Makardah Saraswat Library, Howrah

Crime And Punishment Ed.3rd

Bosu, Bhupendranath · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ফেডর ভস্টয়ভ স্কীর
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
শ্ৰীভূপেন্দ্রনাথ বসু
অনূদিত
মিত্র ও ঘােষ
১০, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা

তৃতীয় সংস্করণ
আষাঢ়, ১৩৫২
—আড়াই টাকা-
মিত্র ও ঘােষ, ১• শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা হইতে প্রমথনাথ
ঘোষ কর্তৃক প্রকাশিত কলিকাতা শ্রীকৃষ্ণ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
২৭ বি, গ্রে ধ্রুট হইতে শীদেবেন্দ্রনাথ শীল কর্তৃক মুদ্রিত।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় সেন্টপিটারবার্গ শহরে নেভা নদীর নিকটবর্তী একটি পাঁচতলা বাড়ী হইতে বাহির হইয়া একটি রুশ যুবক লক্ষ্যহীন- ভাবে ধীরপদক্ষেপে নিকটস্থ সকোর দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। বাড়ীটি সাধারণ ভাড়াটে বাড়ী। সে যে ঘরখানিতে থাকে তাহারই নীচে স্বয়ং গৃহস্বামিনীর রান্নাঘর এবং সিড়ি দিয়া নামিয়া আসিতে গেলে তাঁহার রন্ধনশালার অগ্নিকুণ্ডের তাপ লাগা অনিবাৰ্য্য হইয়া উঠে। ঐ যুবকটি যথনই সিড়ি দিয়া ওঠা-নামা করে তখনই তাহার মনে হয় যেন কোন শলালিত অগ্নিকুণ্ড তাহারই জন্য নিশিদিন জ্বলিতেছে। তাহার কেমন একটু ভয় করে, যেন তাহার একটা মস্ত অবমাননা আসক্স ; অথচ সেই আসন্ন অবমাননার জন্য পরক্ষণেই তাহার বিরক্তি আসে—তাহার জযুগল কুঞ্চিত হয়। গৃহস্থমিনীয় নিকট সে ঋণী এবং সেই অই তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবার কল্পনাতেও সে ত্রস্ত হইয়া ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাহাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে নাই, দারিদ্র্যও তাহাকে নিষ্পেষিত করিতে পারে নাই। তবু কয়েকদিন যাবৎ মন যেন ভাঙিয়া পড়িয়াছে, যখন তখন তাহার সমস্ত স্নায়ু যেন শিথিল হইয়া আসে। কোন সংসর্গই আর তাহাকে আনন্দ দিতে পারে না এবং ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মানুষের সঙ্গ এড়াইতে এড়াইতে আজ যে কোন মানুষের মুখ দেখিলেই তাহার বিরক্তি বােধ হয়। দারিদ্রের জন্য দুঃখ করা সে ছাড়িয়া দিয়াছে। জীবিকা অর্জনের জন্য যা কিছু সে করিত তাহাও এখন পরিত্যাগ করিয়াছে। কর্মহীন অখণ্ড অবকাশের মধ্যে সে মনে মনে তাহার গৃহস্বামিনীকে বিদ্রুপ করে। ঐ রমণীটি কী করিতে পারে তাহার? সে আপন মনে হাসিয়া উঠে। কিন্তু তবু তাহারই সঙ্গে কথাকাটাকাটি বা বিবাদ কিংবা অনুনয় বিনয়ের অভিনয় হইবে এই আশঙ্কায় সে নিঃশব্দে তস্করের মত সিড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া আসে। আজ পথে নামিয়া তাহার এই কাপুরুষতায় সে অত্যন্ত বিস্মিত না হইয়া পারিল না। কেন তুচ্ছ ব্যাপারটাকে সে এত বড় করিয়া দেখিতেছে? সে কি সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর কিছু একটা করিতে যাইতেছে না? এই কাপুরুষতাই মানুষকে বিপদের মধ্যে টানিয়া লইয়া যায়। তাহার জানিতে ইচ্ছা করে, মানুষের পক্ষে সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর কি?::নাঃ সে আর কিছু চিন্তা করিবে না। ভয়ঙ্কর যাহাই হক, সে চিন্তার পরিবর্তে কাজ করিবে। আজ একমাস ধরিয়া সে ঘরের কোণে বসিয়া মনে মনে অনর্গল বকিয়া চলিয়াছে। কি হইবে ইহাতে ? যে কাজ করিতে সে কৃতসংকল্প সে কাজ করিবার মত শক্তি কি তাহার আছে ? সে কি সত্যই কৃতসঙ্কল্প ? একেবারেই না। মাঝে মাঝে যেন উপকথার দৈত্যরা আসিয়া তাহার ঘাড়ে চাপিয়া বসে। এই সমস্তই তাহার অলস মস্তিষ্কের উদ্ভট-কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। শহরের রাজপথে একটা ভারী তপ্ত আবহাওয়ায় যেন খাস রুদ্ধ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৩ হইয়া আসে। সেন্টপিটারসবার্গ শহরের জনতা, ইট চুনে তৈরী হ-শ্রেণী সব কিছু মিলিয়া যেন এই যুবকটিকে আরও পীড়িত করিয়া তুলিল। সর্বোপরি পথের দুইধারে অসংখ্য নিম্নশ্রেণীর পানশালা, মদের গন্ধ এবং উন্মত্ত-মদ্যপের দল, শহরের এই পরিচিত দৃশ্যকে আরও বীভৎস করিয়া তুলিয়াছে। আমাদের এই কাহিনীর নায়কটির সার। অন্তঃকরণ তিক্ত হইয়া উঠিল। তাহার দিকে তাকাইলে সর্বপ্রথম চোখে পড়ে যে তাহার সুদর্শন মুখে বেদনাতুর ছায়া পড়িয়াছে। তবুও তাহার দেহের সৌন্দৰ্য্য চক্ষু এড়াইয়া যায় না। তাহার দীর্ঘ, ঋজু দেহ, ঈষৎ স্বর্ণাভ কেশ, উজ্জ্বল চক্ষু-দুটির গভীর দৃষ্টি তাহাকে সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। পথ চলিতে চলিতে অকস্মাৎ সে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া গেল। দেখিতে দেখিতে তাহার নিকট এই পথ, এই জনতা সব লুপ্ত হইয়া গেল। আপন মনে কি যেন বলিতে বলিতে সে মুচ্ছগ্রস্তের মতো চলিতে লাগিল। ইহা তাহার অভ্যাসে দাঁড়াইয়াছে। ক্ষণকাল পরেই তাহার মনে হইল যেন তাহার সকল চিন্তাই একাকার হইয়া যাইতেছে, বড়ো দুর্বল সে। আজ দুই দিন হইল কি খাইয়া যে বাঁচিয়া আছে তাহা সে কিছুতেই মনে করিতে পারিল না। তাহার মত জীর্ণ পরিচ্ছদ পরিয়া আর কেহ হয়ত দিবালোকে গৃহের বাহির হয় না। কিন্তু যদিও দারিদ্র্যের পরিচয়ে এখনাে সে ব্যথা পায় তবু এই শতধাজীর্ণ পরিচ্ছদে আজ আর তাহার লজ্জা নাই জগতের প্রতি তাহার বিদ্বেষ এবং ঘৃণা চরম সীমায় পৌছিয়াছে। পথ চলিতে চলিতে হঠাৎ সে থমকিয়া দাড়াইল। একটি মাতাল ৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তাহাকে দেখাইয়া পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছে। কি কারণে জানি না, মাতালটিকে একটি মালবােঝাই শকটে কোন রকমে টানিয়া লইয়া যাওয়া হইতেছে। সে কিছু না বলিয়া মাতালটির মাথা হইতে টুপীটা তুলিয়া লইয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিতে লাগিল। ঠিক হইয়াছে। এই টুপীটার সঙ্গে তাহার বেশভূষার অদ্ভুত মিল হইয়াছে। এই টুপীটা মাথায় দিলে আর তাহাকে সহজে কেহ লক্ষ্য করিতে পারিবে না। এখন লােকে তাহাকে যত কম লক্ষ্য করে ততই তাহার পক্ষে সুবিধা। সে তাহার গন্তব্য স্থানের নিকটে আসিয়া পড়িল। আর কয়েক পদ মাত্র অবশিষ্ট। সে গণিয়া রাখিয়াছে—সাতশত ত্রিশ পদ। এক মাস ধরিয়া যে পরিকল্পনা সে করিতেছে অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো, তাহাকে কার্যে পরিণত করিবার মত শক্তি তাহার আছে এ বিশ্বাস আজও দৃঢ় হয় নাই। তবে দিন যাইতে যাইতে সে তাহার নিজের দুর্বলতা এবং বলিষ্ঠ ইচ্ছাশক্তির অভাবের জন্য নিজেকে বার বার ভৎসনা করিয়াছে। এবং যদিও নিজের সংকল্প সম্বন্ধে তাহার সংশয় ছিল তবু যে পরিকল্পনাকে সে স্বপ্ন বলিয়া মনে করিত তাহাকেই কাৰ্যে পরিণত করা আজ আর তাহার একেবারে অসম্ভব বলিয়া মনে হয় না। মনে মনে সে যতই তাহার ভবিষ্যৎ কাৰ্য্যাবলীর মহড়া দিতে লাগিল ততই তাহার উত্তেজনা বাড়িয়া চলিল। অসংখ্য ভাড়াটে-বাড়ীগুলি যেখানটায় একটি খালের দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে সেই স্থানটায় আসিয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইল। এই বাড়ীগুলিতে নানা জাতির নানা শ্রেণীর লােকে বাস করে।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ছুতার, কামার, পাচক, জাৰ্ম্মাণ ব্যবসায়ী, রাজকর্মচারী হইতে শুরু করিয়া সাধারণ গণিকা পর্যন্ত এই বাড়ীগুলির অধিবাসী। অসংখ্য লােক যাতায়াত করিতেছে। সবগুলি বাড়ীর একটি সাধারণ প্রবেশ- পথ, তাহার মধ্য দিয়া প্রবেশ করিলে তবে যে কোন বাড়ীতে যাওয়া যায়। এই প্রবেশ পথে দারােয়ান ছিল। কিন্তু তাহাকে কেহই লক্ষ্য করিল না। সে ঐ দরজা দিয়া প্রবেশ করিয়াই দক্ষিণ দিকের একটি সিড়ি দিয়া একটি বাড়ীর উপরে উঠিয়া গেল সঙ্কল অন্ধকার সিড়ি দিয়া উঠিতে উঠিতে তাহার হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া যেন বন্ধ হইয়া আসে। এই অন্ধকারই যেন তাহাকে বাঁচাইল। যা কেহ তাহাকে দেখে নাই। কিন্তু এ ভয় তাহার কেন? এখনই এত ভয় করিলে কেমন করিয়া সে তাহার সেই পরিকল্পনা কাৰ্য্যে পরিণত করিবে ? উপরে উঠিয়া দেখিল একঘর জাৰ্মাণ ভাড়াটে উঠিয়া যাইতেছে, তাহাদের মালপত্র সব নীচে নামানাে হইতেছে। একটি বুড়ীর ঘরে ঘণ্টা বাজাইবার পূর্বে এই ভাবিয়া সে স্বস্তিবােধ করিল, যে এখন কয়েকদিন এই বুড়ীটা এই পাঁচতলায় একাই থাকিবে। ঘণ্টার শব্দ পাইয়া সেই বৃদ্ধা আসিয়া দরজাটা ঈষৎ ফাক করিয়া তাহাকে সন্দিগ্ধ চক্ষে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। এই বৃদ্ধাটির গলায় গরম কাপড়ের গলাবন্ধ। এই গ্রীষ্মে তাহার গলায় গরম গলাবন্ধ এবং তাহারই উপর মাথার তেল গড়াইয়া পড়িতেছে। সে তাহার দিকে অবাক হইয়া চাহিয়াছিল হঠাৎ বৃদ্ধাটি বিষম কাশিতে শুরু করিল এবং কাশি থামিলে পুনরায় সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে এই যুবকটির পানে তাকাইল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
তাহার এই চাহনিতে যুবকটি ঈষৎ নমস্কার করিয়া বলিল, “আমার
নাম রােডিয়ন্ র্যাকনিকফ,। আমি একজন ছাত্র। একমাস
পূৰ্বে একবার আপনার কাছে এসেছিলাম।”
“মনে পড়েছে, মনে পড়েছে,” বলিল বটে কিন্তু সন্দেহ তাহার
তখনাে যায় নাই।
রাসকনিকফ, বলিল, “দেখুন আমি পূর্বেকার মতাে সেই
কারণেই আপনার কাছে এসেছি—
বৃদ্ধাটি এতক্ষণ চিন্তা করিতেছিল এইবার বাধা দিয়া বলিল, “এস
বাবা ভেতরে এসাে।”
বৃদ্ধা ঘরের মধ্যে লইয়া গেল, এখন আর তাহার দৃষ্টি সন্দিগ্ধ নহে।
ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া র্যাকনিকফ, দেখিল ঘরটি ছােট,
সমস্ত দেয়াল হলুদ রঙের কাগজে ঢাকা কিন্তু জানালায় মলিন-এর
পর্দা, সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি পর্দার মধ্য দিয়া ঘরের মেঝেয় আসিয়া
পড়িয়াছে। সবটা দেখিয়া তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া আসিল,
“সেদিনও তাহলে এমনই সূর্যালােক ঘরের মধ্যে এসে পড়বে!”
ঘরের মধ্যে চোখে পড়িবার মত কোন আসবাব নাই, তবে
ঘরটি খুবই পরিচ্ছন্ন, কোথাও এককণা ধুলিও বােধকরি নাই।
পাশের ঘরে বুড়ীটা শয়ন করে এবং ঐ ঘরেই তাহার টাকাকড়ি এবং
গহনাপত্র থাকে। বৃদ্ধাটি তাহাকে পুনরায় নিরীক্ষণ করিয়া অবশেষে
জিজ্ঞাসা করিল, “কি চাই তােমার ?”
“এমন কিছু নয়। আমি একটা জিনিস বাধা দিতে এসেছি।”
সে পকেট হইতে একটি রূপার পকেট ঘড়ি বাহির করিল।
T
- -

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“কিন্তু আমার পাওনা তা এখনাে শােধ দিলে না। দুদিন
আগে তােমার টাকা মিটিয়ে দেবার কথা।”
“আপনি একটু ধৈর্য্য ধরে থাকুন। আমি তার জন্য আর এক
মাসের সুদ দিচ্ছি।”
“ধৈৰ্য্য আমার আছে বৈকি বাছা, তা না হলে তােমার জিনিস
আমি কবে বিক্রী করে দিতুম।”
“আচ্ছা, এই ঘড়িটার জন্য আপনি কত দিতে পারেন ?”
“ও ঘড়ির কি আর দাম বাছা, কিই বা ওর আছে। সে বারে
দু’রাবল দিয়ে তােমার আংটিটা রাখলুম। ও রকম আংটি স্যাকরার
দোকানে দেড় রাব-এ কিতে পাওয়া যায়?”
“আচ্ছা আমাকে চার রাবল দি। এটা আমার বাবার ঘড়ি
-আমার টাকার বড়ো দরকার তাই।”
“দেড় রাব দিতে পারি বাছা। আর সুদটা আমি এর থেকেই
নিয়ে রাখবে।”
“দেড় রাবল!” র্যাকনিকফের মুখ দিয়া অস্ফুট স্বর বাহির
হইল। “খুশী হয় নাও, না হয়না নিও” বলিয়া বুড়ীটা তাহার
হাতে ঘড়িটা ফেরৎ দিল, সেও ঘড়িটা লইয়া চলিয়া যাইতেছিল,
অকস্মাৎ তাহার মনে পড়িল এই বুড়ীটি ছাড়া টাকা ধার দিবার
তাহার আর কেহ নাই। ইহা ছাড়া এখানে তাহার যেন আরও
কোন উদ্দেশ্য ছিল।
ঘরের মধ্যে পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া বিকৃতস্বরে ব্যাকনিকফ
বলিল, “দাও, তাই দাও।”

৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
বুড়ীটা তাহার পকেট হাতড়াইয়া ডান পকেট হইতে চাবীর রিং
বাহির করিল। পাশের ঘরেই তাহার টাকা কড়ি থাকে।
দেরাজের টানা খুলিয়া সে একটা বড় চাবী বাহির করিল। সম্ভবতঃ
টানার মধ্যে আর একটা বাক্স আছে সেইটা খুলিয়া টাকা বাহির
করিয়া সে বাহির হইয়া আসিল। রাস্কনিকফ, সমস্তটা লক্ষ্য
করিল,—যেন এই ব্যাপারটা সে স্মৃতিপটে মুক্ৰিত করিয়া রাখিতে
চায়। বুড়ীটা যখন এই ঘরে ফিরিয়া আসিল, তখন সে চকিত হইয়া
অস্ফুট স্বরে কহিল, “কী ঘৃণিত! কী কুৎসিত।”
বুড়ীটা আসিয়াই তাহার প্রাপ্য সুদের হিসাব দিতে লাগিল।
পূৰ্বের টাকার জন্য আগামী এক মাসের সুদ এবং এই টাকাটারও
আগামী এক মাসের সুদ কাটিয়া লইয়া সে তাহাকে মােট এক রাবল
পনেরাে কপেক্‌ দিল অর্থাৎ এক রাবল পঞ্চাশ কপেক্‌ এর মধ্য হইতে
উক্ত সুদ বাবদ তাহার পয়ত্রিশ কপেক আগাম দিতে হইল।
একবার প্রতিবাদ করিতে গেল কিন্তু তাহার মহাজনটি হাত নাড়া
দিয়া বলিল, “এই তাে তােমার পাওনা হয় বাপু!”
আর এ সম্বন্ধে কোন কথা না বলিয়া সে টাকাটা গ্রহণ করিল।
তাহার চলিয়া যাইবার কোন তাড়া নাই। কী একটা বলিবার
কিংবা করিবার জন্য সে ব্যাকুল হইয়া উঠিল,
সেইটাই যেন
তাহার পরম প্রয়ােজন। কিন্তু সেটা যে
কী ইহা সে
কিছুতেই ভাবিয়া পায় না। অবশেষে কিছু না ভাবিয়াই সে
বলিয়া ফেলিল, “দেখুন, আমার একটা রূপাের ‘সিগার কেস
আছে সেটা বােধ হয় শিগগিরই আপনার কাছে আনব।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“সে তখন দেখা যাবে বাছা!”
“আচ্ছা দেখুন, আপনি সব সময় একা থাকেন? আপনার
ভগিনী কী কোন দিন আপনার কাছে থাকেন না ?”
কথাটা সে যতদূর সম্ভব নীরস এবং নিস্পৃহ কণ্ঠে বলিল।
“আমার বােনের খোঁজে তােমার কী দরকার বাছা ?”
“-না-না, তা নয়—আচ্ছা চলুম, নমস্কার।” বলিয়া সে
ঘরের বাহিরে চলিয়া আসিল।
আসিল। তাহার বােধ হইল সে অত্যন্ত
উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে
নীচে নামিবার সময়
সে বার বার থমকিয়া দাড়াইতে
লাগিল এই উত্তেজনাকে প্রশমিত করিবার জন্য ! যখন সে পথে
নামিয়া আসিল তখন যেন ঘৃণায় তাহার মন বিষাক্ত হইয়া গিয়াছে।
কী ঘৃণ্য, কী নারকীয় ! সে কি কোন দিন? অসম্ভব! কী
মুখ সে ! এতটা নীচতা, এতখানি অপযশ সে কেমন করিয়া
মাথায় তুলিয়া লইবে ? তাহার সমস্ত মন, এই ঘৃণিত পরিকল্পনার
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া উঠিল। কিন্তু দীর্ঘ একমাস ধরিয়া তো
সে এই চিন্তাই করিয়াছে। আশ্চর্য !
আপন মনে সে অনেক কথাই বলিয়া চলিল কিন্তু কোন
কিছুতেই তাহার মন শান্ত হয় না। যখন নিজেকে বুঝাইবার, সংযত
করিবার সকল প্রকার চেষ্টাই ব্যর্থ হইয়া গেল, তখন সে এই ভয়াবহ
দুর্বলতার হাত হইতে যেন ছুটিয়া পলাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া
উঠিল । মাতালের মতাে পথ চলিতে চলিতে হঠাৎ সে একটা
পানশালার মধ্যে ঢুকিয়া
ঢুকিয়া পড়িল। ইতিপূর্বে সে এমন স্থানে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট কথন আসে নাই। দরজার কাছে দুইটা মাতাল পরস্পর পরস্পরকে গালি দিতেছে। কিন্তু র্যাকনিকফ, সে দিকে দৃপাত না করিয়া ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল। একটুখানি মদের তাহার বড় প্রয়ােজন। প্রয়ােজন। তাহার তাহার বােধ হইল শূন্য পাকস্থলীই তাহার দুর্বলতার একমাত্র কারণ। পানশালার একটা অন্ধকার কোণে একটি অত্যন্ত জীর্ণ, মলিন টেবিলের ধারে বসিয়া সে চাকরকে মদ আনিতে হুকুম করিল এবং চাকরটি আদেশ পালন করিবামাত্র সে চোখ বুজিয়া এক গ্লাস মদ গলায় ঢালিয়া দিল। তৎক্ষণাৎ সে সুস্থ বােধ করিল এবং তাহার চিন্তাশক্তি যেন স্বচ্ছ হইয়া আসিল। অকারণে সে এতটা ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছিল- সে ভাবিতে লাগিল, এ দুর্বলতা নিতান্তই তাহার শারীরিক দুৰ্বলতা। এক গ্লাস বীয়ার এবং কয়েক টুকরা বিস্কুটই তাহাকে সবল করিয়া তুলিবার পক্ষে যথেষ্ট। তাহার সংকল্প স্থির, অটল- কোন দুর্বলতাকেই সে প্রশ্রয় দিবে না। যদিও মুখে সে একটা ভয়ঙ্কর সংকল্পের পুনরাবৃত্তি করিল, তবু তাহার চোখ মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল যেন এইমাত্র কী একটা দুর্বিসহ বােঝা তাহার ঘাড় হইতে নামিয়া গেল। সে সহজভাবে তাহার চারিদিকে তাকাইতে লাগিল। তবু তখনই তাহার মনে হইতে লাগিল যেন এই ঘূৰ্ত্তির ভাবটা ঠিক সত্য নয়—হৃদয় তাহার কিসের ভারে যেন নিষ্পেষিত হইয়া যাইতেছে। তাহার সম্মুখে যে লােকটি বসিয়াছিল তাহাকে দেখিয়া কোন দোকানদার বলিয়া মনে হয় এবং তাহারই পাশের লােকটি পুরাদস্তুর ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মাতাল হইয়া ক্ষণে ক্ষণে জড়িত কণ্ঠে অর্থহীন গান গাহিতেছে। যাহারা নানাবিধ বাদ্য যন্ত্র সহযােগে পানশালার মদ্যপদিগের মনােরঞ্জন করে তাহারা সকলেই চলিয়া গিয়াছে। সমস্ত পানশালাটা নিস্তব্ধ, শান্ত। আর একটি লােক একা বসিয়া আছে এবং উত্তেজিতভাবে একটু একটু করিয়া পান করিতেছে। তাহাকে দেখিয়া কোন অবসর প্রাপ্ত রাজকর্মচারী বলিয়া মনে হয়। রাস্কনিকফ, এই বিচিত্র এবং একান্ত রুচিবিগর্হিত সংসর্গের মধ্যে বসিয়া রহিল। কোন সংসর্গই তাহার ভালাে লাগে না। কিন্তু এই দীর্ঘ একমাস একান্তে কেবল চিন্তা করিয়া এবং বন্ধুবান্ধবদের সাহচর্য্য এড়াইয়া নির্জনে বসিয়া থাকিয়া আজ যেন মনুষ্যসমাজের জন্য তাহার মন হাহাকার করিয়া উঠিল, যেন ক্ষণকালের জন্যও সে তাহার নিঃসঙ্গ জীবনের অলীক অথচ সুদুঃসহ ভাবনার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলে বাঁচিয়া যায়। এই জঘন্য পানশালার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াও যেন সে খুশী না হইয়া পারিল না। পানশালার যে দিকটায় খাবার বিক্রী হইতেছে সে দিকটায় চাহিয়া তাহার চোখে পড়িল কয়েক টুকরাে শসা, কিছু সস্তার বিস্কুট এবং খানিকটা মাছ ছাড়া পানশালায় বিক্রী করিবার মতাে আর কোন খাদ্য দ্রব্য নাই। পচা মদের গন্ধে এবং তীব্র ঝঝে ভিতরের আবহাওয়াটা এমনই ভারী হইয়া উঠিয়াছে যে, যে কেহ পাচ মিনিট সেখানে অবস্থান করিলেই তাহার সম্বিৎ হারাইয়া ফেলিবে। এমন এক একজনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হইয়া যায় যে প্রথম দর্শনেই আমাদের আকৃষ্ট করে। যে ব্যক্তিটীকে দেখিয়া অবসর ১২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট প্রাপ্ত রাজকর্মচারী বলিয়া মনে হয় সে ব্যক্তিটিও র্যাসকনিকফকে ঐরূপ আকৃষ্ট করিল। সে একবারও ঐ অপরিচিত লােকটির উপর হইতে দৃষ্টি ফিরাইতে পারে না, কেবল একদৃষ্টে তাহার দিকে তাকাইয়া থাকে। লােকটি খুব দীর্ঘকায় না হইলেও উন্নতদেহ এবং লােকটিকে মাথায় বিরাট টা ও কয়েক গাছ। পাকা চুল সত্ত্বেও পঞ্চাশ বছরের ঊর্ধে বলিয়া মনে হয় না। তাহার বেশভূষা অত্যন্ত মলিন এবং শতছিন্ন কিন্তু তাহাকে দেখিলেই মনে হয় এ লােকটি যেন ঠিক তাহার পানশালার সঙ্গীদের মত নহে, এ যেন নিজেকে অনেকটা ছােট করিয়া তবে ইহাদের সঙ্গে মেলামেশা করিতেছে। লােকটির চেহারায় কোথায় যেন একটা শিক্ষা এবং আভিজাত্যের ছাপ আছে। সাধারণ রুশ-জনােচিত তাহার দীর্ঘ শ্মশ্রু নাই যদিও অনেক দিন ক্ষৌর-কর্মের অভাবে দাড়িতে তাহার মুখ ভরিয়া গিয়াছে। সর্বোপরি এই পানশালার মধ্যে পানরত লােকটির ব্যবহারে উচ্চপদস্থ কর্মচারীর মত যেন একটা আত্ম-সম্মান লক্ষ্য করিয়া ব্যাকনিকফের বিস্ময়ের অবধি রহিল না। লােকটি কেশবিরল মাথায় হাত বুলাইতেছিল এবং মাঝে মাঝে দুই হাতের মধ্যে মুখ ঢাকিয়া কী একটা মানসিক উত্তেজনা দমন করিবার চেষ্টা করিতেছিল। লােকটি কিয়ৎক্ষণ পরে হঠাৎ র্যাকনিকফকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “যদি স্পর্ধা মনে না করেন, তাহলে আপনার সঙ্গে আলাপ করতে পারি ? আপনাকে দেখে আমার শিক্ষিত ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে, যদিও আপনি এই কুৎসিত মদের আড্ডায় এসেছেন। আমি নিজে লেখা পড়াটাকে খুব বড়ো

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
করে দেখি। হ্যা, আমার নাম মারমেলেডফ, এখানকার সরকারী
দপ্তরে কাজ করি। মশায়ের কি রাজসরকারে কোন কৰ্ম্ম করা হয় ?”
তাহার আলাপ করিবার এই অতি মাত্রায় ভদ্র এবং দরবারি
কায়দা দেখিয়া র্যাকনিকফ, বিস্মিত হইল। হঠাৎ এইরূপে
একজন অপরিচিত লােককে ঘনিষ্ঠতা করিতে দেখিয়া সে একটু
বিরক্ত হইয়া কহিল, “আজ্ঞে না, আমি এখনও ছাত্র।
“ছাত্র ? আমারও ঠিক অই মনে হয়েছিল। যদি অনুমতি
করেন—” বলিতে বলিতে গ্লাস ও বােতল লইয়া সে ব্যাকলনিকফ,-
এর পাশে আসিয়া বসিল। যদিও তাহার নেশা ধরিয়াছে তবু তাহার
কণ্ঠস্বরে জড়িমা নাই। সে দৃঢ়স্বরে তাহার কাহিনী বলিয়া চলিল,
তাহার বলিবার ভঙ্গীটা কী জানি কেন তাহার শ্রোতার শ্রদ্ধা
আকর্ষণ করিল।
কাহিনী: তাহার দীর্ঘ। সে আরম্ভ করিল, “দেখুন মশায়,
'দারিদ্রটা পাপ নয় কিন্তু নিঃস্ব হয়ে যাওয়াটা পাপ। দরিদ্র হলেও
আপনার আত্মসম্মান থাকতে পারে কিন্তু সেটুকুও হারিয়ে যদি আপনি
নিঃস্ব হয়ে যান তাহলে আপনি অত্যন্ত পাপী। সমাজ যে এই
রকম নিঃস্ব লােককে তাড়িয়ে দেয় তার কারণ এই শ্রেণীর লােকগুলো
যে নিজেরাই নিজেদের হীন করে দেয়। এই ধরুন, এই যে আমার
স্ত্রীকে সেদিন লেবেজিয়াটনিকফ, ব’লে একটা 'লােক ধরে মারলে
এতে কি আমার মনে কম আঘাত লেগেছে। হঁ্যা, ভালাে কথা,
আপনি কোন দিন নেভা নদীর ওপর খড়ের নৌকায় শুয়ে রাত
কাটিয়েছেন?”

১৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৫ “আজ্ঞে না।” “এই খড়ের নৌকোতে গত পাঁচটি রাত্রি আমার কেটেছে।” এইবার লােকটি কয়েক গ্লাস মদ গিলিয়া লইল। তাহার কথা শুনিয়া দোকানের ছােরাগুলা হাসিতে লাগিল এবং স্বয়ং মালিক বলিলেন, “বেচারা নিতান্তই খামখেয়ালী! তা তােমাকে তাে রাজকর্মচারী বলে মনে হয়, তুমি কাজকৰ্ম্ম করো না কেন?” “কাজ করি না কেন? আমার নিজের কী ঘৃণা করে না। নিজের এই অকর্মণ্যতায় ? লেবেজিয়াটুনিকফ, যখন আমার স্ত্রীকে ধরে মারলে আর আমি মাতাল হয়ে পড়ে পড়ে তাই দেখলুম তখন কী আমার কষ্ট হয় নি? হয়েছিল। হঁ্যা, তুমি এমন অবস্থায় কী টাকা ধার দাও যখন সে টাকা আর ফিরে পাবার কোন আশা থাকে না? লেবেজিয়াটনিকফ, বলে যে টাকা ধার দেওয়া বিজ্ঞান সম্মত নয়। হ্যা, তারপর যখন তুমি টাকা ধার পেলে না কোথাও তখন তােমায় যা 'হােক একটা কিছু করতে হয়—ইচ্ছার বিরুদ্ধেও করতে হয়। যখন আমার একমাত্র কন্যা, বুঝলে, যখন সে বেশ্যাবৃত্তি করতে বাধ্য হ’ল, পুলিশের খাতায় নাম লেখালে,ওরা হাসছে, তা ওর চুলােয় যা আমার আর ওতে কষ্ট হয় না—এতাে সবাই জানে ! দেখুন দেখি আমায় একেবারে পশুর অধম একটা মাতাল বলে মনে হয় কি না? কিন্তু আমি যাই হই আমার স্ত্রী ক্যাথারিণ, একজন শিক্ষিত মহিলা তার বাপ ছিলেন একজন রাজকর্মচারী, তার যেমন রুচিবোধ, তেমনি বড়ো অন্তঃকরণকেবল আমার প্রতি সে অবিচার করে—এজগতে সকলেই দয়া পায়-সে, বুঝলে, আমার স্ত্রী, আমার ?

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট এই ক’গাছা চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যায়! তা হােক্, বিশ্বাস করুন, সে আমারই দোষে।” র্যাকনিকফ, জানাইল যে সে বিশ্বাস করিতেছে। “বিশ্বাস করুন, আমি তার ছােট্ট ব্যাপারটা থেকে শুরু করে তার জুতাে, তার মােজা পর্যন্ত বিক্রী করে মদ খেয়েছি-এই আমার স্বভাব। আমরা একটা ঠাণ্ডা ককনে ঘরে বাস করি। ক্যাথারিণ কাশে আর রক্ত ওঠে তার মুখ থেকে -তবু সে সারাদিন খেটে তার ছেলে মেয়ের—তার তিনটে ছেলেমেয়েজামা পরিষ্কার করে, পরিষ্কার রাখাটা তার বাতিক! তার যক্ষ্মা দেখে আমার কষ্ট হয়। মদ খেলেই আমার এই সব মনে পড়ে আর খুব কষ্ট হয়। তাই এই কষ্ট পাবাে বলে, আরও কষ্ট পাবে। বলেই আমি মদ খাই-দুঃখ আমার বাড়ক!” বুকভাঙ্গা হতাশায় সে টেবিলের উপর মাথা রাখিল। কিছুক্ষণ পরে সে আবার শুরু করিল, “তােমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভাই তুমিও কষ্ট পাচ্ছো! তুমি শিক্ষিত, তুমি আমার দুঃখ বুঝবে। বলি শােনন, আমার স্ত্রী এক সম্ভ্রান্ত মেয়েদের বােলিং স্কুলে লেখাপড়া শিখেছিল। নাচে এবং লেখাপড়ায় সে সােনার মেডেল আর খেতাব পেয়েছে। মেডেলটা বিক্রী করে খেয়েছি কিন্তু খেতাবটা আছে, সেটা সে বাড়ীউলীকে দেখায়। এইতেই তার আনন্দ, তার তৃপ্তি। সে যত গরীবই হােক, সে চায় ভদ্রলােকের মতে, সম্রান্ত বংশের মেয়ের মতাে সমান সম্মান পেতে। সেদিন ঐ লােকটা যখন তাকে মারলে তখন ক্যাথারিণকে জোর করে ধরে না রাখলে সে তার প্রতিশোধ নিত, গায়ে যা লেগেছিল, বুকে লেগেছিল তার চেয়ে ঢের বেশী ।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“হ্যা, আমি যখন তাকে বিয়ে করি তখন তার ছােট ছােট
তিনটে ছেলেমেয়ে। তার প্রথম বিয়ের স্বামী কী এক সৈন্যদের দলে
চাকরি করতাে।
ও তাকে খুব ভালবাসতে কিন্তু সে লােকটা
জুয়া খেলতে আর ওকে মারধাের করতো। শুনেছি ওদের ঝগড়া
ঝটি খুব হত কিন্তু আজও তার কথায় ক্যাথারিণের চোখে জল
আসে! এটা আমার তেমন ভালো লাগে না, বুঝলে। হঁ্যা,
তারপর সে লােকটি যখন মারা গেল তখন ওর যে কী দুরবস্থা হল
তা’ আমিও বলে বােঝাতে পারবো না। ওকে নিঃস্ব দেখে আমি
ওকে বিয়ে করতে চাইলুম। আমার তখন একমাত্র চৌদ্দ বছরের
একটি মেয়ে ছাড়া কেউ নেই-স্ত্রী মারা গেছে তার অনেক দিন
আগে। এসব জেনেশুনেই ও আমায় বিয়ে করতে রাজী হ’ল—ওর
শিক্ষাদীক্ষায়, ওর বংশমর্যাদায় বাধলো না। ও কাদতে কাঁদতে
আমার ঘর করতে এলাে। আমিও ওকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ
করলুম।” a
তাহার পর মদের বােতলটা দেখাইয়া বলিল, “আমি এক বছর
এই জিনিসটা স্পর্শ করিনি। কিন্তু আমার চাকরি গেল, আমার
দোষে নয়,
অফিসটাই উঠে গেল ! হাতে পয়সা নেই অথচ আবার
আমি মদ ধ’রলুম। তারপর এক বছরের বেশী কেটে গেল গাঁয়ে
গাঁয়ে ঘুরে। শেষকালে এই সেন্ট পিটারসবার্গ শহরে এসে একটা
চাকরি জুটলাে—আমরা সবাই এসে এখানে বাসা করলুম। কিন্তু
বােতলের জন্য সে চাকরিটাও গেল। আমরা থাকি এ্যামেলিয়া বলে
এক বাড়ীউলীর বাড়ীতে। থাকি বটে কিন্তু কেমন করে ভাড়া
।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট দেওয়া হয় তা জানতে চেয়ােনা। এদিকে আমার মেয়ের বয়স বেড়ে চললো। ক্যাথারিণ এদিকে খুব ভালাে, কিন্তু রাগলে তার জ্ঞান থাকে না। আমার মেয়ে সােনিয়া তার সৎআর অত্যাচার চুপ করে সহ্য করতে। সে লেখা পড়া শিখেছিল কিছু, খানিকটা ইতিহাস আর কয়েকটা নভেল সে পড়েছিল। কিন্তু কেমন করে সে পয়সা উপার্জন করবে? কী উপায়ে? সােনিয়া ভালো সেলাই জানে- সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সে জামা তৈরী করতে লাগলাে। ঐ যে কৌসুলী ক্লট, ও আধ ডজন শার্ট-এর অর্ডার দিলে কিন্তু সোনিয়া যখন শার্ট করে দিয়ে দাম চাইতে গেল ক্লক, বুঝলে, দাম তত দিলেই না-সােনিয়া, আমার সােনিয়াকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলে।” “ছেলে মেয়েগুলো এদিকে উপােস করে। একদিন ক্যাথুরিণ সােনিয়াকে বলে, ‘পােড়ামুখী, বসে বসে গিছ আর এরা সব উপােস করছে! গতর নেই তাের ? বেচারা সােনিয়া, সেও ক’দিন কিছু খায়নি ! আমি মাতাল হয়ে মেঝেয় পড়ে তবু শুনতে পেলুম তার কান্না! ডেরিয়া বলে একটা নষ্ট মেয়েমানুষ বন্দোবস্ত করে দিলে, সােনিয়া পুলিশের খাতায় নাম লিখিয়ে এলাে। একদিন সন্ধ্যায় সােনিয়া কোথায় গেল, তারপর বাড়ী এসে ক্যাথরিণের হাতে তিরিশ রাবল গুজে দিলে। কিন্তু বিছানায় পড়ে তার সে কি কান্না! ক্যাথারিণ তার পায়ের কাছে বসে তার পায়ে চুমম খেলে-দু’জনে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাে। তারপর বাড়ীর অন্য ভাড়াটে আর পাড়ার লােকে মিলে সে কী অপমান! ঐ ১৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ডেরিয়া মাগী পৰ্যন্ত বললে, ও বাড়ীতে আর তার থাকা চলবে না। তারপর ঐ লেবেজিয়াটুনিকফ। ও সােনিয়াকে প্রথম প্রথম খুব যত্ন করতাে, ও লােকটা বাড়ীউলীকে বলে, “কেমন করে ওর মতো শিক্ষিত লােক এ বাড়ীতে আর বাস কতে পারে ?” ক্যাথারিণ সােনিয়ার পক্ষ নিয়ে কিছু বলতে গেল কিন্তু ব্যাপারটা রীতিমত হাতাহাতিতে শেষ হলাে ! ক্যাথারিণ মার খেল ওর হাতে! সােনিয়া এখন একটা খোঁড়া দরজির সঙ্গে থাকে— তার আবার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রী আছে, তারা সকলেই একটু তােতলা। রাত্রে সােনিয়া এসে আমাদের দেখে যায়। তােতলা আর খোড়া, বুঝ লে? হ্যা, একদিন সকালে আমি সােজা গভর্ণমেন্টের কৌসুলী আই ভ্যানের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলুম ! তিনি দয়া করে চাকরি দিলেন, বল্লেন, ‘মারমেলেডফ ! আমার নিজের দায়িত্বে তোমাকে আর একটা চাকরি দিলুম।' দেবতা! বুঝলে? আমি তাকে প্রণাম করে বাড়ীতে এসে ওদের খবরটা দিলুন। ওদের সে কী আনন্দ ? আমার কাজ হল ! আমি আবার রোজগার করবো ওদের সে কী আনন্দ!” মুখে সে বলিল বটে ‘আনন্দ’ কিন্তু এইবার কী একবার বেদনার অসহ ভারে যেন সে নিষ্পেষিত হইয়া গেল। ছােট পানশালাটা এই সময় কতকগুলাে মাতালে ভরিয়া গেল। তাহারা চীৎকার করিয়া গান ধরিল। কিন্তু সেদিকে তাহার হৃক্ষেপ নাই। হঠাৎ যেন তাহার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সে আবার আরম্ভ করিল-

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“সে আমাদের সকলের কী আনন্দের দিন! বােজ যখন আমি
অফিস থেকে ফিরে আসতুম ওরা সবাই চুপ করে থাকতে পাছে
মামার বিশ্রামের ব্যাঘাত হয় ! সকালে ক্যাথারিণ আমাকে কফি
P’রে দিতে, তাতে আবার দুধের সর দিয়ে। আমার জামাটা সেলাই
P’রে জুতো পরিষ্কার করে ক্যাথারিণ একেবারে আমায় ভদ্রলােক
করে দিলে । সে যেন আমরা বড়লােক হয়ে গেছি!•••••আজ
থকে ছ’ দিন আগে আমি প্রথম একমাসের মাইনে ক্যাথরিণের হাতে
দলুম। ও আমায় আদর করলে খুব --বুঝলে, ছ'দিন আগে !”
এই মাতালটিকে লইয়া যে কী করিবে ব্যাকনিকফ, তাহা
ভাবিয়া পাইল না। এই লােকটা মাতাল হইয়া খড়ের নৌকায় ঘুমায়
অথচ সংসারের প্রতি তাহার আকর্ষণ কতাে প্রবল ! উৎকর্ণ হইয়া
তাহার কাহিনী শুনিলেও র্যাকনিকফ, কেমন যেন অস্বস্তি বােধ
করিতে লাগিল। কেন সে এমন কুৎসিত স্থানে আসিল ?
“সে দিনটা যেন শুধু স্বপ্ন দেখে দেখে কেটে গেল। আমি
ভাবতে লাগলুম কেমন করে আমার সংসারটাকে ভালো করে
গড়ে তােলা যায়। ছেলে-মেয়েদের জামা আর জুতাে কিবো
ঠক করলুম আর প্রতিজ্ঞা করলুম ক্যাথারিণকে সুখী করবে।
ওর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, ওকে বিশ্রাম দেবে। আর সােনিয়াকে ঐ
পকের ভেতর থেকে তুলে আন্। এই সব ভাবতে ভাবতে
সেদিন সারারাত্রি কেটে গেল। কিন্তু ভােরবেলা আমি চুরি
করলুম, বুঝলে, চুরি করলুম সেই টাকাটা ক্যাথারিণের
বাক্স থেকে আমার মাইনের টাকা, আমার স্ত্রীপুত্রের, সােনিয়ার

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট জীবন বাঁচাবো যে টাকা দিয়ে সেই টাকা !•••কতো টাকা ছিল আমার মনে নেই, কিন্তু বাক্সে যা ছিল সব নিয়েছিলুম। আজ পাঁচদিন আমি বাড়ী ছাড়া তারা জানে না আমার কি হয়েছে। আমার কাজ গেছে—গভর্ণমেন্টের যে সুট ছিল সেটাও বদলে এই ছেড়া জামা আর তালি দেওয়া পাতলুন পরেছি—এই আমার এখন সম্বল।” এইবার সে মাথায় করাঘাত করিতে লাগিল। তারপর চোখ বুজিয়া খানিকক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া হঠাৎ হাসিয়া উঠিল—তাহার মধ্যে একটা পিশাচ যেন এ হাসি হাসিল। সে উচ্চকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “আরও আছে। শােনাে, শােনাে, আমি আজ সােনিয়ার কাছে গিয়েছিলুম মদ খাবার পয়সা চাইতে ! হাঃহাঃ!” এতক্ষণ তাহার গল্প যাহারা ঝুকিয়া পড়িয়া শুনিতেছিল তাহারা জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “সােনিয়া তােমায় টাকা দিলে ?” তাহাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া সে রাসকনিকফকে উদ্দেশ ফরিয়া কহিল, “তারই টাকায় এই মদ খাচ্ছি। সে কিছুই বল্লে না, শুধু তার বাক্স ঝেড়ে তিরিশ কপে বার করে দিলে। এই কপেকু কটা তার বােধহয় খুব দরকার ছিল। আমি তার বাপ, আমি তার পয়সায় মদ খাচ্ছি। আমার অধিকার আছে, বুঝলে? যাক তাও শেষ হয়ে গেল ! এর পর আমায় কি কেউ দয়া করবে, এই সব শুনেও•• আমি ক্ষমা চাই নে, করুণা চাই নে—আমি শান্তি চাই । তােমরা আমার বিচার করে। আমি কষ্ট পেতে চাই—আমি নিদারুণ দুঃখ পাবার লােভে মদ খাই। ঈশ্বর বিচার করবেন ।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তিনি সেই পরম দিনে সােনিয়াকে ডাক দিয়ে বলবেন, “সেই মেয়েটি কৈ যে মেয়েটি তার মাতাল বাপকে দয়া করতাে, তার যক্ষ্মাগ্রস্ত সৎমার ছেলেমেয়েদের জন্য যে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল?-এই যে ! আমি তােমায় ক্ষমা করলুম মা! তুমি এত ভালবাসতে পেরেছিলে বলে তুমি নিষ্পাপ!” আর আমাদের দিকে তিনি তার অভয় হস্ত প্রসারিত করবেন, কেন না তিনি জানেন নে আমরা কেউই তাঁর এতটা দয়া আশা করিনি। আমরা কাদতে কাদতে তার বুকে গিয়ে আশ্রয় নেবো। কবে আবে সেই ভগবানের রাজত্বের দিন-কবে ?” শেষের দিকে তাহার কথা আর বােঝা গেল না। চারিদিকে ব্যঙ্গ আর বিদ্রুপের কোলাহল শুরু হইল। সকলেরই যেন এই লোকটির প্রতি অসীম ঘৃণা। কিন্তু কিছুই তাহার কানে গেল না। কিয়ৎক্ষণ স্বপ্নাবিষ্টের ন্যায় থাকিয়া সে হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “আমায় বাড়ী নিয়ে চল, এইবার আমার ক্যাথারিণের কাছে যাবার সময় হয়েছে।” র্যাকনিকফ, তাহাকে ধরিয়া ধরিয়া বাড়ী লইয়া গেল। কিন্তু বাড়ীর নিকটবর্তী হইবামাত্র মারমেলেডফ, কেমন যেন চঞ্চল হইয়া উঠিল। উত্তেজিত হইয়া সে বলিতে লাগিল, “আমি জানি ক্যাথারিণ আমার চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে। তাতে আমার ভয় নেই—কেবল তার চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় করে-তার নিঃশ্বাসের শব্দে আমার ভয় করে, আর ভয় করে যখন ছেলেমেয়েগুলো কাদে। তা না হলে ও ক্যাথারিণের মারধােরকে আমি ভয় করিনে। এতে আমার সুখ হয়—ও আমায় মারুক- ২২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মেরে ওর মনটা খানিকটা হালকা হােক্ ! এই যে বাড়ীর দোরে এসে পড়েছি- একটা পাঁচতলা বাড়ীর সিড়ি দিয়া তাহার উপরে উঠিল। একেবারে পাঁচতলায় উঠিয়া র্যাকনিকফ, দেখিল, সিড়ির পাশে একটি দরজা খােলা রহিয়াছে, দরজা দিয়া যে ঘরটির ভিতর পর্যন্ত দেখা গেল সেই ঘরটিই তাহার সঙ্গীর বাসা। ঘরটি দশ ফিট লম্বা তাহারই একপাশে একটা ছেড়া কাপড় ঝুলাইয়া খানিকটা পৃথক করিয়া রাখা হইয়াছে। সম্ভবতঃ ঐ খানটায় শয্যা পাতা আছে। মেঝের উপর একটা শতছিন্ন বহু-পুরাতন কৌচ, এবং খানকতক ভাঙা চেয়ার ও একটা টেবিল। একটি লােহার বাতিদানে বাতি জ্বলিতেছে বটে কিন্তু তাহার আয়ু শেষ হইয়া আসিয়াছে। এই ঘরটির পাশে যে দরজাটি খােলা রহিয়াছে তাহার মধ্য দিয়া অন্যান্য ভাড়াটেদের ঘরে যাইতে হয়। ঐ দিকটা হইতে কখনো উচ্চকণ্ঠের চীৎকার, কথনাে অনুরূপ হাসি, এবং কখনাে বা কুৎসিত গালিগালাজ ভাসিয়া আসিতেছিল। কান্না, হাসি এবং অশ্রাব্য কথােপকথনে সমস্ত আবহাওয়াটা যেন বিষাক্ত হইয়া গিয়াছে। যে ঈষৎ দীর্ঘাকার স্ত্রীলােকটি ঘরের মধ্যে দুই হাতে বক্ষ চাপিয়া পায়চারি করিতেছিল, তাহাকে দেখিয়াই রাসকনিকফ, বুঝিল যে সে-ই ক্যাথারিণ। ক্যাথারিণের রক্তাভ অথচ হলুদবর্ণ কেশ, গণ্ডে রক্তিম আভা এবং সুগঠিত দেহ। তবু তাহার দৃঢ়সন্নিবদ্ধ দৃষ্টি, আর মুখের বেদনাতুর ছায়া দেখিলেই তাহার অবস্থা অনুমান করা যায়। ক্ষীয়মান দীপালােকে ক্যাথারিণের মুখ দেখিয়া মনে হয় যেন ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট বয়স কী একটা অব্যক্ত বেদনায় তাহার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। তাহার ত্রিশের কাছাকাছি, তাহার স্বামীর চেয়ে সে অনেকটা ছােট। এখন যে তাহার শ্রবণ এবং দৃষ্টিশক্তি সবই লুপ্ত হইয়া গেছে। রুদ্ধ গৃহের বাতাস ভারী হইয়া উঠিয়াছে কিন্তু জানালা খুলিবার কথা তাহার একবারও মনে হয় নাই। তাহার সকলের ছােট মেয়েটি মেঝেয় পড়িয়া ঘুমাইতেছে, তাহার চেয়ে বড় ছেলেটি ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতেছে, সে বােধ করি এইমাত্র মায়ের হাতে মার খাইয়াছে এবং ছয় বছরের বড় মেয়েটি একটি ছেড়া এবং খাটে। শেমিজ পরিয়া তাহার ভাইটীর গায়ে হাত বুলাইয়া তাহার কান্না থামাইবার বৃথা চেষ্টা করিতেছে। তাহারা উভয়েই সভয়ে এক একবার ক্যাথারিণের দিকে চাহিয়া দেখিতেছে। ক্যাথারিণ ইহাদের প্রথমে দেখিতেই পায় নাই, তারপর যখন দেখিতে পাইল তখনও সে নিতান্ত বিরক্ত হইয়া পাশের দিককার দরজাটা খুলিয়া দিতে গেল। সে ইহাদের ভাড়াটেদের কেহ বলিয়া মনে করিয়াছিল। কিন্তু হঠাৎ স্বামীর দিকে চোখ পড়িতেই সে চীৎকার করিয়া উঠিল এবং পরক্ষণেই রাগে জ্বলিয়া উঠিয়া কলি, “ও! তাহলে ফিরে আসা হ’ল! পাজী ! শয়তান, কৈ দেখি, টাকা কোথায় গেল ?” সমস্ত পকেট খুঁজিয়া যখন কাণাকড়িও পাওয়া গেল না তখন সে আৰ্ত্তকণ্ঠে শুধু একবার বলিল, “ভগবান্ ! এ কেমন করে সম্ভব হয় ? লােকটা যথাসর্বস্ব মদ খেয়ে উড়িয়ে দিয়ে এল!” পরক্ষণেই সে জ্বলিয়া উঠিল। ক্রোধােন্মত্তা । ক্রোধােন্মত্তা হইয়া সে মারমেলেডফকে চুলের মুঠি ধরিয়া ঘরের মেঝেয় টানিয়া আনিল।

28 ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মারমেলেডফ, মেঝেয় আছাড় খাইয়া পড়িল-মুখ থুবড়াইয়া মেঝেয় পড়িয়া সে শুধু বলিতে লাগিল, “এই ভালো—এই আমার ভালো লাগে—আরও—আরও-” ছেলেমেয়েগুলো চীৎকার করিয়া কান্না জুড়িয়া দিল। ক্যাথারিণ র্যাস্কনিকফকে অপমান শুরু করিল, বলিল,-“ছেলে মেয়েগুলাে উপােস করবে, আর মদ খেয়ে সব উড়িয়ে এলো ! কিগো ভদ্দর- লােকের ছেলে, মদের আডডা থেকে উঠে আসতে তােমার লজ্জা করলাে না? তুমি বুঝি সঙ্গী জুটেছিলে? বেরােও বেরােও” রাসকনিকফ, দ্বিরুক্তি না করিয়া ঘরের বাহিরে চলিয়া আসিল। গােলমাল শুনিয়া অন্য ঘরের ভাড়াটেরা আসিয়া জড়ো হইয়াছে। মারমেলেডফের কান্নার সঙ্গে তাহাদের হাসি কানে আসিতে লাগিল। বাড়ীউলী ক্যাথারিণকে উঠিয়া যাইতে বলিতেছে। মদ খাইয়া যায় কিছু খুচরা তাহার কাছে ছিল সেই কয়েক কপেক্ জালার ধারে রাখিয়া রাসকনিকফ দ্রুত সিড়ি দিয়া নামিতে লাগিল। পথে নামিয়া তাহার এই বদান্যতার জন্য অনুতাপ হইতে লাগিল। উহাদের তবু সােনিয়া আছে, তাহার কে আছে ? সােনিয়াকে উহারা পাইয়াছে বেশ! প্রথমে দু-একফোটা চোখের জল, তারপর সব সহিয়া যায়। সােনিয়ার গণিকাবৃত্তিও উহাদের সহিয়া গিয়াছে। মানুষ স্বভাবতঃ কাপুরুষ এবং সব কিছুকেই সে মানিয়া লইতে পারে। খানিকটা ভাবিয়া লইয়া সে মনে মনে বলিল, “আর মানুষ যদি কাপুরুষ না হয় তাহলে সে নিশ্চয়ই যা কিছু সংস্কার যা কিছু ভয়ঙ্কর সব পায়ের তলায় ফেলে এগিয়ে যাবে। । নিশ্চয়ই!”

যায়। পরের দিন যখন র্যাকনিকফের ঘুম ভাঙ্গিল তখন অনেক বেলা হইয়াছে। চোখ খুলিয়াই তাহার মেজাজ খারাপ হইয়া গেল এবং ঘরের মধ্যে চারিদিকে চাহিয়া যে অকারণে রাগিয়া উঠিল ७ को অবস্থা! ছােট নীচু একখানা ঘর-দাড়াইলে ছাদে মাথা ঠেকিয়া দেওয়ালে কাগজ আঁটিয়া যথাসম্ভব ভদ্র করিয়া তুলিবার চেষ্টা করা হইয়াছে ; তিনখানা ভাঙা চেয়ার, একটা রং করা টেবিল। তাহারউপর কয়েকখানা বই আর কিছু কাগজপত্র ধূলায় বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। ঘরের মাঝখানে একটা সােফা আছে, সেইটাতে একটা ছেড়া কাপড় ঢাকা দিয়া সে বিছানা করিয়াছে। পুরাণে। ময়লা এবং ছেড়া জামাকাপড়গুলাে একটা পুটুলি বাঁধিয়া সে বালিশের অভাব মােচন করে। মানুষের সংসর্গ এড়াইয়া চলে বলিয়া বাসার একমাত্র ঝিও তাহার ঘর পরিষ্কার করা অনাবশ্যক মনে করে। বাড়ীউলী খাবার পাঠানো বন্ধ করিয়াছে। সবগুলি মনে পড়তে সে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। নয়টা বাজিয়া গিয়াছে দেখিয়া উক্ত ঝি আসিয়া তাহাকে ডাকিয়া তুলল। কয়েকটা খুচরা কপে ফেলিয়া দিয়া র্যাঙ্কলনিক, তাহাকে কিছু মােটা রুটি এবং মাংস আনিতে বলিল। ঝির নাম নাটাসিয়া, সে মাংস না আনিয়া বাধা কপির ঝোল অনিয়া দিল। র্যাকনিকফকে খাইতে দিয়া সে সস্নেহে পাশে বসিয়া বলিল, “বাড়ীউলী তােমার নামে পুলিশে নালিশ করবে বলচে।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“পুলিশে? কেন।”
“কেন আবার! তুমি ভাড়াও দেবে না আর উঠেও যাবে না,
তাই।”
“মার্গী ভারি পাজী ত ! আচ্ছা, আমি ব’লে দেখছি”
“তা’ নয় হ’ল। কিন্তু তােমার এত বুদ্ধি শুদ্ধি ভালো-তুমি
কিছু কাজকৰ্ম্ম করেন না কেন? তােমার মত ছেলের এত অভাব
হয় কেন ? আচ্ছা তুমি কী করে?”
“আমি একটা কাজে ব্যস্ত।”
“কী কাজে ?”
“চিন্তায়।”
উত্তর শুনিয়া নাসটাসিয়ার হাসিতে দম বন্ধ হইবার উপক্রম হইল।
অতি কষ্টে হাসি থামাইয়া বলিল, “শুধু ভাবলে কি পয়সা আসবে
নাকি?”
“কিন্তু ছেলে পড়তে যাবাে যে তাও তাে পায়ে জুতাে নেই !
তাছাড়া আমার ঘৃণা করে !” কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া
কহিল, “আমি নিমেষে আমার ভাগ্য ফিরিয়ে দেবাে।”
হঠাৎ তাহার মুখের চেহারা দেখিয়া নাটাসিয়ার ভয় করিতে
লাগিল। সে বলিল, “তােমার একখানা চিঠি এসেছে:তুমি অমন
করে তাকিয়ে থেকো না আমায় ভয় করে ! কী হল।”
“চিঠি। কৈ দেখি।”
নাসটাসিয়া চিঠি আনিয়া দিয়া চলিয়া গেল। কম্পিত হস্তে
চিঠিখানা খুলিয়া সে আদ্যন্ত বার বার পড়িয়া ফেলিল। চিঠিখানি

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট २१ পড়িতে পড়িতে কখনাে তাহার দুই চোখ জলে ভরিয়া আসিল, আবার কখনাে তাহার ওষ্ঠে কঠিন বিদ্রুপ, নিষ্ঠুর প্রতিহিংসার তীক্ষ হাসি ফুটিয়া উঠিল। চিঠিখানি তাহার মা লিখিয়াছেন। দীর্ঘ ডিঠি—গত তিনমাসে তাহার মাতা ও ভগিনীর জীবনে যতকিছু অঘটন ঘটিয়াছে তাহারই বিবরণ। চারিমাস পূর্বে যে টাকা তাহার মাতা তাহার প্রাপ্য ভাত হইতে দিয়াছিলেন তাহার পর এক্ষণে আরও কিছু পাঠাইবার মত অবস্থা হওয়ায় তবে এই চিঠি দিয়াছেন। সিড্রিগেলফদের বাড়ীতে তাহার ভগিনী ডুনিয়া শিক্ষয়িত্রী হিসাবে কাজ করিতেছিল কিন্তু মিষ্টার সিড্রিগেলফ, তাহার প্রতি অপমানসূচক ব্যবহার করিতে থাকেন এবং অবশেষে একদিন তাহার কাছে মদ খাইয়া আসিয়া কুৎসিত প্রস্তাব করেন এবং ডুনিয়াকে তঁাহার সহিত পলায়ন করিতে বলেন। ঠিক এই সময় তাহার স্ত্রী মাফ। সেখানে আসিয়া পড়েন এবং ডুনিয়ার নিকট তাহার স্বামীকে প্রেম নিবেদন করিতে দেখিয়া , ডুনিয়াকে তৎক্ষণাৎ তাহার বাড়ী হইতে বিদায় করিয়া দেন। দুনিয়াকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করিতেন কিন্তু তাহাকে তাহার স্বামীর প্রতি আসক্ত মনে করিয়া তিনি ক্রোধে অন্ধ হইয়া ডুনিয়ার কোন কথায় কর্ণপাত করিলেন না। একটা চাষীর গাড়ীতে করিয়া ডুনিয়া কাদিতে দিতে তাহাদের গ্রামে ফিরিয়া আসে। কিন্তু ইহাতেও তাহাদের দুর্দশার শেষ হয় নাই—মাফ। শহরে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে গ্রামে যাইয়া ডুনিয়ার নামে মিথ্যা কলঙ্ক ২৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট রটাইতে লাগিলেন। দুনিয়া এবং তাহার মাতার নির্যাতনের অবধি রহিল না।•••এই বিবরণ পড়িতে পড়িতে রাসকনিকফের চোখে জল আসিয়া পড়িল। তাহার পর, তাহার মাতা লিখিতেছেন, ঈশ্বর তাহাদের প্রতি মুখ তুলিয়া চাহিলেন। মিষ্টার সিড্রিগেলফ, সহসা অনুতপ্ত হইয়া দুনিয়ার এই মিথ্যা কলঙ্ক দূর করিতে মনস্থ করিলেন এবং তাহার নিকট দুনিয়া ঘটনার কয়েক দিন পূর্বে যে-চিঠি লিখিয়াছিল তাহা মাফাকে দেখাইলেন। মাফ। এই চিঠি পড়িয়া বিস্মিত হইলেন। তাহার মনে হইল ডুনিয়া মানবী নহে, সে দেবী দেবীর মতাে চরিত্র না হইলে কেহ এমন চিঠি লিখিতে পায় না। এই চিঠিতে অতি সুন্দর ভাষায় দুনিয়া তাহাকে তাহার স্ত্রী মাফর প্রতি কর্তব্য পালন করতে এবং পিতা হিসাবে তাহার দায়িত্ব এবং সম্মান সম্বন্ধে তাহাকে সচেতন হইতে মিনতি জানাইয়াছিল। ইহা ছাড়া দুনিয়া তাহাকে আরও অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা জানাইয়াছিল। মাফ। অনুতপ্ত হইয়া সেই দিনই সেই চিঠি লইয়া সেই সব বাড়ীতে গেলেন যেখানে তিনি দুনিয়ার সম্বন্ধে কটুক্তি করিয়া আসিয়াছিলেন। ফলে ডুনিয়া সম্বন্ধে লােকের শ্রদ্ধা হইল এবং অনেকেই তাহাকে গৃহ শিক্ষয়িত্রী নিয়ােগ করিতে ব্যর্থ হইলেন। শুধু তাই নয় অনেক ধনবান্ যুবক তাহাকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব করিলেন। এমনই করিয়া আবার তাহাদের ভাগ্য ফিরিয়া গেল।••• এতদুর পড়িয়া ব্যাকনিকফ, শুধু মনে মনে দুঃখিত হইতে- ছিল এইবার পড়িতে পড়িতে সে যেন জ্বলিয়া উঠিল। তাহার ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মাতা লিখিয়াছেন, এই সময় মাফর এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় মিষ্টার পিটার লুশিন দুনিয়ার পাণিপ্রার্থী হইলেন। লােকটির অত্যন্ত কঠিন স্বভাব এবং বয়স যদিও পঁয়তাল্লিশ তবু মেয়েদের চোখে তাহাকে খারাপ লাগে না। লােকটি ব্যবসায়ী কিন্তু তাহার ব্যবহারে অত্যন্ত আভিজাত্যের ছাপ আছে। প্রথম দিনের আলাপেই সে বলিয়াছে যে, সে অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং প্রাচীন-পন্থী তবে রাশিয়ার নব্যভাবকে সে সমর্থন করে এবং কুসংস্কার সে একেবারে দেখিতে পারে না। আরও অনেক কথা সে বলিয়াছে। তাহার কথা শুনিয়া মনে হয় যে লােকটা দাম্ভিক, নিজের কথায় পঞ্চমুখ । তবে দুনিয়া বলিয়াছে যে মিষ্টার লুশিন অল্প শিক্ষিত এবং একটু দাম্ভিক হইলেও তিনি বুদ্ধিমান এবং সম্ভবতঃ উদার প্রকৃতির। তাহার মাতা আরও লিখিয়াছেন যে যদিও ডুনিয়ার মত বুদ্ধিমতী শিক্ষিত এবং চরিত্রবতী মহীয়সী মহিলার সঙ্গে মিষ্টার লুশিনের মতো লােকের কোন সাদৃশ্য নাই এবং যদিও তাহাদের মধ্যে এখনও কোন নিবিড় সম্বন্ধ স্থাপিত হয় নাই তবু ডুনিয়া বলিয়াছে যে, সে ধৈৰ্য্য সহকারে সব কিছু সহ্য করিয়া নিজেকে ঠিক মানাইয়া লইবে। মিষ্টার লুশিন বলিয়াছেন, স্বামী হইয়া তাহাকে দেখিতে হইবে যে, তাহার স্ত্রী তাঁহাকে উদ্ধারকর্তা বলিয়া মনে করে এবং তাঁহার কাছে অশেষ ঋণ স্বীকার করিয়া মাথা নত করিয়া থাকে (একথা নিশ্চয়ই তিনি কটাক্ষ করিয়া বলেন নাই) এবং সেই জন্যই তিনি তাহাদের সেন্ট পিটারসবার্গ যাইবার সমস্ত ব্যয় অগ্রিম দিয়াছেন। শুধু ইহাই নহে, তিনি স্বয়ং জরুরী মােকমার কাজে সেন্ট পিটারসবার্গ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট যাইতেছেন। সেখানে গিয়াই তিনি রাসকনিকফের সঙ্গে দেখা করিয়া তাহার জন্য কিছু করিতে চেষ্টা করিবেন এবং যােগ্য বিবেচনা করিলে তাহাকে তিনি তাহার সেক্রেটারী নিযুক্ত করিবেন। রাসকনিকফের মা বারবার লিখিয়াছেন, সে যেন প্রথম পরিচয়ে লুশিনকে ভুল না বুঝে এবং পরিচয় হইয়া গেলে নিশ্চয়ই তাহাকে তাহার ভালােই লাগবে। দীর্ঘ পত্রখানিতে শুধু তিনি স্বপ্নের জাল বুনিয়াছেন। এই বিত্ত- শালী জামাতাকে কেন্দ্র করিয়া কেমন করিয়া তাহার পুত্র কন্যা উভয়েরই ভাগ্যাকাশে সূর্যোদয় ঘটিবে তাহারই কল্পনা করিয়া আনন্দে আত্মহারা হইয়া এই দারিদ্র্যপীড়িত বৃদ্ধাটি অনেক কথাই তাঁহার প্রিয়তম পুত্রকে বলিয়া ফেলিয়াছেন। চিঠির ছত্রে ছত্রে লুশিনের অভদ্র ব্যবহার, দাম্ভিক এবং অপমান-সূচক কথাবার্তাকে তিনি ঢাকিতে গিয়া প্রকাশই করিয়া ফেলিয়াছেন। র্যাসকল নিকফের বুঝিতে বাকী রহিল না যে শুধু তাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িবার ব্যবস্থা হইবে, তাহার জীবনযাত্রা সুগম হইবে, তাহার দারিদ্র ঘুচিয়া যাইবে, এই জন্যই তাহার বড় আদরের ভগিনী নিজেকে বলি দিতে উদ্যত হইয়াছে এবং তাহার মা তাহাই সমর্থন করিতে চেষ্টা করিতেছেন। চিঠির একস্থানে সে পড়িয়া গেল, “যে দিন লুশিন বিবাহের প্রস্তাব করিলেন সেদিন রাত্রিতে ডুনিয়া ঘুমাইতে পারে নাই। সারারাত্রি সে পায়চারি করিতে লাগিল এবং যখন ভাের হইয়া আসিল সে. বিছানার পাশে নতজানু হইয়া ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিল। তাহার পর সকালে উঠিয়া সে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ০ বলিল যে তাহার মত স্থির হইয়াছে—সে লুশিনকেই বিবাহ করিবে।” ব্যাকনিকফ, আর পড়িল না। শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল এ বিবাহ সে কিছুতেই হইতে দিবে না। সে কোন দিকে চাহিয়া সিড়ি দিয়া রাস্তায় নামিয়া আসিল। লুশিনকে সে দেখে নাই কিন্তু তাহাকে সে চিনিতে পারিয়াছে। এই বর্বর অর্থপিশাচ লােকটা শুধু অর্থ দিয়া দুনিয়ার মতাে মেয়েকে চিরকালের জন্য দাসী করিয়া রাখিতে চায়। সেন্ট পিটারবার্গ শহরে আনিয়া সে তাহাদের উপকার করিবার ছলে নিজের কবলে রাখিয়া দিবে। কথায় কথায় তাহার অর্থের অহঙ্কার, উদারতার দম্ভ নিশিদিন ডুনিয়াকে বিধিতে থাকিবে। মা লিখিয়া- ছেন, দুনিয়া সহ্য করিবে—তাহা হইলেই সব ঠিক হইয়া যাইবে। সহনশক্তি তাহার অসাধারণ-সিড্রিগেলফ দের হস্তে যে নির্যাতন, যে চরম লাঞ্ছনা বিনদোষে সে মুখ বুজিয়া সহ করিয়াছে তাহার পরে তাহার কাছে আর কিছুই অসহ্য হইবে না। যে লােকটি তাহার ভাবী বধুর সহিত প্রথম পরিচয়ের দিনে অকুণ্ঠ চিত্তে বলিতে পারে যে, নিদারুণ দারিদ্র্যের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া এই রমণীকে সে বিবাহ করিবে এই উদ্দেশ্যে, যে সে যেন সারাজীবন তাহার নিকট ঋণী এবং কৃতজ্ঞ থাকে-স্বামী হিসাবে তাহার এক- মাত্র কাম্য যে স্ত্রী যেন তাহাকে ত্রাণকর্তা বলিয়া মনে করে সেই লােকটিকে কি দুনিয়া চিনিতে পারে নাই। তবে কেন সে এ-কাজ করিল? দুনিয়াকে সে জানে, বোধ করি সকলের চেয়ে ৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট - বেশী জানে-দুনিয়া সারাজীবন লােকের বাড়ী সামান্য শিক্ষয়িত্রী থাকিয়া জীবনযাপন করিবে তবু যে লােকটির সহিত তাহার কোথাও মিল নাই, যে লােকটিকে সে কোনদিন শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতে পারিবে না, শুধু অর্থের জন্য তাহারই আইনানুমােদিত সহধম্মিণী হইবে না। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, নিজের আর্থিক সুবিধার জন্য সে কিছুতেই একাজ, করিবে না। এ শুধু ভ্রাতা এবং দুঃখিনী মায়ের জন্য তাহার চরম ত্যাগ, তাহার মহান আত্মােৎসর্গ । দুনিয়া আত্মােৎসর্গ করিতেছে তাহারই জন্য! কিন্তু সে কী ভাবিয়া দেখিয়াছে যে শেষ পর্যন্ত সে সহিতে পারিবে কি না? তাহাদের মধ্যে ভালােবাসা তাে নাই-ই আছে শুধু বিরূপতা কিংবা অপরিসীম ঘৃণা। আর সােনিয়া আত্মোৎসর্গ করিয়া পাইবে আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং বাহিক সুখ সুবিধা ! কিন্তু ইহাদের মধ্যে প্রভেদ কতটুকু? সােনিয়া নিজেকে কলঙ্কিত করিয়াছে, নারীত্ব বিসর্জন দিয়াছে আর দুনিয়া কী ঠিক তাহাই করিতেছে না। , এ আত্মত্যাগ সে ডুনিয়াকে কিছুতেই করিতে দিবে না, জীবন থাকিতে নহে। ডুনিয়াকে সে এইভাবে আত্মত্যাগ করিতে দিবে না বটে কিন্তু কী অধিকার আছে তাহাকে বাধা দিবার? বিনিময়ে সে নিজে কী দিবে তাহাকে ?, লুশিনের পয়সায় সে লেখাপড়া শিখিয়া প্রচুর উপার্জন করিতে পারে। কিন্তু দুনিয়ার জীবন বলি দেওয়া হইয়া যাইবে ! তাহাকে কিছু করিতেই হইবে এবং এখনই করিতে হইবে। উত্তেজনাবশে নিজেকে প্রশ্ন করিয়া নিজের অক্ষমতাকে 1 ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট বিদ্ধ করিয়া সে যেন একপ্রকার আনন্দ পাইতে লাগিল। এ সকল প্রশ্ন এবং চিন্তা নূতন নহে। বহুদিন ধরিয়া নিজের অক্ষমতা, সংসারের নিষ্ঠুর নির্যাতন তাহার হৃদয়ে অহরহ তুষানল জ্বলিয়াছে। আজ আর শুধু ভাবিবার সময় নাই, যুক্তি দিয়া জগতের বিধি- বিধানকে হীন প্রতিপন্ন করিয়া লাভ নাই—আজ তাহাকে কাজ করিতে হইবে, কিছু একটা করিতেই হইবে। আর যদি কিছুই করিতে না পারে ? তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া গেল, “তাহলে : মানুষের সব কিছুকে বর্জন করবাে, হেলায় তুচ্ছ করবে,-মানুষ হিসাবে আমার কোন অধিকার থাকবে না, ভালােবাসার অধিকার, কাজ করবার অধিকার, বাঁচবার অধিকার—কিছু না। নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করবে।” কিছু একটা করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়াই তাহার মনে হইল যে, সেজন্য একটা কোথাও যাওয়া প্রয়ােজন। কোথায় যাইবে সে? নিমেষে তাহার সেই ভয়ঙ্কর কথাটা মনে পড়িল। কাল অবধি যে চিন্তা সে প্রায় স্বপ্নের মতাে দেখিয়াছে, যে চিন্তা মাঝে মাঝে স্পষ্ট হইয়া উঠিলেও একেবারে মনের মধ্যে সত্য হইয়া উঠে নাই, এখন হঠাৎ সেই স্বপ্নই রূপ পরিগ্রহ করিল। যে কাজ সে করিতে যাইতেছে তাহা যেন ছবির মতাে তাহার চোখের সম্মুখে রেখায় রেখায় ফুটিয়া উঠিল। উঃ, কী ভয়ঙ্কর! তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল। সমস্ত দেহ অবসন্ন হইয়া আসিল। খানিকটা বিশ্রাম লইবার জন্য একটা পার্কের মধ্যে ঢুকিয়া একটি বেঞ্চে বসিয়া পড়িল। নানা অসংলগ্ন চিন্তার মধ্যে হঠাৎ তাহার বন্ধু রাজুমিথিনের ৩৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ছিল। কথা মনে পড়িয়া গেল। কলেজে তাহারা একসঙ্গে পড়িত। রাস্কনিকফ, কলেজে কাহারও সহিত মেলামেশা করিত না। অতি সাবধানে সে তাহার সহপাঠীদের এড়াইয়া চলিত। নিজেকে কঠোরভাবে পড়াশুনার মধ্যে রাথিত বলিয়া ছেলেরা তাহাকে শ্রদ্ধা করিত। কিন্তু গরীব বলিয়া সে শুধু একা থাকিত তাহা নহে, ধনীর তনযুদের গর্বভরে অবজ্ঞা করিত। এইরূপে সকলের সঙ্গে পরিহার করিলেও রাজুমিথিনকে সে কোনদিন দূরে রাখিতে পারে নাই। তাহার স্বভাবে কোথায় একটা আকর্ষণ করিবার শক্তি একে তাহার হৃদয় অত্যন্ত কোমল ছিল তাহার উপ হাসি- তামাসায় সে ছিল অদ্বিতীয়। কোন কারণেই তাহাকে অধিকক্ষণ বিমর্ষ থাকিতে দেখা যাইত না। সর্বোপরি প্রতিভাবান ছাত্র বলিয়া তাহার খ্যাতিও ছিল। সে মদ খাইত প্রচুর এবং অকারণে উপবাস করিয়া দারুণ শীতে খােলা-ছাদে শুইয়া দুর্ভোগ সহ্য করিত। একবার সে সমস্ত শীতকালটা ঘরে আগুন না রাখিয়া কাটাইয়া দিল। কারণ, জিজ্ঞাসা করিলে বলিত, “শীত করলে আমার ঘুমটা জমে ভালাে।” টাকা কড়ির অভাবে এখন সে কলেজ ছাড়িয়া দিয়াছে তবে শীঘ্রই তাহার অবস্থার উন্নতি হইবার সম্ভাবনা আছে। এই রাজুমিথিনের কাছে গেলে তাহার কোন সুবিধা হইতে পারে বলিয়া মনে হইল। একটা কাজকর্ম কিংবা আপাততঃ জুতা ও জামা কিনিবার মতাে কয়েকটা রাব হয়তাে সে দিতে পারে। কিন্তু কী হইবে কয়েকটা টাকায়? রাজুমিখিনের কাছে সে যাইবে কিন্তু কাজটা হইয়া গেলে। সেই কাজটা! হ্যা, ঠিক মনে পড়িয়াছে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
৩৫
,
সেইটা সমাধা করিয়া তাহার পর সে যাইবে রাজুমিথিনের কাছে।
কিন্তু পারিবে কি সে? কোন দিন কী তাহার শক্তিতে কুইবে ?
কথাটা মনে পড়িতেই যেন তাহার শীত করিতে লাগিল, বুকের
মধ্যে কম্পন শুরু হইয়া তাহাকে অনেকখানি দুর্বল করিয়া দিল।
একবার মনে হইল বাসায় ফিরিয়া যায়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে
হইল বাসায় গেলে এই ভয়ঙ্কর কথাটাই বারবার তাহার মনে
পড়িবে । নেভার ওপারে গিয়া একটা সরকারী বাগানে ঢুকিয়া
তাহার বেশ ভালাে লাগিল। নানাবিধ ফুলের গাছ, তাহাতে
বিচিত্রবর্ণর অসংখ্য ফুল ফুটিয়া আছে এবং
এবং ছোট ছােট
ছেলেমেয়েগুলি চারিদিকে খেলা করিয়া বেড়াইতেছে, দু-একটা
গাড়ী মন্থর গতিতে চলিয়া যাইতেছে, এ সব দেখিয়া এবং না
দেখিয়া সে পথ হাঁটিতে লাগিল। ঘঁটিতে হাঁটিতে বাগান হইতে
বাহির হইয়া হঠাৎ তাহার অত্যন্ত ক্ষুধা বোধ হইল
পকেটে
তখনও কয়েক কপে অবশিষ্ট আছে দেখিয়া সম্মুখেরই একটা
ভােজনালয়ে ঢুকিয়া পড়িল।
কিছু মদ এবং কয়েকখানা কে খাইয়া যখন সে বাহিরে
আসিল তখন তাহার হাত পা অবশ হইয়া আসিতেছে, যেন কত
রাত্রি সে ঘুমায় নাই। সে বাগানে ঢুকিয়া ঘাসের উপর চিৎ হইয়া
শুইয়া পড়িল। দুৰ্বল দেহ লইয়া অনেক ঘুরিয়াছে, এখন সুরা
তাহাকে শান্তি দিল।
ঘুমাইয়া পড়িয়া সে স্বপ্ন দেখিল যে তাহার শৈশব ফিরিয়া
আসিয়াছে, তাহার বয়স সাত বৎসর। পিতার সহিত বেড়াইতে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট বাহির হইয়াছে। পথে কতকগুলি লােক ঘােড়ার গাড়ীতে চড়িয়া গান গাহিতে গাহিতে চলিয়াছে। কিছুদূর গিয়া ঘােড়াটা আর চলিতে পারিল না, গাড়ােয়ানটা ক্রুদ্ধ হইয়া প্রচণ্ড প্রহার আরম্ভ করিল। মার খাইয়া ঘােড়াটা হুড়ি খাইয়া পড়িয়া গেল কিন্তু প্রহার থামিল । রাস্তায় লােক জড় হইয়া গেল, তাহারা বলিল, “এই গাড়ােয়ান, তুমি কি ঘােড়াটাকে মেরে ফেলবে নাকি?” গাড়ােয়ানটা উত্তর দিল, “আমার ঘােড়। আমি মারবো, তােমাদের কী ?” গাড়ীর ভিতরে যাহারা ছিল তাহারা বলিল, “আলবৎ, মারবে বৈ কি, নিশ্চয় মারবে। আমরা আর একটা গান ধরি।” তাহারা সমস্বরে চিৎকার করিয়া গান ধরিল। ঘােড়াটা মার খাইতে খাইতে একবার উঠিবার চেষ্টা করিল কিন্তু ভার সহ করিতে না পারিয়া পুনরায় শুইয়া পড়িল—আর উঠিল না। গাড়ােয়ানটা তাহার মাথায় কয়েকবার উপর্যুপরি আঘাত করিল। ঘােড়াটা একবার শুধু আৰ্ত্তকণ্ঠে চীৎকার করিল এবং পরক্ষণেই : সেই কঙ্কালসার মুম্ষু প্রাণীটা নিস্তেজ হইয়া পড়িল। এইবার গাড়ীর ভিতরকার লােকগুলি নামিয়া আসিয়া যে যাহা পাইল তাহাই হাতে লইয়া মৃত ঘোড়াটাকে প্রহার করিতে লাগিল। তাহার পিতা তাহাকে সেখান হইতে লইয়া গেলেন। দূর হইতে সেই লােকগুলির হাসির শব্দ ভাসিয়া আসিতে লাগিল। সে কি ভাবিয়া তাহার পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যা বাবা, ওর ঘােড়াটাকে মেরে ফেললে কেন ?” তিনি উত্তর দিলেন, “ওর মাতাল, ও কথা তুমি ভেব না।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মুখ দিয়া একটা অস্ফুট শব্দ হইতেই তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। সারাদেহ তাহার ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে। সে ঐ বীভৎস স্বপ্নের কথা ভাবিয়া বিস্মিত হইল। কেন সে এই উদ্ভট স্বপ্ন দেখিল? ঐ গাড়ােয়ানটার মতো সেও কি কাহারও মাথায় কুড়ল দিয়া মারিবে ? কাল মনে মনে সে যাহা মহড়া দিতেছিল আজ কী তাহাই স্বপ্নে দেখিল? সত্যই কি সে ঐরূপ বীভৎস একটা কিছু করিতে পারে ? মনে মনে সে বার বার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিল। ঐ সকল চিন্তার হাত হইতে সে রক্ষা চায়। নেভার তীরে আসিয়া দাঁড়াইয়া সে যেন সব ভুলিয়া গেল। নদীর বুকে প্রশান্ত সূর্যাস্তের পানে চাহিয়া তাহার মনে হইল, সে মুক্ত! তাহার আর কোন ভয় নাই, কোন ভাবনা নাই। তাহার আর কোন ভয় নাই ! বীভৎস, নৃশংস কোন কাজই সে করিবে না-ঈশ্বর তাহাকে পাপ-চিন্তার হাত হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কিন্তু বাড়ী ফিরিবার পথে সে অকারণে ‘হে-মারকেট’ নামক পল্লীর কাছ দিয়া যাইতে লাগিল। এ পথটা দিয়া যাইতে গেলে অনেকটা ঘুরিয়া যাইতে হয়, তবু এই পথটাই যেন তাহার প্রয়ােজন হইল। রাত্রি নয়টা বাজিয়া গিয়াছে। অধিকাংশ দোকান পাট বন্ধ, বাজারও উঠিয়া গিয়াছে। এই পল্লীটা তাহার ভালােই লাগে। এখানটায় নানা জাতীয় লােকের বাস, অধিকাংশই দোকানদার শ্রেণীর। একটা গলির মুখে আসিয়া সে দেখিল একটা দোকানদার ও তাহার স্ত্রী আর একটা মেয়ের সঙ্গে কথা কহিতেছে। মেয়েটীকে সে চিনিল। এর নাম এলিজাবেথ-এলেনা বলিয়া যে ৩৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট বৃদ্ধার নিকট সে জিনিসপত্র বাঁধা দিয়া টাকা ধার করে এ তাহারই বােন্। এই মেয়েটি সম্বন্ধে সে অনেক কিছু জানে। ইহার বয়স ত্রিশের উপর ; অত্যন্ত নির্বোধ এবং জ্যেষ্ঠা ভগিনীর গৃহে ক্রীতদাসীর মত থাকে। এলেনা তাহাকে গাধার মত পরিশ্রম করায় এবং যখন তখন প্রহার করে। এলিজাবেথ একটা পুটুলি হাতে করিয়া কোন একটা বিষয়ে ইতস্তত করিতেছিল করিতেছিল এবং দোকানদাৰ দম্পতী ততই তাহাকে অনুরােধ করিতেছিল। অবশেষে দোকানদার বলিল, “তুমি ঠিক কাল সন্ধ্যে সাতটার সময় এসাে।” “তুমি বাপু এলেনাকে বড় বেশী •য় করো!” দোকানদার- পত্নী বলিল, “অত ভয় কিসের? তাকে কিছু না বলে তুমি চুপি চুপি চলে এসো। বুঝলে?” “আচ্ছা, তাই আবাে।” বলিয়া এলিজাবেথ চলিয়া গেল। প্রথম বিস্ময়টা কাটিয়া গেলে র্যাসকনিকফের রীতিমত ভয় করিতে লাগিল। আবার তাহার যেন শীত করিয়া হাত পা শিথিল হইয়া আসিল। সে অপ্রত্যাশিতভাবে জানিতে পারিল সন্ধ্যা সাতটার সময় এলেন একা , থাকিবে। বাড়ী যাইতে তাহার পা উঠিতে চাহে না, যেন এই মাত্র সে স্বকর্ণে তাহার মৃত্যুদণ্ড শুনিতে পাইয়াছে।

রাশিয়ার যুবকদের নিকট বনসাম্যবাদের আদর্শ তখন সকলের বড়ো আদর্শ। ভােজনশালায়, পানশালায়, পার্কের বেঞ্চিতে, শিক্ষিত যুবকগণের একমাত্র আলােচনার বিষয় হইতেছে কেমন করিয়া ধনকুবেরদের সিন্দুক খালি করিয়া অগণিত তরুণ আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দিয়া, খাদ্য দিয়া, বাঁচাইয়া রাখা যায়। যাহারা উত্তমর্ণ হইয়া পরের রক্ত শোষণ করিয়া টাকা জমায় তাহারা মঠ-গির্জার নামে টাকা উইল করিয়া স্বর্গের পথ সুগম করে। সমাজের কোন কল্যাণেই আসে না। পাদ্রীদের যখন আহারে- বিহারে কোন ব্যাঘাত ঘটে না তখন শত শত উদার রুশ যুবক নিরন্ন অবস্থায় পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, তাহাদের শিক্ষিত করিবার, . তাহাদের মানুষ করিয়া তুলিবার জন্য কেহ একটি অঙ্গুলিও উত্তোলন করে না। এই সকল কথা রাসূলনিকফ, বহুবার শুনিয়া উত্তেজিত হইয়া নানা প্রকার উপায় উদ্ভাবন করিয়াছে। আজ কেমন করিয়া সেই আদর্শ সফল করিবার দায়িত্ব অবস্থাবিপৰ্যয়ে তাহারই স্কন্ধে আসিয়া পড়িল! কী করিবে সে? এ ত’ আদর্শ নহে, এ যে তাহার প্রয়ােজন। যাহা প্রয়ােজন তাহারই একটা মৌখিক সমর্থন আছে নব্যরাশিয়ার আদর্শবাদে, ইহা ছাড়া আর কী ? অন্ধকার ঘরে চুপ করিয়া এই সকল কথা ভাবিতে ভাবিতে কোন এক সময় সে ঘুমাইয়া পড়িল। পরের দিন বেলা দশটার ৪০ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট সময় নষ্টাসিয়া তাহাকে ডাকিয়া তুলিল। চা এবং কিছু খাদ্য দিয়া নাসটাসিয়া তাহার নিকট দাড়াইয়া তাহার অসুখ করিয়াছে কি না প্রশ্ন করিল কিন্তু ব্যাসকনিকফ, তাহাকে সােজা দরজা দেখাইয়া দিল। প্রভুর বিচিত্র মতিগতি বুঝিতে না পারিয়া নাটাসিয়া চলিয়া গেল। প্রাতরাশ সারা হইয়া গেল কিন্তু তাহার যেন উঠিবার শক্তি নাই। সে অৰ্ধশায়িত অবস্থায় স্তব্ধ হইয়া কী যেন ভাবিতে লাগিল। অকস্মাৎ মায়ামন্ত্রবলে সে যত সব অদ্ভুত দৃশ্য দেখিতে লাগিল। সে যেন মিশরের মরুভূমিতে কোন এক মরুদ্যানে চলিয়া গিয়াছে। সেখানে মরুযাত্রীর দল বসিয়া বিশ্রাম করিতেছে। আঙ্গুর আর খেজুর এখানে সেখানে পড়িয়া আছে। তাহারা সকলে মিলিয়া বসিয়া তাহাদের সান্ধ্যভােজন সারিয়া লইতেছে। তাহাদের ঠিক্ সম্মুখে একটি ছােট নদী কুলকুল ধ্বনি করিয়া বহিয়া যাইতেছে। আর কী স্নিগ্ধ সেখানকার বাতাস, কী শীতল সেই নদীর জল। উটগুলি পর্যন্ত নদীর দিকে চাহিয়া আছে, তাহাদের চোখের পলক পড়ে না। স্বচ্ছ নদী-তাহার তলদেশে স্বর্ণাভ বালুশয্যার উপর অসংখ্য নানাবর্ণরঞ্জিত প্রস্তরখণ্ড ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে, তীরে উপবিষ্ট এই ক্লান্ত মরুপথযাত্রীদল অনিমেষ নয়নে সেইদিকে চাহিয়া আছে। দেখিতে দেখিতে র্যাকনিকফের যেন সাধ আর মেটে না। ঢং-ঢং-ঢং•• ঘড়ির শব্দে তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। চকিতে সে ঘরের বাহিরে আসিয়া কান পাতিয়া শুনিল কোথাও কোন শব্দ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৪১ পাওয়া যায় কি না। না, কেহ নাই । বােধ হয় ছটা বাজিয়া গেল। আজকের দিনটা সে কেমন করিয়া ঘুমাইয়া কাটাইয়া দিল। আর সময় কৈ? তাহাকে যে এখনই প্রস্তুত হইতে হইবে। কিছুই যে এখনাে তাহার জোগাড় হয় নাই ! সে ক্ষিপ্র হস্তে তাহার কোটের মধ্যে একটা বড় পকেট করিয়া লইল। তাহার হাত কাঁপিতেছে। সে কোটটা পরিয়া দেখিল পকেটটা বাহির হইতে দেখা যায় কি না। যাক্, দেখা যায় না! এই পকেটে সে একটা কুড়ল লইবে-কাহার সাধ্য যে ধরিতে পারে ইহার মধ্যে সে একটা কুঁড়ল বহন করিতেছে ! ঘরের মেঝেতে একটা গর্তের মধ্য হইতে সে একটা ছােট বাণ্ডিল বাহির করিল। একটি সিগারেট কেসের মাপে একটা পাতলা কাঠের টুকরা তাহার উপর কাপড় জড়াইয়া এবং সূতা দিয়া বাধিয়া প্রায় দুর্বোধ্য করিয়া তুলিয়াছে। সূতা দিয়া এতগুলি গ্রন্থি পাকাইয়াছে যে সহজে তাহাকে খুলিবার উপায় নাই। কাঠের সঙ্গে ঐ মাপের একটা লােহার পাতও বঁধিয়াছে যাহাতে একটু ভারী হয়। অতগুলি গ্রন্থি খুলিতে এলেনার সময় লাগিবে এবং সেই সুযােগে সে কাজ সারিয়া লইবে। মোড়কটা পকেটে করিয়া বাহির হইবামাত্র, নীচে কে যেন বলিল, “ছ-টা যে অনেকক্ষণ বেজে গেছে।” সৰ্ব্বনাশ ! অনেকক্ষণ ছয়টা বাজিয়া গিয়াছে। সে দ্রুত সিড়ি দিয়া নামিতে লাগিল। বাড়ীউলীর রান্নাঘরের এককোণে একটা কুড়ল থাকে সে দেখিয়া রাখিয়াছে, এখন সেইটাকে সকলের অলক্ষ্যে হস্তগত ৪২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট করিতে হইবে। সে সব মতলব ঠিক করিয়া রাখিয়াছে কিন্তু তবু যেন সমস্ত ব্যাপারটা তাহার অসম্ভব বােধ হইতে লাগিল। ভয়ঙ্কর, এত নৃশংস সে হইবে কি প্রকারে? তাহা ছাড়া কেহ যদি দেখিয়া ফেলে? যদি নান্টাসিয়া আসিয়া পড়ে ? সে জানে নান্টাসিয়া বাড়ী নাই। এবং এক ঘণ্টা পরে যখন সে কুড়লটা যথাস্থানে রাখিয়া যাইবে তখনও নান্টাসিয়া দেখিতে পাইবে না। তবু দ্বিধায় সংশয়ে সে যেন আর অগ্রসর হইতে পারে না। সে যতই ভয় করে, যত তাহার হৃৎ-কম্পন বাড়িতে থাকে ততই যেন সে উত্তেজিত হইয়া দানবীয় শক্তি ফিরিয়া পায়। ইহা ছাড়া ছােটখাট বাধা আসিয়া তাহাকে বাধা দিবে বা সে ধরা পড়িবে-এ সম্ভাবনা সে সুচতুর আসামীর মতো নিৰ্ম্মল করিয়াছে। প্রকৃত সংশয় তাহার নীতিগত, তাহার চরিত্রগত। সেদিনও যখন সে শুধু মহড়া দিবার জন্য এলেনার বাড়ী গিয়াছিল তখনও তাহার পন্থা সম্বন্ধে সে একেবারে নিঃসংশয় হইতে পারে নাই। ইহাকে সে দুৰ্বলতা মনে করিয়া অন্ধ আবেগে নিজেকে দানব করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছে। অথচ নীতির দিক দিয়া, মানুষের ধৰ্ম্মের দিক দিয়া একবার ভাবিয়া না দেখিলে চলে না। কিন্তু নিজের বিচারবুদ্ধি এবং নীতিজ্ঞান দিয়া ভাবিয়া দেখিয়া সে তাহার কাৰ্যের অনুকূলেই রায় দিয়াছে। মাঝে মাঝে সে তাহার এই ভয়ঙ্কর মনােবৃত্তি হইতে মুক্ত হইবার চেষ্টা করিয়াছে বটে কিন্তু সে যেন জােয় পায়ে শিকল পরিয়া তাহার পর মুক্ত হইবার ছলনা মাত্র। এক দুৰ্বাৰ অদৃশ্য শক্তি তাহাকে নিয়তই সম্মুখ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৪৩ পানে ঠেলিতেছে। সমস্ত নৈতিক প্রশ্ন ত্যাগ করিয়া সে ভাবিয়া দেখিল যে, কেন আসামীগুলা ধরা পড়ে, কি সূত্র ধরিয়া পুলিশ তাহাদের অনুসরণ করে। অনেক ভাবিয়া সে ঠিক করিয়াছে আসামীরা তাহাদের নিজের দুর্বলতার জন্যই লােকের চোখে ধরা পড়িয়া যায়। শেষ মুহূর্তে তাহাদের সংকল্প, তাহাদের চিত্তবল ক্ষীণ হইয়া আসে এবং যে সময়ে তীক্ষ বিচার-বুদ্ধি এবং গভীর পর্যবেক্ষণের প্রয়ােজন সেই চরম অবস্থায় তাহারা বালকের মতাে যাহা তাহা করিয়া বসে। সে ভাবিয়া দেখিল, তাহার এমন কোন দুর্বলতা আর নাই, কেননা সে নিশ্চয় জানে যে সে যাহা করিতেছে তাই পাপ নয়-তাহাতে কোন অপরাধ নাই। সে প্রতিজ্ঞা করিল যে, কোন মতেই সে কোন মানসিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিবে না। স্থির মস্তিষ্কে, দৃঢ়চিত্তে সমস্ত বাধা সে অনায়াসে অতিক্রম করিয়া যাইবে। সিড়ি দিয়া নামিয়া সে বাড়ীউলীর রান্নাঘরে আসিয়া দেখিল নাস্তাসিয়া কাপড় শুকাইতে দিতেছে। কুড়ুলটাও সেখানে নাই। নান্টাসিয়া তাহাকে কিছু বলিবার আগেই সে চলিতে আরম্ভ করিল। অত্যন্ত বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ হইয়া সে সিড়ি দিয়া নামিতে নামিতে হঠাৎ একটা অন্ধকার ঘরের সামনে দাড়াইয়া গেল। একটুখানি ঠাহর করিয়া দেখিল জ্বালানি কাঠের স্তুপের মধ্যে কুড়লটা পড়িয়া রহিয়াছে। ক্ষিপ্র হস্তে কুড়লটাকে পকেটে পুরিয়া সে বাহির হইয়া আসিল। উঠানে নামিয়া কেহ তাহাকে লক্ষ্য করিয়াছে কিনা জানিবার জন্য সে কয়েকবার চাকরটাকে হাঁক দিল কিন্তু কোন সাড়া আসিল না। সে নিঃশব্দে পথে বাহির হইল।

৪৪
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
।
রাস্তায় চলিতে চলিতে তাহার বুকের মধ্যে কেমন করিতে
লাগিল। এলেনার বাড়ী আসিয়া সে তাহার দুর্বলতাকে জয়
করিবার জন্য সশব্দে সিড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া আসিল। কয়েকবার
করাঘাত করিবামাত্র দরজার ফাকে এলেনার মুখ দেখা যাইতেই
দরজাটা বন্ধ করিবার সুযােগ না দিয়া রাসকনিকফ, তাহার ঘরে
ঢুকিয়া পড়িল। কণ্ঠস্বর যদিও যথাসম্ভব নিস্পৃহ এবং স্বাভাবিক
রাখিবার চেষ্টা করিল তবু তাহার গলা কঁপিয়া গেল।
“গুড ইভনিং এলেনা। আমি সেই জিনিসটা এনেছি—তােমার
কাছে বাধা রাখবে বলে।”
“কে তুমি হে ছোকরা?” তাহাকে এইরূপে ঘরের মধ্যে
প্রবেশ করিতে দেখিয়া এলেনার ঠিক ভাল লাগে নাই।
“মাপ করবেন। আমি র্যাকনিকফ,--এই যে সেই সিগারেট
কেস।”
সেই মােড়কটা লইয়া এলেনা কয়েক মুহূর্ত পরীক্ষা করিয়া
রাসকনিকফের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। তাহার চোখে
এইরূপে চোখ রাখিয়া তাকাইতে দেখিয়া র্যাস,কনিকফের মনে
হইল যেন তাহাকে ছুটিয়া পলাইতে হইবে। সে কুদ্ধ স্বরে কহিল,
“আপনি আমার দিকে কি দেখছেন ? আপনি যদি এটা না নেন,
তাহলে আমি অন্য জায়গায় চেষ্টা করি। আমার অত সময় নেই।”
শেষের কথাটা তাহার বলিবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু মুখ দিয়া
বাহির হইয়া গেল। তাহার কথা শুনিয়া এলেনা বুড়ীর অনেকটা
সংশয় কাটিয়া গেল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
৪৫
“তা বাপু অমন অধীর হ’চ্ছ কেন? তােমার মুখ ফ্যাকাশে,
হাত কাঁপছে, কি হয়েছে বাছা?”
“জ্বর। তুমিও যদি খেতে না পেতে তাহলে তােমাকেও
ফ্যাকাশে দেখাতাে।” কথা বলিতে বলিতে র্যাকনিকফের যেন
সৰ্ব্বাঙ্গ অবশ হইয়া আসিল। বুড়ীটা হাতে করিয়া সেই মােড়কটার
ওজনটা ঠিক রূপার কেসের অনুরূপ কি না পরীক্ষা করিতে
লাগিল।
সে বলিল, “ওটা সিগারেট কেস, এবং রূপাের। ভালাে
করে দেখ।”
“কি করে বেঁধেছ! একি খােলা যায় সহজে ?”
আলাের নিকটে গিয়া এলেনা মােড়কটা খুলিতে লাগিল।
তাহার পিছনে দাড়াইয়া র্যাকনিকফ, গায়ের কোটটা খুলিয়া
ফেলিয়া পকেটের মধ্য হইতে বাহির করিল বটে কিন্তু
জামার নীচে চাপিয়া ধরিল। সে নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল বােধ
করিতে লাগিল। প্রতি মুহূর্তে তাহার সঞ্চিত শক্তি হারাইয়া
যাইতেছে। ডান হাতের যে দৃঢ় মুষ্টিতে সে কুড়ুলটা ধরিয়াছিল তাহা :
যেন এখনই শিথিল হইয়া যাইবে। তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল।
মােড়কটা খুলিয়া ফেলিয়া এলেন ভীষণ ক্রুদ্ধ হইল। সে
রাসকনিকফের দিকে ফিরিয়া কহিল, “এ কী এনেছ ? চালাকী ?”
আর এক মুহূর্তও দেরী নয় ! সে কুড়ুলটা বাহির করিয়া দুই
হাতে তুলিয়া ধরিয়া যন্ত্রচালিতের মত এলেনার মাথায় বসাইয়া দিল।
কুড়ুলটা তুলির সময় সে প্রায় মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল কিন্তু
আঘাত করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার শক্তি ফিরিয়া আসিল।
কুড়ুলট।

৪৬ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট কুড়লটা ঠিক এলেনার মাথার মাঝখানে পড়িয়াছিল। স্বভাবতঃ সে টুপী পরে না, সেদিন ও পরে নাই। তাহার উন্মুক্ত মস্তকের উপর কুঠারটি পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণ রক্ত ছিটকাইয়া বাহির হইল। একটা অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া এলেনা একটা মাংস-পিণ্ডের মতাে সশকে মাটিতে পড়িয়া গেল। নিমেষে ঘরময় রক্তস্রোত বহিরা গেল এবং সেই রক্ত-প্রবাহের উপর এলেনার বিপুল দেহটা কয়েকবার নড়িয়া চিরতরে নিস্পন্দ হইয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রাসকনিকফ, পিছাইয়া অসিল-মৃতদেহের দিকে তাকাইয়া সে শিহরিয়া উঠিল। বৃদ্ধা এলেনার চক্ষু দুইটা ঠেলিয়া বাহির হইতেছে-চোখে মুখে মৃত্যু যন্ত্রণার শেষ চিহ্ন তখনাে মিলাইয়া যায় নাই। কুড়লটা রাখিয়া র্যাস, কনিকফ, অতি সাবধানে এলেনার ডান দিককার পকেট হইতে চাবির গােছ। বাহির করিল এবং পাশের ঘরে গিয়া একটা লম্বা চাবি লইয়া দেরাজের টানাটা খুলিবার চেষ্টা করিল। সেদিন আসিয়া সে এইসব দেখিয়া গিয়াছিল এবং সমস্তই তাহার মুখস্থ আছে। সে অতি সাবধানে চলাফেরা করিতে লাগিল যাহাতে তাহার গায়ে কোথাও রক্ত না লাগে। দেরাজের টানাটা খুলিবার সময় তাহার একবার মনে হইল সে সব ফেলিয়া ছুটিয়া পলাইয়া আসে কিন্তু পরক্ষণেই নিজের দুর্বলতায় সে নিজেকেই বিজপ করিয়া স্থির মস্তিষ্কে তাহার কাজ করিতে লাগিল। হঠাৎ তাহার মনে হইল বুড়ীটা হয়তো ধচিয়া আছে। কিন্তু ৪৭ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট এ ঘরে আসিয়া সে আবার কুড়লটা তুলিয়া দেখিল আঘাতের আর প্রয়ােজন নাই। গলার সঙ্গে সূতা দিয়া বাধিয়া এলেনা টাকার থলিটা বুকের মধ্যে পুরিয়া রাখিত। সেইটা খুলিতে গিয়া তাহার দুই হাত রক্তাক্ত হইয়া গেল তবু সে মৃত দেহের উপর আর অস্ত্রাঘাত করিল না। কিছু না দেখিয়া সেগুলা পকেটে পুরিয়া সে কুড়লটা হাতে তুলিয়া লইল এবং দৃঢ় পদক্ষেপে এলেনার শােবার ঘরে গিয়া দেরাজের টানাটায় চাবি লাগাইয়া খুলিতে চেষ্টা করিল। অনেকক্ষণ চেষ্টা করিবার পর মনে হইল যে ঐ লম্বা চাবিটা টানার চাবি নৃহে উহা কোন ক্যাশবাক্সের চাবি এবং টানার চাবি বাকী কয়টার মধ্যে একটা। দেরাজের টানা লইয়া আর সময় নষ্ট না করিয়া সে বিছানাটা তুলিয়া একটা বড় তেরঙ্গ বাহির করিল। চাবি দিয়া তাহার ডালাটা খুলিয়া দেখিল একটা পশুর ললাম, কয়েকটা সিল্কের পােশক এবং একটা শাল, ইহা ছাড়া কতকগুলাে ছেড়া কাপড়। পােশাকগুলাে নাড়া দিতেই একটা বহুমূল্য সােনার ঘড়ি মাটিতে পড়িল এবং ছেড়া কাপড়গুলির মধ্যে অসংখ্য ছােট ছােট সােনার গহনা, তাহাদের অধিকাংশই বহুমূল্য প্রস্তর খচিত এবং প্যাকেট করিয়া রাখা হইয়াছে। র্যাকনিকফ, যাহা পারিল তাহাই কোট এবং পাতলুনের পকেটে ভর্তি করিতে লাগিল। এমন সময় কাহার পদশৰ ? কে ক্ষীণ আর্তনাদ করিল ? কাহার চাপা কান্না?, সে কুড়ুলটাকে দুই হাতে বজ্র-মুষ্টিতে ধরিয়া পাশের ঘরে আসিয়া দাড়াইল। এ কি! এ যে এলিজাবেথ !

৪৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ঘরের মাঝখানে এলিজাবেথ দাড়াইয়া, তাহার মুখ কাগজের মত শাদা। মৃতা ভগ্নীর দেহপিণ্ডের দিকে তাকাইয়া সে স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল। হঠাৎ তাহার সানে আততায়ীকে দেখিয়া তাহার শ্বাসরুদ্ধ হইয়া গেল। র্যানিকফ, তাহার দিকে অগ্রসর হইতেই সে পিছু হটিয়া ঘরের কোণে ‘গয়া কোন রকমে রক্ষা পাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করি। আসন্ন মৃত্যুর সম্মুখীন হইয়া সে চীৎকার করিয়া কাহারও সাহায্য প্রার্থনা করিবে এ শক্তিটুকুও হারাইয়া ফেলিল। নির্বাক, নিস্পল সে শুধু নীরবে যেন তাহার প্রাণ ভিক্ষা করিতে লাগিল। তাহার মুখের করুণ মিনতি লক্ষ্য করিবার সময় তাহার আততায়ীর নাই। কুঠারাঘাতে তাহার মাথার উপরিভাগ দ্বিধাবিভক্ত হইল। নিমেষে এলিজাবেথের দেহ ভূলুণ্ঠিত করিয়া র্যাকনিকফ, ছুটিয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল। দ্বিতীয়বার খুন করিবার পর সে ভীত হইল। করিবার পর সে ভীত হইল। একটি নিরপরাধিণী রমণীকে সে অকারণে হত্যা করিল। এ হত্যার পিছনে কোন আদর্শ নাই, শুধু তাহার প্রয়ােজন। সে যদি জানিত যে তাহাকে এমনি করিয়া পাপের পর পাপ করিতে হইবে, অসংখ্য বাধার সম্মুখীন হইতে হইবে, সে যদি জানিত যে কত নৃশংস, কত দানবীয় হত্যালীলা তাহাকে করিতে হইতেছে, তাহা হইলে হয়তো সে ছুটিয়া গিয়া পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করিত। কিন্তু এত চিন্তা করিবার শক্তি তাহার ছিল না। ভীত হইয়া সে শুধু একবার পলাইবার চেষ্টা করিল এবং পরক্ষণেই সে অন্য কার্যে লিপ্ত হই। যেন কিছুই তাহার ভাবিবার, ভয় করিবার নাই। এলেনার রান্নাঘরের দিকে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৪১ চোখ পড়িতেই সে দেখিতে পাইল একটা গায় জল রহিয়াছে। সে তাহাতে রক্তসিক্ত কুড়ুলটি খুব ভালাে করিয়া ধুইয়া লইল। জুতায় যে কয়েকফোটা রক্ত পড়িয়াছিল নিবিষ্ট চিত্তে ধুইয়া তাহা নিশ্চিহ্ন করিল। তাহার পর সে নিজের কোট এবং পাতলুন পরীক্ষা করিল। কোথাও কোন চিহ্ন নাই। তারপর ? এইবার সে কী করিবে? অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে কী করিবে তাহা ভাবিয়া পাইল না। হঠাৎ তাহার মনে পড়িল তাহাকে বাড়ী যাইতে হইবে। কিন্তু এ ঘরে আসিয়া সে বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া গেল। এ কী! ঘরের দরজা খােলা ? এলিজাবেথ তাে দরজা খােলা বলিয়াই ঢুকিতে পারিয়াছিল,-তবে তখন তাহার একথা মনে হয় নাই কেন ? সে দরজাটায় খিল আঁটিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কিৎক্ষণ পরে তাহার মনে হইল নীচে যেন কাহারা ঝগড়া করিতেছে। তারপর আবার সব নিস্তব্ধ বলিয়া মনে হইল। কিন্তু পণণেই তাহার মনে হইল কে যেন উপরে উঠিয়া আসিতেছে। ক্রমে লােকটি পাঁচতলার সিড়ি ধরিল। তাহার পদশব্দ যত নিকটে মনে হয় ব্ল্যাকনিকফ, ততই হাতের কুড়লটা চাপিয়া ধরে। অবশেষে লােকটা আসিয়া দরজার ঘণ্টা বাজাইতে লাগিল। র্যাকনিকফ, প্রস্তুত হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, লােকটা ঘরে ঢুকলেই সে কুড়ুলটা মাথায় বসাইয়া দিবে। এদিকে দরজা বন্ধ দেখিয়া লােকটা প্রাণপণে ঘন্টাটা বাজাইতে লাগিল। এমন সময় আর একটা লােক উপরে উঠিয়া আসি! ..তাহারা দরজায় অনেক করাঘাত করিয়া অনেক ডাকাডাকি করিয়া অবশেষে স্থির করিল, এলেনা এবং তাহার বােন ৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট নিশ্চয়ই বাড়ীতে নাই। কিন্তু তখন প্রশ্ন উঠিল, যদি তাহার বাড়ীতেই না থাকে তবে ঘরের দরজা ভিতর হইতে বন্ধ থাকিবে কেন ? তখন একজন বলিল, হয়তাে তাহার ঘরের মধ্যে অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছে কিংবাভাবিতেই তাহাদের বুকের রক্ত শুকাইয়া গেল। তখন দুইজনে পরামর্শ করিয়া একজন নীচে নামিয়া চাকরটাকে ডাকিতে গেল আর একজন দরজার কড়া ধরিয়া দাড়াইয়া রহিল। যে লােকটা দাড়াইয়া রহিল সে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিয়া বিরক্ত হইয়া উঠিতেছে কিন্তু যে নীচে গিয়াছে তাহার আম কোন সাড়া নাই। এদিকে র্যানিকফ, যেন সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলে। একবার মনে হয় সে দরজা খুলিয়া লােকটার মাথাটা ঘাড় হইতে নীচে ফেলিয়া দেয়, আবার মনে হয় তাহারা ঘরে ঢুকিলেই তাহার অধিক সুবিধা। তাহার মনে হইল তাহার যেন প্রবল জ্বর আসিয়াছে কী করিতেছে, কী বলিতেছে কিছুরই ঠিক নাই। যে লােকটা নীচে গিয়াছিল সে আর ফিরিয়া আসে না দেখিয়া এ লােকটাও নীচে নামিয়া গেল—যা বাঁচা গেল ! ব্যাসকনিকফ, দরজা খুলিয়া ধীরে ধীরে বারান্দায় দাড়াইয়া কান পাতিয়া রহিল। , কেহ কোথাও নাই। সে নিঃশকে নীচে নামিতে লাগিল। কয়েক ধাপ মাত্র নামিয়াছে এমন সময় কতকগুলি লােক উপরে ওঠার শব্দ পাওয়া গেল। সৰ্ব্বনাশ! কী করিবে সে? কোথায় লুকাইবে ? তাহারা যখন ঠিক তাহার নীচে তলায়, তখন র্যাকনিকফ, সিড়ির ডান দিকে একটা অন্ধকার খালি ঘর e ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট দেখিতে পাইয়া সেই ঘরটার মধ্যে ঢুকিয়া দরজার আড়ালে লুকাইয়া রহিল। লােকগুলি আলাে হাতে করিয়া নানা প্রকার জল্পনা করিতে করিতে উপরে উঠিয়া গেল। কেহই আততায়ীকে লক্ষ্য করিতে পারিল না। উদ্ধশ্বাসে নীচে নামিয় যখন সে রাস্তায় আসিয়া দাড়াইল তখন তাহার মনে হইল এতক্ষণে লােকগুলি দরজা ভাঙ্গিয়া সেই বীভৎস মাংসপিণ্ড দেখিয়া চীৎকার করিতেছে, হয়তাে ছুটাছুটি করিয়া কেহ কেহ আততায়ীর সন্ধান করিতেছে। তাহারা নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিয়াছে যে, যে সময়টুকু তাহারা সিড়ি দিয়া উঠিতেছিল সেই সময়টুকুর মধ্যে আসামী অন্তর্ধান করিয়াছে। যদি কেহ তাহাকে বাড়ীর বাহির হইতে দেখিয়া থাকে? ভাবিতেই তাহার হৃৎপিণ্ড শুরু ইয়া গেল। সে একটা গলির মধ্যে ঢুকিয়া ভিড়ের মধ্যে মিশিয়া গেল বটে কিন্তু কেহ যদি তাহাকে লক্ষ্য করিত তাহা হইলে দেখিতে পাইত যে একটা মৃতদেহ যেন কোন্ মন্ত্র বলে হুঁটিয়া বেড়াইতেছে। তাহার স্থির নিশ্চল দৃষ্টি, রক্তহীন মৃত্যুর মুখ দেখিলে যেন আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিতে হয় । অনেকটা পথ ঘুরিয়া সে বাড়ী ফিরিল। কেহ কোথাও নাই। কুঠারটা যথাস্থানে রাখিয়া সে নিজের ঘরে চলিয়া গেল। কোচের উপর চিৎ হইয়া শয়ন করিল বটে কিন্তু ঘুম আসিল না। কত কথা তাহার মনে পড়িল কিন্তু কোনটাই যেন ঠিক ভাবিতে পারিল না।

৪ গভীর রাত্রি পর্যন্ত সেই একই অবস্থায় কৌচের উপর পড়িয়া থাকিতে থাকিতে রাসূলনিকফ, যেন জাগিয়া উঠিল। সে ঘুমায় নাই, তাহার আধাে-জাগ্রত অবস্থা হইতে সে নিজেকে যেন ছিনাইয়া আনিল। ভালো করিয়া চোখ মেলিয়া দেখিল ঘরের দরজা খােলা রহিয়াছে এবং সে জুতা জামা পরিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। আজিকার সন্ধ্যার ঘটনাগুলি সে স্মরণ করিবার চেষ্টা করিতেই তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল, এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস আসিয়া তাহাকে কঁপাইয়া দিল। জানালার ধারে গিয়া দাড়াইতেই প্রত্যুষের ক্ষীণ দিবালােক তাহার মুখের উপর আসিয়া পড়িল। কিন্তু সর্বপ্রথম কী মনে করিয়া সে নিজের জামা পাতলুন এবং জুতা ভালাে করিয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। তাহার কোটে, জুতায় এবং পাত লুনের কয়েক ফোটা স্পষ্ট রক্তের দাগ তথনাে মিলাইয়া যায় নাই। তাড়াতাড়ি পােশাক বদলাইয়া পাত লুনের পায়ের কাছে যেখানটা সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক রক্তাক্ত বলিয়া বােধ হইল সেখানটা কাচি দিয়া কাটিয়া ফেলিল। রক্তের দাগ কতকটা নিশ্চিহ্ন হইল বটে কিন্তু পরক্ষণেই তাহার মনে পড়িল যে এলেনার বাস এবং থলি হইতে যে সব গহনা এবং মণি মুক্তা সে লইয়াছে সেগুলাে ঠিক সেই অবস্থায় তাহার কোটের পকেটে অবস্থান করিতেছে। এক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া দেওয়ালের যে সমস্ত গর্তগুলি ক্রাইম এও পানিশমেন্ট কাগজ অটিয়া ঢাকা দেওয়া ছিল তাহারই একটায় সমস্ত অপহৃত সম্পত্তি লুকাইয়া রাখিয়া সে পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল। একবার মনে হইল, ওভাবে লুকাইয়া রাখাটা নিরাপদ নয়, যেকোন মুহূর্তে সবগুলি বাহির হইয়া পড়িতে পারে, একটা নিরাপদ গােপন স্থান তাহাকে যেমন বিয়া হউক বাহির করিতে হইবে। কিন্তু সৰ্বাঙ্গ অবশ হইয়া আসিল। কোচের উপর বসিতেই মূর্হাগ্রস্তের মতো সে তন্দ্রাভিভূত হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে তাহার তন্দ্রা ছুটিয়া গেল। কি যেন সে ভুলিয়া গিয়াছে, কোথায় যেন সে ভুল করিয়া নিজের জঞ্চ মস্ত একটা ফাঁদ পাতিয়া রাখিয়াছে অথচ তাহা যে ঠিক কি --হাও সে স্মরণ করিতে পারিল না। ঘরের দিকে ভালাে করিয়া দেখিল, কিন্তু কোথও ত কিছু নাই! হঠাৎ সেই পাত লুন এবং কোটের ছেড়া টুকরাগুলির প্রতি তাহার চোখ পড়িল। সেই রক্তমাখা বস্ত্রখণ্ডগুলি ঘরময় ছড়ানাে রহিয়াছে। যদি কেই অসিত?-মনে করিতেই সে শিহরিয়া উঠিল। তাহার মনে হইল তার কোট, পায়জামা, কেচি, সব কিছু রক্তে ভিজিয়া গিয়াছে, লুকদার, রক্ষা পাইবার কোন উপায় নাই। নাঃ, এ সে কি নিতেছে ? তবে ঐ থলিটায় নিশ্চয় রক্ত লাগিয়া আছে। সে খলিটার ধারগুলাে কাটিয়া ফেলিল। আশ্চৰ্য্য, এগুলো ফেলিয়া দিতে হবে এখনই, অথচ সে উঠিতে পারে না কেন? শরীর মনের সমস্ত শক্তি একত্র করিয়া সে কাটা জামা, পাতলুন এবং থলির টুকরাগুলি কুড়াইয়া লইল। কিন্তু জানলা দিয়া সেগুলা ফেলিয়া দিবার পূর্বেই গভীর

৫৪
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
নিদ্রা আসিয়া তাহার সমস্ত চৈতন্য আচ্ছন্ন করিয়া দিল। কেবল
হাতের মুঠার মধ্যে নারী-রক্তপাতের নিদারুণ চিহ্নগুলি ধরা
রহিল।
সজোরে কড়া নাড়ার শব্দে তাহার যখন ঘুম ভাঙ্গিল তখন বেলা
এগারােটা। নাস্টাসিয়া খবর দিল যে পুলিশ-অফিস হইতে তাহার
জন্য ডাক আসিয়াছে।
“পুলিশ। পুলিশ কেন?”
“জানিনে বাপু। তা বলে যেন এখনই উঠো না, তােমার
শরীর খারাপ। আমি কিছু এনে দিই—খেয়ে তবে যেও
হয়। ওকি হাতে অত ছেড়া কাপড় কেন ? . তােমার কী
হল?” বলিয়া নাসটাসিয়া হাসিতে লগিল। তাহার হাসি
দেখিয়া র্যাসকনিকফ,
জ্বলিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি কোটির
পকেটে হাতের মুঠাটা ঢুকাইয়া বলিল, “তুই যা। আমার জন্যে
আর কিছু আনতে হবে না। আমি এখনই বেরুবাে।”
নাসটাসিয়া চলিয়া যাইতেই সে ছুটিয়া জানালার ধারে আলােতে
গিয়া জুতাটা পরীক্ষা করিতে লাগিল। কয়েক ফোটা রক্ত তখনো
জুতার উপর দেখা যাইতেছে, তবে কাদা-মাখা বলিয়া ঠিক নজরে
পড়ে না। কঁপিতে কঁপিতে সে পুলিশের নােটিশটা পড়িল।
কিছুই বুঝিবার জো নাই। কিন্তু আজই কেন ? পরক্ষণেই তাহার
মনে হইল, এই ভালো, যত শত্ৰ ইহার শেষ হয় ততই ভালাে।
সাহস করিয়া জুতাটা পায়ে দিয়া উঠিয়া দাড়াইতেই তাহার হাত
পা কঁপিতে লাগিল। সে মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে কিন্তু ভীষণ

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
আতঙ্কে তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল, তাহার রগ, দুইটা প্রবলভাবে
দপ দপ, করিতে লাগিল।
সিড়ি দিয়া নামিতে নামিতে সেই কাগজে ঢাকা লুষ্ঠিত
রত্নরাজির কথা একবার মনে হইল। রাস্তায় অহ গরমে অসংখ্য
মদ্যপের মধ্য দিয়া চলিতে চলিতে তাহার মাথা টলিতেছে। প্রবল
জ্বরে প্রায় জ্ঞানশূন্য অবস্থায় সে স্থির করিল যে পুলিশের নিকট
নতজানু হইয়া সে সব কিছু স্বীকার করিবে, এ অবস্থায় সে
কিছুতেই বাঁচিয়া থাকিবে না।
পুলিশের অফিসে গিয়া সে দেখিল কেহই তাহাকে লক্ষ্য
করে না। সমস্ত অফিস বাড়ীটাকে একটা বদ্ধ বাতাস ভারী করিয়া
রাখিয়াছে। অনেকটা ভিতরে গিয়া সে কেরাণীর ঘরে একটা
বেঞ্চিতে বসিয়া পড়িল। কেরাণীটি একটি বারবণিতাকে জেরা
করিতেছিল। তাহার দিকে চোখ পড়তেই রুক্ষস্বরে জিজ্ঞাসা
করিল, “তুমি এখানে কেন হে ছােরা?” তাহার ছেড়া জামা
কাপড়ই কেরাণীর রুক্ষতার কারণ।
রাসকনিকফ, দৃঢ়কণ্ঠে জানাইল যে তাহাকে ডাকা হইয়াছে
বলিয়াই সে আসিয়াছে। এমন সময় বড় বাবু বলিলেন, “ওঃ সেই
টাকার ব্যাপারটা।”
টাকা? কিসের টাকা? যাক, তা হলে সে জন্য ডাক
পড়ে নি ! রাসকনিকফ, প্রায় আনন্দে আত্মহারা হইয়া পড়িল।
একটা বিরাট বােঝা তাহার ঘাড় হইতে নামিয়া গেল।
কেরাণীটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কখন শমন পেয়েছে।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
হে ছোকরা? তােমায় বলা হয়েছে নটায় আসতে আর এখন
বারােটা।”
“কিন্তু আমি পেয়েছি এগারােটায় এবং এটুকু বললেই বােধ হয়
যথেষ্ট হবে যে আমি জ্বরে ভুগছি।” কেরাণীর কথায় সে রাগিয়া
উঠিয়াছে
“চীৎকার করাে না, এটা মাননীয় আদালত।”
“চীৎকার আমি করিনি। চীৎকার করছে। তুমি এবং অভদ্রের
মত সিগারেট খাচ্ছে।” এইভাবে ঝগড়া করিতে পাইয়া সে যেন
খুশী হইল।
“সেটা তােমার দেখবার দরকার নেই। তুমি হণ্ড নােট
কেটেছিলে তার জন্য তােমার বিরুদ্ধে চার্জ আছে। তােমাকে
আইন অনুযায়ী লিখে দিতে হবে যে তুমি তােমার জিনিসপত্র বিক্রী
করে টাকাটা শােধ দেবে, আর শোধ না দেওয়া পর্যন্ত শহর
ছেড়ে কোথাও যাবে না।” বলিয়া কেরাণীটি তাহাকে একখানা
কাগজ দেখাইল। তাহার হাত হইতে কাগজটা প্রায় কাড়িয়া
লইয়া ব্লাসকনিকফ, ব্যাপারটা বুঝিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।
“কি, এখনি শোধ দেবে—না সময় নেবে ?” কেরাণী প্রশ্ন
করিল।
কিন্তু আমি কোন টাকা ধার করিনি।”
“সে আমরা জানিনে ! জারনিৎসান-এর বৌ তােমায় দেড়শ’
রাব-এর দায়ে ফেলেছে, এই পৰ্যন্ত।”
“সে ত আমার বাড়ীউলী।”
ALL

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
বড়বাবুটি কতকটা অনুকম্পাভবের এবং কতকটা বিপদগ্রস্ত
অসহায় ঋণভার জর্জরিত ব্যক্তিদের প্রতি তাহার স্বাভাবিক
কৌতূহল থাকার জন্য কৌতুকে তাহার দিকে চাহিয়াছিলেন।
কিন্তু হাওনোটের জন্য রাস কনিকফের কিই বা যায় আসে ?
বাড়ীউলীকে ভয় করিবার তাহার কী আছে? এই সামান্য
ব্যাপারটার প্রতি মনোযোগ দিবার মত তাহার সমর কৈ ?
সেইখানে দাড়াইয়া সে কাগজটা পড়িল, নানা প্রকার প্রশ্ন করিল,
তর্ক করিল কিন্তু এ সমস্তই যেন করিতে হয় বলিয়াই সে করিল।
তাহার সর্বদেহে যেন একটা আনন্দের হিল্লোল বহিয়া যাইতে
লাগিল। যেন সুদুঃসহ নিৰ্যাতনের হাত হইতে এই মাত্র রক্ষা
পাইয়াছে তাহা যেন এখন বহু ক্রোশ পিছাইয়া পড়িয়াছে।
এই মুহূর্তে ভবিষ্যতের সর্বপ্রকার বিভীষিকা, অপরিসীম
অন্তর্বাহ হইতে মুক্তি পাইয়া সে পরম স্বস্তি বোধ করিল।
কেরাণীটি পুনরায় সেই বারবণিতাটিকে জেরা শুরু করিল
এবং সমাজের কল্যাণের জন্য যে এই পুলিশ কৰ্ম্মচারীটি
উদ্যোগের অন্ত নাই এই কথাটা তাহার জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে
উপস্থিত সকলেরই বুঝিতে বিলম্ব হইল না। অনেকক্ষণ
জেরা যখন শেষ হইয়া আসিয়াছে তখন ম্যাজিষ্ট্রেট আসিয়া
এত , কোলাহলের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। কেরাণীটি
কিছুমাত্র দ্বিধা না করিয়া বারবণিতাটিকে সম্পূর্ণ অবহেলা
করিয়া রাসকনিকফকে দেখাইয়া বলিল, “এই যে হুজুর,
এই লােকটি বলছে যে
এ একজন ছাত্র ছিল। এ দেনা
পরে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
করে, কিন্তু শোধ দেয় না। প্রায়ই নানারকম অভিযােগ
অাসে এর বিরুদ্ধে। অথচ আমি একটা সিগারেট খেয়েছি
বলে মেজাজ দেখায়। দেখুন দিকি হুজুর, এই লােকটার
আবার মেজাজ।”
ম্যাজিষ্ট্রেট থমিশ, বলিলেন, “দারিদ্র তাে আর পাপ নয়।”
ম্যাজিষ্ট্রেটের মুখে কথাটা শুনিকমাত্র ব্যাস কলনিকফ, তাহার
দেনার দীর্ঘ ইতিহাস বলিয়া চলিল ।
চলিল । সুযােগ বুঝিয়া সে
একথাও বলিয়া লইল যে যখন তাহার ভাড়া দিবার মত
অস্থা ছিল তখনও তাহার বাড়ীউলী তাহার সহিত তাঁহার
বন্যার বিবাহ দিবার আশায় ভাড়া লইতে সম্মত হন নাই।
এখন সে মেয়েটি মারা গিয়াছে এবং তাহার অবস্থা খারাপ
হইয়াছে বলিয়া আজ তিনি এই ভাড়ার টাকাটা এমনভাবে
দাণী করিতেছেন। অনেকখানি ধৈৰ্য্য ধরিয়া,থমিশ, তাহার
কথা শুনিলেন এবং অবশেষে তাহাকে দিয়া কেরাণীটি
ওয়োনীয় কয়েকটি স্বীকারােক্তি লিখাইয়া লইল। এইরূপে
ব্যাপারটা অতি সহজে মিটিয়া গেল।
নির্দোষ নিরপরাধ এবং
অসহায় একটি
ছাত্রের মত
কয়েকটা স্বীকারােক্তি লিখিয়া দিয়া যখন সে আইনের হাত
হইতে অনায়াসে নিজেকে বাঁচাইতে পারিল তখন সমস্ত মন যেন
বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে। সই করিয়া কলমটা ফেলিয়া সে উঠিয়া
দাড়াইবার চেষ্টা করিল কিন্তু পরক্ষণেই মাথাটা দুই হাতে চাপিয়া
ধরিয়া টেবিলের উপর ঝুকিয়া পড়িল। সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করিয়া

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
সে স্থির করিল যে থমিশের কাছে গিয়া সে সব স্বীকার করিবে এবং
তাহার বাসায় তাহাকে লইয়া গিয়া সমস্ত অপহৃত মণি-মুক্তা তাহার
হস্তে সমর্পণ করিবে। একবার কে যেন তাহাকে বলিয়া দিল,
এখনও ভাবিয়া দেখ ? কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া দুৰ্ব্বার
বেগে সে উঠিয়া দাড়াইল। সে সমস্ত স্বীকার করিবে ! থমিশের
টেবিলের দিকে অগ্রসর হইতেই সে স্তব্ধ হইয়া গেল -কে যেন
তাহাকে অতর্কিতে গুলি করিল। থমিশ, কেরাণীটীর সহিত কী একটা
বিষয় আলােচনা করিতেছে। র্যাকনিকফ শ্বাস রুদ্ধ করিয়া
তাহাই শুনিতে লাগিল।
“না, না, ওদের ছেড়ে দিতেই হবে। ব্যাপারটা বুঝে
দেখুন। আসামী যদি ওরাই তাহলে ওরা কেন আবার নীচে
এসে চাকরকে ডাকতে এলাে। আর তা ছাড়া চাকরটা ত
বল যে, প্যাটােক বলে কে একজন ছাত্রকে আর তিনজন
বন্ধুকে সে ঠিক ঐ সময় বাড়ীর দরজার কাছে দেখেছে।”
“কিন্তু দেখুন কত রকম প্রশ্ন উঠতে পারে। ওরা বলছে।
যে এলেনার দরজায় যখন প্রথমে তারা কড়া নেড়েছিল তখন
ভেতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল অথচ যখন ওরা চাকরটাকে
সঙ্গে করে ওপরে এলো তখন দেখলে দরজা খোলা রয়েছে।
আশ্চৰ্য।”
“কেন ? ঠিকই তো হয়েছে। আসামী তো ভেতরেই ছিল এবং
নিশ্চয় সে বেটা ধরা পড়তো যদি ও লােকটা বােকার মত নীচে
নেমে না আসতাে।
ঐ
ফুসতে
আসল আসামী পালিয়ে গেছে।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“আসামীটাকে কি কেউ দেতে পায় নি ?”
“দেখবে কেমন করে! বাড়ীটা যে একেবারে সেকালের
নােয়ার ধ্বজা।”
থমিশ, আবার জোর দিয়া বলিলেন, “ওহে ব্যাপারটাতে।
পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে।”
“আজ্ঞে না, ঠিক পরিস্কার হচ্ছে না।” কেরাণীটি তাহার
মাথা ঘামাইবেই।
র্যালনকফ, টুপীটা মাথায় দিয়া দরজার দিকে ফিরিল
কিন্তু দরজা অবধি তাহার পোঁছাইবার শক্তি রহিল না'। যখন
তাহার জ্ঞান হইল তখন সে সবিস্ময় চাহিয়া
দেখিল যে সে
একটা আরাম কেদারা: বসিয়া আছে। তাহার পাশে একজন
অপরিচিত ভদ্রলােক একটা গ্লাসে হলদে রঙের পানীয় লইয়া
দাড়াইয়া এবং ঠিক তাহার সম্মুখে থমিশ, দাড়াইয়া আছেন।
তাহার দৃষ্টি তাহারই মুখের উপর দৃঢ়-সম্বন্ধ।
“তোমার কবে থেকে অসুখ করেছিল ?” কেরাণীটি প্রশ্ন
করিলেন।
“কাল থেকে।”
“কাল তুমি বাড়ীর বাইরে গিয়েছিলে?”
“হঁ্যা।”
“ঐ অসুস্থ শরীরে?”
-আজ্ঞে হ্যা।”
“কখন বেরিয়েছিলে?”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“রাত্রি আটটা নাগাদ।”
“কোথায় জানতে পারি কি?”
“এমনি, এখানে সেখানে।”
“হু, পরিষ্কার হলাে।” কেরাণীর স্বগতােক্তি হইল।
রাস্লনিকফ, খুব স্পষ্টভাবে জবাব দিলেও তাহার গলা
ভাঙিয়া গিয়াছে, তাহার মুখ একেবারে শাদা। তাহার
কোটরগত চক্ষুর উপর কেরাণীটির ভীষণ দৃষ্টি হইতে নিজেকে
রক্ষা করিতে গিয়া হঠাৎ তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল। দাড়াইবার
মত শক্তিটুকুও তাহার লােপ পাইয়াছে।
সকলেই চুপ চাপ। থমিশ, কি যেন বলিতে যাইতেছিলেন
কিন্তু তিনিও চুপ করিয়া গেলেন। এই বিসদৃশ স্তব্ধতা
রাস্কনিকেফের নিকট অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হইয়া উঠিল, সে
দ্রুত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। সে বাহির হইবার সঙ্গে
সঙ্গেই পুলিশ অফিসে তুমুল তর্ক বিতর্ক শুরু হইল তাহার
খানিকটা ব্যাসকনিকফ, শুনিতে পাইল।
রাস্তায় চলিতে চলিতে তাহার সম্বিৎ ফিরিয়া আসিল।
পুলিশের লােকগুলা এইবার খানাতল্লাসী শুরু করিবে। শয়তানগুলা
তাহাকেই সন্দেহ করে। কথাটা মনে পড়িতেই সেই পুরাতন
ভয়টা আবার তাহাকে ঝাপাইয়া দিল।

ঘরে ফিরিয়া আসিয়াও সে স্বস্তি পাইল না। একি ।
এলেন বুড়ীর বাড়ী হইতে যে অলঙ্কারগুলি সে চুরি করিয়া
আনিয়াছে সেগুলি যে এখনাে এই ঘরেই রহিয়াছে। দেয়ালের
গর্তের মধ্যে হাত ঢুকাইয়া সে অপহৃত দ্রব্যগুলি বাহির করিল।
সবসুদ্ধ আটটী গহনার বাক্স -পাতলুন ও বুকের পকেটে সেগুলি
ভর্তি করিয়া র্যাকনিকফ, ঘরের বাহির হইয়া দ্রুতপদে নীচে
নামিয়া আসিল। পথে নামিয়া তাহার কেবলই মনে হইতে
লাগিল, কে যেন তাহাকে অনুসরণ করিতেছে। আর
আর কয়েক
মিনিটের মধ্যেই হয়তো তাহাকে গ্রেফতার
করিবার জন্য
পরােয়ানা বাহির হইবে। এই মুহুর্তেই তাহার অপরাধের,
তাহার চৌর্যের সমস্ত চিহ্ন তাহাকে নিঃশেষে বিলুপ্ত করিয়া দিতে
হইবে। উৰ্দ্ধশ্বাসে সে নেভা নদীর নির্জন তীরে আসিয়া
. উপস্থিত হইল। কিন্তু বাক্স গুলি যদি জলে ভাসিয়া উঠে ! নাঃ,
নদীর জলে ফেলিলে চলিবে না। র্যাকনিকফ, শহরের উপকণ্ঠ
দিয়া চলিতে চলিতে হঠাৎ একটি প্রকাণ্ড পােড়া বাড়ীর
উঠানের একটা গর্তের মধ্যে বাক্সগুলিকে ফেলিয়া দিয়া তাহার
উপর একটা পাথর চাপা দিল।
নিঃশব্দ জনমানবহীন প্রেতপুরীর মতো একটা স্থানে অন্ধকারের
মধ্যে সে যাহা করিল তাহা ঠিক্ তলাইয়া বিচার করিয়া চতুরতার
সহিত নিজেকে রক্ষা করিবার জন্য নহে। তবু তাহার মনে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
হইল এ সে ঠিকই করিয়াছে—এই জনশূন্য ভগ্নাবশেষের মধ্যে
তাহার দুষ্কৃতির সমাধি করিয়া সে ভালই করিল। বাড়ীর পথ
ধরিয়া চলিতে চলিতে সে উল্লাসে বার বার হাসিয়া উঠিল।
এখন তাহাকে ধরিবে
কে ?
কেবল একটা কথা তাহাকে
বিধিতে লাগিল—যে ধন সে অকাতরে বিসর্জন দিয়া আসিল,
যাহার প্রতি তাহার কোন আকর্ষণ নাই, সেই কয়টা সােনার
গহনার জন্য একি করিয়া বসিয়াছে ! তাহার জীবনের
উপর চারিদিক হইতে এত বিপদ সে কেন ডাকিয়া আনিল?
যতই সে নিজেকে ধিক্ক ত করে ততই সমগ্র জগতের প্রতি
তাহার বিদ্বেষ বাড়িয়া উঠে। মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি,
আত্মীয় বন্ধুদের প্রতি একটা ঘৃণায় তাহার সর্বদেহ যেন বিষে
জর্জরিত হইয়া উঠিল। পথ চলিতে চলিতে সে একটা পরিচিত
বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। রাজুমিখি তার বন্ধুকে এ
অবস্থায় দেখিয়া অত্যন্ত বিস্মিত হইল। তাড়াতাড়ি তাহাকে
একটা ভাঙা চেয়ারে বসাইয়া তাহার সর্বাঙ্গে একটা চাদর মুড়ি..
দিয়া দিল। র্যাকনিকফের ছেড়া পাতলুন, জীর্ণ কোট এবং
সর্বোপরি গায়ে জ্বর অনুভব করিয়া তাহার দুঃখের অবধি রহিল
না। তাহার নিজের অবস্থাও ভাল নহে-অর্ধাশনে দিন কাটে
কিন্তু ব্যাসকনিকফের একি অবস্থা। সে প্রশ্ন করিল, “কী
হয়েছে তােমার ? জ্বর গায়ে নিয়ে বেরিয়েছে। কেন? সব খুলে
বলো দিকি।”
রাস্কনিকফ, বিরক্ত কণ্ঠে
কহিল, “আমি ভেবেছিলুম

ও
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
তােমার কাছে একটা কোন কাজের খোজ করবাে। কিন্তু
এখন দেখছি আমার কোন কাজ করার দরকার নেই। কাজ
আবার কী!”
“একি! জ্বরের ঘােরে তুমি যে ভুল বচ্ছ!”
“মােটেই না।” র্যাকনিকফ, সহসা রাগিয়া উঠিল এবং
চেয়ার ছাড়িয়া ঘরের বাহির হইতে উদ্যত হইল।
কোথায় যে তাহার অপরাধ হইল রাজুমিখি তাহা বুঝিতে
পারিল না। তবে তাহার সন্দেহ রহিল না যে আপন সহােদর
অপেক্ষা প্রিয় বাল্যবন্ধুটীর দারিদ্র্যের পীড়নে মাথার ঠিক নাই
এবং কঠিন জ্বরে সে বিকারগ্রস্ত।
সে অনেক অনুরােধ করিয়া
হাতে ধরিয়া রাকলনিকফকে বসাইবার চেষ্টা করিল, এখনই
তাহাকে কিছু কাজ জোগাড় করিয়া দিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিল
কিন্তু ইহাতে উল্টা ফল ফলিল। তাহার সন্দেহ জিজ্ঞাসাবাদ ও
কৌতূহলে ব্যালকনিকফ, রীতিমত চটিয়া উঠিল। স্নেহের হউক,
"বন্ধুত্বের হউক মানুষের কোন সম্পর্কই তাহার ভাল লাগে না।
তাহার মুখ কঠিন হইল, সে কহিল, “আমার কাজের প্রয়ােজন
নাই। তুমি আমায় ছেড়ে দাও।”
রাজুমিখি হতবাক। র্যাকনিকফ, প্রায় ছুটিয়া ঘরের
বাহির হইয়া মিলাইয়া গেল। রাজুমিখিন চীৎকার করিয়া তাহার
ঠিকানা জানিতে চাহিল কিন্তু উত্তর আসিল না।
বাড়ী আসিয়া কঁপিতে কপিতে ধুলি-মলিন ওভারকোটটা
গায়ের ওপর টানিয়া লইয়া র্যাকনিকফ, গভীর নিদ্রায় মগ্ন

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট হইল। শুধু একবার মনে হইল তাহাদের বাড়ীউলীকে সেই পুলিশের লােকগুলা ভীষণ প্রহার করিতেছে। রমণীর কাতর আর্তনাদে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। সে নান্টাসিয়াকে জিজ্ঞাসা করিল কেন উহারা বাড়ীউলীকে প্রহার করিতেছে। নান্টাসিয়া জানাইল কেহ কাহাকেও মারে নাই। আজ সারা দিন র্যাঙ্ক- নিকফ, কিছু মুখে দেয় নাই : নান্টাসিয়া বুঝিল সারাদিনের অনশক্লিষ্ট দেহের উপর প্রবল জর আসায় তাহার রক্ত মাথায় উঠিয়া গিয়াছে। কিছু না পাইয়া সে ঠাণ্ডা জল আনিয়া দিল। র্যাকনিকফ, উন্মত্তের মত তাহার হাত হইতে জলটুকু নিঃশেষে পান করিয়া আবার নিমিষে ঘুমাইয়া পড়িল। উঠিল। ইহার পরে কয়েক দিন রানিকফ, অরে অচেতন হইয়া পড়িয়া রহিল। এই কয়দিন কী যে ঘটিয়া গেল র্যাকনিকফ, কিছুই জানিতে পারে নাই। তবে যেদিন সে সুস্থ হইয়া উঠিল. সে দিন কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি তাহার চোখের সম্মুখে জাগিয়া এ কয়দিন কাহারা যেন তাহাকে ধরিয়া রাখিতেছিল এবং সে যেন তাহাদের হাত হইতে মুক্ত হইতে চেষ্টা করিতেছিল। কতকগুলি লােক যেন তাহাকে স্থানান্তরিত করিবার নিজেদের মধ্যে কেবল তর্কবিতর্ক করিত। রকনিকক তাহার সবটা ঠিক মনে করিতে পারিল না। আর একটা লােককে তাহার খুব পরিচিত মনে হইত অথচ কিছুতেই তাহাকে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
চিনিতে পারিত না। সেই লােকটি তাহার খুব পরিচর্যা করিত।
ইহা ছাড়া অসুখের কয়দিন সে কী একট। যেন মনে আনিতে
পারিত না। কিন্তু কেবলই তাহার মনে হইত সেই ব্যাপারটা
যেন তাহার স্মরণ করিয়া রাখা খুব দরকার। এ কয়দিন
কথাটা যতবার মনে করিতে গিয়াছে ততবার সে অচেতন হইয়া
পড়িয়াছে। কী সে ব্যাপারটা ?
ঘটিয়াছিল যাহা
তাহাকে মনে করিয়া রাখিতেই হইবে ?
সেদিন সকাল বেলা র্যাকনিকফ, বিগত দিন-কয়টির
ঘটনাগুলি স্মরণ করিবার চেষ্টা করিতেছিল। দুর্বল। মস্তিষ্কে
সবটাই যেন অস্পষ্ট, অপরিচিত বলিয়া মনে হইতেছিল। এমন
সময় নাস টাসিয়া ও রাজুমিখিন, তাহার ঘরে প্রবেশ করিল।
রাজুমিখিকে প্রথমে সে চিনিতে পারে নাই কিন্তু তাহার
কথাবার্তা শুনিয়া সে যেন হঠাৎ তাকে চিনিতে পারিল।
রাজুমিথিন্ কতদিন পরে তাহাকে সুস্থ এবং জাগ্ৰত দেখিয়া
..আনন্দে আত্মহারা
গেল । আর
নাসটাসিয়া
তাহাকে ধরিয়া বসাইয়া কিছু মুরগীর ঝােল খাওয়াইয়া দিল।
আরও নানা
নানা প্রকারে সে রাসকনিকফের স্বাচ্ছন্দ্য বিধান
করিতে লাগিল। রাসকনিকফ, কোন কথা কহে নাই, শুধু
তাহার মুখে একটু প্রসন্নতার ভাব দেখিয়া রাজুমিখি নানা
কথা কহিয়া তাহাকে প্রফুল্ল রাখিতে চেষ্টা
করিল। সে
ইতিমধ্যে এই বাড়ীর বাড়ীউলীর সঙ্গে
বাড়ীউলীর সঙ্গে ভাব করিয়া ভাড়ার
দিক্‌টা কোন প্রকারে ঠিক্ করিয়া লইয়াছে। বাড়ীউলীকে সে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
এখনই ডাক নামে ডাকিতে শুরু করিয়াছে। তাহার কথায়
মনে হয় বাড়ীউলীও যেন তাহাকে কিছু অধিক অনুগ্ৰহ করিতেছে।
রাজমিখি সােল্লাসে এই কয়দিনের ইতিহাস বলিয়া চলিল।
র্যাস কনিকফ, সমস্ত
সমস্ত শুনিল। বিকারের ঘােরে
ইয়াররিং আর ঘড়ির চেনের কথা বলিয়াছে। তাহার কাদা
নাখা বুট জুতােটা কোলে করিয়া বসিয়াছে। চীৎকার করিয়া
সেই পুলিশ অফিসের লােকগুলাের নাম করিয়াছে।
রাজুমিখিন্ হাসিয়া বলিল, “ভয় নেই হে, তােমার গােপন-কথা
কিছু ফাস করে দাও নি।”
র্যাকনিকফ, শুধু শিহরিয়া উঠিল। সে বুঝিতে পারিল ,
না ইহারা কি জানে আর কী জানে না। রাজুমিখি চলিয়া
যাইবামাত্র রাসকনিকফ, উঠিয়া দাঁড়াইল। কিছু একটা
তাহাকে করিতেই হইবে। কী করিবে ? পরক্ষণেই সে
বিছানায় এলাইয়া পড়িল। কেন সে উঠিয়া দাড়াইয়াছিল
তাহাও সে ভুলিয়া গেল। শুধু ব্যাকুল হইয়া ঈশ্বরের কাছে
প্রার্থনা করিতে লাগিল, “হে ঈশ্বর, কেবল এইটুকু আমায়
দু’লে দাও, এরা আমার কথা কতটা জানে ? সে সমস্তই
কি এরা জানতে পেরেছে ?”
সেই দিনই বিকাল বেলা রাজুমিখিন্ র্যাস, কনিকফের জন্য
টুপী, পাত লুন, কোট এবং বুট জুতা কিনিয়া আনিল।
রাস্কনিক ফ, এই অস্ত লইতে আপত্তি করিলে রাজুমিথিন
বুঝাইয়া দিল যে, তাহার মা যে টাকা পাঠাইয়াছেন তাহা

৬৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
।
দিয়াই এগুলি খরিদ করা হইয়াছে। রাস্কনিকফ, যখন
বন্ধুর স্নেহের আতিশয্যে নূতন জামাকাপড় পরিয়া বিস্মিত হইয়া
তাহার কথা শুনিতেছে তখন এক ভদ্রলােক হঠাৎ তাহারই
খোজ করিতে ঘরের দরজায় আসিয়া দাঁড়ালেন।
আগন্তুক ভদ্রলোকের মূল্যবান পােশাক
পােশাক পরিচ্ছদ
পরিচ্ছদ এবং
চোখে তীক্ষ দৃষ্টি দেখিয়া মনে হইল যেন ইনি দয়া করিয়া
যে এখানে আসিয়াছেন এই কথাটা ইহারা বুঝিতে পারিতেছে
বলিয়া তাহার ইতিমধ্যেই রাগ ধরিয়াছে। ভদ্রলােককে
রাজুমিখি সাদরে ঘরে আনিয়া বসাইল। তিনি ' আসিয়া
বসিলেন বটে তবে তাহার সম্বর্ধনাটা যথােচিত হইল না বলিয়া
কষ্ট হইয়াই রহিলেন। রাজুমিখিন্ র্যাকনিকফকে দেখাইয়া
দিল। র্যাকনিকফ, চিনিতে না
চিনিতে না পারিয়া ' শুধু চাহিয়া
রহিল। এমন কি ভদ্রলােক যখন তাহার নাম বলিলেন ‘পিটার
পেট্রভি, লুশি তখনও সে তেমনই নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া রহিল।
নিরুপায় হইয়া ভদ্রলােক বলিলেন, “আমি ভেবেছিলাম যে
আপনি আপনার মায়ের চিঠিতে সমস্তই জানতে পেরেছেন।”
“ও, বুঝেছি। আপনিই বুঝি সেই পাত্রটি ?” সহসা
বাসনিকফ, অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিল।
তাহার বিরক্তিতে লুশিন, রীতিমত ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিলেন। .
এবং রাজুমিখি যখন তাহার জামাতৃজনােচিত বেশভূষা নিরীক্ষণ
করিতে লাগিল তখন তাহার মেজাজ আরও খারাপ হইয়া
গেল। তবু নিজেকে যথেষ্ট সামলাইয়া লইয়া বলিলেন, “দেখুন

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
S
মামি এখানে তাদের জন্য বাসা নিয়েছি। এখানে আমার
এক ছাত্র লেবেজিয়ানিকফ, তারই বাড়া এখন
তাহার কথা অসমাপ্তই রহিয়া গেল, র্যাকনিকফ কে
কিছুমাত্র ব্যগ্র বা বিচলিত দেখা গেল না। লুশি
রাজুমিখিনের সঙ্গে আলােচনায় প্রবৃত্ত হইলেন, কথা প্রসঙ্গে
তাহার নিজস্ব অর্থনৈতিক মতবাদও . ব্যক্ত করিলেন। তিনি
দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়া এই কথাটাই বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন
বে আজ দেশে যে এত খুন ডাকাতি হইতেছে ইহার মুলে
আছে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং সেই সমস্যার সমাধান হইতে
গরে যদি প্রত্যেকে নিজেকে সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক ভালােবাসে।
তাহার মত সুচিন্তিত সন্দেহ নাই কিন্তু হার বক্তব্য শুনিয়া
রাজুমিখি বিস্মিত হইল এবং র্যাকনিকফ, সােজা হইয়া
সিল। ক্রোধে তাহার মুখ লাল হইয়া উঠিয়াছে, একটা
আঘাত করিবার জন্য সে হিংস্র দৃষ্টিতে লুশিনের দিকে চাহিল।
তারপর হঠাৎ হাসিয়া উঠিয়া কহিল, “ওঃ, এই বুঝি তােমার
ত, তােমার আদর্শ ? এই জন্য বুঝি তুমি তােমার ভাবী
*ীকে বলেছ যে, সে ভিখারী বলে তুমি বেশী খুশী হয়েছ ?
এইজন্য বুঝি তুমি তাকে বলেছ তার মত একটা রমণীকে
দরিদ্রের হাত থেকে, অপমানের হাত থেকে উদ্ধার করলে তুমি
ৰ গর্বিত হবে বলেই তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ ? দরিদ্র
রমণীকে বিয়ে করছ এইজন্য যে, তার ওপর যথেচ্ছাচার করবার
সুবিধা হবে বলে। কেমন, এই না?”
।

৭০ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেট তাহার বক্রোক্তিতে লুশিন চটিয়া উঠিল। কিন্তু লজ্জার ভান করিয়া বলিল, “দেখুন আমি ঠিক একথা আপনার বোনকে বলিনি। আমার মনে হয় আপনার মা আপনাকে তার নিজের কল্পনা অনুযায়ী এসব কথা লিখেছেন। আমি ভাবতেই পারছি না যে তার মত একজন মহিলা আমার কথার এমন বাকা মনে করে আপনার কাছে লাগিয়েছেন। এরকম নীচ মনােভাব তাঁর জালে-” “তুমি কী একটা কথা জানো?” র্যাকনিকফ, উঠিয়া দাড়াইয়া কহিল, তুমি কী জানাে যে আর একটা কথা আমার মায়ের সম্বন্ধে বললে তােমার মাথা নীচের তলায় গড়িয়ে পড়বে।” লুশিন দেখিলেন তাহার চোখ দুইটা জ্বলিতেছে। তাহার মুখ ফ্যাকাশে হইয়া গেল, কোন প্রকারে বলিলেন, “দেখুন আপনার অসুখ শুনে আমি আপনার অনেক অপমান- “আমি অসুস্থ নই !” রাসকনিকফ, চীৎকার করিয়া উঠিল। “তা হলে তাে আরও জাহান্নমে যাও!” র্যালনিকফ, পুনরায় চীৎকার করিল। লুশিন তথন চলিয়া গিয়াছে। যাইবার সময় তাহার ভঙ্গী দেখিয় মনে হইল, সে এই অপমানের একটা ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ লইবে। চলিয়া গেলে সহসা ব্ল্যাকনিকফ, আৰ্ত্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “তােমর সকলে চলে যাও। তােমাদের অত্যাচার আমি আর সইতে পানি না। আমাকে তােমরা একা থাকতে দাও—একেবারে একা !” রাজুমিখি বিস্মিত হইয়া বাহির হইয়া গেল।

রাজুমিখি চলিয়া যাইতেই র্যাকনিক সােজা উঠিয়া দাড়াইল। সে অসুস্থ নহে, ইহারা সকলে মিলিয়া তাহাকে অসুস্থ করিয়া তুলিয়াছে। তাহার মনে হইল আজই তাহাকে ইহাদের সকলের হাত হইতে মুক্ত হইতে হইবে। এই সংশয়, এই বেদনার অপরিশ্রান্ত নিৰ্যাতন সে আর সহিতে পারে না। আজই সব শেষ করিয়া দিবে,-মৃত্যু দিয়া নয়, তবে ? তাহার ঠিক মাথায় আসিল না কেমন করিয়া সব শেষ করিয়া দিবে। তবু সে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া রাস্তায় বাহির হইল। একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকিয়া সে গত কয়েক দিনের খবরের কাগজ ঘাটিয়া ঘাঁটিয়া এলেনা বুড়ীর রহস্যময় হত্যার কাহিনী পড়িতে লাগিল। তথায় পুলিশ-অফিসের কেরাণী জামেটফ, হঠাৎ তাহার সহিত ঘনিষ্ঠ হইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। রকনিকফ তাহারই সঙ্গে সেই হত্যার কাহিনী সম্বন্ধে আলােচনা করিতে শুরু করিয়া দিল। সে সবিস্তারে বলিয়া চলিল ঠিক কী উপায়ে সে নিজে অপহৃত টাকাকড়ি লুকাইয়া রাখিত। নােট জাল করিবার উপায় সম্বন্ধেও সে জামেটফকে তাহার প্ল্যান বুলিল। তাহার এই অসংলগ্ন কথাবার্তায়, তাহার উন্মাদের মত উচ্চ হাসি দেখিয়া জামেটফ, বুঝিল এ ব্যক্তি কখনই আসামী নহে, দারিদ্র্যের চাপে উন্মাদ হইয়া গিয়াছে। সেখান হইতে র্যাকনিকফ, এলেন বুড়ী যে বাড়ীটায় १२ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট থাকিত সেই বাড়ীতে গিয়া ঐ ঘর দুটা ভাড়া লইতে চাহিল। তখন রাত্রি গভীর হইয়াছে, তাহার উপর রানিকফ-এর অদ্ভুত কথাবার্তা শুনিয়া সেই বাড়ীর চাকর তাহাকে সােজা পথ দেখাইয়া দিল। জামেটফকে ঠকাইয়া তাহার মনটা কিছু হাল্কা হইয়াছে। তবু সেই নিঃশব্দ অন্ধকারে পথের দিকে চাহিয়া,সে আর একবার ভাবিল, সে এখন কী করিবে ? পথে দাড়াইয়া তাহার তন্দ্রা আসিয়াছিল, সহসা তাহার সে তন্দ্রা ছুটিয়া গেল। অদূরে একটা ঘোড়ার গাড়ী হঠাৎ থামিয়া গেল এবং একটা ভারী কণ্ঠের আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে কতকগুলি লােক সেখানে ভিড় করিয়া দাড়াইল। র্যাকনিকফ, তথায় গিয়া শুনিল যে একটা মাতাল ঘােড়র পায়ের তলায় গড়াইয়া আসিয়া পড়িয়াছে'। ভিড় ঠেলিয়া আহত ব্যক্তির দিকে অগ্রসর হইতে না হইতেই সে চমকিয়া এ যে সেই মারমেলেডফ! ব্যাকলনিকফ, তাহাকে তুলিয়া ধরিয়া তাহার বাড়ী লইয়া চলিল। আরও কয়েকজন সহৃদয় পথিক ধরাধরি করিয়া সেই রক্তাক্ত দেহপিণ্ডকে বহন করিতে তাহাকে সাহায্য করিল। রাসকনিকফ, উহাদের বাড়ী চিনিত। মারমেলেডফ-এর বাড়ী নিকটেই। একটা ভাড়াটে বাড়ীর উপর তলায় একখানা ঘর লইয়া তাহারা থাকে। মারমেলেউফকে উপরে তুলিয়া সে সম্মুখে যাহাকে দেখিল সে সেই মারমেলেডফের-স্ত্রী ক্যাথারিণ। সে তাহার কন্যাগুলির সঙ্গে তাহার পিত্রালয়ের আভি- জাত্যের কথা গল্প করিতেছিল। এতগুলি লােককে তাহার ঘরে ঢুকিতে দেখিয়া সে কয়েক মুহূৰ্ত্ত হতবাক হইয়া রহিল। কিন্তু উঠিল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৭৩ পরক্ষণেই তাহার ব্যাপারটা বুঝিতে বাকী রহিল না। ক্ষিপ্রহস্তে স্বামীর শয্যা বিছাইয়া দিল। সেই রক্তাক্ত জামা খুলিয়া পরিষ্কার জানা পরাইয়া দিল। বুকের একটা দিক একেবারে ভাঙিয়া গিয়াছিল, পুরাণাে ছেড়া কাপড় দিয়া সেই বীভৎস ক্ষতস্থান ঢাকা দিয়া রাখিল। র্যাকনিকফ, ডাক্তার আনিতে লােক পাঠাইয়া দিল। কিন্তু ক্যাথারিণ তাহার বড় মেয়ে পেলেকাকে শান্ত কণ্ঠে বলিল, সােনিয়াকে ডেকে নিয়ে আয়। প্রথমটা সে রক্তহীন মুখে চাহিয়াছিল বটে কিন্তু চরমতম দুর্ভাগ্যের সঙ্গে মুখােমুখী দাড়াইয়া কোথা হইতে নেন তাহার শক্তি ফিরিয়া আসিল। এদিকে পাশাপাশি ঘরের ভাড়াটিয়া স্ত্রী পুরুষেরা ভিড় করিয়া দাড়াইল আসন্ন বৈধব্যের সূচনায় বিপদগ্রস্ত এই রমণীটির দুর্দশায় তাহারা চুপ করিয়া দাড়াইয়া কী যেন উপভােগ করিতেছে। ক্যাথারিণ চৎকার করিয়া তাহাদের চলিয়া যাইতে বলিল। যক্ষ্মার কাশিতে সে ভাঙিয়া পড়িল কিন্তু তাহাদের নড়িবার কোন লক্ষণ দেখা গেল । ইহার উপর বাড়ীউলী আসিয়া ঝগড়া করিতে লাগিল। তাহাৰু বক্তব্য কেবল ইহাই যে ক্যাথারিণ সম্ভ্রান্ত ভদ্রঘরের মেয় হইলে এরূপ কখনই হইত না। যে কোন ছুতায় সে এই প্রকারে ক্যাথারিণকে অপমান করে। মারমেলেডক একটু পরে চোখ মেলিয়া চাহিল। তাহার আঁখি-তারকা দেখিয়া দৃষ্টিকর্থ করা যায় না। সে র্যাকনিকফকে দেখিয়া চিনিতে পারিল না, শুধু স্ত্রীর দিকে চাহিয়া ভগ্ন কণ্ঠে বলিল, পাত্রীকে খবর দাও।” তাহার গলা ভাঙিয়া গিয়াছে দেখিয়া ক্যাথারিণ এইবার ভাঙিয়া ৭৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেট পড়িল। স্বামীর অন্তিম মুহূর্তে তাহার বুক ফাটিয়া যে কান্না বাহির হইতেছিল তাহাকে সে আর চাপিয়া রাখিতে পারিল না। রােগ- পাণ্ডুর ক্ষীণ দেহ লুটাইয়া পড়িয়া মর্মন্তুদ বেদনায় ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেগিল। লেড নীরবে কাঁদিতেছিল। লেডা মারমেলেডফ, এর বেশী প্রিয়, তাহার দিকে চোখ পড়িতেই মারমেলেফ-এর চোখে জল আসিল। এই শীতে উহার দেহে প্রায় কোন আবরণই নাই। ক্যাথারিণ স্বামীর চোখ মুছাইয়া দিয়া কহিল, “তুমি তো জানাে কেন ওর পরবার কিছু নেই। কেঁদে কী হবে?” সে পুনরায় কেমন যেন কঠিন হইয়া উঠিল। ডাক্তার পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিলেন আর পাঁচ মিনিট মাত্র, তারপরেই মারমেলেফ-এর সকল যন্ত্রণার অবসান হইবে। ধর্মযাজক পুরােহিত আসিয়া মৃত্যুপথযাত্রীর জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিলেন। কন্যা দুইটিকে লইয়া ক্যাথারিণ স্বামীর শয্যাপাশ্বে নতজানু হইয়া প্রার্থনা করিল। সে প্রার্থনা কেহ শুনিল না তবু রাস্কনিকফ-এর “মনে হইল যে ক্যাথারিণ স্বামীর শেষ মুহূর্তে ভগবানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনাই করিল। এমন সময় ভিড় ঠেলিয়া ধীর পদক্ষেপে মারমেলেডফ -এর জ্যেষ্ঠা কন্যা সােনিয়া পিতার পায়ের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার রঙীন বেশভূষা, তাহার বারবণিতাদিগের মত টুপী, সমস্তটা মিলিয়া যেন তাহাকে এই ঘরের মধ্যে অত্যন্ত লজ্জা দিল। র্যাকনিকফ, চাহিয়া দেখিল হীন বারবণিতার বেশে যে মেয়েটি তাসিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহার মুখটি কী কৃশ, তাহার দৃষ্টিতে কী গভীর উদ্বেগ, কী অকলুষ মমতায় ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট স্নিগ্ধ ! কন্যার এই বেশ, এই লজ্জা পিতাকে বিধিল। তখন তাহার কথা কহিবার শক্তি শেষ হইয়া গিয়াছে। একবার শুধু ব্যাকুল বলে উঠিবার চেষ্টা করিয়া মারমেলেডফ, ভগ্ন কণ্ঠে কহিল, “সোনিয়া, আমার ক্ষমা কর মা—আমি”-পিতা হইয়া কন্যাকে যে পাপের পথে নামাইয়া দিয়াছে সেই কথা স্মরণ করিয়া সে একবার ক্ষমা চাহিল কিন্তু আর কিছু বলিবার পূর্বেই এক অব্যক্ত বেদনায় তাহার হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হইয়া গেল। প্রাণহীন দেহ শয্যার প্রান্ত হইতে মেঝেয় পড়িয়া গেল ! সকলে মিলিয়া যখন তাহাকে তুলিয়া ধরিল, তখন পৃথিবীর কোন লাঞ্ছনা আর তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। সেনিয়া পিতাকে কোলে তুলিয়া লইল। ক্যাথারিণ স্বামীর মৃতদেহের দিকে চাহিয়া অস্ফুট স্বরে কহিল, “যাক্, চলে গেল।” সান্ত্বনা দিবার ভাষা নাই। ছোট ছােট কন্যা দুইটিকে লইয়া যে রমণীটি এইমাত্র তাহার একমাত্র অবলম্বনটুকু হারাইয়া ফেলিল, তাহার জীবনে একদিনও সুখ ছিল না—অনাহারে সে যক্ষ্মাগ্রস্ত। তথাপি ঈশ্বর তাহাকে আজ যে শাস্তি দিলেন তাহার জন্য সমবেদনা জানাইকে কোন ভাষায় ? নিদারুণ বেদনায় চাপা কণ্ঠের ক্রন্দনরােলে র্যা- কনিকফের বুক যেন ভাঙিয়া যাইতে লাগিল। তাহার মায়ের টাকার মধ্যে অবশিষ্ট যে কয়টা টাকা সে রাজুমিথিনের নিকট হইতে পাইয়াছিল তাহার সব কয়টা সে ক্যাথরিণের হাতে গুজিয়া দিল। ক্যাথারিণ কিছু বলিবার পূর্বেই সে সংক্ষেপে বলিল, “গত সপ্তাহে আপনার স্বামী আমায় তার সব কাহিনী বলেছিলেন। তিনি আপনাদের সকলের জন্যই খুব ভাবতেন। আপনাকে তিনি শ্রদ্ধা

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
করতেন খুব। আমি তার বন্ধু—আমার বন্ধুত্বের ঋণ কিছু শােধ
করতে দিন। এই সামান্য টাকা কয়টা হয়তাে আপনার প্রয়ােজনে
লাগবে। আমি কাল আবার নিশ্চয়ই আসবাে।”
কেমন করিয়া যে পথে নামিয়া পড়িয়াছে তাহা সে বুঝিতে পারে
নাই। হঠাৎ একটি শিশু কণ্ঠের আহানে সে পিছন ফিরিয়া
চাহিতেই দেখিল, পােলো ছুটিতে ছুটিতে তাহার দিকে
আসিতেছে।
“মা আর দিদি আপনার ঠিকানা জানতে চাইলেন।” পােলেন্ক।
কাছে আসিয়া বলিল।
রাসকনিকফ, ঠিকানাটা বলিল। তারপর হঠাৎ সে পােলেন্কাকে
কাছে টানিয়া প্রশ্ন করিল, “তুমি তােমার দিদিকে ভালবাসো ?”
“সকলের চেয়ে বেশী।”
“তােমার বাবা তোমায় ভালােবাসতেন ?”
“বাবা লেডাকে বেশী ভালােবাসতেন। ভালো থাকলে বাব।
প্রায়ই আমাদের বাইবেল আর গ্রামারের বই দিতেন আর প্রার্থনা
করতে শেখাতেন। প্রার্থনা করলে মাও রাগ করতেন না!”
“তুমি প্রার্থনা করতে জানো?”
“হ্যা, জানি। দিদির জন্য আমরা প্রায়ই মেরীর কাছে প্রার্থনা
করি।”
“আমার নাম রেডিয়—তুমি আমারও জন্য প্রার্থনা করো।”
‘ক’রবেল, বােজ তােমার জন্য প্রার্থনা করবো।”
পরম স্নেহে বালিকাটিকে সে চুম্বন করিল। পােলেকা উৎফুল্ল

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৭৭ ভাবে চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ সেই দিকে চাহিয়া র্যাকনিকফ, আবার চলিতে শুরু করিল। এই সে টের পাইয়াছে। আর সে মরিতে চাহে না। কেমন করিয়া অকস্মাৎ যেন সে জীবনের মধ্যে, বাচিয়া থাকার মধ্যে অর্থ জিয়া পাইল। কয়েক ফুট জমি পাইলেই সে বাঁচিয়া থাকিবে। এই মুহূর্তে যেন সে নূতন জীবন লাভ করিল। আর তার কোন রােগ নাই। শক্তি চাই—শক্তি! র্যাকনিকফ, শুধু শক্তির জন্য মনে মনে প্রার্থনা করিল। এতদিনে যেন মনে তাহার শান্তি ফিরিয়া আসিল। সে বাঁচিয়াই থাকিবে—জীবন নিঃশেষ হইবার নহে। রাজুমিখিনের বাড়ী গিয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া র্যাক- নিকফ, বাড়ীর দিকে চলিতে লাগিল। চলিতে চলিতে রাজুমিখি হাকে অনেক কথাই বলিল। সেই দিনই সন্ধ্যার রেস্তোরাঁয় হার অদ্ভুত কথাবার্তায় জামেটফ, তাহাকে পাগল ভাবিয়াছে এইজন্য রাজুমিখি অনুযােগ করিল। একবার তাহার মনে হইল যে রাজুমিখিকে সব কথা বলিয়া ফেলে। কী এমন- কাজ সে করিয়াছে ? কিন্তু পরক্ষণেই সে চুপ করিয়া গেল। শুধু মারমেলেডফের স্ত্রীকে টাকা দেওয়ার কথা বলিল আর বলিল বে, সে পালকের মত কোমল অথচ আগুনের মত দীপ্তিময়ী একজনকে দেখিয়া আসিয়াছে। কথাটা বলিতেই তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল। নিমেষে চোখে অন্ধকার দেখিয়া সে সামনে যাহা পাইল তাহাই ধরিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। চোখ চাহিয়া দেখিল এটা তাঁহাদেরই বাড়ীর সিড়ি। সময় ৭৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তাহার নিজের ঘরে ঢুকিতে সে বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেল। একী! তাহার মা ও ভগিনী দুনিয়া তাহার ঘরে বসিয়া নাটাসিয়ার সঙ্গে গল্প করিতেছেন। সে একেবারে ভুলিয়া গিয়াছিল যে আজই তাহাদের আসিবার কথা ছিল। তাহাকে দেখিয়া আনন্দে প্রায় চীৎকার করিয়া ডুনিয়া ও তাহার মা তাহাকে জড়াইয়া ধরিলেন। কিন্তু সে তখন পাথরের মত কঠিন নিস্পন্দ। একবার সম্মুখে অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিয়াই র্যাক- নিকফ, জ্ঞান হারাইয়া ভূমিতে পড়িয়া গেল। এই মুহূর্তে কী একটা কথা তাহার মনে পড়িয়া তাহাকে অকস্মাৎ'অভিভূত করিয়া দিল। ঐ একটিমাত্র কথা সে মাতা ও ভগ্নীর সম্মুখে স্মরণ করিতে চাহে নাই। কিন্তু জীবনের সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর সেই কথাটা এখনই তাহার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। রাজুমিখিন কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া র্যানিকফের -চতনা ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। ডুনিয়া ও তাহার মাতাকে বার বার সান্ত্বনা দিয়া সে তাহাদের কিছু দূরে অপেক্ষা করিতে বলিল। মাতা ও ভগ্নী উভয়েই রাজুমিথিনের নিকট কৃতজ্ঞ বােধ করিলেন। এই সহৃদয় যুবকটির কথা তাহারা নাস্টাসিয়ার নিকট ইতিমখেই শুনিয়াছিলেন। র্যাকনিকফের জ্ঞান হইতেই রাজুমিখি ভুনিয়ার হাত ধরিয়া ভ্রাতার নিকট আনিয়া হাজির করিল।

৭
বাও।
মূচ্ছাভঙ্গের পর র্যাকনিকফ যখন শয্যার উপর উঠিয়া
বলি তখন তাহার মুখের চেহারা দেখিয়া তাহার মাতা ও
ভগিনী উভয়েই ভীত হইলেন। তাহার অপ্রসন্ন, চিন্তাগ্রস্ত মুখের
উপর এমন একটা ছায়া দেখা গেল যাহার প্রকৃত কারণ খুঁজিয়া
পাওয়া যায় : না। মাতা ও ভগিনীর সস্নেহ আগ্রহ এবং যত্ন
উপেক্ষা করিয়া সে ঋজুমিখিকে বলিল, “তােমরা এখন চলে
কেন তোমরা আমায় জ্বালাতন করে ? যাও আজকের
মত। এখন তােমাদের থাকার কোন দরকার নেই ! যাও,
খেনি যাও!
মায়ের চোখে জল আসিল। যাহাকে চোখের দেখা দেখিবার
ন্য তিনি ব্যাকুল হইয়া ছুটিয়া আসিলেন সেই প্রাণাধিক পুত্র
তার এ কী বলিতেছে! কিন্তু যাইতেই হইবে। যতদূর তাহারা
নিয়াছেন এ তঁাহার পুত্রের ব্যাধি ! রুগ্ন ব্যক্তিকে শান্তিতে
বাকিতে দিয়া তাহারা উঠিয়া পড়িলেন।
তাহারা চলিয়া যাইতেছেন এমন সময় ব্ল্যাকলনিক, ডুনিয়াকে
কম্বােধন করিয়া বলিল যে, আজই সে লুশিনকে লাথি মারিয়া
নচে ফেলিয়া দিতে গিয়াছিল। ডুনিয়া যদি তাহার জন্য নিতান্ত
ত্যাগ-স্বীকার করিয়া লুশিনকে বিবাহ করে তাহা হইলে ভগিনীর
এ ত্যাগ সে গ্রহণ করিবে না।

৮ ০
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
,
তাহার কথা শুনিয়া মনে হইল যেন সে প্রলাপ বকিতেছে।
কিন্তু ব্লাস্কনিকফ, জানাইয়া দিল যে সে একথা সম্পূর্ণ সজ্ঞানে
বলিতেছে। সে বলিয়া চলিল, “ভয় নেই আমি বিকারের ঘােরে
কথা বলছি না। আমি জানি দুনিয়া, এ বিয়েতে তুমি অনেক
নিচে নেমে যাবে। তােমাকে অনেক হীনতা স্বীকার করতে হবে।
আমার সমাজে কোন স্থান নেই বলে তুমি আমার জন্য যে এতটা
অপমান সহ্য করে বিয়ে করবে এ আমি কিছুতেই হতে দেবে।
। তুমি যদি এই লােকটাকে বিয়ে করে তাহলে আমি আর
তােমায় আমার বােন্ বলে মনে করবে না। দেশে, বেহে
নাও, হয় তােমার ভাই-না হয় লুশি। দেখাে, ভেবে দেখাে”-
অত্যধিক উত্তেজনা সহিতে না পারি সে পুনরায় বিছানার
উপর ঢলিয়া পড়িল। দুনিয়া তাহার দিকে শুধু স্থির দৃষ্টিতে
চাহিয়া রহিল, তাহার মা ছুটিয়া আসিতেছিলেন কিন্তু রাজুমিখি
তাঁহাকে বাধা দিল। পরক্ষণেই রাজুমিখি তাহাদের ঘরের বাহিরে
- লইয়া আসিল।
এই রাত্রে তাহারা যাইবেন কোথা ? রাস্কনিকফ-এর মায়ের
ইচ্ছা যে এই বাড়ীতে রুগ্ন পুত্রের কাছাকাছি কোথাও রাত্রিযাপন
করেন। কিন্তু রাজুমিখিন্ জানে যে বাড়ীউলী সেটা ঠিক পছন
করিবে না। রাজুমিথি অনেক বুঝাইয়া লুশি যে বাসা তাহাদের,
জন্য ভাড়া করিয়াছিল সেই বাড়ীতেই তাহাদের লইয়া গেল।
দুনিয়া ও তাহার মাতা রাজুমিনিকে যতই দেখেন ততই
বিস্মিত হন। রাজুমিখিন রাস্কনিকফ, সম্বন্ধে যাহা যা

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
৮১
বলিল তাহাতে এই কথাটি কাহারও বুঝিতে বাকী রহিল না
যে, এই সহৃদয় যুবকটি তাহার বন্ধুকে একান্তভাবে ভালােবাসিয়া
তাহার সকল দোষগুণ তাহার গূঢ়তম মনােবিকারও স্নেহের চক্ষে
দেখিতে শিখিয়াছে। তাহাদের সম্বন্ধেও তাহার আচরণ অভাবনীয়
মমতায় ভরা। সে
সে এইটুকু সময়ের মধ্যেই তাহাদের শুভাশুভের
সমস্ত দায়িত্ব সহজেই মাথা পাতিয়া গ্ৰহণ করিল। রাজুমিথি
শুধু তাহাদের নিরাপদে রাখিয়া দিয়া ক্ষান্ত • হইল না। সে
তাহার বন্ধু ডাক্তার জোসিমফকে সঙ্গে করিয়া ব্যাকনিকফের
বাড়ী লইয়া গেল। এইমাত্র ব্যাকনিকফের চোখে মুখে
যে নিদারুণ রােগের
রােগের ভয়াবহ ছায়া দেখা গিয়াছিল তাহাতে
দুনিয়া ও পুলচেরিয়া ভীত হইয়া উঠিয়াছেন এবং সে নিজেও
রীতিমত বিচলিত হইয়া পড়িয়াছে। ডাক্তার জোসিমফকে সে
সারারাত্রি র্যাকনিকফের গৃহপাশ্বে বসাইয়া রাখিল এবং নিজে
একটা ব্যাপার মুড়ি দিয়া ঘরের বারান্দায় পড়িয়া রহিল।
এদিকে দুনিয়া ও পুলচেরিয়াকে সে আশ্বাস দিয়া আসিল যে,
যদি কিছু অঘটন ঘটে তাহা হইলে সে রাত্রিতেই তাহাদের
সংবাদ দিয়া যাইবে এবং পরদিন প্রভাতেই তাহাদের যা
কনিকফের নিকট হাজির করিবে।
রাজুমিখিকে ডুনিয়ার বড় অদ্ভুত লাগিল। সে দেখিল
এ লােকটিকে এই বিপদে তাহাদের একমাত্র বন্ধুরূপে পাইয়া
তাহারা বাঁচিয়া গিয়াছে, লােকটির হৃদয়ে পরিচয়ও যাহা
পাইয়াছে তাহাতে তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ না হইয়া উপায় নাই।

৮৭ ক্রাইম এও পানিশমেট তথাপি এই লােকটির কথাবার্তায়, তাহার নাটকীয় ভাবভঙ্গীতে এমন একটা কিছু রহিয়াছে যাহা অবিমিশ্র পরদুঃখকাতরতা নহে। রাজুমিখি বার বার ডুনিয়া সম্বন্ধে এমন স্তুতিবাক্য প্রয়ােগ করিয়াছে যাহাতে নিঃসংশয়ে একটি দুরন্ত হৃদয়ের আত্ম-নিবেদন বলা যাইতে পারে এবং যাহা সপ্ত পরিচিত যুবকের পক্ষে নিতান্ত অশােভন এমন কি অপমানসূচক। রাজুমিখি নতজানু হইয়া দুনিয়াকে নিরাপদে রাখিবার ও স্বয়ং তাহার ভ্রাতার দায়িত্ব লইতে প্রতিশ্রুত হইল এবং আরও যাহা বলিল তাহা অসংলগ্ন হইলেও তাহার প্রকৃত মর্মার্থ অসাধারণ বুদ্ধিমতী দুনিয়ার অগোচর রহিল না। লুশিনের বাসায় গভীর রাত্ৰি পৰ্য্যন্ত দুনিয়া যতই চিন্তা করিতে লাগিল ততই তাহার অনুমান সত্য বলিয়া মনে হইতে লাগিল। রাজুমিখি তাহার আচরণ সম্বন্ধে সচেতন হইয়া যদিও বার বার মার্জনা ভিক্ষা করিয়াছে এবং তাহার এরূপ অভদ্র আচরণকে সুরাপান- জনিত প্রলাপ বাক্য বলিয়া অভিহিত করিয়াছে তবু তাহার জ্বলন্ত দুই চোখ হইতে যে দৃষ্টি দুনিয়ার সারা অঙ্গ ক্ষণে ক্ষণে স্পর্শ করিতেছিল তাহা মনে করিয়া এই গভীর নিশীথে ডুনিয়া যেন শিহরিয়া উঠিতে লাগিল। পরদিন প্রভাতে রাজুমিখি একপ্রকার কম্পিত হৃদয়ে দুনিয়াদের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইল। : নিদ্রাভঙ্গের পর হইতে নিজেকে সে তিরস্কারে জর্জরিত করিয়াছে। মদ্যপ হইয়া জ্ঞান হারাইয়া একটি সুন্দরী যুবতীর আশ্রয়হীনতার সুযােগ লইয়া

১৩
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
সে তাহাকে যথেষ্ট অপমান করিয়াছে। তাহার রূপের প্রশংসা
করিতে গিয়া সে আপন নির্লজ্জ দুশ্চরিত্রতার পরিচয়ই দিয়াছে।
গত রাত্রের আচরণের কথা ভাবিতে ভাবিতে তাহার আর
পা চলে না। কে জানে তাহারা কী ভাবিতেছেন? আজ
যদি তাহার
তাহারা তাহাকে কটু কথা বলিয়া অপমান করিয়া
তাড়াইয়া দেন তাহা হইলেও তাহার প্রতিবাদ করিবার ভাষা
জোগাইবে না। অবশেষে মরিয়া হইয়া সে ডুনিয়াদের ঘরের
সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
পুলচেরিয়া ও দুনিয়া যেন তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।
তাহারা তাহাকে সাদরে প্রাতরাশ খাইতে আহ্বান করিলেন।
পুত্রের বন্ধুকে পুলচেরিয়া পুত্রের মত দেখিতে লাগিলেন। আজ
সকালেই তিনি লুশিনের নিকট হইতে এক পত্র পাইয়াছেন।
পত্র তিনি রাজুমিখিকে পড়িতে দিলেন। লুশিন্ তাহার
পত্রে ব্ল্যাকনিকফ, যে তাহাকে অপমান করিয়াছে তাহার
উল্লেখ করিয়াছে। সে আজ রাত্রে পুচেরিয়া ও ডুনিয়ার সঙ্গে •
একটা পাকা কথা কহিতে চায় কিন্তু যদি ব্যাকনিকফ, সে
সময় সেখানে উপস্থিত থাকে তাহা হইলে সে তৎক্ষণাৎ ফিরিয়া
যাইবে। পরিশেষে সে জানাইয়াছে যে কাল সন্ধ্যায় রাসুকনিকফ,
একটি সদ্য বিধবাকে তাহার স্বামীর শেষকৃত্য করিতে সাহায্য
করিবার নাম করিয়া তাহার সুন্দরী যুবতী কন্যাকে প্রচুর অর্থ
দিয়া আসিয়াছে। সে , ইহা সচক্ষে দেখিয়াছে এবং শুনিয়াছে
যে ঐ মেয়েটির চরিত্র ঠিক ভদ্র ঘরের মেয়ের মত নহে।

৮৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট চিঠিখানি পড়িয়া রাজুমিখি লুশিনের নীচ অভিযােগে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইল কিন্তু দুনিয়ার ভাবি স্বামী সম্বন্ধে কোন কটুক্তি করিলে পাছে তাহা অপমানকর শুনায় এই আশঙ্কায় সে চুপ করিয়া রহিল। পুলচেরিয়া ভাবী জামাতা ও পুত্রের মধ্যে এই অসন্তোষে অত্যন্ত বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছেন। তিনি রাজুমিথিকে একান্ত নিকট আত্মীয়ের মত তাহার মত জিজ্ঞাসা করিলেন। রাজুমিখি জানাইল যে এক্ষেত্রে দুনিয়ার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করাই সমীচীন। ডুনিয়া জেদ করিয়া বলিল, “আজ রাত্রে লুশিনের সঙ্গে যখন কথাবার্তা হবে তখন রাডিয়ন্ নিশ্চয়ই সেখানে উপস্থিত থাকবে। এখন চল তাে আমরা তার কাছে যাই। বেলা অনেক হ’ল- সেখানে গিয়ে যা হয় একটা কিছু ঠিক করা যাবে।” তাহাই হইল, সকলে মিলিয়া র্যাকনিকফের বাসায় আসিয়া উপস্থিত হইল। ব্যাকলুনিকফের বাসায় আসিতে আসিতে রাজুমিখিনের মনে হইল যেন তাহার বুকের উপর হইতে একটা পাষাণ-ভার নামিয়া গেল। র্যাকনিকফের বাসায় যাইতেই ডাক্তার জোসিমফ, তাহাদের জানাইলেন যে ব্যাকুলনিকফ, সারারাত্রি ঘুমাইয়াছে এবং সকাল হইতে বেশ প্রফুল্ল আছে। ডাক্তার জোসিমফ, তাহাদের নিকট বিদায় লইলে সকলে র্যাকলনিকফের ঘরে প্রবেশ করিলেন। ব্যাকনিকফ, হৃষ্ট মনে ধােপ-দুরস্ত জামা কাপড় পরিয়া বসিয়া ছিল। হাত-মুখ ধুইয়া সে যেন নূতন জীবন লাভ করিয়াছে।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৮৫ যদিও তাহাকে ঈষৎ দুৰ্বল দেখাইতেছিল তথাপি পুলচেরিয়া পুত্রের মুখে হাসি দেখিয়া আনন্দে অধীর হইলেন। র্যাকনিকফ, হাসিমুখে দুনিয়াকে কাছে টানিয়া আনিয়া তাহার হাতের আঙ্গুলগুলি লইয়া খেলা করিতে লাগিল। রাজুমিখি ভ্রাতা ও ভগ্নীর মিলন দেখিয়া র্যাঙ্কলনিকফকে যেন আরও অনেকটা ভালােবাসিয়া ফেলিল। কাল দুনিয়া যে রূঢ় আঘাত পাইয়াছিল আজ আর তাহার লেশমাত্র নাই দেখিয়া রাজুমিখি বােধ করি কাহারও অপেক্ষা কম সুখী হইল না। মাতা-পুত্রে নানাবিধ আলােচনা চলিতে লাগিল। পুচেরিয়া রাজুমিখিনের অনেক প্রশংসা করিলেন। র্যাকনিকফ, সস্নেহে বলিল, “ওর কথা আর বলাে না মা। ওকে আমি শুধু গালাগালি দিই আর দূর ছেই করি। ও কিন্তু আমায় ছাড়ে না” গল্পগুজবে সকলের মন হইতে কল্যকার গ্লানি একেবারে নিঃশেষে মুছিয়া গেল। রাজুমিখি চলিয়া যাইতেছিল, রাস্কনিকফ, তাহাকে ধমক দিয়া বসাইয়া রাখিল। আজ যেন সকলকেই আপনার জন • ভাবিতে পারিয়া সে বাঁচিয়া উঠিয়াছে। কেবল মাতা ও ভগিনীর উদ্বেল স্নহের স্পর্শ পাইয়া তাহার মনে হইতে লাগিল এতটা মেহের যােগ্যতা আর তাহার নাই। এই কথাটা মনে হইতেই সে যেন বুকের মধ্যে একটা বেদনা অনুভব করিল। মাতৃহৃদয়ের অকৃত্রিম আতপ্ত স্নেহ- স্পর্শ পাইয়াও যে বার বার তাহার সর্বশরীর হিম হইয়া যাইতেছিল তাহা বােধ করি অন্তর্যামী ছাড়া আর কেহই পুরাপুরি জানিতে পারিল না।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
হঠাৎ এক সময় ব্ল্যাকনিকফ, দুনিয়াকে বলিল, “কিন্তু
ডুনিয়া তুমি কিছুতেই ঐ লুশিনটাকে বিয়ে করতে পারবে না।
আমার দুরবস্থা ঘটেছে বলে তুমিও যে এতটা অপমান সইবে এ
আমি কিছুতেই হতে দেবাে না। আমাদের অবস্থা স্বচ্ছল হবে,
আমি কাজকৰ্ম্ম পাবে এই জন্য যে তুমি এতটা ত্যাগ স্বীকার করে
ঐ জানােয়ারটাকে বিয়ে কৰ্বে এ কিছুতেই হবে না। এ তুমি
নিশ্চয় জেনাে যে, ওকে বিয়ে করলে আমি আর
বাধা দিয়া ডুনিয়া বলিল, “তুমি আমায় ভুল বুঝছো দাদা,
আমি বিয়ে করছি আমারই ভালাের জন্য । তবে আমার ভালাে
হলে যদি তােমাদেরও কোন সুবিধা হয় সে আলাদা কথা। আর
তা ছাড়া উনিই বা'আমাকে দিনরাত্রি অপমান করতে যাবেন কেন ?
উনি হয়তো আমার মর্যাদা বুঝতে পারবেন পরে। উনিও
হয়তাে-
ডুনিয়া আর বলিতে পারিল না, আপনার সহােদরের নিকটে
নিজে যাহাকে মিথ্যা বলিয়া জানে তাহাই সত্য প্রতিপন্ন করিতে
গিয়া সে নিদারুণ লজ্জায় চুপ করিয়া গেল।
রাসকনিকফ, বলিয়া উঠিল, “তুমি নিজেই জানাে তা
হবে না। স্ত্রীর সত্য মৰ্যাদা ও তােমায় দেবে না—দিতে পারে না।
-না, এ আমি কিছুতেই হতে দেবে না। আমি জানি তুমি
তাকে কোন দিনই শ্রদ্ধা করতে পারে না। যাকে শ্রদ্ধা কয়রা
শুধু মা আর ভাই সুখে থাকবে বলে তাকেই—
নানা এ
হবে না, কিছুতেই না।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ৮৭ ডুনিয়া একথার প্রতিবাদ করিল কিন্তু তাহার নিজের কানেই সে প্রতিবাদ অত্যন্ত ক্ষীণ শুনাইল। পুলচেরিয়া লুশিনের চিঠিটা ছেলের হাতে দিলেন। প্রাণাধিক পুত্রের কাছে কোন প্রকার লুকোচুরি করিয়া কন্যার বিবাহ দিতে হইবে ইহা তিনি কোন মতেই ভাবিতে পারেন না। চিঠিখানি আদ্যোপান্ত পড়িয়া বাসকনিকফ, লুশিনের চতুরতায় হাসিল। লােকটা অত্যন্ত ধূৰ্ত্ত তাহাতে সন্দেহ নাই। চিঠিতে শুধু কয়েকটা ইঙ্গিত আছে মাত্র। র্যাকনিকফ, তখন সব কথা খুলিয়া বলিল। তাহার কল্যকার অনুচিত বদান্যতার জন্য একটু পূর্বে সে মায়ের কাছে ক্ষমা চাহিয়াছে। মাকে ইতিমধ্যেই সে সব ব্যাপারটা বলিয়াছে। এখন শুধু আরও খুলিয়া বলিল যে, যে মেয়েটির কথা সুশিন চিঠিতে লিখিয়াছে তাহাকে সে কালই প্রথম দেখিয়াছে এবং টাকাটা সে সেই বিধবাকেই দিয়াছে, ঐ মেয়েটিকে দিবার কোন হেতু নাই। পুত্রের অকপট স্বীকারােক্তিতে মায়ের মনে আর কোন দ্বিধা রহিল না। দুনিয়া বলিল, “ও চিঠিতে যাই মানা থাক তােমাকে আজ রাত্রে উপস্থিত থাকতেই হবে!” বাসকনিকফ, সম্মত হইল। দুনিয়া রাজুমিখিকেও আসিতে অনুরােধ করিল। ব্যাপারটা এত সহজ হইয়া গেল দেখিয়া পুলচেরিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন। এমন সময় নিঃশষে দরজাটি খুলিয়া একটি মেয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। চোখে তাহার ভীত দৃষ্টি, ঘরের মধ্যে ঢুকিয়াই সে ৮৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট আড়ষ্টভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। মেয়েটি ভিতরে আসিতেই সকলে পরম বিস্ময়ে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। প্রথমে ব্যাঙ্কলনিকফ, তাহাকে চিনিতে পারে নাই। তাহার জীর্ণ বেশ, তাহার মলিন টুপী, তাহার এস্ত মুখচ্ছবি তাহাকে সম্পূর্ণ অচেনা করিয়া না তুলিলেও কল্যকার বেশভূষা তাহাকে যে শ্রেণীর জীব বলিয়া নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছিল আজ আর যেন সে কথা মনেই পড়ে না। সকলে তাহার দিকে চাহিয়া আছে দেখিয়া মেয়েটি আরও অপ্রতিভ হইয়া গেল, কি করিবে বুঝিতে না পারিয়া সে ফিরিবার উপক্রম রানিকফ, অবাক হইয়া দেখিতেছিল, এইবার কহিল, “তুমি! সােনিয়াসসানিয়া সেমেনভ না মারমেলেডফ!” লুশিনের চিঠিটা তখনও তাহার হাতেই ছিল। এই মেয়েটি সম্বন্ধে চিঠিতে যে ইঙ্গিত রহিয়াছে তাহা স্মরণ করিয়া একবার তাহার মাথার মধ্যে সব যেন গােলমাল হইয়া গেল কিন্তু পরক্ষণেই সােনিয়ার লজ্জার মুখের দিকে তাকাইয়া সে স্নিগ্ধ কণ্ঠে কহিল, “এসো, এই চেয়ারটায় বস। আমি তােমায় এখানে আশা করি নি। ক্যাথারিণ বােধ হয় তােমায় পাঠিয়েছেন?” সােনিয়া বসিল, তাহার হাত-পা যেন কাঁপিতেছে। এই সম্রান্ত মহিলা দুইটির পাশে তাহার মত একটা মেয়ে কোন্ সাহসে আসন গ্রহণ করিল এই কথাটা মনে হইতেই সে পুনরায় উঠিয়া দাড়াইল। মৃদু, কম্পিত কণ্ঠে কহিল, “আজ্ঞে হ্যা, আমি তার কাছ থেকেই আসছি। তিনি আপনাকে অনুরােধ করে পাঠিয়েছেন যে তার ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট আত্মীয়স্বজন যখন কেউ নেই তখন আপনাকেই কাল বাবার শেষ কৃত্যের সময় উপস্থিত থাকতে হবে। তারপর আপনি ওখানে কিছু জলযােগ করবেন। ক্যাথারিণ নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন যে আপনি তার একথা নিশ্চয়ই রাখবেন। আপনি কি-* “নিশ্চয়ই যাবাে, তুমি ব’স। মা, দুনিয়া, এঁর কথাই বলছিলাম। ইনি সােনিয়া সেমেনভ না মারমেলেডফ-এরই পিতা কাল হঠাৎ গাড়ী চাপা পড়ে মারা গিয়েছেন।” র্যাকনিকফ, সােনিয়ার সঙ্গে মাতা ও ভগিনীর পরিচয় করাইয়া দিল। সােনিয়া পুনরায় বসিল। পুলচেরিয়া সােনিয়ার দিকে চাহিয়া আশ্বস্ত হইলেন। ডুনিয়া এক দৃষ্টে, এই ব্রীড়াবনতমুখী শান্ত- বালিকাটিকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। কিন্তু তাহার কথা ইতিপূর্বে ইহারা আলোচনা করিয়াছেন শুনিয়া সোনিয়া যেন লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশিয়া গেল। র্যাকনিকফ, প্রশ্ন করিল, “তােমাদের অন্য সব বন্দোবস্ত হয়ে গেছে ত? কোন গােলমাল হয়নি ত ?” “না পুলিশ কোন গােলমাল করেনি। তবে বড় গরম পড়েছে, একটু গন্ধও বেরুচ্ছে তাই বাড়ীর অন্য ভাড়াটেরা বড় আপত্তি করছে। তাদেরই জন্য বাবার সমাধি কালই দিয়ে ফেলতে হবে।” সােনিয়া কথা বলে আর হাঁপাইতে থাকে। “ক্যাথারিণ আবার খাওয়া দাওয়ার হাঙ্গামা করছেন কেন? এটা তাে ব্যয়সাপেক্ষ। “তেমন কিছু নয়। কফি খুব সাদাসিদে রকমেরই হবে।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
আর তা ছাড়া ক্যাথারিণের খুব ইচ্ছে যে বাবার আত্মার শান্তির জঙ্গ
একটা ভােজ দেওয়া হয়। ভােজ খুবই সামান্য হবে। আপনি
জানেন তাে আমাদের কী রকম অবস্থা। আপনি যদি কাল নিজে
রিক্ত হয়ে অতগুলাে টাকা না দিতেন তাহলে হয়তাে সমাধি
দেওয়াই-”
সােনিয়া আর বলিতে পারিল না। তাহার ঠোট কাপিতে
লাগিল, কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল। র্যাকনিকফের বাসায় আসিয়া
সে বুঝিয়াছে যে এ লােকটি নিজে অত্যন্ত দরিদ্র এবং কাল
হয়তো সে নিজের শেষ সম্বলটুকুই উজাড় করিয়া দিয়া আসিয়াছে।
আপন ভােলা এই লােকটির প্রতি শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতার কথা
বলিবার ভাষা পৰ্যন্ত সে যেন হারাইয়া ফেলিল।
পুলচেরিয়া উঠিয়া পড়িলেন—তাহাদের এইবার বাসায় ফিরিয়া
যাইতে হইবে। দুনিয়া উঠিয়া দাদার হাতটা লইয়া খানিকটা
খেলা করিল। কী জানি কেন এই মুহূর্তে তাহার নিজেকে
অত্যন্ত সুখী বলিয়া মনে হইল। সে চলিয়া যাইবার সময়
সােনিয়াকে নমস্কার করিয়া গেল। সােনিয়া যন্ত্র চালিতের
প্রতি নমস্কার করিল।
র্যাকনিকফ, সহসা রাজুমিখিকে বলিল, “তুমি ম্যাজিষ্ট্রেট
পরফিরিয়াস-এর বাড়ী জানাে?”
“হ্যা, কেন বলাে তাে?”
“সেই বুড়ীটার কাছে যারা জিনিসপত্র বাধা দিত তাদের
নাকি পফিরিয়াস নানা রকম জেরা করছে। আমার দুটো
মত

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
t
জিনিস বাধা দেওয়া ছিল-সেগুলাে যদি ছাড়ানাে যায়। চলাে
দেখি লােকটার কাছে একবার যাওয়া যাক।” রাস্কনিকফ
সহজভাবে রাজুমিখিনের সম্মতি প্রার্থনা করিল।
“চলল। পুলিশ অফিসের চেয়ে ও ম্যাজিষ্ট্রেট অনেক ভালো।
এখনই চলে।” রাজুমিখি প্রফুল্লচিত্তে যাইতে উদ্যত হইল।
আজ যেন সব কিছুই সুন্দর এবং স্বাভাবিক ভাবে ঘটিয়া
যাইতেছে।
তাহারা নীচে নামিয়া বাড়ীর বাহির হইল, তাহাদের সঙ্গে
সােনিয়াও রাস্তায় নামিল। তাহার বুকের মধ্যে কী যেন উদ্বেল
হইয়া উঠিতেছে। র্যাকনিকফ, তাহার বাসার ঠিকানা জানিতে
চাহিল। সােনিয়া এবার আর চোখ তুলিতে পারিল না। নত
নেত্রে অস্ফুট স্বরে ঠিকানা বলিয়া ফেলিয়াই যেন তাহার ছুটিয়া
পলাইতে ইচ্ছা হইল। রাস্কনিকফ, কথা দিল যে কাল সে
ক্যাথারিণের বাড়ী নিশ্চয়ই যাইবে এবং পরিহাস করিয়া বলিল
যে সােনিয়ার ঠিকানা যখন সে জানিয়া লইয়াছে তখন যে কেন
সময় সােনিয়ার আতিথ্য স্বীকার করিতে পারে।
বিদায় লইয়া সােনিয়া অতি দ্রুত পদে তাহার বাসার দিকে
চলিল। সে মনে মনে বলিল, “হে ভগবান্ সে কী করে
হবে? আমার ঐ ঘরে ওঁকে আমি কেমন করে বসতে দেবাে?”
এ তাহার কি হইল? কী করিবে সে?
সােনিয়া যখন ব্ল্যাকনিকফের কাছ হইতে বিদায় লইল ঠিক
সেই সময় হইতে একটা লোেক তাহাকে অনুসরণ করিতেছিল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট নিজের চিন্তায় বিভাের হইয়া সােনিয়া সেই লােকটাকে দেখিতে পায় নাই। বাসায় গিয়া নিজের ঘর খুলিবার সময় সেই লােকটা তাহাকে বলিল, “আপনি বুঝি এই বাড়ীতেই থাকেন? আমি আপনার পাশের ঘরেই থাকি।” বলিয়াই লােকটা তাহার সােনিয়ার পাশের ঘরের দরজাটা খুলিল। ঐ লােকটার প্রতি মনোেযােগ দিবার সময় যেন সােনিয়ার নাই। সে এখন তাহার এই অভিনব অভিজ্ঞতার নিবিড় আনন্দটুকু শুধু একা থাকিয়া নির্জনে উপভােগ করিতে চায়। সােনিয়া লােকটার উদ্দেশ্য বুঝিবার চেষ্টা করিল না। ব্ল্যাকনিকফ ও রাজুমিখি যখন পরফিরিয়াসের বাড়ী গিয়া উপস্থিত হইল তথন, দুইজনেই বহুদিন পরে হর্ষোৎফুল্ল- চিত্তে ঠাট্টা তামাসা করিতেছিল। আজ অপ্রসন্ন হইবার কোন কারণ ঘটে নাই। পরফিরিয়াস সাদরে তাহাদের অভ্যর্থনা করিয়া বসাইলেন। তিনি র্যাকনিকফকে যেন চিনিতেন বলিয়াই বােধ হইল। রাস্কনিকফ, বলিল যে তাহার একটা ঘড়ি এলেনা বুড়ির নিকট সে বন্ধক রাখিয়াছিল। এ ঘড়িটা তাহার পিতার দান কাজেই ঘড়িটি সে ফিরিয়া পাইতে চায়। পরফিরিয়া বলিলেন, উহার জন্য কিছু আটকাইবে না-দরখাস্ত করিলেই ঘড়িটা পাওয়া যাইবে। ব্যাপারটা এইখানেই মিটিয়া যাইত। কিন্তু পরফিরিয়া নানা ভাবে র্যাঙ্কলনিকফের সঙ্গে কথা কহিতে শুরু করিলেন। এবং পুলিশ অফিসের কেরাণী জ্যামেটফ, তাহার ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট সহিত যােগ দিল। তাহাদের কথাবার্তায় মনে হইল যেন এলেনার হত্যার সহিত র্যাকনিকফ-এর কোন ঘনিষ্ঠ যােগ আছে। পরফিরিয়াস “অপরাধ” সম্বন্ধে রাসকনিকফের সঙ্গে আলােচনা করিতে লাগিলেন। তিনি র্যাঙ্কলনিকফের লেখা একটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করিলেন যে প্রবন্ধে ব্যাস কনিকফ, বলিয়াছে যে এক প্রকার অতিমানব পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে যাহাদের বিরুদ্ধে কোন আইন চলে না। তাহারা বৃহত্তর আদর্শের জন্য খুন-ডাকাতি প্রভৃতি যে কোন অপরাধ করিতে পারে। তাহাদের অপরাধ অপরাধ নহে। পরফিরিয়াস বলিলেন যে, এই রকম কোন আদর্শবাদীই এলেনাকে খুন করিয়াছে। পরফিরিয়াসের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইল। র্যাস- কনিকফের কথায় কোথাও কোন ফঁাক পাওয়া গেল না। একটা দৃঢ় সম্বন্ধ সন্দেহ-জালের ভিতর হইতে রাসকনিকফ, অনায়াসে বাহির হইয়া আসিল। প্রাণপণে সে নিজেকে শক্ত করিয়া রাখিয়াছিল। পরফিরিয়াস, যখন সুচতুরভাবে তাহাকে ফাদে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছিল তখন রাসকনিকফ, বুদ্ধির প্রতিযােগিতায় হঠিয়া আসিবে না এই প্রতিজ্ঞা করিয়া নিজেকে প্রস্তুত করিয়া লইয়াছিল। পরফিরিয়াসের ফাদে সে ধরা পড়িল না বটে কিন্তু সে পরিষ্কার বুঝিতে পারিল যে ইহারা তাহাকেই সন্দেহ করে। যদিচ রাজুমিখি তাহাকে বুঝাইল যে তাহাকে উহারা কিছুতেই সন্দেহ করিতে পারে না, তথাপি সে প্রাণপণে নিজেকে সংযত

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
করিয়া ভাবিয়া দেখিতে লাগিল যে কোথাও কোন চিহ্ন
এখনো রহিয়া গিয়াছে কী না। রাজুমিখিকে বাড়ী যাইতে
বলিয়া সে নিজের ঘরে গিয়া দেওয়ালের সেই গর্তটা তন্ন তন্ন
করিয়া খুজিয়া দেখিতে লাগিল যদি কিছু পড়িয়া থাকে।
প্রায় অচেতন অবস্থায় সে বীভৎস স্বপ্ন দেখিল।
সে মনকে
বুঝাইল সে কোন মানুষকে হত্যা করে নাই, হত্যা করিয়াছে
রাষ্ট্র এবং সমাজের একটা নীতিকে। কিন্তু যে কার্যের জন্য
নিজের কাছেই তাহাকে অহরহ জবাবদিহি করিতে হয় সেখানে
বাহিরের জবাবদিহি সে ঠেকাইবে কী
কী করিয়া? নিজেকে
কেমন
করিয়া রক্ষা করিবে ভাবিতে গিয়া সে চক্ষের সম্মুখে
যেন সীমাহীন অন্ধকার দেখিতে পাইল। কিন্তু তবু তাহাকে
বাঁচিতে হইবে! কে যেন তাহাকে বলিল, সে খুনী, তাহাকে
শান্তি গ্রহণ করিতে হইবে। সে বলিয়া উঠিল, কেমন করে
ধরবে যদি আমি ধরা না দিই। কিন্তু তাহার মনে হইল কে
যেন তাহার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিয়াছে—সে কিছুই বলিতে পারিল না।

৮ সন্ধ্যার সময় প্রথম চোখ খুলিয়া যাহাকে সে দেখিল সে একটি অপরিচিত ব্যক্তি। লােকটিকে দেখিয়া মনে হইল যে সে যেন তাহার নিদ্রাভঙ্গের অপেক্ষায় অনেকক্ষণ দাড়াইয়া আছে। তাহাকে জাগ্রত দেখিয়া লােকটি ঘরের ভিতরে আসিয়া দাড়াইল। রাস কলনিকফ, চাহিয়া দেখিল লােকটি স্কুলাকৃতি, শ্মশ্রুগুচ্ছের বাহুল্যবশতঃ তাহার মুখের চেহারাটা স্পষ্ট দেখা গেল না তবে তাহাকে দেখিয়াই মনে হয় যৌবনের সীমা সে বহুদিন পার হইয়া আসিয়াছে। কিয়ৎক্ষণ নীরবে অপেক্ষা করিয়া লােকটি নিজের পরিচয় দিল, তাহার নাম বলিল, “আরকেডিয়াস, সিড্রিগেলফ,।” সিড্রিগেলফ। তাহা হইলে এই লােকটিই দুনিয়ার সর্বনাশ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, ইহারই কামনার ইন্ধন জোগাইতে পারে নাই বলিয়া তাহার লাঞ্ছনার একশেষ হইয়াছিল! রাস- কলনিকফু ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। লােকটি কিন্তু সে দৃষ্টি যেন দেখিতে পায় নাই এমনই ভারে অনর্গল কথা বলিয়া চলিল। সে জানাইল একদা তাহারই ভগিনীর প্রেমে পড়িয়া সে তাহাকে লইয়া পলাইয়া যাইবার প্রস্তাব করিয়াছিল এবং সেই ডুনিয়াকে সে আজও শ্রদ্ধার চক্ষে দেখে, ইত্যাদি। লােকটার নিল্লজ্জতায় র্যাকনিকফ, ধৈৰ্য্য হারাইল। দরজা ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট দেখাইয়া দিয়া কহিল, “তােমার কথা শােনবার সময় আমার নেই। আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও-একটাও কথা নয়-বেরােও।” সিড্রিগেলফ, হাসিয়া কহিল, “আপনার সঙ্গে পরিচয়টা এ রকমভাবে আরম্ভ করাটা ঠিক হয় নি। আপনার মেজাজটা বুঝতে পারি নি। যাই হােক, শুনুন বলি, আপনার ভগিনীর সঙ্গে আমি আমার বাগানে যেদিন দেখা করি সেই দিনটি ছাড়া আর কোন দিন তাঁর আমি কোন অসম্মান করি নি। আমার স্ত্রী মাফা” “শুনেছি তাকে তো তুমি নিজে মেরে ফেলেছ!” “আপনি শুলেও কথাটা সত্যি নয়। সে হঠাৎ মাথার শির ছিড়ে মারা যায়। দু’দিন ছাড়া জীবনে কখনো আমি তাকে চাবুক মারি নি।” ইহার পর সিড্রিগেলফ, তাহার জীবনের ইতিহাস বলিয়া চলিল। মাফার মৃত্যুতে তাহার জীবনের অনেকটা ক্ষতি, অনেকখানি স্থান শূন্য হইয়া গিয়াছে। তাহার অলস লম্পট এবং মদ্যপ জীবনের কথা যখন সে অকপটে বলিয়া চলিল তখন রাসকনিকফের বিস্ময়ের অবধি রহিল না। তাহার কথা শুনিয়া মনে হইল পত্নীর মৃত্যুতে সে কিছু বদলাইয়া গিয়াছে। সে বলিল প্রায়ই মাফার ছায়ামূৰ্ত্তির সঙ্গে তাহার সাক্ষাৎ হয়। বলিবার অকপট ভঙ্গীর জন্য তার কথা বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয়। তথাপি তাহার ইতরজনােচিত রুক্ষতায় রাসকনিকফ, অত্যন্ত বিরক্তি বােধ করিতেছিল এবং সিড্রিগেলফ, যখন বলিল যে লুশিনের মত একটা বদ লােকের সঙ্গে ভুনিয়ার বিবাহ হইলে সে বিবাহ সুখের হইত না, তখন তাহার ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট অযাচিত আত্মীয়তায় গ্যাসকনিকফ, ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল, ধমক দিয়া কহিল, “তোমার আসল কথাটা কী বলল দেখি। এক কথায় বলল নইলে-” “ব’ছি”, সোৎসাহে সিড্রিগেলফ, বলিতে সুরু করিল, “আমার স্ত্রীর অনেক অনেক টাকা ছিল আগেই বলেছি। তার টাকাতেই আমার চলে। কয়েক বছর আগে আমার স্ত্রী আমাকে একসঙ্গে অনেক টাকা উপহার দিয়েছিল। আমার ইচ্ছে যে আপনার ভগিনীর সঙ্গে একবার দেখা করবাে-আপনিও তখন উপস্থিত থাকবেন না হয়। আমি তাকে জানাবো যে যদি তিনি লুশিকে বিবাহ করার প্রস্তাব বাতিল করেন তা হলে আমি লুশিনের ক্ষতিপূরণ করবার জন্য যত টাকা লাগে তাকে দিয়ে দেবাে। আর তিনি বদি দয়া করে গ্রহণ করেন তা হলে আমি তাকে আমার এই দশ- হাজার টাকা দিয়ে দেবো, মানে, আমি একদিন তার যে অনিষ্ট করেছিলুম এ ধরুন তারই ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া হবে । দেখুন - “তুমি কী পাগল হলে নাকি?” র্যাঙ্কনিকফ, বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল। লােকটার বদান্যতায় সে যেন অপমানিত বােধ করিল, কহিল, “তােমার সাহস তো কম নয় !” “আমি জান্তুম আপনি চটে উঠবেন। কিন্তু এ টাকাটা অন্য উপায়ে ব্যয় করবাে। আমার হাতে এখন অনেক টাকা। আমার কোন দুরভিসন্ধি নেই। • আমি তাকে টাকা দিয়ে তার কিছু উপকার করতে চাই শুধু এই জন্য, যে লােকে জানবে আমি কেবলই তার ৭

১৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
অনিষ্ট করে যাইনি। তাছাড়া এ টাকা দিয়ে আমি দুনিয়াকে
আমার মহত্ব দেখিয়ে মুগ্ধ করতে চাইনা কেননা আমি শীঘ্রই একটী
মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আপনি আমাকে বিচার করুন
আমার সব কথা ভালাে করে বুঝে। আমি ঘার অনিষ্ট করেছি
তার এতটুকু মঙ্গল করবারও কী অধিকার আমার নেই ? আমি
একবার তার সঙ্গে দেখা করবো।” তাহার কণ্ঠে ব্যাকুলতা
প্রকাশ পাইল।
“সে হতে পারে না।" কঠিন কণ্ঠে র কনিকফ, উত্তর দিল।
“তা হলে আমি উঠলুম।” সিড্রিগেলফ, উঠিয়া দাড়াইল। সে
দুঃখিত হইল কি না তাহার মুখ দেখিয়া বোঝা গেল না। • শুধু
অন্যমনস্কভাবে ঘরের দরজার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল।
কয়েক পদ অগ্রসর হইয়াই সে ফিরিয়া দাড়াইয়া কহিল, “হ্যা,
মনে পড়েছে। মৃত্যুর সপ্তাহ খানেক পূর্বে আমার স্ত্রী আপনার
ভগিনার নামে তিন হাজার টাকা উইল করে দিয়েছেন। আপনার
ভগ্না ইচ্ছে করলে সে টাকাটা নিয়ে নিতে পারেন। আপনি তাকে
ববেন, ভুলবেন না যেন! গুডবাই।”
সিড্রিগেলফ ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।
পরক্ষণেই রাজুমিখি প্রবেশ করিল, কহিল, “একটা লােক
তােমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল না? লােকটা কে 'হে ?”
“ঐ লােকটাই সিড্রিগেলফ,। ওরই জন্য দুনিয়াকে অনেক
অপমান সইতে হয়েছে। লােকটার হাত থেকে দুনিয়াকে রক্ষা
করতে হবে।
ওর নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
৯৯
“থাক্ না মতলব। ও দুনিয়ার কী করবে?”
তখন রাত্রি ঘনাইয়া আসিয়াছে। দুই বন্ধুতে মিলিয়া ডুনিয়াদের
বাসার দিকে রওনা হইল। পথে হঠাৎ র্যাকনিকফ, বলিল;
“দৈখ রাজুমিখি আমার মনে হচ্ছে এ ক’দিন যা কিছু ঘটেছে সবই
আমার কল্পনা। আসলে সব ঠিকই আছে। আমি কেবল স্বপ্ন
দেখছি যে ভয়ঙ্কর সব কাণ্ড হয়ে গেছে।”
“চুপ করে দিকি। আজ আমি আবার পরফি রিয়াদের কাছে
গিয়েছিলুম। সে বেটা তােমার সম্বন্ধে বাকা বাঁকা কথা কইছিল।
ওদের নিশ্বাস যে ঐ খুনের ব্যাপারটায় তােমার কোন হাত আছে।
আমি বলে এসেছি এ রকম আর একটা কথা বলে ও নাজিস্ট্রেটকে
আমি দেখে নেবে। বেটা কী শয়তান! তুমি আর কিছু ভেবে।
না। ও যদি পারে তাে তোমায় ধরুক।”
র্যাকনিকফ, বন্ধুর হৃদয়ের পরিচয় পাইল। কিন্তু রাজুমিথি
যেদিন শুনিবে যে সে সত্যই আসামী ! হত্যার অপরাধে যেদিন
তাহার দণ্ড হইবে, সেদিন? কথাটা ভাবিতেই তাহার হাত পা
যেন অবশ হইয়া আসিল।
তাহার ডুনিয়াদের বাসায় প্রবেশ করিতেই লুশিনের সঙ্গে দেখা
হইয়া গেল, লুশিও ঠিক ঐ সময় হাজির হইয়াছে। তিনজনে
একই সঙ্গে ডুনিয়ার ঘরে ঢুকিল কিন্তু কেহ কাহারও সহিত আলাপ
করিল না। দুনিয়া ও পুলচেরিয়া অভ্যর্থনা করিয়া সকলকেই
বসিতে বলিলেন। র্যাকনিকে দেখিয়াই লুশি
লুশি চটিয়া
গিয়াছিল। সে বাড়ীর দরজা হইতেই ফিরিয়া যাইতেছিল ; কেবল

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
দুনিয়া ও তাহার মাতা কেন তাহার অনুরোধ (যাহাকে সে আদেশ
বলিয়াই মনে করে) উপেক্ষা করিয়া ইহাদের ও আসিতে বলিয়াছে
সেই কারণটা জানিবার জন্য ফিরিয়া আসিল।
সকলেই চুপ চাপ,। লুশিন্ পুলচেরিয়কে দু’একটা কুশল প্রশ্ন
করিল। তারপর আবার সকলে নীরব। পুলচেরিয়াই প্রথমে
কথা বলিলেন, “লুশিন্ তোমার সেই অত্মীয়া মাফ। সিড্রিগেলফ,
মারা গিয়েছে শুনেছ বােধ হয় ? ওর স্বামীই ওকে মেরে ফেলে।”
“হ্যা, হঁ্যা, শুনেছি বটে। সিড্রিগেলফ নাকি এখানে এসেছে!”
“সে কি! সিড্রিগেলফ, সেন্ট পিটারবর্গে এলে কেন?”
পুলচেরিয়া ভীত হইয়া পড়িলেন, দুনিয়ারও মুখ শুকাইয়া গেল।
“আমি ওর সব খবর জানি না। তবে মাফ মারা যাবার পর
অনেক টাকা ওর হাতে এসেছে। বেচারী মাফ! স্বামীর যত
ঋণ শোধ করেছে আর স্বামীকে জেল থেকে বাঁচিয়েছে তার ইয়ত্তা
নেই। একবার সিড্রিগেলফ, খুনের দায়ে পড়েছিল, সেবারেও
মাফার টাকার জোরেই ও বেকসুর খালাস পেয়েছিল।”
“আপনি কী ঠিক জানেন যে ও খুনের দায়ে পড়েছিল দুনিয়া
প্রশ্ন করিল। র্যাকনিকফ, অত্যন্ত মনোযােগ সহকারে শুনিয়া
যাইতেছিল।
“আমি অবিশ্যি মাফর কাছে যা শুনেছি তাই বলছি।
সিড্রিগ-এর কীর্তির শেষ নেই। র্যালি বলে একটা মেয়ের
সঙ্গে ওর
রহস্যজনক সম্বন্ধ ছিল। ঐ মেয়েটীর এক
বােঝিকে একদিন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে দেখা যায়।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট পুলিশ সিড্রিগেলফকে গ্রেফতার করে। প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল অনেক কিন্তু মাফ। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে কেসটাকে ঘুরিয়ে দিলে। আর একবার ওর একটা চাকরকে ও মেরে ফেললে, অবিশ্যি মাফর টাকার জোরে প্রমাণ করা শক্ত হ’ল না যে চাকরটাকে ও মারেনি, সে আত্মহত্যা করেছে।” “আমি কিন্তু শুনেছিলুম চাকরটার মাথা খারাপ ছিল যখন তখন যা তা করতাে। আত্মহত্যা করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল না। আর সিড্রিগেলফ, তে চাকরদের সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেন। “দেখুন, মিস, ইউডসিয়া রাসকনিকফ, আপনি যেন ঐ লােকটাধ ওকালতি করছেন!” তাহার ও৮ে একটা নীচ বিদ্রুপের হাসি খেলিয়া গেল। “আমি কী করি বলুন, লােকটাই যে শয়তান। এই দেখুন না, মাফার মৃত্যুর জন্যও লোকে একেই সন্দেহ করে। আমার মনে হয় দেনার দায়ে লােকটা ঙ্গেলে পচে মরবে। নাফ। যে টাকা রেখে গেছে সে তো ও ক'দিনেই নষ্ট করে ফেলবে।” “থাক্, থাক, মিঃ লুশি। অন্য প্রসঙ্গ আলােচনা করুন।” নিয়ার যেন অসহ্য বোধ হইতেছিল। এ লােকটা অকারণে 'মর একজনের নামে অযথা কুৎসা রটনা করিতেছে। ইহার নিজের সাধুতার দম্ভ অসহ! “একটু আগে সিড্রিগলফ, আমার কাছে এসেছিল।” র্যাস- লনিকফ হঠাৎ বলিয়া উঠিল সে এতক্ষণ চুপ করিয়া লুশিনের

১০২
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
মন্তব্যগুলি শুনিয়া যাইতেছিল, তাহার এই কথায় পুলচেরিয়া ও
ডুনিয়ার বিস্ময়ের অবধি রহিল না। সকলেই সবিস্ময়ে তাহার
দিকে ফিরিয়া চাহিল।
“লােকটা বেশ ভদ্র এবং খােশ, মেজাজের। অনেক কথা
সে আমায় বলেছে। ডুনিয়া, সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে
চায়, এ ছাড়া সে তােমায় কী যেন ।
লতে চায়তার একটা
প্রস্তাব আছে। সে বলে মাফ। মারা যাবার সময় তােমার
নামে তিন হাজার রাবল ( টাকা) উইল করে দান করে
গেছে, তুমি সে টাকাটা তুলে আনতে পারে।”
“মাফার আত্মা শান্তি লাভ করুক! বলিয়া পুলচেরিয়া
ক্রশ-চিহ্ন আঁকিলেন।
“আর কী বলে সে?” ডুনিয়ার যেন দম বন্ধ হইবার উপক্রম
হইল।
“বলে যে তার তেমন টাকা কড়ি নেই। মাফর সম্পত্তি
ছেলেমেয়েদের নামে উইল করা আছে, তারা বড় হলে পাবে ।
আরও অনেক কথা।”
“তার কী প্রস্তাব করবার আছে বলেছে ?” পুচেরিয়া
প্রশ্ন করিলেন।
“বলেছে বটে কিন্তু সে কথা এখানে এখন বলা যায় না।”
বলিয়াই ব্যাকনিকফ, নিলিপ্তভাবে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিল।
“আমি তা হলে উঠি । আপনাদের আর বিরক্ত করবে।
না।” বলিয়াই লুশিন টুপী হাতে করিল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১০৩
“কিন্তু আপনি যে আজ কী জরুরী আলােচনার করবার কথা
জানিয়েছিলেন ?” ডুনিয়া বলিল।
“তা ছিল বটে। একটা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় নিয়ে আপনি
এবং আপনার মায়ের সঙ্গে আমার আলােচনা করবার ইচ্ছে
ছিল। কিন্তু আপনার ভাই যখন সিড্রিগেলফ এর প্রস্তাবটা
আমার সামনে বতে পারেন না, আমিও ঐ গুরুতর বিষয়টা
আপনার ভাইয়ের উপস্থিতিতে আলােচনা করতে চাই না।
তাছাড়া আপনারা আমার একটি সনির্বন্ধ অনুরােধ অবহেলা
করেছেন।” লুশিনের মুখখানা সহসা অত্যন্ত কঠিন হইয়া উঠিল,
সে যেন এইবার আঘাত করিবার সুযােগ পাইয়া উদ্যত হইয়া
উঠিয়াছে।
“দেখুন, আমি জানি যে আপনি আমাদের আলােচনায়
আমার দাদাকে উপস্থিত হতে বলতে নিষেধ করেছিলেন।
আপনার সে নিষেধ আমার কথাতেই এরা উপেক্ষা করেছেন।
আমার ভাইএর সঙ্গে আপনার যদি কোন বিরােধ ঘটে থাকে তা
হলে তার মীমাংসা করতে হবে। রােডিন যদি আপনাকে অপমান
করে থাকে তা হলে সে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।”
ডুনিয়ার কথা শুনিয়া তাহার আঘাত করিবার প্রবৃত্তি দুৰ্ব্বার
সে কহিল, “পৃথিবীতে এমন কোন ভালো লােক
নেই যে সে অপমান ভুলতে পারে। প্রত্যেক জিনিসের একটা
সীমা আছে একথাটা সকলের স্মরণ রাখা উচিত।”
“আপনাকে আমি মহৎ এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলেই জানি।
হইয়া উঠিল ।

১০৪
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
এ রকম মনােভাব আপনি পরিত্যাগ করুন। আপনাদের মধ্যে
যদি এই বিরােধের অবসান না হয় তাহলে আমার পক্ষে
দু’জনের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখা কঠিন হবে। বিশ্বাস করুন, তা হলে
হয় আমার ভাইকে পরিত্যাগ করে মাপনাকে গ্রহণ করতে
হবে না হয় আপনার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ না রেখে আমাকে
আমার ভাই-এর কাছেই ফিরে যেতে হবে। আমি দেখতে
চাই আমার ভাবী স্বামী আমার মর্যাদা রেখে চলেন पत
শ্রদ্ধার সঙ্গে আমার কথা
“মিস, ইউডকিসয়া, আপনি আপনার ভাই-এর মত একজন
উদ্ধত প্রকৃতির যুবককে আমার সঙ্গে সমান মর্যাদার আসনে
বসিয়ে দিলেন—এতে আমি অপমানিত বোধ করছি। আপনি
হয় আমাকে নয় আপনার ভাইকে বেছে নিতে চান। আপনি
আমাদের প্রস্তাবিত বিবাহ নাকচ, ক’রতেও দ্বিধা করবেন না
বলেই মনে হচ্ছে। এর দ্বারাই প্রমাণ হচ্ছে যে
আমি
আপনার চোখে কত ক্ষুদ্র !”
“কী বলেন? আমার ভাই-এর সঙ্গে
সঙ্গে আপনাকে একই
মৰ্যাদা দিয়েছি বলে আপনি অপমানিত বােধ করছেন?
আমার জীবনে সকলের চেয়ে যা প্রিয় তার সঙ্গে আপনার তুলনা
ক’বুলে আপনাকে ছােট করা হয় ?”
ডুনিয়ার মুখ লাল হইয়া উঠিল। র্যাকনিকফের মুখে
ঈষৎ বিদ্রুপের হাসি দেখা দিল, রাজুমিখি
দিল, রাজুমিখিন্ নির্লিপ্ত ভাবে
বসিয়া থাকিবার চেষ্টা করিল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
লুশি এইবার যেন হিংস্র হইয়া উঠিল, চীৎকার করিয়া
কহিল, “কিন্তু স্বামীর প্রতি ভালােবাসা তার চেয়েও বড় হওয়া
উচিত। কোন রকমেই আমাকে আপনার ভাই-এর সমপর্যায়ে
ফেলা চলবে না। একটা কথা এখানে স্পষ্ট হওয়া দরকার।”
এইবার সে পুচেরিয়ার দিকে ফিরিয়া কহিতে লাগিল, “আপনাদের
আমি একদিন বলেছিলুম, যে-কোন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে
তার স্বামীকে অধিকতর শ্রদ্ধা করে এবং ভালােবাসে। আপনার
ছেলে কাল এই কথার কদৰ্থ করে আমাকে অপমান করেছেন।
তার বিশ্বাস যে এতে আমার কোন দুরভিসন্ধি আছে, আমি তার
ভগ্নীকে বিবাহ করে অত্যন্ত হীনভাবে রেখে দেবে। আপনার চিঠিতে
নিশ্চয়ই আপনি তাকে আমার কথার ঐরূপ অর্থ ই জানিয়েছেন।”
“আমার তো তা মনে পড়ছেন।”
“তা হলে কী আমিই ভুল বুঝেছি ?”
“কিন্তু তুমি যেন বােডিয়নের দোষ ধ’রতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ
করেছ ! আজ চিঠিতে তুমি ওর নামে মিথ্যা অভিযােগ করেছ।”
“কোন অসত্য লিখেছি বলে আমার মনে পড়ছে না।”
এতক্ষণে রাস কলনিকফ, কথা কহিল। সে লুশিনের দিকে
না তাকাইয়া কহিল, “আপনি লিখেছিলেন যে সেই সদ্যবিধবাটিকে
সাহায্য করার নাম করে আমি মৃতব্যক্তির কন্যাকেই টাকা
য়েছি। সমাজে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করবার জন্য আপনি
ঐ মেয়েটির চরিত্র সম্বন্ধে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছেন। ঐ মেয়েটির
সম্বন্ধে আপনি কিছুই জানেন না।”

১০৬
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেট
“আপনি ঐ মেয়েটির চরিত্র সম্বন্ধে তার দাবী করতে
পারেন? আপনি ঐ মেয়েটিকে ভদ্র সমাজে স্থান দিতে পারেন ?”
লুশিন ক্রোধে কঁপিতে লাগিল।
“আপনি ঐ মেয়েটির একটি আঙ্গুলের ও যােগ্য নন্। আমি
তাকে আজই আমার মা ও বােনের পাশে বসতে দিয়েছি!”
“রােডিয়ন্।” পুচেরিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন। লুশি
হাসিল, নিৰ্ম্মম বিজপে তাহার ও তীক্ষ হইয়া উঠিল।
“ব্যাস, আর কোন কথা নয়! আমি চললাম, আশা
করি
এরকম ভাবে আর আমাকে অপমানিত করবার জন্য
ডাকবেন না। মিসেস, র্যাস কলনিকফ, আপনাকেই আমি ঐ
অনুরােধ করেছিলাম।”
“তােমাকে বলা হয়েছে যে কেন তোমার কথা রাখা হয়
নি। আমরা গরীব বলেই কি তােমার কথাটা আদেশ মনে
করে মেনে চলবো?”
“এখন আর সে কথা বলি কি করে! মাফর তিন
হাজার টাকা যখন পাচ্ছেন তখন আর আপনাদের এই অপমানে
আমি আশ্চর্য্য হচ্ছি না।” লুশিনের তিক্ত কণ্ঠ যেন চিরিয়া
গেল।
“আপনি তা হলে আমাদের দারিদ্র্যের সুবিধা নিয়েই আত্মীয়তা
করবার চেষ্টা করেছিলেন ?” ডুনিয়া কহিল ।
“এখন আর তা বলা চলে না—বিশেষ করে যখন সিড্রিগেলফ,
আপনার কাছে কী একটা প্রস্তাব করছে শীঘ্রই!”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১০৭
“ডুনিয়া,আরও লজ্জিত হতে চাও?” র্যাকনিকফ, প্রশ্ন করিল।
“না, দাদা!” রাগে অপমানে ডুনিয়ার মুখে যেন রক্ত উঠিয়া
আসিল, তথাপি সংযত কণ্ঠে কহিল, “পিটার লুশি, বর থেকে
বেরিয়ে যান্!”
লুশিন্ এতটা ভাবিতে পারে নাই। সে কহিল, “ভেবে দেখ
ডুনিয়া কী ব’ছ, এর ফল কী হবে”
“বেরিয়ে যাও ঘর থেকে ! তোমার লজ্জা করছে না?” ডুনিয়া
উঠিয়া দাড়াইল।
“বুঝেছি। হাওয়া তাহলে এই দিকেই বইছে! কিন্তু পুচেরিয়া
আপনার কথা শুনে আমার কিছু খরচপত্রও হয়েছে। সেটা কি”
“খরচপত্র ! যাই হােক্ সে তুমি পাবে।”
আর একটা কথা। মিস ইউডকিসয়া বােধহয় ভোলেন নি যে
আমি যখন তার পাণিপ্রার্থনা করেছিলুম তখন তার সম্বন্ধে সমাজে যে
আলােচনা হত সেটা ঠিক ভদ্র কন্যার সম্পর্কে প্রযোজ্য হয় না।
আমি অবিশ্যি তখন তাকে বিশ্বাসই করেছিলুম। এখন আমার •
চোখ খুলেছে—সমাজের মতামত অগ্রাহ্য করা দেখছি ঠিক হয়
ন। সবটাই মিথ্যা গুজব নয়”
শেষ আশাটুকু যখন আর রহিল না তখন লুশিনের সকুল ভদ্রতার
আবরণ নিমেষে খসিয়া গেল।
রাজুমিখি লাফাইয়া উঠিয়া কহিল, “লােকটার মাথাটা না
ভঙে দিলে এখান থেকে যাবে না দেখ ছি !”
সে লুশিনের দিকে আগাইয়া চলিয়াছিল, রাস্কনিকফ তাহাকে

১০৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
ধরিয়া দাঁড়াইয়া লুশিনকে কহিল, “আর একটা কথা নয়।
যাও, নইলে-”
লশি আর দাড়াইল না। ক্রোধে, অপমানে সে
হারাইয়াছিল তথাপি সিড়ি দিয়া নামিতে নামতে তাহার মনে হইল
যে এখনাে নিরাশ হইবার কিছু নাই—হয় তো আবার সব ঠিক
হইয়া যাইবে ।
লুশিন্ চলিয়া যাইবার পর কিছুক্ষণ সকলেই প্রফুল্লচিত্তে নানাবিধ
প্রসঙ্গ আলােচনা করিতেছিল। দুনিয়া দিও আজিকার এই
অপ্রীতিকর ঘটনাটার কথা মনে করিয়া মনে মনে অত্যন্ত পীড়িত
বােধ করিতেছিল তথাপি সেও ক্রমশঃ খুশী হইয়া উঠিল। রাজুমিখি
সানন্দে একটা পুস্তকের ব্যবসা দিবার পরিকল্পনা করিতেছিল ।
সে সবিস্তারে তাহার পরিকল্পিত ব্যবসার খুঁটিনাটি বর্ণনা করিতেছিল।
তাহার মানে, সে, রাসকনিক ও ডুনিয়? তিন জনেই ব্যবসার
অংশীদার হইবে ! তাহারা পুস্তক প্রকাশ করিবে—সে নিজে অন্যান্য
ভাষার পুস্তক রুশ ভাষায় অনুবাদ করিয়া দিবে। তাহার কথায়
রাসকনিকফ,ও সােৎসাহে বলিল যে, ইহাতে তাহারও প্রচুর
সম্মতি আছে, সে নিশ্চয়ই এক জন অংশীদার হইবে ।
রাসকনিক, যোগদান করায় রাজুমিখিন্ রীতিমত উত্তেজিত
হইয়া উঠিল। তাহার গুড়া তাহাকে শীই কয়েক হাজার টাকা
দিবেন, কাজেই টাকার জন্য আটকাইবে না। এই বাড়ীটাই ভাড়া
লওয়া যাইবে। সে পুচেরিয়াকে কহিল, “আপনারা খুব সুখে
থাকবেন। এই
এই বাড়ীতেই রােডিয়নের সঙ্গে আপনারা থাকতে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১০১
পারবেন, আমরা ব্যবসা চালাবো-একি ! রেডিয় তুমি উঠছ
কেন ? এখনই যাচ্ছ কোথায়?”
রাস্কনিকফ, উঠিয়া দাঁড়াইয়া সহসা বলিল, “এই হয়তো
তােমাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা ! মা, দুনিয়া তােমরা আমার
খোজ করাে না। আমি এই কথাটা আরও আগে বলবাে মনে
করেছিলুম কিন্তু ভুলে গিয়েছি।”
কথাগুলো যেন সম্পূর্ণ তাহার অজ্ঞাতে সে বলিয়া গেল।
আমাকে তােমরা ত্যাগ করাে—আমি একা থাকতে চাই। দরকার
হলে আমি আবার তোমাদের কাছে ফিরে আসবো—হয়তাে সব
ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু এখন আমি যাই—আমি বাই-”
পুচেরিয়া ও দুনিয়া তাহার হাত ধরিলেন ।
মাতা ও ভগ্নী উভয়েরই চোখে জল আসিল।
“কী হল? রেডিয় আমাদের কাছে থাক্ বাবা-আমরা
তাের কী করেছি?” পুলচেরিয়া কঁদিয়া ফেলিলেন। তাহার
হাতদু’টা ধরিয়া ঝাঁকানি দিয়া ডুনিয়া কহিল, “দাদা, তােমার কী,
দয়ামায়া নেই ? মা কাদছে দেখছো না—কী হ’ল তােমার ?”
রাস্কনিকফ, কাহারও কথা শুনতে পায় নাই—নিজে কী
বলিল তাহাও সে যেন ভুলিয়া গিয়াছে। মাথা নিচু করিয়া অস্ফুটস্বরে
সে কহিল, “কিছু নয়—কিছু নয়। আমি আবার ফিরে আসবে—
ফিরে আসবে!”
আপন মনে কী যেন বলিতে বলিতে ডুনিয়ার হাত ছাড়াইয়া
সে বাহির হইয়া গেল।

১১০ ক্রাইম এণ্ড পানিশনেট “উঃ, কী ভীষণ স্বার্থপর, নিৰ্দর তুমি দাদা!” দুনিয়া ভগ্নকণ্ঠে কহিল । “নির্দয় নয়—ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি দেখি যদি ওকে ফিরিয়ে আতে পারি !” রাজুমিখি তাহাকে ছুটিয়া গিয়া ধরিল, কিন্তু ব্যসকলনিকফ, ফিরিল না, শুধু শান্ত কণ্ঠে কহিল, “তুমি ওদের সঙ্গে থেকো ভাই- কাল হয়তাে কিছু ঘটবে ! না হয় আমি হয়তো ফিরে আসবো !” রাজুমিখি তাহাকে কী প্রশ্ন করিতে যাইতেছিল সে বাধা দিয়া কহিল, “কোন প্রশ্ন করাে না। শুধু আমায় একা চলে যেতে দাও--একা!” অন্ধকার সিড়ি দিয়া নামিতে নামিতে তাহার সর্বশরীর যেন প্রচণ্ড শীতে তুষারের মত শীতল হইয়া আসিতে লাগিল -এইমাত্র তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষা মর্মান্তিক সত্য যেন সে চক্ষুর সম্মুখে দেখিতে পাইয়াছে ! রাজুমিখন ফিরিয়া আসিয়া ক্রন্দনরত দু’টি রমণীকে সান্ত্বনা দিতে লাগিল। সেই এখন তাঁহাদের পুত্র, বন্ধু, সহচর !

রাসকনিকফ, সোজা সোনিয়ার বাসার দিকে চলিল। একটি তােলা ভাড়াটে বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া দরজি ক্যাপারনসুফ এর ঘর খুঁজিয়া বাহির করিল। এই খোঁড়া ও তােতলা দরজিটার রক্ষিত। সোনিয়া ! তিনখানা ঘর লইয়া তাহার থাকে, তাহারই একখান সোনিয়ার নিজস্ব। তবে সােনিয়ার ঘরটি উহাদের বর হইতে কিছু দূরে, মাঝে আরও কয়েকটা ঘর আছে। অন্ধকারে হাতড়াইতে হাতড়াইতে যখন সে সােনিয়ার ঘরের সম্মুখে উপস্থিত হইল তখন, ভৗত রমণী কণ্ঠ তাহাকে অভ্যর্থনা জানাইল, “কে 'ওখানে ?” “আমি। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলুম।” “একি। আপনি !” একটি বাতি হাতে করিয়া ঘরের বাহিরে আসিতেই সােনিয়া বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া গেল, তাহার গলার স্বর কাপিয়া গেল । ভাবিতে পারে নাই যে সত্য সত্যই রাসকনিকফ, তাহার বাড়ীতে সিসিতে পারে। কী করিবে ? কেমন করিয়া অভ্যর্থনা করবে চাহার এই ঘরে! জাবিতেই যেন তাহার মনের মধ্যে সব গোলমাল স্বা গেল। তাহার ভয় করিতে লাগিল। কিন্তু পরক্ষণেই কী মনে করিয়া তাহার রক্তহীন মুখ সহসা আরক্ত হইয়া উঠিল, দুই চক্ষু ভারে টলট করিতে লাগিল। বাতি হাতে করিয়া সে পথ ১১২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট দেখাইয়া ব্ল্যাকনিকফকে ঘরের ভিতর লইয়া আসিল। ব্যাক- নিকফ, তাহার মুখ দেখিতে পাইল না। একটা চেয়ারে বসিয়া র্যাকনিক, ঘরের ভিতরটা ভালো করিয়া দেখিয়া লইল। ঘরটি অনেকটা সিবার ঘরের মত। কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল এবং দের’জে ঘরটি ভর্তি হইয়া গিয়াছে। ঘরের এক কোণে অস্পষ্ট দীপালােকে একটি ছোট বিছানা দেখা গেল। আসবাবপত্রগুলি মূল্যবান কিন্তু সবগুলিই জীর্ণ, অযত্নে বিবর্ণ। যাহা কিছু চোখে পড়ে তাহাতেই দারদ্রের চিহ্ন পরিস্ফুট। রাস্কনিকফ, কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলল, “আর হয়তো এই শেষ আসা। হয়তাে আর তােমাকে দেখতে পাবো না।” সােনিয়া তাহার পাশে দাড়াইয়াছিল, তাহার মনে হইতেছিল যেন এই অদ্ভুত অতিথিটির হস্তেই তাহার ভাগ্যের চরম মীমাংসা করিবার ভার। র্যাকনিকফের কথায় যেন তাহার চমক ভাঙ্গিল, একটা অজানা আশঙ্কায় কাপিয়া উঠিয়া কহিল, “আপনি কি কোথাও চলে যাচ্ছেন ?” “জানি নে। তবে কাল, কালই সব—কি জানি কি হবে ! তােমায় একটা কথা বলতে এসেছি।” তাহার চোখ দুইটী যেন কিসের স্বপ্ন দেখিতেছে। সে সােনিয়ার হাত ধরিয়া তাহারই পাশে বসাইল। তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সােনিয়া বলিল, তাহার হাতটি তখনও র্যাকনিকফ, ধরিয়া রহিয়াছে। “তােমার হাতটি কী ছােট ! তুমি এত বােগা! মৃতের মত তােমার হাতে কোন উত্তাপ নেই।”

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
নাই।
“আমি বরাবরই এই রকম।” সােনিয়ার মুখে একটু ক্ষীণ হাসি
দেখা দিয়াই মিলাইয়া গেল।
ক্যাপানসুমফরা তাে ঐ দিকটায় থাকে ? আচ্ছা, ওরা
সকলেই কী একটু তােত লা?”
“হ্যা, ওরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই তােতলা। ছেলেরাও, তবে
সকলে সমান ভােলা নয়। কিন্তু আপনি এত সব জানলেন কী
করে ?”
“তােমার বাবার কাছে শুনেছিলুম।”
বাবার কথা শুনিয়া সোনিয়া মুখ নীচু করিয়া রহিল। বেদনায়
যেন সে ভাঙিয়া পড়িল। কিন্তু ব্যাসকনিকফ, কিছু লক্ষ্য করে
সে কহিল, “ক্যাথারিণ আর তার ছেলেমেয়েদের কী হবে ?
ওরা এখানে থাকবে কী করে? ওদের তো এখন তুমিই একমাত্র
ভরসা। তােমার টাকাই---
“আমার টাকা,
ওদেরও টাকা । ওরা আমার
ভরসা না করেই বা কী করবে?” সােনিয়া র্যাকনিকফের
কথায় ব্যথা পাইয়াছে। ঈষৎ উত্তেজিতকণ্ঠে কহিল, “আপনি
জানেন না, ক্যাথারিণ কা কান্নাই কাদে ! তার মাথা একেবারে
খারাপ হয়ে গেছে। ছোট ছেলের মত সে কাকে কী খাওয়াবে
এই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছে। মাঝে মাঝে সে কঁাদতে কাদতে
দেওয়ালে মাথা ঠোকে আর কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত
পড়ে। আবার যখন একটু ভালাে থাকে তখন সে বলে যে, গায়ে
গিয়ে একটা স্কুল খুলবে আর আমাকে তার মেট্র করে দেবে

১১৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেট ওর ছেলেমেয়েগুলো ভদ্রভাতে লেখাপড়া শিখ, শানুষ হবে এই ওখ একমাত্র সাধ। স্কুল খাের কনতে ও যেন নতুন জীবন পায়, এইটুকু কমনা করেই ও কী সান্ত্বনাই না পায় ! ধু একটু ভদ্র- লোকের মত থাকার জন্য ও কী না করে ! কি সেটুকুও ঈশ্বর ওকে দেন না। আজই কতকগুলাে সা খরচ করে সাবান দিয়ে নিজে সব পরিস্কার করলে ! উঃ সে যে কী প্রশ্রম ! তবু তাতে ওর কষ্ট হয় না । আপনি যদি ওকে জানতে! যেদিন থেকে আমি এ পথে নেমেছি সেদিন থেকে ও কদিন আমার জন্য কেঁদেছে।” বলিতে বলিতে সােনিয়ার কান্না আসল, উদগত প্রশ্ন রােধ করিয়া সে চুপ করিয়া গেল। “কাগরিণ বোধহয় বেশী দিন আর বাচ । র খ বেঁচেও থাকে,--কিন্তু তোমার অসুখ বিসুখ করলে ঐ ছেলেমেয়ে- গুলাের কী হবে ? তুমি কিছু জমিয়ে রাখতে নিশ্চই পারাে না?” “না। চেষ্টা করেও পারিনি।” “রােজই নিশ্চয় তােমার রােজগার হয় না? এই প্রশ্নের উত্তরে সে শুধু ঘাড় নাড়িল। জ্জায় আর মুখে সে আর মাথা তুলিতে পারিনা। হঠাৎ এত ঘনিতে লাগিল যেন সে খনই অচেত হইয়া পড়িবে । রাস্কনি কফ, আবার প্রশ্ন করিল, “আর পােলো? তার কী হবে? সেও কী তােমার মত এ পথে-- ‘ন না কখনই না-কখনই না। ভগবান তা কখনাে হতে দেবেন না। ভগবান্ ওকে নিশ্চই রক্ষা করবেন। সে A ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট শাকিছুতেই না?” সােনিয়া বিকৃত স্বরে চীৎকার করিয়া বলি, সহসা কে যেন তার মর্মস্থলে ছুরিকাঘাত করিয়াছে ! “ভগবান্ আরও অনেক কিছুই হতে দেন না।” “না-না। এ তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না।” সােনিয়া তাহার সমস্ত শক্তি নিয়া যেন এই কল্পনাটা দূর করিয়া দিতেছে । ব্যাসকনিকফ, তিক্ত স্বরে কহিল, “ভগবান্ ? তুমি নিশ্চয় ননা যে ভগবান বলে হয়তো কেউ নেই।” এবার আর সােনিয়া প্রতিবাদ করিল না। তাহার মুখের চেরসহসা কঠিন হইয়া উঠিল। সে তীব্র দৃষ্টিতে র্যাঙ্কনকফের দিকে চাহিয়া রহিল। বার কয়েক তাহার ওষ্ঠাধর কঁাপিয়া উঠিল, কিন্তু প্রবল উত্তেনায় তাহার মুখ দিয়া কোন কথাই বহির না, শুধু তাহার চাহনিতে যে কঠোর ভৎসনা ছিল তাহা বাস - কনিকককে বিদ্ধ করিতে লাগিল। র্যাকনিকফ, অন্য দিকে মুখ ফিরাইল। তারপর সহসা সােনিয়ার দুই বাহু ধরিয়া প্রবল ঝাকানি দিল। কু দৃষ্টিতে সে সােনিয়ার মুখের দিকে তাকাইল। সােনিয়ার ছােট্ট মুখখানি তখন অবিরল অশ্রুধারায় ভাসিয়া যাইতেছে, সে মুখ তুলিল কিন্তু অশ্রুভারে সিক্ত চোখ দুটি তাহার বন্ধ হইয়া গেল। র্যাঙ্কনিকফ এইবার সে অশ্রু দেখিল। কি জানি মনে করিয়া সে পরক্ষণেই ভূমিষ্ট হইয়া সােনিয়ার পা দু’টির উপর বার বার চুম্বন করিল। সােনিয়া ব্ৰস্ত হইয়া সবিয়া গেল। নিদারুণ বেদনায় তাহার অন্তর নিষ্পেষিত হইতেছে, তাহার উপর এ কী ! শঙ্কিত পাংশু

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
মুখে সে কহিল, “এ আপনি কী করছেন? আর আমাকে ?
ছি-ছি!”
ব্যাকনিকফ, উঠিয়া দাড়াইল। উদভ্রান্তের মত বলিল,
“আমি ঠিক তােমারই পায়ে মাথা রাখিনি—আমি পৃথিবীর সমস্ত
ব্যথিত ভাগ্যহত নর-নারীকে, আমার ভালােবাসা, আমার শ্রদ্ধা
জানালুম। তুমি তাে দেখেছ আমি আজই তােমাকে আমার মা-
বনের পাশে বসতে দিয়েছিলুম।”
“কেন দিয়েছিলেন ? কেন ?” সােনিয়া পাগলের মত বলিয়া
উঠিল।
কেন ? কারণ আমি জানি যে, এই পঙ্কিল জীবনকে
তুমি ঘৃণা করে। তােমার এই ত্যাগ হয় তা কোন উপকারে
আসবে না, কোন মঙ্গল হবে না। তবু আমি জানি তুমি প্রতিনিয়ত
নিজেকে এর জন্য শাস্তি দিচ্ছ। ঐ ছেলে-মেয়েগুলাের মায়াতে
তুমি আত্মহত্যা করেনি, তা না হলে হয়তো আত্মহত্যাই
করতে। আমি জানি, সােনিয়া, তােমার মাথার মধ্যে সব যেন
একাকার হয়ে যায়। তুমি পাগল হয়ে যাও। সােনিয়া, আমি আরও
কী জানি জানাে ? আমি জানি যে এম্‌নি করে তুমি কিছুতেই জীবন
যাপন করবে না।”
তাহার কথা শুনিয়া সােনিয়া শিহরিয়া উঠিল। এত কথা এই
লােকটা জানিল কী করিয়া ? রাকনফ, আর কিছু বলিল
না, শুধু ভাবিল যে সােনিয়া নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করিবে যেদিন
দেখিবে যে, কোন দৈববলেই তার জীবনে কোন শুভ ঘটিল না, ঈশ্বর

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১১৭ তাহার জন্য কিছু করিলেন না। রানিকফ-এর কথা শুনিয়া সােনিয়া স্বস্তি বােধ করিল। এই লােকটি যে তাহার সব কিছু জানিতে পারিয়াছে ইহাতে তাহার মনটা অনেকখানি হাল্কা হইয়া গেল। তাহার চোখ দুটি উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সে ব্যানিফের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠার মধ্যে ধরিয়া রহিল। র্যাকিফ, কিছুক্ষণ পরে টেবিল হইতে বাইবেল পুস্তকটি তুলিয়া লইয়া প্রশ্ন করিল, “তুমি ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন করো? গর্জায় যাও?” “গর্জায় যাই না। তবে গত সপ্তাহে একবার গিয়েছিলুম এলিজাবেথের কবর দেওয়ার সময়। এলিজাবেথ কে বুঝতে পারছেন ? ঐ যে এলাে বুড়ীর কাছে থাকতাে। এলিজাবেথকে কুড়ুল মেরে কে খুন করেছে। ও বড়ো ভালো মেয়ে ছিল। এই বাইবেল- খানা ওর কাছ থেকেই আমি চেয়ে নিয়েছিলুম।” রাসকনিকফের সমস্ত শিরা-উপশিরা যেন সহসা ছিড়িয়া যাইবার উপক্রম হইল। আশ্চর্য ! সে মেয়েটার সঙ্গে ইহারও ভাব ছিল! কী দুর্দৈব ইহার মধ্যে রহিয়া গেল কে জানে! নিজেকে অতি কষ্টে সংবরণ করিয়া সে বিরক্তকণ্ঠে কহিল, “তুমি বাইবেল থেকে খানিকটা পড়ে শােনাও দিকি! শুভ সমাচারের মধ্যে সেই ল্যাজারাসের পুনর্জীবনের কথা-ঐটাই পড়ে শােনাও!” সােনিয়া পড়িয়া শুনাইল খ্রীষ্টের অলৌকিক কাহিনী। তিনি আসিয়া- ছিলেন অজ্ঞানকে জ্ঞান দিতে, দুঃখ হইতে মানুষকে পরিত্রাণ করিতে। ল্যাজারাস মরিয়া গিয়াছিল, খ্ৰীষ্ট আসিয়া তাহাকে বাঁচাইলেন ১১৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট যে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে সে মৃত্যুহীন! পড়িতে পড়িতে সােনিয়ার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল, অশ্রু আসিয়া দৃষ্টি ঝাপসা করিয়া দিল। থামিয়া থামিয়া অস্ফুটস্বরে সে পড়িয়া গেল। বুকের মধ্যে তাহার যেন ঝড় বহিয়া গেল, কিন্তু মুখের উপর দিয়া ক্ষণে ক্ষণে যে আলােছায়া মাত্র খেলা করিয়া গেল ক্ষীয়মাণ প্রদীপের স্নান আলােকে ব্ল্যাকনিকফ, তাহা দেখিতে পাল। শুধু সেই কম্প্র- কণ্ঠের অস্ফুট উচ্চারণে তাহার মনে যেন কিসের প্রতিধ্বনি হইতে লাগিল। পড়া শেষ হইলে র্যাকনিকফ, উঠিয়া দাড়াইয়া কহিল, “আমি এইমাত্র আমার মা-বােনের সঙ্গে সম্বন্ধ চুকিয়ে এসেছি। এখন তুমিই আমার একমাত্র আপনার জন। চলো, আমরা কোথাও চলে যাই। তুমিও দুঃখ পেয়েছ, আমিও পেয়েছি। সমাজে স্থান নেই আমারও নেই। আমি তােমায় চিনেছি-তােমাকে আমার প্রয়ােজন। তাই বছি চলো।” তাহার চোখের দিকে চাহিয়া সােনিয়া ভীত হইয়া উঠিল কহিল, “এ আপনি কী বলছেন ? কোথায় যেতে চান ? কেন?” “কেন? কারণ তােমার এভাবে থাকা চলবে না। ওদের জন্য তুমি কী করতে পারে ক্যাথারিণ মরবে ! পােলেন্কাকে বেশ্যাগিরি করতে হবে। তুমি ঠেকাবে কী করে? তুমি কীই বা করছ!” “কিন্তু এছাড়া আমি আর কা কী করতে পারি !” নিদারুণ হতাশায় সে ব্যাকুলভাবে চাহিয়া রহিল।

• ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“কী করবে ? এসব পিছনে ফেলে এগিয়ে চলতে হবে : শিকল
ছিড়ে স্বাধীন হয়ে বাঁচতে হবে ! বঁচবার মত শক্তি সঞ্চয় করতে
হবে ! ভয়ে কাঁপলে চলবে না। এই আমার শেষ কথা! যদি
আমি কাল আর না আসি তা হলে সব কথা জাতে পারবে কে
এলিজাবেথকে খুন করেছিল ! চলুম !”
কে খুন করেছে ?” ভয়ে সােনিয়ার হাত পা ঠাণ্ডা হইয়া গেল,
সে হতবুদ্ধির মত শুধু প্রশ্ন করিল, “কে সে ?”
“আমি জানি। আমি তা প্রকাশ করবে। শুধু তোমার কাছে।
আর কারুর কাছে নয়। আমি তােমার ক্ষমা ভিক্ষা করবো না,
শুধু সব কথা জানাবো। কয়েকদিন হল আমি তােমাকেই মনে
মনে ঠিক করেছি-তোমাকেই আমার সব কথা বলতে হবে ।
নানা আমার হাত ধরাে না—ছেড়ে দাও!”
র্যাকনিকফ, চলিয়া গেল ! বিস্ময় বিমুঢ় সোনিয়ার মনে
হইল যেন তাহার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে। সে র্যাকনিকফের
সব কথাগুলা একবার ভাবিয়া দেখিবার চেষ্টা করিল কিন্তু পারিশ
না। সােনিয়া মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া গেল।
সােনিয়ার পাশের ঘরটি এতদিন খালিই ছিল। মিসেস
রেলিক্ নামে, একটী স্ত্রীলােক ঐ ঘরটির মালিক। এখন ঐ
ঘরটীতে তাহার এক ভাড়াটে আসিয়াছে, সােনিয়া, তাহা জানিত
। ভাড়াটে আসিয়াছে মিঃ সিড্রিগেলফ,। মিঃ সিড্রিগেলফ
তাহাদের সমস্ত কথা মন দিয়া শুনিল। কাঠের প্রাচীরের ফাকে
কান পাতিয়া একটা কথাও সে শুনিতে ভুল করিস না। একান্ত

১২০ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট বিজনে এই দুটী নরনারীর মধ্যে যাহা ঘটিয়া গেল তাহারও সাক্ষী রহিয়া গেল অথচ কেহই কিছু জানিল না। পরদিন বেলা এগারােটার সময় রাসকনিকফ, ম্যাজিষ্টেট পরুফিরিয়াদের বাড়ী হাজির হইল। আজই সে সমস্ত সন্দেহ, সমস্ত ছল চাতুরির শেষ করিয়া দিবে! আজ যদি পফিরিয়া তাহাকে জেরা করিয়া তাহার নিকট হইতে কিছু ফাস করিতে চাহে, তবে সে আত্ম- সমর্পণ করিবে। উহার যাহা পারে করুক কিন্তু প্রতিমুহূর্তে এই সংশয়, এই চোরের মত সদাসতর্ক চলাফেরা সে আর সহিতে পারে না। আজই পৃথিবী জানুক যে সে খুনী, একটা দাগী আসামীর সঙ্গে তাহার কোন তফাৎ নাই। নিজেকে সে নির্মম ভাগ্যের কাছে বিলাইয়া দিবে। সে তাে সকলের সঙ্গেই সম্বন্ধ চুকাইয়া আসিয়াছে, তবে তাহার আর ভয় কি ? মানুষের সঙ্গে সে সমস্ত সম্বন্ধ অস্বীকার করিয়াছে, তবে মানুষের সমাজে সে কতটা ঘৃণ্য হইল তাহাতে তাহার কী আসে যায়? তাহার সমাজ নাই, তাহার সম্মান নাই। এই জন্যই কাল যখন রাজুমিখি তাহাকে লইয়া ব্যবসা করিবার কল্পনা করিতেছিল এবং তাহার মাতা ও ভগিনী তাহাকে লইয়া নূতন করিয়া সংসার রচনার সুখ-স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, সেই মুহূর্তেই সে তাহাদের নিকট হইতে নিজেকে ছিনাইয়া আনিস। পৃথিবীর সঙ্গে, সংসারের সঙ্গে সে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করিয়া আজ একান্তভাবে তাহার ভাগ্য-

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১২১
বিধাতার কাছে নিজেকে নিবেদন করিতে আসিয়াছে। তার এ
নিবেদন শ্রদ্ধার নহে, ঘৃণার। ভাগ্যের সঙ্গে এইরূপে লড়াই করিতে
আজ সে ঘৃণাবােধ করে, তাই তার অবসান ঘটাইতে চাহে।
পরফিরিয়াস সানন্দে তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া বসাইলেন।
তিনি একটু আলাপ জমাইবার চেষ্টা করিতেই র্যাকনিকফ,
তাহাকে জানাইয়া দিল, যে বাজে কথা না বলিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট হিসাবে
তিনি যাহা করিবার তাহাই করুন—চাতুরীর প্রয়ােজন নাই।
পরফিরিয়াস হাসিয়া বলিলেন, “ম্যাজিষ্ট্রেট হলে তার কথা লােকে
এমনি করেই বােঝে! ঠিকই তো, এমনি করে বাজে কথা
কইতে কইতেই আমরা আসামীর মুখ থেকে আসল কথা বার করে
নিই।” • পরফিরিয়াস বলিয়া চলিলেন কেমন করিয়া তাহারা আসল
আসামীকে খুঁজিয়া বাহির করেন। নিকট আত্মীয়ের মতো
সস্নেহে তিনি রাসকনিকফকে বুঝাইতে লাগিলেন যে, কেমন
করিয়া তাহাদের নিকট পলাতক আসামী ধরা দেয়। তারা যাহাকে
সন্দেহ করেন তাহাকে গ্রেফতার না করিয়া যথেচ্ছা চলাফেরা করিতে
দেন। লােকটা স্বাধীনভাবে থাকে অথচ নিঃসন্দেহে বুঝিতে
পারে যে এই ম্যাজিষ্ট্রেট সবই জানিতে পারিয়াছে। লােকটা
প্রতিমুহূর্তে ভীত হইয়া থাকে অথচ বুঝিতে পারে না যে কেন
তাহাকে গ্রেফতার করা হয় নাই। এইসকল ক্ষেত্রে লােকটা
পলাইতেও পারে না। কেন না, তাহাকে তো ধরিবার চেষ্টা করা
হয় নাই। অবশেষে লােকটার আত্মরক্ষা করিবার মত বুদ্ধি চলিয়া
যায়—তাহার মাথা খারাপ হইয়া যায় এবং পতঙ্গ যেমন আগুনের

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেট দিকে ঝাপাইয়া পড়ে ঐ অপরাধী লােকটিও সেইরূপ পুলিশ অফিসে আসিয়া ধরা দেয়। ইহাই পরীক্ষক ম্যাজিস্ট্রেটের আসামী ধরিবার উপায়। পরফিরিয়া অতি সরলভাবে র্যাকনিকফকে তঁাহার আসামী পরিবার স্বকীয় প্রণালীটি খুলিয়া বলিলেন । র্যাকনিকফ, স্থির হইয়া সব শুনিয়া গেল। কাল সে এই লােকটার কাছে উত্তেজনা প্রকাশ করিয়াছে আজ আর সে ভুল করিবে না। লােকটি তাহাকে অভিভূত করিয়া তাহার বুদ্ধি-বিপৰ্য্যর বটাইতে চাহে। কিন্তু সে কিছুতেই উত্তেজিত হইবে না, বরং লক্ষ্য করিবে লােকটার কী বলিবার আছে। নে চুপ করিয়া রহিল, পাছে কথা কহিতে কহিতে সে উত্তেজনার বসে বোস কিছু বলিয়া বসে। পরফিরিয়াস বলিলেন, “ধরাে, এই এলেনা-হত্যার ব্যাপারটা , এইখানে যে প্রকৃত আসামী সে অসুস্থ, সে যা তা বলে, যা খুশী করে। সেই অসুস্থতার অজুহাতে সে অপূৰ্ব্ব মিথ্যার জাল বুনে চলেছে ! এই করে তার ভরসা বেড়ে যায়। সে পুলিশের লােকদের হতবুদ্ধি করে দেবার জন্য রহস্যজনক ভাবে কথা বলে, উন্মাদের মত এমন ভাব দেখায় যাতে মনে হয় সে অসামী। এই ধরাে, সে পুলিশের কাছে গিয়ে বলে, কেন তাকে গ্রেফতার করা হয় নি। হাঃ হাঃ।” ব্ল্যাঙ্কলনিকফ, বিবর্ণ মুখে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল। তারপর সহসা তাহার ওষ্ঠাধর কপিতে লাগিল, চীৎকার করিয়া কহিল, “আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাও। এলেনা-হত্যার

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
ব্যাপারে তুমি আমাকেই সন্দেহ করে। বেশ তাে গ্রেফতার করে।
-কোন কথা নয়, তুমি গ্রেফতার করাে। তােমার এ ভাঁড়ামি
অসহ! উঃ কী ভয়ানক লােক তুমি!”
পরফিরিয়া তাহাকে ধরিয়া বাইল, কহিল,-“না না ও কিছু
নয়। তুমি মাথা গরম করে না। তুমি অসুস্থ ! আমি তোমার
কথা অনেকের কাছে শুনেছি। তুমি বিশ্বাস করাে তােমায় সন্দেহ
করলে তামার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করতুম না। তোমাকে
আমার ভালো লাগে এই পর্যন্ত। সন্দেহই যদি করবো তা হলে
এসব গোপনীয় কথ! তোমায় বলবো কেন? আমি তোমার সঙ্গে
বন্ধুত্ব করবো বলে তোমায় আসতে বলেছিলুম। তুমি এসো দিকিন,
তােমায় একটা অদ্ভুত জিনিস দেখাই-” বলিতে বলিতে প্রফিরিয়াস
র্যাকনিকফকে প্রায় উন্মাদ করিয়া তুলিল।
“তুমি জানাে যে আমার শরীর অসুস্থ ! তাই তুমি এইসব বলে
আমাকে সহজে উত্তেজিত করে তুলছ, যাতে আমি কিছু একটা বলে
ফেলি। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? শুধু ঐ জ্যামেটফটার কথায়
তুমি আমাকে সন্দেহ করছো। তুমি আমাকে দমিয়ে দিয়ে কাজ
সারতে চাও ! তা হবে না। কী প্রমাণ পেয়েছ তুমি?”
“প্রমাণ আবার কিসের! কী যে বলো তার ঠিক নেই। তুমি
আমাদের জেরা করার পদ্ধতি জানে না তাই রাগ করছো!”
মৃদুকণ্ঠে পরফিরিয়াস যেন ভৎসনা করিল।
এমন সময় একটা লােক উন্মাদের মত ভিতরের ঘর হইতে এই
ঘরে আসিল। তাহার সঙ্গে দু’জন রক্ষী ! লােকটাকে র্যাকনিকফ,

১২৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট চিনিল--এই সেই নিকোলা সেই দিন এলেন বুড়ীর বাড়ীতে সে ইহাকেই দেখিয়াছিল। নিকোলা তখন যেন একেবারে পাগল হইয়া গিয়াছে। পরফিরিয়াকে হাতজোড় করিয়া কেবল বলিতে লাগিল, “আমায় ফাসী দাও—আমিই ওদের খুন করেছি। আর কেউ না—আমিই।” তাহার আর কিছু বলিবার নাই। ব্যাকনিকফ, বুঝিল, ইহাকে এই কথা বুঝাইয়া উন্মাদ করিয়া দেওয়া হইয়াছে, এখন সে নিজেই বিশ্বাস করে যে সে খুনী ! র্যাঙ্কনিকফ, পরফিরিয়াসের দিকে তাকাইল। পরফিরিয়া অপ্রতিভভাবে রক্ষীদের হুকুম করিল নিকোলাকে ভিতরে লইয়া যাইতে। র্যাকনিকফের আর উত্তেজনা নাই, কেবল তাহার হাত- পা যেন কাঁপিতেছিল বােধকরি এক নিরপরাধের দুর্দশা দেখিয়া সে নিজের অপরাধের পরিমাপ করিয়া লইয়াছে। শান্ত কণ্ঠে সে কহিল, “তুমি ভাবতে পারনি যে এটা আমি দেখে ফেলবাে, নয় কি ?” “হ্যা-না, আমি ঠিক এটা আশা করি নি !” ম্যাজিষ্ট্রেট যেন অস্বস্তি বােধ করিতেছিলেন। র্যাকনিকফ, তাহার নিকট বিদায় লইয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া আসিল। নিকোলাকে ঐরূপে উন্মাদ করিয়া দেওয়ার মধ্যে কী রহস্য আছে তাহা সে বুঝিতে পারিল না। তবে ঐ লােকটার স্বীকারােক্তি যখন মিথ্যা প্রমাণিত হইবে তখন উহারা সকলেই

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১২৫
তাহাকে লইয়া পড়িবে। পরফিরিয়াস জানে যে তাহার মাথার
ঠিক নাই তাই তাহার স্নায়বিক অসুস্থতার সুযােগ লইয়া সে
তাহার সঙ্গে ঐ সকল প্রসঙ্গ আলােচনা করিতেছিল, হয়তাে
আজই লােকটা তাহার নিকট হইতে সব কথা বাহির করিয়া
লইত। সে ভয়ে শিহরিয়া উঠিল।-না, তাহাকে সাবধান হইতে
হইবে !
আজ সে ইহার চরম মীমাংসা করিতে গিয়াছিল। কিন্তু
সমস্ত ঘটনাগুলি ভাবিয়া দেখিতে দেখিতে তাহার অন্তরে নূতন
আশার সঞ্চার হইল। কী প্রমাণ আছে! উহারা তাহাকে
ধরিবে কী শুধুই সন্দেহ করিয়া? সে ইচ্ছা করিলেই উহাদের
সমবেত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিতে পারে । সে যুদ্ধ করিবে-
ধরা দিবে না। সে কেবল তাহার নিজেরই মনােবিকারের
বশে এতটা ক্ষিপ্ত হইয়া হতাশায় সব কিছু বিসর্জন দিতে
বসিয়াছিল। সে নিজেই তাহার অনিষ্ট করিবে । নিজের মতি
গতিতে সে বিরক্ত হইয়া উঠিল।
১১
সেন্ট পিটারবার্গ-এ আসিয়া লুশিন্ তাহার
তাহার এক প্রাক্তন
হাত্র লেবেজিয়াটমিকফের বাসায় অতিথি হইয়া আছে। লেবে জয়া-
নিকফ, মারমেলেডফদের প্রতিবেশী অর্থাৎ ঐ বাড়ীটির অসংখ্য
ভাড়াটেদের মধ্যে একজন। সে কোন এক গবর্ণমেন্ট অফিসের

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট কেরাণী তবে লেখাপড়া সে অনেক দূর করিয়াছে। তাহাকে দেখিতে খৰ্ব্বা কৃতি হইলেও বর্তমান পৃথিবীর যত বড় বড় নূতন আদর্শ সবগুলিই তাহার নিজের জীবনের আদর্শ বলিলেই চলে। সামাবাদ সম্বন্ধে যত বই লেখা হইয়াছে সে গুলি সে আদ্যোপান্ত পড়িয়াছে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু ঘটে তাহাই সে একজন সাম্যবাদীর মত উদার দৃষ্টিতে দেখিতে চেষ্টা করে। এমন কি, সাম্যবাদী কায়দায় লােকের সঙ্গে আলাপ করে এবং কাহারও সহিত বিবাদ বাধিলে সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী লইয়াই বিবাদ করে। এক কথায় রুশ জাতির অগ্রগতির কর্ণধার হইতে হইলে যে যে গুণ থাকা আবশ্যক তাহার সবগুলিই লেবেজিয়াটনিকফ, আয়ত্ত্বে আনিয়াছে। লুশিনও জাতীয় অগ্রগতিতে অস্থাবান একজন সহৃদয় সম্রান্ত ভদ্রলােক, এই কারণে তাহাদের মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্বন্ধ ছাড়া আর একটি সম্বন্ধ সম্প্রতি গড়িয়া উঠিয়াছে—তাহা আদর্শ- গত বন্ধুত্ব ! লেবেজিয়ানিকফ, সাম্যবাদী প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার পরিকল্পনা করে এবং সাম্যবাদী আদর্শের ব্যাখ্যা করে আর লুশি ধৈৰ্য্য সহকারে শুনিয়া যায়। বয়স যতই হ লুশি তাহার তারুণ্য বজায় রাখিবার একমাত্র উপায় হিসাবে সাম্যবাদী আদর্শকেই আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে। যেদিন ডুনিয়ার প্রাণি-প্রার্থনার ব্যাপারটা একান্ত অমীমাংসিত- ভাবে শেষ হইয়া গেল তাহার পরদিন প্রভাতে সে অনেকগুলি টাকা লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছিল-খুচর' এবং নােট মিলিয়া প্রায় তিন হাজারেরও উপর ! এই টাকাগুলি সে তাহার ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১২৭ কাম্পানীর শেয়ার বিক্রয় করিয়া পাইয়াছে। টেবিলের উপর টের তাড়া লইয়া লুশিন্ সেগুলি গণিতেছিল আর লেবেজিয়াট- (কফ, আবেগময়ী বক্তৃতা দিয়া তাহাকে পুরাপুরি সাম্যবাদী রিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেছিল। লশিন সহসা প্রশ্ন করিল, “এই বিধবাটি কী একটা ভোজের iথােজন করেছে নাকি?” “হঁা। তােমাকেও তো নিমন্ত্রণ করেছে।” “আমার সঙ্গে আর এমনি কী পরিচয় আছে। আমি যাব না। “আমিও যাব না।” “তুমি তো শুনেছি মাসখানেক আগে একদিন ঐ ক্যাথারিণকে রে ঘা’ কতক-” “কে বলে ?” লেবেজিয়াটুনিকফ, আরক্ত মুখে বলিয়া উঠিল, মথ্যে কথা। সেদিন ক্যাথারিণ এসে আমার চুলের মুঠি ধরে মেরে ফেলেছিল আর কি। আমি শুধু আত্মরক্ষা করেছিলুম- র বেশী আমি কিছুই করিনি। কিছুই করিনি। আত্মরক্ষা করবার অধিকার কলেরই আছে! মেয়েছেলের গায়ে হাত দেবার মত পশু আমি “থাক্‌-থা! তুমি রাগ করাে না। আচ্ছা তুমি দের ঐ মেয়েটাকে চেন? ওর সম্বন্ধে লােকে যা বলে তা # সত্যি?” “সত্যি হলেই বা! আমার তাে মনে হয় সে ঠিকই করেছে! লধন হিসেবে তার যা ছিল তাই দিয়ে সে নিজের জীবনধারণ

১২৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
-
করছে। আমি সােনিয়াকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। সমাজের বিরুদ্ধে
এ তার প্রতিবাদ ! যেদিন সাম্যবাদী রাষ্ট্র-”
“তুমি তাকে তােমার সাম্যবাদী সভার সভ্য করে নাওনি
কেন? তার মানসিক উন্নতির ভার তাে তােমারই ওপর।”
লুশিনের কণ্ঠে বিদ্রুপ ফুটিয়া উঠিল
“তুমি বিদ্রুপ করতে পারে কিন্তু আমি জানি যে সে একদিন
আমার আদর্শ বুঝতে পারবে। শুধু তাই নয় আমি সেই দিনটির
প্রতীক্ষা করছি যেদিন সে, স্বেচ্ছায় এসে আমায় বলবে, আমি
তােমার।”
“সে কথা থাক। ওকে এই দুদ্দিনে কিছু সাহায্য করবার
কথা ভেবে দেখছ কী। ওকে যদি এখানে ডেকে আনতে পারে।
তাহলে আমি কিছু দিতে পারি, আর একটা বন্দোবস্তও করে
দিতে পারি যাতে ওদের সত্যিকার উপকার হয়।”
এক কথায় লেবেজিয়ানিকফ, লুশিনের প্রতি শ্রদ্ধায় বিগলিত
হইয়া গেল। উত্তেজিত স্বরে “আমি এখনই তাকে এখানে ডেকে
আছি !” বলিয়া ক্যাথরিণের ঘরের উদ্দেশে বাহির হইয়া গেল।
লুশি ডুনিয়াকে পত্নীরূপে পাইবার যে একমাত্র পথ বাছিয়া
লইয়াছিল তাহাতে কোনদিন যে সে ব্যর্থ হইতে পারে ইহা
তাহার কল্পনার অতীত। অনেক ভাবিয়া সে ঠিক করিয়াছিল
যে দয়া এবং উদারতা দেখায়। সে ডুনিয়া ও তাহার জননীকে
অভিভূত করিয়া নিজের কাৰ্যোদ্ধার করিবে। কিন্তু যখন ব্যাপারটা
এইভাবে তাহারই অবমাননার মধ্যে শেষ হইয়া গেল তখন সে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১২০ স্পষ্ট বুঝিতে পারিল যে, সে নিজে উদারতার অভিনয়ে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে নাই। আরও কিছু অর্থ দিয়া যদি দুনিয়াকে কৃতজ্ঞতা পাশে বাধিতে পারিত তাহা হইলে ঐ রেডিয় ছোঁড়াটা কিছুতেই তাহাকে হঠাইতে পারি না। এই সকল ব্যাপারেও কৃপণতা করিয়াছে বলিয়া তাহার অনুতাপের সীমা নাই কিন্তু যদি রােষবহ্নিতে কোন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব হইত তাহা হইলে আজ সে র্যাঙ্কনিকফকে হত্যা করিয়া ফেলিত। নিস্ফল আক্রোশে সে ভয়ঙ্কর কিছু একটা করিবার চন্তা করিতেছিল। ক্যাথারিণ যে সর্বস্বান্ত হইয়া একটা ভােজ দিবার উদ্যোগ করিতেছে এবং বাড়ীর সকল ভাড়াটেদের নিমন্ত্রণ করিয়াছে একথা সে কালই বাড়ীউলীর নিকট শুনিয়াছিল। ক্যাথারিণ শাকের দনে সকল বিবাদ ভুলিয়া বাড়ীউলীকেই নিমন্ত্রণ করিবার ভার দিয়াছিল। বাড়ীউলী লুশিনকে নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়া অনেক গল্প করিয়া গেল এবং তাহারই নিকট হইতে লুশি নিতে দারিয়াছিল যে ব্যাকলনিকফকেও নিমন্ত্রণ করা হইয়াছে। লুশি কাল সমস্ত শুনিয়াও তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে নাই কিন্তু আজ এইমাত্র নােটের তাড়া লইয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে তাহার মাথায় একটা মতলব উকি মারিয়া গেল। সরলভাবে, সে সােনিয়াকে এই ঘরে লইয়া আসিতে বলিল—আজ সে-উদারতার চুড়ান্ত অভিনয় করিবে। প্রায় পাঁচ মিনিট পরে লেবেজিয়াটনিক সােনিয়াকে সঙ্গে লইয়া ১৩০ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ফিরিয়া আসিল। সােনিয়া বিস্ময়-বিমূঢ় দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল আতঙ্কে উদ্বেগে তাহার পা যেন চলিতেছে না। শৈশব হইতে নূতন মানুষ দেখিলেই তাহার এই দশা হয়। লুশিন অপরিচিত বন্ধুর মত তাহাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করিয়া বসাইল। লুশিনের আচরণে একজন বয়ােজ্যেষ্ঠ ভদ্রলােকের সঙ্গে সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই ধরিবার উপায় নাই। তাহাকে সােনিয়ার অত্যন্ত দয়ালু ও উদারচেতা বলিয়া মনে হইল। সােনিয়া জড়সড় হইয়া টেবিলের একপ্রান্তে বসিয়াই টেবিলের উপর প্রচুর টাকা দেখিয়া আরও সঙ্কুচিত বােধ করিতে লাগিল। লুশিন্ লেবেজিয়ানিকফুকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল যে ক্যাথারিণের ঘরে র্যাকনিকফু আসিয়া পৌছিয়াছে কিনা এবং লেবেজিয়াট নিকফ, যখন তদুত্তরে ব্যাঙ্কলনিকফ, আসিয়াছে এই সংবাদ দিয়াই বাহির হইয়া যাইতেছিল তখন তাহাকে এখানে উপস্থিত থাকিতে অনুরােধ করিল। একটি যুবতীর সঙ্গে নিভৃতে সাক্ষাৎ করিতে লুশিন-সঙ্কোচ করিতেছে দেখিয়া লেবেজিয়াটনিকফ, অত্যন্ত খুশ হইল এবং তাহাদের নিকট হইতে একটু দূরে জানালার ধারে দাড়াইয়া রহিল। লুশিন্ সোনিয়ার সম্মুখে টেবিলের অপর দিকে বসিল। একটু চুপ করিয়া গম্ভীর মুখে কহিল, “আপনার মাকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে বলবেন যে, কোন বিশেষ কারণে আমি তার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলুম না বলে আমি অত্যন্ত দুঃখিত।” সােনিয়া ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি জানাইল এবং লুশিনের গম্ভীর ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৩১ কণ্ঠস্বরে হতবুদ্ধি হইয়া উঠিবার উপক্রম করিল। লুশিন্ হাত নাড়িয়া তাহাকে উঠিতে নিষেধ করিয়া কহিল, “না-না! এই সামান্য কারণে আপনাকে এখানে কষ্ট করে আসতে বলি নি-আরও কথা আছে।” লুশিন্ এইবার আরও গম্ভীর হইয়া গেল। তাহার মুখ দেখিয়া বােধ হইল যেন এইমাত্র সে এক গুরুতর কর্তব্যের সম্মুখীন হইয়াছে এবং পৃথিবীর সমস্ত বাধা উপেক্ষা করিয়া সে ঐ কর্তব্য পালন করিয়া যাইতেছে। লুশিন্ সােনিয়ার দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া বলিতে লাগিল, “দেখুন কাল আপনার মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হ’ল। তার এই দুর্দশা দেখে আমার মনে হয় মানুষ হিসাবে আমাদের কর্তব্য তার জন্য কিছু করা। আপনার পিতা যখন মারা গেলেন তখন যদি তার চাকরি থাকতো তা হলে গবর্ণমেন্ট থেকে আপনার মা পেস পেতেন কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কাজেই গবর্নমেন্ট থেকে কোন সাহায্য পাওয়া যাবে না। অথচ একটা ভদ্ৰপরিবার উপবাস করে দিন যাপন করবে এ আমরা সইতে পারবে না। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় সকলে মিলে যদি | চাদা করে আপনার মা আর তাঁর পিতৃহীন শিশুগুলির ভরণপােষণ করা যায় তা হলে সবদিক দিয়েই ভালো হয়। অবিশ্যি এর জন্য যা যা করা উচিত সে সমস্তই আমি নিজে করে দেবো। তবে যদি আপনাদের পক্ষ থেকে কোন আপত্তির কারণ— আপত্তি! কৃতজ্ঞতায় সােনিয়ার চোখে জল আসিয়া গেল। স ১৩২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট সাশ্রনেত্রে লুশিনের দিকে মুখ তুলিয়া কহিল, “না-না! আপত্তি আর কী! আপনি যদি কিছু করতে পারেন—এতগুলি অনাথ- শিশু উপবাসে” সে আর বলিতে পারিল না, উদগত অর্শ রােধ করিতে না পারিয়া কঁদিয়া ফেলিল। কঁাদিতে দিতে অস্ফুট- স্বরে শুধু বলিল, “ভগবান আপনাকে পাঠিয়েছেন—তিনি আপনার ভালাে করবেন।” সােনিয়া উঠিয়া.দাড়াইল। লুশিন কহিল, “আর একটি কথা। আমি আমার চাদাটা এখনই আপনাকে দিয়ে দিতে চাই। এই দশ রাব-এর একটি নােট আপনাকে গ্রহণ করতে হবে।” লুন্ িসযত্নে একটি নােট টেবিল হইতে তুলিয়া সােনিয়াকে দিল। সােনিয়া লজ্জার আনত মুখে কোন প্রকারে একটুখানি হাত বাড়াইয়া নােটটি গ্রহণ করিল এবং দ্রুতপদে বাহির হইবার উপক্ৰম করিল। সে অস্ফুট স্বরে কী বলিল বুঝা গেল না। লুশি তাহার সহিত দরজা পর্যন্ত আসিয়া সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলার মত তাহাকে অশেষ সৌজন্য সহকারে বিদায় দিল। সােনিয়া চলিয়া যাইতেই লেবেজিয়াটনিকফ, উচ্ছসিত কণ্ঠে কহিল, “আপনার মহানুভবতায় আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে সে কী বলবে! যদিও ব্যক্তিগত দান আমাদের সাম্যবাদী আদর্শ-বিরুদ্ধ তবু আপনার এত দয়া দেখে আনন্দ না করে পারছি না। সমাজের পক্ষে আপনার মত লোকের প্রয়ােজন খুব বেশী।” “না-না, ও কিছু না। তুমি এত বড় কথা বলো না।” এতখানি আন্তরিক প্রশংসায় সে বিব্রত বোধ করিল। লেবেজিয়াটনিকফ, ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৩৩ উত্তেজিত স্বরে আরও অনেক কিছু বলিয়া গেল। কিন্তু তাহার একটিও লুশিনের কানে গেল না। অনেকক্ষণ পরে লেবেজিয়াটনিকফ, আবিষ্কার করিল যে তাহার শ্রোতা কেমন যেন অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছে। এদিকে ক্যাথরিণের ঘরে ভেজের টেবিল পাতা হইয়াছে। ভােজের আয়ােজন যাহা হইয়াছে তাহা উৎকৃষ্ট না হইলেও প্রচুর। কেন যে ক্যাথারিণ তাহার শেষ পেনিটি পর্যন্ত ব্যয় করিয়া এই একান্ত অহেতুক আয়ােজন করিল তাহা বুঝা কঠিন। তবে তাহার নিদারুণ শোকের মধ্যে সে বােধহয় ইহাই ভাবিয়াছিল যে স্বামীর শেষকৃত্যের দিনে তাহারই আত্মার শান্তি কামনায় যদি সে সকলকে ভােঙ্গন করাইতে পারে তাহা হইলে লােকে জানিবে যে তাহার স্বামী অশ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞার পাত্র ছিলেন না—তিনিও আর পাঁচজনের মত সাধুচরিত্রের লােক ছিলেন, তাঁহারও পরলােকগত আত্ম। সকলের নমস্য। ইহা ছাড়া আর একটা কারণও ছিল। ক্যাথারিণ দরিদ্র, নিরন্ন কিন্তু সে এক সম্ভ্রান্ত রাজকর্মচারীর কন্যা এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে পালিতা তাই আজ সে স্বামীর স্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করিতে গিয়া এই কথাটাই সগর্বে ঘােষণা করিতে চাহে যে, দরিদ্র হইলেও তাহার নীচ জাতীয় নহে এবং অভুক্ত অবস্থায় থাকিলেও তাহারা জানে কেমন করিয়া ক্রিয়া কৰ্ম্ম করিতে হয়। এইজন্যই বাড়ীউলীকে দিয়া সে বাড়ীর মধ্যে যাহারা ভদ্রলােক তাহাদের বিশেষ করিয়া নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। সর্বহারা বিধবাটির আজ একমাত্র সম্বল এই যে, সে ভদ্রকন্যা, বংশগৌরবে সে কাহারও ১৩৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট অপেক্ষা হীন নহে এবং এইটুকু পাঁচজনকে জানাইয়া সে যেন তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষ। দুঃখের দিনে বুক বাঁধিয়া দাড়াইয়া থাকিতে চাহে। কিন্তু ভােজনের সময় যখন আসন্ন হইল তখন একে একে যাহারা তাহার ঘরে আসিয়া আসন গ্রহণ করিতে লাগিল তাহাদের দেখিয়া রাগে, ঘৃণায় ক্যাথারিণের মাথায় রক্ত চড়িয়া গেল। তাহারা সকলেই দুশ্চরিত্র, লম্পট, কারখানার কারিগর। সকলেরই বেশভূষা ও মুখের চেহারা দেখিলে মনে হয় যেন বহুদিন তাহাদের পেটে কোন সুখাদ্য পড়ে নাই, এবং আজ তাহারই সম্ভাবনায় উৎফুল্ল। ক্যাথারিণ তো ইহাদের ভােজন করাইতে চাহে নাই। এই লােকগুলা তাহার বংশ মর্যাদা, তাহার স্বামীর পদগৌরবের কী বুঝিবে! ক্যাথারিণ বুঝিল যে ঐ বাড়ীউলী এ্যামেলিয়া মাগী জানিয়া শুনিয়া ইহাদেরই নিমন্ত্রণ করিয়াছে ! ভেজন আরম্ভ হইলে দেখা গেল বালনিকফ, ছাড়া আর এইটিও ভদ্রলোক নাই। সােনিয়া আসিয়া ক্যাথারিণকে লুশিনের কথা বলিল এবং র্যাঙ্ক- নিকফকে নমস্কার করিয়া ঈষৎ সলজ্জভাবে তাহারই পাশে আসিয়া বসিল। যতই কুব্ধ হউক ক্যাথারিণ আত্মসংবরণ করিয়া ধীরভাবে নিমন্ত্রিতদের ভােজন করাইল। তবে তাহার অধিকাংশ কথাবার্তা হইল ব্যাসকনিকফের সঙ্গে। কথাপ্রসঙ্গে ক্যাথারিণ সকলকেই জানাইয়া দিল যে সে শীঘ্রই এই শহর পবিত্যাগ করিয়া তাহার দেশে গিয়া মেয়েদের বাের্ডিং খুলিবে এবং লেখাপড়ার মধ্যে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট থাকিয়া বাকী জীবনটুকু কাটাইয়া দিবে। ক্যাথারিণের কথার মধ্যে দু'একজন তাহার স্বামীর সম্বন্ধে অত্যন্ত অভদ্র ইঙ্গিতে করিলেও ক্যাথারিণ তাহা নীরবে সহ্য করিল। কিন্তু তাহার বাড়ীউলী যখন তাহাকে ভাড়া না দিবার জন্য অভিযোগ করিল এবং ক্যাথারিণের বংশমর্যাদা সম্বন্ধে কটুক্তি করিল তখন ক্যাথারিণ আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। ক্যাথারিণ বাড়ীউলীকে গালি দিল, বাড়ীউলীও তৎক্ষণাৎ তাহাদের ঘর ছাড়িয়া যাইতে বলিল। অকৃথ্য গালাগালির মধ্যে আগন্তুকগণ একটা অত্যন্ত কৌতুকের. খােরক পাইল। তাহারাও বাড়ীউলীর পক্ষ লইয়া কটুক্তি করিতে ছাড়িল না। ক্রোধে অন্ধ হইয়া বাড়ীউলী টেবিল হইতে খাবারের পাত্রগুলি নামাইয়া ফেলিতে লাগিল। ক্যাথারিণ তাহাকে ভীষণ প্রহার করিতে উদ্যত হইল কিন্তু সােনিয়া ক্যাথারিণকে ধরিয়া ফেলিল। এমন সময় ঘরের দরজার নিকট লুশিকে দেথিয়া ক্যাথারিণ বলিয়া উঠিল, “লুশি।” দরজার নিকট দাড়াইয়া লুশি কয়েক মিনিট তাণ্ডবলীলা দেখিল। তাহার পর কঠিন মুখে ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে আসিয়া দাড়াইল। এই ছিন্নবসন বুভুক্ষু নিমন্ত্রিত লােকগুলির মাঝে সুশিনকে প্রায় রাজপুরুষ বলিয়া মনে হইল। তাহার মূল্যবান বেশভূষা, তাহার রূঢ় আত্মম্ভরিতার ভাব দেখিয়া সকলেই সম্ভ্রমের সঙ্গে তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিল। লুশি প্রবেশ করিবামাত্র কোলাহল স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল, সকলেই নির্বাক বিস্ময়ে লুশিনের দিকে চাহিয়া রহিল। লুশিন্ কাহারও দিকে না তাকাইয়া দৃঢ় পদক্ষেপে

১৩৬
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
টেবিলের নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর বাড়ীউলীকে
সম্বােধন করিয়া কহিল, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত, মাদাম, আমি
অসময়ে আপনাদের বিরক্ত করিলাম। এখন এই বাড়ীর অধিকারিণী
হিসেবে আপনি আমার কথাগুলাে একটু শুনে রাখুন।”
এই বলিয়া সে সােনিয়ার দিকে ফিরিয়া কহিল, “মিস সােনিয়া,
আপনি আমার ঘর থেকে চলে আসার পরই আমার টেবিলের
ওপর থেকে একখানা একশ’ রাব-এর নােট খুঁজে পাচ্ছি
না। আপনি যদি বলতে পারেন সে নােটখানা কী হ’ল তা
হলে আমি ব্যাপারটা এইখানেই শেষ করে দেবে। আর
যদি না বলেন তা হলে আমাকে এর জন্য চরম ব্যবস্থা অবলম্বন
করতে হবে—একথা আমি সকলের সামনেই বলে রাখছি ।
এবং তখন হয়তাে আপনাকে অনুতাপ করতে হবে।”
লুশিনকে দেখিয়াই সােনিয়ার কেমন যেন ভয় করিতেছিল,
এখন তাহার কথা শুনিয়া সােনিয়ার মুখ মৃতের মত রক্তহীন
হইয়া গেল। সে কিছুই ঠিক বুঝতে পারি না, শুধু কয়েক
মুহুর্ত শূন্য দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। তাহার পর সহসা ক্ষীণকণ্ঠে
প্রাণপণে জোর দিয়া কহিল, “আমি জানি না—আমি জানি না।”
লুশি গম্ভীর কণ্ঠে প্রত্যেকটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করিয়া
বলিল, “আজই
“আজই সকালে আমাদের কোম্পানীর শেয়ার বিক্রী
করে প্রায় তিন হাজার রাবল পেয়েছি। টাকাগুলো আমি
টেবিলের ওপর রেখে গুনে দেখছিলুম এমন সময় আপনি আমার
ঘরে এলেন। তারপর আপনি চলে যাবার পর আমি টাকাগুলো

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৩৭
তুলে রাখতে গিয়ে দেখি একশাে রাবল-এর একখানা নােট
পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি যতক্ষণ আমার ওখানে ছিলেন
লেবেজিয়ানিকফ, ততক্ষণ সেখানে উপস্থিত ছিল কাজেই সে
সাক্ষ্য দেবে যে এর একটাও মিথ্যা নয়। আপনি আমার ঘরে
গিয়েই বার বার উঠে আসবার চেষ্টা করছিলেন এবং বার বার
ভয়ে ভয়ে টেবিলের ওপর ছড়ানো নােটগুলাের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
সেই সব দেখে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে সে নােটের সন্ধান আপনিই
দিতে পারেন। আপনাদের দুর্দশা দেখে আমি দয়াপরবশ হয়ে
সাহায্য করতে গেলুম আর তার কী প্রতিদানই পেলুম। ভালােই
হ’ল, আমারও শিক্ষা হয়ে গেল।”
সকলেই সােনিয়ার দিকে চাহিল, বাড়ীউলী বলিল, “আমি
জানতুম,-ও ছুড়ীটার স্বভাবই এই !”
সােনিয়া প্রবল বেগে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, “আমি জানি
না—আমি নিইনি আপনার টাকা। এই নি আপনার সেই দশ
রাবল ! আর কিছুই আমি জানি না!” রুমালের খুট হইতে
খুলিয়া সে নােটখানা লুশিনের দিকে ছুড়িয়া দিল। তাহার
সৰ্বাঙ্গ যেন অবশ হইয়া আসিতেছিল; সে ঘাড় গুজিয়া কোন
প্রকারে বসিয়া রহিল।
লুশিন এইবার রুখিয়া উঠিল, ধমক দিয়া কহিল, “কী তুমি
জানাে না? তুমি সে টাকা চুরি করো নি ?” তাহার পর
বাড়ীউলীর দিকে ফিরিয়া শাসাইয়া কহিল, “তা হলে আর কি!
এবার পুলিশের সাহায্য নিতে হয়।”

১৩৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট এইবার রীতিমত চাঞ্চল্য দেখা দিল। নিমন্ত্রিত লােকগুলি একটি অনাথা রমণীর অসন্ন অপমানের কল্পনা করিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। র্যাকনিকফ নীরবে সােনিয়ার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ক্যাথারিণ এতক্ষণ হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। এইবার যেন তাহার সম্বিৎ ফিরিয়া আসিল, চীৎকার করিয়া লুশিনকে বলিতে লাগিল, “কী, এত বড় কথা ! সোনিয়া তােমার টাকা চুরি করেছে ? পাজী, শয়তান! তােমার বলতে লজ্জা করলো ? সােনিয়া আমার সোনিয়া চুরি করেছে ! ওরে তাের কেউ ওর পায়ের নখের যুগ্যি ন! ঈশ্বর জানেন সােনিয়া কি! তােরা কী বুঝবি ? বেশ, সােনিয়া যদি 'চুরি করে থাকে তো খুজে দেখ, ওর পকেট-ও তো তাের ঘর থেকে এসে ঐখানেই বসে আছে—নে খুজে দেখ!” তাহার পর নিজেই সােনিয়াকে টানিয়া দাড় করাইয়া তাহার জামার পকেটগুলি উলটাইয়া সকলকে দেখাইতে লাগিল। কিন্তু ডান দিক্‌ কার পকেটটি উল্টাইয়া দিতেই সকলে সবিস্ময়ে দেথিল একখানি ভাজকরা একশ’ রাব-এর নােট মেঝেয় পড়িয়া গেল ! পরক্ষণেই যে কলরবের সৃষ্টি হইল তাহা বর্ণনাতীত। যাহার যাহা মুখে আসিল সে তাহাই বলিল। বাড়ীউলী “চোর চোর! জেলে দাও!” বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল।' ছােট ছােট ছেলে মেয়েগুলি সােনিয়ার গা ঘেষিয়া দাঁড়াইয়া দিতে লাগিল। ক্যাথারিণ সােনিয়াকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া তাহার মস্তক চুম্বন করিল। তাহার অবিরল অশ্রুধারায় সােনিয়ার মুখ ভাসিয়া

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
গেল। ক্যাথারিণ কাদিতে দিতে শুধু বলিল, “আমি জানি
সােনিয়া, তুমি কিছুতেই এ কাজ করতে পারো না-কিছুতেই না।”
যে অকাট্য প্রমাণ এইমাত্র পাওয়া গেল তাহাকে সে প্রাণপণে যেন
অবিশ্বাস করিতে চায়।
সােনিয়া আৰ্ত্তকণ্ঠে কহিল, “আমি নয়—আমি এর কিছুই
জানি না আমি কিছু নিই নি।” তাহার কণ্ঠে যে অসহায়
ব্যাকুলতা প্রকাশ পাইল তাহা শয়তানেরও মৰ্ম্ম স্পর্শ করে।
সােনিয়া ক্যাথারিণের বুকে মুখ লুকাইয়া ফুপাইয়া ফুপাইয়া কাঁদিতে
লাগিল। • রাস্কনিকফ, এতক্ষণ তাহার দিকে চাহিয়াছিল,
এইবার নীরবে লুশিনের দিকে ফিরিয়া চাহিল।
চাহিল। তাহার তীক্ষ্ণ
যেন থাকিয়া থাকিয়া লুশিকে বিদ্ধ করিতেছিল।
ক্যাথারিণ বহুক্ষণ ধরিয়া দিল ! তাহার যক্ষ্মাক্লিষ্ট বেদনাতুর
পাণ্ডুর মুখের দিকে তাকাইয়া সকলেই যেন একটু করুণা হইয়া
লুশিন্ পরম স্নেহে • সান্ত্বনার সুরে স্নিগ্ধকণ্ঠে কহিল,
“মাদাম, আপনি বিচলিত হবেন না। এতে আপনার
কোন দোষ নেই। অভাবে পড়ে আপনার কন্যা যা করেছেন
তার জন্য আর কোন কথাই আমি বলবো না। তিনি অপমানের
ভয়ে যদি অস্বীকার না করতেন তা হলে ব্যাপারটা এতদূর
গড়াতো না। যাক গে, যা হবার তা হয়ে গেছে। আপনাদের
দুরবস্থায় আমার দয়া হয়। আমার দ্বারা আপনাদের আর কোন
অসম্মান ঘটবে না।”
লুশি বাসকলনিকফের দিকে চাহিল, দুইজনের দৃষ্টি মিলিত
।
উঠিল।

১৪০
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
হইল। রাকিফের চোখ দিয়া যেন অগ্নি বিচ্ছুরিত হইল।
কঁদিতে কঁদিতে ক্যাথারিণ শুধু সােনিয়াকে সান্ত্বনা দিতেছিল, সে
কিছুই শুনিতে পাইল না।
সহসা ঘরের বাহিরে কাহার কণ্ঠস্বর শােনা গেল, “এত
নীচ ! এত নীচ মানুষ হতে পারে!” লুশিন্ যেন চকিতে আতঙ্কে
শিহরিয়া উঠিল। পরক্ষণেই ঝড়ের মত লেবেজিয়াটনিকফ, ঘরের
মধ্যে প্রবেশ করিয়া একেবারে লুশিনের সম্মুখে গিয়া দাড়াইল।
দাতে দাত দিয়া কহিল, “আর তুমি কিনা আমাকে সাক্ষী মানছিলে?”
“তুমি—তুমি কী বহু।” লুশিনের কথা যেন বাধিয়া গেল
“আমি বলছি তুমি একটা শয়তান! তুমি একটা ভীষণ
ক্রোধে তাহার কণ্ঠ দিয়া যেন স্বর বাহির হয় না।
“তুমি দেখছি রীতিমত অপ্রকৃতিস্থ !” লুশিন্ কোনরকমে
স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলিল।
“আমি মদ খাই নি, খেয়েছ তুমি।” লেবেজিয়াটনিকফ, একটা
প্রবল ঝকানি দিয়া বলিল, “ছি-ছি—আর তােমায় কি না আমি
মহানুভব বলে পূজো করছিলুম। আমি নিজে চোখে দেখেছি
তুমি দরজা অ মিস সােনিয়াকে এগিয়ে দেবার সময় একখানা
নােট তার ডান পকেটে গুজে দিলে। ঐ নােটটা তুমি তার
অনেক আগেই নিজের হাতের মধ্যে ভাজ করে ধরেছিলে।
আমি ভাবলুম, বুঝি তুমি দয়া করে সোনিয়াকে ঐ নােটটা দিচ্ছ,
কেবল নিতে লজ্জা করবে বলে তাকে না জানিয়ে তার পকেটে
গুজে দিচ্ছ! আমিও যেমন মূখ তাই তােমাকে মহৎ ভেবে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৪১ তখনই তােমাকে ধরিয়ে দিই নি ! ছি-ছি তুমি এতখানি নীচ, এত বড় পিশাচ ! একজনকে দয়া করবার ভাণ করে তাকে এইভাবে অপমান করা ! এত বড় শয়তান তুমি-” লেবেজিয়াটনিকফের কথা শুনিয়া সকলেরই বিশ্বাস হইল যে উহার একটি কথাও মিথ্যা নহে! রাসকনিকফ, মন দিয়া তাহার সমস্ত কথা শুনিল। দেখিতে দেখিতে লুশিনের মুখ ছাইএর মত সাদা ইয়া গেল। শুষ্ক, পাংশু মুখে সে অকস্মাৎ চীৎকার করিয়া কহিল, “এসব তােমার মিছে কথা। কৈ-প্রমাণ কৈ ? তােমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয় বলে তুমি আমার নামে এই সব ব’লে যাচ্ছ । “ও! এই ! এ ছাড়া আর তােমার কিছু বলার নেই। বেশ, চলাে’ পুলিশের কাছে ! কোর্টে গিয়ে আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি যে আমার কথা একটিও মিথ্যা নয়। আমি সব দেখেছি! কেবল একটা কথা বুঝতে পাচ্ছি না যে এ মেয়েটিকে অপদস্থ করে তােমার কী লাভ হবে। কোন স্বার্থের জন্য তুমি এতটা নীচ তাহাকে বাধা দিয়া র্যাঙ্কলনিকফ, বলিয়া উঠিল, “কিন্তু আমি সব বুঝতে পেরেছি।” সকলেরই দৃষ্টি তাহার দিকে পড়িল। রাস্কনিকফ, উপস্থিত সকলকে শুনাইয়া লুশিনকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “সকলে যদি আমার কথা শোনেন তা হলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। এই ভদ্রলোক আমার ভগিনীর পাণি প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু যেদিন ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় সেই দিনই আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। তারপর আমি যেদিন স্বর্গীয় মার- মেলেউফকে সমাধিস্থ করার জন্য ক্যাথারিণের হাতে কিছু টাকা দিয়ে যাই ১৪২ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট সেই দিনই উনি, বোধকরি এই বাড়ীতেই থাকেন বলে, সেটা দেখতে পান এবং আমার মায়ের কাছে এক চিঠি লিখে তঁাদের জানিয়ে দেন যে আমি মৃত ব্যক্তির সৎকারের নাম করে তার স্খলিত- চরিত্রের কন্যাকে টাকা দিয়ে এসেছি। উনি সােনিয়ার সঙ্গে আমার একটা অবৈধ সম্বন্ধের ইঙ্গিত করেছিলেন, ওঁর উদ্দেশ্য ছিল আমার মায়ের ও বােনের চোখে আমাকে হীন প্রতিপন্ন করা। কিন্তু ওঁর সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হ’ল। আমার মা ও বোন সত্য কথা জেনে আমায় সাদরে গ্রহণ করলেন। সােনিয়াকে আমি আমার মা ও বােনের সঙ্গে কাল পরিচয় করিয়ে দিলুম। কাল যখন উনি দেখলেন যে আমার হীনতা প্রমাণ করা অত সহজ নয় তখন উনি তাদের অপমান করলেন, ফলে ওঁকে কাল তঁারা সােজ। দরজা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এখন ব্যাপারটা বুঝে দেখুন, উনি বদি আজ সােনিয়াকে চোর এবং দুশ্চরিত্রা বলে প্রমাণ করতে পারতেন, তা হলে আমার মা ও বােনের চোখে আমিও হীন হয়ে যেতুম। কেন না, আমি তাদেরই পাশে সেদিন সােনিয়াকে বসিয়েছিলুম এবং লুশি তঁাদের কাছে প্রমাণ করতে পারতেন যে তিনি তাঁর ভাবী পত্নী ও শাশুড়ীর মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যই আমার সম্বন্ধে তাদের কাছে ঐ সব বলেছেন। এর দ্বারা উনি তাদের শ্রদ্ধা অর্জন করতেন, আমার সঙ্গে আমার মা-বােনের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতেন এবং নিজের কাৰ্যোদ্ধার করতেন।এই হচ্ছে মােটামুটি এই সমস্ত ব্যাপারটার মূল কথা।” র্যাকনিকফের বক্তব্য শেষ হইবামাত্র লেবেজিয়াটনিকফ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৪৩ কহিল, “ও বুঝেছি, এই জন্যই লুশিন্ আমায় তখন জিজ্ঞাসা করেছিল যে তুমি এখানে এসেছ কিনা। এই জন্যই তােমার সম্বন্ধে ওর এত কৌতুহল!” পরক্ষণেই পুনরায় তুমুল কোলাহল শুরু হইল। লুশিন্ সকলকে শসাইয়া কি বলিল তাহা শুনা গেল না। তবে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন তাহার দিকে একটা গ্লাস ছুড়িয়া মারিল। কিন্তু সুশি তখন সেখান হইতে অদৃশ্য হইয়াছে, গ্লাসটা বাড়ীউলীর মাথায় লাগিয়া চুর্ণ হইয়া গেল। রক্তাক্ত মাথা দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া বাড়ীউলী সেইখানেই বসিয়া পড়িল। এই কোলা- ইলের মধ্যেও তাহার কণ্ঠ শুনা গেল, সে অশ্লীল ভাষায় গালি পাড়িতে লাগিল। নিমন্ত্রিত লােকগুলি লুশিকে গালি দিতে দিতে বাহির হইয়া গেল এবং সকলের অলক্ষ্যে সােনিয়াও বাহির হইয়া গেল। বাড়ীউলীর সমস্ত রাগটা গিয়া পড়িল ক্যাথারিণের উপর। ক্যাথারিণ প্রায় মূচ্ছিত হইয়া বিছানায় পড়িয়া ছিল, এই হট্ট- গোলের মধ্যে এক ফাকে শয্যা গ্রহণ করিয়াছে। কিন্তু বাড়ীউলী যখন তাহার জিনিসপত্র টানিয়া ঘরের বাহিরে ফেলিতে লাগিল তখন সে উঠিয়া দাড়াইল। বাড়ীউলী চীৎকার করিয়া উঠিল, “এখনি বেরো আমার ঘর থেকে! এখনি বেরো-নচ্ছার মাগী ।” “কী, আজই আমায় পথে দাড়াতে হবে! আচ্ছা দেখি ভগবান্ এর বিচার করেন কি। দেখি, এখনও পৃথিবীতে সুবিচার ১৪৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট পাওয়া যায় কিনা। পােলেকা তুই থাক, আমি এখনই আছি। দাড়া মাগী, আমি তাের নামে আগে তাদের কাছে নালিশ করে আসি। তারপর”-বলিতে বলিতে মাথায় একটা নীল রঙের রুমাল বাঁধিয়া ক্যাথারিণ ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। সে বােধ করি কোন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর কাছে তাহার দুঃখ জানাইতে গেল। ঘরের এক কোণে তিনটা শিশু নীরবে কাঁদিতে লাগিল। র্যাসকনিকফ ও বাহির হইয়া গেল। ১২ যদিও নিজের দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের অন্ত নাই তথাপি “ব্যাক- নিকফ, সােনিয়ার পক্ষ সমর্থন করিয়া যে ভাবে সৰ্ব্বসমক্ষে লুশিনের দুরভিসন্ধি প্রকাশ করিয়া দিল তাহা বীরত্বব্যঞ্জক সন্দেহ নাই। সে যেন বীরের মত তাহার প্রণয়িনীর প্রাণ বাঁচাইয়াছে! ক্যাথা- ' রিণের ঘর হইতে বাহির হইয়া সে সােনিয়ার বাড়ী গিয়া হাজির হইল। তাহার কেবলই মনে হইতেছিল একমাত্র সােনিয়াকেই যেন তাহার প্রয়ােজন এবং সে প্রয়ােজন সােনিয়ার কাছে আত্ম- সমর্পণ করিবার, তাহার দুস্কৃতির বােঝ উজাড় করিয়া দিবার প্রয়ােজন। এই মেয়েটির কাছে তাহাকে প্রকাশ করিতেই হইবে, কে এলিজাবেথের হত্যাকারী! তবু সােনিয়ার ঘরের দরজার সম্মুখে দাড়াইয়া একবার ভাবিল যে ফিনিয়া যায়। কিন্তু জীবনের এইক্ষণে যাহা তাহার একান্ত প্রয়ােজন সেই কঠিন আত্মস্বীকৃতির সঙ্গে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৪৫ . মুখােমুখী দাড়াইয়া সে এ দুৰ্বলতাকে প্রশ্রয় দিল না, সােনিয়ার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়া নিজেকে যেন ঠেলিয়া দিল। সােনিয়া মাথায় হাত দিয়া চুপ করিয়া বসিয়াছিল, র্যাক- নিকফকে প্রবেশ করিতে দেখিয়াই তাহাকে হাত ধরিয়া বসাইল, যেন সে এতক্ষণ এই লােকটির প্রতীক্ষায় বসিয়াছিল। ব্যাক- নিকফ, বসিল, সােনিয়া তাহার পাশে দাঁড়াইয়া রহিল। সােনিয়া ধীরে ধীরে কহিল, “আপনি না থাকলে আজ আমার কী হত !” ব্ল্যাকলনিকফ, মুখ তুলিয়া কহিল, “সমাজে তােমার স্থান এইখানে বলেই ঐ অভিযােগ লােকে বিশ্বাস করছিল। সকলেই এক কথায় বিশ্বাস করবে যে তােমার মত মেয়ের পক্ষে যে কোন নীচ কাজ করা সম্ভব। আমার কথাটা বুঝতে পারছ?” সােনিয়া ব্যাথা পাইল, মিনতি করিয়া কহিল, “কথা থাক, আজ আর ওকথা নয়।” “সত্যিই আজ যদি দৈবক্রমে আমি এখানে না থাতুম,” র্যাকনিকফ, অন্য দিকে চাহিয়া বলিতে লাগিল, “যদি লেবেজিয়াট-. নিকফ, ঠিক ঐ সময় এসে না পড়তাে, তাহলে কী করতে তােমরা? লুশিন্ তােমার জেলে দিত এবং তার ফলে ক্যাথারিণ না খেয়ে মরতাে। হয়তাে লুশিনের শয়তানির জন্য পােলেঙ্কাকে তোমারই পথে নামতে হত। লুশিন যদি এমনিভাবে তােমাদের সৰ্ব্বনাশ করতো তা হলে তুমি কী করতে? লুশিনকে কি অবাধে তােমাদের সর্বনাশ করতে দিতে ? কী করতে তুমি?” সােনিয়া এ সকল প্রশ্নের ঠিক অর্থ বুঝিতে পারিল না কিন্তু ১৪৬ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট রাসকনিকফ-এর রূঢ়তায় অত্যন্ত ব্যাথা পাইল। প্রায় কাদিয়া ফেলিয়া কহিল, “আপনি কেন এসব বলছেন? এ সব কথার মানে কী? যা হয়নি তাই ভেবে আপনি কেন এত অসম্ভব প্রশ্ন করছেন ? কেন ? সােনিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। রাসকনিকফ, কিমৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া মৃদু কণ্ঠে কহিল, “তােমাকে মিথ্যে ব্যথা দিয়েছি সােনিয়া। লুশিনের কথা বলে আমি নিজেরই কৃতকৰ্ম্মের একটা যুক্তি খুঁজে বার করছিলুম। তামি কাল তােমায় বলেছিলুম যে তােমার কাছে আমার মার্জনা ভিক্ষা ক’রবার আছে আজ সেই জন্যই আমি এসেছি।” ব্যাস, কনিকফ, মুখে হাসি টানিয়া আরও কি যেন বলতে গেল কিন্তু পারিল না। দুঃসহ বেদনায় তাহার কথা জোগাইল না—মাথা নীচু করিয়া স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। একবার সে সােনিয়াকে ঘৃণা করিবার চেষ্ট করিল কিন্তু মুখ তুলিয়া দেখিল সােনিয়া তাহারই মুখের ‘পরে তাকাইয়া আছে। তাহার চোখে গভীর উদ্বেগের ছায়া, ওষ্ঠে, চিবুকে অপরিসীম করুণা। এই সােনিয়াকে সে ঘৃণা করিবে ? অসম্ভব। তারপর সহসা তাহার মনে হইল যেন সেই ভীষণ মুহূর্ত কয়টা ফিরিয়া আসিয়াছে! সে এলেনার সম্মুখে দাড়াইয়া, তাহার হাতে সেই ভারী কুঠার। সে মনে মনে বলিল, “আর এক মুহূর্ত নষ্ট করা চলবে না—এখনই!” সে যেন কুঠারটা তুলিয়া ধরিল-ওঃ! তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল। =

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৪৭
“কী হয়েছে? অমন করছ কেন?” সােনিয়া তাহাকে
রিয়া বসাইল। তাহার মুখের চেহারা দেখিয়া সােনিয়া শিহরিয়া
উঠিল।
কেন তাহার এমন অবস্থা হইল র্যাসকনিকফ, ভাবিয়া
পাইল না। নিজেকে সাপ্লাইয়া লইয়া কহিল, “না-ও কিছু নয়।
যা, তােমাকে আজ বলবে। কে সেই এলিজাবেথকে খুন
করেছিল।”
“তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে?' কে সে? কী নাম ?”
সােনিয়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল।
“তুমি বলাে দেথি!” রাসকনিকফ, তীক্ষ দৃষ্টিতে সােনিয়ার
মুখের দিকে তাকাইল—সে যেন সােনিয়ার অন্তরের গভীর তলদেশ
পৰ্যন্ত দেখিয়া লইতে চায়।
সােনিয়ার সারা দেহ ঝাপিয়া উঠিল। হাসিবার চেষ্টা করিয়া
বলিল, “তুমি এমন ভয় দেখাও! আমি কেমন করে জাবো!”
“জাবে—চেষ্টা করাে।”
কথাটা বলিবার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বেকার মতাে তাহার সর্বশরীর
যেন হিম হইয়া গেল। সােনিয়ার দিকে চাহিয়া সে চমকিয়া
উঠিল। আশ্চৰ্য, সেইদিন এলিজাবেথও তার দিকে অমনই
সভয়ে তাকাইয়াছিল। সােনিয়ার চোখে যেন সেই ভীত অসহায়
! সােনিয়া চকিতে তাহার নিকট হইতে সরিয়া গেল।
“জাতে পারলে?”
“উঃ!. ভগবান!” সােনিয়া যেন আর সহ করিতে পারিল
০

১৪৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
, বিছানায় মুখ খুঁজিয়া পড়িয়া রহিল। তারপর আবার
ব্যাঙ্কলনিকফের নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু এইবার তাহার
মুখের পানে চাহিয়া সােনিয়ার আর সন্দেহের অবকাশ রহিল না।
র্যাকনিকফ, চঞ্চল হইয়া উঠিল—সে ভাবে নাই যে এইভাবে
তাহাকে ধরা দিতে হইবে ।
সােনিয়া যেন সব ভুলিয়া গেল। র্যাকনিকফের পায়ের
কাছে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া পড়িল—তাহার চোখ দুটি ছল ছল
করিতেছে। একবার শুধু বলিল, “তোমাকে হারালুম!” তাহার
পর উঠিয়া দুই বাহু-বেষ্টনে র্যানিকফকে বুকের কাছে আকর্ষণ
করিয়া বার বার তাহাকে চুম্বন করিল। তাহার আলিঙ্গনে, চুম্বনে,
তাহার অঙ্গের নিবিড় স্পর্শসুখে ব্লাস্কনিকফের সারা অন্তর যেন
কী একটা অনুভূতিতে অভিষিক্ত হইয়া গেল। তথাপি সে বিস্মিত
না হইয়া পরিল না। কহিল, “সােনিয়া, একথা শােনার পরও
তুমি আমায় -
সসানিয়া কিছুই শুনিতে পায় নাই। করুণা কণ্ঠে কহিল,
“তােমার চেয়ে দুঃখী কে আছে! তুমি এত সইছ কেমন করে ?”
তেমনিই ভাবে তাহাকে অজস্র স্নেহের ধারায় স্নান করাইতে করাইতে
সােনিয়া ক্রন্দনের বেগ রােধ করিতে পারিল না।
এতক্ষণে র্যানিকফের চোখ অশ্রুপূর্ণ হইয়া আসিল। স্নিগ্ধ
কণ্ঠে কহিল, “সােনিয়া, তুমি আমায় ত্যাগ করব না? আনার
সঙ্গে জেলে যাবে, বলো, যাবে?”
সােনিয়া তাহাকে পুনরায় চুম্বন করিল। কহিল, “হ্যা গাে,

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৪৯
হা! তােমার সঙ্গেই জেলে যাবে।” এই কথাটুকু, এই আশ্চর্য
একান্ত আত্ম-নিবেদনের সুর রাস্কনিকফ, জীবনে শুনতে পায়
নাই। তাহার অপরাধী মন যেন সহসা জগতের বিরুদ্ধে বুক ফুলাইয়া
দাড়াইল। সে কহিল, “আমি এখন হয়তো আর জেলে না-ও
যেতে পারি।”
সােনিয়া তাহাকে দেখিতেছিল। এই হতভাগ্য মানুষটিকে
দেখিয়া যেন তাহার সাধ মিটে না। এ লােকটি খুনী? আশ্চৰ্য্য।
সােনিয়ার মনে হইল হয়তাে সবটাই তাহার ভুল। এ লােকটা
হত্যা করবে কি করিয়া ? সে ব্যাকুল হইয়া প্রশ্ন করিল, “কিন্তু
তুমি-তুমি কেমন করে এ কাজ করলে ? কেন করলে?”
র্যাসনিকফ, একে একে সব বলিয়া গেল। তাহার কথা
শুনিতে শুনিতে সােনিয়ার মনে হইল স্ন্যাসকনিকফ, নিজেকেই
খুন করিয়াছে। দুইটি নিরপরাধ নারীকে হত্যা করিয়া তাহার
শাস্তির অন্ত নাই, তাহার অন্তরের তীব্র দহনে সে ভস্মীভূত
হইতেছে। র্যাকনিকফ, যখন সব বলিয়া শেষ করিল তখন
সােনিয়ার বুকের মধ্যে যেন হাহাকার উঠিল ; সে নীরবে কঁদিতে
লাগিল। তাহার পর সহসা তাহার মুখ উদ্ভাসিত হইল, দীপ্ত কণ্ঠে
কহিল, “এখন এক উপায় আছে। তুমি এখনই গিয়ে সকলের
সামনে দাড়িয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে। যিনি সকলের
ওপরে আছেন তাকে তুমি প্রণাম করাে, আর সমাজের কাছে মাথা
নীচু করে বিচার প্রার্থনা করো। তা হলেই ভগবান্ তােমাকে
মার্জনা করবেন।”

১৫০
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
“কিন্তু বুঝে দেখ সােনিয়া। লােকে তাে তা বুঝবে না। ওরা
ভাববে যে আমি ভয়ে ধরা দিলুম। আমি ধরা দিতে পারবাে
, সােনিয়া।”
“তা হলে কি সারা জীবন এই রকম ভয়ে ভয়ে দুঃসহ পাপের
বােঝা বইবে? এমন করে বেঁচে কি লাভ?”
“পুলিশ আমার খােজ করছে। আমায় শীঘ্রই গ্রেফতার
করবে।”
সােনিয়া ভয়ে শিহরিয়া উঠিল, তাহার মুখ সাদা হইয়া
গেল।
“একি! তুমি ভয়ে শিউরে উঠছো কেন? এই তত তুমি ধর
দিতে ব’ছ, তবে আর ভয় করছ কেন? শােন সােনিয়া, ওর
আমাকে কিছুতেই জেলে দিতে বা দ্বীপান্তরে পাঠাতে পারবে না
কেননা ওদের হাতে কোন প্রমাণ নেই। ধারণার বশে ওরা শুধু
আমাকে হাজতে রাখতে পারে। শুধু তুমি যা করবে
করে। আমার কথা বুঝতে পারছ?”
“হ্যা, বুঝেছি।”
দুইজনেই স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। যেন ভীষণ ঝড়ে জাহাজডুবি
হইয়া দুইটি যাত্রী এক অজানা ভয়সঙ্গুল দ্বীপে আশ্রয় লইয়াছে
তাহাদের মুখে ঠিক তেমনই বেদনার ছায়া, তেমনই উদ্বেগ, তেমনই
হতাশা। ব্যাকনিকফ, সােনিয়ার কাছে আসিয়াছিল শুধু
তাহার এই দুঃসহ বেদনার বােঝা লাঘব করিতে কিন্তু সােনিয়া
যখন হৃদয় উজাড় করিয়া তাহারই পায়ে নিবেদন করিল তখন তাহার
একটু বুবে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট দুঃখের বােঝ। আরও ভারী হইয়া উঠিল। জীবন এখন তাহার কামনার ধন, তাই দুঃখ তাহার অনন্ত ! এমন সময়ে লেবেজিয়ানিকফ, আসিয়া সংবাদ দিল যে, মাদাম ক্যাথারিণ প্রায় উন্মাদ হইয়া গিয়াছেন। তিনি কোন এক বড় রাজকর্মচারীর কাছে বাড়ীউলীর বিরুদ্ধে নালিশ করিতে গিয়াছিলেন। তাহারা এ রকম উন্মাদিনীর কথা শুনিবে কেন ? তাহারা তাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছে। ক্যাথারিণ বুঝি তাহাদের কী একটা ছুড়িয়া মারিয়াছেন। তিনি বাড়ী আসিয়া অনর্গল কথা বলিতেছেন। তাহার কথার মধ্য হইতে লেবেজিয়াটনিকফ, যাহা বুঝিতে পারিয়াছে তাহাই বলিল। ক্যাথারিণ বলিতেছেন তিনি পথে পথে ছেলে- মেয়েদের লইয়া গান গাহিয়া ভিক্ষা করিয়া বেড়াইবেন—লােকে দেখিবে যে সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা পথে পথে ভিক্ষা করিতেছে। ইহাতে সকলেরই মাথা হেঁট হইবে। ক্যাথরিণ লেনা ও পােলেন্কাকে একটা গানও শিখাইতেছেন—এখনই তাহারা পথে বাহির হইবে । ক্যাথারিণের বিবরণ শুনিয়া সােনিয়া আর স্থির থাকিতে পারিল না, দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল। লেবেজিয়াটনিকফ, ক্যাথারিণের অবস্থা দেখিয়া কি করিবে কিছুই ভাবিয়া পাইতেছিল না। বা কনিকফ, তাহার কথা শুনিতে শুনিতে সােনিয়ার ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

সেই অতিপরিচিত ঘর, সেই জীর্ণ ধূলিমলিন খাটের উপর একটা শতছিন্ন বিছানা, সেই কাগজ আটা দেওয়াল, সেই দরিদ্র, ঘৃণিত পরিবেশ! নিজের ঘরে বিশ্রাম করিতে আসিয়া র্যাকনিকফ, ঘরটার চারিদিকে একবার চোখ বুলাইয়া লইল। এত বড় বাড়ীটায় কোথাও কোন শব্দ নাই, জনমানবের কোন কলরব নাই। সে একা, এই দৈন্য লইয়া, এই নির্জনতায় সে একা ! একাই তাহার ভালাে। তাহার মনে হইল আপনার বলিতে তাহার কেহ কোথাও নাই, সােনিয়াও নাই। সে বিশ্বাস করিবার চেষ্টা করিল সে সােনিয়াকে ঘৃণা করে। সােনিয়া কে ! শুধু তাহার দুঃখে দু’ফোটা চোখের জল ফেলিবার জন্য কেন সে সােনিয়াকে তাহার জীবনের পথে টানিয়া আনিল? তাহার যদি জেল হয় তাহা হইলে সসানিয়াকে কিছুতেই অনুসরণ করিতে দিবে না। এবং সে জেলে যাইবেই। কতক্ষণ যে এইভাবে কাটিয়া গেল তাহার ঠিক নাই। সহসা ডুনিয়ার পদশকে সে চমকিয়া সােজা হইয়া বসিল। দুনিয়া কহিল, “তুমি ব’স দাদা! আমি তােমার সব কথা শুনেছি। ওরা তােমায় সন্দেহ করে তাই তােমার জীবন বিষময় হয়ে উঠেছে। এই নীচ সন্দেহের আক্রমণে তুমি মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলো। তোমার কারুকেই ভালাে লাগে না—তাই আমাদেরও ত্যাগ করেছ। তোমার অবস্থায় পড়লে হয়তাে আমি আরও অনেক কিছু করতুম ।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তুমি যদি একা থেকে ভালো থাকে তা হলে তাই পাকো-মাকে আমি বুঝিয়ে রাখবে। আর যখনই প্রয়ােজন হবে আমায় ডাক্ দিয়ে। দাদা, এই কথাটা বলবার জন্যে এসেছিলুম। এখন উঠি -তুমি বেশী ভেবে না। রাজুমিখি ব’ছিলেন যে এই মিছে সন্দেহকে তুমি বেশী বড়ো করে দেখছো-কিন্তু ওরা তােমার কিছুই করতে পারবে না।” দুনিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সে সংযত ধীর কণ্ঠে যাহা বলিয়া গেল তাহাতে তাহার ভগ্নী-হৃদয়ের অকৃত্রিম স্নেহ উচ্ছসিত হইয়া রাসকনিকফকে স্পর্শ করিল। দুনিয়া চলিয়া যাইতেছিল, সে তাহাকে ডাকিয়া কহিল, “দেখ ডুনিয়া, রাজুমিখি বেশ ছেলে, নয়?” ঈষৎ আরক্ত মুখে ডুনিয়া কহিল, “হ্যা, তাতে কি?” “হ্যা, তাই বলছিলাম। ছেলেটি যেমন কঠোর পরিশ্রম করতে পারে তেমনই কোমল স্বভাব এবং ধাৰ্মিক প্রকৃতির। আমার মনে হয় সত্যিকার ভালােবাসতে ওই পারে।•••তুমি যাচ্ছ? যাও !” ডুনিয়া এইবার লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। মৃদু কণ্ঠে কী, একটা বলিয়া বাহির হইয়া গেল। র্যাকনিকদের ইচ্ছা হইল আরও কিছুক্ষণ ডুনিয়ার সঙ্গে কথা বলে, তাহার দিকে চাহিয়া থাকে কিন্তু সে ইচ্ছা প্রকাশ করিল না—ইহার পর হয়তাে দুনিয়া একটা খুনীর সঙ্গে অধিকক্ষণ কাটাইয়াছে মনে করিয়া অনুতাপ করিবে। ডুনিয়া চলিয়া যাইতেই রানিকফ, পুনরায় বাহির হইবার জন্য উঠিয়া পড়িল। জ্বরে তাহার সারা দেহ পুড়িয়া যাইতেছে ১৫। ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তথাপি সে কিসের একটা উত্তেজনায় চলাফেরা করিতেছে! কি করিবে কোথায় যাইবে কিছুই তাহার ভাবিয়া দেখিবার অবস্থা নাই। কী এক অনিৰ্দেশ্য আকর্ষণে সে পথে নামিয়া পড়িল। খালের ধারে যে দিকটায় সােনিয়ার বাড়ী র্যাকনিকফ বেড়াইতে বেড়াইতে পুনরায় সেই দিকে চলিতে লাগিল; একট রাস্তার মােড়ে ভিড় জমিয়া গিয়াছে, কতকগুলি ছােট ছােট ছেলেমেয়ে কী একটা মজা দেখিয়া হাততালি দিতেছে। ভিড়ে মধ্যে দেখিল লেবেজিয়ানিকফ, শুষ্ক মুখে দাড়াইয়া আছে। কাছে গিয়া র্যাকনিকফ, স্তম্ভিত হইয়া গেল। ক্যাথারিণ একটা থাল কিংবা ঐ রকম একটা বাসন বাজাইতেছে আর পােলেকা গা গাহিতেছে। এতগুলি লােকের হাততালি আর কৌতুহলী দৃষ্টি সম্মুখে পোলোর গলা দিয়া স্বর বাহির হইতেছে না। সে সভ চারিদিকে তাকাইয়া দেখে আর ক্যাথারিণ তাহাকে ধমক দিয়া উঠে ছােট ছেলেটি আর মেয়েটিকে ক্যাথারিণ নাচিতে বলিতেছে, তাহাদে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী দেখিয়া সমবেত জনতা হাসিয়া উঠিতেছে। না রঙের ছেড়া কাপড় দিয়া তাহাদের বেদুইনের সাজে সাজানে হইয়াছে। ক্যাথারিণ তাহাদের একটা নুতন নাচ নাচিতে বলিল কিন্তু এইবাৰ সকলে এমনভাবে হাসিয়া উঠিল যে পােলেকা চু করিয়া গেল এবং লেনা আর কোলিয়া সহ নাচ থামাইয়া মাথা হেঁ করিয়া বসিয়া পড়িল। ক্যাথারিণ.ক্ষিপ্ত হইয়া জনতার প্রতি গf বর্ষণ করিতে লাগিল কিন্তু তাহারা আরও হাসিতে লাগিল। অপমানে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট * উত্তেজনায় ক্যাথারিণের কাশি শুরু হইল এবং নিমেষে তাহার মুখ দিয়া রক্ত বমন হইতে লাগিল। সােনিয়া তাহাকে সজল চক্ষে ঘরে ফিরিয়া আসিতে বলিল, সে ক্যাথারিণকে বার বার নানা ভাবে সান্ত্বনা দিতেছিল। কিন্তু ক্যাথারিণ, কিছুতেই ঘরে ফিরিয়া যাইবে না। রক্তাক্ত মুখে কাপড় চাপা দিয়া কহিল, “তুই থাম সােনিয়া। আমি সব জানি, বাের্ডিং স্কুল করলে কিছুই হবে না। এই ঠিক হয়েছে। লােকে জানুক, ঐ হারামজাদা বড়লােকগুলাে দেখুক যে তাদের সমাজের সম্রান্ত ছেলেমেয়েরা ভিক্ষে করছে। এই ঠিক হচ্ছে, বুঝলি ? নে, পােলেকা, সেই গানটা ধর, সেই ফরাসী গানটা, ফরাসী গান না গাইলে লােকে জাবে কেমন করে যে আমরা-বড়ো ঘরের লােক। কী, চুপ করে রইলি যে, ধ নারে, ওরে আমি যে আর বতে পারি না। ওরে—” এক ঝক রক্ত আসিয়া তাহার স্বর বন্ধ করিয়া দিল। ক্যাথারিণের মুখে মৃত্যুর ছায়া স্পষ্ট হইয়া উঠিল। অবিশ্রান্ত রক্তবমনের ফলে তাহার মুখ, কাগজের মত সাদা হইয়া গিয়াছে, চক্ষু দুইটি ঠেলিয়া বাহির হইতেছে। যেটুকু সময় রক্তবমন বন্ধ থাকে । সেইটুকু সময় সে সমবেত জনতাকে বক্তৃতা করিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করে কী অবস্থায় তাহারা আজ পথে বাহির হইয়াছে। সােনিয়া তাহাকে থামাইবার চেষ্টা করে কিন্তু মুখে রক্ত, ভরিয়া উঠিলে ক্যাথারিণকে থামায় কাহার সাধ্য। যাহারা এতক্ষণ মজা দেখিতেছিল তাহারাও এই মুমুধু রমণীর প্রলাপ বাক্যে আর ১৫৬ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট হাসিতে পারিল না, চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। কেহ কেহ কিছু ভিক্ষাও দিল। এক ভদ্রলােক একটা রাব পােলেঙ্কার হাতে গুজিয়া দিলেন। একজন সম্রান্ত ভদ্রলােক তাহাকে দয়া করিল দেখিয়া ক্যাথারিণ আরও উত্তেজিত হইয়া তাহাকে নিজের কাহিনী শুনাইতে লাগিল, তাহার বংশ পরিচয়ের মধ্যে যে গৌরব সে বিবৃত করিয়া গেল তাহার মধ্যে সবটাই তাহার কাল্পনিক, তথাপি কল্পনা ও বাস্তব এখন তাহার একাকার হইয়া গিয়াছে, তাহার সকল কথা ঠিক বুঝাওগেল না। এমন সময় রাস্তায় যানবাহন চলাচলের অসুবিধা হইতেছে দেখিয়া এক সশস্ত্র পুলিশ আসিয়া তাহাদের চলিয়া যাইতে বলিল। ক্যাথারিণ-জানাইল যে সে কিছুতেই যাইবে না, রাজপথে যাহারা অরগ্যান বাজাইয়া গান করে তাহাদের মত সে-ও গান গাহিয়া ভিক্ষা করিবে, এতে পুলিশের কি বলিবার আছে। “কিন্তু মাদাম,” পুলিশটি সন্ত্রমভরে কহিল, “তাহাদের লাইসে থাকে। আপনার লাইসেন্স কৈ ?” “আমার স্বামীকে আজ সকালে কবর দিয়েছি-এই আমার লাইসেন্স। আবার কি লাইসেন্স চাই ? যাও, বিরক্ত করে । লেনা, কোলিয়া নে এইবার ভালাে করে নাচ দেখি-কৈ ? লেন। কৈ? কোলিয়া কৈ ? ওরে তােরা কোথায় গেলি ? সােনিয়া দেখ, না মা ছেলেমেয়েগুলাে কোন দিকে-ওরে আমি যে তােদরই জন্য এই সব করছি—আর তোের।” । পুলিশ, দেখিয়া ভয় পাইয়া শিশু দু’টি পলাইয়া গিয়াছে, ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৫৭ ক্যাথারিণও কঁদিতে কাদিতে ছুটিতে লাগিল। কিন্তু কিয়দ্দর গিয়াই হোঁচট খাইয়া পড়িয়া গেল। দীর্ঘকাল অনশনে, উপযুপরি রক্ত বমনে তাহার শরীরে আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। সামান্য আঘাতেই জ্ঞান হারাইয়া মূচ্ছিত হইয়া পড়িল। সােনিয়াও তাহার পিছনে পিছনে ছুটিতেছিল, সে ক্যাথারিণের মাথাটা কোলে তুলিয়া লইল। ক্যাথারিণের মুখ দিয়া গাঢ়, উষ্ণ রক্ত গড়াইয়া পড়িতেছে, রক্তে দেহ ভাসিয়া যাইতেছে। নিকটেই সােনিয়ার বাড়ী, র্যাস- কনিকফ, ও 'লেবেজিয়াটুনিকফ, ধরাধরি করিয়া ক্যাথারিণকে সােনিয়ার ঘরে তুলিয়া আনিল। ক্যাপানসুমফ, নিজে ডাক্তার ডাকিতে গেল। সােনিয়া ক্যাথারিগের চোখে মুখে ভিজা কাপড় বুলাইয়া রক্ত মুছিয়া দিতে লাগিল। তাহার হাত কাঁপিতেছে, ওষ্ঠে ওষ্ঠ চাপিয়া প্রবল ক্রন্দন চাপিয়া রাখিতেছে। ভিড়ের মধ্যে পাশের ঘর হইতে সিড্রিগেলফ, আসিয়া দাড়াইয়াছিল, সে-ই ক্যাপারুনসুমফকে ডাক্তার ডাকিতে পাঠাইয়াছে। র্যাকনিকফ, “জানিত না, সিড্রিগেলফ, এই বাড়ীতেই থাকে, সে সিড্রিগেলফকে দেখিয়া বিস্মিত হইল। সিড্রিগেলফ, একজন পুরােহিত আনিতে পাঠাইল। একটু পরেই ক্যাথারিণের সংজ্ঞা ফিরিয়া আসিল। প্রাণপণ- শক্তিতে উঠিয়া বসিয়া কহিল, “কৈ পােলেন্কা? লেনা আর কোলিয়া কৈ? ও—এই যে! তােরা পালিয়ে গেলি কেন? যাক গে, সােনিয়া এদের আমি তাের হাতে দিয়ে যাচ্ছি। দেখি, ওরা যেন মানুষ হয়। পুরােহিত ? পুরােহিত আমার দরকার ১৫৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট নেই। জ্ঞানে কোন পাপ করিনি-করলেও ঈশ্বর নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন—তিনি জানতে পারছেন কী দুঃখ আমি পেয়ে গেলুন। আর যদি ভগবান্ আমায় মার্জনা না করেন তা সেও ভালাে- আমার যা হয় হবে। পােলো, আর এদিকে আয়। সেই গানটা গা তাে সেই মুকুতা মাণিক সবই তােমায় দিলেম-” বলিয়া নিজেই সুর করিয়া লাইনটা গাহিতে লাগিল। কিন্তু গান গাওয়া আর হইল না। সহসা তাহার কণ্ঠ বিদীর্ণ করিয়া এক প্রকার বীভৎস শব্দ বাহির হইতে লাগিল। তাহার শ্বাস বন্ধ হইবার উপক্রম হইল, প্রবল ঝকানি দিয়া সে আর একবার শেষ গান গাহিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু স্বর বাহির হইল না, অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করিয়া চাহিয়া রহিল । মুখে কথা নাই, চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। কয়েক মিনিট এইভাবে কাটিয়া গেল। তাহার পর সহসা কি যেন তাহার মনে পড়িয়া গেল অথচ বলিতে পারি না। ভীত, অসহায় দৃষ্টিতে একবার মুখ তুলিয়া তাকাইল। কি যেন রােধ করিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল ... না। নিদারুণ হতাশায় তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল, সােনিয়া, মা আমার, পারলুম না-আর নয় চলুম’আর একবার উঠিবার চেষ্টা করিতেই ক্যাথারিণের মাথাটা গড়াইয়া পড়িল। র্যাকনিকফ, জানালার ধারে গিয়া দাড়াইল। লেবেজিয়াট- নিকফ, ক্রশ চিহ্ন আকিল। মৃত্যু আসিয়া যখন তাহার কাজ শেষ করিয়া চলিয়া গেল

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
তখন সিড্রিগেলফ, রানিকফের নিকট আসিয়া দাঁড়াইল।
চুপি চুপি জানাইল যে, ক্যাথারিণকে কবর দিবার সমস্ত ব্যয়
সে বহন করিবে এবং সােনিয়ার মত পাইলে সে এই হতভাগ্য
শিশুগুলিকে কোন অনাথ আশ্রমে রাখিয়া দিবে এবং তাহার
জন্য যাহা লাগে সে দিবে। এমন কি সােনিয়া যাহাতে এই পঙ্কিল
জীবন-যাত্রা ত্যাগ করিয়া ভালােভাবে সৎপথে থাকিতে পারে সে
বন্দোবস্তও সে করিয়া দিতে রাজী আছে।
রাসনিকফ, তাহার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাইল।
সিড্রিগেলফ, তাহা দেখিয়া কহিল, “তােমার বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে
না? আরে, আমার এত টাকা হবে কী? ক্যাথারিণ তাে
আর সেই সুদখাের মাগীর মত শয়তানী ছিলেন না। তার জন্য,
নব সমাজের কল্যাণের জন্য আমায় কিছু করতে দাও।”
‘সড্রিগেলফ, হাসিল। র্যাঙ্কলনিকফ, তাহার কথায় চমকাইয়া
উঠিল, এই লােকটার কথায় যে নিগূঢ় ইঙ্গিত ছিল তাহা বুঝিতে
পারিয়া তাহার সর্বদেহে যেন হিমপ্রবাহ বহিয়া গেল।
সে কহিল,
তুমি কি এই বাড়ীতেই—”
‘হা, সােনিয়ার ঠিক পাশের ঘরেই আপাততঃ আমি থাকি।”
সে আবার হাসিল।
পুরােহিত আসিয়া শেষকৃত সমাপন করিয়া গেল। রাস্
কনিকফ, সােনিয়ার কাছে যাইতেই সােনিয়া নীরবে তাহার
কাধে মাথা
রাখিল। ব্যাকনিকফ, বুঝিল সােনিয়া তাহার
নিকট নিজকে সম্পূর্ণ বিলাইয়া দিতে চাহে, ইহা তাহারই অভিব্যক্তি।

১৬০ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট রাস্কনিকফ, তাহার হাত দু’টি ধরিয়া একটু চাপ দিল তারপর ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল। ১৪ এই ঘটনার পর র্যাকনিকফ, ভাবিল যে সে একান্ত নির্জনে থাকিবে, কাহারও মুখ দেখিবে না। কিন্তু করিল তাহার ঠি উল্টা! কয়েক দিন ধরিয়া হােটেলে হােটেলে ঘুরিল, পানশালায় বসিয়া প্রচুর মদ খাইল এবং নর্তকীর গান শুনিল। তবে এই সকলের মূলে ছিল সিড্রিগেলফ,। ঐ লােকটা কয়েকদিন যাবৎ ব্যাক- নিকফকে ছায়ার মত অনুসরণ করিতেছে। র্যাকনিকফ, উহাকে দেখে আর পানশালায় ঢুকিয়া মদের পাত্র উজাড় করে। ঐ লােকটা কেন যে তাহার পিছু লইয়াছে তাহা সে ঠিক বুঝিতে পারে না এবং যখনই বুঝিতে পারে তখনই তাহার শরীরের সমস্ত স্নায়ু যেন শিথিল হইয়া পড়ে, তাহাকে সুরার আশ্রয় লইতে হয় ! একদিন প্রত্যুষে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া দেখিল যে সে পার্কের মধ্যে একটা গাছের তলায় রাত্রি যাপন করিয়াছে। তাহার দেহে তখনও জ্বরের উত্তাপ, সে উঠিয়া দাড়াইল এবং সােজা বাসায় গিয়া শুইয়া পড়িল। যখন তাহার ঘুম ভাঙিল তখন বেলা দুইটা বাজিয়া গিয়াছে। নিদ্রার অবকাশে জ্বর ছাড়িয়া গেছে, সে অনেক দিন পরে সুস্থ হইয়া উঠিয়া বসিল। নাসটাসিয়া খাবার 'আনিয়া দিল। খাইতে

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
খাইতে ডুনিয়া ও মায়ের কথা মনে পড়িল। মিথ্যা একটা
আতঙ্কের বশবর্তী হইয়া সে শুধু নিজেকে পীড়ন করে নাই,
তাহাদেরও নানা অশান্তির সৃষ্টি করিয়াছে। সে স্থির করিল
পুনরায় সহজভাবে জীবন যাত্রা শুরু করিবে। তবে তার আগে
একবার ঐ সিড্রিগেলফ, লােকটার সঙ্গে একটা বােঝাপড়া করিতে
হইবে। হেঁয়ালী রাখিয়া সে স্পষ্ট করিয়া বলুক কী সে জানিতে
পারিয়াছে এবং কেন সে তাহার পিছনে ঘুরিয়া বেড়ায়। র্যা
কনিকফ, বাহির হইতেছিল এমন সময় রাজুমিখি তাহার সঙ্গে
একটা বোঝাপড়া করিতে আসিল।
রাজুমিখিকে দেখিলেই মনে হয় যে আজ সে একটা মীমাংসা
করিতে আসিয়াছে। রাস্কনিকফ বেশ সুস্থ আছে, দেখিয়া
তাহার মেজাজ আরও চড়িয়া গেল। গলার স্বর যতটা সম্ভব
চড়াইয়া বলিল, “তুমি তো দেখছি বেশ সুস্থ আছ ! দেখ,
তােমার মতলবখানা কী? ভয় নেই, আমি পুলিশের লোক নই,
তােমায় জেরা করতে আসিনি। তােমার গােপন কথা তােমারই
থা। আমি শুধু জানতে চাই যে তােমার মাথা খারাপ হয়েছে
না অন্য কিছু ? আমি তো আর পারিনে। এদিকে তােমার
মা-বােনের অবস্থাটা কী একবার
“তােমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে ? কবে ?”
“আজই হয়েছে এবং প্রায়ই হয়। কিন্তু তােমার কী হয়েছে ?
এই কদিন তােমায় খুঁজে খুঁজে হয়রাণ। বাসায় এসে শুনি
তােমার খবর এরা কেউই জানে না। শেষে আজ সােনিয়ার

১৬২
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
বাড়ী গেলুম খবর নিতে। সেখানে দেখি সােনিয়ার মা, মরে
গেছে, আজ কবর দেবার দিন.। সােনিয়া ছােট ছােট ভাইবােনদের
নিয়ে খুব কান্নাকাটি করছে। শুনলুম সােনিয়ার মা মারা যাবার
পর দিন থেকে তুমি আর যাওনি। ভাবলুম বুঝি বা তােমার
মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু দেখছি তুমি বেশ ভালই আছে।।
থাক, আমি লুম-তােমার সঙ্গে ঝগড়া করে কোন লাভ নেই।”
“শোন, ডুনিয়া সেদিন আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে
তােমার কথা বলছিলুম।”
“সে এখানে এসেছিল। তা আমার কথা কী “ হ’ল ?”
রাজুমিখি প্রায় রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করিল।
“আমি তাকে বললুম যে তুমি ছেলে ভালাে আর পরিশ্রমী
বলে উপার্জন তুমি নিশ্চয়ই করবে। তুমি যে তাকে ভালােবাসে।
একথা অবশ্যি আমি তাকে জানাইনি, কেননা সে তা জানে।”
“সে জানে ?”
“হা, জানে। এবং আমার বিশ্বাস সেও তােমার প্রতি
বিরূপ নয়। রাজুমিখিন, আমি আমার মা-বােনের হিতাহিতের
ভার তােমার হাতেই দিলুমদের তুমি দেখাে। আমি জানি
তুমি কখনই প্রতারণা করবে না। আর দেখ, আমার কোন
গােপনীয় কথা বা ঘটনা নিয়ে তুমি বেশী ভেবাে না। আমার
ঝ’ ঘটেছে তার তুমি কিছুই করতে পারবে না। আমি একেবারে
মুক্ত থাকতে চাই, স্নেহের আচ্ছাদনও আমার সহ্য হয় না !
আমার কথা মনে রেখাে!”

ক্রাইম-এও পানিশমেন্ট
১৬৩
“মনে রাখবে।” রাজুমিখি চলিয়া যাইতেছিল হঠাৎ ফিরিয়া
আসিয়া কহিল, “হ্যা, আর একটা কথা ! আমি সেই
পরফিরিয়াল্টার কাছে গিয়েছিলুম। তার মুখে শুনলুম নিকোলা
ব’লে সেই পাগলটা ধরা পড়েছে। সেই আসল খুনী !”
“নিকোলা! পরফিরিয়াদ কী বললে?” র্যাকনিকফ উৎ
কণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিল।
“সে অনেক কথা। পরফিরিয়া বড় বড় মনস্তত্ত্বের কথা
বলে বুঝিয়ে দিলে যে ঐ লােকটাই যে আসল আসামী সে
বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে না।”
“ও!”
‘আর্মি এখন চললুম্। শীঘ্রই তােমার কাছে আবো।”
রাজুমিখি চলিয়া গেল। মদ না খাইয়াই যেন সে মাতাল
হইয়াছে! ডুনিয়া ! দুনিয়া তাহাকে ভালোবাসে।
ভালোবাসে। সে যতই
ভাবিতে লাগিল ততই তাহার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হইতে লাগিল।
রাজুমিখিন্ চলিয়া যাইতেই ব্যাকনিকফ, উত্তেজিত হইয়া
পায়চারি করিতে লাগিল। তাহার মনে হইল বঁচিবার মত শক্তি
| তাহার ফিরিয়া আসিয়াছে। সে আর দুর্বল হইয়া বিভীষিকার
নিকট আত্মসমর্পণ করিবে না। যাহাই হউক সে এই লােকগুলার
সঙ্গে একটা চরম মীমাংসা করিয়া লইবে। দেখা যাক এই
সমাধি হইতে সে বাহির হইয়া আসিতে পারে কিনা।
সােনিয়ার কাছে সে কেন সব বলিল? সােনিয়ার কাছে সমস্ত
বীকার করিয়াছিল তাহার বােঝ। লঘু হইবে বলিয়া কিন্তু এখন
০

১৬৪
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
সােনিয়া সব জানিয়াছে বলিয়া সে তাহার উপর ক্রুদ্ধ হইল।
তবু তাহার মনে হইল যে সব ঠিক হইয়া যাইবে—কেহ কিছু
করিতে পারিবে না। কিন্তু নিকোল-পরফিরিয়াস কি সত্যই
বিশ্বাস করে যে নিকোলাই আসল খুনী ? তাহা ত হইতে
পারে না। সে যেরকম ধূর্ত-তবে?
“একি! তুমি ম্যাজিষ্ট্রেট পরফিরিয়াস এখানে? এমন সময়
আমার কাছে ?” তাহারই ঘরে স্বয়ং পরফিরিয়াদকে আসিতে
দেখিয়া র্যাকনিকফ, হতবুদ্ধি হইয়া গেল।
“হ্যা ভাই তােমারই কাছে। আরও দু’দিন তােমার খোঁজ
করে গেছি, পাই নি ! হ্যা, আমি এসেছি তােমার কাছে
একটা জবাবদিহি করতে। সেদিন তােমার সঙ্গে কথা কইতে
কইতে বড় বেশী উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলুম। যদি নিকোল।
এসে না পড়তো, তাহলে-”
“তােমার আসল কথাটা বলাে।”
“হ্যা, সেই কথাই বলছি ! দেখ র্যাকনিকফ
এইবার
আমরা পরস্পরের কাছে খােলাখুলিভাবে কথাবার্তা কইবো,
কেমন ? হ, যা বলছিলুম। সেদিন আমি সত্যই তােমার ওপর
অত্যাচার করেছি। আমার নিজের যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রণালী
আছে তারই সাহায্যে ভেবেছিলুম তােমার কাছ থেকে প্রমাণ
বার করে নেবে। আমার দোষ ছিল না। ঐ খুনটার পর থেকে
তােমার ভাবান্তর, তােমার গতিবিধি ' সম্বন্ধে যে সমস্ত গুজব
শুনতে পেলুম তাতে আমার ঐ সন্দেহই হয়েছিল। তােমার সেই

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৬৫
প্রবন্ধটা পড়ে আমি তােমার বাড়ী যাই খোজখবর করতে কিন্তু
তখন তােমার অসুখ। তােমাকে সন্দেহ করেছিলুম বলেই
‘সেকথা রাজুমিখিকে বলেছিলুম যাতে তার মুখ থেকে সেকথা
শুনে ছটফট করতে থাক! দেখ, এসব আমি তােমায় আজ
স্পষ্টই জানাচ্ছি, কেননা আজ আর লুকোচুরির কোন প্রয়ােজন
নেই। হ্যা, তারপর তুমি একদিন সন্ধ্যেবেলায় রেস্তোরাতে
জামেটফকে বলে ফেললে যে তুমি যদি আসামী হ’তে তাহলে
গহণা-পত্র টাকাকড়ি একটা পােড়া বাড়ীর গর্ভে পাথর চাপা
দিয়ে রেখে দিতে, কেউ জানতে পারত না। তুমি শুনলে আশ্চর্য
হবে যে অপহৃত গহণাপত্র ঐ অবস্থাতেই পাওয়া গেছে। তােমার
কল্পনার সঙ্গে আসল খুনীর কাৰ্য্যের আশ্চর্য মিল। আমি
তােমারই প্রতীক্ষা করছিলুম—আমি জানতুম তুমি আসবে ।
এমন সময় তুমি এলে এবং যদি নিকোলা এসে আমাদের আলাপে
বাধা না দিত-যাক গে, সে কথা। হ্যা, নিকোলাকে আমি
জেরা করে দেখেছি সে কিছুতেই আসামী হতে পারে না।
“কিন্তু রাজুমিথিকে আপনি বলেছেন যে নিকোলাই দোষী
সাব্যস্ত হয়েছে।
“ওটা কিছু নয়! রাজুমিখিনের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার
জন্য ওকথা বলেছিলুম! না, ভাই না, নিকোল খুন করে নি।
এ একটা অদ্ভুত মামলার ভার গভর্ণমেন্ট আমাদের হাতে দিয়েছেন।
যে খুন করেছে সে একজন আদর্শবাদী-আজকাল এরকম
আদর্শবাদী আসামীর অভাব নেই। এলেনা বুড়ীকে খুন করেছে

১৬৬ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট একজন ছাত্র--হ্যা, একজন গ্রন্থকীট ছাত্র। সে খুন করলে অথচ চুরি করলে না। যা চুরি করলে তাও আবার ফেলে দিলে। আমার মনে হয় সে খুন করেছে একটা পরীক্ষা করবার জন্য, মানে তার সাহসিকতার পরীক্ষা। ভয়ঙ্কর কিছু একটা ভয়ঙ্কর কিছু একটা করবার আনন্দে সে খুন করেছে ! ঠিক সে কারণে আদর্শবাদী দুঃসাহসী যুবক পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে আরও কত কী করে থাকে। বুঝলে? এই ছাত্রটি খুন করলে শুধু একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করবার জন্য। যত তার ভয় করে তত সেই ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী কার্যের দিকে সে আকৃষ্ট হয়। এলেনা বুড়ীর বাড়ী সেদিন যখন সে খুন করবার উদ্দেশ্যে গিয়াছিল সেদিন তার ভয়ে আতঙ্কে যে অনুভূতি হয়েছিল সেই অনুভূতিটুকু তার অসুস্থতার কারণ কিন্তু তবু তার ঐ অবস্থায় নিজেকে উপলব্ধি করতে ভালো লাগে তাই সে আবার সেখানে যায় গিয়ে বলে, সে ঐ বাড়ী ভাড়া নেবে। তার মনে হয় ঐ ঘর দু’টোয় * বাস করতে পারলে সে একটা শঙ্কিত সন্ত্রস্ত জীবন যাপন করবে। তার মনে মনে ঐ জীবনের প্রতি লােভের সঞ্চার হয়। ব্যাপারটার মূলে আমার মনে হয়, আমামীর মানসিক বিকার। মানে, সে যা কিছু করেছে, ভেবেছে এবং অনুভব করেছে, সবই অর্ধ-অচেতন অবস্থায়। আর একটা কথা কি জানাে, এই ছাত্রটি খুন করেছে অথচ নিজেকে আসামী বা অপরাধী বলে মনে করে না, মনের গােপন কোণেও তার অনুতাপ আসে না। না রােডিয়ন, নিকোলার দ্বারা এসব সম্ভব নয়।” |

ক্রাইমএণ্ড পানিশমেন্ট
১৬৭
র্যাকনিকফ, রুদ্ধনিঃশ্বাসে শুনিয়া যাইতেছিল। তাহার সর্বাঙ্গ
থরথর করিয়া কাপিতেছিল। সহসা সে চীৎকার করিয়া উঠিল,
“তবে কে--কে খুন করেছে ?”
পরফিরিয়া এ প্রশ্ন আশা করেন নাই। তিনি অস্ফুট স্বরে
কহিলেন, “কে খুন করেছে? তুমি বােভিয়, তুমি খুন
রাসকনিকফ, উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে
আবার বসিয়া পড়িল। তাহার মুখখানা যেন ঈষৎ বিকৃত হইয়া
গেল। পরফিরিয়াস সহজ কণ্ঠে কহিলেন, “আমার কথায় তুমি
আশ্চর্য হচ্ছ। কিন্তু আমি এই জন্যই আজ এসেছি-আমি যা
সত্য তা প্রকাশ করে দিতে এসেছি।”
“না-না, আমি খুন করিনি, আমি খুন করিনি।” র্যাকনিকফ,
প্রতিবাদ করিল কিন্তু তাহার কণ্ঠে জোর ছিল না। অপরাধ
ফরিবার সময় ধরা পড়িলে শিশু যেমন প্রতিবাদ করে এও যেন
তেমনি প্রতিবাদ।
প্রায় মিনিট দশেক দুইজনেই নীরব। ব্যাসকনিকফ, মাথার
চুলের মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতে করিতে পরফিরিয়াকে সহসা
1 দিয়া কহিল, “এ তোমার সেই চালাকী, তুমি কথা বার
করবার চেষ্টা করছ। এসব ছেড়ে দাও-যাও--
“চালাকী আমার যাই থাক আমি তােমায় ধ’রতে আসি নি।
তুমি স্বীকার কর না কর আমার বিশ্বাস আমি সত্য বলেই
জানি। এখানে কোন সাক্ষী থাকূলে-”

১৬৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
ক্রুদ্ধস্বরে ব্ল্যাকনিকফ, বলিল, “তাই যদি হয় তাে আমায়
গ্রেপ্তার করো নি কেন?”
“তুমিই জানাে কেন গ্রেপ্তার করিনি। আমার হাতে কোন
প্রমাণ ছিল না, তা ছাড়া, আমি তােমার সঙ্গে ঠিক আসামীর
মত আচরণ করতে চাই নি। আমি তােমার মঙ্গল কামনাই
করি। রেডিয়ন্, তুমি নিজে ধরা দাও, আত্মসমর্পণ করে
তাতে তােমার ভালােই হবে। আর তা যদি না করে তা
হলে তােমায় গ্রেপ্তার করতে হবে। প্রমাণও আমি পেয়েছি
আমার আর দেরী করা চলবে না।”
“দেখা যাক তুমি কি করতে পারে! তবে একটু সংযত
হয়ে উপদেশ দাও—মূর্খের মত যা তা বলে যেও না। হ্যা,
কী প্রমাণ পেয়েছ তুমি?” সে গর্জিয়া উঠিল।
“তা আমি বলবাে না। তবে এখন যদি তুমি আত্মসমর্প
করাে তাহলে তোমার শাস্তি অনেক লঘু হয়ে যাবে। একজনকে
দোষী করা হয়েছে এমন সময় তুমি আত্মসমর্পণ করলে জজদে
কাছে আমি নিজে তােমার জন্য প্রার্থনা করবাে। তা ছাড়
একথা প্রমাণ করা শক্ত হবে না যে তুমি একটা ভীষণ উত্তেজনা
বশে কাজটা করে ফেলেছ। দেখ, ভেবে দেখ রােডিয়, তােমার
শান্তি কমে যাবে-
র্যাকনিকফ, মাথা নীচু করিয়া কি ভাবিতেছিল। এইবার
সে হাসিল, কহিল, “কি হবে আমার শান্তি লাঘব করিষে,
আমি তা চাইনে।” তাহার হাসি অতি করুণ; যাহা বলিল

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট তাহাতে যে স্বীকারের সুর ছিল তাহা সে বুঝতেও পারিল । “এই ভয় আমারও ছিল। তুমি আমাদের দয়া চাও না- জীবন সম্বন্ধে তােমার ঘৃণা এসে গিয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখ, এমন করে বাঁচার চেয়ে এর পর তুমি অনেক ভালাে ভাবে বাঁচতে পারবে। আমি জানি খুন করলেও তুমি খুনী গুণ্ডাদের অনেক উর্দ্ধে। তুমি আবার সমাজের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াবে। তা ছাড়া যা করেছ তার জন্য শাস্তি পেলে তােমার মন পরিশুদ্ধ হবে। • তুমি হয়তো একথা বিশ্বাস করতে পারছ না। কিন্তু তুমি নতুন জীবন লাভ করবে। তােমার শাস্তিই তােমায় জীবন দান করবে। একথা ম্যাজিষ্ট্রেট-এর মুখে হয়তো তােমার ঠিক ভালাে লাগছে না। কিন্তু তুমি শােননা আমার কথা। ভালােই হয়েছে যে তুমি একটা সুখাের বুড়ীকে খুন করেছ। ঈশ্বরকে তুমি তার জন্য ধন্যবাদ দাও—কে জানে, হয়ত এর মধ্যে তাঁর কোন মঙ্গল ইচ্ছা নিহিত আছে ! তুমি ধরা দাও ন্যায়ের জন্য, ধৰ্ম্মের জন্য। তারপর তুমি পৃথিবীকে ভালােবাসবে। এখন তুমি, শুধু এই জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজেকে মুক্ত করাে।” র্যাকনিকফ, শিহরিয়া উঠিল। মুক্তি! মুক্তিই সে চায়-এর থেকে মুক্তি! তথাপি তিক্ত কণ্ঠে কহিল, “কিন্তু তুমি কে বলে ত যে এত বড় বড় কথা বলছ!” “আমি আর কে। একজন বৃদ্ধ-পৃথিবীতে বিচরণ করবার।

১৭০
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
দিন যার সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে-তােমার জীবনের বিপরীত যার
জীবন। কে জানে তােমার ভবিষ্যত জীবনে আজকের এই দুস্কৃতির
কোন ছাপই হয়ত থাকবে না। তুমি ভাবছ জেলের মধ্যে
অন্ধকারে পচে মরবে ? তা হয়না। তুমি যদি সূর্যের মত জ্বলে
ওঠো লোকে তােমায় ঠিক চিনে নেবে। আমার কথা তােমার
বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু আমি এখন ঠিক পুলিশ ম্যাজিসট্রেট নই।
আমি-আমি থাকগে।”
“তুমি কবে আমায় গ্রেপ্তার করতে চাও!”
“ঈশ্বর তােমায় সুমতি দান করুন। আমি তােমায় দু’দিন
সময় দিতে পারি-দেখ তুমি ভেবে দেখ—”
“এই সময়ের মধ্যে যদি আমি পালিয়ে যাই ?” র্যাকনিকফ
এর মুখে এক জ্ঞেয় হাসি ফুটিয়া উঠিল।
“সে তুমি পারবে না। অত নীচ তুমি কোন মতেই হতে পারবে
, উঃ কী ভীষণ দুঃখের জীবন এই ফেরার আসামীদের জীবন ! সে
তুমি ভাবতেই পারবে না। তা ছাড়া তােমার গতি নেই
পালিয়ে গেলেও তুমি স্বেচ্ছায় আমাদের কাছেই ফিরে আসবে।
শুধু মনে রেখে দুঃখ মানুষকে মহৎ করে তোলে-”
র্যাকনিকফ, উঠিয়া দাঁড়াইল। ক্ষিপ্র হস্তে টুপিটা মাথায়
দিয়া পরফিরিয়াসকে বন্সিল, “আমি বেরুচ্ছি। স্মরণ রেখাে, আমি
তােমার কাছে কিছুই স্বীকার করিনি। স্মরণ রেখাে”
কথা কয়টা বলিতে বলিতে তাহার কণ্ঠস্বর বারবার কাপিয়া গেল।
পরফিরিয়াস দেখিল তাহার সর্বাঙ্গ কাপিতেছে। পাংশু মুখের

১৭১ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট, উপর ভীষণ একটা অসুস্থতার লক্ষণ ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে সস্নেহে বলিল, “যাও, তাই যাও। একটু বেড়িয়ে এসো। ভগবান্ তােমাকে সুমতি দিন। আমি উঠি।” পরফিরিয়াস চলিয়া গেল। ব্ল্যাকনিকফ, কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল, তারপর সবেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। এই মুহূর্তে যাহাকে তাহার প্রয়ােজন সে সিড়িগেলফ, । ঐ লোকটা তাহার কাছে দুর্বোধ্য হইয়া উঠিয়াছে। সিড্রিগেলফ, পরফিরিয়াসের নিকট গিয়া তাহার সম্বন্ধে কিছু বলিয়া আসিয়াছে- এ সন্দেহ যে র্যাকনিকফের মনে জাগে নাই তাহা নহে, তথাপি সে কথা সে ঠিক বিশ্বাস করিল না। সিড্রিগেলফ কে তাহার প্রয়ােজন কিন্তু সে প্রয়ােজন পরফিরিয়াসের কাছে পুনরায় মজ্জি করিবার জন্য নহে। যদিও সিড্রিগেলফ, তাহার সম্বন্ধে কিছু জানিয়া থাকে তাহা হইলে সেই কথা প্রচার করিতে তাহাকে নিষেধ করিয়া কোন ফল কোন ফল নাই। সিড্রিগেলফ, যেমন গায়ে পড়িয়া রফিরিয়াকে বলিয়া তাহার অনিষ্ট করিবে না, তেমনই তাহার রা রাস্কনিকফ এর কোন উপকার সম্ভব হইবে না। আজ এইমাত্র যে ভীষণ রণস্থল হইতে সে আত্মরক্ষা করিয়া আসিল তাহারই রিণতি সে .দেখিয়া লইকে। বিপদ যেদিক্‌ দিয়াই আমু এবং

১৭২
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
যত প্রকারেই অমুক সে একবার শুধু হিসাব করিয়া লইবে—একবার
তাহার অবস্থাটা বুঝিয়া লইবে। তাহার পর যাহা ঘটিবার তাহা
ঘটিয়া যাক, সে প্রস্তুত।
সিড্রিগেলফ, তাহাকে দেখিয়া আনলে কোলাহল করিয়া উঠিল।
সে খুব খােশমেজাজে আছে। সে অনেক কথাই বলিল। বিবাহ
করিবে, নূতন করিয়া সংসার করিবে, এমনতরে আরও অনেক
সুখের ছবি সে বর্ণনা করিয়া গেল। আক্ষেপ করিয়া বলিল যে,
একবার তাহার বাগদত্তাকে দেখাইবার সাধ ছিল কিন্তু কোন
কারণে তাহা সম্ভব হইল না। তবে বিবাহের দিন রাসকনিকফকে
ইতেই হইবে। র্যাকনিকফ • তাহার নিকট হইতে কোন
কথাই বাহির করিতে পারিল না। সিড্রিগেলফ, শুধু বলে যে
ব্যাসকনিকফকে তাহার ভারী ভালো লাগিয়াছে তাই সে এই
কয়দিন তাহার পিছুপিছু ঘুরিয়াছে। শেষ পর্যন্ত সিড্রিগেলফ,
রাসকনিকফকে বিদায় দিল। তাহার কথাবার্তায় ব্যাসকনি-
কফের বুঝিতে বাকী রহিল না যে সে মুখে যাহাই বলুক সিড়িগেলফ,
ডুনিয়ার আশা এখনও ছাড়ে নাই বরং কী একটা মতলব পাকাইয়া
সফলতার আশায় তাহার এত উল্লাস।
প্রথমটা ক্রুদ্ধ হইলেও, র্যাকনিকফ, অন্য মনে নেভা নদীর
তীরে গিয়া দাড়াইল। একা হইবামাত্র সে গভীর চিন্তার মধ্যে
ডুবিয়া গেল। নদীর বক্ষে চঞ্চল প্রবাহ কিন্তু তাহার স্থির
একবারও ব্যাহত হইল না।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৭৩ রাস্কনিকফ, যেখানে দাড়াইয়াছিল তাহারই অদূরে ডুনিয়া কাহার প্রতীক্ষা করিতেছিল। একটা বড় আলােয়নে সর্বাঙ্গ ঢাকা দিয়া সে যতদূর সম্ভব আত্মগােপন করিয়াছিল। এমন সময় ব্যাক- নিকফ কে ঠিক সেই দিকেই আসিতে, দেখিয়া সে দ্রুতপদে নদীর তীর হইতে উঠিয়া আসিয়া নিকটবর্তী একটা রাস্তার বাকে গিয়া দাড়াইল। র্যাকনিকফ, সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক ছিল, কিছুই দেখিতে পাইল না। অল্পক্ষণ পরে সিড়িগেলফ, এদিক ওদিক দেখিয়া অতি সন্তর্পণে রাস্কনিফফ-এর দৃষ্টি এড়াইয়া ডুনিয়াকে তাহার অনুবৰ্ত্তী হইতে ইসারা করিল। দুনিয়া কাছে আসিতেই সিড্রিগেলফ, চুপি চুপি কহিল, “শিগগির এখান থেকে চলুন। আপনার ভাই যেন দেখতে না পায়। এতক্ষণ আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিল অতি কষ্টে আমি ওকে বিয়ে করেছি। চলুন-” “আমরা ত একটা কোণে দাড়িয়ে আছি-এখান থেকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আপনি যা বলবার এইখানেই বলুন।” “মাপ করবেন, এ সব গােপনীয় কথা রাস্তায় দাড়িয়ে বলা চলে। না। আপনি যদি আমার সঙ্গে আমার বাসায় না যান তা হলে আমি কিছুই বলবো না ! মনে রাখবেন আমি এমন গোপনীয় কথা জেনে ফেলেছি যার গুরুত্ব আপনার কল্পনার অতীত।” ডুনিয়া ইতস্ততঃ করিল। আজই সকালে সিড্রিগেলফ, তাহাকে চিঠি লিখিয়া জানাইয়াছে যে সে তাহার ভাই-এর রহস্যের সন্ধান পাইয়াছে। সেই চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী দুনিয়া সব ভুলিয়া সিভ্রি- গেলফের সঙ্গে গােপনে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছে। সিড্রিগেলফ এর ১৭৪ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট মুখ দেখিয়া মনে হয় যেন তাহারই হাতে র্যাকনিকফের মরণ বচন নির্ভর করিতেছে। দুনিয়া মরিয়া হইয়া কহিল, “চলুন, যদিও আপনাকে আমি চিনি, তবু আমি ভয় কবিনে। চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন।” সিড্রিগেলফ, দুনিয়াকে তাহার বাসায় অর্থাৎ ক্যাপারন- সুমফদের বাড়ী লইয়া চলিল। তাহার বুকের মধ্যে তােলপাড় করিতেছে। সহজভাবে মুখে হাসি টানিয়া আনিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। প্রবল উত্তেজনায় তাহার যেন সব কিছু গােলমাল হইয়া গেল। ডুনিয়া! এতদিনে ডুনিয়াকে সে ফাঁদে ফেলিয়াছে বটে কিন্তু কী করিবে, কেমন করিয়া দুনিয়ার মন পাইবে কিছুই ভাবিয়া পাইল না। ডুনিয়া নিঃশব্দে সিড্রিগেলফের পিছু পিছু ক্যাপারনসুমফদের বাড়ীর দোতলায় গিয়া উঠিল। চারিদিক নিস্তব্ধ ; সিড্রিগেলফ, সােনিয়ার ঘরটা দেখাইল। সােনিয়া বাড়ী নাই, ক্যাপারনসুমফরাও কোথায় গিয়াছে। উপরের ভাড়াটেরা কেহই নাই কেবল নীচে কয়েকজনের গলার আওয়াজ পাওয়া যাইতেছে। দুনিয়া বুঝিল আজ এই সময় কেহ থাকিবে না জানিয়াই সিড্রিগেলফ, চক্রান্ত করিয়া তাহাকে লইয়া আসিয়াছে। দুনিয়া সাহস সঞ্চয় করিয়া কঠিন মুখে দাড়াইয়া রহিল। সিড্রিগেলফ, দুনিয়াকে তাহার ঘর দুইটা ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখাইল। সােনিয়ার ঘর ও তাহার ঘরের মধ্যে যে একটিমাত্র ছিদ্ৰবহুল পাতলা কাঠের প্রাচীরের ব্যবধান তাহাও ভালাে করিয়া দেখাইল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৭৫ ডুনিয়া অসহিষ্ণুভাবে কহিল, “এইবার বলুন আমার দাদা এমন কী গর্হিত কাজ করেছে। আপনি চিঠিতে মারাত্মক কিছুর ইঙ্গিত দয়েছেন। আপনি যা বলবেন আমি ঠিক তাই বিশ্বাস চ’রবো এমন কোনাে মানে নেই। তবু শুনি, কী আপনি জনেছেন ?” “বলছি, বসুন আপনি। বিশ্বাস যদি নাই করবেন তবে এলেন কন?” বলিয়া সিড্রিগেলফ, হাসিল। দুনিয়া তাহার হাসিতে লিয়া উঠিল তথাপি সে ভাব দমন করিয়া একখানা চেয়ার টানিয়া ইয়া বসিল। সিড্রিগেলফ, সন্ত্রমভরে টেবিলের অপর পার্শ্বে বসিল, নিয়া তাহার এই কপট শ্রদ্ধা লক্ষ্য করিল। সিড্রিগেলফ, সােনিয়া । র্যাকনিকফের মধ্যে যে কথোপকথন হইয়াছিল তাহাই সংক্ষেপে বৃত করিল ! ব্যাসকনিকফ যে একমাত্র এই সােনিয়ার কাছেই ব কথা অকপটে বলিয়াছে দুনিয়া তাহা বুঝিল। তাহার মুখ বর্ণ হইয়া গেল। নিমেষে তাহার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাইল। ৎকার করিয়া বলিল, “তুমি মিছে কথা বলছ! তােমার মত কাজী মায়ে লােকের কথা আমি বিশ্বাস করি না। এসব মিছে কথা । লাে, কোথায় সােনিয়া-সে বলুক- দুনিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার সর্ব শরীর কঁপিতেছে, টুরিত ওষ্ঠাধরে কথা বাধিয়া যাইতেছে। হত্যা,-এই নৃশংস ত্যাকাণ্ডের নায়ক তাহার দাদা! শিক্ষিত, উদার, কোমলমতি দাদা নী আসামী ? মিথ্যা, ইহা মিথ্যা অপবাদ, শত্রুদের ষড়যন্ত্র। বশ্বাস না করিবার উপায় নাই বলিয়া ডুনিয়া এখনই ইহাকে মিথ্যা

১৭৬
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
প্রমাণ করিতে পারিলে বাঁচে। সে পুনরায় সিড্রিগেলফকে কহিল,
“চলো, আমি যাব সােনিয়ার কাছে।”
দুনিয়ার মুচ্ছিতপ্রায় মুখের দিকে তাকাইয়া সিড্রিগেলফ, ভীত
হইল। সে তাড়াতাড়ি এক গ্লাস জল আনিয়া ডুনিয়াকে পান
করিতে দিল। কহিল, “ডুনিয়া, ডুনিয়া, তুমি সুস্থ হও! সােনিয়া ত
এখন বাড়ী নেই। তুমি স্থির হয়ে সব ভেবে দেখ। এ সময়
অসাবধানে তুমি যদি কিছু বলে ফেল বা কিছু করে ব’স তা হলে
বিপদ আরও বেড়ে যাবে। এখনও তাকে রক্ষা করা যায়। এসো,
আমরা পরামর্শ করে দেখি কি করতে পারি। আমি' সেই জমূই
তােমায় এখানে এনেছি। তুমি সুস্থ হও”
এখনও রক্ষা করিবার উপায় আছে ? ডুনিয়া ঠিক বুঝিতে
পারিল না। কহিল, “তুমি তাকে রক্ষা করবে ? কেমন করে ?”
“হা, হা আমি। আমিই তাকে রক্ষা করবে। তোমার
মুখ থেকে শুধু একটি কথা আমি শুনতে চাই। তারপর আমি
তাকে রক্ষা করবো। সে চলে যাবে আমেরিকায় কিংবা অন্য
কোন দূর দেশে। তার জন্য যা লাগে আমি দেবো। আমার
টাকা আছে, বন্ধুবান্ধবেরও অভাব নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
শুধু তুমি আমায় একটি কথা দাও। রাজুমিখিন, কে ? তার কথা
ভুলে যাও ! আমি তােমার সমস্ত আদেশ পালন করবাে। দুনিয়া,
একবার আমায় তােমার গাউনের প্রান্তভাগ চুম্বন করতে দাও। শুধু
একটি কথা বলল ডুনিয়া, ডুনিয়া!”
সিড়িগেলফ উন্মত্তের মত যেন প্রলাপ বকিয়া গেল। ডুনিয়

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৭৭
চকিতে ঘরের দরজা ধরিয়া টান দিল। কিন্তু দরজা খুলিল
।
“দরজা খােল। কে আছ দরজা খােল! এমন কি কেউ নেই
যে দরজাটা খুলে দেয় !”
“না, কেউ নেই। বাড়ীউলীও কোথায় গেছে।”
“চাবি দাও, আমি যাব।”
“চাবি হারিয়ে গেছে।
“বুঝেছি, তুমি ফাদ পেতেছ ?”” ডুনিয়া ভয়ে শিহরিয়া উঠিল।
ছুটিয়া গিয়া ঘরের অপর প্রান্তে দেওয়ালে পিঠ দিয়া দাঁড়াইল। এই
পাষণ্ডের হাত হইতে নিজেকে রক্ষা করিবার জন্য খানকয়েক চেয়ার
টানিয়া আনিয়া তাহার সামনে রাখিয়া দিল। দুনিয়াকে এইভাবে
প্রস্তুত হইয়া দাড়াইতে দেখিয়া সিড্রিগেলফ, উচ্ছাস দমন করিয়া ধীর
কণ্ঠে বলিল, “ঠিক বলেছ। ফাদই বটে। আমি সব আয়োজন
ঠিক করে রেখেছি। যতই চীৎকার করে কেউ শুনতে পাবে না।
তুমি যদি এর পরেও আমার নামে নালিশ করে তা হলে তােমার
ভাইএর ফাসী অনিবাৰ্য—আমি সব প্রকাশ করে দেবে। তা
ছাড়া যে মেয়ে ঘর থেকে একা বেরিয়ে একটা পরপুরুষের সঙ্গে
নির্জন বাড়ীতে এসে ওঠে তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।
বুঝেছ ?”
“শয়তান !” রাগে ঘৃণায় ডুনিয়ার মুখ দিয়া কথা বাহির
হইল না।
“হু! আমিও চাইনে তােমার প্রতি কোন অসম্মান করতে।
১২

১৭৮
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
কেবল ভেবে দেখ এখন তােমারই ওপর তােমার দাদার, তােমার
মায়ের জীবন নির্ভর করছে। ভেবে উত্তর দাও—আমি এই বসে
রইলুম।”
তাহার দৃঢ় কণ্ঠস্বরে
কণ্ঠস্বরে ডুনিয়া বুঝিল যে লােকটা যাহা স্থির
করিয়াছে তাহা না করিয়া ছাড়িবে না। সে সিড্রিগেলফ কে চিনিত।
সহসা সে পকেট হইতে একটা রিভলভার বাহির করিয়া হাতের
কাছে টেবিলের উপর রাখিয়া দিল। রিভলভার দেখিয়া সিড্রিগেলফ
আশ্চৰ্য্য হইল। কহিল, “ওঃ, 'তা হলে এই উত্তর! কিন্তু তােমার
দাদার কী হবে?”
“পারাে ত তাকে ধরিয়ে দিও। সাবধান ! এক পা এগিয়েছ
কি আমি গুলি ছুড়বে। সাবধান !”
“আমি জানি তুমি গুলি করবে। বাঃ, কী সুন্দর তুমি।”
ডুনিয়ার মুখ সাদা হইয়া গিয়াছে, কম্পিত ওষ্ঠাধর সবলে চাপিয়া সে
ক্রোধ দমন করিতেছে, তাহার কালো চক্ষু দুইটি হইতে ক্ষণে ক্ষণে
যেন অগ্নি বিচ্ছুরিত হইতেছিল। সিড্রিগেলফ, মুগ্ধ হইয়া গেল।
ডুনিয়া তাহার গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিল। সিড্রিগেলফ, অগ্রসর
হইতেই একটা শব্দ হইল। তাহার ব্লগের পাশ দিয়া গুলিটা
চলিয়া গিয়া দেওয়ালে বিদ্ধ হইল। গুলির ঘর্ষণে খানিকটা চাড়।
উঠিয়া গিয়াছে। রুমাল দিয়া সেই স্থানটার রক্ত মুছিতে মুছিতে
সিড্রিগেলফ, হাসিয়া কহিল ও কিছু না। বােলর কামড় !
তােমার লক্ষ্য ভুল হ’ল। আমি অপেক্ষা করছি—আবার চেষ্টা
করে। দেরী করো না। দেরী করলে আমি তােমার

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৭৯ ওপর গিয়ে পড়বে, তুমি আত্মরক্ষা করতে পারবে না। তাড়াতাড়ি !” সে যেন বিকারগ্রস্ত। গুলি ছুড়িবার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়া স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল। এইবার সে শিহরিয়া উঠিল। ক্ষি প্রহস্তে টোটা ভরিয়া আবার ঘােড়াটা টিপিয়া দিল কিন্তু এবার গুলি বাহির হইল না। সিড্রিগেলফ, বলিতেছিল-“তুমি আমায় গুলি করে, তা না হ'লে— তা না হলে, যাহা সে করিবে তাহার মুখের চেহারায় তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিল। কিন্তু এবারও যখন দুনিয়া ব্যর্থ হইল তখন সে হাসিয়া কহিল, “কুছ পরােয়া নেই। তুমি আবার চেষ্টা করে। নাও, জল!” ডুনিয়ার নিকাড়াইয়া সে একদৃষ্টে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। কামনায় উন্মত্ত হইয়া মৃত্যুভয় তাহার চলিয়া গিয়াছে। ডুনিয়া রিভলবারটা ফেলিয়া দিল। “কৈ গুলি ছুড়লে না?” অস্ফুট স্বরে সিড্রিগেল প্রশ্ন করিল। মৃত্যুভয় তাহার ছিল না, তথাপি ডুনিয়াকে রিভলবার ফেলিয়া, দিতে দেখিয়া সে পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল। এমন কি তাহার মনে হইল কিসের একটা বােঝা তাহার বুকের উপর হইতে নামিয়া গেল। সে ধীরে ধীরে দুই বাহু দিয়া ডুনিয়ার কটিদেশ বেষ্টন করিয়া তাহাকে মৃদু আকর্ষণ করিল। দুনিয়া নত নেত্রে চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। সিড্রিগেলফ, কী বলিতে গেল, বলিতে পারিল না। দুনিয়া মিনতি করিয়া কহিল, “আমায় ছেড়ে দাও!” দুনিয়ার কণ্ঠস্বরে সে চমকিয়া উঠিল। অস্ফুট ভীত কণ্ঠে

১৮০
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
কহিল, “তুমি কি আমায় ভালোেবসো না ডুনিয়া ?” ডুনিয়া ঘাড়
নাড়িল।
. “কোন দিন কী পারবেও না ?”
“না।”
সিড্রিগেলফের মনের মধ্যে একটা প্রবল দ্বন্দ্ব বাধিয়া গেল কিন্তু সে
একমুহূৰ্ত মাত্র। পরক্ষণেই সে ডুনিয়াকে ছাড়িয়া দিয়া জানালার
কাছে গিয়া দাড়াইল। তারপর অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া চাবিটা
পকেট হইতে বাহির করিয়া টেবিলের উপর ছুড়িয়া দিল।
“যাও, চলে যাও। এখনই! দেরী করে না। যাও ? তাহার
কণ্ঠস্বর এত দ্রুত চলিয়া যাইতে বলার অর্থ বুঝিতে বিলম্ব হয় না।
সিড্রিগেলফ, জানালার বাহিরে কাইয়া রহিল। দুনিয়া চাবি
খুলিয়া বাহির হইয়া গেল।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে এক নিশীথ রাত্রে, ঘনকুয়াশা-নিবিড়-
অন্ধকারে সিড্রিগেলফ নেভা নদীর নির্জন তীরের দিকে যাইতেছিল।
পাহরাওয়ালা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “কোথায় যাচ্ছ?”
সে হাসিয়া কহিল, “বিদেশে, বন্ধু বিদেশে। সমুদ্রের ওপারে !”
রাসকনিকফ, কয়েকবার ইতস্ততঃ করিয়া পুলচেরিয়ার ঘরে
ঢুকিয়া পড়িল! শেষবারের মত সে একবার মা-বােনের সঙ্গে দেখা
করিতে আসিয়াছে। কাল সারা রাত্রি সে পথে পথে ঘুরিয়া

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৮১ বেড়াইয়াছে। সকলের সমক্ষে নিজেকে হত্যাকারী বলিয়া অভিহিত করার পূর্বে মায়ের কাছে সব কথা বলিয়া যাইবে । জীবনের অবশিষ্ট কাল অহরহ তাহাকে যে স্বীকারােক্তির বােঝ বহিতে হইবে, মায়ের কাছেই তাহার প্রথম পাঠ শুরু করিবে। ইহাতে পুচেরিয়া আঘাত পাইবেন কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছে, মাকে তাহার সব কথা বলিতেই হইবে। দুনিয়াও জানুক—জগতের লােক তাহাকে আততায়ী বলিয়া চিনিবার পূর্বে দুনিয়ার কাছে তাহার স্বরূপ উদঘাটিত হােক। নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করিয়া র্যাকনিকফ, পুলচেরিয়ার কাছে গিয়া দাড়াইল। দুনিয়া বাড়ী নাই, পুলচেরিয়া ছেলেকে কেমন করিয়া অভ্যর্থনা করিবেন যেন খুঁজিয়া পাইলেন না। কেবলই বলেন, “ভয় করিস নে বাবা, আমি তােকে জেরা করবে না।” তাহার বিশ্বাস পুলিশের লােক তঁাহার ছেলেকে মিথ্যা সন্দেহ করিয়া তাহাকে উন্মাদ করিয়া তুলিয়াছে। তিনি ছেলেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া নিজেই বার বার কঁদিয়া ফেলেন। একটা অসন্ন, বিপৎপাতের আশঙ্কায় তাহার মাতৃহৃদয় ছেলেকে আর ছাড়িয়া দিতে চাহে না। র্যাকনিকফ, জানাইল যে আজই তাহাকে কোন দূরদেশে চলিয়া যাইতে হইবে; সে বিদায় লইতে আসিয়াছে। মায়ের পূত স্নেহধারায় অভিষিক্ত হইয়া সে আর তাহার নৃশংসতার ইতিহাস বলিতে পারিল না, প্রতিজ্ঞা ভাসিয়া গেল। চোখের জলে পুলচেরিয়া ছেলেকে বিদায় দিলেন। সহসা ছেলের এই বিদেশ যাত্রার অন্তরালে কী একটা অমঙ্গল প্রচ্ছন্ন আছে এই চিন্তাই তাহাকে

১৮২
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
দিশাহারা করিয়া দিল। তাহার মনে হইল আজ তিনি সত্যই
সৰ্বহারা ভিখারী হইয়া গেলেন, সম্পদ বলিতে, আপনার বলিতে
কিছুই তাহার রহিল না।
আজ দুই দিন পরে র্যাঙ্কনিকফ, বাসায় ফিরিল। কিন্তু ঘরে
ঢুকিয়া সবিস্ময়ে দেখিল দুনিয়া ও নাস্টাসিয়া তাহার ঘরে বসিয়া
আছে। তাহাকে আসিতে দেখিয়া নষ্টাসিয়া চলিয়া গেল।
র্যাকনিকফ, বুঝিল তাহার বাসায় অনুপস্থিতির বিবরণ ইতিমধ্যেই
নাসটাসিয়ার নিকট হইতে ডুনিয়া সংগ্রহ করিয়াছে।
“কাল থেকে কোথায় ছিলে? আমি কাল সারা দিন
সােনিয়ার ওখানে তােমার জন্য অপেক্ষা করেছিলুম।”
‘আমার কথা ছেড়ে দাও ডুনিয়া। কাল রাত্রিতে অনেকবার
নেভার তীরে গিয়ে দাড়িয়েছিলুম-ইচ্ছে ছিল সব শেষ করে
দেবে। কিন্তু পারিনি।”
“আমাদেরও ঐ ভয় হচ্ছিল।
“আজ এইমাত্র মায়ের কাছে গিয়েছিলুম। মায়ের কান্না দেখে
কেমন যেন মনে হ’লমা যদি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন
তা হলে হয়তো ঈশ্বর তা শুনতে পাবেন। ঈশ্বর হয়তো
আছেন।”
ভীতকণ্ঠে ডুনিয়া বলিল, “মাকে তুমি সে-কথা নিশ্চয়ই
বলো নি?”
রাস,কলনিকক, বুঝিল যে সােনিয়ার কাছে দুনিয়া সব
শুনিয়া আসিয়াছে। সে হাসিল, কহিল, “না তা পারিনি।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৮৩
তবে মা’
কতকটা অনুমান করেছেন। ডুনিয়া আমার চেয়ে
দুঃখী আর কে আছে?”
“দুঃখ কিসের ? তুমি তাে নিজে স্বেচ্ছায় ধরা দিতে যাচ্ছ !
এতে তাে তােমার গৌরব ! তুমি কি বিশ্বাস করে না যে
তুমি স্বেচ্ছায় যদি প্রায়শ্চিত্ত গ্রহণ করে, তা হলে তাতে
সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যাবে?”
র্যাস, কনিকফ, সহসা উত্তেজিত হইয়া উঠিল। বিকৃত কণ্ঠে
কহিল, “পাপ ? পাপ কিসের ? সমাজের আবর্জনা একটা নীচ
সুদখােক মেরে ফেলা পাপ নাকি? কিসের রক্তপাত ? কামান
দিয়ে শহর নিশ্চিহ্ন করার চেয়ে কুড়ল দিয়ে একটা বুড়ীকে মারা
কি এতই পাপ? আমিও একটা আদর্শ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলুম !
শেষ পর্যন্ত যে আমি সেটা মুছে ফেলতে পারিনি সে আমার
অক্ষমতা! এই যে আমি ধরা দিতে যাচ্ছি এতে আমার নিজেরই
অবাক লাগে। কি প্রয়ােজন? কেন? পাপ কোথায়?”
তাহার মুখ সহসা রক্তিম হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু কথা
কয়টা বলিয়াই যখন সে ডুনিয়ার দিকে চাহিল তখন আর তাহার
রােষ রহিল না। দুনিয়ার মুখে এমন একটা বেদনার ছায়া
ফুটিয়া উঠিল যাহা ব্যাস,কনিকফকে যেন বিদ্ধ করিয়া স্মরণ
করাইয়া দিল যে তাহার মা-বােনের চরম দুর্গতির জন্য সে
নিজেই দায়ী। সে
দায়ী। সে মাথা নীচু করিয়া
মাথা নীচু করিয়া অস্ফুটস্বরে কহিল,
“আমায় তুমি মাপ করে ডুনিয়া। ভাই হয়ে শুধু তােমাকে
আঘাতই দিয়ে গেলুম। 'আমি চলুম, দেরী হয়ে যাচ্ছে।”

১৮৪
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
ডুনিয়া নীরবে কঁদিতে লাগিল। র্যাকনিকফ, চলিয়া গেল।
সেদিন রাসকনিকফ, চলিয়া যাওয়ার পর হইতে সােনিয়ার
যে কেমন করিয়া দিন কাটিতেছিল তাহা শুধু তাহার অন্তর্যামীই
জানেন। দুনিয়াকে সে সব কথাই বলিল এবং সর্বপ্রকার
সামাজিক ভেদাভেদ ভুলিয়া দুইজনে বড় কান্নাই কাদিল। সেই
দিন হইতে সােনিয়ার কেবলই মনে হইতেছে যে র্যাকনিকফ
যদি আত্মহত্যা করে তাহার জন্য সে-ই দায়ী—অপরাধীর মনে
সে-ই ধিক্কার জাগাইয়া তুলিয়াছে। যত বড় পাপীই হউক্-
রাসকনিকফ, শুধু ফিরিয়া আসুক, শুধু বাঁচিয়া থাকুক ভগবানের
কাছে সে অহর্নিশ এই প্রার্থনাই করিতে লাগিল। আজ সে
একটা মৰ্ম্মঘাতী দুঃসংবাদের প্রতীক্ষায় বুক বাঁধিয়া বসিয়াছিল,
এমন সময় রাসকনিকফ, তাহার ঘরে ঢুকিয়া কহিল, “সােনিয়া,
চলুম।
সময় নেই-এখনই থানায় যাচ্ছি।”
“এখনই ?” ভয়ে সােনিয়ার মুখ কাগজের মত হইয়া সাদা হইয়া
গেল।
“হঁ্যা, এখনই। তুমিই তাে ধরা দিতে বলেছিলে তবে ভয়
পাচ্ছ কেন? আমি ঠিক করে ফেলেছি। শুধু ভাবছি জেল
থেকে বেরিয়ে এসে কতটা পশু হয়ে যাবে-আর কিছু না।
যাক-”
“একবার শুধু প্রার্থনা করে যাও।” সােনিয়া অতি কষ্টে।
ক্রন্দনের বেগ রােধ করিল।

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
১৮৫
সে কী
০
“হ্যা, হঁ্যা, ঠিক বলেছ। প্রার্থনা করতে হবে—বলিয়া
রাসকনিকফ, হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিল।
সােনিয়ার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হইয়া আসিল।
করিল? এমন করিয়া কেন সে নিজের সর্বস্ব ধন ঈশ্বরের নাম
করিয়া শত্রুর হাতে তুলিয়া দিল ? তাহার বুক ভাঙ্গিয়া কান্না
আসিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে চোখ তুলিয়া দেখিল ব্ল্যাক,
নিকফ, চলিয়া গিয়াছে, শেষ বিদায় লওয়া হয় নাই! সােনিয়া
ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
থানায় গিয়া রাসকনিকফ, প্রথমে জ্যামেটফের খোজ করিল।
জ্যামেটফ, নাই, বলি হইয়া চলিয়া গিয়াছে। রাস্কনিকফ,
দুই একটা কথা বলিয়া বাহির হইয়া আসিল।
তাহার মুখ
বিবর্ণ, ঠোট কঁপিতেছে। থানার দারােগা তাহাকে বাড়ী
যাইতে উপদেশ দিল। কাপিতে কঁপিতে র্যাকনিকফ, বাহির
হইল কিন্তু থানার দরজায় দাঁড়াইয়া দেখিল কিছু দূরে যেন
সােনিয়া দাড়াইয়া আছে ! রাস্কনিকফ, ছুটিয়া থানার ভিতরে,
চলিয়া আসিল।
“আপনি আবার ফিরে এলেন যে ? একি! আপনি কঁপছেন
কেন? ওরে, একটা চেয়ার নিয়ে আয়। এইখানে, এইখানে।
জল-জল নিয়ে আয়! কী হল? না না কথা কইবেন না,
আপনি সুস্থ হােন্!
রােগা শরীর নিয়ে-
রাসকনিকফ, চেয়ারে বসিয়া পড়িয়াই কী একটা বলিবার
চেষ্টা করিল কিন্তু স্বর বাহির হইল না। দারােগা নিজে
.

১৮৬
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
একগ্লাস জল তাহার মুখের কাছে তুলিয়া ধরিলেন, র্যাকনিকফ,
তঁাহার হাত সরাইয়া দিল। তারপর সহসা প্রাণপণ শক্তিতে
উঠিয়া দাড়াইয়া কহিল, “আমিই এলেন। আর তার বােন
এলিজাবেথকে খুন করেছি-উদ্দেশ্য ছিল চুরি করা।”
র্যাকনিকফ, আচ্ছন্নের মত বসিয়া পড়িল। দারােগা ছুটিয়া
গিয়া অন্যান্য কর্মচারীদের ডাকিয়া আনিলেন। রাস্কনিকফ,
তাহার উক্তির পুনরাবৃত্তি করিল।
পরিশিষ্ট
৭
সাইবেরিয়ার বন্দীনিবাসে দেড় বৎসর কাটিয়া গিয়াছে।
পূর্বেকার কাহিনী কিছুই সে একেবারে বিস্মৃত হয় নাই, তথাপি
ঘটনাগুলি যেন কোন পঠিত গল্পের মত বিস্মৃতির অন্ধকার
হইতে হঠাৎ চোখের সম্মুখে জাগিয়া উঠে। যেদিন সে ধরা
দিল তাহার প্রায় পাঁচ মাস পরে বিচারক রায় দিলেন।
সব কথাই খুলিয়া বলিয়াছিল। এতদিন পুলিশের লোকেরা
যে সকল সমস্যার সমাধান করিতে গিয়া মাথা কুটিতেছিল,
রাস্কনিকফ, আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া তাহার সবগুলিই
অকপটে মীমাংসা করিয়া দিল। কেবল একটা কথা সে বলিতে
পারে নাই, সে বলিতে পারে নাই এলেনার বাক্সে কত টাকা
ছিল এবং কত সে লইয়াছিল। আদালতে উপস্থিত সকলে
ইহাও ঝিতে পারে নাই যে চুরি করিবার জন্য আসামী খুন

ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৮৭ : করিল, অথচ যাহা চুরি করিল তাহা পাথর চাপা দিয়া কোথায় রাখিয়া দিল। কয়েকজন মনস্তত্ত্ববিদ চিকিৎসক অবশ্য বলিলেন যে ইহা আসামীর অসুস্থ মস্তিষ্কের লক্ষণ অর্থাৎ অপরাধ করিবার সময় আসামী প্রায় মুচ্ছগ্রস্ত অবস্থায় ছিল। তাহার অসুস্থতার বিবরণ পাওয়া গেল নাস্টাসিয়া, রাজুমিথি ও জেসিমফের সাক্ষ্য দানে। কিন্তু সে তাহার শান্তি লাঘব করিবার জন্য কোন কথাই বলিল না, কোন দিক দিয়াই আত্মপক্ষ সমর্থন করিল না। অবশেষে পরফিরিয়াসের প্রার্থনায় এবং স্বেচ্ছায় ধরা দেওয়ার কথা বিবেচনা করিয়-বিচারক তাহাকে আট বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিয়া সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দিবার আদেশ দিলেন।' দণ্ডিত আসামীদের সঙ্গে যখন র্যাকনিকফকে সাইবেরিয়ার গাড়ীতে তুলিয়া দেওয়া হইল তখন রাজুমিখিন্ ও দুনিয়া আসিয়া তাহাকে বিদায় দিল। সােনিয়া তাহার সাথী হইল। কিন্তু সে শুধু অন্যমনস্কভাবে তাকাইয়া রহিল, কিছু বলিল না। সিড্রিগেলফ, সােনিয়াকে কিছু টাকা দিয়াছিল তাহারই উপর ভরসা করিয়া সােনিয়া একাকিনী সাইবেরিয়ার ভীষণ প্রান্তরে বাসা বাঁধিবার জন্য পথে বাহির হইল। যত দুর্গম, যত ভয়ঙ্কর হােক, তবু সে ত বাসনিকফের নিকটেই থাকিবে, তাহাকে দেখিতে পাইবে ! সােনিয়া কাহারও দিকে ফিরিয়া তাকাইল না, ভাসিয়া পড়িল। ইহার মাস দুই পরে রাজুমিখনের সঙ্গে দুনিয়ার বিবাহ হইয়া ১৮৮ ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট গেল। পুচেরিয়া সানন্দে সর্বান্তঃকরণে তাহাদের আশীর্বাদ করিলেন। বিবাহ-উৎসবে তাঁহাকে আসিতে দেওয়া হইল না। সেই যে দিন র্যাকনিকফ; তাহার নিকট বিদায় লইয়া চলিয়া গেল তাহার পরদিন হইতেই তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছেন। তাহাকে কিছুই জানানো হয় নাই, তথাপি তিনি খানিকটা অনুমান করিয়া লইয়া একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছিলেন। দুনিয়া মায়ের শুশ্রুষা করিল কিন্তু কোন ফল হইল না। বিবাহের তিন দিনের মধ্যে বারকয়েক পুত্রের নাম করিয়া পুচেরিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিলেন। সাইবেরিয়ায় বন্দী-জীবন শুরু হইলে র্যাকনিকফ নিজেকে বারবার ধিক্কার দিল। বিগত জীবনের সমস্ত খুটিনাটি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়াও সে এমন কিছু পাইল না যাহাকে সে প্রকৃত পাপ বলিয়া মনে করিতে পারে। শুধু একটি মাত্র ভুল তাহার জীবনটাকে দুর্বিসহ করিয়া তুলিল? একটা চরম ভ্রান্তির উত্তেজনায় সে নিজেকে উৎসর্গ করিয়া দিল এবং তিলে তিলে প্রতিদিন তাহার নিজের জীবনটাকে এই নিরবচ্ছিন্ন উৎসর্গের মধ্যে নিঃশেষ করিয়া দিতে হইবে। তাহাকে এই জীবন লইয়াই বাচিতে হইবে। কিন্তু আজ বাঁচিয়া থাকিবার জন্য তাহার কেন এত আগ্রহ ? সাইবেরিয়ায় আসিয়া অবধি র্যাকনিকফ, অন্যান্য কয়েদীদের ঘৃণা করিতে শুরু করিয়াছে, তাহারাও তাহাকে “ভদ্রলােক” বলিয়া এড়াইয়া চলে আবার কেহ কেহ বিদ্রুপও করে। জগতের সঙ্গে ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৮৯ তাহার সমস্ত সম্পর্ক যেন চিরতরে বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। সে কাহাকেও চিঠি-পত্র দেয় না, ডুনিয়া ও রাজুমিখি সােনিয়ার চিঠিতে তাহার সংবাদ পায়। মায়ের মৃত্যু সংবাদ সোনিয়া তাহাকে জানায় নাই। এদিকে সােনিয়ার প্রতিও র্যাকনিকফ, সম্পূর্ণ উদাসীন। সােনিয়া যে তাহারই জন্য সর্বপ্রকার সুখের আশায় জলাঞ্জলি দিয়া এই সুদূর অরণ্য প্রান্তরে সহায়হীন, সম্বলহীন অবস্থায় দিবারাত্র শুধু তাহারই স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের চেষ্টা করিতেছে, একথা স্ন্যাসকনিকফ, যেন বুঝিয়াও বুঝে না! নির্দিষ্ট দিনে জেলের ফটকে সােনিয়া সানেত্রে আসিয়া দাঁড়ায়, র্যাসকনিকফ, কয়েকটা কথা বলিয়া চলিয়া আসে! তবে এটা সে লক্ষ্য করিয়াছে যে অন্যান্য কয়েদীরা সােনিয়াকে খুব ভক্তি করে। অধিকাংশ কয়েদীই তাহাকে ‘মা’ বলিয়া ডাকে। সােনিয়া তাহাদের চিঠিপত্র লিখিয়া দেয়, মিষ্ট কথায় সান্ত্বনা দেয় । তাহাদেরই মুখে র্যাকনিকফ, শুনিয়াছে সােনিয়া জামা সেলাই করিয়া জীবিকা অর্জন করে। এ অঞ্চলে অনেক যাযাবর জাতির বাস ; তাহারা সােনিয়ার সেলাই খুবই পছন্দ করে ! রাস্কনিকফ, প্রায়ই অসুস্থ হইয়া পড়ে কিন্তু তাহার নিঃসঙ্গ কারাজীবনে সােনিয়ার কথা সে কোন দিনও ভাবিয়া দেখে নাই। এমনই করিয়া দীর্ঘ দেড় বৎসর কাটিয়া গেল। একদিন র্যাঙ্কলনিকফ, হঠাৎ অসুস্থ হইয়া পড়িল। এমন প্রায়ই হয়, তবে এবার আর কিছু প্রবল। তিন চারদিন সে প্রায় ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট অচেতন হইয়া পড়িয়া রহিল। গভীর রাত্রিতে নির্জন কারাকক্ষে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিল। কী একটা ভীষণ মহামারী আসিয়া সমগ্র পৃথিবীর বুকে মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা চালাইতেছে। লােকে ঘরদোর ফেলিয়া ছুটিয়া পলাইতেছে! দেখিতে দেখিতে মড়কে দুর্ভিক্ষে উন্মত্ত ক্ষিপ্ত হইয়া লােকে বিদ্রোহ করিতে লাগিল। বহু রাজত্ব ধ্বংস হইল কিন্তু যাহারা বিদ্রোহ করিল তাহারাও নিজেদের মধ্যে মারামারি করিয়া বিপুল রক্তস্রোতের মধ্যে কোথায় নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। সমগ্র পৃথিবীর উপর দিয়া ভীষণ কৃতান্তের এক বিরাট ধ্বংসপ্রবাহ বহিয়া গেল। অবশেষে প্রকৃতি শান্ত হইলে ব্ল্যাকনিকফ, দেখিল কয়েকজন মাত্র ধরিত্রীর বুকে জাগিয়া বাঁচিয়া আছে কিন্তু তাহাদের সে অনেক চেষ্টা করিয়াও চিনিতে পারিল না। তাহার অসুখের মধ্যে সােনিয়া মাত্র দুইবার তাহার শয্যাপাশ্বে আসিবার অনুমতি পাইয়াছিল, র্যাকনিকফ, কিছুই জানিতে পারে নাই। কয়েকদিন পরে সে সুস্থ হইয়া উঠিল এবং ধীরে ধীরে জানালার কাছে আসিয়া দাড়াইল। স্বপ্নে যাহা সে দেখিয়াছিল তাহা একান্তভাবে তাহার বাস্তব বলিয়া বােধ হয়। সে ভাবিতেছিল এমন কেন হইল, পৃথিবীর বুকে কেন এসব ঘটিয়া গেল। বাহিরে সূৰ্য-কিরণে চাৰ্বিদিক্‌ উদ্ভাসিত, কোথাও কোন মালিন্য নাই। সহসা সে দেখিতে পাইল জেলের ফটকে সােনিয়া দাড়াইয়া আছে তাহারই জানালার দিকে চাহিয়া । সােনিয়াকে দেখিতে পাইবামাত্র লহমা তাহার বুকের মধ্যে কি ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট ১৯১ যেন একটা বিঁধিয়া গেল, সে জানালার কাছ হইতে সরিয়া আসিল। পরদিন হইতে প্রতিদিন সােনিয়াকে দেখিবার জন্য সে জানালায় গিয়া দাড়াইত কিন্তু সােনিয়ার দেখা নাই। অবশেষে সংবাদ লইয়া জানিল তাহার অসুখ করিয়াছে, তবে ভয়ের কিছু নাই, শীঘ্রই সরিয়া উঠিবে। ইহার, কয়েকদিন পরে একদিন অতি প্রত্যুষে জেল কর্তৃপক্ষ তাহাকে ক্ষেতে কাজ করিবার জন্য জেল হইতে বাহিরে পাঠাইলেন। জেলের বাহিরে এত শােভা তাহা ব্যাস, কনিকফ, জানি না। প্রথম সূর্যোদয়ের রক্তিমচ্ছটায় সে যেন স্নান করিয়া লইল। ক্ষেতের মাঝখান দিয়া একটা অতি ছােট নদী বহিয়া যাইতেছে তাহারই তীরে সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। কিয়ৎক্ষণ পরে মুখ ফিরাইয়া দেখিল কখন সােনিয়া আসিয়া তাহার পাশে বসিয়াছে। সােনিয়া চোখ দু’টি তুলিয়া তাহার দিকে চাহিল। তাহার পাণ্ডুর মুখে এখনও অসুস্থতার ছাপ রহিয়াছে, সে শীর্ণ হাতখানি বাড়াইয়া দিল। রাসকনিকফ, সেই ভীরু হাতখানি নিজের হাতের মধ্যে টানিয়া লইল। তাহার দীপ্ত চোখের দিকে তাকাইয়া সােনিয়া মাথা নত করিল। কেহ কোন কথা বলিল না, অন্য কেহ তাহাদের দেখিল না। সহসা র্যাকনিকফের বুকের মধ্যে কী যেন উত্তাল হইয়া সে সােনিয়ার কোলের মধ্যে মুখ লুকাইয়া কাঁদিয়া ফেলিল। সােনিয়া এস্ত হইয়া চকিতে উঠিয়া দাড়াইল কিন্তু পরক্ষণেই ব্র্যাকনিকফের মুখের দিকে চাহিতেই তাহার বুক উঠিল।

১৯২
ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট
ভরিয়া গেল। র্যাকনিকফকে হাত ধরিয়া তুলিল, দুইজনেরই
রােগপাণ্ডুর মুখের উপর অনাগতকালের সুখস্বপ্ন ভাসিয়া উঠিল।
এই মুহূর্তে নব জীবনের মধ্যে জাগিয়া উঠিয়া দুইটি হৃদয়-অনির্বচনীয়
আশা ও আনন্দের সন্ধান পাইল, শাশ্বতকালের চিরপ্রবহমান
আলােকপুঞ্জ তাহাদের অভিনন্দিত করিল।
সেই দিন সন্ধ্যায় রাস্কনিকফ, বাইবেলের একখানা পাতা
প্রদীপের সামনে মেলিয়া ধরিল। সে বার বার শুধু পড়িয়া গেল,
খ্ৰীষ্ট আসিয়া সমাধিতল হইতে মৃত লাজারাসকে উদ্ধার করিলেন,
তাহার স্পর্শে বিগতজীবনের সর্বপ্রকার গ্লানি হইত মানুষ
নবজীবন লাভ করিল, মর্ত্যে আসিল স্বর্গের সুষমা। গত জীবনের
কোন মলিনতা ব্যাসকনিকফকে আর স্পর্শ করিতে পারিবে না,
এতদিন যে দুষ্কৃতিকে সে অস্বীকার করিয়াছে, আজ তাহা নিঃশেষে
মুছিয়া গেল।
র্যাকনিকফ, ও সােনিয়ার নবজীবন শুরু হইল। ধীরে
ধীরে তাহারা মানবতার এক স্তর হইতে অন্য স্তরে উন্নীত হইতে
লাগিল কিন্তু সে ইতিবৃত্ত বলিবার ভার আমাদের উপর নাই।
শেষ

No text on this page.

No text on this page.

Crime And Punishment Ed.3rd

Author
Bosu, Bhupendranath
Title
Crime And Punishment Ed.3rd
File name
Crime And Punishment Ed.3rd
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/17
Publisher
Sumath Nath Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
199
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
Story
DLI number
512571
Barcode
4990010019633.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ZUWeEYF2SBf
Download PDF

Crime And Punishment Ed.3rd