Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Raja Ganesh

Majumder ,sureshchandra · 2010/03/23

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রাজা গণেশ
( ঐতিহাসিক নাটক
শ্রীসুরেশচন্দ্র মজুমদার প্রণীত
গ্রন্থকার কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মূল্য এক টাকা

বিমলেন্দুকুমার মৈত্র
বিজয়া সাহিত্য মন্দির
কাশীধাম ও রাজশাহী
প্রবাসী প্রেস,
১২/২, আপার সার্কুলার রােড, কলিকাতা
শ্ৰমাণিকচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত

ভূমিকা বাঙালীও যে একদিন বীর ছিল, বাঙালীও যে প্রবল শত্রুর সহিত অকুতোভয়ে যুদ্ধ করিত, অকাতরে সম্মুখসমরে প্রাণ বিসর্জন করিত, সিংহলের ন্যায় দূরতর প্রদেশেও বিজয়পতকা উড়াইবার সামর্থ্য রাখিত, তাহা বর্তমান বাঙালী জাতি এখনও প্রাণে প্রাণে অনুভব করিতে পারে নাই। ইতিহাসের পুরাতন পৃষ্ঠায় বাঙালীর বীরত্বের প্রচুর উজ্জ্বল নিদর্শন থাকিলেও সমগ্র জাতিকে অভিভূত করিয়া রাখিয়াছে জরাগ্রস্ত লক্ষ্মণ সেনের পলায়নের মিথ্যা কাহিনী ইউরােপীয় মহাসমরে মেসােপটেমিয়ার যুদ্ধে যােগদান জয়লাভ করিয়া বাঙালী যতটুকু আত্মপ্রত্যয় লাভ করিয়াছে, তাহাতেই সে স্বদেশের পূর্বতন বীরগণের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়াছে। তাই বর্তমান সময়ে গৌড়বীর শশাঙ্ক, রাজা প্রতাপাদিত্য, রাজা সীতারাম, রাজা গণেশ প্রভৃতি বাঙালী বীরগণের জীবনকাহিনী, ইতিহাস, নাটক বা কাব্যের আকারে প্রকাশিত এবং বাঙালী পাঠকপাঠিকাগণ কর্তৃক সমাদৃতও হইতেছে। ভক্তবীর গিরিশচন্দ্র, কবিবর দ্বিজেন্দ্রলাল এবং নাট্যশিল্পী ক্ষীরােদপ্রসাদের তিরােভাবের পর হইতে বাংলার নাট্য সাহিত্যের ভাণ্ডার আর পূর্বের ন্যায় উৎকৃষ্ট দ্রব্যসম্ভারে পূর্ণ হইয়া উঠিতেছে । এই দুঃসময়ে উদীয়মান সাহিত্যিক শ্ৰীযুক্ত সুরেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয়ের নাট্যক্ষেত্রে প্রবেশ খুবই একটা সুলক্ষণ সন্দেহ নাই। ইতঃপূর্বে তিনি মহারাজা সীতারাম নামক একখানি মনােরম নাটক বাঙালী জাতিকে উপহার দিয়াছেন, সম্প্রতি বঙ্গগৌরব বীরবর রাজা গণেশের পুণ্যচরিতকাহিনী ইতিহাসের অন্ধকারময় গহ্বর হইতে উত্তোলন করতঃ একখানি অত্যুজ্জ্বল নাটকের আকারে তিনি বাঙালীর হস্তে অৰ্পণ করিতেছেন দেখিয়া আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছি। আমাদের অধিকতর আননের বিষয় এই যে, রাজা গণেশ মুসলমান নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া বসিংহাসন অধিকার করিলেও গ্রন্থখানিতে হিন্দুমুসলমান মিলনের আগ্রহই বিশেষ পরিস্ফুট হইয়াছে ; আর তাহাও হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ধর্ম বিসর্জন দিয়া নহে, পরন্তু রক্ষা করিয়া। রাজা গণেশ অহিংসার উপাসক হইয়াও ঘটনাস্রোতেই অসি ধারণ করিতে বাধ্য হইয়াছেন। তাহার চরিত্র তৎকালের ন্যায় বর্তমান কালেরও আদর্শস্থানীয়। নাটকীয় অন্যান্য চরিত্রগুলিও বিশেষ পরিস্ফুট ও স্বাভাবিক হইয়াছে, এই ক্ষুদ্র ভূমিকায় সমস্তগুলি বিশ্লেষণের স্থানাভাব, আবার একটিকে রাখিয়া অন্যটির কথা বলিতে গেলেও গ্রন্থকারের প্রতি ঘাের অবিচার করা হয়। তথাপি আমরা রাজা গণেশের মহিষী মহারাণী ত্রিপুরেশ্বরী এবং আজিম শাহের কন্যা আমানতারার কথা না বলিয়া কিছুতেই আমাদের কর্তব্য শেষ করিতে পারিতেছি না। মহারাণী ত্রিপুরেশ্বরী রাজা গণেশের যােগা সহধর্মিণী—ঠিক সিংহীর ন্যায় তেজস্বিনী। তাহারই শক্তিতে শক্তিমান হইয়া সপ্তদুর্গার সামান্য ভূস্বামী গণেশনারায়ণ পরাধীনতার শৃঙ্খল চুর্ণ করিয়া দেশের স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছিলেন। এই মহীয়সী বঙ্গনারীর কথা মনে করিলে গর্বে সমস্ত বুকটা ভরিয়া উঠে না কি ? আবার সুরেশবাবুর সুনিপুণ তুলিকায় আসমানতারার যে চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা আমাদের এই দুর্ভাগ্য বঙ্গদেশে দুর্লভ সন্দেহ নাই। আমানতারা একাধারে কঠিন ও কোমল, উজ্জল ও মধুরা। একদিকে যেমন ভিনি পিতৃসেবাকে জীবনের একটা পবিত্র ও প্রধান ব্ৰত বলিয়া মনে করেন, অন্যদিকে আবশ্যক হইলে বন্দুক হাতে রণাঙ্গনে ঝাপাইয়া পড়িতেও কালবিলম্ব করেন না। প্রখর বুদ্ধিশালিনী বুদ্ধিশালিনী স্বদেশপ্রেমিকা আসমান একটা জীবন্ত প্রতিমারূপেই এই নাটকে প্রতিভাত হইয়াছেন। এরূপ গ্রন্থের সমাদর হওয়া শুধু বাঞ্ছনীয় নহে, অত্যন্ত আশাপ্রদ এবং জাতির অশেষ কল্যাণকর। ইতি। মাষ শুরু দ্বিতীয় বিনীত লগিরিজাকাৰু শৰ্ম্মা গােস্বামী, কাব্য-সাংখ্য-তিতীর্থ } সন ১৩৩৮

উৎসর্গ
প্ৰবৰ্ত্তক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গজননীর একনিষ্ঠ সেবক
শ্ৰীযুক্ত মতিলাল রায় মহাশয়ের করকমলে শ্রদ্ধা
ও প্রীতির নিদর্শন স্বরূপ আমার অতি
আদরের এই ‘রাজা গণেশ সাদরে
অৰ্পণ করিলাম।
বিজয়া সাহিত্য মন্দির।
রাসপূর্ণিমা–১৩৩৮
সুরেশচন্দ্র শর্মা

No text on this page.

রাজা গণেশ ( ঐতিহাসিক নাটক) চরিত্র পুরুষগণ সপ্তদুর্গার রাজা, পরে গৌড়েশ্বর ঐ পুত্র গণেশনারায়ণ যদুনারায়ণ জীবনচন্দ্র রায় দুর্গাচরণ অবনীনাথ কালিকানন্দ স্বামী নসেরিৎ শাহ, আজিম শাহ, বক্তার খা ইশা খা দীননাথ প্রাণনাথ কেদারনাথ গণেশের মন্ত্রী ঐ সেনাপতি সাতােরের রাজা গণেশের গুরুদেব গৌড়সম্রাট ঐ ভ্রাতা ঐ সেনাপতি ঐ সহকারী বুদ্ধগণ স্ত্রীগণ রাণী ত্রিপুরেশ্বরী নৰকুমারী আসমানতারা মেহেরুন্নিসা গণেশনারায়ণের মহিষী অবনীনাথের কন্যা আজিম শাহের কন্যা নসেরিৎ শাহের বেগম বেলা পারুল নবকুমারীর সখীগণ সৈনিকগণ, প্রহরীগণ, নৰ্তকীগণ ইত্যাদি

No text on this page.

শুদ্ধিপত্র
অনিবার্য কারণে পুস্তকে কতকগুলি ছাপার ভুল রহিয়া গিয়াছে।
সহৃদয় পাঠকগণ সেজন্য গ্রন্থকারকে ক্ষমা করিবেন এবং নিম্নলিখিত
তালিকা-দৃষ্টে ভ্রমগুলি সংশােধন করিয়া লইবেন।
পৃষ্ঠা পংক্তি
গাণ
৩১
শেষ
শােন
( বক্তা) জীবন
( বক্তা) গণেশ
৩২
১৭
( বক্তা) গণেশ
( বক্তা) জীবন
আমার
স্বপনেরি
আমার
৯ ৬
२०
কুটুম্ব
মর্শে
১৪
২২
মন্মে

No text on this page.

রাজা গণেশ প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য সপ্তদুর্গা-চলন হ্রদের বাঁধাঘাট গণেশ ও দুর্গাচরণ সােপানের উপর আসীন গণেশ। দেখ দুর্গাচরণ, আমাদের এই ক্ষুদ্র সপ্তদুর্গা দ্বীপটি আমার চক্ষে যে কত সুন্দর দেখায়, তা বলবার মত উপযুক্ত ভাষা আমি খুঁজে পাই না। চারিদিকে দিগন্তপ্রসারিত সুনির্মল বারিরাশি, তারই মধ্যে সপ্তগড় শশাভিত আমাদের এই দুর্গ-নগরী শত্রুর আক্রমণকে উপহাস করে সগৰ্বে আকাশের গায়ে মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে। যতই আমি মনে মনে এই সলিলপ্রাচীররক্ষিত সুন্দর দ্বীপটির কথা আলােচনা করি, ততই যেন গর্বে ও উন্মাদনায় আমার বক্ষস্থল স্ফীত হয়ে ওঠে। দুর্গাচরণ। সত্য মহারাজ। সত্য মহারাজ। আপনার পিতামহ সুবুদ্ধি ভাদুড়ীদেব গৌড়সম্রাট সামসুদ্দীন শাকে যুদ্ধে সাহায্য করার পুরস্কার-স্বরূপ এই জায়গীরটুকু পেয়ে এখানেই রাজা উপাধি নিয়ে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। সেই থেকে আপনাদের বংশ বরাবর সপ্তদুর্গায় রাজত্ব করে বরেন্দ্রভূমির মধ্যে সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজা বলে গণ্য হয়ে আসছে।

২ রাজা গণেশ [১ম অঙ্ক গণেশ। তা জানি দুর্গাচরণ, কিন্তু এই নামমাত্র রাজত্ব আর প্রতাপ চন্দ্রের কলঙ্কের মত আমাদের ললাটে কেবল দাসত্বের চিহ্নই এঁকে দিচ্ছে। দুর্গাচরণ। সত্য মহারাজ। আজ হিন্দুর আর কোন স্বাধীন ইচ্ছা, স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা নেই ; ধৰ্মকৰ্ম্ম সব লােপ পেয়েছে। জাতির দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। সে-সব ভাবতে গেলেও হৃদয় অবসন্ন হয়। তাই ইচ্ছা করে একবার চেষ্টা করে দেখি । হিন্দুজাতি নিদ্রিত বটে, কিন্তু সে নিদ্রা এখনও মহানিদ্রায় পরিণত হয় নি। ইচ্ছা করলে এখনও এরা উঠে দাড়াতে পারে। গণেশ। সত্যই বলেছ দুর্গাচরণ, যে, হিন্দু এখনও উঠে দাঁড়াতে পারে। শুধু তাদের কানে চেঁচিয়ে বলতে হবে যে, তারা এখনও মরেনি, বেঁচে আছে। হিন্দুর এটা ঠিক ঘুম নয়, এটা দারুণ মােহের লক্ষণ। মােহ একবার ভেঙে দিতে পারলে এরা দুনিয়াতে অসাধ্য সাধন করতে পারবে। চাই—শুধু বােগ্য সাধক। দুর্গাচরণ। আপনার চেয়ে এ কাজের যােগ্য আর কে আছে মহারাজ ? গণেশ। তা জানি নে দুর্গাচরণ : অমাবস্যার ভীষণ রাত; শব- সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হবে। ব্ৰত কঠিন বটে, তবে নিরাশ হবার কারণ নেই। এস আমরা বুকভরা আশা নিয়ে কর্মের সাগরে ঝাপিয়ে পড়ি। [ জীবন রায়ের প্রবেশ } জীবন। মহারাজ, এ অপমান কি আপনি নীরবেই সহ্য করবেন ? গণেশ। কি অপমান জীবন ? জীবন। সাঁতােরের রাজা অবনীনাথ দসর্দার শ্যামাদ ও রামাদকে বশীভূত করে সমস্ত চলনবিল তার অধিকারভুক্ত বলে দাবী

১ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
করছেন। আপনিই এতকাল চলনবিলের একাধীশ্বর ছিলেন। এখন কি
চোখের উপর অবনীনাথের আধিপত্য দেখে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন ?
গণেশ। আমি ইতিপূৰ্বেই রাজা অবনীনাথকে চলনবিলের উত্তরার্ধ
আমায় ছেড়ে দেবার জন্য পত্র লিখেছি ; দেখি তিনি কি উত্তর দেন।
[ জনৈক দূতের প্রবেশ ]
দূত। মহারাজ, দাসের কোটী কোটী প্রণাম গ্রহণ করুন। রাজা
অবনীনাথ আপনাকে এই পত্র পাঠিয়েছেন। (পত্র প্রদান )
গণেশ। [ পত্র গ্রহণ করিয়া পাঠ]
স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠ
মহারাজ শ্ৰীযুক্ত গণেশনারায়ণ ভাদুড়ী মহােদয়
করকমলেষু
মহারাজের পত্র আমি যথাসময়ে পাইয়াছি। মহারাজ চলনবিলের
উত্তরার্ধ নিজ সম্পত্তি বলিয়া দাবী করিয়া উহা আমাকে ছাড়িয়া
দিবার জন্য অনুরােধ করিয়াছেন। কিন্তু একান্ত পরিতাপের বিষয়
এই যে, আমি মহারাজের এই অনুরােধ বা আদেশ রক্ষা করিতে
অক্ষম। সমগ্র চলনবিল প্রকৃতপক্ষে দস্তসদ্দার শ্যামাদ ও রামাদের
অধীন ছিল। তাহাদিগকে যখন আমি নিজ বাহুবলে আমার
অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করিয়াছি তখন চলনবিলও তাহাদের সঙ্গে
সঙ্গে আমার অধীনে আসিয়াছে। অতএব আপনার দাবীকে আমি
সম্পূর্ণ অন্যায় বলিয়া ঘােষণা করিতেছি। কেবলমাত্র সপ্তদুর্গা দ্বীপ
ভিন্ন চলনবিলের সূচ্যগ্ৰপ্রমাণ ভূমিও আমি আপনার বলিয়া
স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহি। ইতি
শুভাকাঙ্ক্ষী
শ্ৰীঅবনীনাথ শৰ্মা

৪
রাজা গণেশ
[ ১ম আৰু
গণেশ [ দূতের প্রতি ] উত্তম, তুমি এখন বিদায় হতে পার।
পত্রের উত্তর আমি সময়ান্তরে পাঠাব ।
দূত। যথা আজ্ঞা মহারাজ।
[ প্রস্থান।
জীবন। দেখলেন মহারাজ, কেমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্ৰ ? এখনও
কি আপনি এ অপমান নীরবে সহ্য করতে চান ?
গণেশ। যুদ্ধ ভিন্ন দেখছি এর প্রতীকার হবে না। এরকম
গৃহযুদ্ধ দেশের মন্দ বই ভাল করে না। কিন্তু উপায় যখন নেই, তখন
যুদ্ধেরই আয়ােজন কর ।
জীবন। তা হলে এখনই দুর্গাচরণকে আদেশ
আদেশ দিন, শীঘ্র
অবনীনাথকে ভাল করে শিক্ষা দিয়ে আসুক।
গণেশ। শােন দুর্গাচরণ, আমি বৃথা সময় নষ্ট করতে চাই নে।
তুমি দিনরাত্রি পরিশ্রম করে সৈন্যদের সুশিক্ষিত কর। আজ থেকে
এক সপ্তাহের মধ্যে আমি অবনীনাথের রাজধানী আক্রমণ করব ।
দুর্গা। আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ। দাস অবশ্যই
আদেশ পালন করূবে ।
[ সকলের প্রস্থান ।
[ একটু পরে হুকা টানিতে টানিতে দীননাথ,
প্রাণনাথ ও কেদারনাথের প্রবেশ ]
দীননাথ। ওহে ভায়া, একটা টাকা খবর শুনেছ?
প্রাণনাথ। কি খবর দাদা? বলি মিষ্টি কিছু আছে নাকি ?
দীননাথ। ভারি মজার খবর হে! আমাদের রাজাতে আর
সততারের রাজাতে নাকি ভারি জোর লড়াই বাধবে।

বটে।
১ম দৃশ্য )
রাজা গণেশ
কেদারনাথ। বাধবে আবার কি ? এই বেধেছে বল্লেই হয়।
আমি খােদ মহারাজকুমারের মুখে এই মাত্র শুনে এলাম।
প্রাণনাথ। তা হতে পারে ভাই, কিন্তু আমরা হলুম আদার
ব্যাপারী, আমাদের ও সব জাহাজের খবরে কাজ কি?
কেদারনাথ। তা যা বলেছ দাদা, আমাদের মত খুদে পুটীর
অত যুদ্ধ-ফুদ্দের কথায় দরকার নাই।
দীননাথ। তােমরা কিন্তু ভারি বদরসিক। এ-কথায় দরকার নাই,
ও-কথায় দরকার নাই, তবে থাকবে কি নিয়ে ! তামাকটা যখন ধরে
আসে,তখন এই সব খােসগল্প করলে আসরটা কেমন জমে যায় বল দেখি ।
প্রাণনাথ। আর ওকথা কেন বল দাদা? সে এক কাল ছিল
তখনকার ছেলে বুড়াে, মেয়ে সকলেই দিনরাত রসে ভরপুর
এ কালের লােকগুলো যেন কেমন বদমেজাজী হয়ে
যাচ্ছে। কাল কুটিলা গতিঃ ।
কেদারনাথ। আচ্ছা, খবরটা কি তা ভাল করেই বল না দেখি,
কিছু রস-টস্ পাই কি-না।
দীননাথ। বুঝলে না ভাই? এই যুদ্ধ হলেই রাজা অবনীনাথ তাে
মারা পড়বেই, তা ছাড়া আরাে অনেক হােমরা-চোমরা লােককে
মরতে হবে। আর তারা মলেই তাদের শ্রাদ্ধ হবে এও ত স্বতঃসিদ্ধ।
এই ধর, কারও দানসাগর, কারও বৃষােৎসর্গ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর
শ্রাদ্ধ হ'লেই ব্রাহ্মণভােজন-এই পেটপূজো। ভায়া, ভাব দেখি
যখন এই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড লুচি [ হাত দিয়া মাপিয়া দেখাইয়া ] এসে
পাতে পড়তে থাকবে, তখন মনটা কেমন করবে ?
প্রাণনাথ। তা সত্যি বলেছ, দাদা। আমার ত লুচি খেতে খেতে
মনে হয়, ঠিক যেন চটি জুততা।

রাজা গণেশ
[ ১ম অঙ্ক
;
দীননাথ । দূর বেল্লিক, জুতাে খাবে কেন ?
প্রাণনাথ। ও হাে হাে, তুমি বুঝি বুঝতে পারলে না? চটি
পায়ে দিয়ে যেমন আরাম বােধ হয়, লুচি মুখে দিলেও ঠিক তেমনি
বােধ হয়।
দীননাথ। তাই বল। যা হােল্ক এ ত হ’ল শুধু এক নম্বর।
তারপর দু নম্বর গােণ। এই ধরাে, যারা যুদ্ধে মরবে, তাদের সহধর্মিনীরা
নিশ্চয় বিধবা হবে, তাতে সন্দেহ নাস্তি। আর বিধবা হলেই ব্রত
নিয়মের ধূম। এই আজ বৈশাখ মাস-সহস্র নাম শ্রবণ ; কাল
অমাবস্যার ব্ৰত ; পরশু
ব্ৰত ; পরশু অম্বুবাচি ; তার পর জন্মাষ্টমীর পারণ
ইত্যাদি ইত্যাদি। আর সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণভােজনের ফলার। কেমন
মজাটা হবে বল দেখি?
কেদারনাথ। তা হলে বেশ ত, আজ থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে
যাক না ; অনেকদিন মুখ বদলান হয়নি; শীগগির একটা শ্রদ্ধ-টাদ্ধ
হলে হয়। আহা, লুচি-চিনির ফলার, নাম করতেই যে মুখ দিয়ে জল
সরছে।
প্রাণনাথ। তা ফলার ত খাবে দাদা, কিন্তু যদি যুদ্ধে আমাদের
মহারাজেরই পরাজয় হয়, আর রাজা অবনীনাথ এসে আমাদের বন্দী
করে বাড়ীঘর সব লুট করে নেয়, তখন কি হবে বল দেখি?
কেদারনাথ। কি সর্বনাশ ! একথা যে আমরা একবারও ভেবে
দেখি নি।
দীননাথ। যা তাই তাে! তাহলে কি হবে ?
প্রাণনাথ। সত্যি বলেছ দাদা, যদি রাজা অবনীনাথ এসে
আমাদের সকলকে বন্দী করে, তাহলে আমার ব্রাহ্মণীর কি দশা
হবে? আঁ তাইতাে ! ভয়ে যে আমার সত্যি সত্যি ঘাম দিচ্ছে।

৭ ১ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ কেদারনাথ। না হে না, অমন কথা মুখে এনাে না। মহারাজ যদি একথা ঘুণাক্ষরেও শুনতে পান, তবে রাজদ্রোহী বলে এখনি আমাদের কয়েদ করে ফেলবেন! জান না, যুদ্ধের সময় মিথ্যা জনরবের প্রচার করলে তা কি রকম অপরাধ বলে গণ্য হয় ? প্রাণনাথ। আমি ত ভাই গােড়াতেই বলেছি, আমরা হলুম আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে আমাদের কাজ কি? যদি তেমন কিছু বেগােছ দেখা যায়, আগে থাকতে সরে পড়লেই হল। দীননাথ। ঠিক বলেছ ভায়া, যঃ পলায়তি স জীবতি। আমি ত বলি, অত গণ্ডগােলে থেকে দরকার কি ? এখনই চল এ শহর থেকে পালিয়ে যাই। পৈতৃক প্রাণটা ত আগে বাঁচুক, তারপর যা হয় হবে। কেদারনাথ। আমারও সেই পরামর্শ দাদা, চল আর অযথা বিলম্ব করা নয় ; আজ রাতেই পালান যাক। আর বেশী গােলমাল হলে হয় ত পালাতেই পারব না, পালাবার চেষ্টা করলেই কয়েদ করে দেবে। [ ঘােষযন্ত্র-বাদকের প্রবেশ বাদক। [ বাদ্য করিয়া ] নগরবাসী সকলে শােন। মহারাজ বাহাদুর জানতে পেরেছেন যে, নগরের কতকগুলি লােক প্রজাদের মধ্যে মিথ্যা জনরবের প্রচার করায় অনেকে নগর ছেড়ে পালিয়ে যাবার উদ্যোগ করছে। তাই মহারাজ বাহাদুর আদেশ দিয়েছেন যে, যারা এই রকম মিথ্যা জনরবের প্রচার করবে, তাদের সকলকে নির্বাসন অথবা গুরুতর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে ; আর যারা এ সময় নগর ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করবে, তাদের সম্পত্তি সরকারে বাজেয়াপ্ত করে সকলকেই কয়েদ করা হবে!

রাজা গণেশ
[ ১ম অঙ্ক
দীননাথ। ওহে ভায়া, মহারাজের লক্ষ্যটা আমাদেরই উপর বলে
বােধ হচ্ছে। ব্যাপার বড় গুরুতর।
প্রাণনাথ। তুমিই ত যত অনিষ্টের মূল। আমি ত গােড়া থেকেই
বলছি, আমরা হলুম আদার ব্যাপারী, আমাদের জাহাজের খবরে
কাজ কি ?
কেদারনাথ। আমিও ত সেই কথাই বলেছিলাম। উনিই ত যত
অনিষ্টের গােড়া। তা আমরা যদি তেমন কিছু বুঝি, স্পষ্ট বলে দেব যে,
আমরা এর কিছুই জানি না, সমস্ত দোষই ওঁর।
দীননাথ। ওহে বাপু, তােমরা অত ভয় খেয়ে না। মরকী বাৎ
আর হাতীকী দাত। যদি কিছু বলে থাকি,-বলেছি ; তার জন্যে যদি
কিছু অপরাধ হয়ে থাকে, তবে তার শাস্তিও মাথা পেতে নিতে রাজী
আছি। তবে এমন অপরাধ কিছুই করিনি, যার জন্যে কোন দণ্ড
হতে পারে। যাক, তামাকটা একেবারে পুড়ে গেছে । আর একবার
ভাল করে সেজে তামাকটা খাওয়া যাক, তারপর ও-সব কথা
দেখা যাবে।
*
দ্বিতীয় দৃশ্য
রণক্ষেত্রশিবির
গণেশনারায়ণের মন্ত্রণাকক্ষ--গণেশ ও কালিকানন্দ স্বামী
কালিকানন্দ। বৎস, তােমাদের আচরণে আমি অত্যন্ত মর্মাহত
হয়েছি। তুমি ও অবনীনাথ দু-জনেই আমার শিষ্য, অথচ আমি
থাকতেই তােমরা এমন সাংঘাতিক বিবাদে প্রবৃত্ত হলে! ছিঃ! আমার
যে লজ্জা এবং ঘণায় মুখ দেখাতে ইচ্ছা হচ্ছে না। বরেন্দ্রভূমির দুজন

২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ সুসন্তান কোথায় বন্ধুভাবে মিলেমিশে স্বদেশের গৌরব বৃদ্ধি করবে, না, উভয়ে গৃহবিবাদে মেতে উঠেছ! তােমাদের এই গৃহবিবাদ দেখে শুধু আমার নয়, বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেরই মাথা হেঁট হয়েছে। ছিঃ ছিঃ, সম্মুখে এমন বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র পড়ে থাকতে তােমরা এমনভাবে আত্মহত্যায় প্রবৃত্ত হলে ! গণেশ। কি করব গুরুদেব, বাধ্য হয়েই আমাকে অস্ত্রধারণ করতে হয়েছে, নৈলে এ ভ্রাতৃবিরােধে প্রবৃত্ত হবার আমার কিছুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। কালিকা। আমার ইচ্ছা, তােমরা এইখানেই তােমাদের অসি কোষবদ্ধ করে মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ হও। আমি তােমাদের মধ্যে এমন সন্ধি করে দেব যাতে তােমরা উভয়েই আপনাকে বিজয়ী বলে মনে করবে। গণেশ। এ কেমন সন্ধি গুরুদেব, তা তাে বুঝতে পারলাম না। সন্ধি অথবা বিগ্রহ যাই হােক না কেন উভয়পক্ষ ত তাতে জয়ী হতে পারে না। কালিকা। তুমি আমার প্রস্তাবে স্বীকৃত হও, দেখবে তােমাদের দুজনের যে সন্ধি হবে, তাতে তােমরা উভয়েই আপনাকে বিজয়ী ব'লে মনে করবে। আমার কথার উপরও কি তুমি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছ না? গণেশ। বেশ, আপনার আদেশই শিরােধার্য করলাম, আমি সন্ধি করতে সম্মত। এখন বলুন-কিসে আমরা দুজনেই জয়লাভ করব ? কালিকা। তােমরা দুজনে এই রণক্ষেত্রেই মিত্ৰতাসূত্রে আবদ্ধ হবে, আর এই মিত্ৰতা যাতে চিরস্থায়ী হয়, তার জন্য অবনীনাথ তােমার পুত্র যদুর সঙ্গে তার একমাত্র কন্যা সুন্দরী নবকিশােরীর বিবাহ দিয়ে উত্তর রাজা গণেশ [ ১ম অঙ্ক দিকের অর্ধেক চলনবিল তাকে যৌতুক দান করবে! আমি অবনী- নাথকে পূৰ্বেই এইরূপ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ করিয়েছি, এখন তুমিও সম্মত হলে ; সুতরাং তােমরা অবিলম্বে নিজ-নিজ রাজধানীতে ফিরে মহাধুমধামে শুভবিবাহের আয়ােজন কর। এই বিবাহ-বন্ধন মণিকাঞ্চন- সংযােগের মতই হবে। এ থেকে যে অমৃতময় ফল উৎপন্ন হবে, তাতে তােমরা আপনারা ধন্য হবে, বঙ্গদেশকেও ধন্য করবে। গণেশ। দেব! সত্যসত্যই এরূপ সন্ধি-বন্ধনে আমরা দুজনেই গৌরবান্বিত হব। কোথায় নররক্তে ধরিত্রী কলঙ্কিত হত, তার পরিবর্তে বিবাহের আয়ােজন! যুদ্ধের পরিবর্তে নাচ, গান, বাদ্য এবং মহােৎসব ! ধন্য আপনি, যে, আমাদের আসন্ন ধ্বংসের মুখ থেকে উদ্ধার করলেন। কালিকা। না বৎস, এ সমস্তই মহামায়ার অনন্তলীলা, আমি কেবল নিমিত্তমাত্র। দূরে হিন্দুর ভাগ্যাকাশ একটু উজ্জ্বল ব’লে বােধ হচ্ছে। ভবিষ্যতের জীবন-সংগ্রামে হিন্দুকে জয়ী করবার জন্যই জগ - ননী বােধ হয় তােমাদের দুটি প্রসিদ্ধ রাজবংশকে ধ্বংসের মুখ থেকে উদ্ধার করলেন। [ জনৈক প্রহরীর প্রবেশ ] প্রহরী। [ প্রণাম করিয়া ] মহারাজ! অবনীনাথ শিবিদ্বারে অপেক্ষা করছেন। কালিকা। আমিই তাকে আসতে বলেছি, গণেশ। গণেশ। [ প্রহরীর প্রতি তাঁকে সসম্রমে এইখানে নিয়ে আয়। প্রহরী। যে আজ্ঞা। [ প্রস্থান ]

২য় দৃশ্য।
রাজা গণেশ
১১
কালিকা। দেখ, আমি ডাকামাত্রই অবনী তােমার এখানে
আতে তিলমাত্র সঙ্কোচ করেনি। এতে কি মনে হয় না যে, তােমরা
দু-জনে কুটুম্বিতা কর, এটা ভগবানেরই ইচ্ছা ?
গণেশ। সবই ত তার ইচ্ছাতেই হচ্ছে গুরুদেব ।
[ প্রহরীসহ অবনীনাথের প্রবেশ ও কালিকানন্দকে প্রণাম
করণ। গণেশনারায়ণ উঠিয়া তাঁহাকে সাদরে
অভ্যর্থনা করিয়া নিজ আসনে আপনার
পাশে বসাইলেন ]
কালিকা। মা আমাদের উপর মুখ তুলে চেয়েছেন অবনী। গণেশ
আমার প্রস্তাবে স্বীকৃত হয়েছে।
অবনী। আপনার আদেশ যে ভগবানেরই আদেশ দেব ; কেউ
তা অস্বীকার করতে পারবে কেন ?
কালিকা। তােমরা দু-জনে নিজেদের উষ্ণীষ বিনিময় কর দেখি।
[ গণেশ ও অবনীনাথ উঠিয়া উষ্ণীষ বিনিময় করিলেন ও
পরে উভয়ে কালিকানদের পদধূলি মাথায় লইলেন ]
কালিকা। এই বিবাহে বাংলার দুটি প্রধান বংশ মিত্ৰতাসূত্রে আবদ্ধ
হ’ল। যে-স্থানে যুদ্ধের নরকাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে বরেন্দ্রভূমির সুখশান্তি
অন্তর্হিত করে দিত ; কত রমণী পুত্রহারা হত ; কত শিশু অনাথ
হত ; সেইখানে আজ শান্তির মলয়ানিল প্রবাহিত হচ্ছে। যারা
ক্ষণপূৰ্বে পরস্পরের বক্ষ বিদীর্ণ করবার জন্য উন্মুক্ত তরবারি হস্তে
পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল, তারাই এখন শত্রুতা ভুলে গিয়ে প্রেমালিঙ্গনে
বদ্ধ হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে যে আনন্দ, যে তৃপ্তি আমি পেলাম, লক্ষ রাজার
রাজত্বও তার কাছে অতি তুচ্ছ।

রাজা গণেশ (১ম অঙ্ক অনী। দেব ! বলতে কি, অশেষ পুণ্যবলেই আজ এমন সৎপাত্রে আমার অমন সােনার প্রতিমাকে অর্পণ করবার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আজ এই বিশাল বাংলা দেশের মধ্যে সপ্তদুর্গার ভাদুড়ীদের মত উচ্চ মৰ্যাদার লােক আর ক’জন আছেন ? রূপে, গুণে, মানে, সম্রমে, খ্যাতিতে, প্রতিপত্তিতে, বীরত্ব ও বংশমর্যাদায় মহারাজ গণেশনারায়ণ আজ বাংলার শীর্ষস্থানীয় বল্লেও অত্যুক্তি হয় না। তার পুত্রের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দেওয়া অল্প সৌভাগ্যের বিষয় নয়। আর এ সৌভাগ্যের একমাত্র কারণ প্রভুর চরণকৃপা। সুতরাং প্রভুর নিকট যে আমি কতদুর ঋণী, তা প্রকাশ করবার মত উপযুক্ত ভাষা আমার নেই। কালিকা। বৎস, এ সমস্তই জগন্মাতার লীলাখেলা। আমি যেন দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, এই বিবাহ-বন্ধনের ফলে হিন্দুর ভাগ্যলক্ষ্মী আর একবার তার অধম সন্তানদের পর্ণকুটীর তার চরণকমলস্পর্শে পবিত্ৰীকৃত করবেন। এই একতাবন্ধনের ফলে বিচ্ছিন্ন, আত্মবিশ্বত, মােহনিদ্রাগত বাঙালী হিন্দু সুপ্তোত্থিত এবং সংঘবদ্ধ হয়ে আর একবার পাঠানের সঙ্গে ভাগ্যপরীক্ষায় প্রবৃত্ত হবে। শুধু ভাগ্যপরীক্ষাই বা বলি কেন, ভাগ্যলক্ষ্মীকে করতলগত করে বাংলার সৌভাগ্যগগনে আর একবার মহাগৌরবে নিজেদের বিজয়কেতন উডডীন করবে। নিশ্চয় জেনাে বৎস, আমার এই ভবিষ্যদ্বাণী কদাচ মিথ্যা হবে না। অবনী। আপনার শ্রীমুখের বাণী যে অবশ্যই ফলবে তাতে আর সন্দেহ কি গুরুদেব ?

রাজা গণেশ
১৩
তৃতীয় দৃশ্য
সান্যাল গড়—আনন্দময়ীর মন্দির
কালরাত্রি
নবকুমারী নিবিষ্ট মনে দেবীপূজা করিতেছে
নব। আজি এ শুভ মুহূর্তে জবপুষ্প বিল্বদলে,
দিতেছি মা পুস্পাঞ্জলি তাের রাঙা পদতলে ;
কি আছে আমার মাগাে কি দিয়ে পূজিব বল,
দুখিনী-সম্বল এই ছিল তপ্ত অশ্রুজল ।
[ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম ]
[ সখীগণের প্রবেশ ]
বেলা। ধন্য সখী তুমি, আমাদের জানতে না দিয়েই একাকিনী
এসে নিবিষ্টমনে মা’র পূজায় নিযুক্ত আছ।
নব। হা সখী, সংসারের কোলাহল আজ আমার কাছে বিষের
মত মনে হচ্ছে, তাই মা’র মন্দিরে এসে একটু শান্তি পাবার চেষ্টা করছি ।
কাল সমস্ত রাত অনিদ্রায় কাটিয়েছি। কি যেন একটা বিশাল চিন্তা-
স্রোতের ঘূর্ণাবর্ত এসে তার মধ্যে আমায় আকণ্ঠ ডুবিয়ে দিচ্ছিল।
কিছুতেই মনকে স্থির করতে না পেরে একাকিনী মা’র মন্দিরে চলে
এসেছি।
পারুল। সখীর ভাবনা হবার কথা বই কি! আমার বােধ হয়
আনন্দের আতিশয্যে সখী আমার আত্মহারা হয়ে পড়েছে। ভাবী
মিলনসুখের ঘটনা কল্পনাচক্ষে দেখে সখী আমার একেবারে চিন্তাস্রোতে
হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সখী! তােমার এই বাল্যসহচরীদের বঞ্চিত করে
একাকিনী সমস্ত আনন্দ ভােগ করাটা কি ভাল হচ্ছে ?

১৪ রাজা গণেশ [ ১ম অঙ্ক নব। না সখী, আনন্দ কি নিরানন্দ তা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনে। কেবল অনবরত চিন্তাস্রোতচিন্তার পর চিন্তা-কতই আকাশ- পাতাল যে মনের মধ্যে আসছে, তা আমি বলে শেষ করতে পারিনে। বেলা। তা আমাদের একটু মন খুলে সব কথা বল্লেই ত বুঝতে পারি ব্যাপারটা কি ? তা রাজকুমারী, যতই যা বল, আজ তােমার মুখখানি যেমন হাসিমাখা দেখছি, আর কখনই কিন্তু তেমনটি দেখিনি। বাস্তবিক এমন রূপে গুণে অদ্বিতীয় সাক্ষাৎ কার্তিকের মত বর পেলে কারই বা না আনন্দ হয় ? আমাদের নিতান্ত দুর্ভাগ্য যে, তােমার আবাল্যের এই সখীদের বঞ্চিত করে একাই এ মিলনানন্দ ভােগ করছ। নব। আর জ্বালানে তােরা সখী। তােদের কাছে আমি কোনদিন কোন কথা গােপন করেছি ? সত্যি বলছি সখী, আমি কিছুই বুঝতে পারছি নে, যে, আমার মনের মধ্যে কেমন করছে। এ রকম মানসিক চাঞ্চল্য আর কখনই আমি ভােগ করিনি। তা যাক সখী, এখন আয় আমরা সকলে মিলে মা’র আগমনীর সেই গানটি গাই । [ সকলের গীত] এস জগজ্জননী মাগাে। এস চিরকল্যাণী চিরস্নেহময়ী সকল কর্মে জাগো! এস চিরাধিতা মঙ্গলপদপরশে, বিতর শুভ্র কাম শান্তি হরষে ; এস কল্যাণময়ী মাগাে! মমাদের ম৫ে মর্মে সকল কর্মে শুভ উৎসবে জাগাে। পারুল। হে মা আনন্দময়ী ! আজ আমাদের প্রাণের সখী তার পতিদেবতা লাভ করতে যাচ্ছে। সখী আমাদের নিতান্ত বালিকা, কিছুই জানে না, কিছুই বােঝে না। দেখাে মা, নির্বিঘ্নে যেন আজ এ

৪র্থ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১৫
বিবাহ সম্পন্ন হয় ; আর তােমার প্রসাদে সখী আমাদের যেন চিরকাল
পতিসােহাগিনী হয়ে পরম সুখে দিনপাত করতে পারে।
বেলা। মা, আমরা সংসারজ্ঞানহীনা অবােধ বালিকা; কি করে
তােমার পূজা করতে হয়, তা তাে জানি নে মা। তুমি কৃপাময়ী, তুমি
ইচ্ছা করলে জগতে কি-না হতে পারে ? কৃপা করে এই অবােধ
বালিকাদের পজা গ্রহণ কর।
সকলের প্রণাম
চতুর্থ দৃশ্য
সান্যালগড় --অবনীনাথের বহির্বাটী
কালিকানন্দ, গণেশ ও অবনীনাথ
কালিকা! বৎস গণেশ ও অবনীনাথ! শুভবিবাহ নির্বিঘ্নে শেষ
হওয়ায় আজ আমি যে অপার আনন্দলাভ করলাম, সে আনন্দের কথা-
মাত্র প্রকাশ করি এমন ভাষা নাই। আমাদের পিতৃগণ স্বর্গ হতে এ
দৃশ্য দেখে আনন্দে কেবলই চোখের জল ফেলছেন। এখন আমার
সম্মুখে তােমরা দুজনে একবার গাঢ় প্রেমালিঙ্গনে বদ্ধ হও, আমি দেখে
চক্ষু সার্থক করি।
[ গণেশ ও অবনীনাথ প্রথমে গুরুদেবের চরণধুলি
লইলেন, পরে উভয়ে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হইলেন।]
[ জোড়হস্তে আকাশের দিকে চাহিয়া ] মাগাে, তাের অপার করুণার
কি অন্ত হয় মা ? আজ গণেশ ও অবনীনাথের মিলনদৃশ্য দেখিয়ে তাের
এ অধম সন্তানকে কৃতার্থ করলি মা।
গণেশ। দেব! মহামায়ার কৃপা আর আপনার আশীৰ্বাদ বলে
এ অঘটন সংঘটন হল।

রাজা গণেশ [ ১ম অঙ্ক কালিকা। সমস্তই মহামায়ার ইচ্ছা ! তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোন্ কাৰ্য সিদ্ধ হয় বৎস? গণেশ। গুরুদেব! আমাদের এক্ষণে কর্ত্তব্য কি, অনুগ্রহ করে বুঝিয়ে দিন। কালিকা। শােন বৎস, সমগ্র দেশবাসী এক্ষণে মােহনিদ্রায় আচ্ছন্ন। সেই নিদ্রা হতে জাগরিত করে তাদের কণে দেশাত্মবােধের মহামন্ত্র প্রেরণ কর। মুসলমান আজ ভারতে পূর্ণ শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। সামান্য আয়াসে এই দুর্ধর্ষ মহাবিক্রমশালী জাতিকে বিজিত করা কখনই সম্ভবপর নয়। এজন্য কঠোর সাধনার প্রয়ােজন । প্রয়ােজন। পৃথ্বীরাজের সময় হতে আজ পর্যন্ত হিন্দুজাতি কেবল ভােগবিলাসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে। তাদের মুক্ত কর। মনে রেখাে বৎস, আগে ত্যাগ, তার পর ভােগ। যতদিন না ভারত ত্যাগের মহৎ আদর্শ সম্মুখে ধরবে, ততদিন কিছুতেই উঠে দাড়াতে পারবে না। : গৃহে গৃহে ত্যাগের মহামন্ত্র প্রচারিত হােক্। নারীর অঞ্চল ত্যাগ করে সকলে ব্রহ্মচর্য্যের মহাবলে বলীয়ান হাে। এ কথা ভুলাে না বৎস, যে, ইন্দ্রজিতকে নিধন করবার জন্য লক্ষ্মণকে চৌদ্দবৎসর কঠোর ব্রহ্মচর্য্য পালন করতে হয়েছিল । কুমার ব্রহ্মচারী মহাবীর ভীষ্মের কাছে ক্ষত্রিয়কুল-ধ্বংসকারী ভগবান পরশুরামও পরাজিত হয়েছিলেন। দিন হতে ভারত এই ব্রহ্মচর্যের আদর্শ বিস্মৃত হয়েছে, সেই দিন হতে তার দুর্দশার আরও। সৰ্ব্বপ্রথমে তােমরা ভারতের ঘরে ঘরে এই ব্ৰহ্মচর্যের মহামন্ত্র প্রচার কর। এইটিই মােহগ্রস্ত, অবসন্ন, পরাধীন ভারতের পুনরুত্থানের একমাত্র বীজমন্ত্র । গণেশ। সত্য প্রভু, ব্রহ্মচর্যের আদর্শ ভুলে গিয়েই আজ আমরা এমন দুরবস্থায় উপনীত। দীর্ঘকালের পরাধীনতার ফলে আমাদের ২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ ১৭ শাস্ত্রের অমূল্য আদেশগুলির প্রতি আর আমাদের শ্রদ্ধা নেই, তাই আজ আমরা এ ভীষণ দুর্দশায় উপনীত। আজ এই যে ভারতের ঘরে ঘরে রােগের এত প্রাবল্য, ব্ৰহ্মচর্যের অভাবই এর একমাত্র কারণ। সেই মহাবীৰ্যশালী আৰ্যগণের বংশধর হয়ে আজ আমরা ভীরু, কাপুরুষ, পরপদানত। গােলামী আজ আমাদের অঙ্গের নিত্য-ভূষণ, সিংশিশু আজ শৃগালকে দেখে ভয় পায়। এর প্রতিকারের একমাত্র উপায় ব্রহ্মচর্য্য। আপনার আদেশ আমি মাথা পেতে গ্রহণ করলাম। সর্বাগ্রে এই ব্ৰহ্মচর্যের মন্ত্রেই বাংলার জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করব। দেখি মূৰ্ছাপন্ন, মােহগ্রস্ত বাঙালী জাতিকে জাগাতে পারি কি-না। অবনী। বেয়াই মশায়, আসুন সর্বপ্রথমে আমরা গুরুদেবের এই আদেশ কার্যে পরিণত করি। অবিলম্বে সপ্তদুর্গায় একটি ব্রহ্মচর্য্য বিদ্যালয় স্থাপন করে এ কার্যের সূত্রপাত করি। তারপর গ্রামে গ্রামে শহরে শহরে এই আদর্শ বিদ্যালয়ের শাখা প্রতিষ্ঠিত করতে আরম্ভ করব। যখন এইরূপে প্রতি গ্রামে, প্রতি শহরে ব্রহ্মচর্য্য আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমাদের বালকগণের ব্রহ্মচর্য শিক্ষার পথ প্রশস্ত হবে, তখন আর রাজনীতি, সমাজনীতি কিছুরই আবশ্যক হবে ; অবিলম্বে দৃঢ়কায় কৰ্ম্মঠ, মহাবীৰ্যশালী যুবকগণ প্রত্যেক পরিবারে প্রাদুর্ভূত হয়ে হিন্দুজাতিকে পৃথিবীর মহাশৌৰ্যশালী জাতিতে পরিণত করবে। জাতি ত মানুষেরই সমষ্টি। মানুষ তৈয়ের করতে পারলে আপনা থেকেই জাতির সৃষ্টি হবে। আসুন, এই মহাউদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমরা অবিলম্বে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হই। কালিকা। বৎসগণ, তােমাদের কথায় আমি অত্যন্ত পরিতােষ লাভ করলাম। মা আনন্দময়ীর চরণে ভক্তি রেখে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হও, অচিরেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবে।

দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য সপ্তদুর্গা-গণেশনারায়ণের শয়নকক্ষ পালঙ্কোপরি অর্ধশায়িতাবস্থায় গণেশনারায়ণ, পদতলে ত্রিপুরাসুন্দরী উপবিষ্টা ত্রিপুরা। মহারাজ! তুমি ত বেশ স্বচ্ছন্দে নাওয়া-খাওয়া করছ ? গণেশ! কি করব ত্রিপুরা ? ত্রিপুরা। কেন, কিছুই কি করবার নেই ? এই যে গৌড়েশ্বর ক্রমাগত আমাদের দেশের উচ্চবংশীয় যুবকদের মুসলমানী রাজকুমারী বিবাহ করতে বাধ্য করছে, এতে আর সামান্য কিছুদিন পরেই বাংলায় হিন্দুর সংখ্যা একেবারেই লােপ পাবে। আর হিন্দু কি চিরকাল পরাধীনই থাকবে ? আমাদের মাতৃভূমি কি চিরদিনই বিধর্মীর পদাঘাত সহ্য করবে ? আজ চারিদিকে হিন্দুজাতি ও হিন্দুধর্মের উপর যে পাশবিক উৎপীড়ন চলছে, কোন্ সহৃদয় ব্যক্তি সে সব দেখেও নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে পারে মহারাজ ? গণেশ। সে কথা সত্য ত্রিপুরা। মহারাজ লক্ষ্মণ সেনের পর থেকে আজ পর্যন্ত হিন্দুজাতি কেবল অত্যাচারী বিধর্মীদের পদাঘাতই সহ করে আসছে। এই মােহান্ধ বিধর্মীরা আমাদের ধর্মের উপর যে সব অকথ্য অত্যাচার করে আসছে, তা মনে করতেও হৃৎপিণ্ড ফেটে যাবার উপক্রম হয়। আহা, দুরাত্মা মামুদ গজনী সােমনাথ মন্দিরে কি পৈশাচিক অত্যাচারই না করেছে।

১ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ ত্রিপুরা। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টে দেখ মহারাজ, এমন হাজার হাজার মামুদ গজনী হিন্দুজাতি ও হিন্দুধর্মের উপর অকথ্য উৎপীড়ন করে আপনাদের পাশব প্রবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে। এখনও চক্ষের উপর এমন শত শত নিষ্ঠুরতার অভিনয় নিরন্তর চলছে। এ সব দেখেও কি অন্ধ হয়ে বসে থাকতে চাও মহারাজ ? গণেশ। না—তা চাই নে। কিন্তু যুদ্ধ ভিন্ন কি এর প্রতিকার নেই ? একবার হৃদয় দিয়েই ভালবেসে দেখ না অত্যাচারীর হৃদয় জয় করতে পার কি-না, আর না পারবেই বা কেন, যখন সকল ধর্মই সত্য, সব ধৰ্ম্মের উদ্দেশ্যই সেই ভগবানকে লাভ, তখন মানুষের সঙ্গে মানুষ পৃথকই বা কিসে? ত্রিপুরা। পৃথক যে নয়, তা সকলেই স্বীকার করে। কিন্তু তবু ধৰ্ম্মের নামে নিত্য যত পৈশাচিক কাণ্ড হয়, এত আর বুঝি কিছুর জন্যই হয় না। যদি আশা থাকতাে, তবে দেশের মুখ চেয়ে মিলনের জন্যই একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতাম। কিন্তু ফল যে কিছুই হবার নয় মহারাজ! গণেশ । তুমি কি বলতে চাও ত্রিপুরা, বিধর্মী হিন্দুর প্রতি যে অত্যাচার করে তা ধর্মের জন্য নয় ? ত্রিপুরা। হাঁ মহারাজ, এরা ধর্মের নামে নিজেদের স্বার্থসাধন গণেশ। কিন্তু উপায় কি ত্রিপুরা ? ত্রিপুরা। উপায় আছে মহারাজ। দেখ, লােকে আর সব অত্যাচার না হয় সহ্য করে, কিন্তু ধর্মের উপর এতটা উৎপীড়ন দেখলে নিতান্ত যে অপদার্থ, তারও বুকের রক্ত গরম না হয়ে যায় না। গৌড়ের সঙ্গে যুদ্ধ তােমাকে করতেই হবে, তা দু-দিন আগে আর পরে, এই যা ২০ রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক তফাৎ। আমাকে রমণী বলে একেবারে অবহেলা করাে না মহারাজ । আমি রমণী হলেও তােমারই মহিষী। আমি যা বলছি, তা একবার ভাল করে ভেবে-চিন্তে দেখ। গণেশ। তােমার কথা আমি অস্বীকার করি নে ত্রিপুরা। মহারাজ গণেশনারায়ণের মহিষী কখনও সামান্য। নারী হতে পারে না। বেশ, তােমার পরামর্শই গ্রহণ করলাম। আর যদি আবশ্যক হয়, এর জন্য দেহপাত করতেও কাতর হব না। ত্রিপুরা। তাই কর মহারাজ। তুচ্ছ এই সামান্য রাজ্যের লােভে স্বদেশ এবং স্বধৰ্ম্মের এত দুর্দশা দেখেও নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকা কখনই মানুষের কাজ নয়। গণেশ। এর জন্য বাংলার জমিদার-শক্তিকে কেন্দ্রীভূত এবং সংঘবদ্ধ করতে হবে। যদি এই জমিদার-শক্তি কেন্দ্রীভূত এবং সংঘবদ্ধ হয়ে উপযুক্ত নেতার অধীনে পরিচালিত হয়, তবে মুহূর্তে গৌড়েশ্বরের সিংহাসন কেঁপে উঠতে পারে। দূরদর্শী গুরুদেব এইজন্যই রাজা অবনীনাথের সঙ্গে বৈবাহিক-সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন। আজ এক গৌড়েশ্বর ভিন্ন অন্য কারুরই সাধ্য নেই যে, সপ্তদুর্গা এবং সান্যালগড়ের মিলিত বাহিনীর সামনে মুহূর্তকাল দাড়াতে পারে। ত্রিপুরা। তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। আর শুনলাম শ্রীভবানী- পুরে না-কি ব্রহ্মচর্য্যমঠ স্থাপিত হচ্ছে ? গণেশ। হ্যা, মঠের গৃহনির্মাণ এখনও শেষ হয়নি বটে, কিন্তু শিক্ষাদানের কাজ এরই মধ্যে আরম্ভ হয়ে গেছে। আমাদের সর্বত্যাগী দেবপ্রতিম গুরুদেব স্বেচ্ছায় মঠের অধ্যক্ষতা গ্রহণ করে ছাত্রদের শিক্ষাকাৰ্যে ব্ৰতী হয়েছেন। ত্রিপুরা। কি উদ্দেশ্যে যে তােমরা এই ব্রহ্মচর্যমঠ স্থাপন করলে ২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ তা ত বুঝতে পারলুম না মহারাজ ? এই কর্মের যুগে এভাবে সন্ন্যাসমন্ত্রের প্রচার আমার কাছে ত ভাল বলে বােধ হয় না। গণেশ। আজ রাত্রি আজ রাত্রি বড় বেশী হ’ল। একটু বিশ্রাম করি। সময়ান্তরে তােমাকে মঠস্থাপনের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেব। দ্বিতীয় দৃশ্য ভবানীমন্দির-সংলগ্ন বহ্মচৰ্যমঠ কালিকানন্দ স্বামী ছাত্রদিগকে শিক্ষাদান কার্যে নিযুক্ত স্বামী। বৎসগণ, সৰ্ব্বদা মনে রাখবে, ব্রহ্মচর্য্যেই জীবন। ইন্দ্রিয় পরায়ণতায় মৃত্যু। মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন-ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠায়াং বীৰ্য্যলাভঃ। যিনি অবিচলিত ব্রহ্মচর্ষ অবলম্বন করেন, তার শারীরিক ও মানসিক বীৰ্য্য লাভ হয়। পণ্ডিতগণ তপস্যাকে তপস্যা বলেন না। ব্রহ্মচর্যই সর্বশ্রেষ্ঠ তপস্যা। যিনি যে পরিমাণে ব্রহ্মচারী হবেন, তাঁর সেই পরিমাণে হৃদয় প্রফুল, মস্তিষ্ক সবল, শরীর শক্তিমান এবং মন ও মুখশ্রী স্নিগ্ধ ও কান্তিমা হবে। ১ম ছাত্র। আচ্ছা গুরুদেব, কি উপায়ে খুব সহজে কামের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় ? স্বামী। কামদমনের সর্বাপেক্ষা সহজ উপায় হচ্ছে নিজের বল ও সামর্থ্য চিন্তা করে ভিতরে ব্রহ্মশক্তির উদ্দীপন এবং তেজের সঙ্গে পাপদমনে অগ্রসর হওন। আমরা সকলেই সর্বশক্তিমানের সন্তান, তিনি আমাদের পরম সহায়, মনে মনে এইরূপ চিন্তা করলে নিতান্ত রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক নির্জীব মানুষেরও হৃদয় ব্ৰহ্মতেজে পূর্ণ হবে। “আমি দুর্ভেদ্য ব্ৰহ্মকবচে আবৃত, সাধ্য কি কামের যে এই পবিত্র ব্রহ্মদুর্গ ভেদ করবে”—এই ভেবে যে আপনার ভিতরে সর্বদা ব্ৰহ্মতেজের উদ্দীপন করতে পারে, কাম দমন করা তার পক্ষে অত্যন্ত সহজ! ২য় ছাত্র। আচ্ছা গুরুদেব, আপনি ত ব্ৰহ্মচর্য্যের এত প্রশংসা করলেন কিন্তু আমি কত কত সাধু সন্ন্যাসী দেখেছি, তাদের কাউকেও একটুও হৃষ্টপুষ্ট দেখলেম না। শরীর একেবারে শুষ্ক, সামর্থ্যের লেশমাত্রও নেই। সুতরাং আপনার কথায় এখনও যথেষ্ট সন্দেহ রইল । স্বামী। তুমি যে সব সাধু সন্ন্যাসী দেখেছ, তারা কখনই নিরবচ্ছিন্ন ব্রহ্মচর্য পালন করেনি। নিশ্চয়ই এরা প্রথম জীবনে অত্যধিক ইন্দ্রিয়- লালসা চরিতার্থ করে পরজীবনে পূৰ্ব্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করেছে। নতুবা যারা প্রকৃত ব্রহ্মচারী তারা কখনই ওরূপ হতে পারে না। ব্রহ্মচর্য পালনের যে কত উপকার, তা ব’লে কখনও শেষ করা যায় না। চিকিৎসাশাস্ত্র এবং শারীরবিজ্ঞান সিদ্ধান্ত করেছেন যে, শরীরের রক্তের সারাংশই নরনারীর জনয়িত্রী শক্তির মূল উপাদান। যাদের জীবন পবিত্র তাদের শরীরে এই পদার্থ মিশে গিয়ে রক্তের মধ্যে সঞ্চালিত হয়, এবং অত্যুৎকৃষ্ট মস্তিষ্ক, স্নায়ু এবং মাংসপেশী গঠিত হয়। তারই প্রভাবে মানুষ দৃঢ়কায়, সাহসী উদ্যমশীল এবং বীৰ্য্যশালী হয়। আবার এই বস্তুরই ব্যয় মানুষকে হীনবীৰ্য, দুৰ্বল এবং চঞ্চলমতি করে। তার শারীরিক ও মানসিক শক্তির হ্রাস হয় ; রিপুর উত্তেজনা বলবতী হয়, শারীরযন্ত্রের ক্রিয়া বিপর্যস্ত হয় এবং স্নায়বীয় শক্তি নিতান্ত হীন হয়ে পড়ে। মূচ্ছা, উন্মাদ এবং মৃত্যু এর অনুবৰ্ত্তী হয়ে থাকে। এককথায় বলতে গেলে ব্রহ্মচর্য্যেই জীবন এবং তার অভাবেই মৃত্যু।

২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ ১ম ছাত্র। বড় ভয়ানক কথা গুরুদেব। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি প্রভু, কামক্রোধের তরঙ্গ না আছে কোন্ হৃদয়ে ? যােগ্নীশ্বর মহাদেবের পৰ্যন্ত যখন সমাধির মধ্যে চিত্তচাঞ্চল্য উপস্থিত হয়েছিল, তখন সামান্য মানুষ কি উপায় অবলম্বনে কামের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে ? স্বামী। সত্য বটে, কিন্তু বীরের ন্যায় সম্মুখীন হয়ে কামকে পরাজিত কৰ্ত্তে হবে। যখন কাম মহাবীর শাক্যসিংহের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে বিচলিত করবার উদ্যোগ করল, তখন সেই ধৰ্ম্মবীর বজ্র গম্ভীরস্বরে বললেন,বরং মেরু স্থানভ্রষ্ট হবে, আকাশ হতে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র খণ্ড খণ্ড হয়ে ভূমিতে খসে পড়বে, মহাসাগর শুকিয়ে যাবে, তথাপি সাধ্য নাই কারাে যে আমাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারে। তার সেই দুর্দমনীয় তেজোবিকাশ, সেই অপ্রতিহত শক্তি চালনা, সেই অনন্ত- সাধারণ মানসিক বল দেখে দুরাত্মা কাম আর তার পাশ দিয়ে ঘেষতেও সাহস করলে না। ফলতঃ, যিনি পূর্ণ মানসিক বলে বলীয়ান, কামের সাধ্য নাই যে তার কেশাগ্রও স্পর্শ করে। ২য় ছাত্র। কিন্তু প্রভু, গৃহস্থ যদি ব্রহ্মচারী হয়, তাহলে সংসারই বা কিরূপে চলবে, আর ভগবানের সৃষ্টিপ্রবাহই বা কেমন করে বজায় থাকবে ? স্বামী। বৎস, জিতেন্দ্রিয় হওয়াই গৃহস্থের পক্ষে ব্রহ্মচর্য্য। আর এর প্রয়ােজনও যথেষ্টই আছে। আর্যঋষিগণ জিতেন্দ্রিয় হয়ে তবে বিবাহ করবার বিধি দিয়েছেন। পূৰ্বে ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ ইন্দ্রিয়জয়, তারপর গৃহস্থাশ্রম। বিষয়বাসনা সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ করে তবে বিষয়ভােগ। আর এতে ভগবানের সৃষ্টিপ্রবাহ বজায় থাকবে না এ একটা মস্ত বুঝবার ভূল। ব্রহ্মচারী বা জিতেন্দ্রিয়ের অর্থ যে ইন্দ্রিয়কে জয় করেছে।

২৪
রাজা গণেশ
[ ২য় অঙ্ক
এর মানে ইন্দ্রিয়ের নিরােধ বা বিলােপ নয় ; ইন্দ্রিয়কে স্ববশে রাখা,
ইন্দ্রিয়ের অধীনে না থেকে নিজে ইন্দ্রিয়কে অধীন করা।
ছাত্র! দেব, আপনার কথা এইবার সম্পূর্ণ বোধগম্য হয়েছে।
আমরা কায়মনােবাক্যে আপনার উপদেশ পালন করব।
স্বামী। আচ্ছা, এখন তােমরা সম্মিলিত হয়ে বাংলা মায়ের সেই
গৌরবগাথাটি গাও।
ছাত্রগণ! বে-আজ্ঞা দেব।
গীত
তােমারে দেখেছি বকুলের তলে ঊষার আলােকে জননী।
দেখেছি তােমারে মহিমময়ী গাে রৌদ্র-কনক বরণী।
তােমারে দেখেছি স্নেহকল্যাণী মমতাফুল্ল মল্লী।
শ্যামলা স্নিগ্ধা সুজলা সুফলা, হে মাের বঙ্গ-পল্লী।
সফল জীবন চিরআরাধিতা চিরসুধাময়ী জননী
লভিয়া জনম তােমার অঙ্কে চরণকমলে প্রণমি।
;
দেখেছি তোমারে শ্যামল শস্যে স্নেহ ঢল-চল তনিমা।
দেখেছি তােমারে তটিনী তড়াগে উছলিত তব গরিমা।
বৈশাখী রােদে দাউ দাউ দ্যুতি বিতর শক্তি দীপ্তি।
শারদ নিশায় জোছনা জ্যোতিতে বিসিত তব তৃপ্তি।
সফল জীবন চিরআরাধিতা চিরসুধাময়ী জননী;
লভিয়া জনম তােমার অঙ্কে চরণকমলে প্রণমি।
কত পুণোর উৎস তুমি মা কত কীর্তির ক্ষেত্র
দিয়াছে জগতে জ্ঞানালােক কহ তােমার অরুণ নেত্র।
তােমার আকাশে তােমার বাতাসে রয়েছে কত না শক্তি।
অযুত ভক্ত তােমার ধুলায় ঢেলে গেছে কত ভক্তি।

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
সফল জীবন চিরআরাধিতা চিরসুধাময়ী জননী;
লভিয়া জনম তােমায় অঙ্কে চরণ কমলে প্রণমি ॥
তােমারি ললাটে গরিমার টীকা দিয়াছে আঁকিয়া বিজয় বীর।
বিশ্বজুড়িয়া লভিলা শান্তি পাইয়া তোমার প্রেমের নীর।
তােমারি বুকের অমৃত পিয়ে কপিল হইল সিদ্ধ।
তুমি মাস্বৰ্গ, তুমি না ইষ্ট, বাঙালী জাতির তীর্থ।
সফল জীবন চিরআরাধিতা চিরসুধাময়ী জননী
লভিয়া জনম তােমার অঙ্কে চরণকমলে প্রণমি ।
তৃতীয় দৃশ্য
সপ্তদুর্গা-চলনদের বাঁধাঘাট
সােপানে বসিয়া ধূমপানরত বৃদ্ধগণ
দীননাথ। বলি ওহে ভায়া, নূতন খবর সৰ শুনেছ ত?
প্রাণনাথ। তুমিই সব বল না দাদা! তােমার মুখে যে কথাই শােনা
যায়, তাই পরম মিষ্টি বলে বােধ হয় । যেন পশ্চিমদেশী আমের
চাটুনী।
দীননাথ। পশ্চিমের চানীর খুব নাম শুনেছি বটে, কিন্তু ভায়া
আস্বাদন করা ত এ পর্যন্ত ঘটে উঠল না। তােমার কথা শুনে ত বােধ
হচ্ছে, তুমি খুব সম্প্রতি সেই পরম রমণীয় জিনিষের দ্বারা রসনার তৃপ্তি
সাধন করেছ। আহা, বলতেই জিভেয় জল আসছে। ভায়া, তােমার
ঘরে যদি থাকে তবে আমায় অবিশ্যি অবিশ্যি কিঞ্চিৎ পাঠিয়ে দেবে।

রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক প্রাণনাথ। যদি ঘরে এখনও থাকে, তবে যে নিশ্চয়ই পাঠাব, তাতে আর সন্দেহ কি ? তবে গিন্নীমাগী যে-রকম টক খেতে মজবুত, তাতে ঘরে যে আর আছে, তা ত বােধ হয় না। সম্প্রতি মা পশ্চিমে তীর্থ করতে গিয়ে কাশী থেকে আম, লেবু, লঙ্কা প্রভৃতির অতি উপাদেয় আচার কিনে এনেছিলেন। কিন্তু যেই বাড়ীতে আনা, অমনি একদিনেই প্রায় সমস্ত সাবাড়। গিন্নীমাগীর দেখাদেখি ছেলে- গুলাে শুদ্ধ টক্ খাবার কুমার হয়ে উঠেছে। পাড়ার কারুর গাছে আর ওলন্দাজী লেবু থাকবার জো নেই। যেমন ওদের চোখ পড়েছে, অমনি গাছ থেকে অন্তর্ধান। আমি প্রথমে অনেক গালাগালি করি বটে, কিন্তু গিন্নীমাগী যখন নুনলঙ্কা মেখে একগাল হাসতে হাসতে পাথরবাটী করে নিয়ে এসে সম্মুখে ধরে, তখন রাগটাগ সমস্ত একেবারে জল। কি বিপদ, বলতে বলতেই দেখ, জিব দিয়ে জল আসছে। কেদারনাথ। তুমি কিন্তু দাদা ভারি পেটুক। বুড়াে হয়ে গেলে, শ বছরের কাছাকাছি বয়স হল ; যমে এসে মাথার চুল ধরে টানছে ; কিন্তু চ্যাজড়াদের মত টক খাওয়া গেল না। সে এককাল ছিল বটে, যখন আমিও টক খাবার যম ছিলুম বললেই হয়। এমন দিন যেত না, যেদিন সরকারদের বাগান থেকে আমড়া চুরি না করতুম। আর বৈশাখ মাস এলে ত একেবারে জয়জয়কার। বারুণীর মেলায় চাকু কিনবার পর সে চাকু আর যতদিন গাছে আম থাকত, ততদিন টাকছাড়া হত না। দিন নাই, রাত্রি নাই, দুপুর নাই, সন্ধ্যা নাই, অদুরহ কেবল টো-টো করে ঘুরে বেড়াতুম, আর রাশীকৃত আমকড়ালির শ্রদ্ধ করতুম। তারপর অক্ষয়তৃতীয় হয়ে গেলে মা জেঠীমারা যখন ফুলকাসুন, ঝালকাসুন প্রভৃতি নানা রকমের কাসুন তৈয়ের কৰ্ত্তেন, তখন আম খাবার মজা দেখে কে ? রােজ বিকেলে রাশীকৃত কাঁচা

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
২৭
আম এনে পাথর ভরে মাখা হত, তার পর সেই আম খেতে খেতে
ছেলেদের নৃত্য দেখে কে? সে এক কালই গিয়েছে। আজকাল
ছেলেরা টকের নাম শুনলেই ভয় পায়। যাহা একটু অম্বল ছুয়েছে,
অমনি সাতপ্ৰস্ত লেপমুড়ি দেওয়া ; অমনি বদ্যি ডাক্, বদ্যি ডাক্ বলে
চেঁচামেচি। এদের দিয়ে দুনিয়ার কোন্ কাজটাই হতে পারে?
প্রাণনাথ। যা বলেছ দাদা, একালের ছেলেগুলাে আবার মানুষ ?
আমার ঠাকুরদাদা নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে তিন পশুরা সন্দেশ অনায়াসে
উদরস্থ করতেন। পৌষসংক্রান্তির সময় শুধু খেসারীর শাক দিয়েই
তিন-চার পণ সাদা পিঠে অম্লান বদনে খেয়ে ফেলতেন। একালের
লােক তেমনি খাক দেখি ? কিন্তু দাদা, আসল কথাটা তাে আমরা
ভুলেই গেছি। কি খবর যে বলতে যাচ্ছিলে, বল না ?
দীননাথ। হু, এখনও তােমর। এসব শােননি। আশ্চর্য বটে।
এ সব কথা শুনতে কারই বা বাকী আছে ?
কেদারনাথ। তা বল না ছাই কথাটা কি ?
দীননাথ। রাজধানীর ডাঙায় ডহরে ছেলেবুড়ো পৰ্যন্ত এ সব
বিষয় নিয়ে কানাঘুষাে করছে, আর তােমরা কি তা নাই শুনেছ ?
প্রাণনাথ। তুমি বল ত ব্যাপারখানা কি ; তাহলে বুঝতে পারি
শুনেছি কি-না। না বললে আমরা কি করে জানব ?
দীননাথ । একথা আর কেই বা না শুনেছে ? শহরশুদ্ধ একেবারে
টি-টি পড়ে গেছে। যেখানে দুজন মানুষ একজায়গায় হচ্ছে, সেইখানেই
এই কথা ছাড়া আর মানুষের মুখে অন্য কথাই নাই ' বুঝেছ
ব্যাপারখানা কি ?
প্রাণনাথ। তােমার সঙ্গে আমি পেরে উঠলাম না দাদা। যা
"ওকথা আর আমি শুনতে চাই নে ।

২৮ রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক দীননাথ । তবে এই শােন। গৌড়ের বাদশা না-কি আমাদের মহারাজের কাছে পত্র দিয়েছেন যে, বাদশাহজাদীর সঙ্গে আমাদের মহারাজকুমার যদুনারায়ণের বিয়ে দিতে হবে। এক হপ্তার মধ্যে মহারাজকুমারকে গৌড়ে পৌছে না দিয়ে এলে বাদশা সপ্তদুর্গার চিহ্নমাত্র রাখবেন না। রাজপরিবারের সকলকে বজরায় পুরে কুড়ুল মেরে মাঝ পদ্মায় নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে দেবেন। আর সপ্তদুর্গার আর সপ্তদুর্গার যত অধিবাসী আছে, সকলকেই পেঁয়াজের গন্ধ শুকিয়ে মুসলমান করে দেবেন। খবর শুনবামাত্র মহারাণী-মা অন্নজল ত্যাগ করে শয্যা গ্রহণ করেছেন। আর মহারাজের কথা বলব কি, তিনি একেবারে উন্মাদের মত হয়ে গেছেন। দাস-দাসী, আমলা-পরিজন, কেউ আর তার কাছে যেতে সাহস করছে না। সেনাপতি দুর্গাচরণ ডাকাত ধরতে কলম গিয়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনবার জন্য লােক গিয়েছে। সেনাপতি না এলে আর কারাে সাধ্য নেই যে মহারাজকে প্রকৃতিস্থ করে। প্রাণনাথ। আঁ, সত্যি না-কি ! কি ভয়ানক! তা হলে আমাদেরও ত রক্ষা নেই। সকলকেই পেঁয়াজের গন্ধ উঁকিয়ে দেবে ? কি সর্বনাশ! জাতভিত সব তাহলে যে গেল! অ্যা—তাই তাে; এ যে ভয়ানক কথা, তাহলে কি করা যাবে ? দীননাথ। অত ভয় খেও না ভায়া ! এর উপায় করতে হয়, মহারাজই করবেন। আমাদের আর ওসব কথা নিয়ে ভাবতে হবে না। আমাদের মহারাজকে কি তুমি তেমনি লােক পেলে যে, এর কোন বিহিত না করেই তিনি নিশ্চিন্ত থাকবেন ? তা কখনই নয়। দেখই না কোথাকার জল কোথায় গড়ায় । কেদারনাথ। আমি বলি বাদশার সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া করে কাজ নেই। মহারাজকুমারকে গৌড়ে পৌঁছে দিয়ে এলেই ত সব গােল চুকে ৩য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ যায়। এতে আর মন্দই বা কি ? তিনি বাদশার জামাই হয়ে ত আদরে গােবরেই থাকবেন। সােনার খাটে পা দিয়ে রূপাের খাটে ঘুমােবন। কত দাসদাসী চাকরচাকরাণী দিনরাত্রি সামনে হাতজোড় করে দাড়িয়ে থাকবে। কত কত রাজভােগ খাবেন। মােছলমানদের পােলাও, কোর্মা, কাবাব, আরও কত রকমের সুরসাল খাদ্য দিনরাত রসনার তৃপ্তি সাধান করবে। এমন সুখ হাতে পেলে কি আর ছাড়া উচিত ? আমার যে বয়সটা কিছু বেশী হয়ে গেছে। চুলটা যদি না পাকত, আর দাঁতগুলাে যদি না পড়ত, আর গায়ের চামড়াগুলাে যদি ঝুলে না পড়ত—তা—এখনই কি কুৎসিত হয়েছি ? এ বয়সেও ত গিন্নী- মাগী এই রূপ দেখে পাগল ;, যদি আর একটু জোয়ান হুতুম, তাহলে আমিই সাগ্রহে বাদশাজাদীকে বিয়ে করে দুনিয়ার মজাটা লুটে নিতুম। মহারাজকে বলতুম যে আমাকেই মহারাজকুমার সাজিয়ে গৌড়ে পাঠিয়ে দিন। তাহলে আসল মহারাজকুমারেরও জাত যাবে না, আর আমারও বাদশাজাদীকে বিয়ে করা হবে । দীননাথ। যা বলেছ ভায়া। বয়সটা বেশী হয়েই সব গােল পাকিয়ে দিয়েছে, নইলে কিছুমাত্র ল্যাঠা ছিল না। যা এর আর উপায় নেই, এখন তামাকটা ঢেলে বেশ ভাল করে আর এক ছিলিম সাজ ত দেখি, তারপর ওসব কথা বিবেচনা করা যাবে ।

চতুর্থ দৃশ্য
সপ্তদুর্গ গণেশনারায়ণের মন্ত্রণাকক্ষ
গণেশ ও দুর্গাচরণ
দুর্গাচরণ। বেশ করেছেন মহারাজ, এ অপমানের প্রতিশােধ
নিতেই হবে ; তরবারির মুখেই গৌড়-সম্রাট তার পত্রের উত্তর পাবেন।
আপনি তাকে যুদ্ধে আহ্বান করে অতি উত্তম কাজই করেছেন।
গণেশ। দুর্গাচরণ! আমি পাঠানের স্পর্ধা দেখে বিস্মিত হয়েছি।
সেই ঔদ্ধত্য আর অবজ্ঞাপূর্ণ পত্র পাঠ করে অবধি আমি অনুক্ষণ
সহস্র বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা অনুভব করছি। যতক্ষণ পাঠানকে
এর উপযুক্ত প্রতিফল দিতে না পারব, ততক্ষণ এ যন্ত্রণার কণামাত্র
নিবৃত্তি হবে না। বল দুর্গাচরণ, এ অপমান সহ্ন করা অপেক্ষা মৃত্যুই
কি বাঞ্ছনীয় নয় ?
দুর্গাচরণ। আদেশ করুন মহারাজ, এই মুহূর্তেই আমরা পাঠান
রাজ্য আক্রমণ করি। সপ্তদুর্গা এবং সান্যালগড়ের মিলিত বাহিনী নিয়ে
ভীমরেগে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হই। মুর্থ গৌড়-সম্রাট দেখুক,
মহারাজ গণেশনারায়ণ দুৰ্বল হস্তে অসি ধারণ করেন না।
জীবনচন্দ্রের প্রবেশ
জীবন। মহারাজের জয় হােক।
গণেশ। জীবন, সংবাদ কি?
জীবন। আজ্ঞে সংবাদ খুব শুভ মহারাজ ; শাহ্জাদা আজিম
অনুমান পঞ্চাশ হাজার সৈন্য নিয়ে সপ্তদুর্গা আক্রমণ করতে আসছেন।

৪র্থ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
গত কাল সন্ধ্যার সময় তার বাহিনী চারঘাটের কাছে এসে শিবির
সন্নিবেশ করেছে।
আমাদের গুপ্তচর রাতারাতি সে-সংবাদ নিয়ে
দ্রুতগামী ছিপে পদ্মাবেয়ে সপ্তদুর্গায় এসেছে।
গণেশ। উত্তম, এর জন্য আমরা সর্বাংশেই প্রস্তুত। আমরা
এমন সুন্দর আতিথ্য সৎকারের বাবস্থা করে রেখেছি যে, শাহজাদাকে
জীবনে তার আস্বাদ কখন ভুলতে হবে না।
দুর্গা। আদেশ করুন মহারাজ, আমরা এখনই এগিয়ে গিয়ে
পাঠানকে আক্রমণ করি ; বাঙ্গালীর বাহুতে কত বল, তা তাদের মৰ্ম্মে
মৰ্ম্মে অনুভব করাই। আমি নিশ্চয় বলছি মহারাজ, আজিমকে
আমরা অতি শশাচনীয় ভাবে পরাস্ত করে সসৈন্যে বন্দী করে আনব।
গণেশ। আমি কিন্তু অন্য রকম বিবেচনা করি দুর্গাচরণ। আমাদের
অজেয় বাহিনীর সামনে পাঠান-সৈন্য যে পলমাত্রও দাড়াতে পারবে না,
তা নিশ্চয়। কিন্তু সেভাবে সম্মুখযুদ্ধ করলে অসংখ্য সৈন্তের প্রাণনাশ
অনিবার্য। তাই আমার ইচ্ছা, তারা আরও অগ্রসর হােক। বেশীদূর
যাবার প্রয়ােজন কি? তুমি চলন বিলের প্রবেশপথে সমস্ত সৈন্য
নিয়ে লুকিয়ে থাক, পরে হঠাৎ এমনভাবে আজিমকে আক্রমণ করবে
যে সে যেন আত্মরক্ষা করবারও সময় না পায়।
জীবন।
এ অতি উত্তম পরামর্শ মহারাজ, এতে একরকম বিনা
রক্তপাতেই আমাদের কাৰ্যসিদ্ধি হবে।
দুর্গা। তা হবে বটে, কিন্তু
জীবন। কিন্তু কি দুর্গাচরণ ? অকারণে রক্তপাত করে জাতিকে
দুৰ্বল করা যে কতবড় ভুল, তাকি তুমি বুঝ না ?
দুর্গা। মাপ করবেন মন্ত্রীমশায়, এ আমার ধারণারও অতীত।
গণেশ। ভাল, তােমাকে আমি বুঝিয়ে দেব।

৩২ রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক দুর্গা। মন্ত্রীমশায়! এ পাগলের প্রগলভতা মাপ করবেন। বিনা রক্তপাতে যে আমাদের জাতি কখনও মুক্তিলাভ করতে পারবে না, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। জীবন। কিন্তু তাই বলে বিনা প্রয়ােজনেও কি রক্ত দান করতে হবে ? দুর্গা। প্রয়ােজন ? প্রয়ােজন যথেষ্ট আছে মন্ত্রীমশায়। জীবন। দুর্গাচরণ! রক্তদান করতে করতে যে আমাদের রক্তের উৎসই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। দেবার মত রক্ত কি আর আছে আমাদের ? । এ জাতির রক্তদান--মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে; সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপরের কথা না হয় ছেড়েই দাও; এই কলিতেই ভিরৌরী, থানেশ্বর, কলিঙ্গ এবং সিন্ধুনদতীরে যে রক্তপাত হয়েছে, তাতে শত শত রক্তগঙ্গার সৃষ্টি হতে পারে। আরও রক্ত চাই ? মা ধরিত্রী কি এতই পিপাসিতা যে লক্ষ লক্ষ সন্তানের রক্তপান করেও তার পিপাসার শান্তি হয় নি ? না দুর্গাচরণ, আর রক্ত দেবার অবস্থা আমাদের নেই। দুর্গা। কিন্তু রক্ত ভিন্ন যে স্বাধীনতার অন্যমূল্য নেই মন্ত্রীমশায় ! জীবন। আমি স্বীকার করি দুর্গাচরণ, যে রক্ত স্বাধীনতার অন্যতম মূল্য বটে; তবে তাই যে একমাত্র মূল্য এ কথা আমি কিছুতেই মানতে প্রস্তুত নই। জীবন। দুর্গাচরণ! এদেশে—এই আষঋষির দেশে তাদেরই সন্তান হয়ে তােমার এরকম কথা বলা কখনই শোভা পায় না। মহারাজ বিশ্বামিত্র তার অগণিত সৈন্য নিয়েও তপস্বী বশিষ্ঠের ব্রহ্মবলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এই দৃষ্টান্তের পরেও কি তুমি বলতে চাও যে পশুবল ভিন্ন মুক্তির অন্য পন্থা নেই?

৪র্থ দৃশ্য ] রাজা গণেশ দুর্গা। মন্ত্রীবর, আমি যুদ্ধব্যবসায়ী ; আপনাদের সঙ্গে তর্ক করবার শক্তি আমার নেই। তবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস এই যে, রক্তের চাইতে কম মূল্যে স্বাধীনতা কেনা যায় না; বরং রক্ত দিতে অস্বীকার করলে স্বাধীনতা থাকলেও তা রাখতে পারা যায় না। জীবন। কিন্তু দেবার মত রক্ত আমাদের আছে কি-না সে কথাও ভাবতে হয় দুর্গাচরণ। দুর্গ।। মন্ত্রীবর! স্বীকার করি, ভারতবর্ষ যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলতে গিয়ে যে অপরিমেয় শােণিতরাশি দান করেচে, তা একত্র করলে শত শত রক্তগঙ্গার সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তাই বলে তার রক্তের উৎস নিঃশেষ হয়েছে, এতবড় একটা অসত্য কথা বলতে গেলে তাকে তার গৰ্বোন্নত মস্তক মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। ত্রিশ কোটী ভাই-ভগিনী বর্তমান থাকতে আমাদের রক্তের উৎস নিঃশেষ হয়েছে, একথা বলতে গেলে যে জগতের লােক আমাদের বাতুল বলে উপহাস করবে। জীবন। দুর্গাচরণ, উপহাস করতে পারে না। আর প্রজাদের জীবন নিয়ে অযথা খেলা করবার অধিকারই বা আমাদের কি আছে? বড় বিষম দায়িত্ব আমাদের কঁাধে রয়েছে দুর্গাচরণ! প্রজার রক্ষক আমরা, সুতরাং যে কাজে লক্ষ লক্ষ প্রজার পাণবলি অনিবাৰ্য, বিশেষ সাবধান হয়েই তাতে হাত দিতে হবে। দুর্গা। সে কথা লক্ষ বার স্বীকার করি মন্ত্রীবর। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুললে চলবে না যে, রক্তদান না করলে এ জাতি কখনও স্বাধীনতারূপ অতুল ধনের অধিকারী হতে পারবে না। মন্ত্রীবর, এ একটি অতি বিরাট সমস্যা। এর সঙ্গে শুধু ক্ষুদ্র সপ্তদুর্গা নয়, সমস্ত ভারত- বর্ষের অতি নিকট সম্বন্ধ। ভারতবর্ষ যদি রক্তদানে অসম্মত হয় তবে ৩৪ রাজা গণেশ [ ২য় অঙ্ক চিরকালের তরে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল বহন করতেই হবে। এরূপ জীবনধারণে ফল কি মন্ত্রীমশায় ? দুর্ভিক্ষ অথবা মহামারীতে কুকুর- বিড়ালের মত প্রাণ দেওয়া ছাড়া সে জীবনে আর অন্য প্রয়ােজন নেই। জীবন। কিন্তু যদি বিরক্তপাতেই স্বাধীনতা লাভ করা যায় ? দুর্গা। সে আশা নিশার স্বপনের মতই অসম্ভব। জীবন। না দুর্গাচরণ, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। অহিংসার বলে—প্রেমের বলে যে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়, একথা ভারতবর্ষই জগতের কাছে একদিন প্রতিপন্ন করবে। দুর্গা। মন্ত্রীমশায়, আপনি আপনার অহিংসা নিয়ে থাকুন, আমার যখন হিংসা ছাড়া গতি নেই, তখন আমাকে বিদায় দিলেই ভাল হয়। গণেশ। দুর্গাচরণ, তুমি না পাঠান-সৈন্য আক্রমণ করতে চাও ! দুর্গাচরণ। আমি কখন্ তাতে পিছপা হলাম মহারাজ। গণেশ। বেশ, তুমিই এগিয়ে গিয়ে আজিমকে আক্রমণ কর। দুর্গা। মহারাজ, আমায় মাপ করুন। হঠাৎ কি একটা উত্তেজনার বশে আমি আত্মহারা হয়ে উন্মাদের মত আপনাদের সঙ্গে এত তর্ক করেছি। মহারাজ! আমার অপরাধ হয়েছে, আমায় ক্ষমা করুন। (নতজানু হইয়া উপবেশন) গণেশ। না দুর্গাচরণ, এতে তােমার কিছুমাত্র অপরাধ হয়নি; তােমার তর্ক করবার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। এটা যথার্থ মিত্রের কাজ। আমি যদি কোন অন্যায় আদেশ করি, আর তুমি যদি তা অন্যায় জেনেও যথাশক্তি তার প্রতিবাদ না কর, তবে সে কাজ

৪র্থ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
একজন সামান্য কর্মচারীর পদোচিত হতে পারে বটে, কিন্তু শুভাকাঙ্ক্ষী
বন্ধুর উপযুক্ত হয় না।
দুর্গ। কিন্তু আপনার কাছে আমি এখনও সামান্য বালক মাত্র।
বালকের কথার কোন মূল্য নেই মহারাজ।
গণেশ। না দুর্গাচরণ, আমারই ভুল হয়েছিল। আমরাই এগিয়ে
গিয়ে আজিমকে আক্রমণ করব।
দুর্গ।। মহারাজ, আমার মনে হয়েছিল যে যুদ্ধের গােড়াতেই
আমরা দুর্বলতা দেখাব কেন? কেন আমরা শুধু আত্মরক্ষাই করব ?
আমরাই আক্রমণ করি, তারাই আত্মরক্ষা করুক না কেন ।
গণেশ। তুমি ঠিক বুঝেছিলে দুর্গাচরণ। তােমার প্রস্তাব আমি
সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি। তুমি যত শীঘ্র সম্ভব এগিয়ে গিয়ে
আজিমকে আক্রমণ কর।
দুর্গা। যে আজ্ঞে মহারাজ।
সকলের প্রস্থান

পঞ্চম দৃশ্য চারঘাট-আজিম শাহের শিবির আজিম ও বক্তার আজিম। তুমি কি মনে কর বক্তার, যে, আমরা এ যুদ্ধে জয়লাভ করব? বক্তার। তাতেও কি শাহজাদার কোন সন্দেহ আছে? পঞ্চাশ হাজার শিক্ষিত শাহী-সৈন্য নিয়ে একটা তুচ্ছ ভুইয়াকে পরাস্ত করতে পারব না? শাহজাদা, আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকুন; গণেশনারায়ণ আমাদের এই বিরাট শাহী-সৈন্যের সম্মুখীন হতে কখনই সাহস করবে । বিনা যুদ্ধেই আপনি তাকে বন্দী করতে পারবেন। আজিম। আমার কিন্তু সন্দেহ হয় বক্তার। আমরা ক্রমে সপ্তদুর্গার বুকের উপর এসে পড়লাম ; কিন্তু কৈ, গণেশনারায়ণের সেনার ত চিহ্নমাত্র দেখতে পাই নে। আমার মনে হয়, গণেশ হয় ত আমাদের ফাদে ফেলবার জন্য কি একটা বিষম গুপ্ত ষড়যন্ত্র করেছে। নইলে যার রাজ্য আক্রান্ত হতে বসেছে, তার পক্ষে এমন নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকা একটা গােলকধাঁধা বলেই মনে হয়। বক্তার। না শাহজাদা, এতে ভাববার কথা কিছুই নেই। আপনি নিশ্চয় জানবেন, গণেশনারায়ণ ভয়ে তার রাজধানী ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া তার আর কি উপায়ই বা আছে ? কি সাধ্য তার যে এতবড় শাহী-সৈন্যের সে সম্মুখীন হয়। মশা হয়ে হাতীর সঙ্গে যুদ্ধ করবে ? এ কখনই সম্ভব হতে পারে না।

৫ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
আজিম। কিন্তু তাই যদি হবে, তবে সে কোন্ সাহসে গৌড়
বাদশাহকে যুদ্ধে আহ্বান করেছে ? তুমি যাই কেন বল না বক্তার,
আমি কিন্তু কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছিনে।
বক্তার। আপনার সন্দেহ ভিত্তিহীন শাহজাদা। আর যখন
এখনও শত্রুর কোন চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন আর বৃথা আমরা
তাড়াতাড়ি করে মরি কেন ? এইখানে দিন দু-তিন বিশ্রাম করে,
পরে বড়লের তীর ধরে সপ্তদুর্গার দিকে এগােনো যাবে। ক’দিনের
পথশ্রান্তিতে সৈন্যেরা সকলেই বিশেষ পরিশ্রান্ত হয়েছে। খানিকটা
বিশ্রাম না করলে তারা একেবারে ভগ্নোদ্যম হয়ে পড়বে।
আজিম।
বেশ, এইখানেই সকলে বিশ্রাম করুক। কিন্তু
আমাদের খুব সতর্ক হয়ে থাকতে হবে। শিবিরের চারদিকে উপযুক্ত
প্রহরী রাখবার ব্যবস্থা করবে।
বক্তার। যে আজ্ঞা।
{ প্রস্থান ]
[ আসমানের প্রবেশ ]
আমান! বাবা !
আজিম। কি মা !
আসমান। বাবা, তােমার মুখ । প্রফুল্ল দেখছি না কেন?
তুমি ত এমন হয়ে থাক না বাবা; কি হয়েছে বল না।
আজিম। কিছুই ত হয়নি মা।
আমান। না বাবা, গােপন করলে চলবে না। সত্যি করে
বল দেখি কি হয়েছে তােমার ?
আজিম। পাগলী আমার, কিছুই হয়নি।

রাজা গণেশ
[ ২য় অঙ্ক
আসমান। আমার কাছে মিছে কথা কেন বল বাবা? আমি
বুঝতে পেরেছি, তুমি দিনরাত যুদ্ধের কথা ভেবে এমন মন খারাপ
করেছ।
আজিম। সত্যি তাই মা। তা এত বড় বাহিনীর সেনাপতি
আমি, আমায় যুদ্ধের কথা যে ভাবতেই হবে মা, নইলে তােমার চাচার
কাছে কৈফিয়ৎ দিব কি বলে ?
আসমান। ভাবনা করতে হয় তাে সেজন্য বক্তার আছে। তুমি
কেন অত ভাবতে যাবে ?
আজিম। তা হয় না মা ; আমি যখন সেনাপতি, তখন সব
দায়িত্বই আমার। বক্তার এ যুদ্ধে আমার সহকারী মাত্র।
আসমান। তাই বলে তুমি বুঝি দিনরাত ভাববে ? তা হবে
বাবা। এখন একটু আমার গান শােন, তাহলে তােমার মনটা
একটু হাল্কা হবে।
আজিম। বেশ, গা তবে।
আসমান গাহিল [ শীত ]
রাতের আঁধার তাই বলে কি
দিনের আলাে ফুটবে না ?
লক্ষ্যহারা জীবনতরী
কূলে গিয়ে লাগবে না ?
কাল কেটেছে সুখের ছায়ে
তাই বলে কি দুখের ঘায়ে,
নুইবে পরাণ ব্যাকুল হয়ে
উদ্ধপানে উঠবে না ?

৫ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
সেদিন গেছে ফুলের রথে
আজকে বাদল পিছল পথে
চলতে হবেই ব’লে কেন
চরণ দ্রুত ছুটবে না ?
জগৎ চলে যাঁর ইসারায়,
আমরা রব তার ভরসায় ,
তাঁরই পায়ে লুটবে মাথা
অপর পায়ে লুটবে না।
আসমান। ( আজিমের কোলে বসিয়া তার গলা জড়াইয়া ধরিয়া)
কেমন লাগল বাবা?
আজিম। বড় সুন্দর লাগল মা।
আসমান। সত্যি বলছ ?
আজিম। হঁ্যা মা।
আসমান। বেশ, তাহলে আমার সঙ্গে একটু পাশা খেলতে হবে।
দেখ, আজ তােমাকে কেমন হারিয়ে দিই।
আজিম। আচ্ছা, নিয়ে আয় তবে।
আসমান। তুমি উঠো না বাবা, আমি চট করে নিয়ে আসছি।
[ প্রস্থান ]
আজিম। (স্বগত) এই মাতৃহারা কন্যাটিকে বুকে করে আমি
জীবনের সব দুঃখতাপ, জ্বালাযন্ত্রণা মুহূর্তের মধ্যে ভুলে যাই। বুঝি
বিধাতা আমার হৃদয়ে শান্তিবারি সেবার জন্যেই স্বহস্তে এই নিখুঁত
প্রতিমাখানি গড়ে ধরাতলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আসমানকে বুকে
করলে আমি এই বন্ধুর সংসারে অতুল স্বর্গসুখ ভােগ করি। ভগবান,

৪০
রাজা গণেশ
[ ২য় অঙ্ক
আমার এই ননীর পুতুলটি যেন জীবনে দুঃখ কাকে বলে তা জানতে
পারে, তােমার চরণে এই আমার কাতর মিনতি।
[ জোড়হস্তে প্রণাম ]
[ পাশা লইয়া আসমানের পুনঃ প্রবেশ
আসমান। এই যে বাবা, পাশা নিয়ে এসেছি। এস আমার
সঙ্গে খেলবে এখন।
( আসমান যেমন পাশার ঘর বিছাইতে যাইতেছেন, অমনি
উপযুপরি কামানের শব্দ শুনা গেল ; এবং জনৈক প্রহরী
দৌড়িয়া সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল)
প্রহরী। জাহাপনা, শত্রুপক্ষ শিবির আক্রমণ করেছে।
আজিম। আঁ! শত্রুর তােপ ? দেখি।
[ উভয়ের দ্রুতবেগে প্রস্থান
আসমান । এ কি করলে খােদা? দুশ্চিন্তা থেকে পিতার মনটা
একটু মুক্ত করবার চেষ্টা করছিলাম, অমনি আবার এক নূতন বিপদ
এনে উপস্থিত করলে? পিতাকে আমার একটু শান্তি দাও দয়াময়।
মা’র মৃত্যুতে যদিও কিছুই কষ্ট বােধ করিনি, কিন্তু সেই থেকে পিতা
এতই শােকার্ত হয়ে রয়েছেন যে, তাতে আমার হৃদয়ে সর্বদাই শেল
বিদ্ধ হয়ে থাকে। আব্দার ক'রে পিতার কাছে বন্দুক চেয়ে নিয়েছিলুম,
ইচ্ছা ছিল যে নিজে রীতিমত অস্ত্র শিক্ষা করে আমাদের নারীজাতিকে
সেই বিদ্যায় সুশিক্ষিত করে তুলবাে, ভারতের রমণী কুসুমাঙ্গী-এই
দুনাম দূর করব ; আর সেই বিদ্যার প্রত্যক্ষ পরিচয় দেবার জন্য
নিজের অধ্যক্ষতায় নারীসৈন্যদল গঠন করে দেশের কাজে আত্মনিয়োেগ
করব। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়ের সঞ্চিত সব আশা-

৫ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
৪১
আকাক্ষ নিমিষের মধ্যে শুকিয়ে গেল । এখন পিতার মনে একটু
শান্তি দেওয়া ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর অন্য কাজ নেই ; তাই
রাজধানী ছেড়ে শিবিরে শিবিরে তঁার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দেখি
তিনি এই বিপদের মধ্যে কোথায় গেলেন।
[ প্রস্থান ।
[ক্তার ও ইশাকের প্রবেশ ]
ইশাক। জনাব, যুদ্ধের অবস্থা দেখে বােধ হচ্ছে, আজ আর
আমাদের কল্যাণ নেই। তারা চার দিক থেকেই আমাদের একেবারে
ঘিরে ফেলেছে। দক্ষিণে ও পূবে তাদের যুদ্ধজাহাজ, আর উত্তর ও
পশ্চিমে স্থলসৈন্য আমাদের উপর ভীষণ অগ্নি বৃষ্টি করছে। শাহজাদ।
স্বয়ং নিজহাতে তােপ দেগে শত্রুর নৌসৈন্যের সঙ্গে লড়াই দিচ্ছেন।
এখন আমরা যদি উত্তর ও পশ্চিম দিক রক্ষা করতে পারি তা হলেই
আজ রক্ষা, নইলে আমাদের অদৃষ্টে যে কি আছে, তা একমাত্র খােদাই
বলতে পারেন।
বক্তার! ইশাক খা, তুমি আর তিলমাত্র বিলম্ব না করে পশ্চিম
ভাগে শত্রুকে আক্রমণ কর। উত্তর দিকে তার খুব প্রবল ব’লে বােধ
হচ্ছে ; সুতরাং আমি নিজে উত্তর দিক রক্ষা করব। যাও, শীঘ্র যাও।
ইশাক। যে অজ্ঞা।
[ দ্রুতবেগে প্রস্থান ।
[ আসমানের প্রবেশ ]
আসমান। বক্তার খা, পিতা কোথায় ?
বক্তার। কেন পিয়ারী ?
আসমান। এ কি, বক্তার খা? তােমার এ কিরূপ ব্যবহার ?
তােমার কথাবার্তা ত সম্রমসুচক নয় ?

৪২
রাজা গণেশ
[ ২য় অঙ্ক
বক্তার। পিয়ারী, সন্ত্ৰম করা ত ছার, তােমার জন্য এ প্রাণ পৰ্যন্ত
বিসর্জন দিতে পারি। বল তােমার কি আদেশ পালন কৰ্ত্তে হবে ?
আসমান। তােমাকে আমি সাবধান করছি বক্তার খা, গােস্তাকি
করে বল, আমার পিতা কোথায় ?
বক্তার। তিনি যুদ্ধ করছেন।
আমান। আমাকে সেইখানে নিয়ে চল।
বক্তার। তুমি নারী, সে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে তােমায় আমি নিয়ে
যেতে পারি নে।
আসমান। অগ্নিবৃষ্টিকে আমি কিছুমাত্র গ্রাহ্য করি নে। তুমি
এই মুহূর্তে আমায় তার কাছে নিয়ে চল।
বক্তার। এ ইচ্ছা ত্যাগ কর শাহজাদী। বিপদের মধ্যে তােমায়
কিছুতেই যেতে দেওয়া হবে না।
আসমান। শােন বক্তার খাঁ, আমি স্বয়ং পিতার পার্শ্বে দাড়িয়ে
যুদ্ধ করব। বন্দুক চালনায় আমার অভ্যাস আছে জান।
বক্তার। কিন্তু সৈনিকের যে কর্তব্য তা তুমি কিছুই জান না।
বিশেষ তুমি
সম্রাটের ভ্রাতুস্পুত্ৰী; তােমার জীবনরক্ষার দায়িত্ব
আমাদেরই। তুমি মনে করলেই যা-ইচ্ছা তাই করতে পার না।
আসমান। আমাকে পিতার কাছে যেতেই হবে, তােমার সাধ্য
থাকে ত বন্ধ কর।
[ প্রস্থানের উদ্যোগ ]
বক্তার। কোথা যাও পিয়ারী, দাড়াও।
[ দৃঢ়মুষ্টিতে আমানের হাত ধরিলেন ]
আমান। বক্তার খা! তােমার এতদুর স্পর্ধা ? আমার গা ছুঁয়ে

৫ম দৃশ্য । রাজা গণেশ ৪৩ অম্লান বদনে দাড়িয়ে আছ ? জান, এর পরিণাম কি? আদেশে তুমি শূলে যাবে। বক্তার। (উচ্চ হাস্য করিলেন) আসমান। তবে রে ঘৃণিত কুকুর, তাের কর্মের ফলভােগ কবু। ( আসমান বাম হাতে স্বীয় পকেট হইতে পিস্তল বাহির করিয়া বক্তারের ললাট লক্ষ্য করিলেন। বক্তার অমনি আসমানের হাত ছাড়িয়া দিয়া এক লাফে পশ্চাতে হটিয়া গেলেন এবং নিজ পকেট হইতে পিস্তল বাহির করিয়া আসমানের প্রতি লক্ষ্য করিলেন। আসমান তখন বিদ্যুদ্বেগে অগ্রসর হইয়া বক্তারের ডান হাতের কজীতে নিজ পিস্তলদ্বারা আঘাত করিলেন। অমনি বক্তারের হাত হইতে পিস্তল মাটিতে পড়িয়া গেল, এবং তাড়াতাড়ি আসমান তাহা তুলিয়া লইয়া বক্তারের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন) এইবার কুকুর, দেখি তােকে কে রক্ষা করে ! বক্তার। শাহজাদী, তােমার হাতে মরেও সুখ আছে। তুমি আমাকে গুলি কর, আমি হাসতে হাসতে মরি। আসমান। বক্তার খাঁ, তুমি সম্রাটের একজন কার্যক্ষম সৈনিক। এই যুদ্ধের সময় তােমায় হত্যা করলে সেট। ঘাের আত্মদ্রোহের কাজ হবে। তাই সম্রাটের মঙ্গলের কাছে আমি আমার তুচ্ছ ব্যক্তিগত মঙ্গল বলি দিলাম। যাও বক্তার খা, নারীর প্রতি পীড়ন করে যে পাপের ভার মাথায় নিলে, সম্রাটের কাজে দেহ সমর্পণ করে তার যথােচিত প্রায়শ্চিত্ত কর। যাও, শীঘ্র যাও, সম্রাটসৈন্য ধ্বংসমুখে পতিত, তাদের সাহায্য কর। বক্তার। শাহজাদী, তুমি আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিলে। তােমায় বার বার সেলাম করে আমি সৈন্যদের মধ্যে চম। [বেগে প্রস্থান ]

৪৪
রাজা গণেশ
আসমান। তবে আমিই বা আর দেরী করি কেন ? দেখি পিতা
কোথায় যুদ্ধ করছেন, আমি নিজেই খুঁজে তাকে বার করব।
(বেগে প্রস্থান )
দুর্গাচরণ ও যদুনারায়ণের প্রবেশ
দুর্গা। কুমার, আপনার সংবাদ কি ?
যদু। আজিম শাহ, আজ অদ্ভুত বিক্রমে যুদ্ধ করছেন।
দুর্গ। যুদ্ধ শেষ হয়েছে কুমার। আজিম শাহ, আমাদের কাছে
আত্মসমর্পণ করবেন বলে পত্র লিখেছেন। তাই এই মাত্র আমি
যুদ্ধ বন্ধ করবার আদেশ দিয়েছি।
যদু। তাহলে চলুন, আমরা আজিমের শিবিবে গিয়ে তাঁর
সৈন্যদের নিরস্ত্র করি।
দুর্গা। ই; চলুন।
{ উভয়ের প্রস্থান)
আজিম শাহ ও আসমানের প্রবেশ
আমান। বাবা, এ কি ব্যাপার আমি বুঝতে পারছিনে।
আপনার সৈন্যরা যে যেখানে ছিল, সেইখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আপনি নিজে এতগুলো তােপের মধ্যে থেকেও যুদ্ধ করছেন না।
এর কারণ কি, আমাকে শীঘ্র বলুন, আমি জাবার জন্য অত্যন্ত
ব্যর্থ হয়েছি।
আজিম। মা, আমি সপ্তদুর্গার সৈন্যের কাছে আত্মসমর্পণ
করেছি।
অমান। নানা-বাবা, এ মিথ্যা কথা। আপনার মত
বীর কখন আত্মসমর্পণ করেন না।

৫ম দৃশ্য } রাজা গণেশ ৪৫ আজিম। মিথ্যা নয় আসমান, সত্যই আমি আত্মসমর্পণ করেছি। আমার অদৃষ্টে এও ছিল। সিংহশিশু হয়ে আজ শৃগালকে দেখে ভয় পেলাম। কিন্তু উপায়ান্তর ছিল না আসমান। সম্রাটের অর্ধেক সৈন্য আজকার যুদ্ধে অন্তিম শয্যা রচনা করেছে। এই পৰ্বতপ্রমাণ শবের মাঝে দাড়িয়ে বিজয়গৰ্বে স্ফীত হওয়ার চেয়ে, আত্মসমর্পণ করাই আমি সঙ্গত মনে করলাম। আসমান। ভাল করেননি বাবা। মহামান্য শাহজাদা আজিমের এ ভাবে আত্মহত্য তার কন্যার পক্ষে একান্ত অসহ। না বাবা, তা হতেই পারে না। আপনি আপনার পত্র ফিরে নিন, নিয়ে আবার যুদ্ধ করুন। আর আবশ্যক হয় ত জীবন দিন, কিন্তু এভাবে বন্দীত্ব স্বীকার করে দারুণ অপমানের ডালি মাথায় নেবেন না। আজিম। তা আর হয় না আমান। দুর্গাচরণ ও যদুনারায়ণের প্রবেশ আসুন সেনাপতি, আমাদের অস্ত্র গ্রহণ করুন। ( অস্ত্ৰত্যাগ করিবার উদ্যোগ করিতে করিতে আসমানকে বলিলেন)-মা, তুমিও তােমার অস্ত্র পরিত্যাগ কর। দুর্গা। না শাহ জাদ, মহারাজ গণেশনারায়ণ এত ক্ষুদ্রচেতা নন যে, আপনার মত বীর বা আপনার কন্যার মত বীরাঙ্গনার অস্ত্র গ্রহণ করবেন। আজ হতে আপনারা সপ্তদুর্গার সম্মানিত অতিথি। আপনার সৈন্যরা অস্ত্রত্যাগ করেছে এই যথেষ্ট। আসুন আমাদের সঙ্গে, আমাদের শিবিরে আসুন। সকলের প্রস্থান

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
গৌড় রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুর-সংলগ্ন প্রমদোগান
সম্রাট নসেরিৎ শাহ, আসীন
নর্তকীগণের গীত
সাজ লাে সই সাজ লাে যতনে ;
ধরূতে হবে মনচোরা রসিক রতনে।
পিয়ে নিতি ফুলের মধু,
পালিয়ে যায় ভােস্ত্র বঁধু ।
ছাড়বাে না আজ বাঁধবাে তারে প্রেমের বাঁধনে।
হৃদয়মাঝে লুকিয়ে রেখে প্রেমিকরতনে,
যখন খুশী দেখ ব তখন ও চঁাদবদনে ;
তার মুখের সেই মিষ্টি হাসি,
আমরা বড় ভালবাসি ;
তাই ত জীবন বিকিয়ে দিছি মনােমােহনে ;
ছাড় বাে না আজ বাঁধব তারে প্রেমের বাঁধনে।
নসেরিৎ। ওয়াহিয়াৎ, একদম্ ওয়াহিয়াৎ।
১ম নর্তকী। জাহাপনা, যতদূর সম্ভব ভাল করে গাইবার জন্য
আমরা প্রাণপণে চেষ্টা করেছি। অন্য কতদিন হজরত এই গানেই

১ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
৪৭
মােহিত হয়ে দু’হাতে আমাদের আশরফি বশিস্ দিয়েছেন। আজ
আমাদের একান্ত মন্দ নসীব, তাই জাহাপনার মনােরঞ্জন করতে
পারলুম না।
নসেরিৎ। আচ্ছা, এইবার খুব ভােফা দেখে একটা গা—।
নর্তকী। জো হুকুম।
মেহেরুন্নিসার প্রবেশ
২য় নর্তকী। একি, হজরৎ বেগম সাহেবা এখানে।
( সকলে কুনিশ করিল)
মেহের। দুর হ তােরা এখান থেকে।
নর্তকীগণের প্রস্থান
}
f
( সম্রাটের প্রতি) সম্রাট ! এ কি তােমার আচরণ ?
নসেরিৎ। কি আচরণ মেহের ?
মেহের। কি আচরণ ? সপ্তদুর্গার বিরুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের
বাহিনী পাঠালে, সে বাহিনী নির্মমভাবে পরাজিত হয়ে শত্রুর হাতে
বন্দী; শাহজাদা আজিম তার কন্যার সঙ্গে কাফেরের ঘরে আবদ্ধ।
এতে তােমার মাথা লজ্জায় নুয়ে পড়েনি? এর পরেও তুমি সুন্দরীগণে
বেষ্টিত হয়ে ভােগসুখে মেতে রয়েছ ? ধিক্ তােমাকে! বৃথা তুমি
গৌড়ের সিংহাসন কলঙ্কিত করে রয়েছ সম্রাট। যদি তােমার মনুষ্যত্ব
থাকে, সিংহাসন ত্যাগ করে যেখানে ইচ্ছা চলে যাও ; পাঠান নামে
আর এ ভাবে কলঙ্ক দিও না।
নসেরিৎ। মেহের, তুমি
তুমি তােমার গৃহস্থালীতে মন দাও।
সম্রাটের কর্তব্য সম্বন্ধে পরামর্শ দিতে বৃথা চেষ্টা করাে না।

৪৮
রাজা গণেশ
[ ৩য় অঙ্ক
A
মেহের। সম্রাট, তুমি কি প্রকৃতিস্থ ?
নসেরিৎ। সম্পূর্ণ।
মেহের। মিথ্যাকথা সম্রাট। নইলে যার একটা প্রকাণ্ড বাহিনী
শক্রর হাতে বন্দী, তিনি কখনও নর্তকীগণে পরিবৃত হয়ে থাকতে
পারেন না।
নসেরিৎ। ভাল, তুমি কি করতে বল ?
মেহের। কি করতে বলি? দ্বিগুণ সৈন্য নিয়ে তুমি নিজে এবার
সেই কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা কর ; সপ্তদুর্গার অস্তিত্ব ধরাবক্ষ হ'তে
সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে দাও।
নসেরিৎ। এটা তােমাদের নুরীজনােচিত রীতি হতে পারে বটে,
কিন্তু রাজনীতি নয় ।
মেহের। সম্রাট, তুমি তােমার বেগমকে নারী বলে উপহাস
করতে শিখেছ, এটা কি তােমার পক্ষে বড়ই গৌরবের কথা ?
বিনাশকালে মানুষের এমনি বিপরীত বুদ্ধিই হয়। জিজ্ঞাসা করি,
যার পেট থেকে এত রাজনীতি জ্ঞান নিয়ে জন্মেছ, তােমার সেই মা
নারী ছিলেন, না পুরুষ ?
নসেরিৎ। মেহের, আবার বলছি, তুমি তােমার
তােমার আপনার
জায়গায় গিয়ে নিজের কাজে মন দাও। বৃথা কেন এখানে আমার
সময় নষ্ট করছ ?
মেহের। সম্রাট, আমি তােমার প্রধানা বেগম-পাটরাণী।
তুমি যে তােমার পৈতৃক সিংহাসন কাফেরের হাতে সঁপে দেবে,
আর আমি পাষাণ-প্রতিমার মত নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে তাই দেখব,
এমন কথা কখনই মনে স্থান দিও না। তােমার যাতে চৈতন্য হয়,
তার ব্যবস্থা আমাকে করতেই হবে।

১ম দৃশ্য ।
রাজা গণেশ
৫৯
নসেরিৎ। ভাল, তুমিই না হয় আমার স্থানাপন্ন হয়ে গৌড়দেশ
শাসন কর।
মেহের। তা হলে এই মুহূর্তেই তুমি লক্ষ সৈন্য নিয়ে সেই
কাফেরের বিরুদ্ধে যাত্রা কর ।
নসেরিৎ। কাফের-কে কাফের ?
মেহের। কে কাফের ? যে তােমার সমগ্র বাহিনী বন্দী করে
রেখেছে, সেই গণেশনারায়ণ।
নসেরিৎ। ভাল, সেই কাকেরের তুমি কি করতে চাও?
মেহের। তাকে সবংশে নিহত কর।
নসেরিৎ। ফল?
মেহের। অক্ষয়-স্বৰ্গ। বিশ্বাস না কর, কোরাণ, শরিফ খুলে,
দেখ।
নসেরিৎ। কিন্তু ক’জনকে হত্যা করবে ? এই . বাংলাদেশে
লক্ষ লক্ষ কাফের আছে।
মেহের। যত পার, তত হত্যা কর।
নসেরিৎ। মেহের, আমার অনন্ত নরক হয় "হােক কিন্তু আমি
তােমার পরামর্শ গ্রহণ করতে অক্ষম ; কেননা, আমি বিশ্বাস করি
যে, এই হিন্দুর দেশে ভালবাসা দিয়ে হিন্দুর হৃদয় জয় না করলে, শুধু
পৈশাচিক বলে মুসলমানের রাজশক্তি কখনও অক্ষুন্ন থাকতে পারে না।
হিন্দু আর মুসলমান একই খােদার সৃষ্ট জীব। হিন্দুধৰ্ম্মই বল, আর
মুসলমানধৰ্ম্মই বল, সকলেরই উদ্দেশ্য খােদাকে লাভ। উভয়ের পথ
ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু গন্তব্যস্থান একই। এমন অবস্থায় শুধু কাফের
বলে হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষ পােষণ করা আর আত্মহত্যা করা, এ দুয়ের
মধ্যে আমি কিছুমাত্র প্রভেদ দেখি নে।
;

রাজা গণেশ [ ৩য় অঙ্ক মেহের। সম্রাট, আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, তুমি পাঠানের অর্জিত গৌড়ের শাসনদণ্ড অচিরে কাফেরের হাতে বিসর্জন দেবে। নসেরিৎ। মেহের, আমি হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে ভেদজ্ঞান করি নে। মুসলমানকে যেমন ভালবাসি, হিন্দুকেও তেমনি ভালবাসি। এ যদি উন্মত্ততার লক্ষণ হয়, তবে আমি যাের উন্মাদ। তুমি শুনতে চাও, কেন আমি পাঠানবাহিনীর পরাজয়ের পরও নিশ্চন্ত হয়ে বসে আছি, শােন তবে, আমি সপ্তদুর্গেশ্বর মহারাজ গণেশনারায়ণকে প্রেমের শৃঙ্খলে বাঁধতে চাই, তাই আমি তার বন্ধুত্ব ভিক্ষা করে তার কাছে দ্রুতগামী দূত পাঠিয়েছি। আমি শপথ করে বলতে পারি মেহের বিন্দুমাত্র রক্তপাত না করেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। আমার পত্র পাঠমাত্রই গণেশনারায়ণ আমার সমস্ত সৈন্যকে সসম্মানে মুক্ত করে দেবেন। নিশ্চয় জেনাে মেহের, যে হিন্দু বীরের জাতি ; বীরত্বের তারা কখনই অমৰ্যাদা করবে না। মেহের। তােমার কথা শুনে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। সম্রাটু, তুমি পাঠানের উন্নত শির আজ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে। নসেরিৎ। ভুল মেহের, সম্পূর্ণ ভুল। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছি, এতে পাঠানের সম্পূর্ণ মঙ্গলই হ'ব; আর আমার নিজের সিংহাসনও যে এতে নিরাপদ হবে, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই হিন্দুর দেশে আপদে-বিপদে হিন্দু ছাড়া পাঠানকে আর কে সাহায্য করবে মেহের? তুমি নিশ্চয় জেনাে, এই সিংহাসন নিয়ে একদিন আমারই আপনার জন আমার মাথায় কুঠারাঘাত করতে উদ্যত হবে; তখন বীর গণেশনারায়ণ যে আমার বন্ধুত্বের মষ্যাদা সম্পূর্ণই রক্ষা করবে, একথা আমি শপথ করে বলতে পারি।

২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ মেহের। তােমার যা ইচ্ছা তাই কর, আর উৎস যাবার রাস্তা তৈয়ার কর। নসেরিৎ। ভগবানের রাজ্যে থেকে মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি ঘৃণা পােষণ করা আমার দ্বারা কিছুতেই হবে না। আমি হিন্দুকে ঠিক মুসলমানের মতই ভালবাসব। এতে যদি আমায় উৎসই যেতে হয়, তবে আমি উৎসগ্ন যেতেই রাজী। কিন্তু আবার তােমায় আমি বলছি মেহের, যে, হিন্দুর হৃদয় জয় করতে না পারলে ভারতে মুসলমানের কল্যাণ নেই। তুমি আমাকে উন্মাদই বল আর যাই বল, আমি যেন খােদর কাছ থেকে তাঁর দিব্য বাণী শুনতে পাচ্ছি যে, হিন্দু-মুসলমানের মিলনেই ভারতের জীবন, বিচ্ছেদে মৃত্যু। দ্বিতীয় দৃশ্য সপ্তদুর্গা-গণেশনারায়ণের শয়নকক্ষ গণেশনারায়ণ ও ত্রিপুরেশ্বরী ত্রিপুরা। মহারাজ, আজ সমস্ত দিনের মধ্যে একবারও তােমার দেখা পাইনি। গণেশ। না পাবারই কথা ত্রিপুরা। আজ সমগ্র রাজধানী বিজয়ােৎসবে মত্ত। রাজপথে পিপীলিকার মত সারি সারি লােক; সকলেই একবার তাদের মহারাজ এবং চারঘাটবিজয়ী বীরদের দেখবার জন্য ব্যতিব্যস্ত। পূজা-অর্চনা, বাদ্যভাণ্ড, শশাভাযাত্রা, সর্বোপরি রান গণেশ [ ৩য় অঙ্ক সৈনিকদের বিজয়যাত্রা যাতে সুশৃঙ্খলে সম্পন্ন হয়, তার ব্যবস্থা আমাকে করতে হয়েছে। ত্রিপুরা। আমিও সারাদিনের মধ্যে একতিল জিতে সময় পাইনি মহারাজ। মা ভবানীর মন্দিরে যােড়শােপচারে পূজো হােম ভােগ এবং ব্রাহ্মণ সধবা কুমারী ও কাঙালী ভােজন করিয়ে ঠিক সন্ধ্যার সময়ে আমি বাড়ীতে ফিরে এসেছি। গণেশ। তা বেশ করেছ। ত্রিপুরা। মহারাজ, একটা কথা শুনলুম? গণেশ। কি ত্রিপুরা ? ত্রিপুরা। গৌড়সম্রাট নসেরিৎ শাহ, না কি আমাদের বন্ধুত্ব ভিক্ষা করে পত্র লিখেছেন। গণেশ। হ্যা। আমিও মনে করছি, তার প্রসারিত হস্ত আমি সম্পূর্ণ প্রতিভরেই গ্রহণ করব। ত্রিপুরা। কিন্তু এখন তােমার বন্ধুপাতানাের সময় নয় মহারাজ। পরাজিত হয়ে অনেকেই অমন বন্ধুত্ব ভিক্ষা করে থাকে। তুমি এখন বিজয়ী, সে বিজিত। এই বিজয়ী সেনা নিয়ে যদি অবিলম্বে গৌড় আক্রমণ কর, মুহূর্তে রাজধানী তােমার পদানত হবে। শুভ মুহূর্ত বয়ে যায় মহারাজ, আর বিলম্ব করে না, প্রভাতেই রাজধানী আক্রমণের ব্যবস্থা কর। নইলে যদি শুভ মুহূর্ত অতীত হয়ে যায়, জন্ম জন্ম চেষ্টা করলেও হয়ত বাংলার দাসত্বশৃঙ্খল আর উন্মুক্ত হবে না। গণেশ। সবই ত বুঝি ত্রিপুরা, কিন্তু পরাজিত বীরের সদ্ধিভিক্ষা প্রত্যাখ্যান করা যে ক্ষাত্ৰধর্মের সম্পূর্ণ বিরােধী। ত্রিপুরা। মহারাজ, যাদের সঙ্গে ক্ষাত্রধর্ম পালনের জন্য এত ব্যস্ত ২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ হয়েছ, তারা কি তােমাদের সঙ্গে ক্ষাত্রধর্ম পালন করেছিল? জিজ্ঞাসা করি, মহম্মদ ঘােরীর দ্বারা পৃথ্বীরাজের পরাজয় কি ক্ষাত্রধর্মানুসারে হয়েছিল ? গণেশ। অতীতের বেদনাময় স্মৃতি নূতন করে তুলে আর কোন লাভ নেই ত্রিপুরা। বিশেষ পাঠানেরা রাজ্য জয় করবার পর এই দেশেই বসবাস করতে আরম্ভ করেছে। ভারতের স্বার্থের সঙ্গে তাদের স্বার্থের আর কোনই প্রভেদ নেই। এমন অবস্থায় শুধু পুরাতন অত্যাচারের প্রতিশােধ-কামনায় নূতন করে কলহের বীজ বপন করা আমি মােটেই সঙ্গত বলে মনে করি নে। ত্রিপুরা। তাই বুঝি তুমি পাঠান-শক্তিকে গৌড়-সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে রাখতে সাহায্য করবে ? গণেশ। হ্যা। যখন হিন্দু আর পাঠানের স্বার্থে কোন প্রভেদ নেই, তখন হিন্দুই হােক আর পাঠানই হােক, যে ন্যায় দণ্ডে দেশ শাসন করবে, প্রজামাত্রেরই তাকে সমর্থন করা কর্তব্য। শুধু সাম্প্রদায়িক কারণে বিপ্লবের সৃষ্টি করা দেশের পক্ষে সমূহ অনিষ্টকর। ত্রিপুরা। উত্তম কথা। তাহলে পাঠানের হাতেই যে দেশের শাসনদণ্ড থাকতে হবে, এমন ত কোন কথা নেই। যে রাজ্য শাসনের সবচেয়ে উপযুক্ত, সে-ই দেশের রাজা হবে । গণেশ। এ অতি উত্তম যুক্তি বটে; কিন্তু এ কাজ সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত কঠিন। ত্রিপুরা। কঠিন কিছুই নয় মহারাজ। প্রজাবৃন্দ স্বেচ্ছায় যার মাথায় মুকুট দেবে, সে-ই দেশের রাজা হবে। গণেশ। কিন্তু বাহুবলে সিংহাসন জয় করে কি পাঠান সম্পূর্ণ অধিকার প্রজাদের হাতে ছেড়ে দেবে? এমন ত আমার মনে হয় না। ;

৫৪ রাজা গণেশ [ ৩ অঙ্ক ত্রিপুরা। তবে কেন আর বৃথা ন্যায়ের কথা তােল মহারাজ? যে বাহুবলে দখল করতে পারে সিংহাসন তারই হােক। আর ভারতের শাসনদণ্ডে হিন্দুরই বংশগত উত্তরাধিকার। পাঠানই বরং হিন্দুর সিংহাসন কেড়ে নিয়েছে, হিন্দু পাঠানের কিছুই নেয় নি। এমন অবস্থায় হিন্দু যদি তার পৈতৃক সিংহাসন উদ্ধার করতে চায়, তবে কে তাকে অন্যায় বলবে মহারাজ ? বরং তা না করে বসে থাকাটাই ঘাের কাপুরুষের কাজ বলে গণ্য হবে। গণেশ। কিন্তু গৌড়-বাদশার বন্ধুত্ব কি উপেক্ষার জিনিষ ? ত্রিপুরা। তা না হতে পারে। কিন্তু আগে এই বন্ধুত্ব কোথায় ছিল? যখন গৌড়সম্রাটু ভয় দেখিয়ে পত্র দিয়েছিলেন যে, সপ্তাহের মধ্যে কুমারকে তার মেয়ের সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্য গৌড়ে পৌছে দিয়ে না এলে তিনি সপ্তদুর্গার চিহ্নই রাখবেন না; রাজপরিবারের সকলকে বজরায় পুরে পদ্মায় ডুবিয়ে দেবেন; তখন সে-সব কি বন্ধুত্বের পরিচয় বলে মনে করেছিলে ? মহারাজ, এত অপমানেও তােমাদের লজ্জা হয় না? কেন হঠাৎ আজ তুমি বন্ধুত্বের জন্য লুব্ধ হলে? গণেশ। অনবরত যুদ্ধে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি সবই নষ্ট হয় ত্রিপুরা। ত্রিপুরা। মহারাজ, আজ কিসের জন্য শান্তির প্রতি তোমার এত আগ্রহ? একটা যুদ্ধেই তােমরা এত অবসাদগ্রস্ত হলে যে, মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও তােমাদের প্রাণে আর উত্তেজনার সৃষ্টি করে না? এ বড় আশ্চৰ্য্য কথা। গণেশ। উত্তেজনা হলেই তারপর অবসাদ অনিবাৰ্য ত্রিপুরা। একটা কৃত্রিম অবস্থা সৃষ্টি করে কোনই লাভ নেই, তা মানুষের জীবনেই হােক আর জাতির জীবনেই হােক।

২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ ত্রিপুরা। কিন্তু শান্তির প্রতি এই অযথা আগ্রহ, এই ভীরুতা, এই কাপুরুষতা, এই অপদার্থতা তােমার পক্ষে ঘাের লজ্জার কথা। সিংহ হয়ে আজ শৃগালকে দেখে ভয় পাচ্ছ। শান্তি ? এত শান্তিতেও তােমাদের তৃপ্তি হয় নি? শাস্তির বিনিময়ে একটা জাতির ইহ- পরকাল পাঠানের পায়ে বলিদান। বিনা রক্তপাতে দেশের সিংহান বিদেশীর হাতে সমর্পণ । তারপর এই পুরুষানুক্রমিক দাসত্ব, অত্যাচার, অবিচার—এ সবই ত শান্তির বিনিময়ে লাভ করেছ। খুব শান্তি ভােগ কর মহারাজ ! গণেশ। এর জন্য শুধু আমাকে দোষ দিলে কি হবে ত্রিপুরা? এ সমস্তই আমাদের জাতির মহাপাপের ফল। ত্রিপুরা। বেশ, তােমরা সেই মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত কর। গণেশ। প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই করব, তবে শান্তিপূর্ণভাবে। ত্রিপুরা। অর্থাৎ খুব লম্বা লম্বা দরখাস্ত লিখে, না ? গণেশ। দরখাস্ত না লিখেও অনেক বড় বড় কাজ শান্তিপূর্ণভাবে করা যায়। ত্রিপুরা। হাঁ, তা যায় বই কি; বাদশার সঙ্গে কুটুম্বিতা করে, অর্থাৎ ভগ্নী-কন্যা-মা-মাসী প্রভৃতিকে উপঢৌকন দিয়ে। ছিঃ মহারাজ। তােমাদের কি কিছুতেই চৈতন্য হবে না? এই যে একটা বিরাট মিথ্যার কাছে এমন করে আত্মবলিদান করছ, এতে তােমাদের ধমনীর বক্তরাশি কি তপ্ত তেলের মত ফুটে উঠবে না? মহারাজ! এ একটা তুচ্ছ ব্যাপার নয় যে, যা ইচ্ছা তাই করবে। একটা জাতির ইহ- পরকাল এরই উপর নির্ভর করে। গণেশ। সবই ত বুঝি ত্রিপুরা ; তবু কি জানি কেন মনে হয়, ভারতের মুক্তি হিংসায় নয়, অহিংসায় ; পশুবলে নয়, প্রেমের বলে।

রাজা গণেশ [ ৩অঙ্ক মনে হয়, ভারতের প্রিয় বস্তু পশুবলার্জিত তুচ্ছ জড় পদার্থের সিংহাসন নয়, বিশ্বমানবের হৃদয়রাজ্যের সিংহাসন। আমি সম্পূর্ণ আত্মহারা ত্রিপুরা, আমাকে ভাবতে সময় দাও। তৃতীয় দৃশ্য সপ্তদুর্গা–অতিথিভবন-প্রাসাদসংলগ্ন পুষ্পোদ্যান আসমানতারা একখানা বেঞ্চের উপর হেলান দিয়া বসিয়া আছেন আমান। (স্বগত) আজ এক পক্ষ অতীত হ’লআমরা সপ্তদুর্গায় মহারাজ গণেশনারায়ণের বন্দী। কৈ, এত দিনের মধ্যেও ত কাকা আমাদের উদ্ধারের জন্য সৈন্যদল পাঠালেন না? পিতা আমার দিনরাত এতই ম্রিয়মাণ হয়ে থাকেন যে, তাকে দেখে দুঃখে আমার অন্তঃকরণ ফেটে যাবার উপক্রম হয়। সর্বক্ষণই তিনি কত কি ভাবেন। মা’র মৃত্যুর পর হতেই তার মনােকষ্টের সীমা নেই। তারপর এই পরাজয় আর বন্দীত্বের অপমান পিতার কঠিন হৃদয় ভেঙে একেবারে চুরমার করে দিয়েছে। মহারাজ গণেশনারায়ণ আমাদের সােনার পিঞ্জরে রেখেছেন; তাঁর সুবৃহৎ অতিথিভবন আমাদের বাসের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু যে বন্দী, তার পক্ষে সােনার পিঞ্জর আর লােহার পিঞ্জরে প্রভেদ কি ? পিতা আমার মনের দুঃখে সকালে বিকালে একটু হাওয়া খাবার জন্যও ঘরের বার হতে চান না। আজ কত করে বলে তবে তাকে হ্রদের ধারে একটু বেড়াবার জন্যে পাঠিয়েছি। তার ফিরতে দেরী দেখে মন যেন একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছে। একাকী বসে ব’সে আর কিছুই ভাল লাগছে না। দেখি একটা গান গাই। ।

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
৫৭
আসমানের গীত
আমার প্রাণে-মনে জড়িয়ে থাক
(তােমার) গানের মাঝে অচিন করে
সদা মােরে লুকিয়ে রাখ।
আজি এই রঙীন সাঝে
আমার এ হিয়া মাঝে
স্বপনেরি সােহাগ ছানি
ও রূপের মাধুরী আঁক।
কেন ঐ গােপনপুরে
আছ গাে দূরে দূরে
হরষের আভাস হানি
নিতি নিতি কাদিয়াে নাক।
(উদ্যানের একপার্শ্বে নীরবে যদুনারায়ণের প্রবেশ )
যদু। (স্বগত) আ মরি মরি কি সুন্দর রূপ, আর কত সুন্দর ঐ
বরলহরী।
জানি না এ অপার্থিব রূপরাশি কোন্ ভাগ্যবানের গৃহ
আলােকিত করবে। যবনের গৃহে এমন রূপ হয়, তা তো কখনও
জানতাম না। আজ আমার চক্ষু সার্থক যে, এই স্বর্গীয় সুষমারাশি
দেখতে পেয়ে ধন্য হলাম, কর্ণ সার্থক যে, এই অল্পৰােবিনিন্দিত মধুর
কণ্ঠের সুরলহরী শুনে প্রাণমন পুলকিত করলাম। কিন্তু এ ভাবে
দেখে তৃপ্তি হচ্ছে না, বড় দূর, আরও ভাল করে দেখি।
( অগ্রসর হইয়া) হাঁ, এইবার মুখখানি আরও ভাল করে দেখা
যাচ্ছে। কি লাবণ্য, কি জ্যোতি, কি সৌন্দৰ্য্য, কি কমনীয়তা
ঐ মুখে বিরাজ করছে। যেন একটি পদ্মফুল ফুটে আছে ।

৮
রাজা গণেশ
[ ৩য় অঙ্ক
গন্ধে তীব্রতা নাই ; বড়ই স্নিগ্ধ, বড়ই প্রীতিকর ; দেখলেই প্রাণমন
বিমােহিত হয়। ভগবানের কি অবিচার ; এমন অনাঘ্রাত বন্য
কুসুমটি বনেই ফুটে রইল, বুঝি বনেই এনিভাবে শুকিয়ে শুকিয়ে
শেষে অকালেই ঝরে পড়বে। না, আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি।
( নিকটে গিয়া) শাহজাদী। এ ভাবে একাকিনী আপনার উদ্যান-ভ্রমণ
নিরাপদ নয়। আপনার পিতা কোথায়? তার সঙ্গেই কেন আপনি
বেড়াতে বার হন নি ?
আমান।
কে আপনি?
যদু। আমি সপ্তদুর্গার যুবরাজ-যদুনারায়ণ।
আসমান। আপনি কি বাবার সঙ্গে দেখা করতে চান ? তিনি
হ্রদের ধারে বেড়াতে গিয়েছেন ; সময়ান্তরে এলেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ
হবে।
যদু। না, তার সঙ্গে দেখা করবার আমার প্রয়ােজন নেই।
আসমান। তবে হুকুম করুন, আপনার কি আজ্ঞা অধিনী পালন
করতে পারে ?
যদু। শাহজাদী, আপনি কেন এত সঙ্কুচিত ভাবে কথা বলছেন?
আপনারা এখানে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিশেষ কোন কাজে আমি আসিনি।
তবে দেখলাম আপনি একাকিনী উদ্যান-ভ্রমণ করছেন, তাই আপনাকে
একটু সাবধান করবার জন্য আমি হঠাৎ এস্থানে এসে পড়েছি।
আমান। এ আপনার মহত্বেরই পরিচায়ক।
যদু। না শাহজাদী, এতে মহত্বের কথা কিছুই নেই। যাক, আপনি
এখন ঘরে যান, আমিও ফিরে যাই।
আমান। আবার কখনও আসবেন কি?
যদু। জানি না। বিশেষ তােমরা আমাদের রক্ষণীয়া। এ ভাবে

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
তােমার সঙ্গে কথাবার্তা বলা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা ছাড়া
তােমার পিতাই বা এরূপ সাক্ষাতে অনুমতি দেবেন কেন ?
আসমান। অনুমতির কোন প্রয়ােজন আছে বলে মনে হয় না;
কারণ আমি এখন বয়স্থা; আমার মনের উপর পিতা চিরকাল প্রভুত্ব
করতে পারবেন না। আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করলেই
বা কে জিততে পারে কুমার ?
যদু। তােমার সঙ্গে আমি তর্ক করব না শাহজাদী! যাক, তােমার
বাবা বােধ হয় এখন বাসায় ফিরবেন, আমি এখন বিদায় হই।
(প্রস্থান)
আসমান। (স্বগত) একি, আশ্চৰ্য মনােভাবের পরিবর্তন। এই
ক্ষণেকের জন্য দেখা, এরই মধ্যে শরীর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুৎপ্রবাহ
খেলে গেল। সত্যই কি আমি আমার মনের উপর প্রভুত্ব হারালাম ?
(আজিমের প্রবেশ)
আজিম। আসমান!
আসমান। কি বাবা ?
আজিম। তুমি ত কখনও এখানে একাকিনী আসতে না ; আজ
কি প্রয়ােজনে এসেছিলে মা ?
আসমান। একাকিনী ঘরের ভিতরে থেকে আমার ফাপর ঠেকে
আসছিল বাবা। তাই একটু খােলা বাতাস পাবার জন্য বাগানের
মধ্যে গিয়ে বেঞ্চখানার উপর একটু বসেছিলাম।
আজিম। উদ্যানের প্রবেশপথে একটি যুবকের সঙ্গে আমার
সাক্ষাৎ হল। কে সে মা ?
আসমান। উনি রাজকুমার যদুনারায়ণ, আমাকে একাকিনী
উদ্যান-ভ্রমণ করতে দেখে সাবধান করতে এসেছিলেন।

রাজা গণেশ [ ৩য় অঙ্ক আজিম। আর কখনও এ ভাবে একাকিনী এস না মা। যদি তােমার বেড়াবার ইচ্ছা হয়, আমাকে বললেই আমি তােমার সঙ্গে আসমান। তাই করব বাবা। চল এখন ঘরে যাই, তােমার জলখাবার তৈরি করে দিই গে । আজিম। তুমি যাও, আমি একটু পরে আসছি। অসমান। আচ্ছা। (প্রস্থান) আজিম। (স্বগত) ভগবান আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করে দিয়ে গেলেন। আমার কন্যা বয়স্থা, অথচ আজও আমি তার বিবাহের আয়ােজন করি নি। সুতরাং কন্যার মনে যদি কোনপ্রকার ভাবান্তর এসে থাকে, তবে তার জন্য তার অপেক্ষা আমার নিজের দায়িত্বই অনেক বেশী। মা আমার যােড়শ বর্ষে পদার্পণ করেছে, অথচ তাকে কোন রকম সংযমশিক্ষা না দিয়েই অবিবাহিত অবস্থায় ফেলে রেখেছি। দোষ সম্পূর্ণই আমার নিজের। যদি সন্তানকে কঠোর সংযমে অভ্যস্ত করা যায়, তবে বিবাহ দিতে দেরী করা আর পাপের প্রশ্রয় দেওয়া যে একই কথা তাতে কি আর সন্দেহ আছে ? যাই হােক, এইবার আর বিবাহের দেরী করলে চলবে না। এই রাজকুমার যদুনারায়ণ যদি আসমানকে দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকে, তবে এ একটা সুবর্ণ সুযােগ বলতে হবে। বাংলায় পাঠান রাজবংশের কন্যার বিবাহ একটা বিষম সমস্যায় দাড়িয়েছে। সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে পাওয়া বড়ই দুষ্কর, অথচ রাজগৃহের চরম সুখের মধ্যে কন্যা লালিতপালিত হচ্ছে ; সংযম কাকে বলে জীবনে তা মােটেই জানে না; দেখি যদি এই সুযােগে কাৰ্যসিদ্ধি হয় ।

চতুর্থ দৃশ্য
সপ্তদুর্গা—চলনদের বাঁধা ঘাট
সােপানে বসিয়া ধূমপানরত বৃদ্ধগণ
দীননাথ। বলি ওহে ভায়া ! যা বলেছিলাম তাই হ’ল কি-না?
আমার কথা কি আর মিথ্যা হবার জো আছে ? অমন আমরা টের
ঢের দেখেছি। বলি কত জলের কত মাছ তা কি আর আমাদের
কাছে ছাপাতে পার? যতই ডুবে ডুবে জল খাও না কেন বাবা, এ দী
চক্রবর্তীর চোখ কিছুতেই এড়াবার জো নেই।
প্রাণনাথ। বলিহারী দাদা। তােমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
আর আমিও কিন্তু বরাবর ওই কথাই বলে আসছি। এখন বাবা
ঢাক-ঢাক-গুড়-গুড় নেই; মুখ খুলেই বলছি। বলি কুমার বাহাদুর
যা মজাটা লুটছেন, তাতে সত্যি বলতে কি দাদা, এই আমাদের মত
বুডােরও হিংসে হয়। বলি মােছলমান বাদশাজাদীর সঙ্গে পীরিত করা
কি আর যা-তা? কুমার বাহাদুরের ভাগ্যের জোরটা বড় সাধারণ
নয়।
কেদারনাথ। দাদার কথাগুলি যেন খাটি হীরেমাণিক। দাদা!
একবার কুমার বাহাদুরের কাছে তদবির করে দেখলে হয়, যদি একটা
দিনের জন্যও ওঁর জায়গায় আমাকে একটিনি করতে দেন, তাহলে
মােছলমানী রাজকুমারীর লাল ঠোট দুখানাতে ভাই একলাক-একটা
চুমাে না দিয়ে জলটুকু পর্যন্ত খাই না।
দীননাথ। বলি উচ্ছিষ্ট যে হে।
প্রাণনাথ। রেখে দাও দাদা তােমার ও-সব শান্তর। ও-সব

রাজা গণেশ [ ৩য় অঙ্ক মানতে হয় পােড়াকপালী বিধবারা মানুক গে। দেখতে পাও না বিধবারা একাদশী করে মরে, আর সংবাদের জন্যে সেদিন মাছ ভাতের ব্যবস্থা। তার পর এই ধর, যদি কারও কপাল পুড়িয়ে সােয়ামীটি মরে যান, অমনি সারাজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করে দেহপাত কর। আর পুরুষের যদি নিরানব্বই বছরেও স্ত্রী মরে অমনি আট বছরের একটি গৌরী এসে আঁধার ঘর আলাে করে। তাই বলি শাস্ত্র, ওটা হচ্ছে ওই বিধবাদের জন্য। কেদারনাথ। তুমি দাদা বিধবাদের হয়ে অত ওকালতী করাে না। বলি, অত গলাবাজী ত কষ্ট, তারপর এই ধর, বিধবারা যদি আমাদের দেখাদেখি যােত বছরের কার্তিকের সঙ্গে পীরিত আরম্ভ করে দেয়, তাহলে মুখ বদলাবে কি করে? সব পালপাৰ্বন আর তনিয়মের কথা তাহলে কি আর শুনতে পাবে? বাড়ীতে দুবেলা গিন্নী মাগীর পুইচচ্চড়ী ছাড়া আর কপালে অন্য কিছু জুটে উঠবে না। দীননাথ। সে কি ভায়া? বলি তােমার গৃহিণী কি একাদশী করা আরম্ভ করেছেন না কি? এই চলনবিলের মধ্যে বাড়ী ; আসল কই আর চিংড়ী মাছের জায়গা। এখানে যদি বেচারীর কবলে মাছ না জোটে, তাহলে ভায়া তুমি বেঁচে থাকতেই তার কঠোর বৈধব্য দশা চলছে। আহা বেচারীর জন্য একটু আপশোষ না করে থাকা যায় না। প্রাণনাথ। লাখ কথার এককথা বলেছ দাদা। তা হবে বই কি ভায়া আমার মােছলমানীর অধরমধু পান করবার জন্যে যে রকম পাগল হয়ে উঠেছে তাতে কি আর ওর চল্লিশ বছরের গৃহিণী দেখে মন ওঠে? কাজেই সে বেচারী ও বেঁচে থাকতেই একাদশী করতে আরম্ভ করেছে। কেদারনাথ। সত্যি কথা বলতে গেলে এক রকম তাই বলতে হয় ৪র্থ দৃশ্য ] রাজা গণেশ বটে। দাদা তােমরা জান, আমি কখনও মিথ্যার ধার দিয়েও যাই না। বলব কি দাদা, এই সন্ধ্যার সময়েই যদি কোন দিন ইচ্ছা করে একটু বেড়াতে বার হই, তা হলে গিন্নী মাগী রেগে একেবারে টর হয়ে থাকে। বাড়ীতে গিয়ে দেখি মুখখানা একেবারে হাঁড়ীর মত। অর্ধেক রাত সাধ্যসাধনাতেই কেটে যায়। সাধে কি আর আট বছরের জন্যে আকুল হই। দীননাথ। তা হলে এস সবাই মিলে এক কাজ করা যাক। আমরা সকলেই একটি করে আট বছরের গৌরী জুটিয়ে নি। কেদারনাথ। তা হলে কিন্তু দাদা ওরা আমাদের কুশপুত্তলিকা দাহ না করে ছাড়বে না। দীননাথ। আমি বলি, আমরা একদিকে গৌরী নিয়ে পড়ে থাকি, আর ওরা আর একদিকে কার্তিক নিয়ে পড়ে থাকুক। কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া নেই, কি বল ভায়া? প্রাণনাথ। ঠিক বলেছ দাদা। তা আপত্তিই বা কি? স্বয়ং যুবরাজই যখন রাস্তা দেখাচ্ছেন, তখন আমরা করলেই বা দোষ হবে কেন? কেদারনাথ। দোষ হয় কি-না দেখা যাবে। মহারাজকে তােমরা মর্দ মনে কর না। ব্যভিচার দেখলে উনি কখখনাে সহ করবেন না। তা যুবরাজই হন, আর ক্ষুদ্ৰ প্ৰজাই হন। দীননাথ। মহারাজের কথা বলতে গেলে ভায়া তুমি যা বলছ তা অবিশ্যি বলতে হয়। এমন রাজা বড় একটা হয় না। মহারাজের প্রতাপে বাঘ-ছাগলে একঘাটে জল খাচ্ছে। প্রাণনাথ। আর দুর্গাচরণকেই তুমি কম মনে কর না কি? চারঘাটের যুদ্ধটা এক তুবড়ীতে জিতে ফেললে। বাদশার অত সৈন্য-

৬৪
রাজা গণেশ
[ ৩য় অঙ্ক
সামন্ত সব এক তুবড়ীতে ফু। এখন আজিম শা আর তার কন্যা
সপ্তদুৰ্গায় বন্দী।
কেদারনাথ। বলি তা না হলে কি আর যুবরাজের ভাগ্যে
মাখন-মিশ্র৷ জুটত ?
দীননাথ। তা জুটেছে বটে, কিন্তু ভায়া ও-শুধু মাখন-মিশ্র
নয়, সঙ্গে কোম্মা-কাবাবও আছে। হজম হবে বলে বিশ্বাস হয় না,
শেষে রাজযক্ষ্মা না হয়।
প্রাণনাথ। আমারও তাই মনে হয় দাদা। বলি মােছলমানী
হজম করা কি-আর সহজ কথা? ও আলােচাল-খাওয়া বানে ধাতের
কৰ্ম্ম নয়; রীতিমত মুর্গীর ধাত হওয়া চাই।
কেদারনাথ। তা আশ্চৰ্যও নয়। মহারাজ যে রকম পাগলা
গুরুর পাল্লায় পড়েছেন, তাতে ছোকরাদের ত কথাই নাই, আমাদের
মত বুড়ােরও ঢের ভয়ের কারণ আছে। আমি ত ভেবেই মরি,
কখন আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে ওঁর ব্রহ্মচর্য মঠে ভর্তি করে দেন।
তা হলেই ভাই গিয়েছি আর কি। এই বুড়াে বয়েসে একটি বেলা
মাছের ঝােল না পেলে দুনিয়া অন্ধকার দেখি, এখন যদি আমাদের
আলােচাল আর কঁচকলা খেতে হয়, তাহলে ভাই দুদিনেই শুকিয়ে
একেবারে মারা যাব।
প্রাণনাথ। অমন অলক্ষণে কথা বল না দাদা। একেই ত গিন্নীর
মানভঙ্গ করতে করতে জালাতন,তাতে যদি আবার আমাদের মঠে যাবার
কথা শশানে, তাহলে গালের চোটে একেবারে ভূতছাড়া করে দেবে।
কেদারনাথ। শুধু গাল দিয়ে গেলে ত সাত পুরুষের ভাগ্যি
বলে মনে করতাম। আমার গিন্নী কি আর তাহলে ঝটাপেটা
করে ছাড়বে; চুন হলুদ গায়ে মেখে তবে বাড়ী ঢুকতে হবে।

৫ম দৃ]
রান গণেশ
দীননাথ। এ দিকে যে খিদের জ্বালায় পেট উঁ-আঁ করছে।
এখন কি আর গালগল্প ভাল লাগে ; এস, আজকের মত আসর
ভেঙে দেওয়া যাক।
( সকলের প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য
সপ্তদুর্গা-গণেশনারায়ণের দরবারগৃহ
মহারাজ গণেশনারায়ণ সিংহাসনােপরি এবং পাত্রমিত্রগণ
চতুর্দিকে উপবিষ্ট ; সম্মুখে রাজকুমার যদুনারায়ণ
নতমস্তকে দণ্ডায়মান
গণেশ। যদুনারায়ণ!
যদু। পিতা।
গণেশ। এখন আমার সঙ্গে তােমার পিতাপুত্র সম্বন্ধ নয়
যদুনারায়ণ। আমি রাজ্যের বিচারাসনে উপবিষ্ট, আর তুমি
আমার নিকট অভিযুক্তরূপে দণ্ডায়মান। সুতরাং তুমি আমাকে
মহারাজ বলে সম্বােধন করতে পার, কিন্তু পিতা বলে নয়।
যদু। মহারাজ।
গণেশ। তুমি কি কোন নারীর অমৰ্যাদা করেছ?
যদু। কোন নারীর মহারাজ ?
গণেশ। কোন নারীর ?
হু। না মহারাজ।

রাজা গণেশ
[ ৩য় অঙ্ক
গণেশ। তবে তুমি অতিথিভবন প্রাসাদের উদ্যানে কি উদ্দেশ্যে
প্রবেশ করেছিলে ?
যদু। আমি রাজপথ অতিক্রম করবার সময় দেখতে পেলাম
যে, আজিম শা’র কন্যা শাহজাদী আদমান একাকিনী উদ্যানভ্রমণ
করছেন। এ কাজ তার পক্ষে নিরাপদ নয় মনে করে আমি তাকে
সাবধান করবার জন্য সেই উদ্যানে প্রবেশ করেছিলাম।
গণেশ। এ অতি উত্তম কথা। কিন্তু এ ব্যতীত তােমার মনে
কি কোন কুঅভিপ্রায়ের উদয় হয়েছিল ?
যদু। (নীরব রহিলেন)
গণেশ। (কঠোর স্বরে) যদুনারায়ণ !
যদু। মহারাজ!
গণেশ। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
যদু। এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না মহারাজ।
গণেশ। রাজমহিষী স্বয়ং এর অনুসন্ধানের জন্য আমানতারার
নিকট গিয়েছিলেন, তা তুমি জান ?
যদু। না মহারাজ।
গণেশ। আসমান মহিষীর নিকট কি সাক্ষ্য দিয়েছে জান?
যদু। না মহারাজ।
গণেশ। শােন তবে। আসমান বলেছে যে, তুমি তার রূপমুগ্ধ
হয়ে উদ্যানে প্রবেশ করেছিলে।
যদু। (নীরব রহিলেন)
গণেশ। নীরব রইলে যে যদুনারায়ণ ? এর কি উত্তর দিতে চাও?
যদু। আমি এর উত্তর দিতে অক্ষম মহারাজ।
গণেশ। অর্থাৎ তুমি অপরাধ স্বীকার করছ ?

৫ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ ৬৭ ; যদু। (নীরব রহিলেন)। গণেশ। প্রশ্নের উত্তর দাও যদুনারায়ণ; নইলে সিংহাসন-অমৰ্য্যাদার অপরাধে আমি তােমাকে কঠিন দণ্ড দেব। যদু। মহারাজ, আমি সে উদ্যানে প্রবেশ করেছিলাম এবং শাহজাদীর সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। এতে যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে, তবে আমাকে যে দণ্ড ইচ্ছা দিন। গণেশ। অবশ্য তােমাকে দণ্ড দিব ; সামান্য দণ্ড নয়, খুব কঠিন দণ্ড দিব। যদু। মহারাজ, ন্যায়ের অবতার- গণেশ। সে-কথা তােমায় স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না, যদু। আমার নিজের কর্তব্য পালন কি করে করতে হয় তা আমি বেশ ভাল করেই জানি; নইলে তােমার পিতা হয়ে আজ তােমাকে প্রকাশ্য বিচারালয়ে অভিযুক্ত করতাম না। তােমার অপরাধ সম্বন্ধে আমি নিঃসন্দেহ। স্বয়ং আজিম শাহ, এ কথা আমার কর্ণগােচর করেছেন । তারপর রাজমহিষী স্বয়ং এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন। আর তােমার নিজের কথাবার্তায় তুমি যে দোষী, তা বিশেষভাবেই প্রতিপন্ন হচ্ছে। সুতরাং রাজ- ধৰ্ম্মানুসারে আমি তােমাকে দণ্ড দিতে বাধ্য। রাজ্যের যুবরাজ হয়ে তুমি রক্ষণীয়া নারীর অমৰ্যাদা করেছ ; সুতরাং তােমার অপরাধের গুরুত্ব দ্বিগুণ বেশী হয়েছে। জীবন। মহারাজ, রাজকুমারকে অভিযুক্ত করবার সংবাদ শুনে অবধি রাজপুত্রবধু অনুজল ত্যাগ করে দিনরাত্রি কেবল কান্নাকাটি করছেন। গণেশ। জীবন, রাজপুত্রবধূকে সংবাদ দাও, তিনি অশুভ সংবাদের রাজা গণেশ [ ৩য় অঙ্ক জন্য প্রস্তুত হন। পবিত্র ব্রাহ্মণকুলে জন্মে তার স্বামী যবনীতে আসক্ত। ছিঃ! এর প্রতি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা উচিত কি-না, সেই সম্বন্ধে বিবেচনা করছি। জীবন। মহারাজ, আপনি ন্যায়ের অবতার; লঘুপাপে গুরুদও দিবেন না। গণেশ। জীবন, একে তুমি লঘু পাপ বলে মনে কর? তারা আমাদের বন্দী, সুতরাং তাদের জীবন ও মানসম্ভ্রম রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্বই আমাদের। এ অবস্থায় যে সেই বন্দীর অমৰ্যাদা করে তাকে আমি রাজদ্রোহী বলে মনে করি। (বেগে নবকুমারীর প্রবেশ) নবকুমারী। পিতা, রক্ষা করুন, রক্ষা করুন- ( সিংহাসনতলে পতন ও মুচ্ছা) গণেশ। জীবন, শীঘ্র পরিচারিকাদের ডেকে আন ; তারা সত্বর এসে রাজপুত্রবধূকে অন্তঃপুরে নিয়ে যাক। জীবন। যে আজ্ঞা মহারাজ। (প্রস্থান) দুর্গাচরণ। মহারাজ, কুমারকে দণ্ডিত করলে রাজপুত্রবধূর জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। গণেশ। দুর্গাচরণ, আমি নিজের পারিবারিক স্বার্থের জন্য রাজধৰ্ম্ম ত্যাগ করতে পারি নে। যে-দেশে মহারাজ রামচন্দ্র রাজ্যের মঙ্গলার্থে তার সতীসাধ্বী রাণী সীতাদেবীকে পৰ্যন্তও পরিত্যাগ করতে পেরেছিলেন; সেই দেশে জন্মে আমি ব্যক্তিগত কারণে রাজ্যের মঙ্গল কখনই বলি দিতে পারব না। (পরিচারিকাগণসহ জীবনচন্দ্রের প্রবেশ ও তাহাদের দ্বারা নবকুমারীকে লইয়া প্রস্থান) ; ৫ম দৃশ্য [ রাজা গণেশ দুর্গাচরণ। যতদূর সম্ভব লঘু দণ্ড দানেই দণ্ডদানের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় মহারাজ। গণেশ। তাই বটে; কিন্তু এ কথাও সত্য দুর্গাচরণ, যে, নারীর অপমান অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। যে-ব্যক্তি মাতৃজাতির অপমান করতে পারে, তাকে মানুষের মধ্যে গণ্য না করে হিংস্র পশুর মধ্যে গণ্য করা উচিত। তাকে মানবের সংস্পর্শ থেকে অতি সাবধানে রক্ষা করা কর্তব্য। দুর্গা। মহারাজ, রাজকুমার অপরাধী হলেও সামান্য লােক নন। তিনি আপনার বংশধর—এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। সুতরাং তার প্রতি এমন দণ্ড বিধান করুন যাতে ন্যায়ের এবং রাজবংশের মর্যাদা উভয়ই রক্ষিত হয়। গণেশ। যদুনারায়ণ, ভােমার অপরাধ যেরূপ গুরুতর তাতে তােমাকে শূলে দিলেই ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষিত হত। কিন্তু তােমাকে অনুতপ্ত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবার জনাই অতিশয় লঘু দণ্ড দিলাম। তুমি শ্রীভবানীপুরে পাঁচ বৎসর কাল মা-ভবানীর মন্দিরে তপস্যারত হয়ে থাকবে। রাজগুরু শ্ৰীশ্ৰকালিকানন্দস্বামী তােমার জন্য সমুদয় আবশ্যক ব্যবস্থা করবেন। তুমি ভক্তিযুক্ত হয়ে অনুক্ষণ তাঁর আদেশ পালন করবে। আর মুহূর্তকাল তুমি রাজধানীতে থেক না। (দুর্গাচরণের প্রতি) দুর্গাচরণ, একে এই মুহূর্তেই রাজগুরুর কাছে পাঠিয়ে দাও।

ষষ্ঠ দৃশ্য সপ্তদুর্গা-রাজ-অন্তঃপুর নবকুমারী ও মহারাণী ত্রিপুরেশ্বরী ত্রিপুরা । বউমা, এমন করে দিনরাত কঁদলে শরীরই বা কেমন করে টিকবে, আর সংসারই বা কি করে চলবে? তােমার কি আর এমন অধীরা হলে চলে? ও-সব ভাবনা-চিন্তা ছেড়ে নিজের শরীরের দিকে মন দাও, সময়মত নাও খাও, যাতে শরীরটা শীগগীর ধরে যায়। নব । অবস্থায় কি নাওয়া-খাওয়া যায় না? রাজ্যের যুবরাজ হয়েও উনি সাধারণ কয়েদীর মত প্রকাশ্য বিচারালয়ে অভিযুক্ত হলেন আর বাবা নিজে ওঁকে কঠিন দণ্ডে দণ্ডিত করলেন। স্বামী ছাড়া হয়ে থেকে নারীর সংসারে কি সুখ আছে মা? আজ আমি রাজপুত্রবধূ হয়েও একজন সামান্য ভিখারিণীর চেয়ে অধম। কোন প্রাণে নিজের শরীর নিয়ে থাকব মা ! ত্রিপুরা। বউমা, তুমি বীরকন্যা এবং বীরপুত্রবধু; তােমার মুখে এ কথা শুনব, এমন আশা কখনই করিনি। যদু যে-অপরাধে অপরাধী তাতে এ বংশের সঙ্গে তার আর কোন সম্বন্ধ থাকা উচিত নয়। অপরাধের তুলনায় তার দণ্ড অতি সামান্যই হয়েছে। একবার ভেবে দেখ দেখি, যে ব্রাহ্মণ হয়ে যবনীতে আসক্ত হয় এবং কারারুদ্ধা রাজনন্দিনীর অমৰ্যাদা করে, সে বংশের এবং রাজ্যের ঘাের শত্রু কি- না? তাকে কি আপনার জন বলে পরিচয় দেওয়া যায় ? মা-ভবানীর ইচ্ছায় তুমি পুত্রের মা হয়েছ। এই রাজপুত্রের বিবাহ দেবার বেলায় ৬ষ্ঠ দৃশ্য ] রাজা গণেশ ৭১ যদি লােকে অঙ্গুলিসঙ্কেত করে বলে যে, এই কুমারের পিতা যবনীতে আসক্ত হয়েছিল, তখন ও-সব জেনে-শুনে কে তােমার ঘরে কন্যা পাঠাবে মা! নব। কিন্তু স্বামী বিনা যে নারীর জীবন একেবারেই বৃথা মা। এই দীর্ঘ পাঁচ বৎসরকাল আমি কোন্ সুখে, কি নিয়ে এই সংসারে আবদ্ধ থাকব ? আমাকেও শ্রীভবানীপুরে মা’র মন্দিরে পাঠিয়ে দাও মা। সেখানে থেকে দিনরাত প্রভুর সেবা করলে হয় ত তার কষ্টের একটু লাঘব হতে পারে। হাজার হলেও তিনি রাজপুত্র-ততামারই গর্ভে জন্মেছেন। এই রাজরক্ত শরীরে নিয়ে কি তিনি বন্দিজীবনের কঠোরতা সহ্য করতে পারবেন ? মা, একসঙ্গে দুটো প্রাণ নষ্ট হতে দিও না। অনুপের জন্য আমি মােটেই ভাবি না—তার জন্য তুমি রয়েছ। কিন্তু প্রভুর জন্য ত আর কেউই নেই মা ? তােমার পায়ে পড়ি মা, আমাকে মন্দিরে তার কাছে পাঠিয়ে দাও। ত্রিপুরা। বউমা, বড়ই লজ্জার কথা যে, তুমি সামান্য রমণীর মত বৃথা কেঁদে সংসারটা নষ্ট করতে বসেছ। যদু রাজদণ্ডে দণ্ডিত ; সেটা তাকে ভােগ করতেই হবে। বিশেষ পাঁচ বৎসরকাল তপস্যারত হয়ে আত্মশুদ্ধি করে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। এর জন্য ব্ৰহ্মচৰ্য- পরায়ণ হয়ে ভবানীর প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হতে হবে। তুমি সেখানে গিয়ে কেন তার তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাবে মা? একটু বুঝতে শেখ। তুমি ত সামান্য ঘরের পুত্রবধূ নও। তােমাকে ধরিত্রীর মত সহনশীল হতে হবে। তুমি এই সামান্য কষ্টকে কি কষ্ট বলে গণ্য কর ? নব। এর চেয়ে বেশী কষ্ট স্ত্রীলােকের আর কি হবে মা? ত্রিপুরা। বীরজায়াদের এর অপেক্ষা অনেক বেশী কষ্ট সইতে হয়। রাজস্থানের ইতিহাস পড়ে দেখ মা। সেখানে নারী দেশের জন্য কি ৭২ রাজা গণেশ [ ৩য় অঙ্ক কঠোর, কি অপূর্ব, কি মহৎ আত্মত্যাগই না করেছে। কত শত নারী তাদের পতিপুত্রকে অগ্নিময়ী বাণীতে প্রােৎসাহিত করে দেশের জন্য মরণের কোলে ঝাপ দিতে বাধ্য করেছে। কত শত বীরনারীর পতিপুত্রের শােণিতে ধরিত্রীর বুকে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছে; কিন্তু কখনও তাদের চোখের কোণে এক ফোটা জলও দেখা দেয় নি। নব। আমি তা মিথ্যে বলছি নে মা, কিন্তু নারী চিরকালই নারী নারীজন্ম নিয়ে যদি কেউ স্বামীবিরহ সইতে অপারগই হয়, তবে তাকে দোষ দেওয়া কি সঙ্গত মা? ত্রিপুরা। কিন্তু অপারগই বা কেন হবে মা? ভেবে দেখ দেখি, কি মহৎ বংশে তােমার জন্ম ; কি মহৎ বংশের তুমি পুত্রবধু । বিরহের হা-হুতাশ তােমার আদৌ শােভা পায় না মা। অনুপের শিক্ষার ভার তােমার উপর ; তােমার ত অধীর হলে চলবে না। নব। তবে রোজ ভবানীপুর থেকে তার চরণামৃত এনে দেবার ব্যবস্থা কর মা। তাঁর চরণামৃত পান করে আমি এই পাঁচ বৎসরকাল কোনরূপে জীবনধারণ করব। কিন্তু মা, অনুপের শিক্ষার ভার আমার উপর দিও না। আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে; এ ভাঙা মেরুদণ্ড নিয়ে আর রাজকুমারের শিক্ষার ভার নেওয়া চলে না। অনুপকে তুমিই শিক্ষা দিও। ত্রিপুরা। না বউমা, তা হতে পারে না। তােমাকে যদুর একজোড়া খড়ম মাত্র দিব ; তাই নিয়েই তােমাকে থাকতে হবে। আর তােমার মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে, একথাও মনে করলে চলবে না। আমি যে এত বােঝালাম, তাতেও কি তােমার একটু জ্ঞান হওয়া উচিত নয়? ঈশ্বর করুন, কিন্তু যদি যদুর চরিত্রের সংশােধন নাই-ই হয়, তবে তুমি কি মনে কর যে, পাঁচ বৎসর অতীত হলেই তাকে আবার আমরা গ্রহণ ;

৬ষ্ঠ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
৭৩
করব? তা হবে না মা। তার মনের বিষ যদি দূর না হয়, তবে
নিশ্চিত জেন বউমা, তাকে সাপে-কাটা আঙুলের মতই বিনা
বিচারে আমরা ত্যাগ করব। না হয় তুমি বৈধব্যের আচরণই
করলে—তাতে এত দোষই বা কি হয়েছে? আর অনুপের শিক্ষার
ভার ন্যায়ত ও ধৰ্ম্মতঃ তুমিই নিতে বাধ্য। মার কাছেই সন্তানের
প্রথম শিক্ষা হতে হবে। ঠাকুরমার উপর যদি এই ভার দেওয়া হয়,
তা হলে সন্তানের ভাল শিক্ষা হওয়া ত দূরের কথা, আদুরে-গােপাল
হবার সম্ভাবনাটাই খুব বেশী ।
নব। কিন্তু মা, জোর করে আমার দ্বারা যাই করিয়ে নাও না
কেন, যতদিন প্রভু ফিরে না আসূবেন, ততদিন সংসারে আমার
কিছুতেই মন বসবে না। ভগবান দীর্ঘ পাঁচ বৎসরের জন্য আমার
এক রকম বৈধব্যের বিধানই করলেন। বিধবার নিকট আর সংসার
কি প্রত্যাশা করে মা! তার জীবন ত একেবারেই বৃথা।
ত্রিপুরা। না বউমা, বিধবা হলেই যে তার জীবন একেবারে বৃথা
হয়ে গেল, আর সংসারে তার সব কাজই ফুরিয়ে গেল, এ কথা মনে
করা সম্পূর্ণ ভুল। যে মহৎ কাৰ্য্য করবার সুযােগ
সুযােগ বিধবার
আছে, অধিকাংশ সধবারই তা নেই। সধবারা ত নিজের নিয়েই
ব্যস্ত, নিজের স্বামী, নিজের পুত্রকন্যা—এ ছাড়া অন্যের কথা
ভাববার সময় বা প্রবৃত্তি তার নেই; কিন্তু বিধবার পক্ষে মােটেই
তা নয়। সমগ্র বিশ্বমানবই তার কুট। পরের কাজে নিজেকে
বিলিয়ে দেবার সুযােগ বিধবারই সবচেয়ে বেশী। তার প্রাণ যে
অতি উচ্চ, অতি উদার, অতি মহৎ। এমন জীবসেবার সুযােগ
কি আর হয় মা? বিধবা যদি ইচ্ছা করে, তবে এই সুযোগে সে
আত্মমুক্তির পথও প্রশস্ত করে নিতে পারে, সর্বজীবের সেবা করে,

৭৪
রাজা গণেশ
[ ৩য় অঙ্ক
:
সর্বজীবের মধ্যে শিবকে প্রত্যক্ষ করে সে ধন্য হতে পারে। তা
ছাড়া, সংসারে যে এদের কত দরকার, তা কি আর বলে শেষ করা
যায়? এরা না থাকলে সংসার একেবারে মরুভূমি হয়ে যাবে। এই
দয়ার প্রতিমূর্তি, অহংলেশবর্জিতা পরগতপ্রাণা সেবিকারাই ভারতের
গৌরব। এদের প্রাণ কখন নিল নয় বউমা।
নব। মা, তােমার কথা শুনে আমার আগেকার ভুল বিশ্বাস
এখন সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে গেল। ওই যে বাবা আসছেন, আমি এখন
অনুপের কাছে যাই।
( প্রস্থান)
[ গণেশনারায়ণের প্রবেশ ]
গণেশ। বউমা কি এখনও তেমনি কাদাকাটা করছে ?
ত্রিপুরা। করছে বই কি। আমি কত করে বুঝিয়ে তবে
একটু ঠাণ্ডা করেছি।
গণেশ। তুমি কি মনে কর, আমি যদুকে দণ্ড দিয়ে অন্যায়
কাজ করেছি ?
ত্রিপুরা। অন্যায়
অন্যায় কিছুই করনি।
দিলেই অন্যায়
হােত।
গণেশ। যদুর এই চরিত্র দেখে গুরুদেব কি বলেছেন জান ?
ত্রিপুরা। তার সঙ্গে কি এ সম্বন্ধে কোন কথা হয়েছিল?
গণেশ। হঁ্যা, তিনি বললেন যে, যদুর যে চরিত্র গড়ে উঠেছে,
তার ঘােল আনা দায়িত্বই আমার।
ত্রিপুরা। কেন এতে তােমার কি দোষ উনি দেখতে পেলেন?
গণেশ। উনি বললেন যে, আমাদের বিদ্যালয়ে যে ধর্ম এবং

৬ষ্ঠ দৃশ্য । রাজা গণেশ ৭৫ নীতিজ্ঞানবর্জিত শিক্ষা দেওয়া হয়, এ ব্যাপার তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণাম। ত্রিপুরা। এ কথা কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। আমাদের বিদ্যালয়গুলাে রীতিমত ছেলেদের মাথা খেয়ে তবে ছেড়ে দেয়। গণেশ। তাই আমি সঙ্কল্প করেছি, সব ভেঙেচুরে আবার নূতন করে গড়ব। বর্তমানের প্রত্যেক বিদ্যালয়ের স্থানে একটি করে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় গড়ে তুলব। প্রকৃত মানুষ তৈয়ের করতে না পারলে এ জাতের মুক্তি কিছুতেই নেই ত্রিপুরা। ত্রিপুরা। তাই কর, এ অতি উত্তম পরামর্শ মহারাজ । গণেশ। আর শুনেছ, আমি আজিম শার সঙ্গে উষ্ণীষ বিনিময় করেছি এবং সমস্ত বাদশাহী সৈন্য সসম্মানে মুক্ত করে দিয়েছি। ত্রিপুরা। অর্থাৎ গৌড় বাদশার সঙ্গে মিতেলি পাকিয়েছ, এই ত? এইবার তােমাদের ফলাহারের সঙ্গে কোর্মা কাবাব, পােলাও মিলবে ভাল। তা হলে আর দেরী করে লাভ কি? যুবরাজকে শীগগীর গৌড়ে পাঠিয়ে দাও, শুভ কৰ্ম্মটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাক। এইবার তােমার ভারি উচুপায় হ’ল। গৌড়-বাদশা তােমার বেয়াই হ’ল কি-না? তা, এর পরে আমার সঙ্গে কথাটথা বলবে ত ? গণেশ। এ নিয়ে তুমি আমাকে তামাসা করবে এ-কথা আমি কখন ভাবিনি ত্রিপুরা। তােমার কাছে কি আমি তামাসা শােনবার জন্য এলাম? এ কথা একজন সামান্যা নারী বললে শশাভা পায় বটে, কিন্তু সপ্তদুর্গার রাজমহিষীর মুখে কখনই শশাভা পায় না। যার কাছে আমি কত কত গুরুতর ও জটিল বিষয়েরও সমাধান পেয়েছি, তারই মুখে এত বড় একটা হাল্কা কথা শুনে আমার প্রাণের মধ্যে ।

৭৬
রাজা গণেশ
[ ৩, অঙ্ক
যে কতদূর নিরাশার সঞ্চার হ’ল, তা আর আমি বুঝিয়ে বলতে
পারিনে।
ত্রিপুরা। হাল্কা কথা ছাড়া ভাল কথা আর শােন কই মহারাজ?
তােমাকে ত আমি পাঠানরাজের সঙ্গে সন্ধি করতে নিষেধ করে-
ছিলাম, কিন্তু আমার কথা রেখেছ কি? এখন আর বৃথা কেন
আমাকে দোষ দাও। যাক, যা করেছ তা করেছ। ও নিয়ে আর
ভেবেচিন্তে কাজ নেই। এখন ভবানীর যা ইচ্ছা হয়, তাই হবে।

চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
প্রেমতলী-বৈষ্ণব মহােৎসব।
অদুরে পদ্মবক্ষে আজিম শাহের যুদ্ধজাহাজসমূহ ভাসমান।
[ বৈষ্ণবগণের সংকীৰ্ত্তন ]
;
নিখিল শরণ হরি হে ;
তুমি অমিয় সাগর স্নেহনিঝর
ও রাঙা চরণ ধরি হে।
অগতির গতি পাতকিরণ ভকত বাঞ্ছা প্রভু হে
তুমি দ্বারে দ্বারে ফের পীরিতি বিতরি কাতর কাঙাল জানি হে।
যে জন জানে না প্রেমের মহিমা
চাহে না তােমার কৃপা ;
তুমি তাহানাে নিঠুর পরাণ গলায়ে
প্রেমসুধা দাও ভরি হে।
ওহে অমিয় সাগর স্নেহনিঝর
ও রাঙা চরণ ধরি হে।

৭৮ রাজা গণেশ [ ৪র্থ অঙ্ক (সকলের প্রস্থান এবং অন্য দিক দিয়া আজিম শাহের প্রবেশ) আজিম। (স্বগত ) আজ সপ্তাহকাল হ’ল এই প্রেমতলীতে শিবিরসন্নিবেশ করে রয়েছি ; সৈন্যগণ সকলেই রাজধানীতে ফিরবার জন্য ব্যতিব্যস্ত। সম্রাটের জন্মতিথিরও সপ্তাহমাত্র বিলম্ব, শীঘ্র ফিরে যাবার জন্য রাজধানী হতে ঘন ঘন তাগিদপত্র আছে। আমার কিন্তু এ স্থান ত্যাগ করে যেতে মােটেই ইচ্ছা হচ্ছে না। চারঘাটের সেই নির্মম পরাজয়ের পর হতে আমার মনটা যেন একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে; জীবন দুৰ্ব্বহ বলে মনে হচ্ছে। কি সুখ এই সৈনিক জীবনে ? একটা মিথ্যার আড়ালে আত্মগােপন করে এই যে হিংসার ব্যবসাদারী, এতে আর প্রাণে কণামাত্রও শান্তি আসবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কত সুখী এই বৈষ্ণবের দল। কেমন খােদার প্রেমে বিভাের হয়ে তাতেই সৰ্বস্ব অর্পণ করে তারই মহিমা কীর্তন করে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছা হয়, সংসারের কোলাহল ত্যাগ করে এসে নির্জনে একখানি কুটীর নির্মাণ করি, আর দিবা- রাত্রি দুনিয়ার কাছে খােদার নামসুধা বিতরণ করি। কিন্তু যখন আসমানের কথা মনে হয়, তখন আর এ সঙ্কল্প ঠিক রাখতে পারি নে। তাকে যে গৌড়সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করে যেতে হবে। কেমন করে আমানকে সিংহাসন দিই, সেটা একটা মস্ত চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। দেখছি বিদ্রোহ না করলে আর চলবে না। জানি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা পাপ, কিন্তু আমি যে অন্যায়রূপে সিংহাসন হতে বঞ্চিত হয়েছি। হলুম আমি ছােটবেগমের গর্ভজাত, তবু আমি জ্যেষ্ঠ ; আর নসেরিৎ শাহ, বড়বেগমের ছেলে হলেও সে কনিষ্ঠ। তবে কেন আমি সিংহাসন হতে বঞ্চিত হলুম? যাই

১ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
হােক, আসমানকে আমার গৌড়েশ্বরী করতেই হবে, আর এতে
যদি আমায় বিদ্রোহ করতে হয়, তবে তাতেও আমি বিন্দুমাত্র
দ্বিধা করব না।
(আসমানের প্রবেশ)
আসমান। বাবা, তুমি যে আমাকে আজ না ডেকেই একলাটি
চলে এসেছ? আমি থাকলে বুঝি তােমার সারাদিন যা- ভাববার
সুবিধা হয় না?
আজিম। না মা, তা নয়। ।
আসমান। আচ্ছা বল দেখি, এই মাত্র তুমি কি ভাবছিলে ?
আজিম। ভাবছিলাম
যে
তােকে কেমন করে গৌড়ের
রাণী করব।
আসমান। মিছে কথা।
আজিম। মিছে নয় আমান, সত্যি আমি তাই ভাবছিলাম।
আসমান। (গম্ভীর স্বরে) বাবা, তোমার কি মাথা খারাপ
হ’ল ?
আজিম। কেন মা?
আসমান। কেন? তুমি এ-সব আকাশকুসুম চিন্তা কেন কর
বল দেখি?
আজিম। আকাশকুসুম ? মা, আকাশকুসুম কিছুই নয়।
কেন তােমার পক্ষে গৌড়েশ্বরী হওয়াটা কি এতই অসম্ভৰ যে, একে
আকাশকুসুম বলে মনে কর?
আসমান। হ্যা বাবা, অসম্ভব বই কি। আর গৌড়েশ্বরী হতে
আমার মােটেই সাধ হয় না।

রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অঙ্ক
আজিম। কিন্তু আমার যে হয় মা !
আসমান। কেন এমন সাধ হয় বাবা?
আজিম। তাহলে তুমি সুখী হবে।
আসমান। না বাবা, ওতে আমার বিন্দুমাত্র সুখ হবে না।
আজিম। তবে কিসে তােমার সুখ হবে মা?
আসমান। তােমার সেবা করলে। আমি তােমার কাজ নিয়ে
বড় সুখে আছি বাবা; আমায় তুমি এমনি থাকতে দাও।
আজিম। তা হয় না মা ; ধর, আজ যদি আমার দেহান্ত হয়,
তখন তুমি কি নিয়ে থাকবে?
আমান। খােদার কাজ করব বাৰ। ইসলামের প্রচারে
জীবন উৎসর্গ করব।
আজিম। ইসলামের প্রচার খুব মহৎ ব্রত, তাতে সন্দেহ নেই
মা। কিন্তু মুখে বলা যত সহজ, কাজ করা তত সহজ নয়। বিশেষ
যৌবন মানুষের পরম শত্রু; সেই যৌবন তােমার এসে গিয়েছে।
তুমি আমার কন্যা হলেও এ কথা বলা আমার অবশ্যক যে, যৌবন
কালে মানুষের প্রবৃত্তিগুলি অত্যন্ত বলবতী হয়ে থাকে। এই জন্য
এই কালে খুব সাবধানে চলতে হয়। এই যৌবনরূপ মহাসাগর
পার হবার জন্য একজন সুদক্ষ কর্ণধারের প্রয়ােজন। স্ত্রীলােকের
পক্ষে স্বামীই এই কর্ণধার ; তাই তােমার জন্য একটি কর্ণধার এনে
দিতে হবে মা, যে তােমাকে সংসারের ঝড়ঝঞ্চা থেকে সাবধানে
রক্ষা করতে পারে। আর তুমি যদি সংসারেই থাকলে, তবে আর
সামান্যা নারীর মত থাকবে কেন? গৌড়ের সিংহাসনে তােমার
বংশগত অধিকার আছে, সেই অধিকারের বলে তুমি গৌড়েশ্বরী

২য় দৃশ্য )
রাজা গণেশ
৮১
আসমান। এ হতভাগিনীর জন্য বৃথা কেন অশান্তির সৃষ্টি
করবে বাবা? গৌড়ের সিংহাসনে আমার কোনই দরকার নেই।
আজিম। কেন, এই যে তুমি বললে যে, ইসলামের প্রচার
করতে চাও?
আসমান। হ্যা, তা চাই বই কি।
আজিম। তবে গৌড়েশ্বরীর পক্ষে এ কাজ সহজ, না একজন
সামান্যা নারীর পক্ষে ?
আসমান। কেন গৌড়েশ্বরী হলেই আমার একটা লেজ
বেরুবে না কি ?
আজিম। তুমি বালিকা মা, এ-সৰ বিষয় বুঝবার সময় এখনও
তােমার হয়নি ; ক্রমে সবই শিখবে। চল আমরা আর একটু
এগিয়ে গিয়ে বৈষ্ণবদের সেই প্রাণমাতান কীৰ্ত্তনগান শ্রবণ করি।
দ্বিতীয় দৃশ্য
গৌড়–নসেরিৎ শাহের মন্ত্রণাকক্ষ
নশেরিৎ শাহ ও বক্তার
নসেরিৎ। বক্তার খাঁ, দেবীকোটের হিন্দু প্রজাদের পক্ষ হতে
এক প্রতিনিধিমণ্ডল এসে আজ প্রাতে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।
তারা তাদের যে-সব অভাব-অভিযােগের কথা আমাকে জানিয়েছে,
তাতে দেশের রাজা আমি আমার আর এক তিলও বিল করা
উচিত নয়।

৮২ রাজা গণেশ [ ৪র্থ অৰু বক্তার। তারা কি বললে সম্রাট ? নসেরিৎ। যা বলেছে তা বড় ভয়ানক। সেখানে হিন্দু আর মুসলমান প্রজা এতকাল ধরে খুব সুখ-শান্তিতে এক সঙ্গে বাস করে এসেছে। সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল থেকে কয়জন দুষ্ট লােক এসে আমার সেই শান্তিপ্রিয় প্রজাদের মধ্যে ভীষণ বিবাদের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। মুসলমানেরা বলছে যে, হিন্দুমন্দিরের শঙ্খ ঘণ্টার শব্দে তাদের উপাসনার ব্যাঘাত হচ্ছে ; হিন্দুরাও বলছে যে, মুসলমানদের আজানের শব্দে তাদের ধ্যানধারণার বিঘ্ন হচ্ছে। এই নিয়ে দুই দলে খুব ভয়ানক রকমের কলহ, বিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি চলছে। দুই পক্ষই ক্রোধান্ধ হয়ে এতদূর বর্বরতা আরম্ভ করেছে যে, এই মুহূর্তেই তাদের বাধা দেওয়া দরকার। বক্তার। কেন, ফৌজদার কি এই অশান্তিটুকু নিবারণ করতে পারলেন না? তাঁর কাছে ত যথেষ্ট সৈন্য আছে। নসেরিৎ। দুঃখের কথা আর কি বলব বক্তার? ফৌজদার ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে মুসলমানদেরই পক্ষ সমর্থন করেছে। বক্তার। এইসব সাম্প্রদায়িক বিবাদে এমনি হয় সম্রাট। সকলেই ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষ সমর্থন করে। নসেরিৎ। কিন্তু আমার ত তা করলে চলে না ; আমার কাছে যে হিন্দু আর মুসলমান প্রজা দুই-ই সমান। দুয়েরই রক্ষা আমাকে করতে হবে। বক্তার। তা হলে হজরতের এখন কি ইচ্ছা ? নসেরিৎ। কোন দক্ষ সেনাপতির অধীনে অবিলম্বে একদল সৈন্য সেখানে পাঠান কর্তব্য। বক্তার। হজরৎ কার উপর এই গুরুভার ন্যস্ত করতে চান ?

২য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
নসেরিৎ। তােমারই উপর। তােমাকেই আমি এ কাৰ্য্যের যােগ্য
বলে মনে করি।
বক্তার। কিন্তু হজরতের কাছে আমি মিথ্যা বলতে চাই নে।
আমি আমার স্বধর্মীদের বিরুদ্ধে কস্মিকালেও অস্ত্র ধরতে পারব না।
এমন অবস্থায় সেখানে আমাকে না পাঠানই সঙ্গত। আর যদিই
আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেখানে পাঠান, তাতে আপনার হিন্দু
প্রজাদেরই বেশী ক্ষতি হবার সম্ভাবনা।
নসেরিৎ। বক্তার, তুমিও কি সাধারণ মানুষের চেয়ে উপরে
উঠতে পারলে না? মুসলমান প্রজা যদি অন্যায় করে, তা হলেও কি
তারই পক্ষ সমর্থন করতে হবে ?
বক্তার। আসল মুসলমানের পক্ষে তাই করাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
নসেরিৎ। না বক্তার, ইসলামের উদার ধর্ম কখন সে শিক্ষা দেয় না।
বক্তার। হজরতের সঙ্গে আমি তর্কে পেরে উঠব না।
নসেরিৎ। যাক, তা হলে এ কাজে তুমি যেতে ইচ্ছুক নও?
বক্তার। আজ্ঞা না।
নসেরিৎ। তা হলে শাহজাদাকে অবিলম্বেই সেখানে পাঠাতে হয়।
বক্তার। হাঁ, তাকেই পাঠান; তিনিই এ কাজের যােগ্য ব্যক্তি।
নসেরিৎ। ভাল, তুমি এখনই গিয়ে শাহজাদাকে সঙ্গে করে
নিয়ে এস।
বক্তার।
যে আজ্ঞা
( প্রস্থান)
নসেরিৎ। খােদা কি আমাকে সংসারের সমস্ত লােকের সহানুভূতি
থেকে বঞ্চিত করলেন? এই যে আমি আমার হিন্দু প্রজাকে
মুসলমান প্রজার সঙ্গে সমান রূপেই ভালবাসি, এটা কি আমার এত
;

ও
রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অঙ্ক
বড় অপরাধ যে, এর জন্য সকলেই আমাকে একে একে ত্যাগ
করছে ? কিন্তু যাই হােক, আমি যেন দৈববাণী শুনতে পাচ্ছি,
এতে ভারতের অশেষ কল্যাণই হবে; সুতরাং এ কাজ হতে
আমি কিছুতেই নিবৃত্ত হব না। না হয় আমি সিংহাসনচ্যুতই
হলাম, তাই বলে দেশের যাতে মঙ্গল হবে সে-কাজ ত্যাগ করব?
, তা কিছুতেই হতে পারে না; যত দিন আমার দেহে প্রাণ থাকবে,
ততদিন পর্যন্ত আমি হিন্দুমুসলমানকে প্রেমের বাঁধনে বেঁধে রাখতে
চেষ্টা করব।
( আজিমের সহিত বক্তারের পুনঃপ্রশে)
আজিম। (কুর্নিশ করিয়া) হজরৎ কি আমায় স্মরণ করেছেন?
নসেরিৎ। হাঁ, বােধ হয় তুমি শুনেছ, দেবীকোটে হিন্দু ও
মুসলমান প্রজায় ভীষণ বিবাদ-বিসম্বাদ চলছে। দেশের রাজা
হিসাবে এই বিবাদ-নিবারণের যােল আনা দায়িত্বই আমার। তাই
তােমাকে সসৈন্যে সেখানে পাঠাবার আমার একান্ত ইচ্ছা।
আজিম। হজরতের আদেশ অমান্য না করে আমি এই বলতে
চাই যে, সম্প্রতি আমার মানসিক অবস্থা সেনাপতির গুরুদায়িত্ব গ্রহণের
সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।
নসেরিৎ। এর কারণ আজিম।
আজিম। চারঘাটের পরাজয়ের পর হতে আমার মনের বল
একেবারে নষ্ট হয়েছে। বিশেষ আসমানকে ছেড়ে আর আমার কোথাও
যেতে ইচ্ছা নেই ; আর তাকে সঙ্গে নিয়েও যেতে পারি নে ; কেননা,
সঙ্গে নেওয়ার যে কুফল, তা আমি গেলবারে ভালরূপেই লক্ষ্য
করেছি।

২য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
৮৫
নসেরিৎ। তাহলে কি তােমরা বল যে, আমি নিজে না গেলে
আর এ কাজের জন্ত লােক পাওয়া যাবে না ।
আজিম। না, তা কেন বল ?
নসেরিৎ। তবে কে এ কাজে যাবে? বক্তার যেতে অৰ্থীকৃত,
তুমিও তাই।
আজিম। (নীরব রইলেন)
নসেরিৎ। আমি আর বৃথা সময় নষ্ট করব না আজিম ; তােমার
প্রতি আমি রাজাদেশ দিচ্ছি। তােমাকেই এ কাজে যেতে হবে।
কাল প্রভাতেই তুমি সসৈন্যে যাত্রা কর।
আজিম। বেশ, তা হলে রাজা পালন করব। কিন্তু সেখানে
গিয়ে কি করব সে-কথাটা ভাল করে শুনে নি।
নসেরিৎ। দুই সম্প্রদায় যাতে বিবাদ না করে তাই করবে।
আজিম। হজরতের কথা ভালরূপ বুঝতে পারলাম না।
নসেরিৎ। ধর, মুসলমানেরা অন্যায় করে হিন্দুদের উপর অত্যাচার
করছে, তুমি তাদের বারণ করবে, না শুনলে সৈন্যের সাহায্যে
অত্যাচার বন্ধ করবে।
আজিম।
ন্যায়-অন্যায় কে বিচার করবে ?
নসেরিৎ। সে বিচার অবশ্য তুমিই করবে।
আজিম। বেশ, তা হলে আমি এখন বিদায় হতে পারি?
নসেরিৎ। শােন আজিম, এই হিন্দুমুসলমানের মিলন বা
বিচ্ছেদের উপর হিন্দুস্থানের ভাল-মন সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে।
পাঠানেরা রাজ্য জয় করে এই দেশেই বসবাস করছে। আর
হিন্দুর ত এটা দেশই বটে; সুতরাং হিন্দু বা মুসলমান কেউই
ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন নয়। এমন অবস্থায় এই

রাজা গণেশ [ ৪র্থ অঙ্ক দুই সম্প্রদায়কে যে প্রেমের শৃঙ্খলে বেঁধে এক করে যেতে পারবে, তার মত হিতৈষী বন্ধু ভারতের আর কেউ হবে না। তােমার পক্ষে এক মহাসুযােগ উপস্থিত। যদি তুমি বিবাদ- পরায়ণ এই সম্প্রদায় দুটিকে এক করে যেতে পার, তবে তুমি যে সামান্য বীজ বপন করবে, কালে তাই ফলফুলসমন্বিত বিরাট বনস্পতিতে পরিণত হয়ে তার স্নিগ্ধ ছায়ায় ভারতের শান্তি আনয়ন করবে। এই মিলন আজ তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এ কথা স্থির জেন যে, পরিণামে এর ফলে ভারতে এমন এক দুর্ধর্ষ মহাজাতির উত্থান হবে, যারা সমগ্র বিশ্বমানবকে পদানত করতে সক্ষম হবে। এ মাহেন্দ্র যােগ ত্যাগ কোরাে না আজিম, খােদার অনন্ত আশীর্বাদ তােমার মাথায় বর্ষিত হবে। তৃতীয় দৃশ্য সপ্তদুর্গা-গণেশনারায়ণের মন্ত্রণাকক্ষ গণেশনারায়ণ ও দুর্গাচরণ দুর্গাচরণ। মহারাজ, আপনার অধীনে আমার কাজ করা শেষ হয়েছে। এখন দয়া করে আমায় বিদায় দিন। গণেশ। দুর্গাচরণ, তােমার মুখে ত কখনও এমন কথা শুনিনি, আর শুনতে যে হবে এমন আশাও ত কখনও করিনি। দুর্গাচরণ। উপায় নেই মহারাজ, ক্রমাগত আলস্যে আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। আজ পাঁচ বৎসর হ’ল আপনি গৌড়- ; ৩য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ ৮৭ সম্রাটের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন; সেই হতে আপনার সৈনিকেরা কখনও একটিবারের জন্যও অস্পর্শ করেনি। এই যে অস্ত্রহীন বিরাট বাহিনী, এরই সেনাপতি আমি। শুধু বসে বসে দুবেলা মাছ-ভাতের শ্রাদ্ধ করছি। জীবনটা আর এ ভাবে নষ্ট করে ফল কি মহারাজ? (অবনীনাথের প্রবেশ) অবনী। আমি বলি, মহারাজ, সমস্ত সৈন্যদের বিদায় দিয়ে রাজধানীতে বৈষ্ণব মহােৎসব আরম্ভ করুন, আর আমরা কোথাও মুসলমানের অধীনে চাকরীর জোগাড় দেখিগে। না-হয় কালাপাহাড়ের দ্বিতীয় সংস্করণ ধলাপাহাড় বা এই রকম একটা-কিছু হয়ে ভারতে মুসলমানের সংখ্যাবৃদ্ধি করব, আর মা-ভবানীর মন্দির চূর্ণবিচূর্ণ করে বীরশূন্য বাংলা দেশে আসল বীরত্বের নিশান উড়িয়ে দেব। গণেশ। বেয়াইও দেখছি দুর্গাচরণের সঙ্গে যােগ দিয়েছেন। অবনী। তা না দিয়ে আর উপায় কি মহারাজ ? আপনি যে রকম পাকা বৈরাগী হয়ে পড়েছেন, তাতে ভয় হয় যে, সৈন্যরা পৰ্যন্ত শেষকালে কাছা খুলতে আরম্ভ না করে। গণেশ। গৌড়ের সঙ্গে সন্ধি করে দেখছি আমি স্বজনবন্ধু সকলেরই অপ্রীতিভাজন হয়েছি। যাক, তােমরা যদি তাদের সঙ্গে শত্রুতা করতেই চাও, তবে তা-ই বা কঠিন কি? ইচ্ছা করলেই যখন- তখন পত্র লিখে সন্ধি-ভঙ্গ করা যেতে পারে। দুর্গাচরণ । মহারাজ, আপনি পিতৃতুল্য পরম ভক্তিভাজন, আপনার কাছে আমি কখন মুখ তুলে কথা কই নে। কিন্তু জীবন যখন দুর্বিষহ হয়ে উঠল, তখন আর আপনাকে না বলে কাকে বলি ? হৃদয়ে জ্বলন্ত তুষের আগুন আর বাইরে শীতল চন্দন প্রলেপ

রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অৰু
কতক্ষণ টিকতে পারে মহারাজ! দুর্দমনীয় স্বদেশপ্রেমের উদ্দীপনা নিয়ে
আপনার অধীনে সৈনিক বৃত্তি গ্রহণ করেছিলাম। আশা ছিল যে,
আপনি আপনার অতুল্য প্রতিভাবলে এমন এক
এক মহাশক্তিশালী
পরাক্রান্ত জাতির সৃষ্টি করবেন, যাদের অসির ঝঞ্চনায় ভারতমাতার
শিকলের বাঁধন খুলে যাবে। কিন্তু মহারাজ, আমাদের সে আশায়
ছাই পড়েছে। কুক্ষণে আপনি গৌড়ের সঙ্গে সন্ধি করেছেন।
এর পরিণাম এই হয়েছে যে, আপনার সৈন্যগণ যুদ্ধবিগ্রহের অভাবে
একটা প্রকাণ্ড ক্লীব বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
গণেশ। ব্যস্ত হয়ে না দুর্গাচরণ, খুব অল্পদিনের মধ্যেই তােমাদের
যুদ্ধের সাধ পূর্ণ হবে।
দুর্গাচরণ। আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। কিন্তু জানতে পারি
কি মহারাজ, কখন এটা হবে ?
গণেশ। গুরুদেব বলেছেন যে, গৌড়রাজের কোন আত্মীয় এই
বৎসরের মধ্যেই বিদ্রোহী হবে, সেই বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাদের
সৈন্যদের সাহায্য করতে হবে।
অবনী। আর কিছু বলেছেন?
গণেশ। না, তবে আমাদের যে যুদ্ধে যেতে হবে এটা সম্পূর্ণ
নিশ্চিত।
দুর্গাচরণ। কিন্তু মহারাজ, এই আলস্যপরায়ণ সৈন্যদের নিয়ে
যুদ্ধে গিয়ে কি ফল হবে ? অস্ত্র কি করে ধরতে হয় ওরা তাও বােধ
হয় ভুলে গিয়েছে।
এর পর যখন অস্ত্রের ঝঞ্চনা আর কামানের গুড়-
গুম্ শব্দ ওদের কানের মধ্যে ঢুকবে; তখন ওরা উত্তর গােগৃহে
বৃহন্নলার গাণ্ডীব-নির্ঘোষে মূচ্ছিত উত্তরের মত সংজ্ঞাহীন হবে কি-না,
তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

৩য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ স?" গণেশ। বেশ, তবে এক কাজ কর। চিরন্তন প্রথানুসারে আগামী রামনবমীতে শ্রীভবানীপুরে মা’র সিংহাসনতলে এক মহামেলার আয়ােজন হবে। সেই মহামেলায় সপ্তদুর্গা আর সান্যালগুড়ের সমস্ত সৈন্য একত্র করে পাঠিয়ে দাও। সেখানে পনর দিন ধরে সৈনিকদের সব রকমের কৃত্রিম যুদ্ধ দেখান হােক। একটা নকল পার্বত্য দুর্গ সেখানে তৈয়ার কর ; সৈন্যদের দ্বারা সেই দুর্গ আক্রমণ এবং রক্ষার ব্যবস্থা কর। এতে তারা তাদের লুপ্ত উৎসাহ নিশ্চয়ই ফিরে পাবে। তারপর সময় হলে তাদের সত্যকার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানাে হবে। অবনী। এ অতি সুন্দর ব্যবস্থা মহারাজ, এতে সৈন্যদের মধ্যে আবার ক্ষাত্রশক্তি ফিরে আসবে। আপনার এই সৈন্যদল বীরত্ব ও সাহসে ভারতের মস্তকস্বরূপ ; ঠিকমত পরিচালিত হলে এরা পৃথিবীর বিস্ময় উৎপাদন করবে ; এদের ধ্বংস হতে দেবেন না মহারাজ। গণেশ। বেশ, মা-ভবানী করুন যেন আপনাদের যুদ্ধের ইচ্ছা পূর্ণ । দুর্গাচরণ। মহারাজ, দৈববলে বলীয়ান না হলে জগতে কোন মহৎ কাজই করা যায় না। আমরা সেজন্য এতদিন কোন চেষ্টাই করিনি, তাই সিদ্ধি এখনও আমাদের নিকট থেকে বহুদূরে। আসুন আমরা সকলে মিলে ভবানীর বর লাভের জন্য এক মহাতপস্যায় নিযুক্ত হই। সৈন্যদের কৃত্রিম যুদ্ধের পর আমরা এক মাস কাল ধরে এক মহা হােম এবং মহাপূজার আয়ােজন করি। লক্ষ নরনারী একত্র হয়ে লক্ষ রক্ত- জবার অর্ঘ্য মা’র রাতুল চরণে উৎসর্গ করি ; লক্ষ নরনারী সম্মিলিত হয়ে জননীর সিংহাসনতলে বসে শ্রীশ্রীচণ্ডী আবৃত্তি করি ; লক্ষ নরনারীর দু’লক্ষ নেত্রে ভক্তির গঙ্গা বহিয়ে তাঁর মন্দিরতল প্রক্ষালন করি। ;

রাজা গণেশ [ ৪র্থ অঙ্ক সিদ্ধিশৌর্য্যরূপিণী মা আমাদের পরম দয়াময়ী ; তিনি সন্তানের প্রার্থনা অবশ্য পূর্ণ করবেন। তিনি হৃদয়ে বল দিবেন, বাহুতে শক্তি দিবেন, মনে পূর্ণ বিশ্বাস দিবেন, যাতে সিদ্ধি অচিরে আমাদের করতলগত গণেশ। তাই হােক দুর্গাচরণ, আমি এখনই জীবনকে ডেকে আবশ্যক রাজাজ্ঞা দেবার ব্যবস্থা করছি। চতুর্থ দৃশ্য দেবীকোট-আজিম শাহের শিবির আসমানতারা আসমান। কি করি, কিছুই ত ভাল লাগে না। মৌলবী সাহেব পড়াতে এলেন, পড়তে মােটেই মন গেল না; শরীর ভাল নেই বলে তাঁকে বিদেয় করে দিলাম। বন্দুক নিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে চেষ্টা করলাম,ভাল লাগল না ; বন্দুক বাক্সে পুরে রেখে দিলাম। বাদী এসে বললে, চল শাহজাদী মাথা ঘসে স্নান করিয়ে দি, তাকেও বললাম, তুই যা, আমি স্নান করব না। কিন্তু বাবা এসে যখন রুক্ষ চুল আর শুক্ননা শরীর দেখবেন, তখন তার কাছে যে কি বলে জবাব দেব, তা ভেবে ঠিক করতে পারছিনে। ব্যাপারটা এতদিন তার কাছে লুকিয়েই রেখেছিলাম, কিন্তু আজ যে রকম বাড়াবাড়ি হয়ে গেল তাতে এসব কথা গােপন থাকবে না নিশ্চয়। এখন তিনি হকিম ৪র্থ দৃশ্য ] রাজা গণেশ ১১ ডেকে না বসেন, সেই এক মস্ত ভয় দেখছি। যাক, কোন রকমে মনটা একটু ভাল করতেই হবে। দেখি একটা গান গাই । গীত আমার ছিন্ন আজিকে বীণার তারটি ছিন্ন কুসুম হার, আর উঠে না’ক তাতে মধুর রাগিণী, মধুময় ঝঙ্কার। আমার হিয়ামাঝে শুধু গভীর আঁধার নিবিড় আমার তিমির পাথার অধরে হাসিটি ফুটায়ে তুলিতে পারি না কিছুতে আর। মানস মুকুল অকালে শুকাল- অভিশাপে বুঝি কার। , গান গাইতেও ভাল লাগে না; শুধু এক জনের কথা দিনরাত ভাবতে ইচ্ছা করে। একটি বার মুহূর্তের জন্য তাঁকে দেখেছি; কিন্তু সেই থেকে আমার যথাসর্বস্ব তারই পায়ে বিকিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তিনি কি একথা ঘুণাক্ষরেও জান্‌তে পেরেছেন? কেমন করে জাবেন? আমি ত কই কাউকে এ কথা বলি নি। বাবা আমার বিবাহ দেবার জন্য ব্যতিব্যস্ত; কিন্তু যে পরের কাছে বিক্রীত, তার কি বিবাহ করা সঙ্গত? কেন বৃথা স্বৈরিণী হতে যাব ? এর চেয়ে বরং আজীবন কুমারী হয়েই কাটিয়ে দেব। ;

১২
রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অৰু
(আজিমের প্রবেশ )
আজিম। মা, তুমি কি গান গাচ্ছিলে?
আসমান। কখন বাবা?
আজিম। এই এখনই।
আসমান। হ্যা বাবা।
আজিম। কাকে শােনাচ্ছিলে মা?
আসমান। কাউকে নয় বাবা। মনটা বড়ই খারাপ বােধ
হচ্ছিল, তাই একটু গান নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম।
আজিম। বেশ করছিলে।
আসমান। তােমার যুদ্ধের খবর কি বাবা ?
আজিম। যুদ্ধের খবর কিছু দেবার মত নেই মা। আমি এসে
পৌছাবার আগেই এখানকার হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে মিলে গিয়েছে।
আসমান। বড় আনন্দের কথা বাবা। পৃথিবী আর অকারণে
রুধিররঞ্জিত হবে না।
আজিম। তবে আমি এক কাজ করেছি মা। আজ সকালে
দেবীকোট দুর্গে গােল ছুড়ে দুর্গের মাথার বাদশাহী নিশান ছিড়ে
দিয়েছি।
আসমান। কি বললে বাবা? সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছ?
আজিম। হ্যা।
আসমান। কিসের জন্য ?
আজিম। তােমাকে গৌড়েশ্বরী করব বলে।
আসমান। তুমি কি সত্যি উন্মাদ হলে বাবা?
আজিম। না।
আসমান। তবে আমিও তােমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলুম।

৪র্থ দৃশ্য ] রাজা গণেশ আজিম। সে কি মা? আসমান। আমি তােমার গৌড়েশ্বরী হতে চাই নে। আজিম। হতে চাও বা না-চাও, আমার আর ফিরবার উপায় নেই। আসমান। উপায় যথেষ্ট আছে বাবা, আমি নিজে গিয়ে কাকার কাছে তােমার জন্য ক্ষমাভিক্ষা চাইব। আজিম। না মা, তা হবে না। আমি যুদ্ধব্যবসায়ী ; আমার কৃত- কার্যের ফলস্বরূপ দণ্ড আমি মাথা পেতে নিতে পারি, কিন্তু এ জীবনে কারাে কাছে ক্ষমাভিক্ষা করতে রাজী নই আসমান। কেন ভাইয়ের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করলে কি ইজ্জত নষ্ট হবে? আজিম। তা হবে বই কি। আসমান। কিন্তু ভাইয়ের বুক লক্ষ্য করে যখন অস্ত্র তুলবে তখন কি তােমার ইজ্জত খুব বেড়ে যাবে ? আজিম। তুমি বালিকা মা, তােমার সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। আসমান। তবে আর কার সঙ্গে তর্ক করবে ? আর জিজ্ঞাসা করি, তােমার সংসারে ক’জন বুড়বুড়ী আছে, যাদের পরামর্শ নিয়ে এই কাজ করেছ ? আজিম। পরামর্শ কারাে নিইনি মা। আসমান। তবে দেখতে পাবে যেমন করে তােক আমি তােমাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে নেব। আজিম। পাগলামী করিসনে মা, আমাকে একটু সুখী হতে দে। আসমান। কিন্তু আমাকে দুঃখী করলে কি তােমার সুখ হবে। আজিম। তা নিশ্চয়ই হবে না।

১৪
রাজা গণেশ
(৪র্থ অঙ্ক
আমান। তবে তুমি এ কাজে ক্ষান্ত হও।
আজিম। মরবার আগে যে তাের বিবাহ দিয়ে আমি তােকে
গৌড়সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করে যেতে চাই না।
আসমান। বিয়ে তাে আমি করব না বাবা।
আজিম। কেন মা?
আসমান। তা তত তােমায় আগেই বলেছি।
আজিম। আমিও তার উত্তর দিয়েছি মা, তুমি যাতে সুখী হও,
তারই ব্যবস্থা আমি করব । শােন মা, সপ্তদুর্গার কুমার যদুনারায়ণের
সঙ্গে তােমার বিবাহ দিব। কিন্তু তার পিতার সঙ্গে সম্রাট সন্ধি-
বন্ধনে আবদ্ধ, তাই আমি স্বকার্যসিদ্ধির জন্যে সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করেছি; কেননা, বি:দ্রাহ না করলে যদুনারায়ণকে হস্তগত করা
অসম্ভব। আজই এই দেবীকোট দুর্গ আমার হস্তগত হবে। এই
জায়গায় বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থান করে আমি আমার সমস্ত সৈন্য সম্রাটের
বিরুদ্ধে রাজধানীর দিকে চালিয়ে দেব। আমার বিশ্বাস আছে,
অতি সামান্য যুদ্ধ করলেই রাজধানী আমার দখলে এসে যাবে।
আমান। আচ্ছা, মনে কর রাজধানী তােমার দখল হয়ে গেল,
তারপর ?
আজিম। তারপর? তারপর তুমি গৌড়সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত
হবে, আর কুমার যদুনারায়ণকে তােমার সঙ্গে বিবাহ করতে বাধ্য কর
হবে।
আসমান। বলপূর্বক ?
আজিম। হ্যা।
আসমান। আর একবার ত তাকে বাধ্য করতে গিয়েছিলে,
পেরেছিলে কি?

৪র্থ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
আজিম। একবার বিফল হলেই যে দ্বিতীয়বার তাতে সাফল্য
লাভ করা যায় না এ মনে করা একেবারে ভুল। দুনিয়ায় চেষ্টার অসাধ্য
কর্ম নেই।
আসমান। কিন্তু যার উপর বল প্রয়ােগ করবে, তার শরীরকে
তুমি বাধ্য করতে পার বটে, কিন্তু মন চিরকালের জন্য বিদ্রোহী হয়ে
থাকবে; অন্তত এই মানুষের স্বভাব।
আজিম। তা হােক, তাতে আর লােকসানই বা কি ?
আসমান। সেই বিদ্রোহীকে তুমি জামাই করবে ?
আজিম। ক্রমে বিদ্রোহ শান্তভাব ধারণ করবে।
আসমান। কিন্তু তােমার মেয়ে বিদ্রোহীর হাত ছুঁতে ঘৃণা করে
;
বাবা!
আজিম। অত বিচার করিসনে মা; বিচার করে কোন লাভ
হবে না। খােদার উপর নির্ভর কর, তার যা ইচ্ছা তাই হবে।
আসমান। খােদার উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে নিশ্চেষ্ট হয়ে
বসে থাকতে হবে ?
আজিম। হ্যা, তার ইচ্ছা না হলে গাছের পাতাটি পৰ্য্যন্ত
নড়ে না; সুতরাং মানুষের চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষ্ফল ।
আসমান। তবে তুমিই বা বিদ্রোহী হতে গেলে কেন ? চুপ করে
বসে থাকলেই ত পারতে, তার যা ইচ্ছা তা-ই হ'তত।
আজিম। একেবারে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। কাজ
করে যেতে হবে, তবে ফল দেবার কর্তা সেই খােদা।
আসমান। বাবা, তুমি হিন্দুদের ভগবদ্গীতা পড়েছ?
আজিম। না, কিন্তু কেন ?
আসমান। এই কথাগুলাে গীতার বাণীর মতই শােনাচ্ছে না?

রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অঙ্ক
আজিম। তা জানি নে মা।
আসমান। যাক্, এইবার তুমি হার মেনেছ বাবা। তুমি স্বীকার
করেছ যে, মানুষের বসে থাকা চলে না; তাকে আজীবন কাজ করে
যেতেই হবে।
আজিম। হাঁ।
আসমান। তবে আমার বেলাতেই সে-কথা খাটবে না কেন?
আজিম। আচ্ছা, আমি স্বীকার করলুম তােমার বেলাতেও সে
কথা খাটবে।
আসমান। তা হলে বল, বিদ্রোহীর কলঙ্কিত হাত স্পর্শ করতে
অস্বীকার করবার অধিকার তােমার মেয়ের আছে কি-না?
আজিম। আসমান, আজ থেকে তাের পিতা আর তােকে
কোন অনুরােধ করবে না। তুই বড় হয়ে স্বাধীন হয়েছিল, তাের
যা-ইচ্ছা তাই করতে পারিস। আমার কিন্তু আর ফেরবার উপায়
নেই। সম্রাটের সঙ্গে যুদ্ধ আমি করবই। এ যুদ্ধে যদি আমার
অন্তিম শয্যা রচিত হয়—উত্তম। আর তা না হয়ে যদি আমি জয়যুক্ত
হই, তা হলেও আমি সিংহাসন ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ফকিরী গ্রহণ করব,
আর সারা দুনিয়া ঘুরে লােকের কাছে এই বলে বেড়াব যে, পৃথিবীতে
কেউ যেন কখন সন্তানকামনা না করে।
( প্রস্থান)
আসমান। পিতা আমার ব্যবহারে মর্মান্তিক দুঃখিত হয়ে
অভিমানে চলে গেলেন। আমি কেন তার এত অবাধ্য হলুম? এতকাল
পিতৃসেবাই জীবনের একমাত্র ব্রত বলে গ্রহণ করেছিলুম; আজ স্বার্থের
জন্য কেন আমার সেই দেবতুল্য পিতার মনে এত কষ্ট দিলুম? কুক্ষণে
আমি কুমার যদুনারায়ণকে দেখেছিলুম, তা না হলে সেই হতে আমার

৫ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১৭
এত দুর্দশা হবে কেন ? যদুনারায়ণ, তােমার জন্য আমি আজ খােদার
কাছে কলঙ্কিনী, পিতৃচরণে অপরাধিনী। আমাকে এমনভাবে মজিয়ে
কি তুমি খােদার কাছে নিস্তার পাবে ? কক্ষণাে না। হিন্দু তুমি,
একদিন এই যবনীর রূপতরঙ্গে ঝাপিয়ে পড়তে বাধ্য হবে। পিতা,
মাতা, স্ত্রীপুত্রকন্যা সকলের কাছেই ঘােমায় অপরাধী হতে হবে।
তােমার স্বজাতিরা তােমাকে দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তখন মর্মে মর্মে বুঝবে, অবােধ বালিকাকে প্রলােভনে মুগ্ধ করা যত
সহজ, ভগবানের ন্যায়বিচার থেকে নিস্তার পাওয়া তত সহজ নয়।
তা যদি না হত, দুনিয়াটা এতদিন মরুভূমি হয়ে যেত।
পঞ্চম দৃশ্য
গৌড়-নসেরিৎ শাহের মন্ত্রণাকক্ষ
নসেরিৎ ও বক্তার
বক্তার। সম্রাট, আপনাকে অত্যন্ত অশুভ বার্তা দিতে এসেছি।
নসেরিৎ। অশুভ! তা তােমার অসময়ে সাক্ষাৎ করাতেই
বুঝতে পেরেছি। কি 'অশুভ সংবাদ তা তুমি শীঘ্র প্রকাশ কর,
আমি সব দিক দিয়েই প্রস্তুত হয়ে রয়েছি।
বক্তার। দুর্ভাগ্যের পার নাই সম্রাট, শাহজাদা আজিম বিদ্রোহী
হয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
নসেরিৎ। আমি বিদ্রোহী হয়েছে, বেশ হয়েছে; আর ইশাক

রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অঙ্ক
বক্তার। তিনিও শাহজাদার সঙ্গে যােগ দিয়েছেন।
নসেরিৎ। উত্তম হয়েছে বক্তার, এরা আমার লবণের মর্যাদা
সম্পূর্ণরূপেই রক্ষা করেছে।
বক্তার। শাহজাদা যে বিদ্রোহী হবেন, একথা কখন স্বপ্নেও
কল্পনা করা যায়নি সম্রাট। এ দুঃখ রাখবার স্থান নেই।
নসেরিৎ। দুঃখ কিছু নেই বক্তার। শাহজাদা যদি তার ভাইয়ের
বুকে ছুরি চালিয়ে স্বস্তি বােধ করে, তবে তােমার আমার তাতে
আপত্তি করবার কি কারণ থাকতে পারে ?
বক্তার। এই গৃহবিবাদের পরিণাম কি জানি না।
যে কি ইচ্ছা তা কে বলতে পারে ?
নসেরিৎ। গৃহবিবাদের পরিণাম কখন শুভ হয় না বক্তার। এর
ফল আমাদের উভয়ের পক্ষেই সম্পূর্ণ মারাত্মক।
বক্তার। তা হলে উপায় কি সম্রাট ?
নসেরিৎ। বিদ্রোহীর দণ্ড দেওয়া ছাড়া আর অন্য উপায় নেই।
বক্তার। তাহলে আজ্ঞা করুন, আমি এগিয়ে গিয়ে শাহজাদাকে
আক্রমণ করি।
নসেরিৎ। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ, সিংহাসন বিপন্ন, বুঝতে পারছ
ত? তুমি প্রস্তুত হও, আমি নিজেই এবার সৈন্যদল পরিচালন করব।
বক্তার। আপনি নিজে যদি সৈন্য পরিচালন করেন, ভবে
আমাদের জয় অবশ্যম্ভাবী।
নসেরিৎ। কিন্তু সাবধানের বিনাশ নেই। আমি সপ্তদুর্গেশ্বর
মহারাজ গণেশনারায়ণকে এ যুদ্ধে আমায় সাহায্য করবার ও
আমন্ত্রণ করব। আমি তাঁকে পত্র লিখে দিচ্ছি। তুমি এই
মুহুর্তে খুব দ্রুতগামী ছিপে এই পত্ৰ তার কাছে পাঠিয়ে দাও।

৫ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ ১৯ বক্তার। যে আজ্ঞা। নসেরিৎ। (দোয়াত কলম লইয়া একখানি পত্র লিখিলেন এবং তাহ বক্তারের হাতে দিয়া পুনরায় বলিতে লাগিলেন) তা হলে আর দেরী করাে না, পত্ৰখানা এই মুহূতেই সপ্তদুর্গায় পাঠিয়ে দাও এবং সঙ্গে সঙ্গেই সৈন্যদের কাওয়াজ করবার হুকুম দাও। রাত্রি এক প্রহরের পরই আমরা রাজধানী ত্যাগ করব। বক্তার। বহুৎ আচ্ছা। (প্রস্থান) নসেরিৎ। (স্বগত) এইবার ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ, একটা দেখবার মত জিনিষ বটে। ভাই ভাইয়ের বুক লক্ষ্য করে খড়গ তুলছে, আনন্দে খিল খিল করে হেসে উঠছে, প্রাণভরে ভাইয়ের বুকের রক্ত পান করছে। এস কে কোথায় আছ, এ দৃশ্য দেখে যাও ; এর পরে আমাদের দেখাদেখি তােমরাও এমনি করে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ কোরাে, তা হলে ইহকালে অনন্ত সুখ আর পরকালে অনন্ত স্বর্গ লাভ করবে। (করুণ স্বরে) হতভাগ্য দেশ আমার ! তােমার অদৃষ্টে খােদা যে অনন্ত দুঃখ বিধান করেছেন, কার সাধ্য তা রােধ করতে পারে? এ হিন্দুস্থানের মাটির দোষ। যখন এ দেশে মুসলমান ছিল না তখনও হিন্দুরা ভাতৃবিবাদে ক্ষান্ত হয়নি। এক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভারত বীরশূন্য হয়েছিল। তারপর পাঠানেরাও হিন্দুস্থানে এসেই এ দেশের জলমাটির গুণ পূর্ণ মাত্রায় পেয়ে গিয়েছে। হিন্দুর সঙ্গে ত ঝগড়া আছেই, নিজেরাও দিনরাত মারামারি কাটাকাটি করতে ক্ষান্ত হচ্ছে না। খুব ঝগড়া কর ভাই সব। তােমরা যতজন ভাইয়ের গলা কাটবে, ততটা করে পরী রথে চড়ে স্বর্গ থেকে নেমে আসবে।-কোই হ্যায় ?

রাজা গণেশ
[ ৪র্থ অঙ্ক
( জনৈক প্রহরীর প্রবেশ)
প্রহরী। (কুর্নিশ করিয়া) খােদাবন্দ!
নসেরিৎ। বক্তার খাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বল।
প্রহরী। জো হুকুম।
( প্রস্থান)
নসেরিৎ। ( স্বগত) হতভাগ্য হিন্দুস্থান! সাবধান, এখনও
গৃহছিদ্র বন্ধ কর। নইলে সে-ছিদ্র দিয়ে এমন সব বলবান দস্য
তােমার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করবে, যাদের কস্মিনকালেও
তুমি ঘর থেকে বার করতে পারবে না। তােমার নিজের ঘর
পরের হবে, নিজ বাসভূমে তুমি পরবাসী হবে। পৃথিবীসুদ্ধ লােক
ঘৃণায় তােমার দিকে মুখ তুলেও চাইবে না। তুমি দুনিয়ার
যেখানে যাবে, সেইখানেই অত্যাচার, অপমান, পদাঘাত তােমার
অঙ্গের ভূষণ হবে। তুমি পৃথিবীতে পরগাছার মত হয়ে থাকবে।
তােমার সােনার দেশে এসে সারা দুনিয়ার লােক দু-হাতে সােনা
কুড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর তুমি একমুষ্টি অন্নের জন্য সারা পৃথিবীতে
ঘুরলেও ক্ষুধানল নিতে পারবে না। তুমি রাজরাজ্যেশ্বর হয়েও
দীনাতিদীন হবে। তােমার অনশনক্লিষ্ট দুর্বল দেহে মহামারীর
প্রেতলীলা নিরন্তর চলতে থাকবে, আর যদি কেউ সেই মহামারীর
সঙ্গে লড়াই করে কোন প্রকারে বেঁচে থাকে, তবে বর্বর নরপশুদের
পদাঘাতে তার দাসলীলার অবসান হবে।
(কুর্ণিশ করিতে করিতে বক্তারের প্রবেশ)
নসেরিৎ। আমার সঙ্গে এস বক্তার, এখনই আমি সৈন্যদল
পরিদর্শন করব।
জো হুকুম।
(উভয়ের প্রস্থান)

ষষ্ঠ দৃশ্য
ভবানীপুর-ভবানী মন্দির
।
কালিকানন্দ ও যদুনারায়ণ কর্তৃক ভবানীর স্তবপাঠ।
জয় জয় জয় মাগাে দুর্গতিনাশিনী;
অসুর দলনী ওগাে, সন্তানপালিনী।
চরণে অশুভ নাশ, করেতে অভয় দাও;
চাও ওগাে হররমা সন্তানে ফিরে চাও।
একদিন প্রপীড়িত দেবতার ক্রন্দনে,
আলুলায়িতকুন্তলা অবতরি মহারণে ;
করিলে অসুর বধ দেবতার উদ্ধার,
আর বার এস মাগাে হর গাে ধরার ভার ।
দনুজ দলনী দেবী জয় মাগাে ভবানী ;
ত্রিভুবনে কর ত্রাণ সন্তানপালিনী।
( উভয়ের সাষ্টাঙ্গে প্রণাম)
লিকা। বৎস, তােমার পিতা তােমার চিত্তশুদ্ধির মানসে
পাচ বৎসরের জন্য আমার তত্ত্বাবধানে তােমাকে মা’র মন্দিরে
রেখেছিলেন। আজ তােমার সেই পাঁচ বৎসর পূর্ণ হ’ল। ভবানীর
আশীর্বাদ নিয়ে এইবার তােমাকে আবার সংসারক্ষেত্রে প্রবেশ
করতে হবে। সেখানকার পিচ্ছিল পথে একবার তােমার পদস্খলন
হয়েছিল ; সুতরাং এবার অতি সাবধানে চলতে হবে। এই শুভ
অবসরে তােমার ও তােমাদের বংশের হিতাকাঙ্ক্ষীরূপে তােমাকে

১২
রাজা গণেশ
[ ৪থ অৰু
')
দু-একটি উপদেশ দেওয়া আবশ্যক মনে করি। আশা করি এ বৃদ্ধের
কথাগুলি সতত মনে রেখে কাৰ্যক্ষেত্রে অগ্রসর হবে।
যদু। দেব, আপনি পিতৃগুরু, সুতরাং আমার মহাগুরু।
আপনার মত হিতৈষী সুহৃদ আমাদের বংশের আর নাই। আপনার
উপদেশ যে আমার পক্ষে বেদবাক্যের মত, তাতে আর সন্দেহ কি ?
আদেশ করুন দেব; যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ সে আদেশ
অমান্য করব না।
কালিকা। শােন বৎস তবে। তুমি সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ
করেছ—পৃথিবীতে তােমার যথেষ্ট কাজ আছে। তুমি বিধাতার
কৃপায় অতি উচ্চ ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছ। শতসহস্র ঝড়ঝঞ্চা বজ্রাঘাত
সহ্য করে ব্রাহ্মণেরা আজও এদেশে জ্ঞানের বাতি জেলে রেখেছে।
তাদেরই বংশধর তুমি—সুতরাং অতি সাবধানে তােমাকে চলতে
হবে। তােমার আচরণে তােমার সেই চিরপূজ্য পূর্বপুরুষদের নামে
যাতে কলঙ্ক স্পর্শ না করে, তা তােমাকে দেখে চলতে হবে। তােমার
কাছে তােমার সমাজ ও দেশ অনেক আশা করে থাকে; তাদের সে-
আশায় বঞ্চিত করাে না।
যদু।
আমার এই তুচ্ছ জীবন যদি দেশের সামান্য মাত্র কাজেও
লাগে, তবে তার চেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে
দেব
কালিকা। বৎস, সমগ্র দেশ এখন ভীষণ আত্মকলহে জর্জরিত।
এই আত্মকলহের ফলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। একটা বিরাট
মােহঘােরে আচ্ছন্ন হয়ে কেউই এ আত্মকলহের কুফল দেখতে
পাচ্ছে না। সকলেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে এই কলহানলে ক্রমাগত
ইন্ধন জুগিয়ে একে চিরপ্রজ্বলিত করে রেখেছে। তোমাকে এই
'

৬ষ্ঠ দৃশ্য ) রাজা গণেশ সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখ দুঃখ ও স্বার্থের অতীত হয়ে থাকতে হবে। দেশবাসীর পরীক্ষার সময় আগতপ্রায়। একটা মহা আহ্বান অতি শীঘ্র তােমাদের কানে এসে পৌছাবে; সে আহ্বানে পূর্ণরূপে সাড়া দেবে। নারীর ধ্যান করে জীবনের বহু অমূল্য সময় নষ্ট করেছ। এইবার খুব সতর্ক হয়ে দেশের ও দশের কাজে প্রাণ-মন সমর্পণ করবে। যদু। দেব, আপনার কাছে কোন কথা বলতে সঙ্কোচ করা আমি উচিত মনে করি নে। আমি ইচ্ছা করে কখন কোন নারীর ধ্যান করি নি। কি জানি কি একটা স্বভাবের আকর্ষণে সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই আমি নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আমার মনে হয়, এই আকর্ষণ সৃষ্টিরই একটা নিয়ম ; মানুষ ইচ্ছা করলেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম করতে পারে না। কালিকা। বৎস, স্ত্রীপুরুষের আকর্ষণ স্বভাবের নিয়ম হলেও তাকে সংযত করবার বিধি যথেষ্টই আছে। মানুষ যদি শাস্ত্রনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে, তবে এই আকর্ষণ থেকে অনায়াসে আত্মরক্ষা করতে পারে। যােগীর। যােগবলে আর সাধারণ গৃহস্থেরা রমণীকে জননীতে পরিণত করে এই বিপদ হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকে। য। আপনার আদেশ আমার শিরােধার্য। কায়মনে মহামায়ার কাছে প্রার্থনা করি, যেন এই আদেশ পালনের যােগ্যতা লাভ করতে পারি ; যেন এবার পিতামাতা ও বংশের যােগ্য সন্তান বলে পরিচয় দেবার সৌভাগ্য লাভ করি ; যেন দেশের ও দশের সেবায় এ তুচ্ছ জীবন সমর্পণ করতে পারি। কালিকা। বৎস, দেশের এক্ষণে মহাসঙ্কটকাল উপস্থিত। এই মহাসঙ্কটে শিবরাত্রির সলিতাতুল্য গণেশনারায়ণের একমাত্র পুত্র তুমি-তুমি দেশসেবায় যােগ্যতা লাভ কর, ভণীর কাছে ১০৪ রাজা গণেশ [ ৪র্থ অঙ্ক কায়মনােবাক্যে এই ভিক্ষাই করি। বৎস, আমি যখনই ধ্যানে বসি, তখনই আমার ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যায় ; যেন আমি দেশমাতৃকার কাতর আহ্বান শুনতে পাই,-“কে কোথায় আমার সন্তান আছ এস- আমাকে রক্ষা কর। গৃহে দ্য প্রবেশ করে অস্ত্রাঘাতে আমাকে জর্জরিত করছে ; আমার যথাসর্বস্ব তারা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে।” দেশমাতৃকার এই কাতর আহ্বান শুনে কিছুতেই আর ধ্যানে নিবিষ্ট চিত্ত হতে পারি নে। স্বয়ং বৃদ্ধ হয়েছি ; আর অস্ত্র ধারণের ক্ষমতা নেই ; নইলে এই কৌপীন কমণ্ডলু ত্যাগ করে এই মুহূর্তে অসি হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপ দিতুম। বড় আক্ষেপ যে, মনের ইচ্ছা তৃপ্ত করবার উপায় নেই। এখন তােমরাই একমাত্র ভরসা। যুবক তােমরা, জননীর কাতর আহ্বান শুনে যেন তৎক্ষণাৎ ছুটে চলে যাও, বৃদ্ধের এই একমাত্র বাসনা। যদু। দেব, আপনি বৃদ্ধ হলেও শক্তিতে যুবকতুল্য। আপনার এই জ্বালাময়ী বাণীতে অনেক ক্লীবের শরীরেও মহাবীর্যের আবির্ভাব হবে। ব্রাহ্মণের জীবন চিরদিনই দেশের সেবায় উৎসর্গীকৃত। কেবল অস্ত্র ধরলেই দেশের কাজ হয় না। পিতামহ দধীচি দেশের মঙ্গলের জন্য তার অস্থি দান করেছিলেন। আপনার কাছেও দীনের এই প্রার্থনা, আপনি সমস্ত দেশের লােককে এমনি ভাবে দেশের কাজে উদ্বুদ্ধ করে তুলুন। দু-একজন গণেশ বা দুর্গাচরণের দ্বারা দেশের শৃঙ্খলভার অপনীত হবে না। যখন দেশে শত শত গণেশ ও দুর্গাচরণের সৃষ্টি হবে, তখনই মা’র এ বন্ধনশা ঘুচে যাবে। কালিকা। ভবানী করুন, যেন তা-ই হয় বৎস!

পঞ্চম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য সপ্তদুর্গা-গণেশ নারায়ণের মন্ত্রণাকক্ষ গণেশনারায়ণ, যদুনারায়ণ, দুর্গাচরণ, জীবনচন্দ্র ও অবনীনাথ উপবিষ্ট গণেশ। বন্ধুগণ, গৌড়সম্রাটের ভাই আজিম শাহ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় তা দমন করবার জন্য সম্রাট আমাদের সাহায্যভিক্ষা করেছেন। আমার মনে হয় সম্রাটের এ নিমন্ত্রণ রক্ষা করাই কৰ্ত্তব্য। তােমাদের এ সম্বন্ধে কার কি মত, তা নির্ভয়ে আমার কাছে প্রকাশ জীবন। মহারাজ, এ নিমন্ত্রণ রক্ষা করা অবশ্যকর্তব্য। বিপন্নের সাহায্য দান অতি উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম, আমাদের সেই ধৰ্ম্মপালন করবার অতি মহৎ সুযােগ উপস্থিত; এ সুযােগ কখনই ত্যাগ করা উচিত নয়। গণেশ। তােমাদের সকলেরই কি এই মত ? সকলে। আজ্ঞা হাঁ মহারাজ, সকলেরই। গণেশ। তাহলে আগামী কালই আমাদের যুদ্ধযাত্রা করা উচিত। আজ্ঞা হাঁ মহারাজ। আপনি আজ্ঞা দিন, কালই দুর্গাচরণ সসৈন্তে গৌড়ের দিকে অগ্রসর হােক। গণেশ। না জীবন, এ যুদ্ধ একটা যে-সে যুদ্ধ নয় ; গৌড়ের সিংহাসন নিয়ে যুদ্ধ। একদিকে সম্রাট নসেরিৎ শাহ, অন্য দিকে তাঁর ভাই আজিম শাহ। এদের দুই বিরাট বাহিনীর মধ্যে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং এ সময়ে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারব না ; স্বয়ং এ যুদ্ধে সেনাপতির পদ গ্রহণ করব। জীবন।

রাজা গণেশ [ ৫ম অঙ্ক দুর্গাচরণ। মহারাজ, নিজেই সেনাপতি হবেন? গণেশ। হ্যা, অবশ্য নৌবিভাগে তুমি আর সুলবিভাগে বেয়াইমশায় আমাকে সাহায্য করবেন। এই উভয় সৈন্য একযােগে গৌড়ের দিকে অগ্রসর হয়ে সম্রাটের সৈন্যের সঙ্গে মিলিত হবে। অবনী। বেয়াই, আমরা এত লােক থাকতে আপনি নিজে কেন যুদ্ধে যাবেন ? দুর্গাচরণকেই প্রধান সেনাপতির পদ প্রদান করুন; তাহলে সব কাজ সুশৃঙ্খলে এবং অনায়াসে সাধিত হবে। গণেশ। তা হয় না বেয়াই এ যুদ্ধকে আপনারা নিতান্ত তুচ্ছ বলে মনে করবেন না। এর ফলে দেশের মধ্যে একটা বিরাট ওলট- পালট অনিবার্য। এতে কার যে ভাগ্যোদয় আর কার ভাগ্যাস্ত হবে তা এখন বলা খুবই শক্ত। আমি একে একটা মাহেন্দ্রযােগ বলে মনে করি। এ মাহেন্দ্রযােগ কিছুতেই ত্যাগ করব না ; আমি নিজেই এবার সেনাপতিত্ব করব। দুর্গা। কত সৈন্য আমাদের সঙ্গে যাবে মহারাজ ? গণেশ। রাজধানী রক্ষার জন্য পাচশ’ সৈন্য রেখে অবশিষ্ট সকলকেই যুদ্ধে নিয়ে চল। দুর্গা। আর এদের সেনাপতি ? গণেশ। এই পাঁচশ’ সৈন্তের সাহায্যে মহারাণী অনায়াসে রাজধানী রক্ষা করতে পারবেন। দুর্গা। মহারাণীমা রাজধানী রক্ষা করতে পারবেন? গণেশ। কেন পারবেন না ? দুর্গা। তা হলে রাজধানীর জন্য আর আমাদের ভাবনা- চিন্তা রইল না? গণেশ। সে জন্য কিছুমাত্র ভাবনা নেই। আমার একমাত্র িা ।

T
১ম দৃশ্য)
রাজা গণেশ
১০৭
এই যে, আমাদের জল ও স্থল সৈন্য একই অথবা ভিন্ন পথে গৌড়ের
দিকে অগ্রসর হবে।
দুর্গা। এ বিষয়ে সাঁতােরাধিপতির প্রস্তাব আমি সমীচীন বলে
মনে করি। জলসৈন্য পদ্মা বেয়ে আর স্থলসৈন্য দিনাজপুরের পথে
অগ্রসর হােক। যে দল আগে গৌড়ে পৌছাবে, তারা অন্য দলের
জন্য অপেক্ষা করবে। দু-দল একত্র না হয়ে কখন যুদ্ধে অগ্রসর
হবে না।
জীবন । মহারাজ, আজিম শাহ, দেবীকোটের দিক থেকে
গৌড় আক্রমণ করতে আসছেন। এ অবস্থায় নৌযুদ্ধের কোন
সম্ভাবনাই থাকতে পারে না। আর গৌড়ের নৌসৈন্যও এখন পর্যন্ত
সম্রাটের পক্ষ ত্যাগ করে নি।
গণেশ। তা হলেও নৌসৈন্য সঙ্গে নিয়ে গেলে আমাদের
লােকান কিছুই হবে না। তােমরা ত জান জীবন, আমাদের
নৌসৈন্য ভারতের সর্বত্র অজেয়। আজ সপ্তদুর্গার এই নৌসৈন্যের
নাম শুনলে ভারতের সকলেই ভয়ে কম্পিতকলেবর হয়। এই
মহাবীরদের যশ অর্জনে কেন বাধা দেব জীবন? অন্যান্য সৈন্যদলের
সঙ্গে এরাও বিজয়মুকুট মাথায় পরে আসুক।
জীবন। আচ্ছা মহারাজ, ধরুন, যদি নসেরিৎ শাহ, এ যুদ্ধে
পরাজিত হয় ?
গণেশ। তাঁর পরাজয়ে আমাদেরও পরাজয়। আমি একথা
কখন কল্পনাতেও আনতে পারি নে। সপ্তদুর্গার দুর্ধর্ষ বাহিনী কখনও
পরাজয় স্বীকার করেনি।
দুর্গা। আপনি কেন বৃথা আশঙ্কা করছেন মন্ত্রীমশায় ? এবার
আমাদের অভীষ্টসিদ্ধির
অভীষ্টসিদ্ধির পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক। আমাদের আশা

১০
রাজা গণেশ
আছে, এই যুদ্ধের ফলে গৌড়ের সিংহাসন আমাদের হাতের
ক্রীড়াকন্দুকরূপে পরিণত হবে।
গণেশ। আমিও সেই আশাই করি দুর্গাচরণ। নইলে ভ্রাতৃবিবাদের
আগুনে ইন্ধন জোগাবার জন্য আমি আমার প্রাণাধিক সৈন্যদের
জীবন বলি দিতে অগ্রসর হতাম না। যদি গৌড়ের সিংহাসন দখল
হবার কোন আশাই না থাকত, তাহলে গণেশনারায়ণ পাঠানের
বন্ধুত্ব লাভের চেয়ে ভবানীমন্দিরে তপস্যারত হয়ে থাকা বেশী পৌরুষ
বলে মনে করত।
অবনী। সত্যই এটা আমাদের পক্ষে মাহেন্দ্রযােগ। আজ থেকে
সান্যালগড়ের আর কোন পৃথক অস্তিত্ব রইল না ; সমস্ত সান্যালগড়-
বাহিনীকে আজ আমি সপ্তদুর্গার অঙ্গে মিলিয়ে দিলুম। আমাদের
এই সম্মিলিত সৈন্যের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এই পঞ্চাশ
হাজার সৈন্য নিয়ে যদি আমরা মাতৃভূমির কাজে অগ্রসর হই, মা-ভবানী
অবশ্যই আমাদের দিকে মুখ তুলে চাইবেন।
গণেশ। বেয়াইমশায়, আপনার দেশভক্তি অতুলনীয়। এই
শুভ অবসরে সান্যালগড়বাহিনীকে সপ্তদুর্গার অঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে
আপনি যে দেশের কত বড় উপকার করলেন, তা কখনও বলে শেষ
করা যায় না।
দুর্গা। তা হলে আর বৃথা সময় নষ্ট করার দরকার কি? আগামী
কালই মাহেন্দ্রযােগে আমাদের যাত্রার সময় স্থির হােক।
গণেশ। তাই হােক দুর্গাচরণ। তুমি সৈন্যদলকে প্রস্তুত
হবার জন্য আদেশ প্রচার কর।
যদু। বাবা, আপনারা সকলেই আমার চেয়ে বয়স ও বুদ্ধিতে
বড়। আপনাদের সামনে কথা বলা আমার পক্ষে ছেলেমানুষী বই

১ম দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
আর কিছুই নয়। তবু একটা কথা আমার বলতে ইচ্ছা হয়। যদি
'আজ্ঞা দেন, তা হলে চরণে নিবেদন করি।
গণেশ। তুমি অনায়াসে তােমার বক্তব্য বলতে পার যদু।
রাজ্যের প্রত্যেক প্রজারই রাজাকে পরামর্শ দেবার অধিকার আছে।
যদু। আমার মনে হয়, আমাদের জল ও স্থল- সৈন্য ভিন্ন পথে
গিয়ে যতদূর সম্ভব পরস্পরের কাছে থেকে গৌড়ের দিকে
যাওয়া উচিত।
অবনী। তাতে ফল ?
যদু। ফল ভালই হবে। এতে একের বিপদে অন্যের সাহায্য
পাবার বিস্তর সুবিধা। নইলে সৈন্যরা যদি ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তবে
পথের মাঝে শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে রক্ষা পাবার কোন উপায়ই
থাকবে না।
অবনী।
এ ভয় তােমার অমূলক যদু। সপ্তদুর্গার সঙ্গে শত্রুতা
করে সমস্ত বাংলা দেশে এখন আর এমন কেউই নেই। গৌড়সম্রাট
ত নিজেই বিদ্রোহের জন্য ব্যতিব্যস্ত।
যদু। আজ্ঞে তা সত্য বটে, কিন্তু যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করায় লাভ
কিছুই নেই। বিদেশে সৈন্যদের কখন যে কোন অপ্রত্যাশিত বিপদ
ঘটে, তা কিছুই বলা যায় না। বিশেষ দেশে এখন বিদ্রোহ চলছে।
এ অবস্থায় সাবধানে অগ্রসর না হলে বিপন্ন হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা
আছে।
দুর্গা। মহারাজ, আমি আগে যা বলেছি তার চেয়ে কুমারের
মতই বেশী যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। আমাদের জল ও স্থল- সৈন্যের
ভিন্ন পথে গিয়ে কোন লাভ নেই।
গণেশ। বেশ, তাহলে সমস্ত সৈন্যই পদ্মর পথে যাত্রা করুক।

১১০ রাজা গণেশ [ ৫ম অঞ্চ দুর্গা। তাই ভাল মহারাজ। গণেশ। আজ রাতের মধ্যে কতগুলাে যুদ্ধজাহাজ যাবার জন্য প্রস্তুত হবে দুর্গাচরণ ? দুর্গা। সপ্তদুর্গার পােতাশ্রয়ে আজ দেড় শ’ জাহাজ উপস্থিত আছে মহারাজ। আর যমুনা ও বড়ল প্রত্যেকের মােহানায় আরও পঁচিশ- খানা করে পাহারার কাজে নিযুক্ত আছে। গণেশ। প্রহরী-জাহাজগুলাে সরানাে কোনরকমেই সঙ্গত নয় দুর্গাচরণ। রাজধানীতে যে দেড় শ’ জাহাজ রয়েছে সেগুলাে শুধু যাত্রা দুর্গ।। যে অজ্ঞা, আর তোপ কতগুলাে সঙ্গে নেওয়া হবে মহারাজ ? গণেশ। আমাদের মােট পৌণে তিন শ’ তােপ আছে। তার মধ্যে পঁচিশট। রাজধানীরক্ষার জন্য রেখে বাকী আড়াই শ’ সঙ্গে নাও। দুর্গা। যে আজ্ঞা। আর রসদ সম্বন্ধে ? গণেশ। পঞ্চাশ হাজার লােকের ছয়মাসের যােগ্য রসদসামগ্রী সঙ্গে করে নাও। এই রসদের কথাটি যুদ্ধের একটা খুবই বড় ব্যাপার। সৈন্যদের দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ করা আর না-করা রসদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। দেখ, রসদের জন্য যেন কখন আমাদের পরের মুখাপেক্ষী হতে না হয়। দুর্গা। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ। পঁচিশখানা নৌকাপূর্ণ খাদ্যসামগ্রী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে যাবে। গণেশ। উত্তম। গােলন্দাজ সৈন্য তােমার কত আছে দুর্গাচরণ? দুর্গা। প্রায় আড়াই হাজার হবে মহারাজ। গণেশ। চরসৈন্য ?

১ম দৃশ] রাজা গণেশ দুর্গা। প্রায় পাঁচ শ”। গণেশ। তাহলে আমরা সব দিক দিয়েই যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুভ। আজ রাত্রি এক প্রহরের পরে চল আমরা সকলে মা-ভবানীর চরণের কাছে একত্র হয়ে যুদ্ধজয়ের জন্য তার আশীৰ্বাদভিক্ষা করি। পঞ্চাশ- খানা বজরা এখনই তৈয়ার করবার জন্য আদেশ দাও। দাড়ি-মাঝি- দের জানিয়ে দাও, যদি তারা আধপ্রহরের মধ্যে আমাদের সকলকে মা’র মন্দিরে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে তাদের প্রত্যেককে আমি এক-একটি মােহর পুরস্কার দিব। দুর্গা। তার অনেক আগেই আমরা পৌছে যাব মহারাজ। সপ্তদুর্গার মাঝিমাল্লা সকলেই নৌকা চালাতে সিদ্ধহস্ত। আমার মনে হয় একদণ্ডের মধ্যেই তারা চলন ছেড়ে করতােয়ায় প্রবেশ করবে এবং আর এক দণ্ডের মধ্যে মন্দিরের কাছে আমাদের পৌছে দেবে। গণেশ। তাহলে আর দেরী করে দরকার নেই। তুমি এখনই গিয়ে বজরার ব্যবস্থা কর, আমিও অন্দরে গিয়ে মহারাণীকে প্রস্তুত হতে বলি। (অগ্রে গণেশনারায়ণ ও পরে অন্যান্য সকলের প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য
সপ্তদুর্গা-নবকুমারীর শয়নকক্ষ
নবকুমারী ও যদুনারায়ণ
যদু।
;
অব। এ হতভাগিনীর পােড়াকপালে বিধাতা সুখ লেখেনি।
কেন প্রিয়ে ?
নব। কেন তা কি তুমি বুঝতে পারছ না? রাজকন্যা এবং
রাজপুত্রবধূ আমি ; কিন্তু আমার চোখ কি কখন তুমি জল ছাড়া
দেখেছ? কঁদতে কাঁদতেই ত আমার জীবনটা কেটে গেল।
যদু। কিন্তু আমার ত কোন দোষ নেই লক্ষ্মী ; আমি ত ইচ্ছা
করে একদিনের জন্যও তােমাকে অসুখী করিনি।
নব। তােমার দোষ কেন হতে যাবে ? দোষ আমার এই
পােড়াকপালের।
যদু। মানুষের দিন কখনও সমান যায় না নব। দুঃখের পর
সুখ আসবেই আসবে। বিধাতা যখন যে-অবস্থায় রাখেন, সেই
অবস্থাতে সুখী হ'লে আর দুঃখ পেতে হয় না।
নব। আমরা নারীজাতি, চিরকাল সংসারটাকে যেভাবে
দেখে এসেছি, সেই ভাবেই দেখব। হাজার হাজার দর্শন বা বেদান্তের
কথা শুনিয়েও আমাদের সে চিন্তাস্রোতের ধারা কেউ কোনদিন
ফেরাতে পারবে না।
যদু। তা হলে বল নব, যাতে তােমাকে সুখী করতে পারা যায়,
আমি তা-ই করতে প্রস্তুত।
নব। তা যে হবার নয় প্রাণাধিক। আমার যাতে সুখ বিধাতা

২য় দৃশ্য ] রা গণেশ তা হতে দেবেন কেন? শ্বশুরবাড়ীতে এসে প্রথমতঃ তােমাকে চিনতেই শিখিনি। তারপর যখন তুমি কি জিনিষ তা জানতে পারলুম, যখন পিপাসায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, সামনেই জলের পাত্র দেখে পানের ইচ্ছায় সাগ্রহে পাত্রের দিকে চেয়ে রয়েছি, ঠিক সেই মুহূর্তে বিধাতা সেই জলের পাত্র নিমিষের মধ্যে কোথায় লুকিয়ে ফেললেন। যা কখন স্বপ্নেও ভাবিনি তেমনি একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পাঁচ বৎসরের জন্যে তুমি দূরে সরে গেলে। অভাগিনীর কোমল হৃদয়ে সে সময়ে বাণের মত যে ভীষণ আঘাত লেগেছিল, আমার কপালে অনন্ত দুঃখ আছে বলেই তার পরও আমি বেঁচে রইলুম। যদু। তাতে ত আমার কোনই হাত ছিল না নব । আর সে দুঃখ আমার বুকেও বড় কম বাজেনি, তা ত তুমি জান। নব। জানি কি কষ্টে যে এই পাঁচ বছর কেটেছে, তা সবার সাক্ষী একমাত্র অন্তর্যামী নারায়ণ জানেন। দিনরাত কেঁদে কেঁদে অন্ধ হতে বসেছিলুম। মা কত বােঝাতেন, ঠাকুর নিজে এসে কত প্রবােধ দিতেন, কিন্তু তাতে যেন আমার শশাকের বাঁধ একেবারে চুরমার হয়ে যেত। কতদিন ঠাকুরের সামনেই চেঁচিয়ে কেঁদে উঠতুম । মাঝে মাঝে বাবাও এসে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করতেন; কিন্তু তিনি আমাকে কি প্রবােধ দেবেন, আমার কান্না দেখে নিজেই কেঁদে আকুল হতেন। আর অভাগিনীর এমনি পােড়া কপাল যে, দুঃখের রাত কেটে প্রভাত হতে-না-হতেই আবার এক মস্ত বড় ভীষণ আঁধার রাত এসে উপস্থিত। এবার দুঃখিনীর কপালে যে কি আছে তা কে জানে ? যদু। কি করব নব, আমি চিরকাল কেবল তােমার দুঃখের কারণই হলুম। রাজপুত্রবধূ হয়েও তুমি দীনদুঃখীর চেয়ে অধম।

১১৪
রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
এই হতভাগাই তােমার যত দুঃখের মূল। আমি কি তােমাকে
কেবল দুঃখ দেবার জন্যেই জন্মেছিলাম ? নব ! লক্ষ্মীটি, আমায় মাপ
কর। আর আমি তােমাকে দুঃখ দেব না। আজ থেকে তােমার
মলিন মুখে হাসি ফুটিয়ে তােলা ছাড়া আমার জীবনের আর অন্য
ব্রত রইল না। আজ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আমি তােমাকে
ছেড়ে অন্য কোথাও যাব না। আমার সব যায় যাক ; শুধু তুমি যদি
সুখী হও, তা হলেই আমার সকল সাধ পূর্ণ হয়।
নব। তােমার কথার মর্ম আমি ভাল করে বুঝতে পারলুম না।
যুদ্ধে যাবার জন্য তুমি রাজাজ্ঞা পেয়েছ ; সে আজ্ঞা ত নিশ্চয়ই তুমি
পালন করবে ?
যদু । না নব, সে আজ্ঞা আমি পালন করতে পারব না।
আমার ধৰ্মকৰ্ম্ম ইহকাল পরকাল সবই এখন তুমি ।
নব। ছিঃ, এটা কি তােমার মত অত বড় বীরের কথা হ’ল ?
যে-মহৎ বংশে তােমার জন্ম, যে-প্রাতঃস্মরণীয় পিতার পুত্র তুমি,
তাতে এমন কথা কি তােমার মুখ দিয়ে বের হওয়া সঙ্গত? না-না,
তােমাকে আমি কৰ্তব্যচ্যুত হতে দেব না। আমার জন্য তুমি
বীরধর্মে জলাঞ্জলি দেবে, আর আমি বেঁচে থেকে তাই দেখব,
আমার প্রাণ থাকতে এ কোনদিন হতে পারবে না।
যদু। না প্রিয়ে, আর আমাকে সঙ্কল্পচ্যুত করাে না। আজ
হ’তে তােমাকে ত্যাগ করে আর আমি এক পাও কোথাও নড়ব না,
এটা আমার স্থিরপ্রতিজ্ঞা। এই প্রতিজ্ঞা যেন ভঙ্গ না হয় নব। তুমি
আমার সহধর্মিণী, দেখ, প্রতিজ্ঞাভঙ্গের পাপে যেন আমাকে লিপ্ত
হতে না হয়।
নব। আমার যে ভিতর বার দু-দিকেই দুই ভীষণ দাবানল ।

২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ একদিকে তুমি বীরধর্ম ত্যাগ করলেও যেমন আমার দায়িত্ব, অন্যদিকে তােমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হলেও আমার তেমনি দায়িত্ব। এই দুই আগুনের একটা না মাড়িয়ে আর আমার উপায় নেই। তাই যে-আগুনটার জ্বালা একটু কম, তাইতেই আমি ঝাপ দেব। তােমার প্রতিজ্ঞ। ভঙ্গই হ’ক ; এতে যদি কিছু পাপ থাকে তবে সে-সমস্তই আমি মাথা পেতে নিয়ে নেব ; কিন্তু তােমাকে আমি বীরধর্ম কিছুতেই ত্যাগ করতে দেব না। যদু। কিন্তু তােমার চোখের জল যে আর সহ্য হয় না নব ? নব। হাজার হক আমি নারী। কান্নাকেই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্যা বলে আয়ত্ত করেছি। কিন্তু তাই বলে তুমি পুরুষ, তুমি কেন সেদিকে দৃকপাত করবে ? যদু। পুরুষের হৃদয় আছে নব। আমরা ত আর পাষাণ দিয়ে গঠিত নই; আমাদেরও রক্তমাংসের দেহ। আমার চোখের সামনে তুমি বাণবিদ্ধ বিহঙ্গিনীর মত ছটফট করবে, আর তা দেখেও আমি ভ্রুক্ষেপ না করে চলে যাব, এটা কখন সম্ভব নয় নব। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, রাজাজ্ঞা লঙ্ঘন হয় হক, কিন্তু তােমাকে ছেড়ে আর আমি এক পাও সরে যাব না। নব। তবে আমিও প্রতিজ্ঞা করলুম যে, এ দেহে প্রাণ থাকতে তােমাকে রাজাজ্ঞা লঙ্ঘন করতে দেব না। যদি তুমি আমার এই অনুরােধে কান না দাও তবে দেখতে পাবে কেমন হাসতে হাসতে তােমার পায়ের তলায় আমি এ তুচ্ছ জীবন বলি দিতে পারি। যদু। নব, তােমার এ কি রকম আচরণ, তা আমি বুঝতে পারলুম না। পিতৃআজ্ঞায় যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে তােমার কাছে বিদায় নিতে এলুম, তুমি কেঁদে আমার সকল সঙ্কল্প কোথায় ভাসিয়ে

।
১১৬
রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
দিলে। কিন্তু যেই আমি যুদ্ধে যাব না বলে প্রতিজ্ঞা করলুম, অমনি
তুমি আবার উলটো জিদ ধরলে যে, প্রাণ থাকতে তুমি আমায়
তা করতে দেবে না। এই কি ভােমাদের নারীজাতির স্বভাব ?
নব। সত্যি এই নারীজাতির স্বভাব। নারী প্রিয়জনবিরহে
কাদবে, আপনার আগুনে আপনি পুড়ে ছাই হবে, কিন্তু প্রিয়ের
যাতে অমঙ্গল ঘটে, তা কখনই করতে দেবে না। এই ত নারীর গৌরব।
এই সহিষ্ণুতা গুণ না থাকলে যে নারীকে তার উচু আসন থেকে
নেমে আসতে হবে। নারীকে ধরিত্রীর মত সহনশীল হতে হবে।
নারী দরকার হলে তার হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলবে, কিন্তু প্রিয়জনকে
কখনও কুপথে যেতে দেবে না।
যদু। বেশ, তবে হাসিমুখে বিদায় দাও প্রিয়ে। পিতৃ আজ্ঞায়
যুদ্ধে যাচ্ছি ; যদি ফিরে আসি, আবার দেখা হবে।
নব। হ্যা, হাসিমুখেই তােমায় বিদায় দিচ্ছি। যাও প্রিয়তম,
মাথায় জয়মুকুট পরে যুদ্ধ হতে ফিরে এস।
পরে যুদ্ধ হতে ফিরে এস। ভয় নেই, কেউ তােমার
এক গাছি চুল পৰ্যন্ত ছুঁতে পারবে না। যদি আমি সতী হই, যদি
কায়মনােবাক্যে কখন তােমাভির অন্যের চিন্তা মনে স্থান না দিয়া
থাকি, তবে আমার এ কথা কখন মিথ্যা হবে না। দুঃখিনীর একমাত্র
সম্বল তুমি ; কার সাধ্য তােমার গায়ে কাঁটা বেঁধে ?
যদু। তবে এখন আসি নব, বিলম্বে যাত্রার সময় বয়ে যাবে।
;
৫
(নবকুমারীর মুখচুম্বন ও প্রস্থান)
নব। ভবানী, বুকে বল দে মা; যেন প্রভুর এ বিয়ােগবেদনা
অনায়াসে সইতে পারি। চোখ, আজ তুমি শুষ্ক হও, সারাজীবনই ত
কেঁদে কেঁদে কত অশ্রুগঙ্গার সৃষ্টি করেছ, আজ কি সে নিয়মের ব্যতিক্রম

১১৭ ২য় দৃশ্য ] রাজা গণেশ করতে পারবে না? না, কিছুতেই চোখের জল বন্ধ করতে পারছিনে, প্রবল নদীস্রোতের মত দুই চোখ দিয়ে হুহু করে জল আসছে। তবে কাদি, প্রাণভরে কাদি।, কাদতে-কাদতেই ত জন্ম কেটে গেল, কাদাকে আর আমার ভয় কি ? তবে আয় অ, আয়, গােমুখীর জলধারার মত চোখের কোণ ফেটে বের হয়ে আয়, এসে এমন অ- গঙ্গার সৃষ্টি করে ফেল, যাতে ভবানীর মন্দির-সােপান বিধৌত করে দিতে পারি। ভবানী, সতীর মর্মবেদনা তুই ত সবই জানিস মা। আমার জীবনস্বামী আমারই জন্য পিতৃ আজ্ঞা লঙ্ন করতে উদ্যত হয়েছিলেন, কিন্তু আমি তাকে সে সঙ্কল্পে বাধা দিয়েছি, আমিই তাকে উত্তেজিত করে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখিস মা, যেন সতীর মানরক্ষা হয়। যেন প্রভু আমার অক্ষত শরীরে ফিরে আসেন। যেন আবার হাসিমুখে এসে নব বলে ডাকেন। আজ তুই ছাড়া দুঃখিনীর মনের বেদনা জানতে দুনিয়াতে আর কে আছে মা ? মা, আমার বুকের মধ্যে দিনরাত আগুন জ্বলে জ্বলুক, কিন্তু প্রভুর গায়ে যেন একটুও আঁচড় লাগে। দেখি মা, যেন দুঃখিনীর ধনকে সদা রক্ষা করিস। আজ তােরই হাতে প্রভুকে সঁপে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হচ্ছি। নারী তুই মা,-নারীর ব্যথা তুই না বুঝলে আর কে বুঝবে ? গীত সপে দিনু তােরে হৃদয়ের ধন রাখিস্ মা তারে চরণছায়, আমার সাধের স্বপন না যেন অকালে পলকে মিলায়ে যায়।

১১৮
রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
অকূল বিপদে ব্যাকুল হইয়া
দিনু মা বেদনা চরণে ঢালিয়া
কেবলি পরাণে রহিয়া রহিয়া
কি হয় কেমনে কহিব হায়।
তাই করি নিবেদন আঁখি জলে ভাসি
কাতর মিনতি ও রাঙা পায়।
তৃতীয় দৃশ্য
কানসাট-আজিম শাহের শিবির
নীচে পবিত্র সলিলা গঙ্গানদী প্রবাহিত
আজিম ও আসমান
আজিম। মা, তুই যে বৈষ্ণবদের কীৰ্ত্তন শুনতে চেয়েছিলি,
তাই প্রেমতলী থেকে একজন খুব ভাল কীৰ্ত্তনগায়ক এনেছি। তাের
যখন ইচ্ছা ডেকে তার গান শুনবি।
আসমান। তবে তাকে ডাকাও বাবা, এইখানেই একটু গান
শােনা যাক। তুমিও ত সারাদিন যুদ্ধের কথা নিয়ে ব্যস্ত ; গান
শুনে তুমিও মনটা একটু ভাল কর।
আজিম। আচ্ছা, তা হলে তাকে ডাকাই। ওরে কে আছিস?
(জনৈক প্রহরীর প্রবেশ)
প্রহরী। খােদাৰ !

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১১৯
আজিম। প্রেমতলী থেকে যে কীৰ্ত্তনগায়ক এসেছে, তাকে
এখানে ডাক।
প্রহরী। জো হুকুম।
(এন)
আসমান। কবে এ কীৰ্ত্তনে এসেছে বাবা?
আজিম। আজই সকালে এসেছে মা।
(কীৰ্ত্তনগায়ক সহ প্রহরীর পুনঃপ্রবেশ এবং
তাহাকে রাখিয়া প্রস্থান)
কীৰ্ত্তনীয়া। শ্রীগৌরাঙ্গের জয় হােক। শাহজাদার কি আজ্ঞা ?
আজিম। রাজকুমারী গান শুনবেন। তুমি খুব ভাল দেখে
একটা গান গাও।
কীৰ্ত্তনীয়া যে অজ্ঞা।
গীত
কবে কৃষ্ণধন পাব,
হিয়ার মাঝারে থােব ;
জুড়াইব এ পাপ পরাণ ?
সাজাইয়া দিব হিয়া,
বসাই প্রাণপ্রিয়া ;
নিরখিব সে-চন্দ্ৰবয়ান।
হে সজনী, কবে মাের
হইবে সুদিন ?
সে প্রাণনাথের সঙ্গে কবে বা ফিরিব রঙ্গে,
সুখময় যমুনাপুলিন ?
আমান। বেশ গান গায় বাবা। ওকে কি মাইনে করে রেখে
দেবে ?
আজিম। তুই যদি রাখতে চা, তবে অবশ্যই রাখা হবে।
}

রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
আসমান। ওকি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছে বাবা, না তুমি জোর
করে ধরে এনেছ ?
আজিম। স্বেচ্ছায় আসেনি মা।
আসমান। তা হলে ওকে আমি রাখব না বাবা ; ওকে এই
মুহুর্তেই বিদেয় দাও।
আজিম। সে কি মা?
আমান। বৃথা একটা লােকের স্বাধীনতা হরণ করে পাপের
ভাগিনী হতে আমি চাইনে।
আজিম। বেশ তাই করব মা। (কীৰ্ত্তনীয়ার প্রতি) তুমি এখন
গিয়ে বিশ্রাম কর।
কীৰ্ত্তনীয়া। যে আজ্ঞা (কুনিশ করিয়া প্রস্থান)।
আমান। এস বাবা, এখন একটু
এস বাবা, এখন একটু পাশা খেলি।
আজিম। নিয়ে আয় তাের পাশা। দেখি আজ কে হারে, কে
জেতে।
আমান। আচ্ছা দেখবে এখন।
(প্রস্থান ও কিঞ্চিৎ পরে পাশা লইয়া পুনঃপ্রবেশ)
আসমান। আজ কিন্তু সহজে উঠতে দেব না বাবা। তুমি যে
একবার হারলেই পালিয়ে যাবে তা হবে না।
(ব্যস্তভাবে ইশাক খাঁর প্রবেশ)
আজিম। কি ইশাক খা, সংবাদ কি ?
ইশা। সংবাদ অত্যন্ত অশুভ শাহজাদা। সম্রাটসৈন্য আমাদের
শিবির থেকে এক ক্রোশের মধ্যে শিবিরসন্নিবেশ করে রয়েছে।
আজিম। কে তাদের সেনাপতি ?

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১২১
ইশা। সম্রাট স্বয়ং। আর চরমুখে সংবাদ পেলাম, মহারাজ
গণেশনারায়ণও প্রায় পঞ্চাশ হাজার হিন্দুসৈন্য নিয়ে প্রেমতলীর
কাছে এসে শিবিরসন্নিবেশ করেছেন। তিনি যে-কোন মুহূর্তে
সম্রাটসৈন্যের সঙ্গে যােগ দিতে পারেন।
আজিম। তাহলে এখন উপায়?
ইশা। উভয় সৈন্য যাতে সম্মিলিত হতে না পারে তারই ব্যবস্থা
করা।
আজিম। বেশ এই মুহূর্তেই শিবির ভেঙে দাও। রাত্রি এখন
আড়াই প্রহরের বেশী নয়। প্রভাত হবার আগেই আমরা শাহী
সৈন্যের ঠিক পেছন দিক দখল করে ফেলব। তারপর এমনভাবে
লড়াই চলতে থাকবে, যাতে গণেশনারায়ণ কিছুতেই শাহী সৈন্যের
সঙ্গে যােগ দিতে না পারে। তা ছাড়া আমাদের খুব সাবধানে চলতে
হবে। আমাদের গতিবিধির কথা যেন তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে
না পারে।
ইশাক। তাহলে আর দেরী করে ফল কি? এখনই আমি
শিবির ভাঙবার আদেশ দি ?
আজিম। হ, এই মুহূর্তেই।
(প্রধান)
ইশাক। যাে হুকুম।
আজিম। ফেল তাে মা দান, চট করে দু-হাত খেলে নি।
আমান। বাবা?
আজিম। কি মা?
আমান। আজ এক নূতন খেলা খেলবে বাবা?
আজিম। কি খেলা মা?
আসমান। বন্দুক তরবারির খেলা ?

১২২ রাজা গণেশ [ ৫ম অঙ্ক আজিম। পাগলামি করিসনে মা। আসমান। বাবা, আজ বন্দুক তরবারি নিয়ে সত্যিকার খেলা খেলব। বাবা, বৃথাই কি বন্দুক চালনা অভ্যাস করেছিলুম? আজ শিয়রে আমাদের প্রবল শত্রু ; উভয়পক্ষ পরস্পরের প্রাণ নষ্ট করবার জন্য বুকে খগের আঘাত করতে উদ্যত। আমার অস্ত্র- বিদ্যাপরীক্ষার এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সুযােগ আর কবে পাব বাবা? তােমার পায়ে পড়ি, এ কাজে আমায় বাধা দিও না। আমার বড় সাধ যে, নারীজাতি আত্মরক্ষায় অক্ষম, এই বৃথা কলঙ্ক থেকে তাদের মুক্ত করি। তাই রণক্ষেত্রে একবার শক্তিপরীক্ষা দিবার জন্য আমি এত ব্যতিব্যস্ত হয়েছি। আমায় নিষেধ কোরাে না বাবা। আজিম। বেশ, এতে আমি কোন আপত্তি করব না মা। তুমি স্বচ্ছন্দে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে পার। আসমান। তবে আশীর্বাদ কর বাবা, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে আমা হতে বংশের কোন অগৌরব না হয়। আজিম। কায়মনােবাক্যে আশীর্বাদ করলাম মা যেন খােদা তাের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। আসমান। আর বল বাবা, যেন এমনি হাসতে হাসতে ফিরে এসে তােমার পায়ের ধূলে নিতে পারি। ( এই সময় গুডুমগুম্ করিয়া একটা কামান গর্জিয়া উঠিল) আজিম। (চমকিত ভাবে) একি? কার এ তােপ ? (বেগে জনৈক সৈনিকের প্রবেশ) সৈনিক। খােদাবন্দ, শত্রুপক্ষ হঠাৎ আমাদের আক্রমণ করেছে। ( এই সময় আর একবার কামান গর্জিল) আজিম। শীঘ্র গিয়ে ওদের কামানের প্রত্যুত্তর দিবার ব্যবস্থা

৩য় দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১২৩
করি। আজ আমি নিজেই গােলন্দাজ সৈন্য পরিচালন করব। দেখি
ভাগ্যলক্ষ্মীকে নসেরিৎ শার কাছ থেকে কেড়ে আনতে পারি কি-না।
( প্রস্থান)
আসমান। আজ আমাদের পরম গৌরবের দিন। একদিকে
পিতা নিজে গােলন্দাজ সৈন্য পরিচালন করবেন, আর একদিকে
তাঁর কন্যা বন্দুকের অব্যর্থ লক্ষ্যে শত্রুর বক্ষভেদ করবে।
খােদার কি অবিচার। কোন কাফেরকে আমাদের শক্র না করে
চাচাকে আমাদের শত্রু করেছেন। তা না হলে কাফের বধে যে
তৃপ্তি হত, সারা দুনিয়ার ঐশ্বর্যের সঙ্গেও তার তুলনা হয় না।
যাই হক, আগে দেখি বাবা কেমন ভাবে কোথায় কি করছেন।
(প্রস্থান এবং অন্য দিক দিয়া আজিম ও ইশাক খাঁর প্রবেশ)
ইশাক।
জনাব, তােপ বন্ধ করতে আদেশ করুন। শত্রু
একেবারে আমাদের গায়ের উপর এসে পড়েছে, তােপের আর
এখন কোন মূল্য নেই। এখন সামনাসামনি অসিযুদ্ধ করতে হবে।
সামনের সৈন্যগণকে শত্রু-শিবিরের বাঁ দিক আক্রমণ করবার জন্য
এখনই আদেশ দিন। ঐ স্থানেই শত্রুপক্ষ দুৰ্বল দেখা যাচ্ছে।
আজিম।
বেশ, তােপ বন্ধ হ’ক; কিন্তু পিছনের সৈন্যরা
মুহুর্মুহু বন্দুক চালনা করুক ; আর সামনের সৈন্যদের নিয়ে তুমি
শত্রুর বাঁ দিক আক্রমণ কর। এ দিকে আমাদের অশ্বারােহী সৈন্য
নিয়ে আমি প্রস্তুত হয়ে থাকব, এবং সুযােগ পেলেই শত্রুর ডান
দিক আক্রমণ করব।
( উভয়ের প্রস্থান এবং আসমানের পুনঃপ্রবেশ)
আসমান। মুহুর্মুহু বন্দুক চালনা করে অসংখ্য শত্রুসৈন্য হত্যা

১২৪
রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
করেছি। কিন্তু ওরা সকলেই পাঠান, আমারই স্বজাতীয়। এ আমি
কি করলুম? হঠাৎ একটা কি যেন মােহের ঘােরে আচ্ছন্ন হয়ে এমন
বীভৎস কাণ্ড করে বসলুম? অসংখ্য ভ্রাতৃহত্যা করেছি। খােদা,
খােদা! মাপ কর, আমায় প্রকৃতিস্থ হতে দাও। এ পাপের আমি
প্রায়শ্চিত্ত করব। কাফেরের রক্তে গৌড়দেশ ভাসিয়ে দিয়ে
“ভ্রাতৃহত্যার কল ধুয়ে ফেলব।
( প্রস্থান)
[ আজিম ও জনৈক সৈনিকের প্রবেশ
সৈনিক। খােদাবন্দ, সেনাপতি ইশা খাঁ সংবাদ দেবার জন্য
আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।
আজিম। বেশ, কি সংবাদ এনেছিস বল্।
সৈনিক। জাহাপনা, সংবাদ খুবই শুভ। সম্রাট নসেরিৎ শাহ,
যুদ্ধে মারা গিয়েছেন ; তার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, আর
আমাদের সৈন্যেরা তাড়া করে তাদের পিছনে পিছনে যাচ্ছে।
আজিম। সম্রাট নসেরিৎ শাহ, নিহত !
সৈনিক। আজ্ঞে হ জাহাপনা ; এতে সন্দেহ করবেন না।
জাহাপনা, গােলাম এ শুভ সংবাদ এনেছে; বকুশীসের আশা করে।
আজিম। শুভ সংবাদ নয় সৈনিক ; আজ আমি ভ্রাতৃহীন হ’লাম ।
আমার হৃৎপিণ্ডের অর্ধেকটা ছিড়ে গেল। এ সংবাদ আমার কাছে
বজ্রাঘাতের চেয়েও ভীষণ। ওঃ! এ আমি কি শুনলাম ? ভ্রাতৃহত্যা
করেছি। মহাপাপ করেছি। খােদা, খােদা! আমাকে দণ্ড দাও।
আমাকে অনলহ্রদে নিক্ষেপ কর ; ভ্রাতৃহত্যার উপযুক্ত শাস্তি দাও।
জগতের সামনে আমাকে এমন কঠিন দণ্ড দাও, যাতে দুনিয়ার লােকে
আর কেউ কখনও ভ্রাতৃহন্তা না হয়।
;
৩

চতুর্থ দৃশ্য
গৌড়ের উপকণ্ঠ-গণেশনারায়ণের শিবির
গণেশনারায়ণ ও দুর্গাচরণ
দুর্গা। মহারাজ, ব্যাপার অত্যন্ত ভীষণ। কানসাটের যুদ্ধে
নসেরিং শাহ, নিহত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে তার সৈন্যদল
ছত্রভঙ্গ হয়ে চারিদিকে পালিয়ে যাচ্ছে। এখন আজিম শাহ,
আমাদের আক্রমণ করবার জন্য বায়ুবেগে পদ্মার তীর বেয়ে ছুটে
আছেন।
গণেশ। চিন্তার কোন কারণ নেই দুর্গাচরণ। যেখানে আমরা
শিবির সন্নিবেশ করেছি, তা যুদ্ধের পক্ষে খুবই সুবিধাজনক। এখানে
যদি যুদ্ধ হয়, তবে আমাদের জয়লাভ সুনিশ্চিত।
দুর্গা। তাহলে আমরা আর না এগিয়ে এখানেই শত্রুর
আক্রমণের প্রতীক্ষা করি।
গণেশ। হাঁ দুর্গাচরণ, এস্থান ছেড়ে যাওয়া কোন রকমেই উচিত
নয়। যুদ্ধে জয়পরাজয় স্থাননিৰ্বাচনের উপরও বহু পরিমাণে
নির্ভর করে। আমরা যে-স্থানে শিবির সন্নিবেশ করেছি, সে একটা
ক্ষুদ্র টিলাবিশেষ।
চারদিকের মাটি এর চেয়ে অনেক নীচে।
এস্থানে যদি আমরা আমাদের তােপগুলো খাটিয়ে রাখি, তাহলে
অনায়াসে একটা ধ্বংসলীলার অভিনয় হয়ে যাবে।
(অবনীনাথের প্রবেশ)
অবনী। মহারাজ, আমাদের অশ্বারােহী গুপ্তচর সংবাদ এনেছে

রাজা গণেশ
[ মে অঙ্ক
আজিম শাহের সৈন্য আমাদের শিবিরের দু-ক্রোশের মধ্যে এসে
পড়েছে।
গণেশ। তাহলে আমাদের গােলন্দাজ সৈন্যদের এই মুহূর্তেই
প্রস্তুত হবার আদেশ দিন ; যেন যে-কোন মুহূর্তেই আমরা শত্রুর
উপর গােলাবর্ষণ করতে পারি।
অবনী। যে আজ্ঞা। আমি গােলন্দাজ সৈন্যদের এখনই
প্রস্তুত হবার আজ্ঞা দিতে চললাম ।
( প্রস্থান)
দুর্গা। শুধু গােলন্দাজই নয়, সমগ্র বাহিনীরই প্রস্তুত থাকা
বিশেষ দরকার। শত্রু যখন এত নিকটে, তখন আর বিশ্রামের
অবকাশ কোথায় ?
গণেশ। হঁ্যা দুর্গাচরণ, এখন আর এক মুহূর্তও কারাে বিশ্রাম
করা চলবে না; সমগ্র বাহিনীকেই প্রস্তুত হবার জন্য আদেশ দাও।
রাজা অবনীনাথ গােলন্দাজ সৈন্য পরিচালন করুন। জীবনচক্র
অশ্বারােহী এবং যদুনারায়ণ পদাতিক দলের অধিনায়ক হােক; আর
আমার আজ্ঞাধীনে তুমি সমগ্র বাহিনী পরিচালিত কর।
( উপযুপরি বিপক্ষের কামান গর্জন)
এ কি! বিপক্ষের তােপ ! দুর্গাচরণ, আমাদের লজ্জা রাখবার
স্থান নেই, শত্রুই আমাদের প্রথম আক্রমণ করেছে। তুমি শীঘ্র যাও,
এই মুহূর্তেই এর উত্তর দেবার ব্যবস্থা কর ; আমাদের সমস্ত তােপে
এমন ভীষণ আগুন জ্বেলে দাও, যাতে আজিমের যুদ্ধের সাধ একেবারে
মিটে যায়।
দুর্গা। যে আজ্ঞ। মহারাজ।
(স্থান)

৪র্থ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১২৭
[ জীবনচন্দ্রের প্রবেশ ।
জীবন। মহারাজ, বিপক্ষের গােলা ক্রমাগত আমাদের শিবিরের
মধ্যে এসে পড়াতে সৈন্যরা এতই বিচলিত হয়ে পড়েছে যে, তারা
এখনই শত্রুকে আক্রমণ করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
গণেশ। আক্রমণ করবার আদেশ যথাসময়ে দেওয়া হবে। তুমি
এখানে আর দেরী না করে নিজের সৈন্যদের মধ্যে যাও।
জীবন। যে আজ্ঞা।
( প্রস্থান)
[ উপর্যুপরি তোপের শব্দ ]
গণেশ। হাঁ, এইবার আমাদের তােপ শত্রুর আক্রমণের যথার্থ
উত্তর দিয়েছে। দেখি, আজিম শাহ এবার কি করে। আমার
সৈন্যদল সত্যই ভারতে অতুলনীয়, এদের যুদ্ধপ্রণালী দেখলে গর্বে
বুকটা ফুলে ওঠে।
( জনৈক সৈনিকের প্রবেশ)
সৈনিক। মহারাজ, সেনাপতি দুর্গাচরণ সংবাদ পাঠালেন,
বিপক্ষের সৈন্য আমাদের শিবিরের এক ক্রোশের মধ্যে এসে গিয়েছে।
গণেশ। আচ্ছা চল, আমি নিজে গিয়ে যথােচিত ব্যবস্থা করছি।
( উভয়ের প্রস্থান)
[ সৈন্যগণ, যদুনারায়ণ ও দুর্গাচরণের প্রবেশ ]
দুর্গা। কুমার, আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করা চলে না। আপনি
বিদ্যুদ্বেগে আপনার পদাতিকদের সঙ্গে আজিমের ডান দিক আক্রমণ
করুন।
যদু। ভাই সব, সেনাপতির আদেশ, এই মুহূর্তেই আমাদের
শত্রুগণকে আক্রমণ করতে হবে। আর তিলমাত্র বিলম্ব করাে না,

১২৮
রাজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
ভীমবেগে শত্রুর উপর গিয়ে পড়। আজ গৌড়ের মাঠে সপ্তদুর্গার
বিজয়স্তম্ভ পুতে দাও। বহু যুদ্ধবিজয়ী বীর তােমরা, তােমাদের
বিজয়গৌরব যেন কেউ মলিন করতে না পারে।
( সকলের প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য
গৌড়ের উপকণ্ঠ-রণস্থল
গণেশনারায়ণ একটি বৃক্ষে আরােহণ করিয়াছেন।
গণেশ। ঐ যে আমার সৈন্যেরা ভীমবেগে অমিত বিক্রমে
শত্রুসৈন্য আক্রমণ করেছে। ঐ যে তাদের তরােয়ালের আঘাতে
শত্রুসৈন্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ঐ যে শত শত হত ও আহত
সৈনিক রণস্থলে পতিত রয়েছে; ঐ যে যুদ্ধভূমির উপর দিয়ে প্রবল
রক্তের ঢেউ খেলে যাচ্ছে, ঐ যে আমার সৈন্যদের হাজার হাজার
অসিফলকে সূর্যকিরণ পড়ে উজ্জ্বল জ্যোতির সৃষ্টি হয়েছে। ধন্য আমার
সৈন্যগণ ; আজ তােমরা শুধু সপ্তদুর্গারই নয়, সমগ্র হিন্দুজাতির
মুখােজ্জল করলে। জয় মা ভবানী! জয় মা ঈশানী। আজ তােমার
কৃপাতেই এমন অসাধ্য সাধন সম্ভব হ’ল ।
(বৃক্ষ হইতে অবতরণ ও প্রস্থান)
[ জীবনচন্দ্র ও অশ্বারােহী সৈন্যগণের প্রবেশ ]
জীবন। সৈন্যগণ, ঐ দেখ, কুমারের পদাতিক সৈন্য বিপক্ষ
বাহিনীর ডানদিক ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। দেখ, বিপক্ষের হতাবশিষ্ট

৫ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ সৈন্যগণ তাদের সম্মুখ থেকে বায়ুবেগে উদ্ধশ্বাসে ছুটে যাচ্ছে। তােমরা কি তাদের বিজয়গৌরবের অংশী হ’তে চাও না? তােমাদের শৌর্য বীৰ্য্য কি পদাতিকদের চেয়ে বিন্দুমাত্রও কম ? না বন্ধুগণ, তা নয়। তােমাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভারতে এমন দ্বিতীয় সেনাদল নেই। অগ্রসর হও ভাই সব। বিপক্ষ সৈন্যের বাঁ-দিক ভেদ করে তােমরাও বিজয়গৌরবের সমান অংশী হও। গৌড়ের বিজয়কিরীট তােমাদেরও মাথার শােভা সমানরূপেই বাড়িয়ে দিক। ( সকলের প্রস্থান) [ গণেশনারায়ণের পুনঃপ্রবেশ ও বৃক্ষে আরােহণ ] গণেশ। ঐ যে আমার অশ্বারােহী সৈন্য বিপক্ষের বাঁ-দিক সম্পূর্ণ ভেদ করে ফেলেছে ; ঐ যে আহত এবং মুমূর্ষর বিশৃঙ্খল হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের চারদিকে পড়ে আছে। ঐ যে বিপক্ষের সামান্য মাত্র অবশিষ্ট সৈন্য প্রাণভয়ে উৰ্দ্ধশ্বাসে পালিয়ে যাচ্ছে। আর সন্দেহ নেই, আমাদেরই সম্পূর্ণ জয় হয়েছে। দুর্গাচরণ অসাধ্য সাধন করেছে। আজ সপ্তদুর্গার কি গৌরব! যে-সব মহীয়সী বীরনারীর গর্ভে এই বীরদের জন্ম হয়েছে, যাদের স্তনের দুধে এদের শরীরের রক্তনাশি গড়ে উঠেছে আজ তারা ধন্য ; আর এই মহীয়সী নারীরা যে-দেশের কন্যা সেই বাংলা দেশও ধন্য। ( অবতরণ ) [ দুর্গাচরণের প্রবেশ ] দুর্গা। মহারাজ, মহারাজ, পায়ের ধূলো দিন। ভবানীর বরে আর আপনার পুণ্যবলে আজ গৌড়ের গৌড়ের বিজয়কিরীট আপনার মাথার শােভা বর্ধন করেছে। (গণেশনারায়ণের পদধূলি লইলেন) ;

রাজা গণেশ [ ৫ম অঙ্ক গণেশ। দুর্গাচরণ, ভাই, আজ তুমি শুধু বাংলার নয়, সমগ্র হিন্দুজগতের মুখােজ্জল করলে। এস ভাই, আমার বুকে এস। ( দুর্গাচরণকে আলিঙ্গন) দুর্গা। মহারাজ, আজ ভবানীর কৃপায় শক্ত আমাদের সমূলে বিনষ্ট, আজিম শাহ, এ যুদ্ধে মারা গিয়েছেন। গণেশ। আজিম মারা গিয়েছেন। দুর্গা। হ মহারাজ। আজ তিনি তাঁর পদাতিকদের সামনে অসিযুদ্ধ করছিলেন ; আমাদের জনৈক পদাতিক চিনতে না পেরে হঠাৎ তার মাথা কেটে ফেলেছে। পরে কুমার এ কথা জানতে পেরে অত্যন্ত বিষন্ন হয়েছেন এবং আজিম শার মৃতদেহের যাতে কোন রকম অমৰ্য্যাদা না হয়, তার জন্য অনুরােধ করেছেন। গণেশ। তা হলে মুদ্ধ এখনই বন্ধ হােক দুর্গাচরণ। পরাজিত হতভাগ্যদের প্রাণদান না করা অতি নিষ্ঠুরের কাজ। আমার যে- সব সৈন্য বিপক্ষের পিছনে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের শীঘ্র ফিরিয়ে আন; আর আজিম শার মৃতদেহ হাতীর উপর তুলে গৌড়ে পাঠিয়ে দাও। দুর্গা। যে আজ্ঞা মহারাজ। গণেশ। আজ আমাদের যুদ্ধজয়ের আনন্দ একটা ঘাের নিরানন্দে পরিণত হ’ল দুর্গাচরণ। যদি আজিম শাহ, এ যুদ্ধে মারা না যেতেন তবে বােধ হয় সপ্তদুর্গার বীরেরা শুধু গৌড় জয়েই ক্ষান্ত হত না, যুধিষ্ঠির এবং পৃথ্বীরাজের সিংহাসন দস্যুর হাত থেকে কেড়ে নেওয়া যায় কি-না, তা নিশ্চয়ই একবার পরীক্ষা করে দেখত। যাক, ভবানীর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে কার সাধ্য ? তুমি আর দেরী

৬ষ্ঠ দৃশ্য।
রাজা গণেশ
করে সৈন্যদের প্রতি যথােচিত আদেশ দাও। আমি নিজে গিয়ে
একবার যুদ্ধক্ষেত্র ভাল করে দেখে আসি।
(উভয়ের প্রস্থান)
যষ্ঠ দৃশ্য
রণস্থল
হত ও আহত সৈন্যগণ স্তুপীকৃত হইয়া পতিত রহিয়াছে ; স্থানে স্থানে আহতগণ
যন্ত্রণায় চীৎকার করিতেছে, কেহ কেহ জল জল বলিয়া পিপাসায় ছটফট করিতেছে।
আমানতারা একটি প্রদীপহন্তে এক একটি মৃতের নিকট গিয়া তাদের
পরীক্ষা করিতেছেন।
(যদুনারায়ণের প্রবেশ)
যদু। (স্বগত) আজ গৌড়ের বিজয়গৰ্বও আমার বক্ষস্থলকে
কিছুমাত্র স্ফীত করছে না। একটা ঘাের বিষাদের ছায়া যেন আমার
সমগ্র দেহ-মন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আজ আজিম শাহ,
গৌড়ের প্রান্তরে আত্মবলিদান করে সকলের উপর
উপর বিজয়ী
হয়ে গিয়েছেন। আমি যেন তাঁর কন্যার বিষাদমলিন মুখ-চোখের
সামনে স্পষ্টভাবে তা দেখতে পাচ্ছি। কি করলে আজিম শাহ,
আমার এই গৌরবটুকু কেড়ে নেবার জন্যই কি এমন করে
আত্মবলিদান করলে ? বিজয়ী হয়েও আজ আমি পরাজিত; একটা
ঘাের অশান্তির আগুনে জ্বলেপুড়ে মরছি। এ কি! কে তুমি
রমণী, একাকিনী এই নিশীথে এমন ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে বিচরণ করছ ?

লজা গণেশ
[ ৫ম অঙ্ক
আমান। পরিচয় দেওয়া নিয়ােজন। তবে এটা অনায়াসেই
বুঝতে পার কোন স্বামিপুত্র অথবা পিতৃহীনা ভিন্ন এ সময়ে অন্য
রমণীর এ যুদ্ধক্ষেত্রে আসার কোন প্রয়ােজন নেই।
যদু। এ কি, তােমার স্বর যে পরিচিত। তুমি কি শাহজাদী
আসমানতারা?
অসমান। পিতৃহন্তা, এতক্ষণে আমায় চিন্তে পেরেছ ?
যদু। শাহজাদী! তুমি এ সময়ে কেন এই যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছ?
আসমান। আর শাহজাদীর পিতৃহন্তা, তুমিই বা এখানে কি
করছ ?
যদু। যুদ্ধশেষে আহতের শুশ্রুষা এবং নিহতের সৎকারের জন্য
আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি।
আসমান। আর আমি আমার পিতার মৃতদেহের অন্বেষণ
করছি।
যদু। তুমি কি তােমার পিতার দেহ দেখতে চাও?
আমান। নিশ্চয়ই।
যদু। তবে আমার সঙ্গে এস। তার দেহ আমার বিশ্বস্ত
সৈনিকগণের পাহারায় খুব যত্ন করে রাখা হয়েছে। মহারাজের
আজ্ঞা পেলেই তার সৎকারের ব্যবস্থা হবে।
আসমান। কিন্তু পিতৃহন্তার অনুগ্রহলাভ আমি কুকুরােচিত বলে
মনে করি। তােমার ঐ কলঙ্কিত হাতের দানে পা ঠেকাতেও আমার
ঘৃণা বােধ হয়।
যদু। শাহজাদী, তােমার পিতা যুদ্ধে মারা গিয়েছেন, আমি ইচ্ছা
করে তাকে হত্যা করিনি। এখন পিতৃহীনা তুমি, তােমাকে সাহায্য
করা আমার অবশ্যকর্ত্তব্য।

৬ষ্ঠ দৃশ্য ]
রাজা গণেশ
১৩৩
আসমান। আমাকে সাহায্য করে বুঝি তােমার কৃতকার্যের
প্রায়শ্চিত্ত করবে ?
যদু। হ্যা ।
আমান। সত্যি বছ ?
যদু। হিন্দু কখনও সত্য ভিন্ন মিথ্যা বলে না।
আসমান। তাহলে শপথ কর যে আমি তােমার কাছে যা চাইব,
তা দিতে তুমি কিছুমাত্র কাতর হবে না।
যদু। কিসের শপথ করলে তােমার দৃঢ়বিশ্বাস হয় বল, আমি
সেই শপথই করব।
আসমান। যাতে তােমার অভিরুচি হয়।
যদু। বেশ, আমি আমার বাপমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ পার্থিব দেবতা
বলে মনে করি। তাদের শপথ করে বলছি, যদি আমার সাধ্যের
অতীত না হয়, তবে তােমার ইচ্ছা অবশ্যই আমি পূর্ণ করব। তুমি
অকপটে বল শাহজাদী, আমার কাছে কি চাও?
আমান। শােন তবে কুমার, আমি তােমার দেহ এবং মন
তােমার কাছে প্রার্থনা করি। তাই দিয়ে আমাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা
পাশে আবদ্ধ কর।
যদু। (স্বগত) রে মন, বিদ্রোহী হয়াে না। আমার জাতি
ধৰ্ম্ম যায় যাক, কিন্তু আমাকে সত্য পালন করতে দাও। ( প্রকাশ্যে )
শাহজাদী, আজ হতে এই দেহ এবং মন সম্পূর্ণরূপে তােমার। তুমি
এর দ্বারা যা ইচ্ছা তাই করতে পার।
আসমান। তুমি ধন্য কুমার। এই যে আজ অত্মিদান করে এই
দুঃখিনী দুঃখ দূর করলে, এতে খােদা তােমার উপর অবশ্যই সন্তুষ্ট
হবেন। তবে একটি কথা আছে। আমি বাদশাজাদী, সুতরাং

১৩৪ রাজা গণেশ [ ৫ম অঙ্ক তােমাকে যে উপপতিত্বে বরণ করব না, এটা অবশ্যই তুমি বুঝতে পার। তােমাকে যথাসময়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মের কোলে আশ্রয় নিয়ে আমায় বিবাহ করতে হবে। কিন্তু তােমার বাবা বেঁচে থাকতে এ কাজ করলে তিনি অত্যন্ত ব্যথা পাবেন। তাই তার জীবনকাল পৰ্য্যন্ত তােমাকে পিতৃমাতৃসেবার অবসর দিলুম। যেদিন তােমার বাবা স্বর্গারােহণ করবেন, সেই দিন থেকে তুমি সম্পূর্ণ রূপে আমার। এখন চল কুমার, আমার বাবার মৃতদেহ দেখিয়ে দেবে চল। যদু। এস শাহজাদী, যদুনারায়ণ কর্তব্যের কাছে চিরদিনই অবনতমস্তক। কর্তব্যের প্রেরণায় যেমন নিজের হৃৎপিণ্ড ছিড়ে তােমাকে উপহার দিয়েছি, তেমনই কর্তব্যের প্রেরণায় তােমাকে তােমার পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ করতেও যথাসাধ্য সাহায্য করব। জানি পৃথিবীর লােক আমাকে ইন্দ্রিয়সেবী বলে ঘৃণা করবে, কিন্তু তাতে আমি বিন্দুমাত্রও ভয় করি না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে যদুনারায়ণের নাম মুছে যায় যাক্, কিন্তু যতদিন এ দেহে প্রাণ থাকবে ততদিন তােমার প্রত্যেক ইচ্ছা পূর্ণ করব। আর দেরী করাে না শাহজাদী, এস আমার সঙ্গে এস। ( উভয়ের প্রস্থান) [ অন্য দিক দিয়া জনৈক সৈনিকের প্রবেশ সৈনিক। কুমার বাহাদুর ততফা কপালটাই করেছিলেন। এ দিকে মরা ঘেটে ঘেটে আমাদের প্রাণ যায় আর কি, ওদিকে উনি এরই মধ্যে বেশ দুধকলা জুটিয়ে নিয়েছেন। লড়াইয়ের মধ্যে যদি এ-রকম দু-একটি শাহজাদীর সঙ্গে পীরিত করতে পারা যায়, তবে জন্ম ৬ষ্ঠ দৃশ্য ] রাজা গণেশ জন্ম লড়াই করতেও আমাদের আপত্তি নেই। যাই, আমাদের আর বসে থাকবার কপাল কোথায় ? ( প্রদান ) [ যদুনারায়ণের পুনঃপ্রবেশ । যদু। কি করলাম, নবর কাছে এ মুখ দেখাব কেমন করে ? বাবা মার কাছেই বা এর কি কৈফিয়ৎ দেব ? উঃ! মনে হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী ঘৃণায় আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। না পারব না, সহ করতে পারব না। মৃত্যু? হ্যা, মৃত্যুই শ্রেয়; এ আগুনে জ্বলে- পুড়ে মরার চেয়ে মরণই এখন একমাত্র শান্তির পথ। কিন্তু নিজে হতে মরার অধিকার ত রাখিনি। তবে কি সারাজীবন এমনি ভাবে জ্বলে-পুড়ে মরতেই হবে ? উঃ, অসহ! আসমান! শয়তানী ! এমনি করেই ভালবাসার প্রতিদান দিলি? আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে পথের কাঙাল করলি ? তােকে বুকের মধ্যে রেখেছিলাম তাই কি আমার মর্মস্থানে দংশন করলি? না—অসহ-আর দাড়াতে পারি নে। ( দ্রুতবেগে প্রস্থান)

সপ্তম দৃশ্য
গৌড়রাজপ্রাসাদস্থ অভিষেকমণ্ডপ
সিংহাসনােপরি মহারাজ গণেশনারায়ণ এবং মহারাণী ত্রিপুরেশ্বরী ; সম্মুখে ও
পার্শ্বে কালিকানন্দ স্বামী, দুর্গাচরণ, অবনীনাথ, জীবনচন্দ্র, বক্তার,
যদুনারায়ণ এবং অন্যান্য পাত্রমিত্র ও সৈন্যসামগণ
উপবিষ্ট। পটান্তরালে পুরাঙ্গনাগণ হুলুধ্বনি
ও শঙ্খধ্বনি করিতেছেন।
কালিকা। এই নাও বৎস, গৌড়ের রাজমুকুট গ্রহণ কর।
মহারাজ লক্ষণ সেন যে মহামূল্য রত্ন হারিয়েছিলেন, আজ তােমারই
বাহুবলে তার উদ্ধারসাধন হ’ল। তুমি ইতিহাসে অমর হলে
বৎস। বাংলার মুক্তিযুদ্ধে তােমার এই বীরত্বের কাহিনী প্রত্যেক
বাঙালীর হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে। তােমাকে বেশী কিছু বলা
নিয়ােজন ; তােমার অর্জিত এই মুকুটের মর্যাদা অবশ্যই তুমি
রক্ষা করবে। (ত্রিপুরেশ্বরীর প্রতি) আর মা ত্রিপুরা, তােমাকে
আজ আমি শুধু একটি কথা বলব। আৰ্য্যবংশে তুমি জন্ম নিয়েছ ;
প্রাতঃস্মরণীয়া সীতা, সাবিত্রী, আর জগজ্জননী শক্তি তােমার আদর্শ;
তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বদা পতির শুভাশুভের দিকে দৃ
রাখবে।
( উভয়ের মস্তকে রাজমুকুট পরাইয়া দিলেন ও তঁাহারা
উভয়েই স্বামীর চরণে প্রণত হইলেন)
জীবন। বল সকলে জয় মহারাজ গণেশনারায়ণের জয়।
সকলে। জয় মহারাজ গণেশ নারায়ণের জয়।

৭ম দৃশ্য ] রাজা গণেশ ১৩৭ অবনী। মহারাজ, মৃতকল্প বাঙালী জাতিকে স্বাধীন ও বীৰ্যবস্ত করে তুলে আপনি অক্ষয় কীর্তি রেখে গেলেন। আপনাকে বুকে ধরে বঙ্গভূমি ধন্য মহারাজ। বক্তার। মহারাজ, আজকার এই শুভদিন সমগ্র বাঙালী জাতির পক্ষে চিরস্মরণীয়। খােদার কাছে কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করি, আপনি দীর্ঘদিন শাসনদণ্ড ধারণ করে প্রজার সুখশান্তি আনয়ন করুন। দুর্গা। মহারাজ, এ দৃশ্য দেখে আনন্দে আমার বাক্‌রােধ হয়ে যাচ্ছে। আজ আমার সেই দিনের কথা মনে হচ্ছে, যেদিন চলনবিলের তীরে বসে আমরা দুজনে হিন্দুজাতির ভবিষ্যৎ ভেবে আকুল হয়েছিলাম। সেদিন আমরা কল্পনার চোখে যা দেখেছিলাম, আজ তাই বাস্তব ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মহারাজ, এর মধ্যে আমি ভগবানের মঙ্গল হস্তের স্পর্শ স্পষ্টরূপে দেখতে পাচ্ছি। আপনার এই অভূদয় হিন্দুজাতিরই পুনরভ্যুদয়ের সূচনা করছে। আমি যেন দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি, ভবানীর বরপুত্রগণ বিশ্বজয়ে বহির্গত হয়েছেন। তাঁদের শােৰ্য বীৰ্য্য ও জ্ঞানগরিমার নিকট সমগ্র জগৎ অবনত মস্তকে পরাজয় স্বীকার করছে। তারপর এই ভারত- ভূমির ত্রিবেণীসঙ্গম থেকে জ্ঞান, শক্তি ও শান্তির তিনটি পবিত্র ধারা তিনদিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, আর সমগ্র জগৎ সেই ত্রিধারায় স্নান করে অমর হয়ে যাচ্ছে। মহারাজ, ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষ জগতের মুক্তির জন্য যে মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করবে, আপনি আজ তারই সূচনা করে স্বয়ং ধন্য হলেন, আর সমগ্র হিন্দু জাতিকেও ধন্য করলেন। এখন যার কৃপায় এই অঘটন সংঘটন হয়েছে, আসুন আমরা সকলে ভক্তিভরে সেই জননী ভবানীর জয় ঘােষণা করি।

১৩৮ রাজা গণেশ [ ৫ম অঙ্ক সকলে। জয় ভবানী মায়ের জয়। গণেশ। বন্ধুগণ, আজ আমার মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দিয়ে আপনার এই কথাই প্রমাণ করলেন যে, বাংলার জলমাটির গুণে হিন্দু আর মুসলমান তাদের পৃথক অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে এক অখণ্ড নববীৰ্য্যবান জাতিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্র সপ্তদুর্গানিবাসী সামান্য এক ব্যক্তির পক্ষে বিশাল গৌড়দেশের সিংহাসনে আরােহণ করা একটা অভাবনীয় ব্যাপার সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদেরই চেষ্টায় আর আর ভবানীর ইচ্ছায় এরূপ অঘটন ঘটেছে। অতএব আসুন আমরা সেই জগজ্জনীর চরণে কোটী কোটী প্রণাম করি, আর তার কাছে কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করি, যেন গৌড়ের এই শাসনদণ্ডের গুরুভার বহন করবার যােগ্যতা লাভ করতে পারি। কালিকা। মহারাজ, এই তােমার যােগ্য কথা। অপক্ষপাতে রাজ্যশাসন করে প্রজারঞ্জন করাই আৰ্য্যবংশের গৌরব। তুমি বংশের সেই গৌরব রক্ষা করতে সক্ষম হও, সর্বান্তঃকরণে তােমাকে সেই আশীৰ্বাদই করি। গণেশ। আপনার আশীর্বাদে বুকে অদ্ভুত বল পেলাম দেব। তাই বলতে সাহস হচ্ছে, ভবানীর ইচ্ছা হলে এই সাম্প্রদায়িক কলহ- জর্জরিত বিকারগ্রস্ত গৌড় দেশকে আমি একতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে সক্ষম হব। বাংলার সমস্ত অধিবাসী একই ভূমিতে জন্মে একই অনুজলে পুষ্ট হয়েছে; একই মুক্ত বায়ু সকলে নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছে। বাংলার অত্যুত্থানে সকলের অভখান, আবার বাংলার পতনেই সকলের পতন। অতএব প্রাণ দিয়েও এই কলহ- পরায়ণ ভাইগুলিকে আমি এক করতে চেষ্টা করব। ফলাফল দেবার কর্তা অবশ্য মা ভবানী।

৭ম দৃশ্য ]
রাম গণেশ
১৩৯
কালিকা। মহারাজ, সন্তান অবশ্য জননীর ঋণ জন্মজন্মান্তরেও
শশাধ করতে পারে না, তবু আমাদের যা কর্তব্য তা করতে হবে।
জননীর পীঠস্থান ভবানীপুরের গৌরব যাতে সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত
তার ব্যবস্থা কর। আর মন্দিরপাদমূল-প্রবাহিত পবিত্র
করতােয়াতীরে মা’র পূজার্থীদের জন্য একটি পান্থশালা নির্মাণ
গণেশ। আপনার আদেশ শিরােধার্য্য দেব! কায়মনােবাক্যে
এ আদেশ পালন করতে চেষ্টা করব।
কালিকা। তুমি ধন্য মহারাজ। এখন এস সব গৌড়ের জ্বালাদগ্ধ
মানবের দল, সকলে এসে এই মহানরপতির পদচ্ছায়ায় সমবেত হও;
তােমাদের সকল দুঃখ, সকল আলা মুহূর্তে দূরীভূত হয়ে যাবে।
সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর এই আহ্বানে তােমরা কর্ণপাত কর।
অমৃতের ভাণ্ড সম্মুখে রক্ষিত ; পান করে অমর হও—বিশ্ববাসীকেও
অমর কর :
যবনিকা
সম্পূর্ণ

১০
গ্রন্থকার প্রণীত অন্যান্য পুস্তক
পূজার অর্ঘ্য (উপন্যাস) উৎকৃষ্ট বাঁধাই
মাতৃতীর্থ (উপন্যাস)
মহারাজা সীতারাম (ঐতিহাসিক নাটক)
শক্তিমন্ত্র
বীরব্রত (উপন্যাস)—শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।
প্রাপ্তিস্থান
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, কলিকাতা এবং
অন্যান্য সকল প্রধান পুস্তকালয়।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Raja Ganesh

Author
Majumder ,sureshchandra
Title
Raja Ganesh
File name
Raja Ganesh
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/03/23
Publisher
Bimalendukumar Maittra, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
156
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama.
Keywords
Bela
DLI number
511298
Barcode
4990010018459.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ZOLcQFdnHzB
Download PDF

Raja Ganesh