Makardah Saraswat Library, Howrah
Rajhanso Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
রাজহংস
No text on this page.
শ্ৰীসজনীকান্ত দাস
নন পাবলিশিং হাউস
২৫২ মােহনবাগান রাে
কলিকাতা
২৫২ মােহনবাগান মাে, শনিরঞ্জন
প্রেস হইতে প্রবােধ নান কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত
প্রথম সংস্করণ, চৈত্র ১৩৪২
যে চপল নদী পার হয়ে এল গিরি-বন-প্রান্তর,
কখনো আলােকে, কখনাে অন্ধকারে,
থমকি দাড়ায়ে সহসা সে যদি চাহিত পিছন ফিরে,
হিমালয়-শিরে পেত কি দেখিতে কোথায় উৎস তার?
এপারে-ওপারে ব্যবধান-হেঁড়া গােমুখীর গুঢ়ব্যথা
বুঝিত কি নদী নদীজল কলকলে ?
বুঝিত না, তবু স্রোতােজলে পেত উৎসের পরিচয়।
জননী, কঠোর মৃত্যু তােমারে ঢেকেছে অন্ধকারে,
হ’ল সে অনেকদিন
দেখিতে পাই না দেহ-ক্ষয়-করা সেই করুণার ধারা।
ওপার হইতে এপারে আমারে তুমি এনেছিলে মাতা,
হারাইয়া আজ গিয়াছ আমার জ্ঞান-বুদ্ধির পারে ;
বুঝিতেও নাহি পারি,
যে পথে চলেছি সেই পথে মাের ক্লান্তদিনের শেষে
রেখেছ কি পেতে স্নেহ-কোলবানি তব ?
বুঝিতে পারি না, তবু আছে আশ্বাস।
জননী, আমার জন্মদিবসে তুমি রচেছিলে সেতু
আমার আঁধারে-আলােকে, আমার অতীতে-বৰ্তমানে।
তুমি নাই তাই এত ব্যবধান আলােকে-অন্ধকারে,
ব্যবধান-মুখে তড়িং-তীব্ৰজ্বালা।
যেখানেই থাক জননী, আবার সেতু কর নিম্মাণ,
সহজ-ব্যথায় আমারে প্রসব করাে তুমি পরপারে।
জননী, তােমারে স্মরিয়া আমার কাব্যের দীপশিখা,
জালাইয়া রাখি অবােধ অন্ধকারে,
দেখিতে না পাই, বুঝি অনুভবে, তুমি আছ কাছে কাছে ;
নিজে এসে মাতা, লহ মাের দীপারতি।
No text on this page.
সূচী ১০ রাজহংস কে জাগে ? কালকুট বজ্র-আশীর্বাদ দুই মেরু প্রেমের দেবতা স্বপ্ন তিমির-তীর্থ সূৰ্য্যমুখী এর চেয়ে মৃত্যু ভাল রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ মৈত্র ? ? ? ? ৪ * : * ; ৩৩ ৪৩ নিরিণী ৪৭ পান্থপাদপ চেখভের ডালিং তমসা-জাহ্নবী অরণ্য-প্রান্তর ৭১ ৭৫ বিষামৃত হুইসল সরস্বতী ৮১ चाका-मांचा আকাশ-সাগর
No text on this page.
হিমালয়
No text on this page.
রাজহংস
আমি শুধু পেয়েছি জানিতে,
দিবসের খররৌদ্র অপরাহ্নে ম্লান হয়ে আসে ;
সন্ধ্যার ছায়ান্ধকারে গুড়া গুড়া হয়ে উড়ে যায়,
দাবদগ্ধ দিবসের ভস্ম-অবশেষ।
জানিয়াছি, তারপরে ধীরে নামে অন্তহীন নিশা,
গ্রাস করে চরাচর মুখহীন কবন্ধ-বিস্তারে।
অনন্ত নিঃসীম শূন্যে তম-শীর্ষ তরঙ্গের ঢেউ,
ফুলিয়া ফুসিয়া ওঠে, নিঃশব্দের বুকে দেয় হানা,
দিকে দিকে লােলজি তিমিরের চলে অভিযান।
তমসার কালাে নীরে যত তারা গ্রহ-উপগ্রহ
দোলে তরণীর মত, প্রদীপের মিটিমিটি আলাে
তিমির-তরঙ্গাঘাতে কম্পমান ভয়ার্ত শিখায় ;
ভয় হয়, ক্ষণে ক্ষণে কখন নিবিয়া বুঝি যায় !
কত যে নিবিয়া গেছে মহাকাল-বিপুল-প্রবাহে,
কত মানুষের প্রাণ, মানবের সন্ধ্যা ও দিবস,
কোটি কোটি হ’ল লয় বিন্দু বিন্দু ধূলিকণারূপে
কাল-কালিন্দীর নীরে।
হয়ত হতেছে সৃষ্টি মহাকাল-কালিন্দী-সঙ্গমে
নবতর দ্বীপ কোনো ; ধূলিকণা সেথ। গিয়া লাগে,
এক দুই লক্ষ লক্ষ কোটি ও অৰ্বদ ধূলিকণা।
রাজ হংস
এর মাঝে হায় হায়, মারু গণিতেছি গাঢ় স্নেহে
দিবসের খররৌদ্র অপরাহ্নে হয়ে আসে স্নান,
কখন জেগেছে উষা তিমিরের কালো উপকূলে,
খররৌদ্র জাগিয়াছে মধ্যাহ্নের তপন-প্রভায়
আঁখিতে লেগেছে রঙ, দুই আঁখি ভরিয়াছে জলে,
ভালবাসিয়াছি, আর বুকে কারে লইয়াছি টানি।
উড়িয়াছে রাজহংস মেঘাস্তৃত সুনীল আকাশে,
দুই পক্ষ বিস্তারিয়া শূন্যে করি’ স্থিতির নির্ভর
গতির নির্ভর করি’ আকাশের লঘু বায়ুস্তরে,
কবে সে করেছে যাত্রা, ছাড়িয়াছে মাটির আশ্রয়,
কবে উত্তরিবে গিয়া তারে নাহি জানে সে ঠিকানা,
টলমল গাঢ়নীল হিমবক্ষ মানসের তীরে ;
উপলমুখর সেই মেঘচুম্বী পাহাড়ের কোলে
নীড়ের আশ্রয় তার।
সে-আশ্রয়ে নীড় আর শাবকের মাঝে
দিশাহীন নভােযাত্রা ক্ষণকাল রহে তার স্থির ;
বাহিরের স্থূল ডান হয়ত ধূলায় মিশে যায়,
অন্তরের সূক্ষ্ম পক্ষ যুগে যুগে চলে ঝাপটিয়া
শত শত জন্ম-বিবর্তনে
সেথা তার নাহিক বিশ্রাম,
ক্লান্তি নাই, ক্ষোভ নাই তার।
ধরণীর রাজহংস আকাশের নীলাম্বু-বিস্তারে,
কত ক্ষুদ্র, গ্রহ-তারা-উপগ্ৰহমাঝে
আছে কি না আছে, জাগে অনন্ত সংশয়,
তবু সে একান্ত সত্য, সত্য তার গতির প্রবাহে ;
রাজ হংস
গ্রহতারা তার চেয়ে নহে সত্য বেশি,
অতি মিথ্যা ক্ষয়শীল বস্তুর প্রবাহ,
প্রাণহীন জ্যোতি।
ধরণীর রাজহংস জীবনের অনন্ত প্রতীক,
উড়িছে অনন্তকাল মহাকাল-আকাশ-সাগরে ;
নিয়ে কাল-কালিন্দীর তম-শীর্ষ তরঙ্গের ঢেউ,
ডাকিতেছে যুগে যুগে ঝাঁপ দিতে সে তিমিরনীরে,
ধরিতে পারে না তারে, উদ্ধে তার বিরাট প্রয়াণ,
উচ্চে নীচে চলে দুই গতির প্রবাহ,
চলিবে অনন্তকাল, মিশিবে না কভু একেবারে।
কোটি কোটি গ্রহচন্দ্র কোটি তারা পাইবে বিলয়,
লক্ষ সৃষ্টি ধ্বংস হবে, জন্ম লবে সৃষ্টি নবতন ।
কে জাগে ?
শহরে সবাই ঘুমে অচেতন, জেগে আছে পেট্রোল,
বি-ও-সি এবং সােকোনি এবং শেল
কারো আঁখি লাল, কারাে চোখ দুধ-সাদা।
আর জেগে রয় রাস্তার মােড়ে বীটের পুলিস যত,
পৌষের শীত রাত্রি দুপুর বাজে।
জেগে আছে যারা পানের দোকানে মদের বেসাতি করে,
বিড়ির দোকানে কোকেন যাহারা বেচে
চাটের দোকানে প্লেটে সজ্জিত কঁকড়া, ডিমের ঝাল,
৫
प्राम
গলদা চিংড়ি, বেসনে পলতা-ভাজা-
শীতের হাওয়ায় শুকায়ে হয়েছে কাঠ
।
জেগে আছে তারা এখনও যাদের জোটে নাই খদ্দের,
জুটেছে যাদের—পাখা খুলে দিয়ে ভূতের নৃত্য করে—
মদে আর গানে, চাটে, বায়া-তবলায়।
স্খলিত বচনে ঘন ঘন তারা পান-ওয়ালারে ডাকে,
অকারণে চুমু খায়, হাসে, কাঁদে, গান গায় অকারণ।
বুদ্বুদ-সম কারেন্সি নােট হাওয়ায় মিলায়ে যায়।
জাগিয়া রয়েছে তাহাদের বধূ যাহারা ফেরেনি ঘরে,
মা-হতভাগিনী স্নেহময়ী কারো জাগে;
রাত বাড়ে যত শুকাইছে বাড়া-ভাত,
সদর দরজা খুলে দিতে হবে, ঘুমে ঢুলে আসে আঁখি।
সরিষার তেল প্রলেপ করিয়া চোখে
জাগে বধূ, তার জ্বালাধরা চোখ জলে ছলছল করে,
বুকের জ্বালার প্রলেপ, পাশের ঘুমানো খােকার ঠোটে ।
ললাটে তােলে না হাত,
অদৃষ্টেরে ধিক্কার দিলে পাছে লাগে অভিশাপ।
ভাবে ব'সে আর যত্নে লাগায় তালি,
দুইটি মাত্র পরনের শাড়ী, ছিড়েছে ধােপার ঘরে।
।
যক্ষ্মার রােগী জাগিয়া কাসিছে বসে,
নয়নের জ্যোতি ঝাপসা হতেছে ক্রমে,
চারিদিকে যত মানুষ এবং ঘরবাড়ী গাছপালা
লাগে সুন্দরতর।
রাজ হংস
আঁকড়ি ধরিতে চাহিছে যখন, মুঠি খুলে খুলে যায়,
নিবে আসে ধীরে মলিন জীবন-বাতি।
তাহারই শিয়রে বসি,
ক্লান্ত প্রেয়সী তন্দ্রায় জেগে আছে,
জাগিবে যে কত দিন।
যত জাগে তত সিথির সিঁদুর চওড়া ও গাঢ় করে-
হাতের নােয়ায় মনে হয় তার ঠিকরে হীরক-দ্যুতি।
-
জাগে কারাগারে ফাসীর মঞ্চে কাল যার আয়ু শেষ
যে জন শশানেনি বহুকাল কানে, প্রিয়া ডাকে, “ওগো শােনাে”-
সাধের কন্যা ডাকে, “শােনো শােনাে, বাবা।”
সহসা শিহরি মৰ্ম্মের মাঝে ডাক শুনে জেগে আছে ;
কোথায় যেন রে বিনিদ্র ধরে প্রিয় ফেলে নিশ্বাস ;
ঘুমায়, তবুও খুকী ছটফট করে।
কম্বলে তার শুয়ে আধখান, আধখানা গায়ে দিয়ে,
লাপসি ভুলিয়া আঁধার কক্ষে চেয়ে কড়ি-কাঠ পানে,
জাগ্ৰত আঁখি ঝাপসা যাদের হয়—
তারাও জাগিয়া আছে ;
তার প্রতীক্ষা করে
প্রিয়।-বাইপাশ একদা জড়াবে গলে,
সাধের কন্যা কণ্ঠ-লগ্না হবে,
আছে আশা, আশা মনে তবু কত আছে।
কাল যার আয়ু শেষ---
সে জন জাগিয়া খোঁজে আকাশের তারা,
৭
আ জ ইং স
কঠিন পাষাণে বাধা পেয়ে চোখ, দেয়ালে কি যেন খোঁজে,
চটা উঠে গিয়ে এখানে সেখানে ফুটে ওঠে কত ছবি,
কত চেনা মুখ, অচেনা ভঙ্গি কত ;
ভুলে-যাওয়া কোন্ বাল্য সখীর ঠিক যেন এলে খােপা।
কবন্ধ আর ছিন্নমস্তা-ছায়া
দেয়ালে দেয়ালে জাগে-
চমকি জাগিলে মিলায় পলকপাতে।
মনে পড়ে যায়, পাশের বাড়ীর মেয়ে
একদা আসিয়া বলেছিল কবে, ভেঙে গেছে পেন্সিল,
বেড়ে দিতে হবে সকাতর অনুরােধ ।
ধমকিয়া তারে বলেছিল, নাহি হবে।
যে-বেদনা-ছায়া নেমেছিল কালাে চোখে,
সেই স্মৃতিখানি কেন তার মনে আসে
কাল যার আয়ু শেষ ।
মার আঁখিজল নহে,
কবে কোথা দ্রুত সাইকেলে যেতে, নেহাৎ অসাবধানে
চাপা পড়েছিল একটি কুকুরছানা-
তাহারই আর্তনাদ।
জাগে পাগলিনী, পাগলাগারদে গরাদে রাখিয়া হাত,
ঘুম নাই তার চোখে,
মুখে হাসি ঘন-কান্নার মত ঠেকে,
পরনে জীর্ণবাস।
একে একে তার সন্তান যত মরিল কালের ঘায়ে,
জাগ্ৰত মহাকাল।
রা জ ই ংস
তাহাদেরই পথ চেয়ে জেগে আছে, জননী উন্মাদিনী
অন্ধকারের চরণ-শব্দ শশানে নিবিষ্ট মনে,
হঠাৎ হাসিয়া উঠে;
হঠাৎ আর্তনাদে
স্তব্ধ নিশার নিবিড় শান্তি ক্ষণ-বিঘ্নিত করি,
ডাকে, আয় বাছা, হাঁটি হাঁটি পায় পায়।
প্রসারিত বাহু ব্যর্থ শীতল হয়,
স্তন্যদুগ্ধ ক্ষরিয়া করিয়া পড়ে
ফোটা ফেঁটা দুধ কারার, ধূলায় পড়ে টপ টপ করি,
যুগান্তরের সঞ্চিত কালাে ধূলা—
সৃষ্টি শিহরি উঠে
কাদে গতি-বন্যায় ।
জাগিয়া রয়েছে কবি,
গগনে গগনে অনাহত ধ্বনি, ধ্বনি মঙ্গলময়,
মলিন যা কিছু, যা কিছু অকল্যাণ
সরে ঢাকিয়া সেই সুর যেন নিখিল ছাপিয়া উঠে,
নয়ন ভাসিয়া যায়।
আর জাগে ভগবান,
জাগে নিগুণ, পরম ব্রহ্ম, জাগেন নির্বিকার,
ফুল হতে ফল, ফল হতে বীজ, বীজ হতে অঙ্কুর
অঙ্কুর মেলে পাতা, সেই পাতা শুকায়ে ঝরিয়া পড়ে,
তারে তিনি দেন কোল।
জাগে অশক্ত সর্বশক্তিমান
জাগ্রত ভগবান।
২
রা জ ইং স - শুধু হাসে মহাকাল- হাহা সেই হাসি শুনিলাম যেন রজনী দ্বিপ্রহরে, শীতের রাত্রি, মরা জ্যোৎস্নায় কুয়াস। গলিয়া পড়ে জনহীন রসারােড- চলে চারি জন ক্লান্ত চরণে, ক্ষণে বদলিয়া কঁধ- মুখে অতি ক্ষীণ-বল-হরি-হরিবােল । মহাকাল যেন হাসিল অট্টহাসে। সে ক্রুর হাসিরে উপহাস করি আলােকিত দোতলায়- নবজাত শিশু ককিয়ে কঁদিয়া উঠে— সেই জাগে চিরকাল। কাল-কুট পেয়েছি মৃত্যুর বরাভয়। বিলাসের কণ্ঠলগ্ন হয়ে, কলুষিত হয়েছে যাহারা ; লােভে ক্ষোভে জিহ।-মুখে যাহাদের ঝরিছে নিয়ত দূর হতে লালাস্রাবী প্রেম, লোলুপ ছেলের মত জীবনের ভালবাসে যারা, জীবনেরে ভালবাসে, ভালবাসে আর করে ভয়-- দু’কথা তাদেরে কহি, পেয়েছি মৃত্যুর বরাভয়। রৌদ্র নাহি ভালবাসে, মাথার উপরে ঘােরে পাখা, কেঁদে যায় আকাশের হাওয়া : ছবির মেঘের বুকে দেখে তারা সিনেমার চঁাদ— ষ্টুডিও উইয়ের ঢিবি হিমালয়ে করিছে আঁধার। ১০
রাজ হংস
জলপূর্ণ কাচপাত্রে তাহাদের নীলাম্বু-বিস্তার
উঠানের টবে হেরে বারিধির উন্মত্ত নর্তন
সাগরে জলের ঢেউ আছাড়িয়া তটোরে কঁদায়।
:
বালুময় বেলাভূমে ছাতার আড়ালে রহ তারা,
সেথাও ড্রইংরুম প্রেম।
তাদের বসন্ত আসে, ঝরে না গাছের মরা-পাতা, .
রঙে সাজে কাগজের ফুল,
নিখুত জ্যামিতি-কষা ‘বেডে’ ফোটে ফুল মশুমী
অপরূপ নাম তাহাদের ;
সে নাম যাহারা শােনে, মালীরে ধূলার দিয়ে দাম,
তাহাদের কানে কানে শােনাব মৃত্যুর শতনাম।
দশ ধাপ সিড়ি উঠে, বেঞ্চ-পাতা হলে’ যাহাদের
নির্লিঙ্গ দেবতা শােনে চোখ বুজে অর্গানে কোরাস্ ;
তত ধৰ্ম্ম যত ওঠে হাই,
চৰ্ম্মের ভ্যানিটি-ব্যাগে দর্পণেতে দেবতার ছায়া,
আমি সেই দেবতার দেখিয়াছি মৃত্যুর স্বরূপ
ধূলি বালি কর্দম কঙ্কর ;
মৰ্ম্মর-বেদীর 'পরে দেখিয়াছি হাসিছে করােটি-
দেবতা মৃত্যুর পাত্রে পান করে জীবন-আসব,
পান করে, হাসে খলখল।
পমেটম-ক্রীম-ঢাকা চর্মে হায়, লাগে না শিহর,
কর্ণে নাহি পশে অট্টহাসি ।
ধৰ্ম্মের মন্দির-গর্ভে চিতাধুম দেখিয়াছি আমি
১১
রা জ হংস
প্রেমের বেদিকামূলে লেলিহান মৃত্যুর রসনা-
মহাকাল-করাল-কুটি।
মায়া-মােহ-যবনিকা ধীরে ধীরে করি উত্তোলন
জীবনের রঙ্গমঞ্চে দেখাব মৃত্যুর অভিনয়
মৃত্যুরে করিয়া নমস্কার।
স্বার্থের উদ্দাম লীলা, লালসার উলঙ্গ মত্ততা,
প্রেমের মুখােস পরি’ কি বীভৎস কামের কলুষ !
সন্তান গড়িয়া তােলে অর্থলােভী আয়ার সাধনা,
ক্লীব স্বামী ঔদার্যের ছলে,
পীরে তুলিয়া দিয়া পরের মােটরে—
পর-অর্থে চালায় সংসার!
সংসার।
ঝড়াে হাওয়া আকাশে আকাশে--
ধূলিবালি ওঠে আবর্তিয়া,
শাখাচ্যুত শুষ্ক পত্ৰ শুষ্ক ফুল উড়িছে চৌদিকে,
ঝলসিছে স্যাম কিশলয় ।
ফুলের সংসার আর গাছের সংসার
মরিয়া ঝরিয়া পড়ে ফুরাইলে আয়ু,
মরে আর বাঁচে।
জরাগ্রস্ত বিকৃতেরে বাঁচাবার নাহিক প্রয়াস,
পীতেরে সবুজ নাহি করে।
মানুষের ঘরে ঘরে ফুলের বাগান--
মাঠে মাঠে পথে ঘাটে গৃহের প্রাঙ্গণে
রাজ হং স মানুষের প্রতিবেশ গাছের বিকৃত হয়ে আসে, স্বভাব বীভৎস হয় ক্রমে ; শতদল হয় দলহীন- মৃত্যু হয় নিতান্ত মরণ। সে-মরণ-ভীত আমি, মৃত্যুরে জেনেছি মহীয়ান- জানাইতে চাই সবে মূঢ় সেই মরণ-স্বরূপ। . শিশুর পীযুষ-স্তন্য চাটিতেছে দন্তহীন বৃদ্ধের রসনা, যে মরিবে সে মারিছে যে বাঁচিবে তারে— গুরুভক্তি পিতৃভক্তি বংশের সম্মান, বিরূপ বীভৎস হয়ে জীবনের রােধিয়াছে পথ। একের লালসা অর্থবল, লােকবল, অসহায় দরিদ্রেরে অনুদানবল, পদ-প্রতিপত্তি আর ক্ষুধিতের উদরের ক্ষুধা, দরিদ্রের স্ত্রীকন্যার বস্তু-অলঙ্কারে অভিরুচি, মােটর-ব্যসন আর হােটেল-বিলাস সব কিছু মিলিয়াছে মিটাইতে একের লালস। বহুরে বঞ্চিত করি। এক-কাম-বহ্নি মাঝে বহু প্রেম দিতেছে আহুতি ; দগ্ধ-প্রেম-ভস্মে জমে উদরের সামান্য সংস্থান। রমণীর মাতৃত্বের দিকে দিকে করিছে সংহার পুরুষের বিকল পৌরুষ বক্ষে ক্ষীর অসিতে না পায়।
ब्रो छम
দেহ-বেচা অর্থে মাতা সন্তানের দুগ্ধ করে ক্রয়
দেহ-জাত হায়রে সন্তান।
যুগযুগান্তর ধরি’ পৃথিবীর মানবের শিশু
কঁদিছে মায়ের কোলে বসি—
মাতা অসহায়-
সাম্রাজ্য-ফ্যাক্টরি-মদ-আফিম-কোকেন,
তাড়িখানা, রেস্তোরাঁ, হােটেল,
পথে পণ্যরমণীর ক্ষুধার্ত ইঙ্গিত,
সভ্যতার রথচক্র ঘর্ধরিয়া ছুটিছে উদ্দাম ।
লােভী ছেলে ছুটে যায় পথে,
জননীর চোখের সম্মুখে
রথচক্রতলে তার ছিন্নভিন্ন দেহ,
রক্তস্রোতে কর্দমাক্ত ধূলি।
সে লােহিত ধূলিজালে দেবতার মহান প্রকাশ
অপরূপ মৃত্যুর বৈভব।
-
সমস্ত পৃথিবীব্যাপী দেখিয়াছি মানুষের চোখে
লালসার পঙ্কিল ইঙ্গিত।
মানুষের যন্ত্ররূপ, মানুষেরে করিতে হনন—
সর্পরূপে পশুরূপে পরস্পর চলে হানাহানি।
প্রভুত্ব দাসত্বে হানে, কদর্যতা হানে সুন্দরেরে--
বাহিরে মােহন আবরণ।
নাট্যালয়ে অভিনয়, সিনেমায় চলচ্চিত্র ছবি,
মানুষে টানিছে নীচে, টানে টানে ঘাের উন্মাদনা-
অর্থ দিয়া করে বিষপান।
১৪:
श्री আঁকড়িয়া ধরিবারে প্রিয়, প্রিয়তর জীবনেরে জীবন চুইয়া পড়ে মুঠিতল দিয়া, মৃত্যু আসে নিঃশব্দ চরণ। সে মৃত্যু আমার মৃত্যু নয়- দিগন্ত ছাইয়া উড়ে আমার শিবের জটাজাল, আকাশ আঁধার করে অঙ্গের বিভূতি। ভূমিকম্প নহে তাহা, নহে গিরি-বিদারণ-রূপ- সে তো পলকের লীলা, নটেশের এক পদপাত, দিকে দিকে থৈ থৈ মৃত্যুর তাণ্ডব। তারই মাঝে জীবন-অঙ্কুর শাখা-পত্র-পুষ্প মেলে আলােকের পানে, প্রলয়ে করে না ভয়, দাড়ায়ে মৃত্যুর মুখামুখি, আপনি বাড়িয়া চলে আপন গৌরবে। আমার মৃত্যুর মাঝে দধীচির নিজ অস্থিদান, রাজা শিবি দেহ-মাংস অকাতরে করে নিবেদন কপােত-শরণাগত লাগি। কুশ-কাষ্ঠে বিদ্ধ মাের সে-মৃত্যু মহান অগ্নিদগ্ধ বীরাঙ্গনা রূপ, মৃত্যুতীর্থ স্থানে ধায় বীরদল উত্তর মেরুতে, হিংস্র শ্বাপদের মুখে অরণ্যে গহন, সুনিশ্চিত সলিল-সমাধি। জীবের কল্যাণ লাগি মাের মৃত্যু করে আবিষ্কার নব জীবরসায়ন, রাজ হংস অপরূপ যন্ত্র-উদ্ভাবনা, মৃত্যুর স্পশি’ হাসিমুখে হাসিমুখে ঝাপ দেয় ঘােরর সমরঅনলে আর্ত পীড়িতের সেবা-কাজে। বন্দীর বন্ধন, মুক্তিকামী মৃত্যু মাের আপনার গলে লয় তুলি সে মৃত্যুরে করি নমস্কার। দূর কর মােহ-আবরণ, বৈশাখের উন্মাদ বাতাসে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক যুগান্তের কালাে মায়াজাল, হাসুক শ্যামল কিশলয় । যে জীবন যুগে যুগে মৃত্যুরে করিল উপহাস, মৃত্যুরে করিল নমস্কার- করিল না ভয়, শ্মশানের ভস্মভূপে সে জীবন খুজিছে আলােক, মাটি ফুড়ি উঠিবে আকাশে মৃত্যুর বন্দনা-গানে, সে জীবনে বার বার জানাই প্রণতি। মৃত্যুরে করিতে জয়, নির্ভয়ে করিতে হবে পান জীবনের সেই কাল-কুট। ০ ১৬
বজ্র-আশীর্বাদ
০
হান বজ, বজ্র হান, মেঘলােকবাসী হে বাসব,
বজ্র হান আমাদের শিরে।
দিতির সন্তান নহি, তবু মােরা দেবতা-বিরােধী
সুদুৰ্ম্মদ অহঙ্কারে শূন্যপানে আস্ফালিয়া বাহু,
মেঘলোকে তুলি শির উচ্চ কণ্ঠে কহিতেছি ডাকি
ত্রিদিবের অধীশ্বর আমি আছি,আর কেহ নাই,
সৃজিয়া নিখিল বিশ্ব, সৃষ্টিধ্বংস করি আমি আপন খেয়ালে ;
জন্ম আর মৃত্যু এই জগতের সত্য ইতিহাস
আমিই রচনা করি।
ভােগ করি, করি ক্ষয়, অপচয়ে আনন্দ আমার
অতীতে করি না নতি, ভবিষ্যের করি না সঞ্চয়,
যাহা আছে যাহা পাই মুঠি ভরি উড়াই ফুৎকারে,
অনন্ত কালের বক্ষে ক্ষণিকের বুদ্বুদ-বিলাস!
এর মানে তোমাদের কোথা স্থান, হে বাসব,
তােমরা অমরলােকবাসী—
নন্দনের পারিজাত-মাল্য শােভে গলে তোমাদের,
নিশিশেষে মালা না শুকায়
নৃত্যরতা উর্বশীর নগ্নতা বীভৎস নাহি হয়।
স্থলে না চরণ তার, থামে না সে অশ্রুসিক্ত আঁখি,
কামনা-জড়িত কণ্ঠে তীব্র স্বরে ওঠে না ঝঙ্কারি।
তােমরা চাহিয়া থাক নিত্যকাল অপলক আঁখি,
ঘুমঘােরে নাহি পড় তুলে,
১৭
শু
श्रीम
কাম-কণ্টকিত দেহে আছাড়ি পড় না কোনাে অপরা-চরণে,
ব্যর্থতার অশ্রু কভু গড়ায় না দুই চোখ বেয়ে।
কামহীন মৃত্যুহীন অবিরহী হে দেবতাকুল,
আমরা কঁদিয়া মরি তোমাদের ভাগ্যহীনতায়
আমাদের মাঝখানে তোমাদের কোথা দিব স্থান ?
তােমরা উর্ধেতে থাক, হে দেবতা নন্দননিবাসী
উৰ্দ্ধ হতে আমাদেরে কর কর বজ্র-আশীর্বাদ
হান বজ্র আমাদের শিরে।
আমরা মরিতে চাই, মরিয়া বাঁচিতে চাই মােরা
ধরার মৃত্তিকাবক্ষে পদচিহ্ন নিমিষে মিলায়
অনন্ত অশেষ প্রেম তাও ধীরে শেষ হয়ে আসে।
ক্ষণকাল পূজা করি অতি ব্যর্থ স্মৃতির মন্দিরে
স্মৃতির শ্মশানভস্ম কালস্রোতে ফেলে দিই টানি।
মনে রাখি, ভুলে যাই, ভালবাসি, ঘৃণা করি, পুনঃ
যাহারে ঠেলিয়া ফেলি তারি লাগি কাঁদিয়া ভাই।
অাপনারে উৎসারিয়া আবরিয়া ফেলি এ নিখিল,
ভেঙেচুরে চলে যাই নিঃশঙ্ক গৰ্বান্ধ পদাঘাতে,
দলিয়া পিষিয়া মারি নিজ হাতে আপনার জনে ;
নির্মম কুঠার হানি’ সম্মুখে রচিয়া চলি পথ,
পিছু ফিরে অকারণ খল খল হাসি অট্টহাসি।
সবারে পশ্চাতে ফেলি’ দূরে গিয়ে ফেলি’ অশ্রুজল।
হতাশায় ভেঙে পড়ি, পথ ছেড়ে হই যে বৈরাগী ;
মনে হয় মিথ্যা সব, কিছুতে নাহিক প্রয়ােজন।
১৮
রাজ হংস
চোখে পুন লাগে রঙ, ধরা পড়ি, করি যে শিকার,
প্রিয়ে করি প্রিয়তর, প্রেয়সীরে প্রিয়তমা করি।
মদিনাবিল নেত্রে মধ্যরাত্রে পূজি বারাঙ্গনা,
শুচিস্নান করি প্রাতে দেবীর মন্দিরে দিই পূজা।
এও ক্ষণিকের খেলা, মৃত্যুর
বধির অন্ধকারে
নিঃশব্দে ডুবিয়া যাই অলক্ষিতে সহসা একদা।
ঢেউয়ের পশ্চাতে ঢেউ, এক যায়, পুনঃ আর আসে,
শ্মশানের শুষ্ক চরে পলি পড়ে, ফসল গজায়—
পাষাণে জলের লেখা-মানুষের এই ইতিহাস।
শাশ্বত নন্দনে তব, হে বাসব, কে আছে দেবতা,
পড়ে পাষাণের লেখা, গােণে মর-জীবনের ঢেউ ?
কেহ নাই, নিঃসঙ্কোচে হান হান হন বজ্রবাণ,
হান বজ্র আমাদের শিরে।
মরিতে করি না ভয়, যুগে যুগে মরিয়াছি আমি—
আমার গগনস্পর্শী স্পর্ধা কত মিশিল ধূলায়—
কত উর, বাবিলন, ইন্দ্রপ্রস্থ, অযযাধ্যা, কার্থেজ,
যুগে যুগে কত জাতি জন্ম নিল, মরিল নিঃশেষে
ফারাও, কাইসার কত, শার্লমেন, চেঙ্গীজ, তৈমুর —
পাষাণ-মৰ্ম্মর-মূৰ্ত্তি কারাে আছে, কারো পড়ে ভেঙে,
স্মৃতি সে পাষাণ-ভার বিস্মৃতির প্রত্যন্ত সীমায় ।
-
বাচিবারে চাহি নাই, বাঁচি নাই শামুকের খােলে,
শাখা ত্যজি ধরাপৃষ্ঠে নামিয়াছি মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষায়,
১৯
রা জ ইং স
মেঘচুম্বী দেবলােকে মুহুর্মুহু হানিতে কুঠার
করেছি আকাশযাত্ৰা কামনার ডানা ঝাপটিয়া।
সাগরে ভাসাই তরী, ডুবিয়াছি গহন গভীরে
অতিকায় জলসৰ্প শুয়ে যেথ। প্রবাল-শয্যায়।
মরুপথে অভিযান, ঘনারণ্যে শ্বাপদ-গুহায়,
মর্তের মৃত্তিকা খুড়ি নন্দনের মাণিক্য-সন্ধান,
হিমাচল-শৈলচুড়ে মৃত্যুসাথে যুঝি বারম্বার
তুষারেতে পদচিহ্ন মুছে যায় হিমমেরু-পথে।
বহ্নিরে করেছি বন্দী, অশনি শোনায় মােরে গান,
সে গানের অন্তরালে লক্ষ লক্ষ মৃত মানবের
উঠিতেছে অবিরাম মৃত্যুঞ্জয়ী জয়োল্লাসধ্বনি!
তুমি কি শুনিতে পাও, হে বাসব, সে জয়-সঙ্গীত ?
তােমারে উপেক্ষা করি মানবের এই অভিযান
মেহচক্ষে দেখিয়াছ, অতিলুব্ধ মানব-সন্তানে,
আমারে করেছ ক্ষমা ?
দেখিয়াছ, হে দেবতা, যুগে যুগে কর আশীৰ্বাদ,
রূঢ় বজ্র হানিয়াছ বারম্বার মানবের শিরে
আজো হানিতেছ তাহা, উর্ধে থাকি’ প্রবল বিক্ষেপে,
হান বজ্র আমাদের শিরে।
স্পর্ধা মাের ভাসায়েছ কতবার প্রলয়-প্লাবনে,
ফুসিয়া বাসুকী তব বারম্বার নাড়িয়াছে মাথা,
আমারে ঢাকিয়া গেছে লাভাস্রোত আগ্নেয়গিরির,
উত্তাল তরঙ্গাঘাতে কত তরী ডুবিল অতলে,
কত গৃহ উড়িল ঝঙ্কায়
কত বজ্র হানিয়াছ যুগে যুগে মহামারী রূপে!
রা জ ই ং স কি তাতে হয়েছে ক্ষতি, হে বাসব? এরি মাঝখানে, আমার প্রচণ্ড দম্ভ বারম্বার হাসে অট্টহাসি। এরি মাঝখানে, মহাযুদ্ধে বারম্বার আপনারে করেছি হনন- মুহুর্মুহু গর্জিল কামান, বিষবাষ্প ছড়াল চৌদিকে- শ্যামল ধরণীবক্ষ করিয়াছি মৃতের শ্মশান। আত্মঘাতী দম্ভে মাের, হে দেবতা, ওঠ না শিহরি ? কর না কি বজ্র-আশীৰ্বাদ- তােমার প্রচণ্ড বজ্র পড়ে নাকি নিষ্ফল হুঙ্কারে অসতর্ক অসহায় আবরণহীন এই মানুষের শিরে । আর কত বজ্র আছে, হে বাসব, ওহে বজ্ৰপাণি, কত অস্থি, কত দধীচির ? দিতির সন্তান নহি, তবু মাের। দেবতা-বিরােধী। তােমাদেরে করি না স্বীকার বজ্র হান, বজ্র হান শিরে, বজ্র হান, হে বাসব। ২১
দুই মেরু
আমার মনের এই দুই মেরু উত্তর দক্ষিণ,
দুই হিম-মেরু নহে তুহিন-শীতল ।
তুষার-আবৃত হিম উত্তর আমার,
ক্ষীণ রৌদ্রহীন আলােরেখা,
ক্ষণে ক্ষণে উঠে ঝলসিয়া-
মৃতের অধরে ম্লান পাণ্ডুহাসি যেন।
প্রাণ যদি থাকে সেথা, টলমল থাকে যদি জল,
গাঢ় বরফের তলে গূঢ় হয়ে আছে—
হিম-মরু, হিম-আঁধি, হে হিম-ঝড়।
নিশ্বাস নাকের কাছে জমাট বাঁধিয়।
ধোয়া হয়ে নয়ন ধাঁধায় ।
আকাশে ওড়ে না পাখী, গাছ নাই, শাখায় কুলায়—
মেলিয়া আড়ষ্ট পাখা, হেঁটে চলে পেঙ্গুইনদল ;
বরফ-শীতল-জল আলোড়িয়া তিমি সীল হিমের তিমিরে
দ্বিধায় লুকায়ে থাকে,
মাতালের মত টলে রােমশ ভালুক।
মনের উত্তর মেরু, আলাে-অরােরার,
মৃত্যু নাই; মৃত্যুহীন গাঢ় শীতলতা,
ছায়াহীন আললা ।
কালের কুটিল গতি সেথা স্তব্ধ রয়।
রা * ইংস
মনের দক্ষিণ মেরু উত্তপ্ত ফুটিছে
রক্ত-রাঙা লাভা-স্রোত আগ্নেয়গিরির।
মরে, পচে, পাকে চুল, শাখাপত্র খসি খসি পড়ে
ফুলের সুগন্ধে বায়ু ক্ষণেক মন্থর,
পূতিগন্ধ, ক্ষণে ক্ষণে নাকে আসি লাগে।
ভাল মন্দ রমণীয়, বীভৎস বিকৃতি
চলে কালস্রোত!
দক্ষিণ মেরুতে মাের বারিধি-গর্জন,
রৌদ্রকরে নীল জল উঠে ঝলকিয়া,
সামুদ্রিক লক্ষ জীব উত্তাল তরঙ্গে করে খেলা,
রৌদ্র-স্পর্শ দেহে মাখি তল-হীন অতলে তলায়।
ফেনারাশি নৃত্য করে ঢেউয়ের শিখরে,
আকাশেরে ছুইতে প্রয়াস,
বাতাসে ছােবল মারি’ রহি রহি নিস্ফল হুঙ্কার।
দক্ষিণ মেরুতে মাের পৃথিবীর সব নদী মেশে,
আবৰ্ত্ত পঙ্কিল।
ভেসে আসে শব-দেহ, ভেসে আসে কাঠ-খড়-কুটা,
বিচিত্র ধরার আসে মৃত্যু ও জীবন-পরিচয়,
আলো অন্ধকারের সন্দেশ।
পথের বন্ধুরা আসে, ঝড়াে হাওয়া, ডানা-ভাঙা পাখী,
ওড়ে চিল, ওড়ে মাছরাঙা ;
কানাকানি হাসি ও চীৎকার,
কখনও বৈঠকী গান, কভু একা একতারা সাধা।
রাজ হংস
দক্ষিণে যৌবন মাের, অর্থহীন উন্মত্ত প্রলাপ ।
তপ্ত ভােগ তপ্ত কান্নাহাসি-
দিবস-রজনী আসে, লােভী বারবনিতার রূপে।
গুঢ়-ফণা-কামনার লেলিহান জিহ্বার বিস্তারে
মেরুর উত্তাল জলে অরণ্যের বিভীষিকা জাগে-
সুন্দর কুৎসিত,
সব মিলি আমি অপরূপ।
উত্তর উত্তরে মাের, দক্ষিণে দক্ষিণ,
দোহে দোহাকার নাহি জানে পরিচয়
দুই শুধু এক হ’ল আমার অন্তরে ;
পরিচয়হীন ক্রোধে-
নিষ্ফল আক্রোশে দুয়ে এ উহাবে হানে।
এই হানাহানি,
আমার অন্তর ব্যাপি নিরন্তর এ দ্বন্দ্ব-মন্থন,
বিষবাষ্প উঠে আবর্তিয়া,
কুৎসিতে সুন্দর করে, সুন্দরে ভীষণ।
উত্তরে দক্ষিণে মিলি মাের আমি রয়েছে বাঁচিয়া,
অলক্ষিত দেবতার চরণে গােপনে লোটে মাথা,
সেই মাথা লাল হয় নিপীড়িত রমণীর সিথির সিঁদুরে,
দরিত্রে সর্বস্ব দিয়ে বঞ্চিতের সর্বস্ব কাড়ায়।
দক্ষিণে সবার আমি, উত্তরে আমার আমি একা,
পথের বকুল-ছায়ে উত্তরেতে আমার সমাধি
২৪
ফানের উন্মন বাতাসে
শাখাচ্যুত ফুলদল পড়ে আসি শিয়রে আমার ।
অজ্ঞাত পথিক আসি ফেলে বেদনার অশ্রুজল
আমার মৃত্যুর মৃত্যু সেখানে হয়েছে বহুদিন।
দক্ষিণেরে ভালবাসি, উত্তর আমারে করে প্রেম,
সমাধি-শয়ন রচি’ মাের লাগি সে জাগে প্রহর,
দক্ষিণে আঁকড়ি লােভে আমিও অনন্তকাল ধরি’
রচি উত্তরের ব্যবধান।
জানি না, মৃত্যুর অন্ধকারে
উত্তর দক্ষিণ মাের মিলে গিয়ে এক হবে কি না,
হয়ত প্রতীক্ষা তারই করি।
প্রেমের দেবতা
প্রেমের দেবতা তােমারে প্রণাম করি।
মানবের প্রেমে মানবীগর্ভে মানবের দেহ ধরি
কত যন্ত্রণ। সহিয়াছ পলে পলে,
প্রেমের পরীক্ষায়
নিমেষের তরে না মানিয়া পরাজয়,
যাহারা তােমর লাঞ্ছনা মাঝে উল্লাস করিযাছে
সেই মূঢ়দের যত করিয়াছ ক্ষমা,
এই অনাগত ভবিষ্যতের অনাগত মানুষেরে
স্মরণ করিয়া বিলায়েছ যত প্রেম,
৪
আজিকে আমার বক্ষের মাঝে করি আমি অনুভব
সেই যন্ত্রণা, সেই ক্ষমা, সেই প্রেম ;
যন্ত্রণা সীমাহীন,
ক্ষমা সে অসম্ভব,
সৰ্ববিজয়ী সেই অপরূপ প্রেম।
বিস্ময় মানি তােমার মহিমা স্মরি,
প্রেমের দেব, তােমারে প্রণাম করি।
হে প্রভু, তােমার সেই প্রেম আজ কবরে পড়েছে চাপা ?
তুমি ফিরে আস নাই ?
জগৎ ব্যাপিয়া হিংসার হানাহানি,
স্বার্থের সংঘাত !
তব নাম লয়ে মুখে
তােমার প্রেমের অপমান করে যারা,
নিখিলের আলো কালাে হয়ে এলে তাদের বিমােগারে ;
হে আলাের দূত, তুমি কোথা, কোথা তুমি ?
তােমারে এখন সাজে কি পিতার কোল!
মানুষের প্রেমে মানুষ হয়েছে যেবা
এই উপেক্ষা হে প্রভু, সাজে না তার।
মৃত-সাগরের চারি পাড়ে আজ আমরা করেছি ভিড়,
ভিড় করিয়াছি গাঢ় তিমিরের তীরে,
কঁদিতেছি অনাহারে--
রুটি নাই প্রভু, মাছের টুকরা নাই।
তুমি এস এস, এ মৃত-সাগর পায়ে হেঁটে হও পার,
ভাস্বর দেহে দাড়াও অন্ধকারে ;
হংস ক্ষুধিত জনেরে রুটি দাও, জল দাও প্রেম দাও প্রভু, তােমার অমর প্রেম। ধন্য করেছ মানুষে একদা মানুষের রূপ ধরি, সে মানব মরিয়াছে— তােমার পরশে মৃতেরা লভুক প্রাণ। স্বপ্ন বহু যুগ-যুগান্তের প্রচ্ছন্ন বিস্তারে মনের জড়তা মাের গতিবেগে লভিয়াছে স্বপ্নের সুষমা। যত দ্বিধা, যত ভয়, দিশাহীন তিমিরের যত দ্বন্দ্ব, যতেক সংশয় যত চলিয়াছি পথ - জ্বলিয়া নিবেছে আশা, হইয়াছি ভগ্ন-মনোরথ ; জড়পিণ্ডরূপ ক্রমে তীব্র তীক্ষ্ণ ধরেছে আকার, দীর্ঘতর দিন মাের, ছােট হয়ে আসিয়াছে ধীরে, আমার মানস-লােকে মােহাচ্ছন্ন নিশীথের অমা। = দীর্ঘ দেহ, কায়া সুবিপুল, ছিল মাের সুদীর্ঘ জীবন- অরণ্যের পশুসম অরণ্যেরে করি অনুভব। নগ্নবক্ষে নগ্নদেহে এক হয়ে প্রকৃতিরে বােঝ- বজ্রবৃষ্টি আলো-বাতাসেরে অবাধ স্পর্শের দিয়া প্রেম। ২৭
রাজ হংস
ক্ষুধিত বক্ষের মাঝে তার পরে জেগেছে বাসনা,
নগ্ন, স্বাভাবিক।
হিংসা জাগিয়াছে মনে, নিরুদ্বেগে করেছি হনন;
ধীরে ধীরে রচি’ অন্তরাল
প্রকৃতির কোল হতে বিচ্ছিন্ন করেছি আপনারে ;
এক যাহা দুই হয়ে পরস্পর করে হানাহানি।
তারাে পরে দেহে মনে জেগেছে বিকার ;
বিরাট বিশ্বের সৃষ্টি ক্ষুদ্র ক্ষুব্ধ মনের মাঝারে,
এক হ’ল বহু।
গােপন অন্তরে মাের তারো পরে জাগিয়াছে প্রেম,
কাদিয়াছি, বাসিয়াছি ভাল
বহুরে করেছি এক বারম্বার ভালবাসা দিয়ে,
বারম্বার পরাজয় মানি।
তবু স্বপ্ন সত্য মাের, তবু আমি যা ছিলাম, নহি,
আঁধার ভবিষ্য-গর্ভে রুদ্ধ আলো করিছে ক্রন্দন।
২
তিমির-তীর্থ হে উষা আমারে কর ক্ষম। আলােকের পরপারে অন্ধকারে আমার বসতি, সেথা গাঢ় গহনের মাঝে কায়াহীন ছায়া সব নৃত্য করে আমারে ঘিরিয়া, ছিন্নমস্তা রুধির-পিপাসু, কবন্ধ আকার কত রক্তমাংস জড়পিণ্ডপ্রায় বাহু মেলি’ বন্দী করিয়াছে। পূতিগন্ধ অন্ধকারে তাহাদেরই মাঝে মাের চরিতার্থ দূষিত বাসনা। সে তিমির পার হয়ে বাহু মাের ধরিতে না পারে— হে ঊষা, হে স্বয়ম্প্রকাশ, বহ্নিদীপ্ত ও কায়া তােমার। এ আঁধারে বসি বসি শিহরিয়া করি অনুভব অরুণের জয়যাত্রা, হে উষসী, তােমার উদয়ে। আধ-অবগুণ্ঠনের মাঝে আললারে আড়াল দিয়া তিমিরের করিছ সাধনা; সেই তব পরাজয়, বিজয় আমার, তবু ইহা গর্বের তাে নহে! বসি ক্লান্ত নিঃশব্দের তলে, আতঙ্কিত কর্ণে মাের রহি রহি শুনিবারে পাই-
রা জ হ
হe
ज
মত্ত গুঢ় বাসনার লক্ষ লক্ষ ফণার গর্জন;
শুষ্কপত্র মর্মরিয়া শ্বাপদের নির্ভয় বিলাস।
মাের উত্তেজনা
আমারে করেছে বন্দী, ভালবাসি তাই এ তিমিরে,
ভালবাসি এ পঙ্ক-কর্দম।
তােমারে ধরিতে সাধ নাই,
হে উষসী, মােরে কর ক্ষম।
সূৰ্য্যমুখী
অবােধ সূর্যমুখী
নিন্দা রটেছে, সূর্যের পানে চেয়ে কাটে দিন তার,
রবিহারা রাতি ঘুমের বিকারে কাটে ;
মিথ্যা—-মিথ্য-মিথ্যা তাহার নাম,
মিছা লোেক-অপবাদ ।
সূৰ্য্যমুখী সে নিজ-অন্তরমুখী ;
সব স্নেহ মায়া মমতা ও ভালবাসা
বিধাতার শাপে ভাগ হয়ে গেছে আলােকে-অন্ধকারে,
বিধাতার বর বলিতে তােমরা পার !
জীবনে সূৰ্য্য এসেছিল একদিন
তবু সে সূৰ্য নয়-
অমাবস্যার গাঢ় তমিস্র জমাট বাঁধিয়া কবে
ছুয়ে গেছে তারে রবির ছদ্মবেশে,
৩০
রাজ হংস
কালাে করে গেছে আলো-ভােলা বুকখানি,
প্রথম প্রণয়-পরশ-লােলুপ দুরু দুরু বুকখানি।
কেহ দেখে নাই, কে এল।রবি না তম,
উৎসব-সুখে মগ্ন সকলে, উৎসুক-মুখে নিমীলিত আঁখি তার,
দল মেলিবার আশায় ব্যাকুল কোরক-সূৰ্যমুখী
সেও দেখে নাই, নহে তার অপরাধ।
হ’ল সে অনেক দিন—
কালাের ছোঁয়ায় কালি হয়ে দল মেলেছে সূৰ্য্যমুখী,
বিষপানে জর্জর।
হঠাৎ একদা নিশীথ-বেলায়, হঠাৎ ভাঙিল ঘুম,
চমকি জাগিয়া দেখিল সূৰ্য্যমুখী
রাজপুত্রের ঘুচেছে ছদ্মবেশ,
রবি সে আঁধার-রবি।
পাপের বিকার বুকে বসিয়াছে দেবতার রূপ ধরি,
তখন সময় নাই।
।
পাপ চলে গেল, কাদিল সূর্যমুখী,
অবােধ মূৰ্যমুখী।
দলগুলি মেলি’ নিশীথ শয়নে আজিও জাগিয়া আছে ।
দিবস বিফল তার,
দিনের রৌদ্রে আবরি’ আঁধার হেনেছে মৃত্যুবাণ,
সে রূঢ় আঘাতে কঁপিয়া কাপিয়া কঁাদিল ফুলের প্রাণ,
মরিল না একেবারে।
সে হ’তে সূৰ্যমুখী
আলোর লাগিয়া বাহু মেলে আছে অবােধ অন্ধকারে।
জ ইং স
দীপ্ত সবিতা, রুদ্র বিবস্বান
ছদ্মবেশী সে পাপ-তমিস্রা নহে।
এক নিমেষের ভুল,
দীর্ঘ জীবন টানিয়া টানিয়া চলিতে সে নাহি পারে।
তবু হায়, হায় হায়
সিথির সিদুর হাতের লৌহ—ডাকিছে বহ্নিশিখা ;
দেহের মাংস আজ,
কুঞ্চিত হয়, পুঞ্জিত হয়ে ধরে বাসনার রূপ,
বলে এসাে, এসাে তম,
চির-জীবনের নাহি চাই রবিকর,
এই ক্ষণিকের আঁধারই সত্য বেশ।
বলিছে সূৰ্য্যমুখী
হে পাপ-দেবতা, আলাের অন্তরালে,
তােমার পরশে আমার পরশ একদা স্বপ্নাবেশে
সৃজন করেছে বিপুল সম্ভাবনা।
অন্ধকারের বুক-চেরা ধন, তােমার মিথ্যাচারে
আলােকে চাহিছে প্রবেশের অধিকার।
তাহারা সত্য, তাহারা সত্য, তাহারা সত্য তবু,
তাহারা আলাের দূত।
আঁধার মূৰ্যমুখী
আলোর কিরণ অাশ্রয় করি’ আঁধারের দীপগুলি
আলিবারে চায়, অলিতেছে তাই নিজে ;
সূর্যমুখীর সূৰ্য আজিও মেঘ আবরণে ঢাকা।
৩২
রা জ হংস
কখনও কি হায়, ছিড়িবে সে মায়াজাল,
ভুলে যাবে তার কোরক-দিনের আঁধারের ইতিহাস,
ভুলিবে সূর্যমুখী ? ভুলিতে কি কভু চায় ?
ঘনায় যখন নিশীথের কালো মায়া,
ঘুমায় অলস দল,
জাগিয়া জাগিয়া জাগিয়া সূৰ্য্যমুখী
আঁধারে কামনা করে-
আধার ছানিয়া পাপ-দেবতার ছায়া
রূপ ধরি’ যেন নামে বক্ষের পাশে,
দুবাহু বাড়ায়ে ধরিতে তাহারে যায়।
পাপেরে তখন পাপ বলি নাহি গণে,
সূর্যের চেয়ে অমাবস্যার তমিস্র। ভালবাসে,
মনে মনে বলে, হে দেবতা, মাের তম যেন নাহি কাটে।
সূৰ্যমুখীর আলােহীন ইতিহাস
আঁধারে গােপন থাকে।
এর চেয়ে মৃত্যু ভাল
এর চেয়ে মৃত্যু ভাল, জানি জানি তাও আমি জানি,
নিরাশার অন্ধকারে পড়ে থাকা চিরদিনমান,
মরে যাওয়া ভাল তার চেয়ে !
পড়ে পড়ে মার খাওয়া—মরে যাওয়া ভাল তার চেয়ে
এ কথা জেনেছি কবে, তবু আজো মরিতে পারি না।
ब्राम
মৃত্যুরে কি করি ভয়, জীবনেরে ভালবাসি এত ?
আঘাতে আঘাতে আর নিঃসংশয় অপমান মাঝে
উচ্ছসিয়া উঠে বুকে আশা-আনন্দের বন্যাস্রোত ?
কি যেন রয়েছে বাকী বিধিলিপি আমার ললাটে,
পীড়নের দাবদাহ উত্তরিয়া পাব একদিন
ধবল রজতকান্তি আরামের সুখশয্যাখানি।
সােনার অরুণ আলো হয়তো বা সহসা একদা
বেদনা-শিথিল মাের মৃত্যুমুগ্ধ শীতল ললাটে
অন্ধকার নিশিশেষে হানি যাবে উত্তপ্ত পরশ
বেঁচে আছি তারি প্রতীক্ষায় ?
মরিতে পারি না বলে বাঁচিয়া রয়েছি এতদিন ?
আমার ক্ষুধার অন্ন বুকে লয়ে জননী বসুধা
নিশিদিন জেগে আছে মাের মুখে নির্বাক চাহিয়া।
স্তন্য দুগ্ধ গরিতেছে নদীর প্রবাহে,
অম্লভারে ফাটিতেছে মাটি,
স্বর্ণ রৌপ্য লৌহ আর বহ্নির ইন্ধন
গতির ইন্ধন যত, মাতা বসুমতী
রেখেছে সঞ্চয় করি নিজ বক্ষতলে-
মাের প্রয়ােজন লাগি জননীর আত্মসমর্পণ।
জননীর বক্ষতল নিষ্পেষিয়া করে যায় খালি,
চক্ষে তার বাষ্পোচ্ছ্বাস জাগে !
একে সইতেছে কাড়ি অন্যের আশ্রয়,
করিছে সংগ্রহ একে, মুঠি ভরি’ আপন খেয়ালে
দু’হাতে উড়ায় অন্যে নিতান্ত উল্লাস-অপচয়ে।
৩৪
র জ ই ংস
নিপীড়িত অন্নহীন চেয়ে আছি বিমূঢ় বিস্ময়ে,
আতঙ্ক-কম্পিত কর বারম্বার হানিয়া গলাটে
ডাকিতেছি, মৃত্যু এস, মরিতে পারি না একেবারে।
মায়ের বুকের স্তন্য তাও নারি করিবারে পান,
আপনি যা দেন মাতা মুখে তাও পারি না তুলিতে।
আপনার দৈন্যভারে দুর্ভিক্ষের দ্বারদেশে বসি’
ঈর্ষাক্ষুব্ধ বক্ষে জাগে বঞ্চিতের অক্ষম কামনা
মারিয়া মরিতে চাহি, শীর্ণ বাহু পারি না মারিতে,
লােলুপ জীবন লয়ে মরিতেও নাহি পারি হায়।
-
এর চেয়ে মৃত্যু ভাল, বেঁচে থাকা নহে স্বাভাবিক
চলেছে চঞ্চল গতি নবযুগ-ব্যাধির প্রকোপে ।
জ্বরগ্রস্ত পীড়িতের যন্ত্রণার বিকৃত বিকারে—
বিকার ব্যসন আনে অসংখ্য উন্মাদ উত্তেজনা ;
তারাও বঁচিয়া আছে মরিবার উদ্দাম আগ্রহে,
বেঁচে থাকা নহে স্বাভাবিক।
দুভিক্ষ মৃত্যুরে আনে, প্রাচুর্য মৃত্যুরে দেয় ডাক,
প্রবল, প্রবল দম্ভে মহাশূন্যে মরিছে ফাটিয়া,
কর্দমে দলিত মােরা মরিতেছি তাহাদের চাপে।
সবার ক্ষুধার অন্ন বুকে লয়ে জননী বসুধা
করুণ নয়ন তুলি’ চেয়ে আছে সন্তানের মুখে ;
অন্নাভাবে মরে কেহ, পচ। অন্ন মদ হয়ে ওঠে,
টলিছে সফেন মদ্য অতি স্বচ্ছ কাচের গেলাসে,
ধরণীর ক্লেদপঙ্কে মদ্যপ দিতেছে গড়াগড়ি।
ना कम
বিষাক্ত হয়েছে বিশ্ব স্বর্ণ আর রৌপ্যের বিকারে,
শাণিত লৌহের অস্ত্র
দুলিতেছে মানুষের শিরে,
দিকে দিকে শােনা যায় যন্ত্র-দানবের আস্ফালন।
বহ্নির ইন্ধন আজ কুণ্ডে কুণ্ডে জ্বলে দাউ দাউ,
সে আগুনে লক্ষ লক্ষ মানুষ পুড়িয়া হল ছাই ।
সম্মুখে পড়িয়া আছে দিগন্তপ্রসারী রাজপথ,
সে পথে চলে না কেহ, গতির ইন্ধন পােড় শুধু,
মানুষ ঘুরিয়া মরে আপনার চক্রব্যুহ-পথে ।
এর চেয়ে মৃত্যু ভাল, জীবনের মিথ্য। জয়ধ্বনি,
সবে নিলি তুলিতেছি নবযুগ-ব্যাধির প্রকোপে।
মেঘ-ছোঁয়া দম্ভে আজ জীবনের বীভৎস বিকার,
জীবনের স্বরূপ এ নহে।
প্রাণের মুখোস পরি’ মৃত্যু
আসি দ্বার দেয় হানা,
লাঞ্ছিত দলিত পিষ্ট, যারা আমাদের মত ক্লীব,
ঘৃণায় মরিতে চাহে দিবসের প্রভাতে সন্ধ্যায়,
তিলে তিলে চলিয়াছি অতি হীন মৃত্য-ভিযানে,
বিকল অক্ষম মাের।
একই লক্ষ্য উহাদের, আসিতেছে বিপরীত পথে,
জ্বলিছে তাদের শিরে দম্ভের মশাল পৈশাচিক,
বাজিছে শ্মশানবাদ্য, মশালের ফুলিঙ্গের মত
তারাও নিবিয়া যাবে অন্ধকার অলক্ষিত পথে।
অসহায় মানবের লাগি-
বুদ্ধ, জরথুস্ত্র, খ্ৰীষ্ট যুগে যুগে কেঁদে হবে খুন।
৩৬
রবীন্দ্রনাথ
হিমালয়--
আপনার তেজে আপনি উৎসারিত,
আপনি বিরাট, আপনি সমুজ্জ্বল,
শিখর, গুহা ও অরণ্য-সমাকুল,
যুগ যুগ ধরি সঞ্চিত কত তমিস্রা অনাহত,
পুষ্পস্তবকে বিনম্র তরু, বিচিত্র কত ওষধি গন্ধময়,
ব্যাঘ্র হস্তী বরাহ বন্য, ভীষণ সরীসৃপ,
পুঞ্জিত কত মেঘলােক তার শিখরবিলম্বিত,
হিমালয় তবু হিমে ঢাকা, হায়, তুষাবে অসাড় শির।
ভয় করি তায়, বিস্ময় মনে জাগে
মহিমা বিরাট, শ্রদ্ধায় করি মস্তক অবনত--
ভালবাসিবারে যত যাই তত সভয়ে ফিরিয়া আসি।
হিমালয়-
নিজ সাধনায় প্রান্তর ত্যজি চুম্বিয়া নীলাকাশ,
অসীম শূন্যে হিমে ঢাকি শির একেলা প্রহর যাপে,
আপনার প্রেমে তিলেতিলে হিম হয়েছে বুকের তাপ—-
মাটির উপরে দাড়ায়ে রয়েছে, সে কথা গিয়েছে ভুলে।
অতল নিম্নে গুহা-অরণ্যে শ্বাপদ ভ্ৰমিয়া ফিরে,
সাপেরা চলিছে বুকে পেটে করি ভর
বিচিত্র কত নরনারী, আর পােষমান পশু কত,
ঘােড়। ও কুকুর, ছাগল, ভেড়ার পাল,
তারই আশ্রয়ে রয়েছে তবুও তাহা হতে কত দূর!
৩৭
बालम
r
ভয় করি আর শ্রদ্ধায় করি মস্তক অবনত,
ভালবাসিবারে যত যাই তত সভয়ে ফিরিয়া আসি।
হিমালয়
রৌদ্র-আলােকে তুষার-শিখর সাদা ধব ধব করে—
নিম্নে গুহায় কুহেলি অন্ধকার ;
উৰ্দ্ধ শিখরে ধূ ধূ করে হিম-মরু,
নাহিক পাদপ, নাহি পল্লব-ছায়া—
নীচে অরণ্য, রৌদ্রকিরণ পশে না ছিদ্রপথে,
ঘননিবিষ্ট তরু ও গুল্ম মেলেছে অযুত বাহু
নাহি মানুষের পায়ের চিহ্নে আঁকা ক্ষীণ পথরেখা,
সারা বনভূমি রবিকরলেশহীন।
দূর হতে আসি, হিমে ঢাকা শির চকিতে ঝলসি উঠে,
অনাদিকালের বৃদ্ধ যেন রে বসে আছে পাকা চুলে
ঝলসে তুষার, যেন বৃদ্ধের হা হা হা অট্টহাসি ;
ব্যাকুল হৃদয় আজিও পেল না নরম মাটির ছোঁয়া -
তুষারাবরণে আহত হইয়া ফিরি—
ক্ষোভে কেঁদে ফেলি, শ্রদ্ধায় করি মস্তক অবনত,
ভালবাসিবারে যত যাই তত সভয়ে ফিরিয়া আসি।
••
হিমালয়-
চিনিতে চেয়েছি, বুকেতে চেয়েছি, ধরিতে চেয়েছি তারে,
আজিও তাহার পাই নাই পরিচয়।
হতাশ হইয়া বসেছি আমার গৃহ-অঙ্গন-ছায়ে-
সুমুখে আমার সবজির ক্ষেত তাহারি আড়াল দিয়া
–
৩০
র জ হংস
হিমালয় হতে ঝরণা নামিয়া উপল-চপল পায়ে
ঝিরিঝিরি আর কুলুকুলু রবে ছুটেছে গাঁয়ের মেয়ে।
কোথা হিমালয়, হিমেতে রয়েছে ঢাকা,
পাহাড় গলিয়া নৃত্যচপল এসেছে গাঁয়ের মেয়ে,
বিস্ময় মানি তারি পানে চেয়ে চেয়ে
ঢেউ গণি আর শুনি কুলুকুলু রব,
ভুলি হিমালয়, ভালবাসি নদীটিরে—
তত ভালবাসি যত কাছে যাই, পুলকে ফিরিয়া আসি।
হিমালয়
তুমি হিমে ঢাকা থাক, নদীরে কোরো না হিম।
আমার কুটির-আঙিনা ছুইয়া তােমার চপল মেয়ে
সবুজ করিয়া যুগে যুগে মাের ছােট সে সবজি ক্ষেত
বহিয়া চলুক, তুমি থাক, নাহি থাক—
হিসাব তাহার আমি ত রাখিব না’ক ;
আমি ছুটিব না বিস্ময়ে ভয়ে তােমার পরশ খুজি,
যুগে যুগে আমি স্নান সমাপন করিব ও নদীজলে-
কোথায় উৎস, কোন্ সমুদ্রে লীন,
ইতিহাস তার যে পারে রাখুক লিখে
নদীজলে আমি স্নান করি আর তরণী বাহিয়া চলি
যত ভালবাসি তত কাছে পাই পুলকে ফিরিয়া আসি।
అని
রবীন্দ্রনাথ মৈত্র
রবি নাম তব, ধর নাই রবি-রূপ—
তােমারে ঘিরিয়া গ্রহ শশী আজও করেনি ভ্রমণ শুরু ;
তুমি নীহারিকা, নেবুলা-বাষ্প,
অসীম
মি শূন্য ব্যেপে
গতির আবেগে শিহরে ঈথর নীল)
বাষ্প-বিকারে নিয়ত ঘূর্ণমান।
লক্ষ তারকা অযুত রবির কোটি গ্রহ-চন্দ্রের
সম্ভাবনায় ব্যাকুল তরল প্রাণ।
জ্ব'লে নিবে যায়, জ্বলে জ্বলে ওঠে ধাতব বাষ্প যত,
গলিত লৌহ গলিত স্বর্ণ জল মাটি ধোয়াধার—
জমাট বাঁধিয়া ধরেনি কঠিন দেহ ;
রবি নাম তব, নীহারিকা ইতিহাস।
কে রচিবে হায়, অজাত জ্বণের গতিবেগ-ইতিহাস।
জননী-জঠরে নবীন প্রাণের বিপুল সম্ভাবনা ;
নাম নাই তার, পরিচয় নাই, অস্ফুট অনুভূতি
অনাস্বাদিত অবর্ণনীয় মাতার উন্মাদনা,
অন্ধ ভবিষ্যতের গর্ভে বিরাট আলাের রূপ,
যে দেখেছে তার মনে রয়ে গেল ভাষাহীন অনুভব ।
ব্যাকুল মাতার অধীবতা-উৎসব
জ্বণের বিনাশে সহসা স্তব্ধ হ’ল
আলাের রাজ্যে আঁধারের শিশু ভূমিষ্ঠ হ'ল না যে।
নয়নসলিল ঝরিল কপোল বেয়ে,
বক্ষ হইল হিম।
৪০
রাজ হংস
আমার বুকেতে লেগেছে হিমের ছোঁয়া,
নয়নে অশ্রু নাই।
মূঢ় বিস্ময়ে দেখিলাম চেয়ে, আকাশের নীহারিকা
ঘুরিতে ঘুরিতে প্রচণ্ড বেগে, জ্বালিতে জ্বালিতে আলো,
নিবিড় তিমিরে কোথা হ’ল দিশাহারা—
ধাতব বাষ্প হিমের স্পর্শে শূন্যে বিলীন হ’ল ;
রূপ না ধরিয়া রূপালি বাষ্প বাহির আকাশ ছাড়ি’
মনের আকাশে ধরে অপরূপ রূপ।
অপরূপ রূপ, রূপ অপরূপ, বুঝি না ছায়ার মায়--
তরল আঁধারে অৰ্ধোঙ্খিত তব দক্ষিণ বাহু,
তােমার রােমশ বাহু,
ঝুলে পড়িয়াছে খদ্দরী আস্তিন,
শীর্ণ করাঙ্গুলি
নখাগ্রে তার জাতির মুক্তি-বারতার, স্পন্দন
(এ অভিশপ্ত এই লাঞ্ছিত জাতি)।
বন্ধু, বন্ধু মাের—
কোথা তব মুখ, কোথা বাণী তব, বজ্রকঠিন বাণী,
থাকিয়া থাকিয়া রুদ্ধ আবেগে ভাবগদগদ ভাষা,
অশ্রুজড়িত চাপা কণ্ঠের স্বর?
তােমার আঁখির নীল,
আয়ত চক্ষে বুকের নীলাভ জ্বালা,
কোথায় বন্ধু, অবিন্যস্ত মাথার বিরল কেশ ?
৪১
ब्रा कम দেখিতে যে নাহি পাই- মৃত্যুর কালো ছায়া এত কি নিরেট নিবিড় অন্ধকার । মৃত্যুর নীরবতা এমনই বধির কঠোর বাক্যহীন। আঁধার মৃত্যু তব দক্ষিণ বাহু পারিল না গ্রাসিবারে ; আমি দেখিতেছি বাক্যমুখর ক্ষীণ স্পন্দন তার বলিতেছে, আমি আছি। তব অনাবৃত বক্ষের উপবীতে লেগেছে আগুন ছোঁয়া, বলিতেছে, জাগো জাগাে। জাগাে চণ্ডাল, জাগে। কঙ্কাল জাগো, জাগাে জাগো ব্রাহ্মণ! অগ্নি-জ্বালায় প্রদীপ্ত তব বক্ষের উপবীত পরাইয়া দাও, দাও কঙ্কাল-গলে, শুনি এ শশ্মশানে কঙ্কাল-মঙ্গল। বন্ধু, বন্ধু মাের- তুমি কি চলিয়া গেছ ? তবে কেন শুনি ওঁরাও-আবাসে জীবনের জয়ধ্বনি, চামার মুচির ডােমের মুখেতে নির্ভর-আশ্বাস দেখিতে যে আজো পাই । বাবা-ঠাকুরের সেবার লাগিয়া তারা প্রতীক্ষা করে। ৪২ नाम নিরীহ। নির্যাতিতা, সবাই তত ভাই আশ্রয় পায় নাই। তােমার ছেলেরা সবে আসন পাতিয়া বসে আছে পাত পেড়ে কলেজের ফীজ হয়নি সবার দেওয়া। বন্ধু, তােমার নাটকের প্লট মরিতেছে মাথা খুড়ে, উদাসী আজিও একাকিনী কঁদে মাঠে ; থার্ড ক্লাস সেই রয়ে গেল থার্ড ক্লাস- তবে কেন ছিড়ে চলে গেলে মায়াজাল ? বাস্তবিকার আসরে আজিও হরিকুমারের বসি বিয়ে বিয়ে কঁদিতেছে নাকী রে, শেষ না হইতে দিবা তুমি কেন ছেড়ে গেলে দিবাকরী, বলিয়া গেলে না, কোথা থাকে তব ত্রিলােচন কবিরাজ। বন্ধু, তুমি তাে দেখে গেলে না’ক মানময়ী গার্লস্কুলে বদনের মুখে ছাই দিয়ে মেয়ে হাজারে হাজারে আসে, ঘৃতকুম্ভটি প্রাঙ্গণে আছে পড়ে— দধিকর্দমে পিচ্ছিল প্রাঙ্গণ। বন্ধু, তােমার দক্ষিণ বাহু আরো কি কহিবে কথা, শুনিতে না পাই মিলায় ছায়ার মায়া ; আমারই মনের ভুল-- তুমি নাই, তব দক্ষিণ বাহু নাই, কান পেতে শুনি অসীম শূন্যে চকিতে থামিয়া গেছে গতি-আবেগের অনাহত গীতধ্বনি। ৪৩
রাজ হং স
আকাশের নীহারিকা
বিরাট বিপুল প্রচণ্ড বেগে নিয়ত ঘূর্ণমান,
পুড়িয়া হয়েছে ছাই;
ধরার ধূলায় গুড়া গুড়া হয়ে মরিয়াছে নীহারিকা,
বাতাসে উড়িয়া গেছে।
বন্ধু, তােমার ভস্ম-বিভূতি উড়িছে আকাশ ছেয়ে,
ভস্মের চোখ নাই।
পায় না দেখিতে, কঁদিছে বিধবা, কঁদিছে উন্মাদিনী,
পিতারে হারায়ে কাঁদিছে সাতটি শিশু।
মরজীবনের সীমান্তে আসি কঁদিতেছে অভাগিনী ;
মাতার শয়ন-শিয়রে জ্বলিছে
। ধৃতের প্রদীপ নহে,
মৃত পুত্রের চিত।
৪৪
নিঝরিণী
No text on this page.
পান্থপাদপ
মনটারে সাদ। পরদা বানায়ে স্মৃতির আলােকে দেখি,
কত ছায়াছবি ভেসে ওঠে পরদায়-
মনের কবরে একটি একটি চলিয়াছে শবাধার,
জীবনে তাহারা থাকে নাই বেশী দিন।
স্মৃতির এ শােভাযাত্রায় তারা বিলম্ব নাহি করে।
কারাে সাথে কারাে নাহি কোনাে যােগ, শুধু চলে সারি সারি
আমারই খেয়ালে দ্রুত কি বিলম্বিত ।
প্রখর রৌদ্রে মধ্যদিনের দাহে-
প্রভাতে যখন দিবসের কাজ শুরু,
সে স্মৃতি-খেলায় নাহি মাের অবকাশ ।
রজনী যখন আঁধারিয়া আসে, গগনে ঘনায় কালো,
দূরে কোথা শুধু প্রহরী পেচক জাগে,
মেঘে মেঘে যবে ধূসর আকাশ, আলো আবছায়া হয়,
অবিরল ধারে আকাশের ধারা ঝরে ;
একাকী আমার বাতায়নে বসি, মন-বাতায়নে সখী,
স্তব্ধ পুলকে দেখি চলিয়াছ সবে—
কারো চেনা শুধু সি থির সিঁদুর, কারাে গুণ্ঠনখানি,
কারো চেনা শুধু কণ্ঠের কালো তিল,
শাড়ী পরিবার ভঙ্গিটি শুধু কারাে লাগে চেনা-চেনা,
কেই ধরা দাও পিছন ফিরিয়া চেয়ে---
পথে যেতে যেতে ক্ষয়ে মুছে গেছে চরণে যাবক-রস,
চেয়ে চেয়ে মাের ঝাপসা যে হয় আঁখি।
৪৭
রা জ ইং স
সবে চলে যায়, তুমি শুধু সখী দাড়াও কি যেন ছলে,
তােমারে দেখেছি কাঞ্চন-নদী তীরে।
ফুলের ফসলে ভরা সাজিখানি ছিল না দখিন হাতে,
বাম হাতে নাহি ছিল লীলা-শতদল।
তুমি ছিলে আর ছিল বালুচর, মাছরাঙা উড়ে উড়ে
খর দৃষ্টিতে দেখে আর দেখে শিশু-মৎস্যের খেলা ;
ওপারের বন ঝাপসা হইয়া আসে।
কিছু মনে নাই, মনে আছে শুধু সীমাহীন পটভূমি,
সাঁকোর উপরে চলে আলােকিত ট্রেন।
তুমি আর আমি—তার পরে ছবি, নগরীর ধুলি-ধোঁয়া,
বালীগঞ্জের পথে ছুটে চলে ডজ-গাড়ী একখানা,
রঙীন শাড়ীর বিজলী-ঝলক রেখা,
অতি সুমধুর কলহাস্যের ধ্বনি,
তার পরে মনে নাই।
তবু আজো সখী, কেন নাহি জানি রয়েছি প্রতীক্ষায়,
কিশাের মনের তুমিই প্রথম প্রেম।
দুই
গ্রীষ্মের ছুটি, অনেক দিনের কথা,
তখনাে পাকিয়া ঝরে নাই কালাে জাম,
করমচা পেকে হয় নাই ঘাের লাল,
কঁচা আম আর লঙ্কা মুনের চলে বাদশাহী খান।
তুমি ছিলে কঁাচা, আমারও তখন পাক ধরে নাই মনে
দৃঢ় পাখা মেলি’ অসীম
শূন্যে
করিনি বিহার শুরু।
অতি-পরিচিত অবজ্ঞা কেন হঠাৎ সেদিন সখী,
খর দুপহরে হ’ল অভাবিত প্রেম।
০৮
যে চোখে চেয়েছি, যে সুরে কয়েছি কথা--
একটি নিমেষে নূতন জন্মলাভ ;
চোখে লাগে ঘাের, কঁপিতে লাগিল সুর,
পূর্ণিমা চঁাদ হ’ল যেন আধখানা।
বন্ধ দুয়ার বাতায়ন, শুয়ে পাশাপাশি দুই জনে,
ভীরু মন চাহে তখনই হইতে দেহের সীমানা পার--
তুমি ছিলে সখী, কিছুতে তােমার আপত্তি ছিল না’ক
একূল ওকুল মাঝগাঙ—যেন সকলি সমান তব,
ঘটিবে যা কিছু অস্বাভাবিক ঠেকিবে না তব কাছে।
অপটু অনভ্যস্ত প্রেমের খেলা না হইতে সুরু,
কি জানি কি ভেবে চোখে চেয়ে মাের কহিলে সহজ ভাষে ;
আজ তুমি হেথা পাশে শুয়ে মাের, কোথায় থাকিবে কাল,
কোন্ খেয়াঘাটে কোন্ নদী হবে পার ।
চমকিয়া উঠি, শয্যা ছাড়িয়া জানালা দিলাম খুলে,
অবাক হইয়া তুমি শুধু, সখী, চাহিলে আমার পানে,
তপ্ত বাতাস ধূলি-কাকরের পসরা বহিয়া শিরে
ঘরে এল, ছেড়া কাগজপত্র করিল নাচন শুরু ;
সঙ্গীরা তব খেলা করে দূর কঁঠাল গাছের তলে—
তাহাদের কলহাসি।
তার পরে তব সুকঠিন ব্যাধি, মৃত্যুর সাথে যুঝে
বন্দীতােমারে আনিনু মুক্ত করি ;
রােগ-পাণ্ডুর নয়নে তােমার ফুটিল প্রেমের আলো।
তার পরে তব বিবাহ—তােমারে নিয়ে গেল দূর দেশে,
মূচ্ছাকাতর বাসর-শয়ন মিথ্যা হইল সখী।
৪৯
৭
রা জ ইং স
তার পরে, ফিরে আসিলে উন্মাদিনী—-
ক্রোড়ে শিশুদ, তবু নীলাকাশ দুলিছে ঝড়ের দোলে
তাররা পরে-কালো নিশা
কেহ নাহি জানে তিমির প্রভাতে উদিবে কি শুকতারা।
তিন
একটি মাসের প্রবাস আমার, বহুদূরদেশে নয়,
পাশেরই বাড়ীতে মাঝে গলি ব্যবধান ;
ছাদে ছাদে যার সাথে পরিচয়, যারে দেখিবার ছলে
অকারণে কত করিয়াছি আসা-যাওয়া
এমনই ঘটিল যােগাযােগ, সেই বাড়ীরই কক্ষে কোনাে,
বিছায়ে শয়ন ঘুমেতে নয়ন মুদি ।
মকরকেতন তােমারে ছুইয়া গেছে
চোখে লেগে আছে তখনও পরশ তার।
বুকের বসন খনে খনে খসি পড়ে,
দেহের কিনারে উঠে আর ভাঙে ঢেউ ;
চকিত হাসিতে কালাে শঙ্কার ছায়া !
দু’বাহু বাড়ায়ে, তােমারে ধরিতে গিয়ে,
কঠিন শিলায় প্রতিহত হয়ে ফিরি,
বেশী ঘন ঠেকে রজনীর কালো চুল।
প্রভাত আলােয় মনে হল যেন স্নিগ্ধ পরশে কার
ঘুম ভেঙে গেল, অপরূপ অনুভূতি!
মনে হ’ল, তুমি স্বপ্ন-সরণি পায়ে হেঁটে হলে পার।
দিনের আলােক প্রেম-অভিনয়ে ফেলে দিল যবনিকা,
৫০
রা জ ইং স
রঙ্গমঞ্চে অবােধ শিশুর মত--
তুমি লীলাভরে তুলে ধর যবনিকা,
প্রেক্ষাগৃহেতে আমি একা বসে, লেখা কি পড়ার ছলে
দেখি আর দেখি, লােভে ক্ষোভে দেহ তপ্ত হইয়া ওঠে,
নয়ন মুদিয়া কভু থাকি শুয়ে প্রতীক্ষা-অবসাদে।
সন্ধ্যা-আঁধার যেমনই ঘনায় সখী,
তােমার প্রবেশ, প্রদীপ জ্বলিল ঘরে,
সভয়ে চকিতে শয্যা রচনা করিবার অবসরে
কভু ধরা দাও, কভু কহ, ছি, ছি, ও কি।
ছােট ভাইঝিরে হঠাৎ কাছেতে ডাকি
মাের পানে চেয়ে হাস অকারণ দুষ্টামিভরা হাসি।
তােমারে কি ভালবেসেছি, অথবা চেয়েছি তােমার দেহ,
কৈশাের নয়, যৌবন নয়, তুমি ছিলে মাঝামাঝি
হরিণীর ভয় কখনাে নয়নে, কভু শিকারীর ছল।
৪
দ্রুত ধায় গাড়ী, পাশাপাশি থাকি বসে-
দুয়ে একা নই, আরো থাকে দলবল,
কখনাে জানিয়া, কভু অজানিতে গায়ে গায়ে ছোঁয়া লাগে,
পায়ে পায়ে জাগে বিদ্যুৎ-শিহরণ ;
তাহার অধিক নহে।
তারপরে দূর, বহু দূরে সখী, সুগভীর বনভূমি,
পাহাড়ে ও বনে চোখে অবসাদ জাগে;
সেথা তব বধূবেশ ;
গুণ্ঠন শিরে, চাহিছ ভুলিতে কবে কি ঘটেছে ভুল।
৫১
রা জ হং স } আমার মনের বনে- একদা যে শাখী শাখা মেলেছিল, যদিও শুকায়ে গেছে দখিন বাতাসে আজিও তাহার মৰ্ম্মর-ধ্বনি শুনি; যদি কভু দেখা হয়— তােমার প্রণাম সহজে লইব, সখী। চার আশ্রয়হারা বনের হরিণী, রজনী তিমিরা অতি, আশ্রয় নিল বাঘের দুয়ারে আসি। লােলুপ ব্যাড্র কহে, এস এস—তােমারি লাগিয়া আমি, নিবিড় নিশার ব্যাকুল প্রহর যাপি। রজনী-প্রভাতে দুই জনে মাের। এ বন গহন ত্যজি যাত্ৰা করিব জানার অভিসারে । দু’বাহু মেলিয়া ধরা দিল মৃগ, হারাইল আপনারে। প্রাণের আবেগে তারপরে হায়, বাঘেরে খুজিতে গিয়ে শােনে দূর বনে মৃগপ্রলুব্ধ ব্যাঘ্রের হুঙ্কার- অরণ্যভূমি তাহার শিকারভূমি। হায় সখী, তুমি সেদিন হইতে আজো প্রতীক্ষা কর, যা গিয়েছে, কোনাে শুভ গােধূলীতে পাবে না সার্থকতা, যা দিয়েছ তার বিনিময়ে মাের আঁখির আবেশ হেরি, ক্ষণিকের সেই মােহের ভ্রান্তি মম-- সারাটি জনম কাটিবে কি সখী, স্মৃতি-সৈকতে বসি, ঘট ভরে কারা, তারি ঢেউ গুণে গুণে। তার চেয়ে ঝাঁপ দাও, লক্ষ সাগর শােভিছে লক্ষ চঞ্চল নদীহারে—
রা জ ই ং স
হিমালয়ও নহে এক,
দেওয়ার দাবীতে চেয়ো না বাঘের মন।
পাঁচ
আলাে করিয়াছ, ভালবাস নাই সখী,
গান গাহিয়াছ, সে গান হয়েছে মিছে—
অপরে লুকায়ে পাওনা বুঝিয়া তার
উপরি পাওনা চেয়েছিলে মাের কাছে,
একূল ওকূল দুকূল বজায়, এই ত’ অসতীপনা।
যে নদী সাগরে ধায়—
কূল সে ভাঙিয়া চলে, চাহে না ত’ পিছনে ফিরিয়া কভু,
দরজার পানে ঘন ঘন নাহি চাহে,
প্রিয় এলে ছলে ঝিয়েরে বাজার করিতে পাঠায় না’ক---
তার চেয়ে তুমি আমারে কহিতে যদি,
তুমি দূরে যাও, আমি আর পারি না’ক—
দূরে আসিতাম, ভালবাসিতাম সখী,
কঁদিতাম তব স্মৃতির বালাই নিয়া।
গাছের খাইয়া, তলার কুড়ায়ে সই,
সতী থাকা যায়, হয় না পীরিতি করা।
ভালবাসি তব ভঙ্গিটি সখী, ভালবাসিবার ভাণ,
পরকে ঠকায়ে নিজে ঠকিতেছ ভাবা।
কুন্দদন্তে অধর চাপিয়া, নয়নে চাপিয়া হাসি
ভালবাসি সখী, ভুয়াে ভৎসনা তব।
রাজ হংস
প্রকৃতি তােমারে গড়িয়াছে কৌশলে,
দিতে শেখ নাই, নিতে শিখিয়াছ, নকল করুণাময়ী,
গত জনমের সাধনালব্ধ নয়ন-অশ্রু-জল।
জানি শুনি বুঝি তবু কেন ভুলে থাকি,
হায় পতঙ্গ, হায় পতঙ্গভুক্,
অগ্নি তাে নও, আগুন হইলে নিবে যেতে এত দিন
দাহিকা নহ ত’, নিয়ত শোষণে কীটে জর্জর কর ।
জর্জর হই তবু সখী, ভালবাসি,
পাষাণী, তবুও পাষাণ-ভঙ্গী মন ভুলায়েছে মম।
সাত
কাছে গিয়েছিনু আপন গরজে সখী,
দুরে এসে আমি নিজেরে বাঁচাতে চাই,
মাঝখানে যাহা ঘটিল, সে নহে তটিনীর ইতিহাস।
পচা পাতা আর পচা ধূলা আর লুব্ধ ব্যাপারী যত,
বসেছে বাজার, বাজার করিতে গিয়ে,
এটা ওটা কিনি, যতটুকু পারি কাদা বাঁচাইয়া চলি,
বাজার সারিয়া ঘরে এসে হাঁফ ছাড়ি।
মনেও পড়ে না কুমড়ােউলীর নয়নে ক্ষুধিত ভাষা,
হিসাব খাতায় লেখা আছে শুধু কত তারে দিনু দাম।
বাজারের ইতিহাস
স্মরণ করি না ঘরের রান্নাঘরে ।
তবু যবে রাত দুপুর গড়ায়, শিয়রে নেবাই বাতি,
বাতায়ন-পথে দেখি আকাশের তারা,
দু’একটি ভাল কথা যা শুনেছি, বলেছ প্রেমের ভাণে,
৫৪
রা জ ই ং স
---
আধখানা সুর, ভাঙা সিকিখানা মন,
শতধা হইয়া ফেটে পড়া মিছা পােষা নয়নের জল--
উল্কার মত দপ্ করে জ্বলে’ ছুয়ে যায় মাের মন।
তখন বুঝিতে পারি—
বিচিত্র সখী মানুষের মন, নিখুত যন্ত্র নহে,
পাঁচটার পরে ছয়টা সেথা না বাজে--
সাতটার ঘরে না আসিতে কঁাটা বারােটা বাজিয়া যায় ।
সব ভুলে থাকি তবু ভেজে উপাধান।
আট
ফে করে করে করিলাম বি-এ পাস,
তারি কল্যাণে জীবন-যাত্ৰা আজো করি নির্বাহ,
আপনার ভুলে বাহিরের বিষে জর্জর হয়ে ফিরি,
স্নেহ-সুধারসে নূতন জীবন লভি ।
আকাশের মেঘ নহে এ ত, নহে মেঘেতে বিজলী রেখা,
পদ্মও নহে, নহে কাঞ্চন নদী,
হিমালয় নহে, সাগরের তটে ওঠে আর ভাঙে ঢেউ,
নহে ঝড়, নহে অবিরল জলধার।
ঘন অরণ্য নহে এর পটভূমি,
এ নহেক ধূ ধূ মরুময় প্রান্তর
চোখ-ঝলসান বিদ্যুৎ-দীপ নহে।
যে গায়ে আমার বহু পুরুষের ভিটা,
যেথায় একদা হঠাৎ আসিয়া বিস্ময়ে আঁখি মেলি
বিচিত্র এই ধরণীর পেনু অপরূপ পরিচয়,
সে গ্রামের সে যে অতি পরিচিত ছায়াসুশীতল দীঘি,
কূলে কূলে ভরা কাকের চক্ষু জল!
श्री छ
তীরের বাতাস বনফুলে মধুময়,
অসীম যাত্রী পথিক-পাখীর পাতা-ছাওয়া নীড়খানি।
বাহির-বিশ্বে ঝড়ে আর জলধারে-
হিমালয়-চূড়ে, উত্তাল-ঢেউ অসীম সাগর-বুকে,
মেঘ-বিদ্যুতে বিচিত্র ওই অগাধ শূন্য মাঝে
বহুবল্লভী পতঙ্গ মন, খুঁজে ফিরে বিস্ময় ;
বিস্ময় যবে টুটে, মনখানি ভরে যায় অবসাদে,
অতপতপ্ত ধূলিধূসরিত ঘামে ভিজে ওঠে
মন,
শীতল দীঘিতে ডুবিয়া শীতল হই—
পাতা-ছাওয়া নীড়ে যাপি কালাে নিশীথিনী ;
গ্রামের কুটীরে স্তিমিত প্রদীপখানি—
সন্ধ্যা জ্বালায়, স্নিগ্ধ আলােকে আলােকিত করে মন।
কিছু নাই বিস্ময় ?
কে জানিত এই গাঁয়ের দীঘিতে এতখানি বিস্ময়।
বহু বিচিত্র পসরা লইয়া নিথর সরসী বুকে
একটি একটি করিয়া নয়ন মেলে শিশু-শতদল,
পাতা-ছাওয়া নীড়ে শাবক-কাকলি শুনি,
স্তিমিত প্রদীপে স্নেহরস তারা ঢালে।
অবাক হইয়া রহি—
নিরুদ্দেশের যাত্রী পথিক, যাত্ৰা ভুলিল তার।
নয়
তারে পরে তুমি উকি মারিয়াছ বাতায়ন-পথে সখী,
চোখা চোখা নয়, চোখে চোখে পরিচয়।
তুমি চেয়ে থাক, আমি চেয়ে থাকি মাঝখানে নদী বহে—
নদী? সে তো সখী, কূলভাঙা নদী নহে।
৫৬
র জ হংস
খাচায় বদ্ধ চখা এ-পারের ব্যাকুল চখীর চোখে
শােনে ‘এস এস’---অতি ক্ষীণ আহ্বান।
না এলেও চলে, জেগে রবে সেও পল অনুপল গণি',
আসে ভাল, নাহি উৎসাহ অধীরতা।
কৈশাের গেছে, যৌবন যায়, যৌবন কারে কহ,
সব ঠেলে ভেঙে দুৰ্ব্বার বেগে চলা।
দেহের পরশ দেহ নাহি চাহে, 'আছ’ এই অনুভূতি,
ভালবাস কি না তাও নাহি জানিলাম।
মুগ্ধ। হরিণী সাপের নয়নে হরিণ-নয়ন তুলি
চায়,—সেই চাওয়া প্রীতি-প্রদীপ্ত নহে।
ব্যাঘ্র কোথায় ? হুঙ্কার করি’ শিকার সে নাহি ধরে।
যদি সখী তুমি আপনার ভুলে এসে পড় কাছাকাছি,
খাচার দুয়ার ঠেলে ছুতে চাও তলস শার্পলেরে,
দেবতা তাহারে ক্ষমা করিবেন জেনে।।
তােমরা সবাই সত্য আমার অঙ্কের ইতিহাসে,
সবাই মিথ্যা ছায়াছবি-পরদায়—
অনাদি অসীম যাত্রা আমার, তার ইতিহাস নাই।
মরুপথে যেবা চলিতেছে সখী, মরীচিকা গুণে গুণে
প্রহর গণিয়া চলা কি তাহার সাজে ?
অধ আসে আর আঁধি সরে সরে যায়-
ধূ ধূ মরুভূমি পড়ে থাকে সীমাহীন।
তোমরা এসেছ, তােমরা গিয়াছ সরে,
একে একে সখী, সব ছায়া রােদ হবে,
সব আঁধি পিছে পথের মতন পিছনে রহিবে পড়ে।
৫৭
৮
द्री छ१मं
জননীর কোল হতে যে নেমেছে ভূয়ে,
প্রিয়ার আঁচিল বাঁধে তারে কত দিন!
চির-পথিকের অজানা যাত্রাপথে
তােমরা হে সখী ছায়াসুশীতল পাদপ হইতে পার,
আঁধার মাটিতে শিকড় গাড়িয়া আছ।
আমার জীবনে শুধু
তােমা সবাকার খণ্ড খণ্ড ছায়াময় ইতিহাস।
এর বেশী কিছু নহে,
আমি তােমাদের নহি-
চির-রৌদ্রের চির-আলােকের সঙ্গী পথিক আমি।
চেখভের ডার্লিং
অসম্ভবের করি না সাধনা, চাহি না নিত্যপ্রেম,
ততটুকু মােরে ভালবাস তুমি, যতটুকু থাকি কাছে,
যত দূরে যাই ততখানি যাও ভুলে।
জানি, বিদায়ের কালে
তােমার চোখের ছল-ছল-কর। জলের অন্তরালে
লুকাইয়া আছে, থাকিবে লুকায়ে, তুমি না জানিতে পার—
প্রেমের পীড়ন হইতে তােমার মুক্তির হাসিখানি ;
উঠিবে শিহরি ভাবিতেও সেই কথা,
সেই হাসি তবু জাগিবে সত্য হয়ে।
যুগে যুগে এই মাটির ধরণী সাধিয়াছে জনে জনে,
করিয়াছে পূজা লাখো মন্বন্তরে
৫৮
রাজ হং স লক্ষ মনুরে, মনু-সন্তান লাখাে লাখাে মানবেরে ; স্মৃতির বেদীতে অমর করিয়া পূজা করি বহুদিন বিস্মৃতিজলে শেষে ফেলিয়াছে টানি। চেখভের ডালিং- পূজিতে একেরে একের পূজাই ভেবেছে সত্য বলি, ভেবেছে তাহাই সত্য নিত্যকাল। এক চলে গেছে, অপরে আসিয়া লইয়াছে তার পূজা, একেরে ভুলিতে এক নিমেষেরও লাগেনি অধিক কাল, কারাে পূজা তার মাটির জীবনে হয়নি মিথ্যা কভু, কারো স্মৃতি তার হয়নি মনের ভার প্রেমের এ ইতিহাস। মাটির ধরার তুমিও দুলালী মেয়ে, তুমিও মাটির মেয়ে এই ধরণীর মাটির রক্ত করিয়া অতিক্রম পারাে না হইতে পাথর-কন্যা শিবানী হৈমবতী। জীবনে যে স্বামী, মৃত্যুতে তার ছাই-মাখা কঁাধে চড়ি বিষ্ণুচক্রে খণ্ডে খণ্ডে পড় নাই পীঠে পীঠে। এক হও নাই বহু বহুরে মিলায়ে এক করিতেছ দেহ-পাদপীঠতলে। আমি সে বহুর এক- দেহবেদী 'পরে চাপিয়া বসেছি নিত্যদেবতারূপে, গুরু গুরু বুকে বিসর্জনের শুনিতেছি জয়-ঢাক, নূতন দেবতা আসিতেছে পায়ে পায়ে, বিদায় আমার আসন্ন হ’ল দেবী
***
রা জ হংস
বিদায় আমার আসন্ন হ’ল, ক্ষোভ নাহি করি তবু,
জেনেছি সত্য মাটির জগতে ক্ষণিকের ভালবাস! ;
তােমরা মাটির মেয়ে
এক বরষার প্রণয়-প্লাবনে পলি-পড়া বালুতটে
ফোটে যে কুসুম, আর বরষায় ভেসে যায় স্রোতােমুখে ।
নূতন করিয়া পলিপড়া বালুচরে
ফোটে যে নূতন ফুল।
যে ফুল ফুটিবে তাহারি গন্ধে ভরিয়া উঠিছে দিক ;
স্রোতে-ভেসে-পড়া শুষ্ক ফুলের কঁপিতেছে প্রাণমন,
নূতন ফুলেতে পুরানাে দেবীর পূজা
পেতেছি আভাস তার।
আভাস পেতেছি সে ফুলও শুকায়ে ভাসিয়া কালের স্রোতে
জমিবে আসিয়া মৃত কুসুমের ভিড়ে
তারি অভিনন্দন।
তাই বলে তব প্রেম কি সত্য নয় ?
হয়, নিত্য নহে।
বিদায়-বেলার ছলছল জল ইঙ্গিতভরা চোখে
প্রেম-বেদনায় আসে নাই তব মৰ্ম্ম মথিত করি ?
তােমার ওষ্ঠপুটে
কঁপিয়া কঁপিয়া উঠিছে না তব গৃঢ় হৃদয়ের কথা ?
পরম সত্য তাহা।
পরম সত্য—আজি নিশিশেযে সে কথা যাইবে ভূলি,
আকাশের তারা মুছে যায় যথ। প্রভাতে অরুণোলয়ে --
মুছে যায় তবু এক ঠাই রয় স্থির।
এE
প্রেয়সী, তােমার ক্ষণিকের এই প্রণয়ের ধূপধুমে নিত্য হয়েছে প্রেম-দেবতার পূজা। নেশা তো ছুটিয়া যায়, তাই বলে নেশা যতখন থাকে নহেক মিথ্য। কিছু। বিদায়-বেলার আঁখিজল আর ছলছল ইঙ্গিত করুক রচনা প্রেম-বাঁধনের মুক্তির ইতিহাস, বিদায় হইলে শেষ। আজি ক্ষণকাল স্নান বিদায়ের ক্ষণে, তােমার আমার প্রেমবন্ধন উঠুক নিত্য হয়ে, সত্য হউক ক্ষণিকের মায়াজাল। আমি ভুল করে ভাবি- তােমার অভাবে দিনগুলি মাের থমকি’ দাড়াবে থামি, আঁধার হইবে দিনের রৌদ্র মম। তুমিও আবেগে বুকে এসে মাের, বল হাত দু’টি ধরি, আমি চলে গেলে চলিবে না তব দিন; শরীরে আমার বলিবে যত্ন নিতে, রাত জেগে জেগে কবিতা না যেন লিখি, বেশী ঝাল যেন লােভে পড়ে নাহি খাই- আরও সে অনেক কথা। বলিতে বলিতে চোখ দুটি তব আসিবে আয়ত হয়ে, উপচি পড়িবে জল, আমিও তােমারে বুকে টেনে নিয়ে দুটো বেশী খাব চুমা। তারপর তুমি আবছা দেখিবে, পঁাড়ায়ে নদীর পাড়ে, জলের তাড়নে একগাছি খড় দূরে চলে যায় ভেসে, রাজ হংস ভেসে চলে যায় পাগল ঢেউয়ের মুখে ; বাড়াইয়া গলা দেখিবে, দেখিবে ক্রমে জলের রেখায় খড়ের রেখাটি লীন, দেখিতে পাবে না আর। দেখিতে পাবে না সে কথাও ভুলে দেখিবে আরেক জনে নদীস্রোত হতে মুখ ফিরাইবে যবে ; আমারে ভাবিয়া তারে নিয়ে গিয়ে ঘরে পরম সােহগে জড়াবে বুকেতে তারে, চেখভের ডালিং। যুগে যুগে ধরা এই করিয়াছে, তােমরা মাটির মেয়ে, ধান্য সরিষা আলুর ফসল ফলিছে মাটির বুকে, ফলিছে আগাছা সুখে; মাটির রসেতে সমান সবুজ সবে । পাথর-কন্যা সতীরে লইয়া কঁাধে শিব শুধু ফেরে শ্মশানে শ্মশানে নাচিয়া তাথৈ থৈ, ধরা টলে তার টলমল পদভরে। তােমরা সহজ, নিজেদেরে নাহি চেন, চেখভের। শুধু তোমাদের চিনে গভীর করুণাভরে, লিখে রেখে যায় কালের বক্ষে তােমাদের ইতিকথা। বল বল প্রিয়ে, হাসিকান্নায় গাঁথা বিদায়ের কথা, কর লাখো অনুযােগ- শুনিতে এসেছি, শুনিব তা ভালবেসে ;
শুনিব, আমারে ভুলিবে না তুমি কাছ হতে দূরে গেলে ;
বুঝিব, ভুলিবে কালই।
তা বলিয়া বুকে টানিয়া লইয়া ললাটে খাব না চুমা ?
কান হতে তব সরায়ে সরায়ে এলােমেলাে চুলগুলি,
কপােল কেন না বুলাইব হাতখানি?
বুলাইব হাত, ভাবিব নির্বিকারে,
আরও কতদিন থাকিবে না জানি চিঠি লিখিবার পালা।
শ্মশান-বিলাসী শিব,
কঁধ হতে মৃত সতীরে ফেলিয়া দাও।
তমসা-জাহ্নবী
বহুরূপী আলােকের ক্লান্ত আমি রূপ দেখে দেখে,
নিরাশ্বাস অন্ধকারে দু’দণ্ড বসিব নিরুৎসাহে
তুমি বস কাছে মাের হাতে তব হাতখানি রেখে।
মনে কর সূৰ্য নাই, নাই শশী, নাই তারাদল ;
পথ ভুলি’ এ আঁধারে পশে না পথিক ধূমকেতু ;
খসে না জ্বলন্ত উল্কা; প্রান্তরের আলেয়ার মত
খেলে না বিদ্যুৎ-বিভা আকাশের প্রাঙ্গণ চিরিয়া।
আলােরশ্মিস্পর্শহীন অনন্ত আদিম অন্ধকারে
বসে আছি দুই জনে, এইটুকু শুধু জানিয়াছি—
আলােকের সম্ভাবনা ঝলসে যােজন কোটি দূরে।
সেথা হতে নিরন্তর রশ্মিমুখে আসিছে ছুটিয়া,
অন্ধ মূক অন্ধকারে আসিছে সরল রেখা টানি,
১৯.
পঁহুছিবে হেথা আসি হয় ত’ বা কোটি জন্মান্তরে,
পরশ করিবে স্নেহে আমাদের প্রস্তর-পঞ্জর ;
ভবিষ্য আলাের দূত গাহিবে মােদের জয়গান,
তমসা-তীর্থের কবি খ্যাত হবে আলােকের যুগে।
আজি সখী, আপনারে ভুলব না আশার আলােকে ;
প্রেমের উৎসব শেষ, আলাের উৎসাহ গেছে চলি’--
পৰ্বতের গুহাগর্ভে ধূমে বহ্নি নিৰ্বাপিত প্রায় ;
তার কথা থাক আজি। তুমি কি গাহিবে সখী গান,
অতি ক্ষীণ ব্যর্থতার চুপে চুপে কেঁদে-ফেরা সুর ?
একদা জাহ্নবীতীরে গেয়েছ যা বিষন্ন সন্ধ্যায় –
পদতলে অবিরাম কলভাষে গৈরিক প্রবাহ,
শিয়রে মেঘের স্তুপ নদীজলে ফেলে কালো ছায়া।
যেন আমি বসে আছি বাত্যাক্ষুব্ধ বারিধির কূলে
সুরের তরঙ্গাঘাতে যেন ভেসে চলে গেছি
দূরে,
অতলে ডুবিয়া গেছি, বাড়ায়ে গানের বাহু দু’টি
অনন্ত অসীম শূন্যে তুমি মােরে ধরেছ তুলিয়া ।
উত্ত
গানে তবে কাজ নাই, তুমি কি কহিবে সখী কথা-
যে কথা বলিয়াছিলে একদা প্রভাত-রৌদ্রকরে,
ঙ্গ পৰ্ব্বতচূড়ে, খরজলপ্রপাতের মুখে
চূর্ণ চূর্ণ জলধার। নীচে পড়ে ধোঁয়ার আবেশে,
-বলা-কথার তােড় বাষ্প হয়ে ভরে দুই চোখ,
গুড়া গুড়া সে কথার অর্থ আমি বুঝেছি সেদিন।
সে কথা আজিকে নহে; তােমার নীরব করাঙ্গুলি,
আমার আঙুল ছুঁয়ে রক্তস্রোত চাপুক গােপনে।
৬৪
ना २२
আলােহীন, শব্দহীন, দিশাহীন, স্তব্ধ অন্ধকারে
বিশ্রাম লভিব মােরা; আলাে আর শব্দের আঘাত
সহিতে পারে না প্রাণ ; আলাে শব্দে লোভের সংঘাত
চোখে লাগে, বাজে কানে, শিহরিয়া চমকিয়া উঠি,
খ্যাতির লালসে মন তলে তলে কঁদে গুমরিয়া,
আলােক ঝলসি’ ওঠে প্রাণে প্রাণে হিংসার আকারে।
তার চেয়ে এস সখী, ছিদ্রহীন অন্ধকারে বসি’
অতীতের রৌদ্রে তােলা ছবি যত দেখি অনুভবে।
কুলুকুলু মহানন্দা, দুই তীরে শান্ত জনপদ ;
এপারে দাড়ায়ে এক ক্ষুদ্র শিশু গণে জল-ঢেউ—
এক, দুই, তিন, চারি ; কাঠের গােলার আশেপাশে
সঙ্গীরা প্রসন্ন মনে খেলিতেছে লুকাচুরি খেলা।
আকাশ আঁধার করি’ ওঠে মেঘ, নামে জলধারা,
জলশরবিদ্ধ হয়ে পরপার ঝাপসা দেখায়।
নার্থী এসেছে যারা তার কলকোলাহল তুলি
আছাড়ি’ সাতারি’ খেলে বরষার নবীন উল্লাসে।
নদীপাড়ে শিশুমনে সহসা সে অপূৰ্ব্ব প্রকাশ
টাপুর টুপুর বৃষ্টি কোন্ সে নদীতে এল বান ;
গান তার ভেসে এল, শিহরিল বিল বালক।
••
সে গানের রেশ টানি এল শীর্ণ অজয়ের তীরে ;
বালি-কাকরের পথ, লালমাটি ছােট গ্রামখানি,
পূৰ্বপুরুষের ভিটা; গিরিনদী গৈরিক বন্যায়
সহসা ফুলিয়া ওঠে, কৈশােরে ছাপিয়া যায় কূল !
৬৫
৫
और ख ९में
এলােমেলাে কত গান, জয়দেব, রবীন্দ্রনাথের,
অদূরে নানুর-গ্রামে রচে পদ বড়ু চণ্ডীদাস
মেদূর মেঘের মায়া আবার ঘনায়ে এল নভে।
গুচ্ছে গুচ্ছে থরে থরে নদীচরে ফোটে কাশফুল,
শীর্ণ হ’ল জলধারা, বালুরাশি নিশ্চিন্তে ঘুমায়।
;
বালুচরে পদচিহ্ন মুছে গেছে ; সে কিশোর কবি
দেখা দিল, মুড়ি ছুয়ে যেথা ধীরে বহে গন্ধেশ্বরী,
পৌষসংক্রান্তির উষা, মেশে আসি দ্বারকা-ঈশ্বরে।
দূরে আকাশের গায় কালােছায়া বৃদ্ধ শুশুনিয়া—
কিশাের কবির মনে ঘনাইল পাহাড়ের মায়া,
শাল ও পলাশবন, ধু ধূ মাঠ দিগন্তপ্রসারী।
নেশা না কাটিতে তার, বসন্তের সায়াহ্নে একদা
বিশাল পদ্মার তীরে এল যেথা কঁপে ঝাউবন ;
সুপক্ক কুলের লােভে গুটি গুটি খরগােস দল
চমকিয়া পদশব্দে ছােটে দীর্ঘ কান খাড়া করি।
সেখানে পাড়ের গায়ে, ক্ষণে ধ্বসে-পড়া খাড়া পাড়-
গর্তে গর্ভে উকি মারে লাল-ঠোট পাখীদের ছানা;
ইলিশ ধরার নৌকা সার বাঁধি চলে জাল ফেলে,
বহুদূরগামী যত ষ্টীমারের যায় ধোঁয়া ছেড়ে,
পাশে পাশে উড়ে চলে জলচর পাখী সারি সারি ।
মাঝ গাঙে বালুচর, দুই পাশে কলকল জল ;
তার ছন্দ সেইদিন শুনেছিল যে মুগ্ধ বালক,
वा ३२म
পদ্মার আবর্তে পড়ি সেই জন হ’ল দিশাহারা
বহু বৎসরের পরে, মেঘনা করিয়া অতিক্রম
কালাে আর রাঙা জল যেথা কষ্টে এক হয়ে মেশে।
মিলালাে পদ্মার ছায়া, স্বচ্ছ জল চপল কাঞ্চন,
কিশােরীর বেণী যেন, হাঁটুজল শহরের ধারে ;
ভুলে-যাওয়া কবিতার অকস্মাৎ আবৃত্তির মত
গান গেয়ে ওঠে প্রাণ, কৈশাের যৌবনে আসি মেলে ;
রেললাইনের সাঁকো, পােড়ো বাড়ি আমের বাগান,
নির্জন সন্ধ্যায় যেথা মেঘে মেঘে রঙের বিলাস,
গানে গানে উন্মাদনা ; স্নান করি’ শান্ত নদীজলে
দেবতা-মন্দিরে যেন দেখা দিল তরুণ পূজারী।
;
সে পূজা হয়নি শেষ, মলিনা এ ভাগীরথী তীরে
যৌবনের যত বাঞ্ছা, যত ক্লান্তি, রাখি যত গ্লানি ;
শুচিস্নান করি’ আজো পূজা সারি’ যাচিনু প্রসাদ।
কালাে কলঙ্কের স্পর্শে জেগে ওঠে আবর্ত পঙ্কিল,
কল ও মিলের ধোঁয়া, জেটি-নৌকাষ্টমার বন্ধন,
এরই মাঝে কুলুকুলু কলকল বহে জলধারা।
সাবধানী মানুষের হাতে-রচা ফুলের বাগান
বয়া ভাসে সারি সারি আলো তাতে জ্বলে আর নেবে।
সহজ গানের ধারা বাধা পায় তবু গান জাগে,
মিনারের চূড়ে চূড়ে তবু সুর ভাসিয়া বেড়ায়।
সে সুরের আধখানা তােমারে শুনায়েছিনু সখী,
পঙ্কিল আবর্তে যেথা জাহ্নবীর বিষদুষ্ট জল
৬৭
রা জ ইং স
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে। শুনেছিনু সে জাহ্নবীতীরে
আধখানি গান তব, সে অর্ধেক আজি অন্ধকারে
উঠুক সম্পূর্ণ হয়ে। কৃষ্ণধার তমসার তীরে
নীরবে বসিয়া দেহে একমনে করি অনুভব
যেন মােরা চলে গেছি, পার হয়ে লক্ষ জন্মান্তর ;
সেথা হতে শুনিতেছি, সাঙ্গ যত অসম্পূর্ণ গান—
পূর্ণ অসম্পূর্ণ প্রেম ; আলােরে আড়াল করি’ দিয়া
আড়াল করিয়া দিমু জীবনের আশা ও আশ্বাস।
••
হে সখী, মােদের নয় আলােক-উজ্জ্বল ভাগীরথী
দুজনে বসিয়া আছি, বহে ধীরে তমসা-জাহ্নবী-
আবৰ্ত্ত রচিছে কি না আঁখি মেলি’ দেখিতে না পাই,
অনুভব করি শুধু অবিরাম চলে জলধারা—
সম্মুখ পিছন নাই, উৰ্দ্ধ অধঃ না হয় ঠাহর,
আলাে হবে একদিন এ আঁধার এইটুকু জানি,
আর জানি, মাের। দোহে বাঁচিয়া রব না ততদিন।
মােদের অগীত গান, না-বলা মােদের কথাগুলি,
তমসা-জাহ্নবী তীরে চিরদিন বেড়াবে ভাসিয়া,
অন্ধকার কভু আসি উদিবে না আলােকের তীরে।
৬৮
অরণ্য-প্রান্ত
No text on this page.
বিষামৃত
মনােহরপুর রাজবাড়ী, তার অন্দরে এক ঘরে
মেজোরাণী কঁদে পালঙ্কে একা শুয়ে,
রাত্রি হয়নি বেশী।
মেজোরাণী—তার বিভাবতী দেবী নাম।
মাদুলি তাবিজ ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে সন্ন্যাসী অবধূত,
পীরের দরগা, হকিম বৈদ্য সবে—
রাণীর বয়স মাত্র বাইশ হবে।
সাতটি বছর কামনা করেছে, কামনা সে অপরূপ,
কোল পেতে দিয়ে চেয়েছে যাহারে, দু’টি বাহু প্রসারিয়া,
শয়নে স্বপনে করেছে কামনা, কামনা কামের মাঝে ;
ঠাকুর-দেবতা পূজার মানত, যত ব্ৰত উপবাস
একান্ত মনে করেছে যাহার লাগি,
সে আসি’ আজো না পেীছিল তার পেটে।
খর দু’পহরে একেলা শয়ন-ঘরে
টিপিয়া টিপিয়া দেখেছে স্তনের বোঁটা,
যে আসিবে, তার আহার আসিল কি না।
স্বামীরে বলেছে লজ্জার মাথা খেয়ে,
‘সাপের স্বপন দেখেছি আজিকে ভােরে,-
খােকন এবার কোলে মাের এল বলে।
-চুপ করে কেন, বল সে আসিবে কিনা ?
একটি, দুইটি, সাতটি বছর কঁাদে রাণী বিভাবতী,
মনােহরপুর রাজবাড়ী তার অন্দরে এক ঘরে
কঁদে মেজোরাণী পালঙ্কে একা শুয়ে।
৭১
রা জ ইং স
রামবাগানের পারুল কাদিছে একা,
আঁতুড় তাঁহার হয়নি এখনো শেষ,
কোলে ফুটফুটে খােকা।
কার থােক। তা’ ত’ জানে না সে হতভাগী——
বুক-চেরা ধন তার,
আর যারই হােক কঁদিছে পারুলবালা,
অবােধ সে শিশু কেন এল তার কোলে
কেন এল অকারণে।
একে একে সব প্রতিবেশী যায় দেখে,
কেহ খুশী, কেহ হিংসায় জ্বলে’ মরে,
কেহ বলে, এত আছে বড়ঘর, মরতে এখানে কেন ?
ঠিকা-ঝি হরির মাসী
বকুব করে বকে বকে হ’ল সারা-
‘বালাই এসেছে, বালাই বিদেয় কর।
রামবাগানের মাঠের বাড়ীতে নােংরা আঁতুড়-ঘরে
পারুল কঁদিছে, খােকা এল তার কোলে
কঁদিছে পারুলবালা।
মনােহরপুর রাজবাড়ী, তার উঠানে দাওয়ায় বসি
জটল্লা করে দাসী পাঁচজনে মিলে,
গিন্নিরাণী সে আভাস দিলেন কবে--
বাঁজা মেজোরাণী ; বংশ রাখিতে আসিবে নূতন বধূ,
হতেছে পাত্রী খোঁজা।
খাস-ঝি তরীর মুখে
কঠিন খবর পঁহুছিয়া গেছে মেজোবউরাণী-কানে।
;
৭২
শীতের দ্বিপ্রহরে
বাতায়ন-পথে চাহিয়া দূরের পানে
দাড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেখিতেছে মেজোরাণী—
সুমুখে বস্তি, তারই এক ঘরে ভিজা আঙিনায় বসি
হারু মিস্ত্রীর একপাল ছেলেপিলে—
ভাঙা সাকিতে হাতা-কয় ভাত, তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি!
দেবী ষষ্ঠীরে স্মরি’
অবিচারে তার শীতের দুপুরে চোখ ভরে এল জলে।
–
০
রামবাগানের মানা-বাড়ীউলি আঁরেল সে যে অতি,
গােলাপী ভাড়াটে তার ;
শীতের দুপুরে এসে গেছে ওস্তাদ,
পান খায়, আর পিক ফেলে, আর গান সাধে গলা ছেড়ে,
গােলাপী সে গরবিনী।
তারি মাঝখানে আসে যায় বাবু কত,
আসে, বসে, আর ফিরে যায় তাড়া খেয়ে
কাচুমাচু ওস্তাদ।
বলে, ‘বিবিজান না হয় আজিকে থাক।
গােলাপী সে হাসে, হাসে আর বলে সুমুখে বাড়ায়ে হাত,
‘ও ঘরের ঐ পারুলের কচি ছেলে
সন্ধ্যা না হতে কেবল চেঁচায়, এমন কঁাদুনে ছেলে--
নােটিস দিয়েছে মানা-বাড়ীউলি তারে,
ভাড়াও তাহার বাকী পড়ে গেছে তিন-চার মাস হবে।
আজকাল তার বাবুরা কেহ না আসে।
দুপুরে ঘুমায় সেটা
এই ফঁাকে সেই গানখানা নেব তুলে।
১০
রা জ ইং স
মনােহরপুর রাজবাড়ী,—সেথা মেজোরাণী আজ নাই ;
গিয়াছে বাপের বাড়ী।
এই ফাল্গুনে
আসিবে
নূতন বধূ,
দুৰ্বলা নারী, নূতন বন্ধুরে
লইবে বরণ করি’
বুকে নাই তার ততটুকু উদারতা।
বাপের বাড়ীর ভাত
আছে গিলিবার, কষ্টে তাহাই গেলে,
মা-মরা দাদার মেয়ে--
তারে বুকে নিয়ে দীর্ঘনিশাসে সকাল-সন্ধ্যা কাটে।
রামবাগানের মাঠে
সন্ধ্যার মুখে মানুষের সে কি ভীড়।
মােটর হইতে কেহ নামে, কেহ মুখ ঢাকে আলােয়ানে ;
দালালেরা দেখে পানের দোকানে বসি’
‘পারুলবিবি ? সে হবে না, হবে না বাবু,
আসিতে হইবে রাত বারােটার পরে
লাগিবে বিশঠে। টাকা।
গােলাপী ক্ষুন্ন মনে
বয়া-তবলার সাথে সাথে তার মিলাইতে চাহে গলা,
খনে খনে তাল কাটে।
সুমুখেতে
ঠিক পারুলবালার ঘরে
ঠুংরীর সুর বাতাসে বিকল করে—
গােলাপীর বাবু তাই শােনে কান পেতে।
পারুলের ছেলে হারু মিস্ত্রীর ঘরে
ভাঙা সাকিতে ভাত খায় খুটে খুটে।
৭৪
হুইল
নিঝুম শীতের রাত্রি জড়িমা-মাখা ;
কুয়াশার ভারে প্রহর হয়েছে ভারী,
গাঢ় হইয়াছে তম,
লেপ-ঢাকা ধরা মূৰ্ছা-বিবশ যেন।
;
মশারা অলস, সার দিয়া বসিয়াছে
ধনীর দুয়ারে দীন ভিখারীর মত
মশারির চারি পাশে
টেবিলের ঘড়ি টিকটিক করি’ শীতের ব্যঙ্গ করে।
ঘরের কোণেতে মিটিমিটি জ্বলে আলো।
পথ-পুলিসের ক্লান্ত চোখের পাতা
দুইটা বাজিয়া গেছে।
বন্ধ হয়েছে পথে লােক-চলাচল,
ফাকা গড়পাড় রােড ;
একটি কি দু’টি মােটর ছুটেছে এলােমেলাে বাঁকা চালে
দূরে বড় রাস্তায় ;
হুস্ করে হর্ণ একটানা বেজে কোথায় মিলায়ে যায়।
ফীটন গাড়ীর ঘােড়ার পায়ের ধ্বনি
পীচঢালা পথে খটখট্ করি’ বাড়ীর দেয়ালে ঠেকে,
কানে এসে বাজে মধ্যযুগের সুর--
যেন রাজকন্যারে
৭৫
রাজ হং স হরণ করিয়া বিদেশী দস্যু অশ্ববা টানি’ পিছনে ফিরিয়া দেখিছে গর্বভরে। - মৃত কফিনের মত টুনটুন করি’ কচিৎ কখনো রিক্সা চলিয়া যায় ; মাতাল শুইয়া তাতে দাম দিয়া কেনা নেশার ভারেতে ভারী দামী মাথাখানি ঝুলিয়া কখন পড়িয়াছে একধারে। ফেলে-আসা প্রিয়া অঘোরে ঘুমায় ঘরে, ফিরিয়া আসিবে প্রিয়তম বলি’ জাগিছে যে আর জন- তারো কোলে নাই মাথা। মশারির তলে লেপে ঢাকা দেহ নেহাৎ নিরুদ্বেগে স্বামী-স্ত্রী শুয়ে পাশাপাশি দুইজন। রুদ্ধ-দুয়ার বাতায়ন সব ক’টি ; নিদ্রিত নিঃশ্বাসে শীতল কক্ষ গরম হয়েছে কিছু তিনটা বাজিল রাত। শয্যায় জেগে বসিল সহসা নারী, ঘুম-ভাঙা চোখে কালো শঙ্কার ছায়া। চাহিয়া স্বামীর পানে শিহরিয়া ভাবে, হঠাৎ একি এ হ’ল, কেন করে ভয় ভয়। আতঙ্কে দুই চক্ষু বুজিয়া আসে, রুদ্ধ দুয়ার বাতায়ন পানে চায়। १५
রা জ ই ং স
জানালা বন্ধ, দ্বারে অর্গল আঁটা,
স্বামীর বক্ষে গাঢ় সুপ্তির ওঠে পড়ে নিঃশ্বাস।
কেন তবে হেন ভুল।
মনে হ’ল তার এখনি সে দেখিয়াছে-
, না, সে ভয়ঙ্কর !
ভাবিতেও ভয় হয় !
মনের বিকার—সে ভীষণে দিতে কি
রমণী নয়ন মুদি
মাথা ঢাকি' লেপে শুইল স্বামীর পাশে ;
দুই বাহু দিয়া বক্ষে তাহারে টানি
করে অনুভব ধুধু করা জীবনের স্পন্দন।
আবার আবার ওই
হিম আকাশের ছিড়ি’ বায়ুমণ্ডল,
ছিড়ি’ রাত্রির কুয়াশা-জড়িত তম
দূরে কোথা যেন করুণ তীব্রতায়
কেঁপে কেঁপে ওঠে, কঁপিয়া মিলায় আর্ত বিলাপধ্বনি,
কঁপে মানুষের মন।
ঘুম-ভাঙা নারী আবার কপিল ডরে,
আবার উঠিয়া বসে’ দুই হাতে চাপিয়া ঢাকিয়া কান
বলে, ভগবান, তুমিই রক্ষা কর ।
দুই চোখে তার কান্নার বান ডাকে
দৃষ্টি যতই ঝাপসা চোখের জলে
তত বেড়ে যায় মনের সে বিভীষিকা।
৭৭
ब्राम
বেশী কিছু নয়, শিয়ালদহতে শান্টিং করে ট্রেন,
শান্টিং করে আর দেয় হুইল
শান্ত স্তব্ধ শীতরজনীর মুখর উপদ্রব।
মুখর তবুও রজনীর নীরবতা
ভাঙিয়া মুহুর্মুহু,
অন্ধকারেরে চিরিয়া চিরিয়া অধিক প্রগাঢ় করে।
নিদ্রার ঘােরে শুনি এই হুইল
রমণী জাগিয়া বসে,
রমণী পেয়েছে ভয়।
ভয়েতে কঁপিয়া স্বামীর পরশ খোঁজে
বাতাস-কঁপানাে তীক্ষ্ণ তীব্র সুর
মনের তন্ত্রী সহসা ছিড়েছে তার,
বি ধিয়াছে অন্তর।
হুইল শুধু হুইল্লধ্বনি নহে;
শীতরজনীর শীতল অন্ধকারে
বন্ধ জানালাদ্বার।
মনে হয় তার, কেন জানি মনে হয়,
দূরে কোথা কারা অতিপরিচিত প্রিয় প্রিয়জন ছাড়ি’
যাত্ৰা করিছে অসীম অজানা পথে,
আসিবে না ফিরে আর।
হুইল্লধ্বনি যেন দৈত্যের বাহু,
যেন মৃত্যুর কালাে সে করল ছায়া—
ছিড়িয়া লইবে প্রিয় হতে প্রিয়জনে।
।
৭৮
দ্রুত-কম্পিত তীক্ষধ্বনির মাঝে
লক্ষ যুগের বিরহ-বেদনা জমাট বাঁধিয়া আছে,
সে ঘন-বেদনা তরল হইয়া শূন্যে তুলিয়া ঢেউ
দূর হতে ক্রমে ছড়ায় দূরান্তরে।
তীক্ষ্ণ সূচের মত
অস্থি-মাংস ভেদ করি’ ক্ৰমে পশে অন্তর মাঝে ;
রূঢ় মরণের মূক বিচ্ছেদ সম
প্রিয় ও প্রিয়ের মাঝে রচে ব্যবধান।
যেমনি কর্ণে পশিয়াছে এই সুর,
পাশে শুয়ে স্বামী, মনে হ’ল পাশে নাই—
যেন কোথা দূরে যুগ-যুগান্ত পারে
ওঠে পড়ে তার বক্ষের নিঃশ্বাস ।
ধরা নাহি যায়, ছোঁয়া নাহি যায় তারে,
ব্যগ্র ব্যাকুল বাহু ফিরে আসে শূন্যে আহত হয়ে,
চোখ ভরে আসে জলে।
মনে হল যেন গুমরি’ গুমরি’ কঁাদে—
মাটির আঁধারে লক্ষ যুগের লক্ষ ব্যথিত হিয়া।
প্রিয়হারা নারী ধূলায় লুটায়ে কঁদে,
সন্তানহারা অঞ-অন্ধ মাতা ;
হাতে-গড়া ছেলে অকালে মরেছে, হতভাগা পিতা কঁদে,
জলহীন চোখ, মূক ক্রন্দনে কঁাদে ;
নীলাকাশ কালাে ব্যথিত দীর্ঘশ্বাসে।
সব মিলে সেই জমানাে কান্না মাটির গর্ভ ত্যজি’-
আঁধার শূন্যে ধরে হুইরূপ ;
৭৯
রাজ ইং স
সিথির সিদুর লেপে মুছে যায় সতী রমণীর শিরে,
এয়ােতর নােয়া ভেঙে হয় খান খান।
বৎসর গত, তেমনই শীতের রাতি,
রমণী জাগিয়া বসিয়া তাহার নিরালা শয্যা’পরে-
তিনটা বাজিল রাত।
হাতে নােয়া আর সিথিতে সিদুর নাই।
শিয়ালদহেতে শান্টিং করা ট্রেন
ঘন দেয় হুইল।
হুইল নয়, যেন মৃদু ইঙ্গিত ;
দূরে কোথা প্রিয় প্রতীক্ষা করে বনের আড়ালে একা
অভিসারিকারে হুইলে দিল ডাক।
নারী জুড়ি’ দুই কর
প্রিয়েরে অথবা দেবতারে তার শান্ত প্রণাম কবে ;
মুখে অস্ফুট বলে—
আর দেরী নয়, আমি যাব, আমি যাব,
পেয়েছি শুনিতে হে প্রিয়, তােমার ডাক।
শান্ত রমণী আবার শয়ন করে,
মধুর ঘুমেতে রজনী প্রভাত হয়।
৮০
সরস্বতী
খুজিয়া পেনু হারানাে আপনারে।
কবে কখন করেছিলাম যাত্রা আমার সুরু
ভিন্ গাঁয়েতে পেরিয়ে নদীবন,
বাঁধানাে কভু কখনাে মেঠোপথ,
কখনাে চর, কখনো ডাঙা, কখনো জলাভূমি।
মায়ের কোলে রূপকথাতে শোনা—
তেপান্তরের মাঠের মাঝে দেউল একখানি ;
দেউল, তবু পদ্মবনের মাঝে
হংসারূঢ়া আমার সরস্বতী
বাজান একা হাতের বীণাটিরে।
মায়ের কোল কখন কবে ছেড়ে
নেমেছিলাম কালাে কঠিন ভুয়ে ;
উষর ডাঙা, অলস বালুনদী,
একটি দুটি কাটাখেজুর, দীর্ঘদেহ তাল,
গহন বন, খরস্রোতা নদী,
কঁাকর দিয়ে সাজানো রাজপথ ;
বাউরিপাড়া-মুর্গি-ছাগল-হাঁস,
কুমাের বাড়ীর আঙিনাতে মাচায় ঝোলে লাউ,
চপল লােকালয় ;
সুমুখে আর পিছনে দেখি যাত্রী চলে নানা।
পথের জনতায়
হারিয়ে ফেলে কখনাে আপনারে
৮১
১১
রাজ হংস
আপন মনে চলিয়া এনু সারাটা পথ ধরি’-
কলহ-কোলাহলে
কখনাে মনে জমেছে বিষ, কখনাে ধূলিজালে
হয়েছে কালো আমার দশদিশি।
বিপথপথে অনেক ঘুরে ঘুরে
অনেক বাট, অনেক ঘাট দিয়ে
পেরিয়ে কত শহর লােকালয়
হাজার লক্ষ তেপান্তরের মাঠ
কোথাও নাই রূপকথাতে শােনা
হংসারূঢ়া আমার সরস্বতী।
খুজিতে তারে দিগ্বিদিকে চলিছে ছুটাছুটি,
বাণীপূজার ছলে
পৃথিবী জুড়ে গায়ের হাটে হাটে
বেচাকেনার বসেছে জোর মেলা।
সাজিয়ে তুলে’ নকল সরস্বতী
কমলা-কুপা মাগিতে সবে ফিকির খোঁজে নানা।
ক্লান্তদেহে ফিরিনু আমি দীর্ঘপথ ধরি,
শান্তমনে বসি এসে ঘরের বাতায়নে,
ঘুমায়ে পড়িলাম।
জাগিয়া আজ খুজিয়া পেনু হারানো আপনারে ;
আমারই মন জুড়ে
বসিয়া আছে আমার সরস্বতী।
৮২,
আকাশ-সাগর
No text on this page.
অবশেষে দেবী, তােমারই চরণতলে
শ্রদ্ধা-প্রেমের অর্ঘ্য আনিনু বহি’;
বিপথে ঘুরিয়া তােমাতে আমার সমাপ্ত পথচলা।
জননী-জঠরে আমার অতীত, নমােনমােনমঃ—নমি আমি জননীরে,
নমােনমােনমঃ, তােমার গর্ভে আমার ভবিষ্যৎ।
দাড়ায়েছি করজোড়ে,
বুঝিতেছি, কেন শিবশঙ্কর বক্ষ পাতিয়া বন্দিল শিবানীরে।
নীলকণ্ঠের বিষপান করি’ তুমি দেবী, তুমি কালী সে ভয়ঙ্করী,
নমামি দিগম্বরী,
মহাসাগরের আবরণ শুধু অসীম আকাশ আছে।
ভুল করে দেবী সাগর-স্বপ্ন দেখিয়াছি গােস্পদে,
সাগর দেখেছি কূপ বাপী সরােবরে ;
নিঝরিণীর কুলুকুলু জলে কখনাে দেখেছি ফেলিয়াছে ক্ষীণ ছায়া।
অতি লঘু মেঘ, মেঘ সে চপল অতি।
আমার আকাশ ঢাকিয়া গিয়াছে অকারণ কালো মেঘে,
আকাশে সাগরে ঘটিয়াছে ব্যবধান।
ব্যবধান আজ ঘুচিয়াছে দেবী, আমি আসিয়াছি সম্রমে ভয়ে ভয়ে,
দাড়ায়েছি করজোড়ে
ভবিষ্যতের তমসাতীর্থে ভ্রান্ত পথিকে দেবী,
তুমি লয়ে চল অসহায় হাত ধরি;
অনাগত সেই তিমিরে মিশাও অতীত অন্ধকার ।
৫
রা জ হংস
বর্তমানের বিজলী-ঝলক মাঝে
ত্রাসে কেঁপে উঠি তুমি আর আমি কত বার বার দেবী,
ভুল করিয়াছি জড়াতে পরস্পরে ;
বহুভ্রান্তিতে উঠিয়াছে হলাহল—
সেই হলাহল একেলা করেছি পান।
আজ বেলাশেষে বিষজৰ্জর আসিয়াছি আমি তব মন্দিরদ্বারে,
বর্তমানের ঘৃতদীপালোকে হে দেবী, আমার হাতখানি তুমি ধর।
;
ভবিষ্যতের দীপ জ্বালি’ দিয়া তুমি আর আমি নিঃশেষে যাব মরি’,
পুড়ে ছাই হবে হতাশ বৰ্তমান ;
অতীতে হইবে লীন।
সেই অতীতের আঁধারগর্ভ হতে
অন্ধনয়ন মেলিয়া দেখিব ভবিষ্যতের তমসাসিন্ধুকূলে
সারি সারি সারি জ্বলিছে বাসনাদীপ,
চলে আমাদের পূজারতি যেন মহাকাল-মন্দিরে।
হে দেবী, যে পথে নামিয়া এসেছি হিমালয়-চূড়া হতে
উপলমুখর নিঝর-কূলে-কূলে,
সেইপথ কবে হারায়ে গিয়াছে অরণ্যপ্রান্তরে।
তােমাতে আমাতে অপরিচয়ের দেখা হ’ল বার বার,
বার বার ছাড়াছাড়ি।
বেলাশেষে আজ ছােটগ্রামখানি, তােমারে পড়িল মনে।
অস্তরবির রঙ ধরিয়াছে
দূর
বনানীর শিরে,
একা তালগাছ দাড়াইয়া আছে সীমাহীন প্রান্তরে।
ঘট কঁাখে তুমি চলিয়াছ একা সরােবরে বাঁধাঘাটে,
-
সীমন্তে সিন্দুর
চিতার আগুন সন্ধ্যা-অন্ধকারে।
রৌদ্র-পীড়িত দিবস আমার, তপ্তপথের ধূলিধূসরিত জ্বালা,
সবােবর-নীরে যেন সুশীতল হ’ল ;
তােমারে প্রণাম করি’
দেবতারে মাের বন্দনা করিলাম।
ম;
সন্ধ্যা নামিল, স্নান শেষ কর দেবী,
তুলসীমঞ্চে জ্বলিতে হইবে দীপ--
আমি রব পিছে পিছে,
করজোড়ে শুধু রহিব দাড়ায়ে উঠানের একধারে ।
প্রণাম সারিয়া উঠিবে যখন তুমি,
দেখিতে পাইবে আমার আকাশে সারি সারি দীপ জ্বালা,
তোমার সাগরে যুগযুগ ধরি’ কঁপিবে তাহারি ছায়া।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.