Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Apurva Darshan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
APURVA DARSAN.
A
HISTORICAL POEM
OX A. VISIT OF KAIKOBAD, EMRE
DELHI, WITH HIS FATHERIC
BY
MOJA M M EL IK
অপূৰ-দশন
( কাব্য।)
{ দিল্লীশ্বর কেকোবাদ ও তৎপি ৰখৰ
খার সাক্ষাৎ।)
শান্তিপুৱ-নিবাসী
সীমােজাম্মেল হকর্তৃক
বিরচিত,
এবং
শান্তিপুর-মহম্মদীয় লাইব্রেরী হইতে
মহম্মদ রওসন আলি কর্তৃক
প্রকাশিত।
No text on this page.
উপহার
পরম হিতৈষী
যুক্ত আবদুল বারি মিঞা,
জাতৃবরের সুকোমল
কর-কমলে
এই
অকিঞ্চিৎকর পুস্তক খানি
কৃতজ্ঞতার
চিহ্নস্বরূপ আন্তরিক
ভক্তি ও শ্রদ্ধা
मर
সমর্পণ
কমিলান।
শান্তিপুর-নদীয়া।
১২৯২ সাল ; আশ্বিন।
মােজাম্মেল হক
No text on this page.
অপ-দশনা
(কাব্য)
প্রথম স্তবক।
দিল্লী-রাজপ্রাসাদ-বিলাস ভবন।
গভীর ত্রিযামা, ধর।
ঘুমে অচেতন,
নীরব প্রকৃতি বালা, মেদিনী, গান,
ভাখিল ব্ৰহ্মাণ্ড যেন নীরবতা। ব্ৰতে
ব্ৰতী, অহা বিশ্ব যেন শান্তিনিকেতন
দিবাভাগে উঠেছিল যেই স্থান হতে
ঘাের কোলাহল ব্যাপি বিশাল গগন
এবে নাই, প্রকৃতির এ দৃশ্য কেমন
চমৎকার, অভিনয় খিত্ত-বিনোদন #
অপূর্ব-দর্শন
১ম স্তবক
মৃদুল হিল্লোলে স্নিগ্ধ নৈশ সমীরণ
বহিতেছে স্তব্ধভাবে করিয়া লুণ্ঠন
কুসুম-সুরভি, সুখে প্রীতি-উপহার
প্রকৃতি সতীর পদে, (মন যােগাইয়া )
করে সমর্পণ, চিত না চাহে কাহার
সেবিবারে সে অনিল? হেলিয়া দুলিয়া
নহর নবীন দল গুলি তৰুশিরে
কে বলিবে কিবা সুখে নাচে ধীরে ধীরে।
দিসের পরিশ্রম-ভারে জীবাণ
পরিক্লান্ত ; অচেতনে শুইয়া এখন
নিদ্রার কোমল কোলে লভিছে বিশ্রা
দিবা অবসানে যথা বিহঙ্গ-নিকরে
নীরবে বিমল মুখে লভেরে বিরাম
শাখীর শাখায় কিম্বা কুলায় উপরে।
অথবা নবনীতুপ সম শিশুগণ
পিয়িতে পিয়িতে স্তন সুষুপ্ত যেমন।
৪
মধু-লােভে মত্ত হয়ে মধুকর গণ
দিবসেতে হৃষ্ট চিত্তে করয়ে ভ্রমণ
ফুলে ফুলে করি মধুময় গুঞ্জরণ,
১ম যুবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন
৭
আর না শ্রবণে পশে সে মধুর গান,
বিশ্ব বিমােহিত আহা করিয়া এখন
গয়না ললিত রাগে বিহঙ্গম গ্রাম,
ভুলিয়াছে শােক-জ্বালা শােকার্ত-হৃদয়,
প্রেমিক না করে আর প্রেম-পরিচয় ।
অনন্ত নীলিমাময় নভস্তল পর
নয়নের প্রীতিপ্রদ সুষমা-আকর
উজ্জ্বল চন্দ্রমা চাৰু কিরণে মেদিনী
হাসায়ে প্রশান্ত ভাবে যায় সুখে ভেসে,
বিভাের অমিয় পানে চকোর-রমণী
প্রেম-ভরে নৃত্য করে পতি-পাশে এসে।
শিখী যে প্রকার নব নীরদ নেহারি
ননে নিরত পুচ্ছ উল্লাসে বিস্তারি।
M
ভুবনমোহন রূপে অই শশধর,
আহ কি মাধুরীময় কম কলেবর,
অনুমান সুবিমল সােণার কমল
যেন নীল সরােবরে ( সরসি উজলি )
শােভিতেছে আহ কিবা কর সুশীতল,
চতুর্দিকে ঝলিতেছে নক্ষত্র মণ্ডলী
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
। ১ম স্তবক ।।
হীরক জিনিয়া জ্যোতি, যেন সুর সবে ।
ঘেরিয়া আছে রে বলি দেবে বাসবে।
নিরখি গগনে শশী যামিনী সুন্দরী
আহা কি মােহিনী বেশে সাল্লিয়াছে মরি,
ষােড়শী রূপসী ধনী চন্দ্রিকা বসনে
আবরি শ্যামল তনু, কণ্ঠে দুলাইয়া
তারকা-কুসুম-হার, আনন্দিত মনে
করে সম্ভাষণ নাথে বিরলে পাইয়া।
সরাতলে সিন্ধুজলে পৰ্বতে প্রান্তরে
{ ভ্রম জমে ) স্বর্ণ-ধারা টলন করে।
দিবসে সরসী-নীরে বিধু-প্রণয়িণী
নেত্রযুগ নিমিলিত করিয়া দুখিনী
ছিল বিমলিনা অতি, ঝর ঝর ঝরে
ডুবিয়া ভীষণতর শশাকের প্লাবনে-
ফেলেছিল নয়না কঁপি থর থরে
তমােময় হেরেছিল এ বিশ্ব নয়নে।
হয় কি বিরহ! বিপরীত গুণ তব
তাের স্পর্শে সুধা বিষ তুল্য অনুভব।
পোহায়েছে এবে তার দুখ-নিশীথিনী,
১ম স্তবক। ]
অপূৰ্ব্ব-দশন।
ফুরায়েছে কুমুদীর শােকের কাহিনী,
সুধাংশুর সম্মিলনে উল্লাস-অন্তরা,
হৃদয়-কবাট সুখে করি উদ্ঘাটিত
হানে মহাসুখে, বটে দুটি সহােদর।
কুমুদ নলিনী কিনহেক দুঃখিত
এ উহার দুখে, কঁদে বিরহে লিনী,
( আশ্চর্য্য সােদর-স্নেহ) হাসে কুমুদিনী ।
১০
এ মধুর নিশীথেও সাগর-প্ররস
জাহ্নবীর সহােদর। যমুনা রূপসী
সুনীলিম জলময় কম কলেবর
নিরমল চন্দ্রিকায় আবরি কেমন
জগতের ভুষ্টিকর শশাঙ্ক সুন্দর
সযতনে সৰ্ব্ব অঙ্গে করেছে কারণ,
অনংখ্য লহরী শিরে অসংখ্য চন্দ্রিমা
মরি কি সুরম্য শােভা পূর্ণ মধুরিমা।
উপহাসি প্রীতিকর বীণার সুতানে
কল স্বনে হৃষ্ট মনে সুমধুর গানে
অদূরে বিমােহি বিশ্ব নাচিয়া নাচি।
প্রণয়-পিপাসাভরে সাগর-সদনে
চলিছে নিয়ত নব যৌবনে পশিয়া,
অপূর্ব-দর্শন
কে রোগে সে প্রেম-স্রোত? কে হেন ভুবনে ?
এ বিশ্ব ধরণীধামে টিনি! নিশ্চয়
অকৃত্রিম চিরস্থায়ী তোমারি প্রণয়।
১২
কাতারে কাতারে নীল যমুনা-জীবনে
ভাসিতেছে জল্যান সজ্জিত কেতনে,
তরঙ্গের তালে তালে নাচিছে তরণী,
নাবিকেরা তাহে সবে মুখে নিদ্রা যায়,
যেন রে পাড়ান
ঘুম প্রকৃতি আপনি
আদরে তাদিগে, সুখী তারাই ধরায়।
এই যমুনার কূলে এ চঁদনী রাতে
গেয়েছিল বংশীধর বাঁশী লয়ে হাতে।
সমুন্নত সুপ্রশস্ত প্রাচীর বেষ্টিত
চতুর্দিকে দিল্লী মহানগরী শােভিত,
কত শত রম্য হৰ্ম আছে দাড়াইয়া
কি এক অপূৰ্ব্ব শােভা করিয়া ধারণ,
চন্দ্র কর তাহে প্রতিফলিত হইয়া
দ্বিগুণ সৌন্দৰ্য নেত্ৰ-মানসরঞ্জন
বাড়ায়েছে এবে অরো, সৰ্ব্ব নিকেতন
রৌপ্য বিমণ্ডিত যেন ভবে অতুলন ।
১ম স্তবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
১৪
শোভিছে তােরণ শ্রেণী আহা কি সুন্দর,
অতি উচ্চ, বােধ হয় সুনীল অম্বর
চুৰ্ষিতেছে মেষরাশি করিয়া লঙ্ঘন,
উন্নত করিয়া শির গুঞ্জর-প্রকৃতি,
বিরাজে দুর্জয় দুর্গ ভৗষণ-দর্শন,
হেরি ভীত অনুক্ষণ অরাতি সংহতি।
মৃদু মন্দগতি নৈশ সমীর সঞ্চরে,
বিজয় পতাকা তাহে নাচে দম্ভভূৰে।
?
উলঙ্গ কৃপাণ করে দ্বেবারি।
দ্বার রক্ষা করিতেছে ভীষণ-দশ
কালান্তক যমদূত সম, দংশনে
সেই মূর্তি, দর্শনে কি? স্মরিলে অন্তরে
কঁপে তনু, লোমকূপ শিহরে সঘনে,
শােণিত বিশুদ্ধ হয় রক্তাধার পরে ।
নীরব, সমস্তু পুরী নীরব, কেবল
করিছে চীৎকার ধ্বনি প্রহরীর দল ।
কি আশ্চর্য্য!!!
কোথা হতে উঠিতেছে সংগীত লহরী
জিনিয়া সেতার কিম্বা মধুর বাঁশরী ?
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
| ১ম স্তবক।
কিবা মধুমাখা স্বর, শ্রবণকুহরে
অমৃতের ধারা যেন হতেছে বর্ষণ,
কেবা হেন আছে এই ব্রহ্মাণ্ড ভিতরে
শ্রবণে ও স্বর যার মুগ্ধ নহে মন?
যদি থাকে, বলি তবে তাহার হৃদয়
পাবাণ হতেও অতি কঠিনতাময় ।
১৭
তার চিত্ত আর সেই ভীষণ নিরয়
উভয়ই সমতুল্য নাহিক সংশয়।
হতভাগ্য সেই ভাবে যে মূঢ়ৈর মন,
সংগীত অমৃত-রসে নাহি মজে হায়,
বিমল আনন্দ সেই জানেন। কেমন ।
অই শুন গীতধনি শূন্যপথে খায় ।
কোমল বাছের সহ মিলাইয়া সুর
কোকিল কি কুহু স্বরে ঝঙ্কারে মধুর?
১৮
অপবা অমরপুরে বিদ্যারীগণ
সুর-সভাতলে করি পুলকে নৰ্ত্তন
পরেছে সুমিষ্ট তান, শ্রবণ-কুহরে
পশিতেছে তাই!! এই মর মেদিনীতে
নতুবা কে পারে প্ৰেমতলিত স্বরে
হেন মনােহর গীত সুতানে গাইতে?
অপূর্ব-দর্শন।
লালিত পঞ্চমে কিম্বা পূরিয়া সুতান
রাগিণী সুন্দরী গায় আরােহি বিমান ?
যেই খানে হইতেছে মধুর সংগীত,
গভীর অননে যুথা হতেছে ধ্বনিত
পাখােয়াজ, সুধাপূর্ণ কোমল নিকণে
সেতার জমরে গঞ্জি; মধুর সারঙ্গ,
বীণা যন্ত্র আদি বাজে, চলছে কম্পনে
চল ত্বরা দেখি গিয়া কি উৎসব রঙ্গ
এ ঘাের নিশীথে সেই ঘরে, কে এমন
অামােদ ছাড়িয়া করে অন্যত্র গমন ?
সুসজ্জিত রম্য হৰ্ম ত্যজি কোন্ জন
নিবসে তিমিরাত গভীর কানন ?
কেবা শুনিবারে চায় বয়সের গান
তেয়াগিয়া প্রীতিকর কোকিল কূজন ?
অমৃত ত্যজিয়া আ হলাহল পান
করিয়াছে কোন্ কালে কোন্ মৃঢ় জন?
গীত বাদ্যধ্বনি শুনে হয় অনুমিত
আমােদ-সাগর-বারি হইয়াছে স্ফীত ।
নয়নের তৃপ্তিকর অতি সুসজ্জিত
১৪
অপূর্ব-দর্শন।
{১ম স্তবক
হৰ্ম্মের ভিতরে মনােমুখে বিরাজিত
দিল্লীশ্বর কেকোবাদ ; নয়ন-রঞ্জন
তেজঃপুঞ্জ মহামূল্য বিবিধ রতনে-
মরকত মণি পান্না হীরক কাঞ্চন
বিজড়িঙ সিংহাসনে, অক্ষম বণনে
তার শােভা, যত প্রিয় বসন্তের সনে
আমােদ প্রমােদে মত সহাস্য আননে।
সারি সারি স্তম্ভশ্রেণী মরকতময়
শােভিতেছে, হেন মনে অনুমান হয়
সুস্থির বিজলিপুঞ্জ, ধদিয়া নয়ন
বাহির হতেছে অভা চির জ্যোতির্ময়,
আহা মরি সে আভায় সমস্ত ভবন
হইয়াছে প্রতিভাত অতি শােভাময়,
তমিত্র-বিনাশী দিনমণির কিরণ
পড়িলে উদ্দীপ্ত যথা অখিল ভুবন।
জ্বলিতেছে দীপাবলি করি বিতরণ
সৌরভপূরিত স্নিগ্ধ উজ্জ্বল কিরণ,
স্তন্ত হতে স্তম্ভান্তরে কুসুমের হার
শোভিতেছে, শােভিতেছে স্ফটিকের ঝাড়ে
হরিত লোহিত পত বিবিধ প্রকার
মন্তংক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
১৫
বরণ বিকাশি ; মুগ্ধ না করে কাহারে ?
শোভে যথা ইন্দ্রধনু অম্বর প্রদেশে
চিত্রিত বিবিধ বর্ণে মনােহর বেশে।
২৪
কুসুমের চিরচি সৌরভ সম্ভার
যতনে বহন করি আহা চারি ধার
মৃদুল মধুর স্বনে স্নিগ্ধ সমীরণ
করে বিচরণ সদা সহর্ষ অন্তরে,
নৌরভেতে আমােদিত বিলাস-ভবন,
আতর গােলাপ আরাে সুগন্ধ বিতরে। '
কি ছার ইহার কাছে মলয় পবন
মধুমাসে তােযে যবে জগত-জীবন।
কনকের কাৰু কাৰ্য-করা সুকৌশলে
শােভে চা চন্দ্রাতপ, জ্বলে মধ্যস্থলে
সমুজ্জ্বল মণি, যথা মুবান্ধব
তারকা প্রকর মাঝে সুনীল গগনে।
আরো কত রহিয়াছে বিলাস-বৈভব
কে পারে বর্ণিতে? হেরে এ সব নয়নে
কে ইচ্ছে ব্রিদিব ? আর ত্রিদিব কোথায় ?
বিরাজে ত্রিদিব এই সৌধেতে ধরায়।
অপূর্ব-দর্শন।
15भरक
৫
বসেছে সম্রাট উজলিয়া সিংহাসন,
শিরসে উষ্ণীষ শােভে জগত-লােভন,
প্রশস্ত ললাটদেশ, বঙ্কিম মূরতি,
শরীর আরত নানা রত্ন আভরণে,
নবজাত শুশ্রদল সুকোমল অতি
শােভা পাইতেছে কিবা সুন্দর বদলে।
অতুল সে রূপরাশি নবীন যৌবন,
ধরণীর বক্ষে যেন মধু-আগমন ।
২৭
ত্রিদিবঈশ্বর আহ। দেবরাজ-লে
যেমন সুন্দর পারিজাত মাল দোলে,
তেমতি সৌরভময় কুসুমের হার
দুলিতেছে কণ্ঠদেশে গাঁথা সুচিকণ,
সুচাৰু চামর করে লয়ে অনিবার
সযতনে করে বা মৃদু সঞ্চালন
ঢুলায় চামরী, যেন বিদ্যাধরী বালা,
কবরী
কুসুমে ঘেরা গলে পুষ্পমালা।
বাজিছে বিবিধ বাদ্য বীণা মনােহর।
বিমােহিত করি চিত বাজে সপ্তস্বর,
শরদিন্দু-নিভানন তনু হেমময়,
54
১ম যুবক। অপূর্ব-দর্শন।
বিলাসিনীবৃন্দ আহা গলা মিলাইয়া
বাদ্যের স্বনন সহ গীত মধুময়
গাইতেছে সমস্বরে চিত্ত-বিনােদিয়া,
মধু-সমাগমে যথা মধু-অনুচর
মনােমুখে তৰুশাখে গায় নিরন্তর।
২৯
অই শুন বীণাপাণি বীণাস্বর জিনি
ছাড়িছে সুন্দরী কিবা ললিত রাগিণী;
শুনিয়াছি আহা! কত যন্ত্রের বাদন,
শুনিয়াছি মুরলীর মােহন ঝঙ্কার,
কোকিল-কাকলী কত করেছি শ্রবণ
সুখের বসন্তে নব পল্লব মাঝার।
কিন্তু কভু শুনি নাই এহেন সংগীত,
স্বরাসম্ভব ধনি বুঝি নিশ্চিত।
আহা মরি কি মাধুরী রম্য অভিনয়,
দেখহে কল্পনা-নেত্রে ভাবুক-নিচয়,
বিদ্যুৎ-বরণময়ী যতেক সুন্দরী
সংগীত-সাগর মাঝে হয়ে নিমগন
নাচিতেছে, তুলিতেছে সুকণ্ঠ-লহরী,
হুরষে মৃণাল-ভুজ করে আন্দোলন।
অপূর্ব-দর্শন।
{১ম যুবক।
তালে তালে ফেলিতেছে চঞ্চল চরণ,
তালে তালে হইতেছে ভূষণ-সিঞ্জন।
কি ছার মাণিক্য মণি মুকুতার হার ?
গলে দোলৈ ফুলমালা মোহন বাহার,
বিজড়িত আরো চাৰু অসিত কুন্তল
সুবাসিত চিররুচি ফুলের মালায়,
অনুমান হয় যেন চপলা চঞ্চল
ঝলমল করিতেছে কাদম্বিনী-গায়।
পৃষ্ঠে বিলম্বিত বেণী ফণিনী-গঞ্জন,
নিবিড় নিতম্বদেশ করিছে চুম্বন।
মোত আকাশ-ভালে চন্দ্রের উদয়ে
অসংখ্য হীরক খণ্ড তারকাশনচয়ে
জ্ঞান হয় হারাইয়া সমুজ্জ্বল জ্যোতি,
রমণী সবার চাৰু সৌন্দৰ্য-প্রভায়
ইয়াছে হীনপ্রভ হায় রে তেমতি
প্রদীপনিকর মরি যেন বা লজ্জায় !
যেই রমণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করি,
বােধ হয় সেই গনী অপূর্ব সুন্দরী।
এই বার একবার কর প্রদর্শন
১ম স্তবক।]
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
১৯
মানস-মােহন দৃশ্য নয়ন-রঞ্জন,
এই দেখ বিমােহিনী যতেক অপর
ভাব-রসে মজাইয়া সম্রাটের মন
কোমল কমল হাত করে ধরাধ
সকলে অনন্যমনে করিছে নৰ্ত্ত
গায়িছে অতপূৰ্ব গাথা সুললিত,
•প্রতি গাথা নব সুখে করে শস্ফীত।
৩৪
পরম সুষমাকর কৌশেয় বসন
দ্বিগুণ লাবণ্য জ্যোতিঃ করিছে বর্ধন
রমণী সবার, চাৰু চুমকীর কাজ
বিচিত্ৰ ৰসনে কিবা চিকমিক করে,
আহা যথা ঝলমলে তারকা সমাজ
যামিনীর সমাগমে সুনীল অম্বরে,
দীপের আলােক তাহে হইয়া পন
করিছে কি বদনের শোভা সাধন।
৩৫
নেই বিনা কেবা ইহা প্রকাশিত কৰে
কি বাহার চমৎকার এ আনন ধরে ?
যেই জন দেখিয়াছে হইতে পতন
অৰুণ কিরণ ভাতি প্রভাত সময়ে
সৱােৰর-সুশােভিনী কবিকুল-ধন
অপূর্ব-দর্শন।
[১ম স্তবক
আহা মরি কমনীয় কমল নিয়ে ।
কিম্বা যেই দেখিয়াছে করিতে ভ্রমণ
চাদের কিরণ-তলে রমণী-রতন।
অনিন্দ-প্রতিমা গুলি বেড়ায় নাচিয়া
রূপের মাধুরী কিবা দেখ নিরখিয়া,
সৰ্বাঙ্গ সৌষ্ঠবময় ; ও মুখ-সুষমা :
কাহার সহিত আমি দিব রে তুলন?
কিসে উপমেয় বল শারদ চন্দ্রমা,
যাহার হৃদয়ে কালি-কলঙ্ক স্থাপন !!
ধন্য ধন্য বিধাতার দৈব কারিগরি,
ছাঁচেতে গড়েছে যেন যতেক সুন্দরী : :
মধুময় ও আনন মধুর আকার,
তাই আহা কমলিনী-ভ্রমে অনিবার
মধুকর ভমে অই চাৰু মধুমুখে
আসব-আশয় করি সুকণ্ঠ অনন,
তাই দেখ সুরসিক সমীরণ সুখে,
পরিহরি সুখ-ধাম মলয়-ভবন
গােলাপ রজনীগন্ধা মালতী-চুম্বনে
তুচ্ছ করি ভ্রমে সদা ও ফুল আননে
১ম স্তবক।]
অপূর্ব-দর্শন।
২১
নেত্ৰময় হত*যদি সৰ্বাঙ্গ আমার,
অনন্ত অাকাশ-অঙ্গে যেমতি প্রকার
তারাদাম ; তবে অই বিজলী-গঞ্জন
অলৌকিক আভামরী লাবণ্য-এতিম
নিরখি দর্শন-তুষ। হ’ত নিবারণ।
বিশ্ব-বিনিঃসৃত গীতি মনােরম
সুতৃপ্তি লভিত চিত করিয়া শ্রবণ
হায় রে হত যদি সহস্র শ্রব ।।
হলিত বদন-ইন্দু পানে যত বার
রীক্ষণ করি আহা মানলে তমার
: নব কত ভাব হয় সমুদিত,
সে ভাব চিন্তিতে গেলে হৃদয়-আগার
চিন্তার প্লাবনে হয় বিষম প্লাবিত,
সে ভাব অপূৰ্ব ভাব কি সাধ্য আমার
প্রকাশ করিয়া বলি, চিরদিন তরে
অন্তরের ভাব গুপ্ত রহিল অন্তরে।
৪০
-
পাঠক! অন্তরে তব তৃপ্তি না জলি,
আমারো মনের দুখ মনেই রহিল,
হায় রে হতাম যদি পটু চিত্রকর,
অপূর্ব-দর্শন।
[ ১ম স্তবক
তা হলে পাঠক! তুমি চাৰু চিত্রপটে
দেখিতে এখনি এই দৃশ্য মনােছর
কি ভাবে রঞ্জিত করি তােমার নিকটে
ধরিতাম, কিম্বা যদি হইতাম কবি,
দেখিতে অপূর্ব সাজে এ নবীন ছবি ।
৪১
মরি কি নিরখ অই বসন্ত-রূপিনী
স্বরগ-বাসিনী কটী অমর-কামিনী,
রঞ্জিত তাম্বুল রাগে অধর যুগল,
বাসিত কুসুম-তনু নবীন যৌবনে
করিতেছে ঢল ঢল ; জিনি নীলোৎপল
বিস্ফারিত নেত্র ; হানি করে কত জনে
বিহত-চৈতন্য অই কটাক্ষ শায়ক,
চরণে নূপুর বাজে সন্তোষদায়ক।
82
নৃত্যপরা সুভাষিণি লে সুরসুন্দরি !
অজস্র ধারায় গীত বরষণ করি
বিলাসী সম্রাট কাছে ; সফেন বদন
হইয়াছে; তথাপিও নই কি কাতরা ?
আসন্ন তােমাদের নহে দেহ মন
অবিরত নেচে নেচে ? ধন্য গাে তোমরা ।
১ম স্তবক। ] অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
নাচ, গাও প্রেম-গান, তােষ লো রাজনে
কুমুদরঞ্জন আছে এখন গগনে ।
৪৩
অাবার-আবার বলি যতেক ললনে !
রক্তিম অধর যুগে সরােজ-বদলে
ভুবন-ভুলান হাসি, বাহে মননামাঝে
চন্দ্রিকার ভাতি বলি জনমে বিভ্রম,
মাধি মাতোয়ারা আজ কর নররাজে,
খুলে দেও মনেপ্রাণ, গীত মনােরম
গাইয়া ললিত রাগে মাধুৰ্য-মিশ্রণে
নাচাও গাে চিত্ত নাচি ভঙ্গিমার সনে।
৪৪
প্রস্তর-প্রতিমা-তুল্য অচল সুস্থির
পিয়িছেন বাদশাহ যত রমণীর
গীতামৃত, আহা মরি দুইটী নয়ন
অর্ধ বিকশিত চাৰু কুসুমের প্রায়
করিতেছে ঢুলু ঢুলু ; ঠিকরে তেমন
মাতালের চক্ষু যখ বিঘোর নেশায় ।
প্রমােদ-পয়ােধি-নীরে হয়ে ভাসমান
অনুক্ষণ হেরে সর্ব বামার বয়ান।
৪৫
বিলাসী যুবক! রাজ-কাৰ্য্য পরিহরি
অপূর্ব-দর্শন। [ ১ম স্তবক
রমণীর সহবাসে দিবা বিভাবরী
জঘন্য আমােদে মত্ত্ব থাকা অবিঙ্গত
সাজে কি তােমারে ছি ছি ? কি কুহকে বল
ভুলিলে হে একেবারে জীবনের ব্রত?
দেখিছ না রাজ্য তব পূর্ণ বিশৃঙ্খল ?
দেখিছ না দুরাশয় নিজাম * ঘৃণিত
স্বীয় ভাগ্য প্রসন্নতে কত লালায়িত ?
৪৬
অই যে দেখিছ ভব সংসদগণ,
পয়ন সুহৃদভাবে যাহর এখন
বহুবিধ রাজকীয় পদে বিরাজিত,
মধুমাখা সুতিবাদে প্রতিপলে হায়
আকাশের চাঁদ আনি করছে অর্পিত
তব করতলে কিবা দিবায় নিশায়,
ঘ কার্য সাবিতে সুধু ; ওদের হৃদয়
প্রপূরিত কালকূটে কটু অতিশয় ।
৪৭
মুখ তুমি ভ্রান্তমতি ! এখন জান না?
যত অহিতাথী খল আস্ফালিয়া ফণ।
-
* নিজাম উদ্দীন
ধূৰ্ত্ত-প্রধান কপট
স্বার্থপর (কেকোবাদের) মন্ত্রী।
১ম স্তবক। ]
অপূর্ব-দর্শন।
গােপনে গােপনে ভ্রমে (কুরঙ্গ-জীবন
বধিতে নিঃশব্দ পদে বেড়ায় ভ্রমিয়া
নিদয় কিরাত যখ কাননে কানন )
দেখিবে সুযোগ যবে ভীম গরজিয়া
দংশিবেক, সাবধান মেলহে নয়ন,
অরাতির করে তব বিন্যস্ত জীবন ।
৪৮
কত শত নরপতি ধরায় জনমে,
যাহাদের ভয়ঙ্কর দোর্দণ্ড বিক্রমে
কাপিল সসিন্ধু ধর (যবে উদে মনে)
অদ্যাপিও কাপে ক্ষিতি, করিলা স্থাপন
অনশ্বর কীৰ্ত্তি কত, এই সিংহাসনে
বসিয়া শাসিলা পৃথী কত মহাজন,
লভিলা অক্ষয় যশঃ, কিন্তু কেবা বল,
দিবানিশি উজলিল রমণী-মহল ?
৪৯
ভবিষ্যত অন্ধীভূত ওরে রে অজ্ঞান !
একবার চিন্তিলে না নিজ পরিণাম ?
এমনি আমােদে সুখে কাটাবে জীবন
এমেও দিও না স্থান এ চিন্তারে চিতে।
কি যে বিষময় ফল হবে উৎপাদন
হায় তব এই ভােগ বিপ্লস হইতে,
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
[ ১ম স্তবক।
বুঝিবে তখন করিবে হে হাহাকার
বহিবে হৃদয় প্লাবি উষ্ণ আধার ।
অহে---রাজনীতি-বিশারদ স্বর্গীয় ভূপতি *
সমরে শমন সম, বীৰ্য্যবান অতি,
মাহ-তপন যিনি পরাক্রম যায়,
রাজপুত--মহাযোদ্ধা যে জাতি যহীতে,
রাঙ্গণে পরাভব মনে বারংবার,
যার অনিবার্য বো না শরি সহিতে ।
সর্ব স্থলে শান্তি-পা করি বিতরণ
বিশাল ভারত-রাজ্য করিল শাসন।
ভবিতব্যতার কথা কে জানে ভুবনে ?
হল তার সমগত অহা কি ক্ষণে
জীবনের শেষ দিন, করিল। অর্পণ
কি গুণ দর্শন হেন অর্বাচীনে হায়,
ভারতের রাজ-দণ্ড, ছ, সিংহাসন!!
সেই শান্তিময় রাজ্য অরাজক প্রায়।
নিজে গা মুবরাজ তথা সভ্যগণ,
যেমন দেবতা তার নৈবেদ্য তেমন।
ইতি প্রথম স্তবক।
* বলবন বাদশাহ।
দ্বিতীয়-স্তবক
দিল্লী রাজদরবার
বিরামদায়িনী বিভাবরী সতী
দিল্লী পরিহরি যাইল এবে।
তিমির সভয়ে মরি কি দুর্গতি,
দুরে পলাইল প্রমাদ ভেবে।
তারকার পতি হয়ে হীনভাতি
মুদিছে নয়ন বিষাদ-ভরে।
তেল ফুরাইলে অাহারে যেমতি,
নিবু নিবু ভাব প্রদীপ ধরে।
পূর্ণ কলানিধি আকাশ-সাগরে
কালের শাসনে পাইয়ে তাপ।
ছাড়ি প্রাণােপম প্রিয় পরিবারে
বিষন্ন বদনে দিলরে ঝপ।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
{ ২য় স্তবক।
শশীর এ ভাব দেখিয়াও হয়
বিভব-গতি যতেক নয়ে।
চিরদিন কভু সমান না যায়,
ভ্রমেও এ কথা মনে না করে।
দয়িতের দুখ দেখিয়া নয়নে
কাতর-হৃদয় কুমুদ বালা,
নধর শরীর যেতেছে শুকায়ে
ভেবে ভেবে ভাবী বিরহ-জ্বালা।
ঝর ঝর ঝরে উরস প্লাবিয়া
নিয়ত ঝরিছে শােকাজাল।
হায় রে রূপলী সরনী-ভবনে
নিরখে এখন সকলি কাল ।
৪
মায়াবী নিশার অমােঘ মায়ায়
স্পন্দনরহিত শবের মত।
আপনা ভুলিয়ে ভুলি প্রিয়জনে
শয্যাশায়ী জীব ছিলরে যত।
সে মায়া-নিগড় কাটিয়া এখন
উঠিল সকলে হরষে মাতি।
নববাৎসাহে শবে কে যেন জাগায়ে
জ্বেলে দিল মনে সুখের বাতি।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
বিহঙ্গমচয় ত্যজিল কুলায়,
কুজনি মধুর মধুর স্বরে।
দ্রুততর পক্ষে ছুটে শূন্য কক্ষে
দিগদিগন্তরে আহার তরে।
তাপস নিচয় প্রভাত দেখিয়া
জগদীশ-প্রেমে মজায়ে চিত,
একতান মনে করে উচ্চারণ
পূত বিভু-নাম-পবিত্র গীত।
চক্রবাকী ধনী দেখিল রজনী
প্রভাত হইল, সময় বুঝে,
প্রেম-অনুরাগে চঞ্চলা বিহ্বল।
স্বীয় প্রাণনাথে লইল খুজে।
ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব দরিদ্রে লভিলে
তার মনে সুখ না হয় যত,
ততােধিক অই বিহঙ্গ-দম্পতি
সুখী হয়ে প্রেম-আলাপে রত ।
৭
দিল্লী তােলপাড়ি অতি ঘাের রােলে
বাজে বাদশার প্রভাত-ভেরী,
| ২য় শুবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
গগন ছাইয়া ভীম তােপধ্বনি
উঠিছে শ্রবণ বধির করি।
দূর-হতে হয় অনুমান হেন
অশনি-সম্পাত বিমান পথে,
চকিতে চমকি কাঁদিয়া উঠিল
সুপ্ত শিশু শুনি শয়ন হতে।
প্রমােদ কানন করিয়া উজল
ফুটেছে বিবিধ বরণ ফুল ।
পরিমল-লােভে হইয়া চঞ্চল
ভ্রমে ফুলে ফুলে মধুপ কুল ।
গুণ গুণ গুণ করি কুতুহলে
সমস্বরে থরে স্বভাব-ধীত।
কি যে এক ভাব বিরাজে সে রবে,
শুনিয়ে অখিল জগত প্রীত।
করি ঝির ঝির বিলাসী সমীর
সুগন্ধ আতরে আবৃত হয়ে,
বহিছে, পরশে শীতল শরীর,
সেবি সুখী মানে মানবচয়ে ।
বন্যাসনে আহা কতই ভঙ্গিতে
প্রকৃতি ধনীর আদুরে মেয়ে
২য় স্তবক।]
অপূৰ্ব্ব-দর্শন
৩১
নাচে ফুলবালা স্ফুরিত আননে,
দেখরে ভাবুক দেখরে চেয়ে ।
১০
মৃদু কলম্বনা শ্যামাঙ্গী যমুনা
চলিছে যেনরে উচ্চারি মুখে
কল কল কল প্রেমের সংগীত,
ললিত লহরী রিয়া বুকে।
অথবা সে গীত কিযে ভাবময়,
কি তার মরম কে জানে হয়।
বােবার স্বপন সে চায় জানিতে
ও কল-তান যে বুঝিতে চায়।
১১
পূৰ্ব গৃহ ত্যজি ক্রমে দিনপতি
মনােহর বেশে আইল চলে
প্রভুর আদেশে, দ্রুত পদে অতি
কিরণ ছড়াতে ধরণী-তলে।
আলােক পাইয়া হাসে চরাচর,
হাসে বৃক্ষরাজি প্রকৃতি হাসে।
হাসিয়া ব্যাকুল যমুনা-লহরী,
দিক-বধূ হাসে রঙ্গিল বাসে ।
১২
শ্যাম দুৰ্ব্বাদল ক্ষেত্রের উপরে
অপূর্ব-দর্শন।
[ ২য় স্তবক
সুগোল নিহার শোভিছে থরে,
কিবা নিরমল করে টল মল,
ইচ্ছা হার গেঁথে বালার পরে।
তাহাতে লােহিত অৰুণ-কিরণ
পড়িয়ে ধরেছে কি চাৰু শােভা।
অলকায় যেন কুবেরের ধন,
কমনীয় শােভা জগত-লােভা।
কনক কিরণ যমুনা শ্যামারে
মরিরে সুশোভা দিয়েছে কিবা ।
এই এক রূপ, পরে চাৰুতর,
ক্রমশঃ ফুটিছে রূপের বিভ ।
ঢলাঢ়লী করি কনক লহরী
ছুটিছে পড়িছে সৈকত’পরে ।
এ ভাব নিরখি ভাবুকের মন
স্বতই উথলে ভাবের ভরে।
১৪
হায় সহােদরা কুমুদীর দুখে
নলিনীর বুঝি গলেছে মন।
তাইতে ভাসিছে আঁখি-নীর-স্রোতে,
তাইতে অভাগী কাঁপিছে ঘন ।
অথবা কে জানে বলিব কি করে,
২য় স্তবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
এ ভাব কিছু না বুঝিতে পারি।
প্রাণেশ-মিলনে নাচি বায়ুভরে
ফেলিছে অপার আনন্দ-বারি।
যা কলপনে! ও কথায় আর
কোন প্রয়ােজন নাহিক এবে।
ক্ষেপণ করনা অমূল্য সময়
এই কথা বৃথা মনেতে ভেবে।
বড়ই বাসনা হয়েছে মানসে
জানিতে হে শুভে বল স্বরূপ।
কোন্ ভাবে এবে কোথা বিরাজিত
কেকোবাদ সহ ভারত-ভূপে।
একি এ নিরখি ? এযে অতীব বিস্ময় !!
সমাঝে দিল্লীপতি ? সৌভাগ্য সভার,
সৌভাগ্য প্রজার আজি ; প্রাতে বােধ হয়
মুখ দেখেছিল সবে কোন মহাত্মার ।
নয়ন ! হেরিছ একি প্রকৃত ঘটনা ?
স্বপন-সদ্ভুত কিম্বা অলীক ব্যাপার ?
অথবা মায়াবী কেহ করিতে ছলনা
পেতেছে এ ইন্দ্রজাল সন্মুখে তােমার ?
ওঃ অপূর্ব-দর্শন। ২ নতুবা রে যে যুবক-বিলাসী প্রবর- ইন্দ্রিয়-সুখ-সম্ভোগ, ঘৃণিত আমােদ, জীবনের সার ব্ৰত; সুখের আকর বলিয়া অন্তরে যার চির দৃঢ় বােধ- ডবায়ে বিস্মৃতি-নীরে প্রজানুরঞ্জন নিয়ত নিবসে যেই রমণীর সনে, সভাস্থলে আজ তারে করিব দর্শন, ভাবে নাই এক জনাে একথা স্বপনে। ৩ বতন খচিত হেমময় সিংহাসনে, যার তেজে প্রতিহত ভানুর কিরণ, বিয়াজে সম্রাট আজি অতি শুভক্ষণে, দেখরে নয়ন ভােরে নাগরিকগণ । তামস ভবন ত্যজি বহু দিনান্তরে পূর্ণ কলা সুধাংশুর হয়েছে উদয়, মিটাও মিটাও সথ সুধা পান করে, আনন্দে মুতানে গাও চকোর নিশ্চয়। ৪ দিক-নিরূপণ-যন্ত্র-শলাকার মুখ দিগন্তরে ঘুয়ে দিলেও যে প্রকার, কি এক কৌশল ক্ৰমে উত্তরাভিমুখ
২য় স্তবক।
অপূর্ব-দর্শন।
( ঘুরিয়া ফিরিয়া শেষে) হয় পুনৰ্ব্বার,
যদিও
সভায়
ভূপ, কিন্তু তার মন
তেমতি বিলাসলিয়ে, প্রেম-পিপাসায়
শত ব্যবধান, তবু করে আকর্ষণ
সে চুম্বক তথা, ধন্য চুম্বক
তােমায়।
আহ কি সভার শােভা নয়নরঞ্জক
হেন রম্য সভা আর আছে কি ভূতলে ?
স্থির চক্ষে শূন্য মনে অসংখ্য দর্শক
তাই দেখ নিরীক্ষণ করে দলে দলে ।
অপার সৌন্দর্য-চ্ছটা করেছে বিস্তার
নয়ন বদিয়া অই সৌধ শােভাময়,
কে বলেরে ইন্দ্রালয় শােভার ভাণ্ডার ?
সুষমাতে অবশ্যই মানে পরাজয় !!
মানস চঞ্চল যদি পাঠক। তােমার
হয়ে থাকে এ মনােজ্ঞ শােভা নিরখিতে,
কনা-দর্পণ খানি খােল একবার
সব বিভাসিত তব হইবে আঁখিতে।
অই দেখ উদ্ধভাগে সুশােভে কেমন
কৰুময় চন্দ্রাতপ উজ্জ্বল রক্তিমা,
৩৬
অপূর্ব-দর্শন।
[ ২য় স্তবক।
বিখ্যাত ভারতের শিল্পকরণ
প্রকাশ করেছে যাহে নৈপুণ্য-মহিমা।
অই দেখ কি সুন্দর মৌক্তিক ঝলর
প্রাসাদের চারিদিকে, স্বর্ণ স্তম্ভকোলে
গ্রথিত সুবর্ণ তারে, নেত্ৰ-সুখকর !
ঈষৎ বাতাসভরে মৃদু মৃদু দোলে।
চেয়ে দেখ নিম্নে পুনঃ গালিচা বিস্তৃত,
পুষ্প, লতা, পাতা তাহে চিত্রিত কেমন !
কে সহসা পারে পদ করিতে স্থাপিত ?
পুষ্প লতা পাছে হয় চরণে দলন।
b
সিংহাসন পার্শ্বদেশে দাড়ায়ে দুজন,
তাহারাও পরিচ্ছদে সজ্জিত সুন্দর,
নীরব নিস্পন্দ, করে করিয়া ধারণ
কনকের বিনির্মিত বিচিত্র চামর,
বিনম্র ভাবেতে বাহু করি সঞ্চালিত
করিছে ব্যজন, কভু নাহিক বিরাম,
কি সুবাস কিবা শৈত্য তাহে বিরাজিত,
সেবিলে জুড়ায়ে যায় তপ্ত মর্মস্থান!
বাদশাহ-রতিপতি যেন সিংহাসনে,
২য় স্তবক। ]
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
৩৭
শোভিতেছে মণিময় মুকুট মাথায়,
আহা কি অধিকতর উজ্জ্বল বরণে
মধ্যমণি শােভে অই জিনিয়া সবায় !!
শুকতারামণি যথা অাপন গৌরবে
রূপে ঝলমলি শােভে উবার ললাটে,
প্রিয়ার দর্শন
হেতু
দিনমণি যবে
প্রভাতে অতীব ব্যক্তে পূর্ব দ্বারােদ্ঘাটে।
যামিনীর জাগরণে যুগল নয়ন
লােহিত বরণ জবা ফুলের আকার,
নিৰ্ণিমেষ, একটাও স্ফরেন বচন,
অন্তর হয়েছে মহা চিন্তার আধার।
আজকে করিবে যুব দর্শন কেমনে
পিতার সহিত, তাই মুহুর্ত্তেক তরে
ভুলেছে সে বিলাসীতা সুখের স্বপনে,
অতীব বিকল এই ভাবনার ভরে।
নিজামের গুণপনা করিয়া বাখান
এক বার ভাবিতেছে অজ্ঞান ভূপতি,
ঠিক এর মৰ্মোদ্ভেদ করেছে নিজাম,
আমার এ পদ লাভ আশে বঙ্গপতি,
তাই উপনীত হেথা, এ সম্পদ সুখ
অপূৰ্ব্ব-দর্শন। | ২য় স্তবক
ভুঞ্জিবার তরে আহা বিশাল মহীতে
কোন্ জন আছে হেন না হয় উৎসুক?
কাহার অৰুচি হয় পীযূষ পিয়িতে।
তা যদি না হবে তবে কেন বঙ্গেশ্বর
সংখ্যাতীত সৈন্য সহ করে আগমন ?
যদ্যপি সরল হত তাহার অন্তর,
এত সৈন্যে ছিল তবে কোন্ প্রয়ােজন?
বুঝিয়াছি অভিসন্ধি, সাক্ষাতের ছলে
করিবে আমারে কোন রূপে শৃঙ্খলিত,
পুত্র বলি বধিবেনা, এরি কায়াতলে
সাধন করিবে স্বীয় কাৰ্য মনােনীত ।
}
“তবে কেন সাধ করে জীবন হারাতে
শার্দ ল-কবল মাঝে করিব গমন ?
কে গরিতে চায় কাল বিষধর হাতে ?
অতএব সাক্ষাতের নাহি প্রয়ােজন।”
ক্ষণেকের ভরে যুব দিয়া বিসর্জন
এ চিন্তা বিস্মৃতি-নীরে, প্রবীণ পিতার
স্নেহপরিপূর্ণ সেই লিপির বচন
স্মরণ করিয়া মনে ভাবে অার বার।
২য় স্তবক।]
অপূর্ব-দর্শন।
৩৯
১৪
“না না না আমার এ যে কুবুদ্ধির ফের,
পিতা দেবতার তুল্য চির পূজনীয়,
জগতে পরম গুৰু, আহা সন্তানের
মঙ্গল কামনা যার চির বাঞ্ছনীয়,
তন্ন তন্ন করি খুজি অখিল জগত
• মেলে কি এহেন এক বন্ধু সদাশয় ?
কে আছেরে কুলাঙ্গার হায় মাের মত?
করিতেছি সেই পূজ্য পিতাকে সংশয় ?
“সেই দিন-জানিনাক-অক্ষয় অক্ষরে
লিখিয়া যা দেছে বিধি ভাগ্যেতে আমার
উদে যদি দিনমণি অস্তাচলােপরে
তথাপিও হইবে না খণ্ডন তাহার ।
তবে কেন আর আমি করি ভাবাগণ ?
অচিরে পিতার অজ্ঞা করিব পালন,
ইহাতে কাহার কোন বাধা শুনিবনা,
যে যা বলে কান পাতি করিব শ্রবণ।
“নিজাম উদ্দীন? কে ও মাের? মবির ?
চাহি না উহারে আর, অবশ্যই পাব
জ্ঞানে বৃহস্পতি ওর চেয়ে বিজ্ঞতর
৪০
অপূর্ব-দর্শন।
[ ২য় স্তবক
বহু মন্ত্রী আমি, আছে রত্নের অভাব
রত্নাকর গরভে কি ? ওর মন্ত্র-বশে
হইব না বশ, প্রতিবন্ধক উহার
মানিব না,” এইরূপ যুবার মানসে
চিন্তার উপরে নানা চিন্তার সঞ্চার ।
১৭
আবার নিরখ অই ক্ষুধার তাড়নে,
মাকড়সা লুতাজাল যথা বিস্তারিয়া
চেয়ে থাকে এক দৃষ্টে, সদা তার মনে
জাগে শীকারের আশা, ফণা অস্ফালিয়া
চিত্রার্পিত প্রায় তথা বসে সভাতলে
নিজাম জঘন্যমনা, অভাগা রাজনে
রাজ্যভ্রষ্ট করি রাজ্য স্বীয় করতলে
কিরূপে লইবে সদা মত্ত্ব সে চিন্তনে ।
নিভৃত ভবনে আহা কালি রজনীতে
নিরত আছিল অই পিশাচ পামর,
সুখের আকাশ-পুষ্প চয়ন করিতে
কিবা জাগরণে কিবা ঘুমে নিরন্তর ।
ভবিষ্যৎ-সুখ ভেবে দেখিয়! অন্তরে
হরষেতে হয়েছিল উৎফুল্ল নয়ন,
২য় যুবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
৪১
প্রভাতে কমল যথা ; হৃদয় ভিতরে
বয়েছিল দুরাশার প্রবল পবন।
কম্পমার স্বর্ণ পক্ষে আরােহি কখন
রাজ্য হতে দূরীকৃত করি কেকোবাদে,
লভিয়া নারকী রাজ্য, ছত্র, সিংহাসন,
পরম সুখেতে রাজ্য পালে নির্বিবাদে।
এবে দেখ সে আশায় হইয়া হতাশ
বসিয়া সভার মাঝে অবনত মুখ,
বদনেতে নাহিক সে আনন্দ-আভাস,
ঘন বহে শ্বাস, করে দুরু দুরু বুক।
কথঞ্চিৎ করি স্বীয় চিত্তের সংযম,
মােহিনী অাশার মন্ত্রে হইয়া মােহিত,
মনে মনে বলে, মম রে চাতক মন,
কেন রে অধৈৰ্য্য এত, কেন উৎকণ্ঠিত ?
প্রবল পিপাসা তব শান্তিবার তরে
দেখ না বিধাতা অই হইয়া সদর,
সুপ্রভাত আজি তাের—নব নীলাম্বরে
নবীন নীরদ খণ্ড করিল উদয়।
২১
“ অতএব নিদারুণ নিরাশ-সংগীত
৪
৪২
অপূর্ব-দর্শন
[ ২য় স্তবক
পাশরিয়া ধৈৰ্য্য-গুণ কর রে ধারণ,
ভাগ্যক্রমে যেই মেঘ হয়েছে উদিত,
তাহা হতে হইবেই বাসনা পূরণ
সাধন-বিটপে তাের ফল মনােমত
বহু দিনান্তরে আজ ফলিল রে প্রায়,
অশু যে ভারত তাের হবে পদানত,
আজকে হয়েছে তার প্রশস্ত উপায় ।
কিন্তু অই দুরবল যুবা, যেই জন
সম্পাদিতে কভু মাের কাৰ্য অভিমত,
করে নাই প্রতিবাদ ; কৰি বিচরণ
যেই মন্ত্রণার পথে, ভ্রমে অবিরত
মাের সাতে, কায়া সনে ছায়া যে প্রকার
ফিরে ধনী মুহুর্তৃেক বিচ্ছেদ না হয়,
ভাগ্য-বিড়ম্বনে হয় কিন্তু অভাগার
কি ভাবিয়া আজি তার করিল ব্যত্যয়।
• নাই বা মানিল-এই মন্ত্র-সভা-মাঝ
নাই বা মানিল আজ আমার মন্ত্র?
কি আশঙ্কা তাহে? এই সমুহৎ কাজ
সাধিবার তরে, হেন আছে কোন্ জনা
কাপুৰুষ, ভীমতি পরায়ূখ হয়
২য় স্তবক।]:
অপূর্ব-দর্শন।
৪ত
বদ্ধপরিকর হয়েছি যখন ?
পুষ্পঘাতে চুরমার যদি হিমালয়,
তথাপিও ভঙ্গ নহে আমার এ পণ।
২৪
“ এই যে মন্ত্রণ-জাল করেছি বিস্তৃত,
ইন্দ্রজালময় আমি অব্যর্থ কৌশলে,
অবােধ কুরঙ্গ হবে অবশ্যই স্বত
লােভেতে আকৃষ্ট হয়ে মায়া-মােহ ছলে।
কখনই—এই নীচ ঘৃণাস্পদ কাজ,
কখনই পিতা হয়ে পুত্র সন্নিধানে
হবেনা স্বীকৃত সেই বঙ্গ-অধিরাজ
তেজস্বী বাখৰ তীব্র লজ্জা-অভিমানে।
* তবেই উভয়ে হবে ক্রোধের অধীন,
যেই নিদারুণ ক্রোধে গেল ছারখার
কত নরপতি, কত সাম্রাজ্য স্বাধীন,
বাধিবেক পরস্পর সমর দুর্বার ।
সময় বুঝিয়া বজ-নাদে ভয়ঙ্কর
একি খগে দোহাকার নাশিব জীবন,
অস্ত যাবে উভয়েরি সৌভাগ্য-ভাস্কর,
অভীতি ব্ৰত মম হবে সমাপন।
০
৪৪
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
{ ২য় স্তবক
ওরে রে অধৰ্মচারি বিশ্বাস-ঘাতক।
কি কাজ ভাবিছ মজি মন্ত্রে দুরাশার ?
রাজদ্রোহী মন্ত্রী হয়ে ? কি ঘাের পাতক!!
কখন যাবে না খুৰ্ম্ম তাের পাপ-ভার।
অচিরে উচিত শাস্তি পাবি দুরাচার,
যেই শাখে রে পামর রয়েছ বসিয়া,
* তাতেই করিছ তীক্ষ্ণ কুঠার-প্রহার ?
জাননা কি ভূমে পড়ি যাইবে চূর্নিয়া ?
রে পতঙ্গ ক্ষুদ্র-প্রাণ তোরে আকর্ষিত
করিয়াছে মৃত্যু বুঝি, তাইরে ভুলিয়।
জীবনের পরিণাম, হতেছ ধাবিত
( পরম সুখাদ্য আলো মানসে চিন্তিয়া )
অই রে জ্বলন্তময়ী অগ্নিশিখা পান ?
জাননা কি হা নির্বোধ বিনাশে-জীবন
হুতাশনে? বড় তুষ্ট হারাতে প্রাণ !!
বুঝিনু নিয়তি-লিপি না যায় খণ্ডন।
২৮
ক্ষণেক নীরব সভা, নীরব সকলে,
স্থির ভাবে কত লােক আছে দাড়াইয়া
কৃতাঞ্জলিপুটে চেয়ে বসুন্ধরা তলে,
২য় স্তবক।]
অপূর্ব-দর্শন।
৪৫
নতভাবে, বোধ হয় বিজন বলিয়া,
প্রশান্ত সরসে ক্রমে তরঙ্গ উঠিল
যেন বিচঞ্চল সমীরণের তাড়নে।
অভিবাদনিয়া মন্ত্রী বলিতে লাগিল,
স্বীয় মনােমত কথা বিনম্র বদনে।
নরনাথ!
সাক্ষাৎ করাই যদি হইল নিশ্চিত,
এক নিবেদন তবে কর অবধান।
উচিত বিধান যাহা হবে সমুখিত
মনে তব, করিবেন তথা অনুষ্ঠান ।
পূরাতে দুরভিসন্ধি-বুঝিতে না পারি--
গুপ্তভাবে যদি নাহি থাকে লুক্কায়িত
তাঁর মনে খলতার তীক্ষ্ণ তরবারি,
বিশদ-উদার যদি হয় তাঁর চিত--
৩০
তবু সন্দর্শন কালে সন্মুখে সবার
পুত্র বলি পিতা তব আত্ম-অহঙ্কারে
কখনই রাখিবে না সম্ভম তােমার,
নিঃসংশয়ে আমি ইহা পারি বলিবারে ।
সুরক্ষিত হয় যাহে নিজের সম্মান,
তাহার উপায় আগে করহ চিন্তন।
৪৬
অপূৰ্ব্ব-দর্শন
বুঝে সহসা কোন কাৰ্য্য সমাধান
করিলে, শেষেতে সার বিলাপ লােদন ।
« সৃষ্টি হতে অদ্যাবধি মানব-সংসারে
পরম আদরণীয় প্রভু যেই জন,
প্রভুর সম্ভন রক্ষা যত্ন সহকারে
করিতে সকলে দেখ তৎপর কেমন।
উদ্ধত প্রকৃতি-বশে ঘাের অহঙ্কারে
ইহার অন্যথা করে যেই নরাধম,
অত্যাচারী প্রভুদ্ৰোহী জানিও তাহারে,
কে হেন কৃত ভবে আছে তার সম ?
৩২
“তাই বলি যবে হবে শুভ দরশন,
সম্মান দেখাতে সবে জনক, তােমার
স্থিরভাবে যুক্তকর হইয়া তখন,
প্রণত হইবে ভূমি-তলে তিনবার।
এইরূপ কাৰ্য্য যদি হয় সম্পাদিত,
দুদিক রক্ষিত হবে দেখ বিচারিয়া,
তাহার কর্তব্য যাহা হইবে পালিত,
তােমারে সম্রম ভবে যাইবে বহিয়া ।
‘যদি বল পূজ্যতম জনকের প্রতি
৪৭
২য় স্তবক।]
অপূর্ব-দর্শন।
কোন্ প্রাণে কোন মুখে বলিব পালিতে
এহেন নিষ্ঠুরাদেশ লজ্জাকর অতি,
এ কাৰ্য্য কি হয় দেহে জীবন থাকিতে ?
তােমার শাসনাধীনে কিন্তু যে দিবসে
করিয়াছে আরােহণ বঙ্গ-সিংহাসনে,
অবশ্য সে দিন হতে বিনত-শিরসে
বাধিত হয়েছে তব আদেশ পালনে।
৩৪
“ভেবে দেখ যেই জন পৃথী-অধিপতি,
যাহার অমিত তেজে কাপে ধরাতল,
যার পদে কত নৃপ জানায় প্রণতি,
শার্দল সমীপে যেন অজ দুরৰল !
উদয় ভূধরাবধি অস্তাচল হতে
আকাশের তলে হেন নাহি এক জন,
যার পদ-যুগ নাহি পূজে শ্ৰদ্ধাতে
উড়ায়ে হরষভরে যশের কেতন।
“দেবগণে আকাশের অন্তরালে থাকি,
বিজয়-কীৰ্ত্তন ঘর ঘােষে কুতুহলে,
পিঞ্জরে আপন মনে বসে গায় পাখী।
অধিক কি মহারণ্যবাসী পশু-দলে
৪৮
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
[ ২য় স্তবক।
F
সমভাবে করে যার মান প্রদর্শন, *
( হিতাহিত জ্ঞান যারা চির বিরহিত)
মানভ্রষ্ট হন যদি সেই মহাজন,
কি বলে জগত ভরে ? চিন্তার অতীত।
“হয় ত, হয় ত কেন? অম্লান বদনে,
আন্দোলিয়া তঁার মান-চ্যুতির বিষয়,
পৰু বচন কত উচ্চারণ করে
প্রজাগণ শত ধিক প্রদানে নিশ্চয় ।
যত দিন শূন্যপথে রবি তার। চঁাদ,
হিতাহিত বোধ ভবে রহে যত দিন,
ততদিন রহে তার সেই অপবাদ,
প্রস্তর-অঙ্কিত দাগ হয় কি বিলীন?
৩৭
“কি আর বলিবে দাস, ইচ্ছা অনুসারে
কর কাজ মহারাজ, কে আছে এমন
মকুলে, নিবারিতে পারে আপনারে ?
এ সংসারে হেন শক্তি ধরে কোন্ জন
* হস্তী সকল বাদশাহদিগের সম্মুখ দিয়া
যাইবার সময় সেলামের ছলে শুণ্ডোত্তোলন
করিয়া যাইত।
৪৯
২য় স্তবক। ] অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
রােধ করে তটিনীর প্রবল প্রবাহে ?”
নীরবিল মন্ত্রিবর এতেক কহিয়া,
চিন্তা-অবসন্ন চিতে চারিদিকে চাহে,
দীর্ঘ উষ্ণ শ্বাস ফেলে রহিয়া রহিয়া।
মৃগয়ু-অধর-চাপে কুরঙ্গ যেমতি
বীণার লহরীমালা করিয়া শ্রবণ,
ধত হয়, জড় সম হয়ে হীনগতি,
জানে না যে তীক্ষ্ণ শরে নাশিবে জীবন।
মন্ত্রীর কৌশলপূর্ণ এই বাক্যাবলী
মূর্ধমতি দিল্লীপতি তেমতি শুনিয়া
পূৰ্বের সে দৃঢ়ীকৃত সংকল্প সকলি,
প্রলােভনে মুগ্ধ হয়ে যাইল ভুলিয়া।
৩১
আছিল মুহূৰ্ত্ত আগে সম্রাটের মন,
অদম্য পাষাণ সম কাঠিন্য গঠিত,
অনুভব হয়েছিল ভঁহার এ পণ
অটল রহিবে কভু হবে না খলিত ।
কিন্তু রে সমীর যবে দুরন্ত প্রভাবে
বীর দাপে ক্ষিপ্ত প্রায় ভ্রমে অবিরল,
আর কি থাকিতে আহা পারে স্থিরভাবে
সরসী-আরসী খানি অতি নিরমল ?
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
[ ২য় স্তবক।
৪০
স্তাবকের স্তুতিবাদ শুনি স্থিরভাবে
অৰ্বাচীন সম্রাটের গলিল হৃদয়,
জ্বরমতি নিজামের স্মৃণিত প্রস্তাবে
সম্মতি দানিল দৃঢ় মানিয়া প্রত্যয়।
হায় কেকোবাদ! তব একি মতিভ্রম,
এই কি সভ্যতা ? এই শিক্ষা পেয়েছিলে ?
যশো-শশধর তব বিশ্বে নিৰুপম,
অকপটে কলঙ্কিত করিতে চলিলে ?
দ্বিতীয় স্তবক সমাপ্ত
তৃতীয়-স্তবক
দিল্লী -যমুনাতীর—বঙ্গাধিপের শিবির
দিবা অবসান প্রার, পশ্চিম গগন
শােভিত কি অপূৰ্ব্ব শােভায়।
হরিত লােহিত নীল বিবিধ বরণে
দৃশ্য গুলি কিবা শােভা পায় ।
ধন্য সেই চিত্রকর,—বিচিত্র কৌশল,
শক্তি তাঁর চিন্তার অতীত।
কেমনে বুঝিবে বল ক্ষুদ্রমতি নর,
চির তত্ত্ব-জ্ঞানবিরহিত।
२
জীবগণে পীড়নিয়া প্রচণ্ড বিক্রমে
প্রভাকর শাসিয়া ধরণী।
প্রাচীন বয়সে এবে বীরত্ব হারায়ে
শক্তিহীন অচল ধমনী।
অই দেখ ধীরে ধীরে আপন শিবিরে
ক্ষুন্ন মনে ক্লান্ত কলেবরে
৩য় যুবক।
অপূর্ব-দর্শন
যাইতেছে শান্তিলাভ করিবার তরে,
অস্তাচল-শিখর উপরে।
উত্তপ্ত পৃথিবী এবে হইল শীতল,
প্রাণীমাত্র পুলকিত মন ।
বারী-আশে চেয়ে আর বারীদের পানে ।
করেনাক চাতক রোদন।
শ্রবণ-মােহন স্বরে বিহঙ্গম কুল
আসীন হইয়া নীড়ােপরে,
মধুর কাকলী করে, আপন শাবিকে
পাখায় আবরি স্নেহভরে।
৪
বহিতেছে মৃদুঘনে চঞ্চল সমীর
শীতলতা করি বিতরণ।
সুগন্ধে মােহিছে আজি দিগদিগন্তর,
মরি কিবা সুখ-পরশন।
তাহার পরশে দোলে পদপের পত্র,
তৰু-কণ্ঠে দুলিছে ব্রততী,
রঙ্গিণী-বক্ষে রঙ্গে খেলিছে তরঙ্গ,
নয়নের প্রীতিকর অতি ।
।
ক্রমে সমাগত হল সন্ধ্যা সিমস্তিনী,
ভূবনে ভরিল অন্ধকার ।
৩য় শুক।
অপূর্ব-দর্শন।
সুচাৰু নবীন সাজে শোভিল ধরণী,
প্রকৃতির দৃশ্য চমৎকার।
পেচক কোটর ত্যজি হরষে মাতিয়া
আরম্ভিল কর্কশ ঝঙ্কার।
সন্ধ্যা-সম্ভাষণ তরে চিত্ত বিনােদিয়া
ঝিল্লীদুল বাজায় সেতার।
সােনার বরণে নীল অনন্ত আকাশে,
দুই এক নক্ষত্র ফুটিল ।
দেখিতে দেখিতে অহ নিমেষ ভিতরে
সহস্র সহস্র প্রকাশিল ।
সুরবালাগণ যেন পূজার বিধানে
স্বর্গধামে মন্দাকিনী-নীরে,
নন্দন-উদ্যান-সার পারিজাত লয়ে
একে একে ভাসাল সুধীরে।
৭
এ সংসারে পরিতোষ জন্মে কিসে কার
তাহ কভু বলা নাহি যায়।
এক জমে দানে যাহা সন্তোষ অপার,
তাহা পুন অপরে কঁাদায়।
তিমির নিরখি অতি বিষাদিত মনে,
ভয়ে চক্ষু মুদিল নলিনী।
৫৪
অপূর্ব-দর্শন।
[৩য় বক।
আবার নিরখ অই নিশা-সহচরী
কুমুদিনী কত উল্লাসিনী।
চলিছে কালিন্দী রঙ্গে নাচিয়া নাচিয়া
মধুময় কল কল স্বনে।
বক্ষ পরে অগণিত ললিত লহরী
খেলিতেছে আপনার মনে।
যমুনার তটোপরি তরল আঁধারে
আবরিত করিয়া শরীর,
বিজয়-কেতন শিরে ধরিয়া গরবে
শােভে বঙ্গাধিপের শিবির।
ধারে অপূর্ব ভাবে আলেয়ার মত
তাহে দীপ্ত দীপমালা স্থলে।
তীর-ভূমি অতিক্রমি হয়েছে বিস্তৃত
প্রভা তার তরঙ্গিণী-জলে।
সিছে তুরঙ্গ রঙ্গে, জলদ-গর্জনে,
মাদিতেছে মাতৃঙ্গের দলে।
যামিনীর মোন-ব্ৰত যেতেছে ভাঙ্গিয়া
অসংখ্য সৈন্যের কোলাহলে।
১০
বসিয়া সৈনিক কেহ উচ্চ কণ্ঠ তুলি
সুধাময় সংগীত বরষে।
'৩য় বক।।
অপূর্ব-দর্শন।
তাল, মান, লয়যুত, সুতান চড়ায়ে
বীণা যন্ত্রে মনের হরষে।
বিশাল প্রান্তর ব্যাপি সে সংগীত-ধনি
পবন-বাহন আরােহণে,
সুধীরে উঠিয়া ভ্রমে চঞ্চল হইয়া
যামিনীর নিথর গগনে।
কঁদিছে কেহবা অতি ব্যথিত মরমে,
বহু দিন হয় নাই গত,
করাল কালের মুখে দাৰুণ সংগ্রামে,
পিতা কিম্বা পুত্র যার হত।
দিল্লীর প্রান্তরে পুন আসন্ন আইবে
কি যে তার ভাগ্যে আছে হায়!
সে চিন্তায় নিদ্ৰা নাই নয়ন-পল্লবে,
অনীরে বুক ভেসে যায়।
১২
জাতে অঙ্কিত করি হৃদয়-দর্পণে
প্রিয়তমা প্রাণ-প্রতিমায়,
কোন বীর চিরসখী চিন্তা দেবী সনে
অভিভূত হয়েছে নিদ্রায়।
সে চিন্তা হইতে তার নাহি কভু ত্রাণ,
নিদ্ৰাতেও সে ভাবনা ভাবে।
।
অপূর্ব-দর্শন। [৩য় স্তবক ।
মনশ্চক্ষে প্রেয়সীরে, হেরে অধিষ্ঠান
পার্শ্বদেশে স্বপ্নের প্রভাবে।
দৃশ্য অপরূপ
ন্য স্বপ্ন মায়াবিনি! অপার ক্ষমতা,
বিচিত্র তােমার অভিনয়।
নবীন-নবীনতর
তব বলে হেরে জীবচয়।
পুত্রবতী কর তুমি বন্ধ্যা-সিমস্তিনী,
বিধবারে কর গে সংবা ।
অতীত ঘটনায় প্রত্যক্ষ দেখাও,
তব গুণ কহিব কতবা ।
১৪
স্থানান্তরে কোন জন বসিয়া আবার
কল্পনা করিছে মনে মনে ;
লুণ্ঠিয় বিপুল ধন ধনেশ দৃশ
ধনী হবে এ ভব ভবনে।
এরূপ প্রবল চিন্তা জাগিছে সতত
কোন বীর পুৰুষের মনে,
পদোন্নতি সনে লভিবেক পুরস্কার
বিক্রম দেখায়ে রণাঙ্গণে।
.
এ সময়ে বঙ্গপতি বাখর সুমতি
একাকী বষিয়া ও শিবিরে,
৩য় গুবক।
অপূর্ব-দর্শন।
৫৭
নীরব কেন গাে আজি আনন্দের লেশ
নাহি র হৃদয়-মন্দিরে ?
নেয় অপলক, ললাট কুঞ্চিত,
হাসি নাই বদনমণ্ডলে।
উদাস উদাস ভাব, বিন্যস্ত করিয়া
গণ্ডস্থল বাম করতলে।
১৬
লাবণ্য-শােভিত পূর্ণ চন্দ্রমা যেমতি,
আবৃত হইলে জলধরে ।
যামিনী-সৌন্দর্য্যে হয় কালিমা সঞ্চার,
হাসি আর থাকে না অধরে।
বিকচ কুসুম কিম্বা হয়রে মলিন
কুরমতি কীটের দংশনে,
বিষন্ন মুরতি থরি চিন্তাকুল চিতে
বঙ্গনাথ তথা সিংহাসনে।
সতত প্রফুল্ল থাকে বঁহার অন্তর,
তিনি কেন মগ্ন শােক-ধূমে ?
কি চিন্তা-দাবাগ্নি পশি হৃদয়-কাননে,
ভস্মিয়াছে আনন্দ-কুসুমে ?
প্রভাময় প্রভাকর কেনরে নিষ্প্রভ,
কেন কুহেলিকা আবরিত?
৫৮
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
[ ৩য় স্তবক
বলিতে অশক্ত নর-দুৰ্বল রসনা
সব অন্তর্যামীর বিদিত।
সহসা চকিত ভাবে নিদ্রোস্থিত প্রার
মায়াময়ী চিন্তার আদেশে,
সুদীর্ঘ নিশ্বাস সহ পৰ্যঙ্ক ত্যজিয়া
দাড়ায়ে শিবির-দ্বারদেশে
শূন্য মনে শূন্য পানে যেনরে উন্মাদ
ক্ষণভরে রহিল চহিয়া,
ক্ষণেক কি কথা যেন লাগিল শুনিয়ে
অধোমুখে শ্রবণ পাতিয়া।
আসনে বসিয়া পুন গ্রন্থ লয়ে করে
নিরত হইল অধ্যয়নে,
কিন্তু কি পড়িবে সেই, চিন্তা একবার
যাহার মরম পরশনে ?
ধাতার রচনা মাঝে নাহি হেন স্থান,
আহা তার শান্তি তথা আছে।
বিশ্ব-বিজয়িনী যেই নিদ্রা বিমােহিনী,
পরাজিত চিন্তিতের কাছে।
২
উঃ কি হইল মম মাথার ভিতরে
ঘুণী বায়ু ঘুরিতেছে যেন,
৩য় স্তবক
৫
অপূর্ব-দর্শন।
কিছুই লাগেনা ভাল, উঠিতে বসিতে
স্বেদ ধীর গাত্রে ঝরে কেন?
কালানল পরিপূর্ণ অখিল সংসার,
শূন্যময় যেই দিকে চাই,
বারণ না মানে প্রিয় জীবন-বিহঙ্গ
করিতেছে পালাই পালাই।”
হায় রে আগ্নেয়গিরি-গর্ভস্থ অনল
প্রচণ্ড মূরতি যবে ধরে,
গরভ অবাৰ্য বেগে বিদারি নির্গমে
হুঙ্কারে কঁপায়ে চরাচরে।
দুঃসহ জ্বলন্ত জ্বালা আমার অন্তরে
অনল জ্বলিছে তেম,
ফাটিল ফাটিল হৃদি তাহার প্রদাহে
ভস্মে যেন হৈল পরিণত।”
চিন্তাকুল বঙ্গরাজ এতেক কহিয়।
কি জানি ভাবিয়া কিবা মানসে আবার,
. অাসন হইতে বেগ ভরেতে উঠিয়া
মৃদুল চরণ-ক্ষেপে অজ্ঞাতে সবার
চলিলেন পরিহরি :শিবির সজ্জিত,
একেবারে কোন দিকে লক্ষ্য নাহি করি,
অপূর্ব-দর্শন।
[৩য় স্তবক
এত যে সাধের গ্রন্থ স্বর্ণ-ৰিখচিত,
অনাদরে ভূমি পরে যায় গড়াগড়ি।
অদুরে তরঙ্গময়ী প্ৰবাহিণী-বটে,
নিরখি ভূতল পানে ভ্রমিতে লাগিল,
সৌদামিনী যত শীঘ্র জলদে প্রকটে,
যত দ্রুত বিচরিতে পাক অনিল,
তার চেয়ে দ্রুতবেগে, লীন না হইতে
এক টী চিন্তার স্রোত, নয়নপলকে
শত উদে মনে তার বিভিন্ন মূর্তিতে।
কভু তাহে শান্ত কভু হৃদয় চমকে।
২৪
ভাবনা-বিহ্বল চিতে করিল স্মরণ
শেষবার পুত্রের লে লিপির ভারতী,
কি লিখেছে ? বলিতে যে করেন। বচন,
লেখনী নিশ্চল হয়, নিদারুণ অতি
জনমে মরমে ব্যথা, লিখিয়াছে হায়
‘মান প্রদর্শিতে মম সাক্ষাৎ সময়ে
সকলের সম্মুখেতে প্রকাশ্য সভায়,
প্রণতি করিবে তিন বার নত হয়ে।
উঃ কি ঘোর অহঙ্কার অত্যাচার এত?”
৩য় স্তবক। ] অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
বলিতে বলিতে ৰুদ্ধ হল কণ্ঠস্বর ।
বাত-বিদালিত কদলীর পত্র মত
কাঁপিতে লাগিল দ্রুত সৰ্ব্ব কলেবর।
জ্বলিতে লাগিল আখি জ্বলন্ত বহিতে,
বদনমণ্ডল হল রক্তিম বরণ,
ক্রোধে কাল সাপ যেন লাগিল গর্জিতে,
নাশিকায় উষ্ণ শ্বাস বহে ঘনে ঘন।
শােণিত উত্তপ্ত হয়ে রক্তাধিকরণে।
শিরায় শিরায় তীব্রতর বেগে ছুটে,
দশনে দশন পংক্তি সবল-ঘর্ষণে,
অনুমান হয় দন্ত গেল বুঝি টুটে।
ক্রুদ্ধ-কলেবরে এইরূপে বহুক্ষণ
রহিল, অপেক্ষাকৃত শান্তি দিতে দিতে,
উদ্দীপ্ত ক্রোধাগ্নি হল নির্বাণ এখন
অতঃপর বঙ্গেশ্বর লাগিল বলিতে।
উঃ কি ঘাের অহঙ্কার এত অত্যাচার ?
এত স্পর্ধা? ক্ষুদ্র বৃক্ষ শৈল-পাদ-মূলে
জন্ম লভি, সেই শৈল (অভ্রভেদী, যার
শির সদ) উল্লঘিয়া ভেদি মেঘকুলে
প্রয়াস পশিতে নীল সুদূর গগন ?
৬২
অপূর্ব-দর্শন।
[ ৩য় স্তবক
ভানুর কিরণ লয়ে চিরদিন তরে
শরীর-সৌন্দর্য্য যেই করে সম্পাদন,
সেই বিধু বিল্লানিতে চাহে শশধরে ?
*
‘রক্ত মাংসময় দেহে আছে কোন্ জন
সহিবারে পারে এই অনল-যাতনা ?
হৃদি-স্তরে স্তরে মম যায় যে জীবন,
দংশে কোট কীট ঢালি তীব্র বিষ-কণা।
অষ্টমতি কুলাঙ্গার ! তুই রে ব্রহ্মাণ্ডে
নররূপে হয়েছিস্ পাপ আবিভূত,
ধিক তাের দুরাশায়, ধিক কর্মকাণ্ডে,
কলঙ্কিত প্রণে ধিক ধিকরে প্রভূত।”
“কেন তাের বুদ্ধিভ্রংশ হলরে এমন?
পিপীলিকা-পক্ষ বুঝি মরিবার তরে?
জান না স্বর্গেরে পদে করিয়া দলন
শেষে কি দুর্গতি ঘটে দনুজ-নিকরে?
দেবদ্রোহী রে পামর ! দেবের সম্মান
হরিতে উদ্যত হয়েছিস্ কোন্ বলে?
ধৰ্ম্ম যদি থাকে পাবি তথা প্রতিদান,
যদুকুল ধ্বংস যথা ঋষি-কোপানলে।
'৩য় স্তবক।
অপূর্ব-দর্শন।
“এই দণ্ডে পাপাত্মার প্রতিবিধানিতে
সমুচিত প্রায়শ্চিত্ত পারি সুনিশ্চয়।
পঞ্চভূতে দেহ তার বিলীন করিতে
সক্ষম পৃথক সূক্ষন পরমাণু চয়।
কঠোর বচন হেন করেছে প্রয়ােগ
যেই মুখে পাপময়ী যে তার রসনা,
এই তীক্ষ্ণধার অসি করিয়া নিয়ােগ
শতধা বিচ্ছিন্ন করি এ মাের বাসনা।
৩১
“কিন্তু কি করিব অহো হৃদি ফেটে যায়,
আপনার মাথা খেয়ে আগে না বুঝিয়ে,
কুঠার মেরেছি নিজে আপনার পায়।
নির্বোধের মত আত্ম-হিত না চিন্তিয়ে
লিপির প্রস্তাবে যবে হয়েছি সম্মত,
তখন আমার এ যে বৃথা আস্ফালন ?
কেমনে ফিরাব এবে, সাধ্য নহে তত্ব,
করস্থিত তীর শূন্যে ছুড়িছি যখন।
“হা দুৰ্ম্মতি পশ্বাচারি অকৃতজ্ঞ হিয়া !
এ হেন দুর্ধক্যাবলী বিন্যস্ত করিতে
পত্ন মাঝে, হন্তু তাের শিথিল হইয়া
৬৪
অপূর্ব-দর্শন।
[ ৩য় যুবক।
লেখনী পতিত হয় নাই কি ভূমিতে ?
পাষাণ-হৃদয় তাের হয়নি কম্পিত ?
সবেগে আপনা হতে নয়ন-কোণায়
হয় নাই শােক-অশু-জল উচ্ছসিত ?
সেই দওে ভীম বজ পড়েনি মাথায় ?
* (হয়। আগে জানতাম যদি এর সমাচার
এ অমূল্য কম্পতৰু করিবে অর্পণ,
জীবন-নাশক ফল গরল-আধার
পীযূষের পরিবর্তে অতীব ভীষণ !
তবে কি স্বর্গীয় পিতৃদেবের ভারতী
লঙ্ঘন করিয়া শ্রেষ্ঠ দিল্লী-সিংহাসনে
আরােহিতে করিতাম ব্যক্ত অসম্মতি,
শান্তিময় তুচ্ছ বঙ্গ-রাজ্যের ছলনে?
৩৪
সদয় হইয়া যদি কেহ অভাগায়
বলিত, এ রত্নময় কোষ-অভ্যন্তরে
বিরাজে বিষম ফণী বিষাকর হায়,
তবে কি দিতাম স্থান হৃদয়-আগারে ?
সেই সে মূহুর্তে দুর পারাবার পর,
নিক্ষেপিয়া করিতাম নেত্ৰ-অন্তরাল,
৬৫
ওর স্তক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
অথবা বিবের দন্ত উৎপাটিয়া তার,
এড়াতাম অনায়াসে সকল জঞ্জাল।
“ অয়ি স্মৃতি! কেন আজি জ্বাল পুনৰ্ব্বার
ভূতপূৰ্ব সে আলােক মানস-মন্দিরে ?
মৃত দেহে কেন গুৰু অশনি-প্রহার ?
মনে পড়ে সেই কথা, ভাসি অ-নীরে,
পিতার অন্তিম বাক্য (নাহি দোষ ভার)
উপেক্ষিয়া ভুঞ্জিতেছি পাতকের ফল,
এ সকল দুরদৃষ্ট ক্রমে অভাগার
বিধাতার ষড়যন্ত্রে ঘটিছে কেবল।
ওরে দগ্ধ বিধি ! তােমা কোন্ মূঢ়মতি
দয়াময় পিতঃ বলি ডাকে প্রীতিভরে?
নাহি তব সুবিচার, নাহি এক রতি
ৰ্ম্ম দয়া মায়া লেশ হৃদয়-কন্দরে।
থাকিলে করিত কি এ ভাগ্যহত জনে
পঙ্কিল নয়নাসারে ধরা নিরন্তর ?
থাকিলে এ আৰ্তনাদ আমার শ্রবণে
উথলিত নাকি তব দয়ার সাগর?
“জাজি অনুতপ্ত চিতে ডুবে তমােকুপে
অপূর্ব-দর্শন।
(৩য় যুবক।
এ প্রান্তরে করিতেছি এই ত রােদন,
ভবিষ্য অদৃষ্ট-গর্ভে অলক্ষিত রূপে
জানি দুঃসহ কত অপ্রিয় বচন,
কত অপমান কান্না রয়েছে নিহিত
অকাতরে স’তে হবে প্রাতে। রে জীবন
এখনি এ দেহ হতে হরে বহির্গত,
হউক এ স্থান মাের সমাধি-ভবন।
৩৮
জগত-জনের শােক-সন্তাপহারিণী
নক্ষত্ৰশালিনী অয়ি বিভাবরি সতি!
অসীম অনন্ত মম দুখের কাহিনী
শুনিবে কি, শুনিবে কি কাকুতি মিনতি ?
প্রভাত হয়ােনা আজি এই নিবেদন,
এই স্নিগ্ধ ভাব ধরে রহ দয়াশীলে,
নিষ্ঠুর অন্তরে তুমি যাইলে এখন
ডুবিতে হইবে প্রাতে দুর্দশা-সলিলে।
।
আর চালাােেনা রথ মনােরথ-গতি,
শূন্য কক্ষে তােমরা হে তারকা মণ্ডল,
ধারণ করহ চির অচল মুরতি,
মুদিও না হিরন্মর নয়ন উজ্জ্বল,
অথবা ত্রিদিববাসী তােমরা সকলে
৩য় বক।
অপূর্ব-দর্শন।
১৭
পাপিষ্ঠের প্রতি হয়ে প্রসন্ন-হৃদয়,
ইঙ্গীতে সজীব মন্ত্র যাও এক বলে
যাহে ত্ৰাণ পাই আজি হতে এ নিরয়।
শুনেছি দয়া নদি! রমণীর মন,
পরের দুখেতে বুকে বড় বাজে ভার,
কেন তার বিপরীত তুমি গাে এমন ?
কঠিন কামিনীকুলে পরাণ তােমার !!
নদি প্রকৃত সুখী তুমি এই ভবে
দুখ-রাহু পর্শে নাই তােমারে কখন,
কিরূপে দুখের দাহ বুঝিবেক তবে?
সর্পদষ্ট জন (ই) জানে বিষের জ্বলন ।
৪১
যাও তুমি মনােল্লাসে সাগর-সঙ্গিনি!
যাও পারাবার-পাশে নাচিতে গাহিতে,
কঁদিবার তরে আমি জন্মেছি তটিনি।
তৰ তীরে অাখি-ধারা থাকি বরষিতে।
হায় এ যন্ত্র আর না পারি সহিতে,
বসুন্ধরে! হতভাগ্য জনে কর গ্রাম,
ধূলিসার হােক দেহ, দেহের সহিতে
যত দুখ সব হােক একেবারে নাশ।”
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
[ ৩য় যুবক।
৪২.
অকস্মাৎ ঘন মেঘ মসীর বরণ
স্তরে স্তরে বায়ুবেগে উঠিতে লাগিল,
মাথায় ঠেলিয়া শূন্য, সমস্ত গগন
চক্ষের পলক মাঝে আচ্ছন্ন করিল।
ৰুচির নক্ষত্র মালা রূপে ঢল ঢল,
এই যে করিতেছিল ক্ষিতিলে দান,
শীতল উজ্জ্বল কর নিতান্ত তরল,
স্মিতমুখে হইয়াছে সব তিরােধান।
৪৩
গাঢ়তর অন্ধকারে মগ্ন চরাচর,
ভয়াবহ প্রকৃতির করাল বদন,
কিছুই না হয় আর নয়নগােচর,
তিমিরেতে একীভূত মেদিনী গান।
ব্যাকুল পথের মাঝে এবে পান্থ লােকে,
না জানি কতই ক্লেশ পেতেছে তাহারা,
যায় যদি তড়িতের চপল আলােকে
এক পদ, তখনই হয় পথহারা ।
৪৪
বঙ্গেশের দুখ দেখি নব জলধর
অতি গুৰু ব্যথা পেয়ে কোমল অন্তরে,
পাগলের মত মরি কাদিল বিস্তর,
৩য় শুক। অপূর্ব-দর্শন।
বহিল বৃষ্টির স্রোত ধরার উপরে,
ভয়ঙ্কর আর্তনাদে ফাটিয়া অম্বর
হইল সহ চির যেন বােধ হয়,
অচলা বসুধা কঁপে থর থর থর,
সন্ত্রাসে জীবন্তজীব স্তম্ভিত-হৃদয়।
৪৫
শণ শনি সর্বব্যাপী দুরন্ত সমীর
চলিতে লাগিল যেন প্রমত্ত বারণ,
সুদৃঢ় বিটপী কত হইয়া অধীর
যুঝিল, করিল শেষে আত্ম সমর্পণ ।
পৰুষ পবনাঘাতে কর্দম মাখিয়া
ছিন্ন শতদল পড়ে সৈকত উপরে,
বদ্ধ তরী গুণ ছিড়ি তীরেতে লাগিয়া
চুর্নিয়া পশিল কত তটিনী-উদরে।
তৃতীয় স্তবক সমাপ্ত
চতুর্থ স্তবক।
দর্শন।
১
সহৃদয়গণ এস! সহৃদয়গণ
বহে মৃদু গন্ধবহ,
বিহঙ্গম তার সহ
কূজনে, করেছে রবি কর সম্বরণ,
প্রান্তর ভ্রমণে এবে তৃপ্ত হবে মন।
নিরখিয়া প্রকৃতির মূরতি উদার,
আনন্দ-মদির পানে
উন্মত্ত হইবে জ্ঞানে,
অজ্ঞাত ধুলিয়া যাবে মনের দুয়ার,
নিরখিয়া প্রকৃতির মূরতি উদার ।
দেখ দেখ সবে অই সম্মুখ প্রান্তরে
আড়ঘরে অনুভব,
জানি কি মহােৎসব,
শ্রেণীবদ্ধ আছে তাই মানৰ নিকরে,
৪র্থ স্তবক।
৭১
।] অপূর্ব-দর্শন।
যেন বা রয়েছে কার প্রতীক্ষার তরে ।
হাদে দেখ দিল্লীপতি উচ্চ সিংহাসনে,
শ্বেত ছত্র শিরে ধরা,
শুক্ল পরিচ্ছদ পরা,
বাম ও দক্ষিণ ভাগে পারিষদগণে,
হেথা সমবেত সবে কি কাৰ্য-সাধনে ?
আবার সুদুরে অই বঙ্গ-কহিনুর
বাথর উদারমতি,
দয়ার সরিৎপতি,
নির্মল অন্তর যথা নিৰ্মল মুকুর,
নিয়ত বিরাজে যাহে ভাব সুমধুর।
( এবে) বিষম চিন্তার চিহ্ন প্ৰকটে বদনে,
কুঞ্চিত ললাট ভাগ
শশাঙ্কে চড়েছে দাগ,
হায়রে অধর যুগ কাপে ঘনে ঘনে,
মানসিক বৃত্তিচয় নিস্তেজ এক্ষণে।
৪
ভূতলে কি শূন্যে আছে নাহি বাহান,
আছে বচন
ভাস্কর-খােদিত মুক্তি
সাদৃশ, সুস্থির ভাবে করে অবস্থান,
*
চিন-ত্তি,
৭২
অপূর্ব-দর্শন।
[৪র্থ স্তবক।
অবশ হৃদয়তন্ত্রী ব্যাকুল পরাণ।
পূর্ব অঙ্গীকার ক্রমে প্রকাশ্য সভায়---
(বলিতে এ ইতিবৃত্ত,
শােকানলে জ্বলে চিত্ত,
মহাক্ষোভে বুক ফাটে, অজস্র ধারায়
বছে নেত্রনীর, রক্ত শুকাইয়া যায়)।
৫
}},
-অলক্ষ্যে করিয়া দৃষ্টি উচচ সিংহাসন,
সাষ্টাঙ্গে অপন পুত্রে
নমিল সাক্ষাৎ সূত্রে
যুগান্তর ধরাক্ষেত্রে আজি সংঘটন,
হায়রে ঘটিল আজ “অপূৰ্ব্ব-দর্শন।”
অহহারে অভূতপূর্ব আভের ঘটনা,
লোমহরষণ দৃশ্য
দেখিয়া কঁপিল বিশ্ব
ছুটিল মহােস্কা-শিখা প্রদীপ্ত-রসনা,
কক্ষচ্যুত গ্ৰহপুঞ্জ কঁদে দিগঙ্গনা।
দেখায়ে ক্ষণিক প্রভা গগনের তলে,
শত শত ক্ষণপ্রভা মুহুর্মুহু জ্বলে,
দক্ষ বাজিকর যেন,
অগ্নিময় স্কুণী হেন
'গুৰ্থ লুবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
৭৩
লইয়া খেলিছে থাকি মর-নোড়ালে।
গর্জিল জীমূতবৃন্দ গন্তীর নির্ঘোষে
নিষ্ঠুর পাপীরে যেন দেখাইতে ভয়,
আলােড়িয়া সিন্ধু-জল,
উপাড়িয়া তৰুদল,
প্রকৃতি ছাড়িল শ্বাস চূর্লি হিমালয় ।
৭
প্রকৃতি ত্যজিল শ্বাস চূর্ণি হিমাগার,
প্রলয়ের সূত্রপাত,
আজি একি অকস্মাৎ ?
মূহুর্তে চৌদিকে ঘাের কুয়াশা বিস্তার,
শ্রবণ বধিরি উঠে উচ্চ হাহাকার।
এইবার বিধাতার সাথের রচনা
যায় বুঝি রসাতলে,
ডুবে রে অতল জলে,
যায় যাক, ঘুচে যাক সকল যন্ত্রণ,
লুকাক ও নারকীর মুখ এ বাসনা ।
পুত্র হয়ে জনকের লইল প্রণতি ?
হায় একি অত্যাচার,
হায় একি অবিচার,
হায় একি ব্যবহার বিপরীত অতি,
২৪
অপূর্ব-দর্শন।
(৪র্থ স্তবক
স্বর্ণের উপরে এ যে নিয়তি!!
দয়া ধৰ্ম আজি কি রে অদৃশ্য হইল,
নিষ্ঠুরের আজ হতে
রাজ্য হল এ ভারতে?
বিষম' কলুষে স্বর্ণ-ভূমিরে গ্রাসিল !
শৃগালে সিংহের বক্ষে পদাঙ্ক স্থাপিল ।
তমস-নাশন যেই সহস্র কিরণ,
যার তেজে প্রতিভাত
হয় নিত্য নিশানাথ,
সুবর্ণ সুষমা ধরে তারা অগনণ,
গ্রহাবলী যার ঋণে বদ্ধ অনুক্ষণ ।
সেই সে আদিত্য, সেই জ্যোতিঃ মূলাধার,
সামান্য রাহুতে গ্রামে
হুঙ্কারি গভীরোসে,
সর্ব পরাক্রম হ্রাসে নিমেষে তাহার?
হায় রে গরিমাশূন্য গরিম-ভাণ্ডার।
সর্বদশী বিশ্বপাতা বিশ্ব-নিয়ামক।
বিধি-বিগহিত তব
একি খেলা অসম্ভব
খলিলে ভুবনে 'আজ ? অতি ভয়ানক!
৫.
৪র্থ যুবক।
অপূর্ব-দর্শন।
পাপীশাস্তা নই তুমি পুণ্যাত্মপীড়ক !!
নিরেট পাষাণ সম হৃদয় তোমার,
তা না হলে সুরদলে
পরাভৰি দৈত্য বলে,
অপমানি করে স্বর্ণ-রাজ্য ছারখার?
দময়ন্তী সতী ভাগ্যে লাঞ্ছনা অপার ?
তা না হলে পতিপ্রাণ বৈদেহী সুন্দরী
নারীকুল-শিরােমণি,
প্রাতঃস্মরণীয় যিনি,
দুঃসহ দুখেতে কঁদে হাহাকার করি ?
কানন-চারিণী সেই রাজরাজেশ্বরী ?
নরকের কীট অই সম্মুখে আবার
নহিলে এ অপকর্ম
করে বিসর্জিয়া ধৰ্ম্ম ?
তােমারি কৌশলে এই নৃশংস ব্যাপার,
নিষ্ঠুর বিধান তব নিষ্ঠুর বিচার !
• আবার—আবার অই করিল প্রতি,
আর না পারিনা আর,
দেখিতে এ পাপাচার,
অশ্রুসিক্ত ৰাথরের পাণ্ডুর মুরতি,
অপূর্ব-দর্শন।
( ৪র্থ স্তবক
দূর হয়ে যারে আজ দর্শন-শকতি।
পৈশাচিক দৃশ্য এই হেরিল যেমন,
অমনি স্তম্ভিত হয়ে
ক্ষণেক নিশ্চল রয়ে
ছুটিল বারতাবহ
ক্রুদ্ধ
সমীরণ
শোক-সমাচার বিশ্বে করিতে জ্ঞাপন।
শােকের বার এই শুনিয়া সদুখে
প্রকৃতির হাসিভরা
মুখ হল মান পারা,
বরাঙ্গ হইতে বালা কুসুম-ভূষণ
ছড়ায়ে ফেলিল ভূমে বিষাদে তখন,
যমুনা সুকল নাদে প্রফুল্ল বয়ানে,
উপহার লয়ে হাতে
ভেটিবারে জলনাথে
যেতেছিল শুনিতেই আকুল পরাণে
কলহীন মুখে নদী ছুটিল উজানে ।
সচল জলদপুঞ্জ অাকাশ উপরে
সুধীরে আহলাদে ভেলে
যেতেছিল হেসে হেসে,
এই নিদাৰুণ বাণী শ্রবণকুহরে
ও স্তবক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
৭৭
পশিতেই দাড়াইল বিষয় অন্তরে।
রােষভরে বীরাঙ্গণ জলদ-রঙ্গিণী
চমকে উন্মত্ত হয়ে,
সর্বগ্রাসী বহি লয়ে
২. যেনরে করাল কাল সদৃশ চাহনী।
ভাস্মরে সমুদ্যত এ পাপ অবনী
অকুল বিহঙ্গকুল বৃক্ষ-অন্তরালে,
শাবক ফেলিয়া দূরে,
ক্ষোভেতে নয়ন ঝুরে,
স্তব্ধীভূত ৰনলী-তমালে পিয়ালে,
নীরব, কেই না গায় লালিত্য নিশালে ।
জনস্থানে নরনারী আবাল বনিতা
বিষম বিষাদ সঙ্গে
বিলাপে আবশ অঙ্গে,
অবরোধে কূলবধূ চির-বিকশিতা,
৪ দৰুঘাতে অাজ শোকা প্লাবিত
শোকের উচ্ছাসে পরিপূর্ণ চতুর্দিক,
অলি না অাহরে মধু,
শুকমুখী ফুল বধূ,
নিকুঞ্জ না তাসে শীতামৃতে অলৌকিক,
৭
৭৮
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
: ৪র্থ স্তবক
নীরবে নিষ্ঠুরে সবে দেয় শত ধিক।
অধীর ব্যাকুল প্রাণ স্থাবর জঙ্গম,
জগতের আদরের
কিবা যেন যতনে।
মহামূল্য নিধি এক করেছে ক্ষেপণ
অতল সিন্ধুর তলে কোন্ নিরমম ।
এবার-তৃতীয় বার উন্মাদের প্রস্তু
উপক্রম করিতেছে যেই নমিবার,
এমন সময় হায়
যেন দৈববাণী প্রায়,
সহসা উঠিল এই সদুখ চীৎকার-~--
পৃথীরাজ ! দিল্লীরাজ ! দিল্লীর তন!
প্রবাহ জীবন-তরী,
যে তারকা লক্ষ্য করি,
অযতনে সেই ধ্রুব নক্ষত্রে এখন
উপেখি অকালে তরী দিছ বিসর্জন ?
১৮
নিতান্ত অবােধ তুমি, যেই বীজ হায়
(রাপিলে করমভূমে আজ, অচিরার
তার
তুল্য
অবিকল
পাবে বিষময় ফল,
৪র্থ স্তৰক।
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
নিশ্চয় জানিও ইহা না হবে ব্যত্যয়।
থামিল আকাশবাণ, যুবকের মনে
চৈতন্য ফিরিয়ে এল,
দূরে পলাইয়ে গেল
মায়া-মােহজাত তম, মন্ত্র উচ্চারণে
প্রকৃতিস্থ হল যেন ভূতগ্রস্ত জনে।
তখন বুঝিল উঃ কি বিগর্হিত কাজ,
কুমতির ছলনায়
বুঝে করেছে হায়,
হানিয়া ন্যায়ের আহা মন্তকেতে বাজ,
কলঙ্ক ঘোষিবে যাতে মনুজ-সমাজ।
তখন মরহুল বিদীর্ণ হইয়া
ঘোর অনুপে মন জ্বলিয়া উঠিল,
মহাত্রাসে থর থর
বিকম্পিত কলেবর,
সর্ব অঙ্গে শেদ ধার করিতে লাগিল।
নিরেট পাষাণ সম বজ্রলেপময়
অয়স-হৃদয় এৰে দয়াদ্র হইল,
আপন আসন হতে
ভাসি নেত্ৰাসার স্রোতে
অপূৰ্ব্ব-দর্শন।
| ৪র্থ স্তবক
বিদ্যমান পিতৃপদে ঝাঁপিয়ে পড়িল ।
অমনি দারুণ মুচ্ছ মায়ার কৌশলে
যুবার অজ্ঞাতসারে
জ্ঞানরত্ন নিল হরে,
স্পন্দন-রহিত দেহ, নিশ্বাস না চলে,
প্রাচীন যুবা অই পড়িল ভূতলে!
কতক্ষণ পরে-
মুচ্ছাভঙ্গে ধৰি পিতৃ-যুগল চরণ,
বারংবার ভক্তিভরে
সহস্র চুম্বন করে,
কৰুণ কাতরে কত যাচিল মার্জন,
বেদনাব্যঞ্জক শ্বাস করিয়া ক্ষেপণ।.
সুমতি সরলচেতা বঙ্গ-অধিপতি,
মনােক্ষোভ রােষ ত্যজি,
অপত্য স্নেহেতে মজি,
করে ধরে কেকোবাদে তুলিল, তখন
পিতা পুত্রে হল দৃঢ় স্নেহ-আলিঙ্গন।
২২
সিংহাসনে বসাইয়া প্রবীণ পিতায়
আপনি জুড়িয়া কর কেকোবাদ হায়
নীরবেতে এই দুধে
শুক।
অপূর্ব-দর্শন।
নম্রভাবে অধোমুখে,
দাড়ায়ে রহিল যেন অাজ্ঞা অপেক্ষায়।
অতঃপর বিচক্ষণ বঙ্গ-শাসয়িতা
রাজকাৰ্য্য সুশৃঙ্খলে
চালাইতে বিধ-বলে,
হিতাগর্ভ উপদেশ করিয়া প্রদান
শ আত্মজে, স্বীয় রাজ্যে করিল প্রস্থান।
নিজাম উদ্দীন পা দেখিল তখন
মনের বাসনা তার হল না পুরণ,
করতলে পেতে চান,
পেতেছিল যেই ফাদ,
ছিন্ন হয়ে গেল তাহা, বৃথা আকিঞ্চন ।
অকূল নিরাশ-সিন্ধু-সলিলে ভাসিয়া
দুখে অভিমানে মন ;
দহে এবে অনুক্ষণ,
বুক ফেটে বার যেন হতেছে জীবন,
দিন দিন দিব্য কান্তি মলীর বরণ।
২৪
পরিণামে ভয়ঙ্কর মনের উদ্বেগ
সম্বরিতে নারি তীব্র হলাহল পানে,
পরাণ ত্যজিল হায়
অপূর্ব-দর্শন।
[ ৪ স্তবক
ছাড়িয়া অনিত্য কায়
মিশিল জীবন-বায়ু অনন্ত বিমানে।
হায় এ প্রবাস স্থান বসুন্ধরা মাৰে
নীচ যারা দুরাশয়,
কুকাজে কুমতি হয়,
তাহাদেরি এইরূপ অপমৃত্যু ঘটে,
ৰিমুক্ত স্বর্ণের দ্বার পুণ্যাত্ম নিকটে।
সংপূর্ণ।
খ
বিজ্ঞাপন
+ + +
* =
||• ?
শ্ৰীমােজাম্মেল হকু-প্রণীত নিম্নলিখিত পুস্তকগুলি কলি-
কাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে এবং শান্তিপুর মহম্মদীয়
লাইব্রেরীতে প্রাপ্তব্য।
কুসুমাঞ্জলি
*, ডাঃ মাঃ (১০
অপূর্ব-দর্শন
মেহদী ( সুদানের মাধির ইতিবৃত্ত)
পথশিক্ষা (শ্রেণীপাঠ্য।
নারীজীবন যােগেন্দ্র কুমার মুখােপাধ্যায় কৃতী ৩, ,
নারীপূজা
n,
জীবন সঞ্চার
l,
চিন্তামালা (জীবন চন্দ্র ভক্ত কৃত)
,
মহারাণা
.
lo
১০
কুসুমাঞ্জলি সম্বন্ধে সম্বাদপত্রের অভিমত।
শ্ৰীযুক্ত মােজাম্মেল হক মহাশয় যে গ্রন্থ প্রণয়ণ করি-
আছেন, বাঙ্গালী হিন্দুর লেখনী হইতে তাদৃশ গ্রন্থ প্রমূত
হইলেও অগৌরবের সামগ্রী হয় না। তঁাহার গ্রন্থের ভাব।
ও ভাব সকলই মার্জিত ও সুৰুচিসম্পন্ন। তঁাহার গ্রন্থ মধ্যস্থ
বঙ্গবিধবা, একটা পাখী ইত্যাদি সন্দর্ভ পাঠ করিয়া আমরা
পরম শ্ৰীতি লাভ করিয়াছি।' প্রার্থনা, এই নবীন গ্রন্থকার
নিয়ত সুপাঠ্য পুস্তক রচনা করিয়া দেশের মহােপকার
সাধিত করিবেন এবং যশ ও মানের অধিকারী হইবেন।”
প্রবাহ।
-"
Kusumanjoly—“Poems on a variety of subjects
written in good Bengali and is the style and spirits
of the best Henyali authors.
The Caloniti. Gamte.
-
“পুস্তকের মলাটে নাম দেখিয়া বুঝা গেল, এই গ্রন্থখান
কোন মুসলমান কৰি কর্তৃক বিরচিত, কিন্তু গ্রন্থের ভাষ
দৈখিয়া তাহা বুঝবার যো নাই। ইহার লেখা অনেক
বাঙ্গালীর লেখা অপেক্ষ। সরল ও সুশ্রাব্য।” ভারতী।
“আহ্মাদ সহ এই কুসুমে দ্যানটতে ভ্রমণ করলাম।
ইহাতে কোমল পাণ রজনীগন্ধার সুবাস, প্রণয়পূর্ণ সরল
গােলাবের অপূর্ব সৌরভ ও প্রণয়াতুরা চম্পকের তীব্র ফ্রাণ
একাধারে পাইয়া সুখী হইলাম ।
জনােচিত চিন্তার বিশিষ্ট লক্ষণ দৃষ্ট হইতেছে।” ইলান।
“ইহাতে গ্রন্থক। অাপনার ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন,
তাহা সকলই সারপূর্ণ হইয়াছে।” ভারত দর্পণ।
* ইহাতে কবি
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.