Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pramilar Pratham Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রমীলার প্রথম
ঢাকা, উয়ারী, কাচার হাউসে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী
১লা বৈশাখ, ১৩৩৯ সন।
নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
মুল্য • আনা
।
seeeeeeeeeeeeeess
প্রকাশক
শ্ৰীনিকুঞ্জবিহারী দাশগুপ্ত
পার্শনে এসিষ্টেন্ট,
কাচার হাউস, উয়ারী, ঢাকা।
UOME AFACERO
এees
Bagandard
ভাকা-
0
নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে,
D
কালাচাঁদ বসাকদ্বারা মুদ্রিত।
annanasrangano
ORDODDO
অয়ি, মম ভাব কল্পনা,
সৌন্দৰ্য্য রচনা
অনুরাগিণী
দিলেম তােমাকে
প্রীতি-ফুল্ল চিতে
“প্র-- প্ৰথমখানি।
No text on this page.
প্রথম অভিনয় রজনী—১লা বৈশাখ ১৩৩৯ সন
পরিচয়
পুরুষ
উগ্রচণ্ড রুদ্র।
ফণী রুদ্র
০ ০ ০
ঐ পুত্র
অলক রায় !
জীবন চন্দ।
ফটিক
গাড়ীওয়ালা।
ফণীর শ্যালকা
बौ
শান্তা
০ ০ ০
•••
•••
সরযু
প্রমীলা
शनी
বাম।
শশীমুখী
উগ্রচণ্ডের স্ত্রী।
ফণীর স্ত্রী।
উগ্রচণ্ডর মেয়ে।
ফণীর দাসী।
উগ্রচণ্ডের দাসী।
জনৈক ভদ্র বিধবা ।
No text on this page.
প্রমীলার প্রথম
প্রথম অক
প্রথম দৃশ্য
ফুণীরুদ্রের আপিস বাড়ীর ঘর। তখনাে ভাের হয় নাই।
ধনী ঝাটা লইয়া প্রবেশ করিল।
ধনী। (হাই তুলিয়া) দাদাবাবু সারারাত বাইরে ছিল। এখনাে
নীচে ওর বাতি জ্বলছে। আচ্ছা কারবার চলেছে।
সকালের খাবারের সময় একটা কিছু হবে আজ।
আমার বিয়ে হলে বাড়ীর পেছন দিয়ে ঢুকবার চাৰি
স্বামীর হাতে না থাকে তার বিধিমত চেষ্টা করব।
( একটু আলুথালু ভাবে ফণীর প্রবেশ) এঁ! দাদাবাবু
যে !
ফণী। এ! তুই এত রাত থাকতে কি করছিস্ এখানে ধনী ?
ধনী। রাত, দাদাবাবু ! বাঃ! ভাের হলাে যে !
ফণী। ওঃ! আমি বলতে যাচ্ছিলুম এত ভােরে। (বসিল)
ধনী। দিদিমণি যে আমাকে আরাে সকালে উঠতে বলেন।
ফণী। তা, তা, তাের দিদিমণি তাে ঠিকই বলেন। সকালে
শােয়, সকালে উঠা খুব ভালাে কথা।
ধনী। কিন্তু এ বাড়ীতে সে আমি শুধু একাই মেনে চলি।
২
প্রমীলার প্রথম
?
ফণী। থাক, থাক। আচ্ছা, তাের দিদিমণি ওঠেন নি
ধনী। এখনি উঠবেন।
ফণী। তাহলে পাশের ঘরের বিছানায় আমি একটু গড়িয়েনি।
ওকে বিরক্ত করতে চাই না। শেষে মুস্কিল হবে।
ধনী, তুই যে এখন আমাকে দেখলি তার এক বর্ণও
তাের দিদিমণিকে বলি না।
ধনী। তা বলব না। (দরজায়। কিন্তু বাতিটা সম্বন্ধে কি ?
ফণী। কোন্ বাতি ?
ধনী। হল ঘরে। ওটালে আপনি আনেন নি।
ফণী। ওঃ! হা! যা নিয়ে আয়তত, লক্ষীটি।
ধনী। যাচ্ছি দাদাবাবু।
( নিষ্ক্রান্ত )
রুণী। ওঃ! ক্লাবে বাজি ধরে খেলে কি কাণ্ডই করলুম
আজ! সারারাত যে কেটে গেল তা টেরই পাইনি।
ওঃ! ঘুমে যে চোখ জড়িয়ে আছে।
ঘরের বিছানায় পড়ি গিয়ে। কখন এসেছি সরযূ
জানতে পারবে না, বলব রাত্রে তাকে বিরক্ত করতে
চাইনি।
( বাহিরে শােনা গেল “দুধ” “দুধ-সঙ্গে সঙ্গে
দুধের পাত্র নীচে রাখার শব্দ হইল) ওঃ।
দুধওলা
এসেছে। এত সকালে কি করে দুধ নিয়ে আসে
তাই ভাবি। মধ্যরাত্রে গাই দোয় নাকি ? (ঝিমাইতে
আরম্ভ করিল। এত সকালে, আশ্চর্য্য। (চেয়ারে
বসিয়াই নিদ্রা )
প্রমীলার প্রথম
(ধনী একটা পুটুলী লইয়া প্রবেশ করিল)
ধনী। { পুটুলী টেবিলের উপর রাখিয়া) দাদাবাবু। ঘুমুচ্ছে।
দিদিমণি এসে এখানে দেখলে হৈ চৈ লাগিয়ে দেবে।
দাদাবাবু! দাদাবাবু।
ফণী। (জড়িত কণ্ঠে) হরতনের নওলা।
ধনী । দাদাবাবু। দাদাবাবু!
ফণী। তুরুপ!
ধনী। স্বপ্ন দেখছে যে খেলছে ! দাদাবাবু! দাদাবাবু।
(ঝাঁকানি দিল)
ফণী। এ! ওঃ, তুই ধনী ? হয়েছে কি ?
ধনী। আপনাকে একটা পুটুলি দিয়ে গেল। (স্বগত) এর
মধ্যে একটা শিশুটিশু হবে বলে মনে হচ্ছে।
ফণী। পুটুলি ? কোথায় ? কে দিয়ে গেল ? কাকে?
ধনী। একটা এক ঘােড়ার গাড়ী।
ফণী। গাড়ী-কে ছিল ওতে ? আমাকে দিয়ে গেল বল্লি
যেন!
ধনী। হাঁ, গাড়ীতে একটি বাবু আর একটি মেয়েলােক ছিল।
ফণী। কোথায় তারা?
চলে গেছে বা করে—একটু না থেমেই। (স্বগত)
কেমন কেমন ঠেকছে। কি আছে ওতে কে জানে?
ফণী। আশ্চর্য্য! এতে কি রয়েছে !
( উঠিয়া গিয়া কাপড়ের
ভাজ
খুলিতে প্রবৃত্ত । দেখিল ধনী তাহাকে লক্ষ্য
করিতেছে) আচ্ছা যাক, তুই যা।
ধনী।
৪
প্রমীলার প্রথম
{:
ধনী। যাচ্ছি দাদাবাবু। (স্বগত) দাদাবাবুর কোন্ পাপেরু
ফল এসে দেখা দিয়ে বসেছে তার ঠিক নেই।
( নিষ্ক্রান্ত)
শিশু!
ফণী। বেশ ভারিতে। জিনসটা কি ? খুলেই দেখা যাক।
(পুটুলীর ভাঁজ কিছু খুলিয়া চমকিয়া উঠিল) একটি
এর অর্থ কি ? কেউ ঠাট্টা করলে নাকি ?
শিশু ফেলে গিয়ে ঠাট্টা! আমার কাছে কেন দিয়ে
গেল! হা, ভগবান! এ রকম তাে শােনা গেছে।
অনেক সময় রেলওয়ে স্টেশনে ইত্যাদিতে ফেলে
যায়। ভুলে এখানে ফেলে গেছে; কিন্তু আমার
স্ত্রী শুলে এটা ঠিক ভুল বলে বিশ্বাস করবে না।
কি করা যায়? এটাকে কোনাে রকমে দূর করতে
হচ্ছে। কারু দরজায় ফেলে রেখে আসব। (শিশু
কাঁদিয়া উঠিল ; সে শিশুর মুখ চাপিয়া ধরিল) চুপ, চুপ,
এখন আমার স্ত্রী এসে ঢুকলে আচ্ছা
ফঁাসাদেই পড়তে হবে! ঐ নড়াচড়া করছে
শুছি। (দৌড়িয়া গিয়া জানালার ফাক দিয়া চাহিল,
শিশু আরো জোরে কাঁদিয়া উঠিল) হাঁ, উঠে পড়েছে।
(দৌড়িয়া শিশুর কাছে গিয়া তাহাকে জড়াইয়া ফেলিল)
ধনী হল ঘরে গেছে। আমি পিছনের দরজা দিয়ে
পালাই। (পুটুলী লইয়া দৌড়িয়া নিষ্ক্রান্ত)
লক্ষীটি ।
প্রমীলার প্রথম
আশ্চৰ্য্য।
(র্যাপার জড়াইয়া সরযুর প্রবেশ )
সরযু। (দরজায় থামিয়া) কেউ নেই এখানে।
শিশুর কান্না শুনলুম যেন। (ডাকিল) ধনী। ধনী।
আমার স্বামীর কি হলাে ? আগে তাে কখনাে
রাত্রে বাড়ী ফিরেনি এ রকম হয়নি। তেমন কিছু না
ঘটে থাকলে হয়। আচ্ছা, পাশের ঘরেতে এসে শুয়ে
থাকতে পারে, কে জানে! (উকিদিয়া চাহিল) না,
বিছানায় কেউ শুয়েছে বলেতাে মনে হয় না। ওঃ!
ভারি আশঙ্কা হচ্ছে যে, কোথা রইল সে! ( আবার
ডাকিল) ধনী ! ধনী!
ধনী।
(বাতি লইয়া ধনীর প্রবেশ)
ধনী। কি দাদাবাবু, না, না দিদিমণি! (সরযুর কাছে বাতি
রাখিল)
সরষু। কার শিশু কেঁদে উঠলাে শুনলুম ?
শিশু,
দিদিমণি!
(স্বগত) তাহলে ওটা শিশুই
বটে। (উচ্চে) জানি না, দিদিমণি।
সর। এখানে একটা শিশু ছিল, কান্না শুনেছি।
ধনী। বাস্তবিক, দিদিমণি! আমি কিছু জানি না এর।
সরষু। ঠিক বলছিস্? (স্বগত) ওর রকম দেখে সন্দেহ হচ্ছে।
(উচ্চে) যদিও বিশেষ কিছুই করিনি, এ ঘরে তুই
এসেছিলি দেখতে পাচ্ছি।
প্রমীলার প্রথম
সরযু।
ধনী। শেষরাত্রে উঠতে হলে মানুষ আর কি বেশী করতে
পারে।
থাক, তাের সঙ্গে বর্তমানে উঠবার সময়ের কথা
আলােচনা করতে চাইনা। আমাদের কথা হচ্ছে
শিশুকে নিয়ে, আর এযে শিশু সে সম্বন্ধে কোনাে
ভুলই নেই। আমাকে ভাড়াতে চেষ্টা করিসূনে
বছি। এ কি তাের ?
ধনী। কি, দিদিমণি ! আমার ।
সরযূ। নে, আর ভাণ করিসনে! কথার উত্তর দে, একি
তাের ?
ধনী। (কাদিয়া উঠিয়া ) জীবনে আমাকে এমন অপমান
করেনি কেউ। তুমি জানো আমি বিধবা। তবু
এমন কথা তুমি মুখ দিয়ে আলে? হায়! হায় ?
আমার অদৃষ্টে এও ছিল।
সরষু। থাম, থাম্ ধনী। আমি শুধু তােকে প্রশ্ন করছি।
তুই উত্তর দে। একি তাের ?
ধনী। না, কখখনাে নয়।
সরযূ। বেশ, তুই এ সম্বন্ধে কিছুই জানিস না ?
ধনী। কিছুই জানিনা। (বাতিটা ধরিয়া নাড়িতে লাগিল।
সরযূ। আশ্চৰ্য্য । তুই বাতিটা নিয়ে কি করছিস্?
ধনী। বাতিটা ? ওঃ! দাদাবাবু বল্লেনা, দেখলুম নীচে
জ্বলছে, তাই ওপরে নিয়ে
এলুম।
প্রমীলার প্রথম
সরযূ। কি জন্যে ?
ধনী। জানিনা, দিদিমণি। সিড়ির কাছে পেলুম, তাই নিয়ে
এলুম।
সরযূ
। মিথ্যা কথা। আমি নিজে এটা হলঘরে টেবিলের
ওপর রেখেছিলুম।
ধনী। (কঁদিয়া ফেলিল। তা হবে, দিদিমণি। আমার কি
অতকথা মনে থাকে।
সরযু।
যা এখান থেকে।
ধনী। (কাদিতে কাদিতে স্বগত) আর কারু জন্যে সেখানে। কথা,
বলব না।
(নিষ্ক্রান্ত),
সরষু। কি ব্যাপার ? কি রহস্য এটা ? মেয়েটা নিশ্চয়
আমার স্বামীর দোষ ঢাকতে চাচ্ছে—একে হয়ত
ঢাকতে বলেছে ! এতটা নরাধম সে নয়। হয়ত
আমার ভুল। ধনীটাকে শিশুর কথা জিজ্ঞেস্ করায়
হয়ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল, তাই-কিন্তু শিশুটা।
এতে আশ্চৰ্য্য ! আমার ভুল হতে পারে না, নিশ্চয়
শিশুর কান্নাই শুনেছি। (ফণী জানালার দিক অতিক্রম
করিয়া গেল। জানালা দিয়া বাহিরে চাহিয়া ) এইতাে
বাড়ী ফেরবার সময়ই বটে। বাইরের
পােষাক সবই রয়েছে। ওর পিছনের দরজা দিয়ে
ঢুকবার সুরুচি দেখে খুব খুসি হলুম। এখনি কি
সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াব ? (দরজায় ) না, কেউ দেখেনি
বাবু।
প্রমীলার প্রথম কতে তাই মনে করুক, তারপর চা খাওয়ার সময় দেখা যাবে। (নিষ্ক্রান্ত) ধনী। (ফণীর প্রবেশ) ফণী। বেড়ে হয়েছে, পরিষ্কার কাজটি করেছি। রাস্তায় বেরিয়ে একটা বড়িীর দরজা খােলা পেলুম, দাসী দরজা খুলেই সরে গেল, আমি চুপচাপ শিশুটিকে রেখে সরে এলুম। এখন শােয়া যেতে পারে। ( পাশের ঘরে নিষ্ক্রান্ত) (প্রাতরাশ লইয়া ধনীর প্রবেশ) দাদাবাবু কি করবে না করবে তার ব্যক্তি যাবে আমার ওপর! এ আমি সইতে পারব না। (ফটিকের প্রবেশ, তার বয়স আঠারাে উনিশ হবে। আসিয়া ধনীকে ধরিতে চেষ্টা করিল) কি কর, কি কর ফটিক বাবু? সর, সর! জ্যোৎস্না কি মনে করবে ? ফটিক। জানিনা, জানতে চাইও না। খুব জান, জানতে চাওতো। তাকে তুমি ভালবাস না ? তা এক রকম বাসি। তা এক রকম হােক, দুই রকম হােক, বাস যখন এখন অন্যের প্রতি ভাব দেখাতে আসা কেন ? ফটিক। আরে বুঝলেনা ধনী -আমরা হলুম বিশ্ব-প্রেমিক- তাতে আমাদের কোন দোষ হয় না—তুমি যেন কাদছিলে। কেন ? ধনী। ফটিক। ধনী।
প্রমীলার প্রথম
ধনী।
দিদিমণি ভারি বিশ্রী লজ্জার কথা সব বছিলেন
আমাকে।
ফটিক। কি সম্বন্ধে ?
ধনী।
তা জানােতো, ফটিক বাবু, দাদাবাবু এইমাত্র বাড়ী
ফিরলাে।
ফটিক। এ্যা!
বল কি !
ধনী। তিনি আসতেই, তাকে এখানে এনে কে একটা পুটুলি
দিয়ে গেল। আমি এনে তাকে তা দিলুম। পরে
হল ঘর থেকে ওঁর বাতি আনতে গেলুম, ফিরে দেখি
উনি নেই, দিদিমণি এসে শিশুর কান্না শুনেছেন
বলে আমাকে গালাগাল করতে লাগলেন। আর
সত্যি সত্যি জিজ্ঞেস্ করলেন শিশু আমার কিনা।
(কান্না )
ফটিক। ওঃ, কি লজ্জার কথা !
ধনী। আমি আর থাকব না এখানে।
ফটিক। আরে, এ কিছু নয়। দিদি ভুল করেছে।
ধনী। ভুল করেছে ? না, তাতে করেনি।
ফটিক। তাহলে ঠিকই শিশু ?
ধনী। নিশ্চয়, সে সম্বন্ধে কেননা ভুল নেই।
ফটিক। জামাইবাবুর কাছে! (কয়েক পা সরিয়া গেল।
ধনী। তাই হবে, যে দিলে সে বলে গেল এ বাড়ীতে
ভদ্রলােক থাকেন তাকে দিতে হবে।
প্রমীলার প্রথম
ফটিক।
ফটিক। এ বাড়ীতে যে ভদ্রলোেক থাকেন ? তাহলে হয়তাে
জামাইবাবু নন্ ।
ধনী। দেখাে, আবার তুমি নওতাে, ফটিকবাবু ?
ওঃ, ভারি গােলমাল বেঁধেছে তাে ! (বসিল, ধনী হাের
হােঃ করিয়া হাসিয়া উঠিল)
(সরযুর প্রবেশ
সরযু। ধনী! চা হওয়া মাত্রই নিয়ে আসি।
ধনী। আচ্ছা, দিদিমণি।
ফটিকের দিকে চাহিয়া হাসিয়া নিষ্ক্রান্ত)
সরযূ। তাের কি হয়েছেরে, ফটিক? অসুখ করেছে? অমন
দেখাচ্ছে কেন ভােকে?
ফটিক। ওঃ, কিছু না, দিদি-দাত বেদনায় বােধ হয়।
সর।
(স্বগত) ছোড়া পরিষ্কার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে!
এখানে কিছু একটা হচ্ছে, আর ধনীই এর মূলে।
কিন্তু কিছুই টের পাচ্ছি না।
টের পাচ্ছি না। ওকে আজকেই
তাড়িয়ে দিচ্ছি।••••••( ফটিকের নিকটে বসিয়া ) আজ
সকালে কি হয়েছে ধনী বলেছে কিছু?
ফটিক। হা, দিদি-না, নানা, দিদি! (সরযুর দিকে চাহিতেই
মুখ ফিরাইল)
সরষু। কোষ্টা ঠিক কি না?
-হাঁ, দিদি।
সরযূ। ধনী বলেছে যে আমি শিশুর কান্না শুনেছি ?
ফটিক। --
প্রমীলার প্রথম
১১
s
ফটিক। হাঁ হাঁ, দিদি।
সরযূ। বল, এ আমার কল্পনা, না সত্যি শুনেছি ?
ফটিক। ই-হা-হা, দিদি !
সরযূ। আমি শুনেছি।
ফটিক। হঁ-হা, দিদি !
সরযূ। কার শিশু এটা ?
ফটিক। আমার নয় দিদি।
সরষু। (একটু নীরবতার পর) বােকা ছেলে। কে বলছে
তাের ? এখানে শিশু এল কি করে ?
ফটিক।
এখানে আনা হয়েছে।
সরযূ। কার কাছে ?
ফটিক। জানি না, দিদি। যারা নিয়ে এসেছিল, তারা বল্লে,
যে ভদ্রলােক এখানে থাকেন তাকে দিতে হবে, কিন্তু
সে তাে আমাকে কিছুতেই বােঝাতে পারে না।
সরযূ। যা তাে তাের জামাইবাবুকে জাগা গিয়ে দরজা
দেখাইল, ফটিক সেখানে গিয়া দাঁড়াইয়া) আর ওকে
ঘুমুতে দেওয়া যেতে পারে না। পরে সারাদিন
ঘুমােতে পারবে। এ রহস্য এখনই ভেদ করা চাই।
(উঠিল) যা, জরুরী কথা আছে বল্ গিয়ে। আর
কিছু বলি নি। বুঝলি?
ফটিক। না দিদি।
( নিষ্ক্রান্ত)
প্রমীলার প্রথম সরযূ। আর এ রহস্য ভেদ যদি আমার মনমত না হয় তাহলে আর এক মুহূর্তও আমি এ বাড়ীতে থাকব না। ( বসিল) (ধনীর প্রবেশ) ধনী। দিদিমণি,ও বাড়ীর শশী ঠাকরুণ দেখা করতে এসেছেন। সরযূ। আর এক সময় আসূতে বলিস। এখন আমার অবসর নেই। বলুম-“দিদি”-- ধনী। আচ্ছা, দিদিমণি। { নিষ্ক্রান্ত ) সরযূ। দেখা করতে আসার সময়ই বটে। (ফটিকের পুনঃ প্রবেশ) ফটিক। দিদি, জামাইবাবু আসছেন। সরযূ। কারণ সম্বন্ধে কিছু বলিনি তাে? ফটিক। না দিদি। আমি ঝকানি দিলুম—উনি বল্লেন- “কি গােলমাল করছ!” আমি বলুন- আর এগােবার আগেই উঠে, বল্লেন—“আচ্ছা, যাচ্ছি।” ( নিষ্ক্রান্ত) সরযূ। ওর বিবেক ওকে ঘুমােতে দিলেও আমি ওকে ঘুমােতে দেব না। পুরুষের বিবেক ভারি আছে। (শশীমুখীর প্রবেশ) শী। মাপ করবেন, অসময়ে বিরক্ত করছি। আমি বড় বিপদে পড়েছি। জানাজানি হলে এ ভারি কলঙ্কের কথা— ফটিকের প্রবেশ) ভদ্রঘরের বিধবা আমি।
প্রমীলার প্রথম
শশী।
সরযূ। কি হয়েছে ?
আজ ভােরে কে আমার খােলা দরজার কাছে একটি
একটি শিশু রেখে গেছে।
ফটিক। আর একটি ? ওরে ।
(নিষ্ক্রান্ত)
শশী। আপনি ছাড়া এ পাড়ায় আর কার কাছে উপদেশই
চাইব ? আর কারাে কাছে বল্লে: ঢাক পিটিয়ে
দেবে। এখন বলুন তাে, আমি কি উপায় করি ?
সরষু। বসুন। ( তাহারা বসিল) আমি দুঃখের সহিত জানাচ্ছি
এ ব্যাপারে আমি কোনাে সাহায্য করতে পারব না,
তবে আমার স্বামীকে সাহায্য করতে হবে। তিনি
এখনি এখানে আসবেন।
(ফণীর প্রবেশ )
ফণী। এই আমি—কে, ওঃ! ( শশীকে দেখিয়া ) মাপ করবেন,
লক্ষ্য করিনি। আপনি এ সময় ?
শশী। একটা গােপনীয় বিষয়ে আপনার স্ত্রীর উপদেশ নিতে
এসেছি। উনি আপনাকে বলতে বলছেন। আপনাকে
দিয়েই নাকি আমার বেশী উপকার হবে।
ফণী। তা বলুন।
তা বলুন। এতাে সুখের কথা।
শশী। (উঠিয়া) বলছি তাহলে, আজ ভােরে কোনো খারাপ
লােক আমার দরজা খােলা দেখে-খােলা দেখে
সেখানে একটি শিশু ফেলে গেছে।
ফণী । ( ফিরিয়া) কি! আমি কি—আমি—কি বল্লেন ?
প্রমীলার প্রথম
সরষু। বল, বল, বলে যাও “আমি কি”? “আমি কি আপনার
ঘরেই ?” বলে যাও।
শশী। আমার দাসী গিয়ে কাপড় চোপড় জড়ান পুটুলিটি
পেলাে। (বসিল) :
ফণী। কি আশ্চৰ্য্য কাণ্ড! (স্বগত) এ যে শশী ঠাকরুণের
বাড়ী তাতে জান্তুম না, এ যেন সকলেরই বাড়ী,
চিন্বার যাে নেই। ( প্রকাশ্যে ) কি আশ্চর্য কাণ্ড!
কে এ রকম—
শশী। জানি না, সে পরে বের করতে চেষ্টা করা যাবে।
এখন এই শিশুটিকে নিয়ে কি করা যায় ?
ফণী। (একটু নীরবতার পর আমার উপদেশ শুনলে পুলিশে
পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। (চা ইত্যাদি লইয়া ধনীর
প্রবেশ) ওরা খোঁজ করে মালিক বের করে ফেলবে।
শশী। ওঃ, সেই বেশ। এক্ষুণি তাই পাঠাচ্ছি গিয়ে। (উঠিল)
সর। যাবার আগে অনুগ্রহ করে এক পেয়ালা
শশী। না, এখন আমার মুখ দিয়ে কিছুই গবে না। বােকাটা
নামানাে পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
সে তাে ঠিকই।
শশী। আসি তবে—মাপ করবেন, বিরক্ত করলুম।
ফণী। না, না।
শশী। আপনার উপদেশের জন্যে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
সরযূ। নমস্কার। (শশীমুখী নমস্কার করিয়া ধনীসহ নিষ্ক্রান্ত)
ফটিক! (বসিল)
ফণী।
( সরযু উঠিল)
ফটিক।
প্রমীলার প্রথম
ফটিক। (দরজায় উপস্থিত হইয়া) কি, দিদি ?
সরষু। খেতে আয়। (ফটিক প্রবেশ করিয়া বসিল,সরযু চা পরিবেশন
করিতে লাগিল )
ফণী। বেশী চিনি দিও না, সরু।
আমার জন্যে তিন চামচ, দিদি।
সর। একটা ডিম দি? (আদরের সুরে)
ফটিক। হাঁ, দিদি, দুটো।
সরষু। আমি তাে তােকে জিজ্ঞেস করিনি, তাের জামাইবাবুকে
করেছি। বেশী ফাজিল হয়ে উঠেছি।
ফণী। বােকা হওয়ার চেয়ে সে ভালাে, সরু।
সরযূ। আমি তা মনে করি না।
ফটিক। চা’টা ভারি “লাইট” হয়েছে দিদি।
সরযূ। ছেলেদের পক্ষে এই যথেষ্ট।
ফণী। দেখ সরু, ব্যাপারটা ভয়ানক। থানায় যে শিশুটিকে
রাখবে তা বােধ হয় না।
সরযূ। তাহলে থানায় পাঠাতে বলে দিলে কেন ?
ফণী। কিছু তাে একটা বলা চাই, নইলে যে সারাদিন এখান
থেকে নড়বে না।
সরযূ। এ অবস্থায় পড়লে তােমাকে এই রকম বলে দিলে
কি রকমটা হত ?
তা শিশু যদি কারু বাড়ীতে ফেলে
বাড়ীতে ফেলে রেখে যায়।
( ভঙ্গী। ফটিক টেবিলের নীচে দিয়া ফণীকে খোঁচা দিতে
চেষ্টা করিল)
ফণী।
।
প্রমীলার প্রথম
ফণী।
সরষু। সেটাতাে আর ও বেচারীর দোষ নয়।
ফণী । দেখ সরু, সব সময় একটা কারণ থাকে এই সব
(সেই ভঙ্গী, ফটিক)
সরযূ। ওঃ! থাকে নাকি ? (ভঙ্গী। ফটিক ফণীকে খোঁচা দিল,
সরযু দেখিল এবং চক্ষু ফণীর উপর ন্যস্ত করিল-ফণী আস্তে
আস্তে দাড়াইল) তাহলে ওর কাছে না রেখে যদি
তোমার কাছে ফেলে রেখে যেতাে ?
ফণী। ওঃ, তুমি বাজে কথা পাড়ছে।
সরযু। না, তা পাড়ছিনা। আমি আবার বলছি, ঐ শিশুটি
যদি-
আবার বার তত তােমার কোনাে হেতু নেই—আমি
পরিষ্কার বুঝছি তােমার কথা !
সর। বেশ, তাহলে
ফণী। তাহলে নিশ্চয়--অতি নিশ্চয় কোনাে দ্বিধা না করেই
(ফটিকের চা পান ) নিঃসন্দেহে আমি—আমি–আমি
ফটিককে জিজ্ঞেস করব—(ফটিকের গলায় আটকিল,
পেয়ালা রাখিয়া দিল)
ফটিক। আমাকে, জামাইবাবু ?
ফণী। ব্যাপারটা রহস্য কি।
সরষু। তাই জিজ্ঞেস্ করবে নাকি ?
ফণী। (স্বগত) যাক! একটা বলে দিয়ে তাে বাঁচলুম।
সরষু। তােমাকে যেন অসুস্থ দেখাচ্ছে, প্রিয়তম-রাত্রে বুঝি
ভালাে ঘুম হয়নি ? অনেক রাত্রে এসেছিলে কি ?
প্রমীলার প্রথম
ফণী।
ফণী। (স্বগত) এইবার খেয়েছে। প্রকাশ্যে ) বেশ
ভালাে আছি। চমৎকার ঘুম হয়েছে, একটু দেরীতে
এসেছিলাম।
সরযূ। প্রিয়তম, যখন বাড়ী এসেছিলে তখন কটা বেজেছিল
বলে মনে কর ?
তা—ত—বলতে একটু লজ্জা হয়, বােধ হয় প্রায় একটা
হবে।
সর। তাই নাকি? আমি ত দুটোর আগে ঘুমুতে যাইনি।
ফণী। ও,তাহলে হয়ত দুটো পাঁচ মিনিট কি দশ মিনিট হবে।
সরযূ। কোথায় ঘুমিয়েছিলে, লক্ষীটী ?
ফণী। পাশের ঘরে, সরু।
সরযূ। মেঝের উপর প্রিয়তম ?
ফণী। না, সরু, খাটের উপর।
সরযূ। কিন্তু আমি তাে পাঁচটার সময় দেখলুম বিছানায় কেউ
নেই।
তাহলে সাড়ে পাঁচটায় এসেছি আমি। যা এখন
এ বিষয়।
সরযু। তা থাক।
অন্য বিষয়ে দুই একটা কথা আছে-
ফণী।
ফণী।
সরযূ। সে বিষয়টার আলােচনা হয়ে গেলে তােমার বাড়ী আমি
চিরকালের মত ছেড়ে যাব।
(মুখ ঘুড়াইয়া) তথাস্তু। (বিস্ময়ের ভাব দেখাইয়া) আঁ।
ফণী।
২
প্রমীলার প্রথম
০
স। ওঃ, এতটা বিস্ময়ের ভাব দেখাতে হবে না। আমার
কথা তুমি বেশ বুঝতে পারছ ! তােমার নষ্টামি
গােপন রয়েছে বলে তুমি বিশ্বাস করছ! আমি
- জানি সব।
ফণী। সব !
সরষু। আমি জানি শশীমুখীর বাড়ীতে তুমিই শিশুটা ফেলে
এসেছ, আজ সকালে তােমার কাজেই শিশুটাকে
কে দিয়ে যায়। এখন তােমার—তােমার যদি কিছু,
বার থাকে—সে সে আমার বাবার কাছে গিয়ে:
ব’লাে। (দরজার কাছে গিয়া) আমি আমার ট্রাঙ্ক,
গুছােতে যাই। (নিষ্ক্রান্ত)
খেয়েছে। কি করে জানলে ? ফটিক
কি
করা যায় এখন ?
ফটিক। জানি না।
ফণী। কি বলি ? এর প্রত্যেকটি কথা সত্যি। ফটিক, ঠিক
করে বলতে এই শিশুটা সম্বন্ধে তুমি কিছু জান
কি না।
ফটিক। আমি, জামাইবাবু ?, না।
ফণী। তুমি আমতা আমতা করছ- -তুমি জান কিছু! হু!
বুঝছি সব। (ফটিককে ধরিয়া টানিয়া আনিয়া) তুমি
তুমিই আমার শান্তি নষ্ট করেছ ! তুমি কোথায় কি
করে এসেছ, তার জন্যে কি ভুগ ব আমি ? না ?
ফঠিক !
ফটিক।
প্রমীলার প্রথম
যাও ঐ হতভাগা স্ত্রীলােকটীর কাছে এক্ষুনি, গিয়ে
শিশুটা নিয়ে এস তার কাছ থেকে।
এর সঙ্গে আমার কি সম্বন্ধ থাকতে পারে?
ফণী। জানি না, তবে নিয়ে এস ওটাকে এখানে, নিয়ে যাও
পুলিশ স্টেশনে।
ফটিক। কিন্তু জামাইবাবু
ফণী। কিন্তু কিন্তু করতে হবে না। যাও; (ঠেলিয়া বাহির
করিয়া দিল) আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেছে। যাই,
সরষুর কাছে গিয়ে সব বুঝিয়ে বলি। কিইবা বলব
বুঝিয়ে ? আমলাে !
সেইখানেইতো গােল।
বুঝিয়ে বলার কিছু নেই! (চিঠি লইয়া ধনীর প্রবেশ,
চিঠি দিয়া নিষ্ক্রান্ত) { চিঠি খুলিয়া } আমার বােনের
চিঠি। (পড়িল) “বাবা মা পশ্চিমে থাকার সময়
গােপনে তাে আমার বিবাহ করিয়ে দিলে, কিন্তু
এখন যে নতুন বিপদ উপস্থিত, এখন তুমি ছাড়া আর
আমাকে কে রক্ষা করবে, দাদা ?” এ! আবার
কি হলো? “জানােতাে ওঁর সঙ্গে বিয়েতে বাবা মার
কিছুমাত্র মত, ছিল না।
উনি সাবডেপুটি হওয়ার
খবর গেজেটে বেরুলে মা বাবাকে জানালে আর
আপত্তি হবে না, তাই বসেছিলুম। কিন্তু এখন তুমি
ছাড়া আমাকে কেউ রক্ষা করবার নাই। সুনদাস
ও তার স্ত্রীর সাহায্যে বিপদ হতে কতকটা উত্তীর্ণ
প্রমীলার প্রথম
হয়েছি। তারা কাল কলিকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
যাবার সময় হাওড়ায় তোমার বাসায় আমার
আমার বুকের ধন-নবজাত শিশু পুত্রটি রেখে
যাবেন।” এ! প্রমীলার ছেলে ! হা ভগবান।
ফটিককে পাঠালুম পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতে। কিন্তু
(মনে মনে কি চিন্তা করিয়া হাতে গণিল) ফাল্গুন, চৈত্র,
বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, উহু,
মাঘ, ফায়ূন-যা! ফটিককে তত থামাতে হচ্ছে
এখনি, নইলে এ কোথায় গিয়ে গড়াবে কে জানে।
( ডাকিল ) ধনী ! ধনী! (সরযুর প্রবেশ-চলিয়া যাইবার
জন্য প্রস্তুত হইয়া) এ! এই যে! তুমি ঠিকই বলেছ
শিশুটি সম্বন্ধে ! আমি এটাকে নিয়ে ভীষণ মুস্কিলে
পড়েছি, কিন্তু দেখা যাচ্ছে শিশুটি আমার বােনের।
সরষু। কি।
ফণী। হাঁ, তােমার কাছ থেকে এবং মা বাবার কাছ থেকেও
তার বিয়ের খবর এতদিন গােপন করে রেখেছি, কিন্তু
বাের্ডিংএ থেকেও যে এতটা ফ্যাসাদ বাঁধিয়ে বসেছে
তাতাে জানতুম না। আর কি বুদ্ধি! চিঠি দিলে
ডাকে, তাইতো পরে এসে পৌঁছেছে।
সর। তুমি যে তােমার নিজের নষ্টামি শেষে আপন বােনের
নামে কলঙ্ক রটনা করে ঢাকার চেষ্টা করবে এতটা
নীচতা তাে তােমাকে দিয়ে সম্ভব মনে করিনি।
প্রমীলার প্রথম
২১
ফণী। কলঙ্ক রটনা কি রকম?
সে যে বিবাহিত
সরযূ। সব মিথ্যা! কে তার স্বামী ?
ফণী। অলকরায়। দেখনা চিঠি।
সরষু। (ঘা দিয়া চিঠি তার হাত হইতে ফেলিয়া দিয়া) রেখে দাও।
যা তা বলে ঠকাবে আমি তেমন বােকা নই।
ফণী। আচ্ছা, সে পরে হবে এখন। দুই একদিনের মধ্যে
প্রমীলা এখানে এলেই সব জানতে পারবে। এখন
তাে আর সময় নেই। (ডাকিল) ধনী, ধনী।
সরযূ। কিছুই জানতে চাইনা আমি। আমাকে বাড়ী ছেড়ে
যেতে দাও।
ফণী। না, দেব না। তুমি নিজ ঘরে গিয়ে কাপড় চোপড়
ছাড়।
সরযূ। না, ছাড়ব না। গাড়ী এসেছে, আমাকে যেতে দাও।
(ধনীর প্রবেশ)
ফণী। বেশ, তুমি যদি মনস্থির করে থাক যে তুমি নষ্ট করে
দেবে—ধনী, যাতে এখনি থানায়, বল গিয়ে
তোমার সুখ আর-ফটিককে যে শিশুটা—আমার।
( উভয়ে চমকিয়া উঠিল) না, না। শিশুটাকে এখানে
নিয়ে আসতে হবে। তুই এক্ষুনি যা। (ধনী নিক্রান্ত।
সরযু দরজার দিকে অগ্রসর হইল) সরযু, একটু স্থির হয়ে
ভেবে দেখ।
প্রমীলার প্রথম সরষু। বহুদিন স্থির হয়ে ভেবেছি, আর নয়। আর বােকার মত সব সহ্য করছিনা। (উভয়ে অগ্রসয় হইল) ফণী। দেখ, মিছামিছি- সরষু। দেখ, আমি আর এসব সয়ে থাকব না তােমার ঘরে। এ একেবারে স্থির নিশ্চয়। ফণী । একটু শােন- সরযূ। চুপ কর। আমি আর কোনাে কথা শুনতে চাইনা। ফণী। তােমার এই রাগের চেহারাটি কি চমৎকার যে দেখাচ্ছে সে আর কি বলব: এই মূর্তিতে আমার চোখের সামনে একটু দাড়াও, আমি নয়ন ভরে দেখেনি। মামুলী সেই এক মূর্তিতে আর দিন রাত ধ্যান করা যায় না। সরযূ। হাঁ, হাঁ, এসব আমার জানা আছে, আর নয়। ফণী। ওঃ, সরু ঠাট্টা রাখ। ঠাট্টার বিষয় নয়। তোমার চোখে আমাকে কতটা চমৎকার দেখায় সে আমি জানি। ফণী। তুমি অন্যায় বছ, সরু। আমার চোখে তােমাকে- চমৎকার না দেখালে তোমাকে বিয়ে করলুম কেন ? সরযূ। জানিনা। তােমার সঙ্গে আমার দেখা না হলেই ছিল, ভালাে। (কান্না ) ফণী। (তাহাকে বাহুতে জড়াইয়া ধরিয়া) এইতো, এইতাে! এতটা ইয়ে হয়ে গেছে। কেন তুমি! স্থির হও, স্থির হও, লমীটী! ঘরে গিয়ে এসব ছাড়। ভুল- সরযু।
প্রমীলার প্রথম
২৩
ভুল তােমার সব, ভুলটি কেটে গেলেই দেখবে মুখে
হাসি ফুটবে।
সরযূ। আর আমার মুখে হাসি ফুটবে না।
ফণী। আরে না, না, এ কিছু নয়, যাবে, এ কেটে যাবে
(স্বগত) একটু যেন নরম হয়ে আসছে। 'চল, চল।
( তার ঘরের দিকে টানিয়া নিতে নিতে) তুমি একেবারে
ইয়ে হয়ে পড়েছ, তা আশ্চৰ্য্য নয়। তবে দেখবে সব
পরিষ্কার হয়ে যাবে, তখন আমাদের মত সুখী আর
*•.
সরষু। আমি ঘরে যাচ্ছি, কিন্তু আমি কাপড় চোপড় ছাড়ছি
। (নিষ্ক্রান্ত)
ফণী। তালাবন্ধ করে রাখব নাকি? না, বােধ হয় নরম
হয়েছে কিছু। তা ছাড়া তালাবন্ধ করলে আরাে
ক্ষেপে উঠবে। ফুঃ! এমন মুস্কিলের অবস্থায়
মানুষ কি কখনাে পড়ে! গােপন বিয়ের দোষই এই।
মেয়েদের যেন ওদিকে একটা ঝোকই রয়েছে।
(ধনীর প্রবেশ)
ধনী। ফটিকবাবুকে কোথাও দেখছি না যে?
ফণী। দেখছি না! কিন্তু তাকে যে চাই। পাড়ায় খুজে
দেখ। তুই এদিকে যা, আমি যাই ওদিকে।
ধনী। ( বাহিরে চাহিয়া) ঐ যে ফটিকবাবু।
প্রমীলার প্রথম
(ফটিকের প্রবেশ)
ফণী। তাড়াতাড়ি। কোথায় ওটা? কি করেছ ওটাকে ?
ফটিক। কোন্টা?
ফণী। শিশুটা।
ফটিক। (উৎফুল্ল ভাবে) ওঃ, সে ঠিক হয়েছে।
ফণী। কোথায় ওটা। বের কর ওটাকে।
ফটিক। আমি কি করে বার করব?
ফণী। কি করে করবে ? কি করেছ ওটাকে ?
ফটিক। আমি থানায় গিয়ে কি হয়েছে বল্লম, ওরা আমার দিকে
চেয়ে হাসলে, বল্লে-আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাও।
ফণী। তুমি ?
ফটিক। আমি ফিরিয়ে নিয়ে আসছি, তখন দেখলুম একটা
খালি লালগাড় রাস্তায় দাড়িয়ে, গাড়োয়ান
ঘুমােচ্ছিল
ফণী। তুমি ?
ফটিক। আমি চারিদিকে চেয়ে দেখলুম,
কেউ কোথাও নেই,
চুপি চুপি তখন পুটুলিটি গাড়ীর ভিতর রেখে দিলুম।
ফণী। বােকা! গাধা! গজমূখ! বেরিয়ে এস, এক্ষুণি এসে
দেখিয়ে দাও কোথায় সেই গাড়ী। (ফটিককে টানিয়া
লইয়া নিঙ্কান্ত)
ধনী। কত মজাই যে দেখলুম আজ সকালে। প্রথমে শিশু
এলেন, পরে তিনি অন্তর্ধান করলেন; পরে ফটিকবার
প্রমীলার প্রথম
গেলেন তার খোঁজে, আমি গেলুম ফটিকবাবুর খোঁজে,
এখন ফটিকবাবু এলেন পুটুলিটি গাড়ীতে রেখে, এখন
সেই গাড়ী কই সেই সন্ধানে ছুটছে সবে।
(সরযূর প্রবেশ)
সর। গাড়ী ডাকিয়েছিলুম, চলে গেছে, আর একটা গাড়ী
ডেকে নিয়ে আয়তাে।
ধনী। এদিকে এখন একটা গাড়ীই মাত্র আছে—তাতে ঐ
শিশু রয়েছে।
সরযু। কি বলছিস্ তুই ?
ধনী। ফটিকবাবু তত তাই বলে গেলেন, বাবু যে তাই আনতে
গেলেন।
সরযূ। গাড়ীটা ?
ধনী। হুঁ, দিদিমণি।
সরষু। মড়ার উপর খাড়ার ঘা ? ( বাহিরে চাহিয়া) দয়া করে
তাহলে আমার জন্যে গাড়ী ডাকতে গিয়েছিলে বুঝি,
? (ফণী ও ফটিকের প্রবেশ) কোথায় গাড়ী ?
ফণী। গাড়ী চলে গেছে। (ফটিক ধপ করিয়া ইজিচেয়ারে শুইয়া
পড়িল ; ফণী হতাশভাবে মাথায় হাত দিয়া বসিল)
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সহরের উপকণ্ঠে উগ্রচগুরুদ্রের বাড়ীর বৈঠকখানা। সময়"
সায়াহ্ন। উগ্রচণ্ড, শান্তা এবং প্রমীলা বসিয়া আছে।
উগ্রচণ্ড খবরের কাগজ পড়িতেছে। চোখে চশমা।
শান্তা। (প্রমীলার প্রতি) চা দেব, মা ?
প্রমীলা। দাও।
শান্তা। (উগ্রচণ্ডের প্রতি) তােমাকে দেব ?
উগ্র। জানাে আমি খাবই। কি বােকার মত প্রশ্ন কর !
বলতো, চা খেতে কবে আমি অস্বীকার করিছি ?
শান্তা। তাচ্ছাি, আচ্ছা, প্রশ্ন করব না। দেতাে মা,
দেতাে মা, তাের
বাবাকে চা’টা এগিয়ে।
পাজি ছোঁড়াটা বিকেলের কাগজটা রাখলে কোথায় ?
সে বােধ হয় এখনাে আসেনি।
( খবরের কাগজ টেবিলে রাখিয়া দিয়া চোখের চশমা খুলিয়া
কেইসে রাখিল, এবং কেইসটি বুকের পকেটে রাখিল
নসেন্স! তুমি কি বলতে চাও তুমি এই সিদ্ধান্তে
উপনীত হয়েছ ? তুমি কি ভাবছ:সে গেইটে অপেক্ষা
করে আছে, আমি গিয়ে তার কাছ থেকে কাগজ
অন্ধ বলে ?
উগ্র।
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম
শান্তা। সেখানে যদি দাড়িয়ে থেকে থাকে তাে তার নিশ্চয়
খুব অন্যায়।
প্রমীলা। তােমার টা, বাবা।
উগ্র। (চা লইয়া একটা গোল টুল টানিয়া) বস্, মা ! (প্রমীলা
বসিল) তাের শরীরটা তো বড় কাহিল দেখাচ্ছে।
এতদিন থেকে এলুম পশ্চিমে ! তাের পরীক্ষার
জন্যে তােকে নিতে পারিনি। নইলেতাে-
প্রমীলা। না, না, বাবা, আমি বেশ আছি।
শান্তা। বায়ু পরিবর্তনের জন্যে প্রমীলাকে কোথাও নেওয়া
দরকার।
এখানকার বায়ুর কি দোষটা হয়েছে ?
শান্তা। তা দোষ হয়নি কিছু।
তাহলে পরিবর্তন করতে যাবে কেন ?
শান্তা। তা—তা জানােতাে পরিবর্তনে অনেক সময় উপকার
উগ্র।
উগ্র।
হয়।
উগ্র।
হাঁ, জানি, বায়ু পরিবর্তনে মাথার টাক থেকে আরম্ভ
করে ঘুমে নাসিকা গর্জন পর্যন্ত সব ভালাে হয়ে
যায়-এই তােমার মত।
শান্তা। জানােত আমার বােন রমার ওয়াল্টেয়ার গিয়ে কত
উপকার হয়েছিল।
হাঁ, ফিরে এসে দু’সপ্তাহের মধ্যেই মারা গিয়াছিল।
শান্তা। হায়, রমা !
উগ্র।
২৮
প্রমীলার প্রথম
উগ্র।
উগ্র।
প্রমীলা, জীবন বাবু সম্বন্ধে তাের আপত্তিটা কি ?
প্রমীলা। { মাথা নােয়াইয়া একটু পরে) আপত্তির কথা বলিনি
—তবে আমি বিয়ে করতে চাইনা।
ননসেন্স! বিয়ে করাটা প্রত্যেক মেয়েছেলেরই
কৰ্ত্তব্য।
প্রমীলা। ঘঁ, বাবা। তবে আমি বাড়ীতেই বেশ আছি,
তােমাদের ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাইনা।
শান্তা। তা এখনি তাড়া কিসের। আরাে দু’এক বছর যাক,
তখন বিয়ের আলাপ ভােলা যাবে।
চার পাঁচ বছর বল না কেন, এবং ওকে গ্লাস কেইসে
সা জয়ে রেখে দাও।
প্রমীলা। আমার তাতে আপত্তি নেই, বাবা।
এ! তাই নাকি! বােধ হয় ঐ লক্ষীছাড়া অলকটার
উপর তাের দৃষ্টি আছে। তা তােকে বলে রাখছি,
ও ভেগাবণ্ডটাকে আমি কখখনাে জামাই করব না;
ওর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল তাের কবে ?
প্রমীলা।
ওঃ, অনেকদিন আগে। (স্বগত) কাল বিকেলে।
জীবনচন্দ সব বিষয়ে বাবােটা অলকের সমান।
প্রমীলা। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। (স্বগত) অবিশ্যি
এক বিষয়ে ছাড়া-শরীরটি।
কে তােকে মনে করতে বলে ? তাের মত একটা
ক্ষুদে মেয়ে কি মানুষ চিবি ?
উগ্ন।
উগ্র।
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম
২৯
উগ্র।
উগ্র।
উগ্র।
শান্তা। আমার বােধ হয় স্বামী পছন্দর ব্যাপারে মেয়েদের
আঠারােতে আটাশের চেয়ে বেশী বুদ্ধি থাকে।
তা তােমার মনে হতে পারে। কোন্ বােকামির
কথাটা তােমার কবে মনে না হয়েছে ?
প্রমীলা। জীবনবাবু লােকটি আস্ত বােকা।
তাের মতে হতে পারে, কিন্তু তােকে বলে দিচ্ছি
বােকারাই ভালাে স্বামী হয়।
শান্তা। তুমি যে বোকা তাতে মনে হয় না।
কি ?
শান্তা। (উঠিয়া সরিয়া গিয়া) অবশ্য মাঝে মাঝে তােমার
মেজাজ একটু রুক্ষ হয়ে ওঠে, এবং যা তা বল, কিন্তু
স্বামী হিসাবে এবং পিতা হিসাবে তুমি আদর্শ মানুষ।
তােমার মত স্বামী পেয়েছি এ আমার বহু পুণ্যের
ফল। (চোখে আঁচলের প্রান্ত তুলিল)
নাও, নাও, আর ওসব বাজে ব’কোনা। আমি আবার
বছি বােকারাই ভালাে স্বামী হয়। আর বেশী
চালাক চতুর চটপটে বিশ্বফাজিলদের বিয়ে করলে
দুচার মাস যেতে না যেতেই ওরা পায়ে ঠেলে ।
তারপরই মনের প্রফুল্লতা যায়, দেহের স্বাস্থ্য নাশ
হয়, পরে অকাল মৃত্যু আসে।
শান্তা। ওঃ,আমার যখন বিয়ে হয় তখন তাের বাবার মত অমন
চতুর, সব কাজে উৎসাহী যুবক ও অঞ্চলে ছিল না।
উগ্র।
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম
আমি হলুম নিয়মের ব্যতিক্রম, ব্যতিক্রম দিয়েই
নিয়মের প্রতিষ্ঠা। (ফটিকের প্রবেশ) কি হে!
এখানে যে ?
ফটিক। জামাই বাবু পাঠালেন আপনাদেরে দেখে যেতে।
শান্তা। ভালাে করেছে।
উগ্র। কচু করেছে! (ফটিকের আগমনে ভয় পাইয়া প্রমীলা উঠিল
এবং ঠোটে আঙ্গুল চাপিল) পিতৃমাতৃভক্তির এই
উচ্ছাসের মানেটা কি?
ফটিক। (প্রমীলার প্রতি জনান্তিকে) জামাই বাবু তােমাকে
বলতে পাঠালেন তিনি শিশুটিকে যত্নে রাখবেন, তবে
তুমি সপ্তাহখানেক হাবড়ায় ওঁর বাসায় যেওনা।
দিদির সঙ্গে ভারি ঝগড়া হয়ে গেছে ওঁর। দিদি
আমাদের বাড়ী চলে গেছে।
প্রমীলা। কেন ?
ফটিক। শিশুটি যে তােমার, দিদি তা কিছুতেই বিশ্বাস করলে
, জামাই বাবু আশঙ্কা করছেন দিদি এখানে এসে
কখন উপস্থিত হয়।
প্রমীলা। আসে তবেই রক্ষা।
উগ্র। (শান্তার প্রতি) ছোঁড়াটা বিকেলের কাগজ নিয়ে আসতে
এত দেরী করছে কেন ?
শান্তা। জানােতো, ছোড়াগুলো কেমন ?
প্রমীলার প্রথম
উগ্র। ওদের ছুড়ি ভাবব তেমন বােকা নই আমি, তা বােধ
হয় তুমি জান।
শান্তা। এস ফটিক, একটু চা খাও। ফটিককে চা দেতাে,
প্রমীলা। (প্রমীলা চা দিল, ফটিক চিনির পাত্র হইতে
চিনি চুরি করিয়া পকেটে পুরিল) চা খাওয়াটা খুব ভালাে,
চা খাওয়ার উপলক্ষে খানিকটা করে গরম জল খেলে
হজমের খুব সাহায্য হয়। আমরাতো দিনে পাঁচ
ছ’বার চা খাই।
উগ্র। এখন বল কখন কখন খাও, কি কি সঙ্গে খাও, কখন
ঘুম থেকে ওঠ, কে আমার জুতায় কালী দেয়।
শান্তা। তা ওকে বলে কি লাভ ?
উগ্র। জিজ্ঞেস্ কর ও সিগারেট খায় কিনা, একটা নরম
রকমের সিগারেট খাবে কিনা।
শান্তা। সিগারেট ! তুমি তাে এ বয়সে এই বিশ্রী অভ্যাস
করনি, তা তাকে জিজ্ঞেস্ করতে যাব কেন ?
ফটিক। না, না, ছিঃ !
উগ্র। তুমি বসে বসে যত ইচ্ছা মিথ্যা কথা শোন ওর। আমি
নিজ চক্ষে দেখেছি ওকে খেতে। (ফটিক এর টা বইয়ের
পাতা উল্টাইতে ২ লুকাইয়া কেইক খাইতে গিল)
প্রমীলা। (ফটিকের প্রতি জনান্তিকে) বৌদি যদি এখানে এসে
পড়ে তাহলে উপায়?
৩
প্রমীলার প্রথম
(বামার প্রবেশ)
বামা। জীবন বাবু এসেছেন।
উগ্র। নিয়ে আয় তাকে এখানে।
শান্তা। তাহলে, বামা, আর একটি পেয়ালা নিয়ে আসি।
জীবন বাবু চা ভালােবাসেন। (বামা নিষ্ক্রান্ত)
উগ্র। তােমারতাে এই দোষ, যেই আসুক চা গেলাবে। আর
কিছুর কথা তুমি ভাবতেও পারনা ?
শান্তা। তা চা না হলে-একটু কফি
উগ্র। হাঁ, চা, কফি, সাগু, বার্লি—কেন, জল খাবার কিছু নেই
বাড়ীতে ?
শান্তা। তা আছে বৈ কি! চাবিটা নে তাে, মা! ( প্রমীল
উঠিয়া চাবি লইল) আমারী খুলে দেখবিআটার রুটি-
উগ্র। আটার রুটি! ছােলা ভাজা! অড়হরকা ডাল ! তােমার
মাথা : কেন, সন্দেশ নেই ?
শান্তা। আছে, তাইতাে বলতে যাচ্ছিলুম-আটার রুটির থালার
নীচে বাটীতে-
উগ্র। ময়দা আছে—তার নীচে হাঁড়িতে আলু আছে—তার
নীচে কলসে চাল আছে-হাঁড়িতে জিয়ােনাে কই
মাছ আছে—যাতো, প্রমীলা, তুই দেখে নিয়ে আয়।
প্রমীলা। (জনান্তিকে) বৌদি না এলেই হয়। (নিষ্ক্রান্ত)
উগ্র। (উঠিয়) বেশ বােঝা যাচ্ছে জীবন চন্দ সম্বন্ধে মা
মেয়ের একমত, আর তুমিও তাকে মনে একটি
••••
প্রমীলার প্রথম
আস্ত- বামাসহ জীবন চন্দ্রের প্রবেশ—তাহাকে দেখিয়া )
আদর্শস্থানীয় ভদ্র যুবক বলে। ওঃ, খুসি হলুম
আপনাকে দেখে। আসুন, আসুন, আপনারি কথা
বছিলুম।
জীবন।
নার্ভাস ভাবে ) তা—তা-—আমার সৌভাগ্য। (নমস্কার
করিতে হাতের লাঠি পড়িয়া গেল )
শান্তা। বসুন, বসুন, প্রমীলা গেছে একটু জল খাবার
উগ্র। চুপ কর। জীবন বাবু, এটি হচ্ছে ফটিক, ফণীর
শ্যালক। আপনাদের আর দেখা হয়নি বােধ হয়।
( জীবন ফটিকের কাছে গেল)
জীবন।
—তা বােধ হয় হয়নি—তবে, আশা করি
ফটিক। ভালাে আছেন তো, জীবন বাবু ?
জীবন। হাঁ, ভালাে, আশা করি—আপনিও--
উগ্র। আপনি বসুন।
জীবন। আচ্ছা তা লাঠি কুড়াইয়া বসিল ; বসিবার সময় টেবিলে
লাগিয়া আবার লাঠি পড়িয়া গেল। খাবার লইয়া প্রমীলার
প্রবেশ)
শান্তা। এইখানে রাখ। একটু জলযােগ করুন, জীবন বাবু।
বাড়ীর তৈরী সন্দেশ। রমেশ গােয়ালা দুধ নিয়ে
এসেছিল।
ওর দুধে চমৎকার ছানা হয়।
থেকেই তৈরী।
৩৪ প্রমীলার প্রথম উগ্র। হাঁ, এখন তােমার জ্যাকেট, ব্লাউজ, কামিজ, সেমিজ, কায়া, ছায়া, চুলের কাটা—সব কিছুরই ইতিহাসটা দিয়ে ফেল।••••••জ্বালালে । ছোঁড়াটা এখনাে কাগজ নিয়ে আসছে না কেন! জীবন বাবু, আমাকে ক্ষমা করবেন। জীবন। নিশ্চয়, নিশ্চয়। (উঠিল) উগ্র। আমি ফিরে এসে আমার পড়বার ঘরে যাব, কাজেই হয়ত আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না। জীবন। তা--- ( উগ্রচণ্ড নিষ্ক্রান্ত ) শান্তা। কি মুস্কিল, কাগজটা নিয়ে আসছে না। তাের বাবাতাে এই জন্যেই বিরক্ত হয়ে আছে। শেষে ওর অসুখ টসুখ করে বসবে—এই কাগজের জন্যেই। এই বাড়ীতে খবরের কাগজে অনেক ফাসাদ বাঁধায়। খবরের কাগজ জিনসটা না থাকলেই ছিল ভালাে। কি বলেন জীবন বাবু ? জীবন। কি বল্লেন ? শান্তা। আমি বলছিলুম- ফটিক। খবরের কাগজতে বেশ জিনস মাঐ পুলিশ গেজেট কখনাে দেখেননি ? শান্তা। না। ফটিক। ওঃ! চমৎকার ছবি সব থাকে ওতে, না জীবন বাবু ? জীবন। হবে—তবে- -আমি ঐ কাগজটার কথা শুনিনি। ঠাকরুণ ।
প্রমীলার প্রথম প্রমীলা। (স্বগত) ওঃ, কি জানি করে বসেছি। দাদার কাছে লিখে বৌদির কাছে লিখলুম না কেন, কিন্তু বৌদির পেটেতে কথা থাকতো না! (কাঁদিয়া ফেলিল) শান্তা। ( নিকটে আসিয়া) কি হয়েছে মা? জীবন। (উঠিয়া) আমি বােধ করি—আমি কিছু বলিনি যাতে প্রমীলা। না, না, কিছু নয়। বিকেল থেকে শরীরটা ভালাে লাগছিল না। শান্তা। আঃ! একেবারে ফঁাকাশে দেখাচ্ছে তাের মুখ- খানা। জীবন বাবু, ঐ জানালাটা একটু খুলে দেবেন ? জীবন। নিশ্চয়, নিশ্চয়। (উঠিয়া গিয়া জানালা খুলিয়া দিতে একটা চেয়ার উল্টাইয়া ফেলিল) শান্তা। ফটিক, একটু জল আনােতাে, বাবা! প্রমীলা। না মা, ও কিছু নয়, এখনি সেরে উঠবে। ( বাহিরে তীক্ষ্ণ ও দীর্ঘকালস্থায়ী একটা শিশ শােনা গেল। সকলে ভয়ে চমকিয়া উঠিল) এ! (স্বগত) আমার স্বামীর সঙ্কেত। ( উঠিল) শান্তা। এ আবার কি ? কে যেন বাগানে শিশ দিলে মনে হলাে। চোর টোর নয় তো! জীবন। তাই-তাই নাকি? ওদের হাতে তাে অস্ত্র থাকে- (এককোণে সরিয়া গেল) শান্তা। কেউ জানালাটা লাগিয়ে ফেল—এক্ষনি—জীবন বাবু ? (কোণে সরিয়া গেল )
প্রমীলার প্রথম
জীবন। নিশ্চয়—নিশ্চয়—তবে কিনা—আমার—আমার পা ট
মচকে গেছে।
শান্তা। ফটিক।
ফটিক। ওটা কি করে লাগাতে হয় জানি না। (অন্তকোণে
সরিয়া গেল )
শান্তা। কাউকে তাে লাগাতে হবে, নইলে জানালা দিয়েই যে
ঢুকে পড়বে।
প্রমীলা। ভয় নেই, মা, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। (দোঁড়িয়া
গিয়া জানালা লাগাইল)
শান্তা। (আতঙ্কেপ্রমীলা, সরে আয়, সরে আয়।
প্রমীলা। মিথ্যা ভয় করছ মা, এখানে কেউ নেই। (স্বগত )
ওকে তাে দেখতে পারছিনা। কিন্তু আমাকে দেখছে
নিশ্চয়।
শান্তা। ওঃ! ভয়ে আমার শরীর কাপছে। ( বসিল)
প্রমীলা। (স্বগত) সব এখন চলে যেতে তাে বেশ হতাে।
প্রকাশ্যে মা, তােমাকে ভারি অসুস্থ
দেখাচ্ছে, তােমার ঘরে যাও, একটু বিশ্রাম কর
গিয়ে। আমি আর ফটিকবাবু জীবন বাবুর কাছে
রইলুম।
শান্তা। (উঠিয়া ; তা জীবন বাবু কিছু মনে না করলে আমি
আসতে পারি।
জীবন। তা—তা-খুসির কথা-
কি মুস্কিল।
প্রমীলার প্রথম
!
প্রমীলা। যাও, মা, আমি শীগগীরই তােমার কাছে যাব ;
দেখো, তুমি আবার এসে পড়ােনা।
শান্তা। বেশী দেরী করিসনে মা।
( নিষ্ক্রান্ত )
প্রমীলা। (দৌড়িয়া ফটিকের কাছে গিয়া, তার প্রতি জনান্তিকে।
ফটিক বাবু, এ আমার স্বামী।
ফটিক। এ ! ভারি মজা তো! কোথায় তিনি ?
জীবন। (স্বগত) ভারি অদ্ভূত পরিবারটি।
প্রমীলা। (জীবনকে দেখাইয়া) ইনি চলে না যাওয়া পর্যন্ত
আপনাকে থাকতে হবে--
ফটিক। উনি কোথায় ?
প্রমীলা। দেখা যায়না—ভারি অন্ধকার ।
জীবন। মাপ করবেন—-আমি এ
প্রমীলা। না, জানালার কাছে যাবেন না, তাহলে আপনাকে
দেখে ফেল্বে।
( জীবন বাবুর প্রতি) ওঃ, মাপ
করবেন, আপনার লাঠিটা চাইলেন না ? (লাঠি
লইয়া তার হাতে নিয়া দিল )
জীবন। ধন্যবাদ--লাঠি চাইনা ! আমি বলতে যাচ্ছিলুম
প্রমীলা। না, না, শিষ্টতার কি প্রয়ােজন ? আপনি যেতে
চাইলে
জীবন। তা নয়—আমি বাস্তবিক--
প্রমীলা। ফটিক বাবু আপনাকে গাড়ী ডেকে দিবেন। কেমন,
দিবেন না, ফটিক বাবু ?
প্রমীলার প্রথম
ফটিক। নিশ্চয়।
জীবন। না, না, আমি কষ্ট দিতে চাইনা।
প্রমীলা। নমস্কার, আর একদিন নিশ্চয় আসবেন।
জীবন। তা—তা-
তা—তা-খুসির কথা-
প্রমীলা। আরাে বেশীক্ষণ থাকতে পারছেন না আমাদের সঙ্গে,
সে জন্যে দুঃখিত হলুম।
জীবন। বাস্তবিক -কিন্তু আমি, এ
প্রমীলা। নমস্কার। (তাহারা তাহাকে একরূপ ঠেলিয়া বাহির
করিয়া দিল, জীবনের গায়ের চাদর পড়িয়া রহিল ) যাক,
গেছে। এখন সঙ্কেত—জানালার কাছে দৌড়িয়া গেল)
ফটিক। হুহূরে ! সব পরিষ্কার। ( লাফাইয়া উঠিল)
( জীবনের প্রবেশ )
জীবন। মাপ করবেন। আমার চাদরটা ফেলে গেছি।
(চাদর লইয়া নিষ্ক্রান্ত )
প্রমীলা। এ ! কি যন্ত্রণাটাই দিচ্ছে ! দরজায় থাক,
ফটিক বাবু, দাড়িয়ে পাহারা দাও। ( জানালা খুলিয়া
রুমাল নাড়িল )
ফটিক। চমৎকার হয়েছে—সব পরিষ্কার।
প্রমীলা।
কেমন যেন ভয় ভয় করছে। আজ রাত্রেই ওর
সঙ্গে আমি চলে যাব, নইলে কখন আবার বৌদিদি
এসে উপস্থিত হবে। (অলক রায়ের প্রবেশ। ফটিক
জানালা লাগাইয়া দিল )
প্রমীলার প্রথম
অলক। (প্রমীলার কাছে গিয়া তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া) প্রমীলা।
সু খবর !
ফটিক। বেড়ে !
অলক। ( প্রমীলাকে ছাড়িয়া দিয়া) এটি কে ?
প্রমীলা। ও কেউ নয়—ফটিক বাবু—দাদার শালা।
অলক। ওঃ! ভালো তাে ?
ফটিক। পরিচয় হলাে—ভারি—
প্রমীলা। দাদা ফটিক বাবুকে পাঠিয়েছে খােকাকে যত্নে রাখা
হয়েছে একথা জানাতে।
অলক। চমৎকার মানুষ। কিন্তু ওঁকে আমরা বেশীদিন বিরক্ত
করব না। কালকেই তাঁকে এ দায় হতে নিষ্কৃতিদেব।
ফটিক। কাকে ! ( স্বগত) খেয়েছে !
প্রমীলা। কালকে ?
অলক। হঁ পমি, তােমাকেও আজ রাত্রেই নিয়ে যেতে চাই।
প্রমীলা।
সুখী হলুম শুনে। বৌদি এখানে এসে পড়বে সেই
ভয়ে আমিও এখানে থাকতে চাইনা।
অলক। কেন ?
ফটিক। আমি বাইরে গিয়ে পাহারা দিই, কেমন ?
প্রমীলা। হ, ফটিক বাবু, তাই কর। না, এখানে নয়।
(তার নিকটে গিয়া) বাবা কাগজ নিয়ে আছেন, ওঁর
দিক থেকে কোনাে ভয় নেই। (ফটিককে অন্যদিকে
পাঠাইল) মা আসছে দেখলে খবর দিও।
৪০
প্রমীলার প্রথম
ফটিক। (দরজায় স্বগত) ঠিক সময়ে ফস্কে আসা গেল-নইলে
কি প্রশ্ন করে বসতো ঠিক নেই। ( নিষ্ক্রান্ত)
প্রমীলা। বৌদি ভাছে দাদা ওর সঙ্গে প্রবঞ্চনা করছে,
শিশুটি যে আমার তা বিশ্বাস করছে না। দাদা
আশঙ্কা করছে বৌদি এখানে খোঁজ করতে এসে
উপস্থিত না হয়।
অলক। তা আসুক। এসে তােমাকে এখানে পাবেনা।
এখন বসে খবর শােন। জানােতাে সব ডেপুটি-
গিরিটা পেলেই আমাদের বিয়ের খবরটা তােমার
বাপ মাকে জানাব সেই প্রতীক্ষায় ছিলুম।
প্রমীলা। এখন ?
অলক। সেটা ফস্কে গেল।
প্রমীলা। এই বুঝি তােমার সু খবর ?
অলক। না। তবে শােন।
তবে শােন। সাক্ ডেপুটিগিরিটা ফস্কে গেল
শুনে ভারি নিরাশ হলুম। ভাবলুম, কি করা যায় ?
এ অবস্থায় বাবাকে সব বলে না দিয়ে কি করি ?
প্রমীলা। বলেছ ?
অলক। বলেছি।
প্রমীলা। খুব রেগেছেন ?
অলক। প্রথমটা খুব রেগে উঠে বল্লেন—“তকে আমার এক
পয়সাও দেবনা। যা, খাগে এখন খাবি কি। বিয়ে
করেছেন রূপ দেখে, রূপেতো আর পেট ভরবে না।”
প্রমীলার প্রথম
৪১
আমি বল্লম—“আমি রেঙ্গুন চলে যাচ্ছি প্রমীলাকে
নিয়ে, দুবেলা দুজনের দুমুঠো ভাত, খােকার জন্যে
একটু দুধ জোগাড় করার মত একটা কাজ দেখে
নিতে পারব।” যেই বলেছি খােকার জন্যে, অমনি
বাবা দুপা পিছিয়ে গেলেন, ওঁর চক্ষু আয়ত হয়ে
গেল, ওঁর নীচের চোয়ালটা নেবে পড়ল, বল্লেন
“এ্যা! খােকা! কতদিন হয় বিয়ে করেছি ?
বৌমাকে আর নাতিকে রেখেছি কোথায় ?
কালকেই বাড়ী নিয়ে আয়, হতচ্ছাড়া, গাধা!”
প্রমীলা। বেশ, বেশ হয়েছে। চল, আমরা এক্ষুনি দাদার
কাছে গিয়ে খােকাকে নিয়ে আসি।
(দ্রুত ফটিকের প্রবেশ)
ফটিক। মাঐ মা আসছেন।
প্রমীলা। যাও, যাও। (অলক জানালার কাছে দৌড়িয়া গেল,
কিন্তু তাহা খুলিতে পারিল না। সেখান হইতে দৌড়িয়া সে
দরজার কাছে গেল )
উগ্র। (সেদিক হইতে উকিল ) শান্তা।
( অলক দৌড়িয়া অন্য দরজার দিকে গেল, প্রমীলা ও ফটিক
তাহাকে অনুসরণ করিল ) ,
শান্তা। (সেদিক হইতে) প্রমীলা ।
ফটিক। এই এখানে! টেবিলের নীচে ঢুকে পড়ন।
প্রমীলা। না, পর্দার আড়ালে লুকোও। ( অলক লুকাইল)
৪২
প্রমীলার প্রথম
( শান্তার প্রবেশ)
শান্তা। জীবনবাবু চলে গেছেন মা ?
প্রমীলা। হঁ্যা মা। তুমি সেরে উঠেছ তাে ?
শান্তা। হাঁ, একটু।
উগ্র। (বাহির হইতে ডাকিল ) শান্তা !
শান্তা। ঐ তাের বাবা ডাকছেন। আমি যাই।
প্রমীলা। হাঁ মা, তাড়াতাড়ি চলে যাও, নইলে এখানে তিনি
এসে পড়বেন।
শান্তা। তা পড়বেনইতাে, আর না আসবেনই বা কেন।
প্রমীলা। তা ঠিকইত, তবে ভাবলুম তুমি হয়ত এখন ওঁর
সামনে পড়তে চাওনা।
শান্তা। হাঁ, রেগে থাকলে সামনে যেতে অনেক সময় ইচ্ছা
হয় না তা ঠিকই।
( কাগজ হাতে উগ্রচণ্ডের প্রবেশ }
উগ্র। কি জ্বালা ! ডাকলে উত্তর দাও না কেন? আমি
সারা বাড়ী চশমা খুঁজে বেড়াচ্ছি, তুমি কোথায় নিয়ে
তা লুকিয়ে রেখেছ ?
শান্তা। আমি লুকোব কেন ? কোথায় ফেলে রাখ তার ঠিক
নেই। (প্রমীলা ও ফটিক পর্দার আড়ালে সরিয়া গেল )
। তা রাখিই তাে। কিন্তু তােমার যদি হাত না পড়ে
তাহলে আমার চীৎকার করে গলা ভাঙ্গতে হয় না।
উগ্র
প্রমীলার প্রথম
৪৩
শান্তা। কেন মিছামিছি চীৎকার কর, বলতাে ?
উগ্র। না, বসে বসে তােমার মজ্জির অপেক্ষা করব, না ?
নাকের ডগার সামনে খবরের কাগজ ধরে বসে থাকব,
আর হেডিংগুলাে দেখেই সন্তুষ্ট হব! এইতাে--
“নেপিয়ারে ভীষণ ভূমিকম্প, সারা সহর অদৃশ্য।”
শান্তা। ওমা! সে কোথায় ? দেখিতো।
উগ্র। আমার চশমা কোথায় ? সেটা দেখিতে
শান্তা। আমি কি করে জান ? কোথায় রেখেছিলে ?
উগ্র। বিছানার নীচে-আলমারীর উপরে—চুলাের পাড়ে।
আমি যেখানে রেখেছিলুম সেখানে যদি তা থাকতে
তাহলে এখন আর আমার খুঁজতে হতো না।
শান্তা। হয়ত তাহলে বামা কোথাও---
উগ্র। নিশ্চয়—উনুনে আগুণ ধরাতে নিয়েছে—বাসন মাজতে
নিয়েছে ! তুমি বেশ জানাে আমার পড়বার ঘরের
টেবিলের কিছুই সে ছোঁয় না।
শান্তা। ওঃ, তােমার টেবিলে রেখে এসেছ ? তা আগে
বলনি কেন ? যাই, নিয়ে আসছি।
(তাহাকে টানিয়া ফিরাইয়া) যেতে হবে না। ওখানে
নেই।
শান্তা। তাহলে কোথায় থাকতে পারে ?
উগ্র। আমার মাথায়। দশ মিনিট ধরে আমিওতত সেই
প্রশ্নই করছি।
উগ্র।
৪৪
প্রমীলার প্রথম
শান্তা। আমি তাে ভেবে পাচ্ছিনে, তােমার মূর্তি দেখে আমার
মাথায় সব গােলমাল হয়ে গেছে।
উগ্র। তবে কি আমি ভিজে বেড়ালটির মত চুপ করে থাকব ;
আর তুমি তােমার মাথা পরিষ্কার করবে ! ( খুব নরম
সুরের ভঙ্গী করিয়া) খুঁজে দাও না, লক্ষীটি।
শান্তা। দেখি ভেবে।
উগ্র। আরম্ভটি চমৎকার বটে!
শান্তা। আচ্ছা, শেষবার কখন তােমার চশমা দেখলুম। হাঁ
তখন তােমার চোখে ছিল।
উগ্র। না, পায়ের আঙ্গুলে ! না, ভেবে দেখ, তা দিয়ে মাথা
আঁচড়াচ্ছিলুম না তাে ?
শান্তা। তুমি পড়ছিলে—
উগ্র। দেখ, আমার অতীতের গতিবিধির ইতিহাস শুনতে
চাইনা আমি। আমি জানতে চাই চশমা কোথায় ?
শান্তা। শান্ত হও, আমি সে কথায়ইতাে আসছি। তারপর
তুমি তা খুলে ফেলে, কেইসে রাখলে, আর তারপর
কেইসটা বুকের পকেটে রাখলে—দেখতে, বুকের
পকেটে।
উগ্র। কোথায় ?
শান্তা। (পকেট হইতে আনিয়া) এইতাে।
কে রাখলে এখানে ?
শান্তা। তুমি নিজেই রেখেছ। আমি দেখেছি।
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম
৪৫
উগ্র। তুমি কি মনে কর নিজে পকেটে রেখে আমি পাগলের
মত এখানে ওখানে খুঁজে বেড়াচ্ছি ?
শান্তা। তা আমি বলছিনা, তবে নিজে যে পকেটে রেখেছ
সে সম্বন্ধে ভুল নেই।
উগ্র। আমাকে দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে তুমি এ রকম
পরিহাস করা শিখেছ দেখে আমি সুখী হইনি,
এসবের বয়স তােমার নেই এখন।
শান্তা। কি যে বল ! তুমি কিছু হারালে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত,
হয়ে উঠে, সে অবস্থাটা কি আমার খুব সুখের ?
উগ্র। তুমি না হলে প্রমীলা। কোথায় সে ? (ডাকিল )
( প্রমীলা মাথা বাড়াইল। ফটিক অন্যদিক হইতে তাই
করিল, উগ্রচণ্ড ফিরিয়া প্রমীলাকে দেখিনা) প্রমীলা, তুই
পর্দার আড়ালে কি করছিস্ ?
প্রমীলা। ( নিকটে আসিয়া) কিছু না, বাবা, শুধু দেখছিলুম।
এটা !
উগ্র। দেখবার মতন এতে কি আছে ? পর্দার কি রূপ
বেরিয়েছিল না কি ? (নিকটে গেল।
( বামার প্রবেশ)
বামা। জরুরি কি কাজে বৌদিদি এসেছেন।
প্রমীলা।
খেয়েছে ! কি করব এখন ?
ফটিক। দিদি এসেছে ! এখনি গিয়ে জামাইবাবুকে বলতে
হয়, ফস্কে পড়ি। (দরজার দিকে গেল )
প্রমীলার প্রথম
উগ্র। বোমার কি জরুরি কাজ। এখানে নিয়ে আয়। (বামা
নিষ্ক্রান্ত) ফণী হয়ত টাকা নিতে পাঠিয়েছে। একটি
মাস যদি নিজ বেতনে চালাতে পারতাে ! টাকার
প্রয়ােজন হলেই বৌকে পাঠায়। (সরযূর প্রবেশ।
অন্যদিক দিয়া ফটিক নিষ্ক্রান্ত) ভালাে তাে ? কি জরুরী
কাজ ?
শান্তা। ভালাে আছে তাে মা ?
সরযূ। খারাপ খবর—শুনলে আপনাদের রাগ না হয়ে যাবে
। এ শুধু আমার নয়, আপনাদের মেয়েও এর
মধ্যে জড়িত।
প্রমীলা। ওঃ! (চেয়ারে বসিয়া পড়িল)
অলক। (পর্দার আড়ালে। ওঃ! কি জানি বলে বসে।
উগ্র। প্রমীলা ! কেন, কি ব্যাপার ? বস, শুনি সব।
সরযূ। (বলি) জানি না কে আমার স্বামীর কাছে একটি শিশু
পাঠিয়ে দিয়েছে--
।
( একত্রে) কি ?
;
সরষু। সে ব্যাপারটা আমার কাছ থেকে গােপন করতে
চাইলে ; কিন্তু অন্যেরা জানতাে, আমিও টের পেয়ে
ফেলি ! যখন তাকে জানালুম যে আমাকে ঠকাতে
পারেনি, জানালুম যে চিরকালের মত তার বাড়ী
প্রমীলার প্রথম
৪৭
ছেড়ে বাবার কাছে চলুম তখন সে নিজ দোষ সম্পূর্ণ
অস্বীকার করে—কার উপর চাপাতে চেষ্টা করলে
জানেন ?---প্রমীলার উপর।
উগ্র
প্রমীলা !
উগ্র। তুমি কি বলতে চাও যে আমার ছেলে বলেছে যে
শিশুটি প্রমীলার ?
সরষু। হাঁ, তাই বলতে চাই।
উগ্র। ( উঠিয়া পাজি হতভাগা ! ত্যাজ্যপুত্র করলুম ওকে !
কিন্তু আমার ছেলে ফণী যে এতটা দুর্বত্ত হতে পারে
সেওতাে বিশ্বাস হয় না। যাই আমি এখনি,
ব্যাপারটা পরিস্কার করে নিতে হবে । ( যাইতে উদ্যত )
সরযূ। ( উঠিয়া) দাঁড়ান, আমার শেষ হয়নি, আরাে খারাপ
কিছু রয়েছে।
উগ্র
আরাে খারাপ! ( শান্তা উঠিল)
সরযূ। অনেক খারাপ ! (সকলে বসিল) আমার কাছ থেকে
ব্যাপারটা লুকোবার চেষ্টা করে সে আমাদের এক
প্রতিবেশিনীর ঘরে—
প্রমীলা। কি ? ( উঠিয়া )
অলক। সে কি ?
৪৮
প্রমীলার প্রথম
ওঃ !
সরযূ। রেখে আসে। প্রতিবেশিনী পড়ে মুস্কিলে, তখন
আমার স্বামী আবার শিশুটাকে পাঠিয়ে দেয় থানায় ।
প্রমীলা।
অলক। ভীষণ পাজী।
সর। থানাওয়ালা শিশুকে গ্রহণ করেনি, সে তখন একটা
লাল ঘােড়ার গাড়ীতে শিশুটাকে ফেলে আসে ।
সে ঘােড়ার গাড়ী এখন অদৃশ্য হয়ে গেছে, কোথায়
গেছে কেউ জানে না! (উঠিয়া সরিয়া গেল।
প্রমীলা। (চীৎকার করিয়া ) ওঃ, আমার খােকারে! ( উঠিয়া
মুচ্ছিত হইয়া পড়িবার উপক্রম )
উগ্র
(আতঙ্কে প্রমীলার দিকে ফিরিয়া) কি ?
অলক। হা ভগবান! ( অজ্ঞাতসারে পর্দার বাহিরে আসিয়া পড়িল,
সকলে তাহাকে দেখিয়া ফেলিল, জীবন চন্দ আসিয়া
দরজায় দাড়াইল)
জীবন। ক্ষমা করবেন, আমি একটা কাগজ ফেলে গেছি।
উগ্র। (অলকের প্রতি) তুমি অমন করে এখানে কোন্ সাহসে
দাঁড়িয়ে আছ ? কি চাও তুমি ?
অলক। এঁ, আমি! আমি আপনার জামাই। যে শিশুটার
প্রতি অমন বিশ্রী ব্যবহার করা হয়েছে সেটি আমাদের।
আমি এখনি যাচ্ছি আপনার ছেলের কাছে, সে যদি
শিশু না ফিরিয়ে দেয় তাহলে তারই একদিন,আমারই
প্রমীলার প্রথম
উগ্র।
একদিন ! (দৌড়িতে উদ্যত, জীবনকে ঠেলিয়া দিয়া
অগ্রসর হইতেই ফণীর বাহুর মধ্যে গিয়া পড়িল। অন্যদিকে
ফটিকের আবির্ভাব। ফণীকে দেখিয়া) আপনি আমার
শিশুটিকে কি করলেন ?
প্রমীলা। ( সামলাইয়া উঠিয়া) ওরে আমার খােকারে, তাের কি
হলােরে!
সরযূ। ওঃ! আমি কি করেছি। কি করেছি। (মায়
হাত দিয়া বসিয়া পড়িল)
জীবন। মাপ করবেন, আমি এসে বিরক্ত করলুম।
( বিরক্ত-হাত দিয়া দেখাইয়া) তাহলে চলে যান না।
ফণী। এ পাগলকে ঠেকাও তাে, আমার যে গলা টিপে
মারবে!
প্রমীলা। ( অলকের কাছে দৌড়িয়া যাইতে জীবনকে ঠেলিয়া দিয়া-
অলকের প্রতি ) ওগাে, ওগাে !
ফণী। আমাকে একটু শ্বাস ফেলতে দিন, আমি সব বুঝিয়ে
বলছি
উগ্র। বুঝনােটা একটু শক্ত হবে তা পরিষ্কারই বােঝ
যাচ্চে।
ফণী। আমি সারাদিন ধরে সমস্ত লাল গাড়ীর পিছনে ছুটেছি,
প্রত্যেকটিকে জিজ্ঞেস্ করেছি তার মধ্যে কোনাে
শিশু আছে কিনা ! আট ঘণ্টা দৌড়াদৌড়ির পর
যে গাড়ােয়ানকে খুঁজছিলুম তাকে পেলুম, তার কাছ
৪.
৫;
প্রমীলার, প্রথম
থেকে নিশ্চিত জানা গেল সে শিশুটাকে থানায়
নিয়ে গিয়েছিল
সকলে।
ফণী। আমি এক চিঠি দিয়ে তৎক্ষণাৎ গাড়ােয়ানকে আবার
থানায় পাঠিয়ে দিলুম,
শিশুটিকে
তখনি নিয়ে
আসতে বলে দিলুম। (জীবনচন্দ ফিরিয়া আসিল)
অলক। ওঃ ! শেষে কি এই হলাে ।
প্রমীলা। আমার খােক। শেষে এক গাড়ােয়ানের হাতে গিয়ে
পড়লাে !
উগ্র। (জবীনকে টানিয়া এক পাশে নিয়া) সুমুখ থেকে সরে
দাড়ান, মশায়! (ফণীর প্রতি) তুমি নিজে গেলেনা
কেন শুনি ?
ফণী। জানতুম আমার স্ত্রীটি এসে এখানে উপস্থিত হবেন,
আর—দেখুন, প্রশ্ন করা সহজ, কিন্তু আমার অবস্থায়
পড়লে আপনি কি করতেন তা দেখা যেতাে।
( জীবন ফিরিয়া আসিল )
উগ্র। সরুন মশায়, সুমুখ থেকে সরে দাঁড়ান। জীবনকে
টানিয়া এক পাশে সরাইয়া দিল।
শান্তা। এ সব কি হচ্ছে !—আমি যে কিছুই বুঝতে পারছিনা
উগ্র। বুঝতে পারছ না! আমরা পশ্চিমে ছিলুম সময় মেয়ের
গােপনে বিয়ে হয়েছে, শুধু তাই নয়, তার ছেলেও
হয়েছে। আর তােমার ছেলে সেই শিশুকে একটি
প্রমীলার প্রথম
লাল ঘােড়ার গাড়ীতে চাপিয়ে থানায় পাঠিয়েছেন।
বুঝতে আর বাধছে কোথায় ?
হ ভগবান! (চেয়ারে বসিয়া পড়িল)
জীবন। ভারি--ভারি বিস্ময়ের কথা !
ফর্ণ। গাড়ােয়ানকে থানায় পাঠিয়ে ধনীকে বলে এলুম শিশু-
টিকে আসা মাত্রই যেন এখানে পাঠিয়ে দেয়, পথে
ফটিকের সঙ্গে দেখা হতেই বল্লে সরযুর প্রতি) যে
তুমি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছ। আচ্ছা
গােলমালই বাঁধিয়ে বসেছ ; শুধু তােমার মিথ্যা
সন্দেহের ফল।
উগ্র। এখন তমার স্ত্রীকে শাসিয়ে এ ব্যাপারের কিনারা
হবে না।
ফটিক। শুনুন ! গাড়ীর চাকার শব্দ শুনছি।
সকলে। না ! (তাহারা কাণ পাতিল। প্রত্যেকে বিভিন্ন ভঙ্গীতে ।
ফণী দরজায় ফটিকের কাছে দৌড়িয়া গেল এবং কাঁধের উপর
ঝুকিয়া রহিল।
জীবন। ভারি—অদ্ভুত তাে ?
ফটিক। হাঁ, গাড়ীই বটে, এখানেই থেমেছে।
প্রমীলা। ওঃ, আমার খােকারে!
অলক। ওঃ!
কেমন করছে বুকটা।
উগ্র। সব শরীরে ঘাম দিয়েছে।
ফণী। আমার মুখের ভেতরটা এমন শুকিয়ে গেছে
প্রমীলার প্রথম সরযু। ভগবান করুন শিশুটিকে যেন পেয়ে থাকে। জীবন। আমারাে তাই- ফটিক। এইতাে বামা (বামার প্রবেশ) ফণী। বামা। একটা গাড়ােয়ান এসে ডাকাডাকি করছে । সকলে। এখানে নিয়ে আয় তাকে! (বামা ও ফটিক নিষ্ক্রান্ত ; জীবন যাইতে উদ্যত ) জীবন। যাই, এখন আর থাকতে চাই না। আমার কাগজ টির জন্যে আর একদিন আসব। (দরজায় ) ( উৎফুল্লভাবে) এই তােল তারা ! ( জীবনের প্রতি) সরে যান, মশায় ! ( ঠেলিয়া অলকের উপর ফেলিয়া দিল ) অলক। (জীবনকে ঠেলিয়া দিতেই সে উগ্রচণ্ডের উপর গিয়া পড়িল। সরে যাও। ! পায়ের আঙ্গুলের উপর। সরে যাও, মশায়। (ঠেলিয়া ইজি চেয়ারের উপর ফেলিয়া দিল ) জীবন। মাপ করুন, বাস্তবিক— উগ্র। ( গাড়ােয়ান ও ফটিকের প্রবেশ) সকলে। শিশু কোথায় ? গাড়ােয়ান। নেই হুজুর! সকলে। কোথা গেল ? গাড়ােয়ান। একটি স্ত্রীলােক থানায় গিয়ে বলেছে ওর শিশু।
ফণী । প্রমীলার প্রথম ৫৩ সকলে। কোন্ স্ত্রীলোেক ? গাড়ােয়ান। এই তার ঠিকানা হুজুর। এস ! চল আমরা এক্ষুনি যাই সেখানে। তুমি বিদ্যুদ্বেগে গাড়ী হাঁকিয়ে চল—এই ঠিকানায় ( পড়িল) হীরাবাই- সকলে। হাঁ ! ফণী। ( পড়িল) গােপোলিয়া। সকলে। ঐ ? ( পড়িল) কিষণ সিংএর বাড়ী। সকলে। হাঁ। ফণী। ফণী। কাশী। সকলে। ওঃ! গাড়ােয়ান। কি ? (পলাইয়া যাইতে উদ্যত ) ( প্রমীলা অলকের বাহুর মধ্যে মুচ্ছিত হইয়া পড়িল, ফটিক গাভােয়ানের পিছনের কোটের প্রান্ত ধরিয়া টানিল, উগ্রচণ্ড খবরের কাগজ দিয়া কপালের ঘাম মুছিল ; আতঙ্কে শান্তার হাত দুটি উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইল। ফণ, সরষু ও জীবনের বিভিন্ন রকম অবস্থা )
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
দ্বিতীয় অঙ্কের অনুরূপ। শান্তা ইজি চেয়ারে—ফটিক
বসিয়া আছে, উগ্রচণ্ড টাইম টেবিল দেখিতেছে।
তারা কখন ফিরবে ?
ফটিক। শীগগীরই ফিরবে। টেলি এসেছে ন’টা বিশের
গাড়ীতে কাশী ছাড়বে। ঠিক কটায় ফিরবে উনি
টাইম টেবিল দেখেছেন।
শান্তা। শিশুটিকে পেয়েছে তারা ?
ফটিক। না, যেরূপেই থােক তারা ভুল খবর পেয়ে গেছে ।
শান্তা। ওঃ! ওঃ! এর শেষ কোথায় কে জানে ?
ফটিক। টেলিতে আছে—“আশঙ্কা নেই, শিশু এখানে
নয়, তবে খোঁজ পেয়েছি, প্রমীলাকে অন্ধকারে
রাখবেন।”
(উপরের কথাবার্তার সময় নানারকম বিরক্তিসূচক শব্দ
করিয়া পাতা উল্টাইতেছিল) মাথা আর মুণ্ডু! কিভাবে
সাজিয়েছে! কই, সূচী কই ? ওঃ, এইতাে
Benares 303 (পাতা উল্টাইল )
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম ৫৫ সরযূ। সরষু। সরযু। শান্তা। সরষু। ওঃ ! ( প্রবেশ করিয়া ) ফটিক, এই প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে, শীগগীর ওষুধ নিয়ে আয়। (ফটিক উঠিল ) প্রমীলা কেমন আছে, বৌমা ? (ফটিক নিষ্ক্রান্ত। অনেকটা ভালাে। তবে আপনি এখন ওর কাছে যাবেন না। ডাক্তার বলছেন কেউ যেন গিয়ে বিরক্ত করে। ঘরে কি বেশী আলাে ? খুব বেশী নয়, মা। তবে যথেষ্ট আছে। কেন ? টেলিতে লিখেছে—“প্রমীলাকে অন্ধকারে রাখবে।” ( হাসিয়া) তার মানে জানাবে না কিছু। সেজন্যে চিন্তা নেই। আমি আবার খবর দিয়ে যাব। (নিষ্ক্রান্ত) আমলাে (টাইম টেবিল ছুড়িয়া ফেলিয়া তার উপর লাথি চালাইল) ওঃ ! তুমি যে একেবারে চমকে তুল! দেখ, আমি জিজ্ঞেস্ করছি, টাইমটেবিল বলে বাড়ীতে অমন একাধটা কিছু আছে কিনা। হাঁ, আছে বলেইত জানি। আন সেটা? আচ্ছা, কোথায় দেখেছি সেটা ? ( চিন্তা ) : ফু, রেখে দাও তােমার চিন্তা। বামা। (ডাকিল) : উগ্র। উগ্র। উগ্র । উগ্র। বামা। ৬।
প্রমীলার প্রথম উগ্র। এত অস্থির হচ্ছ কেন? ( বিরক্তির সহিত):তা হব কেন? ওরা কখন এসে পৌছাবে তা জেনে ফেলেছি কিনা। এই টাইম- টেবিলের মতে তাে তারা সারা পৃথিবী পরিক্রমণ করে তবে এসে এখানে পৌঁছাবে। (বামার প্রবেশ। টাকা দিয়া) একটা নতুন A. B. c. কিনে নিয়ে আসতে বল। (বামা নিষ্ক্রান্ত) ওমা! তা দিয়ে তুমি কি করবে ? উগ্র। কেন ? ও বই দিয়ে আমি সিগারেট ধরাব মনে করার কোনাে কারণ আছে নাকি ? ওটাতে গাড়ীর সময়েরই খোজ করব। এ, বি, সি, এই দিয়ে তাে ছেলেপেলেরা প্রথম এ, বি, সি বইয়ের কথা কে বলছে ? আমি বলছি এ, বি, সি, টাইম টেবিলের কথা। টেবিলের কথা। দেখ, জীবন বৈচিত্র্যহীন এখন একথা আর আমাদের বলা সাজেনা। দু’মাসের মত উত্তেজনার খােরাক পেয়ে ফেলেছি আমরা। তুমি জানো কিনা জানিনা, তােমার ছেলে এবং তােমার জামাই একটি অশ্বডিম্ব আবিষ্কার করেছে। কোথায় ? কাশ্মতে। শান্তা। কি আশ্চর্য! তাই দিয়ে তারা কি করবে ? উগ্র। উগ্র ।
প্রমীলার প্রথম
উগ্র।
শান্তা।
উগ্র।
শান্তা।
উগ্র।
সিদ্ধ করে পথের খােরাকের বরাদ্দ সঙ্গে করে নিয়ে
আসবে। আমি কি বলছি বুঝতে পারলে, না,
পারলে না? তারা আলেয়ার পিছনে ছুটেছিল,
শিশুকে সেখানে পায় নাই।
ওঃ! ওঃ। এর শেষ হবে কোথায় ?
ফৌজদারীতে শিশুহত্যার অপরাধে সব কয়টিকে
শেষটায় কাঠগড়ায় গিয়ে দাড়াইতে হবে আর কি ?
শেষ কালে ঝুলতে না হলেই বাঁচি।
( চীৎকার দিয়া) এঁ।
ওরা বলছে যে খোঁজ পেয়েছে। মাথা পেয়েছে।
আচ্ছা ধূলিই দিয়েছে মেয়েটা চোখে। প্রথমত
পরীক্ষা, পরীক্ষা !' আমাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা
করতে পারবে না। পরীক্ষা হয়ে গেলে চলে গেলেও
মাসখানেক পশ্চিমে থেকে আসতে পারতাে। তারপর
সুজনদাস তাদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলেন
সেখানে গেল তিন মাস। এখন সব অর্থ বােঝা যাচ্ছে।
মেয়ের বিয়ের খবর না জানানাে ওদের ভারি অন্যায়
হয়েছে।
উগ্র।
( উঠিয়া) রেঙ্গুন চলে গেছে শুনলুম সস্ত্রীক-নইলে
এখন একবার সামনাসামনি জিজ্ঞেস করতুম।
(শশীমুখীর প্রবেশ । সে উগ্রচণ্ডকে মুখােমুখি করিয়া
আসিয়া ঈড়াইল)
৫
প্রমীলার প্রথম
শশী।
উগ্র।
শশী।
উগ্র।
শশী।
রুদ্রমশায় কোথায় ?
আপনার সম্মুখেই। কি চান আপনি ?
আমি রুদ্রমশাইকে চাই।
তিনি আপনার সম্মুখেই। কি দরকার? জরুরি
কিছু হবে, নইলে এমন অভদ্রভাবে
(তারদিকে অগ্রসর হইয়া) রুদ্রমশাইয়ের সঙ্গে দেখা
হলেই বুঝবেন জরুরি কিনা। আর তার সঙ্গে
দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ছি না।
(বসিল)
ও কি বলতে চায় শােন না ।
শশী। “ও”--আমি একটা “ও”-না ? যাক-আপমান
মাথায় করেই এসেছি ! কাজেই, যত ইচ্ছা অপমান
করুন।
উগ্র। আপনি কে, মহাশয়া ? এরকম বাড়ী চড়াওয়ের
মানে কি ?
শশী। মানেটা হচ্ছে এই যে আমি রুদ্র মশাইকে দেখতে চাই
আমার নাম শশীমুখী।
শান্তা। ওকি বল্লে রশী মুখী ?
শী। হ, যত ইচ্ছা অপমান করুন !
উগ্র। আমার নাম উগ্রচণ্ড রুদ্র।
শশী।
ওঃ! আপনি তাহলে ওর পিতা ।
উগ্র। আমার ছেলেকে চান আপনি ? সে কাশতে।
প্রমীলার প্রথম
শশী।
ওঃ!
শশী। না, না, তিনি এখানে।
উগ্র। আপনি আমাকে মিথ্যাবাদী বলছেন?
শশী। সে আমি জানিনা। আমি বলছি তিনি এখানে।
উগ্র। (চীৎকার করিয়া) তার মানে মিথ্যা কথা বলছি আমি।
শান্তা। { উঠিয়া থামাে, থামাে, অস্থির হয়ােনা। দেখছনা
স্ত্রীলােকটি উগ্র শান্তাকে ঠেলিয়া চেয়ারে বসাইয়া দিল)
যত ইচ্ছা অপমান করুন।
উগ্র। থাক, থাক, শান্তা—তুমি বাধা দিওনা। (শশীমুখীর
প্রতি শেষ কথা বলছি, আমার ছেলে কাশীতে।
শশী। আমি বলছি এখানে! গাড়ােয়ান বলেছে।
উগ্র। গাড়ােয়ান ! কোন্ গাড়ােয়ান ?
শশী। যে গাড়ােয়ান—এঁা—শিশুটিকে থানায় নিয়ে
গিয়েছিল, ওঃ, এ সম্বন্ধে সব কথা জানি মশায়।
আর—প্রতিবেশীরাও সব জানে। আপনার ছেলে
ফিরে এলে খুব ভালােরকম অভ্যর্থনাই পাবে--
সারা পাড়াই প্রস্তুত হয়ে আছে। আপনাকে খুসি
হয়ে এই খবর দিচ্ছি যে আজ সকালে ছােরারা
তার জানালায় ঢিল ছুঁড়ে আমােদ করেছে।
শান্তা। ওঃ, কি ভীষণ স্ত্রীলােকটি
শশী। ওঃ! যত খুসি অপমান করে যান।
উগ্র। শ্ৰীমান ফিরে এসে তাে ভারি সু খবর শুনবেন।
শশী। আরাে বেশী সু খবরের কথা এখনাে বলা হয়নি।
!
প্রমীলার প্রথম
=
==
উগ্র। হয়নি নাকি ? কিন্তু মহাশয়ার এই অনুগ্রহের কারণ
বােঝা যাচ্ছেনা। সে আপনার কি করেছে ?
শশী। করেছে ? ওঃ, কিছুইনা। মােটেই কিছুনা। আমার
কলঙ্কে তার কি যায় আসে ? ভদ্রবিধবার বাড়ীতে
শিশু ফেলে এসে-
উগ্র। ওঃ! তাহলে আপনিই
শশী । ( উঠিয়া) হ মশায়, আমার উপরই ঠাট্টা বিদ্রুপ চলছে,
ছােরারা রাস্তায় ঘাটে অশ্লীল ইঙ্গিত এখন আমার
কাছেই করছে।
উগ্র। স্বীকার করছি, আমার ছেলে মুহূর্তের জন্যে আত্মহারা
হয়ে অন্যায় আচরণ করেছে, কিন্তু পরমুহূর্তে নিজকে
সাল্লায়ে নিয়ে সে আপনার কাছ থেকে শিশুটি
নিয়ে এসেছে।
শশী। তাতে কি হয়েছে মশায় ? আমার দাসী তা দেখে
পাড়ায় ঢােল পিটিয়েছে, আমি আবশ্যি তাকে
তৎক্ষণাৎ বিদায় করে দিয়েছি, কিন্তু তাতে ফল
আরাে খারাপ হয়েছে, সারাদিন আমার বাড়ীর বার
হাওয়া অসম্ভব ছিল। তবে এখন গাড়ােয়ানের
কাহিনী শুনে এবং আপনার ছেলের পলায়নে আমার
কলঙ্ক ক্ষালনের কিছুটা সাহায্য হয়েছে বলতে হবে।
উগ্র। যাক, কিছুটা সান্ত্বনার কথা।
শান্তা। সেততা নিশ্চয়, বিশেষতঃ স্ত্রীলোেকটি যখন বিধবা।
প্রমীলার প্রথম
শশী। ওঃ, যত খুসী অপমান করুন।
উগ্র। থাক, আর নয়। আপনার প্রতি যে অন্যায় করা
হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ করা হবে।
শশী। আমি তাই চাই, মশায়।
( ফণী, অলক এবং ফটিকের প্রবেশ। ফণী, অলক এবং ফটিক
এক সঙ্গে “টাইম টেবিল, টাইম টেবিল” পুনঃ পুনঃ বলিয়া
রঙ্গমঞ্চে ঘুরিতে লাগিল )
ফণী। একটা টাইম টেবিল, তাড়াতাড়ি। (চারিদিকে চাহিল,
শশীমুখী সরিয়া গেল )
অলক। আমরা টাইম টেবিলে দেখতে চাই সাড়ে দশটার
গাড়ী কোন্ ষ্টেশন থেকে ছাড়ে।
শান্তা। শিশু কোথায় ?
উগ্র। সাড়ে দশটার গাড়ীর সঙ্গে শিশুর সম্বন্ধ কি ?
ফণী। (পুরাণ টাইম টেবিলটা কুড়াইয়া লইয়া) ওঃ, এই তত
একটা। (পাতা উল্টাইতে লাগিল )
শশী। (টাইম টেবিল ছে। মারিয়া ছিনাইয়া ফেলিয়া দিয়া) আগে
আমার সঙ্গে বােঝাপড়া হােমশায়।
ফণী। (কুড়াইয়া লইয়া) এ জরুরি ব্যাপার। আপনার কথা
পরে শুদ্ধ।
শশী। ( আবার ঘা দিয়া ফেলিয়া দিয়া) এখন শুনবেন মশায়।
অলক। (বই কুড়াইয়া লইয়া) আমি দেখি। (পাতা উল্টাইতে
লাগিল)
।
প্রমীলার প্রথম ( লইল উগ্র। তুমি সরে যাও বলছি। (শান্তা শশীমুখীর কাছ হইতে দূরে সরিয়া গেল ) সাড়ে দশটার গাড়ীর সঙ্গে শিশুব সম্বন্ধ কি ? ফণী। স্ত্রীলােকটা এখনাে কলকাতাতেই আছে, কিন্তু আজই সাড়ে দশটার গাড়ীতে কল্কাতা ছেড়ে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে তার ঠিক নেই। এখন সাড়ে ন'টা। অলক। এইতাে কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারছিনা। ফটিক। দিন্তত আমার কাছে। উগ্র। (অগ্রসর হইয়া) তুমি এর মাথামুণ্ড কি বােঝ ? আমাকে দাও। ফণী। (ছিনাইয়া লইয়া) আমাকে দিন। শশী। (আবার ঘা দিয়া ফেলিয়া দিল, মশায়, আপনি কেন আমার বাড়ীতে ওটাকে ফেলে এলেন তার একটা সদুত্তর- ফণী। এখন একটু টাইম টেবিলটা দেখতে দিন তােল। শশী। না, দোব না। উগ্র। (শশীমুখীর কাছে গিয়া তাহাকে টানিয়া সরাইয়া, ফটিক এবং অলক, ফণীর কঁাধের উপর দিয়া চাহিল ) সুমুখ থেকে সর (টানিয়া ঘুরাইতে লাগিল, শশী শান্তার উপর গিয়া পড়িল, শান্তা পড়িতে পড়িতে চীৎকার করিয়া তার মেয়ের ঘরে দৌড়িয়া চলিয়া গেল। শশী ঘৃণার সহিত তার দিকে চাহিয়া রহিল। মাগী।
প্রমীলার প্রথম
৬৩
ফণী। এই তাে কাশী। (উগ্রচণ্ড তাহাদের সঙ্গে যােগ দিল )
শশী। আপনি কোন সাহসে আমার গায়ে হাত দিলেন ?
উগ্র। কিন্তু কাশীই যাবে তার ঠিক কি ? সাড়ে দশটার
গাড়ী চাই।
ফণী। সাড়ে দশটার গাড়ী কই ?
ফটিক। মাঝামাঝি জায়গায়।
শশী। আমি এই অভদ্র আক্রমণের জন্যে নালিশ করব।
( সরযূর প্রবেশ)
সরযু। এসব কি হচ্চে? ওঃ, তােমরা এসেছ ? শিশু
কোথায় ?
ফণী। সে ঠিক আছে ; খােজ পেয়েছি।
শশী। (সরযূর প্রতি) নমস্কার ! আপনি বােধ হয় জানেন না
আপনার স্বামীর অনুগ্রহেই
সর। কি অনুগ্রহ ?
শশী। ঐ যে শিশুটি
বামার প্রবেশ)
বামা।
রামবাবু এই—“এ, বি, সি,” এনে দিয়েছে। শশী
এবং সরযু বসিল)
ফটিক । ঐ; (তাহার সবেগে বইটা লইতে ছুটল, বামা নিষ্ক্রান্ত
ফণী
তাহারা আবার জড় হইয়া বই দেখিতে লাগিল, ফণী পুরানো
অলক
বইটী দূরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল )
উগ্র
প্রমীলার প্রথম
সরষু। (স্বগত) কি মুস্কিল। ( প্রকাশ্যে ) আমার স্বামীর
নির্বদ্ধিতায় আপনি যদি ভুগে থাকেন তার জন্যে
আমি দুঃখিত। তিনি জানতেন না কি করছিলেন
শশী। বটে!
ফণী। এই যে !
শিয়ালদ, 10-30
সরযূ। আপনি তাহলে আজ যান। অন্যদিন এই অপ্রীতিকর
বিষয় সম্বন্ধে আপােষে আলাপ করা যাবে।
শশী। আপনার স্বামী সম্বন্ধে আমার কি ধারণা হয়েছে তাঁকে
সে কথাটা না বলে আমি যাচ্ছিনা।
ফটিক। এই দেখুন বেলেঘাটায়, 10–30
উগ্র। বােকা কোথাকার! বেলেঘাটায় যাবে কেন। (ফণী।
বই লইল।
ফণী। আর হাবড়ায়? এই যে, 10 30, দুটা গাড়ী•••••এখন
কি করা যায় ? (তাহারা খুব উত্তেজিত ভাবে আলোচনা
করিতে লাগিল)
সরযূ। কিন্তু আপনাকে জানাচ্ছি পাশের ঘরে রােগী রয়েছে,
এখন যদি নাই যা তাহলে অনুগ্রহ করে স্বর একটু
নামিয়ে কথা বলবেন।
শশী। (মাথা সােজা করিয়া স্বর নামিয়ে কথা বলব ? আপনার
। স্বামীর অন্যায় আচরণে, যে স্ত্রীলােকের নামে
চিরদিনের মত কলঙ্ক রটলাে~~-অবিশ্যি এখন তা
?
প্রমীলার প্রথম
ফণী ।
অনেকটা কেটে গেছে--তাকে, সেই স্ত্রীলােককে
আপনি বলছেন স্বর নামিয়ে কথা বলতে ?
সরযূ। আপনার সুনাম আবার ফিরে এসেছে শুনে সুখী হলুম,
তবে আপনার কথাবার্তা ও ভঙ্গীর ভীষণতা থেকে
আমি মনে করতে পারতুম-হয়ত আমার ভুল যে
নষ্ট হওয়ার মত বেশী কিছু ছিলনা আপনার।
শশী। ওঃ, যত খুসি অপমান করে যান।
সব জায়গায়ই তামাদের যেতে হবে।
অলক। আমি যাব শিয়ালদয়।
ফণী। আমি হাবড়ায়।
ফটিক। আমি বেলেঘাটায়।
ফণী। ( দরজার গিয়া চীৎকার করিয়া ) বামা, তিনটা গাড়ী নিয়ে
আয়, তাড়াতাড়ি। ( সরষুর কাছে আসিয়া) আচ্ছা
মুস্কিলে পড়া গেছে, সরু-তিনটা ঘােড়ার গাড়ী তিন
ষ্টেশন থেকে কাশী যাচ্ছে না, না, তিনটা স্টেশনে
তিন সময়ে-না, না, তিনটা স্টেশন থেকে এক সময়ে
রেলগাড়ী যাচ্ছে কাজেই তিন ষ্টেশনে তিনজনে
তিন সময়ে—না, না, এক সময়ে
মাথামুণ্ড কি বকছে কিছুই বুঝতে পারছিনা।
অলক। না, আসল কথাটা কি, তিন ষ্টেশনে সাড়ে দশটার
গাড়ী দেখতে তিনজনকে যেতে হচ্ছে।
সরষু। কেন, বুঝলাম না।
উগ্র।
• •
প্রমীলার প্রথম
ফটিক। বাঃ! শিশুটা সাড়ে দশটার গাড়ীতে এক ষ্টেশন
থেকে যে চলে যাচ্ছে।
ফুণী। ফটিক, তুমি শিশুটিকে দেখেছ, তুমি দেখলে চিনবে।
( অলকের প্রতি ) আপনি বােধ হয় দেখেছেন ?
অলক। হাঁ।
ফণী। বেশ ! তাহলে রওনা দেওয়া যাক। (ফটিককে
এক দিকে ঠেলিয়া দিয়া)
অলক। আর সময় নেই। ( ঘড়ি দেখিয়া ) দশটা প্রায় বাজে।
( অলক ও ফটিক নিষ্ক্রান্ত )
ফণী । ( ঘড়ি বাহির করিয়া তাইতাে দেখছি! ঘাই, আশা
সফল হয়ে ফিরে আসব ।
(নিষ্ক্রান্ত হইতে যাইবে অমনী শশীমুখী সামনে আসিয়া
পড়িল)
যাবার আগে আমার একটা কথা আছে, মশায়।
ফুণী। ( ঠেলিয়া সরাইতে চেষ্টা, শশীমুখী বাধা দিল ) এখন কথা
শােবার সময় নেই।
শশী। সময় করে নিতেই হবে, মশায়।
উগ্র। ( ফণীর নড়াচড়া অনুকরণ করিয়া। ফণী ও শশীমুখী দরজায়
ঠেলাঠেলি করিতে লাগিল, উগ্রচণ্ড ঠেলিয়া অগ্রসর হইয়া )
সরে যাও, মাগী।
আমাকে যেতে দিন, জীবন মরণের ব্যাপার।
এক পা নড়বার আগে আমি বােঝাপড়া করে নিতে
শশী।
ফণী।
শশী।
প্রমীলার প্রথম
উগ্র।
উগ্র।
চাই। (ফেণী শশীকে ঠেলিয়া দিয়া দৌড়িয়া নিষ্ক্রান্ত'; শশী
অনুসরণ করিল)
ঐ মাগী যদি আবার আসে তাহলে আমি ওর ঘাড়
মুচড়ে রক্ত খাব।
সরষু। এমন অদ্ভুত কাণ্ড জীবনে দেখিনি। সাড়ে দশটার
গাড়ীতে শিশুটি যাচ্ছে কোথায় ?
শোননি ? তিন ষ্টেশন থেকে একই সময়ে তিনটা
গাড়ী রওনা হয়ে যাচ্ছে, শিশুকে নিয়ে ঘুরে ফিরে
বােধ হয় কাশীই যাবে।
সরযূ।
কি জন্যে ?
উগ্র। শিশুটাকে হাওয়া খাইয়ে আনতে, মরলে পরে যেন
শিবলােকে যায়, সেই জন্যে—আমি কি করে জানব
কি জন্যে ? প্রশ্ন করে আমাকে জ্বালিও না ।
অমনি মাথা ঘুরছে।
( শান্তার প্রবেশ)
শান্তা। ' ঐ ভয়ঙ্কর স্ত্রীলােকটা গেছে তাে ?
, সে টেবিলের নীচে আছে। দেখছ না, গেছে
উগ্র ।
কিনা ?
তাহলে প্রমীলা এখানে আসতে পারে, একা একা
ওর ওখানে ভালাে লাগছে না।
, তাকে এখানে নিয়ে এস, সবার সঙ্গে এসে না
গান করবার সময়ই তার ।
উগ্র।
প্রমীলার প্রথম উগ্র।.. উগ্র। সরষু। মা, আপনি.কি পাগল হয়েছেন ? (উঠিয়া) জানেন ততা, ডাক্তারের আদেশ ওঃ, চুলােয় যাক ডাক্তার। দৌড়দাপট করুক এসে। সরযু। আমি যাচ্ছি তার কাছে। ( নিষ্ক্রান্ত). বলি, তােমার বুদ্ধিশুদ্ধি কি একেবারে লােপ হলাে ? অবিশ্যি কোন কালেই তা বেশী ছিল না। জানাে তােমার মেয়ে অসুস্থ, শিশুটাকে না পাওয়া গেলে তার পক্ষে সাংঘাতিক হতে পারে, তবুও শান্তা। ওঃ, মা-(চেয়ারে বসিল) ( ফণী ও পিছনে অনুসরণকারিণী শশীর প্রবেশ) আমাকে স্টেশনে যেতে দেবেন না নাকি ? আগে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে । এই স্ত্রীলােকটা আমাকে পুলিশের হাতে দিতে চাচ্ছে। ( শশীমুখীর প্রতি আমি তােমাকে ছ’মাসের জেল খাটাব তবে ছাড়ব। শশী। আমি ওকে খাটাব ছ’বছরের। ফণী। শশী। ফণী। উগ্র। (জীবনচন্দের প্রবেশ) জীবন। মাপ করবেন। আমার একটি কাগজ ফেলে গেছিলুম, তাই নিতে এসেছি।
প্রমীলার প্রথম
ফণী ।
ফণী।
ফণী।
{ দৌড়িয়া তার নিকটে গিয়া) বেঁচে গেছি। বেঁচে গেছি।
আপনি বন্ধু, একটু উপকার করুন।
জীবন। ওঃ! সুখের কথা।
আপনি হাবড়ায় ছুটে যান। সব চেয়ে দ্রুত গাড়ী
যা পান নেবেন—যগুলি শিশু পাবেন, গিয়ে,
গ্রেপ্তার করে এখানে নিয়ে আসুন।
জীবন। ( হতবুদ্ধি ) এ্যা!
সঙ্গে একটি পুলিশ নিয়ে যান, যেতে যেতে তাকে সব
অবস্থা বুঝিয়ে বলবেন।
জীবন। ওঃ, খুসির কথা, তবে
ফণী।
ওজর আপত্তি তুলবেন না, এটুকু উপকার করলে
আপনার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।
জীবন। ধন্যবাদ।
ফণী।
আর সময় নেই। পাগলের মত ছুটে যান। পুলিশ
নিয়ে যেতে ভুলবেন না। (ঠেলিয়া বাহির করিয়া দিল।
ঐ গর্দভচটাকে পাঠিয়ে কি ফল হবে ? এই
আমিই যাব। (ডাকিল ) বামা, আমার ওভার
কোটটা নিয়ে আয়।
আপনি ওর চেয়েও বেশী গােলমাল বাঁধিয়ে বসূবেন।
(শশীমুখীর প্রতি) আপনি ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কি চান
বলুন, পরে আমাকে হাবড়ায় যেতে দিন! ::::::
উগ্র।
ফণী।
'৭০
প্রমীলার প্রথম
'শশী।
।
আপনাকে ছাড়বার আগে আপনাকে আমি পুলিশের
হেফাজতে দিয়ে যাব।
(একদিক দিয়া কাগজ হাতে ফটিক দৌড়িয়া আসিল।
অন্যদিক দিয়া সরযুর প্রবেশ)
ফটিক। খবর আছে—খবর ।
সকলে। (অত্যন্ত আগ্রহের সহিত) কি, কি ?
ফটিক। শিশুটি।
সকলে। কি ?
ফটিক। শিশুমঙ্গলালয়ে।
সকলে। ওঃ!
ফটিক। আমরা রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিলুম গাড়ী খুঁজে
তখন ধনীর সঙ্গে দেখা। সে এটা আপনাকে দিতে
দিলে, আর বল্লে শিশুটি শিশুমঙ্গলালয়ে।
(কাগজ লইয়া) এটা কি? সমন ?
উগ্র। শিশুমঙ্গলালয় ? সেখানে গেল কি করে ?
(শশীমূখী দরজার কাছে গেল)
ফটিক। হা ভগবান!
সকলে। এটা কি ?
ফণী। আমার বিরুদ্ধে আমার শিশু ফেলে দেবার অভিযােগ
., আনা হয়েছে।
সকলে। কি!!
ফণী ।
প্রমীলার প্রথম
৭১,
ফণী ।
আমাকে গিয়ে পুলিশকোর্টে উপস্থিত হতে হবে।
এর মানে কি ? (ফটিকের প্রতি) বুঝিয়ে বলতে
পারাে ?
ফটিক। দেখা যাচ্ছে, একটি পশ্চিম দেশীয়। স্ত্রীলােক কলকাতা
থাবার কালীন তার শিশুর জন্যে একটি ধাত্রী।
নিযুক্ত করেছিল, সেই শিশু এবং ধাত্রী অন্তর্ধান
করেছে। স্ত্রীলােকটি পুলিশে খবর দিতে একটি
লােক পাঠিয়ে দেয়, তারা তাকে প্রমীলার শিশু দিয়ে
দেয়, সেই শিশুকে গাড়ােয়ান একটু আগেই
পুলিশের হাতে দিয়ে এসেছিল। ধাত্রী আসল শিশু
নিয়ে ফিরে এলে সেই স্ত্রীলােক প্রমীলার শিশুটিকে
পুলিশের কাছে ফেরত দেয়, পুলিশ তখন তাকে
শিশুমঙ্গলালয়ে পাঠিয়ে দেয়।
গাড়ী ডাক—তাড়াতাড়ি। (ফটিক নিষ্ক্রান্ত) আমরা
শিশুমঙ্গলালয়ে যাব, এবার গিয়ে যদি না পাই
তাহলে প্রথম যে গাছ পাই তাতে ফঁসী ঝুলব।
আমাকে ফেলে যেতে পারছ না মশায়—
(তার কোটের পশ্চাদ্ভাগ টানিল । ফণী ও শশী নিষ্ক্রান্ত)
সর। এত টান হঁাচড়াতে কি আর শিশুটা বাঁচবে।
( বসিয়া পড়িল)
শান্তা। . আমার আদরের টুলটুলটিকে শিশুমঙ্গলালয়ে
পাঠালে, কি লজ্জার কথা !
ফণী ।
শশী ।
१२ প্রমীলার প্রথম উগ্র। উগ্র। নইলে কি লাট বাড়ীতে পাঠাবে ? শান্তা। কি খাইয়ে রেখেছে কে জানে ? পােলাও-কোৰ্ম্মা—শিকাবাব-নইলে শিশুকে আর কি খাওয়াবে ? ( জীবনচন্দের প্রবেশ) জীবন। মাপ করবেন—আমি ফিরে এসেছি। . হাওড়া স্টেশন প্রকাণ্ড ব্যাপার, তাই জিজ্ঞেস্ করে যেতে এলুম স্টেশনের সব কটি শিশুকেই কি গ্রেপ্তার করে আনতে হবে,—না, কয়েকটি মাত্র ? শান্তা। আরে যতগুলি শিশু পারেন, সবগুলি নিয়ে আসবেন। ধন্যবাদ, মশায়, আপনার সাহায্য না হলেও আমাদের চলবে। জীবন। খুসির কথা। ( বাহিরে চীৎকার—“হুররে” “হুররে!) উগ্র। উগ্র। একি ! (ফটিকের প্রবেশ, ঢুকিতে জীবনকে দরজার গায় ঠুকিয়া } দিল ) উগ্র। ফটিক। হুররে। শিশুটি পেয়েছি। কোথায় শিশু ? শান্তা। আমাদের টুলটুলটি ! সরষু। সু খবর! প্রমীলাকে দিই গিয়ে (দৌড়িয়া নিক্রান্ত) ( ফণীর প্রবেশ। তার গায় লাগিয়া জীবন আবার আসিয়া দরজায় পড়িল)
প্রমীলার প্রথম
ফণী।
হুররে! এতক্ষণে আমাদের সমস্ত কষ্টের শেষ
হলাে।
( প্রমীলা এবং সরযূর প্রবেশ)
প্রমীলা। কোথায়—আমার খােকন কোথায় ?
(শিশু লইয়া অলকের প্রবেশ)
অলক। এই তােল!
এই তত! ( ফণী মুক ভঙ্গীতে জীবনকে বুঝাইয়া দিল।
জীবন অগ্রসর হইল। অলক শিশুকে প্রমীলার কোলে দিল,,
ফটিক একটানে পিছন হইতে একটি চেয়ার সম্মুখে আনিয়া
স্থাপন করিল, প্রমীলা তাহাতে শিশু কোলে নিয়া বসিল।
অলক তাহার পাশে জানু পাতিয়া বসিল। সরযূও সেই
অবস্থায় বসিল। শান্তা চেয়ারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।
ফটিক শান্তার পাশে, অলকের কাছে ফণী। উগ্রচণ্ড সেই
ভিড় ঠেলিয়া শিশুটিকে এক নজর দেখিতে বৃথা চেষ্টা করিতে
গিল, অবশেষে একটা চেয়ারের উপর উঠিয়া দাড়াইল)
প্রমীলা। ওরে আমার খােকনরে, আমার মাণিকরে।
শান্তা। কি সুন্দর আমাদের টুলটুলটি !
কেমন সুন্দর নাক চোখ ! প্রমীলার চেয়েও সুন্দর
হয়েছে !
শান্তা। কি–মেয়ে ?
প্রমীলা। না।
শান্তা। ছেলে ?
, ছেলেও না মেয়েও না, মাঝামাঝি ! বাপের
মত হয়েছে ?
সরযূ।
উগ্র।
২৪
প্রমীলার প্রথম
ফণী।
ফণী।
জীবন। হুবহু! (ফণীব প্রতি) এটিব বাপ কে ?
ফটিক। বেশ মােটাসােটা, না?
আচ্ছা দৌডটাই তুই দৌড়িযে নিলি আমাদেবে !
জীবন। এটি তাহলে
প্রমীলাব প্রথম সন্তান।
জীবন। প্রমীলাব প্রথম -বাপ কে ?
তুমি নও—গর নিজকে সংযত কবিল)
সকলে। আহাহা—প্রমীলাব প্রথমটী গাে- এটী আমাদেব
প্রমীলাব প্রথম।
উগ্র। প্রথম ন দ্বিতৗয কে বলতে পাবে, সেটা প্রমালাই
ভাল জানে।
উগ্র।
যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.