Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kashyap O Surabhee
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কশ্যপ
ও
সুরভী
জগদীশ গুপ্ত
অন্নদা সাহিত্য ভবন হইতে
ভাৱ দেৰী কৰ্ত্তক প্রকাশিত।
মূল্য-১/০
প্রিন্টার-গােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
২০৩৯১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
আভাষ কশ্যপ ও সুরভী ইহারা স্বামী স্ত্রী। ইহাদের ঐ সম্পর্কটা অসঙ্গত কিছুই নয়, বিস্ময়ের বিষয়ও তা’ নয় ; কিন্তু শাস্ত্রে কথিত আছে যে, একদা কশ্যপের ঔরসে এবং সুরভীর গর্ভে যাবতীয় চতুষ্পদ প্রাণী জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। এই অসম্ভব কল্পনাটা কিরূপ ভাবে ব্যাখ্যাত হইয়া আধুনিক মানুষের বিস্ময় ঘুচাইতে পারে তাহা জানি না; তবে ঐ জাতীয় সমস্ত উপাখ্যানের মত উক্ত বংশবিস্তারের কাহিনীরও ব্যাখ্যা হয়তাে একটা করা হইয়াছে, এবং ইহাও সম্ভব যে, যাবতীয় চতুষ্পদ জন্তুর উল্লেখ করা হইয়াছে, সত্যের সন্মান রাখিতে নয়, গৌরবে বহুবচনের প্রয়ােগ প্রসিদ্ধ বলিয়া। সুরভী দেবী হয়তাে দৈবাৎ প্রসব করিয়াছিলেন মাত্র একটি চতুষ্পদ জন্তু। সৃষ্টিবৈচিত্র্য হিসাবেই তার মর্যাদা পাওয়া উচিত ছিল; কিন্তু মনে হয়, আৰ্য্যগণ অবাক্ হইতে জানিতেন না, কিম্বা অবাক্ হইলেও তাহা প্রকাশ করিতে লজ্জাবােধ করিতেন, কিম্বা অমৃতের পুত্র মানব-অধ্যুষিত পৃথিবীতে চতুষ্পদের অকারণ—তখনকার মতে অকারণ—অজস্র আবির্ভাবের হেতু নির্ণয় করিতে যাইয়া বিহবল অবস্থায় সমস্ত অপরাধ চাপাইয়া দিয়াছেন অমায়িক এক ঋষির স্কন্ধে ; কিম্বা মানুষ আর পশু উভয়ই পরমাত্মাসত জীবাত্মা বলিয়া পশুকে মানুষের স্তরের সঙ্গে ঐ উপায়ে আত্মীয়তায় সংযুক্ত করিয়া দিয়াছেন। ঘটনা যাহাই হউক, আমি আমার বইয়ের নাম রাখিলাম কশ্যপ ও সুরভী। জনক ও জননী রূপে কশ্যপ ও সুরভী ঘটিত ব্যাপারের প্রমাণ নাই; কিন্তু আজকালকার দিনেও মােষিগণ এমন বস্তু প্রসব করিয়াছেন বলিয়া জানা গেছে যা তাজ্জব-সাপ, কচ্ছপ, বানর, রাক্ষস প্রভৃতি এমন কি, প্রস্তরখণ্ডও। সুতরাং আমি যদি এই রচনাগুলির জনক হিসাবে নিজেকে পরিচিত করিতে চাই তাহা হইলে অভূতপূর্ব একটা কিছু, অথবা লজ্জাকর অন্যায় করা হইবে বলিয়া মনে হয় না। চতুষ্পদ জন্তুগণের আদিম পিতা কশ্যপের সন্তানগণের দিকে ক্ষমাময়, উদার এবং সস্নেহ আভাষ ২ নেত্রপাত করার অধিকার, আর তাহাদের চোখের সম্মুখে ক্রীড়াশীল দেখার উল্লাস হইতেও আমি বঞ্চিত হইব না, ইহা নিশ্চয়। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, কশ্যপ ও সুরভীর সন্তানগণ এখন মার খাইতেছে। ; অতিশয় ক্ষুদ্র একটি ব্যক্তির জীবনধারা কিরূপ আবহাওয়ার ভিতর দিয়া চলিতে থাকে, এই রচনাগুলিতে তাহার একটু আভাস আছে; কিন্তু দেশের পরিচয় নাই, দশের পরিচয় নাই, দেশের ও দশের আশা আকাঙ্ক্ষার পরিচয় নাই, শুভ-সাধনের সঙ্কল্প নাই, স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশবাসীকে প্রয়াসযুক্ত করিবার অস্থির উৎকণ্ঠা নাই, সামাজিক সমস্যার নিরুত্তর উত্থাপন নাই, গুণ্ডামি ও ভণ্ডামির তীব্র প্রতিবাদ নাই—অর্থাৎ লেখক হিসাবে জন্মভূমির প্রতি কর্তব্য- পালনের প্রচেষ্টা, কিম্বা যাহারা শুইয়া শুইয়া স্বাধীনতা-সংগ্রামে সেনাপতিত্ব করেন তাহাদের, হিতার্থে যুদ্ধ পরিচালনার সঙ্কেত ইহাতে নাই। যাহারা নিজে নিষ্ক্রিয় এবং নির্বিঘ্ন থাকিয়া পরকে দেশােদ্ধারব্রতী বিদ্রোহী দেখিতে চান্ তাহারা হতাশ হইবেন। যৌনচিত্রের মতই, ঠিক ততখানি লিপ্ততা আর আবেগের সঙ্গেই, কাব্যে উপন্যাসে দেশােদ্ধারকারীর চিত্র উপভােগ করা যাইতে পারে—কিন্তু ঐ পর্যন্তই। একটা মানসিক ভাবকে চিন্তাপরম্পরার শীর্ষে “আনিতে যে-শক্তির প্রয়ােজন হয় তাহা আসে অনুশীলনের সাহায্যে, ক্রমবিস্তৃত অনুষ্ঠানের পথে। কথার দ্বারা অনুভূতি সংক্রামিত করা যাইতে পারে, কিন্তু তাহাকে ফলশালী করিয়া তুলিবার ভার মানুষের নিজের প্রয়ােজনবােধের উপর ; প্রয়ােজনবােধটি দুর্বার আর সৰ্ব্বগ্রাসী হইয়া সমগ্র সভার উপরে না উঠিলে শিথিল স্বপ্নাতুরতা ঘুচাইতে কেহই পারে না, বাহিরের সংলাপে তা ঘটে না। অভাব দেখা যায় ঐ প্রয়ােজনবােধেরই। কোনাে একটা নির্লজ্জ লােক নাকি ভাত চাহিয়া গৃহকত্রীকে বলিয়াছিল : “মা ঠাকরুণ, আমার ফু টু সবই আছে, এখন খুব গরম দু’টি ভাত পেলেই হয়।” প্রজাগণ কেবল প্রচণ্ড ফুৎকারটি লইয়া উদ্যোগী পুরুষসিংহের মত বসিয়া আছে—আশা করিতেছে : গরম ভাত সামনে দিবে অন্য লােকে। একটা মানুষ তার ঘরে বসিয়া কি করিতেছে, আর কি পাইতেছে, ইহাতে আছে তাহারই কয়েকটি কথা। সুতরাং ইহা উৎকৃষ্ট সাহিত্যের বাহিরে। এই কারণেই আমাকে মনে রাখিতে আভাষ হইবে যে, এই বইয়ের নাম কশ্যপ ও সুরভী-যাহাদের মারফৎ যাবতীয় চতুষ্পদ জন্তু পৃথিবীতে দেখা দিয়াছিল, এবং এখন তারা—ঐ জন্তুগণ-নির্বিবাদে মরিতে পারে। শুনিতে পাই, সাহিত্য বলিতে যা বুঝায়, ছােট গল্প সে-জাতীয় সামগ্রী নহে—সে কেবল চুটকী অঙ্গের মনের কথা বা ঘরােয়া কথা। কাযেই ধরিয়া রাখিয়াছি যে, ছােট গল্পের মত অপদার্থ জিনিসকে আরও ছােট করিয়া তা' পদ্যে লিখিলে যা দাড়ায় মনুষ্য সমাজে তার যােগ্যতা কশ্যপ ও সুরভীর সন্তানগণের অনুরূপ। কথা ও কাব্যসাহিত্যে যত প্রকারের পতন ঘটিতে পারে, আমার বিশ্বাস, সমালােচকগণ অক্লেশেই বুঝিয়া ফেলিবেন যে, তার সবগুলিই ইহাতে আছে। আপনাদের সানুকম্প ভৎসনা শিরােধার্য্য করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া রহিলাম । কুষ্টিয়া জগদীশ গুপ্ত ইং ১৫, ১২, ৩৭
No text on this page.
কশ্যপ ও সুরভী অচুনিদের বেহালা “হাসবেন-না দেখেই। যে-জন শেষ না দেখে’ হাসে, অপরিণামদর্শী তারে বলব’ অনায়াসে। অসময়ে হেসে’ এবং অকারণে হেসে’ এমন কি, না হেসেও, একটু খুকখুকিয়ে কেশে’ অনেক লােকই পড়ে গেছে উভয়সঙ্কটে ; হেসে’ কেশে অবাঞ্ছিত দুর্গতিও ঘটে। অনাসক্তভাবে যাহার দিন কাটাবার মন- তাহার পক্ষে না-হাসাটাই বিশেষ প্রয়ােজন। জানি আমি, সাধু অনেকজনা হাসিত্যাগের করছে সাধনা। বাক্য মনের খণ্ড প্রকাশ; অর্থ রেখে চেপে বলতে পারেন অনেক কথাই প্রয়ােজনটা মেপে’... =
কশ্যপ ও সুরভী
| |
কিন্তু হাসি !...হাসি করে এমন উদঘাটিত
উল্টে ব্যাখ্যা অসম্ভব হয় ; স্ফীত সঙ্কুচিত
করা যায় না তারপর
হাসি এমনি ভয়ঙ্কর !
কৃপাপূর্বক করুন আসন গ্রহণ
দেখুন, কেমন সুসমঞ্জস্ যন্ত্রের আয়তন !
আগে অভ্যাস ভালই ছিল, আজো কিছু আছে ;
অব্যবহারের দরুণ মরচে ধরিয়াছে—
হাতের একটু জড়তা,
নয় অনিষ্টকর তা’•••
কিন্তু তা’ ত’ আলােচ্য নয় আমার পক্ষ থেকে
এই যন্ত্রের আবহাওয়াটা প্রাণে নিছি মেখে
কেমন করে, কতটা, আর রকমটা কি তার
বলবাে, এবং শুতে তাহা লাগবে চমৎকার !
বলবেন হয়তাে, ‘তিরিশ টাকায় ঐ ক’খানা কাঠ।
তিরিশ টাকায় হ’ত বৃহৎ জোড়া-তিনেক কপাট।
কাঠের গুণে দ্রব হওয়া অ্যুতেরই সাজে
আজ অবধি কল’ যা’ তার সকলগুলিই বাজে।
অমন কথা বলেন যদি তুব’ না তা’ কানে—
কারণ, কথার পাবােনাকো মানে।
কাষ্ঠ-মূর্তি জগন্নাথ আছেন নীলাচলে
তিনি শুধুই কাষ্ঠখণ্ড এ-কথা কেউ বলে ?
তাহার সজীব যে-রূপটি ব্যাপ্ত প্রাণে প্রাণে
ঐ-রূপে তা বিশ্বে প্রকট ; কাষ্ঠ কি প্রাণ টানে ?
অচ্যুতানন্দের বেহালা
কাজেই বুঝুন, বারে বারে
যা’ দেখেন আর যেমন দেখেন ভুল থাকতে পারে
সেই দেখাতে ; কেবল চোখের দেখায়
হয় না কভু নির্ণীত, ভাই, দাম কি আর তা’ কোথায়।
কাঠ নয়, এ দারুময়ী যাদুকরী প্রিয়া—
বাঁধিয়াছে আলিঙ্গনে গানের তন্তু দিয়া।
কত নিবিড় সে-বন্ধন আমিই কেবল জানি-
আমার প্রাণের প্রতিধ্বনি আমার প্রাণেই হানি’
কত সুখ যে ঢেউয়ে তােলে আমার যাদুকরী
বুঝিয়ে বলা কঠিন ভারি—অনুভবই করি।
জনয়িত্রী প্রিয়া আমার সুপ্রসবিনী-
মুহুর্মুহুঃ করবে প্রসব, কি দিবা কি যামিনী,
সুরের কুহক-লহর, আমি স্পর্শ করি যদি,
ভরবে আকাশ কাণায় কাণায় ; সুরের ভরা-নদী
বইয়ে দেবে জগৎ জুড়ে’!•••এমনি গুণ এ কাঠের
সে-গুণ নাই বৃহৎ বৃহৎ শালের কপাটের।
কোথায় যে এর চেতনা, ঐ জগন্নাথের মত,
টের পাবেনা অবিশ্বাসী অভক্ত লােক যত।
নাচিয়ে ছুটায় রক্ত আমার, চক্ষুতে জল আনে,
ভরে দু’টি বক্ষ-কুহর সম্মিলিত গানে--
আমার কুহর, ইহার কুহর—
কলরােলে গুঞ্জরণে দু’টি বক্ষ মুখর।
অভিমান নাই প্রেমে, প্রেমে নাইকো মলিনতা,
কাঠের প্রিয়া জানে আমার গভীর জীবন-কথা-
কশ্যপ ও সুরভী
৫
বুকে থেকে সুরের চুমায়
পাগল করে তােলে আমায়,
উঠলেন নাকি? এ-র মধ্যেই ? কাল আসবেন? বেশ।
হ’ল নাকো ভাল করে’ কাঠের কথার শেষ ।
গল্প একটা ছিল মজুত, পিসেমশার দাদার
কাকে এসে শুনবেন? আচ্ছা, আসুন, নমস্কার।
অচ্যুতানন্দের পিসেমশা’র দাদা-
।
“বলব” আমি, বাধছে যদিও
পিসেমশা’র দাদাও আমার নিকট আত্মীয়।
পিসেমশা’র ভাই নয় তাে, কেবল পিসেমশায়।
আপনার লােক, এই উক্তিতে খুবই হাসি পায়।
পিসেমশা’র দাদা কিম্বা ভাই,
ভেবে দেখুন, আপনার হতে কোনাে বাধাই নাই।
যাওয়া আসায়, খবর লওয়ায়, আত্মীয়তা পাকে—
এবং তাহা বৃদ্ধিই পায় হৃদয় যদি থাকে ;
আমার হয়েছে তা-ই
খুবই আপনার পিসেমশা’র দাদা এবং ভাই।
কেমন করে ঘটল তা অবাক হবেন শুনে’
ঘটেছে তা উভয় পক্ষের গুণে।
এ-বিষয়ে বক্তব্য আর নেই
গল্প এখন এই ?
ফান মাসে পত্র পেলাম পিসেমশা’র দাদার
শুবােনাকো আপত্তি, বাপ, কোনােকার বাধার
মান্ ধীরু’র বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে বিশে
আমার কিছু নাইকো দিশে কি হবে যে কিসে!
কশ্যপ ও সুরভী ১০ •• তিনি বলছেন, তুমি এসে লহ কাজের ভার সম্প্রতি এই ইচ্ছা সকলকার। মাঝে আছে দিন সাতেক আর, মাত্র সাতটা দিন; অনেক দিকেই অনেক কাজ। অনুজ ক্রমান যতীন কাতর হয়ে দাঁতের ব্যথায় দাত তােলাতে, দাত বাঁধাতে, গিয়েছে কলকাতায়। তাই লিখি, বাপ, আসবে ত্বরা বধূমাতায় নিয়ে বৌমা আমার না এলে যে পণ্ড হবে বিয়ে! তােমার বড় পিসিমা ঘাড় উচিয়ে আছেন, তার নাই উদ্বেগের সীমা ধীরুর বিয়ে না এলে অচ্যুত, বৌমাকে নিয়ে, শুভকাৰ্য্যেই থাকবে খুৎ ! অত্র কুশল। আমাদের আশীর্বাদ জেন’। অলংমিতি বিস্তারেণ। পুঃ। সঙ্গে এন’ তােমার শীতের বিছানাদি শেষ রাত্রে শীত পড়ে খুব। শ্ৰীমতী আজাদী সর্দিজ্বরে কাতর আছে। চিন্তা নাহি তায়। ইতি। নিত্য আশীর্বাদক শ্রীধর গুহরায়। সুরবালা–স্ত্রীর নাম ঐ—ঐ পত্র দেখে তৈরী হলেন তদ্দণ্ডেই তেল ও সিদুর মেখে। তর্ক করলাম বিস্তর তঁাকে সবুর সওয়াতে দেরী করতে দু’দিন। উনি রুষ্টা হয়ে তাতে বন্ধ করলেন বাক্যালাপ- তখন চাইতে হ’ল মাপ।
১১ = অচ্যুতানন্দের পিসেমশার দাদা সে যাই হােক্, তৎপরদিন মােষের গাড়ীর সওয়ার হয়ে আমরা, এবং হ’য়ে দুটি নদী পার এলাম আম্—আমি এবং স্ত্রী সুরবালা- পিসেমশা’র দাদার বাড়ী ! গ্রামের নাম খালা। খালার গুহরায়বাবুরা খ্যাতনামা লােক- পিসে মশা’র ঠাকুর্দা ত’ ছিলেন পুণ্যশ্লোক। সে যাই হােক্ পৌছে গেলাম, এবং শুনলাম গিয়ে, বিয়ের তারিখ আরাে দু’দিন যাবে পিছিয়ে:•• আরাে বুঝলাম, আমার উপর নির্ভর করার কথা আড়াগেছে’ করে আমায় টেনে নেয়ার ভাঁওতা- চালাকি তা’ পিসেমশা’র দাদার ; কিন্তু তিনি লােকটি চমৎকার— ঘুণাক্ষরেও বলেন নাকো, অমুক কাজটা করাে, কিম্বা ও পরামর্শ, বুদ্ধি অধিকতর অর্থাৎ আমায় শুয়ে থাকতে দিলেন•• বহু খাতির কল’ দু’ভাই, ধীরেন এবং নীরেন। বিবাহের দিন এসে পড়ল; কিন্তু পিসেমশায়, যতীনবাবু, এলেন নাকো—তাঁরই আসার আশায় যদিও দিন পিছিয়ে নেয়া হ’ল আরাে দু’দিন- তার অভাবে বাড়ীর সবাই হ’ল ক্ষুন্ন মলিন। সুরবালা অবান্তরভাবে কাঁদলেন দু’টো; জল থাকেই তঁার তবে !
কশ্যপ ও সুরভী
কিন্তু পরে বুঝা গেল, কেন পিসেমশায়
হঠাৎ অমন ছুটে গেলেন দাঁতের চিকিৎসায়
এই আনন্দের দিনে, আর, এই আনন্দ ফেলে’
ধীরু যে তার বড় আপনার, বাড়ীর বড় ছেলে ;
প্রথম বংশধরের আজ হতে যাচ্ছে বিয়ে—
বধূ ঘরে তুলবেন তিনি আশীৰ্বাদ দিয়ে।
সে যা-ই হােক, ধীরুর বিয়ের বরযাত্রিগণ
পৌছল’ সেই কনে’র বাড়ী—সন্ধ্যারাত্রি তখন•••
আলাে জ্বল" খুব, এবং ঢােল বাজল ঢের
ধরিয়ে দিল মাথাই অনেকের।
খুব আয়ােজন সে-বাড়ীতে, আদর আপ্যায়ন,
যত ইচ্ছা চা পান, আর ইচ্ছানুরূপ ভােজন•••
খুশী হলাম সৌজন্যে আর সাধু ব্যবহারে,
আরাে খুশী হলাম প্রচুর শুদ্ধ পানাহারে...
কিন্তু আমি জানতাম নাকো, গল আছে গােড়ায়-
ছ্যাক্ গাড়ীর হাড়-বেরুনাে ঘােড়ায়
বাঘ-শিকারের পােষাক পরে দারুণ ঘটাসহ
চাপতে যাওয়ার দৃশ্য কি নয় খুবই দুর্বিষহ
গােড়ায় গলদ থাকে বলে ? তেমনি গল ছিল
ধনাঢ্য এই বিবাহে—তা’ পরে দেখা দিল।
খুলে বলব বৈ কি, বন্ধু ; কিন্তু আমার প্রাণ
ধড়াস্ ধড়াস্ করে আজও-জন্মে অভিমান
১৩ অচ্যুতাননের পিসেমশায় দালা •• মানবজাতির প্রতি, বিদ্রোহী হই অতি- তার কারণটা বলার পূর্বে বলা প্রয়ােজন । বরযাত্রী গিয়েছিলেন পণ্ডিত একজন, ধীরুর বন্ধু ; সংস্কৃতে প্রীতি-উপহার ছেপে’ এনেছিলেন তিনি-কাগজের কি বাহার! মনে আছে লাইন আট— কল্পনা খুব দূরপ্রসারী, এবং খুবই বিরাট ফুল ফুটবে প্রাণে ব্যঞ্জনায় আর ধ্বনির মধু প্রবেশ করলে কানে । ‘পুরা বিপাসা তটিনীতটে শুভে বসভিরাৰ্যপ্রমুখৈমহাত্মভিঃ বিবাহরীতিবিহিতা যথা তয়া বিভূষিতা ভূক্ষ, ভুবঃ সুখং চিরম্। কুলদন্তী বিকটনিতম্ব কিন্নরকণ্ঠী লঘুতর মধ্যা। বিষফলােষ্ঠী মৃগশিশুনেত্রা মিত্রং ভবন্তং সুখয়তু কান্তা। এই বর্ণনা, উচ্চতম কবিজনােচিত, জাগিয়ে আশা অপরূপ করলে খুবই অহিত... কবি স্বয়ং ধাক্কা খেলেন কনে’র রূপ দেখে, কন্যা বসে আছে যেন অমাবশ্যা মেখে’! ভারি বিশ্রী রং আর ভারি বিশ্রী রূপ- সংস্কৃত ছন্দ-স্বপ্ন আঘাত পেলে খুব ;
কশ্যপ ও সুরভী
১৪
বড় চুলে চাদর ঢাকা দিয়ে
বসলেন কবি আড়ালে আর অন্ধকারে গিয়ে।
সাধারণ ব্যক্তি যারা তারাও হল অবাক্।
গুরুজনের কাণ্ড দেখে লাগল’ আমার তাক্।
বি-এ-পাশ ছেলে, আর, রূপ কি মরি মরি!
তার বরাতে এই স্ত্রী! এই কুরূপা কিশােরী !
চেয়ে রইলাম ধীরুর দিকে...
বামে নিয়ে কনে’টিকে
নির্বিকার চিত্তে তাহার করছে পাণিগ্রহণ
বাধছে নাকো জিহ্বায় তার মন্ত্র উচ্চারণ !
কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে অত রহস্যময়
ব্যাপারটা ত’ নয়!
লােকচরিত্র তল্লাস
আর, চোখকে অবিশ্বাস
করলেও চলে, কারণ, মানুষ দু’দিনের
চিরতরে লক্ষ্মী এলে সে-ই মানুষের ঢের,
তপস্যার পর
সেইটাই ত’ সিদ্ধি, এবং তাহাই দেবীর বর।
কল্পনাতীত বৃহৎ ছিল পণের পরিমাণ
ছত্রিশ শাে নগদ, এবং অন্যান্য দান,
তার মূল্যও হাজার দুই
বাদ গিয়েছে বাড়ী একটা এবং কিছু ভূই।
কাজেই আমার পিসেমশা’র দাদা
পানি কোথাও বাধা।
।
১৫ অচ্যুতানন্দের পিসেমশা’র দাদা উল্লেখযােগ্য বর্তমানে এই ঘটনাটি : সংস্কৃত ঈপ্সা হওয়ায় একেবারে মাটি পণ্ডিত-কবি (সম্ভবতঃ টিটকারীর ভয়ে) পালিয়ে গেলেন রাতারাতি না বলে’ না ক’য়ে। ফিরে এলাম গােপন বাষ্পে চক্ষু দু’টি ভরি’••• খালা গ্রামে পড়ল’ সাড়া।--নিরীক্ষণ করি’ অসুন্দর নববধূটিকে মন্থর হ’ল চলাফেরা, উৎসব হ’ল ফিকে •• চেঁচিয়ে কেউ না উঠলেও ডেকে বিধাতায় আশাভঙ্গ স্পষ্ট হ’ল ম্রিয়মাণতায়। সবারই ত’ এ-রুচি নয়, টাকার ঋণৎকার অসাধ্যসাধন এবং অন্যায় অপকার করুক অবাধে! লােকে বল্ল’ : ‘শ্ৰধরবাবুর ভারি অপরাধ এ। সুরবালা কানাচেতে ফেললেন চোখের জল অনুকম্পাশীলা কিনা! হৃদয় খুবই কোমল।••• সে যা-ই হােক্, চুকে গেল সমগ্র সে-ব্যাপার- ভােজ প্রভৃতি। এবং এটাও হ’ল পরিষ্কার : পিসেমশা’র দাত দেখাতে যাওয়ার প্রয়ােজন ঘটল’ বিয়ের প্রাক্কালে যে, ইহাই তাহার কারণ ; তাঁহার ছিল অমত, আর করেছিলেন মানা কিন্তু তাঁহার দাদারও ত’ কৈফৎ ছিল না। জ্যৈষ্ঠের অভিলাষ শিরােধার্য্য করতেই হবে ভুলে সঙ্কট ত্রাস।
কপ ও সুরভী ১৬ বধূ গেলেন বাপের বাড়ী। দিন সাতেক থেকে ধীরু এল ফিরে, তাকে পিত্রালয়ে রেখে। এইবার যা ঘটবে তা করবেন অনুভব সব ঘটনার সারাংশ তা’-উদ্দেশ্য ও সব। ধীরুর দেখি গম্ভীর মুখ, নিরুৎসাহ মত- ফাকে ফাকে পিতা-পুত্রে কথাবার্তা কত ! নিরুৎসাহের কারণ আছে, তা হ’তে সে পারে- কিন্তু পরামর্শ এত কিসের বারে বারে !••• ভাবছি মনে মনে দু’একটা কথাও হ’ল সুরবালার সনে ; সুরবালা-স্ত্রীর নাম ঐ—দেখেননিকো তা ; শুনে’ বলেন ধমকে’ : ‘তােমার কেবল ফাজিল কথা ! নির্মল ব্যবহার শিখবে কবে আর ? প্রতিবাদ না করে কোনােরূপ করলাম আমি চুপ। কিন্তু দু’দিন পরে হঠাৎ তৃতীয় দিন রাত্রে চমকে উঠল’ বাড়ীর লােক কঁটা দিয়ে গাত্রে। শােনা গেল, পিতা পুত্র-ধীরু আর তার জনক— বলে চলেছেন ক্রমাগত বাক্য ভয়ানক, অসঙ্গত উক্তি সব ; উত্তেজনার টান প্রবল অতি ; কণ্ঠনিনাদ ক্রমবিবর্ধমান্ ; রাগে অন্ধ দু’জনেই- কি বলছেন সে-হুস নেই; ; ;
১৭ অচ্যুতানন্দের পিসেমশা’র দাদা গাল দিচ্ছেন পরস্পরকে যাচ্ছেতাই সব ভাষায়- ক্ষিপ্ত যেন গাঁজা ভাঙের নেশায় ! সহনীয় নিশ্চয়ই নয় মানসিক সেই তাপ- সম্পর্ক ভুলছে যাতে ছেলে আর তার বাপ। দৌড়ে গেলাম দেখতে, চলছে কিসের বিসংবাদ !••• আমি কিন্তু ব’ দিয়ে শাখা পল্লব বাদ— কেন ঘটুল’ চটাচটি বেটা এবং বাপে, বেটা কেন চাইছে টাকা, বাপ কেনই বা শাপে! আমায় দেখে’ ধীরু যেন পেল’ সাহস, সাথী- বলে ঃ “দেখ, অচ্যুত-দা’ বাবার চালিয়াতি! বিয়ে করলাম যে-মেয়েকে দেখলে ত’ সে-মেয়ে !:- কাজল কষ্টি ফস রঙের সেই পেত্নীর চেয়ে ! তােয়াজ করে’, লােভ দেখিয়ে, করে আমায় রাজি- এখন বল্ছেন বাবা আমায়, পিতৃদ্রোহী, পাজি। বলেছিলেন তখন, তুমি করলে আইন পাশ, ওকালতি করূবে, কিন্তু খাবে না ত ঘাস ! মেয়ে একটু কালাে, কিন্তু দেবে অনেক টাকা তারই হাজার দুয়েক নিয়ে ঘােরাও বসে’ চাকা, ওকালতির চাকা, আর বাসাখরচ চালাও- পসার হবে ক্রমে।•••তখন বলেছিলেন ঢালাও; এখন বলছেন, আমার লােহার সিন্ধুকের এই ঢাবি মরলে আমি, পাবে। পূৰ্বে করাে’ নাকো দাবি একটি পাই পয়সার ! দেখ বাবার ব্যবহার। ।
কশ্যপ ও সুরভী
১৮
শীধর গুহরায় বলেন, 'কুলাঙ্গার ও বেটা-
বাড়াবাড়ি জিন্ করলে করব জুততা পেটা।
শুনে আমি দাঁতে কালাম জিব,
ডুকুরে’ উঠলাে জনতার ভিতর থেকে রাজীব
ওঁদের কর্মচারী;
অপর সবাই দুর্ঘটনায় দুঃখিত হ'লে ভারি।
গল্প প্রায় শেষ
তার সঙ্গেই আমার এই গল্প বলার ক্লেশ।
ধীরেন্দ্রনাথ বেরিয়ে গেল কেঁদে ক্লেশে রােষে•••
বালকগঞ্জের হতভাগ্য উকিল এখন সে।
স্ত্রীকে নিয়ে কাছে
বাসা করে আছে, এবং বােধ হয় ভালই আছে।•••
আচ্ছা, আসুন এখন
আবার পদধূলি দেবার রইলাে নিমন্ত্রণ।”
অচ্যুতানন্দের পরামর্শ ; “বাবা ছিলেন যারপরনাই ভক্তি-পরায়ণ- মানুষ পেলেই ভাবতেন, বুঝি এলেন নারায়ণ । ‘বিত্ত হ’তে চিত্ত বড়’, এই ছিল তার মর্মবাণী, চিত্ত তাহার সুবিস্তৃত ছিল সত্যিই অনেকখানি। ভাগ্যে সবার সে-ৰাণী নয়, চিত্ত বিশাল নয়কো সবার তা হলে ত’ লালবাতিতেই ঘুচত লােকের ঘরের আঁধার সবার চিত্তই মুক্ত অমন হলে নৃত্য করে’ মত কতক, কতক মত পিত্ত জ্বলে। 'বিত্ত হ’তে চিত্ত বড়– দূরে থেকেই কথাটাকে প্রণাম করি ; সবাই করাে। সে যাই হােক্, এই সমুদয় নারায়ণের সেবায় ( খুবই তাহা দুরূহ আর সুসঙ্গত দায় ) চঞ্চল খুব দেখতাম তঁাকে। সকুণ্ঠ বিনয়ে আপন দৈন্য অযােগ্যতার ক্ষমা চেয়ে ল'য়ে, দেবতাজ্ঞানে করাতেন সেই ভবঘুরে’ ভােজন- ভুলে যেতেন বদান্যতায় নিজের আয়ের ওজন। এই কথাটা হয়ে জানাজানি ভৃঙ্গারাভিমুখে বহু ভূঙ্গে আন্ত টানি’... আবেই তা ; কারণ, চুরি ত’ তা নয়, তা’ ন্যায্য আচরণ।
২০ ক - কশ্যপ ও সুরভী মানুষ যেথায় একটু নত, একটু হীনবল, সেইখানেতেই ভিড় করবে প্রবঞ্চকের দল। বিশেষ করে অতিথি আর সাধু বৈষ্ণবগণ, লক্ষই তাদের তৃপ্তি এবং পুণ্য বিতরণ... একটু রন্ধ্র, একটু সুযােগ পেলে বলবেনই ত’ : ‘এলাম ; কারণ চিত্ত হেথায় মেলে। ধরা-বাঁধা কথা- হয় না অন্যথা। বাবার হত তাই- দেখতাম, তার অভ্যাগত-সেবার অন্ত নাই। তবে তারা কেহ কেহ করতেন আশীৰ্বাদ ভােজনান্তে, তুমুলভাবে করি’ কণ্ঠনাদ।... তাহার যদি মূল্য থাকে, এবং তা যদি হয় সঞ্চয় আমাদের তুল্য তবে ধনী কেহই নয়। এ-পারেই, কি এ-পার ছেড়ে গিয়ে পরপারে বলব আমরা- ভয় নাই, মন, ডঙ্কা বাজা রে ! সে যাই হােক, সেই সমুদয় নিত্য নিরঞ্জন এ গল্পের বিষয়ীভূত নন্। দিলাম বাবার হৃদয়ের একটু পরিচয়, এ গল্পের সংশ্রবে তা না দিলেই যে নয়। এ-গল্প চাকর নিয়ে নবীনকিশাের হাড়ি চাকর ছিল কয়েক বছর আমাদের এই বাড়ী। বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী সে কাজের ছিল দিশে।
২১
অচ্যুতানদের পরামর্শ
কিন্তু ঘটল দুর্ঘটনা—তার স্ত্রীটি গেল মারা,
নবীন হ’ল বিব্রত খুব হয়ে পত্নীহারা
বালকপুত্রে নিয়ে।•••
সবাই বলে : নবীন, তুমি করে আবার বিয়ে।
নবীন বলে ? উহু। আর বিয়ে করবো না ;
আয়ু থাকলে আমার হাতেই মানুষ হবে ভােনা।
বলে’ নবীন ভানুদাসকে হাতে ধরে এনে
বাবার কাছে এনে—বলে করুণ কণ্ঠ হেনে’
বাবার বুকে : আপনার পায়ে রাখলাম এই ছেলে-
যা ইচ্ছে করুন, রাখুন, কিম্বা দিন্ ফেলে।
শরাঘাতে বিচলিতা অতি
জলধারা দিলেন ভােগবতী,
অর্থাৎ বাবার চক্ষু দুটি হ’ল বাষ্প-মলিন,
বলেন : ‘এ-কে রাখলাম আমি ; কাদিসনে তুই, নবীন।
আরাে বলেন : ‘জীবমাত্রেই আছেন নারায়ণ
আমি তাের এই গােপালটিকে করবে প্রতিপালন।
ঐ কথাতে কৃতজ্ঞতা উদ্বেলিত হয়ে
অশ্রুরূপে চললো দ্বিগুণ ব’য়ে
নবীন হাড়ির চোখে...
আরাে দ্বিগুণ কঁদলাে নবীন মৃতা পত্নীর শােকে।
*
ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে
মার্জনা আর অনুমতি চেয়ে সকাতরে-
কশ্যপ ও সুরভী
২২
••
ভাল লাগে না বলে’ নবীন গেল চাক্ৰী ছাড়ি;
ভােনারূপী গােপাল রইল আমাদেরই বাড়ী:..
নন্দালয়ে যেন নন্দদুলাল
আগলে থাকলে তারে আমার বাবার স্নেহজাল।•••
মানুষ হয় ভানুদাস—অর্থাৎ খায় দায়,
কাপড় জামা পরে, আর বই নিয়ে সে চেঁচায়—
অর্থাৎ সে পড়ে; এবং আমিই তার ‘টিউটর।
ভদ্রভাবে হতে লাগলাে জীবন অগ্রসর
ভানুদাস হাড়ির—-
ছেলে সে এই বাড়ীর।
===
কাটুল ন’টি বছর ; ভােনার বয়স হ’ল বেশ
সপ্তদশ প্রায় ; হ’লাে গুল্ফের উন্মেষ ;
সবিরামে লেখাপড়া শিখলাে ততখানি
কাজ-চালানাে-বিদ্যা বলে যেটুকুকে জানি ।
শুভঙ্করীর অঙ্কপাত আর জটিল জটিল বানা,
লম্বা লম্বা ঠিক্ বসানাে, কলাম তারে দান ;
এ-সবের পিছু
ইংরেজিও শিখল কিছু কিছু।•••
দ্রোণাচার্যের বাড়া আমি ; গরম হয়ে থাকি...
বাবা বলেন : ‘চাক্ী পেতে আর বাধাটা কি ?
দোকানে তুই চাকুরী নে—
বিশ্বাস বজায় রাখিস, দেবে আটটি টাকা মাইনে।
২৩
=
অচ্যুতানদের পরামর্শ
শুনে’ ভােনা ভদ্রভাবে মিটিমিটি হাসে-
মনে হয়, সে কৃতজ্ঞ, আর খুবই ভালােবাসে।
বাবাই নিজে অনেক আড়ৎ ঘুরে’ অনেকবার
চাী ঠিক করলেন যা’ উপযুক্ত ভােনার।
মাল-চালানী ব্যবসা তাদের প্রধান কারবার ঐ--
মুদিখানাও আছে তা বৈ।
কাটায় বস্তা ওজন হয় ; কয়াল ওজন হাঁকে :
“দু’মণ সাড়ে পাম্বের।•••ভােনা লিখে রাখে
করে অঙ্কপাত
আমার শিক্ষায় অঙ্কে ভােনার ভারি দ্রুত হাত।
আরাে ‘ডিউটি’ আছে ভােনার ও খুচরাে বিভাগের
দোরকে তাগিদ তারে বােজ দিতে হয় রে...
এবং বাজারদর জেনে
দেয় মালিককে এনে ;
অধিকন্তু মনিবের ছেলেটাকেও পড়ায়।
ভারি খাতির ভােনার তার নিজেদের সেই পাড়ায়।
ইতিমধ্যে অসুখ হ’ল, বাবা গেলেন মারা
ভােনার সঙ্গে সম্পর্ক তার তখন হ’ল সারা।
এ-দিকটা এই পর্যন্ত, অর্থাৎ বাবার মুন
খেয়ে তােনা জয়ী হ’ল। আমায় এখন দেখুন ।
পরাস্ত আর মলিন নই কি?
আপনারা সব যােল আনা, আমি মাত্র সিকি
এক-চতুর্থ উপযুক্ততা এ-সংসারে থাকার ;
মিল কেবল যে, টাকা সিকি দুইই গোলাকার,
৪ কশ্যপ ও সুরভী অর্থাৎ আমায় ভগ্নাংশিক মুদ্রা বলে’ মেনে’ কাজ চালাতে সঙ্গে করে নিতে পারেন টেনে। হাছেন বুঝি কথা বলার বিরূপ ভঙ্গী দেখে? ঠকে ঠকেই ঐ রকমটা বলতে লােকে শেখে। সে যা-ই হােক্, অতঃপর সমস্যা এক এল ভয়ঙ্কর। পিসে’ মশা’র দাদার ছেলে আমার খুবই আপন, খুবই স্নেহভাজন— নীরেন্দ্রনাথ। নীরেন্দ্রনাথ থাকতে এল দু'দিন আমার এখানে। তাহার দরুণ হ’ল কিছু ঋণ। আমি গেলে পিসে’ মশা’র দাদা, এবং সবাই, এত যত্ন করেন যে তার পরিসীমাই নাই। চক্ষুলজ্জাই ধরিয়ে দেন আদর করে করে, খাওয়ার পরও খেয়ে খেয়ে ধাতই আসে মরে’••• কাজেই যখন নীরেন এল ঘটুলাে ভারি দায়- মানরক্ষার কি করি উপায় ! সুরবালা—স্ত্রীর নাম ঐ-বলেন সুরবালা : ‘তােমায় নিয়ে হ’ল ভারি আলা। মাঝ-সাগরে ঝড়ে পড়ে পাচ্ছ নাকো দিশে- রকমটা তাই ; এত তােমার ভাবনা হ’ল কিসে? বললেন আরও : আমাদের ত’ অভাব বারমাস- আছেই দীর্ঘশ্বাস। তা’ বলে’ ত’ থেমে থাকূলে চছেনাকো এখন, করতেই হবে যথাযােগ্য খাওয়ার আয়ােজন। ••
অচ্যুতানন্দের পরামর্শ
ভানুদাসের দোকানে যাও; ধারেই আনাে কিনে
ময়দা ঘি আর মিহি চা’ল। চলবে না তা বিনে।
ক্রমে সেটা দিয়ে দিলেই হবে—
ভানুদাস ত’ নিজের লােক, সবুর স’য়ে লবে।
সুরবালার ঐ প্রস্তাবে হ’লাম বিস্মিত
বুদ্ধি দেখে’•••এবং আলাম ময়দা চাউল ঘৃত।
তিনটাকা ছ’ আনা বাকি লেখা পড়ল খাতায়-
দোকানদারের খাতায়, এবং আমার চোখের পাতায়,
অর্থাৎ আমার চোখের পাতায় লজ্জা এল নেমে
মুহূর্তেকের তরে ; তখনি তা’ ডুবলাে ভ্রাতৃপ্রেমে
ধীরেন নীরেন প্রিয় আমার সহােদরের মত
ভাইয়ের জন্যে ভাই যে আরাে সহ্য করে কত।
শেষ কবে ভােনার কথা বলে ?
খেরুয়া-বাঁধা খাতা এবং টিকিনের এক থলে
হাতে করে বেড়ায় ভােলা তাগি দিয়ে দিয়ে,
আদায় করে খাতার বাকি’ বাড়ী বাড়ী গিয়ে।
জামা জুতাে পরে এবং পরে মিহি ধুতি-
সেটা নিশ্চয় তাহার পদের বিভূতি ও দ্যুতি।
ঘাড়ের চুল নির্মুল করে কেটে দেয় তার নাপিত,-
সেটাও বােধ হয় উচিত।
পথে ঘাটে সাক্ষাৎ হয়; আমি শুধাই কুশল,
হৃদয়গত চেষ্টা আমার হয় না প্রায়ই সফল
৪
কশ্যপ ও সুরভী
২৬
;
যেহেতু সে গা লাগিয়ে দেয় না কথার জবাব ;
তবু আমি হাল ছাড়ি না; উহাই আমার স্বভাব ;
দ্বিতীয়তঃ, নিম্নগামী স্নেহের শুভ ধার—
স্নেহই করি তারে আমি হিতকামী তার।
ভিতরেতে রয়ে গেছে আরাে একটা বিষয়
মাধুর্য্যে ও দায়িত্বে যা কিছুরই কম নয় !
গুরু যদি শিষ্যের প্রতি না রাখেন প্রেম, প্রীতি-
গুরুরই ত’ দুর্গতি, এবং সেটা দুর্নীতি •••
সে যা-হােক্, কর্তব্য তার খাতার বাকি’ আদায়—
‘দেবেন কিছু আজ ? বলে দেদারকে শুধায় ;
আমায় কেন শুধাবে না? শুধালাে সে আসি’•••
জমা দিলাম হিসাবে তার শীর্ণভাবে হাসি’
মাত্র আট আনা
এবং বেশী না দেয়ার কারণ বললাম নানা••
মনে মনে মাথা হ’ল হেঁট ।
ভালাে হ’ত চুপসে যদি মিলিয়ে যেত পেট
কারণ, খাটো হ’তে হ’ল নিশ্চয় ভােনার কাছে ;
ভাবলাম, জানি নাকো ভাগ্যে আরাে কি সব আছে।
* * * তারপর সে ফিরুলাে দু’দিন দিন বিশেকের ভিতর
আমার সঙ্গে সুরবালাও হয়ে উঠলেন কাতর ;
যদি না যায় তাকিয়ে থাকা স্পষ্ট চোখে ঠিক
কারাে বিরস মুখের দিকে, সে বড়-সাংঘাতিক।
ভােনার কাছে থাকছে না মান; অভিজাত্যের রং
মরে’ আসছে।•••না-খাওয়ানােই ভাল ছিল বরং।
;
২৭
অচ্যুতানদের পিসেমশার দাদা
লজ্জা পেতে হত তখন অনটনের বশে
বুঝত আমার অবস্থাটা—আত্মীয় ত’ সে!
মনে কিছু করত না সে, তেমন ছেলে নয় ;
লুচি পােলাও না দিলে ত ভাঙত’ নাকো প্রণয় !•••
অকপটে ভেবে’ খানি বললেন সুরবালা ও
‘হ’লল ভারি জ্বালা।
সে যা-ই হােক্ চতুর্থবার এল আবার তাগিদ
এবার দেখলাম ভােনার একটু ভারিক্তিভাব, জি!
বলে কিছু দিতেই হবে; মালিক ভারি নারাজ ।
‘পালাম-না দিতে’ শুনে’ ফিবাে নাকো আজ।
বলে’ ভােনা হ’ল আরাে দৃঢ়
এ-অবস্থায় কঁপে ভীরু, কঁপে অনেক বীরও ;
ভীত হয়েই বললাম : ‘হাত একেবারে খালি
এমন পয়সা নাই আজ যে জুতােয় লাগাই তালি...'
বলেই হঠাৎ শুকিয়ে উঠে গলা—
মনে হ’লভাল হয়নি ঐ কথাটা বলা...
এবং তাহার জবাব পেলাম : ‘এমন দেখিনি’ ত’!
তবু খাওয়া চাই-ই লােকের ময়দা মাখন ঘূত!
স্বপ্ন নহে, কিম্বা নহে আকাশ-বাণী উহা
কয়নি’ কথা হঠাৎ-সবা বৃক্ষকোটর, গুহা !
আশ্চৰ্য তা তবু
বােধ করলেন তাহা আমার অন্তর্যামী প্রভু।•••
কপ ও সুরভী
২৮
;
ভােনার কণ্ঠ, কথাগুলাে, স্পষ্ট এল কানে
তাকিয়ে দেখি পিছ পানে
সুরবালা দাড়িয়ে আছেন ; সামনে অদূরে
ভােনা যাচ্ছে চলে। আমি পড়লাম মাথা ঘুরে
|”
থেমেই হেসে বললে অচ্যুত,
“শুতে লাগবে খুবই অদ্ভুত
কিন্তু দে’য়া রইলাে এই পরামর্শ আমার ।
‘ধার করে কেউ ঘি খেও না।•••আচ্ছা, নমস্কার।”
অচ্যুতানন্দের তিক্ততা “পুরাণ খুলেই দেখতে পাবেন, দৈত্য দানব অসুর- দেবদ্বেষী দুষ্টমতি। কারাে ভয়েই তারা গাল দিতে আর লড়াই করতে করলে নাক’ কসুর- এবং যুদ্ধের হ’ল শেষ তারাই গেলে মারা। স্বর্গ হতে তাড়িয়ে দিয়ে করলে পিছু তাড়া অমরগণে; অমরগণ অপদস্থ অতি ; ইন্দ্র সূৰ্য্য বরুণ আদি শ্রান্ত দিশেহারা - চিন্তামগ্ন রুদ্র ব্রহ্মা এবং গােলােকপতি। অমরগণ ত’ মরবেন না ! ক্লেশ ভােগের পর মারলেন তাঁরা দৈত্য দানব রাক্ষস অসুরে-- শত্রুগণে ; প্রচুর ঘেমে ছাড়ল কঠিন জ্বর তখন লাগল উৎসব খুব জয়ী স্বর্গপুরে। আর একটা ব্যাপার দেখুন : ঐ শত্রুগণ অধিকাংশই নির্ভীক আর আত্মাভিমানী অনাৰ্য ত’ বটেই-মহা পাপপরায়ণ, অজ্ঞানতা দম্ভের বশে করলে টানাটানি স্বর্গের অধিকার নিয়ে !—কিন্তু দেখা যায় অনেকেই তার তলে তলে বিষ্ণুভক্ত ভারি জানিয়ে যায় তা মৃত্যুকালে আধ্যাত্মিক ভাষায়- কেহ আবার মনে মনেই পর উপকারী।
কপ ও সুরভী == ; লঙ্কেশ্বর রাবণ ইহার প্রধান উদাহরণ- কুম্ভকর্ণের অগ্রজ আর ইন্দ্রজিতের পিতা, অশেষ দুঃখ দেবার পর করলে মরণ বরণ- সর্বাপেক্ষা দুষ্কাৰ্য তার হরণ করা সীতা। কিন্তু দেখুন মৃত্যুকালে পূজলে’ চরণদ্বয় শ্রীরামচন্দ্রের, জেনে’ ভঁরে পূর্ণব্রহ্ম হরি , গলদলােচন রাম পরম্ ক্ষমাময়- ক্ষমা করলেন শত্রুরে বহু সান্ত্বনা দান করি। তদুপরি দেখুন, রাবণ বলে’ গেল হঠাৎ : ইচ্ছা ছিল তাহার একটা স্বর্গের সিঁড়ি করার ; কিন্তু তাহা হয়নিকো ; করি’ অশ্রুপাত রাবণ করলে নিন্দা নিজের দীর্ঘসূত্রতার হলে বােধ হয় ভালই হত। স্বর্গের সিড়ি বেয়ে সটা উঠে যেত’ মানুষ জীব জন্তু সব ; ভীড় হ’ত খুব বেশী ভীড় বায়ােস্কোপের চেয়ে গুণ্ডার মার খেয়ে আমরা কতাম কলরব ! সে যা-ই হােক, একটা কথা ভাবছিলাম আজ বসে’ : রাবণ যেমন দুষ্ট ছিল ঠকাত’ সে বােধ হয় ; যদি স্বর্গের সিড়িনিৰ্মাণ হাতে নিত’ সে একটুখানি রাখত’ বাকি—অসম্ভব তা নয়। উঠে যেত’ পৃথিবীর সেই দীর্ঘতম সােপান স্বর্গ অভিমুখে ভেদ করি’ সকল লােক— চন্দ্র সূৰ্য্য ধ্রুব আদি-মহান্ দ্বারবান্ দাড়িয়ে আছে স্বর্গদ্বারে অঙ্গে দিব্যালােক— ৩১ অচ্যুতানদের তিক্ততা দেখা যাচ্ছে সিড়ি থেকে’-ছুটুল’ প্রাণে পুলক কিন্তু শেষ ধাপে উঠেই দেখা গেল হঠাৎ শেষ অবধি পৌছে নাই সে, বাকি আছে কতক, স্বর্গদ্বার সেখান থেকে অনেকখানি তফাৎ- লাফিয়ে ওঠা অসম্ভব আর নেমে যাওয়াও কষ্ট। এই কাণ্ডটা রাবণ রাজা করে যদি যেত’ জীবদ্দশায় মানুষগুলাের দু’কাল হ'ত নষ্ট, স্বর্গে যাবার লােভর পর জীবন হত তেততা ! এ সব কথার উদ্দেশ্য কি? দুর্বোধ্য এই কথার মানেটা কি? তা জানতে যদি ইচ্ছা হয়ে থাকে- শ্রান্ত যদি শুনুন্ তবে ক্ষুদ্র একটা ব্যাপার, মানে যদি না পান্ তখন বলবেন আমাকে। শুনে’ নিশ্চয় স্তম্ভিত হবেন : প্রকল্পিত সিড়ি কুচক্রী সেই রাবণ রাজার, উদ্ধে উঠিয়াছে অসম্পূর্ণভাবে ; আছে বিশ্বজগৎ ঘিরি’ অদৃশ্য তা’, কিন্তু সত্য ; সে তৈরী হয়েই আছে— একটুখানি আছে বাকি ; সেটুক পাওয়া গেলে এই জীবনেই স্বর্গলাভ একেবারে ধ্রুব ; কিন্তু নির্মাণকারী গেছে অসমাপ্ত ফেলে’- কে জানে তায় ঘটুছে লােকের অশুভ কি শুভ। সে-সিড়িটা কোথায় ? কেন, সে-সিড়িটা এই যে- আমাদেরই মনের ভিতর ভাগ্যদেবের গড়া, কত উচ্চ, কত সুন্দর—তাকিয়ে দেখুন নিজে এবং ভাবুন সেই সিড়িকে সুসম্পূর্ণ করা
কশ্যপ ও সুরভী
কত প্রার্থনীয় ; আর হয় না বলে তা
ভােগ করছেন সদাই কত কষ্ট দুর্বিষহ !
জব্দ করতে মানুষগুলােয় অদৃষ্টের ঐ কেতা-
বলছে ডেকে’: ‘মানুষ তুমি স্বর্গের যােগ্য নহ।
দৃষ্টান্ত দিই তবে
বুঝতে সহজ হবে :
ধরুন আপনি বিয়ে করলেন—(সব দিকেতেই জয়)
ধনী শ্বশুর, টাকা দিলেন যা চেয়েছেন তা-ই ;
ছড়িয়ে দিলেন সােনা হীরে অষ্ট অঙ্গময়—
( আপনার নয়, বধূটীর গাে!)—হাস্যময়ী সদাই
গৌরবর্ণা স্বাস্থ্যবতী সুলক্ষণা বন্ধু,
চুলে চোখে ভুরু নখে অদ্বিতীয়া নারী,
প্রেমে স্নেহে বিগলিত কণ্ঠে ঝরে মধু ;
যৌবন তার পরিপূর্ণ লাবণ্য তার ভারি—
কিন্তু একটু নাক চ্যাপ্টা! এই কারণেই তখন
অসম্পূর্ণ সেই সিড়িটা পড়ল না কি চোখে ?
ভেঙে গেল উৰ্দ্ধগামী মােল-আনার স্বপন,
আপনি হয়তাে শয্যাই নিলেন চ্যাপ্টা নাকের শশাকে!--
অর্থাৎ আমি বলতে চাই যে, ব্যাহত এই জগৎ
পরাজুখীকৃত ; তারে পরিপূর্ণ সুখে
পৌছে যেতে দেয়া হয় না; এবং ভবিষ্যৎ
অশান্তির কারণ হয়ে দাড়িয়ে আছে রুখে !
এই ত’ গেল ভূমিকা। এখন বলতে পারি ত’
আমার নিজের গল্প একটা নেহাৎ ব্যক্তিগত ?
;
•
৩৩
অচ্যুতানন্দের তিক্ততা
যা’ কর্তৃক চিন্তাশক্তি হয়ে বিচলিত
বলিয়ে দিলে রাবণাদির রূপকাদি যত !
-খুশী হ’লাম মন্তব্যে। এবং সুরবালা
—স্ত্রীর নাম ঐশুনলে হবেন অবাক্ এবং খুশী ;
তিনি বলেন : তোমায় নিয়ে হ’ল আমার আলা,
জ্ঞান জুগিয়ে বেটা ছেলেয় কি করে যে পুষি!
সে যা-ই হােক্, তাঁর সঙ্গে কথা আছে পাকা :
কম খর্চায় চলতে হবে যতদূর সাধ্য ;
স্বপ্নেই আমরা দেখি বহু নিরবয়ব টাকা-
স্বপ্নেই আমরা করব ভােজন ‘চ চোয়’ খাদ্য।
সুরবালা রাজি ; অশেষ গুণবতী কি না,
ধৈৰ্যশীলাও বটেন ; খুব কম খরচায় চালা—
ডাল হলে ত’ সেদিন আর মৎস্য চাহিনা,
ডাল রাঁধেন না যদি কিঞ্চিৎ ছােট মৎস্যও পান্।
তৈলই দেন ছিটে-ফোটা, ছোঁয়া নাকো ঘৃত
তরকারী বা কিছুতেই ; তবু হাতের গুণে
যা রাঁধেন তা-ই খেতে লাগে পরম অমৃত।
হাসছেন হয় তাে মনে মনে স্ত্রৈণ কথা শুনে’!
হাসছেন না? ভাবনা গেল।তারপরেতে শুনুন্ ।
সুরবালার, এই গত কালই, হল কেমন খেয়াল,
বলেন : ‘শুধুই বাঁচিয়ে যাব তুচ্ছ তেল আর নুন
চিরদিনই টিপে টিপে ? এমনি পােড়াকপাল !-
ভাল খাব একটা দিন-বাধা দিও নাকো ;
ঋণ হবে না, নিশ্চিন্ত থাকো।
কশ্যপ ও সুরভী
৩৪
শুনে আমি হাসলাম মৃদু, অপরাধীর ন্যায় ;
ভাবলাম, “স্ত্রীর খাওয়ার ইচ্ছায় প্রকাশ্যে কি চটে!-
আমার টাকা তারই টাকা; তিনিই অপব্যয়
করেন যদি বুঝবেন তিনি কুফল যদি ঘটে।
দুধ কিলেন পােয়া দেড়েক-দধি হ’ল পাতা,
মাছ কিলেন ঐ পরিমাণ, রােহিত মৎস্যের পেটী,
ছ’পয়সায় কিলেন একটা কাৎলা মাছের মাথা
ইত্যাদি সব হ’ল চাই যেমন এবং যে-টী !
নিম-বেগুন দে’ কলাম সুরু। বিপুল আয়ােজন
কিন্তু আহার-ব্যাপার হচ্ছে স্কুল ঐহিক কাৰ্য্য,
আনন্দ তার সসীম, ইহাই কহেন সুধীগণ,
নেহাৎ দেহধারণ করতেই ওটা অনিবার্য।
মনে উদয় হলেও প্রতিদিন
উদর-চিন্তা হেয় বস্তু, বিশেষত্বহীন।
কাজেই বিশেষ বীতং করে’ একটী দুটী করি’
বলব নাকো কি কি খেলাম, কি জিনিস কি দিয়ে ;
তবে, খেলাম পরিণাম-চিন্তা পরিহরি’,
ধীরে সুস্থে হাসিমুখে টেনে সাপটে নিয়ে।
সুরবালা-স্ত্রীর নাম ঐ-সুরবালার সূপ,
করুলাম আমি অনুভব, মুখরােচক অতি,
আনন্দ যা’ পেলাম আমি তার বাস্তব রূপ
কেমন করে দেখাব ?—তার স্বর্গপানেই গতি—
রাবণের সেই সিড়ির মত।—আহার হ’ল শেষ
অচ্যুতানদের তিক্ততা । - নিম-বেগুনে সুরু কবে ক্রমাগত চলে সমাপ্তিতে জমাটু দধি এবং যুগল সন্দেশ চমৎকার সে সন্দেশ, গেল মুখের ভিতর গলে। উদর হল পূর্ণ—সেটা সিদ্ধি রসনার, তৃপ্তি যাহা পেলাম তাহা ঐশিকেরই জ্ঞাতি- কারণ, দেহ সাক্ষাৎ পেলে মনােগত ভূমার- খাইয়ে সুখ দিতে পারে বাংলার স্ত্রীজাতি। ভাল করে পেট ভরলে ভাল জিনিস খেয়ে সে-মুখ করে আলােড়িত সম্বিতেরও মূল ; তভব সেই আনন্দেতেই সমগ্ৰতা পেয়ে মনে হয় যে, শুয়ে পড়ি। কিন্তু সবই ভুল সমগ্রতা নাই ; কিছুই সুসম্পূর্ণ নয় ; শেষ অবধি পৌছে নাই, ভাই, স্বর্গের সেই সিড়ি মনে মনে অহর্নিশি গড়া যারে হয় ; আশাভঙ্গের ব্যথায় মৰ্ম্ম যাবেই যাবে ছিড়ি। সুরবালার—স্ত্রীর নাম ঐনিয়ে অনুমতি উঠে পড়লাম খাওয়ার পর পরিতৃপ্তিসহ, টান ধরুল মনে পান এবং শয্যার প্রতি গুরুভােজন অন্তে দেহ হবেই দুৰ্বহ। চিবােই না ত পেটের জিনিস মুখে করি’ জড়াে কিন্তু শুয়ে ভােগ করা যায় একত্ৰিত স্বাদ, মুখের স্বাদ হয় প্রাণে ব্যাপ্ত হয়ে গাঢ়তর তাহারি নাম স্বর্গ। কিন্তু ঘটুল পরমাদ শেষ হল না সিড়ি, অর্থাৎ শেষের কয়েক ধাপ " • কশ্যপ ও সুরভী ৩৬ হয়নি তৈরী হতভাগ্যের উপকারের তরে ; অদৃষ্টের কি পরিহাস, দারুণ অভিশাপ ! জেনেও লােকে সিড়ি বেয়ে ছুটে ছুটে মরে। গিয়ে বসলাম আঁচাতে ত’ নিয়ে খড়কে’ কাঠি, ঐ অভ্যাসটা আছে আমার, দাঁত মাজা দাত খোঁটার ; শৈশবকাল থেকেই দাত রাখি পরিপাটী মানে, যখন খতম্ হল দাঁত পড়ে দাত ওঠার। সে যা-ই হােক, খড়কে নিয়ে খুটছি বসে দাত, এমন সময়—কি ঘটল তা করুন অনুমান পারবেন না তা।--সুখের মাথায় হল বজ্রাঘাত, তিক্ততায় মুখ পূর্ণ হল, জ্বলে গেল প্রাণ। খড়কের খোঁচায় বেরিয়ে এল দাতের ভেতর থেকে নিম-বেগুনের নিমের টুকরােব কি আর বলুন- ভােজনের সুখ গেল ঘুচে নিমের সে বিষ মেখে, সারা মুখে জড়িয়ে তেতো হয়ে গেলাম খুন।” চুপ করল অচ্যুত মুখ ভারি তিক্ত করি- বল্প আবার ঃ “দুঃখ নাই যদি এখন মরি।” - অচ্যুতানদেৱ বিলা-যাত্রা “শীঘ্র করিব বিলাত-যাত্ৰা”. কহিল অচ্যুতানন্দ, ছাড়ায়ে গিয়েছে সহার মাত্রা, আবহাওয়া খুব মন্দ। যদি বলাে টানি’ ঠাট্টার সুর : ‘হেতুটা কি তা’ করার ? এখানেই ঠাই রয়েছে প্রচুর হাত পা ছড়িয়ে মরার ! বিলাত-যাত্রার প্রয়ােজন কি ? এ দেশেই থাকি, জিতি আর ঠকি, এখানেও মেলে সখা আর সখী হৃদয় দিবার পাত্র ; দেখিতে পাইবে তাকালে ক্ষণেক- এখানেও লোক রয়েছে অনেক, ঘর দোর করে আছে অকাতরে, জ্বলে না তাদের গাত্র। জন্মভূমিরে ত্যজিবে কি তুমি কেবল গরম বলে ? দেশ নহে, ভাই, ফুল মরশুমী-- ফেলে দেবে বাসি হলে।
কশ্যপ ও সুরভী ৩৮ ০ এইরূপে কথা কয়রা যদি শেষ যুক্তি হিসাবে হয় তাহা বেশ, স্বর্গেরও উর্দ্ধে স্থান পাবে দেশ- এ-কথা আমিও মানি; দেখিবে তােমরা ভাবিলে খানি যুক্তির কিছু হয়েছে বেঠিক, তােমরা ভেবেছ তােমাদের দিক্ আমারেও দলে টানি। গরমের ভয়ে যেতেছি বিলাত- এ-কথা সত্য নহে; আমারাে চৰ্ম্মে ঘৰ্ম্ম-প্রপাত রৌদ্রের দাহ সহে কিন্তু আমার আপত্তি কেবল দিবালােক হেথা অতীব প্রবল, জ্যোৎস্নাও অতি প্রখর ধবল- জ্বলিছে নিয়ত যেন ; স্পষ্ট হইয়া সবে বসে আছি পরস্পরের অতি কাছাকাছি, কাজ আপনার গােপন করার সাধ্য নাহিকো কেন ? বিলাতের লােক থাকে কুয়াশায় তুষারপাতের মাঝে, আঁধারেই তারা থাকে, নায়, খায়, সকাল দুপুর সাঁঝে••• অচ্যুতানন্দের বিলাত-যাত্রা জমাট বরফ ঝুলিছে আকাশে বিলাতি সূৰ্য্য পড়ি তার গ্রাসে বৃথাই শূন্যে যায় আর আসে-- রশ্মি ছোঁয় না মাটি ; চঁাদ ত’ সেখানে নেহাৎ বেচারা হিমে হিমাংশু হয়ে গেছে সারা; শােনেনি বিলাত, আছে তারকারা ক্ষুদ্র ও পরিপাটি। দীবনে কখনাে হয় না মালুম চন্দ্র সূর্যোদয়, ঘড়ির কাটায় শুধু জানা যায় দিনের বৃদ্ধি ক্ষয়। চোখােচোখি হয়ে দাড়াবে এমন সুবিধা লােকের হয় না কখন, পরস্পরের দোষাম্বেষণ করিতে পারে না কেহ ; কেহ কাহাকেও চেনেনাক’ ভালল- চিনিবে কি করে ? দেশে নাই আলাে ; তেল ঢেলে ঢেলে’ বাতি জ্বেলে জ্বেলে কে আর বিতরে স্নেহ!••• এ-দেশ দেখ’ তাে কেমন খারাপ নিজেরে যায় না ঢাকা । জানি এ উহার উদরের মাপ, কাহার কিরূপ টাকা।
কশ্যপ ও সুরভী
৪০
লুকায়ে যা’ করি রহে না গােপন ;
পথে ধরে বেঁধে বহু আলাপন,
চোখে পড়া সদা কত জ্বলাতন
নিয়েছি তা ঢের শিখে’...
এত দেখা শুনা,
এতটা
প্রণয়,
সহিতে পারি না—সহিবার নয় ;
সে-দেশে তা’ নাই ; চলিলাম তাই
আঁধার দেশের দিকে।”
বলিয়া অচ্যুতানন্দ
দুয়ার করিল বন্ধ।
অচ্যুতানদের ইচ্ছা-দমন “বিলাত-যাত্রার দেরী কত আর ? জানিতে চেওনা, ভাই ; বড় দমে গেছি শুনিয়া ব্যাপার আমাতে আমি ত’ নাই। সব ঠকঠাকু, সময়, তারিখ, দির্শন যন্ত্রও ঠি••• মনে দেখে স্বপ্ন খুশী হয়ে আছি : বিলাতি জাহাজে যেন চাপিয়াছি, খালাসী টানিছে নােঙরের কাছি জাহাজ ছাড়িল জেটি... - যন্ত্র-শব্দে ভরা তার বুক সাগরের দিকে ঘুরাইল মুখ••• কিন্তু কোথায় নিষ্কৃতি, সুখ ?- কাজে ত’ হ’ল না সেটি। হঠাৎ অশুভ বাজ ভাঙিয়া পড়িল আজ-
কশ্যপ ও সুরভী
8२
কহিলেন হেঁকে স্ত্রী সুরবালা ও
‘তােমারে নিয়ে ত’ হ’ল ভারি জ্বালা,
জানি না, বুদ্ধি কোন্ ছাঁচে ঢালা,
আক্কেল কতটা খাঁটি।
যেও না বিলাত, করিতেছি মানা,
নূতন জায়গা, কিছু নাই জানা ;
বাঁশবনে তুমি হবে ডােম-কাণা-
জীবন হইবে মাটি...
পাবে না থাকার ঠাই।
সদাই আকাশ ঢাকা থাকে মেঘে,
ঝড়ের বাতাস বহে হু হু বেগে,
চিরবর্ষণ আছে সেথা লেগে’-
বৃষ্টির শেষ নাই।
সেথা যে গর্জন করে মেঘদল
এ-দেশের চেয়ে দ্বিগুণ প্রবল ;
তদুপরি সেথা সাগরের জল
গর্জিছে বারমাস••
সে কী কল্লোল তুলিছে সাগর !
শুনি’ আতঙ্কে গায়ে আসে জ্বর ;
ছুটিয়া আসে সে গায়ের উপর
করিতে মানুষে গ্রাস !
৪৩
অচ্যুতানদের ইচ্ছা-দম
সে জলাে’ বাতাস সর্দির ধাতে
শরীরে লাগিলে ধরিবেই বাতে;
গর্জিয়া মেঘ সাগরের সাথে
শিরায় ধরাবে টান
!
কে দিল তােমারে সেই হাস্যকর
আবহাওয়া আর লােকের খবর?
আধারেই তারা বেজায় প্রখর
বেজায় বুদ্ধিমান্।
চলাফেরা করে আঁধারে তাহারা !•••
জনে জনে বীর, ভীষণ চেহারা ;
চোখে চোখে রাখে কি কড়া পাহারা
পরস্পরের প্রতি।
বুদ্ধির জোরে সব টের পায়--
ফন্দিবাজির নাহিকো উপায়,
চালাকি উল্টে’ চালাকে চাপায়
সহিতে পারিবে ক্ষতি ?
৫।
টুপীতে টুপীতে লেগে’ ঠোকাঠুকি
বিভাের তাহারা, প্রেম-কৌতুকী ;
আলাপে বিলাপে হয় সুখী দুখী
ঠিক্ এ দেশের মত ।
কশ্যপ ও সুরভী
৪৪
তােমরা যা করে আলােয় বসিয়া
দল-কোলাহলে, রসিয়া বসিয়া,
খানিক কঁদিয়া, হাসিয়া, শ্বসিয়া,
ইচ্ছা ও চেষ্টা যত,
দেখিবে সেখানে ভদ্র চাষারে—
সেই কাজ অতি চটুপটু সারে
কথায় কথায় গেলাম বাবা রে’
নাহি এ আর্তস্বর ;
আলসে’র সেথা ভারি দুর্দশা ;
বন্ধু ইয়ারে ডেকে নিয়ে বসা-
আললাচনা করা মাছি আর মশা
এবং রূপের দর
চলিবে না; ওরা দেবে ঠেলে ঠেলে
সাগরে নামিয়ে, কিম্বা দিবে জেলে...
হেন অমায়িক সাধু দেশ ফেলে
বিলাত, যেও না, হায় •••!
শুনেই ত’ আমি হারায়েছি দিশে,
একেই জৰ্জর বঙ্গীয় বিষে
বিলায়েতে মিশে কিসে আর কিসে
কি ঘটিছে না বলা যায়।
কাজেই ইচ্ছা আমার
দমন করিমু এবার।”
অচ্যুতানন্দের মাতুলালয় ; প্রশ্নের উত্তরে অচ্যুতানন্দ কহিল ক্ষুঃস্বরে : “দেখেননিকো ক’দিন, কারণ ছিলাম নাকো গ্রামে- সশরীরেই ছিলাম না, ছিলাম নিশ্চয় নামে। এই জীবনে পড়ে যখন ইতি- একেবারে লুপ্ত হওয়া তখনকারই রীতি ; তার পূর্বে কাজের জন্যে করা যাতায়াত- কাছে ঘেষে’ আসা, এবং সরে যাওয়া তফাৎ। একেবারে অদৃশ্য ত’ হতে পারলেই বাঁচি, পাইনে খুজে কার মায়াতে কায়া আঁকড়ে আছি! গিয়েছিলাম কোথায় নিজের গৃহস্থালী ছাড়ি? গিয়েছিলাম পত্র পেয়ে নিজের মামার বাড়ী- এখান থেকে অনেক দূর- যশাের জেলার শত্রুজিৎপুর। জাম নাকো স্নেহের করুণ ডাকে পরাণ এমন ছটফটিয়ে হঠাৎ ছুটতে থাকে । মামা লিখলেন পােষ্টকার্ডে চিঠি একখান্ আমায় ? ‘একবার এসে দেখে যাও বাপ, নিজের মামী আমায়
কপ ও সুরভী
৪৬
ছেলেবেলা থেকেই তুমি দুঃখ বােঝে। মামার
সহােদর নিজের পুত্র ভাগনে তুমি আমার,
ভারি ব্যথার পাত্র আর ভারি স্নেহের জিনিস।
কি শােকে যে জ্বলছি মােরা জ্বলছি অহর্নিশ
ভগবানই জানেন তা
সাক্ষাতে সব শুনবে কথা।
বৌমাকেও সঙ্গে এনাে। জানাই আশীৰ্বাদ।
বৌমা এলে পূর্ণ হবে নিজের মামার সাধ।
তুমি পরম কল্যাণীয়-
নিজের মামীর আশীৰ্বাদও নিও।
এস নিশ্চয়,
অন্যথা না হয়।
নিজের মামার এই পত্রে ছটফটিয়ে উঠে
নিজের মামার বাড়ী আমরা গিয়েছিলাম ছুটে'।
কি দেখলাম? কিছুই না—নূতন কিছুই নয় ;
এই মাত্র যে, শশাকের জ্বালা হয়নি আজও ক্ষয়।
জানেন না কি ঘটনাটা ?"কঠিন ঘটনাটা
মনে পড়লে আজও দেয় সৰ্ব্ব অঙ্গে কাটা।
শুনুন বলি : আমার মামা নিত্যবিলাস ঘােষ
গোঁড়া, আর তার শাস্ত্র মেনেই অশেষ পরিতােষ।
ও পক্ষে সন্তানাদি হয়নি’ কিছু তঁার,
এ পক্ষে একটি কন্যাসের মেয়ে গাঁ-র।
চোখ জুড়ান’ মন জুড়ান’ রূপ এবং স্বভাব
লিয়ে দিল বাবা মায়ের ছেলের নিত্য অভাব ;
৪৭ ; = অচ্যুতানদের মাতুলালয় খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে—সকল কাজে পাকা, লেখাপড়ায়, গৃহকর্মে ; হিসেব করে টাকা খরচ করতে খুব হুসিয়ার এমন মেয়ে হয় না আর। মামা আমার বেজায় হিদু, করে’ গৌরীদান বিশেষ কোনাে শাস্ত্রবাক্যের রক্ষা করলেন মান। অন্য কিছু না-ই বা করি, কেবল গৌরীদানে অশেষ পুণ্যলাভ হয় যে সেটা কে না জানে! এই দেশটায় বিনা চেষ্টায় শুদ্ধিলাভের উপায় ঘুরছে পায় পায়- তাকিয়ে কেবল দেখা, আর কানে কেবল শােনা- তাতেই মানবজমিনে ফলতে থাকে সােনা ; কিছু আচার পালন সঙ্গে সঙ্গে হতে থাকে যাবৎ পাপের ক্ষালন। সংসারটা কিছুই নয়—তবু হ’চ্ছে থাকতে, এ-কথাটা অষ্টপ্রহর হবে মনে রাখতে। জ্বেলে রেখে দিবারাত্র ইষ্টনামের পতে কষ্টের সঙ্গেই হবে তােমায় পুনঃপুনঃ বলতে : ‘যা করাও তা-ই করি, প্রভু ; বদ্ধজীব এ ভবে’••• তা’ হলেই সেই পুণ্যবলে শমন নাহি ছোঁবে। পুণ্যতােয়া গঙ্গামায়ি, তুলসী এবং শাঁখ- এ থাকতেও পুণ্যলাভে যেটুকু থাকে ফাঁক .
৪৮ , কশ্যপ ও সুরভী গৌরীদানেই হয় তা পূরণ—যদি গৌরী থাকে, ইহার পরও যদি ব্যক্তি হরি বলে ডাকে একা একা কিম্বা অনেক হয়ে একঠাই তবে ত’ তার ভরতি জাহাজ-রাখবার স্থান নাই। সে যা-ই হােক্, পাত্রস্থ করে’ কন্যাটিকে চেয়ে আছেন মামা আমার ভবিষ্যতের দিকে পুলকিত চক্ষে বিধাতার সুপ্রসন্নতার তৃপ্তি নিয়ে বক্ষে দীর্ঘকালই—বছর দেড়েক••এমন সময় হঠাৎ কেউ জানে না কাহার পাপে হ’ল বজ্রাঘাত খবর এল । নিস্তারিণীর স্বামী গেছে মারা ! মামী গেলেন মূৰ্ছা-মামা হলেন আত্মহারা আর্তনাদে ছুটে এল যাবতীয় লােক- সবাই মিলে’ করলে অনেক অশ্রুপাত ও শােক। নিস্তারিণী সে-সময়ে ছিল নাকো ঘরে গিয়েছিল সইয়ের বাড়ী দূরে পাড়ান্তরে। ইহার পরই ঘটুল’ যা’ তা’ ঘটান’ ঠিক্ নয়— একটা দিকে ক্ষুদ্রতার তা’ তীব্র পরিচয়। আচার বিধি মানি নাকো-তবু বলতে চাই, ফল দেখে কাজ বিচার করলে মার্জনা তার নাই। যেথায় তােমার আত্মা এবং দেবতা আর পুণ্য সেথায় যদি বুঝার ভুলে অঙ্ক পড়ে শূন্য তােমার ভাগে—আর যদি তা বুঝতে নাহি পারাে, ক্ষতি তাতে তােমার ছাড়া নাইকো কিছু কাররা।
অচ্যুতানদের মাতুলালয় কিন্তু পরের সঙ্গে উচিত-আচরণের বেলায় দেখ’ অহিত না হয় অবােধ ধৃষ্টতা কি খেলায়। ভালো করে বুঝে পরের তৃপ্তি দেখতে গিয়েও দেখাে সেটা খুজে’! সে-কথা যা।''দুঃসময়ে অনেক নরনারী জুটেছিল। বুদ্ধিনাশ ঘটুল’ সবাকারই! সবারই এই মত হ’ল যে, এ-জীবনের মত বঞ্চিত হ’ল মেয়ে; এখন আমার নিয়ম ব্রত পালন করে চলতে হবে সকল বিলাস ছাড়ি' কপাল-ভরা ছাই ছিল যে ! কষ্টের কথা ভারি । ছিন্নলতার দুরূহ সে জীবন বইতে হবে কৃচ্ছ তপে সন্ন্যাসিনীর মতন।••• এবম্বিধ বিলাপান্তে করলেন তাঁরা বােধ- আজ মেয়ে নিক্ খেয়েদেয়ে এ-জন্মের শােধ। মামা তখন বেরিয়ে গেছেন মাথা ঠুকে ঠুকে জামাইয়ের যে-দেশে বাড়ী তারই অভিমুখে একেবারে হয়ে ক্ষ্যাপার মত আলুথালু-তীব্র ব্যথাহত। এদিকে, শােক সম্বরি আর চেপে’ শােকের কান্না নানাবিধ ভালাে ভালাে মৎস্য হলাে রান্না। নিস্তারিণী ভারি খুশী দেখে’ আয়ােজন বলে নেচে’ : ‘ব্যাপার কি, মা, কিসের নিমন্ত্রণ। সে-আনন্দ কত করুণ। আপন বুকের অনুকম্পায় অনুভব তা করুন। ৭
কশ্যপ ও সুরভী
৫
;
সে-দিল্টা গেল চুকে’—অর্থাৎ ক্রমে ক্রমে
বৈধব্যর আবহাওয়াটা যেমন করে’ জমে
তেমনি করেই জমিয়ে দিলেন বালিকাটির দেহে
আবৃত তা করা হলাে অপরিসীম স্নেহে।
শাশুড়ী তার লােকটি ভাললা—বদ-স্বভাবের হলে
বত’ রুখে’ ও ‘বউয়ের পয়েই ছেলে গেল চলে ;
রাক্ষসী ও স্বামীখাগী ; অতএব ও যাক্ ;
চাইনে আমি অমন বধু-বাপের বাড়ীই থাক্।•••
কিন্তু সে তা বললে নাকো; বলে আদর করে’---
ব্যথায় কষ্ট ভরে।
‘আয় আবাগী আমার কোলেই ; থাক্ মা বুকে আমার ;
তােরে দেখেই ঠাণ্ডা হবে বুকের হু হু আঙার।•••
বলে’ নিয়ে রাখল’ কাছে নিস্তারিণীকে
ভুলতে চায় সে পুত্রশােক তাকিয়ে বধূর দিকে...
ভাবে: 'আমার যা হবার তা হ’লই—তবু আমার
যম আছে ; সেই যকেই আমি ডাক্ব অনিবার...
কিন্তু ও যে তা-ও জানে না ; ঐ শিশুটি আজ
জানে না তা কি হারালাে, কোথায় পড়ল’ বাজ !
দীর্ঘ জীবন সম্মুখে তার শুষ্ক নিশ্বাসে’•••
ভাবে আর সে বধূকে তার টানে বুকের পাশে।
এমনি করেই দিবস কাটে বধূ শাশুড়ীর...
মামারাও শােক ভুলে হচ্ছেন ক্রমে ঠাণ্ডা স্থির
এই খবরই জান্তাম ;
তারপর ঐ পত্র তার হঠাৎ সেদিন পেলাম।
৫১
;
অচ্যুতানন্দের মাতুলালয়
কৰ্তব্য ত’ করতে হবেই—গেলাম আমরা ছুটে'..
মামা করলেন অভ্যর্থনা শয্যা থেকে উঠে ;
দেখলাম, মামা কাতর খুবই; মনের অস্থিরতা
চেপে তিনি কইছেন যেন অল্প ভাষায় কথা।
মামী যেন অপ্রতিভ, আর নিজের উপরেই
অপ্রসন্ন হয়ে আছেন—কারণ, বারেবারেই
নিজের প্রতিই প্রয়ােগ করলেন অনেক কটু উক্তি ;
আর দেখালেন যুক্তি :
মানুষে ভুল করে, কারণ, মানুষ বুদ্ধিহীন—
সজ্ঞানে পাপ করলে তারি ক্ষমা পাওয়া কঠিন।
ভুলের ক্ষমা নিশ্চয়ই ত’ করেন ভগবান্
উদ্দেশ্যই দেখেন তিনি, এবং দেখেন প্রাণ।
প্রত্যুত্তরে আমি বল্লাম : তা-ই; তা-ই বটে',
কিন্তু কথার মর্মার্থ টা পোঁছলাে না ঘটে।
জামাইয়ের নাম নিয়ে, এবং নিয়ে মেয়ের নাম
বললেনঃ এরা পূরাল’ না কোনােই মনস্কাম ;
কেবল দিল দাগা ওরা চিরশত্রুর মত,
কেবল দিল হাহাকার আর চিরজীবী ক্ষত।
তাহার পরই আমাদের সেই শুভ গমনে
হরষিত হলেন তারা সমান দু’জনে,
বললেন : “ভারি খুশী হলাম কথা রেখেছ যে ;
শান্তি পেলাম; সে-ই আপন যে অসময়টা বােঝে।
কাল’ সেদিন, এবং ক’দিন, নানা কথাবার্তায়,
আহারাদি হতে লাগল’ বেশী বেশী মাত্রায়।
কশ্যপ ও সুরভী মামা বললেন : কথা ক’য়ে বাঁচল’ যেন মন- তােরা দিলি নিঃশ্বাস—তােরা লক্ষ্মীনারায়ণ !... সাতদিন থেকে মামার বাড়ী স্নেহে আদরে- শান্তি দিয়ে মামী মামায় কাল ফিরেছি ঘরে। আমার তৃপ্তি এইটুকু, আর ইহাই মহিমা আমায় পেয়ে দুঃখী মানুষ পেল’ দুঃখের সীমা, অর্থাৎ আমার জীবন এবং সরস আছে, প্রেমাকাজী চিত্তে তাহা ভালাে লাগিয়াছে। ঠিক বলেছেন—এই গল্পটি ভালাে নয় কো তত ; কৌশলে কি তীব্রতায় নয় আগেরগুলির মত।” তারপরই অচ্যুত খুব মৃদু একটু হেসে বল্লে : “কিন্তু গল্পের শেষ ঘটল’ হেথায় এসে। সুরবালা-স্ত্রীর নাম ঐ--বললেন সুরবালা আজকে আমার সামনে দিয়ে জলখাবারের থালা- বললেন অতি করুণভাবে চেয়ে সম্প্রতি খুব গােপন একটা আঘাত ওঁরা পেয়ে হয়েছিলেন দিশেহারা অপরাধের ভয়ে লজ্জায় হয়েছিলেন সারা; দৈবাৎ আমি দেখেছি এক পত্র- নিস্তারিণীর হাতের লেখা অল্প কয়েক ছত্র ; লিখেছে সে ভারি দুঃখে কান্নাকাটি করে’ নিদারুণ তার অভিমানে ভরে’
৫৩
অচ্যুতানদের মাতুলালয়
;
লিখেছে : মা, যেদিন আমার পুড়ল’ কপালখানা
খবর গেল জানা,
সেদিন তুমি কেন, বলল, অখাদ্য বিধবার
খাইয়েছিলে, চাপিয়েছিলে মহাপাপের ভার
আমার মাথায়
অবােধ পেয়ে আমায় !
কি শান্তি যে পেয়েছিলে তাহা তুমিই জানাে ;
খুইয়ে দেছ পরকালটা-পরকাল ত’ মানাে !
সেই যে অনাচার
প্রায়শ্চিত্ত আছে কি তার?-
সে-কথা নয় কাউকে বলার ; তুল্য অপরাধে
অপরাধী তুমি আমি। এমন বাদও সাধে!
আমার ধর্ম ভাবলে নাকো, চাইলে না তার মুখ,
দেহের শুচির বিনিময়ে ভালাে খাওয়ার সুখ !
তাহাও কেবল একটিবারের ।
এই জঘন্য অনাচারের
প্রতিকার কি, তাদের কাছে শুনে’ বলল আমায়
হয়েছিল যারা তােমার বুদ্ধিদাতা সহায়।
মা হয়ে, মা, তুমি আমার করলে এমন ক্ষতি !
অধিক কি আর লিখব? তােমার ধৰ্ম্মে থাকুক মতি।
তােমার কাছে যাবার আমার আর ইচ্ছা নাই
আমি যেন মরে গেছি, মনে করাে’ ইহাই।
ভেবে দেখুন কৃপাপূর্বক
ইহাও একটি দারুণ শােক ;
কশ্যপ ও সুরভী
৪
;
নিস্তারিণীর ঐ পত্র খুবই সাংঘাতিক
উদ্ভ্রান্ত মামা মামী খুজে পান নাই দি
কি করূলে দুঃসহ এই আত্মগ্লানি ঘােচে,
জীবন আবার রােচে•••
মামী বেজায় নাস্তানাবুদ মামার ভৎসনায়,
খিটিমিটির বিরাম নাই, আর অমিল দু’জনায়।
অপরাধের জ্ঞানে মামী অনুতপ্ত ভারি,
মামা দিতেন খোঁটা আর বুদ্ধির বলিহারী:..
দুঃখময় এই গ্রহের ফের
অসহ খুব ; পরস্পরের
মাঝখানে চাই কাউকে, তাই ডেকেছিলেন আমায়—
ক্লান্ত হয়ে ডেকে ডেকে’ ভাগ্য-বিধাতায়।
এ-সব আমার অনুমানই, কিন্তু বােধ হয় ঠিক,
জাত-মারা ঐ কাণ্ড করে জীবনেতে ধিক
হওয়াই উচিত। এবং মেয়ে এইভাবে যে নেবে
ব্যাপারটা, তা আগে কেউই দেখেননি’ ত’ ভেবে’!
কাজেই ক্ষোভের সীমা ছিল না
একা একা অপার দুঃখে দিন কাটিল না•••
কাজেই আমরা গিয়েছিলাম—নিয়েছিলেন ডেকে
মনটা খারাপ হয়ে আছে শােনার পর থেকে।•••
আচ্ছা, তবে আসুন, ভাই,
সুখী হ’লাম শুনে, খুব ভালাে আছেন সবাই।”
অচ্যুতানদের ক্ষোভ
“মাঝে মাঝে হলেও দুৰ্ম্মতি
ভাবতাম, বুঝি ভাল’র দিকেই এই জগতের গতি,
বুকে আছে পরমার্থের দিকে
বিধাতা এই জগৎ-পুস্পটিকে
ধরে আছেন নাসিকা আর চক্ষুর খুব কাছে-
অর্থাৎ তার গতিবিধি জানা তঁাহার আছে,
জানা তঁাহার থাকে,
তৈরী তিনি সাড়া দিতে আর্ত লােকের ডাকে।”
কাহিল কণ্ঠে কথা কয়ে অচ্যুতানন্দ
কঁদ’ কঁাদ’ হয়ে করলে মুখের কথা বন্ধ।
বলে আবার :
“নাস্তিকতার
কারণটা কি-যদি কেহ শুধায় এখন আমায়
চটে যাব ; দেখবে তখন কার সাধ্য থামায়।
হাঁ করে যে রইলে, হঠাৎ অবাক্ হওয়ার মত ?
বেঁচে থাকলেই শুনতে হয় নূতন কথা কত !
এই পৃথিবী স্ত্রী-পুরুষে বিরাট লােকারণ্য
নূতন কথার কলরবে পূর্ণ হওয়ার জন্য
তার চেষ্টা অবিরাম
পেতে কথার দাম
কশ্যপ ও সুরভী লােকারণ্য মাঝে মাঝে দিচ্ছে মাথা ঝাড়া- কতকাংশ শুয়ে শুয়েই, কতক থেকে খাড়া কিন্তু সে-সব পরের কথা; আমার কথার মূল্য পরের কাছে থাকবে কি আর বৃহৎ লােকের তুল্য। নিজের কথাই বলব আমি : চিরকালই আমি, জানই ত’ ভাই, উপকারী, পরের হিতকামী:.. উদাহরণ ? আমার মনের ইহাই প্রবল চেষ্টা অনিষ্ট না ঘটুক লােকের, সুখে থাকুক দেশটা••• চিত্তের এই চেষ্টার, অর্থাৎ তার ইচ্ছার, অর্থাৎ তার উন্নতির, অর্থাৎ ঝুটা সাচ্চার, কি দৃষ্টান্ত দেখতে পাবে? মরুছে যে-লােক অন্নাভাবে- টাকা দিয়ে পরােপকার, পরের হিতসাধন অসম্ভব নয় তার পক্ষে ? উদাহরণ দেখতে চেয়ে নিজের আত্মার পরিচয়ই দিলে আবার মাসে দুবার অসুস্থ যে তার কাছে যে গতর খোঁজে বলিহারি বুদ্ধি তার। অসুখ লেগেই থাকে— তবু গতর নাড়ি আমি বিপদ্গ্রস্তের ডাকে... অর্থাৎ সৎপরামর্শ আমার কাছে পেয়ে বহু বিপদ পার হয়েছে বহু পুরুষ মেয়ে টাকা কিম্বা শরীর দিয়ে করু’ উপকার- সাধ্য নেই কো তার ; | .
অচ্যুতানদের ক্ষোভ মনে মনে প্রয়ােগ করি’ বিপুলতম উদ্যম হিতসাধন করি আমি। সে-কাজও কি কম!••• দেখে থাকবে বিনয় আমার—খুবই অবনত, মটা যত ভাল থাকে নুয়ে পড়ি তত ; দেখা হলেই শুধাই কুশল ভদ্র ইতর লােকের আমার অনুকম্পা পাবেই সময় এলে শশাকের। দিয়ে থাকি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রাপ্য তাহা যার দেখা হলেই করি নমস্কার ‘ছেলের অসুখ, জ্বর হয়েছে’—খবর শুনে এই আমি যেন নেই, সেই ছেলেটির বাপের চাইতে দুশ্চিন্তার ভার বেশী দেখবে আমার মুখে—বেশী অন্ধকার। সমকক্ষ লােকের সঙ্গে হৃদ্য আচরণে, যথাযােগ্যভাবে মিষ্ট হাস্যবিতরণে পরিপক্ক আমি। আমার উদার ব্যবহার বিশেষ প্রশংসার। আছে এ হুস-- কথায় হারলে চটে মানুষ- আজগুবি সব মিথ্যে কথা শুনি দু’কান পেতে, মাতালের স্ত্রীর কান্না শুনে’ ছুটি দুপুর রেতে- সত্যিই, মহাশয়, অবলার প্রাণ রক্ষা করুতে, মজা দেখতে নয়। বদ্যিদের ঐ সুধাকৃষ্ট–অপদার্থ হাঁদা, নিজের গল্পই করে গাদা গাদা.•• কশ্যপ ও সুরভী ৫৮ ব্ৰহ্মাণ্ডে সে একাই মানুষ, অভ্রভেদী মাথায়, তাহার নামই প্রথম যেন কৃতীর তালিকায় তারেও ডেকে’ বসাই আমি অতি উচ্চাসনে, তার গল্পও শুনি বসে’ অম্লানবদনে। সব জাতেরই হুকো রাখি ঘরে হাতে তামাক খেয়ে কেহ অভিমান না করে ; অনাদরে অসন্তুষ্ট হবে, পরােক্ষে সে ঘৃণা এবং নিন্দার কথা কবে.•• তা’ হলেই দেখুন : = আমার কত বিবেচনা, আর হৃদয়ের গুণ! আরাে বলি শুনুন : পাড়ার খাঁদার ভাই হারা দুষ্ট কাৰ্য ঢাকে কেবল কূট যুক্তির দ্বারা তত্ত্ব-চিন্তার ভারে খর বুদ্ধির ধারে একদিকে সে উদ্দাম এবং অন্যদিকে ভাবুক উচিত-বক্তা সেজে’ মারে কঠিন কথার চাবুক তারেও ভালবাসি তার কথাতেও সায় দিই আর তার কথাতেও হাসি, অর্থাৎ আমি দুষ্ট শিষ্ট অপকৃষ্ট জনে মিষ্ট কথায় তুষ্ট রাখি কষ্ট পেলেও মনে। শত্ৰু বৃদ্ধি হবে বলে পরচর্চায় নাই- ঐ ভয়েতেই যা’ খাই তা নগদ কিনেই খাই... দিনের পর দিন শক্ত বাড়ায় যারা তাদের সবার সেরা ঋণ।
অচ্যুতানদের ক্ষোভ ক তবু দেখুন ব্যাপার কেমন, কেমন জটিল, কি অশােভন!- নিরীহ আর সরল লােকই লক্ষ্য হয়ে নেহাৎ মড়ার মত পড়ে সহে অঙ্গে পদাঘাত ; অদৃষ্টেরই অভিশাপে যে হয়েছে শেষ নিশ্চিহ্ন করতে তারে আমােদ লাগে বেশ। মানুষও যে ছিল আগে নরমাংসখাদক- এই ব্যাপারে তারি প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে কতক। যে ছিল, ভাই, মিত্র, হঠাৎ শত্রু হ’ল সে টাকার লালসে ! কাঁদি নাই—নাই কাদার মত নারী-দুৰ্বলতা, অনি চোখে জল এসেছে বতে বসে কথা। খুলেই বলি : সেবার আমার অসুখ হ’ল কঠিন, একজুরী হয়েই আছি উনিশ কুড়ি দিন ডাক্তারে আর ঔষধেতে ফুরিয়ে গেল পুঁজি ভয় হ’ল যে, অর্থাভাবেই মরুতে হ’ল বুঝি! সুরবালা–স্ত্রীর নাম ঐ—বললেন সুরবালা । ‘তােমায় নিয়ে হ’ল আমার জ্বালা টাকার কথা ভেবে জ্বর বাড়িয়ে নেবে ; ভেবনাকো তুমি, আমার বাক্সে আছে টাকা- একখানা নােট্ দশটা টাকার, অনেকদিনের রাখা। একটা দুটো টাকা রেখে করেছি ঐ নােট— সম্বল ঐ মােট। । । । - কশ্যপ ও সুরভী সুরবালা কথাগুলাে বলে গর্বভরে— শুনে আমার আনন্দ না ধরে। বললাম কঁপা গলায় লক্ষ্মী বাঁধা থাকূলে ঘরে বাধে না দিন চলায় ভাঙা’বে কি করে? আজ ঝি আসে নাই কাজে ; ডাক্তার আসার সময় হ’লআটাও প্রায় বাজে। ভিজিটু ত’ দিতেই হবে— উপায় কি হবে ? সুরবালা বললে : ‘দাড়াও। বলে’ই গেল চলে অনুগত কাউকে দিয়ে নােট ভাঙাবে বলে দরজায় সে দাড়িয়ে আছে পথ চলতে এমন সময়ে এসে গেল কাছে এই পাড়ারই কালীপদ, কালীপদ ঠাকুর, তাকে দেখেই সুরবালার ভাবনা হ’ল দূর- পুত্রস্নেহ ঢালি’ : ‘ভালই হ’ল, অসময়ে পেলাম তােমায়, কালি!-- বাবুর ভারি অসুখ, জ্বর আজ উনিশ কুড়ি দিন, শয্যাগত হয়ে আছেন, শরীর ভারি ক্ষীণ। হাতের টাকা ফুরিয়ে গেছে। অবশিষ্ট আছে, দশটাকার এই নােটখানা। ছিল আমার কাছে। ভাঙিয়ে এনে দাও ত’, বাবা; ভিজিট দিতে হবে। কালী বললে : ‘দিন্ তবে নােট ভাঙান’ কঠিন কিছু নয়, উপকারে লাগতে আমার কষ্ট খুবই সয়। - বলে ডেকে’ কণ্ঠস্বরে
অচ্যুতানদের ক্ষোভ
স্বস্তি পেলেন সুরবালা।—এই আসছি বলে
নােট নিয়ে সেই নােট্ ভাঙাতে কালী গেল চলে,
সুরবালা--স্ত্রী আমার
রইল বসে পথ চেয়ে তার
ফিরুল’নাকো কিন্তু, কালী ফিরুল’নাকো আর
সেদিন নয়, পরদিন নয়—আরাে পরেও তার।
গিয়েছিলাম
করুতে প্রণাম
গিয়েছিলাম বলতে আবার নেহাৎ ক্লেশে পড়ে
সেই টাকাটার কথা কালীর হাতে পায়ে ধরে’••
বড়ই অপমান
করল’ কালী। প্রাণ
চঞ্চল হয়ে আছে, আমি বিষয় খুব এখন
সেই আবেগেই অনর্থক বলাম অনেকক্ষণ ;
সম্ভবতঃ শশাধ করেছি গতজন্মের ধার...
ও, উঠছেন? আসুন তবে, আসুন নমস্কার।”
অচ্যুতানন্দের লােকাপবাদ
“নীরবকৰ্ম্মী বলে লােকের খ্যাতির কথা শুনি,
নিঃশব্দে সৎকর্ম করে তঁারা যান্••
অথচ তা’ জীবদ্দশায় !-কর্মধ্যানী মুনি
চান্ না লােকের ধন্যবাদ, এম্নি মহৎ প্রাণ!
লােকচক্ষুর অন্তরালে চলে কৰ্ম্মের ধারা-
হিতসাধন ব্রত, বৃহৎ চিন্তা-প্রসূত,
নাম প্রচারে বিতৃষ্ণা খুব ; বিরক্ত হন্ তারা
ঢক্কা-নিনাদ করার যদি কেহ দেখায় ছুতাে।
কৰ্মী নীরব হতে পারেন-খুবই বাহাদুর ;
নীরব থাকা খুবই শক্ত স্নায়ুর পরিচয় ;
তবু কিন্তু এই সন্দেহ হয় না শীঘ্র দূর ?
এমন কিছু চলে কি না নীরব সঙ্কেতময়
যাহার ফলে নীরবকৰ্মীর শিষ্য এবং চেলা
কিছুটা রব করতে থাকে নামে বেনামে !-
কৰ্ম্মী যত বৃহৎ, তাঁহার স্তাবক তত মেলা,
নীরবতা বিকায় ততই বেশী বেশী দামে।
লােক জুটে যায় নীরবভাবে প্রচার চালাবার,
সবাই নীরব, অথচ কি শব্দ ওঠে ভীষণ !
অচ্যুতানন্দের লােকাপবাদ সবাই জানতে পারে, কেন নীরব অনিবার কৰ্ম্মী স্বয়ং এবং তাহার শিষ্য চেলাগণ ! একটি মাত্র নীরবকৰ্মী আছে—চেনেন তারে।” একটু থেমে’ বলে অচ্যুত, হেসে’ ঠোটের পাশে । “অখ্যাত আর নেহাৎ ক্ষুদ্র, থাকে একটি ধারে সঙ্কুচিত হয়ে কেবল জাহির হওয়ার ত্রাসে। সে ব্যক্তি কে? যদি জানতে ইচ্ছুক তা- তা’ হলে ত নীরব থাকা চলছে নাকো আর ; সে-ও ভণ্ড কি না, এবং বাস করে সে কোথা কোন্ স্বর্গে ? তাকালেই রূপ দেখতে পাবেন তার, আপনাদেরই আশ্রিত এক দাস দাস- নাম শ্রীমান্ অচ্যুত বােস্।–হেসে উঠলেন যে? আমার সত্তার নীরবতার নাই বৃদ্ধি হ্রাস পায়ের শব্দ গােপন করেই চলছি পদব্রজে।••• কথাবার্তা বলি খুবই, তবু জাবেন ঠিক্ ? মনে আমার নাই কলরব ; নদীস্রোতের মত নিঃশব্দগামী আমি ; চিন্তা অলৌকিক অন্তঃস্রোতে ক্রীড়াশীল নিত্য অবিরত। বাতাসে ঢেউ ওঠে, অর্থাৎ কথা বলি আমি আঘাত পেলে’ বাইরে থেকে; নেহাৎ অনিচ্ছার কণ্ঠ আমার শুনতে পান। মেকী অল্প দামী যদিও সে কথাগুলি—খুঁজলে পাবেন সার। কিন্তু নীরবকৰ্মীর কথা বলেছিলাম আগে, এবং আমি নীরবকৰ্মী তা-ও বলেছি অগ্রে।
রঞ্জু ধরি..
কশ্যপ ও সুরভী
জান্তাম নাকো নীরবতায় অভিসম্পাৎ লাগে,
নীরব কৰ্ম্ম মিথ্যা হয় দুর্ঘটনাচক্রে!
সংশােধিত প্রস্তাব এই : তিনিই বুদ্ধিমান,
দুনিয়াকে চেনেন তিনি, মানুষ চেনেন তিনি,
নীরবতার মাঝেও যিনি তুলে রাখেন তান,
নেপথ্যে নিজের গুণগানের রাগিণী
ভাঁজেন
অনিষ্ট থেকে তারে রক্ষা করেন হরি।
অপদস্থ হন্ না, কারণ, স্পষ্ট হয়ে থাকেন,
ভুল বােঝে না লােকে তঁহার সৎকাৰ্যকলাপ,
আলােচনার সূত্রে তিনি নূতন রীতি শেখেন,
ভাললা বলায় তুষ্ট হন, মন্দে করেন মাপ।
উল্টোপাল্টা কথা আমার ? অর্থবিপর্যয়
এত যে, তা’ যুক্তিযােগে যােগ্য নহে ক্ষমার ?••
কিছুই তাতে যায় আসে না—তবে এ নিশ্চয়,
ক্ষমা করবেন শােনেন যদি দুর্গতিটা আমার।
কথায় কথায় কথা যদি দাড়ায় বিপরীত,
বিশেষ যদি বাক্যের মানুষ হতভাগ্য হয়—
তা হলে তা নিয়ে ধূর্ত তর্ক অনুচিত,
সারগ্রহণে অরুচির তা’
প্রচুর পরিচয়...
অতএব তা পরিত্যাজ্য। শূন্যগর্ভ কথা
অর্থে পূর্ণ হয়ে আসে শ্রোতা প্রেমিক যদি
যদি থাকে মমতা আর হৃদয় বুঝার ব্যথা।
কোথায় থাকে শিশুর কথার অর্থ নিরবধি ?
অচ্যুতানদের লােকাবাদ সে-কথা'যাক্। শুনুন এখন গল্প মজাদারী, নীরবকৰ্মীর নীরবতায় ঘটল কত ল্যাঠা, লােকে কেন সমস্বরে দিলে দুয়াে ভারি কেউ বললে ‘দুষ্ট’, আর কেউ বললে ঠ্যাটা, অর্থাৎ হ’ল অপযশ স্বজাতিদের ঘরে !••• আমাদেরই স্বজাতি এক ভদ্র পরিবার এখানকারই নির্জন এক প্রান্তে বাস করে, ধনবল আর জনবলের খুবই অভাব তার... কাজেই খুব বে-কায়দা এবং কোণঠাসা ; টিকতে হলে ঐ দুটিরই নিত্য প্রয়ােজন- ঐ দুটিই নাইকো তাদের।•••হিতের ভালবাসা সেই ব্যক্তির প্রাপ্য, যার আছে প্রচুর ধন। এই বাড়ীরই একটি ছেলে, নাম বিশ্বনাথ, গৌরাঙ্গের মত সুশ্রী, কিশাের সুকুমার ; মায়ের সে দ্বিতীয়টি ; করি’ প্রাণপাত লেখাপড়া করছিল সে।•••অসুখ হ’ল তার। বড় ছেলে অনাথবন্ধু, চাকরী করে। আয় ? বলব না, সে হাস্যকর। ভগ্নি আছে দু’টি ; ঐ আয়েতে, পঁচিশ ত্রিশে, দিন যে কেমন যায় ভাবুন তা’, আর গৃহস্থালীর খরচ মােটামুটি। অন্নাভাবী গরীব যদি সুস্থদেহে থাকে, দিন চলে তার, যত কষ্টে যে প্রকারেই হােক, উপবাসও সহে, কিন্তু ব্যাধির বিপাকে, অতিরিক্ত দুর্দিনে, তার চাই বাহিরের লােক। •• কশ্যপ ও সুরভী হা অন্নের উপর ছায়া ফেলি’ মৃত্যু যখন হয় অগ্রসর প্রার্থনা তার ছটে তখন, অক্ষুট কি ক্ষুট, বাঁচাও আৰ্ত্তে।...কিন্তু তা ঠিক কানে আসে কি ? আসে? তবে আপনার ঐ কানের দু’টো ফুটো অবাধভাবে চলে আছে হৃদ্কেন্দ্রে ঠেকি’! সকলের তা হয় না। যা হােক, আমায় দিলে খবর, অসুখের ঐ খবর—বড়ই বিপন্ন যে তারা । নীরব কৰ্ম্ম হ’ল সুরু আমার অতঃপর দিবারাত্র চাই সেবা আর বিনি পাহারা রােগীর কাছে, রােগ যে কঠিন। দিনে নাইকো ভয়, রাত্রিই খুব ভয়ঙ্কর, রােগ বৃদ্ধির কাল- মেয়ে দুটির বয়ঃক্রম মাত্র সাত আর নয়, মা সাম্লাবেন একা মানুষ কত দিকের তাল! আমিষ এবং নিরামিষ দুই হেঁসেলে রান্না, রােগীর পথ্য তৈরী করা, গৃহস্থালীর কাজ- অশেষ কাজই—করতে হয় চেপে বুকের কান্না ; ভেঙে তিনি পড়ছেন। তাই ‘দয়া করুন আজ। ভার নিতে যে পারে রােগীর সেবা শুশ্রুষার সেই বাড়ীর সব লােকের ভিতর গণ্য কেবল অনাথ। ছেলেমানুষ অনাথকেই দিলাম দিনের ভার, সে-ই করবে ছুটোছুটি। আমি জাগব’ রাত। চলেছি রাত জেগে। অনাথ কাছেই শুয়ে থাকে, ১৭ . অচ্যুতানদের লােকাপবাদ মাঝে মাঝে উঠে বলে, “দাদা, আপনি শুন... অভয় দিয়ে আসে তাহার চিন্তাজীর্ণ। মাকে এসে বলে, ‘ভুলতে নারূব’ দাদার ঋণ ও গুণ’! আমি বলি, ‘ঘুমাও তুমি’ •••এমনি করে জেগে সাতটা রাত্রি গেল। সেদিন চলে এলাম ভােরে, খুবই অবসন্ন দেহে, রােগী মায়ের জিম্মায় রেখে রােগী তখন নিস্তেজ, ভুল বলছে বিকার-ঘােরে। বাড়ী এসে বিছানায় গা দিতে কি না দিতে অসাড় দেহে তলিয়ে গেলাম ঘুমের সাগরে ঘুম ভাঙল নটায়, লােকের ডাকাডাকিতে। ‘অচ্যুত হে, ওহে অচ্যুত, রয়েছ কি ঘরে’ ? ছিলাম ঘরে, বেরিয়ে এলাম, পেলাম সুসংবাদ : ‘এখনও ঘুমুচ্ছিলে? সাধু-সাধু--সাধু ! ন’টা বাজল’! ঘুমােবার, ইস্, এ কি অন্যায় সাধ! বলে হেসে রাধাকান্ত ওরফে সে রাধু। আমি বল্লাম তারপর ? রাধু ধরলে হাত- বললে, “চলাে, এই মুহূর্তেই শ্মশান যেতে হবে। ‘কে মরেছে’? ‘পাড়ার একটি ছেলে, বিশ্বনাথ। শুনে আমার কি হ’ল তা বুঝুন অনুভবে। রাধু বললে, “অসুখ ছিল, অরবিকারের প্রায় কয়েকদিনই কঠিন কঠিন খুব ; বিকারেরই ঘােরে উঠে বসে খাট থেকে সে নীচেয় পড়ে যায়— পড়ে গিয়েই মারা গেছে।হাত ছিনিয়ে জোরে ছুটলাম সেই দিকে।•••বাড়ীর অবস্থাটা কি
কশ্যপ ও সুরভী
৬৮
;
সে-বৰ্ণনার নেই প্রয়ােজন। তবে, শ্মশানযাত্রার
আয়ােজন প্রায় সম্পূর্ণ—অল্পই আছে বাকি,
সঙ্গে কি সব যাবে মুখেই ফর্দ হচ্ছে তার।
ভিতরেই যা’ কান্নাকাটি ; বাইরে বন্ধুগণ
মুখর এবং চঞ্চল খুব, চলছে ইয়ার্কিং•••
মনে হয় না, জানে তারা, মৃত সবার স্বজন,
যে মরে সে সবার আপন, মান্য এবং প্রিয়।
মৃত্যুর চেয়ে কি আছে আর গম্ভীর এবং গভীর ?
মৃতের চেয়ে দূরতম নৈকট্য কাহার ?
কে করেছে অধিকার চিন্তা অনুভূতির
শেষ সীমা এই মৃত্যু ছাড়া ?••মৃতের সৎকার
দেবার্চনার মতই, খুব সংযমের সে ক্রিয়া,
নিষ্ঠা এবং শ্রদ্ধাসহ সমাধা তার হবে,
তাহা যে না করে তাহার নাই ধৰ্ম্ম, হিয়া
দিব তাহার সুখ সম্পদ হরণ করে’ লবে।
মৃতের পাশে বসে’ যারা মৃতটিকেই ভােলে
অবাঞ্ছিত মানুষ তারা-নিশ্চয় তারা তা-ই ;
বাড়ীর আকাশ ফাটছে যখন মায়ের রােদনরােলে
ওরা করছে হিসেব, গাঁজার খরচ কত চাই ।
আমায় দেখে’ বললে ওরা, হলাম আটজন।
আমি বল্লাম 'আমি ত, ভাই, পিরবাে নাকো যেতে
ওরা বললে, “কেন ?••হলে নবাব কবে, কখন ?
নেমন্তন্ন থাক্ল, এস শ্রাদ্ধের ভােজ খেতে।
পারলাম নাকো যেতে আমি বিশ্বনাথের সাথে-
অচ্যুতানদের লােকাপবাদ
তাহার দেহের শেষ-আশ্রয় চিতা প্রজ্জ্বলিত
চোখে দেখার ভয়ে।''গাল তুলে নিলাম মাথে,
ব্যক্তিগণের আস্ফালনে হ’লাম নাকো ভীত।
চলে গেল বিশ্বনাথে নিয়ে বাহকেরা
করি’ তুমুল কোলাহল, উচ্চ হরিধ্বনি...
লােকে বলে, এরাই মানুষ, কাজের লােকের সেরা,
অচ্যুতটা দুষ্ট ঠ্যাটা—পাবে পশুযযানি।”
চুপ কল অচ্যুত হয়ে খুবই ম্রিয়মাণ
সত্যিকারের দুঃখে, এবার নয় দুঃখের ভাণ
; = অচ্যুতানদের অসুখ “বলুন দেখি, সব চাইতে সহজপ্রাপ্য কি ? ‘হরিনাম’? উ হু; নামে রুচি আছে প্রাণে ; যে শুনায় সে প্রার্থী কিছুর ; পাপী পাতকী ভরসা পায় দৈবাৎ যদি ও-নাম পশে কানে। সে জিনিসটা এমন- লােকে করবেই বিতরণ চান্ না চান, বিরক্ত হােন, লাগুক্ আর না লাগুক্ কাজে আপনার, কারাে কাজে, তবু পাবেন প্রচুর ; মারতে উঠুন মনে মনে কালাে করে মুখ— তবু দেবে লােকে আপনার দুঃখ করতে দূর। প্রকৃতি যা দেছেন, যথা, অাঁধার আলাে বায়ু তার কথা ত হচ্ছে না, ভাই; মানুষের দান নয় ত’! কি বললেন ? ভালবাসা? চমকে দিলেন স্নায়ু- ঐ কথাটায় বিস্ময়ে যে হ’লাম বাক্যহত ! ভালবাসা সহজপ্রাপ্য! কোন্ দেশে তা’ বটে ? কোন্ স্বর্গের কথা বলছেন ? মৃত্তিকায় তা নাই ; কোন্ হৃদয়রাসমঞ্চে? কোন্ যমুনাতটে ? কোন্ নদেয় তা পাবেন যদি হয়েন আপনি নিমাই ? আজও চলছে আরাধনা ভালবাসা মাগি’ সুরু থেকে সেই আকাঙ্ক্ষায় চলছে বারিসেচন—
৭১
অচ্যুতানন্দের অসুখ
চোখের বারি—কিন্তু আজও উঠল’ নাকো জাগি
অঙ্কুর তার ; অন্ধ হ’ল প্রতীক্ষমান নয়ন।
ভালবাসার নামে চলছে স্বার্থ-তপস্যা,
মনে মনে বসে আছি গুপ্ত শবাসনে ;
যে ঘুচিয়ে দেবে আমার ঐহিক সমস্যা
তারেই করব অলঙ্কৃত প্রেমের ভূষণে।--
ইহা ছাড়া ভালবাসা নাই,
তৃষ্ণাহারীর জন্যে আসন পাতা রইল বৃথাই !
সে যাই হােক্, ঝুলিয়ে আর রাখব নাকো শ্রোতায়,
আপনারা সব বন্ধু আমার, এবং বুদ্ধিমান,
সহজপ্রাপ্য যত বস্তু আছে দুনিয়ায়
এক এক করে কতই আর করবেন অনুমান ?
তবে একটা জিনিস আছে---সুবর্ণ সুযােগ’---
খুবই সহজপ্রাপ্য বলে’ বহু বিজ্ঞাপিত ;
স্বাস্থ্য, অর্থ, যৌবন ও অটুট উপভােগ
পাঁচ-সিকেতেই মেলে; সুযােগ’ আসছে অযাচিত।•••
কিন্তু এটা উত্তর নয় আমার জিজ্ঞাসার
সে-জিনিসটা আসে না ত’ বিজ্ঞাপনের রঙে ;
সেটা হচ্ছে কু-অভ্যাস পরহিতৈষণার—
মুখের উপর খই ফুটানো উপদেশের ঢঙে
অর্থাৎ আমি বলতে চাই যে, জগৎ-গােলকধাঁধায়
যখন আপনি বিব্রত খুব, পাবেন কি তা জানেন ?
উপদেশ, ভাই, উপদেশ, লক্ষ লক্ষ কথায়—
অবিমিশ্র সদুপদেশ.••নি না যত পারেন ।
শ
কশ্যপ ও সুরভী
৭২
এমন কি—বতে তাহা কান্না যে, ভাই, আসে—
সুরবালার, স্ত্রীর নাম ঐ, সুরবালার মাথায়
উপদেশের এত বুদ্ধি যে, উপদেশের ত্রাসে
অষ্টপ্রহর হৃদকম্পে দিন কাটানাে দায়।
দুর্বিষহ হলেও সেটা নিছক্ ঘরের কথা-
অভিযােগ নাই তার বিরুদ্ধে ; কারণ, দু’জনার,
আমার এবং সুরবালার, একই দুঃখ ব্যথা,
যুগল পৃষ্ঠে পড়ছে এসে ভগবানের মা’র।
কিন্তু যাহার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই কিছু
তার কি গরজ, বলুন দেখি, সর্বজ্ঞের মত
জ্ঞান উপদেশ নিয়ে হঠাৎ ছুটতে আমার পিছু !
অথচ সব দুঃখের কথা নয় সে অবগত !
মাতব্বরী ( ঠুকরে ফেরার নেশা
সব কথাতেই ) লােকের একটা অবৈতনিক পেশা।
উঠছেন নাকি ? কিন্তু একটা গল্প ছিল পরে
বসূতেই হবে, জানি আমি। মনঃসংযােগ করুন ।
গল্পটা খুব শিক্ষাপ্রদ, ব্যর্থ মতান্তরে ;
যে যা-ই বলুক—সন্দেহ নাই, ব্যর্থ হলেও করুণ।
‘আধা মাঘে কম্বল কঁাধে’—অর্থাৎ শীত গেছে
প্রচণ্ডতার পর; কিন্তু মাঘ মাসেরই শেষে
হঠাৎ একদিন প্রাতঃকালে দিলাম আমি হেঁচে',
সর্দি যখন হবার নয়, সর্দি নাইকো দেশে !
শয্যা ছেড়ে মেঝেয় নেমে দাড়িয়ে আমি আছি-
সুড়সুডিয়ে নাকের ভিতর, গায়ে দিয়ে কাটা,
৭৩
অচ্যুতানদের খ
।
==
এসে গেল—বেরিয়ে গেল—অনর্থক এক হাঁচি,
হাঁচির পর হাল্কা হয়ে ভাল লাগল’ গা-টা।
কিন্তু সেটা মিছে-
বিপদ ছিল পিছে
সুরবালা ছুটে এলেন শুনে আমার হাঁচি-
দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে, মুখ ভয়ে অন্ধকার
তাঁর যত্নে আমার গায়ে বসতে পায়না মাছি,
হাঁচি ত’ খুব দুলক্ষণ, হেতু নির্ণেয় তার।
বললেন এসে : ‘তােমায় নিয়ে হ’ল আমার জ্বালা,
সকালবেলা উঠেই হঠাৎ হেঁচে ফেললে যে !
জল বসেছে মাথায় ; মাথায় যে তােমার জল ঢালা
চান্ করতে! বাঁচিনে আর মর্দানী আর তেজে !
শীত নাইকো বলে দাও গায়ের লেপ ফেলে-
ঠাণ্ডা লেগে’ হ’ল সর্দি ; জ্বর আসছে বােধ হয় !
মানুষ হয় না এমন বে-তাগ, ভূতে দানােয় পেলে’
তুমি যেমন স্বভাবতঃই-স্বভাব যাবার নয় !
মুখ ধুয়ে নাও; করে দিচ্ছি রস খানিকটে আদার,
গরম গরম খেয়ে ফেলবে। র্যাপার দাও গায়ে’..
বলে তিনি গায়ে আমার জড়িয়ে দিলেন র্যাপার
ফুল ষ্টকিং এনে দিলেন—পরুতে হ’ল পায়ে।
আরাে বললেন ‘জোলাপ নিয়ে শুয়ে থাক আজ ;
উপােস দাও আজ।'-বলে তিনি করলেন আদার রস
খেলাম সে-স; রস ত’ নয়, খালি ঝাল আর ঝাঁঝ!
কেউ হয়তাে বলবেন, “তুমি বেজায় স্ত্রীর বশ।
৭৪
কশ্যপ ও সুরভী
তা’ একটু বটে আমি। সে যাই হােক, পরে
সুরবালা-স্ত্রীর নাম ঐ-পয়সা দিলেন দু’টি,
বললেন : “আনাে জোলাপ, বড়ি। যদি পড়াে জ্বরে
বাড়বে না তা বেশী। খাবে সন্ধ্যার পর রুটি।
অবাক্ আমি হলাম নিশ্চয়
কিন্তু সেটা মুষ্টিযােগের বহর দেখে’ নয় ;
এই ভেবে যে, মাঘের শেষে সকালবেলার হাঁচি
এমন উৎকট পীড়াসূচক, ধ্রুব সূত্রপাত,
জাম নাকো; পৌছে যায় লােক যমের কাছাকাছি।
প্রাতঃকালেই মনে হয়, আজ এ কি কুপ্রভাত।
সে-যাই হােক, পয়সা দুটো নিয়ে মুঠোর ভিতর,
কোটের উপর র্যাপার এবং ফুল ষ্টকিং পায়—
বেরিয়ে যখন প’লাম পায়ে তেল মালিশের পর
বেলা তখন অনেক, দেড় প্রহর গতপ্রায়।
জোলাপ আনতে চলাম হ'য়ে খুবই মরা-
নিজের দুঃখে নহে, লােকের দেহসর্বস্বতায় ;
দেহই যেন সব, তারই ব্যাধি ক্ষয় আর জরা
নিরােধীয়; আর-সব পথ খােলা রাখা যায়।
আত্মমূলক জগদ্ধৰ্ম্ম সাধন
দেহের দ্বারা সিদ্ধ হবে যেন ! কি ভ্রম আর পতন!
আর একটা কথা ছিল খুবই দুশ্চিন্তার
সুরবালা বলে থাকেন । মনে রেখ, দায়ী
আর-একজনের জন্যে তুমি, নিয়েছ যার ভার•••
বিপন্ন করে তারে রােগশয্যাশায়ী
;
৭৫ অচ্যুতানন্দের অনুখ হতে পার না তুমিই জান তােমার মন, আমার ত’ ঐ ধারণা। উপযুক্ত কথাগুলি এলােমেলােভাবে ভাবতে ভাবতে চলেছি ত’ ওষুধখানার দিকে আরাে ভাবছি, এমনি করেই এ-জীবন কি যাবে! নিজের বুদ্ধির অনুগামী করব ইচ্ছাটিকে কবে আমি’ ? ‘অচ্যুত যে’!-হঠাৎ শুনতে পেয়ে পরের কণ্ঠে নিজের নাম চমকে চেয়ে দেখি, ভরত দত্ত ; দাড়িয়ে গেছেন আঁতে ধাক্কা খেয়ে- এমনি মুখ কালিবর্ণ। বললেন তিনি। এ কি! অসুস্থ যে খুবই তুমি! অসুখ কবে থেকে? আমি বললাম, ‘সর্দি হবে, করছি অনুমান। ‘সর্দি খুব খল ব্যাধি, ভাই ; উঠছে যখন পেকে বুকে বসার সময় তখন। খুব সাবধান! চক্রপতির দোকানে যাও; তার সর্দির পাচনটা উত্তম জিনিষ ; সেদ্ধ করে’ ছটা দেড়েক কাথ, খেও দু’বার গরম গরম—দেখবে ঘামের ঘটা, নাকের সর্দি যাবে উড়ে গায়ের ঘামের সাথ'। আমি বললাম, আচ্ছা।-এবং তা করতেই মদন- মদন চাকি, এসে পড়লেন ; বিশেষজ্ঞ তিনিও; তিনি বললেন ব্যাপার শুনে’ : সর্দি লাগবে যখন, বলে রাখছি, আমার কাছে পরামর্শ নিও- মার্টিনেটের ফসফোটিনা, আড়াই টাকা শিশি’... শুনে’ ভরত চটে’ বললেন : “তিন পয়সার পাচন ; প
কশ্যপ ও সুরভী
যথেষ্ট গুণসম্পন্ন, এবং তাহা দিশী।
খেও তা-ই।-বলে’ ওঁরা চলে গেলেন দু’জন।
এগিয়ে গেলাম••চোখে প’লাম কৃত্তিবাস দে’র ;
তিনি বললেন, সর্দি রােগে হােমিওর ফল অদ্ভুত ;
এক ফোটাতেই নিৰ্ম্মল হয়, থাকে না আর জের,
দশ বােতলের শক্তি তাহার এক-ফোটাতেই মজুত।
আমি বললাম, “আচ্ছা।-তা’পর ভজবৈষ্ণব দাস
ডেকে’ বললেন : “ওহে অচ্যুত, বেরিয়েছ যে বড়
অসুখ দেহে ? দেখছি তুমি করবে সৰ্ব্বনাশ ;
শােও গে যাও লেপের নীচেয় হাত পা করে জড়াে ;
গা ঘামলেই সেরে উঠবে।—আমি বললাম, “বেশ।
কিন্তু ঐ নয়কো শেষ•••
আমার তখন গা ঘামছে লেপের বাহিরেই
ফুল মােজা আর র্যাপার এবং রােদের গরমে
দেখা বিপুল সােমের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এ্যাই!
ঠাণ্ডা লাগার ভয়েতে, ভাই, উঠেছ যে চরমে!
কমফর্টর কই ? হিমে উঠল মাথা ভিজে’!
আমি বললাম, ঠাট্টা নয়, সর্দির উপক্রম।
“তাই নাকি? বিষম জিনিস, ভুগে’ জানি নিজে ;
সর্দির পরেই কাশি-কেশে’ ফুরিয়ে আসে দম্
সে কী কষ্ট, বাবা!•• তুমি বাড়ী ফিরে যাও।
তারপর কি বলছিলাম?—আর একটা কাজ
করাে যদি ভাল হয় ; সর্দি হবে উধাও
শরীর ঘেমে’; ঠাণ্ডা জলে নে’ও নাকো আজ।
•
৭।
অচ্যুতানদের অসুখ
বদ্ধ ঘরে বসে, গামছা ভিজিয়ে গরম জলে
বাথ, নাও গে। অবিলম্বেই কেটে যাবে গ্লানি।
আমি বললাম, “বেশ’ •••ভাবলাম, রামের আমলে
এতটা সুখ ছিল কি, আর এত মঙ্গলবাণী’!
পা বাড়ালাম আবার আমি, ঠিক্ অন্ধের মত,
হাতড়ে চললাম পথে, যেন অচেনা দেবপুর ;
নরদুলভ উদারতায় পরােপদেশব্রত
হাঁচির সূত্রে উদ্যাপিত করবেই যত সুর
আমায় উপলক্ষ্য করি।
ধন্য আমি, গােপন ব্যাপার জানিয়ে দিলেন হরি।•••
সে যা-ই হােক, হলাম দাওয়াখানায় উপনীত
‘আসুন, দাদা; কি চাই বলুন। দেখছি যে খুব কাতর ?
এমন এয়ার-টাইট আপনায় পূর্বে দেখিনি ত’
পােষ্টাপিসের পার্সেল যেন’!-বলে গঙ্গাধর
ঔষধবিক্রেতা,
ফাজিলের সে অগ্রগণ্য, বকাটদের নেতা।
সত্যিই আমি কাতর তখন; বললাম সকাতরে ।
সাবধানেই খুব আছি, কারণ, সর্দি হতে পারে
এই আশঙ্কা জন্মেছে ; জানােই, সর্দিজাত জ্বরে
অনেক মানুষ মরে, এবং স্ত্রী পুত্রে মারে।
জোলাপ খাব সেই জন্যে ; একটি বড়ি তারই
জরুরী আজ ভারি।
হেসে’ বললে গঙ্গাধর : বাজে খরচ বেজায়
বড়ি কিনে খাওয়া। শুনুন, আধলার হরিতকী
•
কশ্যপ ও সুরভী
৭৮
যথেষ্ট ঐ উদ্দেশ্যে ; আর, নির্দোষিতায়
তার মত আর জিনিস নেই। বড়ি দেব কি ?
আমি বললাম, “থাক্।••এলাম মুদির দোরে ;
বললাম তারে : ‘বিষ আছে হে? অতি তীব্র বিষ ?
যা খেলে’ লােক আর বাঁচে না, নিঃশেষ হয়ে মরে’!
শুনে’ মুদির চক্ষু দু’টি হ’ল নির্ণিমিষ।
বলাম, “আনাে হরিতকী, বিষ যদি না থাকে,
আধ পয়সার। বেঁটে খাবাে•••বিষের বদলে
হরিতকী চাচ্ছি দেখে লােকটা আমাকে
ঠাট্টা করে বললে হেসে উপদেশের ছলে :
‘জ্বর যদি খুব এসে থাকে বাড়ী চলে যান ;
অবস্থা ত’ ভাল নয়ই, ভয়ের কথাই যে !
হরিতকী দিচ্ছি আমি য’ পয়সার চান,
কিন্তু হেঁটেই বাড়ী অবধি যেতে পারবেন নিজে’?
মুদির ছিল আমায় দিয়ে আরাে প্রয়ােজন
প্রকাশ করতে লাগল’ বহুক্ষণ :
‘হরিতকী জিনিস ভালই; কিন্তু আমার বাবার
আবিষ্কৃত জোলাপ আছে, দু’ পয়সার পিল ;
মাত্রা-মাফিক্ হয়ে যাবে পেটা পরিস্কার,
পেটেন্ট বড়ির মত তাহা পেটে ধরায় না খিল।
সাহস হয় না এমন যে, সদুপদেশ দি’,
কিন্তু খুবই খ্যাতি আছে বাবার বড়িটার ;
জ্বরেও তাহা উপকারী। আদেশ করেন যদি
দি’ একটা। বাবুরাই তার বেশী খরিদ্দার।•••
১৯ অচ্যুতানদের অসুখ এখানেই এক কবরেজ ছিলেন- পারুলডাঙ্গার ঈশেন সেন ; বাবাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনিই বলেছিলেন বাবাকে যে, ওহে বিষ্ট, পেটেন্ট ওষুধ নেবে? বাবা বললেন, নেব। যদি দয়া করে দেন কেন নেব না?—তখন অনেক ভেবে ভেবে বললেন ঈশেন কবিরাজ : ফর্দ লেখ তবে ; কিন্তু একটা কথা, বিষ্ট ; এই বটিকার নাম ঈশেন বড়ি’ রাখবে, নাম ‘ঈশেন বড়ি’-ই হবে- দু’টি পয়সার বেশী নয় একটি বড়ির দাম। ধন্বন্তরি ছিলেন তিনি।—দি’ একটা এনে ? ইতর ভদ্র সবাই এটা কেনে। আমি বললাম : ‘দাও; তােমার যা আছে দাও তা-ই বিষ কিম্বা হরিতকী কিম্বা ঈশেন বড়ি! মুদি বললে : ‘বড়িই দিই; বিষ ত’ কাছে নাই; থাকলে দিতাম, চাইছেন যখন এত গরজ করি’! • একটা বড়ি দু পয়সায় বেচ বার কি অধ্যবসায় !••• ভাবতে ভাবতে চলছি পথে বুকে মাথা গুজি’- ‘অচ্যুত যে! কোথা থেকে হঠাৎ হ'লে উদয় ? হিমালয়ের শৃঙ্গ থেকে নেমে আছ বুঝি? এখনও যায় নি তােমার গা-কাঁপুনির ভয়’!
৮০
••
এক
কশ্যপ ও সুরভী
বলে’ টানতে লাগল হুকো
বীরেন সরকার কুমীরমুখখা।
আমি বললাম : ‘অসুখ হবে এই সন্দেহ করি’
মজবুত হয়ে আছে আমি ; কিনে আনলাম জোলাপ—
দু’ পয়সায় সুবিখ্যাত ঈশেন নামা বড়ি ;
উপােস দেব, কারণ, দশা আরাে না হয় খারাপ।
শুনে’ হুকো নামিয়ে রেখে বীরেন এল ছুটে’
বললে : ‘ও বিষ, সাক্ষাৎ বিষ, ফেলে দাও শীগগির ;
কোন্ শত্রু দিলে তােমায় এই বুদ্ধি বিদ্ঘুটে ?
ঈশেন বড়ি জ্যান্ত যম, নরহত্যার ফিকির !
জানাে না কি আয়ুর্বেদের নিষেধ
মলভাণ্ডং ন চালয়েৎ'?
বলে’ বড়ি কেড়ে নিয়ে ফেলে দিল ধূলােয়—
বললে : যাও বাড়ী এখন, বেঁচে গেলে এবার ;
ঈশেন বড়ি! রাম, রাম। ঈশেন গেছে চুলােয়।
এমন কর্ম আর করাে’ না বলছি, খবদ্দার’!
বলে’ আবার তুলে নিয়ে হুকো
হাসতে লাগল’ বীরেন কুমীরমুখখা।
নিঃশ্বাস একটি পড়ল’ আমার। স্ত্রী সুরবালা
বসে আছেন উদ্গ্রীব হয়ে চেয়ে বড়ির পথ—
কি শােনাব’ তাকে আমি, কোন্ মিথ্যার পালা?
বড়ি কিনে না আনার আমি কি দেব কৈফৎ?•••
পৌছে গেলাম ঘরে প্রবল হৃদকম্পনসহ--
‘আনলে বড়ি’? প্রশ্ন হ’ল। আমি বললাম, না।
1
৮১ অচ্যুতানদের অসুখ তিনি বলেন : ‘আমার জীবন করলে দুৰ্বহ— তােমার সঙ্গে যুঝে আমি আর পারলাম না। কি বলব আর তােমায় আমি! এলিয়ে আমি গিছি’... আমি বল্লাম ‘ওষুধ আমি খেয়েই এলাম যে হাত দেখিয়ে কবরেজকে! -বললেন, মিছিমিছি জোলাপ নিয়ে কাজ নেই। এই একটি ভােজ উঠবে সুস্থ হয়ে থাকো গে নির্ভয়ে। মহালক্ষ্মীবিলাস তুরন্তেই সর্দি করে নাশ’ । ‘খাওয়ার কথা কি বললেন ?—বললেন সুরবালা। আমি বললাম, “নাহার নিষেধ করেন নাই। বলে স্নান করে ভাত খেলাম একথালা সুরবালা বলেন, “তুমি মিথ্যে কথার গােসই।” থেমেই অচ্যুত বললে আবার : “বুকে বেজায় ব্যথা এই ব্যথায় লােক আফিং খায়, আমি বলি কথা। আচ্ছা, নমস্কার- আসবেন আবার।”
অচ্যুতানন্দের অমােচন “যে ছেড়ে যায় এই পৃথিবী দুঃখ কেবল তারি জন্যে-- ঠকো না, ভাই, চোখের জলের অপার বন্যা দেখি অন্যে। যে ছেড়ে যায় তারই কাটে শতেক স্থানের শতেক বাঁধন, শূন্যে মিলায় কেবল তারই অপরূপ এই বিশ্বভুবন ; সাজান’ তার মুখের পুরী—আশায় উজল স্বপ্ন-বিলাস- ডােবে চির-অন্ধকারে আনন্দময় জন্ম-নিবাস। পৃথিবী তায় টানে পিছে হাজার বাহুর আকর্ষণে, বিভীষিকায় পূর্ণ হয়ে মৃত্যু ঘনায় দু’নয়নে ; শঙ্কা তাহার তীব্র অসীম কৃষ্ণসাগরতটে এসে কি নিরুপায় অশক্ত সেই বাঁচতে চাওয়ার সংগ্রামে সে! স্তিমিত সেই নেত্র এবং অসাড় সেই দেহ দেখে আত্মীয়েরা কেঁদে ভাসায়, ধূলায় লুটায় দূরে থেকে।••• আপনজনের একটি ত’ সে–তারির ব্যথায় অন্ধকার, সব যায় যার কে মাপে তার বিদায়-বেলার ব্যথার ভার । একটি গেলে সে-শূন্যতা পূর্ণ করি’ আরাে আসে, কয়েকটা দিন ভুলতে লাগে যমের দেওয়া বেদনা সে। বাপ মা মলে’ শ্রাদ্ধে ঘটা-পত্নী মলে’ পত্নী আবার বেঁচে থাকার সুখােপভােগ হয়েই থাকে নানাপ্রকার। যে ছেড়ে যায় এই পৃথিবী দুঃখ কেবল তারই জন্যে টলাে’ না, ভাই, চোখের জলের অপার বন্যা দেখি’ অন্যে।” | e
৮৩
অচ্যুতানন্দের অমােচন
বিকৃত ও হিংস্র করি’ মুখমণ্ডল তার
অচ্যুত কহিল পুনর্বার ।
“কথাগুলি মর্মভেদী নির্মম খুব বুঝি ?
অমনি লাগে তাদের যাদের অভিজ্ঞতার পুঁজি
টাকে গোঁজা থাকে ; যারা উপর-উপর ভাসে
তারাই ঠকে ছলনায় ; আর ভাবে ভালবাসে
মানুষ বুঝি পরস্পরে!
দেহভঙ্গী কণ্ঠস্বরে
প্রেমের চর্চা চলছে কেবল’—ভাই, হৃদয়-বিনিময়
স্বপ্ন, অর্থাৎ অলীক জিনিষ ; জাগ্ৰতের তা নয়।
যে-প্রণয়ের কথাগুলাে মানুষ প্রায়ই বলে
সংসারে তা নাই, কিন্তু কাব্য করা চলে।•••
ঘটনায় তার প্রমাণ আছে—স্বচক্ষে তা দেখা
ভাবছিলাম ত’ তাহা-ই এখন বসে একা একা।•••
স্বীকার করতেই হবে, সূক্ষ্ম অনুশীলন দ্বারা
পার হয়েছে চক্ষুলজ্জার প্রতিবন্ধক যারা
বসুন্ধরা ভােগ্যা তাদের, অর্থাৎ অর্থ, নারী,
তাদের করতলে আসে, তারাই পুরুষ ভারি।
ত্যাগ করেছে অকপটে প্রতি মমতায়
তারাই সুখী, যারা, প্রভু দাসের জনতায়।
কি বললেন ? ফাঁকা আওয়াজ! মানবদ্বেষের কথা
আছেই আছে ভদ্ৰাচরণ, প্রেম ও উদারতা ?
কপ ও সুরভী হবেন না দুঃসহ শুনুন তবে করি’ অনুগ্রহ।••• যাবৎ আদান প্রদান যে-কেন্দ্রে ঘুরছে পেয়ে অনিবাৰ্য টান সে কেন্দ্রে নিজে আমি- মুখে স্বীকার না করূলেও জানেন অন্তর্যামী। ভেবে দেখুন বুদ্ধি করি’ স্থির প্রয়ােজন যার ফুরিয়েছে তাহার মন আর শরীর কতটুকু চেয়ে থাকেন আপনারাই নিজে ? ভুলে যান্ না, কি উচিত আর দৃষ্টিকটু কি যে ?” অচ্যুত’র কণ্ঠ হ’ল ভারি— চোখের জল সে মুছল তাড়াতাড়ি বল্লে : “ভগ্নী ছিল আমার স্নেহলতা নামে বিয়ে হয়েছিল তার ভদ্রলােকের গ্রামে। বাবাই দিয়ে গিয়েছিলেন স্নেহলতার বিয়ে ছেলের কুল আর স্বভাব আর হাঁড়ির খবর নিয়ে। সবই ভালাে; কিন্তু যেথায় মানুষ মাত্রেই খারাপ তার সন্ধান কেউ রাখে না, কোনাে মেয়ের মা আর বাপ। আশ্চৰ্য্য এ ভারি— কোনাে প্রতিকারই নাইকো তার ; প্রতিকার তার একমাত্র ইহাই- বনে গমন এ সংসারকে মনে করে বালাই। ।
অচ্যুতানন্দের অশ্রুমােচন তা’ করা ত’ চলবে না।-তাই নাচার চক্ষু বুজি’ সম্পর্ক স্বীকার করা আর পানােলােক খুজি। ঘরে ঘরে সৃষ্টি করা চলছে অবিরাম সম্পর্কের মিষ্টত্ব দিয়েও কিছু দাম। দাম দিয়ে যে সুখ কেনা হয় জামাই তাদের প্রধান। সৰ্ব্বপ্রধান কুটুম্বিতায় উল্লসিত প্রাণ- বাবা করলেন স্নেহলতায় দান সবিনয়ে, বৈবাহিকের করি’ বহুমান ; মূল্য দিয়ে করলেন জামাই ; কারণ, যিনি জামাই তারে জামাই করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। স্নেহলতা পাকী চেপে গেল শ্বশুরঘরে••• তিটি বছর দ্রুতগতিই কাটলাে’ অকাতরে। দেখতাম আমি স্নেহলতার স্বামী-প্রেমের সুখ- আনন্দময় অনাবিল ; আর শঙ্কাভরা বুক স্বামীর কুশল লাগি’-সে কী অনন্যমনা! কী একাগ্র নিত্য আরাধনা। খুবই ভালবাসাবাসি তাদের, প্রণয় গভীর অতি, পরস্পরে আসক্তি খুব ; এমন দম্পতি এমন উজ্জ্বল অভিভূত-কমই দেখা যায়, শতে একটি পাবেনাকো। বাপের বাড়ী থাকায় অনিচ্ছা খুব দেখা যেত’ ; দু’দিন বাদেই কান্না। ‘ঢের দিন হ’ল বাপের বাড়ী এসেছি ত’! আর না। রেখে’ এস আমায়, দাদা।’-এমনি করেই সে আকুলতাসহকারে স্বামীর সঙ্গে মিশে কপ ও সুরভী ভােগ করল’ এই সংসার পূরাে তিনটি বছর তাহার পরই তাহার উপর পড়ল’ যমের নজর মারা গেল মেহলতা তিনটি দিনের জ্বরে— গেল যমের ঘরে ত্যাগ করে সে স্বামীর গৃহ, সঙ্গস্বর্গ স্বামীর, তীব্রতম বােধ নিয়ে এক অপরিসীম ক্ষতির ; ছেড়ে যেতে অনিচ্ছা তার, অতৃপ্তির সে-ব্যথা, টেনেছিল পিছে কত, কত নিদারুণ তা', কে করিবে কল্পনা আর কে করিবে ওজন- কে বুঝিবে যন্ত্রণা তার কত এবং কেমন! ভগ্নীপতি ওলাল, করলে বহু খেদ চীৎকার তার বন্ধুগণের করল’ মর্মভেদ। ছুটে এসে আছড়ে পড়ে, লাফিয়ে ওঠে আবার বৃথা হ’ল সকল চেষ্টা শান্তি প্রবােধ দেবার। ভাগ্যের এই অনাসৃষ্টি কাণ্ড দেখে’ সে অবাক হ’ল—যেন এটা নূতন-কিছু দেশে! স্ত্রীলােক যেন ইতিপূর্বে সধবা মরে নাই স্ত্রী হারিয়ে শ্যামা আরাে এলিয়ে পলল তাই। বললে কেঁদে’ শ্যামাপদ ধূলাের উপর বসে’ ‘আমার চোখের চন্দ্র সূৰ্য গেল আজকে খসে”। মেহ মেহ স্নেহ স্নেহ, আমার স্নেহলতা- হায় হায় হায়, বিধাতার হায়, এ কি নির্মমতা!••• অদৃষ্টকে দাড় করিয়ে সামনে ডেকে এনে জর্জরিত করল’ তারে বাক্যের বাণ হেনে।
৮৭
অচ্যুতানন্দের অমােন
মানুষ তারে ভালবাসে, ভাগ্য শত্রু তার--
কেন এমন ? জিজ্ঞাসা সে করল’ বহুবার।
যুগল-মূর্তি ফটো নিয়ে ধরল’ বুকে চেপে’••
অর্থাৎ সে স্ত্রী-বিয়ােগে গেল বেজায় ক্ষেপে।
সে যা-ই হােতূ মরল’ স্নেহ স্বামীর পানে চেয়ে,
আলতা পরে’ উঠল’ চিতায় পতিব্র মেয়ে।
।।
এই ছবিটি আছে মনে-স্ত্রী-বিয়ােগের দৃশ্য,
ভগ্নীপতির ধড়ফড়ানি শূন্য দেখি’ বিশ্ব।
ভগ্নী-শােকে, ভগ্নীপতির চরম দুর্দশায়
হয়ে আমি জীবন্ত প্রায়
ফিরলাম ঘরে।••তাহার পর, দিন-বিশেকের পর,
মনে হ’লদেখে আসি দুঃখী শ্যামাপদর
অবস্থাটা কি-শয্যা ছেড়ে উঠেছে সে কি না ;
দেখবে কে আর এ-অবস্থায় শ্যালক-বন্ধু বিনা !
পরস্পরের অনুকম্পায় মৃতের গুণগানে
শােকটা অনেক শান্ত হয়, শান্তি আসে প্রাণে।
পরমাত্মীয়ের কাছে বলা স্বর্গগতের কথা
সে-ও তর্পণ, শ্রাদ্ধজ্ঞাপন, প্রেমের কৃতজ্ঞতা।
রওনা হলাম—অবিলম্বেই শিক্ষা পেতে কিছু ;
রওনা হলাম—হাঁচির বাধা পড়ল’ না ত’ পিছু।
••
পৌছলাম সেই গ্রামে; ক্রমে সেই-বাড়ীরই কাছে
যেথায় আমার ভগ্নী ছিল, ভগ্নীপতি আছে।
কক্ষপ ও সুরভী
১৮
.
সন্ধ্যা তখন উৎরে গেছে মাঘের খাটো বেলায়,
মালুম হ’ল বৈঠকখানা উজ্জ্বল আলাে জ্বলায় ;
লােকের গলাও শুনতে পেলাম অনেক তফাৎ থেকেই
সুখী হওয়া গেল ; চিন্তা বিশেষ নেই,
ভাল আছে সবাই তবে।
শ্যামা ভাবলাম, আমায় পেয়ে খুবই তুষ্ট হবে ;
একা একা পত্নীহারা আছে মুহমা-
উপলব্ধি করবেই সে পরমাত্মীয়ের টান্••
ভাবতে ভাবতে উঠলাম গিয়ে ঘরের বারান্দায়
শ্যামার বৈঠকখানার। সেথায় পাঁচ ছ’টি লােক জমায়
চলছিল খুব গল্প গুজব। কিন্তু গল্পের বিষয়
শুনে অবাক না হবে যে এ-দেশের সে নয়।
শুলাম, বলছে শ্যামাপদ পাচটি উপস্থিত
ঠিক করতে পারছি নাকো কোন্টা করা উচিত।
উকি মেরে দেখলাম, সে গা নাচাচ্ছে বসে’
অদে তার ভুড়ির কাপড় গেছে খানিক্ খসে’!
বললে আবার ঃ আমি নইলে জীবনটা যে বৃথা-
নির্বোধ এই মেয়েগুলাে বুঝবে না কি তা’!
এই কথাতে হাসল’ সবাই জোরে
সেই পুলকে যে-পুলকে পাখী ডাকে ভােরে।
কে একজন বললে হেসে’: শ্রাদ্ধ অন্তে গিয়ে
এক-এক করে দেখে এসে করে ফেলল বিয়ে
এই ফানের প্রথমেই
দেরী করার কারণ ত’ নেই।
৮৯ অচ্যুতানন্দের অমােচন শ্যামাপদ বলে : ‘ভাই, সৰ্বোত্তমায় চাই- কিন্তু মুস্কিল, কেমন করে করা যাবে বাছাই। এক জায়গায় পেলে তবে মিলিয়ে নিতে পারি- হেথার হােথার কতকগুলােয় গােলমাল লাগে ভারি। মূল্যবান্ আর সরস এই কথা ক’টি বলে সােহাগভরে বন্ধুর কোলে পড়ল’ শ্যামা ঢলে।••• কে যেন, ভাই, চাবুক মারল বেঁধে চলে এলাম যে মরেছে তারই জন্যে কেঁদে।” চুপ করল’ অচ্যুত তার বলা শেষ করে’ চক্ষু দু’টি জলে উঠল’ ভরে। -“উঠছেন, ভাই ? কিন্তু একটা কথা ছিল যে পুনশ্চেতে !হঠাৎ মনে পড়ল’ সহজে। স্নেহলতার অসুখ যখন খুবই বাড়াবাড়ি- ডাক্তারটি বিমর্ষ আর শশব্যস্ত ভারি... তখন হ’ল শ্যামাপদ অতিরিক্ত আকুল ; চক্ষু করি’ নিষ্পলক আর রুক্ষ করি’ চুল বললে : বলুন, ডাক্তারবাবু, রুগী বাঁচবে কি না! বলুন খােলাখুলি, আমি আর তাে বাঁচি না। বলে’ সে খুব হ’ল উদ্গ্রীব দ্রুতই কয়েকবার কিন্তু তার এই উৎকণ্ঠা কি খবরটা জানার কণ্ঠাগত ক্ষিপ্ত প্রাণে ? জিজ্ঞাস্য আজ তাই। জানতে চেয়ে বাঁচার আশা আছে কিন্তু নাই-
কশ্যপ ও সুরভী
--
দৃঢ় ব্যক্ত অভিমত অবধারিত মৃত্যুর
চেয়েছিল--ব্যাপার দেখে বুঝছি যতদূর ;
বেঁচে গেলেও যেতে পারে যমকে ফঁকি দিয়া-
এই সন্দেহ করেছিল বিষের মত ক্রিয়া
শ্যামাপদর দেহে মনে ; ছটফটানি তারই ;
নিঃসংশয় হ’বার তার ছিল তাড়াতাড়ি।
আপনাকে করতে মুক্ত, বন্ধন ছেদ কতে,
পেতে নূতন পুরাতনে কে না চাহে মারতে ?
আচ্ছা, আসুন তবে--
আবার আসবেন কবে ?”
অচ্যুতানন্দের ধৈৰ্য্যচ্যুতি - - “যাহার আছে অফুরন্ত ঢের- আর, যার কিছু নাই—ভিক্ষাজীবী পথের মুসাফের, স্বাভাবিক ত’ এরাই দু’টি, পেয়েছে ত’ এরাই ছুটী অন্তহীনতায় সন্দেহ নাই তায়। ওদের একজন পথে চলে সবারই মুখ চাহি’- বিশ্রাম তার নাহি, আর-একজন বিরামমাঝে একক প্রতিষ্ঠিত, নিঃসন্দিগ্ধ অটলতায় চির-পরিস্থিত। একটানা এই দু’টি জীবন অন্তহীনে মিশে পেয়ে গেছে দিশে... জানাই আছে জীবন-স্রোতের আদি মধ্য শেষ, কি হবে এ-র পরে নাহি এই চিন্তার ক্লেশ। কিন্তু যারা মাঝামাঝি-মাঝখানে খায় দোল, তাদের কার্যকলাপ নিয়েই যত গণ্ডগােল ; যাহার কেবল শূন্য ঝুলি, যাহার আছে ঢের এই দু’জনার মাঝে দেহ ঝুলছে তাহাদের।
কপ ও সুরভী - চূড়ান্ত তার কিছুই নহে—সবই অনিশ্চিত , গাঁথনি কঁাচা আগাগােড়া–দুর্বল তার ভিৎ- একটু নাড়া সহে না তার, ভেঙে চুরে হয় একাকার। মিশ খায় না কিছুর সঙ্গে, নয় সে কিছুর মত, পরিত্রাণ তার ভালয় ভালয় দিনটি হলে গত । দল বেঁধেছে এই সংসার-মরু-অভিযানে, দুঃখে শােকে সহভােগী ; দানে প্রতিদানে মিতালী খুব ; একই প্রকার আশা- পরস্পরে বিশেষ ভালবাসা ; অথচ এ দেখতে পাবে, তােমার পরাভবে গােপনে খুব তৃপ্ত আর খুবই খুশী হবে ; নিজের জ্বালা তােমার তুলনায় একটুখানি লঘু ঠ্যাকে সেই সুখটা জানায়। প্রমাণ কি? আবােলতাবােল কথা বলছ কি যে ! প্রমাণ আমি নিজে। এ-বক্তৃতা কিসের জন্য ? বলছি তাহা পরে••• দুর্গতি যে এত তবু দেখবে ঘরে ঘরে এই ধারণাই বদ্ধমূল যত অভাব দুঃখের শূল বিধাতা ঐ স্বর্গে বসে’ দিচ্ছেন ছেড়ে ছেড়ে -- বি ধছে সে-শূল বক্ষে এসে অস্থি মাংস ফেড়ে ! কিন্তু তাহা সত্য নয় ; আজকে আমি নিঃসংশয়
৯৩
অচুতিননের বৈদ্যুতি
বিবাহিত হওয়াই হচ্ছে সব অহিতের কারণ,
বিয়ে বন্ধ করলেই হবে কষ্ট নিবারণ।
একদিকেতে ভিখিরী, আর অন্যদিকে রাজা,
আমরা বেড়াই মধ্যিখানে যত্নে তনু মাজা।
এই দুনিয়ার কারবারেতে যতই করি ফে
ততই বাড়ে বিয়ের নেশা, এবং বাড়ে তেল।
বিয়ে করুক ভিখিরীরা, বিয়ে করুক রাজা-
আমাদের তা গলার ফাসী, অথবা সঙ সাজা।
অদৃষ্ট দেখান’ মিছে হ'লে ভরাডুবি।”
অচ্যুত করিল চুপ ক্লিষ্ট হয়ে খুবই।•••
“উঠবেন না, বসুন, বসুন ; শুনুন কথার শেষ
করছি না ত’ কুৎসা প্রচার কিম্বা মানব-দ্বেষ।
পরবর্তী কাহিনীটা লাগতে পারে ভালাে-
পেতেও পারেন হদিস্ কিছু, পেতেও পারেন আলো।
করেছিলাম বিয়ে
টোপর মাথায় দিয়ে
সেজে’ মদনমােহন,
এবং কছি তখন থেকেই পত্নীর ব্যয় বহন।
করতেই তা’ হবে-
নিষ্কৃতি তা থেকে’, বলুন, কে পেয়েছে কবে !
সেটা কিছু দুঃখের নয়; কিন্তু হ’ল ছেলে,
হাসল’ ধরা আমার পানে চক্ষু দুটি মেলে
কি নর্তন হ’ল সুরু দম্পতির বুক জুড়ি’...
বংশধরে পেয়ে আমার লতিয়ে গেল ভুড়ি।
,
কপ.ও সুরভী
১৪
কৃতজ্ঞতা উছলে উঠে ডেকে’ গেল বান্••
সেই বাহুল্য ভাবের শাস্তি দেছেন ভগবান
খুবই দ্রুতগতি-
মানুষের ভুল শুধরে দিতে নিপুণ তিনি অতি ।
ঘটল’ কি তা বলি শুনুন : পত্র পেয়ে ডাকে -
সগৌরবে গেলেন উনি দেখাতে তার মাকে
অতুল নধর কোলের ছেলেটিকে
আমার পুলক ধরে না আর চেয়ে শােভার দিকে
ছেলে মায়ের কোলে -
চঁপার কলি স্বর্ণলতাদলে !
যা’ হাে, যাত্রা করলেন উনি গৌরবে আর ঘটায় ;
পিত্রালয়ে নিল তারে মাল-বেহারা ছ’টায়।
কাল ফিরেছেন—একটি মাস ছিলেন আমায় ছেড়ে ;
দেখতে আরাে ভালাে হয়েছেন উজ্জ্বলতা বেড়ে।
খােকাটিও ছিল ভালাে মামাবাড়ীর দুধে
আসল চাইতে লােকের নাকি মায়া বেশী সুদে ;
কাজেই স্ত্রী বাপের বাড়ী গেলে
ভালই থাকে শরীর তঁাহার এবং কোলের ছেলে।
সুরবালা-স্ত্রীর নাম ঐ—দু’টি কথা তারই
বলব’ অতি কোমলভাবে, যত দ্রুত পারি।
ঘরােয়া সে কথা ? কথা ঘবােয়াই ত’ বটে—
সার্বজনীন বাণীর আশা আমার নিকটে
করেন নাকি ? শুনে ধন্য সম্মানিত হলাম
সেই সঙ্গে অক্ষমতার লাজেও খানি ম’লাম।
ন অচ্যুতানন্দের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘরােয়া এই কথার ভিতর শিক্ষণীয় বিষয় আছে কিঞ্চিৎ : পুরুষজাতির বুকে সবই সয় সার্বজনীনতা আশা করি পেলেন একটু।-এখন আসল কথাঃ পিত্রালয়ে তিরিশটি দিন ছিলেন সুরবালা- তার মধ্যেই গেঁথে নেছেন কণ্ঠে কথার মালা... অর্থাৎ তার কথার ধারা ধরে’ নূতন পথ লক্ষ্য করে এই অভাগায় ভাবছে ভবিষ্যৎ অনর্গল আর অবিরামই চলছে তাড়না : ‘পয়সা রাখতে হাতে কেবল তুমিই পারে না। এই যে হ’ল ঈশ্বরেচ্ছায় চাদের মতাে ছেলে- হঠাৎ একদিন যেতেও পারে এরে একা ফেলে’! মরার কথা বলতেও কষ্ট, কিন্তু তা নয় গাল- আজ যে আছে সুস্থ সবল মরতে পারে কাল। ভীম যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠতাত, অর্জুন যার পিতা, ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং যাহার পিতার মিতা, সেই অভিমন্যুই, আহা, ফির না আর ঘরে মারা গেল ছেলেমানুষ শত্রুপক্ষের শরে। স্ত্রী উত্তরা গর্ভবতী-নেহাৎ বালিকাটি, বৈধব্য ত’ ঘটুল’ তাহার, জীবন হ’ল মাটি। (যদিও এ ভারত-কথা অমৃত-সমান- এ ব্যাপারটায় শিউরে ওঠে অনেক পুণ্যবান্।) সুরবালা বলতে থাকে । ‘মারে কেষ্ট রাখে বা কে!
কশ্যপ ও সুরভী সংসারেরই ধারা এই, মৃত্যুই খুব সম্ভব, এই কথাটা মনে রাখাই আসল এবং সব। দায়িত্ব যার প্রতিপালন করা স্ত্রী আর পুত্রে- চলবে না তার ভুলে থাকা ওটা কোনােই সূত্রে। ছেলে হবে অন্নাভাবী, নিরাশ্রয় ও অনাথ । ভাবতেই বুক জমাটু হিমে ভরে ওঠে হঠাৎ।••• তাইতে বলি, রাখাে কিছু ছেলেটার মুখ চেয়ে ; অমন করে তাকাচ্ছ যে? তবু ত’ নয় মেয়ে! কি বলছেন? খাঁটি কথা !...কিন্তু আছে খাদ, সেইটাই ত গল্পের জান্- তাহাই পরমাদ। সুরবালা বুঝত’ না ত’ অত জটিল বিষয়- অত অতলগামী চিন্তা সুরবালার নয় ; বােঝে না সে অতশত তােড় জোড়ের কাণ্ড যতই বাজুক ঝণঝণিয়ে মস্তিষ্কের ভাণ্ড- শ্বাশুড়ী খুব বুদ্ধিমতী—নিজের কন্যার তরে কাতর তিনি বৈধব্যের অতি উগ্র ডরে।" শিখিয়ে দেছেন কথাগুলাে পুনঃপুনঃ বলে- দেখিয়ে দেছেন চিত্র, কি হয় জামাই হঠাৎ মলে’ ; আমার মৃত্যু-চিন্তা আর তারই বিভীষিকা জেলে’ দেছেন মেয়ের বুকে দুরদৃষ্টের লিখা শুনিয়েছেন পড়ে পড়ে ; বলে দেছেন আরাে : হাতে রেখো গুছিয়ে, মাগাে, যত টানতে পারে। কার দুয়াের দাড়াবে, মা, ছেলেটাকে নিয়ে? তার চাইতে জামাইকেই বলল তুমি গিয়ে’-
৯৭
।
অচ্যুতানন্দের ধৈৰ্য্যচ্যুতি
অর্থাৎ তিনি শিখিয়ে দেছেন, করবে হাহাকার •
সুরবালা তঁারি কথা বলছে অনিবার
শ্বাশুড়ী ভয় দেখিয়ে দেছেন-পড়ে’ তারি গ্রামে
খুঁচিয়ে আমায় করলে সারা উদরাম্নের ত্রাসে।
কি হয়েছে আমার এমন, কি অনিষ্ট এতে ?
অকারণেই অবােধসম গেছি আমি তেতে’ ?
তা’ বৈ কি! তবু কেমন, কেমন যেন বিগুণ,
কি উদ্ভট অসঙ্গতির উদ্ভব হ’লল দেখুন ।
ইহারই নাম, স্বল্প কথায়, ঔদ্ধ দৈহিক ক্রিয়া-
ঢেকে দেয়া পরলােকের প্রতিবিম্ব দিয়া।
আমি একটি জ্যান্ত মানুষ স্নেহে এবং প্রেমে
যদিও চ মণ্ডিত নই রজত এবং হেমে ;
বৃহত্তম উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সর্বোত্তম স্বপ—
মিতাচারের ওপর থেকে ভদ্রজীবন যাপন ;
অবিলাসে পান ভােজন, আর অবিলাসী বেশ
অঋণী এই অবস্থাতেই জীবন করা শেষ।
তৎসত্বেও মানুষ বলে পরিচিত হওয়া,
ভালবাসা প্রদান করা, ভালবাসা লওয়া।
কিন্তু দেখুন, এই ব্যাপারটা মাঝে পড়ে হঠাৎ
আমার সন্তার কোমলতায় করলে শেলাঘাত
মানুষ আমি কতটা, আর যন্ত্র কতটা,
জানতাম নাকো, লেগে গেছে সেই বিচারের ঘটা।
এ-সন্দেহ করছে লােকে : লক্ষ্মীছাড়ার ঘরে
অন্ন-সঙ্কট যেমন, তার বুকের কুহরে
কশ্যপ ও সুরভী ৯৮ সম্মুখে, নাইকো স্নেহ-ভাবের দিকেও তেমনি হতশ্রী সে- বােধ নাই তার, বােঝে না সে কি ঘটে যে কিসে! দরিদ্র যে তার লােকের কাছে ইহাই প্রধান লাঞ্ছনা – আত্মা ইহার সজীব কি না তা-ও করা হয় বিবেচনা। এ-কথাটাও বিবেচ্য, আর এ-কথাটাও দামী ভেবে দেখুন, কি মূর্তিতে বিরাজিত আমি ওঁদের কি রূপ ধরে আছি ওঁদের স্নেহশীতল বুকে। শবাকারে নয় কি? ওঁদের কামনা তা নয়, তবু দুস্তর চিন্তা সেটা—খুব দেখাচ্ছে ভয়। মৃত্যু আমায় নিয়ে গেছে, পথে ওঁরা একা, জড়িয়ে আমায় পড়ছেন ওঁরা অদৃষ্টের এই লেখা ; এই ভাবেতেই দলভুক্ত হয়ে আমি আছি... সুখে রাখবাে স্ত্রী পুত্রে যাবৎ আমি বাঁচি। এবং রাখব অনেক টাকা বাক্সে দিয়ে চাবি অকালমৃত্যুর ভয়ে, ওঁদের ইহাই প্রীতির দাবি। মনে যা-ই থাক্, মুখে বলাই হৃদয়হীনের কাজ- কর্তব্যের দিকে আমার চোখ ফুটেছে আজ। ছেলের নামে পােয়াতি খায়—কথাটা খুব চটুল, কিন্তু চতুর অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত নয় ভুল। শুনতে মজা-সুরবালার এই যে তাড়স ভয়ের কেবল ছেলের চিন্তায় নয়, বেশীর ভাগই নিজের। যে আজ্ঞে, স্বার্থচিন্তা থাকেই সবাইকার... আচ্ছা আমুন, রাত হয়েছে—দেখা হবে আবার”। -
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.