Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Udbodhon

2009/09/19

PDF Proofread

Front matter

»
এ ভিজিট
উদ্বোধন
n}}৫)
প্রবর্তক
পাব্লিশিং হাউস
.

জ
উদ্বোধন
|
প্রবর্তক
পাব্লিশিং হাউস
-

No text on this page.

উদ্বোধন
চৈত্র, ১৩২৬
প্ৰবৰ্ত্তক পাবলিশিং হাউস
চননগর
মূল্য পাঁচ সিকা

চন্দননগর, বােড়াইচণ্ডিতলা
প্ৰবৰ্ত্তক পাবলিশিং হাউস হইতে
শ্রীরামেশ্বর দে
কর্তৃক প্রকাশিত।
প্রিন্টার-এশীতলচন্দ্র ভট্টাচার্য্য,
মানসী প্রেস
A: ১৪l3,রামতনু বসুর লেন, কলিকাতা।

বিজ্ঞাপন
এই নাটকখানি রচনার কাল ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দ ।
সেই সময়ে বাংলার পল্লীতে পল্লীতে নাটকাভিনয়ের
খুবই ধুম পড়িয়াছে, এমন কি স্কুলে কলেজেও ইহার
প্রভাব বিস্তৃত হইয়াছে—অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকগণ
ইহার বিরুদ্ধে ঘােরতর আপত্তি তুলিয়াছিলেন। ঠিক
এই সময়ে স্ত্রীচরিত্রবিহীন উচ্চ আদর্শপূর্ণ একখানি
নাটক রচনার ইচ্ছা বলবতী হইয়া উঠে, তাহারই
ফলস্বরূপ এই “উদ্বোধন”।
১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দেই আমার কয়েকজন বন্ধু ইহা অভি-
নয় করেন, সম্প্রতি এখানকার কয়েকজন যুবকের চেষ্টায়
ইহার দ্বিতীয় অভিনয় সম্পন্ন হয় ; ক্রমশঃ পুস্তকখানি
ছাত্রগণের বিশেষ আদরের সামগ্রী হইয়া উঠিতেছে-
এই অবস্থায় পুস্তকখানি মুদ্রিত করার প্রয়ােজন বােধে
ইহা প্রকাশিত হইল।

নাটকের মধ্যে কোন একটি চরিত্রে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের
উপর কটাক্ষপাত আছে, উহা সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করিয়া
নহে, ব্যক্তিগত চরিত্র চিত্রণের জন্যই ঐরূপ প্রদর্শিত
হইয়াছে—পরন্তু ব্রাহ্মধর্মের উপর লেখকের যথেষ্টই
শ্রদ্ধা ও সম্মান বােধ আছে—একথা বলিয়া রাখা
ভাল।
পরিশেষে বক্তব্য এই নাটকখানি উৎসর্গ
মন্ত্রেরই সূচনা স্বরূপ, কেননা এই মন্ত্র যখন মূৰ্ত্ত হইয়া
উঠে নাই, তাহার অনতিপূৰ্বেই ইহা স্বতঃস্ফুর্ত হইয়া
প্রকাশ পাইয়াছিল। ইহা পাঠে পাঠকবর্গের মধ্যে
নূতন মন্ত্রের কিঞ্চিৎ আভাষও যদি সমুদিত হয়, তাহা
হইলে পুস্তক প্রকাশ সার্থক হইবে। ইতি
গ্রন্থকার
১লা চৈত্র, ১৩২৬
চন্দননগর

অরবিন্দবাবুর স্ত্রীকে লেখা ক’খানি
বিখ্যাত চিঠি
অরবিন্দের পত্র
অন্যলােকে স্বদেশকে
একটা জড় পদার্থ, কতগুলো মাঠ ক্ষেত্র বন
পৰ্বত নদী বলিয়া জানে
আমি মা বলিয়া জানি”
হৃদয়ের সেই গােপন কথা গুলি
যা দৈবক্রমে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল।
চিঠিগুলি যে-সব বিষয়ে
তা প্রত্যেকেরই জানা দরকার।
দু’খানি ভালো হাফটোন ছবি আছে।
দ্বিতীয় সংস্করণ
দাম পাঁচ আনা।
প্রবর্তক পাবলিশিং হাউস, চন্দননগর

যৌগিক সাধন
বার আনা
আত্মসম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।
এই বইখানিতে মানুষের বহিরিন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়-
গুলির কথা, তাহাদের কাৰ্যাদির বিবরণ খুব সরল
ভাবে বুঝান হইয়াছে।
লীলা
আট আনা
অনন্ত যুগ ধরিয়া শ্রীভগবান তাহার যে অনন্ত
নাটঃলীল প্রকটিত করিয়া আসিতেছেন সেই রহস্য
উপলব্ধি পূৰ্ব্বক সকলেই যাহাতে ভাগবতজীবন লাভ
করিতে পারে-এই ভাবে ইহা লিখিত।
সাধনা
দশ আনা
সাধনার কথা গুলি ফুলের এক একটি পাপড়ীর
মত যুক্ত করিয়া সাধনা নামক পুস্তকাকারে প্রকাশিত
হইয়াছে। নুতন যুগের সাধক এই পুস্তকখানিতে
তাহার অন্তরের নিগুঢ় তত্ব দেখিতে পাইবেন।
প্রবর্তক পাবলিশিং হাউস, চন্দননগর

চরিত্র
ঐ পুত্র
রামদাস স্বামী, ধনাক্ষ্যাপা
রামধন বসু
জমিদার
ধীরেন্দ্রনাথ বসু
বীরেন্দ্রনাথ ঘােষ
প্রচারক ও এ্যাটর্নি
সুধীরকুমার দত্ত
বীরেরে বন্ধু
বিশ্বেশ্বর সরকার
রামধন বসুর নায়েব
ভূতনাথ
নীলমণি
উচ্ছ ঙ্খল যুবক
ভদ্রলােক, জনৈক বৃদ্ধ, কবিরাজ, ছাত্রগণ, জনস,
রাখালে চাষা, হরে, বেয়ারা, হরকরা,
পুলিশ ইত্যাদি
০ ০ ০
০ ০

No text on this page.

উদ্বোধন
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
নদীতীর
ধীরেন্দ্র ও বীরেন্দ্র
ধীরেন্দ্র–মিথ্যা কথা ! কেবা স্রষ্টা? কোথা তার ঘর ?
আজ অবধি নির্ণয় কি হয়েছে কিছু ?
কিছুই না। প্রকৃতির বশে ফোটে ফুল,
বহে নদী তুঙ্গ শৃঙ্গ হ’তে, ধুয়ে দেয়
মেদিনীর সমতল শ্যামল অঞ্চল,
তরুকুল নিত্য শােভে নব কিশলয়ে,
গ্রহতারা আপনার নির্দিষ্ট নিয়মে
বিচরণ করে শূন্যে। তৈলহীন হলে
নিভে যায় আপনি প্রদীপ, সেই মত

উদ্বোধন [ প্রথম দৃশ্য ফুরাইলে আয়ু, জীবনের হয় শেষ, পঞ্চভূতে মিশে যায় নশ্বর শরীর। বিদ্যা, ধন, জ্ঞান, মান, মানবের যত কিছু আছে গুণরাশি, জীবনের শেষে ভস্মে তাহা হয় পরিণত। বীরেন্দ্র সত্য সব মানি, কিন্তু তুমি এইমাত্র নিজমুখে করিলে স্বীকার, প্রকৃতি সমস্ত কাৰ্য্য করে সম্পাদন। জিজ্ঞাসি তােমায় এবে কেবা সে প্রকৃতি? কেই-বা বিশ্বের রাণী ? ধীরেন্দ্র-প্রকৃতিরে দেবী বল কেন ? মিথ্যা দিয়ে সত্যেরে সাজাতে চাও-একি বিড়ম্বনা! দেবি কোথায় অস্তগামী রবির কিরণ পশ্চিম গগন হ’তে লােহিত বরণে শােভে পল্লীবৃক্ষচূড়ে, ধনীর প্রাসাদ- শীর্ষ সে রাগে রঞ্জিত হয়, নদী-নীর চূর্ণ হীরকের মত উজলিয়া উঠে, সন্ধ্যার উজ্জ্বল বর্ণে ; রূপমুগ্ধ কবি ভাবে বিরলে বসিয়া এ বুঝি দেবীর ২ প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন রূপ—একি প্রহেলিকা! সুন্দর বসন্তে যবে বসুন্ধরা শুভ্র চন্দ্রালােকে, কুহু- রবে মত্ত ত্রিভূবন ; ফুটন্ত মল্লিক। মধুগন্ধে কেড়ে নেয় মানবের প্রাণ, মলয় সমীর জগতেরে উদাসীন করে—ভাবুক নীরবে আঁকে প্রকৃতির সেই রম্য রূপে আপনার ভাবতুলি দিয়া কমলার উজ্জ্বল মূরতি, শান্তি কান্তি মাধুরীতে ভরা। এইরূপে মন- গড়া আপনার মত কল্পনায় একে বসে দেবতার কায়া-একি ভ্রম নহে ? বীরেন্দ্র—তােমারে বুঝাতে নারি। শিখিয়াছ বহু কথা ; বাক্যজালে সত্যেরে চাপিয়া রেখে জগতের চোখে ধুলি দিতে চাও। হেরি বিশ্বরাজ্য, রাজারে কি মনে নাহি আসে ? তৃণ হ’তে ব্ৰহ্ম আদি জগতের যাহা কিছু, একভাবে অঙ্গুলিসঙ্কেতে স্রষ্টা যিনি তাহারে দেখায়-বুঝেও বুঝ না ভ্রান্ত তুমি।

উদ্বোধন [প্রথম দৃশ্য ধীরেন্দ্র ভ্রান্ত আমি বুঝেও বুঝি না ! কে আছে আমায় বুঝয়ে দেবে কুটিল বিশ্বের রীতি ? ধন ক্ষ্যাপার প্রবেশ (গান) যার কপালে যেমন বুদ্ধি ভাবনা তার তারি মত আমার সােণার ঘরে ও আমার মন থাকনা কেন প্রেমে রত । ভাবনা কেন তাের সারা বেলা, দুনিয়ায় কেউবা গােরা কেউ বা কাল মােহন বাশী বাজছে সদা, শুনেও তুমি বুদ্ধহত। বাঁশী বাজে সাঝে সকালে, শােনে এরা দিন ফুরালে তুই বাঁশীর রাগে অনুরাগে মেতে থানা অবিরত। হেথায় কেউবা রাজা কেউবা প্রজা, জন্ম অন্ধ সে পাচ্ছে সাজা তাের কারিকুরির বলিহারি, পাগল আমি বুঝব কত। পাগলের ত দিন ফুরাল, কালের কোলে দেখা আলাে পরলােকের নাচ দুয়ারে বাজার্স বঁাশী মনের মত। >;" - [ প্রস্থান ] ধীরেন্দ্র- কেএ.'উম্মাদ রহস্যের । --- ছলে সংশয়ের সব তারে হেনে গেল প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন ভীষণ অশনি, আজন্মের যত মম সঞ্চিত ধারণা, কঠিন প্রস্তর সম ছিল রুদ্ধ হৃদয় মাঝারে, একে একে টুটিল সকলি, ধবল তুষার যথা গলে’ পড়ে গিরিশির হ'তে। বােঝহীন মুক্ত হৃদিমাঝে ফুটে উঠে কার যেন জ্যোতিষ্ময় পবিত্র মূরতি। দূর কর বৃথা চিন্তারাশি। এ বিপুল বিশ্বরাজ্য- মাঝে কত ক্ষুদ্র কত হীন উন্মাদের অর্থশূন্য প্রলাপবচন—যাহে টলে আপনার হৃদয়বিশ্বাস, যুক্তিবলে যাহারে রেখেছি বুকে প্রাণের অধিক করি। পরলােক ! স্বার্থপর সমাজের মনগড়া বিধি ! বীরেন্দ্র বুঝে দেখ ভাল করে ধীরেন্দ্র—( বাধা দিয়া ) রাখ তব বাক্যছল। হের প্রকৃতির হাসি। উদিল আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ হাসায়ে মেদিনী শ্যামা। চল যাই গত-

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বাদ্যে মাতাই চঞ্চল মতি, ভুলে যাই
জগতের যত কিছু আছে কূটনীতি।
[ উভয়ের প্রস্থান }
দ্বিতীয় দৃশ্য
রামধন বসুর চণ্ডিমণ্ডপ
রামধন ও রাখাল।
রামধন—ওটি আমা হতে হবে না। টঙ্কা প্রতি দুই
আনা, এ তো বেশী ব্যাজ নয় ; পঁচিশ টাকায় প্রতি
মাসে তিন টাকা দু’ আনা, বছরেতে হ’ল গিয়ে
সাঁইত্রিশ টাকা অষ্ট গণ্ডা পয়সা। বাপু, কড়ায়-
গণ্ডায় সুদে-আসলে মিটিয়ে দিয়ে বাড়ী চলে যাও।
হরি, হরি, কি দায়েই পড়েছি।
রাখাল—কৰ্ত্তা, আমি গরীব। ফসল কুটো জল বিনে
জ্বলে গেল, তা না হলে কোন্ সনে টাকার জন্যে

প্রথম অঙ্ক ]
উদ্বােধন
আপনার পায়ে পড়ি ? গত সন কর্না ফসল বেচে
মায় সুদে-আসলে সব শুধে গেলুম। দেবতায় না
মেলে এত কথা আপনাকে বলতে হত না।
রামধন-বাজে কথা রাখ, রাখাল। টাকা থেকে টাকা
করেছি—কোটা বানিয়েছি, বুদ্ধির জোরে গ্রামের
ভেতরে দশটার মধ্যে একটা হয়েছি, আমায়
ঠকাতে তুমি পাবে না।
রাখাল—ঠকাঠকির কথা এর ভেতর কিছু নেই।
সন আসল নিয়ে সুদের রেহাই আমায় দিতেই
হবে।
রামধন—তাের জোর নাকি ? প্যাজি ব্যাটা,ছুচো ব্যাটা,
যতদূর মুখ ততদূর কথা ! হারামজাদার আস্পর্ধা
দেখ ! টাকা দিয়ে আমি যেন চোর দায়ে ধরা
পড়েছি। কে আছিস্ রে, ব্যাটাকে থামে বেঁধে
জুতাে মা ত। ভূতাে, শুনে যা। ব্যাটা-
ভূতনাথের প্রবেশ
রামধন—বল্ ব্যাটা টাকা দিবি কি না?
রাখাল-কর্তা, আমি টাকা না দেবার কথা কচ্ছি কি ?
৭

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
সুদ দিতে এ সন পারব না। আপনি মা বাপ,
আপনার করুণায় করে খাই, মিছে কথা আপনার
কাছে কইব না ; ফসল যা হয়েছিল বেচে কিনে
দশ গণ্ডা টাকা হ’ল না, আসল শুধে সোঁত বছরের
খরচ রাখতে টানাটানি হচ্ছে।
রামধন-ওরে নচ্ছার নেমকহারাম জুয়াচোর, টাকা
ঘরে পুরে আমার কাছে নাকে কেঁদে ফাঁকি দিতে
এসেছিস্? ভূতাে, ব্যাটার পিটে দশ কোড়া লাগা
ত, জ্বালার চোটে বাড়ী ঘর বেচে টাকা শুধবেই
শুধবে।
ভূতনাথ–কি কও?
রাখাল—হা আল্লা, আমায় মানুষ করে কেন পাঠিয়ে-
ছিলে ? এর চেয়ে বলদ হওয়া ছিল ভাল।
রামধন-বাজে কথা ছাড়, মার খেয়ে গতর যাবে।
মানে মানে এখন টাকা দে, না-হয় ফসল তুলে
আমার উঠোনে- ফ্যাল, বেচে কিনে যদি বাড়ে,
বাড়তি টাকা তুই পাবি।
রাখল—বারে বারে সে ঠকেছি, কৰ্ত্তা। গতর খাটিয়ে
রােদ জল সয়ে মাঠে পড়ে পেটের খােরাক বার
৮

প্রথম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
কবতে পারিনে। আমায় মারুন আর রাধুন, এই
পঁচিশ টাকা রইল, বেগুণ বেচে সুদের টাকার কিছু
শুধে যাব।
রামধন-ভূতত, ধর ব্যাটাকে। ক’ ব্যাটা ব্যাপারী
জুটে চাষার পােদের মাটি করেছে।
(ভূতনাথ রাখালের হাত ধরিল )
রাখাল-হুজুর ছাড়তে বলুন—এ কোম্পানির বাজ্যি,
টাকা ধারি, ইংরেজের কাছারি আছে।
বামধন—বটেরে শালা-
(ভূতনাথ রাখালকে প্রহার করিল)
=
রাখাল-ওরে বাপরে, খুন করলে রে।
ধীরেন্দ্রের প্রবেশ
ধীরেন্দ্র—একি ! পিতা, একি অত্যাচার ? একে জীর্ণ
অনশনে, শীর্ণকায় দারিদ্র-পীড়নে,
তার পরে এত অত্যাচার ! হায় অর্থ !
রাখাল–বড় বাবু, রক্ষা করুন।
ধীরেন্দ্রভূতনাথ, শুন কথা, ছেড়ে দাও ওরে।
চিরদুঃখী জনে এ শাসন কেন পিতা ?

উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য রামধন—কেন’র উত্তর নেই। সংসার ত মাথায় নেই তা হলে বুঝতে। ভূতত, খবরদার ছাড়িনে ব্যাটাকে—মার শালাকে ! রাখাল-হুজুর ! ধীরেন্দ্র—এই কি সংসার! সংসার কি জগতের এত নীচ, এত দয়াহীন, এত স্বার্থ- প্রিয় নির্মম অধম ! কেঁদে মরে এক- দিকে শক্তিহীন প্রজা, প্রবলের অন্য- দিকে ঘাের অত্যাচার, একদিকে আর্ত- কণ্ঠে করুণ ক্রন্দন, অন্যদিকে স্বার্থে ভরা কুটীলের হাসি। তাই বটে! অতি ক্ষুদ্র শিশু হ’তে অতি বৃদ্ধ বুদ্ধিমান পণ্ডিত অবধি শুধু আপনার দিকে চায়, অপরের কত দুঃখ কভু নাহি দেখে। এই যে দরিদ্র, অনশনে কাটে যার অর্ধেক জীবন, ক্ষুদ্র জীর্ণ গৃহ তৃণশূন্য, বরষার জলে ভেসে যায় কুটীর অঙ্গন, আতপের তাপ নাহি সহে, পুত্ৰ পরিজন লয়ে অতি কষ্টে ১০ প্রথম অঙ্ক) উদ্বোধন করিতেছে জীবন যাপন। আর আমি মুনিজন-মনােলাভা রম্য কমাঝে বিলাস-পঙ্কিল-পক্ষে রাজভােগে আছি, বারেকের তরে ভাবিনে স্বপনে কভু কার শ্রমে করিতেছি এত সুখ ভােগ। ওরে ওরে সরল কৃষক, এ সকলি তােরই পরিশ্রমে, তােরই প্রতি রক্ত- ধারা পরিপুষ্ট করে আমাদের। চূর্ণ করি দেহষ্টিখানি, ঘাের পরিশ্রমে নিয়ত আছিস রত বিলাসীর অর্থ- সমাগমে। পিতা, পিতা, ছেড়ে দিন এরে, এর ঋণ আমিই করিব পরিশােধ। রাখাল-বড়বাবু, বড়বাবু, দয়ার সাগর- রামধন—থাম্ ব্যাটা, বড়বাবু তাের বাবা ! ওরে বােকা ছেলে, পয়সার কাজে দয়া করতে নেই। শালা, টাকা দিবি কি না? ( রাখালকে পুনরায় প্রহার ) ধীরেন্দ্র—অতি অত্যাচার! এস তুমি হে দরিদ্র ভারতের ভিত্তিভূমি, তােমারে দেখিনি ১১ উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য বলে’ দিনে দিনে শক্তিহীন মােরা, ওরে উপেক্ষিত, তােমাদের নীরব ক্রন্দন হাহাকার করিল সৃজন, শস্যপূর্ণ। বঙ্গভূমি মরুময় শ্মশানের প্রায়। [ রাখালকে লইয়া ধীরেন্দ্রের প্রস্থান ] রামধন-হারামজাদা ভূতাে, ছেড়ে দিলি ! একটার তরে সব শালা বিগড়ে দাড়াবে । টাকায় দু’ আনা ব্যাজ ইংরেজের আদালতে গ্রাহ্যই কববে না। বাপ- পিতামহ এমনি করে কারবার চালালে, আর এ ব্যাটা কলির পেস্লাদ, ধন্মের মাদুখুড়াে, ব্যবসা বুঝলে না। হরি, হরি, যা শালা, হুতুমের মত আর দাড়িয়ে ভাবতে হবে না। যাঃ! ভূতনাথ-(স্বগত) এমন বাপের অমন ব্যাটা! [ ভূতনাথের প্রস্থান ] রামধন-হরি, হরি। যাই জপে বসি গে । হা গুরু- দেব! হরি, হরি। [ প্রস্থান } ১২ প্রথম অঙ্ক ? উদ্বোধন তৃতীয় দৃশ্য বীরেন্দ্রনাথের বৈঠকখানা বীরেন্দ্র ও সুধীর বীরেন্দ্র—( সুরা পান করিতে করিতে) দেখ সুধীর, আমরা স্ত্রীজাতির প্রতি যথেষ্ট সমাদর করি না, এটা যে সমাজের মধ্যে কত বড় দোষ, তা তােমায় কি বলব। মানুষ হয়ে জন্মালে কি হবে ? হত- ভাগা দেশের দোষে বঙ্গরমণীরা পশুর অধম হয়ে আছে। না আছে শিক্ষা, না আছে স্বাধীনতা, না আছে তাদের মনে এতটুকু ধৰ্ম্মভাব। শুধু অন্ধকার, নিবিড় অন্ধকার,ঘাের অসভ্যতা, পাশবিক অত্যাচার ! সুধীর—Capital, Capital, নাও বাবা ওটুকু খাও, গেলাস দাও। ( বীরেন্দ্র মদ্য পান করিলে পর সুধীর গ্লাস লইল ) বীরেন্দ্র—সুধীর, সুধীর, দুঃখানলে ফেটে যায় প্রাণ। হায় ভগিগণ ! পিঞ্জরে আবদ্ধ বন্য বিহঙ্গিনী মত চেয়ে আছ বজে }

উদ্বােধন
[ তৃতীয় দৃশ্য
।
গড়া পুরুষের মুখপানে, জীবনের
সব আশা করিয়া নির্ভর। ওহহ! সে যে
নিৰ্ম্মম কঠোর অতি, অতি অর্বাচীন।
কে বুঝিবে মরম বেদনা তব। হায়
ভগ্নী শ্বেতদ্বীপে চল চলে যাই, হেথা
আর কিবা প্রয়ােজন। দরিদ্র ভারত।
“স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় !”
সুধীর—এ কি বাবা ? এক গেলাসেই দেয়াল দেখছ।
কোখেকে কোথায় বাবা ! গুজার দিল্লী যেতে
যেতে একেবারে উলুবেড়ে !
বীরেন্দ্র—হাঁ হাঁ, বছিলুম, সুধীর এটা করূতেই হবে।
দেশকে enlightened করতে হলে আগে
Female education দিয়ে তাদের স্বাধীনতা
দিতে হবে। চিরকাল তাদের দাসী করে রাখলে
ভগবানের চক্ষে আমাদের মহাপাপে পড়তে হবে।
সুধীর-না বাবা, অন্য আড্ডার সন্ধান দেখতে হল।
তােমার খাপছাড়া আজগুবি খেয়ালের মর্ম উপলব্ধি
করূতে করতেই আমার নেশার দফা গয়া হল।
একটু থামােনা বাবা। (মদ্যপানের উদ্যোগ )
১৪

প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন বীরেন বাবু, বীরেন্দ্র—শােন, শােন্, অসভ্য বর্বর, দেখ, চেয়ে সারা বিশ্ব পানে-“সবাই উন্নত, সবে ভাসে জ্ঞানের আলােকে, ভারত কেবল ঘুমায়ে রয় !” সুধীর-—“অসভ্য জাপান তারাও স্বাধীন, তারাও প্রধান, ভারত শুধুই পিছায়ে রয়!” বীরেন্দ্র—এ কি ? সুধীর—কেন? আমি কি কিছু জানি না। বীরেন্দ্র -সুধীর, দেশের কথা কি এক মুহূর্তও ভাব না ? সুধীর—না বাবা, বেয়াড়া করে তুলে। ওসব তােমায় ভাবতে টাবতে হবে না, তােমায় ত আমি জানি—চাও বাবা, চালাও- বীরেন্দ্র—সুধীর, তুমি কি মনে কর আমি তােমার মত অপদার্থ ? সুধীর—আরে বাপরে! কে বলে ? যাক, নেশা জমে নি। ( মদ্যপানের উদ্যোগ ) বীরেন্দ্র–(সুধীরকে ধরিয়া) শোন, দেশব্যাপী একটা প্রবল আন্দোলন করে তুলতে হবে। Female education চাইই। ঈশ্বরের বিধানে এমন স্বার্থ- পরতার কথা কখনই লেখা নাই।

উদ্বােধন [ তৃতীয় দৃশ্য সুধীর-( বিরক্তির স্বরে) না বাবা, তােমার খাট রইল ; তােমার সঙ্গে পােষাবে না। বাঘে নেয় সে ভালাে, বাঘ সেজে যে হুমকি দেখায় সে প্রাণে সইবে না। দেখ বীরেন, আমি সিদে লােক, খােমােদ করে যে মদ মারতে আসি তা মনে কোরাে না; ছেলে বেলার বন্ধুত্ব, দেখছি বাপেক পয়সা বরবাদে দিচ্ছ, কাজেই যাতে তার সদ্ব্যবহার হয় অর্থাৎ আমার মত ভদ্রলােকের, বুঝেছ- ' (পুনরায় মদ্যপানের উদ্যোগ ) বীরেন্দ্র—আগে বল আমার কথাগুলো সত্য কি না ? এই যে দেশের সুধীর—( গেলাস রাখিয়া ) রইল তােমার গেলাস। দেশের কথা তোমার মুখে সাজে না। ব্রাহ্মসমাজে ঢুকেছ, বেশ করেছ। যার চরিত্র নেই, তার বলতে কিছু নেই, দাড়াবার স্থানটুকু নেই। ধীরেন আমরা সােণার চরিত্র খুইয়েছি। সমাজের এক কোণে অন্ধকার পানে নর্দমার ধারে আমাদের পড়ে থাকাই শ্রেয়; তাই তােমায় বলি ওসব বার- ১ .

প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন ফট্টাইগুলো ছেড়ে দাও—আমরা দেশের কোন কাজেই লাগব না। হরকরার প্রবেশ ও বীরেন্দ্রকে পত্র দিয়া প্রস্থান বীরেন্দ্র—( পত্রপাঠ করিয়া) মূৰ্থ, এই দেখ দেশমাঝে আমাদের কত বড় প্রতিষ্ঠা লাভ হয়েছে। আগামী রবিবার এক ধৰ্ম্মসভা হবে, আমায় তা’তে সভাপতি নির্বাচন করেছে। সুধীর—এইবার বুঝিলাম অধঃপাতে গেছে ধৰ্ম্মভূমি। তাই বটে! তা না হলে যেই দেশ এক কালে ধনধান্যে কমলার অক্ষয় ভাণ্ডার ছিল, এবে অন্নহীন মরুভূমি কেন হবে? বিদ্যার গৌরবে ছিল উচ্চে ভারতের নির্দিষ্ট আসন, জননীর পাদমূলে শােভিত পণ্ডিত- জন ভবভূতি কালিদাস সম ; এবে অজ্ঞানের অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন সারা দিক ; ধৰ্ম্মের মন্দিরে তােমারে বরিল লােকে সভাপতিপদে ? নরকের দ্বার • ১৭ [ 2 ] উদ্বোধন [ তৃতীয় দৃশ্য বুঝি খুলিয়া দিয়াছে সয়তান ! পুণ্য- পীঠ এ ভারতের পর্বে পর্বে করিয়া আশ্রয়, পাপ বুঝি সৃষ্টি নাশে হয়েছে উদ্যত, তাই হেরি অসদৃশ ঘটনা এমন। হা ধিক! অন্ধ আঁখি দেশবাসী, ভণ্ডজনে সাধুর সম্মান করে—হায় ধৰ্ম্মহীন বঙ্গভূমি রসাতলে গেল ! [ প্রস্থান ] বীরেন্দ্র—ফেটে মরে গেল, ঈর্ষায় ফেটে মরে গেল। যা মদ্যপান দোষটায় একটা ঢাকা দিয়ে দিতে হবে, তা না হলে আচাৰ্যই হওয়া যাবে না। কথাটা প্রকাশ হতেই বা কতক্ষণ, আর যে সুধীর, ঢাক বাজিয়ে দেবে। তার পর fine art-এর মত ভেতরে যাই থাক্ না, সে আর কে দেখতে আছে বল। আর মদ খাওয়া, health এর জন্যে। ১৮ প্রথম অঙ্ক ) উদ্বােধন চতুর্থ দৃশ্য পথের একাংশ নীলমণি নীলমণি—না বাবা, আজ আর নেশার জোগাড় হল । হাত টান, তার সকল দিকেই টান। কি পুখুরি করেই এ ব্যবসা সুরু করেছিলুম, বুকের দুড় দুড় নি ত আছেই, তার ওপর ধরা পড়লে গােবেড়েন পিটুনি। তাইত করা যায় কি ? নিদেন ছটা পয়সা ত চাই। গাজায় রস নেই, বেজায় বেয়াড়া নেশা। হয়েছে, হয়েছে, এক ব্যাটা মাতাল না? রাত ও অনেক হয়েছে, রাস্তায় লােকজনও বড় একটা নেই। সহজে সুবিধা না হয় শেষকালে বল- প্রয়ােগ। সুধীরের প্রবেশ সুধীরকে বাবা ! মামার মতন নয়। নীলমণি-আজ্ঞে হ্যা। (সুধীরের পকেটে হাত দিবার উদ্যোগ )

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
সুধীর-বাঃ বাঃ বড় মিশুক ত।
( নীলমণি সুধীরের পকেট হইতে ব্যাগ তুলিয়া লইল )
এস বাপ খাটি খাওয়াই (নীলমণির হস্ত ধারণ )
এ কি পেঁচি মাতাল পেয়েছিস্? পাহারাওলা !
পাহারাওল !
( নীলমণির বলপ্রকাশ)
সুধীর হচ্ছে না চঁদমণি, এখানে জোর খাটছে না।
পাহারা ওলা-
নীলমণি–দোহাই মশাই, ছেড়ে দিন। বাজে কেন,
কিছু ত হাতাতে পারি নি।
সুধীর—কোথায় এসেছি জানি ? ব্যাটা আনাড়ি !
ছাড়া হচ্ছে না। পাহারাওলা ?
( নেপথ্যে কোলাহল )
কিসের গােল ?
জনৈক ব্যক্তির প্রবেশ
সুধীর-কিসের গােল মশাই ?
আগন্তুক—একটা বুড়াে গাড়ি চাপা পড়েছে। গাড়ি-
খানা হাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল। এক ব্যাটাও বিটের
কনেষ্টবল নেই-যাই থানায় খবর দিয়ে আসি।
২
.

প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন পায়ের উপর দিয়ে গাড়িখানা গেছে, বুড়াে পড়ে কাতরাচ্ছে। [ প্রস্থান ] (সুধীর ও তৎপশ্চাৎ নীলমণির প্রস্থান। একটি বৃদ্ধকে ধরাধরি করিয়া সুধীর ও নীলমণি পুনরায় প্রবেশ করিল। বুদ্ধকে মাটিতে রাখিয়া ) সুধীর—তাইত, রাতও অনেক হয়েছে—পাড়ার লােক- জন সব ঘুমুচ্ছে—কলেও জল নেই। এখন জলই বা কোথা পাওয়া যায় ? নীলমণি-দাড়ান, আমি জোগাড় দেখছি । [ প্রস্থান ? বৃদ্ধ-বাবা গাে ?- সুধীর—ভয় নেই। আঘাত বড় বেশী নয়, বেঁধে দিলেই যন্ত্রণা কমবে। কনেষ্টবল এলেই হাঁস- পাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ( জল লইয়া নীলমণির প্রবেশ) একটু ছেড়া ন্যাকড়ার দরকার। নীলমণি—নি না। ( নিজের কাপড় হইতে খানিকটা ছিড়িয়া দিল ) সুধীর—আহা করেছ কি ? তুমি গরীব- নীলমণি-আজ্ঞে ছিড়ে ফেলেছি, আর কি হবে। ২১

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
সুধীর( বৃদ্ধের পায়ে কাপড় জড়াইয়া দিয়া) চল,
এইবার আস্তে আস্তে একে পৌছিয়ে দিই, ব্যাটার
কখন যে আবে তার ঠিক কি ?
নীলমণি—এই যে এসেছে, একখানা ঠিকে গাড়ীও
এনেছে। চড়িয়ে দেওয়া যাক।
( বৃদ্ধকে লইয়া সুধীর ও নীলমণির প্রস্থান।
কিছুক্ষণ বাদে উভয়ের পুনঃ প্রবেশ)
সুধীর—শােন, তুমি যে পালালে না?
নীলমণি-আজ্ঞে এমন বিপদ দেখে পালাতে ইচ্ছে হল
।
সুধীর—তুমি চুরি কর কেন ?
নীলমণি-ব্যবসা।
সুধীর—ও ব্যবসা ছেড়ে দাও।
নীলমণি—আজ্ঞে, ব্যবসা কি বন্ধ দিতে আছে ?
সুধীর—আমার কথা শােন, চুরি করা মহাপাপ, ও
ব্যবসা ছাড়। তােমার প্রাণ আছে, তুমি অতি
উদারচোরের হৃদয় এত বড় আমি তা জান্তুম না।
নীলমণি—আজ্ঞে মদ খাওয়াও ত পাপ,আপনি ত তােফা
গােলাপি নেশায় ভরপূর। ও-সব বাজে কথা ছেড়ে
২২

প্রথম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
=
দিন, যার যা বিদ্যে সে কি তা ছাড়তে পারে ?
আমার ঐ হ’ল দিন গুজরানের উপায়, ও বন্ধ করলে
আমায় অনাহারে মরুতে হবে।
সুধীর সত্য কথা। এই টাকা নাও, আমি তোমার
কাজে সন্তুষ্ট হয়েছি।
নীলমণি—আমি ভিখিরি নই, আর কাজটাও আপনার
করি নি। অমন দু দশটা কাজ প্রায়ই করে থাকি,
তার পুরস্কারের আশা আমি রাখি না। ইচ্ছে
করলে এমন কাজ করে আমি অনেক পয়সা
রােজগার করতে পারতুম, কিন্তু তা কব না।
দরিদ্রই উপকারের আশা করে, ধনীদের বিপদে
অনেক মােসাহেব জোটে। একটা লােক মরুলে
বাবু ভায়েরা কঁধ দেয়, গরীবের মড়া কেউ ছোঁয়ও
। উপকারের পুরস্কার নিতে হলে যাদের দুবেলা
পেট ভরে’ অন্ন জোটে না, তাদেরই ঘাড় ভাঙতে
হয়, ওতে আমি রাজি নই। চুরিই শ্রেয়ঃ, এতেই
চালাচ্ছি, এতেই চলে যাবে-ধরা পড়ি, জেল
খাব, তা’ ও বার কতক হয়েছে।
সুধীর—অদ্ভুত প্রকৃতি।
২৩

উদ্বোধন
[ পঞ্চম দৃশ্য
নীলমণি—ভিক্ষা করুব না, অপদার্থ ই ভিক্ষা করে
থাকে। চুরি করি অপদার্থ বলে’ নয়, এতেও শিক্ষা
আছে, যে-সে চোর হতে পারে না। আর কি
জানেন ? একটা অভ্যাস—হাজার টাকা আপনি
আমায় হাত তুলে দিন, আমার নিতে কুণ্ঠা হবে,
কিন্তু পকেট মেরে অনায়াসেই নেব, তা’তে সুখ বৈ
মনে দুঃখ হবে না। যান মশায়, বাজে সময় গেল,
পয়সার যােগাড় দেখি।
[ প্রস্থান ।
সুধীর--দুনিয়ায় অনেক রকম লােক দেখেছি, এর
ভেতর কিন্তু একটু বিশেষত্ব আছে। সংসার
বােঝা দায়, বুঝতে মাথা ঠিকরে যায়।
পঞ্চম দৃশ্য
নদীতীর
ধীরেন্দ্র
ধীরেন্দ্র— ওয়ি স্রোতস্বিনি ! বহ কি আপন মনে
কিম্বা কেহ জীবের মঙ্গলতরে বলে
২
3

প্রথম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
;
দেছে গােপনে তােমার কাণে, প্রাণপণে
করিবারে পর উপকার। আপনার
হৃদিগত পুণ্যবারিদানে, সুশােভিছ
তটভূমি শ্যামল অঞ্চলে ; ফলফুলে
হাসাও মেদিনী। স্নেহময়ী মা যেমন
নিরখে শিশুর মুখে স্বর্গের সুষমা-
মাখা প্রাণপােরা হাসি, হৃদয়ের সুধা-
ধারা যতনে প্ৰদানি’-শ্যামলা ধরণী
মাগাে, তােমারি কল্যাণে। কহ দেবি কোন্
জন ধরণীর রাজা ? সংশয়ে দুলিছে
প্রাণ, অবিরাম হৃদিমাঝে বহিতেছে
ঝটিকা বিষম, প্রলয়ের কালে যথা
পৃথিবীতে পবনের তাণ্ডব নৰ্ত্তন।
জগতের জ্ঞানে এপ্রশ্নের সদুত্তর
মিলিবে না জানি। বৃথা এ ভাবনা। কোন্
দিন চিন্তাকীট দংশিবে জ্ঞানের মূলে,
উন্মাদ হইয়া যাব, অন্ধ বিশ্বাসের
বশবর্তী হয়ে হেরিব কুহকরাজ্য,
মেনে লেব দেবতার পবিত্র আসন।

উদ্বোধন
[ পঞ্চম দৃশ্য
, না, তাহা কভু হইবে না। চমৎকার
এ ভুবন যদি কেহ করেছে সৃজন,
মহাজন অদ্ভুত পুরুষ তিনি। আমি
তার করে গড়া, অবশ্যই স্নেহধারা
নিয়ত বর্ষিছে শিরে। সৰ্ব্বস্ব তেয়াগি”
ধাই যদি তাঁর দিকে, অতুলন
সেই
এ বিশ্বের রাজা করুণায় কোলে তুলে
লইবে নিশ্চয়। কিন্তু কে মিটাবে মম
সংশয় বিষম ? কার এ মধুর কণ্ঠ ?
ধনা ক্ষ্যাপার প্রবেশ
ধনা-
(গান)
এ যে বাধে বিষম বেড়া।
পাগল মনের দফারফা, বদ্ধভূমি আগাগােড়া।
ধ্যান ধারণায় ও আমার মন চিত্তশুদ্ধি করে নেন,
তাের হৃদাকাশে উঠবে ভেসে সােণার কমল তা জাননা।
তখন সংশয় বাধন হবে খতম, মনটি রবে সদাই ঘেরা,
( তােমার ) ছুটোছুটি যাবে ছুটে, বলরে মুখে তারা তারা।
| প্রস্থান ]
ধীরেন্দ্র চিত্তশুদ্ধি ? কিসে হবে চিত্তশুদ্ধি ? ধ্যান
ধারণায় ? হতে পারে। কিন্তু সংশয়ের

প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন অন্ধকারে আবৃত হৃদয় বুঝিতে না পারি কার ধ্যানে হব রত, ধারণায় কাহাকে রাখিতে হবে। পৃথিবীটা যেন কিছু নয় সব শূণ্ঠ, মিথ্যা মায়াভরা। নিদাঘ-মধ্যাহ্নে সাহারার অন্তহীন মরুভূমিমাঝে তপ্ত সূৰ্যে শুকণ্ঠ হইয়া পথিক প্রজ্জ্বলিত মরীচিকা। হেরি ধায় নদী ভ্রমে, অবশেষে কত বার প্রতারিত হয়ে ত্যজে শান্ত দেহ, প্রাণবায়ু মিশে যায় অনন্ত পবনে। সেই মত সুখের আশায় এ সংসারে যে দিকে ফিরিয়া চাই, হেরি চক্ষে ছবি নৈরাশ্যের, টুটে যায় সুখের স্বপন, দারুণ দুঃখের ভারে দেহ ভেঙে যায়। পিতামাতা স্নেহের বন্ধন খসে পড়ে আঁখির নিমিষে, পুত্র-পরিজন কেহ কার না হয় আপন, সব জন মােহ- ডােরে বাঁধা। আমিও ত নহি আপনার। এ শরীর মিশে যায় ধূলারাশি মাঝে, উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য আমি বলে’ কাহারে বা করিব যতন ! সব বৃথা! সকলি অলীক ! সত্য কিছু নাই ? না, এও কি হইতে পারে ? এই যে ভুবন পরিপাটী অলঙ্কৃত বিবিধ ভূষণে, গিরি-নদী প্রস্রবণ বিচিত্র- দর্শন, কুসুমিত বনভূমি, সাগর- মেখলা, সুদর্শন সীমাহীন সুনীল গগন, কোটী কোটী গ্রহতারা, প্রদীপ্ত ভাস্কর, সবই মিছে ? ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণু পরমাণু এক সঙ্গে মিশে গড়িতেছে প্রতিদিন সুন্দর শরীর, কীট হতে মানব অবধি ; বিমােহন উষা-ছবি, সন্ধ্যারাগে উজ্জ্বল গগন, জ্যোছনায় মাখা সুশােভন চঁদিনী রজনী, প্রতি দিন প্রকৃতি দেখায় ভবে যত লীলা খেলা, সকলি কি অর্থহীন কুহকের ছবি ? আৰ্য ঋষিগণ অসার সংসারে দু’ দিনের তরে এসে গড়েছেন এত বিধি কিসের কারণ ? সদাচার যাগ ২৮ প্রথম অঙ্ক ] উদ্বোধন যজ্ঞ ইন্দ্রিয় সংযম মানবের আছে যত সাধনার ধন, মিছে যদি এই ত্রিভুবন, কি কারণ সাধনায় তবে? ধনা ক্ষ্যাপার পুনঃ প্রবেশ ধন- ( গান ) ঘুচে গেল ভবের বন্ধন, ফাঁদ থেকে তুই সরে আয় এ যে লােহা দিয়ে বিধির বাধা, সােজায় কেউ কি ছাড়ান পায়। ধীরেন্দ্র-কে তুমি হে অজ্ঞাত পথিক, চপলার মত চকিতে দর্শন দিয়ে, অন্ধকার হৃদয়-মন্দিরে শুভ্রজ্যোতিঃ পরকাশ কর? ধনা- (গান) আমি ক্ষ্যাপা ভবঘুরে, কেউ ফেরে না আমার সাথে । আনের বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে চলেছি এই সােজা পথে। ধীরেন্দ্র- ওহে মহাজন, শুধাই তােমারে এ সংসারে সত্য কিছু আছে কিনা ? ২৯ উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য ধনা— সত্য। ছিনু গৃহবাসী, হয়েছি উদাসী, দেহ মন সঁপিয়াছি অপরের পায়, আমি বলে’ অহং-এরে করেছি বিদায়। ফিরি নিত্য, নিত্য যেথা জীবের অস্তিত্ব করে ক্ষয়, ধনী মানী পথের ভিখারী সম- ভাবে পায় ক্রোড়, মায়ার ক্রন্দন শূন্যে মিশে যায়, মহাকাল তাথিয়া তাথিয়া নাচে, পঞ্চভূতে করে হুড়াহুড়ি, তবু সত্যে না পাই দর্শন। আর তুমি অন্ধ নর, ঘুরে মর মােহ আবর্তনে, প্রতি পদে নিয়মের বেড়া, শিহর মৃত্যুর কথা হইলে স্মরণ, তুমি চাও সত্য দেখিবারে ? সত্য শিব, সত্যই সুন্দর, অবিরত ভ্রমে ক্ষ্যাপা সত্যের সন্ধানে। ৩০ দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য ছাত্রাবাস মেসের ছাত্রগণ ১ম ছাত্র যাই বল লেকচার খুবই ভালাে হয়েছে, এ না বললে চলবে না। তবে subject বড় শক্ত, আমরা ভালাে বুঝতে পারি নি, আর না বুঝলে ও-নিয়ে তর্ক করা যায় না। ২য় ছাত্র-তুমি থামাে। আমার কথা শােনাে, বীরেন্দ্র- বাবু ধাৰ্মিক বিদ্বান্ বক্তা, তাই বলে তিনি যা বলবেন, সেইটাই ত অভ্রান্ত সত্য হতে পারে না। ১ম ছাত্র–ধাৰ্ম্মি কই কিসে বাবা, একটি কুস্মাণ্ড, একটি অপদার্থ। যথার্থ যদি ভণ্ডের Incarnation দেখতে চাও, ত সে ঐ বীরেন্দ্রবাবু। ৩য় ছাত্র“তুমি একটি আস্ত গাধা, নিন্দুক ! লােকের সবিশেষ না জেনে ও রকম কেচ্ছা করা কোনাে মতেই কৰ্তব্য নয়।

উদ্বোধন [ প্রথম দৃশ্য ১ম ছাত্র--আচ্ছা বাবু, তুমিই বা কেমন করে জানলে তিনি মস্ত ধাৰ্ম্মিক। তুমি ওঁর moral character study করেছ ? ৩য় ছাত্র—আমি ত তা বলিনি, আমি বলেছি বীরেন্দ্র- বাবুর বক্তৃতাটি সারগর্ভ হয়েছে, অনেক শেখবার আছে। আর বীরেন্দ্রবাবু যখন বলেন, তখন কেমন একটা উৎসাহের স্রোত বয়ে যায়। সবাইকে মুগ্ধ করতে পারেন, এ বড় কম ক্ষমতা নয়, এ-কথার প্রতিবাদ করূতে চাও? ১ম ছাত্ৰ-নেহাত মূখ তারাই ওঁর লেকচার শােনে। মানুষ কি আর ও সব শশানে ? চব্বিত চর্বণ মানুষে শুতে যায় না। ২য় ছাত্র–আঃ থামােনা তুমি, কেবল ঝগড়া বাধাবার জোগাড়ে আছ। Real argument কর না। First thing ঈশ্বর আছেন, এ সাৰ্বজনীন সত্য- কথা। তার পর তিনি, How to get Him এই নিয়ে অনেক বাক্‌বিতণ্ডা কলেন, কিন্তু বাবা এক বিন্দুও বুঝতে পালুম না।

দ্বিতীয় অঙ্ক ) উদ্বােধন ৩য় ছাত্র–কেন ? তিনি ত একথা অতি সরল ভাষায় বিশদরূপে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ২ছাত্র—আমার বাবা মাথাটি কিঞ্চিৎ মােটা, আমি তার কথা ভালাে করে appreciate করতে পারিনি। তুমি যদি বুঝে থাক, না-হয় আমাদের বুঝিয়ে দাও। ৩য় ছাত্র—তুমি attention দাওনি, সেটা ত তার দোষ নয়। তােমরা কথাগুলো ভালো করে’ understand না করে লােকের অনর্থক নিন্দা কর। রাজা রামমােহন রায়ের পর এই এক নবীন আলােক বাঙলায় দেখা দিয়েছে। এরই পবিত্র কিরণে দেশের অন্ধকারময় কুসংস্কার নিশ্চয়ই বিদূরিত হবে। ১ম ছাত্র—যাও বাবা, Duff College, এখানে তােমার স্থান হবে না। আমাদের অন্ধকারই ভালাে, ও আলো টালাের ধার ধারি না। ৩য় ছাত্র—তুমি বড় ছােট লােক। ১ম ছাত্র—সে তুমি, ছােট লােক! ইতর- ৩য় ছাত্র“দেখ রমেশ, মুখ সামলে কথা কোয়াে। ! [3]

উদ্বোধন
[ প্রথম দৃশ্য
১ম ছাত্র–কি মারূবে নাকি ?
২য় ছাত্র–কি আপদ, কথা হ’তে হ’তে শেষে হাতাহাতি
হবে নাকি ? রমেশ, তুমিই একটু থামােনা।
১ম ছাত্র--ওর যত বড় মুখ তত বড় কথা, বলে ছােট
লােক,—পাজি, গাধা!
৩য় ছাত্র -তাের বাবা-
১ম ছাত্র-তবে রে শালা-1.
( ৩য় ছাত্রের মুখে এক ঘুষি )
২য় ছাত্র-সৰ্ব্বনাশ ! ওহে থামনা, কি আপদ!
(১ম ও ৩য় ছাত্রে মারামারি করিতে লাগিল )
২য় ছাত্র-রমেশ, ছিঃ ছিঃ লেখা পড়া শিখে বুঝি এই
জ্ঞান হচ্ছে ?
(২য় ছাত্র মাঝে পড়িয়া উভয়ের মারামারি ছাড়াইয়া দিল।
পুনরায় ১ম ছাত্র ৩য় ছাত্রকে এক ঘুষি মারিল।)
৩য় ছাত্র-দেখ !
২য় ছাত্র—কৃগে, তুমি একটু স’য়ে যাও।
১ম ছাত্র-আমােদ করা হচ্ছিল—বীরেন্দ্রবাবুর বক্ত
খুব ভালো হয়েছে, এ কথা কে অস্বীকার করবে।
৩৪

দ্বিতীয় অঙ্ক )
উদ্বোধন
মূর্থ আমরা ও তর্ক কি কবুব, সংবাদপত্রে ত এর
মীমাংসা হয়ে গেছে।
৩য় ছাত্র—এ কথা বল্লেই হত! তুমি ধাঁ করে আমায়
মেরে বলে !
২য় ছাত্র—এটা তােমার অন্যায় হয়েছে।
১ম ছাত্র -আচ্ছা স্বীকার করলুম। ভাই হরিপদ
আমায় মাপ কর। আজ দিব্বি কলুম, আর যদি
কখন তর্কে থাকি।
২য় ছাত্র—যা এক পালা হ’ল। এটা ত নিত্য কৰ্ম্ম।
চল এখন স্নান করা যাগে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
বীরেন্দ্রের বৈঠক খানা
বীরেন্দ্র সংবাদপত্র পাঠ করিতেছিল
সুধীর প্রবেশ করিল
সুধীর—কি বাবা, নিজের কীর্তিকাহিনী পড়ছ—পড়,
পড়–খুব বাহাদুর বটে ! এখন বুঝলুম গলা-
বাজির সঙ্গে কাজের সম্পর্ক একটুও নেই।

উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য বীরেন্দ্র–দেখ সুধীর, গেঁয়ো যােগী ভিখ পায় না, কথাটি সত্য। তােমার সঙ্গে ছেলেবেলা থেকে একটু ইয়ারকি দিয়েছি, সুতরাং আমার অন্তর বাহির তােমার কাছে অবিদিত নেই, তাই বলে তুমি আমায় অপদার্থ মনে কোরাে না। ইংরেজী বিদ্যার মহত্ত্ব একটু আছেই আছে। রাজা রামমােহন রায় এই ইংরেজীটাকে হস্তগত করতে পেরেছিলেন বলে’ তার এত নাম ডাক। সুধীর—যাগে, ও-সব কথায় আর কাজ নেই। খাঁটি টটি আছে ? এই যে ( সংবাদপত্র তুলিয়া লইয়া পাঠ করিতে লাগিল ) “Under the auspices of the Banga Hindu Samaj, a public meeting was held on Sunday evening at the hall of the Samaj for the purpose of discussing Hindu religion. The meeting was largely attended by almost all the literary men of Bengal. Babu Birendra Nath Ghosh

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
Bravo!
was voted to the chair.**
Bravo! বেড়ালের ভাগ্যে ও শিকে ছেড়ে !
..
বেয়ারার প্রবেশ ও বীরেন্দ্রকে পত্র দান
বীরেন্দ্র-পত্র পাঠান্তে ) আনে দেও।
[ বেয়ারার প্রস্থান ]
বীরেন্দ্র -সুধীর একটু স্থির হয়ে বােসস।
ধীরেন্দ্র
আছে, ছোঁড়াটা বড় এক বগগা, আমায় একটু
ভালও বাসে, কেলেঙ্কারি কোরাে না।
সুধীর-কিছু না বাবা, তবে অনেকক্ষণ নিরিমিষ্টি
থাকতে হল।
ধীরেরেন্দ্র প্রবেশ
বীরেন্দ্র—এস বন্ধুবর।
ধীরেন্দ্র
আসিয়াছি, আসিয়াছি-
বীরেন্দ্র—এ কি উন্মত্ত হয়েছে নাকি?
ধীরেন্দ্র
আসিয়াছি
জিজ্ঞাসিতে দুটো কথা। সে দিনের উচ্চ
তত্ত্ব প্রকাশিলে যবে, যদিও সে অতি
পুরাতন তবু বেশ মিষ্ট লেগেছিল,
-
৩?

উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য মন্। আরবার শুনিবার সাধে আসিয়াছি। সথে। অধমেরে কোরাে না বঞ্চিত। বীরেন্দ্র—এ ত ভাল কথা, তার তরে কুণ্ঠিত হবার প্রয়ােজন ত নেই। সে দিনের বক্তৃতার সার মৰ্ম্ম, সত্য ধৰ্ম্ম কি। বর্তমান যুগে শিক্ষিত যার অর্থাৎ ইংরেজী পড়ে যারা পণ্ডিত হয়েছেন, তারা আমাদের কুলগত হিন্দুধর্মটিকে গ্রহণ করতে বড় রাজী বাস্তবিক, সাধারণ ধৰ্ম্মশিক্ষকেরা ধর্মকে যেরূপ মূর্তিতে পৃথিবীতে সংস্থাপিত করেছেন, তাহা বড় অপ্রীতিকর ও ভয়াবহ। উপবাস, প্রায়শ্চিত্ত, বৈরাগ্য, সকল সুখে বিরতি ধৰ্ম্মের মস্ত উপাদান। অষ্টমবর্ষীয়া বালিকার স্বামী যদি মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তবে সেই দুগ্ধজীবী শিশুকে ব্ৰহ্মচারিণী সাজে জীবন কাটাতে হবে। কি পাপ । এমনি করে অনেক দৃষ্টান্ত দেখান যেতে পারে, যাতে করে হিন্দুধৰ্ম্ম যে অসার, তাহা সুপ্রমাণিত হয়। আর দেখ খৃষ্টপ্রচারিত ধৰ্ম্মে কত সুখ ? জ্ঞানলাভ- হেতু সমস্ত পৃথিবীটা পরিভ্রমণ কর, জাত যাবার ভয় নেই, বরফ জল ছাতি ভরে পান কর, অসুখের

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বােধন
সময় ব্রাণ্ডি খাও, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না, সুতরাং
দেখতে দেখতে বাঙলার যত নামজাদা লােক
নাম লিখিয়ে খৃষ্টান হয়ে গেল ;
আমাদের অস্তিত্ব
এনি করে লােপ পেয়ে যায় বুঝে, পরমপিতা-
প্রেরিত ধাৰ্ম্মিক সুজন রাজা রামমােহন রায় প্রকৃত
হিন্দুধর্ম প্রচার কলেন। আমরা ব্রাহ্ম নামে
আখ্যাত, আমরা ব্রহ্মের উপাসনা করি। ওঁ ব্রহ্ম,
যিনি একটি প্রজাপতির পালকে বিচিত্র লেখা
লিখেছেন, একটি দুৰ্বাশীর্ষে সুন্দর রং ফলিয়ে অদ্ভুত
কৌশল প্রদর্শন করেছেন, তাঁর চরণে আমার
কোটী প্রণিপাত। (প্রণাম )
ধীরেন্দ্র
কথা, এর মাঝে এতটুকু নাহি তত্ত্ব
মত্ত যাহে রবে মন, ভুলে গিয়ে মায়া
সংসারের। ব্রহ্ম, সত্য কহি বিচক্ষণ
তুমি মতিমান্ বুঝ মম অন্তরের
কথা, আজীবন রব তব চরণের
দাস, যদি বুঝাইয়া দিতে পার কে বা
ব্ৰহ্ম।

উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য সুধীর-হ-য-ব-র-ল বীরেন্দ্র ব্রহ্ম ? সুধীর গগ। বাবাজী। বীরেন্দ্র- অব্যয় অব্যক্ত যিনি, বাক্যে তঁারে কেমনে বুঝাব ? ধীরেন্দ্র নাহি যার স্থিতি, তারে শুধু কল্পনায় একে মনােমাঝে রাখা চেয়ে শূন্য হৃদে ঘুরে মরা ভাল। বীরেন্দ্র—সে কি কথা! তুমি তবে ঈশ্বর মান না? ধীরেন্দ্র- আমি একা নহি, পৃথিবীর লােকে কভু তারে মানে? তুমি ধীর বিদ্বান্ ভাবুক বল দেখি স্পষ্ট করে, আপনার বুকে হাত দিয়ে সত্য করে’, বল দেখি তুমি প্রচারক, আপনার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে তাহারে পেয়েছ কিনা? ঐ ঐ আঁখি দুটো দিয়ে কোন দিন দেখেছ কি এতটুকু তাঁহার স্বরূপ ? না, না, সব মিথ্যা, সব মিথ্যা— [ প্রস্থান ] বীরেন্দ্র-উন্মাদ হয়েছে, অধঃপাতে গেছে।

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
সুধীর—না বাবা, তােমার কলকাটী নড়েছে কি না,
লােকটি ভণ্ড নয় খাটী, নকল নয় আসল।
বীরেন্দ্র-মরুক গে, চল drawing roomএ।
সুধীর—হ বাবা, ঐ করতেই ত আসি।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
তৃতীয় দৃশ্য
পথ
দুইজন পথিক
১ম পথিক--অতীব অশ্লীল, অতীব অশ্লীল। একটা
উলঙ্গ পুরুষ, তার উপর বিতিকিচ্ছি জিববার করে
একটা দিগগজ মেয়ে মানুষ, ভূতের পূজো, ভূতের
পূজো।
২য় পথিক-ইংরেজ দেবতা। এ সব জ্ঞান আমাদের
হ'ত কি না সন্দেহ।
১ম পথিক—সে কথা আর বােলে, চেহারা দেখে টের
পাও না। মুখের জ্যোতিঃ কি, একটা এ দেশের
অমনতর আছে ?
৪১.

উদ্বোধন [ তৃতীয় দৃশ্য ২য় পথিক-কথাই ত বটে। ধৰ্ম্ম কৰ্ম্মের ভেতরও কেমন সভ্যতা। কেমন ঘর, কেমন চেয়ার, কেমন পােষাক—আর আমাদের দেখ দেখি—সব মাথা নেড়া, কারাে বা অফলা, কেউ বা চিতে বাঘ। হা তাের ধৰ্ম্ম, ধৰ্ম্মের মাথায় মারি ঝাড়। ভটচায্যি পাে’ দের ল্যাজে গােবর, ক্রিয়াকৰ্ম্ম- গুলাে উঠে গো, ব্যাটার হাপু গুণে মরবে আর কি ১ম পথিক-মহাপাপী মহাপাপী, ব্যাটারা ! খালি লােকের জাতিপাত করতে আছে। নাদা পেটা হাঁদা বেটারা উচ্ছন্নয় যাক, উচ্ছন্নয় যাক্। [ উভয়ের প্রস্থান } সুধীরের প্রবেশ সুধীর—কোথায় বাবা ! রাস্তার আলােগুলো শালারা নিভিয়ে রেখে গেছে, ছারা গাড়ির ঘড়ঘড়ানি শব্দও নেই, হেঁটে এত পথ এ অবস্থায় যাক কেমন করে। আজ নেশাটা বড় বেশী হয়ে গেছে। 82

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
ধনা ক্ষ্যাপার প্রবেশ
ধনাক্ষ্যাপা-
(গান)
আমি শিখিয়ে দেব দোকানদারী
জ্ঞানের বোঝা মাথায় করে পাড়ায় পাড়ায় করবি ফিরি
সৎসামগ্রী ঝকায় পুরে, সাজিয়ে দেব থরে থরে,
কেনা বেচা করে শেষে পয়সা নিয়ে ফিরিস্ বাড়ী ॥
সুধীরকে বাবা! ভিখিরী ?—লােক চেন না ?
ধনাক্ষ্যাপা
( গান )
লাগলে চেকে ধরি তাকে, ভাবের স্রোতে দিই ফেলে
ভার পরশে নবীন আশে সব ফেলে সে যায় চলে।
আমি বিষম দাগাবাজ, (আমার) লোক মজান কাজ
মনের মতন পেলে রতন যত্নে কোলে নিই তুলে।
সুধীর—পথ ছাড় বাবা, পথ ছাড়। নেশাখাের মানুষ।
আমার কাছে ভাবের কান্না কেন বাবা ? ভাব
টাবে উদর টোয় টুম্বুর। ছাড় বাবা, ছাড়। আঃ
কি বিপদ। জুয়াচোর ব্যাটা, ভণ্ড ব্যাটা।
*
ধনা
(গান)
আমায় তাড়িয়ে দিলে জোর করে
চোখের জলে বুক ভেসে যায়
৪৩

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
আমি কাদতে কাদতে যাই ফিরে।
চোখের জল দেখলে পরে
মুছাবে মা আদর করে
তাের গুণের কথা কইব সেথা
গাল দেবে মা রাগ ভরে।
তখন কঁদতে হবে ভাই
সে পাষাণী মা তার প্রাণে দয়া কিছু নাই।
খুড়লে মাথা, সে কয় না কথা
সাধলেও তার পায়ে ধরে
[ প্রস্থান ]
সুধীর—যাঃ যাঃ, যত ভ্যাজাল। উঃ কোথায় রে।
তারা! তারা!
[ প্রস্থান ]
~
চতুর্থ দৃশ্য
রামধন বসুর চণ্ডিমণ্ডপ
রামধন
রামধন—সকালে উঠে নিরিবিলিতে যে এক ছিলিম
তামাক খাব তারও জো নেই। এ আসছে সে
৪৪

দ্বিতীয় অঙ্ক )
উদ্বোধন
আছে, কারাে সুদের হিসেব, কারাে বা খাজনার
পাওনা থােওনা, আঃ সংসার করা কি গুখুরি।
হরি ! হরি ! ছেলেটাও মানুষ হ’ল না যে
বৃন্দাবনে গিয়ে বাস কব। বাতও ক্রমশঃ চাগাড়
দিচ্ছে, এক অঙ্গ ত অবশ হয়ে গেল। হরি! হরি !
বেটা কি তামাক সেজেছে। ইংরেজের রাজ্য হয়ে
সুবিধে হয়েছে বটে কিন্তু ছােট লােকের আস্পর্ধা
কিছু বেড়ে গেছে-বর্গীর উপদ্রবে কি পয়সা কড়ি
রেখে সুস্থমনে বাস করা যেত ? ওরে শালা,
ভূতাে ?
ভূতনাথের প্রবেশ
ভূতনাথ-আজ্ঞে।
রামধনশালা তামাক কৈ ? শুধু আগুন দিয়ে
হুকোয় রেখে গেছিস, আমি শালার টেনে টেনে
হাঁপানি বেড়ে গেল।
ভূতনাথ—আজ্ঞে সে কি হুজুর !
রামধনশালা, আমি কি মিছে কথা বলছি—এই
দেখ, না ?
৪৫

উদ্বোধন [ চতুর্থ দৃশ্য ভূতনাথ—তবে হুজুর ভুলে গেছি। রামধন—এ কি রকম ভুলে যাওয়া, তামাক নেই তামাক সেজে নিয়ে এলি ? ভূতনাথ—হুজুর বলে দিচ্ছি। রামধনশালা বলে দিচ্ছি ! [ ভূতনাথের প্রস্থান ] রামধন-নানা রকমে আমায় জ্বালিয়ে তুলে। ছেলেটার জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়েছি, ব্যাটার বৈরাগ্যের উদয় হয়েছে। বিয়ে দেব, তা ব্যাটা তা’তে গর- রাজি। মল্লিকপুরের ঘােষেদের মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থির করে রেখেছি, মেয়েটী কালো কোলাে, তা হােগে, রূপ নিয়ে কি ধুয়ে খাব ? টাকা, টাকা, এমন জিনিষ কি কোথাও আছে ? ভূতনাথের প্রবেশ রামধন-কোথায় যাস? ভূতনাথ-আজ্ঞে না। রামধন-আজ্ঞে না ! ব্যাটা যেন তােতা পাখি। শালা তােকে যে কাল বলেছিলুম লােকজন নিয়ে :৪৬

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
রাখালে চাষার চাল কেটে নিয়ে আসতে—তুই
ব্যাটাও কি ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্টির হয়েছিস ?
ভূতনাথ-আজ্ঞে না।
রামধন আবার শালা আজ্ঞে না।
ভূতনাথ-আজ্ঞে,
রামধন—আবার ?
ভূতনাথ-আজ্ঞে,
রামধন-বল্ শালা, ছােটলােক কি না ? বল্।
ভূতনাথ-“আজ্ঞে না-আজ্ঞে হুজুর।
রামধন—আজ্ঞে হুজুর ! তাের পিণ্ডি, তাের ছেরাদ্দ,
তোর মাথা। চুপ কলি কেন? রাখালে ব্যাটার
চাল কেটে আনতে বলেছিলুম, এনেছিস্ কি ?
ভূতনাথ—আজ্ঞে না।
রামধন-ফের শালা আজ্ঞে না আজ্ঞে না কবি ত
এই লাঠি মাথায় মেরে দেবাে। আঃ কি জ্বালা,
বা বাবা, আমায় জ্বালা কেন।
ভূতনাথ—আজ্ঞে আপনি বলতে দিচ্ছেন কৈ।
রামধন—নে বাবা, আমারই অপরাধ, আমার চৌদ্দ
পুরুষের অপরাধ। তুই বল্ তাের গুষ্টির পায়ে পড়ি।
৪৭

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
ভূতনাথ-আজ্ঞে হুজুর ও কি কথা।
রামধন—ওরে কে আছিস্, এ ব্যাটার গলায় পা দেত,
আমায় পাগল করে দেবে দেখছি।
ধীরেরে প্রবেশ
ধীরে-কি পিতা?
রামধন—আর কি । তাের। সবাই মিলে আমায়
সংসার থেকে তাড়াবি মনে করেছি, সে আমি
অনেকদিন থেকে
বুঝতে পেরেছি।
'ওরে
ব্যাটার-ছেলের দুবেলা দুমুটো আসে কোথেকে
জানি?
ধীরেন্দ্র—কি হয়েছে ভূতনাথ ?
ভূতনাথ-আজ্ঞে
রামধন-ব্যাটা আবার যদি আজ্ঞে বলবি ত মাথা
ভেঙে দুফাঁক করে দেব।
ভূতনাথ–আজ্ঞে
( রামধন মুখ সিটকাইয়া ফিরিয়া রহিল)
ধীরেন্দ্র-কি ভূতনাথ ?
৪৮

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বােধন
ভূতনাথ-আজ্ঞে
রামধনথাম শালা। তাের আজ্ঞে আজ্ঞে শুনলে আমার
সৰ্ব্বশরীর জ্বলে ওঠে, তুই বেয়াে-
[ ভূতনাথের প্রস্থান ]
রামধন—ধীরেন শােন, বাপের আমলের এই চণ্ডি-
মণ্ডপের ঐ খোঁটাটা আছে, আর যা কিছু দেখছ,
এ সব আমার ফেরেফারে হয়েছে। রাখালে ব্যাটাকে
তুমি আগা দিলে, আর সব শালা সুদের টাকা
দিতে প্যাচ দিচ্ছে। ওরা ছােট লােক, ওদের
ওপর কি দয়া কতে আছে ? ঐ ভূতাে শালাকে
কাল বলে’ রেখেছিলুম রাখালে ব্যাটার চাল
কেটে নিয়ে আবি, ব্যাটা কি করলে, এই
এত বেলা হ’তে চল্ল আজ্ঞে আজ্ঞে করেই
কাটিয়ে দিলে। ও-ব্যাটা বুঝি খাতকদের সঙ্গে
মিশেছে ?
ধীরেন্দ্র—আজ্ঞে, রাখাল সম্বন্ধে যদি কিছু জিজ্ঞাস্য
থাকে সে ভূতাের কাছে নয়, আমার নিকট তার
উত্তর পাবেন।
( 4 )

উদ্বোধন [ চতুর্থ দৃশ্য রামধনভ্যাল মাের বাপরে। তাই বলি, ধীরেন 'আমার সােনার সােণার ছেলে একেবারেই কি বয়ে যাবে ! ধীরেন্দ্র—পিতা! স্বর্গ হতে গরীয়ান তুমি, পূজ্য তুমি সন্তানের কাছে, কিন্তু কি করিব ন্যায়ের বিধানে তােমার অপ্রিয় সত্য কহিতে হইল, অপরাধ যদি কিছু হয়, নিজ গুণে করিও মার্জনা। হায় । সম্মুখে হইলে বলি নির্ভয়ে নিরখে যথা ক্ষুদ্র ছাগ শিশু, শত্রুদত্ত তৃণ- দল হৃষ্টচিত্তে করয়ে চর্বণ, ভাবে মুহূর্ত আগে যে খঙ্গ হেনেছে বজ অপরের শিরে, নাশিবে তাহার প্রাণ তারি প্রহরণে। সেই মত অজ্ঞ নর : বুদ্ধি ধৃতি নিয়ে দেখিতেছে প্রতিদিন কোটী নরবলি। কালের উদ্যত অসি হের পিতা রহিয়াছে আপনার শির লক্ষ্য করি—কেমনে মাতিয়া আছ মিথ্যা খেলাঘরে, তুলে দিয়ে বিপ্লবকেতন, '? '

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
চারিদিকে হাহাকার, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস,
অশ্রুধারা, কৃষকের হৃদয় শােণিত ?
রামধন-মারুবি নাকি ? ও ভূতে, ওরে ভূতত, ওরে
বাবা-ও ভূতাে।
ভূত নাথের প্রবেশ
ভূতনাথ-আজ্ঞে ।

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
কালিমন্দির
ধনা ক্ষ্যাপ
(গান)
শুধায়ে না কেহ আমারে
ওগো শুধায়ো না কেহ আমারে
জানি কিনা জানি তারে, জানি শুধু অন্তরে
ভাষায় বুঝাতে নারি, একে দিতে নাহি পারি,
মানস-মন্দিরে সে যে কিবা রূপ মরি, মরি।
ও রূপ সাগরে সদা ডুবিতে বাসনা মম
জাগিতে চাহি না তাই, ভুলে যাই অর্থ কাম।
তাহারি মহিমা যত প্রকাশে সংসারে,
তার কাজে আছি রত, আর কিছু জানিনা রে ।
[ প্রস্থান,
রমদাসের প্রবেশ
রামদাস-রজনীর এই বেশ বড় ভালবাসি,
সারা নিশি অন্ধকারে ঘেরা, সুপ্ত বিশ্ব

তৃতীয় অঙ্ক
উদ্বোধন
অলস মদিরা পানে। এ মন্দিরে আর
কেহ নাই। দূরে শােভে মধুমতী ক্ষীণ
রেখা, কাল মেঘে বিজলীর মত, তীরে
শােভে মসীমাখা বৃহৎ বিটপীরাজি,
পথিকের প্রাণে করি আতঙ্ক সঞ্চার।
শুভ্রচূড়া মায়ের মন্দির উঠিয়াছে
আঁধার ভেদিয়া, কীর্তি যথা নিন্দুকের
মায়াজাল ছাড়ি উঠে উর্ধে মানবের
দৃষ্টি আকর্ষিয়া। আসিয়াছি শুভক্ষণে,
ওয়ি মাতঃ প্রকাশ ভক্তের কাছে, আজ
তােরে ছাড়িব না। একি! রুদ্ধ কেন দ্বার
মন্দিরের ? দেবি, এত যে আঁধার সব
দূর করে’ উজলিয়া উঠ একবার,
নিস্তব্ধ জগৎ ধ্বনিয়া উঠুক আজি
স্নেহমাখা তাের কণ্ঠস্বরে, ধন্য হােক
কোটী জনমের কঠোর সাধনা। কি কি
জাগিবি না? অধরে লুকায়ে হাসি দেখা
কি দিবি না করালিনী ? না না আজ তােরে
ছাড়িব না—কেন মা কি দোষ করেছি মা ?
।

উদ্বোধন [ প্রথম দৃশ্য ভাল মন্দ সব নিয়ে, সত্য মিথ্যা এক করে দিয়ে, শুদ্ধা ভক্তি ফিরে দে জননী। এই আমি বসিলাম তাের সন্নিধানে রুদ্ধ করে মন্দিরের দ্বার, মুহূর্তের প্রাণ অনন্তে মিশায়ে দেব প্রতি জন্মে এমনি করিয়া—দেখি দয়া হয় কিনা ? ধনা ক্ষ্যাপার প্রবেশ (গান) ধনা- মায়ে ব্যাটায় লুকোচুরি আমি আড়াল থেকে দাড়িয়ে দেখি, ছল চাতুরী আর কি চলে আসল এযে নয়ত মেকী রঙীন রঙীন খেলনা দিয়ে রাখবি আর কত ভুলায়ে খেলনা ফেলে কাদে ছেলে দেখতে পাওনা ও চোক খাকি। রামদাস—বাবা ধনেশ্বর ? ধন- কি বাবা? ৫৪ তৃতীয় অঙ্ক ] উদ্বোধন রামদাস- জননীর দয়া মূর্তিমতী বালিকার বেশে এসেছিল এইখানে, স্বকর্ণে শুনেছি তার রুণু রুণু নুপুরের ধ্বনি, স্বহস্তে দিয়াছি পদে জব বিশ্বদল, স্বচক্ষে দেখেছি তার বিমােহিনী অপূৰ্ব্ব মূরতি। ধনেশ্বর ধনা ওয়ি লীলাময়ি! আজ আমারে উন্মাদ করিয়া দে। তাের অমৃতশীতল কণ্ঠ শুনি অনিবার, অবিরত তাের রূপ- দ্যুতি ঝকুক অন্তরে, নিশ্চল হইয়া রহি। লীলার তরঙ্গে উঠা নাবা সব ঘুচে যাক্‌; পাপ পুণ্য বিচারের ভার নিজ হস্তে করিয়া গ্রহণ, ছেড়ে দেগে। আমারে জননী! ছিড়ে ফেলি যত কিছু মনের বাঁধন, সরল শিশুর মত তাের কোলে শুয়ে থাকি নির্ভরতা নিয়ে। রামদাস-ধনেশ্বর, আজ যেন দুজনায় এক হয়ে গেছি। জননীর দুইটী সন্তান, এক বৃন্তে যুগল কুসুম, আয় ঢলে উদ্বোধন [ প্রথম দৃশ্য পড়ি মাতৃপদমূলে, ভাবের অমৃত হ্রদে আয় সুখে করি সন্তরণ। ডেকে আন কে করিবে অমরত্ব লাভ, দেখ চেয়ে কে চাহে উন্মাদ হ’তে, মহাশক্তি- সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিবার আশে দুর্ণিবার সংসারসাগর-কুলে ভগ্ন মনে কেবা বসে আছে—আন সবে ভাব- তরণীর পাল তুলে দিয়ে নিয়ে যাব বৈজয়ন্তী ধামে, এ তরীর কর্ণধার আপনি জননী। [ প্রস্থান ] ধনাক্ষ্যাপা হে সাধক, এ কি তুমি মেগে নিলে দেবতার কাছে শুধু কৰ্ম্ম ! কৰ্ম্মদৃশ্যে হবে নাকি যবনিকাপাত ? আদ্যাশক্তি, মায়াময়ী, অনন্ত তােমার লীলা, এই খেলা খেলাইবে বলি, ভব- ঘুর্ণিপাকে পাঠাইলে অধম সন্তানে!

তৃতীয় অঞ্চ ] উদ্বোধন দ্বিতীয় দৃশ্য রামধন বসুর শয়ন কক্ষ শয্যায় রামধন ও পার্শ্বে কবিরাজ রামধন-ভূতাে, যা ব্যাটা দুখানা চেয়ার নিয়ে আয়। আর কবিরাজ মশাই, আপনার নিদানে বুঝি এ ব্যাধির ওষুধ নেই। কবিরাজ—আজ্ঞে, সে কি কথা। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র, অষ্টাদশ বিদ্যান্তৰ্গত ধন্বন্তরি প্রণীত বিদ্যাবিশেষ। এ শাস্ত্রে ব্যাধির ঔষধ নাই ! ঋক্‌ যজুঃ সামাথ- খ্যা দৃষ্ট। বেদান্ প্রজাপতিঃ বিচিন্ত্যবৈরায়ুৰ্বেদঃ চকার সঃ। রামধন-ও ভূতো, কবিরাজ মশাইকে তামাক দে। কবিরাজ-আজ্ঞে তামাক থাক, আপনি শুনুন। রামধন-শুনে আমার মাথা হবে। আপনার ওষুধের গুণ থাকলে ও শুতে টুতে হত না। হরি, হরি। উঠে হেঁটে যে বেড়াব তারও জো নেই। কাশির ধমকে পাঁজরাগুলাে টাটিয়ে বিষ ফোড়া

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
হয়েছে। ছাই আপনার ওষুধ। আর—আর ক’
হপ্তা লাগবে বলুন দেখি ?
কবিরাজ—আজ্ঞে বাতের জন্যে ত ভাবিনি, ভাবছি ঐ
কাশির জন্যে। পঞ্চ কাশাঃ স্মৃতা বাতপিত্ত শ্লেষ্ম
ক্ষত ক্ষয়ৈং।
রামধন—ওরে ও ভূতাে, কবিরাজকে এক ছিলিম
তামাক দেনা।
কবিরাজ—আজ্ঞে, শুনুন না।
রামধনও শুনে আমার মাথা মুণ্ডু হবে কি? রােগ
ত ভাল হবার নয়, মিছে পয়সা খরচ।
এ হপ্তায়
আর ওষুধ চাই না, দেখি কেমন থাকি। ও ভূতে,
কবিরাজের পাল্কী এসেছে কি ?
কবিরাজ—এ লােকটার মতিচ্ছন্ন হয়েছে। মশায় তবে
চলুম।
রামধন—আসুন। কেমন থাকি পরে খবর দেব।
[ কবিরাজের প্রস্থান ]
রামধন—মবার ত বয়স হয়নি, তবে বাতে বড় কাবু
করে ফেলেছে। হায় হায় কুলে, এসে বােঝাই
নৌকা ডুবল গাে! এত করে বিষয় আশয় কলুম

তৃতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
এক ছেলে হ’তে সব ভেস্তাল। আমি এই ক
মাস বিছানায় পড়ে', আর আদায় পত্র সব বন্ধ হয়ে
পড়েছে।
ভূতনাথ প্রবেশ করিয়া রামধন বসুকে
তামাক দিল
রামধন-ওরে, বড়বাবু কোথায় ?
ভূতনাথ–আজ্ঞে, বলতে পারলুম না।
রামধন—যা শালা নজরছাড়া হয়ে, সব কাজেই
বেটা ভণ্ডুল করূবে । ভূতনাথের প্রস্থান ]
বিশু সরকারের প্রবেশ
বিশুবাবু, সৰ্ব্বনাশ হয়েছে।
রামধন-ওরে বাবা! কি হয়েছে ?
বিশু—আজ্ঞে, লাটের খাজনা পথে মারা গেছে।
রামধন-ও বাবা, এ তো-শালাদেরই কাজ। হরি,
হরি। ভূতােরে ?
ভূতনাথের প্রবেশ
ভূতনাথ-আজ্ঞে।
f

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
রামধন-ওরে বাবা, সর্বনাশ হয়ে গেছে ! তাের বড়
বাবুকে ডাক্।যা না ।
[ ভূতনাথের প্রস্থান ]
না।
রামধন-ও বিশু, উপায় কিছু করে এসেছ,
আমার গলায় পা দেবে বলে দাড়িয়ে আছ ?
বিশু–উপায় ত আর কিছু নেই। খাজনা পত্তর আদায়
করে’ লাটের খাজনা পাঠিয়েছিলুম, লক্ষ্মীবিলের
মাঠে ডাকাতে লুঠ করে নিয়েছে।
রামধন-পুলিশে খবর দিয়েছ ?
বিশু—আজ্ঞে না।
রামধন-আজ্ঞে না! তা দেবে কেন ? তােমরাও
যে চোরের সঙ্গে আছ। ওরে বাবা! দুদিন
বিছানায় পড়েছি, আর সব শালারা লুটেপুটে আমার
সৰ্ব্বনাশ করূলে। ওরে, শালা ভূতত, তাের
বড়বাবুকে ডাক না।
বি-কর্তাবাবু, কালকের মধ্যে খাজনা না পাঠালে,
কোম্পানী থেকে সব মহল নীলাম হয়ে যাবে।
রামধন—শুনে শরীর জুড়িয়ে গেল।

তৃতীয় অঙ্ক ।
উদ্বোধন
ধীরেন্দ্রের প্রবেশ
(न
রামধন—এই যে ! ওরে হতভাগা পথে বসবি যে,
সেদিকে লক্ষ্য রেখেছিস? আমার ত গঙ্গার দিকে
পা—আমি চলুম, এ ব্যারাম যে সাবার নয়।
ধীরেন্দ্র—কি হয়েছে বিশু বাবু ? ·
রামধন-সৰ্ব্বনাশ হয়ে গেছে, লাটের খাজনা ডাকাতে
লুটেছে।
এ সরকার গােমস্তাদের কাজ, ইংরেজের
রাজ্য হয়ে চোর ডাকাত কি আছে ?
সব পরে হবে। এখন যেখান থেকে পার, দশটী
হাজার টাকার যােগাড় কর।
ধীরেন্দ্র-তহবিলে কি কিছু নেই ?
রামধন—তাের পিণ্ডি আছে। ঘরে টাকা রাখলে
কি টাকা ঘেমে বাড়ে? সব খাতকদের কাছে,
জোর করে আদায় ক। শীঘ্র যা—যেখান থেকে
পারি দশ হাজার টাকার যােগাড় কর।
বিশু—আসুন বড়বাবু, তা না হলে সব মহল বিকিয়ে
যাবে।
( ধীরেন্দ্র ও বিশু সরকারের প্রস্থান)

উদ্বোধন
[ তৃতীয় দৃশ্য
রামধন-যা হবে তা ত বুঝতেই পারছি । হা গুরু-
দেব, কি করলে। হে মা কালি, আমায় একবার
তুলে দাও, শালাদের গলায় পা দিয়ে, দশ কেন
বিশ হাজার টাকা আদায় করে আনি।
তৃতীয় দৃশ্য
সুধীরের বাটী।
সুধীর ও উড়ে মালী
সুধীর-হারে, সেদিন কি বড় মাতলামি করেছিলুম ?
উড়ে মালি-হঃ, সে কথা বাবু কি আর বলিব ?
[ প্রস্থান ।
সুধীর—জন্ম জন্ম এমনি করিয়া প্রবৃত্তির
স্রোতে ভেসে চলে যাই, আপনার গতি
আপনি ফিরাতে নারি, মরি ঘুরি ফিরি
নরকের দ্বারে দ্বারে। আত্মশক্তি আছে
মাত্ৰ-কাৰ্য্য তার কভু না করি। আছি
বটে মানবসমাজে কিন্তু ঘৃণ্য কীট

তৃতীয় অঙ্ক ] উদ্বোধন আমা হতে ভাল। আছে তার, তার মত জ্ঞান—অজ্ঞান অধম আমি। ছি ছি, কত দূরে যাব আর-সংসার কি এমনই প্রবল ? দেবতার আদর্শ জীব, নর- দেহ লভি ডুবিব কি পাপপঙ্কে ক্ষুদ্র কীট সম ? ভগবান্ ! তােমায় জানিনা বটে, কিন্তু তব মধুমাখা নামে লঘু করে হৃদয়ের ভার ; নব শক্তি ঢেলে দেয় প্রাণে। আজি স্বপনের মত মনে হয় সে রাত্রির কথা-স্বর্গ হতে দেব- দূত যেন নেমে এসে, সুধা ধারা ঢেলে দিলে প্রাণে, মদিরার মােহে ছিনু মগ্ন —নারিলাম সেই রত্ন ধরিয়া রাখিতে । হায়, যদি কেহ ফিরাইতে পারে সেই দিন, এই প্রাণ অবহেলে দিই তারে। । মালির প্রবেশ মালিবাবু মশাই, একটা খেপা আসিকিরি আপনার দরশন মাগিছে। হৈ-

উদ্বোধন
[ তৃতীয় দৃশ্য
(নেপথ্যে ধনা ক্ষ্যাপা গাহিল
“বঁধু হে এসেছি তােমার দ্বারে দিতে দরশন” )
সুধীর—সেই কণ্ঠস্বর ।
দেবদূত ! দেবদূত !
[ প্রস্থান ]
মালি—বড় সুন্দর গাউছন্তি।
(গান)
পট সে নন্দ সুতা, পট সে নন্দ সুতা।
[ প্রস্থান ]
সুধীর ও ধনাক্ষ্যাপার প্রবেশ
সুধীর—তুমি দাড়াও, তুমি দাড়াও, আমি পাগল হয়ে
যাব।
এমন অপূৰ্ব্ব ঘটনা কাহারও ভাগ্যে ঘটে
। দাড়াও, ফুল তুলে আনি। [ প্রস্থান }
ধনা—এম্‌নি হৃদয়খানি বড় ভালবাসি।
রত্ন যদি পাঁকে পোঁতা থাকে, তবু তারে
ডুব
দিয়ে অতল সাগর হ’তে তুলে
নিতে হয়। দিনগ্রহে মধ্যাহ্ন তপন
সে’ও রহে জল আড়ালে হীনতেজ
হয়ে। সংসারের মায়াজালে বদ্ধ তুমি
৬৪

তৃতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
হে মানব, তােমারে করিব মুক্ত, মুগ্ধ
তুমি করিয়াছ মােরে হৃদয়ের শুদ্ধ
অকপট সরল বিশ্বাসে।
সুধীরের প্রবেশ
সুধীর
দেবদূত।
দাড়াও সম্মুখে মম। সমস্ত হৃদয়
একবাক্যে বলিতেছে, তুমি আসিয়াছ
নেমে ত্রিদিব হইতে, অভাগার প্রতি
করি করুণা প্রকাশ। কিন্তু পূজা মাের
ধরিবার আগে শুন জীবনের কথা।
অন্তৰ্য্যামি ! তুমি যদি দেখা দেয়, ঘৃণা
করে চলে নাহি যেও। একে একে শুন
মম পাপের কাহিনী—যৌবনবিকাশে
পাপস্রোতে ভেসে চলে গেছি, ফিরিবার
আছে কি উপায় ? মদ্যপান বারাঙ্গনা
সনে নিত্য করি ভােগ, পরদার-এ কি
বিদ্রুপের হাসি? হাস হে সন্ন্যাসি, পাপ
কথা অপ্রকাশ না রাখিব। না-না, মন্দ :
[5]

উদ্বোধন [ তৃতীয় দৃশ্য আর। ধন- কথা প্রাণে বাজে ব্যথা—ভাল কহিব না ধর পূজা, এনেছি অঞ্জলি ভরি, নিজ করে করিয়া চয়ন-প্রস্ফুটিত ফুলরাশি—এস এস অশ্রু দিয়ে ধুই তব যুগল চরণ। কি কর, কি কর সরল বিশ্বাস ! আমি নহি বিশ্বপতি। ঐ ঐ তিনি দাড়ায়ে ত্রিদিবে, যারে হেরে দেহেন্দ্রিয় মন প্রাণ বুদ্ধি অহঙ্কার নিমেষে টুটিয়া যায়—যার ধ্যানে মায়া তন্ত্র ছিন্ন হয়ে গিয়ে নিত্যানন্দে ভরে’ উঠে প্রাণ, যাঁর ভাবে হইলে বিভাের অন্য ভাব নাহি থাকে, যে সুখ করিলে লাভ কোন সুখে থাকে না’ক স্পৃহা আর। আয় রে সংসারি, তােরে দিব দেখাইয়া তারে, চেয়ে নিস্ সেই জ্ঞান-যেই জ্ঞানে অজানা থাকেনা কিছু। আয় আয় পাছু পানে ফিরি না আর। টেনে নিয়ে যায় সুধীর-

তৃতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
একি আকর্ষণ ! এযে টেনে নিয়ে যায় ।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
চতুর্থ দৃশ্য
বিশু সরকারের বাটী।
ধীরেন্দ্র ও বিশু সরকার
বিশু --তাই তাে বড় বাবু, একে কৰ্ত্তাবাবু বিছানায়
পড়ে, তাতে এই শিরে সংক্রান্তি লাটের খাজনা।
কি হবে আমি ত ভেবে কিছু কুল কিনারা
পাই না।
ধীরেন্দ্র-এও কি ভাবনা? ধনহীন হব ? হই
হব-ক্ষতি কি বা তায়? আছি রাজভােগে,
কদন্নে কাটিবে দিন-এর তরে এত
দুঃখ কিসের কারণ? দূর হাে ছাই
বিশু-বড়বাবু, কি করূবেন ?
ধীরেন্দ্র-কি করব, সরকার মশাই ?
বিশু—টাকা।

উদ্বোধন { চতুর্থ দৃশ্য ধীরেন্দ্র—টাকার কথা আমায় শুনিয়ো না। বিষয় নীলাম হবে ? হােক গে। বিশু—সে কি কথা বড় বাবু ? পথে বসতে হবে যে। ধীরেন্দ্র-বিশু বাবু, পথে ত সবাই বসে ! কেহ আগে, কেহ তার পিছে। যত যায় আগে, পিছে পড়ে থাকে তত নশ্বর সংসার। বিশু-কৰ্ত্তাবাবু ঠিক ঠাউরেছেন, ছেলেটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যাই হােক, ঝানু মনিবের কাছে পড়ে সারাটা জীবন মিছে কাটাতে হয়েছে, দু পয়সা হাত করতে পারিনি—সেদিন কুষ্টিও দেখিয়েছিলুম, বলেছে এখন আমার একাদশ বৃহস্পতি। বড় বাবু, কি হবে ? ধীরেন্দ্র--আমি কি কব ? বিশু—এক কাজ করুন। ধীরেন্দ্র--কি বল। বিশু—আপনি যদি ইচ্ছে করেন, উপস্থিত কিছু টাকা পেতে পারেন। আমার এক মাস্তুতাে ভাই ক- কাতায় টাকা জমা দিতে যাচ্ছে-হাজার দশেক তা আপনি হ্যাণ্ডনােট লিখে দিলে অবশ্য ৬৮ তৃতীয় অঙ্ক ] উদ্বোধন দিতে পারে, ব্যাঙ্কে ও সুদ, এখানেও তাই, বরং কিছু কম। ধীরেন্দ্র—তা হলে সব ঝঞ্চাট মিটবে ? বিশু—আজ্ঞে হ্যা। টাকার জন্যেই ত গােল হয়েছে । ধীরেন্দ্র—তােমার মাস্তুত ভাই এখন কোথায় ? বিশু—আজ্ঞে তবে তাকে ডাকি। [ প্রস্থান ] ধীরেন্দ্র—আর ত কোন উপায় নেই। পরে খাজন- পত্র আদায় হলে টাকাটা শুধে দিলেই হবে। বিশু সরকার ও নীলমণির প্রবেশ বিশু—বড়বাবু, এই এর কথাই আপনাকে বছিলুম। ধীরেন্দ্র—আমায় কি করূতে হবে ? বিশু—ভাই নীলমণি, ইনি হচ্ছেন আমার মনিবের বড় ছেলে। টাকা তােমার বেশীদিন পড়ে থাকবে না, বিষয় অগাধ। কৰ্ত্তাবাবু ব্যারামে পড়ে’, কাজেই এদিকে টান ধরেছে। নীলমণি—আমি কিছু জানিনা দাদা, তােমার উপর আমার বিশ্বাস। বিস্তু—হ তা’ত বটে।

উদ্বোধন [ চতুর্থ দৃশ্য ধীরেন্দ্র—সরকার মশায়, আমায় কি করতে হবে ? বিশু—এই যে বড়বাবু, আপনি এইটেতে সই করে’ দিন। ( হাওনােটে ধীরেন্দ্র সহি করিল ) বিশু—লেখাটা পড়ে নি। ধীরেন্দ্র—মিবে ত? ব্যস্ নিশ্চিন্ত। [ প্রস্থান } নীলমণি–ছোঁড়াটা পাগল নাকি ? সাবালক ত ? বিশু—হাঁ, তা কি আর আমি না জেনে করেছি। নীলমণি—এখন কি ভাগ বল ? বিশু-টাকা আদায় হলে আধাআধি। এখন এই এক শ টাকা নে। ইমিটেশন ডায়মণ্ডের চেন- টেন আংটী-টাংটীগুলাে কিনে একটু চালে থাক্‌ গে। কর্নার যে ব্যারাম শীগ্রি টাশপুরে যাবে। নীলমণি-না বাবা, একশ’তে কি হবে বল। পাঁচ বৎসর ঘর বাসের পর দুনিয়ায় বেরিয়েছি, নেশাপত্র সব বন্ধ, কলিজা শুকিয়ে আছে, আর একশ চাই। বিশু—এখন কোথায় পাব ? নীলমণি-বটে! একি বাবা ভূষণাের বাঙাল পেলে ? ৭০

তৃতীয় অঙ্ক)
উদ্বােধন
ওটি হবে না চাদ । দশ হাজার পেয়েছ অন্ততঃ
পাঁচ হাজার চাই।
বিশু—তুই ত ভারি মুখ। এটা জমা দিতে হবে না ?
নীলমণিকাজ কি সােণার চাদ, কেঁড়েলি ছাড়, ও
টাকা তুমি আর জমা দিয়েছ !
বিশুদূর বােকা, তা কি হয় ? তা হলে যে জেলে
যেতে হবে।
নীলমণি—সে জানি না বাবা, আমায় কিছু ঝাড়।
বিশু—আর পঞ্চাশ নে। কিন্তু হুসিয়ার দরকার হলেই
যেন পাওয়া যায়।
নীলমণি—পাঁচ হাজার চাই।
[ প্রস্থান ]
বিশু-লােকটা শেষে না ভ্যাস্তায়। যা চাল চেলেছি
দ্বিতীয় রামধন বােস হব। ছোঁড়াটাকে কিছু
দিতেই হবে।
[ প্রস্থান ]
৭১

উদ্বোধন
[ পঞ্চম দৃশ্য -
পঞ্চম দৃশ্য
রামধন বসুর বাটী কক্ষ
রামধন ও বীরেন্দ্র
হরি।
রামধন-বীরেন বাবু, আপনি একজন নামজাদা
এ্যাটর্ণি। আপনি যখন এসেছেন, তখন জানি
উইলের কোন গােল হবে না। উইল বেশ হয়েছে।
ধীরেন একটু এলাে-মেলাে, তা হােক, এর পর
শুধরে যাবে। শুনতে পাই ধীরেনের সঙ্গে আপনার
আলাপ পরিচয় আছে, ছোঁড়াটা যাতে শােধরায়
তার একটু চেষ্টা
করবে না
হরি,
ও ভূতত, বাবুকে একটু তামাক দে না ?
বীরেন—আমি তামাক খাইনে।
রামধন-বটে, তা আপনারা হচ্ছেন গিয়ে দেশের
নামজাদা লােক, এমন দিন নেই “বিশ্ববাসী”তে
আপনার গুণের কথা না পড়ি। অবতার আর
কারে বলে ? আপনারাই অবতার। ওরে
ভূতত, সবাইকে ডাক না, বাবু আর কতক্ষণ বসে
থাকবেন, উইলটা পড়ে শুনিয়ে দিগ। তাের
१२

তৃতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
গিন্নিমাকে ঐ মাঝের দরজায় দাড়াতে বল।
বুঝেছেন বাবু, শুধরে উঠি তবেই ভাল, নইলে
এ সব মিছে। আমায় কি রকম দেখছেন ? ভাল
হব কি ?
বীরেন্দ্র—আজ্ঞে হবেন বৈকি।
রামধন-ভূতাে, বাবুকে তামাক দে। হরি, হরি।
মনেও থাকে না ছাই। বাবু ওসব দিকে নেই।
বুঝেছেন বাবু, অনেকে আবার আছেন তামাক
পান বাইরে খান না, কিন্তু গােপনে মা কালীর
বােধন বসান। হরি, হরি। 'গুরুদেব। উঃ, কি
কাশি। ভূতাে?
ভূতনাথের প্রবেশ
রামধন—দুটো লবঙ্গ দে। ও ঘর থেকে এক গেলাস
জল আর একটা পান নিয়ে আয়।
[ ভূতনাথের প্রস্থান ]
ধীরেন্ত্রের প্রবেশ
রামধন—এই যে ! ওরে শােন সে দিনের উইল পাকা

উদ্বোধন
[ পঞ্চম দৃশ্য
হয়ে এসেছে, বুঝে শুঝে চলিস্ ভাবনা থাকবে না।
ধীরেন্দ্র—বাবা, আমার একটা ঋণ আছে।
রামধন-ঋণ ! ঋণ কিরে? ও ভূতত, এ বলে কি?
ধীন্দ্রে—আজ্ঞে সে দিনের খাজনার টাকা সমস্ত আদায়
কতে পারিনি। বিশুবাবুর এক মাস্তুত ভায়ের
কাছ থেকে দশ হাজার টাকা ধার করে লাটের
খাজনা দিয়েছি।
রামধন-ওরে বাবা !
আমার পাঁজরা কখান খসিয়ে
দিলে। ভূতো একটু জল দে।
জল লইয়া ভুতনাথের প্রবেশ
সঙ্গে সঙ্গে নীলমণিও প্রবেশ করিল
নীলমণি—আপনি কি ধীরেন বাবুর বাবা ?
রামধন—এ কে ?•••দেখে কি বােধ হয় ?
নীলমণি-শুলুম, আপনি ধীরেন বাবুর নামে উইল
করেছেন, আমার টাকা শুধবে কে ?
ধীরেন্দ্র—আজ্ঞে, ইনিই তিনি।
রামধন-ওরে বাবা! মরুতে না মরুতেই যে আমার
পিণ্ডি চট্রকায়। ভূতাে, আমার দম আটকায়,
একটু জল দে।
৭৪

তৃতীয় অঙ্ক উদ্বােধন ধীরেন্দ্র- খাজনাপত্র কিছু আদায় হয় নি রামধন—আমি কিছু জানিনে। ওরে একটু জল। ধীরেন্দ্র—দশ হাজার টাকার নোেট- নীলমণি-সে কি ! দশ হাজার কি মশায় ? লাখ বলুন। দস্তুর মত ষ্ট্যাম্পে সই করা। ধীরেন্দ্র—এ কি রকম ? রামধন—জল, জল। ভূতনাথ—এ সব বিশে ব্যাটার কাজ। বড়বাবু, পঞ্চাশ বছর মুখ বুজে আপনার বাড়ীতে কাজ করে এসেছি—কোন কথা কইনি—আজ আর থাকতে পারলুম না। বিশের চুলের ঝটি ধরে’ নিয়ে আসি -সেই এ সর্বনাশ করেছে। [ প্রস্থান ] বীরেন্দ্র-ধীরেন বাবু এদিকে আসুন; আপনার পিতার অবস্থা বড় খারাপ। ধীরেন্দ্র—এ, সে কি ? বীরেন্দ্র-এ কি! Heart fail কল নাকি ? ধীরেন্দ্রভূতনাথ, শীঘ্র এস বাবা বুঝি চলে যায়। ৭৫

চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বীরেন্দ্রনাথের বৈঠকখানা
বীরেন্দ্র ও জনৈক ভদ্রলােক
বীরেন্দ্র—The condition of the Hindu
Females in these days are truly
pitiable. তা বেশ, আপনি বড় বড় অক্ষরে
প্ল্যাকার্ড এটে দেবেন, আমার নামটা তাতে
উল্লেখ থাকা চাই, আর গ্রামের প্রবেশ দ্বারে
একটা পত্রপুষ্পের তােরণ নির্মাণ করবেন। তার
পর আমার বক্তৃতাটা কাগজে বেশ করে তুলে
দেব, description যা লিখব তাতেই দেশে একটা
sensation পড়ে যাবে।
ভদ্রলােক—আজ্ঞে তা হলে নৌকা করে যাওয়াই
প্রশস্ত। আপনি ঐ Female imancipationটা
ভালাে করে ব্যাখ্যা করূবেন। আমাদের গ্রামে
৭৬

চতুর্থ অঙ্ক ] উদ্বোধন Education among females একটা অদ্ভুত জিনিষ হয়ে পড়েছে, আর গােটা কতক গোঁড়া জুটে, এই আমাদের মত young menগুলো, যাতে লােকের বিষ দৃষ্টিতে পড়ে, তার চেষ্টা করছে। বীরেন্দ্র—আচ্ছা-Kulinism, Polygamy, Infanticide যত সব অহিত কৰ্ম্ম গুলো আমাদের এই বিশাল হিন্দুসমাজে আছে, সবগুলো লােকের চক্ষে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেব। ভদ্রলােক—বেশ বেশ। আপনারা হচ্ছেন মহৎ লােক, আপনাদের আর কি শিখিয়ে দেব। আচ্ছা morality সম্বন্ধে ত বল্‌বেন ? বীরেন্দ্র-হা হা, সে বেশ আরম্ভ করূব। Oh gentlemen ! your morality is at a very low ebb. You spend your time in vice and idleness, and in social and party quarrels. Education among females is unknown, kulinism, polygamy and everyday oppression has

উদ্বোধন
[ প্রথম দৃশ্য
made the life of the
Hindu females
unbearable.
ভদ্রলােক—বাঃ সুন্দর! তবে ঐ ঠিক রইল। দেখবেন
আর কোথাও যাবেন না যেন ?
বীরেন্দ্র-তা কথা যখন রইল
ভদ্রলােক তবে আসি । [ নমস্কার করিয়া প্রস্থান ]
-
আরদালির প্রবেশ
আরদালি—হুজুর, একটা লােক আপনাকে খুঁজছে।
বীরেন্দ্র-আসতে বল।
( আরাদালীর প্রস্থান ]
বীরেন্দ্র—Old superstitionগুলো না দূর করতে
পালে দেশের কোন উন্নতিই হবে না। মহাত্মা
রামমােহন রায় আর দিন কতক বেঁচে থাকলে
অনেকটা সুবিধা হত। প্রতিমা পূজোটা উঠাতেই
হবে -One invisible god must be
worshipped Brahman in the
Unpanished.
as
ভূতনাথের প্রবেশ।
বীরেন্দ্র-তুমি কে ?
*,
৭৮

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
ভূতনাথ-আজ্ঞে, হুজুর আমি।
বীরেন্দ্র -আমি কি রকম ?
ভূতনাথ–আজ্ঞে আমি রামধন বাবুর পুরােণণা চাকর।
বীরেন্দ্রও বটে, বটে। তা কি দরকারে এসেছ ?
ভূতনাথ—আজ্ঞে হুজুর, বড় বাবুর মাথা খারাপ হয়ে
গেছে, তিনি সব জমিদারি বিশু সরকারের নামে
লেখা-পড়া করে’ দিয়েছেন। গিন্নি-মা আমায়
পাঠালেন, আপনাকে এর উপায় করে দিতে হবে।
বীরেন্দ্র—বিষয় ধীরেনের, ধীরেন যদি বিলিয়ে দেয়, তাতে
বাপু কিছু আর করবার জো নেই। ধীরেনের যে
মাথা খারাপ হয়েছে, এটা তােমর প্রমাণ করতে
পার ?
ভূতনাথ—হুজুর আপনার পায়ে পড়ি, আমি মুখসুখ
লােক অতশত বুঝি না—মনিবের বাড়ী চাকরি
করে এই পাঁচ শ টাকা জমিয়েছি, এই নি, আপনি
বিশু সরকারের নামে আদালতে নালিশ করে দিন।
আমি বেশ জানি, বড় বাবু লাখ টাকা কখনই ধার
করেন নি, ও বিশে ব্যাটার কারসাজি, কোম্পানির
বিচারে বড়বাবু আবার বিষয় ফিরে পাবেন।
৭৯

উদ্বোধন
[ প্রথম দৃশ্য
বীরেন্দ্র—তাও ত প্রমাণ করতে হবে যে ধীরেন অত
টাকা ধার করে নি।
ভূতনাথ-আজ্ঞে আপনি আমায় একটু বলে কয়ে
দিলে, আমি ওদিকে সাক্ষীর জোগাড় দেখতে
পারি। দোহাই হুজুর ! তিনি বেঁচে থাকলে কোন
ব্যাটার ঘাড়ে এমন রক্ত নেই যে বেইমানি করে।
অনেকদিন নেমক খেয়েছি, বােসেদের সর্বনাশ
প্রাণ থাকতে দেখতে পাব না।
বীরেন্দ্র-তা এ যা ব্যাপার পাঁচ শ’ টাকার কি হবে,
মকদ্দমা হয় ত বিলেত পৰ্যন্ত গড়াবে।
ভূতনাথ আমার বুকের রক্ত পাত করে’ টাকা এনে
দেব। আপনি টাকার জন্যে ভাববেন না, কিছু
পারি শেষে গিন্নিমার গায়ের গয়না বেচে দশ
হাজার টাকা এনে দেব।
বীরেন্দ্র—আচ্ছা, তােমার বাবু এলেন না কেন ?
ভূতনাথ—আগেই বলেছি হুজুর বাবুর মাথা খারাপ হয়ে
গেছে। দু’ কথায় , বিশের নামে জমিদারি
রেজেষ্টারি করে দিলেন, একবার খালি জিজ্ঞেস
কলেন “বিশুবাবু, উপরে, ধৰ্ম্ম আছেন, লাখ
৮০

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
টাকা কি সত্যই নিয়েছি ?” বিশে ব্যাটা পাষণ্ড,
অনায়াসে বল্লে “হ্যা বাবু, এক লাখ টাকা ধার
নিয়েছেন।” বাবু আর কোন কথা না বলে সমস্ত
বিষয় বিশের হাতে ছেড়ে দিলেন। হুজুর, বাবু যে
পথে ববে, ভূতনাথ বেঁচে থাকতে তা দেখতে
পারবে না।
বীরেন্দ্র—ভাল, আমি মকদ্দমা নিলুম, কিন্তু খরচা পত্র
দিতে হবে, আর যখন যা দরকার পড়বে যেন
পাই।
ভূতনাথ-ভগবান্ আপনার মঙ্গল করূবেন। বিশে
ব্যাটার ছেরাদ্দ করে তবে আমি জল গ্রহণ করব।
[ প্রস্থান ]
বীরেন্দ্রক’দিন সুধীর এল না কেন? অমন ইয়ার
আর হবে না। হরেন আছে বটে, বড় খােসামুদে,
অতটা ভালাে লাগে না। আজ আর হয়ত আবে
[ প্রস্থান ]
।
৮১
[ 6

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
দ্বিতীয় দৃশ্য
বিশু সরকারের কাছারী
বিশু সরকার ও রাখাল
রাখাল-বার, আপনি হলে কেউ খাজনা দিতে দু’কথা
কইবে না। কর্তা বাবু মরেছে, আপদ গেছে-
এমন সৃষ্টি ছাড়া লোক দুনিয়ায় ছিল না। আল্লা কি
নেই ? তবে বড় বাবুর জন্যেই মনটায় বড় কষ্ট হয়,
বড় বাবু কৰ্ত্তার মত নয়।
বিশু-কি করব বাবা, আমার দেনা হত, কিছু বলতুম
—পর, সে শুনবে কেন, কাজেই জমিদারী গেল।
তা তােমাদের কোন ভয় নেই।
রাখাল-হা বাবু সেই হলেই হল। আমরা অত
জানি না, যে আমাদের মুখপানে চাইবে—তাকেই
আমরা পীরের মত পূজো করব। | প্রস্থান ।
বিশু–এ দিকে ত এক রকম হ’ল। ওঃ, এমন সহজে
কি কেউ বড় মানুষ হতে পারে? মা কালী দয়া
করলেন তাই। কালীঘাটে গুষ্টি
কালীঘাটে গুষ্টি শুদ্ধ, গিয়ে

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
জোড়া পাটা দিয়ে আসব । নীলমণে ব্যাটার
জন্যেই যত ভাবনা। একে ব্যাটা মুখ, কি করতে
কি করবে—পণ্ডিতের সঙ্গে নরক বাস বরং ভাল
তবু মুখর সঙ্গে স্বৰ্গ কিছু নয়। ব্যাটা সব ভেস্তে
ছিল আর কি ? কর্তা যদি অক্কা না পেত, কি
সৰ্ব্বনাশই হত! ব্যাটার আর তর সয় না।
ভাগ্যে উইল লেখা-পড়া হয়ে গিয়েছিল, আর
কৰ্ত্তারও দিন ফুরিয়েছিল ! ব্যাটা হাজার টাকা পেয়ে
বিয়ে করে ফেলেছে, ব্যাটার যা চোদ্দ পুরুষে হয়
নি, তাই হয়ে গেল।
(নেপথ্যে নীলমণি-“বিশু দাদা–ওঃ বিশু দাদা!”)
বিশু -সৰ্ব্বনাশ, ব্যাটা আবার এসেছে। এইটেকে
গুম খুন করতে না পারলে বিষয় সুখে ভােগ করা
হবে না দেখছি। (জোর গলায়) কেহে ?—ভায় ?
আরে এস, এস।
নীলমণির প্রবেশ
নীলমণি—আরে বাবা রাজত্যি কছ, আমায় আর
ভােগও কেন, বাকিটা ঝাড় না ?

উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য । বিশু -আরে বস না। কেমন আছ ? বিয়ে করেছ নাকি ?—ভাল কেমন বিয়ে করলে ? নীলমণি—সে আর বােলাে না—বিয়ে করা না রাজত্যি করা--যতদূর গড়াই ততদূর বিছানা আর ঘড়িক ঘড়িক তামাক, বুঝেছ ?—আর বুঝেছ— বিশু –বেশ বেশ, তা কি মনে করে? আর কিছু চাই ? নীলমণি-আর কিছু-টিছু নয় বাবা, ও খুচরো নিয়ে সুবিধে হয় না। সংসারি হয়েছি, মিটিয়ে দাও, বাড়ী চলে যাই বিশু—তা নাও না। | প্রস্থান । নীলমণি— শালা ফাঁকি দেবার মতলবে আছে ? বাবা অমন করলে গােবর মাঠময় করে দেব, আমার আর কি, আমি ত নাম কাটা সেপাই। পিক- পকেটে ধরা পড়ে ছ'মাস শ্রীঘর বাস করেছি, আড়- কাটিতে ছেলে ধরে’ পাঁচ বৎসর ঘানি টেনেছি-না- হয় আর পাঁচ বৎসর ? তুমি ব্যাটা বিশে সরকার, তােমায় নাকের জলে চোখের জলে কব, তবে আমার নাম নীলমণি-যশােদার নয়নমণি। ৮৪ চতুর্থ অঙ্ক ] উদ্বোধন বিশু সরকারের পুনঃ প্রবেশ (নীলমণিকে অর্থ প্রদান। নীলমণি-কত ? বিশু-হাজার। নীলমণি বটে। আটাশে ছেলে নয় বাবা? ও-সব হচ্ছে , পঞ্চাশ হাজার চাই। বিশ-দেখ, তুমি বড় অন্যায় করছ। তুমি কি করেছ বল দেখি? নেহাৎ চক্ষু লজ্জার খাতিরে হ্যাণ্ড নােট- খানা নিজের নামে করিনি। তুমি কে হে ? যদি তােমায় আমি মাঝখানে খাড়া না করতুম— নীলমণি বটে! বিশু বাবু, দেখ আমায় ঘোঁচিয়ে তুমি কখনই সুখী হতে পারবে না, তা বছি । বিশু–এর আর কথা কি। তুমি যে আমায় বড় চোখ রাঙিয়ে কথা কচ্ছ ? তােমার ধারি নাকি ? নীলমণি—এখনও বছি যা কবে ভলাে কর’ বুঝে দেখ। বিশু–এর ভেতর বােঝা-বুঝি আর কি বল—টাকা ত আর পাইনি, জমিদারি পেয়েছি। নীলমণি—আচ্ছা তাই অর্ধেক দাও।

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিশুহাঃ হাঃ। তুমি জমিদারি নিয়ে করূবে কি ?
নীলমণি-তামাসা নয় বিশুবাবু , তুমি হাওনােটখানা
আমার কাছ থেকে বাগিয়ে মনে করেছ জিতেছ,
কিন্তু তা নয়। যদি আশা হতে বঞ্চিত কর,
আমার প্রাণে বড় দাগা লাগবে। এখনও বােঝ
--টাটকা গুকে ঘেঁটিয়ে না ।
বিশু-(মনে মনে) ভাল আপদ! হতভাগা আমার
কি করতে পারে ? মকদ্দমা করবে ? টাকা পাবে
কোথা? এ বাজারে টাকা না হলে কিছু হয় না।
এমন মুখটাকে অর্ধেক বিষয় ছেড়ে দিতে হবে ।
তা হতেই পারে না। নীলমণে পঞ্চাশ হাজার
টাকার বিষয়ের অধিকারী, ভগবানের খাতায়
কিছুতেই থাকতে পারে না।
নীলমণি-ভাবছ কি ? আমি এক কথার মানুষ, স্পষ্ট
জবাব দাও, আমি বাড়ী চলে যাই।
বিশু—তােমায় আমি এক পয়সা দেব না—যা দিয়েছি
যথেষ্ট হয়েছে
নীলমণি-কি ।
–কি। এক পয়সা দেবে না? বিশুবাবু,
আমি অত্যন্ত নির্বোধ, তাই তােমার কথায়

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
ভদ্রলােকের সর্বনাশ করেছি। ভেবে দেখ বিশুবাবু,
সে সময়ে আমার মত একটা লােক না পেলে
তােমার কাজ কিছুতেই হাসিল হত না। আমি
গরিব, চুরি ডাকাতি করেই আমার জীবন কাটে,
অত টাকা আমার সইবে না জানি, তবু আশায়
পড়ে তােমার দোরে হাঁটাহাঁটি করছি। তুমি
আমায় ফাঁকি দিলে, কিন্তু প্রাণ দিতে হয় সেও
স্বীকার, তােমার সর্বনাশ কবই করব।
[ প্রস্থান ]
বিশু-বেটা আমার কি করবে ? মকদ্দমা করবে ?
টাকা পাবে কোথায় ?••ছোঁড়াটাকে কিছু দিলে
তৃতীয় দৃশ্য
নদীতীর
ধীরেন্দ্র
ধীরেন্দ্র-অমল ধবল নিশি; জ্যোছনায় ধুয়ে
গেছে ধরণীর দেহ, অন্ধকার রাশি
৮৭

} উদ্বোধন [ তৃতীয় দৃশ্য সভয়ে লুকায় ঝোপে ঝপে, প্রকৃতির কুটিলতা বিজন কুটীরে। ঘুচে গেছে সংসার বাঁধন, ত্যাগের উজ্জ্বল দৃশ্যে আলােকিত হৃঙ্গভূমি-বাসনার বেড়া বাঁধা হৃদয়ের পাশ, দৃষ্টিহীন নিবিড় তমসাপূর্ণ সমস্ত বেদনা সেথা লয়েছে আশ্রয়। গেছে ধন, গেছে মান, গেছে যশােরাশি, গৃহহীন আজি, লােকচক্ষে উন্মাদ হইয়া ভ্ৰমি, বাস- ভূমি হয়েছে শ্মশান-সংসারের সব সুখে একে একে বিচারে নিরস্ত করি, ডুবায়েছি বিস্মৃতির কোলে ; তবু কেন শান্তিধারা ঢালি, ক্ষুদ্র প্রাণ শীতলিতে নারি। হায় ক্ষুদ্র জীব ! শুধু ক্রীড়নক তুমি, ক্রীড়াচ্ছলে খেল যার করে, তার তরে ব্যাকুলতা কোথা ? কি বলে ডাকিব তােম, ওগাে মাের অন্তরদেবতা, তুমি যদি সকলের পিতা, ব্যাথা কেন বাজে সন্তানের, কেন পথ রেখেছ লুকায়ে ? ৮৮ চতুর্থ অঙ্ক ] উদ্বে দ্বোধন কেন অন্ধ আঁথি, কেন পঙ্গু অসমর্থ উপনীতে তব পাশে ? দাস আমি, দুঃখ- ভারে পীড়িত অন্তর, করুণায় কোলে তুলে লও, বােঝা আর বহিতে না পারি । ধনাক্ষ্যাপার প্রবেশ ধনাক্ষ্যাপা-দিব্যজ্ঞানপ্রদায়িনি, দিব্যজ্ঞান দাও গাে আমারে, দুজ্ঞে য রচনা তব, দিব্য- চক্ষে দেখি গাে জননি। নিশীথিনি, এই যে ফুটন্ত হাসি, কার প্রতি হাসি করি পরকাশ লীলার লহরী তুলিয়াছ বিশ্বরাজ্যে ? কার চুরি করা রূপরাশি জড়ায়ে আপন অঙ্গে সুষমায় ভরে দেছ নিখিল জগৎ ? নিশি-পুষ্প, কোথা হ’তে কাহার সৌরভ বুকে করে আনিয়াছ এ মরতে ? মুগ্ধ জীব গন্ধ ঘ্রাণে তব । প্রতি পরমাণু কাহার বিভূতি ধরি এ ধরা রচেচে ? কার সুশাসনে বহে নদী কলরােলে, ছুটে চলে’ সাগরের ৮৯ উদ্বোধন [ তৃতীয় দৃশ্য কোলে ? দিবাকর করে পরকাশ দিব্য জ্যোতিঃ ? সাধুর পবিত্র করে কে দিয়াছে সত্যেরে বাছিয়া ? পর্জন্ত প্রাণীর প্রাণ, ভূমি কেন বীজের আধার ? এ রহস্য অতি চমৎকার, তুমি না বুঝলে দেবি কে বুঝাতে পারে ? [ প্রস্থান ] ধীরেন্দ্র-- তুমি না বুঝলে দেবি কে বুঝাতে পারে ? কে দেবী ? কোথায় দেবী তুমি কি গাে মূর্তিমতী, মানবের মত? মানবভাষায় তুমি কি গাে বুঝয়ে দেবে ক্ষিপ্ত সন্তানেরে—তুমি আছ ? সুধীর- সুধীরের প্রবেশ হে যুবক, সকল সংশয় নিমেষে টুটিয়া যায় দেবতার বরে। এস যদি মম সাথে একজনে দিব দেখাইয়া, যে তােমার দুঃখভরা প্রাণে ঢেলে দিবে অমৃতের চতুর্থ অঙ্ক ] উদ্বোধন ধারা-শান্তি পাবে, সমস্ত বেদনারশি যাবে পলাইয়া। ধীরেন্দ্র- ভাল, তাই হােক। কিন্তু এই শেষ হেথা সেথা বৃথা আনাগােনা। [ উভয়ের প্রস্থান) চতুর্থ দৃশ্য পথ নীলমণি নীলমণি-উঃ। পঞ্চাশ হাজার টাকা—পঞ্চাশ হাজার টাকা। শালা ফাঁকি দিলে ? কি কব, আমার কথা কে গ্রাহ করবে ? আমি চোর, আমি ভণ্ড, আমার কথা কে শুনবে ? উঃ! পঞ্চাশ হাজার টাকা ফাঁকি দিলে! চুরি বিদ্যে এইবার ছাড়ব, ফাঁকি আর কাউকে দেব না। আমার আক্কেল হয়েছে। উঃ, পঞ্চাশ হাজার টাকা। বাড়ীতে চাল নেই, পরের মেয়ে গলায় ঝুলিয়েছি, তাকে খাওয়াতে হবে ;

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
!
—কি খাওয়াব ?...উঃ, পঞ্চাশ হাজার টাকা।
যাগে ভিক্ষে করে খাব,আর ভিক্ষে করেই বৌকে
খাওয়াব। পঞ্চাশ হাজার টাকা শালা ফাঁকি
দিলে ? • যাগে, আর ভাবব না, ভিক্ষে করে’
খাব। বিশেরে, তুই বেটা দম ফেটে মরবি,
মুফরাসে তােকে পােড়াবে। পঞ্চাশ হাজার টাকা।
জনৈক ভদ্রলােকের প্রবেশ
নীলমণি-মশাই ভিক্ষে দিন, আর চুরি করূব না,
ভিক্ষে করে খাব। বিশে শালা আমায় ফাঁকি
দিয়েছে—পঞ্চাশ হাজার টাকা ! দিন মশাই ভিক্ষে
দিন।
ভদ্রলােক-আ মল, কোথাকার আপদ কোথায় !
[ প্রস্থান ]
নীলমণি-উঃ! এত ছােট হলুম, এত বিনয় করে’
বল্লম, তবু ভিক্ষে দিলে না? মানুষকে ভিক্ষে
করূতে নেই—চুরি করেই খেতে হবে, লােকের
গলায় পা দিতে হবে। কি করব, আমায় যে
কেউ ভিক্ষে দেবে না—কিম্বা আমায় ভিক্ষে করতে

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
নেই, ভিক্ষায় অভাব মেটে না। বলহীন নই,
বােবা নই—যাচিঞা করব না; চুরি করব, ডাকাতি
কব, গলায় ছুরি দেব ।
;
ভূতনাথের প্রবেশ
নীলমনি-মশাই ভিক্ষে দিন। পঞ্চাশ হাজার টাকা
ফাকি দিয়েছে। ওরে বিশেরে, দম ফেটে মবি
দম ফেটে মবি !
ভূতনাথ-একি, লােকটা দেখছি পাগল, এ বিশে
ব্যাটার নাম করে কেন ? ওঃ, এ যে সেই দেখছি।
ওহে, তােমার এদশ করলে কে ?
নীলমণি—ভিক্ষে দিন। না না, ভিক্ষে চাই না ;
চুরি কব-জেলে দেবেন? ভয় নেই। বিশেরে,
পঞ্চাশ হাজার টাকা!
ভূতনাথ-এর ভেতর কিছু আছে। এই নাও।
অর্থ প্রদান )
নীলমণি—আপনি দেখছি ভদ্রলােক। মশাই, বিশে
ব্যাটা আকাশের চাঁদ হাতে ধরে দিয়ে নিজের
কাজ করে নিলে, আশার কুহকে ফেলে আমায়

উদ্বোধন [ চতুর্থ দৃশ্য পাগল সাজিয়ে দিলে। বিশের ভাল কিছুতেই হবে না, সে ব্যাটার কুট মহাব্যাধি হবে। ভূতনাথ-পঞ্চাশ হাজার টাকা কি বল্‌ছ ? নীলমণি—বােসেদের খাজনা গাপ করে’ বড়বাবুর কাছ থেকে দশহাজার বলে’ লাখ টাকার হ্যাণ্ড- নােট কেটে নিয়েছে—আমায় পঞ্চাশ হাজার দেবার কথা, তা শালা আমায় ফাঁকি দিলে । ওরে বিশেরে•••••• ভূতনাথ-লােকটাকে হাত করলে অনেক কাজ হবে দেখছি, ধৰ্ম্মের ঢকি আপনা আপনিই বেজে ওঠে। দেখ, তােমার কোন ভাবনা নেই, আমি তােমায় খেতে দেব, ভিক্ষে করতে আর হবে না। আদালতে তুমি যা জান সব কিন্তু বল্‌তে হবে। নীলমণি—আমায় তুমি দুটি দুটি খেতে দিও, আর আমার বৌ আছে ' তাকেও খেতে দিও, আমি তােমার গােলাম হয়ে থাকব। বিশে ব্যাটার সৰ্ব্বনাশ করতে আমার জান দিতে হয় সেও স্বীকার। উঃ ব্যাটা আমায় পথের ফকির করেছে পঞ্চাশ হাজার টাকা ফাঁকি দিয়েছে। ৯৪

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
উদ্বোধন
ভূতনাথ-দোহাই মা কালি, এ দায়ে যদি উদ্ধার পাই
সােণার মটুক দিয়ে তােমায় পূজো দেবে।
লােকটা জাল হাওনােটের সকল কথাই জানে
দেখছি। টাকার শোকে মাথা খারাপ হয়ে গেছে,
খাওয়ালে দাওয়ালে ঠাণ্ডা হবে। তুমি এস,
তােমার কোন ভাবনা নেই, যা দরকার আমি
সব দেব।
তােমার বৌকে ও নিয়ে এস, আমি
ঘর দেব, থাকবে।
নীলমণি-আর চুরি করূব না, লােকের সর্বনাশ
করব না, তােমার গােলাম হয়ে থাব! বিশে
ব্যাটার বুকের রক্ত পাই ত প্রাণের আলা জুড়ােই ।
ভূতনাথ-এস, আমিও
তােমার মত পাগল হয়ে
আছি। বিশের সর্বনাশ তােমা হতেই হবে,
আমি উপলক্ষ মাত্র।

উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য পঞ্চম দৃশ্য কালীমন্দির ধনাক্ষ্যপা (গান) ধনা- জেগেছে নূতন ভাবনা যেতে হবে এঘর ছেড়ে কোথায় যাব তা নাই জানা। যেন চুপে এসে কে কাছে বসে কত কথা কয় হেসে হেসে নে যাবে সে নূতন দেশে কারু কথা শুনবে না। এ ভারত দেবতার লীলানিকেতন যুগে যুগে অধৰ্ম্মে করিয়া ক্ষয়, সত্য যাহা প্রকাশের ছলে মানব আকারে আপনি উদয় হন জগতের পতি। বাজে বাঁশি বাপীতটে সুমধুর সুরে, সে সুরলহরী তরঙ্গে তরঙ্গে বয়ে যায় গৃহস্থের দ্বারে, মুগ্ধ যত নর-

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
নারি বাদকের করে গুণগান। হেসে
ফেরে পবন ঘৃণায়, মানবের হেরি
আচরণ, ক্ষোভে দুঃখে অভিমানে। ওহে
লীলাময় আমরা কিছুই নই, যত
কিছু তােমার মহিমা, তরঙ্গ আকার
মাত্র, মহিমা মণ্ডিত হয়ে লােক হৃদে
করিয়া ভ্রমণ, তােমার লীলার গুণ
করি পরকাশ-খ্যাতি যশ কিছু নাহি
চাই—চাহি শুধু তােমারে জানিতে। আসি
এই নরাকারে সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম
অবনীতে করিতে প্রচার, একা এসে
নির্জনে বসিয়া অবিরত বংশীধ্বনি
কর, সে ধ্বনি বহিয়া ঢালিয়া দিয়াছি
কানে যত ভাবুকের, ভারতের শেষ
কীৰ্ত্তি ভস্মস্তুপে ছিল যারা জেগে বসে,
একে একে ছুটে আসে তােমার আহ্বানে।
হে দেবতা আমারে বিদায় দেহ, লীলা
খেলা দূর হতে দেখি তব।
[ প্রস্থান ]
৯৭
[7]

উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য ধীরেন্দ্রের প্রবেশ ধীরে-- এই সেই সন্ন্যাসীর পবিত্র আশ্রম। দ্বিপ্রহর নিশি, সমস্ত জগৎ ঘুমায়ে পড়েছে যেন দিবসের শ্রমে ! সুধীর এরই কথা বলেছিল—কোথা সে তাপস ? সে কি কভু হরে’ নিয়ে হৃদয়ের ব্যাথা চির শান্তি ফিরে দেবে ? কে-কে সে মহাপুরুষ ? অষ্টমীর চঁাদ অর্ধ নিশি আপনার কিরণমালায় ভুবন সাজায়ে দিয়ে বুঝি পুনঃ ঢলে পড়ে গগনের গায়, এখনি আঁধারে বিশ্ব ডুবিবে আবার। কোথা তুমি হে সন্ন্যাসি, এস শয্যা ত্যাগি, এ ব্যাধির কর প্রতিকার ; বড় জ্বালা অন্তরে রাখিয়া, এসেছি তােমার পাশে। কৈ কেহ নাই ? কোথা তুমি ? রুদ্ধ যে গৃহ- দ্বার। ( দরজায় ধাক্কা দিয়া ) উঠ উঠ, যদি কেহ থাক।

চতুর্থ অঙ্ক ]
উদ্বোধন
রামদাসের প্রবেশ
রামদাস
আয়
ওরে চির পরিচিত চির আদরের
মহাকৰ্মী, তাের অপেক্ষায় কত নিশি
জাগরণে গেছে কাটি —আজি কি পড়েছে
মনে ?
ধীরেন্দ্র--- একি আজ নব উন্মাদনা! যেন
কত জানাশুনা ছিল এর সনে, যেন
জন্ম জন্ম এরি পায়ে বাঁধা প্রাণ, যেন
জীবনের যাহা কিছু আছে, সব দিতে
আসিয়াছি হেথা। এ কি দুৰ্বলতা? ওগো
যাদুকর কি মন্ত্র প্রভাবে হরে’ নাও
সৰ্বস্ব আমার—কায় মন সকলি কি
নেবে কেড়ে ? আমি বলে রাখিবেনা কিছু ?
রামদাস—ওরে ওরে হৃদয়ের ধন, নবযুগ
আসিছে নবীন সাজে, উজলিয়া সারা
ধরা তরুণ তপন, গগনের গায়ে
যেন। ঐ দেখ মার মুখে হাসি, হাসিছে
৬

উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য জননী আজি, দোহার মিলন হেরি। হে বাছনি চিনিতে পার না ? চিনিতে পার না আপনার ভাব যদি ভাষায় হয় আবির্ভাব ? শক্তি যদি মূর্তিমতী হয়ে সম্মুখে দাঁড়ায়, কৰ্ম্ম যদি ধরে কভু কর্মীর আকার ? শুন বাছা যুগে যুগে এইরূপে দোহে আসি যাই ; তুমি যন্ত্র আমি যন্ত্রী, তুমি বল আমি বুদ্ধি, দোহে মাের বিধির নিয়মে বাঁধা। ধীরে- টুটিয়াছে সংশয় বাঁধন। তবু চাহি হে তাপস যুক্তি তর্কে কাৰ্য্য মম স্থির করে নিতে। দুটি প্রশ্ন। জান কি, কে রচেছে বিশাল ধরণী, জলে স্থলে অন্তরীক্ষে মহিমা যাহার অনাদি অনন্ত কাল করিছে প্রচার? রামদাস হাঁ জানি, সে এই বিশ্বের রাণী, যার কোল ছাড়া হলে আতঙ্কে শিহরে- প্রাণ, যার করুণায় হাসি খেলি আত্ম- চতুর্থ অঙ্ক ] উদ্বোধন হারা হয়ে, যার অতুল বিভবে হাসে ধরা বিপুল পুলকে। হে যুবক, তুমি আসিয়াছ হেথা দেখিবারে জগতের মায়ে? ধীরেন্দ্র- একি এ নূতন কথা শুনি আজি সন্ন্যাসীর মুখে ? হে দেবতা, তুমি কিগে দেখায়ে দেবে বিশ্ব জননীরে চঁাদেরে দেখায়ে দেয় অঙ্গুলিনির্দেশে সন্তানে প্রসূতি যথা ? সত্যময় অগ্নিবর্ণে এ ভাষা তােমার মুখে, হৃদয়ের দুর্ভেদ্য আঁধার নিমেষে করেছে দূর। বল হে সন্ন্যাসী চরণে ধরি, সংশয়ে রেখ আর, বল ত্বর, এই দুটো অাঁখিতার। দিয়ে তাহারে কি দেখা যায় ? তঁার বাণী মরমে কি বাজে ? সে কি হে জীবন্ত রূপে আমা সম অভাগারে দিবে দরশন ? রামদাস—অসম্ভব কিবা আছে ? শুন বাছা, ছেলে শুনে জননীর কথা, মাতৃক্রোড়ে রহে যেই সেই সদা মাতৃমূর্তি হেরে। ওয়ি

উদ্বোধন
[ পঞ্চম দৃশ্য
মাতঃ, এ পাগল তাের কাছে সদা যেতে
চায়।
ধীরেন্দ্র নাও তবে সৰ্বস্ব আমার ; দেহ
মন জীবন যৌবন সমর্পিনু সব
তব করে-জননীরে দেহ দেখাইয়া।
রামদাস-শক্তিমন্ত্র দিব তাের কানে, সার ধরা
স্তম্ভিত হইবে শুনি তাের বীরবাণি,
এ ভারত মৃত দেহে পাবে নব প্রাণ,
আৰ্য্যধৰ্ম্ম পুনরায় আসিবে ফিরিয়া ।
১.২

পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
রামধন বসুর বাটীর সম্মুখস্থ রাস্তা
ভূতনাথ ও নীলমণি
ভূতনাথ-এই বাড়ীর একদিন কি জাঁকই ছিল।
পূজোর সময় কত ছেলে পিলে এসে ঠাকুর গড়া
দেখত-রাত্রিদিন সােরগােলে বােসেদের বাড়ী
সরগরম থাক্ত।
গিন্নিমা সোঁত বছরের মধ্যে
মারা গেলেন, বড়বাবু বিবাগী হলেন। যা কিছু
ছিল সব খরচ করে’ মকদ্দমা চালালুম-বরাতে কি
আছে তা-ও জানিনা। বিলেত থেকে হুকুম এলে
যা হােতূ হবে-আর ছাই বিষয় ফিরে পেলেই বা
ভােগ করূবে কে ?
নীলমণি-ভূতে দা, তুই অত ভাবিস কেন ? বরাত
ছাড়া ত পথ নেই।
ভূতনাথ-নীলু, আমার ভাবনার কথা তুই কি বুঝবি ?
এই বাড়ীর ইট পুততে তদারক করেছি, আবার ঐ

উদ্বোধন
[ প্রথম দৃশ্য
দেখ বাড়ী ভাঙতে আরম্ভ করেছে তাও দেখছি।
চোখের সাম্নে ভােজ বাজীর মত, ফুলের মত ফুটে
উঠল আবার রােদের তাতে সব শুকিয়ে মাটিতে
ঝরে পড়ল। নীলু, এও আমি বুড়ো বয়সে বসে
দেখছি।
নীলমণি—আর দুঃখ করে’ কি কবি ভূতে দা।
শুনলুম বড়বাবু রামদাস বাবাজীর আখড়ায় আছেন,
মকর্দমার খবর যদি ভাল হয়,আমি হাতে-পায়ে ধরে
বড়বাবুকে বাড়ীতে আন্ব, বিয়ে থা দিয়ে বােসেদের
সংসারকে যেমন ছিল তেমনি করে তুলতে হবে।
ভূতনাথ–সুখ এক বার আসে ; কারাে বা আগে, কারাে
বা পিছে। বোসেদের সুখের দিন ফুরিয়েছে, আর
সেদিন ফিরবে না, গিন্নিমা সৰ্ব্বস্ব খরচ করে’ মকদ্দমা
চালিয়ে গেছেন—হায়, হায়, তিনিও শােকে দুঃখে
কোথায় চলে গেলেন।
নীলমণি-ভূতে-দা এক কাজ করূলে হয় না?
ভূতনাথ–কি ?
নীলমণি—এত সৰ্ব্বনাশ ত ঐ বিশে ব্যাটা করলে, তা
ব্যাটাকে থােড়কুঁচি ককূলে হয় না।
১০৪

পঞ্চম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
ভূতনাথ—ছিঃ, নরহত্যা মহাপাপ।
নীলমণি—যে শত্রু, যার কাৰ্য্যে গ্রামের একটি বর্ধিষ্ণু
পরিবার ছারখার হয়ে গেল, তাকে হত্যা ককূলে
কি মহাপাপ হয় ?
ভূতনাথ-বড়বাবুর মুখে শুনেছিলুম বটে শত্রুবধে পাপ
নেই, কিন্তু রাজা ত ছাড়বে না।
নীলমণি—রাজা ত মানুষ, মানুষ আমার কি কতে
পারে ?
প্রাণ নেবে বই ত নয় ? এ প্রাণ ত
চিরকালের জন্য নয়, তবে আর ভয় কিসের? ভূতে-
দা, ও শুধু তােমার আমার শত্রু নয়, ও দশের
শত্র, দেশের শত্রু।
'ভূতনাথ-ভগবান্ আছেন। তিনি এর দণ্ড দেবেন,
তুমি আমি কে নীলমণি !
নীলমণি—ভগবান দণ্ড দেবেন ! আমি অত তত বুঝি
। ভগবান তবে আমাদের সৃষ্টি করেছেন কেন ?
একটি সামান্য পাপীকে দণ্ড দিতে হলে, যদি
ভগবান্‌কে শাসনদণ্ড নিতে হয়, তবে তুমি আমি
কিসের জন্য ?
রাজা সােণার সিংহাসনে বসে
থাকেন, রাজার কর্মচারী দেশ শাসন করে ;

উদ্বোধন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
ভগবান্ স্বর্গে, আমরা তার কর্মচারীরূপে কি
অন্যায়ের সাজা দিতে পারি না? অবশ্যই পারি।
ভয় কিসের ? দুনিয়ায় যদি ভয় করতে হয়, তবে সে
একমাত্র ভগবান্‌কে, নীলমণি আর কাউকে ভয়
করে না। বিশে ব্যাটার দিন ফুরিয়েছে, ভূতাে দা
এ কাজে আমায় বাধা দিস্ না।
ভূতনাথ–স্বভাব ত মলেও যায় না।
নীলমণি চল
ভাই, এ্যাটর্নি বাবুর বাড়ী যাই।
নীলমণি—চল।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
দ্বিতীয় দৃশ্য
কালী মন্দিরের মধ্যেকার প্রাঙ্গন
রামদাস, ধনাক্ষ্যাপা, ধীরেন্দ্র, সুধীর প্রভৃতি
রামদাস—সত্যকথা, এ জগৎ মহাকৰ্ম্মক্ষেত্র,
অলসতা এ ক্ষেত্রের মহাপাপ। ভাবে
করে নরে কৰ্ম্মবীর ; কঠিন শৃঙ্খল
লৌহময়, হেমহারে হয় পরিণত,
;

পঞ্চম অঙ্ক ) উদ্বোধন যদি তারে স্পর্শে কভু পরেশ পাথর। মাতৃভাব মহারত্ন হৃদয়ে পাইলে স্থান, মানব দেবত্ব পায়, ছিড়ে ফেলে সংসারের জাল। স্বতন্ত্র স্বাধীন সেই ভাবের অমর বীৰ্য লভেছে যে জন । বৃথা আলােচনা, বৃথা সে প্রচার কার্য্য যদি তাহে ভাব নাহি রয়। হে সাধক যাও তুমি মহাভাব লয়ে, ফির দেশে দেশে। নিয়তির আবর্তনে ক্লিষ্ট নর- নারি, অমৃতের পাইলে আস্বাদ, বৃথা সুখে দূরে পরিহরি সত্যেরে ধরিবে বুকে ; আবার উজ্জ্বল চিত্র ভারতের ইতিহাসে উঠিবে ফুটিয়া। স্তুপীকৃত তুলারাশি ক্ষুদ্র অগ্নিস্পর্শে যথা নাশ পায়, সব দুঃখ যাবে দূরে, ধৰ্ম্মনীতি জগতে প্রধান। রিপুকুল অতিশয় ব্যাকুল করিবে যবে, ব্রহ্মচর্য মহা অস্ত্র করিবে ধারণ, ত্রাসে রিপুরাজি বিমলিন হবে, ত্যাগের পবিত্র শক্তি উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য উঠিবে জাগিয়া। যদি এসেছ এদেশে এমন পদাঙ্ক তুমি যাইবে রাখিয়া, যেন ভাবীবংশ অবহেলে সেই পথে চলিবারে পারে। যা ও বৎস! মনে রেখাে হিংসায় হবে না কাৰ্য; চাই প্রেম, ভক্তি মুক্তি বিবেক বৈরাগ্য—এ সকল প্রেম- প্রস্রবণ। ধীরেন্দ্র - আসি তবে হে তাপস, দূরে বহুদূরে যাই চলে। চরিত্রসম্পদ মানবের প্রধান সম্বল। ব্রহ্মচর্য্য মহাশক্তি। মা গো ! তােমার সন্তান ভুলে গেছে আৰ্য রীতিনীতি, হীরকে ফেলিয়া দূরে কাচেরে আদর করে। মােহমদে মত্ত আৰ্যভূমি, মিথ্যা স্বপ্ন ভেঙে দিতে হবে, গুরুদেব ! আশীষ সন্তানে, যেই শিক্ষা লভিলাম তব পদমূলে, ব্যর্থ কভু নাহি হবে তাহা। মৃন্ময়ী জননী পূজি চিনিয়াছি দেশজননীরে, মাতৃ- ভাব মাতৃভক্তি প্রচারিব দেশে দেশে, ১০৮ পঞ্চম অঙ্ক ] উদ্বোধন পশ্চিম প্রদেশ কুটনীতিজালে পশু- বলে আবদ্ধ করেছে পূৰ্ব্বে, পূৰ্ব্ব হ'তে মহাশক্তি জাগাব নিশ্চয়, সমুদয় ধরা পদানত হবে পূরবের, ধৰ্ম্ম- যুদ্ধে বীরজাতি হবে পরাজিত। আসি তবে হে সন্ন্যাসি, পেয়েছি নূতন মন্ত্র, চলিলাম তােমারি আদেশে [ প্রস্থান! সুধীর- গুরুদেব, আমার কি হবে ? রামদাস মাতৃভাব দুইবিধ। মার্জারশাবক, দেখ, জননীর সদ। কোলগত, মুখে করে’ হেথা সেথা করে আনাগােনা ; নিতান্ত অধীন রহে নিজ জননীর, প্রয়ােজনবােধে ক্ষীণ কণ্ঠে করে শব্দ, জননীর করুণা লালসি। অন্যদিকে হের অভাব। লভি জন্ম মাতৃক্রোড়ে বুঝে লয় আপনার কাজ কপির শাবক দৃঢ় করে ধরে বৃক্ষ শাখ', স্বভাবের বশে ঘুরি ফিরি পুনঃ উদ্বোধন [ দ্বিতীয় দৃশ্য আসি জননীরে করে আলিঙ্গন। বাছা তুমি রহ জননীর কোলে, সংসারের শান্তিতরুরূপে-তাপক্লিষ্ট সংসারের যত পাখী শাখী নাশিবে রজনী এলে তােমার আশ্রয়ে দিবসের সব শ্রম। সুধীর— তবাদেশ প্রাণপণে পালিব নিশ্চয়। [ প্রস্থান ] ধনাক্ষ্যাপা-হে দেবতা, কাৰ্য্য অবসান, আর কেন আমারে বাঁধিয়া রাখ ? যে বীজ রােপিলে আজি ভারতের বুকে, কালে তাহা হবে পরিণত। ঘরে ঘরে প্রসবিবে কুল- লক্ষ্মীগণ বীরপুত্রগণে, দৃঢ়মনা নির্ভীক কুমার হেরি শমন ডরাবে। অমর ভবন সম সুজলা সুফলা শ্যামা, চিরফুল্ল এই হিন্দুস্থান গাবে ভবে তােমার মহিমা গান। মসী-মাখা ভব-কারাগারে তরাসে রহিতে নারি, কি জানি কথন লাগে কলঙ্কের কাল দাগ। হে দেবতা, আমারে বিদায় দেহ। ১১০

পঞ্চম অঙ্ক )
উদ্বোধন
রামদাস—ধনেশ্বর, দু’জনায় চলে যাব এক
সঙ্গে এক পথে, তাই তােরে ছেড়ে দিতে
নারি। ব্রহ্মচারি, তরাস কিসের ? মহা
বীৰ্য্য ব্রহ্মশক্তি ব্ৰহ্মরন্ধে যত্নে রেখে
দেছ, কার সাধ্য তােমারে টলাতে পারে
পাপের কুহক রাজ্যে ? গাহ একবার
তার স্বরে মায়ের মহিমা গান, ঘুচে
যা মনের আঁধার ।
ধনাক্ষ্যাপা
যথা আজ্ঞা দেব।
(গান)
চিত নিমগন প্রেম সাগরে।
নিমগিয়া নিরবধি ভাব সদা মুলাধারে।
সেথা বিকশিত অরুণ কিরণ ছট!
মধুগন্ধ মাখা মুক্ত মলয় মারুতে
তিরপিত দরশন কিবা রূপের ঘটা
তুমি হৃন্ময়ী চিণায়ী জগৎপালিনী রে,
নাশ আঁধার সঞ্চয়ি নিতি নিতি এ সংসারে ॥
১১১

উদ্বোধন
[ তৃতীয় দৃশ্য
তৃতীয় দৃশ্য
বীরেন্দ্রনাথের বৈঠকখানা
বীরেন্দ্র ও হরেন
বীরেন্দ্র-ছিঃ ছিঃ সভ্যতার আলােকে ভারতের ললাট
দেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল, এমন সময়ে ক’ব্যাটা
বাবাজী জুটে দেশটাকে টেনে ধরে রাখলে। হরেন
তুমি কি বল ? হাঁহে, ধীরেন একেবারে গোড়া
হয়ে উঠেছে নাকি? সুধীরও না ? আ মােলো !
ব্যাপার কি ?
হরেন—( মদ্যপান করিয়া) আর বাবা দেশের মধ্যে কি
মানুষ আছে, তা না হলে রাম ব্যাটার খাতির
বাড়ে ? আমি বড় গলা করে বলতে পারি, তােমার
মত গলার আওয়াজ আর কারাে নেই।
বীর—শুধু আওয়াজ ?
হরেন—কত কারচুপি, যেন পরদায় পরদায় ওঠে,
পরদায় পরদায় নামে—শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি।
বীরেন্থ—দেশটা ত জমে ?
হরেন—একেবারে আচার।আমি ত লক্ষ্মীপূজো তুলে
দিয়েছি, লােকে আমায় লক্ষ্মীছাড়া বলে।
১১২,

পঞ্চম অঙ্ক ] উদ্বোধন কি এ বীরেন্দ্র-বলুকগে। হরেন- বৈ কি। তুমিই আমার authority, শাস্ত্রের পােকা। বীরেন্দ্র—যাক্। ধীরেন কি লেক্চার দিচ্ছে। হরেন—আরে ছিঃ, সে কটা লােকে শােনে ? দেখছ না এখানে কল্কে পেলে না, বিলেত যাচ্ছে। সেখানে গেরুয়ার বােপ পা ঝুপপি ঝুপি চলবে ? তার বাবা Raw goods, Brandy না হলে হজমের জোটী নেই। বীরেন্দ্র—কি বাজে বছি। হরেন-বাজেই বছি ! বলি ও ব্যাটার আক্কেল কি, ব্যাটা বড় বেআক্কিলে। আর ঐ সুধীরটা, তােমার কত খেয়েছে বল দেখি? একটু ধৰ্ম্মজ্ঞান নেই। যার খাই তার গাইতে হয়। ব্যাটা নেমক- হারাম। বীরেন্দ্র-ছিঃ ছিঃ ! হে ভারতবাসী, তােমাদের অদৃষ্টে সুখ নেই। প্রতিমা পূজার কথা আবার তুলতে আছে—না-ও-সব ভণ্ডামির বেশে আর সভ্য জগতে যেতে আছে। ভারতবাসীকে একে ত | [ ৪ ]

উদ্বোধন
[ তৃতীয় দৃশ্য
সকলে অসভ্য বলে, ধীরেন যদি পাগলামি করে
বিলেত যায়, তবে ত দেশের দফা রফা ; সাহেবরা
হাসবে আর কি। ছিঃ ছিঃ !
হরেন—গলায় দড়ি। গলায় দড়ি।
বীরেন্দ্র-ও কিসের জন্য যাচ্ছে ?
হরেন-প্রচার, প্রচার-ওর গুষ্টির মাথা। ছোঁড়াটা
পাগল হয়ে গেছে। আর ঐ এক ব্যাটা রামদাস,
নচ্ছার ব্যাটা কি যাদু জানে—যত ষণ্ডা ষণ্ডা
ছেলে গুলােকে ভুলিয়ে রেখেছে। বিয়েথা করতে
দিচ্ছে না, শুনতে পাই কতগুলাে ছুড়ি ওর
ভেতর আছে, তারা সবাইকে ভেড়য়া করবার ওষুধ
জানে।
বীরেন্দ্র—কি পাগলামি কর ।
হরেন—পাগলামিই করছি বটে
বীরেন্দ্র—এ কি ভাবও ব্যাটা বাবাজীর এমনকি শক্তি
আছে যে এত শিক্ষিত লােকগুলােকে দেখতে
দেখতে বস করে ফেলে ? ধীরেনের মকদ্দমার
খবর কিছু বল্‌তে পার ?
হরেন—নাও কথা। হাতি ঘােড়া গেল তল, ভেড়া
!

-
পঞ্চম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
বলে কত জল। তুমিইত ওদের Case conduct
করছিলে ?
বীরেন্দ্র-Caseটা আমার হাতে ছিল বটে কিন্তু আমি
ছেড়ে দিয়েছি।
হরেন—তবে ত হার হয়েই রয়েছে। পয়সাকড়ির টান
পড়েছিল বুঝি ?
বীরেন্দ্র-তুমিও যেমন, ছোটা নিয়ে কে ঘুরে মরে
বল। বিজয় ছোঁড়া নতুন ব্যারিষ্টার হয়েছে,
শুছি কেষ্টা নিয়ে খুব খাটছে—আমার কাছে
অনেকবার information নিতে এসেছিল।
হরেন—বিলেত আপিল করেছে, তাহলে বিষয়টা
পেলেও পেতে পারে। তুমি বাবা রাঘব বােয়াল,
আস্ত গেল--তােমার হাত থেকে গেছে পরীবের
ভরসাই হয়েছে।
বীরেন্দ্র—কি ভাবছ ?
হরেন—একটা Programme করে ফেল, নেহাত
নিরিমিষ্যি যাচ্ছে।
বীরেন্দ্র-চল বাগান যাওয়া যাক।
হরেন—সেই ভাল।
[ উভয়ের প্রস্থান ]

উদ্বোধন
[চতুর্থ দৃশ্য
চতুর্থ দৃশ্য
রামধন বসুর বাটী
বিশু সরকার
বিশু-~~ ওরে হরে, এক ছিলিম তামাক দিয়ে যা না,
ব্যাটা কোথায় যায় তার ঠিক থাকে না। ঘরটায়
আর একবার কলি ফেরাতে হবে দেখছি। পূঙ্গে।
আছে, দালানটায় এক পোঁছ রঙ দিলে মন্দ হয়
। কার টাকা কে খায় দেখ। কত ফেরফার
করতে হল। আমার মাথাখানার দামই ত
লাখ টাকা। নীলমণে ব্যাটা মকদ্দমাটা ফাঁসিয়ে
দেবার যােগাড় করেছিল। ধীরেনবাবুর হাতে
মকর্দমাটা থাকত ত বেশ হত ; বিজয় ব্যাটা
একটা আস্ত খটকা, বিলেতে আপিল করেছে কি
খবর আসে কি জানি! আর যাই আসুক, জমি-
দারির উপসত্ত্ব ভােগ করে এই ক' বছরে যা’ করে
নিয়েছি, দুপুরুষ বসে খাব।

পঞ্চম অঙ্ক ) উদ্বোধন হরের প্রবেশ হরে-বাবু, বিলেতের মকদ্দমায় আপনার হার হয়েছে । বিশুদূর শালা। ব্যাটা যেন খনা কি বরাহ । হরেন বাবু, মিছে নয়, বাজারে শুনে এলুম। বিশু—কে বল্লে বল দেখি? হরে- সবাই। বিজয়বাবুর কাছে খবর এসেছে । বিশ—যেটা রটে তার কিছু বটে। যদি তাই হয় সাবেক দলিল পত্র গুলো পােড়াতে হবে। হরে-বাবু, সবাই বলছে যে তাের বাবুর জেল হবে । বিশু—হবে হবেই—যাঃ। [ হরের প্রস্থান ] বিশু হতেও পারে। জাল করেছি এইটা প্রমাণ হয়ে থাকে যদি ?—আমি ত আর জাল করিনি। নীল- মণির দেনা, বড় বাবু সেই দেনা মেটাবার জন্যে আমায় জমিদারী অর্পণ করেছিলেন, আমি নীল- মণিকে টাকা দিয়েছি। নীলমণির মাথা খারাপ, এটা ত এখানকার আদালতে প্রমাণ হয়ে গিয়ে- ছিল—কি জানি কি হ'ল।

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
হরের প্রবেশ
হরে-বাবু, গিন্নিমা ডাকছেন।
বিশু -তুই ব্যাটা বুঝি এই খবর বাড়ীতে দিলি? ব্যাটা
দাড়কাক আর কি ।
[ হরের প্রস্থান ]
বিশু—তাই ত-নীলমণে ব্যাটার জন্যেই ত এইটা
হল, সে ব্যাটাকে সরাতে পারলে ভাল হত।
যাই হােক্, সহজে কিছু করতে পাবে না, বড়
জোর জমিদারি ফেরত দেবার হুকুম আতে পারে ।
তাই ত—নীলমণে ব্যাটার মাথার দোষ ছিল,
এখন ভূতো ব্যাটার যত্নে সেরে গেছে। পাপের
পয়সা সুখে স্বচ্ছন্দে ভােগ করা যায় না।
রিভলভার হস্তে নীলমণির প্রবেশ
নীলমণি—বিশু দাদা, পাপের শাস্তি ভগবান্ দেন,
আমি উপলক্ষ মাত্র । এবার তােমার আর নিস্তার
নাই, মরণকালে ভগবাকে ডাক।
বিশু-ওরে বাবা, এযে যম। ও হরে-
নীলমণি-ঈশ্বর এলেও তোমার রক্ষা নেই। এই
১১৮

পঞ্চম অঙ্ক ] উদ্বোধন দরজা চেপে দাড়ালুম। তােমার বুকের রক্ত আজ চাই। একটা কথা তােমায় জিজ্ঞেস করি, তােমার মনটা এখন কেমন আছে বল দেখি? বিশু ও বাবা! দোহাই নীলমণি তােমার পায়ে পড়ি, আমায় মেরাে না—আমার সর্বস্ব নিয়ে, আমায় জীবন ভিক্ষা দাও। নীলমণি-হ্যা, এই জন্যেই তােমার জীবন নিতে এসেছি। আমি জানি, যে পাপী তার সর্বস্ব এক- দিকে আর তার নিজের জীবন অপর দিকে। বিশে, লােকের সর্বনাশ কবার কালে এই প্রাণের ভাবনা কি একবারও ভাবনি—আজ না হয় আমার কাছে জীবন ভিক্ষা চাইছ—আমি মানুষ, তােমায় দয়া কলেও কতে পারি, কিন্তু যম ত তােমার কথা শুনবে না—তখন তােমার এই বিষয় কোথায় থাকবে ? বিশু—দোহাই বাবা, আমায় রক্ষা কর। তুমিই যম- নীলমণি—যা ; তােকে আমি ক্ষমা করলুম (পদাঘাত) একদিন টাকার শােকে পাগল হয়েছিলুম, আজ দেখছি টাকার চেয়েও এক জিনিষ আছে, সেটা ১১৯

উদ্বোধন
[ চতুর্থ দৃশ্য
জীবন। এই জীবনটা কিসে উন্নত হতে পারে,
তার জন্যে পাগল হলে কিছু হতে পারে।
ভূতনাথ, দারােগা, কনেষ্টবল প্রভৃতির প্রবেশ
ভূতনাথ—এই যে নীলমণি, তােমায় কত খুঁজছি।
বিজয়বাবুর দয়ায় বড়বাবু জিতেছেন। বিশে
ব্যাটার বিশ্বাস ঘাতকতার পুরস্কারস্বরূপ দারােগা-
বাবু এই হাত কড়ি নিয়ে এসেছেন।
বিশুমৃত্যুই শ্রেয়—মৃত্যুই শ্রেয়-[ প্রস্থান ]
( নেপথ্যে বন্দুকের শব্দ )
ভূতনাথ—কি সর্বনাশ
( নেপথ্যে বিশু-জল, জল।)
দৃশ্যান্তর
মাটিতে শুইয়া বিশু, নীলমণি, ভূতনাথ প্রভৃতি
ভূতনাথ-কণ্ঠনালিটা একেবারে উড়ে গেছে। দারােগা
বাবু, মিছে, পাল্কীর যােগাড় দেখুন।
[ দুইজন কনেষ্টবলের প্রস্থান ]
১২০

পঞ্চম অঙ্ক ]
উদ্বোধন,
নীলমণি—কি আশ্চৰ্য্য, পূৰ্ব্বক্ষণে যে মৃত্যুর ভীষণ মূর্তি
দেখে ত্রাসে আত্মহারা হয়েছিল, সে মরণকে
আলিঙ্গন করলে—একেই বলে নিয়তি!
পঞ্চম দৃশ্য
সাধারণ সভাগৃহ
ধীরেন্দ্র, সুধীর ও সমবেত জনসঙ্ঘ
( দুইটি অল্পবয়স্ক বালক ধীরেন্দ্রনাথের গলায় মালা
পরাইয়া দিলে পর )
সকলে-বল সবে, জয় সত্যের জয়জয় সত্যের জয় ।
ধীরেন্দ্র—আমি ক্ষুদ্র জন, এ হেন সম্মান শােভে
কখন মােরে। ভ্রাতৃগণ! তােমাদের
শ্রদ্ধা ভক্তি অনুরাগ মাখা হৃদয়ের
সরল বচন-মোরে সৎকার্য্যে করে
উৎসাহিত-অবসাদ দূর করে দেয়।
আজি চলিতেছি সব ছেড়ে—প্রিয়
জন্মভূমি, বাল্য সহচর, আত্মীয় স্বজন,
গুরুজন আদি-হতে পারে এই শেষ।
১২১

উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য জীবনসংগ্রামে আর না ফিরিতে পারি, কিন্তু গুরুকৃপা বড় বলবা, রেথে যাব গুরুর মহিমা—জটিল ধৰ্ম্মের নীতি সরল শিশুর কাছে বােধগম্য হবে। বন্ধুগণ ! সম্মুখে উঠিছে সূৰ্য্য, তরুণ কিরণে আলােকিত হবে বঙ্গ- ভূমি—এত যে অাঁধার নিমেষে ঘুচিয়া যাবে--মুগ্ধ নেত্রে রহিবে বসিয়া, আজি যারা হা হুতাশে ভরায় গগন তল দিব্য চক্ষে দেখিতেছি আজি, আসিতেছে বড় শুভদিন, নবশক্তি স্বর্গ হতে আসিছে নামিয়া। হিমালয়শির রাঙা হয়ে শােভিছে সুন্দর, দেবীর চরণ- স্পর্শে ; জননী আসিছে ছুটে সন্তানের নীরব ক্রন্দনে বেদনা পাইয়া বুকে। ওরে ওরে ভীরু সব বাঙালীর ছেলে ওঠ, ওঠ, মনের দৌর্বল্য ছেড়ে। মাভৈঃ মায়ের মুখে, শক্তি মূৰ্ত্তি সিংহ পৃষ্ঠে দিব্যায়ুধ জননীর করে-শমনের ১২২ পঞ্চম অঙ্ক ] উদ্বোধন ভয় আর কি করিতে আছে ?—পান কর মহাশক্তি সুধা। আমি যাই সিন্ধু পারে এ মহাবারতা প্রচার আমার ভার- দেবতার বাণী জগতে শুয়ে আসি। বিদায় আমারে তবে—এক জননীর আমরা সন্তান, স্নেহডােরে বাঁধা আছি। এত কভু ভুলিবার নহে ! ভাই সব বিদায় এখন। সকলে জয় সত্যেরই জয়। ( সকলে প্রস্থানের উদ্যোগ করিতেছে, কেহ কেহ প্রস্থান করিয়াছে—এমন সময়ে ) নীলমণি ও ভূতনাথের প্রবেশ নীলমণি-ভূতে দা, তুই ঐদিকটা আগলা, আমি এদিকে আছি—আর যায় কোথা ? ভূতনাথ-(নতজানু হইয়া) বড়বাবু, বড়বাবু, অনেক কষ্টে মকদ্দমা জিতেছি, বাড়ি চল, সােণার রাজত্বে বাস কবে-বুড়ো বয়সে ভূতনাথকে আর কষ্ট দিও না।

উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য ধীরেন্দ্র—কে তুমি? ভূতনাথ ! পিতৃ স্থানে তুমি হে বৃদ্ধ, হে প্রতিপালক আমারে করহ ক্ষমা, দেবদেশে চলেছি সংসার ত্যজি, আর আমারে কাঞ্চনে ভুলায়েনা ভূতনাথ-সে কি বড় বাবু ! লক্ষ টাকার জমিদারি, তুমি এই বেশে কোথায় যাবে ? লক্ষ্মী বাবা, বুড়াের মাথায় বজ্রাঘাত কোরাে না। বিশে সর- কার আত্মহত্যা করেছে—বিলেত হতে তােমার বিষয়ের অধিকারী হয়েছ, অগাধ টাকা কড়ি, খাসা মেয়ে দেখে বিয়ে দেব-বােসেদের সংসার আবার জ্ব অন্ করবেবুড়ো হাতে হাতে সুখে মরবে। ধীরেন্দ্র–কামিনী কাঞ্চন আর কি ভুলাতে পারে ? ভূতনাথ বুঝিয়াছি সব কথা। অর্থে আর নাই প্রয়ােজন ! যাও তুমি মম পুরে, সে রাজ্যের রাজা তুমি, তােমা হতে অপব্যয় নাহি হবে, হে প্রতিপালক । রেখাে মনে, ভারতের যত নরনারী একসূত্রে বাঁধা সবে, একই প্রতি ১২৪ পঞ্চম অঙ্ক } উদ্বোধন সবাকার---ভিন্ন ভাব ভেবনা কখন। অন্নহীনে প্রচুর আহার দিও, বস্ত্র- হীন জীর্ণ কানি যাহার সম্বল, নব বস্ত্রে শােভিও তাহার অঙ্গ, রুগ্নজনে তুষিও সেবায়, পতিহীনা অবলায় যত্নে রেখে অন্নবস্ত্রদানে, অতিথিরে কোরাে না বিমুখ ; বিষয়-বিভব দেশ- হিতে যেন হয় ক্ষয়। আসি তবে ওগাে সুহৃদ, করিও এমন কাৰ্য্য তাহার চিহ্ন যেন রহে গাঁথা ধরিত্রীর বুকে, যত দিন চন্দ্র সূৰ্য্য পরকাশ হবে। সকলে--বল সবে জয় সত্যের জয়, জয় সত্যের জয়। (ভূতনাথ ও নীলমণি ব্যতীত সকলের প্রস্থান ] নীলমণি-ভূতো দা, চোখের সামনে ভােজবাজির কত কি একটা হয়ে গেল বল দেখি? ভূতনাথ-নীলমণি, বড়বাবুর মাথা সত্যই খারাপ হয়ে গেছে, অগাধ সম্পত্তি হেলায় হারালে। নীলমণি-ভূতাে দা, আগে ভাবতুম আমিই বুঝি মুখ কিছু বুঝি না, এখন দেখছি আমার চেয়ে আরও উদ্বোধন [ পঞ্চম দৃশ্য মুখ আছে, সে তুমি। বড়বাবু যা বলে গেলেন আমার আঁতে আঁতে লেগে গেছে। পাপের ভিতর দিয়ে চলে অনেক রহস্য দেখলুম। জীবন কিছু নয়, ধন কিছু নয়, মান কিছু নয়, কিছু কেবল সৎকাৰ্য্য। এখন বুঝেছি ভগবান্‌কে যদি ভাল- বাতে হয়, সে লােককে জগৎকে ভালবেসে শিখতে হবে। ভূতাে দা, তুই যা, বড়বাবু যা বলে গেলেন, তাই করগে ; বাস্তবিক আর দিন কতক বাদে বুঝতে পারবি জপ তপ সব মিথ্যে, দেশের সেবাই পরমার্থ, কেননা তা দিয়ে দেশ- জননীর পূজা হয়ে থাকে। আজ আমার মাথার ভেতর হ’তে একটা রুদ্ধ দরজা হঠাৎ খুলে গেল, একি স্বর্গের বিমল আলো। ভূতাে দা, আমায় বিদায় দে, এর চেয়ে আরাে মজা আছে, আর একটু এগিয়ে দেখি । [ প্রস্থান ] ভূতনাথ-পথের সম্বল নিজের মন-আর কেউ নয়। মন! তাের কর্তাবাবু ছিল, সে এখন কোথায় ? বড়বাবুর ভাবনা ভেবে দশ ঘাটের জল এক ঘাটে কলি, সে বড়বাবু তাের মুখে মুতে দিলে, শেষটায়

পঞ্চম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
নীলমণিকে ভালবালি, সেও নিজের পথ দেখলে।
এখন তুই কি করবি? বড়বাবু এক রকম
দেশের সেবা করূতে বলে, কবার ত আর
কিছু নেই, বুড়ো বয়সে তাই করূগে ; বােসেদের
ভালবেসেছিলি, বােসেদের বংশরত্নের
মরণকাল পর্যন্ত মনে রাখি।
[ প্রস্থান ]
;
ষষ্ঠ দৃশ্য
পথ
বীরেন্দ্র ও হরেনের প্রবেশ
বীরেন্দ্রহরেন, আর দেরি করিস্ না—শীগ্রি যা, এই
হাবিলগুলো বিলিয়ে আয়। ফুলের মালা যােগা :
কর। ধীরেন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হ’ল।
বিলেত যেতে হবে, ছোঁড়াটার ভণ্ডামী ভাঙতে
হবে। যা--যা।
হরেন—প্রেসিডেন্ট কাকে করা যায় ?
বীরেন্দ্রদত্ত সাহেব হবে, সে আমি ঠিক করেছি।
একটা address আমিই লিখেছি, ডফ, কলেজের
১২৭

উদ্বোধন
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
প্রােফেসার সেটা পড়বে। আজ রাত্রেই রওনা
হব। ও ছোঁড়াটা পৌছােতে না পোঁছােতে আমার
যাওয়া চাই। মিটিংএ বেশী লােক না হয়, কাগজে
দশ হাজার লােকের উপস্থিতি লিখে দিস্।
[ প্রস্থান ]
হরেন—আমার আর কি ? দুপয়সা পাওনা নিয়ে ত
কথা? ধীরেন বাবু কিন্তু গােখরাে হয়ে উঠল,
তুমি বাবা ঢ্যামনা। বীরেন ঘােষ যাচ্ছ বটে কিন্তু
ওর কাছে কল্কে পাবে না। কিছু না থাক,
চরিত্র আছে ত? ঐটেই যে পরেশ পাথর ;
ঠেকালেই সােণা ।
[ প্রস্থান ]
সপ্তম দৃশ্য
কালিমন্দির
নীলমণি
নীলমণি—হ বাবা, এই বটে, পুলক ও পদ্মগন্ধ
চারিদিক আমােদিত হয়ে আছে, বুড়ী যদি কোথাও
থাকে, ত সে এইখানেই। একবার ছুতে পারলেই
হয়, তাহলে আর চোর হবার ভয় থাকবে না।
১২৮

পঞ্চম অঙ্ক ।
উদ্বোধন
রামদাসের প্রবেশ
রানদাস—মাগো, বাঁশী আর সাজে না তােমার করে ;
বাঁশীর আহ্বানে জাগিবার ছিল যারা
একে একে উঠেছে বসিয়া, চমকিত
শক্তিমূৰ্ত্তি হেরি। নয়নে জ্বলিয়া উঠে
উৎসাহ অনল, পূর্ণ হৃদি পুলক
স্পন্দনে, নিবিড় তামস রাশি নিমেষে
হইল দূর, জগজ্জননী দেবী শক্তি
দেমা। কুহকিনী সহবাসে বীৰ্য্যহীন
মােরা, নিৰ্ব্বিষ গোখুরা-পদাঘাত সহি
অবহেলে, দংশিবার নাহি শক্তি। ফিরে
দে অমৃতভাণ্ড, মহাবীৰ্য্য সযতনে
রাখুক সন্তান, কামিনী কাঞ্চন করি
দূরে পরিহার। পুণ্যপীঠ ভারতের
গগন পবন—ব্রাহ্মণের সামগানে
হােক নিনাদিত—সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা
ঘরে ঘরে হউক প্রচার-জননীর
একই দেউলে কোটী দেবতার পূজা
হােক সমাধান—এক প্রাণ এক মন
এক ধৰ্ম্মে মহাঐক্য হােক প্রতিষ্ঠিত।
১২৯

উদ্বোধন [ সপ্তম দৃশ্য নীলমণিদেবতা এই বটে,অধমতারণ এই বটে। দোহাই বাবা, আমি মহাপাপী, আমায় তরাতে হবে। রামদাস--এস তুমি ! মহাপাপী ? কোথা পাপ কোথা পুণ্য? আত্মা স্বচ্ছ দর্পণের মত, মলা হীন রহে নিরন্তর—ভগবানে চাহে যেই ব্যাকুল অন্তরে। নরকের দ্বার হ’তে ফেরে পাপী পুণ্যের মন্দিরে, উদ্ধ পানে বারেক চাহিলে পরে—এস তুমি মায়ের দুরন্ত ছেলে, জননীর কোলে ভাল মন্দ ছােট বড় সবই সমান। নীলমণিহ বাবা, ঠিক ধরেছি। পরিত্রাতা, মুক্তিদাতা, ইহকাল পরকাল, সবই তুমি আমার । তােমার শ্ৰীমূর্তির ভিতর দিয়েই, আমার মনে হচ্ছে, ব্রহ্মাণ্ড- জননীর দেখা পাব। রামদাস-ওয়ি মাতঃ,-এ ক্ষুদ্র আধারে, তাের বিশ্বরূপ, তাের অনন্ত ঐশ্বৰ্য্য এ উন্মাদ দেখিবারে চায় ? আরে আরে বােধহীন শিশু-অয়স্কান্ত মৃৎপাত্রে উজলিয়া উঠে কভু ? এ যে দেখি উন্মাদ কল্পনা।

পঞ্চম অঙ্ক ]
উদ্বোধন
নীলমণি—'ও সব অলঙ্কার
সব অলঙ্কার রূপক আমি জানিনা
বাবা। চোখের একবার দেখা-শুনায় তােমায়
চিনেছি, জেনেছি। এ জীবনে আর কিছু জান্তে
চাই না।
রামদাস-কিন্তু তাই কি ?
নীলমণি—তাইই। এই আমার স্বর্গ, এই আমার বৈকুণ্ঠ,
এই আমার ভগবান্।
ধনাক্ষ্যাপার প্রবেশ
-ধন--
( গান )
শ্যামসুন্দর রূপ মনােহর, অধমতারণ প্রেমিক হে।
ঊষা সমাগমে এসেছ ভুবনে, জাগাতে জগতে রসিক হে।
ত্রিভঙ্গিম ঠাম, ছিল কি সুঠাম ; বনমালা গলে দুলিত যবে।
পীতধড়া পরে’, মধুর বংশী সুরে, পাগল করিয়া তুলিলে ভবে।
সে কথা হিয়ায় আছে, এমনি এসে ধরমে রেখে
যুগে যুগে তুমি হিয়ায় আছ।
মহিমা তােমার ওহে অন্তৰ্যামি
বা যে ফুরায় কি কহিব আমি?
বুঝিতে না পারি কি লীলা তােমারি
বহে আখি বারি হরি হে!
১৩১

উদ্বোধন
[ সপ্তম দশ
আমায় বলে দাও, তােমার লীলার কথা জানায়ে দাও
আমায় হাসি মুখে তুমি বিদায় দাও
আমি হাতে হাতে চলে যাই
ওহে পুরুষ প্রবর হে।
রামদাস-ধনেশ্বর ?
ধনেশ্বর - বাবা, আর না, জেগেছে তোমার ছেলের
জেগেছে। আর না, আমায় বিদায় দাও।
যবনিক।
১৩২

ভ্রম সংশোধন ১৬ পৃষ্ঠার ১৫ লাইনে ধীরেন স্থলে বীরেন শেষ লেব * নেব নিমেষে ২৭ নিমিষে ভার ৫৮ হায় হায় কুলে, হায় হায়, কুলে ২ ৭ কবে না করূবেন। is ২ are ১১ imancipation emancipition ৭৭ শেষ has have ৭৮ ১৪ ৭৮ ১৬ god Unpanished টাকার God Upainshad টাকায় স ১৭ রচেচে রচেয়ে 1 সঞ্চারি }} ?? শেষ সঞ্চয়ি আছে। চুড়ি আছে। ছুড়ি ১১৪ s ৯ দেনা দে মা

উদ্বোধন
[ স দণ
১৩২

No text on this page.

waj
49
উদ্বোধন
| (
%
প্রবর্তক
পারিশিং হাউস

.
waj
-re:
উদ্বোধন
---
।
4
পারিশিং হাউস
p)

Udbodhon

Author
Not Available
Title
Udbodhon
File name
Udbodhon
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2009/09/19
Publisher
Prabartak Publishing,chandannagar
Language
Sanskrit
Pages
148
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Bhutnath
DLI number
513432
Barcode
4990010020410.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
YUsFGa9Vfl2
Download PDF

Udbodhon