বত্য ঝরণা হু হু শব্দে পাহাড়ের গা দিয়ে ছুটে চলেছে—যেন সে জানিয়ে দিতে চায় যে, এ জগতে গতির চাইতে বড় সত্য আর কিছু নেই। সেই ঝরণার ধারে একটুখানি সমতল জায়গার উপরে ছােট্ট একটি কুটীর-আর সেই কুটীরে বাস করত এক তরুণ পাহাড়ি। তরুণ পাহাড়ির দিনমান কোনই কাজ ছিল না—সে তার কুটীরের চার পাশ বন্য গােলাপের গাছে গাছে ভরে তুলেছিল—বশ্য গােলাপ আরও কত রকমের ফুল লতা পাতা দিয়ে তার কুটীর খানিকে কুঞ্জবনের মত করে তুলেছিল। দিনমান সে সেই ফুল লত। পাতার চর্চা করেই কাটিয়ে দিত—কেবল সকাল বেলায় যখন প্রভাতী সূর্যের আলাের স্পর্শে পাহাড়ের গায়ের বরফ চিকমিক করে উঠত তখন সে একবার সেই ঝরণাটির ধারে গিয়ে উপস্থিত হত।, সেখানে গিয়ে ঝরণার অপর দিকে বহুক্ষণ ধরে চেয়ে থাকত, যেন কার আসবার কথা আছে-যেন সে কায় অপেক্ষায় সেখানে কুটীর বেঁধে রয়েছে। কিন্তু সারাবেলা দেখে দেখে যখন মাথার উপরে উঁচু পাহাড়ের বরফের সােনালি রঙ, চলে গিয়ে তা রূপােলি রঙে ঝিক ঝিক করে উঠত তখন সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কুটীরে ফিরে আস্ত-আবার ফুলগাছগুলোর তত্বাবধান, পরিচৰ্যা কত।

সবুজ পত্র
ভাদ্র, ১৩২৫
এমনি করে কিছু দিন কেটে গেল। একদিন তাকে আর অমনি
ফিরে আসতে হ’ল না। সে ঝরণীর ধারে গিয়ে দেখলে যে অপর
পারে একটা পাথরের উপরে চুপ করে বসে রয়েছে এক সুন্দরী
তরুণী, যেন পাষাণ ফেটে পদ্মফুল ফুটেছে।
মুহূর্তে পাহাড়িকে কে যেন বলে দিয়ে গেল যে এ সেই—যার
অপেক্ষায় সে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াত। মুহূর্তে পাহাড়ির অন্তরটা
সার্থকতায় ভরে উঠল—তার চোখে পলক পড়ল না—অনিমেষ নয়নে
সে দেখতে লাগল সেই সুন্দরী অপরিচিতা তরুণীকে
অচেনা ? অচেনা ত বটেই; কিন্তু তার মত চেনা ত আর কেউ
নেই—আর কিছু নেই। বর্ষে বর্ষে দিনে দিনে পলে পলে তারই
অন্তরের সঙ্গে সঙ্গে যে সে গড়ে উঠেছে তারই আনন্দের ভিতর
' দিয়েই যে তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয়। এ পরিচয় ত এক দিনের
নয়—এক কালের নয়-এ পরিচয় যে বহু দিনের, বহু কালের কত
জন্মের। অচেনাই বটে—কিন্তু অতি অন্তরতম।
পাহাড়ি জিজ্ঞেস করল-“ওগাে তরুণি, তোমার নামটি কি ?
তুমি আসছ কোথা থেকে ?”
তরুণী উত্তর দিলে—“নাম আমার তরুণী —আসছি আমি বহুদিন
হতে—বহুদূর থেকে।”
“বহুদিন হ’তে —তবে ত তুমিই সেই—যার অপেক্ষায় আমি
এতদিন কাটিয়েছি। বহুদুর থেকে।-তাই বুঝি আমি দিগন্তের
কোলে কোলে তােমারই পায়ের নূপুরের গুঞ্জন শুনতে পেতুম-ঐ
দূর বনান্তরাল থেকে যে বাতাস বয়ে আসত তাতে তোমারই কুস্তলের
সুরভী-ঘ্রাণ পেতুম—ঐ ঊর্কে বহুদূরে সুনীল গগনে তােমারই নীল

এ ব্য, পঞ্চম সংখ্যা
একটি সত্যি গল্প
নয়নের অসীম দৃষ্টির গভীরতা আমার চোখে ধরা পড়ত।
তুমিই সেই-তবে ত তুমি আমার-ই। ওগো তরুণি, আমাদের মিলন
হবে কেমন করে? ওপার ছেড়ে এ পারে আসবে না কি?”
“তােমার নামটা কি ?”
“নাম অামার কল্পশেখর।”
“কল্পশেখর, তোমার সাধ্য কি আমায় ধরে রাখবে তােমার ঐ
ছােট্ট কুটীরে—তোমার ঐ ছােট্ট কুটীরে ত আমার জায়গা হবে না।
আর এই খরস্রোত নিঝরিণীকেই বা আমি পেরিয়ে যাব কেমন করে
এ স্রোত যে মত্ত-মাতঙ্গকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তার চাইতে
কল্পশেখর, তুমিই এধারে এস। ওধারে ঐ কুটীর তােমার গণ্ডী।
কিন্তু এধারে ত কোন গণ্ডী নেই-এধারে দিগন্তের আলো, দিগন্তের
বাতাস। সার দিয়ে ঐ যে পাহাড়ের পর পাহাড় অনন্ত যুগ ধরে মোন
হয়ে দাড়িয়ে আছে-সেই অনন্ত যুগের স্বপ্ন এধারে।
যুগের স্বপ্ন নিয়ে অনন্ত যুগের সাক্ষী হয়ে যে পাহাড়গুলাে দাড়িয়ে
আছে তার আশে পাশে ভিতরে বাহিরে উপরে নীচে কত পথ কত
অপথ—কত উপত্যকা অধিত্যকা—কত অসমাপ্তি। এই পথ অ-পথ
ধরে উপত্যকা অধিত্যকার ভিতর দিয়ে এই অসমাপ্তির দিকেই আমরা
যাত্রা করব, কল্পশেখর—তুমিই ওধার ত্যাগ করে এধারে এস না।”
“তবে তাই আসব তরুণী।”
কল্পশেখর জলে মাল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ অনুভব করলে যে তাকে
নিঝরিণীয় খরস্রোত কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে। কল্পশেখর তাড়াতাড়ি
জল ছেড়ে উঠে নিরিণ ৩টে দাঁড়ালে। সাধ্য কি মানুষের
এই খরস্রোতা অগভীর নিরিণী পায়ে হেঁটে পার হয়।
ঐ অনন্ত

সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ কল্পশেখর বলে—“শােনো তরুণী, মানুষের সাধ্য নেই এই খর- শ্রোতা নিঝরিণী হেঁটে পার হয়। শোনাে, চল আমরা দুজনে এই ঝরা ধরে উজানের দিকে চলে যাই। যেখানে এর পরিসর স্বল্প হবে সেখানে এটাকে আমি ডিঙ্গিয়ে যাব।” তরুণী বললে—“আচ্ছা চল।” দু’জনে দু’পার দিয়ে ঝরণার উজানে যাত্রা করল। দু’জনে ধীরে ধীরে চলতে লাগল। ধীরে ধীরে সােনালি সূৰ্য্য পূব গগনে উঠে মাঝ গগনে গিয়ে পড়ল—আবার সেখান থেকে ক্লান্ত দেহে রাজা মুখে পশ্চিমে ঢলে পড়ল, কিন্তু ঝরণা তেমনি হুহু শব্দে ছুটে চলেছে, কোনখানেই তার পরিসর এমন সঙ্কীর্ণ হয় নি যে, কমশেখর তা ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে। সন্ধ্যা যখন তার কাজল আঁখি নিয়ে, তার কালাে আঁচল আকাশে উড়িয়ে প্রকৃতিকে নিস্তব্ধ হ'তে ইঙ্গিত করল তখন তরুণী ব্যথিত কঠে ডাকল—“বল্পশেখর।” “আর ত আমি হাটুতে পারি না, কল্পশেখর।” কল্পশেখর বললে-“তবে আজকার মত আমাদের যাত্রা শেষ। শোনাে তরুণি, এইখানে আমরা দু'জনে রাত কাটাব। তারপর প্রভাত হলে আবার চলব।” তারা সেইখানে নিরিণীর দু'ধারে দু’জনে শ্রান্ত দেহে বসে পড়ল, দু’জন দু’জনের দিকে চেয়ে রইল। চারিদিকের স্তব্ধতার বুক চিরে হু হু শব্দে উদ্দাম উচ্ছল ঝরণা তাদের দু'জনার মাঝ দিয়ে একটা অনন্ত বাধার মতো অক্লান্ত বেগে ছুটে চলল। ধীরে ধীরে চারিদিকে আঁধার নিবিড় হয়ে এল, সুন্দরীর নীলাঞ্চলে চুমকির মতে, নীলাকাশে লক্ষ তারা জ্বল জ্বল করে উঠল। কৌতূহলী '৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা একটি সত্যি গল্প হ'য়ে বুঝি তারা মুখর ঝরণার দু'পাশে এই দুটী মৌন প্রাণীকে দেখতে লাগল। কি চায় এরা? কোন্ মরীচিকার পিছনে ছুটে চলেছে এরা ? পরিণাম কি হবে এদের ? তাই বুঝি তারা পরস্পরের মাঝে বলাবলি করতে লাগল। তার পরদিন প্রভাত হলে তারা আবার চলতে লাগল-কিন্তু যেমন ঝরণ। তেমনি, কোথাও একটু সংকীর্ণ হয় নি, কোথাও তার গতিবেগ একটু মন্দ হয় নি—এ যেন অনন্ত কালের পথে অনাদি কাল থেকে ছুটে চলেছে। আবার সন্ধ্যা হ’ল, আবার নীলাকাশে লক্ষ তারা জ্বল জ্বল করে উঠল। আবার তারা বিশ্রাম করতে বসা। পরদিন প্রভাতে আবার তারা চলতে লাগল, তার পরদিন-তার পর দিন, এমনি করে তারা চলতেই লাগল। যতই তাদের আশা ব্যর্থ হচ্ছিল—ততই তাদের আকাঙ্খা প্রবল হয়ে উঠছিল, যতই তাদের আকাঙ্খা প্রবল হচ্ছিল ততই তাদের উৎসাহ উদ্যম অদম্য হয়ে উঠছিল। এমনি করে কত দিনের পর রাত, রাতের পর দিন কত উপত্যকা অধিত্যকা অতিক্রম করে, কত পর্বতচূড়া প্রদক্ষিণ করে তারা সেই পার্বত্য ঝরণার উজানে চলল। কিন্তু সে ঝরণার কোন পরিবর্তন নেই—একই গতি, একই পরিসর, কোথায়ও এমন অবসর নেই যেখানে কল্পশেখর তা ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে, সাহস করে উল্লম্বনের চেষ্টা করতে পারে। এমনি করে পাঁচটী বৎসর কেটে গেল। সেদিনও তারা চলছিল, হঠাৎ নিঝরিণীর হুহু শব্দকে ডুবিয়ে ছাপিয়ে এক বিশাল গর্জন তাদের কানে এসে বাজল। যেন সহ এন এ সৃষ্টিকে ছিড়ে ফেলবার জন্যে সহস্র দিকে একসঙ্গে ছুটেছে- যেন সপ্ত সিন্ধুর লক্ষ লক্ষ উৰ্ম্মি সহসা ক্ষিপ্ত হয়ে একসঙ্গে ৩৪ সবুজ পত্র গজ,১২৫ পৃথিবীর পায়ে এসে মাথা খুঁড়ছে। কল্পশেখর একটু থেমে তরুণীকে বলে—“তরুণি শুছ ?” “শুনছি।” “কিসের শব্দ এ?” “বুঝি মহাপ্রলয়ের ?” “অগ্রসর হবার সাহস আছে ?” “তুমি যেখানে যাবে সেখানে আমার ভয় নেই।” “তবে চল।” দুজনে আবার চলতে লাগল। তারা যতই অগ্রসর এতে লাগল ততই সে গর্জন প্রবল হ'তে প্রবলতর হয়ে উঠতে লাগল। অবশেষে তারা সেই বিশাল গর্জনের কারণ আবিষ্কার কল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চলাও বন্ধ হ’ল। কিন্তু হায় তাদের যাত্রা শেষ হ’ল না? তারা যেখানটায় এসে পড়ল সেখানে তাদের সামনে বিশাল প্রাচীরের মত এক খাড়া পাহাড় আপনার মাথা তুলে রয়েছে-একে- বারে খাড়া—দক্ষিণে বামে যতদূর দৃষ্টি চলে, ততদুর এই খাড়া পাহাড়। উপরে তাকিয়ে তার উচ্চতার শেষ দেখা যায় না। যেন বিশ্বকর্মা পৃথিবীর সকলকৌতুহলের, সকল আশা-আকাঙ্খার বাধা স্বরূপ যােজন- দীর্ঘ যােজন-উচ্চ এক খাড়া প্রাচীর তৈরী করে এখানে বসিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষের এখানেই গতির শেষ—আর অগ্রসর হবার উপায় নেই। আর সেই পাহাড়ের মাথার উপর থেকে একটি প্রকাণ্ড জলপ্রপাত বিরাট গর্জন করে এসে পড়ছে। এই প্রপা তই সেই ঝরণা হয়ে বয়ে গিয়েছে যার তীরে তীরে তারা এই পাচ বৎসর হেঁটে এসেছে। এই প্রপাতের শব্দই পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত F ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা একটি সত্যি গল্প হয়ে চতুগুণ শব্দে তাদের কানে এসে বাজছিল। তারা সেই প্রপাত ও নিঝরিণীর সঙ্গম স্থলে নিঝরিণীর দু’পারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে রইল। কল্পশেখর ভাতে লাগল। এতদিন অন্তত তাদের মিলনের চেষ্টা করবার উপায় ছিল, আজ তারও শেষ। হয় মিলন, নয় মিলনের চেষ্টা। চেষ্টাও যখন অসম্ভব, তখন জীবনে কাজ কি ? কিন্তু এত সহজেই নিরস্ত হব ? প্রথম বাধাতেই অ-জীবনের সাধনা পরাজয় মানবে ? অসম্ভব! বল্পশেখরের অন্তর দেবতা ত তা মানতে চায় না। এই দুরারোহ পাহাড়ে ওঠার কি কোন উপায় নেই—কোন পথই নেই? এই জলপ্রপাতেই নিঝরিণীর উৎপত্তি। সুতরাং সেখানেই এর শেষ। এই পাহাড়ের ওপরেই তাদের যাত্রা শেষ হবে—তাদের মিলন হবে। কল্পশেখর তার বামে দক্ষিণে তাকিয়ে দেখল। যতদুর দৃষ্টি চলে খাড়া পাহাড় পূর্বে পশ্চিমে আপনাকে বিস্তার করে নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি স্বরূপ দাড়িয়ে আছে। যেন বলছে-মানুষ, তােমার আশা আকাঙ্ক্ষা কল্পনা জল্পনা উদ্যম উৎসাহের এইখানে শেষ—যাও ধরিত্রীর সন্তান আপনার মাতৃ ক্রোড়ে ফিরে যাও। এমন সময় সেখানে এক অপূর্ব সুন্দর পুরুষের আবির্ভাব হ'ল। বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে সে একবার কল্পশেখরকে আরবার তরুণীকে দেখতে লাগল-যেন তাদের এখানে উপস্থিতির অর্থ সে কিছুই খুলে পাচ্ছিল না। অবশেষে সে কল্পশেখরকে সম্বােধন করে বললে- “তুমি কে?” “আমি মানব।” তরুণীরুদিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল-“তুমি কে ?”

সবুধ পত্র
ভা, ১৩২।
“আমি মানবী।”
“কোথা থেকে আসছ তোমরা ?”
কল্পশেখর বললে—“আমরা আসছি সেই দেশ থেকে, যেখানে
ফুল ফোটে আবার ঝরে যায়—মানুষ জন্মে আবার মরে যায়--
যেখানে গড়ে আবার ভাঙে-ভাঙে আবার গড়ে—যেখানে আশার
অন্ত নেই, আকাঙক্ষার শেষ নেই, সাহসের সীমা নেই।”
“তােময়া মর্ত্যের জীব ?”
“আমরা মর্ত্যের জীব।”
“কি চাও তােমরা?”
“তুমি কে ?
“আমি গন্ধৰ্ব্ব।”
“শােনো গন্ধর্বব—অামরা চাই পরস্পরের মিলন। এই পাঁচ বৎসর
ধরে আমরা এই নিঝরিণীর দু'তীর দিয়ে দু’জনে হেঁটে এসেছি—আর
এই পাচ বৎসর ধরে এই নিঝরিণী আমাদের মাঝ দিয়ে একটা অনন্ত
বাধার মত বয়ে গিয়েছে। জানি আজ আমাদের যাত্রার শেষ।
কোথায় ? ওইখানে-যেখান থেকে জলপ্রপাত পড়ছে- ঐখানে
নিঝরিণীর শেষ, ঐখানে বাধার শেষ, ঐখানে আমাদের মিলন
.
হবে।” ।
“অসম্ভব।”
“কি অসম্ভব গন্ধ ?
“তােমাদের মিলন।”
“কেন অসম্ভব গন্ধর্ব ?”

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা
একটি সতি গল্প
“কেন অসম্ভব তা বলতে পারিনে। তবে বােধ হয় মিলন হলে
সকল পাওয়ার, সকল চাওয়ার শেষ—তাই বুঝি অসম্ভব। শােননা
মানব, এ চেষ্টা ছাড়—তােমরা ফিরে যাও।”
মানব উন্নত-শিরে বজ্রকণ্ঠে বলল-“কখনও না।”
মানবী নত-নয়নে মৃদুস্বরে প্রতিধ্বনি করলে—“কখনও না।”
কল্পশেখর জিজ্ঞেস করুল—“এ পাহাড়ে ওঠবার কি কোন উপায়
নেই—কোন রাস্তা নেই গন্ধব ?”
“তােমরা ফিরে যাও।”
“এ পর্বতে আরােহণ করা কি অসম্ভব গন্ধর্ব ?”
“শােনাে—তােমরা ফিরে যাও।”
“একি মানুষের অসাধ্য গন্ধর্ব ?”
“অসাধ্য নয়-দুঃসাধ্য।”
“তবে সাধ্য।”
“আপনার অদৃষ্টকে বশ করতে চাও?”
চাই।”
“নিতান্তই ফিরবে না?”
“শােনো গন্ধর্ব—ফিরব কোথায়? ফেরা মানে মৃত্যু। আজন্ম
যে স্বপ্ন অন্তরে সুপ্ত হয়েছিল—কৈশােরে যে স্বপ্ন অস্পষ্ট
আকাঙক্ষার নিরুদ্দেশ সন্ধানে ঘরছাড়া করেছিল- যৌবনে গত পাঁচ
বৎসর ধরে যে আকাঙক্ষার মাদকতা এ দেহের অণু-পরমাণুতে পর্যন্ত
প্রবিষ্ট হয়েছে—সেই স্বপ্ন সেই আকাঙক্ষাকে ছাড়তে বল, গর্ব
মানুষের মন তুমি জান না।”

৩০৮
সবুজ পত্র
তাজ, ১৩২৫
“বেশ তবে শোন। এ পাহাড়ে ওঠবার রাস্তা আছে-কিন্তু
সেখানে যাবার জন্যে চাই অসীম ধৈৰ্য্য। তােমাদের তা আছে।”
“মানুষের ধৈর্য্যের সীমা নেই।”
গন্ধর্ব বলতে লাগল—“এই যে পাহাড় এ প্রাচীরের মতাে,
যােলন দীর্ঘ-একেবারে প্রাচীরের মতো খাড়া। কিন্তু এই পর্বত
প্রাচীর যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে দুই প্রান্ত শুধু উপর থেকে ঢালু
হ'য়ে নেমেছে। সেই ঢালু জায়গা দিয়ে এর উপরে ওঠবার পথ।
এখন তােমাদের দুজনকে নিঝরিণীর দু'তীর থেকে পর্বতের দু’প্রান্তে
পৌছিতে হবে। সেখানে পৌছে পাহাড়ে ওঠবার রাস্তা দেখবে।
দু’ধার থেকে দু'রাস্তা বরাবর চলে পাহাড়ের উপরের একটা
হ্রদের তীরে প্রকাণ্ড একটা শাল্মলী তরুর মূলে এসে মিলেছে। সেই
হ্রদ থেকেই এই ঝরণার উৎপত্তি। ওই রাস্তায় যদি তােমরা পথ
হারিয়ে না ফেল তবে সেই হ্রদের তীরে তােমাদের মিলন হতে পারে।”
কল্পশেখর জিজ্ঞেস কল-এ যাত্রা শেষ হবে কত দিনে?”
গন্ধর্ব উত্তর দিলে—“কত দিনে তা কে জানে-কে বলবে
সে কথা ?”
গন্ধর্ব অন্তর্ধান হ’ল ।
কল্পশেখর তরুণীর দিকে ফিরে বল—“তরুণী সাহস আছে ?”
তরুণী উত্তর দিলে—“আছে।”
“লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না ?”
দু’জনে দু’দিকে যাত্রা করুণ। কত দিনের মধ্যে কে বলবে।

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা একটি সত্যি গল্প সে দিন সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্পশেখর বাতাসের গায় তাজা পদ্ম ও ভিজে শেওলার গন্ধ পেলে। কল্পশেখর বুঝল যে গন্ধৰ্ব্ব যে হ্রদের কথা বলছিল সে হ্রদ আর বেশি দূরে নয়—তার যাত্রা শেষ হবার আর বেশি বিলম্ব নেই। কল্পশেখর দ্রুত পদে চলতে লাগল। যখন চারদিক আঁধার হয়ে এল তখন সে হ্রদের তীরে এসে পৌছিল। চারদিকে চেয়ে সে হ্রদের উত্তর তীরে একটা প্রকাণ্ড গাছ দেখতে পেলে। বুঝলে এই সেই শাল্মলী তরু। কল্পশেখর হ্রদের তীর দিয়ে গিয়ে সেই শাল্মলী তরুর মূলে পৌছিল। তারপর তার নীচে বসে পড়ল। চারদিক তখন নিবিড় কালাে আঁধারে ঢেকে গেছে—গভীর নিস্তব্ধতায় ভরে উঠেছে। আলকাৎরার চাইতেও কালো সে আঁধার, মৃত্যুর চাইতেও গভীর সে নিস্তব্ধতা। এমনি আঁধারের মাঝে, এমনি নিস্তব্ধতার মাঝে কল্পশেখর বসে বসে হাজার চিন্তার জালে তার মনটাকে জড়াতে লাগল। কল্পশেখরের ত আজ যাত্রা শেষ। কিন্তু তরুণী !—কোথায় সে? সে কি এই কঠিন বন্ধুর পথ অতিক্রম করে আসতে পারবে এই তার গম্য-স্থানে—এই তার কাম্য-স্থানে ? পথে কত বিপদ কত আপদ অতিক্রম করে’ না কল্পশেখর আজ এই হ্রদের তীরে কত বর্ষ পরে পৌঁছেছে—ও কত বর্ষ—সে যেন সৃষ্টির আগে হতে সারাজীবন যেন সে পথই চলেছে-এই সাহস এই ধৈৰ্য্য কি তরুণীর হবে ?-ওঃ-তরুণি-তরুণি । সহসা সেই গভীর নিস্তব্ধতা বিভিন্ন করে কার পায়ের শব্দ কল্প- শেখরের কানে এসে বাজল। কল্পশেখর উৎকর্ণ হয়ে সেই দিকে ১১ সবুখ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ চেয়ে দে। নিবিড় আঁধারে কিছুই দেখা যায় না—কিন্তু স্পষ্ট পদশব্দ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হতে লাগল। ধীরে ধীরে কল্পশেখরের দৃষ্টি আঁধার ভেদ করতে সমর্থ হ’ল। সে দেখলে সে দেখলে একটা মানুষের মুৰ্ত্তিই বটে—তারই পানে আছে। কল্পশেখরের শিরায় শিরায় শােণিত দুরন্ত নৃত্য লাগিয়ে দিল তার হৃদয়ে যেন অসংখ্য বিদ্যুৎ-প্রবাহ পরম্পর মারামারি কাটাকাটি করতে লাগল। কল্পশেখর উঠে সেই মুর্তিটীর পানে অগ্রসর হ’ল। যখন তারা পরস্পর কাছাকাছি হ’ল তখন কল্পশেখর যেন অপরিচিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—“তুমি কে?” “আমি তরুণী।” মুহূর্তে চারটি বাহু দুইটি দেহকে জড়িয়ে নিল—তাদের আজীবন ব্যর্থ প্রাণের অনন্ত পিপাসা নিয়ে, চারটি অধর একটা নিবিড় চুম্বনে যুক্ত হ’ল—তাদের আজীবন পরিপুষ্ট হৃদয়ের অদম্য কামনা নিয়ে। তারপর আজীবন সাধনার সিদ্ধিলাভের শেষে জীবনব্যাপী ক্লান্তি যেন তাদের দুটি শরীরের ওপরে একেবারে ভেঙে পড়ল তারা সেইখানে বসে পড়ল—তাধপর ধীরে ধীরে পরস্পরের আলিঙ্গনাবন্ধ হয়ে সেই পাষাণ শয্যায় ঘাের নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়ল। পাষাণ-শয্যা ?-না, সে-শয্যা পুস্পের চাইতেও কোমল। পরদিন প্রথম ঊষার সঙ্গে সঙ্গে কল্পশেখরের ঘুম ভাঙল। ধীরে ধীরে তার সব কথা মনে পড়ল। সফল তার জীবন। আজীবন সাধনার ধন আজ তার আলিঙ্গনে। কল্পশেখর আলিঙ্গন-বন্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল-একি !!!

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা
একটি সত্যি গল্প
উদ্যতফণা ফণিণীকে সামনে দেখলে পথিক যেমন লাফিয়ে উঠে
দশ হাত পিছিয়ে যায়, তেমনি চক্ষের পলকে কল্পশেখর তাকে আপনার
আলিঙ্গন মুক্ত করে লাফিয়ে উঠে সেই পাষাণ শয্যার কাছ থেকে
পিছিয়ে গেল। তারপর বজ্রাহতের মত শূন্যদৃষ্টিতে তারি সারা-
নিশার আলিঙ্গনবদ্ধা নিদ্রাভিভূতার দিকে তাকিয়ে রইল।
নিদ্রাভিভূত। আলিঙ্গনচ্যুত হয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেল ।
পাষাণ শয্যা ত্যাগ করে উঠে বসল। তারপর কল্পশেখরের দিকে
তাকিয়ে দেখল !
কল্পশেখর কর্কশকঠে জিজ্ঞেস করল-“কে তুমি?”
“আমি তরুণী।”
কল্পশেখর পাগলের মতাে হেসে উঠল। সে হাসি আশে পাশে
পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিহত হয়ে কোন এক প্রেতলােকের বিকট
বীভৎস শব্দের মতো প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। চীৎকার করে’
নিশির সঙ্গিনীর মুখমণ্ডলের দিকে দেখিয়ে দিয়ে ঘৃণার স্বরে বলে
উঠল—“তুমি—তুমি তরুণী—এই লােল চর্ম, বিরল দন্ত, মুখের উপরে
শুকনাে চামড়ার মতাে দু'খানা ঠোট—দীপ্তিহীন কোটরগত ঐ দু'টি
চোখ—মাথায় কাশফুলের মতো সাদা একরাশ চুল+তুমি-তুমি-
তরুণী !”
জরাগ্রস্ত রমণী করুণ বিষাদের হাসি হেসে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
তারপর কল্পশেখরের কাছে এসে তার হাতখানি ধরে তাকে হ্রদের
তীরে জলের কিনারে নিয়ে গেল। তারপর আপনার কৃশ হস্তের
শুষ্ক অঙ্গুলি বিস্তার করে জলের দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললে-
“দেখ।” কল্পশেখর দেখল।

সবুজ পত্র
ভাদ্র, ১৩২৫
কল্পশেখর দেখল হ্রদের জলে আপনার প্রতিবিম্ব। পেশীহীন
গণ্ডদ্বয়ে রসহীন চামড়া ঝুলছে—সাদা ভূরুর নীচে কোটরগত দু'টি
চক্ষু কুয়াশায় ঢেকে গেছে—মসৃণ ললাটে করাল কাল তার নিষ্ঠুর
দাত বসিয়েছে—আর মাথার ওপরে বরফের চাইতেও সাদা একরাশ
চুল গুচ্ছে গুচ্ছে তার অস্থি-চৰ্ম্ম-সম্বল কাঁধের ওপরে এসে পড়েছে।
তরুণীর ধ্যানে এতদিন তার তা চোখেই পড়ে নি। কল্পশেখর দুই
হাতে মুখ চোখ ঢেকে সেইখানে বসে পড়ল।
মানুষের দেহ তার মনকে ব্যর্থ করেছে।
শীসুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী।

*, বন্ধু। ব -ওঃ- অতিদের যে গ্রামে বসবাস, সে গ্রামে ত’দের স্বজন বা স্বজাতীয় বলতে কেউ ছিল না। তেমনতর একটি স্থানকে অজিতের পূর্ব-পুরুষ যে বাড়া করার উপযুক্ত ক্ষেত্র বিবেচনা করেছিলেন, তার কারণ তার কাছে হয়ত স্বজন বা স্বজাতির চাইতে জল-বাতাস-আলোর খাতিরটা ছিল ঢের বেশি। অজিতের পূর্ব-পুরুষেরা যেন সমস্ত : গ্রামের ভিতর ছিল গ্রাম-দেবতা, অথবা দেবতার চাইতেও উন্নততর কোন জীব। কারণ, তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে যে ক’জনের সঙ্গে আমার পরিচয়, তাদের ত জানি সবারই ভােগ-রাগ আছে, মানুষের হাতে তৈরী লুচি-সন্দেশ বা পোলাও পরমান্নে। কিন্তু অজিতদের গ্রামবাসীরা তাদের কাছে ছিল এতই হৈয়, যে তাদের ছোঁয়া লাগলে অজিতদের বাড়ীর কুয়ােটার পর্যন্ত জাতিপাত হবার সম্ভাবনা। এই গ্রামে জয়হরি সরকার ছিল একজন অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। জমি- জমা তার ছিল বিস্তর। আর নিজহাতেই সে চাষ আবাদের কাজ করত। জয়হরির ব্যবসা ঘৃণিত হলেও, তার সততার খ্যাতি গ্রামের ভিতর বেশ ছিল। তার মানের অভাব থাকলেও, ধনের অসম্ভব ছিল না। আতিতে জয়হরি ছিল নমঃশূদ্র। এই জয়হরি সরকারের পুত্র ভজহরি হ’ল অজিতের বন্ধু।

৩১৪ সপ ভাদ্র, ১৩২৫ } অজিত আর ভজহরির মধ্যে কোন্ সূত্রে বন্ধুত্ব হ’ল, তার ইতিহাস একটুখানি বলে রাখা আবশ্যক। আন্তরিক প্রীতির যােগই এ বন্ধুত্বের ভিত্তি নয়। বর-কণের পরস্পরের হৃদয়ের প্রীতি বা প্রাণের আকর্ষণ ব্যতিরেকে, একমাত্র অভিভাবকদের মরজিতেই যেমন তাদের উদাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়, তেমনিতর অজিত ও ভজহরির মধ্যে যে বন্ধু- ত্বের যোগ,--ও ব্যাপারটি অভিভাবকদের ইচ্ছা ক্রমেই সম্পন্ন হয়েছিল। অজিত যখন ছ'সাত বছরের বালক, তখন দেশে একটি নতুন ব্যামো দেখা দিয়েছিল। সেকালে পল্লীর পিতামাতার অন্তরে এই একটি সংস্কার ছিল, যে ধৰ্ম্ম-সম্বন্ধ পাতিয়ে পুত্র কন্যাদের ধৰ্ম্ম-সূত্রে যুক্ত না করলে, ধর্মরাজের চর বা অনুচর বর্গের হাত থেকে আর পরিত্রাণ নেই। সে কারণ, নতুন ব্যামােটি যখন দেখা দিল, তখন চিকিৎসকের শরণাগত হবার আগ্রহ পল্লীবাসীদের ভিতর তেমন প্রকাশ পেলে না ; বরং ধৰ্ম্ম-রাজের অনুচরবৃন্দকে একটি বন্ধনের অজুহাত দেখাবার জন্য ধৰ্ম্মকে স্বাক্ষী রেখে “সই” পাতাবার বা বন্ধুত্ব স্থাপন করবার হুজুগটা পল্লীতে বড় বেশি বেড়ে গেল। অজিতের ঠাকুরমা ছিলেন সেকালের গিন্নি। এমন কোন কুসংস্কার দেশে ছিল না, যার উপর তার আন্তরিক শ্রদ্ধা না ছিল, দেশে এমন কোন আজগুবি কথা উঠত না, যার উপর তিনি বিশ্বাস স্থাপন না করতেন। আকাশের অনন্তব্যাপী যে নীলিমা, ওটা একদিন একটা শামিয়ানার মতাে মানুষের ঠিক মাথার উপরেই ছিল, হাত বাড়িয়ে বেশ ছোঁয়াও চলত। তারপর কোন আদ্যিকালের এক বুড়ি কোন রাজার বাড়ীর উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে হাতের কাটাখানি তুলে যেমনি আকাশের গায়ে একটি বাড়ি মারলে, অমনি ক্ষোভে অভিমানে ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা নিকটের আকাশ কোন্ সুদূরে প্রস্থান কল,—এমনি ধরণের ঢের ঢের শিক্ষা অজিত তার ঠাকুরমার কাছে পেয়েছিল। তারপর পৃথিবীটা যে ত্রিকোণ, তিন মুড়ােতে তিনটি ভীমকায় জন্তু-সিংহ, হস্তী আর অজগর, পৃথিবীকে ধারণ করে রয়েছে, আর এরাই ধরার পাপের ভার যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন এক একবার ঘাড় নাড়া দেয়, আর অমনি পৃথিবীতে ভূমিকম্প উপস্থিত হয়,—অজিত ইংরেজি ইস্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে যেদিন থেকে বিজ্ঞান পাঠ’ পড়তে সুরু করেছিল, সেই দিন থেকে ঠাকুরমার ঐ রকমের ধারণাগুলি দুর করবার জন্য তার সঙ্গে বিস্তর তর্ক বিতর্ক করেছিল, কিন্তু তবু কৃতকাৰ্য হতে পারে নি। দেশে নতুন ব্যামােটি দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে, তার “প্রিভেন্টিভ” স্বরূপ একটা ধর্ম সম্বন্ধ পাতাবার যে হুজুগটা উঠেছিল, সেটা এহেন ঠাকুরমার কানে যেদিন এসে পেছিল, সেদিন কাউকে ধরে তার নাতিটির সঙ্গে জুড়ি মিলিয়ে দেবার তার ব্যস্ততার আর পরিসীমা রইল না। কিন্তু ভদ্র-পরিবার গ্রামে একটিও ছিল না। গ্রামের ভিতর অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ছিল জয়হরি সরকার। তার পুত্র ভজহরি অজিতদের পাঠশালাতেই পড়ত, আর বয়সেও সে ছিল অজিতের সমান। তারপর চেহারাখানিও তার ছিল বেশ ভদ্র-দস্তুর। জাতিতে নমঃশূদ্র হলেও, একটি ব্রাহ্মণ কুমারের বন্ধু হবার যােগ্যতা গ্রামের ভিতর যদি কারু থাকে, ত সে হ’ল ভজহরি।' ঠাকুরমা ভজহরিকেই মনােনীত করলেন। যদিচ প্রাণের প্রতিই বন্ধু দু’টির মিলনের সূত্র নয়, তবু যে পৰ্যন্ত অজিত গ্রামের পাঠশালাতে পড়েছিল, ভজহরিকে না হলে তার চলত না।

সবুজ পর ভাদ্র, ১৩২৫ বাড়ীর ভিতর তার খেলার একমাত্র সার্থী ছিল তার ঘােট বােনটি—রেণুকা, আর পাঠশালাতে অজিতের প্রধান সঙ্গীই হ’ল ভজহরি। অজিত যখন পাঠশালা থেকে ফিরত, গঙ্গাজলে তার দেহের পরিশুদ্ধি না হলে ঠাকুরমা অবশ্য তাকে স্পর্শ করতেন না। তবু জাতিতে ভজহরি তার চাইতে যে ঢের নীচু, সে কারণে পাঠ- শালার জীবনে অজিতের অন্তরে তার প্রতি কোনরূপ ঘৃণার উদ্রেক হয় নি। কিন্তু অজিতের বাপ যখন জেলা কোর্টে ওকালতি করতে বসলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে অজিত পাঠশালার পড়া শেষ করে, সহরের ইংরেজি ইস্কুলে পড়তে শুরু কল, তখন ভজহরির সম্বন্ধে অজিতের মনােভাবের বেশ একটু বিপৰ্যয় ঘটল। ছুটিতে অজিত যখন সহর থেকে বাড়ী আসত, ভজহরির সংসর্গ সে আদো আর বাঞ্ছনীয় মনে করত না; বরং অজিতের মনে একটা শঙ্কা থাকত, কখন বা ভজহরি ছুটে এসে বন্ধু বলে তাকে সম্বােধন করে। দু’জনের ভিতর যে, আকাশ পাতাল প্রভেদ ! ভজহরির প্রমােশন হয়েছে গ্রামের পাঠশালা থেকে বাড়ীর গাে-শালাতে। আর অজিত সহরের ইংরেজি বিদ্যালয়ের ছাত্র। মা, খুড়িমা, মাসী, পিশি সবার কাছে অজিত ইংরেজিতে কত কথা কয় ! জল আবশ্যক হলে, ছােট বােনটিকে আদেশ করে, রেণু! এক গেলাস ওয়াটার। ভাত চাইতে হলে মাকে ডেকে বলে, ‘মাদার, এক মুঠো রাইস দাও। আবার ঠাকুর- মার কাছে গিয়ে তার গলাটি জড়িয়ে ধরে বলে,-“ঠাকুরমা, তুমি আমার গ্র্যাণ্ড মাদার। তারপর চাকর-বাকর, অতিথি-অভ্যাগত সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে অজিত উচ্চৈঃস্বরে তার ইংরেজি পুথির পাঠ আবৃত্তি করে,-“আই মে এ লেম ম্যান ক্লোজ টু পাই ফাৰ্ম্ম,” ;

ও বী, পঞ্চম সংখ্যা বন্ধু ইত্যাদি। ইংরেজিতে যে এতদূর বিদ্বান, সে গ্রামের পাঠশালাতেই পড়াশােনা ইতি করেছে এমন একটি কৃষক-বালকের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্বীকার করতে লজ্জিত না হবেই বা কেন? ভজহরি আবার জাতিতেও এমনি নীচ যে, তার হাতের জলটুকু মুখে তুলতেও নেই। তারপর ভজহরির পিতা জয়হরি সরকার সামান্য একজন হেলে। অজিতের বাপের সঙ্গে সে লাগে কোথায় ? অজিতের বাপ জেলা কোর্টের উকীল, জজ ম্যাজিষ্ট্রেটের সুমুখে দাড়িয়ে তিনি ইংরেজি ভাষাতে কত লম্বা লম্বা বক্তৃতা করেন। এমনি ধারা যথেষ্ট হেতু ছিল, যাতে করে অজিতের মনােবৃত্তিগুলো দিনে দিনে ভজহরির প্রতি বিমুখ হয়ে উঠল। তবু অজিতের বাড়ী আসবার সংবাদটি কানে পৌছামাত্র, ভজহরির পিসিম ভ্রাতপুত্রের বেশ-ভূষা বেশ একটু পরিপাটি করে, তাকে সঙ্গে নিয়ে অজিতদের বাড়ী এসে হাজির হত। ভজহরির মাথার উশকো-খুশকো চুলগুলো তেলে-জলে বেশ করে চুপিয়ে দেওয়া হত। পরণে তার থাকত রঙ্গীন জোলাটে কাপড়, ঘাড়ের উপর কোচানো ফুলদার একখানি চাদর। দু'হাতে তার রূপাের দু’গাছি বালা। তারপর ভজহরির কপালের উপর এসে পড়ত, তার এক গােছ চুলের সঙ্গে সংলগ্ন রূপাের দু’টি ঘুটি। আর তার বুকের উপর ঝুলত রূপাের একটি পান। কিন্তু ভজহরির এই সজ্জাটি তার পিসিমার প্রাণে যতই আনন্দ দান করুক না কেন, অজিতের অন্তরে আদৌ প্রীতির সঞ্চার করত না। ইংরেজি ইস্কুলের বিদ্যা আর সহরের অভিজ্ঞতা নিয়ে অজিত যে কালে বাড়ী আসত, গ্রামের ভজহরি ছোঁড়াটা তার যে বন্ধু এ কথা স্মরণ করে, অজিত ঠাকুরমার গুরুতর অপরাধটি মনে প্রাণে কোনক্রমে সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ আর ক্ষমা করুতে পারত না। ভজহরি পিসিমার সঙ্গে এসে অজিতদের অন্দর-বাড়ীতে যেমনি প্রবেশ কত, অজিত বাহির-বাড়ীতে দৌড়ে গিয়ে বৈঠকখানা ঘরের বারান্দায় একখানি চৌকী টেনে বসে, খুব করে’ দু' পা নাচাত। এরপর অবশ্য, ভজহরি তার বন্ধুর সাহচর্য লাভের আশা ত্যাগ করে পিসিমার আঁচল খানিই বিশেষ করে আশ্রয় করুত। অজিত বিদ্যার সিড়ি এক একটি করে ডিঙ্গিয়ে যতই অগ্রসর হতে লাগল, তার বন্ধু ভজহরির স্মৃতি, কালির আঁচরটির মতো যেন ছুরি দিয়ে বেচে উঠিয়ে মনটাকে পরিষ্কার করে ফেলল। এর পর ঠাকুরমার মৃত্যুতে গ্রামটির সঙ্গেও অজিতদের সম্বন্ধ এক রকম ঘুচল। আত্মীয় স্বজন বা স্বজাতি মােটেই যেখানে নেই, তেমনতর একটি স্থানে অজিতদের যে বস-বাস বজায় ছিল, তার একমাত্র হেতুই হ’ল- ঠাকুরমা। স্বামীর প্রেম-প্রীতির আকর্ষণী-শক্তি যেন গ্রামের মাটিতে জড়িয়ে থেকে ঠাকুরমাকে সেই খানেই আবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু মৃত্যু যে দিন ঠাকুরমাকেই সেখান থেকে টেনে সরিয়ে ফেলল, তখন আর গ্রামের ভিটে মাটি ত্যাগ করে একেবারে সহুরে হবার পক্ষে অজিতদের কোন দিকে কোন বাধা রইল না। অজিত এরপর স্কুল ছেড়ে কলেজে প্রবেশ করল, আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যার মাত্রাও তার দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। আর আর একটিবার তার মনের গতির চেহারা বদল হল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সােপানটি অতিক্রম করে এসে, অজিত একটিবার ফিরে চাইল। অমনি তার পনেরাে বৎসরের সাধনার যে ধন তার মােহটা অনেকখানি কেটে গেল। গ্রামের বিল-খাল, নালা-ডোবাতে বন্যার জল যখন প্রথমে এসে ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা বন্ধু পড়ে, তখন তার চলার ভঙ্গীতে, উৎক্ষেপ বিক্ষেপে, উদ্দাম গতিতে, কলকল ছলছল শব্দে তার আগমন-বাৰ্তা দশ জনকে জানিয়ে দেয়। জ্ঞানের আসার রীতিও যেন তাই। কিন্তু যে দিন তার পরিপূর্ণ, প্রশান্ত রূপটির দর্শন-লাভ ঘটে তখন চিত্তের সমস্ত বাড়াবাড়ি ভাব সমাহিত হয়ে আসে। সেই পূর্ণ জ্ঞানের অভাতে অজিতের মনের ক্ষেত্র প্রসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে, তার বিদ্যার আস্ফালন, শিক্ষার অভিমান, বংশের গৌরব, জাতের বড়াই তার মন থেকে অন্তর্হিত হল। তার প্রাণের উপর রুশীয় সােস্যালিজম আর ফরাসী সাম্যবাদের ধ্বজা উড়ল। রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ জীবনের চির-সাথী হল। টলষ্টয়, গান্ধীকে অজিত তার জীবনের আদর্শ কল। মিল, টুগেনিফ ইবসেন, বার্ণার্ড শ, গ্যালসওয়ার্থী প্রভৃতি সাহিত্যিকদের অজিত তার গুরু-পদে অভিষিক্ত করল। দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বন্ধ-বাতাসে অজিতের অন্তর পুরুষটি যেন হাঁপিয়ে উঠল। দেশের একদল নবীন সাহিত্যিকের সঙ্গে যােগ দিয়ে অজিত জাতীয় মনের আবহাওয়াতে বিপুল একটি পরিবর্তন ঘটাতে প্রবৃত্ত হ’ল। সমাজ, সংস্কারকদের দলের একজন চাই হয়ে, অজিত দেশের সমাজটাকে ভেঙ্গে-চুরে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার উপর নতুন করে তার গােড়াপত্তন করতে কৃতসংকল্প পেল। পল্লীর উন্নতি সাধন আর দেশের নারী- জাতিকে শিক্ষা ও স্বাধীনতা দান, এই দু’টি তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হ'ল। লাঞ্ছিত অবজ্ঞাত জনসাধারণের অন্তরে আত্ম-সম জাগিয়ে তােলা, দেশের কৃষক শ্রেণীর মান বাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি কার্যে অজিত যে একবারে উঠে পড়ে লাগল।

সৰু পত্র ভাদ্র, ১৩২ কিন্তু একদিকে অজিত যেমন দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে সারা হচ্ছিল, অন্যদিকে অজিতের পিতা অনাদিনাথ তেমনি পুত্রের ভবিষ্যৎ-চিন্তায় বিশেষ করে মন দিয়েছিলেন। অজিত এ এ, পাশ করার পর থেকে, অন্যদিনাথ প্রতিদিন জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কুঠীতে গিয়ে তাকে সেলাম জানিয়ে আসতে লাগলেন। তারপর বেশ একটি সুযোগ উপস্থিত হল। বিভাগীয় কমিশনার সাহেব অনাদিনাথের কোন এক মক্কেল-জমিদারের এলাকার ভিতর শিকার করতে এলেন। অনাদিনাথ স্বয়ং উপস্থিত থেকে জমিদারের খরচায় রসদাদি জোগালেন, এবং যথা- বিধি তবির-তদারক করলেন। এর ফলে, অনাদিনাথ জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট আর বিভাগীয় কমিশনার উভয়েরই বিশেষ প্রীতিভাজন হলেন। বলা বাহুল্য, সঙ্গে সঙ্গে হাকিমী-পদে প্রতিষ্ঠিত হবার যোগ্যতা পুত্র অজিত- মােহনের অনেকটা বেড়ে গেল। তবু একটা বাধা ছিল, অজিতের বয়সের অঙ্কে একটি বৎসর বাহুল্য হয়ে পড়েছিল। সেটি ঝেড়ে ফেলতে অজিতের বিশেষ বেগ পেতে হ’ল না। ম্যাজিষ্ট্রেটের সুমুখে অজিত এমন একটি সত্য-পাঠ করল, যার প্রধান অঙ্গই হ’ল-জল-জ্যান্ত একটি মিথ্যা ! যে পদের প্রধান কর্তব্য হ’ল চোরকে সাজা দেওয়া, সেই পদটি অধিকার করবার জন্য সর্বপ্রথমে চুরি বিদ্যাই অজিতকে অবলম্বন করতে হ’ল। তবে পরব্য অবশ্য নয়, আপনার বয়স চুরি, কাজটি , হয়ত গহিত না হতেও পারে। তবু অজিতের বিবেক-বুদ্ধি তার প্রাণে যে হুল না ফুটিয়েছিল, তা নয়। কিন্তু মাথার উপর ছিল তার পিতৃ আজ্ঞা। পরশুরাম যে দেশের দশ-অবতারের এক অবতার, সেই দেশেতে জন্ম নিয়ে পিতৃ-আদেশ অমান্য করবে এমন সাধ্য কার?

৫ম বৰ, পঞ্চম সংখা বন্ধু : কত যুগ যুগান্তরের শ্রদ্ধার ভারে যে সংস্কারটি মনের ভিতর কেটে বসেছে, একদিন ইচ্ছামাত্র সেটিকে মন থেকে সরিয়ে ফেলা, বড় সহজ কথা ত নয়। কাজেই দেশের উন্নতিকল্পে যে সব শুভ অভিপ্রায় আকাশের তারার মত অজিতের অন্তরে এক একটি করে ফুটে উঠেছিল, পিতৃ-আজ্ঞার মুখে এক নিমিষে সব যেন আকাশ কুসুমের মতো ঝরে পড়ল। দেশ উদ্ধারের সমস্ত সংকল্প ত্যাগ করে, চোর ডাকাতের দণ্ডমুণ্ডের একটি বিধাতারূপে অজিত একদিন বিচার- আসন দখল করল। অজিতের কাৰ্যকালের প্রথম দু’টি বৎসর কেটেছিল তার আপনার জেলাতে। সেই সময়ের একটি ঘটনা, নিতান্ত ক্ষুদ্র হলেও আজকের এই ইতিহাসের প্রধান ঘটনা। যে গ্রামের মাটিতে অজিত ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, আর যাকে জড়িয়ে- ছিল তার শৈশবের স্মৃতি, অর্ধ যুগ বাদে আবার একটি দিন অজিত সেই গ্রামে পদার্পণ করল। এবার অবশ্য গ্রামের একজন অধিবাসী রূপে নয়, একটি বাঁটোয়ারা মােকদ্দমার তদন্তকারী একজন হাকিম স্বরূপে। গ্রামে এসে অজিত তার বাড়ীর ভিটেতেই তাঁবু গাড়ল। বড়ীর ঘর-দুয়াের তখন একখানিও অবশিষ্ট ছিল না। ঘরগুলাের সব চালের খড় পচে খসে পড়েছিল। বাঁশের সাঙ্গ উইতে জীর্ণ করেছিল। মাটির দেয়াল বৃষ্টির জলে ধুইয়ে ধ্বসে পড়েছিল। ঘরের মেঝের উপর ঘাস-দূৰ্বে। গজিয়েছিল। আর বাড়ীর উঠোন এরশু- আকন্দ, শুটি, ভেঁটি, তৃণ, লতা, গুল্মতে ভরে উটেছিল। বাড়ীর এই দৃশ্য কোন পরম আত্মীয়ের চরম দুর্দশার মতো অজিতের মনকে বড়ই পীড়া দিতে লাগল। আজ যেন অতীত তার মােহিনী রূপ ধারণ সবুজ পত্র ভাদ্র, ১৩২৫ করে অজিতের অন্তর মাঝে দেখা দিলে। রেণু,—আহা রেণু, আজ কোথায় ? ছােট বােনটির কথা মনে আসতেই বেদনার একটি প্রবল উচ্ছ্বাস অজিতের প্রাণটার ভিতর ঢেউ তুলল। অজিতের মনে পড়ল, পুজোর পর ইস্কুলের ছুটি যখন শেষ হয়, বাড়ী থেকে তার যাত্রার দিনে, সে যখন নদীর ঘাটে নৌকোতে এসে উঠল, রেণু ঠাকুরমার আঁচলখানি ধরে ঘাটের পাড়ের উপর দাড়াল, আর নৌকোখানি যে পর্যন্ত না তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে এল, রেণু সেইখানে ঠিক সেই ভাবে দাড়িয়ে দাদার নৌকোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। রেণুর কাছে সেই হ’ল অজিতের জন্মশােধ বিদায়। ঠাকুরমা ?–ঠাকুরমার ত স্নেহের অন্ত ছিল না। নিত্যি তিরিশ দিন সাঁঝের সময় মণ্ডপ-ঘরের দুয়ােরে উপুড় হয়ে পড়ে অজিতের মঙ্গল কামনায় ঠাকুর দেবতার কাছে তিনি কত প্রার্থনাই না করে- ছেন। আহা! ঠাকুরমাও আজ আর নেই। অজিতের প্রীতি ও অনুরাগের যে ধারাটি দিনে দিনে শুকিয়ে এসেছিল, আজ আবার তাতে প্রবল জোয়ার এল। আর সেই জোয়ারে ভেসে এল আর একজনের স্মৃতি। সে হ’ল গ্রামের জয়হরি সরকারের পুত্র ভজহরি সরকার। গ্রামের যে পাঠশালাতে অজিত ভজহরির সঙ্গে একত্রে পড়ত, আজও সে পাঠশালা আছে। তবে যাদের যঙ্গে পাঠশালা গ্রামে স্থাপিত হয়েছিল, তাদের অভাবে অনাদরের রূপ পাঠশালার ঘরে ফুটে বেরিয়েছে। ঘরের মেঝেতে এতই ধুলো জমেছে যে, একত্র করলে তার ওজন হয়ত এক মণের কম হবে না। ঘরের চৌকাঠ-কবাট কোথায় সব অদৃশ্য হয়েছে, আর তাদের শূন্যস্থান পূর্ণ করবার জন্য রয়েছে ক’খালি দরমা।

৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা বেঞ্চিগুলোর ভিতর কোনােখানির হয়ত একদিকের দুটো পায় ভেঙ্গেই গেছে আর সেই পায়ার পরিবর্তে দুটো বাঁশের খুঁটো পুতে রাখা হয়েছে। একখানি বেঞ্চির গায়ে আজও লেখা রয়েছে, ‘ভজহরি আমার বন্ধু । অজিত একদিন তার ছুরির ডগা দিয়ে আঁচড় কেটে ওবাক্যটি বেঞ্চির গায়ে লিখেছিল। এরপর অজিত যখন ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল, তখন ভজহরির প্রতি তার কি অবজ্ঞা। আর ঠাকুরমা ভজহরিকে বড়ই অসামান্য একটি অধিকার দান করেছেন, এইটে বিবেচনা করে, অজিত তার ঠাকুরমাকে পৰ্যন্ত ক্ষমা করতে পারে নি। ঠাকুরমার কাছে অজিতের সে অপরাধের গুরুত্ব যেন আজ দশগুণ বেড়ে উঠল। আইডিয়ালের যে উচ্চ আকাশে অজিতের প্রাণটি একদিন ডানা মেলে ছিল, সেইখান থেকে অজিত লক্ষ্য করে দেখল, ভজহরিকে হেয় জ্ঞান করতে পারে এমন কোন হেতু তার নেই। ভজহরির পেটে বিদ্যা নেই বটে, কিন্তু অজিতের বিদ্যাই বা তার কোন কাজে লাগছে? অজিত ত একদিন দেশ- বিদেশের ঢের ইতিহাস মুখস্থ করেছিল। অমুক রাজার রাজত্বকালে অমুক দেশের রাজনীতিক বা সামাজিক অবস্থা কিরূপ ছিল। অমুক সাম্রাজ্য কি ভাবে গড়ে উঠল। অমুক দেশের অমুক সময়ের ধর্ম বা সমাজ-বিপ্লব কি ভাবে সংঘটন হ’ল। অমুক সভ্যতার কি রূপ, কি নিদর্শন, কি আদর্শ, কি মুলমন্ত্র ইত্যাদি ঢের তথ্য অজিত জেনে ছিল। কিন্তু দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা চুরি মােকদ্দমার রায় লিখে, অথবা বাটোয়ার মােকদ্দমার তদন্তের রিপাের্ট লিখে যার জীবন কাটছে, তার দেশ- বিদেশের নানা তথ্য জেনে রাখবার কোন প্রয়ােজন ছিল ? আর শিক্ষার গুমরই বা কোথায় ? অজিত যখন কলেজে পড়েছে, অনেক ৩২৪ ভাদ্র, ১৩২৫ রাত জেগে এথিকসের সূত্রগুলো ধরে সে টানা হঁচড়া করেছে। সত্যাসত্য, ন্যায়-অন্যায়ের সূক্ষাতিসূক্ষম চেহারা অজিত পৰ্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু তার জীবনের ফঁাকে সুবৃহৎ ও সুস্পষ্ট মিথ্যা প্রবেশ লাভ করেছে। অজিতের মগজের ভিতর যে সব আইডিয়া একদিন ভিড় করেছিল, যদিও সে গুলাে অন্তর্হিত হয়েছিল, তবুও তারা তার মনের উপর রেখাপাত করে গিয়েছিল। সেই রেখাগুলো আজ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল। আইডিয়ালের উচ্চ ভূমিতে দাড়িয়ে অজিত তার আপনার জীবনটাকে বড়ই খাটো করে দেখল। আর তার কল্পনার দৃষ্টিতে কৃষক-পুত্র ভজহরির জীবনটাই মহিমাময় হয়ে উঠল। অতি মনে ‘মনে ঠাহর করল, ভজহরির যথেষ্ট সমাদর করে, ঠাকুরমার কাছে তার অপরাধের গুরুত্ব লাঘব করুবে। সেই কারণে, ভজহরিকে ডাকবার জন্য অজিত সেই দিন সঁঝের আগে তার কাছে লােক পাঠাল। প্রবল প্রতাপান্বিত যে পুলিশ-দারোগা তার উপরেও অজিতমােহন হ’ল দণ্ডমুণ্ডের বিধাতারূপী একজন হাকিম। ভজহরি ঘাড়ের উপর চাদরখানি ফেলে দিয়েই, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে হাকিম অজিতমােহনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দৌড় দিল। আসবার পথে, অজিতমােহন যে এককালে তার বন্ধু ছিল, এই দুরন্ত চিন্তাটি বারবার একটি বিভীষিকার মত ভজহরির অন্তরে উদয় হল। আর ভজহরি শঙ্কিত হয়ে সেটিকে তার সমস্ত মন দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে লাগল। বিশহাত দূরে ভজহরি জোড়-করে একেবারে শুইয়ে পড়ে মাটীতে কপাল ঠেকাবার উপক্রম করল। অজিত হাকিমী পদে প্রতিষ্ঠিত থেকেও, মানুষের মনুষ্যত্বকে কোন রকমে খর্ব হতে দেখলে, বড় বেশি খুশি থাকতেই, ৫ম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা হতে পারত না। আর আজকের কথা ত ছিল স্বতন্ত্র। ভজহরি তার কাছে এতদূর খাটো হয়ে যে আসবে, এটা যদিও খুব স্বাভাবিক, তবু অজিতের কল্পনাকে যথেষ্ট পীড়া দেবারই কথা। তারপর যে এতদূর খাটো হয়ে এল, তাকে বন্ধু-সম্ভাষণে আপনার উচ্চতর প্রতিষ্ঠা ভূমিতে উন্নত করা, অজিতের পক্ষে বড় সহজ হ’ল না। দু'টো বিপরীত শক্তি তার প্রাণের ভিতর যেন ঠেলাঠেলি করতে সুরু করল। একদিকে হাকিমী পদের মান-মৰ্যাদার দাবী আর অন্যদিকে তার আদর্শ-জীবনের উদার সাম্য-জ্ঞান, যেন দুটো সঁড়ের মত অজিতের মনের ক্ষেত্রে বিষম একটা হুড়াহুড়ি বাধিয়ে দিল। সেই লড়াই-এর একটু ফাঁকে একটি কথা অজিতের প্রাণের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল, “বন্ধু”। এ কথায় বক্তা ও শ্রোতা দু’জনেই সমান চমকে উঠল । অজিত লজ্জিত হয়ে সেখান থেকে উঠে গেল, ভজহরি স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে রইল। ঐ বীরেশ্বর মজুমদার। ?

No text on this page.

স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসুর পত্র। চন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আজীবন পৰব্যবহার ছিল। এই পত্রযােগে পরস্পরের ভিতর বাংলা সাহিত্যের আলােচনা চত। বস্তু মহাশয়ের পত্রে প্রকাশ, তিনি সাহিত্যসেবীদের মধ্যে এইরূপ literary correspondence-এর প্রচলনের বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন। আজ ৩৪ বৎসর পূর্বের লেখা বন্ধু মহাশয়ের দুখানি পত্র প্রকাশ কছি-এর থেকে সেকালে কি ভাবে সাহিত্য আলােচনা করা হত তার পরিচয় পাওয়া যাবে। সম্পাদক। ( ১ ) কলিকাতা ৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৪ সবিনয় নিবেদন, আপনার পত্র পড়িয়া আমি বড়ই তৃপ্তি লাভ করিয়াছি। আমি যাহাদিগকে সকৃতজ্ঞচিত্তে সম্মান করি, তাহারা আমাকে স্নেহ করেন ইহা বুঝিতে পারিলে আমি যথার্থই সুখী হই। সাহিত্য ক্ষেত্রে আমি আপনাকে যুদ্ধবিগ্ৰহ করিতে নিষেধ করি -সাহিত্য ক্ষেত্রে যুদ্ধবিগ্রহ বড় আবশ্যক। সঞ্জীবনীতে আপনি জামার পত্রের প্রতিবাদ করিয়াছিলেন বলিয়াও আমি দুঃখিত হই ০ সবুজ পত্র আনি, ১৩২৫ নাই। আমি যথার্থই * * বাবুকে গালি দিয়াছি, পাছে আপনার। এইরূপ মনে করিয়া থাকেন—এই ভাবিয়া আমি ব্যথিত হইয়াছিলাম। আপনার সুধাময় পত্রপাঠে সে ব্যথা নিবৃত্ত হইয়াছে। আমার কোন লেখা আপনি কখনও কোন লােকের কাছে নিন্দা করিয়াছেন, এ কথা আপনার পত্রে প্রথম জানিলাম, আগে জানিতাম । অতএব সেরকম নিন্দার কথা শুনিয়া আমি ব্যথিত হই নাই । আপনার লিখিত একটি প্রবন্ধে আমার নিন্দা দেখিয়া আমি ব্যথিত হইয়াছিলাম। কিন্তু আপনি যখন সে সকল কথা ভুলিয়া গিয়াছেন, তখন সে প্রবন্ধের কথা আপনাকে স্মরণ করাইয়া দিয়া আর ব্যথিত করিব না। লােকের কাছে মুখে মুখে সমালােচনার কথা যখন উঠিল, তখন আমার একটা সামান্য মত প্রকাশ করি। আমার বােধ হয় যে, আমাদের পরস্পরের গ্রন্থ শুধু ছাপায় সমালােচিত না হইয়া পর- স্পরের মধ্যে চিঠিতে সমালােচিত হওয়া ভাল। বন্ধুর গ্রন্থ সম্বন্ধে বন্ধুকে মত জানাইতে হইলে যে শুধু প্রশংসাই করিতে হইবে, এমন কোন কথা নাই ; বরং বন্ধুভাবে বন্ধুকে মত জানাইতে বন্ধুর লেখার দোষগুলির প্রতিই বেশী লক্ষ্য থাকা সম্ভব এবং উচিত। লেখার গুণ এবং দোষ,এ দুয়ের মধ্যে গুণ জানা খুব আবশ্যক,কিন্তু দোষ জানা তদপেক্ষা বেশী আবশ্যক। ছাপার সমালােচনায় কি গুণ, কি দোষ, কিছুই ভাল করিয়া বুঝান হয় না, অথচ দোষগুলি অতি যথা : প্রণালীতে গাহিয়া দেওয়া হয়, প্রায়ই রুক্ষ এবং অভদ্র ভাষায় বলিয়া দেওয়া হয়। তাহাতে যাহার দোষের উল্লেখ করা হয়, তাহার দোয়- গুলি হয় দোষ বলিয়া মনে হয় না, নয় সমালােচনার ব্যবহার দেখি ৫৭ বৰ্ষ, যষ্ঠ সংখ্যা স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বার পত্র তাহার কথিত দোষগুলি ভাল করিয়া বুঝিয়া দেখিয়া তাহার সংশােধন করিতে প্রবৃত্তি হয় না। বন্ধুভাবে চিঠিতে সমালোচনা হইলে এ সকল কুফল ফলে না। কারণ, সেরকম সমালােচনা প্রথমতঃ যত্নসহকারে করিতে হয়, অতএব সমালোচনা বুঝিতে পারা যায়। দ্বিতীয়ত, সে সমালোচনা ভদ্রভাবে এবং সহানুভূতির সহিত লিখিত হওয়ায়, যাহার গ্রন্থের সমালােচনা তাহারও তাহাতে আস্থা হয়, এবং সমালোচনা ঠিক বােধ হইলে তদনুসারে নিজের দোষ সংশােধন করিতে প্রবৃত্তি, যত্ন এবং চেষ্টা হয়। এবং এই প্রণালীতে সমালোচনা করিতে করিতে আমাদের সাহিত্যের, বিশেষত সমালােচনা-সাহিত্যের (Critical literature-এর) ভাবভঙ্গী ভদ্রোচিত এবং সম্মানাই হওয়া সম্ভব। কিন্তু আমি দেখিয়া বড় দুঃখিত যে, আমাদের মধ্যে এই প্রণালীর সমালােচনার জন্য কাহারও বড় একটা স্পৃহা নাই। আমাদের মধ্যে বন্ধু বন্ধুকে বই উপহার দেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর মতের বা সমালােচনার কামনা করেন না। বােধহয় কেবল প্রশংসার তৃষ্ণা প্রবল বলিয়া এইরূপ হইয়া থাকে। আপনি ঠিকই বলিয়াছেন যে, আমাদের মধ্যে প্রধান লেখকের সমালোচনাকে বেশী ভয় করেন। আমি অনেক দেখিয়া শুনিয়া বুঝিয়াছি, আমরা বড়ই অপদার্থ। কিন্তু আমি যে প্রণালীর সমালােচনার কথা লিখিলাম, সে প্রণালী প্রচলিত হইলে সমালােচনাটা ক্রমে গা-সওয়া হয় না? এবং মােটের উপর আমাদের খুব উপকার হয় না? বঙ্গীয় লেখকদিগের মধ্যে প্রকৃত literary correspondence নাই বলিয়া আমার বােধ হয়। दिनोट (আঃ) চন্দ্রনাথ বন্ধ।

সবুজ পত্র আনি, ১২৫ কলিকাতা, ৯ অক্টোবর, ১৮৮৪। সবিনয় নিবেদন, বঙ্কিম বাবুর আধুনিক গ্রন্থগুলির সম্বন্ধে আপনি আমার মত জানিতে চাহিয়াছেন। আমি যেরূপ বুঝিয়াছি সেইরূপ বলিতেছি। শ তারপর দেবী চৌধুরাণীর কথা। দেবীর সম্বন্ধে আপনি যাহা লিখিয়াছেন, তাহা আমি ঠিক বুঝিতে পারিয়াছি কি না বলিতে পারি না। কিন্তু আপনাকে যেরূপ বুঝিয়াছি, তাহাতে বােধ হয় যেন আপনি একটু ভুল বুঝিয়াছেন। আপনি বলিয়াছেন—দেবী চৌধুরাণী কেমন করিয়া ডাকাইত হইল, কেমন করিয়া ডাকাইতি করিল ?- কিন্তু দেবী চৌধুরাণী ত ডাকাইতি করে নাই। ডাকাইতের সঙ্গে ঘুরিত ফিজিত বটে, কিন্তু কখনও ডাকাইতি করে নাই। ডাকাইতের দলকে উৎসাহিত, চমকিত এবং আবদ্ধ রাখিবার জন্য ভবানী পাঠক দেবীকে রাণী সাজাইয়াছিল, কিন্তু দেবী ডাকাইতি করিত না। তবে দেবী ডাকাইতের দলের রাণীগিরি করিয়া, স্বয়ং ডাকাইতি না করিলেও ডকাইতিকে প্রশ্রয় দিয়াছে, এরূপ তর্ক করা যাইতে পারে। কিন্তু গোড়ায় ভবানী পাঠক দেবীকে বুঝাইয়া দিয়াছিল যে তাহার ডাকাতি, ডাকাইতি নয়—দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন মাত্র। দেবী তখন সে ব, ষষ্ঠ সংখ্যা স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসুর পত্র কথা ঠিক বলিয়া বুঝিয়াছিল। এরূপ বুঝা নিতান্ত অসম্ভব, অসঙ্গত বা অস্বাভাবিক বলিয়া বােধ হয় না। অতএব দেবীর ডাকাইতের দলে থাকা বড় একটা বিচিত্র নয়। কিন্তু ডাকাইতের দলে থাকা দোষের নয়, এরূপ বুঝিয়াও দেবী স্বয়ং ডাকাইতি করে নাই, করিতে পারে নাই। ইহাতে নারীচরিত্রের সঙ্গতিই রক্ষিত হইয়াছে, অসঙ্গতি ঘটে নাই। ডাকাইতের দলে থাকিয়া দেবী তাহার দৈব-দ্ধ প্রভূত অর্থ গরিব দুঃখীকে দান করিয়া বেড়াইত। ইহাও স্ত্রী-স্বভাবসঙ্গত। আমি স্বয়ং দেখিয়াছি দুই একটি স্ত্রীলােক স্বামীর বিষয় পাইয়া তাহা গরিব দুঃখীকে দিয়া কাঙ্গালিনী হইয়াছে। তারপর রাণীগিরি করা। সেটা কিন্তু তাহার মনােগত নয়। গল্পটি পড়িলে এ কথাটি বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, দেবীর রাণীগিরি করা তাহার মনােগত নয়, কেবল ভবানী পাঠকের অনুরোধে তাহা করিত। ভবানী পাঠকের প্রয়োজন সাধন হইয়া গেলেই রাণীগিরি ছাড়িয়া কাঙ্গালিনী সজ্জিত। ভবানী পাঠক তাহাকে বড় বিপদ হইতে রক্ষা করে, তাহাকে অনেক যত্নে শিক্ষা দান করে, তাহাকে বড়ই ভালবাসে এবং ভক্তি করে। সেও ভবানীকে পরম গুরু বলিয়া ভক্তি করে। অতএব ভবানী পাঠকের অনুরােধে তাহার এক আধবার রাণীগিরি করা বড় একটা অসঙ্গত কাজ নয়। অতএব দেবীকে আমি এমন কোন কাজ করিতে দেখি নাই, যাহার মূল তাহার “ভিতর” নাই, অথবা যাহা স্ত্রী-চরিত্রের সহিত সঙ্গত হয় না। দেবীর মাতৃগৃহ ত্যাগ হইতে শ্বশুরগৃহে পুনরাগমন পর্যন্ত তাহার জীবনপ্রণালীটা ( Mode of অবশ্যই কতকটা masculine-রকম বােধ হয়। অত স্বাধীন ও সাহসিক ভাব পুরুষকেই সালে, বাঙ্গালি স্ত্রীকে সঙ্গে না। কিন্তু প্রথম কথা এই যে, । life) ৩৩ বিন,'১৩২৫ দেবী জীবনের চিত্র নয়, আদর্শ চিত্র; এবং সেই জন্য কবি দেবী-চরিত্রে এমন মশলা সংযোগ করিয়াছেন, যাহা বাঙ্গালি মেয়ের চরিত্রে থাকিলে ভাল হয়। একজন ইউরােপীয় স্ত্রী দেবীর মতন জীবনপ্রণালী অবলম্বন করিলে বােধহয় তাহাতেও স্ত্রী চরিত্রের বিপর্যয় ঘটিয়াছে বলিয়া বােধ হয় না। অর্থাৎ দেবীতে যে উপকরণ কবি যােগ করিয়াছেন, সে উপকরণ ইউরােপীয় স্ত্রী-চরিত্রে সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়। অতএব সেই উপকরণ স্ত্রী-চরিত্রের একেবারে অনুপ- যােগী নয়। তাই, কবি বাঙ্গালি মেয়ের চরিত্রে সে উপকরণ থাকা স্পৃহনায় বিবেচনা করিয়া দেবীর চরিত্রে সে উপকরণ সংযােগ করিয়াছেন। আনন্দ মঠের শান্তিতেও এরূপ করা হইয়াছে। অতএব আমার মতে, দেবীকে কবির ideal বা আদর্শ চরিত্র বলিয়া ধরিলে, দেবীর জীবনাংশট। বড় একটা অস্বাভাবিক বা অসঙ্গত বলিয়া বোধ হয় না। সেই জীবন- প্রণালী সম্বন্ধে আমি ইহাও বলি যে, সেরূপ ীবনপ্রণালী সাধারণত বাঙ্গালির মেয়ের পক্ষে অসম্ভব বা অসঙ্গত হইলেও, সকল বাঙ্গালির মেয়ের পক্ষে অসঙ্গত বা অসম্ভব নয়। রাণী ভবানীর কথা আমরা যেরূপ শুনিয়া থাকি, তাহাতে বােধ হয় যে রাণী ভবানীও আবশ্যক হইলে দেবীর জীবনপ্রণালী অবলম্বন করিতে পারিতেন। দ্বিতীয় কথা এই যে, আমরা যখন প্রফুল্লকে প্রথম দেখি, তখনও তাহাতে এমনি সাহস, প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভর-শক্তির লক্ষণ দেখিতে পাই যে, তাহার পরে যখন তাহাকে ডাকাইতের দলে থাকিয়া প্রভুত্ব করিতে দেখি, তখন কিছুমাত্র বিস্মিত হই না। তখন যথার্থই বােধ হয়, এরূপ অবস্থায় সেই প্রফুল্ল যে এই দেবীরণী হইয়া পড়িবে, ইহা কিছু মাত্র আশ্চৰ্য্য নয়। অতএব দেবীতে হঠাৎ পরিবর্তিত হঠাৎ 'ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসুর পত্র আরােপিত হইয়াছে, অথবা তাহার গোড়ার চরিত্রের সহিত অসঙ্গত হইতেছে, এমন কিছুই আমি দেখিতে পাই না। তথাপি আমি বলি যে বঙ্কিমের আগেকার উপন্যাস 'আমাকে যত ভাল লাগিয়াছে, দেবী চৌধুরাণী তত ভাল লাগে নাই। তাহার কারণ দেবী চৌধুরাণীতে theory-র অবতারণা। দেবী অনেক সাহসের, অনেক বুদ্ধির, অনেক দয়ার কাৰ্য্য করিয়াছে; কিন্তু কবি যে বুঝাইতে চেষ্টা করিতেছেন যে, ভবানী পাঠকের শিক্ষার গুণে দেবী সে সব কাজ করিয়াছিল, তাহাই কি ঠিক ? সে শিক্ষা না পাইলে দেবী কি সে সব কাজ করিতে পারিত না? আমাকে বেশ পরিষ্কার বােধ হয় যে, দেবী এমন কোন কাৰ্য করে নাই—যাহা করিবার জন্য তাহার বিশেষ কোন শিক্ষার প্রয়ােজন ছিল। আমি গল্পের • গােড়াতেই দেবীতে যে সকল মশলা দেখিতে পাই, সে সকল মশলার গুণে দেবীকৃত সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়, বিশেষ শিক্ষার কিছুমাত্র প্রয়ােজন নাই। শিক্ষার কথাটা এত করিয়া লিখিবার ফল এই হইয়াছে যে, দেবী যা কিছু করিতেছে তাই যেন সেই শিক্ষার গুণে করিতেছে, তাই যেন সেই শিক্ষার demonstration মাত্র, এরূপ মনে হয়। দেবী রঙ্গরাজকে জিজ্ঞাসা করিতেছে—কোন পক্ষে একটিও মানুষ মরে নাই, একটিও মানুষ আঘাত প্রাপ্ত হয় নাই ? অমনি মনে হইতেছে যেন দেবী সেই নিষ্কাম ধর্মেরকামাজ। theory বজায় রাখিতেছে। অনেক স্থলে এইরকম মনে হয়। দেবীকে শিক্ষার অধীন না করিলে, এবং কথায় কথায় নিষ্কাম ধর্মের নিকি তুলিয়া না ধরিলে, দেবীর কোনও কার্য্যের বিবরণ পড়িয়া — হইতে হইত না—কোনও কাৰ্যই unspontaneous বলিয়া বােধ ৪৫ ৩৩৬ সবুজ পত্র আশ্বিন, ১৪২৪ হইত না। দেবীর সকল কাৰ্য্যই তাহার চরিত্রের অনুরূপ এবং সেই জন্য বড়ই প্রীতিকর। কেবল এক শিক্ষার কথা এবং নিষ্কাম ধর্মের ধুয়া তুলিবার দরুণ, সেই সকল চমৎকার কাৰ্যের বিবরণ অনেকাংশে পূৰ্ণানন্দ প্রদানে অসমর্থ হইয়াছে। কিন্তু কোন কাৰ্য্যই আমার অসঙ্গত, অস্বাভাবিক বা অনুপযােগী বলিয়া বােধ হয় না। আমার বােধহয় যদি ভবানী পাঠকের শিক্ষাপ্রণালীর উল্লেখমাত্র না থাকিত, এবং গল্পের মধ্যে নিষ্কাম ধৰ্ম্ম এই শব্দ পর্যন্তও ব্যবহৃত না হইত, তাহা হইলে দেবী চৌধুরাণী শুধু বাঙ্গালা সাহিত্যের নয়, মনুষ্যের সাহিত্যের একখানি চমৎকার রত্ন হইয়া থাকিত। গল্পের তবে তাৎপৰ্য্য উৎসর্গপত্রে ইঙ্গিতে লক্ষিত হইলেই বেশ সুন্দর হইত। সীতারামে আমি এমন কোন দোষ দেখিতে পাই নাই। দেবী চৌধুরাণী সম্বন্ধে আমার আরো অনেক আছে। দরকার হয় পরে বলিব। ইতি বিনীত (স্বাঃ) শ্রীচন্দ্রনাথ বসু।

পত্র। শ্ৰীমন্ চিরকিশাের কল্যানীয়েষু। । আমার শেষ চিঠি পড়ে, তুমি চমকে না যাও, চমৎকৃত যে হয়েই, সে কথা শুনে আমি আশ্চৰ্য্য হচ্ছি নে। পত্রখানি যে আগাগোড়া পড়তে পেরেছ, এই আমার সৌভাগ্য। তুমি জিজ্ঞাসা করেছ—ইউক্লিড পরমতত্ত্ব নয়, চরম আর্ট-একথা বলে আমি কি বলতে চেয়েছি? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর—যা বলতে চেয়েছি, তা ঐ পত্রের ভিতরেই আছে। মনে ভাবতে পার, এ উত্তর হচ্ছে—চালাকি করে ও প্রশ্ন এড়িয়ে যাবার চেষ্টা। আসলে কিন্তু তা নয়। লেখক কি সব সময়ে জানেন যে তিনি কি বলতে চান ? কলমের মুখ দিয়ে যে অনেক সময় এমন সব কথা বেরিয়ে যায়, যা বলবার লেখকের কোনরূপ অভিপ্রায় ছিল না, তা লেখকমাত্রেই জানেন। লিখৃতে বসলেই দেখা যায়, কথায় কথা টানে, ভাব ভাবের পিছনে ছােটে, তারপর লেখা আপনা হতেই তার নিজমুর্তি ধারণ করে। সুতরাং সে মুৰ্ত্তির যদি কোনও মাথামুণ্ডু না থাকে, ত সে কলমের দোষ, লেখকের নয়। কবিকঙ্কন ভারতচন্দ্র প্রভৃতি যে বলেন যে সরস্বতী তাদের মুখে বাণী দিয়েছেন, সে কথা আমি বিশ্বাস করি। আমরা যাদের কবি বলি, তাদের মন যে ভবসাগরে চিরদিন পাল খাটিয়ে অকুলের দিকে চলে, এ কথা যে না জানে, সে কাব্য কাকে বলে তা সবুজ পত্র আশ্বিন, ১৩২৫ জানে না। তবে অ-কবি অমর, অবশ্য চিরদিন গুণ টেনেই চলি,—অর্থাৎ- মাটির আশ্রয় ত্যাগ করবার আমাদের সাহসও নেই, শক্তিও নেই। ভাবের যাত্রা নিরাপদে সাঙ্গ করবার জন্য আমাদের মত সাহিত্যিকদের পক্ষে, নিরেট বস্তুজগতের উপর পা রেখে লজিকের সিধে পথ ধরে চলা ছাড়া আর উপায় নেই। সুতরাং আমি এ কথা নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করছি যে, আমার গেল চিঠিতে আর যাই থাক্‌-কোনও প্রকাণ্ড সত্য নেই। তবে কি ওটি একটি প্রকাণ্ড রসিকতা?—তাও নয়, কেননা রসিকতা কথন প্রকাও হয় না। ইংরেজরাও জানেন যে Brevity is the soul of wit. ও একটা খামখেয়ালি লেখা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওর ভিতর যদি কিছু থাকে ত,—মানুষের মন লজিকের পথ ছেড়ে দিলে * কি ভাবে চলে, তারই পরিচয়। যদি বল লজিকের ধ্রুবপদ ছেড়ে খেয়ালের বেচাল ধরবার প্রয়োজন কি? তার উত্তর-গুণটানার দাসত্ব হতে অব্যাহতি লাভ করবার লােভ সকলেরই মাঝে মাঝে হয় । আমি জানি, এ কথার জবাব তুমি কি দেবে। তুমি বলবে, ভারতবর্ষের এই দুর্দিনে, আইডিয়া নিয়ে খেলা করাটা কি সঙ্গত ? তোমরা যে আজকাল স কাজেরই হাতে হাতে ফল পেতে চাও, সে কথা কে না জানে। এ ইচ্ছা খুব স্বাভাবিক, কেননা আমাদের কোন কাজেই ফুল ফলে না। যাদের মুখে সময় ঢের আছে তারা মেওয়া ফলাতে চেষ্টা করুক—কিন্তু আমাদের বয়েসের লােকের সবুর সয় না, আর তাতে করে শুধু মেজাজ বিগড়ে যায়। এ অবস্থায় মনের কথা লিখতে গেলেই তা মেজাজি লেখা হয়ে উঠবে। আর আমার । মতে মেজাজি লেখার চাইতে খেয়ালি লেখা ঢের ভাল, কেননা টের বেশি নিরাপদ। যে লেখার মাথা-মুণ্ডু নেই—তার মুণ্ডুপাত কেউ ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা পত্র করতে পারবেন না, অতএব তার বিরুদ্ধে কেউ অস্ত্রধারণ করবেন না। অপর কিছু লিখতে গেলেই কলমধারীদের সঙ্গে আমার কাজিয়া বাধে। কেউ ডান গালে চাটি মারলে, বা গালটি যে অমনি বায়া করে দিতে হবে, এ মন্ত্রে আমি দীক্ষিত হই নি। আমাদের দেশে যারা লেখনী ধারণ করেন, তারা প্রায়ই দেখতে পাই লেখক না হয়ে সমালোচক হতেই ব্যস্ত। সংস্কৃত লৌকিক শ্যায়ে বলে, প্রদীপ দিয়ে ঘর আলো করাই সঙ্গত, চালে আগুন লাগিয়ে দেওয়া অসঙ্গত। সেকালের জনসাধারণ যে কথাটা জাত, একালের শিক্ষিত সমাজ তা ভুলে না গেলে, মনের প্রদীপের আমরা এর চাইতে সদ্ব্যবহার করতে পারতুম। আমরা যে তা করিনে, তার কারণ আমরা আলোর চাইতে আগুনকে চিনি বেশি। ফলে, যে কথায় মনে আলো ফেলে, তার চাইতে যে কথায় বুকে আগুন জ্বলে, এদেশে তার বাজার-দর টের বেশি। কাজেই বাজে কথা বতে হয়। তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যাক যে, আমাদের পক্ষে এখন প্রধান দরকার হচ্ছে-প্রাণের তেঙ্গ, বাড়ানো। আমাদের সুক্ষম শরীরের উত্তাপটা যে এখন subnormal একথা আমিও অস্বীকার করি নে। তবে আলাের ভিতরে যে আগুন নেই, এ সত্য কোন্ হাতে ধরা পড়েছে ? রক্তমাংসের হাতে ত নয়ই। রসিকতাকে পাঁচজনে এত নীচু নজরে দেখে কেন ? লােকের বিশ্বাস হাসির আলাের গায়ে চমক আছে, কিন্তু তার অন্তরে কোনও শক্তি নেই; অর্থাৎ বিদ্যুতের অন্তরে বজ্র নেই। বলা বাহুল্য, এ হচ্ছে তাদেরি মত, যাঁরা যে বস্তু স্পর্শ করূতে পারেন না তার গুণাগুণ মানেন না, কেননা জানেন না। আলাের দোষ-এই যে, ও বস্তু মানুষের করতলগত সবুজ পত্র মানি, ১৩২৫ হয় না। তারপর রসিকতা ছেড়ে যদি সত্যকথা বল, তাতেও রঙ্গে নেই। অমনি লােকে বলতে সুরু করবে যে, সে কথা অপ্রিয়, এবং অপ্রিয় সত্য বলা শাস্ত্রে নিষেধ। এ নিষেধ আমিও মান্য করি। তবে সত্যের খাতিরে আমি বলতে বাধ্য যে, সত্য প্রিয়ও নয়, অপ্রিয় ও নয়—তা শুধু সত্য। সত্যের প্রিয়তা অপ্রিয়তা নির্ভর করে শ্রোতার উপরে। যা একজনের কাছে প্রিয়, তা আর একজনের কাছে অতিশয় অপ্রিয় হতে পারে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক্। একালে যে কথা আমাদের জাতের আত্ম-গরিমা না বাড়ায়, সকলেই জানে যে, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়,-হােক না সে কথা খােল-আনা সত্য। কিন্তু সেকালে ভারতবর্ষে আৰ্য নামক এক জাত ছিল-যাদের প্রকৃতি ছিল ঠিক আমাদের উল্টো। ভাসের নাটকে পড়েছি যে, উত্তরগােগৃহে শত্রুর দল রণে ভঙ্গ দেবার পর, রাজকুমার উত্তর ঘরে এসে শুনলেন যে, দূতমুখে বিরাট-রাজের কাছে এই সংবাদ পোঁচেছে যে, তাঁর বীরত্বেই সে যুদ্ধে জয়লাভ হয়েছে। ব্যাপার হয়েছিল অন্য রূপ। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছিলেন বৃহন্নলা, আর উত্তর শুধু রথের মধ্যে সাক্ষী-গােপাল হয়ে বসেছিলেন। উত্তর এই মিথ্যা-প্রশংসায় হৃষ্ট হওয়া দূরে থাক, অতিশয় রুষ্ট হয়ে বিরাট-রাজের কাছে বলেন যে, এই মিথ্যা-খ্যাতি বিষের মত তার দেহ-মনকে দগ্ধ করূছে ; কেননা যে সত্যসন্ধ, মিথ্যা-প্রশংসা তার কাছে যেমন অগ্রাহ, তেমনি অসহ। এই কথায় উত্তর যে মনােভাব প্রকাশ করেন, সে মনােভাব যে আৰ্য্য, তার পরিচয় আমরা ঐ একই নাটকে, দ্রোণের মুখেও পাই। দ্রোণ শকুনীকে বলেন যে,সত্যের অপলাপ করা গান্ধার দেশের লোকের ধৰ্ম্ম হতে পারে, কিন্তু আৰ্যের নয়। সে যাই হােক, একালের সাহিত্যে ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা পত্র। ৩৪১ রসিকতার চাইতে সত্যকথা যে বেশি অচল—সে কথা অস্বীকার করে কোনও লাভ নেই। * সকল দেশের সকল যুগের সাহিত্যই অবশ্য সমালােচকদের কাছে লাঞ্ছিত ও গঞ্জিত হয়ে এসেছে। সামাজিক মনের সাহিত্য-বিদ্বেষের একটা টাটকা উদাহরণ নেওয়া যাক।-তুমি সম্ভবত জান যে, গত শতাব্দীর মধ্যভাগে ফ্রান্সে দু’দল লেখকের আবির্ভাব হয়। একটি ছিল আর্টের দল, আর একটি বিজ্ঞানের দল। Realist-রা বলতেন যে, সাহিত্যের কৰ্তব্য, সত্য কথা বলা; আর Parnassian-রা বলতেন যে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য সুন্দর কথা বলা। এ দু-দলের ভিতর অবশ্য যথেষ্ট দলাদলি ছিল, এবং পরস্পর পরস্পরের সম্বন্ধে যথেষ্ট মিথ্যা কথা আর যথেষ্ট কদর্ঘ্য কথা বলেছেন। কিন্তু সমালােচকদের হাতে এ দু-দলই সমান মার খেয়েছেন। তাঁরা আটের দলকে বলতেন—তােমাদের লেখায় সত্য নেই; আর বিজ্ঞানের দলকে বলতেন—তােমাদের লেখায় সৌন্দৰ্য্য নেই। সমালোচকেরা অবশ্য সত্যের জন্য কিম্বা সৌন্দর্যের জন্য থােড়াই কেয়ার করতেন—লেখকদের বিরুদ্ধে তাদের আসল অভি- যােগ ছিল এই যে, তাদের কলমের মুখ দিয়ে যা বার হয় তা কাজের কথা নয়। সত্য জেনেই বা কি হবে, আর রূপ দেখেই বা কি হবে, সমাজ চায় সেই কথা—যা জীবনের হাটে ভাঙ্গিয়ে নেওয়া যায়, যা পরিবার নামক ছােট ঘরকরুনা, আর সমাজ নামক বড় ঘরকনা, দুয়েরই সমান কাজে লাগে। মানুষের মনের জীবন তার কাজের জীব- নের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও যে তার অধীন নয়—একথা অনসাধারণ • মানে না; কেননা কাজ সকলেরই আছে, কিন্তু মন সকলের নেই। কী ও জ্ঞান, এ দুই বিচ্ছিন্ন না হলেও যে বিভিন্ন, এক ইউ ৩৪২ সবুজ পত্র আখিন, ১৩২৫ রােপেও লুকোনাে নেই। সুতরাং সাহিত্যিকরা যখন সমাজকে সম্বােধন করে বললেন যে, তােমাদের ঘরকন তােমরা চালাও, আমরা তার তেল-নুন-লকড়ি যােগাতে পারব না; তখন সমাজ উত্তর কলে যে, আমরা তােমাদের আমাদের বাজার সরকারি করতে বলছি নে, আমাদের হয় হাসাও নয় কাদাও। তাতে বিজ্ঞান ও আর্ট একজোট হয়ে সমস্বরে বললে আমাদের “বয়ে গেছে।” বিজ্ঞানের দল বলেন, আমরা তােমাদের চোখের সুমুখে এমন আলাে ধরে দেব, যাতে করে যা সুন্দর তাও কুৎসিত দেখাবে ; আর আর্টের দল বলেন, আমরা রেখা ও বর্ণের এমনি বিন্যাস করব যে, তাতে করে যা কুৎসিত তাও সুন্দর দেখাবে। সমাজ প্রতিকুল না হলে, লেখকেরা এতটা গোঁয়ার হয়ে উঠতেন না, এবং zolaও সরস্বতীর মন্দিরকে ব্যাধি মন্দির করতেন না, এবং Gautierও তাকে চিত্রশালায় ভর্তি করতেন না। তবে এদের একটা কথা খুবই সত্য; সে হচ্ছে এই যে, হাসি-কান্নার বাইরে না গেলে, কি সত্য কি সুন্দর ও দুয়ের কোনটিরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। সত্য ও সুন্দরের চর্চাও হচ্ছে একরকমের যোগসাধনা। afety Leconte-de-Lisle 47: Flaubert-47 468 certet পায়, সে কথা অবশ্য আমাদের মত লেখকের উচ্চারণ করবারও অধিকার নেই। পাঠকসমাজ যদি আমাদের কাছে হাসি-কান্না চান, তাহলেই আমরা কৃতার্থ হয়ে যাই। ফরমায়েস করলে আমি অন্তত ওর প্রথম ভাগটা কায়ক্লেশে যােগাতে পারি। কিন্তু পাঠকসমাজ হাসি ভালবাসে না, তারা চায় শুধু কাদতে; অথচ চোখের জলে কলম ডুবিয়ে আমি লিখলে তাতে হরফ ফোটে না। এইজই ত ম , ষষ্ঠ সংখ্যা এত বাজে বকি, এবং যে-ইউক্লিডের আমি কোনও ধার ধারি নে, তারই গুণ গাই। আমার মাল বাজারে না কাটুক, তাতে কোনও ক্ষতি নেই—দুঃখের বিষয় এই যে, দেশে আজকাল সাহিত্য কেউ চায় না। সমাজ চায় সেই পলিটিকস,যাতে তার ক্রোধ ও মদ বাড়ে,সেই ই- নমিক, যাতে তার লোভ ও মাৎসর্য বাড়ে,—সেই দর্শন, যাতে তার মােহ বাড়ায়--আর সেই গল্প ও সেই কবিতা, যাতে তার কামনা বাড়ায় এবং সে কামনা নিস্ফল হলে, হা-হুতাশ করতে শেখায়। বলা বাহুল্য ষড়রিপুর কোনটিকেই বাড়ানাে সাহিত্যের ধর্ম নয়—সাহিত্যের একমাত্ৰ কৰ্ম্ম হচ্ছে আত্মাকে বাড়ানো। এ কথা যে না বােঝে, তাকে তর্ক-যুক্তির সাহায্যে বােঝন অসম্ভব ; কেননা আত্ম-বস্তুকে জানা যায়, কিন্তু বােঝানো যায় না। যা সকলের ভিতর আছে, তা সকল থেকে ছাড়িয়ে কি করে আলাদা করে দেখানাে যেতে পারে ? -তুমি বলবে এ সব হচ্ছে mysticism-এর বুলি। অবশ্য তাই;যে লেখার ভিতর mystery নেই, তা কি কখন সাহিত্য হতে পারে ?-Mysticism-এর বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই; তবে উপনিষদের “অতিবাদ” শব্দ বােধহয় ঐ জিনিসকেই বােঝায়। ছান্দোগগ্যাপ নিষদে আছে যে, যে ব্যক্তি প্রাণতত্ত্ব দর্শন করেন, মন করেন, এবং তা যে সর্বের অতিরিক্ত এইরূপ নিশ্চয় করেন, তিনিই অতিবাদী হন। এবং এই সূত্রে সনৎকুমার উপদেশ দিয়েছেন যে, যদি কেউ বলে তুমি অতিবাদী-তাহলে উত্তরে বলবে—হাঁ আমি অতিবাদী; নিজের অতি- বাদিত গীকার করবে, কখন গােপন কবে না। সুতরাং mysticien-cয় প্রধান করবার আমাদের কোনও দায় নেই। এ মত কি সজ্ঞানে অস্বীকার করা চলে যে, যার অন্তরে অর্শন নেই, তা কার সবুপ নয়; আর যার অন্তরে অতির ধারণা নেই, তা দর্শন নয়। সে যাই হােক পৃথিবীর যে-কোন ভাষার যে-কোন কাব্য নিয়ে তাকে বুদ্ধির সারা বিশ্লেষণ করে দেখাও ত, তার কবিত্ব কোন্ উপাদানের মধ্যে নিহিত ?-যদি তুমি তা পার, তাহলে তুমি মানুষের দেহকে dissect করেও হাতে ধরে দেখিয়ে দিতে পার তার প্রাণ কোথায়। যার ভিতর রহস্য নেই, তার ভিতর আনন্দও নেই; আর যার ভিতর আনন্দ নেই—তার ভিতর সত্যও নেই, সৌন্দৰ্যও নেই। মানুষে আনন্দের অধিকারী বলেই কাব্য ও কলার সৃষ্টি করেছে। যায়। কথা নিয়ে কারবার করে তারাই জানে, ও হচ্ছে একরকম আগুন নিয়ে খেলা করা। কথার শক্তি অসীম, এবং সে শক্তি যেমন প্রাণ-বৰ্ধক তেমনি মারাত্মক। কথায় আত্মাকে যেমন জাগিয়ে তােলে, তেমনি আবার তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। মানুষে একটা কথার মত কথা পেলে তাই আঁকড়ে ধরে জীবন যাপন করে, সে কথার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করাটা তারা আর আবশ্যক মনে করে না। সাহিত্যের উপর সমাজের রাগই এই যে, সাহিত্য নতুন কথা বলে, আর না হয়ত পুরোনাে কথার নতুন অর্থ বার কয়ে। এত কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, ঐ “আনন্দ” শব্দটি মানুষের মুখে সহজেই একটা বুলি হয়ে দাড়াতে পারে। এ দেশে সে ভয় বিশেষ আছে। বড় বড় কথাকে অর্থহীন বুলিতে পরিণত করতে আমরা সিদ্ধহস্ত। অতএব আনন্দ শব্দের মর্ম আমি কি বুঝি, তা তোমাকে বলছি। জানি অর্থ আমােদ নয়, সারাম নয়, এমন কি সুখও নয়। সনি মনের শান্তি ও করে। সেই কারণে যারা মানুষকে নিয়ে বাৰ শুনিয়েছে, তাই পৃথিৱীতে পাের অশান্তি সৃষ্টি ফেলি। :, 'শ:-) ৫ম বর্ষ, যষ্ঠ সংখ্যা যীশুধষ্ট স্পষ্টই বলেছেন যে “আমি তােমাদের শান্তি দিতে আসি নি, দিতে এসেছি অসি”। শ্রীকৃষ্ণ অসি নিয়ে আসেন নি, এসেছিলেন বাঁশি নিয়ে। কিন্তু সে বাঁশি যে কি গােল ঘটিয়েছিল, তা সকলেই জানেন। সে বাঁশির ডাকে যমুনা যে উজান বয়েছিল—সে আনন্দে, সুখে নয়। যার প্রতি অণু পরমাণুকে উজান ঠেলে যেতে হয়, তার সুখই বা কোথায়, আর সোয়াস্তিই বা কোথায় ? সাহিত্যের অসিই বল আর বাঁশিই বল—দুয়েরই কাজ হচ্ছে সকল মনের শাস্তি ভেঙ্গে দেওয়া। কেননা কাব্য চায় মানুষকে আনন্দ দিতে, আর কবি জানে যে শান্তি হচ্ছে সীমার ধৰ্ম্ম-আর্নন্দ অসীমের। এই সীমা অতিক্রম করার শক্তি প্রয়োগে আনন্দের জন্ম, এবং সেই শক্তি বৃদ্ধিতেই আনন্দের স্ফুর্তি। মানুষ ঘর ছাড়তে চায় না, আর সাহিত্য তাকে বাইরে টেনে নিয়ে যেতে চায়। এই জন্যেই ত সাহিত্যের উপর সমাজের এত আক্রোশ, এত অত্যাচার। অতএব প্রতিদেশে প্রতিযুগে সাহিত্যের কথা সামাজিক sedition হিসাবে গণ্য। সুতরাং আমরা যদি সাহিত্য রচনা না করে বাজে বকি, তাতে আমাদের বুদ্ধির দোষ দিতে পায় না। এ কথা শুনে তুমি হেসে বলবে যে, আমি যখন কবি নই-তার্কিক, তখন অামার ভয় কি?—এ কথা আমি মানি যে, আমি কাউকে আনন্দ দিতে পারি নে বলে অনেককে শিক্ষা দিতে চাই। কিন্তু বিচার করাও যে সকল ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়—যে শাস্ত্র মতে তার প্রমাণ দিচ্ছি। তুমি ভারতবর্ষের ইতিহাস অন, অতএব তােমাকে বলা বাহুল্য King Menander ছিলেন ফলিফে, গ্রীক ভূপতি, এবং তিনি ৰো বর্গ লম্বন করেন। ডিনাশে ছিলেন অর জীবন গিলেনের কাজে Mpnandar-এর-মাতে কি কখন, "rif, **

সদ পত্র
৫
হয়েছিল, “মিলি পঞহো” থেকে এখানে তা উদ্ধৃত করে দিচ্ছি -
রাজা বলিলেন, “ভদন্ত নাগসেন, আমার সহিত আপনি আলাপ
করিবেন কি ?”
-মহারাজ, আপনি যদি পণ্ডিতগণের বিচার অবলম্বন করিয়া আলাপ
করেন, আমি আলাপ করিব। আর যদি রাজাগণের বিচার অবলম্বন
করিয়া আলাপ করেন, মহারাজ তবে আমি আলাপ করিব না।
-ভদন্ত নাগসেন, পণ্ডিতগণ কি প্রকারে
০ প্রকারে আলাপ করিয়া
থাকেন?,
-মহারাজ, পণ্ডিতগণের বিচারে (যাদী ও প্রতিবাদীর দুরবগাই
প্রশ্নরূপ) আবেষ্টনও করা হয়, এবং (তাহার যথােচিত উত্তররূপ)
নিরাবরণও করা হয়; কোন বৈলক্ষণ্য প্রদর্শিত হয়, এবং তদ্বিরুদ্ধ
বৈলক্ষণ্যও প্রদর্শিত হয়। তজ্জন্য পণ্ডিতেরা কোপ. করেন না।
মহারাজ, পণ্ডিতেরা এই প্রকারে আলাপ করিয়া থাকেন।
--আর রাজারা কি প্রকারে আলাপ করিয়া থাকেন?
মহারাজ, রাজারা-আলাপে কোন একটি বস্তুর তজ্ঞা করিয়া
লন। যদি কেহ ঐ বস্তুকে প্রতিকুল ভাবে প্রতিপাদন করে, তবে
তঁাহারা ইহাকে দণ্ড দাও বলিয়া তাহার দণ্ডাজ্ঞা প্রদান করেন।
মহারা, রাজারা এই প্রকারে আলাপ করেন।
এ কথা যে সত্য, তা একালেও আমরা স্বীকার করূতে বাধ্য ; আর
এ কথা কে না জানে যে, একালে সাহিত্য-সমাজের রাজাগণ হচ্ছেন
জনসাধারণ,-ইংরাজিতে যাকে বলে public। সুতরাং স্বয়ং নাসেন
ঘখন রাজার সঙ্গে বিচার করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন, তখন আমি যে

৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা
পজ
public-মহারাজার সঙ্গে বিচার করতে কুষ্টিত হব, তাতে আর
আশ্চৰ্য্য কি ?
নাগসেন অবশ্য অবশেষে মহারাজ মিলিন্দের সঙ্গে বহু বিচার
করেন, তার কারণ তার শেষ কথার উত্তরে মহারাজ বলেন :
“ভদন্ত নগসেন, আমি পণ্ডিত-বিচার অবলম্বন করিয়া অালাপ
করিব, রাবিচার অবলম্বন করিব না। ভদন্ত, আপনি বিশ্বস্ত হইয়া
আমার সহিত আলাপ করুন। আপনি যেমন ভিক্ষু সামণের (নব
শিষ্য) উপাসক বা পরিচারকের সহিত আলাপ করেন, সেইরূপ
বিশ্বস্ত হইয়া আলাপ করুন, আপনি ভয় করিবেন না।”
এ হেন অভয় পাঠকসমাজ আমাকে কখনই দেবেন না;কেননা
Menander মহারাজা হলেও গ্রীক, আর আমাদের জনসাধারণ আর
যাই হন, একি নন। এ ক্ষেত্রে বাজে বকা ছাড়া আর কি করা
যেতে পারে ?
২০শে জুলাই, ১৯১৮ খৃঃ
বীরবল।

সাহিত্যের জাতরক্ষা। দ্বিতীয় প্রস্তাব। ৪ যিনি বলেন যে বহুদিন হ’ল আমরা সমুদ্র যাত্রা করি নি, আজই বা তা কবুতে যাব কেন? আর যিনি বলেন যে অতীতকালে আমাদের কবিরা রাধা-কৃষ্ণের গান লিখেছেন, আজই আমরা মহী বা বিনো- দিনীর মনের প্রাণের খোজ নেব কেন? এই দুই ব্যক্তির মধ্যে বাস্ত- বিক পক্ষেই কোন প্রভেদ নেই। এই দুজনের মধ্যেই রয়েছে একটা দীনতা। এই দীনতাতেই তারা জাতীয়তা তথা ‘পেটুরিয়টিজম’-এর উল রঙ চড়িয়ে বীরত্ব বলে’ চালান করে দিতে চাচ্ছেন। যাদের নিজের উপরে কোন ভরসাই নেই, তারাই পদে পদে পিছন ফিরে আপনার পথ ঠিক করতে চায়—আর যাদের বাস্তবিকই কিছু ববার নেই, তারাই আপনার কথা গুলােকে অতীতের ছাঁচে ঢালাই করে তার একটা মূল্য বাড়িয়ে তুলতে চেষ্টা করে। এ যেন কীটোপি সুমনােসাৎ”—দেবতার মাথায় গিয়ে চড়ে বসূবার চেষ্টা। এই হচ্ছে তাদের দীনতা। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এমন লােকও থাকতে পারেন, যার বাস্তবিকই নিজস্ব কিছু বলার আছে। আর তিনি নিশ্চয়ই সে কথা বলবেন--আপনার আমায়, আপনার সুরে লাগছে, ";".... , हयगर, बई नरव সাহিত্যের আতরক্ষা অঙ, ফলিয়ে। তাকে আমরা কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। আর সেই না পারাটা অতি সুখের কথা। কিন্তু ঐ যে দীনতা - দীনতা কিন্তু মানুষ কোন দিনই স্বীকার কবে না। অন্তত যে মানুষের বাঁচবার ক্ষমতা আছে সে-মানুষ। কারণ এই দীনতা যে মানুষ স্বীকার করবে সেই মানুষই প্রকৃত পক্ষে তার জাতীয়তার মুলে কুড়াল মারবে। কেননা এটা খুব স্পষ্ট কথা যে, একটা কোন জাতিকে মেরে ফেলে তার জাতীয়তাকে বাঁচিয়ে তোেল। যায় না। আর একটা জাতিকে বাস্তবিক মেরে ফেলা হবে, যদি সেই জাতির প্রত্যেক মানুষটা আপনাকে ঐ দীনতায় সাবু-বালি দিয়ে পুষ্ট করূতে থাকে। একটা কথা কিন্তু মনে না লেগে যায় না। সেটা হচ্ছে এই যে, যারা আজ বাঙলা-সাহিত্যে ‘জাতীয়তা জাতীয়তা” বলে খুব কলরব করূছেন, মনে হয় তাঁরা ভাবছেন যে বাঙালীর জাতীয়তাটা বুঝি তাঁদের কয়েক জনের মুঠোর মধ্যেই আছে। এইটে তাদের একটা মহাভুল। এই ভুলটাকে তারা ভুল বলে মনে করতে পারছেন না। নইলে তাদের কোলাহলটা অনেকটা নরম হয়ে আসত। আসল কথা এই যে, বাঙালীর জাতীয়তার হিসেবটা আমাদের কারও আমার পকেটে নেই–আছে সেটা এক বিশ্ব-বিধাতার মনের পটে। কতকগুলাে জিনিস আছে যার সংজ্ঞা কেউ দিতে পারে না, যেমন -ব্ৰহ্ম; কবিত্ব। তেমনি একটা ব্যতিয় জাতীয়তা যে কি, তার মা কে তে পারে না, কেননা বিন জিনিসটা কি শও নয়। কি ব কবরে শংকা দেওয়া + :- ১., আশ্বিন, ১৩২ তেমনি একটা জাতির জাতীয়তার সংজ্ঞা নিরূপণ করা না গেলেও তার জাতীয়তা যে কি নয় তা বলা তত শক্ত নয়। সেই জন্য একথা আজ আমরা নির্ভয়ে বলতে পারি যে, বাঙালীর জাতীয়তা আর যাই হােক সেটা কেবল রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা বা বৈষ্ণব মহাজনের বসত নয়। কেন নয়?-এ সম্বন্ধে যা মনে হয় তা বলবার চেষ্টা করব । ( ২ ) এগতে যত ধর্থ আছে তার মধ্যে আমরা, হিন্দুরা, কেবল আমা- দের ধর্ম সম্বন্ধে সনাতনত্বের দাবী করতে পারি। কেন পারি তাও ‘বছি। কিন্তু এ সম্বন্ধে আমাদের অনেকেরই একটা উল্টো ধারণা আছে, সেইটে আগে বলে নেব। অনেকে মনে করেন যে, হিন্দু ধর্ম যে সনাতন ধর্থ তার মানে হচ্ছে এই যে, অতীত কালের যা কিছু তাই চিরকালের সত্য। বেদে যে সব উপলব্ধি বা চিন্তার কথা আছে, যে সব ক্রিয়া কাণ্ডের ব্যবস্থা আছে—অর্থাৎ সেই যুগের মানুষেরা যে রকম অবস্থার মধ্যে যে-রকমে আপনার জীবনের সত্যকে, জগতের সত্যকে, ভগবানকে উপলব্ধি করেছিলেন,জীবনের,জগতের,ভগবানের ও সত্যের সেই রূপই কেবল চিরন্তন সত্য। কিন্তু হিন্দু ধর্ম যে সনাতন ধর্ণ তার অর্থ এ নয়। এর মানে যদি তাই হয়, তবে আমরা বাঙালীরা আজ কেউই হিন্দু নই। কারণ আমাদের চিন্তার রাজ্য আর বৈদিক যুগের মানুষের চিন্তায় রাজ্যের মধ্যে তিন সাত্তা একুশ সমূত্র ও তিন তেরং উনচনি নদীর ব্যবধান, আর আমাদের কর্মের সঙ্গে বৈদিক যুগের কমে ২ ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা। সাহিত্যেরজাতরক্ষা মিল সেটা শুধু “ক” ধাতুর মিল, তবে আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানা- দিতে, যেমন বিবাহ পৈতে শ্রাদ্ধ ইত্যাদিতে এখনও সে যুগের ক্রিয়াদির একটু ছিটে ফোটা রকমের মিল আছে। তবে বলা বাহুল্য সবাই জানেন যে, সে মিলটা অত্যন্তই বাহিরের মিল-ভিতরের নয়। কেবল তাই নয়। আমাদের ধর্মের সনাতনত্বের ঐ অর্থ অনুসারে আমাদের আর হিন্দু হবার কোন দিনই উপায় নেই। কারণ, যতই চেষ্টা করা যাক না কেন, একই কল্পযুগে বিশ্বমানবের জীবনে একই ভাব ঠিক অবিকল একই রকমে দু’বার আসে না—বিশ্বমানবের যে কোন অংশ সম্বন্ধেও সেই কথা। কিন্তু ঐ যে বলেছি “কৃ’ ধাতুর মিল—ঐ মিলটাই হচ্ছে আসল মিল। ঐটেই হচ্ছে সনাতনত্বের মূল—ঐ দিক থেকেই হিন্দু সনাতন। ঐ “কৃ” ধাতুর পিছনে হাজার যুগে হাজার প্রত্যয় লাগিয়ে হাজার ভঙ্গীতে মানুষ নাচবে কিন্তু “কৃ” সর্বদাই “ক”। এই সত্যটাই প্রাচীন ঋষিরা দেখতে পেয়েছিলেন, আর অর্বাচীন আমরা, দেখতে পাচ্ছি নে। সে যুগের তারা বুঝেছিলেন যে, প্রত্যয়ের পরিবর্তন করা চলতে পারে কিন্তু ঐ “ক” ধাতুকে ত্যাগ করবেন যিনি, তার এ জগতে নিষ্কৃতি নেই। আর আজ আমাদের যে অবস্থা তার প্রধান কারণ হচ্ছে এই যে, ঐ “কৃ” ধাতুটাকে খাটো করে আমরা প্রত্যয় টাকে বাড়িয়ে তুলে মনে করেছি যে সেইটেই সনাতন। তেমনি আমাদের ধর্মের সঙ্গে চার হাজার বছর পূর্বের আদেৱ ধর্মের যে মিল সেটা হচ্ছে “কৃ” ধাতুর মিল-মনের মিল নয় কিন্তু অনুষ্ঠানের মিল নয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই পুরাতন মনবোই নুতন বলে মনে করেন। এখাটা জামি বানিয়ে বছি নে।

স্য পত্র জানি, ১৩২৫ ৫ . এর প্রমাণ এই যে, আজও প্রাচীন কালের বর্ণাশ্রম ধর্মের নাম করে মাঝে মাঝে হা হুতাশ শুনতে পাওয়া যায় এবং তা প্রবর্তন করবার ধুয়ােও মধ্যে মধ্যে ওঠে। এঁরা গায়ের জোরেই মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চান। কিন্তু মনের জাের যে গায়ের জোরের চাইতে জেয়াদাই হয়ে থাকে, এটা সনাতন সত্য। প্রাচীন কালের মানুষেরা নিজ নিজ মন নিয়েই জীবন যাত্রা নির্বাহ করে গেছেন আর আমরাই বা কেন আমাদের নিজের মন নিয়ে আমাদের নিজের জীবন গঠন করব না—এ প্রশ্নটা যে কেন অনেকের মনে উদয় হয় না, সেটা আশ্চ- যই বলতে হবে—বিশেষত এই Self-deterinination-এর দিনে। Self-determination যে কেবল রাজনৈতিক জগতেই সুখ স্বাস্থ্য ও আনন্দের মুল তাই নয়—মানুষের অন্তরের জগতেও তাই। তবে এই রকমের মনের ভাবের কারণও যে নেই তা নয়। আমি আগেই বলেছি-সেটা হচ্ছে মানুষের দীনতা, তার নিজের উপর ভরসার অভাব। সেকালের সবাই ছিলেন এক একজন প্রকাণ্ড ঋষি আর একালের আমরা সবাই এক একজন দীন অকিঞ্চন? মানুষের এই ভাব মানুষকে কোন দিনই অমৃতের পথে নিয়ে যাবে না। এই ভাব মানুষের শক্তিকে কোন দিনই উদ্বুদ্ধ করার সাহায্য করবে না। আর যে শক্তিহীন তার যে আত্মদর্শন লাভ ঘটে না-এ উপনিষ- দেরই কথা। প্রাচীন কালের ঋষিরা মনকে সত্য বলে জেনেছিলেন, কারণ তারা মানুষের প্রকৃতি বলে যে জিনিসটা আছে, তার রহস্য বুঝে ছিলেন। প্রকৃতির ধর্ম যে কি, তা বুঝেছিলেন, তাই তারা মানুষের ধর্মকে কোন “ক্রীড’এর দ্বারা আষদ্ধ করেন নিমানুষের রকে सब व गरज সাহিত্যের জাতক্ষা ৩৩ ৱা “রিলিজ করে তােলেন নি। রিলিজন হচ্ছে ভগবানে পৌছবার পাকা সড়ক, আর ধর্ম হচ্ছে আত্ম-সাক্ষাৎ লাভ কৰাঁর প্রকৃতির মেঠো রাস্তা। আর আত্ম-সাক্ষাৎ লাভ হলেই ভগবান দর্শন হয়। কেননা ভগবান যে মানুষকে তার নিতের ‘মডেলে তৈরী করেছেন, সে-কথা বাইবেলেও বলে। কিন্তু রিলিজন’ ভগবানে পৌছিবার পাকা সড়ক হলেও যে সেটা সােজা রাস্তা এমন নয়—কেননা মনটা রিলিজনের ক্রীডের জালে জড়িয়ে পড়ে। ও অবস্থায় ভগবান ত দূরের কথা—মানুষ নিজেকেই দেখতে পায় না। মনের যা সত্য তা মনের মধ্যেই আছে-তা তার বাইরে নেই। বাইরের “ক্রীড” হয়ত মনের কাছে ঘাের মিথ্যা। আর মিথ্যার মধ্যে মানুষের দৃষ্টি খােলে না কোনদিন, বরং আরও ঘুলিয়ে যায়। আর ঘুলিয়ে-যাওয়া দৃষ্টি নিয়ে নিজেকেও বােঝা যায় —ভগবানকেও পাওয়া যায় না। এই যে এক যুগের মানুষের মন আর এক যুগের মানুষের মনের সঙ্গে এক নয়, আবার এক যুগের মানুষের মধ্যেই একজনের প্রকৃতি আর একজনের প্রকৃতি থেকে ভিন্ন—এই সত্যটা প্রাচীন ঋষিরা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন বলে তাঁদের মধ্যে ধর্ম বলে যে জিনিসটা গড়ে উঠল, সেটা কোন একজনের উপলব্ধ একটা সত্য নয়। আর সেই অন্যেই ক্রিশ্চিয়ান ক্যাথলিক বা প্রটেষ্টান্ট ধর্মে মেরী, খৃষ্ট বা বাইবেলের যে স্থান, মুসলমান খণে মহম্মদ বা কোণের যে স্থান হিরে ধর্শে মৎস্য, কু, সিংহ, বামন মন্দ কি ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরও ঠিক সেই স্থান নয়- বেদ বা কোন উপনিষদের বা তার ঠিক সেই ন জয়। সকালে মির খাতে টিকার এত বিডি ৩৪ সবুজ পত্র সংস্কারকের এত সংখ্যা। এক দর্শনেরই ছ' ছ’টা শাখা-উপনিষদ, পুরাণ, উপপুরাণ হাতের পায়ের আঙুল গুণেও সংখ্যা করা যায় না। হিন্দু ধর্মে সকল প্রকার বিচিত্রতার স্থান আছে বলেই তা সনাতন। তার ধর্মে মানুষের সকল প্রকার সত্যের জন্যেই সিংহাসন পাতা আছে—তাই তা সনাতন। তাই এ ধর্মে প্রকৃতি অনুসারে কেউ ভগবানকে প্রেমময় রূপে পাচ্ছেন, কেউ বা শক্তিময় রূপে দেখছেন— কারও আরাধ্য কৃষ্ণ, কারও আরাধ্য কালী। কারও জীবনে চরম সত্য বিকশিত হয়ে উঠল—নিরাকার আনন্দময় ব্রহ্মে, আবার কেউ দেখতে পেলেন সাকার ভগবান। এমন কি চার্বাকও হিন্দু, কারণ চার্বাকও মানুষের মনের একটা দিক, একটা অবস্থার প্রতিনিধি। তার স্থানও সনাতনের মধ্যেই তার বাইরে নয়, অর্থাৎ এক কথায় সনাতন সনাতন, কারণ তা সমস্তকেই আলিঙ্গন করে আছে। আর ব্ৰহ্ম যে চরম সত্য তার কারণ হচ্ছে, ব্ৰহ্মে সকল সত্যের আরােপ করেও তাকে আনন্দময় রূপেই পাওয়া যায়। এখন উপরের ঐ কথা যদি মানি তবে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যে, হিন্দু ধর্ম যদি এমনি ব্যাপক, তার আধ্যাত্মিক জীবনের দিকটা যদি এমনি উদার, তবে সে হিন্দুর সামাজিক জীবন এমন সংকীর্ণ কেন? তবে সে হিন্দু এমন শুচিবাতিকগ্রস্ত কেন ? সে শতাব্দী শতাব্দী ধরে যারাই হিন্দু নয় তাদেরই 'পর নাসিকা কুঞ্চিত করে ম্লেচ্ছ যবন ইত্যাদি নামে আপ্যায়িত করে আছে কেন? তারা অহিন্দু কাউকেই ছোঁয় না—কারও সঙ্গে খায় না এবং চুলে খেলে তাদের ধর্গের পতন হয়—একথা মনে করে কেন? তার উত্তর হচ্ছে এই যে, হিন্দুর জীবনে ওটা অনেকটা আধুনিক কালের বস্তু-ওটা .

৫ম বর্ষ, যষ্ঠ সংখা সাহিত্যের জাতরক্ষা তার শক্তিহীন অবস্থার কথা। হয়ত এ মধ্যে কিছু রাজনৈতিক রহস্যও লুকিয়ে আছে। দেশের কথা যে কেবল একালেই অনেকের কাছে দ্বেষের কথা তা নয়, সকল কালেই সেটা কারাে কারাে কাছে কিছু কিছু তাই ছিল। যার সঙ্গে গায়ের জোরে পারিনে তাকে অস্পৃশ্য মনে করাই প্রশস্ত- এটা সকল বুদ্ধিমানেই বলবেন। ওটা হচ্ছে হিন্দু সমাজের আচারের কথা—হয়ত তার আত্মরক্ষা করবার প্রয়াসের চিহ্ন। তবে আমাদের এমনি কপাল যে, এখন এই সামা- জিক আচার ব্যবহারগুলােই হয়ে দাড়িয়েছে আমাদের ধর্মের আসল রহস্য। সামাজিক অনেক আচার বিচার যে, আমাদের মনের কাছে ঘাের মিথ্যা হয়েও টিকে আছে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে এই যে, আমরা অন্তত শতকরা আশী জনা মনে করি যে, ঐ আচারগুলােই হচ্ছে বৈতরণী পার হবার আসল “লছমন ঝোলা”। তাই যখন আমাদের মধ্যে সৌখীন কেউ একখানা ‘মাট চপে’র পাশে পাশেই দুটো দ্বিজ বিশেষের “হা বয়েড,” অণ্ড নিয়ে জলযােগ করতে বসেন তখন চারিদিক থেকে অনুষ্টপ ছন্দে সমস্বরে ঐক্যতান সঙ্গীত আরম্ভ হয়ে যায়-গেল “ধর্ম” গেল “জাত” । এখানে একথা আমার বলা মােটেই উদ্দেশ্য নয় যে, হিন্দু সমাজে বা অপর কোন সমাজে আচার বিচারে একটা পূর্ণ ‘এনাকিজম’ রাজত্ব করুক, তাহলে মানুষের মধ্যে সমাজ যে জন্যে গড়ে উঠল তা ব্যর্থই হবে; কারণ সমাজের পিছনেও একটা সত্য রয়েছে। এখানে আমার বলার উদ্দেশ্য এই যে, হিন্দু যে ধর্মের উদ্দে ছিল—মানুষের জীবনের জটিল রহস্যের সন্ধান মানুষের নিজের চোখের সামনে নিজেকে তুলে ধরা, নিজের সরে ফীর জীবের সঙ্গে জগতে, জগতের সতে ভগবানের সহকারি *• ... ১১ ৩৫৬ সবুজ পত্র আধ্যাত্মিক তত্ত্বসমুহের পুখানুপুঙ্খ অনুসন্ধান, মানুষের জীবনে যে একটা চিরন্তনের আনন্দ-রস ধারা অনাদিকাল থেকে প্রবহমান, তার আবিষ্কার ও উপলব্ধি-সেই ধর্মের আজ কাৰ্য হয়েছে হিন্দুর বন্ধন- শালার বিরুদ্ধে অভিযান। এ যেন কামধেনুকে দিয়ে ধান মাড়িয়ে নেওয়া-কামধেনুর অমৃত দেবার ক্ষমতার খোঁজই নেই। যদি বল যে জনসাধারণের কাছ থেকে ধৰ্ম্মের আধ্যাত্মিক দিকটার গুঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করবার আশা করা পাগলামী।তার উত্তর হচ্ছে এই যে, কেবল জন- সাধারণ নয়, আমাদের সমাজে হােরা চোমরা যারা, তাদের ধর্মও হচ্ছে কোন্ দিন বেগুণ খেতে নেই ইত্যাদি। কিন্তু যা সে কথা। এখন সনাতত্বের যে ব্যাখ্যা করা গেল, তাই যদি স্বীকার করি তবে কোন সাহসে আজ আমরা বলব যে, বৈষ্ণবের রসতত্বই সকল বাঙালী হিন্দুর অন্তরে সকল কালে সরস হয়ে ও সত্য হয়ে উঠবে বা থাকবে? এই ব্যাখ্যা অনুসারে এই সিদ্ধান্তটাই আপনি গড়িয়ে আসে যে, মানুষের বৈষ্ণবীভাব একটা ভাব, সনাতন ধর্মে বৈষ্ণব “রিলিজন”-এর স্থান একটা স্থান, কিন্তু সব স্থানই তার নয়। এই বৈষ্ণব “রিলিজন”-কে যদি বাঙালীর ধৰ্ম্মের একান্তরূপ বলে বাংলাদেশের উপরে চাপিয়ে দি, তবে বাঙালী হিন্দুর সনাতন ধর্মের আসল যে রহস্যটুকু তাই মুলে কুঠারাঘাত করা হবে। এখন এই বৈষ্ণবীভাব যদি প্রত্যেক বাঙালীর কঁাধে বাহির থেকে চাপিয়ে দি, তবে তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়ত নিজের কাছে নিলে মিথ্যা হয়ে উঠবেন, সেই মিথ্যার মধ্যে দুর্বল যাঁরা, তারা কোন দিন আপনার জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাবেন না। আর শক্তিমান যাঁরা, তাঁরা বাহিরের ঐ মিথ্যার জাল ছিড়ে ফেলে আপনার নিজের অন্তরের সত্যকে অনবীণা বাজিয়ে ৫ম , যষ্ঠ সংখ্যা সাহিত্যের জাতরক্ষা মেলায় অভিনন্দিত করবে। হিন্দুর ধর্ম—মানুষের ধর্ম। মানুষের ধৰ্ম্মে ভগবান নিজেকে এক স্থানেই একান্ত করে বেঁধে রাখেন নি। দিকে দিকে তার আনন্দ-বীণা সহস্র সুরে, সহস্র রাগিনীতে বাজছে দিকে দিকে তার আনন্দ-স্বরূপ, সহস্র রূপে সহস্র নামে বিকশিত হয়ে উঠছে। এই সহস্র সুর সহস্র রূপ থেকে হিন্দু মানুষকে খণ্ডিত করতে চায় নি-কোন দিন বাঙালী হিন্দুও তা থেকে বঞ্চিত হতে চাইবে না—এই আমাদের আশা ও বিশ্বাস। আর এই কারণেই হিন্দু ধৰ্ম্ম সনতান ধৰ্ম্ম। হিন্দু ধর্মের এই উদারতা, বাঙালী হিন্দুকে মানতে হবে। কিন্তু যদি সে নাও মানে তবে, এই উদারতাই তার জীবনে চিরকাল কাৰ্য- করী হয়ে থাকবে—কারণ মানুষের জীবনে এই উদারতাই চিরকালের সত্য। আর মানুষ মানুক বা না মানুক, সত্য সব সময়েই তার অজ্ঞাত সারেও আপনাকে জয়যুক্ত করে তােলে। মানুষ যতই মনে করুক যে, সে এককালে স্থানুর মতাে অচল অটল হয়ে থাকবে, তা সে পারবে না-অনিচ্ছাসত্ত্বে হয় সে এগিয়ে যাবে, নয় অজ্ঞাতসারে সে পিছিয়ে পড়বে, কারণ জীবন বলে যে জিনিস সেটা জড় নয়, আর সৃষ্টির মধ্যে যার সামনে গতি নেই তারই অগতি, আর অগতি মানেই দুর্গতি। সুতরাং হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক দিকটায় যদি বৈষ্ণব রসতই একমাত্র সত্য না হয়—তবে বাঙালী হিন্দু জাতীয়তাও নয়। কারণ একটা জাতির আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয়তা একই জিনিস-ধু একটা হচ্ছে ভিতরের স্বরূপ, আর একটা হচ্ছে বাহিরের রূপ। এখন পূর্বপ এর উত্তরে একটা কথা বলতে পারেন। আর ৩৫৮ সপত্র আশ্বিন, ১৩২৫ বলতে পারেন—“হে তর্কবাগীশ লেখক। তােমার তর্ক সব বাজে। কিম্বা যদি বাজে নাও হয় তাহলে আমাদের ক্ষতি নেই। কারণ তুমি ধৰ্ম্মের যে উদারতই দেখাও না কেন—আমাদের যে কথা, সে হচ্ছে দিব্যদৃষ্টির কথা। আমরা দিব্যদৃষ্টিতে আজ বাঙালীর প্রকৃতিকে স্পষ্ট দেখেছি। আর দেখেছি সে প্রকৃতির গলায় তুলসীর মালা, নাকের ডগায় কনকোল তিলক, হাতে একতারা, গায়ে নামাবলী, কণ্ঠে পদাবলী। বাঙালীর প্রকৃতি বৈষ্ণবী। আর সেই জন্যেই আজ আমরা বাঙালীকে আর সব মিথ্যা পথ ত্যাগ করিয়ে সেই পথে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছি। এই পথই বাঙালার সত্য-সুতরাং এই পথেই তার জীবনের সিন্ধি ও সার্থকতা। এর উত্তরে আমরা শুধু এইটুকু বলব যে,তারা ভূল দেখেছেন। আর তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে, যেদিন কীৰ্ত্তনের ভাবতরঙ্গে “শান্তিপুর ডুবুডুবু আর নদে ভেসে যায় যায় হয়েছিল সে দিনও সমস্ত বাংলা বৈষ্ণব হয়ে যায় নি। *** ( ৩ ) আজ আমাদের সবারই মনের কোণে গােপন একটা অশা-একটা স্বপ্ন আপনাকে স্পষ্ট করে তুলছে। আমরা সবাই আজ অনুভব করছি, বাঙালী একদিন এ জগতের দশজনের মধ্যে একজন হয়ে মাথা উঁচু করে মানুষের মতো দাঁড়াবে। আর তা করতে হলে প্রথম কৰ্তব্য—এই জগতে শত সহস্র দ্বন্দ্ব কোলাহলের মধ্যে আপনাকে বাঁচিয়ে চলা। আর সেজন্যে ভগবানকে ধু প্রেমময় বলে

গেয়ে। আত্মার মুক্তি হোক-আত্মার তৃপ্তি হােক। আজ যে তরুণ,
৫ম বর্ষ, যত সংখ্যা সাহিত্যের জাতয়া,
জানলেই হবে না—তাকে শক্তিময় বলেও মতে হবে। আমাদের
আত্মাকে আজ রসতত্ত্বের
মিষ্টি হাঁড়িতেই ডুবিয়ে রাখলে চলবে না-
শক্তির রাজমুকুটেও তাকে মণ্ডিত করতে হবে।
তাই আজ আমরা আশা করব—ঐ মনের কোণে গােপন আশা
স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশা করূব- তরুণ বাংলার
অন্তরে অন্তরে নেমে আসুক প্রাণের স্রোতের পাগলা বােরা।”
নেমে আসুক আজ সে “পাগলা ঝোরা”-উর্বরতাহীন অর্থহীন
শত সহস্র সংস্কারের শক্ত মাটী কেটে কেটে—মনের জমাট বাঁধা পাষাণ
ভার টলিয়ে দিয়ে দিয়ে—পুরাতনকে আপনার কাছ থেকে আপনাকে
মুক্তি দিয়ে দিয়ে-নতুনকে আপনার কাছে আপনাকে সত্য করে
সার্থক করে তুলে তুলে। • নেমে আসুক “পাগলা ঝােরা,”—এই তরুণ
বাংলার উপরে শত ধারায় সহস্র ধারায়-শিল্পে, কথায়, জ্ঞানে, বিজ্ঞানে,
যশে গৌরবে—সহস্র দিক মুক্তির গান গেয়ে গেয়ে তৃপ্তির গান গেয়ে
বাংলার হৃদয়ে আকুল স্বরে ধ্বনিত হচ্ছে—মুক্তি, মুক্তি।
মুক্তি, মুক্তি। সে মুক্তি
কেবল বাহিরের নয়—ভিতরের ;-কেবল • দেহের নয়--অন্তরের।
সে যে আজ
প্রাণের উল্লাসে ছুটিতে যায়
ভূধরের হিয়া টুটিতে চায়
আলিঙ্গন তরে ঊর্বে বাহু তুলি
'আকাশের পানে উঠিতে চায়।
প্রজাতি কিনলে পাগল হইয়া
গত মাকারে লুটিতে চায়।

সবুজ পত্র
আনি, ১৫
আজ সে যে এ জগতের মুখ নতুন করে দেখেছে। তাই আজ
তার প্রাণে প্রাণে নতুন সুর বেজে উঠেছে
দেখিব না আজ নিজের স্বপন
বসিয়া গুহার কোণে
আমি—ঢালিব করুণা ধারা,
আমি–ভাঙ্গিৰ পাষাণ কারা,
আমি—জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল পারা।
সে আজ নিজের পথ নিজে কেটে কেটে চলবে। সে পথ যদি
অতীতের সঙ্গে মেলে তবে মিলুক—কিন্তু অতীতের অনুকরণ সে করবে
—তাতে পদে পদে পথভ্রষ্ট হবার সস্তাবনা।
সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী।

নােম। (প্রথম প্রস্তাব) ( ১ ) জোর করে লেগে থাকলে দেখছি অসাধ্য সাধন করা যায়। এভরিম্যানের অনুবাদে চার ভালুম মসেনের রােমের ইতিহাস শেষ হয়ে গেল। অবশ্য এপুথির শেষে পৌছে দেখি গােড়ার দিককার অনেক কথা, মনের মধ্যে ঝাপসা হয়ে এসেছে। কেল্টজাতির স্বাধীনতা রক্ষার নিস্ফল চেষ্টার করুণ কাহিনী, স্যামনাইটদের রােমের নাগপাশ থেকে মুক্তির বৃথা প্রয়াসের ইতিহাসকে একরকম ঢেকে ফেলেছে। সিজারের জয়ধ্বনিতে, হানিবালের স্তুতিগানও প্রায় ডুবে গেছে। সন তারিখের ত কথাই নাই। প্রথম থেকেই তার গােলযােগ শুরু হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত সব একাকার হয়ে গােলযােগের সম্ভাবনারও লােপ ঘটেছে। মােট কথা, রােমের ইতিহাসে পরীক্ষা • দিতে বলে যে, সে পরীক্ষাতে ফেল হব এটা নিশ্চয়। তবুও ল্যাটিন জাতির বিজয় যাত্রার এই অধ্যায়গুলি, মসেনের বর্ণনায় মনের মধ্যে যে দাগ কেটে গেছে, তা সহসা মুছে যাবে না। ভূমধ্যসাগরের চার পাশের যে ভূ-খণ্ডকে আধুনিক যুগের রােমের ঐতিহাসিকেরাও পৃথিবী বলেই উল্লেখ করেন, তার বহু রাজ্য ও বিচিত্র জাতিগুলির উপর নােমর একাই ও একছত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, মনকে যে দোলা দিয়েছে, তার বেগ শেষ হতে কিছু সময় লাগবে। .

সপত্র পাঠকেরা শঙ্কিত হবেন না। মমসেন থেকে দুটো অধ্যায় ইংরেজি অনুবাদের বাঙ্গলা তর্জমা করে দিয়ে লব্ধ-প্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকপদ লাতের কোনও চেষ্টাই করব না। রােম সম্বন্ধে এখানে যা কিছু বলতে যাচ্ছি তা নিতান্তই এলোমেলো রকমের। তাতে প্রত্ন-তত্বের পাণ্ডিত্য এবং ইতিহাসের গান্তীৰ্য্য—এ দুয়ের অত্যন্ত অভাব। সুতরাং যারা প্রবন্ধের নাম দেখে পড়তে শুরু করেছেন তারা হয়ত আর অগ্রসর না হলেই ভাল করবেন। আর যার নাম দেখেই পাতা উল্টে যেতে চাচ্ছেন, তারা একবার শেষ পর্যন্ত পড়বার চেষ্টা করলেও করতে পারেন। , ( ২ ) প্রাচীন হিন্দুজাতি এবং তাদের সভ্যতা আমাদের পশ্চিমের মাষ্টার মােয়দের কাছে অনেক রকম গঞ্জনা শুনেছে। তিরস্কারের একটা প্রধান বিষয় এই যে বংশপরিচয়ে তারাও ছিলেন রােমানদেরই জাতি। সুতরাং সেই একই রক্ত শরীরে থাকতে তারা যে কেমন করে হিন্দু সভ্যতার মত এমন দুর্বল ও বিকৃত সভ্যতা গড়ে বসলেন, এটা পণ্ডিতদের মনে যেমন বিরাগেরও সঞ্চার করেছে তেমনি জিজ্ঞাসায়ও জন্ম দিয়েছে। এবং এই সংশয়ের সমাধানে তারা নানা রকম সম্ভব অসম্ভব, অবশ্য সকলগুলিই ‘বৈজ্ঞানিক মতবাদের প্রচার করেছেন। গল্প আছে, ইংলণ্ডের দ্বিতীয় চার্লস রয়েল সােলাইটার নতুন প্রতিষ্ঠা করে পণ্ডিতদের এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুলেন যে, মা মরুলেই সঠিক সেই সময়টা তার ওজন বেড়ে যায় কেন? পণ্ডিতো উত্তর वर्षमा ৬৩ গলদঘর্ম হয়ে গেলেন। অবশেষে একজন বলেন, আচ্ছা দেখাই যাক না ওজন করে, মাছটা মরলেই তা যথার্থ বেশী ভারী হয়ে ওঠে কিনা। মমসেনের বিপুলায়তন পুঁথি শেষ করে এই কথাটাই বারবার মনে হয়েছে, যে যারা এই রোমান-সভ্যতার তুলনায় প্রাচীন হিন্দু-সভ্যতাকে অতি খাটো ও নিতান্ত হাল্কা বলেছেন, সভ্যতা' বলতে তাঁরা কি বােঝেন ? সভ্যতার কোন মাপকাটিতে তারা এই দুই সভ্যতাকে মাপ করেছেন? কোন্ তোলে, এদের ওজনে তুলেছেন ? এই যে রােমান- সভ্যতা, যার গৌরবের দীপ্তিতে পণ্ডিতদের চোক ঝলসে গেছে, এ ত একটা একটানা পরের দেশ জয় ও অন্য জাতির উপর আধিপত্য স্থাপনের ইতিহাস। প্রথম লেশিয়ামের উপর রােমের প্রভুত্ব বিস্তার, তারপর তারি সাহায্যে উত্তরের ইটাস্কানদের ধ্বংশ করে ইতালীর আয় সকল জাতিগুলােকে পিষে ফেলে গােটা দেশটায় নিজের আধিপত্য স্থাপন। আবার মেডিটারেনিয়ানের ওপারের প্রবল রাজটী, সিসিলির সেতু পার হয়ে এই আধিপত্যের কোনও বিঘ্ন ঘটায়, এই আশঙ্কা- তেই কার্থেজের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে বিজিত ইতালীর সাহায্যে তাকে সমুলে উচ্ছেদ এবং কাথেলের অধিনায়ক হামিলকার ঝকা বা বিদ্যুতের বংশধর, স্পেন থেকেই যাত্রা শুরু করে বস্ত্র হয়ে রোমের মাথায় ভেঙ্গে পড়েছিল বলে, শত্রুর শেষ রাখতে নাই এই নীতি অনুসারে স্পেনেও রাজ্য বিস্তার। এমনি করে দক্ষিণ পর পশ্চিমের ভাবনা যখন ঘুচল তখন স্বভাবতই দৃষ্টি গেল-পূবের দিকে।গায়ে জোর খালে এ আশায়’ ত আর শেষ নাই। পূবে তখন ছিল লেকণ্ডোরে পাৰে গােটা কয়েক বিচ্ছিয় টুক। ওরি মধ্যে যে দুটি প্রবল ম্যালিডন আর এনিয়া, তাল তখন কােরেই এত ** "..

৩৪ সৰু পত্র ৫ এমন আশপাশের রাজ্যগুলিকে গ্রাস করে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টায় ছিল। এ ব্যাপারকে অবশ্য উপেক্ষা কি মার্জনা কিছুই করা চলে না। কেননা পরের দেশ জয় করে রাজ্য ও বলবৃদ্ধি. জিনিসটি মানুষের ইতিহাসের আদিযুগ থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিরই নিজের পক্ষে খুব সুসঙ্গত ও অত্যাবশ্যকীয় এবং অন্য সকলের বেলাই নিতান্ত বিসদৃশ ও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে মনে হয়েছে। সুতরাং বাধ্য হয়েই রােমকে এ দুটি রাজ্য আক্রমণ করতে হ’ল ; এবং এদের বাহুল্য অংশগুলি ছেটে ফেলে যাতে এরা অতঃপর বেশি নড়াচড়া না করে, ভদ্রভাবে জীবন যাপন করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হ'ল। কি সঙ্গে সঙ্গে নােম একটা মহানুভবতার পরিচয় দিতেও কসুর করলে না। ইতালীতে তখন হেলেনিক সভ্যতার স্রোত বইতে আরম্ভ করেছে। তারি গুরুদক্ষিণা হিসাবে গ্রীসের ছােট ছােট নখদন্তহীন নাগরিক রাজ্যগুলিকে ম্যাসিডনের প্রভুত্ব থেকে মুক্ত করে রােম তাদের একবারে স্বাধীনতা দিয়ে দিল। কিন্তু দুঃখের কথা মহানুভবতার এ খেলাও রােম বেশি দিন খেলতে পারল না। কারণ দানে পাওয়া স্বাধীনতা মানেই হ’ল—স্বাধীন ইচ্ছার প্রয়োগটা করূতে হবে দাতারই ইচ্ছা অনুসারে। সুতরাং গ্রীসের চপল প্রকৃতির লােকগুলি যখন নিয়মের ব্যতিক্রম করে, ম্যাসিভনের আবার মাথা তুলবার চেষ্টা দেখে, তাকেই নায়ক ভেবে কিঞ্চিৎ চাঞ্চল্যের লক্ষণ প্রকাশ করল, তখন এই পূবের দেশগুলির আধা স্বাধীনতা আধা অধীনতার বিশ্র অবস্থাটা ঘুচিয়ে সােজা- সুজি এদের করায়ত্ত করে নেওয়া ছাড়া রােমের আর গত্যন্তর থাকল না। এর পর রােমান চোখের দিক্‌চক্রবলে যে দুটি রাজ্য বাকী থাকল, সিরিয়া আর মির, তাদের নিয়ে অবশ্য বেশি বেগ পেতে হল সাম্রাজ্যও ভেঙ্গে পড়ল। ইউরােপের সভ্যতার কেও ভুমধ্যসাগর ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা নােম । । অবস্থা দেখে তারা আপনারাই এসে রেমের পায়ে মাথা টেকালে। সাম্রাজ্য যখন গড়ে উঠল তখন কাজে কাজেই তার “বৈজ্ঞানিক চৌহদ্দি”-রও খোঁজ পড়ল। কৃষ্ণসাগরতীরের মিথুরেডেসিরের রােমের শিকল ভেঙ্গে হাত পা ছড়াবার দুরাকাঙক্ষা দমন উপলক্ষে, রাজ্যের পূব-সীমা ইউফ্রেটিসে গিয়ে ঠেকল, এবং স্বয়ং জুলিয়স কেল্টদের মৃতদেহের উপর দিয়ে রােম সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমা আটলান্টিক পৰ্যন্ত টেনে নিয়ে গেলেন। সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্রাটেরও আবির্ভাব হতে খুব বেশি বিলম্ব ঘটল না। কেননা তিন শ বছর রাজ্য- জায় আর রাজ্যভােগে প্রাচীন রােমান বল-বীৰ্য-ঐক্য সকলেরই তখন লােপ হয়েছে। প্রকৃতির পরিশোধ! আর পররাজ্যজয়ে যে সাম্রাজ্য ও সভ্যতার প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধজয়ী সেনাপতি তার নায়কত্ব না পেলেই বরং বিস্ময়ের কারণ হ'ত। সিজারের উত্তরাধিকারীরা আরও তিন শ বছর ধরে এই রােম-সাম্রাজ্য, যাকে কোন রকমেই আর রােমান “সাম্রাজ্য বলা চলে না, শাসন ও রক্ষা করলেন। রাজ্যের সকল জাতির লােকের মধ্যে বােম-নাগরিকের অধিকার ছড়িয়ে দেওয়া হল, কেননা তখন সকলেই নােম-সম্রাটের সমান প্রজা, ফেলাে সিটি- জেনের অর্থ দাড়িয়েছে ‘ফেলো সাবজেক্ট। উচু আশা ও বড় আকাঙক্ষার তাড়না না থাকলে যে শান্তি আপনিই আসে, রাজ্যজুড়ে সে শান্তি বিরাজ করতে লাগল। ঘরকন্নার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপযােগী পাকা আইন কানুন এই বহুজাতি ভূমিষ্ঠ রাজ্যের মধ্যে গড়ে উঠল। তারপর মানুষের গড়া অপর সকল রাজ্যের মত নােম- ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগরকে আশ্রয় করল। তারি তীরে তীরে, সবুজ পত্র আশ্বিন, ১৩৫ নবীন নানা জাতির মধ্যে মানুষের সভ্যতার চির-পুরাতন ও চির-মূতন খেলার আরম্ভ হ'ল। এই যে ছয় সাত শ বছরের রাজ্যজয় ও রাজ্যশাসনের পলিটিকাল ইতিহাস, রােমান সভ্যতা ও গৌরবের কাহিনীরও এই হ’ল অন্তত চোদ্দ আনা। একে বাদ দিলে রােমান সভ্যতার যা অবশিষ্ট থাকে তার গৌর- বের কাছে প্রাচীন হিন্দু-সভ্যতার কথা দূরে থাক, তার চেয়ে অনেক ছােট সভ্যতারও মাথা নীচু করার কোনও কারণ দেখা যায় না। হেলেনিক সভ্যতার দৃষ্টান্তটি চোখের সামনে থাকলেও নিজেদের সভ্যতার এই স্বরূপ সম্বন্ধে রােমানদের মনেও সংশয়ের কোনও অবসর ছিল না। আগষ্টাশের সভাকবি তাঁর যুগের আত্মবিস্মৃত রোমানদের প্রকৃত রােমান- গৌরব স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে বলছেন,-“জানি আর আর সব জাতি আছে যারা কঠিন ধাতুকে সুষমাময় গড়ন দিতে পারে, পাথরের হিম দেহ থেকে প্রাণের বিপুল উচ্ছাস খুজে বের করূতে পারে, জ্ঞানের আঙুল আকাশে তুলে নক্ষত্রলােকেরও সকল বার্তা একে দেখাতে পারে, কথার সঙ্গে কথা গেঁথে লোকের করতালি নিতেও তারা পটু, কিন্তু রােমান, এ সব কাজ তােমার নয়। তােমার কাজ হ’ল—সকল জাতির উপর রাজত্ব করা। সেই হ’ল তােমার শিল্পকলা। তােমার গৌরব হ’ল বিজিত রাজ্যে শান্তি আনা, উঁচুমথাকে যুদ্ধে নীচু করা, পতিত যে শত্রু তাকে করুণা দেখান।‘এনিড’ যে ইতিহাস নয় ‘কাব্য, পতিত শত্রুকে করুণা দেখানাের কথা বলে ভার্জিল বােধ হয় তারি ইতি করেছেন। কেননা রােমের ইতিহাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা বস্তুটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। যা হােক, ল্যাতিন কবির রােমান সভ্যতা ও গৌরবের এই বর্ণনাটী 'আধুনিক কালের রােমান- তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরাও এক রকম সকলেই মেনে নিয়েছেন। কারণ না মেনে উপায় নাই। এবং এরি মধ্যে মানুষের সভ্য, প্রকৃতি ও শক্তির বিরাট বিকাশ দেখে তাঁরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত ও প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন। মানি, বহু জাতিকে যুদ্ধে পরাজয় করূতে হলে জাতির মধ্যে যে বীৰ্য, যে ঐক্য, যে রাজনৈতিক বুদ্ধি ও বন্ধনের প্রয়ােজন, তার মুল্য কিছু কম নয়। কিন্তু এই বস্তুকে সভ্য তার একটা শ্রেষ্ঠ বিকাশ বললে মানুষের প্রকৃতিকেই অপমান করা হয়। আর জাতির এই বীর্য, ঐক্য ও বুদ্ধি যখন পরের দেশ জয় ও পরের উপর আধিপত্যেই নিঃশেষে ব্যয় হয়, তখন তার শক্তি দেখে অবশ্য স্তম্ভিত হতে হয়, যেমন কালবৈশাখীর রুদ্রমুর্তিতে মানুষ স্তম্ভিত হয়। প্রকৃতপক্ষে একটা সমগ্র জাতি নবীন শক্তি সঞ্চারের আকস্মিক উন্মাদনায় নয়, কিন্তু যেমন মসেন দেখিয়েছেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী সূক্ষম লাভ লােকসানের হিসাব গণন্ম করে চোখের সুমুখে যখনি যাকে প্রবল বা বর্ধিষ্ণু দেখেছে তারি বুকের উপর পড়ে,তার জীবনের যা নিঃশেয়ে শুষে নিয়ে নিজেকে পুষ্ট করেছে, রোমান ইতিহাসের এই ব্যাপারটি তার ভীষণতায় মানুষকে স্তম্ভিত না করেই পারে না; খৃষ্টান ও পার্শি পুরাণে যে অন্ধকার ও অমঙ্গলের দেবতার কল্পনা আছে সেটা ভিত্তিহীন নয় বলেই মানুষের বিশ্বাস জন্মায়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে নােমর এই প্রবল পলিটিকাল সভ্যতা, কেবল সম-সাময়িকদেরই মাথা ভয়ে হেঁট করিয়ে রাখে নি, কিন্তু উত্তর- কালের ঐতিহাসিকদেরও শ্রদ্ধায় নতমুখ করে রেখেছে। প্রাণতত্ব- ;

সবুজ পত্র মাথিন, ১৩২৫ ৫ বিদেরা হয় বলবেন মানুষ পশুরই বংশধর ; শক্তির বিকাশ দেখলেই পূজা না করে থাকতে পারে না। মসেন বলেছেন,এথেন্স যে রােমের মত। রাষ্ট্র গড়তে পারে নি, সে জন্য তার দোষ ধরা মুখতা। কেননা গ্রীক প্রকৃতির যা কিছু শ্রেষ্ঠত্ব ও যা কিছু বিশেষত্ব, তা ছিল তেমন একটা রাষ্ট্র গড়ে তােলার প্রতিকূল। অনিয়ন্ত্রিত রাজতন্ত্রকে বরণ করে’, গ্রীসের পক্ষে জাতীয় একতা থেকে রাষ্ট্রীয় ঐক্যে পৌঁছান সম্ভব ছিল না। সেই জুন গ্রীসে জাতীয় একত্বের যখনি বিকাশ ঘটেছে সেটা কোনও রাষ্ট্রীয় ভিত্তির উপর ভর করে নয়। অলিম্পি- যার ক্রীড়াঙ্গন, হােমারের কবিতা, উরিপিডিসের নাটক এই সবই ছিল হেলাসের ঐক্য-বন্ধন। ঠিক আবার তেমনি ফিডিয়াস কি আরিস্ট- ফেনিসের জন্ম দেয় নি বলে রােমকে অবহেলা করা অন্ধতা। কেননা রােম স্বাধীনতার জন্য স্বাতন্ত্রকে, রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য ব্যক্তির ইচ্ছা ও শক্তিকে নির্মমভাবে দমন করেছে। ফলে হয়ত ব্যক্তিগত বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়েছে, প্রতিভার ফুলও মুকুলেই ঝরে পড়েছে; কিন্তু তার বদলে রােম পেয়েছে স্বদেশের উপর এমন মমত্ববােধ ও ‘পেটি অটিজম', গ্রীসের জীবনে যার কোনও দিন প্রবেশ ঘটে নি। এবং প্রাচীন সভ্য- জাতিগুলির মধ্যে নােমই স্বাধীন রাজতন্ত্রের ভিত্তির উপর জাতীয় ঐক্যের প্রতিষ্ঠায় কৃতকার্য হয়েছে। সেই জাতীয় ঐক্যের ফলে কেবল বিচ্ছিন্ন হেলেনিক জাতির উপরে নয়, পৃথিবীর সমস্ত জানা অংশের উপর প্রভুত্ব, তাদের করতলগত হয়েছিল। আমাদের শাস্ত্রে আছে ‘পুরুষের শ্রেষ্ঠ আর কিছু নেই, তাই শেষ, তাই ‘পরা,গতি'। পরিচিত সমস্ত পৃথিবীর উপর অবাধ প্রভুত্ব কি মানব সভ্যতার ‘পুরুষ’, তার ‘কাষ্ঠা’ ও ‘পরা গতি’! এ প্রভুত্ব ত ৫ম বর্ষ, যষ্ঠ সংখ্যা নােম, ৩৯ কালে উঠে কিছুকালের পরই বিলােপ’হয়; মানুষের সভ্যতার ভাণ্ডারে কিছুই স্থায়ী সম্পদ রেখে যায় না। আমার মুখে উরিপিডিসের কয়েক খানি নাটক রয়েছে। এগুলি ত কেবল খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর হেলাসের • ঐক্য-বন্ধন নয়। তেইশ শ' বছর আগেকার এথেন্সের নাগরিকের মত আমিও যে আজ সে কাব্যের রসে মেতে উঠছি। এগুলি যে চিরদিনের জন্য মানব-সভ্যতার অক্ষয় মঞ্জ যায় সঞ্চিত হয়ে গেছে। যুগের পর যুগ বিশ্বজন এর সুধা আনন্দে পান করবে। আর রােমের প্রভুত্ব ?—সেটি রয়েছে—ঐ মমসেনের পৃষ্ঠায়। এই যে প্রভেদ, এ ত মমূসেনের চার ভ্যলুমও মুছে ফেলতে পারে না। একে কেবল মানুষের সভ্যতার প্রকার ভেদ বলে’ অপোষ মীমাংসার চেষ্টায় কোনও ফল নাই। এর একটির চেয়ে আর একটি শ্রেষ্ঠ, নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ ; যেমন জড়ের চেয়ে জীবন শ্রেষ্ঠ, প্রাণের চেয়ে মন শ্রেষ্ঠ। মানুষের সভ্যতার ধারা দুই। এক ধারা বয়ে যাচ্ছে—কেবলই কালের মধ্য দিয়ে, জাতিকে, সভ্যতাকে ভাসিয়ে নিয়ে স্মৃতি ও বিস্মৃতির মহাসাগরে মিশিয়ে দিচ্ছে। নতুন জাতি, নূতন সভ্যতার তােত এসে ধারার প্রবাহকে সচল রাখছে। আর এক ধারা জন্ম নিয়েছে কালেরই মধ্যে, কিন্তু কালকে অতিক্রম করে’ ধ্রুবলােকে অক্ষয় স্রোতে নিত্যকাল প্রবাহিত হচ্ছে। নূতন স্রোত এসে এ ধারাকে পুষ্ট করছে; কিন্তু এতে একবার যা মিশছে, তার আর ধ্বংশ নেই, তা অচ্যুত। কেননা এ লােক ত পুরাতন কিছু নেই, সবই সনাতন, অর্থাৎ চিরন্তন। সভ্যতার সৃষ্টির এই যে নশ্বর দিকটা এ কিছু তুচ্ছ নয়। এইখানেই বিবিধ মানবের বিচিত্র লীলা, সমাজ গঠনে, রাষ্ট্র নির্মাণে, শৌর্য্যে, বীর্য্যে, মহত্বে, হীনতায় চিরদিন তরঙ্গিত ৩৭০ আনি, ১৩২৫ হয়ে উঠছে। হােক না এ মৃত্যুর অধীন, তবুও জীবনের রসে ভরপুর। কিন্তু মানুষ ত কেবল জীব নয়। সে যে মর অমরের সন্ধিস্থল। মৃত্যুর পথে যাত্রী হয়েও সে অমৃতলােকেরই অধিবাসী। তাই তার সৃষ্টির যেটা শ্রেষ্ঠ অংশ সেটা কালের অধীন নয়। তার ইতিহাস আছে কিন্তু তা ঐতিহাসিক নয়। সেখানে যে ফুল একবার ফোটে তার প্রথম দিনের গন্ধ সুষমা চিরদিন অটুট থাকে ; যে ফল একবার ফলে, রসে আস্বাদে তা চিরদিন সমান মধুর। দুই সভ্যতার যদি শ্রেষ্ঠত্বের মীমাংসা করতে হয়, তবে মানুষের সভ্যতার এই অক্ষয় ভাণ্ডারে কার কতটা দান, তাই হ’ল বিচারের প্রধান কথা। এ মাপ কাটিতে মাপলে, রােমান সভ্যতা গ্রীক কি হিন্দু সভ্যতার সঙ্গে, এক ধাপে 'দাঁড়াতে পারে না। তাকে নীচে নেমে দাড়াতে হয়। যতদিন তার সাম্রাজ্য ছিল, ততদিন তার বলের কাছে -সবারই মাথা নীচু করে থাকতে হয়েছে। কিন্তু উত্তর কালের লােকেরা কেন তার কাছে সন্ত্ৰমে নতশির হবে? তাদের জন্য ত সে বিশেষ কিছু সঞ্চয় করে রেখে যায় নি। তার যা প্রধান দাবী, তার পলিটিকাল শক্তি ও বুদ্ধি, তার পাওনাত তার সম-সাময়িকেরা এক রকম ষােল আনাই মিটিয়ে দিয়েছে। আমাদের কাছে সে দাবীর জোর খুব বেশি নয়। তার গৌরবের চৌদ্দ আনা হ’ল তার ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস জীবনের কাহিনী হলেও জীবন নয়, কেবলি কাহিনী। utz পৃষ্ঠার সঙ্গে মানুষের আত্মার কোনও সাক্ষাৎ যােগ নাই। একজন ফরাসী পণ্ডিত রোমানদের দার্শনিক আলোচনা সম্বন্ধে বলেছেন যে, সে গুলি এখন বক্তৃতা-শিক্ষার-ইস্কুলের ছাত্রদের লেখা প্রবন্ধের মত মনে হলেও যাদের জন্য সে গুলি লেখা হয়েছিল তাদের জীবনে ওর - ৫ম বর্ষ, যষ্ঠ সংখ্যা রোম • ৩৭১ প্রভাব ছিল খুব বেশি। সুতরাং এ সব দার্শনিকের মুল্য বুঝতে হলে সেই সময়কার রােমের ইতিহাসের সঙ্গে সে সব মিলিয়ে পড়তে হবে। হায় রােম, তােমার দার্শনিক চিন্তারও ইতিহাসের হাত থেকে মুক্তি নাই। করেছেন। ( ৪। রােমের পলিটিকাল গৌরবের গুণগান মুখে যতই কেন থাকুক , রােমান সভ্যতার এই প্রকৃতিটি পণ্ডিতদের মনে অস্বস্তির সঞ্চার না করে যায় নি। সেই জন্য য়ুরােপের বর্তমান সভ্যতা, রােমের সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের কাছে কেমন করে কতটা ঋণী, মসেন তার বিশদ ব্যাখ্যা, দিয়েছেন, এবং ছােট বড় মাঝারি সকল পণ্ডিতই তার পুনরাবৃত্তি সে ব্যাখ্যার প্রধান কথাটা এই—রােম সাম্রাজ্যের • প্রাচীর যদি বৰ্তমান য়ুরােপীয় জাতিগুলির অসভ্যকল্প পূর্ব-পুরুষদের ঠেকিয়ে না:রাত, তবে তারা যখন বােম সাম্রাজ্যের উপরে পড়ে তাকে ধ্বংশ করেছিল, সে ঘটনাটি ঘটত আরও চারশ' বছর আগে। এবং তা হলে বিস্তীর্ণ রােম সাম্রাজ্যের মধ্যে,-স্পেনে, গলে, ড্যানিউবের তীরে তীরে, আফ্রিকায়, হেলেনিক সভ্যতার নব সংস্করণ মেডিটারে- নিয়ন সভ্যতা যে শিকড় বসাতে সময় পেয়েছিল, তা আর, ঘটে উঠত না। আর তার ফল হত এই ঐ অর্ধ-সভ্য জাতিগুলি যে সভ্যতার সংস্পর্শে এসে যে আধুনিক য়ুরােপীয় সভ্যতা গড়ে তুলেছে, তা কখনই গড়তে পারত না। মানুয়ের ইতিহাসে যে ঘটনাটা এক রকমে ঘটে গেছে, সেটা সে রকম না ঘটে অন্য রকম ঘটলে তার ফলাফল কি হত এ তর্ক নিরর্থক। যে, .

৩৭২ সবুজ পত্র আশ্বিন, ১৩২ তাতে ‘স্বপ্নলব্ধ’ ইতিহাস ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সুতরাং রােম সাম্রাজ্যকে তার চৌকিদারির প্রাপ্য প্রশংসাটা নির্বিবাদেই দেওয়া যাক। কিন্তু এ ত রােমান সভ্যতার কোনও গৌরবের কাহিনী নয়। এবং রােম সাম্রাজ্যকে যারা চার-শ’ বছর ধরে' রক্ষা করেছিলেন তারা নিশ্চয়ই আধুনিক য়ুরােপীয় সভ্যতার মুখ চেয়ে তা করেন নি। আর এটাও যদি গৌরবের কথা হয় তবে রােমকে আরও একটা গৌরবের জন্য পূজা দিতে হয়। সে হচ্ছে ঠিক সময়ে সাম্রাজ্যের প্রাচীরকে রক্ষা করতে না পারা। কেননা রোম যদি আরও চার-শ’ বছর সাম্রাজ্যকে অটুটই রাখতে পারত, তবে ত আধুনিক য়ুরােপীয় সভ্যতা আরও চার-শ’ বছর পিছিয়ে যেত, এবং হয় ত সে সভ্যতা আর তখন গড়েই উঠতে পারত না! ইতিহাসে তার ওজন কত, সেটা সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের মাপ নয়। এই যে চার-শ’ বছর ধরে পৃথিবীর একটা বৃহৎ অংশে বিচিত্র সব জাতি পরস্পরের সংস্পর্শে এল তার ফলে সৃষ্টি হ’ল কি? মেডি- টারেনিয়ন সভ্যতার এই প্রকাণ্ড শূন্যতা, সমস্ত পলিটিকাল সভ্যতা, রাজ্যজয় ও রাজ্য-শশনের সভ্যতার, উপর এটা একটা বিস্তৃত ভাষ্য। বিস্তীর্ণ বাগানের চার পাশে পাথর দিয়ে বেড় দেওয়া হ’ল পাছে আকস্মিক বিপৎপাতে বাগান নষ্ট হয়। পাথরের দেয়াল খাড়া হয়ে দাড়িয়ে থাকল কিন্তু বাগানে ফুলও ফুটুল না, ফলও পাকল না। রােমান সভ্যতার এই যে উচ্চ জয়গান, এ যে কেবল মিথ্যা স্তুতি তা নয়, এর কলৰােল পৃথিবীর প্রবল জাতিগুলির মন চিরদিন বিপথের ৫ম বর্ষ, নষ্ট সংখ্যা দিকেই টানবে। যেই যখন শক্তিশালী হয়ে উঠবে তারি মনে হবে মানুষের বৈচিত্র্যকে ধ্বংশ করে পৃথিবীর যতটা অংশের উপর পারা যায়, নিজের আধিপত্যের একরঙ্গা তুলিটা বুলিয়ে নেওয়া কেবল স্বার্থ সিদ্ধির উপায় নয়, সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব লাভেরই পথ। এ যে অতি- শয়ােক্তি নয়, তার প্রমাণ মসেন থেকেই তুলে দিচ্ছি। সিজারের গল বিজয়ের বর্মনা মম্‌সেন এই বলে আরম্ভ করেছেন—যেমন মাধ্যাকর্ষণ ও আর আর পাঁচটা প্রাকৃতিক নিয়ম যার অন্যথা হবার যাে নেই, তেমনি এও একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যে, যে জাতি রাষ্ট্র হয়ে গড়ে উঠেছে সে তার অ-রাষ্ট্রবদ্ধ প্রতিবেশী জাতিগুলিকে গ্রাস করবে, এবং সভ্যজাতি, বুদ্ধিবৃত্তিতে হীন তার প্রতিবেশিদের উচ্ছেদ করবে। এই নিয়মের বলে ইতালীয় জাতি ( প্রাচীন জগতের একমাত্র জাতি যে শ্রেষ্ঠ পলিটিকাল উন্নতির সঙ্গে শ্রেষ্ঠ সভ্যতা মেশাতে পেরেছিল, যদিও শেষ বস্তুটির বিকাশ তাতে অপূর্ণ ভাবে এবং কতকটা বহিরা- বরণের মতই ছিল) পূবের গ্রীকদের, যাদের ধ্বংশের সময় পূর্ণ হয়ে এসেছিল, তাদের করায়ত্ত করতে, এবং পশ্চিমের কেন্ট জাৰ্মাণদের, যারা সভ্যতার সিড়ির নীচের ধাপে ছিল, তাদের উচ্ছেদ সাধন করতে সম্পূর্ণ অধিকারী ছিল। প্রাকৃতিক নিয়ম যে কেমন করে অধিকারে পরিণত হয় সে রহস্যের চাবী হয়ত হেগেলের লজিকেও মিলবে না। সে যাই হােক এ ‘নিয়ম’ ও ‘অধিকারের’ মুস্কিল এই যে এর জন্য পৃর্থিবীর সমস্ত জাতিকে সারাক্ষণ নখদন্ত বের করেই থাকতে হয়। কেননা মল্লাঙ্গনই হচ্ছে এ অধিকার প্রমাণের একমাত্র স্থান। কারণ বুকের উপর চেপে বসতে পারলেই প্রমাণ হ’ল যে চেপে বসার অধিকার আছে। আর ৩৭৪ সবুজ পত্র আশ্বিন, ১৩২৫ ' তাই হল এ অধিকার প্রমাণের একমাত্র শাস্ত্রীয় প্রথা। তারপর শক্তি থাকলেই যখন ‘অধিকার আছে, তখন শক্তির পরীক্ষার অধি- কার থেকেও কাউকে বঞ্চিত করা চলে না। পরীক্ষা না করলে ত শক্তিটা ঠিক আছে কিনা তা আগে থেকে অমনি জানবার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত ফেল হ'লেও “হলে ঢোকার অধিকার অস্বীকার করা যায় কেমন করে ? গেল চার বছর ধরে এই পরীক্ষাটা সারা য়ুরােপ জোড় চলছে। মসেনের সৌভাগ্য যে বেঁচে থেকে তার প্রণালীর ফুলটা দেখে যেতে হয় নি। কিন্তু প্রাচীন রােমের গুণগানে যারা মুখর, আধুনিক জার্মাণির উপর মুখ বাঁকানাের তাদের কোনও অধিকার নেই। কার্থেজ ও মিশর বিজয় যদি রােমের পক্ষে ছিল ‘গৌরবের, তবে বেলজিয়মকে গ্রাস করা জাৰ্ম্মাণির পক্ষে অগৌরবের কিসে? আজকার পলিটিক্সে যা হীন, কালকার ইতিহাসে তা মহৎ হয় কোন্ ন্যায়ের জোরে ? এই যে পলিটিকাল শক্তি ও সভ্যতার স্তুতিগান—এ মুলে হ’ল একটা মায়া। শঙ্কর ব্যাখ্যা করেছেন মায়ার প্রকৃতি অধ্যাস, একের ধৰ্ম্ম অন্তে আরােপ করা। পৃথিবীর আদিযুগ থেকে যখন জাতিতে জাতিতে লড়াই চলে আসছে, আর কোন ‘লীগ অব নেশনে’-ই, তা শেষ হবে বলে’ যখন বােধ হয় না, (কেননা ‘লীগের একটা অর্থ হচ্ছে এর ভিতরে যারা আসবে না তারা শত্রু, আর বাইরে যাদের রাখা হবে তাদের এজমালীতে দমন করা চলবে) তখন জাতির রাষ্ট্রীয় শক্তি তার আত্মরক্ষার পক্ষে অমুল্য। জাতির প্রাণই যদি না বাঁচে তবে তার মনের বিকাশও কাজে কাজেই বন্ধ হয়। কিন্তু এই শক্তি যখন আত্মরক্ষায় নয়—পর-পীড়নেই রত থাকে, রক্ষার চেষ্টায় নয় ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা নােম র ধ্বংশের লীলাতেই মেতে ওঠে তখনও যে তার পূজা, তার মুলে হ’ল ‘অধ্যাস'। একের গুণ আর একজনে দেখা, রামের পাওনা শ্যামকে বুঝিয়ে দেওয়া। অবিশ্যি এ দুয়ের সম্বন্ধ অতি নিকট। কিন্তু একান্ত ‘অবিষয় হলে-ত ‘অধ্যাসেরও’ উৎপত্তি হয় না। আমার এ প্রবন্ধটা যখন আগাগােড়াই অল্পবিস্তর অবান্তর রকমের, তখন নির্ভয়ে একটা খাটি অবান্তর কথা দিয়েই এর প্রথম প্রস্তাব শেষ করা যাক। ভাজের ‘সবুজ পত্রে’ শ্ৰীমান চিরকিশোরের বরাবর যুক্ত বীরবলের যে চিঠি বেরিয়েছে, তাতে জৰ্ম্মাণ পণ্ডিতদের ‘সিসেরোর প্রেতাত্মার গায়ে লেখনীর নিষ্ঠিবন নিক্ষেপের কথাটা তােলা হয়েছে। এবং এ কাজটাতে যে তারা আগুনীর পত্নী ‘ফুলভিয়াব’ মত পতি- ভক্তিই পরিচয় দিচ্ছেন, যে পতি হলেন সীজার-যিনি জার্মানিতে ‘কাইজার’রূপ নিয়েছেন, তারও উল্লেখ আছে। এই যে সিসেরো-বিদ্বেষ, আর সিজার প্রীতি, মমূসেনকে এ দুয়েরই এক রকম সৃষ্টিকর্তা বলা চলে। তঁার ‘রােমানইতিহাস"বের হওয়ার পর থেকেই এ দুটি মনোভাব ইউরোপে অতি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। কেননা মমসেনের হাতে সিসেরাের মত “ভাষায় বিদ্যুন্মণ্ডিত বঞ্জ ছিল না সত্য, কিন্তু তার ইতিহাস’ হ’ল আদিম অরণ্যের প্রকাণ্ড বট। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাড়তে বাড়তে তা মনের অন্তস্তল জে করে এমন গভীর শিকড় ঢুকিয়ে দেয়, শাখা থেকে বহু পদ 'সবুজ পত্র আনি, ১৩২ * ০ নামিয়ে সমস্ত মনকে এমন করে আঁকড়ে ধরে, যে তাকে মন থেকে উপড়ে ফেলতে প্রায় প্রলয়ের ঝড়ের প্রয়োজন হয়। তবে আপাতত ইতালী আর ফান্সে একটু একটু করে সুর বদলাচ্ছে। কিন্তু একটা অপরাধের দায় থেকে মমসেনকে মুক্তি দিতে হবে। তাঁর যে সীজার স্তুতি, তা এক অদ্বিতীয় সিজার অর্থাৎ ‘গােয়াস জুলিয়াস সিজার'-এরই স্তুতি। মাতৃভাষায় অনুবাদ হলেও ‘কাইজারের স্তুত নয়। মসেন, তাঁর রােমান ইতিহাসের যে জায়গায় এ কথাটা খুলে বলেছেন তা ভাবে ও ভাষায় এমন তাজা ও চোখ যে মহামহােপাধ্যায় জর্মাণ অধ্যাপকের রচনা হলেও সেটা ‘বীরবলের লেখাতেও চলতে পারে। মমূসেনের সেই কয়টি কথা উদ্ধৃত করে বক্তব্য শেষ করব। মসেন থেকে অনুবাদ করুধ না প্রতিজ্ঞা করে পাঠকদের আরম্ভেই যে ভরসা দিয়েছি এতে সম্ভব সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে না। কেননা এ কটি লাইন ইতিহাসও নয়, প্রত্নতত্ত্বও নয়। আমাদের পুরাণে ব্রহ্মা, বিষ্ণু কি মহেশ্বরের যেমন সবু:স্তব আছে, ‘জুলিয়াস সিজারের সেই রকম একটা স্তবের পর মমূসেন লিখেছেন- ঐতিহাসিকেরা সব সময়েই মনে মনে একটা কথা ধরে নেন যেটা হয়ত একবার এখানে প্রকাশ করে’ বলাই ভাল। ইতিহাসের যে নিন্দা ও ইতিহাসের যে প্রশংসা তাকে তার চারপাশের ঘটনা ও অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনও শ্রেণীবিশেষের মানুষ, কি প্রতি- ষ্ঠানের সাধারণ নিন্দা প্রশংসা'হিসাবে প্রয়ােগ করা চলে না। সে চেষ্টা করে—হয় যার মগজেবুদ্ধি নাই, না হয় যার মনে মতলব আছে। সুতরাং এখানে সিজারের যে বিচার ও মূল্য নির্ধারণ, সেটাকে যেন কেউ ‘সিজারিয়ানিলিমের অর্থাৎ সিজার-তন্ত্রের মূল্যনিরূপণ বলে।

' ৫ম, যষ্ঠ সংখ্যা নেল চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা না করে। অতীত যুগের ইতিহাস যে বর্তমানের শিক্ষাদাতা একথা সত্য। কিন্তু এর এমন গ্রাম্য ও মােটা অর্থ নয় যে, ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টে গেলেই কোন না কোন জায়গায় বর্তমানটা কেই হুবহু দেখতে পাওয়া যাবে, এবং আজকার দিনের পলিটিকাল ব্যাধির নিদান ও ব্যবস্থাপত্র একবারে হাতে হাতেই মিলবে। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব সভ্যতার ইতিহাস কেবল তখনি শিক্ষাপ্রদ, যখন তা থেকে মানুষের সভ্যতার প্রাণশক্তিগুলির সন্ধান পাওয়া যায়, যে শক্তিগুলির মূল প্রকৃতি সর্বত্রই এক, কিন্তু যাদের সংমিশ্রণের রীতি প্রতি- জায়গাতেই বিভিন্ন, এবং যখন তা মানুষকে অন্ধ অনুকরণের পথে না নিয়ে গিয়ে নবীন সৃষ্টির কাজেই উৎসাহ দেয়। এই হিসাবে সিজার ও রােমান ‘ইম্পিরিয়ালিজম’-এর ইতিহাস, তার সমস্ত ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রতিষ্ঠাতার অমানুষী প্রতিভা সত্ত্বেও, আজকার দিনের ‘অটক্রেসির যে তিক্ত ও কঠোর সমালােচনা, তেমন সমালোচনা কোন মানুষের হাতের লেখা থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে নৈসর্গিক নিয়মে অতি ক্ষুদ্র জীবদেহের কাছেও গঠন কৌশলের পর- কাষ্ঠায় হাতগড়া যন্ত্রের হার মানতে হয়, ঠিক সেই নিয়মেই যে শাসনতন্ত্রে দেশের অধিকাংশ লােকের নিজেদের ভালমন্দ নিজেদেরই স্বাধীন ভাবে নিয়ন্ত্রিত করবার অবকাশ আছে, তা কহু বিষয়ে অপূর্ণ ও নানা দোষে দুষ্ট হলেও অতি ভাস্বর ও পিতৃতুল্য ‘অটক্রেসি’য়ও তার সঙ্গে তুলনা চলে না। কেননা ওর একটির বিকাশ ও বৃদ্ধির সম্ভাবনার শেষ নাই, অর্থাৎ তার জীবন আছে; অপরটি যা অই, অর্থাৎ মৃত। রােমান ইম্পিরিয়ালিজম'-এর সেনাপতি-তন্ত্রের ইতিহাসে এই নৈসর্গিক নিয়মটির পরীক্ষা হয়ে গেছে, এবং সে হ’ল চরম পরীক্ষা।

৩৭৮ সবুজ পত্র আখি, ১৩২৫ } এর সৃষ্টিকর্তার প্রতিভার বেগে এবং সমস্ত রকম বাইরের বাধার অভাবে এ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার্টি যেমন অমিশ্র ও অবাধ ভাবে গড়ে উঠতে পেরেছিল এমন আর কোথাও সম্ভব হয় নি। কিন্তু তবুও, যেমন গিবন অনেক পূর্বেই দেখিয়েছেন, সিজারের সময় থেকেই রােমান রাষ্ট্রের ঐক্যটা ছিল কেবল বাইরের চাপের ঐক্য, এর গতি ছিল কলের চলা। এবং এর জীবনের রস নিঃশেষে শুকিয়ে গিয়ে এর অন্তরটা তখন থেকেই হয়েছিল একবারে মৃত। যদি ‘অটক্রেসির প্রথম যুগে, এবং সব চেয়ে সীজারের নিজের মনে, রাজ-শাসনের একাধি- পত্যের সঙ্গে জনসাধারণের উন্নতির স্বাধীন বিকাশের একটা মিলনের স্বপ্ন উঠে থাকে, তবে জুলিয়ান বংশের প্রতিভাশালী নৃপতিদের রাজ্য- শাসনে সে স্বপ্ন টুটতে বেশি দেরী হয় নি। আগুন আর জল এক পাত্রে রক্ষা করাটা যে কতদূর সম্ভব তার পরীক্ষাটা লােকের চোখের সামনে খুব ভীষণ রকমেই হয়েছিল। ইতিহাসে সিজারের সে কাজ তার প্রয়ােজন ছিল, এবং তাতে সুফলও ফলেছিল। কিন্তু সে কাজ এমন নয় যার নিজেরই ভিতরেই কোনও মঙ্গল আছে। সেটা ছিল সমস্ত রকুম সম্ভবপর অমঙ্গলের মধ্যে সব চেয়ে কম অমঙ্গল। প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল দাসত্ব প্রথা, জন সাধারণের প্রতি নিধিমূলক শাসন যার কল্পনাতে কখনও ওঠে নি, যার প্রচলিত রাষ্ট্র প্রণালী ছিল পাঁচ-শ’ বছরের পুরাণাে—যা এই আধ-হাজার বছরের মধ্যে পরিণত হয়েছিল, প্রবল ওখাঁটি ধনীতন্ত্রে, সে ব্যবস্থার সামনে সিজারের সেনাপতি-তন্ত্রের একাধিপত্যই ছিল একমাত্র বাঁচবার পথ। ইতিহাসের বিচারে সিজারের ‘সিজারিয়ানিজম'-এর এই হ’ল বৈধতার দলিল। যখন ভিন্ন অবস্থা ও ভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যেও ‘সিজারিয়ানিজম ক ৫ম , যষ্ঠ সংখা লে, ৩৭৯ মাথা তােলে, তখন সেটা একদিকে অবর দৃখল, অন্যদিকে মুখ-তে চান। কিন্তু ইতিহাস আসল সিজারকে তার প্রাপ্য সম্মানের এক চুল থেকেও বঞ্চিত করতে রাজী হবে না। যদিও সে জানে যে, তার বিচার শুনে, হয় ত অতিসরল ব্যক্তিরা জাল-সিজারদের সামনেও মাথা নােয়াবে, এবং অতিশঠ ব্যক্তিরা মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার একটা সুযােগ পাবে। কেননা ইতিহাসও একটা বাইবেল। এবং বাইবেলেরই মত যদিও সে মুখকেও ভূল বােঝা থেকে বারণ করতে পারে না, এবং সয়তানকেও বচন তুলে আওড়াতে বাধা দিতে পারে না, তবুও তারি মত এ দুই ব্যক্তিকেও সহ করবার এবং মার্জনা করবার ক্ষমতা তারও আছে। শ্ৰীঅতুলচন্দ্র গুপ্ত।

নব-বিদ্যালয়। (ভাষা-শিক্ষা ) শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীচরণেষু। . আমরা যখন বাঙলা ভাষাকে স্কুল কলেজের ভাষা করে তােলবার প্রস্তাব করি, তখন আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একদল লোক, আমাদের উপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন। তাঁদের বিশ্বাস বাঙলা, বিদ্যা- শিক্ষার ভাষা হলে আমাদের ছেলেরা ইংরেজি শিখবে না। এর পাল্টা জবাব অবশ্য এই যে, তারা ইংরাজি না শিখতে পারে কিন্তু বিদ্যা শিখবে। কিন্তু এ জবাবে কারও মন ভিজবে না। আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা এর উত্তরে সমস্বরে বলবেন যে, সে বিদ্যে নিয়ে কি হবে—যায় সাহায্যে জীবন যাত্রা নির্বাহ করা যায় না। ইংরাজি জানলে যে ভদ্রসন্তানের ‘দিন আনা দিন খাওয়া চলে না, এ কথা আমাদের দেশের নিরক্ষর লােকেও জানে। ওভাষায়,অজ্ঞ হলে যে আমাদের ওকালতি, ডাক্তারি, কেরাণীগিরি, মাষ্টারি, এমন কি রাজ- নীতির নেগিরি করাও বন্ধ হবে—এ কথা বলাই বাহুল্য। এবং এসব ক্রিয়া বন্ধ হলে বাঙালীর জীবনে আর কি কাজ থাকবে ? ও অবস্থায় আমরা যে ঘরে বসে সাহিত্য রচনা করব তারও সম্ভাবনা কম। যা কথায় কথায় ইংরাজির তরজমা নয়, যে বাঙলা = ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সং নব-বিল ইংরাজি ভাষার সাহিত্য, অন্তত সাধু-বাক্স। সাহিত্য হতে পারে না, আর প্রমাণ শতকরা নিরনব্বই জন বালা গদ্য লেখকের লেখায় অর্থাৎ আমাদের সকলের লেখায় নিত্যই পাওয়া যায়। অতএব ইংরাজি না শিখলে যে বালার সর্বনাশ হবে, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই—এবং থাকতে পারে না। তবে বাঙলা না শেখাটা ইংরাজি শিক্ষার সদুপায় কি না সে বিষয়ে মতভেদ আছে। আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির প্রসাদে দেশের লােক যে ইংরাজি শিখছে—ইংরাজি নবিশদের এই ধারণাটি অনেকটা অমূলক। পাঁচ বৎসর বয়েস থেকে শুরু করে পঁচিশ বৎসর বয়েস পর্যন্ত দিনের পর দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে’-আমাদের বিদ্যার্থীরা যে, উপর কতটা অধিকার লাভ করে, তার পরিচয় যিনি কখন B, L. পরীক্ষার কাগজ পরীক্ষা করেছেন, তিনিই পেয়েছেন। আমাদের বিশ্ব- বিদ্যালয় থেকে যাদের হাতে উকিলের সনন্দ দিয়ে বিদায় স্লা হচ্ছে, তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই জন সাধু-ইংরাজি লেখা দুরে থাক শুদ্ধ ইংরাজিও লেখেন না, শতকরা পঁচিশজন লেখেন বার-ইংলিশ, আর শতকরা দশজন যা লেখেন, তা দিনেমার ওলন্দাজ কি আলেমানের ভাষা হতে পারে—কিন্তু ইংরাজের নয় ; অথচ এরা সকলেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট! এত দীর্ঘকালব্যাপী ইংরাজি ভাষার এই একাগ্র চর্চা এতটা বিফল হয় কেন ? বাঙালী জাতি সরস্বতীর কৃপায় বঞ্চিত নয়, তুবে আমাদের যুবকদের মধ্যে শিক্ষার এই ব্যর্থতার কারণ কি ।কারণ এই যে, পাঁচ বৎসর বয়েসে ছেলেরা ইংরাজি ধরে এবং পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তারা দিবারাত্র এক ঐ ইংরাজিরই চনা করে।

সানি, ১৩২৫ সকল শিক্ষার মত, বিদেশীভাষা শিক্ষাও কাল ও পাত্র সাপেক্ষ। শৈশব এ শিক্ষার উপযুক্ত কাল নয়, বালক এ শিক্ষার উপযুক্ত পাত্র নয়। শিশুর দেহের পক্ষে মাতৃদুগ্ধ যা, বালকের মনের পক্ষে মাতৃ- ভাষাও তাই। অর্থাৎ মাতৃভাষার সাহায্য বিনা বালকের মন গড়ে ওঠে ‘না। ছেলেরা যে ভাষা অষ্টপ্রহর শানে, আর যে ভাষায় অষ্টপ্রহর কথা কয়, সেই ভাষার সাহাযেই তারা পরের কথা বুঝতে ও নিজের কথা বােঝাতে শেখে। ছেলের ন ও ছেলের ভাষা, ও দুই হচ্ছে একই জিনিসের এ-পিঠ আর ও-পিঠ; সুতরাং এদুই এক সঙ্গে যেমন বেড়ে ওঠে তেমনি গড়ে ওঠে। তারপর অত্মপ্রকাশ করবার চেষ্টাতেই মানব- সন্তানের ভাষার উপর যথার্থ অধিকার আন্মে এবং সেই সঙ্গে মনের শক্তিও বৃদ্ধি পায়। শিশুর দেহের সঙ্গে তার মম এবং তার মনের সঙ্গে তার স্বভাষা-জ্ঞান যে এক রকম স্বাভাবিক নিয়মে গড়ে ওঠে, এ কথা বললেও অত্যুক্তি হয় না। অপরপক্ষে বিদেশী ভাষা,সজ্ঞানে শিখতে হয়; সুতরাং তা শেখবার অন্য সেই মন চাই—যেমন বালকের নেই। বারাে বৎসর বয়েসের পুর্বে বিদেশী ভাষা শেখৃবার চেষ্টাটা" ছেলেদের পক্ষে যে, শুধু কষ্টকর ও ব্যর্থ, তাই নয়—তার মনের পক্ষেও যথেষ্ট ক্ষতিকর। মন্ত মাংস সেবন ছােট ছেলের দেহের পক্ষে যতটা উপকারী, একটি বিদেশী ভাষার চর্চ। ছােট ছেলের মনের পক্ষে তার চাইতে বেশি উপকারী নয়। আমরা ছােট ছেলেদের তা গিলিয়ে দিতে পারি কিন্তু তা কী করবার শক্তি তাদের নেই। ফলে অল্প বয়েসে ইংরাজি শিখতে গিয়ে, আমাদের ছেলেরা ইংরাজিও ভাল করে আয়ত্ব করতে পারে না এবং লাভের মধ্যে শুধু মানসিক মশান্তি হয়ে পড়ে। যে মন ছেলেবেলায় বিদেশী ভাষার চাপেড় হয়ে ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা নব-বিদ্যালয়। পড়ে, সে মন কৈশাের ও যৌবনে তার পূর্ণশক্তি লাভ করতে পারে । আমাদের অধিকাংশ যুবকদের মনের যে দম ও কশ নেই, তার একমাত্র কারণ আমাদের এই সৃষ্টিছাড়া শিক্ষা-পদ্ধতি। কিন্তু ইংরাজি শেখাটা আমাদের অন্নবস্ত্রের সংস্থান করবার জন্য এতই প্রয়ােজন, যে আমাদের সমাজের যত বিদ্বান ও বুদ্ধিমান লােক একবাক্যে বলবেন,-হােক আমাদের ছেলেরা মনে পঙ্গু, তাদের ঐ পাঁচ, বছর বয়েস থেকেই A. B. c. শিখতে বে, নচেৎ তারা বয়েসকালে ইংরাজি-নবিশ হতে পারবে না। না ভেবেচিন্তে কথা কওয়াটা, বিশেষত সেই সব বিষয়ে যে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ—আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটা রােগের মধ্যে দাড়িয়ে গিয়েছে। কেননা অপর দেশের শিক্ষার প্রণালী এবং তার ফলাফল সম্বন্ধে এরা যদি কিছু খোঁজ খবর রাখতেন, তাহলে এরা এ কথা জানতেন যে, বারো, বৎসর বয়েসের পরে, অর্থাৎ মাতৃভাষার উপর যথেষ্ট পরিমাণে অধিকার লাভ করবার পরে, ছেলেরা দু-তিন বৎসরে বিদেশী ভাষা যতটা আয়ত্ত্ব করতে পারে, পাঁচ বৎসর বয়েস থেকে শুরু করে তারপর দশ বৎসরের অবিরাম চর্চায় তার সিকির সিকিও পারে না। এই কারণে নববিদ্যালয়ে ছেলেদের বারাে বৎসর বয়েসের আগে মাতৃভাষা ছাড়া আর কোনও ভাষার সংশ্রবে আসতে দেওয়া হয় না। এদেশেও পুরাকালে উপনয়নের পরই সংস্কৃত শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। অতএব ভাষা শিক্ষার প্রথম এবং প্রধান কপ্পা হচ্ছে—মাতৃভাষা শিক্ষা মাতৃভাষাও যে একটা শিক্ষার বিষয়, এ জ্ঞান আমরা হারিয়ে ৰাল আছি। আমাদের ধারণা, এ বিষয়ে বাঙালীমাত্রেরই অশিক্ষিত পটুত্ব আছে। সে পটু যে বেশির ভাগ লােকের নেই, তা তারা ৫ g আশ্বিন, ১৩২৫ { বাংলা লিখতে বলে অবিলম্বে আবিষ্কার করতে পারূেবন সাহিত্যে আমাদের তুল্য মুখচোরা জাত যে অপর কোনও সভ্যদেশে নেই, তার কারণ আমাদের শিক্ষার গুণে আমরা আশৈশব আত্মপ্রকাশ করবায় সুযােগ পাই নি। স্কুলের ছেলের পক্ষে স্বচ্ছন্দে ইংরাজিতে আত্মপ্রকাশ করা অসম্ভব এবং বাঙলাতে করা বারণ। এর ফলে আমাদের অধিকাংশ লােকের ভাষায়ান ছােট ছেলের জ্ঞানেরই সমতুল্য, খাওয়া-পরা চলা-ফেরার জন্য যতখানি ভাষাজ্ঞান থাকা প্রয়ােজন, অর্থাৎ কেবলমাত্র জীবনধারণের জন্য যে ক’টি কথা না জানলে নয়, আজকের দিনে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালী সেই ক’টি নিত্য ব্যবহার্য্য কথাই অক্লেশে ব্যবহার করূতে পারেন। আমাদের অন্তরে মাতৃভাষার ভিৎ আছে কিন্তু সে ভিৎ এত কাচা যে, তার উপর কি দেশী কি বিলেতি কোনও পাকা ভাষার ইমার খাড়া করা যায় না। অতএব মাতৃভাষা যদি আমরা শিক্ষা করি, তাতে করে ইংরাজি-শিক্ষার কোনও ক্ষতি হবে না; উপরন্তু, আমাদের মন” সবল, সুস্থ এবং সক্রিয় হয়ে উঠবে। তখন আমাদের আর, এ বলে দুঃখ করতে হবে না যে, দেশে এত বিদ্যে আছে অথচ তা দেশের কোনও কাজে লাগে না। পৃথিবীর দর্শন বিজ্ঞান সাহিত্যের সকল বিদ্যা যে আমাদের মনের চক্রব্যুহে ঢুকতে পারে কিন্তু বেরুতে পারে না, তার কারণ 'আত্মপ্রকাশের সহজ পথটিই আমরা বলাকালেই ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। মাতৃভাষাও শিক্ষা করবার জিনিষ, কিন্তু তাই বলে যে উপায়ে যে পদ্ধতিতে আমরা একটি বিদেশী অথবা একটি মৃতভাষা শিক্ষা করি, সে উপায় সে পদ্ধতি, মাতৃভাষা শিক্ষার পক্ষে আবশ্যকও নয়-- ৫ম বৰ, যষ্ঠ সংখ্যা নলিম উপযােগও নয়। বিদ্যারভেই অমরকোষ ও মুগ্ধবােধ কণ্ঠস্থ করাই হয়ত সংস্কৃত শেখার সহজ উপায়, কিন্তু ব্যাকরণ অভিধানের সাহায্যে, কাউকেও মাতৃভাষা শিখতে হয় না; সুতরাং ও উপায় অবলম্বন করুতে শিশুদেরও বাধ্য করা অসঙ্গত। যেউপায়ে ছেলেরা ভাষা নিজে শেখে, সেই উপায় অবলম্বন করেই তাদের ভাষা শিক্ষা দিতে হবে, অতএব এশিক্ষার গােড়ায় ব্যাকরণ অভিধানের কোনও স্থান নেই। বিদেশী ভাষা শিক্ষার একটা প্রধান অঙ্গ হচ্ছে, বিদেশী শব্দের স্বদেশী, প্রতিশব্দ শেখা। কিন্তু মাতৃভাষার গােড়াকার শিক্ষা হচ্ছে—বস্তুর সঙ্গে তার নামের, বাচ্যের সঙ্গে তার বাচকের সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা। ছেলের গ্রন্থ কিম্বা গুরুর সাহায্য না নিয়ে, আপনা হতেই যে-সব কথা শেখে, সেই শব্দয়ংগ্রহই হচ্ছে সব ভাষারই মূল উপাদান, এই উপাদান করায়ত্ত্ব না করতে পারলে, ভাষার উপর পূর্ণ অধিকার জন্মে না, এবং একটি বিদেশী ভাষা শেখার মুক্তিলই এই যে, সে ভাষার মূল উপাদানের পুঁজি নিয়ে আমরা তার বিস্তৃত জ্ঞান লাভ করতে বসি নে। সুতরাং মাতৃভাষার শিক্ষা লেখাপড়া দিয়ে সুরু করবার দরকার নেই, অর্থাৎ হাতে খড়ি দেওয়াটা বিরভের প্রথম ক্রিয়া নয়। নব-বিদ্যালয়ের শিক্ষা-পদ্ধতির বিস্তারিত পরিচয় বারান্তরে দেব। ১লা অক্টোবর, ১৯১৮। প্রাণ চৌধুরী।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sabuj Patra Year 5 1918

Title
Sabuj Patra Year 5 1918
File name
Sabuj Patra Year 5 1918
Text
OCR done
Language
Sanskrit
Pages
389
DLI number
322559
Barcode
4990010253748.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
VMLT id
YEUXicB9SCf
Download PDF

Sabuj Patra Year 5 1918