Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Laghu Charita Manjari

Ray,kali Prosanno · 2009/10/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

LAGHU CHARITA MANJARI.
A Historical Reading Book including
an account of the late Mutiny
in Bengali.
BY
KALLI PROSANNO RAI.
লঘ চরিতমঞ্জরী।
ঐতিহাসিক প্রবন্ধ।
ইহাতে মিউটিনির বৃত্তান্ত সবিস্তর বর্ণিত হইয়াছে
শ্ৰীকালী প্রসন্ন রায় প্রণীত
কলিকাতা
মৃঙ্গাপুর ১২নং পটলডাঙ্গা ষ্ট্রীট।
বরাট যন্ত্রে
ভােলানাথ চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত।
কার্তিক,১২৮৭।

No text on this page.

মহানুভব
শ্ৰীযুক্ত এ. ডবলিউ. গ্যারেট এম, এ,
প্রেসিডেন্সি বিভাগের স্কুলসমূহের ইনপেক্টর
মহােদয় সমীপেষু।
সমুচিত সম্মান পুরঃসর নিবেদন,
এক্ষণে রাজপুরুষদিগের উৎসাহে বাঙ্গালা ভাষার দিন
দিন বিলক্ষণ উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হইতেছে বটে, কিন্তু
ইহাতে “ঐতিহাসিক প্রবন্ধ” সচরাচর দৃষ্টিগােচর হয় না।
আমি সেই অভাব মোচন করিবার জন্য কৃতসঙ্কল্প হইয়া
এই পুস্তক খানি সঙ্কলন করিলাম। ইহাতে লর্ড কাইব,
ওয়ারেণ হেষ্টিংস, লর্ড ডেলহৌসী ও লর্ড ক্যানিঙ এই কয়েক
মহাত্মার ভারতরাজ্য শাসনের বৃত্তান্ত বিশেষরূপে বর্ণিত
হইল। এই পুস্তক খানি কোন বিশেষ ইংরাজী গ্রন্থের
অনুবাদ নহে। মেকলের এসে, আরনল্ড সাহেবের
রচিত ডেলহৌসীর রাজ্যশাসনের বিবরণ, কে সাহেবের
প্রণীত সিপাই বিদ্রোহের ইতিহাস ও ফেণ্ড অব্ ইণ্ডিয়া
প্রভৃতি নানাবিধ পুস্তক ও পত্রিকা হইতে সঙ্কলিত হইল।

অনেক স্থলেই দেখিতে পাওয়া যায়, কি ছােট, কি বড়
গ্রন্থকারেরা, আপনার গ্রন্থ যত নিকৃষ্ট হউক না কেন,
কোন মহানুভব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নামাঙ্কিত করিয়া উজ্জ্বল ও
সাধারণের শ্রদ্ধাস্পদ করিয়া থাকেন। এই লােক ব্যবহার
দর্শনে বাসনা হইয়াছে, আমারও এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি
আপনকার নামাক্ষর সংযুক্ত হইয়া প্রচারিত হয়।
আপনি প্রেসিডেন্সি বিভাগের শিক্ষাকাৰ্যের অধ্যক্ষতা-
ভার গ্রহণ করিয়া অস্মদ্দেশীয় বালকগণের বিদ্যা, বিনয় ও
সদাচার সম্পাদনার্থ আন্তরিক যত্ন ও পরিশ্রম করিতেছেন।
আমি মহাশয়ের সেই সমস্ত সদগুণে আকৃষ্ট ও বদ্ধ হইয়াছি।
আর আপনি আমার প্রতি সময়ে সময়ে যে অনুগ্রহ প্রদর্শন
করিয়াছেন, তজ্জন্য আপনার প্রতি আমার যে আন্তরিক
ভক্তি আছে, তাহা এতদিন কোন রূপে প্রকাশ করিবার
অবসর পাই নাই। এক্ষণে এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি সঙ্কলন
করিয়া ভক্তিসহকারে মহাশয়ের নামে উৎসর্গ করিলাম।
একান্ত বশম্বল
শ্ৰীকালীপ্রসন্ন রায়।

TO A, W. GARRETT Esq. M. A. Inspector of Schools, Presidency Circlc. Sir, Under the fostering care of our Government, the Bengali language is now making much improvement, but a historical reading book is hardly to be found in it. To supply this want I undertook to compile this little work. It contains the administrations of LORD CLIVE, WARREN HASTINGS, LORD DALIOUSIE and LORD CANNING, which have been compiled from various sources, such as---MACAULAY'S Essays, ARNOLD'S Administration of DALIIOUSIE, KAYE'S HISTORY of the SEPOYWAR, THE FRIEND of India, the CALCUTTA REVIEW, &c. It is generally observed that authors, however inferior their productions may be in point of merit, try to make them attractive and fit to be esteemed by the public by coupling the names of highly respected and distinguished persons with their books. Following this usage, it has been my carnest desire that my humble work should go to the world with your name inscribed upon it.

Being in charge of the education of the native boys of
the Presidency
Circle
you have taken deep interest in
their intellectual and moral development. This and
other noble qualities which distinguish your character
as well as the favours I have received at
your
hands froin
time to time, have filled my heart with the highest
regard and esteem for you, which I have long wished
for an opportunity to express. Now that I have compiled
this little work, I avail myself of this opportunity to
show my regard towards you by dedicating it
your name.
I have the honour to be,
Sir,
your most obedient servant,
Kalli Prosanno Rai.

I am happy to certify Baboo Kaliprasanna Rai's "Laghecharitamanjari" as a work suitable for the use of our vernacular schools. I particularly like its language, which observes a just medium, of neither being too learned, nor yet too homely. If I read the signs of our times aright, the Bengalce of the day will grow in beauty, richness and vigour in proportion to the readiness of our future authors to follow the principles which seem to have guided this writer's choice of words. 14 th Novembe* 1880 KRISHNA KAMUL BHATTACHARJEE * Ramkrishnapur. My dear Kaliprasanna Dabu, In compliance with your request I have read your "Laghucharitamanjari" and I am happy to tell you, you have succeeded in making it a very good historical reading book for vernacular schools in Bengal. Presidency college, Yours sincerely November 16th, 1880, Prasanna Kumara Sarvadhikari, প্রিয় কালীপ্রসন্ন, তোমার লঘুচরিতমঞ্জরীর অধিকাংশ পাঠ করিয়া দেখিলাম। উহা ভাষাশিক্ষার্থীদিগের পাঠ্যপুস্তকমধ্যে নিবিষ্ট হইতে পারে। উহা পাঠ করিলে বালকদিগের জ্ঞান জন্মিবার সম্ভাবনা; এরূপ উভয় ফলােপদায়ক পুস্তককেই শাস্ত্রকারের। উৎকৃষ্ট পাঠ্যপুস্তক বলিয়া অঙ্গীকার করিয়া গিয়াছেন। সংস্কৃত কলেজ, তােমার উন্নতি দর্শনেচ্ছু ২০ শে নবেম্বর, শ্রীমহেশচন্দ্র শর্মা। ১৮৮৫। * Fellow of the Calcutta University, and late Sanscrit Professor, Presidency college.

中 লঘু চরিতমঞ্জরী লর্ড ক্লাইব রধট ক্লাইব ১৭ ২৫ খ্রঃ অব্দে ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী সায়র, প্রদেশে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহার পিতার নাম রিচার্ড ক্লাইব। তিনি ব্যবহারাজীবের * কাৰ্য্য করিতেন। রবট ক্লাইব ক্রমান্বয়ে অনেক বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া বিদ্যাভ্যাস করেন, কিন্তু তিনি বিদ্যাভ্যাসে এরূপ অনাবিষ্ট ছিলেন, যে তাহাতে কোন রূপেই কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না। অধিকন্তু সকল বিদ্যালয়েই দুষ্ট বালক বলিয়া প্রসিদ্ধ হইলেন! কিন্তু ইটন নামক এক জন সুচতুর শিক্ষক তাহার আকার প্রকার দেখিয়া বলিয়াছিলেন, ক্লাইব বাচিয়া থাকিলে এবং আপনার নৈসর্গিক গুণগ্ৰাম প্ৰকাশ করিবার সুযােগ পাইলে জগন্মলে সুবি- খ্যাত হইবে। সে যাহা হউক, তৎকালে সাধারণমত তঁাহার অনুকূল- ছিল না। ক্লাইব বাল্যাবস্থায় এরূপ অসমসাহসী ছিলেন, যে মার্কেট ডেরিটনস্থিত ধৰ্ম্মমন্দিরের উচ্চতর শিখরে উঠিয়া বসিয়া থাকিতেন ও সময়ে সময়ে নগরস্থ দুষ্ট বালকগণকে দলবদ্ধ করিয়া লুঠকারী সেনাদলের ন্যায় দোকান লুঠ করিতে যাইতেম ও দোকানদারদিগকে কহিতেন, যদি তােমরা আপেস্ট ও পয়সা না দাও, তবে আমরা তােমাদের দোকানের কপাট ও ডানালা ভাঙ্গিয়া ফেলিব। নিরুপায় দোকান, দারের আপেল ও পয়সা দিয়া তাহাকে শান্ত করিত। * ব্যবহার,মােকদ্দমা,আজীব, জীবিকা। যাহারা বাদী প্রতিবাদীর প্রতি- নিধি হইয়া মােকদ্দমা সংক্রান্ত সমুদায় কার্য করেন। উকীল, ইত্যাদি। t এক প্রকার বিলাতি ফল, দেখিতে গাবের মত। সময়ে সময়ে আমেরিকা হইতে বরফের জাহাজে এই ফল এদেশে আনীত হইয়া থাকে।

২ লঘু চরিতমঞ্জরী। সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়, পিতা যে ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করেন, পুত্রকেও সেই ব্যবসায়ে দীক্ষিত করিতে যত্নবান হন। রিচার্ড ক্লাইব প্রথমতঃ পুত্রকে ব্যবহারাজীবের কাৰ্য্য শিখাইবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাকে বিদ্যাভাসে অকৃত- কাৰ্য দেখিয়া একবারে ভগ্নোদ্যম হইলেন। এমন কি, তাহার এরূপ প্রত্যাশা ছিল না, যে ক্লাইব কস্মিন্ কালে মানুষ হইয়া পরিবারের ফোন উপকারে আসিবেন। তিনি কিয়ৎকাল পরে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির তনে একটী কেরাণিগিরি কার্যে নিযুক্ত কার্যে নিযুক্ত করিয়া ক্লাইবকে মাজ্জাজে পাঠাইয়াদিলেন। ক্লাইব ইংলণ্ড হইতে যাত্রা করিয়া এক বৎসর পরে মান্দ্রাজে আসিয়া উপনীত হন। তিনি মান্দ্রাজে পৌঁছিয়া অতিশয় দুরবস্থায় পড়েন, সঙ্গে করিয়া যে কিঞ্চিৎ অর্থ আনিয়াছিলেন, তাহ পথিমধ্যেই নিঃশেষিত হইয়াছিল, সুতরাং তাহাকে ঋণ করিয়া আবশ্যক ব্যয় নির্বাহ করিতে হয়। তিনি যে বেতন পাইতেন, তাহা যৎসামান্য, তারা উত্তম স্থানে বাস ও উত্তম আহার সম্পন্ন হইত তিনি ইংলণ্ড হইতে আসিবার সময়ে মান্দ্রাজস্থিত এক ব্যক্তির নামে অনুরােধপত্র আনিয়াছিলেন, কিন্তু মান্দ্রাজে পৌছিয়া দেখিলেন, তিনি ইংলণ্ডে যাত্রা করিয়াছেন, সুতরাং অনুরােধপত্র দ্বারা যে কিঞ্চিৎ সাহায্য প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছিল, তাহাতেও বঞ্চিত হইলেন। স্কাইব অতিশয় উগ্ৰস্বভাব ছিলেন, তিনি কাহারও সহিত আলাপ করিতে ভাল বাসিতেন না। এজন্য মাদ্রাজে অনেক দিবস পর্যন্ত কাহারও নিকটে পরিচিত বা আদৃত হইতে পারেন নাই। তৎকালে পুলিন্দা তদারক ও হিসাব রাখা কোম্পানির কেরাণি- গণের প্রধান কার্য ছি। কিন্তু ক্লাইব যেরূপ চঞ্চল-মতি ও উদ্ধত- প্রকৃতি ছিলেন, তাহাতে ঐ কাৰ্য্য তাহার পক্ষে নিতান্ত অনুপযুক্ত হইয়াছিল। অপর, মান্দ্রাজের জল বায়ুও তঁাহাব পক্ষে অনুকূল ছিল না। জল বায়ুর দোষে তাহার শরীর ক্রমশঃ অপটু হইতে লাগিল। ক্লাইব না। পৌছিয়া প্রথমতঃ কিছুকাল এইরূপ গেই অতিবাহিত করেন। তাঁহার মুখের মধ্যে এই মাত্র ছিল, লর্ড ক্লাইব। ৩ যে মাদ্রাজের শাসনকর্তা তাহাকে নিজ পুস্তকালয়ে প্রবেশ ও অধ্যয়ন করিতে অনুমতি দেন। ক্লাইব ল্যাবস্থায় বিদ্যালয়ে বিদ্যাভ্যাসে যেরূপ অনাবিষ্ট ছিলেন, তাহা পৰ্যালােচনা করিলে আপাততঃ মনে এরূপ উদয় হয় না, যে তিনি পুস্তক অনুশীলন করিবেন, কিন্তু এক্ষণে তাহার স্বভাবের এরূপ পরিবৰ্ত্ত হইয়াছিল, যে তিনি পুস্তক পাঠ করিয়াই অধিকাংশ অবকাশ কাল অতিবাহিত করিতেন। কিন্তু কি জল বায়ুর অস্বাস্থ্যকারিতা, কি দরিদ্রতা, কি পুস্তকাধ্যয়ন কিছুতেই সেই প্রগল্ভস্বভাব, অসমসাহসী যুবকের দুর্বিনীত চিত্ত শান্ত করিতে পারে নাই। তিনি যেরূপ বিদ্যালয়ে সৰ্ব্বদা শিক্ষকদিগের সহিত কলহ করিতেন, এক্ষণে কর্মস্থানেও উপরিস্থ কর্মচারিগণের সহিত সেইরূপ বিবাদ আরম্ভ করিলেন। ইহাতে অনেকবার তিনি কৰ্ম্মচ্যুত প্রায় হইয়াছিলেন। তিনি দুই বার পিস্তল প্রয়ােগ দ্বারা আত্মহত্যা সাধনের চেষ্টা করেন, কিন্তু দুইবারই তাহার সন্ধান ব্যর্থ হইয়া যায়। ইহাতে তিনি উচ্চৈঃ স্বরে বলিয়া উঠেন, আমি নিশ্চয়ই কোন মহৎ কাৰ্য্য সাধনের জন্য পৃথিবীতে আসিয়াছি। এই সময়ে এরূপ একটী ঘটনা উপস্থিত হয়, যাহাতে প্রথমতঃ বােধ হইয়াছিল, ক্লাইবের সমুদায় আশা ভরসা উচ্ছিন্ন হইয়া যাইবে, কিন্তু পরিশেষে সৌভাগ্য ক্রমে তাহাই তাহার মহত্ব লাভের হেতু হইয়া উঠিল। মান্দ্রাজে ফরাশিদিগের সহিত ইংরাজদের যুদ্ধ চলিতেছিল। ফরাশিরা ইংরাজদিগকে পরাজিত এবং মাদ্রাজ নগর ও দুর্গ হস্তগত করেন। পণ্ডিচারীরগবর্ণর ডিউপ্লে ক্ষান্দ্রাজের গবর্ণর ও অপরাপর অনেককেই বন্দী করিয়া পণ্ডিচারীতে লইয়া যান। ক্লাইব এই সঙ্কটের সময়ে রাত্রিকালে মুসলমানের বেশে পলাইয়া সেন্ট ডেবিড দুর্গ আশ্রয় করেন। ক্লাইব এক্ষণে যেরূপ অবস্থায় পড়িলেন, তাহাতে তাহার অভিলষিত কাৰ্য্য প্রাপ্তির সুযোগ হইয়া আসিল। তিনি প্রার্থনা করিয়া কোম্পানির সৈনিক কার্যে নিযুক্ত হইলেন। এই সময়ে তাহার বয়ঃক্রম একবিংশতি বৎসরের অধিক ছিল না।

৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। ক্লাইব সৈনিক কার্যে নূতন ব্রতী হইয়াও অনেক বার ফরাশিদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভ করেন। ও সাহস এবং উৰ্যোগ প্রভৃতি গুণ থাকাতে অচির কাল মধ্যেই তদানীন্তন প্রধান বৃটিশ সেনাপতি মেজর লরেন্সের প্রিয় পাত্র হইয়া উঠেন। ক্লাইব সৈনিক কাৰ্যে প্রবিষ্ট হইবার কতিপয় মাস পরে সংবাদ আসিল, যে ইংলণ্ডে ফরাশি ও ইংরাজদের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হইয়াছে। ইহাতে পণ্ডিচারীর গবর্ণর ডিউপ্লে মান্দ্রাজ নগর ও দুর্গ ইংরাজদিগকে প্রত্যর্পণ করেন। ক্লাইবও সৈনিক কার্য পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় ' কেরাণির কার্যে নিযুক্ত হয়েন। ইহার কিছু দিন পরে মান্দ্রাজ প্রদেশীয়দিগের সহিত ইংরাজদের বিবাদ উপস্থিত হয়। ইহাতে ক্লাইব লরেন্সের সাহায্যার্থ কেরাণির কাৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া পুনরায় সেনার কাৰ্য গ্রহণ করেন। তিনি এই রূপে পর্যায়ক্রমে কিছুকাল বাণিজ্য সম্বন্ধীয় ও কিছু কাল সেনা সম্পর্কীয় কাৰ্য্য করিয়া পরিশেষে কমিসরি জেনরেলের কার্যে নিয়ােজিত ও কাপ্তেন পদে উন্নত হয়েন। ১৭৪৮ খ্রীঃ অব্দে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা সুপ্রসিদ্ধ নিজামবংশের আদি পুরুষ নিজাম মলক পরলােক যাত্রা করেন। তঁাহার যাবতীয় অধিকারের মধ্যে কর্ণাট রাজ্য সর্বাপেক্ষা সমধিক সমৃদ্ধি সম্পন্ন ও দূর বিস্তীর্ণ ছিল। নিজাম মলকের পরলােক প্রাপ্তির পরে কর্ণাটে অতিশয় গােলযােগ ঘটে। কর্ণাটের ভূতপূৰ্ব্ব নবারের জামাতা চন্দ- সাহেব ১৭৫১ খ্রীষ্টাব্দে ফরাশিদের সাহায্যে মহম্মদ আলি খাঁর রাজধানী ত্রিঞ্চিনপল্লী অবরােধ করেন। মহম্মদ আলি খ ইংরাজদের পরম বন্ধু ছিলেন, এজন্য ইংরাজের। মহম্মদ আলি খাঁর সাহায্য দানে নিতান্ত উৎসুক হইলেন, কিন্তু তৎকালে মান্দ্রাজে তাহাদের অল্পসংখ্যক সেনা ছিল, তাহাতে আবার তাহাদের উপযুক্ত সেনাপতি কেহই ছিলেন মেজর লরেন্স অবকাশ লইয়া ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিয়াছিলেন। এই সকল কারণে ইংরাজেরা দেখিলেন, যে তঁাহারা যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইতেও পারেন না, নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতেও পারেন না, তাহারা উভয় সঙ্কটে পড়িলেন। ও ইতিকৰ্তব্যত অবধারণে বিমূঢ় হইলেন।

লউ ক্লাইব। এমত সময়ে ইংরাজদের মধ্য হইতে এক বীর পুরুষ সমরে অবতীর্ণ হয়েন ও অসমসাহস ও অতুল পরাক্রম প্রদর্শন দ্বারা কি শক্ত, কি মিত্র সকলকেই চমৎকৃত করেন। আমাদের প্রস্তাবিত ক্লাইবই সেই বীর পুরুষ। তিনি বিঞ্চিনপল্লীকে সঙ্কটাপন্ন দেখিয়া কর্তৃপক্ষের নিকটে এই প্রস্তাব করিলেন, যদি আপ- নার ফরাশিদের সমুচিত প্রতীকার করিতে উপেক্ষা করেন ; তাহা হইলে ত্রিঞ্চিনপল্লী হস্তবহির্ভূত হইবে, মহম্মদ আলি খাঁর বংশ ধ্বংস হইয়া যাইবে এবং ফরাশিরা ভারতবর্ষের যথার্থ প্রভু হইবেন। অতএব এক্ষণে আর উপেক্ষা করা কর্তব্য নহে। ফরাশিদের দমনার্থ যত্ন করা নিতান্ত আবশ্যক হইয়াছে। যদি কর্ণাট রাজ্যের রাজধানী আর্কট নগর আক্রমণ করতে পারা যায় ; তাহা হইলে হয়তো চন্দসাহেব ত্রিঞ্চিনপল্লীর অবরােধে ভঙ্গ দিয়া আর্কট নগর রক্ষার্থে যত্নবান্ হইবেন। মান্দ্রাজবনী ইংরাজেরা ডিউপ্লের জয়লাভ দেখিয়া অতিশয় ভীত হইয়াছিলেন। তাহারা, ইংলণ্ডে ফরাশি ও ইংরাজদের মধ্যে যুদ্ধ উপস্থিত হইলে অচিরকাল মধ্যে মাত্রাজ নগর হস্তবহিভূত ও বিনষ্ট হইবে, এই আশঙ্কা করিয়া ক্লাইবের প্রস্তাবেই সৰ্ম্মত হইলেন এবং তাহার প্রতি যুদ্ধের সমুদায় ভার অর্পণ করিলেন। কাপ্তেন ক্লাইব ২০০ শত গােরা ও ইউরােপীয় রীতি অনুসারে শিক্ষিত ৩০০ শত সিপাই লইয়া আর্কট নগর আক্রমণার্থ যাত্রা করিলেন। তিনি পথিমধ্যে দুরন্ত বৃষ্টি ও ঝটিকায় আক্রান্ত হইয়াছিলেন, তথাপি তাহা লক্ষ্য না করিয়া গন্তব্য স্থানে গিয়া উপনীত হইলেন। আর্কট নগ- রের দুর্গ রক্ষাৰ্থ যে সমস্ত সেনা নিয়ােজিত ছিল, তাহারা ক্লাইবকে সসৈন্যে সমাগত দেখিয়া দুর্গ পরিত্যাগ করিল; সুতরাং ক্লাইব অনায়াসে ও নির্বিবাদে উক্ত দুর্গ অধিকার করিলেন। ক্লাইব বিল- ক্ষণ অবগত ছিলেন, যে আমি দুর্গ অধিকার করিলাম বটে, কিন্তু এক্ষণে নিশ্চিন্ত থাকিলে চলিবে না। ফরাশিদের সহিত অবশ্যই যুদ্ধ বাধিয়া উঠিবে। পাছে বিপক্ষের আসিয়া দুর্গ অবরােধ করে, এই লঘু চরিতমঞ্জরী। আশঙ্কায় তিনি আহস সামগ্রী আহরণ করিয়া রাখিলেন ও উপদুর্গ নিৰ্মাণ করিয়া আত্মরক্ষাৰ্থ প্রস্তুত হইয়া থাকিলেন। যে সমস্ত বিপক্ষ সেনা ক্লাইবের আগমনে ভয়ে পলায়ন করিয়াছিল, তাহার নিকটবর্তী স্থান হইতে সেনা সংগ্রহ করিয়া নগরের সন্নিধানে শিবির সন্নিবেশিত করিল। ক্লাইব নিশীথ রাত্রে দুর্গ হইতে সসৈন্যে বহির্গত হইয়া অতর্কিতরূপে উক্ত শিবির আক্রমণ করিলেন। এই আক্রমণে বিপক্ষপক্ষের অধিকাংশ সেনা নিহত হইল ও অবশিষ্টের। ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িল। কিন্তু ক্লাইবের পক্ষীয় এক ব্যক্তিরও প্রাণ হানি হইল না। তিনি পূর্ণমনােরথ হইয়া দুর্গে প্রত্যাগমন করিলেন। চন্দ সাহেব আর্কট নগরের এই দুর্ঘটনার সংবাদ পাইয়া আপ- নার সৈন্য হইতে ৪ সহ সেনা বাহির করিলেন ও নিজ পুত্র রাজা সাহেবকে সেনাধ্যক্ষ করিয়া আর্কট নগরের উদ্ধারার্থ পাঠাইয়া দিলেন। পথিমথ্যে ডিউপ্লের প্রেরিত ও হতাবশিষ্ট আর্কট দুর্গরক্ষী সেনারা আসিয়া জুটিল। রাজা সাহেব এইরূপে প্রায় ১০ সহস্র সেনার অধিনায়ক হইয়া আর্কট নগর অবরােধ করিলেন। এদিকে ক্লাইবের প্রায় সকল বিষয়েরই অপ্রতুল, তাহার সৈন্য শত্রুসেনা অপেক্ষা সংখ্যায় অনেক ন্যূন, তাহার আহার সামগ্রীরও সচ্ছল ছিল না, আর্কট দুর্গও ভগ্নাবস্থায় ছিল, উহা যে অবরােধ সহ্য করিতে পারিবে তাহারও কোন সম্ভাবনা ছিল না। যতই কেন বিপদ হউক না, ক্লাইব ভগ্নোৎসাহ হইবার পাত্র ছিলেন না। তিনি দৃঢ়তা ও সতর্কতা সহকারে আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন। এই সময়ে ক্লাইবের পক্ষীয় সেনাগণকে আহারভাবে অতিশয় কষ্ট পাইতে হয়। এমন কি, সেরূপ কষ্টে পড়িলে সেনা মাত্রই অসন্তুষ্ট ও অবাধ্য হইয়া উঠে; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, সিপাইরা ক্রাইবের নিকটে আসিয়া অক্ষুন্ন চিত্তে নিবেদন করিল, মহাশয়! ইউরােপীয়দিগকে ভাত দিতে অনুমতি করুন, ভাতের ফেনই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট হইবে। ইতিহাস পাঠে সেনাপতির প্রতি সেগণের এরূপ অটল ততির দৃষ্টান্ত আর কুত্রাপি লক্ষিত হয় না।

লর্ড ক্লাইব। ৭ ক্লাইব আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হওয়ায় অপর এক স্থান হইতে তাহার সাহায্য প্রাপ্তির সুযােগ হইল। মহারাষ্টীয় প্রধান মুরারিরাও মহম্মদ আলির সাহায্যার্থ প্রতিশ্রুত হন, কিন্তু তিনি ফরাশিদিগের ক্ষমতা অনিবাৰ্য ও চন্দ সাহেবের জয় নিশ্চয় করিয়া এ যাবৎ উদাসীন ছিলেন, কিন্তু এক্ষণে আর্কট নগর রক্ষার সংবাদ শ্রবণে প্রােৎসাহিত হইলেন। মুরারি রাও বলেন, ইংরাজেরা যুদ্ধ করিতে জানে, ইহা আমি পূর্বে জানিতাম না। এক্ষণে বুঝিলাম, তাহাদের আত্মরক্ষা করিবার ক্ষমতা আছে ; অতএব সানন্দচিত্তে তাহাদের সাহায্য করিব। মহারাষ্টীয়েরা মহম্মদ আলির সাহায্যার্থ আসিতেছে, রাজা সাহেব ইহা শুনিয়া ত্রস্ত হইলেন ও প্রচুর উৎকোচ দিয়া ক্লাইবের সহিত সন্ধি করিবার চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু ক্লাইব অবজ্ঞা প্রদর্শন পূর্বক তাঁহার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করিলেন। অনন্তর উভয় পক্ষে তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইল। চন্দ সাহেব পরাজিত হইয়া পলায়ন করি- লেন; সুতরাং ক্লাইবেরই জয়পতাকা উত্তোলিত হইল। মান্দ্রাজবাসী ইংরাজের এই জয় লাভের সংবাদ পাইয়া পুলকিত ও অহঙ্কত হইলেন এবং ক্লাইবের সাহায্যার্থ ২০০ শত ইউরােপীয় এবং ৭০০ শত এতদ্দেশীয় সেনা পাঠাইয়া দিলেন। ক্লাইব এতাব- মাত্র সেনা লইয়া টিমারির দুর্গ আক্রমণ ও অধিকার করিলেন এবং মুরারি রাওর সেনার সহিত মিলিত হইয়া পলায়িত রাজাসাহেবের অন্বেষণে চলিলেন। আণি নগরে উভয় পক্ষে সংগ্রাম উপস্থিত হইল, তাহাতে ক্লাইব সম্পূর্ণ জয়লাভ করেন। মান্দ্রাজ গবর্ণমেন্ট এই সকল জয়লাভের সংবাদ শ্রবণে প্রােৎ- সাহিত হইয়া উঠিলেন ও ত্রিঞ্চিনপল্লীর উদ্ধার্থে এক দল পরাক্রান্ত সেনা সঙ্গে দিয় ক্লাইবকে পাঠাইবার সঙ্কল্প করিলেন। এই সময়ে মেজর লরেন্স ইংলণ্ড হইতে আসিয়া উপস্থিত হন ও প্রধান সেনা- পতির কাৰ্য্য গ্রহণ করেন; সুতরাং ক্লাবকে তাহার অধীন হইতে হয়। ক্লাইব যেরূপ অবাধ্য ও অহঙ্কত ছিলেন, তাহাতে যে তিনি পূর্ব বর্ণিত প্রশংসনীয় কার্য করিবার পরে অন্যের অধীনে থাকিয়া ৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। যথানিয়মে কাৰ্য্য করিবেন, এরূপ প্রত্যাশা করা যাইত না, কিন্তু লরেন্স তঁাহার গুণবত্তার বিষয় বিলক্ষণ অবগত ছিলেন। তাহার নিজের যদিও তাদৃশ অসাধারণ বুদ্ধিশক্তি ছিল না, তথাপি তিনি ক্লাইবের বীরােচিত ক্ষমতা সম্যক রূপে বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তিনি পূৰ্ব্বাবধি তাহার প্রতি সানুগ্ৰহ ব্যবহার করিতেন এবং এই অনু গ্রহও নিস্ফল হয় নাই। ক্লাইব সানন্দচিত্তে পূর্ববন্ধুর নিদের্শবর্তী হইলেন ও উভয়ে মিলিয়া ত্রিঞ্চিনপল্লীর উদ্ধার্থ যাত্রা করিলেন। চন্দসাহেব এত দিন পর্যন্ত ফরাশিদের সাহায্যবলে টিচুনােপলী অব রােধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে তিনি স্বয়ং অবরুদ্ধ হইলেনও অনন্যোপায় হইয়া ক্লাবকে নগর সমর্পণ করিলেন। এই ঘটনার কিছু দিন পরে চসাহেব মহারাষ্টীয়দিগের হস্তে পতিত হইয়া নিহত হন। বােধ হয়, তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী মহম্মদ আলির অসৎ পরামর্শে তাহার ঐরূপ শােচনীয় পরিণাম ঘটে। ক্লাইবা যত দিন ভারতবর্ষে ছিলেন, কখনই সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যলাভ করিতে পারেন নাই। এক্ষণে তাহার শরীর এরূপ অপটু হইয়া উঠিল, যে তিনি স্বদেশে প্রতিগমনের মানস করিলেন; কিন্তু তিনি স্বদেশে প্রতিগমনের পূর্বে আর একটা দুরূহ কার্য সম্পাদনের ভার গ্রহণ করেন। ফরাশিরা কোভলঙ, ও চিঙ্গলপুত নামক দুইটী দুর্গ অধিকার করিয়াছিলেন। তাহাদের বিরুদ্ধে এক দল সেনা প্রেরণ করা অবধারিত হয়, কিন্তু এতদর্থে যে এক দল সেনা নিযুক্ত হইল, তাহারা এরূপ অকৰ্ম্মণ্য ও ভীরুস্বভাব, যে ক্লাইব ব্যতিরেকে আর কেহই উহাদের অধিনায়ক হইয়া ফরাশিদিগের সম্মুখীন হইতে সাহসী হইলেন না। যে কার্য সম্পাদন করা অন্যের সাধ্য নহে তাহা সামান্য হইলেও সম্পাদকের গৌরবকর হইয়া থাকে। ক্লাইৰ তাদৃশ অশিক্ষিত সেনা সঙ্গে লইয়াও অল্প কাল মধ্যে কাৰ্য্য সমাধা করিলেন। উল্লিখিত দুইটী দুর্গ ক্রমান্বয়ে তাহার হস্তগত হইল। এইরূপে কর্ণাটে ফরাশিদের ক্ষমতার হ্রাস হইয়া আসিল এ ইংরাজদের পরম মিত্র মহম্মদ আলি শাঁ পিতৃ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হইলেন।

লর্ড ক্লাইব। ক্লাইৰ এই সকল ঘটনার অবসানে মান্দ্রাজে প্রত্যাগমন করেন। তৎকালে তাহার শরীর এরূপ অসুস্থ হইয়াছিল, যে অল্প কাল মধ্যেই তাহাকে ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিতে হইল। ক্লাইব ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিলে পর ডিরেক্টরসভা তৎকৃত অবদান পরম্পরার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ও ভবিষ্যতে উৎসাহ বন্ধন করিবার নিমিত্ত তাহাকে একখানি হীরাখচিত তরবারি প্রদান করেন। ক্লাইব প্রথমতঃ অলােক- সামান্য ভব্যতা প্রদর্শন পূর্বক কহিলেন, যাবৎ আমার উপরিস্থ কৰ্ম্ম- চারী ও বন্ধু লরেন্সকে ঐরূপ সম্মান প্রদান না করিবেন। তাবৎ আমি উহা লইব না। ক্লাইব ভারতবর্যে অবস্থিতি কালে যে ধনসঞ্চয় করিয়াছিলেন, স্বদেশে গিয়া তাহার কিয়দংশ দ্বারা পিতাকে ঋণজাল হইতে মুক্ত করেন ও অবশিষ্টাংশ বিলাসসজ্জায় পৰ্য্যবসিত করিয়াছিলেন। তিনি এইরূপে প্রচুর ধনব্যয় করিয়া দুই বৎসরের মধ্যে রিক্তহস্ত হইলেন ও কোন কাৰ্যোপলক্ষে পুনরায় ভারতবর্ষে আসিবার মানস করিলেন । এই সময়ে যদিও কর্ণাট রাজ্যে ইংরাজদিগের অনুকূলে সন্ধি স্থাপিত হইয়াছিল ও ডিউপ্লে খৰ্ব্বীকৃত ও স্বদেশে প্রতিনিবৃত্ত হইয়াছিলেন; তথাপি ফর।শিদিগের সহিত সত্বর যুদ্ধ ঘটিবার অনেক পূর্বলক্ষণ দৃষ্ট হইতে লাগিল। এজন্য ডিরেকটরসমাজ, ফোটসেন্ট ডেবিডের গবর্ণরের কাৰ্য্য ও ইংলঞরাজ লেপ্টনেন্ট কর্ণেলর পদে ক্লাইকে নিযুক্ত করিয়া পুনরায় ভারতবর্ষে পাঠাইয়া দিলেন। কর্ণেল ক্লাইব ভারতবর্ষে প্রত্যাগমন করিয়া প্রথমতঃ ঘেরিয়াদুর্গ আক্রমণ পূৰ্ব্বক অধিকার করেন। এই দুর্গ প্রায় চতুর্দিকে সমুদ্র- বেষ্টিত ও আম্বিয়া নামক এক জন সামুদ্রিক দস্যুকর্তৃক অধ্যুষিত ছিল। ক্লাইব অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সহিত মিলিত হইয়া আজি য়াকে পরাস্ত করেন ও তাহার সঞ্চিত ধন অপহরণ পূৰ্ব্বক উভয়ে ভাগ করিয়া লয়েন। ক্লাইব এই বীর কার্য সম্পন্ন করিবার পরে মান্দ্রাজে যাইয়া ফোউসেন্ট ডেবিডের কার্যভার গ্রহণ করেন। প্রায় এই সময়ে সুবিখ্যাত নবাব আলিবর্দি খাঁর দৌহিত্র সিরাজ ।

লঘু চরিতমঞ্জরী। উদ্দৌলা মুরশিদাবাদের সিংহাসনে অধিরূঢ় হয়েন। সিরাজ স্বভাবতঃ অল্পবুদ্ধি, নৃশংস ও অব্যবস্থিতচিত্ত ছিলেন। তিনি নট, ভাড় প্রভৃতি নীচ অনুচর বর্গের সহিত ইন্দ্রিয় সেবা ও মাদক দ্রব্য ব্যবহার করিয়া কালাতিপাত করিতেন। বাল্যকালে পশুপক্ষীদিগকে যন্ত্রণা দিয়া আমােদ অনুভব করা তাহার অভ্যাস ছিল ; অধুনা নবাব হইয়া তঁাহার সেই অভ্যাস স্বজাতি পীড়নে পরিণত হইল। সিরাজউদ্দৌলা ইংরাজদের প্রভূত ধন ও উদয়ােন্মুখী প্রভুত। দর্শনে ঈয্যাপরায়ণ হইয়াছিলেন। তিনি কলিকাতা আক্রমণ পূর্বক ইংরাজ অধিবাসীদিগকে পরাজিত ও বন্দীকত করেন। উহার। রাত্রিযােগে অন্ধকুপনামে অল্প পরিসর একটী গৃহে নিক্ষিপ্ত হয়। গৃহস্থিত বায়ু শীঘ্ন দুর্গন্ধে দূষিত হইয়া উঠে। রুদ্ধ ব্যক্তিদিগের মধ্যে অনেকেই দুঃসহ পিপাসায় দহমান হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়েন। পর দিন প্রাতঃকালে দ্বার উদটিত করিলে দৃষ্ট হইল, ১৪৬ জন ইউরােপীয় বন্ধীর মধ্যে ১২৩ মৃত পতিত রহিয়াছে। অবশিষ্টরা এরূপ শ্রীভ্রষ্ট, যে তাহাদের গর্ভধারিণী রাও উপস্থিত থাকিলে তাহাদিগকে চিনিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। কলিকাতার এই দুর্ঘটনার সংবাদ দুর্ঘটনার সংবাদ মান্দ্রাজে পৌছিলে পর তথাকার ইংরাজেরা ক্রোধান্ধ হইয়া উঠিলেন ও বৈনির্যাতনে কত নিশ্চয় হইলেন। তাহারা ক্লাইবকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে রণতরির কর্তৃত্ব ভার দিয়া বাঙ্গালায় পাঠাইয়া দিলেন। ক্লাইব অক্টোবর মাসে মাদ্রাজ হইতে যুদ্ধযাত্রা করেন, কিন্তু বায়ু প্রতিকুল হওয়াতে পথিমধ্যে তার অনেক সময় নষ্ট হয়। তিনি ডিসেম্বর মাসে হুগলীতে আসিয়া উপনীত হয়েন। এদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা জয়ােদ্ধত হইয়া মুরশিদা বাদে আমােদ প্রমোদ করিতেছিলেন, কিন্তু তাহার ভাগ্যে যে শাণিত অসি নিক্ষে- ষিত হইয়া রহিয়াছে, তাহার বিন্দু বিসর্গও জানিতেন না। ইংরাজের। তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে সাহসী হইবেন, ইহা তিনি সিন্ধু শোষণের ন্যায় একা"অসম্ভব মনে করিতেন। তিনি পবকীয় দেশের লর্ড ক্লাইব। ১১ বিষয় এরূপ অনভিজ্ঞ ছিলেন, যে সর্বদাই কহিতেন, সমুদায় ইউরোপ খণ্ডে দশ সহস্র লােকের বসতি নাই। সে যাহা হউক, এক্ষণে তিনি ইংরাজদের রণতরি হুগলীতে পৌছিয়াছে শুনিয়া সেনাগণকে কলি- কাতার অভিমুখে যাত্রা করিতে আদেশ দিলেন। এদিকে ক্লাইব সমভিব্যাহার আনীত ৯০০ শত ইংরাং সেনা ও ১৫০০ শত সিপাই লইয়া নৈসর্গিক সাহস সহকারে কলিকাতার দক্ষিণবৰ্ত্তী বজ, বজ নামক স্থান অধিকার করিয়া লইলেন ও ফোট- উইলিয়ম দুর্গের রক্ষী সেনা গণকে পরাস্ত করিয়া কলিকাতা উদ্ধার করিলেন এবং সমৃদ্ধিশালী হুগলী নগর লুণ্ঠন করিয়া লইলেন। লঘুচিত্ত নবাব, ক্লাইবের এই সকল কাৰ্য দেখিয়া উৎসাহহীন হইলেন ও সন্ধি- স্থাপন করাই তাহার ভয়াকুল চিত্তের অভিমত হইল। তদনুসারে তিনি ক্লাইবের নিকটে এই প্রস্তাব করিলেন, কুঠী ফিরাইয়া দিয়া ইংরাজদিগকে পুনরায় স্বপদে স্থাপিত করিবেন ও কলিকাতার আক্রমণে তাহাদের যে ক্ষতি হইয়াছে, তাহাও পূরণ করিয়া দিবেন। যুদ্ধই ক্লাইবের ব্যবসা। তিনি প্রথমতঃ নবাবেব প্রস্তাবে অসম্মত হইয়াছিলেন, কিন্তু পরিশেষে নবাবের আগ্রহাতিশয় দর্শনে ও অপর কতিপয় কারণে সন্ধিপক্ষই অবলম্বন করিলেন। তিনি ওয়াট সন ও উমিচাদ এই দুই জন এজেন্টের দ্বারা নবাবের সহিত এই সন্ধিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ক্লাইব এত দিন পর্যন্ত এক জন সৈনিক পুরুষ বলিয়া পরিগণিত ছিলেন, কিন্তু এক্ষণে এই সন্ধিস্থাপন দ্বারা একজন রাজনীতিজ্ঞ বলিয়া পরিচিত হইলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা অব্যবস্থিতচিত্ত ছিলেন। তিনি প্রাতঃ- কালে যাহা কৰ্তব্য বলিয়া স্থির করিতেন, সন্ধ্যার সময় আবার তাহাই অকৰ্ত্তব্য বলিয়া তদনুষ্ঠানে বিরত হইতেন। তিনি এই সন্ধির অব্যবহিত পরেই ক্লাইবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সঙ্কল্প করিয়া চন্দন নগরস্থ ফরাশিদিগের সহিত কুমন্ত্রণা করিতে লাগি লেন ও দাক্ষিণাত্য হইতে ফরাশি সেনাপতি বুসিকে আহ্বান করি- লেন। সুচতুর ক্রাইব ও ওয়াটসন দুষ্টবুদ্ধি নববর এই সক! কাৰ্য্য- ১২ লঘু চরিতমঞ্জরী। গুলি বিলক্ষণ অবগত ছিলেন। তাহারা এক্ষণে চন্দন নগর পরাজয় করা আবশ্যক বিবেচনা করিলেন। তদনুসারে ক্লাইব স্থলপথে তদ- ভিমুখে চলিলেন, ওয়াটসন জলপথ দিয়া যাত্রা করিলেন। ক্লাইব চন্দননগরে পৌঁছিয়া অচিরকালমধ্যেই কাৰ্য্যশেষ করেন। চন্দননগর পরাজিত ও ফরাশিদিগের অভ্যুদয়শা তিরােহিত হইল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইতিপূর্বেই ক্লাবের অমিতসাহস ও পরা- ক্রম দেখিয়া ভীত হইয়াছিলেন, এক্ষণে আবার তাহাকে চন্দননগর পরাজয় করিতে দেখিয়া আরও ভীত হইলেন; কিন্তু তাহাকে ভয়াভিভূত হইয়া অধিক কাল জীবিত থাকিতে হইল না, তাহার পতনজন্য অন্তঃশত্রুগণ মস্তক উত্তোলন করিল। তাহার অসদ্ব্যবহার ও অত্যাচার হেতু রাজ্যস্থ, সকলেই তাহার প্রতি বিরূপ হইয়াছিলেন । রাজা রাজ্যমধ্যে ঘোরতর অত্যাচার আরম্ভ করিলে সহজেই রাজ- বিপ্লব ঘটিয়া উঠে। নবাবের দেওয়ান রায়দুর্লভ ও প্রধান সেনা- পতি মিরজাফর প্রভৃতি কতিপয় প্রধান ব্যক্তি চক্রান্ত করিয়া নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করিবার সঙ্কল্প করিলেন ও গােপনে ইংরা- জদের নিকট সাহায্য চাইয়া পাঠাইলেন। তৎকালে কাউসেলের মেম্বরের প্রায় সকলেই ভীরুস্বভাব ছিলেন। তঁাহারা নবাবকে সিংহাসন চুত করা অসমসাহসের কাৰ্য মনে করিলেন, কিন্তু ক্লাইব তাহাদের ন্যায় কাপুরুষ ছিলেন না; সুতরাং তাহাদের মতে সম্মত হইলেন না। তিনি চক্রান্তকারিগণের মতেরই পােষকতা করিলেন। অনন্তর এই স্থির হইল, ইংরাজের নবাবের রাজ্যভ্রংশ বিষয়ে সেনা দ্বারা সাহায্য ও মির জাফরকে রাজ্য প্রদান করিবেন। মিরজাফরও প্রচুর অর্থ 'দিয়া, তাহাদের এই উপকার রাশি পরিশােধ করিবেন, অঙ্গীকার করিলেন। সিরাজউদ্দৌলা যেরূপ কুক্ৰিয়ারত ছিলেন, তাহাতে তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিবার ষড়যন্ত্র যুক্তিযুক্ত হইয়াছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু ক্লাইশ ন্যায়পরতায় বিসর্জন দিয়া প্রতারণা পূৰ্ব্বক যে ঐ চক্রান্তের অনুরূপ কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, তাহা তাহার পক্ষে কোন মতেই ন্যায়ানুগত হয় নাই। তিনি একবার এজেন্ট ওয়াটসন সাহে- লর্ড ক্লাইব। বের দ্বারা মিরজাফরকে বলিয়া পাঠাইলেন, আপনি কিঞ্চিােত্রও ভীত হইবেন না। আমি সমরে অপরাজিত পাঁচ সহস্র সেনা লইয়া আপনার সহিত মিলিত হইতেছি ও যাবৎ দেহে প্রাণসঞ্চার থাকিবে, আপনার সাহায্যদানে পরায়ুখ হইব না। আবার সিরাজউদ্দৌ- লাকে এরূপ স্নেহভাবে পত্র লিখিলেন, যে তাহাতে সিরাজ আ. নাকে সৰ্ব্বতােভাবে নিরাপদ স্থির করিলেন। এইরূপে নবাবের রাজ্য ভ্রংশবিষয়ে সমুদায় স্থির হইলে ক্লাইব শুনিতে পাইলেন, উমিচঁাদ ষড়যন্ত্র প্রকাশ করিতে উদ্যত হইয়াছেন। উমিদ কলিকাতাবাসী এক জন ধনাঢ্য বণিক্ ছিলেন। নবাবের কলিকাতা আক্রমণকালে তাহার বিস্তর ক্ষতি হইয়াছিল। সেই ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তাহাকে অনেক টাকা দিবার কথা নির্ধারিত হয়, কিন্তু তাহাতেও তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এক্ষণে ষড়যন্ত্র প্রকাশ করিবার সুযােগ পাইয়া আর ত্রিশ লক্ষ টাকা দাওয়া করিলেন। ক্লাইব উমিচাদ অপেক্ষা ও ধূৰ্ত্ত ছিলেন। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, যে ব্যক্তি শঠ, তাহার সহিত শঠতা করিলে কিছুমাত্র পাতিত নাই ; অতএব আপাততঃ উহার দাওয়া স্বীকার করি, পরে এ ব্যক্তি আমাদের হস্তগত হইবে, তখন ইহাকে যে কেবল এই ত্রিশ লক্ষ টাকা লাভে বঞ্চিত করিব, এমত নহে, পূৰ্ব্ব প্রতিশ্রুত অর্থলাভেও নিরাশ করিব। ক্লাইব এইরূপ স্থির করিয়া দুইখানি প্রতিজ্ঞা পত্র প্রস্তুত করিলেন। উহার একখানি শ্বেতবর্ণ ও আর একখানি লােহিতবর্ণ কাগজে লিখিত হইল। শ্বেতবর্ণপত্র খানি সত্য, তাহাতে উমিচাদের নামের উল্লেখ রহিল না। লােহিত বর্ণের পত্র খানি কৃত্রিম, ভাহাতে উমিচাদের নাম উল্লিখিত ও তাহাকে ত্রিশ লক্ষ টাকা দিবার কথা লিখিত হইল। কোম্পানির অপরাপর ভৃত্যের অম্লান বদনে ঐ কৃত্রিম প্রতিজ্ঞাপত্রে স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিলেন, কিন্তু অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তাহাদের প্রকৃতির লোক ছিলেন না। তিনি কৃত্রিম প্রতিজ্ঞাপত্রে নাম স্বাক্ষর করিতে অসম্মত হইলেন। ক্লাইব কোন কাৰ্যই অসম্পূর্ণ রাখিতেন না। তিনি ওয়াটসনের নাম দল করিপন ও ঐ জালপত্র উমিচঁাদকে দেখাইলেন।

১৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। এইরূপে চক্রান্তের সমুদায় বন্দোবস্ত হইবার পরে, ক্লাইব সেনা- গণকে মুরশিদাবাদের অভিমুখে যাত্রা করিতে আদেশ দিলেন ও নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে একখানি পত্র লিখিলেন। উহার মৰ্ম্ম এই, আপনি ইংরাজদের প্রতি ঘােরর অত্যাচার করিয়াছেন ও সন্ধির নিয়মানুসারে কাৰ্য্য করেন নাই। অতএব এই সকল বিষয়ের মীমাং- সার্থ আমি স্বয়ং আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেছি। নবাব, ক্লাইবের পত্রের আভাসে ইংরাজদের সহিত যুদ্ধ অপরিহার্য স্থির করিলেন ও অবিলম্বে সেনা সংগ্রহ কবিয়া ক্লাইবের প্রতি ধাবমান হইলেন। অনন্তর ১৭৫৭ খ্ৰীঃ অব্দে মুরশিদাবাদের নিকটে পলাশি নামক স্থানে উভয় পক্ষে সংগ্রাম উপস্থিত হয়। এই সংগ্রামে ক্লাই- বের জয় পতাকা উত্তোলিত হইল। নৰাব পরাজিত হইয়া পলায়ন করিলেন। যুদ্ধ সমাপ্তির পর দিবস মিরজাফর ক্লাইবের সহিত সাক্ষাৎ করেন। যুদ্ধকালে মিরজাফর ক্লাইবের কোন সাহায্য করেন নাই, ইহাতে তিনি সঙ্কুচিত ছিলেন। তাহার অন্তঃকরণে এই আশঙ্কা জন্মিয়াছিল ; পাছে ক্লাইব তাহার প্রতি অনাদর প্রকাশ করেন, কিন্তু তাহার সে আশঙ্কা অবিলম্বেই দূরীভূত হইল। ক্লাইব, তাহার আগমন বার্তা শ্রবণ মাত্র শিবির হইতে বহির্গত হইলেন ও স্বাগত জিজ্ঞাসা পুরঃসর তঁাহাকে আসন পরিগ্রহ করিতে কহিলেন ও বাঙ্গালা, বিহার এবং উড়িষ্যার সুবেদার বলিয়া তাহাকে অভি- নন্দন করিলেন এবং কহিলেন, আপনি অবিলম্বে মুরশিদাবাদে গমন করুন। আমিও সত্বর তথায় যাইতেছি। ক্লাইব কতিপয় দিবসের মধ্যে মুরশিদাবাদে গিয়া উপনীত হইলেন ও কাল বিলম্ব না করিয়া মির জাফরের অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। এস্থলে ইহা উলেখ করা আবশ্যক, যদিও ক্লাইব এদেশের কোন ভাষাই জানিতেন না ও এদেশীয়দিগের সহিত কথােপকথন করিবার আবশ্যক হইলে তাহাকে উভয় ভাষাজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাহায্য লইতে হই, কিন্তু তিনি এদেশের আচার ব্যবহারে অনভিজ্ঞ ছিলেন না।

লর্ড ক্লাইব। তিনি জাফরকে সিংহাসনে বসাইয়া এদেশের চিরাগত প্রথানুসারে সুবর্ণপাত্র নজর ধরিলেন ও সমাগত ব্যক্তিদিগের প্রতি লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, অদ্য কি শুভদিন! আপনারা অপকৃষ্ট নবাবের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইয়া উৎকৃষ্ট প্রভুর হস্তগত হইলেন। ইহা . অপেক্ষা আনন্দের বিষয় আর কি আছে ? মিরজাফর অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, রাজ্য প্রাপ্তির পর ইংরাজ- দিগকে প্রচুর অর্থ প্রদান করিবেন, কিন্তু এক্ষণে দেখিলেন, সিরাজের ধনাগারে এত অধিক অর্থ নাই, যে তিনি সেই অঙ্গীকার প্রতি পালনে সমর্থ হন। ইংরাজেরা ছাড়িবার পাত্র ছিলেন না। তঁাহারা মিরজাফরকে সঙ্গে করিয়া প্রসিদ্ধ বণিক জগৎশেঠের ভবনে গমন করিলেন। তথায় আবশ্যক বন্দোবস্ত – করিবার জন্য একটী সভা হইল। উমিচঁদও সহর্ষচিত্তে সভায়ােহণ করিলেন। তাহার মনে মনে সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল, ক্লাইব কখনই বিশ্বাসঘাতকতা করিবেন না। প্রসন্নচিত্তে প্রতিশ্রুত সমুদায় টাকা দিবেন। কিন্তু যিনি বড় আশা করেন, তার ভাগ্যে প্রায় নৈরাশ্যই ঘটে ! ক্লাইব এপর্যন্ত উমি- চঁাদের সহিত সদয় ব্যবহার করিয়াছিলেন, কোন কথাই ভাঙ্গিয়? বলেন নাই, এক্ষণে অবসর বুঝিয়া কহিলেন, উমিচাদ ! লােহিত প্রতিজ্ঞাপত্ৰ কৃত্ৰিম, আপনি একপয়সাও পাইবেন না। উমি- চঁদি এই অসম্ভব মর্মভেদী বাক্য শ্রবণে মূচ্ছিত হইলেন। সঙ্গীগণ তাহাকে পালকিতে আরােপিত করিয়া গৃহে লইয়া গেলেন। উমি- চাদের সাংঘাতিক মূচ্ছ। হেতু সভাস্থলে কোন গােলযােগ হইল না। ইংরাজের প্রশান্তচিত্তে প্রকৃত বিষয়ের অনুসরণ করিতে লাগিলেন। অনেক বাদানুবাদের পরে স্থির হইল, মিরজাফর আপাতত অঙ্গীকৃত টাকার একার্ফ দিৱেন ও অপরাদ্ধ কিস্তীবনি করিয়া তিন বৎসরের মধ্যে পরিশোধ করিবেন। এদিকে উমিচাদ গৃহে নীত হইয়াও অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিস্তব্ধ ও সংজ্ঞাশূন্য ছিলেন। পরে তাঁহার মূচ্ছ। অপসৃত হইল বটে; কিন্তু তাহার বুদ্ধি শুদ্ধি একবারেই বিলুপ্ত হইয়া গেল। ক্লাইব যদিও দৃশ লঘু চরিতমঞ্জরী । ধর্মপরায়ণ ছিলেন না বটে, কিন্তু তাহার অন্তঃকরণ নিতান্ত দয়াশূন্য ছিল না। তিনি মির্চাদের শােচনীয় অবস্থা শ্রবণে দুঃখিত হই লেন ও তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহাকে তীর্থ যাত্রা করিতে পরামর্শ দিলেন। উমিদ তদনুসারে তীর্থ যাত্রা করিলেন বটে, কিন্তু তাহাতেও তাহার শােকসন্তপ্ত হৃদয় শান্ত হইল না। তিনি কতিপয় মাসের মধ্যেই সৰ্বসস্তাপহাক মৃত্যুর আশ্রয় লইলেন। সরজন্ মেলকলম বলেন, নিতান্ত আবশ্যক হওয়াতেই ক্লাইব প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করিয়াছিলেন; অতএব তাহার প্রতি প্রতিজ্ঞাভঙ্গ জন্য অধৰ্ম্ম অর্শে না। আমরা তাহার এই সিদ্ধান্ত অনুমােদন করতে পারি না। ক্লাইবের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করিবার আবশ্যকতা ছিল না এবং উহা করাও নিতান্ত অনুচিত হইয়াছে সন্দেহ নাই। এই রাজবিপ্লব হওয়াতে উমিদই যে কেবল দেহত্যাগ করি- লেন, এমত নহে,সিরাজউদ্দৌলাও উহার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পান নাই। জগৎশেঠের বাটীতে সভা হইবার দুইদিবস পরে সংবাদ আসিল। সিরাজ, নবাবজাদা মীরনের হস্তে পতিত হইয়া পঞ্চত্ব পাইয়াছেন। মিরজাফর সিংহাসনে আরােহণ করিবার পরে রাজ্যমধ্যে নানা- প্রকার গােলযোেগ উপস্থিত হইল। অনেকেই প্রকাশ্য রূপে তাহার বিপক্ষতাচরণে প্রবৃত্ত হইলেন; বিশেষতঃ অযােধ্যার পর। ক্রান্ত নবাব বাঙ্গালা আক্রমণের বিভীষিকা দৰ্শাইতে লাগিলেন। নবাব প্রভৃতি বড় বড় লােকের সন্তানেরা প্রায়ই আলস্যপরায়ণ ও ভােগাভিলাষী হয়েন, কিন্তু মিরজাফর নবাবপুত্র ছিলেন না; সুতরাং ভূতপূৰ্ব্ব নবাব সিরাজের ন্যায় আলস্য ও লাম্পট্য প্রভৃতি দোষে তাদৃশ আসক্ত হয়েন নাই। কিন্তু তিনি যেরূপ উচ্চপদে অধিরূঢ় হইয়াছিলেন, তাহার বিষয় বুদ্ধি সেরূপ উন্নত ছিল না। তাহার পুত্র মীরণ এরূপ দুফিয়ারত ছিলেন, যে তাহাকে দ্বিতীয় সিরাজউদ্দৌলা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। মিরজাফর বিপদে পতিত হইয়া ক্লাইকের শরণাপন্ন হইলেন।

লর্ড ক্লাইব। ১৭ যৎকালে রাজ্যের এই প্রকার দুরবস্থ ঘটিয়াছিল, ঐ সময়ে ডিরেক্টরেরা বাঙ্গালার কার্য চালাইবার জঙ্ক এরূপ একটি বন্দোবস্ত করিয়া পাঠাইলেন, যে তাহাতে সুশৃঙ্খলা হওয়া দূরে থাকুক, বরং বিশৃঙ্খলা ঘটি বারই অধিক সম্ভাবনা হইয়া উঠিল। তাহারা যে কয়েক ব্যক্তিকে কাৰ্যভার গ্রহণ করিতে লিখিয়াছিলেন, তন্মধ্যে ক্লাইব ছিলেন না। ডিরেক্টরেরা তখন পর্যন্ত পলাশির যুদ্ধে জয় লাভের সংবাদ শুনতে পান নাই, এই জন্যই ঐরূপ আদেশ করিয়াছিলেন। সে যাহাহউক, কৌন্সেলের মেম্বরের। বিবেচনা করিলেন, এক্ষণে ক্লাইবই সৰ্ব্বাংশে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষতঃ এখন এদেশের যেরূপ দুর- বস্থা, তাহাতে ক্লাইব ব্যতিরেকে আর কেহই উহা দূর করিতে পারি- বেন না। তাহারা এই সকল পর্যালােচনা করিয়া ক্লাইবকেই সৰ্বা- ধ্যক্ষের পদে বরণ করিবার প্রস্তাব করিলেন। ক্লাইবও তাহাদের প্রস্তাবে সম্মত হইয়া সাধ্যক্ষের ভার লইলেন। যে সকল গােলযোগ উপস্থিত হওয়াতে মিরজাফর শঙ্কিত ও ক্লাইবের শরণাগত হইয়াছিলেন, ক্লাইব প্রভুশক্তি প্রভাবে অচির- কাল মধ্যে সে সকলের মীমাংসা করিয়া সৰ্বত্ৰ শান্তি স্থাপন করিলেন। ইহার কিছুদিন পরেই ডিরেক্টরসভা • শুনিতে পাইলেন, পলাশির যুদ্ধে জয় লাভ হইয়াছে। তখন তাহারা অগণ্য ধন্যবাদ করিয়া ক্লাইকেই সাধ্যক্ষের ভার গ্রহণ করিতে • লিখিলেন। এক্ষণে ক্লাইবের ক্ষমতার আর ইয়ত্তা রহিল না। মিরজাফর ক্রীতদাসের ন্যায় সভয়চিত্তে তাহার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। এতদ্দেশীয় কোন উচ্চপদারূঢ় ব্যক্তির সহিত বহুকালা- বধি মিরজাফরের বন্ধুতা ছিল। একদা তাহার কয়েক জন লােকের সহিত 'কোম্পানির সিপাইদের কোন কারণে বিবাদ উপস্থিত হয়। ইহাতে মিরজাফর ঐ ব্যক্তির প্রতি কার্কশ্য প্রদর্শন পূৰ্ব্বক কহিয়া- ছিলেন, তুমি কি কর্ণেল ক্লাইবকে জান না? এবং জগদীশ্বর তাহাকে কীদৃশ উচ্চপদে স্থাপিত করিয়াছেন, তাহা কি তােমার ? v, ১r লঘু চরিতমঞ্জরী কর্ণগোচর হয় নাই? ঐ ব্যক্তি বিলক্ষণ উপহাসরসিক ছিলেন কহিলেন, “যাহার দাসানুদাসকে প্রাতঃকালে তিন বার সেলাম না করিয়া শয্যা পরিত্যাগ করিতে পারি না, আমি কি সেই কর্ণেল ক্লাই- বের অবমাননা করিতে পারি। * তাহার এই উক্তিকে অত্যুক্তি বলা যায় কি ইউরােপীয় কি এতদ্দেশীয় সকলেই তুল্য রূপে ক্লা ইবের পদানত হইয়াছিল। এস্থলে ইহ উল্লেখ করা অন্যায্য নহে; যে ক্লাইব আপনার সেই অপরিসীম ক্ষমতা স্বদেশের উন্নতি সাধনার্থই যথােপযুক্ত বিনিয়ােগ করিয়াছিলেন। কর্ণাট রাজ্যের উত্তর ভাগে উত্তরসরকার নামক স্থানে ফরাশিরা তৎকাল পর্যন্ত প্রবল পরাক্রান্ত ছিলেন। ক্লাইব তথা হইতে তাহা- দিগকে দূরীকৃত করিবার নিমিত্ত কর্ণেল ফোর্ডকে পাঠাইয়া দিলেন। তৎকালে ফোর্ডের তাদৃশ নাম সন্ত্রম ছিল না বটে, কিন্তু ক্লাইবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহার বীরােচিত ক্ষমতা প্রকাশিত ছিল। ফোর্ড লক্ষিত স্থানে উপনীত হইয়া সত্বরই কাৰ্য্য সমাধা করিয়া আসিলেন। যৎকালে বাঙ্গালার অধিকাংশ সেনা উত্তরসরকারে ফরাশিদের সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকে, ঐ সময়ে মিরজাফরের রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে একটী ভয়ানক বিপদ ঘটিবার উপক্রম হয়। দিল্লীর সম্রাটের পুত্র শাহআলম বহুকালাবধি দুর্বিপাকে পড়িয়া কষ্ট পাইতে ছিলেন। অযােধ্যার নবাব ও পরাক্রমশালী অপরাপর কতিপয় তাঁহার আনুকূল্য করিতে প্রতিশ্রুত হন। শাহআলম সেই অঙ্গীকৃত সাহায্যের উপর নির্ভর করিয়া বহুল সেনা সংগ্রহ করেন ও নূতন নবাব মিরজাফরকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া তাহার রাজ্যমধ্যে প্রাধান্য স্থাপনে কৃতনিশ্চয় হন। শাহআলম সসৈন্যে রাজ্য আক্রমণ করিতে আসিতেছেন শুনিয়া মিরজাফরের ভয়ের আর পরিসীমা রহিল না। তিনি শাহ- আলমকে প্রচুর অর্থ প্রদান করাই আসন্ন বিপদ হইতে পরিত্রাণ পাইবার একমাত্র উপায় স্থির করিয়া ক্লাইবকে পত্র লিখিলেন। মহাবীর ক্লাইব তঁাহার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করিয়া তাহাকে এই লর্ড ক্লাইব। ১৯ মর্মে একখানি পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন, যদি আপনি প্রচুর অর্থ দিয়া শাহআলমের নিকটে সৌহৃদ্য ক্রয় করেন, তাহা হইলে আপ- নার ঐরূপ সুহৃদ অনেক আসিয়া জুটিবে। মহারাষ্ট্ৰীয়েরা ও অযাে- ধ্যার নবাব প্রভৃতি অনেকে অর্থলােভে আকৃষ্ট হইয়া আপনকার রাজ্য আক্রমণে উক্ত হইবেন। তাহা হইলে, আপনার ধনাগার অচিরকাল মধ্যেই রিক্ত হইয়া যাইবে। অতএব আমার এই নিবেদন, আপনি অনুরক্ত সৈন্য ও ইংরাজদিগের প্রভুভক্তির উপরে নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকুন। এই পত্র পাঠে মিরজাফরের অন্তঃকরণে আশা ভরসার সঞ্চার হইল ও তিনি আসন্ন বিপদ হইতে পরিত্রাণ ইবার যে উপায় উদ্ভাবন করিয়াছিলেন, তাহার অনুসরণ এক বারেই পরিত্যাগ করিলেন। এদিকে শাহআলম্ পাটনা অবরােধ করিলেন, কিন্তু তাহাতে কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না। ক্লাইব সসৈন্যে আসিতেছেন শুনিয়া তাঁহার সেনারা ভগ্নোদ্যম হইল ও ক্লাইবের সৈন্যের অগ্রসর ভাগ পৌছিবা মাত্রই অবরােধে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল। ক্লাইব বিনা যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া মহাসমারােহে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলেন। মিরজাফর ইতিপূর্বে যেরূপ ভীত হইয়াছিলেন, এক্ষণে সেইরূপ আনন্দিত হইলেন ও কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ মহােপকারী ক্লাইবকে বার্ষিক তিন লক্ষ টাকা আয়ের এক বৃহৎ জায়গীর প্রদান করিলেন। সে যাহাহউক, মিরজাফরের কৃতজ্ঞতা দীর্ঘকাল-স্থায়িনী হইল না। তিনি মনে মনে বিবেচনা করিলেন, যিনি বুদ্ধিবলে ও যুদ্ধ কৌশলে আমাকে চির প্রার্থিত সিংহাসনে নিবেশিত করিয়াছেন, হয়তো সেই ক্লাইব আবার আমাকে সিংহাসনচ্যুত করিতে পারেন। ফলতঃ এক্ষণে পাক্রান্ত ইংরাজদিগের অধীনত হইতে মুক্ত হও- য়াই মিরজাফরের উদ্দেশ্য হইল। তিনি মনে মনে আন্দোলন করিতে লাগিলেন, ভারতবর্ষীয়দিগের মধ্যে এরূপ পরাক্রান্ত সমরকুশল সৈন্য নাই, যাহারা ক্লাইবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিয়া কৃতকাৰ্য্য হইতে পারে এবং এদেশে ফরাশিদিগের ক্ষমতা বিলুপ্ত লঘু চরিতমঞ্জরী। হইয়াছে, তাহাদের তাহাদের ভরসা করাও বৃথা। তুৰে ওলন্দাজদিগের যশসৌরভ বহুকালাৰি এদেশে ব্যাপ্ত রহিয়াছে। অতএব বােধ হয়, তাহাদের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করিলে আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হওয়া দুরূহ হইবে না। তিনি এই সকল পর্যালােচনা করিয়া গােপনে চুচুড়াবাসী ওলন্দাজদিগের নিকটে পত্রাদি পাঠাইতে লাগিলেন। কিন্তু জানিতেন না, যে ইউরােপ খণ্ডে ওলন্দাজদিগের ক্ষমতার কত দূর হ্রাস হইয়াছিল। ওলন্দাজের। পূৰ্বাবধি স্বদেশের প্রাধান্য বিস্তার করিতে ইচ্ছুক ছিলেন। এক্ষণে নবাবের যােগ পাইয়া তাহাদের সেই ইচ্ছা বলবতী হইয়া উঠিল। তাহাদের প্রধান বাণিজ্য স্থান জাবা উপ- দ্বীপ হইতে সুসজ্জিত সাত খানি রণতরি অতর্কিতরূপে ভাগীরথীতে আসিয়া পৌছিল। দূরদর্শী ক্লাইবের কোন বিষয় অগােচর ছিল না। ওলন্দাজের। নবাবের কুমন্ত্রণায় প্রােৎসাহিত হইয়া যুদ্ধজাহাজ পাঠাইয়া দিয়াছেন, তিনি তাহা বিলক্ষণ রূপে বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু তথাপি প্রথমত: ওলন্দাজদিগের জাহাজ আক্ৰমণ করিতে অগ্র- সর হইলেন না। তিনি মনে মনে ভাবিলেন, ওলন্দাজ ও ইংরাজ- দিগের মধ্যে সন্ধি আছে। সন্ধিসত্ত্বে ওলন্দাজদিগকে আক্রমণ করা ইংরাজ মন্ত্রিগণের কখনই অভিমত নহে; বিশেষতঃ অল্প দিন হইল, আমি ওলন্দাজকোম্পানির দ্বারা ইংলণ্ডে অনেক টাকা পাঠাইয়াছি। অতএব এরূপ স্থলে উহাদিগকে আক্রমণ করিলে আমি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তিরস্কৃত ও হয়তত অচির প্রেরিত অর্থ লাভেও বঞ্চিত হইব। ক্লাইব এই সমস্ত কারণে যাহাতে ওলন্দাজদিগের সহিত যুদ্ধ না ঘটে, প্রথমতঃ তদ্বিষয়ে একান্ত যত্নবান হইলেন। কিন্তু আবার বিবেচনা করিলেন, ওলন্দাজদিগের জাহাজের গতিরােধ না করিলে, উহার চুচুড়াস্থিত সেনগণের সহিত মিলিত হইবে, সুতরাং ওলন্দাজ- দিগের দলই প্রবল হইয়া উঠিবে। মিরজাফরও নূতন মিত্র ওলন্দাজ- দিগের সহিত মিলিত হইবেন সন্দেহ নাই। তাহা হইলে এদেশে ইংরাজদের বৃদ্ধির আশা এককালেই তিরােহিত হইয়া যাইবে।

উল ক্লাইব। ২১ ক্লাইব এই সকল আন্দোলন করিয়া পরিশেষে যুদ্ধপক্ষই অবলম্বন করিলেন। ক্লাইব ইতিপূর্বে কর্ণাটরাজ্যে ফরাশিদিগকে দমনে রাখিবার জন্য অধিকাংশ সেনা পাঠাইয়া ছিলেন; সুতরাং এক্ষণে ওলন্দাজ দিগের অপেক্ষা তাহার সৈন্যসংখ্যা অল্প ছিল, তথাপি তিনি নৈসর্গিক সাহসের উপরে নির্ভর করিয়া কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। ওলন্দাজদিগের জাহাজগুলি অবিলম্বে তাহার হস্তগত এবং সেনারা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হইল। ক্লাইব এই জয়লাভের তিন মাস পরে স্বদেশে যাত্রা করেন। তিনি ইংলণ্ডে উপনীত হইলে রাজা ও রাজমন্ত্রী উভয়েই মহা- সমাদরে তঁাহার সম্বর্ধনা করেন। কোম্পানির অংশীদারগণের মহাসভা হইতেও তাহার অসামান্য বুদ্ধিমত্তা ও কৃতিত্বের ভূয়সী প্রশংসা কীর্তিত হয়। ইংলণ্ডের তদানীন্তন রাজা তৃতীয় জর্জ “লর্ড” এই উপাধি প্রদান দ্বারা তাহার সদগুণের পুরস্কার করেন। ক্লাইব ভারতবর্ষ হইতে এত অর্থ শােষণ করিয়াছিলেন, যে এক্ষণে ইংলণ্ডস্থিত উচ্চপদারূঢ় ধনাঢ্য ব্যক্তিদিগের প্রতিদ্বন্দী হইয়া উঠিলেন। তাহার সেই সঞ্চিত অর্থ এবার অপব্যয়ে পৰ্যৰসিত হয় নাই। তিনি নানা প্রকারে উহার সদ্ব্যয় করিয়াছিলেন। লর্ড ক্লাইব এক্ষণে পালিয়ামেণ্টসভায় * প্রবিষ্ট হইবার জন্য * ইংলণ্ডের রাজকাৰ্য কেবল রাজার ইচ্ছানুসারে হয় না। রাজা এই সভার মতানুসারে সমুদায় রাজকার্য নির্বাহ করিয়া থাকেন। এই সভা দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। (হাউস অ লর্ডস এবং হাউস্ অব কমন্স) প্রথম শ্রেণিতে দেশের সম্ভ্রান্ত লােকেরা থাকেন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে এক এক প্রদেশের সামান্য লােকদিগের প্রেরিত প্রতিনিধিরা। সম্রান্ত লােকেরা এবং সামান্য লােকদিগের নিয়ােজিত প্রতিনিধিরা রাজ আদেশানুসারে সময়ে সময়ে এই সভায় সমাগত হইয়া রাজকাৰ্য্য চিন্তা করিয়া থাকেন। তাহারা যে নিয়ম নির্ধারিত করেন রাজার অনুমােদিত হইলে সমুদায় রাজ্য মধ্যে সেই নিয়ম প্রচলিত হয়।

লঘু চরিতমঞ্জরী। চেষ্টা করিতে লাগিলেন ও তঁাহার সেই চেষ্টা অচিরকাল মধ্যে সফলও হইল। ১৭ অব্দে তিনি পার্সিয়ামেন্টের মেম্বর হইলেন। এদিকে ক্লাইব ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিলে বাঙ্গালাদেশে নানা গােলযােগ ঘটে। বৃটিশ কর্মচারীরা সৰ্ব্ব প্রধান ছিলেন। তাহারা যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে লাগিলেন। তাহাদের ধর্মাধর্মজ্ঞান বা লােকলজ্জায় কিছুমাত্র ছিল না। তঁাহারা নবাব হইতে সামান্য জমিদার পর্যন্ত সকলকেই পীড়ন করিয়া অর্থ দোহন করিতে লাগিলেন ও মিরজাফরকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া মিরকাশিমকে সিংহাসনে স্থাপিত করিলেন। মিরকাশিম বুদ্ধিমান, সুচতুর ও কাৰ্যজ্ঞ ছিলেন। তিনি নিজে প্রজার উপর সময়ে সময়ে অত্যাচার করিতেন বটে, কিন্তু অন্যকেহ সেরূপ করিলে তাহা সহ্য করিতে পারিতেন না। এজন্য ইংরাজদের সহিত তাহার যুদ্ধ বাধিয়া উঠে। ইংরাজেরা তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া বৃদ্ধতম মিরজাফরকে সিংহাসনে পুনরায় স্থাপিত করেন। নবাব কৃতজ্ঞচিত্তে ইংরজ- দিগকে প্রচুর অর্থ উপহার দেন। মিরকাশিম যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া পাটনায় পলায়ন করেন। তথায় যে সমস্ত ইংরাজ তাহার হস্তে পড়ে, তিনি সকলকেই নিষ্ঠ ররূপে সংহার করেন। তাহার এই ভয়ানক কাণ্ড দেখিয়া সকলে সিরাজউদ্দৌলার অন্ধকুপহত্যার বিষয়ও বিস্মৃত হন। মির কাশিমের সহিত যুদ্ধ ও পাটনার হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ইংলণ্ডে প্রচারিত হইলে কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করিলেন, যিনি ভারত রাজ্যের মূল স্থাপন করিয়ণছেন, সেই ক্লাইব ব্যতিরেকে আর কেহই উপস্থিত গােলযােগ নিবারণে সমর্থ হইবেন না। অতএব তাহাকে ভারতবর্ষে পুনরায় গমন জন্য অনুরােধ করা আবশ্যক। তঁাহারা তদনুসারে ক্লাইবকে আহ্বান করিলেন ও তাহাকে পুনরায় কলিকাতার গবরী পদে নিযুক্ত করিয়া ভারতবর্ষে পাঠাইয়া দিলেন। লর্ড ক্লাইব বাঙ্গালার শাসনকর্তা ও প্রধান সেনাপতি পদে নিযুক্ত হইয়া ১৭৬৫ খ্র: অব্দের মে মাসে কলিকাতায় উপনীত হন।

লর্ড ক্লাইব। তিনি কলিকাতায় উপনীত হইয়া দেখিলেন, কোম্পানির কাৰ্য্যে অতিশয় বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে। কোম্পানির কর্মচারীরা যাহাতে শী শীঘ্র প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করিয়া ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিতে পারেন, তজ্জন্যই ব্যতিব্যস্ত রহিয়াছেন। ডিরেক্টরেরা ইতিপূর্বে দৃঢ়রূপে এই আদেশ করিয়া পাঠাইয়া ছিলেন যে, কর্মচারীরা ভারতবর্ষীয় রাজগণের নিকট হইতে উপঢৌকন গ্রহণ করিতে পারিবেন না, কিন্তু তাহারা অর্জনস্পৃহাবৃত্তির বলবত্তা এবং কর্তৃপক্ষের দূরস্থতা ও অনবধানতা প্রযুক্ত সে আদেশ অমান্য করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাহারা প্রায় চৌদ্দ লক্ষ টাকা উৎকোচ লইয়া মৃত নবাবের শিশু সন্তানকে সিংহাসনে আরােপিত করেন। এবার ক্লাইবের পূর্বসংস্কারের অনেক পরিবর্ত হইয়াছিল। তিনি এই সকল অরাজক কাণ্ড দেথিয়া শুনিয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন ও অবিলম্বে উহার প্রতিবিধানে যত্নবান হইলেন। লর্ড ক্লাইব উপঢৌকন ও উৎকোচ গ্রহণ নিষেধ করিলেন এবং কোম্পানির কর্মচারীরা নিজে নিজে যে বাণিজ্য করিতেন, তাহাও উঠাইয়া দিলেন। ইহাতে কলিকাতাবাসী সমুদয় ইংরাজ তাহার ঘােতর বিপক্ষ হইয়া উঠিলেন। কিন্তু ক্লাইব কিছুতেই দমিবার পাত্র ছিলেন না। তিনি প্রবল বিপক্ষদিগকে পদচ্যুত করিলেন। তখন অবশিষ্টের অনন্যোপায় হইয়া তাহার বশবর্তী হইলেন। লর্ড ক্লাইবের অন্তঃকরণে এই প্রতীতি জন্মে যে, যাবৎ তাহার হস্তে সমুদয় রাজকার্যের ভার অর্পিত থাকিবে, তাবৎ কোন বিষয়ে কোন গােলযােগ উপস্থিত না হউক, কিন্তু তিনি কাৰ্য্য হইতে অপহৃত হইলে পুনরায় পূৰ্ব্ববৎ গেলযােগ ঘটিতে পারে। তিনি ভাবিলেন, কোম্পানির ভৃত্যের যে বেতন পান, তাহা অতি সামান্য। তাহারা কেবল তাহারি উপর নির্ভর করিয়া এই উষ্ণপ্রধান দেশে স্বচ্ছন্দে বাস করিতে পারেন না ও সেই যৎসামান্য বেতন হইতে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ সঞ্চয় করিয়া রাখাও সম্ভাবিত নহে। এই নিমিত্ত তঁাহারা বহুকালাবধি নিজ নিজ বাণিজ্য দ্বারা আপনাদের বেতনের ন্যূনতা পােষাইয়া লইতেছেন। বাঙ্গালা জয়ের পূর্বে এই প্রণালী বিশেষ অনিষ্ট ২৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। । কারিণী ছিল না বটে কিন্তু এক্ষণে কোম্পানি রাজ্যের প্রভু হইয়া- ছেন। তাহাদের কর্মচারিগণের হন্তে মহতী ক্ষমতা অর্পিত হইয়াছে। কিন্তু তাহাদের বেতন পূৰ্ব্ববৎ যৎসামান্যই রহিয়াছে। সামান্য বেতন ও অসামান্য ক্ষমতা এ উভয়ের একত্র সংঘটন হইলে অনিষ্ট- পাত অপরিহার্য হয়। ক্লাইব এটি বিলক্ষণ বুঝিতেন ও তিনি এই সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন, যাবৎ কর্মচারিগণের বেতন বৃদ্ধি না হইবে, তাবৎ ঐ অনিষ্ট নিবারণের আর উপায় নাই। কিন্তু তিনি ইহাও জানিতেন, ডিরেক্টর সভায় বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করিলে তাহ অরণ্যৰুদিতের ন্যায় নিতান্ত নিষ্ফল হইবে। লর্ড ক্লাইব এইরূপে পূৰ্ব্বাপর পর্যালােচনা করিয়া লবণের একচেটিয়া ব্যবসা চালাইতে অনুমতি দিলেন ও তদুংপন্ন অর্থ যথাযােগ্য বিভাগ করিয়া লইতে আদেশ করিলেন। ক্লাইব ডিরেক্টরদিগের উপদেশ ও আত্মমতের বিপরীতে এই কাৰ্যটি করিয়াছিলেন। এই নিমিত্ত ইতি- হাসলেখকদিগের মধ্যে অনেকে তাহার নিন্দাবাদ করিয়া গিয়াছেন। বাস্তবিকও ঐ কাৰ্যটি প্রশংসার হয় নাই, তবে তাহার নিন্দা পরি- হারার্থ এই মাত্র বলিতে পারা যায়, যে নিতান্ত আবশ্যক হওয়াতেই তিনি ঐরূপ করিয়াছিলেন, ইচ্ছানুসারে করেন নাই এবং এই ব্যবসা দ্বারা তিনি নিজে যাহা লাভ করিতেন, তাহা তিনি স্বয়ং লইতেন না, বিভাগ করিয়া কতিপয় বন্ধুকে প্রদান করিতেন। লর্ড ক্লাইব পূর্বোক্ত প্রকারে কোম্পানির ব্যবহারিক কৰ্ম্মচারি- গণের আয়ের বন্দোবস্ত করিবার পরে সাংগ্ৰামিক কর্মচারীদিগকে লইয়া ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। তিনি যে ডিরেক্টরদিগের আদে- শানুসারে সৈনিকব্যয় লাঘব করিয়াছিলেন, তাহাতে সেনাসম্প কীয় কর্মচারীরা তাহার প্রতি খঙ্গহস্ত হইয়া উঠে। ৮ দুই শত ইং- রাজ কর্মচারী চক্রান্ত করিয়া এক দিনেই কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করেন। তাহাদের চক্রান্তের উদ্দেশ্য এই, ক্লাইব ভীত হইয়া তাহাদের আয়ের বিষয় বিবেচনা করিবেন। লর্ড ক্লাইব যত বার বিপদে পড়ি- য়াছিলেন, কখনই হতবুদ্ধি হন নাই, প্রত্যুৎপন্নমতি ছায়ার ন্যায় লর্ড ক্লাইব। নিয়তই তাহার সহচারিণী ছিল। তিনি অবিলম্বে মাত্রা হইতে সেনাপতি আনয়ন করিলেন ও অজ্ঞাপ্রচার করিয়াদিলেন, যাহার। পদ পরিত্যাগ করিয়াছেন, তঁাহাদিগকে কলিকাতায় অনিতে হইবে ষড়যন্ত্রকারীরা দেখিলেন, তাঁহাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবার নহে। ক্লাইব দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন ও তিনি যে সকল সিপাইদের উপরে নির্ভর করিতেন, তাহাদের প্রভুভক্তিও প্রভুভক্তিও অবিচলিত ছিল। সমস্ত কর্মচারী এই ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোগী ছিলেন, তাহারা ধৃত ও দুরীকৃত হইলেন। তখন অবশিষ্টের বিনয় বাক্যে পুনরায় কৰ্ম্ম প্রার্থনা করিলেন এবং অনেকে অপূর্ণ লোচনে অনূতাপও করিতে লাগিলেন। ক্লাইব অল্পদোষীদিগের প্রতি সদয় হইলেন ও তাহাদিগেকে পুনরায় স্বপদে স্থাপিত করিলেন। ক্লাইৰ যৎকালে রাজ্যের কুরীতি শােধন ও সেনাগণকে অবশে আনয়ন করেন, সেই সময়ে অযােধ্যাধিপতি বহুল সেনা সমভিব্যা- হারে বিহারের পর্যন্ত দেশে অবস্থিতি করিতেছিলেন। অনেক আফগান ও মহারাষ্ট্ৰীয়ের। তঁাহার সহিত মিলিত হইয়াছিল এবং সমুদায় রাজগণ একযােগে ইংরাজদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিবেন, তাহারও সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু লর্ড ক্লাইবের নাম ও প্রবল প্রতাপে তাহাদের সমুদায় বিপক্ষতা নিরাকৃত হইল। বিপক্ষের। বিনতি পূর্বক সন্ধির প্রার্থনা জানাইলেন। ক্লাইবও আপনার অভি- মত পণে সন্ধি স্থাপন করিলেন। ক্লাইব এইরূপে এতদ্দেশীয় রাজগণের সহিত সন্ধিস্থাপন করিবার পরে বিবেচনা করিলেন, কোম্পানি শস্ত্রবলে এদেশে প্রাধান্য স্থাপন করিয়াছেন। এদেশের উপরে তাহাদের কোন প্রকার ন্যায়ানুগত স্বত্ব নাই। অতএব ঐ প্রাধান্য বৈধ করা আবশ্যক। তিনি এই বিবেচনায় তদানীন্তন মােগল সম্রাট শাহ আলমের নিকটে কোম্পা- নির পক্ষে বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের দেওয়ানি প্রার্থনা করিলেন। • শাহ আলম একান্ত বলহীন ছিলেন। কোম্পা- নিকে দেওয়ানি প্রদান করা তাহার মনোগত ছিল না, কিন্তু এক ২৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। খণ্ড কাগজে পারস্য ভাষায় গুটিকতক কথা লিখিয়া দিলে কোম্পা- নির নিকট হইতে নায়াসে ও নির্বিঘ্নে প্রচুর অর্থ পাইতে পারি- বেন এই বিশ্বাসই তাহার অপেক্ষাকৃত সন্তোষের কারণ হইল। তিনি ১৭৬৫ খ্রীঃ অব্দের আগষ্ট মাসে লর্ড ক্লাইবকে বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের দেওয়ানি প্রদান করিলেন। ক্লাই- বও পণস্বরূপ সম্রাটকে বাৎসরিক ছাব্বিশ লক্ষ টাকা এবং এলাহা- বাদ ও কোরা প্রদেশ প্রদান করিবেন প্রতিশ্রুত হইলেন। ক্লাইব এই দেওয়ানি লাভের পরে একবার মনে করিয়াছিলেন কোম্পানি এদেশে সর্বপ্রধান হইয়াছেন; তবে আর নবাবকে মুর- শিদাবাদে সাক্ষীগোপাল করিয়া রাখিবার আবশ্যকতা কি ? কিন্তু আবার ভাবিলেন, ফরাশি, ওলন্দাজ এবং অপরাপর ইউরােপীয় বণিসম্প্রদায় বহুকালাবধি নবাবের সম্মান করিয়া আসিতেছেন। অতএব নবাবের নাম বিলুপ্ত হইলে তাহারা প্রতিদ্বন্দ্বী ইঃইণ্ডিয়া কোম্পানিকে তাদৃশ সম্মান করিবেন না। ক্লাইব এইরূপ আলো- লােন করিয়া নবাবের নামে শাসন কার্য চালানই স্থির করিলেন। তৎকালে এই কৌশলটী উদ্ভাবন করাতে ক্লাবের বিলক্ষণ পরি- শামদর্শিতা ও বিজ্ঞতা প্রকাশ পাইয়াছিল সন্দেহ নাই। যদি তিনি উহা না করিয়া একবারেই নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করিতেন, তাহা হইলে রাজ্যমধ্যে নানাপ্রকার গােলযোগ ঘটিবার সম্ভাবনা ছিল। এই সময়ে লর্ড ক্লাইব অনায়াসে এতদ্দেশীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদিগের নিকট হইতে অপরিমিত ধন দোহন করিতে পারিতেন, কিন্তু তিনি দান গ্রহণ প্রতিষেধক আইনটি প্রকৃতরূপেই প্রতিপালন করিয়া- ছিলেন। . নির্দিষ্ট আছে, বারাণসীরাজ তাহাকে বহুমূল্য হীরা প্রদান করিবার প্রস্তাব করেন এবং অযােধ্যাধিপতি প্রচুর অর্থ ও মণিময়-পাত্র লইবার জন্য জিদ করেন; তথাপি ক্লাইবের অন্তঃকরণ লােভ আকৃষ্ট হয় নাই। তিনি বিশিষ্ট শিষ্টতা প্রদর্শন পূর্বক উক্ত উপহার অস্বীকার করেন। তিনি এই সময়ে একটি দান গ্রহণ করিয়া ছিলেন বটে, কিন্তু তাহাতে তাহার প্রতি এই অচির-প্রব- লর্ড ক্লাইব। ত্তিত দান গ্রহণ প্রতিষেধক আইন উল্লন জয় কিঞ্চিত্রও অধর্ম অর্শে না। মিরজাফর মৃত্যুকালে স্বীয় উইলো ক্রাইবকে ছয় লক্ষ টাকা দান করিয়া যান। কিন্তু উল্লিখিত আইন জীবিত ব্যক্তির দান গ্রহণ বিষয়ে প্রচলিত হয়, উহা মৃত্যুকালে উইলের দ্বারা প্রদত্ত ধনের নিবৰ্ত্তক নহে। ক্লাইব উল্লিখিত অর্থ গ্রহণ করেন, কিন্তু তিনি উহা একটি সদ্ব্যয়ে নিয়ােজিত করিয়া অনন্তকালস্থায়িনী কীৰ্ত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। ঐ টাকার সুদ হইতে কার্য্যা- ক্ষম সৈনিক কর্মচারিগণের ভরণ পােষণ চলিতে পারিবে, তিনি এই অভিপ্রায়ে উহা কোম্পানির ধনাগারে পাঠাইয়া দেন। অন- স্তর ঐ মূলধন হইতে ইংলণ্ডে একটি অনাথ সৈনিকশাল প্রতি- ষ্ঠিত হয়। অদ্যাপি ঐ সৈনিকশালা ক্লাইবের নামে চলিতেছে। লর্ড ক্লাইব তৃতীয় বার এদেশে আসিয়া দেড় বৎসর অবস্থিতির পর এরূপ অসুস্থ হইলেন, যে তাহার স্বদেশ গমন আবশ্যক হইয়া উঠিল। তিনি ১৭৬৭ খ্রঃ অব্দের জানুয়ারি মাসে কর্ম পরিত্যাগ করিয়া ইংলণ্ডে যাত্রা করিলেন। লর্ড ক্লাইব পূৰ্ব্ব পূর্ব বারে ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিয়া স্বদেশীয়দিগের নিকটে যেরূপ ভূয়সী প্রশংসা লাভ করিয়াছিলেন, এবারে তাহার অদৃষ্টে সেরূপ কিছুই ঘটিল না। ইতিপূর্বেই ইংলণ্ডে এরূপ অনেক কারণ উপস্থিত হইয়াছিল, যাহাতে তাহার জীবনের শেষভাগ অতি দুঃখে অতি- বাহিত হয় ও অকাল মৃত্যু তাহার জীবন্ত করে । ক্লাইব যে সমস্ত ব্যক্তির অত্যাচার হইতে বাঙ্গাল দেশকে পরি- ত্রাণ করেন ও যে সকল ব্যক্তির অন্যায় স্বার্থ সিদ্ধির অন্তরায় হন, তাঁহারা তৎকালে ইণ্ডিয়া হাউসে ক্ষমতা লাভ করিয়াছিলেন। লর্ড ক্লাইব ইংলণ্ড প্ৰতিগমন করিবার পরে তাহারা চতুর্দিক হইতে তাহার প্রতি অঙ্গহস্ত হইয়া উঠিলেন। কেবল তাঁহার দোষৎ- কীৰ্ত্তন উদ্দেশেই নূতন নূতন সংবাদপত্র প্রচারিত হইল। বিপক্ষ পক্ষের এইরূপ চাতুরী দ্বারা সর্ব সাধারণের অন্তঃকরণ ক্লাইবের প্রতি বিরূপ হইয়া উঠিল। ফলতঃ বিপক্ষে তিলকে তাল করিয়া তুলিলেন লঘু চরিতমঞ্জরী। ক্লাইব দুই এক বার যে দুই একটি কুৰ্ম্ম করিয়াছিলেন, কেবল তাহ নহে, তিনি পৌরুষ গ্রিকাশ করিয়া যে সকল অত্যাচার নিবারণ করেন ও তাহার অনুপস্থিতি-কালে ভারতবর্ষে যে সকল কুক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, বিপক্ষে সেই সমুদায় দোষই তাহার স্কন্ধে নিক্ষেপ করিলেন। ক্লাইব এক্ষণে সর্বসাধারণের ঘৃণাস্পদ হইয়া উঠিলেন ও সকলেই তাহাকে সমুদায় পাপের মূর্তিমান আধার স্বরূপ মনে করিতে লাগি লেন। বিশেষতঃ এই সময়ে আবার এদেশের ছেয়াত্তরে মন্বন্তরের অশুভ সংবাদ ইংলণ্ডে প্রচারিত হয়। ইংলণ্ডবাসীর ভারতবর্ষ সংক্রান্ত বিষয় লইয়া আন্দোলন করিতেছিলেন, তাহাতে আবার ঐ মন্বন্তরের দুৰ্বাৰ্তা প্রচার হওয়াতে তাহাদের সেই আন্দোলন দ্বিগুণিত হইয়া উঠিল। পরন্তু তৎকালে আবার তথায় এই জনরব হয়, যে কোম্পানির কর্মচারীরা দেশের সমুদায় চাউল এক- চেটিয়া করতেই ঐ ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ ঘটিয়াছে। ইংরাজকর্মচারীরা যে মূল্যে চাউল খরিদ করিয়াছিলেন, তাহারা তদপেক্ষা দশ বার গুণ অধিক মূল্যে উহা বিক্রয় করিয়াছেন। উহা বিক্রয় করিয়াছেন। এক বৎসর পূর্বে যে ইংরাজ- কর্মচারীর সহস্র টাকার সংস্থান ছিল না, তিনিও ঐ দুর্ভিক্ষের সময় লণ্ডন নগরে ছয় লক্ষ টাকা পাঠাইয়াছেন। এই সকল অশুভ সংবাদে ক্লাইবের প্রতি সাধারণের পূৰ্ব্বসঞ্চিত বিরাগভাব আরও বর্ধিত হইল। ক্লাইব এদেশ হইতে, প্রস্থান করিবার কতিপয় বৎসর পরে তাদৃশ ভয়ানক দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হয়। তঁাহার কৃত এরূপ কোন কাৰ্য্যই দৃষ্ট হইতেছে না, যাহার দোষে ঐ মন্বন্তর ঘটিতে পারে। যদি কোম্পানির কর্মচারীরা চাউলের এক চেটিয়া ব্যবসাই করিয়া থাকেন । তবে তঁাহারা সাক্ষাৎসম্বন্ধে ক্লাইবের কৃত নিয়মের অন্যথাচরণ করিয়াছেন। তজ্জন্য ক্লাইব দোষভাগী হইতে পারেন । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, এদেশের নৈসর্গিক দুর্ভিক্ষের সমু- দায় অশুভ ফল তাহার কাৰ্যদোষে সমুৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া অনে কের অন্তঃকরণে প্রতীতি জন্মে। ক্লাইব পালিয়ামেন্ট সভায় যে দলভুক্ত ছিলেন, জর্জ থে- লর্ড ক্লাইব। ভিল ঐ দলের অধ্যক্ষ ছিলেন। কিন্তু তৎকালে তাহার মৃত্যু হইয়াছিল, তাহার অনুগামিগণ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া- ছিলেন; সুতরাং পালিয়ামেন্টে এমন কোন ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি ক্লাবের পক্ষ হইয়া দুই একটি অনুকূল কথা বলেন। ক্লাইব চতুর্দিকে বিপদ সাগর দেখিতে লাগিলেন, কিন্তু যত বড় বিপদ হউক না কেন, তিনি কখনই হতবুদ্ধি হইতেন না। রণস্থলে তাহার যেরূপ নৈসর্গিক নৈপুণ্য ছিল, পার্সিয়ামেন্টেও তাহার সেই রূপ চতুরতায় কিছুমাত্র ন্যূনতা লক্ষিত হয় নাই। পলিয়া- মেন্ট সভায় ভারতবর্ষ সংক্রান্তু কাৰ্য্য লইয়া বাদানুবাদ আরম্ভ হইবার পরেই, লর্ড ক্লাইব একটি সুদীর্ঘ বক্তৃতা করিয়া আপনার শেষাবস্থার কার্য্যগুলি নির্দোষ প্রমাণ করেন। কথিত ' অাছে, ঐ বক্তৃতা শুনিয়া : শ্রোতৃবর্গের অন্তঃকরণ আর্জ হয় ; বিশে ষতঃ লর্ড চেথ্যাম এরূপ মােহিত হইয়াছিলেন, যে তিনি বলিয়া গিয়াছেন, উক্তপ্রকার উৎকৃষ্ট বক্তৃতা জন্মাবচ্ছিন্নে কখনই তাঁহার কর্ণগােচর হয় নাই। সে যাহাহউক, শক্তবর্গের বৈনির্যাতন স্পৃহা যে কেবল ইহাতেই চরিতার্থ হইল, এমত নহে, শত্রুরা ক্লাইকে পালিয়মেন্ট সভা হইতে দুরীকৃত ও তাহার মান সম্রম বিলুপ্ত করি- বার সংকল্প করিয়াছিলেন। তাহারা এক্ষণে তাঁহার রাজ্য শাসনের প্রথমাবস্থার দোষােৎকীৰ্ত্তন করিয়া তাহাকে আক্রমণ করলেন। ক্লাইব দুর্ভাগ্যক্রমে শাসন-কার্টের প্রথম কালে কতকগুলি গহিত কাৰ্য্য করিয়াছিলেন; সুতরাং বিপক্ষপক্ষের আক্রমণ করিবার বিল ক্ষণ অযােগই ছিল। পালিয়ামেন্ট সভা ক্লাইবের ভারতবর্ষ সংক্রান্ত কাৰ্যের অনুসন্ধার্থ একটি কমিটী নিযুক্ত করিলেন। কমিটী অবজ্ঞা- পূর্ণ নয়নে সিরাজের সিংহাসন ভ্রংশ অবধি মিরজাফরের সিংহাসনা- নােহণ পর্যন্ত ক্লাইবের সমুদায় কাৰ্যগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে দেখিতে লাগিলেন। ক্লাইব অসঙ্কুচিতচিত্তে কহিলেন, আমি উমিচাদের সহিত প্রতারণা করিয়াছি বটে, কিন্তু ঐ প্রতারণা আমার লজ্জার কারণ নহে ও আমি যেরূপ অবস্থায় পড়িয়া ঐরূপ কাৰ্য্য করিয়া- লঘু চরিতমঞ্জরী। ছিলাম, যদি আমার সেইরূপ অবস্থা পুনরায় উপস্থিত হয়, তাহা হইলে আবার অনবদনে ঐরূপ কাৰ্য্য করিতে পারি। আমি মিরজাফরকে সিংহাসনে আরূঢ় করিয়া তাহার নিকট অপরিমিত অর্থ লইয়াছি বটে, কিন্তু ঐ অর্থ লইয়া আমি ধর্ম বা পদ মর্যাদার বিপরীত কাৰ্য্য করি নাই, বরং নিঃস্বার্থ ব্যবহার হেতু আমি প্রশংসা লাতেরই পাত্র হইতেছি। এই সময়ে তাহার অন্তঃকরণ অতিশয় উত্তেজিত হইয়া উঠিল। কহিলেন, পলাশির যুদ্ধের পর প্রতাপশালী রাজগণ আমার মনােরঞ্জনে তৎপর হন, তাদৃশ সমৃদ্ধিশালী মুরশিদা- বাদ নগর আমার লুণ্ঠন-ভয়ে কম্পমান হয়, বিপুল ঐশ্বর্যশালী শেঠ বংশীয়েরা পরস্পর স্পৰ্ধাপূর্বক আমার কৃপা কটাক্ষপাতের জন্য শশব্য হন, রাশীকৃত স্বর্ণ ও বহুমূল্য রত্ন আমার সম্মুখে উপস্থাপিত হয়, কিন্তু এখন ভাবিয়া আমার আশ্চর্য্য বােধ হইতেছে, যে কি রূপে তাদৃশ রাজ দুলভ সম্পত্তি উপস্থিত দেখিয়াও লােভসম্বরণে সমর্থ হইয়াছিলাম। কমিটী উভয় পক্ষের বাদানুবাদ শ্রবণ করিয়া এই সিদ্ধান্ত করি- লেন, যদিও ক্লাবের কোন কোন কাৰ্য কলঙ্কদূষিত দৃষ্ট হইতেছে, কিন্তু তিনি স্বদেশের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনার্থ অনেক মহৎ কাৰ্য্য করিয়াছেন; অতত্রব তিনি নিষ্কৃতি পাইবার যােগ্য। ক্লাইব এইরূপে নিষ্কৃতি পাইলেন বটে, কিন্তু তিনি যে অধি- কাংশ লােকের ঘণার পাত্র হইয়াছিলেন ও হাউস অব্ কমন্স সভা তাহার যে নিন্দাবাদ করিয়াছিলেন এবং কমিটী যে অবজ্ঞাপূর্ণ নয়নে তাহার ভারতবর্ষ সংক্রান্ত কাৰ্যগুলি তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়া ছিলেন, এই সকল দুঃখে তিনি ক্ষিপ্ত প্রায় হইলেন ও তাহার অন্তঃ- করণ নিস্তেজ হইতে লাগিল। ক্লাইৰ স্বভাবতঃ বিষঃচিত্ত ছিলেন। তিনি ইতিপূর্বে ভারতবর্ষে নানাকার্যে ব্যাপৃত থাকেন ও ইংলণ্ডে প্রচুর মান সম্রম লাভ করেন। ইহাতে তাহার মনের স্ফুর্তি থাকে, এজন্য এতকাল পর্যন্তু ঐ বিমর্শভাৰু তাহার অন্তঃকরণে গুপ্তভাবে ছিল, কিন্তু এক্ষণে তাহার কিছুই প্রার্থনীয় বা করণীয় ছিল না। সুতরাং সেই বিলুপ্ত প্রায় অন্তঃশত্রু সুযােগ পাইয়া তাহার মনােরূপ . ম .

লর্ড ক্লাইব। ৩১ • রাজ্য আক্রমণ করিল। আশ্চর্যের বিষয় এই, চমদশা পর্যন্ত তাহার বিমৰ্শান্ধকারাবৃত হৃদয়ে সময়ে সময়ে বিদ্যুতের ন্যায় স্বভাব-সিদ্ধ জ্ঞানজ্যোতিঃ উদিত হইয়া পরক্ষণেই বিলুপ্ত হইয়া যাইত। কথিত আছে, ক্লাইব মৌনভাবে বসিয়া আছেন, এমন সময়ে সহসা উঠিয়া রাজনীতি সংক্রান্ত কোন গুরুতর বিষয় লইয়া বাদানুবাদ করিতেন, কিন্তু আবার উহার পরক্ষণেই পূৰ্ব্ববৎ মৌনভাবে বসিয়া থাকিতেন। এই সময়ে আমেরিকার সহিত ইংলণ্ডের এরূপ বিবাদ চলিতে ছিল, যে তাহাতে আমেরিকার সহিত যুদ্ধ অপরিহার্য হইয়া উঠে। রাজ- মন্ত্রিগণ ক্লাইবকে পুনরায় যুদ্ধ সংক্রান্ত কাৰ্যে নিযুক্ত করিবার অভিলাষ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাদের সে অভিলাষ বৃথা হইল। তৎকালে ক্লাইবের শেষ দশা উপস্থিত। তিনি অশেষ যাতনা সহকরিতে ছিলেন ও ১৭৭৪ খ্ৰীঃ অব্দের ২২ শে নবেম্বর আত্মহত্যা করিয়া সেই যাতনার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পান। ক্লাইব স্বভাবতঃ তেজস্বী, উৎসাহশীল ও সাহসী ছিলেন। তাঁহার অন্তঃকরণ সহজেই ক্রোধাসক্ত ও বিমর্শ পরায়ণ হইয়া উঠিত। তাঁহার চরিত্র বিষয়ে আমাদের অধিক বক্তব্য নাই। তাঁহার এই জীবনচরিত পাঠ করিলে অনায়াসেই তাহার দোষ গুণ সকলই হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে। তিনি কতকগুলি দোষে দোষী ছিলেন সত্য, কিন্তু তাঁহার অশেষ গুণরাশিও অদ্যাপি দেদীপ্যমান অহিয়াছে। অনেকেই তাঁহার এই ভয়াবহ মৃত্যুকে ভঁহার পাপ সমূহের সমুচিত শাস্তি ও প্রায় চিত্ত স্বরূপ মনে করেন বটে, কিন্তু সে যাহা হউক, পক্ষপাত শূন্য চিতে বিচার করিলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হইবেক, যে তঁাহার অবস্থায় পড়িলে প্রায় মনুষ্যমাত্রেরই তাদৃশ দুস্কৃতিজালে জড়িত হইবার সম্ভাবনা। ইহা সকলকেই এক বাক্যে স্বীকার করিতে হইবেক, যে ভারতবর্ষে ইংরাজজাতির প্রতিপত্তি লাভ ও সাম্রাজ্য স্থাপন, কেব ক্লাইকেরই কাৰ্য। সুতরাং এতাদৃশ গুণ সকল স্মরণ হইলে তাঁহায়তাদৃশ দোষ সকল উপেক্ষিত হইতে পারে।

ওয়ারেণ হেষ্টিংস। ওয়ারেন হেষ্টিংস ১৭৩২ খ্ৰীঃ অব্দের ৬ই ডিসেম্বর ওয়েঃমিনিষ্টা- রের অন্তঃপাতী ডেস ফোর্ড নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। তাহার শৈশবাবস্থায় পিতা মাতা উভয়েই পরলোক প্রাপ্ত হন। তৎকালে তাঁহার পিতামহ জীবিত ছিলেন; সুতরাং তাহার, রক্ষণা- বেক্ষণ ও বিদ্যাভ্যাসের ভার পিতামহের উপরেই পতিত হয়। তাঁহার পিতামহের এরূপ সঙ্গতি ছিল না, যে তিনি তাহাকে কোন উৎকৃষ্ট বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট করিয়া দেন; সুতরাং হেষ্টিংস বাল্যাব স্থায় একটি গ্রাম্য বিদ্যালয়ে প্রেরিত হইলেন ও কৃষাণসন্তানগণের সহিত একাসনে বসিয়া লেখাপড়া শিখিতে লাগিলেন। তাঁহার আহার পরিচ্ছদাদিও যৎসামান্য ছিল। ফলতঃ তাঁহার তখনকার অবস্থা দেখিয়া কেহই অনুভব করিতে পারিতেন না, যে তিনি উত্তর- কালে একজন জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তি হইবেন। হেষ্টিংস বিদ্যাভ্যাসে অতিশয় অনুরাগী ছিলেন। তিনি পূর্বপুরুষদিগের ধনবতা, মাহাত্ম, বীৰ্য্য ও রাজভক্তি বিষয়ক উপাখ্যান শুনিতে ভাল- বাসিতেন।. তাঁহার পূর্বপুরুষেরা ডেস ফোর্ড নামক স্থানের জমিদার ছিলেন, কিন্তু কোন কারণ বশতঃ ঐ জমিদারী তাহাদের হন্তবহির্ভূত হয়। বাল্যকালাবধি হেষ্টিংসের অন্তঃকরণে : এই আশার সঞ্চার হইয়াছিল, যে কোন উপায়ে হউক, ঐ পৈতৃক স্থান ডেস ফোর্ড উদ্ধার করিবেন। বয়ােবৃদ্ধি সহকারে তাহার এই আশা বলবতী হইয়া উঠে। তিনি ভারতবর্ষে আসিয়া কত বার কত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, কতবার কত ঘােরতর বিপদে পড়িয়া- ছিলেন ও কতবার কত রাজনীতি সংক্রান্ত ‘দুরূহ চিন্তায় নিমগ্ন * ওয়ারেণ হেষ্টিংস। হইয়াছিলেন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তাহার অন্তঃকরণ হইতে ঐ আশা অন্তুহিত হয় নাই। হেষ্টিংস অষ্টম বর্ষ বয়সে উপনীত হইলে তাহার পিতৃব্য তাহার শিক্ষাকাৰ্য্যের ভার গ্রহণ করেন ও তাহাকে লণ্ডন নগরস্থ একটি বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট করিয়াদেন। হেষ্টিংস এই বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া উত্তমরূপে বিদ্যাভ্যাস করিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে আহার পাইতেন না। ইহাতে তিনি সর্বদাই কহিতেন, অম্লাহারে আমার শরীর দুর্বল ও কৃশ হইয়া যাইতেছে। অনন্তর দশমবর্য বয়ঃক্রমকালে ওয়েষ্টমিনিষ্টার বিদ্যালয়ে প্রেরিত হন। তিনি বিদ্যাভ্যাসে এরূপ আবিষ্টচিত্ত ছিলেন, যে স্বল্পকালমধ্যে এই বিদ্যালয়ের একজন প্রধান ছাত্র বলিয়া পরিগণিত হইলেন। তিনি এখানে পাঠ সমাপন করিয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইবার উদেবগি করিতেছিলেন, এমত সময়ে দুর্ভাগ্যক্রমে তাহার পিতৃব্যের পরলােক হইল ; সুতরাং তাহার আশা ভরসা একবারেই অন্তর্হিত হইয়া গেল। তাঁহার পিতৃব্য মৃত্যুকালে দুরকুটুম্ব চি- উইক নামক এক বন্ধুর প্রতি ভ্রাতৃপুত্রের প্রতিপালন ও বিদ্যাভ্যাসের ভার সমর্পণ করিয়া যান। চিউইক এই ভার গ্রহণ বিষয়ে সম্পূর্ণ অস্বীকার করিলেন না বটে, কিন্তু যত শীঘ্র সম্ভব, উহা হইতে পরিত্রাণ পাইবার চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন। ওয়েষ্টমিনিষ্টার বিদ্যা- লয়ের অন্যতম শিক্ষক ডাক্তর নিকলস হেষ্টিংসকে অতিশয় ভাল বাসিতেন, তিনি প্রিয়ছাত্রের বিদ্যাভ্যাসের ব্যাঘাত দেখিয়া অতিশয় দুঃখিত হইলেন ও চিউইককে বিস্তর বুঝাইলেন এবং ইহাও কহিলেন, হেষ্টিংসকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ জন্য যে ব্যয় হইবে, আমি তাহা প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। আপনি উহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ- ইয়া দি। কিন্তু চিউইক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়াছিলেন, তিনি তাহার প্রতিবাদে কর্ণপাত করিলেন না। অনন্তর হেষ্টিংসের অষ্টাদশ বর্ষ ৰয়মকালে ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনে একটি লেখকের কৰ্ম্ম- প্রাপ্তির সুযােগ হওয়াতে চিউইক সহর্ষচিত্তে ঐ কাৰ্য্য স্বীকার ৩৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। করিলেন ও হেষ্টিংসকে বাঙ্গালায় পাঠাইয়া দিয়া নিশ্চিন্ত ও সুস্থ হইলেন। হেষ্টিংস ১৭৫০ খ্রীঃ অঝের অক্টোবর মাসে কলিকাতায় আসিয়া উপনীত হন ও অবিলম্বে সেক্রেটরি অফিসে কেরাণিগিরি করিতে আরম্ভ করেন। তিনি এই স্থানে ক্রমাগত দুই বৎসর কেরাণিগিরি করিয়াছিলেন। অনন্তর কাশিমবাজারে প্রেরিত হন। কাশিমবাজার মুরশিদাবাদ হইতে প্রায় আধক্রোশ দূরস্থিত। তৎকালে কাশিম- বাজার উৎকৃষ্ট রেশমের জন্য বিখ্যাত ছিল। ইংরাজের। এই স্থানে একটি কুঠি স্থাপন করিয়াছিলেন। হেষ্টিংস সেই কুঠিতে ক্রমাগত অনেক বৎসর পর্যন্ত রেশমের ক্রয় বিক্রয় কার্যে ব্যাপৃত থাকেন। এই সময়ে সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে অধিরূঢ় হন ও ইংরাজ- দিগকে আক্রমণ করেন। কাশিমবাজার মুরশিদাবাদের সন্নিহিত, বিশেষতঃ অসংরক্ষিত ছিল ; সুতরাং উহা বিপক্ষ কর্তৃক অবি- লম্বে আক্রান্ত হইল। হেষ্টিংস বন্দীকৃত ও মুরশিদাবাদে প্রেরিত হইলেন। সিরাজের আক্রমণে কলিকাতার গবর্নর ও তঁাহার সহচর সকলেই পলতায় পলায়ন করেন। তাহারা স্বভাবতঃ নবাবের সমুদায় চেষ্টিত অবগত হইবার জন্য সমুৎসুক হন, কিন্তু তৎকালে হেষ্টিংস ব্যতি- রেকে এমন কোন ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি অনায়াসে তাহাদের সেই ঔৎসুক্য চরিতার্থ করিতে পারিতেন। হেষ্টিংস যদিও বন্দীকৃত হইয়া- ছিলেন, কিন্তু ওলন্দাজ কোম্পানির কৰ্ম্মচারীরা দয়া প্রদর্শন পূর্বক নবাবের নিকটে বিস্তর অনুরােধ করাতে তাহার প্রতি কোন প্রকার অত্যাচার ঘটে নাই, প্রত্যুত তাহার অনেক অংশে স্বাধীনতাই ছিল। তিনি কৌশল করিয়া নবাবের কাৰ্য্য বিবরণ পলতায় পলায়িত ইংরাজ- গণের গােছর করেন। এই সময়ে নবাবকে পদচ্যুত করিবার জন্য একটি ষড়যন্ত্র করা হয়। হেষ্টিংস তাহাতে গুপ্তভাবে লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু ঐ ষড়যন্ত্র চালাইবার উপযুক্ত সময় উপস্থিত না হওয়াতে স্থগিত রাখা আবশ ওয়ারেন হেষ্টিংস। শ্যক হয়। তখন হেষ্টিংস আপনাকে ঘােরর সংকটাপন্ন বােধ করি। লেন ও পলাইয়া পলতায় আশ্রয় লইলেন। এরূপ কিম্বদন্তী আছে, হেষ্টিংস পলাইয়া প্রথমতঃ কাশিমবাজার- বাসী কৃষ্ণকান্ত নন্দীর আলয়ে আশ্রয় লন। কৃষ্ণকান্ত নন্দীও তঁাহার প্রতি সস্নেহ ব্যবহার করেন। অনন্তর হেষ্টিংস তথা হইতে সুযােগ ক্রমে পলতায় চলিয়া যান। হেষ্টিংস উত্তরকালে কৃষ্ণকান্ত নন্দীর যেরূপ উপকার করিয়াছিলেন, তাহাতে ঐ কিম্বদন্তী সত্যমূলক বলিয়াই প্রতীতি জন্মে। হেষ্টিংস গবর্ণর জেনেলের পদে অধিরূঢ় হইবার পরে কৃষ্ণকান্ত নন্দীকে ডাকাইয়া ১৭৮৫ খ্ৰীঃ অব্দের প্রারম্ভে আজীমগড় ও গাজীপুরের অন্তর্গত “ডুহাবেহারা” নামক জায়গীর প্রদান করেন ও তাহাকে রাজোপাধি গ্রহণ করিতে বলেন, কিন্তু কান্ত নন্দী স্বয়ং রাজোপাধি না লইয়া পুত্র পৌত্রাদির নিমিত্ত প্রার্থনা করেন। হেষ্টিংসও তাহার প্রার্থনায় সম্মত হন। তদনুসারে তঁাহার পুত্র লােকনাথ রাজোপাধি লাভ করেন। তাঁহার পরলােক প্রাপ্তির পরে তদীয় পুত্র হরিনাথ ও পৌত্র কৃষ্ণনাথ ক্রমান্বয়ে পৈতৃক উপাধি প্রাপ্ত হন। কুমার কৃষ্ণনাথ কোন কারণে আত্মহত্যা করেন। এক্ষণে তঁাহার সহধর্মিণী মহানুভাবা মহারাণী স্বর্ণময়ী নানাবিধ দানাদি পুণ্য কৰ্ম্ম দ্বারা সর্বত্র সবিশেষ সুখ্যাতি লাভ করিয়াছেন এবং পতিকুলের নাম ও মান সম্ভ্রম রক্ষা পূৰ্ব্বক রাজত্ব করিতেছেন। ভারতেশ্বরী ভিক্টো- রিয়া প্রীত হইয়া ১৮৭৮ খ্ৰীঃ অব্দের জানুয়ারি মাসে “মেম্বর অব দি ইম্পিরিয়াল অডর অব দি ক্রাউন অব ইণ্ডিয়া” এই সন্ত্রম সূচক উপাধি প্রদান করিয়া তাহার সদগুণের পুরস্কার করিয়াছেন এবং তাহার সুবিচক্ষণ মন্ত্রী শ্ৰীযুক্ত রাজীবলোচন রায় মহাশয়কে রায় বাহাদুর ” উপাধি প্রদান দ্বারা সম্মানিত করিতেও বিস্মৃত হন নাই। হেষ্টিংস পলতায় যাইবার কিছু দিন পরে ক্লাইব নবাবকে আক্রমণ করিবার মানসে সসৈন্যে মাদ্রাজ হইতে আসিয়া ভাগীরথীতে উপ- নীত হন। ক্লাইব যেরূপ সাধারণ বিপদের সময়ে ইচ্ছা পুৰ্ব্বক সৈনিক ৩৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। কাৰ্য্য গ্রহণ করিয়াছিলেন, হেষ্টিংসও সেইরূপ এই সাধারণ বিপদে পড়িয়া তাহার দৃষ্টান্তানুসরণ করিলেন ও যুদ্ধের প্রারম্ভেই বন্দুক হস্তে করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া উপস্থিত হইলেন। ক্লাইবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাহার গুণবত্তা অবিলম্বেই প্রকাশ হইয়া পড়ে। ক্লাইব যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পর মিরজাফরকে নবাব (করিয়া তাহার দরবারে হেষ্টিংসকে এজেন্ট নিযুক্ত করেন। হেষ্টিংস এই কাৰ্যোপলক্ষে মুরশিদাবাদে প্রায় পাঁচ বৎসর ছিলেন। অনন্তর ১৭৬১ খ্রীঃ অকে কাউসেলের মেম্বর নিযুক্ত হইয়া কলিকাতায় আইসেন ও তিন বৎসর পরে শরীর অসুস্থ হওয়াতে স্বদেশে প্রতিগমন করেন। হেষ্টিংস ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিয়া ক্রমাগত চারি বৎসর কাল বাস করেন, কিন্তু তিনি এই সময়ে যে কি করিতেন, তাহা সুন্দররূপে নির্ণীত হয় নাই। তাহার চরিতাখ্যায়কদিগের মধ্যে কেহ কেহ বলেন, যে তিনি অভিলষিত পুস্তকাধ্যয়ন ও পণ্ডিতমণ্ডলী মধ্যে গমনাগমন করিয়াই অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করিতেন। হেষ্টিংস যেরূপ বিদ্যানুরাগী ছিলেন, তাহাতে তাহাদের এই নির্দেশ নিতান্ত অযৌক্তিক বােধ হয় না। পূর্বে কোম্পানির কর্মচারীরা এদেশের ভাষাধ্যয়নে একান্ত উপেক্ষা করিতেন ও উহা কেবল বাণিজ্য কাৰ্যোপযােগী বলিয়া জানিতেন। কিন্তু হেষ্টিংসের সংস্কার সেরূপ ছিল না, তিনি এতদ্দেশীয় ভাষাধ্যয়নের ফলােপধায়কতা সম্যক রূপে বুঝিতে পারিয়া ছিলেন। তিনি মনােযােগ পূৰ্ব্বক পারস্য ও হিন্দুস্থানী প্রভৃতি ভাষা অধ্যয়ন করেন। যাঁহারা নূতন নূতন বিষয়ের অনুশীলনে প্রবৃত্ত হন, তাহাদের যেরূপ অভ্যাস, তিনিও সেইরূপ অভিমত শাস্ত্রসমূহ তাদৃশ ফলেপধায়ক ' না হইলেও বহু ফলােপধায়ক মনে করিতেন। তঁাহার অন্তঃকরণে ধিলক্ষণ প্রীতি জন্মিয়াছিল, পারস্য ভাষা অধ্যয়ন করিলে ইংরাজভদ্রসন্তান- গণেরও বিশেষ উপকার দর্শিতে পারে। কি ' প্রণালীতে সে সমস্ত অনুশীলিত হওয়া উচিত, তিনি তদ্বিষয়ক উপদেশ গর্ড একটি সন্দর্ভ :

ওয়ারেন হেষ্টিংস। ৩৭ প্রস্তুত করিয়াছিলেন। ইউরােপখণ্ডে পুনর্বার # যথারীতি বিদ্যা- নুশীলন আরম্ভ হইবার পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়িক ভাষা সমূহের অধ্যয়ন একবারেই উপেক্ষিত হয় নাই। কথিত আছে, এই বিদ্যালয়েই পারস্য-ভাষার অধ্যয়ন হওয়া উচিত, হেষ্টিংস, এই বিষয়টি স্বরচিত, সন্দর্ভে বিশেষরূপে বর্ণনা করিয়া ছিলেন। হেষ্টিং- সের এরূপ প্রত্যাশা ছিল, কোম্পানি এবিষয়ে আনুকুল্য করিতে পারেন। তৎকালে ইংলণ্ডে ডাক্তর জন পণ্ডিতাগ্রগণ্য ছিলেন, বিশেষতঃ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত তাহার নানাপ্রকার সম্বন্ধ ছিল। হেষ্টিংস মনে করিলেন, ডাক্তর জনের প্রবৃত্তি জন্ম- ইতে পারিলে অামার অভিপ্রায় সিদ্ধ হওয়া দুরূহ হইবে না। তিনি এই সকল বিবেচনা করিয়া ডাক্তর জনের সহিত সাক্ষাৎ করেন। তাহাতে জন্মনের নিকটে তাহার বিদ্যা বুদ্ধি বিশেষ রূপে প্রকাশ পায়। কথিত আছে, ইহার বহুকাল পরে হেষ্টিংসের ভারতবর্ষে রাজ্যশাসন সময়ে পণ্ডিতবর জন্সন বিশিষ্ট শিষ্টতা প্রদর্শন পূর্বক তাঁহাকে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন। অল্পকালের নিমিত্ত উভয়ের আলাপ পরিচয় হইয়া পরস্পরের যে পরিতােষ লাভ হইয়াছিল, ঐ পত্রে তদ্বিষয় উল্লিখিত হয়। হেষ্টিংস ভারতবর্ষে অবস্থিতি কালে অধিক অর্থোপার্জন করিতে পারেন নাই। তিনি যে পরিমিত অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিলেন, ইংলণ্ডে প্রতিগমনের পর অল্প কালের মধ্যেই তাহার কতক প্রশংসনীয় কাৰ্য্যে ব্যয়িত হয় ও কতক তাঁহার কাৰ্য্যদোষে বিনষ্ট হইয়া যায়। তিনি উদ্বৃত্ত ধনের অধিকাংশ অধিকবৃদ্ধি লাভের প্রত্যাশায় বাঙ্গালায় রাখিয়া যান, কিন্তু অধিক সুদ লাভের প্রত্যাশা ও অপাত্রে অসভ্য জাতিরা বােমসাম্রাজ্য ধ্বংস করিবার পরে ইউরােপ খণ্ডে বিদ্যানুশীলন এক কালে রহিত হইয়া যায়। ইহার, প্রায় সহস্র বৎসর পরে মুদ্রাযন্ত্রের সৃষ্টি হয়। এবং গ্রীকেরা ইউরােপের পশ্চিম ভাগে গতিবিধি করিতে আরম্ভ করেন। ঐ সময়ে প্রাচীন গ্রীক ও লাটিন ভাষার অনুশীলন পুনরায় আরম্ভ হয়।

৩৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। অর্থ স্থাপন উভয়ই অনর্থের মূল। হেষ্টিংস পরিশেষে মূল ধনও হারাইয়াছিলেন। এইরূপে সমুদায় অর্থ নিঃশেষিত হওয়াতে হেষ্টিংস ঋণ গ্রহণ করিতে বাধ্য হন, কিন্তু বিষয় কৰ্ম্ম না থাকিলে কেবল ঋণ করিয়া কতদিন চলে ? হেষ্টিংস দিন দিন ঋণ বৃদ্ধি দেখিয়া অতিশয় ব্যাকুল হইলেন ও কোন প্রকার কর্মে নিযুক্ত হইয়া পুনরায় ভারত- বর্ষে আসিবার অংশয়ে ডিরেক্টর সমাজে আবেদন করিলেন। ডিরেক্টরসমাজ তাহার কাৰ্যদক্ষতার বিষয় অবগত ছিলেন, তাহারা তাহাকে মান্দ্রাজ কৌন্সেলের অন্যতম মেম্বরের পদে নিযুক্ত করিয়া ভারতবর্যে পাঠাইয়া দিলেন। হেষ্টিংস ১৭৬৯ খ্রীঃ অব্দের বসন্তকালে জাহাজ আরােহণ করিয়া ভারতবর্ষের অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি পথে আসিবার সময়ে জামেন দেশীয় কোন যুবতীর প্রণয়ে পতিত হইয়াছিলেন। উত্তর কালে এই যুবতীই তাহার সহধর্মিণী হন। হেষ্টিংস মাত্ৰাজে পৌছিয়া প্রথমতঃ কোম্পানির বাণিজ্য কাৰ্য্য অধিকতর মনােনিবেশ করেন ও কতিপয় মাসের মধ্যে উহার শ্রীবৃদ্ধি সাধনে কৃতকার্য হন। ইহাতে ডিরেক্টর সভা তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে বাঙ্গালার শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত করিলেন। হেষ্টিংস এই উচ্চতর পদে অধিরূঢ় হইয়া ১৭৭২ খ্রীঃ অব্দে কলি- কাতায় আসিলেন। তৎকালে লর্ড ক্লাইবের অনুমােদিত প্রণালীতেই শাসনকার্য চলিতে ছিল। মুরশিদাবাদের নবাব নামে অধীশ্বর, কিন্তু কাৰ্যে কিছুই ন, কোম্পানিই রাজ্যের সর্বময় কর্তা। প্রধান ক্ষমতাগুলি তাহাদেরই হস্তগত। যদিও কোম্পানি এইরূপে রাজ্য- মধ্যে অসীমক্ষমতাশালী ছিলেন, তথাপি তাহার রাজ-উপাধি গ্রহণ করেন নাই। তাহারা সন্ধি বিগ্রহ সম্পৰ্কীয় ও বিদেশ সংক্রান্ত কাৰ্যের ভার স্বহস্তে গ্রহণ করিয়া ছিলেন ও বিচার নির্বাহ এবং রাজস্ব সঙ্কলন প্রভৃতি সমুদায় কার্যের ভার নবারের মন্ত্রী মহম্মদ রেজা খাঁর হস্তেই রাখিয়াছিলেন। হেষ্টিংস রাজকার্যের ভার গ্রহণ ওয়ারেণ হেষ্টিংস ত পূৰ্ব্বক বিবেচনা করিলেন, এক রাজ্যে দুই প্রতু থাকিলে রাজকার্যে নানা গােলযােগ ও বিশৃঙ্খলা ঘটে। তিনি এই বিবেচনায় নবাবের মন্ত্রী মহম্মদ রেজা খাঁর কাৰ্য্য উঠাইবার ও রাজস্ব সংগ্রহ প্রভৃতি কাৰ্য্য ইংরাজদিগের হস্তে আনিবার উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। যৎকালে ঐ মন্ত্রিপঢ় প্রদত্ত হয়, সে সময়ে নন্দকুমার ও মহম্মদ রেজা খাঁ উভয়েই প্রার্থী হইয়া ছিলেন, কিন্তু মহম্মদ রেজা খাঁ কৃত- কাৰ্য্য হওয়াতে নন্দকুমার তাহার প্রতি ঈৰ্য্যাবান হন ও তদবধি তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী মহম্মদ রেজা খাঁর নাম সন্ত্ৰম বিলুপ্ত করিবার জন্য নিয়ত চেষ্টা করিতে ছিলেন। তাঁহার সেই চেষ্টা এক্ষণে সফল হইবারও সময় উপস্থিত হইল। লর্ড ক্লাইব বাঙ্গালা দেশে শাসনকার্যের যেরূপ প্রণালী প্রবর্তিত করিয়া যান, তাহাতে কোম্পানির প্রত্যা- শানুরুপ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হইত না। তৎকালে ইংলণ্ডে ভারতবর্যের ধনবত্তা বিষয়ে একটি অদ্ভুত সংস্কার ছিল। ইংলণ্ডবা- সীরা ভারতবর্ষকে সর্বপ্রকার ধনের আকর স্বরূপ মনে করিতেন, কিন্তু এটি যে তাঁহাদের ভ্রান্তি, তাহা তাহারা স্বপ্নেও ভাবিতেন না। ডিরেক্টরেরা নবােপার্জিত রাজ্যের বিষয় কিছুই অবগত ছিলেন না। তাহাদের অন্তঃকরণে এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যে বাঙ্গালা দেশের রাজস্ব হইতে রাজ্যের সমুদায় ব্যয় সমাধা হইয়াও বিস্তর অর্থ উদ্বৃত্ত হইতে পারে। তাহারা এক্ষণে ঐ অসঙ্গত প্রত্যাশায় নিরাশ হইয়া এই সিদ্ধান্ত করিলেন, যে মহম্মদ রেজা খাঁর কাৰ্যদোষেই রাজস্বের ক্ষতি হইতেছে, তাহাতে আবার নন্দকুমার লণ্ডন নগরস্থ এজেন্টের দ্বারা মহম্মদ রেজা খাঁর নানাপ্রকার দোষােৎকীর্তন করাতে তাহাদের সেই ভ্রান্তিমূলক সিদ্ধান্ত আরও বদ্ধমূল হইয়া উঠিল। তাহারা এই মর্মে হেষ্টিংসকে একখানি পত্র লিখিলেন, যে মহম্মদ রেজা খাঁর কাৰ্যদোষে প্রত্যাশানুরূপ ধনাগম হইতেছে না। হইতেছে না। অতএব আপনি তাহাকে কৰ্ম্মচ্যুত করিয়া বন্দী করিবেন ও নন্দকুমারের সাহায্যে তাঁহার কার্যের বিষয় বিশেষরূপে অনুসন্ধান করিয়া দেখিবেন। হেষ্টিংস পূৰ্বাধি মহম্মদ রেজা খাকে পদচ্যুত করিবার উপায় } ৪ ০ লঘু চরিতমঞ্জরী। দেখিতে ছিলেন, এক্ষণে ডিরেক্টরদিগের এই আদেশ তাহার সেই মনােরথ সিদ্ধির সর্বজ উপায় হইল। তিনি কালবিলম্ব না করিয়া মহম্মদ রেজা খাঁকে কৰ্ম্মচ্যুত ও বন্দীকৃত করিলেন। মহম্মদ রেজা খার বিচার কাৰ্য্য নানা ব্যপদেশে অনেক দিন পর্যন্ত স্থগিত থাকে। হেষ্টিংস সেই অবকাশে তাহার পদ উঠাইগা দেন ও রাজস্ব সংকলন প্রভৃতি সমুদায় কার্যের ভার কোম্পানির কর্মচারিগণের হস্তে আনয়ন করেন। প্রতি জেলায় ফৌজদারি ও দেওয়ানি মােকদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য ইউরােপীয় বিচারপতির নিযুক্ত হন, কলিকাতায় সদর দেওয়ানি ও সদর নিজামত নামক দুইটি আপীল আদালত স্থাপিত ও কতকগুলি আইন প্রস্তুত হয়। হেষ্টিংস, ছয় মাসের অনধিক কাল মধ্যে এই সকল গুরুতর কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করেন। অনন্তর মহম্মদ রেজা খাঁর বিচার আরম্ভ হয়। মহারাজ নন্দ- কুমার তঁাহার দোযােদঘাটক নিযুক্ত হন। মহম্মদ রেজা খাঁর প্রতি নন্দকুমারের ভয়ঙ্কর বিদ্বেষ-বুদ্ধি ছিল। তিনি যত দূর সাধ্য, মহম্মদ- রেজা খাঁর দোষ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। বিচারেও মহম্মদ রেজা খার নির্দোষিতা স্পষ্টরূপে সপ্রমাণ হইল না, কিন্তু তাহার প্রতি নির্দয় ব্যবহার করা গবর্ণর জেনেরলের উদ্দেশ্য ছিল না, হেষ্টিংস, দোষ সপ্রমাণ হইল না বলিয়া পদচ্যুত মন্ত্রীকে অব্যাহতি দিলেন। নন্দকুমারের মনে মনে বড় সাধ ছিল, মহম্মদ রেজা খুঁকে পদচ্যুত করাইয়া নিজে মন্ত্রীর কার্য্য গ্রহণ করিবেন, কিন্তু হেষ্টিংস মন্ত্রীর পদ উঠাইয়া দেওয়াতে তিনি সে আশয়ে বঞ্চিত হইলেন, সুতরাং হেষ্টিংসের ঘােরতর বিপক্ষ হইয়া উঠিলেন। এই সময়ে রাজকোষ ধনশূন্য হইয়াছিল, তাহাতে আবার ডিরেক্ট- রেরা বারংবার টাকা চাহিয়া পাঠাইতে লাগিলেন, অতএব যে কোনরূপে হউক, অর্থোপায় করা হেষ্টিংসের প্রধান উদ্দেশ্য হইয়া উঠিল। তিনি এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কতকগুলি অবৈধকার্যের । অনুষ্ঠান করেন। মুরশিদাবাদেয় নবাব এতদিন পর্যন্ত বাৎসরিক ওয়ারেন হেষ্টিংস। $ বত্রিশ লক্ষ টাকা বৃত্তি পাইয়া আসিতেছিলেন, কিন্তু এক্ষণে হেষ্টিংস তাহা হইতে ষােল লক্ষ টাকা কৰ্ত্তন করিলেন। দিল্লীর সম্রাট, কোম্পানিকে যে দেওয়ানি প্রদান করেন, তজ্জন্য কোম্পানি বাহা- দুর পণস্বরূপ তাহাকে কোরা ও এলাহাবাদ এই দুই প্রদেশ দিয়াছিলেন ও বাৎসরিক ছাব্বিশলক্ষ টাকা প্রদান করিতে অঙ্গী- কারবদ্ধ থাকেন। হেষ্টিংস এক্ষণে এই ব্যপদেশে ঐ দুইটা প্রদত্ত প্রদেশ প্রতিগ্ৰহণ ও ছাব্বিশ লক্ষ টাকা কর্তন করিলেন যে, মােগল সম্রাট, প্রকৃত সম্রাট, নহেন, তাঁহার স্বাধীনতা নাই। অতঃপর কোম্পানি আর তাহাকে কর প্রদান করিবেন না এবং কোরা ও এলাহাবাদ প্রদেশেও তাহার আর আধিপত্য থাকিবে না। কোরা ও এলাহাবাদ প্রদেশ অধিকারে রাখিতে হইলে অধিক ব্যয়ের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তাদৃশ আয়ের প্রত্যাশা ছিল না। হেষ্টিংসের “রুধির লইয়া কাজ” তিনি উক্ত দুইটি প্রদেশ অযােধ্যাধিপতির নিকটে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা মূল্যে বিক্রয় করিলেন। হেষ্টিংস এই সময়ে আর একটি গহিত কার্যের অনুষ্ঠান করেন। তাহাতে কেবল তাহার নামে কেন, সমুদায় ইংলণ্ডের নামেও চির- কলঙ্ক অর্পিত হয় । বহুকালাবধি মােগল সম্রাটের কান্দাহার ও কাবুল প্রদেশের নিকটবর্তী স্থান হইতে সেনাসংগ্রহ করিতেন। এই সমস্ত সেনার মধ্যে রােহিলা নামে বিখ্যাত বলবীর্য-সম্পন্ন কতকগুলি সম্প্রদায় উহারা পাঠান অথবা আফগানবংশ সস্তৃত। মােগল সম্রাটেরা উহাদের অসামান্য যুদ্ধনৈপুণ্য দেখিয়া পুরস্কার স্বরূপ উহা দিগকে অতি বৃহৎ এক খণ্ড ভূমি দান করেন। এই ভূমিখণ্ড রােহিলাগণ কর্তৃক অধ্যুষিত হওয়াতে রােহিলখণ্ড নামে বিখ্যাত হয়। পরাক্রান্ত মােগল সাম্রাট, আরঞ্জীবের মৃত্যুর পরে রােহিলারা রাজকার্যের নানা গােলযােগ দেখিয়া স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করে। উহারা তদবধি স্বাধীনতা ভােগ করিয়া আসিতেছিল। অযােধ্যাধিপতি সুজাউদ্দৌলা এই সমৃদ্ধিসম্পন্ন রােহিলখও স্বাধি ছিল।

১২ লঘু চরিতমঞ্জরী অন্যের কারভুক্ত করিবার উচষ্টা করেন, কিন্তু তাদৃশ সমরকুশল রোহিল। দিগকে পরাভব করা অসাধ্য বিবেচনা করিয়া হেষ্টিংসের নিকটে সাহায্য চাহেন ও প্রত্যুপকারস্বরূপ তঁাহাকে চল্লিশ লক্ষ টাকা প্রদানের অঙ্গীকার করেন। হেষ্টিংস তাহার এই প্রলােভনকর প্রস্তাবে সম্মত হইয়া য়ােহিলাদিগকে স্বাধীনতারত্নে বঞ্চিত করিতে উদ্যত হন। অনন্তর বৃটিশ সেনাপতি কর্ণেল চ্যাম্পেন সসৈন্যে অযোধ্যাধিপতি সুজাউদ্দৌলার সেনার সহিত মিলিত হইয়া নিরপরাধ রোহিলাগণের সম্মুখীন হইলেন। রােহিলারা প্রথমতঃ বিস্তর কাকূতি মিনতি করিল ও নিয় দিয়া নিষ্কৃতি পাইবারও চেষ্ট। পাইল, কিন্তু কোন ফলােদয় হইল না। তখন তাহার। উপায়ান্তর না দেখিয়া যথাসাধ্য আত্মরক্ষা করিতে যত্নবান হইল ও ভয়ঙ্কর সংগ্রাম আরম্ভ করিল। কর্ণেল চ্যাম্পেন বলেন, “এই যুদ্ধে রােহিলারা যে কত দূর রণদক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করে, বৰ্ণনা করিয়া তাহা হৃদয়ঙ্গম করা সাধ্য নহে। যাহাহউক, পরিশেষে রােহিলারা পরাভুত ও সুজাউদ্দৌলার হস্তে পতিত হয়। অযযাধ্যা- ধিপতি এইরূপে রােহিলখণ্ড অধিকার করিয়া তথায় ঘােরতর অত্যাচার করেন। এক লক্ষেরও অধিক অধিবাসী তাহার অত্যাচার সহ করিতে না পারিয়া জঙ্গলে পলায়ন করে। সহস্র সহস্র গৃহ দগ্ধ ও ভস্মীভূত হয়। ফলতঃ অল্পকাল মধ্যে তাদৃশ ফলতঃ অল্পকাল মধ্যে তাদৃশ সমৃদ্ধিশালী রােহিল খণ্ড একবারে শ্রীভ্রষ্ট হইয়া যায়। হেষ্টিংস এই সকল কাৰ্য্য করিয়া দুই বৎসরের অনধিক কাল মধ্যে প্রায় পঁয়তাল্লিশ লক্ষ টাকা কোম্পানির বাৎসরিক আয় বৃদ্ধি করিলেন। এতদ্ভিন্ন নগদ দশ লক্ষ টাকা সংগৃহীত হইল, অথচ তিনি প্রকৃতি- পুঞ্জের নিষ্পীড়ন করিলেন না। এস্থলে ইহাও উল্লেখ করা আব- শ্যক, যে তিনি অযােধ্যায় কতকগুলি সেনা নিযুক্ত রাখিয়া সৈনিক ব্যয় সবাবের স্কন্ধে নিক্ষেপ কতঃ প্রতি বৎসরে বাঙ্গালার রাজস্ব আড়াই লক্ষ টাকা বাঁচাইয়া ছিলেন। হেষ্টিংস যদি সদুপায় বলম্বন করিয়া এইরূপ অর্থোপায় করিতেন, তাহা হইলে তিনি ওয়ারেন হেষ্টিংস। জন এবং স্বদেশীয়দিগের নিকটে ভূয়সী প্রশংসা প্রাপ্ত হইতেন সন্দেহ নাই। সে যাহাহউক, রাজ্যশাসন বিষয়ে তাঁহার যে অসাধারণ ক্ষমতা ছিল, উপরি বর্ণিত কাৰ্যগুলি দ্বারা তাহা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন হইতেছে। ১৭৭৩ খ্ৰীঃ অব্দে পালিয়ামেন্টের বিধানানুসারে ভারতবর্ষের প্রচ- লিত শাসনপ্রণালী পরিবর্তিত হওয়াতে কোম্পানির অধিকৃত সমুদায় প্রদেশ বাঙ্গালা প্রেসিডেন্সির অধীন হইল। বাঙ্গালার সর্বাধ্যক্ষ গবর্ণরজেনেরল ও তঁাহার সহিত রাজকাৰ্য পর্যবেক্ষণার্থ চারি মেম্বর নিযুক্ত হইলেন কলিকাতায় সুপ্রিমকোর্ট নামক বিচারালয় স্থাপিত হইল; এই বিচারালয়ের সহিত গবর্নর জেনেবল ও তাহার কাউন্সেলর কোন সম্বন্ধ রহিল না। এস্থলে ইহা উল্লেখ করা আবশ্যক, যে পালিয়ামেন্টের বিধানানুসারে প্রস্তাবিত ওয়ারেন হেষ্টিসই ভারতবর্ষের প্রথম গবর্ণর জেনেরল হন। সুপ্রীম কাউন্সেলে যে চারি জন মেম্বর নিযুক্ত হইলেন, তন্মধ্যে তিন জন ইংলণ্ড হইতে আসিলেন। আর একজন বহুকালাবধি এদেশে ছিলেন, সুতরাং তিনি এদেশের বিষয় বিলক্ষণ জানিতেন। ইহার নাম বারওয়েল, ইনি হেষ্টিংসের বন্ধু ছিলেন। হেষ্টিংস রাজ্য শাসনের এই নূতন প্রণালী পছন্দ করতেন না, ও ইংলণ্ড হইতে আগত নূতন মেম্বরগণের প্রতিও তাহার তাদৃশ ভক্তি ছিল না। নূতন মেম্বরেরা এ বিষয়টি জানিতে পারিয়া হেষ্টিং- সের সাধুতা বিষয়ে সন্দিহান হইলেন। একের প্রতি অপরের ভক্তি না থাকিলে সামান্য সামান্য বিষয় লইয়াও পরস্পরের বিবাদ উপ- স্থিত হয়। মেম্বরের কলিকাতায় উপনীত হইবার সময়ে সমসুচক একবিংশতি তােপের প্রত্যাশা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা না হইয়া তাহাদের সম্মানা যােলটি মাত্র তােপ হয়। ইহাতে তাহারা মনে মনে অসস্তুষ্ট হইলেন। প্রথম সাক্ষাৎ দিবসে কোন গোলযােগ উপস্থিত হয় নাই, পরস্পর পরস্পরের প্রতি যথারীতি শিষ্টাচার করেন, কিন্তু ইহার পরে কাউন্সেলের প্রথম অধিবেশন দিবসে এরূপ বিবাদ উত্থিত হয়, যে তাহা বহুকাল স্থায়ী হইয়া কোম্পানির কার্যে বহু বিজ্ঞ উৎপাদন করে।

88 লঘু চরিতমঞ্জরী। সুপ্রীম কাউন্সেল কেবল বার ওয়েল সাহেবই হেষ্টিংসের পক্ষ ছিলেন। নূতন মেম্বরেরা সকলেই তাহার বিপক্ষ, তাহাদের সংখ্যা অধিক, সুতরাং তাহাদের ক্ষমতাও অধিক ছিল। কারণ যেস্থলে অনে- কের প্রতি কার্য নির্বাহের ভার অর্পিত হয়, তথায় মতের অনৈক্য উপস্থিত হইলে অধিকাংশ ব্যক্তির মতানুসারেই কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইয়া থাকে। নূতন মেম্বরের হেষ্টিংসের পূর্বকৃত কাৰ্য্য গুলির দোষােৎকীর্তন করিলেন। হেষ্টিংস অযােধ্যার দরবারে যাহাকে এজেন্ট নিযুক্ত করিয়াছিলেন, নূতন মেম্বরেরা তাহাকে কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া তথা হইতে ফিরিয়া আসিতে আদেশ করিলেন ও অনুগত এক ব্যক্তিকে এজেন্ট নিযুক্ত করিয়া তথায় পাঠাইয়া দিলেন ও রােহিযুদ্ধের বিষয় দৃঢ়রূপে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। যেসমস্ত বৃটিশ সেনা হতভাগ্য রােহিলাদিগকে পরাস্ত করিয়াছিল, তাহাদিগকে রােহিলখণ্ড হইতে কোম্পানির রাজ্যে ফিরিয়া আসিতে আদেশ করি- লেন ও হেষ্টিংসের প্রতিবাদ না শুনিয়া অধীনস্থ প্রেসিডেন্সির উপরে আপনাদের আধিপত্য বিস্তার করিতে লাগিলেম। অল্পকাল মধ্যেই বিদিত হইল, যে নূতন মেম্বরেরাই সর্বপ্রধান। হেষ্টিংসের আর কোন ক্ষমতা নাই। ইহাতে এই ফল দর্শিল, যাহারা ইতিপূর্বে তৎকৃত কাৰ্য্যে অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, তাহারা নূতন মেম্বরগণের নিকটে তঁাহার নামে অভিযোগ করিতে আরম্ভ করিলেন। অভিযােগ- কারিগণের মধ্যে নন্দকুমারই সৰ্ব্ব প্রধান ছিলেন। তিনি এই বলিয়া কাউন্সেল সভায় হেষ্টিংসের নামে অভিযােগ উপস্থিত করিলেন, যে তিনি প্রচুর অর্থ লইয়া মহম্মদ রেজা খাঁকে বিনা দণ্ডে অব্যাহতি দিয়াছেন, আমার পুত্র গুরুদাসকে নবাব-সরকারে ধনরক্ষক নিযুক্ত করিবার সময়ে প্রচুর উৎকোচ লইয়াছেন ও মণিবেগমের প্রতি, অল্প বয়স্ক নবাবের রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যাশিক্ষা দেওনের ভার অর্পণ করিয়া তাহার নিকট হইতেও প্রচুর অর্থ দোহন করিয়াছেন। নূতন মেম্ব- রেরা নন্দকুমারের অভিযােগ গ্রাহ্য করিয়া হেষ্টিংসের দোষানুসন্ধান করিতে লাগিলেন। অনেক তর্ক বিতর্কের পর পরিশেষে স্থির হইল, ওয়ারেন হেষ্টিংস। ৪৫ হৈষ্টিংস ৩ | ৪ লক্ষ টাকা উৎকোচ লইয়াছেন। তাহাকে ঐ টাকা ফিরিয়া দিতে হইবে। বাঙ্গালাদেশবাসী সমুদায় ইংরাজ অভিজ্ঞতা ৪ কাৰ্যদক্ষতা হেতু হেষ্টিংসের স্বপক্ষ ছিলেন, কিন্তু তথাপি হেষ্টিংস আপনাকে ঘােতর বিপদাপন্ন বােধ করিলেন। তিনি এই সময়ে ইংলণ্ডে আপীল করিলেও করিতে পারিতেন, কিন্তু ভাবিলেন, যদি কর্তৃপক্ষের। বিপক্ষ মেম্বরগণের স্বপক্ষ হন, তাহা হইলে আমি কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিব না, প্রত্যুত পদচ্যুত হইব। তিনি এই বিবেচনায় ইংলণ্ডস্থ এজেন্টের নিকটে এই উপদেশ সহকারে একখানি পদত্যাগপত্র পাঠাইয়া দিলেন, যদি কর্তৃপক্ষেরা আমার প্রতি প্রতিকূল হইয়াছেন বুঝিতে পার, তবে তুমি এই পত্র তাহাদের নিকটে পাঠাইয়া দিবে। এই সময়ে কলিকাতার সুপ্রীমকোর্টে সর, ইলিজা ইম্পে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি হেষ্টিংসের সহাধ্যায়ী ও বন্ধু, তাহারও মূতন মেম্বরগণের প্রতি তাদৃশ ভক্তি ছিল না। হেষ্টিংস এই প্রধান বিচারপতির সাহায্যে দোষারােপক নন্দকুমারের নিপাত সাধনে যত্নবান হইলেন। তিনি তদনুসারে এতদ্দেশীয় এক ব্যক্তিকে উপ- লক্ষ করিয়া সুপ্রীমকোর্টে জালকারী বলিয়া নন্দকুমারের নামে নালিশ করিলেন। সুপ্রীমকোর্টের জজেরা এই নালিশ গ্রাহ্য করিয়া নন্দ- কুমারকে কারাগৃহে রাখিতে আদেশ দিলেন। নূতন মেম্বরেরা নন্দ- কুমারের স্বপক্ষ ছিলেন, তাঁহারা বারংবার সুপ্রীমকোর্টের বিচার- পতিদিগকে বলিয়া পাঠাইতে লাগিলেন, আপনারা জামিন লইয়া নন্দকুমারকে ছাড়িয়া দি, কিন্তু জজেরা তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিলেন না। ইত্যবসরে সুপ্রীমকোর্টে শেসনের কাৰ্য্য আরম্ভ হইল। নন্দকুমার প্রধান বিচারপতি ইম্পের সম্মুখে আনীত হইলেন। বিচার আরম্ভ হইল। জুরিরা সকলেই ইংরাজ ছিলেন, তাঁহার। মন্দকুমারকে অপরাধী স্থির করিয়া দিলেন ও বিচারপতি ইম্পে তাঁহার প্রাণদণ্ডের আদেশ করিলেন। ইহার পর দিবসেই নন্দ কুমারের কাশী হইল।

লঘু চরিতমঞ্জরী। এস্থলে ফাশী শব্দের পরিবর্তে হত্যা শব্দটা ব্যবহৃত হইলে কিঞ্চি আত্রও অত্যুক্তি হয় না। জাল অপরাধে কোন হিন্দু সন্তানকে ফাশী দেওয়া নিতান্ত ন্যায়বিরুদ্ধ। ইংলণ্ডে যে আইন অনুসারে জালকারীর গুরুতর দণ্ড হইতে পারে, ভারতবর্ষীয়দের পক্ষে সে আইন প্রচলিত নহে। ফলত সর ইলিজা ইম্পে গবর্ণজেনেরলের সন্তোষার্থ ধৰ্ম্মাধর্ম জ্ঞানশূন্য হইয়া এই মহাপাপে লিপ্ত হইয়া ছিলেন, তাহার সন্দেহ নাই। রােহিলাযুদ্ধ ও নূতন মেম্বরগণের সহিত গবর্ণর জেনেলের বিবাদের সংবাদ ইংলণ্ডে পেছিলে, ডিরেক্টরদিগের মধ্যে অধি- কাংশ ব্যক্তি হেষ্টিংসের অসদাচরণ জন্য তাহাকে তিরস্কার করিয়া একখানি পত্র লিখিলেন। হেষ্টিংস কেবল অর্থের জন্য ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়া রােহিলা যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন, ইহাতে তিনি নিন্দা ব্যতিরেকে আর কিছুই লাভ করিতে পারেন না, সত্য বটে, কিন্তু ডিরেক্টর গণের ইহা একবার বিবেচনা করা কর্তব্য ছিল, হেষ্টিংস যদি অসদুপায় দ্বারা অর্থোপার্জন করিয়া থাকেন, আপনার স্বার্থ সাধনের জন্য করেন নাই, তাহাদেরই দাওয়া পুরণ করিবার জন্যই করিয়া- ছিলেন। ফলত তৎকালে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এই একটি রীতি ছিল, যে তাঁহারা কর্মচারীদিগকে সাধু ও সচ্চরিত্র হইতে কহিতেন, কিন্তু অনেক সময়ে এরূপ অনেক আদেশ করিয়া পাঠাইতেন যে সদুপায় অবলম্বন করিয়া সে সকল সম্পন্ন করিতে পারা যায় না। ইতিপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, হেষ্টিংস ইংলণ্ডে আপনার এজেন্টের নিকটে পদত্যাগ পত্র পাঠাইয়াছিলেন। এক্ষণে তঁাহার এজেন্ট, ডিরেক্টরদিগকে প্রভুর প্রতি প্রতিকূল দেখিয়া ঐ পত্র ডিরেক্টর সমাজে পাঠাইলেন। ডিরেক্টরেরাও উহা গ্রাহ করিয়া আপনাদের অন্তরঙ্গ ছােএলার নামক এক ব্যক্তিকে গবর্ণর জেনেরল নিযুক্ত করিলেন, ও যাবৎ তিনি ভারতবর্ষে উপনীত না হইবেন, তাবৎকাল পর্যন্ত কাউন্সেলের প্রধান মেম্বর ক্লাবরিং তাহার কাৰ্যসম্পন্ন করিবেন, এই আদেশ করিয়া পাঠাইলেন। = ওয়ারেণ হেষ্টিংস। যৎকালে ইংলণ্ডে এই সকল ব্যাপার অনুত হয়, ঐ সময়ে বাঙ্গালা দেশে শাসনকার্যের অনেক পরিবর্ত ঘটে। কাউন্সেলের অন্যতম মেম্বর মন্সন পরলােক প্রাপ্ত হন। : ইহাতে কাউন্সেলে চারিজন মাত্র মেম্বর থাকেন। ফান্সিস ও ক্লাবরিং এক পক্ষ, বার- ওয়েল' এবং গবর্ণর জেনের অন্যপক্ষ। সমসংখ্যাস্থলে গবর্ণর জেনে- ঘলই প্রধান। হেষ্টিংস বিগত দুই বৎসর কাল কৌন্সেলে ক্ষমতা হীন ছিলেন, তিনি এক্ষণে একবারেই অসীমক্ষমতাশালী হইয়া উঠিলেন ও কাল বিলম্ব না করিয়া বিপক্ষ মেম্বর দ্বয়ের প্রতিফল প্রদানে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি তাহাদের সমুদায় কাৰ্য্য অন্যথা করিতে লাগিলেন ও তাহাদের সাহায্যৰলে যাহারা উন্নত পদে অধিরূঢ় হইয়াছিলেন, তাহাদিগকে পদচ্যুত করিলেন। করস্থাপ- নের অভিপ্রায়ে বঙ্গভূমির নুতন জমাবন্দী করিবার আদেশ হইল ও এই নিয়ম নির্ধারিত করিয়া দিলেন, যে তৎসংক্রান্ত সমুদায় তদারক গবর্ণর জেনেবল নিজে করিবেন ও সমুদায় চিঠিপত্র তাহার নিজ নামে লিখিত হইবে। এই সকল ঘটনার কিছুদিন পরে ইংলণ্ড হইতে সংবাদ আসিল, যে হেষ্টিংসের পদত্যাগপত্র গ্রাহ হইয়াছে। হােএলার সাহেব তাহার পদে নিযুক্ত হইয়া যাইতেছেন ও যাবতিনি ভারতবর্ষে উপনীত না হইবেন, তাবৎ কাউন্সেলের প্রধান মেম্বর ক্লাবরি তাহার কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবেন। হেষ্টিংস কেন্সেলে এতদিন ক্ষমতাহীন থাকিলে বােধ হয়, সহজেই পদত্যাগ করিতেন। কিন্তু তিনি এক্ষণে ভারত রাজ্যের প্রকৃত প্রভু হইয়াছিলেন। তিনি তাদৃশ উচ্চপদ পরিত্যাগে অসম্মত হইয়া নানাপ্রকার আপত্তি উত্থাপন করিতে লাগিলেন । কিন্তু ক্লাবরিং তাহা না শুনিয়া তাহার খাতাপত্র অধি- কার করিলেন ও তাহার নিকটে ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ ও ত্রেজুরির চাবি চাহিয়া পাঠাইলেন। হেষ্টিংস এই সময়ে বুদ্ধিপূর্বক প্রস্তাব করেন, আমি উপস্থিত বিষয়ের মীমাংসার ভার সুপ্রীমকোর্টের বিবেচনায় অৰ্পণ করিলাম। সুপ্রীমকোর্ট যাহা স্থির করিয়া দিবেন, আমি ।

৪৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। তাহাই করিব। কচুরিং কিঞ্চিৎ ভাবিয়া পরিশেষে অনিচ্ছাপূৰ্ব্বক তাঁহার প্রস্তাবেই সম্মত হইলেন। সুপ্রীমকোর্টের জজের হেষ্টিংসের স্বপক্ষ ছিলেন। তাহারা কহি- লেন, পালিয়ামেন্টের বিধানানুসারে গবর্ণর জেনেরলের স্বপদে অব স্থান করিবার সময় পাঁচ বৎসর অবধারিত হইয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি হেষ্টিংসের পাঁচ বৎসর পূর্ণ হয় নাই। অতএব তাহার পদত্যাগপত্র গ্রাহ্য হইতে পারে না, তাহাকে স্বপদে থাকিতে হইবেক। তখন ক্লাবরিং অনন্যোপায় হইয়া সুপ্রীমকোর্টের বিচারেই সম্মত হইলেন। ইত্যবসরে নূতন নিয়ােজিত গবর্ণর জেনেবল হােএলার সাহেব ইংলণ্ড হইতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গবর্ণর জেনেরলের কাৰ্য্য গ্রহণ করা তাহার নিতান্ত বাসনা ছিল, কিন্তু তিনি হেষ্টিংসকে পদত্যাগে একান্ত অনিচ্ছুক দেখিয়া পরিশেষে অনিচ্ছাপূৰ্ব্বক কাউন্সেলের মেম্বর হই- লেন। ইহাতে হেষ্টিংসের কাউন্সেলে প্রভুত্ব করিবার কোন প্রতি বন্ধক ঘটিল না, বারওয়েলের সাহায্যে তখন পর্যন্ত কাউন্সেলে তাহার-প্রভুতা ছিল। এই সময়ে ইংলণ্ডে ডিরেক্টরদিগের অন্তঃক- রণ পরিবর্তিত হয়। তাহারা হেষ্টিংসের প্রতিকূলে যে সকল কাৰ্য্য করিবার সংঙ্কল্প করিয়াছিলেন, তাহা পরিত্যাগ করিলেন ও তাঁহার কাৰ্য্য করিবার নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হইয়া আসিলে পুনরায় কঁহাকে গবর্ণর জেনেলের পদে নিয়ােজিত করেন। ইহার প্রকৃত কারণ এই, তৎকালে ইংলণ্ডের শাসন কার্যে অতিশয় বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছিল, তাহাতে আবার আমেরিকার সহিত ইংলণ্ডের ঘােরতর যুদ্ধ চলিতেছিল এবং ফরাশী প্রভৃতি অপরাপর ইউরােপীয় শত্রুগণের সহিত যুদ্ধ ঘটিবারও সম্পূর্ণ লক্ষণ দৃষ্ট হইতেছিল। পাছে এই সুযোগে ইউরােপীয় শত্রুগণ ভারতবর্ষীয় কোন রাজার সহিত মিত্ৰতা করিয়া ভারতরাজ্য আক্রমণ করেন, ডিরেক্টর ও রাজমন্ত্রিগণ এই আশঙ্কা করিয়া হেষ্টিংসকে স্বপদে নিযুক্ত রাখিতে যত্নযুক্ত হন। তাহারা বিলক্ষণ জানিতেন, হেষ্টিংসের যত কেন দোষ থাকুক না, বিপক্ষেরাও তাঁহার বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায় গুণের অপলাপ করিতে পারেন না।

ওয়ারেণ হেষ্টিংস। ৪৯ হেষ্টিংস পুৰ্ব্বাবধিই মনেমনে ভাবিতে ভাবিতে মহারাষ্টীয়দিগের হইতে রাজ্যের অনেক অনিষ্ট ঘটিতে ঘটিতে পারে। মহারাষ্টীয়ের যেরূপে আধিপত্য বিস্তার করেন, তাহাতে হেষ্টিংসের অন্তঃকরণে ঐরূপ আশঙ্কা হওয়া অসঙ্গত বােধ হয় না। দক্ষিণ ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলে দূরবিস্তীর্ণ পৰ্বতশ্রেণীই মহারাষ্ট্রজাতির আদিম বাসস্থান ছিল। উহার। আরঙ্গজীবের রাজত্ব সময়ে সন্নিহিত জন- পদে নামিয়া লুণ্ঠন করিতে আরম্ভ করে। সুপ্রসিদ্ধ শিবজী উহাদের অধিনায়ক হন। আরঙ্গজীবের মৃত্যুর পরে তদীয় উত্তরাধিকারি- গণের ভগ্ন দশায় যাহারা স্বাধীন রাজা বলিয়া আত্ম পরিচয় প্রদান করেন, তন্মধ্যে মহারাষ্ট্ৰীয়েরা অল্পকাল মধ্যে সাহস, অত্যাচার ও চাতুৰ্য্য নিবন্ধন সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রবল হইয়া উঠে। উহারা প্রথমত দস্য ছিল, কিন্তু শীঘ্রই জেতৃপদে অধিরূঢ় হয়, সাম্রাজ্যের প্রায় অন্ধভাগ মহারাষ্ট্রীয়রাজ্য হইয়া উঠে। দয়া নীচকুলে জন্মিয়া ও নীচকৰ্ম্মে অভ্যস্ত হইয়াও পরাক্রান্ত রাজা হইয়াছিল। উহাদের মধ্যে এক দল দর সরদার ভরা বিরারের রাজা হন। পশু- জীবি গুইকোওয়ার গুজরাটে রাজত্ব স্থাপন করেন, তাহার পরিবা- রে অদ্যাপিও তথায় রাজত্ব করিতেছেন। সিন্ধিয়া ও হােলকার মালব প্রদেশে প্রধান হইয়া উঠেন। যদিও মহারাষ্ট্রীয়রাজ্য সকল পরস্পর বস্তুতঃ স্বাধীন ছিল, তথাপি মহারাষ্ট্রীয়েরা ঐ সকল এক * সাম্রাজ্যের অঙ্গভূত বলিয়া পরিচয় দিত ও উহারা সকলে শিবজীর উত্তরাধিকারীকে সমুদায় রাজ্যের অধীশ্বর বলিয়া স্বীকার করিত ; কিন্তু শিবজীর উত্তরাধিকারী নামমাত্র অধীশ্বর ছিলেন। তিনি পিতারনগরে নজরবন্দী-ভাবে থাকিতেন ও ভাঙ খাইয়া এবং নর্তকীদিগের সহিত আমােদ প্রমোদ করিয়া কালাতিপাত করিতেন। তাহার অমাত্যকে পেশােয়া কহিত। পেশােয়াও একজন মহারা- স্ত্রীয় প্রধান ছিলেন ও শিবজীৱবংশে তঁাহার অমাত্য পদ কৌশিক ছিল। তিনি পুনানগর রাজধানী করেন; বায়ত আরঙ্গাবাদ ও বিজাপুর প্রদেশেও তঁাহার আধিপত্য অঙ্গীকৃত হয়। ৭ ৫০ লঘু চরিতমঞ্জরী। ইউরােপে ফরশিদের সহিত যুদ্ধ ঘটিবার কতিপয় মাস পূর্বে বাঙ্গালা দেশে সংবাদ আসিল, যে একজন সাহসী ফরাশি পুনা- নগরে আসিয়া ফালাধিপতি ষােড়শ লুইর পত্র ও উপঢৌকন পেশোয়াকে সমর্পণ করিয়াছেন; ইংরাজদের বিরুদ্ধে মারহাট্টা ও ফরাশিদের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হইয়াছে। হেষ্টিংস এই সংবাদ শ্রবণে কাল বিলম্ব না করিয়া মারহাট্টাদের ক্ষমতা বিলুপ্ত করিবার উপায় দেখিতে লাগিলেন। মারহাট্টাদের মধ্যে এক ব্যক্তি আপ- নাকে পেশােয়া বলিয়া ভান করিতেন। তাঁহার পক্ষে কতকগুলি মার- হাট্টাও ছিল। হেষ্টিংস সৈন্য দিয়া ঐ কৃত্রিম পেশােয়ার সাহায্য করি- বার সঙ্কল্প করিলেন এবং বিরারাধিপতির সহিত বন্ধুতা স্থাপনে কৃত- নিশ্চয় হইলেন। বিরধিপতি ক্ষমতা বিষয়ে মহারাষ্ট্রীয় অপরা- পর রাজগণের অপেক্ষা কোন অংশেই নুন ছিলেন না। মহারাষ্ট্ররাজ্যে সৈন্য প্রেরিত হইল এবং বিরারাধিপতির সহিত সন্ধি বিষয়ক কথােপকথনও চলিতে লাগিল। কিন্তু সেনাপতির দীর্ঘসূত্রতা ও বােম্বের কর্তৃপক্ষের অনবধানতা দোষে হেষ্টিংস আপনার উদ্দেশ্য সাধনে কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলেন না; কিন্তু কৃতকার্য হইতে না পারিয়া ভগ্নোৎসাহও হইলেন না। বােধহয়, যদি একটা ভয়ঙ্কর বিপদ উপস্থিত হইয়া তাহার সমুদায় শাসনকৌ- শল পরিবর্তিত না করিত, তাহা হইলে তিনি মারহাট্টাদের ক্ষমতা বিলােপের জন্য যে উপায় উদ্ভাবন করিয়াছিলেন, তাহাতে সম্পূর্ণ রূপেই কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিতেন। ইংলণ্ডের • কর্তৃপক্ষীয়েরা কুট নামক একজন সুপ্রসিদ্ধ সৈনিক পুরুষকে বুদ্ধিপূৰ্ব্বক সেনাপতি ও কৌন্সেলের মেম্বর নিযুক্ত করিয়া বাঙ্গালা দেশে পাঠাইয়াছিলেন। কূট অনেক বৎসর পূর্বে পলাশির যুদ্ধে প্রচুর বীরতা ও অধ্যবসায় প্রকাশ করেন। তদনন্তর দক্ষিণ- ভারতবর্ষের যুদ্ধে ফরাশিসেনানায়ক নালীকে পরাস্ত করিয়া পঙুিচারী অধিকার করিয়া লন এবং কর্ণাট রাজ্যে বৃটিশ আধিপত্য স্থাপন করেন। এই সকল বীরােচিত কাৰ্য্য করিবার পরে প্রায় ওয়ারেন হেষ্টিংস। ৫১ বিংশতি বৎসর অতীত হইয়াছিল, সুতরাং এক্ষ কূট প্রথমাবস্থার ন্যায় শ্রমসাধ্য কাৰ্য্য করিতে পারিতেন না, কিন্তু তখন পর্যন্ত তাহার অন্তঃকরণ সতেজ ছিল! এস্থলে ইহাও উল্লেখ করা আব- শ্যক বােধ হইতেছে, যে কূট অতিশয় ধনলােভী ছিলেন, ধনতৃষ্ণা চরিতার্থ করা তঁাহার যেরূপ উদ্দেশ্য ছিল, কর্তব্য সম্পাদন করা সেরূপ ছিল না। যদিও কূটের ন্যায় উচ্চপদস্থ ব্যক্তির এবম্প্রকার দোষ সামান্য বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে না, কিন্তু তথাপি তৎকালে বােধ হয়, বৃটিশসৈন্যমধ্যে তাঁহার ন্যায় উপযুক্ত ও অভিজ্ঞ কর্মচারী আর কেহই ছিলেন না। কূট কৌন্সেলে হেষ্টিং- সের স্বপক্ষ ছিলেন ও নিরন্তর তাহারই মতের পােষকতা করতেন। গবর্ণর জেনেবল ও প্রচুর ভাতা দিয়া ঐ বৃদ্ধ সৈনিক পুরুষের বলবতী ধনতৃষ্ণা চরিতার্থ করেন। এই সময়ে কোন যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল না বটে, কিন্তু যুদ্ধ অপেক্ষাও ভয়ঙ্কর একটী আভ্যন্তরিক বিপদে পতিত হইয়া রাজ্য উৎপন্নপ্রায় হয়। পালিয়ামেন্ট সভা কলিকাতায় সুপ্রীমকোর্ট নামক বিচারালয় স্থাপন করিবার সময়ে উহার একটী ক্ষমতা নির্দিষ্ট করিয়া দেন নাই। ইহাতে এই ফল দর্শে, যে উক্ত কোর্টের বিচারপতিরা সমুদায় রাজ্য মধ্যে আপনাদের একাধিপত্য বিস্তার করিতে আরম্ভ করেন। সুপ্রীম- কৌন্সেলের ক্ষমতা বিলুপ্তপ্রায় হইয়া যায়, শাসনকার্য অস্তমিত হয়, ও প্রকৃতিপুঞ্জের যে কতদূর অনিষ্ট ঘটে, তাহা বর্ণনা করিয়া শেষ করিতে পারা যায় না। হেষ্টিংস সুপ্রীমকোর্টের অন্যায় দাওয়া ও ঘোরতর অত্যাচার নিবারণের যে একটা সহজ উপায় উদ্ভাবন করেন, তাহা উৎকোচ প্রদান অপেক্ষা প্রশংসনীয় নহে নিন্দনীয়ও নহে। সর, ইলিজা ইম্পে পালিয়ামেন্টের বিধানানুসারে বাৎসরিক অশীতি সহস্র টাকা বেতনে সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তাহার সহিত কোম্পানির গবর্ণমেন্টের কোন সংস্রব ছিল না, তিনি সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ইংলণ্ডেশ্বরেরই অধীন ছিলেন। হেষ্টিংস ইম্পের স্বভাব বিশেষরূপে জানিতেন, তিনি ৫২ লঘু চরিতমঞ্জরী। তঁাহাকে কোম্পানি অধীনেও বিচারপতি নিযুক্ত করিবার ও তদু- পলক্ষে বাৎসরিক আর অশীতি সহস্র টাকা বেতন দিবার প্রস্তাব করিলেন। ইম্পে অতিশয় ধনলােভী ছিলেন, তিনি অধিকতর অর্থ- লােভে আকৃষ্ট হইয়া কোম্পানির অধীনে সদর দেওয়ানী আদা- লতেও বিচারপতি হইলেন। সুপ্রীমকোর্টের দাওয়া অন্তর্হিত হইয়া গেল, রাজ্য রক্ষিত হইল, প্রধান বিচারপতি বঙ্গ মানুষ ও শান্ত হইলেন, কিন্তু তিনি দুর্নাম হইতে পরিত্রাণ পাইলেন না। অনেকে বলেন, হেষ্টিংস ইংলণ্ডেশ্বরের নিযুক্ত জজ ইম্পেকে কোম্পানির অধীনে আনয়ন করিয়া উত্তম কাৰ্য করেন নাই, কিন্তু পূৰ্ব্বাপর বিবেচনা করিয়া দেখিলে তাহাদের এ সিদ্ধান্ত কোন মতেই যুক্তিযুক্ত বােধ হয় না। ইম্পে অতিশয় অধাৰ্মিক ও অর্থ- লােভী ছিলেন। ইংলণ্ডেশ্বরের ভৃত্য হইয়া, কোম্পানির কাৰ্য গ্রহণ করিলে যে স্বপদের অবমাননা করা হয়, তাহা তাহার অন্ত:- করণে উদিত হইবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। পালিয়ামেন্টের এই একটী দোষ দৃষ্ট হইতেছে, যে সুপ্রীমকোর্ট স্থাপন করিবার সময়ে উহার একটী ক্ষমতা নির্দিষ্ট করিয়া দেন নাই। প্রধান বিচারপতি ইম্পে অধিকতর বেতন না পাইলে সুপ্রীমকোর্টের সেই অনির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রচার করিবার সঙ্কল্প করিলেন। হেষ্টিংস দেখি- লেন, বেতন বৃদ্ধি করিয়া ইম্পেকে কোম্পানির কাৰ্যে আনয়ন না করিলে রাজ্য রক্ষার উপায় নাই, সুতরাং তাহাকে ঐ উপায় অব লম্বন করিতে হইল। অতএব এবিষয়ে হেষ্টিংসের কোন প্রকার নিন্দা অর্শিতে পারে না, বরং তিনি প্রতিষ্ঠা লাভই করিতে পারেন। সুযােগ পাইলে সমুদ্র মধ্যে পথিককে আক্রমণ করা জলদস্যুর স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম, কিন্তু যদি কেহ নিছুর দিয়া জলদস্যুর হস্ত হইতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিত্রাণ করেন, তাহা হইলে কি নিয় দাতা জল- দস্যুর ধৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি দূষিত করিলেন বলিয়া নিন্দাভাজন হইবেন, না হতভাগ্য বন্দীকে জলদসু্যর হস্ত হইতে মুক্ত করিলেন বলিয়া সুখ্যাতি লাভ করিবেন ?

ওয়ারেণ হেষ্টিংস। ৫৩ মহারাষ্ট্ৰীয়েরই হেষ্টিংসের ভয়ের বিষয় ছিলেন। হেষ্টিংস উহাদের ক্ষমতা বিলুপ্ত করিবার জন্য যে উপায় উদ্ভাবন করেন, কৰ্ম্ম- চারিগণের দোষই প্রথমতঃ তাহার সেই উপায় সিদ্ধির অন্তরায় হইয়াছিল, কিন্তু হেষ্টিংস ভগ্নোৎসাহ না হইয়া সেই উপায়ের অনুসরণ করিতেছিলেন, এমত সময়ে মহীসুরের মুসলমান রাজ্যের স্থাপয়িতা হাইদৰআলির সহিত ভয়ানক সংগ্রাম উপস্থিত হওয়াতে ইংরাজেরা ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়েন ও যে কোনরূপে হউক, মহারাষ্ট্রীয় রাজগণের সহিত সত্বর সন্ধি স্থাপন করা আবশ্যক বােৰ করেন। হেষ্টিংস ১৭৮১ খ্ৰীঃ অব্দেমােল লক্ষ টাকা দিয়া বিরারপতির সহিত মিত্ৰতা সূত্রে বদ্ধ হন ও সিন্ধিয়ার সহিতও সন্ধি স্থাপিত হয়। হাইদৰ আলির সহিত ইংরাজদের সংগ্রাম বর্ণনা করিবার পূর্বে হাইদরের অভ্যুত্থান বিষয়ে সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ বলা আবশ্যক বােধ হইতেছে। হাইদর আদৌ একজন মুসলমান সেনা ছিলেন। তিনি প্রায় এই সময়ের ত্রিশ বৎসর পূর্বে দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধে দৈনিক কার্যে ব্রতী হইয়া খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভ করিতে আরম্ভ হাইদৰআলি লেখাপড়া কিছুই জানিতেন না, তিনি নীচবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা রাজস্ব সংক্রান্ত একজন সামান্য কর্মচারী ছিলেন। তাঁহার পিতামহ ফকীরের বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেন। হাইদর যদিও নীচ বংশস- ভুত ও বর্ণজ্ঞান-বিহীন ছিলেন, তথাপি একদল সেনার অধিনায়ক হইয়াই জয়শীল সেনাপতি বলিয়া বিখ্যাত হইলেন। যে সকল প্রধান প্রধান ব্যক্তি তৎকালে রাজত্ব লইয়া পরস্পর বিবাদ করিতে- ছিলেন, তাহাদের মধ্যে কেহই হইদরের ন্যায় যুদ্ধৰিশারদ অথবা রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন না। সাধারণ বিবাদের সময়ে যে সকল পুরা- তন রাজ্য বিনষ্ট হইয়া যায়, সেই সকলের ধ্বংসাবশেষ হইতে মহা- মতি হাইদৰ মহীনুর, প্রদেশে একটি পরাক্রান্ত সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। হাইদৰ আমােদপ্রিয় ও ভােগাসক্ত ছিলেন বটে, কিন্তু বিলক্ষণ বুঝিতেন, প্রকৃতিকুল অনুরক্ত হইলেই রাজ্য চিরস্থায়ী করেন। ।

৫৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। হয়। তিনি যদিও অত্যাচারী ছিলেন, কিন্তু রাজ্যমধ্যে অন্য কাহা- কেও অত্যাচার করতে দিতেন না। হাইদর এক্ষণে বৃন্ধ হইয়া- ছিলেন, কিন্তু যৌবকালের ন্যায় তাহার বুদ্ধিশক্তি পরিষ্কৃত ও অন্ত করণ উৎসাহ পূর্ণ ছিল। ভারতবর্ষে হাইদরের ন্যায় ইংরাজদের প্রবল শক্ত আর কেহই ছিনেন না। দক্ষিণ ভারতবর্ষের ইংরাজেরা পূৰ্ব্বাপর বিবেচনা না করিয়া হাই- দরের বৈরভাব উদ্দীপন করেন। ইহাতে নব্বই হাজার সেনা মহী- সুরের অধিত্যকা হইতে নামিয়া সহসা কর্ণাটরাজ্যে প্রবিষ্ট হয়। হাইদরের একেত এই অসংখ্য সেনা, তাহাতে আবার ইউরােপের উৎকৃষ্ট সৈনিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিত ফরাশি কর্মচারীরাই উহাদের অধিনায়ক হইয়াছিলেন। হাইদর সর্বত্রই জয়লাভ করিতে লাগি লেন। বৃটিশদুর্গ-রক্ষী সিপাইরা অস্ত্রশস্ত্র পরিত্যাগ করিল। উহার কতকগুলি দুর্গ রক্ষা করিবার উপায় না দেখিয়া ও কতকগুলি দুর্গ বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া হাইদরকে সমর্পণ করিল। কতিপয় দিব- সের মধ্যেই কোলরূণ নদীর উত্তর দিক স্থিত সমুদায় দেশ হাইদরের হস্তগত হইল। মান্দ্রাজের ইংরাজ অধিবাসীরা ইতিপূর্বেই সেন্টট- মাস পর্বতের উপর হইতে রাত্রিকালে অগ্নিশিখায় গগনমণ্ডল লােহিত বর্ণ দেখিয়া জানিতে পারিয়াছিলেন, যে আমাদের কপাল ভাঙ্গিয়াঙ্গে, গ্রাম সকল দগ্ধ ও ভস্মীভূত হইতেছে। আমাদের দেশীয়লােকেরা বাণিজ্য ও রাজকার্য সমাপন পূর্বক দিবাবসানে যে সকল গ্রামে যাইয়া বঙ্গোপসাগরের শীতল সমীরণ সেবন করিয়া থাকেন, এক্ষণে সে সকল গ্রাম জনশূন্য মরুভূমি হইল। ফলতঃ মাজবাসী ইংরাজেরা হাইদরের প্রভাব ও জয়লাভ দেখিয়া এরূপ ভীত হইয়াছিলেন, যে মাদ্ৰাজনগরেও অবস্থিতি করা আশঙ্কার বিষয় মনে করিলেন ও সত্বর হইয়া সেন্ট জর্জ দুর্গে আশ্রয় লইলেন। মাদ্রাজে এর হেক্টর মরাের অধীনে অনেক সেনা ছিল এবং বেলি নামক আর একজন সেনাপতিও বহুল সেনা সমভিব্যাহারে অগ্রসর হইতেছিলেন। তাহারা উভয়ে মিলিত হইলে হাইদরকে ওয়ারেন হেষ্টিংস। ৫৫ দুরীকৃত করিতে নাই পারুন, অন্ততঃ মান্দ্রা প্রেসিডেন্সি রক্ষা করিতে পারিতেন, কিন্তু তাহারা মিলিত হইলেন না, সুতরাং পৃথক ভাবে আক্রান্ত হইলেন। বেলির সেনাদল নিহত হইল, মরে সমুদায় দ্রব্য সামগ্রী পরিত্যাগ করিয়া ও সমুদায় কামান সন্নিহিত পুষ্করিণীতে ফেলিয়া দিয়া পলায়ন করিলেন। হাইদরের সহিত যুদ্ধ আরম্ভ হইবার পরে তিন সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ ভারতবর্ষের বৃটিশ রাজ্য উৎপন্নপ্রায় হইল, কেবল কয়েকটি মাত্র রক্ষিত স্থান ইংরাজদের হস্তগত থাকিল। এই সময়ে বিদিত হইল, অল্পকাল মধ্যে করমণ্ডল উপকূলে বহুল ফরাশি সেনার পৌছিবার সম্ভাবনা আছে এবং ইংলও চতুর্দিকে শত্রুমণ্ডলী পরিবেষ্টিত হইয়াছে, অতএব এই দূরবর্তী রাজ্যের ব্ৰক্ষাৰ্থ তথা হইতে যে সৈন্ত আসিবে, তাহারও কোন সম্ভাবনা ছিল না। এক্ষণে হেষ্টিংসের তেজস্বিনী বুদ্ধিশক্তি ও অটল সাহসই ইংরাজদের জয়লাভের সাধক হইল। দক্ষিণ ভারতবর্ষের দুর্ঘটনার সংবাদ কলিকাতায় পৌছিলে, হেষ্টিংস কৌন্সেলে প্রস্তাব করিলেন, মান্দ্রাজে অনতিবিলম্বেই প্রচুর অর্থ ও প্রভূত সৈন্য পাঠাইতে হই- বেক এবং যুদ্ধের ভার একজন উপযুক্ত ব্যক্তির প্রতিই অর্পণ করা আবশ্যক, নতুবা সমুদায় যত্নই বিফল হইয়া যাইবে। মান্দ্রাজের গব- “র অযােগ্য, তিনি সস্পেণ্ড থাকিবেন। যুদ্ধের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিয়া জেনরেল কুটকে পাঠাইতে হইবে। কৌন্সেলের অধিকাংশ মেম্বর হেষ্টিংসকৃত এই প্রস্তাবের পােষক হইলেন। কুট সসৈন্যে হাইদ রের বিরুদ্ধে যাত্রা করিলেন ও ফরাশিদের রণতরি ভারতসাগরে পৌছিবার পূর্বে মান্দ্রাজে গিয়া উপনীত হইলেন। কুট, যদিও বৃদ্ধ ও নােগাভিভূত হইয়াছিলেন, তথাপি যুদ্ধে স্থিরপ্রতিজ্ঞ ও সেনা- পতির-কার্যে বিলক্ষণ নিপুণ ছিলেন। তিনি কতিপয় মাসের মধ্যে পাের্ট নভােনামক বন্দরের যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া ইংরাজদের বিলুপ্ত যশােরাশি উদ্ধার করেন। ইত্যবসরে কোন্দলের অন্যতম মেম্বর ফান্সি, ইংলণ্ডে প্রতি • এ ৫৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। গমন করিলেন, বেলার ক্রমশঃ গবর্ণর জেনেলের পক্ষ হই লেন। হেষ্টিংস এক্ষণে কৌন্সেলে পরস্পরের অনৈক্য নিবন্ধন কষ্ট হইতে পরিত্রাণ পাইলেন বটে, কিন্তু তাহাকে তদপেক্ষা ভয়- কর আর একটি কষ্টে পতিত হইতে হইল। রাজকোষ ধনশূন্য হই- য়াছিল। গবর্ণর জেনেলের, যে কেবল বাঙ্গালার শাসনকার্য নিৰ্বাহ করিবার জন্য এমত নহে, কর্ণাট রাজ্যে ইউরােপীয় ও ভারত- বর্ষীয় শত্রুগণের সহিত যুদ্ধ চালাইবার নিমিত্তও, প্রচুর অর্থের প্রয়ােজন হইয়া উঠিল। এতদ্ব্যতীত তাহাকে ইংলণ্ডেও টাকা পাঠাইবার উপায় দেখিতে হইল। হেষ্টিংস কতিপয় বৎসর পূর্বে বৎসর পূর্বে মােগল সম্রাটের সর্বস্ব অপহ- রণ ও রােহিলাদিগকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্ধন করিয়া কোম্পানির শূন্য- ধনাগর পূর্ণ করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি এবার প্রথমত: বারাণসী- রাজকেই লক্ষ্য করিলেন। পূৰ্বে আসিয়া খণ্ডে বারাণসীর তুল্য সমৃদ্ধিশালী, পবিত্র ও প্রজাপূর্ণ নগরী সচরাচর নয়নােচর হইত না। বহুকালাবধি এক জন হিন্দু ভূপতি দিলীপতির অধীনে থাকিয়া এই নগরীর শাসন করিতেন। তৎপরে মােগল সম্রাটগণের ভগ্নদশায় বারাণসীর অধীশ্বরেরা দিল্লীর অধীনতা পরিত্যাগ করেন, কিন্তু তাঁহাদিগকে অযােধ্যাধিপতির অধীনতা স্বীকার করিতে হয়। তাঁহারা অযযা- ধ্যাধিপতির অত্যাচারে নির্ভর নিপীড়িত হইয়া ইংরাজদের শরণাগত হন। ইংরাজেরা সৈন্য দিয়া তাহাদের সাহায্য করেন। অযযা- ধ্যাধিপতি ইংরাজদের বিপক্ষে অন্ত্র ধারণ করিয়া কৃতকার্য হওয়া অসাধ্য বিবেচনায় বারাণসী রাজ্য ইংরাজদিগকে সমর্পণ করিলেন। তদবধি বারাণসীরাজ বঙ্গদেশীয় গবর্ণমেন্টের করতলস্থ হন ও কলিকা- তায় বাৎসরিক কর প্রেরণ করিবার অঙ্গীকার করেন। হেষ্টিংসের অধিকার কালে চেতসিংহ কাশী রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন। তিনি নিয়মিত রূপে কোম্পানিকে কর প্রদান করিতেন। ১৭৭৮ খ্রীঃ অব্দে ইউরোপে ফরাশিদিগের সহিত ইংরজদের ওয়ারেণ হেষ্টিংস। যুদ্ধ আরম্ভ হইবার পর হেষ্টিংস চেতসিংহের নিকুটে নিয়মিত কর ব্যতীত পাঁচ লক্ষ টাকা চাহিয়া পাঠাইলেন। চেতসিংহ প্রথমবারে কোন আপত্তি না করিয়া ১৭৭৯ খ্ৰীঃ অব্দে সমুদায় টাকা প্রদান করেন। ইহার পর বৎসর হেষ্টিংস চেতসিংহের নিকটে পুনরায় ঐরূপ অতিরিক্ত টাকা দাওয়া করিয়া পাঠালেন। চেত সিংহ কিঞ্চিৎ রেহাই পাইবার মানসে গবর্ণর জেনেবলকে গােপনে দুই লক্ষ টাকা উৎকোচ প্রদানের প্রস্তাব করেন। হেষ্টিংস তদনুসারে ঐ টাকা গ্রহণ করিলেন বটে, কিন্তু গােপন করিয়া রাখিলেন ও কিছু কাল পরে উহা কোম্পানির ধনাগারে পাঠাইয়া দিলেন। তাহার শত্রুরা বলেন, “ ঐ টাকা আত্মসাৎ করা হেষ্টিংসের উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু পাছে ধরা পড়েন, এই আশঙ্কায় পরিশেষে উহা কোম্পানির ধনা- গারে পাঠাইয়া দেন। তাহাদের এই নির্দেশ নিতান্ত অমূলক বােধ হয় না। সে যাহা হউক, হেষ্টিংস ঐ টাকা কোম্পানির ধনাগারে পাঠাইবার পরে পুনরায় চেত সিংহের নিকট পূর্ববৎ অতিরিক্ত টাকা দশওয়া করিলেন। রাজা প্রথমতঃ আপনার নিঃস্বতা জ্ঞাপন করিলেন, কিন্তু হেষ্টিংস ছাড়িবার পাত্র ছিলেন না, পরন্তু টাকা পাঠাইতে বিলম্ব হইয়াছে বলিয়া লক্ষ টাকা জরিমানা করিলেন এবং ঐ টাকা আদায় করিবার জন্য সৈন্য পাঠাইয়া দিলেন। চেতসিংহ অনন্যোপায় হইয়া উক্ত সমুদায় টাকা প্রদান করিলেন, কিন্তু তাহ- তেও হেষ্টিংসের দাওয়া গেল না। দক্ষিণ ভারতবর্ষে যুদ্ধ উপস্থিত হওয়াতে কোম্পানির অনেক অর্থ নিকাশিত হয়, তাহাতে অতিশয় অর্থচ্ছ হইয়া উঠে। হেষ্টিংস এই কষ্ট নিবারণের উপায়ান্তর না দেখিয়া চেত সিংহের যথাসর্বস্ব হরণ করিবার সংকল্প করি- লেন। কোম্পানির সহিত বারণসীরাজের সন্ধি ছিল। সন্ধি সত্বে তাহাকে আক্রমণ করিতে পারেন না, এ জন্য তিনি কোন বিবাদ উত্থাপন করিয়া আপনার ঐ দুরভিসন্ধি সিদ্ধ করিতে চেষ্টাবান হইলেন। তাহার ঐ চেষ্টা সত্বর সফল হওয়াও দুরূহ হইল না। তিনি বারাণসীরাজের নিকট উত্তরােত্তর অধিকতর টাকা দাওয়া ৫৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। * করিতে লাগিলো। অকারণে বারংবার অধিকতর অর্থ প্রদান করিতে হইলে দাতার অন্তঃকরণে স্বভারত: বিরক্তি জন্মে, চেতসিংহ অর্থ প্রদান অস্বীকার করিলেন। হেষ্টিংস ইহাকেই দোষ গণনা করিয়া লইলেন ও চেতসিংহের সমুদায় রাজ্য রাজেয়াপ্ত করাই ঐ দোষের উপযুক্ত দণ্ড স্থির করিলেন। চেতসিংহ ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন এরং গবর্ণরজেনেলকে বিশ লক্ষ টাকা প্রদানের প্রস্তাব করিলেন, কিন্তু হেষ্টিংস এই উত্তর লিখিলেন, যে তিনি পঞ্চাশ লক্ষ টাকার ঋন কোন মতেই লইবেন না। ফলতঃ এক্ষণে বারণসীরাজ্য বিক্রয় করিয়া অর্থ সংগ্রহ করাই হেষ্টিংসের উদ্দেশ্য হইল, তিনি বারাণসী যাত্রা করিলেন। হেষ্টিংস আসিতেছেন শুনিয়া চেতসিংহ প্রায় ত্রিশক্রোশ দূরে স্থিত বক্সরে যাইয়া ভঁহার প্রত্যুদগমন করিলেন ও তাহাকে সঙ্গে করিয়া নিজ রাজধানীতে লইয়া গেলেন। হেষ্টিংস বারাণসীতে পৌছিয়া টাকার দাওয়া করিয়া রাজাকে একখানি পত্র লিখিলেন। রাজা পত্রের উত্তরে নানাপ্রকার ওজর করিলেন। হেষ্টিংসের * রুধির লইয়া কাজ ওজর শুনিবেন কেন? তিনি কাল বিলম্ব না করিয়া রাজাকে ধৃত করিতে আদেশ দিলেন। আদেশ দিলেন। তদনুসারে বারাণসীর বৃটিশ এজেন্ট দুই দল সেনা লইয়া রাজাকে ধৃত করিলেন। এই সংবাদ সমুদায় নগর মধ্যে প্রচারিত হইতে না হইতেই চতুর্দিকে মহা মহা কোলাহল উপস্থিত হইল, রাজপথ লােকা রণ্য হইয়া উঠিল, অন্যের কথা দূরে থাকুক, দণ্ডী ও সন্ন্যাসী প্রভৃতি। রাও অস্ত্র ধারণ করিলেন। রাজা তখন পর্যন্ত স্থানান্তরিত হন নাই, কিন্তু তাহার নিকটে প্রহরী স্বরূপ যে দুই দল সেনা নিয়ােজিত ছিল, তাহারা নিহত হইল। হেষ্টিংস এই বিপদ দেখিয়! আর দুই দল সেনা পাঠাইয়া দিলেন, কিন্তু তাহাদিগকে রাজভবন পর্যন্ত যাইতে হইল না, তাহারা পথিমধ্যেই নিহত হইল। চেতসিংহ এই গােলযােগের সময় পলাইয়া গঙ্গার অপর পারে রামনগরে আশ্রয় লইলেন। .

ওয়ারেণ হেষ্টিংস। চেতসিংহ রামনগরে পৌছিয়া ক্ষমা প্রার্থনা পূর্বক ক গবর্ণর জেনে- বলকে পত্র লিখিলেন এবং প্রচুর অর্থ প্রদানেরও প্রস্তাব করিলেন, কিন্তু হেষ্টিংস তাহার প্রস্তাবে কর্ণপাত করিলেন না। তিনি যদিও ঘােতর সংকটে পড়িয়াছিলেন, তথাপি ভগ্নোৎসাহ হইবার পাত্র ছিলেন না। তিনি অবিলম্বে দূত প্রেরণ করিয়া সুপ্রীমকোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি ইম্পেকে এই দুর্ঘটনার সংবাদ জানাই। লেন। ইম্পে হেষ্টিংসের পরম বন্ধু, তিনি ঐ দিবস বারাণসীর সন্নিধানে ছিলেন। তিনি এই অসম্ভাবিত দুর্ঘটনার সংবাদ শ্রবণে উদেবাগী হইয়া কতকগুলি সেনা সংগ্রহ করিয়া পাঠাইয়া দিলেন পর দিবস মৃজাপুর হইতে চারি শত সেনা আসিয়া উপস্থিত হইল। উহাদের অধিনায়ক পূৰ্ব্বাপর বিবেচনা না করিয়া রামন- গর আক্রমণ ও অধিকার করিবার মানসে বেলা দুই প্রহরের পর যাত্রা করিলেন, কিন্তু পথিমধ্যে বিদ্রোহীরা তাহাকে আক্রমণ করিল। এই আক্রমণে তিনি স্বয়ং নিহত হইলেন ও তাহার পক্ষীয় বিস্তর সেনাও হতাহত হইল। বিদ্রোহীরা জয় লাভে আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল। হেষ্টিংস অনন্যোপায় হইয়া রাত্রি কালে পলায়ন করিলেন। বিদ্রোহীরা তাহাকে পলাইতে দেখিয়া জয় ধ্বনি করিয়া উঠিল ও উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিল,-- “হাতীপর হাওদা, ঘােড়ে পর জীন, জলদি যাও, জলদি যাও, ওয়ারেন হেষ্টি” হেষ্টিংসকে পলাইয়া অধিক দূর যাইতে হইল না। তিনি রাত্রি প্রভাত হইবার পূর্বে নিরাপদে চুনারে গিয়া উপনীত হইলেন ও কাল বিলম্ব না করিয়া সেনা সংগ্রহ করিলেন এবং মেজর পহেমকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া বারাণসীতে পাঠাইয়া দিলেন। উক্ত সেনাপতি বারাণসীতে পৌছিয়া অচিরকাল মধ্যে কাৰ্য্য সমাধা করিয়া তুলিলেন। বিদ্রোহীরা পরাস্ত ও রামনগর হস্তগত হইল। হত- ভাগ্য রাজা চেতসিংহ, জন্মের মত দেশত্যাগী হইলেন। তাঁহার সমুদায় রাজ্য বৃটিশ অধিকার-ভুক্ত হইল। তাহার ভ্রাতৃপুত্ৰ সিংহ- লঘু চরিতমঞ্জরী। সনে অধিরূঢ় হইকেন। কিন্তু তঁাহার আর কোন ক্ষমতা রহিল না। হেষ্টিংস রাজ্যের সমুদায় কার্যভার স্বহস্তে গ্রহণ করিলেন। ফলতঃ তদবধি বারাণসীরাজ বাঙ্গালার নবাবের ন্যায় কেবল বৃত্তিভােগী হইলেন। হেষ্টিংস এইরূপে বারাণসী কোম্পানির অধিকার ভুক্ত করিয়া বাৎসরিক প্রায় বিশ লক্ষ টাকা আয় বৃদ্ধি করিলেন বটে, কিন্তু তাহাতেও উপস্থিত অর্থ কৃচ্ছের বিশেষ প্রতিবিধান করিতে পারিলেন না। তাঁহার প্রত্যাশা ছিল, চেত সিংহের ধনাগারে কোটী টাকা পাওয়া যাইবে, কিন্তু ধনাগার মধ্যে পচিশ লক্ষ টাকার অধিক দৃষ্ট হইল না; সুবিখ্যাত লর্ড মেকলে বলেন, সেনারা ঐ টাকা যুদ্ধে হৃত দ্রব্যের ন্যায় বণ্টন করিয়া লয়, কিন্তু কোন কোন ইতিহাস লেখক কহেন, ঐ টাকা সেনগণের বেতনে পর্যবসিত হয়। আমাদের বিবেচনায় এই শেষ বাক্যই যুক্তিযুক্ত বলিয়া বােধ হইতেছে। গবর্ণর চেনেলের টাকার যেরূপ অপ্রতুল হইয়াছিল, তাহাতে যে তিনি পঁচিশ লক্ষ টাকা যুদ্ধে হতদ্রব্য স্বরূপ সেনাগণকে প্রদান করিবেন, ইহা সম্ভাবিত বােধ হয় না। হেষ্টিংস বারাণসী রাজ্যে অভীষ্ট লাভে অকৃতকার্য হইয়া অযােধ্যার প্রতি লক্ষ্য করিলেন। অযােধ্যার তদানীন্তর নবাব আসফ দৌলা অতিশয় হীনপ্ৰতাপ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ ছিলেন। তিনি সর্বদাই রাজ্যমধ্যে ঘোরতর অত্যাচার করিতেন। ইহাতে তিনি প্রকৃতিপুঞ্জের একান্ত অপ্রিয়পাত্র হন ও হীনপ্রতাপ বলিয়া সন্নিহিত রাজগণ তাহাকে ঘৃণা করেন। কিন্তু তাঁহার রাজ্যমধ্যে বৃটিশ সেনা নিযুক্ত থাকাতে প্রকৃতিকুল তাহার প্রতিকূলে অভ্যুত্থান করিতে পারিত না। এবং সন্নিহিত রাজগণ ও তাহাকে আক্রমণ কন্সিতে সাহসী হইতেন না। সে যাহাহউক, কিছুকাল পরে নবাব এই মর্মে গবর্নর জেনের- লকে একখানি পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন, যে আমার রাজস্বের বিস্তর ক্ষতি হইতেছে, আমার ভূতেরা রীতিমত বেতন পায় না, অতএব আমার রাজা রক্ষার জন্য সে বৃটিশ সেনা নিযুক্ত আছে, আপনি তাহা- ওয়ারেন হেষ্টিংস। ৬১ দিগকে ফিরাইয়া লউন। আমি আর তাহাদের খরচ যােগাইতে পারি না। গবর্ণর জেনের হেষ্টিংস নবাবকে এই উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন, আপনি উপযাচক হইয়া বৃটিশ গপূর্ণমেন্টের নিকটে সৈন্য চাহেন ও সৈন্যের সমুদায় ব্যয় প্রদানের অঙ্গীকার করেন। তদনু- সারে আপনার রাজ্যে সৈন্য প্রেরিত হয়। অযােধ্যায় সেনারা কতদিন থাকিবে, সন্ধিপত্রে তাহার কোন উল্লেখ নাই। অতএব আপনাকে বৃটিশসেনা নিযুক্ত রাখিতে হইবে। হেষ্টিংস আরও কহি- লেন, অযােধ্যা হইতে বৃটিশসেন। ফিরাইয়া আনিলে নিশ্চয়ই তথায় অরাজক কাণ্ড উপস্থিত হইবে এবং হয়তাে মহারা স্ত্রীয়েরা, অযােধ্যা আক্রমণ করিবে। আপনকার রাজস্বের ক্ষতি হইতেছে বটে, কিন্তু সেই ক্ষতি আপনকার অনবধানতা ও উচ্ছ ঙ্খলতা দোষে ঘটিতেছে সন্দেহ নাই। গবর্নর জেনেবল ও নবাবের কিছুকাল এই রূপ বিবাদ চলিতে ছিল। হেষ্টিংস বারাণসীর কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবার পরে লক্ষে যাইয়া নবাবের সহিত সমুদায় বিষয় মীমাংসা করিবার সংকল্প করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাকে কষ্ট স্বীকার করিয়া আর লক্ষ্ণৌ যাইতে হইল না। অযােধ্যাধিপতি স্বয়ং চুনারে আসিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। পরস্পর যথারীতি শিষ্টাচারের পর হেষ্টিংস নবাবের নিকটে প্রচুর টাকা চাহিলেন। নবাব কহিলেন, মহাশয় । অতিরিক্ত টাকা দেওয়া দূরে থাকুক, আমার নিকটে যত টাকা বাকী পড়িয়াছে, তাহাও রেহাই করিতে হইবেক। তাঁহাদের পরস্পরের এইরূপ মতভেদ হওয়াতে প্রথমতঃ বােধ হইয়াছিল, উপস্থিত বিষয় সহজে মীমাংসা হওয়া সম্ভাবিত নহে, কিন্তু পরিশেষে তাহারা এরূপ - একটি উপায় উদ্ভাবন করিলেন, যাহাতে তাহাদের উভয় পক্ষেরই সমুদায় বিবাদের মীমাংসা হইয়া গেল, কিন্তু নির্দোষ অপর এক পক্ষের সর্বনাশ ঘটিল। নবাবের মাতা ও পিতামহীর অনেক ভূমি সম্পত্তি ছিল ও তাহাদের ধনাগারে প্রচুর টাকারও অসম্ভব ছিল না। হেষ্টিংস নবাবের সহিত মিলিত হইয়া তাঁহাদের লঘু চরিতমঞ্জরী। সমুদায় সম্পত্তি অপহরণ করিবার সঙ্কল্প করিলেন, কিন্তু সহসা তাহাদের যথাসর্বস্ব অপহরণ করিতে না পারিয়া বন্ধুন্বেষণ করিতে লাগিলেন। বারাণসী রাজ্যে রাজবিপ্লব হওয়াতে অযযাধ্যা প্রদেশেও মহাগােযােগ উপস্থিত হয়। হেষ্টিংস বেগমদিগকে এই গােলযােগের হেতু বলিয়া অপরাধিনী করিলেন ও তাহাদের সমূদায় সম্পত্তি কাড়িয়া লইতে আদেশ করিয়া পাঠাইলেন। এদিকে চুনার হইতে রাজধানীতে ফিরিয়া আসিবার পরে নব- বের মন পরিবৰ্ত্ত হইল। তিনি গবর্ণর জেনেলের সহিত যে বন্দোবস্তু করিয়াছিলেন, তজ্জন্য অনুতাপ করিলেন। তাহার মাতা ও পিতামহী বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। নবাব অতিশয় অত্যাচারী ছিলেন বটে,কিন্তু তাহার অন্তঃকরণ নিতান্ত নির্দয় ছিল না। তিনি তাহাদের এই উপস্থিত বিপদ দেখিয়া শােকাকুল হইলেন এবং যিনি এত দিন পর্যন্ত হেষ্টিংসের একান্ত অনুগত ছিলেন, লক্ষে নগর স্থিত সেই ইংরাজ রেসি- ডেন্টও এই অন্যায় ব্যবহার দেখিয়া চমৎকৃত ও সঙ্কুচিত হইলেন। হেষ্টিংস দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, কাহার অনুনয় বিনয় শুনিতেন না, তিনি রেসিডেন্টকে এই মর্মে একখানি পত্র লিথিয়া পাঠাইলেন, যে আপনি অবিলম্বে আমার আদেশ প্রকৃত রূপে প্রতিপালন করিবেন, না করিলে আমি স্বয়ং যাইতেছি। রেসিডেন্ট, হেষ্টিংসের পত্রের লিখনভঙ্গী দেখিয়া ভীত হইলেন ও নবাবের নিকটে যাইয়া চুনারের বন্দোবস্ত অনুসারে কাৰ্য্য করিতে জিদ করিলেন। যদিও এক্ষণে মাতা ও পিতামহীর প্রতি বৎ ব্যবহার করা নবাবের মনােগত ছিল না, কিন্তু আবার না করিলে গবর্ণর জেনেরলের সঙ্গে অকৌশল হয়, এজন্য তিনি অত্যন্ত অনিচ্ছা পূৰ্ব্বক উহাতে সম্মত হইলেন। বেগমদিগের ভুমি সম্পত্তি অনায়াসে বাজেয়াপ্ত হইল, কিন্তু তাহাদের ধনসম্পত্তি হস্তগত করা তাদৃশ সহজ ব্যাপার ছিল না, এজন্য কোম্পানির এক দল সেনা ফয়জাবাদ জেলায় প্রেরিত হইল। সেনারা তথায় পৌছিয়া রাজবাটীর দ্বার ভাঙ্গিয়া ফেলিল ও অন্দর মহলে প্রবেশিয়া বেগমদিগকে স্ব স্ব মহলে ওয়ারেণ হেষ্টিংস। ৬৩ বন্দী করিল, কিন্তু তথাপি তাহার ধনসম্পক্তি প্রদানে সম্মত হই- লেন না। তখন তাঁহাদের সম্পত্তি অপহরণ করিবার জন্য যে একটা উপায় অবলম্বিত হয়, তাহা অতীব জঘন্য। যদিও বহুকাল হইল এই জঘন্য ব্যাপার অনুষ্ঠিত হইয়াছে, তথাপি এক্ষণে তত্তান্ত লিখিতে হইলে অন্তঃকরণ-মধ্যে যুগপৎ ঘৃণা ও লজ্জার উদয় হয়। বহুকালাবধি নবাবদিগের এই একটী রীতি ছিল, যে তাহারা অন্তঃপুর মধ্যে খােজা রক্ষক নিযুক্ত রাখিতেন। খােজারা সচরাচর নবাবগণের বিশ্বাসভাজন হইত। অযযাধ্যার ভূতপূর্ব নবাব সুজা- দ্দৌলা এই চিরন্তন প্রথানুসারে দুইজন খােজা রক্ষক অন্তঃপুরে নিযুক্ত করেন। তাঁহার মৃত্যুর পরে উহারাই বেগমদিগের সর্বময় কৰ্ত্তা হইয়া উঠে, সুতরাং উহাদের পীড়ন না করিলে অর্থনিষ্কাসন হওয়া সম্ভাবিত নহে। হেষ্টিংসের আদেশানুসারে ঐ দুই ব্যক্তি ধৃত, কারারুদ্ধ, লৌহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ ও অনাহারে মৃতপ্রায় হয়। দুই মাস ক্রমাগত কারাবাসের পর স্বাস্থ্য ভঙ্গ হওয়াতে উহার। কারাগারস্থ উদ্যানে কিয়ৎক্ষণ বেড়াইবার প্রার্থনা করে, কিন্তু যে কর্মচারীর হস্তে কারাগৃহের ভার অর্পিত ছিল, তিনি তাহাদের প্রার্থ- নায় সম্মত হইলেন না। ফলতঃ উহাদের দুঃখের লাঘবার্থ যাহা কিছু করা যাইতে পারি, তাহার কিছুই অনুষ্ঠিত হয় নাই ; প্রত্যুত অধিকতর দুঃখে নিক্ষিপ্ত করিবার জন্য উহাদিগকে লক্ষ্ণৌ নগরে প্রেরণ করা হয়। উহারা তথাকার কারাগারে রুদ্ধ থাকিয়া যে কি দুঃসহ যাতনা সহ্য করিয়াছিল, তাহা বর্ণনা করিয়া অন্যের হৃদয়ঙ্গম করা সাধ্য নহে। যে সৈনিক পুরুষের হস্তে এ কারাগারের ভার সমর্পিত ছিল, কোন বৃটিশ রেসিডেন্ট তাহাকে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন, অদ্যাপি তাহা পালিয়ামেন্ট-পুস্তকে নিবেশিত আছে। উহার মর্ম এই, মহাশয়! আপনকার অধীনে যে দুই জন বন্দী আছে, তাহাদের শারীরিক যন্ত্রণা দেওয়া নবাবের অভিমত, অতএব আপনি নবাবের কর্মচারিগণকে কারাগৃহে যাইবার ও বন্দী- গণের প্রতি যথেচ্ছ ব্যবহার করিবার অনুমতি দিবেন।

লঘু চরিতমঞ্জরী। যৎকানে লক্ষ্ণৌ নারে এই ভয়ঙ্কর নৃশংস ব্যাপার অনুষ্ঠিত হয়, বেগমেরা তখন পর্যন্ত ফয়জাবাদে বন্দীকৃত ছিলেন। কারাধ্যক্ষ তাহাদিগকে এত অল্প আহার প্রদান করিতেন, যে তাহাতে তাহা- দের সঙ্গিনীরা অনাহারে মৃত কল্প হয়। ক্রমাগত কিছুকাল এইরূপ নিষ্ঠুর ব্যবহার করিবার পরে, হেষ্টিংস গেমদিগের নিকট হইতে এক কোটী বিংশতি লক্ষ টাকা বাহির করেন। তখন তিনি বিবেচনা করিলেন, বেগমদিগের হস্তে যাহা কিছু ছিল, তৎসমুদায়ই আমার হস্তগত হইল, তবে আর তাহাদিগকে যন্ত্রণা দিবার আবশ্যকতা কি? তিনি এই বিবেচনায় লক্ষে নগরের কারাগারস্থ মৃতকল্প বন্দীদ্বয়কে ছাড়িয়া দিতে আদেশ করিলেন। তদনুসারে কারাগৃহের দ্বার উদঘাটিত ও হতভাগ্য বন্দীদ্বয়ের লৌহশৃঙ্খল উন্মুক্ত হইল। তখন শােকাবেগে উহাদের ওষ্ঠদ্বয় কম্পিত হইতে লাগিল ; চক্ষু হইতে অশ্রুধারা বহিতে লাগিল; উহার। আপনাদিগকে পুনর্জীবিত বােধে সৰ্বনিয়ন্তা জগদীশ্বরের ধন্যবাদ করিতে লাগিল। তৎকালে সেই স্থান এরূপ শশাচনীয় ভাব ধারণ করিল, যে তাহা দেখিয়া শুনিয়া, অন্যের কথা দূরে থাকুক, উপস্থিত ইংরাজ যােদ্ধা- গণের কঠোর হৃদয়ও কারুণ্যরসে দ্রবীভূত হইয়া গেল। পার্সিয়ামেন্ট সভা কিছু কাল অবধি ভারতবর্ষের কাৰ্য্য বিবরণ পৰ্যবেক্ষণে মনােনিবেশ করিয়াছিলেন। আমেরিকার যুদ্ধ পরিস- মাপ্তির পর ভারতবর্ষ সংক্রান্ত কার্য পৰ্যালােচনা করিবার জন্য দুইটি কমিটি নিযুক্ত হয়। এডমণ্ড বক এক কমিটির ও রাজমন্ত্রী উদ্ভাস, অন্য কমিটির অধ্যক্ষ ছিলেন। হেষ্টিংসের কৃত অনেক কাৰ্য, বিশেষতঃ রােহিলা যুদ্ধ অতিশয় অবৈধ বলিয়া বিবেচিত হয়। ডডাস, হেষ্টিংসকে কৰ্ম্মচ্যুত করিবার প্রস্তাব করেন, কিন্তু প্রােপ্রাইটরগণের মধ্যে সকলের মত না হওয়াতে হেষ্টিংস স্বপদেই অবস্থিত থাকেন। হেষ্টিংস এইরূপে নিয়ােগকর্তাগণের অনুগ্রহে পদস্থ থাকিয়া ১৭৮৫ খ্রীঃঅব্দ পর্যন্ত শাসন কার্য সম্পাদন করেন। অনন্তর উক্ত অজে কর্ম পরিত্যাগ করিয়া স্বদেশে ফিরিয়া যান।

ওয়ারেণ হেষ্টিংস। হেষ্টিংসের রাজ্য শাসনের প্রথম কাল যেরূপ দুর্ঘটনা-সঙ্কুল ছিল, তাহার শাসন কার্য্যের শেষভাগ সেইরূপ সৰ্ব্বথ উপদ্রব শূন্য হয়। মহারাষ্ট্রীয়দিগের সহিত কোন বিবাদ বিসম্বাদ ছিল না, প্রবল শত্রু পরলােক গমন করিয়া ছিলেন, তাহার ' পুত্র টিপু সুলতানের সহিত সন্ধি স্থাপিত হইয়াছিল, মহীসুরসেনারা কর্ণাটরাজ্য পরিত্যাগ করিয়াছিল, ইংলণ্ডেও কোন গোলযােগ ছিল না। হেষ্টিংস ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিলে পর ডিরেক্টরের তঁাহাকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করেন এবং ইংলণ্ডাধিপতিও তাঁহাকে সমাদরে পরিগ্রহ করেন। হেষ্টিংস ইংলণ্ডে এইরূপ লব্ধ প্রতিষ্ঠ হইয়া কিছুদিন সানন্দে অতিবাহিত করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার যে ঘাের তব বিপদ ক্রমশঃ সন্নিহিত হইতেছে, তাহার বিন্দুবিসর্গও জানিতেন না। ইতিপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, কৌন্সেলের অন্যতম মেম্বর ফ্রান্সিস্ ইংলণ্ডে প্ৰতিগমন করেন। তিনি ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিয়া পালিয়ামেন্টের মেম্বর হন। হেষ্টিংসের প্রতি তঁাহার ঘােরতর বিদ্বেষবুদ্ধি ছিল, তিনি এক্ষণে এক্ষণে সুযোগ পাইয়া কায়মনােবাক্যে হেষ্টিংসের প্রতিহিংসা করিতে চেষ্টাবান্ হইলেন। তাহার উত্তে- জনায় পালিয়ামেন্টের কতিপয় প্রধান প্রধান মেম্বর হেষ্টিং- সের ভারতবর্ষসংক্রান্ত কার্যের দোযােল্লেখ করিয়া তাহার নামে অভিযোগ করেন। অভিযোক্তাগণের মধ্যে বৰ্কই প্রধান ছিলেন। তিনি হেষ্টিংসের বিপক্ষে পালিয়ামেণ্ট সভার উপর্যপরি কয়েকটি অধিবেশনে বক্তৃতা করেন। তাহার ন্যায় সুচতুর, বিধান ও বাগ্মী সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায় না। সুতরাং তাহার বক্তৃতা শুনিবার জন্য ওয়েষ্টমিনিষ্টার গৃহ লােকারণ্য হয়। বক্ততার প্রারম্ভে তিনি ভারতবর্ষীয়দিগের আচার ব্যবহারাদির বিষয় বর্ণন করিয়া, যে সকল ঘটনা হওয়াতে ইংরাজদের ভারতবর্যে প্রভুত স্থাপন হয় ও ইংরাজেরা তৎকালে শেরূপে ভারতবর্ষের রা কার্য নির্বাহ করি- : -৬৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। তেন, সে সমুদায়ের বর্ণনা করেন। তৎপরে তৎপরে হেষ্টিংস রাজ্যশাসন কালে ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ আইনবিরুদ্ধ যে সকল অসৎ কর্ম করিয়াছিলেন, তিনি সেইগুলি এরূপ প্রতীতিজনক ও করুণরসপুর্ণ বাক্যে বর্ণনা এই রিত লাগিলেন, যে তৎশ্রবণে চ্যান্সেলর ( অন্যতম রাজমন্ত্রী) চমৎ• : ও মােহিত হন, প্রতিবাদী হেষ্টিংসের কঠোর হৃদয়ও কিয়ৎ জন্য বিচলিত হয়, সমাগত মহিলাগণের চক্ষে অশ্রুধারা বিগ- ৩ হইতে থাকে, সেরিডনের পত্নী মূচ্ছিত হইয়া পড়েন। ফলতঃ তৎকালে হেষ্টিংসকে মূর্তিমান পাপস্বরূপ, মনুষ্যরূপী রাক্ষসস্বরূপ ও হতভাগ্য ভারতবর্ষের কালান্তক যম স্বরূপ বলিয়া সকলের বােধ হইতে লাগিল। বৰ্ক উপসংহার কালে কহেন, মামি ওয়ারেণ হেষ্টিংসের নামে তাহার ভয়ঙ্কর দুরাচারিতার নিমিত্ত অভিযােগ করিতেছি ; আমি পালিয়ামেন্টের কমন্স সভার পক্ষ হইয়া তাহারি নামে অভিযোগ করিতেছি, যিনি তাঁহাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন। আমি সমুদায় ইংরাজ জাতির পক্ষ হইয়া তাহারি নামে অভিযােগ করিতেছি, যিনি তঁাহাদের বহু কালের উপার্জিত মানসম্ভ্রম একেবারে উৎসন্ন দিয়া আসিয়াছেন। আমি হতভাগ্য ভারতবর্ষীয়দিগের পক্ষ হইয়া তাহারি নামে অভিযােগ করিতেছি, যিনি তঁহাদের ন্যায়ানুগত স্বত্ব সকল দর ন্যায় বলপূর্বক অপহরণ করিয়াছেন এবং তাঁহাদের স্বর্ণভূমি ভারতবর্ষকে মরুভূমি করিয়া তু লয়াছেন। আর অধিক কি বলিব ; মনুষ্য নামের মর্যাদা রক্ষা বিষয়ে যাহাদের মমতা আছে, এতাদৃশ সৰ্ব্বলােক ও ধরাধামের যাবতীয় পরনারী, সৰ্ব-কাল এবং আপামর সাধারণ সকল ব্যক্তির প্রতিনিধি হইয়া সৰ্বসাধারণ শত্রু, সকলের উৎপীড়নকারী হেষ্টিং- সের নামে অভিযোগ করিতেছি। ১৭৮৮ খ্ৰীঃ অব্দে হেষ্টিংসের বিচার আরম্ভ হয়, বিচার শেষ হইত প্রায় আট বৎসর লাগে। একের প্রতি অপরের যত কেন বিদেষভাব থাকুক না, কালক্রমে সেই ভাবআবশ্যই অন্তহিত হয়, সুতরাং যাহার বিচারের আরম্ভে হেষ্টিংসের ঘােরতর বিপক্ষ ওয়ারেণ হেষ্টিংস। ৬৭ ছিলেন, তাহাদের মধ্যে অনেকেই এক্ষণে তার স্বপক্ষ হইয়া উঠি- লেন। অষ্টবার্ষিক বিচারের পর উনত্রিশ জন ‘পিয়ার * ৰয় দেন তন্মধ্যে ছজন মাত্র চেতসিংহ ও বেগম সংক্রান্ত অপরাধে হেষ্টিংসকে অপরাধী করেন, কিন্তু অন্যান্য অভিযােগে তাহার পক্ষে মতদাতার সংখ্যা আরও অধিক হইয়াছিল এবং কতকগুলি অভিযােগে সক- লেই এক বাক্যে তাহাকে নির্দোষী বলিলেন। তিনি ১৮৯৫ খ্রীঃ অব্দের ১৭ই এপ্ৰেল অব্যাহতি লাভ করেন। সমুদায় পৃথিবী মধ্যে প্রচারিত বহুকালস্থায়ী এই বিচার দ্বারা ভারতবর্ষীয়েরা জানিতে পারিয়াছেন, যে এরূপ উচ্চ বিচারালয় আছে, যথায় উচ্চপদারূঢ় রাজপুরুষেরাও কোন প্রকার অপরাধ করিলে নীত ও ভয়ে কম্পিত কলেবর হন। প্রধান দোষারােপক বকের মনে এই বিশ্বাস জন্মিয়াছিল, যে আমি প্রথম গবর্ণর জেনের হেষ্টিংসের কৃত অত্যাচার প্রকাশ করিয়া একটী প্রধান কাৰ্য্য করিলাম। ইহাতে আর কেহই কখন ঐরূপ অত্যাচার করিতে সাহসী হইবেন না। বস্তুতঃ বর্কের এই কাৰ্যটী প্রধান কাৰ্য্য বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। তিনি এতদ্বারা ভারতবর্ষীয়দিগের নিকটে চিরস্ম- রণীয় হইয়া রহিয়া রহিয়াছেন। যংকালে ইংলণ্ডে হেষ্টিংসের অাচরণের দোষোদঘাষণ হয়, যদি তিনি সেই সময়ে অাত্মদোষ স্বীকার করিয়া পাঁচ লক্ষ টাকা জরি- মানা দিতেন, তাহা হইলে তাহার পক্ষে অনেক মঙ্গল হইত। তিনি বিশুদ্ধচরিত বলিয়া বিখ্যাত না হউন, কিন্তু দেউলিয়া হইয়া যাইতেন না। নির্দিষ্ট আছে, এই মােকদ্দমা উপলক্ষে তাহার সাত লক্ষ যাটি সহস্র টাকা ব্যয় হয়। হেষ্টিংস উকীলের বেতন প্রভৃতি ন্যায্য ব্যয়ে যে সেই সমুদায় টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন এমত নহে, তিনি আপ- নার পক্ষে অনুকূল কথা লেখাইবার জন্য সংবাদ পত্র সম্পাদক- দিগকে প্রভূত অর্থ প্রদান করেন এবং তাহার অনুকূ৷ে যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তক রচিত ও প্রচারিত হয়, তাহতেও তাহার প্রচুর * লর্ড সভার মেম্বরদিগকে পিয়ার কহে ।

লঘু চরিতমঞ্জরী। খ্রীঃ অব্দের *। অর্থ নিঃশেষিত হইরূছিল। তাহার বিপক্ষ বর্ক ১৭৯০ প্রারম্ভে কমন্স সভায় " বলিয়াছিলেন, “ মুদ্রান্ত্রের মুখ বন্ধ করি- বার জন্য হেষ্টিংসের হেষ্টিংসের দুই লক্ষ টাকা নিঃশেষিত হইয়াছে।” আমরা তাহার এই বাক্যের সত্যাসত্যের বিষয় অংশয়িত রূপে বলিতে পারি না, কিন্তু বাদী প্রতিবাদীর বিচার কার্য নির্বাহ করিবার উপযােগী যে সকল উপকরণ প্রচলিত আছে, ন্যায়ানুগত হেতু বিন্যাস অবধি অতি জঘন্য পিতৃ মাতৃ উচ্চারণ পৰ্য্যন্ত সে সমস্তই প্রযুক্ত হইয়াছিল, ইহার যথার্থতা বিষয়ে কিঞ্চিত্রও সংশয় নাই। হেষ্টিংস আত্মরক্ষা করিতে যাইয়া অমিত অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন বটে, তথাপি মিতব্যয়ী হইয়া চলিলে তঁহার কিঞ্চিৎ সংস্থান থাকিত, কিন্তু মিতব্যয়িতা তাহার অন্তঃকরণে স্থান প্রাপ্ত হয় নাই। গৃহ- কার্যে তাহার অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ছিল না। যে বৎসর পালিয়া- মেন্টে তাহার বিচার আরম্ভ হয়, সেই বৎসরেই তিনি চিরকাঙ্ক্ষিত ডেস ফোর্ড নামক স্থান উদ্ধার করেন ও পার্লিয়মেন্ট সভায় নিষ্কৃতি পাইবার পূর্বে ঐ স্থানের সংস্কার, অট্টালিকা নির্মাণ ও পুষ্করিণী খনন ইত্যাদি কার্যে চারি লক্ষ টাকারও অধিক ব্যয় করিয়াছিলেন ; সুতরাং এক্ষণে তিনি অতিশয় দুরবস্থায় পড়িলেন। মােকদ্দমা উপলক্ষে তাহার যত টাকা ব্যয় হইয়াছিল, তাহার বন্ধুগণ তৎসমুদায় ও বার্ষিক পঞ্চাশ সহস্র টাকা তাহাকে বৃত্তি দেওয়াইবার জন্য ডিরে- ক্টর সমাজে প্রস্তাব করেন। ডিরেক্টরেরা মনে মনে জানিতেন, যে কেবল আমাদের হিত সাধন করিতে যাইয়াই হেষ্টিংস দুর্বিপাকে পড়িয়াছেন। তাহারা তাহার বন্ধুবর্গের প্রস্তাবে অনুমােদন করিলেন, কিন্তু বাের্ড অব কন্ট্রাল সভার* মত-নিরপেক্ষ হইয়া ঐ প্রস্তাব অনুয়ায়ী কাৰ্য করা তাহাদের সাধ্য ছিল না, সুতরাং তাহাদিগকে ত। *ডিরেক্ট: সভার কার্যপক্ষণার্থ ১৭৮ ৩ খ্রীঃ তাব্দে এই সভার সৃষ্টি হয়। এই সভার অমতে ডিরেক্টর, সমাজের কোন কাৰ্য্য করিবার সূতা ছিল ।

৬১ ওয়ারেন হেষ্টিংস। বাের্ড অব কনট্রোলের মত জিজ্ঞাসা করিতে হইল। তৎকালে উনডাস, বাের্ড অব কনটোলের অধ্যক্ষ ছিলেন, তিনি হেষ্টিংসের ঘােতর বিপক্ষ ; সুতরাং সম্মত হইলেন না। সে যাহাহউক, অনেক বাদানুবাদের পর পরিশেষে এই স্থির হইল, 'হেষ্টিংস যাবজ্জী বনের জন্য বার্ষিক চল্লিশ সহস্র টাকা বৃত্তি পাইবেন ও তাহার যে সমস্ত ঋণ অবিলম্বে পরিশােধ করা আবশ্যক, তাহার নিমিত্ত তাহাকে দশ বৎসরের বৃত্তি অগ্রিম দেওয়া হইবে। এতদ্ভিন্ন কোম্পানি হেষ্টিং- সকে এই করারে পাঁচ লক্ষ টাকা ধার দিলেন, যে তাঁহাকে উহার সুদ দিতে হইবে না, তিনি কিস্তিবন্দী করিয়া ঐ টাকা পরিশােধ করিবেন। হেষ্টিংস এইপ্রকার যে প্রচুর আনুকুল্য প্রাপ্ত হইলেন, বুঝিয়া চলিলে তিনি অনায়াসে উহা দ্বারা জীবনের অবশিষ্ট ভাগ স্বচ্ছন্দে যাপন করিতে পারিতে, কিন্তু তিনি এরূপ অসাবধান ও অপব্যয়ী ছিলেন, যে তাহাতেও তঁহার অপ্রতুল ঘুচিল না, তাহাকে বারম্বার কোম্পানির নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করিতে হইয়াছিল ; কোম্পা- নিও দানশৌণ্ডতা প্রদর্শন পূৰ্ব্বক তাহার প্রার্থনা পুরণ করেন। ১৮১৩ খ্ৰীঃ অব্দে কোম্পানির চাটর নবীকৃত হওয়াতে পালিয়া- মেন্টে ভারতবর্ষ সংক্রান্ত বিষয় লইয়া বিস্তর বাদানুবাদ হয়। ইহাতে হেষ্টিংস সাক্ষ্য দিবার জন্য কমন্স সভায় উপস্থিত হইতে আদিষ্ট হন। হেষ্টিংস সাতাইশ বৎসর পূর্বে আপনার মােকদ্দমার সময়ে এই সভায় উপস্থিত হইয়াছিলেন ; তৎকালে তাহার প্রতি সাধারণের যেরূপ বিদ্বেষ-বুদ্ধি জন্ম, বহুকাল অতীত হওয়াতে এক্ষণে তাহা একবারেই তিরােহিত হইয়াছিল। সকলেই হেষ্টিংসের কুক্রিয়া বিস্মৃত হইয়াছিলেন, কিন্তু তিনি যে স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেন, তাহা সকলের অন্তঃকরণে জাগরূক ছিল। কমন্স সভার সভ্যরা সমাদর প্রদর্শন করিয়া তাহাকে বসিতে আসন প্রদান করিলেন ও তিনি উঠিয়া যাইবার সময় উঠিয়া দাড়াইলেন। লর্ড সভাও তাহার প্রতি ঐরূপ সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিলেন। অকসফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাহাকে “এল ডি” এই উপাধি প্রদান করেন।

৭০ লঘু চরিতমঞ্জরী । হেষ্টিংস এই রূপে মান সম্ভ্রম লাভ করিবার কিছুকাল পরে ইংলণ্ডের তদানীন্তন রাজা ফোর্থ জর্জের অতিশয় প্রিয়পাত্র হইয়া উঠেন ও প্রীবিকেন্সেলে মেম্বর নিযুক্ত হন। ইংলণ্ডরাজ তাহার এতদূর গৌরব করিতেন, যে প্রকাশ্য রূপে বলিয়াছিলেন, হেষ্টিংস আসিয়াখণ্ডে বৃটিশ রাজ্য রক্ষা করিয়া ইংলণ্ডের মহতী শ্রবৃদ্ধি সাধন করিয়াছেন। প্রীবি কৌন্সেলে মেম্বর নিযুক্ত করিয়া তাহার সমুচিত সম্মান করা হয় নাই, তিনি উহা অপে- ক্ষাও সমকর পদের উপযুক্ত পাত্র। অতএব তাহাকে অচিরকাল মধ্যে কোন উচ্চতর পদ প্রদান করা যাইবে। ওয়ারেন হেষ্টিংস রাজার এইরূপ প্রশংসাবাদ শ্রবণে লর্ড উপাধি প্রাপ্তির প্রত্যাশা করিয়াছিলেন, কিন্তু কোন অনির্দিষ্ট কারণে তাঁহার সে মনােরথ পূর্ণ হয় নাই। সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের জ্ঞান বৈলক্ষণ্য ও স্বাস্থ্য ভঙ্গ হয়, কিন্তু হেষ্টিংসের বিষয়ে সেরূপ দৃষ্ট হইতেছে না। তিনি দীর্ঘজীবী ছিলেন, বার্ধক্য অবস্থায় তাহার স্বাস্থ্যের কোন প্রকার ব্যাঘাত হয় নাই এবং তাহার হৃদয়াকাশে মেঘমুক্ত জ্যোৎস্নার ন্যায় জ্ঞানজ্যোতিঃ মৃত্যুকাল পর্যন্ত নির্মল ছিল। তিনি ১৮১৮ খ্রঃ অব্দের আগষ্ট মাসে ছিয়াণী বৎসর বয়ঃক্রম কালে কলেবর পরি- ত্যাগ করেন। হেষ্টিংস সদালাপী ও বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এক জন সামান্য কেরাণি হইয়া প্রথমতঃ ভারতবর্ষে আইসেন, কিন্তু কাৰ্য্যদক্ষতা গুণে পরিশেষে ভারতবর্ষের প্রথম গবর্ণর জেনেরলের পদে অধিরূঢ় হন। তাহার শাসন কার্যের প্রারম্ভে শান্তি রক্ষা, কর সংগ্রহ ও বিচার প্রভৃতি প্রায় সকল বিষয়ে মহাগােলযােগ ছিল। কিন্তু তিনি ক্রমে ক্রমে ঐ সকল বিষয়ের সুন্দর বন্দোবস্ত করেন, তাহার বুদ্ধিশক্তি এরূপ পরিস্কৃত ও তীক্ষ ছিল, যে তিনি সকল বিষয়ের মর্মাবধারণ ও সকল প্রকার উপায় উদ্ভাবন করিতে পারিতেন। তাহার অবিচলিত সাহস, তাহার রাজ্যের হিত চিন্তা ও তাহার মহীয়সী সহিষ্ণু- ক ওয়ারেণ হেষ্টিংস ৭১ তার বিষয় পৰ্যালােচনা করিলে সকলকেই চমৎকৃত হইতে হয়। তাঁহার জীবনবৃত্তান্ত লেখকদিগের মধ্যে কেহ কেহ তাহাকে সর্ব প্রকার দোষ শূন্য বলিয়া নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন, কিন্তু পক্ষপাত শূন্য চিত্তে তাহার কাৰ্যগুলি পৰ্যালােচনা করিয়া দেখিলে তাহাদের এই নির্দেশ সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া কখনই প্রতীতি জন্মে না। তিনি এরূপ কতকগুলি কাৰ্য করিয়াছেন, যে তাহা কোন রূপ্লেই ন্যায়ানুগত ও ধৰ্ম্মসংগত বলিতে পারা যায় না। তিনি যে অযােধ্যা ও বারাণসী রাজ্যে ঘােরতর অত্যা- চার করিয়াছিলেন, তাহা কি তাহার পক্ষে লজ্জাকর নহে? তিনি যে বৈর-নির্যাতন স্পৃহা চরিতার্থ করিবার জন্য নন্দকুমারের নিপাত সাধন করেন, তাহাতে কি তাহার নীচাশয়তা প্রকাশ পায় নাই। তবে আমরা এস্থলে তাহার অনুকূলে এইমাত্র বলিতে পারি, যে তিনি যৎকালে কেরাণি হইয়া এদেশে আসিয়াছিলেন, সে সময়ে কোম্পানির এদেশের সহিত কেবল বাণিজ্য সম্বন্ধ ছিল, তৎকালে যে কোন উপায়ে হউক, অর্থোপার্জন করিয়া স্বদেশে প্রতিগমন করা কোম্পানির কর্মচারীমাত্রেরই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। এরূপ স্থলে হেষ্টিংসের চরিত্র বিশুদ্ধ ও নির্দোষ হইবে, ইহা কখনই প্রত্যাশা করা যাইতে পারেনা।

লড ডালহৌসী ডেলহৌসী ১৮১২ খ্ৰীঃ অব্দে ডেলহৌসী ক্যাসেল নামক স্থানে জন্ম পরিগ্রহ করেন। ইহার তিন সহােদর, তন্মধ্যে ইনি কনিষ্ঠ ছিলেন। ডেলহৌসী প্রথমতঃ হ্যারাে নামক বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ করেন এবং তথায় পাঠ সমাপন করিয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হন। যে বংসর লড ক্যানিঙ “ ডিগ্রী ” অর্থাৎ উপাধি প্রাপ্ত হন, ইনিও সেই বৎস- রেই লাটিন ও গ্রীকৃভাষায় উপাধি লাভ করেন। ইহার কিছু দিন পরে ইহার দুই জ্যেষ্ঠ সহােদরের ক্রমান্বয়ে পরলােক প্রাপ্তি হয় এবং ইনিও বিদ্যালয় পরিত্যাগ করেন। মহারাণী ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে অধিরােহণ করতে পালিমেন্ট সভার যে নূতন সটন হয়, ডেল- হৌসী সেই সময়ে হেডিংটন প্রদেশের প্রতিনিধি হইয়া উক্ত সভায় প্রবেশ করেন। ইহার, অল্প দিন পরেই তঁাহার পিতার পরলােক প্রাপ্তি হয়। তাহার লর্ড উপাধি ছিল; সুতরাং তাহার মৃত্যুতে ডেল- হৌসী পৈতৃকধনের ন্যায় পৈতৃক উপাধিরও উত্তরাধিকারী হইলেন ও কমন্স সভার কার্য পরিত্যাগ করিয়া লড’ সভায় প্রবেশ করি- লেন। ইতিপূর্বেই তাহার বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতার বিষয় পালিমেন্টে প্রকাশ হইয়াছিল। রাজমন্ত্রী সরবঃ পীল এক্ষণে তাহাকে বাণিজ্য সভার প্রতিনিধি সভাপতি পদে নিযুক্ত করিলেন। লর্ড ডেলহৌসী এই কাৰ্য্য পাঁচ বৎসর করিয়াছিলেন। অনন্তর গবর্ণর জেনের হাডিঞ্জ স্বদেশে প্রতিগমন করাতে ইংলণ্ডের কর্তৃপক্ষের লর্ড ডেলহৌসীকে তাহার পদে বরণ করেন। লর্ড ডেলহৌসী গবর্ণর জেনেল হইয়া ১৮৪৭ খ্রীঃ অব্দের নবেম্বর মাসে ইংলণ্ড , লর্ড ডেলহৌসী। হইতে যাত্রা করেন। এই সময়ে তাহার বয়ঃক্রম। বংস হইয়াছিল। যৎকালে লর্ড ডেলহৌসী ভারতবর্ষে উপনী হন, সে সময়ে পঞ্জাবে লর্ড হার্ডিঞ্জের কৃত বন্দোবস্ত অনুসারে সমুদায় রাজকাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইতেছিল, তথায় কোন গোলযােগ ছিল না। কিন্তু অল্প- কাল মধ্যেই পঞ্জাবের সেই পরিষ্কৃত আকাশে মুলতান হইতে মেঘ- কাশি সমূদিত হইল। মুলতান স্বনামখ্যাত রাজ্যের রাজধর্মী ছিল। সরফরাজ নামক একজন আফগান এই নগয়ে আধিপত্য করিতেন। লাহােরাধিপতি রণজিৎসিংহ মুলতানের সমৃদ্ধি দর্শনে প্রলােভিত হইয়া বলপূর্বক উহা অধিকার করিয়া লন ও সাবমল নামক এক ব্যক্তিকে তথাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। মহারাজ রণজিৎসিংহ যতদিন জীবিত ছিলেন, রাজমধ্যে কোন গােলযােগ ঘটে নাই, তাঁহার নাম ও প্রবল প্রতাপে সকলেই সশঙ্কিত থাকিতেন কিন্তু তাঁহার উত্তরাধি- কারীরা অপদার্থ ও প্রহপহীন ছিলেন। রাজলক্ষ্মী বীরপুরুষদিগেরই ভােগ্যা। তিনি কখন প্ৰতাপহীন পুরুষের প্রতি অনুরাগিণী হননা। সুতরাং রণজিৎ সিংহের মৃত্যুর পরে রাজলক্ষ্মী পঞ্জাব হইতে অন্ত ব্ধান করিলেন। রাজ্য মধ্যে কেবল কুক্রিয়া ও কুমন্ত্রণাই অনুষ্ঠিত হইতে লাগিল। ঐ গোলযােগের সময়ে মুলতানের সুবিচক্ষণ শাসন- ক। সাবমল, ঘটনাক্রমে হউক, অথবা বিপক্ষপক্ষের অভিসন্ধি ক্রমেই হউক, লাহাের দরবারে পিস্তলের গুলি খাইয়া প্রাণ হারা- ইলেন। তৎপরে তদীয় পুত্র মুলহাজ মুলতানের গবর্ণীপদে নিযুক্ত হন। পঞ্জাব রাজ্যের এই একটা রীতি ছিল, কোন ব্যক্তি রাজকীয় পদে অভিষিক্ত হইলে ৰাজসকারে সেলামি দিতে হইত। মুলরাজের ধনবান বলিয়া খ্যাতি ছিল, লাহাের দরবার তাহার নিকটে এক- কোটি টাকা সেলামি চাহেন। মুলরাজ তৎ প্ৰদামে অসম্মত হওয়াতে পরিশেষে এই বন্দোবস্ত হয়, যে তাঁহাকে ১৮ লক্ষ টাকা দিতে :

লঘু চরিতঞ্জয়ী। হইবে। প্রায় এই সময়ে প্রথম পঞ্জাব যুদ্ধ বাধিয়া উঠে, লাহাের করবার বিশ্লেষিত হয় এবং মুলরাজও কিছুকালের নিমিত্ত লাহাের- রবারের সেই অসঙ্গত দাওয়া হইতে পরিত্রাণ পান। যুদ্ধ সমাপ্তির পর লাহাের দরবার পুনঃ সঘটিত হয় ও তাহারা মূলয়া- জের নিকটে পুনরায় ঐ টাকা দাওয়া করেন। কিন্তু মূলরাজ অর্থ প্রদান অস্বীকার করাতে তাহার বিরুদ্ধে সৈন্ত প্রেরিত হয়। তখন তিনি ভীত হইয়া বলেন, রাজধানীস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্ট মধ্যস্থ থাকিয়া আমার সহিত লাহাের দরবারের যেরূপ বন্দোবস্ত করিয়া দিবেন, তাহাই করিব। ইহাতে এই ফল লাভ হয়, যে মূলরাজ ১৮৪৬ খ্রঃ অব্দে লাহােরে গমন করেন ও কিস্তিবৃন্দী করিয়া অর্থ প্রদান করিতে প্রতি ক্ষত হন এবং লাহোরদরবার তাঁহার রাজ্যের কিয়দংশ বাজেয়াপ্ত করেন ও অবশিষ্টাংশ তিন বৎসরের করারে তাহাকে ইজারা দেন। বােধ হইতেছে, মুলরাজ এই বন্দোবস্তে তৎকালে সন্তুষ্ট হইয়া মূলতানে প্রত্যাগমন করেন। তিনি মূলতানে প্রত্যাগমন করিবার পরে এক বৎসরেরও অধিককাল কুশলে রাজ্য শাসন করিয়াছিলেন অনন্তর লাহাের দরবারের বন্দোবস্ত সুবিধা কর হয় নাই ভাবিয়া ১৮৪৭ খ্রীঃ অব্দের শেষে পুনরায় লাহােরে গমন করেন ও দরবারের মেম্বরদিগকে উৎকোচ দিয়া নির্ধারিত রাজস্ব কমাইবার চেষ্টা পান, কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য হইতে না পারিয়া পদ পরিত্যাগ করিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। দরবার কহিলেন, রীতিমত পদত্যাগ পত্র প্রেরিত হইলে তাহা গৃহীত হইবে, কিন্তু পদত্যাগ করা বিহিত কিনা, আপনি বিশেষরূপে বিবেচনা করিয়া দেখুন, যেন পরিশেষে আপনাকে পরিতাপ করিতে না হয়। এইরূপ কথােপকথন হইবার পরে মূলরাজ লাহাের পরিত্যাগ করিলেন ও মুলতানে প্রত্যাগমন করিয়া এক খানি পদত্যাগপত্র পাঠাইয়া দিলেন। দরবারও তাহা গ্রাহ করিয়া সরদার খা সিংহ নামক এক ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট বেতনে মুলতানের গবর্নর নিযুক্ত করি- লন, এবং আগ্নিয়ু ও আন্ডারসন নামক দুই জন বৃটিশ কর্মচা- লর্ড ডেলহৌসী। জীকে সঙ্গে দিয়া তাহাকে মূলতানে পাঠাইয়া দিলেন ও উহাদের সঙ্গে পাঁচ শত সেনা ও প্রেরিত হইল। তাহারা তথায়,পৌছিয়া কোন প্রকার বিদ্রোহলক্ষণ নিরীক্ষণ করিলেন না, মূসরাজ স্বয়ং আসিয়া বৃটিশ কর্মচারীদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। পরস্পর যথারীতি শিষ্টাচারের পর বৃটিশকর্মচারীরা মূলয়াজের নিকটে হিসাব চাহিলেন। ইহাতে মূলরাজ বিরক্ত হইয়া তথা হইতে চলিয়া গেলেন, কিন্তু পর দিবস শান্তভাবে. আসিয়া পুনরায় তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও তাহাদিগকে দুর্গের অভ্যন্তরে লইয়া গেলেন। দুই দল সেনা ও কতকগুলি অশ্বারােহী পুরুষ দুর্গের অন্তত ধারে স্থাপিত হইল। এক্ষণে বিপদ সন্নিহিত হইয়া আসিল। মূলরাজ যথারীতি দুর্গ সমৰ্পণ করিলেন। অনন্তর তাহারা সকলে দুর্গের দ্বার দিয়া বাহির হইতেছিলেন, এমত সময়ে বৃটিশ কর্মচারীরা অতর্কিত রূপে আক্রান্ত ও মর্মান্তিক আহত হইলেন। মূলরাজ তৎ- কালে অশ্বোপরি ছিলেন, তিনি এই ব্যাপার দর্শনে কিছুই বলিলেন না, অশ্ব পরিচালন পূর্বক দ্রুতবেগে উদ্যানভবনাভিমুখে চলিয়া গেলেন। সরদার খা সিংহ আহত কৰ্মচারীদিগকে শিবিরে আনয়ন করিলেন। পর দিবস সমুদায় মূলতান সেনা প্রকাশ্য বিদ্রোহে প্রবৃত্ত হইল। বােধ হয়, মুলরাজ প্রথমতঃ দোষী ছিলেন না, তিনি আগ্নিযু সাহেবকে বলিয়া পাঠাইলেন, আমি বিশ্বাসঘাতক নহি, সেনারা উচ্ছ ঙ্খল হইয়া এই অত্যাচার করিয়াছে, অতএব আমাকে ক্ষমা করিবেন। কিন্তু ইহার কিয়ৎক্ষণ পরেই মূলরাজ কায়মনোবাক্যে বিদ্রোহে অভূত্থান করিলেন ও রাত্রি সমাগমের পূর্বে দল বল সঙ্গে লইয়া বিপক্ষের প্রতি ধাবিত হইলেন। যেঅট্টালিকায় আহত কৰ্ম্ম- চারীরা ছিলেন, ছিলেন, তাহা বেষ্টিত তাহা বেষ্টিত হইল। নিরুপায় কর্মচারীরা শয্যাগত ছিলেন, তথাপি বীরতা প্রকাশ করিতে ত্রুটি করেন নাই। দেহে প্রাণসঞ্চার ছিল, যুদ্ধ করিয়াছিলেন । পরিশেষে অভিভূত হইলেন ও এই কথা বলিয়া ভূতলে পড়িলেন, যে মামা- লঘু চরিতঞ্জয়ী। দের দেশের সহস্র সহস্র লোক আসিয়া তােমাদিগকে এই নির ব্যবহারের প্রতিফল দিবেন। মুলতানে এই ভয়ঙ্কর কাণ্ড উপস্থিত হওয়াহে লাহাের দরবার বিবেচনা করিলেন, যদি বিৰ্জোহী মূলরাজের বিরুদ্ধে মূলতানে শিখসেনা প্রেরিত তাহা হইলে উহারা মূলরাজের সহিত যােগ দিবে ও যদি শিখসেনাগণের সহিত কতকগুলি বৃটিশ সেনা প্রেরণ করা যায়, তাহা হইলে ইংরাজসেনাগণের নিপাত হইবে ও অবিলম্বে ইংরাজদের সহিত যুদ্ধ ঘটবে। লাহাের দরবার এই সকল আন্দোলন করিতেছিলেন, এমত সময়ে লাহােৱস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্ট, জেনরেল হুয়িসকে সৈন্য সহকারে মূলতানে পাঠাইয়া দিলেন। হয়ি তথায় পৌছিয়া ১৮৪৮ খ্ৰীঃ অব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর মহারাজ দলীপ সিংহ ও ইংলণ্ডেশ্বরীর দোহাই দিয়া দুর্গরক্ষী সেনা- গণকে কহিলেন, “তোমরা দুর্গ সমর্পণ কর, ” কিন্তু কোন উত্তর না পাইয়া পরিশেষে দুর্গ অবরোধ করিতে লাগিলেন। ইহার কতিপয় দিবস পরে শিখসরদার শেরসিংহ সসৈন্যে পঞ্জাব হইতে আসিয়া মূলতানে উপস্থিত হইলেন। মূলরাজ প্রথমতঃ সন্দিহান হইয়া দুর্গের দ্বার উদঘাটন করিলেন না, কিন্তু পরিশেষে শেরসিংহ মিত্রভাবে আসিয়াছেন বুঝিতে পারিয়া তাহারে সমাদরে পরিগ্রহ করিলেন। এইরূপে সাংঘাতিক যোগ সম্পন্ন হইলে পর বৃটিশ জেনরেল ভাবিলেন, যাহার জন্য জন্য যুদ্ধ করিতেছি, যদি তঁাহার পক্ষীয় লােকেরা বিপক্ষ হইল, তবে আর যুদ্ধ করিবার আবশ্যকতা কি? তিনি অতিশয় বিরক্ত হইয়া অবরোধ পরিত্যাগ করিলেন। ইংরাজের। প্রথমত সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়া ছিলেন, মুলতানের বিদ্রোহানল মূলতানেই নির্বাপিত হইয়া যাইবে, পঞ্জাবের অন্য কোন স্থানে বিস্তৃত হইবে না। মূলরাজ লাহােরগবর্ণমেন্টের কর্মচারী, তাহার কৃত, অত্যাচার সাক্ষাৎ সম্বন্ধে আমাদের উপর নহে,' তিনি লাহাের গৰমেন্টের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিয়াছেন এবং পায়ের পাম বৃটিশু সনাব সাহায্যে তঁাহার শাসনে প্রবৃত্ত হই।

লর্ড ডেলহৌসী। অমৰয়স্ক যাছেন। কিন্তু তাহাদের এই সিদ্ধান্তটি যে ভ্রান্তিমূলক, এক্ষণে তাহারা তাহা বিলক্ষণ বুঝিতে পারিলেন ও শিখদিগের সহিত পুন- রায় যুদ্ধ অপরিহার্য স্থির করিলেন। শেয়সিংহের পিতা চরসিংহ ইংরাজদের নিকট কহিতেন, বিদ্রো- হবাসনা আমার অন্তঃকরণ হইতে একবারেই অন্তর্হিত হইয়াছে এবং ইহাও বলিতেন, শিখসেনারা বিশ্বাসযােগ্য নহে। কিন্তু তিনি এক্ষণে সেই ছদ্মভাব পরিত্যাগ করিয়া হজরাদেশে বিদ্ৰোহানল প্রজ্বলিত করিলেন। শেরসিংহ মূলতান হইতে আসিয়া তাহার সহিত মিলিত হইলেন। ফলতঃ এক্ষণে সমুদায় পঞ্জাব ইংরাজদের প্রতিকূলে। অভ্যুত্থান করিল। পঞ্জাবরাজ দলীপসিংহ তৎকালে ছিলেন, তিনি তিনি কোনরূপে ইস্তবহিভূত না হন, শিখসরদারের। তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাহাদের সে চেষ্টা বিফল হইয়া গেল। লাহােৱস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্ট বুদ্ধিপূর্বক দলীপ- সিংহকে লাহােরে নজরবন্দীভাবে রাখিলেন। যৎকালে পঞ্জাবরাজ্যে এই সকল ব্যাপার অনুষ্ঠিত হয়, সে সময়ে লর্ড ডেলহৌসী কলিকাতায় নুতন আসিয়াছেন। লর্ড ডেলহোনী ইংলণ্ডে অতি উচ্চপদস্থ ছিলেন, এজন্য কি ইংলণ্ড কি ভারতবর্ষ সত্ৰই তাহার নাম সন্ত্রম ছিল। তিনি কলিকাতায় উপস্থিত হই- বার পরেই সকলে তাহার কাৰ্য্য বিলােকনে সমুৎসুক হইলেন, কিন্তু তিনি প্রথমতঃ কিছুকাল কোন কাৰ্য্যই করেন নাই। সেক্রেটরির তাঁহার নিকটে যে সকল কাগজপত্র পাঠাইয়া দিতেন, তিনি কেবল নাম স্বাক্ষর করিয়া সেই গুলি প্ৰতিপ্রেরণ করিতেন। এইরূপে কিছু দিন অতীত হইলে পর তিনি সিপাইদের ভাতাবিষয়ক একখানি মিনিট লিখিয়া প্রচারিত করেন। সেক্টেরিয়া তাহার কৃত মিনিট পড়িয়া কহিলেন, ইহার কি এই পর্যন্তই বিদ্যা * এই বলিয়া পরস্পর মুখ নিরীক্ষণ করিতে ও হাঁসিতে লাগিলেন। কিন্তু লর্ড ডেলহৌসী রাজনীতি প্রয়ােগে যে কিরূপ কৌশলসম্পন্ন ছিলেন। তখন পর্যন্ত তাহারা তাহা জানিতে পাড়েন নাই। অনন্ত ৯৪৮ খ্রঃ গলের এই লঘু চরিতঞ্জরী। অক্টোয় যারাকপুরের গবর্ণমেন্ট হাউসে তাহার রাজনীতি কৌশলের যার উদঘাটিত হইল। ঐ : দিবস রাত্রিকালে, তথায় নৃত্যগীতাদি হইতেছিল, অনেক সম্ভ্রান্ত ইউরােপীয় তথায় উপস্থিত ছিলেন, এমত সময়ে লাহােৱস্থিত রেসিডেন্টর প্রেরিত মূল রাজের বিদ্রোহ ঘটিত পৰ আসিয়া পৌছিল। লন্ড’ ভেলহৌসী পত্রখানি পড়িয়া কহিলেন, আমি অন্তরের সহিত সন্ধি বাসনা করি, কোন প্রকারে সন্ধি ভঙ্গ হয়, ইহা আমার অভিপ্রেত নহে। কিন্তু যদি তারতবর্ষীয় শত্রুগণ যুদ্ধলাভের বাসনা করেন, তবে তাহারা প্রতিফল সহকারে যুদ্ধই প্রাপ্ত হইবেন। লউডেল:হাসী ইহার কতিপয় দিবস পরে উত্তর পশ্চিম প্রদেশে যাত্রা করেন। ফিরােজপুরে বৃটিশ সেনা সংগৃহীত হয় ও ১৩ই নবেম্বর সমুদায় সেনা লাহােরে গিয়া পোঁছে। এই সময়ে শিখেরা রাজ্যের সমুদায় স্থানেই ইংরাজদের প্রতিকূলে ভূখান করিয়া ছিলেন, সুতরাং রেসিডেন্টের গৃহপ্রাচীরের হর্ভগে সূর্গ পরিমিত স্থানেও ইংরাজদের প্রভুতা ছিল না। পঞ্জাববাসী সমু- দায় ইংরাজ আপনাদিগকে লইয়াই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িয়া ছিলেন। বৃটিশসেনাপতি লঙ গফ সিলয়া পাহাড়ে তিনি ২১ নবেম্বর পোঁছিয়া শতদ্রুনদীর বামতীরস্থিত সেনা- গণের সহিত মিলিত হন ও পরদিব রামনগরে যুদ্ধ করেন। বৃটিশ সেনাপতি এই যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাহাতে স্বপক্ষীয় অনেকগুলি সাহসী সেনার নিপাত ব্যতিরেকে আর কোন ফলােদয় হয় নাই। এই ঘটনার কতিপয় দিবস পায়ে বিতস্তা নদীর তীরে শিখদিগের সহিত পুনরায় যুদ্ধ হয়, কিন্তু তাহাতে ও ইংরাজের। পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক ফললাভ করিতে পারেন নাই। ১৮৪৯ খ্ৰীঃ অব্দের ২রা জানুয়ারি জেনরেল হুরি বােম্বের সেনা গণের সহিত মিলিত হইয়া মূলতান নগর লুঠন ও দুর্গ অবরোল, করেন। দুর্গ প্রাচীর এরূপ দৃঢ় ছিল, যে তাহাতে কামানের গোলা প্রতিহত হইয়া গাজিত লাগিল। তখন বৃটিশ সেনারা বারুদের ছিলেন, লর্ড ডেলহেসী। খায়া দুর্গ প্রাচীর উড়:ইয়া দিবার নিমিত্ত সুড়ঙ্গ কাটিতে লাগিণ ও অনবরত দুর্গের প্রতি গোলাবর্ষণ করিতেও ক্ষান্ত হইল না। ঐ সময়ে একটা জ্বলন্ত গোল মুলরাজের বারুদাগারে পতিত হওয়াতে প্রায় দুই লক্ষ মােন বারুদ জুলিয়া উঠ। . তন্নিবন্ধন শতশত অট্টালিকা ভূমিসাৎ হয় এবং সহ, সহু লোক এক কালে কালকবলে পতিত হইয়া যায়। এই ভয়ানক কাও উপস্থিত হওয়াতে দুর্গস্থিত মুলতান সেনারা এরূপ ভীত হইয়াছিল, যে মূলরাজ কোন প্রকারে তাহ- দিগকে উৎসাহিত করিতে পারিলেন না। তখন তিনি অতিশয় দুর্বিপাকে পড়িলেন ও দুর্গ সমৰ্পণ করিয়া আপনার এবং অন্তঃ, পুরিকগণের জীবন রক্ষা করাই শ্রেয়ঙ্কর স্থির করলেন। তিনি তদনুসারে দুর্গ সমৰ্পণ পূৰ্ব্বক জেনারেল হুয়িসের নিকটে আপনার এবং অন্তঃপুরকাগণের জীবন প্রার্থনা করেন। বৃটিশ সেনাপতি কহিলেন, ইংরাজের স্ত্রীলােকদিগের সহিত যুদ্ধ করেন না। অতএব আমি অাপনার অন্তঃপুরিকাগণের জীবন রক্ষা করিতে প্রতিশ্রুত হইলাম, কিন্তু আপনার জীবন রক্ষা অথবা সংহার করা গবর্নর জেনের লড ডেল:হাসীর ইচ্ছা, সে বিষয় আমি কিছুই বলিতে মূল হন পতনের কতিপয় দিবস পূৰ্ব্বে চিলিয়ানালা নামক স্থানে প্রধান বৃটিশ সেনাপতি লড় গফের অভিপ্রায় ছিল, ১৪ই জানুয়ারি প্রাতঃকালে যুদ্ধ আরম্ভ করেন। কিন্তু সুচতুর শিখসরদা- রো উহার পূর্ব দিস বেলা দুই প্রহরের পর বৃটিশ সেনাগণের সম্মুখীন হইলেন, সুতরাং অভিপ্রায় না থাকিলেও বৃটিশ সেনা- পতিকে যুদ্ধ আরম্ভ করতে হইল। তুমূল, সংগ্রাম হইতে লাগিল, বৃটিশ পক্ষের অসংখ্য সেন হতাহত হইল, কিন্তু যুকাবসান হইতে না হইতেই দিবাবসান হইয়া গেল। রাত্রি সমাগমে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের হত্যাকাণ্ড স্থগিত হইল। উভয় পক্ষই জয়ধ্বনি করিয়া উঠি- লেন, কিন্তু বৃটিশ পক্ষের হত্যার বিষয় বিবেচনা কৰিলে এরূপ বােধ হয় না, যে তাহারা জয়ী হইয়াছিলেন।

লঘু চরিতমঞ্জরী। প্রধান বৃটিশ সেনাপতি চিলিয়ানালা যুদ্ধে অকৃতকার্য হইবার পরে সমুৎসুক চিত্তে মূলরাজের আত্মসমর্পণ বার্তা প্রতীক্ষা করিতে ছিলেন। তাৎপৰ্য্য এই, মুলতান হস্তগত ইইলে তাহার সৈন্য সংখ্যা বর্ধিত হইতে পারিবে। কাৰ্য্যে তাহাই ঘটিল। মূলতান পতনের পরেই জেনরেল হয়ি প্রায় ১২ সহ সেনা সমভিব্যাহারে করিয়া প্রধান সেনাপতির সহিত মিলিত হইলেন। লর্ড গফ, এইরূপে বর্ধিতসামর্থ্য হইয়া পুনরায় শিখদিগকে আক্রমণ করিবার সঞ্চয় করিলেন। শিখসরদারেরা কিছুকাল অবধি কাবুলাধিপতি দোন্তমহম্মদ খার সাহায্য লাভের জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। প্রথমত, বােধ হইয়াছিল, দােস্ত মহম্মদ বৃদ্ধ হইয়াছেন ও ইংরাজদের বলবীর্যের বিষয় বিলক্ষণ অবগত আছেন। অতএব এক্ষণে তিনি আর তাহ- দের প্রতিকূলে অত্যুত্থান করিবেন না। কিন্তু কি বার্ধক্য, কি অভি- জ্ঞতা কিছুতেই কোন ফল দর্শিল না। চিলিয়ানালা যুদ্ধ সমাপ্তির পর দোস্তমহম্মদ খ সসৈন্যে পঞ্জাবে আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও আপনার এক পুত্রকে শিখসরদার শের সিংহের শিবিরে পাঠা- ইয়া দিলেন এবং পুরাতন শত্রু ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য কতকগুলি আফগান সৈন্য ও পাঠাইলেন। তাহার অন্তঃকরণে বড় সাধ ছিল, যে তিনি এই সুযােগে পেশোয়ার উদ্ধার করিবেন। কিন্তু তাহার বৃদ্ধবয়সের এই পাগলামী যে কতদূর শােচনীয় হইয়াছিল, ২১ শে ফেব্রুয়ারির গুজরাট যুদ্ধে তিনি তাহা বিলক্ষণ অনুভব করেন। ঐ দিবস প্রাতঃকালে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। যদিও শিখলে নার যুদ্ধে অভিজ্ঞ ও স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিল, কিন্তু এই যুদ্ধে তাহারা বিপক্ষের গোলা বর্ষণ সহ্য করতে না পারিয়া ফেলা দুই প্রহরের পরে পলাইতে আরম্ভ করিল ; সুতরাং তাহাদের কামন, বারুদ প্রভৃতি সমুর উপকরণ সামগ্রী বৃটিশ পক্ষেরই হস্তগত ও তাহা দের জয় পতাকা উত্তোলিত এবং আফগান সেনারা পঞ্জাব হইতে দূরীকৃত হইল।

লর্ড ডেলহৌসী। শের সিংহ এক্ষণে বিবেচনা করিলেন, ইংরাজদের অনুকম্পা ব্যতীত আর আমাদের পরিত্রাণের উপায় নাই। তিনি ১৮৪৯ খ্রীঃ অব্দের ৫ই মার্চ বৃটিশবলীদিগকে বৃটিশসেনাপতির শিবিরে পাঠাইয়া দিলেন ও ১৪ই মার্চ তের জন সরদার ও ষোল হাজার সেনা সমভিব্যাহারে বৃটিশ সেনাপতির সম্মুখে উপস্থিত হইলেন ও সমুদায় অস্ত্র শস্ত্র তাঁহার পাদোপরি সমৰ্পণ করিলেন। এইরূপে প্রধান সংগ্রামিক কর্মচারীর কাৰ্য্য সমাপ্ত হইলে পর ব্যবহারিক শাসন কর্তার কাৰ্য্য আরম্ভ করিবার সময় উপস্থিত হইল। লর্ড ডেলহৌসী ক্ষিপ্ৰকৰ্ম্মা ছিলেন, পঞ্জাবের রাজকাৰ্য্য নিৰ্বা- হের বন্দোবস্ত করিতে কালবিলম্ব করেন নাই। তিনি ফিরােজপুর হইতে এই ঘােষণা প্রচার করিলেন, লর্ড হার্ডিঞ্জ মহারাজ দলীপ সিংহের সহিত যে সন্ধি করিয়াছিলেন, অতঃপর বৃটিশগবর্ণমেন্ট সে সন্ধির নিয়মানুসারে চলিবেন না। এই অবধি পঞ্জাব বৃটিশ- রাজ্যের একটা অংশ হইল। মহারাজ দলীপ সিংহ পদচ্যুত রাজার ন্যায় সম্মানিত ও সমাদৃত হইবেন এবং বাৎসরিক পাঁচ লক্ষ টাকা বৃত্তি পাইবেন। যুদ্ধ কালে যে সকল সরদার সদ্ব্যবহার করিয়া ছিলেন, তাহারা স্ব স্ব পদে প্রতিষ্ঠিত থাকিবেন ও যাহারা বিদ্রো- হাচরণ করিয়াছিলেন; তঁাহাদের ভূমিসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাইবে। যদিও লাহােরদরবারস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্ট ইতিপুর্বেই ডেল- হৌসী প্রণীত এই অভিনব নাটকের অভিনয় করিয়াছিলেন, তথাপি গবর্ণর জেনেবল উহার পুনরভিনয়ার্থ ইলিয়ট সাহেবকে সসৈন্তে লাহােরে পাঠাইয়া দিলেন । ১৮৪৯ খ্রীঃ অব্দের ২৯শে মার্চ লাহােরে শেষ দরবার হয়। মহারাজ দলীপ সিংহ ও সমাগত সরদারগণের সমক্ষে ঘােষণাপত্র ইংরাজী, পারস্য ও হিন্দুস্থানীভাষায় পঠিত হইল। পাঠকালে সকলে নিস্তব্ধভাবে ছিলেন, কেহই কোন কথা বলেন নাই। কেবল দেওয়ান রাজা দীননাথ, এইমাত্র কহিলেন, গবর্নর জেনেলের এই বিচার ন্যায়ানুগত হউক অথবা ন্যায় বিরুদ্ধই হউক, আমাদিগকে উহা প্রতিপালন করিতেই হইবেক। অনন্ত ৮২ লঘু চরিতমঞ্জরী। রাজা তেজ সিংহ করার পত্রখানি মহারাজ দলীপ সিংহের হস্তে দিলেন।দলীপ সিংহও উহা তৎক্ষণাৎ স্বাক্ষর করিলেন। এইরূপে ঘােষণা পত্র পঠিত ও করারপত্র স্বাক্ষরিত হইলে পর ইলিয়ট সাহেব বিদায় লইয়া - বহির্গত হইলেন, এমত সময়ে দুর্গ মধ্য হইতে ইংরাজদের জয়পতাকা উড্ডীয়মান হইল ও তােপধ্বনি হইতে লাগিল। ইহাতে খাল সারা স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারিল, যে বৃটিশ- রাজ্যের সৌভাগ্যসূর্যের সমুজ্জল তেজে শিখজাতির গৌরব চিরকালের জন্য মলিন হইয়া গেল এবং সকলি লােহিতবর্ণ হইয়া যাইবে” * মহারাজ রণজিৎ সিংহের এই ভবিষ্যৎ বাণীও সফল হইল। এক্ষণে কুমারিকা অন্তরীপ হইতে হিমালয় পর্যন্ত বৃটিশ অধিকার বিস্তৃত হইয়া পড়িল। তৎকালে এই সুবিস্তীর্ণ ভারতবর্ষের স্থানে স্থানে অনেক রাজা ছিলেন বটে, কিন্তু তাহারা রাজক্ষমতা বিহীন হইয়া বৃটিশ গবর্ণমেন্টের করতলস্থ হইয়াছিলেন। মহারাজ রণজিৎ সিংহ মৃত্যুকালে জগৎবিখ্যাত কোহিনুর । জগন্নাথ দেবের নামে উৎসর্গ * কোন সময়ে এক শিখ যুবক লাহােরের নিকটবর্তী লুধিয়ানা নগরের ইংরাজী বিদ্যালয়ে পড়িতে যান। তিনি তথায় পাঠ সমাপন করিয়া ফিরিয়া আসিলে মহারাজ রণজিৎ সিংহ একখানি মানচিত্র আনাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন। ইহার স্থানে স্থানে লােহিতবর্ণ রেখা দৃষ্ট হইতেছে, উহা কি ? শিখ যুবা উত্তর করি- লেন, মহারাজ! এ সকল ইংরাজাধিকারের চিহ্ন। ইহাতে রণজিৎ সিংহ কিঞ্চিৎ বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া মানচিত্র দূরে ফেলিয়া দিলেন ও উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, কালক্রমে সকলি লোহিত বর্ণ হইয়া যাইবে। এরূপ প্রবাদ আছে, এই রত্ন প্রথমতঃ রাজা যুধিষ্টিরের অধিকারে ছিল। কালক্রমে উহা দিল্লীর সম্রাট সাজিহানের হস্তগত ও উহা দ্বারা তাহার সুবিখ্যত মযুরাসন সুশােভিত হয়। যৎকালে পরস্যরাজ নাদিয়- সাহ দিল্লী আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন, ঐ সময়ে কোহিনুর তাহার হস্তে পড়ে। তাহাগ নিধন প্রাপ্তির পরে উহা আহম্মদ আবদালির হস্তগত হয়।

লর্ড ডেলহৌসী। সর এই করিয়াছিলেন। পঞ্জাব পরাজয়ের পরে উহা ইংলণ্ডেশ্বরের নিকটে প্রেরিত হইল। অধুনা উহা ইংলণ্ডেশ্বরীর মুকুটের ভূষণ হইয়াছে। লর্ড, ডেলহৌসী এইরূপে পঞ্জাবের বন্দোবস্ত করিবার পরে মহারাজ, দলীপ সিংহের বিদ্যাভ্যাসেরও বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। তৎকালে দলীপ সিংহ দ্বাদশবর্ষ বয়স্ক হইয়াছিলেন। লর্ড ডেল- হৌসী জন লগিন নামক একজন ডাক্তরকে তাহার শিক্ষক নিযুক্ত করেন। এই শিক্ষক কিছুকাল পরে দলীপ সিংহকে খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করেন ও ইংলণ্ডেশ্বরীর নিকট হইতে “ সর, সমসূচক উপাধি প্রাপ্ত হন। দলীপ সিংহ প্রাপ্ত হন। দলীপ সিংহ এক্ষণে স্কটল আছেন ও তথাকার লঙদিগের শ্রেণীভুক্ত হইয়া গিয়াছেন। এ দিকে চিলিয়ানালা যুদ্ধের ভয়ঙ্কর হত্যার সংবাদ ইংলণ্ডে পৌছিলে সৰ্বসাধারণে লর্ড গফের প্রতি অতিশয় অসন্তুষ্ট হইলেন। গফ অতি উপযুক্ত সেনাপতি ছিলেন, তিনি ইতিপূর্বে অনেক জয়লাভ করিয়া লব্ধপ্রতিষ্ঠ হন। কিন্তু এক্ষণে সকলে তঁাহার সেই অধিনায়কোচিত গুণগ্রাম বিস্মৃত হইয়া বলিলেন, লড গফ সেনাপতিপদের অনুপযুক্ত। কর্তৃপক্ষেরাও অসন্তোষের চিঃ সকল প্রকাশ করিতে লাগিলেন। সর, চালস নেপিয়ারের ভারতবর্ষে আসিবার কথা হইল। ইংলণ্ডীয় প্রধান সেনাপতি ওয়েলি- ঙটন কহিলেন, না হয়, আমিই যাইতেছি। সে যাহা হউক, পরি- শেষে সর চালস নেপিয়ারকে ভারতবর্ষীয় সেনাগণের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত করিয়া পঞ্জাবে প্রেরণ করাই স্থির হইল। তদনুসারে নেপিয়ার ইংলণ্ড হইতে যাত্রা করিলেন, কিন্তু তিনি পঞ্জাবে পেশছিয়া দেখিলেন, লড গফ, কাৰ্য সমাধা করিয়া তুলিয়াছেন। শিখেরা পরাজিত ও পঞ্জাব বৃটিশ রাজ্যে যযাজিত হইয়াছে। যুদ্ধে তৎপরে উত্তরাধিকারি-ক্রমে উহা তদীয় পৌত্র সামুজা প্রাপ্ত হন। মহারাজ রণজিৎসিংহ, সাজার নিকট হইতে কোহিনুর বল পূর্বক গ্রহণ করিয়াছিলেন।

লঘু চরিতমঞ্জরী। নেপিয়ারের ভারতবর্ষে পৌছিবার কিছু দিন পরে এরূপ একটা কারণ উপস্থিত হয়, যে তাহাতে তঁাহাকে পদ ত্যাগ করিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে হইল। সিপাইরা বৃটিশ রাজ্যের বাহিরে কাৰ্য্য করিবার নিমিত্ত যে অতিরিক্ত ভাতা পাইত, পঞ্জাব বৃটিশ রাজ্যে যােজিত হওয়াতে তাহা উঠিয়া সিপাইরা সেই অতিরিক্ত বেতন পাইবার নিমিত্ত অবাধ্য হইয়া প্রকাশ্য বিদ্রো- হের লক্ষণ সকল প্রকাশ করে। লড় ডেলহৌসী এই সময়ে সমুদ্রযাত্রা করিয়াছিলেন। তথায় পত্র লিখিয়া সত্বর তঁাহার অভিপ্রায় অবগত হইবারও কোন সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু আবার এ দিকে সিপাইদের বেতনের বিষয় বিবেচনা করিতে বিলম্ব হইলে ভারতরাজ্য ঘােরতর সঙ্কটে পতিত হয়। নেপিয়ার, সিবিল গবর্ণরের মত নিরপেক্ষ হইয়া সিপাইদের বেতন বৃদ্ধি করিয়া দেন। অনন্তর লড ডেলহৌসী কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিয়া সিপাইদের বেতন বৃদ্ধি করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে নেপিয়ার বলিলেন, পঞ্জাব- রাজ্যস্থিত সিপাইরা পূর্বের ন্যায় অতিরিক্ত বেতন না পাওয়াতে বিদ্রোহে উন্মুখ হয়। আমি সাংগ্রামিক নিয়মানুসারে তাহাদের দণ্ড বিধান করিয়াও যখন দেখিলাম, তাহার বশবর্তী হইল না, তখন রাজ্যের বিপদ অনিবাৰ্য বোধে তাহাদের কিঞ্চি বেতন বৃদ্ধি করিয়া দিয়াছি। ডেলহৌসী কহিলেন, ২৪ দল সেনা বিদ্রোহে- মুখ হইয়াছিল, তাহাতে রাজ্যের বিপদ ঘটিবার কোন সম্ভাবনা ছিল , অতএব সিপাইদের বেতন বৃদ্ধি করা অন্যায় হইয়াছে। নেপি- য়ার, লর্ড লেহৌসীর ন্যায় তেজস্বী ছিলেন। আকাশে কখনই দুই সূর্য তেজঃগুঞ্জ বিস্তার করিতে পারে না, গবর্ণজেনেরলের সহিত অকৌশল হওয়াতে নেপিয়ার অস্বাস্থ্য ব্যপদেশে তদানীন্তন ইংলঞ্জীয় প্রধান সেনাপতি ওয়েলিঙটনের নিকট পদত্যাগপত্র পাঠাইয়া দিলেন। লর্ড ভেলহেদী ১৮৫২ খ্ৰীঃ অকে একটা সামান্য কারণ উপলক্ষ করিয়া আদেশের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। ১৮২৬ খ্ৰীঃ অব্দে লর্ড লর্ড ভেলহৌসী। আমহাষ্টের অধিকার কালে ব্ৰহ্মদেশাধিপতির সহিত ইংরাজদের একবার যুদ্ধ হয়, তাহাতে ব্রহ্মরাজ পরাস্ত হন ও কতকগুলি প্ৰদেশ প্রদান করিয়া ইংরাজদের সহিত সন্ধি করেন। এই সন্ধি প্রায় পঁচিশ বৎসর পর্যন্ত অক্ষত ছিল। ব্ৰহ্মদেশীয়েরা অহঙ্কত, অসভ্য ও নির্বোধ। তাহারা সুযোগক্রমে সুযোগক্রমে কখন কখন ইংরাজদের প্রতি সাহঙ্কার ব্যবহার করিত, কিন্তু তাতে ইংরাজ জাতির কোন ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা ছিল না, ইংরাজেরা ইরাবতী নদীর তীরে কোন ইংরাজের অবমাননা ও যমুনা পুলিনে কোন ইংরাজের অবমাননা এদুয়ের অনেক ইতর বিশেষ মনে করিতেন। ব্ৰহ্মদেশ ভারতবর্ষের সীমার বহির্ভূত, তথায় কেহ কোন ইংরাজের প্রতি অশিষ্ট ব্যবহার করিলে ভারতবর্ষীয় রাজগণ অথবা প্রধান প্রধান ব্যক্তি তাহা জানিতে পারিতেন না। এই নিমিত্ত ইংরাজেরা এতদিন পৰ্যন্ত সমানে সসমে থাকিয়া ব্ৰহ্মদেশীয়দিগের সেই ঔদ্ধত্য সহ্য করিয়া আসিতে ছিলেন। ১৮৫১ খ্ৰীঃ অব্দে রেঙ্গুনের গবর্নর কতিপয় বৃটিশ বণিকের পােধ্যক্ষের অবমাননা করেন। লর্ড ডেলহৌসী অতিশয় তেজস্বী ছিলেন, বৃটিশ প্রজার উপরে কেহ কোন অত্যাচার করিলে কখনই তাহাতে উপেক্ষা করিতেন না। তিনি অবিলম্বে রেঙ্গনের গবর্ণরের নিকটে ক্ষতি পূরণ স্বরূপ প্রচুর অর্থ দাওয়া করিলেন। কিন্তু এই কার্য সম্পন্ন করিবার ভার একজন পােতাধ্যক্ষের প্রতি অর্পিত হয় । সন্ধি কাৰ্য্য অপেক্ষা পােতবাহন কাৰ্য্যে তাহার অধিকতর নৈপুণ্য ছিল, তিনি রেঙ্গুনের গবর্ণরের অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহারে ক্রোধান্ধ হইয়া ব্ৰহ্মদেশের একখানি জাহাজ আক্রমণ করেন। ইহাতে পুনরায় যুদ্ধ বাধিয়া উঠিল। এস্থলে যুদ্ধের বিশেষ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আমাদের উদ্দেশ্য নহে। এই মাত্র বলিলেই পৰ্যাপ্ত হইবে, ইংরাজের জয়লাভ করেন ও পেগু প্রদেশ তাহাদের পদানত হয়।.লর্ড ভেলহৌসী, পেশু প্রদেশটী বৃটিশ রাজ্যে যােজিত করিয়া ব্ৰহ্মদেশীয়দিগের কৃত অবমাননার পরিশোধ করেন।

লঘু চরিতমঞ্জরী। ' লড ডেলহৌসী ভারতবর্ষে আসিয়া এইরূপে কতিপয় বৎসরের মধ্যে দুইটী মহাযুদ্ধ সম্পন্ন করিয়া দুইটা প্রধান রাজ্য বৃটিশ অধি- কারভুক্ত করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি আর যে সকল আক্রমণে প্রবৃত্ত হন, তাহাতে তাহাকে যুদ্ধের অনুষ্ঠান করিতে হয় নাই। কেনই বা হইবেক ? আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বল হইলে সহজেই প্রবল আক্রমণ- কারীর মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইয়া থাকে। লড ডেলহৌসী ভারতবর্ষে আসিবার কিছুকাল পরেই সেতারা বৃটিশ অধিকার ভুক্ত করিবার সুযােগ উপস্থিত হয়। সেতারা নগর মহাবলেশ্বর পাহাড়ের নিকটে ও কৃষ্ণানদীর উৎপত্তি স্থানের অনতি দূরে অবস্থিত। এই নগর মহারাষ্ট্রীয় রাজ্যের স্থাপয়িতা শিবজীর রাজধানী ছিল। শিবজীর পৌত্র সাহু, বলজী বিশ্বনাথকে পেশোয়া ( প্রধান মন্ত্রী নিযুক্ত করেন। সাহু, সম্পূর্ণরূপে অমাত্যের আয়ত্ত ছিলেন। তঁাহার পরলােক প্রাপ্তির পর তদীয় উত্তরাধিকারিগণ ক্রমশঃ নিস্তেজ হইয়া পড়িলেন, কিন্তু পেশােয়া (মন্ত্রী) সমুদায় রাজ্য মধ্যে প্রধান হইয়া উঠিলেন। লড হেষ্টিংস ১৮১৮ খ্রীঃ অকে পরাক্রান্ত, পেশােয়াকে পরাভূত ও শিবজীর বংশধর প্রতাপ- সিনকে রাজ্যে পুনঃস্থাপিত করেন। অনন্তর রাজা প্রতাপ সিন ও কোম্পানি বাহাদুরের মধ্যে যে সন্ধি স্থাপিত হয়, সেই সন্ধি পত্রে এইরূপ লিখিত ছিল, প্রতাপসিন পুত্র পৌত্রাদিক্রমে চিরকাল রাজ্য ভােগ করিতে পাইবেন। যদি পুত্র পৌত্রাদির অভাবে দত্তক গৃহীত হয়, তাহা হইলেও ঐ দত্তক পুত্র রাজাধিকারী হইবেন। কোম্পানি বাহাদুর তাহাতে কোন আপত্তি করিবেন না। ১৮১৯ খ্রীঃ অব্দে এই সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত ও প্রচারিত হয়। ইহার বিংশতি বৎসর পরে (১৮৩৯) ইংরাজেরা প্রতাপসিনকে এই বলিয়া দোষী করেন, আপনি নাগপুরের পদচ্যুত রাজা ও গোয়া নগরবাসী পাের্ক গীশদিগের সহিত মিলিত হইয়া, বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার মন্ত্রণা করিতেছেন। ইংরাজেরা কোন্ মূল অবলম্বন করিয়া প্রতাপসিনের প্রতি এই রূপ দোষারােপ করিয়া ছিলেন, তাহা আমরা অবগত ।

লর্ড ডেলহৌসী। নহি। প্রত্যুত যে সমস্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহাতে সেতারারাজকে সম্পূর্ণ নির্দোষী বলিয়াই প্রতীতি জন্মে। গোয়ার শাসনকর্তা স্পষ্টাভিধানে বলিয়া গিয়াছেন, প্রতাপসিন বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে আমাদের সহিত কোন প্রকার ষড়যন্ত্র করেন নাই, ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে আমার নামে যে সকল পত্র প্রেরিত হইয়াছিল, সে সকল কৃত্রিম। কর্ণেল ছাছুক নামক কোম্পানির এক জন কর্মচারী (যিনি কিছুকাল ইণ্ডিয়া কৌন্সেলে মেম্বর হইয়াছিলেন) বলিয়া গিয়াছেন, নাগপুরের পদচ্যুত রাজা মধুঙ্গী ভসে গােধপুরে একটা সামান্য স্থানে বাস করিতেন। ভিক্ষাই তঁাহার জীবিকা ছিল, অতএব তিনি যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়া প্রচুর অর্থ দিয়া প্রতাপসিনের সাহায্য করিবেন, ইহা নিতান্ত অসম্ভব। সে যাহা হউক, প্রতাপসিন আরােপিত দোষ হইতে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় যথারীতি বিচার প্রার্থনা করেন, কিন্তু ইংরাজেরা রীতিমত বিচার করিলেন না। তাঁহার দোষানুসন্ধার্থ গুপ্তভাবে একটা কমিটী নিযুক্ত হইল। কমিটী তঁাহারে দোষী স্থির করিয়া দিলেন। অনন্তর রাজা রাজভবন হইতে রাত্রিকালে বহিষ্কৃত ও নগর হইতে প্রায় চারি ক্রোশ দূরে স্থিত একটী গােশালায় নীত হইলেন। তাহার ধনাগারে স্বর্ণ, রৌপ্য ও মণি মুক্তাদিতে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা পাওয়া গেল। কোম্পানি ঐ টাকা আত্মসাৎ করিলেন। ইংরাজেরা এইরূপে প্রতাপসিনকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া তাহার ভ্রাতা আপাসাহেবকে সিংহাসনে আরােপিত করেন। আপাসাহে- বের সহিত কোম্পানির কোন প্রকার নূতন নিয়মে সন্ধি হয় নাই, কোম্পানি এইরূপ ভূমিকা করিয়া পূৰ্ব্বকৃত সন্ধির সমুদায় নিয়ম- গুলি বজায় রাখিলেন, যে সেতারা অধিকার করা আমাদের অভি, প্রেত নহে। প্রতাপসিন আপন কৰ্ম্মফলে দণ্ডিত হইলেন। আপনি তাঁহার সহােদর, এক্ষণে আপনি যথানিয়মে রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন করুন। ও ১৮৪৯ খ্ৰীঃ অব্দে প্ৰতাপসিন ও আপাদাহেব দুই *, লঘু চরিতমঞ্জরী। ভ্রাতাই ক্রমান্বয়ে পরলােক গমন করেন। তাহাদের কাহারই ঔর পুত্র ছিল না, কিন্তু তাহারা হিন্দুশাস্ত্রানুলারে দত্তকপুত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন। বহুকালাবধি ভারতবর্ষে এই রীতি আছে, ঔরসপুত্রের ন্যায় দত্তক পুত্রও বিয়য়াধিকারী হয়, কিন্তু লড ডেলহৌসী সেই চিরন্তন রীতি উল্লম্বন করিয়া ইংলণ্ডে ডিরেক্টর সভায় এই মর্মে একখানি পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন, প্রকৃত উত্তরাধিকারীর অভাবে হউক, অথবা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের মতানুসারে দত্তক গৃহীত না হওয়াতেই হউক, অধীন রাজ্য অধিকার করিবার সুযােগ উপস্থিত হইলে তাহাতে উপেক্ষা করা কোন মতেই কর্তব্য নহে। তাদৃশ স্থলে অধীন রাজ্য অধিকার ভুক্ত করাই বৃটিশ গবর্ণমেন্টের একটা নিয়ম। আপাসাহে- বের মৃত্যু হওয়াতে সেই নিয়ম প্রচলিত করিবার উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব আপনারা এবিষয়ে উপেক্ষা করিবেন না। ডিরেক্টরের ১৮৪৯ খ্ৰীঃ অব্দের জানুয়ারি মাসে ডেলহৌসীর প্রেরিত পত্রের এই উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন, আমরা আপনকার মতে সম্মত হইয়া লিখিতেছি, ভারতবর্ষের সাধারণ নিয়ম ও রীত্য- নুসারে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অনুমতি ব্যতিরেকে সেতারার ন্যায় অধীন রাজ্য দত্তকপুত্রে অর্শিতে পারে না। কিন্তু অনুমতিদান আমাদের ইচ্ছা সাপেক্ষ, আমরা কোন প্রকারেই অনুমতিদান বিষয়ে অঙ্গী- কার বদ্ধ নহি। এইরূপে সেতার বৃটিশ রাজ্যে যােজিত হইল বটে, কিন্তু তাহার উপরে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের কোন প্রকার বৈধস্বত্ব দৃষ্ট হইতেছে না। যদি প্রতাপসিন কোম্পানির সহিত অসদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন ও যদি সেই অসদ্ব্যবহারই তাহার স্বত্বলোপের কারণ হয়, তবে আমরা আর কোন কথা বলিতে ইচ্ছা করিনা। কিন্তু আপাসাহেব কি অপরাধ করিয়াছিলেন, যে তাহার পুত্র বিষয় লাভে বঞ্চিত হইগেন। আপানাহেব । কোম্পানির অকপট মিত্র ছিলেন। তিনি রাজ্যমধ্যে কখনই কোন প্রকার অত্যাচার করেন লড’ডেলহৌসী। ২৯ নাই। তাহার অধিকার সময়ে প্রজারা পরমসুখে বাল করিত। অতএব তাহার স্বত্ব বিলোপের কোন প্রকার ন্যায়ানুগত কারণই দৃষ্ট হইতেছে না। লর্ড ডেলহৌসী ও তাহার বণিক প্রভুরা এই একটী হেতু প্রদর্শন করেন, সেতারা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অধীন, সেতা- রার উপরে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের সর্বতােমুখী ক্ষমতা ছিল। তাহা- দের এই হেতুপন্যাস কিরূপে সুসঙ্গত হয়, তাহা বুঝিতে পারা যা না। যদি সেতারা অধীন রাজ্যই হয়, তবে কোম্পানি ১৮১৮ খ্রীঃ প্রতাপ সিনকে সেতারার স্বাধীন রাজা বলিয়া যে ঘােষণা করিয়াছিলেন, তাহার সার্থকতা কোথায় থাকিল ? যে উত্তরাধিকারিত্বের নিয়ম কি নিঃসন্তান রাজার সুশােভন ভবনে কি নিঃসন্তান দরিদ্রের ভগ্ন কুটীরে সর্বত্রই প্রচলিত ছিল, লর্ড ডেলহৌসী সেই নিয়ম উল্লম্বন করিয়া প্রথমতঃ সেতারা বৃটিশ অধিকারভুক্ত করেন। তাহার এই অবৈধ কাৰ্য্য দর্শনে পশ্চিম প্রদেশ শীয় রাজগণ ও জমিদারবর্গ ভীত হইলেন ও বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিপক্ষ হইয়া উঠিলেন। ১৮৫৩ খ্ৰীঃ অব্দে নাগপুরাধিপতি রঘুজী ভন্সেলে অপুত্রক অবস্থায় কলেবর পরিত্যাগ করেন। তিনি মৃত্যুকালে জ্যেষ্ঠ সহধৰ্ম্মিণীর প্রতি গ্রহণ করিবার অনুমতি দিয়া যান। তদনুসারে তঁাহা মহিষী গ্রহণ করেন। হিন্দুশাস্ত্রানুসারে স্বামীর অনুমতিক্রমে ভাৰ্য্যার দত্তক গ্রহণ করিবার রীতি আছে। বৃটিশ গবর্ণমেন্ট ইতিপূৰ্ব্বে কখনই উক্ত রীতি উল্লজম করেন নাই। ১৮৩৪ খ্রীঃ অব্দে ধারাধিপতি সহধৰ্ম্মিণীর প্রতি দত্তক গ্রহণ করিবার অনুমতি দেন। তদনুসারে যে দত্তক পুত্র গৃহীত হয়, বৃটিশ গবর্ণ- মেন্ট, তাহাকে রাজ্যে স্থাপিত করিয়াছিলেন। লর্ড ভেলহৌসী উক্ত প্রকার বহুতর প্রমাণ সত্বেও নাগপুর রাজ্ঞীর গৃহীত দত্তক পুত্রকে রাজ্যলাভে বঞ্চিত ও নাগপুর বৃটিশ রাজ্যে যােজিত করেন। লর্ড ডেলহৌসী সেতারা ও নাগপুর অধিকার করিবার বৃটিশ বর্ণমেন্টের অনুমতানুসারে অথবা যথাবিধি দত্তক গৃহীত দত্তক একটা দত্তক লঘু চরিতমঞ্জরী। হয় নাই, এইরূপ ছল করিয়া দত্তক গ্রহণ বিধির কিঞ্চিৎ মান রাখি- মাছিলেন, কিন্তু ব্যন্সি অধিকার করিবার সময়ে উক্ত বিধি প্রকাশ রূপেই উল্লম্বন করেন। ঝান্সি, বুন্দেলখণ্ডের সন্নিহিত একটা ক্ষুদ্র রাজ্য। ভারতবর্ষীয় অপরাপর সকল রাজ্য অপেক্ষা উহার উপরে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অধিকতর ক্ষমতা ছিল, তথাপি বৃটিশ গবর্ণ- মেন্ট যথেচ্ছ ব্যবহার না করিয়া এই ক্ষুদ্র রাজ্যটা বজায় রাখেন ও রামচন্দ্র রাওকে ঝালির মহারাজা বলিয়া ঘােষণা করেন। রামচন্দ্র রাও লর্ড উইলিয়ম বেন্টিকের অধিকার কালে এই রাজ্যে রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি কখনই বৃটিশ গবর্নমেন্টের প্রতিকূল ব্যব হার করেন নাই, বরং নানা প্রকারে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের সম্মানই করিয়াছিলেন। ১৮৫৩ খ্রঃ অব্দে তদানীন্তন মহারাজ গঙ্গাধর রাও উদরাময় রোগে আক্রান্ত হন ও তাহাতে তাহার জীবন সংশয় হইয়া উঠে। গঙ্গাধর রাও নিঃসন্তান ছিলেন। পুত্রহীন ভাগ্যবান ব্যক্তির মৃত্যু সন্নিহিত জানিতে পারিলে স্বভাবতঃ দত্তক গ্রহণে সমুৎসুক হন, গঙ্গাধর রাও নিকট সম্বন্ধ আনন্দ রাও নামক জ্ঞাতি- পুত্রকে যথাবিধি দত্তক গ্রহণ করিলেন গ্রহণ করিলেন এবং দরবারস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্টকে এই মর্মে এক খানি পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন, যে আমি এক্ষণে অতিশয় পীড়িত হইয়াছি। আমি বৃটিশ গবর্ণমে- ন্টের প্রতি অতিশয় অনুরক্ত এবং বৃটিশ গবর্ণমেন্টও আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিয়া আসিতেছেন এরূপ স্থলে আমার সহিত আমার পিতৃপুরুষের নাম বিলুপ্ত হইয়া যাইবে, ইহা সামান্য আক্ষেপের বিষয় নহে, অতএব বৃটিশ গবর্ণমেন্টের সহিত যে সন্ধি- স্থাপিত হইয়াছিল, আমি সেই সন্ধির দ্বিতীয় নিয়মানুসারে একটা দত্তক গ্রহণ করিলাম। আমার বয়ঃক্রম অধিক হয় নাই। জগদী- ধরের অনুগ্রহ ও বৃটিশ গবর্ণমেন্টের প্রসাদে যদি আমি রোগ- হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা হইলে আমার পুত্র হইবারও সম্ভা- বনা আছে। যদি অামার এই আশা ফলবতী হয়, তবে উত্তরকালে যেরূপ আবশ্যক বােধ হইবে, তাহাই করিয়া যাইব, কিন্তু যদি এ ১) লড ডেলহৌসী। ৯১ যাত্রায় রক্ষা না পাই, তবে আমার এইমাত্র প্রার্থনা, বৃটিশ গণ- মেন্ট আমার প্রভুভক্তি স্মরণ করিয়া আমার এই দত্তকপুত্রের প্রতি কৃপাদৃষ্টি করেন ও আমার ভাৰ্যাকে এই বালকের মাতাস্বরূপ গণনা করিয়া তাহাকে রাজ্যমধ্যে কর্তৃত্ব করিতে দেন, যেন তিনি কোন প্রকারে ক্ষুগ্ন না হন। গঙ্গাধর রাও বৃটিশ রেসিডেন্টকে এই পত্র প্রেরণ করিবার কিয়- দ্দিন পরে পরলােক গমন করেন। তাঁহার পত্নী লক্ষ্মীবাই অতিশয় তেজস্বিনী ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। তিনি অবিলম্বে স্বামীর প্রার্থনা পূরণ করিবার জন্য লড ডেলহৌসীর নিকটে একখানি আবেদন পত্র পাঠা- ইলেন, কিন্তু গবর্ণরজেনেরল তাহার আবেদন গ্রাহ্য না করিয়া ঝান্সি বৃটিশ অধিকার ভুক্ত করিতে আদেশ করেন। লক্ষ্মী বাই তঁাহার আদেশ রদ করিবার জন্য বিস্তর চেষ্টা পাইয়াছিলেন, কিন্তু কিছু তেই কিছু করিতে পারিলেন না। একদা বৃটিশ রেসিডেন্ট তাহার সহিত সাক্ষাৎ করতে তিনি পরদার পশ্চাতে দাড়াইয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিয়াছিলেন, “ মেরা ঝান্সি দেগ। নহি কিন্তু তিনি বাক্যে যেরূপ তেজস্বিনী ছিলেন, কাৰ্যে তৎকালে ততদূর ছিলেন না, সুতরাং তাহার ক্ষুদ্ররাজ্য ঝান্সি উত্তর পশ্চিম প্রদেশের সহিত যোজিত হইয়া গেল। লর্ড ডেলহৌসী ঝান্‌সি গ্রহণ করিবার যে কারণ প্রদর্শন করিয়া ছেন, তাহাতে তাহার কপট ভাব প্রকাশ পায় নাই। তিনি স্পষ্টাভি- ধানে বলিয়াছিলেন, ঝান্সি অধিকার করাতে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিশেষ লাভের প্রত্যাশা নাই। উহা ক্ষুদ্র রাজ্য এবং উহার আয়ও যৎসামান্য, তবে লাভের মধ্যে এইমাত্র দৃষ্ট হইতেছে, যে ঝান্সি বুন্দেলখণ্ডের সন্নিহিত, উহা, অধিকার করাতে বুন্দেলখও প্রদেশের রাজস্ব সংগ্রহ ও বিচার নির্বাহ প্রভৃতি ও কার্সের সুবিধা হইল। লড ডেলহৌসী কর্ণাট ও তাঞ্জোর রাজ্যের যে কিঞ্চিত মান সম্ ছিল, তাহাও বিলুপ্ত করেন। লর্ড ওয়েলেসলির অধিকার লঘু চরিতমঞ্জরী। { ৩ কালে কর্ণাটের নবাব ও তাঞ্জোরের হিন্দু রাজার শাসন ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়, কিন্তু তাহাদের রাজোপাধি ছিল ও তাহারা প্রচুর বৃত্তিও ভােগ করিয়া আসিতেছিলেন, লড ডেলহৌসীর অধিকার কালে তাহারা উভয়েই পরলোক গমন করেন। তাঁহাদের ঔরসপুত্র ছিল না। লর্ড ডেলহৌসী এই সুযােগে উল্লিখিত দুইটা রাজপরি- বারের শূন্য গর্ভ উপাধি উঠাইয়া দেন ও তাহারা যে প্রচুর বৃত্তি ভােগ করিতেন, তাহাও বাজেয়াপ্ত করেন। পূর্বে ভারতবর্ষে অনেক পদচ্যুত রাজা ছিলেন। যদিও শ্বেত পুরুষের সন্ধি দ্বারা হউক অথবা জয় করিয়াই হউক, তাহাদের রাজ- চিহ্ন সকল হস্তগত করেন, তথাপি তঁাহারা আপনাদের পুরাতন বংশের নাম সম্বম বজায় রাখিয়াছিলেন ও প্রচুর রাজস্ব ভােগ করি- তেন। ডেলহৌসীর অধিকার কালে উক্ত প্রকার তিন জন রাজার পরলােক প্রাপ্তি হয়। সেতারা, নাগপুর ও পুনা এই তিনটা নগরে মহারাষ্ট্রীয়দিগের তিনটী প্রধানবংশ রাজত্ব করিতেন। লর্ড ডেল- হৌসী যেরূপে প্রথমােক্ত দুইটা রাজ্য ধ্বংস করেন, তাহা ইতিপূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে। এক্ষণে শেষােক্ত মহারাষ্ট্রীয় বংশের উচ্ছেদের বিষয় বিস্তারিতরূপে বর্ণিত হইতেছে। পেশােয়ায় শিবজীর বংশধরগণের ক্ষমতা বিলুপ্ত করিয়া পুনা নগর রাজধানী করেন। পুনা নগর প্রশস্ত প্রান্তর মধ্যে অবস্থিত। উহার মধ্য দিয়া মুতা ও মূলা নদী প্রবাহিত হইতেছে। মন্ত্রীর এই রাজধানী অতি ত্বরায় কি ঐশ্বৰ্য, কি দৈর্ঘ্য, কি লোক সংখ্যা সকল প্রকারেই রাজার রাজধানী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইয়া উঠিল। লড হেষ্টিংস অব্দে হাইদেরাবাদের নিজামের সাহায্যে পুনার শেষরাজাবাজিরাও পেশোয়াকে পরাস্ত ও তঁাহার রাজ্য হস্তগত করেন। বাজিরাও তদানীন্তন সন্ধি বিষয়ক কৰ্ম্মচারী সর জন মেকলমের শরণাপন্ন হন। মেলম অতিশয় দয়ালু ছিলেন, তাহার অনুরােধে বৃটিশ:গবর্ণমেন্ট পেশােয়কে কানপুরের নিকটে বিখুর নগর প্রদান করেন ও তাহারে বাৎসরিক ৮লক্ষ টাকা পেন্সন ১৮১৮ লড ডেলহৌসী। নির্ধারিত করিয়া দেন। বাজিরাও দীর্ঘজীবী ছিলেন, তিনি বিশ- বৎসরেরও অধিক কাল উক্ত নগরে আধিপত্য করেন। তাহার অপত্য ছিল না, তিনি দেশ প্রচলিত রীত্যনুসারে একটী দত্তক গ্রহণ করেন। এই পুত্রের নাম নানা সাহেব। বাজিরাও মৃত্যুর ৰুতিপয় বৎসর পূর্বে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের গােচর করেন, যে আমি যুথারীতি একটী দত্তক গ্রহণ করিয়াছি। আমার প্রার্থনা এই, আমার মৃত্যুর পরে সেই দত্তকপুত্র আমার উপাধি ও পেনের উত্তরাধি- কারী হয়। কোম্পানি তাহার প্রার্থনা শুনিলেন না, কিন্তু তাহারা তঁাহার আশা একবারেই নিৰ্ম্ম ল না করিয়া কহিলেন, ভবিষ্যতে এ বিষয় বিবেচনা করা যাইবে, আপনার পরিবারের ভরণ পােষণের কোন উপায় করিয়া দিব। বাজিরাও ১৮৫৩ খ্রঃ জব্দের জানুয়ারি মাসে কলেবর পরিত্যাগ করেন। এই সময়ে নানা সাহেবের বয়ঃক্রম ২৭ বৎসর হইয়াছিল তিনি পিতার মৃত্যুতে ১৫ লক্ষ টাকা নগদ ও ১৫ লক্ষ টাকার কো- ম্পানির কাগজ প্রাপ্ত হন। নানা সাহেব এই প্রচুর অর্থের উত্ত- রাধিকারী হইলেন বটে, কিন্তু তাঁহাকে অনেক অনুগত ব্যক্তির ভরণ পোষণ করিতে হইত বাজিরাওর দেওয়ান সুবেদার রামচন্দ্র- পন্থ বৃটিশ গবর্নমেন্টের নিকটে এই মর্মে এক খানি আবেদন পত্র পাঠাইলেন, নানা সাহেব কোম্পানিকে পিতৃস্থানীয় মনে করেন, তাহার ভরণ পােষণের ভার কোম্পানিকে গ্রহণ করিতে হইবেক। অতএব প্রার্থনা, কোম্পানি তাহার পরিবারের ও তাহার পারিষ বর্গের ভরণ পােষণের কোন উপায় করিয়া দেন। এই আবেদনপত্র খানি প্রথমতঃ বিখুরের কমিসনর মােরল্যাণ্ড সাহেবের হস্তে পতিত হয়। মােরল্যাণ্ড উহা উত্তর পশ্চিম প্রদেশের লেপ্টনেন্ট গবর্ণর টমসন। সাহেবের নিকটে পাঠাইবার সময়ে নানা সাহেবের পেন্সন দেওয়া- ইবার নিমিত্ত তাঁহাকে অনুরােধ করেন। টমসন ডেলহৌসীর দলের লােক ছিলেন, ভারতবর্ষীয় রাজগণ ও প্রধান প্রধান ব্যক্তির উপরে হার তাদৃশ মেহ ছিল না, তিনি কমিশ্যনরকে লিখিলেন, আমি .৯৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। . আবেদন পত্র গবর্নর জেনেলের নিকটে পাঠাইলাম। আপনি নানা সাহেবকে বলিবেন, যে তিনি কোম্পানির নিকটে আর সাহায্য প্রাপ্তির প্রত্যাশা না করেন ও মোশাহেবদিগকে ছাড়াইয়া দেন। লড ডেলহৌসী গবর্ণর জেনেরা ছিলেন, এধকার বিষয়ে তাহার লেপ্টনেন্টের সহিত মত ভেদ হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না, তিনি টমসনের অভিপ্রায় অনুমােদন করিলেন ও পরুষ বচনে মােরল্যাণ্ড সাহেবকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, নানা সাহেবের অনুকুলে তাহার অনুরােধ করিবার আবশ্যকতা ছিল না এবং উহা করাও যুক্তি- বিরুদ্ধ হইয়াছে। এস্থলে ইহ উল্লেখ করা আবশ্যক, গবর্গর জেনের নানা সাহেবকে পৈতৃক বৃত্তি লাভে বঞ্চিত করিলেন বটে, কিন্তু তাহার পৈতৃক নগর বিথুর অপহরণ করিলেন না, তিনি লেপ্ট- নেন্ট গবর্ণ রকে লিখিয়া পাঠাইলেন, বিথুর নগর নানা সাহেবেরই থাকিল, কিন্তু তাহার পিতার ঐ নগরের উপরে যেরূপ শাসন ক্ষমতা ছিল, নানা সাহেবের সেরূপ ক্ষমতা থাকিবে না, তিনি কেবল উহার উপস্থৰ ভােগ করিবেন। নানা সাহেব যখন দেখিলেন, ভারতবর্ষীয় গবর্ণমেন্টের নিকট হইতে আর সাহায্য লাভের প্রত্যাশা নাই, তখন তিনি ইংলণ্ডে আপীল করিবার সঙ্কল্প করিলেন। তদনুসারে একখানি আবেদন পত্র প্রস্তুত ও ভারতবর্ষীয় গবর্ণমেন্টের দ্বারা উহা ইংলণ্ডে প্রেরিত আবেদন পত্রখানি সালঙ্কার বাক্যে বাক্যে পূর্ণ ছিল। নানা সাহেব পৈতৃক পেন্সনের উপরে আপনার স্বাভাবিক স্বত্ব সপ্রমাণ করিবার জন্য উহাতে নানা কারণ প্রদর্শন করিয়াছিলেন, কিন্তু কি অলঙ্কার যুক্ত বাক্য বিন্যাস, কি ন্যায়ানুগত হেতুপন্যাস কিছুতেই কোন ফলোদয় হইল না। ডিরেক্টরগণের পাষাণ হৃদয়ে কোন রূপেই কারুণ্যসে সঞ্চারের সম্ভাবনা ছিল না। তাহারা ইতিপূর্বেই সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন, পদচ্যুত পেশোয়া "বৎসর পৰ্যন্ত যে প্রচুর বৃত্তি পাইয়াছিলেন, তাহা হইতে তিনি অনেক অর্থ সঞ্চয় করিয়া গিয়াছেন। সেই সঞ্চিত অর্থই তাহার উত্তরাধি- হইল।

লড ডেলহৌসী। কারী ও পরিবার বর্গের ভরণপােষণের পক্ষে যথেই হইতে পারিবে। তাহারা নানা সাহেবের আবেদনপত্র প্রাপ্তিমাত্ৰ লর্ড ডেলহৌসীকে এই মর্মে একখানি পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন, যে আপনি নানা লাহেবকে কহিবেন, তাঁহার পিতার পেন্সন মৌসী নহে, তিনি কোম্পানির নিকটে কোন দাওয়া করিতে পারেন না, অতএব তাহার আবেদন পত্র সম্পূর্ণরূপে অগ্ৰাহ হইল। লর্ড ডেলহৌসী ইংলণ্ডে বাণিজ্য সভার প্রতিনিধি সভাপতি ছিলেন, সুতরাং কিরূপ কাৰ্য্য করিলে বাণিজ্যের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি হইতে পারে, তিনি তাহা বিলক্ষণ রূপে বুঝিতেন। তিনি কলিকাতায় পৌছিয়া ১৮৪৮ খ্ৰীঃ অকে বাস্পীয়শকট নির্মাণ ও লৌহবত্ম প্রস্তুত করিবার আদেশ করেন এবং ডাক্তার ওসাননির সাহায্যে তাড়িত ৰাৰ্ত্তাবহ যন্ত্র স্থাপনেও প্রয়াস পান। তাহার ঐ সকল মহৎ সঙ্কল্প সম্পূর্ণরূপে সিদ্ধ হইয়াছিল। তিনি ভারতবর্ষে থাকিতে থাকিতেই বাস্পীয় শকট হাওড়া হইতে রাণিগঞ্জ পর্যন্ত পরিচালিত হয় ও উহার সঙ্গে সঙ্গেই তাড়িত ৰাৰ্তাবহের কাৰ্য্য চলিতে থাকে। ভারত- বর্ষে বাস্পীয় শকট নির্মাণ ও তাড়িত বার্তাবহ স্থাপন হওয়াতে সৰ্ব্ব- সারণের বিশেষতঃ বাণিজ্যব্যবসায়ীদিগের যে কত দূর সুবিধা হইয়াছে, বর্ণনা করিয়া তাহার শেষ করিতে পারা যায় না। পদার্থ বিদ্যার সাহায্যে যে সকল অদ্ভুত ব্যাপার, সম্পন্ন হইতে পারে, তন্মধ্যে বাস্পীয় শকট ও তড়িতবার্তাবহ যন্ত্রই প্রধান। বাস্পীয় শকটে আবােহণ করিলে এক দিনে মাসগম স্থানে পৌছিতে পার। যায় ও তাড়িতবার্তাবহ ক্ষণকাল মধ্যে দূরবর্তী স্থানের বার্তা বহন করিতে পারে, পূৰ্ব্বে এতদ্দেশীয় সাধারণের সেরূপ সংস্কারই ছিল , সুতরাং ঐ অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে সাধারণের অন্তঃকরণ বিস্ময় রসে মগ্ন হইল ও তাহার! বৃটিশ গবর্নমেন্টের অগণ্য, ধন্যবাদ করিতে লাগিলেন। যবনরাজগণ জলসিঞ্চন কার্যে অতিশয় অনুরক্ত ছিলেন । পৃথিবীর ধনস্বরূপ আরবদেশের এই প্রবাদটা তাহাদের অন্তঃকরণে মূল লঘু চরিতমঞ্জরী। অনুক্ষণ জাগরূক ছিল। তাহারা স্থানে স্থানে কুপাদি খনন করি। ভুমির উর্বরতা বৃদ্ধি করেন। কালক্রমে ঐ সকল জলাশয় শুষ্ক ও অকর্মণ্য হইয়া যায়। ইহাতে কৃষিকার্য্যের বিশেষ অসুবিধা ঘটে। ইংরাজেরা ভারতবর্ষে আধিপত্য স্থাপন করিবার পরে অনেক বৎসর পর্যন্ত ঐ সকল কূপ প্রভৃতির সংস্করণাদি কার্যে তাদৃশ মনােযোগী ছিলেন না। অনন্তর লর্ড ডেলহৌসী সুবিস্তীর্ণ গঙ্গার খাল কাটাইয়া তাহাদের ঐ দোষটীর পরিহার করেন। তঁাহার ভারতবর্ষে পৌছিবার পূ: এই প্রকাণ্ড ব্যাপারের অনুষ্ঠান হয় বটে, কিন্তু তাহারই যত্নে ১৮৫৪ খ্ৰীঃ অব্দে উহার পরিসমাপ্তি হইয়াছিল। নির্দিষ্ট আছে, এই খাল কাটিতে প্রায় ৮ বৎসর লাগে ও এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। গঙ্গার খাল হরিদ্বারের সনিহিত প্রান্তরের চতুঃপাশ্বে পরি- বেষ্টিত। উহা দৈর্শে ২৫ ক্রোশ ও প্রস্থে ১১২ দ্বারা উত্তর পশ্চিম প্রদেশীয় অনেক প্রান্তর জলষিক্ত ও শস্য পূর্ণ হইতেছে। লর্ড ডেলহৌসী পােষ্ট অফিসের অনেক সুরীতি স্থাপন করেন। তাহার সময়ের পূর্বে মাইল হিসাবে পত্রাদির মাশুল লইবার প্রথা ছিল, সুতরাং দূরবর্ত্তী স্থানে পত্রাদি পাঠাইতে হইলে অধিক মাশুল লাগি হ। এরূপ অনেক ব্যক্তি আছেন, যাহাদের অায় যৎসামান্য ; কাজে কাজেই তাহার নিতান্ত আবশ্যক হইলেও দূরবর্তী স্থানে পত্রাদি পাঠাইতে পারিতেন না। ইহাতে যে কেবল তাহাদেরই স্বার্থহানি হইত এমত নহে, আনুষঙ্গিক গবর্ণমেন্টের রাজস্বের ও ক্ষতি হইত এবং তৎকালে নির্বিঘ্নে পত্রাদি পোছিবার পক্ষে ও বিস্তর ব্যাঘাত ছিল। একেত অধিক ব্যয় করিয়া পত্রাদি পাঠাইতে হইত, তাহাতে আবার ঐ সকল যথা সময়ে না পৌছিলে অথবা পথি মধ্যে বিনষ্ট হইলে প্রেরকের অন্তঃকরণে স্বভাবত বিরক্তি জন্মে। ইহাতে অনেকে মিলিত হইয়া পােষ্ট অফিসের নামে গবর্ণমেন্টে অভিযােগ করেন। গবর্ণর জেনেরল লর্ড ডেলহেদী ডেলহোণী পোষ্ট অফি- লর্ড ডেলহৌসী। ৯৭ । সের কাৰ্যানুসন্ধানাথ তিন জন ব্যবহারিক কর্মচারীকে কমিসনর নিযুক্ত করেন। কমিসনরে পােষ্ট অফিসের কুরীতি সকল অনু- সন্ধান করিয়া গবর্ণমেন্টে একখানি রিপাের্ট পাঠান। ডেলহৌসী সেই রিপাের্টের মর্ম অবগত হইয়া ১৮৫০ খ্ৰীঃ অব্দের ১৭ আইন বিধিবদ্ধ করেন। ঐ আইন অনুসারে এই নির্ধারিত হয়, যে অতঃ- পর পােষ্ট আফিস একটা স্বতন্ত্র আফিস হইল। উহার সহিত এদে- শীয় গবর্ণমেন্টের কোন প্রকার সম্বন্ধ থাকিল না। পােষ্ট আফিস সংক্রান্ত অনিয়ম সকল প্রতিবিধান করিবার নিমিত্ত এক জন তন্ত্র অধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন। তাহার নাম ডিরেক্টর জেনেবল হইল। দূরত্ব অনুসারে মাল লইবার প্রথা উঠিয়া গিয়া সমান মালে বৃটিশ রাজ্যের সর্বত্র পত্রাদি প্রেরিত হইতে লাগিল। লর্ড ডেলহৌসীর অধিকার কালে ভারত বন্ধু বেথুন মহােদয় বেলা অ্যাক্ট বিল বিধিবদ্ধ করিতে চেষ্টা করেন। এক্ষণে বিচার বিষয়ে ইউরােপীয় ও. এতদেশীয় বলিয়া যে কিঞ্চিৎ প্রভেদ আছে, উক্তবিল বিধিবন্ধ হইলে তাহা তিরােহিত হইয়া যাইত, হত্যা ব্যতি- রেকে অন্য কোন ফৌজদারী মােকদ্দমায় মফস্বলবাসী ইউরােপীয়দি- গকে আর কলিকাতার সুপ্রীমকোটে আসিতে হইত না, জেলা মাজিষ্ট্রেট ও জজেরাই তাহাদের বিচার করিতেন। একটা সামান্য অপরাধে শতক্রোশ দুস্থিত হইলেও কোন ইউরােপীয়কে সাক্ষীসহ কলিকাতার সুপ্রীমকোর্টে আনাইবার রীতি যে একান্ত অসঙ্গত ও কষ্টপ্রদ, ইউরােপীয়রা অহঙ্কার বশতঃ তাহা বুঝিতে পারিলেন না। তাহারা বেলা অ্যাক্টের নাম শুনিয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন ও নানা প্রকার আপত্তি উখাপন করিলেন, সুতরাং সদাশয় বেথুনের তাদৃশ সদভিপ্রায় ধূমশেষ হইয়া গেল। কিন্তু তিনি আর একটা বিষয়ে কৃতকার্য হন। তিনি স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে অতিশয় নুরাগী ছিলেন, তাঁহার আন্তরিক যত্ন ও উৎসাহে কলিকাতার হেদুয়া, পুষ্করিণীর নিকটে ভদ্রকন্যাগণের শিক্ষার্থ, বর্তমান বালিকাবিদ্যালয় স্থাপিত হয় ও তাহারই প্রবর্তনায় ভদ্র ব্যক্তিরা স্ব স্ব কন্যাদিগকে বিদ্যা শিক্ষার্থ 1 ৯৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। সাগর তথায় পাঠাইতে আরম্ভ করেন। এক্ষণে যে গবর্ণমেন্টের সাহায্যে স্থানে স্থানে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হইতেছে, বেথুন মহােদয়ই তাহার সূত্রপাত করিয়া যান। এই সময়ে গবর্ণরজেনেরল লর্ড ডেলহৌসী বিধবা বিবাহ আইন বিধিবদ্ধ করিতে যত্নবান হন। ইহার কিছু দিন পরে তাহাকে ইং লণ্ডে প্রতিগমন করিতে হইল, কিন্তু তাহাতে তাহার ঐ সৎসঙ্কল্প সিদ্ধির কোন ব্যাঘাত ঘটে নাই, তাহার পদের উত্তরাধিকারী বিচ ক্ষণ লর্ড ক্যানিঙ ১৮৫৬ খ্ৰীঃ অব্দের জুলাই মাসে ঐ আইন বিধি বদ্ধ করেন। এদেশের যে সকল সুশিক্ষিত সম্রান্ত ব্যক্তি বিধবা বিবাহের প্রধান উদ্যোগী ছিলেন, তাহাদের মধ্যে শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা- মহাশয় সর্বাগ্রগণ্য। বিখ্যাত পণ্ডিত কাশীনাথ তর্কালঙ্কার প্রথমতঃ বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। হিন্দুসমাজে কিছু কাল আন্দোলনের পর তাহা একবারেই স্থগিত হইয়া যায়। তৎ- পরে শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় “বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না, এই শিরােনাম দিয়া এক খানি ক্ষুদ্র পুস্তক প্রচারিত করেন। তাহাতে নানা স্থান হইতে তাহার বিপক্ষে ঘোর- তর কোলাহল উপস্থিত হয় ও যাহার যত দুর সাধ্য, বিধবাবিবাহের অশাস্ত্রীয় সপ্রমাণ করিবার নিমিত্ত নানাবিধ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া অন্ন চল্লিশ খণ্ড পুস্তক প্রকাশ করেন। তৎপরে বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎসমুদায়ের প্রত্যুত্তর স্বরূপ পূর্বোক্ত শিরােনাম দিয়া অপেক্ষাকৃত বৃহৎ অর এক খানি পুস্তক বাহির করেন। তাহার সঙ্কলিত পুস্তক খানি পক্ষপাতশূন্যচিত্তে পড়িয়া দেখিলে বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয়তা ও আবশ্যকতা বিষয়ে অণুমাত্রও সন্দেহ থাকে না। আইন বিধিবদ্ধ হইবার পরে খাটুর নিবাসী শ্ৰীযুক্ত শ্ৰীশচন্দ্র বিদ্যার এই চির নিরুদ্ধ প্রথা পুনৰ্ব্বার প্রবল করিবার প্রথম দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটা বিধবার পাণিগ্রহণ করেন। লর্ড ডেলহোবীর রাজ্য শাসনের শেষে আর একটা বৃহৎ রাজ লড ডেলহৌসী। বৃটিশ অধিকার ভুক্ত হয়। সে রাজ্যের নাম অযােখা বৃটিশ- গবর্ণমেন্টের সহিত অযোধ্যার নবাবদিগের বন্ধু ছিল, তাহাদের প্রকৃত উত্তরাধিকারীর ও অভাব ছিল না, সুতরাং জয় করিয়া অথবা প্রকৃত উত্তরাধিকারী নাই বলিয়া ডেলহৌসী অযােধ্যা গ্রহণ করেন নাই, অযােধ্যার শাসনকার্যে যে বিশৃঙ্খলা ঘটিয়া ছিল, ডেলহৌসী তাহাকেই অযােধ্যা গ্রহণের প্রকৃত কারণ মনে করিয়া লন। ১৮০১ খ্ৰীঃ অব্দে লর্ড ওয়েলেসলির অধিকার কালে নবাব সাদৎ আলি খাঁ ও কোম্পানি বাহাদুর এই উভয়ের মধ্যে যে সন্ধি স্থাপিত হয়, তাহার নিয়মানুসারে অযােধ্যাধিপতি রাজ্যস্থিত বৃটিশ সেনা- গণের ভরণ পােষণ ও বেতনের নিমিত্ত রাজ্যের কিয়দংশ কোম্পা- নিকে নির্ধারিত করিয়া দেন ও রাজ্য মধ্যে এরূপ শাসন প্রণালী প্রচলিত করিতে প্রতিশ্রুত হন, यारा প্রকৃতিকুলের বন প্রাণ রক্ষা ও সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি হইতে পারে। কোম্পানিও শত্রু গণের আক্রমণ হইতে অযােধ্যা রক্ষা করিতে প্রতিশ্রুত হন ও যাহাতে অযােধ্যার রাজকার্য সুন্দর রূপে সম্পন্ন হয়, তদনুরূপ উপদেশ ও পরামর্শ দিবেন, অঙ্গীকার করেন। দিবেন, অঙ্গীকার করেন। বৃটিশ গবর্নমেন্ট অর্ধ শতাব্দীরও অধিক কাল এই সন্ধি প্রতিপালন করিয়াছিলেন। যদিও এই দীর্ঘ কাল মধ্যে কোম্পানি বাহাদুর নিরন্তর যুদ্ধ ব্যাপারে ব্যাপৃত ছিলেন, কিন্তু অযোধ্যায় কোন বিদেশীয় শক্ত পদার্পণ করে নাই ও তথায় কোন প্রকার বিদ্রোহলক্ষণও নিরীক্ষিত হয় নাই। অনন্তর লর্ড ডেলহৌসী অযােধ্যার শাসন কাৰ্য্য অতিশয় বিল বটিয়াছে দেখিয়া ১৮৫৬ খ্রীঃ অব্দে এই ঘােযণা প্রচার করেন, যে এই অবধি অযােধ্যা বৃটিশ রাজ্যের একটা অংশ হইল, বৃটিশ গবর্ণ- মেন্ট তথাকার শাসন কার্য নির্বাহ করিবেন, নবাৰ উজীদ আলি খ। ও তদীয় উত্তরাধিকারিগণ বাৎসরিক ১২ লক্ষ টাকা পেঙ্গন পাইবেন। এই ঘােষণা প্রচারিত হইলে পর নবাব লখনৌস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্ট আউটরামের নিকটে সন্ধির নিয়ম ভঙ্গ করা হইল বলিয়া নানাপ্রকার আপত্তি উত্থাপন করিলেন, কিন্তু তিনি কোন মতে লঘু চরিতমঞ্জরী। হে স্বপক্ষ সমর্থন করিতে পারিলেন না। রেসিডেন্ট কহিলেন, গৰ্ণর জেনেল আপনাকে সন্ধি পত্র স্বাক্ষর করিতে দিয়াছেন, আপ নাকে তাহা স্বাক্ষর করিতে হইবে। গবর্ণর জেনেলের আদেশ অনু- ঘনীয়, কাহার তাহা উল্লম্বন করিবার ক্ষমতা নাই, অতএব যাহা অপরিহার্য্য, তাহার বিরুদ্ধে তর্ক করিবার আবশ্যকতা কি? রেসি- ডেন্টের এই বাক্য শুনিয়া নবাব একবারে ভগ্নহৃদয় হইলেন ও সন্ধি পত্রখানি পড়িয়া কহিলেন, “ সন্ধি কেবল সমকক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যেই হইয়া থাকে। অতএব ইহাতে আমার নামস্বাক্ষর করিবার কোন আবশ্যকতা নাই। বৃটিশ গবর্ণমেন্ট আমার ও আমার রাজ্যের প্রতি যাহা ইচ্ছা, তাহাই করিতে পারেন। শতবৎসর পর্যন্ত আমার পিতৃ- পুরুষের অযােধ্যায় রাজত্ব করিয়াছেন, তাহারা বৃটিশ গবর্ণ- মেন্টের সাহায্য, অনুগ্রহ ও আশ্রয় লাভ করিয়া আসিয়াছেন। বৃটিশ গবর্ণমেন্টই অযােধ্যার সৃষ্টিকারক, অযােধ্যার উপরে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের সর্বতােমুখী ক্ষমতা আছে। তাহারা ইচ্ছা করিলে অযোধ্যার উন্নতি সাধন করিতে পারেন ও ইচ্ছা করিলে উহারে অধঃপাতিতও করিতে পারেন। আউটরাম হোসীর দলের লােক ছিলেন না, ভারতবর্ষীয় রাজগণ প্রধান ব্যক্তির উপরে তাহার সম্পূর্ণ স্নেহ ছিল, তিনি নবাবের উক্ত প্রকার বিলাপ ও পরিতাপ শুনিয়া অতিশয় দুঃখিত হইলেন। কিন্তু গবর্ণর জেনেলের প্রতিকূলে তাহার কিছুই করিবার ক্ষমতা ছিল না। তিনি নবাবকে কেবল এইমাত্র কহিলেন, অপ্রতিবিধেয়- বিষয়ে শােক বা পরিতাপ করা বৃথা। ১৮৫৭ খ্রীঃ অব্দে ভারতবর্ষে যে ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ-বহ্নি প্রজ্বলিত হয় ও যাহার দুঃসহ তাপে ভারতবর্ষ অদ্যাপি সন্তপ্ত রহিয়াছে, আহার বিষয় গৰ্যালোচনা করিয়া দেখিলে ডেলহৌসীর এই শেষ কাৰ্যটীর গুণ দোষ অনায়াসেই ‘সকলের হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে। প্রথমতঃ সেতার ও নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য অপহরণ করতে দেশীয় জগণের অন্ত করণে এই সংস্কার জনিয়াছিল, বৃটিশ গবর্ণমেন্টের লর্ড ডেল- *.

লড ডেলহৌসী ১০১ ন্যায় অন্যায় বিবেচনা নাই, তাহারা রাজ্য লইবার সুযােগ পাইলে তাহাতে উপেক্ষা করেন না, অতএব হয় তো এক দিন কোন ছল করিয়া বলপূর্বক আমাদিগকেও রাজ্যচ্যুত করিতে পারেন। এক্ষণে অযােধ্যা বৃটিশ অধিকার ভুক্ত করিতে দেখিয়া তাহাদের সেই সং- স্কার বদ্ধমূল হইল ও তঁাহারা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের ঘােতর বিপক্ষ হইয়া উঠিলেন। দ্বিতীয়তঃ অযযাধ্যা বৃটিশ অধিকার ভুক্ত হওয়াতে তথা হইতে চল্লিশ সহ সেনা ফিরাইয়া আনিতে হইল। নবাবের সরকারে থাকিবার সময়ে তাহাদিগকে সকল বিষয়ে সেনাপতির আদেশানুসারে চলিতে হইত না, সেনাপতি কৃত কোন আদেশ অন্যায় বােধ করিলে তাহারা লখনৌস্থিত বৃটিশ রেসিডেন্টের নিকট আপীল করিতে পারিত, কিন্তু এক্ষণে তাহাদের সেই আপীল করিবার ক্ষমতা বিলুপ্ত হইয়া গেল, সুতরাং তাহারা অসন্তোষ চিহ্ন প্রকাশ করিতে লাগিল। ফলতঃ অযােধ্যা গ্রহণ পূৰ্ব প্ৰধুমিত বিদ্রোহ নলের সমীরণ হইয়াছিল, তাহার সন্দেহ নাই। কোন কোন ইতিহাস লেখক কহেন, ডেলহৌসী সেতারা ও নাগপুর প্রভৃতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য অধিকার করিবার সময়ে প্রকৃত উত্তরাধিকারী নাই অথবা যথাবিধি দত্তক গ্রহণ হয় নাই, এই রূপ, ছল করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাতে তিনি লােকাপবাদ হইতে পরিত্রাণ পান নাই, অনেকেই তাহার অনেক নিন্দাবাদ করিয়াছেন, কিন্তু অযােধ্যার বিষয়ে সেরূপ দৃষ্ট হইতেছে না। অযোধ্যায় সৰ্ব্ব- দাই ঘোরতর অত্যাচার হইত, প্রতিকুল নবাবের প্রতি বিরূপ হইয়াছিল, অতএব ডেলহৌসী অযােধ্যা বৃটিশ রাজ্যে যােজিত করিয়া উত্তম কাৰ্য্য করিয়াছেন। আমরা তাহাদের এই সিদ্ধান্ত কোন মতেই অনুমােদন করিতে পারি না। যদি নবাবের শাসন- কাৰ্য্য দোষে প্রকৃতি তাহার প্রতি অপরক্তই হইত, তাহা হইলে তাহারা বিদ্রোহের সহায়তা করিবে কেন ? বরং উৎকৃষ্ট প্রভুর হস্তে পড়িয়াছি ভাবিয়া কোম্পানির স্বপক্ষ তাচরণই করিত। অথবা, নবাব রাজ্য মধ্যে অত্যাচার করিতেন, প্রকৃতিকুল তাহার ১০২ ( লঘু চরিতমঞ্জরী। প্রতি বিরূপ হইয়াছিল, ইহা আমরা স্বীকার করিলাম, কিন্তু নবাবের শাসনপ্রণালীর দোষ, তাহার রাজ্য অপহরণ করিবার কারণ হইতে পারে না। কোম্পানি ও নবাবের মধ্যে যে সন্ধি স্থাপিত হয়, কোম্পানি সেই সন্ধির নিয়মানুসারে অযােধ্যা শক্তগণের আক্র- মণ হইতে রক্ষা করিতে প্রতিশ্রুত হন ও যাহাতে অযযাধ্যার রাজ- কাৰ্য্য সুন্দর রূপে সম্পন্ন হয়, তদনুরূপ উপদেশ ও পরামর্শ দিবেন, অঙ্গীকার করেন। কিন্তু শাসন কাৰ্য্যের বিশৃঙ্খলা ঘটলে অযোধ্যারাজ্য যে অপহরণ করিতে হইবেক, এরূপ কোন বন্দোবস্ত ছিল না ও এরূপ বন্দোবস্ত হইতেও পারে না। ভূমণ্ডলে নানা প্রকার শাসন প্রণালী প্রচলিত আছে। সকলেই স্ব স্ব শাসনপ্রণালী উৎকৃষ্ট বলিয়া থাকেন, সুতরাং কোন শাসনপ্রণালী সর্বোৎকৃষ্ট, তাহা নিঃসংশয়ে নির্ণীত হইতে পারে না। অতএব যদি শাসনপ্রণালীর দোষ থাকিলে কোন রাজার রাজ্য অধিকার করা সন্নিহিত ভূপতির বিহিত হইত, তাহা হইলে ভূমণ্ডলে নিরন্তর গােযােগ ও বিবাদ বিসম্বাদ ব্যতীত আর কিছুই দৃষ্ট হইত না। অতএব যদি সন্ধির নিয়মানুসারে রাজ- গণের কাৰ্য্য করা ন্যায়ানুগত হয়, তাহা হইলে এই কাৰ্যটি নিতান্ত গহিত হইয়াছে সন্দেহ নাই। অযােধ্যার নবাবেরা শত বৎসর পর্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন, তাহারা কখনই বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অপকার করেন নাই, বরং নানা প্রকারে উপকারই করিয়াছিলেন। যুদ্ধকালে অর্থ দিয়া তাহারা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের আনুকূল্য করেন, বৃটিশ গবর্ণমেন্ট ঋণসাগরে নিমগ্ন , হইলে তাহার অর্থ দিয়া তাঁহাদের উদ্ধার করেন। অতএব যদি উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা যুক্তি যুক্ত ও ন্যায়ানুগত হয়, তাহা হইলেও ডেলহৌসীর এই কাৰ্য্যটী গহিত হইয়াছে সন্দেহ নাই। ডেলহৌসী ৪ প্রজাগণের উপকরার্থ অযোধ্যা বৃটিশ রাজ্যে যােজিত করিয়াছিলেন, ইহাও বলিতে পারা যায় না। যদি প্রজা- পুঞ্জের উপকার করা তঁাহার প্রধান উদ্দেশ্য হইত, তিনি অযােধ্যার অনুপযুক্ত নবাবকে পদচ্যুত করিয়া তাহার আত্মীয়গণের মধ্য হইতে !

লড ডেলহোসী। কোন এক উপযুক্ত ব্যক্তিকে নবাব করিলেও করিতে পারিতেন। অতএব ইহা নিঃসংশয়ে প্রতীয়মান হইতেছে, ডেলহৌসী কেবল কোম্পানির স্বার্থসাধনের স্বার্থসাধনের জন্যেই অযােধ্যা বৃটিশরাজ্যে যােজিত করিয়াছিলেন। ফলতঃ কোনরূপে বিবেচনা যায়, তাহাতেই এই কাৰ্যটী অন্যায় বলিয়া আমাদের প্রতীতি জন্মে। লড ডেলহৌসী ক্রমাগত ৮বৎসর গুরুতর পরিশ্রম করিয়া এরূপ অসুস্থ হইয়াছিলেন, যে তাহার ইংলণ্ডে প্রতিগমন করা আবশ্যক হইয়া উঠিল। তিনি অযােধ্যা বৃটিশ রাজ্যে যোজিত করিবার পরে এক মাসের মধ্যে ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইবার আয়ােজন করিতে লাগি- লেন। লর্ড ডেলহৌসী কর্ম পরিত্যাগ করিয়া দেশে ফিরিয়া যাইতে ছেন, এই সংবাদ প্রচারিত হইলে পর বাঙ্গালা, বােম্বে ও মাদ্রাজের রাজধানীতে তাহার সম্মানার্থ এক একটী সভা হয়। লর্ড ডেল হৌসী ১৮৫৬ খ্ৰীঃ অব্দের ৬ই মার্চ জাহাজ আরােহণ করেন। তাহার ইংলণ্ডে প্রতিগান কালে ভারতবর্ষে রাজকোষ ধনপূর্ণ ছিল, বাণিজ্য কাৰ্য সুন্দর রূপে চলিতেছিল, বাস্পীয় শকট হাওড়া ও রাণিগঞ্জের মধ্যে প্রতি দিন সহস্র সহ আরােহী বহন করিতে ছিল, গঙ্গার খাল ইতিপূর্বেই হরিদ্বার হইতে ইটোয়া ও কাণপুর পর্যন্ত সমুদায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর শস্যশালী করিয়াছিল, তাড়িত বার্তাবহ ক্ষণকাল মধ্যে দূর দেশের বার্তা বহন করিতেছিল। লর্ড ভেলহৌসী ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিলে পর ডিরেক্টরের কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ তাহারে বাৎসরিক পঞ্চাশ সহস্র টাকা বৃত্তি নির্ধারিত করিয়া দেন, কিন্তু তিনি শরীর অসুস্থ হওয়াতে রাজনীতি- সংক্রান্ত কোন প্রকার কার্যের অনুসরণ করতে পারেন নাই। লণ্ডন ও এডেনবরা নগরের প্রধান প্রধান ডাক্তরেরা তাহাকে এই বলিয়া আরােগ্য লাভের আশা দিলেন, যে আপনি দেড় বৎসর কাল বিশ্রাম করুন, কোন প্রকার পরিশ্রম করিবেন না, তাহা হইলে আপ- নার শরীর পুনরায় পূৰ্ব্ববৎ সুস্থ ও সবল হইবে। ডাক্তারগণের উপদেশ প্রতিপালন করাতে তাহার শরীর এরূপ সবল ও অন্তঃকরণ - ।

লঘু চরিতমঞ্জরী। এরূপ সতেজ হয়, যে তাহাতে সকলে অনুমান করিয়াছিলেন, যে তিনি পুনরায় রাজকায় করিতে সমর্থ হইবেন। কিন্তু কালের করাল গ্রাস হইতে কাহারও নিস্তার নাই, তিনি কিছুকাল পরে মূত্রাশয় রােগে আক্রান্ত হইয়া ১৮৬০ খ্ৰীঃ অব্দের ১৯ ডিসেম্বর ৪৯ বৎসর বয়ঃক্রম কালে কলেবর পরিত্যাগ করেন। লর্ড ডেলহৌসী অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি স্বকৃত কাৰ্য্য- পরম্পরায় সেই শক্তি সম্পূর্ণরূপে প্রদর্শিত করিয়া গিয়াছেন। তাহার অদ্ভুত স্মরণশক্তি ছিল, তিনি একবার যাহা পড়িতেন, কস্মিন কালেও তাহা বিস্মৃত হইতেন না। তাহার রচনা শক্তিও সামান্য ছিল না, তিনি যে সকল মিনিট ও কাগজ পত্র লিখিতেন, তাহাতে তাহার ভ্রম প্রমাদ প্রায়ই দৃষ্ট হইত না। তিনি অতিশয় ক্ষিপ্ৰ কৰ্ম্মা ছিলেন। কার্যে বিলম্ব হইল বলিয়া তাঁহার সেক্রেটরিকে এক দিনের জন্যও আক্ষেপ করিতে হয় নাই। লর্ড ডেলহৌসী ভারতবর্ষের অনেক উন্নতি সাধন করিয়াছিলেন বটে, তথাপি তিনি ভারতবর্ষীয়দের নিকটে আপন পদের উত্তরা ধিকারী লর্ড ক্যানিঙের ন্যায় সুখ্যাতি লাভ করিতে পারেন নাই। অন্যায় পূৰ্ব্বক অন্যের রাজ্য গ্রহণ করিবার রীতিই তাহার সুখ্যাতি লাভের প্রধান অন্তরায় হইয়াছিল। যদি তিনি ন্যায় পরায়ণ হইতেন, তাহা হইলে ভারতবর্ষীয়েরা চিরকাল তাহার নিকটে কৃতজ্ঞতা পাশে বদ্ধ থাকিতেন সন্দেহ নাই। তাহার গুণগৌরব- কারীরা বলেন, যদি ভারতবর্ষীয়েরা কাৰ্য্যদোষে তাহার প্রতি অসন্তুষ্টই হইবেন, তাহা হইলে তাহার ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইবায় সময়ে সভা করিয়া তাহার সম্মান করিতেন না। এতদুত্তরে আম- দের এই মাত্র বক্তব্য, যে সভায় তাহার অভিনন্দন করা হয়, তাহা ইউরােপী বিশেষতঃ ইংলীয় দ্বারা সটিত ছিল। অতএব যাহারা সেই অভিনন্দন দ্বারা ভারতবর্ষীয় সাধারণের সন্তোষ চিহ্ন অনুমান করেন, তাহাদের প্রান্তি স্পষ্টই লক্ষিত হইতেছে। যদিও সেই সভায় এতদ্দে শীয় দুই এক জন উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু তাহারা ন

লড ক্যানিঙ।
১০৫
কখনই সমুদায় ভারতবর্ষীয়দিগের প্রতিনিধি হইতে পারেন না।
প্রত্যুত ভেলহৌসীর প্রতি সাধারণের মনের ভাব যখন তাদৃশ
বিরূপ দেখা যায়, তখন ভারতবর্ষ পরিত্যাগ কালে তাঁহাকে যে
অভিনন্দন করা হইয়াছিল, আমরা তাহা অকিঞ্চিৎকর বলি-
মাই জ্ঞান করিয়া থাকি। তিনি কোম্পানির স্বার্থ সাধনের নিমিত্ত
যে সকল গর্হিত কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, বিদ্রোহ ঘটনা ও কোম্পা-
নির হস্ত হইতে রাজ্য গ্রহণ তাহারই এক প্রকার প্রতিফল স্বরূপ।
লর্ড ক্যানিং।
ক্যানিং ১৮১২ খ্রীঃ অব্দে ১৪ ই ডিসেম্বর লণ্ডন নগরের নিকটে
ষ্টার লজ নামক উদ্যানভবনে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহঁর পিতার
নাম জর্জ ক্যানিঙ। তিনি রাজমন্ত্রী ছিলেন। ক্যানিঙ প্রথমতঃ টেমস্
নদীর তীরবর্তী পুটনি স্কুলে প্রবিষ্ট হইয়া লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ
করেন। তাঁহার সহাধ্যায়ীরা অনেক বিষয়ে তাহাকে যােগ্য
বলিয়া জান করতেন।
করিতেন। ক্যানিঙ বাল্যকালে অসাধারণ ধীশক্তি
সম্পন্ন অথবা
লোকের সমাদরভাজন ছিলেন না
বটে, কিন্তু তাঁহার আকৃতি দেখিয়া সকলে মনে করিতেন,
এই বালকটীতে
বালকটীতে পদার্থ আছে। ক্যানিঙ পুটনিস্কুলে পাঠ
সমাপন করিয়া রেবারেণ্ড জন শশারের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে কিছুকাল
করেন। তৎপরে ইটনকালেজে প্রবিষ্ট হন। এই কলেজে
পড়িবার সময়ে বিদ্যা-বিষয়ে তঁাহার অনেক উন্নতি হইয়াছিল।
বোধ হয়, তাঁহার পিতার পরলােক প্রাপ্তি,
প্রাপ্তি, তদনন্তর তঁাহার
১৪

১০ ৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। মাতার ভাইকাউন্টেস • উপাধি দ্বারা সন্ত্রম বৃদ্ধি এবং দৈব দুর্বি- পাক বশত: জ্যেষ্ঠ হােদরের অপমৃত্যু এই সকল কারণে তাহার নিজের পক্ষে কৰ্তব্য কি, তদ্বিষয়ে তাহার চৈতন্যোদয় হয় এবং তিনি সমধিক যত্ন ও মনােযােগ সহকারে বিদ্যাভ্যাসাদি বিষয়ে প্রবৃত্ত হন। ক্যানিঙ, জ্যেষ্ঠ সহােদর লােকান্তরিত হওয়ায় পৈতৃক ধনসম্প- ত্তির উত্তরাধিকারী হইলেন এবং ভবিষ্যতে রাজ কার্যে তঁাহার প্রচুর সম্মান লাভের পথও পরিস্কৃত হইয়া আসিল। ক্যানি ইটনকালেজ পরিত্যাগ করিয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হন ও মনোযোগ সহকারে লাটিন ও গ্রীক ভাষা অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করেন। তিনি কিরূপে পিতৃগৌরব বজায় রাখিয়া চলিবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে এই বিষয়টা তাহার অন্তঃকরণে নিরন্তর জাগরূক ছিল। ক্যানিঙ স্বভাবত: মিতভাষী ছিলেন, তিনি কতিপয় বন্ধু ব্যতিরেকে প্রায় কাহারও সহিত আলাপ করিতেন না। তিনি ১৮৩৩ খ্রীঃ অকে লাটিন ও শ্রীভাষায় এবং অঙ্কশাস্ত্রে ডিগ্রী অর্থাৎ উপাধি প্রাপ্ত হন। এই সময়ে তাহার বয়ঃক্রম ২১ বৎসর হইয়াছিল। ক্যানিং ১৮৩৫ খ্ৰীঃ অব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর বিবাহ করেন। তাঁহার সহধর্মিণী শান্ত- প্রকৃতি ও রূপবতী ছিলেন এবং তাহার অনেক অসাধারণ গুণ ও ছিল। ক্যানিঙ বিবাহ করিবার এক বৎসর পরে ওয়ারউইক নামক স্থানের প্রতিনিধি হইয়া পার্সিয়ামেন্টের কমন্স সভায় প্রবেশ করেন। ইহার কিছুদিন পরে তঁাহার মাতার পরলােক প্রাপ্তি হওয়াতে তিনি লড়' উপাধি প্রাপ্ত হন ও ডি সভায় আসন পরিগ্রহ করেন। ক্যানিঙ স্বভাবতঃ মিতভাষী ছিলেন, তিনি পালিয়ামেন্টে প্রায় মুখ খুলিতেন না, কিন্তু শান্তভাবে ও বিনা * ইংলণ্ডে যে সকল সন্ত্রান্ত ব্যক্তি “ লর্ড ” এই নামে অভিহিত হইয়া থাকেন, তাহাদের মর্যাদা বিষয়ে ক্রমান্বয়ে নিম্ন লিখিত তারতম্য আছে যথা, ব্যারন, ভাই কাউন্ট, আরল, মারকুইস ও ডিউক।

লড ক্যানিং। ১০৭ আড়ম্বরে আপনার কর্তব্য সম্পাদন করিতেন। তিনি প্রায় কুড়ি বৎসর পর্যন্ত লডসভায় ছিলেন। অনন্তর রাজমন্ত্রী সর রবঃ পীল সাহেবের সময়ে বিদেশ সংক্রান্ত কার্যের অণ্ডার সেক্রেটরি হন। ইহার কিছুদিন পরে পীলসাহেব কর্ম পরিত্যাগ করেন। ক্যানি তাহার দলের লােক ছিলেন, সুতরাং তিনি কর্ম পরিত্যাগ করাতে ক্যানিঙকেও কৰ্ম্ম ছাড়িতে হইল। রাজমন্ত্রী ডবির অধিকারকালে ক্যানিঙকে বিদেশসংক্রান্ত কার্যের সেক্রেটরির পদে নিযুক্ত করিবার কথা হয়, কিন্তু রাজমন্ত্রীর সহিত কোন কোন বিষয়ে মত ভেদ থাকাতে ক্যানিং উক্ত কাৰ্য্য গ্রহণ করেন নাই। ১৮৫২ খ্রীঃ অব্দে রাজমন্ত্রী এবারডিনের অধিকার কালে ক্যানিং পােষ্টমাষ্টার জেনেরলের কার্যে নিযুক্ত হন। তিনি ক্রমাগত পাঁচ বৎসর ঐ কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। অনন্তর লড ডেলহৌসী গবর্ণর জেনেরলের কার্য পরিত্যাগ করাতে ডিরেক্টরেরা লড' ক্যানিঙকে তাহার পদে মনােনীত করেন। বহু কাল অবধি ডিরেক্টরগণের এই একটী রীতি ছিল, যে তাহাৱা কোন ব্যক্তিকে গবর্ণর জেনেবল নিযুক্ত করিয়া ভারতবর্ষে পাঠাইবার সময়ে তঁাহারে ভােজ প্রদান প্রদান করিতেন। তদনুসারে ক্যানিঙ ও নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। তিনি বিদায় লইবার সময়ে একটা বক্তৃতা করেন। উত্তর কালে যে সকল ঘটনা হয়, সে সকলের সহিত ঐক্য করিয়া দেখিলে ঐ বক্তৃতাটাকে এক প্রকার ভবিষ্যৎবাণী বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তৎকালে তাহার বক্তৃতার ভাবার্থ লোকে বিশেষ মনােযোগ পূৰ্ব্বক গ্রহণ করেন নাই বটে, কিন্তু তাঁহার অধিকারকালে ভারতবর্ষে যে সকল ঘটনা হইয়াছিল, সে গুলি মনে পড়িলে তাঁহার সেই বক্তৃতাচী এক্ষণে মহামূল্য বলিয়া বােধ হয়। এস্থলে আমরা ঐ বক্তৃতার সারাংশ সঙ্কলন করিয়া দিতেছি। ৫৫ কাৰ্য্য গতিকে কি ঘটিয়া উঠে, আমি তাহা জানি না। জগ- দীশ্বরের নিকটে প্রার্থনা এই, যেন আমাদিগকে কাহারও.. সহিত যুদ্ধ করিতে না হয়। কুশলে শাসনকার্য নির্বাহ করা আমার লঘু চরিতমঞ্জরী। বাঞ্ছনীয়, কিন্তু ইহাও বিস্মৃত হওয়া উচিত নহে, আমরা ভারত বর্ষে যে অধিরাজ্য বিস্তার করিয়াছি, উহার শাসন কার্য নিরূপ- ঐবে ও নিরুদ্বেগে সম্পন্ন হইবার পক্ষে বিস্তর ব্যাঘাত ঘটিতে পারে। বােধ হয়, পৃথিবীর অন্য কোন ভাগে সেরূপ ব্যাঘাতের তাদৃশ সম্ভা- বনা নাই। আমাদের অন্তঃকরণে নিরন্তর ইহা জাগরূক রহিয়াছে, যে আকাশ নিরবচ্ছিন্ন শান্ত বলিয়া প্রতীয়মান হউক, অথবা উহার এক কোণে বিতস্তি প্রমাণ একখণ্ড মেঘ ব্যতীত অন্য কোন উৎ- পাতের চিহ্ন লক্ষিত না হউক, কিন্তু সেই মেঘ খণ্ডের এত দূর বৃদ্ধি হইতে পারে, যে প্রবল ঝটিকা উপস্থিত হইয়া পরিশেষে আমাদের সর্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। যাহা এক বার ঘটিয়াছে, তাহা পুনরায় ঘটিতে পারে। উদ্বেগের কারণ সকল এক্ষণে মন্দীভুত হইয়াছে বটে, কিন্তু সে সকল একবারে দূরীকৃত হয় নাই। কিন্তু এ সমস্ত আশঙ্কা বৃথা হইলেও হইতে পারে। অতএব এক্ষণে সানন্দচিত্তে উহাদিগকে বিসর্জন দেওয়াই শ্রেয়ঃ এই এই বিবেচনায় আমি প্রত্যাশা করিতেছি, যে ভারতবর্ষে যাইয়া আপনাদের সাহায্য দ্বারা অশেষবিধ লােক-হিতকর সদনুষ্ঠানে কালক্ষেপ করিতে পারিব। লর্ড ক্যানিং ১৮৫৬ খ্রীঃ অব্দের ২৯ ফেব্রুয়ারি কলিকাতায় উপনীত হন ও গবর্নমেন্ট হাউসে যাইয়া ঐ দিবসেই যথারীতি শপথ পূৰ্ব্বক রাজকাৰ্য্য গ্রহণ করেন এবং ইংলণ্ডে এইরূপ পত্র লিখেন, * এখানে এত শীঘ্র শী কার্য সম্পন্ন হয়, যে আমি এখান- কার ভূমি স্পর্শ করিবার পরে পাঁচ মিনিটের মধ্যে শপথ করিয়া পদাভিষিক্ত হইয়াছি।” লর্ড ক্যানিঙ এদেশের আচার ব্যবহারাদির বিষয় বিষয় কিছুই জানিতেন না, কিন্তু এদেশে আসিয়াই তাহাকে দুরবগাহ কাৰ্য্য সঙ্কটে পতিত হইতে হইল। এরূপ অনেক জটিল বিষয় তাঁহার বিবেচনায় অর্পিত হইতে লাগিল, যে অপ্রমত্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণের পক্ষেও সে সকলের মীমাংসা করা সহজ নহে। লর্ড ক্যানিঙ ধীর- লড ক্যানিঙ। • একৃতি ছিলেন, সহসা কোন প্রকার মীমাংসা না করিয়া সম্মুখে উপ- স্থাপিত সমুদায় বিষয়গুলি প্রথমতঃ সুন্দররূপে বুঝিতে লাগিলেন। তৎকালে কৌন্সেল সভা গ্রান্ট, পিকক, লাে এবং ভােরিন এই চারিজন মেম্বরে সঙ্ঘটিত ছিল। মেম্বরেরা সকলেই উপযুক্ত ও অভিজ্ঞ ছিলেন। ক্যানিঙ কাৰ্যভারে আক্রান্ত হইয়াও তাহাদের সাহায্যে হতােৎসাহ বা বিরক্ত হইলেন না, প্রফুল্লচিত্তে সমুদায় কাৰ্য পৰ্যালােচনা করিতে লাগিলেন। ভারতবর্ষে কোন গােল- যোগ ছিল না। বাহিরে বােধ হইতে লাগিল, যেন ডেলহৌসী সর্বত্র শান্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। অযােধ্যায় কিছুকাল পূর্বে রাজবিপ্লব ঘটে, তথায়ও শান্তি এবং সন্তোষের বাহলক্ষণ লক্ষিত হইতে লাগিল। লাগিল। কিন্তু তথা কার সুবিচক্ষণ কমিশ্যনর আউটরাম অসুস্থতাবশতঃ ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করাতে তথায় এক জন নূতন কমিসনর নিযুক্ত করা আবশ্যক হইল। লর্ড ক্যানিঙ জ্যান নামক উত্তর পশ্চিম প্রদেশের এক জন ব্যবহারিক কর্মচারীকে কমিসনর নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। জ্যাকসনের অধীনে দুই জন কর্মচারী ছিলেন। একের নাম গােবিন্ ও অন্যের নাম ওমানি। গােবিন্ প্রকৃতি ছিলেন। তিনি নূতন কমিসনরের সহিত এরূপ ব্যবহার আরম্ভ করিলেন, যে উপরিস্থ কর্মচারীর প্রতি সেরূপ করা কোন মতে কর্তব্য নহে, সুতরাং অল্পকাল মধ্যে তাহারা পরস্পর বিবাদ আরম্ভ করিলেন। ঐ বিবাদের সংবাদ ক্ৰমে লর্ড ক্যানিঙের গােছর হইল। তিনি উহাদিগকে শান্ত করিবার চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। এমত সময়ে অযোধ্যার নবাব উজীদ আলি খাঁ লখনৌস্থিত ইংরাজকর্মচারিগণের নানাপ্রকার অত্যাচার উল্লেখ করিয়া গবর্ণরজেনেরলের নিকটে একখাহি অভিযােগপত্র পাঠাইলেন। নবাব রাজ্যচ্যুত হইয়া অবধি সঙ্কল্প সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, ইংলণ্ডে যাইবেন ও মহারাণীর নিকটে আপীল করিয়া নষ্টরাজ্য উদ্ধারের উদ্ধ লঘু চরিতমঞ্জরী । চেষ্টা পাইবেন। কিন্তু তাহার ন্যায় অধ্যবসায়হীন, অলস প্রকৃতি ও ভােগাভিলাষী ব্যক্তির পক্ষে ইংলণ্ড অথবা অন্য কোন দূরবর্ত্তী স্থানে গমন করা সহজ ব্যাপার নহে। ইহা এক প্রকার অবধারিতই ছিল, যে নবাব পথিমধ্যে কোন স্থানে উত্তীর্ণ হইয়া ইংলণ্ড গমনের বাসনা পরিত্যাগ করিবেন। কাৰ্য্যে তাহাই ঘটিল। নবাব, ইংলণ্ড গমনের সমুদায় আয়ােজন করিতে লাগিলেন, এমত সময়ে শুনিলেন, মন্ত্রী আলিনকি খ কলিকাতা হইতে ফিরিয়া আসিতেছেন। আলি- নকি খ। সুচতুর ও বুদ্ধিমান ছিলেন, পাছে তিনি রাজ্য মধ্যে কোন প্রকার গােলযোগ করেন, এই আশঙ্কায় লর্ড ডেলহৌসী অযােধ্যা গ্রহণ করিবার সময়ে তাহাকে কলিকাতায় আনিয়াছিলেন। নবাব এক্ষণে মন্ত্রী আসিতেছেন শুনিয়া হর্ষিত হইতেন ও তাহার আগমন প্রতীক্ষায় রাজভবন হইতে বহির্গত হইয়া নগরের অনতিদূরে অব স্থিতি করিতে লাগিলেন। কতিপয় দিবস পরে মন্ত্রী গিয়া উপণীত হইলেন। নবাবও অবিলম্বে মন্ত্রীসহ সপরিবারে কলিকাতায় যাত্রা করিলেন। তৎকালে ছাপ ঘাটীর মােহনা শুষ্ক হইয়াছিল, সুতরাং নবাবকে সুন্দরবন দিয়া ঘুরিয়া আসিতে হয়। ইহাতে সুবিচক্ষণ লড ক্যানিং বলিয়াছিলেন, নবাব জল পথের কষ্ট দেখিয়া ইংলও- গমনে নিরুৎসাহ হইবেন। লর্ড ক্যানিঙ যাহা বলিয়াছিলেন, বাস্ত- বিকও তাহাই ঘটল। নবাব কলিকাতায় পৌছিয়া ইংলণ্ড গমনের বাসনা পরিত্যাগ করিলেন। কিন্তু ইহাতে তাহার ইংলণ্ডে আপীল করিবার পক্ষে কোন ব্যাঘাত হইল না। নবাবের মাতা, ভ্রাতা ও পুত্র গোপনে ইষ্টিমার কোম্পানির সহিত পরামর্শ করিয়া রাত্রিযােগে ইষ্টিমারে আরােহণ করিলেন। গবর্ণর জেনেরল, ইহার কিছুই জানিতেন না, তিনি পদিবস শুনিয়া অতিশয় চমৎকৃত হইলেন ও ইংলণ্ডে ডিরেক্টদিগকে পত্র লিখিলেন, নবাবের পরিবারের। ইং লণ্ডে যাত্রা করিয়াছেন। তাহারা ইংলণ্ডে পেছিয়া আপনাদিগকে বিরক্ত করিবেন বটে, কিন্তু আপনারা যেন তাহাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করেন। নবাবের পরিবারের। ইংওে পোঁছয়। আপীল লড ক্যানিঙ। ১১১ করিলেন, কিন্তু কত কাৰ্য্য হইতে পারিলেন না। লাতের মধ্যে অন- র্থক প্রচুর অর্থ ব্যয় হইল, নবাবের মাতা, পরলােক গমন করিলেন এবং পুত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করিয়া দেশে ফিরিয়া আসিলেন। ইত্যবসরে নবাব উজীদ আলি গবর্নরজেনেরলের নিকটে পুনরায় এই বলিয়া অভিযােগ করিলেন, যে লক্ষৌস্থিত ইংরাজ কর্মচারীরা আমার রাজ ভবন অশ্বশাল করিয়াছেন, অন্তঃপুরি কাগণকে ভবন হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিয়াছেন, দ্বার ভাঙ্গিয়া প্রবেশ পূর্বক অামার ধনাগার লুণ্ঠন করিয়াছেন, আমার পরিবারের সম্পত্তি বিক্রয়ার্থ নীলামে পাঠাইয়াছেন ও ও আমার অনুগত অনুগত ব্যক্তিগণের অবমাননা করিয়াছেন। নড় ক্যানিও যদি ও নবাবের এই সকল অভি- যোগ সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিলেন না, তথাপি তিনি কমিসনর জ্যাকসনকে ঐ সকল অনুসন্ধান করিয়া অবিলম্বে রিপাের্ট করিতে আদেশ করিলেন। জ্যাক্সন নিম্নস্থ কৰ্মচারী গােবিনের বিবাদে এরূপ ছিলেন, যে তিনি স্পষ্টরূপে ঐ গুরুতর বিষয়ের কোন উত্তরই লিখিলেন না। ইহাতে গবর্ণর জেরেল বিরক্ত হইয়া ১৮৫৬ খ্রীঃ অব্দের ১৬ ই অক্টোবর লেখেন, ইহা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, যে আপনি স্পষ্টরূপে আমার পত্রের ‘দনে উপেক্ষ। করিতেছেন। কর্মচারীরা জেলওয়াখানা ভাঙ্গি- আছেন, ছত্তর মঞ্জিল অশ্বশাল করিয়াছেন, ইত্যাদি অত্যাচারের উল্লেখ করিয়া নবাব যে অভিযােগ করেন, উহার সত্যাসতের বিষয় আমি এপর্যন্ত অবগত হইতে পারিলাম ম না। নবাবের প্রতি, যদি কোন অত্যাচার হইয়া থাকে, আপনার অগোচরে, হই- মাছে, অামার এরূপ বােধ হয় না। অথবা নবাবের অভিযােগ মিথ্যা, তাহার প্রতি কোন অত্যাচার হয় নাই, এই বিবেচনা করিয়া যদি আপনি স্পষ্ট উত্তরদানে উপেক্ষা করিয়া থাকেন, তাহাও আমাকে শিখিবেন। নতুবা নবাবের অভিযােগপত্র দলীল স্বরূপ হইবে। কমিশ্যনর, গােবিন্ এবং ওমানিকে লইয়াই ব্যস্ত ছিলেন, তিনি গবর্নর জেনেবলের দ্বিতীয় পত্র পাইয়াও কোন সদুত্তর দিলেন ক ১১২ লঘু চরিতমঞ্জরী। । ইহাতে লড ক্যানিং অতিশয় বিরক্ত হইয়া বিবেচনা করিলেন, আমি জ্যাকসনকে অযােধ্যায় কমিশ্যনর নিযুক্ত করিয়া উত্তম কাৰ্য্য করি নাই। লর্ড ক্যানিঙ এক্ষণে ভাবিতে লাগিলেন, অন্য কোন্ ব্যক্তিকে অযযাধ্যার কমিসনর নিযুক্ত করা যায়, এমন সময়ে শুনিতে পাইলেন, আউটরাম সুস্থশরীর হইয়াছেন। তিনি সত্বর ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিবেন ও অযযাধ্যার কাৰ্য্য গ্রহণ করিবেন। এই সংবাদে গবর্ণর জেনের অত্যন্ত হর্ষিত হইলেন। লর্ড ক্যানিঙ এদেশে এদেশে আসিবার পরেই পারস্যরাজের मरिड যুদ্ধ ঘটি বার সম্ভাবনা হয়। ইংলণ্ডীয় গবর্ণমেন্টের বহুকাল অবধি এই ইচ্ছা ছিল, হিরাট স্বাধীন থাকে। কিন্তু পারস্যরাজ সঙ্কল্প- করিয়াছিলেন, সুযােগ পাইলেই হিরাট নগর অধিকারভুক্ত করিবেন। হিরাটরাজ সাকামরাণের মৃত্যুর পরে রাজকার্যে নানা গােলযােগ ঘটে, পারস্যরাজ সেই সুযোগে একবার হিরাটে সৈন্য পাঠাইয়াছিলেন। পরাক্রান্ত ইংলণ্ডীয় গবর্ণমেন্ট অন্তরায় হওয়াতে তাহাকে তৎকালে হিরাট হইতে সেনাদিগকে প্রত্যানয়ন করিতে হয়। তৎপরে পারস্যরাজ ১৮৫৬ খ্ৰীঃ অব্দের প্রারম্ভে পুন: রায় হিরাটে সেনা প্রেরণ করেন। হিরাটের তদানীন্তন রাজা ইসফ খ। অতিশয় হীন প্রতাপ ছিলেন, তিনি আত্মরক্ষা করিতে অসমর্থ হইয়া হিরাটের দুর্গ পারস্য সেনাপতিকে সমর্পণ করেন। গবর্ণরজেনেরল লর্ড ক্যানিং মধ্য আসিয়ার রাজকার্য নির্বাহের প্রণালী ভাল বাসিতেন না, তিনি অতীত' কাবুলযুদ্ধের ভয়ঙ্কর পরি- শাম দেখিয়া ভীত হইয়াছিলেন। তিনি, যাহাতে পারস্যয়াজের সহিত যুদ্ধ না ঘটে, তাহারই চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু ইং- লণ্ডের কর্তৃপক্ষের। তাহার অভিপ্রায়ে অনুমোদন করিলেন না, তঁাহারা পারস্যরাজের সহিত যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া দিলেন । সুতরাং অভিপ্রায় না থাকিলেও • লর্ড ক্যানিঙকে যুদ্ধের আয়ােজন করিতে হইল। তিনি বােম্বে হইতে পারস্য সাগরে সেনা পাঠাইতে আদেশ দিলেন ও জেনল ষ্টকারকে সেনাপতি পদে নিযুক্ত করিলেন।

লড ক্যানিং। ১১৩ যৎকালে ভারতবর্ষে পারস্য যুদ্ধের এই সকল বন্দোবস্ত হয়, ঐ সময়ে ইংলণ্ডে আউট রামকে পারস্য যুদ্ধে সেনাপতি করিয়া পাঠা- ইবার কথা চলিতে ছিল। ২৬ অক্টোবর আউট রাম ইংলও হইতে ক্যানিওকে লেখেন, আমি এক্ষণে সম্পূর্ণরূপে সম্পূর্ণরূপে আরােগ্য লাভ করিয়াছি, ২০ ডিসেম্বর পুনরায় ভারতবর্ষে যাত্রা করিব। পারস্য যুদ্ধে সেনাপতির কাৰ্য্য গ্রহণ করা আমার অভিলষণীয়। আমি নিয়ন্তু সমাজের (বাের্ড অব কন্টোল ) অধ্যক্ষের নিকটে ঐ কাৰ্ষ্য গ্রহণ করিবার প্রস্তাব করিয়াছি, আপনি আমাকে সেনা- পতি নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলে ইংলণ্ডীয় গবর্ণমেন্ট কোন আপত্তি করিবেন না। অনুমান হয়, অযােধ্যায় কোন গোলযােগ নাই তথাকার কাৰ্য্য গ্রহণ না করিলে কোন ক্ষতি হইবেক না। আপনি অামার এই পত্রের উত্তর এডেন নগরে ॥ পাঠাইবেন। আমি তথা হইতে বােম্বে যাত্রা করিব। লর্ড ক্যানিং ২রা ডিসেম্বর ঐ পত্র প্রাপ্ত হন ও ৮ই আউট- স্নামকে এই উত্তর লেখেন, “আমি আপনার আরােগ্য সংবাদে অতি- আনন্দিত হইলাম। আমার এরূপ ইচ্ছা নহে, যে আপনি পারস্যযুদ্ধে সেনাপতি হইয়া যান। পারস্যরাজের সহিত বিশেষ যুদ্ধ ঘটি বার সম্ভাবনা নাই। অতএব পারস্য যুদ্ধে আড়ম্বর করিবার অথবা আপনার ব্যায় কোন প্রধান রাজনীতি ব্যক্তির সেনাপতি হইয়া যাইবার আবশ্যকতাও নাই। অতএব উত্তম কল্প এই, আপনি আসিয়া পূর্বপদ গ্রহণ করুন। অযােধ্যা সম্পূর্ণ অযােধ্যা সম্পূর্ণ উপশান্ত রহিয়াছে ও তথাকার রাজকার্য সুন্দররূপে সম্পন্ন হইতেছে, তথাপি আপ- নাকে তথাকার কার্যভার গ্রহণ করিতে দেখিলে আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইব।” প্রকৃত বিষয় এই, তৎকালে অযােধ্যায় ঘােরতর, বিবাদ উপস্থিত হওয়াতে শাসনকার্যে এরূপ বিশৃঙ্খলা ঘটে, যে প্রধান কমিসনর জ্যাকসনকে অযােধ্যা হইত স্থানান্তরিত না এই নগর আরবের নৈঋত কোণবৰ্তী ভারতবর্ষ হইতে ডাকযোগে ইংলণ্ডে যে সংবাদদি যায়, তাহা এই নগর দিয়া যাইয়া থাকে।

১১৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। করিলে তথাফার শাসনকার্য শৃঙ্খলাবদ্ধ হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল । লর্ড ক্যানিঙের এই অভিপ্রায় ছিল, আউটরাম আসিয়া কাৰ্য্য গ্রহণ করিলে জ্যাকসন সহজেই দূরীকৃত হইবেন, আমি যে বিরক্ত হইয়া তাহাকে দূর করিলাম, তাহা অপ্রকাশিত থাকিবে এবং অযােধ্যার গোলযোেগও শেষ হইয়া যাইবে। কিন্তু তিনি ১লা জানুয়ারি ইংলণ্ড হইতে পত্র পাইলেন, যে ইংলণ্ডেশ্বরী আউট- রামকে পারস্য যুদ্ধে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়াছেন, সুতরাং তাহার ঐ অভিপ্রায় বিফল হইয়া গেল। আউটরাম পারস্য যুদ্ধে যাত্রা করিলেন। পারস্য যুদ্ধের আয়োজন অবধি কাবুলের আমীর দোস্ত মহম্মদ খ। ইংরাজদের সহিত সন্ধি করিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিতে ছিলেন। তাহার সহিত সন্ধি করা উচিত কি না, এই বিষয় লইয়া বৃটিশ কর্মচারিগণের মত ভেদ হয়। কেহ বলিলেন, দোস্ত মহম্মদ খাঁ পঞ্জাব যুদ্ধের সময়ে সসৈন্যে যাইয়া শিখদের সহিত মিলিত হন, এক্ষণে আবার আমাদের সহিত সন্ধি করিতে উদ্যত হই- য়ছেন। তিনি অব্যবস্থিত চিত্ত, অদ্য, যাহা করিব বলিয়া প্রতি- শ্রত হইবেন, কল্য তার বিপরীত করিয়া বসিবেন। কেহ কহি লেন, দোস্ত মহম্মদের সহিত সন্ধি করিলে হানি নাই। ইত্যবসরে পেশােয়ারের কমিশ্যনর এড় ওয়াড প্রস্তাব করেন, দোস্ত মহম্মদ খাকে আহ্বান করিয়া উভয় রাজ্যের প্রান্তভাগে আনয়ন করা যাউক, এক জন দূত তথায় যাইয়া তাহার সহিত সন্ধির কথা বার্তা স্থির করুন। লর্ড ক্যানিং তাহার এই প্রস্তাব অনুমােদন করাতে দোস্ত মহম্মদ, পেশােয়ারে আহুত হইলেন।' পঞ্জাবের কমি- স্যনর জন লরেন্স, এডওয়ার্ডকে লিখিলেন, আপনি দোস্ত মহম্মদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যথা কর্তব্য স্থির করিবেন। এভ ওয়ার্ড পত্রের উত্তরে এই কথা লিখিয়া পাঠাইলেন, আমি একাকী যাইব না, আপনাকেও যাইতে হইবেক। অনন্তর তাহারা উভয়ে মিলিয়া সসৈন্যে বৃদ্ধ আমীরের সহিত সন্ধি করিতে চলিলেন।

লর্ড ক্যানিঙ। এদিকে দোস্ত মহম্মদ খাঁ আহ্বান পত্র প্রাপ্ত হইরার পরে দুই পুত্র, কতিপয় মন্ত্রী ও কতকগুলি সেনা সমভিব্যাহারে রাজ্যের পর্যন্ত ভাগে যাত্রা করিলেন। বৃটিশ কমিসনরেরা ১৮৫৭ ১লা জানুয়ারি তাহার সহিত খাইবার উপত্যকায় সাক্ষাৎ করেন। প্রথম সাক্ষাৎ দিবসে কার্যের কথা কিছুই হইল না, পরস্পর পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার করিলেন। ইহার দুই দিবস পরে আমীর পেশশায়ারের নিকটে বৃটিশ কমিশ্যনরদিগের সহিত সাক্ষাৎ করেন। কমিস্যনরেরা তাহার সম্মানার্থ সপ্ত সহ সেরও অধিক বৃটিশ সেনা অর্ধ ক্রোশ পৰ্য্যন্ত দাঁড় করাইয়া দেন। এই দিবসেও কাৰ্য্যের কোন কথা উত্থাপিত হইল না, আমীর জরূদ নামক স্থানে শিবির সন্নি- বেশিত করিয়া ছিলেন, বৃটিশ কমিসনরের ৫ই জানুয়ারি আমী- রের শিবিরে গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। এই দিবস কার্যের কথাও উথিত হইল। আমীর প্রথমতঃ হিরাটের বিষয় লইয়া কথোপকথন আরম্ভ করিলেন। তাঁহার পুত্রের পশ্চাতে ও মন্ত্রিরা সম্মুখে দাড়াইলেন। আমীর, পারস্য রাজকে পরাস্ত করিয়া হিরাট অধিকার করিবার জন্য অতিশয় আগ্রহবান ছিলেন, মুক্তকণ্ঠে কহিতে লাগিলেন, আমি হিরাট অধিকার করিবার একান্ত বাসনা করিয়াছি। যদি জগদীশ্বর আমার প্রতি প্রসন্ন হন ও যদি বৃটিশ গবর্ণমেন্ট আমার সাহায্য করেন, তাহা হইলে আমি হিরাটের দুর্গ উড়াইয়া দিব ও হিরট অধিকার কবিব। যৎকালে আমীর পেশােয়ারে বৃটিশ কমিনরদিগের সহিত এইরূপ, কথােপকথন করিতেছিলেন, ঐ সময়ে গবর্ণর জেনের লর্ড ক্যানিং কলিকাতার গবর্নমেন্ট হাউসে বসিয়া তার পক্ষে জন লরেন্সের নিকটে এই বার্তা প্রেরণ করিলেন, যত শীঘ্র সম্ভব, আমি পাঁচ সহস্র সেনা পারস্য সাগরে পাঠাইব। যদি পারস্যরাজ সন্ধি করিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন, তবে তাহার সহিত অন্যান্য নিয়মের মধ্যে এই দুইটা নিয়মও • নির্ধারিত করিতে হইবে, যে তিনি হিরাট হইতে সৈন্য উঠাইয়া লইবেন ও তাহাকে প্রতিজ্ঞা লঘু চরিতমঞ্জরী। করিতে হইবে, যে কস্মিন্ কালে আর আফগানিস্থানের কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন না। সুচতুর লরেন্স আমীরের সহিত প্রথম সাক্ষাৎ দিবসাবধি এই সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, অগ্রে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অভিপ্রায় প্রকাশ করা হইবেক না, প্রথমতঃ আমী- য়ের মনােগত ভাব জানিতে হইবেক। এই নিমিত্ত তিনি পারস্য- রাজের সহিত সন্ধির কথা গােপনে রাখিয়া আমীরকে কহিলেন, সংবাদ পাইলাম, আমাদের পাঁচ হাজার সেনা পারস্য সাগরে শীঘ্র উপনীত হইবে। এক্ষণে আমার জিজ্ঞাস্য এই, আপনি কি উপায়ে পারস্য- রাজকে পরাস্ত করিবেন। আপনার কত সৈন্য আছে, বাৎসরিক আয় কত এবং বৃটিশ গবর্ণমেন্টকেই বা কি সাহায্য করিতে হইবেক ? অাপনি তাহা বিস্তারিত রূপে বলুন। দোস্ত মহম্মদ খাঁ পাকাপাকি দেখিয়া কহিলেন, অদ্য আমি এ বিষয় বিবেচনা করিয়া দেখি, পরে আপ- নাকে বলিব। আমীর এই বলিয়া বিদায় লইলেন। ৭ই জানুয়ারি দোস্ত মহম্মদ খাঁ কতিপয় মন্ত্রী সহকারে কমিশ্যনরদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও পূর্বের ন্যায় বাগাড়ম্বর করিতে লাগিলেন। জন লরেন্স তাহাকে স্মরণ করিয়া দিলেন, অদ্য আপনার সমুদায় পরিষ্কাররূপে বলিবার কথা আছে। অতএব আপনি মন্তব্য বিষয়ের অনুসরণে বিরত হইতেছেন কেন? বাগাড়ম্বর আরম্ভ করাতে আমীরের অন্তঃকরণ উত্তেজিত হইয়াছিল, তিনি বহুকষ্টে প্রকৃতিস্থ হইয়া কহিলেন, আপা- ততঃ ঋতুর প্রতিকূলতাবশতঃ হিরাটে যুদ্ধ যাত্রা করা সুসাধ্য নহে। দুইমাস অতীত হইলে নূতন ঘাস জন্মিবে এবং প্রচুর খাদ্য সামগ্রী ও পাওয়া যাইবে। মানস করিয়াছি, সেই সময়েই যুদ্ধ যাত্ৰা করিব। তাহা হইলে সেনাগণের আহার নিবন্ধন কোন কষ্ট থাকিবে না। এক্ষণে আমার ৬৮ টা কামান ও ৩৫ হাজার সেনা আছে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে আর ১৫ হাজার সেনা ও ৪০ টা কামান সংগৃহীত হইবে। আমি চল্লিশ সহ সেনা ও প্রায় সমুদায় কামান লইয়া হিরাটে যুদ্ধ যাত্রা করিব। আমীরের কথা সমাপ্ত হইলে পর লরেন্স কহিলেন, আমাদিগকে কি সাহায্য করিতে হইবেক। আমীর উত্তর দিলেন, অদ্য এ কথা লড ক্যানিঙ। থাকুক, আমি বিবেচনা করিয়া পুত্রের দ্বারা কল্য বলিয়া পাঠাইব। পর দিবস আমীরের দুই পুত্র মন্ত্রী সমভিব্যাহারে লইয়া জন লরে- ন্সের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ও আফগানিস্থানের সমুদায় আয়ের হিসাব দিয়া কহিলেন, যতদিন পারস্য রাজের সহিত যুদ্ধ চলিবে, আপনাদিগকে সালিয়ানা ৬৪ লক্ষ টাকা ও অনুন ৫০ টা কামান, তদুপযুক্ত বারুদ ও গােলা দিতে হইবেক। তাহা হইলে আমরা হিরাট হইতে পারস্য সেনাদিগকে দূর করিয়া দিতে পারি। ইংরা- জেরা যেরূপ সাহায্য করিবার ইচ্ছা করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন, করিয়াছিলেন, সরদারেরা তাহা অপেক্ষা অধিক চাহিয়া বসিলেন। জন লরেন্স বাড়াবাড়ি দেখিয়া কহিলেন, আপনাদিগকে হিরাট হইতে পারস্য সেনা দূর করিবার কথা দূরে থাকুক, কি হইলে আপনারা কাবুল রক্ষা করিতে পারেন। হিরাটে যুদ্ধ যাত্রা করা সরদারগণের নিতান্ত বাসনা ছিল, তাহারা এক্ষণে মনের মত কথা না শুনিয়া অসন্তুষ্ট হইলেন ও মৌন- ভাব অবলম্বন করিলেন। সে যাহা হউক, লরেন্স ঐ প্রশ্নের উত্তর পাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। সরদারেরা কহিলেন, পিতার সহিত পরামর্শ না করিয়া আমরা উহার কোন উত্তর দিতে পারি না, এই বলিয়া তাহারা সে দিবস বিদায় লইলেন। পর দিবস পুনরায় আসিয়া বলিলেন, ৪ হাজার বন্দুক ও ৮ হাজার সেনার বাৎসরিক বেতন ১২ লক্ষ টাকা দিলে কাবুল রক্ষা হইতে পারে। জলরেন্স অবিলম্বে এই বিষয়টা তাড়িত বার্তাবহের সাহায্যে লর্ড ক্যানিঙের গােচর করিলেন। লর্ড ক্যানিও, এই উত্তর পাঠা- ইলেন, আপনি আমীরকে কহিবেন, আমি তাহার বাক্যে সম্মত হই- লাম। ৪ হাজার বন্দুক অবিলম্বে প্রেরিত হইবেক এবং যাবৎ পারস্য রাজের সহিত ইংলণ্ডের যুদ্ধ চলিবে, তাবৎ বাৎসরিক ২২ লক্ষ টাকা দেওয়া যাইবেক। ১৩ই জানুয়ারি টালিগ্রাফ যােগে লড় ক্যানিঙের এই উত্তর প্রেরিত হয়। পর দিবস প্রাতঃকালে জলরেন্স দোন্তমহম্মদ খার শিবিরে খার শিবিরে যাইয়া তাহাকে বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অভিপ্রায় বলিলেন। আমীর অগত্যা হিরাটে যুদ্ধ যাত্রা করিবার ১১৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। #দের বাসনা পরিত্যাগ করিয়া ইংরাজদের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন, কিন্তু কাবুলে কতকগুলি বৃটিশ কর্মচারী থাকিবার কথা হওয়াতে আমীর বিরক্তিভাব প্রকাশ করিয়া কহিলেন, আফগানেরা ইংরা- নাম শুনিতে পারে না, অতএব বৃটিশ কর্মচারীরা আফগান রাজধানীতে কিরূপে থাকিতে পারেন। লরেন্স তাহাকে এই বলিয়া বুঝাইলেন, আমরা আমরা যে আপনার সাহায্য করিব, সাহায্য করিব, আপনি তাহা উপযুক্ত রূপে বিনিয়ােগ করিবেন কি না, দেখিবার জন্য কাবুলে বৃটিশ কর্মচারী রাখা আবশ্যক হইতেছে। অনন্তর অনেক তর্ক বিত- কের পর এই স্থির হইল, যে বৃটিশ কর্মচারীরা কাবুলের যে কোন স্থানে থাকিতে পারিবেন, ইহা সন্ধিপত্রে লিখিতে হইৰেক, কিন্তু কাৰ্যতঃ তঁাহারা কান্দাহার অতিক্রম করিবেন না । ২৬ জানুয়ারি সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত ও প্রচারিত হয়। লড় ক্যানিঙ কলিকাতা হইতে টালিগ্রাফ যােগে যােগে . লরেন্সকে বলিয়া পাঠাইলেন, আপনি আমীরকে কহিবেন, আমি তাহার সদ্ব্যবহারে অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি। জগদীশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করি, যেন তিনি দীর্ঘায়ু হন ও সুস্থশরীরে রাজত্ব করিতে থাকেন। আমার বাসনা ছিল, যে যাইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করি, কিন্তু কাৰ্য্য- গতিকে করিতে পারিলাম না, ইহাতে অতিশয় দুঃখিত হইতেছি। বৃদ্ধ আমীর লর্ড ক্যানিঙের এই সকল মধুমাখা কথা শুনিয়া আন- ন্দের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইলেন। আহলাদে তাহার কলেবর রোমা ঞ্চিত হইয়া উঠিল । তখন তিনি হর্ষোৎফুল্ল লােচনে কহিলেন, লর্ড ক্যানিঙের সহিত সাক্ষাৎ হইলে বড় সন্তোষের বিষয় হইত, , কিন্তু আমি এরূপ প্রত্যাশা করিতে পারি না, যে তিনি এতদুর পর্যটন করিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। ভূতপূৰ্ব গবর্ণর জেনের লর্ড অকল্যাণ্ডের সহিত আমার আলাপ পরিচয় ছিল ও আমি লর্ড এলেনবরাকেও জানিতাম। তাহারা আমার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করিয়াছিলেন, আমি তাহা কস্মিন্ কালে কালে বিস্মৃত হইতে পারিব না। দোস্ত মহম্মদ খাঁ উপসংহার কালে কহিলেন, আমি এক্ষণে লর্ড ক্যানিঙ। সময়ে বৃটিশ গবর্নমেন্টের সহিত মিত্ৰতাসূত্রে বদ্ধ হইলাম। হইলাম। যতদিন শরীরে প্রাণসঞ্চার থাকিবে, সন্ধি প্রতিপালন করি। এই রূপে সন্ধিশেষ হওয়াতে দোস্ত মহম্মদ খাঁ বিদায় লইয়া স্বীয় রাজধানী প্রত্যাগমন করিলেন এবং বৃটিশ কমিসনরেরাও স্ব স্ব কৰ্ম্ম স্থানে ফিরিয়া গেলেন। ইতি পূৰ্বে উল্লিখিত হইয়াছে, কমিসনর জ্যাকসনের কাৰ্য্যদোষে অযােধ্যায় অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা ঘটে। লর্ড ক্যানিঙ আউটরামকে অযােধ্যায় কমিসনরের পদে পুনঃ স্থাপিত করিয়া জ্যাকসনকে তথা হইতে দুরীকৃত করিবার সহজ উপায় উদ্ভাবন করেন। কিন্তু ইংলণ্ডে- শরী আউটরামকে পারস্যযুদ্ধে সেনাপতি নিযুক্ত করাতে তাঁহার সে অভিপ্রায় ব্যর্থ হইয়া যায়। লর্ড ক্যানিং তদবধি চিন্তা করিতে ছিলেন, জ্যাকসনকে অযােধ্যা হইতে স্থানান্তরিত করিতেই হইবেক। কিন্তু অন্য কোন ব্যক্তিকে তঁাহার পদে নিযুক্ত করা যায়, এমত রাজপুতনার এজেন্ট হেরি লরেন্স লিখিলেন, আমি অসুস্থ হইয়াছি, আমার প্রার্থনা এই, যে কিছু দিনের জন্য অবসর লইয়া দেশে ফিরিয়া যাই। কোম্পানির সংগ্রামিক কর্মচারিগণের মধ্যে লরেন্স অতি যোগ্য পুরুষ ছিলেন। লর্ড হাডিঞ্জ প্রথম পঞ্জাব যুদ্ধের পরে ইহাকে লাহাের দরবারে রেসিডেন্ট নিযুক্ত করেন। অনন্তর পঞ্জাবরাজ্য বৃটিশ অধিকারভুক্ত হইলে তথায় যে, রাজ্যশাসন বিষয়িণী সভা স্থাপিত হয়, লরেন্স তাহার প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। তঁাহার হস্তে রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যের বন্দোবস্ত করিবার ভার অর্পিত ছিল। তিনি ন্যায় পথে থাকিয়া জায়গীরদারদিগের সহিত যে বন্দোবস্ত করেন, তাহা কোম্পানির পক্ষে অসুবিধার অসুবিধাকর বিবেচনায় লর্ড ডেলহৌসী তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হন ও তাহাকে রাজপুতানায় পাঠান। সে যাহা হউক, সুবিচক্ষণ লর্ড ক্যানিঙের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাহার গুণবত্বা অপ্রকাশিত তিনি র পত্র প্রাপ্তির কিয়দিন পূর্বে তাহাকেই কমিশনরের পদে মনোনীত করিয়া ছিলেন। এক্ষণে তাহার বাটী ছিল না, তঁাহার ১২০ লঘু চরিতমঞ্জরী। গমনের অভিপ্রায় জানিয়া এই উত্তর লিখিলেন, আপনি ইংলণ্ডে প্রতিগমনের বিষয় পুনৰ্ব্বার পুনৰ্ব্বার বিবেচনা করিয়া দেখুন। আমার বাসনা এই, আপনি যাইয়া অযােধ্যার কাৰ্য্য গ্রহণ করেন। আমি আপনা ব্যতিরেকে এমন কোন ব্যক্তি দেখিনা, যাহার হস্তে অয্যো- ধ্যার কাৰ্য্যভার সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারি। কিন্তু আমার এই আশঙ্কা হইতেছে, অযােধ্যায় পাঠাইলে পাছে আপনার স্বাস্থ্য লাভের ব্যাঘাত জন্মে। হেরি লরেন্স রাজপুতনায় কার্য করিতে ভাল বাসিতেন না, অযোধ্যার কমিসনরের পদে নিযুক্ত হওয়া তাহার পূৰ্ব্বাবধিই প্রার্থনীয় ছিল। আউট রাম ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিবার সময়ে তিনি একবার ঐ পদের প্রার্থী হন, কিন্তু লর্ড ক্যানিং তাহার প্রার্থনা পত্র প্রাপ্ত হইবার পূর্বেই জ্যাকসনকে মনােনীত করিয়া ছিলেন, সুতরাং লরেন্স তৎকালে অভীষ্ট লাভে বঞ্চিত হন। এক্ষণে লড় ক্যানিঙ ইচ্ছা পূৰ্ব্বক তাহাকে সেই চির প্রার্থিত পদে নিযুক্ত করিবার প্রস্তাব করাতে তিনি অতিশয় হর্ষিত হইয়া লিখিলেন, আমি রাজপুত- নার কাৰ্য্য করিতে বিরক্ত হইয়াই কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরিয়া যাইবার অতি প্রায় করিয়াছি, শরীরের অসুস্থতা আমার ইংলণ্ডে প্রতিগমনের প্রধান হেতু নহে। আমি কাৰ্য্য করিতে ভয় করিনা, ডেসে বসিয়া প্রতি দিন ১০। ১২ ঘণ্টা কাৰ্য্য করিতে পারি। অত- এব যদি আমাকে অযোধ্যায় পাঠান, আমি সম্পূর্ণ সম্মত আছি, বিশ দিনের মধ্যে তথায় যাইতে পারি । লড ক্যানিঙ একেত লরেন্সকে অযােধ্যায় কমিশ্যনর করিতে সমুৎ- সুক হইয়াছিলেন, তাহাতে আবার লরেন্স ও আগ্রহাতিশয় প্রকাশ করিলেন, সুতরাং তাহাদের উভয়ের মনোবাঞ্ছা অবিলম্বেই পূর্ণ হইল। লরেন্স রাজপুতন! হইতে লক্ষ্ণৌ যাত্রা করিলেন। তিনি পথে যাই- বার সময়ে কতিপয় দিবস অাগ রায় আঁৰস্থিতি করেন। তৎকালে উত্তর পশ্চিম প্রদেশের লেপ্টনেন্ট গবর্ণর আগরায় থাকিতেন। হেনরি লরেন্স আগরায় অবস্থিতি কালে একদা পরিহাসক্ৰমে .. কোন লর্ড ক্যানিঙ। ১২১ এবং K বন্ধুকে বলেন, “ যখন সিপাইরা বিদ্রোহী হইয়া লেপ্টনেন্ট গবর্ণর, অপরাপর সন্ত্রান্ত ইউরোপীয় এবং আমাকে এই আগরার দুর্গে বন্ধ করিয়া রাখিবে, সে সময়টী বড় দূরবর্তী নহে।” হেনরি লরেন্স সিপাইদের প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারিয়াছিলেন ভারত- বর্ষীয় সংগ্রামিক প্রণালীগত যে অনেক দোষ ছিল, তিনি তাহাও বিলক্ষণ জানিতেন। ইহাতে তাহার অন্তঃকরণে অনেক দিন পূর্বে পরি টরূপে এই প্রতীতি জন্মে, যে এক সময়ে সিপাইরা বিদ্রোহী হইয়া একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড উপস্থিত করিবে । লরেনস, দ্বাদশবৎসর অবধি " প্রকাশ্যরূপে ঐ বিষয়টা বলিয়া আসিতে ছিলেন এক্ষণে আগরায় অবস্থিতি কালে পরিহাসক্রমে কোন বন্ধুকেও কহিলেন। লরেনস : ঐ কথাগুলি পরিহাসচ্ছলে বলিয়াছিলেন কটে, কিন্তু ইহাতে তাহার হর্ষ অপেক্ষা অধিকতর বিষাদই প্রকাশ পাইয়া ছিল। লরেন্স বিপদের আশঙ্কা করিয়া কখনই কর্তব্য কৰ্ম্মের অনুষ্ঠানে বিরত হইতেন না। তিনি সত্বর হইয়া আগরা হইতে যাত্রা করিলেন ও ২০শে মার্চ সূর্যোদয়ের পূর্বে লক্ষে গিয়া উপনীত হইলেন। তাহার আগমনে জ্যাকসন মনে মনে অসন্তুষ্ট হইলেন বটে, তথাপি মৌখিক সদ্ভাব প্রকাশ করিয়া তাহার যথােচিত সম্বর্ধনা করিলেন। লরেনস পূৰ্ব্ব রাত্রে অনাহারে অশ্বারােহণ করিয়া পথ চলিয়াছিলেন, কিন্তু প্রাতরাশ করিবার পূর্বেই লর্ড ক্যানিঙকে এক খানি পত্র লিখিলেন। উহার মৰ্ম্ম এই, আমি অদ্য ' এখানে পৌছি- য়াছি। জ্যাকসনের সহিত দুই ঘণ্টা কথােপকথন, করিলাম। তিনি ভদ্র ব্যক্তির ন্যায় আমার সহিত ব্যবহার করিয়াছেন। লরেন্স এই পত্র শেষ করিতে না করিতেই লর্ড ক্যানিঙের পূৰ্ব্বপ্রেরিত দীর্ঘ ও উৎসাহবাক্যে পূর্ণ এক খানি পত্র প্রাপ্ত হইলেন। তিনি উহা পড়িয়া : তৎক্ষণাৎ এই উত্তর লিখিলেন, আপনি যদি অন্তরের সহিত আমার সাহায্য করেন, কৃতকাৰ্য্য হইব সন্দেহ নাই। । ইতি পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, লর্ড • ক্যানিঙ ডিরেক্ট রদিগের নিকটে বিদায় লইবার সময়ে বলিয়াছিলেন, ভারত রাজ্যের আকাশে *। ।

লঘু চরিতমঞ্জরী। বিতস্তি প্রমাণ " মেঘ উদিত হইয়া সময়ে সময়ে ভয়ঙ্কর ভাব ধারণ করে। এক্ষণে সেই ক্ষুদ্র মেঘ উৎপন্ন হইবার উপক্রম হইল। পেশু রাজ্যে অনেক মাত্রা সেনা ছিল। লর্ড ক্যানিঙ বাঙ্গালার সেনা- গণকে তথায় যাইতে ও মাত্রা সেনাদিগকে তথা হইতে বঙ্গদেশে আসিতে আদেশ করিলেন। সমুদ্রযাত্রা হিন্দুশাস্ত্র মতে निरिक বাঙ্গালার সৈন্ত মধ্যে অধিকাংশই ৰাহ্মণ ; সুতরাং তাহারা সমুদ্র দিয়া পেণ্ড যাইতে অস্বীকার করিল। লর্ড ক্যানিঙ তৎকালে নূতন আসিয়াছিলেন, এদেশের আচার ব্যবহারাদির বিষয় কিছুই জানিতেন না, তিনি সিপাইদেয় ঐ কুসংস্কার বিমোচনে যত্নবান হইলেন। তিনি তদনুসারে ১৮৫৬ খ্ৰীঃ অব্দের ৫ই জুলাই এই আদেশ প্রচার করিলেন, ভবিষ্যতে যাহারা সৈনিক কার্যে নিযুক্ত হইবার প্রার্থনা করিবে, তালিকায় নাম লিখাইবার সময়ে তাহা- দিগকে এই অঙ্গীকার করিতে হইবেক, যে আমরা সমুদ্র পথে কোম্পা- নির রাজ্যের বাহিরে হউক, অথবা ভিতরে হউক, আদেশ করিলেই যাইব, তাহাতে কোন আপত্তি করিব না। লর্ড ক্যানিঙ ইহার কিছু দিন পরে ইংলণ্ডের কর্তৃপক্ষ দিগকে লিখিলেন, সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ বলিয়া সিপাইদের যে কুসংস্কার ছিল, আমি তাহা দূরীকৃত করিয়াছি। আপনারা দেখবেন, বঙ্গদেশের সিপাইরা সমুদ্রযাত্রা স্বীকার করিতে সঙ্কুচিত হইবে না। ইহা অত্যন্ত আশ্চ- য্যের বিষয়, যে এতদিন পর্যন্ত সিপাইদের অন্তঃকরণে ঐ কুসং- স্কারটা ছিল এবং বৃটিশ গবর্ণমেন্টও এত দিন পর্যন্ত উহার মূলচ্ছেদে উপেক্ষা করিয়াছিলেন। আমি আমি দেখিতেছি, জাতি জাতি ও জন্মস্থান বিষয়ে বাঙ্গালা ও বােম্বে স্থিত সিপাইদের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই। কিন্তু বােম্বের সেনারা সমুদ্র যাত্রায় কোন আপত্তি করে না। ও আমার এই নূতন আদেশ প্রচার হইবার পরেও বঙ্গদেশীয় সেনাগণের মধ্যে কোন অনন্তোষ-চিহ্ন লক্ষিত হইতেছে না। লর্ড ক্যানিঙের এটা ভ্রান্তি। গবর্ণমেণ্ট মাউসে অসন্তোষ চিহ্ন লক্ষিত হয় নাই সত্য বটে, কিন্তু অনেক অনেক গ্রাম বাজার ও সৈনিক আবাসে * :

লড ক্যানিঙ। লড ক্যানিঙের ঐ আদেশ লইয়া সাতিশয় আন্দোলন হইয়াছিল। বস্তুতঃ ঐ আদেশটী প্রচার হওয়াতে সিপাইদের স্বত্বের উপর হস্ত ক্ষেপ করা হয় নাই, এরূপ বলিতে পারা যায় না। সিপাইরা পুরুষানুক্রমে কোম্পানির, সরকারে, কাৰ্য্য করিয়া আসিতে ছিল, এক্ষণে তাহারা মনে করিল, গণমেন্ট আমাদিগকে সমুদ্রযাত্রা করিবার আদেশ না করুন, কিন্তু ইহা অবধারিত বটে; যে আমাদের সন্তানেরা সমুদ্রযাত্রা করিতে আদিষ্ট হইবে। সুতরাং আমরা এতকাল পর্যন্ত যে সত্ব ভােগ করিয়া আসিতেছিলাম, তাহা বিলুপ্ত হইল। সন্তানগণের কর্ম প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা রহিল না। এক্ষণে ৰাহ্মণের সৈনিক কাৰ্য্য গ্রহণের বাসনা পরিত্যাগ করিবে, সুতরাং বন্ধু বান্ধবগণের শূন্য পদে এরূপ ব্যক্তি সকল নিযুক্ত হইবে, যে তাহাদের সহিত বন্ধুতা জন্মিবার কোন সম্ভাবনাই থাকিবে না। সিপাইরা যে আশঙ্কা, করিয়াছিল, বাস্তবিক তাহাই ঘটিল। লর্ড ক্যানিঙের ঐ আদেশ সমুদায় রাজ্য মধ্যে প্রচারিত হইতে না হইতেই লক্ষিত হইল, ব্রাহ্মণেরা আর সৈনিক কাৰ্য্য গ্রহণে প্রয়াসী নহে। এই সময়ে জনরব উঠিল, গবর্ণমেন্ট ত্রিশ হাজার শিখ সেনা নিযুক্ত করিবেন। ইহাতে সিপাইরা মনে করিল, গবর্নমেন্ট পুরা- তন সিপাইদিগকে দুর করিতে উদ্যােগী হইয়াছেন। এক্ষণে আর আমাদের প্রতি যত্ন করিবেন কেন? এখন তাহাদের মনােবা। পূর্ণ হইয়াছে। যত দিন ভারতবর্ষের মধ্যে সূচ্যগ্র পরিমিত ভূমিও জয় করিতে অবশিষ্ট ছিল, ততদিন তাহারা আমাদের প্রতি যথেষ্ট সেহ করিতেন। এক্ষণে জয়তরঙ্গ সমুদ্রে যাইয়া পড়িবে, কিন্তু ধর্ম লােপের আশঙ্কায় আমরা সমুদ্রযাত্রা অস্বীকার করাতে গবর্ণমেন্ট একবারেই আমাদের প্রতি স্নেহ শূন্য হইলেন। লর্ড ক্যানিং ভারতবর্ষে আগমন করতে এরূপ কতকগুলি কারণ উপস্থিত হয়, যে , তাহাতে এতদ্দেশীয় অনেক ব্যক্তির অন্তঃকরণে ললাপের আশঙ্কা জন্মে। ভিন্ন ভিম্ন স্থানের সৈনিক কর্মচারি- গণের মধ্যে অনেকে সিপাই দিগকে খ্রীষ্টান ধর্মের উপদেশ দিতে ১২৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। আরম্ভ করেন। লর্ড ক্যানিঙ বিধবা বিবাহ আইন বিধিবদ্ধ করেন; বহু বিবাহ নিবারণে যত্নবান হন এবং মিশনরিস্কুল ও বাইবেল সসাসাইটীর উন্নতি সাধনে চেষ্টা পান। যৎকালে লর্ড ক্যানিঙ এই সকল কাষের অনুষ্ঠান করেন, ঐ সময়ে তাহার সহধৰ্ম্মিণীও স্ত্রীশিক্ষার শ্রীবৃদ্ধি সাধনে যত্নবতী হইলেন ও স্বয়ং বাঙ্গালী পল্লীতে গতিবিধি করিয়া বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধারণ করিতে লাগিলেন। বস্তুতঃ লর্ড ক্যানিং ও তাঁহার সহধর্মিণীর কোন প্রকার দুরভিসন্ধি ছিল না। পাটনায় মহাগেলযােগ উপস্থিত হইল। পাটনার কমিসনর টেলর সাহেব বাঙ্গালার তদানীন্তন লেপ্টনেন্ট গবর্ণর হেলিডেকে লিখিলেন, এখানকার অধিবাসিগণের এই আশঙ্কা জন্মিয়াছে, যে গবর্ণমেন্ট ভারতবর্ষীয়দিগকে বলপূর্বক খ্ৰীষ্টানধর্মে দীক্ষিত করিবার চেষ্টা পাইতেছেন। হেলিডে অবিলম্বে ঘােষণা করিলেন; গবর্ণমেন্ট কখনই ভারতবর্ষীয়দিগের ধৰ্ম্মে হস্তক্ষেপ করেন নাই এবং করিবেনও না। এই ঘােষণা প্রচার হইবার পরে উত্তর পশ্চিম অঞ্চল হইতে এক খানি ক্ষুদ্র পুস্তক প্রচারিত হয়। উহাতে এই রূপ লিখিত ছিল, যদি সাধারণের . অন্তঃকরণে ধর্ম ললাপের আশঙ্কা জন্মিয়া থাকে, তবে গবর্ণমেন্টই তাহার কারণ। গবর্ণমেন্টের ব্যাৰ্য্য গুলি ঐ আশঙ্কার পােষকতা করিতেছে।" এই সকল ঘটনার কিছু দিন পরে রাজপুতনা বৃটিশ অধিকারভুক্ত হইবার জনরব উঠে। পারস্যরাজ দিল্লীর বাদশাহর নিকটে দূত প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি যে কি অভিপ্রায়ে দূত প্রেরণ করিয়া ছিলেন, তাহা নির্ণীত হয় নাই। বােধ হয়, তাহার কোন অসদভি- প্রয় ছিল। বিশেষতঃ পূৰ্বাবধি একটা ভবিষ্যৎবাণী ভবিষ্যৎবাণী এদেশে প্রচারিত ছিল, ইংরাজের শতবৎসরের অধিক কাল রাজত্ব করিতে পারিবেন না। ইহাতে কেহ কেহ বিবেচনা করিলেন, ইরানদের রাজত্ব করিবাক্স নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হইল। তাহাগ ১৭ ৫৬ খ্রীঃ অকে বাঙ্গালী জয়ের দ্বারা ভারতবর্ষে আধিপত্য স্থাপন . .

লড ক্যানিঙ। ১২৫ করেন। তদবধি এ পর্যন্ত (১৮৫৬) নির্বিঘ্নে আধিপত্য করিলেন। এক্ষণে অবশ্যই রাজবিপ্লব ঘটিবে। তঁাহার,এই বিবেচনায় ঐ ভবিষ্যৎবাণী সফল হইবার সময় উপস্থিত বলিয়া জ্ঞান করিতে লাগিলেন। গবর্ণমেন্টের অত্যাচারে ভীত ও অপকৃত ব্যক্তিরা কতিপয় বৎ সর অবধি গবর্ণমেন্টের অনিষ্ট করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহাদের সেই মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইবার সময় সন্নিহিত হইয়া আসিল। ১৮৫৭ খ্রঃ অব্দের জানুয়ারি মাসে ভারতবর্ষে কোন গােলযােগ ছিল না, সর্বত্রই শান্ত ভাব লক্ষিত হইতে ছিল। ইংরাজের। পূর্ব- ব্যবহৃত ব্রাউন বেচু নামক বন্দুক অপকৃষ্ট বলিয়া রাইফেল নামক নূতন বন্দুক ব্যবহার করিতে আদেশ করিলেন। এই নূতন বন্দু- কের গুণ এই, যে, উহার দ্বারা গুলি অনেক দূর পর্যন্ত নিক্ষেপ করা যায়। ইহাতে সিপাইরা অতিশয় সন্তুষ্ট হইল এবং বৃটিশ গবর্ণমেন্টের অগণ্য ধন্যবাদ করিতে লাগিল ! এই সময়ে একটা জনরব উঠিল, যে সিপাইদের ব্যবহারের নিমিত্ত গােরুর ও শূকরের চৰ্বি মাখান টোটা প্রস্তুত হইতেছে। বাস্তবিক এই জনশ্রুতি অমূ- লকও নহে, বীজ ব্যতিরেকে কখন বৃক্ষ জন্মে না। গােরুর চর্বি যেরূপ হিন্দুদের মতে, মতে, শূকরের চর্বি সেইরূপ মুসলমানদিগের মতে অস্পৃশ্য, সুতরাং ঐ জনশ্রুতি শ্রবণে সিপাইদের সেই সাধুবাদ ও সন্তোষ ভাব অচির কাল মধ্যে রোষ ভাবে পরিণত হইল। যেরূপে টোটা কাটার গল্পটা সৰ্ব্বত্র প্রচারিত হয়, এস্থলে আবশ্যক বােধে তাহার মূলবৃত্তান্ত সংক্ষেপে সঙ্কলিত হইল। জানুয়ারি মাসে এক দিবস ঘটনাক্রমে একজন নীচ জাতীয় লস্কার দমদমার : সেনানিবেশ প্রবেশ করিয়া অনির্দিষ্ট নামা” কোন ব্রাহ্মণ সিপাইকে কহিল, মহাশয়! আমি অতিশয় পিপাসু হইয়াছি, আপনি একবার আপনকার লোটাটা দিন আমি জল পান করি। ব্রাহ্মণ সিপাই ঘৃণা করিয়া বলিলেন, তুই নীচ জাতি, আমার ললাটা লইয়া লঘু চরিতমঞ্জরী । জল খাইতে ইচ্ছা করিতেছিস্? লঙ্কার কহিল, মহাশয় ! আর জাত্যভিমান কোথায়? ব্রাহ্মণ ও শূদ্র বলিয়া যে ভেদ আছে, তাহা আর থাকিবে না। টোটা প্রস্তুত হইতেছে, উহা শূকর ও গাের চৰ্বি মাখান। বন্দুক ছুড়িবার সময়ে সিপাইদিগকে ঐ টোটার মুখ দাত দিয়া ছিড়িয়া বন্দুকের ভিতরে দিতে হইবে। ব্রাহ্মণ সিপাই, লস্কারের এই কথা গুলি আপনার সঙ্গীদিগকে বলেন। এইরূপে অল্পকাল মধ্যে দমা ও বারাকপুরের সমুদায় সিপাইরা উহা শুনিতে পাইল ও অসন্তোষ চিতু প্রকাশ করিতে লাগিল। ২৮শে জানুয়ারি জেনের হিয়ার্স ব্যারাকপুর হইতে আডজুটেন্ট জেনেলের অফিসে রিপাের্ট করেন, এখানকার সিপাইরা টোটা কাটিবার কথা শুনিয়া অসন্তোষ প্রকাশ করিতেছে। কতকগুলি কুলোক সিপাইদের মধ্যে রটাইয়া দিয়াছে, যে গবর্ণমেন্ট উহাদিগকে বলপূৰ্ব্বক খ্ৰীষ্টানধর্মে দীক্ষিত করিতে উদ্যত হইয়াছেন। বােধ হয়, ঐ সকল কুলােক কলিকাতাস্থিত ধর্ম সভার মেম্বর ও বিধবা বিবাহের বিপক্ষ। উহার। সিপাইদের অন্তঃকরণে অসন্তোষ জন্মাইয়া আপনা- দের স্বার্থ সাধনের চেষ্টা পাইতেছে। জেনেবল হিয়াস এই রিপাের্ট করিবার কতিপয় দিবস পরে বারাকপুরের টালিগ্রাফ অফিস দগ্ধ হয় ও ইংরাজ কর্মচারিগণের গৃহও দগ্ধ হইতে লাগিল। রাত্রিযােগে সিপাইরা একত্র হইয়া সভা করিতে আরম্ভ করিল। বারাপুর ও কলিকাতার পােষ্ট অফিসের দ্বারা বাঙ্গালার সিপাইদের প্রধান প্রধান আড্ডায় সংবাদ গেল, গবর্নমেন্ট বসা- মিশ্রিত টোটা কাটাইয়া সকলকে খ্ৰীষ্টান করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন, তােমরা সকলে এই বেলা সাবধান হও এবং গর্শমেন্টের ঐ অস- ভিপ্রায় নিবারণে যত্ন কর। ইহার কিছুদিন পরে বহরমপুরের সিপাইয়া বিদ্রোহী হয়। বহ- রমপুর বারাকপুরের উত্তরে পঞ্চাশ ক্রোশ দূরে স্থিত ও মুরশিদাবাদেয় সন্নিহিত। বহরমপুর অথবা উহার নিকটবর্তী স্থানে ইউরােপীয় সেনা ছিল না। অতএব ইহা অসম্ভব বােধ হয় না, যে মুরশিদাবাদের অনেক -- লড ক্যানিং। ১২৭ * হইতে আড় জু- নষব যােগ দিলে সিপাইরা একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড উপস্থিত করিত। কিন্তু সৈন্যাধ্যক্ষ কর্ণেল মিছাল অনেক কর্ণেল মিছাল অনেক কৌশলে বিদ্রোহ-প্রবৃত্ত সিপাইদিগকে বশবর্তী করেন। ২৩ জানুয়ারি জেনের হিয়ার্স বারাকপুর টেন্ট জেনেলের নিকটে রিপাের্ট করেন। সিপাইরা টোটা কাটিতে অসম্মত। আপনি এই বিষয়টা শীঘ্র, গবর্ণমেন্টের খােচর করুন। হিয়া রিপাের্ট করিবার সময়ে এই অনুরােধ করেন, সিপাইরা টোটায় যে চর্বি ইচ্ছা, মিশ্রিত করুক, গবর্ণমেন্ট যেন তাহাতে কোন আপত্তি না করেন। ২৪ এ শনিবার অপরাহ্নে হিয়ার্সের রিপাের্ট আডজুটেন্ট জেনেলের অফিসে পৌঁছে। পরদিবস রবিবার, অফিস বন্ধ থাকাতে কোন কাৰ্য্য হয় নাই । সুতরাং হিয়ার্স সত্বর লড় ক্যানিঙের অভিপ্রায় জানিতে পারিলেন না। ২৭ জানুয়ারি কাওয়াজের সময়ে এক জন দেশীয় সাংগ্রামিক কর্মচারী হিয়ার্স সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন, মহাশয়। আমাদের টোটা কাটার বিষয়ে কি হুকুম আসিয়াছে ? হিয়ার্স তৎকাল পর্যন্ত গবর্ণমেন্টের কোন হুকুম পান নাই, সুতরাং কোন উত্তর দিতে পারিলেন না। ইহাতে সিপাইদের ধর্মলোপের আশঙ্কা আরও দৃঢ়ীভূত হইল। ইহার পর দিবস আডজুটেন্ট জেনেল লিখিলেন, সিপাইরা টোটায় যে চৰ্বি ইচ্ছা, মিশ্রিত করুক, গবর্ণমেন্ট তাহাতে কোন আপত্তি করিবেন না। হিয়ার্স, অবিলম্বে গবর্ণমেন্টের অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন বটে, কিন্তু তাহাতেও সিপাইরা সন্তুষ্ট হইল না। জেনের হিয়াস ফেব্রুয়ারি মাসে বারাকপুর হইতে লেখেন, আমরা এখানে বান্ধদপূর্ণ অন্তঃসুড়ঙ্গের উপরে বাস করিতেছি, কণা- মাত্র অগ্নিসংযােগ হইলেই আমাদের সর্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। আমি এখানে কিছু দিন অবধি সিপাইদের মনের ভাব গতি দেখি- তেছি। কতকগুলি কুলােকের কথায় উহাদের মন বিগড়িয়া গিয়াছে। উহাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে, যে গবর্ণমেন্ট উহাদিকে বলপূর্বক খ্রীষ্টান করিবেন। 2 লঘুচরিতমঞ্জরী। { দুরভি হস্তক্ষেপ টোটা কাটার উপাখ্যানটা ক্রমশঃ উত্তর পশ্চিম প্রদেশেও প্রচা- রিত হইল। বৃটিশ গবর্ণমেন্টের শত্রুর অভাব ছিল না, তাহারা নানা অলঙ্কার দিয়া ঐ উপাখ্যান আর ও পল্লবিত করিয়া তুলি- লেন। ইংরাজের বিপক্ষ পক্ষের অত্যুক্তিবাদ লক্ষ্য না করিয়া বৃত্তান্ত সত্য কি না, তাহাই অনুসন্ধান করিতে লাগি লেন। তঁাহাদের স্থিরসিদ্ধান্ত ছিল, গবর্ণমেন্টের কোন সন্ধি নাই, তবে যে সিপাইরা দুরভিসন্ধি আশঙ্কা করিয়া ভীত হইয়াছে, সে তাহাদের ভ্রান্তি এবং উহা সহজেই দূরীকৃত হইবে। কিন্তু অনলে অনিল যােগের ন্যায় বিপক্ষ বর্গের সেই অতিবর্ণন সিপাইদের অসন্তোষ ভাব যে আরও বর্ধিত করিবে, ইংরাজেরা তখন পর্যন্ত তাহার বিন্দু বিসর্গও জানিতেন না। সেনাপতিরা সিপাইদিগকে বুঝাইতে লাগিলেন, তােমাদের ধর্মে করা গবর্ণমেন্টের অভিপ্রেত নহে, তােমরা টোটায় যে চৰ্বি ইচ্ছা, ব্যবহার কর এবং টোটার মুখ দাত দিয়া না ছিড়িয়া হাত দিয়া ছি , তাহাতে আমাদের কোন আপত্তি নাই। কিন্তু টোটা অপবিত্র বলিয়া সিপাইদের অন্তঃকরণে এরূপ সংস্কার জন্মিয়াছিল, যে তাহারা এক্ষণে টোটার কাগজের প্রতিও সন্দিহান হইল। কাগজের উপরিভাগ তৈলাক্ত পদার্থের ন্যায় চিক্কণ দেখাইত, তাহাতে আবার উহা দগ্ধ করিলে চর্বি পােড়ার মত গন্ধ নির্গত হইত, সুতরাং সিপাইদের সন্দেহ শীঘ্রই বদ্ধমূল হইয়া উঠিল। গবর্ণর জেনেরাল কাল বিলম্ব না করিয়া টোটার কাগজ পরী- ক্ষার্থ একটা কমিটী নিযুক্ত করিলেন। সিপাইরা, তথায় আহুত হইয়া কহিল, টোটার কাগজ চর্বিযােগ প্রস্তুত হইয়াছে বলিয়া আমাদের সন্দেহ জন্মিয়াছে। কমিটী জিজ্ঞাসা করিলেন, তােমা- দের সন্দেহ কিরূপে নিরাকৃত হইতে পারে ? সিপাইরা উত্তর দিল, টোটার কাগজ পরিবর্ত ব্যতিরেকে আমাদের সন্দেহ ঘুচি- বার উপায় নাই। কমিটি অবিলম্বে টোটার কাগজ পরীক্ষার্থ, রসা- নশাস্ত্র বিশারদ ডাক্তর ম্যাক্‌নেমারার নিকট পাঠাইলেন। ম্যাক্‌- লর্ড ক্যাঙি । নেমার পরীক্ষা করিয়া রিপাের্ট করেন, যে উহাতে চর্বি দেখিতে পাওয়া যায় না, যায় না, তবে উত্তম অণুবীক্ষণ দিয়া দেখিলে কিঞ্চিৎ তৈলবৎ সৃষ্টি হয়। বােধ করি, যাহারা কাগজ পুলিন্দা করিয়া পাঠাইয়াছে, তাহাদের হাতের তৈল হইবে। সিপাইরা এই সকল কথা শুনিয়াও সন্তুষ্ট হইল না। জেনেরল হিয়াস ১৯ এ ফেব্রুয়ারি কাওয়াজের সময়ে সিপাই- দিগকে সম্বােধন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে হিন্দুস্থানী ভাষায় কহিলেন, সিপাইগণ! তোমাদের ভ্রান্তি জন্মিয়াছে। তােমরা যে গবর্ণমে- টের ভৃত্য ও যে সমস্ত ইউরােপীয় কর্মচারী তােমাদের উপরে কর্তৃত্ব করিয়া থাকেন, তাহারা এক মুহুর্তের জন্যও এরূপ মনে করেন না, যে তোমাদিগকে খ্ৰীষ্টান করিবেন। বাইবেল পড়িতে ও বুঝিতে না পারিলে ইংরাজেরা কাহাকেও খ্ৰীষ্টান করেন না কিন্তু তােমরা বাইবেল পড়িতে জাননা ও বুঝিতেও পার অতএব গবর্নমেন্ট বলপূর্বক খ্ৰীষ্টান করিবেন বলিয়া তোমরা যে আশঙ্কা করিতেছ, তাহা পরিত্যাগ কর। হিয়াস বক্তৃতা সমাপন করিয়া সিপাইদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন, তােমরা আমার কথার তাৎপর্যগ্ৰহ করিয়াছ? সিপাইরা কোন উত্তর না দিয়া চুপ করিয়া থাকিল। ইহাতে হিয়াস ভাবিলেন, সিপাইরা বক্তৃতা শুনিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছে। কিন্তু তাহাদের সন্তোষতাব চিরস্থায়ী হইল না, বহরমপুরের বিদ্রোহের সংবাদ শুনিয়া তাহাদের মন পুন- রায় বিগড়িয়া গেল। এদিকে বহরমপুরের সিপাইদের বিদ্রোহের সংবাদ কলিকাতায় পেীছিলে; লর্ড ক্যানিং বিদ্রোহীদিগকে পদচ্যুত করিবার সঙ্কর করিলেন। এই সময়ে কলিকাতা ও দানাপুরের মধ্যে একটা মাত্র ইউরােপীয় রেজিমেন্ট ছিল। লর্ড ক্যানিঙ বিষেচনা করিলেন, অধিক সংখ্যক ইউরােপীয় সেনা উপস্থিত না থাকিলে দেশীয় সহ সেনাকে পদচ্যুত করা যুক্তিযুক্ত নহে। তিনি এই বিবেচনায় আপা- ততঃ বহরমপুরের বিদ্রোহ-প্রবৃত্ত সিপাইলের শাস্তিবিধান স্থগিত ১৭ লঘু চরিতমঞ্জরী। ! রাখিয়া যত শীঘ্ন সম্ভব, রেঙ্গুন, হইতে ইউরােপীয় সেনা আনয়ন করিবার আদেশ করিলেন ও বহরমপুরের সেনা নায়ক কর্ণেল মিছা- লকে লিখিলেন, আপনি সিপাইদিগকে বারাকপুরে আনিয়া পদচ্যুত করিবেন। বারাকপুরের সেনানায়ক হিয়াস এ সকল বিষয় কিছুই জানিতেন না, কিন্তু তাহার সিপাইরা উহা ইতি পূৰ্বেই অবগত হইয়াছিল। এই সময়ে গোয়ালিয়ারের রাজা কলিকাতা দেখিতে আসিয়াছিলেন। তিনি ১০ই মার্চ রাত্রে কোম্পানির বাগানে লর্ড ক্যানিঙ ও তাহার পারিষদবর্গকে ভােজনের নিমন্ত্রণ করেন। সিপাইরা গবর্নর জেনেলের অনুপস্থিতি রূপ সুযােগে কলিকাতার কেল্লা দখল করিবার সঙ্কল্প করে। ঘটনাক্রমে ঐ নির্ধারিত দিনে ঝড় বৃষ্টি হওয়াতে নিমন্ত্রণ স্থগিত থাকে এবং সিপাইদেরও দুরভি- সন্ধি সিদ্ধ হইবার ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু ঐ দিবস সন্ধ্যাকালে আর একটি ঘটনা হয়। টাকশালার প্রহরীদিগের সুবেদার একখানি পুস্তক পড়িতেছিল, এমত সময়ে কেল্লা হইতে দুই জন সিপাই আসিয়া তাহারে কহিল, আজি রাত্রে গবর্ণর জেনের বাহিরে যাইবেন। কলি- কাতার মিলিসিয়া* নিশীথ রাত্রে আসিয়া কেল্লার সিপাইদের সঙ্গে মিলিত হইবে। অতএব যদি আপনি যাইয়া যােগ দেন, তবে আমরা অনায়াসে কেল্লা দখল করিতে পারি। সুবেদার প্রভুভক্ত ছিলেন, তাহাদের কথায় ভুলিলেন না। তিনি অবিলম্বে ঐ দুই জন লিপাইকে কয়েদ করিলেন ও পর দিবস প্রাত:কালে উহাদিগকে ফোর্ড উইলিয়ম দুর্গে পাঠাইয়া দিলেন। ইহার কতিপয় দিবস পরে উহাদের বিচার হয়। বিচারে অপরাধ সপ্রমাণ হওয়াতে উহাদের প্রত্যেকের ১৪ বৎসর করিয়া কারাবাসের আদেশ হইল, এ দিকে জেনের হিয়ার্স পূৰ্ব্বকৃত বক্তৃতা দ্বারা প্রত্যাশানুরূপ ফল লাভ হইল না দেখিয়া . পুনরায় বক্তৃতা করিয়া লিপাইদের ভ্রান্তি বিমােচনে কৃতনিশচয় হইলেন। তিনি ১৪ই মার্চ কলিকা- তায় গবর্ণর জেনেলের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ঐ, অভি প্রায় প্রকাশ নগররক্ষী সেনাদিগকে মিলিসিয়া কহে। .

লর্ড ক্যানিঙ। কেবল করেন। লর্ড ক্যানিঙও তাহার অভিপ্রায় অনুমােদন • করিলেন। হিয়ার্স বিদায় লইয়া বারাকপুর ফিরিয়া গেলেন। সিপাইদের গোলযােগ শুনিয়া অবধি লর্ড ক্যানিং অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়াছিলেন। হিয়া প্রস্থান করিবার কিয়ৎক্ষণ পরে তাহার অন্তঃকরণে এই সন্দেহ জন্মিল, হয়তাে হিয়া বক্তৃতা করিবার সময়ে অনেক অনাবশ্যক কথা বলিতে পারেন, অথবা যে সকল কথা বলা আবশ্যক, তাহাও পরিত্যাগ করিতে পারেন। ক্যানিঙ এই আশঙ্কা করিয়া তৎক্ষণাৎ এক খানি পত্র লিখিলেন। বক্তৃতা কালে যে সকল কথা বলা আবশ্যক, ঐ পত্রে তাহা বিশেষ রূপে বিন্যস্ত হইল। জেনেবল হিয়ার্স পর দিবস সূর্যোদয়ের পূর্বে ঐ পত্র প্রাপ্ত হন। অনন্তর তিনি সিপাইদিগকে কাওয়াজ দিবার স্থানে একত্র হইতে আদেশ দিলেন। সিপাইরা সমবেত হইলে পর হইলে পর তিনি এইরূপে বক্তৃত আরম্ভ করিলেন, সিপাইগণ ! এক্ষণে টোটার কাগজ তােমাদের সন্দেহের বিষয় হইয়াছে, কিন্তু বিবেচনা করিয়া দেখিলে ঐ সন্দেহ কোন মতেই জন্মিতে পারে না। তােমরা কাগ- জের যে চিকণ দেখিতেছ, উহা বসা নিবন্ধন নহে, উহা অন্নের মও হইতে জন্মিয়াছে। তােমাদের দেশের রাজগণ যে সকল কাগজ ব্যবহার করিয়া থাকেন, তাহাও এই টোটার কাগজের ন্যায় মসৃণ ও তিনি ইহার প্রমাণ স্বরূপ স্বর্ণশোভিত একটা থলিয়া হইতে একখানি পত্র বাহির করিলেন এবং উহা সিপাইদিগকে দেখাইয়া কহিলেন, তােমরা যে টোটার কাগজের উপর সন্দেহ করিতেছ, দেখ, এই পত্রের কাগজ তদপেক্ষা অধিকতর উজ্জ্বল ও চিকণ । যৎ কালে আমি পাবে ছিলাম, ঐ সময়ে কাশ্মীরাধিপতি গোলাপ সিংহ অামাকে এই পত্র লেখেন। যদি ইহাতেও তােমাদের সন্দেহ ভঞ্জন না হয়, তবে তােমরা শ্রী রামপুরে যাও। তুথায় যেরূপে কাগজ প্রস্তুত হইয়া থাকে, দেখিলেই তােমাদের সকল সন্দেহ ঘুচিয়া যাইবে। জেনেবল হিয়া বক্তৃতা সমাপন করিয়া অশ্বারােহণে প্রস্থান করিলেন। সিপাইরাও আর কোন কথা না বলিয়া শান্তভাবে স্ব স্ব গাবাসে ফিরিয়া গেল। উজ্জ্বল।

১৩ ( লঘু চরিতমঞ্জরী। পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, বহরমপুরের সেনানায়ক কর্ণেল মিছাল বিদ্রোহী সিপাইদিগকে বারাকপুরে আনিয়া বারাকপুরে আনিয়া পদচ্যুত করিতে আদিষ্ট হন। তিনি তদনুসারে ২০ মার্চ সিপাইদিগকে সঙ্গে করিয়া বহরমপুর হইতে যাত্রা করেন ও ৩০ এ বারাকপুর হইতে চারি ক্রোশ দুরস্থিত বারাসতে আসিয়া উপনীত হন। তিনি তথায় থাকিয়া গবর্ণমেন্টের আদেশ প্রতীক্ষা করিতে ছিলেন, এমত সময়ে শুনিতে পাইলেন, বারাকপুরে একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড হইয়া গিয়াছে। ২৯ মার্চ তিপ্পান্ন সংখ্যক রেজিমেন্টের পঞ্চাশ জন গোরা কলিকাতা হইতে চাণকে প্রেরিত হয়। ইহাতে চাণকের চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের সিপাইরা আরও ভীত হইল। উহা- দের মধ্যে মােগল পাড়ে নামক এক ব্যক্তি ঐ দিবস ভাঙ খাইয়া উন্মত্ত হইয়াছিল, সে ইউরােপীয় সেনগণের উপস্থিতির সংবাদ শুনিয়া স্থির করিল, আমরা যে বিপদের আশঙ্কা করিতে ছিলাম, তাহ। এক্ষণে উপস্থিত। এত দিনের পর আমাদের জাতি গেল। গােরারা আমাদিগকে খ্ৰীষ্টান করিতে আসিয়াছে। মােগল পাড়ে এই রূপ স্থির করিয়া সঙ্গীদিগকে ডাকিয়া কহিল, যদি তােমরা টোটা কাটিয়া ধৰ্ম্ম নাশ করিতে না চাও তবে সত্বর আমার সঙ্গে আইস। ফিরিঙ্গীদের সহিত যুদ্ধ করিতে হইবে। সে এই কথা বলিয়া বারূদ- পূর্ণ বন্দুক ও শাণিত খঙ্গ লইয়া আপনার গৃহ হইতে বাহির হইল ও যে স্থানে সাংগ্রামিক কর্মচারীরা থাকিতেন, তথায় যাইয়া ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়াইতে লাগিল। এমত সময়ে কোন ব্যক্তি দৌড়িয়া গিয়া এই বিষয়টা সারজেন্ট মেজরের গোচর করে। মেজর তখনি বাহিরে আসিলেন। মােগল পাড়েও অমনি তাহাকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিল। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাহার সন্ধান ব্যর্থ হইয়া গেল। মােগল পাড়ে বন্দুকে পুনরায় বারূদ পুরিল। সারজেন্ট মেজর ভীত হইয়া দৌড়িয়া পলাইলেন। লেপ্টনেণ্ট বাগ এই অসম্ভাবিত সংবাদ শ্রবণে খঙ্গ ও পিস্তল লইয়া দ্রুতবেগে অশ্ব পরিচালন পূর্বক ঘটনা স্থলে উপস্থিত হইলেন। তিনি উপস্থিত হইয়া অশ্বের রশ্মি- লর্ড ক্যানিঙ। সংযত করিতেছিলেন, এমত সময়ে মােগল পড়ে তাহারে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিল, কিন্তু গুলি তঁাহার শরীরে না লাগিয়া অশ্বের শরীরে প্রবিষ্ট হইল। অশ্ব তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্ব পাইল, 'লেপ্টনেন্ট বাগও ভুলে পড়িলেন। তিনি অবিলম্বে উঠিয়া মোগল পাড়ের প্রতি পিস্তল প্রয়ােগ করিলেন, কিন্তু তাহাতে কোন ফলােদয় হইল । তখন শাণিত অলি নিষ্কাশিত করিয়া মােগল পাড়ের অভিমুখে দৌড়িয়া গেলেন। ইত্যবসরে সারজেন্ট মেজর পুনরায় আসিয়া তাহার সহিত মিলিত হইলেন। অনন্তর উভয় পক্ষে খযুদ্ধ আরম্ভ হইল। = - যে স্থলে এই সকল ঘটনা হয়, তাহার অনতিদূরে জমাদার ঈশ্বরী পড়ে ও কুড়ি জন সিপাই উপস্থিত ছিল এবং বন্দুকের শব্দ শুনিয়া আরও অনেক সিপাই তথায় আসিতে লাগিল, কিন্তু তাহাদের মধ্যে শেখ পলটু নামক একজন মুসলমান সৈনিক ব্যতিরেকে অার কেহই বিদ্রোহী মােগল পাড়েকে ধৃত করিবার চেষ্টা করিল না। মােগল পাড়ের শাণিত খঙ্গের আঘাতে ইংরাজ কর্মচারীদিগের শরীর দিয়া রক্তধারা বহিতে ছিল, এমত সময়ে শেখ পলটু দৌড়িয়া গিয়া বিদ্রোহী মােগল পড়েকে ধরিল। ইংরাজ কর্মচারীরা সেই অবসরে পলাইয়া প্রাণ রক্ষা করিলেন। এই ঘটনার পরে বারাকপুরের সেনানায়ক জেনেবল হিয়ার্স দুই পুত্র সমভিব্যাহারে অশ্বারােহণ পূর্বক ঐ স্থানে উপস্থিত দেখিলেন, মােগল পাড়ে উন্মত্ত প্রায় হইয়া বন্দুক হন্তে ভয়ঙ্কর ভাবে বেড়াইতেছে। এক জন কর্মচারী আসিয়া সেনাপতিকে উচ্চৈঃস্বরে কহিল, মােগল পাড়ের বন্দুক বারূদ পূর্ণ, আপনি সাবধান হইবেন। সেনাপতি ড্যাম দি মকেট”: এই উত্তর দিয়া বিদ্রোহীর অভি মুখে অশ্ব চালনা করিলেন এবং জমাদার ও সিসাইদিগকে সঙ্গে সঙ্গে আসিতে আদেশ দিলেন। সিপাইদের এরূপ অভিপ্রায় ছিল না, যে সেনাপতির আদেশ পালন করে, কিন্তু তাহারা তাহার ধমকে ভীত হইল ও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিতে লাগিল। সেনাপতি, হইয়া ০ ১৩৪ । লঘু চরিতমঞ্জরী। মােগল পাড়ের নিকটে উপস্থিত হইলে পর তঁাহার পুত্র জন হিয়ার্স কহিলেন, পিতঃ ঐ দেখুন, মােগল পাড়ে আপনাকে লক্ষ্য করি- তেছে। যাহারা সেনাপতির কাৰ্য্য গ্রহণ করেন, তাহাদের অন্তঃ- করণ প্রায় ভয়াভিভূত হয় না। হিয়াস উত্তর করিলেন, জন। যদি গুলি খাইয়া আমি প্রাণ হারাই, তবে তুমি আক্ৰমণ করিয়া বিদ্রো- হীর প্রাণ সংহার করিও। মােগল পাড়ে উন্মত্ত হইয়াছিল, সুতরাং তাহার আত্ম পর বিবেচনা ছিল না, সে সেনাপতির প্রতি বন্দুক প্রয়ােগ না করিয়া আপনার প্রতি প্রয়ােগ করিল ও ভূতলে পড়িয় রক্তাক্ত কলেবরে ধূলিতে লুঠিত হইতে লাগিল। অবিলম্বে ডাক্তর আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও ক্ষতস্থান পরীক্ষা করিয়া কহিলেন, ইহা মারাত্মক নহে, ইহাকে চিকিৎসালয়ে পাঠান আবশ্যক। মোগল পাড়ে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসালয়ে নীত হইল। সেনাপতিও অশ্বারােহণে সিপাইদের মধ্য দিয়া এই কথা বলিতে বলিতে চলিলেন, সিপাইগণ ণ! তােমাদের ভ্রান্তি জন্মিয়াছে, তোমাদিগকে খ্ৰীষ্টান করা গবর্ণমেন্টের অভিপ্রেত নহে। আমি তােমাদিগকে কর্তব্য কৰ্ম্ম সাধনে পরান্মুখ দেখিয়া দুঃখিত হইলাম। আততায়ীর প্রাণ সংহার করা তােমাদের অতীব কৰ্তব্য ছিল। সিপাইর কহিল, মােগল পাড়ে পাগল, সে ভাঙ খাইয়া বিহবল হইয়াছিল। সেনাপতি কহিলেন, যদি তাহাই হয়, তবে তােমরা কেন তাহাকে গুলি করিয়া পাগলা কুকুরের ন্যায় মারিলে না? ইহাতে সিপাইদের মধ্যে কেহ কেহ বলিল, মােগল পাড়ের বন্দুক বারূদপূর্ণ ছিল। সেনাপতি কহিলেন তোমরা বারূদ পূর্ণ বন্দুক ভয় কর ? ” সিপাইরা আর কোন কথা না বলিয়া চুপ করিয়া থাকিল। সেনাপতি অবজ্ঞা পূৰ্ব্বক তাহাদিগকে বিদায় দিয়া উদ্বিগ্নচিত্তে সন্ধ্যার সময়ে বাসস্থানে ফিরিয়া আসিলেন এবং এক্ষণে স্পষ্ট রূপে বুঝিতে পারিলেন, যে সিপাইরা কোম্পানির দাস বলিয়া পরিগণিত হইবার যােগ্য নহে।। নেবল হিয়াস বহরমপুরের বিদ্রোহীদিগকে বার , তা',দশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এক্ষণে সেই আদেশানুযায়ী কি ! পদচুত করি- লড ক্যানিঙ। । লইয়া অনন্তর বলিয়া । কাৰ্য্য করিবার সময় উপস্থিত হইল। কর্ণেল মিছাল বিদ্রোহী সিপাইদিগকে বারাকপুর পৌছিলেন ও রেঙ্গুন হইতে ইউ- রােপীয় সেনারা আসিয়াও উপস্থিত হইল।.. জৈনেরল হিয়াস কাল বিলম্ব না করিয়া বারাকপুরস্থিত, সমুদায় সিপাইদিগকে সমবেত হইতে আদেশ করিলেন। তদনুসারে সিপাইরা সমবেত হইল ও ইউ- রােপীয় সেনারা, বিদ্রোহী সিপাইদিগকে মধ্যবর্তী করিয়া চতুঃ পার্শে মণ্ডলাকারে দাড়াইল। হিয়ার্স বিদ্রোহীদিগের দণ্ডাজ্ঞা প্রচার করিলেন। বিদ্রোহীরা কোন কথা না শস্ত্র পরিত্যাগ করিল। তখন হিয়াস কৰুণস্বরে কহিতে লাগিলেন, যদিও গবর্ণমেন্ট তােমাদিগকে তােমাদিগকে ছাড়াইয়া দিলেন, কিন্তু তােমাদের পোশাক কাড়িয়া লইবেন ও তোমরা বহরমপুর হইতে আসিবার সময়ে পথে যে সদাচরণ, করিয়াছ, এবং তােমাদের অন্তঃকরণে বিদ্রোহ নিবন্ধন যে অনুতাপ উপ- স্থিত হইয়াছে, তাহার পুরস্কার স্বরূপ সরকারী ব্যয়ে তােমাদি - গকে বাটী পৌছিয়া দিবেন। সেনাপতির এই সানুগ্রহ বাক্য পদ- চ্যুত সিপাইদের অন্তঃকরণে এরূপ অঙ্কিত হইল, যে তাহাদের অনেকেই অনুতাপ করিয়া কহিল, চাণকের চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের উত্তেজনায় আমরা বিদ্রোহী হইয়াছিলাম। উহাদের মধ্যে এক ব্যক্তি কহিল, “ আমাদিগকে দশ মিনিটের নিমিত্ত অস্ত্র প্রদান করুন। আমরা সেই চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্ট দেখাইয়া দি।” যৎকালে পদচ্যুত সিপাইদের বেতন বণ্টন হয়, জেনের হিয়ার্স ঐ সমবেত সিপাইদিগকে সম্বােধন করিয়া বলেন, দেখ, তােমাদিগকে খ্রীষ্টান করা গবর্ণমেন্টের অভিপ্রেত নহে। তবে, খ্রীষ্টান করিবেন, বলিয়া . তােমরা যে আশঙ্কা করিতেছ, তাহ অমুলক। অতএব তােমরা সেই অমূলক আশঙ্কা পরিত্যাগ কর। বহরমপুরের , সিপাইরা ' অপরাধ করিয়াছিল, এই নিমিত্তই পদচ্যুত : হইল।. হিয়ার্স এইরূপ উপদেশ দিয়া - স্বস্থানাভিমুখে চলিলেন, পদচ্যুত সিপাইরাও জন্মভূমি অযােধ্যায় যাত্রা করিল। মধ্যে ..সময়ে লঘু চরিতমঞ্জরী। দিকে লর্ড ক্যানিঙ বহরমপুরের বিদ্রোহী সিপাইদিগকে পদচ্যুত । করিবার আদেশ করিয়া অবধি অতিশয় উৎকণ্ঠিত ছিলেন, পদচ্যুত করিবার সময়ে না জানি কি ঘটে, এই ভাবনায় তাহার অন্তঃকরণ আকুলিত হইয়াছিল। কিন্তু কোন গােলযোেগ ঘটে নাই, বিদ্রোহীরা শান্তভাবে অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে শুনিয়া এক্ষণে সুস্থির হইলেন ও সিপাইদের বিদ্রোহ আশঙ্কায় ভীত ইউরােপীয় অধিবাসীগণের উৎসাহ বর্ধনাৰ্থ অবিলম্বে ঐ সংবাদ সমুদায় নগর মধ্যে প্রচারিত করিলেন। লর্ড ক্যানিঙ এক্ষণে বারাকপুরের চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমে- ন্টের দোষের বিষয় বিবেচনা করিবার অবসর পাইলেন। মােগল পাড়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহী হইয়া ইংরাজকর্মচারিগণের উপরে ভয়- র অত্যাচার করে। লর্ড ক্যানিং লর্ড ক্যানিং তাহার প্রাণদণ্ডের আদেশ করিলেন। জমাদার ঈশ্বরী পাড়ে ঘটনা স্থলে উপস্থিত ছিল কিন্তু বিদ্রোহী মােগল পড়েকে গুলি করিবার অথবা ধরিবার চেষ্টা করে নাই, এই অপরাধে তাহাকেও ফাশী দিবার সঙ্কল্প করিলেন। ৮ই এপ্রিল বারাকপুরস্থিত সমুদায় সেনার সম্মুখে মােগল পাড়ের ফাশী হয়, কিন্তু জমাদারের ফাঁশী হওয়া উচিত কি না; এই বিষয় লইয়া তর্ক বিতর্ক উপস্থিত হওয়াতে ২২শে এপ্রেল পর্যন্ত তাহার প্রাণদণ্ডের আদেশ স্থগিত থাকে। তৎপরে ঐ দিবস বারাকপুরে সমুদায় সেনার সম্মুখে উহার ফাঁশী হয়। লর্ড ক্যানিং স্থির করিয়াছিলেন, বহরমপুরের সিপাইদের অপেক্ষা বারাকপুরের চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের সিপাইরা অধিকতর অপরাধী। এজন্য তিনি উক্ত রেজিমেন্ট শুদ্ধই পদচ্যুত করিবার আদেশ করিলেন। এই, আদেশ প্রচারিত হইবার পূৰ্ব্বে ভিন্ন ভিন্ন স্থান হইতে গবর্ণর। জৈনেরলের উদ্বেগের অনেক কারণ উপস্থিত হয়। লর্ড ক্যানি ও কিছুতেই হতাশ্বাস হইতেন না এবং তিনি এরূপ সাহসী ছিলেন, যে কখনই ভাবি বিপদকে গুরুতর বলিয়া ভাবিতেন না; অথবা বিষগ্র চিত্রে বর্তমান : দুরবস্থার বিষয়ও পৰ্যালোচনা করিতেন না। 7.

লড ক্যানিঙ। ১৩৭ ছিল। কিন্তু ক্রমে ইহা স্পষ্টই লক্ষিত হইল, জানুয়ারি মাসের শেষে যে ক্ষুদ্র মেঘ উদিত হয়, তাহা উত্তরােত্তর, গাঢ়তর হইয়া উঠি- তেছে। ইতি পূর্বেই হিমালয়ের সন্নিহিত দূরবর্তী কোন কোন স্থানে ঐ মেঘ হইতে বজ্রনিনাদ শ্রুতিগােচর হইয়াছিল এবং গ্রীষ্মের প্রারম্ভেই বিলক্ষণ অবধারিত হইল, হিমালয় অবধি কলি- কাতা পর্যন্ত সর্বত্রই ভয় সঞ্চার হইয়াছে এবং সকল স্থানের সৈনিকেরাই টোট। কাটার বিষয় লইয়া আন্দোলন করিতেছে। প্রধান সেনাপতি আনন কলিকাতা হইতে পাঁচ শত ক্রোশ দূরবর্তী অম্বালা নগরে অবস্থিতি করিতেন, সুতরাং ঐ স্থানই সেনাগণের প্রধান আড়া আঙ্গন ইতিপূর্বে এক বার কলিকাতায় আসিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি অল্পকাল পরেই অম্বালায় 'প্রত্যাগমন করেন। তিনি অম্বালায় প্রত্যাগমন প্রত্যাগমন করিয়া শীতল সমীরণ সেবনাৰ্থ দিল। পাহাড়ে যাইবার উদ্‌যোগ করিতে ছিলেন, এমত সময়ে সিপাইদিগকে লইয়া ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। নূতন প্রণালী অনুসারে রাইফেল বন্দুকের ব্যবহার শিখাই- বার নিমিত্ত অম্বালায় একটী বন্দুকাগার স্থাপিত হয়। ছত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের কতক গুলি সিপাই ঐ বন্দুকাগারে থাকিত। এক দিবস উহাদের দুই জন কর্মচারী তথাকার সেনানিবেশে (ক্যান্টনমেন্টে) কোন সুবেদার তাহাদিগকে কহেন, কহেন, তোমরা বন্দুকের কারখানায় কাজ কর, তােমাদের জাতি গিয়াছে, আর কেহই তোম- দের সঙ্গে আহার ব্যবহার করিবেন না। কর্মচারী এই মর্মভেদী বাক্য শ্রবণে অতিশয় ভীত হইল ও বন্দুকের কারখানায় আসিয়া অপূর্ণ নয়নে লৈপ্টনেন্ট মার্টিনােকে কহিল, আমরা এই বন্দুকের কারখানায় কর্ম করাতে জাতিভ্রষ্ট হইয়াছি, দেশীয় লােকেরা আর , আমাদের সঙ্গে আহার ব্যবহার, করিবেন না। মাটিনো অবিলম্বে এই বিষয়টা প্রধান সেনাপতির গোচর করেন। পর দিবস সেনা- কারখানায় যাইয়া দিপাইদিগকে একত্র একত্র হইতে আদেশ দেন। তদনুসারে সিপাইরা কাওয়াজ দিবার স্থানে শ্রেণী- পতি বন্দুকের লঘু চরিতমঞ্জরী। বন্ধ হইয়া দাড়াইলে আন্সন তাহাদিগকে কহিলেন, তােমরা ধৰ্ম্মলােপের আশঙ্কা করিয়া কেন ভীত হইতেছ, গবর্ণমেন্ট কখনই তোমাদের ধর্মসংস্কারের বিরুদ্ধে কাৰ্য্য করেন নাই ও করিবেন না অতএব তােমরা ঐ অমূলক আশঙ্কা পরিত্যাগ কর। প্রধান সেনা- পতি এই রূপে সিপাইদিগকে বুঝাইয়া চলিয়া যাইবার পরে উহারা মার্টনোর নিকটে আসিয়া কহিল, এক্ষণে টোটা কাটিতে আমাদের কোন আপত্তি নাই, কিন্তু আমাদের দেশের সহস্র সহস্র লােক ধৰ্ম লোপ ভয়ে উহাতে আপত্তি করিতেছে। অতএব টোটা কাটিলে আমাদের শেষ দশা কি হইবে, এই ভাবিয়া আমরা আকুল হইয়াছি। দেশীয় লােকেরা আমাদের সঙ্গে আহার ব্যবহার করিবেন না, বন্ধু এবং পরিবার বর্গ আমাদিগকে পরিত্যাগ করিবেন। অত- এব প্রার্থনা এই, বড় সাহেব আমাদের সেই ভাবী বিপদ নিবারণের কোন প্রকার উপায় করিয়া দেন। মাটিনাে অঙ্গীকার করিলেন, আমি হা প্রধান সেনাপতিকে জানাইব। তিনি তদনুসারে পত্রের দ্বারা উহ! আলনের গােচর করেন। আঙ্গন এক্ষণে দেখিলেন, সিপাই- দের তান্তঃকরণে যে ভয় জন্মিয়াছে, তাহা সহজে অপনীত হইবার নহে। তিনি একবার মনে করিলেন, এখানে সম্প্রতি নূতন প্রণালী অনুসারে যুদ্ধ বিদ্যা শিখাইবার যে বাবস্থা প্রচলিত হইয়াছে, গ্রীষ্ম- " র ছ ল করিয়া তাহা এ বৎসর রহিত করা যাউক। কিন্তু ন কিঞ্চিৎ বিবেচনা করিয়া পরে স্থির করিলেন, এরূপ করিলে কে বল। ভীরু তা প্রকাশ পাইবে। তদনুসারে তিনি এই আদেশ দিরার সঙ্কল্প করেন, যে উল্লিখিত শিক্ষাকাৰ্য্য যথাবিধানে চলিতে ‘ক, কেবল যাবৎ মিরাট হইতে টোটা কাটার বিষয়ে বিশেষ স? বাদ না আইসে, তাবৎ সিপাইদের বন্দুক ছুড়িতে শিক্ষা দেওয়া স্থগিত রাখা যাউক। প্রধান সেনাপতি অবিলম্বে ঐ সঙ্কল্প লর্ড ক্যানি- ঙের গোচর করলেন। কিন্তু ক্যানিঙ তার অভিপ্রায় অনুমােদন করিলেন না। তিনি অনকে পত্র লিখিলেন, বন্দুক ছুড়িতে শিক্ষা দেওয়া বন্ধ করা হইবেক না। তাহা করিলে সিপাইরা নিশ্চয় মনে লড’ ক্যানিঙ। • করিবে, গবর্ণমেন্টর দুরভিসন্ধি ছিল। সুতরাং উহাদের অমূলক আশঙ্কা নিরকৃত না হইয়া বরং বর্ধিতই হইতে পারে। সেনাপতি আন কিছুকাল অবধি অসুস্থ হইয়া- ছিলেন, তিনি গবর্ণর জেনেলের ঐ পত্র প্রাপ্ত হইবার পূর্কে বিশুদ্ধ বায়ু সেবনাৰ্থ সিল। পাহাড়ে যাত্রা করেন ও তথায় পৌছিয়। লর্ড ক্যানিঙকে লেখেন, এস্থান । অতিশয় রমণীর । এক্ষণে এখানকার জলবায়ু ও সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য কর। আমি অন্তরের সহিত বাসনা করি, সে আপনি এখানে আসিয়া কিছুকাল বিশ্রাম সুখ অনুভব করেন। কি এই সময়, হৈমালয়িক আনন্দ উপভােগ করিবার পক্ষে যে অনু- কূল ছিল না, অঙ্গন তাহা তখন পর্যন্ত বুঝিতে পারেন নাই। ইহার কিছু দিন পরে অম্বালায় গৃহদাহ হইতে আরম্ভ হয় ও নিরাট হইতে সংবাদ আইসে, যে তথায় অশ্বারোহী সেনারা বি- দ্রোহী হইয়াছে। ২৪শে এপ্রিল কাওয়াজের সময় নববুই জন নিপই উপস্থিত ছিল, তাহাদের মধ্যে পাঁচ জন মাত্র টোটা লইল, অবশিষ্ট নিপাইর টোট। স্পর্শও করিল না। সেনাপতি কর্ণেল স্মিথ উহাদিগকে বিস্তর বুঝাইলেন, কিন্তু অকৃতকার্য হইয়া পরি- শেষে উহাদিগকে সাংগ্রামিক বিচারালয়ে পাঠাইয়াছেন। এই সকল ঘটনা হওয়াতে লর্ড ক্যানিঙের প্রতীতি হইল, সিপাইদের অন্ত:- করণ ধৰ্ম্মলােপের আশঙ্কা বদ্ধমূল হইয়াছে, উহা সহজে অপনীত হইবার নহে এবং তিনি অল্পকাল মধ্যে জানিতে পারিলেন, কেবল সিপাইরা নহে, পশ্চিম প্রাদশীয় লােকেরাও ধৰ্ম্মলােপের অাশঙ্কা করিতেছে । ক্যানিঙ যদি ও সকল সময় সুস্থির ও প্রফুল ভাব রক্ষা করিয়াছিলেন, কিন্তু ক্রমশঃ তাবৎ লোকেই সন্দিহান ও অস্থির হইতেছে শুনিয়া তাহার অন্তঃকরণ বিশেষরূপে উদ্বিগ্ন, হইয়া উঠিল। উত্তরপশ্চিম প্রদেশীয় লােকের অন্তঃকরণে সঞ্চার হয়, এপ্রল মাসের ঘটনা দ্বারা তাহা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন হইয়াছিল। উল্লিখিত মাসের প্রারম্ভে কানপুরে আটা দুৰ্ম্ম শ্য হয়। মিরাটের ১৪ ০ লঘু চরিতমঞ্জরী। কতকগুলি মহাজন গবর্ণমেন্টের বােট ভাড়া করিয়া, কানপুরে আটা আমদানি করে এবং তথাকার বাজারে অল্পমূল্যে বিক্রয় করিবার প্রস্তাব করে। ইহাতে কানপুরে এই জনরব উঠিল, ইংরাজের। সকলকে খ্ৰীষ্টান করিবার অভিপ্রায়ে আটায় গোঅস্থি চূর্ণ মিশ্রিত করিয়া বিক্রয়ার্থ পাঠাইয়াছেন। এই জনরব হওয়াতে আটা বিক্রয় বন্ধ হইয়া গেল। কি সিপাই, কি অন্য লােক, কেহই উহা স্পর্শও করিল না। যাহারা আহার করিতে বসিয়াছিল, তাহারা পৰ্যন্ত রুটি ফেলিয়া দিল এবং আপনাদিগকে অপবিত্র স্থির করিল। কেহ কেহ বলেন, কানপুরের মহাজনেরা স্বার্থ সিদ্ধির ব্যাঘাত দেখিয়া ঐরূপ জনরব তুলিয়া দেন। অন্যেরা কহেন, ঐ জনরব বিপক্ষবর্গের চাতুরী। বিপক্ষে রা গবর্ণমেন্টের প্রতি সাধারণের অন্তঃকরণ বিরূপ করিবার মানসে ঐরূপ করিয়াছিলেন। আমরা এই দুইটা কারণের কোটি সত্য, তাহা নিঃসংশয়ে বলিতে পারি । কিন্তু ঐ নরবের যে কোন কারণ হউক না কেন, উহা দ্বারা উত্তর পশ্চিম প্রদেশীয় লােকের অন্তঃকরণে এই বিশ্বাস জন্মে, যে গবর্নমেন্ট কৌশলে সকলকে অভক্ষ্য ভক্ষণ করাইয়া জাতিভ্রষ্ট করিতে উদ্যত হইয়াছেন। এক্ষণে লর্ড ক্যানিঙের অন্তঃকরণে পূৰ্ব্বাপেক্ষ। দৃঢ়তর প্রতীতি হইল, বৃটিশ গবর্ণমেন্টের প্রতি সর্বসাধারণের বিদ্বেষ বুদ্ধি জন্মিলে অনিষ্ট ঘটিবার সম্ভাবনা, উক্ত প্রকার ভয়সঞ্চার তাহা অপেক্ষা অধিক ( অনিষ্টকর। লর্ড ক্যানিঙ মনে মনে এই রূপ আন্দোলন করিতেছিলেন, সময়ে শুনিতে পাইলেন, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে একজন দূত এক খানি চাপাটী' লইয়া সন্নিহিত গ্রামে যাইতেছে এবং ঐ গ্রামের প্রধান ব্যক্তিকে উহা দিয়া কহি- তেছে, মহাশয়। এই চাপাটী পরবর্তী গ্রামে প্রেরণ করুন। প্রধান ব্যক্তিও কোন কথা না বলিয়া উহা পরবর্তী গ্রামে পাঠাই- তেছেন। এই রূপে চাপাটা এক এম হইতে অন্য গ্রামে প্রেরিত * এক প্রকার রুটী। যতদূর অনিষ্ট এমত করুন। ঐ লর্ড ক্যানিঙ। ১৪১ হইতেছে। কি গবর্নর জেনেরল, কি তাহার অভিজ্ঞ কর্মচারিগণ কে হই এই আশ্চৰ্য্য সংবাদের মৰ্ম্মোদ্ভেদে সমর্থ হইলেন না। কেহ কহিলেন, উহার মধ্যে ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত পত্র আছে। কেহ বলিলেন, একটা যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড উপস্থিত হইবে, তদ্বিষয়ে সকলকে সতর্ক করাই উক্ত প্রকারে চাপাটী পাঠাইবার উদ্দেশ্য। এইরূপে অনেকে অনেক প্রকার বলিতে লাগিলেন, কিন্তু ঐ রহস্যের প্রকৃত মৰ্ম্ম কি ; তাহা নিঃসংশয়ে নির্ণীত হইল না। গবর্নর জেনেরল লর্ড ক্যানিঙের এই একটী স্কুল বিশ্বাস ছিল, দুষ্ট লোকেরা গবর্ণমেন্টের নিপাত- সাধন জন্য দূত প্রেরণ করিতেছে। তিনি পূৰ্বাবধি পদচ্যুত অযে- ধ্যাধিপতির মন্ত্রীদিগকে চক্রান্তকারী বলিয়া সন্দেহ করিতেন এবং এক্ষণেও তাহাদের ব্যতিরেকে আর কাহার উপর বিশেষ সন্দেহ করিলেন না। কিন্তু এই সময়ে নানাসাহেব যেরূপ ব্যস্ত হইয়া বেড়াইতেছিলেন, তাহাতে তাহাকেও চক্রান্তকারী বলিয়া সন্দেহ করা রাজপুরুষদিগের কর্তব্য ছিল। নানাসাহেব বিথুর নগর হইতে প্রায় বাহির হইতেন না, কিন্তু তিনি সেই এপ্রেল মাসের ভয়ঙ্কর গ্রীষ্মের সময়ে এক মাসের মধ্যে কানপুর, দিল্লী ও লক্ষ্ণৌ পরিভ্রমণ করেন। এই শেষােক্ত নগরে তাহার সহিত কমিস্যনর সর হেরি লরেন্সের সাক্ষাৎ হয়। লরেন্স তাহারে সমাদরে পরিগ্রহ করিয়া তাহার আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। নানাসাহেব উত্তর দেন, নগর দেখিতে আসিয়াছি। লর্ড ডেলহৌসী নানাসাহেবের প্রতি যে অসদ্ব্যবহার করিয়াছিলেন, নানা সাহেবের অন্তঃকরণে তাহা প্ৰস্তরে খােদিত প্রস্তরে খােদিত রেখার ন্যায় অঙ্কিত ছিল, তিনি নিরন্তর কোম্পানির উচ্ছেদের মন্ত্রণা করিতেছিলেন । কিন্তু ইংরাজেরা তাহা বুঝিতে পারিলেন না। তাহারা নানাসাহে- বকে সহসা চতুর্দিক পরিভ্রমণ করিতে দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু কেহই তঁাহাকে চক্রান্তকারী বলিয়া সন্দেহ করেন নাই। তাহারা নানাসাহেবের বাহ, ব্যবহার দেখিয়া অনুমান করিয়াছিলেন, যে তিনি পৈতৃক মান সম্রম নাশের শােক এক প্রকার বিস্মৃত হইয়া- ১৪২ লবু চরিতমঞ্জরী। ছেন। সে যাহা হউক, নানা সাহেব কতিপয় দিবস লক্ষে ছিলেন। অনন্তর জেরেলের নিকট হইতে বিদায় না লইয়াই লক্ষ্ণৌ পরিত্যাগ করেন। এইরূপে এপ্রেল মাস অতীত হয়। (মে মাসের প্রারম্ভে অনেক সুলক্ষণ সুলক্ষণ দৃষ্ট হইল। বারপুরের সিপাইরা শান্তভাবে আপনাদের কর্তব্য কৰ্ম্ম করিতে লাগিল, দম- দমায় কোন গােলযােগ ছিল না, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে ও সিপাইর। শান্তভাবে যুদ্ধবিদ্যার অনুশীলন আরম্ভ করিল, মিরাট হইতেও আর কোন নুতন গােলযােগের সংবাদ আসিল না। লর্ড ক্যাঙি বিবেচনা করিলেন, বুঝি জগদীশ্বরের প্রসাদে সিপাইদের মনাে- মালিন্য দূরীকৃত হইল। গবর্ণর জেনেরল যদিও এই সময়ে প্রফুল্লচিত্ত হইলেন, কিন্তু তাহার উদ্বেগের আর একটা প্রধান কারণ ছিল। বারাকপুরে চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্ট তখন পর্যন্ত দণ্ডাজ্ঞা প্রতীক্ষা করিতে- ছিল। ৬ই মে জেনেবল হিয়ার্স ও প্রধান সেনাপতি অনির পরামর্শানুসারে গবর্ণর জেনের উক্ত রেজিমেন্টকে পদচ্যুত করেন। ইতিপূৰ্বে বহরমপুরের উনিশ সংখ্যক রেজিমেন্টকে পদচ্যুত করিবার সময়ে গবর্ণমেণ্ট তাহাদের পরিচ্ছদ অপহরণ করেন নাই, কিন্তু এই চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের প্রতি সেরূপ অনুগ্ৰহ করিলেন না। উহাদের পরিচ্ছদ কাড়িয়া লইলেন ও উহারা সক্রোধ চিত্তে জন্মভূ মি অযােধ্যার অভিমুখে যাত্রা করিল। ইতিপূর্বে উনিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের সিপাইর পদচুত হইয়া অযোধ্যায় প্রস্থান করে, এক্ষণে চৌত্রিশ সংখ্যক রেজিমেন্টের সিপা- ইরাও পদচ্যুত হইয়া তথায় প্রস্থান করিল। এই সময়ে লর্ড ক্যানি- ঙের অন্তঃকরণ বঙ্গসেনার জন্মভূমি ও নুতন যোজিত প্ৰদেশ অযাে- প্রতিই পাবিত হইল। কমিশ্যনর লর্ড ক্যানি কে যে সকল পত্র লেখেন, তাহাতে নানাসাহেবের লক্ষ্ণৌ গমন সম্বন্ধে কোন কথাই উল্লিখিত ছিল না, কিন্তু এরূপ অনেক বিষয় লিখিত হইছিল, সে তাহাতে গবর্নর জেনের উৎকণ্ঠাকুল হইলেন। লরেন্স, লর্ড লর্ড ক্যানিং। ১৪৩ নাই । কমিশ্যনর লরেন্স লক্ষে নগরে ৪৮ সংখ্যক রেজিমেন্ট ছিল। যদিও ঐ রেজি- মেন্টের সিপাইরা এতাবৎ কাল কোন প্রকার বিদ্রোহচিহ্ন, প্রকাশ তথাপি সুবিচক্ষণ তাহাদের আচরণের বিষয় সন্দিহান হন ও তাহাদিগকে স্থানান্তরিত করি- বার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। লর্ড ক্যানিঙ তঁাহার অভিপ্রায় অনু- মােদন করিয়া লেখেন, আপনি ৪৮ সংখ্যক রেজিমেন্টকে মিরাটে পাঠাইয়া দিবেন, এ বিষয়ে প্রধান সেনাপতির অনুমতির অপেক্ষা করবেন না। লরেন্স কিছুকাল অবধি সিপাইদের অবস্থার বিষয় প্রগাঢ় রূপে চিন্তা করিতেছিলেন, তিনি লর্ড ক্যানিঙের ঐ উত্তর প্রাপ্তির পূৰ্ব্বে পুনরায় তাঁহাকে লিখিলেন, আমি এখানকার অপরাপর রেজি- মেন্টের ভাব গতিক ও ভাল দেখি না, অতএব ৪৮ সংখ্যক রেজিমে- স্টকে স্থানান্তরিত করিলেই যে অযােধ্যার মঙ্গল হইবে, এমত বােধ হয় না। প্রত্যুত উহারা যে স্থানে যাইবে, তথাকার সিপাইদের অন্তঃকরণেও অসন্তোষ ভাব সঞ্চারিত করিয়া দিবে। ইহার অল্পদিন পরেই অবােধ্যার অপরাপর রেজিমেন্টের অসন্তোষ ভাব স্পষ্টরূপে দৃষ্ট হইতে লাগিল। ৭ 3ংখ্যক রেজিমেন্টের সিপাইরা ৪৮ সংখ্যক রেজিমেন্টের সিপাইদিগকে একখানি পত্র লিখে । উহার মর্ম এই, আমরা যে কোন রূপে হউক, টোট। কাটার বিষয়ে আপত্তি করিতে প্রস্তুত আছি। সংখ্যক রেজিমেন্টের একজন ব্রাহ্মণ সিপাই ঐ পত্র প্রাপ্ত হন। তিনি প্রথমতঃ হাবেলদারকে বলেন, হবে- লদার সুবেদারকে কহেন। অনন্তর তাহারা তিন জনে মিলিয়া পত্ৰ খানি কমিশ্যনর লরেন্সের হস্তে দেন। লরেন্স ইতিমধ্যে সংবাদ পাইয়াছিলেন, ৭ সংখ্যক রেজিমেন্ট বিদ্রোহী হইয়াছে। ঐ রেজিমেন্টের চারিজন সিপাই সাংগ্রমিক কৰ্ম্মচারী লেপ্টনেন্ট মিকামের গৃহে প্রবেশ করিয়া তাহাকে বলে, তুমি মরিতে প্রস্তুত হও, তােমার উপরে আমরা কুপিত হইয়াছি এমত নহে, তবে তুমি ফিরিঙ্গি, এই নিমিত্ত তােমাকে অবশ্যই মরিতে হইবে। মি কাম সে যাত্রায় কেবল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বলেই মৃত্যুর ৪৮ ১৪৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। হস্ত হইতে পরিত্রাণ পান। তিনি সিপাইদের ঐ ভয়ঙ্কর বাক্য শুনি- বামাত্র এই উত্তর দিলেন, আমি এক্ষণে নিরস্ত্র রহিয়াছি, তােমরা ইচ্ছা করিলে অনায়াসেই আমার প্রাণ সংহার করিতে পার । কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করি, আমাকে হত্যা করিয়া তােমাদের কি ফল লাভ হইবে, তােমরা বিদ্রোহী হইয়া কখনই জয়ী হইতে পারিবে না। আমার নিধনের পরে আর এক ব্যক্তি আমার পদে নিযুক্ত হইবেন ও তােমাদিগকে শাসনে রাখিবেন। মিকমি এই কথাগুলি এরূপ দৃঢ়তা ও সাহসিকতা পূৰ্ব্বক বলিয়াছিলেন, যে তাহতে সিপাইদের অন্তঃকরণে ভয় সঞ্চার হইল ও উহার কোন কথা না। বলিয়া তথা হইতে চলিয়া গেল। লরেন্স এই সংবাদ পাইবামাত্র ইউ- রােপীয় সেনা সঙ্গে লইয়া বিদ্রোহী রেজিমেন্টের সম্মুখবর্তী হই- লেন। কামানগুলি ও বিদ্রোহীদের অভিমুখে স্থাপিত হইল। ইহাতে বিদ্রোহীরা মনে করিল, বুঝি আমাদের উপরে গােলাবর্ষণ আরম্ভ হয়। এই ভয়ে তাহার পলাইতে লাগিল। ইউরােপীয় অশ্বারােহী সেনারা তাহাদের অনুসরণ করিল। হেনরি লরেন্স ও অশ্বপরিচা- লন পূৰ্ব্বক পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। পলায়িতের উচ্চৈঃস্বরে “কোম্পানি বাহাদু রকে। জয়, কোম্পানি বাহাদুর কো জয়” এই কথা বারম্বার বলিতে লাগিল। হেরি লরেন্স তাহাদের অস্ত্র শস্ত্র কাড়িয়া লইতে আদেশ করিলেন। পলায়িতো কোন আপত্তি না করিয়া তাহার আদেশ পালন করিল। লরেন্স বিদ্রোহী পণ্টনের অস্ত্র শস্ত্র কাড়িয়া লইলেন বটে, কিন্তু তৎপরে কি কর্তব্য, জানিবার নিমিত্ত লর্ড ক্যানিঙের আদেশ প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। লরেন্স এইরূপে যেমন বিদ্রোহী সিপাইদের দণ্ডবিধান করিলেন, তেমনি আবার প্রভুভক্ত সিপাইদিগকেও পুরস্কার দিলেন। যে তিন ব্যক্তি বিদ্রোহঘটিত পত্ৰ আনিয়া দিয়াছিল, তাহাদের সম্মা- নর্থ তাহার গৃহের সম্মুখবর্তী প্রান্তরে একটী সভা হয়। লরেন্স সেই সভায় একটা বক্তৃতা করেন। ধর্মবিষয়ে হস্তক্ষেপ করা গবর্ণমেন্টের অভিপ্রায় নহে, ইহাই ঐ বক্ত তার উদ্দেশ্য ছিল।

লর্ড ক্যানিঙ। • ১৪৫ যায়। হেনরি লরেন্স লরেন্স এত কাণ্ড করিয়াও অভীষ্টফললাভ করিতে পারি- লেন না। ৭ই মে ৪৮ সংখ্যক রেজিমেন্টের আবাসগৃহ দগ্ধ হইয়া যে সুবেদার বিদ্রোহঘটিত পত্রখানি কমিশ্যনরকে দিয়াছিল, প্রথমতঃ তাহার গৃহেই আগুন লাগে। লরেন্স পর দিবস প্রাতঃকালে ঐ স্থানে উপস্থিত হন, কিন্তু কোন ব্যক্তি গৃহদাহ করিয়াছে তাহা জানিতে পারিলেন না। তিনি দেখিলেন, সম্পত্তি বিনষ্ট হওয়াতে সিপাইরা অতিশয় দুঃখিত হইয়া অধােবদনে চিন্তা করিতেছে। এই অযােধ্যার সিপাইদের মনের ভাব যে কিরূপ দোলায়মান হইয়াছিল, তাহা নির্ণয় করিবার নিমিত্ত হেরি লরেন্সই সর্বাপেক্ষ। সমধিক উপযুক্ত ছিলেন। লরেন্সের এই একটা বিশেষ গুণ ছিল, যে তিনি লোকের অন্তঃকরণে বিশ্বাস জন্মাইয়া দিতে পারিতেন। তাঁহার নিকটে কাহার যাইবার প্রতিষেধ ছিল না, তিনি সকলের সহিত কথাবার্তা কহিতেন ও সকলেই অসঙ্কুচিত চিত্তে তাহাকে মনের কথা ভাঙ্গিয়া বলিত। লরেন্স অনেক অনুসন্ধানের পর এই সিদ্ধান্ত করেন, সিপাইদের অন্তঃকরণে ৰুে ধৰ্ম্ম লােপের আশঙ্কা জন্মিয়াছে, কেবল বসামিশ্ৰিত টোটার উপাখ্যানটাই উহার একমাত্র কারণ। লরেন্স ৯ই মে লক্ষ্ণৌ হইতে লড ক্যানিঙকে লেখেন, আমি এখানে এক জন জমাদারের সহিত এক ঘণ্টারও অধিক কাল কথোপকথন করিলাম। তাহার জিদ দেখিয়া আমার বিস্ময় জন্মি- ঝাছে। জমাদার জাতিতে বাহ্মণ, তাহার বয়ঃক্রম চল্লিশ বৎসর। সে কহে, আমার অন্তঃকরণে এই বিশ্বাস জন্মিয়াছে, যে দশ বৎসর অবধি ইংরাজের ভারতবর্ষীয়দিগকে খ্রীষ্টান করিবার চেষ্টা পাইতে- ছেন। যে ইংরাজৈরা চাতুরী করিয়া ভরতপুর ও লাহাের অধিকার করেন, তাহারা যে, আটায় গােঅস্থি চূর্ণ মিশ্রিত করিবেন, ইহা অসম্ভব নহে। আমি বলিলাম, ইংরাজ জাতির বল বীর্যের বিষয় কুসিয় যুদ্ধে প্রকাশ আছে। এক বৎসরের মধ্যে তাহাদের সেনা চতুগুণ বৃদ্ধি হয়। তাহারা এই হিন্দুস্থানেও যত সেনা আবশ্যক, ছয় মাসের মধ্যে ইংলণ্ড হইতে আনিতে পারেন। জমাদার বলিল ১১ ১৪৬ • লঘু চরিতমঞ্জরী। ই। আমি জানি, আপনাদের অনেক লােক ও অনেক অর্থ আছে কিন্তু ইউরােপীয় সেনাগণকে আনয়ন করা বহু ব্যয় সাধা, এই নিমি- ওই আপনারা হিন্দুদিগকে সমুদ্রে লইয়া পৃথিবী জয় করিবার অভি- লাষ করিয়াছেন। আমি বলিলাম, সিপাইরা স্থল যুদ্ধে ভাল বটে কিন্তু সামান্য আহার নিবন্ধন জল যুদ্ধে একান্ত অপারক। জমাদার কহিল, এই নিমিত্তইতো আপনারা আমাদিগকে যাহা ইচ্ছা, খাওয়া- ইয়া বলবান্ করিবার ও সর্বত্র লইয়া যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছেন। আমি উত্তর দিলাম, নির্বোধ ও বিশ্বাসঘাতকেরা এরূপ বলিয়া থাকে, সচ্চরিত্র ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা এরূপ বিবেচনা করেন না। জমা- দার কহিল, সিপাইরা মেষের ন্যায়। প্রধান ব্যক্তি যে দিকে যায়, আর সকলেই তাহার অনুসরণ করে। আমি জমাদারের এই সকল কথা শুনিয়া মনে মনে ভাবিলাম, এ ব্রাহ্মণের মন বিলক্ষণ সতেজ আছে, এ বিংশতি বৎসর পর্যন্ত আমাদের চাকরি করিতেছে, আমাদের সামর্থ্য ও দৌৰ্ব্বল্যের বিষয় বিলক্ষণ অবগত আছে এবং আমাদি- গকে অন্তরের সহিত ঘৃণা করে। অতএব এরূপ ব্যক্তি অতিশয় ভয়ঙ্কর। অনন্তর আমি কহিলাম, ১৮৪৬ খ্রীঃ অব্দে কাবুলে আমাদের সৈন্য কর্তৃক এতদ্দেশীয় দেড় শত সন্তান পরিত্যক্ত হয়। আমি তাহা দিগকে যত্ন পূৰ্ব্বক বন্ধু বান্ধবগণের নিকটে পৌঁছিয়া দি। যদি খ্রীষ্টান করা আমাদের উদ্দেশ্য থাকিত, তবে তাহাদিগকে অনায়াসে খ্রীষ্টান করিতে পারিতাম। জমাদার উত্তর দিল, হুঁ মহাশয়! আমার বিলক্ষণ স্মরণ হয়। আমি তৎকালে লাহােরে ছিলাম। কিন্তু আপ- নার দুর্ভিক্ষের সময়ে ক্রীত সন্তানদিগকে খ্রীষ্টান করিয়া থাকেন। হেরি যে দিবস জমাদারের সহিত' এইরূপ কথােপ- কথনের বিষয় কলিকাতায় লড’ ক্যানিঙের গােচর করেন, সেই দিবস আগ রায় লেপ্টন্টে গবর্ণর কলভিনকেও লিখিয়া পাঠান ও তাহাকে উত্তর পশ্চিম প্রদেশের দুর্গ সুরক্ষিত রাখিতে ইঙ্গিত করেন। কিন্তু তাহার পত্র পেঁছিতে বিলম্ব হয় ; সুতরাং বিপদের অসমতা নিব। ঋন শে উ:গ করিয়া রাখা আবশ্যক, তাহার বিছুই হয় নাই। লরেন্স লড ক্যানিঙ। ১৪৭ ১৮৫৭ খ্রীঃ খ্ৰীঃ অব্দের ১০ই মে নিরটে সিপাইরা• প্রকাশ্য রূপে বিদ্রোহী হয় ও ইউরােপীয়দিগকে হত্যা করে। উত্তর পশ্চিম প্রদেশ শের তদানীন্তন লেপ্টনেন্ট গবর্ণর কলভিন আগরায় থাকিতেন, তিনি এই সংবাদ পাইবামাত্র টালিগ্রাফ, যোগে কলিকাতায় মঞ্জ ক্যানিঙের গােচর করেন। কিন্তু ঐ সংবাদটা যথানিয়মে ‘হর কর্ণ গোচর হয় নাই। আগর বাসিনী কোন ইউরােপীয় নারী বন্ধু- গণের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে মিরাটে যাইবার উদ্যোগ করিতেছিলেন, এমত সময়ে তাহার ভাগিনেয়ী মিরাট হইতে টালি- গ্রাফ করেন, এখানে অশ্বারােহী সেনারা বিদ্রোহী হইয়াছে। তাহার কি স্ত্রী, কি পুরুষ, ফিরিঙ্গি দেখিবামাত্র হত্যা করিতেছে। অতএব আমি সাবধান করিয়া দিতেছি, তুমি এক্ষণে এখানে আইস না। মিরাট হইতে টালিগ্রাফ যোগে এই শেষ সংবাদ প্রেরিত হয়। রাজপুরুষে রা বার্তা প্রেরণ করিবার পূর্বেই বিদ্রোহীরা তাড়িত- বার্তাবহের তার কাটিয়া ফেলে । এইরূপে মিরাটের বিদ্রোহ সংবাদটী প্রথমত: আগরা তদনন্তর কলিকাতায় পৌছে। গবর্নর জেনেবল ও তাহার কো- ন্সেলের মেম্বরের। উহার যথার্থ বিষয়ে সন্দিহান হইলেন। কোন্সেলের অন্যতম মেম্বর ডোরিন বলিলেন, ভরসা করি, মিরাটের বিদ্রোহ সংবাদটী যেন মিথ্যা হয়। কিন্তু কার্যে উহা সত্য হইয়া উঠিল এবং তথায় যে ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটে, দুর্ঘটনা ঘটে, ঐ সংবাদটা তাহার কিয়দংশ মাত্র। তাড়িতবার্তাবহ নিরন্তর উত্তর হইতে দক্ষিণে ও দক্ষিণ হইতে উত্তরে এই বার্তা বহন করিতেছিল, যে মিরাটে সিপাইরা বিদ্রোহী হইয়াছে, সুতরাং অবিলম্বেই কোন্সেল সভার সন্দেহ দূরীকৃত হইল। ইহার পরেই সংবাদ আসিল, বিদ্রোহীরা মিরাট ও দিল্লীর মধ্যবর্তী পথের কিয়দংশ অধিকার করিয়াছে। প্রকাশ পাইল, মিরাটের বিদ্রোহীরা দিল্লীতে গিয়াছে এবং দিল্লীর সিপাইরা তাহাদের সঙ্গে যােগ দিয়াছে। লেপ্টনেন্ট গবর্ণর ১৪ই মে আগরা হইতে লেখেন, আমি দিল্লীর বাদশাহের ১৪৮ লঘু চরিতমঞ্জরী। হইয়াছে, একখানি পত পাইলাম, তাহাতে তিনি বলেন, সিপাইরা বিদ্রোহী হইয়া দিল্লী নগর ও দুর্গ অধিকার করিয়াছে এবং আমিও তাহাদের হস্তে পড়িয়াছি। কমিশ্যনর ফেজর ও অপরাপর অনেক ইংরাজ- ভদ্রসন্তান নিহত হইয়াছেন। পরিশেষে বিদিত হইল, বাদশা বিদ্রোহের সহায়তা করিতেছেন, পুরাতন মােগল পতাকা পুনরায় উত্তোলিত নগর পথে বিদ্রোহীরা ইংরাজজাতীয় কি স্ত্রী, কি পুরুষ দেখিবামাত্রই হত্যা করিতেছে, বাদশা ভারতবর্ষীয় রাজগণ ও সর্বসাধারণকে সম্বােধন করিয়া একটী ঘােষণা প্রচার করিয়াছেন। এস্থলে সংক্ষেপে উহার সারার্থ সঙ্কলিত হইল। বাদশা সমুদায় রাজা ও সর্ব সাধারণকে জ্ঞাত করিতেছেন, যে ইংরাজের। ধৰ্মনাশক। তাহারা পূর্বে বাইবেল বিতরণ করিতেন, এক্ষণে বিধবা বিবাহ দিতে আরম্ভ করিয়াছেন। সহমরণ উঠাইয়া দিয়াছেন ।* চিনি ও চিনি ও ময়দায় গাে অস্থি চূর্ণ মিশ্রিত করিয়াছেন। নাগপুরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া দেখুন, দত্তক পুত্র আর বিষয়াধি- কারী হয় না। অতএব ইংরাজের। আর কিছু কাল থাকিলে ভারত- বর্ষীয় ধর্মের একবারেই মূলােচ্ছেদ হইবে। গােবধ হিন্দুদের মতে অতিশয় নিষিদ্ধ, কিন্তু আমি বলিতেছি, যদি হিন্দুরা সেই সাধারণ শত্রু ইংরাজদের উচ্ছেদের বিষয়ে সাহায্য দেন, তবে আমি সমুদায় মুসলমান নবাবদিগকে এইরূপ অঙ্গীকারে বদ্ধ করিতে পারি, যে তঁাহারা গােহত্যা উঠাইয়া দিবেন ও যে সকল মুসলমান গােমাংস খাইবে, তাহাদিগকে শূকর খাদক বলিয়া ঘৃণা করা যাইবে। ইংরাজের। হিন্দুদের সান্ত্বনার জন্য গােবধ উঠাইবার কথা বলিতে পারেন, কিন্তু তাহারা প্রবঞ্চকের শিরােমণি, তাহাদের কথা কেবল কথামা, ইষ্ট সিদ্ধি হইলে তাহারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া থাকেন। হিন্দুস্থানের আবাল বৃদ্ধ বনিঙা সকলেই উহা অবগত আছেন। আমি হিন্দুদের *১৮৩০ খ্ৰীঃ অব্দে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিকের অধিকার কালে সহমরণের প্রথা উঠিয়া যায়।

লড ক্যানিং । ১৪৯ ৩ গঙ্গা, তুলসী ও শালগ্রাম এবং মুসলমানদের কোরাণের দোহাই দিয়া বলিতেছি, ইংরাজেরা উভয় জাতির শত্রু। অতএব ধৰ্ম্ম রক্ষার্থ উভয় জাতি মিলিয়া উহাদের উচ্ছেদে যত্নবান হও। এমন দিন আর আসবে না। ইংরাজেরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া ভারতবর্ষ আধিপত্য স্থাপন করিবার পরে শত বৎসরের মধ্যে উক্ত প্রকার ভয়ঙ্কর সংবাদ কখনই ইংরাজ শাসন কর্তার কোন্সেল গৃহে আনীত হয় নাই। যে বিতস্তি প্রমাণ মেঘ নূতন বৎসরের প্রথম মাসে উদিত হইয়াছিল, তাহা ক্রমশঃ পরিবর্ধিত হইয়া এক্ষণে নিবিড় অন্ধকারে সমুদায় গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিল এবং ইংরাজদের উপরে দুর্বিসহ বাত্যা সহকারে বিপদ বারি বর্ষণ করিতে লাগিল। ভারতবর্ষের পক্ষে ইহা একটা সৌভাগ্যের বিষয় বলিয়া স্বীকার করিতে হইবেক, যে এই সময়ে লর্ড ক্যানিঙের হতে রাজ্যের সমুদায় কর্তৃত্ব ভার থাকে। যদিও এই সময়ে তাহার অন্তঃ করণ নানা চিন্তায় আকীর্ণ হইয়াছিল, তথাপি সৰ্বজন সমক্ষে কোন প্রকার উদ্বেগ চিহ্ন প্রকাশ না পাইয়া বরং গাম্ভীৰ্য ভাবই প্রকাশ পাইতে লাগিল। তিনি অবিলম্বে এই ঘােষণা প্রচার করিলেন, যে সকল উপাখ্যান দ্বারা কতকগুলি রেজিমেন্টের সিপাইরা ধৰ্ম্ম ললাপের আশঙ্কা করিতেছে, সে সকলই মিথ্যা ও কুলােক কল্পিত। অতএব আমি সকলকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, যেন কেহই সেই কুলােকের কাল্পনিক গল্পে বিশ্বাস করিয়া প্রতারিত না হন। ভারতবর্ষীয় গৰুৰ্ণমেণ্ট কখনই প্রজাগণের ধৰ্ম্মের উপরে হস্তক্ষেপ করেন নাই এবং করিবেনও না। গবর্ণর জেনেরল এই ঘােষণা পত্র প্রচার করিলেন বটে, কিন্তু বাত্যাকুলিত মহাসমুদ্রের তরঙ্গমালা কি যৎকিঞ্চিৎ তৈল প্রক্ষেপ করিলে প্রশমিত হইতে পারে ? বস্তুতঃ লর্ড ক্যানিংও কেবল ইহার উপর নির্ভর করিয়া থাকিলেন না, তিনি মুদ্রান্ত্রের স্বাধীনতা স্থগিত করিবার জন্য অবিলম্বে একটা বিধিবদ্ধ করিলেন, উপদ্রুত আইন ১৫০ লঘু চরিতমঞ্জরী। লেন। প্রদেশে সাং5ামিক আইন প্রচার করিয়া দিলেন ও বােম্বে মান্দ্রাজ প্রভৃতি নানা স্থান হইতে সেনা আনিবার উপায় চিন্তা করিতে লাগি- প্রথমতঃ আউ'রামের সেনারাই তঁাহার লক্ষ্য হইল। ইতি পূৰ্ব্বে উল্লিখিত হইয়াছে, আউটরাম সেনাপতি হইয়া পারস্য রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। তিনি পারস্য সাগরে উপনীত হইয়া যে সকল কাৰ্য করিয়াছিলেন, এস্থলে সে সকল বিশেষ রূপে উল্লেখ করিবার প্রয়ােজন নাই। কেবল এই মাত্র বলিলেই পৰ্য্যাপ্ত হইতে পারে, যে তিনি পারস্য রাজের সহিত সন্ধি করিয়া ফিরিয়া আসিতে- ছিলেন। ক্যানিঙ এই সংবাদ প্রাপ্তি মাত্র তাহাকে লিখিলেন, অাপনি যত শীঘ্র সম্ভব, ইষ্টিমার দ্বারা সসৈন্যে ফিরিয়া আসিবেন। এই সময়ে সৌভাগ্য ক্রমে অন্য দিক হইতে লর্ড ক্যানিরে সাহায্য প্রাপ্তির সুযােগ হইল। চীনাধিপতি রাজ্যস্থিত ইংরাজ- অধিবাসীগণের প্রতি সাহঙ্কার ব্যবহার করাতে ইংলণ্ডীয় গবর্ণ- মেণ্ট তাহার প্রতি বিরূপ হন ও তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সঙ্কল্প করেন। লর্ড এল গিনের প্রতি এই যুদ্ধ চালাইবার ভার সমর্পিত হয়। তদনুসারে এলগিন ইংলণ্ড হইতে সসৈন্যে যাত্রা করিয়াছিলেন। লর্ড ক্যানিঙ তঁাহাকে ক্রমান্বয়ে এই মর্মে দুই খানি পত্র লেখেন, ভারতরাজ্যের ঘােরতর বিপদ উপস্থিত, সিপাইরা বিদ্রোহী হইয়া মিরাট ও দিল্লী অধিকার করিয়াছে। অতএব আপনি যত সেনা বাঁচাইতে পারেন, শীঘ্র পাঠাইয়া দিবেন। যদি সৈন্য পাঠাইলে ইংলণ্ডীয় গবর্ণমেন্ট আপনাকে কোন কথা বলেন, আমিই তাহার জবাবদিহি করিব, সে নিমিত্ত আপনি কোন চিন্তা করিবেন না। আমি দিলী ও মিরাটের বিদ্রোহ শান্তির নিমিত্ত আপনার সাহা * সাধারণ আইন অপেক্ষা সাংগ্রামিক আইন অনেকাংশে কঠিন। সেনাসম্পৰ্কীয় লোকদিগকে সচরাচর এই আইনের অধীন হইয়া থাকিতে হয়। কিন্তু কোন জেলা বা প্রদেশে গুরুতর উপদ্রব উপস্থিত হইলে তপাকার লােকদিগকে শাসিত রাখিবার নিমিত্ত সময়ে সময়ে অন্যান্য ব্যক্তির উপরেও এই আইন প্রচলিত করা হয় ।

লর্ড ক্যানিং। } চাহি না। চতুর্দিকে যে সমস্ত ইউরােপীয় সেনা আছে, শহারা দিল্লীতে আসিয়া একত্রিত হইলেই তথাকার বিদ্রোহানল সহজে নিৰ্বাপিত হইবে। অন্যথা শাস্তি হইবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু যতই কালাতিপাত হইবেক, অপরাপর প্রদেশের অপরাগাক্রান্ত সেনগণের সাহস ততই বৃদ্ধি হইতে থাকিবে। অথচ কালাতিপাত একবারেই পরিহার করা যাইতেছে না। বিশেষত অগিরার এদিকে যে সকল বিদ্রোহী পণ্টনের কোন সংবাদই লওয়া যাইতেছে না, তাহাদের মধ্যে যদি এক পল্টনও সাহস পূৰ্ব্বক অগ্রসর হয়, তবে গঙ্গার প্রান্তবর্তী সকল স্থানই এক পক্ষের মধ্যে তাহাদের হস্তগত হইবেক বলিয়া অবধা- রিতই রহিয়াছে। এই সময়েই দশাহ বা দ্বাদশাহের মধ্যে প্রতি বিধানের সমস্ত উদ্যোগ সম্পন্ন করিয়া তোলা অবশ্য ক। যদি বিদ্রোহের বিস্তার না হইয়া এই দশ বার দিন অতিবাহিত হয় ; তাহা হইলে ভদ্রস্থতা দেখিতেছি। অন্যথা নিদারুণ উপদ্রব ঘটিবে। যদি সেই ঘােরতর অরাজককাও নিবারণের আশয়ে অত্ৰত্য সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করিবার কিছুমাত্র উপায় থাকে এবং সেই উপায় অব- লম্বন করা না হয়, তাহা হইলে আমাদিগকে গুরুতর অপরাধে অপ- রাধী হইতে হইবেক। যদি আপনি সৈন্য প্রেরণ করেন, তবে আমি অনুলজ্যনীয় প্রয়ােজন সমাধা হইবার পরে এক মুহুর্তের নিমিত্ত তাহাদিগকে এখানে রাখিব না। যদি সেই সঙ্গে আপনার স্বয়ং আসিবার ইচ্ছা হয়, তবে আমার কিছুমাত্র অনভিমত নহে জানিবেন। এই সময়ে আর একটী শুভ ঘটনা দৃষ্ট হইল। বহরমপুরের বিদ্রোহী রেজিমেন্টের পদচ্যুতি সময়ে রেঙ্গুন হইতে যে সমস্ত ইউ- রােপীয় সেনা জনীত হয়, তাহারা তখন পর্যন্ত কলিকাতার সন্নি- ধনে ছিল, লর্ড ক্যানিং অবিলম্বে তাহাদিগকে বিদ্রোহ-স্থানে যাইবার আদেশ দিলেন ও এই সময়ে সেনা আনয়ন করিবার জন্য মান্দ্রাজে ও টালিগ্রাফ, করিলেন। লর্ড ক্যানিং অন্যান্য স্থানের অপেক্ষ। পঞ্জাবের সেনাণের উপরেই অধিকতর নির্ভর করিতেন। তিনি অবিলম্বে আগরীয় লেপ্টনেন্ট গবর্নরকে লিখিয়া পাঠাইলেন, লঘু চরিতমঞ্জরী। আপনি পঞ্জাবের কমিশ্যনরকে লিখিবেন, যে তিনি শিখ সেনা পঞ্জাব রাজ্যস্থিত ইউরােপীয় সেনা যত বঁাচাইতে পারেন, অবিলম্বে দিলীতে পাঠাইয়া দেন। প্রথমতঃ দিল্লী উদ্ধারের নিমিত্ত যতদুর সাধ্য, চেষ্টা করিতে হইবেক। লড ক্যানিং ইতিপূর্বে একবার বিদ্রোহের সংবাদ ইংলণ্ডে লিখিয়া ছিলেন, এক্ষণে আবার ভারতবর্ষ সম্প ক্ত রাজমন্ত্রীর নিকট লিখিয়া পাঠাইলেন, যে সকল ব্যক্তি বিদ্রোহের উত্তেজনা করিয়াছে, তন্মধ্যে ব্রাহ্মণেরা এতদ্দেশীয় লােককে এই ভয় দেখাইতেছেন, যে ইংরাজের। হিন্দুধৰ্ম্ম লােপ করিতে উদ্যত আছেন। অন্যান্য ব্যক্তির অভিসন্ধি এই যে, ইংরাজদের অধীনতা হইতে মুক্ত হইবে। ১৪ই মে মিরাট ও দিল্লীর বিদ্রোহের সংবাদ কানপুরে পৌছে। এই সময়ে কানপুরে দেড় শত ইউরােপীয় সেনা ও চারি পল্টন লিপাই ছিল। সহিউ হুইলার উহাদের অধিনায়ক ছিলেন। ১৬ই মে রাত্রে সহসা আগুন লাগিয়া প্রথম রেজিমেন্টের বাস- শ্রেণী দগ্ধ হইয়া যায়। কানপুরে দুর্গ ছিল না, অকস্মাৎ ঐ ঘটনা হও যাতে সেনাপতি হুইলার কতকগুলি কামান বারিকে আনয়ন করেন। এই সময়ে ইউরােপীয় নারী ও বণিকেরা ভীত হইয়া বারিকে আশ্রয় লন। লক্ষ্ণৌ হইতে ৩২ সংখ্যক রেজিমেন্টের কতকগুলি সিপাই কানপুরে আসিয়া পেীছে। নগর মধ্যে জনরব উঠে, ২৩এ সিপাইদিগকে টোটা কাটিতে হইবে, যাহারা টোটা কাটিতে অস্বী- কার করিবে, তাহাদিগকে তােপে উড়াইয়া দেওয়া হইবে। ইহাতে কানপুর-স্থিত রাজপুরুষগণের এরূপ ভয় সঞ্চার হয়, যে তঁাহার ২৪:এ মে মহারাণীর জন্মদিন উপলক্ষেও পাছে সিপা- ইরা তােপধ্বনি শুনিয়া উত্তেজিত ও বিদ্রোহে প্রবৃত্ত হয়, এই ভয়ে তোপ বন্ধ করিয়া দিলেন। এই সময়ে নানাসাহেব পারিষদবর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া বিধুর নগরে বাস করিতে ছিলেন। লড ডেলহৌসী তঁহাকে ১৮৫৩ খ্রীঃ অব্দে পৈতৃক পেন্সন লাভে বঞ্চিত করেন। নানা সাহেব তদবধি মে (?

লর্ড ক্যানিঙ। বৃটিশ গবর্ণমেন্টের উপরে জাতক্রোধ হইয়াছিলেন, কিন্তু তিনি এ পৰ্যন্ত বৃটিশ কর্মচারিদের সহিত মৌখিক সদ্ভাব রাখিয়া আসিয়া ছিলেন। তিনি সময়ে সময়ে তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া বাটীতে আনিতেন। বৃটিশ কর্মচারিগণের স্থিরসিদ্ধান্ত ছিল, নানা সাহেব পৈতৃক মান সন্ত্রন নাশের শােক একপ্রকার বিস্মৃত হইয়াছেন; সুতরাং তাহারা নানা সাহেবের উপরে কোন প্রকার সন্দেহ করি- তেন না। বিধুর নগর কানপুরের সন্নিহিত। নানা সাহেব কানপুরে বিদ্রো- হের পূর্বলক্ষণ দেখিয়া তথাকার মাজিষ্ট্রেটকে লিখিলেন, আমার পাঁচ শত সেনা ও দুইটী কামান আছে। যদি আপনারা আমার সাহায্য চাহেন, আমি সাহায্য করিতে প্রস্তুত করিতে প্রস্তুত আছি। মাজিষ্ট্রেট তাহার সাহায্য গ্রহণ করা আবশ্যক বােধ করিলেন। তদনুসারে ২৬ মে নানা সাহেবের প্রতি কানপুরের ধনাগারের রক্ষণাবেক্ষ- ণের ভার অর্পিত হয়। ধনাগার নানা সাহেবের ভবনের অনতি- দূরে ছিল, নানা সাহেব তথায় দুইটী কামান ও দুই শত অশ্বারােহী সেনা পাঠাইলেন। এই সময়ে অযোধ্যার কমিশ্যনর লরেন্সের প্রেরিত অযোধ্যার দ্বিতীয় সংখ্যক রেজিমেন্ট কানপুরে আসিয়া পৌঁছে। সেনাপতি হুইলার ঐ রেজিমেন্টের প্রতি সন্দিহান হন ও উহাদিগকে ফতেগড়ে পাঠাইয়া দেন। পথিমধ্যে উহারা বিদ্রোহী হয় ও সঙ্গে যে সকল ইউরোপীয় কর্মচারী ছিলেন, তাহাদিগকে হত্যা করে। সে যাহা হউক, উক্ত রেজিমেন্টের কতকগুলি শিখসেনা কানপুরে ফিরিয়া আইসে। সেনাপতি হুইলার অবিলম্বে উহাদিগকে ছাড়াইয়া দেন। কানপুরে দুর্গ ছিল না, সেনাপতি হুইলার এক্ষণে বিপদ সন্নি- হিত বুঝিতে পারিয়া বারিক পরিবেষ্টিত করিতে করিতে লাগিলেন ও সমুদায় ইউরােপীয় অধিবাসীদিগকে বারিকে যাইয়া যাইয়া থাকিতে কহিলেন। কানপুরে সৈনিক, স্ত্রী, পুরুষ ও বালক সৰ্ব্বশুদ্ধ অন্ন ৫০ ইউরােপীয় ছিলেন। তাঁহারা অবিলম্বে পরিখাবেষ্টিত বারিকে ১৫৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। যাইয়া বাস করিতে লাগিলেন। ৪ ঠা জুন এক মাসের উপযুক্ত আহার সামগ্রী ও জেরি হইতে ১ লক্ষ টাকা বারিকে আনীত হইল। কিন্তু তখন পর্যন্ত জেরিতে ৯ লক্ষ টাকা রহিল। অস্ত্র- শালা হইতে বারুদ ও গুলি গােলা স্থানান্তরিত করিবার উপায় হইল না। ৬ই জুন রাত্রি ২ টার রাত্রি ২ টার সময়ে সিপাইরা বিদ্রোহে অভ্যুত্থান করিল। উহারা প্রথমতঃ ধনাগারে গেল, রক্ষী সেনারা উহাদিগকে কোন কথাই বলিল না ; সুতরাং উহারা নির্বিবাদে ধনাগার লুণ্ঠন করিয়া লইল। এই রূপে ধনাগার লুণ্ঠন করিবার পরে বিদ্রোহীরা কারাগারে প্রবেশ করিল ও সমুদায় কয়েদী দিগকে ছাড়িয়া দিল এবং নিকটবর্তী সমুদায় অফিস দগ্ধ করিয়া ফেলিল। ইহার পরেই বিদ্রোহীরা দিল্লী যাইবার মানসে কানপুর হইতে বাহির হয়। পথি মধ্যে উহারা কল্যাণপুর নামক স্থানে ছাউনি করে। নানাসাহেব যদিও এ পর্যন্ত ইংরাজদের সহিত মৌখিক সদ্ভাব রাখিয়া আসিয়া ছিলেন, কিন্তু তলে তলে তাহার সহিত বিদ্রোহীদের যোগ ছিল। বিদ্রোহীরা অপহৃত অর্থের অধিকাংশই তাহাকে প্রদান করে। নানাসাহেব এক্ষণে অবসর অবসর বুঝিয়া ছদ্ম ভাব পরি- ত্যাগ করিলেন। তিনি স্বয়ং বিদ্রোহীদের ছাউনিতে গিয়া কহি- লেন, তােমরা কানপুরে ফিরিয়া আইস, তথাকার ইউরােপীয় কর্মচারী, সৈন্য ও সমুদায় খ্ৰীষ্টান অধিবাসীগণের প্রাণ সংহার কর। তৎ- পরে তোমরা, কানপুর প্রদেশের রক্ষাৰ্থ কতকগুলি সেনা রাখিয়া দিল্লী অথবা লক্ষ্ণৌ যে স্থানে ইচ্ছা, যাইও। বিদ্রোহীরা নানা সাহে বের বাক্যে সম্মত হইল। নানা সাহেব ঐ দিবস সন্ধ্যার সময়ে উহা- দিগকে সঙ্গে লইয়া কানপুরে ফিরিয়া আসিলেন •ও ” সেনা-নায়ক হুইলারকে জানাইলেন, আমি তােমাকে , আক্রমণ করিতে আসি- য়াছি। নানা সাহেব এই বাক্যটা শীঘ্রই প্রকৃতরূপে প্রতিপালন করিলেন। অবিলম্বে চারিটা কামান আনীত হইল। নানার সেনারা বারিকের প্রতি গােলাবর্ষণ করিতে লাগিল। অবরুদ্ধেরাও বারিকের .

লর্ড ক্যানিঙ। । মধ্য হইতে গােলাবর্ষণ আরম্ভ করিল। আক্রমণের প্রথম দিবস কোন পক্ষের বিশেষ ক্ষতি বৃদ্ধি হয় নাই। দ্বিতীয় দিবস বিদ্রোহীরা যে একটি উপায় অবলম্বন করিল, তারা তাহাদিগের দলপুষ্টির বিলক্ষণ সুবিধা হইল। উহারা নগর মধ্যে মুসলমানের নিশান তুলিয়া দিগ। ইহাতে কানপুরবাসী সমুদায় সমুদায় মুসলমান আসিয়া বিদ্রোহের সহায়তা করিতে লাগিল। নানা সাহেবের সেনাদল ক্রমশঃ প্রবল হইয়া উঠিল ও সমুদায় নগর এবং বারুদ, গুলি, গােলা প্রভৃতি যুদ্ধের সমুদায় উপকরণ সামগ্রী তাহার হস্তে পতিত হইল, সুতরাং এক্ষণে নানা দুর্জয় হইয়া উঠিলেন ও কানপুরের স্বাধীন রাজা বলিয়া ঘােষণা প্রচার করিলেন। তাঁহার সেনারা উত্তরোত্তর বারিকের সন্নিহিত হইয়া অগ্নি বৃষ্টি করিতে লাগিল। অবরুদ্ধগণের যন্ত্রণার আর পরিসীমা ছিল না, উহাদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তি নিহত ও ইউরােপীয় নারী এবং অন্যান্য ব্যক্তি যন্ত্রণায় উন্মত্ত প্রায় হইল, তথাপি বৃটিশ সেনারা অতিকষ্টে ২৬এ জুন পর্যন্ত আত্ম রক্ষা করিয়াছিল। নানাসাহেব ঐ দিবস প্রাতঃকালে আসিয়া ইংরাজদের নিকটে এই প্রস্তাব করেন, যে সকল সেনা ও যে সকল ব্যক্তি ডেল- হোসীর কার্যে লিপ্ত নহেন ও যাহারা এক্ষণে অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া অত্ম সমর্পণ করিবেন, আমি তাহাদিগকে নিরাপদে এলাহ- বাদে পোঁছিয়া দিব। কানপুর বাসী ইংরাজেরা ঘােরতর বিপদে পড়িয়াছিলেন, বিশে- যতঃ সেনাপতি হুইলার এরূপ আহত হইয়াছিলেন, যে তাহাতে তাহার বাচিপার সম্ভাবনা ছিল না, সুতরাং ইংরাজের। উপায়ান্তর দেখিয়া নানা সাহেবের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। অবিলম্বে ত্রিশ খানি নৌকা আনীত হইল। হতাবশিষ্ট ইউরােপীয়ের। ২৭ জুন প্রাতঃকালে এলাহাবাদে যাইবার মানসে বারিক হইতে যাত্রা করিলেন। এক্ষণে নানা সাহেবের বিশ্বাসঘাতকতা করিবার প্রকৃত অবসরও উপস্থিত হইল। কেবল কতকগুলি ইউরোপীয় নৌকারােহণ করিয়াছেন, এমত সময়ে নাবিকেরা পূৰ্ব্বকৃত বন্দো- লঘু চরিতমঞ্জরী। . লেন। বস্ত অনুসারে নৌকার ছতরীতে আগুন দিয়া দ্রুতবেগে তীরে আসিয়া উঠিল। তৎপরে ইউরােপীয়দিগের উপরে অগ্নি বৃষ্টি আরম্ভ হইল। হইল। ত্ৰিশখান ত্রিশর্থনা নৌকার মধ্যে কেবল দুইখানি মাত্র ছাড়িয়াছিল, উহার একখানি কিয়ৎক্ষণের মধ্যে জলমগ্ন হইল। কিন্তু আরোহীর অতি কষ্টে অপর নৌকা খানিতে আসিয়া উঠি- অন্য আটাইশ খানি নৌকায় যে সকল ব্যক্তি আরােহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কতকগুলি নিহত, কতকগুলি জলমগ্ন ও অবশিষ্টের। বন্দীকৃত হইলেন। যে নৌকাখানি চলিতেছিল, তাহাতে পঞ্চাশ জন ইউরােপীয় ছিলেন। নানার সেনারা গঙ্গার উভয়তীর দিয়া অবিশ্রান্ত অগ্নি বর্ষণ করিতে করিতে তাহাদের অনুসরণ করিল। নৌকাখানি ৩ ক্রোশ চলিয়া দুর্ভাগ্যক্রমে চড়ায় ঠেকিল। পলায়িতের ভিতরে থাকিয়া অতিকষ্টে দিন যাপন করি- লেন। স্নাত্রি সমাগমে বাহিরে আসিলেন ও ধরাধরি করিয়া নৌকা- খানি উঠাইয়া চালাইতে লাগিলেন। কিন্তু নৌকাখানি ৪ ক্রোশ আসিয়া নৌজেপুর নামক স্থানে পুনরায় চড়ায় ঠেকিল। এই স্থানে বিদ্রোহীরা পুনর্বার নৌকা আক্রমণ করে। এই আক্রমণে যদিও পলায়িতদিগের অনেকে নিহত হইয়াছিল, কিন্তু পরিশেষে বিদ্রোহীদিগকে হটিয়া কানপুরে আসিতে হয়। নানাসাহেব অবি- লম্বে দুইটী পূর্ণ রেজিমেন্ট পাঠাইলেন। ঘটনাক্রমে ঐ দিবস রাত্রে ভয়ানক ঝড় হওয়াতে আরােহীদিগের পক্ষে শাপে বর হইল, নৌকা- খানি সহজে উঠিয়া গেল। আরােহী। পথের বিষয় কিছুই জানি- তেন না, সুতরাং খানিক দূর গিয়া নৌকাখানি সূর্যপুরের নীচে পুনরায় চড়ায় লাগিয়া গেল। এই স্থান কানপুর হইতে ১৫ ক্রোশ দূরে স্থিত। সে, যাহা হউক, রাত্রি প্রভাত হইবামাত্র আরােহীরা দৈখিতে পাইলেন, নির্দয় বিদ্রোহীরা অনুসরণ করিতেছে। এক্ষণে আরােহীরা বিবেচনা করিলেন, নৌকাখানি উদ্ধার করা সাধায়ত্র নহে। তাহাদের মধ্যে চৌদ্দ ব্যক্তি আক্রমণকারীদিগকে দুর করিবার মানসে, তীরে উত্তীর্ণ তীরে উত্তীর্ণ হইলেন। প্রথমতঃ তাঁহাদের অভি- লর্ড ক্যানিং। ১৫৭ প্রায় সিদ্ধ হয়। তাহারা শত্রুগণের অনুসরণ করিতে করিতে অনেক দুরে আসিয়াছিলেন। তৎপরে ক্লান্ত হইয়া সন্নিহিত একটী মন্দিরে আশ্রয় লন। মন্দিরের দ্বারে এক ব্যক্তি নিহত হন। অবশিষ্ট তের জন প্রথমতঃ শত্রুগণের সহিত সন্ধি করিবার চেষ্টা পাইয়াছি। লেন, কিন্তু অকৃতকার্য হইয়া পরিশেষে বন্দুক ছুড়িতে লাগিলেন। শত্রুগণের মধ্যে অনেকে হত হইল। এক্ষণে শত্রুরা সেই সংখ্যক ইংরাজদিগকেও আক্রমণ করিতে ভীত হইয়া একটা কামান আনিল ও মন্দিরের উপরে গােলা বর্ষণ আরম্ভ করিল। কিন্তু মন্দিরী এরূপ দৃঢ় ছিল, যে তাহাতে গোনা লাগিয়া প্রতিহত হইয়া আসিতে লাগিল। তখন বিদ্রোহীরা মন্দিরের দ্বারে জ্বালানি কাষ্ঠ কাষ্ঠ রাশীকৃত করিয়া আগুন করিল ও তাহাতে বারুদ ফেলিয়া দিল। অতিশয় ধূনোদগম হওয়াতে অভ্যন্তরস্থিত হত-ভাগ্য ইংরাজগণের নিশ্বাস রুদ্ধপ্রায় হইল ও তাহারা এক উদ্যমে বাহিরে আসিয়া গঙ্গার দিকে দৌড়িয়া যাইবার সঙ্কল্প করিলেন। মন্দিরের মধ্য হইতে বন্দুক ছুড়িবাতে বিদ্রোহীরা চতুর্দিকে পলাইতে লাগিল। বােধ হয়, হতভাগ্য ইংরাজদের মধ্যে ব্যক্তি সাতার জা নিতেন না। তঁাহারা ভাবিলেন, আমাদের আর জীবন রক্ষার উপায় নাই, তাহারা এই বিবেচনায় বিদ্রোহীমণ্ডলের মধ্যে দ্রুতবেগে দৌড়িয়া গেলেন ও যতক্ষণ সাধ্য, যুদ্ধ করিয়া পরিশেষে প্রাণ হারাইলেন। অবশিষ্ট সাত জন দৌড়িয়া গঙ্গায় পড়িলেন। তাহাদের মধ্যে দুই জন গুলি খাইয়া প্রাণ হারাইলেন। এক জন চীত সাঁতার দিতে দিতে অজ্ঞাতসারে নিকটে আলিয়া পৌছিলেন। বিদ্রোহীরা অবিলম্বে শাণিত খড়গ দ্বারা তাহার প্রাণ সংহার করিল। অবশিষ্ট চারি জন সাঁতার দিরা তিন ক্রোশ আসিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে তিন জন আহত হন, কেবল এক জন মাল অক্ষত শরীরে ছিলেন। পরিশেষে ঘটনাক্রমে ঘটনাক্রমে তাঁহাদের জীবন রক্ষার উপায় হইল। মিত্ররাজ দিগ্বিজয় সিংহের দুই জন সিপাই তাহা- দিগকে দেখিতে পায় ও সাদর আহ্বান করে। তঁাহারা তিন দিবস তীরের একটী লঘু চরিতমঞ্জরী। অনাহারে থাকিয়া মৃতকল্প হইয়াছিলেন, এক্ষণে বিদ্রোহীরা তানু, সরণে বিরত হইয়াছে দেখিয়া তাহারা আপনাদিগকে পুনর্জীবিত বােধ করিলেন ও একবারেই রাজার নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলেন। দিগ্বিজয় সিংহ তাহাদের দুরবস্থা দর্শনে অতিশয় দুঃখিত হন ও এক মাস রাখিয়া তাহাদের শুশ্রুষা করেন। অনন্তর তাহাদিগকে নিরাপদে এলাহাবাদে পাঠাইয়া দেন। এদিকে কানপুরের ঘাট হইতে দুই খানি নৌকা চলিয়া যাইবার পরে তথায় ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড চলিতে থাকে। ইউরােপীয়দিগের উপরে অবিশ্রান্ত গােলাবর্ষণ হয়। নানার অশ্বারােহী সেনারা চতুর্দিক হইতে আক্রমণ করিয়া তলোয়ারের দ্বারা হতভাগ্য ইউরােপীয়দিগের প্রাণ সংহার করে। পরিশেষে নানাসাহেবের ভ্রাতা হত্যাকাণ্ড স্থগিত করিতে আদেশ দেন। তৎপরে হতাবশিষ্ট ব্যক্তির একটী বৃহৎ গৃহে আনীত হইল। বিদ্রোহীরা তথায় স্ত্রীলোক ও বালক ব্যতিরেকে আর সমুদায় ব্যক্তির প্রাণ সংহার করিল। স্ত্রী ও বালকদিগকে বিবিঘর নামক একটা ক্ষুদ্র গৃহে আনিয়া রুদ্ধ করিয়া রাখিল । সূৰ্য্যপুরের নীচে নৌকার ভিতরে যে সকল ইউরােপীয় ছিল, তাহারাও বীকৃত ও কানপুরে আনীত হয়। বিদ্রোহীরা তাহাদের মধ্য হইতেও সমুদায় পুরষদিগকে হত্যা করিয়া অবশিষ্ট বালক ও স্ত্রীলােকদিগকে উপরােক্ত বিবিঘরে রুদ্ধ করিয়া রাখে। জেনরল হাবলক ৬ই জুলাই এলাহাবাদ হইতে সসৈন্যে কানপুরে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে অনেক শশাচনীয় ব্যাপার তাহার দৃষ্টি- গােচর হয়। বিদ্রোহীরা অনেক গ্রাম দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিল, অনেক অনেক গ্রাম জনশূন্য মরুভূমি তুল্য কবিয়াছিল। 'হাবলক অনেক দূর পর্যন্ত জনমানবের সমাগম দৃষ্টিগোচর করেন নাই। হ্যাবলক ১৫ই জুলাই কানপুরের নিকট আয়উঙ নামক গ্রামে যুদ্ধ করেন। সেই যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাস্ত হইয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে। নানাসাহেব এই সংবাদ শুনিকমাত্র ভগ্নোদ্যম হন ও যে সমস্ত ব্যক্তি তাহার হতে পতিত হইয়া তৎকাল পর্যন্ত জীবিত t লর্ড ক্যানিঙ।। করেন । করে। ছিল, অবিলম্বে তাহাদের প্রাণ সংহার করিবার সঙ্কল্প তদনুসারে ঐ দিবস সন্ধ্যার প্রাক্কালে পুনরায় হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হয়। বিবিঘরে স্ত্রীলােক ও বালকদের সহিত তিন চারি জন পুরু- যও রুদ্ধ ছিল, নানার সেনারা প্রথমতঃ পুরুষদিগকে বাহিরে আনিয়া হত্যা তৎপরে নানাসাহেব স্ত্রীলোক ও বালকদিগকেও বাহিরে আনিতে আজ্ঞা দেন। কিন্তু উহারা কোনমতে বাহিরে আসিল না, পরস্পর জড়সড় হইয়া বন্দিগৃহের ভিতরেই থাকিল। সিপাইরা জানালা দিয়া গুলি করিতে লাগিল। স্ত্রীলােক ও বালকের। ইতিপূৰ্বেই অর্ধমৃত হইয়াছিল, উহাদের মধ্যে অনেকেই গুলি খাইয়া অবিলম্বে ভূতলশায়ী হইল। তৎপরে ঘাতকেরা খঙ্গ লইয়া অভ্য। স্তরে প্রবেশ করিল ও হতাবশিষ্ট হতভাগ্য বন্দিগণের প্রাণ সংহার করিতে লাগিল। বিবিবরের মধ্য হইতে মর্মভেদী আর্তনাদ অন- বরত উথিত হইতে লাগিল। বহ ক্ষণ পরে হতভাগ্য বন্দিগণের দুঃ খানল রুধিরের স্রোতে নিৰ্বাপিত হইয়া গেল। হত্যাকাণ্ড শেষ হইতে না হইতে রাত্রি হইয়া পড়ে। রাত্রি সমাগমে বন্দিগৃহের দ্বার রুদ্ধ হয়। নানাসাহেব সন্নিহিত একটী পান্থশালায় নাচ তামাসার আমােদে সেই রাত্রি অতিবাহিত করেন। পর দিবস প্রাতঃকালে বিবিঘর পরিষ্কৃত করিতে আদেশ দেন। তদনুসারে মৃত দেহ সকল একটী কূপে নিক্ষিপ্ত হয়। ইহার পরেই নানাসাহেব কানপুরের অস্ত্রশালা তােপে উড়াইয়া দিয়া পলায়ন করেন। হ্যাবলক ১৭ই জুলাই কানপুরে গিয়া উপনীত হন ও কানপুর অধিকারু করেন। তঁাহার সেনারা পথিমধ্যে যুদ্ধ করিয়া অতিশয় ক্লান্ত হইয়াছিল, তাহাদের বিশ্রাম করিতে দুই দিবস অতীত হয়। হ্যা বলক ১৯ জুলাই বিঘুরে যাত্রা করেন। যাত্রা করেন। এক্ষণে তাহার পথ, নিষ্কণ্টক হইয়াছিল, দুৰ্বত্ত নানা ইতিপূৰ্বেই সপরিবারে পলায়ন করিয়াছিলেন। হ্যাবলক নিৰ্বিবাদে বিথুরে পোঁছিয়া নানার ভবন ভূমিসাৎ করিলেন ও বিথরের অস্ত্রশলা তােণে উড়াইয়া দিয়া কান- পুরে ফিরিয়া আসিলেন।

লঘু চরিতমঞ্জরী। 4 এ স্থলে ইহাও উল্লেখ করা আবশ্যক, যে সাহাবাদ জেলার অন্তঃ- পাতী জগদীশপুরের সুপ্রসিদ্ধ জমিদার কুমার সিংহ বিদ্রোহী হইয়া নানাসাহেবের সহিত যােগ দেন। সকল ব্যক্তি বিদ্রোহী- সেনাগণের অধিনায়ক হন, তন্মধ্যে কুমার সিংহ যদিও বৃদ্ধ ছিলেন, তথাপি তিনি যথার্থ বীর পুরুষ বলিয়া গণ্য হইতে পারেন। তিনি অনেক দিন পর্যন্ত ইংরাজদের বিপক্ষতাচরণ করিয়াছিলেন। পরিশেষে আহত হইয়া ১৮৫৮ খ্রীঃ অব্দে এই বিদ্রোহানলে জীবন আহুতি প্রদান করেন। ইতিমধ্যে জেনরল নীল মান্দ্রাজ হইতে সসৈন্যে কলিকাতায় আসিয়া পৌছিলেন। লর্ড ক্যানিং অবিলম্বে তাহাকে উত্তর পশ্চিম প্রদেশে যাইতে আদেশ করেন। তিনি হাওড়ায় পৌছিয়া দেখি- লেন, ট্রেন প্রস্তুত, আরােহণ করিলেই হয়। কিন্তু তখন পর্যন্ত তাহার কতকগুলি সেনা নোকা অভাবে গঙ্গাপার হইতে পারে নাই। ইষ্টেসন মাষ্টার নীলকে কহিলেন, আপনার লোকেরা আসিতে বিলম্ব করিতেছে, কিন্তু সে নিমিত্ত অপেক্ষা করিতে পারি না, আমি টেন ছাড়িয়া দিই। নীল অতিশয় তেজস্বী ও সাহসী ছিলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ সমভিব্যাহারী সেনাদিগকে এই আদেশ করিলেন, যতক্ষণ অপর পার হইতে সেনারা আসিয়া না পৌছে, তােমরা ইষ্টেসন মাষ্টারকে ধরিয়া সেনারা তৎক্ষণাৎ ইষ্টেসন মাষ্টারকে কয়েদ করিল। অপর পার হইতে সেনার আসিয়া গাড়িতে উঠিলে তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হয়। এদিকে লক্ষে নগরে কমিশ্যনর লরেন্স বিদ্রোহ প্রবৃত্ত পণ্টনের শাস্তি বিধান ও প্রভুভক্ত সিপাইদের পুরস্কার প্রদান করিলে পর দুই এক দিবস , তথায় কোন গােলযােগ লক্ষিত হয় নাই, কিন্তু তৎপরে আবার উচ্ছ স্থল ব্যবহার আরম্ভ হইল। রাত্রি যোগে সভা হইত, গৃহদাহও প্রায় ঘটিত এবং মুসলমানদিগকে বিদ্রোহে প্রবৃত্ত করিবার জন্য রাস্তার মােড়ে ইস্তেহার মারা হইত। পুলিশ কর্মচারীরা কাহাকেও ধরিতে পারি না। ইহাতে বােধ হয়, লর্ড ক্যানিং। গেলেন। উহার অযােগ্য ছিল, অথবা চক্রান্তকারীদিগের সহিত ‘য়ােগ দিয়া- ছিল। পুলিশ কর্মচারীরা উত্তরকালে গবর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে যে সকল কৰ্ম্ম করে, তাহা ভাবিয়া দেখিলে দ্বিতীয় পক্ষই সমর্থিত হয়। কমিসনর লরেন্স 'এক্ষণে বিলক্ষণ বুঝিতে পারিলেন, যে বিপদ ক্রমশঃ সন্নিহিত হইতেছে। বিপদের আসন্ন নিবন্ধন পূর্বে যেরূপ উদোগ করিয়া রাখা আবশ্যক, লরেন্স তৎ সমুদায়ই করিয়াছিলেন। তিনি মুচিভন অট্টালিকা প্রাচীরবেষ্টিত করিয়া দুর্গ স্বরূপ করিলেন, সেতুর উপরে প্রহরী নিযুক্ত রাখিলেন ও রেসিডেন্সি । দৃঢ়ীভূত করিয়া উহার মধ্যে ইউরােপীয় নায়ী ও অশদিগকে লইয়া লরেন্স যদিও এই সকল সময়ে অতিশয় উদ্বিগ্ন ছিলেন, তথাপি অশ্বারােহণ করিয়া সর্বদাই নগর মধ্যে বেড়াইতেন ও সদুপদেশ দিয়া অধিবাসীদিগকে বশবর্তী করিবার চেষ্টা করিতেন। অধিবাসীরা তাহার বাক্যে মৌখিক সম্মতি প্রদর্শন করিত বটে, কিন্তু তাহাদের অন্তঃকরণ সেরূপ ছিল না, সুতরাং লরেন্সের সমুদায় প্রয়াস বিফল হইয়া গেল। এ মে রাত্রি ৯টার সময়ে লক্ষ্ণৌ নগরে প্রকাশ্য বিদ্রোহ আরম্ভ হইল। ঐ সময়ে সহসা ৯১ সংখ্যক রেজিমেন্টের বাসশ্রেণী হইতে গুলি গােলার শব্দ শ্রুতিগোচর হয়। জেনরল হ্যাণ্ডসকোম্ ঐ স্থানের নিকট থাকিতেন, তিনি তৎক্ষণাৎ দ্রুতপদে তথায় উপস্থিত হইলেন ও গুলি খাইয়া প্রাণ হারাইলেন। লেপ্টনেন্ট গ্রান্ট পাহারায় ছিলেন, তিনিও গুলি খাইয়া আহত হইলেন। একজন সুবেদার তাহাকে খাটিয়ার নীচে লুকাইয়া রাখিল ও বিদ্রোহীদিগকে কহিল, তিনি পাইয়াছেন। কিন্তু একজন হাবেলদার চারিপায়া *ইংরাজদের রাজনীতি সম্পর্কে এই একটি নিয়ম প্রচলিত আছে, যে মিত্র- ভাবাপন্ন রাজার নিকটে চিরস্থায়ী দুতস্বরূপ স্বপক্ষীয় এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়া থাকেন, তাহাকে রেসিডেন্ট কহে। নবাবের আধিপত্য কালে লক্ষ্ণৌ নগরে এক জন রেসিডেন্ট ছিলেন। তাহার তত্ৰত্য বাসস্থানের নাম রেসিডেন্সি।

লঘু চরিতমঞ্জরী। • দেখাইয়া দিল। বিদ্রোহীরা অমনি তাহাকে তথা হইতে বাহিরে আনিয়া পশুর ন্যায় হত্যা করিল। এদিকে কমিশ্যনর লরেন্স গুলি, গােনর শব্দ শুনিৰামাত্র অশ্বারো- হণে ঐ স্থানে অলিলেন। তাহার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, যাহাতে বিদ্রোহীদের সহিত বিদ্রোহােন্মুখ নগরবাসিগণের যােগ না হয়। তিনি এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির নিমিত্ত দুইটী কামান ও এক দল ইউরােপীয় সেনা পথে রাখিলেন ও অবশিষ্ট সেনাগণকে বিদ্রোহীদের দমনের জন্য পাঠাইলেন। বিদ্রোহীরা ভাঙ খাইয়া মত্ত হইয়াছিল, তাহার অগ্রসর হইয়া ইউরোপীয় সেনাদিগকে যুদ্ধে আহ্বান করি। কিন্তু তােপধ্বনি শুনিয়া এক উদ্যমে স্ব স্ব আবাসে দৌড়িয়া গেল ও তথা হইতে গুলি ছুড়িতে লাগিল, কিন্তু ইউরােপীয় সেনারা কামান লইয়া | নিকটবর্তী হইবামাত্র বিদ্রোহীরা চতুর্দিকে পলাইতে আরম্ভ করিল। অবিলম্বে তাহাদের প্রাণ সংহার করিবার জন্য এক দল দেশীয় অশ্বারােহী সেনা প্রেরিত হইল। কিন্তু বিদ্রোহীদের উপরে অত্যা- চার করা অশ্বারােহী সেনাগণের অভিমত ছিল না, সুতরাং কোন বিশেষ ফল লাভ হইল না। তৎপরে বিদ্রোহীরা ৩১ এ মে রাত্রি ৪ টার সময়ে মুগিপুরে আসিয়া পোঁছে। অশ্বারােহী সেনারা অনুসরণে বিরত হইয়াছে দেখিয়া বিদ্রোহীরা তথা হইতে লক্ষে নগরে ফিরিয়া চলিল। তাৎপর্য এই, তথায় যাইয়া অপরাপর রেজিমেন্টের সিপাইদের সহিত মিলিত মিলিত হইবে। লরেন্স উহাদিগকে আক্রমণ করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত ছিলেন, তিনি রেসিডেন্সি রক্ষিত করিয়া দুই শত ইউরােপীয় সেনা, দুইটা কামান ও ৭ সংখ্যক অশ্বারােহী সেনা লইয়া অগ্রসর হইয়াছিলেন। ইউরোপীয় শাের আসিতেছে দেখিয়া বিদ্রোহীরা পলাইতে লাগিল। ইউরােপীয় সেনার গােল। বর্ষণ করিতে করিতে মুগিপুর পর্যন্ত উহাদের অনুসরণ করে। উহাদের ২। ৩ ব্যক্তি হত ও ষাটি জন বন্দীকৃত এবং ইংরাজদের মধ্যে এক জন নিহত হয় : লক্ষ্মৌ, নগরটী ষড়যন্ত্রকারী লােকে পরিপূর্ণ হইয়াছিল, সুতরাং লড ক্যানিং। 4, এ অবস্থায় নগর পরিত্যাগ করিয়া অধিক দূর যাওয়া কত্তব্য বোধে লরেন্স নগরে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি ফিরিয়া আসিবার পরেই নগর মধ্যে সাংগ্রামিক আইন প্রচার করিলেন ক্যান্টনমেন্ট * হইতে সেনা ও কামান বিভাগ পূৰ্ব্বক রেসিডেন্সি ও.. মুচিভন দুর্গে পাঠাইলেন। ক্যাট নমেন্টে কেবল চারিটী কামান ও দুই শত সেনা থাকিল । এই ঘটনার কতিপয় দিবস পরে সিপাইরা পুনরায় বিদ্রোহে অভূ- খান করে, নগরের সমুদায় অধিবাসী আসিয়া তাহাদের সহিত নি- লিত হয়। বিদ্রোহীরা মুচিভন দুর্গ ও রেসিডেন্সির উপরে গেল। বর্ষণ আরম্ভ করে। এক্ষণে সুবিচক্ষণ কমিশ্যনর দেখিলেন উল্লিখিত দুইটী স্থান রক্ষা করা সাধ্যায়ত্ত নহে। তিনি মুচিভন দুর্গ হইতে সমু- দায় অধিবাসী, সমুদায় সেনা ও কামান বারুদ প্রভৃতি যুদ্ধের সমু- দায় সামগ্রী, রেসিডেন্সিতে আনাইলেন দুর্গটী তােপে উড়াইয়া দিলেন। ইহাতে রেসিডেন্সি বাসিগণের সাহস কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি হইল। লরেন্স এই রূপে রেসিডেন্সি রক্ষিত করিয়া কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। বিদ্রোহীরা ১ লা জুলাই রেসিডেন্সি অবরােধ করিতে আরম্ভ করে। লরেন্স ঐ দিবস আপনার কুঠরীতে বসিয়া কোন কৰ্ম্ম- চারীর সহিত কথােপকথন করিতে ছিলেন, এমন সময়ে বিদ্রোহীদের নিক্ষিপ্ত একটী গোলা আসিয়া তাহার গৃহের ভিতরে পড়ে, কিন্তু গােলাটী ফ। টি বার পূর্বে তাহারা তথা হইতে সরিয়া গেলেন। ইহাতে সে দিবস তাহাদের কোন অনিষ্ট ঘটিল না। উক্ত কর্মচারী লরেন্সকে কহিলেন, এ ঘরটি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য হইয়াছে ; অতএব আপনার এ ঘরে থাকা কর্তব্য নহে, আপনি আর একটা কুঠরীতে গিয়া থাকুন। লরেন্স তঁাহার কথায় কর্ণপাত কবিলেন না । শর দিবস তিনি সেই ঘরে বসিয়া আছেন, এমত সময়ে আর একটা গােল। * সেনারা ব্যাপক কাল যে স্থলে শিবির স্থাপন বা গৃহাদি নির্মাণ করিয়া বাস করে, তাহাকে ক্যান্টনমেন্ট কহে।

১৬৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। আসিয়া ঠিকু সেই স্থানে পড়িল ও ফাটিয়া গেল। ইহাতে লরেন্সের শরীর মর্মান্তিক আহত হয়। তিনি দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করিয়া দুই দিবস জীবিত ছিলেন, তৎপরে ৪ঠা জুলাই প্রাণত্যাগ করেন। রেসিডেন্সিবাসী, সমুদায় ব্যক্তি লরেন্সের সাহস ও বুদ্ধি-কৌশ- লের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করিতেন, এক্ষণে তাহার এইরূপ শােচ- নীয় পরিণাম দেখিয়া এক বারে ভগ্নোদ্যম হইলেন। বিদ্রোহীদের ভয়ঙ্কর অত্যাচারে তাহাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়াছিল, ভৃত্যের এক- বার বাহিরে গেলে আর ফিরিয়া আসিত না, অধিক বেতন দিতে স্বীকার করিলেও কেহই চাকরী স্বীকার করিত না। অনেক অনেক সম্রান্ত ইউরােপীয় নারীদিগকে স্বয়ং সন্তানগণের সেবা শুশ্রষা করিতে হইত ও স্বয়ং বস্ত্র ধৌত করিতে হইয়াছিল এবং তাহারা যে যৎকিঞ্চিৎ আহার সামগ্রী পাইতেন, তাহা তাহাদিগকে স্বহস্তে পাক করিতে হইত। রেসিডেন্সিবানীর সাহায্য ও সংবাদ পাইবার মানসে প্রতিদিন চর পাঠাইতেন, কিন্তু উহাদের মধ্যে কেহই আর ফিরিয়া আসিত না। অবশেষে ২৬ জুলাই অঙ্গদ নামক এক ব্যক্তি কানপুর হইতে এই সংবাদ লইয়া আইসে, যে হাবলক সসৈন্যে যাত্রা করিয়াছেন। তিনি ৫। ৬ দিবসের মধ্যে এখানে আসিয়া পৌছিবেন। রেসিডেন্সি- বাণীরা অবিলম্বে এক জন চরের দ্বারা হ্যাবলককে এই কথা বলিয়া পাঠাইলেন, যে যখন আপনি নগরের সন্নিধানে আসিয়া পৌছি- বেন, ঐ সময়ে দুইটা হাউই ছড়িবেন। তাহা হইলে আমরা আপনার আগমন সংবাদ জানিতে পারিব ও আপনার সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইয়া থাকিব। সে যাহা হউক, ছয় দিবস অতীত হইল, তথাপি হ্যাব- লক আসিয়া পোঁছিলেন না, ইহাতে রেসিডেন্সি বাসীরা আরও উদ্বিগ্ন হইলেন। তাহারা দিবসে বিদ্রোহীদের অত্যাচার সহ্য করিয়া রাত্রে কেবল হাউই লক্ষ্য করিয়া থাকিতেন। এইরূপে কিছু দিন অতীত অনন্তর তাহারা ২৯ আগষ্ট শুনিলেন, হ্যাবলক আসিতে ছলেন বটে, কিন্তু পথিমধ্যে তাহাকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে . হইল।

লড ক্যানিঙ। হয়। তঁাহার সঙ্গে যে সমস্ত যুদ্ধ সামগ্রী ছিল, তাহা নিঃশেষ হওয়াতে তিনি তৎসমুদায় পুনরায় সংগ্রহ করিবার জন্য ফিরিয়া গিয়াছেন। ২৫ এ সেপ্টেম্বর হ্যাবল ও আউটরাম দুই জনে মিলিয়া সসৈন্যে লক্ষৌ নগরের সন্নিধানে গিয়া পৌছিলেন। এই সময়ে সন্ধ্যা হয়। রাত্রি সমাগমে আউটরাম কহিলেন, আজি বাহিরে থাকা যাউক। হ্যাবল বলিলেন, যখন পৌছিয়াছি, যে কোনরূপে হউক, আজি রাত্রেই নগরমধ্যে যাইয়া রেসিডেন্সিবালিগণের দুঃখ মােচন করিতে হইবে। অনন্তর তঁাহারা নগরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। বিদ্রো- হীরা উপর হইতে অবিশ্রান্ত গুলিগােলা বর্ষণ করিতে লাগিল। ইহাতে হ্যাবলকের সেনগণের মধ্যে অনেকে হতাহত হয় বটে, তথাপি তাহারা হটিয়া আসিল না। তাহারা পৌছিবামাত্র রেসিডেন্সিবাসীরা অতিশয় হর্ষিত হইল ও জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। হ্যাবল উপস্থিত হওয়াতে • রেসিডেন্সিবাসিগণের দুঃখের কিঞ্চিৎ লাঘব হইল বটে, কিন্তু তাহারা মুক্ত হইতে পারিল না, তাহাদের বাহির হইবার কোন উপায় ছিল না, বিদ্রোহীরা রেসিডেন্সি বেষ্টিত করিয়া রাখিয়াছিল। বিদ্রোহীদের সংখ্যা অনেক অধিক, কিন্তু বৃটিশ সেনার সংখ্যা : অতি অল্প; বিশেষতঃ রেসিডেন্সি আহত, পীড়িত, স্ত্রীলােক এবং বালকে প্রায় পরিপূর্ণ হইয়াছিল। এরূপ অবস্থায় হ্যাবল যুদ্ধ করিতে পারিলেন না ও রেসিডেন্সিবাসীদিগকে স্থানা- রিত করিতেও সাহসী হইলেন না, সুতরাং তাহাকে কষ্ট সৃষ্টে রেসিডেন্সিতেই থাকিতে হইল। এ দিকে দিল্লী বিদ্রোহীদের প্রধান আড্ডা হয়। দিল্লী নগর প্রাচীরবেষ্টিত ও দুর্গ-রক্ষিত। তথায় বৃদ্ধ মোগল সম্রাট বাস করিতেন। দিলীতে দিল্লীতে অনেক অনেক দিন অবধি ইউরোপীয় সেনা ছিল না, তথা কার সমুদায় সিপাইরা যাইয়া বিদ্রোহীদের সহিত মিলিত হয়। লেপ্টনেন্ট উলবি দিল্লীর অস্ত্রশালার অধ্যক্ষ ছিলেন, তিনি অস্ত্রশলা রক্ষা করা অসাধ্য দেখিয়া বারুদের ঘর অগ্নি সংযােগ করিয়া উহা উড়াইয়া দেন। ইহাতে পথ বাহী অনেক ব্যক্তি বিনষ্ট লঘু চরিতমঞ্জরী ও সন্নিহিত অনেক অনেক গৃহ দগ্ধ হইয়া যায়, কিন্তু ইংরাজদের পক্ষে অনেক সুবিধা হইয়াছিল; বারুদ, গোলা প্রভৃতি যুদ্ধের সামগ্রী কিছুই বিদ্রোহীদের হস্তে পতিত হয় নাই। দিল্লী নগর বাসী যে কয়েক জন ইউরােপীয় পূর্বে সাবধান হইয়াছিলেন, কেবল তাহারাই পলাইয়া জীবন রক্ষা করেন। অবশিষ্ট সমুদায় ইউরােপীয় বিদ্রো- হীদের হস্তে পতিত হইয়া কলেবর পরিত্যাগ করেন। বাদশা সিংহাসনে আরূঢ় হন। পুরাতন মােগল পতাকা পুনরায় উত্তো- প্রধান সেনাপতি আন সিলিয়া • পাহাড়ে ছিলেন, তিনি এই ভয়ঙ্কর সংবাদ পাই বামাত্র অম্বালা নগরে ফিরিয়া আইনে ও তথা হইতে সসৈন্যে দিলীর অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি পথি মধ্যে করনল নামক স্থানে পোঁছিয়া ওলাউঠা রোগে আক্রান্ত হন ও ২৭ এ মে কলেবর পরিত্যাগ করেন। আসনের মৃত্যুর পরে বারনার্ড প্রধান সেনাপতি হইয়া দিলী উদ্ধার করিবার নিমিত্ত যাইতে ছিলেন, কিন্তু তিনিও পথিমধ্যে দুর্ভাগ্যক্রমে নিধন প্রাপ্ত হন। এই সকল ঘটনা হওয়াতে দিল্লীর বিদ্রোহীরা আরও উৎসাহিত হইয়া উঠিল। শাজাদার। সেনাধ্যক্ষ হইয়াছিলেন, কিন্তু কিরূপে সৈন্য চালনা করিতে হয় ও কিরূপে সৈন্যদিগকে বশবর্ত্তী করিতে হয়, তাহারা তাহার কিছুই জানিতেন না, সুতরাং সিপাইরা উচ্ছ ঙ্খল হইয়া ভয়ঙ্কর অত্যাচার আরম্ভ করিল। এদিকে সরকালিন ক্যাম্বেল (ইনি উত্তর কালে লর্ড ক্লাইড নামে বিখ্যাত হন) লক্ষৌ নগরে রেসিডেন্সিবাণীদিগকে উদ্ধার করিবার নিমিত্ত ২৭ এ অক্টোবর কলিকাতা হইতে যাত্রা করিয়া ৫ই নবেম্বর কানপুরে উপনীত হন। তিনি কানপুরে কতিপয় দিবস ছিলেন, অনন্তর চতুর্দিক হইতে সেনা সংগ্রহ করিয়া লক্ষ্ণৌ যাত্রা করেন। ক্যাম্বেল অতি উপযুক্ত সেনাপতি ছিলেন, তিনি আপনার সেনা অপেক্ষা দশ গুণ অধিক বিদ্রোহী সেনার সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে ১৭ই নবেম্বর রেসিডেন্সিতে উপনীত হন। রেসিডেন্সিস্থিত বালক, স? লাক, অহত ও পীড়ি হদিগকে স্থানান্তরিত করিবার বন্দোবস্ত লড ক্যানিঙ। . ১৬৭ করিতে চারি দিবস অতীত হয়। ক্যাম্বেল উহাদিগকে ২২এ নবেম্বর নিরাপদে কানপুরে লইয়া যান। এইরূপে রেসিডেন্সিবাসীর মুক্তি লাভ করিলেন বটে, কিন্তু লক্ষৌ নগরটী বিদ্রোহীদেরই হস্তে থাকিল। ক্যাম্বেলের এত অধিক সেনা ছিল না, যে তিনি বিদ্রোহীদিগকে পরাস্ত করিয়া লক্ষো অধিকার করিতে পারেন, সুতরাং তাহাকে কিছু কাল সেনার নিমিত্ত অপেক্ষা করিতে হইল। ইতি পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, মিরাটের বিদ্রোহ ও দিল্লী পরাজয়ের সংবাদ শুনিবামাত্র লর্ড ক্যানিঙ আগরয় লেপ্টনেন্ট গবর্ণরকে লিখিয়া পাঠান, আপনি পঞ্জাবের কমিশ্যনরকে লিখিবেন, যে তিনি শিখ সেনা ও পঞ্জাব রাজ্যস্থিত ইউরোপীয় সেনা যত বাঁচাইতে পারেন, অবিলম্বে দিল্লীতে পাঠাইয়া দেন। প্রথমতঃ দিল্লী উদ্ধারের নিমিত্ত যতদূর সাধ্য চেষ্টা করিতে হইবেক। তদনুসারে কমিশ্যনর সরু জন লরেন্স দিল্লীতে শিখসেনা পাঠান। পাতিয়ালা ও ঝিণ্ডির রাজাও ঐ সময়ে সৈন্য দ্বারা বিস্তর সাহায্য করেন। জেনবল উইলসন সেনা- পতি হন। ঐ সকল ঐ সকল সেনারা আসিয়া ৭ই সেপ্টেম্বর দিল্লী অবরােধ করিতে আরম্ভ করে। দুই দিবস দিল্লীর উপরে অনবরত গােলাবর্ষণ হয়। তাহাতে নগরপ্রাচীরের দুইটী স্থান ভগ্ন হইয়া যায়। উই- লুন ১৪ই সেপ্টেম্বর বিদ্রোহীদিগকে আক্রমণ করেন। এই আক্র- মণে ছয়দিবস যুদ্ধ হয়। বৃটিশ সেনাপতি ২০ এ সেপ্টেম্বর দিল্লী নগর পুনরধিকার করেন। বিদ্রোহীরা পলাইয়া অযােধ্যায় যায়। বাদ- শাহও উপায়ান্তর না দেখিয়া পলায়ন করেন, কিন্তু এক দল অশ্বা- রােহী সেনা অনুসরণ করতে তাহাকে পরিশেষে আত্ম সমর্পণ করিতে হয়। ১৮৫৭ খ্রঃ অব্দের ২রা অক্টোবর কলিকাতায় লর্ড ক্যানিং সংবাদ পাইলেন, জেনবল উইলস দিল্লী পুনরধিকার করিয়াছেন ও বাদশা বন্দীকৃত হইয়াছেন। দিল্লী বিদ্রোহীদের প্রধান আড্ডা ছিল, তথায় ক্রমাগত চারি মাস বিদ্রোহ থাকে , সুতরাং দিলী উদ্ধার হওয়াতে বিদ্রোহীদের মস্তক চর্ণীকৃত হইল।

। লঘু চরিতমঞ্জরী। ইত্যবসরে সিংহল ও চীন প্রভৃতি নানা স্থান হইতে বৃটিশ সেনা সকল এদেশে আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল। নেপালের সেনাধ্যক্ষ জং বাহাদুর সসৈন্যে আসিয়া বৃটিশ সেনার সহিত মিলিত হন। সরু কোলিন ক্যাম্বেল এইরূপে বর্ধিত-সামর্থ্য হইয়া লক্ষ্ণৌ যাত্রা করেন। তিনি তথায় পেীছিয়া ৫ই মার্চ অবধি ১৬ই পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তৎপরে ঐ দিবস লক্ষ্ণৌ- নগর পুনৰ্ব্বার ইংরাজদের হস্তগত হয়। বিদ্রোহীরা চতুর্দিকে পলায়ন করে। ১৮৫৮ খ্রীঃ অব্দের ৩রা মাচ্চ লর্ড ক্যানিং অযােধ্যার কমিশুনর আউট রামের নিকটে এই উপদেশ সহকারে একখানি ঘােষণা পত্র পাঠাইয়াছিলেন, যে আপনি লক্ষৌ হস্তগত হইবামাত্র উহা তথায় প্রচার করিবেন। এক্ষণে সেই ঘোষণা পত্র প্রচার করিবার সময় উপস্থিত হইল। ঘোষণার মৰ্ম্ম এই, বৃটিশ গবর্ণমেন্টের উপরে অযযাধ্যার যে ছয় জন তালুকদারের ভক্তি অবিচলিত আছে, কেবল তাহারাই পদস্থ থাকিবেন। অপরাপর সমুদায় ব্যক্তির ভূমিসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাইবে। তবে এক্ষণে তবে এক্ষণে অযােধ্যার যে সমস্ত তালুক- দার, জমিদার ও প্রধান প্রধান ব্যক্তি অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া কমিশুনরের নিকটে আত্মসমর্পণ করিবেন, তাঁহাদের মধ্যে যাহারা কোন ইংরাজ হত্যার পাপে লিপ্ত হন নাই, সপ্রমাণ হইবে, গবর্ণর জেনেবল অঙ্গীকার করিতেছেন, তাহাদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করিবেন। এতদ্ভিন্ন তাহাদের উপরে আর কোন অনুগ্রহ করা বৃটিশ গবর্ণমেন্টের বিচার ও ক্ষমার উপরে নির্ভর করিতেছে, গবর্ণর জেনরল সে বিষয় অঙ্গীকার করিতে পারেন না। অনেকে আশঙ্কা করিয়াছিলেন, লর্ড ক্যানিঙের ঘােষণা অযাে- ধ্যায় প্রচার হইল তথায় বিদ্রোহের শাস্তি না হইয়া বরং বিস্তার হইবার সম্ভাবনা। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তাহা হয় নাই। লর্ড ক্যানিঙ যে অভিপ্রায়ে ঘোষণা করিয়াছিলেন, তাহা সম্পূর্ণ রূপেই সফল হয়। মানসিংহ প্রভৃতি প্রধান প্রধান তালুকদারেরা অস্ত্র শস্ত্র - লন্ড ক্যানিঙ। ন্তুষ্ট হন পরিত্যাগ করিয়া বৃটিশ গবর্ণমেন্টের শরণাগত হন ও অযােধ্যার বিদ্রোহানলও নির্বাপিত হইয়া যায়। এদিকে অযােধ্যার ঘােষণার বিষয় ইংলণ্ডে প্রচার হইবার পরে বাের্ড অব কন্ট্রোলের অধ্যক্ষ লর্ড এলেন বর ক্যানিঙের প্রতি অস- কাশ্য প্রদর্শনপূর্বক তাহাকে লেখেন, আপনি অযোধ্যায় যেরূপ ঘোষণা করিয়াছেন, তারা তথায় শান্তি স্থাপন হওয়া সম্ভব বােধ হয় না। অন্যান্য দেশের লোকেরা যেরূপ পৈতৃব- সম্পত্তির উপরে মেহ করিয়া থাকেন, ভারতবর্ষীয়দের ও সেই রূপ । পৈতৃক-সম্পত্তির প্রতি মমতা আছে। আপনার ঘোষণার যে কোন নিগূঢ় অভি প্রায় থাকুক না কেন, উহার দ্বারা এই বােধ হইবেক, যে আপনি অযোধ্যাবাসী অধিকাংশ ব্যক্তিকে সেই প্রিয় সম্পত্তি লাভে বঞ্চিত করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন। পক্ষপাতশূন্য চিত্তে বিবেচনা করিলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, যে সকল রাজ্য বহু কাল অবধি বৃটশ গবর্ণমেন্টের করতলস্থ আছে, তত্ৰত্য লোকের বিদ্রোহাচরণ ও নূতন গৃহীত অযােধ্যা রাজ্যের বিদ্রোহ পরস্পর অনেক বিভিন্ন। অযোধ্যার নবাব ও তাহার পূর্ব- পুরুষের প্রজাদের উপরে যত কেন দৌরাত্ম করুন না, কিন্তু তাহারা কখনই সন্ধি ভঙ্গ করেন নাই, বিপদের সময়ে তাহারা অনেক বার আমাদের সাহায্য করিয়াছেন, 'ও তঁাহারা কখনই বৃটিশ গবর্ণমেন্টের প্রতিকূল ব্যবহার করেন নাই। আমরা সন্ধির নিয়ম লজন পূৰ্ব্বক অযােধ্যাধিপতিকে সিংহাসনচ্যুত বরিয়াছি। তৎপরেই তথায় ভূমির যেরূপ বন্দোবস্ত করা হয়, তাহাতে প্রধান প্রধান জমিদার চিরাধিকৃত ভূমি সম্পত্তিতে এক বারে বঞ্চিত হন। অতএব এরূপ অবস্থায় অযোধ্যায় যে বিদ্রোহ ঘটিয়াছে, তাহাকে ন্যায়ানুগত সং- গ্রাম বলিলেও অসঙ্গত হয় না। সুতরাং তন্নিমিত্ত অযােধ্যাবাদী- দিগের প্রতি কাঠিন্য প্রয়ােগ অপেক্ষা অনুগ্রহ প্রদর্শন করাই কর্তব্য। সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়, জেতৃগণ পরাজিতদিগের মধ্যে অনেককেই ক্ষমা করেন, অল্প ব্যক্তির শাস্তি বিধান করিয়া থাকেন। ૨૨ ১৭৫ লঘু চরিতমঞ্জরী। কিন্তু আপনি সেই প্রসিদ্ধ রীতির ঠিক বিপরীত কাৰ্য্য করিতেছেন। আপনি অল্প ব্যক্তির প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন ও অধিকাংশ ব্যক্তির শাস্তি বিধান করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন। বৃটিশ গবর্নমেন্ট প্ৰজাপুঞ্জের মনােরঞ্জন করিয়া রাজত্ব করেন, ইহাই আমাদের প্রার্থনীয়। কিন্তু সর্বসাধারণের ভূমি সম্পত্তি বাজে মাপ্ত করিলে প্রজাগণের সন্তোষের সম্ভাবনা কি ? রাজা অন্যায় করিতেছেন, ভাবিয়া যে রাজ্যের লােকে রাজদ্রোহী হয়, তথায় যত কেন সেনা থাকুক না, সে রাজত্ব কখনই চিরস্থায়ী হইতে পারে না। যদিও কোন রূপে সে রাজ্য রক্ষা করিবার সন্তা- বনা থাকে, তথাপি তাহা বাঞ্ছনীয় নহে। অতএব আমাদের ইচ্ছা এই, আপনি অযােধ্যাবাসিগণের প্রতি যে শাস্তি বিধান করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন, তাহা পরিত্যাগ করেন। লর্ড এলেনবরার এই পত্ৰ কলিকাতায় পৌঁছিবার পূর্বে উহা ইংলণ্ডে প্রচারিত হয়। পালিয়ামেন্ট সভার অধিকাংশ মেম্বর তাহার প্রতি রুষ্ট হন। এলেনবরা তদানীন্তন রাজমন্ত্রী ডৰ্বির ছিলেন। ইহাতে সকলে অনুমান করেন, মন্ত্রীর উপদেশে এলেনবরা পত্র লিখিয়াছেন। এজন্য তাঁহারা মন্ত্রীকে পদচ্যুত করিবার চেষ্টা পান, কিন্তু এলেনবরা স্বপদ পরিত্যাগ করিয়া মন্ত্রীকে পদস্থ রাখেন। তিনি স্পষ্টাভিধানে বলিয়া ছিলেন, যে মন্ত্রী আমার ঐ পত্রের বিষয় কিছুই জানেন না, আমি উহা নিজে লিখিয়াছি। অতএব উহার জবাবদিহি আমি নিজেই করিব। এদিকে লক্ষে হস্তগত হইবার পরে প্রধান সেনাপতি ক্যাম্বেল রােহিলখণ্ডে প্রবেশ করেন। বেরিলি বেরিলি নগর এই রাজ্যের রাজ- রােহিশখণ্ডে বিদ্রোহ ঘটিবার পরে, খাঁ বাহাদুর নামক এক ব্যক্তি তাকার বিদ্রোহীদের, অধ্যক্ষ হইয়াছিলেন। নানা- সাহেব প্রভৃতি যে সমস্ত ব্যক্তি গবর্ণমেন্টের প্রতিকূলে অস্ত্র ধারণ করেন, তন্মধ্যে এই খাঁ বাহাদুর কেবল যথারীতি রাজত্ব করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। তিনি রীতিমত রাজস্ব আদায় করিতেন এবং ধানী।

লড ক্যানিঙ। ৭১ নগরগুলিও সুরক্ষিত রাখিয়াছিলেন। সে যাহা হউক, বৃটিশ সেনা- পতি এক্ষণে আক্রমণ করতে বিদ্রোহীরা চতুর্দিকে পলায়ন করে। ৭ই মে বেরিলি নগর সম্পূর্ণ রূপে তাহার হস্তগত হয়। ইহার পরেই প্রধান সেনাপতি এলাহাবাদে ফিরিয়া আইসেন। এদিকে মধ্যভারতবর্ষ এবং বুন্দেলখণ্ডেও বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইয়াছিল। সৰু হিউবােজ ঐ সকল স্থান বিদ্রোহীদের হস্ত হইতে মুক্ত করিতে আদিষ্ট হন। তিনি তদনুসারে সসৈন্ঠে যাত্ৰা করিয়া ১৮৫৮ খ্রীঃ অব্দের প্রারম্ভে ইণ্ডোরে উপনীত হন ও তথায় বিদ্রো- হীদিগকে পরাস্ত করিয়া হল কারের আধিপত্য পুনঃস্থাপিত করেন। হিউরােজ এই রূপে অনেক অনেক উপদ্রুত প্রদেশ হইতে বিদ্রোহী দিগকে দূর করিয়া দিয়া পরিশেষে ঝান্সিতে আসিয়া পৌছিলেন। লর্ড ডেলহৌসী ঝান্সির রাণীর প্রতি যে অত্যাচার করেন, তাহার প্রতিশােধ দিবার নিমিত্ত রাণী লক্ষ্মীবাই তদবধি কৃতনিশ্চয় হইয়া- ছিলেন। ১৮৫৭ খ্রীঃ অব্দের এই বিদ্রোহ-বহ্নি প্রজ্বলিত হইলে তিনি পুরুষকার ইন্ধন দিয়া উহাকে বর্ধিত করেন। যে সমস্ত ইউরােপীয় তঁাহার রাজধানীতে ছিলেন, তিনি তাহাদের প্রাণ সংহার করেন। গােয়ালিয়ার রাজ্যের বিদ্রোহী সিপাই ও লক্ষৌ নগরের পলারি- তেরা আসিয়া রাণীর সেনার সহিত মিলিত হয়। নানার এক জন লেপ্টনেন্ট ছিলেন, তাহার নাম টান্টিয়া টোপী। গােয়ালিয়ার রাজ্যে বিদ্রোহ ঘটিবার পরে রাজা পলায়ন করেন, তদবধি টান্টিয়া টোপী বুদ্ধি-কৌশল ও চাতুরীর জন্য বিখ্যাত হন। তিনি এক্ষণে আসিয়া রাণীর সহায়তা করিতে লাগিলেন। রাণী এই রূপে বর্ধিত-সামর্থ হইয়া অস্ত্র ধারণপূর্বক অশ্বারােহীর বেশে এলে বৃটিশ-সেনাপতিকে আক্রমণ করেন। ইংরা জেরা যাহাকে কিছু কাল পূৰ্ব্বে রাজ্যশাসন কাফে অসমর্থ ভাবিয়া রাজ্য ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে সেই ঝান্সির রাণীকে প্রকৃতি- প্রদত্ত অধিনায়কত গুণে বিভূষিতা দেখিতে পাইলেন। রাণী আপনার সৈন্যচালন-নৈপুণ্যে প্রথমতঃ সরূ হিউরোজের ৩০ এ নৈসর্গিক অদ্ভুত । १२ লঘু চরিতমঞ্জরী। সেনাগণকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া ফেলেন, কিন্তু পরিশেষে তাহাকে রণে ভঙ্গ দিয়া কল্পি নামক স্থানে আসিতে হয়। তৎপরে এই স্থানে যে যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহাতে রাণী পরাজিত হন। কিন্তু পরাজিত হইয়াও উৎসাহহীনা হইলেন না, তিনি গােয়ালিয়ার রাজ্যে ১৮ই জুন পুনরায় বৃটিশ সেনাগণের উপরে আক্রমণ করেন। এই দিবস তাহার পক্ষীয় সেনারা শ্রেণী ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করে। কিন্তু ইহাতে রাণীর কিঞ্চিত্রও ন্যূনতা ছিল না, তিনি স্বীয় সেণাগণকে রণক্ষেত্রে আন- মন ও বিপক্ষ পক্ষকে বারম্বর ভয়ানক আক্রমণ করিয়াছিলেন। ইত্য- বসরে সরূ হিউরোজ স্বয়ং উষ্ট্রারােহী সেনা সমভিব্যাহারে দ্রুতবেগে রণক্ষেত্রে প্রবিষ্ট হন ও রাণীর সৈন্যশ্রেণী ভঙ্গ করিয়া দেন। সেনারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়াতে রাণীকে জয়লাভের আশা পরিত্যাগ করিতে হইল বটে, তথাপি তিনি প্রথমতঃ রণস্থল পরিত্যাগ করেন নাই। পরিশেষে ঝান্সি অপেক্ষাও প্রিয়তর বৈরনির্যাতন প্রয়াস বিফল হইল দেখিয়া পলায়ন করিতেছিলেন, এমত সময়ে কোন বৃটিশ সেনা তাহাকে এক জন তুরুকস ওয়ার বিবেচনা করিয়া ও তাঁহার বক্ষঃস্থলে দোলায়মান হার লোভে আকৃষ্ট হইয়া থঙ্গাঘাতে তাহার প্রাণ সংহার করে। এক জন বৃটিশ সেনা কর্তৃক অপকৃত রাণীর এই রূপ ভয়ঙ্কর পরিণামের বিষয় আমরা নিঃসংশয়ে বলিতে পারি না কিন্তু ইহা দৃষ্ট হইয়াছিল, যে তিনি ক্ষত ও রক্তাক্ত কলেবরে প্রান্তর মধ্যে পতিত ছিলেন। বৃটিশ সেনাপতি হিউরােজ ঘোরতর বিপক্ষ হইয়া ও রাণীর ব্রীরােচিত গুণগ্রামের এরূপ পক্ষপাতী হন, তিনি স্পষ্টাভিধানে বলিয়া গিয়াছেন, বিপক্ষ পক্ষে কেবল সমর- শায়িনী ঝান্সির রাণীই যথার্থ পুরুষকারসম্পন্ন ছিলেন। সে যাহা হউক, রাণীর নিধনের পরে টান্টিয়া টোপী পলায়ন করেন এবং সিন্ধিয়। সিংহাসনে পুনঃস্থাপিত হন। লর্ড ক্যানিং ভারত য প্রধান শাসনকর্তার পদ গ্রহণ করিলে পর এই বিদ্রোহরূপ যে মহন,টকের আরম্ভ হইয় ছিল, গোয়ালিয়ার রঙ্গভূমির অভিনয়ক্রিয়াতে তাহার পরিসমাপ্তি হইল।

লর্ড ক্যানিঙ। ১৭৩ , ১৭৫৬ খ্ৰীঃ অব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাস্ত , করিয়া ইং- রাজের ভারতবর্ষে আধিপত্য স্থাপন করেন। তদবধি এক বৎসর ভারতরাজ্য কোম্পানির হস্তে ছিল। ভারতবর্ষ বৃটিশ সাম্রা- জ্যের অলঙ্কার স্বরূপ। এই রাজ্য হস্তগত থাকাতেই ইংরাজদের বল ও বুদ্ধিকৌশল দিক দিগন্ত ব্যাপী হইয়া উঠিয়াছে। এখানে ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ ঘটনা হওয়াতে ইংলণ্ডের কর্তৃপক্ষের ভাবিলেন, এতাদৃশ বিস্তীর্ণ ভারত রাজ্য এক দল বণিকের হস্তে রাখা আর কর্তব্য হয় না। এই বিবেচনায় মহারাণী বিক্টোরিয়া স্বহস্তে আমা- দের ভার গ্রহণ করিলেন। ১৮৫৮ খ্ৰীঃ অব্দের ১লা নবেম্বর লর্ড ক্যানিঙ মহারাণী বিক্টো- রিয়ার ঘোষণাপত্র প্রচার করেন। উহার মৰ্ম্ম এই, মহারাণী সুনিয়মে প্রজাপালন করিবেন ও উহাদের ধর্মের উপরে কখনই হস্তক্ষেপ করিবেন না এবং ভারতবর্ষে তাহার যে রাজ্য আছে, তাহারও বৃদ্ধি। করিবার চেষ্টা পাইবেন না। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষীয় রাজগণের সহিত যেরূপ নিয়মে সন্ধি করিয়াছিলেন, মহারাণী তাহা প্রতিপালন করিবেন। ধর্ম ও জাতিভেদ না করিয়া, যিনি যেরূপ উপযুক্ত হইবেন, তাহাকে সেই রূপ রাজকার্যে নিযুক্ত করিবেন। ভূমি সম্পত্তিতে যাহার যে অধিকার আছে, মহারাণী তাহাতে হস্তক্ষেপ করিবেন না। আইন প্রস্তুত ও তদনুযায়ী কাৰ্য্য করিবার সময়ে ভারতবর্ষীয়দিগের প্রাচীন স্বত্বাধিকার ও রীতি নীতির দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি রাখিবেন। যাহারা অন্যের কুমন্ত্রণায় প্রতারিত হইয়া বিদ্রোহে অভ্যুত্থান করিয়াছিল, যদি তাহারা এক্ষণে রীতিমত প্রজাধৰ্ম্ম পালন করে, মহা- রাণী তাহাদিগকে ক্ষমা করিবেন, তবে যে সকল বিদ্রোহী ইংরাজ- হত্যা পাপে সাক্ষাৎ লিপ্ত হইয়াছে, কেবল তাহাগই ক্ষমার যােগ্য নহে। ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শনের যে নিয়ম নির্দিষ্ট হইল, যাহারা আগামী জানুয়ারি মাসের পূর্বে ঐ নিয়ম প্রতিপালন করিবে, তাহা দিগকেই ক্ষমা করা যাইবে।

১৭৪ লঘু চরিতমঞ্জরী। শান্তি স্থাপনের পর মহারাণী কৃষি বাণিজ্য প্রভৃতি হিতকর বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করিবেন। যে সকল বিদ্রোহী' ধৃত অথবা নিহত হয় নাই, প্রত্যুত চারি দিকে লুট পাট করিতে ছিল, উল্লিখিত ঘোষণা প্রচার হইবার পরে তাহ- দের মধ্যে অনেকেই অস্ত্র শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া আত্ম সমর্পণ করে। বিদ্রোহকালে পাতিয়ালার রাজা নেপালের সেনাধ্যক্ষ জং বাহাদুর প্রভৃতি উত্তর পশ্চিম প্রদেশীয় প্রধান প্রধান ব্যক্তি গবর্ণ- মেন্টের যে সাহায্য করেন, লর্ড ক্যানিঙের অন্তঃকরণে তাহা দৃঢ়রূপে অঙ্কিত হইয়াছিল। তিনি বিদ্রোহ শান্তির পরে যথাযােগ্য রূপে তাহাদের সম্মান বর্জন করেন। লর্ড ক্যানিং, এক্ষণে অযােধ্যার শাসনকার্যে মনােনিবেশ করি- লেন। লর্ড ডেলহৌসী অযােধ্যা বৃটিশ অধিকার ভুক্ত করিবার পরে তথাকার ভূমির যেরূপ বন্দোবস্ত করিয়া যান, তাহাতে প্রধান প্রধান জমিদার চিরাধিকৃত ভূমি সম্পত্তিতে একবারে বঞ্চিত হন। লড ক্যানিং, এক্ষণে সেই বন্দোবস্ত সংশােধন করিলেন। তারা জমিদারগণের পুরাতন স্বত্ব বজায় হইল। ইহাতে ভঁহাদের অস। ন্তোষভাব দূরীকৃত হয় এবং অযযাধ্যায় শাসন কাৰ্য্যও সুন্দর রূপে চলিতে থাকে। দিল্লী, কানপুর প্রভৃতি উত্তর পশ্চিম প্রদেশীয় যে সকল স্থান বিদ্রোহকালে গবর্ণমেন্টের হস্ত-বহিভূত হস্ত-বহিভূত হইয়াছিল, ঐ সকল স্থানেও আর কোন গােলযােগ ছিল না, তথাকার শাসন- কাৰ্য যথানিয়মে নিৰ্বাহ হইতেছিল। কিন্তু ঐ সময়ে বাঙ্গালার নীল-প্রধান প্রদেশের কৃষকেরা অসন্তোষ চিহ্ন প্রকাশ করিতে আরম্ভ করে। উহারা দিন অবধি নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে নির্ভর নিপীড়িত হইতেছিল, ঐ সময়ে সেই অত্যাচার বার পর নাই বাড়িয়া উঠে। পূর্বে কৃষকদের এই একটী ভ্রান্তি ছিল, যে নীল বপন গবর্ণ- মেন্টের আদেশ ক্রমেই কব্বান হইয়া থাকে। ক্রমে এই বিষয়টী তদা- নীন্তন লেপ্টনেন্ট গবর্ণর মহানুভাব গ্রাস্টের কর্ণগােচর হয়। গ্রান্ট অনেক লর্ড ক্যানিঙ। ১৭৫ অতিশয় ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তাহার যত্নে কৃষকদের ঐ ভ্রান্তি দূরী- কৃত হয়। তখন তাহারা নীল বপন বিষয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ • করিতে লাগিল, সুতরাং প্রজাদের সহিত নীলকরদিগের বিবাদ আরম্ভ হইল। ১৮৬০ খ্ৰীঃ অব্দের মার্চ মাসে একটী অনিষ্টকর কনটাক্ট আইন বিধিবদ্ধ হয়। তাহাতে নীলকরদিগের পক্ষে বিলক্ষণ সুবিধা হইল, কিন্তু প্রজাদের উপরে যার পর নাই অন্যায় অত্যাচার হইতে লাগিল। পূর্বে প্রজারা নীলের দাদন লইয়া চুক্তিমত নীল না দিলে তাহাদের নামে কেবল দেওয়ানি আদালতে নালিশ হইত, কিন্তু ঐ আইন হইবার পর ফৌজদারি আদালতেও নালিশ হইতে লাগিল। ফলতঃ তৎকালে নীলপ্রধান প্রদেশে একপ্রকার অরাজক কাণ্ড উপ- স্থিত হইয়াছিল। কি সদোষ কি নির্দোষ, সকল প্রজাকেই ঐ আই- নের বিষময় ফল ভােগ করিতে হইল, কিন্তু আনন্দের বিষয় এই যে, ঐ আইনটী ছয় মাসের অধিককাল প্রচলিত ছিল না । এই সময়ে প্রজাদের সৌভাগ্যক্রমে লেপ্টনেন্ট গবর্ণর গ্রান্ট মফঃ স্বলে যান। প্রজারা দরখাস্ত হাতে করিয়া নদীর উভয় তীর দিয়া তাহার ইষ্টিমারের ধারে ধারে দৌড়িতে ও আর্তনাদ করিয়া আপনা- দের দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিল। গ্রান্ট অতিশয় দয়ালু ছিলেন, তিনি প্রজাদের আর্তনাদ শুনিয়া দুঃখিত হইলেন ও অবিলম্বে লড ক্যানিঙকে লিখিয়া পাঠাইলেন, আমি কখনই এত অধিক প্রজাকে দরখাস্ত হাতে করিয়া আর্তনাদ করিতে দেখি নাই। ইহাতে আমার প্রীতি হইতেছে, নীলকরের প্রজাদের উপর অত্যাচার করিয়া থাকেন। লর্ড ক্যানিঙ নীলক রদিগের কাৰ্য অনুসন্ধানৰ্থ একটা কমিমন বসাইলেন। বাঙ্গলা গবর্ণমেন্টের সেক্রেটরি সিটন কার সাহেব এই কমিশনের অধ্যক্ষ, শ্ৰীযুক্ত বাবু চন্দ্রমােহন চট্টোপাধ্যায় আর তিন জন ইংরাজ মেম্বর হন। তঁাহার। নীলকরদিগের কাৰ্য্য অনুসন্ধান করিয়া একখানি রিপাের্ট করেন। তারা এই সপ্রমাণ হয়, যে প্রণালীতে নীল বপন কার্য সম্পন্ন হইয়া থাকে, তাহ। প্রজাদের জ ১৭৬ লঘু চরিতমঞ্জরী। পক্ষে শ্রেয়স্করণ নহে। তৎপরে গবর্নমেন্ট যে উপায় অবলম্বন করেন, তারা • প্রজাদের অনেক সুবিধা হয়। এস্থলে ইহ। উল্লেখ করা আবশ্যক, যে তৎকালে মহাত্মা অ্যালি ইডেন কটকে মাজিষ্ট্রেট ছিলেন। তিনি নীলকর নিপীড়িত প্রা- গণের দুঃখে অতিশয় দুঃখিত হন ও কলিকাতায় নীলকরদিগের কাৰ্য্য অনুসন্ধানার্থ কমিসন্ বসিবার পরে স্বয়ং আসিয়া নিরীহ প্রজাগণের অনুকূলে স্বাক্ষ্য প্রদান পূর্বক স্বীয় ন্যায়পরতা ও অপক্ষপাতিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। অধুনা তিনি এই বঙ্গদেশের লেপ্টনেন্ট গবর্ণর হইয়াছেন। যদিও এক্ষণে রাজকার্য্যের অনুরােধে যে সকল ষয়ে হস্তক্ষেপ করিতেছেন, তাহাতে সকল সময়ে সকল সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট করা তাহার পক্ষে সম্ভব নহে, তথাপি তিনি আপনার সেই স্বাভাবিক সদ্গুণের পরিচয় বিশিষ্টরূপে প্রদান করিতেছেন। সেই সময়ে নীল দর্পণ নামক এক খানি নাটক প্রচারিত হয়। তাহাতে নীলকরদিগের অত্যাচারের বিষয় বিশেষ রূপে বর্ণিত হই য়াছিল । সদাশয় রেবারে লঙ সাহেব প্রজাদের দুঃখ রাজপুরুষ- গণের গােচর করিবার অভিপ্রায়ে ইংরাজী ভাষায় ঐ নাটকের অনু- বাদ করেন। ইহাতে তাহার নামে সুপ্রীমকোর্টে এই অভিযোগ উপস্থিত হইল, হইল, যে তিনি নীল-দর্পণের ভূমিকায় লিখিয়াছেন, ইংরাজী সংবাদ পত্রের দুই জন সম্পাদক জন সম্পাদক সহস্র টাকা উৎকোচ লইয়া নীলকরদিগের পক্ষ সমর্থন করেন এবং ঐ পুস্তকের অনুবাদ মধ্যে নীলকরদিগের কুৎসা লিখিয়াছেন। বিচারপতি ওয়েস সাহেবের সম্মুখে এই মোকদ্দমা উপস্থিত হয়। জুরিরা সকলেই ইংরাজ ছিলেন, তাঁহারা লঙ সাহেবকে দোষী স্থির করিয়া দিলেন। অনন্তর বিচারপতি ওয়েলস লঙ, সাহেবের সহস্র টাকা জরিমানা করেন ও এক মাস কারাবাসের আদেশ দেন। সুপ্রসিদ্ধ বাবু কালী প্রসন্ন সিংহ মহােদয় ঐ টাকা প্রদান করেন, কিন্তু দণ্ডের অবশিষ্ট ভাগ বঙ্গদেশের হিতৈষী লঙ সাহেবের শরীরের উপর দিয়াই যায়। নীলকরেরা প্রজাদের উপরে যে, ঘােরর অত্যাচার করিতেন, লঙ লর্ড ক্যানিং। ১৭: সাহেবের অন্তঃকরণে তাহা, এরূপ. অঙ্কিত হইয়াছিল, যে, তিনি উক্ত প্রকারে দণ্ডিত হইয়াও প্ৰজা পক্ষ সমর্থনে ত্রুটি করেন নাই। তিনি জেলে থাকিয়াও ‘মার কিন্তু শুন” (Strike but hear) এই শিরোনাম দিয়া এক গ্লানি ইংরাজী পুস্তক রচনা করেন। লর্ড ষ্টালি ভারতবর্ষের সেক্রেটরী হইয়া ১৮৫৮ খ্ৰীঃ অব্দেয় শেষে লর্ড ক্যানিঙকে পতিত ভূমির বন্দোবস্ত করিবার আদেশ করেন। ক্যানিঙ অন্যান্য বিষয়ে ব্যস্ততা প্রযুক্ত দুই বৎসর কাল ঐ আদেশ প্রতিপালন করিতে করিতে পারেন নাই। তিনি ১৮৬১ খ্রীঃ অব্দের ১৭ই অক্টোবর এই আজ্ঞা প্রচার করিয়া দিলেন, যিনি পতিত ভূমি ক্রয় করিবার জন্য প্রথম দরখাস্ত করিবেন, তাহাকে ৭০ টাকার হিসাবে সাড়ে তিন বিঘা করিয়া ভূমি দেওয়া যাইবে। কিন্তু যদি অনেকে প্রার্থী হন, তবে ঐ ভূমি নীলামে বিক্রীত হইবে, যিনি সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক মূল্য ডাকিবেন, তাহাকেই দেওয়া যাইবে। যৎকালে লর্ড ক্যানিং ঐ আজ্ঞা প্রচার করেন, তখন ইহার কোন আইন বিধিবদ্ধ হয় নাই। পশ্চাৎ ১৮৬২ খ্রঃ অব্দের ১২ই মার্চ আইনটা বিধিবদ্ধ করা হইল। কিন্তু সরু চার্লস উড় ভারতবর্ষের সেক্রেটরি হইয়া ঐ আইনটা অন্যায় হইয়াছে বলিয়া রহিত করি- লেন ও এই আদেশ দিলেন, যে সমুদায় পতিত ভূমি নীলামে বিক্রীত হইৰে। সে যাহা হউক, পতিত ভূমি বিক্রয়ের আজ্ঞা প্রচারের পর অনেক ইউরােপীয়, আসাম ও দারজিলিঙ প্রভৃতি স্থানে ভুমি ক্রয় করিয়া তথায় চার চাস করিতেছেন। ১৮৬২ খ্ৰীঃ অব্দে লর্ড ক্যানিং তিটা ব্যবস্থাপক সভা স্থাপিত করেন। একটা বাঙ্গালা দেশে, একটা বােম্বে ও একটা মান্দ্রাজে। প্রত্যেক সভায় তৎৎ প্রদেশের লেপ্টনেন্ট গবর্নর সভাপতি হন এবং সেই সেই সভায় সেই সেই দেশের আইন প্রস্তুত হইতে আরম্ভ এতদ্ভিন্ন গবর্নর জেনরলের একটা স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপক হইল। তাহাতে গবর্নর জেনল স্বয়ং সভাপতি হইলেন। ভারত- বৰ্ষ সাধারণ যে কোন ব্যবস্থা। প্রণয়নের প্রয়ােজন হয়, এই সতেই লঘু চরিতমঞ্জরী। তাহার প্রস্তাব হইয়া তাহা বিধিবদ্ধ হইয়া থাকে। এই ঘটনাটাকে ভারতবর্ষের একটা প্রধান ঘটনা বলিতে হইবেক। কারণ এই নুতন প্রকার ব্যবস্থাপক সভার সৃষ্টি হওয়াতে এদেশীয় সন্ত্রান্ত ব্যক্তি রাজপুরুষের ইউরোপীয়দিগেরও ব্যবস্থা প্রণয়নে এবং লর্ড ক্যানিং ১৮৬২ খ্রীঃ অব্দের মার্চ মাসে পদ পরিত্যাগ করিয়া ইংলও যাত্রা করেন। কিন্তু তিনি ইংলণ্ডে পৌছিতে না পৌছিতেই মুহাশয় রোগে আক্ৰান্ত হন ও উক্ত অব্দের ১৭ই জুন কলেবর পরিত্যাগ করেন। ক্যানিং ভারতবর্ষে থাকিতে থাকিতেই তাহার পত্নীর পরলোক • প্রাপ্তি হয়। তাঁহার আর কেহই উত্তরাধিকারী ছিলেন না। সুতরাং তাহার বংশের মান সম্রম তাহার সঙ্গে সঙ্গেই তিরােহিত হইল। কিন্তু তাহার যশঃশরীর চিরকাল ভারতবর্ষের অকৃত্ৰিম কৃতজ্ঞতার আস্পদ হইয়া থাকিবে। আমরা মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি, যে ভারতবর্ষের কোন গবর্ণর জেনলকে তাহার ন্যায় তাদৃশ সঙ্কটাপন্ন সময়ে এদেশের শাসনভার গ্রহণ করিতে হয় নাই, কিন্তু তিনি যেরূপ বুদ্ধিমত্তা, নীতিনিপুণতা ও দূরদর্শিতা সহকারে সেই সমস্ত দুরতিক্রম বিপদের মস্তকে আরােহণ করিয়াছিলেন, তারা তাহার নাম ইহার মধ্যেই ইতিহাস গ্রন্থে জাজল্যমান হইয়া উঠিয়াছে। সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Laghu Charita Manjari

Author
Ray,kali Prosanno
Title
Aitihasik Prabandha
File name
Laghu Charita Manjari
Text
OCR done
Citation
1880
Published
2009/10/20
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
192
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Account Of Late Mutiny In Bengal
DLI number
512849
Barcode
4990010019883.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ZK2As7mJev1
Download PDF

Laghu Charita Manjari