Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dhuper Dhoyay Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পের ধোন
No text on this page.
স্বিগু
BURU
( নাটিকা )
সত্যেনাথ দত্ত
-
Z
আৰ্য সাহিত্য ভবন
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলিকাতা
প্রকাশক
বারিদকান্তি বস্তু
প্রথম সংস্করণ
শ্রাবণ, ১৩৩৬,
ফাম পাঁচ সিকে ]
প্রিন্টার--শ্রীশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
বাণী প্রেস
৩৩ মদন মিত্র লেন, কলিকাতা
নাট্যোক্ত চরিত্র
সীতা
ঊর্মিলা
মাগুবী
-অযোধ্যার রাজবধূ
কুরঙ্গিকা
বিহঙ্গিকা
চঞ্চরীকা
নকুলিকা
রাজবধূদের প্রধান প্রধান সহচর
তাবুড়ী
( ওরফে চন্দ্রাবলী)
সুমিত্রার দাসী
বেত্রবতী
-প্রতিহারিণী
মালিনী, শবরী, ভাণমতী, যবনী শাস্ত্রী।
তরঙ্গিক
নিপুণিকা
বল্লরীকা
পঞ্জিকা
সুপর্ণিকা
কপােতিকা
সাগরিকা
আরাত্রিকা
মনিকা
-পুরবাসিনী তরুণী
দাসী, মালী, চামরধারিণী, করঙ্কবাহিনী, সখীর দল,
বধূনাট্যের দল, যবনীর দল।
এই নাটিকায় রাজবধূদের মাথায় স্বস্তি-মুকুট; পরনে তিল-ফুল বুটিদার ও ভােৱা বুটিদার ও ভাণ্ডীর বুটিদার জরির তেছা ডুরে। কাণে কর্ণিকা ; হাতে ‘যবাঙ্কুরী’ নামক উৎসপী কঙ্কন ; গলায় মুক্তার শতাবলী হার ; কোমরে কাঞ্চী ; পায়ে ‘ভ্রমরী নূপুর। ৬ প্রধান সহচরীদের মাথায় মুক্তার সীমন্তিকা পরনে জরির তেরছা ডুরে, বুটি নাই। কাণে ‘তাল- পত্ৰী; হাতে তালী কঙ্কন ; পায়ে ‘গুঞ্জরী’ নূপুর। তরুণীদের মাথায় মুক্তার একাবলী ; পরণে বাসন্তী রঙের শাড়ী । কাণে চাপা ; হাতে গুঞ্জাবলী কঙ্কণ ; পায়ে নূপুর ; গায়ে ফুলের গহনা। বধূনাট্যের কারাে মাথায় চাপাই-চূড়াে, কারাে জোড়-চামর-খোঁপা, কারাে ত্ৰিধম্মিল, কায়রা চতুঃশৃঙ্গ, কারাে পঞ্চফণা। বেবর্তী ও যবনীদের গায়ে কঞ্জুক ; কাণে কুণ্ডল।
No text on this page.
ধূপের ধোয়া
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
{ অযােধ্যার রাজপ্রাসাদ, শ্রুতকীৰ্ত্তির আরাম-ঘর। হাতীর
দাতের পালঙ্কে অর্ধশয়ান মুক্তকেশী শ্রুতকীর্তি ; প্রধান সহচরী নকুলিকা
তঁার মুক্তকেশে ধূপের ধোয়া দিচ্ছে। সখীর দল ইতস্তত ছড়িয়ে
আছে ; এদের কারো হাতে চামর, কারাে হাতে পদ্মপাতা; কারো বা
ধূপদানী, আবার কারাে বা মৃণালের মালা। ]
সখীর দল।
( গাইছে)
গায়ে সই সইবে না রােদ
শুকিয়ে নে চুল ধূপদানীতে !
ধূপের ধোঁয়ায়
জোছনা নিছিয়ে-নেওয়া
নিছনি তাের মুখখানিতে!
দুপুরে দারুণ রােদে
সারীশুক নয়ন মােদে,
হরিণী হারায় দিশা
মরীচিকার হাতছানিতে।
ঝঝি সব ঝাঝিয়ে গেছে
সায়রে জলের মাঝে,
ঝঝি বােদ মাথার 'পরে
মগজে ঝ ঝর বাজে!
ধেয়ে যায় হলকা হাওয়া
হ’ল দায় আরাম পাওয়া
বসুধার বুকের সুধা
ফুরায় রােদের বালাই নিতে।
পলাশের চক্ষু রাঙা
ভ্রমরী ভিৰ্ম্মি গেছে,
দুনিয়ার শুক্নাে পাতায়
খামােকাই ঘুর লেগেছে !
ধূপের ধোঁয়ায়
সারঙের সুর নেমে যায়,
পাপিয়ার তান গেয়ে যায়,
আকাশের শন্ ঘেমে যায়
চাতক পাখীর কারানিতে।
উশীরের গুচ্ছ কোথা?
মৃণালের কইরে মালা?
ঘিরে দে পদ্মপাতায়,
বাতাসে বিষের জ্বালা।
দিনে রাত ঘনিয়ে আনন,-
ঘরে আজ চুল শুকানন,
চামরে ঢুলিয়ে নয়ন
ধূপের ধােয়র আমদানীতে।
শ্রুতকীৰ্ত্তি । ( চোখ রগড়াতে রগড়াতে) তাের ধূপদানী সরিয়ে-নে,
নকুলিকা,......কত ধােয়। কল্লি দ্যাখ, দেখি, মাথা ধরে
গেল।
নকুলিকা। চুল কিন্তু ভিজে রয়েছে......
শ্রুতকীর্তি। তা’ থাক, তুই ধূপদানী সরিয়ে-নে, •••••পােয়।
করেছে দ্যাখনা, যেন গােয়ালঘরে সজাল দিয়েছে।
ধূপের ধোঁয়ায়
নকুলিকা। সাজ না হতেই সাজাল, ••••"কসুর হয়েছে ।
শ্রুতকীর্তি | দ্যাখ, নকুলিকা!
নকুলিকা। এরা সব যে হুক্কা-হুয়ার দোহাকী সুরু করেছে
...আমি বলি সন্ধ্যেই বা হ’ল, .....অযােধ্যায় আজকাল
দিন-দুপুরে শেয়াল-রাগিনী শােনা যাচ্ছে!... ..সম্রাট বশিষ্ঠা-
শ্রমে গিয়ে অবধি এমনি অরাজকই হয়েছে বটে
শ্রুতকীর্তি । নকুলিকা! .....সব সময়ে নকল ভালাে লাগে না।
নকুলিকা। আসল মানুষকে ডাক্ব নাকি?
শ্ৰতকীর্তি। আবার!.•••••
নকুলিকা। আবার কই ?•••.. এই তাে প্রথম বার ......না, না,
থুড়ি, ভুল হয়েছে......দ্বিতীয় বার। তা আমার উপর
চোখ পাকালে কি হবে? আমি আর কি কব বল ?
দুপুর বােদ্দরে, তিন দেউড়ী পার হয়ে, চিঠি নিয়ে
দৌড়-পাড়াপাড়ি কলুম,—তােমার তাকে বল্লুম,—চিঠি
জরুরি, জবাব চাই। তিনি তখন নিজের তৈরী শত্ৰুঞ্জয়
খেলার ছক পেতে বসেছেন,-খেলাতেই মত্ত, ঘাড় না
তুলেই বলা হ’ল“তুমি যখন পত্রবাহক তখন চিঠি যে
জরুর-ই, তা বুঝতে পেরেছি; কিন্তু জবাব’--এই পৰ্য্যন্ত
বলেই ভুরু কুঁচকে বাতাসের গায়ে আল্পনা দিতে লাগলেন।
আমি প্রহর খানেক দাড়িয়ে দাড়িয়ে চলে এলুম।
শ্রুতকীর্তি। উঃ পুরুষ মানুষ কি হৃদয়হীন!—কি স্বার্থপর! খেলায়
৪
ধূপের ধোঁয়ায় মত্ত-চিঠির জবাব দেবার অবসর নেই !একটু দায়িত্ব- জ্ঞানও কি নেই? সম্রাট নগরের বাইরে, ধূমকেতুর দোষদৃষ্টি কাটাবার জন্যে কুলগুরুর আশ্রমে স্বস্ত্যয়নে ব্যস্ত,-এদিকে এরা চার ভায়ে পাঁচ-পরের ভরসায় দুর্গ ছেড়ে কোথায়, যে চলেছেন, তা তারাই জানেন, আর ধর্মই জানেন। নকুলিকা। (ছছাটো গলায়) মন্দ কি? নতুনতর বন্দোবস্ত, রাজা অমঙ্গলকে রাজ্য থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছেন। রাজপুররা তাকে নেমন্তন্ন করে ডেকে আছেন ! অমঙ্গল- বেচারারই মুস্কিল ! কার কথা রাখে বল দেখি । শ্রুতকীর্তি। সঙ্গে নিয়ে যেতে বলুম, তা তাে হলই না; এমন কি কোথায় যে যাওয়া হচ্ছে তাও বলা হল না ; লুকোনো নকুলিকা। কোথাও লড়াই বাধল না তাে? শ্রুতকীর্তি। উহু, গড়াই বাধলে সে কথা চাপা থাকত না,- চারদিকে সাজ-সাজ পড়ে যেত। নকুলিকা। তবে ? মৃগয়া? শ্রুতকীর্তি। উহু, সে কথা ঢেকে রাখত না••••• নকুলিকা। তবে? আবার বিয়ে নাকি ? শ্রুতকীৰ্ত্তি । বিচিত্র কি ? নকুলিকা। চার ভায়ের এক সঙ্গে ? শ্রুতকীর্তি। হতে পারে, ---আমাদের বেলা কি হয়েছিল ? .
ধূপের ধোঁয়ায়
নকুলিকা। না, না, তাও কখনাে হয়, এত প্রণয়।
শ্রুতকীর্তি। খুব হয় নকুলিকা, তুই পুরুষ মানুষকে চিনিস-নি,
ওরা সাপের সঙ্গেও ভাব রাখে, আবার ব্যাঙের সঙ্গেও
ভাব রাখে। তলারও কুড়ােয়, গাছেরও পাড়ে।
নকুলিকা। আমার তােত মনে হয় না।
শ্রুতকীর্তি । আচ্ছা তাের কি মনে হয় ঠিক কোরে বল্ দেখি।
নকুলিকা। আমার মনে হয় পুরুষ মানুষের মন গানের কলির
মতন, কখনাে াকের দিকে গড়ায়, কখনাে বা সমের দিকে
ঝোকে।
ভয়ের কোনাে কারণ নেই, ফাকের পর
থেকে দ্বিগুণ ঝোঁকে সমের ঘরেই ফিরে আবে......পুরুষ
মানুষ••••••একটু ফাকা ভালােবাসে, ......মাঝে মাঝে একটু
ফঁাকে না যেতে পেলে হাঁপিয়ে ওঠে। ওরা পাখীর জাত••
•••ইক-না-হক উড়ে বেড়াতে ভালােবাসে।
শ্রুতকীর্তি । হু, পুরুষ মানুষ পাখীর জাত, ওদের সব ফুৰ্ত্তির
প্রাণ ; আর মেয়েমানুষ কুনাে বেড়াল, কোণ থেকে নড়তে
নেই। (পরিক্রমণ)
নকুলিকা। (ছােট গলায়। না, মাথা বিগড়েছে দেখছি, গােড়ে
গােড় দিয়ে দেখা যাক্।
এতকীত্তি। আমাদের যেন প্রাণ হাঁপায় না, আমাদের ফঁাকায়
যাবার দরকার হয় না, যত জোয়ার-ভাটা, ওঁদের প্রাণে ;
আমাদের একটানা গঙ্গা, কেবল ঘর আর ঘর।
ধূপের
ধোঁয়ায়
নকুলিকা। যা বলেছ আমাদের খালি আরসুলা, টিকটিকি আর
মাকোষার সঙ্গে গা-ঘে সাঘেসি কোরে ঐ ঘর কাছেই
থাকতে হয়।
শ্রুতকীর্তি। আমােদ নেই, আলাদ নেই.••
নকুলিকা। ফুৰ্ত্তি নেই......
শ্রুতকীৰ্ত্তি ॥ ফুৰ্ত্তি শুধু ওঁদের,-
মকুলিকা। আর আমরা কেবল ছার পােকার মতন বাড়ী কামড়ে
পড়ে থাকতে জন্মেছি।
( গান )
নকুলিকা। তফাৎ করিয়া খাসা ওঁরা দূরে চলে যান,
সখীর দল।
আমরা বসিয়া থাকি আততা
নকুলিকা। দুনিয়াতে ওঁদেরি যা ফুর্তির প্রাণ, সই,
আমরা এসেছি ভেসে, ফালতাে !
সখীর দল।
মিছাই পরেছি পায়ে আতা,
নকুলিকা। মিছাই রেধেছি গুড় চা!
সখীর দল।
নাতে ভিজায়ে রাতে,
মিছে ছেকে দিই প্রাতে,
নকুলিকা। পোঁছে নাকো তবু আজ কাল তােত।
ওরা সব মর্দ-ফুর্তির ফর্দ লম্বা,
নকুলিকা। আমাদের বেলা শুধু রম্ভা।
সখীর দল।
৭
ধূপের ধোঁয়ায়
সখীর দল।
অথচ না হলে নারী
দিন চলা হত ভারি,
হেঁশেলেতে কে উনুন্ জ্বালতাে ?
নকুলিকা।
সখীর দল।
নকুলিকা।
সখীর দল।
অবলা বলিয়া সই সইরে,
এত অপমান জ্বালা সইরে।
নাহি বাঁচি নাহি মরি,
জাঁকড়ে জীবন ধরি,
কি হবে উপায় হায় বল্ তা,
সাথে যেতে কর যদি বায়না,
আজিটা কাণে পেঁৗছায় না,
ভালােবাসা ছিল মিঠে
গােড়াতে পায়েস পিঠে,
শেষে কিনা আথুথুথু ! পতা!
আরসুলা-টিকটিকি রঙ্গে,
কোণ নিয়ে থাকো নারী সঙ্গে,
অশ্বমেধের ঘােড়া
বাইরে ফেরেন ওরা,
হাঁড়ে না মেলে হালচাল তাে !
নকুলিকা।
সখীর দল।
কুলিকা।
ধূপের ধোঁয়ায়
সখীর দল।
ঠাই ঠাই,
চলে যায় পায় পায় পায় রে।
হায় সখী হায় হায় হায় রে ।
অবাক্ নয়নে চাই,
ছায়া কায়া
( যেন ) খসে পড়ে নারকেল-বাতাে !
শ্রুতকীর্তি। নাঃ, কিছুই ভালাে লাগছে না।......নকুলিকা, পাল্কী
তৈরী করতে ব......দিদির মহলে যাব।
নকুলিকা। রােসাে, রােসাে, মেলাই পায়ের শব্দ পাচ্ছি,.....
কারা আসছে !......( এগিয়ে) •••••আর পাল্কী বলে কি
হবে? তিনি নিজেই আছেন।
[ সীতা, ঊর্মিলা ও মাণ্ডবীর প্রবেশ ]
শ্রুতকীর্তি। বা!••••••দিদি !......তুমি .....তােমরা!......এস,
এস, ••••••বেশ! ......এই আমি তােমাদের কাছেই
যাচ্ছিলুম।
সীতা। কেন, শ্রুতি, মন টিকছে না বুঝি?...•••এরি মধ্যে ঘর
ফঁকা ঠেছে ? ••••••তুই হাসালি বোন, এখনাে যে ওরা
দুর্গের বাইরেও যায়নি।
শ্রুতকীত্তি । না দিদি ঠিক তা নয়-•••••
সীতা। তবে ?
তােমার সঙ্গে একটা পরামর্শে আছে,,..... আচ্ছা,
ধূপের ধোঁয়ায়
দিনে দিনে এ সব কি বইছে ?••• • এগুলাে কি সব উচিত
হচ্ছে ?
সীতা ॥ কী গুলাে ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি । এইযে আমাদের কাছে লুকিয়ে কোথায় সব যাওয়া
হচ্ছে
সীতা । তা গেলই বা.....ঘুরে আসুক, চার ভাইয়ে তােত প্রায়
একঠাই হবার সুযােগ হয় না, ••••••আশ মিটিয়ে বেড়িয়ে
নিক,••••••আমরাও চার বােনে মনের আশ মিটিয়ে গল্প গুজব
করে নিই, কবে আবার নন্দীগ্রামে চলে যাবি।••••••আবাৰ
কবে দ্যাখা শুনাে হবে তার ঠিক কি ? যে ক’দিন আছি
সে কটাদিন চার বােনে মিলে আমােধ্যাকে মিথিলা করে
তােলা যাবে, কি বলিস?
{ শ্রুতকীত্তি নিরুত্তর।
চুপ করে রইলি যে?••••••ওদের ভায়ে ভয়ে ভাব,
আর আমাদের বােনে বােনে বুঝি আড়ি?
শ্রুতকীৰ্ত্তি । না দিদি আমার এ লুকোচুরি ভালাে ঠেকছে না,
•••দশবচ্ছর হলাে বিয়ে হয়েছে, এমন ভাব তাে কখনাে
দেখিনি, আগে তাে এ রকম ছিল না।
মাণ্ডবী। ধূমকেতু লাে ধূমকেতু, এ-সব ধূমকেতু ওঠার ফল,এই
মধুমাসে অসহ্য গ্রীষ্ম, ••••••
ধূপের ধোয়ায়
উৰ্মিলা। আর এই মধুর দাম্পত্য জীবনে তার চেয়েও অসহ
সংশয়ের গুমােঢ়.....
মাগুবী ॥ ‘রাহো গােমমদকং ধাৰ্যং কেতো মরকতং তথা’......
শ্রুতি, ভালাে চা তাে একটা মরকত-মণি ধারণ কর
ও কেতুও যে ধূমকেতুও সে।
উৰ্মিলা। অশ্বগন্ধার মূল ধারণ করলেও হয়, আস্তাবলের বাগান
থেকে আনিয়ে-নে না।
মাগুৰী । আস্তাবলের বাগান কেন ?
উৰ্মিলা। আস্তাবল নইলে অশ্বগন্ধা পাবে কোথায় ?
সীতা। ক্ষ্যাপাকে আর ক্ষ্যাপানি বােন, ক্ষমা দে।
শ্রুতকীৰ্ত্তি ॥ না দিদি ক্ষ্যাপা নয়, •••• আমি স্পষ্ট কথা চাই, ••••••
সঙ্গে নিয়ে না যায় বেশ, নিয়ে যেতে হবে না,••••চাইনি
যেতে; কিন্তু, কোথায় যাওয়া হবে, তা বলবে না কেন?
সীতা। তুই কি সন্দেহ করি, তি? ••••••আমি করিনি,
ককূলে বাচতুম না।
শ্রুতকীর্তি। না, ঠিক সন্দেহ নয়।
, ঠিক সন্দেহ নয়।••••••তবে কি জাননা,......
এ কি-রকম জাননা,......এ যেন নিজের অধিকার থেকে
বঞ্চিত হওয়া।•••••আচ্ছা, বলে গেলে কি হয় ?••••••
আমরা কি যাওয়া কেড়ে নেব ?
সীতা। রাজবংশের মেয়ে হয়ে তুই এই কথাটা বলি, শ্রুতি?...
জানি-নে?••••••রাজবংশে যাদের জন্ম তাদের কত বিষয়ে
ধূপের ধোঁয়ায়
সাবধান হয়ে চলতে হয়?••••••দুদিন পরে রাজ্যের ভার
যাদের মাথায় নিতে হবে, মন্ত্র-গুপ্তি তাদের সাধনার সামগ্রী
••••••সব কথা জানিয়েই যে যেতে হবে তার কি মানে
}
আছে?
শ্রুতকীর্তি। আমি অতশত বুঝতে চাইনে,•• • স্ত্রী তাে স্বামীর
ছায়া,••••কি না, স্ত্রী সৰ্ব্বদা ছায়ার মতন স্বামীর
অনুগামিনী হবে, আমাদের সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা
হচ্ছে কেন?••••••তুমিই বলল,•••••হয় বল শাস্ত্রের এ কথা
ভূয়াে, নয় তাে••••••
মাগুৰী । নয় তো, আর কি ? চল, সবাই মিলে ওদের রথের
অনুগমন করি অর্থাৎ কি না পিছন পিছন ধাওয়া করি......
উৰ্মিলা। যদি ওরা ঘােড়ায় চড়ে যাত্রা করে ?
মাগুবী। তবে ঘােড়ার ল্যাজ ধরে সটান ঝুলে পড়ি, অনুগমন
তাে করতে হবে!••••••
শ্রুতকীৰ্ত্তি যাও,
মাওঃ,•••••আমি সে কথা বলছি-নে।
সীতা ॥ তবে?
শতকীৰ্ত্তি । কোথায় যাওয়া হচ্ছে, অন্তত, সেইটে জানতে হবে,
সীতা। কি করে ?
শ্রুতকীর্তি।
ফের চিঠি লিখে।
বেশ, লেখাে।
শ্রুতকীর্তি । সবাই মিলে, চার বােনে।
। + ০ ।
সীতা।
।
.
ধূপের ধোঁয়ায়
!
জীত কৌতূহল নেই, তােমরা লেখাে••••••
‘ঘুষ দিবি না লিখলে আমিও লিখব না।
: গু; ;; আমি না ।
শতশ । এই থাে, দিদি, তুমি না লিখলে কিচ্ছু হবে না; ...'
নাক্ষীরায্য অধিকার দাবী করবার লােকের অভাবে
মাঠে মারা যাবে
সীতা তুই জালালি .....কি লিখতে হবে, শুনি?
কী লিখে দাও না যা ভাল হয়, তুমি তাে বেশ গুছিয়ে
লিতে পারে, লিখে দাও না দু’কলম ।
সীতা, 'না, ন. ওই বন্।
it , ••••ঐকথা.•••••সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হল না,...
“য় যাওয়া হচ্ছে তাও বলা হল না। অতএব
• এ
তােমাদের সঙ্গে আড়ি।
আমরা রইলুম বাড়ি।
মরা বুধব,
আমরা বাড়বে,
'আমরা খাব পায়েস।
কাটার
চোদ্দ ঘণ্টা
ঘুমিয়ে কয়ব আয়েস।
আমাদের দিয়ে কোনাে কাজ হবে না, তােমরা
শিখেছ। আমি চলুম আৰ্য্যা সুমিত্রার কাছে ।
ধূপের ধোঁয়ায়
|ীতা। না, না, তাকে আর জ্বালা-নে।
আল মা চু*
সেইখানে গিয়ে চিঠি চাপাটি যা মন চার তাই,
মাগুবী ও উম্মিল। আমি চাপাটি চাই,.•••••চিঠি চাই-নে
আমি চাপাটির দলে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
মেয়ে-মহলের দেউ7; চন্দন কাঠের প্রক: ক + :
রয়েছে, ফটকের গায়ে নক্সার সুষ্যমুখী ফুলগুৰি :ঠক মা মাঝে
মানানসই লােহার গুলাে ; কাটা দরজাট। ঈৎ খােলা: খ
হাতে বেত্রবতী পায়চারি করছে।]
বেত্রবতী । ( খখসের চৌকো পাখার বাত খেতে খেতে
দেড় ঘটি আঁব-পােড়ার সরবৎ, আড়াই ঘটি মিহৰি
আর ঘড়াটাক সরযূর জল !.. উদয়
ঠেকে উবে গেল, তা ঠিক ধরতে পায়
করে মুখে ঢালুম এইটুকুই মনে আছে
মনে আছে চক্-চক্ বক্-বক্ শব্দ !
বিধাতা-পুরুষ পবন দেবকে বরখাস্ত কে
ধূপের ধোঁয়ায়
অগ্নিদেবকে বাহাল কলেন নাকি।•••••"বসন্তোৎসবের
আগেই এমন দুরন্ত গরম তত জন্মে কখনাে দেখিনি ?
••••••যে দিন থেকে ঝাটা-কাটা ধূমকেতুটা উঠেছে সেইদিন
থেকেই এই অগ্নিবৃষ্টি শুরু হয়েছে !••••••সুয্যি গ'লে আগুনের
পানা তৈরী হচ্ছে, উঃ আগুন!
( হাতে চোখ ঢেকে উপবেশন ও তন্দ্রাবেশ )
নেপথ্যে ॥ হা-আ, • • • • • বেম্মােতলায় আগুন লেগেছে।•• • • • পায়ের
তেলােয় ফোস্কা!••••• মরে গেলুম মা,••••••সারা হয়ে গেলুম!
[ কাট্য দরজার ভিতর দিয়ে গুড়ি মেরে তাবুড়ির প্রবেশ ।
তাবুড়ী । আ-আঃ, ঠাইটে বেশ ঠাণ্ডা রে, অন্ধকার কিনা,
শা,•••••একটু জিরিয়ে নিই মা, জুড়িয়ে নিই,••••••
আহা-হা-হা কাকাল্•••দরদূ•••••( বেত্রবর্তীর
উপবেশন )
বেত্রবতী । ( চমূকে
উঠে। কি এ?
......কে এ ?.••••
রাম, রাম, নেবে বস না,•••...ঘাড়ের উপর বসার জায়গা ?
শ্রাবুড়ী । অ-মা অন্ধকারে দেখতে পাহান,-আমি বলি
মােড়াটা!••••••কে ? অ-মা ! বেতন্ত দিদি।
বত্রবতী।
আর বেতন্তু দিদি,••••••দুরন্ত গরমের চোটে নিতান্ত
কাহিল অবস্থায় এক পাশে পড়ে আছি আমি!.... বলি
যাওয়া হয়েছিল কোথা ?
ধূপের ধোঁয়ায় আর কোথা ?......ঐ নকুখনের হােতায় ; ......খেয়ে উঠে সবে পানটি মুখে দিইছি, সুমিত্তিরে রাণীর হুকুম হ’ল • •••যা’ রাম-নখনকে নিম্মল্যি দিয়ে আয়, দিয়ে এলুম, ••••••যাত্রা করে বেরিয়েছে, আর তাে ঘর ঢুকবে না, দিয়ে এলুন, ••••••এসে সবে গা গড়াবার গােছ, করিছি আবার ডাক পড়ল......কি সমাচার? না, হাতির দাঁতের গাছ-কৌটোয় ভূজ্জিপাতার লেখন আছে,••••. যা’, রাম- নকৃথনকে দিয়ে আয়,......পঞ্চাশটে দাসী রয়েছে,...... তা আর কাউকে দিয়ে বিশ্বাস হবে না,......আমাকেই নিয়ে যেতে হবে,......তা কি করব? ..... রাজার রাণী... ...মুখ ফুটে বলে,......ঠেতে পারিনে।..... কৌটো বার করলুম,......খুলে দেখি অ-মা দুখানা লেখন,......কোন- খানা নিই—কোন্খানা থুই, বিষম ফাপর, সুধুতে গেলুম,......তা’ রাণী তখন পূজোয় ব’সেছে, ....কারে সুধুই কি করি? ....তা কৌটোসুদ্ধই নিয়ে গেলুম। বেত্রবর্তী। তা বেশ করেছ......বুদ্ধির কাজই করেছ। তন্দ্রাবুড়ী। তা আর বলতে ! নইলে কি আবার টানাপােড়েন করব নাকি......সাতমহল মাড়িয়ে ?......এই বােন্দরে ? বেত্রবতী । তা বই কি, তাতে এই বুড়াে বয়েস...... তন্দ্রাবুড়ী। (গলা খাকার দিয়ে) না বেতন্তু দিদি, আমি বুড়াে হইনি, আমায় রােগে করেছে। তা যা’ বছিলুম,
ধূপের ধোঁয়ায়
====
••••••তেতেপুড়ে কৌটোসুদ্ধ নখনকে তত দিলুম,..
সে আবার কৌটো খুলে দু’খানা চিঠিই রামকে দিলে .....
দুজনে বিড়বিড় করে পড়লে......তারপর কি বলাবলি
কলে, করে ট’রে অ-মা ! শেষে আমার উপর তম্বি। তা
বাছা তম্বি কলে কি হবে ?......বলে--
কোন্ হাঁড়ির কি বৃত্তান্ত ।
আমি কি জানি তপ্ত পান্ত ।
তা’ যা বলছিলুম, মুখখানা হাড়িপানা করে, একখান লেখন
কৌটোয় ভরে নখন কৌটোটা ফেরৎ পাঠালে,......
তাই নিয়ে যাচ্ছি।
বেত্রবতী ॥ তা নিয়ে যাবে বইকি,......নিয়ে যাবে না তাে কি ফেলে
দেবে,......গরীব লােক, গায়ের রাগ গায়েই মারুতে হবে।
তন্দ্রাবুড়ী। ঐ গায়ের রাগ গায়ে মেরেই তাে চুলগুলাে সব অসময়ে
শােণের নুড়ি হয়ে গেল, •••••. যা বলছিলুম মা, .....
দোষ কল্লে সুমিত্তিরে রাণী, আমি খেলুম চোখ-রাঙানি।
......তােমরা রাজার রাণী রাজার ঝি লেখাপড়া জানাে,
লেখন চিনে আমায় হাতে হাতে বুঝিয়ে দিয়ে পূজোয়
বলেই তাে হত, ••••••আঁা......আবার তাও বলি বাছা,
..সুমিত্তিরেরই বা অপরাধ কি ?......ওর কি আর
মাথার ঠিক আছে না মনের ঠিক আছে ?......রাজা
গেলেন দেশ ভেরূমনে,' েগেলেন কে না পাটরাণী
২
ধূপের ধোঁয়ায়
কৌশল্যে, ......তা যা পাটরাণী, যাবে না, যাক্।......
আর গেলেন কে না নাটের রাণী কেকই, নইলে যে তিনি
গোঁসা ঘরে ঢুকবেন।••••••তিন রাণীর মধ্যে দুজন গেলেন
রাজার সঙ্গে,......কেন আরেকজন কি যেতে জানেনা?
সুমিত্তিরে নেহাৎ ভালােমানুষ ....মুখ ফুটে কোনাে
কিছুই বলেনা, তাই যত হেনস্তা তাকে ;......সে একলাটি
পড়ে রইল ; নইলে বাড়ী আগলাবে কে ? বউদের সব
চরাবে কে? ঘরে সন্ধ্যে দেবে কে ?......বলি এতে কি
আর মাষের মনের ঠিক থাকে ? রাজা আমাদের বুড়াে
হ’তে বসেছেন, কিন্তু একচোখােমি ঘুচল না।
বেত্রবতী ॥ রাজা-রাজড়ার কাণ্ড!......আমাদের ও-সব কথায়
কাজ কি আয়ি।
তন্দ্রাবুড়ী। না, তাই বছি,......বলি নকৃখন আমার ওপর রাগ
কলে কিনা। ......আমি ওরে কোলে পিঠে করে মানুষ
করেছি, ... . ওর মা সুমিত্তিরে, তারে হ’তে দেখলুম,
......মানুষ কলুম, ......আমার ওপর তম্বি কলে,
তা করু!
বেত্রবতী। তুমি রাগ করনি তাে ?
তন্দ্রাবুড়ী। তা কি পারি বেতন্তু দিদি? ওদের অকলল্যণ হবে
যে ? সুমিত্তিরের ক্ষুদ্ৰ কুঁড়ে নয়ন, শিবরাত্তিরের সােতে,
আঁধার ঘরের মাণিক, ওদের দু নিয়ে সুমিত্তিরে
৫ •••••
ধূপের ধোঁয়ায়
সংসারী হয়েছে, ওদের ওপর আমি রাগ করব? (গালে
মুখে চড়াতে চড়াতে) আরে আমার কপাল! আরে
আমার কপাল !
বেত্রবতী। না, না, আমিও তাে তাই বছিলুম, তুমি কি রাগতে
পার ......বলি হ্যা আয়ি, তােমার গাছায় কি ?
তন্দ্রাবুড়ী। অ-মা !
ও সেই কৌটোটা আর কটা কাঁচা বেল,
......বড় দেউড়ীর দারােয়ানেরা পাড়ছিল কি না, ......
তাই......চেয়ে আলুম, ......কঁচা বেল,......পুড়িয়ে থাব।
বেত্রবর্তী৷ তা বেশ করেছ । এখন আমাদের বেলপােড়ই
আহার, আর তামাক-পােড়াই বাহার।
তন্দ্রাবুড়ী । ( আপন মনে) দেখলুম ঠাউরে ঠাউরে গােটাকতক
বেল পেকেছে, তা......
[ নকুলিকা ও কুরঙ্গিকার প্রবেশ ]
নকুলিকা। পেকেছে তত পেকেছে, বেল পাকলে কাগের কি?
তন্দ্রাবুড়ী। কে লা?••••••নকুলি বুঝি, •••••.তুই বড় নকুলে,
......তা’ হালা, আমি কি কাগ ?
নকুলিকা। যা! তুমি কাগ হ’তে যাবে কেন? তুমি হচ্ছ
“কাগভূষণ্ডির কাকী, কাকাতুয়া পাখী।”......তা আমি,
কই, আজকে আমায় পান দিলে না?
তন্দ্রাবুড়ী। ওলাে আমার নাম তন্দরা নয়, তন্দরা নয়, আমার নাম
চন্দরা, আলশের চাদ......বুঝেছিস ?
ধূপের ধোঁয়ায়
নকুলিকা। তবে যে সবাই তন্দ্রাবুড়ী বলে ?
তন্দ্রাবুড়ী। তা বুঝি জানি-নে-
এই, বয়স যখন তিনকুড়ি সাত
ফোলা দাতের কল্যাণে,
তখন, চন্দ্রাবলীই তন্দ্রাবুড়ী
নকুলিকা। গঙ্গাপ্রাপ্তি সজ্ঞানে !
তন্দ্রাবুড়ী । যখন, সদাই ঢেলে দু’চক্ষু
নকুলিকা। ভূয়ে, না গড়াতেই ঘড় ফুঃ !
তন্দ্রাবুড়ী। তখন, নতুন নতুন আখ্যা নিতুই
নানী-নাতির ব্যাখ্যানে।
নকুলিকা। তা বাপু, নানী নাতির দোষ কি?......সব বয়সে
মানায়, সকল বয়সে মানে হয়, তাকেই তাে বলি নাম।
বাপ-মায়ে সে রকম নাম রাখে না কেন? তা রাখা হয় না ;
নাম কি? কুসুমিকা, অরুণিকা, মদনমােহিনী
কুসুমিকা যখন বোঁটাসারিকা তখনাে কুসুমিকা! অরুণিকা
যখন আসী-গালিকা তখনাে অরুণিকা ! মদনমােহিনী
যখন যমদূতেরও মন মােহন করতে পারেন কিনা সন্দেহ,
তখনাে নাম জিজ্ঞেস করুলে বলতে বাধ্য হবেন সেই
মদনমােহিনী।
ধূপের ধোঁয়ায়
তাবুড়ী। এত রঙ্গও জানিস্ তুই।
নকুলিকা। রঙ্গ?"•••••কই, ঠোটে একটুও রং নেই, ......তুমি
পান দিলে না, তন্দ্রাবুড়ী !
কুরঙ্গিকা। খবরদার আয়ি ! ওকে দিয়াে না, তােমায় বুড়ী
বলেছে।
নকুলিকা। থুড়ি, তন্দ্রাবুড়ী নয়, তা আয়ি, ......না, না, চন্দ্রা
আয়ি,......এইবার দাও।
তন্দ্রাবুড়ী। তুই সেই পানের গানটা ব, নইলে দেব না।
নকুলিকা। তুমি দাও আগে......
তন্দ্রাবুড়ী। তুমি গাও আগে......
নকুলিকা। (হাত পাতিয়া) আচ্ছা ডান হাত বা হাত.....
কুরঙ্গিকা। আচ্ছা, আমি মীমাংসা করে দিচ্ছি ; তুমি তান ছাড়,
আর তুমি পান ছাড়, হাঁ!......এইবার বিচারকের বেতন
হুঁ!
নকুলিকা।
( পানের খিলি হাতে নিয়ে )
{ গান)
পাহাড়ে ছিল এলাচ, লঙ্গ পার-ঘাটে।
কুরঙ্গিকা। লালচে রাঙা ঠোটের জুটল এক হাটে।
নকুলিকা। ছিল যে চূণ ভাঁটিতে,
কুরঙ্গিকা। খয়েরের বাগানটিতে,
২১
ধূপের ধোঁয়ায়
উভয়ে।
উভয়ে।
কুরঙ্গিকা।
=
সুপারির সঙ্গে তারাও ফন্দী কি অটে।
নকুলিকা। মিলে শেষ পান-খিলিতে,
কুরঙ্গিকা। রূপসীর বালাই নিতে,
লিখে দ্যায় রঙীন লেখা হাসির কপাটে ।
নকুলিকা।
মধুরে মধুর করে
সুবাসে দ্যায় রে ভরে
উভয়ে
মিঠে-ঝাল কি মন্তরে নাচায় একনাটে!
কুরঙ্গিকা। তুই যাবি, না, আয়ির সঙ্গে সারাদিন রঙ্গ কবি?...
বেলা গড়িয়ে গেল.•••••এর পর গেলে কুমারদের সঙ্গে
দ্যাখাও হবে না, ......চিঠিও দেওয়া হবে না। ......তিন
দেউড়ী পার হয়ে যেতে হবে, মনে থাকে যেন।
নকুলিকা। রােস্ না ভাই, একটু জিরােই, ...আমার বড়
গা’ টিটি কছে।
কুঙ্গিকা। অ! বটে! আমারও বড় হাত নিসপিস্ কছে।
( কিল )
নকুলিকা। যা’ না,......দ্যাখ, রাগালে কিন্তু এখ খুনি গালাগালি
কব•• •••
কুরঙ্গিকা। গালাগালি?'••••"কি রকম গালাগালি ভাই!••••
যেমন হাতে হাতে হাতাহাতি, চুলে চুলে চুলােচুলি, গলায়
গলায় গলাগলি, ••••••তেনি ধারা নাকি ?
২২
ধূপের ধোঁয়ায় । ; নকুলিকা। হু হু ! কুরঙ্গিকা। না, না, খবরদার!..•••• চান্তার মতন ' গাল তাের, ••••• খবরদার! নকুলিকা। তা’ বই কি! কুরঙ্গিকা। খবরদার! চালতা আমি মােটে ভালােবাসি না,•••••• চান্তার অম্বল অবধি ছুই না ; ••••••খবরদার......চান্তা গালে গালাগালি কোরােনা, কিন্তু •••••ভালাে হবে না, বলছি; এই খবরদার, এই!......খবরদার! এই- [ প্রস্থান নকুলিকা ( যেতে যেতে ) বেত্রবতী! আমাদের দেউড়ীগুলাে পার করে দিয়ে যাও, আমরা রাজকুমারদের চিঠি দিতে যাচ্ছি। [ প্রস্থান বেত্রবতী ॥ না আবার এই বােন্দরে ভােগালে। [ প্রস্থান তন্দ্রাবুড়ী । ( গাছায় জিনিস গুছিয়ে নিতে নিতে) যাই আমিও যাই, একলাটি হেতায় কি করব। [ প্রস্থান নেপথ্যে । আরে দূর,••••• আরে ছেই, কোন্ দিক সালাই, দূর হ’, দূর হ', দূর হ’,...... আরে দূর, ৫ । ** ।।।।। ঐ বাঃ!
ধূপের ধোঁয়ায়
[ তন্দ্রাবুড়ীর পুনঃপ্রবেশ ]
তন্দ্রাবুড়ী নিয়ে গেল, নিয়ে গেল, মাথা খেলে আমার !••••••অ
বাপু কিঞ্চিন্ধেবাসী, অ হুনুমান্••••••ও গাছ-মােণ্ডা নয়।
..ও হাতীর দাতের গাছ-কৌটো .....ও খাওয়া যায়
রে, পাওয়া যায় না, ......দিয়ে যা, ....কি আপদেই
পড় লুম গা,•• •• অ বেতন্ত দিদি !......মুখপােড়া বেল
নিলে না, আমার মাথা খেতে কৌটো নিয়ে পালালাে,
দিয়ে যা রে দিয়ে যা..... বলি, হুনুমান্ :
কিচ কিন্ধে।••••••অ মুখপােড়া।
[ প্রস্থান
। •
ম
তৃতীয় দৃশ্য
[ হাওয়া-মঞ্জিল, চারিদিকে শ্বেতপাথরের জালি ; একদিকে একটা
ম মালতী লতার গাছ লতিয়ে উঠে চাদোয়া রচনা করেছে। ছােটো
মাটির কুণ্ডায় জুই ফুলের গাছ। শ্বেতপাথরের বেদীর উপর সীতা,
উর্মিলা ও মাণ্ডবী উপবিষ্টা, কাছে বিহঙ্গিকা।]
বিহজিকা ।
{ গান )
কুড়ি ওই পাখনা মেলে !
পাপড়ি বলে ভুল কর’ না !
২৪
ধূপের ধোঁয়ায়
তাই বুঝি ফুল
।
দেছে ভন্ পাখায় ভ্রমর,
উদাস-মনা!
বাঁধা যে আছে বোঁটায়,
ভুলে যায়,—পরাণ লােটায় ;-
কেঁদে কয় বন্ধু! আমায়
শেখাও দূরের আনাগােনা।
মিনতি হ’ল মিছে, চায় না পিছে, ভ্রমর মােটে,
করে ফুল আথাপাথাত্ উতল হাওয়ায় মাথা কোটে।
খুলে যায় বোঁটার বাঁধন,
বুঝি বা ঘুচল কঁাদন ;
রে না,-হর্ষে বিষাদ,--
ধুলায় লােটায় চঁাদের কোণা!
সীতা ॥ ফুলের দুঃখু তার সঙ্গী চলে গেল, সে সঙ্গে যেতে পেলে
, বেচারী সঙ্গ-মুখে বঞ্চিত হ’ল।......ভাে কি
ভাবলে তা ভােরাই জানে।.••••. যারা দূরে যায় তারা
পুরােনাে হারিয়ে নতুন পায় ......কত নতুন ফুলের সৌরভ,
••••"কত নতুন পাখীর কাকলি .....কত নতুন চোখের
বিদ্যুৎ......তাদের মন হরণ করবার জন্যে ......বিজন
বনেও মায়াপুরী নিৰ্মাণ করে রেখেছে। কিন্তু, যারা
চোখের জল সম্বল করে পিছনে পড়ে বইল, •••
;
ধূপের ধোঁয়ায়
...ম্লান হাসি হেসে, আপনার জনকে বিদায় দিয়ে,
আঁধার মুখে ঘরের অন্ধকার কোণে ফিরে এল, তাদের
সব শূন্য, সব খালি, সব ফঁাকা। সেই পুরােনাে ঘর-দুয়ার,
সেই পুরােনাে সাজ-সরঞ্জাম, সেই সমস্ত । •••নতুনের
মধ্যে?
ভরা ঘরের মাঝখানে দুর্ভর ব্যাকুলতা, ঘরভরা
কান্না, .....বুকভরা হাহাকার ! .....চেনা মুখের হাসি
চাইলেও দেখতে পাওয়া যায় না, স্মরণের সােনার কৌটোয়
সাত রাজার ধন মাণিক হয়ে বিরাজ করে।
ঊর্মিলা | দিদি।
সীতা। (আকাশের দিকে চেয়ে, অন্যমনস্কভাবে) পূর্ব দিকের সাদা
মেঘগুলাে সােণার বর্ণ হয়ে উঠেছে, ••• • আজ কি পূর্ণিমা ?
উৰ্মিলা। আজ তাে নয়......কাল......
সী। এটা না মধু-পূর্ণিমা ?
উৰ্মিলা। হ্যা, মধু-পূর্ণিমা.•••••বসন্তোৎসব।
সীতা। এবার বসন্তোৎসব নিরানন্দে কাটাতে হবে,... ..এবার
নিরুৎসব।
মাগুবী । এটা কি এদের ভালাে হ’ল ? •••••শ্রুতিকে তখন
হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিলুম, কিন্তু এখন দেখছি নানা রকমে
বঞ্চিত হচ্ছি......চারিদিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
উৰ্মিলা। এখন মনে হচ্ছে, শ্রুতি কিছু অন্যায় করেনি, ঠিকই
করেছে..
ধূপের ধোঁয়ায়
এ ৮ ০ ০
সীতা। দ্যাখাে চিঠির কি জবাব আসে•••••
বিহঙ্গিকা। ঐ দ্যাখাে......ঐ ধূমকেতু উদয় হয়েছে।
মাগুৰী। কি প্রকাণ্ড ওর পুচ্ছ !......পূৰ্ব্ব থেকে পশ্চিম আকাশ
পৰ্যন্ত আচ্ছন্ন হয়ে গেল,......চঁাদ নিষ্প্রভ হয়ে গেল।
ঊর্মিলা। ওটা ধূমকেতু না কালকেতু
বিহঙ্গিকা। না কপালকেতু ?
মাণ্ডবী। শুনেছি, ওটার নাম তামসকীলক, আমাদের কপালে
কালকেতু হয়ে দাড়িয়েছে।
ঊর্মিলা। কালও যেখানে উঠেছিল আজও ঠিক সেইখানে।......
আজ চোদ্দ দিন ধরে ঐ একটা জায়গাতেই উদয় হচ্ছে ।
মাগুবী। শুনেছি নাকি ওটা যে দেশে যে ক’দিন দ্যাখা যায় সে
দেশে তত বৎসর অমঙ্গল।
সীত। অমঙ্গলের আর বাকী কি ?......এরি মধ্যে তত মনের
ভিতর সব গােলমাল সেধিয়েছে......সব যেন কেমন......
মাগুবী। আড়ে আড়ো ছাড়া ছাড়াে হয়ে পড়ছে।
বিহঙ্গিকা। তবু মহারাজ দস্তুরমত স্বস্ত্যয়ন করাচ্ছেন।
মাগুবী। (অন্যমনস্কভাবে ) তাইতাে! নকুলিক ন কি ?
এখনাে ফিমূল না। কুরঙ্গিকাই বা কি খুলে
উৰ্মিলা। কি জানি?.....তি তত ৫টিতে নেড়াচ্ছে ....
সী। বিহঙ্গিক দ্যাখ, তত এগিয়ে...••••শি কুক্ষিকাকেট
ফিল না ?
ধূপের ধোঁয়ায়
[ নকুলিকা, কুরঙ্গিক ও শ্রুতকীৰ্ত্তির প্রবেশ ]
ফিরেছি•••••জবাব এনেছি......চার চার খানা জবাব
এনেছি..... শিরােপা চাই....পুরস্কার,••••••
নকুলিকা। হু,......শিরােপা চাই......
কুরঙ্গিকা। তাের কিসের শিরােপা, র্যা ? তুই তাে যেতে
চানি.•••••বলেছিলি
দেবে না,••••• তারপর
তন্দ্রাবুড়ীর ওখানে ফষ্টিনষ্টি করে দেড়ঘণ্টা কাটালি,
শিরােপা দেবে না গলায় পা দেবে।
নকুলিকা। দ্যাখ, তুই কুরঙ্গিক। না ভুজঙ্গি কা?
কুরঙ্গিকা। কেন বল তাে......
বহুঙ্গিকা। নইলে, নকুলিকার সঙ্গে অত লাগি কেন ?......
ঠিক যেন সাপে নেউলে......
নকুলিকা। বল তাে ভাই, বল্ তাে......
শ্রুতকীর্তি। নে, নে,......চিঠি দে......
নকুলিকা। আগে বখশিস
(গান)
( আমায়) করে চাপরাশী চিঠি রাশি রাশি
পাঠালে! হটালে ! খাটালে
শ্রুতকীর্তি । তাই বুঝি সারা বেলাটা বেবাক
বাহির-মহলে কাটালে ?
ধূপের ধোঁয়ায়
--
-
নকুলিকা। সে কসুর মােটে নয় আমাদেরি,
জবাব পেতে যে হয়ে গেল দেরী, :
শ্রুতকীৰ্ত্তি ।
দে, দে, চিঠি দেখি,
নকুলিকা।
বখশিস ?
শ্রুতিকীর্তি।
দ্যাখ,--
ভাল হবে নাক ঘাঁটালে, আমায় ঘাটালে।
নকুলিকা। বেশী নাহি চাই কোরােনাকে কোপ,
পাগড়ী নাগরা দাড়ি আর গোঁফ,
{ চাপরাশ চাপদাড়ি আর গোঁফ, )
কুরঙ্গিকা। চোপ, চোপ, নিজে সব নিবি বুঝি ?......
ধৰ্ম্মে সবে না ছাঁটালে, আমায় ছাঁটালে।
নকুলিকা। গোঁফ নেই গোঁফে তেল দিবি কিরে ?.
ভারি লােভ দেখি কাটালে, গাছের কাটালে।
* ৮ ও ৮ * *
মাগুবী। আচ্ছা, পাগড়ী, নাগরা আমি দেব এখন,
আমায়
দে•••••
(কুঙ্গিকার তথাকরণ )
উৰ্মিলা ॥ চিঠি সব পড়বে কে..•••
মাগুবী। দিদি যাকে বলবে...•••
ধূপের ধোঁয়ায়
সীতা। যে বড় সেই পড়বে......আমায় দাও......(পাঠ)
উৰ্মিলা,
তােমার আজকের পত্রের বচন-বিন্যাস মােটই উৰ্ম্মি-
মালার কলধ্বনির মতন নয়, এ একেবারে তরঙ্গভঙ্গ।
সে যা হােক, আমরা চার ভাই কোথায় যাচ্ছি তা
তােমায় বলতে পারলুম না, কেন যাচ্ছি তাও না। তুমি
জানাে কারাে কাছে জবাবদিহি করা আমার স্বভাব নয়।
এতে যদি অভিমান কর নাচার। ইতি-লক্ষ্মণ
উৰ্মিলা। (অপােবদনে রইলেন )
শ্রুতকীৰ্ত্তি । ( অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ) উঃ !
সীতা। (আর একখানা খুলে) এ খানা দেখছি আমার।
( নীরবে পাঠ)
মাগুবী। কই ?...•••পড় !
সীতা। কী আর পড়ব.•• • ঐ একই কথা,......( আর একখানা
গুলে পাঠ)
মাণ্ডবী,
তােমার চিঠি কোথায় ‘মম শিরসি মণ্ডন’ হবে,
..... তা না হয়ে একেবারে কোদণ্ড-টঙ্কার!......একেবারে
যুদ্ধং দেহি !••••••চিঠিতে তােমার এই চণ্ডীমূর্তি দেখে, হে
কোপনে ! সত্যই আমাকে একটু গণ্ডগােলে পড়তে হয়েছে।
কেথায় যাচ্ছি সে কথাটা তােমার কাছে বিজ্ঞাপিত করা
ধূপের ধোঁয়ায়
হয়নি বলে প্রতিজ্ঞা করেছ যে সজ্ঞানে সরযু-লাভ হলেও
এই আজ্ঞাবহ ভৃত্যকে সে সংবাদ জ্ঞাপন কবে না! : কি
আশ্চর্য! তােমার মতন প্রজ্ঞাবতী নারীর কি এই বিচার ?
ভালাে, আমি......থুড়ি......আমরাও প্রতিজ্ঞা করছি, যে
তােমরা না আহ্বান কলে আর ওমুখাে হব না, এমন
কি নগরেও ফিরূব না; যে দিকে দুই চক্ষু যায়, আক্ষেপের
সঙ্গে বলতে হচ্ছে, যে সেই পথেরই পথিক হব। অভিমান
নামক সামগ্রীটি কেবল ভামিনী কুলেরই একচেটে নয় ।
তোমার হতভম্ব ভর্তা-ভরত বর্মা
উৰ্মিলা। ( মাণ্ডবীর মুখের দিকে চাইলেন।)
মাগুবী । ( গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসলেন কি নিজের গালে
নিজে চিমটি কেটে বিদ্রোহী হাসিটার বেয়াদবীর দণ্ডবিধান
করলেন তা ঠিক বুঝতে পারা গেল না।)
শ্রুতকীৰ্ত্তি । { দাড়িয়ে উঠে। আবার ঠোটের উপর ঠোট চেপে
দুই হাতের মুঠো শক্ত করে বসে পড়লেন।
সীতা। তি! এইবার তাের চিঠি,•••••( পাঠ )
শ্রুতকীর্তি,
তােমার আবার এ কি নূতন কীৰ্ত্তি ! দস্তুরমত
নারীবিদ্রোহ পাকিয়ে তুলেছ দেখছি। তােমরা চারজনে
একজোট হয়ে আমাদের চার ভাইকে দমিয়ে দেবে
ধূপের ধোঁয়ায়
ভেবেছ? সেটি হচ্ছে না, আমরাও চারজনে এককাট্টা
হলুম, জাবে। দেখি কারা হারে আর কারা জেতে।
বিদায়ের আগে শুধু এইটুকু বলে রাখছি, যে তােমরা
বিধিমতে সাধ্য-সাধনা না ক’বুলে সাধের অযযাধ্যায় আর
পদার্পণ কছি-নি। ইতি-
তােমার শত্রুর শত্রু
পুনশ্চ :-লিখেছ কথা না রাখলে আর চিঠি লিখবে না,
এই তােমার প্রতিজ্ঞা। ভালাে, আমি তােমার প্রতিজ্ঞা
ভঙ্গ করতে চাই-নে। তবে স্বামীর কর্তব্য আমায় কতেই
হবে। যদি কোনােদিন স্মরণ করবার আবশ্যক হয় তবে
এইসঙ্গে যে অঙ্গুরী পাঠালুম, সেইটি পাঠিয়ে দিও।
মাণ্ডবী। তা হলে ঠিকানা দিয়েছে।
সী। কই না। ( চিঠি উল্টেপাল্টে দেখলেন)
মাণ্ডবী। কোথায় পাঠাতে হবে বলেনি?•••••নকুলিকা!
নকুলিকা। কই সে কথা আমাদের কিছু বলেননি।
শ্রুতকীৰ্ত্তি । তা বলতে যাবে কেন ?.....আশা জাগিয়ে নিরাশ
করে অপমানের উপর অপমান কবার ও আর-একটা
ফন্দী।
মাগুবী । দেখ লে দিদি, চিঠির সব ছিরি দেখলে ?
ধূপের ধোঁয়ায়
উৰ্মিলা। কি হবে, দিদি?•• ••অযযাধ্যা যােদ্ধাশূন্য হয়ে রইল ।
কি হবে ?
মাণ্ডবী। কি আবার হবে,......ওঁরা নইলে সত্যিই কি অযােধ্যা
অরণ্য হবে।
ঊর্মিলা। আমাদের পক্ষে হবে বই কি......
শ্রুতকীর্তি। না, না, তুমি অমন দমে যেয়াে না.•••••দমে গেলে
চলবে না ••• 'আমাদের অভিমানের অপমান করেছে......
আমাদের বিদ্রোহী বলেছে,......বেশ••••••আমরা বিদ্রোহই
ঘােষণা কলুম।
মাণ্ডবী। আমরা রােগে পড়ি, মরে যাই,......কোনাে খবর
দৈব না ।
শ্রুতকীৰ্ত্তি । বিপদ হােতূ আপ হাে••••••কোনাে খবর দেব না,
•••••কোশল দুর্গ শত্রু এসে ঘেরাও করলেও না।
সীতা। ভগবান করুন, তেমন দিন যেন না হয়।
শ্রুতকীর্তি। যদি হয়, মেয়েরাই এ দুর্গ রক্ষা করূবে, পুরুষের
শরণাপন্ন হবে না। জয় হয় ভালােই......হেরে যাই অগ্নিদেব
আছেন।
সীতা। শ্রুতি, তুই কি বছিস্?......
মাণ্ডবী। সব তাতেই কি বাড়াবাড়ি ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি ॥ না, দিদি, বাড়াবাড়ি নয়,......যারা অকারণে আমাদের
মনে আঘাত দিতে পারে, তাদের করুণা ভিক্ষা ভিন্ন,
৩
ধূপের ধোঁয়ায়
সত্যিই কি আমাদের কোনাে উপায় নেই ?.....তুমি
দেখাে, আমি দেখিয়ে দেব খুব উপায় আছে।......যারা
অভিমানের মান রাখতে জানে না, তাদের পায়ে না ধরূলে
দিন চলবে না?••••••খুব চলবে।......ছােটো ছােটো
কাজের ভেতর দিয়ে দেখিয়ে দেব, .....খুব চলবে। আজ
থেকে আমার মহলের সমস্ত কাজ......সমস্ত কাজের ব্যবস্থা
আমি মেয়েদের দিয়ে করাব। আর তাদের সবাইকে
বলে দেব, যেন কোনাে কাজে কোনাে পুরুষের কোনাে
সাহায্য না নেওয়া হয়।
নকুলিকা। তা হলে তােমার মহলে সন্ধ্যা-সকালে সানাই
বাজবে না ?
শ্রুতকীর্তি। যদি মেয়ে বাজার পাওয়া যায় বাজবে••••
নকুলিকা। নইলে ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি। বাজবে না।
নকুলিকা। হাঁড়ি চড়বে না ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি। যদি মেয়ে-সূপকার পাওয়া যায় চড়বে......
নকুলিকা। নইলে ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি চড়বে না।
নকুলিকা। তােমার সখের বাগানে গাছপালায় জল পড়বে না
শ্রুতকীৰ্ত্তি। যদি মেয়ে উদ্যানপাল পাওয়া যায় পড়বে..••••
নকুলিকা। নইলে ?
৩৪
ধূপের ধোয়ায়
শ্রুতকীৰ্ত্তি । পড়বে না।
নকুলিকা। তা হলে আর এক পা এগিয়ে গাছগুলি সব কেটে
বাগানে শুধু লতা রাখলেই তো ভালাে হয়। ব্যাকরণে
বলেছে গাছগুলাে সব পুরুষ••••••
শতকীৰ্ত্তি । হাসি নয়, ••• • তাই হবে ; আমার বাগানের লতাদের
আর গাছের মুখাপেক্ষী করে রাখব না। যা বলেছি
তা’ কব, যতদূর চালাননা যায়, চালাব ; শেষ না দেখে
ছাড়ব না।
উৰ্মিলা। মনে থাকে যেন কাল মদন-মহােৎসব......কন্দর্প-মন্দিরে
যাবি-নে তাে ?......কন্দর্প পুরুষ-দেবতা।
শ্রুতকীর্তি। যাই-না-যাই দেখতেই পাবে......
মাগুবী । হ্যা, যখন বিদ্রোহী বলেছে তখন বিদ্রোহ কাকে বলে
তা দেখিয়ে দেওয়া চাই।
নেপথাে । স’রে যাও!......স’রে যাও!......হাওয়া-মঞ্জিলে
হনুমান পড়েছে।••••••সাবধান! সরে যাও।
উর্মিলা। (সভয়ে) স’রে এস দিদি, স’রে এস।
সীতা। চল্ ভিতরে যাই।
[ সকলের প্রস্থান
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
[ শ্রুতকীর্তির মহল-সংলগ্ন ‘শ্যামল-আরাম’ নামক পুস্পবাটিকা ;
মাঝে মাঝে ইট-বাঁধানাে পথ ; পথের ইটগুলি কতকটা মৎস্যপঞ্জরের
ছাঁদে সাজানাে, মাঝে মাঝে আবার স্বস্তিকের ছাদে বসানাে হয়েছে।
স্বস্তিকের মাঝ থেকে কোথাও ফিকি দিয়ে ফোয়ারা ছুটেছে, কোথাও
রজনীগন্ধার পুষ্প-দণ্ড উঠেছে। ঝিলে—পদ্মবন, পদ্মবনের মাঝে মাঝে
শ্বেতপাথরের পদ্মকলি। দূরে প্রাচীরের ধারে ধারে অশােক, বকুল,
চাপা, নাগকেশর ও মুচুকুলের গাছ। তার কোলে গন্ধরাজ, গর,
রঙন, জুই, চামেলী প্রভৃতি। একটা ফুকরী পাথরের বেদীর উপর
একরাশ কৃষ্ণচূড়ার ফুল। নিপুণিকা, কপােতিকা, মুকুলিকা প্রভৃতি
তরুণীর দল একটা বকুলগাছের ডালে দোলা বাঁধতে ব্যস্ত।
তরুণীর দল ।
( গান)
চারি চক্ষে যে চেনাচিনি, অয়ি কিশােরী !
তারে, জীয়াইয়ে রেখ মিনতি করি ।
তােরি তরে ঝরােকারে রেখেছে রে খােলা ।
সাড়া দাও, পায়জোরে আওয়াজে ভরি’!
তােরি তরে তরু 'পরে বেঁধেছে রে দোলা।
দুলে যাও, ভুলে চলে এস ভ্রমরী ।
*
সকলে ।
ধূপের ধোঁয়ায়
তােরি তরে সরােবরে ফুটায়েছে ফুল রে !
তুলে নাও, কোনাে ছলে পথ বিসরি’!
তােরি তরে অন্তরে জুটায়েছে ভুল রে!
যদি চাও দাও ভেঙে সে ভুল ওরি!
মুকুলিকা। কি সুন্দর, ভাই, দ্যাখ, কি চমৎকার।
সকলে৷ কি? ভাই, কি ?
মুকুলিকা। দেখে যা, দেখে যা, ফুলের ফোটা দেখে যা, সন্ধ্যামণির
বন্ধ করা পাপড়ি দেখতে দেখতে খুলে যাচ্ছে !
ওরে আয় আয়, ফুলের ফোটা দেখবি আয়।
(গান)
‘ফুলের ফোটা দেখবি কে?
সাঁঝের পরী যায় ডেকে।
যেই ইসারায় ঈষৎ শশী
হাল নীলাকাশ থেকে!
সাঁঝের পরী যায় ডেকে !
আবছা আলােয় উসখুসিয়ে
রসের বেদন উসূকে দিয়ে
বাতাস বিভােলকুঁড়ির প্রথম
পাপড়ি খােলর হাই লেগে !
ধুপের ধোঁয়ায়
ঝুমকোলতার ঝুরির ডােরায়
অবাক ঝি ঝি ঝিমিয়ে চায় !
নয় যে কুঁড়ি নয় যে কুসুম
নিঝুম হয়ে দেখছে তায়!
পাপিয়া কোকিল উঠছে গেয়ে
ফুল-ফোয়ারার ছন্দ পেয়ে,
বলছে জোনাক আলাের বুলি
ভালােবাসার বােল্ ঢেকে।
কপােতিকা। সন্ধ্যা হয়ে এল, বা রে! মালিনী কই
নিপুণিকা । আমার ফুলের চোলিটার কি ক’লে কে জানে!
মুকুলিকা। ভারী মজার লােক, যা হাে••••••
কপােতিকা। কাল উৎসব, আজ কি আর তার মরুবার ফুরসুৎ
?
আছে ?
নেপথ্যে ।
( গান)
খাস্ বাগানের ঠাস্ গােলাপে রাশ করে !
বেঁধেছি পরিপাটি এই তােড়াটি বসন্তে উদাস করে !
নিপুণিকা। মরবে কি ?......অনেককাল বাঁচবে......ঐ যে তার
গলা পাচ্ছিনি?
ধূপের ধোঁয়ায়
}
[ মালিনীর প্রবেশ ]
মালিনী।
{ গান )
খা-বাগানের ঠাস্ গােলাপে রাশ করে !
বেঁধেছি পরিপাটি এই তােড়াটি মৌমাছি নিরাশ করে।
এনেছি জুয়ের গােড়ে যত্নে গড়ে
ফুলের তােড়ে মন্ত্রে বেঁধে,
এনেছি
ফুলের
চোলি কলি কলি
বেচামেলি ছন্দে গেঁথে,
গড়েছি ফুলের পাখা ফুল-পতাকা
মালঞ্চ উদাস করে !
কেড়েছি পঞ্চশরের সব ক’টি শর
কিশাের হাসির দাস করে।
কপােতিকা। মালিনী, অ মালিনী
নিপুণিকা। ফুলের চালি? এনেছ তাে•••••
মালিনী ৷ এনেছি বই কি, সব এনেছি......শুধু ফুলের চোলি ?
....হঃ!
কত রকম ফুলের গয়না এনেছি, তা তােত
দ্যাখনি......আজ বসন্তোৎসবের সন্যুৎ, ......এই আজ
আর কাল••••••এই দু’দিন সােনার গয়না গায়ে ঠেকাতেই
নেই, তা বুঝি জান না?••••••
* * . . ০ ০
৩৯
ধূপের ধোঁয়ায়
(গান)
আজ,
ফাগুন-দিনে ফুল-গহনা
সােনা না-মঞ্জুর!
কঠিন সােনা আজকে মানা
আজ রাখ তায় দূর!
ফুলের কঁাকন ফুলের মুকুট
( আর) ফুলের রতন-চূড়
ফুলের নূপুর বাজবে নীরব
সৌরভে ভরপুর !
সকলে। আমি নেব......ফুলের গয়না......আমি কি......
নিপুণিকা। ক’ সুট আছে ? কুলােবে তাে?
মুকুলিকা। বেশ হ’ল ভাই আর স্যাক্রার খােমােদ কয়ুতে
হবে না।
সকলে ।
(গান)
আমরা, ডাক্বনা আর ড্যারাকে—
স্যারাকে ।
আমাদের, গয়না হবে নিত্যি-নতুন
মালঞ্চে হাজার শাখে।
৪০
ধূপের ধোঁয়ায়
ওরা দ্যায়নাকো পান, ন্যায়নাকো বানি,
শুধু, দিয়েই খুসী প্রত্যাশী নয়, জানি খুব জানি ;
আর রইল না ভয় চোর-ডাকাতের
সােনায় যারা টক রাখে ।
নিপুণিকা | তাের মালঞ্চ-সুটের গয়না কত করে পড়বে, ভাই,...
...কি দিতে হবে ?
মালিনী। তাড়াতাড়ি কি, তার জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না,......
যা হয় দিয়াে না তখন,......রাজার মালঞ্চের ফুল, তার তো
আর দাম লাগবে না,......আমার মজুরি,......যা হয়
দিয়ে।
নিপুণিকা। আমার ফুলের চোলিটা?......ওটার জন্যে কি
দিতে হবে ?
( গান )
তরুণীর দল। চামেলির এই কঁাচলি বেচবি কি করে ?
মালিনী। বুনেছি সােহাগ দিয়ে বেচব আদরে।
তরুণীর দল। কি জিনিস, চা মালিনী ?
সােহাগের সর খালি নিই।
নয়নের নিই আরতি ফুল্ল অধরে ।
মালিনী।
৪১
ধূপের ধোঁয়ায়
তরুণীর দল। না, না, ভাই ঠিক বল না,
মালিনী।
তবে চাই কানের সােনা,
দরদী দর করনা কিনতে সুন্দরে।
[ ফুল নিয়ে তরুণীদের প্রস্থান
[ শ্রুতকীৰ্ত্তি ও নকুলিকার প্রবেশ ]
নকুলিকা। মালিনী! উদ্যান-পালিকে ! দাড়াও ! দাড়াও!
হুকীৰ্ত্তি । মালিনী । এদিকে এস !......শােননা,......আমার
মহলে আমি পুরুষের সংস্রব রাখতে চাই-নে.....তুমি
বাগানের সব কাজ করতে পারবে ?
মালিনী ॥ (বিস্মিতভাবে) সব কাজ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি । হ্যা.. ••••সমস্ত কাজ, •••••• ঘাস নিড়াননা, মাটি
কোদলানাে, কলম বাঁধা, সার দেওয়া,••••••
নকুলিকা। দরকার হলে গাছে ওঠা, ডাল ঝুড়ে দেওয়া, জঙ্গল
কেটে ফেলা••••••
কেন, মালী ?
শ্রুতকীর্তি। বল্লম পুরুষের সংস্রব রাখব না......মালী ছাড়িয়ে
দেওয়া হবে......
গাছে উঠতে হবে ? .....গাছ কাটতে হবে ?•••••
শ্রুতকীৰ্ত্তি , হবে......কতবার ব.•••••
মালিনী। তা......আচ্ছা......আপনি যখন বলছেন,.....তখন
মালিনী ।
মালিনী।
82
ধূপের ধোঁয়ায়
যথাসাধ্য চেষ্টা করে দেখ ব,......তা সম্প্রতি কি করতে
হবে ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি। সম্প্রতি বাগান থেকে সমস্ত গাছ কেটে উড়িয়ে দিতে
হবে ;......অর্থাৎ সংস্কৃতে যাকে বৃক্ষ বলা যেতে পারে সেই
সব গাছ কেটে ফেলতে হবে,...লতা গাছ কাটতে হবে না।
মালিনী। বাগানে ঘােড়দৌড় হবে বুঝি ?
নকুলিকা। না, না, ঘােড়দৌড় হবে কেন...... বুঝতে পারুলে না,
লতা গাছ মেয়ে জাতের গাছ কিনা, তাই ওদের কাটা হবে
, বাকী সব পুরুষ গাছ......তাই সেগুলাে সব বাগানের
বার করে দেওয়া হবে, তা সহজে তাে বার করা যাবে
••••••তাই অস্ত্রের সাহায্য নিতে হবে......কেটে উড়িয়ে
দিতে হবে ।
মালিনী। (ঈষৎ একটু ঘােষ্টা টেনে) গাছ পুরুষ মানুষ ? কি
করে জালেন?
নকুলিকা। ব্যাকরণ বলে এক শাস্তর আছে,•••• সেই শান্তরে
সব লেখা আছে,......
মালিনী। ( প্রণাম করে) শাস্তরে বলেছে ?••• তা হলে কাটতে
হবে বই কি!•••তা এক কাজ কলে হয় না, ••••••কাটা
দিয়ে কাটা তুল্লে হয় না, ......মালীদের তােল তাড়িয়ে দেবেন,
তা মালীদের দিয়ে গাছগুলাে কাটিয়ে নিয়ে তাড়িয়ে দিলেই
' তত সকল দিকে সুবিধে হয়।
ধূপের ধোঁয়ায়
শ্রুতকীর্তি। না, না,......যা বলছি তাই কহ্।
মালিনী। যে আজ্ঞা, তাই করব।......আচ্ছা, যে সব গাছের
সঙ্গে লতাগুলাে জড়িয়ে গেছে সে গাছগুলাে কি বাদ
রাখা যাবে !
শ্রুতকীর্তি। লতার পাকগুলাে আস্তে আস্তে খুলে নিয়ে, তারপর
কোপ লাগাবে।
মালিনী। লতাগুলােতে বাঁশের ঠেকনে দিতে পারি ?
নকুলিকা | বাঁশ মেয়ে না পুরুষ ?......আচ্ছা, ব্যাকরণ দেখে
পরে বলে পাঠাব, ••••••এখন যেতে পার।
মালিনী। ( যেতে যেতে ফিরে এসে) কাল মদন-মহোৎসব,
কাকের দিনে অশােক বকুল চাপা গাছগুলাে সব কাটব ?
, কাল বাদে পরশু কাটলে চলবে ?
শ্রুতকীর্তি। না, কালই কাজ শুরু করা চাই, যাও।
মালিনী ।
যে আজ্ঞে ।
[ প্রস্থান
শ্রুতকীৰ্ত্তি । নকুলিকা,... ..বধূনাট্যের দলে খবর পাঠানাে
হয়েছে ?
নকুলিকা। হয়েছে..
হয়েছে......সন্ধ্যেবেলায় নৃত্যশালায় আসতে বলে
দিইছি।......কি পালা হবে তা তাে বলে দেওয়া
হল না।
শ্রুতকীৰ্ত্তি । সে হবে এখন।
৪৪
ধূপের ধোঁয়ায়
নেপথ্যে ।
( গান)
তােমারে মারলে কে কোন্ বাণে হায় রে
ও বনের পায়রা মাের।
শ্রুতকীর্তি । নকুলিকা! কে গান গায় ? দেখত ।
নকুলিকা। (নেপথ্যের দিকে এগিয়ে) ও একটা পাখ মারাদের
মেয়ে......এইদিকেই আসছে, ......ঐ যে কুরঙ্গিক ওর
সঙ্গে
এইদিকেই আসছে।
০ ০ ০ ০
[ একজন শবরী ও কুরঙ্গিকার প্রবেশ ]
শবরী ।
(গান)
তােমারে, মালে কে ? কোন্ বাণে ? হায় রে !
ও বনের পায়রা মাের।
হায়! হায় !
বন্ধু ! আমার মেল আঁখি !
জনমের সাথী গাে এ তাে নয় রাতি।
কেন এই ঘুমের ঘাের !
হায়! হায়!
ধূপের ধোঁয়ায়
বন্ধু ! আমার মেল অাখি ।
কাকলি কব যে ঝরুনার বােল ধরূব
মিলায়ে পাখনা পাখায় !
হায়! হায়!
সঙ্গী! আমার মেল অাঁখি !
কেবলি, ডাছি আর, চক্ষের জল মাখছি,
বাতাসে হুতাশ জাগায় !
হায়! হায়!
বন্ধু ! আমার মেল অাখি ।
শ্ৰণ্ডকীত্তি ।
এ কে রে কুরঙ্গিকা!••••••কোথায় পেলি একে ?
কুঙ্গিকা। পাখী বেচতে
এসেছে,......দেউড়ীতে বেত্রবর্তী
আটুকেছিল......আমি অনেক বলে কয়ে নিয়ে এলুম।
শবরী। পাখী নেবে গা রাণী? পাখী ?
( কুরঙ্গিকা ও নকুলিকার পরস্পরে কানে কানে কথা )
শ্রুতকীত্তি। কি পাখী ?......দেখি ! ......পায়রা ?......ােয়রা
কি হবে ? রাজপুরীতে পায়রার অভাব কি ?
এ পায়রার অনেক গুণ!
শ্রুতকীর্তি । কি গুণ ?......চিঠি নিয়ে যেতে পারে ?.....সে
রকম পায়রাও এখানে ঢের আছে।
শবরী ।
৪৬
ধূপের ধোঁয়ায়
১৯
শবরী ? উহু,......এ জুড়ি-ভাঙা পায়রা, জুড়িদারের কাছে চিঠি
নিয়ে যায়,•••••যাকে মনে করে চিঠি ছাড়বে......তারি
হাতে পৌঁছে দেবে।
শ্রুতকীর্তি। বটে ?......বটে?......এ পায়রা তুই কোথায় পেলি
শবরী ?
শবরী। আমাদের সর্দারের যে সর্দার তার কাছে পেয়েছি।
তার নাম দুমন-কাটারী।
কুরঙ্গিকা। (চোখ, টিপে মানা করূলে) অত নাম-ধামের দরকার
কি আমাদের......কি দাম চাস? তাই বল না।
শবরী। এই পায়রার ওজনে সােনা চাই।
চাই।...সর্দার-রাজা
বলে দিয়েছে••••••ার কমে বেচতে মানা আছে•••••
শ্রুতকীৰ্ত্তি । আচ্ছা, তাই হবে,••••• নকুলিকা, পায়রার ওজনে যত
সােনা হয়, দিয়ে দি। ( প্রস্থানােত)
শবরী । বাস ?••••••হয়ে গেল সওদা?......আর কিছু চাই-নে?
......আমার ঘরে অনেক রকম জানােয়ার আছে......
শ্রুতকীৰ্ত্তি । (একটু ভেবে) আচ্ছা, আপাতত একটা মেয়ে-
কোকিল, একটা মেয়েময়ুর আর একটা মেয়ে-হরিণ এনে
দি।
নকুলিকা। কেন ?......তােমার হরিণ, ময়ুর সব কি হল ?
শ্রুতকীর্তি । কি আর হবে ?......তাড়িয়ে দিয়েছি, উড়িয়ে দিয়েছি,
পুরুষ-জন্তু পুষব না,••••••ওদের হৃদয় নেই।
৪৭
ধূপের ধোঁয়ায় নকুলিকা ৷ অ!......বুঝেছি...•••তা দ্যাখ, শবরী, তুই রাণীজীর জন্যে একটা মেয়ে-হরিণ, একটা মেয়ে-ময়ুর আর একটা মেয়ে-কোকিল নিয়ে আবি, বুঝেচি তত ? শবরী। বুঝেচি। শ্রুতকীৰ্ত্তি । নকুলিকা, তাের কিছু ফাস থাকে যে, অমনি বলে দে, মেয়ে-জন্তু হওয়া চাই কিন্তু,......আমি চলুম। [ প্রস্থান নকুলিকা। (একটু ভেবে) আমার জন্যে?••••••মেয়ে জন্তু? .............আচ্ছা, আনিস্ একটা মেয়ে-গরু। শবরী। যে হুকুম । কুরঙ্গিকা। দাড়িয়ে রইলি যে...... পায়রার ওজনে সােনা নেবে? ....সােনা অত সস্তা নয়, ••••••যাও দুষম-কাটারির কাছে সেইখানে দু'শাে মণ চারশাে মণ যা চাইবে......তাই পাবে, • • ••যাও। নকুলিকা। কে পায়রা পাঠিয়েছে ?......হাঃ হাঃ হাঃ••"কে?••• কে?•••••ভুলে গেলুম!••••••কে? কুরঙ্গিকা। দুষমন্-কাটারি......চমৎকার নাম- নকুলিকা। বা নামের চমৎকার তজ্জম উভয়ে । হিঃ হিঃ হিঃ । [ মুখে কাপড় দিয়ে হাসতে হাসতে প্রস্থান ৪৮
ধূপের ধোঁয়ায়
দ্বিতীয় দৃশ্য
[ স্নানাগারের সম্মুখ ; অসংখ্য ধাপওয়ালা একটা সিড়ির খানিকটা
দ্যাখা যাচ্ছে, সিড়ির মাথা থেকে পাতাল-ঘরে আলাে এসে পড়েছে।
একটা কুলুঙ্গিতে সিদূর-মাখানাে একটা মকরের পিঠে বরুণের মূর্তি ;
একটা কুলুঙ্গিতে কতকগুলাে ফুল আরেকটাতে একটা কৌটো একজন
যবনী শান্ত্রী ধনুর্বাণ নিয়ে পায়চারি করছে। স্নানাগারের ভিতর
থেকে দর্পণ, কাজললতা প্রভৃতি নিয়ে চঞ্চল-চরণে চঞ্চরীকার প্রবেশ।]
৩
ঈদ
যবনী । চিঞ্চিনাটি ।
চঞ্চরীকা। (মুখ ভেংচিয়ে) চিঞ্চিনাটি! পিছনে ডাকছ কেন
বাবুইহাটি? পাথরের সিড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়ে ময়ূব ?
যবনী । মরুং? না পৰ্ব্ব,-কাল পৰ্ব্বদিন ?
চঞ্চরীকা । হা গাে, কাল মদন মহােৎসব,-ভালােবাসার পর।
যবনী । (আকৰ্ণবিশ্রান্ত হাসি হেসে), ভালােবাসা ?.....
••••••কি আফ্রোজিনি ?......মেয়ে কি মরদ ?
চঞ্চরীকা।
আমাদের ভালােবাসার ঠাকুর মেয়ে নয়, মরদ, তার
নাম কন্দর্প।
যবনী । আমাদের যবন-মণ্ডলে ভালােবাসার ভারি দেবতা হচ্ছে
মেয়ে লােক••••• তার নাম আফ্রোজিনি,•••...হালকা দেবতা
ঈরস ধনুক নিয়ে বেড়ায়,••••••আফ্রোজিনির বেটা।
চঞ্চরীকা। ধনুক নিয়ে বেড়ায় ?••••••সে তাে আমাদের কন্দর্প,
••••••তােমরা তাকে কি বল ?
ধূপের ধোঁয়ায়
যবনী । ঈরস্।
চঞ্চরীকা। কী রস?
যবনী। ( চঞ্চরীকার কাণের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে) ঈর।
চঞ্চরীকা। ও-রসে আমাদের কাজ নেই, আমাদের কন্দর্পই
ভালাে।......আবার ভালােবাসার মেয়ে-দেবতা? তার
নাম কি বল্লে ?
যবনী। ওর দু’ নাম,•••••কেউ বলছে আফ্রোজিনি,•••••কেউ
বছে আফ্রোদিতি।
চঞ্চরীকা। যবনী, তাের কপাল খুলেছে।
যবনী । (কপালে হাত বুলিয়ে দেখে) কই ?
চঞ্চরীকা। হাত বুলিয়ে কি দেখছিস্?••• ••তুই দেখতে পাবি-
নি; আমি দিব্যচক্ষে দেখছি।
যবনী। (সবিস্ময়ে মুখের দিকে চেয়ে বােকটে হাসি হাসতে লাগল )
চঞ্চরীকা। শাে বলি তােদর এই ভালােবাসার মেয়ে-
দেবতার কথা শ্রুতকীৰ্ত্তি ঠাকরুণকে বলতে পারি ?......
বখশিস্ পাবি।
ছােটো কী আমাদের দেবতা পূজবে? আমরাও
কাল পূজব,•••••মিছিল বার হবে,••••••আফ্রোজিনির
মিছিল......নােকায় বার হবে।
চঞ্চরীকা। কোথায়? সরযুতে ?
যবনী। না, ফুলবাড়ীর ঝিলে ; •••••.যত মেয়ে শান্ত্রী মিলে চাদা
যবনী।
ধূপের ধোঁয়ায়
তুলেছি। নৌকা সাজাব••••••গেছে পশমের ফুল দিয়ে,
লাল টক্ টক ফুল দিয়ে।
চঞ্চরীকা | গেছে পশম ?......সে কি ?
যবনী । ভারি বড় গাছ •• ••• ভারি লাল লাল ফুল!
চঞ্চরীকা। (হেসে) অ! শিমুল।
যবনী । হু", আমরা গেছাে পশম বলি......আমার দেশে গাছে
পশম হয় না,••••••তােমার দেশ ভারি মজার......গাছে
পশম হয়।
চঞ্চরীকা। তা তাে হয় !.....কিন্তু এত ফুল থাকতে শিমুল
ফুল কেন?
যবনী । লাল••••••কলিজার মতন লাল......কি রং !
চঞ্চরিকা। তােমরা রংই সার জেনেছ,••••••গন্ধ ফুল ভালাে
লাগে না?
গন্ধ ফুল ?...হাঁচি হয়,
চঞ্চরীকা। শিমুল ফুল ধুয়ে খাও ..••• চলুম।
[ প্রস্থান
[ স্নানাগারের ভিতর থেকে সীতা ও উৰ্মিলার প্রবেশ |
যবনী। (গ্রীক ধরণে অভিবাদন করে কুলুঙ্গি থেকে একটা
কৌটা নিয়ে সীতার সামনে ধরে ) কৌটা !..••••
সীতা। কৌটো ?......কিসের কৌটো?......কোত্থেকে এল?
যবনী। কিপােস্ ফেলেছে.•••••
যবনী ।
সর্দি!
ধূপের ধোঁয়ায় সীতা। কিপােস্? ...কিপােস্ কে ? যবনী। ( মাথা চুলকিয়ে) কিপাে•••••কিপােস্ .....কপি। উৰ্মিলা। কপি?••••••বাঁদর?••••••বাঁদরে ফেলেছে ?••••• দেখি (কৌটো খুলে ভিতরে ভূর্জপত্রে কি লেখা রয়েছে, চিঠি,..... গােড়াটা নেই, বাঁদরে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে.••••• সীতা। যতটুকু আছে তাই পড়ে দ্যাখ না।•••••• উৰ্মিলা। (পাঠ) পুরােহিত-পরিষদ এবং স্বয়ং মহর্ষির এই অভিমত। এই বায়সাকতি ধূমকেতুর উদয়ে শুধু রাজ্যেরই যে সমূহ অনিষ্টের সম্ভাবনা তাহা নহে, অপিচ শ্ৰীমাদিগের সহিত শ্ৰীমতী বধূমাতাদিগের দীর্ঘ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা। এই উভয় অমঙ্গলের নিরাকরণ জন্য পুরােহিত-পরিষদ গ্ৰহযাগের অনুষ্ঠান করিতেছেন, তদ্ভিন্ন মহর্ষি আজ্ঞা করিয়াছেন, যে আগামী বসন্তোৎসবের পূৰ্ব্বাহ্নে কোনাে পক্ষকে কোন কারণ না দর্শাইয়া পৃথক করিয়া দিতে হইবে। শ্ৰীমন্মহর্ষি বলেন বসন্তোৎসবের সময়ে চিরাকাঙ্ক্ষিত আনন্দের পরিবর্তে আকস্মিক ভাবে তীব্র মানসিক দুঃখভােগ ঘটাইতে পারিলে গ্ৰহবৈগুণ্যের খণ্ডন হইলেও হইতে পারে। কিন্তু এ সমস্ত বৃত্তান্ত শ্ৰমান্ বা শ্ৰীমতীদের মধ্যে কেহ ঘুণাক্ষরেও যেন জানিতে না পারেন। জানিলে সমস্তই পণ্ড হইবে। ইতি অঙ্গ-বঙ্গ- ধূপের ধোঁয়ায় সিন্ধু-সৌবীর-সৌরাষ্ট্র-কাশী-মগধাদি-সমস্ত-সামন্ত-স-মৌলি - মণি-রঞ্জিত-পাদপীঠ অষ্টোত্তর-শত-শ্ৰীযুক্ত মহারাজ উত্তর- কোশল-স্বামী•••••• সীতা । আর পড়তে হবে না,......উর্মিলা!•••••• ঊর্মিলা। (বিষন্ন মুখে) দিদি !••••• কেন পড়লুম জালুম••••• কি হবে, দিদি। সীতা। মহর্ষির সমস্ত ইষ্ট-চেষ্টা পণ্ড হয়ে গেল.....কিন্তু কাকে দোষ দেব?......তােমায়?••••••না যবনীকে?••••••না যে বাদর এই কৌটো ফেলেছে তাকে ?••••••কাউকে না, .....দোষ অদৃষ্টের। উৰ্মিলা । কি হবে দিদি। সীতা । কি হবে ?••••••যা ভবিতব্য •••••• বিধাতার ইচ্ছে। তুই বিষন্ন হ’সনি উর্মিলা! মনের বল হারানি, ......হয়তাে ধূমকেতুর অমঙ্গল-সুচনা ধোঁয়াতেই অবসান হবে।••••••আর যদি তা না-ই হয়..... তাই বলে••••• নৌকো ডুবতে পারে বলে,••••••কে কবে ঝড়ের আগে নৌকো ডুবােয় ! উৰ্মিলা। (নিরুত্তর) সীতা। আর ছাড়া আরেকটা কথা ভাবার আছে,• • আমরা দু’বােনে যা জেনেছি তার ফল চারজনকে যেন ভুগতে হয়। সে সম্বন্ধে সাবধান হয়ে চলতে হবে।
ধূপের ধোঁয়ায়
আমাদের বিষগ্ন দেখলে, সেই বিষন্নতার কারণ জানার
• জন্যে সবারি কৌতুহল হবে, কাজেই ক্রমে......
উর্মিলা।
সী।
চল যাই..
* a r এ
[ তন্দ্রাবুড়ীর প্রবেশ ]
তন্দ্রাবুড়ী। অ-মা ! তােমরা এখানে,••••••আর আমি খুজে
খুজে আলা !••••••
কেন আয়ি !
তন্দ্রাবুড়ী । এই ধূম-খেত্তরের দোষ কাটাবার জন্যে তােমার
শ্বাশুড়ী:••• সুমিত্তিরের......মহলে স্বস্তেন হচ্ছে,......তাই
হােমের ফোটা পবার জন্যে তােমাদের ডাকছে।
-সপ্তভূমক প্রাসাদে তাে !
তন্দ্রাবুড়ী। হ্যা গাে; আবার কোথা••••••( সহসা উৰ্মিলার
হাতে কৌটো দেখে) অ-মা ! কি আশ্চৰ্য্যি! .....এ
কৌটো তুমি কোথায় পেলে•••••হাদে দ্যাখাে, হৃদে দ্যাখাে
......কি আশ্চর্য্য।
সীতা। বাঁদরে বুঝি ফেলেছিল, এই যবনী কুড়িয়ে পেয়েছে
এই মাত্র দিলে.•••••
তন্দ্রাবুড়ী। কই দেখি দেখি, হঁা এইত••••••এইত বটে। গায়ে
তিন-থাক শঙ্খ-লতা••••• এষে সুমিত্তিরের...
এযে সুমিত্তিরের......এযে তােমার
শ্বাশুড়ীর•••••আমায় রাখতে দিয়েছিল, দিদি, জিন্মে
করে দিয়েছিল,......তা’ পােড়া বাঁদরের জ্বালায় কি কিছু
৫৪
!
ধূপের ধোঁয়ায়
রাখবার যাে আছে গা’!••••••যদি খোঁজ পড়ে•••••আর
খুঁজে না পায়......তা হলে এখুনি অন্নখ কবে।
দাও দিদি দাও !••••••তা দ্যাখ, দিদি, বদরে নিয়ে
গিয়েছিল বােলো না যেন•••
উর্মিলা ॥ ব’লে আর কি হবে।
[ সীতা ও উর্মিলার প্রস্থান
তন্দ্রাবুড়ী। আজ দশ বছর বিয়ে হয়েছে......চার চারটে বাে’য়ের
কারাে কি ছেলে হতে নেই গা !......সুমিত্তিরেকে বলি
যে রাজাকে বলে একটা পুৎ-ষষ্টির যগগি টগি করাও,
তা কারাে গেরাজি হয় না।......ভাললা দ্যাখায় কি গা ?
চার চারটে বাে’য়ের কারাে কোলে ছেলে নেই......রাজার
রাজ্যি ব’য়ে যায়......ভালো দ্যাখায় কি? আঁ? এই
সুমিত্তিরেকে মানুষ করলুম......তার ছেলে নক্ষণকে মানুষ
কলুম,••••এখন নক্ষণের একটি ছেলে হলে মানুষ মানুষ
করে দিয়ে যাই। সত্যি কিছু ছেরাল থাবনা। তাই বলি
বলি, তােমাদেরও তাে ঐ পুৎ-ফষ্টির যগুগি করেই
ছেলে হয়েছিল, তা বাে’য়েদের বেলাও না হয় সেই যগুগি
করাও, তা কারাে গেরাজ্যি নেই......রাজার রাজ্যি বয়ে
যায় .....ভাললা দ্যাখায় কি গা, আঁ?
[ প্রস্থান
ধূপের ধোঁয়ায় তৃতীয় দৃশ্য [ নৃত্যশালা, সারি সারি পিতলের দীপ-বৃক্ষ, তার ডালে ডালে অভ্রের আবরণে ঢাকা দীপ জ্বলছে। দেওয়ালের মাথার কাছে চারিদিকে মৃণালবাহী মালশ্রেণী আঁকা রয়েছে, তার নীচে কিন্নর- দম্পতী বীণা বাজাতে বাজাতে যেন শুন্যমার্গে চলেছে। তার নীচে তরঙ্গ-লেখা। পিন্সেয় পি-েরাগ-রাগিণীর মূর্তি। এক পাশে একটা কাঞ্চন দণ্ডে একট। মণিময় ময়ুর। চীনাংশুকে ঢাকা আসন্ধিকা নামক আসনে শ্রুতকীর্তি ও মাগুবী আসীন। পাশে দুখানা আসন খালি রয়েছে। পিছনে চামরধারিণী ও পানের বাটা নিয়ে কঙ্কবাহিনী। সামনে রক্ত-কম্বলাসনে বধূনাট্যের দল। মৃদঙ্গ, বেণু, বীণা প্রভৃতি যন্ত্র ইতস্তত ছড়ানাে রয়েছে । ] শ্রুতকীৰ্ত্তি। না, না, না, ......এবার বসন্তোৎসবে ও-রকম ধরণের গান-টান চলবে না। ও ভালােবাসার পালা শুনে-শুনে ঝালাপালা হওয়া গেছে, অন্য কোনাে পালা- টালা থাকে তাে বলাে। প্রথমা। ভালােবাসার গান ভালাে লাগছে না ? প্রেমের পালা পছন্দ নয় ? তবে ত মুস্কিল ! আমাদের এলাকায় প্রীতি ছাড়া যে গীতই নেই। বধূ-নাট্যের ভিৎ হ’ল ভালােবাসার গানে। দ্বিতীয়া | সেইজন্যেই ত সারস্বতমণ্ডলী থেকে আমাদের কাউকে উপাধি দিয়েছে প্রীতিতীর্থ, কাউকে দিয়েছে যত্ন-রত্ন, কাউকে দিয়েছে সােহাগ-ভূষণ।
ধূপের ধোঁয়ায় বটেন। ৮ ০ ০ ৮। তৃতীয়া। রােসাে, রােসস!......আচ্ছা দেখুন, আপনারা প্রেমের ছাড়া আর কোনাে পালা যদি শুনতে চান, তবে আমার মামা মশায়ের তৈরি একটি নতুন পালা শােনাতে পারি। মামা মশাই আমার কবিও বটেন, আবার কবিরাজও সেইজন্যে তিনি কবিত্বে এবং কবিরাজত্বে মিলিয়ে যে নাটকটি রচনা করেছেন, তার নাম হচ্ছে ‘আধি-ব্যাধি-ওষধি-চম্পূ. তাতে গদ্যে-পদ্যে সমস্ত টোকা ওষুধের সঙ্গে আধি-ব্যাধির যুদ্ধের কথা পালার আকারে লেখা হয়েছে ;......ােলাটি জ্ঞাতব্য জ্ঞাতব্য তথ্যে একেবারে টইটম্বুর.....আজ্ঞে করেন তাে...... মাগুবী। না, আমাদের ঘুড়ি-কাশি হয়নি, অন্য কিছু থাকে ত বলাে..... তৃতীয়া। আজ্ঞে, বিদ্যে-ডুগডুগি মশায় এ পালা পড়ে খুব.•••• মাগুবী। তা হাে বিদ্যে-ডুগডুগি মশায়ের বুলিতে ভালুক নাচতে পারে, মানুষে নাচে না। চতুর্থী । আজ্ঞে আমাদের পাড়ার তর্কচর্কী মশায়ের তৈরি একটি মানুষের মতন পালা আমার মুখস্থ আছে ; যদি শােননন তাে গাই......সেটি একটি দার্শনিক পালা......তার নাম হচ্ছে ‘তত্ত্ব-তাণ্ডব’ বা ‘সৰ্ব্বতত্ত্ব-সংঘট্ট-ঘটোৎকচকচি’...... এতে সৰ্ব্বতত্ত্বের সারমর্ম নাট্যাকারে গ্রথিত করা হয়েছে। এতে বিশ্বতত্ত্ব, নিঃস্বতত্ব, শব্দতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব, অলঙ্কার- ধূপের ধোঁয়ায় তত্ত্ব, স্বর্ণকার-তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ডিম্বতত্ত্ব মাগুবী। ব্যস, ব্যস্ ...তত্ত্বের গর্ভে জ্যান্তে কবর হয়ে গেল দেখছি! থামাে, থামাে পঞ্চমী। ওগাে থামাে না, জানি তােমার পালা পছন্দ হবে ! ( এগিয়ে এসে) আচ্ছা, দেখুন, আপনাদের সদুপদেশ- পূর্ণ উপাদেয় পালা শুনতে আপত্তি আছে কি? মাণ্ডবী । কত আর ‘না, না করা যায়...... শ্রুতকীৰ্ত্তি। আচ্ছা, শােনাও......( কাধের উপর দিয়ে পিছনে হাত বাড়িয়ে পান নিলেন) পঞ্চমী । আমাদের এই পালাটির নাম “ভুবনের মাসী” বা “কৰ্ম্মদোষে কর্ণ-কৰ্ত্তন” ; প্রস্তাবনাটা একটু শুনুন, ( সুরে) ভুবন নামেতে ব্যাড়া বালক তার ছিল এক মাসী, আহা, ভুবনের দোষ দেখে দেখিত না- সে মাসী সৰ্ব্বনাশী । ক্রমে, কলাচুরি মূলােচুরি করে বাড়ে ভুবনের আস্কারা,
ধূপের ধোঁয়ায়
চোর হতে পাকা ডাকাত হ’ল সে
ব্যাবসা মানুষ-মারা !
শেষে,
ধরা পড়ে গেল বিচার হইল
ভুবনের হবে ফাঁসী,
হাউ হাউ কেঁদে লাড়, মুড়ি বেধে,
ছুটে এল তার মাসী ।
তখন, মাসীরে ভুবন দেখে বলে “শােন্
কথা আছে কাণে কাণে,
আহা! কাছে গেল মাসী বােন্ধাের মনে
কী আছে কিছু না জানে!
জগৎ স্তব্ধ সহসা শব্দ
হইল কটা করে,
কেটে নেছে কাণ মাসীর ভুবন
ডাকাতে-দাতের জোরে।
ফাঁসীর কারণ মাসী কঁদে, আর
উপদেশ পাই মােরা,
আস্কারা পেলে তস্কর হয়
রাস্কেল বােপােরা!
ধূপের ধোঁয়ায়
মাণ্ডবী। দ্যাখাে বাপু, আমাদের চার বােনর মধ্যে কারাে
বােপাে নেই, এ উপদেশ নিয়ে আমরা কি করব?
আচ্ছা এ কি তুমি নিজে লিখেছ ?
পঞ্চমী । আজ্ঞে, না, মৌলিকতার দাবী করি-নে, অন্যের রচনা
নাট্যাকারে গ্রথিত করি।
মাণ্ডবী। ভবিষ্যতে আর পরের এলাকায় অনধিকার প্রবেশ
ক’র না, ফঁাড়িতে পাঠিয়ে দেবে।
শ্রুতকীৰ্ত্তি। না, ভেবেছিলুম বধূনাট্যের দলটাকে চাঙ্গা করে,
মেয়েদের দিয়ে শিল্পসাধনায় একটা নতুন মৌচাক্ সৃষ্টি
কব....কিন্তু ক্রমশঃ হতাশ হয়ে পড়তে হচ্ছে......
ষষ্ঠী। না, না, হতাশ হয়ে পড়বেন না, ......আপনাদের কাছ
থেকে আমরা অনেক আশা করি। আচ্ছা আরেকটি
জিনিস আপনাদের শােনাই, ......এ পালা শুনলে হতাশ
প্রাণে আশার সঞ্চার হয়। এ পালায় আচারপরায়ণা
আচাৰ্যানীদের একটি বিশেষ বাণী বিঘােষিত হয়েছে,
এটি আমাদের গার্হস্থ্য পবিত্রতার সনাতন সঙ্গীত,......
পালাটির নাম হচ্ছে শ্ৰীশ্ৰীগােবর-মঙ্গল ! (অন্যান্য সভ্যাদের
প্রতি) ধয় না ভাই, সকলে মিলে শােনাই।
(গান)
জয় জয় গােময়! গােলােকে বসতি হয়,
শুচি তুমি শুচিতার সেতু!
ধূপের ধোঁয়ায়
বৈকুণ্ঠের গােবরাটে গােবরিয়া পােকা হাঁটে
গায়ে তার গােময় যেহেতু !
বধূনাট্যের দল। হায় রে, গায়ে তার গােময় যেহেতু !
যষ্ঠী। সৃষ্টি আগে বৃষরূপে ধৰ্ম্ম নাদিলেন চুপে
সেই নাদে সৃষ্টির পত্তন,
সংসার হইল তাই ষাঁড়ের গােবর ভাই
অকেজো অখদ্যে অকারণ!
বধূনাট্যের দল। হায় রে, অকেজো অখদ্যে অকারণ!
••
ষষ্ঠী। গােবর অমূল্য ধন ধরিলেন গােবন
নন্দের নন্দন নিজকরে
গােবরে যে ঘেন্না করে, গােভূতে তাহারে ধরে,
হয় সেই ল্যাজে ও গােবরে ।
।
মাণ্ডবী। বাস, বাস, আর গাইতে হবে না......থামাে,......
এ যে দেখছি..••••
উপদেশ-পুটুলির পুটিম কবি।
গড়েছে গােবর দিয়ে বাদেবীর ছবি।
বধূনাট্যের দল। (বিস্মিতভাবে মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করূতে লাগল )
মাওবী । এ সকূড়ি-ঘরের পালা নাচঘরে কেন?
ধূপের ধোঁয়ায়
শ্রুতকীৰ্ত্তি ॥ নাঃ জছে না, জমছে না ( পিছন না ফিরে কঁাধের উপর
দিয়ে পান নিয়ে)। কেন দিদি আজ জমছে না বল তাে?
মাগুবী। জবে
কি ?
বচনের বীণকার বীণকারী কই তার?
মরমের তরফের তার বাজে কই ?
গরজের বাজনা এ,
খোজে শুধু খাজনা ,
ভালুকের নাচ না এ, এতে রাজি নই।
শ্রুতকীৰ্ত্তি। নাঃ জমছে না, অন্য কোনাে ভালাে পালা নেই ?
প্রথমা। আছে বই কি, ভালাে ভালাে পুরােণাে পালা আছে,
যেমন লক্ষ্মী-স্বয়ম্বর, সমুদ্রমন্থন, মাতৃকা-মঙ্গল বা কার্তিকের
জন্ম, রুরুর জয় বা পুরুষ-সাবিত্রী
শ্রুতকীর্তি।
এমন পালা নেই বাতে সব স্ত্রীলােক, পুরুষের
নাম-গন্ধ নেই ?
দ্বিতীয়া। আজ্ঞে, ••••••অভিনয় যারা করবে••••••তারা সবাই
স্ত্রীলােক, ••••••কিন্তু পালাতে পুরুষ আছে বই কি ; তবে,
সে সব ভূমিকাও আমরাই গ্রহণ করব। মেয়েরা পুরুষ সাজবে।
শ্রুতকীর্তি। না, না, আমি ও-রকম চাইছি-নে, •.ও-বুকম
চাই-নে, ......না জমছে না, জমছে না।
[ নকুলিকার প্রবেশ ]
এতকীৰ্ত্তি । কই ? দিদি এলেন না ?
ধূপের ধোঁয়ায় ০ ০ ০ ০ নকুলিকা। না, তার শরীর একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তিনি আসতে পাবেন না। শ্রুতকীর্তি। শরীর অসুস্থ নয়, ••••••মনে সুখ নেই, মনে সুখ নেই, ••••• তাই এলেন না, ......আমি বুঝেছি। মাগুবী । উর্মিলার কি হল ? নকুলিকা। সীতাদেবী একলাটি আছেন, সেইজন্যে তিনি তার কাছে রয়েছেন। শ্রুতকীৰ্ত্তি । নাঃ আজকে আর জবে না, সব মাটি...... সকল রকমে মাটি......সব মাটি। [ প্রস্থান (ছােটো গলায়) নকুলিকা, শ্রুতির অবস্থা দেখলি ? ••••••ও বাইরে কারুকে জানতে দিচ্ছে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ওর মন কাঁদতে শুরু করেছে। নকুলিকা। ওঁর একূলার নয়, অনেকেরই মন কাঁদতে শুরু করেছে। এই বসন্তকাল......চঁদনী রাত......এমন রাতে একলাটি ; ••••••এক রকম ভালাে......বসন্তে নিম্ব- ভোজন। [ মাণ্ডবী ও নকুলিকার প্রস্থান প্রথমা । আজ আমরা কার মুখ দেখে বেরিয়েছিলুম, কে জানে, কারুকে খুসীও কতে পারুলুম না, নিজেরাও খুসী হওয়া গেল না। মাওবী।
ধূপের ধোঁয়ায়
দ্বিতীয় রাজবধূদের প্রসন্ন হাসিটুকুও আজ পাওয়া গেল
প্রশংসা-ভিখারীর হাত-পাতাই সার।
তৃতীয়া। সব ভিখারীরই এক দশা।
সকলে।
( গান }
{ ও তুই) ব্যাকুল হয়ে বাড়ালি হাত দান পাবি বলি!
{ দেখি ) ফিল যে তে র আপন বুকেই শূন্য অঞ্জলি !
(তাের) বাজল সারং বিফল গানে,
ধল না রং কারু প্রাণে,
{ শেষে ) চোখের জলের বন্যা প্রবল রইল কেবলি ।
(হায় )
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
Lr
[ পুষ্পবাটীকার অপর অংশ, দূরে কপ-মন্দির দ্যাখা যাচ্চে।
মন্দিরের গায়ে চকাচকি, হংস-হংসী, ময়ুর-ময়ুরী, কপােত-কপােতীর
আধ-খােদাই নক্সা। পাশে ঝিল, ঝিলে দিয়ে সাজানাে একখানা
নৌকো। এদিকে মাধবী-লতা-জড়ানাে ঔণল গাছে একটা ফুল দিয়ে
সাজানাে দোলা ঝুলছে। মুকুলিকার পিছন পিছন বল্লরীকার প্রবেশ।]
বল্লরীকা। স্বজনী ! শােজনে কুঁড়ি!
মুকুলিকা। কি স্বজনী বড়াই-বুড়ী!
বল্লরীকা। দেব গায় ফাগের গুঁড়ি!
মুকুলিকা। ফুকুড়ি ফের? বটে ?...বটে ?
বল্লরীকা। দিই না দু’টি আজ কি চটে?
মুকুলিকা। দিসখুনি সেই সন্ধ্যেবেলা,
জমূবে যখন লােকের মেলা।
বলি হালা! রকম কিলাে ?
বল্লরীকা। রকম কি আর ? দুঃসমাচার
হুতুম-ঘুমাের হুকি এলাে।
*মুকুলিকা। সে কি রকম ?
লরীকা। বন্ধ এবার বকবকম্।
}
ধূপের ধোঁয়ায়
মুকুলিকা। হেঁয়ালি রাখবনা খুলে !
বল্লরীকা। দ্যাখ না নিজের চক্ষু তুলে !
কুড়ুল নিয়ে আসছে কারা
অশােক বকুল শিরীষ পারুল
সব গাছেরই দফা সারা।
মুকুলিকা | কাটবে না তাে দোলা-সমেত তমালটাকে ?
বল্লরীকা। চল দেখিয়ে দাড়িয়ে ফঁাকে।
[ অন্তরালে গমন
[ মালিনী ও স্ত্রীবেশে মালীর প্রবেশ ]
মালিনী। শিগগীর সেরে নাও, এখুনি ছােটো কী এসে পড়বে
..মুস্কিল হবে ....এই গাছটা .... এই গাছটা।
মালী তুইওতত আচ্ছা লােক দেখছি •••••আজ পূজোর দিনে
•••••দেবতার চোখের সামনে.•••• জ্যান্ত গাছটাকে প্রাণে
মাঝব?......ছছাটো কী তােকে বলেছে••• তুই কাটু না,
আমার তত চারী এনেও খসেছে, অনেও খসেছে।"
মালিনী। হঁাগা আমি কি পারি ? ... আমি হলুম নারী..
যাতে জোরের দরকার সে কাজ কি আমাদের দিয়ে হয় ?
মালী। আ তােমার মুখে (জিভ কেটে ) বেগুন! .... ছােটা
কত্রীকে কাল সে কথা বলিনি কেন ?... ওঁর কথায়
আমি দেবতার গাছ কাটি••••••নিজের পায়ে কুড়ল মারি,
ধূপের ধোঁয়ায়
বলি দেবতার কোপে পড়ে শেষে এই বুড়ো বয়সে
কি আবার বিয়ে কব নাকি ?
মালিনী। তা হ’লই বা, বলে, ভাগ্যিমানের.....আমরা মরি!
মালী। তুই কি আমায় ভাগ্যিমানি ঠাওরালি র্যা ?
মালিনী। পুরুষ মানুষ সবাই ভাগ্যিমান......ভাগ্যি ওদের
ল্যাজে বাঁধা।
মালী। না না, শেষে কি সত্যি তােকে হারাব? কেন তুই সং
সাজিয়ে এখানে নিয়ে এলি ?
মালিনী। আহা, না কাটো, দুটো কোপ দিয়ে রাখনা, ছােটো
কত্রীর চোখে পড়ক, কাজ দ্যাখানাে নিয়ে বিষয়।
মালী। নাঃ, তাের সাহস থাকে তুই কাট।
মালিনী। আহা বড় কথাই বল্লেন, উনি দেবতার মন্যির ভয়
রাখেন, আমি তাে রাখি-নি!...... আর, তােমার কাজ
আমাকে কখনাে সাজে!
মালী। কেন ?..... তােমার সাজটা আমায় দিব্যি সাজল, আর
আমার কাজটা তােমায় সাজবে না? না-হয় উড়ে-
সুন্দরীদের মতন মালকেঁাচা মারে।
মালিনী। বচনের খোঁচা দিতে খুব মজবুত, কাজের বেলায় দুদু !
মালী । ওরে । আর কেঁাচাও দিতে হবে না, খোঁচাও খেতে হবে
, এইবার সিধে চেঁচা দিই চ'......কারা আসছে••••••
মালিনী। তা এই বা,......চেঁচা দিতে যাব কেন ?
ধূপের ধোঁয়ায়
মালী। তা নইলে এই চোচের মতন মােচের বাহার দেখলেই
নুড়াে জ্বেলে এখনি বেচা করে ছেড়ে দেবে, ...দিই
চেঁচা......আমা-হ’তে ও-কাজ আজ কিছুতেই হবে না।
মালিনী। খবরদার, ঘােটা টেনে দাও
পালিয়াে না।
[ বল্লরীকা ও মুকুলিকার প্রবেশ ]
ও নতুন মালিনী।
বল্লরীকা | মালিনী, এ আবার কে লাে?
মালিনী।
মুকুলিকা। বাস্ রে!••••••এ যে বােম্বাই মালিনী।
মালিনী। বােম্বাই কি?......ও আমার সম্পর্কে (ঢাক গিলে )
বােন্ হয়, ......দিদি।
বল্লরীকা । দিদি কি লাে, মরদ মরদ ঠেছে যে!
মালিনী। তা মেয়ে-ছেলেকে মরদের কাজ করূতে হলে অমন
একটু ঠেকবে বই কি
ছােটো কৰ্তীর হুকুম তােত
জান না, তা মেনে চলে, ক্রমে আমাদেরও গোঁফ বেরুবে।
মুকুলিকা। তা’ হ্যা ভাই, তাের দিদিকে মরদের কাজ কতে
হয় কেন ?
মালিনী। অ-মা !......তা জাননা?......ওর যে হট্টমালার দেশে
বিয়ে হয়েছে, ......সেখানে গাই-বলদে চষে কিনা, তাই।
বল্লরীকা। তা ভাই, আমরা মেয়েছেলে আমাদের দেখে তাের
দিদি ঘােষ্ট দিচ্ছে কেন?
৬৮
ধূপের ধোঁয়ায়
মালিনী। ( নিরুত্তর)
মালী ॥ (সলজ্জ অঙ্গভঙ্গী।
মুকুলিকা। ভাই বােম্বাই মালিনী, ঘােমটা খােললা, ......তােমায়
দেখি,......ভাব করূবে না?......সে কি ভাই (যােমটায়
টান দিয়ে)......ওঃ সাবা! বােম্বাই মালিনীর গোঁফ
বল্লরীকা । মেয়ে-ছেলের গোঁফ কি লাে?......বলি হঁ্যা মালিনী।
মালিনী। চুপ! চুপ!......গােল করে কি বােন্? দিদি
আমার লজ্জা পাবে ;......তা জান না, দিদির ঐ তত
রােগ! কত কবরেজ কত বদ্যি দেখলে......কিছুতেই
কিছু হ’ল না। ...... সেদিন ওদের গায়ে একজন
সন্ন্যাসী এসেছিল, সে একটি মাদুলি দিয়ে গেছে,......
মধুপূর্ণিমের দিন সরযুর জলে ডুব দিয়ে সেই মাদুলি
ধারণ কলে নাকি ভালো হয় ; তাইতাে আমার এখানে
এসেছে, ••••••নইলে ওদের কিসের দুঃখ,
গােয়াল-ভরা গাই, গােল-ভরা ধান, গা-ভরা গয়না।
তা এখন চলুম ভাই, ...... আজ আবার ক’ দণ্ডের পর
বুঝি পূর্ণিমে ছেড়ে যাবে, তার আগে নাইয়ে নিয়ে আসিগে,
•••চল দিদি, চল, নাইবার জোগাড় দেখিগে।
[ একদিকে মালী ও মালিনী আর
অন্যদিকে মুকুলিকা ও বল্লরীকার প্রস্থান
;
বলে,
। . .
ধূপের ধোঁয়ায়
[ সাজিতে ফুল নিয়ে জনকয়েক তরুণীর প্রবেশ ]
প্রথমা। চল্ ভাই, এইবেলা পূজো দিয়ে আসি! .....এখনি
ভিড় হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়া। পুরুৎ এসেচে ?
তৃতীয়া ।
এ পূজোয় আবার পুরুৎ কি ?......আমরাই পুরুৎ !
সকলে।
( গান)
আমায়, অশােক ফুলের রূপটি দাও ।
মদন! সদ, নেত্রে চাও!
মল্লিকারি মনােহরণ
মন্ত্র শিখাও, কিশাের-শরণ!
নীলােৎপলের কাজল দিয়ে দৃষ্টি ছাও!
আমের মুকুল আকুল আশা
সফল কর ভালােবাসা
অরুণ অরবিন্দ হিয়ায় রস ঘনাও!
মদন! সদয়-নেত্রে চাও!
[ মন্দিরের দিকে গমন
[ একদিকে মুকুলিকা, বল্লরীকা আর অন্যদিকে নিপুণিকা
ও তরঙ্গিকার প্রবেশ ]
বল্লরীকা। এই যে, লােক আতে সুরু হয়েছে।
৭০
ধূপের ধোঁয়ায়
+ + ০ + ০ ০
নিপুণিকা । ওলল, এর গায়ে দে, এর গায়ে দে,
মুকুলিকা। আরে না, না, আমায় না......ছিঃ
নেহাৎ দিলে......দাও......আকাত্র-টাত্রা
কিন্তু......
দিলে?
দিয়ােনা
( গান)
যদি, নেহাৎ দেবে তবে না হয় বরং
দাও আবীর চুলে গায়ে বাসন্তী রং।
যদি ফাগুন লাগে
( প্রাণে ফাগুন লাগে)
তবে রঙীন ফাগে
সবে, রাঙাও সখী! প্রাণে বাজাও সারং !
****
মুকুলিকা। আরে বাবা, ......হয়েছে •• হয়েছে। সব রং
এখনি খরচ করে ফেল্লে যে••••••
তরঙ্গিকা। রঙের অভাব কি ?......রাজবাড়ীর দৌলতে কাজলা
দীঘি আজ এতক্ষণ আবীরের ঠেলায় লালদীঘি হয়ে
উঠল......
মুকুলিকা। ঐ দ্যাখাে......ওরা আবার কারা.•••••
[ কপােতিক ও সুপর্ণিকার প্রবেশ ]
তরঙ্গিকা। এমন দিনে ধবধবে কাপড় পরে বেরিয়েছ ?......
তােমাদের সাহস ত কম নয় ?.•••••তােমরা কে গা ?..••••
৭১
ধূপের ধোঁয়ায়
কপােতিকা । আমরা কপােত কপাের্তী......
মুকুলিকা। তােমরা বােবা পায়রা নাকি ?
কপােতিকা। শুবে-বকবকম্ ?
{ গান )
আমি তােরে খুব—খুব
খুব ভালােবাসি লাে বাসি।
দিয়ে তােরি রূপে ডুব,
অপরূপ স্বপনে ভাসি।
তনু হল ঘুম্ ঘু
মনােভব-কুঙ্কুম,
অনুভবে রুম্ঝুম্ অধরে হাসি।
[ উভয়ের মন্দিরের দিকে প্রস্থান
নিপুণিকা। ওরে, ওদের গায়ে রং দেওয়া হল না ? চলে
গেল যে••••••
তরুণিকা। ওদের প খারাপ হয়ে যাবে,......যাক গে,.....
নিপুণিকা। আ-হা-হা-হা ফকা পায়রা করে ছেড়ে দিতে হয় ;
••••বাঃ! আবার কারা আসে রে.•••••
[ কুসুমিকা ও ফুল্লরিকার প্রবেশ ]
গলা-ধরাধরি করে তােমরা আবার কেগাে ?
কুসুমিকা। আমরা একবৃন্তে দুটি ফুল...•••
| ০ ০
१२
ধূপের ধোঁয়ায়
( গান )
আমরা দু’টি স্বর্গ লুটে মর্ত ভরেছি ।
অনুরাগের পরাগ পরিবৰ্ত্ত করেছি।
ফুটেছি এক বৃন্ত পরি,
বিভােল বাতাস উদাস্ করি,
পরিমলের আমরা পরী মূৰ্ত্তি ধরেছি।
পরস্পরে পরশ করি’
পরশমণির ক্ষোভ পাশরি,
জীবন-মরণ প্রেমের সাধন সৰ্ত্ত করেছি।
নিপুণিকা । ওরে এদের ছাড়িনি......দে, দে, ••••••রং দে..••••
কুমিকা। ফুলের গায়ে আর রং দিয়ে কি হবে......আমরা
অনিতেই রঙীন্.....
[ গাইতে গাইতে মন্দিরের দিকে প্রস্থান
নিপুণিকা।
ওঃ ধূম লেগে গেছে। আবার কারা আছে•••••
ওরে, মদনিক মদন সেজেছে......হাতে ফুলের ধনুক......
[ মদন-রতির বেশে মদনিকা ও আরাত্রিকার প্রবেশ ]
তরঙ্গিকা। মাথায় ফুলের মটুক•••••"তােমরা কে গা?......যেন
চেন চেন কছি.. তােমরা কে ভাই ?
ধূপের ধোঁয়ায়
মনিকা।
যারা, কুসুম-শরে পাগল করে আমরা সেই
আরাত্রিকা। মােদর, সকল কথা ব্যক্ত হবে সঙ্গীতেই....
(গান)
আমরা, কথা বলি শুধু বাঁশিতে !
করি কানাকানি মন-জানাজানি
মল্লিকা-ফুল-রাশিতে
অঙ্কুরে মােরা মুঞ্জরি,
নয়নে নয়নে গুঞ্জরি,
আমরা, নিখিল হিয়ায় হিন্দোলে দুলি
চির ভালােবাসা বাসিতে।
কুসুম ধনুর গুণ টেনে
মরণের বুকে বাণ হেনে
জীবনেরি জয় লিখে দিই নিতি
চামেলি চঁাদের হাসিতে।
নিপুণিকা। রং দে• • •• ••রং দে•••••
মনিকা। সাবধান •••বাণ মারুব!
তরঙ্গিকা। মারাে......আজ বাণ খেতেই তত বেরিয়েছি।
মারাে বাণ, করাে মানা, তা বলে কি রং দেব না।
[ হুড়ােহুড়ি কতে করতে সকলের মন্দিরের দিকে প্রস্থান
৭৪
ধূপের ধোঁয়ায়
[ প্রজাপতির বেশে পতঙ্গিকার প্রবেশ ]
পতঙ্গিকা।
(গান)
আমি, গােপনে এসেছি স্বপনে ভেসে !
পশেছি না জেনে ফুলেরি দেশে!
হেথা, চামেলি মালতী চাপারে দেখে
শেষে যে অশােকে গিয়েছি ঠেকে,
একে গেছে বুকে ছবি নিমেষে,
কেমনে রহি রে ভালাে না বেসে ।
নীরবে নুয়েছি ছুয়েছি চুপে
ডুবেছি ডুবেছি ডুবেছি রূপে
ডুবে ভেসে গেছি সুরেরি রেশে
প্রাণেরি গানেরি তানেরি শেষে।
[ মন্দিরের দিকে প্রস্থান
[ মনিকা, আরাত্রিকা, নিপুণিকা প্রভৃতির পুনঃপ্রবেশ ]
নিপুণিকা। ওরে এইবারে দে রং ••••ওর পাকাটির বাণ ফুরিয়ে
গেছে, তূণ খালি
তরঙ্গিকা। বাণ মেরে ভারি উস্তু-ফুস্তুম্ করা হয়েছে, না—
রােসাে—এই যে-এই যে
ধূপের ধোঁয়ায়
{ গান)
ও যে, সকল হিয়া বেঁধে কুসুম-শরে
ওরে, সবাই মারাে সই কঁকন-করে।
ওর আবীর লােহ
ওর রঙীন মােহ
মুহু পড়ুক ঝরে ঝরে ভুবন পরে।
( সকলের প্রস্থান
[ শ্রুতকীৰ্ত্তি ও নকুলিকার প্রবেশ ]
শ্রুতকীর্তি। আর বছর এই বসন্তোৎসবের দিনে, আকস্মিক
আনন্দে, দিনের বেলাতেই অকাল-জ্যোৎস্নার ব্রত করেছিলুম
......তিমিধ্বজের পৌত্র নক্ৰধ্বজকে পরাস্ত করে সেদিন
ওরা হঠাৎ নগরে ফিরুল......ফেবার কোনাে সম্ভাবনা
ছিল না......আর এবার••••••
নকুলিকা। এবার সবাই মিলে অকাল বাদলের ব্রত করছি......
হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেছে! .....উৎসবটা একেবারে
অপপৗরুষেয় হয়ে উঠেছে......পুরুষের নাম-গন্ধ নেই; ••••••
অর্ধেক সম্রাটের সঙ্গে পােবনে......অর্ধেক কুমারদের
সঙ্গে নিরুদ্দেশ ••••••একলা মেয়েরাই এবার এক হাতে
উৎসবের তালি বাজাবার চেষ্টায় আছে। •••ভালাে কথা
ধূপের ধোঁয়ায় শবরী অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে......ওর হরিণ কি রাখা হবে ? শ্রুতকীৰ্ত্তি । না, না, ও হরিণ ফিরিয়ে দে, ••••••ও আমার চাই- নে, ••••••ওর শিং নেই, কোনাে বাহারই নেই..... নকুলিকা। মেয়ে-হরিণ আতে বলা হয়েছিল যে, মেয়ে-হরিণের শিং হয় বুঝি ! .....ময়ূরটা? রাখব? শ্রুতকীৰ্ত্তি। না, না, ও পেখম ধরে না, ন্যাড়া-বেচা, বি...... নকুলিকা । মেয়ে-ময়ূর বুঝি পেখম ধরে?..••••কোকিলটা ?...... ওটা থাক .....কি বল ? শ্রুতকীর্তি। তুই যে বছিস্ ও ডাকবে না, ••••••না ডাকে তত পুষে কি হবে ? নকুলিকা। মেয়ে-কোকিল কোনাে পুরুষেও ডাকবে না। ক্যার ক্যান্ কবে, কুহুধ্বনি ভুলেও কবে না। শ্রুতকীৰ্ত্তি । তা তাে আগে বলিনি। নকুলিকা। তুমি যে কোন পুরুষ জানােয়ার পুষবে না•••••• ’ বলে কি করব ? শ্রুতকীর্তি। যাকগে, ......আচ্ছা তুই যে কি আনতে দিয়েছিলি ••••••এনেছে ? নকুলিকা। হা এনেছে। একটি মেয়ে-গরু আনতে দিয়েছিলুম, তা এনেছে, •••••তােমার মেয়ে-ময়ূর পেখম ধরূবে না, মেয়ে- ৭৭
ধূপের ধোঁয়ায়
কোকিল গান কযুতে পারবে না, কিন্তু আমার মেয়ে-গরু
দিব্যি দুধ দেবে।
শ্রুতকীর্তি। যা তুই! (নেপথ্যের দিকে চেয়ে) ছি, ছি, ওদিকের
গাছগুলাে কেটে বাগানটা বড় বিশ্রী দেখতে হয়েছে।
নকুলিকা। তা’ কি করূবে বল! •••••ব্যাকরণে গাছকে যে পুরুষ
বলেছে ;
শ্রুতকীর্তি। তুই যা’ আর জ্বালা-নে!
নেপথ্যে।
{ গান)
নীল সিন্ধুর সিত পঙ্কজিনী।
জয়! জয় ! জয় দেবী! আফ্রোজিনি !
নকুলিকা।
ঐ দেখ তােমার মনের মতন মিছিল বেরিয়েছে,
যবনীরা ওদের মেয়ে-কন্দর্পকে নৌকোয় নিয়ে গান গাইতে
গাইতে আসছে।......ঐযে নৌকাখানার ঢাকুনি প্ৰকাণ্ড
ঝিনুকের মতন একবার ফাক হচ্ছে আর একবার বন্ধ হয়ে
যাচ্ছে ; ঐযে মেয়ে-কন্দর্প নৌকোর ভিতরে অঙ্গ ঢেলে আরাম
করছেন।
তকীৰ্ত্তি। আর মেয়ে-কন্দর্পে কাজ নেই,......চল, আমাদের
চিরকেলে কন্দর্পকে ফুল দিয়ে আসি।
নকুলিকা দৰ্প তা হলে টিকল না !
[ প্রস্থান
৭৮
ধূপের ধােয়ায়
[ ঝিলে নৌকোয় গুণ টাতে টাতে যবনীদের প্রবেশ ]
যবনীর দল।
( গান )
নীল সিন্ধুর সিত পঙ্কজিনী
জয় ! জয় ! জয় দেবী আফ্রোজিনী।
শুক্তির অঙ্কে সুপ্তিহরা !
তৃপ্তির গর্ভে তৃষ্ণা-ভরা !
যৌবন-ধাত্রী গাে গৌরবিনী ।
ফুর্তির যাত্ৰিনী আফ্রোজিনী !
দেবরাজ-পুত্রিকা মূর্ত প্রীতি !
সুন্দরী! শুকতারা। আফ্রোদিতি ।
চির-প্রেমপাত্রী গাে সম্মােহিনী!
মনােভব-মাতৃকা! আফ্রোজিনী।
[ প্রস্থান
[ অন্য নৌকায় কয়েকজন তরুণীর প্রবেশ ]
প্রথমা। এগিয়ে গেল.•••••দাসীদের নৌকো এগিয়ে গেল !......
আস্পর্ধা! .....জোরে বাও জোরে বাও!
দ্বিতীয়া। আজ উৎসবের দিন .....
কর্পের দরবারে সবাই
সমান
যাগে এগিয়ে
আভিজাত্যের দর্প আজ
ধূপের ধোঁয়ায়
কতে নেই ..চল্ না, দিব্যি আস্তে আস্তে গাইতে গাইতে
বাইতে বাইতে যাওয়া যাবে,......আমােদ নিয়ে কথা !
সকলে ।
(গান)
যদি কুসুম শরে হৃদয় বেঁধে
তবে কেঁদনা,
ও যে, ফুলের সুখ-পরশ মাঝে
মৃদু বেদনা।
ও যে, দিনের দাহে কুঞ্জ-ছায়ে
স্বপ্ন আনে বিভােল বায়ে
ঘুমের শেষে আলাের দেশে
আধ-চেতনা !
[ বাইতে বাইতে প্রস্থান
[ কয়েকজন তরুণীর প্রবেশ ]
প্রথমা। এই, আজ দোল খেতে হবে......দোল খেতে হবে
( দোলায় উঠে )......একটু দুলিয়ে দে না ভাই
আমি আবার তাের বেলায় দেব’খুনি ; নে, না।
দ্বিতীয়া । আচ্ছা, নে, গান ধর •••••
( গান)
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে !
দুনিয়াতে আজ নতুন হাওয়া
৮০
ধূপের ধোঁয়ায় - দুলিয়েছে মন ভুলিয়েছে ! শাখায় শাখায় আমের মুকুল, পারুল, চাপা, অশােক, বকুল- দুলছে দোদুল আকুল হাওয়ায় ভােদ্র ফেরে পায় সেধে ! ( আজ ) কোকিল ডাকে নতুন স্বরে, নতুন ফোটে নতুন ঝরে, নতুন ছবি অাঁখির 'পরে জাগল মােহন ফাদ কেঁদে ! [ প্রস্থান [ নকুলিকা ও শ্রুতকীৰ্ত্তির পুনঃপ্রবেশ ] নকুলিকা। ( একহাতে তালি দেওয়ার ভঙ্গী করে ) বাঃ । বাঃ! বাঃ। শ্রুতকীর্তি। নকুলিকা! ও আবার কি? তাের কি সবই অদ্ভুত ? নকুলিকা। একহাতে তালি দিয়ে একটু নতুন রকম ফুৰ্ত্তির চেষ্টায় আছি। শ্রুতকীর্তি । তা কখনাে হয় ?......সব বিটকে..... নকুলিকা। আজ কিন্তু দেখছি সবাই ঐ চেষ্টাই কছে!••••• এরা দেখেও শিখছে না......ঠেকেও শিখছে না......আমি ৮১
ধূপের ধোঁয়ায়
এই ঠেকে শিখলুম••••••দেখলুম একহাতে তালি-বাজাননা
সুবিধে হয় না।
(গান)
তালি বাজল না সই, এক হাতে কই বাজল না।
নাচতে গেলাম এক পায়ে, তাও সাজল না!
শ্রুতকীৰ্ত্তি # তুই বড় বাড়িয়েছি।
নকুলিকা।
বলছে সবাই বাড়াবাড়ি
শুক-শারীতে আড়াআড়ি,
তেল ঢেলে আর ফল কি, বলল, রাধাই যখন নাচল না।
[ প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
[ হাওয়া-মঞ্জিল, সময় অপরায়, অন্যমনস্কভাবে উৰ্মিলার প্রবেশ।]
নেপথ্যে ।
(গান)
বইল না রে জীবন
এ আর বইল না।
যারি পরে ভরসা
শেষে সেই দেখি ভর সইল না।
৮
ধূপের ধোঁয়ায়
দেখি আর কূল পাথারে
শকতি যে নাই সাঁতারে,
ভেরে এল অঙ্গ
ভরা ডুবল বুঝি রইল না।
ঊর্মিলা। বিহঙ্গিকা! বিহঙ্গিকা:.....এ সঙ্গীত তুই কোথায়
পেলি আমার কুষ্ঠিত অন্তরের অস্ফুট হাহাকার সুরের
ইন্দ্রজালে কি করে ফুটিয়ে তুললি ! বিহঙ্গিকা!......কই
বিহঙ্গিকা তত এখানে নেই !••••••কে গাইলে?......বেলা
পড়ে আছে..
••••••পড়ন্ত বরাদুরে ঝরা বকুলগুলাে শুকিয়ে
কুঁকড়ে যাচ্ছে,••••••আমার মনের ভিতরটাও অম্নি শুকিয়ে
যাচ্ছে......ঠিক্ অনি কুঁকড়ে যাচ্ছে.. •• হুতাশের হাওয়া
বইছে......আর যে পারছি না, আর যে সইছে না......
কি কলুম, ......কি হ’ল ; বিধাতা!......যে দুৰ্বল......
তার পায়ে পায়ে অপরাধ...পদে পদে আতঙ্ক...•••সে
কেবল কাদতেই জন্মেছে।
(চোক ঢেকে নীরবে ক্রন্দন )
[ সীতার প্রবেশ ]
সীতা। উর্মিলা!......ছি বােন্•••••শুধু শুধু চোখের জল ফেলতে
নেই......ওতে অমঙ্গলকে ডেকে আনা হয়।••••• দুর্দিন
আবার আগেই তুই যে আতঙ্কে শুকিয়ে যেতে বসেছি,
৮৩
ধূপের ধোঁয়ায়
০ ০ ০ ০
কপালে দীর্ঘ বিচ্ছেদ থাকে....তা কি তুই চোখের
জল দিয়ে রদ করূতে পারবি ?
ঊর্মিলা। না দিদি, আমি তাে কঁদিনি......কে গান গাইছিল,
সেই গান শুনে, মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল ;
.....গানের সুর শুলে আমার প্রাণের ভিতরটা কেমন
আকুলি-বিকুলি করতে থাকে.•••••চোখ, ছ-ছলিয়ে আসে
ও কিছু নয়।
সীতা । আমাকে ভােলা নি, বাে••••• ধূমকেতুর ধোঁয়ায়
এখনাে তাের মনটা থােলাটে হয়ে রয়েছে। প্রাণের ভিতর
যার কান্নার মেঘ পথমিয়ে আছে, গানের হাওয়ায় তারি
বালা নামে। সহজ হয়ে নে••••• সহজ হয়ে নে ;••••••
গ্রহ-তারা ফলের সূচক মাত্র•••• ধূমকেতু বল্ছে তােমার
আমার চলার পথে বিস্তর বিঘ্ন আছে !......কিন্তু সেই
বিপদে যে ডুবব তা কে বললে ?...... ধূমকেতু বলে গেল,
বন্যা আসবে, বাঁধের মাটি আলগা, সাবধান! এমন
অবস্থায়, লােক বাঁধের গোঁড়ায় নতুন করে মাটি দ্যায়,
চোখের জল ঢেলে বন্যার আগেই বাঁধ ধ্বসিয়ে দ্যায় ?
......কি করে ?......বল দেখি!
উর্মিলা। যার বাঁধ দেবার শক্তি আছে সে বাঁধ দ্যায়, যার নেই
সে কঁদতেই বসে।
সীতা। তাের শক্তি নেই কি করে জালি?
৮৪
ধূপের ধোঁয়ায়
এ ৫০০০
উর্মিলা। নিজের শক্তি নিজে জানিনে ?
সী। না, জানিনে, ...তুই কেন,......কেউ জানেনা,••••••
ঘাড়ে বােঝা না চাপলে ঘাড়ের যে কতটা জোর তা পরীক্ষা
হয় না ; .....বিপদ ঘাড়ে এসে পড়লে মানুষ অসাধ্য সাধন
করে ;... . মানুষের শক্তির সীমা নেই।
[ দাসীর প্রবেশ ]
দাসী । ছােটো কত্রী আপনাদের কাছে নিবেদন করূছেন,......
কামরূপ থেকে একজন ভাণমতী এসেছে।
সীতা। কোথায় ?
দাসী ৷ এই মেয়ে-মহলের অঙ্গনে।
সীতা । চল ঊর্মিলা ভাণমতীর খেলা দেখিগে।
উৰ্মিলা চলল।
[ প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
[ মেয়ে-মহলের অঙ্গন। দূরে দস্তুর প্রাচীর ; চারিদিকে বেলে-
পাথরের ঘর ; সােনাব জাল-আটা ঝরােকা; নাগদন্তের ভনায় জালির
বারাণ্ডা। সখীর দল ; সিংহ-পীঠিকায় মাণ্ডৰী, শ্রুতকীৰ্ত্তি ; পাদপীঠিকায়
বিহঙ্গিকা, কুঙ্গিকা; মাটিতে ভাণমতী। ভাণমতীর উবু খোপা, পরনে
নীলাম্বরী, গাছ-কোমর করে বাঁধা। এক হাতে আস্ত শখের শাখা,
;
৮৫
ধূপের ধোঁয়ায়
এক হাতে একটা গাছের শিকড় কঙ্কণের আকারে জড়ানাে। এক
কাণে কড়ি, আর-এক কাণে আধ কপালে সুপারি । হাতে ময়ূরপুচ্ছের
চামর। সামনে একটা আধ-খােলা বেতের ঝাপি। একটা শূন্য খাঁচা
ও একটা রঙীন হাঁড়ি।]
ভাণমতী। লাগ ভেল্কী লাগ, জলে জ্বালাই আগ, লাগ ভেলকি
লাগ! লাগ, লাগ, পাগ, !
(গান)
আসমানে শিলি লটকিয়ে দোল্ খাই,
গাছ রুয়ে সাঁজো ফল ফলাই,
শূননা পিঁজরাতে পাপিয়া ময়নায়
সিরুজিয়ে হরেক বােল বলাই।
মাগুবী। বটে! তবে তাে খুব গুণিন্ দেখছি!....আর কিছু
দেখাতে পারাে ?
ভাণমতী।
(গান)
কেউটিয়া গােখ রাে মুখ থেকে নিকলাই,
ইসারায় হয় মাের ফুল বিষ্টি ।
নখের আয়নাতে দুনিয়াটা উজলাই,
মন্তরে তারা চাঁদ ছিষ্টি ।
ধূপের ধোঁয়ায়
মাণ্ডবী। তুমি নখ-দর্পণ জানাে ?
ভাণমতী। জানি কিছুমিছু!
শ্রুতকীর্তি । আচ্ছা দেখাও।
[ একদিক দিয়ে সীতা, ঊর্মিলা ও অন্যদিক দিয়ে
নকুলিকার প্রবেশ ]
মাগুবী ৷ এই যে, দিদি,... এস,.....এখানে নখ-দর্পণ হচ্ছে।
সীতা। (বতে বসতে) ভাণমতীকে ডাকালে কে? শ্রুতি
বুঝি ? মেয়েদের সব কেরামতি এক দিনেই দেখে ফেলতে
হয় বুঝি ?
মাগুবী। না কেউ ডাকায়-নি,......আপনি জুটেছে!
ভাণমতী। তিন তুড়ি তিন ফুক !
দিই কু কঁপে বুক
ধুপু•••••ধুপু!
ঝক্ ঝক্ করে নখ!
এই দ্যাখ, কার মুখ !
নকুলিকা। দেখি ! দেখি! বাঃ আশ্চর্য্য!.....যুবরাজ রামচন্দ্র।
ভাণমতী। দিই ফুক কাঁপে বুক!
ঝক্ ঝক্ করে নখ !
চেয়ে দ্যাখ, কার মুখ!
ধূপের ধোঁয়ায়
সীতা। আশ্চৰ্য্য......দেবর লক্ষ্মণ !......বাঃ, চোখ না পাল্টাতেই
বলে গেল! বাঃ••• ''এ কে ?.....বাং-এ যে দেবর
উৰ্মিলা।
বদলাচ্ছে......এবার শ্রুতি ভালাে করে
দ্যাখ••••••কে!
মাগুবী ।
এ বর......তকীর্তির!
সখীর দল। দ্যাখােগা!••••••াগা......ওগো•••••অ ভাণমতী।
বলি থামাে না,......সবাই মিলে......ওগাে!
মাগুবী ॥ আহা সবাই মিলে কি কলরব হচ্ছে ?......আচ্ছা
ভাণমতী, নখদর্পণে যাদের দ্যাখালে, তারা এখন••••••এই
মুহূর্তে কোথায় আছেন, কি কছেন, তা তােমার বিদ্যার
বলে দ্যাখাতে পারাে ?
ভাণমতী। (হেসে) পারি কিছু কিছু! •••••আয়, আয় চলে
আয়, কে যায়, কে যায়? পূর্বদিকে কে যায় ?... ..
ঐরাবতে ইন্দির যায়.....হাজার চক্ষে কটমটু চায়, চোখে
দেখি, না, নখে দেখি ?......নখেও দেখি, চোখেও
দেখি !••••••ঠিক বলছি তাে ?••••• ই গুরু হাঁ,......ঠিক
বলছি,...... তাই বল, আর, না দেখি তাে চশমা
নে,•••••মনের ছবি আমানে!••••••ইন্দির যায়। ইন্দির
যায়! পূর্বদিকে আর কে যায় ?......বঙ্গ মগধের রাজা
যায়......
৮৮
ধূপের ধোয়ায় “মাথাতে যার বরুণছত্র, সমুদ্র যার সেনা। মণাঙ্ক যার ঝাণ্ডা নিশান, কড়ির লেনা দেন।” সকলে। চমৎকার ! চমৎকার ! ভাণমতী। নাঃ পূর্বদিকে নেই! পশ্চিম দিকে কে যায়? মকর- বাহন বরুণ যায়! অথই জলে দিক ভােলায়! সাঁতার জলে ফুল ছড়ায়। পাথার জলে জাল জড়ায়। আর কে যায়.....সিন্ধু-সুরাটের রাজা যায়, ঘােড়ায় চড়ে হেলার ভরে, সিংহ হাতী শিকার করে। শূলের আগায় হনের মাথা। শকের সকল দর্প হরে। চোখে দেখছি না নখে দেখছি ?......নখের কল্যাণে চোখেই দেখছি ! সকলে। আশ্চর্য! আশ্চর্য ! ভাণমতী ॥ নাঃ এদিকেও নেই !.....দক্ষিণদিকে কে যায় ? মহিষবাহন যম যায় ! যমের ভাই নিয়ম যায়.•••••যমদূতেরা চোখ পাকায়।......আর কে যায়, লঙ্কার রাজা রাবণ যায়...... “বড়বা-মুখ যজ্ঞকুণ্ডে শত্রুমুণ্ড দ্যায় আহুতি।
ধূপের ধোঁয়ায় * ০ + ০ + দশটা মাথা, বিশটা ফন্দী, লাখের উপর নাতি পুতি ॥” সকলে। এই রাবণ !••••••ভয়ঙ্কর মূৰ্ত্তি ! .....কি ভীষণ ! ভাণমতী। নাঃ এদিকেও নেই!•••• বাকী আছে উত্তর, উত্তর দাও উত্তর দিক! যা দেখাবে ঠিক ঠি! উত্তর দিকে কে যায় ? ..মাষের কাঁধে কুবের যায়, সােনার গুঁড়ো উড়িয়ে যায় !... ..সােনার কুমড়াে গড়িয়ে যায় । ......আর কে যায়, সিদ্ধপুরের রাজা যায়, ...... “সােনাপােকার পেট টিপে যে বার করে ন্যায় সােনা। ধ্বজাতে যার সপ্তচামর হাওয়ায় আনাগােনা।” নাঃ এদিকেও নেই। সকলে। ( সভয়ে) সে কি!...... মাগুৰী। সেকি ?......কোথাও নেই কি? ভালো করে দ্যাখ ••••••ভালাে করে দ্যাখ! ভণমতী। নখেও দেখলুম, চোখেও দেখলুম, লােকেও দেখলে, আমিও দেখলুম, সিদ্ধপুরে নেই, যম-কোটিতে নেই, লঙ্কায় নেই, কোথাও নেই!......বায়ুকোণে বায়ু বললেন ওড়াই- নি,... ..অগ্নিকোণে অগ্নি বললেন পােড়াইনি; ঈশানের জট খালি, নৈঋতের কোল খালি।
ধূপের ধোঁয়ায়
শ্রুতকীৰ্ত্তি। কী বছ
ভালাে করে দ্যাখ
ভাণমতী।
ফের তুড়ি ফের ফুক!
ধুপু-ধুপু ॥
নয়, তিন, তিন এক।
দূরে নেই কাছে দ্যাখ।
পায়ের তলায় চাল দেখি, চাতালের তলে পাতাল দেখি ।
পাতালে দেখি বাকি।
সুধার ভাণ্ড কোলে করে
নাগ বাসুকী অসুখী।
হাজার মাথা নেড়ে বলছেন, হেথায় নেই, হেথায় নেই,
হেথায় নেই!•••••তবে কোথায় ?
নয়ে তিন তিনে এক,
মাথার উপর চেয়ে দ্যাখ,;
মাথার উপর কি দেখি ? অরুণ-রথে সুয্যিকে দেখি -
সূর্যি মামা, সূর্যি মামা, মাথা খাও! সূর্য্যি বংশের চুড়াে
দেখাও।
সূর্য্যি বল্লেন ইশারায়,
ইশারায় দিশা পাই।
কি দেখিরে কি দেখি,
সূৰ্যি-বংশের চার চুড়াে চার ভাইকে দেখি!
-সরযুর ভীরে সব্বাইকে দেখি,কিন্তু
ধূপের ধোঁয়ায়
চার জনকেই ঘেরাও ক'রে,
দিচ্ছে হকার বুনাের দল!
কোশল রাজ্য উঠছে কেঁপে,
এমনি বিষম কোলাহল।
মাগুবী | ভাণমতী। এ তােমার কী ভাণ?
ভাণমতী । ( নিজের মনে) চোখে দেখিস্ ?••••••না নখে দেখি?
•••••. গুরুর দয়ায় চোখেও দেখি, নখেও দেখি,......ঠিক
দেখছিস্? হ গুরু— ! গুরু বলছেন, না দেখিস্ তাে
চমা নে••••••মনের ছবি আসমানে।
শ্রুতকীর্তি। একে ছেড়াে না। নকুলিকা !......যবনী শান্ত্রীকে
ভা, ••••••এ বােধ হয়-
এ বােধ হয়.•••••বুনােদের চর,••••••শত্রুর চর,
আমি আছি......ছেড়ো না !••••••
( অট্টহাস ) হাঃহাঃহাঃহাঃহাঃহাঃ।
ভাণমতী।
[ হাসির ধমকে সকলে চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল ।
সমস্ত গােলমাল হয়ে গেল, এই সুযােগে ভাণমতীর
প্রস্থান।
৯২
ধূপের ধোঁয়ায়
চতুর্থ দৃশ্য
.
[ প্রাসাদ শিখর ; শতঘ্নী-সজ্জিত প্রহরা-গুম্বজ ; চূড়ায় চূড়ায় সােনার
কলস। শবরীর দেওয়া পায়রা বুকের ভিতর করে নিয়ে শ্রুতকীর্তির
প্রবেশ।]
শ্রুতকীত্তি ॥ হাজার হাজার পাহাড়ী নগরের দিকে আছে,••••••
সরযুর জল তােলপাড় করে আছে,......কী সর্বনাশ !
••••••নগরে সৈন্য নেই,•••••সেনাপতি যুবরাজদের সঙ্গে,
......কী করব ?......মন্ত্রী-পরিষদে খবর দেব ? তারা
কি খবর পায়নি ?......চরেরা খবর দ্যায়-নি?••••••
কী করুব?••••••সর্বনাশ হ’ল! •••• দুর্গ-রক্ষার কোনাে
আয়ােজন নেই, ••• কোনাে বন্দোবস্ত নেই, যবনী-
শান্ত্রীদের খবর দেব? দুর্গে চার-পাঁচ শশা মেয়ে আছে
......তাদের সবাইকে হাতিয়ার দেব ?......দুর্গের দরজা
বন্ধ করে লড়াই কব ?••••••কিন্তু এদের চার ভাইকে
যে পাহাড়ীরা ঘেরাও করেছে ! হয়তত বন্দী করেছে ;
যুদ্ধ কলে এদের যদি অনিষ্ট করে? বরগুলাে
যদি প্রাণের হানি ঘটায়?......কী করব ?...... আর
ভাবতে পারি-নে......ভাবার সময় নেই......আংটি বেঁধে
পায়রাটাকে ছেড়ে দিই!......পায়রা ঠিক্ পৌছােবে তত !
ধূপের ধোঁয়ায়
পায়রা পরখ করে নিইনি,..... শবরী ঠকায়নি তাে?
••••ভাববার সময় নেই......
( পায়রা উড়িয়ে দিলেন।
যাচ্ছে......যাচ্ছে••••••ঐদিকেই যাচ্ছে।
(ব্যগ্রভাবে পায়রার গতি নিরীক্ষণ )
[ নকুলিকার প্রবেশ }
নকুলিকা। বাঃ! সাবাস!......পায়রা পাঠানো হচ্ছে ?......
এই বুঝি প্রতিজ্ঞা ?
শ্রুতকীৰ্ত্তি ॥ থাম তুই নকুলিকা !•••••বিপদের সময় বিদ্রুপ ভালাে
লাগে না।
নকুলিকা। বিপদ!......কিসের বিপদ!
শ্রুতকীৰ্ত্তি । দেখছি-নে?......পঙ্গপালের মতন আসছে,
নগর অরক্ষিত,••••••দেখ ছিনে?
নকুলিকা। তুমি পাগল !......সে ভাবনা তােমার কেন? যারা
রাজ্যের কর্ণধার, তারা কি ভাবছ, সত্যিই স্ত্রীলােকের
হাতে দুর্গ সপে নিশ্চিন্ত আছে ?......কক্ষুকের জায়গায়
কলিকা বাহাল করেছে ?......তুমি ভুল বুঝেছ ...•••
রঞ্জুতে তােমার সর্পভ্রম হয়েছে ;•••••.পাহাড়ীরা দুর্গ লুঠ,
কতে আছে না,......তুষার-প্লাবনে গরীবদের সর্বস্ব গেছে
তাই আশ্রয়ের ভিখারী হয়ে ওরা দিগ্বিদিকে বেরিয়ে
৯৪
ধূপের ধোঁয়ায়
পড়েছে, পথে যুবরাজদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা,... ঈদের
কাছে দুঃখ জানাতে,••••••আশ্রয় দেবেন বলে আশ্বাস
দিয়ে, তারাই ওদের সঙ্গে নিয়ে আসছেন। ঐ দ্যাখাে,
সূৰ্য্যবংশের চার চূড়াের চারখানা রথের চুড়ােতেই সগৌরবে
নিশান উড়ছে।••••••
শ্রুতকীৰ্ত্তি । তুই এত খবর কোথায় পেলি ?
নকুলিকা। নগরের দরজায় পাহাড়ীর দঙ্গল দেখে পাছে নগরের
লােক ভয় পায়, তাই এদের আতঙ্ক নিবারণের জন্যে
মন্ত্রী-পরিষদ এইমাত্র ঘােষণা দিয়ে জানিয়েছেন ;....
খবরই তােমায় দিতে আসছিলুম ; আসতে আসতে দেখি,
মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার বিরহ-যন্ত্রণা সইতে না পেরে......কাব্যের
নায়িকার মতন, সখী আমাদের কপােত-দূত প্রেরণে ব্যস্ত।
শ্রুতকীৰ্ত্তি । আমি কি পায়রা পাঠাতুম,•••••ভাণমতীর ভড়ঙে
কথায় আর বর্বরদের ভিড় দেখে মনে হ’ল,••••••হয়তাে
ওরা বিপদে পড়েছে !••••••তা ওরা সােজাসুজি দুর্গে না
এসে সরযুর তীরে কি করূছে ?
নকুলিকা। তােমরা না ডাকলে ওঁরা দুর্গে ফিবেন না, বলে-
ছিলেন, বােধ হয়, সেই প্রতিজ্ঞা পালন কয় হচ্ছে।
এইবার আসবেন.•••••তােমার কপােত-দূত পোঁছলেই
আসবেন।
শ্রুতকীৰ্ত্তি। হার হ’ল নকুলিকা, আমাদেরি হার হ’ল !
০ ০ ০ ০ ০।
নকুলি.;;লিস কি? তা হলে......
ন? | (হেসে) হারটাকে যদি জিৎ বলে প্রমাণ করে
নিতে পারি ?••••••কি উপহার দেবে ?
.
“রি। { সাগ্রহে ) যা চা!
সকালক 1. আচ্ছা, এই কথাতাে ?......তবে শােননা......একে
:+ ব বলি, প্রথম কথা, তােমার পায়রা বে রাজকুমারের
কাছে ঠিক পৌঁছবে......তা কি করে তুমি জালে ?......
শবরী যদি ঠকিয়ে থাকে ?
ত। আমিও একটু আগে সে কথা ভাবছিলুম।
নক ভেবে কি ঠাওরালে ?
শ্রুতকীর্তি। কিছু না।
কুলিকা পায়রা পৌঁছবে।......
পোঁছবে,......তার কারণ, তুমি পায়রা যার কাছে
পাঠিয়েছ, শবরীর মারফতে পায়রাটি তিনিই পাঠিয়েছিলেন।
ও চিঠি-বাজ পায়রা, ঠিক পৌছবে !......আরও
পবল্প আছে, ভাণমতীও তারই চর।
কীর্তি । সবু, বুঝেছি, তা হলে কৌশলে
'আমাদের
প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়েছে, ছলে হার মানিয়েছে !
লিকা {} . ' অবলা বলে তাচ্ছিল্য করে বলপ্রকাশ করেনি,
হার মানিয়েছে, তুমি এ পরাজয়কে পরাজয়
ধূপের ধোঁয়ায়
-
শ্রুতকীর্তি। না !
নকুলি। ( হাত পেতে ) বশি!
( হাত পেতে) বশি!••••••প্রমাণ করে দিয়েছি।
যা বলেছিলুম প্রমাণ করে দিয়েছি।
শ্রুতকীর্তি। তুই সব জাতিস্?
নকুলিকা। না ঠিক জান্তুম না,......খানিকটা আন্দাজ......
খানিকটা জানা••••••
তকীৰ্ত্তি । অথচ আমায় বলিনি,...উপহার দেব তােমায় ?
উপহার দেব না প্রহার দেব......
[ সীতা, উর্মিলা ও মাণ্ডবীর প্রবেশ ]
• ৫০
গীতা | শ্রুতি, খবর পেয়েছিস্?
শ্রুতকীৰ্ত্তি পেয়েছি।
মাগুবী। শুধু মন্ত্রী-পরিষদের ঘােষণা নয়, আরাে খবর আছে
সীগ। মহাদেবী সুমিত্রার কাছে এইমাত্র পত্র এসেছে......
সম্রাট বশিষ্ঠাশ্রম থেকে নগরের দিকে যাত্রা করেছেন,
•••আজই রাত্রে পৌঁছবেন।
কতকীৰ্ত্তি। অ!
৷ অ!••••••খবরটায় পেট ভরূল না,
খবরটায় পেট ভরূল না,•••• তবে দ্যাখ,
সম্রাটের চিঠি......( চিঠি দিলেন)......এইখানটা পড়ে
দ্যাখ,
৮
ধূপের ধোঁয়ায়
অল আলি
শ্রুতকীওঁ। (পাঠ) পরে মহর্ষি বলিলেন, যে, যে পাপের
বাল্মকি নিষাদকে অভিসম্পাৎ দিয়াছিলেন, ভাবিয়া দেখি।
লাম, আমি কিয়ৎ পরিমাণে সেই পাপের ভাগী হইতে
বসিয়াছি।
সময় থাকিতে সে পাপের প্রায়শ্চিত্তের
প্রয়ােজন। অতএব শ্রীমান্ ও শ্ৰীমতী বধূ-মাতাদের গ্রহ
শান্তির জন্য পূর্বে যে ব্যবস্থা দিয়াছিলাম, মদন-মহোৎসবের
রাত্রে তাহা রহিত করিতে চাই। বিরহ-দুঃখ উভয় পক্ষই
ইতিমধ্যে অল্পবিস্তর ভােগ করিয়াছেন।
বিস্তরেণ। ফল হইবার হয় উহাতেই হইবে। ইতি
ওঃ! একটা দিনের মধ্যে •••••কত কাণ্ড, কত বিভ্রাট
কী তুলাম !•••••কিন্তু শ্রুতি! .. তুই মাঝে থেকে
কি কাণ্ড কলি বল দেখি?
সীতা। সে কথা আর তুলিনি, বােন,
উর্মিলা। যেতে দাও......যেতে দাও......ছেলে মানুষ......
নকুলিকা। ও কিছু নয়,......একে এই দারুণ গরম••••••তার
ওপর নতুন বিরহ, তার ওপর ধূপের ধােয়।••••
একেবারে তেরস্পর্শ !••••••এতে মাথাটা একটু বেঠি
হবারই কথা। ঠিক থাকাই বিচিত্র।
সকলে। ও কিছু নয়। ••ও কিছু নয়......
# ৩
৯৮
ধূপের ধোঁয়ায়
[ নীচের তলায় শঙ্খ, ঝারি, চন্দন-মালা প্রভৃতি
নিয়ে সখীর দলের প্রবেশ ]
সখীর দল।
(গান)
কিছু নয়, ধূপের ধোঁয়ায় হঠাৎ কেমন
মাথাটা গেছল ধরে
মনে হয়, স্বপ্ন যেন চক্ষু মেলে
দেখেছি দিন দু’পরে !
কলহ দম্পতীর এই, দোষ কিছু নেই,
সবারি ঘটে এমন,
বিরহ বিদ্রোহী হয়, জ্বলে হৃদয়,
গােপনে গলে নয়ন।
খেয়ালে দেয়াল তুলে মনের ভুলে
মিছে রই মুখ ফিরায়ে,
শেষে ঠিক মেঘ কেটে যায়, চঁাদ হেসে চায়
নীরবে মন ভিড়ায়ে !
ধূপের ধােয়ায়
শারীকে পুরুষ নারী দুই দোহারি
আড়াআড়ি মােহের ঘোরে
হয়ে রয় হাসির কথা দ্বন্দ্ব-ব্যথা
চোখের জলে মুক্তা কোরে #
যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.