Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ekalobbo
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
একলব্য
(পৌরাণিক নাটক)
“জুপিটারে” অভিনীত
থম অভিনয়—বুধবার ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৩০
শ্রীবরদাপ্রসন্ন দাসগুপ্ত প্রণীত
মূল্য ৭০ অনা।
প্রকাশক- শাশুতোদ সেনগুপ্ত ১নং শ্যামবাজার স্ত্রী, কলিকাতা। প্রিন্টার—ঐবিষ্ণুচরণ শেঠ বি, এ, সেথ এণ্ড কোং-প্রিন্টিং হাউস। ৮২নং বলরাম দে ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
পাত্রপাত্রীগণ
দ্রোণাচাৰ্য
দুৰ্য্যোধন
অৰ্জ্জুন
অশ্বত্থামা
হিরণ্যধনু
•••
দ্রোণাচার্যের পুত্র
নিষাদ-রাজ
•••
- ৫০
•••
একলব্য
হিরণ্যধনুর পুত্র
হর্ষণ
বিদ্যাবিপর্যয়
জনৈক কুরুপক্ষীয় ব্রাহ্মণ
ক্ষত্রিয় কুমারগণ
ভানুমতী
হিরণ্যধনুর স্ত্রী
চিত্রা
ঐ পালিতা ব্রাহ্মণ কন্যা
নিষাদ বালিকা
অনুচর, কুৰুসৈন্যগণ, জনৈক সাধু, ভিখারী, নিষাদ-যুবকগণ,
নিষাদ বালিকাগণ, অবিদ্যাগণ, নাগরিকগণ ইত্যাদি।
বিনীত নিবেদন।
অন্যান্য বহুকার্যে ব্যস্ত থাকায় নিজে একলব্যের প্রুফ
সংশােধন করিতে পারি নাই। তজ্জন্য ইহাতে অনেক ভুল
রহিয়া গিয়াছে। সেজন্য পাঠক পাঠিকা ও অনুগ্রাহকগণের
নিকট মার্জনা ভিক্ষা করি। শুদ্ধিপত্র দিয়া পুস্তকখানিকে
অনর্থক ভারাক্রান্ত করা সঙ্গত মনে করিলাম না। আশা করি
পাঠক পাঠিকার পক্ষে ছাপার ভুল সংশােধন করিয়া পড়া দুরূহ
হইবে না।
বিনীত গ্রন্থকার
এক্ষ্য । প্ৰথম অঙ্ক। বনভূমি—নিষাদপল্লী—কাল অপরাহ্ন হর্ষণ জয়া ও অন্যান্য কিরাত যুবক যুবতীগণ। গীত। আজ উঠেছে হাসির বাতাস, খুসির কোলাহল- কালকে পাব মনের মতন অচিন গাছের ফল। ধিতাং ধিনা ধিন ধিনা, পরাণ দিয়ে পরাণ কেনা, বেঁধেছি গাটছড়। তাই ক্ষোড়ে জোড়ে সােহগে ঢ ঢল। চলে আয় সােণামানিক ! ধিকি ধিনি রূপেতে ঝলমল । ( প্রস্থান ) ( গুন্ গুন্ করিতে করিতে কলসীকক্ষে চিত্রার প্রবেশ বিপরীত দিক হইতে হিরণ্যধনুর প্রবেশ) হির। হঁারে চিত্রা, একা কোথায় আছে দেখেছিস? চিত্রা। দেখিনি, তবে সে কোথায় আছে আমি জানি। হির। কোথায় রে ? আমি তো তাকে কোথাও দেখতে পেলুম না।
একলব্য
।
চিত্রা। যেখানে বকুল তলায় ঘাসের পরে ছড়িয়ে আছে ফুলের রাশি,
যেখানে প্রজাপতি পাখনা মেলে দখিণ হাওয়ায়
বেড়ায় ভাসি,
যেখানে ‘বে কথা কও’ কেঁদে মরে দোয়েল শ্যামা
বাজায় বাঁশী,
আকাশে ইন্দ্রধনু দেখার আশে চেয়ে আসে সে উদাসী।
হির। সে কিরে! তুই যে কি বল্লি আমি তাে কিছুই বুঝতে
পালুম না।
চিত্রা। বুঝলে না বাবা! সে ঘাসের উপর আড় হয়ে শুয়ে আকাশ
পানে চেয়ে স্বপ্ন দেখছে।
হির। কোথায় ? চল দেখি, দেখি।
( একটী ধামা লইয়া ভানুমতীর প্রবেশ)
ভানু। এই অবেলায় কোথায় চলেছ গা?
হির। চলেছি ছেলেটাকে খুঁজতে। তােমার কি বল না ! তুমি
তার মা, অথচ’সে যে সকাল থেকে কোথায় গেল, সারাটা দিন বাড়ী
এল না, সে জন্য তােমার কিছুমাত্র ভাবনা চিন্তা নাই। তাই বলে আমি
তাে আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না।
ভানু। ভাবনার কারণ নেই, তাই ভাবিনি। আমি জানি সে
যেখানেই থাক নিরাপদে আছে, তার সময় হলেই সে আসবে ।
হির। তাতে আসবে। কিন্তু চিত্রা কি বলছে শুনছ ?
২
প্রথম অঙ্ক। ভানু। কি বলেছিস চিত্রা ? চিত্রা। কৈ, না,-আমি কি বলেছি ? হির। চিত্রা বলছে, সে নাকি বনের ভিতর ঘাসের উপর আড় হয়ে পড়ে আকাশ পানে চেয়ে স্বপ্ন দেখছে। আর ওর কথায় বুঝলুম এটা তার পক্ষে কিছু নূতন নয়, এরকম প্রায়ই হয় ; বেদের ছেলে- শীকার করবার ঝোঁক নাই, হাতের তাগ ঠিক করবার চেষ্টা নাই, দিনের বেলা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা--এততা নিছক পাগলের লক্ষণ। তারপর কোন দিন এই রকম স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ সাপে খাবে কি বাঘে খাবে তাই বা কে জানে ? ভানু। ভুল তােমার। বেদের ছেলে সে বটে—কিন্তু জন্ম তার ব্রাহ্মণের আশীর্বাদে। মনে করে দেখ হির। তাতে জানি। কিন্তু ভানু। জান যদি, তবে কেন ভুলে যাও যে ব্রাহ্মণ সে না হলেও ব্রাহ্মণের তপস্যায় তার কিছু অধিকার আছে। সে হরিণ মারা ছেড়ে দিয়ে নির্জনে বসে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখবে, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে ? আর হিংস্র জন্তুর ভয় কচ্ছ? সাধ্য কি তারা—তার কাছে ঘেসতে পারে ? আমি তার মা—আমি যে অষ্টপ্রহর তাকে বুকদিয়ে ঘিরে রয়েছি। আমি বেঁচে থাকতে—যা খামখা ভেবে মন খারাপ করাে না। ঘরে যাও, সে আপনিই আসবে । যা চিত্রা,-হাঁ করে দাড়িয়ে থাকিস নে। তাড়াতাড়ি জল নিয়ে আয়, ঘরে এক ফোঁটা জল নেই। ( চিত্রা ও ভানুমতীর ভিন্ন দিকে প্রস্থান)
একলব্য।
হির। যেমন মা তেমি ব্যাটা—দুই-ই পাগল ! যাই দেখি ছেলেটা
কোথায় গেল।
( হর্ষণ ও জয়ার প্রবেশ )
গীত।
হণ।
তুমি বুঝি ভেবেছ মনে-প্রেমটা ভারি সস্তা ?
চাইলে পরেই যায় তা পাওয়া বস্তা বস্তা বস্তা ?
আমি জেনেছি মনে—তুমি চাও মনে মনে
( নােলা ঝরে গােপনে)-
আমার মত কচি ছেলে, লঘুপাক ও খাস্তা।
শুধু পাওনা খুজে রাস্তা।
প্রেম নয় ডালা কুলো, হাড়ি কুড়ি, দেরকে কিম্বা লোটা,
প্রাণের গাছে ব্যংধার সে ফল নাইক তাহার বোটা
ছিড়তে গেলেই কেলেঙ্কারী অশেষ দুরবস্থা।
সে যে হীরেমাণিক খাটী সােণা নয়কো পিতল দস্তা।
হষণ।
হর্ষণ। দেখ, জয়া।
জয়া। কিরে বেহায়া ?
হর্ষণ। দেখ, আমি ঠিক করেছি
আমি ঠিক করেছি আমি বৈরাগী হব। তুইও
বােষ্টমী হ।
জয়া। কেন বৈরাগী হবি আগে শুনি?
হর্ষণ। আমি বেশ দেখে নিয়েছি, সংসার না ছাড়লে প্রাণ খুলে
প্রেম করা যায় না।
জয়া। কিসে বুঝলি ?
৪
প্রথম অঙ্ক।
হর্ষণ। কেন আমার দাদা একলব্যকে দেখে। চিত্রাদি’তে আর
তাতে গলায় গলায় ভাব। এমনভাব কখনাে কারু হয় নি। তাই
দেখনা তারা দুজনের একজনও সংসারের ধার ধারে না,সারাদিন
শুধু জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে।
জয়া। হু। তুই যদি তা করিস তাহলে আমি কি করব জানিস ?
হর্ষণ। প্রেমের তাতে গলে জল হয়ে যাবি আর কি
জায়া। উহু।
হর্ষণ।
তবে ?
জয়া। পেত্নী হয়ে তাের ঘাড় মট্রাব।
হর্ষণ। না না তা করিস নি। তাতে বড় সুবিধে হবে না-
?
তােরও না আমারও না ।
জয়া।
তবে তুইও বৈরাগী হােসনে। তার চেয়ে এক কাজ
করি আয়।
হর্ষণ। কি
বল
দেখি
জয়া। আয় ওদের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে সত্যিকরে মিলন করে দিই
নইলে চিত্রাদির চোখের জল আর দেখতে পারি না।
হর্ষণ।
জয়া। তবে তুই কি জানিস ? সে রােজ লুকিরে কঁাদে। আমি
দেখেছি।
হর্ষণ। দেখ, তবে বলি আমিও দাদাকে নিরিবিলি বসে খামখা
চোখের জল ফেলতে দেখেছি।
জয়া। ওরে জানিস না তাে-ওকেই বলে ভালবাসা। নইলে
সে কিরে ।
?
একলব্য।
w
তাের আমার কি ভালবাসা? এ যেন চকমকি আর লােহার ঠোকাঠুকি,
-খালি ফিকি ছুটছে আর আগুণ বেরুচ্ছে।
হর্ষণ। তাইতাে! ওরা দুজনে ভালবেসে শুধু কেঁদেই মরবে? না না
তা কখনাে হতে পারে না। এর একটা বিহিত কর্তেই হবে। চল
একটা মৎলব পাকাই গে ।
জয়া। হা হা সেই ভাল চন্--
এক
গীত।
প্রেম ছিড়তে গেলে কেলেঙ্কারী অশেষ দুরবস্থা।
সে যে হীরে মানিক খাটী সােণা নয়কো পিতল দস্তা।
উভয়ের প্রস্থান)
( চিন্তিতভাবে একলব্যের প্রবেশ)
এক। কাল বীরাষ্টমী। “সমস্ত দিন উৎসব, শীকার, নৃত্যগীত
আমােদ প্রমােদ, তারপর সন্ধ্যায় যে যার মনের মতনটি বেছে নিয়ে
বিবাহের আনন্দে মাতােয়ারা হয়ে উঠবে ? কত আশা ওদের মনে,—কত
স্ফুর্তি, কত উৎসাহ! আমি কেন ওদের সঙ্গে মিশতে পারি না, কেন
এই সব কোলাহল হতে দূরে থাকতে চাই, কেন স্বপ্নের নেশায় বিভাের
হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই? আমি কি চাই? কেন চাই?
কোথায় তার আরম্ভ ? কোথায় তার শেষ ? কে আমায় বলে দেবে ?
( হর্ষণের পুনঃ প্রবেশ)
হর্ষণ। দাদা। দাদা!
এক। কে ? হর্ষণ! কি বলছিস্?
--
প্রথম অঙ্ক।
হর্ষণ। বলছি এই, কাল বীরাষ্টমী। তুমি অন্ততঃ এই দুটোদিন
মুখভার করে থেকো না। অন্ততঃ এই দুটোদিন তুমি স্বপ্নের খােলসটা
ছেড়ে ফেল।
ফক। পাগল!
হর্ষণ। পাগল বড় নই। চিত্রা দি’কে দেখে এলাম জল আনতে
গিয়ে ঝর্ণর ধারে বসে কাদছে।
এক। সেকিরে! তুই সত্যি বলছিস ?
হর্ষণ। সত্যি মিথ্যা তাকে জিজ্ঞাসা কলে জানতে পারবে। ওই
আসছে।
আমি পালাই।
( প্রস্থান)
(গাহিতে গাহিতে চিত্রার প্রবেশ)
গীত।
চিত্র।
আকাশের ওই রাঙ্গামেঘের জাল
টেনে নেয় কোন অজানায়, হ’ল যে মাের কাল।
এক। একি! এ যে আমারই মনের কথা।
গীত
চিত্রা। আকাশের ওই রাঙ্গা মেঘের জাল
টেনে নেষায় কোন অজানায়, হ’ল যে মাের কাল !
আমার মনের ফুলকলি পাপড়ী খোলে আপন ভুলি,
বুলিয়ে যায় কে রঙ্গের তুলি নিতুই সাঁঝ সকাল।
সে যে পড়তে ঝরে চায়না ফিরে একিরে বেচাল ।
৭
একলব্য।
এক। চিত্রা! চিত্রা! ;
চিত্রা। কি !
এক। (মুহূর্তকাল তাহার চোখে চোখে চাহিয়া ) তুমি, তুমি না
কিছু না
চিত্রা। বলবে না আমায় ! বল না।
এক। চিত্রা, আজকের দিনে সবাই আনন্দে মেতে আছে।
তােমার মুখে কেন মেঘের ছায়া ? তােমার গান কেন বাদল
চিত্রা। আগে তুমি বল, তুমি কেন সবাইকার সঙ্গে মিশে আনন্দ
কচ্ছ না। কেন নিত্যিকার মত আজও একলাটী বনে বাদাড়ে ঘুরে
বেড়াচ্ছ ? বছরে এই দুটো একটা দিনও কি তােমার স্বপ্ন দেখা বন্ধ
রাখতে পার না?
এক। চিত্রা! চিত্রা! জানতে তুমি, আমি কি স্বপ্ন দেখি,
কার স্বপ্ন দেখি। এই স্বপ্নটুকু হারিয়ে গেলে, আমার মনে হয়
আমার জীবনটাই অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই
চিত্রা। এ জীবনটা কি তবে শুধু স্বপ্ন দেখে দেখেই কেটে যাবে ?
সত্যিকার ধরা ছোঁয়া কোনকালে হবে না?
এক। আমার যে ভয় করে ,মাকড়সার জালের চেয়েও মিহি
এই স্বপ্নের জাল যদি ছুঁতে গেলে ছিড়ে যায়। কাছে যেতে
ভয় করে,
কি জানি যদি দূরের পাওয়া কাছে গেলে হাওয়ায়
মিশে যায় ?
বা। কিন্তু আমি যে আর পারি না। স্বপ্ন দেখে দেখে আমার
প্রথম অঙ্ক।
বুক পিপাসায় ভরে উঠেছে। আকাশ আমার মেঘে ছেয়ে আছে কিন্তু
এক ফোঁটা জল নাই। প্রাণটা আমার কেঁদে মচ্ছে—“ফটিক জল !
ফটিক জল ! ফটিক জল !”
এক। তাতে জানতেন না। চিত্র। আমি ভারি বােকা তাই বুঝতে
পারিনি ! আমারও প্রাণটা এক এক সময় অমি কেঁদে ওঠে। আমি
তাকে টু টিটিপে চুপ করিয়ে দিই। যাক, যা হবার হয়েছে। আর নয় ।
চল আমরাও ওদের সঙ্গে মিশে আনন্দ করিগে। তারপর কালকের
উৎসব শেষে স্বপ্ন ছেড়ে সত্যের দেশে পা দেব। সত্যটাকেই আমরা
স্বপ্নের মত মিষ্টি করে তুলব। নয় চিত্রা?
চিত্রা। যাবে ? সত্যি বলছ ? চল তবে, এখুনি।
এক। চল, আগে বাবা মার আশীৰ্বাদ নিইগে—
( হিরন্যধনুর প্রবেশ)
হির। কিসের আশীৰ্বাদ রে একা?
এক। না এই বলছিলাম,—এই—চিত্রা আর আমি,-না—এই,
আমি অর চিত্রা—তাই বলছিলাম-এই কালকের উৎসবের পর--
হির। বুঝেছি। কিন্তু তা হবার নয়।
কেন বাবা ?
চিত্রা। কেন হবার নয় বাপ ?
হির। শুনতে চাস ? শােন্। সেইতে শুনতেই হবে।-একা!
চিত্রা আমাদের কেউ নয়। আমরা বেদে বড় ছােট জাত। আর
চিত্রা হিল বামুনের মেয়ে।
এক। বামুনের মেয়ে!
একলব্য। চিত্রা। সে কি! এক। তাহলে চিত্রা অামাদের ঘরে এল কেমন করে ? হির। আমি অনেকদিন আগে একবার দূর দেশে গিয়েছিলাম। সে অনেকদূর।–বারানসী যাবার পথ। সন্ধ্যার মুখে পথের ধারে একটা বড় গাছতলায় একদল তীর্থযাত্রী বিশ্রাম কচ্ছিল। আমি ত একপাশে একটু যায়গা করে নিলুম। শেষ রাত্রে তাদের মধ্যে একটী বিধবার বিচিকা হল, সকালে সে মারা গেল। তার সঙ্গে একবছরের একটী মেয়ে ছিল। মেয়েটী সারারাত্রি কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারা সব বিশ্বেশ্বর দর্শনে চলেছে,সংসারের যত পাপ সেইখানে গিয়ে ক্ষয় করবে, তারা কি দেরী কর্তে পারে ? তারা আর এসব ছােটখাট ব্যাপারের জন্য মাথা ঘামালে না, সেই মরা মা আর জ্যান্ত মেয়েকে সেই পথের ধারে গাছতলায় ফেলে অনায়াসে চলে গেল। সেই মেয়ে,—এই আমি তাদের জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলুম চিত্রা বামুনের মেয়ে। চিত্রা। হতে পারি আমি বামুনের মেয়ে। নিজে কিন্তু আমি বামুন নই। আমিও তােমাদেরই মত বেদে। আমি বেদিনী মায়ের মাইদুধ খেয়ে বড় হয়েছি, বেদেবাপের এটো খেয়েছি, ছেলে বেলা থেকে বেদে বেদিনীই দেখেছি, তাদেরই মত হয়েছি। বাবা, মানুষের ছােট ছেলে মেয়ে যদি বাঘের গর্তে বাঘিনীর দুধ খেয়ে বড় হয়, তবে সেও বাঘই হয় মানুষ থাকে না। হির। তা জানি না। কিন্তু ভেবে দেখ দেখি ঘটনাচক্রে বাঘ হয়ে আমি তােকে তাের নিজের যায়গা থেকে কতখানি নীচে টেনে নামিয়েছি। তা যদি না কৰ্ত্তম তবে আজ তুই কোথায় থাকতিস ? চিত্রা। ?
প্রথম অঙ্ক। চিত্রা। থাকতুমইনা। থাকবার কোন দরকারও তাে দেখছি না, যদি এমন করেই বেঁচে থাকতে হয় । হির। শােন্ আমি তােকে তাের যায়গা থেকে যতখানি টেনে নাবিয়েছি তা দায়ে পড়ে, অন্য কোন উপায় ছিল না বলে। তাতে যদি কিছু পাপ হয়ে থাকে তা আমারই হয়েছে। তুই না জেনে যা করেছিস তাতে তাের কোন পাপ হয়নি। যদিও বা হয়ে থাকে তা খুবই সামান্য সামান্য প্রায়শ্চিত্তেই তার প্রতিবিধান হতে পারে। কিন্তু আমার জ্ঞানকৃত পাপ আর বাড়াব না। তােরা যা চাস ৩ যদি আমি আজ তােদের দিই তবে ত শােধরাবার আর কোন উপায় থাকবে না। এক। কিন্তু বাবা, এখনাে যে শােধরাবার উপায় আছে তা কি তুমি ঠিক জেনেছ ? যদি জেনে থাক তবে এতদিন তা করনি কেন? এখনই বা কচ্ছ না কেন? ভেবে দেখ চিত্রা মিথ্যা বলে নি। সে এখন আর ব্রাহ্মণী নয়। সে বেদিনী। হির। শােধরাবার উপায় আছে তা জেনেছি কিন্তু পথ পাইনি। আমার সােমত্ত মেয়েকে তত আর আমি পথে বারকরে দিতে পারি । যেদিন তেমন কোন ব্রাহ্মণ-সন্তানকে খুঁজে পাব যে সব জেনেও একে নিতে চায়, যার হাতে একে অনায়াসে তুলে দিতে পারি, সেই দিন চিত্রা তার নিজের যায়গায় ফিরে যাবে। তা যতদিন না পাব ততদিন সে আমাদের ঘরেই থাকবে, কিন্তু তার বিয়ে হবে না। এক। যদি তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তেমন লােক খুঁজে না পাও ? হির। তবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চিত্রা কুমারী থাকবে। শােন একলব্য। চিত্রা।—এতদিন তুই যা জানতে পারিস নি আজ তা জেনেছিস। আজ থেকে তুই আর আমাদের ছোঁয়া জলটুকু পৰ্যন্ত খানে। আমাদের চুসনে,—আমাদের মা রে বসিনে, আমাদের ছায়া মারাস্ নে। আজ- কের রাতটুকু ওই গাছতলায় কাটিয়ে দে তারপর কাল সকালে আমি ততার জন্য আলাদা পাতার কুঁড়ে বেধে দেব। তােকে জেনেশুনে পাপ কর্তে আমি দেব না। চিত্রা। না, না বাবা তা হবে না। আজ আমি তােমার এঁটোই খাব। আমি বলেছিতাে বাবা ! আমি ব্রাহ্মণী নই, আমি জপ জানিনা, তপ জানিনা, তন্ত্র মন্ত্র আচার বিচার কিছু জানিনা। আমি জানি তীর ছুড়তে, বর্ষা বিধতে! বাঘের মুখে হাতপুরে দিয়ে তার জিভ টেনে ধর্তে। জান? আমি যে বেদের মেয়ে-বেদিনী। এই বেদের ছেলেই আমার বর। আমার বিয়ে তুমি না দাও নাই দেবে,--মনে মনে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে আমাকে ঘর থেকে বার করে দিতে চাও কেন? বামুনের ছেলের সঙ্গে আমি যাব কেন? আমি যদি না যাই তবে তুমি আমায় কেমন করে তাড়াবে। হির। চিত্রা। তুই তাে ভারি মুস্কিলে ফেলি আমায় ! কেন পাগলামী কচ্ছিস বল্তো ? আমি যা বল্লম, একবার ভেবেদেখ,- তারপর এক। আচ্ছা, কেন বাবা- হির। চুপ কর। চিত্রা যা বলছে তার মানে বুঝতে পারি, কিন্তু তুই বলছিস তা তো আমি বুঝতে পাচ্ছি না। তুই যদি সত্যি ওকে ভালবাসিস, তবে ওর ভাল না চেয়েওকে কেন চাইছিস ? যে ১২
প্রথম অঙ্ক।
উচু যায়গায় ও উঠতে পারে সেখানে ওকে তােলবার চেষ্টা না করে
তাের নিজের কাছে তাকে টেনে নামাতে চাইছিস কেন?
এক। ঠিক, ঠিক বলেছ বাবা,আমার ভুল হয়েছিল।
চিত্রা। না, না, না, তােমার ভুল হয়নিকক্ষনাে হয়নি। ভুলই
যদি হয়ে থাকে তবে সেই ভুলকেই সারা জীবন আঁকড়ে ধরে থাক।
তাকে শােধরাবার চেষ্টা করােনা, চিত্রার বুকে নিজের হাতে ছুরি
বসিও না। বাবা, তুমি কাকে ঠেলে ওপরে তুলতে চাও ? এই রক্ত
মাংসের চিত্রাকে ? ভুল তােমার,—সে যেখানে আছে সেইখানেই থাকবে
তাকে একচুলও নড়াতে পারবে না। যখন এই রক্তমাংস ঝরে গিয়ে
শুধু শুকনাে পাঁজরা খান পড়ে থাকবে তখন তাকে যত উচুতে ইচ্ছা
তুলে রেখে দিও-কেউ বারণ করবে না। কিন্তু এখনো তার দেরী
আছে জেনাে।
( প্রস্থান)
হির। হু।
এক। আচ্ছা বাবা, চিত্রাতে আমাতে অনেক তফাৎ না?
হির। অনেক তফাৎ। স্বর্গ আর নরকে যতখানি তফাৎ, বামুনে
আর বেদেতে ঠিক তেমনি তফাৎ।
( বিদ্যাবিপর্যয়ের প্রবেশ)
বিদ্যা। যাক। কোনক্রমে তাে ঠিকানায় এসে পৌঁছান গেল।
কিছ এসে ভাল করেছি কি মন্দ করেছি তাতে ঠিক বুঝতে পাচ্ছি না।
পথে আসতে আসতে শুনলুম এরা নাকি বড় ভয়ানক লােক। এরা
নাকি মানুষ খায়, আর এদের রাণী নাকি শাস্ত্রজ্ঞ বাহ্মণের মুড়ে
দিয়ে অম্বল খেতে খুব ভালবাসে। তদুপরি বনে বাঘের ভয়, ভুতের ভয়,
একলব্য।
?
এবং মশার উপদ্রব। রাত কাটাবার জন্য একটা নিরাপদ স্থানও চাই।
ভেবে আর কি করব, এসে যখন পড়েছি তখন যেন তেন প্রকারেন
এদের আতিথ্যগ্ৰহণ কৰ্ত্তে হবে। তারপর হয় আমার মাথা যাবে নয়তো
এদের কাছ থেকে ভােজন দক্ষিণা আদায় করব। আঁ এই যে দুটো
লােক। আমায় দেখতে পেয়েছে নাকি।
এক। তাই তাে বাবা, তাহলে উপায়
হির। জানিনা। বুঝতে পাচ্ছি না। উপায় হয় যদি কোন
ব্রাহ্মণ সন্তানকে পাই, আর কোন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণের কাছে বিধান নিতে
পারি।
বিদ্যা। কি চাই ? কি চাই?
চাই ? কি চাই? ব্রাহ্মণ সন্তান? পাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ ?
একাধারে উভয়ই আমি উপস্থিত ।
হির। আপনি
বিদ্যা। আমি শ্রীবিদ্যাবিপৰ্যয় শৰ্মা, বাহস্ফোট ঠাকুরের সন্তান,
বিস্ফোটক আচার্যের শিষ্য সৰ্ব্বশাস্ত্রে অজ্ঞ, কুলে শীলে বিদ্যায় অবিদ্যায়
নিদানে বিধানে টিকিতে তিলকে সর্ববিষয়ে পারদর্শী,—ঠিক তুমি যা
চাইছ তাই। অতএব পূৰ্ব্বাহ্নে দক্ষিণাটী শ্রীচরণ সমীপে রক্ষা করে
তােমার কি প্রয়ােজন বাক্ত কর। আমি প্রাপ্তিমানে ভােক্তব্য-সঙ্গে
সঙ্গে উপায় করে দিচ্ছি।
হির। দেবতা প্রণাম হই। আপনি কে, কোথা থেকে এসেছেন।
বিদ্যা। তুমি তাে বড় অর্বাচীন হে। এইমাত্ৰ বৰ্লম আমি শ্রীবিদ্যা-
বিপৰ্যয় শৰ্মা, বাহ্যস্ফোট ঠাকুরের সন্তান
এক। ঠাকুর, আমরা মূখ খু বেদে। অমরা কি অত লম্বা লম্বা
১৪
প্ৰথম অঙ্ক ।
কথা মনে রাখতে পারি ? আর কোথা থেকে এসেছেন কেন,
এসেছেন তাতে বলেন নি।
বিদ্যা। শনৈঃ পন্থা শণৈঃ পন্থা শনৈঃ পৰ্বত লন—অর্থাৎ কথা
বলতে হবে ধীরে, এক একটী করে। তুমি একেবারে সবটা উদরস্থ
কর্ডে চাইলে চলবে কেন? আমার প্রয়ােজনও বলব,তবে তােমাদের
কাছে নয়। আমি তােমাদের অধিপতিকে চাই, তার নিকট আমার
কিছু ব্যক্তব্য আছে।
হির। আপনার যা বলবার আমাকে বলুন তা হলে আপনার কাজ
হবে।
বিদ্যা। আরে দূর।
আরে দূর। তাও কি হয়! তুমি
কি হয়! তুমি হলে একটা কেউ
কেটা কিস্তুত কিমাকার। সে সব অতি গুরুতর ব্যাপার তােমাকে কি
বলা চলে। তােমরা তাকেই ডাক, তারি কাছে আমি সব বলব।
হরি। আজ্ঞে আমিই সে-যাকে আপনি খুজছেন।
বিদ্যা। আঁ! বলে কি! আমি তা হলে এতক্ষণ কাকে কি
বলছিলাম? তা হলে তাে দেখছি ঘাটান ভাল হয়নি। নাঃ ভড়কান
হবে না। ( প্রকশ্যে ) তােমরা তো দেখছি বড় ভয়ানক লােক।
আমাকে দুঃখিনী অনাথিনী পেয়ে এতক্ষণ ঠকাবার চেষ্টায়
ছিলে ।
একা। আঁজ্ঞে আমরা তাে আপনাকে ঠকাবার চেষ্টা করি নি।
আপনি নিজেইতাে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। এইমাত্র তােত আপনি
বলেন আমার বাবার সঙ্গে আপনার দরকার।
বিদ্যা। আঁ বল কি হে ছােকরা! তােমার বাবা!
বাপ।
একলব্য। একা রামে রক্ষা নাই, সুগ্রীব তার দোসর। একা তােমাকে এটে উঠতেই আমার ধনুষ্টঙ্কার হবার উপক্রম, তদুপরি আবার বাবা কিরে বাবা ? হির। না, না, আপনার কোন চিন্তা নাই। আপনার কি দরকার নির্ভয়ে বলুন। বিদ্যা। তা বাপু চিন্তা একটু কর্তে হয় বৈকি ;-কঁচ। মাথাটা হাতে করে যখন তােমার বনে এসে ঢুকেছি। আর তা ছাড়া যা আমি তােমাকে বলব তাতে তুমি আল্লাদে আটখানা হয়ে আমায় আলিঙ্গন করবে না নিশ্চয়। হির। আপনার কোন চিন্তা নাই। আপনি যা বলতে চান নির্ভয়ে বলুন। বিদ্যা। আচ্ছা আচ্ছা আগে তুমি বল দেখি তুমি শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ খুঁজছিলে কেন? হির। আমি ব্রাহ্মণ খুঁজছিলেম একটা প্রায়শ্চিত্তের বিধান নেবার জন্য। সে এরপর আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলব। এখন আপনার প্রয়ােজন বলুন। বিদ্যা। প্রয়ােজনটা এই, আমি এসেছি হস্তিনাধিপতি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি অনুসারে। আমাদের ব্রাহ্মণ পল্লীতে একেবারে নস্থানং তিলধারণং। তাই আমারা কিঞ্চিৎ ভূমির জন্য রাজার নিকট আবেদন করেছিলেন। তিনি আমাদের এইস্থানে ভূমি দিতে চেয়েছেন তার ইচ্ছা এই মনােরম স্থানটীকে তিনি ব্রাহ্মণেভ্যো নমঃ করেন। তাই আমি স্থানটা প্রদর্শন কর্তে এসেছি। আমি ফিরে গিয়ে তাঁকে অনুমতি প্রথম আঙ্ক। কল্লেই তিনি আদেশ প্রদান করবেন। আমি আপাততঃ আজ রাত্রির মত তােমার অতিথি, মাথা রাখবার জন্য একটু নিরাপদ স্থান চাই। সে কি! আমাদের কি তাহলে এখান থেকে উঠে যেতে হবে ? বিদ্যা। তা একরকম হবে বৈ কি। ব্রাহ্মণ পল্লীতে তােমরা বেদে হয়ে কি করে আর থাকবে বল ? হির। সে কি ঠাকুর, এখানে যে আমাদের বহুপুরুষের বাস। এখানকার আকাশ বাতাস গাছপালা ঝরণা সবই যে আমাদের অনেক কালের বান্ধব। আমাদের বাপ পিতামাে’র হাড় এই মাটীতে মিশে আছে—এখানকার মাটীতে তাদের শেষ নিশ্বাসের পরশ লেগে আছে। এ বন ছেড়ে আমরা যাব কেন ? বিদ্যা। রাজার আদেশ হলে যেতেই হবে। আমরা হচ্ছি বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, আগে আমাদের সুবিধা দেখতে হবে, তারপর ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য তারপর তােমরা শূদ্র অর্থাৎ কিনা অন্তস্থ্য “য” এই হচ্ছে শাস্ত্রের বিধান। এক। যদি আমরা না যাই- বিদ্যা। না যাও তাে রাজার সৈন্যরা এসে গুতাের চোটে তাড়াবে-এ-না না, আমি ভুল বলেছি সসম্মানে। তােমাদের যদি আপত্তি থাকে তােমরা রাজার কাছে আবেদন কর্তে পার। আর সেই কথা তােমাকে বলবার জন্যই তাে আমার আশা। হির। বুঝেছি। আসুন আপনি আমার সঙ্গে। আমি আপনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ১৭
একলব্য।
বিদ্যা। তা যাচ্ছি। দেখ বাপু, আমার কোন দোষ নাই ।
তােমার গৃহিনীকে বুঝিয়ে বলল যে অন্ন জিনিসটা খাওয়া মােটেই ভাল
নয় বিশেষ এই পরিপক আর্কফলাযুক্ত মস্তক দিয়ে।
হির। বলেছিতো আপনার কোন ভয় নাই।
এক। বাবা, আমরা এ বন ছেড়ে যাব না। কোনমতে যাব না।
তাতে যা হবার হােক।
হির। পাগল! রাজার শক্তি তুই জানিসনা তাই একথা বলছিস।
ক্ষত্রিয় রাজা তরােয়াল শিয়রে নিয়ে শােয়। তারা নানাবিধ অস্ত্রের
ব্যবহার জানে, তাদের লােকবল অসীম। আমরা তাদের সঙ্গে লড়তে
পারব কেন। রাজার হুকুম হলে যেতেই হবে। চলুন আপনি।
বিদ্যা।
তা যাচ্ছি। তবে হ্যা দেখ, সেই প্রায়শ্চিত্তের কথা
কি বলছিলে? সেই দক্ষিণান্ত ব্যাপারটা?
হির। চলুন আপনাকে সব কথা বুঝিয়ে বলছি। আয় একা।
( সকলের প্রস্থান)
( চিত্রার প্রবেশ)
চিত্রা। পুড়ে যাক-ছাই হয়ে যাক, গুঁড়াে হয়ে ধূলােয় মিশে যাক
এই ব্রাহ্মণের অহঙ্কার। যাতে দু দুটো প্রাণের বাঁধন ছিড়ে দিয়ে
মাঝখানে দেয়াল তুলে দিতে চায় তা যত বড়ই হােক তাকে আমি চাই
পিশে দলে ভেঙ্গে চুরে সমান করে দিতে। হায়! এরা যেন পাথর—দয়া
নেই মায়া নেই, দুঃখু দরদ বলে কিছু নেই,বুঝি প্রাণও নেই—আছে
শুধু আচার আর নিষ্ঠা! ভিতরে দগদগে ঘা তাতে ময়লার গাদি লেগে
যাক, পুজ হােত-পােক হােক, দুর্গন্ধে বাতাস বিষিয়ে উঠুক, কিছু দোষ
১৮
প্রথম অঙ্ক।
==
নাই, বাইরে তক্তকে ঝঝকে হলেই হল। কিনা আমি খুব বড়, তুমি
অতি ছােট। কেন? আমিও যা তুমিও তা। তুমি নিজের ক্ষমতায়
বড় হও ছােটকে নীচু থেকে টেনে তুলে বড়কর তাকে কোল দাও তবে
আমি তােমাকে বড় বলে মানব। তা নইলে তুমি আমার কে? তােমায়
আমি কেন চাইব? তুমি যে আমারই উপর ভর দিয়ে বড় হয়ে আমারই
মাথায় পা তুলে দেবে, কেন আমি তা সহ্য করব ?
( চোখ মুছিতে মুছিতে জয়ার প্রবেশ)
জয়া ! চিত্রা দি’ চিত্রাদি’-
চিত্রা। কে জয়া ! কি বলছিস্?—ওকি তাের চোখে জল কেন ?
কি হয়েছে।
জয়া। বলছিলাম কি,-এই, না থাক বলবনা তুমি রাগ করবে।
চিত্রা। কথাটা কি তাই আগে বল,রাগ করি না করি সে
তাে পরের কথা।
জয়া। না ভাই কাজ কি আমার খামখা তােমাকে রাগাবার ?
তােমরা একে বয়সে বড়, তায় গুরু নােক, তােমাদের ভাল তােমরা
বুঝৰে। আমার তা নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকারই বা কি ?
চিত্রা। তুই কি বলছিস?—আমাদের কি কথা?—আমাদের কথা
আর তােদের কথা কি আলাদা হয়ে গেছে নাকি ?
জয়া। না,-এই তােমাদের কথা,—কিনা,-এই -একা দার
কথা-
চিত্রা। তার কথা কি?-শীগগির ব--তুই কাঁদছিস কেন?
জয়া। না এই এমন কিছু না,তাকে দেখে এলুম সে একলাটী
একলব্য।
একটা ঝােপের আড়ালে বসে ভারি কাদছে। দুগাল বয়ে তার চোখের
জল টপ টপ করে মাটীতে পড়ছে—আর থেকে থেকে দমকা হাওয়ার
মত এক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ছে। কি আর বলব দিদি, আজকের
দিনে তার চোখে জল—আমিও আর চোখের জল ধরে রাখতে পালুম
না—তাই,—এই এই
চিত্রা। বটে!—আচ্ছা চল্ তাে দেখি গিয়ে।
(চিত্রার প্রস্থান)
জয়া। বাঃ! বাঃ! চুরি বিদ্যে আর মিথ্যা কথা এই দুটো তাে
চমৎকার জিনিস, যদি ঠিক চলে যায়। (সুরে) বাঘ মিথ্যেবাদী
রাখালের ঘাড় ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেল।
( নেপথ্যে নিষাদ বালিকাগণের গীতধ্বনি)
ওকি! ওঃ কালকের কনেরা সব আজ রাত্রে মায়ের মন্দিরে পূজা
দিতে চলেছে। যাই আমিও স্নানকরে ফুলফল নিয়ে মায়ের মন্দিরে
চলে যাই।
( প্রস্থান)
(পূজা সম্ভার লইয়া নিষাদ বালিকাগণের প্রবেশ )
নিষাদ বালিকাগণ। গীত।
চলে আয় বুক চিরে সব রক্ত দিবি মায়ের চরণ কমলে,
মায়ের বরে মিলবে ভাতার মনের মত ঝলমলে।
( দেখে) বরের মাথায় ফুলের টোপর গলায় ফুলের মালা,
ছাদনা তলায় চঁাদের মেল হাতে বরণ ডালা,-
অনুরাগে রঙীন হবে গাল দুখানি লটুলে।
সােহাগে আসবে মুল নয়ন দুটী চল চলে ।
(গীতান্তে প্রস্থান)
প্রথম অঙ্ক। ( ক্রমে সন্ধ্যা হইল ) (হিরণ্যধনু ও বিদ্যা বিপর্যয়ের প্রবেশ) হির। অত তাড়াতাড়ি ময় ব্রাহ্মণ। আপনি সময় নিন, চিন্তা করুণ, তারপর জবাব দেবেন। জানেন তাে আমরা মুখ খু বেদে সংসারের কিছু বুঝিনা, বুঝি শুধু কথার দাম। আমরা একবার যদি বলি হাঁ তবে তা কোনমতেই আর না হবার যাে নাই,তাতে প্রাণ থাকে কি যায়। আমরা লােকের কাছে চাইও সেই রকম পাকা জবাব। কাজেই বুঝতে পাচ্ছেন,-আপনি যদি একবার জবাব দেন তবে আর কোন মতেই তা পাল্টাবার উপায় থাকবে না। যদি কখনাে সেরকম আপনার ইচ্ছা হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে মনে করবেন, যে আমরা কেউটে সাপ নিয়ে খেলা করি, জাগন্ত বাঘিনীর বুক থেকে বাচ্ছা কেড়ে নিয়ে আসি, সিংহের কেশর ধরে তার পিঠের উপর চেপে বসি- বিদ্যা। ব্যাস, ব্যাস্, ব্যাস, আর নয়। যে কথাগুলাে বল্লে তাই আগে হজম কৰ্তে দাও। বাপ ভাবতেও গায়ে কাটা নিয়ে উঠে কুটুম্ব হবে ভাল। দেবে থােবে প্রচুর কিন্তু একটু বেচাল হলেই আর দেখতে হবে না একেবারে সােজা রামনাম সত্যহ্যায়”। ( প্রকাশ্যে ) তা দেখ, সেই যে তুমি কপােত ডিম্ববৎ কি একটা পদার্থ দেখাবে বলেছিলে— হির। এই দেখুন। ( মুষ্টি খুলিয়া দেখাইল) গজমুক্তা,-এক একটা পাররার ডিমের মত। এই রকম এক হাজার, হাতির দাঁত এক একটা তিনহাত সাড়ে তিন হাত লম্বা আর তেমি মােটা ও এক
একলব্য।
হাজার, চন্দন কাঠ দশজন লােকে যত বয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাছাড়া
তেজপাতা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, মধু এসব জিনিষ যত চান তত
পাবেন—যদি আপনার ছেলের সঙ্গে আমার চিত্রার বিয়ে দেন। কিন্তু
কথা ওই, তাকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে জাতে তুলে নিতে হবে, আত্মীয় কুটুম্ব
সব নিয়ে এইবনে এসে বাস কৰ্ত্তে হবে,—আর আমার চিত্রা হবে সকলের
উপর রাণী তার হুকুমে সবাইকে চলতে হবে। সে যদি কাছে পীঠে
কোথাও একটু যায়গা আমাদের দেয়, আমরা থাকব নইলে আমরা
অনেক দূরে চলে যাব। কিন্তু দূরে গেলেও আমরা সব সময় চিত্রার
খবর রাখব। যদি কখনাে তাকে কষ্ট দেন আর তা যদি আমরা জানতে
পারি তাহলে আবার মনে করবেন, আমরা কি—আর কি কর্তে
পারি।
হির।
বিদ্যা। রাম নাম সত্য হয়—রাম নাম সত্য হয়—রাম নাম
সত্য হয়। আপাততঃ ওই মুক্তো টা আমার হাতে দাও দেখি।
এই নিন।
বিদ্যা। আর নগদ কিছু দেবে না ?
নগদ ? আমাদের তত টাকা পয়সা নেই। তবে হ্যা
পাহাড়ের তলায় মাটী খুড়তে খুড়তে খানিকটা সােনা পাওয়া গিয়েছিল--
বেশী নয় বিশ পঁচিশ সের হবে আমাদের কোন কাজে লাগে না বলে
ছাই গাদার ভেতর ফেলে রেখেছি। চান যদি তাে দিয়ে দিতে
পারি ।
বিদ্যা! আহাে? বেড়ে কুটুম্ব, চমৎকার কুটুম্ব—তবে গলদ
যা কিছু এই রমি নামে।
প্রথম অঙ্ক। । ! হির। তাহলে আপনি ভাবুন—একদিন, দুদিন দশদিন—আপনি যত ইচ্ছা সময় নিন, তারপর আমাকে জবাব দিবেন। এখন চলুন, ঐ কুটীরে আপনার বিশ্রামের যায়গা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যা। বেশ, চল।-রাম নাম সত্য হয়, রাম নাম সত্য হয়। ( হর্ষণ ও জয়ার প্রবেশ) ( উভয়ের প্রস্থান) জয়া। শুনলি ? হর্ষণ। শুনলুম তাে। এখন উপায়? জয়া। উপায় ! তুই ব্যাটাছেলে হয়ে আমাকে উপায় জিজ্ঞেস কচ্ছিস ? হর্ষণ। তা কচ্ছি। কেন জানিস! অন্য সব বিষয়ে ব্যাটাছেলের বুদ্ধি চলে বটে কিন্তু কাউকে ভােগা দেবার বেলা মেয়ে মানুষের বুদ্ধি খেলে ভাল। জয়া। কিন্তু উপায় যে একটা চাই হর্ষণ। নইলে একা দা’ আর চিত্রাদি, কেউ প্রাণে বাঁচবে না। জয়া। আয় দেখি নিরিবিলি একটু ভেবে দেখি। দুজনার বুদ্ধি একসঙ্গে জুড়লেও কি একটা উপায় বেরুবে না ? হর্ষণ। আমিও তােত তাই বলি, নিশ্চয় বেরুবে। গীত হর্ষণ। আমরা দুটী হীরেমানিক মিলেছি ভালো দিনকে রাত কৰ্ত্তে পারি সাদাকে কালো জয়া। হর্ষণ। জয়া। উভয়ে। আজ দেখব এক হাত করব বাজীমাত কুপােকাৎ করব নাকাল চালবেচাল বেজায় ঝাঝালো (উভরের প্রস্থান) একলব্য। ৫ ( বিদ্যাবিপর্যয়ের পুনঃ প্রবেশ) বিদ্যা। না ঘরে টেকতে পালুম না,গা ছমছম করে। মনে হল যেন চোখের সম্মুখে হাঁচি কুমড়ার মত, এক একটা গজ মুক্তা লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, বট গাছের মত এক একটা হাতীর দাঁত খোঁচা মাৰ্ত্তে আসছে। সােনার তালগুলাে যেন উনুনের ভিতর থেকে দাত বের করে হাসছে। “বাপ, এযেন সাপের ছুচো গেলা হয়েছে—ওগরাবার ও যাে নেই ঠোঘরাবার ও যাে নেই। (প্রেতিনী বেশে জয়া ও কতিপয় বালিকার প্রবেশ- তাহারা বিদ্যাবিপর্যয়ের চতুর্দিকে ঘিরিয়া দাড়াইল) জয়া। শশুর মােশাই। ( বিদ্যাবিপৰ্যয় পলাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল অন্যান্য বালিকাগণ চারিদিক হইতে বাধা দিল ) অন্যান্য বালিকাগণ। শশুর মােশাই। বিদ্যা। রাম রাম রাম-রাম নাম সত্য হয়। রাম নাম সত্য হয়। এ সব কি বিকট ব্যাপার! এখুনি তত এই কচি ঘাড়টী মটাৎ হয়ে যাবে। এই কাঁচা মস্তকটা কড় মড় কড় কড়াই ভজায় পরিণত হবে। দোহাই বাপ শঙ্খেশ্বরী আমি অপােগণ্ড শিশু বৃদ্ধ ক্ষেমাঘেন্না করে আমায় রেহাই দাও বাবা। শশুর যখন বলেছ তখন কসুর মাপ কর। অন্যান্য বালিকাগণ। ইতত আপনাকে শশুর বলছি। জয়া। আপনি ভয় পাচ্ছেন কেঁন ! আমরা যে আপনার হবু বৌমার সই! তাইতো আপনাকে শশুর বলছি। ২৪
প্রথম অঙ্ক।
বিদ্যা। হবু বৌমা! বলকি তােমরা! তিনি তাে কৈ তােমাদের
মত নাকেশ্বরী নন।
জয়া। রাত্তির বেলা ঘঁন।
অন্যান্য বালিকাগণ। হু হন।
বিদ্যা। ও বাবা আচ্ছা রাত্রি বেলা তিনি আর কি করেন?
জয়া। আমাদেরই
মত দূর দেশে উড়ে গিয়ে
কচি ছেলে
ধরে খান।
অন্যান্য বালিকাগণ। হু খানই তে।
বিদ্যা। আঁ বলকি ! আচ্ছা আর কি করেন?
জয়া। শেষ রাত্রে খুব উচু শালগাছের মগডালে শুয়ে নিদ্রা যান।
বিদ্যা। আঁ! যাব কোথায় রাম রাম, রাম রাম, রাম রাম ! আচ্ছা
তিনি এখন কোথায় ?
জয়া। ঠিক জানি না। আপনার ছেলের নামে তার নােয় জল
ঝরছিল, বােধ হয় তাকে দেখতে গেছেন।
বিদ্যা। ওরে বাবা ! ওরে বাবা! কে কোথায় আছিস রে--
ছুটে আয় রে, ওরে আমার সর্বনাশ হল,আমার ছেলে গেল আমি
গেলুম, আমার টিকি চটিজুতো নামাবলী সব গেল
(একটী সৰ্প গলায় বাঁধিয়া লইয়া হর্ষণের প্রবেশ)
হর্ষণ। কি হয়েছে? কি হয়েছে? (জয়া বালিকাগণের প্রস্থান)
বিদ্যা। দোহাই বাবা ! আমায় রক্ষে
কর বাবা–শ্রীরামচন্দ্র
ঘাড়ে চেপেছিল (সর্প দেখিয়া) ওরে বাবা ! গুরুতর ততােধিক। ওদের
২৫
একলব্য।
f
কাছে যদি বা রাম নাম করে হাতে পায়ে ধরে রেহাই পাবার উপায়
ছিল, ইনিত বাবা খুড়াে মানবেন না। এখন যাই কোথায়।
হর্ষণ। আপনার কিছু ভয় নাই, এটাকে আমি কাল ধরে এনেছি।
পােষ মানাবার জন্য সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছি।
বিদ্যা। তা বেশ করেছ বাপধন। এখন দয়া করে ওকে খােয়ারে
রেখে এসাে দৈখি। দেহাই তােমার আমি তােমাদের মুক্তোও
চাই না শু হতেও চাইনা আর প্রাণান্তেও আর গজদন্তের নাম
করব না বাবা। খুব হয়েছে এখন ভালয় ভালয় এখান থেকে
বেরুতে পালে যে বাচি।
হর্ষণ। সেকি! তাহলে আমাদের চিত্রাদির কি হবে ?
বিদ্যা। তিনি যখন শেষরাত্রে শালগাছের মগডালে শুয়ে নিদ্রা যান
তখন তার জন্য ভাবনা নাই, যার ঘাড়ে ইচ্ছা চাপবেন। আমার ওই
একরত্তি ছেলেকে নিয়ে আর তিনি কি করবেন—ওতে তার চাখেতেই
ফুরিয়ে যাবে।-এখন তুমি ওই খােকাবাজীবনটীকে নিয়ে সরে পড়
দেখি-ওকি কাছে আনছ কেন ?—ওরে বাবা গা শোকে যে ! ওরে
এখুনি হালুম করবে।
হর্ষণ। আচ্ছা আমি যাচ্ছি (সর্পটী বিদ্যাবিপর্যয়ের দেহ শুকিল
হর্ষণ তাহাকে লইয়া চলিয়া গেল ) ( নেপথ্যে ব্যাঘ্রের গর্জন)
বিদ্যা। বাপ, এধারে পেত্নী ওধারে বাঘ শিয়রে আছেন তক্ষক
নাগ। ঘরে গিয়ে তাে হুড়কো দিই তারপর যা হয় হবে।
( একলব্যের প্রবেশ)
( প্রস্থান)
এক। ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়, ক্ষত্রিয় আর ব্রাহ্মণ,একজন গুরু
প্রথম অঙ্ক। আর একজন রাজা,-এরাই যেন পৃথিবীর সব—যত কিছু সুখ সুবিধা এরা ভােগ করবে, এদের হয়ে যদি কিছু উপচে পড়ে তবে তা অপরে পাবে নইলে পাবে না। এরা যেন ভগবানকে ঘুষ দিয়ে বশ করে রেখেছে, তাই এদের সব হুকুম সবাইকে মাথা নীচু করে মেনে নিতে হবে,নইলে ইহলােকে কঠিন শাস্তি পরলােকে অনন্ত নরক। ব্রাহ্মণের দরকার, আর রাজার হুকুম কাজেই আমাদের ঘর বাড়ী ছেড়ে চৌদ্দপুরুষের বাস তুলে চলে যেতে হবে। ব্রাহ্মণের ঘর থেকে ডাক এসেছে—তাই আমার চিত্রাকে ছেড়ে দিতে হবে। কেননা তারা বামুন আর আমরা বেদে, তারা মানুষ আর আমরা শ্যালকুকুর। তারা স্বর্গ আর আমরা নরক। চিত্রাকে স্বর্গে তুলে দিতে হবে—আর আমি নরকে পড়ে থাকব। চিত্রা,আমার চিত্রা,--আমার কলেজার আধখানি— উঃ ! বিধাতা এই কি ভােমার বিচার ( চিত্রার প্রবেশ) চিত্রা। না এ বিধাতার বিচার নয়। এ মানুষের রচা ধোকার টাট-এসাে আমরা এতে আগুণ ধরিয়ে দিই। এক। না না, চিত্রা তা হয় না। বাবার হুকুম,তােমার স্বর্গে তােমাকে ভুলে দিতে হবে,-এ আমাদের দায়। চিত্রা আমি তােমাকে এখানে আসতে বলেছি কেন জান? তােমার কাছে বিদায় নেবার আর আমি এখানে থাকব না,-একটুও না। আজ রাত্রিতেই যে দিকে দুচোখ যায় চলে যাব। এখানকার মাটীতে তােমার পায়ের দাগ, বাতাসে তােমার গায়ের গন্ধ কোকিলের কণ্ঠে তােমার গান, হরিণের চোখে তােমার দৃষ্টি। এ সব আর আমি সইতে পারব না। ? ২৭
একলব্য।
t
চিত্রা। তুমি বিদায় নিতে চাও নাও কিন্তু আমি তােমায় বিদায়
দেব না। চিত্রা তােমারই, তুমি তাকে চাও কিম্বা না চাও। সে তােমার
সঙ্গে নরকেই পড়ে থাকবে। স্বর্গে কখনাে যাবে না। তােমাকে ছেড়ে
ব্রাহ্মণ তত দূরের কথা, দেবরাজেরও সঙ্গিনী হবে না।
গীত
এক। আমি আপনা হাতে পেয়েছিনু গাে তােমারে
চিত্রা। আমি আপনা বিলায়ে হারায়ে ফেলেছি আমারে
এক। আমি স্বপনে তোমারে দেখেছিনু গো ফুল বনে
ফুটিতে সেফালী মালতী বকুল সনে
চিত্রা। আমি সে এক ফাগুন রাতে গেঁথেছি অপন হাতে
মনের মালাটী তােমার লাগিয়া কেমনে ছিড়িব তারে,
উভয়ে। মরমের কাটা মরমে রাখিব কহিব না করে।
(ভানুমতী নেপথ্যে) চিত্রা! একা!
একা ! কোথায় গেল এর ?
( প্রবেশ) এই যে তরা এখানে।
এক। মা! মা! (দিয়া ফেলিল)
চিত্রা। মা! মা! আমার কি হবে ?
ভানু। একা! চিত্ৰা কঁদছে। জিজ্ঞাসা কচ্ছে তার কি হবে ?
উত্তর দে। ওকি! তুইও মেয়ে ছেলের মত কঁদছিস? তুই আমার
পেটে জন্মেছিস বলে যে আমি অহঙ্কার করি ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদ তাের
জন্ম বলে যে আমি মনে মনে তােকে আকাশে তুলে বসে আছি।
সেকি সব মিছে।
এক। তােমার মুখেও সেই ব্রাহ্মণের কথা! ব্রাহ্মণ কি ঈশ্বর ?
২৮
প্রথম অঙ্ক
ভানু। না ব্রাহ্মণ ঈশ্বর নয় তবে তার খুব কাছে, যদি তার তপস্যা
থাকে সাধনা থাকে যদি সে সত্যি ব্রাহ্মণ হয়। এ আমার শােনা কথা
নয়,—আমি দেখেছি। তেমন ব্রাহ্মণ বেদের ছায়া মাড়ালে নাইতে
ছােটে না, তাকে কোল দেয়। জানিস তত কেউটে সাপও সাপ আর
ঢােড়া ঢেমনাও সাপ। যে ব্রাহ্মণের তপস্যা নেই, সাধনা নেই ধনের
জন্য নিজেকে বিক্রী কর্তে পারে সেও তেমনি। সে ব্রাহ্মণের কথা আমি
বলিনি।
চিত্রা। কিন্তু মা আমি বামুনের মেয়ে হলেও আমার তো তপস্যা-
নেই সাধনাও নেই তবে কিসে আমি তােমার ছেলের চেয়ে উঁচু ?
ভানু। আজ উচু নােস। কিন্তু আমার ছেলে যদি তাই হয় যা
আমি তাকে দেখতে চাই ; তবে সে ঠিক ততাকে উচুতে তুলে তাের
যায়গায় পৌছে দেবে।
একা। তাই হবে মা ভাই হবে। তােমার আশীর্বাদে যদি তাই
আমি হতে পারি-জানিনা সে কি। যদি পারি—তারপর আর আমি
চিত্রাকে নাগাল পাব না তার জন্য দুঃখও করব না। শুধু উচু দিকে
চেয়ে দেখব।
ভানু। কেন নাগাল পাবি না রে ?
কেমন করে পাব ! আমি যে বেদে।
ভানু। কেমন করে পাবি? পাবি তপস্যায় পাবি সাধনায়।
ব্রাহ্মণ আকাশ থেকে পড়েনি কত যুগের চেষ্টায় তাকে ব্রাহ্মণ হতে হয়েছে।
এক। মা! মা। তুমি কি বলছ! তপস্যায়, সাধনায় কি বেদে
বামুন হতে পারে?
এক।
২৯
Ag
একলব্য।
৫
ভানু।. তার চেয়েও উঁচুতে উঠতে পারে, ঈশ্বর কে ছুতে পারে।
এক। মা মা। তবে আমি তাই হব যা তুমি আমাকে দেখতে
চাও। আমি ক্ষত্রিয়ের দর্প চূর্ণ করব। ব্রাহ্মণের চেয়ে উচুতে উঠব
ভানু। পারবি ?
এক। তুমি আশীর্বাদ কর।
ভানু। আমি আশীৰ্বাদ কচ্ছি'—আমি তাের মা, আমি তােকে
আশীৰ্ব্বাদ কচ্ছিততার কথা সত্য হবে, তুই অমর হবি ; দেবতা, মানুষ,
গন্ধর্ব পিশাচ যে যেখানে আছে সবই তাের পানে অবাক হয়ে চেয়ে
থাকবে।
৩০
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য
দ্রোণাচার্যের গৃহ সম্মুখস্থ পথ ।
( নারীগণ জল আনিতে যাইতেছে)
নারীগণ।
গীত
সহেলিয়ে। গগরি ওরণে চলে যমুনা।
ছল ছল চঞ্চল উছল বহত বারি
মানত কাহা সখী মানা?
শ্যামল বারি, শ্যামল সাড়ী, গামতমাল তরু দোলেরে।
শ্যামল সুন্দর বংশী বাজাও, যুবতী জন মন ভােলেরে
বড়াহি চাতুর পিয়া, হুসিয়ার হুসিয়ার তুহু সখী চঞ্চল গমন।।
মিঠা ঝুটা কপট! পারে ক্যায়সে পুরব সখী কামনা।
( সকলের প্রস্থান)
বিদ্যা। বাপ, তালের মতন বৃহৎ এক একটী গজমুক্তা দুম্ দাম্
করে পৃষ্ঠে পতিত হচ্ছেন আর ছুচালো শালের খুটীর মত এক একটী
গজদন্ত থেকে থেকে খোঁছা মাচ্ছেন। তার সঙ্গে ছাই গাদায় সােনার
তাল আছেন, বনে বাঘ আছেন আর গাছের ডালে পেত্নী আছেন। কি
চমৎকার অবস্থা। আর কিয়ৎক্ষণ সেখানে থাকলেই হয়েছিল আর কি।
২য় অঙ্ক।] একলব্য। যা রাজধানীতে যখন এসে পড়েছি আর চিন্তা নাই। এইবার একটা মৎলব পাকাতে হচ্ছে যাতে করে ঐ সব বহুমূল্য পদার্থগুলােও হস্তগত হয় অথচ কোন ঝক্কিও না পােহাতে হয়। বুড়াে বেদেপালের গােদাকে তাে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সে রাজসভায় আবেদন করেছে-রেহাই পাবার জন্য। আমি এদিকে তাকে বুঝিয়ে দিই যে আমার অনুরােধে রাজা অবশ্যই তাকে রেহাই দিবেন। সে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে যাক। এদিকে ব্রাহ্মণরা ক্ষেপে উঠুক সেইখানে তুমি পাবার জন্য, কাজেই রাজা অপারগ হােন তার প্রার্থনা পূর্ণ কৰ্ত্তে। সে না জানতে পেরে নিশ্চিন্ত থাকবে আর এদিক থেকে হটাৎ একদিন সৈন্যসামন্ত গিয়ে উপস্থিত হবে তাদের উচ্ছেদ কৰ্ত্তে। সেই সুযােগে আমার কাৰ্যোদ্ধার হবে। মন্দ কি? এই মৎলবই ভাল। কিন্তু তার আগে ছেলেটাকে একটা রক্ষা কৃবচ বেঁধে দিতে হবে কি জানি বাবা, ভূত পেত্নী ঘটিত ব্যাপার—বলা তাে যায় না। যদি ছেলেটাকে পছন্দই করে ফেলে! (হিরণ্যধনুর প্রবেশ) হির। এই যে আপনি এখানে ! আপনি আমাকে পরিত্যাগ করে চলে এলেন কেন? বিদ্যা। পরিত্যাগ ! সে কি হে! আমি তাে তােমায় রাজসভায় দেউরীতে পৌছে দিয়ে পথে এসে তােমার জন্য অপেক্ষা কচ্ছি। এর মধ্যে পরিত্যাগ আবার দেখলে কোনখানটায় ? হির। ওঃ! তা হলে আমার ভুল হয়েছে।
একলব্য
[ ১ম দৃশ্য।
বিদ্যা। নিশ্চয়ই ভুল হয়েছে। তা সেকথা যাক, রাজা তােমার
আবেদনের উত্তরে কি আদেশ দিলেন।
হির। বিবেচনা করে এবং অনুসন্ধান করে পরে আদেশ দেবেন
বল্লেন। তাতে দু চারদিন সময় লাগবে।
বিন্যা। আরে আদেশ যা দেবেন তাতে আমার হাত।. সে সব
ব্যবস্থা আমি ঠিক করে নেব’খন। কথাটা কি জান। রাজারাজড়ার
দুচার দিন ও দুচার মাস ও হতে পারে। তুমিই বা কতদিন উত্তরের
আশায় বাড়ী ঘর ছেড়ে এখানে পড়ে থাকবে। তার চেয়ে তুমি ফিরে
যাও, যা করবার আমিই সব করে নেব। (ইতস্ততঃ চাহিয়া মৃদুস্বরে)
বিশেষ তুমি যখন আমার বেয়াই হতে যাচ্ছ। কি বল ?
হির। তা হলে আপনি আমার প্রস্তাবে সম্মত ?
বিদ্যা। নিশ্চয়ই সম্মত নইলে কি শুধুই গজদন্তের খোঁচা খেয়ে
ম’লাম না খামকাই তােমার জন্য এতটা কষ্ট স্বীকার কৰ্ত্তে চাচ্ছি।
হির। গজদন্তের খোঁচা!
বিদ্যা। আরে ভাই সে সব কথা ছাড়ান দাও। সে তুমি বুঝবে
। তা হলো এখন তুমি কি করবে?
হির। আপনার উপর এ বিষয়ের সমস্ত ভার দিয়ে আমি বাড়ী
ফিরে যাব।
বিদ্যা। বেশ! বেশ! কথাটা কি জান নেহাৎ তােমাকে বামুন
বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে তােলা চলবে না তা নইলে তােমাকে অন্তত এ
বেলাটা পেসাদ না পাইয়ে ছাড়তুম না। এ-এ-তবে হঁা-বামুন
বাড়ীর পেসাদ—আলােচাল, ঘি, সৈন্ধব আর কঁচকলা সে তোমার
২য় অঙ্ক।]
'একলব্য।
মােটেই মুখরােচক হত না তবে কিনা—হেঁ হেঁ—তুমি তাে সবই বুঝতে
পাচ্ছ—হেঁ হেঁ হেঁ।
হির। সে জন্য আপনাকে বিব্রত হতে হবে না। আপন
আসুন—প্রণাম হই।
বিদ্যা। জয়ােস্তু। (স্বগত) শিগগির
( স্বগত) শিগগির নিপাত যাও। কল্যান
হােক স্বগতু) তােমার বিচিকা হােক। (প্রকাশ্যে ) আমি
তা হলে আসি। হেঁ হেঁ হেঁ-
হির। আসুন।
বিদ্যা। বাপধন ঘুঘু দেখেছ ফাদ দেখনি। বামুনের ছেলের সঙ্গে
বেদের মেয়ের বিয়ে যে কত বড় মজা-- তােমার হাড়ে হাড়ে
টের পাইয়ে না দিই তো আমি বামুনের ছেলেই নয়। কল্যাণ
হােক কল্যাণ হােক। ( উভয়ের ভিন্ন দিকে প্রস্থান)
( অশ্বত্থামা ও দ্রোণাচার্য্যের প্রবেশ )
দ্রোণ.। বৎস! গুরু কখনাে কৃপণতা করে না শিষ্যকে বিদ্যাদান
কর্নে। কিন্তু গুরু যা দেন শিষ্যের তা নেবার শক্তি থাকা চাই।
যার যতখানি শক্তি সে ততখানিই গ্রহণ কর্তে পারে তার বেশী
পারে না! সুতরাং অর্জুনের প্রতি দুৰ্য্যোধনাদির ঈর্ষা নিতান্তই
অনুচিত। শাস্ত্রের বিধান-শিষ্যের যােগ্যতা বুঝে তাকে বিদ্যাদান
কৰ্ত্তে হবে। আমি তাই করি। এতে অর্জুনের দোষ কি ?
অশ্বত্থামা। সবই জানি পিতা, সবই বুঝি। কিন্তু দুৰ্য্যোধন
বুঝতে চায় না।
দ্রোণ। সেও বুঝবে—কিন্তু এখন নয় এক বৎসর পরে যখন প্রকাশ্য
একাব্য। [ ১ম দৃশ্য। বঙ্গক্ষেত্রে সামান্ত একটা পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, তার স্থান অর্জুন হতে কত নিয়ে। আমি দেখেছি অশ্বত্থামা ! তার শিখবার ইচ্ছা আছে কিন্তু একাগ্রতা নেই । যখন তার দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ থাকা উচিত লক্ষ্য ও শরাসনের উপর তখন সে তার কুটীলচক্ষু চঞ্চল ভাবে ক্রমাগত ফেরাতে থাকে অর্জুনের উপর, যেন মনে মনে ভাবতে থাকে যে, অর্জুনকে এবং অন্যান্য পাণ্ডবগণকে ধ্বংশ করাই অস্ত্র শিক্ষার চরম সার্থকতা। এরূপ মনােভাব যার সে কখনন অর্জুনের সমকক্ষ হতে পারবে না। অশ্ব। আচ্ছা পিতা! অর্জুনকে কি সমস্ত বিদ্যাই প্রদান করবেন, যা আপনার আছে? দ্রোণ। সব প্রদান করব-যা আমার আছে—শুধু একটী- মাত্র বিদ্যা দিতে পারব না,-গুরুর নিষেধ। অশ্ব। কি সে বিদ্যা পিতা ? দ্রোণ। শব্দভেদী বান। ত্রেতাযুগে রাজা দশরথ অন্ধকমুনির পুত্র সিন্ধুকে যা আঘাত করেছিলেন। এই দ্বাপরে তা একমাত্র জানেন আমার গুরু ভার্গব আর জানি আমি। আর কেউ জানে না। অশ্ব। সে বানে কি হয় ? দ্রোণ। শব্দ লক্ষ্য করে সে বান নিক্ষেপ কৰ্ত্তে হয়। তাতে নিক্ষেপকারীর ইচ্ছানুসারে শব্দকারীকে বধ করা যায়—কি তার শব্দ রূদ্ধ করা যায়। অশ্ব। শুধু শব্দ লক্ষ্য করে ? যাকে আঘাত করব তাকে চোখে দেখতে পাব না ?
২য় অঙ্ক।]
একলব্য।
.
দ্রোণ। কোন প্রয়ােজন নাই। গভীর অন্ধকারেও এ শর নিক্ষেপ
করা যায়।
এ অস্ত্র কখনাে বিফল হয় না।
অশ্ব। এ তত বড়ই আশ্চৰ্য্য পিতা। এ অস্ত্র তত আপনি
আমাকেও শিক্ষা দেন নি।
দ্রোণ। বল্লুম যে গুরুর নিষেধ। তাঁর আদেশ এ অস্ত্র আমি
স্বেচ্ছায় কাকে শিক্ষা দেব না।
অশ্ব। তবে কি আপনার অনিচ্ছায় আপনার নিকট হতে তা গ্রহণ
কৰ্ত্তে হবে ? তা কেমন করে সম্ভব হবে? এমন শক্তিই বা কার
আছে ?
দ্রোণ। তা জানি না। গুরুর যা আদেশ আছে তাই তােমাকে
বল্লুম।
অশ্ব। তাঁর এরূপ আদেশ দেবার কারণ কি পিতা?
দ্রোণ। কারণ ধনুর্বেদের এই অংশ ত্রেতাযুগের জন্য সৃষ্টি
হয়ছিল—যখন পৃথিবী অতিশয় হিংস্র শ্বাপদে পরিপূর্ণ ছিল, মহাবলশালী
মায়াবী রাক্ষসগণের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, পদে পদে মানুষের প্রাণের
আশঙ্কা বৰ্তমান ছিল। আজ আর সে অবস্থা নাই। তাই দ্বাপরে
এর ব্যবহার নিষিদ্ধ।
অশ্ব। আশ্চৰ্য্য জ্ঞান ছিল এই বিধানদাতাদের। তারা ভূত
ভবিষ্যৎ বর্তমান নখদর্পণে দেখতে পেতেন। তাই সমুদায় অবস্থা বিবেচনা
করে যুগােপযােগী ব্যবস্থা করে গেছেন।
দ্রোণ। নিশ্চয়ই। আর্য ঋষিদের সমুদায় ব্যবস্থাই ওই একই
প্রণালীতে রচিত। ভিত্তি তার যুক্তিতর্ক এবং ভূয়ােদর্শনের উপর
৩৬
একলব্য। [ ১ম দৃশ্য। গঠিত তুমি জান না বৎস ধনুর্বেদের প্রত্যেকটী অধ্যায়-যুগেতিহাসের পরিচায়ক এসো আজ তােমাকে সে বিষয়ে কিছু উপদেশ প্রদান করব। ( উভয়ের প্রস্থান) ( কতিপয় ক্ষত্রিয় বালকের প্রবেশ } গীত বালকগণ। আমরা বড় বড় বীরের খোকা ক্ষুদে ক্ষুদে বীর- ছালকপাট খেলি না তাই, খেলি ধনুক তীর। হােমরা চোমরা যদিও মােরা, ছাড়িনি মাইদুধ, গলায় বেধে বিষমলাগে খুটে খেতে ক্ষুদ, . তবু ফোস ফোসানি কম নয় কিছু সদাই উচু শির। আমরা হাওয়ার সঙ্গে করি লড়াই বুকের বলের করি বড়াই, কাউকে গ্রাহ করি খােড়াই, পেঁচা কি কুমীর। (খাই) টপটপ বড় হব বলে বাটি বাটি ক্ষীর । (একলব্যের প্রবেশ এক। ওগাে বীরপুরুষেরা। বলতে পার এখানে দ্রোণাচার্যের বাড়ী কোথায় ? ১ম বা। কি। আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা! সকলে। এত বড় কথা ! ২য় বা। কি! আমরা উপস্থিত থাকতে দ্রোণাচার্যের বাড়ী। সকলে। এত বড় আস্পর্ধা!
২য় অঙ্ক।]
একলব্য।
৩য় বা। কি। আমাদের বাবাদের গুরুর নাম ধরা!
সকলে। এত বড় ধৃষ্টতা।
এক। তােমরা রাগ কচ্ছ কেন? আমি তাে অন্যায় কিছু
বলিনি।
===
১ম। বলনি! দেখবে তবে মজা!
২য়। মাথাটী চিবিয়ে খাব যেন ভােলা মটর ভাজা।
৩য়। কিম্বা খাজা গজা।
সকলে। আজি বধিব বধিব তােরে খণ্ড খণ্ড করি-
দ্রোণাচার্য্যের প্রবেশ)
দ্রোণ। গােল কিসের? একি! সর্বনাশ! তােমরা এতগুলাে,
বীর মিলে একজনকে আক্রমণ কচ্ছ। ছিঃ-
১ম। আচ্ছা তবে এ যাত্রা মাফ কলুম
২য়। প্রাণ ভিক্ষা দিলুম
৩য়। শুধু আপনার অনুরােধে
সকলে। নইলে কি আর রক্ষে ছিল ?
(কাল্পনিক গোঁফে তা দিতে দিতে গর্বিত পাদবিক্ষেপে প্রস্থান)
দ্রোণ। বৎস! তুমি কে? তােমার নাম কি ?
এক। আমি নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র-নাম একলব্য ।
দ্রোণ। এখানে তােমার কি প্রয়ােজন?
এক। প্রভু দ্রোণাচার্যের কাছে আমার প্রার্থনা আছে।
দ্রোণ। দ্রোণাচার্যের কাছে প্রার্থনা। সে তাে এক দীন ভিখারী
ব্রাহ্মণ, বাজারে প্রতিপালিত-গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য রাজার নিকট হতে
;
একলব্য।
[ ১ম দৃশ্য।
সামান্য বৃত্তি গ্রহণ করে মাত্র। তার নিকট এমন কি মূল্যবান জিনিষ
আছে যা তুমি চাও ?
এক। আমার বা প্রার্থনা তা একমাত্র তিনিই পূর্ণ কর্তে পারেন।
দ্রোণ। কি তােমার প্রার্থনা ?
এক। প্রভু আপনিই কি আচাৰ্য্যদেব ?
দ্রোণ। আমারই নাম দ্রোণ। কি তােমার প্রার্থনা বল ?
এক। ধনুর্ব্বিদ্যা।
দ্রোণ। ধনুর্বিদ্যা! দ্রোণাচার্যের কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখতে এসেছ,
তুমি নিষাদ পুত্র !
এক। বড়ই অপরাধ করেছি কি প্রভু ?
দ্রোণ। না বংস অপরাধ নয়। কিন্তু তােমার গুরুতর প্রম
হয়েছে।
এক। কি ভ্ৰম প্রভু।
দ্রোণ। যে ধনুর্বিদ্যা আমি দান কর্তে পারি তাতে ক্ষত্রিয়ের
অধিকার, নিষাদপুত্রের নয়। শাস্ত্রের নিষেধ অনধিকারীকে বিদ্যা
দান কৰ্তে নাই।
: এক। নিষাদপুত্র যদি ধনুর্বিদ্যায় অনধিকারী, ব্রাহ্মণও তত তাই।
দ্রোণ। যদিও এ তর্ক তােমার পক্ষে অনধিকার চর্চা তথাপি
বলতে আপত্তি নাই,-বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণের পক্ষে বিশেষ অবস্থায় বিশেষ
ব্যবস্থা। পুরাণে, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্তের অভাব নাই। বিশেষ
আমি বিদ্যা অর্জন করেছি দান করবার জন্য—বৃত্তি হিসাবে নয়।
এক। আমি আপনাকে মনে মনে গুরু বলে বরণ করেছি।
৩৯
২য় অঙ্ক। ] একলব্য । আপনার আদেশ আমি কখনাে অবহেলা করব না। আপনার যদি সেইরূপই আদেশ হয় তবে আমিও এ বিদ্যা শুধু দান করব, নিজের কোন প্রয়ােজনে ব্যবহার করব না। দ্রোণ। নিষাদ! দানের পাত্র অপাত্র অাছে। অপাত্রে বিদ্যা দান করলে বিষময় ফল অবশ্যম্ভাবী। কে পাত্র আর কে অপাত্র তা বিচার করবার শক্তি তােমার নাই। যদি বা থাকে তােমার স্বজাতিয় ভিন্ন কোন ক্ষত্রিয় সন্তান তােমার কাছে বিদ্যগ্ৰহণ কৰ্তে যাবে ? নিষাদ যদি ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি অবলম্বন কর্তে চায় তার ফল কি হবে জান? বর্ণাশ্রম ধর্মের সকল শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যাবে, সমাজে বিপ্লব উপস্থিত হবে, ব্রাহ্মণ চণ্ডালের প্রভেদ তিরােহিত হয়ে যাবে। তুমি ফিরে যাও নিষাদ, আমি তােমার প্রার্থনা পূর্ণ কর্তে পারব না। তাে ফিরে যাব বলে আসিনি প্রভু। আমি আপনাকে মনে মনে গুরু বলে বরণ করে জননীর আশীৰ্বাদ নিয়ে বেরিয়েছি। সে আশীৰ্বাদ বিফল হবে না,—ফিরে আমি যাব না। আপনি পণ্ডিত—আমি মুর্থ, আপনি বড়—আমি ছােট, আপনি দাতা আমি আপনার দুয়ারে ভিখারী, আপনি স্বীকার করুন বা না করুন আপনি গুরু আমি শিষ্য—আপনার যদি দয়া হয় তা হলে আমার প্রার্থনা পূর্ণ কর্তেও পারেন কিম্বা যদি ইচ্ছা হয় তা হলে আমায় পদাঘাত করে দুর করেও দিতে পারেন। কিন্তু আপনি যাই করুন ফিরে আমি কিছুতেই যাব না। আপনার দুয়ারে না খেয়ে পড়ে থেকে মরে যাব তবু নড়ব না—আমি চণ্ডাল বটে তবু আপনার শিষ্য হবার স্পর্ধা রাখি। আমি প্রমাণ করব যে আমি অযােগ্য নই। এক। আমি ৪ একলব্য। [ ১ম দৃশ্য। দ্রোণ। কি করব নিষাদ, আমি অক্ষম—আমি অক্ষম। আমি পারব না শাস্ত্রের আদেশ ঘন করে নিষাদকে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দিতে। বৎস! তােমার জন্য আমার দুঃখ হয় কিন্তু নিরুপায়, নিরুপায় । ( প্রস্থানেদ্যোগ ) ( ভানুমতীর প্রবেশ ) ভানু। দাড়াও ব্রাহ্মণ । তােমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। দ্রোণ। কে তুমি মা ? এক। একি! আমার ম! মরি মরি! মায়ের আমার এ কি রূপ! এ রূপ তাে আগে কখনো দেখিনি। যেন সাক্ষাৎ মা ভবানী কিরাতিনীর রূপ ধরে মাটীতে নেমে এসেছে। দ্রোণ। উত্তর দাও মা--প্রজ্জ্বলিত বগ্নিশিখারূপিণী তুমি কে? ভানু। আমি যে হই, তুমি বল দেখি ব্রাহ্মণ,কোথায় কিরূপে তােমার জন্ম হয়েছিল? শুনেছি পিতা তােমার মহামুনি ভরদ্বাজ। তােমার মা কে বল দেখি দ্রোণ। এ প্রশ্ন কেন? কোথায় কিরূপে আমার জন্ম হয়েছিল, আমার মা কে এ সকল পরিচয়ই তাে আমার নামের সঙ্গে গাঁথা রয়েছে। দ্রোণীর মধ্যে আমার জন্ম—তাই আমার নাম, দ্রোণ। আমার মাতা নাই। আমি অযযানিসম্ভব। ভানু। তবু ভাল ঘৃতাচী অপ্সরার নাম করনি। আচ্ছা তুমি যখন ভূমিষ্ঠ হয়েছিলে তখন কে তােমায় ধাত্রিরূপে পালন করেছিল? . কে তােমায় বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছিল ? তােমায় কোলেপিঠে করে ? ৪১.
২য় অঙ্ক।] একলব্য। মানুষ করেছিল? . তুমি অযােনীসম্ভব বটে। কিন্তু তবু তত তােমার মায়ের প্রয়ােজন হয়েছিল। বল দেখি সে মা তােমার কে ? দ্রোণ। পিতার আশ্রমে দুগ্ধবতী গাভী কল্যাণী আমাকে দুগ্ধ দিয়ে প্রতিপালন করেছিল। কিন্তু তুমি কে? ভানু। বল ব্রাহ্মণ, সেই দুগ্ধবতী গাভী ভিন্ন আর কেউ কি তােমার মাতৃত্বের দাবী কৰ্তে পারে না। তােমার মাতৃঋণ কি তারই চরণ তলায় শেষ হয়েছে ? আর কারু কাছে কি তােমার কিছুমাত্র ঋণ নাই ? দ্রোণ। আছে। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর আমি দেবে না যতক্ষণ না তুমি নিজের পরিচয় প্রদান কর। ভানু। বেশ তুমি না বলতে চাও, আমি বলছি। শোণ-তােমার জন্মের পূর্বে একদিন একপুত্রহারা অনাথিনী বেদিনী শান্তিলাভের আশায় শিশু কন্যার হাতধরে তােমার পিতার চরণ তলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল । স্বেচ্ছায় তােমাদের দাসীবৃত্তি অবলম্বন করেছিল। তোমার পিতা ছিলেন সংসার ত্যাগী মহর্ষি, তিনি তােমার মত সঙ্কীর্ণচেতা ছিলেন না। তিনি কিরাতিনীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, অস্পৃশ্য বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন নি। বন্ধনহীন সেই মহাপুরুষকে তােমার জন্মও বিব্রত করতে পারেনি, একদিনের জঙ্গও তার তপস্যার ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। তিনি অনায়াসেই সেই কিরাতিনীর উপর তােমার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়ে তপস্যায় চলে যেতেন, আর সেই কিরাতিনী তােমায় কোলে নিয়ে তােমার মলমূত্র পরিষ্কার করে, তােমায় স্তন্যপান করিয়ে নিজের হারাণ পুত্রের শােক নিবারণ কৰ্ত্ত। ব্রাহ্মণ, আজ সেই কিরাতিনী মায়ের কথা বলতে লজ্জায় তােমার মাথা নুয়ে পড়ে কেন ? ৪২ একলব্য। [ ১ম দৃশ্য। দ্রোণ। তুমি—তুমি কি ভানুমতী ? ভানু। হ্যা আমি ভানুমতী—সেই কিরাতিনীর কন্যা ভানুমতী। যে শৈশবে তােমায় খেলা দিত, কঁদলে সান্ত্বনা দিত, পদাঘাত মুষ্টাঘাত নীরবে সহ্য কৰ্ত্ত। ব্রাহ্মণ, আমি তােমার পিতাকে দেখেছি, ভাগ্যবশে তাঁর পায়ের তলায় মাথা নত করেছি। আজ তােমাকেও দেখছি। বল ব্রাহ্মণ ! সেই কিরাতিনী মায়ের কাছে মাতৃঋণ কি তুমি স্বীকার দ্রোণ। অবশ্য করি। সে ঋণ আমি জীবনে শােধ কর্তে পারব না। ভানু। কথঞ্চিৎ পার যদি তুমি ইচ্ছা কর। তুমি শাস্ত্রজ্ঞ। তুমি জান মায়ের অধিকার কন্যায় বৰ্ত্তে। সেই অধিকারের বলে আমি তােমার বলছি, আমার পুত্রের প্রার্থনা পূর্ণ করে তােমার সে ঋণ কথঞ্চিৎ শােধ করতে পার। মনে রেখ তােমার পিতার আশীর্বাদের ফল আমার এই পুত্র। দ্রোণ। তােমার পুত্র ! ভানু। হাঁ! এই আমার পুত্র। কেমন করবে? দ্রোণ। না, না ও অনুরোধ আমায় করে না। বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্মের শৃঙ্খলা আমি ভাংতে পারবনা—এ মহাপাপ,-এ আমাদ্বারা হবে না। ও কি তুমি অমন করে আমার পানে তাকাচ্ছ কেন?—আমায় কি দগ্ধ করবে? না না তােমার দৃষ্টি সংযত কর। দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও, ও চাউনী আমি সইতে পাচ্ছি না, আমি যাই—আমি যাই— ( প্রস্থান) ভানু। যাও ব্রাহ্মণ। কিন্তু পারব না বল্লে আমি ছাড়ব না। ৪৩
২য় অঙ্ক।]
একলব্য।
তােমায় পার্নে হবে। এ তােমার পাওনাদারের তাগাদা। না, বল্লে
সে তাে শুনবে না।
এক। বৃথা চেষ্টা মা। ব্যাধ এতই হীন যে ব্রাহ্মণ কিছুতেই তাকে
বিদ্যাদান করবে না। সে যােগ্য কি অমােগ্য—সে বিচার করবে না,
একবার পরীক্ষা করে দেখবে না, সে যদি মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে মরেও যায়
তবু একবারও ফিরে তাকাবে না। যেহেতু সে ব্যাধ। তার জণই
তার যথেষ্ট অপরাধ-যেন তার জন্য সে নিজেই দায়ী, যেন কৰ্ম্মেও তার
অধিকার নাই। যা সে কথা মা! তুমি এখানে এলে কেন?
ভানু। তােকে বিদায় দিয়ে ঘরে থাকতে পারিনি তাই এসেছি।
তাের পিতা এসেছেন রাজার কাছে আবেদন কর্নে। তার সঙ্গে আমরা
সবাই এসেছি।
এক। সেকি! এত দুৰ্বল তুমি মা?
ভানু। দুৰ্বল নইরে—দুৰ্বল নই। কিন্তু সেকথা এখন নয়। এখন
চল দেখি আমার সঙ্গে।
এক। সে কি মা ! তােমার আশীর্বাদ নিয়ে আমি ঘর থেকে
বেরিয়েছি। আচৰ্য্য দ্রোণকে গুরু বলে বরণ করেছি—নিস্ফল হয়ে ফিরে
যাব ?
ভানু। তবে কি করবি
এক। এইখানে গুরুদেবের দ্বারের পার্শ্বে আনাহারে প্রাণ দেব।
দেখি তার দয়া হয় কি না। দেখুি পারি কি হারি।
ভানু। তাতে হয়তাে তাের সিদ্ধি লাভ হতে পারে। কিন্তু তা
এ জন্মে না-পর জন্মে। আমি তােকে সে আশীৰ্বাদ করিনি। আমি
*,
৪৪
';
একলব্য।
১ম দৃশ্য।]
তােকে এ জন্মেই অমর হবার আশীৰ্ব্বাদ করেছি। শুনলি তাে, আমি
বাল্যকালে মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে প্রতিপালিত, সাধনা সম্বন্ধে কিছু
ধারণা আমার আছে,আমি তােকে উপায় বলে দেব।
(নেপথ্যে গীতধ্বনি)
ফিরে আয় ফিরে আয়রে মোদের হীরে মানিক সােনা !
ওই শােন মেয়েগুলাে সব তােকে নিয়ে যেতে এসেছে।
( নিষাদ বালিকাগণের প্রবেশ ও গীত )
ফিয়ে আয়, আয় রে মােদের হীরে মানিক সােনা।
ওরে তাের জন্যে কেঁদে মরি আমরা যে সব জনা রে !
ওরে তাের হাসেতে ডিম পেড়েছে, বিউল বুধি গাই
বেল গাছেতে বেল পেকেছে--তুই যে ঘরে নাই !
তুই বিনে তাের হরিণ ছানা ছোঁয়না ঘাসের কণা রে।
ওরে বনে বনে কেঁদে মরে বৌ কথা কও পাখী,
কেঁদে কেঁদে কোকিল বৌয়ের রাজা হল অখিরে-
কলিস নে আর মেয়েদের কথা পেটে নেইরে গান,
দিনে রেতে শুধুই দেখি তাের চাদ মুথথানা রে !
( সকলের প্রস্থান
---
২য় অঙ্ক।]
একলব্য।
দ্বিতীয় দৃশ্য
দ্রোণাচার্যের বাড়ীর কক্ষ। সময় রাত্রি।
অশ্বথামা একখানি ভূর্জপাত্র অঙ্কিত নক্সা দেখিতেছে, তাহার
সম্মুখে একখানি তালপাতার পুর্থ খােলা আছে।
অশ্বত্থামা। “আমার এই সূচিব্যুহ সম্পূর্ণ অভিনব। এর গতি
কেউ বােধ কর্তে পারবে না। এইখানে প্রবেশ পথ, এইখানে
নির্গমণের পথ—আর এই সূচিমুখে তীক্ষ্ণ বর্ষাধারী বৰ্মাবৃত সৈনিকদল
—ব্যাস ! (পুর্থী দেখিতে লাগিল)-
(দ্রোণাচার্য্যের প্রবেশ )
দ্রোণ। কে ? অশ্বত্থামা!
অশ্ব। পিতা! পিতা! , আমি এক অতি চমৎকার সূচিবৃহ
আবিস্কার করেছি। এই দেখুন।
দ্রোণ। | একবার চোখ বুলাইয়া) কাল প্রভাতে দেখব। রাত্রি
অধিক হয়েছে। এখন নিদ্রা যাও গে ।
(বিমর্ষভাবে অশ্বত্থামার প্রস্থান)
(উপবেশনপূৰ্ব্বক) ভানুমতি! ভানুমতি ! আমায় অপরাধী করাে
। আমার দোষ নাই। আমার প্রাণ চায় বড় বােন বলে তােমার
পায়ে মাথা নােয়াতে, আর আমার সমাজ, লােকাচার, দেশাচার, এসে
চোখ রাঙ্গিয়ে পথ রােধ করে দাড়ায়,-আমি কি করব ? আমার
পিতা ছিলেন সংসার বিরাগী মহর্ষি—আর আমি হয়েছি ঘােরতর
৪৬
একলব্য।
[ ২য় দৃশ্য।
অক্ষম।
সংসারী। তিনি যা পার্তেন, আমি তা পারি না। এই বর্ণাশ্রম ধর্মের
কঠিন শৃঙ্খল আমার অস্থিমজ্জায় জড়িয়ে রয়েছে। তা ভাংবার শক্তি
আমার নাই। তাই তাে আমি একলব্যকে শিষ্য বলে গ্রহণ কৰ্ত্তে
এতে আমার কোন দোষ নাই। (হাই তুলিয়ানিদ্রাকর্ষণ
হচ্ছে। রাত্রি তৃতীয় প্রহর হতে চল্প,—নিদ্রারই বা দোষ কি?
( শয়ন করিয়া নিদ্রাভিভূত হইল—অশ্বত্থামার পুনঃপ্রবেশ )
অশ্ব। পিতা, পিতা, আমার সূচিব্যুহে একটা বড় দোষ রয়ে
গেছে—তাই তাে নিদ্রিত হয়ে পড়েছেন! যাক, ডাকব না।
( প্রস্থানােদ্যোগ )
দ্রোণ । ( ঘুমের ঘরে) তুমি ফিরে যাও, তােমার প্রর্থনা পূর্ণ
করবার শক্তি আমার নাই
অশ্ব। এ কি! পিতা ঘুমের ঘোরে কাকে কি বলছেন।
দ্রোণ। ( ঘুমের ঘােরে) না, তােমাকে পুনঃ পুনঃ প্রত্যাখ্যান
কর্তে আমি পাচ্ছি না। তােমাকে বিদ্যাদান কলে মাতৃঋণ কতক
পরিমাণেও শােধ হয়। তবে এসাে, তােমার যদি গ্রহণ করিবার শক্তি
থাকে, তুমি গ্রহণ কর। বর্ণাশ্রমধর্মের রক্ষার ভার যাদের উপর ন্যস্ত
আছে তারা তা গ্রহণ করুন। (ঘুমের ঘরে শয্যার উপর উঠিয়া বসিল)
অশ্ব। এ কি! আমি তাে কিছুই বুঝিতে পাচ্ছি না।
দ্রোণ। ভানুমতি।
ভানুমতি!
দিদি আমার ! বল
তােমার অভিমান নাই। আমি তােমার ছােট ভাইটি।
ছেলেবেলায়
কত পদাঘাত, মুষ্ট্যাঘাত করেছি, কতদিন তােমার কোলে মলমূত্র
পরিত্যাগ করেছি তাও সহ্ন করেছ, তবে আজ এ অভিমান কেন ?
আর
৪৭
২য় অঙ্ক। ]
একলব্য।
অশ্ব। পিতা ? পিতা ? শয়ন করুন, নিদ্রা যান।
দ্রোণ। (উঠিয়া দাড়াইল) না না, ওরকম নয়। বামজানু ভূমিতে
দৃঢ় ভাবে সংলগ্ন করে, দক্ষিণ জানু সােজা করে মেরুদণ্ড খাড়া করে
বােস—( দ্রোণ উঠিয়া ধনুঃশর লইল)—এই ভাবে—না, না হল না,
হ্যা এইবার ঠিক হয়েছে এই রকম করে ধনুক ধারণ কর।—শর
নাও,-তর্জনী-মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দ্বারা শর ধারণ করা ঠিক
হয়েছে- লক্ষ্য কর
অশ্ব। পি! পিতা! আপনি কাকে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দিচ্ছেন?
পিত, এযে স্বপ্ন-পিতা! পিতা!
দ্রোণ। আঁ! কে ? কে তুমি ? ওঃ অশ্বত্থামা ! অশ্বত্থামা !
অশ্বত্থামা। সে কোথায় গেল? এই তাে ছিল।
অশ্ব। কে পিতা ?-
দ্রোণ। কে ? পরিচয়ের প্রয়ােজন নাই। যে এইমাত্র ছিল।
অশ্ব। আপনি এবং আমি ছাড়া আর তােত কেউ এখানে ছিল
না। আপনি তাে স্বপ্ন দেখছিলেন।
দ্রোণ। আমি স্বপ্ন দেখছিলেম—না? বল বল অশ্বত্থামা,—এ
সত্য নয়, স্বপ্ন।
অশ্ব। এ স্বপ্ন পিতা।
( নেপথ্যে গীতধ্বনি।
ওরে তাের গুবতে হবে না
এ ভবের হাটর বেসাতি তাের সবই ধারে কেনা।
০৮
একলব্য।
[ ২য় দৃশ্য।
দ্রোণ। ও কি।
অশ্ব। প্রভাত হয়েছে পিতা। রাজপথে ভিখারীগণ গেয়ে
চলেছে।
দ্রোণ। না না ও ভিখারীর গান নয়। ভিখারীর গান নয় ও
দৈববাণী—ওকে ডাক অশ্বত্থামা -আমি ওর গান শুনব ।
( অশ্বত্থামা ভিখারীকে ডাকিল।
গীত।
ভিখারী।
ওরে হাের শুধতে হবে দেন।
এ ভবের হাটের বেসাতি তাের সবই ধরে কেনা।
বকেয়া পাতার যত পাওনাদার,
তারা কি ছাড়বে তাের ভেবেছিস কি পাৰি পার ?
সুদের কড়ি করবে আগায় রেহাই দেবে না
পারের কড়ি চাস যদিবে ফাঁকি চলবে না
দ্রোণ। জানি জানি কেউ রেহাই দেবে না। টু’টি টিপে সব
পাওনা আদায় করবে। তুমি দিতে চাও আর না চাও, কোনমতে
নিস্তার নাই।
৪৯
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য
বনভূমি কালী মন্দিরের সম্মুখ
মন্দিরের দ্বার রূদ্ধ-( সময় সন্ধ্যার প্রাক্কাল )
হর্ষণ ও জয়া ।
নেনা নেমা মােদের হৃদয় বলি নে মা
আপন হাতে মােদের চোখের ঠুলি খুলি দে মা
র ঝর ঝর মাথার উপর ঝরুক শিলা পাথর
বাজুক মা বাজ কড়, কড়, কড়, হই না যেন কাতর
তাের চরণে নােয়াই মাথা, নােয়বে তো কে মা :
মরণজয়ী শিব চরণে—তুই যে মদের সে মা।
( মন্দির দ্বার খুলিয়া ভানুমতীর প্রবেশ)
ভানু। হর্ষণ ! জয়া! এই নে মায়ের প্রসাদী সিন্দুর মায়ের
আশীৰ্বাদে তােদের মরণ ভয় দূর হােক।
জয়া। তাই হােক মাতাই হােক। তােমার আশীর্বাদে যেন
দু’জনে এক সঙ্গে মর্তে পারি।
একলব্য। [ ১ম দৃশ্য। হর্ষণ। মর্তে তাে সবাইকে হবে। কিন্তু তার পর? ভানু। তারপর মরণের পরও আর কিছু আছে নাকি রে হতভাগা ছেলে। হর্ষণ। যারা মরবে তাদের জন্য এ পারে আর কিছু নাই জানি। কিন্তু যারা থাকবে তাদের কি হবে ? সেই তােল তাদের অন্য বনে গিয়ে আশ্রয় নিতেই হবে, তবে মিছামিছি এ রক্তপাত কেন ? ভানু। রক্তপাত মায়ের তৃপ্তির জন্য। অত্যাচারীর শাসনের জন্য।—নিজেদের মাথা বাঁচাবার জন্য। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে হর্ষণ—যে ব্রাহ্মণই পৃথিবীর সব নয়,চণ্ডালও মানুষ, তারাও এ সংসারের সুখ সুবিধার উপর কিছু দাবীদাওয়া রাখে। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যেই পৃথিবীর সকল শক্তি লুকিয়ে নেই, রাজা সর্বশক্তিমান নন যে—তিনি ইচ্ছাকলে ই অস্ত্রের বলে প্রজাকে তার চিরদিনের অধিকার থেকে জোর করে তাড়িয়ে দিতে পারেন না। সােজা কথা—আমরা এ বন ছেড়ে যাব না। রাজার হুকুমে ব্রাহ্মণদের বাসের জন্য এক ছটাক ভুইও ছেড়ে দেব না,তার জন্য প্রাণ দিতে হয়, দেব। হর্ষণ। বুঝেছি না। এখন শােন তােমার কাছে যে জন্যে এসেছি। বাবা জিজ্ঞাসা করে পাঠালেন যে তুমি মায়ের আদেশ পেয়েছ কি না। ভানু। পেয়েছি। তঁাকে গিয়ে বল যে মা বলেছেন যে আজকের অমাবশ্যার অন্ধকারে মা নিজে শ্মশানে তাথৈ তাথৈ তাণ্ডব নৃত্য করবেন। শ্মশান যেন তৈরি থাকে। (মেঘগর্জন ওই শশান্ হর্ষণ। ওকি মা !
৩য় অঙ্ক।]
একলব্য।
ভানু। বুঝতে পলিনা বােক। ছেলে, ও মায়ের হুঙ্কার। মা আগে
থেকেই জানান দিয়ে রাখছেন।
হর্ষণ। বেশ, আমি চম।
(হর্ষণের প্রস্থান)
জয়া। আমি কি করব মা!
ভানু। তুই ও যা। মায়ের মেয়েদের সব একত্র কন্। তাদের
তৈরি হতে কল্। আজ মায়ের পূজা শুধু ছেলেরা করবে না, মায়ের
মেয়েরাও করবে। জানিস তাে মায়ের কাছে মেয়েরা কোন দিনই
ফো নয়।
( জয়া ভানুমতীকে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল )
ভানু। দেখিস মা, মুখ রাখিস । আজ তােরই ভরসায় বনে
দাবানল জ্বেলে দিচ্ছি যেন পুড়িয়ে মারিস নি।
( ভাকুমতীর মন্দিরাভ্যন্তরে গমন)।
( জনৈক সাধুর প্রবেশ )
সাধু।
গীত
মধুপানে মত্তনেশায় দেখে মা তাের রক্ত আঁখি,
ভরে ওঠে চিত্ত যে মাের, অনিমিষে চেয়ে থাকি।
অ গুরু দেয়া ভাকে
*
কাজল মেঘের ফাকে ফাকে
চমূকে উঠে ক্ষণপ্রভা শিউরে উঠে পরাণ পাখী
ছােটে যে তোর চরণ পাণে (আমি) কোন পরাণে বেধে রাখি?
(গীতান্তে প্রস্থান)
৫২
একলব্য।
[ ১ম দৃশ্য।
( সূর্য অস্ত গেল চারিদিকে অন্ধকার ঘনীভূত হইতে লাগিল—মাঝে
মাঝে মেঘগর্জন শুত হইতে লাগিল।
( হিরধনুর প্রবেশ)
হির। ভানুমতী! ভানুমতী।
(মন্দিরাভ্যান্তর হইতে ভানুমতীর প্রবেশ ),
ভানু। কি রাজা? কি হয়েছে? তুমি কাপছ কেন ?
হির। কিছু হয় নি ভানুমতী। আমি মায়ের পায়ে প্রণাম
কর্তে এসেছি, তােমার কাছে শেষ বিদায় নিতে এসেছি।
ভানু। কেন রাজা-শেষ বিদায় কেন?
হির। তুমি তাে সবই জান। তবে আবার জিজ্ঞাসা কেন ?
ভানু। জানি সব, কিন্তু এরই মধ্যে যে তােমার শেষ বিদায় নেবার
সময় উপস্থিত হবে-তাতাে জানতুম না।
হির। রাজার তরফ থেকে আমাদের উচ্ছেদ কর্তে এসেছে
কে জান? দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা, ছেলে মানুষ বটে কিন্তু
বীরত্বে হস্তিনায় তার মত অল্পই আছে।
ভানু। বেশতাে! ভাইপাে এসেছেন পিসীর বাড়ীতে-এ সুখের
কথা। যদি আদর যত্ন ভালবাসা চাইতেন বুকে করে রাখতুম, মাথায় করে
রাখতুম। চাইছেন আমাদের বুকের রক্ত—তাই পাবেন। তবে কি
জান, এ ফাগের খেলার মত, দেওয়া নেওয়া দুই চাইনইলে
হয় না।
হির। তারপরে শােনতার সঙ্গে সৈন্য সামন্ত হাতী ঘােড়া
৩য় অঙ্ক।]
একলব্য।
বিস্তর,—আর তাদের পথ দেখিয়ে এনেছে সেই লােভী ব্রাহ্মণ যার
পুত্রের সঙ্গে চিত্রার বিবাহ দিতে চেয়ে ছিলেম। সেই আমাকে মিথ্যা-
কথায় ভুলিয়ে নিশ্চিন্ত করে রেখে ভিতরে ভিতরে এই কাজ করেছে।
তার লােভ আমার গজমুক্তা আর হাতীর দাঁতের উপর। সে সব আমি
কোথায় রেখেছি তাও বিশ্বাস করে তাকে বলেছিলেম—এই আমার
অপরাধ।
ভানু। তাতে আর দোষ কি হয়েছে ? সে যে ব্রাহ্মণ। • দোষ,
পাপ-এসব তােমার জন্য—এসব তাে আর তাদের গায়ে লাগে না,
পদ্মপাতায় জলের মত গড়িয়ে পড়ে যায় ।
হির। তাই দেখছি। তারপর শােন। আমার বিশ্বাস আজ
শেষ রাত্রেই তারা আমাদের উপর এসে চড়াই করবে। আমাদের
একটী লােকও যে প্রাণে বাঁচবে সে ভরসা আমার নাই।
ভানু। আমার কিন্তু আছে।
হির। কিসে!
ভানু। (আকাশে অঙ্গুলী নির্দেশ ) ঐ দেখ।
হির। দেখছি। কিন্তু সময়ে নাগাল পাবে কি?
ভানু। মা জানেন। আমি কিন্তু ভরসা করে বসে আছি । এই
নাও মারের নির্মাল্য।
(হিরন্যধনু নিৰ্মাল্য গ্রহণ করিয়া মন্দির দ্বারে
প্রণাম করিল)
হির। আমি তবে আসি ।
( হিরধনুর প্রস্থান)
৫৪
?
একলব্য।
[ ১ম দৃশ্য।
ভানু। এসাে। আমিও যাচ্ছি। জয়া ! জয়া।
( জয়ার প্রবেশ)
জয়া। কি মা?
ভানু। বনের বাইরে তাদের ছাউনী দেখেছিস ?
জয়া। দেখেছি।
ভানু। ঝড় উঠল বলে। ঝড় উঠবার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের গায়ে
গা মিশিয়ে চোরের মতন পা টিপে টিপে গিয়ে হাতীর পায়ের শেকল খুলে
দিতে হবে। পারবি
জয়া।
কেন পারব না? এ আর একটা শক্ত কি!
ভানু। তবে যা। তােরা বিশজন বেশী নয় ।
( জয়ার প্রস্থান)
চিত্রা! চিত্রা!
(চিত্রার প্রবেশ ) :
ভানু। যা বলে দিয়েছি মনে আছে ?
চিত্রা। আছে।
ভানু। বেশ যাও। হর্ষণকে একবার পাঠিয়ে দিও
(চিত্রার প্রস্থান ও হর্ষণের প্রবেশ)
হর্যণ। আমায় ডাকছিলে মা ?
ভানু। হঁা। আচ্ছা বল দেখি হ্যণ, যখন চারিদিক ভেঙ্গে
চুড়ে ঝর উঠবে, মিশ মিশে কালাে অন্ধকার ঘুট ঘুট করবে, তখন যদি
তাদের হাতী গুলাে ছাড়া পেয়ে তাদেরই ছাউনীর উপর দিয়ে দল
বেঁধে ছুটে চলে যায়, তাহলে কি অবস্থা হয় ?
৩য় অঙ্ক।]
একলব্য।
৫
হর্ষণ। খুব চমৎকার হয়। আমরা লড়াই না করেই জিততে
পারি। আর তারা বেশীর ভাগ পিশে মরে যায়। যে কজন বেঁচে
থাকে তাদের দুর্দশার একশেষ হয়।
ভানু। বেশ। তবে শােন ঝড় উঠলেই হাতী গুলো ছাড়া পাবে,
ভােরা শুধু মশাল জ্বেলে তাদের তাড়া দিয়ে ছাউনীর উপর দিয়ে চালিয়ে
দিবি। কেমন পারবি?
হর্ষণ। খুব পারব। কিন্তু হাতীর পায়ের শেকল খুলবে কে ?
সে ভার আমার ! তােরা সব তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ছে।
(হর্ষণের প্রস্থান)
ভানু। দেখিস মা, মুখ রাখিস। আজ তােরই ভরসায় বনের মাঝে
দাবানল জ্বেলে দিচ্ছি, যেন পুড়িয়ে মারিস নি।
( প্রস্থান)
( সজোরে মেঘগর্জন—ঝড় উঠিল )
(গাহিতে গাহিতে চিত্রার প্রবেশ ।
চিত্রা
গীত
গুরে ও বনের পথের পথ ভােলা।
আয়রে ছুটে আমার পাছে আমার ঘরের দোর খেলা।
আমি আঁধার রাতের দীপালী রে, মরু পথের ঝরণা।
বাদল রাতেব পথের সাথী, রূপসী হেম বরণা,
আমি হারিয়ে যাওয়া দখিন হাওয়া, মন ফাগুনের হিন্দোল। -
অায়য়ে ছুটে নে রে লুটে আগুন ফাগের রং গােলা।
( গাহিতে গাহিতে প্রস্থান)
-
একলর। [ ১ম দৃশ্য। ( দুইজন কুরু সৈনিকের প্রবেশ) ১ম সৈ। ওরে, ওরে ওটা কে বল দেখি, মানুষ না অপদেবতা ? ওর পেছনে ছুটতে ছুটতে এ আমরা কোথায় এসে পড়লুম ? ওর গানে আমরা এত মাতােয়ারা হয়ে পড়েছি যে মাথার উপর দিয়ে দৈত্যের মত বিরাট ঝড় শোঁ শোঁ করে ছুটে চলেছে—তাও টের পাইনি। গায়ে বৃষ্টি পড়ছেনা, যেন তীর বিধছে, শীল পড়ছেনা যেন এক একখানি পাথর ছিটকে এসে লাগছে—তাও গ্রাহ করিনি। বন, বাদাড়, খানা, ডােবা ভেঙ্গে শুধু ছুটেছি আর ছুটেছি। এখন প্রাণ যায় । ২য় সৈ। কিন্তু গেল কোথায় ? এখন পর্যন্ত ঠিক পেছন পেছন এসেছি। এইখানে এসে খেই হারিয়ে ফেললুম। ১ম সৈ। হারিয়ে গেছে আপদ গেছে। এখন চল, কোথাও গিয়ে মাথা বাঁচাই। উঃ প্রাণ গেল যে। ২য় সৈ। যেতে হয় তুই যা, আমি যাব না। আমি দেখব ও কোথায় গেল। ওকে ধরবই ধরব। তাতে প্রাণ যায় কি থাকে । ১ম সৈ। তবে মর ( প্রস্থান ) (নেপথ্যে গীতধ্বনি) আমি আঁধার রাতের দীপালী রে মরু পথের ঝরণা বাদল রাতের পথের সাথী, রূপসী হেমবরণ- আয়রে ছুটে আমার কাছে আমার ঘরের দ্বার খোল। ওরে ও বনের পথের পথ ভােলা ! ওই---ওই যাচ্ছে, ওই যাচ্ছে। সুন্দরী দাড়াও। (বেগে প্রস্থান ) ৩য় অঙ্ক।] একলব্য। ( খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে বিদ্যাবিপর্যয়ের প্রবেশ ) বিদ্যা। ওরে যাসনে যাসনে, ওটা পেত্নী—এখুনি ঘাড় মটকাবে। যা মরগে। আমার কি ? উঃ হুঃ হুঃ হোঁচট খেয়ে পাটা একেবারে গেছে। যেমন গেছিলুম ওই জমাদার ব্যাটাদের সঙ্গে ভাব করে কাজ গুছিয়ে নিতে--তেন্নি ফল হয়েছে। গিন্ধড় ব্যাটারা নিজেরাও মল আমাকেও মেরে গেল। এখন উপরে ঝঞ্চাবাত শিলাপাত নীচে অন্ধকার অপিচ খট্টা ভাঙ্গিলে ভূমি শয্যা হয়! এখন করি কি? যাই দেখি কোন কোটরে টোটারে ঢুকে প্রাণটা বাঁচাতে পারি কি । রাম নাম সত্য হারাম নাম- ( ভল্ল উদ্যত করিয়া ভানুমতীর প্রবেশ-) আঁ! একি বিরহ বিধুর বিকট ব্যাপার! একজন তাে গানের পিছনে দৌড় করিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাজাত করে দিয়েছেন ইনি যে আবার শূল দিয়ে হুল ফুটিয়ে ভব নদী পার কৰ্ত্তে চান! না—গতিক তত মােটেই সুবিধে বুঝছি না। ভানু। তুমি আমার বন্দী। যদি প্রাণের মায়া থাকে নিঃশব্দে আমার সঙ্গে এসাে। বিদ্যা। বন্দী! বন্দী কি? একটু সন্ধি একটু সন্ধি বিচ্ছেদ করে বল তাে শুনি। ভানু। আমার সঙ্গে এসাে বলছি। বিদ্যা। তা, তা—আহাহা যাচ্ছি যাচ্ছি—খোঁচা দাও কেন? অমি বিনামূল্যেই যাচ্ছি। খোঁচাদাও কেন?
একলব্য। [ ১ম দৃশ্য। ( অশ্বত্থামা ও হরণ্যধনুর প্রবেশ ) অশ্ব। ব্যাধ মনে করাে না, দৈব দুর্বিপাতে, ঝড়ে, শিলাপাতে, রণ- হস্তীর তাড়ণে আমাদের শিবির ও সৈন্য দল বিদ্ধস্ত হয়েছে বলে তােমরা নিরপদ হয়েছ। মনে রেখাে কুরুরাজের সৈন্য বল অসীম, আমার মত নগণ্য সেনাপতি তার বহু আছে। তিনি যখন সঙ্কল্প করেছেন যে এখানে নূতন নগর নির্মাণ করে ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপন করবেন, তখন যে তিনি একবার বিফল হয়েই সে চেষ্টায় বিরত হবেন তা স্বপ্নেওঁ মনে করাে না। এ সব জেনেও যদি তােমরা আমায় বন্দী কর্তে চাও আমি, বারণ করব না। কিন্তু এর ফল হবে অতি ভীষণ তা জেনে রেখাে। হির। আমরা মুখখু বেদে। অত ফলাফল হিসেব করবার মত বুদ্ধি কি আমাদের আছে ? তবে হ্যা, বন্দী ঠিক তুমি নও, তুমি থাকবে নজর বন্দী! ঘরে বাইরে যেখানে ইচ্ছা বেড়িয়ে বেড়াও, যা খুশী কর, কেউ বারণ করবে না। কেবল সীমানার বাইরে যেতে পারবে না। অশ্ব। বেশ তাই হবে। চল কোথায় নিয়ে যাবে । হির। এখন আর কোথাও যেতে হবে না। আজ রাত্রির মত এই মন্দিরেই বিশ্রাম কর। কাল তােমার জন্য একটা ভাল যায়গা দেখে ঘর বেঁধে দেওয়া যাবে। অশ্ব। মন্দির! আঃ বাঁচলেম। ব্যাধ আমি বড় তৃষ্ণার্ত, তােমার মন্দিরের পূজারীকে বল আমায় একটু পানীয় জল দিতে হির! এই তাে মুস্কিলে ফেলে দেবতা। মন্দিরে তত পূজারী নাই। অশ্ব। মন্দিরে না থাক্, সে নিশ্চয়ই নিকটেই কোথাও আছে।
৩য় অঙ্ক।] একলব্য। আমি বড়ই তৃষ্ণার্ত। তুমি বরং আমাকে তার কুটীরে নিয়ে চল । আগে আমায় জলপান করিয়ে যেখানে নিয়ে যেতে হয় যেও। হির। দেবতা, আমাদের এখানে পূজারী বলে কেউ নাই। আমরা নিজেরাই মায়ের পূজা করি। তাও আবার মন্ত্র তন্ত্র জানিনা, মনের সােজা কথাগুলি মাকে বলি। বেদের বুদ্ধি কিনা, আমরা মনে করি মার পায়ে সন্তান ফুল জলের অঞ্জলী দেবে, দয়াল ঠাকুরের কাছে নিজের দুঃখ নিবেদন করবে তাতে আবার কতকগুলি বাধা বুলি আওড়বার জন্য মাঝখানে একজনকে দাড় করবার দরকার কি? মা বাবা থাকেন কৈলাশে, দীনের ঠাকুর দীননাথ থাকেন বৈকুণ্ঠে। আমাদের পূজা সেইখানে গিয়ে পৌঁছায়-দুযায়গার এক যায়গায়ও তো জাতের বিচার নাই—যে নন্দী ভূঙ্গি শূল নিয়ে তাড়া করবে কি জয় বিজয় বেত মেরে বিদায় করবে। অশ্ব। আচ্ছা, মন্দিরে যখন দেবীমূৰ্ত্তি আছে তখন নিশ্চয় তার পাদোদকও তাে আছে। হির। তাতে আছে। কিন্তু এতত আর তােমাদের বামুনের পূজো করা দেবী নয়। এ যে বেদের মা। চড়ালের ঘরে এসে চঁড়ালের ছোঁয়া খেয়ে মারও যে জাত গিয়েছে। তাঁর পাদোদক জল তুমি কেমন করে খাবে ঠাকুর? না না, একেত রাজার বিষ নজরে পড়েছি, তার উপর তােমার আবার জাত মেরে তােমার বাবার শাপমন্তি কুড়ােতে পারব না। তার চেয়ে চল আমি তােমায় ঝরণার ধারে নিয়ে যাচ্ছি সেইখানে আঁজলা পুরে জল খেয়াে আর নূতন কলসী দিছি, জল নিয়ে এসো—যেন আবার দরকার পড়লে ছুটেতে না হয়। । একটি
একলৰ্য।
[ ১ম দৃশ্য।
কথা কিন্তু বুঝতে পচ্ছি না। আমাদের ছোয়া ঝর্ণার জল
খাবে তাে?
অশ্ব। খাব, খাব, তুমি চল। (স্বগত) তাইতাে! কিরাতের
ঘরে এসে মা ভবানীরও কি জাত গিয়েছে। জাতের গণ্ডীর বুনিয়াদ
কি এতই পাকা ?
( উভয়ের প্রস্থান)
( চিত্রার প্রবেশ)
চিত্রা।
গীত
আজি বাদলে আজি বাদলে
নাচে ময়ুরী ডাকে দাদুরী আপন ভােলা দলে দলে।
হােথ ভালভরা মেঘ বিজলী হানিয়া হাসিছে ঝলকে ঝলকে,,
গুরু গুরু গুরু বাজায় উমরু পুলকে পলকে পলকে,
হেথা বিরহিনী কমলিনী ভাসিছে নয়ন জলে।
হারায়েছে ওগাে বধয়া কাহার আজি এ অ ধার রাতে
বু ভেঙ্গে যায় দারুণ ব্যথায়—নিদ নাহি আঁখি পাতে
ভুলে যাও, তারে ভুলে যাও সখী ভুলোনা আশার ছলে।
করমের লেখা আছে কি উপায়-মরম যদি গো জ্বলে ?
**:
৬১
দ্বিতীয় দৃশ্য।
বন দিবাভাগ।
(ব্যাধ বালকগণের প্রবেশ)
বাবা-গণ।
গীত
আমরা নেহাৎ ছােট তের মেয়ে
ছায়াটী চুলে মোদের ঘর বুকে নেয়ে।
পঞ্চবটী বনের মাঝে গঙী দেওয়া ঘরে
ছিলেন সীতা নিরাপদে, কিন্তু যখন পরে
ভূলের বশে বাহিরে এলেন, ধ’ে রাবন রাজা
কতই দুঃখ দিলে তারে দিলে কতই সাজা।
বলি তাই গণ্ডী কেতো।
খিল এঁটে সব ঘরে থাক বাইরে ছুটো না
( মােদের) লাগলে হাওয়া জল বিছুটী জ্বালায় যাবে ছেয়ে
সামলে চলে। ও বড়রা নিজের ভাল চেয়ে।
(দ্রোণাচাৰ্য দুর্যোধন ও অর্জুনের প্রবেশ )
অৰ্জ্জুন। এ অতি আশ্চৰ্য্য। বনের মধ্যে কিরাতদের ঘর বাড়ী
সব আছে কিন্তু তারা যে কোথায় লুকিয়ে আছে কিছুতেই খুঁজে
পাওয়া যাচ্ছে না। অশ্বথামা এবং সেই ব্রাহ্মণকে যে কোথায় আবদ্ধ
করে রেখেছে তারও কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এখন
উপায় কি ?
একলব্য।
[ ২য় দৃশ্য।
দুৰ্য্যোধন। আমার ইচ্ছা বনে আগুন ধরিয়ে দিই, তা হলেই
কিরাতদের পাওয়া যাবে। তাদের পেলেই অশ্বত্থামা এবং সেই
ব্রাহ্মণেরও সন্ধান পাওয়া যাবে।
অর্জুন। তা হয় তাে যাবে, কিন্তু তখন তাদের সেই অগ্নি থেকে
রক্ষা করবার কোন উপায় থাকবে না।
দ্রোণ। বিশেষ এই বনের অপর প্রান্তে তপস্বীদের আশ্রম। অগ্নি
যদি তাদের আশ্রম স্পর্শ করে তা হলে তাঁদের অভিশাপে একদিনে
ভারতবংশ নির্মূল হয়ে যাবে। বৎস দুৰ্য্যোধন, তুমি স্থির হও—ধৈৰ্য্য
হারিও না।
অর্জুন। আমাদের একশ তিন ভাই সৈন্যসামন্ত নিয়ে বনে বনে
তাদের সন্ধান কচ্ছে। চলুন গুরুদেব আমরাও যাই
দ্রোণ। একটু ভাবতে দাও, একটু ভাবতে দাও অর্জুন। অধীরতায়
কাৰ্য সিদ্ধ হয় না।
( ভানুমতীর প্রবেশ)
ভানু। তােমরা বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়েছ না ?
দুৰ্য্যোধন। এই যে এক কিরাতিনী। কিরাতিনী ! যদি প্রাণের
মায়া থাকে শীঘ্র বল্ অশ্বত্থামা এবং সেই ব্রাহ্মণকে কোথায় রেখেছিস?
তােদের লােজনই বা সব কোথার বল, নইলে এই অমােঘ বান
এখুনি তাের বক্ষ ভেদ করবে ।
দ্রোণ। ছিঃ দুৰ্য্যোধন, কি কর ?
অৰ্জ্জুন। ভাই, এ যে নারী। নারীর সঙ্গে আমাদের কিসের
বিবাদ ?
৩য় অঙ্ক। একলব্য। ভানু। রাজপুত্র, তােমাদের সামনে যখন এসে দাঁড়িয়েছি তখন কি ভেবেছ প্রাণের মায়া রেখে এসেছি ? তােমরা বড়, আমরা ছােট,-ভেবেছ কি তােমাদের আমরা চিনি না। দ্রোণ। ভানুমতী, অশ্বত্থামা কোথায়? ভানু। নিশ্চিন্ত হও—সে কুশলে আছে। আমি নিজে তার রক্ষণা- বেক্ষণের ভার নিয়েছি। তাই আমি তােমায় বলতে এসেছিলেম। তােমার ছেলে-আমার ঘরে তার যতখানি যত্ন হওয়া উচিত তা হবে । দ্রোণ। আর সেই ব্রাহ্মণ ? ভানু। সেও নিরাপদে আছে। দুৰ্য্যো। তাদের এখুনি ফিয়িয়ে দাও। আময়া তাদের চাই। ভানু। আগে তােমরা স্বীকার কর যে তােমরা আর খামখা আমাদের উপর জুলুম করবে না, আমরা এখুনি তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি। দুৰ্য্যো। যদি স্বীকার না করি? ভানু। তা হলে আমরা তাদের ফিরিয়ে দেব না। তােমরা পার, তাদের খুঁজে নাও। দুৰ্য্যো। তবে রে পাপিষ্ঠা অস্ত্রাঘাত করিতে উদ্যত হইল, অর্জুন তাহার হাত ধরিয়া বাধা দিল। দ্রোণ। দুৰ্য্যেধন! দুৰ্য্যেধন! তুমি একে জান না তাই ক্রোধে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছ। আমার নিষেধ তােমরা কেউ এর কেশাগ্রও স্পর্শ কর্তে পারবে না। এ নারী হলেও যুদ্ধবিদ্যায় অপটু নয়, তথাপি নিরস্ত্র হয়ে আমাদের সম্মুখে এসেছে। আমি বুঝতে পাচ্ছি তুমি কেমন করে এর অঙ্গে অস্ত্রাঘাত কৰ্ত্তে উদ্যত হচ্ছ । মনে ৬৪ একলব্য। [ ২য় দৃশ্য। ' রেখাে এরা বর্বর নিষা—এদের প্রতিহিংসা হৃতশাধক বাঘিনীর চেয়েও ভয়ানক। যদি এর গায়ে কাঁটার আঁচড়টী লাগে তবে সেই মুহূর্তে অশ্বত্থামা এবং সেই ব্রাহ্মণের প্রাণ যাবে,–এর স্বামীও বাধা দিয়ে রাখতে পারবে না,-ফল তার যাই থােক। যদি তাদের উদ্ধার কর্তে চাও তবে শান্ত ভাবে সন্ধির কথা কও। দুৰ্য্যোধন। আপনি কি বলছেন গুরুদেব ? এক সামান্য কিরা- তিনীর সঙ্গে সন্ধির কথা কইব আমি,-মহারাজাধিরাজ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র। ভানু। বেশ না কও নাই কইবে। এখন আমার দু একটা সােজা কথার উত্তর দাও দেখি। তােমরা আমাদের সঙ্গে এত লাগছ কেন? আমরা বনে থাকি, তােমাদেরই প্রজা। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে ডাকলে আমরা ছুটে গিয়ে তােমাদের জন্য প্রাণ দিই। নেহাৎ গরীব আমরা, আমাদের উপর এ জুলুম কেন ? দুৰ্য্যো। সমস্ত ভূমির অধিকারী রাজা। তিনি যে কোন ভূমি যাকে ইচ্ছা দান কর্তে পারেন এতে অত্যাচার হয় না। বিশেষ অনাৰ্য্য বর্বরদের উচ্ছেদ সাধন করে ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপন করা বিধি সঙ্গত। এতে কোন পাপ হয় না। ভানু। সমস্ত ভূমির অধিকারী রাজা? আর প্রজা—যে বন কেটে চাষের জমি বার করে ফসলের জন্য দিনরাত মুখে রক্ত উঠিয়ে খেটে মাটীকে সােনা করে তােলে, যেখানে জল নেই সেখানে জল নিয়ে আসে, যেখানে ফল নেই সেখানে বাগান তৈরি করে,সে কেউ নয়? রাজার একটা মুখের কথায় তার খাটুনীর সমস্ত ফল আর একজনের পায়ে ডালি দিয়ে তাকে নির্বিবাদে চলে যেতে হবে ?
৩য় অঙ্ক।]
একাব্য।
.
একটা মুখের কথাও সে কইতে পাবে না? এই কি বিধি ? এই
কি বিচার ?
দুৰ্য্যো। অবশ্য ।
ভানু। ভাল জিজ্ঞাসা করি, এ অধিকার রাজা পান কোথায়?
কে তাকে এ অধিকার দেন ? এই অধিকার নিয়েই কি তিনি ভুমিষ্ঠ হন ?
দুৰ্য্যো। এ তাঁর বিধিদত্ত অধিকার। এতে হস্তক্ষেপ করবার
শক্তি কারু নাই।
ভানু। ভুল রাজকুমার, ভুল তােমার। বিধাতা কখনাে অন্যায়
করেন না, রাজারও রাজ্য যায়, ভিখারীও রাজা হয়। সে তার
কৰ্ম্মফল। অবিচার অত্যাচার যে করে সে রাজা হলেও বিধাতা
কখনাে তার সহায় হন না। তিনি তােমারও যেমন আমারও ঠিক
তেমনি। তাঁর কাছে জাতিভেদ নাই। প্রজা সুখে থাকবে বলেই
রাজার দরকার। তা যদি না হত তৰে রাজা বলে কোন জীবকে
তিনি সৃষ্টি কৰ্ত্তেন না। একজনের হাতে রাজদণ্ড তুলে দিয়ে আবার
তা কেড়ে নিতেন না। যাক সে কথা। ব্রাহ্মণ, তােমার কাছে
আমার একটী ভিক্ষা আছে। তােমরা যদিও আমাদের সাজা দিতে
এসেছ তবু তােমরা আমাদের অতিথি। আমরা অনেক বনের ফল
সংগ্রহ করে রেখেছি। যদি আমরা কিছু ফল তােমাদের পাঠিয়ে
দিই তােমরা নেবে কি ?
দ্রোণ। অবশ্য নেব।
অবশ্য নেব। তুমি আমাদের ছাউনীতে পাঠিয়ে দাও।
ভানু। যারা ফলের ঝুড়ি বয়ে নিয়ে যাবে তারা নিরাপদে বেরুতে
পারবে তো।
১
একলব্য।
[ ২য় দৃশ্য।
দ্রোণ। নিশ্চয়। আমি কথা দিচ্ছি।
দুৰ্য্যো। যদি আমরা তাদের পেছু নি?
ভানু। পারবে না। বনের ভেতর তারা অনায়াসে তােমাদের
চোখে ধুলাে দিয়ে পালাবে। আমি তা হলে চল্লম। যদি এর পর
আমাদের সঙ্গে সন্ধির কথা কইবার তােমাদের ইচ্ছা হয়, কি আর
কোন দরকার হর—এইখানে এসে তিন বার শাখে ফু দিও, আমার
দেখা পাবে।
(প্রস্থান)
অর্জুন । গুরুদেব! এ নারী কে ?
দ্রোণ। সময়ান্তরে বলব। এখন শিবিরে চল, দেখি তােমাদের
একশ তিন ভাই যারা অনুসন্ধানে বেরিয়ে ছিল তারা কেউ কোন
সংবাদ নিয়ে ফিল কি না।
( প্রস্থানােদ্যোগ—ব্যস্তভাবে জনৈক অনুচরের প্রবেশ)
অনুচর। রাজকুমার! আচাৰ্য্যদেব, বড় আশ্চর্য ঘটনা। আমা-
দের একটী শিকারী কুকুর বনের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। বহুক্ষণ
সন্ধ্যানের পর যখন তাকে খুজে পেলেম, দেখি তার মুখে একযােগে
সাতটী শর বিদ্ধ হয়ে তার বানােধ করে দিয়েছে অথচ তার অঙ্গের
অন্য কোন স্থানে আঘাতের চিহ্ন নাই। এরূপ শরবেধ আমরা কখনো
দেখিনি, কেউ যে দেখেছে তাও কখনাে শুনিনি।
দ্রোণ। তুমি কি বলছ সৈনিক! এও কি সম্ভব ? চলত দেখি
দুৰ্য্যো! গুরুদেব! থাক কুকুর এখন। আগে চলুন অশ্বত্থামার
সন্ধান করি।
।
৬৭
৩য় অঙ্ক।]
একলব্য।
(
দ্রোণ। না, না দুৰ্য্যোধন, অশ্বত্থামার চেয়েও প্রিয় আমার ধনুৰ্বেদ।
আমি দেখতে চাই কে তার অপমান করে, তার বিধি নিষেধকে অবহেলা
করে। কে সে, কোথা হতে, কেমন করে, এ বিদ্যা আয়ত্ব কলে। চল,
দুৰ্য্যোধন, এসাে অর্জুন আমার একমুহূৰ্ত বিলম্ব অসহ বােধ হচ্ছে।
অগ্রসর হও সৈনিক, পথ দেখাও।
সকলের প্রস্থান)
(হর্ষণ ও জয়ার প্রবেশ)
গীত
হর্ষণ।
বেদিনী লো ! ওরা ফুট ফুটে সব বড় লােক বলে
ওদের পানে নয়না হানিস, আমার তাই গা বলে ।
জয়া।
তাের মনটা ভারি কু,
তাই সিংটী নেড়ে আসিস তেড়ে মার্তে চাদরে ঢ ?
তুই আপন দোষে জ্বলে মরিস বেগুণে তেলে ।
হর্ষণ। তুই যে বাস্ত ঘুঘুঘু ঘু ঘু,
আমি ভাল মানুষ করি নাক ট,।
তাই বলে ভাবি নাক উড়ে যাবি—আমার কাছে চাল চেলে।
আমি কচ্ছি মানা, ঘেসিমনে আর আমার কাছে রে
হর্ষণ। আমি কচ্ছি না। ছুটিসনে আর আমার কাছেরে!
আমি তাের কপালে তেঁতুল গুলে আপন পথে যাই চলে।
যাই চলে যাই চলে যাই চলে।
জয়া। ওরে শােন্ শাে-
হর্ষণ। পেছু ডাকলি তাে! ইচ্ছেটা আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে
মরি কেমন ?
**
৬৮
একলর্য।
[ ২য় দৃশ্য।
জয়া। ওরে শশান্ না, ভারি একটা কাজের কথা আছে।
হর্ষণ। কি বল্।
জয়া। (ঠোনা মারিল )—এই নে ।
(প্রস্থান)
হর্ষণ। আচ্ছা আমারও নাম হর্ষণ
করব কেশাকর্ষণ
করিয়ে দেব সর্ষে ফুল দর্শন।
(প্রস্থান)
( দ্রোণ দুৰ্য্যোধন ও অর্জুনের পুনঃ প্রবেশ)
দ্রোণ। বৃথা তােমার অভিমান অৰ্জ্জুন। তুমি সাধনার বলে বিদ্যা
গ্রহণ করবার যে শক্তি অর্জন করেছ তা আর কেউ পারেনি।
তুমিই আমার শ্রেষ্ঠ শিষ্য। তােমাপেক্ষা অধিক বিদ্যা আমি আর
কাউকে প্রদান করিনি, কেউ আমার কাছ থেকে নিতে পারে নি।
(দুৰ্য্যোধন মুখ ফিরাইল)
কিন্তু প্রহেলিকার অর্থ আমি বুঝতে পাচ্ছি না। ত্রেতা যুগের বিস্তৃত
দ্বাপরে নিষিদ্ধ ধনুর্বেদের এই অংশ কে কোথা হতে কেমন করে আয়ত্ব
কলে। গুরুদেব সমগ্ৰ ধনুর্বেদ আমায় দান করবার সময় বলেছিলেন
পৃথিবীতে এ বিদ্যা আর কেউ জানে না। তার বাক্য, অভ্রান্ত।
আমায় দেখতে হবে কে তার অন্যথা করেছে। এসাে দুৰ্য্যোধন। এসাে
অর্জুন, আমার গুরুর মান রক্ষা কর, আমার মান রক্ষা কর।
( সকলের প্রস্থান)
তৃতীয় দৃশ্য।
একলব্যের পােবন।
[ দ্রোণাচার্যের দারুমূর্তির পাদমূল্যে একলব্য ধনুকে শরসংযােগ
করিয়া দূর লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া নতজানু হইয়া বসিয়া আছে।
আশে পাশে অবিদ্যাগণ তাহার তপােভঙ্গ করিবার চেষ্টা করিতেছে।]
গীত
অবিদ্যাগণ।
বঁধুয়া এত কি নিঠুর তব হিয়া !
রূপের বিজলী ছটা পশে না মরমে গাে
ও আখির দুয়ার দিয়া !
নিটোল এ যৌবন ঢল ঢল উছিলত
ধরিয়া রাখিতে বঁধু নারি যে,
অধর মদিরা মাথা সুধার সায়র বধু
পথ চেয়ে রয়েছে তােমারি যে,
গাধি আশা ভালবাসা মালাটী এনেছি গাে
তােমা লাগি পরাণ পিয়া।
রাতের স্বপন বধু প্রভাতে মিলায়ে যাবে,
রবে শুধু স্মৃতির পরশ
আজিকার ফোটাফুল কালিকে ঝরিয়া যাবে,
রবে শুধু সুদ হরষ ।-
আজি লুঠে নাও বধু মিলনের যত মধু,
মাের ফিরি রিক্ত হইয়া।
যত ব্যথা যত কাটা আমাদের দিয়া বধু
তুমি যাও সুখ টুকু নিয়া।
একলব্য।
[ ৩য় দৃশ্য।
এক। কে তােমরা কেন আস বার বার ?
কি চাহ এখানে?
তপস্যায় বাধা কেন দাও ?
১মা। আমরা টাটকা ফোটা ফুল এসেছি ভাংতে তােমার ভুল
সুখের শয্যা ছেড়ে কেন দুখ পেতে ব্যাকুল ?
২য়। তীরধনুক আর লক্ষ্যভেদ কি ফল হবে বল ?
তপস্যার এ দারুণ দুঃখে সুখের দিন যে গেল।
৩য়। তাই তাে বলি—
সকলে।
গীত
আজি লুঠে নাও বধু মিলনের যত মধু
মাের ফিরি রিক্ত হইয়া
যত ব্যথা যত কাটা আমাদের দিয়া বধু তুমি যাও সুখ টুকু নিয়া
এক। বুঝেছি, তােমরা অবিদ্যা—আমার তপােভঙ্গ কৰ্ত্তে এসেছ।
দূর হও, এই মুহূর্তে এখান থেকে দূর হও। নইলে এই বাণাঘাতে
তােমাদের পুড়িয়ে ছাই করে দেব,সংসারের একটা অশান্তি দূর
১ম অবিদ্যা। না না, আমরা যাই, তােমায় বিরক্ত করব না
আমরা যাই।
অন্যান্য অবিদ্যাগণ। আমরা যাই, আমরা যাই।
( অবিদ্যাগণের প্রস্থান)
এক। এসে গুরুদেব ! এই দারুমূর্তিতে প্রাণরূপে প্রবেশ লাভ
করে আমায় বিদ্যা দান কর—এই ব্রহ্মশির অস্ত্রের স্থাপন মরণ সংহরণ
৭১
৩য় অঙ্ক। ]
একলব্য।
মন্ত্র শিক্ষা দাও। তােমার শিষ্য আমি-আশীৰ্বাদ কর যেন তােমার
মান রাখতে পারি।
( দ্রোণাচাৰ্য, দুর্যোধন, অর্জুন ও সেনানীর প্রবেশ)
দ্রোণ। বৎস! কে তুমি এই বিজন বনে বসে ধনুর্বেদের সাধনা
কচ্ছ? তােমার নাম কি কার পুত্র তুমি ? কার কাছে তােমার
?
শিক্ষা ?
এক। আমি নিষাদকুলপতি হিরণ্যধনুর পুত্র—আমার নাম একলব্য।
আমি দ্রোণাচার্য্যের শিষ্য, তিনিই আমায় ধনুর্বেদ শিক্ষা দিয়েছেন,
এখনও দিচ্ছেন।
অর্জুন ও দুর্যোধন। গুরুদেব !
দ্রোণ। চুপ কর। তুমি দ্রোণাচার্যের শিষ্য ? সত্য বলছ ?
এক। মিথ্যা বলব কেন ? কিন্তু আমার কথা কইবার সময়
নাই। তােমরা যাও এখান থেকে, আমার সাধনায় বাধা দিও না।
দ্রোণ। বৎস! আমরা তােমার সাধনায় বাধা দেব না, বরং
সহায়ক হব। আচ্ছা বল দেখি সে কি নিজে এসে তােমায় শিক্ষা
দিয়ে যায় ?
এক। হ্যা আমার আহ্বানে তিনি এই দারুমূর্তিতে আবির্ভূত
হয়ে আমায় বিদ্যা দান করেন। দিবাভাগে তিনি প্রায় আসেন না
গভীর রাত্রিতে যখন সমস্ত সংসার ঘুমিয়ে থাকে তখন তিনি আসেন।
এই তাে সকাল থেকে আমি তাকে আহ্বান কচ্ছি, কিছুতেই তাঁর দয়া
হচ্ছে না। কিন্তু রাত্রিতে ডাকবামাত্র আসেন।
( দুৰ্য্যোধন ও অর্জুন পরস্পরের মুখ চাহিল )
৭২
=
একলব্য।
[ ৩য় দৃশ্য।
দ্রোণ। হু। তুমি যে কিয়ৎক্ষণ পূৰ্বে এক কুকুরের মুখে শব্দভেদী
সপ্তশর নিক্ষেপ করেছিলে, তাও কি দ্রোণাচার্যের নিকট পেয়েছ ?
তা নইলে আর কোথায় পাব ? কুকুর চিৎকার করে
আমার সাধনার ব্যাঘাত কচ্ছিল, তাই আমি তার বাবােধ করে
দিয়েছি।
দ্রোণ। দ্রোণ আর আচাৰ্য নয়, ব্রাহ্মণ নয় গুরুর অবমাননাকারী
পাতকী পিশাচ। বৎস, তুমি আর তাকে গুরু বলে পূজা করাে না
আজ হতে ওই দারুমূৰ্ত্তি-
এক সাবধান ! সাবধান! আমি তাঁর শিষ্য-ক্ষত্রিয় শিষ্য নই—
চণ্ডাল শিষ্য। আমার সম্মুখে তাকে কটুক্তি কলে আমি এই মুহূর্তে
তােমার রসনা দ্বিখণ্ডিত করব। একি! একি! আমি কি জেগে
আছি না ঘুমিয়ে আছি ? গুরুদেব! সত্য আপনি এসেছেন, না আমি
দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখছি? স্বপ্ন থােক, সত্য হােক, আজ আমার
পুনর্জন্ম। যে দিন আপনার চরণাশ্রয়ে বঞ্চিত হয়ে কঁদতে কাঁদতে
ফিরে এসেছিলাম, সেদিন মা আমায় দীক্ষা দিয়ে বলেছিলেন, যেদিন
এইখানে বসে তুই গুরুর পদধূলি পাবি, সেই দিন তাের চণ্ডালত্ব
মােচন হবে, তাের পুনর্জন্ম হবে। সেদিন আর দেবতা, ব্রাহ্মণ, রাজা
কেউ তােকে চণ্ডাল বলে ঘৃণা করবে না। আজ সেদিন এসেছে
গুরুদেব! চণ্ডালত্বের গ্লানি আমার ভেতর বার আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
দিন আমায় পদধূলি দিন, আমি মুক্ত হই।
মন্নাথ শ্রীজগন্নাথ মগুরু শ্রীজগদগুরুঃ
মদাত্মা সৰ্ব্বভূতাত্মা তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।
৭৩
৩য় অঙ্ক।] একলব্য। অর্জুন। চণ্ডাল সংস্কৃত বাক্য উচ্চারণ করে—এ কি আশ্চর্য্য। দ্রোণ। কিছু আশ্চর্য নয় বৎস। সাধনায় সব হয়। এর সাধনায় ওই মন্ত্র দিবানিশি জপ করে দেবদুলভ শক্তি সঞ্চয় করেছে। এই বালক বিদ্যার্থী হয়ে আমার দ্বারে গিয়েছিল। চণ্ডাল বলে আমি বিদ্যা দান করি নি। সেইদিন হতে প্রতি স্বপ্নে আমায় আকর্ষণ করে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার নিকট হতে বিদ্যা গ্রহণ করেছে, নিজের যােগ্যতা প্রতিপন্ন করেছে, আমার দম্ভ চূর্ণ করেছে, আমায় উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছে। বৎস! তােমার চণ্ডালত্ব মােন হয়েছে কিন্তু আমি চণ্ডাল হয়েছি। আমি গুরুর আদেশ লঙ্ঘন করেছি, তার অবমাননা করেছি। এক। কিসে প্রভু ? দ্রোণ। তার আদেশ ছিল ত্রেতাযুগের শব্দভেদীবাণ-দ্বাপরে কেউ প্রয়ােগ করবে না। আমি তা কাউকে শিক্ষা দেব না। কিন্তু আমি ইচ্ছায় হােক অনিচ্ছায় হােক তােমাকে তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তুমি তা প্রয়ােগ করেছ। এক। গুরুদেব । আমি জানতেম না যে ও বানের ব্যবহারে আপনার গুরুর নিষেধ আছে। জানলে কখনাে আমি তা গ্রহণ কৰ্ত্তেম । কিন্তু গুরুদেব! আমি যা করেছি তার জন্য পাপভাগী আমিই তাে হব। আপনার এতে কি দোষ ? দ্রোণ। দোষ এই যে গুরুর আদেশ অনুসারে আমি তােমায় দণ্ড বিধান করে তার অবমাননার প্রতিশােধ নিতে বাধ্য। কিন্তু তা আমি পারব না। পুতুল্য শিষ্য তুমি আমার, অর্জুনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ৭৪ একলব্য। [ ৩য় দৃশ্য। শিষ্য, তুমি আমার মুখােজ্জ্বলকারী—সধনার অপূর্ব নিদর্শন দেখিয়ে আমায় মুগ্ধ করেছ। স্নেহে আমার হৃদয় ভরে উঠেছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে তােমায় বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করি। তােমায় দণ্ড দেওয়া আমার সাধ্যাতীত। এক। না, না গুরুদেব। আমার জন্য আমি আপনাকে পাপ- ভাগী হতে দেব না। আদেশ করুণ কি দণ্ড আমি গ্ৰহঃ করব। আমি এই মুহূর্তে আপনার আদেশ পালন কচ্ছি। সেদণ্ড যতই কঠিন হােক আমি হাসি মুখে তা গ্রহণ করব। আপনি আমার গুরু। আমি আপনার চণ্ডাল শিষ্য হলেও এত অধঃপতিত নই যে আপনার নিকট হতে বিদ্যা গ্রহণ করে তার বিনিময়ে আপনাকে দেব এমন গুরুদক্ষিণা— যা চির- দিনের মত আপনাকে কলঙ্কিত করে রাখবে। দ্রোণ। প্রাণাধিক প্রিয় শিষ্য আমার ! আমায় পাপমুক্ত কর্তে চাও যদি তবে তােমায় দিতে হবে এমন কিছু যার তুলনায় তুমি নিজের প্রাণকেও তুচ্ছ জ্ঞান কর। পারবে দিতে ? এক। অবশ্য পারব গুরুদেব। আমি যে বড় মুখ করে মাকে বলেছি, আমি প্রমাণ করব, আমি আপনার যােগ্য শিষ্য। আপনি চান এমন কিছু যার তুলনায় আমি প্রাণকে তুচ্ছ জ্ঞান করি। আমি দেব আপনাকে এমন কিছু যার বিনিময়ে আমি চতুৰ্গকেও তুচ্ছ জ্ঞান করি। নিন গুরুদেব আমার এই ধনুর্বাণ, আমার শিক্ষা দীক্ষা সাধনা যা আপনার পায়ের তলায় বসে আমি পেয়েছি, আর তার নিদর্শন { অর্জুনের কোষ হইতে তরবারি টানিয়া লইয়া বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কাটিয়া দিল) আমার এই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ যেন আমি জীবনে আর কখনাে বাণক্ষেপ কর্তে না ৭৫ ৩য় অঙ্ক।] একলব্য। পারি। আমার এই শান্তিতে আপনার পাপ মােন হােক গুরুদেব, আপনার গুরুর মান রক্ষা হােক। দ্রোণ। একলব্য ! একলব্য ! কে বলে তুমি চণ্ডাল? তুমি আমার চেয়ে অনেক বড়। আমি তােমাকে নাগাল পাই নাই। তুমি নরশ্রেষ্ঠ তুমি দেবতা। তােমার এই গুরুভক্তিই তােমাকে সকলের উর্দ্ধে স্থান দিয়েছে। আজহতে আমার আদেশ সমগ্র ক্ষত্রিয় সমাজ তােমার নামে শির নত করবে, ব্রাহ্মণ সম্রমে তােমার নাম উচ্চারণ করবে। যে তােমার অমর্যাদা করবে আমার একশত পঞ্চশিষ্য তাকে শাসিত করবে; সসাগরা ধরণীর অধীশ্বর ভারতবংশ তার শক্ত হবে। কাব্যে, পুরাণে, ইতিহাসে তুমি অমর হয়ে থাকবে। যতদিন পৃথিবীতে গুরুশিষ্য সম্বন্ধ থাকবে ততদিন তােমার নাম লুপ্ত হবে না। দুৰ্য্যো। তাই হবে গুরুদেব তাই হবে। আমরা ভারতবংশের কুমার, রাজপ্রতিনিধি-আপনার আদেশ মাথা পেতে নিলেম। একলব্য ! তােমার মত সতীর্থ পেয়ে আমরা গৌরব অনুভব কচ্ছি। আজ হতে তােমরা সগােষ্ঠি নির্বিবাদে এইবনে বাস কর, কেউ তােমাদের শান্তি ভঙ্গ করবে না। আমি রাজার নামে তােমাদের বাক্যদান কচ্ছি। অর্জুন। ভাই আশীৰ্বাদ কর যেন তােমার মত গুরুভক্তি লাভ করি। ( ভানুমতীর প্রবেশ ভানু। ঠাকুর তােমার পিতা বলেছিলেন, আমার গর্ভে অমর পুত্র জন্ম লাভ করবে। তাই আমি ভরসা করে পুত্রকে অমর হবার ৭৬ একলব্য। [ ৩য়, দৃশ্য। শীৰ্বাদ করেছিলেন। আজ তােমার দয়ায় আমার কথা সত্য হল । তুমি বয়সে ছােট হলেও ব্রাহ্মণ। আমায় আশীৰ্বাদ কর। ( প্রনাম করণ ) দ্রোণ। চিরায়ষ্মতী হও বােন । ভানু। রাজকুমার, তােমরা যেমন বড় তেমি আজ বড় মনেরই পরিচয় দিলে। তােমরা বড়ই আছ বড়ই থাক আমরা ছােট আছি ছােটই থাকি কিন্তু তাই বলে ঘােটর প্রতি বড়দের যা কৰ্ত্তব্য তা যেন কখনাে ভুলে যেও না। মনে রেখাে ছােট আছে তাই বড়র আদর, নইলে কেউ কাউকে বড় বলে মানত না। দুৰ্য্যো। মা আমাকে লজ্জা দিও না। ভানু। একা ! সংসারে যখন যা ভাল জিনিস পেয়েছি ভালবেসে তােক দিয়েছি। আজও একটী বস্তু তােকে দিচ্ছি। এর চেয়ে ভাল কখনাে কিছু তােকে দিই নি। দেবও না। কেউ কখনাে দিতেও পারবে না। এই নে। ( চিত্রার হাত একলব্যের হাতে তুলিয়া দিল ) সকলে। সাধু! সাধু! এক। (প্রণাম করিয়া) মা আশীর্বাদ কর, যেন তােমার দানের মান রাখতে পারি। (হিরণ্যধনু, চিত্রা, হর্ষণ, জয়া, অশ্বত্থামা,বিবাহের বেশে বিদ্যাবিপৰ্যয় এক বৃদ্ধা বেদিনীর সহিত গাঁট ছড়া বাঁধা ও অন্যান্য নরনারীগণের প্রবেশ ) হিরণ্য। ঠাকুর। এই নাও তােমার ছেলে। আর সেই বামুন- - ৭৭।
৩য় অঙ্ক।] একলব্য। বিদ্যা। আর বামুন নই। ছাচি কুমড়াের মত মুক্তো আর শালের খুটীর মত গজদন্তই আমার সর্বনাশ করেছে। এই বেদিনী আমার জাত মেরে দিয়ে ন্যাজে বেঁধে নিয়েছে-আর ছাড়াবার উপায় নাই। রাম নাম সত্য হয়-রাম নাম সত্য হয়। দ্রোণ। অশ্বত্থামা, তুমি বহুবার আমাকে প্রশ্ন করেছ, কে আমার সেই প্রিয় শিষ্য যাকে আমি প্রতি দিন স্বপনের ঘােরে ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা দিই। এই তার উত্তর অশ্ব। আমি সব শুনেছি পিতা। আমি একে সসম্রমে নমস্কার করি। হির। ঠাকুর আপনার দয়ার সীমা নাই। আপনারা রাজ- কুমার, রাজার মতই মহৎ অন্তঃকরণের পরিচয় দিয়েছেন। তাই ভরসা করে একটা প্রার্থনা জানাচ্ছি-আমাদের লােকজনেরা সব ক্ষেপে উঠেছে যে আজ সকলে মিলে আপনাদের নিয়ে আনন্দ করবে, যদি আপনাদের দয়া হয়। দ্রোণ। অবশ্য, অবশ্য। তাহলে সকলে আমাদের ঘরে চলুন। ( হর্ষণ ও জয়া ব্যতীত সকলের প্রস্থান) হর্ষণ। ওরে! ওরে ! জয়া। যাঃ! তাের সঙ্গে আড়ি। হর্ষণ। ওরে শােন্ শাে-রাগ করিস নি। আচ্ছা প্রাণটা কেন খামখা তুড়ি লাফ খাচ্ছে বল তাে! জয়া। শুধু তুড়িলাফই খাচ্ছে কিছু বলছে না ? হির। ৭৮
একলব্য।
[ ৩য় দৃশ্য।
হর্ষণ। বলছে বই কি। কি বলছে জানিস ?
হর্ষণ ও জয়া।
গীত
হর্ষণ।
উভয়ে।
তা ধিন তা ধিন ধিন্ তা ধি নি কি ধি নি কি তা
জয়া। আমরা দুয়ে মিলে একটি হলুম রইল না আর ফাক
হর্ষণ! বুকের ভিতর প্রেমের পাথায় বাধা মানে না
জয়া।
লহর তুলে ভাসিয়ে নে যায় কথা শোনে না
ছাড়িস নে প্রাণ কোন মতে আঁকড়ে ধরে থাক
কা কা কা, কু কু কু ভাকুক কোকিল কাক ৷
দ্রোণাচাৰ্য, দুর্যোধন, অর্জুন প্রভৃতিকে লইয়া হিরণ্যধনু, ভানুমতী,
একলব্য, চিত্রা, বিদ্যবিপৰ্যয় ও নিষাদ নরনারীগণের প্রবেশ।
নিষাদ তরুণ তরুণীগণ
গীত
ও কোয়েল বৌ-কুহু কুহু তােল, তান
গুন্ গুন্ গুন্ ও ভােমরা তােলরে তাের গান
আজকে মােদের এসেছে রাজ অতিথি
ধন্য হােক চরণ ধূলায় আমাদের এ বন বিধি
বাজারে ভাই বাজা মাল আহাদে যে নাচে প্রাণ
(আজ) আঁধার গেল ফসা হল—এলো আলো রাজার গান।
যবনিকা পতন।
৭৯
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.