Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Madham O Konishto
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মধ্যম
( একাঙ্ক নাটক)
শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র দাস
প্রণীত
প্রকাশক
শ্ৰীআশুতােষ ধর,
আশুতোেষ লাইব্রেরী
৫নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
সন ১৩৩৮ সাল
মূল্য আনা
কলিকাতা
৫নং কলেজ স্কোয়ার, নারসিংহ প্রেসে,
শ্ৰপ্ৰভাতচন্দ্র দত্ত দ্বারা মুদ্রিত
ভূমিকা। • বাংলাদেশের উচ্চ ইংরাজী স্কুল ও কলেজসমূহের ছাত্রগণের পক্ষে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অবশ্যপাঠ্য হইয়াছে। কিন্তু প্রায় একুশ বৎসর কাল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারমিডিয়েট ও বি-এ পরীক্ষায় বাংলা সাহিত্যের পরীক্ষক থাকিয়া বুঝিয়াছি যে, অধিকাংশ যুবক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সবিশেষ ব্যুৎপত্তিলাভ করিতে পারে নাই। তৎপ্রতি পরীক্ষার্থিগণের একান্ত ঔদাসীন্য ও অবহেলাই ইহার প্রধান কারণ বলিয়া মনে হইয়াছিল। অনেক যুবক বাংলা মাসিক পত্রসমূহে প্রকাশিত গল্প ও উপন্যাস পাঠ করিতে আগ্রহান্বিত হয় বটে; কিন্তু তাহারা ব্যাকরণ, বানান, ভাষা ও রচনা-শিক্ষার প্রতি সাতিশয় অমনােযােগী। এই কারণে অনেকে দুই ছত্র বাংলা লিখিতে গিয়া পাঁচটি বানান ভুল করিয়া বসে এবং বিশুদ্ধ বাংলা লিখিতেও পারে না। ইহা নিতান্ত পরিতাপের বিষয়, সন্দেহ নাই। উচ্চ ইংরাজী স্কুলসমূহে বাংলাভাষায় রচিত ইতিহাস, ভূগােল, বিজ্ঞান ও সাহিত্য প্রভৃতি পড়াইবার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। তাহার উদ্দেশ্য এই যে, মাতৃভাষায় এই সকল বিষয় পাঠ করিলে, বালকেরা সহজে ও অল্প আয়াসে সেগুলি বুঝিতে ও আয়ত্ত করিতে সমর্থ হইবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক পাঠ্যপুস্তক এত অধিক সংস্কৃতবহুল শব্দে ও সমাস ও অলঙ্কারে পূর্ণ যে, বহুস্থলে বালকেরা ইংরাজী সাহিত্য পাঠ করা অপেক্ষা বাংলা সাহিত্য পাঠ করিতে যেন অধিকতর ভীত o হয়। এরূপ ভয় থাকিলে, বালকবালিকাদিগকে মাতৃভাষায় উচ্চ শিক্ষা দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্যটি বিফল হওয়ার আশঙ্কা আছে। বিদ্যালয়সমূহের জন্য যে বাংলা পাঠ্যপুস্তকাবলী নিৰ্বাচিত হয়, সেগুলি পাঠ করা ব্যতীত বালকবালিকারা গৃহেও যাহাতে সরল ও বিশুদ্ধভাষায় রচিত তাহাদের উপযােগী বাংলা সাহিত্যপুস্তকসমূহ পাঠ করিতে পারে, তাহার ব্যবস্থা করা কর্তব্য। এই পুস্তকগুলিকে “আনুষঙ্গিক পাঠ্যপুস্তক” বা Companion Readers বলা যাইতে পারে। বলাবাহুল্য যে এইরূপ পাঠ্যপুস্তকসমূহের বিষয়গুলি জ্ঞানগর্ভ, নীতিগর্ভ ও বালক বালিকাদের চিত্তাকর্ষক হওয়া আবশ্যক। ইদানীং এইরূপ বহু পুস্তক রচিত হইয়া প্রকাশিত হইতেছে। তারা আশা করা যায় যে বালকবালিকারা সেগুলি পাঠ করিয়া জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট হইবে । আমরা কিশাের-কিশােরীদের জন্য কতিপয় গৃহপাঠ্য পুস্তক প্রকাশের সঙ্কল্প করিয়াছি। সেই সঙ্কল্পানুসারে এই পুস্তকাবলীর নাম “কিশাের- পাঠ্য বাংলা সাহিত্য” দেওয়া হইল। এই শ্রেণীর অন্তর্গত প্রত্যেক পুস্তকের ভাষা যাহাতে সরল, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল হয়, এবং বিষয়ও যাহাতে জ্ঞানগর্ভ, নীতিগর্ভ ও কিশাের-কিশােরীদের চিত্তাকর্ষক হয়, তৎপ্রতি বিলক্ষণ দৃষ্টি রাখা হইবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাহাদের অনুরাগবর্ধন করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য আংশিকরূপে সফল হইলেও, আমাদের শ্রম সার্থক মনে করিব। ইতি শুভ বৈশাখ, ১৩৩৮ সাল সম্পাদক গ্রন্থ-পরিচয়। “কিশাের-পাঠ্য বাংলা সাহিত্যের প্রথম পুস্তক একখানি একাঙ্ক নাটক। অধিকাংশ নাটকেই শৃঙ্গারাদি বিভিন্ন রসের যেরূপ সমাবেশ থাকে, তাহাতে সেগুলি অল্পবয়স্ক বালক- বালিকাদের হাতে দেওয়া উচিত নহে। পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের যাহা পাঠ্য, তাহা সকল সময়ে অল্পবয়স্কদের পাঠ্য হইতে পারে না। অথচ অল্পবয়স্কেরাও নাটক পড়িতে ও অভিনয় দেখিতে ভালবাসে। সেই আকাক্ষা আংশিকরূপেও মিটাইবার জন্য মহাকবি ভাসের রচিত “মধ্যম-ব্যায়ােগ” নামক সংস্কৃত নাটকের আখ্যান-ভাগ মাত্র অবলম্বনে “মধ্যম ও কনিষ্ঠ” নামক এই ক্ষুদ্র নাটকখানি রচিত হইল। এস্থলে ইহা বলা কৰ্তব্য মনে করি যে, ইহা “মধ্যম-ব্যায়ােগের অনুবাদ নহে। মূল সংস্কৃত নাটকের আখ্যানের সহিত এই নাটকখানির আখ্যানেরও সর্বত্র সামঞ্জস্য নাই। সংস্কৃত-সাহিত্যে “মধ্যম-ব্যায়ােগের ন্যায় কিশাের-পাঠ্য নাটক অত্যন্ত বিরল। “ব্যায়ােগের স্থূল মৰ্ম্ম এই যে, নাটকের ইতিবৃত্ত খ্যাত হইবে, স্ত্রী-জনের সংখ্যা অল্প হইবে, পুরুষ-জনের সংখ্যা অধিক হইবে, নাটকখানি একাঙ্ক হইবে,
•
আখ্যানভাগে স্ত্রীলােকের নিমিত্ত কোনও যুদ্ধ হইবে না,
তাহাতে হাস্য-শৃঙ্গার-শান্ত রস থাকিবে না এবং নায়ক
প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ও ধীরােদ্ধত হইবেন। ইত্যাদি। এই সমস্ত
লক্ষণের মধ্যে কেবল কতিপয় লক্ষণমাত্র এই পুস্তকে দৃষ্ট
হইবে।
এই পুস্তকের মধ্যে আখ্যানভাগের দ্যোতক কতিপয়
চিত্র সন্নিবিষ্ট হইল। সেগুলি কিশাের-কিশােরীদের
চিত্তাকর্ষক হইবে বলিয়া আশা করি। ইতি
সম্পাদক
খ্যাতেতিবৃত্তো ব্যায়ােগঃ স্বল্প স্ত্রীজন-সংযুতঃ।
হীনাে গর্ভ-বিমর্ষাভ্যাং নরৈবহুভিরশ্রিত।
একাঙ্কশ্চ ভবেদস্ত্রীনিমিত্তসমরােদয়।
কৌশিকী-বৃত্তিরহিতঃ প্রখ্যাতত্র নায়ক।
রাজর্ষি রথ দিব্যা বা ভবেন্ধীবােদ্ধতশ্চ সঃ।
হাস্যশৃঙ্গার-শাস্তেভ্য ইতরেহত্ৰাঙ্গিননা রসা।
(সাহিত্য-দর্পণ)
নাটকোলিখিত
পুরুষ ও স্ত্রীগণ
০ ০ ০
কেশবদাস
ব্রাহ্মণী
জ্যেষ্ঠ
০৮০
কনিষ্ঠ পুত্র
মধ্যম
কনিষ্ঠ
ভীম
হিড়িম্বা
ঘটোৎকচ
দ্রৌপদী
ইন্দ্রপ্রস্থ নগরের জনৈক দরিদ্র ব্রাহ্মণ
কেশবদাসের পত্নী
কেশবদাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র
মধ্যম পুত্র
ঐ
মধ্যম পাণ্ডব
ভীমের রাক্ষসী পত্নী
হিড়িম্বার গর্ভজাত ভীমের পুত্র
পঞ্চপাণ্ডবের মহিষী
কাঠুরিয়াদ্বয় ও অনুচরদ্বয়।
০ ০ ০
No text on this page.
No text on this page.
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
R.Millra.
অবণ্য-মধ্যবর্তী পথে কেশব, ব্রাহ্মণী ও তাহাদের পুত্রয়
[ ৬ পৃঃ
( মুখপত্র )
মধ্যম ও কনিষ্ট
(একাঙ্ক নাটক)
প্রথম দৃশ্য।
ইন্দ্রপ্রস্থ-নগরের মধ্যে একটী পর্ণকুটীর
(কেশবদাস ও ব্রাহ্মণী )
কেশব।—ব্রাহ্মণি, পাণ্ডবদের বনগমনের পর দুরাত্মা দুৰ্য্যোধন
ইন্দ্রপ্রস্থ-নগর অধিকার করে পাণ্ডবদের প্রিয়পাত্র সকল
ব্যক্তিকেই অত্যন্ত উৎপীড়িত ক’রূছে। সে আমাদেরও
ব্ৰহ্মাত্তর ভূমি হরণ করেছে, তা তাে শুনেছ? দুৰ্য্যোধন
আমার উপর অসন্তুষ্ট বলে, তার ভয়ে কেউ আমাদিগকে
এক মুষ্টিও ভিক্ষা দিতে চায় না। এখানে বাস করে
আমাদের জীবন-যাত্রা নির্বাহ করা কঠিন হয়েছে।
এখন কি উপায় করা যায়, বলতে পার?
ব্রাহ্মণী।—আমি মেয়ে মানুষ ; কি উপায়ের কথা বলব
তােমাকে? তুমি নিজে যা ভাল বিবেচনা কর, তাই কর।
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
(দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া )—এতখানি বেলা হয়ে গেল,
কনিষ্ঠ এখনও কিছুই খায় নি। খাবার খেতে চেয়ে,
কিছু না পেয়ে সে কঁাদতে কাঁদতে কোথায় বেরিয়ে
গেছে! ছেলেদের কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না।
এখন আমার মরণ হলেই বাঁচি। (বস্ত্রাঞ্চলে মুখচক্ষু
ঢাকিয়া নীরবে বােদন )
কেশব।—(ব্যথিত স্বরে) ব্রাহ্মণি, এই কষ্টের জন্যই তাে
আমার মনে হচ্ছে, এই স্থান ত্যাগ করাই আমাদের
পক্ষে ভাল। নীতিশাস্ত্রেও বলে স্থানত্যাগেন দুর্জনঃ।
শুনেছি, পাণ্ডবেরা এখন কাম্যক বনের অনতিদূরে
দ্বৈতবনে বাস করছেন ; সেই বনে মহারাজ যুধিষ্ঠির না
কি বহু ব্রাহ্মণ ও ঋষিতপস্বিগণকে প্রতিপালন ক’ছেন,
দ্বৈতবন এখান থেকে বহুদূরে অবস্থিত, আর সেখানে
যাবার পথও কিছু দুর্গম বটে। কিন্তু আমার ইচ্ছা
হচ্ছে, আমরাও আমাদের তিনটি পুত্রকে নিয়ে সেই
ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আশ্রয় গ্রহণ করি।
তিনি এত
লােককে আশ্রয় দিয়েছেন, আর আমাদের এই পাঁচটি
প্রাণীকে কি আর আশ্রয় দিতে পাবেন না?
ব্রাহ্মণী।—তা হয়ত তিনি দিতে পারেন। কিন্তু তাঁর
বর্তমান অবস্থাও তত আমাদের একবার ভেবে দেখা
( ২ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ উচিত। তিনি ও তার ভাইলি এখন বর্জ্যহীন হয়ে বনবাসী হয়েছেন। এরূপ অবস্থায় কোন্ মুখে আমরা তঁাকে আমাদের ভরণ-পােষণের ভার নিতে বলব ? কেশব।—সে কথা সত্য বটে; কিন্তু তবুও আমার মনে হচ্ছে, একবার তার সঙ্গে দেখা করি। যদি তাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি না পাই, তখন না হয় কোনও গ্রামে বাস করে ভিক্ষাদ্বারা জীবন-যাত্রা নির্বাহ ক’র্ব। এখানে যে পাপাত্মা দুর্যোধনের অত্যাচারে ভিক্ষা পৰ্যন্ত মিলে না। ব্রাহ্মণী।—এখান হতে দ্বৈতবনে যেতে কয় দিন লাগবে ? কেশব।—শুনেছি, ইন্দ্রপ্রস্থ হ’তে দ্বৈতবন তিনদিনের পথ। দুটী দিন লােকালয়ের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে দুই একখানি বড় বড় গ্রামও আছে, সেখানে ভিক্ষা পাওয়া যেতে পারে ; কিম্বা কোনও দয়ালু গৃহস্থের গৃহে আতিথ্যও গ্রহণ ক’তে পারি। কিন্তু সমস্ত তৃতীয় দিনটি আমাদিগকে একটি গভীর অরণ্যের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। বন দুর্গম ও জন- মানব-শূন্য। শােনা যায়, পূৰ্বে এই বনে কিৰ্মীক নামে এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস বাস ক’ত; কিন্তু মহাবীর ভীম না কি তাকে বধ করে বন নিরুপদ্রব করেছেন। এই (৩)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কারণে, এখন রাক্ষসের আর উপদ্রব নাই। দিনের
বেলায় বিপদের কোনও আশঙ্কা নাই বটে; কিন্তু
রাত্রিতে হিংস্র বন্য পশুর উপদ্রব হয়। আমরা দ্রুতপদে
হেঁটে চললে সন্ধ্যার পূর্বেই কাম্যক বন অতিক্রম করে
দ্বৈতবনে নিরাপদে উপস্থিত হতে পারব। আমার
পরামর্শ এই যে, চল আমরা দ্বৈতবনেই যাই।
ব্রাহ্মণী। দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) তবে তাই চল। আমি
আর কি বলব ? আমাদের অদৃষ্টে যা আছে, তাই
হবে। কিন্তু আমার শ্বশুরের এই পৈত্রিক ঘর-ভিটে
ছেড়ে যেতে আমার প্রাণ শােকে আকুল হয়ে উঠছে।
হা ভগব, শেষকালে দেশ ছেড়ে আমাদের বনবাসী
হ’তে হ’ল ! কি ক’ব, আমাদের যেমন পােড়া কপাল !
(বস্ত্রাঞ্চলে মুখচক্ষু ঢাকিয়া আবার অশ্রু বিসর্জন ও ভূতলে
উপবেশন ) ( ব্রাহ্মণের প্রস্থান)
(জ্যৈষ্ঠ, মধ্যম ও কনিষ্ঠের প্রবেশ)
কনিষ্ঠ।—মা, মা, তুমি কঁদ্ছ কেন? কি হয়েছে, বল না !
মধ্যম।—মা, আপনার চোখে জল কেন ?
জেষ্ঠ।—মা, কি হয়েছে, বলুন না ?
( নীরবে ব্রাহ্মণীর আরও অধিকতর বেগে অশ্রুবিসর্জন)
( 8 )
No text on this page.
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
|"
.
.
3 m T,
E
এই দেখ, কেঁাচড় ভ’রে.••কুল এনেছি।
[ ৫ পৃঃ
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কনিষ্ঠ।—শােন, দাদা, মার বডড খিদে পেয়েছে, তাই মা
কাছে। আমারও বড়ড খিদে পেয়েছিল, তাই কাতে
কঁতে বেরিয়ে গেছ,লুম।
এই দেখ না, ওদের
বাগানের মালী আমাকে কত মিষ্টি কুল দিয়েছে !
কুল খেয়ে আমার পেট ভরে গেছে।
এই দেখ,
কেঁাচড় ভ’রে তােমাদের জন্যে, আর মা ও বাবার জন্যে
কত ডাগর ডাগর কুল
এনেছি! এই নাও তােমরা।
( উভয়কে কতকগুলি কুল প্রদান )। মা, তুমিও নাও। কুল
খাও মা, কুল খাও; কুল খেলে আর খিদে থাকবে
না! ভারি মিষ্টি কুল, মা; বাবার জন্যেও চারটি
রেখে দাও। মালী আমায় কালও যেতে বলেছে।
মা গাে, এক গাছ কুল—সব পাকা পাকা কুল!
মালী
গাছে উঠে ডাল নাড়া দিতেই ঝর ঝর করে কত কুল
গাছের তলায় পড়ে গেল। ভারি মিষ্টি কুল ; কালও
আমি যাব, মা?
ব্রাহ্মণী।—( চক্ষু মুছিতে মুছিতে কনিষ্ঠকে ক্রোড়ে বসাইয়া) না,
বাবা, কাল আর যেও না। বেশী কুল খেলে অসুখ হবে।
কনিষ্ঠ।—তবে কাল কি খাব, মা? বল না?
(ব্রাহ্মণীর আবার অশ্রুবিসর্জন )
•( ৫ )
দ্বিতীয় দৃশ্য।
নিবিড়-অরণ্য-মধ্যবর্তী পথ ।
(কেশব, ব্রাহ্মণী, ও তাহাদের পুত্রয়ের প্রবেশ )
কেশব।-ব্রাহ্মণি, দু’টি দিন তাে পথে একরকম কেটে গেল।
আজ ভােরের সময় এই কাম্যক বনে প্রবেশ করে
মধ্যাহ্ন পৰ্যন্ত আমরা চলেছি; কিন্তু এখনও যে বনের
অন্ত পাওয়া যাচ্ছে না! বন যেন ক্রমশঃই নিবিড় ও
দুর্গম হয়ে উঠছে। সূৰ্যও অত্যন্ত প্রখর হয়েছে, আর
চারিদিকেই তীব্র ও কর্কশ ঝিল্লীরব শােনা যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত একটি মানুষও আমাদের চোখে পড়ল না।
কি নির্জন অরণ্য! আহা, তুমিও তাে আর হাঁটতে
পাছ না, দেখছি ; পাথর-কাকরের উপর চলতে চলতে
তােমার পা যে ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
জ্যেষ্ঠ আমাদের ভারী মােটখানা বইতে বইতে অত্যন্ত
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ; আর মধ্যমের তাে কথাই নাই।
সে কনিষ্ঠকে ঘাড়ে পিঠে বয়ে নিয়ে চলেছে! ভাগ্যে
পথের ধারে একটী জলাশয় পাওয়া গেছল; তাই
( ৬ )
;
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
সেখানে নাকি সেরে, দুই চারূটে পদ্মের বীজ খেয়ে
কোনও প্রকারে পিত্ত রক্ষা করা গেছে। রৌদ্রে ও
ক্লান্তিতে সকলেরই মুখ শুকিয়ে গেছে ও মলিন
হয়েছে ; এস, এই গাছের ছায়ায় সকলে বসে একটু
বিশ্রাম করি!
ব্রাহ্মণী।—তাই ব’স সকলে; আমার কিন্তু এই বনের ভিতর
ঢুকে অবধি সৰ্ব্বদা গা ছম্ছ ক’ছে, আর বুকও দুর
দু ক’ছে !
কেশব-না, না, ভয়ের কোনও কারণ নাই। হা রে, মধ্যম,
তাের মুখখানা এত শুকিয়ে গেছে কেন? তুই কি
পদ্মের বীজ খাস নাই ?
কনিষ্ঠ।-না, বাবা, মেজদা' কিছুই খায় নি।
পদ্মকোষ তুলেছিল, তাদের বীজ ছাড়িয়ে সব তােমাকে,
মাকে, বড়দা’কে আর আমাকে দিয়েছে। নিজে একটীও
খায় নি।
ব্রাহ্মণী।—বলি কি রে ? হা রে মধ্যম, তুই জলে সাঁতার
দিয়ে অত পদ্মকোষ তুললি ; আর নিজে একটীও পদ্ম
বীজ খাস্ নি ?
মধ্যম।-মা, আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে বলে
স্নানাফিক সাতে পারি নাই; তাই পদ্ম-বীজ খাই নাই।
• ( ৭ )
সে যত
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ব্রাহ্মণ।—শােন, মধ্যম, আমরা এইখানে বসে একটু বিশ্রাম
ক’ছি ; জলাশয় তাে আর বেশী দূরে নয় ; তুমি সেখানে
নাহ্নিক সেরে কিছু পদ্মবীজ খেয়ে এস, আর যদি
পার, কনিষ্ঠের জন্য দুই চারটে নিয়ে আসূবে । ( সহসা
চমকিত হইয়া) ও কিসের শব্দ ? কারা যেন দ্রুতপদে
এইদিকে আছে না?
( দ্রুতপদে দুই জন কাঠুরিয়ার প্রবেশ)
প্রথম কাঠুরিয়া।—( চমকিত হইয়া) এ রে, তােরা ইন্ ঠেনে
ব’সে কি কছু ?
কেশব।-বাছা, তুমি বলতে পার, এখান থেকে দ্বৈতবন
আর কত দূরে?
দ্বিতীয় কাঠুরিয়া।-দৈৎ বন ? যি ঠেনে—ম—পাশুরে
যাছি—কি নাম বটেই—যি ঠেনে তােদের যুধাই
রাজা আছে? সে বনটাকে তােরা সাঁঝলে পৌছবি।
প্রথম কাঠুরিয়া-তােরা উঠে চলে যা এখুনি। খুব
খর খর চলে যা। বিলম্ নাই করুস্। রাত হ'ল্যে
১
১। ও হে, তােমরা এখানে বসে কি ক’ছ ?
২। দ্বৈতবন? যেখানে—ম ভুলে যাচ্ছি—কি নাম বটে! হাঁ, মনে পড়েছে
যেখানে তােমাদের যুধিষ্ঠির রাজা আছে? সে বনে তােমরা সন্ধ্যা নাগাদ পৌছিবে।
( ৮ ).
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
জ্যেষ্ঠ।
বলি ন?
ভারি ল্যাঠা হ’ব্যে—বন-কুকুর আর বন-ছাগল গুলা
বাইব্যে।
সবিস্ময়ে ) বনকুকুর আর বন-ছাগল কি হে?
প্রথম কাঠুরিয়া।—তুই নাই জানুস্? তুরা যিটোকে বাঘ
বলু, সিটোকে হাম্রা বন-কুকুর বলি ন? আর তুরা
যিনটোকে ভালুক বলু, সিটোকে হামরা বন-ছাগল
বেলা রইতে বইতে
৩ বনটা পার হয়ে
চলে যা। ইটো ভারি ডাগর বন বটে।
দ্বিতীয় কাঠুরিয়া।—আর হারা এখুনি শুনলি কি—আজ
হিড়ির ব্যাটা ঘড়াকুচাও বাইর্যাইচে। এই দ্যাখনা,
হামরা আজ কাঠ না কাট্যেই ঘরকে পালাছি।
কেশব।—( সাশ্চর্যে) হিড়ির ব্যাটা ঘড়াকুচা কে হে?
দ্বিতীয় কাঠুরিয়া।—তুই নাই জানু ঘড়াকুচাকে?
সিটো
যে একটা বড় রাখুস্ বটে হে—মানুষ ধরে খায়।
৪
১। তােমরা এখনি উঠে চলে যাও; খুব দ্রুতপদে যাও; বিলম্ব করাে না; রাত্রি
হলে বড় বিপদ হবে ; বন-কুকুর ও বন-ছাগলগুলা বাহির হবে।
২। তুমি জান না? তােমরা যাহাকে বাঘ বল, তাকে আমরা বন-কুকুর বলি না?
আর তােময়া যাহাকে ভালুক বল, তাকে আমরা বন-ছাগল বলি না?
৩। রইতে রইতেথাকতে থাকতে।
৪। আর আমরা এখনি শুলাম যে, হিড়ির ব্যাটা ঘড়াকুচাও বাহির হইয়াছে।
এই দেখ না, আজ আমরা কাঠ না কেটেই ঘরে পালিয়া যাচ্ছি।
( 9 )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ব্রাহ্মণী। সভয়ে) ও মা, কি হবে গাে। শুনে যে বুক্
দু দু ক’ছে। মধুসূদন, মধুসূদন, রক্ষা কর ।
(নেপথ্যে সহসা ভয়ানক হুঙ্কার ও গর্জন)
কাঠুরিয়া-দ্বয়। সভয়ে চমকিত হইয়া )—হুই রে!—হুই রে!
—হিড়ির ব্যাটা ঘড়াকুচাই বটে!—পালা, পালা!-মা
দেলা।
১
( কাঠুরিয়াদ্বয়ের বেগে পলায়ন )
( সহসা ভীষণাকার, পিঙ্গলকেশ, আরক্তচক্ষু ও ব্যাঘ্রচৰ্ম্ম-পরিহিত
ঘটোৎকচের প্রবেশ এবং তাহাকে দেখিয়া ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী
ও তাহাদের পুত্রয় ভয়ে আড়ষ্ট)
ঘটোৎকচ।—( বিকট আনন্দের সহিত) হাঃ হাঃ হাঃ! আজ
সকালে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম রে ।
দেখছি,
এতক্ষণে মার পারণের ভাবনাটা দূর হ’ল! বাঃ, বাঃ!
একটা নয়, দুটা নয়, একেবারে পাঁচ পাঁচটা বামুন!
ভারি মজা তাে! (স্বগত) কিন্তু এদের মধ্যে ঐ
মেয়েমানুষটাকে তত বাদ দিতে হবে।
মেয়েমানুষের মাংস খাবে না। আর
বামুনটাকেও বাদ দিতে হবে—কেবল অস্থি-চৰ্ম্ম-সার।
ঐ বুড়া
১। ঐ রে, ঐ রে—হিড়ির ব্যাটা ঘড়াকুচাই বটে!—পালা, পালা, চ'লে আয়!
(১০) ।
No text on this page.
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
.
ও বুড়াে বামুন, তুই থর থর করে কঁপছিস কেনে?
[ ১১ পৃঃ
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ও-র দেহে তাে রকস্ কিছুই নাই—কেবল চিড়ে
মাংস। বড় ছেলেটা মন্দ নয়—কিন্তু মেজটা ওর চেয়ে
ভাল-মােটা তাজা বটে। আর ঐ ছােট-টা-ওটাকে
তো ভাতে দিলে চমৎকার হয়। এই তিনটেকেই ধরে
নিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে—কিন্তু মার আদেশ, কেবল
একটা বামুন বা ক্ষত্রিয় ধরে নিয়ে আসবি—দুটাও নয়,
তিনটাও নয়—তা হলে রেগে আগুন হয়ে উঠবে।
একে তাে উপােস করে আছে—কাল নরমাংসে তার
পারণ হবে। আরে—মা কি নরমাংস খেতে চায়
বলে অনেকদিন ছেড়েছি—তার উপর যদি রেগে উঠে
কার সাধ্য তাকে খাওয়ায় ? আমার কিন্তু তিনটার
উপরেই ভারি লােভ হচ্ছে। মাকে একটা দিয়ে, না হয়
আর দুটাকে জীয়িয়ে রাখতাম্। না-না—আর লােভ
করে কাজ নাই। মার আদেশমত কেবল একটাকেই
ধরে নিয়ে যাই। (প্রকাশ্যে ) হিঃ হিঃ হিঃ! বলি
ও বুড়া বামুন, তুই এমন থপ্ থপ্ করে কঁপছিস্ কেনে?
বুঝতে পেরেছি, যখন চিল পড়েছে, তখন কূটাটাও
নিয়ে উঠবে না। আমি তােদের সকলকে চাই না
তােকে আর ঐ মেয়েমানুষটাকেও চাই না। আমার
মা’র কত দয়া দেখেছি-সে মেয়েমানুষ খায় না, আর
• (১১)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
বুড়াও খায় না—সে খায় কেবল ছেলে আর জুয়ান
মানুষ। তােদের ঐ ছেলে তিনটার মধ্যে একটাকে
দে,-মার কালকের পারণের জন্যে নিয়ে যাই। মা
আজ তিন দিন উপােস করে আছে।
কেশব।—( সভয়ে) কে বাবা তুমি ? তােমার চেহারা
দেখে তাে রাক্ষস বলে মনে হয় না—তােমাকে তাে
মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কেন, বাবা,
কেন, বাবা, এই দরিদ্র
ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীকে আর এই ছেলে গুলিকে ভয়
দেখা’চ্ছ ? পথ ছেড়ে দাও, বাবা, আমরা চলে
যাই।
ঘটোৎকচ।—( ক্রুদ্ধ হইয়া) বাঃ বাঃ, বামুন তত ভারি
রসিক দেখছি। বলা হচ্ছে কি না—পথ ছেড়ে দাও,
বাবা, আমরা চলে যাই। পথ তাে পড়ে আছে—
চ'লে যা না তাের—তােদের একটা ছেলেকে দিয়ে।
কে তােদর আটকে রেখেছে ? তামাসা ক’বার
আর লােক পেলি না বুঝি ? আমি কে, তা তুই
জানিস্ ? আমি ভীম আর হিড়িম্বার ব্যাটা ঘড়াকুচা
মা কিন্তু আমায় আদর করে ডাকে ‘ঘটোৎকচ।
ততাদের এই তিনটা ছেলের মধ্যে কোন্টাকে দিচ্ছি,
দে; আমি আর বিলম্ব ক’বুতে পারি না।
(১২)
{
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কেশব।—( ভয়ে নিস্তব্ধ ; কিয়ৎক্ষণ পরে স্থলিত বচনে বলিলেন)
কোন্ ভীমের পুত্র তুমি, বাবা?
ঘটোৎকচ।—( সক্রোধে ) আরে অত পরিচয় তােকে দেবার
আমার সময় নাই। আমার পরিচয় নিয়ে তাের কি
হবে ? আমি আমার বাপকে কখনও দেখি নাই—
কিন্তু বামুনের অভাবে আজ তাকেও পেলে মার
পারণের জন্য নিশ্চয় ধরে নিয়ে যেতাম। এখন কি
বলছি, বল ; কোন্ ছেলেটা দিচ্ছি আমাকে?
ব্রাহ্মণী।—( সাশ্রনয়নে ও স্খলিত বচনে ) বাবা, তুমি আমাকে
নিয়ে গিয়ে আমার স্বামীকে ও ছেলে তিনটিকে ছেড়ে
দাও, বাবা ; দোহাই তােমার ।
ঘটোৎকচ। ক্রোধে দন্ত কিড়মিড় করিয়া ও মুখ ভ্যাঞ্চাইয়া )
দো-হা-ই তাে-মা-র ! বলি, এতক্ষণ কি শুলি,
বানি? আমি গােড়াতেই বলেছি যে, আমার মা
মেয়ে মানুষের মাংস খায় না, আর ঐ রস-কস-হীন
বুড়ােটারও মাংস খাবে না। তােদের এখুনি
দিচ্ছি—একটা ছেলেকে দিয়ে বাকী দুটাকে নিয়ে চলে
যা। তাের ঐ কোলের ছেলেটাকে দে না—বেশ কচি
আর নধরও বটে—মা খেয়ে খুসী হবে! (ব্রাহ্মণী অস্ফুট
চীৎকার করিয়া কনিষ্ঠকে বুকের কাছে টানিয়া জড়াইয়া ধরিলেন)।
(১৩)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কনিষ্ঠ।–দাও না মা আমায় ছেড়ে ? তুমি কঁাছ কেন ?
বাবা, বড়দা’, মেজদা থাকবে। তারা ভিক্ষে করে এনে
তােমাকে খাওয়াবে। আমি যে, মা, কোথাও যেতে
পারি না—আর ভিক্ষে ক’রুতেও জানি না। আমার
খিদে পেলেই কঁদি, আর তােমাকেও কাদাই। আমাকে
আটকে রেখে কি হবে, মা ? ছেড়ে দাও, আমি
ঘড়াকুচার সঙ্গে চলে যাই—আর তােমরাও এখান
থেকে চলে যাও। ঘড়াকুচার সঙ্গে যেতে আমার
কিছুই ভয় হবে না। ছেড়ে দাও, মা, আমি চলে
যাই। তুনি কেঁদ না।
ব্রাহ্মণী।—( কঁদিতে কাদিতে) ষাট ! যাই । অমন কথা
বলতে নাই, বাবা! তুই যে আমার বুক-জোড়া ধন,
রে! আমি কোন্ প্রাণে তােকে রাক্ষুসীর পেটে দিব
রে? তােকে নিয়ে গেলে আমি এখনই আত্মঘাতী
হয়ে ম’ব।
জ্যেষ্ঠ।“বাবা, অনুমতি করুন, আমি রাক্ষসের সঙ্গে যাই।
আমার স্নেহের দুইটি ভাই রইল। আপনারা এদের
লালন-পালন করূবেন, আর এদের মুখ চেয়ে আমার
শােক ভুলবেন। রােগেও ত আমি মরে যেতে পারতুম্ ;
তখন কি করতেন আপনারা? জন্ম হলেই মৃত্যু
(১৪ ) :
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
অবশ্যম্ভাবী। আমার জন্য শােক ক’বুবেন না—আমায়
যেতে দিন্ ।
কেশব।—কি নিদারুণ কথা আমায় শুনালি, জ্যেষ্ঠ ? অমন
কথা আর মুখে আনিস না। তুই আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র,
প্রথমেই তােকে লাভ করে, আমরা ধন্য হয়েছি ; তুই
আমার বংশের প্রদীপ। তুই আমার পিণ্ডাধিকারী
তাের প্রদত্ত জলপিণ্ডের জন্য আমাদের পিতৃগণ স্বর্গ
থেকে সােৎসুক নয়নে চেয়ে আছেন। তাের পরিবর্তে
আমি নিজে যেতে প্রস্তুত আছি; কিন্তু আমি বৃদ্ধ বলে
রাক্ষস আমায় নিতে চায় না! বাবা, তুই গেলে, এই
মুহূর্তেই আমি শশাকে প্রাণত্যাগ ক’রূব।
মধ্যম। (স্বগত) বেশ হ’ল, এইটিই আমি চাচ্ছিলুম ; মা
ছােট ভাইটিকে আটকালেন, আর বাবা আটকালেন
বড়দা’কে। এদের মঙ্গলের জন্য প্রাণ দিতে আমি
সৰ্ব্বদাই প্রস্তুত। আজ আমার এই তুচ্ছ প্রাণ দিয়ে
এদের প্রাণরক্ষা ক’তে পারব বলে আমার হৃদয়
আনন্দে পূর্ণ হয়েছে। ধন্য আমি! আর ধন্য আমার
জীবন! ( প্রকাশ্যে ) বাবা, মা, আপনারা ঠিক কথা
বলেছেন, আর ঠিক কাজই ক’রূছেন। আপনারা
নিরুদ্বেগ হউন ; আমি আমার এই তুচ্ছ প্রাণ দিয়ে
. ( ১৫. )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
আজ ভাইদের প্রাণ বাঁচা’ব। বড়দা’ আমাদের বংশের
তিলক, আর কনিষ্ঠ মার ও আমাদের সকলেরই একান্ত
স্নেহের পাত্র। বিশেষতঃ কনিষ্ঠ মার অঞ্চলের নিধি।
তাকে হারালে মা নিশ্চয়ই বাঁচবেন না; তা হলে
আমরা মাতৃহত্যার পাপে লিপ্ত হ’ব। বড়দা’কে হারালে,
বাবা, আপনারও প্রাণসংশয় হবে। তা হলে আমি
পিতৃহত্যার পাপে লিপ্ত হ’ব। আমার এই তুচ্ছ প্রাণের
মূল্য কি ? যদি আজ আমি এই তুচ্ছ প্রাণ দিয়ে,
ভাইদের প্রাণ বাঁচাতে পারি, আর আপনাদিগকেও
এই বিপদ হতে ত্রাণ ক’তে পারি, তা হলেই আমার
প্রাণের কিছু মূল্য হবে, আর আমার জীবন-ধারণও
সার্থক হবে। আজ আমার জীবনে মাহেন্দ্রক্ষণ
উপস্থিত; এমন সৌভাগ্য কার হয় ? মা যে আমাকে
গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তা আজ সার্থক হ’ল। মা,
বাবা, আপনারা আমার জন্য কিছুমাত্র শােক করবেন
। আমি ধন্য হয়েছি,—আমার জীবনটা যে আপনাদের
কিছুমাত্র উপকারে
লাগল, সেই জন্য আমার হৃদয়
আনন্দে পূর্ণ হয়েছে। আপনাদের শ্রীচরণে আমি
বিদায় নিচ্ছি। চল, রাক্ষস, চল, আমি তােমার সঙ্গে
যাচ্ছি। এদের অভয় দাও, এরা চলে যান। আমার
(১৬)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
যাবার কিছুমাত্র বিলম্ব নাই। কেবল আজিকার
স্নানাচ্ছিকটি সেরে নেবার জন্য আমি অদূরবর্তী জলাশয়ে
একবার যাব। অনুমতি দিবে কি ?
ঘটোৎকচ।—( কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া) আচ্ছা, যা; কিন্তু
শীগৃগি ফিরে আসিস, যেন বিলম্ব না হয়।
মধ্যম।—বিলম্ব হবে না, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। (পরে
নিম্নলিখিত গানটি গাহিতে গাহিতে প্রস্থান)
গান
সার্থক জনম মম, সার্থক মম জীবন।
(আজি) আত্মাহুতি দিয়ে করি জীবন-যজ্ঞ সমাপন।
জ্যেষ্ঠের জীবন তরে, মরিব আজ অকাতরে,
মায়ের কোলে কনিষ্ঠেরে রেখে যাব শমন-সদন।
কি আনন্দ হৃদে জাগে, পরিপূর্ণ চারি ভাগে,
উছলিয়া নয়ন-কোণে ঝরে পুলক-প্রস্রবণ।
মাগো, তাের স্নেহের ধার, শশাধিতে নারিনু আর,
পিতঃ, তব বৃদ্ধকালে সেবিতে নারিনু চরণ।
হৃদে জাগে এই সাধ, কর মা গাে আশীৰ্বাদ,
জন্মে জন্মে মধ্যম হয়ে, (যেন) পান করি তব স্তন।
(১৭)
২
তৃতীয় দৃশ্য।
সে যদি
পূর্বোক্ত গভীর অরণ্য।
(কেশব, ব্রাহ্মণী, জ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠ ও ঘটোৎকচ )
ঘটোৎকচ।—( চঞ্চলভাবে পদচারণা করিতে করিতে ও জলাশয়ের
দিকে বার বার চাহিতে চাহিতে মধ্যমকে আসিতে না দেখিয়া
কেশবকে বলিল)
ততাদের ছেলেটা তাে অনেক ক্ষণ স্নানাফিক ক'তে
গেছে। কোথাও পালিয়ে গেল না কি ? না, জলে ডুবে
ম’ল? কই, এখনও তাে সে এল না?
আসতে বিলম্ব করে, তা হলে, বলে রাখছি—এই
দুটো ছেলের মধ্যে যেটাকে হােক্, আমি নিয়ে যাব।
তার আসার জন্যে আমি আর অপেক্ষা ক’ব না।
(কেশব ও ব্রাহ্মণী ভয়ে ও শশাকে মুহ্যমান হইয়া নীরব রহিলেন)।
ঘটোৎকচ।—( অনেকক্ষণ পথ পানে চাহিয়া অসহিষ্ণু ভাবে বলি
—সে তাে এল না—আমি আর অপেক্ষা ক’ব ।
তাের কি নাম ধরে সেই ছেলেটাকে ডাকিস ?
(সকলে নীরব )
(১৮)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ কনিষ্ঠ।—(অল্পক্ষণ পরে), বল না, বাবা, তার নাম ? ভয় কি তােমাদের ? সত্য কথা বলতে ভয় কি ? শােন, রাক্ষস, আমি ব’ছি, তার নাম মধ্যম। ঘটোৎকচ।—মধ্যম? আচ্ছা, আমি তারে ডাছি। আরে মধ্যম, আরে মধ্যম—বিলম্ব করিস্ না—শীগগির আয়। (পুনঃ পুনঃ আহান) (সহসা বিপরীত দিক হইতে দ্রুত পদধ্বনি, এবং ভীমের প্রবেশ) ভীম।-কে ডাকছিলে আমায় ? (ভীম ঘটোৎকচকে দেখিয়া চমকিত হইলেন) ঘটোৎকচ।কই, তােমাকে তত আমি ডাকি নাই। আমি এদের ‘মধ্যম' নামের ছেলেটাকে ডাকছিলাম। ভীম।আমার নামও তত মধ্যম’! কেন ডাছিলে এদের ছেলেকে ? দেখছি, তুমি তাে রাক্ষস! রাক্ষস কি ? মানুষ ? ঠিক বুঝতে পারছি না যে! ঘটোৎকচ।—আমি ভীম ও হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকচ। মানুষও বটি—রাক্ষসও বটি। ভীম। (স্বগত) হাঁ, আমিও আকার প্রকারে তাই মনে ক’ছিলুম। এই জন্যই বােধ হয় একে দেখে মনের মধ্যে অপত্য-স্নেহের আবির্ভাব হচ্ছিল! কি বীরত্ব- (১৯)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ব্যঞ্জক আকার! (প্রকাশ্যে ) এখানে এদের মধ্যম
পুত্রের সহিত কি প্রয়ােজন তােমার ?
ঘটোৎকচ।—বিলক্ষণ প্রয়ােজন আছে; তা তােমাকে আমি
ব’লতে চাই না।
ভীম। ( দৃঢ়স্বরে) নিশ্চয় তােমাকে ব’তে হবে। দেখছি
তাে এরা ব্রাহ্মণ। নিরীহ ও অসহায় পথিকের উপর
তােমার এরূপ অত্যাচার কেন ?
ঘটোৎকচ। ( ক্রুদ্ধস্বরে) অত্যাচার ? অত্যাচার কাকে
বল? মৃগ-বরাহ তাে তােমাদের খাদ্য। এইরূপ জন্তু
দেখতে পেলে খাবার জন্য তােমরা তাকে বধ কর কি
না? মানুষও আমাদের খাদ্য। সেইজন্য মানুষ পেলেই
আমরা ধরে নিয়ে যাই। কিন্তু আমার মা হিড়িম্বার কত
দয়া দেখ ! উপােস করে আছে ; কাল নরমাংস খেয়ে
পারণ করবে। (ভীম চমকিত হইয়া উঠিলেন!) কিন্তু
যে-সে মানুষ সে খাবে না—তার জন্য একটা ব্রাহ্মণ বা
ক্ষত্রিয় চাই। আমি এই অরণ্যে ঘুরতে ঘুরূতে এদের
দেখতে পেয়েছি—আর এদের মধ্যম ছেলেটাকে পেয়ে
এদের সকলকে অভয় দিয়েছি ! একে কি তুমি অত্যাচার
বল ? সেই মধ্যম ছেলেটা ঐ দিকের একটা পুকুরে
নাহ্নিক করতে গিয়ে বহু বিলম্ব ক’ছে। সেই জন্যে
( ২০ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
তাকে ডাকছিলাম।—এই যে ! সে এসে পড়েছে।
চল রে মধ্যম চল; এত বিলম্ব করলি কেন?
( পদ্মের বীজ ছাড়াইয়া ও সেগুলি হাতে লইয়া মধ্যমের প্রবেশ)
মধ্যম।—কোনও দিকে দৃকপাত না করিয়া কনিষ্ঠকে বলিল) ভাইটি
আমার, পদ্মকোষ তুলতে ও পদ্মের বীজ ছাড়াতে
একটু বিলম্ব হয়ে গেল। এইগুলি খাও তুমি, আমি
দেখে যাই। (পদ্মের বীজ প্রদান )
কনিষ্ঠ।-( পদ্মের বীজ হাতে লইয়া মধ্যমের হাত ধরিয়া
সাশ্রনয়নে বলিল ) না, দাদা, তুমি যেও না; তােমাকে
দেখলে আমি বাঁচব না। তুমি যেও না গাে
দাদা! ( ক্রন্দন ও সেই সঙ্গে তাহার মাতাপিতারও অশ্রুবর্ষণ )
মধ্যম।ছিঃ ভাই, অমন কথা বলতে নাই। বাবা, মা,
বড়দা’, সকলেই রইলেন। আমার জন্যে কেঁদ না ;
লক্ষ্মী-ভাইটি আমার, এইগুলি খাও।
এইগুলি দিয়ে তুমি আমাকে ভুলিয়ে রেখে
যাবে, বুঝি? আমি তােমার ফন্দি সব বুঝতে
পেরেছি। আমি পদ্মের বীজ খাব না।— ভূমিতে
ফেলিয়া দিল। তুমি যেও না ; আর যাবে যদি, আমাকে
সঙ্গে নিয়ে চল। আমি মার কাছে বা কারুর কাছে
কনিষ্ঠ।
(২১)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
থাকব না। আমি তােমার সঙ্গে যাব। চল আমাকে
তােমার সঙ্গে নিয়ে। (রােদন ও সকলের চক্ষে জল)
মধ্যম মা, বাবা, বড়দা’—আমি আপনাদের শ্রীচরণে
প্রণত হই। আপনারা কেউ আমার জন্য শােক করবেন
। আমি যে আজ ভাইদের প্রাণরক্ষা ক’রুতে পালুম,
এতেই আমার হৃদয় আহ্বাদে পূর্ণ হয়েছে, আর
আমি নিজের জীবনকেও ধন্য ও সার্থক মনে করছি।
তবে এখন আমি আপনাদের নিকট চির-বিদায় গ্রহণ
ক’ছি। ( সকলের ক্রন্দন )
কনিষ্ঠ।—( কঁদিতে কঁদিতে) ও গাে দাদা, আমাকে ফেলে
যেও না গাে ! আমি তােমার সঙ্গে যাব গাে !
(উঠিয়া দাড়াইল)
ঘটোৎকচ।—ওরে মধ্যম, তুই শীগগির চলে আয় আমার
সঙ্গে।
( মধ্যম যাইতে উদ্যত হইল, কনিষ্ঠও বলপূৰ্ব্বক জননীর হাত
ছাড়াইয়া তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল)
ভীম।—(ব্যথিত স্বরে) থাম, মধ্যম, তুমি যেও না। এই
রাক্ষস দ্বন্দ্বযুদ্ধে আমাকে পরাজিত না ক’রূতে পারলে,
তােমাকে নিয়ে যেতে পারবে না।
( ২২ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ঘটোৎকচ -( সক্রোধে) কি! এত বড় আস্পর্ধা তাের ।
ভীম আর হিড়িম্বার ব্যাটা
ব্যাটা ঘড়াকুচার সঙ্গে তুই
দ্বন্দ্বযুদ্ধ ক’বি! আজ তােকেও বধ করে তাের মাংসে
আমার উদর পূর্ণ ক’ব।
আয় তবে।—( বাহ্বা-
স্ফোটন )
ভীম।—তবে তুইও এগিয়ে আয় রে রাক্ষস ! দেখি,
তাের বাহুতে কত বল !
( উভয়েই ক্রোধে বাহ্বাস্ফোটন, পরস্পরকে আক্রমণ ও মুষ্ট্যাঘাত
করিতে লাগিল ; পরে বৃক্ষের শাখা ভাঙ্গিয়া পরস্পরকে আঘাত
করিতে লাগিল। পরিশেষে উভয়েই যেন পরিশ্রান্ত হইয়া পরস্পর
হইতে কিছু দূরে দণ্ডায়মান হইল)
ভীম। কই, রে রাক্ষস, আমাকে তত পরাজিত ক’তে
পালি না?
ঘটোৎকচ।—( বিদ্রুপের কণ্ঠে) তুইও তাে আমাকে পরাজিত
ক’ঝতে পারলি না। তবে দে এখন ছেড়ে ঐ মধ্যম
ছেলেটাকে।
ভীম।-শােন্, রে ঘটোৎকচ, প্রাণ থাকতে তা আমি
পাব না।
আমি বেঁচে থাকতে তুই ব্রাহ্মণের
ছেলেকে ধরে নিয়ে যাবি ? এত বড় আম্পর্ধা
তাের ?
(২৩)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ঘটোৎকচ।তবে আর একবার লড়বি, আয়। এইবার
তােকে নিশ্চয়ই যমের ঘরে পাঠাব। (আবার দ্বন্দ্ব
যুদ্ধের উদ্যম)
}
ভীম।—(ঈষৎ চিন্তা করিয়া) আচ্ছা, থাক্, থাক্, আর লড়া-
লড়িতে কাজ নাই। তুই ধরে নে যেন আমারই
পরাজয় হ’ল। তাের রাক্ষসী মা তাে তার পারণের
জন্য একটি ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় ধরে নিয়ে যেতে
বলেছে ? এই ব্রাহ্মণ ছেলেটির পরিবর্তে তুই আমাকেই
নিয়ে চল। আমি ক্ষত্রিয়—আমার মাংস খেতে
তাের মায়ের কোনও আপত্তি হবে না।
ঘটোৎকচ।—(হাসিয়া) আপত্তি? আপত্তি কেন হবে ?
বরং তাের মত শিকার ধরেছি বলে মা খুব আহলাদিতই
হবে। ঐ ছেলেটার মাংসের চেয়ে তাের মাংস বিলক্ষণ
সুস্বাদু হবে।
ভীম।—(হাসিতে হাসিতে) আচ্ছা, তাই চল। (কেশবের
দিকে চাহিয়া ) আপনারা কোথায় যাচ্ছিলেন ?
কেশব।“বাবা, আমরা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আশ্রয় পাব
বলে দ্বৈতবনে যাচ্ছিলুম। পথে দেখছেন তো এই
বিপদ!
(২৪)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ভীম।-(ভূমিতে পদাঘাত করিয়া) কোই হয় ? (ধনুর্বাণ-হস্তে
ভীমের দুই অনুচরের প্রবেশ) ওহে দেখ, তােমরা এই
ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ও ছেলে তিনটিকে পথ দেখিয়ে দ্বৈতবনে
নিয়ে যাও। আমি এই রাক্ষসের সঙ্গে যাচ্ছি।
অনুচরদ্বয়।—( করজোড়ে) বীর, আমরা একজন আপনার
সঙ্গে যাব না ?
ভীম।—-না-কোনও প্রয়ােজন নাই।
কেশব ও ব্রাহ্মণী।—( সানয়নে) বাবা, আমাদের মধ্যমকে
বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজের প্রাণ দিতে যাচ্ছ? কে
বাবা তুমি ?
ভীম।—(হাসিয়া) আমি যেই হই, আপনারা আমার জন্য
কোনও চিন্তা করবেন না। আপনারা এদের সঙ্গে
যান। (ঘটোৎকচের সহিত ভীমের প্রস্থান)
( ২৫ )
চতুর্থ দৃশ্য।
গভীর অরণ্য ; হিড়িম্বার বহিৰ্বাটীর অঙ্গন।
(ভীম ও ঘটোৎকচের প্রবেশ)
ঘটোৎকচ।—মা, মা—তােমার জন্যে কেমন শিকার ধরে
এনেছি, দেখবে এস।
হিড়িম্বা।—( অন্তরাল হইতে) বেশ করেছ ; শক্ত করে বেঁধে
রেখে দাও, যেন না পলায়। বেশ হৃষ্ট-পুষ্ট বটে তাে ?
ব্রাহ্মণ না ক্ষত্রিয় ?
ঘটোৎকচ।-ব্রাহ্মণ নয়, ক্ষত্রিয়। কেমন শিকার এনেছি
একবার বেরিয়েই দেখ না।
হিড়িম্বা। এখন আমি কাজে বড় ব্যস্ত ; যেতে পাব
। পাচককে বলে দাও,—কাল আমাকে জিজ্ঞাসা
করে যেন শিকার বধ না করে।
ঘটোৎকচ।—(সক্রোধে) কি এমন কাজ তােমার, যে একটি-
বার বেরিয়ে এসে দেখতে পার না?
হিড়িম্বা।রাগ ক’ছিস্ কেন, ঘট? আচ্ছা, যাচ্ছি।
( সুন্দরী রমণীবেশে হিড়িম্বার প্রবেশ ; হিড়িম্বা ভীমকে দেখিবামাত্র
( ২৬ )
No text on this page.
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
::|://dli.
.
(R.iiiFr
হিড়িম্বা ভীমকে দেখিবামাত্র ঘােষ্টা টানিয়া দিল
[ ২৭ পৃঃ
মধ্যম ও কনিষ্ঠ চিনিতে পারিয়া, লজ্জায় জিভ, কাটিয়া ও মাথায় ঘােমটা টানিয়া দিয়া স্বগত বলিল) আ মরি মরি! বেশ শিকার তত ? এ যে স্বয়ং আৰ্যপুত্রকে ধরে এনেছে, দেখছি! কি সুপ্রভাত আমার । ( মুহূৰ্ত্ত মধ্যে হিড়িম্বা ভীমের নিকটে আসিয়া তাহার পাদ বন্দনা করিয়া বলিল)—আৰ্যপুত্র, হিড়িম্বা আপনার চরণে প্রণাম ক’ছে। আপনার কুশল তাে? পুত্রের অপরাধ ক্ষমা ক’রবেন—সে তত আপনাকে কখনও দেখে নাই। (পরে ঘটোৎকচের দিকে চাহিয়া) ঘটোৎকচ, তােমার পিতাকে প্রণাম কর—তুমি যাকে দেখতে চেয়েছিলে—এই তিনি! (ঘটোৎকচ কিয়ৎক্ষণ বিস্ময়-বিমূঢ় ভাবে দণ্ডায়মান থাকিয়া, মাতার আদেশে ভীমের পদ বন্দনা করিল) ভীম। (ঘটোৎকচের মস্তকে হস্তাৰ্পণ করিয়া) বৎস, তুমি দীর্ঘায়ু হও। আজ তােমার বাহুবল দেখে আমি বড় আন- ন্দিত হয়েছি। আমার যােগ্য পুত্র তুমি। (পরে হিড়িম্বার দিকে চাহিয়া ) হিড়িম্বে, এখনও কি রাক্ষসী-প্রবৃত্তি ত্যাগ ক’তে পার নাই? এখনও কি নরমাংসে লােভ আছে ? হিরি।-না, আৰ্য্যপুত্র, তােমার সঙ্গে বিয়ে হ’বার পর থেকেই আমি আর কখনও নরমাংস স্পর্শ করি নি ? (২৭)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কিন্তু তােমার এই ছেলেটি বড় দুরন্ত। তার স্বভাব
যাবে কোথায় ? জন্ম থেকে কখনও তাে বাপকে
দেখে নি? আর বাপও ছেলের কোনও সংবাদ রাখেন
নি, বা তাকে কিছু শিক্ষাও দেন নি ! কাজেই ছেলে
এখনও রাক্ষসই আছে।
ভীম।তা’ হলে, তােমার পারণের জন্য ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়
ধরে আতে বলেছিলে কেন ?
হিড়িম্বা।—( হাসিয়া ) তবে শুবে ? নরমাংস খাবার জন্যে
ঘট প্রায়ই আমাকে অনুরােধ করে। আমি তাকে
বলেছিলুম, আমি অনেক দিন নরমাংস খাওয়া ছেড়ে
দিয়েছি ; এখন আবার যদি নরমাংস খেতে হয়, তা
হলে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় ব্যতীত অন্য কোনও মানুষের
মাংস আমি খাব না। তােমরা সব দ্বৈতবনে এসেছ,
তা আমি শুনেছি ; আর আমাদের এই কাম্যক বনে
তুমি প্রায় প্রত্যহ মৃগয়া করতে এসে থাক, তাও
আমি শুনেছি। সেই জন্য ঘটকে আমি বলেছিলুম,
আমি একটা ব্ৰত ক’ছি ; ব্ৰতের পর পারণের দিনে
যদি একটা ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় ধরে আতে পারি,
তা হলে আমি নর-মাংস খাব। জানি
তুমি দ্বৈতবনে থাকতে কেউ ব্রাহ্মণ, বা ক্ষত্রিয়, বা
( ২৮ )
আমি যে,
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
কোনও মানুষের গায়ে আঁচড়টি পৰ্যন্ত দিতে পারবে
। আর যদিই ঘট কারেও ধরে আনে, তা হলে
সংবাদ পেলে, নিশ্চিত এখানে তােমার শুভাগমন হবে।
(হাসিয়া) আমি যা কল্পনা করেছিলুম, দেখ, ঠিক তাই
হয়েছে ! তােমার শুভাগমনে আমি আজ ধন্য হয়েছি,
আর ঘটও ধন্য হ’ল। ঘট, তােমার পিতার জন্য
একটা আসন নিয়ে এস। আমি পাদ্য নিয়ে আছি।
( আসন ও পাদ্য আনয়ন)
তুমি কোন্ দিন না কোন্ দিন দাসীর গৃহে আসবেই
আবে—এই মনে করে আমি প্রত্যহই তােমার জন্য
সুমিষ্ট ফল সংগ্রহ করে রাখি। যদি অনুমতি কর,
তােমার জন্য সুশীতল পানীয় জল, আর কিছু ফল
নিয়ে আসি।
ভীম।(হাসিয়া) আচ্ছা, তােমার যেরূপ অভিরুচি হয়,
কর।-হিড়িম্বে, তুমি তাে আমাদের বর্তমান অবস্থার
কথা শুনেছ ? মহারাজ যুধিষ্ঠির আর আমরা সকলেই
পাপাত্মা দুর্যোধনের চক্রান্তে আজ রাজ্যহীন, সহায়-
সম্পত্তি-হীন ও বনবাসী। দুর্যোধনের সঙ্গে শীঘ্রই
একটা সংগ্রাম বাঁধবে। বীর ঘটোৎকচ,-বৎস,সেই
(২৯)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ সময়ে তােমার সাহায্য আবশ্যক হবে। তুমি আজ থেকে নর-মাংস-ভােজন পরিত্যাগ কর। মৃগমাংস বা বরাহ-মাংস খাও, আর এই অসভ্য বনবাসীদিগকে অভয় প্রদান কর। তুমি দ্বৈতবনে এসে মহারাজ ও আমাদের ভাইদের সঙ্গে পরিচিত হও, আর যুদ্ধবিদ্যা শিখে এই বনবাসীদিগকেও যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা দাও। তােমার দ্বারা অসভ্য বনবাসীদের প্রভূত মঙ্গল হবে, আর যথাসময়ে আমাদেরও বিলক্ষণ উপকার হবে। ঘটোৎকচ।—( প্রফুল্ল হইয়া) পিতঃ, চলুন, আজই আপনার সঙ্গে দ্বৈতবনে গিয়ে পূজনীয় জ্যেষ্ঠতাত ও পিতৃব্য- গণের শ্রীচরণ দর্শন করে আসি। আমাকে যে আদেশ ক’লেন, আমি তাই ক’ব। আজ হ’তে আমি নরমাংস ভােজন ত্যাগ ক’লাম, আর বনবাসীদিগকেও অভয় দিলাম । ভীম।-সাধু, সাধু, বৎস! চল তবে, এখন দ্বৈতবনে যাওয়া যাক্। সেই ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ও তাদের ছেলেগুলি নিরাপদে সেখানে পৌছল কি না, দেখতে হবে। এস তবে আমার সঙ্গে। (উঠিতে উদ্যত ) হিড়িম্বা।আমি যে তােমার জন্যে ফল আর জল নিয়ে দাড়িয়ে আছি। ( ৩০ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
ভীম।—( হাসিয়া ) দাও তবে একটি ফল। (জলদ্বারা
হস্ত ও মুখ প্রক্ষালন ও পরে হিড়িম্বা-প্রদত্ত ফল-ভক্ষণ ও আচমন)
হিড়িম্বা।-আমি ধন্য হলুম। (প্রণাম করিল) এই দাসীকে
মনে রাখবেন, যেন ভুলবেন না।
ঘটোৎকচ।—মা, তােমার শ্রীচরণে প্রণাম। আজ পিতার
দর্শন পেয়ে আমিও ধন্য হয়েছি। তার সঙ্গে এখুনি
আমি দ্বৈতবনে যাচ্ছি।
হিড়িম্বা।–এস, বৎস!
( মাতাকে প্রণাম করিয়া ভীমের সহিত ঘটোৎকচের প্রস্থান)
. (৩১)
পঞ্চম দৃশ্য দ্বৈতবনের মধ্যে একখানি কুটীর (কেশব দাস ও ব্রাহ্মণী আসীন) কনিষ্ঠ।-( বাহিরে খেলা করিতে করিতে কুটীরের মধ্যে বেগে ছুটীয়া আসিয়া) মা-মা-বাবা বাবা-কালকের সেই মধ্যম- বীর আর সেই ঘড়াকুচা আমাদের এই দিকে আছে ! কেশব।-বলিস্ কি রে ? কনিষ্ঠ।—, বাবা, দেখবে এস ! কেশব।-ব্রাহ্মণি, কাল পথে আসতে আসতে সেই অনুচর দুটীর মুখে শুলে তাে, যিনি আমাদের মধ্যমকে বাঁচালেন, তিনিই মধ্যম পাণ্ডব-মহাবীর আমিও সেইরূপ মনে করেছিলুম, কিন্তু তাকে ঠিক্ চিতে পারি নাই। আমাদের ভাগ্যক্রমেই তিনি ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলেন। তিনি না এলে আজ আমাদের মধ্যমের কি দশা হত ? ( ৩২ ) ভীম।
মধ্যমও কনিষ্ঠ
ব্রাহ্মণী।—(বস্ত্রাঞ্চলে চক্ষু মুছিয়-আমাদেরু'ভাগ্যের কথা
কি আর বলতে হয়? স্বয়ং মধুসূদন মধ্যম-পাণ্ডবের
রূপ ধরে আমার মধ্যমকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু কাল
সারাপথ আমি ভাবতে ভাবতে আর কাঁদতে কাঁদতে
এসেছি—আহা, আমার মধ্যমকে বাঁচাতে গিয়ে মধ্যম
পাণ্ডব আপনার প্রাণ দিলেন ? কাল সারা রাত্রির
মধ্যে আমি একটুও ঘুমােতে পারি নি। মধ্যম-পাণ্ডব
বেঁচে আছেন, এই কথা কনিষ্ঠের মুখে এখুনি শুনে
এতক্ষণে আমার সমস্ত ভাবনা দূর হ’ল। যাও না
তুমি একটু এগিয়ে ? এই যে, ওঁরা এসে পড়েছেন।
বাপরে, ঘড়াকুচাকে দেখে এখনও আমার বুক দুরুদুর
কছে ! হা রে কনিষ্ঠ। আমাদের জ্যেষ্ঠ আর
মধ্যম কোথায় গেছে ? আমি তাদের যে দেখতে
পাচ্ছি না?
কনিষ্ঠ।—মা, তারা ঋষিদের আশ্রমে বেড়াতে গেছে।
ভীম।-( কুটীর দ্বারের নিকটবর্তী হইয়া) ঠাকুর, মা-ঠাকুরাণি,
আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। কাল পথে আসতে ও
এখানে এসে, আপনাদের তাে কোনও কষ্ট হয় নাই ?
কেশব।—না, বাবা, কোনও কষ্ট হয় নাই। মহারাজ
যুধিষ্ঠির আমাদের বাসের জন্য এই কুটীরখানি নির্দিষ্ট
( ৩৩ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
করে দিয়েছেন, আর রাত্রিতে আমাদের জন্য প্রচুর
ফলমূল ও গাে-দুগ্ধ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
ভীম।--কাল আমাদের ফিরে আসতে অনেক রাত্রি
হয়েছিল; এই কারণে আপনাদের শ্রীচরণ-দর্শন ক’রুতে
আসতে পারি নাই।
কেশব।—(ঘটোৎকচকে দেখাইয়া) একে যে আবার সঙ্গে নিয়ে
এলেন ?
ভীম।—( ঈষৎ হাসিয়া ) ঠাকুর, ঘটোৎকচ আমার পুত্র ; এর
জননী হিড়িম্বা আমার বিবাহিতা পত্নী। বহু বৎসর
পূৰ্বে অগ্রজের ও জননী কুন্তী দেবীর অনুমতি
নিয়ে আমি তাকে বিবাহ করেছিলাম। ঘটোৎকচ,
এ-দের চরণে প্রণত হও।
( ঘটোৎকচের তদ্রুপ করণ )
কেশব।—আমিও ঘটোৎকচকে প্রথমে দেখেই রাক্ষস বলে
ঠাওরা’তে পারি নাই, বাবা! বৎস ঘটোৎকচ,
আশীৰ্বাদ করি, দীর্ঘজীবী হও ও পিতার মত বীর হও।
কনিষ্ঠ।—( ঘটোৎকচের নিকটে গিয়া) ভাই ঘড়াকুচা-না-না
ঘটোৎকচ, তুমি আমায় এখন বল ত, তােমার মা
আজ কি খেয়ে পারণ ক’রূবেন ?
( ৩৪ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
;
ঘটোৎকচ।(হাসিতে হাসিতে) ফলমূল খেয়ে। তিনি
নরমাংস খান না।
কনিষ্ঠ।--তবে মেজদা'কে কাল ধরে নিয়ে যাচ্ছিলে কেন?
দাদাকে নিয়ে গেলে, আমিও তােমার পেছু পেছু
যেতুম, আর তােমার মাকে বলতুম ‘দাদাকে না খেয়ে
আমাকে খাও। তােমার মা নরমাংস খান না বলে,
কিন্তু তুমি তাে খাও?
ঘটোৎকচ।—আমি মাঝে মাঝে খেতাম বটে; কিন্তু আর
কখনও খাব না। পিতা নিষেধ করেছেন।
কনিষ্ঠ ।এখন তবে কি মাংস খাবে ?
ঘটোৎকচ।-হরিণ, বন্যবরাহ, শশক প্রভৃতির।
কনিষ্ঠ।–আহা! এদেরও তত মা-বাপ, ভাই বােন্ আছে ?
এদের মেরে খেলে তাদের মনে কষ্ট হবে না?
( ঘটোৎকচ কোনও উত্তর দিতে না পারিয়া ভীমের দিকে চাহিল )
ভীম।—( হাসিয়া) কনিষ্ঠ—আমরা ক্ষত্রিয়-মাংস না খেলে
আমাদের চলে না। আমাদের যুদ্ধ ক’রূতে হয় যে !
কনিষ্ঠ।—( ঈষৎ চিন্তা করিয়া) হাতী তােত মাংস খায় না ? সে
কত মােটা, আর তার গায়ে কত বল। তুমি হাতীর
সঙ্গে যুদ্ধ করতে পার?
( , ৩৫ )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
.
ভীম।—( হাসিয়া ) পারি। বুনাে হাতীর শুড় ধরে তাকে
মাথার উপর আকাশে ঘুরিয়ে মাটীতে আছড়ে মেরে
ফেলেছি।
কনিষ্ঠ। (সবিস্ময়ে) বাপ রে ! তােমার গায়ে কি বল ?
আমার কিন্তু কোন জীবকেই মারুতে ইচ্ছে হয় না
বাঘকেও না—সিংহকেও না—হাতীকেও না-আর
রাক্ষসকেও না।
ভীম।-না মালে, তারা যে তােমাকে মেরে ফেলবে ?
কনিষ্ঠ।—কেন মারবে ? আমি যে সকলকেই ভালবাসি।
আমার সঙ্গে সকলেরই ভাব হয়ে যাবে।
ভীম।—(কনিষ্ঠকে সহসা বাহু দ্বারা তুলিয়া, সহর্ষে), কনিষ্ঠ, তুমিই
যথার্থ ব্ৰাহ্মণ ! দীর্ঘজীবী হয়ে তুমি একজন মহর্ষি হও—
তােমরাই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
কনিষ্ঠ।—( ভীমের হাত ছাড়াইয়া তাড়াতাড়ি নামিয়া )—মা, দেখ,
দেখ—কে একজন রাণীর মতন আমাদের এই দিকে
আছেন ?
ভীম।—( ফিরিয়া চাহিয়া) ওঃ, মহারাণী দ্রৌপদী আসছেন যে।
(জনৈক পরিচারিকার সহিত দ্রৌপদীর প্রবেশ )
ব্রাহ্মণী—( অগ্রসর হইয়া করজোড়ে) মা, আসুন—আসুন—
আজ আপনাকে দেখে আমরা ধন্য হলুম।
( ৩৬)
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
Remitha
ভীম।•••কনিষ্ঠ ; তুমিই যথার্থ ব্রাহ্মণ !
[ ৩৬ পৃঃ
No text on this page.
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
( দ্রৌপদী ব্রাহ্মণ-দম্পতিকে প্রণাম করিলেন)
দ্রৌপদী।—মা, কাল রাত্রিতে আপনাদের বিপদের কথা
শুলুম। মধ্যম-পাণ্ডব কাল আপনাদিগকে রাক্ষসের
হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আপনারা কাল রাত্রিতে
কুশলে ছিলেন ত ?
ব্রাহ্মণী।—মা, আপনি স্বয়ং রাজলক্ষ্মী। আপনার কৃপায়
আমাদের সমস্তই কুশল, আর কিছুরই অভাব হয় নি।
( ভীমের ইঙ্গিতে ঘটোৎকচ দ্রৌপদীকে প্রণাম করিল )
দ্রৌপদী।—(সবিস্ময়ে) কে বৎস, তুমি ? তােমাকে যে আর
কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না। কিন্তু তােমাকে
দেখে যেন চেনা-চেনাও বােধ হচ্ছে।
ভীম।—মহারাণি ! ইনি আপনার পুত্র—ঘটোৎকচ ;
হিড়িম্বার গর্ভজাত।
দ্রৌপদী।-( সানন্দে ) বটে ? বটে ? বৎস, চিরায়ু হও।
তােমার ও তােমার মার নাম শুনেছি—কিন্তু তােমা-
দিগকে দেখার সৌভাগ্য কখনও হয় নি। তােমার
মা ভাল আছেন ত ? এখন কোথায় তিনি ?
ঘটোৎকচ।—নিকটেই আছেন ; একদিন আপনার সঙ্গে
সাক্ষাৎ করতে আসূবেন।
( ৩৭ )
;
মধ্যম ও কনিষ্ঠ দ্রৌপদী।—নিকটে থাকেন ত আমি নিজেই তার কাছে যাব। ঘটোৎকচ।-না, মা, অরণ্য বড় দুর্গম। আমিই তাকে নিয়ে আসব। দ্রৌপদী।—তা বেশ ; শীঘ্র তাকে একদিন নিয়ে আসূবে। বৎস, মধ্যাহ্নে তােমার এই মায়ের হাতের চাটি অন্ন খেয়ে চলে যেও না যেন। ঘটোৎকচ।-যে আজ্ঞা, দেবি ! কনিষ্ঠ।—( ঘটোৎকচকে) ভাই ঘটোৎকচ, তােমার মা যেদিন আসূবেন, আমায় একবার তাকে দেখাবে ত ? ঘটোৎকচ।— হাসিয়া) তাকে আমি তােমাদের এই কুটীরে নিশ্চয়ই নিয়ে আসব। দ্রৌপদী।—(কেশব ও ব্রাহ্মণীর প্রতি) ঠাকুর, ঠাকুরাণি, আপ- নারা এই বনে যতদিন অবস্থান ক’বেন, অন্যান্য ঋষি ও ব্রাহ্মণদের সহিত আপনারাও সকলে মহারাজের কুটীরেই প্রত্যহ ভােজন ক’রূবেন। কেশব।—মা, আমরা আপনাদেরই আশ্রিত। আপনার নিমন্ত্রণ আমরা সাদরে ও সসম্মানে গ্রহণ ক’লাম। ব্রাহ্মণী।—মা, আপনার যদি কোনও প্রকার সাহায্য আবশ্যক হয়, তৎক্ষণাৎ আমাকে ডেকে পাঠাবেন। ( ৩৮. )
মধ্যম ও কনিষ্ঠ
দ্রৌপদী।—না, মা, আমার কোনও সাহায্য আবশ্যক হবে
। আপনারা আমাদের পূজ্য অভ্যাগত। আপনাদের
সেবা ক’বার অধিকার ও আনন্দ থেকে আমাকে বঞ্চিত
ক’বেন না। মধ্যম-পাণ্ডব, ঘটোৎকচকে সঙ্গে নিয়ে
মা, আপনারা সকলে মধ্যাহ্নের সময় শুভাগমন
ক’রূবেন।
( ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর বিনয়পূর্বক সম্মতি-জ্ঞাপন)
কনিষ্ঠ।—( আবদারের স্বরে জননীকে) মা, আমি এখনি একবার
রাণী-মার সঙ্গে যাব।
দ্রৌপদী।—( সানন্দে) এস, বৎস, এস, এস। এস আমার
ক্রোড়ে আরােহণ কর। আহা, যেন দেব-শিশুটি।
কনিষ্ঠ।—না, রাণী-মা, আমি আপনার কোলে
চাপব
। আমি আপনার সঙ্গে হেঁটে যেতে পাব।
ভীম।—দেব-শিশুই বটে। এমন ছেলে আমি কখনও
দেখি নাই।
( ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীকে অভিবাদন পূৰ্ব্বক সকলের প্রস্থান)
পট-ক্ষেপণ।
সমাপ্ত
.( ৩৯ )
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.