Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Gaibi Khun
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নন্দনকানন-৯ম।
গৈবী খুন!
ভয়াবহ খুনের গুহ- তদন্তমুলক বিচিত্র উপন্যাস
উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
বসুমতী ।
মূল্য ৬০ আনা মাত্র।
১৪।
শ্রীপুণচন্দ্র মুখােপাধ্যায়।
বসুমতী ইলেকট্রো-মেসিন প্রেস
৪ে ট, কলিকাতা।
বসুমতী পুস্তক বিভাগ
১৯৫৪ নং গ্রে স্ট্রীট,
কলিকাতা।
ওয়াণ্ডারিং জু!
অভিশপ্ত য়িহুদী!
ঠাকুরবাড়ীর দপ্তর
১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ খণ্ড রয়েল ৮০ পৃষ্ঠা।
ইহাই সেই প্রসিদ্ধ নবন্যাস।
সুলভ মূল্য ২ টাকা।
ডাঃ মাঃ ।
বসুমতী পুস্তক বিভাগ।
দুইখানি সামাজিক উপন্যাস পাঠ করুন !
১ প্রমদা
১
ফিরিঙ্গীর সেই ভীষণতর অত্যাচারের হস্ত হইতে
প্রত্যেকখানি গান, এক লইলে ১, টাকা।
হিন্দু রমণীর অলৌকিক সতীত্বরক্ষার নুতন চিত্র !
সুমতি
বঙ্গভাষায় অভিনব স্ত্রীপাঠ্য উপন্যাসদয় ।
১১৫৪ নং গ্রে স্ত্রীট, কলিকাতা।
গৈবী খুন প্রথম রঙ্গ এক নারী, দুই নর। ইউরােপে একটা সুপ্রসিদ্ধ নগরের সহরতলীতে একখানি সুবিচিত্র পােষাকের দোকান। অনেকগুলি সুন্দরী সুন্দরী দরিদ্র-কুমারী সেই দোকানের কিঙ্করী। তাহাদের মধ্যে একটীর নাম লুসী। দোকানদারের প্রিয়পাত্রী বলিয়া লুসী একটা সুন্দর ঘাগরা উপহার পাইয়াছিল। লুসী স্বভাবতঃ সুন্দরী, সেই ঘাগরাটা পরিধান করিলে তাহাকে আরও অধিক সুন্দরী দেখাইত। কিরীর সৌন্দৰ্য্যবৃদ্ধি দোকানদারের লাভের হেতু হইয়াছিল। ঘাগরা পরিলে বেশী সুন্দরী দেখায়, ইহা বিবেচনা করিয়া ২ গৈবী খুন। সেখানকার অনেক বিবি সেই ঘাগ, খরিদ করিবার জন্য প্রতিদিন দোকান- ঘরে ভিড় করিত। তাহাতেই দোকানদারের খরিদ্দার বাড়িয়াছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কুমারী লুসী দোকান হইতে বাহির হইয়া ব্রিক্স- টন রােডে হাওয়া খাইয়া বেড়াইত। একদিন রাত্রি আটটার সময় অভ্যাস- মত সে ভ্রমণ করিতেছে, রাস্তায় কতকগুলা কমলালেবুর খােসা পড়িয়া ছিল, তাহাতে পা পিছলাইয়া লুণী পড়িয়া যাইবার উপক্রম হয়, পশ্চাৎ হইতে দুটী লােক আসিয়া তাহাকে ধরে, তাহতেই পড়িয়া যায় নাই। লােক দুটার মধ্যে এক জনের নাম উইলিয়ম, দ্বিতীয় জনের নাম চার- লস। লুসী তাহাদিগকে ধবাদ প্রদান করিল, পথিমধ্যেই তিন জনে বন্ধুত্ব হইল। ঐ দুই ব্যক্তি নগরীমধ্যে কেরাণীগিরি কাৰ্য্য করিত, উভয়েই এক বাসায় থাকিত, তাহাদের দুইজনের সাপ্তাহিক বেতন তিন পাউণ্ড । রাস্তায় দেখা হইবার পর অবাধ প্রতিদিন রবিবার সন্ধ্যাকালে লুসা তাহাদের বাসায় চা খাইতে যাহত ; নানা প্রকার গল্প চলিত, হাস্য-কৌতুক হইত, কিন্তু প্রণয়াভাসের কোন প্রসঙ্গ উত্থিত হইত না। দিনকতক এই রকম চলে, এক রবিবার চার্লস্ তাহার একজন বন্ধুর সহিত সন্ধ্যার পর দেখা করিতে গিয়াছিল, বাসায় উইলিয়ম একাকা ছিল, সেই সময় লুসী গিয়া উপস্থিত হয়। বলিয়া রাখা উচিত, সেই কুমারী চার্লস অপেক্ষা উইলিয়মকে বেশী ভালবাসিয়াছিল ; উইলিয়ম একাকী আছে দেখিয়া গুনী ভারী খুসী হইল ! চা খাওয়া আরম্ভ হইল, সঙ্গে সঙ্গে গল্প ; এক বিষয়ের একঘেয়ে গল্প নহে, পাঁচরকম নূতন নূতন গল্পের সঙ্গে একটু একটু রঙ্গরস চলিতে লাগিল। এই বাসায় সুন্দরী লুসীর বেশী আদর ; উইলিয়ম তাকে আদর করিয়া বৃহৎ একখানা ইজী চেয়ারে বসাইয়াছিল ; গল্প করিতে করিতে সে একবার উঠিয়া সেই চেয়ারের পশ্চাৎ হইতে লুসীর মস্তকটা একটু ঘুরাইয়া লইয়া দুই কপােলে দুটী চুম্বন করিল।
গৈবী খুন ; মুখ ফিরাইয়া চাহিয়া লুসী বলিল, “কেন তুমি চুম্বন করিলে?” দ্বিতীয়বার চুম্বন করিয়া উইলিয়ম সেই প্রশ্নের উত্তর দান করিল। কুমারী লুসী চেয়ার হইতে উঠিয়া দাড়াইল, মুখখানি রক্তবর্ণ হইল, উন্নত স্তনদয় কঁপিতে লাগিল; কিছু বলিবে বলিবে মনে করিতেছিল, মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল, ঠিক সময়ে চারুলস সেই গৃহে পুনঃ প্রবেশ করিল ; কোন কথাই বলা হইল না। দশ মিনিট পরে লুসীকে সঙ্গে গইয়া উভয়ে রাস্তায় বাহির হইল, ঠিক।- নায় রাখিয়া আসিল। লুসী সুন্দররূপ কাজকর্ম কয়ে, ভাল ভাল পােষক বিক্রয় করে, সেই খাতিরে কারখানা-বা দুহে তাহার শয়নস নির্দিষ্ট হইয়াছিল। শৰন কক্ষে প্রবেশ কঝিয়া কুমারী প্রথমে দেয়া- লের কাছে দাড়াইল , দেয়ালে এক থানি দর্পণ ছিল, সেই দর্পণে অাপনা প্রতিবিম্ব দশন করিল ; দর্পণখানি বৃহং নহে, 'অতএ সৰ্বাঙ্গ দেখ গ না, কটিদেশ পর্যন্ত দেখিতে পাইল; আপনাকে পবর্তী দেখিয়া মনে মনে গৰ্ব্ব সিল ; দর্পণে প্রতিবিদ পড়িয়াছে, মুখখানি বেশ দেখাইতে, ঠোঁট দুখানি কঁপিতেছে, নিজের ও নিজে চুম্বন কৰিা আভলাসে। বিলাসিনী কামিনী দূণের উপরেই চুম্বন করল ! উইলিমের চুম্বনে যেৰূপ আরাম বােধ হইয়াছিল, নিজের চুলন সেপ সুপ হইল ন! ; কুমারী কিছু ক্ষুন্ন হইল । দিন খায় ; রববারো পর ছয় দিন অতিবাহিত হই গেল, ''র রবিবার আসিল। সন্ধ্যার সময় চা খাইতে হইবার পূর্বে শলী আ মনে ভাবিতে লাগিল, বিশি: হ ত আমাকে বিবাহ করিতে ইচ্ছা কৰে, সে ইচ্ছা না থাকিলে চুম্বন করিয়া না পান না কেন? বিতায় চুম্বন করিল কেন? বােপ হয়, বিবাহ করিব। এ ইচ্ছা আছে। আর * উইলিয়ম শব্দের দ্বিতীয় উচ্চারণ বিলিয়ম রসিকা সুনণীরা বিলিয়ন গুলিকে বিলি বলিয়া আদর করে ; সম্বােধনে বিল।
৪ গৈবী খুন। তাহাকে ভালবাসিয়াছি; কিন্তু কি করিয়া বিবাহ হয় ? এখানকার কেরা- শীরা যে রকম বেতন পায়, তাহা আমি জানি, সে রকম সামান্য বেতনে এক. জনেরই কষ্টে চলে, পরিণীত জীবনে স্ত্রী-পুরুষেব কিছুতেই চলিতে পারে না , তবে কিরূপে সে আমাকে ‘ববাহ করিবে ? বিবাহ হইলে আমি আর চাক্র করিব না, কাজে কাজেই চাক্রী ছাড়িতে হইবে, তখনকার উপায় কি ? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল, লুসী তখন বেশ- ভূষ করিয়া বন্ধুদের বাসায় চা খাইতে চলিল। পথেও তাহার চুম্বনের চিন্তা। উইলিয়ামের চুম্বনের পূর্বে আর কেহ নাকে কখনও চুম্বন করে নাই, সেই জন্য নুতন চুম্বনের আস্বাদ পাইয়া হার মন চলিয়া গিয়াছিল, দর্পণে চুম্বন করিয়াছিল, আশা পরিতৃপ্ত হয় নাই। কেরাণীদের বাসায় বিলাসিনী কুমারী উপস্থিত হইল। সে দিনও চা- উপস্থিত ছিল না। সহরে তাহার কি একটা কাৰ্য্য ছিল, বাসায় হিরিয়া আসিতে রাত্রি অধিক হইবে, এই কথা বলিয়া গিয়াছিল। উইলিয়ম একাকী। লসীকে প্রাপ্ত হইয়া তাহার মুখে হাতরঙ্গ ক্রীড়া করিল। বাসক নাগরের বুঝিবেন, বাহিরে হাস্য-তরঙ্গ, অন্তরে প্রেম-তরঙ্গ। চা খাওয়া হইল। সান্ধ্য সমীরণ সেবন করিবার নিমিত্ত উইলিয়ম এক- বার বেড়াইতে যাইবার প্রস্তাব করিল, কুমারী সম্মত হইল। ব্রিক্সটন রােডে ট্রামগাড়ী চলে, লুসীকে লইয়া উইলিয়ম ট্রামগাড়ীতে উঠিয়া দূরবর্তী উপবনের দিকে গমন করিল; গাড়ী হইতে নামিয়া উপবনের একপ্রান্তে নবীনতৃণদলের উপরে উভয়ে উপবেশন করিল ; চারিদিকে তরুলতা, স্থানটা নির্জন, অথচ রমণীয়। সুন্দরীর কটিদেশ বেষ্টন করিয়া নবীন নাগর উই- লিয়ম তাহাকে বারংবার চুম্বন করিল, একটা একটী করিয়া সুন্দরীর কর্ণে প্রেমের কথা শুনাইল ; সুন্দরী ও মৃদুমধুবচনে সকল কথার উত্তর দিল। বাত্রি যখন নট, তখন পুনর্বার ট্রামগাড়াতে আরােহণ করিয়া তাহার ; }
গৈবী খুন
;
উপনগরে ফিরিল ; লুসীকে কারখানা-বাড়ীতে রাখিয়া উইলিয়ম আপন
বাসায় চলিয়া গেল।
এt দ্বিতীয় রঙ্গ। বর হইবে কে ? এক মাস অতীত হইল, লুসীর সহিত উইলিয়ামের ভালবাসা বাড়িতে লাগিল। চালসকে ও লুসী ভালবাসে, কিন্তু ততটা নয়। প্রতি রবিবার তিনজনে একসঙ্গে চা খায়, একসঙ্গে গান করে, মাখামাখি ভাব হইয়াছে, অনুমান করিয়া তাহা বলা যায়, কিন্তু কেহই বিবাহের কথা বলে না। উই- নিয়ম জানে, বেশী টাকা আয় না হইলে বিলাতে বিবাহ করিতে নাই। চারুলস তাহার আফিসে কম টাকা পায় বটে, কিন্তু তাহার একটা আসা আছে, সময়ে একটা দাও জুটিতে পারে। উইলিয়ামের সে আশা নাই। এক রজনীতে দুইটা বন্ধু আপনাদের শয়নঘরে বসিয়া গল্প করিতে- ছিল, কথায় কথায় চালস বলিল, “ভাই রে। আমার কপাল ফিরিয়াছে, আমার সেই পিসীট মরিয়া গিয়াছেন। তিনি যে উইল করিয়া গিয়াছেন, সেই উইলে লেখা আছে,“আমি তিন হাজার পাউণ্ড পাইব ; তাঁহার ঘরের জিনিসপত্র, গরু-বাছুর ও গাড়ী-ঘােড় বিক্রয় করিয়া যাহা হইবে, তাহাও আমি পাইব। সেই সকল টাকা পাইলে বিবাহ করিতে আমার গৈবী খুন। ৭ মন হইবে। কুমারী লুসী আমাদের উভয়ের মধ্যে কাহাকে বেশী ভাল- বাসে, তাহা এখন জানিতে পারা যায় নাই। তাহার মনের ভাব অর্থে জানিতে না পারিলে তাহাকে কোন কথা বলা হইবে না। আগামী কল্য আমি মফঃস্বলে যাইব, পিসীর জিনিসপত্রগুলি বিক্রয় করিয়া আমার প্রাপ্য টাকাগুলি লইয়া আগামী রবিবার সন্ধ্যার পূর্বেই আমি এখানে ফিরিয়া আসিব। একটা কথা তােমাকে বলিয়া রাখি । ইতিমধ্যে যদি সূসীর সঙ্গে তােমার দেখা হয়, কত টাকা আমি পাইয়াছি, সে কথা তাহাকে বলিও না, আমি নিজেও এখন তাহাকে সে কথা বলিব না। অগ্রে তাহার মন পরীক্ষা করিব, টাকার আশা না রাখিয়া আমাদের মধ্যে কাহাকে সে পছন্দ করে, অগ্রে তা জানিব, তৎপূৰ্ব্বে টাকার কথা তাহাকে বলা উচিত বিবেচনা করি না। তুমি কি বল ?” উইলিয়ম বলিল, “আমিও তাই বলি। তুমি টাকা পাইয়াছ, সে কথা এখন আমি তাহাকে বলিব না।” রাত্রের পরামর্শ ঐ পৰ্য্যন্ত। প্রভাতে উঠিয়া চার্লস মফঃস্বলে যাত্রা করিল, সেই দিন সন্ধ্যাকালেই উইলিয়ম উত্তম পােষাক পরিয়া লুসীফে লইয়া ট্রাম-কার আরােহণে বাগান অঞ্চলে বেড়াইতে গেল। গাড়ীর যে কামরায় তাহারা বসিয়াছিল, সে কামরায় তখন অন্যলােক ছিল না। ঘেসিয়া বসিয়া উইলিয়ম একটু হাসিয়া লুসীকে বলিল, “তােমাকে আমি কত ভালবাসি, এই দেখ, তাহা তােমাকে জানাইয়া দিতেছি।” “লুসী বলিল, না, না, এখন না,-এখানে না,-একটু সবুর লুসী ভাবিয়াছিল, উইলিয়ম হয় ত গাড়ীতে বসিয়াই তাহাকে চুম্বন করিবে, তাহা ভাবিয়াই নিষেধ করিল। ভাব বুঝিতে পারিয়া উইলিয়াম হাে হো করিয়া হাস্য করিল। একটা বাগানের নিকট তাহার গাড়ী হইতে নামিল, একটী বৃক্ষতলে গৈৰী খুন। একখানি বেঞ্চ পাতা ছিল, সেই বেঞ্চের উপরে দুইজনে বসিল। অন্ধকার হইয়াছিল, দূরে দূরে গ্যাস জ্বলিতেছিল, নিকটে লোকজন ছিল না, লুসীকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া, গলা জড়াইয়া ধরিয়া, গুঞ্জনস্বরে উইলিয়ম বলিল, “আজ তােমাকে আমি একটা খােস-খবর দিব।” মুখ উচু করিয়া চকিতনয়নে চাহিয়া লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “কি রকম খােস খবর ?” উইলিয়ম হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিল, চালীর একটা পিসী আছে, তাহা কি তুমি জানাে ?” সকৌতুকে সুসী বলিল, “কে?—সেই পেনী পিসী ? সকলের সঙ্গে যে সৰ্ব্বদা ঝগড়া করে, সেই পিসী ?” উচ্চ হাস্য করিয়া উইলিয়ম বলিল, “না না না, সে নয়, আমাদের চালীর পসা। সম্প্রতি সেই পিসী মরিয়াছে, উইল করিয়া গিয়াছে, চার্জী তিন হাজার পাউণ্ডের মালিক হইয়াছে।” উদাসনয়নে চাহয় লুসী বলিয়া উঠিল, “অসম্ভব?” উইলিয়ম বলিল, “অসম্ভব নয়, সত্য কথা। সেই টাকার বন্দোবস্ত করিবার জন্যই চালী আজ সেইখানে চলিয়া গিয়াছে। আগামী রবিবার আসিবে, আমি বােধ করি, তােমাকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব করিবে। টাকার কথা এখন বলিবে না, তুমি তাহাকে ভালবাস কি না, অগ্রে সেইটা বুঝিবে।” রাষভাব জানাইয়া উগ্ৰস্বরে লুসী বলিল, “পশু ! কি ঘৃণিত চাতুরী ?” উইলিয়ম বলিল, “চাতুরীই বটে; টাকার কথা বলিবে না, বিবাহের কথা বলিবে। ভারী মিথ্যাবাদী! তবে কি জানাে, আমি গরীব, আমাকে তুমি ভালবাসিয়াছ, তাহাও আমি বেশ জানি, কিন্তু চালী এখন তিন হাজার পাউণ্ডের মালিক, আমার ভাগ্যে তিনহাজার শিলিং কখনও জুটিবে না।”
গৈবী খুন। ৯ লুসী বলিতেছিল, “সে কি তবে বিবেচনা মুখের কথা সুফিয়া লইয়া উইলিয়ম বলিল, “তাহার বিবেচনায় কিছুই হইবে না, তােমার বিবেচনার উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর। চাণী রেসমের কুঠাতে চাকুরী করে, তাহা তুমি অবশ্যই জাননা, পিসীর বাড়ী যাইবার পূর্বে সে তাহার মনিবকে ঐ টাকার কথা বলিয়াছিল। মনিব বলিয়াছে, সেই টাকা কুঠাতে জমা দিলে সে একজন অংশী হইতে পারিবে ; হপ্তায় হপ্তায় আপাততঃ পাঁচ পাউণ্ড করিয়া খরচ কবিবে, কাজ বাড়িলে তাহাব বৃত্তি ও বাড়িবে ।” লুসী বলিতেছিল, “তাহার টাকাগুলি কি তবে-- বাধা দিও। উইলিয়ম বলিল, “অবশ্যই কারবারে খাটিবে। দুই হাজার তাহার মনিবের কুঠীতে জমা রাখিবে, বাকী এক হাজার হার নিজের হাতে থাকিবে । তুমি যদি তাহাকে বিবাহ করিতে রাজ! হও, তবে সেই টাকা হইতে স্বতন্ত্র বাড়ী ভাড়া লইয়া ঘর সাজাইবার আসবাব খরিদ করবে। আমি যেন দেখিতে পাইতেছি, তুমি আমার বন্ধু চালীর অর্ধাঙ্গভাগিনী হইবে। ছােট একটী দাসী রাখিবে, ভাল কাপড়, ভাল টুপীতে সেই দাসী- টীকে সাজাইবে, আমি যখন তােমার বাড়ীতে চা খাইতে যাইব, তখন সেই দাসীটী দরজা খুলিয়া দিবে।” লুসী বলিল, “যাও, যাও, পাগলামী করিও না।” উইলিয়ম বলিল, “তুমিও পাগলামী করিও না। হপ্তায় হপ্তায় পাঁচপাইও করিয়া খরচ করিলে চার্লী আর হাটিয়া বেড়াইবে না, তােমাকেও গাড়ী কমিয়া লইয়া বেড়াইতে যাইবে তুমি বেশ সুখে থাকিবে। এই বেলা পাকা পাকা ফল পাড়িয়া নাও, বসন্তের গােলাপফুল তুলিয়া নাও। রবিবার চালী আসিবে। তুমি তাহাকে বিবাহ করিতে অমত করিও না।” কুমারী লুসী গরীব হইলেও অনেক নাট্যশালায় নাট্যাভিনয় দর্শন করিয়াছে, গীতাভিনয় শ্রবণ করিয়াছে, ক্যব্যগ্রন্থ পাঠ করিয়াছে, নাটকের ১০ গৈৰী খুন নায়িকাদের মত ভঙ্গী দেখাইয়া সে গম্ভীরবদনে বলিল, “তুমি কেন নিজে আমাকে বিবাহ করিবার কথা বলিতেছ না ? উইলিয়ম উত্তর করিল, “আগেই ত বলিয়াছি, আমি গরীব, তিন হাজার শিলিংও আমার ভাগ্যে জুটিবে না। একটা জামা কিনিয়াছি, এখনও তাহার মুল্য দিতে পারি নাই, আবার একটা না হইলেও চলিতেছে না, তােমাকে লইয়া আমি কি করিব ? কোথায় রাখিব ? কি খাওয়াইব ?” একটু চিন্তা করিয়া লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “তবে কি তুমি আমাকে চালীকে বিবাহ করিতে পরামর্শ দাও ?” উইলিয়ম উত্তর করিল, “ 1 দিয়া আর কি করি? তুমি যদি তাহাকে বিবাহ না কর, তাহা হইলে আমি বুঝিব, তুমি পাগল।” লুসী ধীরে ধীরে একখানি হস্ত পশ্চার্দিকে লইয়া গিয়া নিজ কণ্ঠ হইতে উইলিয়মের হস্ত সরাইয়া দিল ; উইলিয়ম বিস্মিত, লজ্জিত ও দুঃখিত হইল ;-বলিল, “ঠিক। ভাল কার্যের এইরূপ পুরস্কার বটে " লুসী প্রথমে কোন উত্তর করিল না ; অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া লইল। যদি সম্মুখরিকে চাহিয়া থাকিত, তাহা হইলে উইলিয়ম তাহার চক্ষে জল দেখিতে পাইত। সে জল তাহাকে দেখিতে দিবে না বলিয়াই কুমারী সাব- ধান হইয়াছিল। নেত্ৰমাৰ্জন করিয়া বেঞ্চ হইতে উঠিয়া সহসা পরিতপ্ত কুমারী অরুদ্ধস্বরে বলিল, “চল আমরা বাড়ী যাই।” “আপনাকে অপরাধী বুঝিতে পারিয়া উইলিয়ম বলিল, “চল যাই।” বৃক্ষচ্ছায়ায় অন্ধকারে দাড়াইয়া অভিমানিনী লুসী যুগলহন্তে উইলিয়মের কণ্ঠবেষ্টন পূৰ্ব্ব ? বলিল, “তুমি আমাকে চুম্বন কর।” উইলিয়ম কম্পিতশরীরে কম্পিতকণ্ঠে লুসী বলিল, *বিল! এই চুম্বন আমাদের শেষ চুম্বন।” উইলিয়ম বলিল, কাজে “কাজেই শেষ।” চুম্বন করিল গৈবী খুন। ১১ উভয়ে ট্রামগাড়ীতে উঠিল, ঠিকানায় গিয়া পৌছিল ; পােষাকের কার- পানার দ্বারদেশে উপনীত হইয়া উইলিয়ম পূর্ণ আগ্রহে লুসীর পাণিপীড়ন কলিল ; এত জোরে পীড়ন যে, কুমারীর হস্তে বেদনা লাগিল। অনুরাগিণী কামিনীর সেরূপ বেদনা গ্রাহ করে না, লুসীও গ্রাহ্য করিল না ; উইলিয়- মের মূর্তি ভাবনা করিতে করিতে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল।
তৃতীয় বর হইল চালী। ববিবার আসিল, চালীও আসিয়া পৌছিল, লুসীও আসিয়া জুটিল ; তিন- জনে দস্তুরমত ‘চা’ খাইল। সেই সময় উইলিয়মের মনে হইল, একটা জরুরী টেলিগ্রাম পাঠাইতে হইবে। রবিবারে টেলিগ্রাফ অফিস বেশীক্ষণ খােলা থাকে না, অতএব মজলীস ত্যাগ করিয়া সে শীঘ্র বাহির হইয়া গেল। দ্বারের নিকটে দাড়াইয়া একবার চারুলসের দিকে নয়ন ইঙ্গিত করিল, আর একধারে সরিয়া গিয়া লুসীর মুখের দিকেও চক্ষু টিপিয়া সেই- রূপ ইঙ্গিত করিল। গৃহমধ্যে রহিল চালী আর লুসী। অবসর বুঝিয়া চালী বলিল, “তোমাকে আজ আমি একটা কথা বলিতে ইচ্ছা করি।” কিছুই যেন বুঝিল না, সেই ভাবে বিস্ময় প্রকাশ করিয়া লুসী বলিল, “ওঃ!”
গৈবী খুন। চারদ বলল, 'আমি অন্ধকারে ঢিল ফেলিব না; অগ্রে আমি জানিতে চাই, তুমি আমাকে ভালবাস কি না? আমাকে বিবাহ করিতে তােমার ন চায় কি না ?” সী প্রথমে কোন উত্তর করিল না। সেনাটকের অভিনয় জানিত, অময়ের পদ্ধতিতে কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ করিয়া অল্পক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া ক গ্রীবা মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘চালা! তুমি কি তামাসা করিতেছ কিংবা উহা তাের মনের কথা ? চাল উওর করিল, গুরুতর কথায় তামাসা চলে না, আমার অন্তরস্থ ঘরে বাজিয়াছে, এমন সুর আর কখনো বাজে নাই।” পূবার অভিনয়ের ভঙ্গীতে লুসী বলিতেছিল, “কিন্তু—কিন্তু--” বাধা দিয়া চালা বলিল, “কিন্তু ছাড়িয়া দাও, স্পষ্ট জবাব কর ;- কি না ?” আবার অল্পক্ষণ মৌন থাকিয়া লুসী বলিল, ‘চালী ! তুমি জানো, ২ই জানো, আমি তােমাকে ভালবাসি। ওঃ! কত ভালবাসি, তাহা হরি না।” চন্নার হইতে উঠিয়া, কুমারীর পার্শ্বে জানু পাতিয়া বসিয়া, তাহার এক- ২ানি ইধারণ পূর্বক চালী বলিল, “ও কথা আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি ; * কথা এই যে, তুমি আমাকে বিবাহ করিতে পারি কি না?” অন্য এক প্রকার ভঙ্গী দেখাইয়া লুসী উত্তর করিল, “না-না---না, ও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিও না । ককটা আশ্বাস পাইয়া, টাকার গরমে চালী বলিল, “কেন করিব না ? আমি এখন আর সে মানুষ নই, আমি এখন আর গরীব লোক নই, আমি এখন টাকার মানুষ ; আমার পিসী মরিয়াছে, মৃত্যুকালে উইল করিয় আমাকে তিন হাজার পাউণ্ড দিয়া গিয়াছে, সেই টাকা আমার হাতে আসিয়াছে ; এখন আমি যাহা মনে করি, তাহাই করিতে পারি। আমাকে ১৪ গৈবী খুন। বিবাহ করিতে তােমার যদি কোন আপত্তি থাকে, টাকার জোরে আমি তাহা খণ্ডন করিতে পারিব। টাকায় কি না হয় ?” লুসী বলিল, “টাকার কথা আমি বলিতেছি না, তুমি টাকা পাইয়াছ, দেই টাকায় তােমার সৌভাগ্যের উদয় হইবে, বিবাহ করিয়া টাকাগুলি নষ্ট করা উচিত হয় না। তবে যদি তুমি বিবাহ করিয়া সুখী হইবার আগা কর, তবে আমি সম্মত আছি। তুমি আমার স্বামী হইলে আমিও সুখী হইতে পারি। আমাকে তুমি স্বার্থের দাসী মনে করিও না।” কথা কহিতে কহিতে কুমারী একখানি রুমালে আপনার চক্ষু দুটী ঢাকিল, তখনি আবার রুমালখানি নামাইয়া লইয়া চালীর পাশ্বে গিয়া বসিল, তাহার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল । মনে মনে বলিল, “বিলির চুলগুলি বেশ নরম, ইহার চুলগুলাে শক্ত শক্ত-খোঁচা খোঁচা।” চালস্ বলিল, “লুসী! সত্যই আমি বলিতেছি, তােমাকে আমি সুখী করিব।” লুসী বলিল, “তােমার টাকার লােভে আমি তােমাকে বিবাহ করিতে সম্মত হইতেছি না, আমার টাকা নাই ; আমার যদি টাকা থাকিত, তাহা হইলে কল্যই আমি তােমাকে বিবাহ করিতাম। দেখিও, বিবাহ করিয়া তােমার উন্নতির পথ অবরুদ্ধ করিও না।” উভয়ে এইরূপ কথা হইতেছিল, এমন সময় গৃহমধ্যে সুগন্ধি ধূমরাশি প্রবেশ করিল, ম্যানিলা চুরুট খাইতে খাইতে উইলিয়ম আসিয়া উপস্থিত। তাহাকে দেখিয়াই চাল আনন্দে বলিয়া উঠিল, “বিশ! বিল! লুসী আমাকে বিবাহ কহিতে রাজী হইয়াছে, তুমি অভিনন্দন কর।” উইলিয়ম বলিল, “পরম আহলাদের বিষয়। তােমরা উভয়েই এই বিবাহে সুখী হও; ঈশ্বরেরর্শনকট ইহাই আমার প্রার্থনা।” রাত্রি কিছু বেশী হইল, লুসী বাসায় চলিল ; সে রাত্রে চালী একাকী তাহাকে রাখিয়া আসিতে গেল, উইলিয়ম তাহাদের সঙ্গে গেল না। চালস গৈৰী খুন। ১৫ । । ফিরিয়া আসিবার পর দুই বন্ধুতে একত্র বসিয়া বিবাহ-সম্বন্ধে অনেক প্রকার কথােপকথন করিল। দুই দিন গেল। বিবাহের দিন স্থির হইল। পুনৰ্ব্বার বলা উচিত, এ বিবাহের বর হইল চার্জী। নব প্রণয়িনীকে যেখানে রাখিতে হইবে, অন্বেষণ করিয়া চালী তদুপযােগী একখানি বাড়ী ভাড়া লইল, ভাল ভাল আবাবপত্র খরিদ করিয়া বাড়ীখানি সাজাইল। সব ঠিকঠাক। দুইটা বন্ধুতে এক বাসায় একটা ঘরে বাস করিত, সেই রাত্রে উহাদের একত্রবাসের অবস্থান; চালীর অবিবাহিত অবস্থারও অবসান। উইলিয়মকে সঘােধন করিয়া চালস বলিল, “ভাই। এখন অবধি আমাদের ছাড়াছাড়ি হইল, কল্য হইতে আমি স্বতন্ত্র বাস করিব, এখন বল দেখি, আমি তােমার কি উপকার করিতে পারি? সন্দেহ করিও না, কুণ্ঠিত হইও না, লজ্জা করিও না, যদি তোমার কিছু আবশ্যক থাকে, অকপটে আমাকে বল। তুমি আমার প্রাণের বন্ধু, অনেক দিন একসঙ্গে ছিলাম, সাধ্যমতে তােমার কিছু উপকার করা আমার কর্তব্য।” উইলিয়ম বলিল, “যদিও তােমার কাছে আমার কিছু সাহায্য চাহিবার অধিকার নাই, কিন্তু আমার কিছু আবশ্যক হইয়াছে।” চালী।—অসঙ্কোচে বল, কি আবশ্যক? উইলি। সে দিন কারম হােটেলে যে লােকটার সঙ্গে আমাদের দেখা হইয়াছিল, যাহার নাম আর্করাইট, তাহার কথা তোমার মনে আছে? চালী।--আছে। সেই কেতাবওয়ালা।” উইলি।, সেই লােক। তাহার সহিত আমার অনেক দিনের আলাপ। কর বৎসরের মধ্যে পুস্তক বিক্রয় করিয়া লােকটা অনেক টাকা করিয়াছে, খানকতক বাড়ীও করিয়াছে। এখন আর বেশী পরিশ্রম করিতে চাহে না। সে আমাকে বলিয়াছে, আমি যদি তাহার কারবারে দুই শত পাউণ্ড জমা দিতে পারি, তাহা হইলে সে আমাকে কারবারের গৈবী খুন। লাভের আড়াই আনা অংশ দিতে পারে। আমার টাকা নাই, তাহা তুমি জানো, তুমি যদি আপাততঃ দুই শত পাউণ্ড আমাকে ঋণ দাও, তাহা হইলে কাৰ্য্যটী আমি পাই। তােমার এক ফার্দিও নষ্ট হইবে না; প্রতি মাসের প্রথমেই বারো পাউণ্ড আমি তােমাকে পাঠাইয়া দিব, দুই শত পাউণ্ড শােধ করিতে দেড় বৎসরও লাগিবে না। চার্লস দ্বিরুক্তি করিল না। সে বুঝিয়াছিল, লুসী উইলিয়মকেই ভাল- বাসিত, উইনিয়ম তাহার আশা ত্যাগ করাতে লুসী এখন তাহার হইয়াছে। উইলিয়ম তাহার উপকারী বন্ধু, ইহা স্মরণ করিয়া চাণী তৎক্ষণাৎ দুইশত পাউণ্ডের একখানা চেক লিখিয়া দিল। উইলিয়ম তাহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিল। পরদিন লুসীর সহিত চার্লীর বিবাহ হইয়া গেল। প্রধান সাক্ষী হইল উইলিয়ম। তিন জনেরই অতুল আনন্দ। নবদম্পতীর মঙ্গল কামনা করিয়া উইলিয়ম সেইখানে মনের সুখে মদ্য পান করিল। আনক্ষেত্রে মদ্যপানের নাম বন্ধুলােকের স্বাস্থ্যপান। বিবাহের পর বর-কন্যার হনিমুন-যাত্রা। প্রেমামােদে এক পক্ষকাল হনিমুনে কাটাইয়া দম্পতী ফিরিয়া আসিল; চালী অধিক আগ্রহে আপন কাৰ্যে মন দিল। যে কার- বারে সে নিযুক্ত হইল, মার্শেলিস সহরে সেই কারবারের একটা শাখা আছে, চালীকে প্রতি বৎসর গ্রীষ্মকালে একমাস সেইখানে থাকিতে হইবে, এইরূপ বন্দোবস্ত। সর্দার অংশী প্রতি বৎসর শীতকালে এক মাস মার্শোলিসে বাস করে; সুতরাং কাহারও কিছু আপত্তি করিবার কারণ রহিল না।
চতুর্থ রঙ্গ । পুরাতন ভালবাসা। নূতন কারবারে উইলিয়মের বেশ লাভ হইতে লাগিল। সে মধ্যে মধ্যে চার্লীর বাড়ীতে পান-ভােজন ও আমােদ-প্রমােদ করিয়া আইসে। বিবাহের পর লুসীর রূপ বাড়িয়াছে, লুসী বেশ মােটা-সােটা হইয়াছে, উইলিয়মকে দেখিয়া সে কেমন একরকম সকৌতুক নয়নভঙ্গী করিল। বিদায় হই বার সময় উইলিয়ম যখন লুসীর কর মর্দন করে, তখন লুসীর হস্তের অঙ্গুরীতে আঘাত লাগিল; তাহার অঙ্গুলীতে নূতন বিবাহের নূতন অঙ্গুরী ছিল, অঙ্গুৱীটী কিছু ছােট হওয়াতে মাংসের উপর চাপিয়া বসিয়াছিল, সেই জন্যই করমর্দনের সময় অত্যন্ত বেদনা অনুভূত হইল, বেদনা পাইয়াও লুসা একটু হাস্য করিল। সেই দিন অবধি উইলিয়ম ঘন ঘন লুসীর বাড়ীতে গতিবিধি আরম্ভ করিল। দুই তিন ঘণ্টা কাল বেশ আমােদ-আহলাদে কাটিয়া যায়। চলে, কৌতুক চলে, অখি-ঠারাঠারিও চলে। চালী তাহা যেন দেখিয়াও দেখে না। মদ ১৮ গৈবৗ খুন। জুলাই মাস শেষ হইয়া আসিল, দেখিতে দেখতে মাসটী ফুরাইয়া গেল, আগষ্ট মাসের আরম্ভ। এই সময় চালীকে মার্শেলিস বন্দরে যাইতে হইবে। সংবাদ আসিয়াছিল, মার্শেলিসে তখন অর-রােগের বড়ই প্রাদুর্ভাব, সেই জন্য চালী একাকী চলিয়া গেল, লুসীকে সঙ্গে লইল না। লুসীর প্রতি তাহার বিলক্ষণ বিশ্বাস, এক মাস একাকিনী থাকিলে তাহার চিত্ত বিচলিত হইবে, চালীর মনে সে সন্দেহ আসিল না। ফল কথা—লুসী যে কি জিনিস, চাব্দী তা বুঝতে পারে নাই, তাহাকে চিনতেই পারে নাই। বিবাহের পর হইতে লুসী অতিশয় মাতাল হইয়াছিল, হুইস্কির বােতল সম্মুখে না থাকিলে তাহার মন উড়, উড়, করিত, তাহার সহচরী ছিল হুইস্কি আর সোডা। বিবাহের পূর্বে কাপড়ের দোকানে হাড়ভাঙ্গা খাটুনী ছিল, এখন আর পরিশ্রম করিতে তাহার মন চায় না। স্বামী বিদেশে চলিয়া গেল, এক মাসের জন্য বিচ্ছেদ ঘটিল, সে বিচ্ছেদের ক্লেশটা লুসীর মনে আদৌ-স্থান পাইল না, মদ খাইয়া আমােদ করিয়া, বেশ হাসিয়া খেলিয়া বেড়ায়। একটা দাসী রাখিয়াছিল, তাহার উপরেই সমন্ত কাৰ্য্যের ভার। লুসী বলিত, গৃহস্থেরা কুকুর পােষে, বাড়ীতে ব- লােক আসিলে কুকুরের ঘেউ ঘেউ করিয়া ডাকে ; গৃহস্থকে যদি কুকুরের মত ডাকিতে হয়, তবে আর কুকুব রাখিবার কি দরকার? সেই সংস্কারে দাসীকে উদয়াস্ত খাটাইয়া হয়রাণ করিত, নিজে আরাম করিয়া বেড়াইত। বাস্তবিক মাতাল হইয়া অবধি লুসী বেজায় কুড়ে বনিয়। গিয়াছিল। স্বামী যখন বাড়ীতে ছিল, তখনও যেরূপ, এখনও সেইরূপ। নিজে কোন কার্যাই করে না। সকালে বিছানা হইতে উঠিতে পারে বিছানায় শুইয়া শুইয়া হাজিরা খায়, বেলা দুই প্রহরের পূর্বে বিছান, পরিত্যাগ করে না। চলী তাহা দেখিত, কিন্তু কিছুই বলিত না। সে মনে করিত, এখন সুখের দশা, এখন আর নিজে পরিশ্রম করিবে ৮ না, গৈবী খুন। ১৯ === কেন ? চার্লী এখন বিদেশে, লুসা এখন স্বাধীন, যাহা ইচ্ছ, তাহাই করে, আলস্য হইলেই মদ খায় । এক সপ্তাহ অতীত । লুসী ভাবিতে লাগিল, “করা যায় কি ? একা থাকা ভাল লাগে না,যেন মড়ার মতন হইয়া পড়িয়া থাকা অসহ। কেনই বা থাকিব? ভয় কি ?” মদ খাইলেই ঐ ভাবনা আরও প্রবল হইত। একদিন সে একখানা ক্ষুদ্র পত্র লিখিল । কাহাকে লিখিল, পাঠক মহাশয় এখনি তাহা বুঝিতে পারিবেন। পত্রে লেখা রহিল “প্রিয়তম বিল ! আমি একাকিনী, কিছুই ভাল লাগে না। শীঘ্র আইস।—তােমার লুসী।” পত্ৰখানা সে নিজেই ডাকঘরে লইয়া গেল, টেলিগ্রামের মত শাস্ত্র পোঁছাইবে বলিয়া মাসুলের উপর আরও তিন পেনী মুল্যের টিকিট চা- ইয়া দিল। সেই পত্র প্রাপ্ত হইয়া উইলিয়মের মন টলিল। সে ভাবিতে লাগিল, এ নিমন্ত্রণ রক্ষা করা উচিত। লুসী একাকিনী, সে আমাকে ডাকিতেছে, কেন আমি যাইব না ? তাহার বিবাহ হইয়াছে, আমার হাতে কি ? আমি তাহাকে ভালবাসি, সে আমাকে ভালবাসে, বিশেষত সেখানে গেলে আশ মিটাইয়া হুইস্কি খাইবার বিলক্ষণ সুবিধা হইবে। অবশ্যই আমি যাইব হুইস্কি মদিনায় উইলিয়ম নিত্য আসক্ত, কিন্তু মেয়েমানুষ হুইস্কির গন্ধ আঘ্রাণ করে, সেটা সে আসলেই ভালবাসিত না; কিন্তু লুসী হুইস্কি ভিন্ন থাকে না, তাহা জানিয়াও উইনিয়মের বিরাগ জন্মে নাই। সেই আম হােটেলের একজন পরিচারিকা প্রেমের ফাঁদ পাতিয়া উইলিয়মকে ধরিয়াছিল, উইলিয়ম তাহার পিরাতে পড়িয়াছিল, এক মাসের মধ্যে গােপনে তাহাদের বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। পরিচারিকার নাম পশী।
গৈবী খুন লুসী যেমন অপব্যয় করে, পলী তেমন করে না। মিতাচারের সেবা করিয়া পলী দুই শত পাউণ্ড সঞ্চয় করিয়াছিল। একটা নূতন কাৰ্য্যে নিযুক্ত হইবার জন্য তাহার চারি শত পাউণ্ড দরকার। নিজের ছিল দুই শত, আর দুই শহের অভাব। উইলিয়মের কাছে সে দুই শত পাউণ্ড চায়, চক্ষুলজ্জার খাতিবে উইলিয়ম তাহা দিতে স্বীকার করে ; এক পক্ষের মধ্যে দিবার ক য , এক মাস হইয়া গেল, দিতে পারিল না ; তাহার টাকা ছিল না, পলী তজ্জন্য তাহাকে তিরস্কার করে। উইলিয়ম ভাবিয়া আকুল। ঠিক সেই অবসরে পুসীর নিমন্ত্রণপত্র আইসে। উইলিয়ম ভাবিল, শুভসংঘটন ; লুসীর কাছেই দুই শত পাউণ্ড ঋণ গ্রহণ করিবার সুবিধা হইবে। ইহা স্থির করিয়াই সে সেই দিন লুসীর বাড়ীতে যাত্রা করিল। দ্বারে আঘাত করিবামাত্র লুসী স্বয়ং আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল, উইলিয়ম প্রবেশ করিল, পুনরায় দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া লুসী তাহাকে নিজের ঘরে লইয়া গিয়া বসাইল। প্রথম কথা -লুসী বলিল, “বিল! তুমি আসিয়াছ, বড়ই খুসী হইয়াছি। তুমি আসবে বলিয়া আমার দাসীটাকে আজ রাত্রের জন্য ছুটী দিয়াছি।” বিমর্ষবদনে উইলিয়ম ধীরে ধীরে বলিল, “আমার মনে বড় অসুখ।” কোলে উঠিয়া বসিয়া এক হস্তে তাহার কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “কি রকম অসুখ ? উইলিয়ম প্রথমে কথা কহিল না। লুসী এ বার উঠিয়া আসিয়া এক গ্লাস হুইস্কি ঢালিয়া তাহাতে সােডা মিশাইল, পূর্বে যে ভাবে বসিয়া ছিল, সেই ভাবে আবার উইলিয়মের জানুর উপর বসিল ; এক ইত্তে কণ্ঠবেষ্টন, অন্য হস্তে মদের গ্লাস। দুই জনে মদ খাইল। লুসী বলিল, “তুমি আমাকে চুম্বন কর। অনেক দিন চুম্বন কর নাই, আজ তােমার চুম্বন পাইতে আমার সাধ হইতেছে।”
গৈবী খুন। চুম্বন করিয়া পূৰ্ব্ববৎ বিমর্ষবদনে উইলিয়ম পুনর্বার বলিল, “আমার মনে বড় অসুখ।” স্পষ্ট কিছু বুঝিতে না পারিয়া লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “কি প্রকার অসুখ ?” স্পষ্ট কথা না বলিয়া উইলিয়ম উত্তর করিল, “যাহার অভাবে পুরুষেরা সর্বদা অসুখী থাকে, সেই প্রকার অসুখ।” চমকিত-চক্ষে চাহিয়া লুসৗ জিজ্ঞাসা করিল, “কোন মেয়েমানুষের জন্য কি ?” -- এই প্রশ্ন করিয়াই নায়কের কথা হইতে হাতখানি সরাইয়া লইল। উইলিয়ম বলিল,“তাহা নহে, তুমি ভিন্ন আর কোন মেয়েমানুষকে আমি ভালবাসিতে পারি না। আমার অসুখের কারণ কিছু টাকার তাব।” সেই কথায় বিশ্বাস করিয়া পুনরায় তাহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া লুসা সবিস্ময়ে বলিল, “টাকার অভাব?--আশ্চৰ্য। চালী বলিয়াছিল, আজকাল তুমি অনেক টাকা রােজগার করিতেছ।” উইলিয়ম বলিল, “রােজগার হইতেছে সত্য, কিন্তু আমার অংশী বলে, বৎসর শেষ না হইলে আমাকে বেশী টাকা দিবে না। ডিসেম্বর মাসের শেষে হিসাব করিয়া লাভের অংশ আমাকে প্রদান করিবে। এখন কেবল হপ্তায় হপ্তায় নিজ খরচের জন্য ছয় পাউণ্ড মাত্র আমি প্রাপ্ত হই। তাহার উপর একটা পেনীও আমি লইতে পারি না।” “লুসী বলিল, একাকী থাক, হপ্তায় ছয় পাউণ্ড পাও, তবে অকুলান কেন হয় ?” মিথ্যাকথায় উইলিয়ম বিলক্ষণ তৎপর; মনে মনে একটা উত্তর রচনা করিয়া সে তৎক্ষণাৎ বলিল, “অকুলান হইত না, তবে কি না, আমি একটা পাগলামী করিয়াছি; ঘােড়দৌড়ে বাজী রাখিয়া অনেক টাকা হারিয়াছি, গৈবী খুন। এক হপ্তার মধ্যে সেই সকল টাকা শােধ করিতে হইবে, না করিলে মান পাকিবে না।” লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “কত টাকা?” উইলিয়ম বলিল, “বেশী নয়, দুই শত পাউণ্ড মাত্র।” নতবদনে একটু চিন্তা করিয়া লুসী বলিল, “আচ্ছা, আমি যদি তােমাকে সুই শত পাউণ্ড ধার দিই, ঠিক ডিসেম্বর মাসের শেষে তাহা তুমি শােধ করিতে পারিবে কি না ?” উইলিয়ম বলিল,“নিশ্চয় পরিব,আপাততঃ দুই শত পাউণ্ড প্রাপ্ত হইলে ঋণদায় হইতে আমি মুক্ত হইতে পারি।” লুসৗ বলিল, “ডিসেম্বর মাসেই শােধ দিও। কেন না, আমার হাতে এখন বেশী টাকা নাই। বিবাহের সময় চাল আমাকে স্ত্রীধন বলিয়া পাঁচ শত পাউণ্ড যৌতুক দিয়াছিল, তাহার অধিকাংশ আমি ইতিমধ্যে খরচ করিয়া ফলিয়াছি ; তথাপি দুই শত পাউণ্ড তােমাকে আমি দিব; কিন্তু একটা করার কর।” উইলিয়ম ভাবিল, কি রকম করার চায় ? সুদ চাহিবে না কি ? মনে মনে এইরূপ সন্দেহ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি রকম করার চাও। মুখের কাছে মুখ লইয়া গিয়া লুসী বলিল,“আমি তােমাকে চাই ! আজ মঙ্গলবার,আগামী সােমবার একটা পৰ্বদিন,আমি একাকিনী আছি,এখানে মন টিকিতেছে না, তুমি আমাকে সঙ্গে করিয়া মার্গেট নগরে লইয়া চল ; দিনকতক সেখানে আমােদ-আহলাদ করিয়া চলিয়া আসিব। কল্যই ইয়া চল।” উইলিয়ম ভাবিল, বিভ্রা। পলী যদি ইহা জানিতে পারে, তাহা হইলে বিষম কলহ বাধাইবে। কুলীর কথায় রাজী না হইলেও টাকাগুলি পাওয়া যাইবে না। করা যায় কি? ইহা ভাবিয়া একটু থামিয়া থামিয়া বলিল, গতায় আমি পারিব না। তুমি একজনের বিবাহিতা স্ত্রী হইয়াছ, তােমাকে গৈবী খুন। লইয়া পৰ্বদিনের মেলা দেখিতে যাওয়া ভালকথা নহে। যদি কেহ দেখিতে পায়, চাণীকে যদি বলিয়া দেয়, তাহা হইলে তুমি বিপদে পড়িবে।” লুসী জিজ্ঞাসা করিল, “কেন ভয় করিতেছ? কে দেখিতে পাইবে ?” উইলিয়ম বলিল, “পৰ্বদিন, সমুদ্রকূলে মার্গেট, সেখানে বহুলােকের জনতা হইবে, কাহার চক্ষে পড়িব, কেহ জিজ্ঞাসা করিলে কি কৈফিয়ত, দিব, তাহা তুমি বিবেচনা কর।” লুসী বলিল, “কৈফিয়ত ?---কে আমাদের কাছে কৈফিয়ত চাহিবে ? কোন ভয় আমি রাখি না। তােমার তাে সাহস আছে ? আমার জন্য কোন ভাবনা নাই, আমার কাজ আমি নিজেই বুঝিয়া লইব।” আর একটু ভাবিয়া উইলিয়ম জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার দাসীকে কি বলিয়া যাইবে ?” লুসী উত্তর করিল, “কল্য প্রাতঃকালে সে আসিলেই তাহাকে আমি জবাব দিব। কোন কাজের নয়, ভারী কুড়ে, কথায় কথায় আবার বেজার হয়, মুখনাড়া দেয়, আজই তাহাকে আমি বলিয়াছি, দরকার নাই। কল্যই তাহাকে জবাব দিব। সদরদরজায় চাবী দিয়া চাবী আমি নিজে সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইব।” সব ফিকির ভাসিয়া গেল দেখিয়া উইলিয়ম অবশেষে বলিল,তবে আচ্ছা, কল্য বৈকালের ঐণেই রওনা হওয়া যাইবে। তােমাতে আমাতে এক গাড়ীতে যাইব না, সেখানে পৌঁছিয়াও দুই জনে এক ঘর থাকিব না, আমি আমার নিজ নামেও পরিচয় দিব না। কল প্রাতঃকালে সেখান- কার একটা হােটেলে টেলিগ্রাম করিব, ঘর স্থির করিয়া তােমাকে সংবাদ দিব। বৈকালে পাঁচটার পূর্বে তুমি ভিক্টোরিয়া ষ্টেসনে উপস্থিত থাকি, আমি তােমার অগ্রে গিয়া দুইখানা টিকিট কিনিয়া রাখিব। পরামর্শই ঠিক।”
২৪ গৈবী খুন। লুসীর ঘরে মদ্য পান করিয়া, আমােদ আহলাদ করিয়া রাত্রি ১১টার পর উইলিয়ম আপন কর্মস্থানে চলিয়া গেল। মঙ্গলবারের রজনী অবসান। বুধবার প্রাতঃকালে লুসী আপনার প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র গাঁটরী বাঁধিয়া প্রস্তুত হইয়া রহিল। বেলা দুই প্রহরের পূর্বে ডাকযােগে একখানা চিঠি আসিল, উইলিয়ম লিখিয়াছে--- “প্রিয়তমে লুসী! মার্গেটের বারিগল হােটলে ঘর ঠিক করিয়াছি। তােমার নামে একটী ঘর, তাহার নম্বর ২৩, আমি আমার নাম বদলাইয়। ২৪ নম্বর ঘর স্থির করিয়াছি। আমার নাম হইয়াছে ওয়ার্ণার। হােটেলে সেইরূপ টেলি- গ্রাম পাঠাইয়াছি, সেখানকার টেলিগ্রামে ঐরূপ উত্তর পাইয়াছি। বেলা ৫ টার পূর্বে তুমি ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনে যাইও, বিলম্ব হইলে ট্রেণ পাওয়া যাইবে না। তােমার প্রেমাস্পদ বিল।” বন্দোবস্তমত বুধবার অপরায়ু ৫টার ট্রেনে উভয়ে মার্গেটে পৌছিল। বারিগল হােটেলে লুসী অগ্রে উপস্থিত হইল, পাঁচ মিনিট পরে ওয়ার্নার- নামধারী উইলিয়ম। ২৩ নম্বর ও ২৪ নম্বর দুই ঘরে দুই জনে রহিল। দুই জনেই হুইস্কি ভক্ত, দুই জনেই আমােদপ্রিয়, বেশ আলাদ-আমােদে রাত্রি কাটিল, তাহার পর রবিবার পর্যন্ত চারি দিন চারি রাত্রি সমান আমােদ চলল। সােমবার সমাগত। সেই দিন পর্পোৎসব। প্রভাতে লুসীর ঘরে প্রবেশ করিয়া গল্প করিতে করিতে উইলিয়ম সেই টাকার কথা তুলিল। লুসা বলিল, “কল্য তােমাকে এখানে থাকিতে হইবে, চেক-বহি আমার সঙ্গেই আছে, কল্যই তােমাকে চেক দিব।”
গৈবী খুন। পাউণ্ড। উইলিয়ম বলিল, “কল্য আমি থাকিতে পারিব না,কল্য আমাকে লওনে যাইতে হইবে; তােমার খাতিরে পাঁচদিন আমি বাহিরে বাহিরেই কাটাইলাম, কাজকৰ্ম্ম নষ্ট হইতেছে, কল্য প্রাতঃকালে অবশ্যই আমাকে যাইতে হইবে।” লুসী বলিল,“আচ্ছা, তবে আজই লিখিয়া দিতেছি।” এই বলিয়া ব্যাগের ভিতর হইতে চেক-বহি বাহির করিয়া টেবিলে গিয়া ৰাসল, কালীতে কলম ডুবাইয়া একটু ভাবিয়া জিজ্ঞাসা কবিল,“ওয়ার্ণার নামটা লিখিয়া দিব কি?” উইলিয়ম বলিল, “না না, ও নাম লিখিও না, চেকবাহক লিখিলেই ঠিক হইবে।” লুস তাহাই িখিয়া দিল। মঙ্গলবারের তারিখ, অঙ্কপাত দুই শত দস্তখত করিয়া চেকখানি উইলিয়মের হাতে দিয়া প্রফুল্লবদনে লুসী বলিল, “কেমন, এখন তো খুসী হহলে ?” উইলিয়ম বলিল, “যে উপকার তুমি করিলে, তাহা আমি জীবনে ভুলিব না। তোমাকে ধন্যবাদ !” লুসী বলিল, "হ, মনে রাখিও, চেষ্টা করিও না।” চেকখানি পকেটে রাখিয়া উইলিয়ম অন্যপ্রসঙ্গে অনেক কথা বলিল। লুসা বলিল, “বিল! পূর্বে তুমি আমাকে যত ভালবাসিতে, এখন তাহার অর্ধেকও নাই ; সিকিও নাই ; সর্বক্ষণ যেন ছাড়া ছাড়া ভাব দেখিতেছি।” উইলিয়ম বলিল, “তোমার প্রতি আমার ভালবাসা এক বিন্দুও কমে নাই ; তুমি তাহা বুঝিতে পারিতেছ না।” লুসী বলিল, “আচ্ছা, যদি কমে নাই, তবে প্রমাণ দেখাও। যাহা আমি বলি, তাহা যদি করিতে পার, তবে বুঝিব, তােমার মুখের কথার সঙ্গে মনের মিল, তবে বুঝিব, সত্যই তুমি আমাকে ভালবাস। শনিবার পৰ্যন্ত এইখানে আমি থাকিব, তােমাকেও থাকিতে হইবে।”
গৈবী খুন ; উইলিয়ম বলিল, “আমি থাকিতে পারিব না। প্রথমেই তােমাকে বলিয়াছি, মঙ্গলবার আমাকে লণ্ডনে উপস্থিত থাকিতেই হইবে। অদ্যই আমি বিদায় হইলাম, সেলাম।” কথা-কাটাকাটি করিতে করিতে উভয়ে কলহ করিবার উপক্রম হইল। সেই সময় হােটেলের একজন কিঙ্করী লুসীর জন্য হাজিরাখানা লইয়া আসিল ; তাহার দিকে লক্ষ্য না করিয়া, উইলিয়নের দিকে চাহিয়া, লুসী বলিল, “তবে তুমি থাকিবে না ?” দৃঢ়সংকল্পে উইলিয়ম উত্তর করিল, “কিছুতেই না।” অনিমেষ-দৃষ্টিতে উইলিয়মের মুখের দিকে চাহিয়া লুসী পুনরায় বলিল, “বুঝিতেছি, আমাকে খুন করাই তোমার একান্ত চেষ্টা ; আমার মরা মুখ দেখিলে তুমি বাঁচো।” হােটেলের পরিচারিকার সম্মুখে নির্বোধ লুসী এরূপ কথা বলিল, উই- লিয়ম তাহাতে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া হােটেলের বিলের টাকা চুকাইয়া দিম তৎক্ষণাৎ হােটেল হইতে বাহির হইয়া গেল।
পঞ্চম রঙ্গ বিভীষণ কাণ্ড। লণ্ডনে উপস্থিত হইয়া মঙ্গলবার পূর্বাহে উইলিয়ামের প্রথম কাৰ্য্য চেক ভাঙ্গাইয়া টাকা লওয়া। ব্যাঙ্কের লােকেরা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল,নােট লইবে কি নগদ টাকা লইবে ? উইলিয়ম বলিয়াছিল, “সমস্তই স্বর্ণমুদ্রা চাই।” তদনুসারে দুই শত স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণ করিয়া উইলিয়ম সর্বপ্রথমে পলীর বাড়ীতে গেল, দুই শত স্বর্ণমুদ্রা তাহাকে দিয়া তাহার মনস্তুষ্টিসাধন করিল। খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর উইলিয়ম যখন চলিয়া আসিবার জন্য উঠিয়া দাড়াইল, পলাঁ তখন তাহাকে বসাইয়া আদুরে কথায় বলিল, “মামার শরীরটা কিছু খারাপ আছে, বাহিরে খানিকক্ষণ হাওয়া খাইয়া আসিতে পারিলে সুস্থ হইতে পারি। ট্রামগাড়ী করিয়া তুমি আমাকে গ্রীণউইচ ময়দানে বেড়াইতে লইয়া চল।” আহাৱাদির পর অপর দ্বিতীয় ঘটিকার সময় পলীকে লইয়া উইলিশ ময়দানে বেড়াইতে গেল। আকাশে যতক্ষণ সুৰ্য্য ছিল, ততক্ষণ প্রান্তর- বিহার, সূর্যাস্তের পর তাহারা একটা হােটেলে জলযােগ ফরিতে গেল। একজন খানসামাকে ডাকিয়া খানা প্রস্তুত করিবার হুকুম দিল। যে ঘরে গৈবী খুন। ; তাহারা বসিয়াছিল, সে ঘরে তখন অপর নােক কেহই ছিল না; টেবি- লের উপর একখানা খবরের কাগজ পড়িয়া ছিল, উইলিয়ম সেইখানা তুলিয়া লইয়া পাঠ করল। টাটকা খবর। কাগজের উপর একবার চক্ষু বুলাইয়াই তাহার গাত্রকম্প উপস্থিত, বানােধ ; সে যেন তখন পাথ- রের পুতুলের মত অস্পন্দ। চকিতনয়নে তাহার দিকে চাহিয়া পলী জিজ্ঞাসা করিল, “ও কি? কি হইল তােমার ? কাণ্ডখানা কি ?” উইলিয়ম কিছুই উত্তর করতে পারিল না। পলী তখন তাহার হস্ত হইতে কাগজখানা কাড়িয়া লইয়া, একবার দেখিয়াই শিহরিয়া উঠিল। বড় বড় অক্ষবে লেখা রহিয়াছে— “খুন ! মারগ্রেট হােটেল। একটী স্ত্রীলােক শয্যার উপর মরিয়া আছে। হত্যাকারী পলাতক। পুলিশ কতকটা সন্ধান পাইয়াছে।” ঘটনার লিষ্ট এইরূপ যে,সম্পাদক লিখিয়াছেন, “অদ্য প্রাতঃকালে মার- গ্রেট বন্দরে মহা হুলস্থূল। একটা খুন হইয়াছে, জনরবে এইরূপ প্রচার । অল্পক্ষণের মধ্যেই জনরবটা সত্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। পুলিশের তদন্ত ব্যাপারে আমাদের একজন বিশেষ সংবাদদাতা জানিতে পারিয়াছেন, গৈবী খুন। ২৯ নিঃসন্দেহ খুন। বিবি মাকনামধারিণী একটী রমণী বারিগল হােটেলে গত বুধবার একটা ঘর ভাড়া লইয়া তাহাতে বাস করিয়াছিল। নামটা সত্য কি কত্ৰিম, তাহা জানা হয় নাই ; তাহার পরিচিত কিংবা নুতন আলাপী একজন পুরুষও সেই দিন তাহার পাশের ঘরে থকিবার বন্দোবস্ত করিয়া- ছিল; সেই পুরুষের নাম ওয়ার্ণার। হােটেলের একজন কিঙ্করী সাক্ষ্য দিয়াছে, সােমবার প্রাতঃকালে সে উক্ত রমণীর ঘরে খানা লইয়া গিয়াছিল, কংকালে উক্ত ওয়ার্ণারকে সেই রমণীর ঘরে দেখিয়াছিল। রমণী কাদিয়া কঁদিয়া ওয়ার্নারকে বলিল, “তুমি আমাকে খুন করিবার চেষ্টা করিতেছ, তুমি আমার মরামুখ দেখিতে চাও, এই কথার পর ওয়ার্ণার হােটেলের বিল শােধ করিয়া হোটেল হইতে চলিয়া যায়। অদ্য মঙ্গলবার প্রাতে সেই কিঙ্কৰী সেই রমণীর ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখে, বিছানার উপর রমণী মরিয়া রহিয়াছে। মুখখানি কালীবর্ণ হইয়া গিয়াছে। তৎক্ষণাৎ পুলিশে খবর দেওয়া হইয়াছিল, ডাক্তার ডাকা হইয়াছিল; কিন্তু ডাক্তা- ৰেক চিকিৎসা করিবার সময় ছিল না। পুলিশের লােকেরা সেই রমণীর নাম-ঠিকানা জানিবার চেষ্টা করিয়াছিল, জানিতে পারে নাই। টেলিগ্রাফ যােগে হােটেলে ঘর ভাড়া লওয়া হইয়াছিল, টেলিগ্রামখানা হারাইয়া গিয়াছে। পুলিশ এখন ডাকঘরে ও টেলিগ্রাফ-আফিসে সন্ধান লইবে স্থির করিয়াছে। রমণী যে ঘরে ছিল, সেই ঘরে তাহার একটী ব্যাগ পাওয়া গিয়াছে। সেই ব্যাগের ভিতর একখানা চেকবহি ছিল, আজিকার তারিখেই দুই শত পাউণ্ডের চেক কাটা হয়, চেকের মুড়ি দেখিয়া পুলিশ অবশ্য ব্যাঙ্কারের নিকট সন্ধান লইবে। তাহা হইলে হত্যাকারীর অন্বেষণ হইবার সম্ভাবনা।” পলী অতিশয় চতুর স্ত্রীলােক ; সে ঐ সকল বৃত্তান্ত পাঠ করিয়া বড়ই উদ্বিগ্ন হইল, তাহার মনে মহা সন্দেহ আসিল ; উইলিয়মকে সে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমিই কি তবে ওর্ণার ?” • গৈবী খুন অন্য উত্তর না পাইয়া উইলিয়ম বলিল, “হুঁ, আমি।” পলী পুনৰ্বার জিজ্ঞাসা করিল, “সেই রমণী তােমার কে? পূৰ্ব্বে তুমি আমাকে বলিয়াছিলে, তােমার এক মাসী তােমাকে দুই শত পাউণ্ড ধার দিয়াছেন, সেই দুই শত পাউণ্ড তুমি আমাকে দিয়াছ, যে স্ত্রীলােক খুন হইয়াছে, সেই কি তােমার মাসী ?” উইলিয়ম চমকিয়া উঠিল। জলমগ্ন ব্যক্তি যেমন বাঁচিবার আশায় সম্মুখে একগাছি তৃণ ধারণ করে, সেইভাবে মাথা নাড়িয়া উইলিয়ম বলিল, “হাঁ।” পলী পুনরায় জিজ্ঞাসা কবিল, “তবে তুমিই কি তাহাকে খুন করিয়াছ?” কাপিয়া কঁপিয়া উইলিয়ম উত্তর করিল, “না-না-না! দোহাই পরমেশ্বর ! না গো--না ? তাহা তুমি বিবেচনা করিও না।” উইলিয়ম যে যথার্থ অপরাধী, পলী এ কথাটা ঠিক বিশ্বাস করিল না, অথচ তাহার মুখের কথা শুনিয়া সেই রকম সন্দেহ দাড়াইল। মনে মনে কত কি দুর্ভাবনা আসিয়া জুটিল। দৃঢ়সঙ্কল্প মনে আনিয়া সে তখন বলিতে লাগিল, " এতক্ষণে হয় ত তােমার হুলিয়া ছাপা হইয়া পুলিশের থানায় থানায় লটকাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তােমার গায়ের কোর্তাটা খুলিয়া ফেল। এই ঠিক। খান হাজির, খাইতে বসিয়া যাও; খাইতে পার, কাটা-চামচ হাতে লইয়া বসিয়া থাক।” তাহারা উভয়েই থানা খাইতে বসিল, কাটা-চামচ ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দুজনেই খানার জিনিসগুলি লইয়া খেলা করিল। খানসামা তখন উপস্থিত ছিল না, পলী ক্ষিপ্র-হস্তে ভােজনপত্রের কতকগুলি জিনিস একখানা খবরের কাগজে জড়াইয়া ঝুলি বাঁধিয় সরাইয়া রাখিল , তাহার পর খানসামাকে ডাকিল , হােটেলের হিসাব চুকাইয়া দিবার জন্য তাহার হস্তে এক খানা নােট দিল। খানসামা নােট বলাই করিতে গেল, সেই গৈবী খুন। অবসরে পলী চুপি চুপি বলিল, “যখন আমরা আসি, তখন পথের ধারে একখানা টুপীর দোকান দেখিয়া আসিয়াছি, আমি অগ্রে গিয়া তােমার জন্য একটা নূতন রকম টুপী কিনিয়া রাখিব, তুমি ময়দানের রাস্তার মােড়ে দাড়াইয়া থাকিও, শীগ্রই আমি তােমার সঙ্গে মিলিত হইব।” খানসামা নােটের টাকা লইয়া ফিরিয়া আসিল, বিলের টাকা চুকাইয়া দিয়া, বাকী টাকা লইয়া পলী তাহার সঙ্গীকে বলিল, “চল।” গায়ের কোৰ্তাটা জড়সড় করিয়া উইলিয়ম নিজের বগলে লুকাইয়া লইল, খাবার জিনিসের বাণ্ডিলটা পলী নিজ হাতে করিয়া লইয়া হােটেল হইতে বাহির হইল। নূতন টুপী কিনিয়া লইয়া পলী ময়দানের পথে আসিল, দুইজনে মিলিল,দুই জনে একখানা বেঞ্চের উপরে বসিল। পলী বলিল, তােনার মাথার পুরাতন টুপীটা পদতলে দলন করিয়া চওড়া করিয়া ফেল, আমি উহা লইয়া যাইব, তুমি এই নূতন টুপী মাথায় দে ও ; তােমার কোর্তাটা এই বেঞ্চের উপর ফেলিয়া বাখ, যে কেহ দেখিতে পাইবে, সেই ব্যক্তি লইয়া যাইবে।” এইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া, একখানা ঠিকাগাড়ী ডাকিয়া তাহারা বাড়ীর দিকে চলিল ; পথে যাইতে যাইতে পণী সেই গাড়ীর জানালা গলাইয়া উইলিয়ামের ভাঙ্গা টুপীটা রাস্তায় ফেলিয়া দিল, তাহারা বাড়ীতে গিয়া পৌছিল। পলী যে বাড়ীতে ঘর ভাড়া লইয়াছিল, সে বাড়ীখানি নির্জন পল্লীর মধ্যে ; রাস্তায় লােকজন ছিল না : পৰ্ব্বদিন বিধায় বাড়ীওয়ালীও বাহির হইয়া গিয়াছিল, উইলিয়মকে লইয়া পলী যখন বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল, তখন কেহই তাহাদিগকে দেখিতে পাইল না। ঘরে প্রবেশ করিয়াই ব্যগ্রতা সহকারে চঞ্চলস্বরে পলী বলিল, “বিল ? ঈশ্বরের নামে শপথ করিয়া বল, সে রমণীকে তুমি খুন কর নাই ?” উইলিয়ম বলিল, “পলী! পলী! ওঃ! অমন কথা বলিও না! মনেও • গৈৰী খুন করিও না। আমি—আমাকে কি খুনে লােকের মত দেখায় ? আমি কি তেমন কাজ করিতে পারি? না-না-না, কখনই না! পরমেশ্বর সত্য !" পলী বলিল, “খুনে লােকের মত তােমাকে দেখায় না, তেমন কাজ তুমি করিতে পার না, সে কথা সত্য, তথাপি তুমি নাম ভাড়াইয়া সেই হােটেলে ছিলে।” উইলিয়ম বলিল, “নাম ভাঁড়াইয়াছিলাম, তাহা আমি জানি, বাধা দিয়া পলী বলিল, “আর তুমি আমাকে কিছু বলি'ও না। তুমি যে তােমার মাসীকে খুন” উইলিয়ম কাপিয়া উঠিল। পলী আবার বলিতে লাগিল, “যত দিন পর্যন্ত হত্যাকারী ধরা না পড়ে, তত দিন পর্যন্ত তুমি একটু গা-ঢাকা হইয়া থাক, প্রকাশ্য স্থানে বাহির হইও না। আমি আজ রাত্রে আমার ভগ্নীর বাসায় শয়ন করিব, তুমি এই ঘরেই থাক । কল্য প্রাতঃকালে আমি তােমাকে একখানা ক্ষুর আর একখানা কাচি আনিয়া দিব, তুমি তােমার গোঁফ-দাড়ী মুড়াইয়া ফেলিও, মাথার চুলগুলি খুব ছােট করিয়া কাটিও, নুতন মূর্তি ধরিও।” ঊদ্ধদিকে মুখ তুলিয়া উইলিয়ম একবার বলিয়া উঠিল, “হা পরমেশ্বর ?” মুখ ভারী করিয়া পলী বলিল, “আর কথা কহিও না, চুপ করিয়া থাক। আর একটা কথা আমার জিজ্ঞাসা করিবার আছে। তােমার মাসী 'আপন ইচ্ছায় ঐ দুই শত পাউণ্ড-তােমাকে দিয়াছে কিংবা তুমি তাহাকে খুন করিয়া টাকাগুলি চুরী করিয়া আনিয়াছ, শপথ করিয়া সত্য বল, সেই কথাটী আমি জানিতে চাই। কোন্টা সত্য?” কাপিয়া কঁপিয়া উইলিয়ম উত্তর করিল, 'সত্য!—সত্য।—হ, মাসী —মাসী—তিনি আমাকে গতরাত্রে ঐ টাকা- গৈবী খুন। পলী বলিল, “বুঝিয়াছি। তােমার কথায় আমার বিশ্বাস হইতেছে না। আমার কাছে মিথ্যাকথা বলিয়া তুমি পার পাইবে না। আমাকে তুমি ঠকাইতে পারিবে না। এখন তুমি নিদ্রা যাও, ৮টা বাজিয়া গিয়াছে, বসিয়া বসিয়া সে সব কথা আর ভাবিও না। ক্য প্রাতঃকালে আমি আসিয়া যাহা কৰ্ত্তব্য হয়, ব্যবস্থা করিব।” পলী বাহির হইয়া গেল, উইলিয়ম একাকা বসিয়া আকাশপাতাল ভাবিতে লাগিল।
ষষ্ঠ রঙ্গ পুলিশ ও পলী। রাত্রি নবম ঘটিকার সময় পলীর ভগ্নীর গৃহে একটী লােক আসিল। লােকটীয় সহিত পলীর জানা-শুনা ছিল। নানাপ্রকার গল্প করিতে করিতে লােকটী বলিল, “মার্গেট-বন্দরে একটা আশ্চৰ্য্য খুন হইয়াছে, তাহা তােমরা শুনিয়াছ ?” পলী ও তাহার ভগিনী এক ঘরে বসিয়া ছিল, খুনের কথা পড়িবামাত্র সেই লােকটাকে পলী ইসারা করিয়া পাশের ঘরে উঠিয়া গেল, লােকটাও তাহার সঙ্গে সঙ্গে চলিল। গৃহে প্রবেশ করিয়া, দরজা ভেজাইয়া দিয়া, পলী একখানা চেয়ারে বসিল ; লােকটীকে নিকটে বসাইয়া চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল, “সে খুনের খবর তুমি কত দুর জান?” লােক বলিল, “তােমরা কিছু কিছু শুনিয়াছ না কি?” পলী বলিল, “আজ বৈকালে গ্রীণ-উইচের এক হােটেলে একখানা খবরের কাগজে আমি দেখিয়াছিলাম, মার্গেটের এক হােটেলের একটা •• গৈবী খুন। শ্রীলােক বিছানার উপর মরিয়া রহিয়াছে, হত্যাকারী পলাইয়া গিয়াছে, পুলিশ তদন্ত করিতেছে, হােটেলের একজন কিঙ্করীর মুখে কিছু কিছু সন্ধান পাইয়াছে। তাহার পর কি হইয়াছে, সে কাগজে তাহার কোন সংবাদ নাই।” পকেট হইতে একখানা খবরের কাগজ বাহির করিয়া পলীর হস্তে দিয়া লােকটী বলিল, “এই দেখাে।” সন্ধ্যাকালে যে সকল কাগজ ছাপা হয়, সেই সকল কাগজের মধ্যে একাখনি ঐ কাগজ। সেইদিন সন্ধ্যাকালে ছাপা হইয়া রাস্তায় রাস্তায় বিলি হইয়াছে। পলী তাহাতে দেখিল, পুলিশের লােকেরা খুনের ঘরে যে চেকবহি পাইয়াছিল, সেই বহি লইয়া একজন ইস্পেক্টর লণ্ডন ব্যাঙ্কে উপস্থিত হয়, যে লােক চেক ভাঙ্গাইয়া টাকা লইয়া গিয়াছে, তাহার চেহারা কিরূপ, জিজ্ঞাসা করাতে কেসিয়ার একটা লােকের চেহারা বলিয়া দিয়াছে, সেই চেহারা অবিকল ছাপা হইয়াছে ; থানায় থানায় সেই হুলিয়া প্রেরিত হইয়াছিল, আসামীর হুলিয়ার সহিত সেই ওয়ার্ণারের চেহারায় ঠিক ঠিক মিলন। ইত্যাদি ইত্যাদি। সেইটুকু পাঠ করিয়াই পলী ক্ষণকাল স্তম্ভিত হইয়া রহিল। লােকটা বলিল, “আজ রাত্রে হয় ত খুনী আসামী গ্রেপ্তার হইবে।” পলী সে কথার উপর তখন আর কোন কথা কহিল না, খবরের কাগজখানা সেই লােকটাকে ফিরাইয়া দিয়া মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল। ক্ষণকাল পরে উভয়ে আবার পূৰ্ব্বগৃহে প্রবেশ করিল। লােকট যে কার্যের জন্য আসিয়াছিল, পলীর ভগ্নীকে সংক্ষেপে সেই কার্যের কথা- গুলি বলিয়া এক গ্লাস মদ খাইয়া বিদায় গ্রহণ করিল। পাশের ঘরে পলীর সহিত সেই লােকের কি কি কথা হইয়াছিল, পলীর ভগ্নী তাহা জিজ্ঞাসা করিল না। সে রাত্রে মহা দুর্ভাবনায় মনের ঘৃণায় পলী একবারও চক্ষের পাতা গৈবী খুন। বুজিতে পারিল না, ভাের হইবামাত্র শয্যাত্যাগ করিয়া, ভগ্নীকে কিছু না বলিয়াই একখানা ট্রামকারে উঠিয়া ষ্টোন এন পুলিশ-থানায় উপস্থিত হইল। সেখানকার প্রধান ইনস্পেক্টরের সহিত পলীর আলাপ ছিল । ইনস্পেক্টরের নাম জসন। খানায় প্রবেশ করিয়া পলী সরাসর জনসনের গৃহে উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়াই ইনস্পেক্টর সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, “এ কি ! পলী? তুমি এত সকালে কোথা হইতে আসিলে ? এত সকালে এখানে তোমার কি কাজ ?” পলা উত্তর করিল, “তােমাকে একটা সংবাদ দিতে আসিয়াছি, মার্গেট হােটেলে যে খুন হইয়াছে, তাহাতে যাহার প্রতি সন্দেহ, তুমি কি তাহার হুলিয়া পাইয়াছ?” ঘরের দেয়ালে একখানা সবুজব তক্তা ঝুলানো ছিল, সেই তক্তার গায়ে কতকগুলা খণ্ড খণ্ড ছাপা কাগজ আঁটা, সেই তক্তার দিকে চাহিয় জনসন উত্তর করিলেন, “ই, পাইয়াছি। তুমি কি সেই হুলিয়ার নকল চাও না কি ? সে কি তােমার বন্ধু লােক ?” পলী উত্তর করিল, “ছিল বটে বন্ধু, কিন্তু এখন পরিহাস মনে করিয়া জসন ঈষৎ হাস্থা করিলেন। পলী জিজ্ঞাসা করিল, “তােমরা এখনও তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে পার নাই? লােকটা কোথায় আছে, তাহা আমি জানি ; সেই কথাই তােমাকে বলিতে আসিয়াছি।” জনসনের মুখের হাসি মুখেই মিলাইল, গম্ভীরবদনে তিনি বলিলেন, ‘পলী ! সকল কাজেরই সময় অসময় আছে। যখন তুমি দোকানে থাক, তথন রঙ্গরস করিতে পার; জানি আমি, তুমি বেশ রসিকা, তােমার নিজের জায়গায় রসিকতা শােভা পায়, কিন্তু পুলিশ-ষ্টেশন ঠাট্টা-তামাসার জায়গা নয় ; বিবেচনা করিয়া কথা কও।” .
গৈবা খুন।
৩৭
রিলেন ;
পলী বলিল, “ঠাট্টা-তামাসা ?—আমি ঠাট্টা করিতে আসি নাই। তুমি
ওয়ার্নারকে চাও, কিন্তু কে সেই ওয়ার্ণার, তাহা তুমি জান না--আমি
শনি---আমি জানি, কোথায় সে আছে, তাহাও আমি জানি।”
ইনস্পেক্টর তখন পলার মুখপানে চাহিয়া কথাগুলির সত্যতা অনুভব
পাশের একটা দবজা খুলিয়া তাহাকে একটা নির্জন ঘরে
গাইয়া গেলেন , বলিলেন, 'এইখানে উপবেশন কর, কে সেই ওয়ার্ণার,
ঠক করিয়া আমাকে বল।"
পল। বলিল, “তুমি তাহাকে বেশ জান ; তাহার সত্য নাম উইলিয়ম
ব্যাঙ্কাস।”
ইনস্পেক্টর মহা বিস্ময়াপন্ন। তখন তাহার মনে হইল, ব্যাঙ্কাসের
চেহারা, আর ওয়ার্নারের চেহারা ঠিক একরকম। পলীকে তিনি বলিলেন,
‘বলিয়া যাও।”
পলা উত্তর করিল,“আমি একখানা ঘর ভাড়া লইয়াছি,দোতালার উপর
পাদ্দিকের ঘর , সে দিকে সেই ঘরথানি ছাড়া আর ঘর নাই
ঘরের নম্বর ৪২। এ বাড়ীখানি নর্থরােডের মধ্যে।
ব্যাঙ্কের সেই
খানেই আছে।
উঠিয়া দাড়াইয়া জনসন জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঠিক বলিতেছ? উহার
মধ্যে কিছু ভুলচুক নাই • সাবধান ! এ সকল
এ সকল কাজে বির বিপদ
আছে। তােমার কথা প্রমাণে সেই বাড়ীতে আমি যদি লােক পাঠাই,
আলামীকে যদি সেখানে পাওয়া না যায়, তাহা হইলে তােমাকে মাজিষ্ট্রে
টের হুজুরে হাজির হইতে হইবে, তােমার সঙ্গে আলাপ আছে বলিয়া
আমি তােমাকে ছাড়িতে পারিব না।”
সতেজে পলী বলিল, “তুমি কি আমাকে পাগল ঠাওরাইলে ? আমি
কি তােমার কাছে মিথ্যা বলতে আসিয়াছি ? সেই বাড়াতে গেলেই সেই
ঘরে তাহাকে দেখিতে পাইবে।”
গৈবী খুন। জন্সন বলিলেন, “আচ্ছা, তােমার কথা আমি সত্য বলিয়া মানিলাম, কিন্তু আমি শুনিয়াছি, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেসের সহিত তােমার বিবাহের সম্বন্ধ হইয়াছে।” পলী বলিল, “সম্বন্ধ নহে, ভালবাসার খাতিরে গুপ্ত-বিবাহ। আজ বুধবার, আজ প্রকাশ্যরূপে গির্জা-মন্দিরে প্রকাশ্য বিবাহ হইবার কথা ছিল, 'এখন হইল কি? জল্লাদের সহিত তাহার বিবাহ হইবে!- দুরন্ত জানােয়ার !” জন বলিলেন, “ওঃ! তােমাদের ঝগড়া হইয়াছে বুঝি?” পলী বলিল, “একটুও না;—সামান্য একটা কথান্তর পর্যন্ত হয় নাই। কিন্তু আমি তাহাকে চিনিতে পারিয়াছি। আমার ঘরেই সে লুকাইয়া আছে ; প্রভাতে আমি গিয়া তাহাকে ডাকিব, এইরূপ কথা আছে । তুমি দাও ; একজোড়া হাতকড়ী লইয়া যাও।” চিন্তাকুল-নয়নে পলীর মুখপানে চাহিয়া জনসন জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাড়ীর দরজাটার রাস্তা কোন দিকে? প্রবেশের অসুবিধা হইবে না ত? বাড়ীখানা কাহার ?” পলী উত্তর করিল, “কোন অসুবিধা হইবে না,দরজার চাবী আমার কাছে, এই লও। স্বচ্ছন্দে প্রবেশ করিও। দোতালার উপর পশ্চাতের ঘর, ভুলিও না। উপরে উঠিয়া দ্বারে আঘাত করিও, আমি আসিয়াছি মনে করিয়া সে তৎক্ষণাৎ দরজা খুলিয়া দিবে। হাঁ, আর একটা কথা ; অঙ্গীকার কর, আমার নামগন্ধ যেন প্রকাশ না হয়। আমি সবে সেই বাড়ীতে নূতন গিয়াছি, খুনী মামলার সঙ্গে আমার সংস্রব, ইহা প্রকাশ পাওয়া বড় দোষের কথা।” ইনস্পেক্টর বলিলেন, “ঠিক বলিয়াছ । আমি অঙ্গীকার করিতেছি, কোন সূত্রে তােমার নাম প্রঙ্গাশ পাইবে না।” এই কথার পর পলী ইস্পেক্টরকে সেলাম করিয়া থানা হইতে বিদায় হইল।
*** সপ্তম রঙ্গ আসামী গ্রেপ্তার। • ইস্পেক্টর, জসন কিছু ব্যথিত হইলেন। উইলিয়ম ব্যাঙ্কেসের সহিত তাহার বন্ধুত্ব ছিল, অনেক দিন একসঙ্গে বসিয়া মদ খাইয়াছেন, অনেক দিন বাজী রাখিয়া দুজনে ঘােড়দৌড় করিয়াছেন, উইলিয়ম যথার্থ ভদ্রলােকের ন্যায় শিষ্টশান্ত হইয়া ভ্রমণ করিত; সে ব্যক্তি যে খুন করিতে জানে, জনের ইহা স্বপ্নেরও অগােচর ছিল। যাহা হউক, সরকারী কাৰ্য্যের অনুরােধে তাঁহাকে বাহির হইতে হইল ; সঙ্গে রহিল দুইজন কনষ্টেবল, তাহাদের কিন্তু ইউনিফরম রহিল না। বাড়ীর নিকটে উপস্থিত হইয়া তাহারা পায়ের জুতা খুলিলেন ; গাড়ী করিয়া গিয়াছিলেন, গাড়োয়ানকে, অপেক্ষা করিতে বলিয়া তাঁর। উদ্দিষ্ট বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন ; দোতালায় উঠিয়া গিয়া তাঁহারা আবার জুতা পায়ে দিলেন। যে ঘরে উইলিয়ম ছিল, জনসন সেই ঘরের দরজায় আঘাত করিলেন। ঘরের ভিতর লৌহ-খাটিয়ার কঁাচ- ৪০ গৈবী খুন। । কেঁাচ শব্দ হইল, একজন লােক খাটিয়া হইতে নামিয়া ভিতর হইতে জিজ্ঞাসা করিল, “পলী আসিয়াছ ?” উত্তর না পাইয়া ও উইলিয়ম দ্বার খুলিয়া দিল, পুলিশের ললাকেরা গৃহ- মধ্যে প্রবেশ কলি। সম্মুখে পুলিশ দেখিয়া উইলিয়ম গোঁ গোঁ করিয়া আড়ষ্ট হইয়া রহিল। একজন কষ্টেবল গৃহের জানালার দিকে গিয়া দাড়াইল, আর একজন দরজা আটকাইয়া দাড়াইয়া রহিল। কম্পিতকণ্ঠে উইলিয়ম বলিয়া উঠিল, “পুলিশ ?” জন বলিলেন, “হা,–আমি তােমাকে গ্রেপ্তার করিতে আসিয়াছি। তুমি-- উইলিয়ম বলিল, “তাহা আমি জানি; মর্গে ট হােটেলে বিবি মিন্টক খুন হইয়াছে, সেই জন্য----- জন বলিলেন, “কথা কহিও না। আমার কথা শুন। কৰ্ত্তবানু- রােধে আমি তােমাকে বলিয়া রাখিতেছি, এখন তুমি আমার সাক্ষাতে যাহা যাহা বলিবে, আদালতে তাই তােমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যস্বরূপ গণ্য হবে।” উইলিয়ম কঁপিতে কঁপিতে পুনৰ্বার বিছানায় উঠিয়া বসিল, মাথা হেঁট করিয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া হাঁপাইতে লাগিল; একটু পরেই সাহসে ভর করিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া কম্পিতস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমরা কি আমাকে থানায় লইয়া যাইবে?” জন বলিলেন, “হ, জামা গায়ে দাও।” হতভাগা কঁপিতে লাগিল। জন বলিলেন, “এখন আমি তােমাকে হাতকড়া পরাইব না, ভালমানুষের মতন আস্তে আস্তে নীচে নামিয়া চল, বাহিরে আমার গাড়ী আছে, সেই গাড়ীতে তুলিয়া তােমাকে লইয়া যাইব।” আসাম রাজী হইল , গোঁ গো করিয়া বলিল, “আমি একটু জল খাইব।”
গৈবী খুন। ৪১ ঘরে জল খাইবার গ্লাস ছিল না, একটা কুজাতে হাতমুখ ধুইবার জল থাকত, সেই কুজাটা তুলিয়া হতভাগা এক পেট জল খাইয়া লইল ; তাহার পর বলিল, “চল তবে যাই। ওঃ! দাড়াও, জুতা পরা হয় নাই। এই বলিয়া কম্পিতহস্তে বিছানার পার হইতে এক জোড়া জুতা তুলিয়া লইল।” জনসন একজন কষ্টেবলকে বলিলেন, “উহার একখানা হাত ধর, উহার মাথায় টুপী পরাইয়া দাও, জুতা পরাইয়া দাও।” কনষ্টে- বল আজ্ঞাপালন করিল। অতঃপর তঁাহারা নামিয়া আসিয়া গাড়ীতে আরােহণ করিলেন, গাড়ীখানা পুলিশ-ষ্টেসনে চলিল। থানায় পৌছিয়া ইম্পের সলহিয়াৎ বহিতে অভিযােগ লিখিয়া লই- লেন, আসামী হাজতে রহিল, প্রধান ইনস্পেক্টর সেইদিনেই মার্গেট পুলিশে টেলিগ্রাম পাঠাইলেন, সেইদিনেই তিনজন কনষ্টেবল তথা হইতে আসিয়া আসামীকে মার্গেটপুলিশে সইয়া গেল।
। reat অষ্টম রঙ্গ খুনী মামলা। মার্গেট সহরের পুলিশ-কোর্টে মােকদ্দমা উপস্থিত। আসামী উইলিয়ম ব্যাঙ্কে। অভিযোেগ নারীহত্যা। যাহাদিগকে সাক্ষীশ্রেণীতে তলব করা হইয়াছিল, তাহারা হাজির হইয়া দস্তুরমত জবানবন্দী দিল। অভিযােগপক্ষে বারিষ্টার ছিলেন, জ্যাসন্ ও ম্যাথিউ। সাক্ষিগণ খুন করিতে দেখিয়াছে, এমন কথা বলিতে পারিল না, মিষ্টার ম্যাথিউ তাহাদিগকে জেরা করিয়াছিলেন, জেরাতেও সাক্ষীদের খেলাপ হয় নাই। মােকদ্দমা দায়রা-সোপর্দ হইয়াছিল, সেখানেও ঐ দুইজন বারিষ্টার সেখানেও সাক্ষিগণের প্রতি পূৰ্ব্ববৎ জেরা। অবস্থাঘটিত প্রমাণাদি শ্রবণে জুরীরা আসামীকে অপরাধী বলিয়া সাব্যস্ত করেন, বিচারপতি তাহাদের অভিপ্রায়ে অনুমােদন করিয়া আসা- মীর প্রাণদণ্ডের আজ্ঞা দিয়াছেন। ম্যাথিউ সাহেব যখন মােকদ্দমা চালাইতে যান, তৎপূর্বে তাহার একজন আইনজ্ঞ বন্ধুকে মােকদ্দমার বিবরণপত্র দেখাইয়া পরামর্শগ্রহণ করিয়া- ।
গৈবী খুন। ৪৩ ছিলেন। সেই বন্ধুর নাম ল্যানবার্ড। উভয়ে যখন কথােপকথন হয়, সেই সময় ল্যাম্বার্ড বলিয়াছিলেন, 'আমি যেন বুঝিতেছি, এই আসামী নিরপরাধী,সম্পূর্ণ নিরপরাধী।” ম্যাথিউ বলিয়াছিলেন,“তাহাই বােধ হয় বটে, কিন্তু সাক্ষিগণের বাক্য শ্রবণ না করিলে নিশ্চয় করিয়া কিছুই বলা যায় না।” “যেদিন দায়রার বিচার শেষ হইবে, সেইদিন তােমাকে আমি টেলিগ্রাফ যােগে সংবাদ পাঠাইব” ল্যানবার্ডকে এই কথা বলিয়া মিষ্টার ম্যাথিউ মােকদ্দমা করিতে গিয়াছিলেন। যেদিন সেসনের বিচার শেষ হইবার কথা, সেইদিন বেলা দুই প্রহরের সময় মিষ্টার ল্যান্বার্ড অতিশয় চঞ্চল হইয়াছিলেন। দুই প্রহরের পরেই টেলিগ্রাফ, আফিসের এক ছাের। আসিয়া তাহার হস্তে একখানা টেলিগ্রামের খাম দিয়া গেল। খামখানি হাতে করিয়াই তিনি খানিকক্ষণ কি ভাবিলেন ; ভাবিতে ভাবিতে বুঝিলেন, আশঙ্কাই বুঝি সত্য, নির্দোষী লােক বুঝি বা প্রাণ হইল ; কম্পিত-হস্তে খামখানি তিনি খুলিলেন। লেখা ছিল, “অপৰাধী।" আমি যাইতেছি।” মিষ্টার ল্যানবার্ড অস্থির হইলেন; যাহা ভাবিতেছিলেন, তাহাই ঠিক নির্দোষী লােক মারা যাইবে। ম্যাথিউ আসিয়া উপস্থিত হইলে, বিশেষ বৃত্তান্ত জানিতে পারিবেন, সেই প্রত্যাশায় আরও অধীর হইয়া রহিলেন। সন্ধ্যার সময় ম্যাথিউ আসিয়া উপস্থিত। তঁাহার শুকবদন দর্শন করিয়া ল্যান্ড বুঝিতে পারিলেন, ইহার প্রাণেও আঘাত লাগিয়াছে ; ত্বরিতম্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার মুখ শুকাইয়াছে কেন ?” ম্যাথিউ উত্তর করিলেন, “অগ্ৰেই জানাইয়াছি। আসামীর অপরাধ সাব্যস্ত হইয়াছে ;-ফসীর হুকুম। আহ! গরীব বেচারা। পূৰ্ব্বে তুমি ৪৪ গৈবী খুন। যাহা বলিয়াছিলে, আমিও এখন বুঝিতেছি, তাহাই যথার্থ। লােকটা নির্দোশী। আহা! নির্দোষীলােকের ফাঁসীর হুকুম হইয়াছে। কথাটা বলিই বা কাহাকে ?—যাহাকে বলিব, সেই ব্যক্তিই হাস্য করিবে ; আম- কেই পাগল বিবেচনা করিবে। সাক্ষীর ভুল বলিয়াছে, জুরীর ভুল বুঝিয়াছেন, জজেরও ভুল হইয়াছে, কেবল তুমি আর আমি ঠিক বুঝতেছি। ইহা কি কখনও বিশ্বাসযোগ্য হইতে পারে ? হায় হায় ! এখন আমার অনুতাপ আসিতেছে। ল্যাম্বার্ড বলিলেন, “তােমার অনুতাপ আসিতেছে কেন?” ম্যাথিউ বলিলেন,“আমি সাক্ষিগণের জবানবন্দী লইয়াছি,আমিই তাহা দিগকে জেরা করিয়াছি, তাহাতেই জুরীরা অপরাধ সাব্যস্ত করিয়াছেন। ইহা কি আমার দোষ নয়?” ল্যান্বার্ড বলিলেন, “তােমার দোষ কি? বারিষ্টারের যাহা কর্তব্য, তাহাই তুমি করিয়াছ। আসামীর যাহাতে গুরুতর দণ্ড হয়, বক্তৃতা করিয়া তাহা কি তুমি জুরীগণকে বুঝাইয়া দিয়াছিলে?” ম্যাথিউ উত্তর করিলেন, “না,আমি বক্ততা করি নাই ; বক্ত তা করিয়াছিলেন, মিষ্টার জ্যাকসন।” ক্ষণকাল মৌন থাকিয়া ল্যানকার্ড জিজ্ঞাসা করিলেন, “হােম-সেক্রে- টারীর নিকট আপীল করিবার কোন বন্দোবস্ত করিয়াছ কি?” ম্যাথিউ বলিলেন, “সাহস হইতেছে না। জুরীগণের মতভেদ হয় নাই, তাহারা সকলে সমবেত বাক্যে একপ্রকার রায় দিয়াছেন, জজের মতেব সহিতও অনৈক্য হয় নাই।” ল্যাম্বার্ড বলিলেন, “তবে আর চারা কি ? নির্দোষী লোকের প্রাণদণ্ড হইবে, বড়ই আক্ষেপের কথা।” ম্যাথিউ বলিলেন, “কেবল আক্ষেপ নয়, আরও বেশী । তুমি বলিলে, চারা কি ? আমিও বুঝিতেছি, চারা নাই কিন্তু নির্দোষীলােকের ফাসী গৈবী খুন। ৪৫ হইবার পর ভবিষ্যতে যদি প্রকৃত হত্যাকারী বাহির হয়, তাহা হইলে আপ- সােস্ ও অনুতাপ আরও শতগুণে বৃদ্ধি হইবে।” ল্যাম্বার্ড এই সময় হুইস্কি সরাপে সােডা মিশাইয়া ম্যাগিউকে পান করিতে দিলেন, এক চুমুকে তাহা পান করিয়া ম্যাথিউ পুনৰ্ব্বার বলিতে লাগিলেন, “আহা! যেদিন ফাসীর হুকুম হয়, বেচারা সেদিন কিছুই খায় নাই। অবসক্রমে আমি একটা বিস্কুটের বাক্স তাহার সম্মুখে রাখিয়া দিয়াছিলাম, মাথা নাড়িয়া সে তাহা গ্রহণ করে নাই, একবার চাহিয়া দ্বিতীয়- বার সে দিকে চাহেও নাই। ওঃ! আমার একটা ঘটনা মনে পড়িতেছে। মানুষের কথাই নাই, একটী কুকুর একবার আমাদের করুণা উদ্দীপন করিয়াছিল। একটি লােকের বৃহৎ একটা শীকারী কুকুর ছিল। কুকুরটী তাহার মনিবকে বড়ই ভালবাসিত, কখনও তাহার গায়ে উঠে নাই, অাঁচ- ডায় নাই, সঙ্গছাড়া হয় নাই, সৰ্ব্বক্ষণ প্রভুভক্তি দেখাইত। তাহার প্রভু একদিন মাতাল হইয়া বিনা দোষে তার মস্তকে ও চক্ষে সপসপ চাবুক বসাইয়া দেয় ; হু হু করিয়া রক্ত পড়িতে থাকে। বাড়ীর লােকেরা সেই কুকুরকে সেই অবস্থায় ভাল ভাল খাদ্যদ্রব্য খাইতে দিয়াছিল, কুকুর তাহা স্পর্শও করে নাই। একদিন পরে কুকুরটা মরিয়া গিয়াছিল। বিনা দোষে, বিনা রােগে মরিবার পূর্বে—অপরের নিষ্ঠুরতা স্মরণ করিয়া পজাতি যখন উপবাস করিয়া মরে, তখন মানুষের ত কথাই নাই।” ল্যান্বার্ড জিজ্ঞাসা করিলেন, “সাক্ষীরা তো কেহ স্বচক্ষে খুন করিতে দেখে নাই, কিরূপে খুন হইল, তাহা স্থির হইল কিরূপে?” ম্যাথিউ বলিলেন, “ডাক্তারের কথায়।ডাক্তার সাক্ষ্য দিয়াছিলেন, ২। টিপিয়া মারা ;—বিবি মাল্টকের গলায় বড় বড় অঙ্গুলির দাগ বসিয়াছিল। লানবার্ড বলিলেন, “তাহ যেন হইতে পারে, কিন্তু কোন্ ব্যক্তি গলা টিপিয়া মারিয়াছে, তাহাই এখনকার সমস্যা।”
৪৬ গৈবী খুন সত্য হউক, মিথ্যা হউক, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেসকে আসামী বলিয়া গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল, মােকদ্দমা সেসনে অর্পিত হইয়াছিল, উইলিয়মের ফসীর ইকুম হইয়াছে, তিন সপ্তাহ পরে কসী হইবে, এইরূপ অবধারিত।
To . at is ' - নবম রঙ্গ এক জোড়া বদ্মাস। উইলিয়মের ফাঁসির হুকুম হওয়াতে ল্যান্ড ও ম্যাথিউ অতিশয় মনাে- বেদনা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন । যথার্থ অপরাধী কে, তাহা নিরূপণ করিবার নিমিত্ত তঁাহারা উভয়ে বিস্তর চেষ্টা করেন, লণ্ডনে কোন তত্ব অবগত হইতে না পারিয়া,লুসী মাশুকের স্বামী চারলকে সংবাদ দিবার অভিপ্রায়ে মিষ্টার ল্যান্ড মার্শোলিস-বন্দরে যাত্রা করিলেন, মিষ্টার ম্যাথিউ মার্গেট বন্দরে রহিলেন। মার্শলিসে এক জোড়া বদমাস অনেক দিবসাবধি অদ্ভুত কৌশলে চুরী, জুয়াচুরী, দাগাবাজী, জুয়াখেলা ইত্যাদি দুফাৰ্য্য করিয়া বেড়াইতেছিল। এক জন পুরুষ, এক জন স্ত্রীলােক। পুরুষের নাম জ্যাকুইস, স্ত্রীলােকের নাম মেরী। জ্যাকুইস্ সেই মেরীকে বিবাহ করিবে বলিয়া আপন পাপকাৰ্য্যের সহকারী করিয়াছিল, কিছুদিন ইংলণ্ডে নানা খেলা খেলিয়া ফরাসী রাজ্যে লইয়া গিয়াছিল, সেখানেও বিবাহ করে নাই, ধর্ম নষ্ট করিয়া বিবিধ পাপা- চরণে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। তাহাদের কিছুমাত্র সম্বল ছিল না, দিনান্তে আহার জুটিত না, সামান্য কুটীরে বাস করিয়া ভিক্ষা করিবার ছলে পথিক লােকের সর্বস্ব হরণ করিতে বাহির হইত ; গাঁট কাটিয়া অথবা চুরী করিয়া যাহা কিছু পাইত, জ্যাকুইস্ তাহা জুয়াবাজীতে উড়াইয়া দিত। পথিক ৪৮ গৈবী খুন। লােকদিগকে যে প্রকারে পবিত, তাহার দুই একটা উদাহরণ এই স্থলে প্রদর্শিত হইল। ইংরাজজাতির উপরে ফরাসী-জাতির অত্যন্ত ঘৃণা ; জ্যাকুইস্ নিজেও ফরাসী; প্রকাশ্য রাজপথে কিংবা অন্ধকার গলীতে কোন ইংরাজ পথিক একাকী ভ্রমণ করিতেছে, দেখিতে পাইলে জ্যাকুইস তাহাকে ধাক্কা মারিয়া রাস্তায় ফেলিয়া দিত, বেদম প্রহার করিয়া অজ্ঞান করিয়া ফেলিত, মেরী সেই অবসরে মূচ্ছিত লােকের পকেট হইতে যাহা কিছু পাইত, বাহির করিয়া লইয়া অগ্রে পলায়ন করিত, তাহার পর জ্যাকুইস্ শূন্য-হস্তে তাহার অনুগামী হইত। এইরূপে অনেক ইংরাজের নগদ টাকা, ঘড়ী, চেইন, অঙ্গুরী ইত্যাদি মূল্যবান বস্তু তাহারা চুরী করিয়াছিল। টাকা অনেক পাইয়া ছিল, কিন্তু অভাব ঘুচে নাই ; জুয়া-খেলায় সমস্তই উড়িয়া যাইত। দরিদ্রতার পীড়ন অসহ। মুখলােকে দুরবস্থায় পতিত হইলে তাহাদের অনেক প্রকার কুৎলব জোগায় ; ক্ষুধার উৎপীড়নে আরো অধিক ভয়ঙ্কর ভষঙ্কর মংলব উপস্থিত হয়। বুদ্ধি তখন বহুরূপীর খেলা করে। একদিন সন্ধ্যার সময় একটা ভদ্রলােক একটা অন্ধকার পথ দিয়া যাইতেছিলেন, জ্যাকুইস্ তাহাকে আক্রমণ করিয়া গুরুতর প্রহারে অচে- তন করে, লােকটী মৃতবৎ হইয়া পড়িয়া থাকেন, সতই যেন মরিয়াছেন, এইরূপ অনুমান করিয়া জ্যাকুইস তাহার নাসিকায় ও বক্ষে হস্তাৰ্পণ করিয়া পরীক্ষা করে ; মেরীর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলে, “মরে নাই রে, মরে নাই ; নিশ্বাস আছে, তুই দুটো পা ধরু, আমি মাথাটা ধরি, চল্ ইহাকে আভড়ায় নিয়া যাই।” তাহারা তাহাই করিল, আচ্ছায় লইয়া গিয়া, লােকটীর পকেটের সমস্ত জিনিস বাহির করিয়া লইল অনেকক্ষণ পরে লােকটীর চৈতন্য হয়, তিনি পকেটে হাত দিয়া দেখেন, কিছুই নাই, দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া হতাশে বলিয়া উঠেন, “আমি কোথায়?” • গৈবী খুন। ৪৯ মুখের কাছে বসিয়া ম্যাকুইস বলিল, “ভয় নাই, আপনি বন্ধুলােকের কাছেই আছেন। আপনাকে ডাকাতে ধরিয়াছিল, হয় ত মারিয়া ফেলিত, আমি ও আমার স্ত্রী হঠাৎ সেই সময় সেইখানে উপস্থিত হওয়াতে ডাকাত পলাইয়া যায়, আমরা আপনাকে আমাদের বাড়ীতে আনিয়া যত্ন করিয়া রাখিয়াছি। যদি একটু আগে আমরা সেখানে পৌঁছিতে পারিতাম, তাহা হইলে আপনার জিনিস গুলি রক্ষা হইতে পারি।” ভদ্রলােকটা খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জ্যাকুইসকে জিজ্ঞাসা করি, লেন, “তোমাদের ঘরে ব্র্যাণ্ডি আছে ?” চক্ষে জল আনিয়া জাকুইস্ বলিল, “হায় হায় ব্যাণ্ডি আমরা কোথায় পাইব? আজ দুদিন আমাদের আহার হয় নাই। আমরা বড় গরিব। আধখানি রুট কিনি, তেমন সংস্থান পর্যন্ত নাই।” এক পাত্র ঠাণ্ডা জল পান করিয়া, প্রাণ রক্ষার জন্য তাহাদিগের নিকট কৃতজ্ঞতা জানাইয়া ভদ্রলােকটা উঠিয়া বসিলেন। মেরী বলিল, “একখানা ঠিকা গাড়ী ডাকিয়া দিই, আপনি বাড়ী যান, এমন জঘন্য স্থানে ভদ্রলােকে বেশীক্ষণ থাকিতে পারেন না।” গাড়ী ডাকা হইল, “কল্য আমি তােমাদের নামে পত্র পাঠাইব, এই কথা বলিয়া, গাড়ীতে উঠিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। পরদিন ডাকের চিঠি আসিল। চিঠিতে শত শত ধন্যবাদ, আর পাঁচ শত ফ্রাঙ্ক * মুদ্রার ব্যাঙ্ক নােট । জোড়া বদমাস এই রকম ব্যবসা চালাইতেছিল, কিন্তু একটী কপর্দকও সঞ্চয় করিতে পারে নাই। যে সময়ে মিষ্টার ল্যান্ড মার্শেলি বন্দরে আইসেন, ঐ জুয়াচোরেরা সেই সময় সেই খানেই ছিল, প্রতিদিন রেলওয়ে ষ্টেশনে তাহারা ওৎ করিয়া থাকে, নিত্য নিত্য নুতন রকম পােযাকবলায়, * ফ্রাঙ্ক-সাড়ে নয় পেন্স।
গৈৰী খুন। কোন ইংরাজ ভদ্রলােক একটা সেই ষ্টেশনে নামিলে তাহার। পাছু লয়, নূতন নূতন শলে আপনাদের মতলব হাসিল করে। মিষ্টার ল্যান্ড ষ্টেশনে নামিয়া, পাের্ট্যান্টটা হাতে করিয়া প্লাটফরমে বেড়াইতেছেন, জ্যাকুইস্ ধা করিয়া একটু তফাতে সরিয়া গেল, মেরী একখানা রুমাল চক্ষে দিয়া কাদো কাদো মুখে তাহার সম্মুখে আসিয়া কাতর বচনে বলি, “মহা- শয়, আম বা বড় বিপদে পড়িয়াছি, আপনি এক বার ষ্টেশনের বাহিরে আসুন, দুঃখের কথা আপনাকে জানাইব।” দুঃখিণী স্ত্রীলােকের কথায় কোন সন্দেহ না ভাবিয়া মিষ্টার ল্যাব তাহার সঙ্গে বাহিরে গেলেন, একটা বৃক্ষতলে উপস্থিত হইয়া পুনব্বার চক্ষে রুমাল দিয়া মেরী বলিতে লাগিল, “মহাশয় ! আপনার কাছে আমি কিছু সাহায্য চাই, টা । চাহি না, ভিক্ষা চাহি না, আপনি দয়া করিয়া একবার আমাদের কুটীবে চলুন। আমবা সম্প্রতি এখানে আসিয়াছি, নিকটেই থাকি,আমি আর আমার ভগিনী। আমার ভগ্নীর বড় সঙ্কটাবস্থা। আজ কাল এখানে জ্বরের বড় প্রাদুর্ভাব-ইফুলু এঞ্জা জ্বর ছোঁয়াচে রােগ ; ভগ্নীর নফুলু এঞ্জা হইয়াছে, এমন আপনি মনে করিবেন না, রেলওয়ের দুর্ঘটনা ; -- আমার ভগ্নীর মস্তকে ভয়ানক আঘাত লগিয়াছে। আপনি ইংরাজ, ইংরাজের শরীরে দয়া অধিক, সেই জন্য-ই --- ল্যান্ড' বলিলেন, “তুমি কি ডাক্তার অন্বেষণ করিতেছ? আমি ডাক্তার নই।” মেরী বলিল, “না গাে না, ডাক্তার আমাদের আছে, খুব ভাল একজন ইংরাজ ডাক্তার। তিনি ভাল রকম ব্যবস্থা করিতেছেন, কিন্তু ভগ্নী বােধ হয় বাচিবে না। যে যন্ত্রণা গো, মরিলেই ভাল হয়। আমি আপনার কাছে ভিক্ষা চাহিতেছি, আপনি একবার সেইখানে চলুন। একখানি উইলের কথা। ভগ্নীর এখনো বেশ জ্ঞান আছে, তিনি উইল করিবেন।” - গৈবা খুন। * ল্যানবাড বলিলেন, “তবে কি তুমি একজন উকীল চাও? আমি ওকালতী করি না, আইনকানুন ভাল বুঝি না।” মেরী বলিল, “না গাে না, উকলি আমি চাই না। উইল লেখা-পড়া হইয়া গিয়াছে। দুইজন ভদ্রলােক সাক্ষী চাই। যে ডাক্তার চিকিৎসা করিতেছেন, তিনি একজন সাক্ষী, আর এক জন ভদ্রলােক দরকার, আমরা এখানে নূতন আসিয়াছি, এখানকার লােকের উপর আমার বিশ্বাস হয় না ইংরাজের উপরেই আমার পূর্ণ-বিশ্বাস।” ল্যানড বলিলেন,“ এই কাৰ্য্য নদি হয়, তাহাতেই যদি তােমার উপকার হয়, তবে চ। ' য়ে চললেন। একটা গন্ধকার গহ্বরের নীচে »্যাক লুইসেব আভা। বেশদ্বারের নিকটে জ্যাকুইস দাঁড়াইয়া ছিল, শীকার সম্মুখ- গ দেখিয়া, সে তৎক্ষণাৎ ঔষধ প্রয়ােগ করিল, তীব্র ক্লোফেৰ্ম্ম ল্যান- সাড় অজ্ঞান হইলেন। দুজনে ধরাধবি করিয়া তাকে শিতবে লইয়া গেল, এক থানা কোচের উপর শয়ন করাইয়া মেরা তার পাশে বসিল। জ্যাকুইস্ খুব শক্ত শক্ত লৌহ-শৃঙ্খলে তাহার কটিদেশ বন্ধন কবিয়া দেয়ালে আটার সঙ্গে বান্ধিয়া রাখিল । যথাসময়ে চৈতন্য প্রাপ্ত হইয়া লা’ নিজের অবস্থা বুঝিতে পারিলেন, ঘরের চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন ; আরাে দেখিলেন, পার্শ্বদেশে মেরী:উপবিষ্টা, একধারে কাকুইস দণ্ডায়মান। ইহার জ্ঞান হইয়াছে দেখিয়া জ্যাকুইস কিয়ৎগুণ ইতস্ততঃ করিল। ল্যানবাড বলিলেন," প্রতারণা করিয়া কেন তােমরা আমাকে ধরিয়াছ? আমার একজন বন্ধু একটা খুনীমামলায় অভিযুক্ত হইয়াছিলেন, তিনি নির্দোষী, বিনা দোষে হার ফাসীর হুকুম হইয়াছে, এই বন্দরে আমার আলাপ লােক আছে, সেই ব্যক্তি আমার সেই নির্দোষী বন্ধুর পক্ষে সাফাই দিতে পারিবে, তারই সন্ধানে আমি আসিয়াছি। তোমরা আমাকে ৫২ গেৰী খুন। ছাড়িয়া দেও, আমি ধৰ্ম্মতঃ অঙ্গীকার করিতেছি, আমার কাৰ্য শেষ হইলে তােমরা যাহা চাও, তাহাই আমি দিব।” এই বলিয়া পকেট হইতে এক- খানি খবরের কাগজ বাহির করিয়া জ্যাকুইসেব প্রদান করিলেন ;-বলিলেন, “পড়ি দেখ, এই কাগজেই সেই খুনী মাম- লার বিচারের রিপাের্ট আছে।” কাগজখানি খুলিয়া জ্যাকুইস কেবল ড় বড় হেডিংগুলি দর্শন করি, ভাল লাগিল না, কাগজখানা মেরীর কোলে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল। মেরী কয়েক ছত্র পাঠ করিয়া যখন আসামীর নাম দেখিতে পাই, তৎক্ষণাৎ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া মূচ্ছিতা ইয়া পড়িল। জ্যাকুইস সেই দিকে চাহিয়াই তথা হইতে ছুটি । বাহির হইল। মুচ্ছাভঙ্গ হইবার পর উঠিয়া বসিয়া মেরী আবার চক্ষে রুমাল ঢাকা দিল, হাঁপাইয়া পাইয়া কাদিতে আরম্ভ করিল। ল্যান্ড বলি- লেন, “বাহবা বাহবা ! এটা আবার কিরূপ ?—দেখিতেছি, তুই যেন নাচ- ঘরের নটী , যখন যে রকম আবশ্যক হয়, তখনি সেই রকম খেলা করিতে পারি ? খবরের কাগজ পডিতে পড়িতে মুচ্ছ। আসিল, কান্না আসিল, ২াপ আসিল, বহুৎ তাড়িপ ?" কাঁদিয়া কঁদিয়া মেরী বলিল, “নটীগিরী আমি জানি, এখন কিন্তু সে বিদ্য। আমার নাই। আপনার কাছে আমি একটা মিথ্যাকথা বলিয়াছি । আমার ভগ্নী মরণাপন্ন, সে কথাটা মিথ্যা ; আমার ভাই মরণাপন্ন। হাস্য করিয়া লাড বলিলেন, “তাের আবার ভাই আছে? কোথায় তাের ভাই ? ঐ যে লােকটা যার নাম জ্যাকুইস, সে তাের স্বামী তাের মুখে শুনি নাই, তারি মুখে শুনিয়াছি। সেটা ও কি মিথ্যা ? সেই কি হাের ভাই ?" মেরা বলিল, “না গাে না, সে আমার ভাই নয়। আপনি বলিলেন, আমার ভাই মরণাপন্ন।”
গৈবা খুন কখন আমি ["স্মিত হইয়া বাড়া বলিলেন, “ফের মিথ্যাকথা? বলিলাম?” মেরী বলিল, “আপনার এক বন্ধুর ফাসার হুকুম হইয়াছে, খবরের কাগজেও তাহাই দে লাম । যাহার ফাসীর হুকুম, সেই আমার ভাই তাহার নাম উলিয়ম ব্যাঙ্কেস্, আমার নাম মেরী ব্যাঙ্কেস। গ’পনি আমার ভাইকে বাচাইবাৰ চেষ্টা করিতে আসিয়াছেন, আমিও আপনাকে বাচাইব, আপনার বন্ধন খুলিয়া দিব।” “ উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস তাের ভাই, এ কথাটা কিরূপে আমি বিশ্বাস করিব?” লাম্বারে এই প্রশ্নে মেরী উত্তর করিল, “তাহার চেষ্টাবা যদি আমি বলিতে পারি, ছেলেবেলা আমরা দুইজনে রে স্কুলে পড়িয়াছি, যে সকল খেলা করিয়াছি, তাহা যদি আপনাকে শুনাইয়া দিতে পারি, তাহা হইলে বিশ্বাস হইবে ?"-মেরী বাস্তবিক উইলিয়মের চেহারা ঠিক ঠিক বলিল, ছেলেবেলার গল্প ও বলিল, জেরা৪ে খেলাপ হইল না। ল্যান্ড বিস্ময়পন্ন হইলেন। চকিতনয়নে মেরীর মুখপানে চাহিয়া সন্দেহে সন্দেহে তিনি বলিলেন, "উইলিয়ম তোের ভাই, এ কথা হয় । সত্য হইতে পারে, কিন্তু তুই আমার বন্ধন মোচন করিয়া দিবি, তাই আমি কেমন করিয়া সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিব ?” ক্লোরােফরমের প্রভাবে ল্যান্ড যখন অজ্ঞান হইয়াছিলেন, অজ্ঞান অবস্থায় জ্যাকুইস যখন তাকে বঁধিয়া রাখিয়াছিল, সেই সময় তাহার পাের্টমেন্ট খুলিয়া জিনিসপত্র অন্বেষণ করিয়াছিল, টাকা অতি অল্প, পরিধেয় বসন অনেকগুল, তাহার মধ্যে একখানা চেক-বাহ! কাপড়ে জ্যাকুইসের দরকার ছিল না, টা কাগুলি বাহির করিয়া লইয়া, চেহিথানা বন্দীর সম্মুখে ধরিয়া মেরী বলিল, “ইহার একখানা চেকে দস্তখৎ করুন, একশত পাউণ্ড অঙ্কপাত করুন, জ্যাকুইসের নামে টাকা গৈবী খুন। দিবার বরাত লিখুন। এই কাৰ্যটী করিলেই আমি আপনাকে মুক্ত করিয়া দিতে পারব।” ল্যান্ড' বলিলেন, “আয় আয়, আমার কাছে সরিয়া আয়—তাের কাণে কাণে আমি একটা পরামর্শ বলিব।" মেরা তাঁহার মুখের কাছে সরিয়া গিয়া বসিল, তিনি তাহার গলা টিপিয়া ধরিয়া সক্রোধে বলিলেন, “পিশাচি! নরকের কীট! এতদূর দুষ্ট বুদ্ধি তাের? এই খেলা খেলিবার জন্য তুই এত বাগজাল বিস্তার করিতে ছিলি? চকখানা হাতে পাইলেই তুই তাের সেই পাষণ্ড স্বামীকে ডাকিয়া আনিবি, সে আসিযা আমার প্রাণবিনাশ করিবে। কেমন, এই মৎলব নয় ?” সরণভাব দেখাইয়া বিনীত বচনে মেরী বলিল, “না গাে না, তাহা আমি করিব না। আমি তােমাকে নিশ্চয় খালাস করিয়া দিব। তুমি আমার ভাইকে বাচাইবাব চেষ্টা করিও।" এই কথা শুনিয়া প্যাডের ক্রোধ আরও বাড়িয়া উঠিল, আরে জোরে গলা টিপিয়া ছুড়ীটাকে তিনি দূরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন । ভূলে গড়াগড়ি খাই। মেরী কেবল সতৃষ্ণ-নয়নে তাহার মুখপানে চাহিয়া বহল। • ল্যানবাড বলিলেন, “দাড়া,---উঠিয়া দাড়া;-আবার আমার কাছে আয়, কি তোদের মৎলব, খােলসা করিয়া আমাকে বল্।” অঙ্গের ধুলা ঝাড়িয়া, মেরী আস্তে ব্যস্তে উঠিয়া আবার তাহার নিকটে গেল, নিকটে বসাইয়া তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে লােকটা কোথায় গিয়াছে, চেক লইয়া দে আমাকে মারিয়া ফেলিতে চায় কি না, তাহা কি তুই জানিস্ ?” মেরী বলিল, "তুমি আমার কথায় বিশ্বাস কর,আমি তােমাকে খালাস জাকুইস এখানে থাকিলে সে কাজ আমি করিতে পারি না। করিব।
গৈবী খুন। চেকখানা দস্তখৎ করিয়া দাও, চেক লইয়া জ্যাকুইস ইংলণ্ডে চলিয়া যাক, আমি একাকিনী হইলে আর কোন ভয় থাকবে না। তাহার পর তুমি ইংলণ্ড ব্যাঙ্কে টেলিগ্রাম করিয়া উহাকে চেকের টাকা দিতে নিষেধ করিয়া দিও।” একটু চিন্তা কবিয়া তিনি বললেন, “তাহাই করিব, তাহাই করিব, কিন্তু সে লােকটা তার স্বামী, তাহাকে আমি পুলিশের হাতে ধরাইয়া দিব না।” সওজ-নয়নে চাহিয়া মুক্তকণ্ঠে মেরা বলিল, “সে আমার স্বামী চমকিত হইয়া ল্যানবাড়' বলিয়া উঠিলেন, “কি ?—স্বামী নয় ? কি তবে?-কে সে ?” মেরী বলল, সে একজন জুয়াটোর -ভয়ানক জুয়াচোর-ডাকাত, ভয়ঙ্কর বদমাস ! সে আমার সর্বনাশ করিয়াছে। তাহার সঙ্গে মিশিয়া আমি অনেক পাপকাৰ্য্য করিয়াছি ;-করিতে বাধ্য হইয়াছি।” এই বলিয়া মেরী তখন আগাগােড়া সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিল। সমস্ত শ্রবণ করিয়া ল্যাম্বাডের ভ্রম ঘুচিল, বিনা সন্দেহে তিনি তখন একশত পাটঙের চেক সহী করিয়া দিলেন। জ্যাকুইস একটু তফাতে ছিল, চেক ই! মেরা সহাস্যবদনে তাহার হাতে দিল, সঙ্গে সঙ্গে ষ্টেশন পর্যন্ত গিয়া তাহাকে বেলগাড়ীতে তুলিয়া দিয়া আসিল। জ্যাকুইস ইংলণ্ডে চলিয়া গেল। গহ্বরে ফিরিয়া আসিয়া মেরী একখানা উখা দিয়া শিকল কাটিয়া লনবাডের বন্ধন মােচন করিয়া দিল। মেরীর প্রতি তখন তাহার অখণ্ড বিশ্বাস জন্মিল। তিনি বলিলেন, “আর এখানে থাকা নয়, জুয়াচারের সঙ্গে থাকিলে তােমাকে মহা বিপদে পড়িতে হইবে। তুমি আমার সঙ্গে ইংণ্ডে চল, আমি সেখানে তােমার চাকরী করিয়া দিব, কিংবা আমি নিজেই গৈবী খুন তােমাকে রাখি, বদমাস জ্যাকুইস এইবার উত্তম শিক্ষা পাইবে। আমি তােমাকে বুঝিতে না পারিয়া প্রহার করিয়াছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তুমি আমার উপকারিণী ভগ্নী, আমাকে একটা চুম্বন দাও।” এই বলিয়া অস্নেহে মেরীকে তিনি চুম্বন করিলেন। মেরী লজ্জিত হইল; সলজ্জ বদনে বলিল, “আমি পাপী,-মহাপাপী, গলা টিপিয়া আমাকে ফেলিয়া দিয়া মন কাযা করেন নাই,মারিয়া ফেলিলেও আমি সুখী হইতাম। পাপিষ্ঠ জ্যাকুইস আমাকে বিস্তর যন্ত্রণা দিয়াছিল, মাতাল হইয়া নিত্য নিত্য আমাকে চোরের অধিক প্রহার করিত, আজিও আমার গায়ে এ সকল প্রহারের দাগ আছে।” ল্যান্ড বলিলেন, “সে সব কথা এখানে নয়, চল, আমরা এই নরক- কুণ্ড হইতে বাহির হই, বােকেজ হােটেল এখান হইতে দূর নয়, দুটী রাস্তা পার হইলেই সেই হােটেল পাওয়া যাইবে, চল আমরা সেইখানে যাই, কল্য ইংলণ্ডে চলিয়া যাইব।” মেরী আপনার জিনিসগুলি খুব বড় একটা চামড়ার ব্যাগে পূর্ণ করিয়া লইল। ল্যানবাড বলিলেন, “তােমার ব্যাগটা ভারী হইল, এটা আমি নই, আমার ব্যাগটা হাল্কি আছে, এটা তুমি লও।” উভয়ে বােকেজ হােটেলে গিয়া পৌঁছিলেন, হােটলে একটী ঘর ভাড়া লওয়া হইল। খান প্রস্তুত কারবার হুকুম দিয়া মিষ্টার ল্যানবাড একবার হােটেল হইতে বাহির হইলেন। মাশোলস হরে ইংলণ্ড-ব্যাঙ্কের একটী শাখা অফিস আছে, অগ্রে তিনি সেই আফিসে গিয়া চেকের টাকা বন্ধ করিবার উপদেশ দিলেন, সেই আফিসের কর্তারা তৎক্ষণাৎ সেই মন্মে ইং ও ব্যাঙ্কে টেলিগ্রাম পাঠাইলেন। অতঃপর, ল্যান্ড পুলিশে গিয়া এজাহার দিয়া দস্তুরমত বন্দোবস্ত করিলেন, তাহার পর টেলিগ্রাফ অফিসে গিয়া নিজের দুই একটা বন্ধুকে টেলিগ্রাম পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন । এই সকল কার্য শেষ হইলে তিনি হােটেলে গিয়া আহারাদি করিলেন ।
গৈবী খুন কাৰ্যগতিকে তঁহাকে তিনদিন সেই হােটেলে বাস করিতে হইল। চতুর্থ দিবস মেরীকে লইয়া তিনি ইংলণ্ডে যাত্রা করিলেন ।তথায় বন্ধুবান্ধবগণের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানাইয়া মেরীকে আপন ভবনে রাখিয়া তিনি পুনর্বার মার্শোলস বন্দরে যাত্রা করেন, তথা হইতে পুনৰ্ব্বার ইংলণ্ডে আসিয়া অবস্থান করিতে থাকেন। ইংলব্যাঙ্কে চক ভাঙ্গাইতে গিয়া জ্যাকুইস পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। তথা হইতে মার্শে- লিস চালান হইয়াছিল ; সকল অপরাধের ফরিয়াদী উপস্থিত ছিল না,সুতরাং শেষােক্ত দাগাবাজী অপরাধে তাহার কঠিন শ্রমসহ দুই বৎসর কারাবাস। মিষ্টার ল্যানবাড সেই সংবাদট। মেরীকে জানাইনে ; দণ্ড অল্প হইলেও মেরী সন্তুষ্ট হইল।
19. নত w.y }}}}{ali দশম রঙ্গ কিঙ্করী ও বানী। ল্যান্ড ও মাথিউ, এই দুই বন্ধুতে উইলিয়ম ব্যাঙ্কেকে নির্দোষী বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলেন, কি সূত্রে কোথায় সাফাই পাওয়া যায়, তাহা অবগত হইবার নিমিত্ত ল্যান্ড একাকী মার্শোলস বন্দরে যাত্রা করিয়াছিলেন, পূৰ্ব্ব-পরিচ্ছেদে পাঠক মহাশয় তাহা পরিজ্ঞাত হইয়াছেন। বারিষ্টায় মাথিউ লণ্ডনে ছিলেন। অন্যান্য লােকের মকদ্দমায় তাহার এক- দিনও অবকাশ ছিল না, সুতরাং তিনি অকুক্ষেত্র মার্গেট নগরে যাইতে পারেন নাই। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে একদিন তাহার কেরাণী তাহাকে জানাইল, আগামী কল্য তাহার কোন মক্কেলের কোন মকদম আদালতে উপস্থিত হইবে না, অতএব সে দিনটা তিনি অবসর পাইলেন, পূৰ্বদিন সন্ধ্যার ট্রেণে মার্গেটে উপস্থিত হইলেন। বারিগল হােটেলের ২৩ নম্বর ঘর তিনি ভাড়া লইলেন। মিষ্টার ম্যাথিউ নিজে আপন তদন্তের বিষয় যেরূপ বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাই এই স্থলে গ্রহণ করা হইল। তিনি লিখিয়াছেন, “বারিগল হােটেলে গৈৰী খুন। আমি উপস্থিত হই, হােটেলের কিঙ্করী ( chamber-maid ) আসিয়া আমার অভ্যর্থনা করে। যে কিঙ্করী সেসন আদালতে উইলিয়নের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়াছিল, যাহাকে আমি জেরা করিয়াছিলাম,সেই কিঙ্ক রা আমাকে দেখিয়া নিতে পারে নাই। সে দিন আমার পরচুল পরা ছিল, গাউনটাও নূতন ধরণের ছিল। কিঙ্করী আমাকে চিনিল না। ভালই ওইল, আমার সন্তোষ জন্মিল।” একটা ঘর আমি লইলাম, কিন্তু নিজের বিষয়কৰ্ম্ম করিবার জন্য আর একটা সর লওয়া আবশ্যক বােধ হইল। শয়নঘরের পাশে আর একটা ছােট ঘর, নির্জনে বসিয়া কাজকর্ম করার সুবিধা হইবে বলিয়া সে ঘরটা আমি লয়াছিলাম ; কিন্তু আশ্চৰ্য, শয়নঘরের ভিতর দিয়া সেই ঘরে যাইতে হয়, মধ্যস্থলে কেবল একটামাত্র দরজা, অন্য কোন দিকে আর প্রবেশের দ্বার ছিল না। আর এক কথা, সেই দরজাটী দুই ঘর হইতেই খােলা যায় ; চাী দিয়াও খোলা যায়, পেঁচ ঘুরাইয়া ও খােলা যায়। যে কিঙ্করার কথা আমি বলিলাম, সেই কিঙ্করীই আমার কাজকর্ম করিবার জন্য নিযুক্ত হইয়াছিল। সিগারেটের ধােয়া উড়াইতে উড়াইতে ঘরের চিনার পার্শ্বস্থ বিজলা-কল আমি টিপিয়া দিলাম, তৎক্ষণাৎ দরজা খুলিয়া গেল, ঘণ্টার ধ্বনি হইল, কিঙ্কর প্রবেশ করিল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তােমার নাম কি ?” কিঙ্করা।-আমার নাম ম্যাগী। আমি।-ভূত মানে? কিঙ্কর।-( চমকিয়া) কেন মাশয় । আমি ।-কেন ? একমিনিট হইল, এই ঘরে আমি ভূতের খেলা দেখিয়াছি। কিঙ্করী। ঘরের চারিদিকে চাহিয়া কাপিতে কাপিতে) ও বাবা ।
গৈবী খুন। } আমি।সত্যই আমি দেখিয়াছি,দুটী নারীমুক্তি ।-একটী.রাত্রিবাস পর, আর একটা দস্তুরমত পােষাক পরা। শেষেরটী বোধ হয় সহচরী।” ম্যাণী। - পাণ্ডুবদনে) ও বাবা! দুটী স্ত্রীলোক ! দুটী মূৰ্ত্তি এ ঘরে । কেবল একটা মাত্র। আমি-- একটা মাত্র কি ? বলিতে বলতে থামিলে কেন ? যদি কিছু গােলমাল থাকে, স্পষ্ট করিয়া বন। এ ঘরে যদি ভূতের উপদ্রব থাকে, তাহাতে আমি ভয় পাইব না। আছে কি না,কেবল সেইটা আমি জানিতে চাই। ম্যাগী-ভূতের গল্প করিতে নিষেধ আছে । হােটেলের কত্তা মা- দের সককে সে কথা বলাবলি করিতে বারণ করিয়া রাখিয়াছেন। আপ- নাকে যদি কিছু আমি বলি, কৰ্ত্তা যদি তাহা জানিতে পারেন, তাহা হইলে আমার পক্ষে আমি সে কথা কার কাণে উঠিবে না। আমি স্বীকার করি ৩ছি, যাহা তুমি বলিবে, তাঃ কে বল আমিই শুনিয়া রাখিব, আমার মুখে অপরে শুনিয়া রাখিবে না । মাগী?--(কম্পিত হইয়া)বে বল। এই ঘরে একটা বিবি থাকি, তাহার নাম ছিল বিবি মান্টক। ঐ পাশের ঘরে বিছানার উপর কে তাহাকে খুন করিয়া গিয়াছিল ।” আমি। ওঃ! তবেই ত ঠিক! যে দুটী ভূত আমি দেখিয়াছি, তাহাদের যদি কোন কাৰ্য্য থাকে, তবে আমি বুঝিতেছি, এই হােটলের দাসীগণের মধ্যে কেহ নয় কেহ সেই বিবিটীকে খুন করিয়াছে। ম্যাগী।--( ফ্যা ফ্যাল করিয়া চাহিয়া মহাবিস্ময়ে) ও বাবা!- 1 না। ,-সেই বিবি-সেই বিবি-জানে কি না,—সেই বিবির একজন বন্ধু আসিয়াছিলেন ;-সেই বন্ধু-মেয়েমানুষ নয়, পুরুষ মানুষ,-সেই বন্ধু ৪াহাকে—তাহাকে-খুন- গৈবী খুন । ঐ পর্যন্ত শুনিয়াই আমি বুঝিলাম, এই ম্যাগী তাহাকে খুন করে নাই। লােকের মুখশ্রী দেখিয়া প্রকৃতি নির্ণয় করা আমার অভ্যাস হইয়াছে, মাগীর মুখ দেখিয়া আমার প্রত্যয় জন্মিল, ম্যাগী খুন করে নাই। সে যাহা বলিল, তাহাই সত্য বলিয়া আমি বিশ্বাস করিলাম, তখন তাহার মুখে আ'ম আর কোন কথা শুনিতে চাচ্ছিলাম না। সে তথাপি আপন ইচ্ছায় সেই খুনের বিস্তারিত বিবণ আমাকে শুনাইল। নূতন কথা কিছুই পাওয়া গেল না ; আদালতে যাহা যাহা ব্যক্ত হইয়াছিল, ম্যাগী কেবল তাহাই বলিল। চলিয়া যাইবার পূর্বে সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, আপনি কি •বে আপনার শয়নঘরটা বলাইয়া--- হাস্য করিয়া আমি বলিয়াছিলাম, “বদলাইব কেন? বদলাইব না। ভূতেরা আমাকে ভয় দেখায় না। কেন জানো ?--তাহাদিগকে আমি ভয় করি না।” ম্যাগী বাহির হইয়া গেল। আহারাদি করিয়া সেই ঘরে আমি শয়ন করিলাম। নিজের ঘরে যেমন সুখে নিদ্রা হয়, সে রাত্রে সেই ঘরে সেইরূপ মুখে নির্বিঘ্নে আমি নিদ্রা গিয়াছিলাম ; এক ঘুমেই রাত্রি প্রভাত। প্রভাতে হাজিরা খাইয়া দুটা ঘরের চতুর্দিকে আমি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দর্শন করিলাম কোথাও কোন নিদর্শন পাইলাম না । শয়নঘরের জানালাগুলি পরীক্ষা কহিলাম ; একদিকের একটা জানালার অর্গল ছিল না, বন্ধ করিবার দাণ্ডা ভগ্ন। সহজেই সাসী খােলা যায়,একটা সাসী আমি খুলিলাম , বাহিরের দিকে মুখ বাড়াইয়া দেখিলাম,খুব মােটা নল একট। উপর হইতে নীচে পৰ্য্যন্ত বিল- স্বিত শেষভাগে একটা তার পিঞ্জরাকারে নিবদ্ধ ; সেই পথ দিয়া হাওয়া সেইটা দেখিবামাত্র বানরের কাৰ্য্য আমার মনে পড়িল। বানরের কি প্রকারে নল বাহিয়া উঠে নামে, তাহা আমার ঠিক জানা ছিল না, মানুষেরা নলের গায়ে পা রাখিবার সুবিধা পায় কি না, তাহাও আf জানি গৈবী খুন। ; না থাকিলে একটা সিদ্ধান্ত আসিত, কিন্তু নল বাহিয়া জানালায় আসা যায়, সেটা সত্য। জানালা বন্ধ করিয়া আমি হোটেল হইতে বাহির হইলাম। ২ সমুদ্রকূলে একটা প্রকাণ্ড পশুশালা। ছয় পেনস দর্শনী দিয়া আমি সেই পশুশালায় প্রবেশ করিলাম। পিঞ্জরে পিঞ্জরে অনেক সিংহ, অনেক Tri, অনেক ভল্লক। একটা বৃহৎ হস্ত, আরবদেশীয় একটা বৃহৎ উষ্ট্র। বানরের খাঁচা অগণ্য। একটা বৃহৎ লৌহপিঞ্জরে এক বানৱী দেখিলাম, তত বড় বানরী জীবনে আমি আর কখনও দেখি নাই। দীর্ঘ ছয়ফুট, অঙ্গের লোম পিঙ্গল- বর্ণ, লম্বা লম্বা সম্মুখের পা দুইখানা খর্ব, পশ্চাতের পদদ্বয় দীর্ঘ দীর্ঘ ; মুখখানা ককাংশে মানুষের মুখের মতন। মােটা মােটা শিকলে তাহার পা ধা, কোমর বাঁধা, গলা বাপ। বানর-বারীকে তেমন করিয়া বাপিয়া রাখে, তাহা আমি জানিতাম না ; কোথায় দেখিও নাই। একটা লােক সেই পশু পালার অধ্যক্ষ। তাহাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এই বানরীটা কোন্ দেশ হইতে আনা হইয়াছে, ইহাকে এমন করি। বাঁধিয়া রাখা হই- যাছে কেন?” লােকটা প্রথমে বলিল, “ইহার ইতিহাস আমরা কাহাকেও বলি না। আমার কৌতুহল আরাে বৃদ্ধি হইল। আমি তাহাকে অদ্ধ ক্রাউন ( আড়াই শিলিং) বাসস্ দিয়া খুসী করিয়া, বৃত্তান্ত জানিয়া লইলাম। আমেরিকার জঙ্গলে সেই বানরী রুগ্ন অবস্থায় পড়িয়াছিল, সেই সময় ভাল ঘিরিয়া ধরা হইয়াছে। এখানকার লােকে ইহাকে বনমানুষ বলিয়া অবধারণ করে। ইহার শরীরে বিলক্ষণ বল, বড় বড় পালােয়ানেরা ইহাকে ধরিয়া আটকাইয়া রাখতে পারে না। ছয় মাস হইল, ইহাকে এখানে আনা হইয়াছে, ছয় মাসের মধ্যে ছয়বার কাটগড়া ভাঙ্গিয়া পলাইয়া গিয়াছিল, বহু কষ্টে ধরা হইয়াছে। পূৰ্ব্বে ইহাকে শিকল দিয়া বাধিয়া রাখা হইত না; পলাইয়া পলাইয়া লােকের বাড়ীতে বাড়ীতে লাফাইয়া যাইত, জানালায় উঠিয়া দাত গৈবী খুন। খিচাইয়া গৃহস্থ লােকগুলিকে ভয় দেখাইত, বৃক্ষের ফলপত্রাদি তছরুপ করিত, সেই জন্য এখন বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে। শুনিলাম, কিন্তু সকল কথায় আমার মনঃসংযােগ হইল না। যাহা আমি ভাবিতেছিলাম, তাহাই অগ্রবর্তী; সুতরাং হঠাৎ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আগষ্ট মাসে সেখানে যে পর্পোৎসব হইয়াছিল, সে সময়ে এই বানরী কোথায় ছিল ?” লােক উত্তর করিল, “প ধ্বাহের পরদিন কাটগড়া 'ভাঙ্গিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল, তাহার পর আপনিই ফিরিয়া আসিয়াছে।” খুনের কিনারা করিবার দুটি পন্থা আমি স্থির করিয়াছিলাম , দুটীতেই আমি ঠাকলাম। প্রথম চেষ্টা ছিল, হােটেলের একজন কিঙ্করীকে আসামী করিতে পারি, কিন্তু ম্যাগী যে প্রকার সরলভাবে আমার সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়াছিল,সুতরাং তাহার প্রতি কিংবা অন্য কোন পরিচারিকার প্রতি সন্দেহ করিতে পারি নাই। শেষে ভাবিয়াছিলাম, বানরের প্রাচীরের নল , বাহিয়া জানালা দিয়া লােকের ঘরের ভিতর যাইতে পারে, কোন বানর হয় ত লুসীকে খুন করিয়া থাকিবে। তাহা ভাবিয়াই পশুশালায় গিয়াছিলাম, বানরী দেখিয়া সন্দেহ হইয়াছিল, কিন্তু পর্পোৎসবে খুন হয় নাই, পশুপাল- কের মুখে শুনিলাম, উৎসবের দিন বানরীটা বাহির হইয়াছিল, সেই দিনেই ফিরিয়া আইসে। ঘটনা শ্রবণ করিয়া আমি হতাশ হইলাম ; দুটী চেষ্টাই বুথা হইল। কাৰ্যানুরােধে তৎপরদিন প্রাতঃকালে আমি লণ্ডনে ফিরিয়া আসিলাম। আসিয়াই সংবাদ পাইলাম, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেসের ফাসী হইয়া গিয়াছে। অত্যন্ত দুঃখিত হইয়া ল্যাম্বার্ডের নামে টেলিগ্রাম প্রেরণ করলাম। তিনি তখন মার্শেলিসে ছিলেন।
* ৭ ॥ - ২ একাদশ রঙ্গ আবার খুন ! -তাবার তদন্ত ! মেরা ব্যাঙ্কেস লণ্ডনে আসি ল্যান বাড়ে ব যত্নে বেশ সুখে ছিল । মিষ্টার ল্যান্ড মার্শেলিস হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে বিবাহ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। মেবী সহজে রাজী হয় নাই। সে বুঝিতে পারিয়াছিল, তাহার প্রতি ল্যানবাডের আন্তরিক ভালবাসা পড়িয়াছে, সেই কারণেই চালাকী করিয়া ইতস্ততঃ করিয়াছিল ; তাহার ভ্রাতার ফার্সী হইয়াছে শুনিয়া নিজের বিবাহের কথায় ততটা আগ্রহ প্রকাশ করে নাই। ভ্রাতার মৃত্যু সম্বন্ধে সে ভাবিয়াছিল, বিচার ঠিক হইয়াছে, জজের বিচার ভুল হয় নাই, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস সত্যই তবে অপরাধী ছিল, এইরূপ তাহার ধারণা, এই কারণেই ভ্রাতৃবিয়ােগে তাহার শােকাধিক্য হয় নাই। কিছু দিন পরে মিষ্টার ল্যান্ড বসন্ত রােগে আক্রান্ত হন। সেই সময় মেস্ত্রী ব্যাঙ্কেস পরম কত্নে তাহার সেবা করিয়াছিল; তিনি আরােগ্য লাভ করিলে মেরীর সহিত তাহার বিবাহ হয়, এক বৎসরের মধ্যে মেরী একটা সন্তান প্রসব করে।
গৈবী খুন। মিষ্টার ল্যানবাড° সৰ্ব্বদাই মনে মনে ভাবিতেন,জ্যাকুইস যেরূপ চরিত্রের লােক, সেই ব্যক্তি হয় ত লুসীকে খুন করিয়া পলাইয়া গিয়াছিল , দাগা- বাজী অপরাধে তাহার দুই বৎসর মেয়াদ হইয়াছে, সে খালাস হইলে তাহাকে ধরিবার চেষ্টা করা হইবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময় কোন ব্যক্তি মেরাকে খুন করিয়া ফেলে। ডিটেটিভেরা অনেক অনুসন্ধান করিয়াছিলেন, কিছুই কিনারা করিতে পারেন নাই। জ্যাকুইসের কারাবাসের মেয়াদ ফুরাইয়াছিল,সে ব্যক্তি খালাস পাইয়া আসিয়াছিল, ল্যান্ড সে সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার অভিপ্রায়ে তিনি অনেক স্থান পরিভ্রমণ করেন। ষ্টোন্ এণ্ড পুলিশের ইনস্পেক্টার জনসকে মনে পড়ে। পুলিশে গিয়া তিনি জন্ সনের তত্ত্ব লন। সেখানকার লােকেরা বলে, এক বৎসর হইল জন্স পেন্স পাইয়া কৰ্ম্মত্যাগ করিয়াছেন। কোথায় আছেন, সংবাদ জানিয়া তিনি সেই ঠিকানায় গিয়া উপস্থিত হন। জন তখন সহরের বাহিরে একটা নির্জন পল্লীতে একখানি সুন্দর বাটী লইয়া অবস্থান করিতেছিলেন। বাটীর চতুর্দিকে মনােহর উদ্যান, স্থানে স্থানে লতাকুঞ্জ, দিব্য রমণীয় স্থান। একদিন তিনি লতাবল্ল- বেষ্টিত গাড়ীবারান্দায় বসিয়া মনের আয়েসে সিগারেট খাইতেছেন,পুলিশের কার্য্যের অতীত স্মৃতি তাহার মনােমধ্যে উদিত হইতেছে, এমন সময় তিনি দেখিতে পাইলেন, মস্ত একটা টুপী মাথায় দিয়া একটা লােক তাঁহার বাড়ীর ফটকের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। দেখিবামাত্র জনসন্ তাহাকে চিনিতে পারিনে। অভ্যাগত ব্যক্তি অপর আর কেহই নহেন, মিষ্টার রিচার্ড ল্যানবাড়। উঠিয়া আসিয়া জন তৎক্ষণাৎফটক খুলিয়া তাহার অভ্যর্থনা করিলেন। ল্যানবার্ড জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি আমাকে চিনিতে পার ?”
গৈবী খুন। জনসন্ উত্তর করিলেন, “পারি বই কি। মার্গেটের খুনী মামলার তদন্তের সময় প্রথমে তুমি আমার কাছে গিয়াছিলে, উইলিয়ম নামক যে ব্যক্তির উপর সন্দেহ হইয়াছিল, তুমি আমাকে বলিয়াছিলে, সে ব্যক্তিকে নির্দোষী বালয়া তােমার বিশ্বাস। এখন ৩ সেই লোকের ফাসী হইয়া গিয়াছে, এখনও কি তুমি সেইরূপ বিশ্বাস রাখ ?” দুইখানি চেয়ারে দুইজন উপবেশন করিলেন। জনের প্রশ্নে ল্যান্বার্ড উত্তর করিলেন, “পি বৈ কি? কেবল সন্দেহ নয়, লুসীর হ্যাকাণ্ডে উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস সম্পূর্ণ নির্দোষী, আমি তাহার অকাট্য প্রমাণ দিতে পারি।” জন।- (চমকিত হইয়া) বল কি ! ধন্য পরমেশ্বর! ধন্য পরমেশ্বর। ল্যান।সেই তদন্তের সময় তােমার সহিত আলাপ করিয়া আমি তােমার কাৰ্যদক্ষতার ও তীক্ষ্ণবুদ্ধির বিশেষ পরিচয় পাইয়াছি। জন।-(ব্যস্বরে) এখন তুমি আমাকে কোন কাজ করিতে বল না কি ? ল্যান।-ষ্টোন এণ্ড পুলিশে তােমার পদে যিনি এখন ইম্পেক্টর আছেন, তাঁহার মুখে শুনিয়াছি, সম্প্রতি তুমি তাহাকে এক পত্র লিখিয়া- ছিলে, চুপ করিয়া বসিয়া থাকাতে তােমার মেজাজ খারাপ হইয়া যাইতেছে। জন। হাস্য করিয়া) সত্য কথা—সত্যই আমার চুপ করিয়া বসিয়া থাকায় কষ্টকর বােধ হইতেছে। তুমি যদি আমাকে একটা তদারকের সূত্র ধরাইয়া দিতে পার, তাহা হইলে যতক্ষণ আমি কিনারা করিতে না পারি, ততক্ষণ পরিশ্রম করিতে বিরত থাকিব না। ল্যান।--তােমার মতন লােক একজন দরকার। যে কাজ করিতে আমি বলিব, তাহাতে যদি তুমি হস্তক্ষেপ কর, তাহা হইলে প্রতিদিন তােমাকে আমি একটী করিয়া গিনী দিব, তাহা ছাড়া যাতায়াতের সমস্ত খরচা আমার কাছেই পাইবে।
গৈবী খুন।
৬৭
জন।--বল দেখি কাজটা কি ?
ল্যান।-তুমি এখন সরকারী কাৰ্য্য কর না, আইনের বাঁধাবাঁধির
ভিতর এখন তােমাকে থাকিতে হইবে না, আপন ইচ্ছামত পূর্ণ-স্বাধীনতায়
কাজ করিতে পারিবে।
জন।-“হাঁ, অবশ ই আমি নিজের ইচ্ছায় কাজ করিতে পারিব ।
কিন্তু কাজটা কি ?
ল্যান।-একটা লােকের সন্ধান করিতে হইবে। সেই লােকটা
ফরাসী রাজ্যে অপরাধ করিয়া দুই বৎসরের জন্য কয়েদ হইয়াছিল, সম্প্রতি
খালাস
পাইয়াছে। তাহার অন্বেষণের জন্য আমাদিগকে ফ্রান্সে
যাইতে হইবে। সেখানকার জেলখানার নিয়ম ইংলণ্ডের জেলা-
খার অপেক্ষা খুব ভাল ;
কয়েদী খালাস হইলে ভবিষ্যতে তাহাকে
চিনিবার জন্য এক একটা নিদর্শন রাখা হয়।
জন--তবে সেই কথাই ভাল, ফ্রান্সে যাইতে আমি রাজী।
মিষ্টার ল্যানবার্ড ! তােমার স্ত্রীটী মারা গিয়াছে, আমার প্রাণে বড় বেদনা
লাগিয়াছে। আমি
ল্যান।–চুপ কর, চুপ কর । সে কথা তুলিও না। তােমার প্রাণে
আঘাত লাগিয়াছে, তা আমি জানি, কিন্তু যাহা মানুষের হাত নয়,
সে বিষয়ে অনুতাপ করা বৃথা, হত্যাকারী পলায়ন করিয়াছে। তাহাকে
ধরিতে না পারিলে অন্য আন্দোলন বিফল। আমি-আমি-না--না,
সে কথায় এখন আর কাজ নাই।
জনসনকে এই কথা বলিয়া মিষ্টার ল্যানবাঙ হঠাৎ আসন হইতে উঠিয়া
ফটকের কাছে গেলেন, সেইখানে খানিকক্ষণ দাড়াইয়া হাওয়া খাইয়া
একটু সুস্থ হইলেন। যখন আবার গাড়ীবারান্দায় ফিরিয়া আসিলেন,
তখন তাহার বদনে রক্তের লেশ দেখা গেল না; মুখে ও ললাটে ধৰ্মধারা
গড়াইতেছিল, রুমালে মুখ মুছিয়া কাতরস্বরে তিনি বলিলেন, ক্ষমা
আহা !
৬৮ গৈবা খুন। কর,-- আর সে কথা বলিও না । আমার স্ত্রীকে আমি প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসিয়াছিলাম। রােগে মরিলে আমার বেশী কষ্ট হইত না, কিন্তু খুন! হায় হায় ? যখনই আমি ভাবি, তখনি যেন মনে হয়, আমি পাগল হইয়া যাইতেছি। সে কথা ছাড়িয়া দাও, কথা বল। মিষ্টার জসন অন্য কথা ধরিলেন । পূৰ্ব্বকথা স্মরণ করিয়া গম্ভীর বদনে বলিলেন, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস নির্দোষী, তুমি তাহার প্রমাণ দিতে পার বলিতেছ, তবেই বুঝিতে হইবে যে, আর একজন সত্য অপরাধী, তাহারও প্রমাণ তুমি দিতে পার। লন।নিশ্চয় । জন।—সে প্রমাণটা কি তবে তােমার গুহকথা ? লন।না । হন। কে তবে সত্য অপরাধী, তাহ কি তুমি আমাকে জানাইবে ? ল্যান।-ই, তা তুমি জানতে পারিবে। লােকটা ধরা পড়িলে সে নিজেই সব কথা বলিবে। জন।কখন ? সান।--যখন আমরা তাহাকে ধরিব। জন—দুই বৎসর হইল, মার্গেটের হত্যাকাণ্ড হইয়া গিয়াছে। এখন আমি বুঝতে পারিতেছি। সত্যই কি আমরা হত্যাকারীকে অন্বেষণ করিতে যাইব ? । , লন।অবশ্য । হস্তক্ষেপ করিতে আমার মন জন।কিন্তু চাহে না। ল্যান :—কি জন
গৈবী খুন।
জন।—বিচার হইয়া গিয়াছে, একজনের ফাঁসী হইয়া গিয়াছে, এ
সময় আর একটা লােককে ধরিলে
ধরিলে বিচারের উপর
দেওয়া হয়।
ল্যান।-তুমি ত এখন আর পুলিশে কাজ কব
না, তবে কিসের
জন।কাজ করি না সত্য, কিন্তু পুলিশের লােকেব যে একটা স্বাভা-
বিক বুদ্ধি থাকে, তাহা আমি হারাই নাই।
ল্যান।-তবে কি সত্য অপরাধীটা বিনদণ্ডে অব্যাহতি পাইবে, ইহাই
তােমার স্বাভাবিক বুদ্ধির উপদেশ ?
জন। না না, তাহা আমি বলিতেছি না, কিন্তু কাজটা আমাকে কেমন
কেমন লাগিতেছে।
ল্যান।—যদি তুমি এখন পুলিশে কাজ করিতে, তাহা হইলে এই
খবর পাইবামাত্র ফ্রান্সে চলিয়া যাইতে পারিতে না।
জন।–সত্য কি আমরা একজন খুনী আসামীর সন্ধানে যাইতেছি ?
শ্যান অব ।
জন।—আইনমতে যে রকমে খুনী আসামী ধরা হয়, এ কাটা সে
রকমে হইবে না কেন?
ল্যান।-পুলিশে দস্তুরমত কাৰ্যের উপর আমার বিশ্বাস নাই, সেই
দস্তুর ছাপাইয়া কাৰ্য্য করা আমার অভিপ্রেত।
জন।-আচ্ছা, এখন বল দেখি, সেই লােকটাকে যখন দেখিতে পাই,
তখন কি আমি তাহাকে গ্রেপ্তার করিব? আমি কি তাহাকে আদালতে
চালান করিব? কথা দাও,—ধর্মপ্রমাণে আমাকে উপদেশ দাও।
ল্যান-ধৰ্ম্ম প্রমাণেই আমি তােমাকে বলিতেছি। তাহাকে পাইলে
আমি তােমার হাতেই সপিয়া দিব, তাহার পর তুমি যাহ উচিত বিবেচনা
করিবে, তাহাই করিও।
গৈবী খুন। ; হন। --আমার হাতে সঁপিয়া দিবে ?-দীবন্ত ? ল্যান।-তুমি কি তাহা বুঝিতে পারিতেছ না ? হত্যাকারীকে ধরিয়া আমি কি হস্তে তাহাকে মাৰিব ? জল্লদের ফসদিড়ী হইতে একটা লোককে বাচাইয়া সেই ফাস কি আমি আমার নিজের গলায় পরিব? ল্যানবাঙের ঐ সকল কথা শুনিয়া জনের সন্দেহ ঘুচিল না ; তিনি ঐ প্রস্তাবিত কাৰ্য্যকে আইনবিরুদ্ধ বিবেচনা করিলেন ; ভাবিলেন, এতদিন পুলিশে কার্য্য করিয়া যে অভিজ্ঞতালাভ হইয়াছে, তাহাতে কাৰ্য্য কখন আমি করি নাই। তাহাদের কথােপকথন হইতেছিল, সেই সময় জনসনের স্ত্রী সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ল্যানবাঙের চা খাইবার নিমন্ত্রণ হইল। বিবি স্বহস্তে চা প্রস্তুত করিলেন। চা খাওয়া হইল । ল্যানবার্ডকে দেখিয়া বিবি মনে করিলেন, কোন দেবতা ছদ্মবেশে তাহাদের উপকার করিতে আসিয়াছেন। স্বামীর ফ্রান্সযাত্রায় তিনি অনুমােদন করিলেন, নিজ ইস্তে ব্যাগ সাজাইয়া দিলেন ; জনসনকে লইয়া মিষ্টার ল্যানবার্ড, ফ্রান্সে যাত্রা করিলেন । লণ্ডন হইতে প্যারিস, প্যারিস হইতে মার্শেলিস। তথাকার কারা- গারের গবর্ণরের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া মিষ্টার জন্ন আপনার পরিচয় দিলেন । তিনি ইংরাজ পুলিশের ইনস্পেক্টর । সেই পরিচয় পাইয়া জেল- খানার গবর্ণর তাহার যথেষ্ট সমাদর করিলেন এবং যাহা তিনি জানিতে চাহিলেন, সরলভাবে তৎসমস্তই বলিলেন । গবর্ণ বলিলেন, কয়েদ জ্যাকুইস লিমেয়ার দুই বৎসর জেল খাটিয়া সম্পতি খালাস পাইয়াছে। জেলখানার মধ্যে যে ব্যক্তি বিস্তর উপদ্রব করিয়াছিল। খালাস হইবারসময় তাহাকে অঙ্গুরী, ঘড়ী, চেইন এবং পাঁচ শত ফ্রাঙ্কের নােট ও স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হইয়াছে। তাহাকে যখন জেলখানায় আনয়ন করা হয়, তখন ঐ সকল জিনিস তাহার সঙ্গে ছিল।
গৈবী খুন। ৭১ আপনারা কি সেই কয়েদীর কোন সন্ধান চান। তাহার অঙ্গুলীর চিহ্ন আমার কাছে আছে, যদি আপনারা তাহা চান, আমি তাহা দিতে পারি। এখানকার কয়েদীরা যখন খালাস পায়, তখন তাহাদের সকলেরই অঙ্গু- লীর চিন্তু আমরা রাখি, তাহাতে কি আপনাদের দরকার আছে?” জনসন বলিলেন, “বিশেষ দরকার। একেত উহা নূতন প্রথা, তাহার উপর তাহার সহিত দেখা করিবার একটা নিদর্শন।” গবর্ণর তৎক্ষণাৎ জ্যাকুইসের অঙ্গুলী-চিহের ফটোগ্রাফ জনসনকে দিলেন, জন তাহা পকেটবহির মধ্যে রাখিয়া গবর্নরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “খালাস পাইয়া যাইবার সময় জ্যাকুইস তাহার ঠিকানার কথা বলিয়া গিয়াছে কি না?” গবর্ণর বলিলেন, “বলিয়া গিয়াছে—মার্শেলিস-ফ্লিচার্ডরােড নম্বর যখন তাহাকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল, তখনও ঐ ঠিকানা বলিয়াছিল।” ল্যানবার্ডের সহিত মিষ্টার জনসন কারাগার হইতে বাহির হইলেন, } ৩ নম্বর বাটীর সন্ধানে চলিলেন; ল্যানবার্ড বলিলেন, “সে বাড়ী আমি চিনি, সেখানে যাওয়া বিফল। তথাপি তাহারা সেই বাড়ীতে গিয়াছিলেন। বাড়ীখানা খালি পড়িয়া আছে। প্রতিবাসীরা বলিল, দুই বৎসর ঐ রকম খালি। বাড়ীর জানালায় জানালায় নীলামওয়ালাদের ইস্তাহার ঝুলিতেছিল তাহাদের ঠিকানা জুলেস ক্রোজিয়ার কোম্পানি, ১৪ নম্বর প্ল্যাকাট, মােড়, মার্শোলস। ঐ ঠিকানা দেখিয়া তাহার প্রথমে একটা হোটেলে প্রবেশ করিলেন। ল্যানবার্ড বলিলেন, “আমি অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়াছি, এইখানেই রহিম, তুমি যদি পার, জ্যাকুইসের সন্ধান লইয়া আইস।” জনসন বাহির হইলেন, ল্যানকর্ড একখানি পত্র লিখিলেন। পূর্বোক্ত নীলামওয়ালার নামে পত্র। লেখা হইল - “বােকেজ হােটেল
৭২
গৈবী খুন।
প্রিয় মহাশয় !
দুইবৎসর হইল, জ্যাকুইস লিমেয়ার নামক এক ব্যক্তি ফ্লিচার্ড
রোডের ৪৩ নম্বর বাড়ীতে বাস করিত, এক্ষণে সেই বাড়ীর জানা-
লায় আপনাদের নিলামী বিজ্ঞাপন লটকানাে হইয়াছে।
এক্ষণে সেই
জ্যাকুইস লিমেয়রকে কোথায় দেখিতে পাওয়া যাইবে, অনুগ্রহ পূর্বক
আমাকে লিখিয়া জানাইলে বাধিত হইব
আপনার অনুগত
আর ল্যানবার্ড।
সেই চিঠীর এইরূপ উত্তর আসিয়াছিল। যথা:-
“মার্শোলস,
প্লাক্যাট রােড ১৪ নম্বর।
প্রিয় মহাশয় !
আপনার পত্র পাইয়াছি। মিষ্টার জ্যাকুইস লিমেয়ার এখন কোথায়
আছেন, সে ঠিকানা আমরা আপনাকে দিতে পারিলাম না, আমরা
তাহা জানি না। আমরা শুনিয়াছি, তিনি ইউরােপ হইতে অন্য
স্থানে চলিয়া গিয়াছেন। তবে আমরা কেবল এই পর্যন্ত বলিতে পারি যে,
যাইবার পূর্বে তিনি তাহার বন্ধু মিষ্টার ভিক্টর ব্রেণকে উকিল নিযুক্ত করিয়া
গিয়াছেন। ব্রেণের ঠিকানা, সামােনি হােটেল, হেষ্টিং সসেক্স, ইংলণ্ড।'
আমরা বলিতে পারি, জ্যাকুইসের এটর্নী উক্ত ভিক্টর ব্রেণ তাহার ঠিকানা
বলিতে পারিবেন।”
আপনার বিশ্বাসভাজন
জুলেস ক্রোজিয়ার।
মিষ্টার ল্যানবাড ঐরূপ পত্র লিখিয়া ঐরূপ উত্তর পাইয়াছিলেন, জনসন
তৎকালে তাহা জানিতে পারেন নাই। তিনি বেড়াইতে গিয়াছিলেন,
তিনি ফিরিয়া আসিলে ল্যানবার্ড তাঁহাকে বলিলেন, “এখানে
“এখানে কোন
গৈবী খুন। ৭৩ সন্ধান হইল না, তবে আর বিলম্ব করায় কি ফল ? চলুন, দেশে যাওয়া যাক।” পরদিন তাহারা লণ্ডনে ফিরিয়া গেলেন, ল্যানবাড বলিলেন, “মিষ্টার জন্! আমি তােমার কাছে অঙ্গীকার করিয়াছি, আসামী ধরিয়া তােমার হাতে দিব, সে অঙ্গীকার অবশ্য পালন করিব। অদ্য হইতে তিন দিনের দিন তােমাকে আমি পত্র লিখিব,সেই পত্রের মর্মানুসারে কাৰ্য্য করিলে খুনি আসামীকে তুমি ধরিতে পারিবে। জনসকে যত টাকা দিবার কথা ছিল, স্যানবাড় সেই দিন তাহা প্রদান করিলেন, সেলাম করিয়া জনসন্ বিদায় হইলেন। তৃতীয় দিবসের অপরাহ্বে জস একখানি ডাকের চিঠি প্রাপ্ত হইলেন। চিঠিখানি রেজেষ্টারী করা, বেস হিল ডাকঘরের মােহর। পুলিন্দার খাম খুলিবামাত্র দুটী চাবী বাহির হইল; একটা বড়, আর একটী ছােট। পত্রে লেখা ছিল :-- “লাল বাংলা, বেক্স হিল। প্রিয় জন্স! আমি যাহা অঙ্গীকার করিয়াছিলাম, তাহা পালন করিলাম। তিন দিনের মধ্যে চিঠি লিখিব বলিয়াছিলাম, এই লিখিলাম। খুনী আসামীকে তােমার হস্তে সমৰ্পণ করিব, আমার এইরূপ অঙ্গীকার ছিল,তাহাও পালন করিলাম। এই পত্ৰমধ্যে দুটি চাৰী রহিল ; বড় চাবীটিতে আমার বাংলা-কুঠীরদ্বার খােল। যাইবে,ছােট চাবিটী সেই ক্ষেত্রে কাজে লাগিবে। আমার ঘরের দেওয়ালের সঙ্গে খুনী-আসামী শৃঙ্খলাবদ্ধ আছে, এত শক্ত বন্ধন যে, শৃঙ্খল ভগ্ন করিয়া মীটা পলায়ন করিতে পারিবে না। আমি সেখানে যাইব না, আমাকে তােমার আবশ্যকও হইবে না। আমি একটা ভিন্ন দেশে চলিয়া যাইব, তথা হইতে আর ফিরিয়া আসিব না। এই পত্রের মধ্যে আর একখানা ৭৪ গৈবী খুন। লেফাফা রহিল, মার্গেটের খুনের বিশেষ রহস্যবৃত্তান্ত সেই লেফাফার মধ্যে অন্য কাগজে লেখা আছে পাঠ করিলেই জানিতে পারিবে। তােমার বিশ্বাস-ভাজন রিচার্ড ল্যান্ড। পত্র পাঠ করিয়া মিষ্টার জন্ আর তিলা বিলম্ব করিলেন না, খুনী আসামী ধরিতে নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রা করিলেন । সঙ্গে রহিল এক যােড়া হাতকড়ি, একটা পিস্তল ও আর একটা আধারে লণ্ঠন। সেই দিনের বৈকালের ট্রেণে তিনি লণ্ডনে পৌছিলেন, তথা হইতে দ্বিতীয় ট্রেণে উঠিয়া বেগসহিলে পেীছিলেন। রাত্রি অনেক। ষ্টেশনের লােকদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি মিষ্টার ল্যাম্বার্ডের লাল- বাংলার ঠিকানা জানিয়া লইলেন। অনেকেই বলিল, “কিছুদিন পূর্বে সেই বাংলায় একটী স্ত্রীলােক খুন হইয়াছিল।” মিষ্টার জন্ এই কাৰ্য্যের যেরূপ বর্ণনা নিজ হস্তে লিখিয়াছিলেন, পাঠক মহাশয় তাহাই এইখানে দর্শন করুন। তিনি লিখিয়াছেন,' আমি লালবাংলায় চলিলাম। সমুদ্র তীরের প্রাচীরের উপর দিয়া যাইতে হয় । ফটকের কাছে পৌছিয়া ফটকে হস্তাৰ্পণ করিয়াছি, এমন সময় পশ্চাৎ দিক হইতে বংশীধ্বনি হইল। সতর্কতা সুচক সঙ্কেত। আমি জানি, পুলিশের লােকেরা ঐরূপ সঙ্কেত করিয়া থাকে। এখানে কিসের সঙ্কেত? আমাকে কি বাড়ীর ভিতর যাইতে নিষেধ করিতেছে ? পুনরায় বংশীধ্বনি। আমি স্থির হইয়া দাড়াইলাম, যে দিক হইতে সঙ্কেত আসিল, সেই দিকে চাহিলাম, ঘোর অন্ধকার, কিছুই দেখিতে পাইলাম না, কিন্তু বংশীধ্বনি শুনিয়া সাবধান হইতে হইল। ধীরে ধীরে উদ্যানে প্রবেশ করিয়া সদর দরজার নিকটে উপস্থিত হইলাম, দরজার চাবী খুলিলাম। কোন দিকে কোন শব্দ নাই। পিস্তল বাহির করিলাম, পিস্তলের ঘােড়র উপর অঙ্গুলী রাখিলাম। গুপ্ত- লণ্ঠনটা একবার উপর দিকে ঘুরাইলাম। সম্মুখের ঘর ও উপরে উঠিবার গৈবী খুন। ৭৫ সিড়ি দেখিতে পাইলাম। উপরে উঠিব মনে করিতেছি, এমন সময় বােধ হইল, যেন একটা চাবী খােল শব্দ আমার কর্ণে আসিল। কাণ খাড়া করিয়া আমি দাঁড়াইয়া রহিলাম, কিন্তু আর কিছুই শুনিতে পাইলাম না। চতুর্দিক নিস্তব্ধ। লণ্ঠনটা ভূমিতে রাখিয়া, চারিদিকে চাহিয়, সদর দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম । লণ্ঠনটী তুলিয়া লইবার জন্য সবে মাত্র আমি হেঁট হইয়াছি, সেই সময় স্পষ্ট শুনিলাম, কে যেন উপরের ঘরের একটা জানালা খুলিল। সিড়ির দিকে আমি অগ্রসর হইলাম। উপরে উঠিব কি না ভাবিতেছি, এমন সময় উপরের ঘরে মানুষের পদশক শুনিতে পাইলাম। সাবধান হইবার জন্য লণ্ঠনের মুখ ফিরাইয়া সিড়ির একধারে আমি লুকাইলাম। উপরের একটা দরজা খুলিয়া গেল, সিড়ির মাথার চাতালে দেয়ালের গায়ে একটা আধারে লণ্ঠনের আলো পড়িল। আমি চমৎকৃত হইলাম। বাড়ীতে চোর প্রবেশ করিয়াছে কি? আমি গিয়াছি খুনী আসামী ধরিতে, চোর আসিছে ঘরের জিনিষপত্র চুরী করিতে, ঠিক এক সময়ে আমরা দুইজনে দুইরকম কার্য করিতে এক বাড়ীতে প্রবেশ করিয়াছি, ইহা কি সম্ভব ? ভাবিতে ভাবিতে আমার মুখে হাসি আসিল ; তখনি আবার সেই সি মিলাইয়া গেল। সিড়ির চাতালের উপর একটা মনুষ্য মূর্তি দেখা দিল ; আধারে-লণ্ঠন হাতে করিয়া সেই লােকটা সিড়ির রেলের পার্শ্বে ঝুকিয়া উ কি মারিতেছিল। কদাকার চেহারা। হারলণ্ঠনের মুখটা যেদিকে, আমি তাহার বিপরিত দিকে ছিলাম, সুতরাং সে আমাকে দেখিতে পাইল না; সাবধানে সাবধানে ধীরে ধীরে পায়ে পায়ে উপর হইতে নামিয়া আসিল। আমি নিশ্চয় বুঝিলাম, লােকটা সিদেল চোর। সে যখন সদর দরজায় দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল, আমার দিকে পশ্চাৎ ফিরিল, আমি তখন প্রাঙ্গণের একটা কোণে আমার লণ্ঠনটী রাখিয়া, পশ্চাৎ দিক কইতে তাহার ৭৬ গৈবী খুন। ঘাড়ের উপর লাফাইয়া পড়িলাম ; লােকটা হুমড়ী খাইয়া পড়িয়া গেল, চক্ষের নিমেষে আমি তাহার বুকে হাঁটু দিয়া বসিলাম। সে যখন পড়ে, তখন তাহার লণ্ঠনটা দূরে নিক্ষিপ্ত হইয়া নিবিয়া গিয়াছিল, অন্ধকারেই আমাদের দুজনের যুদ্ধ। তাহার অঙ্গবস্ত্রের মধ্যে কোন প্রকার অস্ত্র লুকান আছে কি না, অগ্রে আমি তাহা নিরীক্ষণ করিলাম, কোন অস্ত্র ছিল না। আমি তাহার গলা টিপিয়া ধরিলাম, লােকটা গোঁ গোঁ করিয়া উঠিল। বেশ চেঁচাইতে না পারে, সেই অভিপ্রায়ে আমি আরাে জোরে তাহার গলা টিপিয়া তাহাকে টানিয়া টানিয়া দাড় করাইলাম, তখনও সে আবার অক্ষ ট চীৎকার করিয়া উঠিল। আশ্চৰ্য্য! ঠিক সেই সময় বাহির হইতে খুব জোরে জোরে সদর দরজায় করাঘাত! আমি মনে করিলাম, এ চোর তবে একাকী আইসে নাই, বাহিরে আরাে চোর আছে। একুশ বৎসর আমি লণ্ডনপুলিশে কাৰ্য্য করিয়াছি, এ রকম চোর ধরা একবার ও আমার ভাগ্যে ঘটে নাই। বাহির হইতে এক ব্যক্তি চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, “অমরা পুলি- শের শােক, ভিতরে কে আছ, দ্বার খুলিয়া দাও, যদি না থােলো, তবে আমরা দরজা ভাঙ্গিয়া ফেলিব।” আমি মনে করিলাম, এ বাড়ীতে চোর প্রবেশ করিবে, পূর্বে ইহা জানিতে পারিয়া পুলিসের লােকেরা নিকটে নিকটে ঘাটী বসাইয়াছিল, আমি তাহাদের আসামীকে গ্রেপ্তার করিয়াছি, ইহা দেখিয়া তাহারা হয়ত আশ্চর্য জ্ঞান করিবে। আমাকেই হয়ত তাহারা চোর মনে করিবে, সে ভাবনাটা একবারও আমার মনে আসিল না। যাহাকে আমি ধরিয়াছিলাম, তাহাকে টানিয়া লইয়া সদর দরজার নিকটে উপস্থিত হইলাম, ইস্তত; না করিয়া দ্বার খুলিয়া দিলাম। তিন জন লােক। কাহারই পুলিশের পােষাক পরা ছিল না, সাধারণ লােকের মত সাদাসিদা কোট প্যান্টুলান পড়া। তখন আমার মনে হইল, পুলিশের গৈবী খুন। ৭৭ নাম করিয়া ইহারা আমাকে ঠকাইয়াছে ; ইহারাও হয় ত চোর ; চারি জন চোরকে আমি একাকী কিরূপে ধরিব, তাই চিন্তা করিতে লাগিলাম। বাহিরের তিন জনের মধ্যে দুই জন সদর দরজার চৌকাঠের উপর উঠিয়া দাড়াইল, একটা লােক বাহিরে রহিল, যে লােকটা আমার বন্দী, বাম হস্তে তাহার গলা টিপিয়া রাখিয়া, দক্ষিণ হস্তে পিস্তল বাগাইয়া ধরিলাম ; যাহারা চৌকাঠে উঠিয়াছিল, তাহাদিগকে বলিলাম, আর যদি এক পদ অগ্রসর হও, তখনি আমি গুলী করিব।” অগ্রবর্তী লােকটা গভীর গর্জনে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “কে তুমি ?” আমি উত্তর করিলাম, “আমিও সেই কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি। “তােমরা কে ? সম্মুখের লােক উত্তর করিল, “আমরা পুলিশের লােক। এই বাড়ীতে একজন খুনি আসামী লুকাইয়া আছে, সেই সংবাদ পাইয়া আজ তিন দিন তিন রাত্রি আমরা এই বাড়ীর উপর নজর রাখিতেছি।” তাহার কথায় আমার প্রত্যয় জন্মাইবার জন্য সেই লোেক তাহার কোটের বােম খুলিয়া আমাকে চাপরাস দেখাইল। আমি সন্তুষ্ট হইলাম, আমার সন্দেহ দূর হইল সেই লােক পুনর্বার আমাকে জ্ঞািসা করিল, “তুমি কে? তুমি এত রাত্রে এখানে কি করিতেছ?” আমি উত্তর করিলাম, “এখানকার পুলিসে কি এই রকমে কাৰ্য্য চলিয়া থাকে ? একুশ বৎসর আমি লণ্ডন পুলিসে চাকরী করিয়া নিম্ন পদ হইতে ক্রমে ক্রমে ইনস্পেক্টর হইয়াছিলাম, পুলিসের লােকেরা সর্বদা তােমা- দের মতন ছদ্মবেশে বেড়ায়, তেমন দৃষ্টান্ত আমার জানা নাই। যাহা হউক, তােমার প্রশ্নের উত্তর দিতেছি এই বাড়ীতে খুনি আসামী আছে, নিশ্চিত সংবাদ পাইয়া, দরজার চাবী হস্তগত করিয়া, এই রাত্রে আমি এই বাড়ীতে প্রবেশ করি, আমি যাহাকে ধরিয়া রাখিয়াছি, এই লােকটা চুরী করিতে ৭৮ গৈবী খুন। আসিয়াছিল, বড়ীর ভিতর আমি আছি, জানিতে না পারিয়া চুপি চুপি উপর হইতে নামিয়া আসিয়া সদর দরজা খুলিতে আসিতেছিল, সেই উপ- ক্রমেই আমি ইহাকে ধরিয়া ফেলিয়াছি।” পুলিসের লােক বলিল “ছাড়িয়া দেও, ও ব্যক্তি আমাদেরই সঙ্গী f; চোর নয়। বাড়ীর জানালা দরজা সমস্ত বন্ধ দেখিয়া, আমি উহাকে অন্য উপায়ে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিতে বলি, বাড়ীর পশ্চাতে সিড়ি লাগাইয়া উপরের একটা জানালা খুলিয়া প্রবেশ করিবে, নামিয়া আসিয়া সদর দবজা খুলিয়া দিবে, ইহাই আমার উপদেশ ছিল । ছাড়িয়া দাও, উহার জন্য আমি দায়ী রহিম।” প্রস্তুত না হইয়া লােকটাকে আমি ছাড়িয়া দিলাম, সে তাহার দলের লােকের সঙ্গে মিশিল, তিনজন ছিল তাহাকে লইয়া চারিজন । সর্দার আফিসারের হস্তে একটা আধারে-লণ্ঠন, যাহাকে আমি ধরিয়া- ছিলাম,তাহার হস্তেও একটা আধারে-লণ্ঠন। সদর দরজার সম্মুখেই বাগান। তিনজন সেই বাগানে চলিয়া গেল, সর্দার আমার আহ্বানে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল অল্পক্ষ, মধ্যেই আমি তাহার পরিচয় পাইলাম। তিনি একজন ডিটেকটি সার্জন, তাহার নাম মিষ্টার পাঙেন। ইতিপূর্বে আমার গুপ্ত-লণ্ঠনটি আমি সঙ্গোপনে সিড়ির ধরে একটা কোণে রাখিয়া গিয়াছিলাম,সেইটা তুলিয়া লইয়া সম্মুখের ঘরে দ্বার খুলিলাম, সেই ঘরে কেহই ছিল না। পাউনকে সঙ্গে লইয়া সেই ঘরে আমি প্রবেশ করিলাম ; তাহাকে বলিলাম, “যনি এই লাল বাংলার অধিকারী, তুমি অব- শ্যই জান, তাহার নাম মিষ্টার ল্যাঙ, তিনি আজ আমাকে এক- খানি পত্র লিখিয়াছেন; পুত্রে লেখা আছে, দুই বৎসর পূর্বে মাগেটের হােটেলে যে ব্যক্তি স্ত্রী হত্যা করিয়াছিল, সেই খুনি আসামীটা এই বাড়ীতে বান্ধা আছে। পত্রের মধ্যে দরজার চাবি আমি পাইয়াছি।”
গৈবী খুন। ৭৯ বিস্ময় প্রকাশ করিয়া পার্ডেন বলিলেন, “মার্গেটের খুন ?-না না- তােমার ভুল হইয়াছে। অল্পদিন হইল যে ব্যক্তি মিষ্টার ল্যাম্বার্ডের স্ত্রীকে এই বাড়ীতে খুন করিয়াছে, আমি তাহারই সন্ধানে আছি ; তিনদিন পূর্বে সেই আসামীটা এই বাড়ীতে প্রবেশ করিয়াছে, লােকে উহাকে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছে। আমি বােধ করি, মিষ্টার সানবার্ড তাঁহার পত্রে মার্গে- টের খুনের কথা লেখেন নাই।” কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করি। আমি বলিলাম, “বােধ হয় মার্গেটের কথা লেখা নাই, খুনী আসামী বান্ধা আছে, কেবল এই কথাই তিনি লিখিয়াছেন।” পার্ডেন বলিলেন, “তাহাই ঠিক। আসামীটা ফরাসী লােক।” কিছু কিছু ভাব বুঝিতে পারিয়া আমি বলিয়া উঠিলাম, “ফরাসী লােক। সত্য নাকি?” পার্ডেন বলিলেন, “আমি তাে তাহাই বুঝিয়াছি। ফটোগ্রাফিতে আমার খুব বিশ্বাস। লােকটার পায়ের জুতার রক্তমাখা দাগ আমি ফটোগ্রাফে দেখিয়াছি, সে ফটোগ্রাফ আমার কাছে আছে; তাহা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের চিত্নের ফটোগ্রাফও আমি রাখি।” ফরাসী জেলখানার গভর্ণর আমাকে যে অঙ্গুলী, কয়ে, অঙ্গুলীচিহ্নের ফটোগ্রাফ দিয়াছিলেন, পকেটবহি হইতে সেখানি বাহির করিয়া দেখাইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “দেখ দেখি তােমার ফটোগ্রাফের সহিত এই ফটোগ্রাফের মিলন হয় কি না ?” নিজের পকেটের ফটোগ্রাফ বাহির করিয়া, দেখিয়া দেখিয়া মিলাইয়া সার্জন পার্ডেন মুক্তকণ্ঠে বলিলেন, “ঠিক-ঠিক-ঠিক। কোন সন্দেহ নাই।” উৎসাহিত হইয়া আমি বলিলাম, “তুমি আমি উভয়েই একটা লােকের সন্ধানে আসিয়াছি। লােকটা কোন্ ঘরে আছে; অন্বেষণ করি চল।”
গৈবী খুন সার্জন জিজ্ঞাসা করিলেন, “নিশ্চয়ই এই বাড়ীতে আছে, এমন কি তােমার বিশ্বাস হয় ?” আমি উত্তর করিলাম, “মিষ্টার ল্যান্বা মিথ্যাবাদী, এমন আমি বিবে- চনা করিতে পারি না। তিনি লিখিয়াছেন, এই বাড়ীতেই আছে।” আর সেখানে বাগবিতণ্ডা হইল না ; নিজের নিজের গুপ্ত-লণ্ঠন হাতে করিয়া লইয়া আমরা উভয়ে সে গৃহ হইতে বাহির হইলাম।
দ্বাদশ রঙ্গ। গ্রেপ্তার। জন ও পাঙেন একসঙ্গে বাহির হইয়া নিম্নতলের পশ্চাতের গৃহে প্রবেশ করিলেন, যাহা দেখিলেন, যাহা করিলেন, জনসনের নিজের বাক্যই পাঠক মহাশয়কে তাহা আমরা বুঝাইব। গুপ্তলণ্ঠনের আলােতে এক বিকট মুত্তি দর্শন করিয়া আতঙ্কে আমরা শিহরিলাম। একটা বিকটাকার লােক ভিত্তিগাত্রে দণ্ডায়মান ; ফটাদেশে ইস্পাতের কটীবন্ধ, তাহার সঙ্গে লৌহ-শৃঙ্খল, সেই শৃঙ্খলে চাবি দেওয়া বৃহৎ একটা কুলুপ ; বন্ধন-শৃঙ্খল বেষ্টনে দেওয়ালের সঙ্গে আবদ্ধ। লােকটার মস্তকের কেশ, গোপদাড়ী সমস্তই শুক্ল বর্ণ, মুখখানা ভীষণাকার, চক্ষু যেন পাগলের চক্ষুর ন্যায় বিঘূর্ণিত। গৃহমধ্যে আলাে দেখিতে পাইয়া লােকটা উৰ্দ্ধদিকে হাত তুলিল। অঙ্গুলী ঘূরাইতে ঘুরাইতে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। যাহারা পাগলের হাস্য দর্শন করিয়াছেন, তাঁহারাই সেই হাস্যের প্রকৃতি বুঝিতে পারিবেন। ভয়ানক বিকট হাস্য ; সে হাস্য দেখিলে আতঙ্কে সর্বশরীর ৮২ গৈবী খুন। রোমাঞ্চিত হয়। হাস্থের শব্দ শুনিয়া কর্ণে অঙ্গুলী দিয়া দারুণ ভয়ে সহজ লোকেরা ছুটিয়া পলায়। লােকটার পশ্চাতে একখানা খাটিয়া, মাথার উপর কড়িকাষ্ঠ-লম্বিত একটা লণ্ঠন, সম্মুখে একটা ছােট টেবিল ; টেবিলের উপর দোয়াত, কলম, ও খানকতক কাগজ। ল্যান্ডের পত্রের মধ্যে যে দুটী চাবী আমি পাইয়াছিলাম, তাহার মধ্যে ছােট চাবীটী ডিটেকটিভ সার্জনের হস্তে প্রদান করিলাম ; বলিলাম, “এই চাবী দিয়া আসামীর বন্ধন-শৃঙ্খলের তালা খােলা যাইবে। লােকটার সন্ধানের জন্য তুমি অনেক দিন খুঁজিয়া বেড়াইয়াছ, অতএব এ আসামী তােমারই বন্দী।” সার্জন পাঙেন যুবা পুরুষ, তাহার আকাঙ্ক্ষা বিস্তর। সন্ত্রম, গৌরব- লাভে তাহার একান্ত অভিলাষ । আমার বাক্য শ্রবণ করিয়া সানন্দে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সত্যই কি তুমি এ আসামীটাকে আমাকেই দিলে ?” • আমি উত্তর করিলাম, “অখণ্ড সত্য, আমার পরামর্শ শ্রবণ কর। তােমার সঙ্গী লােকেরা বাড়ীর মধ্যে আসিবার পূর্বেই তুমি ইহার বন্ধন মােচন করিয়া দেও। কি প্রকারে ইহাকে তুমি পাইয়াছ, তাহা তাহা- দিগকে বলিও না, সাদা কথায় বলিও, এই লােক অরে লুকিয়াছিল, তুমি ধরিয়া ফেলিয়াছ। এই কথা প্রচার হইলে সকলেই তােমার বুদ্ধি-বিক্রমের অধিক সুখ্যাতি করিবে; তােমার নামটা খুব জাহির খুব জাহির হইয়া উঠিবে। এই কথাগুলি সার্জনয়ে আমি কেন বলিলাম, তাহাও বুঝাইয়া বলি- তেছি, এই রকমের নামসুব্ধ যুরা আফিসারেরা খবরের কাগজে দশ ছত্র আপনাদের সুখ্যাতি পাঠ করিলে মহানন্দে মহা গৌরবে ফুলিয়া উঠেন। আমি তাহাকে আরও বলিলাম, “এই আসামীর গ্রেপ্তারী কার্যের মধ্যে ৬।
গৈবী খুন। . আমি ছিলাম, এ কথা তুমি কাহাকেও বলিও না; আমাকে একেবারে ছাটিয়া ফেলিয়া দাও। . রজনী প্রভাত হইলেই আমি লণ্ডনে চলিয়া যাইব, আমার সঙ্গে তােমার দেখা হইয়াছিল, এ কথাও প্রকাশ পাইবে না। সার্জন পাঙেন পরম সন্তুষ্ট হইয়া আমাকে সেলাম করিল তারপর শৃঙ্খলের চাবী খুলিয়া আসামীকে খালাস করিল ; পাছে হুটপাটী করিয়া পলাইবার চেষ্টা করে, সেই সন্দেহে জোর করিয়া তিনি সেই পাগলা আসামীর একখান হাত চাপিয়া ধরিয়া রাখিলেন। কোন দরকার ছিল না। বন্ধন-যাতনায়, কয়েক দিনের উপবাসে এবং প্রাণান্ত ভাবনায় লােকটা নিতান্ত শক্তিহীন হইয়া পড়িয়াছিল ; যেন এক দিনের প্রসূত শূকরির বাচ্ছা। পাৰ্ডন আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বাড়ীর দ্বারে চাবী বন্ধ করিবার কিরূপ বন্দোবস্ত হইবে ? আমি:বলিলাম, “সে ভাবনা তােমার নাই, তুমি চলিয়া যাইবার পর, আমি নির্বিঘ্নে চাবা বন্ধ করিয়া বাহির হইব। মনে রাখিও, তােমার সঙ্গে আমার এই দেখাই শেষ দেখা ; ইহজীবনে আর দেখা-সাক্ষাৎ হইবে না। আমাকে সেলাম করিয়া, ধন্যবাদ দিয়া, আসামী লইয়া মিষ্টার পার্ডেন বাহির হইয়া গেল। খানিকক্ষণ পরে দরজা বন্ধ করিয়া আমি চলিয়া আসিলাম, হােটেলে গিয়া শয়ন করিবার বন্দোবস্ত করিলাম। এইখানে বলিয়া রাখি, বন্দীর সম্মুখভাগে ক্ষুদ্র টেবিলের উপর যে কাগজগুলি পড়িয়াছিল, সেগুলি আমি সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলাম। সমস্তই লেখা কাগজ আসামীটার নিজ হস্তের লেখা। শয়ন করিবার পূর্বে সেই কাগজগুলি আমি পাঠ করিলাম। .
এয়ােদশ রঙ্গ।
বন্দীর পাপ-স্বীকার।
আমি জ্যাই লিমেয়ার, কোন নিগূঢ় অভিপ্রায়ে সে নাম লুকাইয়া
নূতন নাম ধরিয়াছিলাম ভিক্টর ব্ৰেণ। সেই নামে দোকান খুলিয়া
সরাপের কারবার করিতেছিলাম। এখন আমি বন্দী।
আমার সম্মুখে
লিখিবার সরঞ্জাম ছিল, আমার মাথার উপর যে লণ্ঠন ঝুলিতেছে তাহাতে
আলো ছিল, আমি আমার নিজের কাহিনী লিখিয়া রাখিলাম।
আমি এইখানে মরিয়া থাকিব, আমার মৃতদেহ যাহারা দেখিতে পাইবে,
এই লেখাগুলিও তাহার প্রাপ্ত হইয়া সমস্ত লােককে জানাইয়া দিবে ;
সেইজন্যই লিখিয়া রাখিলাম।
হেষ্টিং নগরে আমার মদের কারবার।' আজ প্রাতঃকালে এই লাল
বাংলা হইতে মনুর ল্যাম্বার্ড আমার নামে এক পত্র লেখেন । আমার
নাম ভিক্টর ব্রেণ হইয়াছিল, সুতরাং সেই নামেই পত্র ।
ল্যা বাড়ের
অনেক মদের দরকার , আমি যদি নিজে আমার ক্যাটলগসহ তাঁহার
গৈৰী খুন। be সহিত সাক্ষাৎ করি, তাহা হইলে তিনি অধিক পরিমাণে সরাপ সরবরাহের অর্ডার দিবেন; পত্রের মর্ম এইরূপ । কোথা হইতে পত্ৰ আসিল, কে লিখিল, তাহা দেখিয়াই আমি চমকিয়া গিয়াছিলাম, অনেকক্ষণ অনেক ভাবিয়াছিলাম। যাইব কি না, এই ভাবনাই প্রবল হইয়াছিল। তাহার পর একটা কথা মনে পড়িল। লােকের মুখে শুনিয়াছিলাম, বসন্ত রােগে ল্যাম্বার্ডের দুটা চক্ষু অন্ধ হইয়ছে, কিছুই তিনি দেখিতে পান না। তবে আর ভয় কি ?-পূর্বে আমি ল্যাঙের চক্ষে পড়িয়াছিলাম, তাহার সহিত কু-ব্যবহার করিয়াছিলাম, তিনি আমাকে চিনিয়া রাখিয়াছিলেন; কিন্তু এখন আর চিনিতে পারি- বেন না; তাহার চক্ষু নাই। অধিকন্তু এখন আমার নাম হইয়াছে ভিক্টর ব্রেণ, নামেও চিনিবার সম্ভাবনা নাই। আমাকে তিনি দেখিতেই পাইবেন না। হেষ্টিং নগরের সকলেই জানে, তিনি অন্ধ। আমার কারবার এখন খুব নরম যাইতেছিল, বেশী টাকার মাল সর- বরাহের আদেশ পাইব, সেই লােভে অদ্য বেলা ১১টার ট্রেণে আমি এই বেকস্ হিলে আসিয়া পৌছাই কিয়ৎক্ষণ পরে এই লালবাংলার দ্বারে উপস্থিত হই। ঘণ্টা বাজাইবামাত্র ল্যান্বার্ড নিজে দ্বার খুলিয়া দেন। আমি দেখিয়াছিলাম তাঁহার মুখ বিবর্ণ ও বিশুষ্ক। মুখ দেখিয়াই আমি বুঝিয়াছিলাম, আমিই তাহার বিষাদ জন্মাইবার কারণ। মনে একটু অনুতাপ আসিয়াছিল। ল্যান্বার্ড জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে? তুমি এখানে চাও ?” কণ্ঠস্বর বদলাইয়া আমি উত্তর করিলাম, “আমি সরাপের সওদাগর ; আপনি আমাকে এখানে আসিবার জন্য পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহাই আমি আসিয়াছি।” ল্যান্ বলিলেন, “ওঃ! ঠিক বটে। ভিতরে আইস।” ;
গৈবী খুন। আমি বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিলাম । সদর দরজা বন্ধ করিয়া তিনি এক লক্ষে আমার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইলেন, আমার নাকে মুখে রুমাল বর্ষণ করিলেন; তখনি আমি বুঝিলাম ক্লোরােফরম। দুই বৎসর পূর্বে আমি ঐরূপ ক্লোরােফরম যোগে তাহাকে অজ্ঞান করিয়াছিলাম । লােকে আমাকে চিনিতে পারবে না, সেই বিশ্বাসে আমি অসাবধান ছিলাম, জ্ঞান হারাই বার পূর্বে হুড়াহুড়ি করিয়াছিলাম, তিনি আমাকে শক্ত করিয়া চাপিয়া ধরিয়াছিলেন; বলবান লােকের হস্তে ক্ষুদ্র শিশু যেমন কাবু হইয়া পড়ে, আমি ও সেইরূপে কাবু হইয়াছিলাম, তাহার হাত ছাড়া- ইতে পারি নাই। ক্ষণপরেই আমার চৈতন্য (লাপ হইয়াছিল। যখন আমার চৈতন্য ফিরিয়া আসিল, তখন দেখিলাম, এই ঘরে আমি বন্দী ; সুদৃঢ় মৃঙ্খলে আমার কটিদেশ আবদ্ধ। ঘরের চারিদিকে জানালা দরজা বন্ধ। দিনমান অতীত হইয়াছিল, আমার মাথার উপর ঝুলানো লণ্ঠনে আলাে জ্বলিতেছিল। পশ্চাৎদিকে একখানা খাটায়া, সম্মুখ দিকে একখানা টেবিল, সেই টেবিলের উপর কালি, কলম, কাগজ দেখিতে পাই- লাম। আমার কোমরের শিকলটা দেওয়ালের সঙ্গে বান্ধা, পশ্চাতে হাত দিয়া বুঝিলাম, শিকলের সঙ্গে বৃহৎ চাবী তালা নিবদ্ধ। ভয়ে আমার প্রাণ উড়িয়া গেল। বুঝিলাম দেওয়ালটা না ভাঙ্গিলে পলায়নের উপায় নাই ভাবিতেছি, এমন সময় যেন একজনের কণ্ঠস্বর শ্রবণে চকিত হইয়া চারিদিকে আমি চাহিলাম। দেখি, পার্শ্বভাগে একটু দূরে একখানি চেয়ায়ের উপর মসুর ল্যানবার্ড। তিনি স্থির হইয়া বসিয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিয়াছেন ;--, ঠিক চাহিয়া রহিয়াছেন। ঠিক আমি দেখি- ঠিক আমি বুঝিলাম। তিনি অন্ধ, সে কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, তিনি অন্ধ নহেন। চেয়ারে বসিয়া তিনি সিগারেট, পাকাইতেছিলেন। আমি যখন তাঁহার দিকে চাহিলাম, পরিহাস করিয়া তখন তিনি বলিলেন, “জ্যাকু, নিশ্চিন্ত থাকো; বন্ধুলোকের কাছে তুমি রহিয়াছ।” লাম, গৈবী খুন। পরিহাস শুনিয়া আমার কপালে ঘাম ঝরিল। ক্লিচার্ড রােডের গুপ্ত-গহ্বরে যখন আমি যাত্রী ধরিয়া ভােগ দিয়া আটক করিতাম, তখন তাহাদিগকে আমি উৎসাহ দিয়া ছল করিয়া ঐরূপ বিশ্বাসের কথা বলিতাম। ল্যাম্বার্ড আবার বলিতে লাগিলেন, “আমরা তােমার বন্ধু। আমরা কে কে, তাহা বুঝিয়াছ ?--আমি স্বয়ং, আর এই ঘরে তুমি যে স্ত্রীলােক- টীকে খুন করিয়াছ, তাহার প্রেতাদ্মা সেই মেরী,—সেই মেরীকে আমি বিবাহ করিয়াছিলাম, তাহা তুমি জানো; মেরীর প্রেতাত্মা এই বাড়ীতে বিচরণ করে।” আমি কঁপিয়া উঠিলাম, কিন্তু কথা কহিতে পারিলাম না। তিনি বলিতে লাগিলেন, “বাহবা জ্যাকুইস, রসনা দমনে তােমার আশ্চর্য ক্ষমতা! তােমার মনে হইতে পারিবে, আমি যখন তােমার হাতে পড়িয়া- ছিলাম, তখন আমি তােমাকে মিষ্ট কথা বলিতে পারি নাই, তুমি কিন্তু সে সময়ে, আমার সহিত বেশ রসিকতা করিয়াছিলে। তখনও আমি কথা কহিতে পারিলাম না, কেবল নয়নে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম। সিগারেটের ধূম উদগীরণ করিতে করিতে তিনি বলিতে লাগিলেন, “আরও মনে কর, আমাকে লইয়া সেই গহবর মধ্যে যাহা করিতে তুমি ইচ্ছা করিয়াছিলে, কেমন ঠাণ্ডা হইয়া একটা একটী করিয়া, তাহা তুমি আমাকে বুঝাইয়া দিয়াছিলে। এই কথাগুলি বলিয়া তিনি তাহার চেয়াখানি টেবিলের কাছে সরাইয়া আনিলেন, করতলে মস্তক রাখিয়া টেবিলের উপরে কুনুই রাখিয়া, জ্বলন্ত-উজ্জ্বলচক্ষে আমার দিকে চাহিয়া রহিলেন। মেশ্বর ! আমি ভাবিয়াছিলাম, অন্ধ ;-ও বাবা! তাহার চক্ষু যেন দপ, দপ, করিয়া জ্বলিতে লাগিল! তাহার চক্ষের আগুনে আমি যেন দগ্ধ হইতে লাগিলাম। হা পরমেশ্বর! কি ভয়ঙ্কর ফাদে আমি পদার্পণ করিয়াছি গৈবী খুন। তিনি আবার বলিতে লাগিলেন, জ্যাকুইস! আমার দিকে চাহিয়া দেখ ; খুব ভাল করিয়া চাও,-অনেকক্ষণ ধরিয়া চাহিয়া থাক ;- বুঝিতে পারিবে, আমার তুল্য মনুষ্য এই পৃথিবীতে তুমি আর কখনও দেখ নাই। আরও বুঝিতে পারিবে, যাহা যাহা আমি বলিতেছি, তাহা মিথ্যা কি সত্য—তুমি আমার প্রতি যেমন ব্যবহার করিয়াছিলে, আমিও তােমার প্রতি সেইরূপ ব্যবহার করিয়াছি। তুমি আমাকে ক্লোরােফরম দিয়া অজ্ঞান করিয়াছিলে, লৌহ-শৃঙ্খলে বান্ধিয়া রাখিয়াছিলে, আমিও তাহাই করিয়াছি। চিনিতে পারিয়াছ, আমি কে ?→আমি রিচার্ড ল্যান্ বাড; আমার জীবনের তেজ ফুরাইয়া গিয়াছে, যে স্ত্রীলােকটীকে তুমি খুন করিয়াছ, আমার আত্মা তাহার সেই কবরে নিহিত রহি- আছে। তুমি মরিবে, সেই দণ্ডাজ্ঞা আমি উচ্চারণ করিতে পারি। দুই বৎসর পূর্বে আমি বলিয়াছিলাম, তােমার উচিত প্রতিফল এখন ভােলা রহিল, সে কথা তােমার মনে আছে?” সব আমার মনে আছে, আমার মুখ দেখিয়াই তিনি তাহ' বুঝিয়া লইলেন, কথা কহিয়া ব্যক্ত করিবার আবশ্যক হইল না ; কথা কহি- বার শক্তিও আমার ছিল না, তালুদেশে জিহা উঠিয়াছিল। ল্যান্ড বলিতে লাগিলেন, “জ্যাকুইস। দেয়ালের সঙ্গে তুমি শৃঙ্খল-বদ্ধ, অল্পে অল্পে ধীরে ধীরে তােমার প্রাণান্ত হইবে। ঘণ্টায় ঘন্টায়, দিনে দিনে, ক্ষুধা তৃষ্ণার যাতনায় তােমার আয়ুক্ষয় হইয়া আসিবে। আমি তােমার প্রতি যেরূপ দয়া করিলাম, মৃত্যু তদপেক্ষায় অধিক দয়া করিবে। এই পৃথিবী তােমার পক্ষে নরককুণ্ডু, মৃত্যু তােমাকে এই নরক হইতে উদ্ধার করিবে, রসাতলে আরও নরক আছে, জীবনান্তে মৃত্যু তােমাকে সেই নরকে পাঠাইবে।* সেই সময় আমি চীৎকার করিবার উপক্রম করিতেছিলাম। লক্ষণ বুঝিয়া ল্যাম্বা বলিয়াছিলেন, “এ বাড়ীতে আর জনপ্রাণীও নাই, সমস্ত গৈবী খুন। ৮৯ দিন সমস্ত রাত্রি চীৎকার করিলেও কেহ শুনিতে পাইবে না; আকাশ বিহারী পক্ষীকূল যেমন চীৎকার করিতে করিতে শূন্যমার্গে উড়িয়া যায়, কেহই তাহাদের কলরবে ক্ৰক্ষেপ করে না, তােমায় চীৎকারও সেই রূপ বিফল হইবে। আমার একজন চাকর আছে, বাহিরের বাগানে থাকে, বাড়ী চৌকী দেয়; সে একজন ধীবর অত্যন্ত বৃদ্ধ হইয়াছে, অত্যন্ত কালা,- বদ্ধ কালা; এমন কি তাহার কাণের কাছে দুই হস্ত তফাতে যদি বন্দুকের আওয়াজ হয়, তাহাও সে শুনিতে পায় না।” তাহার ঐ কথাগুলির তাৎপৰ্য আমি বেশ বুঝিলাম। আমি চেচাইলে শুনিতে পায়, বাড়ীর মধ্যে কিম্বা বাড়ীর নিকটে সে রকম লােকজন থাকিলে তিনি আমার হাত মুখ বান্ধিয়া রাখিতেন। শুনিবার লােক ছিল না বলিয়াই আমার মুখে কাপড় বান্ধা ছিল না। ল্যাম্বার্ড আবার বলিতে লাগিলেন, “ঐ যে লণ্ঠন ঝুলিতেছে, আলাে জ্বলিতেছে উহা আট ঘণ্টা জ্বলিবে, তাহার পর নির্বাপিত হইবে। তুমি যতদিন না মর, ততদিন এইখানে ঘাের অন্ধকারে এই রকম বান্ধা থাকিবে। লণ্ঠনের আলােটা আমি ইচ্ছা করিয়া ঐ রকম করিয়া রাখিয়াছি, এমন মনে করিও না, বরাবর ঐ রকম আট ঘণ্টা জলে। আর এক ঘণ্টা কাল আমি এখানে আছি, তাহার পর এখান হইতে চলিয়া যাইব,-কত দূরে যাইব, কোন দেশে যাইব, তাহা আমি জানি না। এই লালবাংলা চাবী বন্ধ থাকিবে, কেহই ইহার মধ্যে আসিতে পারিনা, কেহই তােমাকে বিরক্ত করিবে না। আমি তখন তাঁহাকে কি বলিব ? কিই বা করিব? দয়া প্রার্থনা করা আমার ইচ্ছ, আমার মুখ দেখিয়া সেই ভাব বুঝিয়া তিনি বলিতে লাগিলেন, “জ্যাকুইস! তুই যেমন নরপিশাচ, তাহার উপধুক্ত যন্ত্রণা দিয়া তােকে বিনাশ করিতে পারা যায়, তেমন যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু ইহ- সংসারে নাই। যে যন্ত্রণায় তােকে রাখিলাম, ইহা অপেক্ষা অধিক যন্ত্রণা গৈবী খুন। দিবার পায় থাকিলে তাের পক্ষে উপকার হইত। দুই বৎসর পূর্বে আমাকে খুন করিবার জন্য তুই যে রকমে আমাকে বান্ধিয়া রাখিয়াছিলি, তাহা কি তাের মনে হয়? সম্প্রতি এই ঘরের মধ্যে কি রকমে আমার স্ত্রীকে তুই খুন করিয়াছি, তাহা কি তাের মনে আছে? তুই ভাবিয়া- ছিস, আমি তােকে দেখিতে পাই নাই,---কিন্তু আমি দেখিয়াছিলাম। বসন্ত রােগে কিছু দিন আমার দৃষ্টিরােধ হইয়াছিল, দৈবানুগ্রহে এখন আমার চক্ষু পরিষ্কার হইয়াছে, এই পরিস্কার চক্ষে আমি আমার স্ত্রীর মৃতদেহ ও তাহার সজীব হত্যাকারীকে দেখিতে পাইয়াছিলাম ;- তুই তখন হামাগুড়ী দিয়া দেয়ালের কোলে লুকাইতেছিলি। আমি কঁপিয়া উঠিয়াছিলাম, ঘরের যে কোণে মেরীকে আমি খুন করিয়াছিলাম, ঐ সকল শুনিকমাত্র সেই কোণের দিকে আমি চাহিলাম । ল্যাম্বার্ড বলিতে লাগিলেন, আলাে যখন নির্বাণ হইবে, নিবিড় অন্ধকারে এই গৃহ যখন আবৃত হইবে, তখন তুই ভাবিয়া দেখিস, এই ঘরে কি কি, কাৰ্য্য করিয়াছিলি ;-রে ঘৃণিত কুকুর! চোরের মত এই ঘরে প্রবেশ কয়িয়া তুই আমার স্ত্রীর প্রাণবিনাশ করিয়াছিলি। আরও শুনিয়া রাখ, যাহাকে তুই খুন করিয়াছিল, তাহার প্রেতাত্মা নিত্য নিত্য তােরও চতুর্দিকে ঘূড়িয়া বেড়াইতেছে,-অপেক্ষা করিতেছে,-অপেক্ষা - অপেক্ষা--ঘন ঘন অপেক্ষা ;—যতদিন তুই না মরিবি, পিশাচেরা যতদিন তােকে পিশাচপুরীতে লইয়া না যাইবে, ততদিন সেই প্রেতাত্মা তাের কাছে কাছে ঘূরিবে।” তখনও অন্ধকার হয় নাই, তথাপি আমি সমস্ত অন্ধকার দেখিতে লাগি- লাম। ক্রন্দন করিয়া দয়া চাহিতে পারিলাম না। কাহার কাছে দয়া চাহিব ? যে লােকটা আমার নিকটে, তাহার হৃদয় লৌহনির্মিত আমি ভাবিতে লাগিলাম, অন্ধ হইলে আমি কি করিব? চীৎকার করিতে পারিলাম না, ভয়ে ভয়ে দন্তদ্বারা ওষ্ঠ চাপিয়া রাখিলাম।
গৈবা খুন। ; ল্যাম্বার্ড বলিতে লাগিলেন, “দ্বাদশ মাসের মধ্যে তাের অবয়বে কি অবশিষ্ট থাকিবে, লােকে তাহা দেখিবে। তখন তাের আকৃতি কিরূপ হইবে, আমি তাহা অনুমান করিতে পারিতেছি না। আমি এ কথা বলিতেছি, তাহারও কারণ আছে, এখানে ইন্দুরের বড় দৌরাত্ম্য ! তাহারা আমাকে সর্বদাই আলাতন করত। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ইন্দুর , নর্দমাল ইন্দুর ;-রাঙা রাঙা চক্ষু, ভীষণ ভীষণ দন্ত ;-নিকটের নমা হইতে তাহারা আসিয়া জমা হয় ; কিছুতেই তাহারা ভয় পায় না। অন্ধকার হইলেই তাহারা তাের সঙ্গে দেখা করিতে আসিবে। এই সব কথা বলিয়া প্রতিহিংসালােলুপ মসুর ল্যান্ড চেয়ার হইতে উঠিলেন, টুপী মাথায় দিলেন, চারিদিকে চাহিলেন, আবার বলিতে লাগি- লেন, “কিছুই আমি ভুলি নাই ;-ভুলিয়াছি কি কিছু? হাঁ, এই টেবিলের উপর কাগজ কলম আছে, যদি তাের কাৰ্যকলাপ লিখিয়া রাখিতে ইচ্ছ। হয়, লিখিয়া রাখি; খানিকক্ষণ লিখিলে তাের যন্ত্রণা অনেক কমিবে। আমি এখনু চলিলাম। তাের কি কিছু বলিবার আছে ?” উচ্চৈঃস্বরে আমি বলিলাম, “দাড়াও,তুমি কি ভয় পাইতেছ না ? তুমি আমাকে খুন করিলে ! ইহারই নাম খুন! এই অপরাধে তােমার ফুসী হইবে।” আমার কথা শুনিয়া তিনি মুখ টিপিয়া হাসিলেন। আমার রাগ হইল। তখন আমি উচ্চকণ্ঠে বলিলাম, “তােমরা ইংরাজ, তােমরা বলিয়া থাক, খুনে আসামীরা ধরা পড়েই পড়ে। তুমি আমাকে খুন করিলে, তুমি কি ধরা পড়িবে না? তোমার কি ফাঁসী হইবে না?” ল্যান্ড আবার হাস্য করিলেন, আবার বলিতে লাগিলেন, “জ্যাকু- ইস্! তুমি আমার সকল কথা মন দিয়া শােন নাই। আমি বলিয়াছি, তােমার প্রাণদণ্ড হইবে তাহাই দেখিবার জন্য আমি বাঁচিয়া রহিলাম, খালি বাড়ী ত্যাগ করিয়া আমি যাইতেছি, বাড়ীতে চাবী বন্ধ করিয়া যাই, ৯২ গৈবী খুন। তেছি, এক বৎসরের মধ্যে কেহই এ বাড়ীতে প্রবেশ করিতে পারিবে না, ইহাতেই আমার ঠিক জানা হইল, এই ঘরেই তুমি মরিবে ; মনুষ্যসাধ্য কোন কৌশলেই তুমি এ ঘর হইতে জীবন্ত বাহির হইতে পারিবে না। আমিও আর বাঁচিয়া থাকিব না। আমার পৃথিবীর কাৰ্য শেষ হইয়াছে, অচিরাৎ আমি ইহসংসার পরিত্যাগ করিয়া যাইব; যে রমণীকে তুমি খুন করিয়াছ, সে যেখানে আছে, সেইখানে গিয়া তাহার সহিত মিলিত হইয়া এক সঙ্গে বিশ্রামলাভ করিব। পৃথিবীতে আমার আর কোন কাৰ্য্য বাকি নাই।” পায়ে পায়ে অগ্রসর হইয়া তিনি তখন গৃহের দ্বারের নিকটে গমন করিলেন, ক্ষণকাল সেইখানে দাড়াইয়া আমার দিকে একবার চাহিলেন, তাহার পর বাহির হইয়া গেলেন, দ্বারে চাবী বন্ধ করিলেন জায়ও চাৰী বন্ধ হইল, শব্দ শুনিয়া তাহা আমি অনুভব করিয়া লই, লাম। হা পরমেশ্বর ! সেই কবরমধ্যে আমার জীবন্ত সমাধি। সেই কবরে আমি তখন একাকী। একবার আমি চিৎকার করিয়া উঠিলাম। খাটিয়ার উপর বসিয়া টেবি- লের উপর হাত রাখিয়া ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিলাম। * * * পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রার্থনা করিলাম, জীবনে আমি কখনও প্রার্থনা করি নাই, পরমে- শ্বর আমি মানিতাম না, কিন্তু তখন হে পরমেশ্বর বলিয়া ডাকিলাম, পবিত্র কুমারীর কাছে কষ্ট জানাইলাম। আবার দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিলাম। হায় হায় ! কি আমি করিলাম, কিছুই জানি না। বোঁ বোঁ করিয়া আমার মাথা ঘূরিতে লাগিল। জীবন্ত মরুভূমি যেমন নিস্তব্ধ, আমার কারাগৃহও সেইরূপ নিস্তব্ধ ; কোন দিকে কোন শব্দ শুনিতে পাই না; বােধ হইল যেন আমি পাগল হইলাম। ভাবিতে লাগিলাম, দীপনির্বাণ হইলে সেই ঘাের অন্ধকারে আমি কি করিব ? সেই ভাবনাতে আরও আমার ভয় বাড়িল; ঠিক গৈবী খুন। যেন বুঝিলাম, আমি পাগল। সে অবস্থায় চুপ করিয়া বসিয়া থাকা ভাল নয় ; অবশ্যই কিছু করা চাই।” টেবিলের উপর হইতে একটী কলম তুলিয়া লইলাম , যাহা যাহা আমার লিখিবার তাহা লিখিতে আরম্ভ করিলাম , সেই দিকেই আমার মন রহিল। অনেকক্ষণ ধরিয়া লিখিলাম। মধ্যে মধ্যে আমি, ভাবি-ভাবি,ভাবি, ভাবি ভাবিয়া আবার লিখি, আবার লিখি। ভয়টা যখন মনে আইসে, কমটা তখন ফেলিয়া দিই, আবার ভাবিয়া ভাবিয়া কলম তুলিয়া লই।” কতক্ষণ আমি এ ঘরে আছি ; বেশীক্ষণ নহে, কয়েকঘণ্টামাত্র ; কিন্তু বােধ হইতে লাগিল, যেন কতদিন, কতমাস। অন্ধকারে আমার বড় ভয় ! এই ধরে ঘাের অন্ধকারে মেরীকে আমি খুন করিয়াছি! মেরী যখন মরে, আমি তখন তাহার কাছে ছিলাম, মেরী আমার দিকে কাতর-নয়নে তাকাইয়া ছিল। আমি যেন এখনও তাহার সেই চক্ষু দেখিতে পাইতেছি । ল্যাম্বার্ড বলিয়া গেলেন, মেরীর প্রেতাত্মা আমার কাছে আছে। অন্ধ- কার হইলে সত্যই কি সেই প্রেতাত্মা আসিবে? আসিয়া সত্যই কি আমার কাছে কাছে ঘূরিবে ? ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কতক্ষণে আমি মরি, ঘণ্টায় ঘণ্টায়, দিনে দিনে তাহাই কি দেখিবে ? অন্ধকার হইলে ইন্দুরের আসিবে।” আলাে কমিয়া আসিতে লাগিল। তৈল ফুরাইল! এখনই ঘাের অন্ধকার হইবে। হা পরমেশ্বর ! আমি পাগল হইয়া যাইব। আর আমি ভাবিতে পারি । নিজে ও মরিতে পারিব না! খানিকক্ষণ আমি যেন অজ্ঞান হইয়াছিলাম, যখন জ্ঞান ফিরিয়া আসিল, তখন আলােটা নিতান্ত নিষ্প্রভ। দীর্ঘনিশ্বাসের সময় যেমন একপ্রকার গন্ধ অনুভূত হয়, আমি সেইরূপ গন্ধ পাইলাম। * * * * দেখিতে পাই না, আর কি লিখিব? তথাপি লিখিতেছি। ঘরের যে কোণে আমি মেরীকে মারিয়াছিলাম সেই কোণের দিকে চাহিতে না হয়, সেই জন্য মাথা হেঁট করিয়া কগজের উপর কালীর আচড় পড়িতে ওঃ !
৯৪
গৈবী খুন
-
লাগিলাম।
ঘরে কে আসিয়াছে—কে আসিয়াছে ? অব
শ্যই কে আসিয়াছে । ও পরমেশ্বর ! ঐ যে মেরী ।-আমি মেরীকে
চোখে দেখিতেছি।
কলমটা ফেলিয়া দিয়াছিলাম, আবার
তুলিয়া লইলাম ; অন্যদিকে নজর না যায়, সেই জন্য কাগজের উপর
নজর রাখিলাম।
দীপ নিৰ্বাপিত ঘাের অন্ধকার!
এত অন্ধকার যে আমি--আমি
কিছুই—আবার কি? আবার কি? ঘরের ভিতর কি নড়িতেছে। ঐ
কি শব্দ হইতেছে! নড়িতে আমি-আমি--
@ p চতুর্দশ রঙ্গ দ্বিতীয় রহস্য ভেদ ! লণ্ডন পুলিসের পেন্সন প্রাপ্ত ইনস্পেক্টর মিষ্টার জনসন ঐ কাগজ গুলি পাঠ করিলেন, আপন মনে বলিলেন, “হ • ভাগা উহা সমাপ্ত করিতে পারে নাই। যাহা হউক, ঐ জ্যাকুইস্ টিমেয়র যে তাহার পূর্ব পরিচিত মেরীকে খুন করিয়াছে, তাহাতে অব সন্দেহ রহিল না।” “লোকটা পাগল হইয়া গিয়াছে, মিষ্টার ল্যাঙ উহাকে বান্ধিয়া রাখি- আছেন, ক্রমাগত অনাহারে ঐখানে মরিয়া থাকিবে, ইহা তাহার অভি- প্রেত নহে; পূর্বাপর অবস্থা স্মরণ করিয়া তাহা বেশ বুঝিতে পারা যাই- তেছে। তিনি আমার কাছে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, খুনী আসামীকে আমার হস্ত্রে সমর্পণ করবেন ভঙ্গীকার তিনি করিয়াছেন।” আত্মগত এইরূপ উক্তি করিয়া তিনি আর একখানি দলিল বাহির করিলেন। মিষ্টার ল্যানবাড ইতিপূর্বে তাঁহাকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে দুটী চাবী আর একটা অতিরিক্ত লেফাফা ছিল । চাবী দুটী লইয়া তিনি বলিলেন, আসামী ধরিতে যাত্রা করিয়াছিলেন, ;
গৈবী খুন। লেফাফায় কি আছে, তাহা তখন দেখিবার অবসর পান নাই! সেই দিন সেই লেফাফা খুলিলেন। লেফাফার উপরে ব্রিটিশ কাউনের ছবি অঙ্কিত ছিল। লেফাফার মধ্যে খানকতক পাতলা পাতলা কাগজে অনেক কথা লেখা। ফরাসীরাজ্যের স্থানে স্থানে যে সকল ব্রিটিশ কনসল থাকেন, তাহাদের মধ্যে একজন মার্শেলিস বন্দরে ছিলেন। তিনি যেরূপ সাটিফিকেট দিয়াছেন, তাহাই প্রথমে পঠিত হইল, তাহাতে লেখা ছিল, --- আমি মেব্রেক্ষিজ মরিজ, মার্সেলি বন্দরে মহারাণী ভিক্টোরিয়া পক্ষের ব্রিটিশকল, আমি এতদ্বারা বিজ্ঞাপন করিতেছি, নিম্নভাগে যে তারিখ লেখা রহিল, সেই তারিখে রিচাড ল্যানবাড আমার নিকটে আসিয়া বলিলেন, “একটা লােক মরিতেছে, সে আপনার পাপ কাৰ্য্য আপনি লিখিয়া রাখিয়াছে, আপনার সাক্ষাতে তাহাতে দস্তখত করিবে, অতএব এখনি আপনাকে তাহার মৃত্যু শয্যার নিকটে যাইতে হইবে। জীবন মরণের ঘটনা। সেই মুমূর্ষ ব্যক্তি একটা স্ত্রীহত্যা করিয়াছিল, আসামীর সন্ধান না হওয়াতে অপর ব্যক্তি সন্দেহজমে ধরা পড়ে, ইংলণ্ডের বিচারালয়ে তাহার বিচার হইয়া গিয়াছে। সেই নির্দোষী লােকের ফাসীর হুকুম হইয়াছে, বাস্তবিক এই মুমুধু ব্যক্তি যথার্থই হত্যাকারী। সেই বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া আমি তৎক্ষণাৎ উক্ত রিচার্ড ল্যানবার্ডের সহিত মার্শেলিসের মিচেল রােডের s৩নং বাটীতে উপস্থিত হই। “যে ব্যক্তি মরণাপন্ন তাহার নাম চালস মালট আমি তাহার শয্যার নিকটে বসি; অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে পারি, মৃত্যু নিকট বটে, কিন্তু বেশ জ্ঞান আছে; উক্ত রিচার্ড ল্যান্ড আর এডওয়াড কপ ফল নামক একজন ইংরাজ ডাক্তায় আমার সঙ্গে ছিলেন। উক্ত চালস মাণ্ট খানকতক লেখা কাগজ আমার হস্তে দিয়াছিল, 1
গৈবী খুন
আমি তাহাতে এ, বি, সি, ডি, ই, এফ, জি চিহ্ন দিয়া একসঙ্গে গাথিয়া
আমার এই রিপাের্টের সঙ্গে পাঠাইলাম। মা বলিল, “সমস্তই
আমার নিজ হস্তের লেখা, শীঘ্রই আমার প্রাণ যাইবে, সেই জন্য
অগ্রে এইগুলি লিখিয়া রাখিয়াছি।”
“উপরিউক্ত চিহ্নযুক্ত ফর্দগুলিতে সে ব্যক্তি আমার সাক্ষাতে
দস্তখত করিল; আমি বলিতেছি, ঐ দস্তখতগুলি উক্ত চাল'স মার্শকের
প্রকৃত হত্যাক্ষর।
“আমি আরও বলিতেছি উক্ত রিচাড় ল্যানবাড
এডওয়াডকপ খাল এই দলিলের সাক্ষী হারাও আমার সাক্ষাতে
আমার অনুরােধে এই দলে দস্তখত করিয়াছেন।
“ঐ সকল কার্য শেষ হইবার সাত মিনিট পরে উক্ত চালস মাল্ট
হাপাইয়া হাপাইয়া অবসন্ন হইয়া পড়িল, তাহার প্রাণবায়ু বহির্গত
হইয়া গেল। মৃত্যুকালে সে ব্যক্তির শেষ সাক্ষ্য এই যে, পরমেশ্বর
ইং। যেন যথাসময়ে বিচারপতিগণের চক্ষুগোচর হয়, বিলম্ব না ঘটে।”
এইখানে গরিখ দেওয়া , ব্রিটিস কন্সলের স্বাক্ষর এবং কনটোলার
আফিসের মােহর। মৃতব্যক্তির অপরাধ
অপরাধ স্বীকারবৃত্তান্তগুলি পরবর্তী
পরিচ্ছেদে ব্যক্ত হইল।
৭
পঞ্চদশ রঙ্গ। মরণকালে পাপ স্বীকার । আমি চালস মান্ট। জ্বর রােগে আক্রান্ত হইয়া এই মশেলিস নগরে মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিয়া আছি। নিশ্চয় জানিয়াছি এ যাত্র। আমি বচিব না। মৃত্যুকে আমি ভয় করি না। কিন্তু আজ প্রাতঃকালে বে এক সংবাদ আমার কর্ণগােচর হইল, তাহাতে আর কালবিলম্ব করিয়া তৎক্ষণাৎ লেখনি ধারণ করিলাম । যতক্ষণ শক্তি থাকে ততক্ষণ আমি লিখিব, ইহাই আমার ইচ্ছা। এ প্রদেশে সংক্রামক জ্বরের অত্যন্ত প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, পাঁচ সপ্তাহ- কাল সেই জ্বরে আমি কষ্টভােগ করিতেছি। যদিও এখন জ্বর ত্যাগ হইয়াছে, কিন্তু ডাক্তার বলিয়াছেন, এ রােগ হইতে আমি মুক্তি পাইব না; এই মুত্যুশয্যা হইতে এ জীবনে আমি আর উঠিব না, আমিও বুঝিতেছি ডাক্তারের কথাই সত্য। আমার সেবার নিমিত্ত যে সকল ধাত্রী নিযুক্ত হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে একজন অদ্য প্রাতঃকালে আমার মন প্রফুল্ল রাথিবার উদ্দেশে r গেবা খুন। করে, সেই একখানি ইঙ্গা খবরের কাগজ আমার হস্তে প্রদান করে, কাগজের একটা স্থান দেখিয়া আমি আতঙ্কে কঁপিয়া উঠিল। কাগজে লেখা ছিল, একটী লােক বিনাদোষে দাসী যাইবে। যে অপরাধে ঠাহর কাসীর হুকুম সে অপরাধে আমি নিজেই অপরাধী। লুসী মান্টকে আমিই খুন করিয়াছি, আমি তাহার স্বামী। উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস খুন করে নাই । উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস আমার বন্ধু আমিও তাহার বন্ধু ;-ব্যাঙ্কেস একটা দোম করিয়াছিল, কিন্তু সে দোষে প্রাণদণ্ড হইতে পারে না, যে অপরাধের জ; তাহাব নামে অভিযোগ, সে অপরাধে সে নির্দোষী ; জল্লাদের হস্তে, ফসীকাষ্ঠে তাহার প্রাণ যাওয়া উচিত নহে। বালিসে ভর দিয়া একটু সােজা হইয়া আমি বসিলাম, কেমন করিয়া আমার স্ত্রীকে আমি খুন করিয়াছি,তাহা এইবার লিখিব। স্বজ্ঞানেই শামি খুন করিয়াছি। বেশী দিন আমাদের বিবাহ হয় নাই। আমার এক পিসির উইল অনুসাতে আমি কিছু টাকা পাই, সেই টাকা লইয়া একটা কারবারে অংশী হই। সেই কারবারের একটা শাখা অফিস এই মাশেলিসে আছে। প্রতি ঋতুতে দুইবার এক এক মাস করিয়া আমাদের দুইফুন অংশীকে পর্যায়ক্রমে এখানকার শাখা অফিসে থাকিতে হয়। জুলাই মাসের শেষে আমি এখানে আসিয়াছি, আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানে আমার থাকিবার কথা ; সরের ভয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে আনি নাই । নিত্য নিত্য তাহার পত্র পাইতাম, চারদিন পত্ৰ পাই নাই। স্ত্রীকে বড় ভাল বাসিতাম, তাহাকে দেখিবার জন্য মন উচাটন হইল । সােমবার, এখান- কার ব্যাঙ্ক-পৰ্বাহ, আফিস বন্ধ ছিল, আমি রেলওয়েবেগে লণ্ডনে যাত্ৰা করিলাম, বাড়ীতে গিয়া দেখি, বাড়ী অন্ধকার। রাত্রি অনেক। বাড়ীর ভিতর গিয়া উপরে উঠিব, আলাে ছিল না। আমার ঘড়ির চেইনে একটা দেয়াশলাই বাঁধা ছিল, একটা গ্যাস জ্বলিলাম, সদর দরজা বন্ধ বৎসর দুই ১০০ গৈবী খুন। করিতে যাইতেছি, দেখি দরজার ধারে একটা কাগজের মােড়ক। খুলিয়া পাঠ করি,ডাকঘরের নােটিস। বাড়া আসিব বলিয়া আমার স্ত্রীকে টেলিগ্রাম পাঠাইয়া ছিলাম, লােক না পাওয়াতে টেলিগ্রাম বিলি হয় নাই। নােটিশে তাহার সংবাদ। উদ্বিগ্ন হইয়া আমি উপরে উঠিলাম। শয়ন ঘরে গিয়া গ্যাস জ্বলিয়া দেখিলাম বিছানা খালি পড়িয়া আছে, ঘরে কেহ নাই। ভাবিলাম স্ত্রী তবে কোথায় গেল? বিছানার উপর বসিলাম, অন্য- মনস্ক হইয়া বালিশের নিচে হাত দিয়া রহিলাম । হাতে একখানা কাগজ ঠেকিল ; বাহির করিয়া দেখিলাম ; একখানা চিঠি, হস্তাক্ষর আমি চিনিলাম। চিঠিখানা পড়িলাম ; তাহাতে লেখা ছিল :- “প্রিয়তমে লুসী! বন্দোবস্ত ঠিক। মারগেটের বাড়ীগল হােটেলে দুটী ঘর লইয়াছি। ২৩নং ঘর তােমার নামে, ২৪নং ঘর ওয়ার্কারের নামে,-আমি ওয়ার্নারের নাম লইয়াছি, তুমি ৫টার ট্রেণের অগ্রে ভিটোরিয়া ষ্টেসনে উপস্থিত থাকিও, আমি অগ্রে গিয়া টিকিট লইয়া সেইখানে থাকিব। তোমার প্রেমাস্পদ বিল।” চিঠি দেখিয়াই আমি শিহরিলাম। আমার বন্ধুর হাতের লেখা। সেই বন্ধু উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস। সেই বন্ধুকে টাকা দিয়া সাহায্য করিয়াছিলাম। সেই বন্ধুরই এই কাজ । আর বিলম্ব করিলাম না ; রাত্রের ট্রেণে মারগেটে পৌছিলাম। বাড়ী- গল কোথায় সন্ধান জানিয়া সেইখানে উপস্থিত হইলাম, ২৩ নং ঘরে প্রবেশ করিলাম, দেখিলাম একটা বিছানার উপর লুসী কাত হইয়া শুইয়া আছে, ঘরে আলো জলিতেছে। কম্পিতকণ্ঠে আমি ডাকিলাম, লুসী! আমার কণ্ঠস্বর শুনিয়া লুসী মুখ ফিরাইয়া আমার দিকে চাহিল, ভয়ে তাহার মুখ ওখাইয়া গেল। বিছানার উপর বসিয়া আমি সজোরে গৈৰী খুন। তাঁহার গলা টিপিয়া ধরিলাম ; মুখথান। কালীবণ হইয়া গেল ; চক্ষু কপালে উঠিল, জীব বাহির হইয়া পড়িল! কম্ম ফরসা ! আমি বাহির হইয়া আসিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় ঘরের বাহিরে গুণ গুণ স্বরে গান গাহিতে গাহিতে একটা দাসী অন্যদিকে চলিয়া গেল ; বােধ হয় তাহার হস্ত হইতে এক খানা বাসন পড়িয়া গিয়াছিল, বন- ঋন করিয়া শব্দ হইল। তার পর সমস্তই নিস্তব্ধ। পাহের আমােদ,হোটে- লের লােকেরা তামাসা দেখিতে বাহির হইয়াছিল। আমি বাহির হইলাম, কহই আমাকে প্রদখিতে পাই না। এই পর্যন্তই আমার বক্তব্য শেষ ।
ষােড়ষ রঙ্গ উপসংহার । ডিটেক্টীভ সার্জন পাডেন আসামী ধরিয়া পুলিসে লইয়া গিয়াছিলেন । আসামী জ্যাকুইস লিমেয়ার। পরদিন পুলিসের ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করিয়া পাগল সাব্যস্ত করেন, আরও দুইজন ডাক্তার একবাক্যে তাহাই বলেন। আসামীকে আদালতে চালান করা হয় নাই ; আদালতে বিচার হয় নাই। ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডাক্তারের পরামর্শ করিয়া জ্যাকুইসকে ব্ৰভমুরের পাগলা গারদে প্রেরণ করেন ; সেই গারদেই তাহার মৃত্যু হয়। এই স্কুলে আর একটা কথা চালস্ মাণ্টক মৃত্যুকালে যখন পাপ স্বীকারপত্র লিখিয়া রাখে, ব্রিটিশ কাল যখন তাহার মৃত্যুশয্যার নিকটে উপস্থিত হন তখনও হতভাগ্য উইলিয়ম হাজত গারদে জীবিত ছিল। রিচার্ড ল্যান্ড তখন সত্য-বৃত্তান্ত সকল প্রকাশ করেন নাই কেন? এই প্রশ্ন উথিত হইতে পারে। উত্তর এই যে, তিনি যখন উহা অবগত হইয়া সানন্দচিত্তে উইলিয়মকে বাচাইবার জন্য লণ্ডনে আয়ােজন করিতে ছিলেন, সেই সময় তিনি একখানি টেলিগ্রাম পান। টেলিগ্রামের প্রেরক গৈবী খুন ব্যারিষ্টার ম্যানু। টেলিগ্রামের নির্ঘণ্ট, অদ্য প্রাতঃকালে উইলিয়ম ব্যাগে, সের ফাসী হইয়া গিয়াছে। নির্দোষী লােকের ফাসী হইল, তাহার আ২ কোন উচ্চবাচ্য হইল না। মেরী তখন বাচিয়াছিল। রিচাড় ল্যান্য সেই মেরীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। উইলিয়ম ছিল সেই মেরীর সদর ভ্রাতা ; অতএব বিনা অপরাধে সহােদরের প্রাণদণ্ড ইয়াছে, এ কথা শুনিলে মেরী হয় ত অনর্থ ঘটাইতে পারি ত, ইহা ভাবিয়া লন বা সত্য কথা প্রকাশ করেন নাই। কোন খবরের কাগজেও ছাপা হয় নাই । ঘটনা গতিকে নির্দোষ লােকেরও ফাসী হয়, উইলিয়ম ব্যাঙ্কেস তাহা এক দৃষ্টান্ত।” সম্পূর্ণ।
。
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.