Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Hindu-darshan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
হিন্দু-দর্শন।
[ হাওড়ার সাহিত্য-সম্মিলনে
বেদান্ত-দর্শন”
সম্বন্ধে বক্তৃতা।
--- ---
মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত
শ্ৰীযুক্ত দুর্গাচরণ সাঙ্খ-বেদান্ততীর্থ
মহাশয়ের নি
“সাহিত্য-সম্মিলন।
৬নং কালীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেন, হাওড়া
‘পৃথিবীর ইতিহাস প্রিন্টিং ওয়ার্কস মুদ্রান্ত্রে -
ধীরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
নিবেদন পরম শ্রদ্ধাস্পদ মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিত যুক্ত দুর্গাচরণ শাখ বেদান্ত-তীর্থ মহাশয়, হাওড়ার সাহিত্য-সম্মিলনে” ‘বেদান্ত-দর্শন বিষয়ে বক্তৃতার জন্য অনুরুদ্ধ হন ; এবং তঁাহার সেই ধারা- বাহিক বক্তৃতার মর্ম তিনি লিপিবদ্ধ করিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশে জন্য সাহিত্য-সম্মিলনকে দান করিবেন—স্থির হয়। তাহার সেই মনােমদ মধুর বক্তৃতা যিনিই শুনিয়াছিলেন, তিনিই মুগ্ধ হইয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি তাহার সেই বক্তৃতা মৰ্ম্ম লিপিবদ্ধ করিয়া তাহার পাণ্ডুলিপি আমাদিগকে প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাই এই পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হইল। পুস্তিকা যে সর্বত্র সমাদৃত হইবে, তাহা বলাই বাহুল্য। সাঙ্খ্যবেদান্ততীর্থ মহাশয়ের এই বক্তৃতার জন্য হাওড়ার ‘সাহিত্য- সম্মিলন’ তাহাকে এক শত টাকা প্রণালী প্রদান করিয়াছিলেন। তিনি এখন, তাঁহার এই গ্রন্থদের স্বত্ব-মিত্ব হাওড়ার “সাহিত্য যমিলনকে দান করিয়া আশর্বাদেম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিলেন। তাঁহার এই আশীর্বাদে হাওড়ার ‘সাহিত্য-সম্মিলন’ তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিল। ইতি ৪ঠা চৈত্র, ১:৩৫ সাল। “সাহিত্য-ম্মিলন।” (ডিউক লাইব্রেরী।) হাওড়া। } নিবেদক এহর্গাদাস লাহিড়ী (শৰ্ম্মা)। ‘সাহিত্য-সম্মিলনের সম্পাদক।
বেদান্ত-দর্শন যাহার উপর প্রতিষ্ঠিত, সেই বেদান্তশাস্ত্র এতই বিস্তৃত
ও বহুশাখায় বিভক্ত যে, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে সে সমুদয়ের সম্পূর্ণ
ভাবে আলােচনা বা সে সফলের বিষয়-বিশ্লেষণ-পূর্বক বর্ণনা কর।
কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না; সেই কারণে বেদান্ত-সম্বন্ধে
দার্শনিক মতবাদ-সকল কেবল এখানে আলােচনার্থ উপস্থাপিত
এবং সম্ভবপর হইশে অপরাপর বিষয়েও অবতারণ;
করিতে ক্রটি করিব না।
করিব ।
হিন্দু-দর্শন। সূচনা। কোনও দর্শন বা দার্শনিক তত্ব আলােচনা করিতে হইলে, প্রথমেই দর্শনের স্বরূপ, লক্ষ্য ও প্রােচ্ছন, এই তিনটা বিষয় উত্তম রূপে নিরূপণ করার আবশ্যক হয়; কিন্তু বর্তমান প্রবন্ধ সে সকল নিষয়ের পূর্ণমা নয় আলোচনা করা সম্ভবপর হইবে না। এই কারণে এ ক্ষেত্রে সংক্ষেপঃ ঐ তিনটী বিষয়ের কথা পরি- সমাপ্ত করিয়া প্রস্তাবিত বিষয়ের অবতারণা করিব। দর্শনের স্বরূপ বা পরিচয়। দর্শন শব্দের যৌগিকাৰ্থ ধরিয়া বিচার করিলে দেখা যায়, দর্শন শব্দটা ‘দৃশ্য ধাতু হইতে করণবাচ্যে অনঢ় প্রত্যয়যােগে নিষ্পন্ন হইয়াছে। দৃশ, ধাতুর সহজ অর্থ-প্রেক্ষণ। প্রেক্ষণ’ শব্দের অর্থ চাক্ষুষ জ্ঞানচক্ষুরিন্দ্রিয়ের দ্বারা যে জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়, তাহা। কিন্তু ব্যবহার-দৃষ্টে জানা যায় যে, কেবল চাক্ষুষ জ্ঞানই উহার একমাত্র অর্থ নহে, পরন্তু জ্ঞানমাত্রও উহার অপর একটী অর্থ।
२ হিন্দু-দর্শন। ইহা আধুনিক কল্পনাপ্রসূত কথা নহে। প্রাচীন বৈয়াকরণ পণ্ডিত- গণও এইরূপ দুর্থ অঙ্গীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন । তাহারাও ‘দৃশেরপি জনবচনত্বাৎ' বলিয়া দৃশ,ধাতুর সাধারণ জ্ঞানার্থতায় সম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছেন। সুতরাং দৃশ ধাতৃর জ্ঞানার্থতা করুন অনুচিত বা অপ্রামাণিক হইতে পারে না। অতএব ‘র্শন’ শব্দের এরূপ অথ করা অসঙ্গত হইবে না যে, যাহা জ্ঞানসাধন অর্থাৎ মানুষ যাহার দ্বারা প্রকৃত তত্ব জানিতে পারে, তাহার নাম-দর্শন। ন্যায় বৈশেষিক প্রভৃতি শাস্ত্রসমূহ তথাবিধ জ্ঞানলাভে সহায়তা করে। এই জন্য ঐ সকল শাস্ত্র ‘দর্শন নামে পরিচিত। এখানে বলা আশক যে, য'দও উল্লিখিত যৌগিকাথানুসারে জ্ঞানসাধন শমাত্রই দর্শন নামে পরিচিত হইবার যােগ্য হইতে ; তথাপি ভারতীয় আচাৰ্য্যগণ এস্থলে তাদৃশ উদার অর্থ গ্রহ ণ করিতে সম্মত হন নাই। তঁাহারা বলিয়াছেন,-জ্ঞান- সাধন শাস্ত্র এই দর্শন মধ্যে পরিগণনীয় নহে ; পরন্তু যে সকল শাস্ত্রের উপদেশ বলে, জীব জগৎ বা আত্মা ও অনাত্মার যথার্থ স্বরূপ জানিতে পারা যায়, এবং বন্ধ মােক্ষ ও তাহার উপায় সকল অবধারণ করতে পারা যায়, অর্থাৎ যে সকল শাস্ত্রের সাহায্যে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষের ন্যায় এমএমদ শূন্য নিঃসন্দিগ্ধ জ্ঞান লাভ করা যায়, কেবল সেই সকল শাস্ত্রই দশন নামে পরিগণিত হইবার যােগ্য। প্রচৎ ন্যায়-বৈশেষিকাদি শাস্ত্রই ঐ প্রকার জ্ঞানােৎ- পাদনের প্রকৃষ্ট সাধন। এইজন্য ঐ সকল শাস্ত্র ‘দর্শন নামে পরিগণিত ও আদৃত ইয়াছে। কেহ কেহ মনে করেন,প্রসিদ্ধ নাস্তিক সম্প্রদায়ই দর্শন শাস্ত্রের প্রথম প্রবর্তক, এবং সংস্কৃত সাহিত্যে দর্শন শব্দের প্রথম হিন্দু-দর্শন। প্রবর্তকও তাঁহারাই। কারণ, নাস্তিকগণ প্রত্যক্ষের অতিরিক্ত অপর কোনও প্রমাণের অস্তিত্ব বা উপযােগি তা মােটেই স্বীকার করেন না, এবং স্বীকার করিবার প্রয়ােজন আছে বলিয়াও মনে করেন না। সৰ্ববাদিসম্মত প্রত্যক্ষ প্রমাণের সাহায্যেই সৰ্ববিধ জাগতিক ব্যবহার নির্বাহের প্রয়াস পাইয়া থাকেন। প্রত্যক্ষ ছয় প্রকার। তন্মধ্যে চক্ষুদ্বাৰা যে প্রত্যক্ষ নিম্পন্ন হয়, সেই চাক্ষুষ প্রত্যক্ষই সাধারণতঃ নির্দোষ ও সত্যগ্ৰাহী; এই জন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণই সর্বাপেক্ষা অধিক গান। সেই কারণে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ- মূলক তঁাচ্চাদের সিদ্ধান্থসমূহ প্রথমে ‘দর্শন’ নামে অভিহিত হইত ; পরে গতানুগতিক নিয়মে আস্তিক পণ্ডিতগণের বিচারমূলক সিদ্ধান্ত শাস্ত্রসমূহও দর্শন’ নামে পরিচিত হইতে লাগিল। ইহাদের মতে নাস্তিক সম্প্রদায়ই প্রথমে দর্শন শব্দের ও গর্শন শাস্ত্রের প্রথম প্রন করে, পরে নাস্তিক মতবাদের খণ্ডনােদ্দেশ্যে বিরচিত আস্তিক শনালর আবির্ভাব হয়। প্রকৃতপক্ষে এরূপ সিদ্ধান্ত বিশেষ বিচারসহ বলিয়া মনে না। কারণ উল্লিখিত কল্পনার অনুকূলে যথেষ্ট পরিমাণে মৌলিক প্রমাণ দেখিতে পাওয়া যায় না; পক্ষান্তরে এ কথার বিপক্ষে অনেক প্রমাণ দেখিতে পাওয়া যায়। প্রাচীন প্রামাণিক শাস্ত্র আলােচনা করিলে জানা যায় যে, আত্মদর্শনই প্রচলিত দর্শন শব্দের মুখ্য অর্থ। সেই অর্থের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই প্রাচীন পণ্ডিতগণ দর্শন’ শব্দের প্রয়ােগ করিতেন। প্রসিদ্ধ ন্যায় বৈশেষিক প্রভৃতি শাস্ত্রগুলিও আত্মদর্শনেদ্দেশ্যে বিরচিত হইয়াছে বলিয়াই ‘র্শন নামে অভিহিত হইয়াছে। দেখা যায়, প্রসিদ্ধ উপনিষদ শাস্ত্রগুলি আত্মদর্শনবিষয়ক উপদেশে পরিপূর্ণ এবং তাহারই হিন্দু দর্শন। অলৌকিক মহিমাময় গুণকীর্তনে ব্যাপৃষ্ণ। মুসারে অনুমান করা যাইতে পারে যে, চার্বাক সম্প্রদায় আবির্ভূত হইবা বহুকাল পূৰ্বে বৈদিক উপনিষদ শাস্ত্রই এদেশে আত্মর কথা জন- সমাজে সর্বপ্রথমে প্রচার করে। পরবর্ত্তী দার্শনিকগণ উপনিষ হইতেই উপাদান সংগ্রহ করিয়া বিভিন্ন গ্রন্থ প্রণয়পূর্বক দর্শন- শাস্ত্রের অঙ্গপুষ্টি সম্পাদন করিয়াছেন। প্রসিদ্ধ বৃহকাণ্যক নামক উপনিষদে যাজ্ঞবল্কা-মৈত্ৰেীসংবাদ নামে একটি প্রকরণ আছে। সেখানে দেখা যায়, শেষ জ্ঞান- নিধি মহর্ষি যাবা যখন সন্ন্যাস গ্রহণে সঙ্কল্প হয়। স্বীয় পত্নীদ্বয়কে নিজ সম্পত্তি বন্টন করিয়া দিবার প্রস্তাব করেন, এখন তিনি আপনার নিদূষা ঃী মৈত্রেয়ীর প্রশ্নোত্তর নন প্রসঙ্গে তঁাহাকে সম্বােধন করিয়া বলিয়াছিলেন যে, -- “আখ বা তার দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্য: মন্তব্য: নিদিশাসনতব্য ত্যাদি। ইহার অর্থ এই যে,-মৈত্রেয়ি, আত্মাকে দর্শন করিতে হয়। অর্থাৎ মনুষ্যকে আপনার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করিতে হইবে এবং তদুদ্দেশ্যে আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিবে, মনন করিবে ও নিদিধ্যাসন বা ধ্যান করিবে। উক্ত বাক্যে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য প্রথমেই আত্মদর্শনের উপদেশ করিয়াছেন; পরে তাহারই উপায়রূপে ক্রমে শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের আদেশ করিয়াছেন। অভিপ্রায় এই যে,-প্রথমতঃ বেদ ও আচাৰ্য বাক্য হইতে আত্মার প্রকৃত তত্ব শ্রবণ করিতে হয়। বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রেরই শ্রুতি বিষয়ে সংশয় ও বিপরীত জ্ঞান হইয়া থাকে বা হইতে পারে। যতক্ষণ সেই সংশয় ও ভ্রান্ত জ্ঞান অপনীত W , ততক্ষণ সে বিষয়ে কাহারও প্রবৃত্তি বা চেষ্টা জন্মিতে পারে তাং থিয় নিদিধ্যাসন (ধ্যান) করা সম্ভবপর হয় না।
হিন্দু-দর্শন। সেই কারণে এত বিষয়ে মনন করার আবশ্যক হয়। মনন অর্থই যুক্তি ও তর্কের সাহায্যে সমুৎপন্ন সংশয়াদি নিরসন পুৰ্ব্বক শ্রুত বিষয়ের সত্যতাবধারণ। অনন্তর সাক্ষাৎকারের উপযােগী ধ্যান (ণাত্মচিন্তা করতে হয়। একাগ্রতা-সহকারে আত্মতত্ত্ব চিন্তাই এখানে নিদিধ্যাপন কথার দুর্থ । উল্লিখিত উপনিষদ্বাক্যে আত্মদর্শনােপযােগী মননের উপদেশ সুস্পষ্ট রহিয়াছে। মনন স্বার্থ যে উপযুক্ত যুক্তিতর্কসমন্বিত বিচার ভিন্ন আর কিছুই নহে, সে কথা পর্বেই বলা কইয়াছে। প্রসিদ্ধ ন্যায়-বৈশেষকাদি এর কলেবরও ঐ জাতীয় যুক্তিতর্কে পরিপূর্ণ ; মনে হয়, এই কারণেই ন্যায়-বৈশেষিকাদি শাস্ত্রসমূহ ‘গর্শন নামে অভিহিত হইয়াছে। ঐ সকল শাস্ত্র যে আত্মদর্শনেপ. যােগ বিচার-বহুল, তদ্বিষয়ে বােধ হয় কাহারও মতভেদ নাই। ইহা হইতে এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া নিতান্ত অসঙ্গত বা অযৌক্তিক হবে না যে, ‘আত্মদর্শনই’ ‘দর্শন শব্দের মৌলিক অর্থ। যে সমুদয় শাস্ত্র প্রধানতঃ সেই আত্ম-দর্শনের সহায়তা-কল্পে রচিত ও প্রচারিত, সে সমুদয় শাস্ত্রও ‘দর্শন’ নামে অভিহিত ও পরিচিত হইয়াছে। গোতম, কণাদ প্রভৃতি ঋষিগণ যে ছয়টী গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তার সকল ৩ঃ ' প্রধানতঃ আত্মতত্ত্ব-নিরূপণে ব্যাপৃত। ওই হার দর্শন’ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়াছে। দশম-শা? নাকী সম্বন্ধে আরও অনেক প্রকার মন্তব্য প্রচলি অছ। (প দ ৫া কথার অবতারণা করিয়া পাঠক বর্গের দৈর্ঘ্যাচু ও ঘামতে চ্ছা করি না। বিশেষতঃ, দর্শনশাস্ত্র বলে যাহা বুঝিতে হয়, এেেশর শিক্ষিত সমাজ নিশ্চয়ই তদ্বিষয়ে সংশয় রহিত। ৩২ অকারণ অনুপযোগী বিষয়ের হিন্দু-দর্শন। আলোচনার কারা প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি করা উচিত হয় না, এবং তাহা আমাদের লক্ষ্যও নহে। এ জন্য এখানেই এ কথা পরি- সমাপ্ত করিয়া অন্য কথার অবতারণা করিতেছি। অতীতের ইতিহাস আলােচনা করিলে বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, প্রচলিত ন্যায় বৈশেষিক প্রভৃতি ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রসমূহ দিব্যদশী আর্য্য-ঋষিবৃন্দের অদ্ভুত প্রতিভা ও অলৌকিক চিন্তা- শক্তির অপূৰ্ব ফলস্বরূপ। ঐ সকল দর্শনশাস্ত্র প্রচারিত হইয়া এদেশের বিদ্বৎসমাজে একপ্রকার অভিনব চিন্তার ধারা আনয়ন করিয়াছিল; এবং লােকচক্ষুর অগােচরে যে সকল দুৰ্বিজ্ঞেয় সত্য বস্তু প্রচ্ছন্নভাবে লুকায়িত আছে, প্রস্তাবিত দর্শনশাস্ত্রই সে সকলের অনুসন্ধানােপযােগী নিষ্কণ্টক প্রশস্ত পথ প্রথমে প্রদর্শন করিয়াছিল। অধিকন্তু একমাত্র শাস্ত্রগম্য বিষয়েও যে, নির্দোষ তর্ক-যুক্তির যথেষ্ট উপযােগিতা আছে, তাহাও আলােচ্য দর্শনশাস্ত্র হইতেই উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে সত্য; তথাপি এ কথা বলা অসঙ্গত হইবে না যে, দার্শনিক তর্ক-চিন্তার উপাদান সকল অতি পুরাতন-"রণাতীত সময় হইতে ঐ জাতীর চিন্তাপদ্ধতি বিষৎ- সমাজে আত্মলাভ করিয়াছিল। বিশাল বারিধি-বক্ষে নিরন্তর উত্থান-পতনশীল তরঙ্গমালার ন্যায় বিচিত্র বিশ্ব-যন্ত্রের বিবর্তন-ধারা ও কাৰ্য-করণ-ভাব দর্শনের ফলে মনস্বী মানবমণ্ডলীর মানস মধ্যে অহরহঃ যে সকল চিন্তার তরঙ্গ প্রাদুভুত হইয়া মানবগণকে সমুচিত সুখ-দুখানুসন্ধানে ও হিতাহিতপ্রাপ্তি-পরিহারে নিয়ে- জিত করে, সর্বপ্রকার ব্যবস্থার প্রবর্তক সেই সকল চিতার এরাই প্রচলিত দর্শনশাস্ত্রের বীজ বা প্রধান উপকরণ। বর্তমান সময়ের ন্যায় স্মরণাতীত যুগেও যে এই জাতীয় চিন্তা- হিন্দু দর্শন। ৭ ৰাজ বিদ্যমান ছিল, এবং সুধীসমাজে সমাদৃত ও উপাদেয় বেধে গৃহীত হইত, তাহার প্রভূত নিদর্শন আমরা প্রাচীন গ্রন্থসমূহে দেখিতে পাই। বৈদিক উপনিষদের মধ্যে ইহার প্রভূত উদাহরণ দেখিতে পাওয়া যায়। এই কারণে প্রসিদ্ধ বেদশাস্ত্রকেই সমস্ত কান্তিক দর্শনের মূল ভিত্তি বলিয়া অনেকে অনুমান করিয়া থাকেন। উপনিষদ গ্রন্থ যখন বেদেরই অং বশেষ, তখন উক্ত প্রকার অনু. মান নিতান্ত অসঙ্গত বা অযৌক্তি : বলিয়া মনে হয় না। • শ্রৌতশাস্তু-প্রণেতা মহর্ষি আ শখৰ বেদবিদ্যার পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে বলিয়াছেন - “মন্ত্র-ব্রাহ্ম যােবেদনামধেয়ং।” অর্থাৎ,-মন্ত্রভাগ ও ব্রাহ্মণ ভাগ, এতদুভয়ের সম্মলিত নামবে। সুতরাং ‘বেদ” বলিলে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ, এই উভয় ভাগই বুঝিতে হয়। বেদের মন্ত্র ভাগ সাধারণত সংহিতা ও কর্মকাণ্ড নামে, আর ব্রাহ্মণ- ভাগ-ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। এখানে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ এ কথায় আদৌ সন্তুষ্ট নহেন। তাহারা বলেন, মন্ত্রময় সংহিতা-ভাগই প্রথমে বিরচিত হইয়াছিল ; ঐ ভাগই যথার্থ ‘বেদ” শব্দবাচ্য ; পরে সমাজ- মধ্যে যেমন যেমন জ্ঞানালােক গদ্ধিত হইয়াছিল, তেমনি বেদা- সালে ক্রমশঃ সমুন্নত প্রণালীতে অধ্যাত্মচিন্তাপূর্ণ আরণ্যক ও উপ- নিষদ প্রভৃতি সুচিন্তিত গ্রন্থরাশি বিরচিত ও প্রচারিত হইয়া প্রাচীন বেদ-শাস্ত্রের কুক্ষিগত হাছিল। স্বকপোল-কল্পিত এই সিদ্ধান্তের অনুকুলে তঁাহারা চতুষুগের অতিরিক্ত আরও কতকগুলি অভিনব যুগ কল্পনা করিয়া থাকেন। যেমন বৈদিক যুগ, আরণ্যক যুগ, সূত্রযুগ প্রভৃতি। এই সকল অভিনব যুগের কল্পনা করিয়া তাহারা ৮ হিন্দু-দর্শন সরলচিত্ত মানবমণ্ডলীর হৃদষমধ্যে এক বিস্ময়-রসের সর করিয়া থাকেন। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, গতানুগতিশীল অম্মদেশীয় বহু- লােকও ঐ কথারই প্রতিধ্বনি করিয়া আত্ম প্রসাদ লাভ করিতে কুণ্ঠা বােধ করেন না। দুর্ভাগ্যদোষে আমরা কিন্তু এ মতের অনু- মােদন করিতে পারি না। আমরা জানি, কালস্রোতের ন্যায় বেবিজ্ঞা ও চিরন্থন-অনাদি। ইহার গুরুশিয-পারম্পর্য কখনও একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই। সেখানে যুগ কল্পনার কোনও অবসরই নাই। একই দেবি। সংহিতা ও ব্রাহ্মণ নামক দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছে, ব্রাহ্মণ জাতিই সাধারণতঃ বেদ ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন। এই সাদৃশ্য বশতঃ বেদ নিজেই নিজের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করিবার নিমিত্ত দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছেন, এবং যে ভাগে সংহিতার রহস্য সকল বিরোবে প্রকাশিত হইয়াছে, সেই ভাগ ‘ব্রক্ষণ’ নামে অভিহিত হইয়াছে। সংহিতা-ভাগের অর্থ ও তাৎপর্য প্রকাশক ব্রাহ্মণ-ভাগের মধ্যে যেমন সংহিতাক্ত যাগ-যজ্ঞ'দ ক্রিয়াকুষ্ঠানের কশ্য প্রণালী প্র? টি * হইয়াছে, তেমনি জীব, জগৎ, বন্ধু, মােক্ষ ও ব্ৰহ্মত প্রভৃতি বিশেষভাবে বর্ণিত ও মীমাংসিভ হইয়াছে। এইরূপ বিষয়ভেৰুে ও তাৎপর্যাভেদে ব্রাহ্মণভাগের মধ্যেও আরণ্যক ও উপ- নিষদ প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার আখ্যার সৃষ্টি হইয়াছে। একই উদ্ধ, এক লোকের প্রণীত একই গ্রন্থের যৎকিঞ্চিৎ ষয়- ভেদানুসারে যেরূপ পূর্বভাগ ও উত্তরভাগ কল্পিত হইয়া থাকে, ঠিক তদ্রুপ একই ব্রহ্মবিদ্যা-প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রকটিত বহুশাখায় বিস্তীর্ণ একই বেদশাস্ত্র মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ নামক দুইটা ভাগে বিভক্ত হইয়াছে মাত্র ; বস্তুতঃ উহারা বিভিন্ন প্রকৃতির পৃথক শাস্ত্র নহে।
৯ হিন্দু-দর্শন। উপরিউক্ত বেদশাস্ত্রের সর্বত্র, বিশেষতঃ উপনিষদভাগের মধ্যে, আলো: দার্শনিক চিন্তার উপকরণসমূহ স্তরে স্তরে বিন্যস্ত রহিয়াছে দেখিতে পাই। উপনিষদের অধিকাংশ ভাগই দর্শনােচিত চিন্তায় পরিপূর্ণ, এবং প্রায় সমস্ত উপনিষদেই বিভিন্ন দর্শনের সূক্ষ্ম সূত্ৰসমূহ বিক্ষিপ্তভাবে বিন্যস্ত দেখিতে পাওয়া যায়। এই কথা সমর্থনের জন্য ছাপোগোপনিষদের ষষ্ঠ প্রপাঠক ও বৃহদারণ্যকোপ- নিষদের জনক-যাজ্ঞবল্ক্য-সংবাদ প্রভৃতি অংশগুলি বিশেষ উল্লেখ- যােগ্য মনে করি। তবে সময় ও সামাজিক tiহানুসারে সে সময়ে -সভ্যতত্ত্ব-সমূহকে অকারণ কর্কশ তর্কের দ্বারা পরীক্ষা করিবার আ ক ছিল না । তৎকলে শুদ্ধশান্ত সালস্বভাব ভারতীয় না- নারীর হৃদয়াকাশে শান্তিময় শশধর চরবিরাজমান ছিল, শাস্তির স্নিগ্ধাজ্ঞ সুধাস্বাদে সকলেই সন্তুষ্ট ছিল। তখন নাস্তিকতা- পিশাচী তাদের ত্রিসীমায়ও পদার্পণ করত না সকলেই পরমার্থ- সত্যাবেদ ক বেদবাক্যকে গুরু :কের ন্যায় নিঃসংশয়চিত্তে পরমাদরে গ্রহণ করি এবং তদনুসারে সাধন-পথে *গ্রসর হইত। সকলেই সেই দ প কল্পপাদপে শ্ম ও ছায়ায় সমাসনি থাকিয়া আপন তপন - ৪ -সম্প-পূরক শোকতাপদগ্ধ হৃদয়ে শান্তিনুদাবাদে কৃতার্থতা লাভ কর; সুতরাং সে সময়ে বৰ্ত্তমা কালীন ককশ পদ্ধতির সরণ করবার আবশ্যকতাই অনুভূত হইত না। পতে যখন ম মহিম কালচক্রের অমােঘ অবৰ্ত্তনে সে অবস্থার বিপর্যয় ঘটল, ভারতীব সে সুখ • দ্রার অবসান হইল—দেখিতে দেখতে সমস্ত সৎ• যেন কলুধিত হইতে লাগিল। ক্রমশ ভারতৰ নিয়নিস, কাশে সংশয়-মেঘের সূক্ষ্ম রেখা প্রকটিত হিন্দু-দর্শন। হইল। বিতণ্ডাবাদরূপ বিষম বাত্যাসহযোগে সেই সু মেঘ- রেখাই বিষম জলহজালে পরিণত হইয়া দেশমধ্যে খােতর দুর্দিনের সঞ্চার করিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে নাস্তিকতা-পিশাচীর তাণ্ডব লীলার আবির্ভাব হইল; প্রবল কুতর্কস্রোতে সনাতন ধর্মসেতু বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হইতে লাগিল; অনাচার আবর্জনায় চিরপরিচিত সৎপথ সকল পঙ্কিল ও দুর্গম হইয়া পড়িল, এবং শান্তশীল সাধুহৃদয়ও দিন দিন কুতর্ক-কালিমা-স্পর্শে মলিন হইতে মলিনতর হইতে লাগিল। ফলে, জগন্মঙ্গলময় বিশাল বেদতরু তখন ছিন্ন-ভিন্ন বিপর্যস্ত হইয়া অভূতপূর্ব অবস্থায় উপনীত হইল। এবংবিধ বিষম বিপর্যয় দর্শনে মহাসাগরের ন্যায় প্রশান্ত-হৃদয় ঋষিসমাজ সমধিক ক্ষুব্ধ ও চঞ্চল হইয়া পড়িলেন, এবং সমবেত চেষ্টায় উপস্থিত বিপৎপ্রতিকারে বদ্ধপরিকর হইলেন। তাহারা প্রথমেই সৰ্ব্বার্থের নিদান নান্ত- ফতানিবাসের নিমিত্ত, প্রতিপক্ষ-জয়ের অমােঘ অস্ত্রস্বরূপ দর্শন- শাস্ত্র-প্রণয়নে মনােযােগী হলেন। ক্রমে গােতম, কণাদ, কপিল, পতল, জৈমিনি ও বেদব্যাস-বেদের ধ্রুবসত্যতত্ত্বরাশি মুশৃঙ্খল ভাবে যথানিয়মে সঙ্কলনপূর্বক ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, পাতঞ্জল, পূর্ব-মীমাংসা ও উত্তর-মীমাংসা নামে পৃথক পৃথক ছয়খানি উৎকৃষ্ট দর্শনশাস্ত্র প্রণয়ন করিলেন। ফলকথা, সমস্ত বেদে যাহা ছিল বা আছে, ষড়দর্শনে তাহার অতিরিক্ত কিছুই নাই। । বিশেষ এই যে, বেদে যাহা সংক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত বা অস্পষ্টভাবে ছিল, গােতমাদি ষিগণ সেই সমুদায় তত্ত্বই একত্রিত করিয়া বিস্তৃতভাবে সুশৃঙ্খলরূপে স্পষ্টভাষায় সন্নিবদ্ধ করিয়াছেন, এবং বিশুদ্ধ তর্ক, যুক্তি ও প্রমাণ দ্বারা পরীক্ষিত ও সুব্যবস্থিত করিয়া, বিশ্বাসহীন তর্কপ্রিয় লােকদিগের সমক্ষে হিন্দু-দর্শন। ১১ উপস্থিত করিয়াছেন মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তাঁহারা অবৈদিক কোনও নূতন তত্ব আবিষ্কার করেন নাই। একই প্রদেশ হইতে বিনিৰ্গত পার্বত্য নদীসকল যেমন বিভিন্ন পণে ও বিভিন্ন প্রকারে দূরদেশে প্রসূত হইয়া এবং বিভিন্ন প্রকার নামরূপ প্রাপ্ত হইয়াও মহাসমুদ্রে সম্মিলন বা আত্মসমর্পণরূপ প্রধান উদ্দেশ্য কেহই বিস্মৃত হয় না; তেমনি বেদশাস্ত্ররূপ একই মূলস্থান হইতে নিঃসৃত ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রসমূও নানা পথে, নানামতে বিভক্ত হইয়াও, আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তি বা ব্ৰহ্মপ্রাপ্তিরূপ চরম লক্ষ হইতে কেহই বিচ্যুত হয় নাই এখানে আর একটা কথা বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, তম ও কণাদ প্রভৃতি প্রণীত ন্যায় ও বৈশেষিক প্রভৃতি গ্রন্থনিশ্চয় আত্মদর্শনের অনুকুল উপায় প্রদর্শক বলিয়া ‘দর্শন’ আখ্যা লাভের সম্পূর্ণ অধিকারী হইলেও কে কবে কোন শুভ-মুহূর্তে যে ঐ সমুদয় গ্রন্থের উপর ‘দর্শন’ শব্দের প্রয়ােগ করিয়াছিলেন, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা বড়ই কঠিন । চীন অষ-গ্রন্থে ঐরূপ অর্থে দর্শন’ শব্দের প্রয়ােগ বড় দেখা { না। প্রাচীন আচাৰ্যগণের মধ্যেও, একমাত্র জগদগুরু শ্রীমৎ শঙ্করাচাৰ্য্যকেই স্বীয় ভাষ্য মধ্যে স্থানে স্থানে দর্শন’ শব্দের উপ করিতে দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা হইতে কেহ কেহ মনে করেন যে, জৈন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ই দর্শন’ শব্দের প্রথম প্রবর্তন করিয়াছিলেন, পরে আতিক আচাৰ্য গণও গতানুগতিক-ন্যায়ে ঐরূপ অর্থে দর্শন শষের প্রয়ােগে অত্যন্ত হইয়াছিলেন। যাহা হউক, এ সম্বন্ধে সু গবেষণার ভার আমার মুযােগ পাঠকবর্গের উপরে সমর্পণ করিয়াই আমি নিশ্চিন্ত রহিলাম।
হিন্দু-দর্শন। হিন্দু দর্শনের লক্ষ্য। অনেকে মনে করেন, বুদ্ধিবৃত্তি পরিমার্জিত করা ও নীরস তর্কপরম্পরা শিক্ষার দ্বারা পরপক্ষ পরাজয়ের পথ প্রদর্শন করাই ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রসমূহের চরম লক্ষ্য। তদ্ভিন্ন দেশের কল্যাণকর দৈহিক বা মানসিক সমুন্নত, কিংবা ধনাগমের উপায় চিন্তা ও শিল্পবাণিজ্যাদির সম্প্রসারণ, অথবা দুঃখ-দারিদ্র্য-নিবারণ সম্পর্কে কোনও প্রকার উপায় নির্দেশ করা হিন্দুদর্শনের চিত্থাপথেও স্থান লাভ করে নাই। সুতরাং ঐরূপ পরকালসৰ্বস্ব ধন- শাস্ত্রগুলি দেশের সম্পূর্ণ অনুপযােগী ও অনিষ্টকর। কাজেই ঐ জাতীয় তর্কসার শাস্ত্রসমূহের আলােচনা সৰ্ব্বতােভাবে পরিত্যাগ করাই শ্রেয়স্কর। এ কথার উপরে বলিতে হয় যে, আর্যঋষিগণ জানিয়া শুনিয়াই উল্লিখিত বিষয় সমূহের আলােচনায় মনঃসংযােগ করেন নাই। কেন না, তারা বিলক্ষণরূপে বুঝিয়াছিলেন যে, জাগতিক সুখ- দুঃখ ও দুপায় সকল চিরকাল এরূপে আত্মপ্রকাশ করে না। যাহা একজনের পক্ষে মাদকের বস্তু, তাহাই আবার অপরের নিকট নাদরে উপেক্ষিত হইয়া থাকে। এই প্রকথ একই বস্তু কালভেদে একই ব্যক্তির নিকট প্রিয় ও অপ্রিয়রূপে অদৃত ও উপেক্ষিত হইয়া থাকে। অধিক কি, দেশ-কাল-পাত্র-নিৰ্বিশেষে সমভাবে সকলের নিকট প্রিয় বা প্রিয়ভাবে গৃহীত হইতে পারে, -এরূপ স্তু জগতে কোনকালে চুল না, বর্তমানেও নাই এবং সুদু শিষ্যক্তেও হইবে না। এই কারণেই সদাশয় ঋষিগণ ঐ সমুদয় অনির্দিষ্ট মূর্তি ভুদয়ের দিকে দৃকপাত না করিয়া এমন হিন্দু-দর্শন। একটা বিষয়কে দর্শনশাস্ত্রের চরম লক্ষ্য স্থির করিয়াছেন, যাহার সম্বন্ধে আপামর সাধারণ কোনও লােকরই ৰিপ্রতিপত্তি বা মতান্তর সম্ভবপর য় না বা হইতে পারে না। সেই বিষয়টা খার কিছুই নকে—ীবের আত্যন্তিক দুঃখ নিক্তি ও পরমানন্দ প্রাপ্তি। গতে প্রতিস্থ এমন কোনও লােক দেখা যায় না, যে লােক দুঃখের বিভীষিকায় কাতর হইয়া প্রতিকারের উপায় চিন্তা করিতেছে না। জগতে যদি কিছু পহাৰ্য্য বা বিদ্বেষের বিষয় থাকে, তবে তা দুঃখ ভিন্ন আর কি চুই নহে; আর যদি কিছু প্রার্থনীয় ৰা ভালবাসার বন্ধু থাকে, তাহাও দুঃখনিবৃত্তি বা পরমা- নন্দ প্রাপ্তি ভিন্ন আর কিছুই নহে। ইহাই মনুষেয়-~~-শুধু মনুষ্যের নহে-জীবসাধারণের ঐকান্তিক লক্ষ্য বা প্রার্থনীয় বিষয়। দুঃখ অপ্রিয় বলিয়াই দুঃখেৎপাদক বিষয়-সমূহও অপ্রিয় মধ্যে, এবং দুঃখনিবৃত্তি ও পরমানন্দ আমাদের প্রিয় বলিয়া ভৎসাধন-সমূহও সমানভাবে প্রিয়শ্রেণীতে পরিগণিত হইয়া থাকে। বলা আখ্যক যে, আনন্দলাভে অভিলাষবিহীন লােক জগতে দুলভ না হইতেও পারে; কিন্তু দুঃখশান্তি চাহে না, এরূপ লােক জগতে বস্তুতই দুভ-নাই বলিলেও অত্যুক্তি বা অসঙ্গতি হয় না। এই জন্যই আর্যঋষিগণ অনিশ্চিত-স্বভাব ঐহিক সমুন্নতিকে লক্ষ্য না করিয়া, যাহা ধনী দরিদ্র পণ্ডিত মূৰ্থ উত্তমাধম নির্বিশেষে সকলের পক্ষে সমানভাবে প্রার্থনীয়, যাহার উপায়ান্বেষণে জীবমাত্রেই ব্যাকুল, সেই দুঃখনিবৃত্তির প্রকৃষ্ট পথ প্রশনের নিমিত্ত দর্শনশাস্ত্রের অবতারণা করিয়াছেন।
হিন্দু-দর্শন। হিন্দু-দর্শনের শ্রেণীবিভাগ। হিন্দুদর্শনের সমষ্টি সংখ্যা ছয় হইলেও, বস্তুতঃ ঐ ছয়খানি গর্শন তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন-ন্যায়দর্শন দুই-এক গােতকৃত, জাপর কণাদকৃত। সাংখ্যদর্শন দুই-এক কপিল- কত, দ্বিতীয় পতঞ্জলিকৃত। মীমাংসা দর্শন দুই-এক জৈমিনিকৃত পূৰ্বমীমাংসা, দ্বিতীয় বেদব্যাসকৃত উত্তর-মীমাংসা। । ষড়দর্শনের পৌব্বাপৰ্য-চিন্তা। অতঃপর উক্ত ছয়থানি দর্শনের পৌৰ্ব্বাপৰ্য্য পৰ্যালোচনায় অবসর উপস্থিত। ষড়দর্শনের পৌঝাপৰ্য্য নিরূপণ করা খুব আবশ্যক হইলেও, উহা এতই নিবিড় তমসাবৃত যে, আমাদের ক্ষীণতর জানালােক সে অন্ধকার নিসপূৰ্ব্বক প্রকৃত তত্ত্ব নিরূপণ করিতে নিতান্তই অপটু বালিয়া মনে হয়। বলা বাহুল্য যে, ইতিহাস- রসিক পুরাতত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণ নিশ্চয়ই এ কথায় সন্তোষ লাভ করিবেন না। বর্তমান গবেষণার যুগে, সম্ভব হউক আর অসম্ভবই হউক, ঐ রকম একটা আলােচনা না থাকিলে প্রবন্ধের অসম্পূর্ণতা- দোষ দুর হয় না। এইজন্য প্রবন্ধের পূর্ণতা-সম্পাদনের জন্য অন্তত ‘বােধ হয় নিশ্চয়ই অথবা ‘সম্ভবতঃ খুব সত্য ইত্যাদি অর্থহীন কতিপয় শব্দবিন্যাস দ্বারাও প্রবন্ধের অসম্পূর্ণতা দূর করিতে হয়। এই জন্য আমাকেও বাধ্য হইয়। উক্ত অনধিকারচর্চায় হস্তক্ষেপ করিতে হইতেছে। দর্শনশাস্তুসমূহের পৌৰ্ব্বাপৰ্য-নিরূপণের প্রধান অন্তরায় হইতেছে এই যে, প্রায় প্রত্যেক দর্শনেই অপর দর্শনের প্রতি কটাক্ষপাত ও হিন্দু-দর্শন। তন্মতখগুনের সমধিক প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। ন্যায়দর্শন বৈশে যিকের মতে কটাক্ষ করিয়াছেন, বৈশেষিকও ন্যায়মতখণ্ডনে যত্ন করিয়াছেন। এইরূপ সাংখ্যদর্শন বৈশেষিক প্রভৃতির নামােল্লেখ করিয়াছেন, এবং মীমাংসার মতখনে অগ্রসর হইয়াছেন; তাহা রাও আবার অনুরূপ ব্যবহারে অপর সকলকে আপ্যায়িত করিয়া- ছেন। অধিক কি, পরমতখন বা তাহাদের প্রতি কটাক্ষপাত করা যেন দর্শনশাস্ত্রগুলির একটা অপরিহার্য কর্তব্য মধ্যে পরিগণিত বলিয়ান হয়। এই কারণেই দর্শনশাস্তু সমূহের পৌৰ্বাপৰ্য্য নিরূপণ করা দুষ্কর হইয়া পড়ে। দুষ্কর হইলেও উাদের পেৰ্বাপৰ্য্য নিরূপণ করা একেবারে অস্তব মনে হয় না। কারণ, দর্শনশাস্তুগুলি বিভিন্ন ঋষির দ্বারা বিভিন্ন সময়ে রচিত হইলেও, ঐ সকল দার্শনিক মতবাদ ঋষিগণের আবিষ্কারের ফল নহে। ঐ সমুদয় মতবাদ বহু পুরাতন-মরণাতীত কাল হইতেই সুধীসমাজে সমাদৃত বা উপেক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল; এবং সেই সমুদয় মতবাদের অনুকূল (সমর্থক) ও প্রতিকূল বিভিন্ন সম্প্রদায় চিরকালই বিদ্যমান ছিল। এ কথার অনুকূলে ছান্দোগ্যোপনিষদের অংশবিশেষ উল্লেখ করিতে পারা যায়। ছান্দোগ্যোপনিষদের ষষ্ঠ প্রপাঠকে, যেখানে উদ্দানক ঋষি নিজ পুত্র শ্বেতকেতুকে ব্ৰহ্মবিদ্যার উপদেশ দিয়াছেন, সেখানে তিনি জগতের কারণ নির্দেশ-প্রসঙ্গে শ্বেতকেতুকে সম্বােধন করিয়া বলিয়াছেন-“সদেব সােম্যেমগ্ৰ অসীৎ একমেবাদ্বিতীয়।” হে সােম্য, সৃষ্টির পূর্বে এই দৃশ্যমান জগৎ কারণ-স্বরূপ সৎ- ব্ৰহ্মরূপে বিদ্যমান ছিল। ইহার পরেই আবার পরমত উদ্ধার করিয়া বলিয়াছেন-“তকৈ অহং-অসনেবেদম আসীৎ। হে { হিন্দু দর্শন। সােম্য, এক শ্রেণীর লোকেরা বলেন---এই জগৎ সৃষ্টির পূর্বে অসৎই ছিল। তা শ্য, উদ্ধানক ঋষি এই অসৎকারণবাদী নাস্তিকমত খগুন করিয়া প্রথমােক্ত সৎকারণবাদই সমর্থন কৰিছেন। ইহা হইতে বেশ বুঝা যায় যে, ঐ সকল দার্শনিক মত বা তত্ত্ব চিরকাই এদেশে বিভিন্নারে প্রচলিত ছিল। পরে সদাশয় ঋষিগণ সমাজের কল্যাণার্থ সেই সমুদয় পুরাতন চিন্তারাশিকেই দেশকাল পাত্ৰাপারে সঙ্কলন পূৰ্ব্বক উপযুক্ত যুক্তিতর্ক সহযােগে বিবৃত করিয়াছেন মাত্র । এইরূপ সিদ্ধান্তু সমীচীন হইলে, ষড়দর্শন সঙ্কলনের পৌৰাপৰ্য্য নির্ধারণেরও একটা সুযােগ ঘটিতে পারে। গােতম। দেশে যে সময় বেদবিধি বিধ্বস্ত করিয়া ও চিরাচরিত সদাচার- পরম্পরা পদদলিত করিয়া দেহাত্মবুদ্ধি দ্রুতবেগে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল, এবং ভারতীয় নরনারীর হৃদয় হইতে পরলােকচিন্তা একেবারে অপসারিত করিবার উপক্রম করিতেছিল, তাহার ফলে অধিকাংশ লােকই যখন ইহকালসৰ্বস্ব হইয়া - “যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ। ভস্মীভূত দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ। ন স্বর্গে। নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ ॥” ইত্যাদি নাস্তিকবাদে সমধিক শ্রদ্ধা পােষণ করিতেছিল ; সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান, কর্ম ও উপাসনাদি বেদবােধিত সদনুষ্ঠানসমূহ দেশ হইতে মহাপ্রস্থান করিবার উপক্রম করিতেছিল, সেই স্মরণীয় ভয়াবহ ; হিন্দু-দর্শন। সময়ে মহর্ষি গােতমের করুণহৃদয় দুঃস্থ সমাজের কল্যাণ-সাধনে সমুদ্ধ হইল; মহর্ষি গোতম দেহাত্মবুদ্ধি-নিবাসে সচেষ্ট হইলেন। বিচক্ষণ চিকিৎসক যেমন রােগ ও রােগীর অবস্থানুসারে চিকিৎ সার ব্যবস্থা কয়েন, মহর্ষি গোতমও সমাঙ্গের তৎকালীন অবস্থাঃ- লারে দুরধিগম্য ব্রহ্মবিদ্যা প্রভৃতি সুক্ষ্ম-তত্ত্বের উপঃদশ অনুপযােগী ও অনর্থক বিবেচনা করিয়া সে পথ পরিত্যাগ করিলেন, এবং তদানীন্তন সমাজের যথার্থকল্যাণকরবােধে কেবল দেহাত্মবাদ- নিরসে ও তদনুকূল যুক্তিতর্ক-সঙ্কলনে আপনার শক্তি নিয়ােজিত কৰিলেন । তিনি পরিমার্জিত যুক্তিতর্কের সাহায্যে লােকদিগকে উত্তম- রূপে বুঝাইয়া দিলেন যে, দেহ মন প্রাণ প্রভৃতি সমস্তই জড়পদার্থ এবং অচেতন ও অনিত্য। অচেতন জড়পদার্থ কখনই চেতন আত্মার স্থান অধিকার করিতে পারে না; এবং আত্মা অনিত্য হইলে দৃশ্যমান বিশ্ববৈচিত্র্যও উপপন্ন হইতে পারে না। অতএব দেহ, মন, প্রাণ প্রভৃতি কেহই আত্ম-শব্দ-বাচ্য নহে। প্রকৃত আত্মা হইতেছে—দেহাদির অতীত, নিত্য ও চেতন। দেহেতে যে আত্মবুদ্ধি, তাহা সম্পূর্ণ ভ্রমাত্মক। এই মই জীবগণের সর্বানর্থের নিদান; এবং তাহার নিবৃত্তিই পরমশান্তিময় মুক্তি লাভের নিদান। অতএব এই অনর্থ নিবৃত্তির জন্য এবং প্রকৃত আত্মার স্বরূপাধিগমের নিমিত্ত সকলেরই তত্ত্বজ্ঞানের অনুশীলনে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক। মহর্ষি এই মহৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তদুপযােগী প্রমাণ-প্রমেয়াদি ষােড়শ পদার্থ নিরূপণ করিয়া বিশ্রাম লাভ করিলেন। তাহার পর মহামুনি কণাদের কথা। হিন্দ-দর্শন হিন্দু দর্শন। কণাদ। মহামুনি কণাদ দেখিলেন, গােতমের যুক্তিযুক্ত উপদেশে লোকের মতিগতি অনেকটা পরিবর্তিত হইয়াছে ; দেহাত্মবুদ্ধি সম্পূর্ণ- রূপে না হউক, কিয়ৎপরিমাণেও বিদুরিত হইয়াছে। কিন্তু এখনও নাস্তিক সম্প্রদায়ের পরমপ্রিয় স্বভাবকারণবাদ প্রভৃতি কতিপয় অনর্থব্রীজ অক্ষতদেহেই সমাজমধ্যে বিরাজমান আছে। এখন সে সমুদয়ের সমুচ্ছেদ করা একান্ত আবশ্যক। তাই তিনি গােমের অনুক্তাংশ-পরিপূণ মানসে পরমাণু-কারণবাদ সংস্থাপনে এবং তদুপযােগী অধ্যা বিষয় নিরূপণে সচেষ্ট হইলেন। তিনি স্বকৃত বৈশেষিক-ফশনে বিশদভাবে বুঝাইয়া দিলেন যে, স্বভাব কখনই এ বি'চত্র বিশ্ব-নিৰ্মাণের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করিতে পারে না। কারণ, স্বভাব নিজে অচেতন—হিতাহিত বােধশক্তি- বিহীন; সুতরাং সে কখনই ভালমন্দ বিচার করিতে পারে না, এবং তদনুসারে উত্তম কাৰ্য্যভেদেরও ব্যবস্থা করিতে পারে না। তাহার পক্ষে দেশকালনির্বিশেষে সর্বদা একপ্রকার কাৰ্য্য সম্পাদনই সম্ভবপর হয়, বৈচিত্র-সম্পাদন করা কখনই সম্ভব হয় না ও হইতে পারে না। অথচ দৃশ্যমান বিশ্বের বৈচিত্র্যরাশি আপামর সাধারণের প্রত্যক্ষসিদ্ধ। এক কথায়, উহা উড়াইয়া দিবার বা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বিশেষতঃ স্বভাবের স্বভাব পৰ্যালােচনা করিলেও এ মতের অসারতা সহজেই ধরিতে পারা যায়। সৃষ্টি করা অর্থাৎ পরমাণু- পুঞ্জকে পরস্পরের সহিত সম্মিলিত করাই যদি স্বভাবের স্বভাব হয়, তাহা হইলে কস্মিকালেও পরমাণুপুঞ্জের বিয়ােগ ঘটিতে পারে ;
হিন্দু দর্শন। ১৯ না; এবং সেই বিয়ােগের ফলে প্রনয়ও সম্ভাবিত হইতে পারে না পক্ষান্তরে পরমাণু-পুঞ্জকে বিষয়াজিত করাই যদি উক্ত স্বভাবের স্বভাব হয়, তাহা হইলেও চিরকাল প্রলয়াবস্থাই বিরাজ করিতে পারে, কখনও উহাদের সংযোগ-ফল সৃষ্টির সম্ভাবনা হইতে পারে এই সকল অনুপপত্তির ভয়ে যদি সংযোজন বিয়ােজন উভয়ই স্বভাবের স্বভাব ধরিয়া লওয়া হয়, তাহা হইলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য সি:দ্ধর পথ নিষ্কণ্টক হয় না। কারণ, তাদৃশ বিরুদ্ধ-স্বভাব-সম্পন্ন কোনও বস্তু কখনও কোথাও দৃষ্ট হয় না, এবং যুক্তির দ্বারাও সমর্থিত হয় না। অধিকন্তু, ঐরূপ বিরুদ্ধ-স্বভাব ভাব পদার্থ-দ্বারা সৃষ্টি-কাৰ্যাও সম্পন্ন হইতে পারে না। কারণ, যে মুহূর্তে সংযােজন- স্বভাব দুইটী পরমাণুকে সম্মিলিত কৰিৰে, সেই মুহূর্তেই তাহার বিয়ােজন-স্বভাব আবার ঐ দুই টী পরমাণুরই বিশ্লেষণ ঘটাইবে; কারণ সন্নিহিত থাকিলে কাৰ্য্য না হইবার পক্ষে যুক্তিযুক্ত কোনও কারণ দেখা যায় না। এ সকল আপত্তি খণ্ড’নর জন্য যদি স্বভাবেরও কার্য নিয়ামক অপর কোনও শক্তি-বিশেষাদি কল্পনা করিতে হয়, তাহা হইলেও সৃষ্টিকাৰ্যে স্বভাবের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা পায় না। অতএব উক্ত প্রকার স্বভাব কখনই : গৎ-সৃষ্টিশকূিঢ় ভার গ্রহণ করিতে পারে না; এই কারণে, নিত্য নিরবয়ব পরমাণু রাশিকেই জগতের আদি উপাদান-কারণ বলিয়া স্বীকার করিতে হয়; এবং জীবগণের পূর্বসঞ্চিত অদৃষ্ট-সহচর পরমেশ্বরকে সৃষ্টি কার্যে নিমিত্ত-কারণরূপে গ্রহণ করিতে হয়। জীবগণের প্রাক্তন অদৃষ্টানু- সারে জগতে সৃষ্টিবৈচিত্র্য উপস্থিত হয়, এবং প্রত্যেক পরমাণুতে বিশেষ’ নামক এক প্রকার পদার্থ আছে (যাহার দ্বারা পরমাণু সমুহের বৈণগণ্য রক্ষিত হয়, সেই ‘বিযে’ পদার্থের দায় হিন্দু-দর্শন। অজ্যমান বস্তুবাশির বৈচিত্র্য সাধিত হয়, এ কথা অনিচ্ছাপূর্বক স্বীকার করিতে হইবে। এততিরিক্ত যে সমুচ্চয় বিষয় গোতম ঋষি স্বকৃত ন্যায়শনে উত্তমরূপে প্রতিপাদন করিয়াছেন,যেমন দেহাতিরিক্ত নিত্য চেইন আত্মার অস্তিত্ব, সেই আত্মায় মুখঃখ দিভােগ ও বন্ধু- মোক্ষাদি ব্যবস্থা প্রভৃতি,-শেই সমুদয় বিষয়ে সম্মতি-পদাপূর্বক মহামুনি কণাদ বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। কপিল। কণাঙ্গের পই কপিলের কথা বলিতে হয়। মহামুনি কণা আপনার কর্ত্য সমাধা করিয়া বিরত হইলে পর, মহামুনি কপি অবসর বুঝিয়া কৰ্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। তিনি দেখিলেন, মর্ষি গো এম ও '' প্রচেষ্টায় ২ দুইখানি দর্শনশাস্ত্র (ন্যায় ও বৈশেষিক } এত ও প্রচারিত হইয়াছে ; ঐ উভয় দর্শনই লোক সমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হইয়াছে। উহাদের অপরিসীম এভাবে লোকের হৃদ হইতে দেহাত্মবাদ সম্পূর্ণরূপে অপনীত হইয়াছে ; নাস্তিকতাও তান্তর্হিত হইয়াছে, এবং লোকের মন অধ্যাত্মচিন্তার পথেও শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হইতেছে। সেই শুভ সময় ও সুযােগ বুঝিয়া কপিলদেব আরও কিঞ্চিৎদুর অগ্রসর হইলেন,-অধ্যাত্ম চিন্তার উপযােগ দিগদর্শনে মনোযােগী হইলেন। কপিলদেব আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিবার উদ্দেশ্যে সাঙ্খদর্শন প্রণয়ন করিলেন এবং তাতে বিবেকজ্ঞানােপযােগী প্রকৃতি-পুরুষের তত্ব সন্নিবেশিত্ত न হিন্দু দর্শন। তিনি স্বকৃত সাঙ্খদর্শনে উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিলেন যে, আত্মা দেহেন্দ্রিয়াদির অতীত নিত্য, চৈতন্য এবং কর্তা ভােক্তা ও দেহ- ভেদে ভিন্ন ভিন্ন,-শুধু ইহা জানিলেই আত্মার প্রকৃত তত্ব জানা হয় না; কারণ, আত্ন। যেমন দেহেক্রিয়াদির অতিরিক্ত, তেমনই সুখদুঃখাদিরও অতীত; কর্তৃত্ব ভোক্তত্ব প্রভৃতি বুদ্ধি-ধৰ্ম্ম গুলি অবিবেকবশতঃ আত্মাতে আরােপিত হয় মাত্র। চৈতন্য অত্মার গুণ বা ধ নহে, পরন্তু আত্মার স্বরূপ। আত্মা অঙ্গ ও উদাসীন কর্তৃত্ব ভোক্তত্ব ও সুখদুঃখদি ধর্ম গুলি প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বুদ্ধি প্রভৃতির ধৰ্ম্ম, কেবল অৰিযেকে। ফলে পুরুষগত বলিয়া ভ্রান্তি উপস্থিত হয় মাত্র। যত দিন বিবেক জ্ঞান উদিত হইয়া সৰ্বানর্থের নিদানভূত অবিবেকের সমূলে উন্মলন করতে না পারিবে, ততদিন ঐরূপ ভ্রান্তি-সহচর সুখদুঃখাদি ধর্মগুলি আত্মগত বলিয়া অবশ্যই প্রতীত হইবে। এই অবিবেক নিবৃত্তির জন্য বিবেক জ্ঞান-প্রকৃতি হইতে পুরুষের ( আত্মার) পার্থক্যবােধ হৃদয়ঙ্গম করিতে হইবে। () প্রকৃতি ও তাহার পরিণাম। স, রাঃ ও তমঃ নামে তিনটী গুণ বা শেলিক পদার্থ আছে। উক্ত প্রত্যেক গুণই নিত্য ও অনক্ত। উহাদের সমষ্টির নাম প্রকৃতি। সেই প্রকৃতিই সমস্ত জগতের উপাদান কারণ, কিন্তু উৎ। ক্ষায় ও বৈশেষিকোক্ত পরমাণু নহে। সঙ্খ্যমতে পরমাণু অনিত্য, সাবয়ব ও পরিচ্ছন্ন ; সুতরাং উহাও উৎপত্তি শীল,—নিত্য নহে। জাগতিক পরমাণু সমুহ সাদ্যোক্ত তন্মাত্র’ স্থানবী, কাজেই অনিত্য সাবয়ব পরমাণু কখনই নিখিল জগতের হিন্দু-দর্শন। আদি উপাদান হইতে পারে না; এই জন্য নিত্য প্রকৃতিকেই নিখিল জগতের মূল কারণ বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। প্রকৃতি নিত্যা হইয়াও পরিণামশীল; সুতরাং তার দৃশ্যমান জগৎও পরিণামশীল। কিন্তু প্রকৃতির ন্যায় জগতের অধিক কি ধূলিকণারও—অত্যন্ত উচ্ছেদ সম্ভাবিত হয় না; রূপান্তর হয় মাত্র প্রকৃতি অচেতন—বিচারশক্তিবিহীন হইলেও, চেতন পুরুষের সান্নিধ্যবশতঃ তাহাতে কাৰ্য্যশক্তি সন্ধ ক্ষিত হয়। ইহাকে ‘অন্ধ- পঙ্গু ন্যায় বলে। অঙ্ক দৃষ্টিশক্তিবিহীন—পথ দেখিতে পায় , আবার পঙ্গু ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হইয়াও ক্রিয়াশক্তি না থাকায় পথ চলতে পারে না; কিন্তু তাহারা উভয়ে মিলিত হইয়া যা পরস্পরকে সাহায্য করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই পথ চলিতে সমর্থ হইতে পারে,-পঙ্গু পথ দেখাইতে লাগিল, আর অঙ্ক তদনুসারে পথ চলিতে লাগিল। এইভাবে উহাদের উভয়ের সহযােগিতায় অভীষ্টস্থানে গমন যেমন সম্ভবপর হয়, তেমনি অচেতন প্রকৃতি ও নিষ্ক্রিয় পুরুষ, এতদুভয়ের সহযােগে কোনও কাৰ্য্যই অসম্ভব বা সাধ্য হয় না। এইরূপ ব্যবস্থানুসারে সাঙ্খার কপিলদেব নাস্তিক্যবাদবিমুগ্ধ তানীন্তন লােকদিগের কথ’ঞ্চৎ মনস্তুষ্টির জন্যই যেন জগৎকারণ পরমেশ্বরকে পর্যন্ত বাদ দিতে বাধ্য হইলেন। কেবল বিবে জ্ঞানের একান্ত উপযােগী দেহাতির আত্মার অস্তিত্ব, নিত্যত্ব, বিভুত্ব ও নিষ্ক্রিয়ত্ব এবং জন্মান্তরবাদ প্রভৃতি অত্যাবশ্যক বিষয় গুলি দৃঢ়তর প্রমাণ ও যুক্তিতর্ক সাহায্যে অতি উত্তমরূপে সংস্থাপন নিয়, তিনি আপনার কর্তব্য সমাপন করিলেন।
হিন্দু-দর্শন। পতঞ্জলি। এইবার মহামুনি পতঞ্জলির কথা বলিব। যে সময় কপিল দেবের সিদ্ধান্তবাদ ভারতীয় সভ্যসমাজে সমাদরে গৃহীত হইয়াছে ; অম্লাধিক পরিমাণে সকলেই সে মতে সম্মতিপ্রদান পূৰ্ব্বক তদুপদিষ্ট পথে ধীরভাবে অগ্রসর হইতেছে ; কেহই আর দেহাত্মবাদের কুহকে আত্মসমর্পণ করিতেছে না; সেই শুভমুহূর্তে মহামুনি পতঞ্জলির সদয় হৃদয় সমাজের কল্যাণ-চিন্তায় নিযুক্ত হইল। পলি মনে করিলেম-কপিলদেব অনুপযােগী-বোধে তৎ- কালে যে সমস্ত বিষয় বলেন নাই, অথবা অতি সংক্ষেপে উল্লেখ মাত্র করিয়া গিয়াছেন, এখন সেই সমুদয় অমুক্ত অংশের উপদেশ ও সংক্ষিপ্ত কথার বিস্তৃতি-বিধানের উপযুক্ত অবসর উপস্থিত হইয়াছে। এখন আর এ বিষয়ে উদাসীন থাকা উচিত নহে। এইরূপ চিন্তার পর তিনি কাৰ্ঘ্যে প্রবৃত্ত হইয়াই প্রথমে আত্মজ্ঞানের উপযােগ মােগ, যােগবিভাগ ও তৎসাধনার প্রণালীসমূহ উত্তমরূপে উপদেশ করিলেন; এবং যােগসিদ্ধির অঞ্চতম উপায়রূপে পরমেশ্বরের অবতারণা করিয়া, সাংখ্যশাস্ত্রের অসম্পূর্ণতার সমাধান করলেন। তথনও বেদান্তবেদ্য ব্ৰহ্ম বা উপদেশের উপযুক্ত সময় হয় নাই বিবেচনা করিয়া, কথিত ঈশ্বরকে কেবল ক্লেশকর্মাদিরহিত পুরুষ বিশেষমাত্র বলিয়াই ক্ষান্ত হইলেন এবং বিস্তৃতভাবে যােগ, যােগ- সাধনা ও যােগফল প্রভৃতি ময়ােপযােগী বিষয়-সমূহ নিরূপণ করিয়াই যােগদর্শন পরিসমাপ্ত করিলেন।
হিন্দু-দর্শন। জৈমিনি। এইরূপে ব্যায়বৈশেষিকাদি দর্শনের প্রচার-বাহুল্যের ফলে দেশে যখন নাস্তিকতার খরতর স্রোত ক্রমশঃ অবরুদ্ধ হইল, শনৈঃশনৈঃ জন্মান্তর চিন্তা আসিয়া লােকের হৃদয়শে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিল, এবং ঐহিক ভােগসুখের তীব্র বাসনা নিতান্ত ক্ষীণদশা প্রাপ্ত হইল; তখন মহর্ষি জৈমিনি ‘পূর্ব-মীমাংসা প্রণয়নে প্রবৃত্ত মীমাংসা মাত্রই সংশয়-সাপেক্ষ। যেখানে সংশয়, সেখানেই মীমাংসার প্রয়ােজন। সংশয় বা বিপ্রতিপত্তি না থাকিলে মীমাংসার কথা উঠিতেই পারে না। ইহা হইতে অনুমান করা যাইতে পারে বে, তখনও দেশের লােক বেদবাক্যের নিবৃঢ় প্রামাণ্য-সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হইতে পারে না, এবং “একমেবাদ্বিতীয় “সৰ্ব্বং খাদং ব্ৰহ্ম” ও “তত্বমসি” প্রভৃতি দ্বৈত ব্ৰহ্ম প্রতিপাদিক বাক্যসমুহের গুঢ় রহস্যও হৃদয়ঙ্গম করিবার উপযুক্ত ক্ষমতা লাভ করে নাই। বিশেষত, নিষ্কাম কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান ব্যতীত সে ক্ষমতা কাজ করাও সম্ভবপর হয় না; অথচ ভোগালপৰশ লোক- সকল সহজে নিষ্কাম কৰ্ম্মানুষ্ঠানেও প্রবৃত্ত হইতে চাহে না এই সব কারণে তিনি প্রথমতঃকেবাক্যের উপর জনসাধারণের অনুরাগ- বন্ধনের জন্য কৰ্ম্মানুজ্ঞানের উপর জোর দিয়া বলিলেন,- “আমায় ক্রিয়ার্থত্বদানৰ্থক্যমত দৰ্থান।” অর্থাৎ,যাগ-যজ্ঞাদি ক্রিয়-প্রতিপাদনই বেদের প্রধান উদ্দে যে সম্মন্তু বেদবাক্যে কৰ্ম্মানুষ্ঠানে উপদেশ নাই -- কেবলই প্রসিদ্ধ বস্তুর উল্লেখ আছে, সে সমস্ত বেদবাক্য নির্গক ; নির্ধক • হিন্দু-দন। বলিয়াই অপ্রমাণ। অতএব সে সমুদয় বাক্যের আলােচনায় কোনও প্রয়োজন নাই। বিহিত কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান ও নিষিদ্ধ করে পরিত্যাগ,—ইহাই দুঃখভাত লােকদিগের সর্ববিধ দুঃখ-প্রশমনের একমাত্র উপায় । অতএব যথানিয়মে সকলকেই বেদবিহিত কর্মের অনুষ্ঠান করিতে হইবে। গূঢ় অতি প্রায় এই যে, কামনার পরবশ লােকেরা প্রথমতঃ লােভে কৰ্ম্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইবে; এবং কৰ্ম্মানুষ্ঠানে আশানুরূপ ভোগ্য ফল লাভ করিয়া বেদবাক্যের সত্যতায় সন্দেহশূন্য হইবে। ক্রমে বেদোক্ত নিষ্কাম কৰ্ম্মানুষ্ঠানেও অনুরক্ত ও প্রবৃত্ত হইতে পারিবে। অনন্তর তাহাদের নির্মলচিত্তে ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসার কৌতূহল আপনা হইতেই জাগরিত হইবে। তথন দুই ব্রহ্মবিদ্যা গ্রহণ করা তাহাদের পক্ষেও সহজ ও অনায়াসসাধ্য হইবে। এই উদ্দেশ্যের বশবর্তী হইয়াই জৈমিনি মুনি লােকদিগকে লক্ষ্য করিয়া উপদেশ দিলেন যে,-বেদশাস্ত্র নিত্য, অপৌরুষেয় এবং স্বতঃপ্রমাণ। বেদোক্ত ক-কলাপই জীবগণের ইহপরালের সহায় ও সুহৃদ এবং সাংসারি সর্ববিধ দুঃখ-প্রতিকারের মােধ উপায়। স্বর্গ ই পংমানন্দধাম। সে স্বর্গধাম একমাত্র কলভ্য আত্মা নিত্য ও ৯ই কৰ্ম্মফলের ভােক্তা; এবং ভােগ্য জগৎ মিথ্যা মায়া-কল্পিত নহে; ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের উপদেশ করিয়া এবং জীবের কৰ্তব্যাকৰ্তব্য পথ নির্দেশ করিয়া, সুদৃঢ় বেদভিত্তির উপর সমস্ত ফৰ্ম্মকাণ্ডের বৃহৎ মণ্ডপ প্রতিষ্ঠা করিয়া, মহর্ষি জৈমিনি পূঞ্চীমাংসা পরিসমাপ্ত কাগলেন।
; হিন্দু-দশ। বেদব্যাস ও বেদান্তদর্শন। পরমমঙ্গলময় গােতমাদি ঋষিবৃন্দের অলৌকিক প্রতিভা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে যে সময় দেহাত্মবুদ্ধির ব্যানােহ দেশ হইতে বিদূরিত হইয়াছে ; প্রকৃতি-পুরুষের বিবেকজ্ঞান বিষয়ে লােকের সমধিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সুব্যবস্থিত হইয়াছে; চিত্তবৃত্তি- নিরােধের প্রকৃষ্ট পথ যােগসাধনেও লােকের আগ্রহ জন্মিয়াছে; এবং চিত্তের বিশুদ্ধি-সাধনের ও বিক্ষেপ- ( চাঞ্চল্য-) নিবারণের প্রশস্ত পথ কর্মকাণ্ডের উৎকৃষ্ট পদ্ধতিও লােকসমাজে বিশিষ্ট স্থান লাভ করিয়াছে ; কেবল, জীব-নিস্তারের প্রধান সহয়, শান্তিময় মুক্তিলাভের প্রকৃষ্ট সাধন এবং বেদের সারভূত ব্রহ্মবিদ্যা তখনও এক প্রকার অজ্ঞানের অন্ধকূপে লুক্কায়িত রহিয়াছে ; সেই শুভ সময়ে ভগবান নারায়ণাবতার কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ধরাধামে অবতীর্ণ হইলেন। তিনি অবতীর্ণ হইয়া, ব্ৰহ্মবিদ্যা উপদেশের উপযুক্ত অবসর উপস্থিত দেখিয়া, তদ্বিষয়ক উপদেশ-দানে মনোযোগী হইলেন। লােকের বােধসৌকর্যসাধনমানসে প্রথমে তিনি বেদবিভাগ-পূর্বক ঋক, যজুঃ, সাম ও অথৰ্ব্ব নামে চাৰিটী সংহিতা প্রচার করলেন। অনন্তৰ বেদসার ব্ৰহ্মণাত্মক উপনিষদের প্রকৃতার্থ-নির্ধারণের নিমিত্ত ব্ৰহ্মপুত্ৰ বা বেদান্তৰ্শন নামে পরম উপাদেয় উত্তর- মীমাংসা-প্রণয়নে প্রবৃত্ত হলেন। তিনি উত্তর-মীমাংসায় উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিলেন যে, বেদের প্রকৃত উপদেশ হইতেছে এই যে, “সদেব সােম্যেদগ্ৰ অসৗৎ-একমেবাদ্বিতীয়।” তুষ্টির পূবে একমাত্র দ্বস্তু ছিল ; তিনি এক ও অদ্বিতীয় অর্থাৎ তাহার সজাতীয় বা বিজাতীয় অপর কোন বস্তুই ছিল না, হিন্দু দর্শন। এবং বর্তমানেও নাই, এবং তাহার স্বগতভেদ বা অংশও নাই--- তিনি নিরবয়ব। “দৈক্ষত বহু স্যাং-প্রজায়েয় । তিনি স্থির করিলেন, “আমি বহু হইব—জন্মিব। তিনি সত্য যঙ্কল্প, তাঁহার ইচ্ছা-মাত্রে আকাশ, বায়ু, তেজ, জল ও পৃথিবী সুষ্ট হইল। এ সমস্তই সূক্ষ্ম পদার্থ,-ভােগের অযােগ্য। তাই তাহার পুনরায় সঙ্কল্প হইল- “হন্তাহমিস্তিস্রো দেবতা অনেন জীবেনাত্মনা অনুপ্রবিষ্ণু নামরূপে ব্যাকরবানি—তাসামেকৈকাং ত্রিবৃতং ত্রিবৃতং করণি ৯ অর্থাৎ,-এই যে ভূতবর্গ ( ছালোগো-তেজঃ, জল ও পৃথিবী এই তিন, কিন্তু তৈত্তিরীয় মতে-আকাশদি পৃথিবী পর্যন্ত পঞ্চ) সৃষ্ট হইল, আমিই জীবরূপে প্রবিষ্ট হইয়া এ সকলকে ‘ত্রিবৃৎ ( এ্যাত্মক-পঞ্চীকৃত। করিব ; অর্থাৎ পরস্পরের সংমিশ্রণে পঞ্চভূতকে জীবভোগ্য স্থানাকারে পরিণত করিব, এবং ইহাদের ব্যবহারােপযােগী ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করিব। এইরূপে স্বয়ং ব্রহ্মই জীবরূপে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া সুক্ষ্ম পঞ্চভূতকে জােগযােগ্য সুলাকারে পরিণত করিয়া নিজেই নিজকল্পিত জগৎ ভোগ করিতে লাগিলেন। এই সকল উক্তি হইতে বেদব্যাস বুঝাইয়া দিলেন-ব্রহ্মই একমাত্র সত্য বস্তু ; তাহার সজাতীয়, বিজাতীয় কিংবা স্বগত কোনও ভেদ নাই। তিনি অখণ্ড ও অনন্ত। এই জগৎ তাঁহারই সঞ্চ-প্রসূত। মানব স্বপ্ন সময়ে যেরূপ নিজের কল্পনাপ্রসূত আপ্ন-দৃশ্য দেখিয়া সুখ-দুঃখ অনুভব করে। আবার স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া হয়, হিন্দু-দর্শন। গেলে ঐ সমস্ত বস্তু অদৃশ্য হইয়া যায় এবং মিথ্যা বলিয়া প্রীত ঠিক সেইরূপ পরিদৃশ্যমান জগৎও কল্পনায় ; জীবগণ যতক্ষণ অজ্ঞান-নিদ্রায় অভিভূত থাকিবে, ততক্ষণ এই দৃশ্য প্রপঞ্চের বিরাম হইবে না,-অক্ষয় অজয় বলিয়া প্রীত হইবে। যদি কখনও সৌভাগ্য-বশে জীবের মায়া-নিদ্রা অন্তহিত হইয়া যায়; জীব যদি নিজে নিজের ব্রহ্মভাব-নিত্য-মুক্ত-স্বভাব বুঝিতে পারে, তবে তখন সে বুঝিতে পারিবে যে, এই জগৎ মায়াময় স্বপ্নদৃশ্যতুল) অসত্য; ব্ৰহ্মই পরমার্থ সত্য; এবং “অহং ব্ৰহ্মাশ্মি” -আমিও সেই ব্ৰহ্মস্বরূপ; সুতরাং নিত্যানন্দময় আমাতে আগাপাশীল- সুখদুঃখ-সম্ভাবনা কেবল ভ্রান্তিবিলাস মাত্র। তখন তাহার সমস্ত দ্বৈত-বিত্র বিদূরিত হইবে, এবং “ব্রহ্মবিদ ব্ৰহ্মৈব ভবতি”— এই শ্রুতিবচনের সার্থকতা উপলব্ধি করিয়া চিরশান্তিলাভে কৃতার্থ হইবে। বেদব্যাস এই পরমরমণীয় ব্ৰহ্মতত্ত্ব, তাহার বিবৃতি ও তদধি- গমের বিবিধ উপায়-মদমাদি সাধনসম্পত্তি, এবং তদনুকূল অন্যান্য বহু বিষয় উত্তমরূপে বিবৃত করিয়া দর্শন শাস্ত্রের চরম লক্ষ্য। ব্রহ্মবিদ্যা সুধীসমাজে প্রচার করিয়া দর্শনশাস্ত্রের পূর্ণতা সম্পাদন পূৰ্ব্বক আপনার কর্তব্য পরমাপ্ত করিলেন । বেদান্ত। অামরা বেদবিদ্যার কথা বলিতে যাইয়া গাবশ্যক-বােধে অনেক গুল প্রাসঙ্গিক কথা বলিয়া ফেলিয়াছি। আশা করি প্রাসঙ্গিক হইলেও সে সকল কথা তত্ত্বানুসন্ধিৎসু সুধীবর্গের নিতান্ত বিরক্তি হিন্দু-দর্শন। কর হবে না। যাহা হউক, এখন প্রাসঙ্গিক কথা পরিত্যাগ করিয়া প্রকৃত কথার অবতারণা করিতেছি। দোক্তশা---লেদের সারভাগ। যে দুৰ্বজ্ঞেয় ব্রহ্মতত্ত্ব বা ব্ৰহ্ম- বিদ্যা সমস্ত বেদশাস্ত্রের মধ্যে ফনদীর পয়ঃপ্রবাহের ন্যায় স্তরে স্তরে প্রচ্ছন্নভাবে বিরক্ত করিতেছে, অথবা দুগ্ধমধ্যগত নবনীতের প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করিতেছে, আচে নেদা’ তাহারই প্রকট মূর্তি বা অবস্থাবিশেষ মাত্র। উপনিয়ৎ শাস্ত্রে সেই বেদসার ব্রহ্মবিদ্যা প্রধানতঃ স্থানলাভ কৰিয় লোকবদ্ধির গোচরে আসিয়াছে। এই জল্প উপনিষৎ-শাস্তুই ‘বেদান্ত’ শব্দে মুখ্যার্থ-রূপে পরিচিত হইয়াছে। তাহার পর, আরও যে সকল গ্রন্থ সেই বেদাত্তবেদ্য ব্রহ্মবিদ্যর সমর্থনকল্পে নানাবিধ যুক্তিতর্ক ও মীমাংসার অবতারণা করিয়াছে, সেই সকল গ্রন্থও ‘বেদান্ত’ নামে পিিচত হইয়াছে। প্রসিদ্ধ বেদাহ্নদর্শন প্রভৃত গ্রন্থগুলিও এই শ্রেণীর বেদান্তমধ্যে পরিগতি। এই ভাবে গৌণ মুথা ভেদে বেদান্ত-শস্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া বিরাট আকার ধারণ করিয়াছে। ব্ৰহ্মবিদ্যাত্মক বেঙ্গান্তশাস্ত্র অপরিমার্জিত সাধারণ বুদ্ধির অগম্য- অতিশয় দুরূহ শাস্ত্র বলিয়া প্রসিদ্ধ। যাহার উপযুক্ত সাধন-সম্পত্তি- বিহীন নিতান্ত অশান্তহৃদয় লোেক, ইচ্ছাসত্ত্বেও তাহারা বেদান্তের গৃঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হয় না। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এত দুরূহ ও চুধিগম্য বেদান্তবিদ্যাও ভারতে সুধীসমাজে অপরিচিত বা অনালােচিত ছিল না, বরং পুরাতত্ত্ব পৰ্যালােচনার দ্বারা জানিভে পায় যায় যে, এ দেশে এমন এক পবিত্র সময় আসিয়াছিল, যে সময় দুরূহ বেদান্তবিদ্যা বিদ্বৎসমাজে জীবনের সাৱতর লক্ষ্যরূপে হিন্দু দর্শন। পরিগণিত হইয়াছিল, এবং বেদান্তশাস্ত্রের প্রচার-বহুলোর জন্তও সমধিক আয়ােজন হইয়াছিল। বেদান্তবিদ্যা যে এ দেশে কি পরিমাণে লোকের শ্রদ্ধা ও প্রতি আকর্ষণ করিয়াছিল, একটা মাত্র প্রাচীন প্রবচন পৰ্যালােচনা করিলেই তাহার কতকট। আভাস বুঝিতে পাা যায়। প্রাচীন মনীষিগণ আপনাদের অতিপ্রিয় বেদান্তবিদ্যার গুণগান করিতে যাইয়া তারস্বরে বলছিলেন- “সুপ্তেরাবৃতেঃ কালং নয়েদ্বোস্তুচন্তা।” অর্থাৎ, মােমী নিদ্রা-সমাগমের পূর্ব পর্যন্ত আৰু সৰ্ব্বংক - মৃত্যুর করল কবলে পতিত না হওয়া পর্যন্ত, বেদান্তচিন্তার সময় অতি- বাহিত করিবে। অর্থাৎ, আত্মহিতাকাঙ্ক্ষী পুরুষ যাৎ ব চিয়া থাকিবে এবং যাবৎ নিদ্ৰাপরবশ না হই। জাগরিত থাকবে, তাবৎকাল পমঙ্গলময় বেদান্তবিদ্যার অনুশীলন করিঙে থাকিবে, বেদান্তচর্চাকেই জীবনের সারতর অবলম্বন করিবে। এই উপদেশবাণী এ দের আদর্শভূত জ্ঞানবিজ্ঞাননিয়ত ও সত্য-সন্তোষাদি সাধনের নিত্য সহচরু সৰ্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসীমণ্ডলীর পূত কণ্ঠ হইতে শােকসন্তাপতপ্ত বিশ্বমানবের হিতার্থে উদঘাষিত হইয়াছিল, এবং ইহার দ্বারা দেশে দেশে বেদান্ত-বিদ্যার উজ্জ্বল আলােকমালা বিসর্পিত হইয়াছিল। উল্লিখিত একটামাত্র উপ- দেশবাণী হইতেই অনুমান করা যায় যে, তৎকালে এদেশে বেদান্ত, বিদ্যার প্রভাব, প্রতিষ্ঠা ও সমাদর কি পরিমাণে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছিল। যাহারা বেদান্তের অপূর্ব মহিমান্বিত রহস্যর হৃদয়ে ধারণ করিয়া আপনাদিগকে বিশেষভাবে গৌরবমণ্ডত করিয়াছিলেন, কঁহাদের পক্ষে বেদান্তের গুণকীর্তন করা কিছু আশ্চর্যের বিষয় হিন্দু-দর্শন। হইতে পারে; কিন্তু যাহারা আংশিক-ভাবেও বেদান্তের মৰ্ম্মগ্রহণ করিবার উপযুক্ত অবসর লাভ করে নাই, এবং সাধারণভাবেও উহার সহিত পরিচিত দুইবার সুযােগ পায় নাই, তাহারাও যে বেদান্তের অপূর্ব রহস্য-কথা শ্রবণ করিয়া সমধিক আদর, আগ্রহ ও আনন্দ প্রকাশ করিয়া থাকে, ইহা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। মনে হয়, বেদান্ত-শাস্ত্রেয় সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতশূন্য অসীম উদারতাই ত'দৃশ লােকানুরাগবৃদ্ধির নিদান। ভারতে এমন কোনও শাস্ত্র দেখতে পাওয়া যায় না, কিংবা ধর্মসম্প্রদায় দৃষ্ট হয় না, যাহার উপর বেদান্তের প্রভাব অল্পমাত্রও বিসর্পিত হয় নাই। এই কারণেই অতীতকালে বেদান্তের অসাধারণ প্রভাব ও প্রতিষ্ঠায় সদ্ভাব অমিত হয় । বেদান্ত-শাস্ত্রের অনন্যসাধারণ প্রতিষ্ঠার অপর কারণ এই যে, মৃত বেদান্ত শাস্ত্র প্রকৃতপক্ষে কোনও ব্যক্তিবিশেষের কপােল কল্পিত বা উদ্দাম কল্পনাপ্রসূত মতবাদ মাত্র নহে; উহা বস্তুতঃ স্বতঃপ্রমাণ অপৌরুষেয় বেদ-শাস্ত্রেরই সারভূত ( বৃহস্যাত্মক) অংশবিশেষ। বেদ-শাস্ত্র কখনই কোনও সম্প্রদায়-বিশেষের নিজস্ব সম্পত্তি নহে; উহা সকলেরই অধিকারভুক্ত; উপযুক্ত অধিকার অর্জন করিতে পারিলে সকলেই সমানভাবে উহার রসাস্বাদে সমর্থ হইতে পারে। অলোচ্য বেদান্ত-শাস্ত্র সেই বেদেরই সারভুত অংশ- বিশেষ বলিয়া উহাতে কোনও প্রকার সাম্প্রদায়িকতার সম্বন্ধ ৰা পক্ষপাত থাকা সম্ভবপর হয় না। মূল বেদান্ত যে, বেদেরই অংশবিশেষ, তাহা বেদ-ভাষ্যকার আপস্তম্বের উক্তি হইতেও জানিতে পারা যায়। বেদের স্বরূপ- নিরূপণ প্রসঙ্গে আপস্তম্ব বলিয়াছেন-"মন্ত্ৰব্ৰাহ্মণৰ্বেদনাম- হিন্দু-দর্শন। ধেয়,” অর্থাৎ মাত্মক সংহিতাভাগ আর মার্থ-প্রকাশক ব্রাহ্মণভাগ, এতদুভয়ের নাম ‘বে। এতদনুসারে বুঝা যায়, বেদ-শাস্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের নাম --মন্ত্র বা সংহিতা, অপর ভাগের নাম-রাহ্মণ। মন্ত্র ভাগ প্রধানতঃ কৰ্ম্ম ও তদুপযােগী মন্ত্র প্রধান, আর ব্রাহ্মণভাগ প্রধান মন্ত্রভাগের ব্যাখা-স্বরূপ, এবং যজ্ঞাদি ক্রিয়ার অনুষ্ঠান-পদ্ধতি ও ব্রহ্মদ্যিা প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ের প্রকাশক। আরণ্যক ও উপনিষদ প্রভৃতি উৎকৃষ্ট অংশ- গুলি এই ব্রাহ্মণ-ভাগেরই অন্তর্গত। বিশেষ এই যে, বেদের যে সকল অংশ প্রধানতঃ ব্রহ্মবিদ্যা- প্রকাশক, জীব জগৎ ও ব্রহ্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিদ্যা প্রকাশনে ব্যাপৃত, বেদের সেই সমুদয় অংশই ‘উপনিষদ’ নামে অভিহিত ও পরিচিত হইয়াছে। উপনিযৎ' শব্দের যৌক্তিক অর্থানুসারেই ঐরূপ বিশেষ ব্যবস্থার প্রবর্তিত হইয়াছে। এই জন্যই দেখা } আচার্যগণ উপনিষদ' শব্দের এইরূপ অর্থ নির্দেশ করিয়াছেন-“উপ’ অর্থ ঋন্ত্র ও সামীপ্য ; ‘নি অর্থ-নিশ্চয় ও নিঃশেষ ; ‘ষ অর্থ-বিশরণ, অবসাদন ও গমন। এই কয়টা ( উপ+নি+ষদের) সমুদিত অর্থ হইতেছে-যে বিদ্যা শী নিশ্চিতরূপে সংসারের সত্যতা বুদ্ধ শিখিল করিয়া দেয়, অথবা সংসারের নিদান অবিদ্যা ও তৎকাৰ্য-সংসার বন্ধনের অবসন্নতা ঘটায়, অথবা যে বিদ্যা অধিগত হইয়া জ্ঞাতাকে ব্ৰহ্ম সমীপে লইয়া যায়, সেই ব্ৰহ্ম-বিদ্যার নাম—উপনিষদ। তাদৃশ বিদ্যা ব্রহ্মবিদ্যা ভিন্ন আর কিছুই নহে। যে সমস্ত গ্রন্থে উক্ত ব্ৰহ্মবিদ্যা স্থান পাইয়াছে, সে সমুদায় গ্রন্থও উপনিষদ নামে অভিহিত হইয়া থাকে।
হিন্দু-দর্শন এয়, মন্ত্র-গের মধ্যেই হউক, আর ব্রাহ্মণ-ভাগের মধ্যেই হউক, সেখানেই ব্ৰহ্মবিদ্যার কথা মুখ্যভাবে স্থান পাইয়াছে, তাহাই উপনিষদ নামে পরিগণিত ও পরিচিত হইয়াছে। অধিকাংশ উপনিষদ ব্রাহ্মণ ভাগের অন্তর্গত কওে মাগে যে উছার অত্যন্ত প্রভাব আছে, তাহা বলতে পারা যায় না; কারণ, প্রসিদ্ধ ঈশােপনিষত্ প্রভৃতি গ্রন্থগুলি মন্ত্র ভাগেরই তৰ্গত। ভবে মন্ত্র- ভাগের মধ্যে উপনিষদের সংখ্যা যে খুই কম, সে বিষয়ে সন্দেহ উক্ত উপনিষদ শাস্ত্র বেদের সারসৰ্ব্ব স্ব ( ব্ৰহ্মতত্ব) দোহন করিয়া আত্ম প্রকাশ করিয়াছে; এবং যথাসম্ভব বেদের আদি মধ্য ও ও ওাগ অস্কৃত করিয়া রহিয়াছে। এই উপনিষদ ভাগই যে যথার্থ বেদান্ত এবং বেদান্ত অর্থ যে বেদেরই সনুভাগ, এ কথা আমরা প্রথমেই বলিয়াছি। বেদান্ত শকের এবধি অর্থের প্রতি লক্ষ্য রাখাই সদানন যতীন্দ্র বলিয়াছেন--“বেদান্তে। নাম উপনিষৎ-প্রমণ; তদুপকারীণি শারীরসূত্ৰীনি।” { বেদান্তসার ।। এখানে দেখা যায়, সদানন্দ যতীন্দ্র প্রধানতঃ বৈদিক উপনি- ভাগকেই মুখ্য বেদান্ত নামে অভিহিত করছেন, এবং উপ- নিষদের উপকারী বা তাৎপৰ্য প্রকাশক ব্ৰত্ৰ-বেদান্ত-দর্শন প্রভূতিকেও বেদান্ত মধ্যে পরিগণিত করিয়াছেন। তদনুসারে এই কারণে ভগবদ্গীতা প্রভৃতি অবৈদিক গ্রন্থও উপনিষদ্ নামে পরিচিত হইয়াছে। প্রসিদ্ধ ঈশােপনিষদ যজুৰ্বেদ-সংহিতার অন্তর্গত। কৌষিকী মন্ত্রোপনিষদ্ও বেদ-সংহিতারই অন্তর্গত। এই প্রকা আরও উপনিষদ আছে। হিন্দু র্শন -- ৩ ৩৪ হিন্দু-দর্শন। অধ্যাত্মদ্যিা-প্রকাশক সনৎ-সুজাতীয় সংবাদ ও ভগবদগীতা প্রভৃতি কতিপয় গ্রন্থ ও বেদান্ত-মধ্যে উচ্চ স্থান লাভ করিয়াছে। কিন্তু ন্যায়রত্নাবলী’ প্রণেতা ব্রহ্মানন্দ সরস্বতী এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ভাব প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন—শারীরক মীমাংসার (বেদান্ত-দর্শনঃ ) চারি অধ্যায়, এবং আচাৰ্য-প্রণীত •াষ্য, বাচস্পতি মিশ্র কত তৎটাকা, কত তৎটাকা, কল্পতরু নামক তদীয় টীকা করুকরুটী কাপরিমল,--এই পাঁচথা না এই বেদ পদবাচ্য। এখানে বসা মাপক যে, ব্রহ্মানন্দ সস্বতীর উ'খিত মতবাদ যুক্তিসঙ্গত বা সৰ্ব্ববাদিম্ম নহে। কারণ, উক্ত পাঁচ খানির অতিরিক্ত আরও ল ব গ্রন্থ বিদ্বৎসমাজে 'বেদান্ত’ নামে প্রচলিত তছে ; এবং বৈদ্যতিক অচায্যগণও বিক?ব্যয় সে সকল গ্রন্থ আদর ও এ দু। সঃ কারে অধ্যয়ন অধ্যান ওয়া থাকে। কেহ কে বা ঐ সকল গ্রন্থের ব্য: বাসীক্ষাও রচনা কর। গিয়াছেন; সু ৩রাং সে সকল গ্রন্থকে বেদান্তসংজ্ঞালাভে বঞ্চিত করা সম্ভবপর হয় না । কিন্তু তিনি যদি বেদান্ত শব্দে কেবল বেদান্তদর্শন মাত্র অর্থ করিয়া থাকেন, এবং তদনুসারে ঐরূপ উক্তি “বেদশাস্ত্রে!ত শারীরকমীমাংসা চতুরধ্যায়ীতদ্ভাষ্য -তদীয় টীকা বাচস্প্য—তদায় টাকা কল্পতরু-তদীয় টাকা পরিমলস্থ পঞ্চকেতা।” (ন্যায়রত্নাবণী)। + শঙ্করাচাৰ্য্যকৃত উপদেশসস্ত্রী, বিবেকচূড়ামণি, আত্ম- বােধ ও সব্ববেদান্তসিদ্ধাস্তুসার এবং সংক্ষেপঞ্জীরক, অবৈত- সিদ্ধি, সুখী প্রভৃতি গ্রন্থগুলি বেদান্ত ভাণ্ডারে উজ্জ্বল রত্নরূপে প্রকাশ পাইতেছে।
হিন্দুশন। করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তঁার উক্ত দোষাবহ মনে হয় না। কারণ দোস্ত দর্শনের দিক দিয়া দেখিতে গেলে ঐ পাঁচ খানি গ্রন্থের গুরুত্ব ও প্রভাব যে সর্বাপেক্ষা অধিক ও অবিসংবাদিত, সে কথা অস্বীকার কেিত পারা যায় না। জলােচ} বেদান্ত শাস্ত্র নি ভাগে বিভক্ত। উছার এক এক ভাগ প্রস্থান নামে অভিহিত করা হয়। প্রস্থান অর্থ - সাম্প্রদ{{ক বিভাগ। বোরে প্রথম প্রস্থান- ঘি ও প্রস্থান--ব্রহ্মপুত্র ; তৃতীয় প্রস্থান—ভগবদগী ও প্রভৃতি। উঃ ভিাগ অনুসারে শা, স্মৃতি ও তর্ক-তিনই শ। উপনিষদ, ; ; এই প্রকার প্রস্থান ভেদ নির্দেশ দ্বারা বিদ্যাধিগণের পাঠ, পাক। নির্দশ কৰা হইয়াছে। প্রথমে উপনিষদ প্রস্থান অধ্যয়ন করবে, পরে বেদান্তদর্শন পড়ি, অন্তুর ভবতা অধ্যয়ন করিয়া প্রকৃত সিদ্ধান্ত সংকলন করবে। এই জগ উপনিষদ শাস্ত্রকে বেদান্তের সূত্রস্থানীয়, ব্ৰহ্মসূত্রকে ব্যাখ্যা বা ভাষ্য-স্থানীয়, আর ভগবদগীতা প্রভৃতিকে উপসংস্থা নয় বলা হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, সমস্ত উপনিষদ শাস্ত্র লিলাড়ন পূৰ্ব্বক বেদান্তদর্শনের মধ্যে যে সারসিদ্ধান্ত সঞ্চিত হইয়াছে, মহর্ষি বেদব্যাস ভগবদ্গীতার মধ্যে তাহাই স্বল্পকথায় ও সরল ভাষায় গু পিষ-সংবারপে সান্নবদ্ধ করিয়াছেন। প্রাচীন অধ্যয়ন অধ্যাপনা প্রণালীও এই ক্রমেই সম্পন্ন হইত। প্রথমে উপনিষৎ শাস্ত্র পাঠ করত। পরে উপনিষদের মনাসা ও তাৎপৰ্য্য নির্ণয়ের • শেদ:গুদর্শন পাঠ কার৩, এ সর্বশেষে বেদান্তের রহস্য বা মাসদ্ধাও । ৩।বী ৩, আ ন +৩।
হিন্দু-দর্শন। এবার অন্তর্নিদিষ্ট রহিয়াছে বুঝতে হইবে। তন্মধ্যে উপনিষদ ভাগ হইতেছে সাক্ষাৎ শ্রুতি; ভগবদগীতা প্রভৃতি-স্মৃতি ; তার ব্ৰহ্মসূত্র (বোম্ভনশন) হইতেছে--তর্ক-স্বরূপ। এইরূপ বিভিন্ন প্রস্থানে বিভক্ত কইলেও, সকলেই লক্ষ্য বা অভিপ্রায় বিষয় এক-সেই ব্রহ্মবিদ্যা। বেদান্ত মতে বন্ধ ও আত্মা একই বস্তু; সুতরাং ব্রহ্মাদ্য, তন্ত্রবিদ্যা, অধ্যাখ দ্যা ফলত এই স্থির নাম-ভেদ মাত্র। জগতে বৃক্ত প্রকার বিদ্যা বিদ্যমান বা প্রসিদ্ধ আছে, তন্মধ্যে এই ব্ৰহ্মবিদ্যাই সৰ্ববিদ্যার সার-পাবিদ্যা ; তও যই বিদ্যা, সমস্তই অপরাবিদ্যারূপে পরিগণিত। পরাদ্যিার বিষয় এক { ); সুতরাং বিদ্যাও এক প্রকান্স। কিন্তু অপর িদ্য বিষয়- ভেদে বহু প্রকার প্রশ্নোপনিষদে -“দ্ধে বিদ্যে বেতব্যে~-পর চৈবাপাচ” বলিয়া পরপর-ভেদে দ্বিধ বিদ্যার উল্লেখ করিয়া প্রথমতঃ অপরাবিদ্যার পরিচয় প্রদানেপলক্ষে ঋগ্বেণ প্রভৃতি বহু প্রকার বিদ্যার উল্লেখ করিয়াছেন। বর্তমান সময়ে সে সকল স্যার কেবল প্রচার-মাজ রহিত হয় নাই, নাম পৰ্য্যন্তও বিলুপ্ত হইয়াছে। সে সকল বিদ্যার পুনরায় আবির্ভাব হইবে কিনা, তাহা ভগবানই জানেন। পূৰ্বেই বলিয়াছি যে, পবিদ্যা একই প্রকার ; উহার লক্ষ্য এক বলিয়াই আর বিভাগ বা প্রকারভেদ সম্ভবপর হয় না। পরীবিদ্যার স্বরূপ-নির্দেশ-প্রসঙ্গে প্রশ্নোপনিষদ বলিয়াছেন—অথ স্বয়ং ভগবাও সর্বাবস্থার মধ্যে অধ্যাত্ম-বিদ্যার শ্রেষ্ঠত। জ্ঞাপন করিয়াছেন—“অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যান” ( ভগবদগীতা ১৯৯১-আমিই সমস্ত বিষ্মর শ্রেষ্ঠ অধ্যাত্ম-বিদ্য-স্বরূপ।
হিন্দু দর্শন। ৩৭ •• পরা, যয়া তক্ষরমধিগম্যতে”। যাহা দ্বারা সেই অক্ষর-পদবাচ্য পর- ব্ৰহ্মকে জানিতে পারা যায়, তাহার নাম পরীবিদ্যা। একমাত্র ৰহ্মজ্ঞানেই সংসাবানলতপ্ত #ীবগণ পরম শান্তিলাতে সমর্থ হয়। এই অল্প ব্ৰশ্ববিদ্যাই সৰ্ববিদ্য। অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বিদ্যা ; এই জন্য পরা বিদ্যা নামে অভিহিত হইবার যােগ্য। বেদান্ত শাস্ত্র সেই বিদ্যা প্রচার করিয়া জগতে =ে পদবী লাভ করিয়াছে। অবণ রাখিতে হইবে যে, বৈদিক উপনিষদাবলীই বেদান্ত শব্দের মুখ্য অর্থ। আৰ্য ঋষিগণ এই উপনিষদর সাহায্যেই সভ্য সমাজে পরম পবিত্র ব্রহ্মবিদ্যার প্রচার করিতেন, এবং শােকসন্তাপ-সমাকুল মানগণের হৃদয়ে শাস্তিসুধা-সিঞ্চনে সমর্থ হইতেন। কিন্তু যাহা- দের হৃদয়-দর্পণ বহু-জন্মর্জিত ভো-বাসনাবশে নিতান্ত মলিন, শত চেষ্টায় ও সূক্ষ্মতত্ত্ব ধারণা-পথে আনয়ন করিতে পারে না, তাহারা কখনই ব্রহ্মবিদ্যালভে কিংবা দুৰ্বিজ্ঞেয় অদ্বৈত ব্ৰহ্মানন্দ অস্বাদে সমর্থ হ ন ও হইতে পারে না; বরং পদে পদে সংশয় ও বিপর্যয়ের দ্বারা প্রতিহত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হয়। জিজ্ঞাসু জনের পক্ষে তাদৃশ সংশয় ও বিপৰীত ভাবনা বিদূরিঙ করিতে হইলে, অধিগত বিষয় মনােনিবেশ পূর্বক প্রগাঢ় মনন যা শসম্মত বিচার করা আবশ্যক হয়, উপনিষদের ঋষিগণ ও কথা বিস্মৃত হইতে পারেন নাই; সেই জন্য তঁাহারা ব্ৰহ্মবিদ্যা উপদেশের সঙ্গে সঙ্গে মননের ব্যবস্থা করিয়া গিয়াছেন। মনন অর্থ ই বিচার। কিন্তু তাহাদের অবলম্বিত বিচার-প্রণালী অভ্রান্ত হইলেও বড়ই সংক্ষিপ্ত ; চঞ্চলচিত্ত লােকেরা তাহার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রবোধ লাভ করিতে পারে না। এই অসুবিধা অপনয়নের নমিত্ত গিবান্ বেদব্যাস দয়াপরবশ হইয়া বিবিধ তর্কযুক্তি-সমন্বিত বেঙ্গা হিন্দু-দর্শন। মীমাংসা বেদান্তদর্শন প্রণয়ন করিয়াছেন। তিনি বিশাল উপনিষদ- সাগর মথন-পূৰ্ব্বক বেদান্ত দর্শনরূপ মারদ্রের উদ্ধার সাধন করিয়াছেন। এখানে বলা আবশ্যক যে, বেদান্তদর্শনের বিপুল কলেবর যে কেবল উপনিষদের বাক্যার্থ বিচারেই পূর্ণতা লাভ করিয়াছে, তাহা নষ্টে ; পরন্তু দোস্তবে ব্ৰহ্মবিদ্যার অনুকূল ও প্রতিকুল যত প্রকার বিষয় আছে, সে সমস্তই উহার উদৰে উত্তম- ক্লপ স্থান লাভ করিয়াছে, এবং তাহার দ্বারা যে উহার যথেষ্ট গৌরব বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহা বলাই বাহুল্য। বেদান্ত-দর্শন। বেদান্তদর্শন বয়সে কনিষ্ট হইলেও গৌরবে সর্বাপেক্ষা মান ও প্রশংসনীয়। এ গোবে বিশেষ কারণ এই যে, ন্যায় ০ৈশেষক প্রভৃতি প্রায় সমস্ত দর্শনেই অধিক পরিমাণে প্রৌঢ়বা ও ভূ- পবাদ স্থান পাইয়াছে * কিন্তু বেদান্তদর্শনে সে সকল দোষের : প্রাচীন আর্ষ-শাস্ত্রের মধ্যেও যে অভূপগুমবাদ ।ভৃতি স্থান পাইয়াছে, তাহা আমরা বিষ্ণুপুৰাণ প্রভৃতি প্রামাণিক গ্রন্থ পাঠে জানতে পাই। বিষ্ণুপুরাণে কথিত আছে, “এতে ভিন্নদৃশং দৈত্য, বিকল্প কথিত ময়া। ত্বপগমং তত্র সংক্ষেপঃ শ্ৰয়ং মম ॥” হে দৈত্য, ভেদশী লোকদিগের অন্য আমি পগমাঙ্গ স্বীকার পূর্বক এই সকল বিকল্প (মতভেদ । নির্দেশ করলাম। এখন আমার নিকট এ সকলের সারসংক্ষেপ শ্রবণ কর।
হিন্দু-দর্শন। সংস্পর্শ ঘটে নাই, এবং ক্ষতিবিরুদ্ধ কথা কোথাও স্থান পায় নাই। কারণ, বেদান্তদর্শন-প্রণেতা বেদব্যাস এ গ্রন্থে তত্ত্ব নিরূপণের জন্য যতটা প্রয়াস পাইয়াছেন, বাদি-পরাজয়ের পক্ষে ততটা মনােযােগ করেন নাই। বিশেষতঃ তিনি নিজে বেদবিভাগ কাৰ্যে সাফল্য লাভ করিয়া বেঙ্গবিদ্যায় আপনার পারদর্শিতার প্রমাণ করিয়াছেন; সুতরাং তাহার দ্বারা বেদবিরুদ্ধ কোনও কথা সন্নিবেশিত হওয়া কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। কাজেই বেদান্ত-নির্ণয়ের জন্য তাঁর পক্ষে অপগমবাদ প্রভৃতি অসদুপায় অবলম্বন করিবার আবশ্যক হয় নাই। এই কারণে বেদান্ত- দর্শনের প্রামাণ্য ও গৌরব সর্বাপেক্ষা অধিক। বিশেষত ভারতীয় আন্তিকগণের মধ্যে যত প্রকার ধর্মসম্প্রদায় বর্তমান আছে, সেই সকল সম্প্রদায়ের প্রায় সকল আচাৰ্যই বেদান্তদর্শনকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ানুগত করিয়া লইতে প্রাস পাইয়াছেন, এবং প্রায় সকলেই আপনাদের পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের প্রামাণ্য ও দৃঢ়তা সংস্থাপনের সহায়তা কল্পে বেদান্ত-দর্শনের উপর টাকা গুণী ও ভাষ-ব্যাখ্যাদি রচনা করিয়া গিয়াছেন। সম্প্রদায়- নির্বিশেষে এরূপ সমাদর লাভের শুভ অবসর অপর কোনও দর্শনের ভাগ্যে ঘটে নাই; সুদূর ভবিষ্যতেও ঘটিবে বলিয়া মনে হয় না। অন্যত্র আছে-অক্ষপাদ শ্ৰণীতে চ কাণাকে সাংখ্যযােগয়াের। ত্যাজ্যঃ শ্রুতিবিরুদ্ধে!হংগঃ “ত্যেক শরণৈর্ণ ভিঃ। জৈমিনীয়ে চ বৈয়াসে বিরুদ্ধোহংশে ন কশ্চন। ত্যা বেদার্থবিজ্ঞানে তিসারং গতো হি তো ? (পরাশরীয়ােপপুরাণ) এ সকল শ্লোকের অর্থ সহজ ও সুবােধ্য,ব্যাখ্যা অনাবশ্যক।
হিন্দু-দর্শন। নাই। যদিও আচাৰ্য্যগণের সাম্প্রদায়িক মতভেদের ফলে শাস্ত্রে প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারণে ব্যাঘাত ঘটিতে পারেবেদব্যাসেজ প্রকৃত অভিপ্রায় কোন্ দিকে, তাহা নির্ণয় করা অসম্ভব হইতে পারে সত্য, তথাপি আচাৰ্যগণের প্রতি উপেক্ষা করিয়া বা ভাজা- দের কথায় কর্ণপাত না করিয়া এক পদও অগ্রসর হইবার উপায় যাহারা জ্ঞান-রাজ্যের পথপ্রদর্শক প্রাচীন আচাৰ্যগণের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন পূর্বক স্বকপােলকল্পিত সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাহাই বেদব্যাসের অভিপ্রেত বলিয়া সমাজে চলা- ইতে চেষ্টা ও যত্ন করিয়া থাকেন, তাদের সিদ্ধান্তে আস্থা স্থাপন কর তত্ত্ব-জিজ্ঞাসু কোনও ব্যক্তির পক্ষেই মঙ্গলকর বলিয়া মনে হয় না। কেননা, যারা দীর্ঘকালব্যাপী কঠোর সাধনা বলে আত্মসংযম পূৰ্ব্বক কোনও একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া লােকহিতার্থে জগতে প্রচার করিয়াছেন, তাহাদের সিদ্ধান্ত বুঝিতে হইলে অগ্রে তাহাদেরই সাধনা-প্রণালীর মধ্য দিয়া তাহাদের চিন্তাধারার অনুসরণ করিতে হইবে। প্রসিদ্ধ আচাৰ্য্যগণের মধ্যে সকলেই তাদৃশ সাধনা সম্পন্ন ও তদনুরূপ চিন্তাশীল না হতে পারেন সত্য ; কিন্তু তাহারা যাহাদের নিকট হইতে তত্ত্ব-বিদ্য' লাভ করিয়াছেন, পূর্ববর্তী সেই সকল আচাৰ্য্যগণের তাদৃশ সাধন-সম্পত্তি থাকা কিছু বিস্ময়কর নহে। বিশেষত: প্রত্যেক সম্প্রদায়ই গুরু- শিষ্য-পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত এক একটী মত-বিশেষের উপাসনা করেন। তাঁহার সেই বিশিষ্ট মতটাকেই গুরু-শিষ্য-পরম্পরাক্রমে আগত মৌলিক সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন; • শিষ্য হতার্থ গুরু সম্প্রদায়ু শিষ্যদিগের বােধশক্তি ও অনুষ্ঠানের ক্ষমতা বিবেচনা করিয়া, যাহার পক্ষে যাহা কলাণকর ও হিন্দু দর্শন। ৪ ঐ মুদয় মততেও আর্ষ-চিন্তা ও প্রকৃত সত্যের সহিত সম্বন্ধ- বর্জিত একটা বিকট কল্পনা মাত্র নহে, পরন্তু সত্য ও সত্যলাভের সম্পূর্ণ সহায়। এই জন্যই গুরুশিষ্যভাবের প্রশংসা পূৰ্ব্বক উপ- মিষ বলিতেছেন- আচাৰ্যান্ধৈব বিদ্যা বিদিতা সাধিষ্টং প্রাপয়তি।” (ছান্দোগ ৪২৩) তত্ত্ববিদ্যা আচাৰ্য হইতে লব্ধ হইলেই সাধু ফল সম্পাদন করিয়া থাকে। এই কারণেই সম্প্রদায়শুদ্ধ বিদ্যার এত সম্মান ও সমাদর ; আর সম্প্রদায়বিহীন শুদ্ধ কল্পনা প্রসূত ছিন্নমূল বিদ্যার প্রতি তাত্যধিক অনাদর ও নিন্দা শাস্ত্র-মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। যাহারা বিদ্যৎসমাজ দম্মত সেই চিরন্তন পদ্ধতি মানিয়া লইতে প্রস্তুত নহেন, তাহারা যাহা করিতে হয় করিবেন ; আমব। কিন্তু প্রাচীন আচার্য্য দিগকে সসম্মানে শ্রদ্ধা করি এবং তাঁহাদের উপদেশেও বিশ্বাস করি; সুতরাং বর্তমান প্রবন্ধে আমরা যাহা কিছু বলিব, আচাৰ্য- দিগের মতানুসারেই বলিব। যদি তাতে কোথাও ভুলভ্রান্তি ঘট, সহৃদয় পাঠকবর্গ ভাহ। মার্জনা করিবেন এবং তদ্বিষয়ে আমাকে উপদেশ দিয়া উপকৃত করিবেন। এ প্রবন্ধে আমি প্রাচীন আচাৰ্যগণের সিদ্ধান্ত-পদবী অনুসরণ করিব বলিয়াছি; কিন্তু আচার্য্য একজন নহেন—অনেক, এবং তাহাদের মতবাদও এক প্রকার নহে—বিভিন্ন প্রকার। এখন গ্রহণযােগ্য মনে করেন, তাহাকে তদ্বিষয়ে অনুরূপ উপদেশ দিয়া থাকেন। সেই কারণে একই গুরুর শিষদিগের মধ্যে মতানৈক্য লক্ষিত হয়। বুঝিতে হবে, উহাদের প্রত্যেক মতই সত্যলাভের সম্পূর্ণ অনুকূল; সুতরাং কোনও মতটাই উপেক্ষণীয় নহে।
৪৪ হিন্দু-দর্শন। যায় না। বস্তুতঃ বেদান্ত-দর্শনের উপর যে সমস্ত ব্যাখ্যা বা ও বিরচিত হইয়াছে, তন্মধ্যে শঙ্করের ব্যাখ্যায় যে একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, অপর কোনও ব্যাখ্যাতেই তাহা দেখিতে পাওয়া যা না। সেই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যগুণেই শঙ্করের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত জগতে এতদূর লােকপ্রিয় ও প্রভাবশালী হইতে পারিয়াছে। আমরাও এই প্রবন্ধে প্রধানতঃ শঙ্কর-প্রদর্শিত সেই মতবারেই অনুসরণ করিব। আমরা যে সকল বিষয় বেদান্ত-সিদ্ধান্ত বলিয়া শির্দেশ করিব, সে সকল বিষয় শঙ্কর-সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত বলিয়া বুঝিতে হইবে। আচাৰ্য শঙ্কর শুদ্ধাদ্বৈতবাদী ছিলেন,—এ কথা আমরা প্রথমেই বলিয়াছি। তঁাহার মতে সমস্ত বেদান্ত শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় হতেছে--এক-সত্য, জ্ঞানানন্দং ব্ৰহ্ম” ও “একমেৰা- দ্বিতীয় ইত্যাদি বাক্য প্রতিপাদিত ব্ৰহ্ম । উক্ত ব্রহ্মের স্বরূপ- পরিচয় ও উপাসনদি প্রতিপাদনেই সমস্ত উপনিষদ শাস্ত্র পরি- সমাপ্ত হইয়াছে। এই কারণে উপনিষদ শাস্ত্র “ব্রহ্মবিদ্যা” নামে, আর উপনিষদের মীমাংসা-প্রকাশক বেদান্ত-দর্শন “ব্ৰহ্মসূত্র” নামে পরিচয় লাভ করিয়াছে। ব্ৰহ্মচিন্তার সহিত জীবের স্বভাজি চিন্তাও ঠিক সেইরূপই অপরিহার্য ; কারন, যতক্ষণ জীব ও জগতের প্রকৃত-তত্ত্ব যথা যথভাবে নিরূপিত না হয়, ততক্ষণ বেদান্ত (বেদ) ব্রহ্মের অদ্বৈত বাদও সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুনির্ণীত হয় না বা হতে পারে না। এই কারণে বেদান্ত-শাস্ত্রে ঐ উভয় চিন্তাও ব্রহ্মচন্তার অঙ্গীভূত হইয়া স্থান লাভ করিয়াছে। সম্ভবতঃ এই প্রকার অপৰিহাৰ্যাত্ব-ধেই পরবর্তী আচাৰ্য্যগণ বেদান্ত-শাস্ত্রের বিষয়-ক্ষেত্র কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত হিন্দু-দর্শন। করিয়া আপনাদের কাৰ্যদ্ধতিরও পরিসর বৃদ্ধি করিয়া লইয়াছেন। উক্ত আনুসঙ্গিক ধিয় দুই টীকেও ব্রহ্মের সঙ্গে সমান আসনে স্থাপন করিয়া বলিয়াছেন, --- “ব্ৰহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মেব নাপঃ।” এখানে তারা ব্ৰহ্ম, জীব ও জগৎ, এই তিনকেই বেদান্ত- কে তত্ত্বরূপে একসূত্রে গ্রথিত করিয়াছেন। বেদান্ত-দর্শনের মধ্যেও ব্ৰ' আর ব্যায় অ৭ি ও জগতের সম্বন্ধে তত্ত্বালােচনা প্রধান স্থান অধিকার করিয়াছে। এভদতিরিক্ত সে সকল বিষয় আলােচিত বা মীমাংসিত হইয়াছে, সে সকল বিষয় উক্ত বিষয়ত্ৰয়েরই অন্তর্নিবিষ্ট বা আনুসঙ্গক বিষয় মাত্র। উপরি-উদ্ভূত সংগ্রহ-বাক্য-মধ্যে যদিও মায়ার কোন প্রকার উল্লেখ বা নির্দেশ নাই সত্য; তথাপি মায়ার কথা। নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক বা অসমৃদ্ধ বলিয়া উপেক্ষা করা যাইতে পারে না। কারণ, মায়াই ব্রহ্মের কাৰ্যকারিণী-শক্তি, এবং দৃশ্যমান জগৎ প্রপঞ্চের একমাত্র উপাদান কারণ; সুতরাং মায়াবাদ বাদ দিলে অদ্বৈতবাদই অচল হইয়া পড়ে ; এবং নিগুপ নিরাকার ব্রহ্মের উপযােগিতা ও অসত্য জগৎ-প্রপঞ্চের বিকাশম্ভাবনাও তিরােহিত হইয়া যায়; সুতরাং পৃথকভাবে নামােল্লেখ না থাকিলেও জীব, জগৎ ও ব্রহ্মের কথাতেই মায়ার প্রসঙ্গ অপৰিহাৰ্য্যরূপে আসিয়া পড়িয়াছে। মনে হয়, এই জন্যই উপরিউদ্ধত বাক্যে স্বতন্ত্রভাবে মায়ার উল্লেখ করা হয় নাই। অতঃপর আমরা এই প্রবন্ধের মধ্যে যথাক্রমে ব্ৰহ্ম, মায়া, জীব ও জগৎ এই চারিটী বিষয়ের প্রধানতঃ আলােচনা করিব; এবং প্রসঙ্গতঃ অপরাপর বিষয়েরও যথাসম্ভব আলোচনা করিতে চেষ্টা করিব।
৪৬ হিন্দু দর্শন। ' বেদান্তের ব্রহ্ম। ব্ৰহ্ম বস্তু বোস্তবেদ্য অতি দুবাধগম্য হইলেও ভারতবাসীর নিকট নিতান্ত অপরিচিত বা অপ্রসিদ্ধ নহে। এ দেশে অজ্ঞ ব নির্বিশেষে প্রায় সকল লােকই ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে কোন-না-কোনও প্রকার ধারণা পােষণ করা থাকে। এ ভাব যে অতি আৰু নৰু বা সম্প্রদায়-বিশেষ প্রচেষ্টার ফল, তাহা বলিতে পারা যায় না। পুরাতত্ত্ব পৰ্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ব-পারা স্মরণাতীত কাল হতে জার বাণী হৃদয়ক্ষেত্রে প্রবহমান খতিয়াছে। প্রাচীন গাযগ দয়াপরবশ হইয়া লোকহিতার্থ সেই চিরন্তন ভাবধারাকেই নিয়ন্ত্রিত ক'83) সুপথে পরিচালিত করিয়াছেন মাত্র। অ সন্ধান করিলে সৰ্বএ হর ইহরণ দেখিতে পাওয়া যায়; ভারতবীর প্রত্যেক কার্যে ব্রহ্মচ। অব্যাহত প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ভারতবাসীর যে কোনও ধৰ্ম্ম-৯ম, যে কোনও সাধনা-পথ এবং যত প্রকার শাস্ত্র গ্রন্থ আছে, তৎসম এহ্ম চিন্তার সহিত ও প্রাত ভাবে সংশ্লিষ্ট। বলা বাহুল্য, এমন কাও ধর্মমত নাই, যাহার সঙ্গে ব্রহ্মচিন্তার সম্পর্ক পা আছে । এন (+নিও সাধনা-পথ নাই, যেখানে ব্ৰহ্মচিন্তার অপেক্ষা অস্বীকৃত হইয়াছে ; এবং এরূপ কোনও প্রামাণিক শাস্ত্রও নাই, যাহাতে ব্ৰহ্মচিন্তা স্থান- শাভে বঞ্চিত আছে। পক্ষান্তরে যে ধৰ্ম্ম ব্ৰহ্মলাভের যােগ্যত। জন্মায় , যে সাধন ব্ৰহ্ম-প্রাপ্তির অনুকূলতা করে না, এবং যে শাস্ত্র ব্রহ্মা- বােধে সহায়তা করে না; সে ধৰ্ম্ম, সে সাধনা ও সে শাস্ত্র যতই উত্তম ও যতই লোভনীয় হউক না কেন, তত্ত্বা নিকট তাহা কখন । প'কে বকাপে দৃত হয় না বা হইতে পারে না। এই জন্যই ছোট-বড় সমস্ত শাহ অল্পধক পরিমাণে ব্ৰহ্ম- * হিন্দু দর্শন। ৪ চিন্তায় আত্মনিয়ােগ করিয়াছে। অনুসন্ধান করিলে আৰ্য্য- শাস্ত্রের সর্বত্রই ব্রহ্ম-সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য প্রচুর তত্ত্ব সংগ্রহ করা মাহতে পারে। এস্থলে বলা আবশ্যক যে, যদিও পুরাণাদি শাস্ত্রে ব্ৰহ্মচিন্তার উপকরণ প্রচু পরিমাণে সন্নিবদ্ধ আছে, এবং ব্রহ্ম-নিরূপণের জন্য সে সকল স্থান হতেই আলু + পকরণ সংগ্রহ করা যাইও পারে সতী ; কৃপাপি অামরা সে পথে যাইব না এবং সে সুযােগ গ্রহণও কবি না। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা প্রধানতঃ বেদান্ত- শাস্ত্রকেই আমাদের অবস্থনীয় পথের সায়রূপে গ্রহণ কবি, এবং আবশ্যকমত অপরাপর শাস্ত্রে ও যথাসম্ভব সায়। মাত্র ৩ হব। এই যথার উদ্দেশ্য এই যে, আন+1 এ বিষয়ে যার পদাঙ্কামু- সরণ করতেছি, সেই আচায্য শঙ্কর স্বয়ং অদ্বৈতবাদী ছিলেন ; তার সিদ্ধান্ত অদ্বৈতবাদ, সম্পূর্ণরূপে বেদাস্তত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত-পুরাণাদির উপর নহে। কাজেই আমাদিগকে অনন্য- শরণ হইয়া বেদান্তের আশ্রয় লইতে হইতেছে। আচার্য শঙ্কর অদ্বৈতবাদী ছিলেন। তিনি বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ, প্রচার করিয়া জগতে যে অক্ষয় কার্তিগুম্ভ স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, তাহা এখনও অক্ষতদেহে তাহার পুণ্যস্মৃতি লোক-হৃদয়ে জাগাইয়া স পুরাণাদি গ্রন্থ ব্ৰহ্মকে, কোথাও ভগবান্, কোথাও পরমাত্মা, কোথাও জ্ঞান বা চৈতন্য শব্দে, কোথাও বা সাক্ষাৎ ব্রহ্ম শব্দেও নির্দেশ করিয়াছেন। বস্তুতঃ এ সমুদয় শব্দ ব্রহ্মেরই নামান্তর মাত্র। এ কথা ভাগবতে উক্ত আছে- বদন্তুি তৎ তত্ত্ববিদ যদ জ্ঞানদ্বয়ম্। ব্রহ্মে৩ পমাত্মা গান। ৩ থ।" ২৩ ৪৮ হিন্দু-দর্শন। ব্লখিয়াছে। আশা করা যায়, যতদিন শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রদীপ্ত আলােক সম্পূর্ণরূপে নিৰ্বাপিত না হইবে, ততদিন তঁাহার সে পুণ্যস্মৃতি লােকর হইতে একেবারে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে না । সত্যের অনুরােধে এখানে একটা কথা বলিতে ইচ্ছা করি। সে কথাটা এই,—অনেকের বিশ্বাস, আচাৰ্য শঙ্করই এ দেশের প্রথম অদ্বৈতবাদী ; তিনিই সৰ্ক প্রথম এ দেশে অদ্বৈতবাদ প্রচার করিয়া যশস্বী হইয়াছিলেন। কথা সত্য নহে। শঙ্করের পূৰ্ব্বে এবং পরে বহু অদ্বৈতবাদী জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তঁহারাও অদ্বৈতবাদ অবলম্বন পূর্বক বিস্তর গ্রন্থ লিখিয়া গিয়াছেন। পূর্ব- বত্তাদের মধ্যে আচায্য বােধায়ন, উপধর্য ও ভর্তৃহরির নাম, এবং পরবর্তীদিগের মধ্যে আচৰ্য্যি রামানু স্বামীর নাম সম্ভ্রমে উল্লেখ যােগ্য মনে করি। তাহাদের সহিত আচার্য শঙ্করের মতগত পার্থক্য ও বিশিষ্টতা এই যে, তাহারা সকলেই দ্বৈতবাদের সহিত একটা আপােষ মীমাংসার চেষ্টা করিয়াছেন, আর শঙ্কর সে পথেই যান নাই। তিনি দ্বৈতের অনুরােধ উপেক্ষা করিয়া, বিশুদ্ধ দ্বৈত- বাদের মহিম ও বিজয়বার্তা প্রচার করিয়াছেন; এবং নিজের সিদ্ধান্তকে ‘দ্ধাদ্বৈতবাদ’ নামে পরিচিত করিয়াছেন। এখানেই তাহার বিশিষ্টতা। এই বিশিষ্টতাই তাহার নামকে জগতে চির- স্মরণীয় করিয়া রাখিয়াছে। সে যাহা হই, অপর অদ্বৈতবাদ কাহাকে বলে, তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় প্রদান করা যাউক। “দ্বিধতং দ্বীতমিত্যাহুস্তদ্ভাব দ্বৈতমুচ্যতে দ্বিধা ইতং- দ্বীতং', অর্থাৎ দ্বিধাযুক্ত-ভেদবিশিষ্ট। তস্য ভাব-দ্বৈতম” { অর্থাৎ দ্বিধভূত বা ভােদবিশিষ্টের ধর্ম। তস্যাভাবঃ-“দ্বৈতম্। দ্বৈতের (সর্বপ্রকার ভেদে) অভাবই অদ্বৈত। বাদ” অর্থ ৩০ হিন্দু-দর্শন। ৪৯ সিদ্ধান্ত ; সুতরাং অদ্বৈতবাদ কথার অর্থ হইতেছে--দ্বৈতের অভাব বিষয়ক সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ যে সিদ্ধান্তে দ্বৈতের অসত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহাই অদ্বৈতবাদ। আচাৰ্য রামানুজও অদ্বৈতবাদী ছিলেন সত্য ; কিন্তু তাহার অদ্বৈতবাদ হইতে শঙ্করের অদ্বৈতবাদ সম্পূর্ণ বিভিন্ন। রামানুজ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী; তাহার মতে সজাতীয় বিজাতীয় ভেদ পরিত্যক্ত হইলেও, স্বগতভাে স্বীকৃত হইয়াছে। একটী বৃক্ষ স্বরূপতঃ এক ভূইয়াও যেরূপ অংশতঃ ভিন্ন ভেযুক্ত,-উহার শাখা-প্রশাখা ও পত্র-পুষ্পদি অংশগুলি পরস্পর বিভিন্ন ; অথচ ঐ সকল শাখা- প্রশাখাদি লইয়া বিশিষ্ট বৃক্ষটী এক ; সেইরূপ ব্ৰহ্মও স্বরূপতঃ একই বটেন ; কিন্তু ব্রহ্মের অংশ জীব ও জগৎ পরস্পর বিভিন্ন । চেতনাচেতনাত্মক উক্ত জীব ও জগৎ বিশিষ্ট ব্ৰহ্ম এক অদ্বিতীয়। এই জন্য রামানুজ-সম্মত অদ্বৈতবাদের নাম—বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ। আচার্য শঙ্কর, রামানুজ-সম্মত সিদ্ধান্তে সম্মতি দেন নাই তিনি বলিয়াছেন,-সজাতীয়, বিজাতীয় ও স্বগত রূপে যে তিন প্রকার ভেদ জগতে দৃষ্ট হইয়া থাকে, উহাদের কোনও ভেদই ব্রহ্মে থাকিতে পারে না। উক্ত তিন প্রকার ভেদ নিবাসের জন্যই শ্রুতিতে—এক-এব’-অদ্বিতীয় এই তিনটী শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে। “বৃক্ষস্য স্বগতে মেদঃ পত্ৰপুষ্পফলাদিভিঃ। বৃক্ষান্তরাৎ সজাতীয়ো বিজাতীয় শিলাদিতঃ ॥ তথা সঘন ভেদত্ৰয়ং প্রাপ্তং নিবাৰ্যতে। ঐক্যাবধারণ দ্বৈতপ্রভিষেধেস্ত্রিভি ক্ৰমাৎ।” (পঞ্চদশী)। হিম-শন- হিন্দু-দর্শন। ‘একং শব্দে স্বগতভেদ, অবধারণার্থক ‘এ’ শব্দে সজাতীয় ভে, আর দ্বৈতবারক অদ্বিতীয়’ শব্দে বিজাতীয় ভেদ নিবারিত হইয়াছে। ব্রহ্মেতে কোনপ্রকার ভেদ সম্বন্ধ থাকাই শ্রুতির অভিপ্রেত নহে; এমন কি, গুণতােহপি নাদ্বৈত শ্ৰতির্ভেদ সহতে”-অদ্বৈত’ শ্রুতি ব্রহ্মের গুণগত ভেদও সহ্য করে না। অতএব বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ প্রতিপাদনেই শ্রুতির তাৎপৰ্য্য অবধারণ করিতে হইবে। “একমেবাদ্বিতীয়।” “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন।” “সশীল একো দ্রষ্টা অদ্বৈ।” “সৰ্ব্বং ঋণ ব্ৰহ্ম।” “শান্তং শিবম- দ্বৈতম্ ।” “মৃত্যেঃ সঃ মৃত্যুমাপােতি য ইহ নানেব শতি।” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যও ব্রহ্মের নিৰ্ব্বিংশষ অদ্বিতীয় ভাব স্পষ্টাক্ষরে ঘােষণা করিতেছে। ব্রহ্মের এবধি নিব্বশেষত্ব প্রতিপাদন করে বাণই শঙ্করের সিদ্ধা শুদ্ধ অদ্বৈতবাদ’ নামে অভিহিত হইয়াছে। জীব সম্বন্ধেও শঙ্কর মতে যথেষ্ট বৈ'শষ্ট্য আছে। জীব ও ব্রহ্ম স্বরূপতঃ একই পদার্থ ; কেবল মায়াকৃত ভান্তিবশে পার্থক্য প্রতীত হয় মাত্র। জীব ব্ৰহ্ম হইতে আসিয়াছে, আবার পরি- শেষে ব্রহ্মেই বিলয়প্রাপ্ত হইবে; সুতরাং জীবের জীব-ভাব বা সংসারিত্ব মায়া-কল্পিত অসত্য। জীব-ভাবের ন্যায় জগদ্ভাবও মায়াকল্পিত মিথ্যা অসত্য অবস্তু। অর্থে ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে বক্তব্য শেষ করিয়া পরে জীব ও জগৎ সম্বন্ধে স্বতন্ত্রভাবে আলােচনা করিব। ব্রহ্ম। প্রথমেই বলিয়াছি যে, ব্ৰহ্মনিরূপণে আমরা প্রধানতঃ বেদান্ত শাস্তুকেই সহায় ও প্রমাণ রূপে অবলম্বন করিব; কেননা, বেদান্ত- হিন্দু-দর্শন। ভিন্ন অন্য কোনও প্রমাণ দ্বারাই ব্রহ্মের প্রকৃত তত্বটা বোধগম্য হয় না ও হইতে পারে না। কারণ, যে সমস্ত গুণ থাকিলে বন্ধুর প্রত্যক্ষ হইতে পারে, সে সমুদয় গুণের (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধের) একটা গুণও ব্রহ্মেতে নাই। সুতরাং প্রত্যক্ষের দ্বারা তাহাকে জানিতে পারা যায় না। অনুমানাদি প্রমাণের দ্বারা বড় জোর তার অস্তিত্ব মাত্র প্রমাণিত হইতে পারে; কিন্তু তগত অপর কোনও বিশেষ ভাব প্রমাণ করা অনুমানাদিরও অসাধ্য ব্ৰহ্মান্ধ যদি কিছু বিশেষ ভাব জানিতে হয়, তবে তাহা বেদান্তের উপদেশ হইতেই জানিতে হইবে, তদ্ভিন্ন আর কোনও পথই নাই। এই জন্যই ঈশ্বরকৃষ্ণ বলিয়াছেন— তস্থাপি চাসিদ্ধং পরােক্ষমাপ্তাগমাৎ সিদ্ধম্ ॥” ( সাংখ্যকারিকা)। অর্থাৎ, যে সকল পদার্থ সামান্যতো দৃষ্ট” অনুন দ্বারাও জানিতে পারা যায় না; এরূপ পরােক্ষ ( তীন্দ্রিয়) পদার্থকে আপ্তবাক্য হইতেই জানিতে পারা যায়। বেদান্তাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযােগ্য আপ্তবাক্য আর কি হইতে পারে। কাজেই ব্ৰহ্ম-বিষয়ে বাধ্য হইয়াই বেদান্তের আশ্রয় লইতে হয় । বেদান্ত শাস্ত্র হইতে জানা যায়, ব্রহ্মের লক্ষণ দুইটী-স্বরূপ লক্ষণ’ ও ‘তটস্থ লক্ষণ। সর্বপ্রকার বিশেষণ-সংস্পর্শ-শূন্য স্বরূপ- * ব্রহ্ম-সম্বন্ধে কঠোপনিষদ বলিয়াছেন- “অশব্দমস্পশমরূপমব্যয়ং তথাৰসং নিত্যমগন্ধব যৎ। অর্থাৎ যিনি ব্রহ্ম) শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ বিহীন, নিত্য, নির্বিকার।
হিন্দু-দর্শন। মাত্র দ্বারা যে পরিচয় প্রদান, তাহাই স্বরূপ লক্ষণের পরিচায়ক । যথা—“সত্যং জ্ঞান আনন্দং ব্ৰহ্ম”-ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও আনন স্বরূপ। সত্য অর্থ-কোনও কালে, কোনও দেশে ও কোনও অবস্থায় যাহার বাধ বা বিনাশ নাই ; চিরকালই একভাবে লিঙ্ক- মান থাকে। জ্ঞান অর্থ-চৈতন্য বা অনুভূতি ; যাহা প্রদীপবৎ নিত্য স্বপ্ৰকাশ। আনন্দ’ অথ—সুখ, যে সুখ ত্যি একপ্রকার এং দুঃখ-সম্বন্ধ-বর্জিত। যদিও আপাতঃজ্ঞানে উক্ত সত্য জ্ঞান ও আনন্দ—এই তিনটী পৃথক ও স্বতন্ত্র পদার্থ বলিয়া প্রতীত হয়, তথাপি ঐ তিনটীকে এক অভিন্ন পদার্থ বলিয়া বুঝিতে হইবে । মহামতি বাচস্পতি মিশ্র বলিয়াছেন- আনণে। বিষয়ানুভবে চ নিত্যত্বং চেতি সন্তি ধৰ্ম্মা অপৃথঞ্জে হপি চৈতন্যাৎ পৃথগিবাবসন্তে।”—ঙামতী। অর্থাৎ—আনন্দ অনুভব (জ্ঞান) ও নিত্য, এই তিনটা ধৰ্ম্ম- চৈতন্য হইতে পৃথক্ না হইলেও, পৃথকের ন্যায় প্রতিভাত হইয়া থাকে। বস্তুতঃ ঐ তিনই চৈতন্যের বিভিন্ন আকারে ক্ষরণ মাত্র। প্রসিদ্ধ ‘সংক্ষেপশারীরক’ গ্রন্থে এই তিনটাই ব্রহ্মের স্বরূপ বলিয়া কথিত আছে- অস্তি ভাতি প্রিয়ং রূপং নাম চেভ্যংশ পঞ্চক। অশ্য ত্রয়ং ব্রহ্মরূপং জগদ্রপমতে দ্বয়।” অর্থাৎ অস্তি (সৎ), ভাতি (জ্ঞান), প্রিয়ং (আনন্দ), রূপ { আকৃতি) ও নাম ( মনুষ্য গো প্রভৃতি),-এই পাঁচটা বিষয় সাধারণতঃ আমাদের অনুভগােচর হইয়া থাকে। গতে ধাতরিক্ত কোনও বিষয় নাই-অনুভবেও ধরা যায় না। উক্ত কান বিষয়ের মধ্যে প্রথমােক্ত তিনটী ব্রহ্মের স্বরূপ, এবং অপর হিন্দু-দর্শন। দুইটা জগতের স্বরূপ; অর্থাৎ সৎ, চিৎ ও আনন্দের অতিরিক্ত যেমন ব্ৰহ্ম নাই, তেমনই প্রসিদ্ধ নাম ও রূপের অতিরিক্ত জগৎ বলিয়া কোনও পদার্থ নাই, নাম-রূপই জগৎ। জগতে যে সত্তা ও আনন্দ প্রতীতিগােচর হইয়া থাকে, বস্তুতঃ সে সত্তা ও সে আনন্দ জগতের নিজস্ব সম্পত্তি নহে; পরন্তু সচ্চিদানন্দস্বরূপ ব্ৰহ্ম হইতে প্রাপ্ত। এই কারণে জাগতিক সত্তা ও আনন্দকে ‘যাচিতমগুন- ন্যায় বলা হইয়া থাকে। ফল কথা, সত্তা জ্ঞান ও আনন্দ ব্ৰক্ষ ভিন্ন আর কোথাও মাই এই জন্য “সত্যং নিমান ব্রহ্ম”—এই শ্রুতি-কথি • লক্ষণই ব্রহ্মের স্বরূপ লক্ষণ। ইহা হইতেই ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ বুঝিয়া লইতে হইবে। ব্রহ্মের আর একটী লক্ষণ আছে ; তাহার নাম ‘তটস্থ-লক্ষণ। ‘তট’ অর্থ তীর। সেই তীরস্থ বৃক্ষের ন্যায় যে লক্ষণ অচিরস্থায়ী, তাহাই তটস্থ লক্ষণ। যেমন—জগৎ-কর্তৃত্ব প্রভৃতি। “জন্ম- ; * ‘যাচিতমন’ ন্যায়টী এই প্রকার,-কোনও ধনী গৃহস্থের বাড়ীতে বিশেষ উৎসব উপলক্ষে নিমন্ত্রিত দরিদ্র গৃহিণীগণ সাধা- রণতঃ আত্মমর্যাদা রক্ষার আশায় প্রতিবেশীগণের নিকট হইতে প্রয়োজনমত অলঙ্কারাদি বেশভূষা ভিক্ষা করিয়া লয় এবং সেই সমস্ত বেশভূষা পরিধান-পূৰ্ব্বক উৎসবক্ষেত্রে উপস্থিত হয়। যাহারা পরকীয় বেশভূষায় সুসজ্জিতা, সেই সকল রমণীর আভ্যন্তরিক অবস্থা জানে , তাহারা যেমন ঐ সকল বেশভূষা সেই সকল রমণীর নিজস্ব সম্পত্তি মনে করিয়া বিস্মিত হয়, তেমনি যাহারা মায়া ও জগতের তত্ত্ব জানে না, তাহারা ব্ৰহ্মলব্ধ জাগতিক সত্তা ও আনন্দ দর্শনে বিমােহিত হইয়া জাগতিক ভােগ করিতে সমুৎসুক হয়।
৫৪ হিন্দু দর্শন। দ্য যতঃ (ব্ৰহ্মপুত্ৰ ১১১), এবং “যতে বা ইমানি ভূতানি জান্তে, যেন জাতানি জীবন্তি, যৎ প্রযন্ত্যভিসংবিশক্তি।” (তৈত্তি- রীয় উপনিষদ ৩১১) ইত্যাদি। এইরূপ জগপালকত্ব ও জগৎ- সংহারকত্বও ব্রহ্মের তটস্থ লক্ষণ মধ্যে পরিগণিত। এই যে জগৎ-কর্তৃত্ব, জগৎপলকত্ব ও জগৎসংহারকত্ব, অথবা এই জাতীয় আরও যে সমস্ত লক্ষণ আছে বা হইতে পারে, সে সমস্তই তটস্থ লক্ষণ মধ্যে গণ্য। কেননা, এই সমস্ত লক্ষ আপাততঃ ব্রহ্মের পরিচায়ক হইলেও চিন্তাদনের জন্য ব্রহ্মের করি, চায়ক হয় না ও হইতে পারে না। প্রলয়কালে জগৎ বা সৃষ্টিক্রিয়া কিছুই বর্তমান থাকে না। কাঠে তৎকালে কর্তৃত্ব ও পালক দ্বারা ব্রহ্মের পরিচয় প্রদান করা সম্ভবপর না; সুতরাং উৎকালে ঐ দুইটা, লক্ষণ বলিয়াও গৃহীত হইতে পারে না। এইরূপ সৃষ্টি- কালে সংহার-ক্রিয়া বিরত থাকায় গতসংহারকত্বও তাঁহার লক্ষণ বলি গণ্য হইতে পারে না এই কারণেই এই জাতীয় লক্ষণ- গুলিকে তটস্থ লক্ষণ নামে অভিহিত করা হইয়া থাকে, এবং তটস্থ লক্ষণে লক্ষিত ব্রহ্মকে ঈশ্বর ও পরমেশ্বর প্রভৃতি নামে নির্দেশ করা হইয়া থাকে। উল্লিখিত উভয়বিধ সক্ষণাক্রান্ত ব্ৰহ্ম এক কি কানেক, সাবয়ব কি নিরবয়ব,-এতদুত্তরে উপনিষদ বলিয়াছেন যে, “একমেবা- দ্বিতীয় ব্ৰহ্ম নিশ্চয়ই এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কেবল একই নহেন; সজাতীয়, বিজাতীয় ও স্বগত ভেদ পৰ্যন্ত ভঁহাতে নাই। এই অভিপ্রায়ে উপনিষদ কেবল এক বলিয়াই নিশ্চিন্ত হতে পারেন নাই ; সঙ্গে সঙ্গে অবধাণার্থক ‘এ’ ও ‘অদ্বিতীয় দ্বলিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন। ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে উক্ত প্রকার বিবিধ ভে হিন্দু-দর্শন। নিরাস পূৰ্ব্বক অদ্বিতীয়ত্ব সংস্থাপন করে বলিয়াই আচাৰ্য শঙ্করের অভিমত সিদ্ধান্তকে শুদ্ধাবৈতবাদ সংজ্ঞা প্রদত্ত হইয়াছে। অদ্বৈতবাদীর ব্ৰহ্ম নির্বিকার নিলেপ নিয়ন সৰ্বব্যাপী এবং এক অখণ্ড ও অদ্বিতীয়। ইহাই শঙ্কর-মতের বিশিষ্টতা। এই বিশিষ্টতা লইয়াই তিনি দৃশ্যমান জগৎপ্রপঞ্চের অসত্যতা প্রতি পাদন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। ঈশ্বর। জগতে ছোট বড় যত রকম বস্তু আছে, সকলের মধ্যেই উহাদের কার্যোপযােগী এক একটা বিশেষ শওি নিহিত আছে, প্রত্যেক শক্তিই কাৰ্যানুমেয়। কোন বস্তুতে কিরূপ শক্তি সন্নিবদ্ধ আছে, তাহা তাহার কাৰ্য দর্শন ব্যতীত জানিবার বা বুঝিবার শক্তি কাহারও নাই। বিশেষ বিশেষ কাৰ্য্যই সেই সমুদয় বস্তুব শক্তি-বিশেষের অনুমাপক। ব্ৰহ্মও যখন একটী বস্তু, সুতরাং তাহাতেও যে একটা বিশেষ শক্তি নিহিত আছে, তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। আচাৰ্য্য বিদ্যারণ্য স্বামী বলিয়াছেন- “শক্তিরস্ত্যৈশ্বরী কাচিৎ সৰ্ববস্তুনিয়ামিকা। তমােরজঃসত্ত্ব গুণাপ্রকৃতিদ্বিবিধা চ সা ।” সশুদ্ধ-বিগুদ্ধিভ্যাং মায়াবিদ্যে চ তে মতে। (পঞ্চদশী ) অর্থাৎ,-সৰ্ববন্ধুর নিয়ামিকা এক প্রকার ঐশী শক্তি আছে। ঐ শক্তি সঞ্চ-রজ-তমােগুণময়ী প্রকৃতি নামে প্রসিদ্ধ । সত্ত্বগুণর উৎকর্ষ ও অপকর্মানুসারে সেই প্রকৃতি দুই ভাগে বিভক্ত। বিশুদ্ধ হিন্দু-দর্শন। সন্ধ্রপ্রধান প্রকৃতির নাম মায়া, আর রজতমোগুণে অভিভূত মলিন সত্বপ্রধান প্রকৃতির নাম অবিদ্যা। জগতে অন্যান্ত বস্তুর শক্তি যেমন সকল সময়ে বস্তুর সর্বাংশ ব্যাপিয়া থাকে না, ব্রহ্মের মায়াশক্তিও ঠিক তেমনি ব্রহ্মের সৰ্বাংশ জুড়িয়া নাই। ঐ ব্ৰহ্মশক্তি ( প্রকৃতি বা মায়া) জগৎ অপেক্ষা অনেক বড় হইলেও, অখণ্ড অনন্ত ব্ৰহ্ম হইতে অনেক ছােট- পরিচ্ছিন্ন। অনন্ত আকাশে এক খণ্ড সুবৃহৎ মেঘ উদিত হইলে তন্মধ্যস্থ জলে যেমন আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে, ঠিক সেইরূপ অনন্ত ব্রহ্মের অভ্যন্তরে অবস্থিত উক্ত মায়াশক্তির মধ্যগত বিশুদ্ধ সাত্ত্বিক ভাগেও সেই সচ্চিদানন্দস্বরূপ ব্রহ্মের প্রতিবিশ্ব পতিত হইয়া থাকে। সেই মায়া-প্রতিবিম্বিত চৈতন্যের নাম ঈশ্বর আয় মলিন সত্ত্বপ্রধান অবিদ্যার প্রতিবিম্বিত ব্ৰহ্ম-চৈতন্যের নাম জীব। “মায়া-বিশ্বে বশীকৃত্য তাং স্যাৎ সর্বজ্ঞ ঈশ্বর। অবিদ্যাবশগঃ (জীবঃ), তদ্বৈচিত্রাদনেকধ। ” s জীবের কথা পরে বলা হইবে, এখন ঈশ্বরের কথাই বলা হইতেছে। । অদ্বৈতবাদী বৈদান্তিকগণ নীরূপ আকাশেরও প্রতিবিম্ব স্বীকার করেন। তাহারা বলেন, গভীর কূপ মধ্যে দৃষ্টিপাত করলে আকাশস্থ মেঘমালা ও নক্ষত্ররাশি দৃষ্ট হয়, এবং আকাশে সে সকলের মধ্যে যতটা ব্যবধান থাকে, তাহাও অবিকল দৃষ্ট হয়। এই যে মেঘ ও নক্ষত্রাদির ব্যবধান ও তন্মধ্যগত অবকাশ, উহ বস্তুতঃ আকাশেরই প্রতিবিম্ব।
হিন্দু-দর্শন। ৫৭ উক্ত প্রকার মায়া যেরূপ পরব্রহ্মে ঈশ্বর ভাব আনয়ন করে, ঠিক সেইরূপ পরমেশ্বরেও বিশ্ব-সৃষ্টির অনুকূল ক্রিয়াশক্তি সমুদ্বোধিত করে। ঈশ্ব মায়া সম্বন্ধের অভাব হইলে, তাহার ঈশ্বরভাব যেমন বিলুপ্ত হয়, তেমনি সর্বপ্রকার ক্রিয়াশক্তিও তাহার তিয়াে- হিত হইয়া যায়। এইজন্যই বেদান্ত-শাস্ত্রে জীবভাব ও ঈশ্বর উভয়ই মায়াকক্সি ত অনিত্য অবাস্তব বলিয়া উঘােষিত হইয়াছে। “মায়াখ্যাঃ কামধেনােবসো জীবেশ্বরবুতে। যথেচ্ছ পিবতাং দ্বৈতং তত্ত্বদ্বৈতমেব হি।” (পঞ্চদশী) অর্থাৎ, মায়ানমক কামধেনুর বৎস দুইটা—একটা জীব, অপটী তাহারা উভয়ে ইচ্ছামত দ্বৈতদুগ্ধ পান করে করুক ; কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অদৈতই তত্ত্ব অর্থাৎ পরমার্থ সত্য, দ্বৈত নহে। উক্ত ঈশ্বরভাব মায়া-কল্পিত; সুতরাং কালপরিচ্ছিন্ন হইলেও তনাদি কোনও শুত মুহূর্তে যে মায়ার সহিত পরব্রহ্মের সম্বন্ধ ঘটিয়াছিল, এবং সেই সম্বন্ধের ফলে ব্রহ্মে ঈশ্বভাব পরিকল্পিত হইয়াছিল, মানবের ক্ষুদ্র বুদ্ধি তাহা অবধারণ করিতে পারে না। কাজেই অর্বাচীন মানবের পক্ষে ‘অনাদি বলিয়া সন্তুষ্ট থাক। ভিন্ন গত্যন্তর নাই। ব্রহ্মের ঈশ্বরভাব যেমন অনাদি, তেমনি আবার সান্ত বা বিনাশশীল। এমন এক সময় আসিবে, যখন জাগতিক অন্যান্য পদার্থের ন্যায় ঈশ্বরের ঈশ্বরভাবও চিরকালের জন্য অস্তমিত হইয়া যাইবে,-উহার অস্তিত্ব পৰ্যন্ত বিলুপ্ত হইবে। অবশ্য এ কথা কেবল শাস্ত্র ও তর্কের সাহায্যেই জানিতে পারা যায় । কিন্তু অনুভব-গােচর করিবার শক্তি কাহারও নাই। সুতরাং কবে যে সেরূপ দুদ্দিনের আবির্ভাব হইবে, তাহা ভাবিয়া কাতরতা-বৃদ্ধির প্রয়ােজন নাই। অতঃপর ঈশ্বরকৃত সৃষ্টি-প্রপঞ্চ হিন্দু-দর্শন। সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলােচনা করা আবশ্যক হইতেছে। অতএব এখন আমরা সে বিষয়েরই অবতারণা করিতেছি। ঐশী-সৃষ্টি। আন্তিক দর্শনে ও তদনুগামী অন্যান্য শাস্ত্র মধ্যে সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে বহু প্রকার মতভেদ পরিদৃষ্ট হয়। তন্মধ্যে এই তিনটী মত প্রধান—আরম্ভবাদ, পরিণামবাদ ও বিবৰ্ত্তবাদ। - অারম্ভবাদ। প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক পণ্ডিতগণ সাধারণতঃ আরম্ভবাদের পক্ষ- পাতী। তাঁহারা বলেন,-সুক্ষ্ম অবয়ব সমষ্টির দ্বারা তদপেক্ষা স্থূল ও স্কুলতর কাৰ্য্য আরব্ধ হইয়া থাকে। উৎপত্তির পূর্বে কোনও কাৰ্য্যই সৎ বা বিদ্যমান থাকে না। সূক্ষ্ম অবয়বশি পরস্পর সম্মিলিত হইয়া অভিনব কার্যের সৃষ্টি করিয়া থাকে। কাৰ্য্যগুলি উৎপত্তির পর নিজ নিজ আরম্ভক অবয়ব-সমুহকেই আশ্রয় করিয়া বর্তমান থাকে। এই মতে কাবণী ভূত অবয়ব-সমূহকে বলা হয়- আরম্ভক ; আর তৎকাৰ্য্য-সমূহকে বলা হয়-ার। আরম্ভক কারণের অপর নাম-‘সমবায়ী’ কারণ। কৰ্ত্ত সেই সকল সমবায় কারণের উপর কাৰ্য্যোৎপাদনক্ষম ব্যাপার উৎপাদন করিয়া থাকেন; এই জন্য ঐ সকল কার্যের কাকে বলা হয়--নিমিত্ত কারণ। নিমিত্ত কারণ ও সমবায়ী (উপাদান) কারণের অতিরিক্ত আরও একটা কারণের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় । তাহার নাম- অসমবায়ী কারণ। অসমবায়ী কারণ সাধারণতঃ গুণ ও ক্রিয়া ব্যতীত আর কেহ হয় না। অসমবায়ী কারণ সমবায়ী কারণে হিন্দু-দর্শন। বিদ্যমান থাকিয়াই কাৰ্যোৎপাদন করিয়া থাকে ; কোথাও এ নিয়মের অন্যথা হয় না । অসমবায়ী কারণের অভাব হইলে কোনও কাৰ্যই বর্তমান থাকে না বা থাকিতে পারে না। কিন্তু সমবায়ী কারণ ও নিমিত্ত কারণের অভাবে সৰ্বত্ৰ কাৰ্য্য ধ্বংস হয় না। একটা উদাহরণের তারা বিষয়টা পরিস্কার করিবার চেষ্টা করা যাউক। প্রসিদ্ধ মৃন্ময় ঘট একটি কাৰ্য। কুম্ভকার কপাল ও কপালিফা নামক দুই টী অংশকে একত্রিত করিয়া পস্পরের সহত,পরস্পরকে সংযােজিত করিয়া ‘ঘট’ নিৰ্মাণ করিয়া থাকে। এস্থলে কুম্ভকার নিমিত্ত কারণ, কপাল’ ও ‘কপালিকা অংশ দুই টা আরম্ভক বা সমবায়ী কারণ, আর সেই কপাল ও কপালিকা’র সংযোেগ হইতেছে-‘অসমবায়ী’ কারণ। কেননা, ঐ সংযোগের সদ্ভাবেই ঘটের সদ্ভাব। আর উহার অভাবেই দুটের অসদ্ভাব বা ধ্বংস সুনিশ্চিত। উপরে আরম্ভবাদ সম্বন্ধে যে বিবৃতি প্রদত্ত হইল, আলোচ্য বিশ্বপ্রপঞ্চ সম্বন্ধও তাহার অনুসরণ করিতে হইবে। এই যে, বিশাল বিশ্ব-প্রপঞ্চ, যাহা আমাদের প্রত্যক্ষ গোচর হইতেছে, ইহাও এক সময়ে (প্রলয়কালে) অসৎ বা অবিদ্যমান ছিল, পরে সর্বজ্ঞ সর্বশক্তি পরমেশ্বর স্বীয় শক্তি-প্রভাবে পরমাণুপুঞ্জ হইতে দ্বমুক এসরেণুক্রমে বিশাল বিশ্বরাজ্য রচনা করিয়াছেন পৃথিবী, জল, তেজঃ ও বায়ু—এই চারি ভূতের চারি- প্রকার পরমাণু আছে। পরমাণুসমূহ নিত্য, প্রলয়কালেও উহাদের ধ্বংস হয় না। দুই দুইটা পরমাণুর সংযােগে এক একটা স্নগুকের সৃষ্টি হয়, আবার দুই দুইটা দ্বণুকের সংযােগে একটা সরেণুর উৎপত্তি হয়, ইত্যাদি।
হিন্দু-দর্শন। এ মতে দুইটী পরমাণু হয়,-একটা দ্ব্যণুকের ‘আরম্ভক বা সমবায়ী কায়ণ ; আবার দুই দুইটী দ্বণুক হয়—একটা এস- নুর আরম্ভক। ঐ পরমাদ্বয়ের যে সংযােগ যাহার দ্বারা দ্বাণুকের সৃষ্টি হয়, তাহা অসমবায়ী’ কারণ, আর স্বয়ং পরমেশ্বর উহাদের ‘নিমিত্ত কারণ। আন্তবাদে কাৰ্যসৃষ্টি সম্পূর্ণ অতি- নব। উৎপত্তির পূর্বে ও পরে কারণের (সমবায়ী কারণে) সহিত কার্য্যের কোন প্রকার সম্বন্ধ ছিল না ও থাকিবে না। সুতরাং ক য ও কারণ এক অভিন্ন বস্তু নহে, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। অতএব আরম্ভবাদে কাৰ্য-কারণে অভিন্নভাব সিদ্ধ হয় না, এবং “সবে সােম্যেমগ্র আসীৎ” “একমেবাদ্বিতীয় ” ইত্যাদি শ্রুত- বাক্যেরও সহজে অর্থ-সঙ্গতি হয় না। এই ভয়ে সাংখ্যসম্প্রদায়ের আচাৰ্যগণ পরিণামবাদের আশ্রয় লইয়া থাকেন। পরিণাম-বাদ। তাহারা বলেন, কাৰ্য কখনও স্বীয় উপাদান কারণ (সমবায়ী কারণ) হইতে পৃথক নহে; পরন্তু উপাদান-কারণই অবস্থ-ভেদে বিভিন্ন প্রকার কাৰ্য্য-সংজ্ঞা লাভ করিয়া থাকে। এই কাৰ্য্য- মাত্রই কারণ হইতে অ থক বস্তু। জগতে “নাসদুৎ পঙ্গুতে, ন চ সদিন ত” অর্থাৎ যাহা অসৎ-অবিদ্যমান-আকাশকুসুম-সদৃশ, তাহ। কখনও উৎপন্ন হয় না। আর যাহা সৎ-বাস্তবসাযুক্ত, তাহা কখনও বিনষ্ট হয় না। সৎ বস্তু চিরকালই আছে ও থাকবে, আর যাহা অসৎ-বাস্তব-সত্ত্ববিহীন, তাহা কস্মি কালেও শত-প্রযঙ্গও আত্মলাভ করে না ও করিতে পারে না,—ইহাই অবিসম্বাদিত নিয়ম। কখনও এ নিয়মের অন্যথা হয় নাই ও হইবে না।
হিন্দু-দর্শন। এই নিয়মানুসারে সাজ্ঞবাদিগণ বলেন,—আরম্ভবাদীর অভি মত-পরমাণুপুঞ্জ জগৎপ্রপঞ্চের মূল কারণ নহে; মূল কারণ ( উপাদান কারণ) হইতেছে—ত্রিগুণাত্মিক। প্রকৃতি। রজঃ ও তমঃ,—এই গুণত্রয়ের সমষ্টিগত নাম প্রকৃতি। প্রকৃতির অপর নাম প্রধান। * এই ত্রিগুণময়ী প্রকৃতিই জীবগণের ক- অশে মহৎ অংস্কার প্রভৃতি কাৰ্য্যরূপে পরিণত ইয়া স্কুল, স্থূলতার ও স্থূলতম ক্রমে এই বিশাল বিশ্ব-প্রপঞ্চের আকার ধারণ করিয়াছে। ইহাদের মতে ঈশ্বর বা অন্য কেহ প্রকৃতির দ্বারা জগৎ সৃষ্টি করেন নাই ; পরন্তু প্রকৃতিই জগদাকার ধারণপূর্বক বিবিধ ণৈচিত্র্যময় বিশ্ব-সংজ্ঞা লাত করিয়াছে। বিশ্বপ্রপঞ্চের প্রলয়কালে এই সকল নামরূপ ভেদ বিলুপ্ত হইলে পর, উক্ত মূল প্রকৃতিই আবার সাম্যাবস্থায় অবস্থান করিবে। পরিণামদী আচাৰ্য্যগণ এতদনুকুল বিবিধ যুক্তি ও প্রমাণ প্রদর্শন করি। আপনাদের সিদ্ধান্তের সারবত্তা সমর্থন করিয়া থাকেন। বিবৰ্ত্তবাদ। অতঃপর বিবৰ্ত্তবাদের কথা। বিবৰ্ত্তবান প্রধানতঃ শঙ্কর- সম্প্রদায়ের অভিমত। কিন্তু আচাষ শঙ্কর নিজে প্রকৃতপক্ষে সাংখ্যমতে ত্রিগুণের পরিচয় এই প্রকার- “সত্ত্বং লঘু প্রকাশকমিষ্টমুপষ্টকং চলং চ রজঃ। গুরু বরণমেব তমঃ প্রদীপবচ্চাৰ্থতে বৃত্তিঃ॥” (ঈশ্বরকৃষ্ণ) সত্ত্বগুণের ধৰ্ম্ম-লঘুত্ব ও প্রকাশ, রজের ধর্ম—উত্তম্ভন ও চঞ্চলতা, আর তমের ধর্মগুরুত্ব ও আবরণ। ইহারা মিলিতভাবে কাৰ্য্য নিৰ্বাহ করিয়া থাকে।
হিন্দু-দর্শন। বিবৰ্ত্তবাদী ছিলেন কি পরিণামবাদী ছিলেন, তাহা নির্ধারণ করা বড় কঠিন। কারণ, তৎসম্বন্ধেও আচাৰ্যগণের মধ্যে মতভাে পরিলক্ষিত হয়। ঐ প্রকার মতভেদের প্রতি কটাক্ষ করিয়া উপহাসস্থলে কেহ কেহ বলিয়াছেন, “কৃপণধী: পরিণামমুদীক্ষতে, ক্ষয়তকল্মষধীন্তু বিবৰ্ততা।” এখানে পরিণামবাদীকে ‘কৃপণধী বলা হইয়াছে, আর বিব- বাদের পক্ষ তাকে ক্ষয়ি ১৫ লুধী অর্থাৎ বিমলবুদ্ধি বল। হইয়াছে। অবশ্য, উপরি উদ্ধত বাক্যের তাৎপৰ্য লইয়াও আবার ব্যাখাতৃবর্গের মধ্যে মতবিরােধ উপস্থিত হইয়াছে। কেহ লে,-উক্ত বাক্যের যথা ও অর্থে ই তাৎ; আবার কেহ কেহ বলেন,—উহা পরিহাস-বাক্য, গতরাং যথাশ্রুত অর্থ পরিত্যাগ না করিলে উহার তাৎপৰ্য ব্যাহত হয় । অতএব বুঝিতে হবে যে, বিবৰ্ত্তবাদের পক্ষকে নিন্দা করিয়া পরিণামবাদের পক্ষকে প্রশংসা করাই ঐ বাক্যের তাৎপৰ্যার্থ । সে যাহা হউক, উক্ত বাক্যের তাৎপৰ্যার্থ যাহাই হউক, আচার্য্যের অভিপ্রায় লইয়া যে স্বসম্প্রদায়ের মধ্যেই মতভেদ উপস্থিত হইয়াছিল, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। সুতরাং এ বিষয় লইয়া আর অধিক বাক্যব্যয় করা অনাবশ্যক। এ কথা খুবই সত্য যে, অধ্যাসবাদ যেমন আচাৰ্য শঙ্কমের তীক্ষ্ণ- মণীষার অদ্ভুত আবিষ্কার, আলােচ্য বিবৰ্ত্তবাদও তেমনি তাহার সুচিন্তাবৃত্তির অতুলনীয় ফল। তাহার উপদেশাবলী আলােচনা করিলে, সে কথা অস্বীকার করিতে পারা যায় না। এই কারণেই কোন কোন আচাৰ্য উভয় সম্প্রদায়ের সম্মান রক্ষাকল্পে পরিণাম বাদ ও বিবৰ্ত্তবাদ উয়েরই পৃথক স্থান নির্দেশ করিয়াছেন।
হিন্দু দর্শন। ব্ৰহ্মকে বিশ্ব প্রপঞ্চের বিবৰ্ত্তকরণ বলিয়াছেন, আর মায়ােপহিত গুদ্ধ ব্ৰহ্মকে (ঈশ্বরকে) পরিণাম-কারণরূপে নির্দেশ করিয়া- ছেন। সুতরাং শুদ্ধ (তুরীয়-পদবাচ্য) ব্রহ্মের তুলনায় এই জগৎ বিবৰ্ত্ত, আর মায়ােপহিত ব্রহ্মের তুলনায় পরিণামরূপে পরিগৃহীত হওয়ায় উভয় বাদই তুলরূপে সমাদৃত হইয়াছে। পূর্বোক্ত পরিণামবাদ হইতে বিবৰ্ত্তবাদের বিশিষ্টতা এই যে, পৰিণামস্থলে এক বস্তু স্বীয় আকারা গত বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করিয়া অন্যাকারে প্রকটিত হয়। তৎকালে তাহার আর পূর্বতন আকার বা স্বরূপ বিদ্যমান থাকে না ; সমস্তহ বিধ্বস্ত হইয়া যায়, কিন্তু বিবর্তস্থলে সেরূপ কিছু হয় না। যে বস্তু যে প্রকার রূপ ও স্বভাব সম্পন্ন, সে স্তু সেইরূপে ও সেই স্বভাবেই বিদ্যমান থাকে, অথ> দশক ব্যক্তি সেই বস্তুকে অন্য প্রকারে দর্শন করে- অন্য বস্তু বলিয়া মনে করে। অবশ্য, অজ্ঞানই তথাবিধ ভ্রান্তি- সমুৎপাদনের বীজ বা মূল কারণ। উক্ত বিবৰ্ত্তবাদ-সম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, কূটস্থ ব্ৰহ্ম এই বিশ্ব- প্রপঞ্চের কারণ সত্য; কিন্তু কুম্ভকার যেরূপ ঘটাদি কার্যের কারণ, তিনি সেরূপ কারণ নহেন; পন্তু কোনপ্রকার বাহ উপাদান সংগ্রহ না করিয়াই, এবং নিজে কোনপ্রকার বিকার প্রাপ্ত না হইয়াই-অবিকৃত থাকিয়াই দৃশ্যমান জলদাকারে প্রকাশ পাইতে- “সতত্ত্বােেহথা প্রথা বিকার ইদাহৃতঃ। অততােহথা প্রথা বিবৰ্ত্ত ইত্যুদীরত।” অর্থাৎ কোন বস্তুর যে স্বরূপতই অন্যপ্রকারে প্রকাশ, তাহার নাম পরিণাম ; আর স্বরূপের অন্যথাভাব ব্যতিরেকেই যে থাকারে প্রকাশ, তাহার নাম—ববৰ্ত্ত।
৬৪ হিন্দু দর্শন। ছেন; অথবা তিনি নিত্য নির্বিকারভাবে বিদ্যমান থাকিলেও জীবগণ অনাদি-বাসনাবশে তাহাকে দেখিতে বা বুঝিতে না পারিয়া জান্তিময় বিশাল বিশ্বমাত্র দর্শন করিয়া থাকে। এবম্বিধ অধ্যাসের ফলে, অধ্যাসাশ্রয় ব্রহ্মে জাগতিক দোষ গুণ বিন্দুমাত্রও সংক্রামিত হয় না। আচাৰ্য বলিয়াছেন,-“যত্র যদধ্যাসঃ, তৎকৃতেন দোষেণ গুশেন বা আনুমাত্ৰেণপি ন স সম্বধ্যতে।” (অধ্যাভাষ ); সুতরাং ভ্রান্তির বশবর্তী জীবগণ ব্রহ্মে জগৎ দর্শন করিলেও প্রকৃত পক্ষে সেই জগৎ ব্রহ্মকে স্পর্শ করিতে পারে না। পারে না বলিয়াই ব্রহ্মের বিশুদ্ধতাও ব্যাহত হয় না। ইহাই সাধারণত বিবৰ্ত্তবাদের বিশিষ্টত। উল্লিখিত বালয়ের মধ্যে আরম্ভবাদ ও পরিণামবাদ উভয়ই অদ্বৈতবাদ সংস্থাপনের পথে আদৌ অনুকূল নহে। কারণ, উক্ত উভয়বাদই কাৰ্য্য ও কারণের ভে-সাপেক্ষ; সুতরাং দ্বৈতবাদেই সম্পূর্ণ সমর্থক। উহাদের যে কোনও একটী পক্ষ গ্রহণ করিলেও জগতের অসত্যতা প্রমাণিত হয় না, এবং জগৎকারণ ব্রহ্মের শ্রুতিসম্মত বিশুদ্ধতা ও নিরপেক্ষ-কারণ, সংরক্ষিত হয় না ; সুতরাং “একমেবাদ্বিতীয়” (ব্রহ্ম সজাতীয় বিজাতীয় ও স্বগত ভেদরহিত), এবং “দৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়” ( তিনি ইচ্ছা করিলেন, আমি বহু হইব—জন্মিব) ইত্যাদি অদ্বৈতবােধক শ্রুতি- বাক্যেও মর্যাদা রক্ষা পায় না। পক্ষান্তরে, পূর্বোক্ত বিবৰ্ত্তবাদের আশ্রয় গ্রহণ করিলে সকল দিকই রক্ষা পাইতে পারে। একদিকে ব্রহ্মের জগৎকারণ, নির্বিকারতা ও বিশুদ্ধ অদ্বিতীয়তা যেমন রক্ষা পায়, তেমনিই আবার অপরদিকে পারমার্থিক সত্তার অভাবেও জগতের ব্যবহারিক সত্যতা রক্ষা করা যায়। এই কারণেই হিন্দু-দর্শন। শর্বোক্ত বিবর্তী অমৈতী পণ্ডিতগণের এত প্রিয় ও আদরের বঙ হইয়াছে। বিবর্তমান বাদ দিলে শরসম্মত অদ্বৈত ৰা একেবারে অসভব না হইলেও অনায়াসসাধ্য যে হয় না, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। এতদনুসারে বোরোর বা আয়ােপহিত ব্ৰহ্ম একই বিশ্বরি নিমিত্ত ও উপাদান কারণৰূপে পৰিকল্পিত হইয়াছেন। বিশ্বরচনার জন্য তাঁহাকে তার বাহির হইতে কোনপ্রকার উপাদান সংগ্রহ করিতে হয় নাই। প্রসিদ্ধ লুকীট । মাকড়শা) যেরূপ বাহু উপাদান না লইয়াই আপনার শরীর ও চৈতন্যের সাহায্যে সুত্ৰ নিৰ্মাণ করিয়া থাকে, তদ্রুপ পরমেরও স্বীয় চৈত ও মায়া- শক্তির সাহায্যে দৃশ্যমান বিশ্বকাৰ্য সম্পন্ন করিয়া থাকেন। তাহা জন্য আর কোনও বা বস্তুর অপেক্ষা করেন না। দৃষ্টান্তস্থলে লুকীটের শরীর হয় উপাদান-কারণ, আর তাহার নশক্তি হয় নিমিত্ত-কাণ; অর্থাৎ মাকড়শা স্বীয় জ্ঞানশক্তির প্রভাবে আপনার দেহ হইতে সূত্ৰশি নিষ্কাশিত করে, আর আলােচ্য- হলে পরশেখর ধীয় নিরন্তু চৈতন্ত-প্রভাবে শরীরস্থানীয় মায়াকে আগাকারে পরিনমিত করেন ; কাজেই তাহার উভয় প্রকার কারতাই সিদ্ধ হয়। ইহাও অদ্বৈতবাদের অপর একটী বিশিষ্ট। উপরে যে পয়মেনের কথা বলা হইল, তিনিই বিশ্ব সৃষ্টির একমাত্র কর্তা, এ কথাও বলা হইয়াছে। এলয়াবসানে তাঁহার হৃদয়ে বিশ্বসৃষ্টির ইচ্ছা জাগরিত । “মৈত বহু স্যাং এলা- নেয়”-তিনি ইচ্ছা করিলেন, আমি বই হই—আমি অবি। তিনি আমােসং সংকমাত্রেই তিনি তেল প্রভৃজি ভূর্গের হিনি-৫ হিন্দু-দর্শন। সৃষ্টি কৰিলেন। অতঃপর ইচ্ছা করিলেন যে, “অনেন জীবেনাত্মন অনুপ্রবি নামরূপে ব্যাকরণি।”—আ'ম এই জীবাত্মারূপে এই সৃষ্ট ভূবর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ-পৰ্ব্বক এ সকলের নাম ও রূপ অর্থাৎ বাচক শব্দ আকৃতিভেদ প্রকটিত করিব। এই প্রকার সংকল্পের পর তিনি নিজেই জীবভাবে প্রকটিত হইয়া স্বকৃত পঞ্চ- ভূতের নাম ও আকৃতি প্রকাশ করিলেন, এবং তৎসৃষ্ট। তদেবানু- বিশৎ” সৃষ্টির পর নিজেই সে সমুদয়ের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইলেন ইত্যাদি। এ সকল কথার দ্বারা স্বয়ং শ্রুতিই ভঙ্গক্রমে দৃশ্যমান জগৎ প্রপঞ্চের অসত্যতা বিজ্ঞাপ করিয়াছেন। কেননা, সত্য বস্তু মাত্রই স্বপ্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ সত্যস্তু কখনও আপনার অবস্থতির জন্য অপর কাহারও অপেক্ষা করে না । অবাস্তব অসত্য পদার্থের অবস্থা অন্যরূপ। সে কখনও কোনও একটা সত্যকে আশ্রয় না করিয়া থাকিতে পারে না। অস •্য বা ভ্রান্তিকল্পিত সর্প কখনও , বা তথাবিধ কোনও একটী সত্য পদার্থকে প্রবলম্বন না করিয়া থাকিতে পারে না। জগৎ যদি যথার্থই সত্য স্বপ্রতিষ্ঠিত হইত, তাহা হইলে কখনই তন্মধ্যে কাহারও প্রবেশ করিবার আবশ্যক হইত না এবং প্রবেশও সম্ভব হইত না। পরমেশ্বরের প্রবেশ হইতেই অনুমান করা যায় যে, সত্যপদার্থে অধিষ্ঠান ব্যতীত অসত্যের স্থিতি সম্ভবপর হয় না বলিয়াই পরমেশ্বর নিজে অধিষ্ঠান- রূপে আশ্রয় দিয়া অসত্য জগৎকে রক্ষা করিয়াছেন ও করিতেছেন। ছান্দোগ্যোপনিষদের উপদেশ হইতেই জানিতে পারা যায় যে, সৰ্বনিয়ন্তা পরমেশ্বর প্রথমতঃ তেজঃ, জল ও পৃথিবী—এই তিনটা- মত ভূত সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সেখানে আকাশ ও বায়ু সৃষ্টির হিন্দু দর্শন। কোনও কথাই নাই। কিন্তু তৈত্তিকীয় উপনিষদে যেখানে ভূতসৃষ্টির কথা বলা হইয়াছে, সেখানে অপর ভূতত্রয়ের সঙ্গে আকাশ ও বায়ু সৃষ্টির কথাও সন্নিবদ্ধ হইয়াছে। ব্রহ্মসূত্র এই উভয় প্রকার ক্ষতি সমাধান প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, যদিও ছান্দোগ্যোপনিষদে সৃষ্টি, প্রকরণে আকাশ ও বায়ুর উল্লেখ নাই, তথাপি উদ্ধাদের উৎপত্তি ছান্দোগ্যশ্রুতির অনভিপ্রেত বা বি প্রতিষিদ্ধ নহে। কারণ, তৈত্তিরীয় উপনিষদে যখন “তদ্ব। এতক্ষ্মায়ূন আকাশঃ সস্তৃত, আকাশদ্বায়ু, বায়ােগ্নি, অগ্নেরাপ, অদ্ভঃ পৃথিবী” ইত্যাদি। ক্রমে স্পষ্টাক্ষরে বায়ু ও আকাশের উৎপত্তি বর্ণিত আছে, তখন “ৎ তেজোহসৃজত” ইত্যাদি স্থলে “আকাশং বায়ুং চ সৃষ্ট। তৎ { ব্রঙ্গ তেজঃ অস্ত” এই অর্থ গ্রহণ করিয়া :তর ন্যূনত। পরিহারপূর্বক সামঞ্জস্য বিধান করিতে হইবে। ফলকথা, বৈদান্তিক আচাৰ্য্যগণ সকলেই উক্ত ব্যাখ্যার অনুমােদন করিয়াছেন ও করিবেন এবং পঞ্চভূতের উৎপত্তি বিষয়ে একমত হইয়াছেন। অতএব এ বিষয়ে আর অধিক কথা বলা অনাবশ্যক। উপরে, যে পঞ্চভূতের উৎপত্তি-বিবরণ প্রদত্ত হইল, তাহা ব্যব- হারােপযােগী স্কুল-ভূত নহে-অতি সুক্ষ্ম জীবগণের ব্যবহারের অযােগ্য ; সুতরাং সে সকল ভূতের সাহায্যে জীবগণের প্রাক্তন কৰ্ম্মানুরূপ বিচিত্র ফলভােগ সম্পূর্ণ অসম্ভব। অথচ জীবগণের ভেদ-সম্পাদনই ভূত-সৃষ্টির মুখ্য বা একমাত্র উদ্দেশ্য। এখন সেই * সেই পূৰ্ব্বকথিত আত্মা (পরমেশ্বর) কইতে প্রথমে আকাশ উৎপন্ন হইল, ক্রমে আকাশ হইতে বায়ু বায়ু হইতে তেজঃ, তেজ হইতে জল এবং জল হইতে পৃথিবী উৎপন্ন হইল।
হিন্দু-দর্শন। ভূতবর্গ যদি জীবগণের ভোগে না আইলে, তাহা হইলে সৃষ্টিজ উটে বাইয়া যায়। এই কারণে 'তাগায় পুনর্ভোগ্য ভোগায়তনে। পক্ষীরােতি তগবান প্রত্যেক বিয়াকিম ॥” (পঞ্চদশ ) বগণের কাজ জোগশাধনের জন্ধু এবং ভােগায়তন জর্থাৎ বাঙ্গাকে আশ্রয় করিয়া জীবগণ কর্মফল ভােগ করিবে, সেই ভােগাধিষ্ঠান দেয় অচনার উদ্দেশ্যে ভগবান্ (পরমেশ্বর ) স্বকৃত আকাশাদি পঞ্চভূতের প্রতেকটীকে পক্ষীকৃত বা পঞ্চাত্ম করিলেন। অভিপ্রায় এই যে, সুহ্ম-সে। অধিষ্ঠিত জীবের কোন প্রকার স্থূলভাগ সম্ভবপর হয় না; স্কুল-ভোগের জন্য স্কুল দেহের গাব হয়। পক্ষান্তরে স্কুল দেহে থাকিয়া সু-স্কুলের উপভোগ * সুশীলের পরিচয় এই প্রকার- পঞ্চপ্রাণ মনােবৃদ্ধি দশেষি-সমৰিম । অপঞ্চীকৃত-ভূতােৰং সৃং তল্পিমুচ্যতে।” অর্থাৎ- পাণ, অপান, সমান, বাম ও উজান ভেদে পঞ্চ প্রণ, পঞ্চঙ্গনেন্দ্রিয় ও পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় এবং মন ও বুদ্ধি,-এই সপ্তদশ অবয়বে রচিত দেহই সু-দেহ ও লিঙ্গদেহ নামে কথিত । এই সুদেহ সৃষ্টির প্রথমে উৎপন্ন এবং মােক্ষের পূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী। মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে কা বিলােপ ঘটে। সুদেহই জীবের গােপ- বর্গ-ন। সূক্ষ্মদেহ অবলম্বন করাই : সাধারণত জন্ম মরণ স্বর্গ নরক এবং ভােগ ও অপব ৩ হইয়া থাকে। জীবের রূপতঃ অমণাদি ধৰ্ম্ম না থঃ লও দেহের রণাদি লইয়াই জীবের জন্মগরণাদি অবস্থা হইয়া থাকে।
;
হিন্দু-দর্শন।
করাও জীবের পক্ষে অসম্ভব হয়। এই জত প্রথম সূক্ষ্ম
আকাশাদি পঞ্চভূতের স্কুল সম্পাদন
পঞ্চীকরণই সেই স্থূলতা-সম্পাদনের একমাত্র উপায়। সেই জন্যই
পরমেশ্বর ঐ সকল তুতের পঞ্চীকরণে প্রবৃত্ত হইলেন। পঞ্জীকরণ
অথ—পঞ্চাত্মককরণ; অর্থাৎ অবিমিশ্রিত এক একটা ভূতকে
অপরাপর চারি ভূতের সহিত মিশ্রিত করা। তাহার ফলে আর
চারিটি ভূতের অংশের সহিত মিলিত হইয়া প্রত্যেক ভূতই পঞ্চত
স্কুল ভূতরূপে পরিণত হয় ।
পঞ্চীকরণের প্রণালী এইরূপ-প্রথমতঃ পঞ্চভূতের প্রত্যেক
টাকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া, উহাদের প্রত্যেক অংশকে
আবার চারি ভাগে বিভক্ত করিতে হয়। অনন্তর এই চারি
ভাগের এক এক ভাগকে অপরাপর ভূতের অর্ধাংশের সহিত
মিলিত করিলেই সেই মাংশগুলি পঞ্জীকৃত হইয়া পড়ে।
সেই পঞ্চীত হব হইতেই স্থাৰৰ জম সমস্ত জীবদেহ ও
ভােগ্য বস্তু নির্শিত হইয়াছে। বর্তমান সময়ে আকাশ বায়ু প্রভৃতি
যে কোন খুঁত ও ভৌতিক পদার্থ আমাদের উপলব্ধিগােচর হইয়া
অধ। বিধায় চৈকৈ চতুর্থ। প্রথম পুনঃ।
বেতর দ্বিতীয়াংশধোজনাৎ পঞ্চপতে ॥
অর্থাৎ-এক একটা সূক্ষ্ম ভূতকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া, এক
এক অদ্ভূভাগকে আবার চারি ভাগে বিভক্ত করিয়া ইহাদের
( চার ভাগের এক একটা ভাগকে অপরাপর ভূতের অভাগের
সহিত মিলিত করিলেই ঐ পঞ্চভূতের অর্ধাংশগুলি পঞ্চাত্মক
হইয়া থাকে।
হিন্দু-দর্শন। থাকে, তাহার কোনটাই অবিমিশ্র বিশুদ্ধ ভূত বা ভৌতিক পদার্থ নহে -সকলই বিমিশ্র পঞ্চভূতাত্মক। অতএব দৃশ্যমান জগৎ- টাকেই পক্ষীকৃত বা পঞ্চাত্মক বলিয়া নির্দশ করা যাইতে পারে। আমরা প্রথমেই বলিয়াছি, মায়া-সম্বলিত পরমেশ্বর অনির্ব- নীয় মায়ার সাহায্যে আপনার আমােঘ সঙ্কল্প দ্বারা এই দৃশ্য- জগৎ নিৰ্মাণ করিয়াছেন। উক্ত ঐশী মায়াকে সৎ বা অসৎ বলিয়া নির্ণয় করা যায় না; এই জন্য উহাকে অনির্বচনীয় বলিতে হয়। মায়া অসৎ-আকাশ-কুসুমাদির ন্যায় অসত্য বা অবস্তু চলে তাহা হইতে কোনপ্রকার কার্যৎপত্তি সম্ভবপর হয় না। পক্ষান্তরে ব্রহ্মের ন্যায় সৎ-কুটন্তু সত্য পদার্থ হইলে উহার কালবশে অত্যন্ত উচ্ছেদ হওয়া অসম্ভব হয়, এবং দুৎপন্ন জগৎ চিরকাল অক্ষত দেহে অবস্থান করতে সমর্থ হয়। অথচ, মায়া ও মাষিক জগতের ধবংস বা উচ্ছেদ সর্বজনবিদিত। এই কারণে ঐশী মায়াকে অনির্বচনীয় একটা ভাৰপৰাৰ্থ বলিয়া স্বীকার করিতে বেদান্ত-শাস্ত্র বাধ্য হইয়াছেন। সৃষ্টি। '। 1 সেখানে সে সক ব্যবহার-জগতে দেখা যায়, মায়াপটু ঐন্দ্রজালিক স্বীয় শক্তি- প্রভাবে বিচিত্র মায়াজাল বিস্তার করে, এবং তা দর্শকমণ্ডলী সভৃষ্ণনয়নে সে দৃশ্য দর্শন করিয়া থাকে। মায়িক পদার্থ প্রকৃতপক্ষে অসত্য ইলেও, অজ্ঞ দর্শকমণ্ডলী যেমন সে সকলকে সত্য মনে করিয়া বিমুগ্ধ হয়; এবং ঐ ঐন্দ্রজালিকই যেমন সে সকল মায়াময় পদার্থের উৎপত্ত, স্থি ও লয়, অবস্থা: জয়ের একমাত্র আশ্রয় ; ঠিক তেমনই সত্যসঙ্কল্প পরমেশ্ব স্বী হিন্দু-দর্শন। ৭১ মায়াশক্তি-প্রভাবে এই বিচিত্র বিশ্ব প্রপঞ্চ প্রকাশ করেন; এবং উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়, তিন অবস্থাই সে সকলের একমাত্র আশ্রয়। সেই আশ্রয়ের সত্তা বা অস্তিত্ব লইয়াই দৃশ্য জগতের অস্তিত্ব। অথচ এ সকল পদার্থ (জগৎ) মায়াকড়িত-অসত্য হইলেও অজ্ঞানান্ধ মনুষ্যগণ সত্যবােধে গ্রহণ করিয়া থাকে। মায়াবী ঐন্দ্রজালিকের অস্তিত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত (স্বতন্ত্র সন্তা- রহিত তৎপ্রদর্শিত দৃশ্যাবলী যেমন অসত্য-মিথ্যা বলিয়া অবধারিত হয়, তেমনই স্বতন্ত্রভাবে অবস্থানে অক্ষম পরমেশকাশ্রিত মায়া জগৎও স্বাধীনসত্তাবিহীন বলিয়া বিবেকী পুরুষ ইহাকে অসত্য-মিথ্যা বলিয়া অৰধারণ করিয়া থাকেন। এ সম্বন্ধে সাধারণ নিয়ম এই যে, যে সকল দৃশ্য পদার্থ উৎপত্তি, স্থিতি ও ধ্বংস—এই তিন অবস্থায়ই পরাপেক্ষিত বা পরাশ্রিত, সে সকল পদার্থ যেমনই হউক না কেন, প্রকৃত পক্ষে উহাদের স্বাধীন সত্তা কখনও নাই; কেবল আশ্রয়ের সত্তা লইয়াই উছারা সত্যের ন্যায় প্রতিভাত হইয়া থাকে। এই জন্য উহার মিথ্যা বা অসত্য বলি পরিগণিত হয়। ইহার দৃষ্টান্ত এই যে,-মুগ্ম র ট মৃত্তিকা হইতে উৎপ, উৎপ ত্তর পরেও মৃত্তকায়ই অবস্থিত, এবং ধ্বংসের পরেও মৃওিকাতে পরিণত হয়। এই ভাবে উৎপত্তি, স্থিতি ও ধ্বংস, এই অৰায়েহ মৃত্তিকার আশ্রত বলিয়া ঘট-রূপে ঘট যেমন অস , অথাৎ মৃ'ত্তকার সত্তা লইয়াই ঘটের সত্তা, উহার স্বতন্ত্র সত্তা নাই, এবং নাই বলিয়াই ঘট যেমন সত্য ও মিথ্যা হয়। থাকে, ঠিক তেমনই পরিদৃশ্যমান জড় জগৎও স্বীয় উপাদান-কারণ ব্রহ্মে চিরকাল সমাশ্রি অর্থাৎ উৎপত্তি স্থিতি ও ধ্বংস এই তিন অবস্থায়ই ব্ৰহ্ম-সত্তার অধীন। এই কারণে দৃশ্য জগৎপ্রপঞ্চকেও ৭২ হিন্দু-দর্শন। অসত্য বা মিথ্যা বলা হইয়া থাকে। বতঃ অগৎপ্রপঞ্চ কখনই আকাশকুসুম বা শশ-শৃঙ্গের ন্যায় অলীক বা অত্যন্ত অসৎ পদার্থ নহে এখানেই শঙ্করসম্মত অদ্বৈতবাদের সহিত বিজ্ঞান বাণী বৌদ্ধমতের মহৎ পার্থক্য। জীব। বাহার জয় সেই নির্বিকার নিঃসঙ্গ পরম পুরুষেরও অভিনব ইচ্ছাশক্তির সমুদ্রেক হইয়াছিল, এবং বহুধা বিভক্ত হই। জন্ম- পনিগ্রহের অভিলাষ জন্মিয়াছিল-তদৈক্ষত বহুং-প্রদায়ে; যাহার ভােগােযােগ দ্রব্যসম্ভার ও ভােগসাধন দেহযন্ত্ৰ নিৰ্মাণের অন্য এত আয়ােজন-অধিকন্তু অনন্ত বৈচিত্রধাম এই বিশাল বিচিত্র নির্মাণ করতে হইয়াছে ; সেই জীবের স্বরূপ ও জন্মমণাদি ব্যবহারের প্রকৃত ত কি ও কি প্রকার, তাহা না বলিলে বক্তব্য বিষয় শেষ হয় না, এবং জিজ্ঞাসুর আকাকাও পরিসমাপ্ত হয় না। এই এখন জীৰত্ব বিষয়ে আলােচনা করা আবশ্যক ইতেছে। আমরা অতঃপর দীৰতত্ব আলােচনা করিতে চেষ্টা করি। • বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধগণ বলেন, কোনও দৃশ্য পদার্থেরই বাহিরে অস্তিত্ব নাই। অৱস্থ বুদ্ধি-বিজ্ঞানই উহাদের আকর বা উৎপত্তি-স্থান। অন্তরে যখন যেরূপ বুদ্ধি-সংস্কার জাগিয়া উঠে, তখন সেরূপই বস্তুম ছবি বাহিরে দৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ বাহিরে সে সকলের কোনরুপ অস্তিত্বই নাই। অস্তিত্ব না থাকিলেও অবস্থা বশতঃ লোকে সে সকল বস্তুর অস্তিত্ব প্রম করিয়া থাকে। স্বপ্ন ইহার উত্তম দৃষ্টান্ত-স্থত।
হিন্দু-দর্শন। ৭ আমরা পূর্বেই বলিয়াছি যে, বেদান্তশাস্ত্রের সিদ্ধান্তে জীব ও ব্ৰহ্ম একই পদার্থ ; উভয়ের মধ্যে প্রভেদ অতি অল্পই আছে। শুদ্ধাদ্বৈতবাদে সে প্রতেও আবার বাস্তব নহে, উহা অবিদ্য-কল্পিত মিথ্যা বা অসত্য। অসত্য ভেদ কখনই বস্তুর পারমার্থিক ঐক্য অপনয়ন করিতে পারে না। হাশোগ্যোপনিষদে কথিত আছে যে, সেই পরমেশ্বর ইচ্ছা কম্নিলেন, আমি বহু হইব-জবি’--“তদৈক্ষত বহুস্যাং- প্রজায়ৈ।” তাহার পর তিনি আপনার আমােধ ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে ভূতসমূহ সৃষ্টি করলেন। কেবল ভূত সৃষ্টি করিয়াই তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারিলেন মা, আরও কর্তব্য তাহার হিপথে পতিত হইল। তিনি পুনশ্চ সঙ্কজ করিলেম, হস্ ইমাস্তিস্রো দেবতা অনেন জীবেনাত্মন অনুপ্ৰশি নাম-রূপে ব্যাকরবাণি”-আমি এই জীবরূপে উক্ত তিন দেবতার অর্থাৎ পঞ্চ- ভূতের অত্যন্তরে প্রবিষ্ট হইয়া নাম (সং) ও রূপ (আরুতি ) প্রকটিত করিব, অর্থাৎ ঐ সকল ভূতকে স্থলাকারে পরিণত করিয়া উহাদিগকে বিশেষ বিশেষ সংজ্ঞা প্রদান করিব ইত্যাদি। এখানে দেখা যায়, পয়ং পরমেই জীবরূপে জগতে প্রবেশ করিয়াছেন, এবং তিনিই সৰতাৰে প্ৰকৃত ভূত ভৌতিক পাখ- নিয় উপভােগ করিতেছেন। ইহা ছাড়া “তত্বমসি” “অহং ব্ৰহ্মাম্মি” ইত্যাদি শ্রুতি দ্বাৰাও প্রমাণ হয় যে, জীব ও ব্রহ্ম পরমার্থতঃ একই বস্তু; কেবল অনাদি অজ্ঞানৰশে উভয়ের মধ্যে দৈ কল্পিত হয় মাত্র। এখানে বলা আবশ্যক যে, কেবল আচার্য্য শরই যে জীব ও ব্রহ্মের অভেদবাদ অবলম্বন করিয়া আপনার অভিমত সিদ্ধান্ত সংস্থাপন করিয়াছেন, তাহা নহে; পরন্ত প্রায় ৭৪ হিন্দু-দর্শন। সকল বৈদান্তিক আচাৰ্যই জীব ব্রহ্মের অভেদবাদ সাদরে গ্রহণ করিয়াছেন। কেহ কেই বা অভেদের সহিত ভেদের সমন্বয় করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন মাত্র। ফল কথা, জীব যে, প্রকৃতপক্ষে ব্ৰহ্ম হইতে স্বতন্ত্র বস্তু নহে, এ বিষয়ে সকলেই সমস্বরে সম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছেন। এ স্থলে আচাৰ্য রামানুজ, ভট্টভাস্কর ও মধ্ব প্রভৃতির নামােল্লেখ করা যাইতে পারে। যাহা হউক, জীবহ্মের অভেদবাদই বেদান্ত-শাস্ত্রের সার সিদ্ধান্ত ; এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। এখন, কি প্রকারে যে অখণ্ড অনন্ত সচিদানন্দ ব্রহ্মের জীৰভাব আবির্ভূত হয়, অতঃপর তাহারই আলোচনা করা যাইতেছে। আমরা প্রথমেই বলিয়াছি যে, জাগতিক বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে যেমন বিভিন্ন শক্তির বিকাশ দেখিতে পাওয়া যায়, তেমনই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মেও একটা বিচিত্র শক্তির সদ্ভাব শাস্ত্রানুশাসন হইতে জানিতে পারা যায়। ঐ শক্তির পরিচয়-প্রসঙ্গে বিদ্যারণ্য স্বামী বলিয়াছেন, শক্তিরস্ত্যৈশ্বরী কাচিৎ সর্বস্তুনিয়ামিকা। তমারজঃসত্ত্বগুণ প্রকৃতিঃ, দ্বিবিধা চ সা । সত্ব শুদ্ধবিগুদ্ধি ত্যা মায়া বিদ্যে চ তে মতে।” আচাৰ্ষ্য রামানুজ প্রভৃতি বৈদাস্তিকগণ জীব হইতে ব্ৰহ্মকে বিচ্ছিন্ন বা ব্রহ্মের অংশ বলিয়া স্বীকার করিলেও অত্যন্ত এতে বা জীবাবস্থায় তাহার ব্রহ্মভাব স্বীকার করেন না; অধিকন্তু জীবব্ৰহ্মের বিভাগকেও উচ্ছেদ শীল বা বিনাশী বলিয়া মানেন না। তঁাহারা ঐ বিভাগকে অনাদি অনন্ত বলেন, এবং মুক্তকালেও সে রিভাগ অক্ষুন্ন থাকিবে বা বর্ণনা করেন; সুতরাং এ সমস্ত অংশে শঙ্কর-মতের সহিত তাহাদের মতের পার্থক্য অত্যন্ত অধিক।
হিন্দু-দর্শন। সরজন্তমোগুণময়ী উক্ত প্রকৃতিই মায়া-শব্দ বাচ্য। শঙ্করের জতে উক্ত মায়া অনির্বচনীয় পদার্থ ; উহাকে সৎ বা অসৎ কিছুই বলা যায় না। মায়া সৎ (পরমার্থ সত্য) হইলে মায়াময় জগতের কখনও উচ্ছেদ সম্ভবপর হইত না; আবার অসৎ হইলেও তাহা হতে কোন প্রকার কায়োৎপত্তি সম্ভব হইত না; কাজেই মামাকে সদসনির্বচনীয় বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। মায়া, প্রকৃতি ও অবিদ্যা, এই তিনটী শব্দ প্রকৃতপক্ষে তুল্যার্থ- বােধক হইলেও, বিদারণ্য স্বামী ব্যাখ্যানসৌকৰ্যার্থ একই প্রকৃতির মায়া ও আবিদ্যা নামে দুই টী বিভাগ কল্পনা করিয়াছেন; এবং সঙ্গে সঙ্গে ঐ উভয়ের স্বরুপগত প্রভেদও নির্দেশ করিয়াছেন। মথ-সত্ত্বওদ্ধবিশুদ্ধিভ্যাং মায়া বিদ্যে চ তে মতে। প্রকৃতির যে অংশ সগুণাধিক, সেই অংশ ‘মায়া’, আর যে অংশ তমােগুণ- প্রধান, সেই অংশে ‘অবিদ্যা-নামে পরিচিত। এবংবিধ বিভাগ যে সকল অদ্বৈতবাদীই মানিয়া লইয়াছেন, তাহা নহে । স্বয়ং বিদ্যারণ্য স্ব মীও সর্বত্র এই বিভাগের মর্যাদা রক্ষা করিয়া চলিতে পারেন নাই। তৎকৃত ‘পঞ্চদশী নামক গ্রন্থ দেখিয়েই এ কথার যাথার্থ প্রমাণিত হইতে পারে। সে যাহা হউক, বিদ্যারণ্য স্বামী উক্ত প্রকার বিভাঙ্গানুসারেই জীবেশ্বরাদি বিভাগ নিরুপণ করিয়াছেন। তাহার মতে—“মায়াবিষে বশীকৃত্য তাং স্মাৎ সর্বজ্ঞ ঈশ্বর। বিদ্যাবশগন্য, দৈচ্যিাদানক অর্থাৎ, সৰ্ব্বব্যাপী পরমব্রহ্ম মায়া-দর্পণে প্রতিবিধিত হইয়া শরসংজ্ঞা লাভ করিয়াছেন, আর অবিদ্যার প্রতিবিম্বিত হইয়া জীব- পদবাচ্য হইয়াছেন। মা স্বভাবতই শুদ্ধসত্ত্ব, সেই জন্য তৎ প্রাক্তন বিন্ধিত ঈশ্বরও সৰ্ব্বজ্ঞতা লাভ কৰিছেন, এবং মায়াকে স্বাবুশে *, ৭৬ হিন্দু-দর্শন। রাখিয়া যথেচ্ছরূপে পরিচালিত করিতেছেন, আর তম প্রধান অবিদ্যায় প্রতিবিম্বিত জীৰ অজ্ঞান বাংল-বশতঃ অবিদ্যার অধীন হইয়া পরিচালিত হইতেছে; এবং অজ্ঞানের তারতম্যানুসারে দেবভিৰ্য্যমুখাদি ক্ৰমে অনন্ত বৈচিত্র প্রাপ্ত হইয়া সংসার-ক্ষেত্রে পরিভ্রমণ করিতেছে। এখানে আর একটা কথা না বলিলে আমাদের কথা অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। সেইজন্য এখানে সেই কথাটা বলিয়া রাখা আবশ্যক। কথাটী এই, উপরে জীবতত্ত্ব সম্বন্ধে যাহা বলা হইল, তাহা প্ৰতিবিদের কথা। এততিরিক্ত আরও একটী বা আছে ; তাই অবচ্ছেদ- বাদ নামে পরিচিত। একই আকাশ যেমন টমধ্যে টাকাশ, মঠমধ্যে মঠাশ, এবং আরও অনেক বন্ধুরা পাচ্ছিন্ন বা সীমাবদ্ধ হইয়া বিভিন্ন নামে পরিচিত হয় ; মমই পরব্রহ্মও পূৰ্ব্বোক্ত মায়া ও অবিদ্যার অভ্যন্তরে তদুভয়ের দ্বারা অবচ্ছিন্ন বা সীমাবদ্ধ হইয়া ঈশ্বর ও শাৰ সংজ্ঞায় অভিহিত হন; সুতরাং মায়া হইতেছে ঈশ্বরের, আর অবিদ্যা হইতেছে জীবের অবচ্ছেদক। এই অবছে- কেই অপর মাম উপাধি।। কেহ কেই আবার উক্ত প্রকার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হইতে পারেন না। অতএব, তাহা বলিয়া থাকেন, । * সংস্কৃত দর্শন শাস্ত্রে ‘উপাধি’ ও ‘অবচ্ছেক শব্দের প্রয়ােগ অত্যধিক দৃষ্ট হয় । উপাধি ও অবচ্ছেদকের প্রধান কাৰ্য ইতেছে সাধাশ বস্তুকে বিশেষিত করা, এবং অপরিমিত বা গৎজুকে পরিমিরূপে প্রদর্শন করা অথবা নির্বিশেষ যঙ্গে সবিশেষ আরোপিত করা। স্মরণ রাখিতে হইবে যে, উহা ঐ প্রায় ব্যবহার সম্পাদনে সহায়তা করে মাত্র, কিন্তু কোন বরই বাতা- বিক অবস্থা ধ্বংস করতে পারে না।
হিন্দু-দর্শন।
প
কাৰ্য্যোপাখিরয়ং জীব, কারণণপাধিয়ী।”
অর্থাৎ, কাকুণীভূত মায়া হইতেছে-ঈশ্বরের উপাধি বা অবচ্ছে,
আর মাৰ্য বা : মায়ার পরিণাম অন্তঃকরণ হইতেছে-
বের উপাখি। ইহাদের মতে প্রকৃতির প্রাগুক্ত আর
অবিদ্যা বিভাগের কোনই প্রয়ােজন না । সাধারণত
ব্ৰহ্মশক্তি প্রকৃতিই মামা ও অস্থি স্বতন্ত্র দুইটা নামে ব্যবহৃত
হইয়া থাকে।
অঙ্গসুত্র বেদান্তদর্শনে উপরিউক্ত উভয় প্রকার মতেরই সমর্থন
দেখিতে পাওয়া যায়। জীবের স্বরূপ কি ? এই প্রশ্নের উত্তরে
সূত্রকার প্রথমে বলিয়াছেন-“অংশে। নানা ব্যপদেশা।
( ব্রহ্মসূত্র ৩২)। আবার প্রতিবিম্ববাদ সমর্থন পূর্বক
বলিয়াছেন-“আমি এব চ ” ( সূত্র ৩২)। এখানে
প্রথম সুত্রে জীবকে ব্রহ্মের অংশ বলায় অবচ্ছেদবদে সম্মতি প্রদান
করিয়াছেন। কারণ, অৰবােদেই জীবহ্মের আংশশিব
উপপন্ন হয়, প্রতিবিম্ববাদে নহে। প্রতিবিম্ব যে বিবস্তুর অংশ
নহে, ইহা যেমন যুক্তিত, তেমনই লােকব্যবহারসম্মতও বটে।
সুতরাং প্রথম সুত্র যে প্রতিবিধবাকে প্রদর্শক নহে, তাহাতে
আর সন্দেহ নাই। পক্ষান্তরে, উল্লিখিত তিীয় সুত্রে যে প্রতি
বিষবাই সমর্থিত হইয়াছে, তাহাতে সন্দেহ করিবার কোনও
কারণ নাই। প্রতিৰি আৰু আভাস অন্তত একই পদার্থ ;
সুতরাং দ্বিতীয় সূত্র। সূত্রকার প্রতিবিমাদেরই সমর্থন করিয়া-
যেন বলিতে হইবে। কেবল তাহাই নহে; “আভাস এব*-
এই ‘এ’ শব্দের থানা প্রতিবিষাঙ্গের দিকেই সুত্ৰকারের
আদনাতিশয় বিজ্ঞাপিত হইয়াছে। এই কারণে অনেকেই মনে
.
৭৮ হিন্দু দর্শন। করেন যে, প্রতিবিম্ববাদই সূত্ৰকারের অভিপ্রেতবাদ, আর অবচ্ছেদটী কেবল সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্তরূপে ব্রহ্মপুত্রে উপগুপ্ত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে উহা পুত্ৰকারের অভিপ্রেত সিদ্ধান্ত নহে- ইঙ্যা'দ। এরূপ কল্পনার অনুকূলে যথেষ্ট যুক্তিও আছে । বিস্তৃতিভয়ে এখানে সে সকল কথার আলােচনা পরিত্যাগ করা হইল। এখন দেখিতে হইবে যে, জীব সম্বন্ধে প্রতিবিম্ববাদই সত্য হউক আর অবচ্ছেদবাদই সত্য হউক, জীব যে অকৃিত বন্ধু- স্বরূপ, সে বিষয়ে আর মতভেদ নাই। ব্ৰহ্ম স্বভাবতই কাম-রাগ- বিবর্জিত নির্বিকার ও 'নষণ ; সুতরাং তাতে সুদুঃখময় সংসা-সম্বন্ধ কখনই সম্ভবপর হয় না। ব্রহ্মে যখন সাংসারিক সুখদুঃখ সম্ভবপর হয় না, তখন ব্রহ্মস্বরূপ জীবেও সুখদুঃখভোগ সম্ভবপর হইতে পারে না। অথচ জাগতিক জীবমাত্রই যে দেশ- কালনির্বিশেষে সুখদুঃখের ভােগে সমধিক হর্ষবষাদ অনুভব করিয়া থাকে, ইহা কাহারও অবিদিত নহে। প্রত্যক্ষের অপলাপ করা প্রকৃতস্থ কোনও ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভবপর হয় না। অতএব জিজ্ঞাস্য এই যে, এই অঘটন সংঘটন হয় কিরূপে এবং কাহার প্রভাবে ? তাহা না জানিলে বা না বুঝিলে জিজ্ঞাসুর কৌতুহল নিবৃত্তি হয় না, এবং শান্ত্রার্থেও শ্রদ্ধা বা অনুরাগ আসিতে পারে না; সুতরাং তদ্বিষয়ে কঠোর সাধনা স্বীকারেও আগ্রহ জন্মিতে পারে না। এই জন্য, যে কারণে ব্রহ্মস্বরূপ জীবেও সুখদুঃখ ভােগ এবং জন্মমরণ ও বন্ধমােক্ষ প্রভৃতি অসম্ভব বিষয়ও সম্ভবপর হইয়া থাকে, অতঃপর তদ্বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলােচনা করা যাইতেছে।
হিন্দু-দর্শন। ৭৮ অবিদ্যার শক্তিদ্বয়। পূর্বে যে ব্রাহ্মী-শক্তির কথা বলা হইয়াছে,-মায়া, অবিদ্যা, অজ্ঞান প্রভৃতি যাহার নামান্তর-সেই অবিদ্যার দুই প্রকার শক্তি আছে-এক আবরণ-শক্তি, অপর বিক্ষেপ-শক্তি। অবিদ্যা যাকে আশ্রয় করিয়া থাকে অথবা যে বিষয়ে পতিত হয়, তদীয় আবরণ শক্তি প্রথমতঃ সেই বস্তুর যথার্থ স্বরূপটা আবৃত বা আচ্ছাদিত করিয়া রাখে, অর্থাৎ সেই বস্তুর প্রকৃত রূপটা দেখতে দেয় না। পরে বিক্ষেপ-শক্তি ঐ আবৃত বস্তুর উপর অন্ত প্রকার অসত্য আকৃত ও নাম পরিকল্পনা করিয়া থাকে। তখনই লােকে বস্তুকে অপর বস্তু বলিয়া প্রত্যক্ষ করিয়া বিষম ভ্রান্তিকালে জড়িত হয়। অদ্বৈতবাদীর মতে সমস্ত জগৎটাই উক্ত উভয়বিধ বিদ্যা-শক্তির বিলাস বগিয়া বিবেচিত হয়। জীবের সুখ দুঃখ ভাগও উক্ত অবিদ্যাশক্তিরই অপরিহার্য ফল বলিয়া জানিতে হইবে। অদ্বৈতবাদী পণ্ডিতগণ বলেন,-যে অনির্বচনীয় অধিষ্য-শক্তির প্রভাবে নিরাকার নির্বিকার সর্বব্যাপী ব্রহ্ম ও জীবভাব প্রাপ্ত হন, সেই অবিদ্যারই মহীয়সী শক্তির দ্বারা প্রথমতঃ জীবের ব্ৰহ্মভাব আবৃত হইয়া পড়ে; পরে নানাবিধ বাস্তবভাব তাহাতে কল্পিত হইয়া কমে বুদ্ধিগত সুখদুঃখাদি ধৰ্ম্ম বা গুণসমূহ জীবে সম- রােপিত করে। পক্ষান্তরে, জবিভাবাপন্ন ব্রহ্মের জ্ঞান ও আনন্দ প্রভৃতি ধর্মও বুদ্ধিতে আরােপিত হইয়া থাকে। তখন আর বুদ্ধি ও আত্মার মধ্যে যে প্রভেদ আছে, তাহা বুঝিতে পারা যায় না। এই না-বুঝারই নাম ‘অবিবেক’, অধ্যাস ও অবিদ্যা প্রভৃতি ; এবং ইহারই মহিমায় জীব সাক্ষাৎ সচ্চিদানন্দ এহ্মস্বরূপ হইয়াও হিন্দু-দর্শন। কখনও বা ক্ষণিক আনন্দের প্রত্যাশায় উচ্ছসিত, কখনও বা অবাস্তব দুঃখভােগে নিতান্ত বিধাগ্রস্ত হইয়া থাকে। আচাৰ্য শঙ্কর বলিয়াছেন- “তামিম বিকেলঙ্কশাবিদ্যাং পুরস্কৃত্য সৰ্বে লৌকিক বৈদিকাশ বৰঃ প্রবৃত্তা, সর্বাণি চ শাণি বিধি-প্রতিষেধ। মােক্ষপাশি।” (বোন, অধ্যায়)। অর্থাৎ, উক্ত প্রকার অবিবেকাত্ম অবিদ্যাকে অগ্রসর কমিয়ই যত-কিছু লােকব্যবহার ও বেদোক্ত ব্যবহার (যাগযজ্ঞজিৰ অনুষ্ঠান) প্রবৃত্ত হইয়াছে। অধিক কি, বিধি-নিষেধ ও মুক্তি প্রতি- পাদক সমস্ত শাস্ত্রও এই অবিছাপূর্বক প্রবৃত্ত হইয়াছে। অভিপ্রায় এই যে, লৌকিক ও বৈদিক যত প্রকার ব্যবহার আছে, এবং শাস্ত্রোক্ত যতপ্রকার বিধি-নিষেধ ও মােক্ষ-কথা আছে, সে সমুদয়ের মূল ইতেছে-অবিয়া বা অবিবেক; অবিবেক বিলুপ্ত হইলে, ঐ সকল বিষয়ও বিলুপ্ত হইয়া যায়। উলিখিত আচার্য্য-বাক্য হইতে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় যে, প্রাপ্ত অবিবেক বা অবিঙ্কাই যত অনর্থের মূল। অৰিাই অসত্যে সত্যতা বুদ্ধি ও সত্যে অসত্যতা বুদ্ধ সমুৎপাদন করতঃ অচেতন- বুদ্ধিতে চেতন-ভ্রান্তি জন্মায়, আবার চেতন আত্মাতেও বুদ্ধিগত সুখদুঃখের ভাব আরােপ করায়। তাহার ফলে জীবাত্মা প্রকৃত পক্ষে লোকসিদ্ধ সুখদুঃখে অসংম্পৃষ্ট নিত্য আন্দস্বরূপ হইয়াও আপনাকে সুখী দুঃখী ইত্যাদি প্রকার মনে করে, এবং তৎ- পরিহারের নিমিত্ত সতত যত্নপর হইয়া থাকে। জব যতদিন এই অৰিস্তাৱ অধীন হইয়া আপনাকে ভুলিয়া থাকিবে-আত্মজ্ঞানে বঞ্চিত থাকিবে, ততদিন অসত্য হইলেও হিন্দু-দর্শন। উক্ত সংসার-সম্বন্ধ অপনীত হইবে না; পক্ষান্তরে যেই মুহূর্তে সে আপনার স্বরূপ অবগত হইবে-উক্ত অবিদ্যা-বন্ধন ছিন্ন করিবে, সেই মুহূর্তেই সৌরকিরণ-সংস্পর্শে নীহাররাশির ন্যায় তাহার সর্ববিধ সংসারিভাৰ বিধ্বস্ত হইয়া যাইবে। তখন ছিন্নমূল সংসারতরু আর স্থিতিলাভ করিতে পারিবে না। ব্ৰহ্মবিদ্যাই জীবকে’এ শুভমুযােগ প্রদান করিতে সমর্থ, অপর কেহ নহে। সেই জন্যই অধ্যাত্ম- শাস্ত্রে—বিশেষতঃ বেদান্তশাস্ত্রে—আত্মজ্ঞানের বা ব্রহ্মবিদ্যার এত প্রশংসা ও মহিমা বর্ণিত হইয়াছে। যে আত্মবিজ্ঞানের দ্বারা অবিদ্যার উচ্ছেদ হয়, সেই আত্মজ্ঞান কি প্রকার, তাহা লাভ করিবার উপায় কি এবং অবিদ্যা-নিবৃত্তির পর জীবাত্মা কিরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হয় ;-অপর প্রধানতঃ এই কয়টা বিষয়ের আলােচনা করা হইবে। আশা করি, তাহাতেই আমাদের বক্তব্য পরিসমাপ্ত হইবে। আত্ম-জ্ঞান। পূর্বোক্ত অবিদ্যাই যে আত্মার একমাত্র বন্ধন ও সমস্ত অনর্থের নিদান, এবং আত্মজ্ঞানই যে ঐ অবিদ্যা নিবৃত্তির উপায়, তাহা সাধারণভাবে বলা হইয়াছে। সেই আত্মজ্ঞান ও অবিদ্যা যে কি প্রকার, তাহা বলিতে বাকি আছে। এখন তাহাই বলা হইতেছে। জন সাধারণতঃ পরােক্ষ ও অপরােক্ষ ভেদে দুই প্রকার। অজ্ঞান বা অবিদ্যাও সেইরূপ পরােক্ষ ও অপরােক্ষ ভেদে দুই প্রকার। সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা যে জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়, তাহা অপনােক্ষ বা প্রত্যক্ষ নামে কথিত হয় ; আর হিন্দু-দর্শন-৬ হিন্দু-দর্শন। শব্দ ও অনুমানাদির দ্বারা যে জ্ঞান হয়, তাহা পরােক্ষ ( অপ্রত্যক্ষ জ্ঞান নামে পরিচিত। যেমন—চক্ষুদ্বারা রূপদর্শন, কর্ণদ্বারা শব্দ- শ্রবণ, কিংবা জিহ্বা দ্বারা রসাস্বাদন ইত্যাদি জ্ঞান অপরােক্ষ মধ্যে পরিগণিত ; আর শব্দ-শ্রবণে যে অতীত ও দুরবর্তী বস্তুর জ্ঞান, কিংবা অনুমানাদির সাহায্যে যে ব্যবহিত বা দূরবর্তী বস্তুর জ্ঞান হয়, তাহা পরােক্ষ জ্ঞান-শ্রেণীর অন্তর্গত। জ্ঞান পরােক্ষই হউক আর অপরােক্ষই হউক, উভয় প্রকার জ্ঞানই ভ্ৰম-প্রম-সাধারণ । জ্ঞেয় বিষয়ের সত্যতার ও অসত্যতার উপরে জ্ঞানের প্রমা (সত্যতা) ও ভ্রমত্ব ( অসভ্যতা) প্রতিষ্ঠিত; অর্থাৎ বিজ্ঞাত বিষয় যথার্থ ইলে, তদ্বিষয়ক জ্ঞান হইতে প্রমা আর বিজ্ঞান বিষয়টা অসত্য হইলে, তদ্বিষয়ক জ্ঞান হইবে অপ্রমা বা ভ্রম। এখন সে জ্ঞান পরােক্ষই হউক আর অপনােই হউক, তাহাতে কিছু ক্ষতি- বৃদ্ধি নাই। বেদান্ত-শাস্ত্রে উক্ত যথার্থ জ্ঞানই প্রমা, জ্ঞান ও বিদ্যা প্রভৃতি নামে, আর অযথার্থ-জ্ঞানই প্রম, অপ্রমা, অজ্ঞান ও অবিদ্যা প্রভৃতি নামে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। শাস্ত্রান্তরেও এরপ ব্যবহাঃ উপেক্ষিত হয় নাই। সে যাহা হউক, উল্লিখিত নিয়মে প্রমাণিত হইল যে, জ্ঞান যেমন পরােক্ষ ও অপরােক্ষ ভেদে দুই প্রকার, তেমনই বিদ্যা ও অবিদ্যা (অজ্ঞান) ভেদেও দুই প্রকার। এখন প্রথমে দেখিতে হইবে যে, জীবাত্মা প্রকৃতপক্ষে অখণ্ড অনন্ত নিত্য নির্বিকার ব্রহ্মরূপ হইয়াও যে আপনাকে তদ্বিপরীত ভাবাপন্ন মনে করে-জানে, এ জ্ঞান পরােক্ষ কি অপরােক্ষ। এ জ্ঞান যখন শব্দ বা অনুমানাদি জনিত নহে—সুখদুঃখাদি জ্ঞানের ন্যায় সাক্ষাৎ মানস (মনােজ), তখন নিশ্চয়ই এ জ্ঞানকে অপরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভিন্ন পরােক্ষ বলিতে পারা যায় হিন্দু-দর্শন। না। অথচ ঐ জ্ঞানটী প্রত্যঙ্গাত্মক হইলেও অভ্রান্ত নহে; পর । বিজ্ঞাত বস্তুর (আত্মার প্রকৃত তত্ত্ব প্রকাশ না করিয়া অন্যরূপ প্রকাশ করায়,–এই জন্য নিশ্চয়ই ভ্রম বা অজ্ঞান-পদবাচ্য। অধি- কন্তু, উহা অজ্ঞান বা ভ্রমাত্মক হইলেও অপরােক্ষত্ব নিবন্ধন শব্দ বা অনুমানাদি জন্য পরােক্ষ জ্ঞানাপেক্ষা প্রবল ( বলবান্)। প্রবলকে বাধা দিবার শক্তি দুর্বলের নাই ; নাই বলিয়াই আত্মতত্ত্ব-বিষয়ে শত শত উপদেশ হইতে লব্ধ অভ্রান্ত জ্ঞানেও উহা অপনােদন করিতে পারা যায় না; ইহা সকলেরই অনুভবসিদ্ধ। ঐ প্রকার অপরােক্ষ ভ্রম নিবারণের নিমিত্ত তুল্যবল অপরােক্ষ আত্মজ্ঞানের আবশ্যক হয়। আপনােক্ষ এম অপেক্ষা অপরােক্ষ তত্ত্বজ্ঞান নিশ্চয়ই প্রবল; সুতরাং আত্ম-বিষয়ে অভ্রান্ত সাক্ষাৎকার বা অপরােক্ষ জ্ঞান সমুৎপন্ন হইলে, তদপেক্ষা নিতান্ত দুৰ্বল আত্মবিষয়ক ভ্রমাত্মক অজ্ঞান বা অবিদ্যা তৎক্ষণাৎ পলায়ন করিয়া যায়। ইহা জ্ঞান- শাস্ত্রের সার-সিদ্ধান্ত । * নিজের সুখদুঃখের যে অনুভূতি, উহা কখনই পােপদেশ- লব্ধ বা অনুমানগম্য নহে; সকলেই মনে মনে উহা প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। এই কারণেই আমার সুখ বা দুঃখ আছে কিনা, এরূপ সংশয় কাহারও হয় না। এইরূপ অনাত্মা-দেহাদিতে যে আত্মজ্ঞান বা অহং-বােধ, আর আত্মাতে যে সুখদুঃখাদিবােধ, তাহাও পরের উপদেশ পাইয়া কিংবা অনুমান করিয়া বুঝিতে হয় না। উহা এক প্রকার স্বাভাবিক জ্ঞান বলিলেও অত্যুক্তি হয় না; সুতরাং ঐ জ্ঞানকেও অপরােক্ষ বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলিয়াই স্বীকার করিতে হইবে। উহা প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলিয়াই উপদেশাদিল তত্ত্বজ্ঞানেও উহার নিবৃত্তি হয় না।
৮৪ হিন্দু-দর্শন। অতএব যাহারা শান্তিময় মুক্তিরস আস্বাদনে কৃতার্থ হইতে অভিলাষী, তাহাদের সর্বাদৌ সৰ্বান-প্রবর্তক অজ্ঞান বা বিদ্যং বিধ্বংসে যত্নবান হওয়া আবশ্যক। . আত্মবিষয়ে অভ্রান্ত অপরােক্ষ জ্ঞান লাভ ব্যতীত যখন অবিদ্যা-ধবংস সম্ভবপরই হয় না; তখন মুমু ব্যক্তিকে সর্বাদে জ্ঞান-সাধন সামগ্রী সংগ্রহেও তৎপর হইতে হয় ; বিষয়-চিন্তানিরত সংসারী মানব আপনার অমার্জিত বুদ্ধির দ্বারা সে সকল সামগ্রী সংগ্রহ করিতে পারে না, তাহার জন্য অধ্যাত্মতত্ত্ব-প্রকাশক প্রামাণিক শাস্ত্র-বাক্যের সাহায্য লইতে হয়। যে সকল সাধন-সামগ্রী মেগোপযােগী, আত্মজ্ঞানলাভের একান্ত সহায়, উপনিষদ ও আধ্যাত্ম-শাস্ত্রসমূহ সে সকল সাধনের পরিগণনা করিয়া রাখিয়াছেন; সুতরাং সেই সকল গ্রন্থ হইতে আমরা সাধন-সামগ্রীর প্রকৃত পরিচয় পাইতে পারি। এ বিষয়ে উপনিষদ বলিয়াছেন- “শান্তো দান্ত উপস্থিতিক্ষুঃ সমাহিত শ্রদ্ধাবিন্তো ভূত্বা আত্মবােত্মানং পশ্যেৎ।” অর্থাৎ, যিনি বহিরিন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয় সংষত করিয়াছেন, সমস্ত ভােগ্য বিষয় হইতে বিরত হইয়াছেন, শীতােষ্ণাদি-দ্বন্দ্ব-সহনে অভ্যস্ত হইয়াছেন, এবং চিত্তবৃত্তি-নিয়ােধরূপ যােগ-সাধনায় সিদ্ধি- লাভ করিয়াছেন, তাদৃশ অধিকারী পুরুষ আপনাতেই আপনাকে দর্শন করিয়া থাকেন। ইহার দ্বারা বলা হইল এই যে, আত্ম- দর্শন করিতে হইলে অগ্রে ঐ সকল গুণে বিভূষিত হওয়া আবশ্যক। ব্রহ্মপুত্র-রচয়িতা স্বয়ং বেদব্যাসও “অথাতো ব্ৰহ্ম- জিজ্ঞাসা” (১১১)—এই সুত্রস্থ ‘অথ” শব্দের দ্বারা ঐ সকল সাধনসামগ্রীর কথাই ধ্বনিত করিয়াছেন। আচাৰ্য শঙ্করও হিন্দু-দর্শন। -ধ্যে ঐ সূত্রের ব্যাখ্যাস্থলে ‘অথ’ শব্দ-সূচিত বিবেক, বৈষ্ণগ্য, শমমাদি সম্পদ ও মুমুক্ষা (মুক্তির ইচ্ছা)। • এই টীকে ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার ঐকান্তিক সাধনা-রূপে নির্দেশ করিয়া- ছেন। আচাৰ্য শঙ্করের মতে উল্লিখিত সাধনসমূহ বাহার অধিগত বা আয়ত্ত হইয়াছে, সে লােক বেদবিদ্যা অধ্যয়ন করুক বা নাই করুক, আত্মজিজ্ঞাসায় তাহার সম্পূর্ণ অধিকার হইবেই হইবে পক্ষান্তরে ঐ সকল সাধনবিহীন লােক বেদবিদ্যায় পারদর্শী হইলেও আত্ম-জিজ্ঞাসায় অধিকারী কখনই হইতে পারে না। উপরি-উক্ত বিবেক বৈরাগ্যাদি গুণগুলি অধিকার-প্রবর্তক হইলেও সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে আত্মজ্ঞান-সমুৎপাদনে সমর্থ নহে; আত্ম- জ্ঞানের অর্থাৎ আত্মার স্বরূপ সাক্ষাৎকারের উপায় স্বতন্ত্র। সে ; “নিত্যনিত্যবস্তুবিবেকঃ ইহামূত্রার্থফলভােগবিরাগঃ শম সমাধিসাধনসম্পত্তিঃ মুমুক্ষুত্বং চেতি। এযু চ সৎসু বেদাধ্যয়নাৎ প্রগ্ন্ধং চ শক্যতে ব্রহ্মজ্ঞাতুং জিজ্ঞাসিতুং চেতি (১১১)। অর্থ এই যে, ব্রহ্মই একমাত্র নিত্যপদার্থ, তদ্ভিন্ন সমস্তই অনিত্য । এইরূপ বিভাগ জ্ঞান-নিত্যানিত্য-বস্তু-বিবেক। অনিত্য ও অল্পকালস্থায়ী মনে করিয়া যে ঐহিক ধনধান্যদি ও পারলৌকিক অর্গাদি-ভােগে বিরক্তি, তাহাই ইহামুত্ৰাৰ্থলভােগবিরাগ ; শম- মশালিসাধন অর্থ—শম, দম, উপবতি, তিতিক্ষা, সমাধি ও শ্রদ্ধা। মুমুরুত্ব অর্থ-মুক্তিলাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই চার প্রকার সাধনের অভাবে যখন ব্ৰহ্মজ্ঞান হয় না, পক্ষান্তরে উহাদের সদ্ভাবেই হয়, তখন এই চাৰিটাই ব্ৰহ্মজ্ঞান-লাভের অব্যভিচারী উপায়, বা সাধন।
৮৬ হিন্দু-দর্শন। উপায় তিন ভাগে বিভক্ত—শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন নামে অভিহিত। স্বয়ং শ্রুতই উক্ত ত্রিবিধ উপায়কে আত্মসাক্ষাৎকারে অব্যভিচারী উপায়রূপে নির্দেশ করিয়াছেন—“আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যা মন্তব্যো নিদিধ্যাশিতব্য।” এখানে ক্ষতি প্রথমতঃ আত্মদর্শনের জন্য আদেশ করিয়াছেন, পরে তাহার উপায়- রূপে দর্শন, শ্রবণ ও মননের বিধান দিয়াছেন। পুরাণ-শাস্ত্রও উক্ত শ্ৰতিবাক্যের অর্থ বিবৃত করিয়া স্পষ্ট কথায় বলিয়াছেন- “শ্রোতঃ শ্রুতিবাক্যেভভ্যা মন্তব্যশ্চোপপত্তিভিঃ। মত্ব। চ সততং ধ্যেয় এতে দর্শনহেতবঃ।” অর্থাৎ বেদবাক্য হইতে প্রথমতঃ আত্মার প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হইবে, পরে সেই বিজ্ঞাত তত্ত্ব সম্বন্ধে যে সমুদয় সংশয় বা ভ্রান্তি উপস্থিত হয়, উপযুক্ত যুক্তি-প্ৰয়ােগে সে সমুদয় সংশয় ও প্রাপ্তি জ্ঞান অপনয়ন পূর্বক তার্থে দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করিবে। অনন্তর সেই নিঃসংশয়িত শ্রুতি-বিষয়ে নিদিধ্যাসন করিবে অর্থাৎ তদ্বিষয়ে অবিচ্ছিন্নভাবে ধ্যান বা চিন্তা করিবে। এই প্রকারে সম্পাদিত শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনই আত্মদর্শনের উপায়। সর্বত্রই আত্ম- দর্শন’ শব্দের অর্থ আত্ম-সাক্ষাৎকার, কিন্তু পরােক্ষ জ্ঞান নহে। উপরি-উক্ত শ্রুতিবাক্যে ও পুরাণ-বচনে যদিও শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন—এই তিনই তুল্যরূপে নির্দিষ্ট হইয়া থাকুক, তথাপি আচাৰ্য্যগণ উক্ত তিনটী উপায়েরই তুল্য ক্ষমতা স্বীকার করেন নাই; এবং সে বিষয়ে সকলে একমতও হইতে পারেন নাই। কেহ বলিয়াছেন— ‘মাদি বাক্যোখং জ্ঞানং মােক্ষ সাধন।” অর্থাৎ তত্ত্বমসি' প্রভৃতি শ্রুতিবাক্য শ্রবণে যে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, ; হিন্দু-দর্শন। ৮৭ তাহাই মুক্তির কারণ। এ কথার তাৎপর্য এই যে, আত্মতত্ত্ব প্রকাশক শ্রুতিবাক্যের শ্রবণই (শ্রবণ জন্য জ্ঞানই) প্রকৃতপক্ষে মুক্তি ( আত্মসাক্ষাৎকার) জন্মায়, মনন ও নিদিধ্যাসন উহার সাহায্য করে মাত্র। অপর সম্প্রদায় আবার এ কথায় পরিতুষ্ট না হইয়া বলেন যে, নিদিধ্যাসনই সাক্ষাৎকারের একমাত্র উপায় শ্ৰৰণ ও মনন তাহার সাহায্য করিয়া থাকে মাত্র। যােগশাস্ত্র এ কথা অনুমােদন করিয়া থাকে। এ ক্ষেত্রে কাহার মত সত্য, আর কাহার মত মিথ্যা, এবং কোন পক্ষ গ্রাহ্য আর কোন্ পক্ষ ত্যাজ্য, সে কথা আমাদের আলােচ্য নহে। মুমুক্ষুগণ সাধনপথে কি র অগ্রসর হইলে, নিজেরাই উক্ত উভয় মতের উৎকৰ্ষাপকর্ষ অৰধারণ করিতে সমর্থ হইবেন; সুতরাং তদ্বিষয়ে অপরের সম্মতি গ্রহণ সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ও নিপ্রয়ােজন। বিশেষতঃ মুমুক্ষু ব্যক্তির পক্ষে যখন শ্রবণ মনন ও নিদিধ্যাসন-এই তিনই অনুপেক্ষণীয়, তখন অগ্রে সত্যাসত্য নির্ধারণ করিতে যাইয়া বৃথা সময়ক্ষেপ ও শক্তিক্ষয় করা কখনই সঙ্গত নহে। এই জন্য আমরাও এই কথা এখানেই সমাপ্ত করিয়া জীবের চরম লক্ষ্য মুক্তি বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলােচনা করিয়া বক্তব্য শেষ করিতে ইচ্ছা করি। মুক্তি। দুঃখ যেমন প্রাণমাত্রেরই অপ্রিয় ও প্রার্থনীয়, মুক্তি আবার তেমনি সকল প্রাণীর একান্ত প্রিয় ও প্রার্থনীয়। মুক্তির অর্থ- সর্বপ্রকার দুঃখের আত্যন্তিক উপশম বা নিবৃত্তি। দুঃখের নিবৃত্তি চাহে না, এরূপ লােক জগতে নাই। অন্যান্য বিষয়ে লােকের যতই মতভেদ থাকুক না কেন, দুঃখনিবৃত্তির উপাদেয়া সম্বন্ধে ৮৮ হিন্দু-দর্শন। কাহারও মার দেখা যায় না। দুঃখ-নিবৃত্তির ন্যায় অবিসংবাদিত প্রিয়, জগতে আর কিছুই নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অধিক কি, অত্যন্ত ভিন্নপথগামী স্ব সিদ্ধান্তের সমর্থনের জন্য পরস্পর বিবাদমান ঋষিবর্গ ও আচার্যগণ অন্যান্য বিষয়ে বিরুদ্ধবাদী। হইলেও দুঃখনিবৃত্তির উপাদেয়তা সম্বন্ধে সকলেই একমত হইয়া কথা বলিয়াছেন। তত্ত্বজ্ঞানই যে সেই দুঃখ-নিবৃত্তির নিদান, এ কথাতেও প্রায় সকলেই সম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছেন। আমরা প্রথমেই বলিয়াছি যে, অজ্ঞানই জীবের সর্ববিধ দুঃখ- ভােগের নিদান। সুতরাং অজ্ঞানের নিবৃত্তি ব্যতিরেকে দুঃখ- নিবৃত্তি সম্ভব হয় না; এবং অপরােক্ষ জ্ঞানই যে, অজ্ঞানের একমাত্র বিরােধী, এ কথাও আমরা পূর্বেই বলিয়াছি। সুতরাং জ্ঞানলাভ না হইলে সেই দুঃখ-মূল অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয় না। এ বিষয় আমরা পূর্বেই আলােচনা করিয়াছি; এখানে তাহার পুনরুল্লেখ অনাবশ্যক। এখানে এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, আত্ম- জ্ঞানে অধিকারী পুরুষ যে প্রকার উপাসনার দ্বারা আত্মতত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়া থাকেন, সেই উপাসনা কিরূপ, কত প্রকার, এবং তৎসম্পাদিত মুক্তি ও তাহার প্রভেদ কত প্রকার, এই কয়েকটা বিষয়ের আলােচনা করিলেই আমাদের বক্তব্যগুলি পরিসমাপ্তি হইতে পারে। পূর্বে যে নিদিধ্যাপনের কথা বলা হইয়াছে, সেই নিদিধ্যাসনের অপর নাম-উপাসনা। বেদান্তমতে উপাসনা তিন প্রকার—(১) সম্পদুপাসনা, (২) প্রতীকোপাসনা এবং (৩) অহংহোেসন। তন্মধ্যে কোনও উৎকৃষ্ট বস্তুর কোনপ্রকার গুণসম্পদ দেখিয়া যে তদপেক্ষণ ইনবস্তুকে সেই উৎকৃষ্ট বস্তু মনে করিয়া উপাসনা (চিন্তা, হিন্দু-দর্শন। তাহার নাম-সম্পদুপাসনা। আর কোনও একটি উৎকৃষ্ট বস্তুর কোনও একটা (নামরূপাদি) চিহ্নবিশেষকে সেই উৎকৃষ্ট বস্তুবােৰে উপাসনা, তাহার নাম—প্রতীকোপাসনা। আর উপাস্য বস্তুকে শহংবুদ্ধিতে অর্থাৎ নিজের সহিত অভেদবুদ্ধিতে যে উপাসনা,-- তাহার নাম অহংগ্ৰহােপাসনা (যেমন উপাস্য ব্রহ্মের অহংকাৰে উপাসনা। এস্থলে উপাস্য ও উপাসকের মধ্যে অতিঅল্পমাত্রও ভেদবুদ্ধি থাকে না। উক্ত ত্রিবিধ উপাসনার মধ্যে অহংগ্ৰহহাপাসনাই আত্মসাক্ষাৎ কারের অন্তরঙ্গসাধন, আর অপর দুইটী তাহার বহিরঙ্গসাধন। প্রথমে বিষয়ানুরক্ত মন উপাস্যের অপূৰ্ব্ব মহিমা ভাবনা করিতে করিতে বিষয়-প্রীতি ভুলিয়া যায়, কিন্তু তখনও বহু বিভূতি ভাবনার ফলে মনের বিক্ষেপ বা চঞ্চলতা সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত হয় না। সেই বিক্ষেপ নিবৃত্তির জন্য প্রতীক উপাসনায় মনােযােগ করিতে হয়। প্রতীকে ভাবনীয় বিষয়ের বাহুল্য থাকে না। সুতরাং বিক্ষেপ বৃদ্ধিরও ভয় থাকে না; বরং বিক্ষেপের মাত্রা ক্রমশঃ হ্রাস পাইয়া মনেতে প্রশান্তভাব আনয়ন করে। তদবস্থায় বিশুদ্ধ মন উপাস্ত ব্ৰহ্মবস্তুর সহিত আত্মার অভেদ চিন্তা করিবার অবসর প্রাপ্ত হয় ? তাদৃশ অহংগ্রহেপাসনারই পরিণামে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার বা জীব- ব্রহ্মের অভিন্নভাব প্রত্যক্ষ-গােচর হইয়া থাকে। এবংবিধ সাক্ষাৎ কারেই জীবের কর্তব্য পরিসমাপ্ত হইয়া থাকে। তখন জীবের আর কিছু করণীয় থাকে না। এই অবস্থাকে লক্ষ্য করিয়া শ্ৰতি বলিয়াছেন—“ব্রহ্মবিদ হ্মৈব ভবতি”; তখন জীবের জীবভাব ঘুচিয়া যায় এবং ব্রহ্মভাব ফুটিয়া উঠে। সংসারের ত্রিতাপজালা তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না, এবং ভবিষ্যতের ভাবনাও থাকে হিন্দু-দর্শন। । ভবন্ধন ছিন্ন হইয়া যায়—তিনি মুক্তির শান্তিময় ক্রোড়ে চিরদিনের তরে বিশ্রামলাভ করিয়া কৃতার্থ হন। উপরে যে মুক্তির কথা বলা হইল, তাহা দুই ভাগে বিভক্ত জীবন্মুক্ত ও বিদেহমুক্তি। যাহারা ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার উপযুক্ত অধিকার লাভ করিয়া যথাবিধি শ্রবণ মনন ও নিদিধ্যাসন করত। এই দেহে থাকিয়া, জীবদবস্থায়ই আত্মার ব্রহ্মভাব দন করিতে সমর্থ হন, তাহারা জীবন্মুক্ত। তাদের মুক্তিকে জীবন্মুক্তিনামে অভিহিত করা হয়; আর যাহারা উপযুক্ত অধিকার প্রাপ্ত হইয়া এবং দীর্ঘকাল শ্রবণাদি সাধনের অনুশীলন করিয়াও জীবদবস্থায় ব্ৰহ্মাত্মভাব সাক্ষাৎ করিতে অসমর্থ হন, তাহাও দীর্ঘকালব্যাপী অভ্যাসজ সংস্কারবশে মৃত্যুসময়ে ব্ৰহ্মনিষ্ঠা লাভ করেন; তখন তাহার ব্ৰহ্মাত্মভাব সাক্ষাৎ করিতে সমর্থ হন। সুতরাং তাহাদের আর লােকান্তরে গতি হয় না; এখানেই তাঁহাদের সুক্ষ্মদেহ বিশীর্ণ হইয়া পঞ্চভূতে মিলিয়া যায়। ফলে জীব তখন বন্ধনমুক্ত হইয়া পরমাত্মাতে মিশিয়া যায়। শ্রুতি বলিয়াছেন-“ন তস্য প্রাণ। উৎকামন্তি, ইহৈব সমবনীয়ন্তে, বিমুক্ত বিমুচ্যতে”—সেই উপ- সকের প্রাণাদি ইন্দ্রিয়বর্গ বাহিরে লােকান্তরে চলিয়া যায় না। এখানেই স্ব কারণে বিলীন হয়। তিনি পূৰ্বেই বন্ধন-মুক্ত ছিলেন, এখন কেবল দেহমুক্ত হইলেন মাত্র। এইরূপে দেহ- ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাহার আত্মা পরমাত্মাতে মিলিত হইয়া এক হইয়া যায়, কিছুমাত্র পার্থক্য থাকে না। জীবন্মুক্তেও মৃত্যুকালীন অবস্থা এতদনুরূপ। কিন্তু যাঁহার। দীর্ঘকাল সগুগ ব্রহ্মের উপাসনায় রত থাকিয়া স্বরূপ সাক্ষাৎকারের পূর্বেই দেহত্যাগ করেন, তাঁহাদের অবস্থা অন্য প্রকার। তাহারা
হিন্দু-দর্শন।
দেহ-ত্যাগের পর ব্রহ্মলােকে (চতুখ ব্ৰহ্মার ললাকে) গমন
করেন। সেখানে যাইয়া ব্ৰহ্মার গায় তাহারও জ্ঞানসাধনে রত
হন, এবং সেই সাধনার ফলে আত্ম-সাক্ষাৎকারে অধিকার লাভ
করেন। পরে যখন সেই ব্রহ্মার কাৰ্যকাল পরিপূর্ণ হয়, তখন
ব্ৰহ্মণা সহতে সৰ্ব্বে সপ্রাপ্তে প্রতিসঞ্চরে।
পরস্যান্তে কৃতাত্মনঃ প্রবিশন্তি পরং পদম্ ॥”
সেই সমুদয় ব্রহ্মলােকবাসী পুরুষ, আত্মসাক্ষাৎকারে কৃতকার্য হইয়া
সেখানেই অবস্থান করেন। পরে যখন প্রলয়কাল উপস্থিত হয়,
ব্ৰহ্মার আরব্ধ অধিকার পরিসমাপ্ত হয়, তখন ব্রহ্মার সঙ্গে সঙ্গে
ব্ৰহ্মলােকবাসী সেই সকল জ্ঞানী পুরুষও পরমাত্মায় বিলীন হইয়া
চিরনির্বাণ লাভ করিয়া কৃতার্থ হন। তাঁহাদের আর ঘাের
সংসারে আসতে হয় না। এখানেই তাহাদের সংসার-নাট্যের
যবনিকা পতন হয়, শান্তিময় চিরবিশ্রাম লাভ হয়। “অনাবৃত্তিঃ
শব্দাৎ-অনাবৃত্তিঃ শব্দাৎ।”
শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.