Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shakya Singha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শাক্যসিংহ।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন
পাঠক! লেখনী চালগ কাহাকে বলে আমি জানি
না। আমার লেখনী এই মাত্র প্রথম পদ নিক্ষেপ করিল।
যাত্ৰাটী শুভ কি অশুভ এবং ফলই বা কিরূপ হইবে,
তাহা আপনারাই বলিতে পারেন। আপনাদের নিকট
আমার এই মাত্র প্রার্থনা যে আমার লেখনী যেরূপ কষ্ট
যত্ন স্বীকার করিয়া এ লিপিকাক্ষেত্রে পরিভ্রমণ করিল,
সেরূপ অপনারাও অনুগ্রহ পূর্বক একবার ক্ষেত্রটীর প্রতি
কটাক্ষপাত করিলে পরম সন্তোষ লাভ করিব।
বঙ্গাব্দ ১৩২২।
তারকেশ্বর শৰ্ম্মণ।
No text on this page.
শাক্যসিংহ। প্রথম অধ্যায়। । পূৰ্ব্বকালে বর্তমান অযযাধ্যার উত্তর ভাগে নেপাল পর্ব- তের শিখরদেশে কপিলবস্তু নামে একটী রাজ্য ছিল। তাহার রাজনী কপিলবস্তু ভারতবর্ষের তদানীন্তন যাবতীয় নগরের অপেক্ষা মনােহর রূপ ধারণ করিয়া দর্শকদিগের চিত্ত হরণ করিত। নানাদেশীয় লােকের সমাগমে নগরটা সমধিক-সমৃদ্ধিশালী ও উন্নত হইয়া উঠে। নগরের চতুষ্পশ্বে শৈলমালী দুর্ভেদ্য দুল দুর্গরূপে নগরকে শত্রু হস্ত হইতে রক্ষা করিত। ইহার অনতিদূরে সিংহ ব্যাঘ্র ভল্লুক প্রভৃতি হিংস্র পশুদিগের আবাস ভূমি। দুর্গম অরণ্য শ্রেণী দেখিয়া বােধ হয় প্রকৃতি যেন বিবিধ সজ্জায় সুসজ্জিত হইয়া পরম পিতা পরমেশ্বরের আশ্চর্য সৃষ্টি কৌশল প্রকাশ করিতেছে। নগরের পাশ্ব চতুষ্টয় নদী শাখায় প্রায় পরিবেষ্টিত। এই জন্য নবাগত ব্যক্তিরা এই মনােহর স্থানের আশ্চৰ্য্য নয়নতৃপ্তি কর কাৰ্যকলাপ দেখিয়া এই কল্পনা করিত, বিশ্ববিধাতা যেন স্বয়ং একাগ্রচিত্তে কোন নিভৃত স্থানে বসিয়া একখানি চিত্র- পট প্ৰস্তুত করিয়াছেন এবং দেখিলেই মনােমধ্যে পূর্ব ভাবের উদয় হইত যেন প্রকৃতি-দেবী মেখল পৰিধান २ শাক্যসিংহ। করিয়া দেশের উৎপাদিকা শক্তি ও পোঁতাগমের সুবিধা বিধান দ্বারা বাণিজ্যের সবিশেষ শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছেন। স্থানে স্থানে শৈলমালা হইতে নিঝর বা, নির্গত হইয়া গলিত রজত শােভ ধারণ পূৰ্ব্বক ক্ৰমে সাগরাভিমুখে গমন করিয়া নগর বাসীদিগকে মহতের আশ্রয় গ্রহণের উপদেশ দান করিতেছে। এদিকে নগর মধ্যে স্থানে স্থানে তাল তমাল হিন্তাল প্রভৃতি নানাজাতীয় পাদপগণ অপরূপ শােভায় পরিশােভিত হইয়া নগরের রমণীয় শােভা সংবর্ধন করিতেছে। কোথায় নব পল্লবের আবির্ভাব, কোথায় মুকুলােদগম, কোথায় কুসুম বিকাশ, কোথায় বা ফলের পরিণাম রমণীয়তা কোথায় পল্লব দল ক্রমে রূপান্তর ধারণ করিয়া জীবনের নশ্বরতা এবং সময় ও অবস্থার অচির পরিবর্তনের পরিচয় দান করিতেছে। কোথায় বৃক্ষসকল নিরবধি পুষ্প নিক্ষেপ করিয়া জন সমাজকে এই শিক্ষা দিতেছে যে তাহারা স্ব স্ব সৎকৰ্ম্ম-রূপ সুবৃক্ষ হইতে যশােরূপ পুষ্প নিক্ষেপ করিয়া পৃথিবীকে সৌরভে পরিপূর্ণ করুন। কোথায় বা ফলবান বৃক্ষ সকল ফল ভরে অব- নত হইয়া মানব সমাজকে গৰ্ব্ব পরিত্যাগে উপদেশ দিয়া পরম পিতা পরমেশ্বরের চরণে প্রণত হইতে শিক্ষা প্রদান করিতেছে। কোথায় বা সরসীসকল প্রিয় সরােজিনী ও কুমুদিনীকে বক্ষে ধারণ করিয়া নগরের স্থানে স্থানে অপূর্ব শােভা সম্পাদন করিতেছে। তন্মধ্যে হংস কারবাদি জল- চর পক্ষিগণ অনুপম ক্রীড়াসুখ অনুভব করিয়া বিচরণ করিতেছে। নগরের মধ্যস্থলে আনন্দকানন নামে একটী মনােহর
শাক্যসিংহ।
পুষ্পোদ্যান ছিল। উদ্যানস্থ নানাপ্রকার পুষ্পের সৌরভে,
বিহঙ্গমগণের সুতান সংমিলিত সুমধুর স্বরে, ভ্রমরের গুনগুন
রবে জনগণের মনে নিত্য সুখ বিরাজ করিত। শােকাত্ত
ব্যক্তিরাও তথায় গমন মাত্রে যাবতীয় দুঃখ বিস্মৃত হইত।
রােগী ব্যক্তিরাও তথায় গিয়া রােগের যন্ত্রণা ভুলিয়া যাইত।
চিন্তাকুল ব্যক্তির চিন্তা দূরে প্রস্থান করিত। ভাবুকগণের,
মনে যে কত নব নব ভাবের আবির্ভাব হইত, তাহা বর্ণন
করিয়া শেষ করা যায় না। তাপসগণ তথায় উপনীত হইবা-
মাত্র আনন্দাশ্রু-পরিপ্লুত হইয়া ঈশ্বর প্রেমে বিগলিত হইতেন।
কাৰ্যদক্ষ শ্রমশীল ধনাভিলাষী ব্যক্তিগণ স্বানুরূপ পক্ষিগণের
আহার সংগ্রহ চেষ্টা সন্দর্শন করিয়া নিজ জন্ম ধন্য জ্ঞান
করিত। তথায় উপস্থিত হইবামাত্র নিরানন্দ ব্যক্তিগণেরও
মনােমালিন্য দূর হইত বলিয়া উদ্যান-নির্মাতা তাহার নাম
অননশ্চানন রাখিয়াছিলেন। উদ্যান মধ্যে প্রবেশ করিলে
বােপ হইত ঋতুরাজ বসন্ত যেন তথায় সদা বিরাজমান আছেন।
বিরহি ভিন্ন আর কাহারই আনন্দকানন নামের বিপরীত ফল
ভােগ হইত না। বিরহিরাই কেবল কাননকে মৃত্যুকানন
বােধ করিত। তথাঁয় প্রবেশ মাত্র মদন শরাঘাতে তাহাদের
মন জর্জরিত করিয়া তুলিত। সুতরাং ইন্দ্রিয় ব্যাকুল, বুদ্ধি
বিপথগামি ও অঙ্গ অবশ হইয়া উঠিত। একে দুর্বার
মদনানল জ্বালা, তাহার উপরে কোকিল হুঙ্কার ও ভ্রমর
ঝঙ্কার, পুষ্পের সৌরভ, নব পল্লবের অপরূপু শােভা, সেই
অনলে আহুতি স্বরূপ হইত।
উদ্যানের মধ্যস্থলে একটা অপূর্ব সরােবর। তাহার চারি
৪ শাক্য সিংহ। পার্শ্ব প্রস্তরময় সােপান-পরম্পরায়, নিবদ্ধ। তাহাতে নানা- প্রকার পুষ্প প্রস্ফুটিত হইত। বােধ হইত যেন উহারা উচ্চ হাস্য করিয়া গগনবিহারী তারকব বৃলিকে ন্যাক্কার করিতেছে। তথায় নানাজাতীয় জলচর পক্ষী ও অসংখ্য মৎস্য ক্রীড়া করিয়া অপার আনন্দ ভােগ করিত। এই সরােবরের চারি দিকে চারিটি পাষাণ-বিনির্মিত বিলাস-ভবন ছিল। উহার আশ্চর্য কারুকার্য সৌন্দর্য্যে উদ্যানের অধিকতর শােভা হইয়াছিল। কাননের চতুষ্পশ্ব প্রাচীর-পরিবেষ্টিত হইয়া উদ্যানকে রাজপথ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়াছিল। উদ্যা নের তােরণ-চতুষ্টয় রাজপথের পার্শ্বস্থিত। তােরণ পার হইলেই বিস্তৃত রাজপথ। ঐ পথগুলি কামিনীর কমনীয় কণ্ঠ- ভূষণ প্রায় উদ্যানকে পরিবেষ্টন করিয়াছিল। কাননের পশ্চিম দ্বার অতিক্রম করিয়া যে রাজপথ, তাহার অপর পার্শ্বে নগরের অধিষ্ঠাতা রাজ্যের রক্ষাকর্তা ভগবান রাধাবল্লভের পুরী। দক্ষিণ দ্বার অতিক্রম করিয়া পান্থ-নিবাস, চিকিৎসালয় ও নানা প্রকার বিদ্যালয়। পূৰ্ব্ব দ্বারের পূর্ব নানা প্রকার লােকের বাস ও বিস্তৃত বিখ্যাত প্রাচীর-পরিবেষ্টিত চক। উত্তর দ্বারের উত্তর দৃঢ়কায় সমরপ্রিয় সাহসিক অস্ত্রধারী বীর পুরুষদিগের আবাস মন্দির। অরিন্দম নামে দুর্গ ; এই দুর্গের উত্তর পার্শ্বে রণক্ষেত্র, তদুত্তরে রাজপুরী। রাধাবল্লভের পুরী অত্যুচ্চ প্রস্তরময় প্রাচীর পরিবেষ্টিত ; সিংহ দ্বার কৃষ্ণ প্রস্তর বিনির্মিত ; হঠাৎ দেখিলে পৰ্বত বলিয়া ভ্রম জন্মিত। ঐ দ্বার মধ্যে অত্যুজ্জ্বল এক খণ্ড প্রস্তর পতিত ছিল। তাহার আলােকে সমুদায় পুরী আলােকময় হইত।
• শাক্যসিংহ। মহাবল পরাক্রান্ত, দশ সহজ ক্ষত্রিয় নিয়ত পুরীক্ষণে তৎপর হইয়া অস্ত্রধারণ পূর্বক দ্বারদেশে উপস্থিত থাকিত; কিন্তু সকলেরই স্বভার শান্ত, কৃতি গভীর, সকলেরই অভ্যাগত অথিতির প্রতি সবিশেষ যত্ন ও ভক্তি ছিল। পুরী মধ্যগত নানা প্রকার পুষ্পেদ্যান ও ফলবান বৃক্ষশ্রেণী পুরীর অনির্বচ- নীয় শােভা সম্পাদন করিয়াছিল। সােপানবদ্ধ একটী মনাে- হর সবােবর মনােহর নাম ধারণ করিয়া জল দান দ্বারা আগ- কদিগের পিপাসা দূর করিয়া জন সমাজকে আতিথ্য-সৎকার- রূপ মহাব্রত অবলম্বনের শিক্ষা দান করিত। রাধাবল্লভের অথবা নগরবাসিদিগের প্রাণবল্লভের মন্দির শ্বেত প্রস্তরে গঠিত। তাহার অভ্রংলিহ অত্যুচ্চ চূড়া নিকটবর্তি পর্বত শ্রেণীকে উপহাস করিত। পুরীটী অতি পরিষ্কৃত ও পরিচ্ছন্ন এবং অশেষবিধ শিল্প-নৈপুণ্যসম্পন্ন। প্রথিত আছে বিশ্বকৰ্ম্ম। স্বহস্তে এই মন্দিরটী প্রস্তুত করিয়াছিলেন। মন্দিরটী নানা প্রকার বহুমূল্য মণির আলােকে আলােকময়। উহার দ্বার মলয়কাষ্ঠ নির্মিত। তন্মধ্যে পাষাণময় রাধাবল্লভ রাধা সহ মণিময় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আহাঃ রাধাবল্লভের কি মনেহির রূপ ! দেখিবা মাত্র অতি পাষণ্ডেরও মনে ভক্তি ও শান্তি রসের উদয় হইত। রাধাবল্লভের মন্দিরের দক্ষিণ পাশ্বে স্ফটিক-নির্মিত আর একটী মন্দির ছিল। ঐ মন্দিরের মধ্যে দেবাদিদেব সতীশ সতী সহ রত্নময় আসনে আসীন থাকিয়া নগরে মঙ্গল বিধান করিতেন। এমন্দিরটাও ভাস্বরকান্তি নানাবিধ মণির উজ্জ্বল দীপ্তি দ্বারা সুশােভিত হইয়াছিল। অনধিক তিন শত ব্রাহ্মণ শাক্যসিংহ। বিগ্রহ দ্বয়ের পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকিয়া নিত্য পূজাদি সমা- ধান করিতেন। তথায় দুটী মঠ ও দুটী ইষ্টকালয় ছিল। নানাদিক দেশ হইতে সন্ন্যাসিং আসিয়া তথায় অবস্থান করিতেন। তথায় বাস করিলে হিংসা দ্বেষ কাম ক্রোধাদি রিপুগণ ও পাপ পিশাচ দেহকে আশ্রয় করিয়া বিকৃত করিয়া তুলিতে পারি না। তথায় যিনি যাইতেন, তিনিই শান্ত-প্রকৃতি ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া মহাসুখে কালাতিপাত করিতেন। সতীশের মন্দিরের অনতিদূরে প্রাচীর পরিবেষ্টিত ইষ্টকা- লয়চষ্টয় পান্থ নিবাস বলিয়া বিখ্যাত। তথায় অভ্যাগত সৰ্ব্ব- দেশীয় যাবতীয় লােক অতিথি সৎকারলাভ করিয়া যার পর নাই পরিতৃপ্ত হইতেন। যিনি যত কাল ইচ্ছা বাস করুন, তাহার নিবারণ ছিল না। কাহারাে প্রতি কোন প্রকার বিরক্তি- জনক ব্যবহার করা হইত না। কেহ মহারাজের অনভিপ্রেত এই নিষিদ্ধ কাৰ্য্য করিলে তৎক্ষণাৎ তাহার গুরুদণ্ড বিধান হইত। ইহারই পূৰ্ব্বদিকে চিকিৎসালয়। তথায় ভৃত্যবর্গ যথা- বিধি সেবা শুশ্রুষা ও শাস্ত্রসম্মত সুবৈদ্যবিহিত নানাপ্রকার ঔষধ পথ্য প্রদান করিয়া রােগিদিগকে অচির কাল মধ্যে সুস্থ করিয়া তুলিত। ইহার কিঞ্চিৎ পূৰ্বাংশে বিবিধ বিদ্যাশিক্ষার্থ নানাবিধ বিদ্যালয়। শিক্ষকগণ অবিরত শিক্ষাদান পূর্বক অজ্ঞান তিমির নাশ করিয়া দিব্য জ্যোৎস্নাময় জ্ঞানপথে উপনীত করিতেন। শিক্ষার্থির মনক্রমেই বিদ্যার রসাস্বাদে মগ্ন হইয়া তৎপ্রতি গাঢ়তর অনুরক্ত হইত। পরােপকার-ব্ৰতাবলম্বী শিক্ষকগণ অর্থে গমন করিয়া কন্টকময় বন্ধুর দুরাবােহ তমােময় পথ সমুদায় শাক্যসিংহ। সুগম ও পরিষ্কার করিয়া মিজ মহাত্মতার পরিচয় দান করি- তেন। ছাত্রগণ সকলেই বিদ্যাকাননের ফললাভের প্রয়াসে লােলুপ হইয়া স্ব স্ব লঙ্গি বৃক্ষের দিকে ধাবিত হইলে শিক্ষক মহাশয়েরা উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া যথাক্রমে ফলদান করিতেন। শিক্ষার্থিগণের মধ্যে যিনি যত্নরূপ বারি সিঞ্চন করিয়া যে বৃক্ষকে জীবিত রাখিতেন, তিনিই সেই বৃক্ষের ফল- ভােগে সম্পূর্ণ অধিকারী হইতেন। শিক্ষকেরা বিনা পক্ষপাতে সকলকে তুল্যরূপ শিক্ষার পথ প্রদর্শন করিতেন। কিন্তু ছাত্রের নিজ নিজ বুদ্ধির গতি প্রবৃত্তি ও রুচি অনুসারে কেহ গণিত, কেহ সাহিত্য, কেহ দর্শন, কেহ স্মৃতি, কেহ আয়ুৰ্বেদ, কেহ শিল্পশাস্ত্ররূপ বৃক্ষ সকল মানসক্ষেত্রে রােপণ ও শ্রমরূপ সলিল সেচন করিয়া তাহার অঙ্কুর বর্জন ও উন্নতি সাধন করিয়া ফলভােগ করিতেন। আহাঃ সে ফল কি সুমধুর! তাহার মহীয়সী শক্তিই বা কি অদ্ভুত! একবার ফলের আস্বাদ পাইলে বৃক্ষের উপরে উত্তরােত্তর স্নেহের বৃদ্ধি হইত। যত্নরূপ বারি- রও কি চমৎকার মহিমা! প্রথমে যিনি যত অধিক বারি সিঞ্চন করিতেন, পরিশেষে তিনি তেমনি অল্প সিঞ্চনে অধিক ফল প্রাপ্ত হইতেন। যিনি প্রথম অল্প সিঞ্চন করিতেন, পরি- শেষে তাহার অধিক সিঞ্চনেও আশানুরূপ ফল লাভ হইত না। কপিলবস্তুর বাজার অতি মনােহর। তথায় জগজ্জাত সর্ব প্রকার পদার্থই অনীত হইয়া ক্রয় বিক্রয় হইত। যে চকে নিত্য বাজার বসিত, তাহার ঢারিধার স্তম্ভ বেষ্টনে পরিবেষ্টিত। চকটি দেখিতে অতি সুন্দর। যে দিকে দৃষ্টিপাত করা যাইত, . শাক্যসিংহ। দৃষ্টিকে সে দিক হইতে ফিরান ভার হইত। এরূপ মনােহর চক ভারতবর্ষে অতি বিরল। চকের চম্পার্শ্বে নানাপ্রকার ধনী ও সম্ভ্রান্ত মহাজনদিগের নিবাস। তাহাদের প্রাসাদ সকলের ধবলাকার অতি উন্নত চূড়াসকল নগরের ধ্বজারূপে দণ্ডায়মান থাকিয়া নগর-দর্শন-প্রিয় পথভ্রান্ত পথিকদিগকে আহ্বান করিত। প্রাসাদ সকল কেবল যে বাহ্য সৌন্দৰ্যশালী, তাহা নহে, তাহারা মণি মুক্তাদি নানা প্রকার বহু মূল্য রত্ন স্বর্ণ রৌপ্যাদি দ্বারা পরিপূরিত ছিল। ঐ সমস্ত প্রাসাদস্বামীর এত ঐশ্বৰ্য্য ছিল যে তাঁহারা ধনেশের সমকক্ষ হইয়া ধনেশ এই উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। কপিল বস্তুর দুর্গ অতি বৃহৎ। দুর্গের প্রাচীর সকল দুর্ভেদ্য প্রশস্ত ও দুল্য। গড়ের দ্বারচত্তষ্টয় কৃতান্ত-সদনের তােরণ তুল্য বলিয়া বােধ হইত। অশ্বের হেষাব, হস্তির বৃংহিত,বীর- গণের সিংহনাদ ও অস্ত্রের ঝন ঝন শব্দ শুনিলে বিদেশীয় সাহসী ব্যক্তিরও হৃৎকম্প উপস্থিত হইত। কপিল বস্তুর উপরিভাগে যেমন প্রাসাদ হাট বাজার ও জনগণের বাস স্থান দেদীপ্যমান ছিল, পৃথিবীগর্ভেও ঐ সকল অবিকল সেইরূপ ছিল। তৎ- স্থান জয় করা দূরে থাকুক, শত্ৰুদিগের তথায় প্রবেশ শক্তিও ছিল না। এই নিমিত্ত দুর্গপ্রণেতা তাহার অরিন্দম নাম প্রদান করিয়াছিলেন। এই দুর্গটী ভারতবর্ষের তদানীন্তন দুর্গ সমুদ- য়ের মধ্যে অতি শ্রেষ্ঠ ও ত্রিংশৎসহস্রবীরের বিহারস্থল ছিল। ইহারই উপ্তরে প্রায় পাঁচ ক্রোশ বিস্তৃত রণক্ষেত্র। নব কামল তৃণ শােভায় উহা অপূৰ্ব্ব শােভা ধারণ করিয়াছিল। ক্ষেত্ৰ-মধ্যগত একটী বিস্তৃত পরিস্কৃত রাজপথ সীমন্তিনীর শাক্যসিংহ। সীমন্তের ন্যায় ক্ষেত্ৰটীকে সমভাগে বিভক্ত করিয়াছিল। এই ক্ষেত্রের উত্তর ভাগেই রাজভবন। পুরীটী সপ্ত খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিবিভাগই প্রাচীর ও পরিঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত । প্রবেশের একটা মাত্র দ্বার ছিল। দ্বারটী প্রস্তর দ্বারা বিনির্মিত। উহা রণদক্ষ দশ সহস্র সাহসিক যােধ পুরুষ দ্বারা সুরক্ষিত হইত। তথায় বিনা অনুমতিতে কাহারই প্রবেশ করিবার অধিকার, ছিল না। কেবল সেনাপতি ও অমাত্যগণ ইচ্ছামত পরিভ্রমণ করিতে পারিতেন। রাজার সমস্ত প্রাসাদই প্রস্তর নির্মিত এবং নানা প্রকার কারুকার্য দ্বারা সুশােভিত। তথাকার শােভা সন্দর্শন করিয়া দর্শকমাত্রের মন একেবারে বিমােহিত হইয়া যাইত এবং দর্শকগণ মনে মনে নির্মাণকৰ্ত্তাকে অশেষ প্রকার ধন্যবাদ প্রদান করিতেন। অতি প্রাচীন কাল হইতে শাক্যবংশােদ্ভব রাজগণ এই পুরীর অধিস্বামী হইয়া রাজ্য শাসন করিয়া আসিতেছিলেন। এক সময়ে প্রায় সমুদায় ভারতবর্ষই এই বংশের পদাবনত হইয়াছিল। কিন্তু কাল ক্রমে তাহাদের বাহুবল সঙ্কুচিত হইয়া যায়, কেবল মাত্র কপিলবস্তু রাজ্যে তাহাদের প্রভুশক্তি অপ্রতিহত ভাবে বিরাজমান ছিল। খৃষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বৎসর পূর্বে কপিলবস্তু নগরে শাক্যবংশে এক জন রাজা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রজাগণের অশেষ সুখ সমৃদ্ধি সম্পাদন করিয়া রাজনামের যথার্থতা সম্পা- দন করিয়াছিলেন। তাঁহার মত সৎস্বভাব জিতেন্দ্রিয় ও ন্যায়পরায়ণ রাজা তৎকালে পৃথিবীতে অল্প ছিলেন। গুণী ব্যক্তির সমাদর, বিদ্বান ব্যক্তির উৎসাহ দান ও দয়াদাক্ষিণ্য
শাক্যসিংহ।
প্রভৃতি অশেষ সদগুণ একাধারে থাকিতে প্রায় দেখা যায়
না। কিন্তু ঐ গুণগুলি মিত্র ভাবে মহারাজে বাস করিত।
তিনি মহারাজ সুপ্রবুদ্ধের কন্যা মায়াদেবীর পাণিগ্রহণ করেন,
তাহারই গর্ভে বুদ্ধদেব জন্ম গ্রহণ করেন। কেহ কেহ তাহাকে
শাক্যসিংহ ও কেহ কেহ গৌতমও বলিয়া থাকে। রাজকুমারের
জন্মবাৰ্তা শ্রবণ করিয়া পুরবাসিগণ অতিশয় উল্লাসিত হইল।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
রাজকুমার জন্মিয়াছেন শুনিয়া নগর মহােৎসবে পূর্ণ
হইয়া উঠিল। রাজপথে স্থানে স্থানে মুকুল পৱব শশাভিত
তােরণ নির্মিত হইল। তাহার উভয় পার্শ্বে রােপিত কদলী-
বৃক্ষ মূলে পল্লবাচ্ছাদিতু পূর্ণ কুম্ভসকল পথের অপূৰ্ব শােভা
সম্পাদন করিল। পথের উভয় পার্শ্বস্থিত অট্টালিকাসকল
অশেষবিধ সুসজ্জায় সজ্জিত হইয়া দর্শকদিগের চিত্ত হরণ
করিতে লাগিল। তন্মধ্যে আবার পিক-বিনিন্দিত-কণ্ঠস্বর-সম্পন্ন।
বারনারীদিগের সুতান সংমিলিত কণ্ঠধ্বনি মৃদু বায়ু ভরে সঞ্চা-
লিত হইয়া শ্রোতাদিগের কর্ণে অমৃত বরিষণ করিতে লাগিল।
তচ্ছবণে অনেকেই স্পন্দহীন চিত্রাপিতের ন্যায় দণ্ডায়মান
রহিয়াছেন, বিস্তর যত্নেও সংজ্ঞা লাভ করিতেছেন না।
দুর্গমধ্যে মহাকায় বীরপুরুষগণ মহােৎসবে মত্ত হইয়া
অরিকুল সংহারক ভীষণ গর্জন করিতেছেন। কিন্তু কেহই
আত্মবিস্মরণ কি মােহােন্মত্ত হয় নাই, সকলেই সচকিত সতর্ক
এবং স্বকৰ্ম্মব্যস্ত ; অতি সাবধান হইয়া নিয়মিত কাৰ্য্য সুসম্পন্ন
করিয়া তাহারা দুলভ যশােলভ করিতেছে।
শাক্যসিংহ। ১১ রাজভবন মহােৎসবে পরিপূর্ণ ; কোথায় বা পুষ্পময় গৃহ মধ্যে রাগিণীবিশারদ গায়কদিগের গগনস্পশী স্বর মন্দ মলয় পবন ভরে শ্রোতাদিগকে নানা প্রকার আনন্দ দান করিতেছে কোথায় বা আয়তলােচনা সৰ্বালঙ্কার-ভূষিত নর্তকীদিগের নূপুরােৎপাদিত রুনু ঝুনু শব্দ শ্রোতাদিগের কর্ণ শীতল করিতেছে ; কোথায় বা কামধনুঃপ্রায় যুগ্ম শালিনী 'বার- নারীগণ নিরবধি কটাক্ষ শর ক্ষেপণে দর্শকদিগের মনােগ আহত করিতেছে ; কোথায় বা অশেষবিধ শিল্পচাতুর্যের আকর স্বরূপ পল্লবনির্মিত গৃহ নানারূপ মনােহর অবয়র ধারণ করিয়া নট নটী গায়ক গায়িকাদিগের বিহার স্থল হইয়া দর্শকগণের অতুল আনন্দ বিধান করিতেছে ; কোথায় বা পট বিনিৰ্মিত গৃহসকল ও তৎসন্নিহিত কল্পিত বৃক্ষশ্রেণী দর্শনকা- রীদিগের চিত্তহরণ করিয়া প্রণেতার কারুকার্য্যের পরিচয় দান করিতেছে; স্থানে স্থানে নানাপ্রকার বাদ্যকদিগের যন্ত্র ধ্বনিতে সকলেরই শ্রবণশক্তি বিহ্বল হইতেছে। মহারাজ পুত্রের মঙ্গল জন্য রাধাবল্লভের নানাপ্রকার সেবাযােগ্য উপহার প্রেরণ করিতেছেন। ব্রাহ্মণেরা ইচ্ছানু- রূপ দান গ্রহণ করিয়া সন্তুষ্টচিত্তে মহারাজের জয় হউক বলিয়া হস্তোত্তোলন পূর্বক আশীৰ্বাদ করিতে করিতে নিজালয় প্রত্যাবর্তন করিতেছেন। দীনভাবাক্রান্ত ভিক্ষুকগণ অভি- লষিত অর্থ লাভ করিয়া মহারাজের জয়ধ্বনি করিতেছে। অন্ধ বধির এবং হস্তপদহীন জনগণ প্রচুর পরিষ্কাণে এত অর্থ লাভ করিল যে তাহাদের অন্ধত্যাদি নিবন্ধন কষ্ট অনুভব হইল । নৃপাজ্ঞানুসারে বন্দীগণ কারামুক্ত হইয়া অপার আনন্দ ১২ শাক্যসিংহ।' প্রাপ্ত হইল নগর উৎসবময় হইল। আনন্দলহরী তথায় বিরাজ করিতে লাগিল। নগরের রমণীগণ রাজকুমায়ুজন্মিয়াছে শুনিয়া নদবিহ্বল। হইয়া স্ব স্ব কর্ম ত্যাগ করিয়া দলে দলে রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। রাণীর সহচরীগণ তাহাদিগকে পরম সমাদরে অভ্য- র্থনা করিলেন। নাগরীগণ কুমারকে দর্শন করিয়া পরম আনন্দ লাভ করিলেন এবং জয় জীব ইত্যাদি আশীর্বাদ দ্বারা অভি- নন্দিত করিয়া স্ব স্ব নিকেতনে প্রস্থান করিলেন। এরূপ মহােৎ- সব পক্ষান্ত পৰ্যন্ত নগরে নিরবচ্ছিন্ন বিরাজমান থাকিবে মহা- রাজের এইরূপ আদেশ হইলে পর সকলেই মনের কৌতুকে কালযাপন করিতে লাগিলেন। হায়! জগদীশ্বরের কি আশ্চর্য লীলা? বিধিকৃত কাৰ্য্যের ব্যাঘাত করিতে কাহারই সাধ্য নাই। এরূপ মহােৎসবের সপ্তাহ অতীত হইতে না হইতেই তাঁহাদের আনন্দলহরী দুঃখ- রূপ বিপরীত স্রোত প্রতিঘাতে ভগ্ন হইয়া গেল। রাজভবন শােকময় কোলাহলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। রাণী হঠাৎ সাংঘাতিক রােগাক্রান্ত হইয়া ভিষকগণের নানাপ্রকার চেষ্টা নিষ্ফল করিয়া জীবন ত্যাগ করিলেন। সহচরীগণের ক্রন্দন কোলাহলে নগর পূর্ণ হইল। মহারাজ প্রেয়সীর মৃত্যু সংবাদ শ্রবণে ছিন্ন তরুর ন্যায় “ হা প্রেয়সি,” বলিয়া ভূতলে পতিত ও সংজ্ঞাশূন্য হইলেন। মুহূর্ত পরে বিস্তর যত্নে সংজ্ঞা লাভ হইলে ধূল্যবলুষ্ঠিত কলেবরে ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া পরে আবার হাঃ প্রণয়িনি আয়তলােচনে প্রাণেশ্বরি, প্রিয়ম্বদে সুচারুভাবে মম জীবিতপ্রদায়িনি মনােমন্দিরাধিষ্ঠাত্রি শাক্যসিংহ। ; অশেষরূপলাবণ্যসম্পন্নে বিবিধ সুখপ্রদ পুরজনহিতকারিণি ! বিবিধ মন্ত্ৰপ্ৰদে প্রাণেশ্বরি! একবার দর্শন দিয়া প্রাণ রক্ষা কর। তুমিই আমার ঝুলিত দীপপ্রায় ছিলে। তােমা বিনা জগৎ অন্ধকার এবং পৃথিবী শূন্যময় নিরীক্ষণ করি, তেছি। হায়! তুমিই রাজ-নিয়মপ্রদায়িনীরূপে বিদ্যমান থাকিয়া প্রকৃষ্টপদ্ধতি ক্রমে রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিতে- ছিলে। এক্ষণে তােমা বিনা রাজ্যেরই বা কি দশা ঘটিবে! এই বলিয়া পুনর্বার মূচ্ছিত হইলেন। অনুচরবর্গ বিস্তর চেষ্টায় সংজ্ঞা দান করিল বটে কিন্তু দুই দিবস দুই রাত্রি আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়া শােকবিহ্বল ও উন্মত্তপ্রায় হইয়া অজস্র অশ্রু বিসৰ্জন করিলেন। তৃতীয় দিবস অপেক্ষাকৃত কিঞ্চিৎ সুস্থ হইলেন। অপত্যস্নেহ প্রবল হইয়া শােককে অনেক মন্দীভূত করিল। তিনি তখন ধীরে ধীরে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া সম্মুখেই মনােহর বিলাসমন্দির দেখিতে পাইলেন। মন্দিরটী রঞ্জিত প্রস্তরে বিনিৰ্মিত, অশেষ শিল্প-নৈপুণ্যের দৃষ্টান্ত স্থল। মন্দির মধ্যে বিচিত্র গালিচা বিস্তৃত, তদুপরি দ্বিরদ-রদ বিনিৰ্ম্মিত পৰ্যৰুে দুগ্ধফেননিভ শয্যা সুসজ্জিত রহিয়াছে। নৃপবর তৎস- মুদয় সন্দর্শন করিয়া তাহাদিগকে সচেতন বােধে জিজ্ঞাসা করি- লেন, প্রাসাদ শ্রেষ্ঠ! তব অধিষ্ঠাত্রীদেবী অশেষ রূপলাবণ্য বুদ্ধি বিদ্যা ও সৎ নিয়মের আর আমার সেই প্রেয়সী কোথায় ? শয্যা আমার সেই প্রিয়ংবদা জীবন-সর্বস্ব প্রেয়সী কোথায় গিয়াছে বলিয়া দিয়া আমার প্রাণ রক্ষা কর। ভাল সহচরীগণ। আমার জীবিতেশ্বরী কোথায় লুকাইয়া রহিলেন? বিধুমুখি ? (২) ১৪ শাক্যসিংহ। প্রেয়সীর প্রাণ-সমা সখী ছিলি ? তােকে না প্রাণেশ্বরী সহােদরাধিক ভাল বাসিত ? যাইবার সময় তােকও কি একটা কথা বলিয়া যান নাই? প্রিয়াকে দেখাইয়া আমার প্রাণ রক্ষা কর। মহারাজ শােকাকুল চিত্তে এরূপ নিল প্রশ্ন করিতেছেন, এমন সময়ে নবকুমারের প্রতি তাঁহার দৃষ্টিপাত হইল। তিনি রে মাতৃহীন! তাের উপায় কি হইবে বলিয়া অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন। ক্ষণকাল পরে অপেক্ষাকৃত শান্ত হইয়া প্রেয়সীর সহােদর মহারাজ সুপ্রবুদ্ধের দ্বিতীয় কন্যাকে ( যাহাকে রাণীর মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে বিবাহ করিয়া আনিয়াছিলেন) আহ্বান করিয়া বলিলেন, এ হতভাগ্য বালক মাতৃহীন হইয়াছে, এক্ষণে ইহার উপায়কি হইবে? নবীনা ফণি-বিনিন্দিত-বেণী, পদ্মনেত্ৰা পদ্মাস্যা, বিষাধরা, কস্তুগ্রীবা, ক্ষীণ-কটি, বরাবােহা, মিষ্ট- ভাষিণী, অশেষ শিল্প-নিপুণা, বিদ্যাবতী, ভগিনীশশাকে মলিনা, শােক-বিহবলা হইয়া ক্ষণকাল রােদন করিয়া গভীরস্বরে প্রত্যুত্তর করিলেন, আপনার যদি কোন অনুগৃহীত। দাসী থাকে, তবে ইহারও জননী আছে, আপনি ইহাকে বৃথা মাতৃহীন সৰােধন করিবেন না। এ দুই দিন ইহাকে যে প্রতি- পালন করিয়াছে,নিশ্চয়ই জানিবেন, এখনও সেই প্রতিপালন করিবে। এখন সুস্থির হউন, সন্তানের জন্য কোন চিন্তা করিবেন না। আপনি শান্ত না হইলে প্রজাগণ ব্যাকুল, কাৰ্য- কারকগণ অলস ও স্বার্থপর হইতে পারে। রাজ্যের বিশৃঙ্খলা দেখিয়া রাজদ্রোহী শত্রুগণ এই অবসরে নিজ নিজ অভীষ্টসুসিদ্ধ করিয়া লইতে পারে। মহারাজ! অরাজক রাজ্য, তমােমর শাক্যসিংহ। আকাশ, পতিহীনা নারী, বিদ্যাহীন জীবন এ চতুষ্টয়ে বিপদ ঘটাই আশ্চর্যের বিষয়। শাস্ত্রকারের বলিয়াছেন, জ্ঞানী লােকেরা বিপদকালে ধৈৰ্ষাবলম্বনপূর্বক তাহার প্রতি- বিধান, সম্পদকালে ক্ষমাশীল হইয়া লােকসমাজে নিজ সদাশ- মতার পরিচয় দান, সভাতে বাগজাল বিস্তার পূর্বক সকলের মনােহরণ, এবং যুদ্ধে বৈনির্যাতন পূর্বক নিজ কীর্তি স্থাপন করেন। মহারাজ! এ দাসীর কথায় অবজ্ঞা করিবেন , এক্ষণে ধৈৰ্য্য অবলম্বন করিয়া ব্যাকুল প্রজাপুঞ্জকে সুস্থির চিত্তে পুত্রসম প্রতিপালন করিয়া দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে তৎপর হউন আপনার ব্যাকুলতায় সমুদায় রাজ্যই একরূপ অরাজক হইয়াছে। মহারাজ তাহার এবষ্কৃত বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন । ভদ্রে! আমি তােমার কথায় পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। আজি হইতে জানিলাম পদ্মরাগমণির আকরে কাচের উদ্ভব কোন মতেই সম্ভব হইতে পারে না। আমার এই বােধ হই- তেছে যে এই বালকের জীবন রক্ষার জন্যই ভূমণ্ডলে তােমার জন্ম হইয়াছে; তুমি স্বাধিষ্ঠিত কোন দেববনিতা, পৰাে- পকার ব্ৰতাবলম্বন করিয়াই মর্ত্যে আগমন করিয়াছ। যাহা হউক, আমি এক্ষণে এই মাতৃহীন শিশুকে তােমার হন্তে সম- পণ করিলাম। তুমি ইহাকে আত্মসন্তানৰৎ প্রতিপালন করিয়া জগৎ নিজ যশঃসৌরভে পরিপূর্ণ কর । মহারাজ এই বলিয়া কুমারকে তাহার হস্তে সমৰ্পণ করিয়া অন্তঃপুর হইতে বাহিরে আসিয়া রাজকার্যে মনােনিবেশ করি- লেন। নূতন রাণী পরম যত্নে সন্তান রক্ষা করিতে লাগিলেন।
শাক্যসিংহ। কুমার ক্রমে অর্ধস্ফুট কথা কহিতে শিখিলেন, তখন তিনি পুর- বালিদিগের কণ্ঠে কণ্ঠে কঠিপ্রায় বিরাজ করিয়া সময়ে সময়ে অমিয়জড়িত আধ আধ কথা কহিয়া সকলের কর্ণ অমৃতাভি- যিক্ত করিলেন। সহচরীরা সকলে মিলিয়া নবকুমারকে লইয়া অশেষবিধ কৌতুকে সময় অতিবাহিত করিতেন। কুমার অতি 'অল্পকাল মধ্যেই পরম মনােহর রূপলাবণ্যসম্পন্ন হইয়া উঠি- লেন। তাহার প্রশস্ত জ ও ললাট, বিশাল আয়ত লােচন, খগরাজবিনিন্দিত উন্নত নাসিকা, হাস্যপূর্ণ মুখ, বিষেষ্ঠ, স্থূল গণ্ড, আজানুলম্বিত বাহু, বিশাল বক্ষ, মৃগেন্দ্র সমমধ্য, রাম- রম্ভাবিনিন্দিত উরু ইত্যাদি রাজচিহু লক্ষিত হইতে লাগিল। কুমার ক্রমে অন্দরের বাহির হইলেন। কুমার বাহিরে আলিয়াছে শুনিয়া নগরবাসিগণ নানা প্রকার উপঢৌকন সহ রাজকুমার দর্শন প্রয়াসে রাজভবনাভিমুখে ধাবিত হইল। কেহ কেহ কৌস্তুভ, পদ্মরাগ, সূৰ্য্যকান্ত, চন্দ্রকান্ত, ইত্যাদি মণি সংযােজিত বহুমূল্য রত্ন হার, কেহ বা নানা প্রকার বহুমূল্য অলঙ্কার, কেহ বা অত্যুৎকৃষ্ট বস্তু, কেহ বা অশেষ কারু- কার্যসম্পন্ন নানাবিধ পুষ্পসজ্জা, কেহ বা সুমধুর ফল, কেহ বা বহু স্বর্ণ রজত মুদ্রা উপঢৌকন প্রদান করিল। রাজকুমার কেবল সুস্বাদু ফল গ্রহণ করিলেন। বহুমূল্য রত্নাদি কি কারুকার্যসম্পন্ন পুস্পালঙ্কার স্পর্শও করিলেন না। নগরবা- সিরা কুমার দর্শন করিয়া পরম সন্তোষে নিজালয়ে প্রত্যা- বৰ্তন করিয়া নানা প্রকার মঙ্গলাচরণে প্রবৃত্ত হইল। গৃহসকল বিবিধ সজ্জায় সজ্জিত করিয়া ক্রমে তিন দিবস পর্যন্ত গান বাদ্য ইত্যাদি নানাপ্রকার আমােদে প্রমত্ত রহিল।
শাক্যসিংহ।
১৭
তাহার পর সকলেই স্ব স্ব কর্মে মনােনিবেশ করিল।
এদিকে রাজকুমারও নাগরিক সমবয়স্ক বালকদিগের
সহিত নানা প্রকার খেলায় প্রমত্ত থাকিয়া নির্বিকার নির্মল
পরম পবিত্র বাল্যকালােচিত পরমানন্দে সখাসঙ্গে মিলিত
হইয়া সময়াতিপাত করিতে লাগিলেন।
তৃতীয় অধ্যায়।
রাজকুমারের বয়স এক্ষণে পঞ্চম বৎসর অতিক্রম করিল ;
তিনি বলশালিতার তেজস্বিতার ও বুদ্ধির তীক্ষতার পরিচয় দিতে
লাগিলেন। একদা মহারাজ অমাত্য বন্ধু বান্ধব পুরােহিত
মন্ত্রী ও পণ্ডিতবর্গ পরিবেষ্টিত হইয়া অনন্যমনে রাজকাৰ্য
পৰ্যালোচনা করিতেছেন, এমন সময়ে রাজকুমার দক্ষিণ হস্তে
একটী সিংহশিশু এবং বাম হস্তে একটী করভ ধরিয়া পরমা-
হলাদে সভায় উপস্থিত হইলেন। ইহা অবলােকন করিয়া
সকলেই বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে চাহিয়া রহিলেন। কুমার করী
ও মৃগেন্দ্র শাবক উভয়কে সভা মধ্যে ছাড়িয়া দিলে অনেক
পূর্ণবয়স্ক যুবা পুরুষ তাহার একটীকেও ধরিয়া রাখিতে পারিল
। তাহাদের চেষ্টা বিফল হইল দেখিয়া কুমার অট্ট হাস্য
আরম্ভ করিলেন। কিছুকাল এরূপ কৌতুক করিয়া রাজকুমার
অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন।
মহারাজ এ সকল ব্যাপার অবলােকন করিয়া মনে মনে
বিবেচনা করিতে লাগিলেন, রাজকুমার এত অল্প বয়সেই
যেরূপ বিক্রমশালী হইয়া উঠিয়াছেন, উপযুক্ত সময়ে যদি অনু-
রূপ সদুপদেশ না পান এবং অসৎ সংসর্গ হয়, তাহা হইলে
। ১৮ শাক্যসিংহ। ঘাের অনিষ্ট ঘটিবার সম্ভাবনা। অতএব ইহাকে শীঘ্রই বিদ্যা- মন্দিরে প্রেরণ করা আবশ্যক। অনন্তর মন্ত্রিবরকে বলিলেন ; মন্ত্রিবর! রাজকুমারদিগের বিদ্যা শিক্ষার জন্য যে একটী স্বতন্ত্র গৃহ আছে, অবিলম্বে তাহার সংস্কারকাৰ্য্য সুসম্পন্ন করুন। পুরােহিতকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, আৰ্য! অবিলম্বে কুমারের বিদ্যারম্ভ করাইতে হইবে, আপনি অনুগ্রহ পূর্বক একটী শুভ দিন নির্ণয় করুন। রাজাজ্ঞানুসারে এ সকল কাৰ্য অতি সত্বর সুসম্পন্ন হইল। শুভদিনে ও শুভক্ষণে পুত্রের বিদ্যারম্ভ হইলে পর রাজা কুমারকে এক বিখ্যাত পণ্ডিতের হস্তে সমৰ্পণ করিলেন এবং নানা বৃত্তি বিধান করিয়া ব্রাহ্মণের সম্মান বর্ধন করিলেন। কুমার শুভক্ষণে গুরু- পদে প্রণত হইয়া মনোনিবেশ পূৰ্ব্বক অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করিলেন। রাজকুমারের বর্ণপরিচয় হইলে তিনি বিদ্যামন্দিরে প্রবে- শের পন্থা ব্যাকরণশাস্ত্র অধ্যয়নে প্রবৃত্ত হইলেন। সে পথটী প্রথম অতি দুরারােহ ও বন্ধুর বােধ হওয়ায় গমন নিতান্ত কষ্ট সাধ্য হইয়াছিল। কিন্তু শ্রম ও যত্ন নামে দুই মহাবল পরা- কান্ত বীরপুরুষ তাহাকে অচিরেই সে কন্টকময় পথ অতি- ক্রম করিয়া মনােহর বিদ্যা-নগর দেখাইয়া দিল। পৃথিবীতে এ বীর পুরুষদ্বয়ের অসাধ্য কিছুই নাই; তাহাদের সহায়তায় মানবগণ অচিরেই নিজ মনােরথ সাধন করিতে পারেন। রাজকুমারও তঁহাদিগেরই আশ্রয় গ্রহণ করিলেন । তিনি বিদ্যা-নগরে প্রবেশ মাত্রই সম্মুখে দুটী মনােহর উপ- বন দর্শন করিয়া প্রথম কোন বনে প্রবেশ করিবেন মনে মনে শাক্যসিংহ। এই চিন্তা করিতে লাগিলেন। এমন সময়ে ভ্রম নামে একটা দুৰ্বত্ত পিশাচ তাহার সঙ্গে সঙ্গে চলিয়া গমনের নানা প্রকার ব্যাঘাত জন্মাইতে লাগিল ;কিন্তু পূর্বোক্ত বীরদ্বয় রাজকুমারের হস্তে জ্ঞান নামে মহা অসি প্রদান করিলে তিনি তাহার আঘাতে পিশাচকে বিনাশ করিয়া নির্বিঘ্নে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ উদ্যানে উপস্থিত হইলেন। উদ্যানের শােভা দর্শন করিয়া তাহার মন একবারে বিমােহিত হইল। তথায় ফল-পল্লব- পরিশােভিত বৃক্ষশ্রেণী আগন্তুকদিগকে যােগাযােগ্য বিবে- চনা করিয়া ফল প্রদান করিতেছে ; পৃথিবীর যাবতীয় লােকই সেই বনের ফললাভ-প্রয়াসে একবার তদভিমুখে গমন করিয়া থাকেন, কিন্তু অনেকেই পথ-ক্লেশ সহ্য করিতে না পারিয়া প্রত্যাবর্তন করেন। রাজকুমার এসকল ব্যাপার পর্যবেক্ষণ করিয়া, কিছুকাল সেই উদ্যানেই রহিলেন। কুমার উদ্যানে প্রবেশমাত্রই সম্মুখে এক অতি বৃহৎ বৃক্ষ দর্শন করিলেন। তাহার চিত্তবিনােদিনী শােভা দর্শন করিলে, তমূল পরিত্যাগ করিয়া স্থানান্তরে যাইতে কাহারই ইচ্ছা হয় । তাহার চতুর্দিকের বিস্তৃত শাখা প্রশাখা পত্র একটীও ভগ্ন কি ক্ষত নয়, এবং নিত্য নবপল্লব মুকুল পরিশােভিত হইয়া উদ্যানের অপূৰ্ব্ব শােভা সম্পাদন করিতেছে। রাজকুমার সমভিব্যাহারী পরােপকারব্রতাবলম্বী শিক্ষক মহাশয়কে বৃক্ষের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে অধ্যাপক মহাশয় ইহার নাম সাহিত্য বৃক্ষ বলিয়া ইহার যাবতীয় গুণ ব্যাখ্যা করিলেন। গুরুকৃত পরিচয় পাইবার পূর্বেই কুমারের অন্যদিকে দৃষ্টিপাত হইল, তিনি দেখিলেন ইহার কাব্য নামে অতি বৃহৎ শাখা, বাগানের, শাক্যসিংহ। অনেক স্থান ব্যাপিয়া রহিয়াছে। এই শাখার ছায়াই যাবতীয় তরুণবয়স্ক সুকুমারমতি বালকদিগের বিশ্রামস্থল। শাখাটী অলঙ্কার নামে কতগুলি লতায় জড়িত হইয়া অপরূপ শােভা ধারণ করিয়াছে। সুকুমার কবিগণ ঐ লতা হইতে পদ্য ও গদ্য নামে দুই প্রকার পুষ্প আহরণ করিয়া নানা প্রকার পুষ্প- লঙ্কারে বিদ্যাদেবীর অর্চনা ও বিদ্যাকে বিবিধ সজ্জায় সজ্জিত করিতেছেন। দেবী তাহাদের সেই সকল উপহার সাদরে গ্রহণ করিয়া ভুবনমােহিনীরূপে দর্শকদিগের নানা প্রকারে চিত্ত বিনােদন করিতেছেন। রাজকুমারও তাহাদের অনুবর্তী হইয়া কিছুকাল বিদ্যাদেবীর পূজা করিয়া সাহিত্য বৃক্ষ সম্পূর্ণ পৰ্যবেক্ষণ পূর্বক স্মৃতি বৃক্ষ মূলে গমন করিলেন। এ বৃক্ষটী স্বভাবত স্থূল। বনমধ্যে ইহার পর্যবেক্ষণই কিঞ্চিৎ সহজ ব্যাপার। গাছটী দেখিতে বিশেষ সুন্দর নহে, আর লােকের চিত্ত সম্পূর্ণ হরণ করিতে পারে না, কিন্তু সর্বদা প্রয়াে জনীয় বলিয়া অনেক মহানুভবই ইহার সেবায় তৎপর হইয়া কালযাপন করিতেছেন। রাজকুমার ক্ষণমাত্র ঐ বৃক্ষমূলে দণ্ডায়মান থাকিয়াই ইহার পর্যবেক্ষণ কাৰ্য্য সুন্দররূপ সম্পন্ন করিয়া শিক্ষক মহাশয়কে ও মহাবল পরাক্রান্ত যত্ন ও শ্রম বীরদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া ন্যায়-বৃক্ষমূলে উত্তীর্ণ হইলেন। ঐ বৃক্ষটী অতি মুনােহর, শাখা প্রশাখা চতুর্দিকে সম বিস্তৃত, পত্ৰসকল স্বভাবতঃ নির্মল প্রভাবিশিষ্ট, পুষ্পদল দেখিতে তেমন সুন্দর নয়; কিন্তু গন্ধ অতি মিষ্ট, বিস্তর যত্ন করিলে কিছু কিছু পাওয়া যায়। ফলসকল অতি রসাল বটে কিন্তু বর্ণচোরা, অর্থাৎ কাঁচা পাকা এক বর্ণ বলিয়া অনেকেই
শাক্যসিংহ।
২১
৩
সুস্বাদু সুরসাল সুপক্ক ফল চিনিতে না পারিয়া ভ্রমরূপ
পিশাচের বশবর্তী হইয়া রসনার অপ্রিয় অস্বাস্থ্যকর কটু কাঁচা
ফল পাড়িতে উদ্যত হন; কিন্তু ফলের বন্ধন অতি দৃঢ় বলিয়া
তাহাতে অকৃতকার্য হইয়া পরাঙ মুখ হন; এবং তাহাদের
যাবজ্জীবনােপার্জিত যত্ন-কৃত গৰ্ব বজ্রাঘাতে চূর্ণ হইয়া যায়।
তৎকালে তাঁহারা একরূপ মৃতপ্রায় হইয়া প্রতিনিবৃত্ত হন।
রাজকুমার এ সকল পরিদর্শন করিয়া একান্ত বিস্মিত হইলেন;
কিন্তু নিজ বুদ্ধি কৌশলে, শ্রম ও যত্ন শক্তিধর বীর দ্বয়ের
এযত্নে এবং গুরুমহাশয়ের উপদেশে ভ্রমের মস্তক, পথি-
মধ্যেই চুর্ণ করিয়াছিলেন । এক্ষণে ন্যায়বৃক্ষ ইচ্ছানুরূপ
দর্শন করিতেছেন, এমন সময়ে শিক্ষকমহাশয় বলিলেন,
কুমার! একটী আশ্চৰ্য্য দেখ, দর্শন নামে যে ছয়টী বৃহৎ বৃক্ষ
আছে এ বৃক্ষটী তাহারই অন্যতর। এই কথা বলিয়া
তিনি উহার যাবতীয় গুণ ব্যাখ্যা করিলে রাজকু।
মার পূর্বোক্তসঙ্গিগণ সঙ্গে করিয়া ঐ বৃক্ষমূলে উপস্থিত
হইলেন।
এ গাছটী নামে যেরূপ কাজে ও সেই রূপ। এ গাছটা
বনের অন্যান্য গাছ হইতে অপেক্ষাকৃত নূতন ও মহাসার
বিশিষ্ট ; দেখিতেও সাহিত্য তরু ভিন্ন অপরাপর যাবতীয় তরু
হইতেই সুন্দর। ইহাতে শাখা অধিক নাই, যাহা আছে তাহাও
অতি সুগঠিত, সুচিত, সুদৃশ্য এবং বিবিধ আনন্দপ্রদ।
ইহার একটী পত্ৰও ক্ষত নয় এবং নয়নের তৃপ্তিকর উজ্জ্বল
দ্যুতি বিশিষ্ট। পুষ্প সকলের গন্ধ অতি আদরণীয় এবং
দেখিতেও বিলক্ষণ সুন্দর। ফল সকল স্বভাবতই অতি মিষ্ট।
শাক্য সিংহ। রাজকুমার পূর্বোক্ত সঙ্গিদিগের সহায়তাবলে দর্শন প্রভৃতি যাবতীয় বৃক্ষ দর্শন করিয়া অবশেষে মহাবৃক্ষ গণিত মূলে উপ স্থিত হইলেন এ বৃক্ষটী অতি সারবান এবং বনের যাবতীয় বৃক্ষ অপেক্ষা উচ্চ, প্রবীণ ও প্রাচীন। ইহার জ্যোতিষ ইত্যাদি শাখাই প্রায় উদ্যানের অধিকাংশ বৃক্ষ হইতে স্কুল ও বিস্তৃত। ইহার পত্র সকল এত সূক্ষ্ম ও জটিল যে একান্ত মনােনিবেশ পূর্বক স্থির দৃষ্টি না করিলে তাহার স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। যিনি এক বার সে সৌন্দৰ্য্য অবলােকন করি- য়াছেন, তিনি চিরকাল স্থির নয়নে তাহারই অলৌকিক সৌন্দর্য্য পৰ্যবেক্ষণ করিতেছেন। ইহার ফুল দল দেখিতে অতি মনাে- হর, গন্ধও অতি মিষ্ট; সে গন্ধ জগতের সমুদয় স্থানেই সম- সঞ্চালিত হইতেছে। ইহার ফল কাননের যাবতীয় ফল অপেক্ষা বড় সুস্বাদু, স্বাস্থ্যজনক, রসনার তৃপ্তিকর এবং দেখিতে অতি রমণীয়। যাবতীয় অধিকবয়স্কৰ্চন্তাশীল বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা এ বৃক্ষ মূলে অবস্থিতি পূৰ্ব্বক গণিত পুষ্প চয়ন করিয়া হার গ্রন্থন করত বিদ্যাদেবীর যথা বিহিত অর্চনা করিতেছেন। ভাগ্যবান ব্যক্তিরা মধ্যে মধ্যে দেবীর সন্তোষ সাধন করিয়া দুটী একটা ফল গ্রহণ করিয়া থাকেন এই মাত্র ; অধিকাংশ লােকই তাহার ফল গ্রহণে পরাঙ্মুখ হন। রাজকুমার ধৈৰ্য্য, স্থির- প্রতিজ্ঞা, শ্রদ্ধা, যত্ন ও শ্রম এই পাঁচ জন অনুচরের বলে এবং অধ্যাপকের উপদেশে গণিত বৃক্ষ সুচাৰু ৰূপে দর্শন করিয়া উদ্যান হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। কুমার উদ্যান হইতে প্রত্যাবর্তন করিতেছেন, এমনসময়ে শাক্যসিংহ। দেখিলেন, বিদ্যাদেবী ভূতলস্থ যাবতীয় কবি উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণকে তথায় মনােহরপুরী প্রদান করিয়া বিদ্যানগর স্থাপন করিয়াছেন। নগরের শােভা অতি মনােহর। যিনি এক বার তৎস্থানে পদার্পণ করিয়াছেন, তাহার কোন ক্রমেই সে স্থান পরিত্যাগ বাসনা জন্মে না। রাজকুমার এ উদ্যানের দর্শন কাৰ্য শেষ করিয়া এক্ষণে বাম পাশ্বস্থ উদ্যানে প্রবেশ করিলেন। এ কাননে পূর্বোক্ত কাননের ন্যায় সারবান বিস্তীর্ণ শাখা প্রশাখাদি সম্পন্ন সুখময় সুগন্ধ পুষ্পময়, সুস্বাদু সুরসাল স্বাস্থ্য- কর ফলবান। একটী বৃক্ষও নাই। সমুদায় বৃক্ষই হীনসার, গন্ধ হীন বা অত্যল্প-সৌরভ-বিশিষ্টপুষ্পশােভিত এবং ক্ষত ও ভগ্নাবশিষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখাপ্রশাখাদি-সম্পন্ন বটে, কিন্তু উদ্যানটী মনােহর শােভা ধারণ করিয়া যাত্রিকদিগের নানা প্রকার সুখবৃদ্ধি ও মনঃস্ফূৰ্ত্তি জন্মাইয়া থাকে। তাহার শােভ দর্শন-লোলুপ হইয়া অনেকেই তথায় গমন করিয়া থাকেন। রাজকুমারও সর্ববরপ্রদ যত্ন ও এম বীরদ্বয় সঙ্গে করিয়া তৎকাননে প্রবেশ করিলেন। কুমার কাননে প্রবেশ মাত্রই সম্মুখে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাদপ শ্রেণী দেখিতে পাইলেন। ইহাদের রূপ অতি মনােহর, জগতস্থ সর্বপ্রকারের লােকই ইহাদের সৌন্দৰ্য্য দর্শনে বিমাে- হিত হইয়া থাকেন। এ সকল পাপ শ্রেণী উত্তম রূপ ফলপ্রদ নহে; পুষ্পসকল সৌরভবিহীন হইলেও অশেষ শােভার আকর। কতিপয় বিচক্ষণ ব্যক্তি ইহাদের পুষ্প চয়ন করিয়া বিদ্যাদেবীর অর্চনায় তৎপর আছেন; কিন্তু তাহারা যত দূর ২৪ শাক্য সিংহ। শ্রমশীল কাৰ্যকালে সেরূপ সুস্বাদু ফল গ্রহণ করিতে পারেন । রাজকুমারও তাহাদের অনুবর্তী হইয়া কতিপয় দিবস ফলপুষ্পোপশােভিত মনােহর শিল্পবৃক্ষের পুষ্প চয়ন করিয়া নানা প্রকার রমণীয় হার গ্রন্থন করত বিদ্যাদেবীকে উপ- হার প্রদান করিলেন। এরূপে ক্রমে উপবনস্থ যাবতীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃক্ষসকল পৰ্যবেক্ষণ করিয়া অবশেষে জগজ্জন বিখ্যাত শবৃক্ষ মূলে উপস্থিত হইলেন। এ তরুটী বিলক্ষণ স্থূল, কিন্তু ততদূর সারবান কি শােভাকর নহে; তথাপি নানা দেশীয় লােকই এ বৃক্ষের পরিচৰ্য্যায় তৎ- পর আছেন। দিদেশাগত বীর-চিপূর্ণ-মুখশ্র অসীম সাহ- সের আকর যুবা পুরুষগণ তাহার মুকুল সংগ্রহ করিয়া বিদ্যা- দেবীর চরণে অঞ্জলি অর্পণ পূর্বক তাহার প্রসাদে সেই বৃক্ষের ফল গ্রহণ করিয়া থাকেন। সাহসী যুবা বীরপুরুষগণ ভিন্ন বালক কি বৃন্ধদশাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদিগের তথায় প্রবেশ অধিকার নাই। তথায় গমন মাত্রই ভয় নামে বৃক্ষমূলস্থ একটা রাক্ষস তাঁহাদিগকে গ্রাস করিতে অগ্রসর হইলে তাঁহারা আত্মরক্ষার জন্য তৎপথ হইতে পলায়ন করেন। রাজকুমারের তথায় প্রবেশ কালে ঐ রাক্ষসটা এক বার তাঁহাকেও বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করিয়াছিল। কিন্তু তাঁহার প্রিয় সহচর সাহস অচিরেই নিশাচরের প্রাণ সংহার করিয়া কুমারকে নির্বিঘ্নে শস্ত্রবৃক্ষমূলে আনয়ন করিলেন। তিনি নিজ সহচর সাহস, যত্ন, ও শ্রমের সহায়তায় অনতিবি- লম্বেই তত্রস্থ যাবতীয় ভ্রমণকারীকে পশ্চাৎ করিয়া বিস্তর পুষ্প চয়ন করত বিদ্যাদেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করিলেন। ৩ শাক্যসিংহ। পূৰ্ব্বদর্শিত শাস্ত্রকাননের চতুষ্পশ্ব যেরূপ কবিদিগের আবাস স্থল, সেইরূপ এই সশিল্প শস্ত্র কাননের চতুষ্পশ্বে যাব- তীয় শিল্পকার ও মহাকায় বীরপুরুষদিগের নিবাস। রাজকু- মার এ সমুদা অবলােকন করিয়া বিদ্যাদেবীর চরণ দর্শন পূৰ্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। মহানুভব শিক্ষক মহাশয় নৃপসন্নি- ধানে গমনপূর্বক কুমারের বিদ্যানগর দেখা শেষ হইয়াছে, এই . নিবেদন করিলেন। মহারাজ বহুসংখ্যক পরীক্ষক নিযুক্ত করিয়া পুত্রের পরীক্ষা করিলেন। কুমার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন শুনিয়া মহারাজ অপার আনন্দরসাভিষিক্ত হইয়া নানা প্রকার মঙ্গলাচরণ ও উৎসবে দিনাতিপাত করিতে লাগিলেন। শিক্ষক মহাশয় রাজদত্ত বিবিধ পুরস্কার গ্রহণ করিয়া নৃপ- সন্নিধানে কুমারকে প্রত্যর্পণ করিলেন। কুমারও প্রণাম পূৰ্ব্বক গুরু সন্নিধানে বিদায় গ্রহণ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। রাণী পুরবাসিনী সহচরীগণ পরিবেষ্টিত হইয়া কুমার- সম্পর্কে নানা প্রকার কথােপকথন করিতেছিলেন, এমন সময়ে কুমারকে আগত দেখিয়া সাদরে অঙ্কে স্থাপন করিলেন। কুমার মাতৃচরণে প্রণত হইয়া অারােহণ করিলে, রাণী নানা- প্রকার মাঙ্গলিক বার্তা জিজ্ঞাসা করিয়া অশেষবিধ সুস্বাদু ফল ও মিষ্টান্ন প্রদান করিলেন। কুমার তৎসমুদায় গ্রহণ পূর্বক মাতৃ সমীপে বিদায় গ্রহণ করিয়া মাতৃসমা ধাত্রী বিধুমুখীকে নানা প্রকার মধুর সম্ভাষণ করিয়া বিশ্রামার্থ নিজ ভবনে গমন করি- লেন। তথায় পণ্ডিত ও কবিগণ পরিবেষ্টিত হইয়া শাস্ত্রের (৩) শাক্যসিংহ। আলােচনায়ও কাব্যরসের আস্বাদনে পরম কুতূহলে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। চতুর্থ অধ্যায়। কুমার সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী হইয়া কতিপয় দিবস তরুণ- বয়স্ক সুশিক্ষিত পারিষদবর্গ-পরিবৃত থাকিয়া পরমাহলদে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। তৎকালে কুমারের সভার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে বৃহস্পতি প্রভৃতি দেবগণ বেষ্টিত অমর- সভা প্রায় বােধ হইত। তাহার প্রাসাদ ভারতবর্ষের যাবতীয় কবিগণের আরানস্থল ছিল। রাজভবন এইরূপ মহােলস, পূর্ণ আছে, এমন সময়ে ভয়ানক ঝঞ্জাবাত প্রবাহিত হইয়া সে আনন্দকানন বাত্যাহত কদলীকানন প্রায় সম্পূর্ণ ভগ্ন করিয়া ফেলিল। একদা রাজকুমার নিজ বিশ্রাম-গৃহের পার্শ্বস্থ উপবনের শােভা সন্দর্শন করিতেছেন, এমন সময়ে তাহার মনে কি এক ভাবের উদয় হইল। তিনি অতি সত্বরে তথা হইতে বিশ্রাম গৃহের এক নির্জন প্রকোষ্ঠে উপস্থিত হইয়া পার্শ্ব চর দ্বারা দ্বার- পালকে আহ্বান করিলেন। দ্বারপাল অবিলম্বে কুমার সন্নি- ধানে উপস্থিত হইয়া যথাবিধি প্রণাম করিয়া গললগ্নীকৃতবাসে কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান রহিল। কুমার তাহাকে কহিলেন, প্রতিহারি ! জনসমাজ তােমার কর্তব্যনিষ্ঠার ভূরিতর প্রশংসা করিয়া থাক। তােমার সতকা ও কাৰ্যদক্ষতা-গুণে পুরবাসিগণ সদাই সুখে কালযাপন করিতেছেন। তােমার কায্যে আমিও পরম সন্তোষ লাভ করিয়াছি। এক্ষণে তুমি শাক্যসিংহ। ২৭ আর একটা কৰ্ম্ম করিয়া আমার, পরমােপকারি-শ্রেণী-মধ্যে পরিগণিত হও। দ্বারী কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল, রাজ- কুমার ! নিজ বেতনভােগী দাসের প্রতি আজ্ঞা করুন; এ দাস প্রাণান্তেও আপনার অনুজ্ঞাপালনে পরাঙ্মুখ হইবে না। এ শরীর আপনার অন্নে পালিত। আপনার কাৰ্য্যে যদি ইহার নাশ হয়, তাহাতেও আমি আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিব। আপনার যাহা ইচ্ছা হয় আজ্ঞা করুন, আমি প্রতিপালন করিব। রাজকুমার বলিলেন দ্বারপাল ! তােমার কথাতেই আমার শ্রবণ অমৃত-স্পর্শ করিল, এবং তােমাকেও প্রভুভক্তির চির দৃষ্টান্ত করিয়া রাখিল। আমার অধিক কিছুই বক্তব্য নাই, তােমাকে কেবল এই মাত্র বলিতেছি যে, আমার আদেশ ভিন্ন কাহাকে এ বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিতে দিবে না। দেখিও যেন কোন ক্রমেই কেহ এখানে আসিতে না পায়। প্রতিহারী কিঞ্চিৎ বিস্মিত হইল, কিন্তু প্রভুর আজ্ঞা ভাবিয়া, যে আজ্ঞা বলিয়া প্রস্থান করিল। রাজকুমার প্রতিহারীকে বিদায় করিয়া পার্শ্বচরদিগকে স্থানান্তরে যাইতে অনুমতি দিয়া স্বয়ং এক নির্জন প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলেন। তথায় তাঁহার মানসভৃঙ্গ বিজ্ঞানসরসীজাত চিন্তাসয়ােরুহে বিরাজ করিতে লাগিল। তিনি বনপাদপশ্রেণীর গাট পরিচিন্তায় মনােনিবেশ করিলেন। আহার নিদ্রা পরি- ত্যাগ করিয়া একাসনে উপবেশন পূর্বক অনন্যমনে এক বৃক্ষ পানেই নিয়ত চাহিয়া রহিলেন; কেহ কোন কথা জিজ্ঞাসা করি লেও উত্তর দেন না। মহারাজ ও মন্ত্রিবর্ণ কুমারের এই শােচনীয় ভাবের কথা শ্রবণ করিয়া তাহার গূঢ় মৰ্ম্ম গ্রহণ না করিয়াই ১৮ শাক্যসিংহ। নানারূপ বৃথা কথার আন্দোলন করিতে লাগিলেন এবং এটা একটী পীড়া মনে করিয়া চিকিৎসা কাৰ্য্য আরম্ভ করাইলেন। ভিষকগণও তাঁহার কি রােগ হইয়াছে তাহার কিছুই নির্ণয় করিতে পারিলেন না। সুতরাং অচিরেই অকৃতকার্য হইয়া পরাঙ্মুখ হইলেন। পরে নানা প্রকার দৈবক্রিয়া আরম্ভ হইল তাহাতেও কিছুই প্রতিকার হইল না। এ ব্যাধি চিকিৎসার অসাধ্য, চিন্তা-রােগ বলিয়া নির্ণীত হইল। তখন রাজস- ভাসগণ তাহারই প্রতিবিধান চেষ্টা আরম্ভ করিলেন। একদা নিশীথ কালে মহারাজ নিজ বিলাস-ভবনে প্রবেশ করিয়া মনােহর দিরদরদ-নির্মিত খট্টাঙ্গোপরি বিচিত্র মখমল শয্যায় উপবিষ্ট হইলেন, এমন সময়ে সেই বিলাসভবনস্থ নানা- বিধ প্রস্তরের আলােকে ও প্রসারিত গবাক্ষ দিয়া গৃহমধ্য পতিত চালােকে বিলাসসুখের সমধিক উন্নতি সাধিত হইতে লাগিল। পতিভক্তিপরায়ণ রমণী পদসেবাদি সমাপন করিয়া পাশ্বে উপবেশন করিলেন। সখীগণ কেহ চামর ব্যজন, কেহ বিলাসযােগ্য তাম্বুল, কেহ বা সুমিষ্ট পয়, কেহ বা চন্দন ও পুষ্প সজ্জা প্রদান করিতেছেন; কেহ বা বিবিধ সংগীতা- লােচনায় মন্দির আনন্দ পূর্ণ করিতেছেন; এমন সময়ে রাণী কথাপ্রসঙ্গে সুমধুর স্বরে কহিলেন, প্রাণবল্লভ! অনেক দিন হইল কুমারকে না দেখিয়া আমার মন যার পর নাই ব্যাকুল ও সংসার অরণ্য-প্রায় বােধ হইতেছে। কুমার কেনই বা অন্তঃপুরে প্রবেশে বিরত আছেন ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না, আরাে শুনিলাম তিনি নাকি অকূল চিন্তার্ণবে মগ্ন থাকিয়া কাহারাে সহিত কোন আলাপ না ;
শাক্যসিংহ। ২৯ করিয়া একাকীই নির্জনে বাস করিতেছেন। আপনি অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক রজনী প্রভাতে তাহাকে আমার নিকট পাঠাইয়া দিবেন। মহারাজ রাণীর এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, প্রিয়ে! কুমারের কথা অকথ্য ; কি জন্য যে তাহার. এরূপ অচিন্তনীয় অবস্থা ঘটিল, রাজসভা তাহার বিন্দুমাত্রও বুঝিতে পারিতেছে না। কুমার নির্বোধ বালক নন, তাহার বুদ্ধি অতি তীক্ষ বিদ্যাও প্রচুর লাভ করিয়াছেন। অধিক কি, তাহার মত বিজ্ঞ আমার সভায় নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এমত অবস্থায় কুমারের শােচনীয় ভাব গ্রহণ কেবল আমাদের মন্দ ভাগ্যের পরিচয় মাত্র। বিধিকৃত কাৰ্য কাহারই খণ্ডনের সাধ। নাই; মহারাজ এই প্রকার আক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে বাণী বলিলেন, প্রাণেশ্বর! অস্থির হইবেন না, ধৈৰ্য্যাবলম্বন করুন। কুমার এক্ষণে সর্ব প্রকারে সুশিক্ষিত হইয়া গুণিগণার্থ- গণ্যরূপে পরিণত হইয়াছেন। প্রজাপুঞ্জ ভূয়ােভূয়ঃ কুমারের গুণ- কীৰ্ত্তন করিয়া তাহার রাজ্যাভিষেকের ইচ্ছা করিতেছে। আপ নিও যৌবন কানন অতিক্রম করিয়া চরম ক্ষেত্রে পদার্পণ করিয়া ছেন ; বুদ্ধি, বল, বিক্রম, ক্ৰমে শিথিল হইয়া আসিতেছে। প্রাণেশ ! আমাদেরও আর দ্বিতীয় পুত্র নাই; দৈবৰটনায় কখন কাহার অদৃষ্টে কি ঘটে বলিতে পারা যায় না। আমার * বিবেচনায়, অনতিবিলম্বে কুমারের উদ্বাহ-কাৰ্য সুসম্পন্ন করুন, পরে রাজ্যভার তাহার হস্তে সমৰ্পণ করিয়া আমাদের ধৰ্ম পরিচিন্তায় তৎপর হওয়া কর্তব্য। মহারাজ রাণীর এই প্রকার বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, প্রাণাধিকে ! আমি
শাক্যসিংহ।
তােমার কথায় পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। যে রাজার
তােমার ন্যায় মন্ত্রী, তঁাহার রাজ্যে কোন কালেও অশুভ
প্রবেশ করিতে পারে না; যাহার গৃহে তােমার ন্যায় গৃহিণী
অধিষ্ঠিতা, তাহার মানােভৃঙ্গ নিরবধি শান্তিরূপ অতুল
সুখামৃত পান করিতে থাকে। আজ হইতে জানিলাম তুমিই
আমার গৃহলক্ষ্মীরূপে রাজভবনে অশেষ মঙ্গল প্রদান করি-
তেছ ; এবং তােমার সুমন্ত্রণাই আমার রাজ্যরক্ষার প্রধান
কারণ। মহারাজ এইরূপ অশেষ প্রকারে রাণীর প্রশংসা
করিয়া নানাবিধ সুখাপে নিশা যাপন করিয়া প্রভাতে রাজ
সভায় প্রবেশ করিলেন।
নৃপকুলচন্দ্র মন্ত্র ভবনে প্রবেশ করিয়া প্রতিহারীকে
আহ্বান করিয়া কহিলেন, প্রতিহারি! তুমি অবিলম্বে গমন
করিয়া মন্ত্রিবরকে বল আমি তাহার দর্শনাভিলাষী হইয়াছি।
প্রতিহারী সত্বর-পদে মন্ত্রিসদনে গমনপূর্বক নিবেদন
করিল, মহাশয়! মহারাজ অতি সত্বর আপনাকে স্মরণ
করিয়াছেন। মন্ত্রিবর অসময়ে আননিবন্ধন যুগপৎ কিঞ্চিৎ
বিস্মিত ও চমৎকৃত হইলেন; কিন্তু যাহা হউক কোন
বিশেষ ঘটনা উপস্থিত হইয়াছে মনে করিয়া প্রতিহারীর সঙ্গে
অতি সত্বর নৃপসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। মহারাজ উচিত
আসন প্রদান পূর্বক মন্ত্রিবরের সংবর্ধনা করিলে প্রতিহারী
বিদায় গ্রহণ করিল। মহারাজ ও মন্ত্রী উভয়ের কুমারসম্পকে
নানা প্রকার কথােপকথন চলিয়া অবশেষে এই স্থির হইল যে
তাহাকে চিন্তাসাগর হইতে উদ্ধারের দারগ্রহণই একমাত্র
তরণী। অতএব শীঘ্রই তাহার উদ্বাহকার্য সম্পন্ন করা উচিত।
শাক্যসিংহ। এক্ষণে তদ্বিষয়ে কুমারের মত গ্রহণের ভার সচিবশ্রেষ্ঠের প্রতিই অর্পিত হইল। তিনি কুমারের গৃহদ্বারে উপস্থিত হইলে দ্বারপাল কুমার সদনে গমন করিয়া তাঁহার আগমনবার্তা নিবেদন করিল। রাজকুমার ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া দ্বারবানের প্রতি মন্ত্রিবরকে আনয়নের আদেশ করিলেন। দ্বারী প্রতিনিবৃত্ত হইয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া পুনরায় কুমারসদনে উপস্থিত হইল। রাজকুমার সচিবপুঙ্গবের হস্ত ধারণপূৰ্ব্বক উচিত আসন প্রদান করিয়া দ্বারীকে বিদায় দান করিলে মন্ত্রিবর সবিনয়ে নিবেদন করিতে লাগিলেন রাজকুমার! মহারাজ আমাকে আপনার নিকটে কয়েকটী কথা জিজ্ঞাসা করিতে পাঠাইয়াছেন; আজ্ঞা হইলে জিজ্ঞাসা করি,উচিত উত্তর দানে কৃতার্থ করুন। রাজ- কুমার বলিলেন,মহারাজের আজ্ঞা আমার শিরােধার্য্য,আপনার যাহা জিজ্ঞাস্য জিজ্ঞাসা করুন। মন্ত্রিবর কহিলেন, কথা বড় অধিক নয় ; মহারাজ শীঘ্রই আপনার উদ্বাহকাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিতে বাসনা করিয়াছেন, এক্ষণে আপনার অভিপ্রায়মাত্র প্রতীক্ষণীয়। রাজকুমার সহসা কোন উত্তর প্রদান না করিয়া স্থিরচিন্তার নিমিত্ত মন্ত্রিবরকে সপ্তাহ অপেক্ষা করিতে কহি লেন। সপ্তাহ পরে তিনি প্রথমে বিবাহে অসম্মত হইয়াছিলেন; কিন্তু পরে আবার মনে মনে কি ভাবিয়া সম্মতি প্রকাশ করিলেন। অনন্তর মন্ত্রির রাজসদনে গমন করিয়া কুমার বিবাহে সম্মত আছেন, ইহা মহারাজকে নিদেন করিলেন। মহারাজ কুমারের বিবাহে অসম্মতি শুনিয়া প্রথমে যেমন দুঃখিত হন, শেষে আবার সম্মতিবার্তা শ্রবণে তাহার শত গুণ
৩২
শাক্যসিংহ।
।
অধিক আনন্দিত হইয়াছিলেন। তিনি কর্মচারিদিগকে আহ্বান
করিয়া বিবাহের আয়ােজন করিতে অনুমতি দিয়া, মন্ত্রিবরকে
একটী সুকুমারী পাত্রী পরিদর্শন করিতে আদেশ করিলেন।
বিবাহােপযােগী প্রয়ােজনীয় সমুদয় দ্রব্য আহরণ হইল ;
মন্ত্রিবর নানা দেশ পরিভ্রমণ করিয়া মহারাজ দণ্ডপাণির পরম
সুন্দরী দুহিতা গােপাকে পাত্রী মনােনীত করিলেন।
রাজকুমারের বয়স কিঞ্চিদূন পঞ্চবিংশতি বর্ষ ; অবয়ব
এরূপ দীর্ঘ যে অন্যের হইলে তাহাতে তাহাকে নিতান্ত কুরূপ
করিয়া তুলিত; কিন্তু তাহার প্রসন্নতি-বিশিষ্ট বদন, বিশাল
বক্ষ এবং অঙ্গের স্থূলতায় তাহার অলৌকিক সৌন্দর্য প্রতি-
হত না হইয়া বরং সমধিক উন্নতি ধারণ করিয়াছে। গােপার
বয়স কিঞ্চিদধিক এয়ােদশ বৎসর ; তাহার যৌবন উদ্যান
সুরসিক যুবা পুরুষদিগের আরামস্থল হইয়া উঠিল। তঁাহাব
ফণিরূপিণী বেণী অনেকেরই সাপিনীরূপে ভ্ৰম জন্মাইয়া ক্রমে
নিতম্ব অতিক্রম করিয়া পৃথিবীর প্রতি ধাবিত হইয়াছে।
অলকারেখা-পরিশােভিত সীমন্ত ঘনশ্যামবর্ণ কেশমধ্যে
মেঘান্তরস্থিত বিদ্যুৎ শােভায় শােভিত ; ললাটের
চতুষ্পর্শ্বে
কুঞ্চিত কেশাবলী কর্ণপৰ্যন্ত লম্বমান থাকিয়া ললাটের
অসীম সৌন্দৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছে ; ললাট নিয়ে ঈষৎ বক্র
যুগল কামধনুর শােভায় পরিশােভিত ; বিশাল কর্ণায়ত
লােচনদ্বয় অবিরাম পলক ক্ষেপণে খঞ্জনের গৰ্ব খর্ব করি-
তেছে ; তন্নি তিলফুলের দর্পহারী নাসিকা মুখমণ্ডলের
অপরূপ শােভা সম্পাদন ও হাদ্যপূর্ণ মুখপদ্ম বিম্বেষ্ঠ
পরিবৃত হইয়া প্রেমদার প্রেমের পরিচয় দান করিতেছে।
।
শাক্যসিংহ।
সূল গণ্ডদেশ নিয়ে বিলাসক্ষুৎপিপাসাক্রান্ত নাগরদিগের
তৃপ্তিজনক বিস্তীর্ণ বক্ষ-ক্ষেত্রে মানববৃক্ষজাত দাড়িম্বরূপে
কুচযুগল
অনির্বচনীয় শােভা সম্পাদন করিতেছে।
গােপার বর্ণ অতসীপুষ্পের আভা ধারণ করিয়া সহর্ষে বিদ্যু
তকে নিন্দা করিতেছে। চরণােৎপাদিত নূপুরধ্বনি ভ্রমরকে
ঝঙ্কার এবং সুতানসংমিলিত কণ্ঠধ্বনি ছয় রাগ ছত্রিশ রাগি,
পীর পরিচয় প্রদান পূর্বক পিকবরকে সংগীত শিক্ষা
দিতেছে। তাহার এমন অধিক কোন অলঙ্কার নাই, তথাপি
অলৌকিক সৌন্দর্য প্রকাশ হইতেছে।
দণ্ডপাণি যখন দেখিলেন কন্যার যৌবনপদ্ম প্রায় প্রস্ফু
টিত হইয়াছে, তখন তিনি তদুপযুক্ত সৎপাত্রের অনুসন্ধান
করিয়া কোন এক তরুণবয়স্ক রাজকুমারের সহিত তাহার
বিবাহ স্থির করিয়া সাদরে তাহাকে আনয়নপূর্বক নিজ
বাটীতেই রাখিয়াছিলেন, পরে যখন শুনিলেন, নরপুঙ্গব শাক্য
কুমার তাঁহার দুহিতার পাণিগ্রহণের অভিলাষ করিয়াছেন,
তখন তিনি তাহাতে অর্ধসম্মতি প্রকাশ করিলেন; কিন্তু
কোন বিশেষ কারণে পূৰ্ব্ব আনীত রাজকুমারকে সহসা
বিদায় দিতে পারিলেন না। অনতিবিলম্বে শাক্যকুমার আসিয়া
নিজ বাহুবলে এবং ধীশক্তিতে পূৰ্ব আনীত রাজকুমারের
যাবতীয় গুণ অতিক্রম করিলে তিনি অগত্যা তাহাদের
বিবাহে সম্মতি দান করিয়া স্বয়ং প্রস্থান করিলেন।
তাঁহার গমনের পর দণ্ডপাণি কন্যার বিবাহের যাবতীয়
আয়ােজন করিয়া পণ্ডিতগণ আহ্বান পূৰ্ব্বক বিবাহের দিন
স্থির করিলেন। তাঁহার ভবন মহােৎসবে পরিপূর্ণ হইল ;
৩৪
শাক্যসিংহ।
পুরজন সকলেই গােপার বিবাহরূপ আনন্দনীরে অবগাহন
করিতে লাগিলেন। স্থানে স্থানে নৃত্য গীত ও বাদ্য কোলা-
হলে কর্ণ বধির হইয়া উঠিল ; গৃহসকল বিচিত্র সজ্জায় সজ্জিত
হইয়া দর্শকদিগের চিত্ত আকর্ষণ করিতে লাগিল। প্রত্যেক
গৃহের উপরিভাগে শ্বেত ধ্বজাসকল উড্ডীন হইয়া অব্যক্ত
শব্দ দ্বারা জনসমাজে গােপার বিবাহসংবাদ প্রচার করিতে
লাগিল। দ্বার-দেশের উভয় পাশ্বে রামরম্ভা রােপিত ও পল্লবা-
বৃত পূর্ণ কুম্ভ, মঙ্গলাচরণের নিমিত্ত স্থাপিত হইতে লাগিল।
পুরীমধ্যে পুরবাসিনী ও প্রতিবাসিনীগণ একত্র মিলিত
হইয়া অশেষবিধ মঙ্গলাচরণ ও মুহুর্মুহু হুলহুলি প্রদান করিয়া
পুরবাসী সকলের মনে অপার আনন্দ দান করিতে লাগিল।
বিবাহসভা সুসজ্জিত হইল ; আগন্তুক যাবতীয় ভদ্র জন
সভা আয়ােহণ করিলে কুলাচাৰ্য্যগণ দাতা ও গ্রহীতার কুলের
পরিচয় দান করিলেন। পণ্ডিতগণ বিবিধ শাস্ত্রের পর্যা-
লােচনা করিয়া লগ্ন স্থির করিলে দণ্ডপাণি শুভ লগ্নে সৰ্বা-
লঙ্কারভূষিতা পরমা সুন্দরী গােপাকে বেদোক্ত মন্ত্রোচ্চারণ
করিয়া শাক কুমারকে দান করিলেন। নব দম্পতী যুগলের
পরস্পর শুভ দৃষ্টি হইলে উভয়েরই মনে অপার আনন্দ রসের
উদ্ভব হইয়াছিল। সে সময় গোপার মুখে ঈষৎ হাস্যও প্রকাশ
পাইয়াছিল। চতুর্দিকে কুলাঙ্গনাগণ আনন্দময় হুলহুলি
প্রদান করিলেন। নব দম্পতী বিলাসভবনে বরশয্যায় গমন
করিলে ভদ্রসমাজ সভা ভঙ্গ করিয়া স্ব স্ব নিবাসে প্রস্থান
করিলেন।
বর ও পাত্রী বরশয্যায় উপবেশন করিলে সখীরা কেহ
শাক্যসিংহ। চামর ব্যজন, কেহ তাম্বুল কপূরাদি দান, কেহ সুমিষ্ট পয়ােদন, কেহ বা সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন করিতে লাগিল। উভয়েরই মনে কথা কহিবার অভিলাষ হইতেছে কিন্তু প্রথম কে কোন সূত্র অবলম্বন করিয়া কথা কহিবেন ইহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। গােপার বাক্যগুলি একবার কণ্ঠ পৰ্যন্ত আসিয়া দারুণ লজ্জারূপ বজ্রাঘাত দ্বারা প্রতিহত হইয়া আবার অন্তরে প্রবেশ করিতেছে। তাঁহার মুখ অব- গুণ্ঠনে আবৃত, তিনি বসনমধ্য হইতে রাজকুমারের প্রতি ঘন ঘন সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। সখী নিকটে রহি- য়াছে বলিয়াই হউক বা আর কোন কারণেই হউক, রাজ- কুমারও কিছু কাল নিস্তব্ধ থাকিয়া বলিলেন; প্রিয়ে। ঐ দেখ চন্দ্রমণ্ডল অগ্নিজাল বিস্তার করিতেছে। গােপ বদন সম্পূর্ণ আচ্ছাদন করিলেন। তখন কুমার বলিলেন, প্রেয়সি! এ মুখচন্দ্র বসন মেঘে বৃথা আচ্ছাদন করিলে কেন ? গগনালম্বিত চন্দ্র বঘ্নি বরিষণ করিলে এ চন্দ্ৰমাই অমৃত বরি- ষণ করিয়া দগ্ধাঙ্গ শীতল করে। গােপা অধধামুখী হইলেন। রাজকুমার তখন সখীকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন,ভাল সখি? তােমাদের সখীকে এ পর্যন্ত কথা কহিতেও শিক্ষা দাও নাই? কোন সখী বলিল, মহাশয় ! জগতে সমানে সমানে মিলন হইয়া থাকে; আমি হীন-কুলােবা, আপনাকে কি উত্তর দিব ; তবে কেবল এই মাত্র বলিতেছি যে ইহাকে আপ- নার ন্যায় সৰ্বগুণসম্পন্ন ব্যক্তিতে দান করিতে পারিব বলিয়া ইহাকে কথা শিখাইবার আমাদের প্রয়ােজন হয় নাই। এক্ষণে আপনি ইচ্ছানুরূপ শিক্ষা দিন। !
শাক্যসিংহ।
রাজকুমার পুনৰ্ব্বার বলিলেন ; প্রিয়ে! বদন তুলিয়া ঐ
দেখ সূর্য পশ্চিম দিক আলাে করিয়া ক্ৰমে উর্ধে উখিত
হইয়া কৃশানুসম কর বিস্তার দ্বারা দিঙ মণ্ডল দগ্ধ করিতে
উদ্যত হইয়াছেন। গােপা রাজকুমারের বাক্য” শ্রবণ করিয়া
বসন মধ্য হইতে মৃদু মধুর স্বরে কহিলেন; প্রাণেশ! যিনি
‘দর্শন মাত্রে মন প্রাণ হরণ করিয়া থাকেন, তাঁহাকে পরিচয়
দিতে কাহার না ভয় হয় ? আপনি বাক্যামৃত বর্ষণে জগত
শীতল করেন,আমি জগৎ ছাড়া নহি। অতএব আমার আবার
সুধাকর বা প্রভাকরের বত্নি বর্ষণে ভয় কি ? ক্ৰমে ভয় নাশ
হইল। লজ্জাও
দূরে
পলায়ন করিল। গােপা অবগুণ্ঠন মুক্ত
করিয়া নানাপ্রকার সুখালাপ আরম্ভ করিলেন। সঙ্গীত
আললাচনাদি বিবিধ বিলাস-সুখে নিশা যাপিত হইল।
রজনী প্রভাতকল্প দণ্ডপাণি শয্যা হইতে গাত্রোখান
করিয়া প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপন পূৰ্ব্বক যাবতীয় আমন্ত্রিত
ব্যক্তিকেই উপযুক্ত উপহার প্রদান করিয়া বিদায় করিলেন।
তাহারা দণ্ডপাণির ভদ্রতায় পরম সন্তোষ লাভ করিয়া স্ব স্ব
স্থানে প্রস্থান করিলেন; মহােৎসবও ক্রমে অন্তর্ধান হইতে
লাগিল। রাজকুমার তথায় সপ্তাহকাল অবস্থিতি করিয়া
গােপা সহ নিজালয়ে গমন করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে
দণ্ডপাণি গােপার পরিচর্যার্থ বহুসংখ্যক দাসী এবং রাজকুমা-
রকে নানাবিধ উপহার ও যৌতুক প্রদান করিলেন। কমার
তৎ সমুদায় সঙ্গে লইয়া নিজ রাজধানী কপিলবস্তুতে উপনীত
হইলেন।
রাজকুমার স্ব নগরে প্রবেশ করিলে নগর উৎসবে পরিপূর্ণ
শাক্যসিংহ। ৩৭ হইল ; রাজপথে স্থানে স্থানে নানা প্রকার পত্রময় ফটক, তৎ পাশ্বে কদলীবৃক্ষ, পূর্ণকুম্ভ, দধিপূর্ণ ভার, সবৎসা ধেনু ও বরা- গনা ইত্যাদি মাঙ্গল্য চিতু সকল স্থাপিত হইল। প্রাসাদসকল অশেষবিধ সজ্জায় ও বিচিত্র ধ্বজায় পরিশােভিত হইয়া নগরে কুমারের আগমন-বাৰ্তা জ্ঞাপন করিতে লাগিল। রাজ- ভবন গান বাদ্য ইত্যাদি নানারূপ আমােদে পরিপূর্ণ হইল । রাজকুমার ক্রমে নগর অতিক্রম করিয়া পুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। চতুর্দিকে মঙ্গলময় হুলহুলি ধ্বনি হইতে লাগিল। তিনি পিতৃচরণে প্রণাম পূৰ্ব্বক অন্তঃপুরে গমন করিয়া মাতৃচরণে প্রণাম ও ধাত্রী বিধুমুখীকে সুমিষ্ট সম্ভাষণ করিয়া বিশ্রাম- ভবনে গমন করিলেন। গােপা রাণীর চরণে বহুমূল্য বস্ত্র ও রত্নালঙ্কার প্রদান পূর্বক প্রণাম করিলে রাণী তাহাকে আদরে বক্ষে স্থাপন করিয়া নানাপ্রকার মিষ্ট সংলাপ করিতে লাগিলেন। নাগরীগণ রাজ- কুলবধু দর্শনার্থ ক্রমে দলে দলে নৃপ-ভবনে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। গােপার সহচরীরা তাঁহাদিগকে উচিত সম্মান করিয়া গাোের অবগুণ্ঠনপট উন্মােচন করিলে সকলেই নব- বধুর মুখ দর্শন ও উচিত উপঢৌকন প্রদান করিয়া বিধাতাকে। সহস্র সহস্র ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। রাণী হাদি গকে সুমধুর সম্ভাষণে ও উচিত সম্মানে বিদায় করিয়া দিলেন। গােপার স্বভাবগুণে শীঘ্রই সহচরী ও যাবতীয় পুরবাসিনীগণ তাহার একান্ত অনুগত হইয়া উঠিল। রাণী সুশীলা, গুণযুতা, অশেষ-রূপলাবণ্য-সম্পন্না, প্রাণাধিকা পুত্রানুরূপা পুত্রবধূ প্রাপ্ত হইয়া পরম আহলাদে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। ( ৪ ) سوان শাক্যসিংহ মহারাজ পুত্রের উদ্বাহ-কাৰ্য্য সমাপনান্তে কুমারকে যৌব- রাজ্যে অভিষেক করিয়া একান্ত আনন্দরসাভিষিক্ত চিত্তে কালযাপন করিতে লাগিলেন। পঞ্চম অধ্যায়। মহাসমারোহে কুমারের যৌবরাজ্যাভিষেক সুসম্পন্ন হইল, কিন্তু তাহার চিন্তার্ণব ক্রমে প্রশান্ত না হইয়া বরং উথলিতে লাগিল। এক্ষণে তিনি জীবন ও মৃত্যুর গাঢ়-পরিচিন্তায় কাল তিপাত করিতে লাগিলেন। তিনি ভাবিলেন, এ জগতে কিছুই অবিনশ্বর কি প্রকৃত নয়; জীবন কাষ্ঠ-ঘর্ষণেৎপাদিত অগ্নি- স্ফুলিঙ্গ প্রায় স্বভাবতঃ তেজোময়। মানবগণ বলিতে পারেন যে, ইহা কোন সময় কোথা হইতে উৎপন্ন হইয়া কোথায় লয় হয়। মনুষ্যগণ যেরূপ তন্ত্রী-ধ্বনি শ্রবণে তাহার কার্য্য নির্ণয় করিয়াও উৎপন্ন লয়স্থান নির্ণয় করিতে পারে না; জীবনও সেইরূপ তন্ত্রীধ্বনিপ্রায়। জ্ঞানী লােকেরা বৃথা ইহার আবি ভাব ও তিরােভাব সম্পর্কে নানা প্রকার তর্ক বিতর্ক করিয়া থাকেন; এ জগতে অবশ্যই এ রূপ কোন শ্রেষ্ঠ পন্থা আছে, যাহা অবলম্বন করিয়া মনুষ্যগণ শান্তিলাভ ও দেহ তেজোময় করিতে পারেন। আমি যত্ন করিলে মনুষ্যে তেজ-প্রদান ও স্বয়ং সিদ্ধ ও মুক্ত হইয়া সমুদায় সংসারকেই ধৰ্ম্ম-পথে আন মন পূর্বক ধার্মিক মধ্যে পরিগণিত করিতে পারি। লােকস- আজ বৃথা মােহজালে আবদ্ধ হইয়া ধর্মের নির্মল সুখ অনুভব কবিতে পারে না, এ জগতে যত্নের অসাধ্য কিছুই নাই। নহারাজ কুমারকে এবম্প্রকার চিন্তা-মগ্ন অবলােকন শাক্যসিংহ। ৩৯ করিয়া তাহাকে চিন্তাসাগর হইতে উদ্ধার জন্য বিস্তর চেষ্টা পাইলেন। তিনি কুমারের আনন্দ-বদ্ধনার্থ প্রতিদিনই সুখ- সেব্য আনন্দ-কানন পরিদর্শনার্থ বহু অনুচর সহ কুমারকে সেই কাননে যাইতে অনুমতি করিলেন। কুমার পিতৃ আজ্ঞা পালনে পরাঙ মুখ হইতেন না। বিধাতার কাৰ্য্য লােকের অণুমাত্রও বুঝিবার সাধ্য নাই; লােকসমাজের অতি সাধারণ কয়েকটী ঘটনাই তাহার সংসার-ত্যাগের প্রধান কারণ হইয়া উঠিল। একদা যুবরাজ উদ্যান গমনাভিপ্রায়ে বহু অনুচর পরিবে- ষ্টিত হইয়া কাননের পূর্ব দ্বার দিয়া যাইতেছেন, পথি- মধ্যে অগ্ৰস্ত এক ব্যক্তিকে দেখিতে পাইলেন। তাহার সর্বাঙ্গে শিরা ও ধমনিসকল স্পষ্ট প্রকাশ পাইতেছে ; সর্ব শরীরের মাংস লােল ও দন্ত বিগলিত হইয়াছে, কেশ পক্ক হইয়া কাশের শােভ ধারণ করিয়াছে এবং শরীর মুহুর্মুহু কম্পিত হইতেছে। এরূপ চরম দশাপ্রাপ্ত জরাগ্রস্ত দণ্ডোপরি বস্থিত। বৃদ্ধকে দেখিতে পাইয়া তিনি সারথিকে সুমধুর স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন। সূত! ভাল দেখ দেখি এ লােকটী কে ? ওরূপ হওয়া কি উহার বংশের সাধারণ নিয়ম না ? প্রাণিমাত্রেরই স্বভা- বগত অদৃষ্টের ফল। সারথি সানুনয়বাক্যে নিবেদন করিল ; মহাশয়। এ ব্যক্তির চরমকাল উপস্থিত, ইহার বুদ্ধি শিথিল ও শক্তি দূরগত হইয়াছে এবং এ ব্যক্তি আত্মীয়বর্গ দ্বারা উপেক্ষিত হইয়াছেন। গৃহকাৰ্য্য নির্বাহে অশক্ত ও স্থবির হওয়ায় ইনি এক্ষণে লােক সমাজে অরণ্যজাত মৃত•শু-বৃক্ষ প্রায় পরিগণিত হইতেছেন; কিন্তু
৪০
শাক্যসিংহ।
এটা ইহার কুলের সাধারণ নিয়ম নয়, লােমাত্রেরই
যৌবন অন্তে বৃদ্ধ দশা উপস্থিত হয় ; আপনার পিতা, মাতা,
কি আত্মীয় বন্ধুবর্গ সকলকেই শেষকালে এই দশা প্রাপ্ত
হইতে হইবে। যুবরাজ বলিতে কি! এটা প্রাণিমাত্রেরই যমালয়
গমনের ঘােষণাপত্র।
সারথির বাক্যাবসান হইলে রাজকুমার বলিলেন, আহা!
মনুষ্যগণ এতদূর অনভিজ্ঞ,বিবেক শক্তিহীন ও মুখ যে তাহারা
ভাবী প্রাপ্তব্য বৃদ্ধদশা প্রতি অণুমাত্রও বিবেচনা না করিয়া ক্ষণ
ভঙ্গুর যৌবন-মদে গর্বিত হইয়া অশেষবিধ কুকর্মে লিপ্ত হয়।
সারথে! অবিলম্বে রথগতি পরিবর্তন কর, আমিস্থানান্তরে
যাইব। সারথি আজ্ঞামাত্র রথের বিপরীত গতি সম্পাদন
করিল। আমি এক্ষণে দারুণ জরার হাত হইতে মুক্তি লাভের
উপায় কি করি! সুখসম্ভোগে আমার ফল কি হইবে ? এই
রূপ বাক্য প্রয়ােগ করিয়া যুবরাজ সুখময়
উদ্যান
গমনে বিরত হইয়া স্বনগরে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দ্বিতীয়
দিবসে যুবরাজ সুখময় আনন্দ কাননের দক্ষিণ দ্বারে
প্রবেশ করিতেছিলেন; এমন সময়ে রাজপথে একটী লােক
দেখিতে পাইলেন; তাহার শরীর শীর্ণ হইয়া অস্থিচর্ম ও শিরা-
বলী প্রকাশ পাইতেছে, সৰ্ব্বাঙ্গব্যাপী মালিন্য দেহের মনােহর
কান্তি হরণ করিয়া মলিনতারূপ অলঙ্কার প্রদান করিয়াছে ;
তাহার স্বজন বন্ধু বান্ধব কেহই নিকটে নাই এবং আবাসচ্যুত
হইয়া পথিমধ্যে পরিভ্রমণ করিতেছে; তাহার রূপ অতি ভয়া-
নক, নয়নদ্বয় ঘন ঘূর্ণিত হইয়া লােক সমাজে মৃত্যু যন্ত্রণার
পরিচয় প্রদান করিতেছে ; তাহাকে গ্রাস করিবার জন্য মৃত্যু
শাক্যসিংহ। অতি সত্বর গমনে পদক্ষেপ করিতেছে। রাজকুমার এই শােচ- নীয় অবস্থা দর্শন করিয়া সারথিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সূত। ভাল এ লােকটী কে ? সারথি কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল মহাশয়। জ্বর নামে একটা দুর্বত্ত দস্যু ইহার সুখ সৰ্বস্ব শরীরের অভ্যন্তরস্থ মহামূল্য অবােগিতা নামে মহারত্ন হরণ করায় এ ব্যক্তি একান্ত বিপর্যস্ত হইয়াছে, এবং এই অবসরে সর্বভুক কাল ইহার জীবন পর্যন্তও গ্রাস করিতে উদ্যত হইয়াছে ; এ ব্যক্তি যে রূপ দুর্বল হইয়াছে বােধ হয় দুৰ্বত্ত শীঘ্রই ইহাকে গ্রহণ করিবে। কুমার সারথির এবম্প্রকার বাক্য শ্রবণ করিয়া বিরস মনে কহিলেন, আহা! অবােগিতা স্বপ্নলব্ধ বিবরণ প্রায় ; স্বপ্নের ঘটনাসকল নিদ্রাভঙ্গ হইলে যেমন বিনষ্ট হয়, প্রাাতিক সূৰ্য্য কর লগ্নে শিশির বিন্দু যেমন নষ্ট হইয়া যায় অরােগিতাও সেইরূপ ক্ষণমাত্র স্থায়ী আহার নিদ্ৰাদি কিঞ্চিত্র শারীরিক নিয়ম লঙ্ঘন মাত্রেই রােগ উৎপন্ন হইয়া দুর্লভ জীবন দুর্দান্ত কালসূৰ্য্য করে শুষ্ক হইয়া যায়। হায়! এ ভয়ানক অবস্থা সকল কেই প্রাপ্ত হইতে হইবে। সে জ্ঞানী ব্যক্তি কোথায়, যিনি নিজের এ রূপ দশা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও মুখসম্ভোগ ও বিলাস অভিলাষ করেন। যুবরাজ এরূপ চিন্তার্ণবে পতিত হইয়া সারথিকে রথ প্রত্যাবর্তন করিতে অনুমতি করিলেন। তৃতীয় দিবস যখন যুবরাজ পারিষদবর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া আনন্দময় আনন্দ কাননের পশ্চিম দ্বারে প্রবেশ করেন, তখন দেখিলেন, কতকগুলি লােক রাজমার্গগামী সৰ্বাঙ্গ বসনাবৃত
82
শাক্যসিংহ।
দেহে নিশ্চেষ্ট
একটী মৃতদেহ খট্টোপরি রাখিয়া স্কন্ধে করিয়া লইয়া
যাইতেছে। তাহার চতুষ্পর্শ্বে দণ্ডায়মান বন্ধুবর্গের হৃদয়
বিদারণ হাহাকার ও ক্রন্দন ধ্বনি গগন স্পর্শ করিয়া লােক
মাত্রকেই বিষাদসাগরে মগ্ন করিতেছে; কেহ কেহ শােকা-
ইত, ব্যাকুল চিত্ত, ধূল্যবলুষ্ঠিত কেশাবলী বিচ্ছিন্ন করিতে-
ছেন; কেহ বা নিরবধি ধূল্যবলুণ্ঠন করিয়া শরীরের বিদ্যুৎ
বিনিন্দিত স্বাভাবিক বরণ গােপন করিয়া কর্দমময়
পতিত রহিয়াছে ; কেহ বা সঘন বক্ষে
করাঘাত ও হাহাকার শব্দে জনগণের হৃদয়ে দারুণ আঘাত
প্রদান করিতেছে; অবলা কুলবালাগণ করকঙ্কণাঘাতে
ললাট শশাণিতময় করিয়া সিন্দুর ও অলকার সৌন্দৰ্য্য
হরণ করিতেছে; বন্ধুবর্গ সকলেই শশাকে বিহ্বল হইয়া ঘন
দীর্ঘ নিশ্বাসে ঝঞ্জাবাতের সৃষ্টি এবং বাষ্পক্ষেপণে নদীপ্রবাহ
বৰ্দ্ধিত করিতেছে। যুবরাজ এরূপ শােকময় ঘটনা দর্শন
করিয়া সারথিকে তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
সারথি সবিনয়ে নিবেদন করিল, রাজকুমার ! ঐ খট্টা-
রূঢ় ব্যক্তি সুখময় সংসার পরিত্যাগ করিয়া শমন ভবন
দর্শনে গমন করিতেছেন, তাঁহার বন্ধুবর্গ আর তঁাহার দর্শন
পাইবে না বলিয়াই এরূপ শােকময় ক্রন্দন করিতেছে।
মহাশয় ! জীবগণ এ সংসারে অত্যল্প কাল মাত্র বিশ্রাম করে ;
পৃথিবী মধ্যে কিছুই চিরস্থায়ী কি অবিনশ্বর নয়। যেরূপ শাখি
শাখে পক্ষিগণ নিশিযােগে একত্র অধিবেশন পূৰ্ব্বক প্রভাতে
ইচ্ছানুরূপ দিগদেশে গমন করে; অথবা পথিমধ্যে পথিকগণ
পান্থবাসে মিলিত হইয়া নিশাশেষে নিজ নিজ অভিপ্রেত
শাক্যসিংহ। স্থানে গমন করে, সেইরূপ মনুষ্যগণও এ সংসারে স্বজন বন্ধু বান্ধবগণ পরিবেষ্টিত হইয়া জীবন শেষে স্বকৰ্ম্মানুসারে ধর্মের বিচারমতে উপযুক্ত স্থানে গমন করে। কুমার শ্রেষ্ঠ ! এ দশা সকলকেই প্রাপ্ত হইতে হইবে; পৃথিবীতে যিনিই কেন যত উচ্চ আসনারূঢ় থাকুন না, অন্তে সকলেই এক দশা প্রাপ্ত হইয়া চিতায় প্রবেশ করিবেন। যেরূপ ক্ষণভঙ্গুর জলবিন্ধু- সকল অত্যল্প কাল মধ্যেই জলে মিলিত হয়, সেইরূপ এ জীবনও অত্যল্প কাল মাত্র পৃথিবীর সুখ সম্ভোগ করিয়াই পঞ্চ ভূতে মিলিত হইয়া যায়। যুবরাজ সারথির এ সকল বাক্য শ্রব করিয়া আক্ষেপ বাক্যে বলিলেন, আহা ! জীবনের সর্বপ্রকার সুখ সম্ভোগ ও বিলাস- মন্দির যৌবন কাল দারুণ জরা প্রতিঘাতে চূর্ণ হয়, এবং অমূল্য জীবনের সার রত্ন অবােগিতা অগণিত মন্দ বুদ্ধি দুরাচার তস্কররূপ ব্যাধি দ্বারা অপহৃত হইয়া থাকে; জীবনও আবার এত অল্প কাল স্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গুর যে কোন সময় মৃত্যুর অব্যর্থ দণ্ডাঘাতে চূর্ণ হইয়া যায়, তাহার নিশ্চয় নাই। প্রাণিমাত্রই যদি চির যৌবন সুখে লিপ্ত থাকিয়া জরার মুখ দর্শন না করিত, বােগরূপ দুর্লক্ষ্য মন্দবুদ্ধি অনিষ্ট-তৎপর পাপময় পিশাচ কোন ক্রমেই দেহমন্দিরে যদি প্রবেশ করিতে না পারিত, তাহা হইলে এই জীবগণের মনােভিলাষ পূর্ণ হইবার একমাত্র পন্থা থাকিত। রাজকুমার ব্যথিতান্তঃকরণে এরূপ শােক প্রকাশ করিয়া কহিলেন, সূত! অবিলম্বে রথ প্রত্যা- বৰ্তন কর, আমি সেই দুৰ্বল বন্ধু সৰ্বানন্দপ্রদ, মুক্তিপথদর্শক, ত্রাণকর্তা ধর্মের অনুসন্ধানে যত্নশীল হইব।
৪৪
শাক্যসিংহ।
চতুর্থ দিবস যুবরাজ সুখসেব্য বিবিধ ফল পুষ্পেপশশাভিত
মনােহর আনন্দকাননের উত্তর দ্বারে পরিভ্রমণ করিতেছেন ;
নাসিকা গন্ধবহের সাহায্যে বিবিধ পুষ্পের সৌরভে অপার
আনন্দ লাভ করিতেছে; শাথিশাখে পিকগণের কল কল ধ্বনি,
শ্রবণে অমৃত ধারা বরিষণ করিতেছে; নবপল্লব সকল প্রকৃতির
রিচিত্র শােভা সম্পাদন পূৰ্ব্বক নয়নের দর্শনপিপাসা দূর করি-
তেছে ; মন্দ অনিল গাত্র স্পর্শ মাত্র প্রিয় সহচরী নিদ্রাদেবীকে
আহ্বান করিতেছে। বাস্তবিক আনন্দকানন আনন্দ রূপ ধারণ
করিয়া মনের যাবতীয় ক্লেশ দূর করিতেছে। কুমার সারথি
সঙ্গে অশেষৰিধ কথোপকথন করিতেছেন, এমন সময়ে
শান্তপ্রকৃতি সহিষ্ণু, মৌনাবলম্বী, জিতেন্দ্রিয়, নিত্যসত্যপ্রিয়,
শুচি, সরলস্বভাব, ধৰ্ম্মপরায়ণ, অৰ্যভক্ত দিগম্বর এক
ভিক্ষুক নয়নপথে পতিত হইলে, তিনি সারথিকে সম্বােধন
করিয়া কহিলেন, সারথে ! দেখ দেখি এ লােকটী কে ?
সারথি বদ্ধাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল, মহাশয়। এ
ব্যক্তি জগতে ভিক্ষুক বলিয়া প্রসিদ্ধ। ইনি জীবনের যাবতীয়
সুখ ও ইচ্ছা দূরে নিক্ষেপ করিয়া সংসারে ভিক্ষা করিয়া
পরিভ্রমণ করেন। ইনি রিপুগণকে দৃঢ় বন্ধন এবং হিংসা ও
থেষের মস্তক পাঘাতে চূর্ণ করিয়া আত্মজয়ে যত্নশীল হইয়া-
ছেন। ইনি সংসাররূপ বিষক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া নিত্য
আনন্দপ্রদ কল্প ও অমৃতম-পরিশােভিত ধৰ্ম্মকাননে প্রবেশ
করিয়াছেন। এক্ষণে ইহার চিন্তারূপিণী ভাৰ্যার গর্ভে জ্ঞান
নামে বিচক্ষণ পুত্র জন্মিয়া নিজ বৈমাত্রেয় ভগিনী মায়াকে
বিনাশ করিয়া নিজ গৌরব প্রকাশ জন্য সত্য, সহিষ্ণুতা
শাক্যসিংহ। ৪৫ শান্তি, অহিংসা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নামে পাঁচ জন মহাবল পরা ক্রান্ত অনুচরকে পিতার পরিচর্যায় নিয়ােগ করিয়া নিজেও যত্ন, শ্রম, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা নামে সখাগণ পরিবেষ্টিত হইয়া ধৰ্ম্মকানন প্রবেশে সমধিক যত্ন করিতেছেন। রাজ- কুমার! বলিতে কি, এই কয় জন সহায় হইলে ধৰ্ম্মকানন প্রবেশে অণুমাত্রও সংশয় থাকে না; ইনিও তৎকানন প্রবেশে প্রায় কৃতকার্য হইয়া এক্ষণে ধাৰ্মিক উপাধি গ্রহণ করিয়াছেন। রাজকুমার বলিলেন জ্ঞানী লােকেরা সদাই ধার্মিক দিগের গুণানুবাদ করিয়া থাকেন। মনুষ্য ও পশুদিগের মধ্যে আহার নিদ্রা ভয় মৈথুন ইত্যাদি যাবতীয় প্রক্রিয়া সমান সত্ত্বেও মানবগণ কেবল জ্ঞান ও ধর্মবলে শ্রেষ্ঠ পদ গ্রহণ করিয়াছেন ; জ্ঞানের জন্ম মাত্রে তৎসঙ্গে সঙ্গে ধৰ্ম্মেরও জন্ম হয়। যিনি সেই সৰ্বসুখপ্রদ ধৰ্ম্মে বঞ্চিত, তাহাতে আর পশুতে অণুমাত্রও প্রভেদ নাই। ধৰ্মই জীবমাত্রের বিপদ হইতে মুক্তি লাভের একমাত্র প্রকৃষ্ট পন্থা, ধৰ্মই প্রকৃত জীবন ও অমরত্ব প্রদান করিয়া থাকে। অতএব আমার এক্ষণে এই পথ অবলম্বন করাই অভিলাষ সিদ্ধির একমাত্র পন্থা। সর্বপ্রথমেই এই পথ অবলম্বন করাই কর্তব্য। রাজকুমার এইরূপ বলিতে ছেন, এমন সময়ে রথ প্রত্যাবর্তন করিয়া নিজপুরে প্রবেশ করিল। কুমার বাড়ী আসিয়া কোন্ সূত্র অবলম্বন করিয়া সংসার ত্যাগ করিবেন, এই চিন্তায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। বলিতে কি, সে রাত্রিতে তাহার নিদ্রা হইল না, তিনি সমুদায় ৪৬ শাক্যসিংহ। রাত্রি বাতায়নে উপবেশন-পূৰ্ব্বক রজনী যাপন করিলেন। প্রভাতিক মৃদু মলয়মারুতভরে কিঞ্চিত্র নিদ্রাকর্ষণ হইয়াছে, কুমার সােপানােপরি অর্ধ অচেতন অবস্থায় শয়িত আছেন, ইতিমধ্যে তাহার স্বপ্নযােগ হইল, তিনি দেখিলেন, পৃথিবীগর্ভ হইতে এক প্রকার জ্যোতির্ময় পদার্থ বাহির হইয়া সমুদায় সংসার দগ্ধ করিয়া অবশেষে তাঁহাকেও দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছে। এই ভয়ানক ব্যাপার দর্শন করিয়া কুমারের নিদ্রা ভঙ্গ হইল। তখন তিনি ঘন কম্পিত কলেবরে মন্দির মধ্যে ইতস্ততঃ পৰ্যটন করিতে লাগিলেন। রজনী প্রভাত কল্পা, পক্ষিগণ বৃক্ষ শাখায় উপবেশন পূর্বক সকলে মিলিয়া সুতান সংমিলিত সুমধুর সুশ্রাব্য সঙ্গীত শাস্ত্রের পরিচয় দান পূর্বক জগদীশ্বরের গুণানুকীৰ্ত্তন করতঃ তাহারই মহিমার পরিচয় দান করিতেছে। মন্দ অনিল সর্বত্র সঞ্চালিত হইয়া জনসমাজে প্রভাত সংবাদ ঘােষণাপূর্বক অপার আনন্দ দান করিতেছে। ভগবান মরীচিমালী নিজ জায়া ছায়ার সহিত হাস্য বদনে পূর্বদিকে দর্শন দিয়া জগৎ রক্তিম আভায় পরিপূর্ণ করিলেন; সরােজিনী প্রিয় নাথের দর্শনে হাস্য প্রকাশ পূৰ্ব্বক বিকসিত হইলেন। নবশ্যামল দূৰ্ব্বাদলােপরি মুক্তাহার প্রায় শিশিরবিন্দু সকল ক্ৰমে ভালুকরে জলবৎ হইয়া পরাে- পকার ব্রতে ব্ৰতী হইয়াই যেন মেদিনীর উৎপাদিকাশক্তি বৰ্ধনার্থ তৎগর্ভে প্রবেশ করিল। সুধাংশু সমুদায় রাত্রি রােহিণী বাসে যাপন করিয়া প্রভাতে অগ্রজ দর্শনে লজ্জায় পাণ্ডুবর্ণ হইয়া নিজালয়ে সত্বর গমন করিতেছেন। কুমুদিনী প্রাণবল্লভের বিরহ মনে করিয়া মলিন বদন অবগুণ্ঠনে আবৃত
শাক্যসিংহ।
৪৭
করিতেছেন চক্রবাক দম্পতী বিচ্ছেদকে দূরে অপসারিত
করিয়া একত্র মিলিত হইতেছে। লােক সকল স্ব স্ব শয্যা
পরিত্যাগ করিয়া গৃহকর্মে মননিবেশ করিতেছে।
প্রকৃতি অপরূপ নব ভূষণে বিভূষিত হইয়া অবিরত হাস্য
প্রকাশ করিতেছে। কুমার শয্যা পরিত্যাগ করিয়া হস্ত
পদাদি প্রক্ষালন পূর্বক প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপন করিয়া
সুৰ্যোদয়ের অনতিদীর্ঘকাল পরেই পরমারাধ্য পিতা, পরম
হিতৈষিণী বিমাতা, মাতৃসমা ধাত্রী বিধুমুখী ও প্রিয়ংবদা
রূপবতী রসবতী সহধর্মিণীর নিকট সংসারত্যাগের অভি
প্রায় প্রকাশ করিলেন; কিন্তু তারা সকলেই অসম্মত
হইলেও তাঁহার মনে সংসারত্যাগের বাসনা বদ্ধমূল হইয়া
রহিল। একদা প্রায় অর্ধ রাত্রি গত হইয়াছে, লােকপূর্ণ
কোলাহলময় জগৎ শব্দ হীন, নগর মধ্যে কেবল সময়ে সময়ে
কৃতান্ত ঘটিকায় পেচকের কঠোর নিস্বন ভিন্ন আর কাহা-
রই কণ্ঠস্বর শুনিতে পাওয়া যায় না। ভগবান কৌমুদীবল্লভ
পূৰ্বদিকে দর্শন দিয়া জগৎকে ধ্বান্তের হস্ত হইতে পরিত্রাণ
মানসে করজাল বিস্তার করিয়া পৃথিবী সুধাসিক্ত করিতে-
ছেন ; কুমুদিনী নাথের আগমনে পরম আজাদ প্রাপ্ত হইয়া
তাঁহার উপবেশন জন্য হাস্য প্রকাশ পূৰ্ব্বক নিজ হৃদয়রূপ
সিংহাসন দান করিতেছেন; এমন সময়ে যুবরাজ জাগরিত
হইয়া তাহার রক্ষণ ভারপ্রাপ্ত প্রহরিগণকে একান্ত সুষুপ্ত ও
নিদ্রাবশে মৃতপ্রায় অবলােকন করিয়া অশ্বশালে, গমন পূর্বক
অতি গােপনে সারথিসহ রথ সুসজ্জিত করিয়া সত্বর গমনে
রাজধানী পরিত্যাগ করিলেন।
৪৮ শাক্যসিংহ। ষষ্ঠ অধ্যায়। রক্ষকগণ প্রভাতে উঠিয়া কুমারকে দেখিতে না পাইয়া একান্ত উদ্বিগ্নচিত্তে ব্যস্ত সমস্ত হইয়া নৃপ সন্নিধানে গমন পূৰ্ব্বক কুমারের পলায়ন বার্তা নিবেদন কয়িল। মহারাজ ইহা শ্রবণ মাত্র হতচেতন হইয়া সিংহাসন হইতে ভূতলে পতিত হইলেন। সভাসদ পাত্র মিত্র ও বন্ধুবান্ধব সকলেই ক্ষণকাল নিশ্চেষ্ট থাকিয়া পরে আত্মশােক সংবরণ পূর্বক মহারাজের চেতনা লাভের জন্য বিস্তর চেষ্টা পাইলেন; কিন্তু নানা প্রকার যত্নেও তৎকালে তাঁহার চেতনা লাভ হইল না ; তিনি যামার্ধ পর্যন্ত অচেতন থাকিয়া পরে হা বুক ! বলিয়া দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া চেতনালাভ করিলেন। তখন ভৃত্যবর্গ তাঁহার অঙ্গের ধুলিরাশি মােচন করিয়া আসনে উপ- বেশন করাইবার চেষ্টা পাইলে তিনি হা জীবন সর্বস্ব বলিয়া পুনৰ্ব্বার ধরাশায়ী হইলেন। অনুচরবর্গ বিস্তর যত্ন ও চেষ্টা করিয়া পুনঃ সংজ্ঞা দান করিলে তিনি অতি কষ্টে ধৈৰ্য্যধারণ করিয়া সিংহাসনে উপবেশন করিলেন। তাঁহার চিত্ত দুর্বার শােকানলে দগ্ধ হইতে লাগিল, তিনি ক্ষণকাল পরে দীঘোষ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেনঃ হে প্রাণাধিক! তােমার মনে কি এই ছিল ! তুমি জন্ম মাত্রেই নিজ জননীর বিনাশ সাধন করিয়া যৌবন প্রারম্ভেই জনকের মৃত্যু সংঙ্কল্প করিয়া শর সন্ধানে উদ্যত হইয়াছ। আজ নিশ্চয়ই জানিলাম জগদীশ্বর এ রাজবংশের নির্মূল বাসনা করিয়া তােমাকে তৎকাৰ্য্য সাধনের জন্য কালরূপে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন। বৎস! মনুষ্যগণ সূৰ্য্য শস্য ও সলিল
শাক্যসিংহ।
৪৯
বিনা জীবিত থাকিতে পারে কিন্তু তােমাকে না দেখিয়া
আমার প্রাণ ক্ষণমাত্রও দেহে থাকিতে পারিতেছে না।
অতএব বৎস! দেখা দিয়া প্রাণ রক্ষা কর।
রে দারুণ বিধাতা! এই কি তাের মনে ছিল যে আমার
হৃদয়কুসুম হরণ করিয়া তুই সুখী হইবি? রে নির্দয়! যে
কুমার রথ অশ্ব গজ ভিন্ন এক পাও চলিতে পারে না,
তাহাকে তুই কোন, দুর্গম কণ্টকময় পথে প্রেরণ করিলি ?
তাঁহার শিরীষ-কুসুম-বিনিন্দিত পদযুগল বনকণ্টক ও কুশাগ্র
ক্ষত দেখিয়া তাের কি অণুমাত্রও দয়ার সঞ্চার হইবে না ?
বাহার আত্মার জন্য কুণ্ডলধারী পাচকবৃন্দ কে অর্থে যাইবে
বলিয়া মহা কোলাহলে সুধাময় রন্ধন করিত, তাহাকে কটু
তিক্ত ও কষায় ফলদল আহার করিতে দেখিয়া তর মনে কি
কিঞ্চিত্রও কষ্ট বােধ হইবে না ? যে কুমারপুঙ্গব মহা বস্ত্র
পরিশোভিত হইয়া সুখে কাল যাপন করিত, তাহাকে বল্কল
পরাইয়া তুই কি আনন্দই বা লাভ করিবি? রে নিষ্ঠুর !
সুশীলা পতিব্রতা পরম সুন্দরী ইন্দুবদনা গােপাকে নারীজীবন
রত্ন-পতিহীনা মলিনা বিরহ-নিপীড়িতা দেখিয়াও কি তাের
দয়ার সঞ্চার হইতেছে না ? রে নির্মম ! তাের পায় ধরি, তুই
বিধি হইয়া অবৈধ কাজ করিস না। মহারাজ এইরূপ শােক
প্রকাশ পুৰ্ব্বক ব্যাকুলেন্দ্রিয় হইয়া আহার নিদ্রা ও যাবতীয়
রাজকাৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া শােকাগারে প্রবেশ করিলেন।
ক্রমে রাজভবন শােকে পরিপূর্ণ হইল। ঘাট পথ ইত্যাদি
সকল স্থানেই কুমারের শােকপ্রবাহ প্রবল হইয়া জনসমাজের
মানসক্ষেত্ৰ-জাত আনন্দকানন অত্যল্প কাল মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন
শাক্যসিংহ। করিয়া ফেলিল। নগরমধ্যে কি স্ত্রী কি পুরুষ কি বালক কি বৃদ্ধ কি বরাঙ্গনা কি কুলবধু সকলেরই হৃদয় নিরবচ্ছিন্ন অশ্রুজলে অভিষিক্ত হইতে লাগিল, ক্রমে নগর মধ্যে শােক- ময় কোলাহল ভিন্ন আর কিছুই শুনা যাইতে লাগিল না ; সকলেই একান্ত ব্যাকুল মনে কালযাপন করিতে লাগিলেন। ক্ৰমে অপরাহু কাল উপস্থিত হইল। শােকানল বহিৰ্বাটা দগ্ধ করিয়া ক্রমে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল। রাণী কুমারের পলায়ন বার্তা শ্রবণ করিয়া কৰ্ত্তরিকাহত শস্য প্রায় ভূতলে পতিত হইয়া অজ্ঞান হইলেন। সখীগণ বিস্তর যত্নে সংজ্ঞা দান করিলে ক্ষণকাল ধূল্যবলুষ্ঠিত কলেবরে ধরাসনে নিশ্চেষ্ট আসীন থাকিয়া পরে হা! শাক্যকুলচন্দ্র! বলিয়া পুনৰ্ব্বার ধরাতলে পতিত হইলেন। সহচরীরা বিস্তর চেষ্টায় পুনঃ সংজ্ঞা দান করিলে অপেক্ষাকৃত ধৈৰ্য্যধারণ করিয়া সখী- দিগকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, সখীগণ! আমার সেই শাক্যসিংহ কুমার কোথায় গেল, তােরা কি তার কিছুমাত্র সংবাদও জানিস না ? যদি কিছু জানিয়া থাকিস, বলিয়া দিয়া আমার প্রাণ রক্ষা কর। রে দারুণ বিধি ! তাের কি মনে এই ছিল? তুই কোন প্রাণে আমার সেই অপুত্রার পুত্র জীবনের জীবন স্নেহাস্পদ এক মাত্র পুত্র সেই শাক্যকুলতিলক বুদ্ধকে হরণ করিলি ! রে দুৰ্ম্মম! তাের প্রাণ নিশ্চয়ই পাষাণে নির্মিত, তাহা না হইলে কেনই বা বুদ্ধ পলায়নরূপ অব্যর্থ শরসন্ধান করিয়া এই শাক্য-রাজবংশের বিনাশে প্রবৃত্ত হইয়া এত সরল অবলার প্রাণ বধে উদ্যত হইবি! রে পামর! তাের পায়
শাক্যসিংহ।
ধরি, তুই আমাদের সেই জীবনসৰ্বস্ব স্নেহময় কুমারকে
প্রত্যর্পণ করিয়া আমাদের প্রাণ রক্ষা কর এবং অতুল যশাে-
লাভ করিয়া জগতে ধর্মের ধ্বজা স্থাপন কর।
হে রাধাবল্লভ। আত্মবিনাশের জন্যই কি এ রাজবংশ এত
কাল তােমার বিবিধ সেবায় তৎপর ছিল ? অদ্য জানিলাম
তুমি একান্ত অকৃতজ্ঞ। হে প্রাণবল্লভ হে রাধাকান্ত! মধু-
সূদন! যদি আমার সেই প্রাণসম বুদ্ধের পুনর্দর্শন পাই,
তবে তােমার বিবিধােপচারে পূজা করিব। আমার সেই
প্রাণাধিকের সংবাদ পাওয়া মাত্রই তােমাকে ঘৃত মধু সংযাে-
জিত পায়সান্ন দান করিব। প্রাণবল্লভ! তুমি আমার সেই
অপুত্রার পুত্রকে সচ্ছন্দে রাখিও।
হে জীবনসৰ্বস্ব ! আমি এক মুহূর্তের জন্যও তােমায়
কোনরূপ অপ্রিয় বাক্য প্রয়ােগ কি তােমার অসন্তোষজনক
কাৰ্য্য করিয়াছি স্মরণ হয় না। তােমার প্রতি যে আমার
অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালবাসা, তাহা তুমি সম্পূর্ণই জ্ঞাত আছ।
তুমি চির দিনই আমাকে জননীতুল্য ভক্তি ও সেবা করিতে,
তবে অদ্য কি দোষ পাইয়া এ দারুণ বিচ্ছেদ শরক্ষেপণে
আমার প্রাণ বিনাশ করিতে উদ্যত হইলে ! হে বৎস! যদি
অজ্ঞাতসারে কোন দোষ করিয়া থাকি,তাহাও মার্জনা করাই
তােমার কর্তব্য। হা বুদ্ধ! তােমায় না দেখিয়া আমার
প্রাণ যে কেমন করিতেছে, তাহা বলিবার নয়, সেই অন্তরের
বেদনা অন্তর্যামীই জানেন আর কেহই জানে না; এ প্রাণ
ক্ষণকালের জন্যেও আর এ দেহে থাকিতে ইচ্ছা করিতেছে
, তােমা বিহীনে এক্ষণে কৃতান্তের আশ্রয় গ্রহণই শ্রেষ্ঠ বােধ
৫২ শাক্যসিংহ। হইতেছে। বৎস! একবার দেখা দিয়া প্রাণ রক্ষা কর । রাণী এইরূপ খেদ প্রকাশ পূৰ্ব্বক একান্ত শশাকবিহ্বল হইয়া ঘন দীর্ঘোষ্ণ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উন্মাদিনী প্রায় অঙ্গনে ঘন পদক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে দৈববাণী হইল। সে শব্দ অতি গম্ভীর; কিন্তু রাণী ভিন্ন আর কেহই শুনিতে পাই- লেন না। শূন্য হইতে কোন এক মহাপুরুষ গভীর স্বরে বলিলেন, বৎসে! ব্যাকুল হইও না, তােমার প্রিয় পুত্র শাক্যসিংহকে দ্বাদশ বৎসরেরর পর পুনৰ্বার দেখিতে পাইবে। তুমি এক্ষণে ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া অনন্য মনে গৃহকাৰ্য্য সুসম্পন্ন কর। রাণী আকাশ বাণীতে হাতে আকাশ পাইয়া ধৈৰ্য্যাবলম্বন পূৰ্ব্বক গৃহকাৰ্য্যে মননানিবেশ করিলেন। এদিকে গােপার সহচরীগণ রাণীর শােচনীয় অবস্থা দর্শন করিয়া একান্ত অধীরা হইয়া অজস্র অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে গােপার গৃহে উপস্থিত হইয়া অনুচ্চ স্বরে কি বলিতে- ছিলেন, এমন সময় গােপা তাহাদের পশ্চাদ্ভাগে থাকিয়া সবিস্তার শ্রবণ করিলেন, কিন্তু স্পষ্ট কিছুই বুঝিতে পারিলেন , কেবল কথার আভাস ও মুখভঙ্গীতে এই মাত্র বুঝিতে পারিলেন যে তাহার কোন অপ্রতিবিধেয় অনিষ্ট সংঘটিত হই- আছে। যাহাই কেন হউক না, সম্পূর্ণ বুঝিতে না পারিয়া, তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, সখীগণ ! তােরা এতক্ষণ চুপে চুপে কি বলিতেছিলি, আমায় একবার স্পষ্ট করিয়া বল দেখি! ভাল মহারাজ দণ্ডপাণির ত কোন অশুভ ঘটনা ঘটে নাই ? অনেক দিবস হইল, আমি তাহার ভবন ত্যাগ করিয়া আসিয়াছি এ পর্যন্ত তাহার দর্শন বা কোন
শাক্যসিংহ।
মাঙ্গলিক বার্তা প্রাপ্ত হই নাই। তােরা কোথায় কি শুনিয়া
আসিলি সত্য করিয়া আমায় তুয়ায় বল। ভাল আমার পিতৃ
দেব কুশলে আছেন ত ?
সখীগণ ভগ্ন স্বরে উত্তর করিলেন, রাজনন্দিনি! শুনি-
আছি কাল নাকি তােমার বাপের বাড়ীর পত্ৰ আসিয়াছে ;
তাহারা সকলেই ভাল আছেন, তজ্জন্য চিন্তা করিও না। রাধা-
বল্লভ না করুন, এর পর আবার পিত্রালয়ের কোনরূপ অশুভ
ঘটিলে আর উপায় নাই। গােপা তখন নিশ্চয়ই বুঝিলেন ;
তাহার কোন বিশেষ অনিষ্ট ঘটিয়াছে, তাহার আর অণু-
মাত্রও সন্দেহ নাই। তখন গােপা ব্যগ্র হইয়া বলিলেন,
সখীগণ ! তােরা সত্য করে বল না, আমার কি সর্বনাশ
ঘটিয়াছে ? আমার মাথার দিব্য আছে সত্য করে বল দেখি,
তােরা যে এর পর ” বলিলি বল এর অর্থ কি! সখীর।
বলিল, রাজৰালে ! কিছু নয়, অপনি অস্থির হইবেন না,
ধৈৰ্য্য ধারণ করুন; অমঙ্গলকে ডাকিতে হয় না, সে আপনা
হইতেই আসিয়া উপস্থিত হয়। গােপা তখন আরো অস্থির
ইলেন, এবং মনের স্থৈর্য হারাইয়া এ কথা সে কথা করিয়া
নানা কথাই জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন; কিন্তু সখীরা সকল
কথাই গােপন করে দেখিয়া একান্ত অধীরা হইয়া কি ঘটি-
য়াছে কিছুই বুঝিতে পারিতেছেন না; পরে ক্ষণকাল মৌনী
থাকিয়া বলিলেন, সখীগণ! তােদের ভাব দেখে আমার বােধ
হইতেছে, আর কিছুই নয়, আমারই পােড়া কপাল ভাঙ্গি-
আছে। যাই কেন হউক না তােরা কোন প্রকার সন্দেহ
করিস না, আমার মাথা খাইস, সত্য করে বল দেখি আমার
;
৫৪
শাক্যসিংহ।
প্রাণনাথের মঙ্গল ত? ভাল কয়েক দিবস হইল, প্রাণবল্লভ
অন্দরে আসিতেই বা বিরত আছেন কেন? তােরা কি তার
কিছুই জানিস না? জানিস ত বল, আমার কি পােড়া কপাল
পুড়িয়া গিয়াছে ? সখীগণ গােপার এরূপ ভাব দর্শন করিয়া
আর ধৈৰ্য্য ধরিতে পারিলেন না। মুখ বস্ত্রে আবৃত করিয়া
অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন। গােপা তাঁহাদের ক্রন্দন
দেখিয়া আরাে অধীরা হইয়া ক্ষণে শয্যায় ক্ষণে ধরায় ক্ষণে
সখীদের হস্ত ধারণ করিয়া বলিতে লাগিলেন ; সখীগণ ভাল
দৈব প্রতিকূল হইয়াছে দেখিয়া তােরাও কি আমার প্রতিকূল
হইলি ! আমার মরমে আর ব্যথা না দিয়া কি অভ ঘটি-
য়াছে বলিয়া আমায় সুস্থির কর।
চিত্রাঙ্গিনী নামে গােপার একজন সহচরী তাঁহাকে এরূপ
অধীরা দেখিয়া মনােভাব আর গােপন করিতে পারিলেন না,
অতি কষ্টে দিতে দিতে বলিলেন, বলিব কি, বলিতে
হৃদয় বিদীর্ণ হয়, বাণী কণ্ঠমধ্যেই থাকিতে চায়। আমি আজ
রাণীর মহলে গিয়াছিলাম, তথায় শুনিলাম শাক্যকুলচন্দ্র
কুমার বুদ্ধ গত নিশিতে নগর পরিত্যাগ করিয়া কোথায়
পলায়ন করিয়াছেন। মহারাজ শােকবিহ্বল হইয়া শােকা-
গারে বিচেতন হইয়া পড়িয়া আছেন, রাণীও উন্মাদিনী প্রায়
হইয়া হা পুত্র বলিয়া ঘন ঘন দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে-
ছেন এবং পুরবাসিগণ সকলেই শােকপূর্ণ নয়নে হাহাকার
রবে ক্রন্দন করিতেছেন। কাহারই চিত্ত সুস্থির নয়, কেবল
হা বুদ্ধ! কোথা বুদ্ধ বলিয়া দিনপাত করিতেছেন
এই কথা বলিতে বলিতে সহচরী চিত্রাঙ্গিনীর কণ্ঠবােধ
•
শাক্যসিংহ। ৫৫ হইয়া আসিল। তিনি পুনঃ ক্রন্দন আরম্ভ করিলেন। গােপা সখীমুখে কুমারের পলায়ন বার্তা শ্রবণ করিয়া মণি- হারা ফণি প্রায় হতচেতনা হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন। সখীরা সংজ্ঞাঁদানের বিস্তর চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কোন মতেই তাঁহার চেতনা লাভ হইল না। গােপার তৎকালীন ভাব দর্শন করিলে কাহার না মন দুঃখে দ্রবীভূত হয়? তাহার ফণিবিনি. দিত লম্বিত বেণী ধূলায় ধূসরিত, নয়ন ঘন ঘূর্ণিত, সােপানা- ঘাতে ললাটশােণিত বাষ্পবারির সহিত মিলিত হইয়া বক্ষ- স্থলকে সুসিক্ত করিতেছে। নাসিকায় ঘন শ্বাস প্রবাহিত, ইন্দু- বদন ফ্লাহুগ্রস্ত সুধাংশু প্রায় মলিন ও ঘন ফেনলালায় পরিশাে- ভিত হইয়া মুমুর্যদশার পরিচয় দান করিতেছে। চতুষ্পশ্বোপ- বিষ্ট সখীগণেরও বক্ষস্থল নয়নজলে ভাসিতেছে; তাঁহারা গােপার চেতনা জন্য তাঁহার মুখকমলে অবিরল সুশীতল জল সিঞ্চন করিতে লাগিলেন। বিস্তর চেষ্টার পর গােপা চৈতন্য লাভ করিয়া বলিলেন, ভাল সখি! প্রাণবল্লভ কি একান্তই এ দাসীকে পরিত্যাগ করিলেন ? সখি! যদি আমার সেই শিঝােমণি নারীজীবনের একমাত্র ভূষণ প্রাণনাথকেই হারাইলাম, তবে আর এ সকল অলঙ্কারের প্রয়ােজন কি ? এই বলিয়া যাবতীয় রত্নালঙ্কার দেহ হইতে উন্মােচন করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন, এ সকল জ্বলন্ত অঙ্গারস্বরূপ, তােরা অবিলম্বে এ সকল দূরে লইয়া যা। একে প্রাণনাথের দারুণ বিচ্ছেদ অনল আমায় অনিবার দগ্ধ করি- তেছে, তাহাতে আবার এ সকল জ্বলন্ত অঙ্গাবােত্তাপ আর সহ্য হয় না। এই বলিয়াই তিনি মুচ্ছিত হইলেন। সখীরা অশে- শাক্যসিংহ। যৰিধ যত্নে পুনঃ সংজ্ঞালাভ করাইলে, তিনি একান্ত অধীরা হইয়া বলিতে লাগিলেন। জীবিতেশ্বর ! তােমার মনে কি এই ছিল ? আমি তােমাকে চিরকাল দয়াবান ও পরােপকারী বলিয়া জানিতাম, তবে তুমি আজ কেন এ দুৰ্ম্মম হৃদয়বিদারণ কাৰ্য করিতে উদ্যত হইলে? এ দাসী যে তােমার চরণে কোনপ্রকার দোষে অপ- রাধিনী, এরূপ স্মরণ হয় না। তবে এ দাসীকে কোন দোষে ত্যাগ করিলে ? নাথ ! যদি মন ও বুদ্ধির অগােচরেও কোন পাপ করিয়া থাকি, তবু দাসী বলিয়া সে দোষ মার্জনা করাই তােমার কর্তব্য ছিল। নাথ! তুমিই আমার জীবনরূপে বিরা- জমান ছিলে, আমি এখন জীবনহারা হইয়া কিরূপে জীবন- ধারণ করিব ? নাথ ! তােমার বিরহে আমার প্রাণ একান্ত অস্থির হইয়াছে, আর ক্ষণমাত্রও জীবিত থাকিতে ইচ্ছা হই- তেছে না? প্রাণেশ ! একবার দেখা দিয়া প্রাণ রক্ষা কর । তােমার বিরহে এ হতভাগিনীকে কৃতান্ত অবিলম্বেই আক্রমণ করিবে ; এক্ষণে দর্শন দিয়া নিজ দাসীকে কৃতান্তের হস্ত হইতে মুক্ত করুন। তাহা না হইলে জগতে কাপুরুষ বলিয়া তােমার দুনাম ঘােষণা হইবে । গােপা রাজকুমারের প্রতি এইরূপ আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া বিধাতাকে বলিলেনঃ- রে দারুণ বিধাতা! তুই কোন প্রাণে আমার সেই একমাত্র জীবনভূষণ, জীবনসৰ্বস্বকে হরণ করিলি ! রে নির্দয় ! আমার সেই রমণীদুল্লজ জীবনবল্লভকে হরণ করিতে তাের কি অণুমাত্র দয়ার সঞ্চার হইল না? রে দুৰ্ম্মম! তুই স্ত্রীহত্যারূপ দুষ্কর পাপ কৰ্ম্ম করিতে উদ্যত হইয়াছিস; যদি নিজ মঙ্গল সাধনে !
শাক্যসিংহ। ০ ঘাসনা থাকে, তবে এখনও নাথকে প্রত্যর্পণ করিয়া আমার প্রাণ রক্ষা কর। গােপা এরূপ আক্ষেপ করিতেছেন এমন সময় চন্দ্রমণ্ডল মণ্ডিত ত্রিযামা উপস্থিত হইলে গােপা আরাে শত গুণ উতলা হইয়া উঠিলেন। সখীরা তাঁহাকে গৃহমধ্যে লইয়া গেল। তিনি সখীদিগের কণ্ঠধারণ করিয়া বলিতে লাগিলেন,সখীগণ আমার প্রাণ কেমন করিতেছে, এই সুকোমল মখমল শয্যা কন্টকবৎ সৰ্বাঙ্গ বিদ্ধ করিতেছে। চন্দন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রায় আমায় অনিবার দগ্ধ করি- তেছে। তাম্বুল, শূল প্রায় সঘনে অন্তরে আঘাত ও এ নীল বসন কালসাপিনীরূপে ঘন তীক্ষ্ণ দংশন করিতেছে। চন্দ্রমণ্ডল গরল- ময় অংশুমালা বিস্তার করিয়া অবলার প্রাণ সংহারে কৃতসংকল্প হইয়াছে। সখি! এ প্রাসাদ অন্য দিবস নানাপ্রকার, সুখ দান করিত; কিন্তু অদ্য সুখময় সজ্জায় সজ্জিত থাকিয়া কেবল মাত্র প্রাণনাথ বিরহে অশেষবিধ দুঃখের আকররূপে পরি- গণিত হইতেছে। সখি! আজ জানিলাম সকলই সময়ের বন্ধু ; অসময়ে মিত্রও শক্ত হইয়া উঠে; তাহা না হইলে এ হতভাগিনী গােপাৰ চিরসুখপ্রদ এ সকল বিলাসসজ্জা অদ্য কেনই বা মরমে দারুণ আঘাত প্রদান করিবে। গােপা এরূপে উন্মাদিনীপ্রায়, ক্ষণে ধরায় ক্ষণে শয্যায় ক্ষণে সখীদের কোলে উপবিষ্টা আছেন ; এমন সময়ে রজনীপ্রভাতকা, মন অনিল ভরে তাঁহার কিঞ্চিত্র নিদ্রাবেশ হইলে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন, কপিলবস্তুর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভদ্রকালী তাঁহাকে বলিলেন “ গােপে ! অস্থির হইও না, পুনৰ্ব্বার তুমি তােমার পতি প্রাপ্ত হইবে।” দেবী এই বলিয়াই অস্ত- শাক্যসিংহ। হিত হইলেন। গােপার নিদ্রা ভঙ্গ হইল। তিনি দেবীর আশ্বাসে অপেক্ষাকৃত শান্তি লাভ করিলেন। এ দিকে বুদ্ধ সমুদায় রাত্রি গমন করিয়া সারথিকে সমুদায় রত্নালঙ্কারের সহিত বিদায় করিয়া একাকী ভৈশালি গমন করিলেন। সারথি পর দিবস রজনী প্রভাতে কপিলবস্তুতে উপস্থিত হইয়া কুমারের ভৈশালি গমন বার্তা নিবেদন করিলে সকলেই সারথি মুখে সবিস্তার শ্রবণ করিয়া মন স্থির করি- লেন। যে স্থান হইতে সারথি প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল, তথায় একটী চিতুস্তম্ভ স্থাপিত হয়। বর্তমান গােরকপুরের পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণ পূৰ্ব্ব যাের অরণ্যাবৃত হায়নােৎসাঙ্গে সে কীর্তি- স্তম্ভ এখন পর্যন্তও দেদীপ্যমান রহিয়াছে। তাহার শিল্প কারুকাৰ্য্য অতি মনােহর, একবার দেখলে বারম্বারই দেখিতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু কালের কুটিল গতিতে সে নগর এক্ষণে এক- রূপ লয় প্রাপ্ত হইয়াছে। সপ্তম অধ্যায়। বুদ্ধ সারথিকে বিদায় করিয়া স্বয়ং ভৈশালি গমন করিয়া তথায় তিন শত ছাত্র পরিবেষ্টিত এক অতি বিখ্যাত ব্রাহ্ম- ণের নিকট অধ্যয়ন আরম্ভ করিলেন। নিজ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি প্রভাবে অত্যল্পকাল মধ্যেই ব্রাহ্মণের যাবতীয় বিদ্যা মনােমন্দিরে স্থাপন করিলেন। ব্রাহ্মণ তাহাকে আর অধিক শিক্ষা দিতে অশক্ত হইলে তিনি অগত্যা সে স্থান পরিত্যাগ করিলেন। এই ব্রাহ্মণের নিকট যে জ্ঞান লাভ করিলেন, তাহাতে তাহার ধর্মচিন্তার অণুমাত্রও সাহায্য হইল না। বুদ্ধ তখন কিয়ৎক্ষণ শাক্যসিংহ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিলেন, পরে মগধের তৎকালীন রাজধানীতে উপস্থিত হইয়া তথায় সাত শত শিক্ষার্থী পরি- বেষ্টিত কোন এক অতি সুবিখ্যাত ব্রাহ্মণের নিকট পুনরায় অধ্যয়ন আৰম্ভ করিলেন। কিছু কাল অনন্যমনে পাঠ করিয়া ব্রাহ্মণের বহুবিধ উপদেশ গ্রহণ করিয়াও ধর্মচিন্তার পন্থা নির্দেশ করিতে পারিলেন না। তখন পাঁচ জন সমপাঠির সহিত সেই স্থান পরিত্যাগ করিয়া উকভিলব গ্রামের নিকটবর্তী এক জনহীন অরণ্য আশ্রয় করিলেন। তথায় ছয় বৎসর কাল বাস করিয়া তিনি স্বয়ংই পৃথিবীর শিক্ষকরূপে পরিগণিত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার জীবনের এই খণ্ডের শেষ ভাগেই তিনি যাবতীয় সুখ স্বচ্ছন্দ পরিত্যাগ করিয়া সৰ্বজন প্রশংসনীয় পােব্ৰত অবলম্বন করিলেন। তিনি তিমিরময় সংসারকারাগার ত্যাগ করিয়া ধৰ্ম্ম-শৈলায়ােহণের আলােকময় সত্য পথে পদার্পণ পূৰ্ব্বক একেবারে পাঁচ জন শিষ্যের গুরু বলিয়া পরিচিত হইলেন। কুমার আত্মপরাজয় সম্পন্ন করিয়া স্বমত প্রকাশ করিতে বাসনা করিলেন। ব্রাহ্ম- ণের উপদেশ ও শিক্ষা জরা নােগ ও মৃত্যু হইতে পরিত্রাণের পথ নয়, যুক্তিই লােকের একমাত্র পরম বন্ধু যে ধৰ্ম্ম, তাহার মূল। এইরূপ বহু চিন্তার পর প্রকাশ করিলেন যে,তিনি সত্য জ্ঞান লাভ করিয়াছেন। সেই সত্য জ্ঞানই জীবমাত্রের জীবিত কালের যাবতীয় ভয়নাশের একমাত্র প্রকৃষ্ট পন্থা, এ পথ ভিন্ন আর যাবতীয় পথই ভ্ৰম, বিপদ, ও কণ্টক সমাকুল। এই বলিয়া তিনি চারি বর্ণের লােককেই সেই ধর্ম গ্রহণে আহ্বান করিলেন।
শাক্যসিংহ। যে সময়ে তিনি সত্যজ্ঞান লাভ করেন, সেই সময়েই বুদ্ধ বা জ্যোতির্ময় নামে পরিচিত হইয়া সিদ্ধার্থ উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহার অণুমাত্রও ভুল নাই। কারণ,যে মুহূর্তে বুদ্ধ সত্যজ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন,সেই মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ লােক বিভীষিকাভিভূত হইয়া কম্পিতকলেবর হইয়া উঠিলেন। বুদ্ধ স্বধর্ম নিজ মনেই বিলীন রাখিবেন, না পৃথিবীতে প্রচার করিবেন, কিছুকাল এই চিন্তায় বিব্রত থাকিয়া, অবশেষে তাহার সেই ধৰ্ম্ম পৃথিবীতেই প্রচার করিয়া স্বয়ং সত্য ধর্মের প্রচারক বলিয়া জগতে বিখ্যাত হইলেন। এই নূতন ধর্ম প্রচারকের অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা অতি সামান্য। তৎকালে শিক্ষা বিষয়ে ভারতবর্ষের সর্ব প্রধান স্থান কাশীধামে গমন করিয়া বুদ্ধদেব পূর্বোক্ত পাচজন সমপাঠির দ্বারা ধর্ম প্রচার আরম্ভ করিলেন; কিন্তু তাহারা তাহাকে ব্রাহ্মণদিগের যুক্তি ও উপদেশের বিরুদ্ধগামী দেখিয়া অল্প কাল মধ্যেই পরিত্যাগ করিলেন। অন্যান্য কয়েকটী সাধারণ ঘটনায় তাঁহাকে কাশী পরি- ত্যাগ করিতে হইয়াছিল। সেই অবধি তাঁহার আর কোন বিশেষ ঘটনা জানা যায় না। বৌদ্ধদিগের অস্পষ্ট দুরভিজ্ঞেয় ধৰ্ম্ম গ্রন্থ হইতে এইমাত্র জানা যায় যে তিনি কাশী হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া একবার মগধে গমন করিয়াছিলেন। মগধ সুপ্রসিদ্ধ মহারাজ জরাসন্ধের রাজ্য। ইহার রাজ- ধানী অতি পূৰ্ব্বকাল হইতে ভারতবর্ষের একটী প্রধান নগর বলিয়া প্রসিদ্ধ। এখানকার শস্য ও ফল অতি সুস্বাদু ও পুষ্টি- কর। এ স্থানের ভূমির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি এত অধিক শাক্যসিংহ। যে অতি সামান্য যত্নে নানাপ্রকার অত্যুৎকৃষ্ট উদ্ভিদের জন্ম হয়। এখানকার জল বায়ু অতি পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর। অধি বাসীরা স্বভাবতঃ বলবান, সাহসী, নির্ভয় ও বুদ্ধিমান। ইহা- দের যুদ্ধকৌশলও অতি প্রসিদ্ধ। নগরটী দেখিতে অতি সুন্দর। প্রাসাদ সকলের শিল্পনৈপুণ্য অতি চমৎকার। তাহাদের মূল পৃথিবীগর্ভে দৃঢ় আবদ্ধ এবং ক্রমে শ্রেণীবদ্ধ থাকিয়া নগ- রের অপূর্ব শােভা সম্পাদন করিতেছে। এখানে বহুসংখ্যক নানাবিধ ধনী লােকের বাস। এখানকার ধনী বণিকগণ অদ্যা- পিও ভারতবর্ষের প্রায় সকল স্থানেই নানারূপ বাণিজ্য করিয়া থাকেনও এ নগরে মহারাজ জরাসন্ধ রাজত্ব করিয়া কালগ্রাসে পতিত হইলে ক্রমে তাঁহার বংশধরেরাই রাজত্ব করিয়া আসি- তেছিলেন। বুদ্ধের সমকালেও মগধ সিংহাসনে ভুবনবিখ্যাত বীরশ্রেষ্ঠ জরাসন্ধের বংশাবতংস বিম্বিসর নামে রাজা আসীন ছিলেন। তাহার শাসনগুণে তৎকালে ভারতবর্ষের সর্বত্রই মগধের জয়পতাকা উড়ডীন হইয়াছিল। কেবল মাত্র বর্তমান দিল্লীর নিকটবর্তী হস্তিনানগরে মহারাজ পরীক্ষিতের বংশজাত কোন কোন রাজা স্বাধীন অবস্থায় রাজত্ব করিতেছিলেন। বিম্বিসর সরলস্বভাব, প্রিয়ভাষী, বিদ্যোৎসাহী, বুদ্ধিমান, সাহসী অথচ বলবান এবং রমণীয় রূপলাবণ্যসম্পন্ন ছিলেন। তিনি সকলের প্রতিই দয়া প্রকাশ করিতেন; এমন কি তাহার শত্রুগণও দোষ স্বীকার করিলে তিনি অক্ষুন্ন হৃদয়ে তাহাদের দোষ মার্জনা করিয়া তাহাদিগকে আশ্রয় প্রদান করিতেন। এক্ষণে বুদ্ধও কাশী হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার শাক্যসিংহ। নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করিলে তিনি তাঁহাকে মগধে আহ্বান করিলেন। বুদ্ধ মগধ রাজ্যে আসিয়া সারীপুত্র কাত্যায়ন এবং মদ - গুল্য নামে তাঁহার সুবিখ্যাত তিন জন শিষ্যের সহিত মিলিত হইয়া ধর্মের সমধিক প্রচার ও উন্নতি সাধন করিতে লাগি- লেন। মহারাজ বিম্বিসর বুদ্ধের কতিপয় উৎকৃষ্ট যুক্তি ও উপ- দেশ শ্রবণ করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলেন। নগরস্থ সৰ্ব্ব- প্রকারের ধনী লোকেরা বক্তৃতা শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে এত মণি মুক্তাদি উপহার প্রদান করিল যে তাহা একটা সামান্য রাজ্যের রাজস্ব দিয়াও ক্রয় করা যায় না। রাজা বিস্কির বুকের যুক্তি শ্রবণে পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহার আশ্রম নির্মাণ জন্য পুরাতন রাজধানী পরিবেষ্টিত পৰ্বত পাঁচটীর মধ্যে একটীর শৃঙ্গ তাহাকে পুরস্কার প্রদান করেন এবং স্বয়ংও তাঁহার ধর্মকে পরম পবিত্র জ্ঞান করিয়া অবলম্বন করেন এবং তাহার সহিত বন্ধুত্ব করিয়া পরমসুখী হন। বুদ্ধের মগধে প্রদত্ত যুক্তি, উপদেশ ও বক্তৃতা সকল কালান্তকে ধর্মশালায় বদ্ধমূল হইয়া অদ্যাপিও ধর্মগ্রন্থরূপে বর্তমান রহিয়াছে। মহারাজের আৰ্য্যধৰ্ম্ম পরিত্যাগে তত্ৰত্য আৰ্য কুলভূষণ ব্রাহ্মণ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন; কিন্তু রাজার প্রতি কিছু করিবার অধিকার নাই বলিয়াই মনটদুঃখ মনেই বিলীন করিলেন। সাধারণ লােকে ধর্মের অবমাননা করিলে রাজা তাহাকে সমুচিত দণ্ড প্রদান করেন; কিন্তু যদি স্বয়ং রাজাই সেই দুরপনেয় পাপপঙ্কে লিপ্ত হন, তবে তাহার মুক্তি লাভের সদুপদেশই একমাত্র উপায় বিবেচনা করিয়া শাক্যসিংহ। D ব্রাহ্মণগণ নৃপসন্নিধানে গমনপূৰ্ব্বক কতিপয় পরম পবিত্র উপদেশ দান করিলেন; কিন্তু বিম্বিস তাহাদের কথায় কর্ণ- পাতও করিলেন না। তাহারা কিয়ৎক্ষণ অরণ্যে রােদনপ্রায় বৃথা বাকজাল বিস্তার করিয়া রাজসভা হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। মহারাজ তাহাদের কথায় কোথায় সম্মত হইবেন অসন্তোষ প্রকাশ করিয়া তাহাদের যথােচিত অবমাননা করিলেন। ব্রাহ্মণগণ একান্ত বিষাদমগ্ন হইয়া কালযাপন করিতে লাগিলেন। এই মহারাজের যুবরাজ পুত্র অজাতশত্রু বিবিধবিদ্যা- পারদর্শী ও সৎস্বভাব অশেষশক্তিসম্পন্ন সাহসী ও যুদ্ধ- নিপুণ ছিলেন। হিন্দু দেব দেবী ও ব্রাহ্মণদের প্রতি তাঁহার অটল ভক্তি ছিল। তিনি স্বভাবতঃ নিষ্ঠুর ও ক্রোধপরবশ ছিলেন বটে; কিন্তু বিনা কারণে কাহারও প্রতি কোন অত্যা- চার কি দৌরাত্ম্য করিতেন না। বুদ্ধের মত হিন্দু-শাস্ত্র-বিরুদ্ধ হওয়াতে তাহার প্রতি কুমারের শত্রুতা জন্মিল এবং জিগীষা ক্রমেই বৃদ্ধি হইতে লাগিল। মগধ কুমার এককালে বুদ্ধের প্রাণ সংহার করিবেন, এইরূপ সংকল্প করিয়াছিলেন, কিন্তু মগধেশ তাহার সহায় থাকায় কৃতকাৰ্য্য হইতে না পারিয়া পিতৃসমীপে গমনপূৰ্ব্বক তাহাকে বুদ্ধের ও তৎকৃত ধর্মের উচ্ছেদ জন্য বিস্তর অনুনয় বিনয় করিয়াছিলেন এবং বুদ্ধকে নাস্তিক ও তদ্ধর্মকে নাস্তিকধৰ্ম্ম বলিয়া নিন্দা করিয়া পুনর্বার পরম পবিত্ৰ সৰ্বসুখপ্রদ হিন্দুধর্ম গ্রহণ জন্য নানাপ্রকার যুক্তি প্রদর্শন করিলেন, কিন্তু বৌদ্ধধৰ্ম্ম তাহার অন্তরে এত দৃঢ় অঙ্কিত হইয়াছিল যে কুমার তাহার উচ্ছেদে অকৃতকার্য হইয়া ৬৪ শাক্যসিংহ। মনে মনে আপনাকে যৎপরোনাস্তি অপমানিত জ্ঞান করিতে লাগিলেন। তিনি তৎকালে বুদ্ধের বিনাশ-সংকল্প পরিত্যাগ করিয়া অগ্রে পিতার প্রাণবিনাশে স্থিরনিশ্চয় হইয়া তাহারই চেষ্টায় মনােনিবেশ করিলেন। অজাতশত্রু কি উপায়ে সংকল্পিত কাৰ্য্য সুসিদ্ধ করিয়া স্বাভীষ্ট সাধন করিবেন, দিবারাত্রি এই ভাবনায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। বৌদ্ধধর্মের উচ্ছেদ বাসনায় তিনি ভারত- বর্ষের যাবতীয় রাজগণের নিকট অনুরােধ পত্র প্রেরণ করিলেন। সকলেই একচিত্ত হইয়া তাহাতে সম্মতি প্রকাশ করিলেন। মগধকুমার রাজাদিগের নিকট অনুরােধপত্র প্রেরণেরুকনি- দীর্ঘকাল পরেই হিন্দু ধর্মের বিশেষ সমালােচনা আরম্ভ করি- লেন। স্থানে স্থানে দেবালয় ও ধর্মসভা স্থাপিত হইল, দেব দেবীদিগের ত্ৰৈকালিক পূজায় ও ব্রাহ্মণদিগের বেদাদিগ্রন্থ পাঠ দ্বারা নগরে হিন্দুধর্ম পুনর্জীবিত হইয়া শত গুণ প্রবল হইয়া উঠিল। তত্ৰত্য যাবতীয় সম্রান্ত লােক ও ব্রাহ্মণগণ কুমারের অশেষবিধ প্রশংসা করিয়া আশীর্বাদ করিতে লাগিলেন। সুশীল ধর্মশীল ব্রাহ্মণগণ নিরবচ্ছিন্ন ভঁহার সভায় উপস্থিত থাকিয়া সভার অশেষবিধ শােভা সংবর্ধন করিলেন। কুমারও তাহাদের কার্যে পরম সন্তোষ লাভ করিয়া নানাপ্রকার পুরস্কার প্রদান পূর্বক তাহাদিগকে উৎসাহিত করিয়া তুলি- লেন। অনেক প্রধান ক্ষত্রিয় বংশধর ও হিন্দু সৈনিকগণ রাজাকে অন্যধর্মাবলম্বী দেখিয়া তাহার প্রতি সাতিশয় অসন্তুষ্ট হই- য়াছিলেন। এই অবসরে রাজ্যে রাজদ্রোহ ও নানারূপ বিশ্ব- শাক্যসিংহ। জুলাও উপস্থিত হইয়াছিল। শত্রুগণ রাজ্যের এরূপ দুরবস্থা দেখিয়া স্বাধীন হইয়া স্বেচ্ছানুসারে চলিতে আরম্ভ করিয়া- ছিলেন। অজাত শক্রর হিন্দুধৰ্ম্মে দৃঢ় বিশ্বাস দর্শন করিয়া সৈনিকগণ পুনৰ্ব্বার তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করিলে তিনি তাঁহাদের সহায়তা বলে অত্যল্প কাল মধ্যেই শত্রুগণকে পদাবনত করিলেন। তঁাহার শক্তি প্রভাবে মগধের জয় পতাকা ভারতবর্ষের সর্বত্রই পুনৰ্বার নির্বিঘ্নে উডডীয়মান হইল। তিনি রাজ্যে সুশৃঙ্খলা বন্ধন করিয়া সকলের মনেই অপার আনন্দ প্রদান করিলেন। শৈমিগণ এক্ষণে তাঁহার একান্ত পদানত হইয়া আজ্ঞাভার বহন করিতে লাগিল। বুদ্ধ এই সকল ব্যাপার অবলােকন করিয়া একান্ত ভীত চিত্তে ধর্ম প্রচারের আড়ম্বর অপেক্ষাকৃত খর্ব করিয়া স্বয়ংও বহু-রক্ষক-পরিবেষ্টিত হইয়া অতি সাবধানে এক পুরী মধ্যে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। যুবরাজ আজাতশত্রু রাজ্যের সুশৃঙ্খলা সংস্থাপন করিয়া নিজ সংকল্পিত কার্য্যের অনুষ্ঠানে রত হইলেন। যােদ্ধগণ নগর- বাসী সম্ভ্রান্ত ধনিগণ এবং প্রজাপুঞ্জের সহায়তায় তিনিই বাস্ত- বিক রাজা হইলেন, বিধিসরের কেবল রাজা এই উপাধি- মাত্র রহিল। তিনি নামমাত্র রাজা ছিলেন, কোন রাজ- কার্য্যের উপর তাহার হস্তক্ষেপ করিবার সাধ্য ছিল না। মহারাজ পুত্রের এরূপ অবাধ্যতা দেখিয়া অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া অবিলম্বেই তাঁহার নির্বাসন সংকল্প করিলেন। কুমার ও তাহার অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া তাহার প্রাণ বিনাশ না করিলে স্বীয় অভীষ্ট সাধনের উপায়ান্তর নাই ভাবিয়া সেই শাক্যসিংহ। চেষ্টায় মনােনিবেশ করিয়া নিরন্তর তৎসাধনের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। একদা নিশীথকাল উপস্থিত ; গগন যেন অপূর্ব নীলপট পরি- ধান করিয়া নক্ষত্র ভূষণে বিভূষিত হইয়াছে; ভগবান কৌমুদী বল্লভ গগনমণ্ডলের মধ্যস্থলে উপস্থিত হইয়া অর্ধ রাত্রির পরিচয় প্রদান করিতেছে ; দক্ষিণ মলয়ানিল পুষ্পের সৌরভ ভার বহনে হীনশক্তি হইয়া ধীরে ধীরে গমন পূৰ্ব্বক লােক সমাজকে অপার আনন্দ দান করিতেছে ; জগৎ নিস্তব্ধ ; জীবগণ মায়া- বিনী নিদ্রার বশে অচেতন হইয়া কালনিদ্রায় নিদ্রিত আছে। মহারাজ একাকী প্রাঙ্গণে উপবেশনপূর্বক প্রকৃতির সন্দর্শন করিতেছেন, এমন সময়ে অজাতশত্রুর একজন গুপ্ত চর তাহাকে একাকী দেখিতে পাইয়া সত্বর গমনে কুমার সমীপে সবিশেষ নিবেদন করিল। তিনি তন্মুহুর্তেই রণবেশ ধারণ করিয়া দক্ষিণ হস্তে সুতীক্ষ্ণ শাণিত তরবারি এবং বাম হস্তে অসিচৰ্ম্ম গ্রহণ পূৰ্ব্বক সৈনিকদিগকে সুসজ্জিত থাকিতে ও ইঙ্গিত মাত্রে উপস্থিত হইতে অনুমতি করিয়া স্বয়ং পিতৃ- সমীপে উপস্থিত হইলেন। কুমারের তাদৃশ ভাব দর্শন করিয়া মহারাজের কলেবর কম্পিত হইয়া উঠিল। তিনি তাঁহার এরূপ বেশ গ্রহণের কারণ জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু কুমারের কালবেশ হইতে ভয় নামে একটা দুৰ্বও অসুর প্রাদুভূত হইয়া তাহার কণ্ঠবােধ করিল। তিনি দুই তিন বার কথা কহিবার চেষ্টা পাইয়াও অকৃতকার্য হইয়া মনের ইচ্ছা মনেই লীন করিলেন। কুমার গম্ভীর স্বরে বলিলেন রে দুরাত্মা! হিন্দুকুল পাংশুল নৃপাধম! তুই যেমন কৰ্ম্ম করিয়া- শাক্যসিংহ। ; ছিস, এই তার ফল হাতে হাতে গ্রহণ কর; এই রলিয়া খড় উত্তোলন পূর্বক তাহার শিরচ্ছেদ করিয়া অতি সত্বর স্বভবনে প্রবেশ করিলেন। রাজার প্রহরিরা কুমারের ভয়ানক আকৃতি দর্শন মাত্রেই ভয়ে পলায়ন করিল। অজাতশত্ৰু পিতৃহত্যার পর বুদ্ধের প্রাণসংহারে কৃতসংকল্প হইলেন। বুদ্ধও প্রিয় বন্ধু বিম্বিসরের মৃত্যুর পর আপনাকে একান্ত নিঃসহায় দেখিয়া আত্মরক্ষার জন্য তৎস্থান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক গঙ্গার উত্তর তীরে কোশল রাজ্যের রাজধানী স্রাবস্তি নগরে গমন করিলেন। তথায় অনাথপিণ্ডদ নামে একজন বিগত সম্রান্ত বণিক তাহার শিষ্যবর্গ সহ অধিবেশন জন্য বিবিধ কারুকার্য সম্পন্ন অট্টালিকাময় একটী পুরী প্রদান করেন। তথায় একটি বৌদ্ধ সমাজ স্থাপিত হয় এবং বুদ্ধের অধি- কাংশ যুক্তি, উপদেশ ও বক্তৃতা প্রকাশিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের বহুল প্রচার আরম্ভ হইলে নগরের অধিকাংশ লােকই তদ্ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলেন। বুদ্ধের স্রাবস্তিতে আগমনের অত্যল্প কাল পরেই কোশলরাজ প্রসন্নগীত তদ্ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়া তাহাকে গুরু বলিয়া স্বীকার করিলেন। তখন বুদ্ধ অজাত- শত্রুর ভয় হইতে একরূপ পরিত্রাণ পাইয়া মহারাজ প্রসন্ন- গীতের প্রসাদাৎ নির্বিঘ্নে পরম সন্তোষে কালযাপন করিতে লাগিলেন। অষ্টম অধ্যায়। বুদ্ধ বহু শিষ্য পরিবেষ্টিত হইয়া পরমালাদে স্রাবস্তিতে বসতি করিতে লাগিলেন। তথায় ক্রমেই তাহার শিষ্যসংখ্যা শাক্যসিংহ। বৃদ্ধি হইয়া বৌদ্ধ ধর্মের বহুল প্রচার ও শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইতে লাগিল; ক্রমে তাঁহার শিষ্যসংখ্যা এত অধিক হইল যে ধর্মাধিকরণে তাহাদের সমাবেশ হওয়া কঠিন হইয়া উঠিল বুদ্ধ একদা এইরূপ সমারােহে ও মনের আহলাদে ধর্ম প্রচার করিতেছেন, এমন সময় হঠাৎ তাহার মনের গতি পরিবর্তিত হইয়া উঠিল। তিনি পুনর্বার পিতৃ দর্শন বাসনায় কপিলবস্তুতে যাইবেন বলিয়া প্রিয় শিষ্য অথচ পরম হিতৈষী কোশলরাজ প্রসন্নগীতের নিকট বিদায় গ্রহণার্থ গমন করিলেন। বুদ্ধ দ্বারে উপস্থিত হইলে প্রতিহারী গমন পূর্বক গল- লগ্নীকৃতবাসে নিবেদন করিল, মহারাজ! বুদ্ধদেব দেশে উপস্থিত হইয়াছেন এবং আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রার্থনা করিতেছেন। মহারাজ বলিলেন, প্রতিহারি। অবিলম্বে তাহাকে এখানে আনয়ন কর। প্রসন্নগীত এই বলিয়া প্রতিহারিকে বিদায় করিয়া পারি- ষদবর্গ সহ নানারূপ কথােপকথন করিতেছেন, এমন সময় প্রতিছারিকে সঙ্গে করিয়া বুদ্ধদেব সভামণ্ডপে উপস্থিত হইলেন। মহারাজ গুরুদেবকে , আগত দেখিবামাত্র গাত্রোত্থান করিয়া উচিত সংবর্ধনা পূৰ্ব্বক উপবেশন জন্য রত্নময় সিংহাসন প্রদান করিলেন। বুদ্ধ প্রসন্নগীতকে নানা- রূপ অশীৰ্বাক্য প্রয়ােগ করিয়া তদুপরি আসীন হইলে মহারাজ জিজ্ঞাসা করিলেন ভগবন। আজ আপনাকে এত { উদ্বিগ্ন ও চঞ্চল প্রায় বােধ হইতেছে কেন? আপনার হাস্য- পূর্ণ মুখ অদ্য যেন রাহুগ্রস্ত চন্দ্র প্রায় মলিন ও নিস্তেজ বোধ হইতেছে। গুরুদেব! কেহ যদি আপনার মরম বেদনার শাক্যসিংহ। কোন কারণ উপস্থিত করিয়া থাকে বলুন, আমি তাহাকে এই মুহূর্তেই উচিত ফল প্রদান করিব। আর যদি আপনার শারীরিক কি মানসিক অন্য কোন প্রকার বিরক্তির কারণ উপস্থিত হইয়া থাকে তবে বলুন, তাহার প্রতিবিধান চেষ্টা করিব। আপনাকে এরূপ মলিন ও বিষন্ন দেখিয়া আমার যৎপরােনাস্তি কষ্ট বােধ হইতেছে; যাহাই কেন হউক বলিয়া আমায় সুস্থ করুন। বুদ্ধ প্রসন্নগীতের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া কহি লেন, বৎস! কেহ আমার কোন প্রকার মরম বেদনার উপস্থিত করে নাই। তোমার ন্যায় সৰ্বগুণশালী অদ্বিতীয়-শক্তিসম্পন্ন যাহার শিষ্য, তাহার অন্য কোনরূপ অসুখ ঘটিবার সম্ভাবনা কি? বৎস! তােমার যত্নে আমি একান্ত মনের সুখে কাল যাপন করিতেছি; বােধ করি দেব- গুরুও আমার ন্যায় নিরবচ্ছিন্ন সুখ সচ্ছন্দে কাল যাপন করিতে পারেন না। তুমি বিদ্যমানে আমার কোন প্রকার ভয় কি উৎকণ্ঠা জন্মিবার কোন সম্ভাবনাই নাই। তােমার অনুগ্রহেই দুরাত্মা অজাতশত্রুর হাত হইতে নিস্তার পাইয়াছি। বৎস! তুমি চিরজীবী ও চিরসুখী হও এই আমার বাসনা। ক্রমে তােমার রাজশ্রী সমুদায় পৃথিবী মধ্যে নির্বিঘ্নে বিচরণ করুন। তােমার শক্তি অনিবাৰ্য রূপে জগৎ শাসন ও অচিরে দুরাত্মা ধৰ্ম্মভ্রষ্টদিগের অহঙ্কার চূর্ণ ও খণ্ড খণ্ড করুক। বুদ্ধের বাক্যাবসান হইলে কোশলরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন, গুরুদেব! যদি কোনরূপ অসুখের কারণ উপস্থিত হইয়া না থাকে, তবে আপনার এতদূর চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ কি ?
শাক্যসিংহ। বুদ্ধ কহিলেন, বৎস! গত কল্য দ্বাদশ বৎসর পূর্ণ হইয়াছে, কপিলবস্তু ত্যাগ করিয়াছি, পরমারাধ্য পিতৃদেবের আর দর্শন পাই নাই; এক্ষণে তাঁহার চরণ দর্শন জন্য মন একান্ত অস্থির হইয়াছে; তাহাকে না দেখিয়া মন আর ক্ষণকালও ধৈৰ্য্য ধরিতে পারিতেছে না। বৎস! স্বর্গ তুল্য জন্মভূমি পরিদর্শ- নই আমার একমাত্র চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ। অতএব শীঘ্রই পিতৃ সদনে গমন করিবার মানসে তােমার নিকট বিদায় গ্রহণার্থ আসিয়াছি ; এক্ষণে তুমি সন্তুষ্টচিত্তে আমাকে বিদায় দিয়া আমার চিত্তের স্থিরতা সম্পাদন কর। ইহা শুনিয়া কোশলরাজ বলিলেন, মহাশয়! ক্ষণকুলের জন্যও আপনাকে ত্যাগ করিতে আমার ইচ্ছা হয় না; আপনার সহবাসে এত কাল যে কি সুখে কালযাপন করিলাম তাই। বলিবার নয়; আপনার গমন মনে করিয়াই আমার হৃদয় অকূল বিষাদে মগ্ন হইতেছে; কিন্তু আপনার মন একান্ত চঞ্চল ও বিষন্ন হইয়াছে দেখিয়া আপনাকে এখানে আর অধিক কাল বসতি করিতে বলিতে অভিলাষ হইতেছে না, বরং শীঘ্রই আপ- নাকে কপিলবস্তু পাঠাইতে বাসনা হইতেছে ; আপনার মনের উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি হইয়াছে, আপনি শীঘ্রই পিতৃদর্শনে গমন করুন। বুদ্ধ বলিলেন বৎস! অদ্য অপরাহেই গমনের ইচ্ছা ; তােমার সহিত দেখা শুনা এই পর্যন্তই শেষ হইল। মহারাজ পুনৰ্ব্বার বলিলেন, আপনার চিরশত্রু মহাপাপী অজাতশত্রু এখনও আপনার অনিষ্ট চিন্তা করিতেছে। অতএব আপনাকে কেবল অত্যল্প মাত্ৰ শিষ্য সঙ্গে পাঠাইতে আমার সাহস হইতেছে না। অভিপ্রায় এই, যে আত্মরক্ষাৰ্থ সহস্র সৈনিক সঙ্গে করিয়া ;
শাক্যসিংহ। ৭১ । লইয়া যান। বুদ্ধ বলিলেন বৎস প্রসন্নগীত ! তুমি অতি বিচ- ক্ষণ তােমার নিকট অধিক বাক্য প্রয়ােগ সমুদ্রে জলসিঞ্চন- প্রায় ; বেলা অধিক হইয়াছে, আমি এক্ষণে বিদায় হই, তুমি ধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া পুত্রসম প্ৰজাপুঞ্জ পালন, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে তৎপর হইয়া রাজনিয়মানুসারে রাজ্য শাসন ও অতুল যশ লাভ কর। বুদ্ধ এই বলিয়া গাত্রোখান পূর্বক প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলে মহারাজ, আৰ্য অভিবাদন করি বলিয়া প্রণত হইলেন। বুদ্ধ, বৎস! চিরজীবী ও চিরসুখী হও বলিয়া আশীর্বাদ করিয়া প্রস্থান করিলেন। কুদ্ধ প্রস্থান করিলে মহারাজ প্রধান সেনানীকে আহ্বান করিয়া কহিলেন যােবর! তুমি স্বয়ং সহস্ৰ সৈনিক সঙ্গে করিয়া আমার ইষ্টদেব পরমাত্মা শাক্যসিংহকে নিরাপদে কপিলবস্তু নগরে উত্তীর্ণ করিয়া আইস। ইহাতে কোনক্রমেই মনােযােগের ত্রুটি কি শৈথিল্য করিও না। সেনানী যে আজ্ঞা বলিয়া সহস্র যােদ্ধা সহ বুদ্ধসমীপে উপস্থিত হইলেন। ক্রমে অপরাহু উপস্থিত হইল, বুদ্ধ সমুদায় শিষ্যগণকে সাবস্তি ধর্মাধিকরণে রাখিয়া স্বয়ং অত্যল্পপ্রিয় শিষ্যের সহিত কপিলবস্তুতে গমন করিলেন। পথিমধ্যে অজাতশত্রু তাঁহার অনিষ্ট উৎপাদনের নানারূপ চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহার সহিত কোশলরাজদত্ত সহস্র যােদ্ধা থাকাতে তাহাতে কৃতকাৰ্য্য হইতে না পারিয়া অগত্যা রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলে বুদ্ধ নিরাপদে কপিলবস্তু উত্তীর্ণ হইয়া সৈন্যদিগকে কোশলে পুনঃ প্রেরণ করিলেন। সেনানী কোশলে উপস্থিত হইয়া নৃপসমীপে সবিস্তার
৭২
শাক্যসিংহ।
নিবেদন করিলে মহারাজ তাঁহাকে নানাপ্রকার মধুর সম্ভাষণ
করিয়া পুরস্কার প্রদান করিলেন। সেনানী রাজপ্রসাদ প্রাপ্ত
হইয়া পরমাহাদে শিবিরে প্রস্থান করিলেন।
বুদ্ধ বাড়ী আসিয়াছেন শুনিয়া নগর মধ্যে আনন্দলহরী
উখিত হইল, সকলেই মদবিহ্বল হইয়া নানাপ্রকার মঙ্গলা-
চরণ করিতে লাগিলেন। মহারাজ পুত্রের আগমন বার্তা শ্রবণে
অতীব প্রযত্নে রাধাবল্লভের পূজোপহার প্রদান করিলেন। পুরী-
মধ্যে নানাপ্রকার উৎসব আরম্ভ করিবার অভিপ্রায় করিয়া
সপ্তাহ পর্যন্ত স্ব স্ব কার্য পরিত্যাগ পূর্বক সকলকেই উৎসবে
ব্যাপৃত থাকিতে হইবে নগর মধ্যে এই ঘােষণ করিয়া
দিলেন।
এদিকে অন্দর মধ্যে কুমারের আগমন বার্তা প্রেরিত
হইলে রাণী অপহৃত-মণি-প্রাপ্ত ফণীর প্রায় অপার আনন্দ
প্রাপ্ত হইয়া সহচরীগণ দ্বারা নাগরিক কুলবধূগণকে আনয়ন
করিয়া অশেষবিধ মঙ্গলাচরণ করিতে লাগিলেন।
এমন সময় গােপা মন্দিৰােপরি পরিভ্রমণ করিতেছিলেন ;
তিনি রাণীর এরূপ আনন্দ দর্শন করিয়া পার্শ্বস্থ প্রিয় সহচরী
সত্যপ্রিয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন, সখি! ভাল দেখ ত, বার
বৎসর কাল পর্যন্ত অজস্র অশ্রু বিসর্জন করিয়া রাণী আজ কি
জন্য এরূপ উৎসব আরম্ভ করিলেন! বিধাতা কি এ-হতভাগি-
নীর প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমার সেই প্রাণবল্লভ শাককুলচন্দ্রকে
প্রত্যর্পণ করিলেন! * গত নিশিতে স্বপ্ন * এই মাত্র বলিয়াই
গােপার কণ্ঠবােধ হইল। তিনি অনিবার অশ্রুবিসৰ্জন করিতে
লাগিলেন। সত্যপ্রিয় অঞ্চলে তাহার বাস্প মােচন করিয়া
শাক্যসিংহ। ৭৩ বিসৰ্জন করিতে লাগিল। গােপা ক্ষণকাল মৌনী থাকিয়া পরে দীঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, সখি! সেচা জল কতক্ষণ থাকে ? স্বপ্নের কথা কি কখন সত্য হয় ? সে স্বপ্ন ভঙ্গ হইয়াছে'। সত্যপ্রিয়া পুনৰ্ব্বার বলিল, সখি! স্বপ্নে কি দেখিয়াছিস বল না শুনি! গােপা একটুকু চিন্তা করিয়া বলিলেন, সখি ! বলিতে কি কোন অমঙ্গলের কথা নয় ; রজনী প্রভাতকল্প, ভগবান নিশানাথ অস্তাচল-চূড়ায় আবাে- হণ করিতেছেন, পক্ষিগণ কল কল স্বরে ভাতিক সঙ্গীত করিতেছে, এমন সময়ে মৃদু অনিলভরে আমার নিদ্রাবেশ হই নিদ্রা দেবীর স্পর্শ মাত্রেই দেখিলাম, আমার জীবন- বল্লভ এ অভাগিনীর মন্দির মধ্যে প্রবেশ করিয়া পাশ্বে উপবেশন পূর্বক বলিলেন “ প্রিয়ে! রজনী প্রভাত হই- যাছে, এক্ষণে গাত্রোখান কর। * সখি! বলিতে কি, এমন সময় যেন আমার শিরে দারুণ বাজ পড়িল, নিয়মিত প্রাভা- তিক ভেরী নির্ঘোষে আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল, উঠিয়া দেখি আমার প্রাণনাথ কোথায়, দিনমণি নিজ জায়া ছায়ার সহিত রক্তিমাভা ধারণ করিয়া উদয়াচলচূড়াবলম্বন করিতেছেন। গােপা এই বলিয়াই অস্পষ্ট ক্রন্দন আরম্ভ করিলেন। সত্য- প্রিয়া গােপার বাক্যাবসান হইলে বলিলেন, সখি! লােকে বলিয়া থাকে, মানুষ দিবসে যে চিন্তায় কালযাপন করে, নিশিতেও তাহাই স্বপ্নে সন্দর্শন করিয়া অপার আনন্দ কি দুঃখ ভােগ করিয়া থাকে। যাহাই হউক, অবিলম্বে তাের স্বপ্ন সফল হউক। আমিও গত নিশিতে স্বপ্ন দেখিয়াছি, যে তুই সুকুমার এক নবকুমার প্রসব করিয়াছিস। ।
৭৪
শাক্যসিংহ।
s
সত্যপ্রিয়ার কথা শুনিয়া গােপর মুখে কষ্টহাসিপ্রায়
একটুকু হাসিও আসিল; মুস্তক দক্ষিণে ঈষৎ নত হইল,
দক্ষিণ কর্ণের কুণ্ডল কাপিতে লাগিল, তদুপরি কুঞ্চিত কেশা-
বলী লম্বমান থাকিয়া অপরূপ শােভা পাইতে লাগিল। তিনি
মৃদু মধুর স্বরে বলিলেন, সখি! আর চিন্তা কি! জগদীশ্বর বুঝি
এত দিনে তােমার সুদিন ঘটাইলেন। লােকে কথায় বলে
স্বপ্নে যে কিছু পরের ঘটনা দেখা যায়, তাহা নিজেরই ঘটিয়া
থাকে।” তবে সখি ! তােমারও বুঝি এত দিনে তাই ঘটিল ;
বা হউক শুভ সংবাদের মিথ্যাও ভাল।
সত্যপ্রিয়া বুদ্ধের পয়েন অবধি এই দীর্ঘ কালের
এইমাত্র গােপর মুখে হাসি দেখিয়া নিজেও একটুকু হাসি-
লেন। গােপা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি সখি! তুমি যে হাসিলে?
সে বলিল, সখি! অনেকদিন পরে তােমার মুখে হাসি দেখি-
যাই হাসিলাম। গােপা বলিলেন, সখি সত্যপ্রিয়ে। ভাল
আজ আমার এরূপ অবস্থা হইল কেন? বাম চক্ষু ঘন স্পন্দিত
হইতেছে ; শরীর আহ্বাদে পুলকিত, মন হর্ষপূর্ণ এবং প্রিয়-
জন দর্শন জন্য একান্ত উতলা হইতেছে। সখি! আমার সেই
প্রাণনাথের প্রথম দর্শন দিন ভিন্ন মন ত আর কখনও এরূপ
ভাব ধারণ করে নাই। আবার কি আজ আমার ভাঙ্গা কপাল
জোড়া লাগবে। জীবিতেশ্বর কি এ দাসীকে স্মরণ করিয়া দর্শন
দিবেন ? সত্যপ্রিয়া বলিল, সখি ! জগদীশ্বর বুঝি আমাদের
প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন; ভাল ধৈর্য ধারণ কর দেখা যাউক
!
কি হয়।
সখী সহ গােপা এই সকল কথােপকথন করিতেছিলেন,
শাক্যসিংহ। ৭৫ এমন কালে চিত্রাঙ্গিনী উপস্থিত হইয়া বলিল, ও মা একি! সখি ! ততদিগের যে বড় আাদ আহাদ দেখছি ! তােরা কি আমারও আগে শুনেছিস! সত্যপ্রিয়া বলিল, ভাল চিত্ৰাঙ্গিনি সে আবার কি! কই আমরা তােত কিছু শুনি নাই। কৈ কোথায় কি শুনিয়া কি দেখিয়া আসিলি, বল দেখি আমরাও শুনি! চিত্রাঙ্গিনী বলিল, ঠিকই তাে তােরা কিছু শুনিস নাই? তবে শুন আমি বলি ; আজ আমি রাণীর মহলে গিয়াছিলাম, সেখানে গুনিয়া আসিলাম, শাক্যকুলচন্দ্র কুমার বুদ্ধ আজ বাড়ী আসিয়াছেন। চিত্রাঙ্গিনী এই মাও বলিলেই গােপা বলিলেন সখি তাের কথা ভাল জানা আছে; ললাকে বলে “ গােড় কাটিয়া আগায় জল ” তােরও সেই কথা ; তুই যা আর আমার পােড়া ঘায় লেবুর রস দিয়ে জ্বালাস নে। চিত্রাঙ্গিনী বলিল সখি ! তুমি আমায় অবিশ্বাস করাে না; আমি তােমার মাথা খাই, তােমার মাথায় হাত দিয়ে দিব্য করে বলিতেছি রাজকুমার নগরে উপস্থিত হইয়াছেন। চিত্রাঙ্গিনীর বাক্য শ্রবণ করিয়া সত্য- প্রিয়া আর হাসি সংবরণ করিতে পারিল না ; বলিল, সখি । গােপে! এ দিব্যটী বড় মন্দ হইল না ; লােকে কথায় বলে। এ পরের মাথায় দিয়ে হাত কিরা করে নির্ঘাত » আমাদের চিত্রাঙ্গিনীরও সেই দশা, সে পরের মাথায় হাত দিয়ে যা বল ভাই বেশ দিব্য করিতে পারে। চিত্রাঙ্গিনী সত্য- প্রিয়ার কথা শুনিয়া বলিল তাের কথা শুনিলে গা জ্বলে যায়, ভাল চোক খাকী! চোক খেয়ে দেখে আয় না গিয়ে, কুমার এসেছে কি না ! সত্যপ্রিয়া হাসিতে লাগিলেন। তখন ; - শাক্যসিংহ। চিত্রাঙ্গিনী বলিল, রাজনন্দিনি! ও পােড়র মুখীর কথায় তুমি কাণ দিও না, আমি যা বলি তাই শােন। আমি মিথ্যা বলিলে যাকে ভাল বাসি তার মাথা খাই, দুটী চোক খাই, মলেও যেন গঙ্গা না পাই। রাজবালে! ঐ দেখ কুমারের আগ মনে নগর মহােৎসব-পূর্ণ হইয়াছে ; গৃহসকল বিবিধ সজ্জায় সজ্জিত হইতেছে, প্রতিগৃহের চূড়াই শ্বেত পীত ইত্যাদি ধ্বজা সকল ধারণ করিয়া কুমারের আগমন বার্তা ঘােষণা করিতেছে। গোপা বলিলেন, সখি আমি সব জেনেছি, তােমার আর অধিক বলিবার আবশ্যকতা নাই; এই বলিয়া তিনি সখীগণ সহ গৃহে প্রবেশ করিলেন। এদিকে বুদ্ধ পুরীমধ্যে প্রবেশ করিয়া পিতৃচরণে প্রণাম ও নানাপ্রকার কথােপকথনের পর অন্দরে প্রবেশ করিলেন। রাণী সখী বিধুমুখী সহ গৃহদ্বারে দণ্ডায়মান হইয়া কথােপ- কথন করিতেছিলেন, এমন সময় কুমারকে আগত দেখিয়া বিধুমুখীকে প্রেরণ পূর্বক তাহাকে উচিত সংবর্ধনায় আনয়ন করিয়া উপবেশন জন্য রত্নময় আসন প্রদান করিলেন। কুমার মাতৃচরণে প্রণাম করিয়া আসনে উপবেশন করিলে রাণী অশেষবিধ আশীৰ্বাদ করিয়া সুমধুর স্বরে মাঙ্গলিক বার্তা জিজ্ঞাসা করিলেন। কুমার উচিত উত্তর দান করিয়া মাতৃসমীপে বিদায় গ্রহণ করিলেন, পরে মাতৃসমা ধাত্রী বিধুমুখীকে মধুর সম্ভাষণ করিয়া গােপার ভবনে উপস্থিত হইলেন। গোপা দ্বিরদবদবিনিৰ্ম্মিত খটোপরি উপবিষ্ট হইয়া সখী সহ মনের আলাদে নানাপ্রকার কথােপকথন করিতেছেন, শাক্যসিংহ। ৭৭ এমন সময় বুদ্ধকে দেখিতে পাইয়া মনে মনে হাতে চাদ পাইয়া সখী সম্বােধিয়া বলিলেন, সখি ! ভাল দেখত, চুপি চুপি চোরের মত এ লােকটী কে আসিতেছে ? আহা! কি মনাে- হর রূপ দর্শনমাত্রেই আমার মন প্রাণ হরণ করিল। সখি বার বৎসর অতীত হইয়াছে, প্রাণবল্লভ পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছেন, এপর্যন্ত এ ভবনে আর কখনও পুরুষ দেখিতে পাই নাই আজ আবার এলােকটী কে আসিল একটুকু আগিয়ে দেখে আইস না! গােপার আজ্ঞায় সখী সত্যপ্রিয়া শীঘ্র গাত্ৰোথান করিয়া দ্বারদেশে যাইয়া কুমারবুদ্ধকে আগত দেখিয়া বলিল, মহাশয়। আমাদের এ পুরীমধ্যে পুরুষের প্রবেশে প্রিয়সখী গােপার নিষেধ আছে। আপনি যেই কেন হােন না; পুরীমধ্যে প্রবেশ করিবেন না; প্রবেশ করিলে উচিত দণ্ডবিধান হইবে। রাজ কুমার সখীবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন; সখি ! আমি তােমা- দের সখীর আজ্ঞা লঙ্ঘন করিব না। আমি তােমাকে যে দুটি একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি, তাহার উত্তর দিয়ে আমার পরম উপকার কর। সখি! ভাল আমার প্রাণাধিকা তো ভাল আছেন! সখী বলিল, ভাল মহাশয় ! সে আবার কি? আপ- নার প্রাণাধিকা ? আপনি কে ? কোথা হইতে আসিলেন ? আপনার প্রাণাধিকাই বা কে ? বুদ্ধ বলিলেন, সখি! আমায় চিনিতে পার নাই! চিনিতে পারিবেও না; সকলই সময়ে করে। তুমি গিয়ে তােমার সখীর নিকট সম্বাদ দেও, যে তােমার চিরাতি বুদ্ধ দ্বাবে উপস্থিত, অভিপ্রায় হইলে পুরীমধ্যে প্রবেশ করে। সত্যপ্রিয।
৭৮ শাক্যসিংহ। তখন সচকিত ভাবে প্রণিপাত করিয়া বলিল ; যুবরাজ । এ দাসীর দোষ গ্রহণ করিবেন না। বুদ্ধ বলিলেন, সখি! তােমার দোষ কি, আমার সময়ের দোষ। সখী বলিল, ভাল মহাশয় ! আমাদের সখীকে প্রাণাধিকা বলিতে কি আপনার অণুমাত্রও লজ্জা বােধ হইল না ? লােকে প্রাণত্যাগ করিয়া এক মুহূর্তও জীবিত থাকিতে পারে না! তবে আপনি প্রাণাধিকা সখীকে পরিত্যাগ করিয়া এতদিন কিরূপে জীবিত ছিলেন ? যাহা হউক, এতদিন পরে যে আপনি আমা- দের সখীকে স্মরণ করিয়াছেন, এও আমাদের মন্দের ভাল, শুভাদৃষ্টের পরিচয় বলিতে হইবে। রাজকুমার বলিলেন সুখি । এততা তুমি বল না! আমার সময়ে বলে। তােমাকে যাহা বলি- লাম যদি ইচ্ছা হয় অনুগ্রহ করে তাই কর। সখী যে আজ্ঞা বলিয়া প্রস্থান পূৰ্ব্বক গােপার নিকট সবিস্তার নিবেদন করিলে তিনি ক্ষণকাল মােনী থাকিয়া পরে কুমারকে আনয়ন করিতে আদেশ দিলেন। সত্যপ্রিয়া শীঘ্র আসিয়া কুমার সহ গােপার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল ; সখি ! এত দিন তুই যে মণিহারা হয়ে উন্মাদিনী প্রায় হইয়াছিল, এই তাের সেই মণি নে; শিরােমণি হিয়ায় ধারণ করে প্রাণ শীতল কর। বুদ্ধ সিংহাসনােপরি উপবেশন করিলে গােপা মুখ অৰ্ধাব- গুণ্ঠনে আবৃত করিয়া বসনমধ্য হইতে কুমারের প্রতি একবার কটাক্ষপাত করিয়াই অজস্র অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিলেন। কুমার গােপার করে কর সমৰ্পণ করিয়া উপবিষ্ট ছিলেন; এমন সময় তাঁহার হস্তে একবিন্দু নেত্রজল পতিত হইলে, তিনি চকিত নেত্রে চাহিয়া দেখিলেন গােপা কঁদিতেছেন। ;
শাক্যসিংহ। ! তখন তিনি নিজ বস্ত্র মধ্য হইতে উরণ বাহির করিয়া তাহার বাষ্প মুছাইয়া কহিলেন, প্রিয়ে ! যা হবার তা হয়ে গেল । এখন বৃথা ক্রন্দনে আর ফল কি বল, ক্রন্দন সংবরণ কর; সুখের সময় অসুখ,উপস্থিত হইলে মরমে যার পর নাই ব্যথা উপস্থিত হয় ; অতএব প্রেয়সি ক্রন্দন করিয়া আর আমায় ব্যাকুল করিও না। পাঠক মহাশয় কিঞ্চিৎ মাত্র মনােযােগ করিলেই বুঝিতে পারেন, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর প্রেম পুনর্জীবিত হইলে মান কতক্ষণ থাকিতে পারে। গােপা অবগুণ্ঠন মুক্ত করিয়া কথােপকথন আরম্ভ করিলেন; নানারূপ সুআলাপে নিশি যাশন করিয়া প্রভাতে কুমার বহিৰ্বাহী প্রবেশ করিলেন। বুদ্ধ বহির্বাটী আসিয়া স্বকৃত ধর্ম প্রচার আরম্ভ করিলে অনেকেই প্রথম তাহাতে বিরক্তি প্রকাশ করিয়া তদ্ধৰ্ম্ম গ্রহণে অসম্মত হইয়াছিলেন; কিন্তু অল্প কাল মধ্যে সমুদয় শাক- বংশ তদ্ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলে অনেকেই আগ্রহের সহিত বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে লাগিলেন। গােপাও কিছুকাল কিংকর্তব্য বিমূঢ় থাকিয়া পরে পতিকেই স্ত্রীজাতির একমাত্র গুরু স্থির সিদ্ধান্ত করিয়া তাহার ধর্মে দীক্ষিত হইলেন। তাঁহার মাতৃস্বসাও গােপার অনুবর্তিনী হইলেন। বৌদ্ধদিগের মধ্যে প্রথম এই স্ত্রী বৌদ্ধ প্রথা আরম্ভ হইয়া ক্রমে তাঁহাদেরই প্রযত্নে ধর্মাধি- করণ স্ত্রীপূর্ণ হইয়া উঠিল। বুদ্ধের শিষ্যসংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তিনি বহু শিষ্যের গুরু হইয়া পরমালাদে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। ; ==
শাক্যসিংহ।
নবম অধ্যায়।
অজাতশত্ৰু পিতৃ হত্যার পর অনেকবার বুদ্ধেরও বিনাশ
সাধনে উদ্যত হইয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন
নাই। এক্ষণে তাঁহার যৌবনকাল অতীত, বল বিক্রম এবং
মনের চাঞ্চল্য দূরে অপসারিত হইয়া মন শান্তি রসে পরি-
পূর্ণ হইল। তিনি বিপু পরাজয়ে যত্নশীল হইয়া জ্ঞানী,
ও ধার্মিকদিগের সহবাস করিতে লাগিলেন। এটী প্রকৃতির
স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম “ যৌবনকালে যিনি যতই কেন দুশ্চরিত্র হউন
না, যিনি অল্প কি অধিক যে পরিমাণে পাপই করুন না,
যৌবন অন্তে তাহার অপােচনা করিয়া তাহার মনে মনে
অবশ্যই আত্মগ্লানি উপস্থিত হইবে।” ইহার অণুমাত্রও ভুল
নাই, প্রকৃতির নিয়মের বশীভূত হইয়া অজাতশত্রু ও এখন
পিতৃ হত্যাদি যৌবনকালকৃত যাবতীয় পাপ কাৰ্য্য মনে করিয়া
আত্মগ্লানি উপস্থিত হওয়ায় আপনা হইতেই মরমে আঘাত
পাইতে লাগিলেন, এবং যাবতীয় স্বকৃত পাপকাৰ্য আলােচনা
করিয়া মনে মনে আপনাকে মনুষ্যত্বহীন পশু প্রায় বিবেচনা
করিয়া যার পর নাই কষ্ট পাইতে লাগিলেন।
অজাতশত্রুর এখন সে অবস্থা নাই, মনােবৃত্তিও পূর্বের
ন্যায় সতেজ নাই, মলিনতা ক্রমেই তাহার দেহের মনােহর
কান্তি হরণ করিতেছে, মুখশ্রী এক্ষণে নিস্তেজ হইয়া ভীরু-
তার পরিচয় দান করিতেছে, মনােবৃত্তিসকল তেজোহীন
হইয়া ক্রমেই শান্ত ও নির্বিকার হইতেছে। মগধরাজ প্রধান
অমাত্যের তি যাবতীয় রাজকার্য্যের ভার প্রদান করিয়া
স্বয়ং প্রিয় সহচরী চিন্তা দেবীকে সঙ্গে করিয়া পিতৃহত্যার
শাক্যসিংহ।
দুরপনেয় পাপপঙ্ক হইতে মুক্তিলাভের উপায় স্থির করিবার
জন্য দিবা রাত্রি এক নির্জন গৃহ আশ্রয় করিলেন; কিন্তু
তাহাতেও কোন উপায় স্থির করিতে না পারিয়া একান্ত
বিষয় মনে কাল যাপন করিতে লাগিলেন।
অজাতশত্রু এইরূপ বিষাদে মগ্ন আছেন এমন
সময় বুদ্ধ পুনৰ্ব্বার মগধরাজ্যে উপস্থিত হইলেন। এক্ষণে
তাহার বয়স দশাধিক এয়ােবিংশ বর্ষ, কিন্তু শারীরিক নিয়ম
পালন নিবন্ধন দৃঢ়কায় ও সবল শরীর, হঠাৎ দেখিলে যুবা
বলিয়া অনেকেরই ভ্রম জন্মিয়া থাকে। বুদ্ধ মগধে উপস্থিত
হইলে বিহারপতি তাঁহার প্রতি কােন অত্যাচার না করিয়া
বরং যথােচিত সম্মান প্রদর্শন করিয়া তাহাকে রাজধানীতে
আহ্বান করিলেন। বুদ্ধ প্রথমতঃ পূৰ্ব্ব কথা মনে করিয়া
তাহার আহ্বানে একান্ত ভীত হইয়াছিলেন । কিন্তু অবশেষে
অজাতশত্রুর অবস্থা শুনিয়া তাহার সে ভয় দূরীভূত হইল, তখন
তিনি নির্ভয়ে রাজগৃহে উপস্থিত হইলেন। মগধরাজ তাহার
আগমনবার্তা শুনিয়া তাহার অধিবেশন জন্য পুরীর বাহিরে
বিবিধ রত্নাদি খচিত অশেষ কারুকার্য্য-বিনির্মিত একটা
অট্টালিকা মনােনীত করিলেন; এবং একজন প্রধান কার্য্য
কারককে একদল সৈন্য ও ভেরী ধ্বজাদি রাজ চিঃ সঙ্গে করিয়া
বুদ্ধের উচিত সংবর্ধনায় সেই মন্দিরে আনয়নপূর্বক পরম
যত্নে অতিথি সৎকার করিতে কহিলেন। বুদ্ধ মগধপতির প্রযত্নে
পরম সন্তোষ লাভ করিয়া সেই গৃহে সে দিবস যাপন
করিলেন।
পর দিবস রজনী প্রভাত হইলে অজাতশত্রু বুদ্ধের সাক্ষাৎ
শাক্য সিংহ।
কার বাসনা করিয়া দ্বারে উপস্থিত হইলে তাহার প্রিয় শিষ্য
সারীপুত্র গমন পূর্বক গুরুসমীপে মগধরাজের আগমনবার্তা
নিবেদন করিলেন। বুদ্ধ ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করি-
লেন, তিনি কি একাকীই আসিয়াছেন? সারীপুত্র বলিলেন,
মহাশয়! তাহার সহিত অল্পমাত্র অস্ত্রধারী রক্ষক ও এক
জন পারিষদ আসিয়াছে। বুদ্ধ বলিলেন, তাহাদিগকে দেখিয়া
কি রাজার নিয়মিত পাশ্বচর না অন্য কোনরূপ মন্দবুদ্ধি সম্পন্ন
বােধ হইল ? সারীপুত্র বলিলেন, তাহারা রাজার নিয়মিত
পাশ্বচর, সকলেই শান্তপ্রকৃতি, দেখিলে সরলস্বভাব ও ধর্ম
চিন্তা-তৎপর বলিয়া দ্বাধ হয় ; মগধরাজকেও এখন
পূর্বের ন্যায় দুরভিসন্ধি-সম্পন্ন বলিয়া বােধ হইল না। বুদ্ধ ও
সারী পুত্র এরূপ কথােপকথন করিতেছেন এমন সময়
কাত্যায়ন আসিয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন! বিহারপতি
অজাতশত্রু দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া আপনার সাক্ষাৎকার
লাভের ইচ্ছা করিতেছেন। ফাটক মধ্যে অনেকক্ষণ থাকাতে
আতপতাপে তাপিত হইয়া যার পর নাই ক্লান্ত হইয়াছেন,
যাহা অভিপ্রায় হয়, আজ্ঞা করুন। বুদ্ধ ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া
কহিলেন, তােমর চল আমি স্বয়ংই যাইয়া তাহার সহিত
সাক্ষাৎ করিব। এই বলিয়া প্রিয় শিষ্য সারীপুত্র ও কাত্যায়ন
সমভিব্যাহারে দ্বারে উপস্থিত হইয়া মগধপতির হস্ত ধারণ
পূৰ্ব্বক অশেষবিধ সদালাপ করিতে করিতে মন্দিরমধ্যে প্রবেশ
করিয়া উভয়েই এক রত্নময় আসনে উপবেশন করিলেন।
কিয়ৎক্ষণ শিষ্টালাপের পর অজাতশত্রু বলিলেন,
মহাশয় ! এ দুরাচার মহাপাপী পিতৃহন্তা আপনার নিকট
শাক্যসিংহ। অগণিত দোষে অপরাধী, বােধ করি নানারূপ প্রায়- শ্চিত্ত করিলেও সে সকল দোষ হইতে মুক্তি লাভের উপায় নাই; আমার অন্তে গতি কি হইবে ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। আমার এক্ষণে শেষ কাল উপস্থিত, আপনারও নিৰ্ব্বাণ প্রাপ্তির অল্পদিন মাত্র অবশিষ্ট আছে। মহাশয় ! এ জগতে কাহারাে চিরদিন সমান যায় না ; কাৰ্য্যে মিত্রও শক্ত হয় এবং শত্রুও এককালে পরম মিত্র বলিয়া পরিগণিত হয়। যত্ন করিলে লােকে বিষ হইতেও অমৃত গ্রহণ করিতে পারে এবং সময়ে অমৃত হইতেও বিষের সৃষ্টি হইয়া থাকে। লােকে যেলাহল পানে মুহূর্ত মধ্যে জীবনতাগ করিয়া থাকে, আবার সেই হলাহলই সময়ে অগণিত ব্যাধিনাশ করিয়া মনুষ্যের পরমােপকারী হয়। একান্ত সৎস্বভাব-সম্পন্ন ব্যক্তিও নানা কারণে স্বভাবদূষিত হয় এবং মহাপাপ মন্দবুদ্ধি দুরাত্মা ধর্মভ্রষ্টদিগেরও আবার অল্প- কাল মধ্যেই মনের গতি পরিবর্তিত হইয়া পরম পবিত্র ও সৰ্বত্ৰ সাধুতার দৃষ্টান্ত স্থল হইতে দেখা যায়। আমি যে পরি- মাণে পাপ কৰ্ম্ম করিয়াছি, ইহাতে আমার মুখ দর্শন করিলেও পরম পবিত্র স্বভাব তাপসবৃন্দের শরীরে পাপ স্পর্শ করে। আমি এক সময় আপনার প্রাণ বিনাশ পর্যন্তও সংকল্প করি, য়াছিলাম, কিন্তু এক্ষণে আপনার নিকট এই মাত্র প্রার্থনা . করিতেছি যে আপনি আমাকে পূর্ব শত্রু বিবেচনা না করিয়া আমার যৌবনকৃত যাবতীয় দোষ মার্জনা করুন; পূর্ব কথা স্মরণ করিলে আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতেও আমার লজ্জা বােধ হয়।
৮৪
শাক্যসিংহ।
বুদ্ধ বলিলেন, মহাশয়! চিরদিন কাহারাে সমভাব থাকে
; সকলেরই মাতৃগর্ভে শশাণিতময় দেহ থাকে, ভূতলে
পতিত হইলে জননী প্রবঙ্গে ক্রমে হৃষ্ট পুষ্ট বলিষ্ঠ হয় এবং শৈশ
বাদি কাল বিশেষে মন পৃথক পৃথক্ গতি অবলম্বন করে।
যৌবনকালে শরীর সবল এবং মনােবৃত্তিসকল সতেজ হয়।
তৎকালে অনেকেই উচিত মত রিপু শাসনে অকৃতকার্য হইয়া
নানারূপ কুকর্মে লিপ্ত হন। আমার অনিষ্টচিন্তা সে আপনার
দোষ নয়, এটা যােবনকালের স্বাভাবিক নিয়ম। আপনি
আমার অনিষ্টচিন্তায় তৎপর ছিলেন, আমিও যে একবারেই
আপনার অনিষ্টচিন্তা করে নাই এরূপ কহিতে পারি ।
আপনি সবল, আমি দুৰ্বল বলিয়াই আপনার চিন্তা অপেক্ষা
আমার চিন্তাও দুর্বল, সে চিন্তা প্রকাশে আমার নিজেরই
অনিষ্ট হয় বলিয়া মনের চিন্তা মনেই রাখিয়াছি; আপনার
সে চিন্তা প্রকাশে কোন ক্ষতি নাই বলিয়াই প্রকাশ করিয়া-
ছেন; তাহাতে আপনার দোষ আর আমারই বা গুণ কি?
কিন্তু আপনার যে এত দূর স্বভাবের পরিবৰ্ত্ত হইয়াছে,
ইহাতেই আমি পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। আজাতশত্রু
বলিলেন স্বভাবের পরিবৰ্ত্ত না করিয়াই বা কি করি? আমি
যেরূপ আমার পিতার একমাত্র পুত্র ছিলাম, সেইরূপ আবার
আমারও বহু পুত্র হইয়াছে, কি জানি পাছে তাহারা আমার
অনুকরণ করে। বুদ্ধ বলিলেন, মহাশয় ! আমি আপনার
কল্যকার সমুদাচারে পরম সন্তোষ লাভ করিয়াছিলাম, কিন্তু
আজ তাহা হইতেও শতগুণ অধিক সন্তোষ লাভ করিলাম।
আমি প্রার্থনা করি, আপনি পৃথিবীর একমাত্র অধীশ্বর হন।
-
No text on this page.
?