Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shibajee Maharaj

Bandhopadyay,brajendranath · 2010/01/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Pat

শিবাজী মহারাজ
জেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
এম-সি-সরকার এণ্ড সন্স
কলিকাতা

প্রকাশক
সুধীরচন্দ্র সরকার
•২এ হারিসন রােড, কলিকাতা
মূল্য বারো ধান।
সর্ব-সংরক্ষিত
প্রিন্টার-সুরেশচন্দ্র মজুমদার
গৌরাঙ্গ প্রেস
১১ মিগ্লাপুর ট, কলিকাতা
এ, ৬ই জানুয়ারী

পরিচয়
শ্ৰীযদুনাথ সরকার, এম-এ, সি-আই-ই
সব জাতির মধ্যে এক-একজন বীর জন্মেন,
যাঁহার নাম সকলেই পূজা করে, যাহার কথা শত
শত বৎসর ধরিয়া ছেলে-বুড়াে শুনিতে চায়।
আমাদের এই মহাদেশের দক্ষিণ দিকে মহারাষ্ট্র
প্রদেশে শিবাজী এইরূপ একজন। তিনি আড়াই-শশা
বৎসর হইল মারা গিয়াছেন, কিন্তু এখনও তাহার
নাম করিলে মহারাষ্ট্র দেশে যেন নূতন প্রাণ আসে।
তাহার সঙ্গীরা তরবারি লইয়াই ব্যস্ত ছিল
বলিয়া তাহার জীবনের কথা বেশী কিছু লিখিয়া
যায় নাই। যাহা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করা যাইতে
পারে, তাহা আমার ইংরেজী পুস্তকে দিয়াছি।
এই বীর ও পুণ্যাত্মা শিবাজীর জীবনের চারটি
মনােরম ঘটনা লইয়া ছেলেদের জন্য অতি সুললিত
ভাষায় ব্রজেন্দ্রবাবু তাহার এই বইখানি লিখিয়াছেন।

ইহাতে যথাসম্ভব ইতিহাসের সত্য রক্ষা করা হইয়াছে।
গল্পগুলি সত্য হইলেও উপন্যাসের মত আশ্চর্য
আর ইহাতে শিবাজীর চরিত্র অতি সুন্দর পরিষ্কার
ভাবে দেখা যায়।

সুখ-দুঃখের দোসর
শ্ৰীযুক্ত নিশিকান্ত সেন
প্রিয়বরেষু

গ্রন্থকারের আর দুইধানি ছেলেমেয়েদের জন্য লেখা
মাদার গল্পের
বারাে আনা
রণ-৬ঙ্কা
কেল্লাফতে
আট আনা

১
বুননা ওল বাঘা তেঁতুল
কেমন জব্দ
২৮
সেয়ানে সেয়ানে
:::
৪০
জয়-পরাজয়
৬৯

শিল্পী শ্ৰযতীন্দ্রকুমার সেন কর্তৃক চিত্রিত

:
শিবাজী মহারাজ
। প্রাচীন চিত্র হইতে )

No text on this page.

শিবাজী মহারাজ
বুনাে ওল, বাঘা তেঁতুল
শিবলী
বিজীর বাপ শাহজী চাকরি করিতেন
বিজাপুরের রাজসরকারে। শিবাজী
থাকিতেন পুণা গ্রামে মা জীজাবাঈ-এর কাছে।
ভারি দুর্দান্ত ছটফটে ছেলে, তার উপর বুদ্ধি

শিবাজী মহারাজ
অতি তুখড় ; দল পাকাইয়া
দল পাকাইয়া সর্দারি করিতে
তার জোড়া মেলা ভার। সুবােধ ছেলের মতাে
লেখাপড়ায় মন দিয়া পণ্ডিত হইবার দিকে
তার মন
গেল না—হুটোপাটি মারামারিতে
পাকা হইয়া উঠিলেন। লুটপাট দাঙ্গা-হাঙ্গামা
হইল তার খেলাধূলার সামিল। এমনি করিয়া
যখন বয়স আর সাহস দুই বাড়িয়া উঠিল, তখন
আর সামান্য লুটতরাজে ঝোঁক রহিল না,
লড়াই করিয়া কেল্লা ফতে করিবার জন্য মাতিয়া
উঠিলেন। আজ করেন এ-কেল্লা দখল, কাল
করেন ও-কেল্লা ফতে, পরশু করেন অমুক
লড়াইওয়ালার সঙ্গে লড়াই। ক্রমে শিবাজীর
সাহস এতটা বাড়িয়া উঠিল যে, তাঁহার পিতা
শাহজী যে বিজাপুর-সরকারে কাজ করিতেন,
সেই রাজ্যেও দৌরাত্ম্য আরম্ভ করিয়া দিলেন।
আদিল শা তখন নামেমাত্র বিজাপুরের রাজা ;
আসলে কিন্তু
বড়ী-সাহেবাই রাজ
কাৰ্য চালাইতেন। তাঁর যেমন বুদ্ধি, তেমনি
বুড়াে রাণী

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল সাহস। তিনি শিবাজীর এই উৎপাত সহ্য করিবেন কেন? বিজাপুর এক সময়ে একটা রাজ্যের মতােই রাজ্য ছিল। ধন-বল বলল, জন-বল বলল, কিছুই তাহার অল্প ছিল না। লড়াইয়ে বিজাপুরের রাজারা কোনকালেই পেছ-পাও নয়। মােগল- বাদশাদের সঙ্গে তাে বিবাদ একরূপ লাগিয়াই আছে ; তবু বিবাদ -বিবাদই সই, হার মানিতে রাজি নয়। কিন্তু এখন খারাপ। অনেকদিন রাজত্ব করিলে রাজবংশের লোেকদের যে-সব দোষ ঘটে, তাহাদেরও তাহাই হইয়াছে। সবাই বিলাসী বাবু হইয়াছেন, আর ঘরােয়া বিবাদে ব্যস্ত আছেন । তারপর একদিকে মােগল-বাদশা, আর একদিকে মারাঠাদের রাজা শিবাজী, -বাঘ আর ভালুকের মতে, দুইদিকে ওৎ পাতিয়া বসিয়া ; শুধু বসিয়া নয়,—থাকিয়া থাকিয়া হানা দিতেও কসুর করিতেছেন না। লােকে বলে,—মরা হাতী লাখ টাকা, তা বড় মিথ্যা নয়। বিজাপুরের বুড়াে রাণী শিবাজীর

শিবাজী মহারাজ
অত্যাচার চুপ করিয়া বরদাস্ত করিতে পারিলেন
। শাহজীকে ডাকিয়া বলিলেন, তুমি
আমাদের খাইয়া-পরিয়া মানুষ, আর তােমারই
ছেলে আমাদের ওপর অত্যাচার করিবে, এ
কেমন কথা? বিহিত করাে, ছেলেকে সায়েস্তা
করিয়া দাও।
শাহজী ফঁপরে পড়িলেন। ছেলের উপর
তাহার কোন জোরই ছিল না ; বুড়া বয়সে
আবার বিবাহ করিয়া তিনি শিবাজী ও তার
মা জীজাবাঈ-এর কোনাে খোঁজখবর রাখিতেন
। মুখ কাচুমাচু করিয়া বলিলেন,--আমাকে
দোষ দেওয়া বৃথা। ভারি বেয়াড়া ছেলে শিবা,
সে আমার কোনই তােয়াক্কা রাখে না ; আমি
তাহাকে ঠাণ্ডা করিতে পারিব না। আপনি
যেমন করিয়া পারেন তাকে শাস্তি দিন, তাতে
আমার কিছুমাত্র আপত্তি নাই।
বড়ী-সাহেব তখন চটিয়া বলিলেন,-বেশ,
তবে তাই হবে। শেষকালে কিন্তু দোষ দিতে
৪

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
পারিবে না, তা বলিয়া রাখিলাম। দেখাে,
আমি তার কি দশা করি ! কে আছ আমার
সেনা-সামন্তের মধ্যে এমন লােক, যে শিবাজীকে
উচিত-মত সাজা দেয় ?—এই বলিয়া রাজসভার
মাঝে তিনি একটা পানের খিলি রাখিয়া দিলেন।
তখনকার দিনে যুদ্ধের জন্য এই রকম পান
রাখিয়া সেনাপতি ঠিক করা হইত। খিলি
দেওয়ার পর যে-বীর সকলকার আগে গিয়া
টপ, করিয়া পানটি তুলিয়া লইতেন, তাহাকেই
সেনাপতি করিয়া যুদ্ধে পাঠানো হইত।
একটা লম্বা-চওড়া লােক তখনই ছুটিয়া আসিয়া
রাণীর রাখা সেই পানের খিলিটা তুলিয়া লইল ;
নাম তার আফজল খ, ভারি লড়াইওয়ালা সে।
কিন্তু শিবাজীও লােক বড় সহজ নয়। তার
অনেক সৈন্য। আবার যে মারাঠা-দেশে তার
বাড়ী, সেখানে মাথা গলানাে বড় শক্ত ;-
পশ্চিম-ঘাট পর্বতের ঘাের বন-জঙ্গল
দেশটাকে বুকে করিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছে।
••
৫

শিবাজী মহারাজ ইহাকে ভেদ করিতে হইবে। তারপর মারাঠাদের মালে-সৈন্যেরা যমদূতের দোসর । তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে হইলে প্রাণ হাতে করিয়া যাইতে হয়। এই-সব জানিয়া-শুনিয়াও আফজল এতটুকু দমিলেন না, বুক ফুলাইয়া বলিলেন,--হু', ভারি তাে কাজ। তার মতো অনন লােক আমার ঢের ঢের দেখা আছে। তার সঙ্গে তাবার লড়াই কিসের ? যাব, আর চুলের মুঠি ধরিয়া তাকে বাঁধিয়া লইয়া আসিব, আমাকে ঘােড় হইতে নামিতেও হইবে না। আফজল যতই বড়াই করুন না কেন, রাণী তাহাতে ভুলিলেন না। তিনি নিজের অবস্থাও বােঝেন, আর শিবাজীকেও জানেন। মােগল- বাদশাদের সঙ্গে লড়াই করিয়া তার অনেক সৈন্য ক্ষয় হইয়াছে, আর সৈন্য ক্ষয় করবার ইচ্ছা তাহার নাই ; বলিলেন,—সামনা-সামনি যুদ্ধ না হইলেই ভাল। কলে-কৌশলে কাজ হাসিল করিতে হইবে। মুখে ভাব দেখাইয়া

বুনাে ওল, বাঘা তেঁতুল
বড় তীর্থ
শিবাজীকে ভুলাইবে; বলিবে যে, কোনাে ভয়
নাই, বিজাপুর-রাজ আদিল শা তাহার দোষ
লইবেন না। এস আমরা মিটমাটের একটা ব্যবস্থা
করি। এইরূপে হাত করিয়া, হয় তাকে খুন,
নয় কয়েদ করিয়া ঘরে ফিরিবে ।
আফজল ‘বহুৎ আচ্ছ।' বলিয়া সেলাম ঠুকিয়া
মস্ত একটা
হাতীতে চড়িলেন। দশ হাজার
ঘােড়সওয়ার সঙ্গে চলিল।
তুজাপুর মারাঠাদের সবচেয়ে
—এইখানে তাহাদের ভবানী-মন্দির । আফজল
সদলবলে এইখানে চড়াও হইয়া মন্দির ভাঙ্গিলেন,
আর পাথরে-গড়া ভবানী দেবীকে যায় পিষিয়া
ছাতু করিলেন। মারাঠারা রাগে গগ করিতে
লাগিল, কিন্তু কিছুই করিয়া উঠিতে পারিল না।
আফজল ভারি যােদ্ধা, ভারি দুরন্ত, আর ভারি ধূর্ত,
তার কাজে বাধা দেয়, এত বড় বুকের পাটা কার ?
কিন্তু আফজলের মনেও কি ভয় নাই ? যে
মারাঠা-সর্দার এক দেশ হইতে আর এক দেশে
৭

শিবাজী মহারাজ
আসিয়া কেল্লা দখল করে, তলােয়ারের দায়
বড় বড় বীরের মাথা উড়াইয়া দেয়, সে যে
দেশের মধ্যে দুশমন পাইলে এক হাত না।
লইয়া ছাড়িবে, ইহাও কি সম্ভব ?
কিন্তু
আফজল যখন দেখিলেন যে,
দেখিলেন যে, ভবানী-মন্দির
গুড়া হইলেও মারাঠারা উচ্চবাচ্য করিল না,
তখন তাহার সাহস খুব বাড়িয়া গেল ; ভাবিলেন,
ব্যাটারা নিশ্চয় ভয় খাইয়াছে।
আফজল এইবার ঠিক করিলেন, বাজের
মতাে হঠাৎ শিবাজীর আবাস—পুণার উপর
ভাঙ্গিয়া পড়িবেন; কিন্তু শুনিলেন, সেখান হইতে
শিবাজী দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রতাপগড়ে গিয়াছেন।
তখন তাহাকেও সেইদিকে ছুটিতে হইল ; পথে
যত ঠাকুর-দেবতার মন্দির চোখে পড়িল, সব
ভাঙ্গিয়া চুরমার করিলেন, বামুন-পণ্ডিতের টিকি
কাটিলেন।
তারপর সাহারার দশ ক্রোশ উত্তরে
বাই শহরে গিয়া ছাউনী করিলেন।
৮

গ;
বাজীর সৈন্যেরা ইহার আগে জায়গায়
জায়গায় লুটতরাজ করিয়াছে—ছােটখাট
লড়াই, এমন কি দু’চারটা কেল্লাও যে দখল
করিয়াছে, তা নয়। কিন্তু এবার বড়
ঠেকাঠেকি; তাদের সঙ্গে লড়িতে আসিতেছে—
বিজাপুরের পাক্কা লড়াইওয়ালা সেনাপতি আফজল
সঙ্গে তার দশ হাজার ঘােড়সওয়ার,
গরুর গাড়ীতে বড় বড় কামান, ঘােড়ার পিঠে
বারুদ, লড়াইয়ের আরও কত কি সরঞ্জাম।
আফজল বিজাপুর হইতে বাই—সারা পথটাই
লুটপাট করিতে করিতে আসিয়াছেন। শিবাজীর
মারাঠা-সেনারা
একটু ঘাবড়াইয়া গেল ;
তালি সৈন্যের গােলা-বারুদের মুখে দাঁড়াইয়া
লড়াই করা কি সহজ কথা? তাহারা শিবাজীকে
বলিল,“প্রভু, যুদ্ধে কাজ নাই—রফা করুন।
যুদ্ধ করিলে খালি প্রাণই যাইবে, আর কোনাে
ফল হইবে না।
এমন
৯

শিবাজী মহারাজ
শিবাজী এক মহাভাবনায় পড়িলেন। মিটমাট
তাে ইচ্ছা করিলেই করা যায়। কিন্তু তার
ফল কি ?লড়াইও করিতে হইবে না, কাজেই
লােজন খুনজখম হইবে না। কিন্তু যে নামের
জন্য, বড় হইবার জন্য, এতদিন ধরিয়া এত
চেষ্টাযত্ন, এত রক্তারক্তি কাটাকাটি করিলাম,
তা সবই বৃথা হইবে !—শিবাজীকে বিজাপুরের
গােলাম হইয়া থাকিতে হইবে। আর মিটমাট
করিলে দুশমন বিজাপুরের সঙ্গে কতদিন
ধরিয়া এই লড়াই চলিবে, কে বলিতে পারে ?
কিন্তু শিবাজী যে স্বাধীন, সেই স্বাধীনই থাকিবে,
—কেউ তাকে গােলাম বলিয়া, অধীন বলিয়া,
তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিতে পারিবে না।
সারারাত শুইয়া শুইয়া শিবাজী ভাবিতে
লাগিলেন, কোটা বাছিয়া লইব—গােলামী, না
লড়াই ?
—না গােলামী নয় কিছুতেই
যুদ্ধ ! পরদিন সকাল-বেলা লােকজনদের ডাকিয়া
বলিলেন,-ভাই-সব, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও;

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
ভাবিয়া দেখিলাম, কারও কাছে খাটো হইতে
পারিব না। মরি যদি সেও ভাল, তবু খাটো
হইতে পারিব না। বীরের কাছে মৃত্যু তাে
খেলা—তার জন্যে ভয় কি। এস আমরা বীরের
করিয়া মরি।
দলপতির কথায় মারাঠাদের গায়ের রক্ত যেন
টগবগ করিয়া ফুটিতে লাগিল, তারা সিংহের
মতাে গজ্জিয়া
উঠিল, -জয় মা ভবানী।—সে
গর্জনে পাহাড়-বন সঁপিয়া উঠিল।
মতাে যুদ্ধ
১১

এপি
দিকে আফজল যখন দেখলেন যে, শিবাজীর
নাগাল পাওয়া যাইতেছে না—পাশ কাটিয়া
এখান হইতে ওখানে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, তখন
ঘােষণা করিলেন, যে-লােক শিবাজীকে ধরিয়া
দিতে পারিবে, তাকে অনেক টাকা বখশিশ
দেওয়া হইবে। কিন্তু তাহাতে কোনাে ফল
হইল না। তখন আফজল আর
এক ফন্দী
করিলেন, তিনি তার দূত 'কৃষ্ণাজী ভাস্করকে
দিয়া শিবাজীকে খবর পাঠাইলেন,-তােমার
বাপ আমার অনেকদিনের দোস্ত, কাজেই তুমি
আমার ছেলের মতো। একবার এখানে আসিয়া
আমার সঙ্গে দেখা করিলে আমি ভারি
ভারি খুশী
আর যাতে তোমার ভাল হয়, তার
ব্যবস্থা করিব। আদিল শা’কে বলিয়া তােমাকে
কেঁাকন-রাজ্যে বসাইব। যে-সব 'কেল্ল। এখন
তােমার দখলে আছে, পরেও যাহাতে সেগুলি
তােমারই থাকে, তাহারও ব্যবস্থা করিয়া দিব।
হইব ;

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
হয়,
আবার আমাদের রাজসরকার হইতে যাহাতে
তুমি রাজ-সম্মান, আর অস্ত্রশস্ত্র পাও, তাও করিব।
তুমি যদি রাজ-দরবারে হাজির
থাকিতে চাও,
—ভালই, সেখানে তােমার আদর-যত্নের ত্রুটি
হইবে না; আর যদি তাহাতে অমত
ক্ষতি নাই ;—যাহাতে না গিয়াই কাজ হয়,
তাহাও আমি করিয়া দিব। শুধু একবার চোখের
দেখা দিয়া যাইবে, আর কিছুই তােমাকে
করিতে হইবে না।
আফজলের দূত কৃষ্ণাজী ভাস্কর প্রতাপগড়ে
শিবাজীর কাছে উপস্থিত। শিবাজী তাহাকে
দেখিয়া অবাক হইলেন। আফজল
আফজল তাহাকে
যে-সব কথা বলিয়া পাঠাইয়াছেন, তাহা শুনিয়া
তিনি আরও অবাক হইলেন। দেখা হইলে
আফজল বড়, খুশী হইবেন, কেঁাকন-রাজ্যের রাজা
করিয়া দিবেন—এ-সব কি ছলনার কথা নয় ?
বেণের কাছে ছুঁচ চুরি!—শিবাজীর মনে খটকা
লাগিল। রাত্রে নিরিবিলি কৃষ্ণাজীর সঙ্গে দেখা

শিবাজী মহারাজ
করিয়া বলিলেন,—দেখুন, আপনি আমার স্বজাতি
হিন্দু, তারপর বামুন, তারপর পুরুতবংশ, একটা
কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করিব, তার ঠিক ঠিক
জবাব আমাকে দিতে হইবে।—খা-সাহেবের
মনের ভাব কি? আমার সঙ্গে ভাব করা,
, আমাকে ভুলাইয়া ফাঁদে ফেলা ?
কৃষ্ণাজী আফজলের নিমক খান, তার দূত,
সব কথা খুলিয়া বলিতে পারেন না। তবে
আমতা-আমতা করিয়া যাহা বলিলেন, তাহাতে
আফজলের চালাকী তাহার কাছে চাপা রহিল
। কিন্তু তবু কথাটা আরও ভাল করিয়া
দরকার, ছাড়া খাঁর সঙ্গে কত
সৈন্যসামন্ত আছে,
আছে, তাহাও না জানিলে নয়।
আবার আফজল কৃষ্ণাজীকে দিয়া যে-সব কথা
বলিয়া পাঠাইয়াছেন, তাহারও জবাব দিতে
হইবে। শিবাজী তাই গােপীনাথ পন্থ, নামে
একটি বিশ্বাসী চতুর লােককে শিখাইয়া-পড়াইয়া
কৃষ্ণাজীর সঙ্গে পাঠাইয়া দিলেন।
১৪

বুনাে ওল, বাঘা তেঁতুল
গােপীনাথ খ-সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়া
বলিলেন,—আপনার কথামতো শিবাজী আপনার
সঙ্গে দেখা করিতে রাজি আছেন, তবে আপনাকে
দিব্য দিয়া বলিতে হইবে যে, দেখা করিতে
আসিলে আপনি তার কোন অনিষ্ট করিবেন না।
খ-সাহেব বলিলেন,—তােবা ! তােবা! অমন
কথা কি মনে করিতে আছে ? তার কোনাে
ভয় নাই। ভালাের জন্যই আমি তাকে ডাকিয়া
পাঠাইয়াছি।
গােপীনাথ তারপর আফজল খাঁর সেনাদের
সঙ্গে খুব ভাব করিয়া অনেক কথা জানিয়া
লইলেন, আরও যেসব কথা তাহারা বলিতে
চাহিল না, ঘুষ দিলে তাহাও তাহারা পটুপট
করিয়া বলিয়া ফেলিল। ইহাও বলিল যে, খার
মতলব ভাল নয়। সামনা-সামনি যুদ্ধ করিবারও
তার ইচ্ছা নাই। তিনি বুঝিতে পারিয়াছেন যে,
যুদ্ধ করিয়া শিবাজীর মত লােককে পাকড়াও
করা অসম্ভব। তাই তাকে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া

শিবাজী মহারাজ কাছে আনিবার চেষ্টা। আসিলেই অমনি খ- সাহেব কঁা করিয়া তাহার গলা টিপিয়া ধরিবেন। গােপীনাথ ফিরিয়া আসিয়া প্রভুর কাছে সব কথা খুলিয়া বলিলেন। শিবাজী রাগে দাত কড়মড় করিতে লাগিলেন, আর মনে মনে বলিলেন,-বটে তােমার পেটে এত শয়তানি যে আমারই কোটে আসিয়া, আমাকেই কঁদে ফেলিয়া, বুক ফুলাইয়া ঘরে ফিরিতে চাও? শিবাজীকে তুমি এখনও ভাল করিয়া চিনিতে পার নাই—এইবার চিনাইব। শিবাজী খার সঙ্গে দেখা করিতে রাজি হইলেন। প্রতাপগড় হইতে বাইসারা পথটাই বন- জঙ্গলে ভরা ; শিবাজীর হুকুমে তখন জঙ্গলের ভিতর দিয়া বন কাটিয়া একটা পথ করা হইল। আর খার লােকজনের যাতে কোনাে কষ্ট না হয়, তাই পথের পাশে পাশে জল ও খাবার রাখা হইল। আফজল প্রতাপগড়ের নীচে একটা গ্রামে আসিয়া ছাউনী করিলেন। ১৬ বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল ঠিক হইল, পরদিন প্রতাপগড়ের কেল্লার নীচে, একটা পাহাড়ের মাথায় দু’জনের দেখা- সাক্ষাৎ হইবে। যেখানে দেখা হইবে, সেখানে শিবাজী একটা তাবু খাটাইলেন। তাঁবুর ভিতরে চমৎকার শামিয়ানা-চারিদিকে কত কি আসবাব- পত্র। বসিবার জায়গাটাকে ঠিক রাজা-রাজড়ার দরবারের মতাে করিয়া সাজানাে হইল। আর বনপথের দুইদিকের ঝােপে-ঝাড়ে শিবাজী অনেক পাকা সৈন্য লুকাইয়া রাখিলেন। ১৭ २ দাবা রবারে যাইবার সময় হইতেছে। শিবাজী খুব শক্ত লােহার জালের পােষাকে শরীর ঢাকিয়া তার উপর কাপড়ের জামা পরিলেন। মাথায় পরিলেন পাগড়ী, কিন্তু তার নীচে রহিল ইস্পাতের টুপি। বাঁ-হাতের আঙুলে লাগাইলেন— বাঘ-নখ। বাঘ-নখ এক-রকম অস্ত্র। এই অস্ত্র হাতের মুঠার মধ্যে রাখা যায়—কড়া দিয়া আঁটা ইস্পাতের পাঁচটি নখ, বাঘের নখের মতােই ধারালাে, আর বাঁকা বাঁকা কাহারও পেটে বসাইয়া দিতে পারিলে তার নাড়ি-ভুড়ি সব টানিয়া বাহির করিতে পারা যায়। পাছে কেহ দেখিতে পায় তাই বাঘ-নখ লুকাইলেন মুঠার মধ্যে ; আর ডান হাতে জামার আস্তিনের ভিতরে লুকানাে রহিল- একখানি সরু ধারালাে ছােরা, নাম তার ‘বিছুয়া। সঙ্গে চলিল—ঢাল-তলােয়ারে সাজিয়া দুইজন খুব হুসিয়ার সাহসী বীর। শঠের সঙ্গে দেখা করিতে হইলে শঠ সাজিয়া, বিপদের জন্য তৈরী হইয়া ১৮

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
যাইতে হয়,—ইহা চতুর শিবাজী বেশ ভাল রকমই
জানিতেন, তাই তিনি বেশ সাবধান হইয়া
চলিলেন।
প্রতাপগড় হইতে বাহির হইয়া পড়িবেন,
এমন সময় যেন এক দেবীমূৰ্ত্তি তাঁহাদের সামনে
আসিয়া দাঁড়াইলেন। শিবাজী তাহাকে দেখিয়া
গড় করিলেন। ইনি কে, জানাে ? শিবাজীর
মা জীজাবাঈ। তিনি পুত্রকে আশীর্বাদ করিলেন,
-তােমার জয় হােক।
স্বামী দূরদেশে—ভুলিয়াও তার খোঁজখবর লন
; এ সংসারে ছেলের মুখ চাহিয়াই তিনি
বাঁচিয়া আছেন; শিবাজী যে তাঁহার নয়নের
মণি ; তাই বারবার সঙ্গীদের বলিয়া দিলেন,
শিবাকে দেখিও,—তাহার ভার তােমাদের ওপর।
আফজল খাঁ শিবাজীর সঙ্গে দেখা করিতে
আসিতেছেন ; সঙ্গে তার
বন্দুক-ঘাড়ে এক
হাজারের উপর সিপাই। শিবাজীর দূত গােপীনাথ
আবার
তেমনি সেয়ানা; আপত্তি করিয়া

শিবাজী মহারাজ
বলিলেন,-দেখুন খসাহেব, কাজটা কিন্তু ভাল
হইতেছে না; আপনার নাম শুনিয়াই শিবাজী
খুব ঘাবড়াইয়া গিয়াছেন, তার ওপর এত
লােকলস্করের বহর দেখিলে তিনি কিছুতেই
আপনার সঙ্গে দেখা করিতে ভরসা করিবেন
। আপনি এক কাজ করুন--তিনিও যেমন
দু’জন মাত্র রক্ষী লইয়া আসিতেছেন, আপনিও
তেমনি দু’জন রক্ষী লইয়া চলুন।
আফজল ভাবিলেন, 'কথাটা মন্দ নয় ; তিনি
তখনই সৈন্যদের ছাড়িয়া দিয়া পাল্কীতে উঠিলেন।
সঙ্গে রহিল মােটে তিনটি লােক, আর দুই
দলের দুই দূত—গােপীনাথ ও কৃষ্ণাজী।
তাঁবুতে পৌছিয়া, এদিক-ওদিক চারিদিক
চাহিয়া
আফজল
অবাক !
মারাঠাটা
করিয়াছে কি? একেবারে পূরাদস্তুর নবাবী
যে! যেমন দামী গালিচার 'বাহার, তেমনি
তাকিয়ার সাজ, আবার তেমনি আর আর-সব
জিনিষপত্রের ঘটা। খ-সাহেবের চোখ টাটাইতে

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
লাগিল। তিনি রাগ আর কিছুতে চাপিতে না
পারিয়া বলিয়া ফেলিলেন,-সামান্য একটা
জায়গীরদার!—তারই ছেলের এত নবাবী। এ
কিসের জন্য হে ?
শিবাজীর দূত গােপীনাথ ভড়কাইবার লােক
নন; তিনি বুদ্ধি করিয়া বলিলেন,-খ-সাহেব,
এ সবই আপনার সম্মানের জন্য। আপনি
বিজাপুরের মস্তবড় সেনাপতি কি না; তাই
আপনার মান-রক্ষার জন্য শিবাজী খাইয়া-না-খাইয়া
এই-সব আয়ােজন করিয়াছেন। দেখা-সাক্ষাৎ
হইয়া গেলেই,-বুঝিলেন কি না খা-সাহেব-মায়
তাকিয়া গড়গড়া সব একদম বিজাপুরে পাঠাইয়া
দেওয়া হইবে। শিবাজী যে বিজাপুরের কাছে মাথা
হেঁট করিয়া তার অধীন হইলেন, এইগুলিই হইবে
তার প্রথম নম্বরের নিশানা--রাজার ভেট আর কি
কথা শুনিয়া খা-সাহেব একেবারে ঠাণ্ডা ।
শিবাজী তখন পাহাড়ের নীচে। খসাহেবের
আসিবার খবর পাইয়া ধীরে-সুস্থে উপরে উঠিতে

শিবাজী মহারাজ লাগিলেন। পথে শুনিলেন, খা সৈয়দ বান্দাকে সঙ্গে আনিয়াছেন। সে ভারি লড়াইওয়ালা। তলােয়ারের খেলায় তখন তার খুব নাম। শিবাজী ধরিয়া বসিলেন,বান্দাকে না সরাইলে তিনি তাঁবুতে ঢুকিবেন না। খা-সাহেব ভাবিলেন, শিবাজী সত্যই ভয় পাইয়াছে। কাজেই বান্দাকে সরাইলেন। যেখানে দু’জনের মিলন হইবে, কথাবার্তা হইবে, সেখানটা একটু উচু করিয়া বেদীর মত করা হইয়াছে। আফজল আগে আসিয়া সেই বেদীর উপরে আরাম করিয়া বসিলেন। লােক- জনের ভিড় নাই। বেদীর নীচে শুধু দুইদলের দুইজন করিয়া সেনা, আর একজন করিয়া দূত। শিবাজী সিড়ি দিয়া বেদীর উপরে উঠিয়া খা-সাহেবকে সেলাম জানাইলেন। দিব্য ভালমানুষটির মতো সাজগােছ— দেখিলেই মনে হয় যেন বিদ্রোহী দায়ে পড়িয়া শত্রুর হাতে ধরা দিতে আসিয়াছে,—তলে তলে ২২ বুনাে ওল, বাঘা তেঁতুল ; যে তাহার এত কারসাজি, তাহা কিছুতেই বুঝিয়া উঠিবার জো নাই। শিবাজীর পােযাক- আষাক দেখিয়া খসাহেব মনে মনে হাসিলেন। তাঁহার নিজের কোমরে একখাল ছােরা আঁটা কিন্তু শিবাজীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র অস্ত্রশস্ত্র কিছুই দেখা যাইতেছে না। খ -সাহেব যেন শিবাজীকে কোল দিবেন, এমনিভাবে উঠিয়৷ হাত বাড়াইয়া দিলেন। শিবাজীও কোল ঘেঁ সয়া দাঁড়াইলেন। এইবার সত্যসত্যই কোলাকুলি—যাকে বলে, সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি--ঠিক তাই আর কি! কিন্তু শিবাজী লােকট রি বেঁটে, মাথা তাঁর খ-সাহেবের গলা পর্যন্ত উঠিল—তার উপর আর উঠিল না। খ.-সাহেব দেখিলেন, ভারি মজা যাকে বাগে (ফেলিবার জন্য তার এত চেষ্টা, সে একেবারে হাতের মধ্যে। তিনি তাঁহার লােহার মতে শক্ত বুকের উপর শিবাজীকে আনিয়া প্রাণপণ বলে চাপিয়া ধরিলেন। তেমন-তেমন লােক হইলে আর কিছুই করিতে } শিবাজী মহারাজ হইত না,—চাপের চোটেই হাড়গােড় ভাঙ্গিয়া গুড়া হইয়া যাইত। কিন্তু শিবাজীর শরীরটাও লােহার ভীমের মত শক্ত, তাই ইহাতে তিনি কাবু হইলেন না। খা-সাহেব তখন বাঁ-হাত দিয়া তাঁহার গলা চাপিয়া ধরিলেন, আর ডান হাতে কোমর হইতে ছােরা টানিয়া খুব জোরে বাঁ-পাঁজরে একটা ঘা মারিলেন। শিবাজী আগে হইতেই সাবধান হইয়া লােহার জামা পরিয়া আসিয়াছিলেন; তাই ছােরার ঘায় তাহার কিছুই হইল না। কিন্তু টিপুনীর চোটে তাহার দম বন্ধ হইবার মতাে হইল ; তিনি তখন-তখনই কোনাে রকমে দম লইয়া বাঁ-হাতের বাঘনখ সজোরে খ- সাহেবের পেটে বসাইয়া দিলেন, আর ডান হাতের ‘বিছুয়া ছােরা মারিলেন তাহার পাজরে। খুন! খুন। দাগাবাজী! কে কোথায় আছ ? কে কোথায় আছ ?—বলিয়া চীৎকার করিয়া খা তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন, আর শিবাজীও তার হাত হইতে খালাস পাইয়া—মারিলেন এক লাফ । ২৪

বুননা ওল, বাঘা তেঁতুল
রক্ষীরা নিমেষে ছুটিয়া আসিল।
তলােয়ারওয়ালা বান্দা আর কোনােদিকে না
তাকাইয়া, মারিলেন শিবাজীর মাথায় তলােয়ারের
এক কোপ! যেমন-তেমন কোপ নয় সে,--যাকে
বলে বিরাশী সিক্কা ওজনের, তাই। কোপের
চোটে শিবাজীর মাথার পাগড়ীটা কাটিয়া দু’-
ফাক হইল, আর নীচে যে ইস্পাতের টুপি ছিল,
সেটা টোল খাইয়া গেল। শিবাজী বুঝিলেন,
গতিক বড় ভাল নয়, তাই ফস্ করিয়া তাঁর
রক্ষী জীব মহালার হাত হইতে তলােয়ার লইয়া
রুখিয়া দাড়াইলেন। তখন সামনা-সামনি দুই
বীরে বন্ বন্ শব্দে তলােয়ার ঘুরাইয়া লড়াই।
জীব মহালার কাছে আর একখানা তলােয়ার ছিল ;
সেও তখনই ছুটিয়া আসিয়া তলােয়ার চালাইল,
আর কচ, করিয়া বান্দার ডান হাতখানা কাটিয়া
ফেলিয়া তাহাকে কাত করিল।
এদিকে বেহারারা আধ-মরা খাঁকে পাল্কীতে
তুলিয়া লইয়া পলাইবার চেষ্টায় ছিল। শিবাজীর
২৫

শিবাজী মহারাজ
একজন মারাঠা-রক্ষী আসিয়া তাহাদের পায়ে
তলােয়ারের কোপ মারিল—বেহারারা পাল্কী
ফেলিয়া দিল ছুট! রক্ষী তখন খার মাথাটা কাটিয়া
প্রভুকে উপহার দিল ।
এইরূপে বিপদের হাত হইতে রক্ষা পাইয়া
শিবাজী ও তাঁর দু’জন রক্ষী তাড়াতাড়ি
প্রতাপগড় কেল্লায় গিয়া কামান দাগিলেন।
পাহাড় হইতে পাহাড়ে, বন হইতে বনে, সেই
আওয়াজের প্রতিধ্বনি উঠিল। আর যাবে কোথা,
প্রভুর এই ইসারা বুঝিয়া যে-সব মারাঠা-সেনা
বন-জঙ্গলে লুকাইয়াছিল, তাহারা হর হর মহাদেও।
শব্দে বাহির হইয়া পঙ্গপালের মতাে আচকা
খার সৈন্যের উপর গিয়া পড়িল, আর তাহাদের
কাটিয়া কুচিকুচি
করিতে লাগিল। অনেকেই
মরিল, তবে যাহারা দাঁতে তৃণ ধরিয়া মাপ
চাহিল, তাহাদিগকে আর কিছু বলা হইল না।
শুনা যায়, মােটের উপর মারাঠাদের তলােয়ারের
মুখে খা-সাহেবের তিন হাজার সৈন্য সাবাড়
২৬

বুনাে ওল বাঘা তেঁতুল
হয়। আর বিজাপুরীদের গােলা-বারুদ, হাতী,
ঘােড়া, উট, বস্তাবস্তা কাপড়, আর নগদ ও
মণিমাণিক্যে দশ লাখ টাকা—সবই মারাঠাদের
হাতে পড়িল। একে তো শিবাজী দিনদিন নিজের
বল বাড়াইতেছিলেন, তার উপর এই সব জিনিষপত্র
পাইয়া তিনি একেবারে কঁপিয়া উঠিলেন।
শিবাজীর নাম চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল।
।
২৭

কেমন ঈদ ঐ বলে, একটা কলাপাতায় দশজন ফকিরের বেশ জায়গা হয়, কিন্তু বড় একটা দেশে দু’জন রাজার জায়গা হয় না, কথাটা খুব ঠিক। দিল্লীর বাদশা আওরংজীব ও মারাঠাদের রাজা শিবাজী একই সময়ের লােক। দু’জনেই যেমন চতুর, তেমনি বীর। আবার তাঁহাদের চেহারার চেহারার মধ্যেও খুব মিল দেখিতে পাওয়া যায়। এই দুই মহাবীর, আর এই দুই মহাচতুরের মধ্যে মােটেই ভাব ছিল ,একজন আর একজনকে করিতে পারিলে আর কিছু চাহিতেন না। কাজেই দু’জনের তলােয়ারের খেলা, আর বুদ্ধির খেলা খুব জমিয়া উঠিয়াছিল। দিল্লীর বাদশামন্ত-বড় বাদশা, তার ভারত- জোড়া রাজ্য ; কত ধনজন, হাতী-ঘােড়া সৈন্য- সামন্ত তার ঠিক নাই। শিবাজী তখন মারাঠা ২৮

কেমন জং
দেশের ক্ষুদ্র মালিক। তার ধনজন সৈন্যসামন্ত যতই
থাক না, দিল্লীর বাদশার কাছে তাহা কিছুই নয়।
সত্যই দু’জনের কথা ভাবিয়া দেখিলে বেশ
বুঝিতে পারা যায় যে, দিল্লীর শাহান্শা বাদশা
মনে করিলে শিবাজীকে পিঁপড়ার মতাে টিপিয়া
মারিতে পারিতেন। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায় যে,
মারাঠা দেশের এই ক্ষুদ্র রাজা মাঝে মাঝে
ডঙ্কা বাজাইয়া বাদশার রাজ্যে ঢুকিতেছেন, আর
মার-কাট লুটতরাজ করিয়া অবাধে আপনার
গণ্ডীর ভিতরে ফিরিয়া আসিতেছেন। অত-বড়
বাদশা, তার অত সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র, তবু
তিনি শত চেষ্টাতেও শিবাজীর তেমন কিছুই
করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না।
আওরংজীব বাদশার নামে শায়েস্তা খাঁ তখন
দক্ষিণাপথ শাসন করিতেন। ভারতবর্ষের দক্ষিণ
দিকের দেশগুলিকে দক্ষিণাপথ বলে। শিবাজীর
বাড়ীও সেইখানে। তাঁহার তেজ দেখিয়া শায়েস্তা
খ আর ঠিক থাকিতে পারিলেন না; রাগে
২৯

শিবাজী মহারাজ
আগুন হইয়া সৈন্যসামন্ত লােকলস্কর লইয়া
শিবাজীকে জব্দ করিবার জন্য যাত্রা করিলেন।
শায়েস্তা খাঁ বড় যে-সে লােক নন,-মন্ত-বড়
বীর। আর দেশ-শাসনেও খুব মজবুত। তিনি
যে সামান্য জায়গীরদারের ছেলে শিবাজীকে
মাথা তুলিতে দিবেন, ইহা কখনও সম্ভব নয়।
খা-সাহেব,আর কথাবার্তা নাই, সসৈন্যে ছুটিয়া
গিয়া শিবাজীর বড় সাধের পুণা গ্রামটি কাড়িয়া
লইলেন। আর এই গ্রামের যে বাড়ীখানিতে
শিবাজী খেলাধূলা করিয়া মানুষ হইয়াছেন,
একেবারে সেইখানে গিয়া চাপিয়া বসিলেন।
এই বাড়ীর চারিপাশে—তাহার শরীর-ক্ষী ও
চাকদিগের থাকিবার জায়গা, আর নারখানার
(বাজনার ঘর) বন্দোবস্ত হইল। চারিদিকে
ভাবুর পর তাঁবু! বাদশাহী সেনাদের মধ্যে
নাচগান ও আনন্দের ফোয়ারা ছুটিল ! একটু
দূরে মােগলদের রাজপুত-সেনাপতি মহারাজ
যশােবন্ত সিংহ দশ হাজার ফৌজ লইয়া পাহারা

কেমন জ
দিতে লাগিলেন। শায়েস্তা খাঁ শিবাজীকে
বাহিরে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিলেও, মনে মনে
যে ভয় করিতেন, এই-সব কড়াক্কড় ব্যবস্থাই
তার সাক্ষী।
সাধের পুণা গ্রামটি শত্রুদের হাতে পড়ায়
শিবাজীর মনে ভারি দুঃখ হইল; কিন্তু তাহার
মতাে তেজ আর সাহস, কয়টি লােকের আছে ?
তিনি এতটুকুও দমিলেন না। মােগলদের জব্দ
করিবার জন্য ফন্দী আঁটিতে লাগিলেন।
তারপর একদিন শিবাজী একেবারে হাজার
সৈন্য লইয়া সিংহগড় হইতে বাহির হইলেন।
ওখান হইতে পুণা গ্রাম এগার মাইল পথ।
সন্ধ্যা হইয়াছে। শিবাজী আঁধারে গা ঢাকিয়া
চুপি চুপি গ্রামের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন।
মােগলদের সৈন্যবল অনেক বেশী, সামনা-সামনি
লড়াই করিয়া যে তাহাদের সঙ্গে আঁটিয়া উঠিতে
পারিবেন না, তাহা তিনি বেশ বুঝিতেন। তাই
খুব চুপি চুপি গ্রামে চড়াও হইবার ব্যবস্থা।

শিবাজী মহারাজ মােগলদের গণ্ডীর আধ ক্রোশ দূরে পথের দুইদিকে শিবাজী দুইদল মারাঠা-সৈন্য লুকাইয়া রাখিলেন। তারপর চারশাে বাছা বাছা সৈন্য লইয়া তিনি যখন গ্রামের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন, তখন অন্ধকার বেশ ঘাের হইয়া উঠিয়াছে। তাহারা মােগলদের এলাকার মধ্যে পা দিতেই শান্ত্রী-পাহারা খুব জোর-গলায় হাঁকিল,-কোন্ হায় ? শত্রুর পুরীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছেন। চারিদিকে তাহাদের সেনাশাস্ত্রী লােজন কিলকিল করিতেছে। টের পাইলে তখনই চারিদিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া ছাঁকিয়া ধরিবে, আর তাহাদের যে কি দুর্দশা করিবে, ভাবিলেও গায়ে কাঁটা দিয়া উঠে। তাহাদেরই লােক জোর-গলায় হাঁকিতেছে,-কোন্ হায় ? তেমন-তেমন লােক হইলে কথা শুনিয়াই যে তার চোখ কপালে উঠিয়া যাইত, আর তখন- তখনই শত্রুর হাতে ধরা পড়িয়া উপযুক্ত সাজা পাইতে হইত, তার আর সন্দেহ নাই। কিন্তু শিবাজী মহারাজ

No text on this page.

কেমন এ শিবাজী তাে যেমন-তেমন লােক নন ; তাঁর যেমন উপস্থিত বুদ্ধি, তেমনি সাহস। চটপট, জবাব দিলেন—আমরা তােমাদেরই লোেক গাে, তােমাদেরই লােক। বাদশার যে-সব দক্ষিণ- দেশের সেনা এইখানে থাকে, আমরা তারাই; সারাদিন পাহারা দিয়া এখন নিজের নিজের তাঁবুতে ফিরিয়া যাইতেছি। উত্তর শুনিয়া শাস্ত্রী মনে করিল, তা হবেও বা। এখানে তাে দক্ষিণ-দেশের সৈন্যের অভাব নাই। সে আর কোনাে আপত্তি করিল না। পাহারাওয়ালার চোখে ধূলাে দিয়া শিবাজী একটা নিরিবিলি জায়গায় নিজের লােকজন লইয়া জিরাইতে লাগিলেন। যে বাড়ীতে নবাব শায়েস্তা খাঁ ছিলেন, মাঝরাত্রে লােকজনের ভিড় কম হইলে, তঁাহারা চুপি চুপি সেই বাড়ীর দিকে চলিলেন। গ্রামের কোথায় কি আছে, বিশেষ যে বাড়ীতে তিনি ছেলেবেলায় মানুষ, তাহার অলিগলি সব শিবাজীর চোখের সামনে ভাসিতেছে।

খন রমজান মাস। এই পুণ্যমাসে মুসলমানরা সারাদিন উপােস করিয়া, রাত্রে খানাপিনা করে। নবাবের অন্দরের চাকর- বাকরেরা অনেকেই দিনের উপবাসের পর রাত্রে পেট পূরিয়া খাইয়া মনের সুখে ঘুমাইতেছে। কেবল জনকয়েক রাধুনী রাত থাকিতে থাকিতেই উঠিয়াছে ; নবাব সূৰ্য্য উঠিবার আগেই খানা খাইবেন, তাই তারা উনুন ধরাইয়া রান্নাঘরে খাবার তৈরী করিবার আয়ােজন করিতেছে। টু শব্দটি করিবার সময় না দিয়া মারাঠারা গিয়া তাদের খুন করিল। বাইরের এই রান্নাঘর, আর ভিতরের মেয়ে-মহল—এই দু’য়ের মাঝখানে একটা দেওয়াল। এই দেওয়ালের গায়ে শিবাজীর আমলে একটা ঘােট দরজা ছিল। কিন্তু আমীর- উমারাদের মত উঁচুদরের মুসলমানদের অন্দরের ভারি আঁটাআঁটি—দেওয়ালে ফাক থাকিবারও জো নাই। তাই এখন ইটকাদা দিয়া আচ্ছা ৩৪

কেমন জ
করিয়া উহা বুজাইয়া দেওয়া হইয়াছে। মারাঠারা
ঠিক এই জায়গাটায় গর্ত করিবার জন্য ইটগুলি
আস্তে খুলিতে লাগিল। তাহাদের
শাবলের আওয়াজ ও আধমরা চাকর-বাকরের
গোঁ গো শব্দে নবাবের কয়েকজন চাকরের ঘুম
ভাঙ্গিয়া গেল ; তাহারা তখনই তাহাদের সন্দেহের
কথা প্রভুকে জানাইল। কিন্তু তুচ্ছ কারণে ঘুম
ভাঙ্গানাের জন্য নবাব-সাহেব তাে চটিয়াই আগুন।
ধমক খাইয়া চাকরেরা যে যার জায়গায় চলিয়া গেল।
দেওয়ালের গর্ত অল্পে অল্পে বড় হইয়া এমন
হইল যে, একটা লােক অনায়াসে তাহার মধ্য
দিয়া গলিয়া যাইতে পারে। শিবাজী,
তাঁহার বিশ্বাসী শরীর-রক্ষী চিনাজী বাপুজী,
খােলা-তলােয়ার হাতে অনর-মহলে ঢুকিয়া
পড়িলেন। একটি
একটি করিয়া দুশশা মারাঠা-
সৈন্য তাহাদের পিছু পিছু চলিল। অন্দরে
ঢুকিয়া শিবাজী দেখিলেন, সেটা যেন একটা
গােলক-ধাঁধা—পর্দার পর পর্দা, আড়ালের পর

শিবাজী মহারাজ
আড়াল। তাহার মধ্যে কি মাথা গলাইবার
জে। আছে; কাজেই তলােয়ারের ঘায় পর্দাগুলি
কাটিয়া ছিড়িয়া, পথ করিয়া, শেষে শিবাজী
একেবারে খা-সাহেবের শুইবার ঘরে গিয়া হাজির।
নবাব তখনও ঘুমে অচেতন। বেগমেরা ভয় পাইয়া
তাড়াতাড়ি ভঁহাকে জাগাইল, কিন্তু নবাব অস্ত্রে
হাত দিবার আগেই শিবাজী এক লাফে তাঁহার
কাছে আসিয়া একটা তলােয়ারের ঘা মারিলেন।
আঘাতটা কিন্তু ঠিক তাহার বুকে লাগে নাই,
লাগিলে যে কি হইত, তা বলা যায় না। যাই হােক,
আঘাতের চোটে তাহার হাতের বুড়াে আঙুলটি
উড়িয়া গেল। অন্দরের একজন বেগম-সাহেবা
কিন্তু এই সময়ে খুব বুদ্ধি আর সাহসের পরিচয়
দিয়াছিলেন। বেগতিক দেখিয়া তিনি ঘরের
আলাে নিবাইয়া দিলেন, আর বাদীরা এই ফাকে
শায়েস্তা খাকে একটা সুবিধামতাে জায়গায়
সরাইয়া
অন্ধকারে ছুটাছুটি করিতে
দু’জন মারাঠা জলের চৌবাচ্ছায় পড়িয়া গেল।
ফেলিল।

কেমন এ শিবাজীর বাকি দুশশা সৈন্য অন্দরের বাইরে ছিল ; তাহারা ওদিকে প্রহরীদের উপর লাফাইয়া পড়িল। যারা জাগিয়াছিল বা যারা ঘুমাইতেছিল, মারাঠারা গিয়া তাদের খুন করিতে লাগিল, আর ঠাট্টা করিয়া চেঁচাইতে লাগিল,—তােমরা তাে খুব হুসিয়ার পাহারাওয়ালা—বুঝি এমনি করেই পাহারা দাও, আর নবাবের নিমক খাও। কাটাকাটি খুননাখুনি করিতেই তাে লড়াই- ওয়ালাদের ফুৰ্ত্তি। তাঁদের এই ফুৰ্ত্তিটা আরও পূরা দমে চালাইবার জন্য মারাঠারা আর একটা ভারি মজার কাণ্ড করিল। বাজনার ঘরের কাছে গিয়া বাজারদের খুব একচোট ধমক দিয়া কহিল,-বাজা বাজা ব্যাটারা, জী বাজা-খা-সাহেবের হুকুম। খ-সাহেবের নামে তাদের ঘুম তখন চোখ ছাড়িয়া পলাইবার আর পথ পায় না। তারা চটপট যে যার ঢাক-ঢােল কাড়া-নাকড়ার কাছে বসিয়া, দিল তাহাতে কাটি। আর যাবে কোথায়, বাজনার চোটে বাড়ী ফাটিয়া পড়ে আর কি!

শিবাজী মহারাজ
বাজনার জোর আওয়াজে সকলের চেঁচামেচি
তলাইয়া গেল, আর শত্রুদের ধেই-ধেই নাচ সুরু
হইল। অন্দরেও তখন গােলমাল এত বেশী
হইতে লাগিল যে, মােগল-সৈন্যেরা বুঝিল,
তাহাদের মনিবকে শত্রুরা তাড়া করিয়াছে।
হুসিয়ার—দুশমন! দুশমন!-বলিয়া চেঁচাইতে
চেঁচাইতে তাহারা সাজসজ্জা করিতে লাগিল।
শিবাজী দেখিলেন, মােগলরা জাগিয়া উঠিয়াছে,
আর দেরী করা ভাল নয়; তিনি তখন নিজের
লােজন ডাকিয়া সােজাপথে পলাইলেন। এদিকে
মােগলরা শত্রুর খোজে মিছামিছি এ-তবু সে-তবু
ঘুরিয়া হায়রান হইতে লাগিল।
আওরংজীব বাদশা তখন কাশ্মীর যাইতে-
ছিলেন। তিনি স্বপন দেখিতেছিলেন, এতদিনে
দক্ষিণাপথ জয় শেষ হইয়াছে,—দুষ্ট শিবাজী জব্দ
হইয়াছে। কিন্তু হঠাৎ তাহার সুখের স্বপন ভাঙ্গিয়া
গেল। পথে যখন শুনিলেন, শায়েস্তা খা লজ্জায়

কেন এ
=
৩
ও দুঃখে অতি কষ্টে পুণা হইতে পলাইয়া প্রাণ
বাঁচাইয়াছেন, তখন রাগে তাহার সমস্ত শরীরটা
কপিতে লাগিল। তিনি হুকুম দিলেন,আমি
আর শায়েস্তা খাঁর মুখও দেখিতে চাই না, নরকের
সামিল যে বাঙ্গলা দেশ, তাকে সেই দেশে পাঠাও,
—সে সেই দেশেরই উপযুক্ত নবাব।
সেকালের নবাব-বাদশারা বাঙ্গলা দেশকে
এমনি ঘৃণা করিতেন।
అని

সেয়ানে সেয়ানে
শিবাজীর
বাজীর কাণ্ডকারখানা দেখিয়া দেশসুদ্ধ
লােকের তাক লাগিয়া গেল। এত বড়
যে বাঘের মতাে বাদশা আওরংজীব--যার নামে
বড় বড় রাজা-রাজড়ার মাথা হেঁট হয়, বড় বড়
লড়াইওয়ালার বুক ধুক ধুক করিতে থাকে, তাকেও
কিছুমাত্র গ্রাহ নাই! তাঁরই চোখের উপর আজ
এখানে লুটপাট, কাল সেখানে লড়াই। नावान
ধরা, না যায় ঠেকানন। লােকেরা অবাক হইয়া
ভাবিতে লাগিল, এই মারাঠা মানুষ নয় কখনই
ডানাওয়ালা এক আজব প্রাণী ; ডানায় ভর দিয়া
উড়িয়া আসে, আবার ডানায় ভর দিয়া যেখানে
খুশী উড়িয়া যায়।
বাদশা অবশ্য এ-সকল কথা বিশ্বাস করেন না,
কিন্তু তিনি যে সিংহাসনে বেশ আরাম করিয়া বসিয়া
দাড়িতে হাত বুলাইবেন, তাহারও উপায় নাই।
থাকিয়া থাকিয়া শিবাজীর চালাকীর কথাই মনে
৪০

সেয়ানে সেয়ানে
আর দাঁত কড়মড় করিতে করিতে
ভাবেন,-আপন কোটে পাই তাে, চিড়ে কুটে
খাই। কিন্তু তাকে আপন কোটেও পান না,
আর তাহার চিড়ে কুটিয়াও খাওয়া হয় না।
ওদিকে তাহার তেজ যেন দিনদিন বাড়িয়াই
চলিয়াছে। শিবাজী যেন আকাশের মারাত্মক
বিদ্যুৎ—চকিতে দেখা দিয়া রাজ্যের ভিতর বজের
মতাে ভাঙ্গিয়া পড়ে, জ্বালাইয়া পােড়াইয়া খাক
করিয়া নিমেষে হাওয়ায় মিলাইয়া যায়। একদিন
সে দশ হাজার সেনার চোখের সামনে অনায়াসে
আফজল খাঁর মতাে বীরকে খুন করিয়া বাহাদুরী
লইল। আর একদিন বিশ হাজার মােগল-ফৌজের
মাঝখান দিয়া অন্দরে ঢুকিয়া, শায়েস্তা খার মতাে
লােককে জখম করিয়া বেমালুম সরিয়া পড়িল।
বাদশা রাগে অস্থির হইয়া চীৎকার করিয়া
উঠিলেন,-কি এতদূর আস্পর্ধা! ঐ ক্ষুদে পাহাড়ে
ইদুরটা—বাদশা আওরংজীব বাঁচিয়া থাকিতে
যাহা খুশী তাহাই করে। ক্ষুদে জানােয়ারটাকে
৪১

শিবাজী মহারাজ ধরিয়া আনিয়া আমার সামনে হাজির করে, এমন লােক কি কেউ নাই ? শিবাজীর বাড়ী পাহাড়-অঞ্চলে, তাই আওরংজীব বাদশা তার নাম দিয়াছিলেন—পাহাড়ে ইদুর। কিন্তু তিনি যাহাই খুশী বলুন না কেন, লােকেরা শিবাজীকে যমের মতাে ভয় করিত। সেনাপতি- মশায়রা মাটির দিকে চাহিয়া মাথা চুলকাইতে লাগিলেন। অবশেষে গালপাট্টা-দাড়ি রাজপুত-বীর মহারাজা জয়সিংহ বাদশাকে সেলাম জানাইয়া কহিলেন,জাহাপনা, হুকুম করিলে এই রাজপুতই শিবাজীকে জব্দ করিতে পারে। বাদশা হুকুম দিলেন,বেশ, বাছা বাছা সৈন্য নিন, আর ভাল ভাল অস্ত্র, পাহাড়ে ইদুরের কত বড় দাত, আর কতখানি তেজ, তাই আমি দেখতে চাই। চারিদিকে তখন ‘সাজ সাজ রব পড়িয়া গেল। পিঁপড়ার সারির মতাে যােদ্ধার দল—মােগল- সরকারের বাছা-বাছা লড়াইওয়ালা, দক্ষিণাপথের ৪২

সেয়ানে সেয়ানে
দিকে কুচ করিতে করিতে রওনা হইল—একজন
সামান্য জায়গীরদারের ছেলেকে জব্দ করিতে ।
সেয়ানা সতর্ক বাদশা এই-সকল সৈন্যকে
চালাইবার জন্য শুধু এক রাজপুত-সেনাপতি
জয়সিংহকে পাঠাইয়াই নিশ্চিন্ত হইতে পারেন নাই,
মুসলমান-সেনাপতি দিলীর খাকেও পাঠাইয়া-
ছিলেন। বীরত্বে ইহারা কেহই কম নন। এই
দুই মহাবীর যখন হাজার হাজার সৈন্য লইয়া
চারিদিক হইতে মারাঠা-বীরকে চাপিয়া ধরিলেন,
তখন তিনি কিছুই করিয়া উঠিতে পারিলেন
কেমন করিয়া পারিবেন ? তাহার সৈন্যবল
যে মােগল-সৈন্যের কাছে কিছুই নয়। কাজেই
তাহাকে হার মানিয়া বাদশার সঙ্গে একটা
মিটমাট করিতে হইল। তিনি বাদশাকে কতকগুলি
কেল্লা, আর কেল্লার এলাকাধীন অনেক জায়গা
জমি, ছাড়িয়া দিয়া, তাহার বশ্যতা স্বীকার
করিয়া লইলেন। আর বিজাপুরের রাজাদের
সঙ্গে আওরংজীব বাদশার অনেক দিন হইতেই
।
৪৩

শিবাজী মহারাজ
বিবাদ চলিতেছিল; শিবাজীকে কথা দিতে হইল
যে, ইহার পর তিনি বাদশার দলে থাকিয়া
বিজাপুরের সঙ্গে লড়িবেন। কিন্তু এদিকে তিনি
যাহাই বলুন, আর যাহাই করুন, একটা বিষয়ে
ভারি হুসিয়ার হইয়া কাজ করিলেন; মিটমাটের
সময় স্পষ্টই বলিয়া দিলেন—আমি কিন্তু বাদশার
মনসবদার—সেনাপতি-টতি হইতে পারিব না,
আমার ওপর যেন তেমন কোনাে হুকুম জারি
হয়।
শিবাজীর মত বীরকে দলে পাইয়া জয়সিংহের
খুব সুবিধা হইল। তিনি তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া
তােড়ে বিজাপুর আক্রমণ করিলেন। কিন্তু
বিজাপুরের কেল্লার কাছে এগােয় কার সাধ্য।
বিজাপুরীরা বিপদ বুঝিয়া আগে হইতেই ঘরােয়া
বিবাদ মিটাইয়াছে। কাজেই এখন তারা সব
একজোট। জয়সিংহকে বেগতিক দেখিয়া শেষে
পিছু হটিতে হইল। এই সময়ে আবার বিজাপুরীর
অনেক টাকা ঘুষ দিয়া, নেতাজীকে হাত করিয়া
৪৪

সেয়ানে সেয়ানে
লইল।
তিনি শিবাজীর যুদ্ধের সাথী-মস্ত
লড়াইওয়ালা।
জয়সিংহ ভাবনায় পড়িলেন। নেতাজী গেলেন,
এইবার তার দেখাদেখি শিবাজীও যদি ফস্ করিয়া
গিয়া বিজাপুরের সঙ্গে যােগ দেন, তাহা হইলেই
সর্বনাশ ! জাতার ভিতরের গমের মতে, দু’দিকের
চাপে পিষিয়া মরিতে হইবে।
শিবাজীকে ঠাইনাড়া না করিলে,—এখান
হইতে সরাইয়া দিতে না পারিলে তাে নিশ্চিন্ত
হওয়া যাইতেছে না। এ সময়টা তাকে একবার
ভুলাইয়া-ভালাইয়া আগ্রায় পাঠানাে যায় না।
কিন্তু শিবাজী যে মিটমাটের সময় আগে থাকিতেই
বলিয়া রাখিয়াছেন, “আমি হুজুরে হাজির হইতে
পারিব না। তা হােক, চতুর জয়সিংহ মনে মনে
ভাবিতে লাগিলেন, চেষ্টার অসাধ্য কাজ নাই,
তিনি এলব্ধ সাধ্যমতাে চেষ্টা করিয়া দেখিবেন।
জয়সিংহ ফন্দীর কথা বাদশা আওরংজীবকে
লিখিলেন। এমন প্রস্তাবে কি তিনি অমত
৪৫

শিবাজী মহারাজ
করিতে পারেন ? খুব খুশী হইয়া তাহাতে সায়
দিলেন। তখন শিবাজীর মন গলাইবার চেষ্টা
হইতে লাগিল। কত বন্ধুতা, আর কত লােভের
কথাই যে জয়সিংহ তাহাকে বলিলেন, তার ঠিক
নাই; বলিলেন,-একবার আগ্রায় গিয়া বাদশার
অতিথি হওয়ায় ক্ষতি কি? আপনার সঙ্গে তার
মিটমাট হইয়া গিয়াছে, এইবার একবার তাঁহার
সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হইলে, তিনি আপনার উপর
ভারি খুশী হইবেন। আপনি আমার কথা
শুনুন, আগ্রায় যান, আপনার ভাল হইবে। এই
দক্ষিণ- দেশ শাসন করিবার জন্য একজন ভাল
লােকের দরকার। আপনি তার সম্পূর্ণ উপযুক্ত।
বাদশার সঙ্গে দেখা হইলে, চাই কি, সে পদটাও
আপনার চট্‌ করিয়া জুটিয়া যাইতে পারে।
কথাগুলি যতই মিষ্ট, যতই মােলায়েম হােক
কেন, শিবাজী জয়সিংহকেও চিলিতে, আর
বাদশা আওরংজীবকেও জানিতেন ; তাই এ-সম্বন্ধে
কি করা উচিত, কি করা অনুচিত, চিন্তা করিতে
৪৬

সেয়ানে সেয়ানে
লাগিলেন। ধনে জনে যে মােগলের সমান
দুনিয়ায় আর কেহ নাই, তারই বাদশা। আর
তারই রাজধানী, দেখিবার মত জিনিষ বটে।
আর তা ছাড়া কয়েকটি কাজের কথাও আছে,
বাদশার সঙ্গে দেখা হইলে তার নিষ্পত্তি হইতে
পারে। কিন্তু বাদশার কথায় ও কাজে কিছুমাত্র
মিল নাই। তাকে বিশ্বাস কি ? যদি আগ্রায়
গিয়া ফাঁদে পড়িতে হয় ? শিবাজী চিন্তা করিতে
লাগিলেন। জয়সিংহ ভরসা দিয়া বলিলেন,-
আপনার কোনাে ভয় নাই। আমি বাঁচিয়া
থাকিতে আপনার গায়ে আঁচড়ও লাগিবে না।
যান আপনি, একবার মনের সুখে আগ্রা ঘুরিয়া
আসুন। আপনার ভালমন্দের দায়ী আমি।
শিবাজীর মন ভিজিল ; ভাবিলেন, যখন
মিটমাট হইয়াছে, তখন আর কোনাে গােল
হইবে না গেলে হয় তত সুবিধাই হইবে। ভয়ের
কারণ যে একেবারে নাই, তাহা নহে; কিন্তু
সেটা তাে অনুমানমাত্র। এই মনগড়া ভয়ের
৪৭

শিবাজী মহারাজ
জন্য যেখানে ভাল হওয়ার কথাই বেশী, শিবাজীর
মতাে সাহসী লােক কি সেখানে না গিয়া বসিয়া
থাকিতে পারেন । বিপদের মধ্যে ঝাপাইয়া
পড়িতেই না বীরের আনন্দ ? শিবাজী বিপদের
কথা ভুলিয়া গিয়া, বাদশার দরবারের লাভের
কথাই ত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন। নাজানি
সেখানে গিয়া কি দেখিবেন! কি হইবে। কি
করিবেন। কি আনন্দ! কি আনন্দ।
বড় ছেলে শম্ভুজী, সাতজন বিশ্বাসী কর্মচারী,
আর চার হাজার সৈন্য সঙ্গে লইয়া শিবাজী
আগ্রা চলিলেন। পথ-খরচের জন্য লাখ টাকা
বাদশার তরফ হইতে তাহাকে দেওয়া হইল।
৪৮

সেদিন দিন বাদশার জন্মােৎসব। আগ্রা-দুর্গের ভিতরে লাল পাথরে-তৈরী দেওয়ান-ই- আম নামে মস্ত ঘরে দরবার বসিয়াছে। তার কত রকমের কত থাম, থামগুলি কি জমকাল। রেশমী কাপড়, কিংখাপে, মখমলে দেওয়াল আর থামগুলি কি সুন্দরভাবে মুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। তারপর আবার উৎসবের সাজসজ্জা! সাজের পর সাজ-ফুল, ফুলের মালা, নিশান, আরও কত কি! আসর জমকাইবার জন্য কত যে দামী আসবাবপত্র বাহির হইয়াছে, তাহার অন্ত দরবার-ঘরের মেজে খুব দামী রংদার গালিচায় ঢাকা, উপরে কত কত রঙের চাদোয়া। ঘরের সজ্জাও যেমন জমকাল, যেমন সুন্দর, সভার লােকজনের সাজসজ্জাও তেমনি। তাদের মাথায় রঙবেরঙের পাগড়ী, শালের রেশমের মসলিনের লম্বা লম্বা জামা-পায়জামা, কোমরে বাঁকা তলােয়ার, পায়ে শুভূতােলা জরির জুতা। নাই। ৪৯ শিবাজী মহারাজ বাদশার সিংহাসনের সামনে সেই মস্তবড় হল, আর তার আশপাশে রাজ্যের সব হােরা-চোমরা আমীর-উমারা ও তাহাদের লােকজনের বসিবার আসন। লােক-লােকের পরে লােক। যাহারা পদে মানে সকলের উপর, তাহাদের আসন প্রথম, তারপর ছােট-বড়র হিসাব-মতাে থাকের পর থাক। জন্মােৎসবে বাদশাকে সােনা-রূপা দিয়া ওজন করা হইয়া থাকে, তাহারও আয়ােজন হইয়াছে। বাদশার ওজন হইলে, এই-সব সােনা-রূপা গরীব- দুঃখীদের দান করা হইবে। শিবাজী রাজধানীর কাছাকাছি পৌছিলে বাদশার পক্ষ হইতে জয়সিংহের ছেলে রামসিংহ, আর মুখলিস খ, তাঁহাকে আদর করিয়া লইয়া যাইতে আসিলেন। শিবাজীর মনটা একটু দমিয়া গেল। রামসিংহ, কি মুখলিস, কেহই তেমন উচুদরের লােক নন। যাই হোক, যখন আসিয়াছেন, তখন শেষ পর্যন্ত দেখিতেই হইবে। দশজন সৈন্য আর পুত্র শম্ভুজীকে লইয়া শিবাজী

সেয়ানে সেয়ানে
রামসিংহের সঙ্গে দরবারে ঢুকিলেন। নবাব-বাদশার
সঙ্গে তাে খালি হাতে দেখা করিবার নিয়ম নাই;
শিবাজী তাই বাদশার ‘নজর’ পনর-শাে মােহর,
আর অন্য বাবদে ছয় হাজার টাকা সঙ্গে আনিয়া-
ছিলেন। উহা পেশ করা হইলে, বাদশা আওরংজীব
শিবাজীকে অনুগ্রহ দেখাইবার জন্য ডাকিয়া
বলিলেন,—আও শিবাজী রাজে!
শিবাজী কাছে গিয়া বাদশাকে দস্তুরমতাে
তিনবার কুনীশ করিলেন। তখন বাদশার হুকুমে
তাঁহার আসন ঠিক হইল, সামনের দুই সারির পর
তিন নম্বর সারিতে। তারপর বাদশা অন্য কাজে
মন দিলেন।
দেশ হইতে আসিবার সময় এই দরবারের
সম্বন্ধে কত সুখের কথাই না শিবাজীর মনে
উঠিয়াছিল। বাদশার সঙ্গে দেখা হইলে কত বড়
খেতাব, কত উপহার, কত বড় রাজ-সম্মান যে তিনি
পাইবেন, ভাবিয়াও স্থির করিতে পারেন নাই।
তাহার ফল হইল এই। বাদশা একবারমাত্র তাহার

শিবাজী মহারাজ
নামটি মুখে আনিয়া, তারপর তাহার কথা যেন
ভুলিয়াই গেলেন ।
পর পর দুই সারির পিছনে, তিন নম্বর সারির
যে জায়গায় শিবাজীকে আনিয়া ছাড়িয়া দেওয়া
হইল, সেখানে কেবল লােকের পরে লােকের আড়াল,
তাহার উপরে বাদশার একটু নজরও পড়িবার জো
নাই। শিবাজীকে ঠায় খাড়া হইয়া দাঁড়াইয়া
থাকিতে হইল। ইহার পর যখন তিনি শুনিলেন,
বাদশার পাঁচ-হাজারী মন্দার বা সেনাপতিদের
মধ্যে তাঁহার আসন হইয়াছে, তখন রাগে তাহার
গায়ের রক্ত যেন টগবগ করিয়া ফুটিতে লাগিল।
তিনি গলার সুর চড়াইয়া রামসিংহকে বলিলেন,-
কি! পাঁচ-হাজারীর ভিতরে আমি। আমার সাত
বছরের ছেলে না, পাঁচ-হাজারী—আমার চাকর যে
নেতাজী, সেও পাঁচ-হাজারী মনসবদার। আর আমিও
তাই! এই মান—এই তুচ্ছ পদের জন্যই কি বাদশার
হইয়া আমি এত করিয়াছি!—কোন্ দূর মারাঠা-
দেশ হইতে এত কষ্ট সহিয়া এতদূর আসিয়াছি।

সেয়ানে সেয়ান
রাগে অন্ধ শিবাজী নিজের অবস্থা ভুলিয়া, বাদশা
আর বাদশাহী-দরবারের আদব-কায়দার কথা ভুলিয়া,
যাহা মুখে আসিল, তাহাই বলিয়া জয়সিংহের ছেলে
রামসিংহকে বকিতে লাগিলেন। এত অপমানের
পর বাঁচিয়া থাকার চেয়ে মরণই ভাল মনে করিয়া,
তিনি নিজের গলায় নিজেই তলােয়ার বসাইবার
উদ্যোগ করিলেন। রামসিংহের তখন মহাভাবনা।
তিনি খুব ব্যস্ত হইয়া শিবাজীকে থামাইবার চেষ্টা
করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহার রাগ কি থামিবার ?
রাগে, দুঃখে, অপমানে অস্থির শিবাজী সভার
মধ্যে অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। দরবারের মধ্যে
চেঁচামেচি, তলােয়ারের আস্ফালন, তারপর মূচ্ছ।
চারিদিকে একটা বিষম হৈচৈ পড়িয়া গেল,
সকলেই ব্যস্ত হইয়া উঠিল। বাদশাও ডাকিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি হইয়াছে ?
সত্য কথা খুলিয়া বলিলে বাদশা হয় তাে
রাগিয়া শিবাজীকে খুব কঠিন শাস্তি দিবেন,
রামসিংহ তাই বুদ্ধি করিয়া বলিলেন,-বাঘ হ’ল

শিবাজী মহারাজ
বনের জন্তু, দরবারের গরম কি তার সহ্য হয় ?
মেজাজটা একটু বিগড়াইয়াছে।
বুদ্ধিমান বাদশা ব্যাপার বুঝিয়া মনে মনে
হাসিলেন। কিন্তু মুখে বলিলেন,—আচ্ছা, উহাকে
এখান হইতে সরাইয়া লইয়া যাও।
বাসায় ফিরিয়া শিবাজী বাদশাকে মন খুলিয়া
গালি দিতে লাগিলেন। তিনি স্পষ্টই বলিলেন
যে, তাঁর এখন আর মরিবার ভয় নাই। তাহাকে
মারিয়াই ফেলা হােক; এ অপমানের চেয়ে মরণই
ভাল।
এ-সকল কথা কি গােপন থাকে ? সব কথাই
বাদশার কাণে উঠিল। তিনি আরও চটিয়া গেলেন।
হুকুম হইল—নজরবন্দী করিয়া রাখ। কোথায় ?
শহরের বাইরে একটা বাড়ীতে। পাহাড়ে ইঁদুরকে
ততা কিছুমাত্র বিশ্বাস নাই, কাছাকাছি রাখিলে
কি-জানি কখন কি ঘটাইয়া বসে। শিবাজী
নজরবন্দী হইলেন। তঁাহার খবরদারীর ভার পড়িল,
রামসিংহের উপর।
1
৫৪

সেয়ানে সেয়ানে এই রামসিংহ, আর তাঁহার পিতা জয়সিংহের কথায় বিশ্বাস করিয়াই শিবাজী এতদূরে মােগল- দরবারে আসিয়াছিলেন। তাহার এই ফল দেখিয়া পিতাপুত্র দু’জনেই দুঃখিত হইলেন। শিবাজীকে দক্ষিণ-দেশ হইতে কিছুদিনের জন্য সরাইয়া দিবার ইচ্ছাই তাহাদের ছিল, আর কোনাে মতলব ছিল বলিয়া বােধ হয় না। তাহাকে ছাড়িয়া দিবার জন্য তাহারা অনেক করিয়া বলিলেন ; কিন্তু বাদশার মন এতটুকুও নরম হইল না। তিনি শিবাজীর জন্য আরও কড়া-পাহারার ব্যবস্থা করিলেন। শিবাজীর বাসা-বাড়ীর চারিদিকে কামান, গােলন্দাজ-সেনা, আর অনেক প্রহরী বসানাে হইল। এতদিনে বনের বাঘ খাঁচায় আটক হইল। পাহাড়ে, বনে, ইচ্ছামতাে ঘুরিয়া বেড়ানােই ছিল যার আনন্দ, সে এখন নজরবন্দী,বাড়ী ছাড়িয়া পাও তাহার নড়িবার উপায় নাই। শিবাজীর মনের ভাব কিরূপ হইল, তাহা তােমরা অবশ্যই বুঝিতে পারিতেছ। কিন্তু

শিবাজী মহারাজ
তিনি হা-হুতাশ করিয়া বসিয়া থাকিবার লােক
নন। কি করিয়া বাদশার হাত হইতে পার
পাইবেন,গণ্ডী কাটিয়া নিজের কোটে যাইবেন,
তাহাই হইল তাহার চিন্তার বিষয়।

একদিন
কদিন শিবাজী বাদশাকে বলিয়া পাঠাইলেন
যে, তাহাকে ধরিয়া রাখায় তাে কোননা
লাভ নাই, বরং ছাড়িয়া দিলেই লাভ। ছাড়িয়া
দিলে তিনি শুধু বিজাপুর-রাজ্য কেন, গােলকুণ্ডাও
তাঁহাকে জয় করিয়া দিবেন।
বাদশা জবাবে বলিলেন,—সবুর, ব্যস্ত কেন,
দিনকতক যাক না, তারপর দেখা যাবে।
শিবাজী বুঝিলেন, এ কেবল কথার কথা,
তাহাকে ভুলাইয়া রাখিবার ছলমাত্র। দিনকয়েক
পরে আবার জানাইলেন, ভারি একটা গােপন
কথা আপনাকে বলিতে চাই। কথাটা আপনার
খুব উপকারে আসিবে।
বড়-মন্ত্রী জাফর খা একেবারে আঁকাইয়া
উঠিয়া বলিলেন,—হুসিয়ার হুজুর! অমন কাজও
করিবেন না। লােকটা ভেল্কিবাজ, দমবাজ
যতদূর খারাপ হইতে হয়, তাই আর কি। তার সঙ্গে
গােপনে দেখা করিতে গিয়াছেন, কি মরিয়াছেন।
৫৭

শিবাজী মহারাজ
আওরংজীব বাদশাকে এতটা সাবধান না
করিলেও চলিত, কেননা তিনি দুনিয়ায় কাহারও
চেয়ে কম হুসিয়ার নন। তারপর আফজল খ
ও শায়েস্তা খাঁর নাকালের কথা, তখনও তাহার
মনে জ্বল জ্বল করিতেছে! তিনি শিবাজীর গােপন
কথা শুনিলেন না। শিবাজী শেষে মন্ত্রীকেই
ধরিয়া দেখিলেন, তাহাতেও কোন ফল হইল
না। তিনি বড়ই হতাশ হইয়া পড়িলেন।
ছেলেকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া আপশােষ করিতে
লাগিলেন,“হায় হায়! কি বােকামীর কাজই
করিয়াছি, কেন এখানে মরিতে আসিলাম ।
ভাবিতে ভাবিতে তাহার মাথায় একটা বুদ্ধি
জোগাইল। বাদশা, আর তার উজীর-নাজিরকে
খােশামােদ না করিয়া তিনি বিছানায় পড়িলেন,
-না জানি তাহার কতই অসুখ। বিছানা আর
ছাড়েন না। দেখিতে দেখিতে চারিদিকে তাহার
অসুখের কথা ছড়াইয়া পড়িল। অসুখও কি
যেমন-তেমন অসুখ ! তা কি সাধু-সজ্জনের দোয়া

সেয়ানে সেয়ানে
হইলে সারে ? এই দোয়া পাইবার অছিলায়
তিনি বামুন-পণ্ডিত, ফকির-সন্ন্যাসী, আর দরবারের
আমীর-উমারাদের বড় বড় ঝুড়ি করিয়া সন্দেশ
পাঠাইতে লাগিলেন। দু’জন লােক বাঁক বহিয়া,
ঝুড়ি ঝুড়ি মিঠাই লইয়া, বিলাইবার জন্য বােজ
সন্ধ্যাবেলা তাহার বাসা হইতে বাহির হইয়া
যাইত। প্রহরীরা দু’চার দিন ঝুড়ি পরীক্ষা করিল,
শেষে আর তাহা দরকার মনে করিল না।
বা, আর চাই কি?
এই তত সুযােগ—এই
সুযােগই যে তিনি এতদিন ধরিয়া খুঁজিতেছেন।
একদিন বিকালে শিবাজী প্রহরীদের
জানাইলেন, অসুখটা বড় বাড়িয়াছে; তাহারা
কেহ যেন তাহাকে বিরক্ত না করে। হিরাজী
ফরজন্দ, শিবাজীর এক বৈমাত্রেয় ভাই। ইহাদের
দু’জনকেই দেখিতে অনেকটা এক রকম। হিরাজী
একটা ভারি মজা করিলেন শিবাজী যে খাটে
শুইতেন, তাহাতে বেশ করিয়া লেপ মুড়ি দিয়া
শুইয়া রহিলেন, আর শিবাজীর ডান হাতে যে
;

শিবাজী মহারাজ
সােনার বালা ছিল, সেটা নিজের ডান হাতে
পরিয়া, সেই হাতখানা লেপের ভিতর হইতে বাহির
করিয়া রাখিলেন।
সেদিন দলে দলে লোেক সন্দেশের বাঁক লইয়া
বাহির হইতে লাগিল—শিবাজীর যে ভারি অসুখ।
অসুখের যেমন বাড়াবাড়ি, মিঠাই বিলাইবার ঘটাও
তেমনি,না হইলে কি রােগ সারে। প্রহরীদেরও
তেমনি বুদ্ধি কি না! মিঠাই নােজই যখন এমনি
করিয়া যাইতেছে, তখন তার আবার পরীক্ষা
কিসের ? তাহারা নিশ্চিন্ত হইয়া গোঁফে চাড়া
দিয়া, দরজায় পাহারা দিতে লাগিল।
আগে এক বাঁক, পিছনে এক বাঁক, আর
মাঝের বাঁকে শিবাজী ও তার ছেলে দু’জনে
দু’টি সন্দেশের ঝুড়িতে বসিয়া, সন্দেশ সাজিয়া,
মাথায় ঢাকনী চাপা দিলেন। তারপর গােলন্দাজ
বরকন্দাজ যে-যেখানে ছিল, সেইখানেই পড়িয়া
রহিল, তাহাদিগকে বােকা বানাইয়া তাহারা গণ্ডী
কাটিয়া বাহির হইলেন।
৬০

সেয়ানে সেয়ানে
মারাঠাদেশ হইতে শিবাজীর সঙ্গে যে
সাতজন কর্মচারী, আর চার হাজার সৈন্য
আসিয়াছিল, তাহারা বাদশার হুকুম পাইয়া
আগেই দেশে ফিরিয়া গিয়াছে। হিরাজীর পথ
যে সে নিজেই করিয়া লইতে পারিবে, তাহাও
শিবাজী ভাল রকমই জানিতেন। কাজেই তিনি
নিশ্চিন্ত।
এদিকে হিরাজী সারারাত ও তার পরের দিন
দুপুরবেলা পর্যন্ত • বিছানায় দিব্যি শুইয়া
কাটাইলেন। সকালবেলা প্রহরীরা ঘরে একবার
উকি মারিয়া দেখিল, কয়েদী লেপ মুড়ি দিয়া বেশ
ঘুমাইতেছে, আর ঘরের মেঝেয় বসিয়া একজন
চাকর তাহার পা টিপিতেছে। যে শুইয়া আছে,
তার হাতে সেই সােনার বালা। বাস, আর
কি দেখিবে ? প্রহরীরা নিশ্চিন্ত হইল ভাবিল
ঐ তো শিবাজী। বেলা যখন প্রায় তিনটা, হিরাজী
তখন আস্তে আস্তে চাকরটাকে লইয়া বাহিরে
আসিলেন। এতক্ষণে যে শিবাজী ছেলেকে লইয়া

শিবাজী মহারাজ
অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছেন, তার আর সন্দেহ
নাই। হিরাজী লােকটা যেমন চালাক, তেমনি
মজার ; ফটক পার হইতে হইতে শান্ত্রী-পাহারাদের
ডাকিয়া বলিলেন,—বহুৎ হুসিয়ার। গােল করিও
; শিবাজীর ভারি অসুখ, বুঝলে?
ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল, আর একটু একটু
করিয়া প্রহরীদের মনে সন্দেহ হইতে লাগিল,-
কয়েদীর ঘরে মানুষের সাড়াশব্দ নাই কেন ?
আগেকার মতাে আর তাে লােকজনও শিবাজীকে
দেখিতে আসিতেছে না। তাহারা তখন খবর
লইতে গেল।
ঘরে ঢুকিয়াই তাহাদের চক্ষুস্থির ।
পাখী যে উড়িয়াছে—শিকলী কাটিয়া! এখন
উপায় ? বাদশার যে রাগ! তিনি কি তাদের
সব-ক’টাকে আস্ত রাখিবেন ? প্রহরীরা হাঁপাইতে
হাঁপাইতে ছুটিয়া গিয়া পুলিসের সর্দার ফুলাদ
খাকে খবর দিল। খবর শুনিয়া ফুলদেরও
আক্কেল গুড়ুম! কিন্তু শেষটা অনেক ভাবিয়া-
চিন্তিয়া সাহসে ভর করিয়া দাড়াইলেন। তাহাদের

সেয়ানে সেয়ানে
দোষ কি? পাহারা দিবার কথা, তাহা তাে
তাহারা সাধ্যমতােই দিয়াছে। তবু যদি শিকার
হাত ছাড়িয়া পালায়, তােত তাহারা কি করিতে
পারে! ফুলাদ বাদশাকে একটা লম্বা সেলাম
জানাইয়া কহিল,-খােদাব! আমাদের কাহারও
কোনাে দোষ নাই দোষ সেই শিবাজীর। সে
হয় বেমালুম ডানায় ভর দিয়া উড়িয়াছে, নয়
মাটির নীচে ডুব মারিয়াছে। তাহা না হইলে
তাহার সাধ্য কি যে পালায় ? আমরা যে ঠায়
দরজায় দাঁড়াইয়া পাহারা দিয়াছি।
এ-সকল গাঁজাখুরি গল্পে বিশ্বাস করিবার লােক
বাদশা আওরংজীব নন। তিনি রাগিয়া উঠিয়া,
শান্ত্রী-প্রহরীদের উপর মহা তম্বি আরম্ভ করিয়া
দিলেন। তাঁহার মুখ হইতে শিবাজীকে ধরিবার
হুকুম বাহির হইতে না হইতে, ধর ধর’ করিতে
করিতে লােক ছুটিল । কেউ চলিল ঘােড়ায়
চাপিয়া, কেউ চলিল পায়ে হাঁটিয়া। কিন্তু শিবাজী
তখন অনেক দূরে। তাঁহাকে ধরিবার জন্য যে

শিবাজী মহারাজ
চেয়ে
লােক ছুটিবে, তাহা তিনি আগেই জানিতেন।
চালাকীতে তােত তিনি বাদশার
নন, বরং কিছু বেশী বলিয়াই বােধ হয়।
বাদশার লােকেরা যখন শিবাজীর নাগাল পাইবার
জন্য তাহার ঘরে ফিরিবার সােজাপথ-পশ্চিমদিকে
ছুটিয়াছে, তিনি তখন খাড়া পূব দিকে! কেউ
চিনিতে না পারে, তাই কখনও সাজিতেছেন
ফকির, কখনও সাজিতেছেন সওদাগর।
বাদশা কিন্তু লােক পাঠাইয়াও নিশ্চিন্ত হইতে
পারেন নাই; পুরস্কার ঘােষণা করিয়াছেন। তাঁহার
লােকেরা শিবাজীর নাগাল না পাইলেও, অপর
ললাকেরা তাে পুরস্কারের লােভে তাঁহাকে ধরিয়া
দিতে পারে।
পথও যেমন লম্বা, বাধাও তেমনি পায়-পায়,
পথও ফুরায় না, আর বাধা কাটিয়াও কাটে না।
এমন করিয়া দিন কাটিতেছে। কোনােদিন আহার
জোটে, কোনােদিন জোটে না, কিন্তু তবু পা
চলিতেছে—ক্রোশের পর ক্রোশ, দিনের পর দিন।
৬৪

সেয়ানে সেয়ানে
শেষে পা আর চলিতে চায় না, দেহও আর বয় না।
শিবাজী দেখিলেন, এক ঘােড়াওয়ালা ঘােড়া লইয়া
যাইতেছে—টাট্ট, ঘােড়া। অনেকদিন ঘােড়ায়
চড়া হয় নাই, পায়েও ব্যথা, তার উপর তাড়াতাড়ি
ঘরে ফিরিতে হইবে। শিবাজীর ঘােড়া কিনিবার
ভারি ঝোঁক হইল। ঘােড়াওয়ালাকে ডাকিয়া
ঘােড়ার দরদস্তুর করিলেন, কিন্তু দাম চুকাইয়া
দিতে গিয়া দেখেন, সঙ্গে টাকা-পয়সা কিছুই নাই
আছে খালি মােহর, হীরাজহরৎ। আচ্ছা, মােহর
মােহরই সই। ঝনাৎ করিয়া গােটাকতক
মােহর লােকটার দিকে ছুড়িয়া দিয়া, এক লাফে
ঘােড়ার পিঠে চড়িয়া বসিলেন।
লােকটা ত অবাক। একবার চায় মােহরের
দিকে, আর, একবার চায় ঘােড়সওয়ারের দিকে।
টাকার বদলে মােহর দেয়, এমন লােক তাে সে কখন
চর্মচক্ষে দেখে নাই। সে একেবারে চেঁচাইয়া
বলিয়া উঠিল,-“তুমি নিশ্চয়ই শিবাজী—শিবাজী!
শিবাজী তাহার মুখ বন্ধ করিবার জন্য মােহরের

শিবাজী মহারাজ
থলিটাই ঝনাৎ করিয়া ফেলিয়া দিয়া, ঘােড়ার পিঠে
শপাশপ চাবুক! ঘােড়া বাতাসের আগে ছুটিয়া চলিল।
কিন্তু তবু কি ফঁাড়া কাটিতে চায় ? ফৌজদার
আলী কুলী শিবাজীর পলাইবার খবর পাইয়া,
তাঁহাকে ধরিবার জন্য হুসিয়ার ছিল। তাহারএলাকায়
পা দিতেই, তাহার লােজনেরা সন্দেহ করিয়া
তাহাকে ধরিয়া ফেলিল ; কিন্তু ঠিক শিবাজী কিনা,
বুঝিতে পারিল না। রাত যখন দুপুর, শিবাজী চুপি
চুপি গিয়া ফৌজদারের সঙ্গে দেখা করিয়া বলিলেন,
ভাবছাে কি? আমিই সেই শিবাজী! ধরিয়ে
বকশিশ নেবে নাকি? তা সেবকশিশ না-হয় আমিই
দিচ্ছি। এই নাও না—বলিয়া শিবাজী একরাশ
হীরাজহরৎ তাহার চোখের সামনে মেলিয়া ধরিলেন।
এত হীরাজহরৎ ফেলিয়া কে আবার মানুষ ধরে।
বাদশার লােকেরাও তাঁহাকে ধরিতে পারিল
না, পুরস্কার-ঘােষণারও কোনাে ফল হইল না।
শিবাজী একদিন সত্যসত্যই ‘স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে
যে, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা দেশে গিয়া মায়ের কাছে

সেয়ানে সেয়ানে
দাড়াইলেন। আপনজনেরা, দেশের লােকেরা
আনন্দে পাগলের মত হইয়া উঠিল।
কিন্তু বাদশার ব্যবহারের কথা—তাহাকে যে
তিনি এতদিন ধরিয়া ভােগাইয়াছেন, তাহার কথা,
শিবাজী একদিনের তরেও ভুলিতে পারিলেন না।
তঁার যত শক্তি, যত তেজ, যত বুদ্ধি ছিল, সব এক
করিয়া বাদশার পিছনে লাগিলেন। মারাঠাদেশ
এক হইয়া ক্ষেপিয়া উঠিল। তারপর—যুদ্ধ আর
যুদ্ধ। কামানের ডাক, তলােয়ারের ঝন্‌ঝনা, আর
মারাঠাদের জয়ধ্বনিতে দক্ষিণ-দেশটা যেন ফাটিয়া
যাইতে লাগিল। বাদশার অনেক জায়গা-জমি,
অনেক কেল্লা দখল করিয়া, শিবাজী স্বাধীনতার
জয়পতাকা উড়াইলেন। বাদশা যতদিন বাঁচিয়া-
ছিলেন, মারাঠারা একদিনের তরেও তাহাকে
শান্তি েথাকিতে দেয় নাই। তাই মরণকালে তিনি
আপশােষ করিয়া বলিলেন,-রাজ্য-শাসন করিতে
হইলে সকল সময় সকল কাজ হুসিয়ার হইয়া
করিতে হয় ; এক পলের জন্য বেহুস হইলে যে
৬৭

শিবাজী মহারাজ
ক্ষতি, যে অনিষ্ট হয়, সারাজীবনেও আর তাহা
শােধরাইবার উপায় থাকে না। আমাদের এতটুকু
মনােযােগের অভাবে শিবাজী পলাইল, আর তার
জন্য আমাকে সারাজীবন কেবল ‘যুদ্ধ যুদ্ধ করিয়াই
হায়রান হইতে হইয়াছে। হায় রে হায়, কি ভুলটাই
করিয়াছিলাম।

জমপরাজয়
বাদশাকে
দশাকে অবাক করাইয়া, রাজ্যসুদ্ধ লােকের
মনে চমক লাগাইয়া দিয়া, অবশেষে
একদিন শিবাজী ঘােষণা দিলেন যে, তিনি
মারাঠাদের স্বাধীন রাজা, বাদশার কোনাে ধার
ধারেন না। খুব ঘটা করিয়া তিনি সিংহাসনে
বসিলেন, মহা জাকজমকে তার অভিষেক হইল।
সাহস বুদ্ধি চেষ্টা ও যত্ন থাকিলে মানুষ
করিতে পারে, হেন কাজ দুনিয়ায় নাই।
এই-সব গুণ তাে তাঁহার ছিলই, তা ছাড়া
যেসব গুণ থাকিলে মানুষ সত্যসত্যই মহৎ
হয়, সকলের
ও সম্মানের পাত্র হয়,
সে সব গুণও তাহার অল্প ছিল না ; তারই
একটি গুণের কথা বলিতেছি।'
অভিষেকের ব্যাপারে শিবাজীর খরচপত্র
হইয়াছিল বিস্তর—প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা।
তােষাখানা উজাড় হইয়া গিয়াছিল আর কি।
৬৯

শিবাজী মহারাজ
এই টাকাটা পােষাইয়া লওয়া দরকার, তাই
তিনি সদলবলে বাহির হইয়া পড়িলেন—নূতন
রাজ্য জয় করিতে। প্রথমেই চড়াও হইলেন
মাদ্রাজের কর্ণাটকের উপর ; দেশটি ধনধান্যে
ভরা—একেবারে লােনার দেশ। শিবাজীর
মালে-সৈন্য ভারি দুর্দান্ত, ইহাদের লইয়া কৰ্ণাটক
জয় করিতে শিবাজীকে মােটেই বেগ পাইতে হইল
। কাজ হাসিল করিয়া তিনি দেশে ফিরিলেন।
পিছনে তাহার অনেক সৈন্য। ফিরিবার মুখে
তাহারা বেলবাড়ি গ্রামে ঢুকিয়া বিস্তর রসদ
লুটিয়া লইল।
এই বেলবাড়িতে ছিল একটা কেল্লা
সামান্য মাটির কেল্লা। কেল্লাটি একটি স্ত্রীলােকের,
নাম তার সাবিত্রী বাঈ। খ্রীলােক হইলে কি
হইবে, দেশের মানকে তিনি জানের চেয়ে
ঢের বেশী মূল্যবান বলিয়া মনে করতেন।
শিবাজীর লােকদের কাণ্ড দেখিয়া তিনি দলিত
ফণিনীর মত ফোস করিয়া ফণা তুলিয়া
৭০

জয়পরাজয়
দাড়াইলেন।—স্ত্রীলােক বলিয়া বুঝি আমাকে এই
অবহেলা ! বিনা হুকুমে আমার মুলুকে পা
দেওয়া! আবার জোরজুলুম করিয়া আমার
লােকদের কাছ থেকে রসদপত্র কাড়িয়া লইয়া
বুক ফুলাইয়া যাওয়া ! রােসস দেখিয়া লইতেছি,
কত-বড় বীর, আর কি-রকম বেটাছেলে তােমরা।
-অন্ত্রের ঝনঝনায় দিক কঁপাইয়া তখনই
ঝাঁপাইয়া পড়িলেন মারাঠা-সৈন্যদের মধ্যে,
কতকগুলি মাল-বােঝাই গরু লুটিয়া লইয়া তবে
তিনি কেল্লায় ফিরিলেন।
খবর যখন শিবাজীর কাণে গেল, তখন
তাঁর রাগ দেখে কে! রাগটা যে শুধু সাবিত্রী
বাঈয়ের উপরই, তাহা নয়—নিজের লােকজনের
উপরও খুব হইল, তিনি তাহাদের ধিক্কার
দিতে কসুর করিলেন না। কত মহা মহা
বীরের শির শিবাজী তলােয়ারের ঘায় উড়াইয়া
দিয়াছেন, কত রাজা-বাদশা তঁাকে যমের মতাে
ডরায়, আর কিনা সামান্য একটি স্ত্রীলােকের
৭১

শিবাজী মহারাজ কাছে হার মাথা হেঁট হইল। প্রতিকার যে করিলেই নয়! শিবাজী সেনাপতি দাদজী রঘুনাথকে হুকুম দিলেন, বেলবাড়ির কেল্লা যেন মাটির ওপর খাড়া না থাকে—মাটিতে লুটাইয়া দিয়া আসিতে হইবে। দাদজী তখনই তােড়জোড় করিয়া ছুটিলেন বেলবাড়ির দিকে। সেখানকার লােজনেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাই তাদের উপর চড়াও হওয়া সহজ হইয়াছিল। দাদজী যাইতেছেন সম্পূর্ণ প্রস্তুত হইয়া,—যাইবেন আর তিন তুড়িতে কেল্লা ফতে করিয়া সাবিত্রী বাঈকে জব্দ করিবেন। কিন্তু হানা দিতে গিয়া দেখেন, কেল্লা নয়, যেন যমের দক্ষিণ-দুয়ার, আগাইয়া গেলে কাহাকেও প্রাণ লইয়া ফিরিয়া আসিতে হয় । সাবিত্রী বাঈয়ের হাতে তীরধনু, পিঠে তৃণ, কোমরে অসি-রণরঙ্গিণী বেশ ! ইঙ্গিতে তার শত শত বীর শির দিতে প্রস্তুত। দাদজী তিন- চারিবার দুর্গ আক্রমণ করিতে গিয়া বহুলােক ৭২ জয়-পরাজয় খােয়াইলেন। বুঝিলেন, এ বড় বিষম ঠাই মাটির কেল্লা হইলে কি হইবে, পাষাণের চেয়েও অটল ; যাহারা ইহাকে আগলাইতেছে, তাহারা নিমকের মান কি করিয়া রাখিতে হয় বিলক্ষণ জানে। দাদজী আর বেশী বল না দেখাইয়া কলেই কাজ হাসিল করিবার মতলব করিলেন- লােজন দিয়া কেল্লাটি ঘেরাও করিয়া রাখিলেন। ছােট্ট কেল্লায় কতই বা তীরধনু গুলিবারুদ আছে, আর কতই বা খাবারদাবার মজুত! কিছুদিন আটক রাখিতে পারিলে সব জিনিষেরই টানাটানি পড়িবে, দায়ে পড়িয়া রাণী সহজেই ঘাড় হেঁট করিবেন। কিন্তু দিনের পর দিন যাইতে লাগিল, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, তবু তাঁর কাবু হইবার লক্ষণ নাই। এক-একদিন দরজায় ঘা দিয়া দেখেন, যেন ভীমরুলের চাক?—একসঙ্গে শত শত বীর গর্জিয়া অস্ত্রের ঝনঝনা তুলিয়া রুখিয়া আসে! কি খাইয়া ইহারা বাঁচিয়া আছে, কিসের ৭৩

শিবাজী মহারাজ
জোরে ইহারা লড়িতে ভয় খায় না—তিনি ভাবিয়া
কিনারা করিতে পারেন না।
শিবাজী আর তার সেনাসামন্তের নিন্দায়
দেশ ভরিয়া গেল। সামান্য একজন স্ত্রীলােককে
সায়েস্তা করিতে পারে না-বাগে আনিতে
হিমসিম খায়। কি করিয়া ইহারা বড় বড়
লড়াইওয়ালার সঙ্গে লড়িয়া আসিল, বড় বড় লড়াই
ফতে করিল।
৭৪

দে
খিতে দেখিতে মাসখানেক কাটিয়া গেল।
দাদজী যে আশায় কেল্লা ঘেরাও করিয়া
রাখিয়াছিলেন, সে আশা একেবারে বিফল হইল না
—বেলবাড়ির কেল্লায় যে-সবগুলি বারুদ আর
খাবারদাবার ছিল, তাহা সত্যসত্যই ফুরাইয়া
আসিল। সাবিত্রী বাঈ দেখিলেন, না খাইয়া তিলে
তিলে মরার চেয়ে বীরের মতাে লড়াই করিয়া
মরা অনেক ভাল। তার যে-সব ধনদৌলৎ, দামী
দামী গহনা ছিল, একে একে লােকজনদের মধ্যে
বিলাইয়া দিলেন, তারপর সকলকে ডাকিয়া
বলিলেন—এস দেশের বীরপুত্র-সব, দেশের মান
রাখিবার জন্য-শেষবারের মত শত্রুর সঙ্গে
বল পরীক্ষা করি। যদি মরিতেই হয়, যত পারি
শনিপাত করিয়া মরি।তৎক্ষণাৎ কেল্লার মধ্যে
বিষম সাড়া পড়িয়া গেল। ‘জয় রাণীমাইকী
জয়’-রবে সবাই
আকাশ-বাতাস কাপাইয়া
তুলিল।

শিবাজী মহারাজ
প্রভাতের রাঙা আলাে কেল্লার তােরণ রাঙাইয়া
তুলিতে না তুলিতেই অস্ত্রে অস্ত্রে হাজার সূৰ্য্য
ঝলকাইয়া রাণী সদলে বিপক্ষের উপর ঝাঁপাইয়া
পড়িলেন। দুইপক্ষে তুমুল যুদ্ধ বাধিয়া গেল।
কিন্তু রাণীর সৈন্যসামন্ত নিতান্ত অল্প—মারাঠাদের
তুলনায় কিছুই নয়। শুধু বীরত্বের বলে তাহারা
কতক্ষণ যুঝিবে? যতক্ষণ দেহে প্রাণ রহিল, বিপক্ষের
কাছে তাহারা কিছুতেই হার মানিল না—অপূর্ব
বীরত্ব দেখাইয়া একে একে ধরায় লুটাইল।
সাবিত্রী বাঈকে অসহায় পাইয়া মারাঠারা চারিদিক
হইতে তাহাকে বেড়িয়া ধরিল—সপ্তরথীতে যেমন
অভিমন্যুকে ঘিরিয়াছিল। দিনের আলাে তখন
নিবিয়া আসিয়াছে—সন্ধ্যার আর বড় বাকি নাই।
এতক্ষণ অসংখ্য সৈন্যের সঙ্গে তিনি সমানে সমানে
যুঝিয়াছেন, দেহ ক্ষতবিক্ষত,
তিনি
লড়িতেছেন—মরিয়া হইয়া শনিপাত করিতেছেন।
হঠাৎ বিপক্ষের অন্ত্রের ঘায় তঁাহার ঘােড়া খোড়া
হইয়া পড়িয়া গেল। সাবিত্রী ভূয়ে দাঁড়াইয়াই
৭৬

জয়-পরাজয়
অস্ত্র চালাইতে লাগিলেন, কিন্তু শ্রান্ত বাহু আর
কতদিক সামলাইবে? চারিদিক হইতে তাঁহার
উপর অস্ত্র পড়িতেছে। যন্ত্রণায় রণশ্রমে শরীর
এলাইয়া পড়িল, তিনি মারাঠাদের হাতে বন্দী
হইলেন—তাহাদের উল্লাস-চীৎকারে আকাশ
ফাটিয়া পড়িতে লাগিল।
সাবিত্রী বাঈ বন্দী হইয়াও পার পাইলেন না।
মারাঠাদের মনের ঝাল তখনও মেটে নাই;
সেনাদের মধ্যে সখুজী গাইকোয়াড় নামে শিবাজীর
একজন আত্মীয় মুখে যাহা আসিল, তাহাই বলিয়া
তাহাকে গালাগালি করিল, আরও নানা রকমে
অপমান করিয়া মড়ার উপর খাড়ার ঘা দিল।
সাবিত্রী বাঈকে তারপর কোলাপুরে শিবাজী
মহারাজের কাছে হাজির করা হইল। লােজন
সহায়সম্পদ যাহা ছিল সব গিয়াছে, তাহার
উপর অপমান নির্যাতন! মনের তাপে সাবিত্রী
জ্বলিয়া মরিতেছেন। শিবাজীকে দেখামাত্র তিনি
সিংহীর মতাে গর্জিয়া উঠিলেন—যদি সত্যি-সত্যি
৭৭

শিবাজী মহারাজ
বীর হও, তবে দাও আমার হাতে অস্ত্র, বুঝে
নেব-মারাঠাদের রাজা বীর, না তার সেনাসামন্তের
মতােই একটা সামান্য দস্যু !
যে-সব সিপাইশান্ত্রী তাহাকে ধরিয়া আনিয়া-
ছিল, রাগে তাহারা দাঁত কড়মড় করিতে লাগিল।
এই স্ত্রীলোেকটি মহারাজের রসদ কাড়িয়া লইয়াছিল,
তারপর যুদ্ধ করিয়া কত সৈন্য আর কত
অর্থ ক্ষয় করিয়াছে, তাহার উপর এই স্পর্ধা ।
কড়া হুকুমের জন্য সবাই শিবাজীর মুখের দিকে
চাহিল।
স্নিগ্ধ শান্তস্বরে শিবাজী ডাকিলেন,—মা।
সভার লােজন হতভম্ব, সাবিত্রী বাঈ অবাক
—ডাকের অর্থ কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই।
শিবাজী তেমনি ঠাণ্ডাভাবে বলিলেন,—আজ
থেকে তুমি আমার মা। ছেলের দোষ কি মাকে
নিতে আছে ? মন ঠাণ্ডা করে তুমি তােমার নিজের
কোটে চলে যাও। বেলবাড়ির কেল্লা তােমার
হাতেই রইল।
৭,

জয়-পরাজয়
ক্ষতস্থানে বিষের ছােরাই বসিবে, ইহাই ছিল
সাবিত্রী বাঈয়ের বিশ্বাস; কিন্তু এ যে অমৃতের
প্রলেপ। তার দুই চোখ জলে ভরিয়া উঠিল—
মুখ দিয়া কোনাে কথা বাহির হইল না।
ব্রিাজী কড়া-গলায় হাকিলেন,-সখুজী।
ব্যাপার দেখিয়া সখুজীর প্রাণ আগেই উড়িয়া
গিয়াছিল, সে কাঁপিতে কাঁপিতে শিবাজীর কাছে
আসিল !
শিবাজী বলিলেন—অতি হীন কাপুরুষ তুমি।
আমি তােমার মুখ দেখতে চাই না। বেলবাড়ির
কেল্লাদার পত্নীর গায়ে হাত তুলে তুমি আমার
মায়ের অপমান করেছ। আমার সেনাদের মধ্যে
তােমার স্থান নেই—কারাগারই তােমার উপযুক্ত
স্থান।
শিবাজীর হুকুমে শাস্ত্রীরা তখনই সখুজীকে
কারাগারে লইয়া চলিল।
মায়ের জাতির সম্মান যে কি করিয়া রাখিতে
হয়—দেখিয়া সবাই অবাক হইয়া গেল। সভার

* * * * ) ,
শিবাজী মহারাজ
লােজনেরা চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না,
আনন্দে চীৎকার করিয়া উঠিল—“জয় শিবাজী
মহারাজকী জয়।

No text on this page.

No text on this page.

Shibajee Maharaj

Author
Bandhopadyay,brajendranath
Title
Shibajee Maharaj
File name
Shibajee Maharaj
Text
OCR done
Citation
1890
Published
2010/01/22
Publisher
M.c.sarker And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Jay Parajay
DLI number
513266
Barcode
4990010020261.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ZcLwXyHCMOE
Download PDF

Shibajee Maharaj