Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Swadhinatar Sangram

Pramanik, Manimay · 2010/03/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বাধীনতার সংগ্রাম
শ্রীমণিময় প্রামাণিক বি,এ
এক টাকা ]
বৰ্মণ পাবলিশিং হাউস
১৯৩ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট
কলিকাতা

গ্রন্থকার কর্তৃক
২-এ, অক্রুর দত্ত লেন
‘রহস্য-লহরী’ প্রেস হইতে
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
১লা মে, ১৯২৮।
| বৰ্ম্মণ পাবলিশিং উসের সত্ত্বাধিকারী কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

স্বাধীনতার সংগ্রাম আমেরিকার স্বাধীনতা সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের পরপারে আমেরিকা মহাদেশ অবস্থিত। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগের পূর্ব পর্যন্ত ইউরােপের কোন জাতির এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের অস্তিত্বও জানা ছিল না। পুরাকাল আমেরিকা হইতে স্থলপথে আরব বণিকদের মারফতে ভারতের আবিষ্কার সহিত স্পেন-পওঁ গীজদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রচলিত থাকায় স্পেন ও পর্তগীজবাসীদের মধ্যে সুবর্ণ-প্রসবিনী ভারতের অতুল ধনসম্পদ সম্বন্ধে অনেক আজগুবি গল্প বটিয়াছিল। এই সময় পর্ব গাল ও স্পেনের কতিপয় অসম-সাহসী উদ্যমশীল যুবক-জলপথে ভারত-আবিষ্কারের জন্য বাহির হন। তরুণদের এই অভিযানে কলম্বস নামক জনৈক ব্যক্তি সহস্র বিপদ উপেক্ষা করিয়া ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে ১২ই অক্টোবর উষার স্নিগ্ধ আলােকে এক সুবিস্তীর্ণ নূতন ভূখণ্ড দেখিতে পান,—এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডই আমেরিকা এবং তদবধি ইহা নৃতন-জগত নামে অভিহিত হইয়া আসিতেছে।

স্বাধীনতার সংগ্রাম ইউরােপীয়দের নিকট আমেরিকা নূতন জগত হইলেও তাহা সকলের নিকট নূতন নহে। কতিপয় মনীষীর-গভীর-প্রাণপাত গবেষণার ফলে জানা যায় যে পুরাণাদিতেও আমেরিকায় হিন্দু-উপনিবেশের ভারতের নৌ-অভিযান কথা উল্লিখিত আছে। যব, বলী, লম্বক ও বাের্ণিয় দ্বীপ দিয়া হিন্দুগণ আমেরিকায় গিয়াছিলেন। পূর্বোক্ত দ্বীপগুলিতে আজও হিন্দুর বসতি বিদ্যমান থাকায় অতি প্রাচীন যুগের আমেরিকায় হিন্দু- উপনিবেশের কথা একেবারে ভিত্তিহীন বলিবার কোন যুক্তিযুক্ত হেতু দেখি । যাহাই হউক এই পুস্তকে হিন্দুসভ্যতার বিস্তার বিষয়ক আলােচনা অপ্রাসঙ্গিক হইবে। তবে অনেকেই আমাদের অতীতের নৌ-অভিযানের গৌরব-কাহিনী সম্বন্ধে একেবারেই জানেন না। সেইজন্য এই আলােকের মাত্রআভাষ দিলাম। অনুসন্ধিৎসু পাঠক এই বিষয়ে আলােচনা করিলে অনেক লুপ্ত স্মৃতির-পঙ্কোদ্ধার হইবে সন্দেহ নাই। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরােপীয় জাতিবৃন্দ ধনৈশ্বর্যের লােভে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠিয়াছিলেন। দেশের পর দেশ লুণ্ঠন করিয়া সমৃদ্ধিশালী হওয়াই তাঁহাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। ইহার ফলে ইউরােপের উপনিবেশ স্থাপন রাজন্যবর্গের মধ্যে দ্বেষ, হিংসা, কলহ লাগিয়াই ছিল। ঐশ্বৰ্য্য-লালসার তীব্র হলাহলে যখন ইউরােপ জর্জরিত ঠিক সেই সময়ে আমেরিকা আবিষ্কৃত হইল। স্পেনীয়েরাই আমেরিকায় প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেন। এদিকে আমেরিকার সােণা দানার মণি-মাণিক্যের কথা সমগ্র ইউরােপে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। এই সংবাদে ফরাসী, ইংলণ্ড ও হলাণ্ড প্রভৃতি দেশ লক্ষ্মীর কৃপালাভের আশায় দলে দলে আমেরিকায় ছুটিল। কিন্তু ইহারা কেহই স্বাধীনতার সংগ্রাম আমেরিকায় স্থায়ী উপনিবেশ স্থাপন করেন নাই। পরবর্তী কালে ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসের জন্য নির্যাতিত, রাজনৈতিক অত্যাচারে প্রপীড়িত, অর্থ- কষ্টে ক্লিষ্ট ইউরােপীয়ানগণ প্রাণের দায়ে নিজেদের স্বদেশ, বাস্তুভিটা ত্যাগ করিয়া আমেরিকায় আসিয়া স্থায়ীভাবে উপনিবেশ স্থাপন করে। এই নিৰ্যাতিত বিদেশাগত সৰ্বহারা যাত্রীর দলই Pilgrim-fathers নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। অবশ্য দক্ষিণে ভার্জিনিয়া প্রভৃতি স্থলে তুলার চাষাবাদে প্রচুর ধনাগমের জন্য অনেক ইংরাজ ধনীসন্তানও আমেরিকায় আসিয়া উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন। এই সময়ে ইউরােপে একটি ধর্ম-বিপ্লব উপস্থিত হয়। মার্টিন লুথার এবং জর্জ ফস্ এই ধৰ্ম্ম-বিপ্লবের অগ্রদূত। তৎকালে সমগ্র ইউরােপে রােমের পােপের ক্যাথলিকধৰ্ম্ম প্রবর্তিত ছিল। Pilgrim জাৰ্ম্মাণীতে মার্টিন লুথার পােপের এই ক্যাথলিক Fathers ধৰ্ম্মের বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই অনেকেই লুথারের মতাবলম্বী হন। লুথার পােপের ধর্মমতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার প্রবর্তিত ধৰ্ম্মকে প্রতিবাদ মূলক অথবা Protestant Religion নামে অভিহিত। জর্জ ফক্স নামক জনৈক পিউরিটান আবার কোয়েকার নামক এক সম্প্রদায় গঠন করেন। তিনি বিবেকের বাণীকেই সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। ইংলণ্ডে বিভিন্ন খ্ৰীষ্ট-সম্প্রদায়ের মধ্যে বহুদিন যাবৎ বাদ-বিসম্বাদ চলে ; কিন্তু সে সময়ে ইংলণ্ডের রাজবংশ ছিল ক্যাথলিক। সুতরাং রাজার মতের বিরুদ্ধে চলিলে আর কাহারও রক্ষা ছিলনা। কাজেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ী পিউরিটানরা ভয়ানক ভাবে রাজশক্তি কর্তৃক নির্যাতিত হইতে । ৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম লাগিল। দিনের পর দিন উৎপীড়নের মাত্রা চরমে পৌছিল। অবশেষে অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে ধর্মমতের পার্থক্য হেতু সহস্র সহস্র নরনারীকে গাছে ঝুলাইয়া ফাসী পৰ্যন্ত দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু এবম্বিধ শত অত্যাচার সত্ত্বেও ধর্মপ্রাণ পিটরিটানরা কিছুতেই নিজেদের ধর্মমত পরিবর্তন করিতে স্বীকৃত হন নাই। অবশেষে রাজ-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া নিজ মাতৃভূমি চিরতরে পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক তাহারা ১৬২০ খ্রীষ্টাব্দে সুদূর আমেরিকা মহাদেশ অভিমুখে যাত্রা করেন, তথাপি নিজেদের বৈশিষ্ট্য জলাঞ্জলি দেন নাই। এই অত্যাচার উৎপীড়নে অটল স্বাধীনচেতা ধর্মপ্রাণ যাত্রীর দলই Pilgrim fathers নামে জগতের ইতিহাসে সুপ্রসিদ্ধ এবং আমেরিকার নবাগত এই যাত্রীরদল বর্তমান আমেরিকাবাসীর পূৰ্ব্ব-পুরুষ। আমেরিকার আদিম-নিবাসীরা এই অভ্যাগতদের প্রথমতঃ সমাদরের সহিত আপন দেশে স্থান দিয়াছিল। কিন্তু অর্থগৃধু নবাগতেরা উপকারীর উপকার বুঝিলনা। ইউরােপীয়ানগণ উপনিবেশ স্থাপন আদিম নিবাসী করিবার জন্য আমেরিকায় উপস্থিত হইয়া ইণ্ডিয়ান গণের স্থান অধিকার করিতে সচেষ্ট হইল। তাহাদের প্রতি কুকুর শৃগালের ন্যায় বর্বরােচিত ব্যবহার করিতে লাগিল। সুতরাং অসভ্য অধিবাসীরাও এই শঠতার যথাসাধ্য প্রত্যুত্তর দিতে ভূলিল না; কিন্তু হায় ! সুসভ্য জাতির প্রতিযােগীতার সহিত পারিবে কেন ? ধীরে ধীরে আমেরিকার প্রকৃত অধিবাসীরা ধ্বংশের মুখে চলিল। আমেরিকার এই আদিম-নিবাসীদের রেড-ইণ্ডিয়ান বলে। পূর্বে ' বলিয়াছি, স্পেনীয়েরা দলে দলে ভারত-আবিষ্কারের জন্যই বাহির হইয়াছিল। কাজেই, কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করিয়া মনে রেড, ইণ্ডিয়ান স্বাধীনতার সংগ্রাম অশান্তির পূর্বে করিলেন ভারত আবিষ্কার করিয়াছেন। দেশীয়েরা শরীরে একরকম লাল রং মাখিত বলিয়া তাহাদের নাম রেড-ইণ্ডিয়ান করা হয়। উত্তর-আমেরিকায় ইংরাজরা স্থায়ী উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক শতাব্দীর কিছু অধিক সময়ের মধ্যে তেরটি বিভিন্ন প্রদেশ স্থাপিত হইল। প্রত্যেক প্রদেশের নিজের নিজের এক একজন শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়া অধিবাসীগণের মতামত লইয়া শাসন-পদ্ধতি রাজকার্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন। ইংলণ্ডের রাজা অধিবাসীদের কাৰ্যে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করিলেন না। ফলে, রাজ্য- শাসনে, শিক্ষায় ও সমাজে অপ্রতিহত স্বাধীনতা-স্রোতে তাহাদের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ সহজেই অস্ফুরিত হইয়া উঠিল। আপনা আপনিই দেশে সাধারণতন্ত্র শাসনপ্রণালী প্রবর্তিত হইল। নির্বাচনের দ্বারা শাসনকর্তা নির্ধারিত হইতে লাগিল। দিনের পর দিন এইরূপ স্বাধীনভাবে বাস করিয়া আমেরিকা-অধিবাসীদের স্বভাবতঃ স্বাধীনতাপ্রিয় হৃদয় আরও স্বাধীনতাপ্রিয় হইয়া উঠিল। কিন্তু তাহাদের এইভাবে স্বাধীন জীবন-যাপন বেশী দিন ঘটিল না । অচিরে দ্রুত উন্নতিশীল আমেরিকা-অধিবাসীদের উপর ইংলণ্ডের খেন-দৃষ্টি পতিত হইল। ইংলণ্ড আমেরিকা-অধিবাসীদের অশান্তির বীজ লাভে ভাগ বসাইতে চাহিলেন। কাজেই অধিবাসীদের স্বাধীন শাসন-তন্ত্রের দিকেই তাঁহাদের প্রথমে নজর পড়িল। অকস্মাৎ শাসন-কাৰ্য্যের অখণ্ড স্বাধীন-স্রোত বাধা পাইল। ইংলণ্ডের রাজা নিজে ইংলণ্ড হইতে শাসন-কৰ্ত্তা মনােনীত করিয়া পাঠাইতে আরম্ভ করিলেন। স্বাধীনচেতা অধিবাসীরা ইহাতে অবােয়াস্তি বােধ করিতে লাগিল।

স্বাধীনতার সংগ্রাম মানুষ মানুষকে দাস করিবার দারুণ লালসা-মত্ত হইয়া ভুলিয়া যায় মানুষকে মানুষ কখনও শক্তি দিয়া বশ করিতে পারে না। এক জাতির উপর অপর এক জাত্নীর শাসন, কোন কালেই শাসিতকে তুষ্ট করিতে পারে না। বৈদেশিক শাসনকর্তা, সৰ্ব্বদেশে সৰ্বকালে সৰ্বরূপ অনিষ্টের মূল। নিজের শাসন কুশাসন হইলেও সহ্য হয়, তথাপি পরের শাসন যতই না কেন মঙ্গলময় হউ তাহা শ্রেয়ঃ হইতে পারে না। বিদেশীর শাসন বিদেশীর স্বার্থই ষােল আনা দেখে। সুতরাং সেখানে সু-শাসন ভ্রান্তি মাত্র। বিজিত জাতির পরাজিতকে শাসন করিবার এই দুরন্ত অভিলাষই যুগে যুগে জগতে অশান্তির সৃষ্টি করিয়াছে ও করিবে। আমেরিকাতেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। ১৭৩৪ খৃষ্টাব্দে ‘কবে’ নামক এক ব্যক্তি আমেরিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি শাসনকর্তা হইয়াই অযথা অত্যাচারে দেশ উদ্বস্ত করিয়া তুলিলেন, সেই সময়ে নিউইয়র্কের একখানি সংবাদপত্র দলন সংবাদপত্রের সম্পাদক ‘পিটার জেঙ্গার শাসনকর্তা ‘কসবের নীতি-বিরুদ্ধ কাৰ্য্যাবলীর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাহাকে অবিলম্বে এই বে-আইনী এবং রাজদ্রোহ-জনক রচনার জন্য গ্রেপ্তার করা হইল, এমন কি জামিন পৰ্য্যন্ত দেওয়া হইল না। পরিশেষে'নয় মাস মােকদ্দমা চলার পর তিনি মুক্তি পাইলেন। রাজ-আইনে তিনি দণ্ডিত হইলেন না বটে কিন্তু এই দীর্ঘ নয় মাস কাল বৃথাই হাজতে পঁচিয়া মরিতেছিলেন। জামিনে খালাস দিলে তাহাকে এই বৃথা কষ্ট ভােগ করিতে হইত না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের এই চেষ্টায় দেশে হুলস্থূল পড়িয়া গেল। লােকে রাজ-শাসনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন স্বাধীনতার সংগ্রাম আরম্ভ করিয়া দিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করিলে জাতির একতার সূত্র ছিন্ন হইয়া যায়। জনমতের মুখপত্র সংবাদপত্র। সুতরাং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা এবং জনমতকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করা একই কথা। সাৰ্বজনিক বিষয়ে সাধারণের বাদানুবাদ করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা ও মুদ্রা-যন্ত্রের স্বাধীনতা ব্যতিরেকে ইংলণ্ডের বর্তমান কনষ্টিটিউসনাল-সরকারের গঠন সম্ভবপর হইত না। বক্তৃতা ও মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতাই রাষ্ট্রীয় ভাবের উৎপত্তি ও পরিপুষ্টি করিয়া থাকে। সুতরাং বর্তমানে যদি মুদ্রান্ত্রের স্বাধীনতা বিশ্বের কোন অংশে আবশ্যকতা থাকে তবে তাহা ভারতবর্যেই সর্বাপেক্ষা অধিক। কারণ ভারতবাসীরা একে রাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে অজ্ঞ, তদুপরি আমলাতন্ত্র পরিচালিত ভারতের শাসনভারের প্রতিবাদ করিতে হইলে একমাত্র মুদ্রান্ত্রের সহায় ব্যতিরেকে দ্বিতীয় উপায় নাই। যাহাই হউক আমেরিকায় ইংলণ্ডের দলন-নীতির প্রথম সূচনা সংবাদপত্র-দলন। স্বাধীনতা আসে কি করিয়া ? পৃথিবীতে যে সকল বিশ্ব-বিপ্লবী আন্দোলন হইয়া গিয়াছে তাহাদের পশ্চাতে অনেক মনীষীর গভীর গবেষণা ও প্রাণপাত চেষ্টা দেখা যায়। জাতিকে তাহার জাতীয়তা আমেরিকার মাতৃভূমি বিষয়ক জ্ঞান, ভক্তি এবং আত্মসম্মান উদ্বদ্ধ দীক্ষাগুরু বেঞ্জামিন করিতে হইলে তদুপযােগী সাহিত্য এবং ভাবধারার ফ্রাঙ্কলিন বহুল প্রচার একান্ত আবশ্যক। মানুষের কাজ তাহার চিন্তা-ধারার একটি বহিপ্রকাশ মাত্র। সুতরাং জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনে ব্ৰতী করিতে হইলে প্রথমে তাহার চিন্তাধারার জড়তা দূর করিয়া স্বাধীন এবং সরস করা প্রয়ােজন। ১১ স্বাধীনতার সংগ্রাম আমেরিকার এই চিন্তা-বিপ্লবের সুকঠিন ভার পড়িয়াছিল মহা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের উপর। মহাত্মা বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকাকে স্বাধীনতার নূতন এবং সজীব চিন্তাধারার দ্বারা প্লাবিত করিয়াছিলেন। তাঁহার চিন্তাধারার মূলমন্ত্র ছিল—Unite or die অর্থাৎ হয় মিলন না হয় মৃত্যু। তাহার এই নীতি হইতে আমেরিকার নাম ইউনাইটেড, ষ্টেট হইয়াছে। আমেরিকা বেঞ্জামিনের প্রচারিত মিলনের মহামন্ত্র সম্যক অনুভব করিতে পারিয়াছিল, তাই সে আজ স্বাধীন; কারণ আমেরিকার বিভিন্ন জনপদ সমূহ এবং বিভিন্ন জাতির মিলন ভিন্ন ইংলণ্ডের মহাশক্তিকে কখনই বিচ্ছিন্ন ভাবে বাধা দিতে পারি না। আমাদের ভারতবর্যেও নানা প্রদেশ, নানা ভাষা, নানা ধৰ্ম্ম, নানাজাতি হওয়ায় এক-মন এক-প্রাণে দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনের পথে অভাৰ কন্টক স্বরূপ হইয়া দেখা দিয়াছে। মহানুভব বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭০৬ খৃষ্টাব্দে বােষ্টন সহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা সাবান ও বাতি প্রস্তুত করিতেন। দশ বৎসর বয়সেই বেঞ্জামিনকে পিতার এই কার্যে ব্রতী হইতে হয়। পরে তাঁহার এই কাৰ্যে অমনােযােগ দর্শনে তাঁহার পিতা তাঁহাকে ছাপাখানার কাৰ্য্যে নিযুক্ত করেন। কিন্তু যে মহাপ্রাণ বিরাট কৰ্তব্য-ভার লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন তাহার গতিরােধ করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই। অচিরে তাঁহার অসামান্য প্রতিভা জগৎকে বিস্ময়স্তব্ধ করিয়া দিল। পরবর্তী কালে তিনি মহাপ্রাণ দেশ-হিতৈষী এবং প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিক-রূপে বিশ্ববাসীর নিকট পরিচিত হইয়াছেন। এদিকে যখন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন প্রভৃতির চেষ্টায় দেশে নব জাগরণের স্বাধীনতার সংগ্রাম সাড়া পড়িয়া গিয়াছে, দেশবাসী একতাবদ্ধ হইয়া স্বাধীনতা অর্জনে বদ্ধপরিকর হইয়াছে ঠিক তখন অপরদিকে ইংলণ্ডের ১৭৬৫খৃঃ ৪াম্প- আইন রাজা তৃতীয় জর্জ তাহাদের সকল চেষ্টা, সকল উদ্যম ব্যর্থ করিয়া পরাধীনতার কঠিন নিগড়ে বাধিবার জন্য মামলা-মােকদ্দমায়, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং বিবাহের কাগজ পত্রাদিতে বৃটিশ সরকারের ষ্ট্যাম্প ব্যবহার করিতে হইবে, এই মৰ্ম্মে ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে ষ্ট্যাম্প-আইন প্রবর্তিত করিলেন। দেশের অবস্থা তখন অতীব শশাচনীয়। সবে মাত্র ফরাসীর সহিত যুদ্ধ শেষ হইয়াছে। যুদ্ধে আমেরিকা ঔপনিবেশীকেরা অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঋণ-ভারে প্রপীড়িত হইয়া পড়িয়াছে। তাহার উপর নুতন করভার স্থাপিত হওয়ায় তাহারা তাহাদের এই দুরবস্থায় ষ্ট্যাম্প-আইন র করিবার জন্য কাতর নিবেদন জানাইল। ইংলণ্ড তাহাদের এই ন্যায্য কাতর নিবেদনে ঐক্ষেপও করিল না। কাজেই দেশে অশান্তির মূর্তি ঘনাইয়া উঠিল—এই অন্যায়ের প্রতিকারার্থে। (১) দেশে যখন আগুন জ্বলিয়া উঠে তখন কোন একটি মাত্র কারণে জ্বলিয়া উঠে না। তাহার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং অন্যায় জুলুমের পর জুলুমে কোন বিধি-সঙ্গত প্রতিকারের উপায় না পাইয়া বা ব্যর্থ হইতে দেখিয়া তাহারা বিপ্লবের আগুনে ঝাপাইয়া পড়ে। ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দের এক্স-লা চ্যাপেলের সন্ধির পর হইতেই বৃটিশ সরকার ক্রমাগত আমেরিকাকে দাবে রাখিবার চেষ্টা করেন এবং তত্রত্য অধিবাসীর অধিকার ক্ষুঃ করিয়া নিজেদের অযথা আধিপত্য বিস্তার করিতে চেষ্টা করেন। তাঁহাদের এই চেষ্টার বীভৎস মূর্তি প্রকাশিত হইয়া পড়িল ১৭৬১ খৃষ্টাব্দে। ১৭৬১ (১) ভারতেও ইংরাজ ষ্ট্যাম্প-আইন প্রবর্তিত করিয়াছেন।

স্বাধীনতার সংগ্রাম খৃষ্টাব্দে আমেরিকার উপর “আমদানী শুল্ক” ধার্য করা হইল এবং তাহা আদায়ের জন্য কড়াকড়ি আরম্ভ হইল। ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে আমেরিকার বন্দরে আগত মাল বােঝাই জাহাজ সমূহ কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করিতে লাগিলেন। আমেরিকা কিছুতেই এই কর প্রদানে স্বীকৃত হইল না, অধিকন্তু ইহাকে অনায্য দাবী বলিয়া প্রতিবাদ করিতে লাগিল। তাহারা বলিল, বিলাতে পার্লামেন্ট-মহাসভায় আমেরিকার প্রতিনিধি নাই। যে মহাসভায় আমাদের প্রতিনিধি নাই তাহার নির্দেশ আমরা মানিয়া চলিতে বাধ্য নহি। বৃটিশের অন্যায় প্রভুত্বকে তারা কোন মতেই মানিয়া লইতে পারিল । আমেরিকাবাসীর এবধি মানসিক অবস্থার উপর ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে “ষ্ট্যাম্প-আইন পাশ হইল। আমেরিকায় অসন্তোষের বহ্নি জ্বলিয়া উঠিল। এই ষ্ট্যাম্প আইনই অদূর ভবিষ্যতে ইংরাজকে আমেরিকার প্রভুত্ব ত্যাগ করিতে বাধ্য করিয়াছিল। কিন্তু গতির বিচিত্র ভঙ্গিমা মানুষের করায়ত্ত নহে। যে ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে “স্ট্যাম্প আইনে গতির বিচিত্র ভঙ্গিমা ইংরাজের আমেরিকা অধিকারে ভাঙন ধরিয়াছিল ঠিক সেই খৃষ্টাব্দেই বক্সার যুদ্ধ-বিজয়ী ইংরাজ ভারত সম্রাট সাহ আলমেরর দুর্বল হস্ত হইতে মিত্রতার আবরণে বঙ্গদেশের শাসনভার প্রাপ্ত হইলেন। আমেরিকার লুণ্ঠনের দ্বার চিরতরে বন্ধ হইল, ভারতের দ্বার উন্মুক্ত হইল। খৃষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর হইতে ষ্ট্যাম্প আইন কার্যকরী হয়। আমেরিকাবাসী উক্ত দিবসকে জাতির শােকের দিন মনে করিয়া দোকান- পাট ও কাজ-কর্ম সমস্তই বন্ধ রাখে এবং যাহাতে শশাকের দিন “ষ্ট্যাম্প-আইন” কাৰ্যতঃ চালান অসম্ভব হয় তাহারও চেষ্টা চলিতে থাকে। এক দিকে স্থানে স্থানে ষ্টাম্প কাগজ পােড়াইয়া ১৭৬৫ ১৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম ফেলা হইল এবং বণিক-সম্প্রদায় ষ্ট্যাম্প-আইন র না হওয়া পর্যন্ত বৃটিশ পণ আমদানী করিবে না বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিল। অপর দিকে বণিক- জাতি ইংরাজের মূল স্বার্থে ঘা দিবার জন্য এবং দেশকে আত্মপ্রতিষ্ঠ করিবার জন্য ফ্রাঙ্কলিন প্রভৃতি মনীষীর পরামর্শমত দেশের শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতিসাধনকল্পে নানারূপ চেষ্টা করিতে লাগিল। দেশের যখন এইরূপ অবস্থা তখন হঠাৎ আকাশের কালাে-মেঘ কাটিয়া গেল। ঘটনাচক্রে এই সময় আমেরিকায় “ষ্ট্যাম্প-আইন” বলপূর্বক প্রচলনের প্রধান উদ্যোক্তা ইংলণ্ডের মন্ত্রী মিঃ গ্রেনভাইল পদত্যাগ করিলেন এবং তৎপরিবর্তে উদার হৃদয় স্বাধীনচেতা ও দূরদর্শী পিট মহােদয় ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রাপদে অভিষিক্ত হইলেন। মিঃ পিট মন্ত্রী হইয়াই ষ্ট্যাম্প-আইন” র করিলেন। দেশ আবার শান্তির স্নিগ্ধ-চ্ছটায় উদ্ভাসিত হইল। এই শান্তি ও স্নিগ্ধতা অধিক দিন স্থায়ী হইল না। পরবৎসরই, ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে চা, গ্লাস, শিসা, রং, কাগজ প্রভৃতি আমেরিকার আমদানীর উপর তৎকালীন ইংলণ্ডের সচিব “রেভিনিউ এ্যাক্ট” নামে এক নূতন কর ধার্য্য করিলেন। কিন্তু পরে অন্যায্য কর আদায় করা অসাধ্য দেখিয়া চায়ের উপর প্রতি পাউণ্ডে তিন পেন্স করিয়া কর নির্ধারিত করা হইল এবং অন্যান্য পণ্যের উপর কর প্রত্যাহার করিলেন। দেশ পুনরায় ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল, এই অত্যাচারের প্রতিকারার্থে প্রথম যথারীতি আবেদন নিবেদনের পালা চলিল। কিন্তু ইংলণ্ড দেশবাসীর এই কাতর নিবেদনের প্রতি কর্ণপাত না করিয়া আমেরিকাকে তরবারীর বলে দমন করিতে উদ্যত হইলেন। ঔপনিবেশিকগণকে নির্যাতন করিবার জন্য ১৭৬৮ চা-কর স্বাধীনতার সংগ্রাম খৃষ্টাব্দে দুই দল সৈন্ত বােষ্টনে উপনীত হইল এবং ইংরাজ রণতরীর নাবিকেরা জনৈক আমেরিকাবাসীর একখানি নৌকা লুণ্ঠন করিল। উন্মত্ত দুর্ধর্ষ সৈন্যদল উপস্থিত হইলে স্বভাবতঃই নানারূপ অকথ্য অত্যাচার যে হইয়া থাকে তাহা বলাই বাহুল্য। চারিদিকে অপ্রতিহত অত্যাচারের সংবাদ দিনের পর দিন বৃদ্ধিই পাইতে লাগিল। হঠাৎ ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে রাজ- পথে একদিন কতকগুলি স্কুলের ছাত্রের উপর গুলি চলিল। তাহার সপ্তাহ খানেক পরে সৈন্য-বারিকের সম্মুখ পথ দিয়া গম্যমান কতকগুলি লােকের উপর গুলি বর্ষিত হইল। গুলির আঘাতে তিন জনের মৃত্যু হইল এবং তিন জন আহত হইল। দৈনন্দিন এবম্বিধ পাশবিক অত্যাচারে দেশ যে উত্তেজিত হইয়া উঠিবে তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি! বরং উত্তেজিত না হওয়াই আশ্চর্য ! দেশের লােক দলবদ্ধ হইয়া বল সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। সকলে প্রতিজ্ঞা করিলেন, আমেরিকার সহিত ইংলণ্ডের সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিতেই হইবে এবং তজ্জন্য সকলে হয় স্বাধীনতা অর্জন নয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিবেন। ইহাকেই বলে স্বাধীনতার জন্য জাতির প্রাণের সত্যকার জাগরণ। তাহারা প্রতিজ্ঞা করিল চা-কর উঠাইতে না পারিলে চা আর খাইবে সঙ্গে সঙ্গে বৃটিশ-পণ্য বয়কট মন্ত্র প্রচারিত হইতে লাগিল। ১৭৭৩ খৃষ্টাব্দে বােষ্টন বন্দরে চা-বােঝাই এক জাহাজ উপস্থিত হইল। দেশবাসী একটি সভা করিয়া স্থির করিল চা-কর রহিত না হওয়া পর্যন্ত কোন মতেই চা নামাইতে দেওয়া হইবে না এবং পরে আবার ঠিক হইল 'ঐ চা সমুদ্রের জলে ভাসাইয়া দিতে হইবে। রাত্রি নয়টার সময় কতিপয় ভদ্রলােক আমেরিকার আদিম নিবাসী কুলীদের বেশ ধারণ করিয়া স্বাধীনতার সংগ্রাম v জাহাজে আরােহণ করিল এবং ৩৪৫টী চা-র বাক্স সমুদ্রের জলে ভাসাইয়া দিল। অকস্মাৎ এই ঘটনা ঘটায় সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত ছিল না সুতরাং রক্তপাত হইল না। ইহার পর হইতে চা-র জাহাজ উপস্থিত হইলেই দলে দলে লোেক সমবেত হইয়া চা নামাইতে বাধা প্রদান করিতে লাগিল। ইতিপূর্বেই যে সকল চা দেশে আমদানী হইয়া জমা ছিল তাহা কেহ ক্রয় না করায় বাক্স বন্দী অবস্থায় পঁচিতে লাগিল। ইংলণ্ড এই সংবাদে তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন। বােষ্টন এই ক্ষতির প্রতিশােধ লইবার জন্য বােষ্টন পাের্ট বন্ধ করিয়া দিলেন। “ম্যাসা- চুসেটস এ্যাক্ট” পাশ করিয়া আমেরিকার অধিবাসীদের পূর্ব সনদ সমূহের রদ করিলেন। বৃটিশ সেনাপতি কেজকে ৪ দল সুশিক্ষিত সৈন্য সমভি- ব্যাহারে ঐ প্রদেশের শাসনকর্তা ও সৰ্ব্বেসর্বা নিযুক্ত করিয়া পাঠান হইল। নানাভাবে আমেরিকাকে সম্পূর্ণরূপে ইংলণ্ডের অধীন করিবার চেষ্টা চলিতে লাগিল। কিন্তু ইংলণ্ড যতই করুন গােড়ায় ভুল করিলেন। কোন জাতিকে যে পশু-বলে শাসন করা চলে না এই সত্যটি ইংলণ্ডের শক্তিমত্তা মস্তিষ্ক কিছুতেই বুঝিতে চাহিল না। ফলে ইংলণ্ডের অত্যাচারের মাত্রা অথবা দমনের প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল ততই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়িয়াই চলিল। ১৭৭৪ খৃষ্টাব্দের ফিনাডেলফিয়া কংগ্রেস আমেরিকার অন্যান্য সমস্ত প্রদেশ একত্রিত হইয়া প্রকাশ্যেই ইংলণ্ডের আইন অমান্য করিবার প্রস্তাব পাশ হইল। ইহার পরে আমেরিকাবাসী প্রকাশ্যেই ইংলণ্ডের বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছে। দেশে এই দুর্দিনে আবির্ভাব হইল জর্জ ওয়াসিংটনের। কোন ১৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম জাতিকে উদ্বুদ্ধ করিতে হইলে—চাই জ্ঞান ও কর্মের সংমিশ্রণ। সৰ্ব্ব- কালে, সৰ্ব্বদেশে এবং সর্ব অবস্থায় ইহাই জাতীয় জাগরণের মূলমন্ত্র। আমেরিকার স্বাধীনতার পথেও দুই মহান প্রাতঃস্মরণীয় বীর স্বাধীনতার এই দুই ( জ্ঞান ও কৰ্ম্ম ) মহামন্ত্র প্রচার করিয়া আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পথ সুগম করিয়াছিলেন—জ্ঞানবীর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, কৰ্ম্মবীর জর্জ ওয়াসিংটন। পূৰ্ব্ব হইতেই বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন হৃদয়ে হৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও একতার আবশ্যকতা এবং প্রতিনিধিত্ব ব্যতীত করভার সহিব না, ও প্রতিনিধিত্ব ব্যতীত আইন কানুন মানিব না ইত্যাদি সারগর্ভপূর্ণ তথ্যগুলি প্রাণপণ চেষ্টায় বিস্তার করিয়াছিলেন। আর আজ এই দেশের দুর্দিনে ওয়াসিংটন কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ায় জাতীর এই স্বাধীনতার প্রচেষ্টা কৰ্ম্মের মধ্য দিয়া পরিণতি প্রাপ্ত হইল। জর্জ ওয়াসিংটন এক দরিদ্র কৃষকের পুত্র ছিলেন। ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে ভার্জিনিয়ার অন্তর্গত এক পল্লীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালেই তাঁহার পিতৃবিয়ােগ হওয়ায় বাল্যকালে পাঠাভ্যাস জর্জ ওয়াসিংটন করিবার সুযােগ পান নাই। তাঁহার আর্থিক এবং সাংসারিক বিপদ তাহার প্রথম জীবনে উন্নতির পথে প্রতি পদে অন্তরায় , হইয়াছে। এই অনটনক্লিষ্ট দরিদ্র বালকই ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের প্রেসি- ডেন্ট পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। তাঁহার মাতৃভূমি আমেরিকার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা ও কৰ্ম্মবহুল জীবন আমেরিকাবাসীর নিকট তাহার নাম প্রাতঃস্মরণীয় করিয়া রাখিয়াছে। যােড়শ বৎসর সময় হইতে তিনি যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা করেন। বাল্যকাল হইতে স্বাবলম্বন শিক্ষা করায় তাহার মনের ও দেহের দৃঢ়তা সাধিত স্বাধীনতার সংগ্রাম হইয়াছিল। এই দৃঢ়তা তাঁহার ভবিষ্যতের কঠিন সৈন্যজীবনে অনেক সহায় হইয়াছিল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সৈন্যদলের অধিনায়কত্ব প্রাপ্ত হন। তাহার পর যখন ইংলণ্ড আমেরিকায় যুদ্ধ বাধিল তখন তাঁহার রণকৌশল ও দক্ষতা আমেরিকাকে জয়মাল্য ভূষিত করিয়াছিল। ফিলাডেলফিয়া কংগ্রেসের পর হইতে আমেরিকাবাসী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিল ; এই সময় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইংলণ্ড ও আমেরিকার বিবাদ মিটাইবার জন্য ইংলণ্ডে গমন যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। কিন্তু তাহার এই শুভ চেষ্টায় ইংলণ্ড কর্ণপাত করিলেন না। উপরন্তু আমেরিকায় “অস্ত্র-আইন” জারি করা হইল। আমেরিকাবাসী লুক্কায়িতভাবে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া কনকর্ডে সমবেত হইবে লাগিল। আমেরিকার ইংরাজ শাসনকর্তা মিঃ গেজ এই সংবাদ পাইয়া তাহাদের বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা দমন করিবার জন্য পূর্বাহ্নেই এক দল সৈন্য প্রেরণ করিলেন। কিন্তু কয়েকজন স্বদেশপ্রেশিক আমেরিকা- বাসী কনকর্ডের জাতীয় সৈন্যদলকে প্রস্তুত হইবার অবসর দিবার জন্য সামান্যমাত্র অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ইংরাজের এই সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণ করিল। এই স্বদেশপ্রাণ যুবকদল প্রাণপণ শক্তিতে করিয়া সম্মুখ যুদ্ধে প্রাণ দিল কিন্তু তাহাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হইয়াছিল। কনকর্ডে জাতীয় সৈন্যদল সুপ্রতিষ্ঠিত হইবার সুযােগ পাইয়া ইংরাজ সৈন্যবাহিনীকে ঘাের যুদ্ধে পরাস্ত করিল। স্বাধীনতার চেষ্টারই জয় হইল। কিন্তু ইংরাজ সহজে সহজে ছাড়িবার পাত্র নহে। বাংকাস হিলে আবার উভয় পক্ষে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এই সময় আমেরিকার জাতীয় সৈন্যদল সংখ্যায় মাত্র দেড় সহস্র ছিলেন। কাজেই আমেরিকা পরাজিত ১৯ স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং ইংরাজেরই জয় হইল। আমেরিকা যদিও পরাজিত হইল তথাপি তাহার শক্তি সামর্থ্যের পরিচয়ে শত্রুপক্ষ ইংলণ্ডকেও বিস্মিত হইতে হইয়াছিল। এই যুদ্ধে এয়ারেন নামক একজন সুদক্ষ সেনা নিহত হওয়ায় যুদ্ধে পরাজয় অপেক্ষাও আমেরিকাবাসী অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত এবং বেদনা অনুভব করিয়াছিল। যাহাই হউক আমেরিকাবাসী কিছুতেই হতাশ হইলেন না। বরং দ্বিগুণ উৎসাহে তাহাদের স্বাধীনতার পথ পরিষ্কার করিবার জন্য কাজে লাগিয়া গেল। ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে হইতে ১৭৮২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় আট বৎসর কাল ক্রমান্বয়েই যুদ্ধ চলিয়াছিল। বাংকার্স হিল বাংকার্স হিল যুদ্ধের পর আমেরিকার ফিলাডিলফিয়ার দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন হইল এবং কংগ্রেস হইতে ইংলণ্ডে রাজার নিকট পুনরায় এক আবেদনপত্র প্রেরিত হইল। ইংরাজ তখন সবেমাত্র বাংকাৰ্গ-হিল যুদ্ধে জয় করিয়া জয়ােল্লাসে তাহাদের আবেদঘৃণাভরে উপেক্ষা করিয়া মিঃ গেজকে পূৰ্ব্ববৎ যুদ্ধে চালাইবার আদেশ দিলেন। এইদিকে আমেরিকাবাসী ও নিশ্চিন্ত ছিল না। আমেরিকা- বাসী কর্মবীর ওয়াশিংটনকে সেনাপতি পদে বরণ করিল। জর্জ ওয়াশিংটন সসৈন্যে বােষ্টন নারাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। পথে ইংরাজ সেনাপতি মিঃ হােয়ের সহিত তাঁহার সংঘর্ষ উপস্থিত হইলেন। এই সংঘর্ষে ইংরাজ সেনাপতি সসৈন্তে অবরুদ্ধ হইলেন। পরে ইংরাজ সেনাপতি অবিলম্বে বােষ্টন নগয় ত্যাগ করিবেন এই সৰ্তে ওয়াশিংটন ভঁহাকে মুক্তি দিলেন এবং মহাসমারােহে বােষ্টন নগর অধিকার করিলেন। এই জয়ে উৎফুল্ল হইয়া আমেরিকাবাসী স্বাধীনতার ঘােষণা পত্র প্রচার করিলেন। ইহাতে আমেরিকাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলিয়া ঘােষিত হইল। #, # স্বাধীনতার সংগ্রাম কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা বলা যায় না। ইহার পরই লঙ, দ্বীপে ওয়াশিংটন সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হইয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। এই সময় তাঁহার বহু সৈন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হইল এবং ছত্রভঙ্গ হইয়া যে যেখানে পারিল গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিল। ওয়াশিংটনকেও বহুদিন যাবৎ প্রাণের ভয়ে দেশ দেশান্তরে পলায়ন করিয়া গুপ্তভাবে আত্মরক্ষা করিতে হইয়াছিল। ফিলা ভেলফিয়া হইতে কংগ্রেস সভা বাল্টিমোরে উঠিয়া যাইতে বাধ্য হইল এবং ফিলা ভেলফিয়া ইংরাজ কর্তৃক অধিকৃত হইল। কিন্তু ঠিক এই সময়ে ওয়াশিংটন সারােটোগার যুদ্ধে আসীম সাহসিকতার সহিত ইংরাজ সৈন্ত আক্রমণ করিয়া তাহাদিগকে বন্দী করিলেন। ইংরাজের এই পরাজয়ে আমেরিকার ভাগ্যগগনের কালাে মেঘ কাটিয়া গেল। অল্পদিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন ফিলা ভেলফিয়া পুনরুদ্ধার করিলেন। স্বাধীনতাগৰ্বে আমেরিকা আবার হাসিয়া উঠিল। কিন্তু তথাপি ইংলণ্ডের সহিত আমেরিকার বিবাদ মিটিল না। এদিকে যখন আমেরিকায় যুব্ধ আরম্ভ হইল তখন মহাপ্রাণ ফ্রাঙ্কলিন এই অনর্থক নরহত্যা রােধ করিবার জন্য ইংলণ্ডে গমন করেন। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ মনােরথ হইয়া ইংলণ্ডের চিরশত্রু ফরাসীর ফরাসীর মিত্ৰতা নিকট গমন করিলেন। তৎকালীন ফরাসী সম্রাট ঘােড়শলুই ফ্রাঙ্কলিনের বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি অশেষ গুণে মুগ্ধ হইয়া প্রকাশ্যে সাহায্য না করিলেও গােপনে সহায়তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু সারাটোগার যুদ্ধে ওয়াশিংটনের বিস্ময়কর বীরত্ব এবং জয়লাভ করার সংবাদ পাওয়ার পর হইতে ফরাসী সম্রাট প্রকাশ্যেই আমেরিককে সহায়তা করিতে লাগিলেন এবং আমেরিকাকে স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৭৮০ was স্বাধীন বলিয়া মানিয়া লইলেন (১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে স্পেন এবং খৃষ্টাব্দে হলাও আমেরিকার সহিত সন্ধি স্থাপন করিল। কাজে কাজেই ইউরােপেও যুদ্ধ বাধিয়া গেল। ইংরজি নিজের অদূরদর্শিতা ও শক্তি মত্ততার ফলে উভয় দিক হইতে বিব্রত হইয়া পড়িলেন। এই সময় ফরাসীদেশ হইতে কতকগুলি সৈন্ত আসিয়া আমেরিকার সৈন্যদলের সহিত যােগদান করিল। তন্মধ্যে জিলবার্ট লাফেটের নাম আমেরিকার ইতিহাসে চির প্রসিদ্ধ। তিনি নিজ ব্যয়ে ফ্রান্স হইতে আমেরিকায় আসিয়া সখের সৈন্যরূপে আমেরিকান জাতীয় সৈন্ত-দলে কাজ করেন। ১৭৮১ খৃষ্টাব্দে কর্ণওয়ালিস ভার্জিনিয়ায় বৃটিশ সৈন্যের অধিনায়ক নিযুক্ত হইয়া আমেরিকা গমন করেন এবং দেশে লুণ্ঠন ও অত্যাচার আরম্ভ করেন। কর্ণওয়ালিস পরে নিউইয়র্কে সেনাপতি ক্লিটনের সহিত মিলিত হইতে চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থল পথে ওয়াশিংটন ও লাফেট পরিচালিত সৈন্যবাহিনী দ্বারা এবং জলপথে ডি, গ্রাসির পরিচালিত ফরাসী নৌ- বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া মিঃ কর্ণওয়ালিস সসৈন্যে অবরুদ্ধ হইলেন। ইংরাজের আমেরিকায় আধিপত্যের সকল আশা ফুরাইল। দুর্ঘটনার পর ইংলণ্ডের মন্ত্রী সচিব লর্ড নর্থ মন্ত্রিপদ ত্যাগ করিলেন এবং তৎপরিবর্তে সার ওই, কারলটন প্রধান মন্ত্রিপদে অধিষ্ঠিত হইলেন। বরাবরই তাঁহার আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি ছিল। সুতরাং সন্ধির চেষ্টা সহজেই সফল হইল। ১৭৮২ খৃষ্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর আমেরিকাকে স্বাধীন বলিয়া স্বীকার করিয়া ইংলণ্ড সন্ধি-পত্রে সাক্ষর করিলেন। এই সন্ধি অনুসারে কানাডা, নভঙ্কোশিয়া এবং নিউ ফাউণ্ড- ২২ স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রভুত্ব বিস্তার ল্যাণ্ড ব্যতীত অন্য সমস্ত প্রদেশ আমেরিকা যুক্ত রাজ্যের অন্তর্গত বলিয়া ঘােষিত হইল। এই সন্ধিতে ইংলণ্ড-আমেরিকা যুদ্ধের অবসান হইল। শাসন বিষয়ে পণ্ড বল কত দুর্বল তাহাই আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিখা আছে। করিতে গেলে ও অত্যাচার উৎপীড়নের দ্বারা জাতিকে অধীন রাখিবার চেষ্টা করিলে তাহার যে কি বিষময় ফল উৎপন্ন হয় তাহাই শক্তি-মন্ত জাতির শিখা উচিত এবং স্বাধীনতা অর্জনে অত্যাচার উৎপীড়নকে উপেক্ষা করিবার জন্য দুৰ্বল জাতির বল সংগ্রহ করা উচিত। আজ আমেরিকায় স্বাধীন জনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত।

দাস জাতির স্বাধীন রাজ্য লাইবিরিয়া। লাইবিরিয়া দাস জাতির স্বাধীন রাজ্য। এই লাইবিরিয়া-বাসীরা এক পুরুষ বা দুই পুরুষ আগে সকলেই ইউরােপ ও আমেরিকার সন্ত্রান্ত ব্যক্তিদের ক্রীতদাস ছিলেন। দাস প্রথা যে কি ভয়াবহ কি অমানুষিক তাহা অল্প বিস্তর সকলেই জানি। মানুষকে বাজারের পণ্য হিসাবে যেখানে বিক্রয় করা হইয়া থাকে সেখানে যে তাহাদের সুখ স্বচ্ছলতা এবং অধিক কি প্রাণের প্রতিও কোনরূপ যত্ন লওয়া হইবে না তাহাতে আর আশ্চর্যের কি আছে। আমেরিকায় দিনের পর দিন অধিকার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্ষেত্র ও বিস্তীর্ণ হইয়া পড়িল। কাৰ্য্যক্ষেত্রের বিস্তৃতির অর্থ ই শ্রমজীবির আবশ্যক। কিন্তু আমেরিকার আদিম নিবাসী রেড ইণ্ডিয়ানর। পাশ্চত্য জাতির আশানুরূপ শ্রম পরায়ণ না হওয়ায় আফ্রিকা হইতে কষ্ট সহিষ্ণু পরিশ্রমী নিগ্রোদের আমদানী করা আরম্ভ হইল। এই ব্যায়ের প্রথম প্রবর্তন করেন স্পেন ও পর্তুগাল ১৫১৭ খৃষ্টাব্দে। ২৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম তাহাদের দেখাদেখি লাভের মাত্রাধিক্যে ইংলণ্ড প্রভৃতি ইউরােপের অন্যান্য জাতিও এই পৈশাচিক পন্থা অবলম্বন করিতে কসুর করিলেন না। এই ব্যবসায় তথা কথিত সভ্য জাতিরা কিছুমাত্র লজ্জা বােধ করিতেন না। বল পূৰ্ব্বক হউক বা প্রলােভন প্রদর্শন পূৰ্ব্বকই হউক এই সকল দাস সংগৃহীত হইত। ইহাদের সংগ্রহের জন্য ৪০টি আড়কাটির কুঠি নির্মিত হইয়াছিল। এই সমস্ত আড়াকুঠিগুলি দাস চালান দেওয়ার প্রধান আড়া ছিল। জাহাজ পূর্ণ করিয়া দাসদের আমেরিকার উপকূলে নামান হইত। ১৭৭২ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের মহামনা বিচারপতি জজ, মানসফিল্ড সৰ্ব্ব প্রথম এই প্রথার উচ্ছেদ কল্পে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরােপের সর্বত্রই দাস প্রথা রদ করিবার জন্য কঠিন আইন প্রচলিত হয়। এই মাত্র বলিয়াছি দাস প্রথা উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভেই বে-আইনী বলিয়া ঘোষিত হয়; কিন্তু সত্যই কি দাস প্রথা উঠিয়া গিয়াছে ? ইতিহাস লক্ষ্য করিলে স্পষ্টই দেখা যায় যে ক্রীতদাস দাসত্বের প্রথা উঠিয়া গিয়াছে সত্য কিন্তু দাসত্ব প্রথার উচ্ছেদ পট পরিবর্তন সাধন করা হয় নাই শুধু আকৃতির পরিবর্তন করা হইয়াছে। কারণ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই তথা কথিত পাশ্চত্য সভ্য জাতি সমূহ Indentured System' প্রবর্তন এবং Immi. gration Act বিধি বদ্ধ করেন। এই Indentured system এ সহস্র সহস্র ভারতীয় কুলি মােরিটাস, বৃটিশ গিয়ানা, অষ্ট্রেলিয়া, সুমাত্রা, জামিকা, ত্রিনিডাড, নাটাল ও ফিজি দ্বীপে প্রেরিত হয়। এই Indentured system দাস প্রথা রদ হওয়ার মুখ্য ফল। দাস প্রথা ২৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম র হইল বটে কিন্তু পােষাক অরি নাম বদলাইয়া আবার এই নূতন উপায়ে মানুষকে দাস করিবার হিংস্র প্রবৃত্তি সভ্য জাতিরা ত্যাগ করিতে পারেন নাই। এই Indentured system এর কুফল ও অত্যাচারে ভারতের বাহিরে ভারতীয় অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। ভারতেও বিদেশী চা-কররা ভারতবর্ষে Agreement system বা চুক্তি প্রথা প্রবর্তন করেন। আসামের চা বাগানের কুলিরা এই Agreement কুলিদের ‘এগিরিমিটী’ কুলি বলে। আসামের চা বাগানের কুলিদের উপর কর্তৃপক্ষের অযথা অত্যাচার তাহাদিগকে দাসের অধম করিয়া রাখিয়াছে। যাক এ সব অবান্তর কথা। আমার বক্তব্য এই যে দাসত্ব প্রথা উচ্ছেদ হইয়াছে এক ভাবে এ কথা সত্য-বাজারে দাস বিক্রয় বিজ্ঞাপন বাহিরও হয় না, “দাস চাই” বলিয়া পথে ঘাটে হাঁকিতে শুনা যায় না সত্য কিন্তু বর্তমানের এই পরিমার্জিত ভাবে আইনের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিয়া যে হাজারে হাজারে মানুষকে দাস করিয়া রাখা হয় তাহাও দাস প্রথার নামান্তর মাত্র অবস্থান্তর নহে। এই প্রথার ও উচ্ছেদ একান্ত বাঞ্ছনীয়, এবং একান্ত প্রয়ােজন হইয়া পড়িয়াছে। মুক্তির অব্যবহিত পরে দাস দাসীরা মহা সমস্যায় পড়িল। তাহারা বহুদিন যাবৎ সম্রান্ত পরিবারে ক্রীতদাস ভাবে থাকার পর হঠাৎ যখন স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার অধিকার পাইল সাইৰিয়াৰ এবং তাহাদের প্রভুরাও আইনের ভয়ে তাহাদিগকে প্রতিষ্ট। বাড়ী হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিলেন তখন তাহারা কোথায় যাইবে কি করিবে ভাবিয়া স্থির করিতেই পারিল না। তাহাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম মধ্যে মুক্তি পাইয়াও অনেকে দাস জীবন বহন করিতে বাধ্য হইয়াছিল। দাস দাসী দিগের মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের অবস্থানাদির এবং জীবি- কার্জনের চিন্তা অনেক সহৃদয় ব্যক্তি বাস্তবিকই অনুভব করিতে লাগিলেন। তাহারই ফলে ইংলণ্ডে একটি “Antislavery” সভা ও আমেরিকায় Colonisation Society প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে আফ্রিকার উত্তর পশ্চিমে “সিরালয়ে।” নামক এক উপনিবেশ স্থাপিত হয় এবং সেখানে ইংলণ্ডের মুক্ত দাস দাসীদের বসবাস করিবার জন্য প্রেরণ করা হয়। ইহা আজও ইংরাজের অধীনে। ইংলণ্ডের অনুকরণ করিয়া আমেরিকার Colonisation society ও আমেরিকার মুক্ত দাস দাসীর জন্য “সিরালয়ের দক্ষিণ পূৰ্ব্বে “লাইবিরিয়া” নামক এক উপনিবেশ স্থাপিত হয় ১৭৮২ খৃষ্টাব্দে। ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দে আমেরিকা লাইবিরিয়াকে স্বাধীন বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। লাইবিরিয়া বাসী দাসেরাও গত অৰ্দ্ধ শতাব্দীর উপর পর্যন্ত তাহাদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিয়া সুশৃঙ্খলার সহিত তাহাদের রাজকার্য পরিচালনা করিতেছেন। তাহারা আমেরিকার যুক্ত র আদর্শ লইয়া লাইবিরিয়ায় শাসন প্রণালী প্রবর্তন করিয়াছেন। লাইবিরিয়ার দেশের স্বত্ব স্বামীত্বে কেবল কৃষ্ণ জাতিরই অধিকার ; শ্বেত জাতির কোন অধিকার থাকিবে না। তাহারা এই আইন প্রণয়ন করিয়া শ্বেত জাতির দর্পচুর্ণ করিয়াছে। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই যে কালার ধলা পার্থক্য এবং শ্বেত জাতির উৎকৃষ্টতা তাহা আজ এই স্বাধীন দাস জাতির হস্তে নিগৃহীত হইয়াছে। স্বাধীনতাই জাতিকে সম্মানাহ করে। কালা ধল আমাদের পরাধীনতার ফল মাত্র। লাইবিরিয়ার স্বাধীনতা প্রাপ্তির ইতিহাস বলিতে গিয়া স্বতঃই ২৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম আমাদের ভারতের দৈন্ত এবং বন্ধনের কথা মনে পড়ে। লাইবিরিয়ার দাস জাতি মাত্র অর্ধ শতাব্দী কাল সভ্য জাতির সংস্পর্শে স্বাধীন ভাবে থাকিয়া নিজেদের শাসনযন্ত্র নিজে পরিচালনা করিবার ক্ষমতা অর্জন করিয়াছে; কিন্তু আমরা ভারতবাসী দেড় শত বৎসর কাল মহাশক্তিশালী ইংরাজের অধীনে থাকিয়া ইংরাজী শিক্ষা দীক্ষা লাভ করিয়াও কেন আমরা আজ পর্যন্ত স্বাধীনতা প্রাপ্ত হইলাম না। কেন রাজপ্রতিনিধিরা বলিয়া থাকেন “ভারত আজও তাহার শাসন-যন্ত্র স্বহস্তে গ্রহণ করিবার উপযােগী হয় নাই, ইহার অর্থ কি ? আমাদের গৌরবময় অতীত, বর্তমানে দিনের পর দিন নব নব জগৎ স্তব্ধকারী মনীষির আবির্ভাব এবং গত মহাযুদ্ধে ভারতবাসীর যুদ্ধে অসীম দক্ষতা প্রভৃতি থাকা সত্বেও কেন, কিসের অভাবে আমরা উপযুক্ত হই নাই ? ইহার উত্তরের জন্য বেশী বেগ পাইতে হয় না। ভারতের অফুরন্ত ধনরত্ন, প্রাকৃতিক সম্পদ, সন্তাশ্ৰমিক ও জনবল বৃটিশসিংহ ত্যাগ করিতে চাহিবেন কেন? কারণ তাহা হইলে জগতে তাঁহার আর শ্রেষ্ঠ শক্তির আসন অধিকার করা চলিবে না। সুতরাং ভারতকে স্বাধীনতা লাভ করিতে হইলে আবেদনে বিবেদনে হইবে না কারণ আবেদন নিবেদনে স্বার্থের কঠিন দ্বার উন্মুক্ত হয় না। ভারতকে এই স্বার্থের পথে বাধা সৃজন করিতে হইবে। কিন্তু ইংরাজের স্বার্থ ভারতের রক্তমাংসের সহিত জড়িত কাজে কাজেই দেখিতে হইবে কাহারা দেশের রক্তমাংস, দেশের জীবনীশক্তি। গণশক্তিই দেশের জীবনীশক্তি এবং রক্তমাংস। এই গণ- শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করিতে হইবে।

স্বাধীনতার সংগ্রাম কিউবা-দ্বীপ কিউবার প্রাচীন ইতিহাস জানিবার উপায় নাই। তবে যখন হইতে ইউরােপের সহিত কিউবার সম্বন্ধ স্থাপিত হয় তখন হইতেই তাহার ইতিহাস জানা যায়। ১৪৯২ খৃষ্টাব্দে কিউবা প্রথম কলসের নয়নপথে পতিত হয়। কিউবা প্রকৃতিদেবীর সৌন্দৰ্য্য ও সম্পদের ভাণ্ডার স্বরূপ। কি শস্য সম্পদে, কি সৌন্দর্য্যে কিউবা অতুলনীয়। কিউবার সুখ সমৃদ্ধিতে প্রলুব্ধ হইয়া স্পেনীয় নৃপতির কনিষ্ঠ ভ্রাতা শতাধিক কিউবার ইতিহাস সৈন্থ লইয়া কিউবাতে উপনিবেশ স্থাপন করেন। তদবধি কিউবা বারংবার বিদেশী শক্তিদ্বারা আক্রান্ত হয়। অবশেষে ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে ইউরােপীয় শক্তিদের মধ্যে একটি সন্ধি হয়। এই সন্ধিদ্বারা কিউবা সম্পূর্ণরূপে স্পেনের কর্তৃত্বাধীন হয়। তদবধি কিউবার শাসন দণ্ড পরিচালনার জন্য স্পেন হইতে শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়া আসিত। এই শাসনকর্তাই স্পেনের রাজপ্রতিনিধিরূপে কিউবা শাসন করিতেন। স্পেন কর্তৃক শাসিত হইয়াও বহুদিন যাবৎ কিউবাবাসী কোনরূপ বিরক্তি প্রকাশ করেন নাই। হয়ত করিবার কিছু ছিল না অথবা তাহাৱা পরাধীনতার ব্যথায় জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করাইবার অবসর পায় নাই। যাহাই হউক ইতিহাস বলে যে কিউবা স্পেন অধিকারে প্রথম প্রথম কৃষি বাণিজ্য ও শিল্পে বিশেষ উন্নত হইয়াছিল। কিন্তু হঠাৎ উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে কিউবার রাজধানী হাভানা সহরের অন্তর্গত জেসুমারিয়া পল্লী ভস্মসাৎ হয় এবং প্রায় ১২ হাজার লােক গৃহশূন্থ, আশ্রয় হীন হয়। চতুর্দিকে দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা স্বাস্থ্য সৌন্দৰ্য্য ভরা কিউবারে শ্মশানে পরিণত করিল। কিউবার অশান্তির এই প্রথম সূত্রপাত।

স্বাধীনতার সংগ্রাম বিপদ একা আসে না। ঠিক এই সময়ে স্পেনেও গােলযােগ উপস্থিত হইল। স্পেন-রাজবংশ নেপােলিয়ন কর্তৃক রাজ্যচ্যুত হইল। শাসন যন্ত্রের মূলকেন্দ্রে এইরূপ বিপৰ্যয় উপস্থিত হওয়ায় কিউবার শাসন কর্তারাও স্বেচ্ছাচারী হইয়া উঠিলেন। জুলুম এবং অন্যায় কর আরােপের দ্বারা অর্থ শশাষন করিয়া নিজেদের পকেট পূর্ণ করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। কাজেই দেশে অত্যাচারের স্রোত প্রবাহিত হইতে লাগিল। মানুষের ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে। মানুষে সেই সীমা অতিক্রান্ত হইলেই আর সহ্য করিতে পারে না। মুষ্টির বিরক্তি ও রাজদ্রোহ বলপূৰ্ব্বক দমন করা যাইতে পারে কিন্তু যখন সমগ্র জাতি অপর এক জাতির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া স্বাধীনতার জন্য ক্ষেপিয়া উঠে তখন তাহাকে কোনশক্তিই রােধ করিতে পারে না। কিউবা বাসীরও তাহাই হইল। ক্রমেই যখন অত্যাচার অসহ্য হইয়া উঠিল দেশবাসী তখন রাজকীয় অত্যাচারের কোন প্রতিকারের উপায় না পাইয়া বিদেশী রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতে লাগিল। ইহার ফলে দেশে উপর্যুপরি বিদ্রোহ আরম্ভ হইল ;-যথা ১৮২৯ খৃষ্টাব্দের ব্ল্যাক ঈগল যড়যন্ত্র, ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দে , নারশিখাে লােপেজের ষড়যন্ত্র ও ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে যুক্তরাজ্য হইতে ৬০০ শত সৈন্ত সহ লােপেজের পুনরায় আক্রমণ । বিদ্রোহে শাসক সম্প্রদায়ের অত্যাচারের মাত্রা কমে না বরং বৃদ্ধিই পায়। কারণ শাসক সম্প্রদায় শক্তি মত্ততার ঠুলির মধ্য দিয়া বিদ্রোহ দমনের সত্য পথটি দেখিতে পান না। তাহারা দমনমূলনীতির দ্বারা বিদ্রোহ দমন করিবেন মনে করেন। কিন্তু এই নীতির দ্বারা বিদ্রোহ স্বাধীনতার সংগ্রাম সাময়িকভাবে প্রশমিত হইলেও মূল যে নষ্ট হয় না বরং আরও দৃঢ় হয়, এই সত্যটি কিছুতেই শক্তি মত্ত শাসক সম্প্রদায় বুঝিতে চাহেন না। স্পেন সরকারও এই ভুল করিলেন। কিউবার দিনের পর দিন স্পেন সরকারের অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে দেশেও অশান্তি ও বিদ্রোহের বৃদ্ধি হইয়াই চলিল। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশঃ এতদূর পাশবিক আকার ধারণ করিয়াছিল যে যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেন্ট সহৃদয় পােক সাহেব কিউবাবাসীর দুঃখে দয়া হইয়া দশ লক্ষ ডলার (প্রতি ডলার তিন টাকার উপর) মূল্যে কিউবা দেশ ক্রয় করিতে চাহেন। কিন্তু স্পেন সরকার তাহাতে স্বীকৃত হইলেন না। কাজেই দেশবাসীর উপর অত্যাচার পূর্ববৎ চলিতে লাগিল। অবশেষে ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে “জাঞ্জন” নামক স্থানে কিউবাবাসী ও স্পেনের সহিত এক সন্ধি হইল। তাহাতে স্পেনীয় দিগের সহিত কিউবাসীর সমান অধিকার স্বীকার করা হইল। এই উপায়ে সেবারকার মত কিউবায় স্পেন অধিকার অক্ষুন্ন রহিয়া গেল। দেশে লুপ্ত শান্তি ফিরিয়া আসিল। সন্ধি সমানে সমানেই সম্ভব। বাঘে-হরিণে কোনদিন এক ঘাটে জল খাইয়াছে ? যেখানেই এইরূপ ভক্ষক ও ভক্ষ্যের অসম্ভব প্রীতির প্রস্তাব হইয়াছে সেখানেই দেখা গিয়াছে—ভক্ষক অত্যাচারে ভক্ষকে নিজের কবলের মধ্যে আনিয়া অধিকতর পুনঃবর্তন। আয়াসে নির্বিঘ্নে ভক্ষণ করিবার জন্যই এইরূপ অসম্ভব প্রস্তাবে সম্মতি দিয়াছে। অল্পদিনের মধ্যেই স্পেন সরকার ‘জাঞ্জনের’ সন্ধি সৰ্ত্ত অমান্য করিলেন। দেশবাসী শাসন যন্ত্রের উচ্চপদ .

স্বাধীনতার সংগ্রাম সমূহ হইতে বিতাড়িত হইতে লাগিল। তাহার পরিবর্তে স্পেনীয়রা নিযুক্ত হইতে লাগিল। আর যে দু চার জন দেশবাসী রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাঁহারা সকলেই স্পেন-সরকারের ধামা ধরা এবং দেশের ও দশের শত্রু। ক্রমাগত অত্যাচার করিতে অভ্যস্ত হইয়া পড়ায় রাজকর্মচারীদিগের মধ্যে ও নৈতিক ও মানসিক অবনতি ঘটিতে লাগিল। ইহাতে প্রজার মনে বিদ্বেষের সহিত ঘৃণারও উদ্রেক হইতে লাগিল। একদিকে যেমন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা দিন দিন শশাচনীয় হইয়া উঠিতেছিল অপর দিকে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক অধঃপতনেরও সীমা পরিসীমা ছিল না। চিনির ব্যবসায় বহু কিউবাবাসী জীবিকা অর্জন করিত। কিন্তু হঠাৎ চিনির দর কমিয়া যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হইল। এই সময়ে দাস ব্যবসা রহিত হওয়াতেও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হইল। দেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দিল। কিউবাবাসীর এই দুঃসময়ে স্পেন-সরকারের কোনরূপ সাহায্য করা দূরের কথা পরন্তু কিউবা হইতে ৫২ লক্ষ ৪০ হাজার পাউণ্ড রাজস্ব আদায় করিবার জন্য চারিদিকে অকথিত অত্যাচার অনাচার অনুষ্ঠিত হইতে লাগিল ; রপ্তানী দ্রব্যের গুল্ক বৃদ্ধি করিয়া আমদানী দ্রব্যের উপর শুল্ক হ্রাস করা হইল। স্পেন তাহাদের নিজের সামরিক ঋণ পরিশােধ করিবার জন্য ক্লিষ্ট দেশবাসীকে গুরু কর ভারে পীড়িত করিতে লাগিল। প্রকাশ্যে সরকারের দাবী হিসাবে এই সকল অত্যাচার সংঘটিত হইতে লাগিল। রাজ কর্মচারীরাও এই সুযােগে নিজেদের উদর পুষ্টি করিতে যে কসুর করেন নাই তাহা বলাই বাহুল্য। এত অত্যাচার করিয়াও স্পেন সরকারের সাধ মিটে নাই। ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে কিউবায় একটি ৩২ স্বাধীনতার সংগ্রাম পাশবিক লােমহর্ষণ কাণ্ড ঘটিল, যাহার তুলনা জগতের ইতিহাসে অতি বিরল। “কতকগুলি স্কুলের বালক, জনৈক স্পেন:রাজকর্মচারীর কবরের প্রস্তর-ফলকের উপর কয়েক ছত্র অসম্মানসূচক কবিতা লিখিয়া আসিয়া- ছিল। সন্দেহ করিয়া বালকদের তিন জন নেতাকে স্পেনীয়গণ গ্রেপ্তার করিল এবং সেই তিন জন বালককে গুলি করিয়া মারা হইল।” এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দেশবাসী ক্ষিপ্ত-প্রায় হইয়া উঠিল। বেগতিক দেখিয়া স্পেন-সরকার উপৰ্যপরি আবার দুইটি সন্ধি করিলেন। সময় বুঝিয়া এই সন্ধিয়ও পূৰ্ব্ববৎ স্পেনীয়রা অমান্য করিলেন। কিউবাবাসীর এই সঙ্কটে স্বদেশ-সেবক যােশী-মাটির আবির্ভাব হয়। বিদেশীর অত্যাচারে অনাচারে দেশের বুকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ভাবে যে ব্যথা গুমরিতেছিল, যােশী সেই ব্যথার সহিত প্রাণ যোশী-মার্টি সংযােগ করিয়া সমগ্র জাতিকে পূত স্বদেশ মন্ত্রে দীক্ষিত করিলেন। তাঁহার প্রাণস্পর্শী বক্তৃতায় ও উপদেশে জাতি জাগিল। অধীনতা পাশ হইতে দেশের মুক্তি কামনা জীবনের ব্রত বলিয়া গ্রহণ করিল। যােশীর অধিনায়কত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহ করিবার জন্য চতুর্দিকে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের আয়ােজন করিতে লাগিল। কিন্তু যােশীর এই প্রাণপাত চেষ্টা সমস্তই ব্যর্থ হইল। বিদ্রোহের পূর্ব মুহূর্তে মহাপ্রাণ যােশী ধৃত হইলেন এবং রাজ আইনে তাঁহাকে গুলি করিয়া নিহত করা হইল। কিছুদিনের জন্য কিউবার স্বাধীনতার গতি প্রতিহত হইল। জাতি জাগিলে কেহ তাহার গতিরােধ করিতে পারে না। ১৮৯৬ s স্বাধীনতার সংগ্রাম খৃষ্টাব্দে “জারা” নামক স্থানে কতকগুলি লােক বিদ্রোহ ঘােষণা করিলেন। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন—জেসাস বিদ্রোহ রাবির। প্রথম প্রথম স্পেনীয়রা এই বিদ্রোহকে সমগ্র জাতির বিদ্রোহ বলিয়া বুঝিতে পারেন নাই। কিন্তু ক্রমেই বিদ্রোহ যখন দেশময় ছড়াইয়া পড়িল স্পেন-সরকার ব্যস্ত হইয়া জেনারেল ক্যাম্পসের অধীনে কিউবায় এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করিলেন। তখনও হয়ত শাসন পদ্ধতির সংস্কার করিলে বিদ্রোহ প্রশমিত হইত কিন্তু স্পেন-সরকার তাহা না করিয়া দমন মূলক নীতি অবলম্বন করিলেন। দেশীয়গণ স্পেনের শাসন অমান্য করিয়া নিজেদের স্বাধীন বলিয়া ঘােষণা করিল এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশে সাধারণ তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিল। কাজেই দেশে দ্বৈত শাসন আরম্ভ হইল। এই অসহায় অবস্থায় স্পেনীয় সৈন্যগণ কতক আহারাভাবে এবং কতক পথ ঘাট না চেনার দরুন বিদ্রোহীদের সহিত আঁটিয়া উঠিতে পারিল না; যদি চ স্পেনীয় সৈন্যগণ সংখ্যায় বিদ্রোহীদের দশগুণ ছিল। স্পেন সরকার নিজের এই অক্ষমতায় একেবারে ক্ষিপ্তপ্রায় হইলেন। জেনারেল ওয়াইলার পূর্বাপেক্ষা দ্বিগুন সংখ্যক সৈন্য লইয়া কিউবায় উপস্থিত হইলেন। দেশে অত্যাচারের সীমা পরিসীমা অত্যাচারী রহিল না। ওয়াইলার কিউবায় পৌছিয়াই গ্রামের ওয়াইলার পর গ্রাম সৈন্থ দ্বারা ঘেরাও করিতে লাগিলেন। স্ত্রীলােক ও বালক বালিকা এই ভাবে অবরুদ্ধ করার উদ্দেশ্য——যাহাতে বিদ্রোহীরা নিজ নিজ গৃহ হইতে কোনরূপ সাহায্য না পায়। বরং আত্মীয় কুটুম্ব, মাতা স্ত্রীকে এই ভাবে অবরুদ্ধ হইতে দেখিয়া বিদ্রোহীরা স্বতঃ । ৩৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম ; প্রবৃত্ত হইয়া আত্ম সমর্পন করিতে বাধ্য হয়। এই সব অবরুদ্ধ গ্রাম সমূহে হাজারে হাজারে নর-নারীকে হত্যা করা হইল; স্ত্রীলােকদের ইজ্জত নষ্ট করা হইল ; ঘড় বাড়ী শস্যক্ষেত্র ধ্বংস করা হইল। অবশেষে পশু ওয়াইলার সৈন্যদের এমন পর্যন্ত আদেশ জারি করিয়াছিলেন যে,-পথে মানুষ দেখিলেই গুলি করিবে। কিউবা শ্মশানে পরিণত হইল। কিউবার প্রতি এই অত্যাচারে সমগ্র সভ্য জগত বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। তন্মধ্যে স্বাধীনতার প্রতীক যুক্তরাজ্য স্পেনের প্রতি অতি মাত্রায় বিরক্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। নিয়তির চক্রে যুক্তরাজ্যের সে সময় এমন কতকগুলি ঘটনা সংঘটিত হইল যাহাতে সমবেদনা ও সহায় যুক্ত রাজ্যের আন্তরিক এই ধূমায়িত অসন্তোষ ক্রমে প্রজ্বলিত হুতাশন রূপে আত্ম প্রকাশ করিয়া স্পেনে অত্যাচারের হাত হইতে কিউবা-বাসীকে রক্ষা করিল। অত্যাচারী ওয়াইলার যুক্তরাজ্যের বিদ্রোহীদের অস্ত্র-শস্ত্র আসিতেছে সন্দেহ করিয়া একখানি জাহাজ ধৃত করিলেন এবং আরােহীদের প্রাণ- দণ্ডের আদেশ করিলেন। অবশ্য পরে তাহাকে এই জাহাজ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইতে হইয়াছিল। আবার ঠিক এই সময়েই স্পেনীয়গণ একজন কিউবা বাসীকে গ্রেপ্তার করেন। ইনি যুক্ত রাজ্যের একজন Naturalised অধিবাসী অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে কিছু কাল বাস করিয়া ইনি যুক্তরাজ্যের অধিবাসী রূপে গণ্য হইয়াছেন। সুতরাং ইহাকে গ্রেপ্তার করায় যুক্তরাজ্য প্রতিবাদ করিল। আবার ভাগ্যক্রমে এই বন্দী আবদ্ধ অবস্থাতেই মারা যান। কাজেই আকস্মিক এই মৃত্যুতে যুক্তরাজ্যের সন্দেহ আরও বৃদ্ধি পাইল। ৩৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম ইতিমধ্যে ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে জেনারেল ব্যাঙ্কো কিউবার আসিয়া আবদ্ধ নর-নারী গণকে মুক্তি দিলেন। কিন্তু জেনারেল ওয়াইলারের অত্যাচারে ঘর দুয়ার শস্যক্ষেত্র সমস্তই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে সুতরাং সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত নর-নারী থাকিবেই বা কোথায় আর খাইবেই বা কি? ব্যাঙ্কো কিউবায় স্বায়ত্বশাসন ঘােষণা করিলেন। কিন্তু কিউবা বাসী ব্যাঙ্কোর এই সমস্ত সদয় ব্যবহার সন্দেহের চক্ষে দেখিতে লাগিল। তাহারা স্পেনীয়দের কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না। সমস্তই একটা প্রতারণার জাল বলিয়া তাহাদের চক্ষে প্রতিভাত হইল। ব্যাঙ্কো যখন এই ভাবে দেশে শান্তি স্থাপনে চেষ্টা করিতেছিলেন সে সময় হঠাৎ একখানি যুক্ত রাজ্যের যুদ্ধ জাহাজ হাভানার বন্দরে জলমগ্ন হইল। যুক্তরাজ্য আর সহ করিল না। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠিল। লাভ। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন মহানুভব প্রেসিডেন্ট ম্যাককিনলে বরাবরই কিউবার দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করিয়া আসিতেছিলেন। এইবার উপযুক্ত সুযােগ পাইয়া কিউবাকে স্পেনের কবল কিউবার স্বাধীনতা হইতে মুক্ত করিয়া স্বাধীন সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প করিলেন। যুক্তরাজ্য ও স্পেনে যুদ্ধ বাধিল । অবশেষে উভয় পক্ষের বহু হতাহতের পর সন্ধি স্থাপিত হইল। এই সন্ধি অনুসারে স্পেন ও যুক্ত রাজ্যের মধ্যে অনেক সৰ্ত্ত স্থাপিত হইল, তন্মধ্যে কিউবা যুক্তরাজ্যের শাসনাধীন হইবে ইহা তাহার অন্যতম। যাহাই হউক যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯০২ খৃষ্টাব্দে কিউবাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে এক সন্ধি হয় তাহাতে কিউবা স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশিষ্ট বিশিষ্ট বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে মানিয়া চলিতে হয়। যাহাই যউক কিউবা এখন স্বাধীন, এবং যুক্তরাজ্য তাহার পৃষ্ঠপােষক। ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ। খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত এই দ্বীপপুঞ্জ সম্বন্ধে কোন কিছু জানা যায় না। ১৫২১ খৃষ্টাব্দে স্পেনীয়রা এই দ্বীপপুঞ্জ প্রথম আবিষ্কার করেন এবং ১৫৭১ খৃষ্টাব্দে তাহাদের ইতিবৃত্ত। অধিকার পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয় অর্থাৎ ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ স্পেনের রাজ্য বলিয়া পরিগণিত হয়। ১৭৬২ খৃষ্টাব্দে ইংরাজের লােলুপ দৃষ্টি ও একবার পড়িয়াছিল বলিয়া ইতিহাস বলে। পর বৎসর ইংরাজ ও স্পেনের মধ্যে এক সন্ধি হয়। তদবধি স্পেন নিৰ্বিবাদে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের উপর আধিপত্য করিয়াছেন। ২৬শ টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ লইয়া এই দ্বীপপুঞ্জ গঠিত। স্পেনের সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপের নামানুসারেই এই দ্বীপপুঞ্জ ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ নামে অভিহিত হইয়াছে। এই দ্বীপপুঞ্জের রাজধানীর নাম ‘ম্যানিলা। এখানে প্রকৃতি দেবী তাঁহার স্নেহসার দানে কিছুমাত্র কার্পণ্য করেন নাই। এই দ্বীপপুঞ্জের জমি বিশেষ উৰ্ব্বরা। নানা ফল পুষ্প-ভারে বৃক্ষরাজি সৰ্ব্বত্রই শােভা বৃদ্ধি করিতেছে। এখানে রবার, তামাক, কফি, কোকো ও ইক্ষুর চাষ অতি উৎকৃষ্ট হইয়া থাকে। খনিজ সম্পদে ও ৩৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পদশীল। স্বর্ণ, রৌপ্য তাম্র, লৌহ এবং পাথুরে কয়লা প্রভৃতি খনিজ দ্রব্য এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। যে দেশে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের এত প্ৰাচুৰ্য তাহা যে পরধন লােভী তথা কথিত সভ্য জাতির হিংস্র কবলে পতিত হইবে তাহাতে আর আশ্চর্যের স্থান কোথায় ? ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে স্পেনের আধিপত্য অক্ষুন্ন ছিল। তিন শত বৎসর পর ফিলিপাইন বাসী স্পেনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের আয়ােজনে প্রবৃত্ত হইল। দেশবাসী প্রজা সাধারণের স্পেনের পতন উপর অমানুষিক অত্যাচারই এই মনােভঙ্গের কারণ। চারিদিকে অত্যাচারের নিরবিচ্ছন্ন স্রোতে দেশ উৎসন্নে যাইতে লাগিল। দেশে রাজকীয় অত্যাচার ও ধৰ্ম্ম যাজকের অনাচার এক সঙ্গে দেখা দিল। রাজ কর্মচারীরা প্রজাদের নিকট হইতে উৎকোচ গ্রহণ করিতে লাগিল। নৃতন নূতন কর বসাইয়া জনসাধারণকে জর্জরিত করিতে লাগিল। একদিকে এই সমস্ত অন্যায় কর আদায়ের জন্য প্রজাদের উপর যথেচ্ছ বল প্রয়ােগ হইতে লাগিল। অপরদিকে ধৰ্ম্ম যাজকদের ধর্মের ভানে পরের স্ত্রী কন্যার উপর অনাচার অত্যাচারে দেশ ভাসিতে লাগিল। দেশের লােক এইরূপ দ্বিবিধভাবে উৎপীড়িত হইয়া রাজ দরবারে নানারূপ আবেদন নিবেদন করিল কিন্তু ভঁহাদের কাতর প্রার্থনায় কেহ কর্ণপাত করিল না। বরং অত্যাচারের মাত্রাই বৃদ্ধি পাইল। যে সকল দেশহিতৈষী মহাপ্রাণ ব্যক্তিরা হত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন তাঁহাদিগকে ষড়যন্ত্রকারী এই মিথ্যা দোষারােপ করিয়া গ্রেপ্তার করা হইল। এই গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৯৬ .

স্বাধীনতার সংগ্রাম জন। আমরা কলিকাতায় কল্পিত অন্ধকূপ হত্যার ঘটনায় শুনিয়াই শিহরিয়া উঠি। আর সেদিন ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে বৰ্ত্তমান সভ্যতার দিবালােকে সুসভ্য স্পেনীয়রা ১৯৬ জন ফিলিপাইন বন্দীকে ভূনিয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছিল। তখন গ্রীষ্মকাল। প্রকোষ্ঠের একটি মাত্র গবাক্ষ ছিল তাহাও শান্ত্রীরা বন্ধ করিয়া দিল। বন্দিগণ সকলেই গ্রীষ্মপ্রধান দেশের কষ্ট সহিষ্ণু প্রাণী। কাজেই পরদিন প্রভাতে দেখা গেল ৫৪ জন মৃত অবস্থায় পড়িয়া আছে। এবং অবশিষ্ট মুমূর্ষ বগিণকে রাজার পৈশাচিক আইনে গুলি করিয়া বধ করিবার আদেশ হইল। অবশেষে তাহাদের গুলি করিয়া মারা হইল। তাহাদের বিরুদ্ধে যে যড়যন্ত্রের অভিযােগ আনা হইয়াছিল তাহার কোন প্রমাণ স্পেন-সরকার দিতে পারেন নাই। বড়ই পরিতাপের বিষয় আজ বাংলা দেশে ও সুসভ্য ইংরাজ শাসনে অর্ডিনান্স আইনের কঠিন নিষ্পেষণে বহু সম্ভ্রান্ত বংশীয় বাঙালী যুবক বিনা বিচারে সুদূর পল্লীর মধ্যে আবদ্ধ হইয়া তিলে তিলে প্রাণ দিতেছেন। ইহাতেই অত্যাচারের শেষ হয় নাই। দেশবাসীর ভাগ্যে আরও দুর্দশা ছিল। এই অন্ধকূপ হত্যার পরই ১৩ জন ভদ্র লােক গ্রেপ্তার হইলেন। এই ভদ্র লোেকদের মধ্যে জমীদার ; নৃশংসতার-চরম ব্যবসায়ী, ডাক্তার, রাসায়নিক এমন কি দুইজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীও ছিলেন। তাঁহাদিগকে পূর্ববর্তী অাসামীদের * ঘাতকের গুলিতে প্রাণ দিতে হইল। হত্যার পর হত্যায় দেশের লােক ক্রমশই বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হইয়া , স্বাধীনতার সংগ্রাম উঠিল। রাজ কর্মচারীরাও অত্যাচারের মাত্রা দিনের পর দিন বৃদ্ধিই করিতে লাগিলেন। দেশবাসী নিরুপায় হইয়া এক ভদ্রলােকের বাড়ীতে এক সভা করিলেন—উদ্দেশ্য দেশের দুর্দশার প্রতীকারের উপায় উদ্ভাবন করা। গুপ্ত চরের কৃপায় নানাভাবে রঙীন হইয়া এই খবর রাজকর্মচারী- দের কানে গেল। সভা আরম্ভ হইলে হঠাৎ একদল অস্ত্রধারী সৈন্ত আসিয়া নিরস্ত্র ভদ্রলােকদের উপর হিংস্র পশুর মত দয়ামায়া হীন হইয়া গুলি বর্ষণ করিল। সভামণ্ডপেই অনেকে নিহত হইলেন; অবশিষ্ট যাহারা ধরা পড়িলেন তাহাদিগকেও পরে গুলি করিয়া মারা হইল। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে এই সভাভঙ্গের ব্যাপার সংঘটিত হয়। এই সব হত্যাকাণ্ড ও নৃশংস ব্যভিচার অপেক্ষাও স্পেনীয় রাজ- কর্মচারীদের পাশবিক মনােবৃত্তি আমাদের মনকে অধিক পীড়া দেয়। রাজপুরুষরা এই সকল হত্যাকাণ্ড ও ব্যভিচারের জন্য গর্ব ও আনন্দ প্রকাশ করিতেন এবং তাহাদের স্বদেশবাসী ভাইয়েরা ও এই সকল নর হন্তারকদের মহাসমারােহের সহিত অভ্যর্থনা করিতেন। মানুষের মনােবৃত্তি প্রভুত্ব দর্পে কতদূর পশুত্ব প্রাপ্ত হইতে পারে ইহাই তাহার চরম নিদর্শন। ভারতবর্যে ও নরঘাতক জেনারেল ডায়ারকে এই সঙ্গে মনে পড়ে। সুসভ্য জাতিদের মনে রাখা উচিত হত্যা সমর্থনকারীরাও হত্যা- কারীর মতই ভয়াবহ ও দোষী এবং হত্যাপ্রেম পশুত্ব মনুষ্যত্ব নহে। দেশবাসী স্পেনের এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হই উঠিল। চারিদিকে বিদ্রোহের আয়ােজন চলিতে লাগল। ফিলিপাইন বাসীর এই অকুল পাথারে দুইজন মহাপ্রাণ বীৰ আসিয়া দেশের হাল ধরলেন। স্বদেশ উদ্ধারই তঁাহাদের জীবনের ব্রত হইল। এই দুই মহাপুরুষের এক জনের ৪০ স্বাধীনতার সংগ্রাম নাম আগুনাল্ড, অপর জনের নাম রাইজে। তাহাদের আবির্ভাবে দলে দলে কাতর দেশবাসী আসিয়া তাহাদের সহায় হইল। সঙ্গে সঙ্গে ফিলিপাইনে স্পেনের আসন টলিল। ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দে স্বদেশ প্রেমিক আগুনাল্ড জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফিলিপাইনের এক সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান ছিলেন। তাঁহার বয়স যখন ২৭ বৎসর তখন স্বদেশ বাসীর উপর বিদেশীর অত্যাচারে আগুনা ব্যথিত হইয়া দেশের স্বাধীনতা অর্জনে মন প্রাণ সমর্পন করেন। একদিকে তাহার জ্বলন্ত স্বার্থত্যাগ অপরদিকে তাঁহার স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টা সমস্ত ফিলিপাইন বাসীকে মুগ্ধ করিল। দলে দলে আসিয়া তাহার আজ্ঞানুবর্তী হইতে লাগিল। আগুনাল্ড অকুতােভয়ে দেশবাসীর নিকট বিদেশীর অত্যাচারের কাহিনী ও তাহার প্রতিকারের ব্যবস্থা প্রভৃতি আলােচনা করিতে লাগিলেন। নানাভাবে আগুনাল্ড দেশীয় জনসাধারণের হৃদয়ের সুপ্ত প্রেরণা জাগরিত করিতে সমর্থ হইলেন। দেশবাসী বিদ্রোহ ঘােযণা করিল। ঠিক এই সময়ে স্পেন সরকার কিউবাতে ও বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন। সুতরাং ফিলিপাইন বাসীর এই সময়ােচিত বিদ্রোহ ঘোষণায় কিঞ্চিত ভীত হইয়া পড়িলেন। স্পেন সরকার উভয়দিক হইতে এই সঙ্কটে পড়িয়া আগুনাল্ডকে উৎকোচ দ্বারা বশীভূত করিবার জন্য রাজকোষ হইতে বিশ লক্ষ ডলার (প্রতি ডলার তিন টাকার কিছু উপর) প্রদান করিলেন। বিদ্রোহ চালাইতে হইলে অনেক অর্থের প্রয়ােজন। অর্থের অভাবে বিদ্রোহে অকৃতি অনিবার্য। তখন আগুনাল্ডের হাতে টাকা মােটেই, ছিল না এবং ব্যক্তিগত ভাবে টাকার লােভ ও তাঁহাকে উৎকোচ গ্রহণে বােচনা ৪১ স্বাধীনতার সংগ্রাম দিয়াছিল। ফিলিপাইনের স্পেনীয় শাসনকর্তা সরকার প্রদত্ত বিশ লক্ষ ডলার মুদ্রার মাত্র আট লক্ষ টাকা দিয়া আগুনাল্ডকে নিরস্ত করিলেন এবং অবশিষ্ট টাকা নিজে আত্মসাৎ করিলেন। আপাতত বিদ্রোহ থামিয়া গেল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে আবার অত্যাচার আরম্ভ হইল। পূৰ্বে সভা ভঙ্গের যে ভীতি প্রদ ঘটনা বর্ণনা করিয়াছি তাহা বিদ্রোহ থামার এক বৎসর পরে ঘটে। আগুনাল্ড সেই সময়ের জন্য শান্ত হইলেও পরবর্তী জীবনে তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে দেশের জন্য বীরের মত যুদ্ধ করিয়াছিলেন। অধিক কি তাহার মস্তকের জন্য স্পেন সরকার পঁচিশ হাজার ডলার মুদ্রা পারিতােষিক ঘােষণা করা সত্ত্বেও তিনি ভয় পান নাই। জগতের স্বাধীনতার ইতিহাসে দেশবন্ধু রাইজেল একজন চিরস্মরণীয় ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে জমীদার গৃহে তাঁহার জন্ম হয়। তিনি একাধারে সুকবি, সুলেখক, সুবক্তা ও স্বদেশভক্ত বীর ছিলেন। দেশবন্ধু বাল্যকাল হইতেই তাহার অমৃতময়ী লেখনী মিঃ রাইজেল সাধারণকে মুগ্ধ করিয়াছিল। পরিণত বয়সে তাঁহার স্বদেশ সম্বন্ধে যে সকল সুচিন্তিত গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছিলেন তাহা ফিলিপাইন বাসী ঔৎসুক্যের ঔৎসুক্যের সহিত পড়িয়া পড়য়া থাকে। তাহার “ফিলিপাইনের ইতিহাস প্রথম সভ্য জগতকে ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাইতে সমর্থ হইয়াছিল। একুশ বৎসর বয়সে তিনি ইউরােপে গিয়া স্পেনের রাজধানী মাদিদে ডাক্তারী বিদ্যা শিক্ষা করেন। পরে জার্মানী, ত ষ্ট্রীয় ও বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশে ঘূরিয়া বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে দেশে ব্যক্তি। ৪২ স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রত্যাবর্তন করেন। ফিলিপাইনে তখন অত্যাচারের নিরবিচ্ছিন্ন স্রোত অবাধ গতিতে চলিতেছে। দেশের এই দুর্দশায় মর্মে মর্মে পীড়িত হইয়া তিনি মানুষের জন্মগত দাবী স্বাধীনতার জন্য দেশ বাসীকে উদ্বুদ্ধ করিতে লাগিলেন। রাজ-গুপ্তচরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাহার উপর পতিত হইল। তিনি প্রতিপদে বাধা পাইয়া বুঝিলেন যে বর্তমান জগতে কোন নিপী- ড়িত, বিদেশী শক্তির দ্বারা পদদলিত জাতিকে যদি স্বাধীনতা অর্জন করিতে হয় তবে ঘরে বাইরে প্রচার একান্ত প্রয়ােজন। কারণ জগতের বিবিধ স্বাধীন জাতিতে অন্তর্জাতিক সম্বন্ধ দিন দিন এমন কঠিন হইয়া উঠিতেছে যে, বিদেশী স্বাধীন জাতির সহানুভূতি পাইলে স্বাধীনতার পথ অনেকটা সুগম হয়। বিচক্ষণ রাইজেল এই সব চিন্তা কয়িয়া দেশত্যাগী হইলেন। কিছুকাল জাপান ও লণ্ডনে বাস করিয়া ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। অন্যান্য স্বাধীন জাতির মত দেশে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে বিদ্রোহের সূচনা হয়। স্পেন সরকার তাঁহাকে যড়যন্ত্রের মামলায় জড়াইয়া গ্রেপ্তার করিলেন। প্রকাশ আদালতে তাঁহার বিচার হইল। তাহার বিরুদ্ধে কোনরূপ প্রমান পাওয়া গেল না এবং রাজ কৰ্ম্মচারীরা রাইজেলের নির্দোযিতা প্রমানের চেষ্টাকে মােটেই আমল দিল না। বিচারে তাহার প্রাণদণ্ডের আজ্ঞা হইল। রাইজেলের হত্যা ব্যাপার একটি করুণ হৃদয়বিদারক রােমান্স। তিনি ব্রাকেন নাম্নী এক যুবতীর সহিত প্রণয়ে আবদ্ধ ছিলেন। রাইজেলের মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ পাইয়া যুবতী ব্রাকেন ছুটিয়া আসিলেন। তখন রাইজেলের মৃত্যুর আর দুই ঘণ্টা অবশিষ্ট আছে। এই শ্মশান ৪৩ স্বাধীনতার সংগ্রাম শয্যায় উভয়ের পরিণয় যথাবিধি সম্পন্ন হইয়া গেল। বিবাহের অনতিকাল পরেই মহাপ্রাণ রাইজেল ঘাতকের গুলিতে প্রাণত্যাগ করিলেন। ব্রাকেনের ধমনীতে আইরীশ রক্ত প্রবাহিত ছিল। তার উপর তিনি মহামতি রাইজেলের প্রণয়িনী। স্বামীকে এইরূপ অসহায় ভাবে পিশাচ- দের হাতে নিহত হইতে দেখিয়া তাহার রমণী হৃদয়ে বিদ্রোহ প্রতিহিংসার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। কোমল দেহে কঠিন বৰ্ম্ম পরিধান করিলেন এবং সসস্ত্র হইয়া বিদ্রোহীদের উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। এমন কি তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়া যুদ্ধ করিয়াছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি দেশ বিদেশে স্পেন সরকারের নৃশংশ অত্যাচারের কাহিনী প্রচার করিতে লাগিলেন। দেশময় বিদ্রোহ জলিল। মার্কিন ফিলিপাইন বাসীর দুঃখে সহানুভূতি সম্পন্ন এবং স্পেনের নৃশংস ব্যবহারে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন। এই সুযােগ দেখিয়া মহামতি আগুনাল্ড ৫০ সহস্র দেশী সৈন্ত লইয়া মার্কিনকে সাহায্য করিতে লাগিলেন। আগুনাল্ড টাকা পাইয়া দেশকে ভুলিয়া যান নাই। উৎকোচরূপে প্রাপ্য অর্থের অতি সামান্য অংশ নিজের জন্য রাখিয়া বেশীর ভাগই এই সেনাদল গঠন করিতে ব্যয় করিয়াছিলেন। যাহাই হউক স্পেন সরকার এই ধাকা সহ করিতে পারিলেন না। স্পেনীয়রা ফিলিপাইন হইতে বিতাড়িত হইলেন। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে দেশে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইল। আগুনাল্ড ফিলিপাইন সাধারণ তথ্র। সাধারণতন্ত্রের প্রথম সভাপতি বলিয়া ঘােষিত হইল। ৪৪

স্বাধীনতার সংগ্রাম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইন বাসীর মুক্তি সমরে সাহায্য করিবার
জন্য সেনাপতি ভিওয়েকে পাঠাইয়াছিলেন। ফিলিপাইন বাসী যখন
স্বাধীন সাধারণতন্ত্র ঘােষণা করিল তখন মার্কিন
যে তিমিরে
সেই তিমিরে।
সেনাপতি কোনরূপ বাধা প্রদান করিলেন না।
কারণ তখন তাহার সৈন্যবল অতি যৎসামান্যই ছিল।
নব বলে বলীয়ান জাগ্রত ফিলিপাইন বাসী ও বিচক্ষণ কৰ্ম্মবীর আনান্ডের
বিরুদ্ধাচরণ করার তখন মার্কিন সেনাপতির সামর্থ্য ছিল না। সুতরাং
তিনি কিছুকালের জন্য নির্বিকার ভাবে অবস্থান করিলেন। পরে
যুক্তরাজ্য হইতে উপযুক্ত সাহায্য উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন
সেনাপতি ভিওয়ে আগুনাল্ডকে বন্দী করিলেন এবং ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ
যুক্তরাজ্যের অধিকারভুক্ত বলিয়া ঘােষিত হইল।
আজও. ফিলিপাইন বাসী স্বাধীনতা পায় নাই। মার্কিনের শক্তি
শৃঙ্খলে বদ্ধ। আন্দোলনের বিরাম নাই। ক্রমাগত স্বাধীনতার দাবী
করিয়া আসিতেছে। কিন্তু সদাশয় মার্কিন সরকার
বর্তমান ফিলিপাইন
কিছুতেই ফিলিপাইন বাসীকে স্বাধীনতা লাভের
দ্বীপপুঞ্জ।
উপযুক্ত বলিয়া মনে করিতে পারিতেছেন না।
আর যে ভাবে মার্কিনের হাওয়া-গাড়ীর টায়ার টিউবের জন্য রবারের
চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে তাহাতে ফিলিপাইনের স্বাধীনতা লাভ
সুদূর পরাহত সন্দেহ নাই। কারণ ইহার ক্ষেত্রে যে রবার উৎপন্ন হয়
তাহাতে মার্কিনের প্রয়ােজনের এক তৃতীয়াংশ সরবরাহ হইয়া থাকে।
ফিলিপাইন মার্কিনের কামধেনু। মার্কিন কি ইহা সহজে পরিত্যাগ
করিবেন ?
৪৫

স্বাধীনতার সংগ্রাম সেদিন মার্কিনের প্রেসিডেন্ট মিঃ কুলিজ কর্ণেল টমসনকে ফিলিপাইন বাসীর স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত হইয়াছে কি না, পৰ্যবেক্ষণ করিবার জন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন। কর্ণেল টমসন পরিষ্কার ভাষায় কুলিজকে জানাইয়াছেন ফিলিপাইন বাসী যতই আন্দোলন করুক এখনও তাহাদের স্বাধীনতা দিবার উপযুক্ত সময় হয় নাই। কর্ণেল টমসন ফিলিপাইনের পেটি মট ম্যানুয়েল কোয়জনের সহিত অনেক কথাবার্তা বলেন। তাঁহার প্রতি কথায় মার্কিনের স্বার্থের দিক ফুটিয়া বাহির হইয়াছে। মার্কিন জগতে প্রচার করিয়া থাকেন যে, তাঁহার স্বাধীনতা প্রিয় উদার জাতি। বহুকষ্টে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছেন সুতরাং স্বাধীনতার মূল্য বুঝেন। কিন্তু হায় ! স্বার্থ বড় চীজ। ফরাসী বিপ্লব। ফরাসী জাতিকে আজ নূতন করিয়া পরিচয় দিবার আবশ্যক নাই। ভারতবর্ষে মােগল রাজত্বের শেষভাগে অনেক পাশ্চত্য জাতি এখানে আধিপত্য লাভ করিবার চেষ্টা করেন। তন্মধ্যে ইংরাজ ও ফরাসীই প্রধান। কিন্তু কালের গতিতে ইংরাজ ভারতে প্রভূত্ব লাভে সমর্থ হইলেন। ফরাসী পারিলেন না। এখনও ভারতে পণ্ডিচেরী, কালিকট, মাহী, ইয়ান ও চন্দন ফরাসীদের অধিকারে রহিয়াছে। এই প্রবন্ধে ফরাসী রাজ্যই আমাদের আলােচ্য বিষয়। ৪৬ স্বাধীনতার সংগ্রাম ফরাসী জাতি বড় ভাব-প্রবণ জাতি। ফরাসী দেশে ঘন ঘন অন্তবিপ্লবে রক্তস্রোত বহিয়াছে। রাজবংশ সিংহাসন চ্যুত হওয়ার পর ও ফরাসী দেশে তিন তিন বার জনতন্ত্র স্থাপিত হইয়াছে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী দেশের ইতিহাসকে একটা একটানা বিপ্লবের ইতিহাস বলা যাইতে পারে ফরাসী দেশের বিপ্লবের বিভীষিকাময় ঘটনা সমূহ পড়িলে স্বতঃই মনে হয় কেন ফরাসী দেশে বিপ্লবের পর বিপ্লব একটানা গতিতে চলিয়াছে ? ফরাসী দেশ কোন বিদেশী জাতির শাসনভারে ত’ পীড়িত নহে? তবে কেন এই বিপ্লবের দাবাগ্নি ? রাজবংশ সিংহাসনচ্যুত হইল কিন্তু তবু বিপ্লবের বহ্নি নিৰ্বাপিত হইল না কেন ? দেশে জনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ও দুইবার জনতন্ত্র ভাঙ্গিয়া নূতন জনতন্ত্র গঠিত হইল কেন? ফরাসী বিপ্লবে কেবল এই কথায় প্রতিপন্ন হয় যে বিদেশীর অধীনতা শুধু অধীনতা নহে। যেখানে মানুষের বা সাধারণের অধিকারকে ক্ষুন্ন করা হয় বা খর্ব করার চেষ্টা হয় তাহাই অধীনতা। আর এই ক্ষুন্ন করা বা খর্ব করার চেষ্টা একটা সীমার বাঁধ না মানিয়া শুধু গায়ের জোরে বা তরবারির দৌলতে শাসন করিতে চাহিলে বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। ফরাসী দেশে যখন প্রথম জনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় তখন ফরাসী জাতি কোন বৈদিশিক রাজার অধীনতাপাশে আবদ্ধ ছিল না। স্বদেশের স্বাধীন নৃপতিগণই তখন অপ্রতিহত ভাবে শাসনকার্য নির্বাহ করিতে ছিলেন এবং সহস্র বৎসরের সম্মানিত প্রাচীন রাজবংশই তখন রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই প্রাচীন রাজবংশের নির্মুল করিয়াই প্রথম ফরাসী জনতন্ত্র স্থাপিত হয়। ৪৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম ( যাহাই হউক) এই ফরাসী বিপ্লবের একটা ঐতিহাসিক বিবরণ এখানে উপস্থিত করিব। বহু প্রাচীন কাল হইতে ফরাসী দেশে ‘ফিউডেল’ প্রথা প্রচলিত ছিল। ‘ফিউডেল’ প্রথা অনেকটা আমাদের দেশের জমিদারী প্রথার মত। ফরাসী দেশে বুরৰো রাজবংশের আবির্ভাবের সঙ্গে ‘ফিউডেল’ প্রথা প্রায় লােপ পায়। এই বুরবো বংশের প্রথম নৃপতি হেনরী ঠমের সময়ে (১৬০৪ খৃষ্টাব্দে) ভারতবর্ষের সহিত ফরাসীদের প্রথম পরিচয়। বুরবো বংশ চতুর্দশ লুইএর সময়ে শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে আরােহণ করিয়াছিল। চতুর্দশ লুই রাজনীতি ক্ষেত্র হইতে জনসাধারণের সমস্ত ক্ষমতা অপহরণ করেন। তাঁহার রাজত্বকালে রাজ্যের অবস্থা ফিউডেল লর্ডদের ক্ষমতা একেবারে নিৰ্ম্মল হইয়াছিল বলিলেও অত্যক্তি হয় না। রাষ্ট্রের সমগ্র শক্তি ফিউডেল লর্ডদের হাতে বিক্ষিপ্ত ছিল। চতুর্দশ লুই রাষ্ট্রের এই বিক্ষিপ্ত শক্তিকে রাজ সিংহাসন তলে কেন্দ্রীভূত করিবার জন্য ফিউডেল লর্ডদের শক্তি কাড়িয়া লইলেন। তিনি এইভাবে রাজশক্তিকে সেই সময় শক্তিশালী করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার এই প্রচেষ্টায় ফিউডেল লর্ডরা অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন। সুতরাং চতুর্দশ লুই ফরাসী রাজ্য সুগঠিত ও রাজবংশকে সৰ্ব্বে সৰ্বা করিবার পথেই রাজবংশ ধ্বংসের বীজ বুনিয়া গেলেন। এইভাবেই ফরাসী বিপ্লবের প্রথম অঙ্কুর বহির্গত হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও যুদ্ধ বিগ্রহে যখনই রাজকোষ শূন্য হইত তখনই প্রজার উপর যথেচ্ছ কর বসাইয়া প্রজার রক্ত শােষণ করিতেন। ৪৮ স্বাধীনতার সংগ্রাম Rel=0 ১৭১৫ খৃষ্টাব্দে তাঁহার পুত্র পঞ্চদশ লুই সিংহাসন আরােহণ করেন। তিনি অত্যাচারে পিতাকেও অতিক্রম করিয়া ছিলেন। রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াই রাজশক্তির অপব্যবহার ত’ করিলেনই তদুপরি তাহার চরিত্র দোষ, অমিতচারী স্বভাব এবং বিলাস প্রিয়তার ফলে রাজকোষ শূন্য হইতে লাগিল। এই সুযােগে তােসামদকারীরা নানাভাবে স্বার্থসিদ্ধি করিতে লাগিল। দিনের পর দিন দুরভিসন্ধিপরায়ণ কর্মচারি গণের ও উপপত্নীর চক্রালে পতিত হইয়া তাহাদের হস্তে তিনি ক্রীড়া- পুত্তলি স্বরূপ ছিলেন। সুতরাং প্রজার দুর্দশার অবধি রহিল না! তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র সােড়শ লুই ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে বিংশ বর্য বয়ঃক্রকালে ফ্রান্সের রাজ সিংহাসনে আরােহণ করেন। যােড়শ লুই পিতার মত অমিতাচার ও চরিত্রহীনতা দোষের—উত্তরাধিকারী না হইলেও দেশের সেই বিপর্যস্ত অবস্থায় সম্রাট হইবার উপযুক্ত দক্ষতা ও মেধার তাহাতে একান্ত অভাব ছিল। কাজেই প্রজার হিতসাধনে তাহার ইচ্ছা থাকিলেও কাৰ্যতঃ তাহা করিতে পারেন নাই। নিজের চরিত্রের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবে স্বীয় পত্নী মেরী আনতেনেটীর পরামর্শই তাঁহার একমাত্র সম্বল ছিল। মেরী আনতেনেটী গৰ্ব্বিতা ও অদূরদর্শী নারী ছিলেন। আনতের বিষময় নীতি ভবিষ্যতে তাহার স্বামী ও তাহার নিজের উভয়ের পক্ষেই মারাত্মক হইয়াছিল। চারিদিকে অরাজকতার সৃষ্টি হইতে লাগিল। প্রজা পীড়নের মাত্রা কিছুমাত্র লাঘব হইল না। বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ঘােড়শ লুইএর শাসন সংস্কারের চেষ্টা বিফল হইল। ফিউডেল লর্ড সম্প্রদায় কি ভাবে রাজশক্তি হারাইয়াছিলেন তাহা ৪৯ স্বাধীনতার সংগ্রাম পূৰ্ব্বে বলিয়াছি। এই লর্ড সম্প্রদায় রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হারাইয়া তােষামদকাৰী সভাসদে পরিণত হইলেন। কোনরূপ (খ) ফিউডেল লর্ড সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা তাহাদের থাকিল না। সম্প্রদায় কিন্তু তখন পর্যন্ত তাঁহারা পূর্ধ্বতন লর্ড সম্প্রদায়ের সুবিধা ও দাবীগুলি নির্বিঘ্নে ভােগ করিয়া আসিতেছিলেন। কাজেই তাঁহারা প্রকৃতশক্তি চূত হইয়া অধীনস্থ রায়তের উপর অন্যায় দাবী করিতে আরম্ভ করিলেন। নিত্য নূতন কর বসিল। মজুরদের বলপূর্বক নিজের কাজে লাগানাে হইতে লাগিল। বিবিধ উপায়ে নিজেরই রাষ্ট্রের পাওনা রাজস্ব ফাঁকি দিতে লাগিলেন। মরিতে মরিল শুধু গরীব প্রজা। মধ্য যুগে পৃথিবীর সর্বত্রই ধর্মের প্রচার অতিমাত্রায় দেখিতে পাওয়া অজি ও প্রাচ্য ভূখণ্ড ধর্মের প্রভাব কাটাইতে পারে নাই। ধৰ্ম্মের সঙ্গে রাজনীতির যােগ করিয়া এক অপূৰ্ব্ব গ) ধৰ্ম্মযাজক সম্প্রদায় সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু পাশ্চাত্য দেশ সমূহে রাজনীতি ধৰ্ম্ম হইতে সম্পূর্ণ পৃথক করা হইয়াছে। ফরাসী বিপ্লবের পূৰ্ব্বে ধর্ম যাজকেরা এই ধর্মের দোহাই দিয়া অনেক কুকাৰ্য পরস্বাপহরণ করিতেন। তাঁহারা সাধারণের আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে মােটেই দৃকপাত করিতেন না। কি সে তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধি হইবে তাহাই ছিল তাঁহাদের প্রধান চিন্তা। তৎকালে ফরাসীদেশে ২ কোটি ৬২ লক্ষ ৭০ হাজার লােকের বাস ছিল। এই ২ কোটি ৬২ লক্ষ ৭০ হাজার লােকের মধ্যে ধর্মযাজকের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩০ হাজার এবং ১ লক্ষ ৪০ হাজার অভিজাত সম্প্রদায়ের সংখ্যা অবশিষ্ট সমস্তই সাধারণ লােক। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে বিরাট সাধারণ সংখ্যার তুলনায় স্বাধীনতার সংগ্রাম ধৰ্ম্মযাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় নিতান্ত মুষ্টিমেয় হইলেও এই মুষ্টিমেয়েরই অধিকারে ছিল দেশের তিনি পঞ্চমাংশ জমি এবং অবশিষ্ট মাত্র দুই পঞ্চমাংশ জমি ছিল সংখ্যায় বিরাট জনসাধারণের অধিকারে। তদুপরি জনসাধারণের অংশে বেশীর ভাগই অনুব্বর ও জলাভূমি পড়িয়াছিল। ধৰ্ম্ম-যাজকগণের এই প্রকারের স্বার্থপরতায় জন-সাধারণ দিন দিন বিরক্ত হইয়া উঠিতেছিল। প্রকৃত পক্ষে ফরাসীদেশে এই সময় ধর্মযাজক সম্প্রদায় বাদেও মুখ্যভাবে অভিজাত ও সাধারণ প্রজা এই দুইটি সম্প্রদায় ছিল। পূর্বেই দেখাইয়াছি দেশের জমিতে ধৰ্ম্মযাজক ও অভিজাত (ঘ)অভিজাত সম্প্রদায় সম্প্রদায়ের কতদূর আধিপত্য ছিল। ইহা ছাড়াও রাজ্যের বড় বড় চাকরীগুলি অভিজাত সম্প্রদায় টাকার জোরে অধিকার করিয়া বসিয়াছিলেন। সেখানে সাধারণ লােকের কোন স্থান ছিল না। অভিজাত সম্প্রদায় অর্থবলে বলীয়ান হওয়ায় গরীব সাধারণের নানাবিধ অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর ছিল না। অভিজাত সম্প্রদায়ের জন্য দরিদ্র সাধারণকে ‘বেগার খাটিতে হইত ; নীচ বংশজ বলিয়া নানারূপ অবজ্ঞার ভাজন হইতে হইত। কাজে কাজেই দেশের মধ্যে অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতি জন সাধারণের বিদ্বেষ ভাব ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। ফরাসী বিপ্লবের যুগে ফরাসী দেশ বর্তমানের মত কারখানা-শিল্পে ও বিজ্ঞানে তত অগ্রসর হইতে পারে নাই। তখন শতকরা বেশীর ভাগই ছিল চাষী এবং শিল্পের অধিকাংশই গৃহ শিল্প। (ঙ) চাষী ও মজুর। যে দেশে চাষীর সংখ্যা অধিক অথচ জমি যাহার নিজ হাতে চাষ করে না তাহাদের হাতে, সেখানে চাষীদের দুঃখের যে অবধি থাকিবে না তাহাতে আর সন্দেহের স্থান কোথায় ? মজুরদের স্বাধীনতার সংগ্রাম চাষীরা যে সন্ধেও তথৈবচ। তখন ইউরােপের মজুর শ্ৰেণী আজ কালকার মত সংঘ বদ্ধ ছিল না। সুতরাং বিশৃঙ্খল মজুর শ্ৰেণীকে শশাষণ করিতে ধনিক শ্রেণীর কোন রকম কষ্ট পাইতে হইত না। । মজুরদেরও বাধ্য হইয়া অতি অল্প মজুরীতে মজুরীতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটিতে হইত। এমন কি প্রায়ই তাহাদের ‘বেগার খাটিতে হইত। যে জমি-জমা গ্রহণ করিত আপন ইচ্ছানুসারে তাহা চাষাবাদ করিবার অধিকার হইতে তাহাদের বঞ্চিত করা হইত। দেশের বেশীর ভাগ যাহারা ( চাষী ও মজুর) তাহাদের এই হীন অবস্থার উপর নানারূপ কর ভার চাপানাে হইয়াছিল যথা “টলী, সােবেলী’, কোরভী ইত্যাদি। ইহার অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ দেশে দুর্ভিক্ষ চির বিরাজমান ছিল। দেশের বেশীর ভাগ লােক ক্রমে এই হীন হইতে হীনতর অবস্থায় আসিতে পশুত্ব প্রাপ্ত হইতে লাগিল। দেশের যখন এই অবস্থা তখন যে বিপ্লব আসিবে ইহাতে আর আশ্চর্যের কি আছে? দেশে দমন নীতি পূর্ণ বেগে চলিতে লাগিল। “লােকাল’ গভর্ণমেন্ট- গুলির অধিকার সম্পূর্ণ অপহরণ করা হইল। সাধারণ প্রতিষ্ঠান পঞ্চদশ লুইএর প্রধান মন্ত্রী (পালমেন্টকে) জাতীয় মাকে বে-আইনী ঘােষণা করিলেন। সকল দেশেই আইন ব্যবসায়ীরা সাধারণতঃ বড় লােক হইয়া থাকে। ফরাসী দেশের তৎকালীন জাতীয় মহাসভার আইন ব্যবসায়ীর দল প্রতিনিধিদের অধিকাংশই ছিলেন আইন ব্যবসায়ীরা সুতরাং অধিকার ক্ষুন্ন করায় আইন-ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন। কারণ ইহাতে সরাসরি তাহাদের স্বার্থে ঘা লাগিল।

স্বাধীনতার সংগ্রাম বিপ্লবের পূর্বে ফরাসী দেশে দুইটি দল দেখা দিয়াছিল--একটি রাজার দল, অপরটি জনসাধারণের দল। রাজ সম্পর্কে সম্পকিত, অভিজাত সম্প্রদায় ও ধর্ম যাজক সম্প্রদায় লইয়া জন সাধারণের রাজার দল গঠিত। মুটে মজুর, চাষী ও মধ্যবিৎ প্রকৃত অবস্থা লইয়া জন সাধারণের দল। রাজার দল সর্ববিধ ক্ষমতার অধিকারী হইলেন আর জন সাধারণেরা সৰ্ব্ব প্রকারে উৎপীড়িত হইবার সনন্দ পাইলেন। রাজার দল স্বেচ্ছামত যেখানে সেখানে কর আদায় করিতে পারিতেন। রাজার দলের পরামর্শ অনুসারেই রাজ কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইত। রাজ্যের সমস্ত বিভাগই তাহাদের করায়ত্ত্ব ছিল। রাজার দলের লােকেরা মনে করিতেন তাঁহারা শাসন করিতেই জন্মিয়াছেন এবং জন-সাধারণ নির্বিকার চিত্তে হুকুম তামিল করিতেই জন্মিয়াছে। এই প্রভুত্বের ধারণা বদ্ধমূল হওয়ায় জন- সাধারণকে পশুতুল্য মনে করিতেন। মানুষকে যাহারা পশু জ্ঞান করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করেন তাহাদের বৃত্তি যে পাশবিক হইবে সে বিষয় কোন সন্দেহ নাই। এই রাজার-দলের অত্যাচার কাহিনী বর্ণনা করিবার স্থান এখানে নাই। অনুসন্ধিৎসু পাঠক ইতিহাসের পাতায় তাহার ভূরি ভূরি নিদারুণ ঘটনা দেখিতে পাইবেন। পূৰ্বেই বলিয়াছি যে তৎকালে ফরাসী দেশে দুর্ভিক্ষ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়াছিল। তবে ১৭৮৮ , খৃষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষ তন্মধ্যে অতি ভয়াবহ। ফসল কাটিবার কয়েক দিন পূৰ্ব্বে হঠাৎ শিলাবৃষ্টি হইয়া সকল ফসল নষ্ট হই। রাজকোষ অর্থশূন্য। দুর্ভিক্ষ নিবারণের কোন চেষ্টাই রাজ পক্ষ হইতে হইল না।

স্বাধীনতার সংগ্রাম • সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে চতুর্দশ লুই সিংহাসনে আরােহণ করিয়াই অনেক অর্থ যুদ্ধ বিগ্রহে ব্যয় করেন। পরবর্তী শতাব্দীর প্রারম্ভে পঞ্চদশ লুই ইন্দ্রিয় সেবায় ও বিলাস ব্যসনে যথেচ্ছ রাজ ভাণ্ডারের অর্থক্ষয় করেন। তৎপরে ষােড়শ লুইএর অদূরদর্শী মহিষীর অদূরদর্শিতায় ও আমেরিকা-স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য কল্পে বহু অর্থ ব্যয়িত হয়। এই ভাবে রজেকোষ একেবারে অর্থশূন্য হইয়া পড়িল। চারিদিকে দুর্ভিক্ষের তাণ্ডবনৃত্য আরম্ভ হইল সৈন্যগণ নিয়মিতরূপে বেতন পাইতেছে না, পরান্নপুষ্ট রাজপােষ্যবর্গের ভারে সরকার ভারাক্রান্ত। কারেন্সীতে মুদ্রা নাই। শুধুই নােট চলিতে লাগিল। দেশে যখন এই অরাজকতা তখন তাহা দূরীকরণের জন্য নানা উপায় অবলম্বিত হইতে লাগিল। টারগট, নেকার, ক্যালােন ওব্রায়েন প্রভৃতি মন্ত্রীগণ দেশের শৃঙ্খলা পুনস্থাপনের জন্য বহুবিধ চেষ্টা করিতে ক্ৰটী করিলেন কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তনই হইল না। চিন্তাই কৰ্ম্মের জননী। চিন্তা বলিতে অবশ্য গবেষণা বুঝিতে হইবে। কারণ কি করিব, কেন করিব ও কি ভাবে করা উচিত ইহা সর্বাগ্রে বুঝিতে হইবে। কৰ্ম্মের প্রেরণা চিন্তা হইতেই সাহিত্যের প্রভাব আসিয়া থাকে। এই পুস্তকে আমরা যে কয়টি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসের সহিত পরিচিত হইয়াছি তাহার প্রত্যেকটিতেই পাঠক হয়ত লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে তাহাদের জাগরণের পশ্চাতে ছিল কতকগুলি মনীষির প্রাণপাত চিন্তা। কোন সময়ে কি করিতেহইবে, কোন দেশের জল বায়ুতে কি করিলে সুবিধা হইবে তাহা জানিবাব জন্য মনীষিদের গবেষণার প্রয়ােজন। ৫৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম জাতিকে জাগ্রত করিতে হইলে তাহাকে সেই ভাবের ভাবুক করিয়া তুলিতে হইবে। দেশ বলিতে কোন একটি পার্থিব স্থূল কিছু বুঝায় না অথচ দেশ বলিতে দেশের জীব জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ ও জড় জগৎ কোনটাই বাদ পড়ে না। এই যে দেশাত্মবােধ ইহা শুধু চিন্তার দ্বারাই আসিতে পারে। আর আপনারা সকলেই জানেন যে দেশাত্ম বােধ না আসিলে দেশ স্বাধীন হইতেই পারে না। দেশাত্মবােধ কথাটি ঠিক স্পষ্ট বুঝা যায় না। সুতরাং একটি উদাহরণ দিয়া বুঝাইতে চেষ্টা করিব। মনে করুন রাজ কর্মচারী ‘খ’কে অর্ডিনান্স আইনে গ্রেপ্তার করিল। ‘খ’ এর আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব ইহাতে রাজ শাসনে বিরক্ত হইতে পারে । কিন্তু ইহাতে সপ্তকোটি বাংলার অধিবাসী চঞ্চল হইয়া উঠিল যদিও তাহাদের সহিত ‘খ’ এর কোন প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ নাই। আবার মনে করুন কৃষকদের উপর সরকার একটি নূতন কর বসাইলেন। ইহাতে কৃষক স্যায়তঃবাদ সাধিতে পারে কিন্তু অকৃষক, যাহাদের সহিত জমির কোন সম্বন্ধই নাই তাহারাও তীব্র প্রতিবাদ করিল। কেন ? ইহাকেই বলে দেশাত্মবােধ। দেশের প্রত্যেক জিনিষের সহিত এমন কি প্রত্যেক ধূলি কণার সহিত আমার প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ আছে এই জ্ঞানই দেশাত্মবােধ। এই দেশাত্ম বােধ হাতে পাইবার জিনিষ নয়। ইহা জ্ঞানের দ্বারা উপলব্ধি করিতে মুহ। সাহিত্যের প্রভাবই এই দেশাত্মবোেধ জাগরণের একমাত্র সম্বল। কারণ সাহিত্যই জ্ঞানের বাহন। ফরাসী সাহিত্য ফরাসী বিপ্লবের একটি মূল কারণ।

স্বাধীনতার সংগ্রাম ফরাসী দেশবাসী ক্রমান্বয়ে অত্যাচারের পর অত্যাচারে যখন দিশেহারা হইয়া পড়িয়াছিল তখন সাহিত্য এই নৈরাশ্যপীড়িত জাতিকে এক নূতন আলােক প্রদান করিল। এই সময়ে মনটেসকিউ, ভলটেয়ার, এনসাই- ক্লোপিডিষ্ট, টারগট, হেলভেটির, হলব্যাক ও রুসে। প্রভৃতি মনীষিগণ জন্মগ্রহণ করেন। মনীষিরা সকলেই চলিত কুপ্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধবাদ প্রচার করিতে লাগিলেন। ফরাসীদেশে মনটেকিউ এই মনীষিদের মধ্যে প্রথম পথ প্রদর্শক। ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দে মনটেকিউ জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭৫৫ খৃষ্টাব্দে তাহার মৃত্যু হয়। তিনিই প্রথম ফরাসী দেশে মিশ্র-শাসন পদ্ধতি প্রচলনের উপদেশ দেন অর্থাৎ দেশের আইন-সভা সাধারণ নির্বাচনে গঠিত করিয়া সমগ্ৰ সভাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন এবং এই সভা দ্বয় রেসপন্সিবল বা ঝুকি সহ মন্ত্রীর আদেশ অনুসারে পরিচালিত হইবে। রাজ্যের শেভার জন্য নামে মাত্র রাজা থাকিবেন। তাহার কোন প্রকৃত ক্ষমতা থাকিবে না। মনটেসকিউ ‘স্পিরিট অব-ল’ নামক এক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এই গ্রন্থে দেশের অবস্থা বুঝিয়া তিনি ব্যবস্থা করিতে ও গ্রীসের আত্ম ত্যাগের জ্বলন্ত দৃষ্টিতে দেশকে অনুপ্রানিত করিতে চেষ্টা করেন। ১৬৯৪ খৃষ্টাব্দে ভল্টেয়ারের জন্ম হয়। ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। তিনি বলিতেন প্রজার হিতের জন্য রাজা। দেশের শাসন পদ্ধতি যদি রাজা বা রাজসম্পৰ্কীয়দের অথবা বিশিষ্ট শ্রেণীর সুবিধার উদ্দেশ্যে কাজ করে তবে তাহার ধ্বংস অনিবাৰ্য। শাসনপদ্ধতির জন- স্বাধীনতার সংগ্রাম সাধারণের মঙ্গলের জন্য সর্বদা কাৰ্য্য করা উচিত। তৎকালীন ফরাসা শাসন পদ্ধতির দোষ দেখাইয়া ভল্টেয়ার প্রজা সাধারণের পক্ষাবলম্বন করি শাসন কাৰ্য্যকে বিদ্রুপ করেন। চতুর্দশ লুই এর চরিত্র সম্বন্ধে বিদ্রুপ করায় তাঁহাকে কারাদণ্ড পৰ্যন্ত ভােগ করিতে হইয়াছিল। তিনি যাহা সত্য বলিয়া মনে করিয়াছিলেন তাহা প্রাণপণে প্রচার করিয়া গিয়াছেন। এই সত্য প্রচারের জন্য বহুবার তাহাকে কারা যন্ত্রণা ভােগ করিতে হইয়াছে। তিনি ধর্মধ্বজীদেরও সমালােচনা করিতে ছাড়েন নাই। রুসোঁকে পলিটিক্স জগতে এক নূতন ভাবের প্রবর্তক বলা যাইতে পারে। তাহার চিন্তা ফরাসী বিপ্লব অতিক্রম করিয়া আধুনিক জগতের বিপ্লবের ইতিহাসে ও অনেকখানি স্থান অধিকার করিয়া আছে। তাঁহার রচিত ‘সমাজ দেহের পরিণতি বাদ’ (সােসিয়াল কন্ট্রাক্ট থিওরি) চিন্তা জগতে এক নূতন স্রোত আনয়ন করে। পূৰ্ব্বকালে রাজাকে ভগবানের অভিপ্রেত বলিয়া লােকের ধারণা ছিল। কাজেই রাজার কাৰ্যকলাপ ন্যয়ান্তায় নির্বিচারে জনসাধারণ ভগবানের ইচ্ছা বলিয়া মানিয়া লইত। তাহার কোন প্রতিবাদ পৰ্য্যন্ত করিত না। রাজা তাহার কার্যের জন্য কোন মানুষের নিকট দায়ী ছিলেন না। তাহার ন্যায়ান্যায়ের বিচার ভগবানের দরবারে হইবে। এই ছিল জন- সাধারণের বদ্ধ মূল ধারণা। এই ধারণার বশীভূত হইয়া প্রজারা অত্যাচারী রাজার অত্যাচার উৎপীড়ন মুখ বুজিয়া সহ্য করিত। অতাচারী নৃপতি- ও প্রাণের সুখে প্রজার সহিত যথেচ্ছ ব্যবহার করিতে কুণ্ঠিত বা ভীত হইতেন না। ৫৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম রুসে। রাজার এই একাধিপত্যের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলেন এবং এই একমুখী শাসনের বিরুদ্ধে প্রচার করিতে লাগিলেন। ‘সমাজদেহের পরিণতিবাদ’ গ্রন্থে তিনি দেখাইলেন—দেশের এই একমুখী শাসন এবং বাজার একাধিপত্য ভগবানের অভিপ্রেত নহে। সৃষ্টির প্রারম্ভ হইতেই মানুষ স্বাধীন। মানুষের জন্মগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কাহারও পক্ষে স্থায্য বা মঙ্গলময় ভগবানের অভিপ্রেত হইতে পারে না। সমাজদেহের পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে সকল মানুষ সমবেত হইয়াপ্রত্যেক মানুষ তার বিশেষ অধিকার রক্ষার জন্য ক্ষুদ্র অধিকার রাজার হাতে দিয়াছে। রাজা যদি সেই অধিকারের অপব্যবহার করেন তবে ন্যায়তঃ প্রজাসাধারণ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া উপযুক্ত শাসনপদ্ধতির পূর্ণগঠন করিতে পারে। “জোর যার মুল্লুক তার” এই নীতি প্রজাসাধারণ মানিয়া চলিবে । সুতরাং তৎকালীন অত্যাচারী নৃপতিদের পরিবর্তে তিনি প্রজাতন্ত্র শাসন- পদ্ধতি প্রচলন করিতে উপদেশ দেন। দেশের অবস্থা ও প্রজাসাধারণের মানসিক ভাবগতির অনুযায়ী শাসন প্রণালী প্রচলিত হওয়াই ন্যায়তঃ ধৰ্ম্মতঃ কর্তব্য। রাজার যথেচ্ছাচার বরদাস্ত করা প্রজার পক্ষে পাপজনক। অত্যাচারে অত্যাচারে দেশবাসী তখন এক প্রকার ক্ষিপ্তপ্রায়। সুতরাং তাঁহার এই সকল ভাবােদ্বীপক চিন্তাধারায় সহজেই জনসাধারণ আকৃষ্ট হইল। রুসে। ১৭১২ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দে তাহার মৃত্যু হয়। ডিডেরা, হেল-ভিটিসস, টরেগট ও হলব্যাক প্রভৃতি মনীষিরাও নানা গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া লােকের মনে রাজ-অত্যাচারের বীভৎসতা এবং স্বাধীনতা লাভের আশা সঞ্চার করেন। ৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৭৫১ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৭৭২ খৃষ্টাব্দের মধ্যে ডিডেররা ও ডি এলাম- বার্টের অধ্যক্ষতায় ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ নামক এক গ্রন্থ প্রণীত হয়। খৃষ্টান ধৰ্ম্মানুযায়ী, মানুষ তাহার পাপের ফল ভােগ করিতেছে। কিন্তু এই গ্রন্থ তাহার প্রতিবাদ করিয়া মানুষের ক্রমােন্নতিবাদ প্রচার করেন। ইহার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য ও ইতিহাস প্রভৃতি কি ভাবে উন্নত করা যায় তাহার আলেচনা করা হইয়াছিল। এই গ্রন্থের প্রভাব এতদূর বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিল যে গ্রন্থ প্রণয়নের অনতিকাল পরে ‘এনসাই- ক্লোপিডিষ্ট’ নামক একটি দল গড়িয়া উঠে। ফলতঃ তৎকালীন সাহিত্যিকরা দেশে তাঁহাদের সাহিত্যের মধ্য দিয়া সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা প্রচার করিতেছিলেন। তাহারা সমস্বরে প্রচার করেন যে প্রকৃতির নিয়মে কোন উচ্চ নীচ ভেদাভেদ নাই। এই শ্রেণীবিভাগ মানুষের কৃত। একই মানবজাতির ভিতরে অনিয়ম থাকিতে পারে না। স্বাধীনতা সকলেরই জন্মগত অধিকার। কেহ কাহারও স্বাধীনতা হরণ করিতে পারে না। সকলেই স্বাধীন। স্বাধীনতা মানুষ মাত্রেরই কাম্য। ক্রমে দেশে যখন অশান্তিচিহ্ন ঘনাইয়া আসিল তখন রাজা যােড়শ লুই ব্যস্ত হইয়া পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞামত ষ্টেটশ, জেনারেল বিপ্লবের সূত্রপাত মন্ত্রণা সভা আহ্বান করিলেন। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে ভারসেলিস নগরে এই সভা আহত হইল। কিন্তু সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইল। ‘ষ্টেট জেনারেল’ ফরাসী দেশের প্রাচীন ‘মহাসভা। ষ্টেটস জেনারেল মন্ত্রণা সভায় ধর্মযাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় এবং সাধারণ হইতে নির্বাচিত স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রতিনিধির স্থান ছিল। চিরকালই এই সভায় ধর্মযাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি সাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি অপেক্ষা সংখ্যায় অনেক অধিক থাকিত। কাজেই এই সভায় সাধারণের কোন রকম আধিপত্য ছিল না। পূৰ্বেই ধৰ্ম্মযাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়কে রাজার- দল নামে অভিহিত করিয়াছি পাঠকের স্মরণ থাকিতে পারে। সুতরাং এই মন্ত্রণা সভা যদিও নির্বাচিত প্রতিনিধিতে পূর্ণ ছিল তথাপি যাহারা দেশের বেশীর ভাগ অর্থাৎ ‘গণ তাহাদের দুর্দশার কোনরূপ লাঘব হইত না। কিন্তু এই দুদ্দিনে দেশের মন্ত্রণা সভার গঠনে এইরূপ অসামঞ্জস্য থাকিলে সাধারণকে কোন মতেই শান্ত করা যাইবে না বুঝিতে পারিয়া তৎকালীন ফরাসী রাষ্ট্র সচিব ‘নেকার’ সাধারণের প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া অপর দুই শ্রেণীর (ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেনী) সংখ্যার যােগফলের সমান করিলেন। এই ভাবে ‘ষ্টেটস জেনারেল মন্ত্রণা সভায় সাধারণের প্রতিনিধি সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ায় মন্ত্রণা সভায় সাধারণের ক্ষমতা অত্যন্ত বৃদ্ধি পাইল। সুতরাং ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দের ভারসেলিসে আহূত ‘ষ্টেটস জেনারেল মন্ত্রণা সভায় স্বতঃই দুইটি দল গড়িয়া উঠিল—রাজার দল ও জন সাধারণের দল। এই উভয় দলের মধ্যে মতান্তর উপস্থিত হওয়ায় মূল মন্ত্রণা সভা হইতে ‘সানাল এসেম্বলী’ বা ‘জাতীয সমিতি’ উদ্ভূত হইল। এই জাতীয় সমিতি’ সম্পূর্ণ সাধারণ দলের প্রতিনিধিতে পরিপূর্ণ। প্রধান মন্ত্রী নেকার, ল্যাংগুইনেস, বিসিপরি, মারাট, ল্যাফেটী এবং অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এই জনসাধারণের দলে যােগ দিলেন। এই জাতীয় সমিতি প্রথমতঃ রাজার ঋণদাতাদিগকে সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিলেন এবং দেশের দুর্দশার প্রকৃত কারণ অন্বেষণে তৎপর হইলেন।

স্বাধীনতার সংগ্রাম এই জাতীয় সমিতি’ যােড়শ লুই এর অপ্রতিহত ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করিবার জন্য চেষ্টা করিলেন। প্রস্তাব হইল বৃটিশ শাসন প্রণালীর অনুকরণে শাসন প্রণালী নিয়ন্ত্রিত করিতে চেষ্টা করা হউক। কিন্তু তাহাতে রাজ ক্ষমতার হ্রাস পাইবে এবং বহুল পরিমাণে সীমাবদ্ধ হইবে বুঝিয়া যেড়শ লুই তাহাতে কিছুতেই স্বীকৃত হইলেন না। বরং ‘জাতীয় সমিতি’র সহিত অভদ্র ব্যবহার করিলেন এবং জাতীয় সমিতি'কে অবৈধ বলিয়া ঘােষণা করিলেন। চারিদিকে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। সাধারণ তাহাদের ন্যায্য অধিকার লাভের জন্য ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণা সভায় যে সময় দলাদলি চলিতেছিল তখন শাসন যন্ত্রের বাহিরেও বহু ‘ক্লব’ বা সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করিয়া নানা প্রকারে দেশের মধ্যে আন্দোলন চলিতেছিল। ঐ সকল ক্লবের মধ্যে ভারসেলিস সহরের ‘ব্রেটন ক্লব’ ও প্যারিসের ‘জ্যাকোবিন' ক্লবই প্রসিদ্ধ। জাতীয় সমিতি এবং ক্লব প্রভৃতির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল দেশে সাধারণতন্ত্রের প্রবর্তন করা। রাজা যােড়শ লুইএর দু ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণা সভায় হৈ চৈ পড়িয়া গেল। চারিদিকের আন্দোলনে রাজা বড়ই ভীত হইয়া পড়িলেন এবং প্রজাকে ভয় দেখাইয়া দমন করিবার অভিপ্রায়ে জার্মানি ও সুইজারলণ্ড হইতে ভাড়াটিয়া সৈন্ত আমদানী করিলেন। ইহাতে দেশের লােক আরও উত্তেজিত হইয়া পড়িল। রাষ্ট্রীয় সচিব নেকার রাজার এই অন্যায় কাৰ্যে বাধা দিবার চেষ্টা করায় মন্ত্রীত্ব পদ হইতে বিতাড়িত হইলেন। দেশের লােক জয় জয় ধ্বনি করিয়া নেকারের প্রতিমূর্তি লইয়া এক বিরাট শশাভাযাত্রা বাহির করিল। নেকারকে সম্মান প্রদর্শন করা ছাড়া এই স্বাধীনতার সংগ্রাম শােভাযাত্রার অন্য কোনরূপ দাঙ্গা হাঙ্গামার অভিপ্রায় ছিল না। কিন্তু রাজ পক্ষ নানারূপ অহেতুকী অনিষ্ট আশঙ্কা করিয়া নিরস্ত জনতার উপর গুলী বর্ষণ করিলেন। এই গােলমালে হঠাৎ রাজপক্ষের জনৈক ফরাসী দেহরক্ষী একজন জর্মন সৈন্তের গুলিতে নিহত হইল। দেশময় রব উঠিল রাজা বিদেশী সৈন্যের সহায়ে দেশবাসীকে দমন করিবেন। এই গুজবে ক্ষিপ্ত হইয়া বহু ফরাসী সৈন্ত জাতীয় দলে যােগ দিল। অপরদিকে অন্ন- ক্লিষ্ট ও বেকারের দলও সােৎসাহে জাতীয় দলে যােগ দিল। সুতরাং প্রকাশ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ আরম্ভ হইল। ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই প্যারিসের উন্মত্ত জন-সাধারণ এবং সৈন্যদল ব্যাষ্টিল দুর্গ অধিকার করিল। এই দুর্গ বুরৰ্বে। রাজাদের অত্যাচারের বঙ্গভূমি ছিল। কত লােক এই দুর্গে আজীবন রাজবন্দী অবস্থায় কাটাইয়া গিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। বহুকাল যাবৎ এই দুর্গ অরাজকতা ও অত্যাচারের জন্যই দেশময় প্রসিদ্ধ হইয়াছিল। বিপ্লব আরম্ভ হইতে না হইতেই এই অরাজকতার প্রতিকৃতি ব্যাষ্টিল দূর্গ বিদ্রোহীদের অধিকৃত হইতে দেখিয়া ফরাসীদেশের রাজা যােড়শ লুই প্রাণের ভয়ে জনসাধারণের হস্তে আত্মসমর্পন করিয়া সাধারণ তন্ত্রের প্রাধান্য স্বীকার করিলেন। ব্যাষ্টিল দুর্গের চূড়ায় রাজকীয় পতাকার পরিবর্তে সাধারণ তন্ত্রের বিজয় কেতন শােভা পাইতে লাগিল। প্যারিস বিদ্রোহের সংবাদে দেশের সর্বত্র বিদ্রোহ জ্বলিয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু যােড়শ লুই অতি সহজে জন সাধারণের প্রাধান্ত স্বীকার করায় সাময়িক ভাবে দেশে শান্তি স্থাপিত হইল। রাজকর্মচারীদের একাধিপত্য স্বাধীনতার সংগ্রাম বিলুপ্ত হইল এবং তৎপরিবর্তে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের আধিপত্য স্থাপিত হইল। রাজার প্রহরীদের দূর করিয়া সমস্ত জাতীয় দল হইতে প্রহরী নিযুক্ত হইল। ৪ঠা আগষ্ট এক ঘােষণা পত্র প্রচারিত হইল। তাহাতে জন সাধারণের স্বত্ব সম্বন্ধে বিশেষ ও বিশদভাবে লিখিত হইল। ইহার দ্বারা সৰ্ববিধরাজকার্য্যে, সমাজ বিষয়ে ও ধর্ম বিষয়ে সাধারণের সহিত রাজবংশীয়, অভিজাত সম্প্রদায় এবং ধর্মযাজক সম্প্রদায়ের উচ্চচনীচ ভেদ দূর করা হইল! এই রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণাসভায় সাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মত লইয়া রাজকার্য পরিচালিত হইতে লাগিল। পদচ্যুত নেকার পুনরায় মন্ত্রীপদে অভিষিক্ত হইলেন। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে রাজা-প্রজার এই মিলন অধিকদিন স্থায়ী হইল না। সকলেই দেশে শান্তি স্থাপিত হইবে আশা করিয়াছিল। কিন্তু দৈবের নিৰ্বন্ধে বিদ্রোহ শান্ত হইতে না হইতেই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল, কিন্তু তখন রাজ কোয শূন্য। সুতরাং যাহারা রাজ কার্যের পরিচালনা ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহারা অর্থাভাবে প্রজা সাধারণের ক্ষুধা নিবৃত্তির কোন উপায়ই করিতে পারিলেন না। ক্ষুধার জ্বালায় উন্মত্ত নরনারী প্যারিস হইতে দলে দলে ভার্সেলিস অভিমুখে চলিল। ষােড়শ লুই তখন স্ত্রী পুত্র কন্যা সহ ভাসেলিস নগরে সুখ-শয়নে নিদ্রিত ছিলেন। ক্ষিপ্ত জনসাধারণ ভাসেলিসে পৌছিয়া রাজ প্রাসাদ বেষ্টন করিয়া দারুণ কোলাহল আরম্ভ করিল। অনেকে মন্ত্রণসভাগৃহে প্রবেশ করিল। । রক্ষি সৈন্যদল জন সাধারণকে বিতাড়িত করিবার চেষ্টা করিল। ফলে জন সাধারণ ক্রোধা হইয়া দুইজন রক্ষীর মস্তক ছেদন করিয়া প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিল। বেগতিক দেখিয়া রাজ সেনাপতি ল্যাফেট স্বাধীনতার সংগ্রাম রক্ষিসৈন্যদল সমভিব্যাহারে আসিয়া জনতাকে বাধা প্রদান করিলেন। বাধা পাইয়া জনসাধারাণ চীৎকার করিতে লাগিল “রাজাকে প্যারিসে লইয়া যাইব” ক্ষুধার্ত জন-সাধারণ মনে করিয়াছিল যে রাজাকে প্যারিসে লইয়া যাইতে পারিলেই রাজা প্রজার দুরবস্থা সন্দর্শনে প্রতীকার করিতে বাধ্য হইবেন। অবশেষে যােড়শ লুই বাধ্য হইয়া প্যারিসে যাইতে স্বীকৃত হইলেন। ঘােড়শ লুই প্যারিসে আসিয়া রাজ প্রাসাদে স্থান পাইলেন বটে কিন্তু সর্বপ্রকার রাজ কাৰ্য্য হইতে বঞ্চিত হইলেন। প্রকারান্তরে রাজা নজর- বন্দী হইলেন। এই সময় ‘মিরাবো’ জাতীয় সভার সভাপতি পদে বরিত হইলেন। তখনও রাজার প্রতি কেহ অসম্মান দেখায় নাই। কিন্তু ক্রমশঃ সৈন্যদলের মধ্যে রাজ-বিদ্বেষ প্রকট হইতে লাগিল। যােড়শ লুই অবস্থা সঙ্গীন বুঝিতে পারিয়া ছদ্মবেশে সপরিবারে পলায়ন করিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ জাতীয় দলের সৈন্যরা সপরিবারে রাজাকে ধরিয়া ফেলিল। এবারও রাজাকে পূর্বোক্ত রাজপ্রাসাদে রাখা হইল কিন্তু কড়া পাহাড়া নিযুক্ত হইল। এদিকে দেশময় রাষ্ট্র হইল বরণসউকের ডিউক সসৈন্তে প্যারিস আক্রমণ করিতে আসিতেছেন। এই সংবাদে জন সাধারণ উন্মত্ত হইয়া রাজার দলের যাহারা বন্দী ছিল তাহাদের নৃশংসভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করিল। রাজা ষােড়শ লুইএর বিরুদ্ধে জন সাধারণ যড়যন্ত্রের মামলা করিল। প্যারিসে আসিয়া, প্রথম প্রথম রাজা যােড়শ লুই শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু কিছু অধিকার পাইয়াছিলেন। কিন্তু দিনের পর দিন তাহার ৬৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম অধিকার হ্রাস পাইতে লাগিল। সাধারণ-তন্ত্রের নূতন মন্ত্রী সভা গঠিত হওয়ায় পদে পদে রাজা অপদস্থ হইতে লাগিলেন। ঠিক এই সময়ে সাধারণ-তন্ত্রের বিরুদ্ধে ইউরােপের অন্যান্য শক্তির সহিত সােড়শ লুইএর ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ হইয়া পড়িল। রাজরাণী মেরিয়াে-এন্টিওনেট ছিলেন অষ্টিয়া রাজার কন্যা। তিনি ফরাসী জাতিকে ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন। কাজেই তিনি রাজার ষড়যন্ত্রের ইন্ধন যােগাইতে ছিলেন। রাজার যড়যন্ত্র প্রচেষ্টা সমস্তই প্রকাশ হইয়া পড়িলে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণা সভা রাজার শেষ ক্ষমতাটুকু এমন কি রাজা উপাধিটি পৰ্য্যন্ত কাড়িয়া লইল। প্রকাশ্যে আদালতে রাজা ষােড়শ লুইএর যড়যন্ত্রের মামলা আরম্ভ হইল। এবং ১৭৯২ খৃঃ ২২শে সেপ্টেম্বর ফরাসীদেশের প্রথম সাধারণতন্ত্র ঘােষিত হইল। সাধারণ তন্ত্রের আদালতের বিচারে রাজা ঘােড়শ লুই এর প্রাণ দণ্ডাজ্ঞা নির্ধারিত হইল। ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দের ২০শে জানুয়ারী প্রজারা রাজাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করিল। ১৬ই অক্টোবর ফরাসী বিপ্লবের রাণীকেও প্রজারা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করিল। রাজা মূলমন্ত্র । রাণীর সমাধির উপর ফরাসী দেশের প্রথম সাধারণ- তন্ত্রের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতাই ছিল ফরাসী বিপ্লবের মূল মন্ত্র। এই মূল মন্ত্র সাধন করিতে গিয়া ফরাসী দেশে বিপ্লব আসিয়াছিল। আর এই মন্ত্র প্রভাবেই দেশে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধন করিয়া সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইল। পূৰ্বেই বলিয়াছি ফরাসী দেশে তিন তিনবার সাধারণ তন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বর্তমানের ফরাসী দেশ তৃতীয় বারের ৬৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম এই যে সাধারণতন্ত্র শাসন প্রণালী ক্রমেই পরিচালিত হইতেছে। বার বার শাসন যন্ত্রের পরিবর্তন ইহার গােড়ায় রহিয়াছে মূলমন্ত্রের অপব্যবহার। বিপ্লবের সময় সকল দেশেই রাজার দলে ও প্রজার দলে সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। কিন্তু ফরাসী দেশে প্রজার দলের মধ্যেও ‘জিরােণ্ডিষ্ট’, ‘জ্যাকেবিন, ‘এনসাইক্লোপিডিষ্ট’, ‘ভ্যান্টনিষ্ট’, ‘গরবার্টনিষ্ট ইত্যাদি অনেক দল সৃষ্টি হইয়াছিল। প্রত্যেক দলই প্রাণপণ চেষ্টায় দেশের স্বাধীনতা অর্জন করিতে চেষ্টা করে। সুতরাং সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গেই আধিপত্য লইয়া বিভিন্ন দলের মধ্যে মনােমালিন্ত ঘটে। এই মননামালিন্যের ফলে দেশে নূতন শাসন যন্ত্র অধিক দিন স্থায়ী হই- পারিল না। যে দল যখন রাজ্যের শাসন যন্ত্র হস্তগত করে সে তখন অন্যান্য দলকে দলিত করিতে প্রবৃত্ত হয়। কাজেই সাধারণ তন্ত্রের মূল মন্ত্র ‘সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতা ভিত্তি হীন হইয়া পড়িল। দেশে অরাজকতা ও অত্যাচার পূর্ববৎ রহিয়া গেল। সাধারণতন্ত্র দলের মধ্যে এই বিশৃঙ্খলার সুযােগে রাজার দল পুনরায় নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। রাজার দল ষােড়শ লুইএর ভ্রাতাকে অষ্টাদশ লুই নামে অভিহিত করিয়া ফরাসী দেশের রাজা বলিয়া ঘােযণা করিল। ইউরােপের শক্তিপুঞ্জও অষ্টাদশ লুইকে রাজা বলিয়া স্বীকার করিল। ঠিক এই সময়ে আবার ইংরাজ ও অষ্টিয়া ফরাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিলেন। চারিদিক হইতে ফরাসী দেশে রক্তের স্রোত বহিতে লাগিল। এই বিভীষিকাময় ফরাসী বিপ্লবের মধ্যেও একটি ক্ষীণজীবি বাঙালীর স্বাধীনতার সংগ্রাম কৃতিত্বের কথা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। পঞ্চদশ লুইএর উপপত্নী “ম্যাডাম ডুমারি” একজন ইংরাজ জাহাজের অধ্যক্ষের নিকট ফবাসী বিপ্লবে হইতে এক দশম বর্ষীয় বাঙালী বালককে ক্রয় করেন। বাঙালী পরে ক্রীতদাস বাঙালী বালক ‘ডুমারির স্নেহ যত্নে উপযুক্ত শিক্ষিত হন। ‘ডুমারি এই বাঙালী বালককে জামুর বলিয়া ডাকিতেন। জামর রুসাের প্রণীত গ্রন্থাদি পাঠ করিয়া ‘সাম্য মৈত্রী স্বাধীন- তার ভাবে ভাবুক হইয়া পড়েন। এবং ফরাসী বিপ্লবে যােগ দেন। ভবিষ্যতে এই বাঙালী ক্রীতদাস সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী ভাবে ফরাসীদেশের একটি সভার সম্পাদক এবং অপর একটি কার্যকরী সভার সহকারী সম্পাদক হইয়াছিলেন। বিদেশে এক অসহায় বাঙালীর এই কৃতিত্ব বাঙালী জাতির গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই। ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাসে নেপােলিয়েনের ব্যক্তিত্ব ও অসীম ক্ষমতা প্রায় সবখানি জুড়িয়া আছে। এমন কি নেপােলিয়েন ইউরােপের ইতিহাসে ও গত মহাযুদ্ধের নায়ক বােনােপার্টি জার্মান সম্রাট কাইজার ব্যতীত নেপােলিয়নের তুল্য দুর্দমনীয় বীর আর দৃষ্ট হয় না। ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে কৰ্ষিকা দ্বীপে নেপােলিয়ন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার জন্মিবার দুইমাস পূৰ্ব্বে কষিকা দ্বীপ ইতালির হস্ত হইতে ফরাসী অধিকারে আসে। সুতরাং তিনি কয়েকমাস পূৰ্বে জন্মগ্রহণ করিলে ইতালির অধিবাসীরূপে গণ্য হইতেন। কিন্তু হঠাৎ ভাগ্য চক্রের পরিবর্তনে ফরাসী অধিবাসীরূপে পরিগণিত হইলেন। সংসারের অতি দুর্দিনে নেপােলিয়নের জন্ম হয়। নেপােলিয়নের ৬৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম পিতার নাম চালস বােনাপার্ট, মাতার নাম লেঠিশিয়া বেমেলিনী। চালিস বােনাপার্ট আইন ব্যবসায়ী ছিলেন। কষিকা দ্বীপ যখন ফরাসীর অধিকারভুক্ত হয় তখন নেপােলিয়েন বােনাপার্টির পিতা স্বদেশ ভক্ত প্যালিদের সহিত মিলিত হইয়া ফরাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন; কিন্তু বারংবার পরাজিত হইয়া প্রাণরক্ষার জন্য পার্বত্য গভীর অরণ্যে আশ্রয় লইতে বাধ্য হন। সংসারের অনাটন উপস্থিত হইল। পরিবারের মধ্যে এই আর্থিক অনাটনের দরুণ নেপােলিয়ন বাল্যজীবনে অত্যন্ত দুঃখ পাইয়াছিলেন। নেপােলিয়নের বয়স যখন মাত্র যােত বৎসর তখন তাহার পিতৃবিয়ােগ হয়। নেপােলিয়নের মাতা আটটি শিশু সন্তান লইয়া বড়ই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। পরিশেষে নেপােলিয়নের মাতা তাঁহার যৎসামান্য সম্পত্তি সমস্তই বিক্রয় করিয়া ফরাসীদেশে আসিয়া বসবাস করিতে বাধ্য হন। নেপােলিয়নের ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্খ বাল্যকালেই তাহার মাতৃপ্রদত্ত শিক্ষা হইতে প্রথম অঙ্কুরিত হইয়াছিল। তাঁহার মাতা গ্রীস রােমীয় বীর গণের অত্যদ্ভুত বীরত্ব কাহিণী গল্পচ্ছলে প্রায়ই শিশু পুত্রকে শােনাইতেন। নেপােলিয়নের তরুণ হৃদয়ে বীরত্বের মাদকতা শৈশব হইতেই দেখা গিয়াছিল। তিনি বরফের দুর্গ নির্মাণ করিয়া সমবয়সী সাথীদের সহিত যুদ্ধের খেলা খেলিতেন। এই যুদ্ধ পিপাসু উচ্চাকাঙ্খী বালকের অতুল বীরত্বে পরবর্তী কালে সমগ্র ইউরােপ ভীত, ত্রস্ত হইয়াছিল। হৃদয়ে দারুণ ইচ্ছা থাকিলে সুযােগের প্রায়ই অভাব হয় না। পথের বাধা-বিঘ্ন বন্যার স্রোতের মুখে তৃণের মত ভাসিয়া যায়। নানাবিধ অসুবিধা ও অনটনের মধ্যে যখন নেপােলিয়নের শৈশব বৃথাই নষ্ট হইতেছিল।

স্বাধীনতার সংগ্রাম তখন কাউন্ট মারবােফ নামক জনৈক ভদ্রলোেক কর্ষিকার শাসনকর্তা পদে নিযুক্ত হইয়া আসেন। বালকের তীক্ষ্ণ মেধা ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হইয়া তিনি নেপােলিয়নের পড়াশুনার সুবন্দোবস্ত করিয়া দেন। নেপােলিয়নের বয়স যখন দশ বৎসর তখন মারবােফেব কৃপায় বালক ‘যুদ্ধ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিলেন। পরে পঞ্চদশ বয়ঃক্রম কালে প্যারিসের রয়েল মিলিটারী স্কুলে ভর্তি হইলেন। তথায় বৎসরাবধি উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করিয়া গোলন্দাজ সৈন্যের সহকারী লেফটেনেন্ট পদ প্রাপ্ত হন। পূৰ্ব্বাপর সাধারণ-তন্ত্রের সহিত নেপােলিয়নের আন্তরিক সহানুভূতি ছিল। কাজেই তিনি লেফটেনান্ট হুইয়াই সাধারণ-তন্ত্রের শত্রু ধ্বংসের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বিপ্লবের যুগে ফরাসী দেশ অরাজকতার ক্রীড়াভূমিরূপে পরিণত হইয়াছিল। বৈদেশিক রাজার সৈন্যরা আসিয়া দেশের মধ্যে নানারূপ অত্যাচার করিতেছিল। নেপােলিয়ন এই অত্যাচারী দলের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করি। বিশেষ কৃতিত্বের সহিত তাহাদিগকে পরাজিত করেন। তাহার এই কৃতকাৰ্য্যতায় পদোন্নতি ঘটে। তিনি সহকারী লেফটেনেন্ট হইতে কাপ্তেন পদে উন্নীত হন। ফরাসী রাজ্যের অন্তবিপ্লবের সুযোগ বুঝিয়া ইংরাজ ফরাসী রাজ্যের অন্তর্গত টুলল নামক এক সমুদ্রবন্দর অধিকার করেন এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যকে বন্দী করিয়া রাখেন। নেপােলিয়ন মাত্র মুষ্টিমেয় সৈন্যের সহায়ে ইংরাজকে পরাজিত করিয়া অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন এবং টুলো অধিকার করেন। এই সময় কষিকা দ্বীপ ফরাসীদের হস্তচ্যুত হয়। নেপােলিয়ন এই দ্বীপটা ও ইংরাজের নিকট হইতে পুনরুদ্ধার করেন।

স্বাধীনতার সংগ্রাম তাঁহার উপযুপরি এই বিচক্ষণতা ও যুদ্ধ-নৈপুণ্যে দেশের উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা মুগ্ধ হইয়া তাহাকে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদে অভিষিক্ত করেন। এই ঘটনার অল্পদিন পরেই ১৭৯৪ খৃষ্টাব্দে আল্পস প্রদেশীয় সৈন্ত চালনার ভার প্রাপ্ত হইয়া তিনি আল্পস পৰ্বতে গমন করেন এবং তাহার অলৌকিক যুদ্ধ কৌশলে আল্পস প্রদেশেও ফরাসীর অধিকার স্থাপন করিলেন। কিন্তু মানুষ মানুষের উন্নতি দেখিতে পারে না। নেপােলিয়নের এই উন্নতি ও বর্ধমান খ্যাতিতে কর্তৃপক্ষদের মধ্যে অনেকে হিংসা করিতে লাগিলেন। কাজেই চারিদিকে শত্রু গড়িয়া উঠিল এবং দেশদ্রোহিতার অভিযােগে নেপােলিয়ন বন্দী হইলেন। কয়েকদিন পরে তিনি মুক্তি পাইলেন বটে কিন্তু পদাতিক সৈন্যদলের এক অধঃস্তন কর্মচারীর পদে নিযুক্ত হইলেন। জেনারেল পদ হইতে বঞ্চিত হইলেন। বীর-হৃদয় এই অপমান সহ করিতে পারিল না। সংসারের দারুণ অনটনের দিকে ক্ৰক্ষেপ পর্যন্ত করিয়া অবলীলাক্রমে চাকরী ত্যাগ করিলেন। কয়েকদিন দুই বেলা পেট ভরিয়া সপরিবারে আহার করার পরই আবার অন্নকষ্ট প্রবল ভাবে দেখা দিল। অন্নকষ্টে উন্মাদ-প্রায় হইয়া নেপােলিয়ন আত্মহত্যা পর্যন্ত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সেই সময় তাঁহার জনৈক বন্ধু আসিয়া ছয় সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা প্রদান করিয়া সমস্ত অভাব বিমােচন করেন। সঙ্গে সঙ্গে নেপােলিয়নও নিজের দৌর্বল্য সবলে ছিন্ন করিয়া অসীম উদ্যমে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। যার জগতে মহৎ কর্মুভার লইয়া জন্মেন তাহাদের জীবন নানা ঘটনা-পর্যায়ের মধ্য দিয়া এমনি ভাবেই রক্ষা পায়। সেদিন নেপােলিয়ন যদি আত্মহত্যা করিতেন তবে আজ জগতের ইতিহাস অন্তরূপ হইত। তিনি ভবিষ্যতে সম্রাট হইয়াও এই অকৃত্রিম স্বাধীনতার সংগ্রাম বন্ধু ডেমাসিকে বিস্মৃত হন নাই। ডেমাসিস বৃদ্ধ বয়সে যখন কৃষিকার্যে জীবনাতিপাত করিতেছিলেন তখন হঠাৎ একদিন নেপােলিয়ন সেখানে উপস্থিত হইয়া ডেমাসিকে অনেক পীড়াপীড়ির পর ছয় সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা প্রদান করেন। মহৎ হৃদয় ডেমাসিস্ ওই অর্থ সৎকার্যে ব্যয় করেন। নিজের জন্য এক পয়সাও ব্যয় করেন নাই। অকস্মাৎ নেপোলিয়নের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটিল। রাজপথে শান্তি- শক্ষার জন্য একজন বিচক্ষণ ব্যক্তির একান্ত আবশ্যক হইল। কাজেই নেপােলিয়নের আবার ডাক পড়িল। তৎকালে ফরাসী রাজ্যে নেপোলিয়নের অপেক্ষা বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিল না। তিনি ভূবৃত্তান্ত জ্ঞাপক সমিতির সভাপতি পদে বরিত হইলেন। তাঁহার দেশের ভূপরিচয় সম্বন্ধে জ্ঞান অসামান্য ছিল। অশৈশব তিনি অতি যত্নের সহিত ভূগােল অধ্যয়ন করিয়াছিলেন ; সুতরাং দেশের নদ-নদী গ্রাম-নগর প্রভৃতি যাবতীয় খুটি নাটি বিষয় পর্যন্ত তাহার অজ্ঞাত ছিল না। আবার ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে অষ্ট্ৰীয়ানদের সহিত যুদ্ধ বাধে। নেপােলিয়ন ইতালিৰ সৈভার প্রাপ্ত হইয়া অষ্ট্ৰীয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। ইতালীতে অষ্ট্ৰীয় সেনাপতির সহিত তাহার ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও ভাগ্যলক্ষ্মী নেপােলিয়নেরই অঙ্কশায়িনী হইলেন। পর বৎসর ষ্ট্ৰীয় সেনাপতি বাধ্য হইয়া নেপোলিয়নের সহিত এক সন্ধি করিলেন। এই সন্ধিতে ফরাসী- রাজ্য বহুদূর বিস্তৃতি লাভ করিল। সমগ্র ইউরোপ নেপােলিযনের এই বিজয় বার্তায় বিস্মিত হইল। তাহার অত্যদ্ভুত জয়ের পর জয়ের কাহিনী ও অসীম সাহসিকতায় অনেকে তাঁহাকে দৈববলে বলীয়ান মনে করিতে লাগিল এবং দলে দলে তাহার সৈন্যদলভুক্ত হইয়া নেপোলিয়নের শক্তি বৃদ্ধি . ৭১ স্বাধীনতার সংগ্রাম করিতে লাগিল। কিন্তু এই সকল জয়ের মূলে ছিল তাহার কৰ্ম্মঠ ওঅধীনস্থ কর্মচারী বৃন্দের ও সৈন্যদলের হৃদয় জয় করিবার অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা। নেপােলিয়ন নিদ্রা বা বিশ্রাম যেন জানিতেনই না। এই কৰ্ম্মপ্রাণ বীর-সাধক দিবারাত্র কর্মের মধ্যে নিজেকেই হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন এবং কৰ্ম্মই তাহার জীবনের ব্রত ছিল। তিনি কখনও দুই তিন ঘণ্টার বেশী কোন দিন ঘুমাইতেন না। ইহা ছাড়াও তাহার চরিত্রের মধ্যে আর একটি মহৎ গুণ বিশেষ ভাবে দেখিতে পাওয়া যায়। পরকে আপন করিতে হইলে যে স্বার্থত্যাগ, যে সহানুভূতি প্রয়ােজন, নেপােলিয়ন তাহা বিশেষ জানিতেন। আর সেই গুণেই তাহার সহস্র সহস্ৰ সৈন্তের হৃদয় দেবতার আসন পাইয়াছিলেন। তিনি ইতালী জয় করিয়া যে অমূল্য ধন রত্ন পাইয়াছিলেন তাই তিনি নিজে না লইয়া সৈন্যদের মধ্যে বিতরণ করিয়াছিলেন এবং যাহার যাহা অভাব তাহা বিমােচন করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। নেপােলিয়নের আবার এই দিগন্তব্যাপী যশঃপ্রভার ফরাসী দেশের উচ্চতন কর্মচারীরা ঈর্ষা করিতে লাগিলেন। এই বিজয়ের পর বিজয়ে নেপােলিয়নের বিজয়ােৎফুল্ল হৃদয় ও নৃতন দেশ জয়ের আশায় মাতিয়া উঠিল। তিনি মিশর জয়ের অনুমতি চাহিলেন। ডিরেক্টর সভাস্থ ব্যক্তিরা তাহাকে দূরে রাখিবার অভিলাষে মিশর অভিযানে তাহাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু এখানেও ভাগ্যদেবী নেপােলিয়নের প্রতি প্রসন্ন হইল। তিনি আলেকজান্দ্রিয়া সফর অধিকার করিয়া সম্পূর্ণরূপে কাইরাের অধিপতি হইলেন। কিন্তু মানুষের আশার শেষ নাই। মানুষ কিছুতেই তৃপ্ত হইতে চায় না। অন্তরাত্মা হাঁকিতেছে—আরও চাই, আরও চাই। এই ৭২, স্বাধীনতার সংগ্রাম অতৃপ্ত বাসনা লইয়া সে ছুটিয়াছে কোন্ অসীমের পানে। নেপােলিয়ন মিশর জয় করিয়া তৃপ্ত হইতে পারিলেন না। তিনি ভূমধ্যসাগরে একাধিপত্য বিস্তার করিয়া সিরিয়ার পথে কনস্তান্তিনােপল এবং পরিশেষে ভারতবর্ষ জয় করিতে সংকল্প করিলেন। এই আশায় উদ্ব দ্ধ হইয়া তিনি টিপু সুলতানের সহিত পত্র আদান প্রদান পৰ্য্যন্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু মানুষের সব আশা পূর্ণ হয় না। ইংৰাজ নৌ-সেনাপতি নেলসন তাহার আশার পথে কণ্টক স্বরূপ হইলেন। নেপােলিয়নের ইংরাজকে তাড়াইয়া ভারতে ফরাসী-অধিকার স্থাপনের আশা চিরতরে লুপ্ত হইল। নেপােলিয়ন যখন প্রাচ্য জয়ের অলীক কুহকে মত্ত ছিলেন তখন তাহার নিজের গৃহ ইউরােপীয় শক্তি-পুঞ্জ কর্তৃক পদে পদে লাঞ্ছিত হইতেছিল। নেপােলিয়ন এই সংবাদ পাইয়া তৎক্ষণাৎ নব অধিকৃত মিশর রাজ্যের ভার একজন সেনাপতির হস্তে অৰ্পণ করিয়া দেশে ফিরিলেন। দেশে তখন চারিদিকে বিশৃঙ্খলা। দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ তৎকালীন প্রবর্তিত ‘ডিরেক্টর সভা উচ্ছেদ সাধন পূৰ্ব্বক ‘কনসলেট’ সভা গঠন করিয়া ১৭৯৯ খৃষ্টাব্দে নেপোলিয়নকে এই সভার পরিচালক বা ‘কনসাল’ পদে অভিষিক্ত করিলেন। ‘কনসাল’ হইয়াও নেপােলিয়নের ভাগ্যে বিশ্রাম জুটিল না। আবার অষ্ট্ৰীয়ার সহিত যুদ্ধ বাধিল। কিন্তু পূৰ্ব্ববৎ এবাৰেও অষ্ট্ৰীয়ান সেনাপতি নেপােলিয়নের নিকট বারংবা পাজিত ও বিধ্বস্ত হইয়া ১৮০১ করিতে বাধ্য হইলেন। ১৮০২ খৃষ্টাব্দে ইংরাজ ফরাসীতে এক সন্ধি হইয়া গেল। তৎপরে ১৮০৪ খৃষ্টাব্দে জনসাধারণ নেপােলিয়নকে মহাসমারােহে ফরাসী রাজ্যের সম্রাট পদে বরণ করিল। খৃঃ সন্ধি ৭৩ স্বাধীনতার সংগ্রাম আমাদের বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, “পত্নী ভাগ্যে ধন”। এই প্রবাদটী বীরপুঙ্গব নেপােলিয়নের সম্বন্ধে বিশেষ ভাবে প্রযুজ্য। । নেপোলিয়নের সহধম্মিণীর নাম জোসেফিন। ১৭১৬ দাম্পত্য জীবন খৃষ্টাব্দে নেপােলিয়ন জোসেফিনের পাণিগ্রহণ করেন। নেপােলিয়নের বিবাহ কিছু আশ্চর্য্য ধরণের। বিবাহের সময় নেপােলিয়নের বয়স চব্বিশ এবং তাহার নব পরিণীতা স্ত্রীর বয়স তখন তেত্রিশ। তদুপৰি পূৰ্বপক্ষের দুইটি সন্তান বিদ্যমান ছিল। জোসেফিনের বয়স যখন পনর তখন তাহার প্রথম বিবাহ হয়। পরে তাঁহার পূর্ব পক্ষের স্বামী ‘ভাই- কাউন্ট ডি বেহারনেস’ রাজদ্রোহিতা অপরাধে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং জোসেফ্রি বন্দী হন। বন্দিনী জোসেফিনের রূপে মুগ্ধ হইয়া নেপােলিয়ন তাহাকে বিবাহ করেন। জোসেফিন তাহার ভাগ্যলক্ষ্মীরূপে আসিয়াছিলেন। বিবাহের পর হইতে তাহার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইল এবং দিনের পর দিন তাঁহার পদোন্নতি ও গৌরব বৃদ্ধি হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি ফরাসী সম্রাজ্যের সম্রাট পৰ্যন্ত হইলেন। যতদিন জোসেফিন পত্নীরূপে তাহার গৃহে বিরাজমানা ছিলেন ততদিন নেপােলিয়নের ভাগ্য সম্পদ অটুট ছিল। কিন্তু মনীষিরও মতিভ্রম ঘটে। নেপােলিয়নেরও তাই ঘটিয়াছিল। নেপােলিয়ন মানুষ, নেপােলিয়ন দেবতা নয়। মানুষের ভুল ভ্রান্তি কিছু বিচিত্র নয়। তের বৎসর কাল নিরবচ্ছিন্ন সুখ-সম্পদ ও দাম্পত্য-প্রেমের মধুতে ভরা মহাবীর নেপােলিয়নের জীবন অতিবাহিত হওয়ার পর ১৮০৯ খৃষ্টাব্দে হঠাৎ নেপােলিয়ন জোসেফিনকে পরিত্যাগ করিলেন। জোসেফিনকে পরিত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে নেপােলিয়নের ভাগ্যলক্ষ্মীও নেপােলিয়নকে পরিত্যাগ ৭৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম নেপােলিয়ন গত-প্রাণা সতী জোসেফিনের তপ্ত চক্ষুজলে নেপােলিয়নের গৌরব-সূৰ্য্য নিস্তেজ হইয়া পড়িল ! নেপােলিয়নের পতন আরম্ভ হইল। দলিত অপমানিতা জোসেফিন স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত অবস্থায় মাত্র পাঁচ বৎসর জীবিত ছিলেন। অন্তিম শয়নে ‘নেপােলিয়ন। নেপােলিয়ন' বলিতে বলিতে তিনি প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন। সতীর প্রাণে ব্যথা দিয়া সতী রমণীকে অপমান করিয়া কেই কোন দিন নিস্তার পায় নাই। সতীকে অপমান করিয়া দক্ষের কি অবস্থা হইয়াছিল তাহা সকলেই জানেন। সতী সীতার চোখের জলে কণকপুরী লঙ্কা ছারখার হইয়াছিল। দ্রোপদীর চোখের জলে কুরুকুল ধ্বংস হইয়াছিল। সতী জোসেফিনের চোখের জলেও এই গতানুগতিক চিরন্তনী সত্যের কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই। জগতের ইতিহাসে এই সত্যের কোন দিন ব্যতিক্রম ঘটিবে না। থাক এ সব কথা। নেপােলিয়নের এই মতিচ্ছন্নতার দ্বিবিধ মতবাদ ইতিহাসে পাওয়া যায়। একটি মত এই যে-নেপােলিয়নের ঔরসে কোন পুত্রসন্তান না হওয়ায়, নিজের উত্তরাধীকারীর জন্যই তিনি এই কার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। অপর পক্ষ বলেন-উচ্চ রাজবংশের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া আপনার বংশ পরম্পরাকে অভিজাত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করিবার দুরাশায় নেপােলিয়ন অষ্ট্ৰীয়ার রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, আমাদের মনে রাখিতে হইবে ১৮০৯ খৃষ্টাব্দ হইতে অর্থাৎ জোসেফিনকে পরিত্যাগ করার পর হইতেই নেপােলিয়নের পতন আরম্ভ হয় এবং ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮০৯ খৃষ্টাব্দ এই তের বৎসর কাল তিনি আপন গৌরব ও প্রতিভার পূর্ণ দীপ্তিতেই য়ুরােপের ইতিহাসে দেদীপ্যমান ছিলেন। ৭৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম ইউরােপের সর্বত্র সমরানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। ইংলণ্ড, স্পেন, পর্ত- গাল, রুষিয়া, অষ্ট্ৰীয়া ও জার্মানি কেহই বাদ গেল না। সে সময় ভারতেও ইংরাজ ও মহারাষ্ট্রীয় জাতিতে ঘােরতর যুদ্ধ আরম্ভ ভাগ্য-বিপৰ্যয়। হইয়াছিল। এই সুযােগে পৃথিবীর সম্রাট রাজচক্রবর্তী হইবার নেশায় নেপােলিয়ন ক্ষিপ্তপ্রায় হইলেন। তাঁহার এই রাজচক্রবর্তী হওয়ার পথে ইংরাজ প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে বিরাজ করিতে লাগিলেন। সুতরাং নেপােলিয়ন ইংলিশ চ্যানেল’ অধিকারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কারণ একবার ‘ইংলিশ চ্যানেল’ দখল করিতে পারিলে নেপােলিয়নের পক্ষে ইংলণ্ড জয় করা কিছু কঠিন হইবে না। নেপােলিয়ন উচ্চকণ্ঠে বলিয়াছিলেন, “যদি ছয় ঘণ্টার জন্যও আমি ‘ইংলিশ চ্যানেলে অধিকার বিস্তার করিতে পারি, তাহা হইলেই আমি পৃথিবীর সম্রাট পদ লাভ করিতে পারিব।” নেপােলিয়নের এই উক্তি হইতেই বুঝা যাইতেছে ইংরাজ-ফরাসীতে যুদ্ধ অনিবার্য। ১৮০৫ খৃষ্টাব্দে যে যুদ্ধ হইল তাহাতে ফরাসীরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত ও বিধ্বস্ত এবং ইংরাজের বিজয়কেতন সগর্বে উডডীন হইল। এই যুদ্ধই ইতিহাস প্রসিদ্ধ যুদ্ধ—‘ট্রাফালগার যুদ্ধ' নামে অভিহিত। ট্রাফালগার যুদ্ধে ইংরাজ জয়ী হইলেন সত্য কিন্তু সেদিন যে অমূল্য রত্নের বিনিময়ে এই জয়শ্রী ক্রয় করিলেন তাহা ইংলণ্ড বাসী কোন দিন ভুলিতে পারিবে না। এই ট্রাফালগার যুদ্ধে ইংরাজের জগৎ বিখ্যাত বিজয়ী নৌ-সেনাপতি নেলসন যুদ্ধের শেষ সময় এক গােলার আঘাতে প্রাণত্যাগ করিলেন। ইংরাজের জয়ের হর্ষে বিষাদের সুদীর্ঘ কালাে ছায়া পতিত হইল। আধিপত্যের নেশা বড় তীব্র। ট্রাফালগারের যুদ্ধে পরাজিত হইয়াও স্বাধীনতার সংগ্রাম নেপােলিয়ন আশা ছাড়িলেন না। দ্বিগুণ উৎসাহে তিনি নৃতন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হইলেন। ১৮০৫ খৃষ্টাব্দে তিনি অষ্টারলিজের যুদ্ধে রুশিয়া ও অষ্ট্ৰীয়ার সমবেত শক্তিকে পরাজিত করিলেন। ১৮০৬ খৃষ্টাব্দে নেপলস জয় করিয়া নিজ ভ্রাতাকে সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। ইহাতে তাহার সমগ্র ইউরােপের একাধিপত্য স্থাপিত হইল। এই সময় তিনি ইংলণ্ডকে জব্দ করিবার জন্য ‘বলিন ডিক্রি’ নামক এক ঘােযণাপত্র প্রচার করিলেন। এতদ্বারা ইউরােপের অন্যান্য দেশকে ইংলণ্ডের সহিত বাণিজ্য সম্বন্ধ ছিন্ন করিতে আদেশ করিলেন। স্পেন ও পর্তুগাল নেপােলিয়নের এই আদেশ পালন করিতে অস্বীকার করিল। স্পেন ও পর্তুগালের এই ধৃষ্ট ব্যবহারে রুষ্ট হইযা নেপােলিয়ান উক্ত দেশদ্বয় বলপূৰ্ব্বক অধিকার করিলেন। স্পেন ও পর্তুগালের রাজা প্রাণভয়ে ব্রাজিল দেশে পলায়ন করিলেন। কিন্তু দেশবাসী নেপােলিয়নের এই ব্যবহার সহ্য করিল না। সকলে সঘবদ্ধ হইয়া নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিল। ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ‘পেনিনসুলার’ যুদ্ধ নামে খ্যাত। ইংরাজ বণিকের জাতি। কাজেই অন্যান্য দেশের সহিত বাণিজ্য সম্বন্ধ ছিন্ন হওয়ায় ইংরাজ ব্যস্ত হইয়া পড়িল। তখন মহাবীর নেপােলিয়নের উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেলসন নাই। কি উপায়ে নেপলিয়নের বর্ধমান শক্তিকে দমন করা যায় সেই চিন্তায় ইংরাজ পাগল হইয়া উঠিল। সে সময়ে রব উঠিল নেপােলিয়ন ভারতবর্ষ জয়ে সঙ্কল্প করিয়াছেন, ইংরাজ আর স্থির থাকে কি করিয়া ? এই সময় স্পেনে পেনিনসুলার যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ইংরাজ এই সুযােগ ত্যাগ করিতে পারিলেন না। ভারতে এই যুদ্ধ ৭৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম মহারাষ্ট্রীয়দের সহিত যুদ্ধ ব্যাপৃত মহাযােদ্ধা ইংরাজ-সেনাপতি সার আর্থার ওয়েলেশ,লি স্বদেশের সম্মান রক্ষার জন্য ইংলণ্ডে আহুত হইলেন এবং ‘পেনিনসুলার’ যুদ্ধে নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে স্পেনীয়দের সাহায্য করিবার জন্য স্পেনে প্রেরিত হইলেন। স্পেনীয়রাও ইংরাজ-শক্তির সহায় পাইয়া প্রবলবেগে নেপােলিয়নের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন। ছয় বৎসর কাল যুদ্ধ চলিল। বহু ফরাসী সৈন্য নিহত হইল। ইংরাজ-সেনাপতি বহু যুদ্ধে ফরাসীদের পরাজিত করিলেন। অবশেষে ছয় বৎসর যুদ্ধের পর ১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে প্যারিসের প্রথম সন্ধি হইয়া যুদ্ধের অবসান হয়। শক্তিমদে মত্ত হইয়া মানুষ যে অন্ধ হয় নেপােলিয়ন তাহার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। পেনিনসুলার’ যুদ্ধে যখন ইংরাজ-স্পেনীয়দের সমবেত শক্তির সহিত ফরাসী জাতি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ব্যাপৃত তখনও নেপােলিয়ন নবীন আশা কুহকে মুগ্ধ হইয়া নূতন রাজ্য জয়ের পিপাসায় ১৮১২ খৃষ্টাব্দে রুষ অভিযানে বহির্গত হইলেন। এই রুশ অভিযানই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেপােলিয়নের জীবনের মারাত্মক ভ্রম। অভিযানের প্রথমেই তিনি বারােভিনাের’ যুদ্ধে জয়লাভ করায় সােৎসাহে মস্কো সহরে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হইতে লাগিলেন। সহরবাসী বেগতিক দেখিয়া সহর অগ্নিসংযােগে সম্পূর্ণ ভস্মসাৎ করিয়া যে যে দিকে পারিল পলায়ন করিল। নেপােলিয়ন মস্কোতে বিরাট সৈন্যবাহিনী সমেত উপস্থিত হইয়া মহাসমস্যায় পড়িলেন। সঙ্গে চারি লক্ষ সৈন্য, কিন্তু খাদ্য নাই। এদিকে শীতও আরম্ভ হইল। দারুণ শীতে, অনাহারে দলে দলে সৈন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হইতে লাগিল। কাজেই নিরুপায় হইয়া তিনি প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইলেন। প্রত্যাবর্তন কালে রুষসৈন্ত ৭৮ স্বাধীনতার সংগ্রাম পশ্চাৎ দিক হইতে এবং উভয় পাশ্ব হইতে প্রুসিয়া ও অষ্ট্ৰীয়ার সৈন্য আক্রমণ করিল। নেপােলিয়ন মহা ফঁাপড়ে পড়িলেন। তথাপি এই অসুবিধার মধ্যেও তিনি অনেকগুলি খণ্ডযুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। কি পরিশেষে ‘ লিপজিগে’ রুষিয়া, প্রুসিয়া ও সুইডেনের সমবেত শক্তির নিকট তিন দিন বীরদর্পে যুদ্ধ করিয়া নেপােলিয়ন রণে ভঙ্গ দিয়া প্যারিসে প্রত্যাবৃত্ত হইতে বাধ্য হইলেন। এই রুষ-অভিযানে তাঁহার অত্যন্ত শক্তি- ক্ষয় হইয়াছিল। তিনি চার লক্ষ সৈন্যসহ যাত্রা করিয়াছিলেন, মাত্র বিশ সহস্র সৈন্যসহ প্যারিসে প্রত্যাবর্তন কবিলেন। এদিকে তখন ‘পেনিনসুলার’ যুদ্ধেও ফরাসীদের পরাজয় হইয়াছে। এই ভাবে উভয়দিক হইতে যুগপৎ পরাজিত হইয়া নেপােলিয়ন একেবারে অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। চতুর্দিক হইতে জয়ােন্মত্ত সমবেত শক্তিপুঞ্জ প্যারিসে প্রবেশ করিয়া নেপােলিয়নকে বন্দী করিল। অবশেষে ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে তিনি ‘এলবা’-দ্বীপে নির্বাসিত হইলেন। তাহার পৃথিবী: সম্রাট হওয়ায় মােহের স্বপন এইখানেই ভাঙ্গিয়া গেল। নেপোলিয়ন নিৰ্বাসিত হইলেন। ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে ইউরােপের শক্তি- পুঞ্জের সহিত ফরাসীর সন্ধি হইল। এই সন্ধিই ‘প্যারিসের প্রথম সন্ধি নামে অভিহিত। এই সন্ধি অনুসারে ইউরােপীয় শক্তিপুঞ্জ অষ্টাদশ লুইকে ফরাসী রাজ্যের সম্রাট পদে অভিষিক্ত করিলেন। কিন্তু প্রকৃত শক্তি শক্তি-পুঞ্জের হস্তেই রহিয়া গেল। অষ্টাদশ লুই নামে মাত্র রাজা হইয়া শক্তিপুঞ্জের ক্রীড়াপুত্তলি হইলেন। ফরাসী দেশে বিদেশীর আধিপত্য বিস্তৃত হইল। সাধারণ-তন্ত্রের সকল আশা সমূলে উৎপাটিত হইল। বিদেশীর অত্যাচারে দেশ প্লাবিত হইতে লাগিল। নেপােলিয়নবিহীনে ৭৯ স্বাধীনতার সংগ্রাম দেশবাসী জীবনীশক্তি হারাইয়াছিল। কাজেই বিদেশী শক্তিপুঞ্জের আধিপত্যে ও রাজা অষ্টাদশ লুইয়ের ব্যবহারে তাহারা মনের জ্বালা মনেই মিটাইতে লাগিল। কোনরূপ বাধা দিতে পারিল না। নেপােলিয়নের সহকারী কর্মচারীবৃন্দ ও আত্মীয় স্বজন বিনা বিচারে দণ্ড পাইতে লাগিল। নেপসের রাজা নেপােলিয়নের ভ্রাতা মুরাট বাধা দিবার চেষ্টা করায় তাহারও প্রাণ দণ্ড হইল। দেশময় অবসাদের চিত্রক্লান্তির চিহ্ন ফুটিয়া উঠিল যারা জীবনে মহাকৰ্ম্মভার লইয়া জন্মেন তাঁহারা শত বিপদেও কোন দিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া নিশ্চেষ্টভাবে বসিয়া থাকিতে পারেন না। নেপােলিয়ন বন্দী হইয়াও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। প্রজাসাধারণের ব্যথায় তিনি স্থির হইয়াছিলেন। কি করিয়া আবার ফরাসী দেশে সাধারণতন্ত্র স্থাপন করা যায় সেই চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হইয়া পলায়নের জন্য নানা উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। তাঁহার স্বভাবসুলভ সদয় ও অনুকম্পাসূচক ব্যবহারে ‘এলবা’-দ্বীপের স্ত্রী-পুরুষ, ধনী-নিধন ও উচ্চ-নীচ সকলেই মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে তাহাদের রাজা বলিয়া গ্রহণ করিল। সুতরাং সমস্ত এলবা- বাসী তাহার পলায়নের সঙ্কল্পে প্রাণপণ সাহায্য করিতে লাগিল। এলবা-দ্বীপে নেপােলিয়ন যখন পলায়নের সুযােগ খুজিতেছিলেন ঠিক সেই সময় তাহার ভগিনী পােলিন ফরাসীদেশে বুরবো রাজবংশের উচ্ছেদ- সাধন করিয়া নেপােলিয়নের পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য গােপনে জনসাধারণকে উত্তেজিত করিতেছিলেন। এই প্রচারের ফলে প্রজাসাধারণের মনে নেপােলিয়নের প্রতি যখন সহানুভূতি প্রকাশ পাইতে লাগিল তখন পােলিন এলবা-দ্বীপে নেপােলিয়নকে এই সংবাদ পাঠাইলেন। এই শুভ সংবাদে } ১০ স্বাধীনতার সংগ্রাম উৎসাহিত হইয়া অনতিবিলম্বে নেপােলিয়ন এলবা-দ্বীপ হইতে পলায়ন করিয়া অতি গােপনে ফরাসী দেশে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার আগমনে দলে দলে লােক তাহার সৈন্যদলভুক্ত হইতে লাগিল। তিনিও ক্রমশঃ প্যারিসের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। অষ্টাদশ লুই নেপােলিয়নের আগমন সংবাদে তার গতিরােধ করিতে একদল সৈন্য প্রেরণ করিলেন। কিন্তু সৈন্যদল নেপােলয়নের সম্মুখীন হইয়াই নেপােলিয়নকে চিনিতে পারিয়া বিনা যুদ্ধে তঁাহার আনুগত্য স্বীকার করিল। চারিদিকে নেপােলিয়নের আগমন সংবাদ রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। দলের পর দল স্বেচ্ছায় আসিয়া নেপােলিয়নের সহিত সংযুক্ত হইতে লাগিল। অতঃপর ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে নেপােলিয়ন রাজধানী প্যারিস নগরে উপনীত হইলেন। অষ্টাদশ তখন বেলজিয়মে পলাইয়াছিলেন। জন-সাধারণ আবার তাঁহাকে সম্রাট পদে ভিষিক্ত করিল। সমগ্র ইউরােপখণ্ডে কম্পিত কণ্ঠে ধ্বনিত হইল “আবার নেপােলিয়ন!” নেপােলিয়ন সম্রাট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরােপে আবার সমরানল জ্বলিয়া উঠিল। নেপােলিয়নকে দমন করিবার জন্য ইংলণ্ড, অষ্টীয়া, সিয়া জাৰ্ম্মাণী, সুইজাল ও ও রুষির সমবেত শক্তি চারি দিক হইতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ওয়াটারূলু ক্ষেত্রে এক দিকে বীরপুরুষ নেপােলিয়ন ও অপর দিকে অন্যান্য শক্তির সহায়তায় শক্তিমান ইংরাজ-সেনাপতি ওয়েলিংটন। যুদ্ধের প্রথম ভাগে নেপােলিয়নের দুর্দমনীয় আক্রমণে ওয়েলিংটনের জয়ের সকল আশাই তিরােহিত হইয়াছিল। কিন্তু দৈবক্রমে ঠিক সেই সময়ে সেনাপতি বুলকার এক বিরাট সৈন্যবাহিনী লইয়া ওয়েলিং- টনের সহিত যােগ দিলেন অথচ নেপােলিয়নের সেনাপতি গ্রোচি আসিয়া * ৮১ স্বাধীনতার সংগ্রাম নেপােলিয়নকে সাহায্য করিতে পারিলেন না। কাজেই নেপােলিয়নকে এই সম্মিলিত সৈন্যবাহিনীর নিকট পরাজিত হইতে হইল। তিনি পরাজিত হইয়া প্যারিসে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কিন্তু তাহার প্রায় সমস্ত সৈন্যদল সেদিনকার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ ত্যাগ করিল। নেপােলিয়নের আশা চিরতরে অন্তর্হিত হইল। ওয়াটারলুর যুদ্ধের পরাজয়ের পর ফরাসী দেশের প্রতিনিধি সভা সমবেত হইয়া নেপােলিয়নকে সম্রাটপদ ত্যাগ করিতে আদেশ প্রদান করিল। তখন পৰ্যন্ত যদিও বহু লােক ও সেনাপতি নেপােলিয়নকেই সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত রাখিবার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল, তথাপি নেপােলিয়ন প্রতিনিধি-সভার আদেশ অমান্য করিয়া গৃহবিবাদ সূচনার পরিবর্তে সানন্দে সম্রাট পদত্যাগ করিলেন। তিনি প্রতিনিধি-সভাকে তঁাহার পুত্র দ্বিতীয় নেপােলিয়নকে সম্রাট পদে অভিষিক্ত করিতে অনুরােধ করেন কিন্তু প্রতিনিধি-সভা তাঁহার এই শেষ অনুরােধ রক্ষা করেন নাই। সম্রাট-পদ ত্যাগ করিয়া নেপােলিয়ন ফরাসী রাজ্য হইতে চিরতরে বিদায় লইতে সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু তখন বৈদেশিক শক্তিপুঞ্জ তাহাকে ধরিবার জন্য জলে স্থলে লক্ষ লক্ষ সেনা নিযুক্ত করিয়াছিল। তাঁহার কোথাও থাকিবার স্থান ছিল না। অগত্যা তিনি নিজেই ইংরাজের হাতে ধরা দিলেন। ইংয়াজ কিন্তু এই রাজাধিরাজ বন্দীর উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করেন নাই। তাহাকে সেন্ট-হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয় এবং যাহাতে পূৰ্ব্ববৎ পলাইতে না পারেন তাহার জন্য কড়া পাহারা নিযুক্ত করা হয়। এই নির্বাসিত অবস্থায় ফরাসী জাতির গৌরব-রবি জগতের পূজ্য মহাবীর একটুকরা রুটীর অভাবে ক্ষুধার তাড়নায় কতই না কষ্ট স্বাধীনতার সংগ্রাম পাইয়াছেন। নেপােলিয়নের ভাগ্যে ইহার অধিক আর কি হইতে পারে! অসহ্য মানসিক যন্ত্রণায় এই বন্দী অবস্থায় ১৮২১ খৃষ্টাব্দে অক্ষত রােগে এই মহাবীরের প্রাণ-বিয়ােগ হয়। নেপােলিয়ন দ্বিতীয়বার সম্রাট পদচ্যুত হইলে অষ্টাদশ লুই পুনরায় ফরাসী রাজ্যের সম্রটপদে অভিষিক্ত হইলেন। অষ্টাদশ লুই-এর রাজ্য প্রাপ্তির সঙ্গে ফরাসী দেশে বৈদেশিক শক্তিপুঞ্জের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাইল এবং নেপােলিয়ন বিহীন ফরাসীকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য বহুবিধ অন্যায় দাবী পূরণ করিতে বাধ্য করিল। আর এই দাবী পূর্ণমাত্রায় কার্যকরী করিবার মানসে ইউরোপের রাজন্যবর্গের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হইল। এই সন্ধি ‘হোলি এলায়েন্স’ বা ‘পবিত্র সম্মিলনী’ নামে অভিহিত। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮২৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত অষ্টাদশ লুই রাজত্ব করেন। তাঁহার পর দশম চালস্ রাজা হন। দশম চালস রাজা হইয়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লােপ, চেম্বার অফ ডেপুটী’ বা প্রতিনিধি সভার পরিবর্তন সাধন এবং নূতন নিৰ্বাচন-প্রথার সৃষ্টি করিয়া নিজের প্রভাব অপ্রতিহত রাখিবার মানসে মন্ত্রণা-সভায় অধিক সংখ্যক রাজকীয় সদস্য গ্রহণ প্রভৃতি ব্যাবহারে, দেশবাসী ও প্রতিনিধি সভার সহিত মনােমালিন্ত ঘটে। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে তিন দিন ব্যাপীয়া ফরাসী রাজ্যে এক নৃতন বিপ্লব উপস্থিত হয়। দশম চার্লস্ রাজপদ ত্যাগ করেন। প্রজা অসন্তুষ্ট হইলে রাজার রাজত্ব কখনও টিকিতে পারে না। দশম চালস, সিংহাসনচ্যুত হইলে জনসাধারণ লুই ফিলিপকে সম্রাট পদে অভিষিক্ত করিলেন। ১৮৩০ হইতে ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দ এই কয় বৎসর কাল ফিলিপের রাজত্বকাল। প্রথম প্রথম কয়েক বৎসর জনসাধারণের মতের স্বাধীনতার সংগ্রাম ; অনুকূলে মত দিয়া তিনি রাজকার্য নির্বাহ করিলেন; কিন্তু শীঘ্রই দেশের মধ্যে টিয়ার্সের দল ও গুইজটের দল নামক দুইটি দলের আবির্ভাব হইল। দেশে দলাদলি আরম্ভ হইল। ক্ৰমে দলাদলি হইতে রক্তারক্তি আরম্ভ হইল। ফিলিপ প্রাণভয়ে ইংলণ্ডে পলায়ন করিলেন। অনেক মারামারি কাটাকাটির পর দেশে আবার সাধারণতন্ত্র শাসন-প্রণালী প্রতিষ্ঠিত হইল। ফরাসী রাজ্যে ইহাই দ্বিতীয় সাধারণতন্ত্র নামে অভিহিত। ১৭৯২ খৃঃ হইতে ১৭৯৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রথম সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরে ১৮০৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ‘কন্সলেট-সভার অধীনে দেশের রাজ- কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হয়। এই সময় হইতেই নেপােলিয়নের প্রাধান্ত কাল। অবশেষে প্রথম সাধারণ-তন্ত্রের উচ্ছেদ সাধিত হয় এবং নেপােলিয়ন সম্রাট- পদে অভিষিক্ত হন। পুনরায় ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় সাধারণ- তন্ত্র ১৮৫১ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্যন্ত যথারীতি আপন মৰ্যাদা বজায় রাখিয়া চলিয়াছিল। এই সময় নেপােলিয়নের ভ্রাতুস্পুত্র লুই নেপােলিয়ন দ্বিতীয় সাধারণ-তন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হন। এই সময় প্রেসিডেন্টের সময় কাল নিরূপিত ছিল চার বৎসর। কিন্তু ১৮৫২ খ্রীষ্টাব্দে উপযুক্ত সুযােগ উপস্থিত হওয়ায় নেপােলিয়ন নিজেকে সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করেন। তদবধি দ্বিতীয় সাধারণ-তন্ত্রের সমাপ্তি। ইনি ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ইহার রাজত্ব কালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, ইতালীর স্বাধীনতা প্রাপ্তি, দিনেমারগণের যুদ্ধ ও ফরাসী-প্রুসিয়া যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই ফরাসী-প্রসিয়ার যুদ্ধে নেপােলিয়ন বহু সৈন্য সমেত প্রসিয়ার সেনাপতির হস্তে বন্দী হন এবং ফরাসী ও প্রসিয়ার মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দেশে সাধারণ- ৮৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম তন্ত্র আবার প্রতিষ্ঠিত হইল। ইহাই তৃতীয় সাধারণতন্ত্র নামে অভিহিত এবং এই তৃতীয় সাধারণতন্ত্রই আজ পর্যন্ত ফরাসী দেশে প্রচলিত আছে। ইতালীর পুনরুত্থান • দেশ নিজের দোষেই স্বাধীনতা হারায় আবার নিজের বাহু বলেই তাহার পুনরুদ্ধার সাধন করিয়া থাকে। কোন দেশই স্বাধীনতা ও উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরােহণ করিয়া চিরকাল শক্তিগৰ্বে গ্রীবাতােলন পূর্বক সময়ের গতির নিয়মকে অঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করিতে পারে না। উন্নতির পর পতন আবার উন্নতি, গতির ইহাই স্বাভাবিক নিয়ম, ইতালীই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সমগ্র ইউরোেপ যখন অজ্ঞান তিমিরাচ্ছন্ন ছিল ; ইউরােপীয় জাতি বর্গে যখন বন্য পশুর অপেক্ষা কোনগুণে শ্রেষ্ঠ ছিল না; তখন এই ইতালীর রােম সাম্রাজ্য সভ্যতার জ্যোতির্ময় আলােকে সারা বিশ্ব উদ্ভাসিত করিয়াছিল। সে আজ বহুদিনের কথা। মানুষের দৃষ্টিশক্তি সেই সুদূর অতীতের গাঢ়তমিশ্র ভেদ করিয়া পথ চিনিতে না পারিতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তাহার বক্ষে মৃত্যুহিম ছাপ বহন করিয়া সত্যকে অমলিন রাখিতে ত্রুটি করে নাই। ইতালির বিশ্বব্যাপি সভ্যতা, তাহার পতন আবার উত্থান সমস্তই ইতিহাসের বক্ষে সমভাবে স্থান পাইয়াছে। ইতালীর পুনরুত্থানের ইতিহাস লিখিতে বসিয়া তাহার জ্যেষ্ঠ সহােদর ভারত সভ্যতার কথা মনে আসাই স্বাভাবিক, ইতালী যাহা হারাইয়াছিল তাহা আবার ফিরিয়া পাইয়াছে কিন্তু ভারত যাহা হারাইয়াছে ৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম আজ ও তাহা ফিরিয়া পায় নাই। সে আজও পরাধীনতার শৃস্থলে শৃঙ্খলিত। কিন্তু ইতালীর ইতিহাসের পৰ্য্যায় পরীক্ষা করিয়া ইহা বেশ জোর গলায় ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় যে, ভারতের ও অচিরে বহুযুগের দৈন্ত আবর্জনা পরাধীনতা মুক্ত হইয়া পুনরুত্থানের দিন আসিবে। চিরকালই বােম ইতালীর রাজধানী এবং রাজধানী রােমের নামানু- সারেই রােম সাম্রাজ্য বা বােম সভ্যতা নামকরণ হইয়াছে। রােম সভ্যতার সহিত ভারত সভ্যতার যে বিশিষ্ট যােগাযােগ ছিল ইহা অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ দেখাইয়াছেন। বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মিঃ পােবাকের মতে ‘রাম’ শব্দ হইতেই রােম নামের উৎপত্তি। তিনি বলেন-“ইংরাজী ‘এ’ (a) বর্ণের পরিবর্তে ‘ও’ (o) বর্ণের প্রয়ােগ অনেকস্থলে দেখিতে পাওয়া যায় এবং রােম’ শব্দটি লাটিন ভাষার শব্দ নহে। ভারতবর্ষ হইতে উপনিবে- শিকগণ আসিয়া য়ােমরাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল এবং সেকালে হিন্দুদিগের বীরগণ, প্রাচীন গ্রীসের এবং রােমের দেব দেবী বলিয়া পূজিত হইতেন। ইত্যাদি।” যাহাই হােক্ এখানে এ সব আলােচনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। এই পুস্তকে রােম সভ্যতা সম্বন্ধে বলিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। কাজেই আমার বক্তব্য কেবলমাত্র ইতালীর পুনরুদ্ধারের ইতিহাস গণ্ডীবদ্ধ করা। রােম সাম্রাজ্যের দোর্দণ্ড প্রতাপ ও অতুলনীয় সভ্যতার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইতালী দেশ বহুধা বিভক্ত হইয়া পড়িল। ঠিক সেই সময়ে রোমের উভয় পার্শ্বে দক্ষিণে ও বামে দুইটি নূতন ধৰ্ম্ম দিনে: পতনের চরম পর দিন শক্তি সম্পন্ন বহুদূর বিস্তৃত হইয়া পড়িতে অবস্থা লাগিল। একদিকে খৃষ্ট ধর্ম অপরদিকে মহম্মদের আবির্ভাব। খৃষ্ট ধর্মের আবির্ভাবের ও পরিপুষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ফরাসী, স্বাধীনতার সংগ্রাম জার্মানী ও অষ্ট্ৰীয়া আসিয়া ইতালীর বিচ্ছিন্ন -ক্তিগুলিকে অনায়াসে করতলগত করিয়া বসিল। ওদিকে মহম্মদের অনুচরবর্গ নবজাগ্রত শক্তিতে শক্তিমান হইয়া তুকিস্থান রােমসাম্রাজ্য হইতে বলপূর্বক ছিনাইয়া লইল। ফলে অবশিষ্ট ভূখণ্ড হস্তপদহীন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন ইউরােপীয় শক্তির অন্তর্ভূক্ত হইল। এই সময় ইতালী দেশ বােম, টাস্কালী, লম্বাডি, পিডমন্ট, ভিনিসিয়া, নেপথস প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক অংশে এক একজন করিয়া শাসনকর্তা ছিলেন কিন্তু তঁাহার। শাসন পদ্ধতি-- সকলেই অষ্ট্ৰীয়া সম্রাটের অধীনতাপাশে বদ্ধ ছিলেন। এই শাসনকর্তাদের বা দেশের জনসাধারণের কোনরূপ স্বাধীনতা ছিল না। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দের ‘পবিত্র সম্মিলন’ বা Holy allianceএর পর হইতে ইতালির পরাধীনতা শৃঙ্খল আরও দৃঢ় হয়। কারণ নেপােলিয়নের পতনের ঠিক পরেই ইউরােপের রাজন্যবর্গ নিজেদের রাজ্য রক্ষার্থে এত ভীত হইয়া পড়িয়াছিলেন যে নিরঙ্কুশ রাজ্য সম্পদ ভোগ করিবার আশায় পরস্পরের মধ্যে এই সন্ধির দ্বারা একতাবদ্ধ হইতে সচেষ্ট হইয়াছিলেন। ইতালির রাজনীতিক অবস্থা যখন এইরূপ দুর্দশাগ্রস্ত ঠিক সেই সময়ে ধম্মযাজকদের অত্যাচারও দেশে প্রবলভাবে দেখা দিয়াছিল। এইভাবে উভয়দিক হইতে নিস্পিষ্ট হইয়া উচ্চ চিন্তা, উচ্চ আশা, উচ্চ কল্পনা প্রভৃতি মানব হৃদয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বৃত্তিগুলি ইগলি হইতে একেবারে লােপ পাইল। ইতালির এই ঘাের অশান্তির ছবি “গারি বন্ডীর জীবন চরিতে” এই ভাবে অঙ্কিত হইয়াছে---“ইতালী, ছিন্নভিন্ন ও বিদীর্ণ, ছয়টি যথেচ্ছাচারিণী প্রভূশক্তি দ্বারা খণ্ড বিভক্ত পতিত পােপীয় শাসনের অত্যাচারে ও নিষ্ঠুরতায় ৭ স্বাধীনতার সংগ্রাম দাসীকৃত এবং নিজের রাজগণের এবং প্রভৃভক্তির মর্মন্তুদ শাসনে ও নির্দয় অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া এরূপ নীতিভ্রষ্ট হইয়াছিল যে, স্বদেশের উদ্ধারের জন্য গৃহীত ব্ৰত ব্যক্তিগণের মধ্যেও পরামর্শের একতা ও মতের সমতা ছিল না। বহুদিনের দাসত্বের ফলে তাহারা পরস্পর বিদ্বেষী ও কাৰ্য্য- কালে সংশয়াকুল হইয়াছিলেন। এই বিবরণ হইতেই পতিত ইতালীর দুর্দশা অনেকটা বুঝা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরােপের রাজন্যবর্গ ও অভিজাত সম্প্রদায় মনের আনন্দে যথেচ্ছভাবে গরীব জনসাধারণ লুণ্ঠন করিয়া আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেন। কেহই জন সাধারণের ইতালীর শােচনীয় সুখ দুঃখ লইয়া মাথা ঘামাইবার প্রয়ােজন বােধ অবস্থা-- করিতেন না। অসহায় নিরক্ষর জনসাধারণ শক্তিমান রাজশক্তির ও ধনশক্তির নিষ্পেষনে ভারবাহী পশুর ন্যায় দিনাতিপাত করিতে বাধ্য হইত। কারণ সে সময় ‘গণশক্তি’ ছিন্নভিন্ন ছিল। তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একতার বাঁধন ছিল না। গণশক্তির এই দুরবস্থায় কালমার্কস প্রভৃতি কয়েকজন চিন্তাশীল মহাপ্রাণ ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়ায় শ্রমজীবিদের মধ্যে একটা নূতন যুগের সৃষ্টি হইল। ফরাসীবিপ্লবেই এই নূতন যুগের সূচনা হয়। তদবধি এককালীন বিপ্লব ও সাধারণ তন্ত্রের তরঙ্গাঘাতে সমগ্র ইউরােপ বিক্ষোভিত হইয়া উঠে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইতালীতেও এই নূতন যুগের নূতন বার্তা পৌছিয়াছিল। যখন মহাবীর নেপােলিয়ন সমগ্র ইউরােপের একচ্ছত্র অধিপতি হইয়া দেশের পর দেশ জয়ে সমগ্র পৃথিবীর রাজচক্রবর্তী হইবার দুরন্ত আশায় নরমেধ যজ্ঞ আরম্ভ করিয়াছিলেন, সে সময় নিপীড়িত দুর্দশাগ্রস্ত ইতালী স্বাধীনতার সংগ্রাম ও তাহার রাজ্যলােলুপতার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পায় নাই। ১৮০০ খৃঃ মােরঙ্গের যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অষ্ট্ৰীয়াকে পরাজিত করিয়া ইতালীকে অষ্ট্ৰীয়ার কবল হইতে কাড়িয়া লইয়াছিলেন এবং এই নব জীবিত দেশ নিজের আত্মীয় স্বজন ও সেনাপতিদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেন। তাহার ফলে ইতালী বহুধা বিভক্ত হইয়া ভিন্ন ভিন্ন শাসনকর্তার অধীন হয় এবং প্রত্যেক খণ্ডের শাসনকর্তা বা রাজা নিজের ইচ্ছামত একমুখী শাসন পদ্ধতি প্রচলন করেন। ইতালী ফরাসীর অধীনে অধিক দিন ছিল না। নেপােলিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে অষ্ট্ৰীয়া আসিয়া তাহার পূৰ্বাধিকার পুনস্থাপন করিল। । এইরূপে অষ্ট্ৰীয়ার অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচার পুনপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। পূৰ্বেই বলিয়াছি চিরনিৰ্যাতিত গণশক্তির নিজের অধিকার কড়ায় ক্রান্তিতে বােঝাপাড়া করাই ফরাসী বিপ্লবের মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রজা- শক্তির এই জাগরণ রাজতন্ত্রের সহিত অহিনকুল সম্বন্ধ। কাজেই ‘গণশক্তি যাহাতে প্রবল হইতে না পারে তাহার জন্য ইউরােগের রাজন্যবর্গ সমবেত ভাবে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার ফলে ইংলণ্ড ব্যতীত ইউরােপের রাজ্য সকল পরস্পমো রক্ষার জন্য পবিত্র সম্মিলনী’ বা holy allience নামক সংঘের সৃষ্টি করেন। প্রজাবিদ্রোহের হাত হইতে রাজাকে রক্ষা করাই এই সংঘের মুখ্য উদ্দেশ্য। কাজেই অষ্ট্ৰীয়ার অধীনে ইতালীতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আইনের অত্যাচার, সামন্ত- তন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মঠ স্থাপন, পুরােহিতদের বিচারালয় প্রটেষ্টান্ট ও ইহুদীদের নানা বিষয়ে অধিকার লোপ প্রভৃতি অনাচারগুলি আবার পূর্ণ মাত্রায় দেখা দিল।

স্বাধীনতার সংগ্রাম অষ্ট্ৰীয়ার অধীনতাপাশে ও অত্যাচারে সমগ্র ইতালী এই হীন অবস্থা উপনীত হওয়ায় স্বভাবতঃই ইতালীবাসীর হৃদয় এই বিদেশী অষ্ট্ৰীয়- শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। যদিও ইতালীবাসী প্রত্যেকেই সমভাবে অষ্ট্ৰীয় শাসনকে মনে প্রাণে ঘৃণা করত কিন্তু তথাপি স্বদেশ উদ্ধার সম্বন্ধে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন মত ও পথ মত ও পথ অবলম্বন করতে দেখা যায়। তন্মধ্যে চারিটি বিভিন্ন মতবাদ ইতালীর ইতিহাসে বিশেষ দ্রষ্টব্য। অষ্ট্ৰীয় শাসনের উচ্ছেদকল্পে একদল তরুণ ইতালীবাসী গুপ্ত-সমিতি গঠন করিয়া অষ্ট্ৰীয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেন। এই সম্প্রদায়ই কাৰ্বোনারাে সম্প্রদায় নামে অভি- কাৰ্বোরা সম্প্রদায় হিত। ইতালীর স্বাধীনতার পুনঃ প্রতিষ্ঠাই এই সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য ছিল। অষ্ট্ৰীয় শাসন হইতে দেশকে মুক্ত করাই ইহাদের মুখ্য উদ্দেশ হইলেও ভবিষ্যৎ ইতালীর কিরূপ শাসনপদ্ধতি হইবে, কি ভাবে শাসিত হইবে, এবং কেমন করিয়াই বা স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব, এসব বিষয়ে তাঁহাদের কোন পরিষ্কার ধারণা ছিল না। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও দিনের পর দিন এই সম্প্রানের লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। স্বাধীনতা লাভের জন্য উন্মত্ত তরুণের দল, দলে দলে মাংস কার্বোনা সম্প্রদায়- ভুক্ত হইতে লাগিল। কাজেই গুপ্তসমিতির কাৰ্য্য অতি অল্প দিন মধ্যে এত বিস্তৃত হইয়া পড়িল যে আর গুপ্তভাবে থাকা কোন মতেই সম্ভবপর হইল না। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গের দূরদৃষ্টি না থাকায় তাহারা কিছুতেই নিজেদের শক্তির উপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিতে না পারিয়া পিড়মন্টের রাজা চালস আলবার্ট এবং নেপলসের রাজা ফ্রান্সেস কোর সাহায্য গ্রহণ স্বাধীনতার সংগ্রাম করিতে উদ্গ্রীব হইয়া পড়িলেন। কিন্তু কাৰ্য্যক্ষেত্রে কাৰ্বোনানাে সম্প্র- দায়ের এই একমাত্র অবলম্বন ভূপতিদ্বয় যখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলেন তঘন এই হতাশা-পীড়িত সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মকলহ দেখা দিল। কিন্তু তখন আর বিদ্রোহ স্থগিত রাখিবার কোন উপায় ছিল না। কাজেই বিদ্রোহ ঘােষণা সম্বন্ধে ও ধ্বংসের কাৰ্যে সকলে একমত হইলেও গঠন কাৰ্য্যে বিভিন্ন মতবাদ দেন দিল। কেহ কেহ সমগ্র ইতালীতে একছত্র রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিলেন ; কেহ কেহ স্পেন বা ফরাসীর সাহায্য ভিক্ষা করিতে উপদেশ এলেন ; কেহ কেহ ইতালীতে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন ; কয়েকজন ইতালীকে অনেকগুলি সাধারণ-তন্ত্রে বিভক্ত করিবার মতও প্রকাশ করিয়াছিলেন। নিজেদের এবম্বিধ মতবিরােধ উপস্থিত হওয়ায় এই সম্প্রদায় একেবারে দুর্বল হইয়া পড়িল। তাদের অশা-বৃক্ষে কোন ফলই ফলিল না—না রাজতন্ত্র, না সাধারণতন্ত্র, না বিশেীয় শক্তির সাগব্য। শুধু অকৃতি বিদ্রোহের বিষ আকণ্ঠ পান করিল কাব্বোনারে প্রায় দুই তিন বার এই ভাবে চেষ্টা করিয়া অকৃত- কাৰ্য্য হইয়াছেন, এম দিককার বিদ্রোগুলি উচ্চশ্রেণী ও সৈনিকদের সাহায্য ব্যতীত সফ হইতে পারে না, এই ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হওয়ায় তাহারা নিজেদের শক্তির উপর আস্থা স্থাপন করিতে পারেন নাই। কাজেই তাহাদেব বিদ্রোহগুলি বিফল হয়। কিন্তু শেষদিকে তঁাহারা নিজেদের এই ভ্রান্তধারণা স্পষ্ট বুঝিতে পারিয়া সম্পূর্ণভাবে নিজেদের উপর নিভর করিয়া কৰ্যক্ষেত্রে অগ্রসর হন। কিন্তু প্রাদেশিকতার মােহ তাহাদের কর্মক্ষেকে জাতীয়তা বােধ পরিস্ফুট হইতে দেয় নাই। কাজেই স্বাধীনতার সংগ্রাম নেতারা বৈদেশিক সাহায্যলাভের আশায় ব্যস্ত হইয় উঠিলেন। কিন্তু সময়মত কাৰ্যকারিতার ও ক্ষিপ্রতার অভাবে বিদ্রোঃ বিফল হইয়া যায়। তাহাদের প্রাণদণ্ডের আদেশ হইল। রাজদণ্ডে দণ্ডিত কারো বীরগণ অমানুষিক সহিষ্ণুতা ও নির্ভীকতার সহিত প্রাদণ্ড গ্রহণ করেন। তাহাদের বিপদে ধৈৰ্য, অবিচলিত অধ্যবসায়, নির্থ আত্ম ত্যা ও স্বদেশের কাৰ্যে অকাতরে প্রাণবিসর্জন প্রভৃতির তিহাস পাঠ করিয়া হৃদয় তাহাদের প্রতি ভক্তি, করুণায় ভরিয়া উঠে। মানুষ কেমন করিয়া আদর্শের জন্য অম্লানবদনে মৃত্যুকে বরণ করিতে পারে তা এই সকল বীরদের আত্ম-বিসর্জনের ইতিহাস হইতে জানা যায়। কিন্তু তথাপি কার্লোনারো সম্প্রদায়ের পদ্ধতি কোন দিন সফল ঔ নাই। বার তাহাদিগকে বিফলমনােরথ হইতে হইয়াছিল। যে সকল স্বদেশপ্রাণ বীরসাধকের প্রাণপাত পিরশ্রমে ইলিঃ নব- যুগের আবির্ভাব হইয়াছিল মনীষী ও কর্মবীর ম্যাসিনী তাদের ধ্যে অন্যতম। ম্যাটসিনি তাঁহার চিধারায় প্রাণিত নব্য ইতালী সম্প্রদায় করিয়া নিজে হাতে একদল তাকে গাও তুলিয়া- ছিলেন। তাহারাই ইতালীর ঋীনতা: ইসে জোসেফ ম্যাটসিনি ‘নব্য ইতালী সম্প্রদায়’ নামে পচিত। ম্যাটসনীর সহিত এই সম্প্রদায়ের কোন প্রভেদ ছিল না। কাজই এই সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে কিছু বলিতে হইলে ম্যাটসিনিকে আগে জানা উচিত। সেই জন্যই ম্যাটসিনীর জীবনী সংক্ষেপে দিব। ম্যাটসিনীর বিনী লিখলেই এই সম্প্রদায় সম্বন্ধে পৃথক করিয়া লিখিবার কোন প্রয়ােজহইবে না। ১৮০৫ খৃঃ ম্যাটসিনীর জন্ম হয়। দেশের অবস্থা তখন অতীব ১২ স্বাধীনতার সংগ্রাম । শশাচনীয়। তাঁহার পিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এনাটমির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বাল্যকাল হইতেই খুব স্বাধীনচেতা বালক ছিলেন। পােপের নামে তথাকথিত অনাচারগুলি মুখ বুজিয়া সহ করিতে পারিতেন । প্রথমে তাঁহাকে পিতার ব্যবসা অবলম্বন করাইবার জন্য চিকিৎসা- শাস্ত্র অধ্যয়ন করাই ঠিক ছিল। কিন্তু তাহার হৃদয়ের বৃত্তিগুলি তাঁহার এই পথের বাধা স্বরূপ হইয়াছিল। তিনি চিকিৎসার ঘরে বীভৎস কিন্তুত কিমাকার মূর্তি দেখিয়া সহ করিতে পারিতেন না। কজেই তিনি বাধ্য হইয়া আইন পড়িতে আরম্ভ করেন। কিন্তু তাঁহার সাহিত্য প্রবণ মন কোনদিন তাহাকে বিচক্ষণ আইন ব্যবসায়ী হইবার সুযােগ দেয় নাই। তাহার ঝোঁক ছিল সাহিত্যের দিকে। যদি স্বর্গাদপি গরীয়সী মাতৃভূমির উদ্ধার-রূপ মহত্তর ব্রত তাহার সম্মুখীন না হইত তাহা হইলে নিশ্চয়ই তিনি সারাজীবন নির্মল সাহিত্য চর্চা করিয়াই অতিবাহিত করিতেন সন্দেহ নাই। ম্যাটসিনী যে অকাতরে তিল তিল করিয়া প্রাণ বিসর্জন দিয়াছিলেন তাহার গােড়ায় ছিল তাহার কিশাের জীবনের একটি মর্মন্তুদ ঘটনা। তাহার বয়স তখন মােল বৎসর। তিনি তাঁহার মাতার হাত ধরিয়া জেনােয়ার রাজপথে ভ্রমণ করিতেছিলেন। এমন সময় জনৈক ইতালীর বিপ্লবপন্থী আসিয়া বিপ্লবপন্থীদের জন্য ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। ইহারা পিড়-মন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন; কিন্তু পরে অবস্থার গতিকে তঁাহারা অকৃতকার্য হইয়া জেনােয়ায় পলায়ন করেন। এই ঘটনা ম্যাটসিনীর কিশাের হৃদয়ে যে গভীর রেখাপাত করিয়াছিল ভবিষ্যতে তাহারই জন্য তিনি জীবন পণ করিয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তদবধি শয়নে স্বপনে তিনি এই স্বদেশ মাতৃকার মুক্তির স্বপন দেখিয়াছিলেন।

স্বাধীনতার সংগ্রাম সাহিত্যের মধ্য দিয়াই প্রথম তিনি রাজনীতিক্ষেত্রে অবতরণ করিলেন। দেশের সংবাদপত্রে ও মাসিকপত্রে নিজের মত প্রচার করিতে লাগিলেন। ইহাতেও তিনি তৃপ্ত হইতে পারিলেন না। তিনি কার্বোনানাে দলে যােগদান করিলেন। কিন্তু অধিক দিন এই দলে থাকিতে পারেন নাই। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে কাৰ্বোনারী গুপ্ত সমিতির সভ্য বলিয়া তিনি রাজরােষে পতিত ও বন্দী হইলেন। ছয়মাস কারাদণ্ড ভােগের পর তিনি কারামুক্ত হন। এই মুক্তির অনতিকাল পরেই তাহার প্রতি নির্বাসন দাণ্ডাজ্ঞা প্রচারিত হইল। এই সময় ইতালীর নির্বাসিত ব্যক্তিগণ ফ্রান্সের লিয় সহরে সমবেত হইয়া ফরাসী সরকারের সহায়তায় ইতালী আক্রমণের উদ্যোগ করিতে- ছিলেন। ম্যাটসিনি এই সংবাদ পাইয়া অনতিবিলম্বে আল্পস পর্বত অতিক্রম করিয়া লিয় সহরে বিদ্রোহীদের দলে যােগদান করিলেন। কিন্তু প্রকৃত কাৰ্যারম্ভের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ফরাসী সরকার বিশ্বাস ঘাতকতা করায় সমস্ত আয়োজন পণ্ড হইয়া গেল। পুনরায় যখন ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে ইতালীতে বিদ্রোহ প্রকাশ পায় তখনও তিনি যুদ্ধে পশ্চাৎপদ ছিলেন না। কিন্তু এবারও বিফল মনােরথ হইয়া তিনি লণ্ডনে পলায়ন করেন। লণ্ডনে আসিয়াও প্রচার কাৰ্য্য হইতে বিরত হন নাই। লণ্ডন হইতে ইংরাজ প্রেসের সহায়তা লাভ ‘ইংলণ্ডের পররাষ্ট্র নীতিকে ইতালীর অনুকূল করা এবং বৈপ্লবিক কর্মের জন্য টাকা কড়ির সাহায্য পাইবার আশায় তিনি বহু পরিশ্রম করিয়াছিলেন। ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে মহাপ্রাণ ম্যাটসিনির লােকান্তর ঘটে। উনবিংশ শতাব্দীতে সমগ্র ইউরােপব্যাপী যে মহাচাঞ্চল্য উপস্থিত { ১৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম হইয়াছিল—দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মনীষী ম্যাটসিনী তাহার প্রভাব পূৰ্ব্ব হইতেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কাল মার্কস প্রভৃতি মনীষি- ম্যাটসিনীর শিক্ষা গণ নূতন চিন্তার ধারায় একটা নব-যুগের প্রবর্তন করিয়াছেন সত্য, কিন্তু ম্যাটসিনী তাহার জীবনের মধ্য দিয়া চিন্তা ও কর্মের যে অত্যদ্ভুত সমম্বয় রক্ষা করিয়া চলিয়াছেন তাহা অতুলনীয়। মধ্যযুগের পর হইতে ধৰ্ম্ম রাজনীতি হইতে সম্পূর্ণ পৃথক হইয়া পড়িয়াছিল। ম্যাটসিনি বরাবর রাজনীতিকে ধর্মের একটি অঙ্গ বলিয়া মনে করিতেন। তিনি রাজতন্ত্রের একজন প্রধান শত্রু ছিলেন। ইতালীতে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে সাধারণ তন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহার একমাত্র চেষ্টা ছিল ইতালীতে ঐক্যের সংস্থাপন এবং সাধারণ তন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা। ইহাই তিনি জীবনের একমাত্র ব্রতরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। আর এই ব্রতকে কাৰ্যে পরিণত করিবার জন্য তাঁহাকে আজীবন কতই না কষ্ট ভােগ করিতে হইয়াছে। অনাহারে অনিদ্রা ইউরোপের অলি গলিতে ঘুরিয়া, গুপ্ত পুলিশের হাত হইতে অতিকষ্টে রক্ষা পাইয়া, সারাজীবন দুঃখ । দারিদ্র্যের মধ্য দিয়া অতিবাহিত করিয়া গিয়াছেন। আজ ইতালীতে মিঃ কাভুর ও গ্যারিবীর নাম লােকসমাজে যদিও সমধিক পরিচিত, কিন্তু মহাপ্রাণ ম্যাটসিনীর নাম তাহার আদর্শ, তাহার অদ্ভুত কাৰ্য্য ও অদম্য উৎসাহ মানব হৃদয়ের মর্ম স্পর্শ করিয়া যায়। খণ্ড বিদ্রোহের দ্বারাই ম্যাটসিনী তঁাহার চিরাকাঙ্ক্ষিত ইতালীর স্বাধীনতা আনায়ন করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি ধর্মের নামে সমগ্র ইতালীতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করিয়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি খ্রীষ্ট ধর্মের উপর সম্পূর্ণ আস্থাবান ছিলেন ৭ । ** স্বাধীনতার সংগ্রাম । তিনি নিজের আত্ম বিশ্বাসের উপর বিশ্বাস । এক উদারতর ধৰ্ম প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি । করতেন, মানবতার উদার ধর্মের দ্বারাই ইতালীতে ঐক্য স্থাপিত হ। এ ঐক; স্থাপিত করিয়া খণ্ড বিদ্রোহের দ্বারা রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ । • স!ধাণ তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিবেন। তিনি যে সময় এ সকল ম: ব করছিলেন সে সময় খণ্ড বিদ্রোহের দ্বারা স্বাধীনতা আনয়ন 10 অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছিল। কারণ তখন অষ্ট্ৰীয়া নূতন বং দ্বিতীয়বার রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হইয়াছে, জাৰ্মানী, -“ত্তি প্রতর দিন দিন হ্রাস পাইতেছে। ইতালীর এই পারিপাণি অবস্থ; এ তিনি যথােপযুক্ত বিবেচনা করেন নাই, তদ্ব্যতীত ) H: কয় অভ্যন্তরীন প্রকৃত অবস্থাও তিনি ভাল করিয়া । i: বে! প নাই। তজ্জন্য তিনি পিড়ন্ট এবং ইহার রাজাকে বিশ্ব, ' *** •াই এবং কাভুরকে ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন। ফলে খণ্ড যুদ্ধ প্রয়াস তঁাহার ব্যর্থ হইয়াছিল। তাহা ছাড়াও : ‘ত্রের একটি প্রধান দুর্বলতা ছিল, “তিনি কোনও নূতন ভাণ :: "সf ছিলেন । একটি মতের প্রবর্তক যাহারা, তাঁহারা স্বভাব ও ; এবং তাহার উপর ম্যাটসিনীর সমস্ত ভাবগুলি পরস্পর এত সে দঢ় সম্বন্ধ যে একটিকে অন্যটি হইতে পৃথক করা যায় না। তিনি কারও পরামর্শ সহিতে পারিতেন না; যদি কেহ তাহার মতে মত না দিই তবে তিনি তাহার কথা বিচার না করিয়া তাহাকে নির্যাতিত হয়। চলিতেন” ; কাজেই তিনি একগুঁয়ে ভাবে অবস্থা বিবেচনা না করিয়াই বন্দুকের খোঁচায় দেশের স্বাধীনতা আনিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তাঁহার জীবন-চলার পথ • স্বাধীনতার সংগ্রাম যতই না কেন ভ্রান্ত হউক ইতালী যে এই মহাপুরুষের সংস্পর্শে আসিয়া সজীব, সতেজ ও নববলে বলীয়ান হইয়া উঠিয়াছিল সে বিয়য়ে কোন সন্দেহ নাই। তিনিই প্রথম জাতির হৃদয়ে নিজের শক্তিতে, নিজের চেষ্টায়, নিজের পানের উপর ভর করিয়া স্বাধীনতা অর্জন করিবার প্রয়াস ও আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করিয়াছিলেন। ম্যাটসনী জকে শুধু তাহার সুচিন্তিত প্রবন্ধগুলি এবং উচ্চ ভাব- রাশিই দিয়া যান নাই। তিনি এই ভাবগুলিকে মূর্তি দিবার জন্য নিজে কৰ্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তাঁহার চেষ্টার ম্যাটসিনী ও নব্য- এই ‘নব্য ইতালী’ সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যাটসিনী ইতালী সম্প্রদায় এই কাব্বোনারাে সম্প্রদায়ের দুরবস্থা ও দুর্বলতা দেখিয়া নূতন 'ভত্তির উপর ইতালীর যুবক সম্প্রদায় লইয়া এই নব্য ইতালী সম্প্রদায়ে প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের বাণী হইল-সাম্য, মনুষ্যত্ব ও স্বাধীনতা। এবং মূলমন্ত্র হইল-ভগবান ও জন সাধারণ। শ্বেত, লােত, হরিত—এই তিন রঙ। তাহাদের জাতীয় পতাকারূপে গণ্য হই। ইহারা অনর্থক নরহত্যর বিরােধী ছিলেন। শুধু শিক্ষা বিস্তার ও রাজদ্রোহ প্রচারের দ্বারা দেশে বিদ্রোহ আনিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কাব্বোনানাে সম্প্রদায় পরিচয় চিহ্নরূপে তরবারি ব্যবহার করিতেন, কিন্তু এই নব্য ইতালী সম্প্রদায় তৎপরিবর্তে পুস্তক এবং শােকচিহ্ন ব্যবহার করিলেন। ইউরােপের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এই সম্প্রদায়ের কাৰ্য্যকেন্দ্র স্থাপিত হইল। ঐই বহু বিস্তৃত নব্য ইতালী সম্প্রদায় ম্যাটসিনীর কর্মজীবনের কীত্তি স্বরূপ। তিনি তাঁহার স্বহস্তে গঠিত এই নব্য ইতালী সম্প্রদায়ের সহায়ে দেশের মধ্যে ঐক্যের সংস্থাপন ও সাধারণ তন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করিবার স্বাধীনতার সংগ্রাম জন্য আমরণ প্রাণপণ শক্তিতে চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। এইভাবে মহাপ্রাণ ম্যাটসিনী জীবনে ভাব ও কর্মের সমম্বয় আনিয়াছিলেন। ম্যাটসিনি ও কাভুর দুইটি বিশিষ্ট মতবাদের প্রতিনিধি। ম্যাটসিনী ছিলেন সাধারণতন্ত্র বাদী ও সশস্ত্র বিদ্রোহের পক্ষপাতী। কূট রাজনীতির ধার ধারিতেন না। অপরদিকে কাভুর ছিলেন রাজ- মডারেট দল ও তন্ত্রবাদী, কূট রাজনীতিজ্ঞ ও সংস্কার প্রয়াসী। কাভুর কাজেই এইরূপ দুইজন সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ মতাবলম্বী ব্যক্তি কখনই একমত হইয়া কাজ করিতে পারে না। ইহার ফলে আজীবন উভয়েই উভয়কে হিংসা করিতেন। কাভুর পিড মন্টীয় নােবল ছিলেন। ১৮১০ খৃষ্টাব্দে তাঁহার জন্ম হয়। ১৮৬১ খ্ৰীষ্টাব্দে একান্ন বৎসর বয়সে তিনি মায়া যান। তিনি বহুধা বিভক্ত ইতালাতে জাতীয়তা বােধ উদ্রেক করিয়া ঐক্য সংস্থাপন করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি কাৰ্বোনায়াে ও নব্য ইতালী সম্প্রদায়ের জন্য বিদ্রোহ করিয়া দেশের স্বাধীনতা আনয়ন করা বিশ্বাস করিতেন না। কারণ তিনি মনে করিতেন যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী অষ্ট্ৰীয়ার বিরুদ্ধে এই সকল খণ্ড বিদ্রোহের কোন মূল্যই নাই। নিতান্তই তুচ্ছ। অথচ ইহাও জানিতেন যে অষ্ট্ৰীয়াকে দূর করিতে না পারিলে ইতালীর মুক্তি নাই। কাজেই অষ্ট্ৰীয়াকে ইতালী হইতে বহিস্কৃত করিবার মানসে তিনি বিদেশী শক্তির শরণাপন্ন হইয়া কূট রাজনীতির পরিচয় দিয়াছিলেন এবং দেশের মধ্যে ম্যাটসিনী প্রভৃতির ন্যায় খণ্ড বিদ্রোহের দ্বারা সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিবার চেষ্টা না করিয়া তৎকালীন প্রবর্তিত রাজতন্ত্রের শাসন পদ্ধতির সংস্কার করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি রাজতন্ত্রের একমুখী ক্ষমতা খর্ব স্বাধীনতার সংগ্রাম করিয়া বৃটিশের ন্যায় সীমাবদ্ধ রাজতন্ত্র (Limited monarchy) প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁহার মূলমন্ত্র ছিল—A free church in a free state. কাভুর রাজতন্ত্রের উৎসাহদাতা ছিলেন তাঁহার শত্রুপক্ষ তাঁহাকে অনেক কটুক্তি করিয়া থাকেন কিন্তু তিনি যে স্বদেশকে প্রকৃতই মনে প্রাণে ভালবাসিতেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। প্রকৃত পক্ষে কাভুরই ইতালীর স্বাধীনতা আনিয়াছিলেন। আজ তাহার নাম ইতালীতে দেবদেবীর ন্যায় ভক্তিপুষ্পাঞ্জলি পাইয়া থাকে। তিনিই ঠিক সময়ে দেশের প্রকৃত দুর্বলতার অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন। এই দল পােপকে সর্বময় কৰ্ত্তা করিয়া হার অধীনে সমগ্র ইতালীকে একতা সূত্রে আবদ্ধ করিতে চাহিয়াছিলেন এবং পােপের পূত চরণ স্পর্শে পবিত্র হইয়া পােপের আদেশানুযায়ী স্বদেশের পােপের দল স্বাধীনতা আনিতে দৃঢ়সংকল্প হইয়াছিলেন। এই দলের নেতা ছিলেন ‘ভিনসিনজো জিয়ােবার্টি’, তবে ইতালীর স্বাধীনতার ইতিহাসে এই দলের প্রভাব বিশেষ দেখিতে পাওয়া যায় না। যােড়শ গ্রেগাড়ীর মৃত্যুর কিছুদিন পূৰ্ব্বে জিয়ােবাটি একখানি পুস্তক লেখেন। তাহাতে তিনি বলেন যে “এমন একজন পােপ আসিতেছেন, যাহার ছায়াতলে রাজা ও এজা মান ভাবে থাকিতে পারিবে।” ইহার অল্পদিন পর গ্রেগরীর মৃত্যুতে ‘পায়সে’ নবম পােপ পদে অধিষ্ঠিত হইলেন। ‘পায়স’ পােপ হইয়াই সমস্ত রাজবন্দী ও নির্বাসিতদের মুক্তি দিলেন। ইহাতে দেশের মধ্যে খুব হুলস্থুল পড়িয়া গেল। ধর্মভীরু ও অশিক্ষিতের দল পায়াসকেই জিয়ােবার্টের কথিত পােপ বলিয়া মহা আনন্দে নৃত্য করিতে স্বাধীনতার সংগ্রাম লাগিল। সমগ্র ইতালীতে বেশ উত্তেজনা দেখা দিল কিন্তু সে সময় দেশে যেসুইট সম্প্রদায় অত্যন্ত প্রবল ছিল। এই সম্প্রদায়ের প্ররােচনায় জনসাধারণ অষ্ট্ৰীয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিবার জন্য ক্ষেপিয়া উঠিল। পােপ গতিক দেখিয়া গােপনে অষ্টীয়ার সঙ্গে সন্ধি করিলেন এবং ক্রমাগত জনসাধারণকে এই যুদ্ধে বাধা দিতে লাগিলেন। ফলে যুদ্ধের প্রাক্কালে জনসাধারণ পােপের প্রতি শ্রদ্ধা হারাইল। এই সুযােগে উদারনীতিকগণ খুব ক্ষমতা বিস্তার করিয়া লইলেন। কাজেই পােপ গেটায় পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। এইরূপে ইতালীতে রােমের একাধিপত্যের আশা সমূলে বিনষ্ট হইয়াছিল। দেশের ঘাের দুর্দশার দিনে নানা মুনির নানা মত হইতে দেখা যায়। ঈর্ষা, বিদ্বেষ, অবিশ্বাস প্রত্যেক হৃদয়কে অধিকার করিয়া বসে। এই সময় নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মে আত্ম-নিয়ােগ করিতে খুব কম গ্যারিবী লােককেই দেখা যায়। আমরা বিভিন্ন মতবাদের আলােচনা করিয়াছি। কিন্তু এই সঙ্গে যদি নিঃস্বার্থ কৰ্ম্মবীর গ্যারিবীর জীবন চরিত আলােচনা না করি, ইতালীর স্বাধীনতার ইতিহাস অপূর্ণ থাকিয়া যাইবে। গ্যারিবল্ডী ম্যাটসনীর সম সাময়িক লােক ছিলেন। ১৮০৭ খ্রীষ্টাব্দে গ্যারিবীর জন্ম হয় এবং ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে ইতালীয় কৰ্ম্মবীর গ্যারিবীর মৃত্যু হয়। গ্যারিবীর পিতা সমুদ্র পথে বাণিজ্যপােত পরিচালনা করিতেন। গ্যারিবীও বাল্যকাল হইতেই পিতার নাবিক-বৃত্তি গ্রহণ করিয়াছিলেন। গ্যারিবীর জীবন চরিত লেখক ম্যাটসিনী ও গ্যারিবীর তুলনা করিতে গিয়া প্রকৃতই বলিয়াছেন “এক জনের আদর্শ নারায়ণ, অন্য জনের আদর্শ ১০০ স্বাধীনতার সংগ্রাম নর-নারায়ণ। একজন শ্রীকৃষ্ণ, অন্যজন অৰ্জ্জুন। শ্রীকৃষ্ণ যেমন কুরুক্ষেত্র সমরের প্রকৃত নায়ক, ম্যাটসিনীও সেই রূপ ইতালীর স্বাধীনতা সমরের প্রকৃত নেতা। এই জ্ঞানময় ও কর্মময় জীবনের ঐকতানিক সাধনা ব্যতীত কোন মহৎ কাৰ্যই সুসিদ্ধ হইতে পারে না। ফ্রান্সের বিপ্লবে রুসসা ও ভল্টেয়ার, আমেরিকার বিপ্লবে আডাম স্মিথ ও ফ্রাঙ্কলিন এবং ইতালীর বিপ্লবে ম্যাটসিনী-নারায়ণের অবতার। আর ফরাসী বিপ্লবে নেপোলিয়ান, আমেরিকা বিপ্লবে ওয়াসিংটন এবং ইতালী বিপ্লবে গ্যারিবী-নরনারায়ণের অবতার।” পূৰ্বেই বলিয়াছি গ্যারিবীর প্রথম জীবন নাবিকের কাৰ্যেই অতি- বাহিত হইয়াছিল। নাবিকের কাৰ্য্যে তিনি বিশেষ বিচক্ষণতা প্রদর্শন করিয়া উচ্চপদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। গ্যারিবী হার নাবিক জীবনেই স্বদেশের মুক্তি-মন্ত্র মনে প্রাণে অনুভব করিয়াছিলেন। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ম্যাটসিনীর সহিত তাঁহার প্রথম পরিচয় হয় এবং ম্যাটসিনীর মুখে দেশের দুরাবস্থা ও রাজার অকথিত অত্যাচারের কথা শুনিয়া স্বদেশ উদ্ধারকেই জীবনের ব্রত বলিয়া গ্রহণ করেন। গ্যারিবী এই মহাব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া ম্যাটসিনীর সহিত যােগদান করায় সােনায় সােহাগার সংযােগ হইল। ম্যাটসিনীর সহিত সমবেত হইয়া গ্যারিবী ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে পিড মন্ট আক্রমণ করিলেন। কিন্তু এই যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় ম্যাটসিনী ও গ্যারি বন্ডী উভয়কেই প্রাণ লইয়া পলাইতে হইয়াছিল। গ্যারিবী বহু বাধা বিয় অতিক্রম করিয়া আমেরিকায় পলায়ন করেন। আমেরিকাতেও সে সময় সারণতন্ত্রের সংগ্রাম চলিতেছিল। গ্যারিবী দক্ষিণ আমেরিকায় উপস্থিত ধীনতার সংগ্রাম হইয়া ‘উরুগয়ে সাধারণ-তন্ত্রের পক্ষ লইয়া দক্ষতার সহিত সৈন্ত পরিচালনা করেন। সাধারণতন্ত্রেরই জয় হইল। গ্যারিবী উরুগয়ে’র সাধারণ তন্ত্রে সেনাপতি পদে বরিত হইলেন। ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে চার্লস আলবার্টের মিথ্যা ছলনায় ইতালীর জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হইয়া উঠে এবং গ্যারিবীকে স্বদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যােগ দিবার জন্য আহ্বান করে। গ্যারিবীও সদল বলে আমেরিকা হইতে ইতালীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নানা স্থানে যুদ্ধ হইল। প্রত্যেক যুদ্ধে গ্যারিবী অসীম সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করিলেন। কিন্তু হঠাৎ এই সময় তিনি যুদ্ধে আহত হইলেন এবং নিজের দলের নেতাদের নানা মতভেদ দেখা দিল। ফলে, গ্যারিবীকে বাধ্য হইয়া রণে ভঙ্গ দিতে হইল। তিনি পুনরার আমেরিকায় উপস্থিত হইলেন এবং অতি দীন ভাবে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। পরে, পেরু দেশীয় সৈন্য দলের অধিনায়ক পদে নিযুক্ত হন। ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে ইতালীর ‘পালেরমাে নামকস্থানে পুনরায় বিদ্রোহ দেখা দিল। স্বাধীনতার সজীব মুত্তি গ্যারিবল্ডী পুনরায় স্বদেশে আসিয়া একদল ভলেন্টিয়ার সৈন্য গঠন করিয়া অমিতবিক্ৰমে নেপলস জয় করিলেন। নেপলসের রাজা প্রাণ লইয়া পলায়ন করিলেন। গ্যারিবীর এই জয়ের পর জয়ের খ্যাতি দেশময় বিস্তৃত হইয়া পড়িল। দলে দলে লোেক আসিয়া গ্যারিবীর সহিত যােগদান করিলেন। নূতন বলে বলীয়ান হইয়া গ্যারিবী ক্রমাগত দশটি যুদ্ধে জয় লাভ করিয়া ইতালীতে স্বাধীনতা স্থাপন করেন। এই সময় ম্যাটসিনীর সহিত গ্যারিবীর মত বিরােধ খটিল। ম্যাটসিনী তাঁহার চিরাকাঙ্খিত সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে • ঘটিল ১২ স্বাধীনতার সংগ্রাম চাহিলেন। কিন্তু গ্যারিবী এই সময় কাভুরের সহিত যােগদান করিয়া রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এই সময় গ্যারিবীর সামরিক শক্তি এবং জনসাধারণের বর্ধমান শ্রদ্ধা দিন দিন এত প্রবল হইয়া উঠিতেছিল যে তিনি ইচ্ছা করিলেই অনায়াসে সমগ্র ইতালীর একছত্র অধীশ্বর হইতে পারিতেন। কিন্তু গ্যারিবল্ডী এই অবস্থায় নিঃস্বার্থপরতার যে মহান আদর্শ দেখাইয়াছিলেন তাহা এই দ্বেষ- হিংসা-স্বার্থ-প্রপীড়িত কলিতে সত্যই অতুলনীয়। বাহুবলে সমস্ত রাজ্য জয় করিয়া প্রাণপাত চেষ্টায় রাজ্যের সমস্ত কণ্টক দূর করিয়া, দেশের প্রকৃত রাজা ভিক্টর ইম্যানুয়েলকে স্বাধীন ইতালির রাজপদে অধিষ্ঠিত করিলেন। ইতালীর লুপ্ত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করাই মহাবীর গ্যারিবীর চরম উদ্দেশ্য ছিল। দেশের এই স্বাধীনতা অর্জনের পথে দুঃখ দৈন্য দারিদ্র্যকে তিনি আপনার করিয়া লইয়াছিলেন। ভােগকে কেমন করিয়া দূরে ঠেলিয়া রাখিতে হয় তাহা গ্যারিবীর জীবন হইতে প্রত্যক্ষ জানা যায়। দীপের অভাবে স্ত্রী পুত্র পরিবার লইয়া অন্ধকার গৃহে বসিয়া রাত্রি যাপন করিতেন। কথিত আছে গ্যারিবী একদিন ঐভাবে অন্ধকার গৃহে স্ত্রী পুত্র লইয়া বসিয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। তাঁহার বীরত্ব দর্শনে মুগ্ধ হইয়া রাজ সেনাপতি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়া তাঁহাকে তদবস্থায় অন্ধকারে বসিয়া রাত্রি যাপন করিতে দেখিয়া বিস্ময়াবিষ্ট ও লজ্জিত হইয়া মহাৰীরের সাংসারিক অভাব দূর করিবার জন্য রাজকোষ হইতে কিছু অর্থ সাহায্য করেন। কিন্তু সে অর্থও গ্যারিবী গরীবের দুঃখ নিবারণের জন্যই ব্যয় করিয়াছিলেন। দুঃখতেই যাহার সুখ তাহাকে সাহায্য করিয়া দুঃখ নিবারণ করা যায় না। অধিক কি যেদিন তিনি সমগ্র ইতালী রাজা স্বাধীনতার সংগ্রাম ইম্যানুয়েলকে দান করিয়া ক্যাপরাে দ্বীপে প্রস্থান করেন সেদিন ইচ্ছা করিলে তিনি প্রচুর ধনরত্ন লইয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু সেদিন তিনি রিক্তহস্তে ক্যাপরাে দ্বীপে প্রস্থান করিলেন। রাজা হাকে অর্থ লইতে অনুরােধ করিলে তিনি তাহার বাহুযুগল দেখাইয়া বলেন—ইহাতে এখনও শক্তি আছে, চাষ করিয়া খাইব। স্বাধীনতার প্রতিমূর্তি গ্যারিবীর মুখেই একথা সাজে। ইতালীর রাষ্ট্র-বিপ্লবে কার্বোনানাে সম্প্রদায়ই প্রথম বক্ত-যুগের অবতারণা করেন, পরে ম্যাটসিনী প্রতিষ্ঠিত নব্য ইতালী সম্প্রদায় ইতালীতে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ইতালীর স্বাধীনতার এই কাৰ্বোনাবরা ও নব্য ইতালী সম্প্রদায়ের চেষ্টায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার অনেক ত্রুটি ও দুর্বলতার মধ্য দিয়া ক্রমাগত ১৮২১, ইতিহাস ১৮৩১ এবং ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহ হইয়া গেল। ইহার মধ্যেও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্রোহ সংঘটিত হইয়াছিল তবে ইতালীর ইতিহাসে এই কয়টি বিদ্রোহই প্রসিদ্ধ এবং তন্মধ্যে ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দের বিদ্রোহই সর্বশ্রেষ্ঠ। অতি সামান্যের জন্যই ইতালীবাসীর এই বিদ্রোহ অকৃতকার্য হইয়াছিল। যাহাই হউক ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দের বিদ্রোহ প্রশমিত হইল বটে কিন্তু দেশের আভ্যন্তরীণ গুমট ভাব ঘুচিল না এবং পশুশক্তির প্রয়ােগে কোনদিন কোথাও বিদ্রোহের মূল নষ্ট করিতে পারে নাই। অষ্ট্ৰীয়াও পশক্তির প্রভাবে ইতালীবাসীর হৃদয়ের নব জাগ্রত বিদ্রোহশক্তি নষ্ট করিতে পারিল না ; উপযুক্ত অবসরের প্রতীক্ষায় ধূমায়িত হইতে লাগিল। এই সময়েই রাজনীতি-শ্রেষ্ঠ কাভুরের আবির্ভাব। অষ্ট্ৰীয়ার রাজা তাহাকে পিড় মন্টে ইচ্ছানুরূপ শাসনপদ্ধতি প্রচলিত ১৪ স্বাধীনতার সংগ্রাম করিতে আদেশ করেন এবং তাহাতে তিনি কোনরূপ বাধা দিবেন না বলিয়া প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দ্বিতীয় ইমানুয়েল অষ্ট্ৰীয়রাজের এই অবাচিত দানের প্রতি ক্ষেপও না করিয়া সমগ্র ইতালীর স্বাধীনতার্জনে তৎপর হইয়াছিলেন এবং বিচক্ষণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ কাভুর এই সময়ে তাঁহার প্রধান অমাত্যের পদ অলঙ্কৃত করিয়া ইম্যানুয়েলের এই মহৎ উদ্দেশ্যকে কার্যে পরিণত করিয়াছিলেন। ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দের অকৃতি বিদ্রোহের পর কাভুর স্থির বুঝিয়াছিলেন যে ম্যাটসিনি প্রচলিত খণ্ড-বিদ্রোহের দ্বারা ইতালীর স্বাধীনতা আনয়ন করা সম্ভবপর নয়। অষ্ট্ৰীয়ার অধীনতাপাশ ছিন্ন করিতে হইলে বাহিরের শক্তির সহায়তা একান্ত আবশ্যক। ইহা বুঝিতে পারিয়া তিনি ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে ইউরােপের শক্তিনিচয়ের প্যারিস কংগ্রেসে যােগদান করেন এবং ইতালীর স্বাধীনতাযুদ্ধে ইউরােপের শক্তিবর্গকে সহানুভূতিসম্পন্ন করিতে চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসীরাজা তৃতীয় নেপােলিয়নের সহিত সখ্যসূত্রে আবদ্ধ হন। কাভুর এই ভাবে ফরাসীরাজের শক্তিতে শক্তিমন্ত হইয়া নিজ-রাজ্যের অস্ত্রবল ও সৈন্যবল বৃদ্ধি করিতে লাগিলেন। ইহা দেখিয়া অষ্ট্ৰীয়রাজ ক্রুদ্ধ হইলেন এবং সৈন্যসংখ্যা হ্রাস করিতে আদেশ করিলেন। কিন্তু কাভুর অষ্ট্ৰীয়রাজের এ আদেশে কর্ণপাত করিলেন না। কাজেই অষ্ট্ৰীয়রাজ বাধ্য হইয়া ইতালী আক্রমণ করিলেন। এই সময় গ্যারিবল্ডী তাহার স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী লইয়া অষ্ট্ৰীয়া সৈন্যবাহিনীকে বারম্বার অতর্কিত আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। ওদিকে ইতালী ও ফরাসীর সম্মিলিত সৈন্যবাহিনীর নিকট অষ্ট্ৰীয়ার সৈন্যবাহিনী উপর্যুপরি দুইবার পরাস্ত হইল। ১০৫ স্বাধীনতার সংগ্রাম ইতালীবাসী যখন এই জয়ের পর জয়ে আনন্দসাগরে ভাসমান তখন হঠাৎ ফরাসীসম্রাট তৃতীয় নেপােলিয়ন অষ্ট্ৰীয়সম্রাট জোসেফ ফ্রাঙ্কসিসের সহিত এক সন্ধি করিলেন। এই সন্ধি অনুসারে ইম্যানুয়েল ইতালীর লম্বার্ডি প্রদেশ পাইবে এবং ভেনিস অষ্ট্ৰীয়ার করতলগত হইবে ও ইতালীর অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি অষ্ট্ৰীয়ার তত্ত্বাবধানে থাকিবে। ফরাসী সম্রাটের অকস্মাৎ ইতালীর সহিত মনােভঙ্গ করিয়া শত্রুপক্ষ অষ্ট্ৰীয়ার সহিত সন্ধি স্থাপন করার অনেকগুলি কারণ ছিল। (১) তিনি যত সহজে অষ্ট্ৰীয়াকে পরাজিত করিবেন মনে করিয়াছিলেন তাহা সম্ভব নহে, ইহার জন্য বহু লােকক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। (২) তাহার ভয় হইয়াছিল প্রুসিয়া অষ্ট্ৰীয়ার হইয়া যােগ দিলে ফরাসীর সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা (৩) ইতালীর সমস্ত রাজ্যগুলি যদি পিড,মন্টের সহিত মিলিত হয় তাহা হইলে ইতালী প্রবল হইয়া পড়িবে।” একতাবদ্ধ স্বাধীন ইতালি ফরাসী সম্রাটের বাঞ্ছনীয় ছিল না। তিনি কাভুরকে সাহায্য করিয়া শুধু পিড,মন্ট প্রদেশকে শক্তিমন্ত করিতে চাহিয়াছিলেন। কারণ পিমেন্ট শক্তিমন্ত হইলে ফরাসী সম্রাটের অষ্ট্ৰীয়াকে ভয় করিবার কিছু থাকিবে না। কিন্তু তিনি যখন দেখিলেন হিতে বিপরীত ঘটিয়াছে। ইতালী এই সুবর্ণ সুযােগে একতাবদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। কাজেই যাহাতে স্বাধীন ইতালী নব বলে বলীয়ান হইয়া ফরাসীর রাজ্যলিপ্সা প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে তজ্জন্য অসময়ে তাহাদিগের সহিত সৰ্তভঙ্গ করিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করিল। যাহাই হউক ইতালী বাসী ফরাসীর এই ব্যবহারে একেবারে নিরুৎসাহ হইয়া পড়িল। ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে কাভুর ভগ্নহৃদয়ে প্রধান অমাত্যের পদ ত্যাগ করিলেন। ১০৬ স্বাধীনতার সংগ্রাম অবশেষে ইমানুয়েলকে বাধ্য হইয়া অষ্ট্ৰীয়ার সহিত সন্ধি করিতে হইল। এই সন্ধির ফলে ভেনিস অষ্ট্ৰীয়ার এবং রােম ফরাসীর হস্তগত হইল। কিন্তু সেই সঙ্গে টক্যানি, পাৰ্ম্মা, মডেনা এবং রােমাগেনা প্রভৃতি প্রদেশগুলি সার্জিনিয়ার সহিত সংযুক্ত হইয়া নৃপতি ইম্যানুয়েলের রাজছত্ৰতলে আসিয়া যােগ দিল। এইভাবে উত্তর ইতালী সংঘবদ্ধ হওয়ায়ও সমগ্র ইতালীর স্বাধীনতার পথ অনেকটা পরিষ্কৃত হইল শুধু বাকী থাকিল ভেনিস ও নােম। এই ঘটনায় ভগ্নহৃদয় কাভুরের মনে আশার সঞ্চার হইল। তিনি আসিয়া পুনরায় ইম্যানুয়েলের সহি যােগ দিয়া যােগ দিয়া নূতন উৎসাহে কাৰ্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। কাভুর এবং ইমানুয়েল পরামর্শ করিয়া প্রথমেই মহাবীর গ্যারিকভীকে সসৈন্যে সিসিল দ্বীপ আক্রমণ করিতে প্রেরণ করিলেন। গ্যারিবী এই রাজাজ্ঞা পাইয়া অবিলম্বে সসৈন্যে সিসিল দ্বীপে উপস্থিত হইয়া ঐ দ্বীপ অধিকারপূর্বক রাজা ইম্যানুয়েলের রাজ্যান্তভুক্ত করিলেন। ইতিমধ্যে আম্রো ও মার্কে বিদ্রোহ উপস্থিত হওয়ায় ইম্যানুয়েল তৎপ্রদেশে উপস্থিত হইয়া প্রদেশেদ্বয় স্বীয় অধিকারে আনয়ন করিলেন। এইভাবে ক্রমাগত সুযােগ সুবিধা বুঝিয়া আক্রমণপূৰ্ব্বক ইম্যানুয়েল প্রায় সমগ্র ইতালীতে স্বীয় একাধিপত্য স্থাপন করিলেন। কেবলমাত্র ভেনিস ও বােম হইতে তখনও অষ্ট্ৰীয়া ও ফরাসীর অধিকার দূরীভূত হইল না। এই সময় এই দুই প্রদেশ অধিকারের জন্য অষ্ট্ৰীয়া ও ফরাসীর সহিত যুদ্ধ ঘােষণা অযুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিয়া কাভুর কিছুদিনের জন্য উপযুক্ত সুষােগ সন্ধানের আশায় অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু হঠাৎ (১৮৬১ খ্রীঃ) এই সময় কাভূরের মৃত্যু ঘটে। রাজা ইমানুয়েল এরূপ সুদক্ষ এবং সর্বকাৰ্যে দক্ষিণ হস্তবৎ স্বাধীনতার সংগ্রাম মন্ত্রীকে হারাইয়াও বিচলিত না হইয়া অতি সন্তর্পণে সুযােগের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কয়েক বৎসর পরে তাঁহার সেই চিরঈপ্সিত সুযােগ মিলিল। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রশিয়ায় সহিত অষ্ট্ৰীয়ার যুদ্ধ বাধিল। ইম্যানুয়েল প্রশিয়ার সহিত সন্ধি করিয়া অঞ্জীয়ার বলক্ষয় করিবার ভার গ্রহণ করিলেন। এই যুদ্ধে যদিও ইতালীর পরাজয় ঘটিল কিন্তু প্রুশিয়া অঞ্জীয়াকে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত করায় যুদ্ধাবসানে প্রশিয়ার চাপে ইতালীকে ভেনিস প্রদেশ ত্যাগ করিতে হইল। ঠিক এই ভাবে ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে প্রশিয়ার সহিত ফরাসীর সংঘর্ষ উপস্থিত হওয়ার সুযােগে নােম প্রদেশও ফরাসীর হস্তচ্যুত হইয়া ইম্যানুয়েলের অধিকৃত হইল। এক কথায় সমগ্র ইতালীতে স্বাধীনতা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইল। আজ আবার ভীম দর্পে ফ্যাসিজি আন্দোলন চলিতেছে। সুবিধা হইলে ইতালীর এই নবীন আন্দোলনের ইতিহাস ও অদুর ভবিষ্যতে পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত করিব। বন্দেমাতরম

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Swadhinatar Sangram

Author
Pramanik, Manimay
Title
Swadhinatar Sangram
File name
Swadhinatar Sangram
Text
OCR done
Citation
1928
Published
2010/03/30
Publisher
Rahasya Laharii Press
Language
Sanskrit
Pages
112
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
History
Keywords
Amerikar Swadhinata
DLI number
511499
Barcode
4990010018639.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
YR1gTMjNJek
Download PDF

Swadhinatar Sangram