Makardah Saraswat Library, Howrah

Reshmi Phas

2009/07/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রেশমীস
শ্ৰীমনােরঞ্জন চক্রবর্তী সম্পাদিত
শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী এণ্ড সন্স
২১ নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা
বার আনা

জ্যৈষ্ঠ--১৩৪ ০ প্রকাশক–শ্রীকালীক চক্রবর্তী, ২১ নন্দ কুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা - কালিকা তে , ২১ নন্দ কুমার চৌধুরী লেন কলিকাতা-শ্রীশশধর চক্রবর্তী,মুদ্রিত রেশমী কঁাস ১ রাস্তার মােড়ে মোড়ে খবরের কাগজের ফেরিওয়ালার চীৎকারে সমস্ত কলিকাতা সেদিন মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে। জোর খবর বাধু! জোর খবর !! রাণীর গলা থেকে দেড়- কোটী টাকা দামের হার চুরি ! চোর উধাও! জোর খবর বাবু ! দৈনিক বসুধারার পৃষ্ঠা জুড়িয়া বড় বড় অক্ষরে ছাপা হইয়াছে সমুদ্র-গড়ের রাণীর গলা হইতে দেড় কোটী টাকা মূল্যের মুক্তার মালা চুরি !! বল্-নাচের আসরে অদ্ভুত দুঃসাহসিক চুরি! জন-সমুদ্রের মধ্যে চোর নিরুদ্দেশ । ( আমাদের নিজস্ব সংবাদ দাতার বিবরণ) গত রাত্রে সমুদ্রগড়ের রাণী তাহার প্রাসাদে যে ব-নাচের আয়ােজন করেন তাহাতে একটি অত্যন্ত কৌতূহলােদ্দীপক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। সমুদ্রগড়ের রাণী সাহেবার। বংশপরম্পরায় যে মূল্যবান্ মুক্তাহার পরিয়া থাকেন,গতকল্য রাত্রে সেই হার রাণীর কণ্ঠ হইতে চুরি গিয়াছে। হারগাছি বহুদিন হইতে বহু রাজা-মহারাজার বিস্ময় ও ঈর্ষার বস্তু হইয়া সমুদ্রগড় রাজ- ভাণ্ডারের শােভা এবং সম্পদ বৃদ্ধি করিয়াছিল। গতকল্য রাত্রে রাণী তাহার ইউরােপীয় বন্ধু-বান্ধবী, অন্যান্য রাজা ও রাজ- বংশীয়দের লইয়া একটি ব-নাচের আয়ােজন কং'ঘ। তদুপলক্ষে যথারীতি তাহার কণ্ঠদেশে সেই মুক্তার মালা শােভা পাইতেছিল।

রেশমী বাস কিছুক্ষণ নাচের পর শ্রান্ত হইয়া রাণী যখন একটি লতা-বিতানের মধ্যে বিশ্রাম করিতেছিলেন সেই সময় কুঞ্জের পাশ হইতে কোন লােক হাত বাড়াইয়া মালাটি তাহার গলা হইতে ছিনাইয়া লয়। রাণী তৎক্ষণাৎ চীৎকার করিয়া মূচ্ছিত হইয়া পড়েন। সেখানে রাণীর ভ্রাতা নরেন্দ্রকুমার ব্যতীত আর কেহই উপস্থিত ছিলেন । নরেন্দ্রকুমার তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া গিয়া রাজাকে খবর দেশ। রাজা আসিয়া লোক-লস্কর লইয়া চারিদিকে তন্নতন্ন করিয়া অন্বেষণ করেন। কিন্তু কোথাও কাহাকেও দেখিতে পাওয়া যায় নাই, শুধু বাগানের একপার্শ্বে লতাগুলি ছিন্নভিন্ন এবং তাহারই আশে-পাশে মাটীতে পায়ের দাগ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা দেখিয়া উপস্থিত সকলেই অনুমান করেন যে চোর পাঁচীল ডিঙাইয়া পলাইয়াছে। তখন বাহিরেও বিস্তর অনুসন্ধান করা হয়, কিন্তু চোর ধরা পড়ে নাই দৈনিক চন্দ্রিকার খবর অধিকতর চমকপ্রদ, তাহাতে এইরূপ খবর বাহির হইয়াছে। সমুদ্রগড়ের রাণীর মুক্তাহার অপহৃত ! রহস্যময় চুরি !! চোর ধরা পড়িয়াছে কিন্তু বামাল পাওয়া যায় নাই। গত রাত্রে সমুদ্রগড়ের রাণীর ব-নাচে এক ভীষণ বিপত্তি ঘটিয়াছে। নাচ তখন পুরাদমে চলিতেছে ; রাণী অদূরবর্তী কুঞ্জান্তরালে বিশ্রাম করিতেছেন এমন সময় কে বা কাহারা রাণীর পিছন দিক হইতে আক্রমণ করে এবং তাহার গলা হইতে বহুমূল্য : . মুক্তার মালা ছিনাইয়া লয়। রাজ-শ্যালক নরেন্দ্রকুমার রাণীর চীৎকারে ঘটনাস্থলে আসিয়া ব্যাপার বুঝিতে পারেন ও তৎক্ষণাৎ রেশমী কাস সকলকে সংবাদ দেন। তখন সিপাহী-শাস্ত্রী লইয়া চতুর্দিকে চোরের অনুসন্ধান করা হয়। পদচিহ্ন ও অন্যান্য লক্ষণে বুঝিতে পারা যায় যে চোর প্রাচীর উল্লঘন করিয়া পলায়ন করিয়াছে। অনুসন্ধানকারীরা বাহিরে আসিয়া বহুদূর পর্যন্ত ঘুরিয়া ঘুরিয়া অন্বেষণ করেন কিন্তু কাহাকেও দেখিতে না পাইয়া প্রত্যাবর্তন করিবার জন্য বাড়ী ফিরিবার অন্য একটি পথ ধরেন। সেই পথে একটা ভগ্নপ্রায় বাড়ীর প্রাচীরের নীচে তাহারা একটি লােককে রহস্যময় ভাবে দণ্ডায়মান থাকিতে দেখেন এবং তৎক্ষণাৎ তাহাকে ধৃত করেন। অনুসন্ধানের ফলে তাহার নিকট হইতে, একটি কাদা-মাখা মুক্তা পাওয়া যায়। সে মুক্তাটি যে রাণীর কণ্ঠের মুক্তা-মালার তাহাতে আর কোন সংশয় নাই—লােকটিকে পুলিশে দেওয়া হইয়াছে। তাহার নাম—হরেন্দ্রনাথ দত্ত। লােকটিকে বিশিষ্ট ভদ্ৰব্যক্তি বলিয়াই মনে হয়। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সমস্ত ঘটনার ভিতর কোন গভীর রহস্য লুক্কায়িত আছে। পুলিশ-দন্ত জোর চলিতেছে । রােমাঞ্চকর সংবাদের সন্ধান পাইয়া অনেকেই যেমন নির্বিচারে খবরের কাগজ ক্রয় করিতেছিল, তেমনি ঘটনাটি পাঠ কমািত্র ভুলিয়া যাইতেও তাহাদের বেশী সময় লাগিতেছিল । সকলেই যে যাহার নিজের কাজ লইয়া ব্যস্ত, এই ঘটনা লইয়া মাথা ঘামাইবার সময় কাহার আছে ? সকলে না থােক, অন্ততঃ একব্যক্তি এই ঘটনা পড়িয়া অতি মাত্রায় চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল ;-ঘটনাটি তাহার মাথার মধ্যে হাজার রকমের চিন্তার জাল বিস্তার করিতেছিল, সকালে খবরের কাগজ পড়িবার পর হইতেই সে পৃথিবীর অন্য রুমস্ত কাজ রেশমী ফাস ভুলিয়া কেবল সেই একটি মাত্র চিন্তায় নিজেকে ব্যাপৃত রাগালি। মুক্তামালা অপহরণের ব্যাপার এত অধিক মাত্রায় যাহাকে বিচলিত করিয়াছিল তাহার নাম–তরুণ গুপ্ত ! সখের গােয়েন্দা- গিরি তাহার জীবনের একমাত্র বাতিক। পুলিসের বড় সাহেবের সহিত তাহার পিতার বহুদিনের বন্ধুত্ব ছিলসেই সুযােগে সে বড় সাহেবের বিশেষ স্নেহের পাত্র এবং সমস্ত বেসর- কারী তদন্তে সাহেবের দক্ষিণ হস্ত । ঘটনাটি পাঠ করিবার পর হইতে তরুণ আপন মনে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল ! এ রহস্য সে যদি ভেদ করিতে পারে তাহা হইলে তাহার জীবনের একটি বৃহৎ আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হইবে । খবর পড়িয়াই তরুণ বাহির হইয়া গিয়াছিল। ফিরিল অধিক বেলায়। স্নানাহার সারিয়া একটু বিশ্রাম করিয়া সে পুনরায় বাহির হইবার আয়োজন করিতে লাগিল। পথে বাহির হইয়া সে একখানি ট্যাক্সির জন্য দু’এক পা অগ্রসর হইয়া সহসা দেখিল—কিছু দূরে যে পুলিশ-ষ্টেশন অাছে তাহার সম্মুখে বিস্তর লােক জমা হইয়াছে। ব্যাপার কি জানিবার জন্য কাছে গিয়া দেখিল -ফাড়ির দরজায় যে নােটিশ লটুকান থাকে তাহাতে একটি প্রকাণ্ড বিজ্ঞাপন আঁটা রহিয়াছে। সেই বিজ্ঞাপনই পথিক-মণ্ডলীর আকর্ষণের বস্তু। তুরুণ আরও একটু কাছে গিয়া বিজ্ঞাপনটি পাঠ করিল। তাহাতে এইরূপ ঘােষণা করা হইয়াছে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার !! পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার !!! চাংলী নামক একজন ভীষণ চনদস্য সদলবলে চীন- রেশমী ফাস বন্দীশালা হইতে পলায়ন করিয়া ভারতবর্ষে মসিয়াছে। কর্তৃপক্ষ জানিতে পারিয়াছেন যে, চাংলী কয়েকদিন আগে কলিকাতায় পৌছিয়াছে। যে বা যাহারা চাংলীকে ধরাইয়া দিতে পারিবেন বা তাহার প্রকৃত সন্ধান দিতে পারিবেন চীন- কর্তৃপক্ষ তাহাকে, বা তাহাদিগকে উক্ত অর্থ পুরস্কার দিবেন। লােকটার একটি চক্ষু কণা, নাকের উপর একটা কাটা দাগ আছে। মাথায় দীর্ঘ বেণী। নীচে প্রতিকৃতি দেওয়া হইল। অনুমত্যনুসারে ইত্যাদি ঘোষণাপত্র পড়িয়া তরুণ নীচেকার চেহারাটি ভাল করিয়া * দেখিয়া লইল-ভীষণ আকৃতি, কিম্ভুতকিমাকার ! একবার দেখিলে সে চেহারা বােধ করি চিরদিনের মত মনের মধ্যে রহিয়া যায়। তরুণ মৃদু হাসিয়া অসংখ্য কৌতূহলী দর্শকের ভিড় ঠেলিয়া বাহিরে আসিয়া সম্মুখে একখানা ট্যাক্সী দেখিয়া তাহার উপর উঠিয়া বসিল। পুলিশ তদন্ত-সমিতির বড় কর্তা ডেভেনহাম সাহেব তখন খাসকাম্রাতে কাজ করিতেছিলেন ; তরুণকে সমাদর করিয়া বসাইয়া বলিলেন—তােমাকেই আমি এই মাত্র মনে মনে চাইছিলাম । তরুণ সসম্রমে কহিল—কেন, বলুন তাে? সাহেব হাসিয়া বলিলেন—তুমি কেন এসেছে, আগে তাই বল হয়ত, দেখবাে, দুজনেরই চিন্তাধারা একই পথে চগ্রেছে।

রেশমী কাস
৬
তরুণ কহিল—কাল রাত্রে সমুদ্রগড়ের রাজবাড়ীতে যে চুরি
হয়েছে, আমি সেই সম্পর্কে আপনার সঙ্গে আলােচনা করতে
এসেছি।
সাহেব কহিলেন—কাল রাত্রে সমুদ্রগড়ের রাজবাড়ীতে যে
চুরি হয়েছে, আমি সেই সম্পর্কে তোমার সঙ্গে আলােচনা করবার
জন্যেই তােমায় অনুসন্ধান করছিলাম ।
* তরুণ কহিল—উপর থেকে যা দেখা যাচ্ছে, সত্য বস্তু তা নয়,
এ ব্যাপারের মধ্যে কিছু গােলযােগ আছে।
তারপর সোজাসুজি তাহার মনেব কথা প্রকাশ করিল।
আমার বড় ইচ্ছ, বেসরকারীভাবে এই কেসটার তদন্ত করি।
সাহেব কহিলেন—তােমার মতো আমারও ধারণা হয়েছে-
এর মধ্যে গােল আছে। আমি সানন্দে তােমার ইচ্ছাকে অনু-
মােদন করছি। এ সম্বন্ধে তুমি কি ভেবেছ বল দেখি—তােমার
বক্তব্য শুনি।
তরুণ কহিল-খবরের কাগজের ঘটনাটি পড়ে আমি সমস্ত
দিনে যে যে কাজগুলি করেছি, আপনাকে তারই ইতিবৃত্ত বলি ;
তাহলেই আপনি আমার বক্তব্য বুঝতে পারবেন।
সাহেব কহিলেন—ও! তুমি এর মধ্যে কাজ আরম্ভ করে
দিয়েছ নাকি! শুনি, শুনি।
সকালে ঘটনাটি পড়ে দেখলাম, চোর ধরা পড়েছে।
মুক্তো হাতে পাঁচীলের ধারে দাঁড়িয়েছিল ; ভদ্রলােক চোর!
ব্যাপারটা কেমন যেন সন্দেহজনক বলে মনে হ’ল। লােকটির
বিষয় জানবার জন্যে হাজতে গেলাম। আমায় লােকটির সঙ্গে
দেখা করতে দিলে না বটে কিন্তু তার ঠিকানা ও অন্যান্য পরিচয়

রেশমী যাস ৭ ; ; পেলাম। লোকটির নাম হরেন্দ্র! শিক্ষিত যুবক! হাজত থেকে ঠিকানা পেয়ে বাসস্থানটা দেখবার ও পাড়া থেকে তার সম্বন্ধে কিছু জানবার কৌতুহল হল। সেখান হতে বরাবর অনুসন্ধান করে তার বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে প্রথমে বেরিয়ে এলাে, একটা বুড়ী ঝি—আমায় দেখে এই মারে কি এই মারে! তারপর আমি পুলিসের লােক জেনে সে বেচারা ভীত হয়ে পড়ল। আমি তখন ব’ল্লাম—একবার হরেনবাকুর- স্ত্রীর সঙ্গে গোটাকতক বিষয় আলােচনা করতে চাই। ভয় নেই, আমি তাকে সাহায্যই করব ; জুলুম করতে আসি নি। '{ সাহেব, একমনে শুনিতেছিলেন সিগারটা মুখ হইতে নামাইয়া কহিলেন—তারপর ? তরুণ বলিল—হরেন্দ্রের স্ত্রী শিক্ষিতা ; আমার সামনে অসঙ্কোচে বেরিয়ে এলেন। মেয়েটির মধ্যে অসামান্য গাম্ভীৰ্য্য ও আত্মমর্যাদা আছে। তার কাছে হরেন্দ্রের বিষয় যা শুনলাম, উপধ্যাসের মতে তা বিচিত্র ! হরেনের মা মারা যাবার পর তার বাপ যখন প্রকাশ্যেই নিজের বাড়ীতে তার রক্ষিত স্ত্রীলােক- টাকে এনে রাখলেন, তখন হরেন তার বাপের এ ব্যবহার সহ করতে পারলে না-কলহ হল। সাহেব বলিলেন—বল কি! এত কাণ্ড ? তারপর ? তরুণ তখন সংক্ষেপে হরেন্দ্রের স্ত্রী মায়ার কাহিনী প্রকাশ করিয়া বলিল। হরেন্দ্র পিতার সহিত কলহ করিয়া একস্ত্রে বাড়ী হইতে বাহির হইয়া আসে, জীবনে কখনাে আর সে বাড়ীর দ্বার অতিক্রম করে নাই—কোনরূপ অর্থ প্রার্থনা করা তত দূরের কথা। মাতার জীবিতকালেই হরেন্দ্রের বিবাহ হইয়াছিল। তাহার ০ রেশমী ফাস ৮ স্ত্রী মায়াও তেজস্বিনী তরুণী ; সে তাহার পিতার ও শ্বশুরের নিষেধ না শুনিয়া হরেনের অনুগামিনী হয়। স্বামীর সহিত স্বেচ্ছায় দারিদ্র বরণ করিয়া কলিকাতার এক অপরিসর গলির মধ্যে একখানি ছােট বাড়ী ভাড়া করিয়া উভয়ে সংসার-যাত্রা আরম্ভ করে। ছাত্র পড়াইয়া ও পত্রিকা প্রভৃতিতে সাংবা- দিকের কাজ করিয়া হরেন্দ্রের দিন একরকম কাটিয়া যাইতেছিল। এমন সময় সেদিন রাত্রে সহসা মায়ার কলেরা হইবার উপক্রম হইলে হরেন্দ্র অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া ডাক্তার আনিতে বাহির হইয়া যায়। সমস্ত রাত অতিবাহিত করিয়া সকালে মায়া আপনা-আপনি সুস্থ হইয়া ওঠে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তাহার স্বামীর এক ছাত্রের নিকট হইতে পুলিসের হাতে গ্রেপ্তার হইবার কথা জানিতে পারে। হরেন্দ্র সম্পূর্ণ নিরপরাধ—এ কথা মায়া ঈশ্বর সাক্ষী করিয়া বলিতে পারে। হরেন্দ্রের দ্বারা কোন ছােট কাজ কখনাে হইতে পারে না এইরূপ ধারণা তার। বিচিত্র এই কাহিনী শ্রবণ করিয়া ডেভেনহ্যাম সাহেব বিস্মিত হইলেন। তারপর তরুণকে প্রশ্ন করিলেন—তুমি এই মহিলাটিকে ও তার এ সমস্ত কথা বিশ্বাস করাে ? তরুণ কহিল—করি! মেয়েটির কথাবার্তায় ও ব্যবহারে এমনি একটি সুস্পষ্ট সত্যের ছাপ আছে যা চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না। আপনি যদি সেখানে থাকতেন, আপনারও বিশ্বাস করতে দ্বিধা হত না। সাহেব কহিলেন—এই স্ত্রীলােকটীকে দেখে তােমার যা মনে হয়েছে, ধৃত স্বামীকে দেখে, তার সঙ্গে অল্প দু’একটা কথা বলে আমারও ঠিক তাই মনে হয়েছে। লােকটিকে আমি কোন প্রশ্ন

রেশমী কাস
বা জেরা করিনি। সে সব করবে তুমি। আমার বিশ্বাস
যাকে ধরা হয়েছে, সে প্রকৃত অপরাধী নয়।
তরুণ কহিল—হরেনের সঙ্গে আমি একবার দেখা করব। •
নিশ্চয় করবে ; এখুনি যাও। আমি পত্র লিখে দিচ্ছি।
সব কথা তার কাছ থেকে জেনে নেবে। বিশেষ করে, সেই
রত্রের ঘটনা সম্বন্ধে সব কথা খুটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবে। তোমার
ওপর যখন,এ কেসের ভার দিলাম তখন জেনে রেখাে, তুমি
তোমার নিজের ও সেই সঙ্গে আমার সুনামের জন্যে দায়ী।
যখনই প্রয়ােজন হবে, আমাকে তোমার কাজে লাগবে ; সব
সময়েই তােমাকে সাহায্য করতে আমি প্রস্তুত থাকবে।
সাহেব হাজতের সুপারিনটেনডেন্ট-এর উপর পত্র লিখিয়া
দিলেন। পত্র লইয়া তরুণ প্রস্থান করিল।
হাজতে যখন তরুণ উপস্থিত হইল, তখন সন্ধ্যা। হাজতের
ঘর হইতে হরেন্দ্রকে বাহিরে আনিয়া তরুণ তাহাকে লইয়া আর
একটি ক্ষুদ্র ঘরে প্রবেশ করিল ; বাহিরে অবশ্য একজন সিপাহী
দাড়াইয়া রহিল।
হরেন্দ্রের বয়ঃক্রম ত্রিশের মধ্যে। সুন্দর সুগঠিত দেহ।
প্রশস্ত ললাটে তেজের দীপ্তি। তাহাকে দেখিয়া তরুণের মনে
হইল, উপযুক্ত স্ত্রীর উপযুক্ত স্বামীই বটে! অপরাধ ,ইহাদের
কাছে আসিতে ভয় পায়-তাহা নিঃসংশয়ে সত্য !
হরেন্দ্র বসিলে তরুণ তাহাকে সহাস্যে প্রশ্ন করিল—আমাকে
চেনেন না নিশ্চয়।
হরেন্দ্র তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল—হয়ত কোথাও
আপনাকে দেখে থাকুববা, কিন্তু চিনি না।

রেশমী ফাঁস আমার নাম, তরুণ গুপ্ত। আমি একজন বেসরকারী গােয়েন্দা ! হরেন্দ্র কহিল—ওঃ! আপনি কি এই কেসের তদন্ত কচ্ছেন ? আমাকে জেরা করতে এসেছেন ? কিন্তু আমি ত বলেছি আমার সব কথা ; তার বেশী তরুণ তাহাকে থামাইয়া কহিল-এক মিনিট! আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন। এ কেসের তদন্ত আমি করব—কিন্তু তা সরকারের পক্ষে ও আপনার বিপক্ষে নয়। আমি এ কেস বেসর- কারী ভাবে আপনার পক্ষে তদন্ত করব। অর্থাৎ প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বার করাই আমার লক্ষ্য। সে কাজে আমি আপনার সাহায্য চাই! আমার বিশ্বাস আপনি নিরপরাধ'; আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে এ ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হয়েছে ! স্ত্রীর নামে হরেন্দ্র সচকিত হইয়া উঠিল ; কহিল--মায়া ? মায়ার সঙ্গে দেখা করেছিলেন ? কেমন আছে সে ? বলুন। ভাল আছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। এ-কথা আপনাকে ব’লতে বাধা নেই যে, এই কেসের তদন্ত আরম্ভ করে প্রথমেই আমার একটি মস্ত লাভ হয়েছে। আমার নিজের বােন ছিল না—এতদিনে আমি একটি ভগ্নী পেয়েছি। মায়া আমাকে তার দাদার পদে অভিষিক্ত করেছে, এবং আমাকে তার সাহায্যকারী রূপে বরণ করেছে ! সেইজন্যে আমার কর্তব্য আরও দায়িত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন আপনি আমায় সাহায্য করুন ! তরুণের কথা শুনিয়া হরেন্দ্রের দুই চক্ষু বাষ্পকুল হইয়া উঠিল ; কহিল—কি করতে হবে, বলুন! কাল রাজৈর ইতিহাস আমার কাছে খুলে বলুন ; কোন ;

রেশমী ফাস
কথা গােপন করবেন না। ডাক্তার ডাকতে বেরিয়েছিলেন;
তারপর কি হল ?
হরেন্দ্র কছিল—আমাদের বাড়ীর সরু পথের পাশেই প্রকাণ্ড
চওড়া রাস্তা ; সেই রাস্তার বাঁকে একটা পুরানাে বাগান-বাড়ী
আছে-
জানি। সেই বাগান-বাড়ীর পাঁচীলের নীচেই আপনাকে
ধরা হয়েছিল ।
হ্যা। আমি বাড়ী থেকে বেরিয়ে দ্রুতপদে ডাক্তারের
উদ্দেশ্যে চলেছি, পথের বাঁকে বাগান-বাড়ীটার কাছ বরাবর এসে
হঠাৎ দেখলাম, অন্ধকারে দুজন লােক পাঁচীলের নীচে দাঁড়িয়ে
ধস্তাধস্তি করছে—একজন আর একজনের হাত থেকে কি-একটা
জিনিষ কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে, এই ভাব। লােক দুটোকে
দূর থেকে দেখেই আমার সন্দেহ হ’ল ; হাঁক দিলাম—কে
ওখানে? আমার গলা পাবামাত্রই দু’জনেই চমকে উঠে থেমে
গেল ; তারপর প্রথমে একজন, পরমুহূর্তেই অন্যজন লাফ দিয়ে
পাচীল ডিঙিয়ে বাগানের মধ্যে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। মিনিট
কয়েক মাত্র! এর মধ্যেই এই ব্যাপার ঘটে গেল। আমি
হতভম্ব হয়ে, লােকদুটো যেখানে দাড়িয়ে ধস্তাধস্তি করছিল
সেইখানে এসে দাড়িয়ে ব্যাপারটা অনুধাবন করবার চেষ্টা করছি,
এমন সময় পায়ের কাছে মাটীর ওপর কি যেন দপ করে জ্বলে
উঠল। ভালাে করে চেয়ে, নীচু হতেই দেখলাম, গােলাকার
একটি ছােট্ট পায়রার ডিমের মতাে কি একটা বস্তু থেকে ঐ রকম
জ্যোতি বা’র হচ্ছে। বিস্ময়ে ও কৌতুহলে তখন মায়ার অসুখের
কথা আমি ভুলে গেছি। তাড়াতাড়ি মাটি থেকে সৈই ডিমটি

হাতে তুলে নিয়ে দেখলাম—মুক্তো! অসম্ভব দামী একটি মুক্তো !!
অবাক হয়ে মুক্তোটি দেখছি, এমন সময় পিছনে বহু লােকের
পায়ের শব্দ পেলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি মুক্তোটিকে
মুঠার মধ্যে ভ’রে এগিয়ে যাব, এমন সময় তারা এসে ‘চোর’
‘চোর’ শব্দে আমাকে ঘিরে ধরল ! বিস্ময়ে ও ভয়ে তখন আমি
বিহ্বল হয়ে গেলাম।
তরুণ কহিল—আশ্চৰ্য্য নয়। তারপর ?
তারপর তারা সবাই মিলে আমার কাপড় জামা খোঁজ
করতে থাকে। মুক্তোটি বেরিয়ে পড়তেই তারা আমায় ধরে
নিয়ে একেবারে থানায় এনে হাজির করে। তার পরের কথা
আর কি বলব ?
তরুণ কহিল—আচ্ছা, যে বাগান-বাড়ীর ভিতর লোকদুটী
লাফাইয়া পড়িল, সে বাড়ীটা কার ? সেখানে কে থাকে ?
নাম-ধাম ঠিক জানিনে। তবে শুনেছি বেলেঘাটার কোন
এক মহাজনের। তিনি নিজে থাকেন না, থাকে তার একজন
সরকার। বাগান পুকুর তত্ত্বাবধান করে আর করে ভাড়া আদায় ।
বাগানটির মধ্যে তিন চার খানা ছোট ছােট বাড়ী আছে, তাতে
তিন চারটে ভাড়াটে থাকে।
এদের আপনি চেনেন ?
। তবে পাড়ার লোকের মুখে শুনেছি—যারা থাকে
তারা সবাই বেশ বর্ধিষ্ণু লােক। একজন রিটায়ার্ড মুন্সেফ,
একজন প্রফেসর, আর একজন সাহেব।
তরুণ আর কোন প্রশ্ন করিল না, হরেন্দ্রকে আশ্বাস ও সান্ত্বনা
দিয়া উঠিয়া দাড়াইল।

রেশমী ফাস
হরেন্দ্র কহিল—নিজের জন্যে ভাবিনে। কিন্তু মায়া ? তানে
দেখবার যে কেউ নেই।
কেউ নেই, এ-কথা সত্যি নয়, হরেন্দ্র বাবু! তাকে
দেখবার জন্যে তার এই দাদা আছে, কোন কর্তব্যে সে অবহেলা
করবে না।
হরেন্দ্র জোড় হাতে তরুণকে প্রণাম করিয়া তাহার কৃতজ্ঞতা
জ্ঞাপন করিল। তরুণ বাহির হইয়া গেল।
রাত্রের আহার সত্বর সমাধা করিয়া তরুণ ফোনে মিঃ
ডেভেনহ্যামকে তাহার সহিত হরেন্দ্রের সাক্ষাতের বিবরণ
জানাইল।
ডেভেহাম সাহেব বলিলেন—নতুন খবর তাে কিছু পাওয়া
গেল না। এখন কি করবে ঠিক করলে?
তরুণ জবাব দিল—আজ রাত্রেই আমি বাগান-বাড়ীটায়
গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে চাই। ওখান থেকে তদন্তের কোন
সূত্র আবিষ্কার করতে পারি কি না, দেখবাে।
বেশ, তা করে দেখতে পারাে। কিন্তু হুসিয়ার, যেন
সেখানকার লােকজনের কাছে ধরা পড় না; তাহলে মুস্কিল
হবে। তারা না-জেনে তােমায় পুলিসে দেবে আর সঙ্গে সঙ্গে
লােক জানাজানি হয়ে যাবে।
তরুণ কহিল—আজ্ঞে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন; অত
কাচা কাজ আমি করব না।

রেশমী দাস
১৪
ডেভেনহ্যাম সাহেব বলিলেন—আর একটা কথা জেনে
রাখােএই চুরির বিষয় সবচেয়ে বেশী কে জানে, জানাে?
যার গলা থেকে চুরি হয়েছে, সেই রাণী নিজে।
তরুণের বিস্ময়ের অবধি রহিল না! কহিল—সেকি! তাহলে
তিনি পুলিসকে কিছু বলছেন না কেন?
নিশ্চয় কোন গৃঢ় কারণ আছে।
কিন্তু এ-কথা এখন
থা। আমি কিছু কিছু খোঁজখবর পেয়েছি; আরও পাবে।
সব কথা যথাসময়ে তুমি শুনতে পাবে। এখন যে কাজে যাচ্ছে,
সে কাজে সফল হয়ে এসে এই প্রার্থনা করি।
সাহেব ফোন ছাড়িয়া দিলেন। রাত্রি বাড়িয়া উঠিতেছে
দেখিয়া তরুণ ও কালবিলম্ব না করিয়া বাহির হইয়া পড়িল।
।
নিঝুম, নিস্তব্ধ পল্লী। তরুণ যখন সেই বাগান-বাড়ীটার
সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইল, তখন আশে-পাশে বাড়ীর দ্বার বন্ধ
হইয়াছে এবং পল্লীবাসীর অধিকাংশই নিদ্রার কোলে মগ্ন।
তরুণ লক্ষ্য করিয়া দেখিল, বাগানের ভিতর যে বাড়ীটি
সর্বাপেক্ষা বড়, তাহারই উপরকার দু’একটা ঘরে আলাে
অলিতেছে। পাশাপাশি আর সব বাড়ীগুলির ঘর অন্ধকার।
তরুণ আর একবার চারিদিক ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া পাঁচীল
বাহিয়া উপরে উঠিল এবং একলাফে বাগানের ভিতর
নামিয়া পড়িল।
জন্য নিস্তব্ধ উদ্যান,—দুর হইতে ঝিল্লীর “রব ভাসিয়া

রেশমী ফাস
;
•
আসিতেছে ; আকাশে তখনো চাদ উঠে নাই; চারিদিকে নিবিড়,
অন্ধকার! তরুণ ক্ষণেক অপেক্ষা করিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর
হইতে লাগিল।
বাগানের মধ্যে যে তিন চারি খানি ছােট ছোট বাড়ী
সেগুলি একটি প্রকাণ্ড অট্টালিকারই বিশ্লিষ্ট অংশ। সম্মুখের
বাড়ীটির মাঝখানে সিড়ি; সেই সিড়ি বাহিয়াই তিন চার ঘর
ভাড়াটিয়াদের নিজ নিজ অংশে উঠিতে হয়।
তরুণ শুনিয়াছিল, জমিদারের কর্মচারীটি নীচেকার দক্ষিণ
দিকের ঘরে থাকে ; সে প্রথমে সাবধানে সেই ঘরের দিকেই
অগ্রসর হইল ! ধীরে ধীরে সেই ঘরের সম্মুখে আসিয়া সে
দেখিল, দ্বারে তালা বন্ধ ! তরুণ খুসী হইল! বুঝিল, কর্মচারীটি
কাৰ্যন্তরে অন্য কোথাও গিয়াছে এবং তাহার অনুপস্থিতিতে
সেই ঘরটি পরীক্ষা করিয়া লওয়া সহজ হইবে।
প্রয়োজনীয় জিনিষ-পত্র তরুণের সঙ্গে ছিল ; তাহারই একটার
সাহায্যে সে অনায়াসেই দরজা খুলিয়া ফেলিল এবং সম্মুখে টর্চের
আলাে ধরিয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া দরজা বন্ধ
করিয়া দিল।
অতিপরিসর ঘরের ভিতর অতিশয় সামান্য আসবাব-পত্র ;
এক কোণে একটি আমকাঠের তক্তাপােষ, তাহার উপর বিছানাটি
গুটানে রহিয়াছে ; আর একদিকে একখানি পুরানো টেবিল,
দু’একখানা চৌকি, একখানা ইজি-চেয়ার
টর্চের আলাে ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া চারিদিকে নিক্ষেপ করিয়া
তরুণ ঘরটিকে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতেছিল, এমন সময় ইজি-
চেয়ারের উপর আলাে পড়িতেই সে চমকিয়া উঠিল।

রেশমী কাস একটি লােক একখানি শাদা চাদরে বুক হইতে পা পর্যন্ত আবৃত করিয়া তাহার উপর শুইয়া ঘুমাইতেছে !! তরুণের বিস্ময়ের আর অন্ত রহিল ন! বাহির হইতে দ্বার বন্ধ আর ঘরের মধ্যে লোকটি এমন অকাতরে নিদ্রা যাইতেছে ? তরুণ তাহার মুখের উপর টর্চের তীব্র আলো নিক্ষেপ করিয়া দেখিতে লাগিল। সহসা তাহার মনে হইল, লোকটি কি সূত্যই ঘুমাইতেছে ? অগ্রসর হইয়া লোকটির কাছে দাড়াইতেই তরুণের সন্দেহ বাড়িল ; সে তাহার হাত লোকটির কপালের উপর রাখিতেই বুঝিতে পারিল—নিস্পন্দ দেহ, ছিম অসাড় হইয়া আছে। হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া হইতেছে কিনা তাহা নিঃসংশয়ে জানিবার জন্য তরুণ নিদ্রিত লােকটির গায়ের কাপড়খানা সরাইয়া ফেলিল ; এবং সরাইয়া ফেলিয়াই একটা অস্ফুট চীৎকার করিয়া সে কিয়দ্দর সরিয়া গেল- দেখা গেল, চাদরের নীচে লোকটির সমস্ত দেহ বুকের তাজা রক্তে লাল হইয়া আছে! বুকের উপর প্রকাণ্ড ক্ষতের মুখ হইতে তখনাে অল্পঅল্প জমাট রক্ত বাহির হইতেছে ; বুকের ঠিক উপরেই ছুরি বসাইয়া তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে ! তরুণের কণকিত দেহ সে-দৃশ্য দেখিয়া বার বার শিহরিয়া উঠিল। মুহূৰ্ত্ত কয়েক সে নিৰ্বাক্ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর সহসা মাথার উপর কিসের শব্দে চকিত হইয়া মুখ তুলিয়া বুঝিতে পারিল, কে বা কাহারা যেন তাহার মাথার উপরকার দ্বিতলের ঘরে দাঁড়াইয়া পাঠুকিতেছে ; সঙ্গে সঙ্গে ক্রুদ্ধ ও চাপা কণ্ঠস্বর কাণে অসিল ।

রেশমী বাস তরুণ আশ্চৰ্য্য হইল, -কৌতূহলী হইল। ব্যাপারটা তাহাকে ভালো করিয়া বুঝিতে হইবে। সে ধীরে ধীরে ঘর হইতে বাহির হইয়া দ্বার ভেজাইয়া দিয়া অতি সন্তর্পণে সিড়ি বাহিয়া দ্বিতলে উঠিতে লাগিল। বাঁ দিকের চুলগুলি নিস্তব্ধ ও অন্ধকার। তাহাদের অধিবাসিবৃন্দ এতক্ষণে হয়ত গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত। তরুণ উপরে উঠিয়া যে-ঘর হইতে চাপা কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিতেছিল, সেই ঘরের দিকে অগ্রসর হইল। উত্তেজনায় তাহার বুক কাপিতেছিল। দ্বার বন্ধ। ভিতরে একাধিক লোক কি-একটা বিষয় লইয়া চাপাস্বরে তর্ক করিতেছে। দ্বারের অল্প ফাক দিয়া আলাের রেখা বাহির হইয়া আসিতেছে। তরুণ নিঃশব্দ-পদসঞ্চারে দ্বারের পাশে গিয়া দাঁড়াইল। তারপর, কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিয়া দাড়াইয়া থাকিয়া সাহসে ভর করিয়া আঙুলের আগা দিয়া দরজাটি ঠেলিয়া ঈষৎ ফাক করিয়া ভিতরে দৃষ্টিপাত করিল। প্রশস্ত ঘর। একপাশে লৌহ পালঙ্কে বিস্তৃত শয্যা ; অপর পাশে একটি মেহগনির অলিমারী। ঘরের মধ্যস্থলে একটি গােলা- কার টেবিলের উপর একটি নীল-ঢাকা-লাগানাে রীডিং ল্যাম্প অলিতেছে এবং তাহারই দুই ধারে বসিয়া দুইজন লোক। তরুণ দাঁড়াইয়া দাড়াইয়া একদৃষ্টে তাহাদের নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। দ্বারের দিকে পিছন করিয়া যে লোকটি বসিয়াছিল তাহার বয়স বােধ করি পঞ্চাশের উপর। মাথার উপর প্রকাণ্ড টাকৈর পাশে সমস্ত চুলগুলিই পাকিয়া গিয়াছে। বয়স অধিক হইলেও লােকটি বেশ বলিষ্ঠ ও হৃষ্টপুষ্ট। অপর ব্যক্তি মধ্য বয়সী ; শীর্ণ শুষ্ক চৈহারা, মুখের উপর চিন্তার কালাে ছায়া ! ch •

রেশমী ঈস
১৮
;
সহসা তাহাদের মধ্যস্থলে টেবিলের উপর আলাের নীচে
তরুণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইল। সবিস্ময়ে সে দেখিল, একটি ছােট
পুটলির ভিতর হইতে একটা তীব্র জ্যোতি বাহির হইতেছে ;
সে অপলক নয়নে সেই দিকে চাহিয়া রহিল।
লোক দুইটী এতক্ষণ অতিশয় নিম্নকণ্ঠে কথা বলিতেছিল ;
এইবার টক-ওয়ালা লোকটি অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে বলিল—না,
"তার বেশী নয় ; দুটো কি বড় জোর তিনটে মুক্তো এই থেকে
খুলে দিচ্ছি—নিয়ে বিদেয় হও ! আর, মুক্তো না নাও, নগদ
দু-হাজার টাকা—তার একটি পয়সা বেশী নয়।
শীর্ণ লোকটি উত্তেজিত ভাবে কহিল—আমি এত কষ্ট করে
এত পাপ করে জিনিষটা উপার্জন করলুম, আপনি কোন্
অধিকারে তার ভাগ চাইচেন ?
টাক কহিল—ধীরে, বাপু ধীরে! জিজ্ঞাসা করি, তুমি কোন
অধিকারে ও জিনিষটা আর-একজনের কাছ থেকে নিয়েছিলে ?
শুধু তাই নয়, তাকে শেষ অবধি হত্যা করেছে ! নরহত্যা;
তার ফল কি জানো-ফাসী !! এই মুহূর্তে যদি পুলিস ডেকে
তােমায় ধরিয়ে দিই, তাহলে কি হয় বুঝেছো? মুক্তো তো
যাবেই, উপরন্তু প্রেমের ফাস গলায় পরতে হবে। আর তাতে
আমার লাভ বৈ লােকসান নেই, বুঝেছ ? বামাল-শুদ্ধ তােমায়
ধরিয়ে দিতে পারলে—রাজা আর মহারাণীর কাছ থেকে প্রচুর
পুরস্কার পাবাে। এখন বুঝছে—কোন অধিকারে এই জিনিষের
দাবী করছি আমি? এতকাল মুন্সেফী করে এলুম, অধিকার
অনধিকারের কথাগুলাে জানি বৈকি !!
তরুণের চোখের সম্মুখে সমস্ত ব্যাপায় এক নিমেষে পরিষ্কার

রেশমী ফাস
হইয়া গেল। অদৃষ্টক্রমে সে যে চুরির তদন্ত করিতে আসিয়া
একেবারে সাক্ষাৎ অপহরণকারীদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে,
তাহা মনে করিয়া উত্তেজনায় চঞ্চল হইয়া উঠিল ।
সে বুঝিতে পারিল, নীচেকার হত লােকটিই আসল চোর ;
তাহাকে হত্যা করিয়া ওই শীর্ণ লোকটি মুক্তাহারটি সংগ্রহ
করিয়াছে, এখন আবার বৃদ্ধ মুন্সেফটী তাহা হস্তগত করিতে চায়।
শীর্ণ লােকটি বলিল—বেশ, তাহলে আধা আধি ভাগ করে
6
নিন !
টাক কহিল—না, পরের রক্তে যদি হাত দিতেই হয়, তাহলে
আধাআধি নয় ; কিছু টাকা তােমায় দিচ্ছি তাই নিয়ে সরে
পড়। আর বাপু তুমি যে অর্ধেক চাইছে তােমার দৌড় তত
জানি, ওগুলো নিয়ে তুমি ক’রবে কি, বেচবে কোথায় ? যে
জহুরীর কাছে যাবে সেই পুলিশ ডেকে তােমায় ধরিয়ে দেবে।
সহসা তরুণের যেন মনে হইল, লােকদুটীর পিছনে দরজার
উপর যে ভারী পর্দাখানা ঝুলিতেছিল, সেখানা নড়িয়া দুলিয়া
উঠিল
। সে চকিত হইয়া
সেই দিকে চাহিয়া রহিল কিন্তু কিছুই
দেখিতে পাইল না। লােকদুইটী নিজেদের কথায় মগ্ন ছিল, এই
সামান্য ব্যাপার তাহাদের নজরে পড়িল না।
শীর্ণ লােকটি উত্তেজিতভাবে কহিল-বেচা-না-বেচা আমার
ইচ্ছে ? সে কথা যাক, যে মুক্তোগুলাের জন্যে একটা খুন পৰ্য্যন্ত
করলুম, সেগুলাে অত অল্পে আমি দেবাে না। দশটা মুক্তো আর
পঞ্চাশহাজার টাকা—এই আমার শেষ কথা।
টাক কহিল—আমি যা বলেছি, সেই আমার শেষ কথা, তার
চেয়ে এক-পয়সাও বেশী নয়।
}

রেশমী কাস ! শীর্ণ লােকটি সহসা সোজা হইয়া বসিয়া কহিল—যার জন্যে একটা খুন করেছি, দরকার হলে তার জন্যে আর একটা করতেও কুণ্ঠিত নই ! এই বলিয়া চক্ষুর নিমেষে বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে একখানা ছােরা বাহির করিল । ঘরের মধ্যে অপার্থিব নিস্তব্ধতা! বাহিরে সীমাহীন অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে দাড়াইয়া ভয়-চকিত নেত্রে তরুণ দেখিল, ঘয়ের আলাের রশ্মি শীর্ণ লােকটির হস্তষ্কৃত ছোরাখানির উপর পড়িয়া প্রতিফলিত হইতেছে। আর একটা নরহত্যা সংঘটিত হইল বলিয়া। কিন্তু মুন্সেফ বাবুও কম নহেন ;-বৃথাই তিনি এতদিন সরকারের অন্ন গ্রহণ করেন নাই। ছুরি বাহির হইবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনিও তাহার পকেট হইতে ছােট একটি পিস্তল বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং তাহা শীর্ণ লোকটির দিকে উদ্যত করিয়া কহিলেন—আস্তে, বাপু আস্তে ! আমাকে কি তুমি এমনই বােকা ঠাওরালে যে প্রস্তুত না হয়েই আমি তােমার সঙ্গে লেন- দেন করতে এসেছি ! এখন ছুরি গুটিয়ে নাও, তা না হলে আবার কি হতে কি হবে— শীর্ণ লোকটির হাত হইতে ছুরি খসিয়া পড়িল ; দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া সে তাহার সম্মুখের শক্তিমান প্রৌঢ়ের দিকে চাহিয়া রহিল। টাক হাসিয়া কহিল—বেশ, যখন এত কষ্ট করেছে। তখন হয় সবশুদ্ধ আরও কিছু বাড়িয়ে দিচ্ছি। নিয়ে এই মুহূর্তে স’রে পড়। মড়াটার ব্যবস্থা আমিই সহসা কথা বন্ধ হইয়া গেল। সবিস্ময়ে তরুণ দেখি, }

No text on this page.

Nipho'sht 325 রেশমী ফাস ; টাকের চক্ষু কপালে উঠিয়াছে ; জিব বাহির হইয়া পড়িতেছে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় তাহার মুখ বিকৃত হইয়া উঠিয়াছে। ওধারে চাহিয়া দেখিল-শীর্ণ লােকটিরও একই দশ!! তরুণ বিহ্বল হইয়া গেল-সহসা তাহারা এমন অস্বাভাবিক অবস্থায় উপনীত হইল কেমন করিয়া ? লক্ষ্য করিয়া এধার ওধার চাহিয়া সে দেখিল পিছনের পর্দার ভিতর হইতে দুইটী সূক্ষ্ম রেশমের ফাস বাহির হইয়া আসিয়া তাহাদের কণ্ঠ. জড়াইয়াছে— এই অত্যাশ্চর্য লোমহর্ষণ ব্যাপারে তরুণের হাত-পা মুহূর্তের জন্য যেন অসাড় নিস্পন্দ হইয়া গেল। রেশমের ফাস দেখিয়া তাহার মনে বিদ্যুৎ চমকের মতাে একটা কথা জাগিয়া উঠিল। সে জানিত পৃথিবীতে একমাত্র চীনা-দস্য ছাড়া ঐরূপ রেশমের *সি আর কেহই ব্যবহার করে না। তবে কি- তরুণ পকেটে হাত দিয়া তাহার পিস্তল বাহির করিতে যাইবে, দেখিল পকেট শূন্য, পিস্তল নাই। ঠিক সেই সময় তাহার পিছনে ঘাড়ের উপর কে যেন হস্ত স্থাপন করিল। তড়িৎবেগে ফিরিয়া দাড়াইতেই তরুণের সমস্ত দেহ শিহরিয়া উঠিল। সে দেখিল একটা বেঁটে চীনাম্যান তাহার ললাটের উপর পিস্তল উদ্যত করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। লােকটার মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া মুহূর্তে তরুণ চিনিল—তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া আছে, রকৰ্ম্মা, নিষ্ঠুর নরঘাতক চীন দস্যু-দলপতি-চাংলী !! ।

৪
;
তখন শেষ রাত্রি।
মিঃ ডেভেনাম তঁাহার খাস কামরায় একাকী বসিয়া কাজ
করিতেছেন। ঘরের বাহিরে একজন ইন্সপেক্টার তঁাহার অদেশের
অপেক্ষা করিতেছে।
মিঃ ডেভেহাম গভীর চিন্তামগ্ন। এক একবার খানিকটা
লিখিতেছেন, বাকী সময় কিসের দুরূহ চিন্তায় অন্যমনস্ক হইয়া
পড়িতেছেন। এমনি করিয়া ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়া যাইতেছে।
টেবিলের ওধার হইতে কি একটা প্রয়োজনীয় বস্তু লইতে
গিয়া তিনি সহসা চকিত হইয়া উঠিলেন; তাহার সম্মুখে একখানি
চিঠি পড়িয়া রহিয়াছে উপরে তাহারই নাম লেখা! কী আশ্চর্য্য।
এ চিঠি তাে তিনি আগে দেখেন নাই! কে দিয়া গেল ?
ঘণ্টা বাজাইতেই একজন সার্জেন্ট ঘরে প্রবেশ করিল।
ডেভেনহ্যাম সাহেব চিঠিখানি তাহাকে দেখাইয়া প্রশ্ন করিলেন—
এ চিঠিখানি কে দিয়ে গেল ?
সার্জেন্ট বিস্মিত-নেত্রে লেফাফার দিকে চাহিয়া সসম্ভ্রমে
জানাইল—সে কিছুই জানে না।
মানে ? এর মধ্যে কে ঢুকেছিল আমার ঘরে?
কেউ না। আমি সমস্তক্ষণ পাহারায় আছি।
তাহলে চিঠিখানি কি উড়ে এলো ?
সার্জেন্ট পুঙ্গবের লাল মুখ অধিকতর লাল হইয়া উঠিল ; সে
নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল।

রেশমী ফাস সাহেব কহিলেন—ইন্সপেক্টার লাহিড়ী বাইরে অপেক্ষা করছে। ডাকো তাকে। লাহিড়ী আসিলে সাহেব তাহাকেও প্রশ্ন করিলেন; কিন্তু সে-ও কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিল না, তবে এ কথা নিঃসংশয়ে জানাইল যে ইহার মধ্যে কেহই সাহেবের ঘরে প্রবেশ করে নাই। সাহেব তখন বিরক্ত হইয়া খাম ছিড়িয়া চিঠি বাহির করিলেন এবং পত্র শেষে লেখকের নাম খুজিতে লাগিলেন। মুহূর্ত মধ্যেই তাহার ভাবান্তর ঘটিল। বিরক্তি উত্তেজনায় পরিণত হইল। তিনি রুদ্ধ-নিঃশ্বাসে চিঠি পড়িতে লাগিলেন। চিঠিতে বিশুদ্ধ ইংরাজীতে লেখা ছিল- বাপু হে! যমের বাড়ী যাইবার জন্য এত সখ হইয়াছে কেন? চীন হইতে ভারতে আসিয়াছিলাম, কিছুদিন শান্তিতে দিনপাত করিব বলিয়া। কিন্তু তােমরা কেন শুধু শুধু আমার পিছনে লাগিলে ? ভালাে কাজ কর নাই। এখন তাহার ফল ভােগ কর। যাহাদের হাতে আমার তদন্তের ভার দিয়াছি, বলিয়া দিতেছি, তাহাদের একজনকেও জীবিত রাখিব না। আমার ক্ষমতা আছে কিনা তাহার প্রমাণ চাও। বেশ, জানিয়া রাখােতােমাদের পুলিসের বড় সাহেবকে আজ রাত্রেই নরকে পাঠাইব। সাধ্য থাকে তাহাকে রক্ষা করিও। আর একটি খবর যে গােয়েন্দাটিকে মুক্তার মালার খোঁজে পাঠাইয়াছিলে, সে ঠিক জায়গাতেই গিয়াছিল; কিন্তু সুখের বিষয়—উপস্থিত সে এবং মুক্তার মালা দুই-ই আমার হাতে পড়িয়াছে। মহারাণীকে বলিও তাহার নির্বুদ্ধিতায় তিনটী লােক খুন হইয়াছে ; কাল দিই।

রেশমী যাস
२8
জানিতে পারিবে। সুতরাং মুক্তামালায় আর তাহার কোন
অধিকার নাই। তাহা এখন আমার। সাবধান ! আমার
সমস্ত অনুসন্ধান একেবারে পরিত্যাগ করিবে। নচেৎ তোমারও
রক্ষা নাই। শুভরাত্রি।–চাংলী ।
মিঃ ডেভেনহ্যাম-এর হাত হইতে চিঠি খসিয়া পড়িল ।
অসহ ক্রোধে তাহার সমস্ত মুখ লাল হইয়া উঠিয়াছে! তরুণ,
তাহার পুত্রেপিম তরুণ—সে দস্যুর কবলে ! তাহার আজ্ঞাবহ
কর্মচারীদের জীবন সঙ্কটাপন্ন। ইহার প্রতিকার চাই।
তিনি লাহিড়ীর দিকে ফিরিয়া তাহাকে কহিলেন—লাহিড়ী,
তোমায় এখুনি একটা কাজ করতে হবে। কয়েকজন সার্জেন্ট
আর সিপাহী নিয়ে এখনি তুমি ইন্সপেক্টর মুখার্জি বােস আর
দত্ত—এই তিনজনের সাহায্যের জন্য যাও। তাদের দেখতে
পেলেই তাদের সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবে। পরে অন্য কাজ
করবার অর্ডার দেব—যাও।
আদেশ-পত্র লইয়া লাহিড়ী প্রস্থান করিল। ডেভেনহ্যাম
সাহেব তখন অন্য একজন সার্জেন্টকে ডাকিয়া বলিলেন--
ম্যাকফারসন, তুমি এখুনি আরও পাঁচজন সার্জেন্ট আর বাবাে-
জন পাহারালা নিয়ে বড় সাহেব সার হাব্বাটের বাড়ী যাও।
আজ বাকী রাত কাল সারা দিন সারা রাত সার হাব্বাটের বাড়ী
পাহারা দেবে। এমনভাবে পাহারা দেবে যেন একটি মাছিও
তার বাড়ীর ভিতর ঢুকতে না পারে—যাও।
সার্জেন্ট চলিয়া গেল, ডেভেনহাম সাহেব একাকী ঘরের মধ্যে
পদচারণা করিতে লাগিলেন। পুলিস আপিসে তখন সাড়া
পড়িয়া গিয়াছে। কী যে ব্যাপার তাহা কেহই বুঝিতেছে না,

রেশমী ফাস
শুধু অনির্দিষ্ট আশঙ্কায় সকলেই উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছে।
ডেনেহম সাহেবের এরূপ বিচলিত ভাব কেহ কখনো দেখে ।
নাই। সুতরাং ব্যাপার যে সহজ-সাধারণ নয় তাহা সকলেই
মনে প্রাণে অনুভব করিতেছে।
সহসা কি মনে হইতে ডেভেহাম সাহেব টেলিফোন যন্ত্রট।
তুলিয়া লইলেন, তারপর নিম্নকণ্ঠে পুলিসের বড়-সাহেব
সার হাব্বাটের বাড়ীর নম্বর চাহিলেন।
মিনিট দুয়েক পরেই উত্তর আসিল, ফোন ধরিয়াছেন,
সার হার্বাট স্বয়ং! তখন ডেভেহাম সাহেব ধীরে ধীরে সকল
কথা তাহাকে খুলিয়া বলিলেন। সার হাব্বাটের বিস্ময় ও
ক্রোধের আর অন্ত রহিল না; বলিলেন-বটে ! ব্যাপার এতদূর
এগিয়েছে ! সহজে ওদের ছাড়া হবে না। হলদে পোকাগুলোকে
ভালরকম শিক্ষা দিতে হবে।
ডেনেহাম সাহেব বলিলেন–চাংলী আমাকে যে চিঠি
লিখেছে তাতে সে আপনাকেও হত্যা করবে, এমনি ভয় দেখিয়েছে।
আমি কয়েকজন লােক পাঠিয়েছি, আপনার বাড়ী পাহারা দেবার
জন্যে। তারা এখান থেকে রওনা হয়েছে।
স। ২ টি হাসিয়া উত্তর দিলেন—বটে ! ব্যাটার স্পর্ধা
তো কম নয় ! আমাকেও যাক্, লােক পাঠিয়েছে তার
জন্যে ধন্যবাদ ! কিন্তু তার দরকার ছিল না; আমার যা
বন্দোবস্ত আছে, তাতেই আমি যথেষ্ট নিরাপদ। কারও সাধ্য
নেই—
সহসা কথা বন্ধ হইয়া গেল। মিঃ ডেভেনহ্যাম বিস্মিত হইয়া,
বারবার “হ্যাল্লো, হ্যালো” করিতে লাগিলেন ; কিন্তু কোন উত্তর

রেশমী যাস আসিল না, শুধু ঠক্ করিয়া একটা শব্দের দ্বারা বোঝা গেল, সার হাটের রিসিভারটা টেবিলের উপর পড়িয়া গেল। এক মিনিট । তারপরেই তারের অপর প্রান্ত হইতে শব্দ অসিল-হাল্লো ! ডেতেনহাম সাহেব বলিলেন—ইয়েস!' সার হার্বাট ? উত্তর হইল—সুপ্রভাত মিঃ ডেভেনহ্যাম ! চাংণী তার কথার খেলাপ করে না জানবেন। সার হার্বাট এতক্ষণ পর- লোকের পথে !! সার হাব্বাটের বাড়ী পাহারা দিবার জন্য সার্জেন্ট, ম্যাক- ফারসনের উপর শেষ পর্যন্ত ডেহোম সাহেব আস্থা স্থাপন করিতে পারিলেন না। তাহার বুদ্ধি ও কাৰ্যতৎপরতা সম্বন্ধে তঁাহার সন্দেহ ছিল। সুতরাং তাহাকে অন্য কাজে নিয়ােজিত করিয়া ডেভেনহ্যাম সাহেব অন্য একজন বাঙালী ইন্সপেক্টরকে প্রেরণ করিলেন। ইন্সপেক্টর অখিল সিনা কয়েকজন সিপাহী সঙ্গে লইয়া যখন সার হাব্বাটের বাড়ী পাহারা দিবার জন্য পস্থিত হইল, তখন সমস্ত কলিকাতা সহর নিস্তব্ধ। র!স্তায় লোক-চলাচলের স্রোত বন্ধ হইয়া গিয়াছে—শুধু চৌরঙ্গীর উপর দিয়া থাকিয়া থাকিয়া দুই একখানা মােটর গাড়ী বিদ্যুদ্বেগে ছুটিয়া যাইতেছে । সার হাব্বাটের বাড়ী যে রাস্তায় তাহা অন্য গলি অপেক্ষা নির্জন। সেই নির্জন পথের উপর সিপাহীদের জুতার শব্দ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল।

রেশমী ফাস २१ বাড়ীর নিকটে গিয়া দেখা গেল—গেট বন্ধ। সমস্ত বাড়ী অন্ধকার ; শুধু ত্রিতলের একটি ঘরের পরদা ভেদ করিয়া আলোর রশ্মি বাহির হইতেছে। বুঝা গেল, উহা সার হাটের শয়ন-- কক্ষ এবং তিনি এখনাে জাগিয়া আছেন। ইন্সপেক্টার সিপাহীদিগকে বাড়ীর চারিপাশে সাজাইতে লাগিল। দুই জনকে বাড়ীর পশ্চিমদিকে দেওয়ালের কোণে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া অপেক্ষা করিতে আদেশ করিল ; তার- পর আর দুইজনকে লইয়া উত্তর দিকের সরু গলিটার মধ্যে দাড় করাইল। একজন সিপাহী রাস্তার মােড়ে গিয়া দাড়াইল, অন্য একজন সার হাব্বাটের বাড়ীর উল্টা দিকের দোকান ঘরের রকের উপর বসিয়া সম্মুখের বাড়ীর প্রতি লক্ষ্য রাখিল। প্রত্যেকেই সশস্ত্র ; প্রত্যেকেই অসন্ন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ! তাহাদের উপর হুকুম হইল—রাস্তা দিয়া যে লোক যাইবে তাহাকে আটক করিয়া তাহার কাপড় জাম। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান করিবে এবং চীনা হইলে তাহাকে তৎক্ষণাৎ থানায় প্রেরণ করিবে। কাজে লাগিতে পারে ভাবিয়া ইন্সপেক্টর মোড়ের মাথায় একখানা ট্যাক্সীও দাঁড় করাইয়া রাখিয়াছিল। বাড়ী ঘেরাও করা শেষ হইলে ইন্সপেক্টর ১ার হাটের সহিত একবার দেখা করিতে মনস্থ করিল। বাড়ীর বন্ধ দ্বারের উপর দাড়াইয়া কলিং-বেল-এর উপর হাত রাখিতেই ভিতরে লোক-চলাচলের শব্দ এবং সঙ্গে, 'ঙ্গে দরজা খুলিয়া গেল। পথের স্বল্প আলোয় দেখা গেল একজন সশস্ত্র সার্জেন্ট পিস্তল উদ্যত করিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান ! ইন্সপেক্টার অল্প একটু বিস্মিত হইল। সার হার্বাট নিজেও

রেশমী ফাস
২৮
আয়োজন বড় কম করিয়া রাখেন নাই। মৃদু হাসিয়া ইন্সপেক্টর
সার্জেন্টকে কহিল—বন্ধু ! তোমার পিস্তলটা নামাও !
ইন্সপেক্টরকে ভাল রূপে নিরীক্ষণ করিয়া সার্জেন্ট তাহাকে
নিজেদের লোক বলিয়া চিনিতে পারিল ; কহিল—এত রাত্রে ।
কি প্রয়োজন ?
ইন্সপেক্টর মৃদু হাসিয়া জবাব দিল—কদিন ধরে তোমাৰ
দেখা না পেয়ে বড় মনকেমন কছিল, সার্জেন্ট । তাই রাত্রে
তোমার সঙ্গে আলাপ করতে
এসেছি।
গম্ভীরমুখে সার্জেন্ট কহিল-তোমার রসিকতার সময় এ নয়,
ইন্সপেক্টার। গুরুতর বিপদের আশঙ্কায় আমরা সবাই সশঙ্কিত
হয়ে আছি।
ত। তাে দেখতেই পাচ্ছি। তোমার মতো আর কজন আছে ?
তিন জন।
ভালাে। আমি এখন একবার সার হাব্বাটের সঙ্গে দেখা
করতে চাই। তার কি হবে বল দেখি ?
এখন! অসম্ভব। সার হার্বাট এখন তাঁর শােবার ঘরে
ব’সে রিপোর্ট লিখছেন। এখন সে-ঘরে অন্যের প্রবেশ নিষেধ
ডিকি তার ঘরের বাইরে পাহারা দিচ্ছে—সে পর্যন্ত এখন ঘরে
ঢুকতে পারবে না।
কিন্তু আমায় যে একবার পারতেই হবে। মিঃ ডেভেনামের
হুকুম ।
তা এ-বিষয়ে আমি তােমায় কোন সাহায্য করতে পারবাে
। তুমি নিজের দায়িত্বে ঘরে প্রবেশ করতে পারাে।
ইন্সপেক্টার হাসিয়া কহিল—কাজেই !.
t

রেশমী ঈস
আর কালবিলম্ব না করিয়া উপরে গেল।
সার হাব্বাটের ঘরের বাহিরে ডিকি দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া
ঘুমাইতেছে। তাহার এইরূপে ঘুমাইতে পারার অত্যাশ্চর্য
ক্ষমতা সতীর্থ মহলে অবিদিত ছিল না; ইহা লইয়া বন্ধুরা
রসিকতা করিয়া আহকে ঘোড়ার সহিত সমশ্রেণীভুক্ত করিয়া
তাহাকে মাঝে মাঝে রাগাইয়া আনন্দ উপভােগ করিত।
ইন্সপেক্টার সোজা গিয়া ডিকির উদরে বুড়াে আঙুলের
ধাক্কা দিতেই সে চকিত হইয়া একটানে তাহার বেল্টের মধ্য
হইতে পিস্তল বাহির করিল।
ইন্সপেক্টর হাসিয়া বলিল—থাক্ ! আর কষ্ট করে দরকার
নেই। পিস্তলটা যথাস্থানে রেখে দাও!
ডিকি দুই চোখ মেলিয়া চাপা কণ্ঠে বলিল—না, রাখবে না।
তুমি ঠিক করে বলো—তুমি কি আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু ইন্সপেক্টার
সিনা, অথবা কোন ছদ্মবেশী চীনা, কিংবা কোন অশরীরী
অষ্ম। আমায় ভয় দেখাতে নেমে এসেছে !
ভয়ে উত্তেজনায় ডিকির হাত কাপিতেছিল ।
চীনা নই ভাই,—আমি সত্যই সিনা। পিস্তলটা রাখাে বন্ধু
তা না হলে কি শেষে তােমার হাতেই প্রাণটা খােয়াবাে ।
এইবার ডিকির বিশ্বাস হইল। এ ইন্সপেক্টর*সিনাই
বটে ! ওরূপ রসিকতা করিয়া কথা বলিবার ভঙ্গী আর কাহারাে
নাই! কহিল—তুমি ! তুমি এখানে কেমন করে এলে?
যেমন করে মানুষে আসতে পারে, তেমনি করে। যা !
শোন, আমি একবার সার হার্বাটের সঙ্গে দেখা করব।
খবর দাও।

রেশমী মাস
মাই গড,। আমি পারবো না। কড়া হুকুম—আদেশ না
পেলে, বিরক্ত করবে না। আমি পারবাে না, দাদা! সাহস
থাকে, তুমি ভিতরে প্রবেশ কর !
ইন্সপেক্টার মনে মনে ইতস্তত করিতে লাগিল। কি জানি,
শেষে কি কমিশনারের বিরক্তি উৎপাদন করিয়া সে তাহার
অপ্রীতিভাজন হইবে ! কিন্তু না; ডেভেনহ্যাম সাহেবের হুকুম
তাহাকে অমান্য করিলে চলিবে না। দেখা তাহাকে
করিতেই হইবে।
দরজার বাহিরে দাঁড়াইয়া ইন্সপেক্টার সিনা কহিল—ভিতরে
অসতে পারি কি ?
ভিতরে কোন শব্দ নাই।
ইন্সপেক্টার আবার অপেক্ষাকৃত উচ্চ কণ্ঠে কহিল—ভিতরে
আসবাে ?
উত্তর নাই।
ইন্সপেক্টার শঙ্কিত হইয়া দ্বার ঈষৎ খুলিয়া মুখ বাড়াইয়া
কহিল—আমি ডেভেহাম সাহেবের কাছ থেকে আসছি
পরক্ষণেই যে দৃশ্য তাহার চোখে পড়িল তাহা দেখিয়া তাহার
কথা শেষ হইল না ; বিস্ময়ে অস্ফুট চীৎকার করিয়া সে ছুটিয়া
সার হাটের নিকটে উপস্থিত হইল !
তাহার দেহ এলাইয়া পড়িয়াছে ! দুই চোখ যেন ঠিকরাইয়া
বাহির হইবার উপক্রম করিতেছে। টেবিলের পাশে বসিয়া
হয় ত লিখিতেছিলেন—কলমটি তখনাে তাহার দুই আঙ্গুলের
মধ্যে ধরা রহিয়াছে।
ইন্সপেক্টর সবিস্ময়ে দেখিল—তাহ'র কণ্ঠদেশ বেষ্টন
;

রেশমী কাস করিয়া একটি সরু রেশমী সূতা ঝুলিতেছে! সে তাড়াতাড়ি সেই ফাসটি কাটিয়া দিল ! ডিকি! ইয়েস! বলিয়া একলাফে ডিকি ঘরের মধ্যে অসিয়াই বজ্রাহতের মতো, নিস্পন্দ হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। মুখ দিয়া কোন কথা সরিল না। এসস; আমাকে সাহায্য করে। দুজনে ধরাধরি করে একে এই ইজিচেয়ারটায় শুইয়ে দিই। ডিকি কহিল—কি কোরে এ-রকম হ’ল ? আমার চেয়ে তােমারই বেশী জানা উচিত। ইন্সপেক্টার সিন। টেলিফোনের যন্ত্রটা তুলিয়া লইল— হ্যাল্লো ! মিস ! রিজেন্ট! ইয়েস! হ্যাল্লো! মিষ্টার ডেভেনহ্যাম-এর সঙ্গে কথা কইব ! নেই তিনি ? এই মাত্র বেরুলেন ? কোথায় বেরুলেন, জানেন। । অলরাই ! ভয়ে ভয়ে ডিকি কহিল—সাহেব কি মারা গেছেন ? । এখনো মারা যান নি বটে। কিন্তু বাচবেন কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই বলিয়া টেলিফোন বই হইতে আর একটি নম্বর খুঁজিয়া লইয়া ইন্সপেক্টার পুনরায় টেলিফোন যন্ত্র তুলিয়া লইয়া আর একটা নম্বর চাহিল- হাল্লো ! ডক্টর গ্রীন ? আমি সার হাব্বাটের বাড়ী থেকে কথা বলছি। সার হার্বাট ? হা পুলিস কমিশনার-হঠাৎ অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়েছেন ! হ্যা; সাঙ্ঘাতিক! একবার আসুন! ধন্যবাদ ।

রেশমী ফাস
=
টেলিফোন করিয়া ডিকিকে সার হাব্বাটের উপর নজর
রাখিতে বলিয়া ইন্সপেক্টর বাহির হইয়া গিয়া নীচেকার সার্জেন্ট
ও দুইজন জমাদারকে সংক্ষেপে ঘটনার কথা বলিয়া তাহাদিগকে
উপরে পাঠাইয়া দিল এবং নিজে পথে বাহির হইয়া আসিল।
তাহাকে দেখিয়াই অপর দিক হইতে একজন জমাদার
ছুটিয়া আসিল। ইন্সপেক্টার কহিল—খবর কি, রামলগন ?
দোনো ডাকু পাকাড় গিয়া হাজুর !
দোনে। ডাকু ! চীন লোক ?
হাজুর !
উ-লোক কিধার হয় ?
ইন্সপেক্টরের প্রশ্ন শুনিয়া জমাদার অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া
হাঁক দিল—জুড়িদার হাে!
অন্ধকারে অন্য প্রান্ত হইতে অনুরূপ উত্তর আসিল এবং
চারজন সিপাহী-কর্তৃক ধৃত জন দুই ‘ডাকু’কে লইয়া অন্য এক
জমাদার অগ্রসর হইয়া আসিয়া ইন্সপেক্টরকে দীর্ঘ সেলাম
করিয়া দাড়াই।
বিস্মিত ইন্সপেক্টর ধৃত লোক দুইটীর পানে তাকাইয়া
দেখিল—তাহারা দুইজন মুসলমান খানসামা ; যে সাহেবের বাড়ী
কাজ করে, সেই সাহেবের নামের আদ্যক্ষর তাহাদের পােশাকের
উপর মুদ্রিত রহিয়াছে ! জমাদারের কীর্তি দেখিয়া তাহার হাসি
পাই; ইচ্ছা হইল জমাদারকে ধমক দিয়া তাহার চৈতন্য সঞ্চার
করে। মুখে মনের ভাব প্রকাশ না করিয়া কম্পিত-কলেবর
খানসামা দুইটার প্রতি তাকাইয়া গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করিল—
এত রাত্রে তাহার কোথায় কি কাজে ঘুরিতেছিল ?
;

রেশমী স
খানসামা দুইজন ভীতকণ্ঠে যাহা জানাইল তাহার মর্ম
হইতেছে এই যে, তাহারা অদূরবী টমাস সাহেবের বাড়ী কাজ
করে। সাহেবের বাড়ীতে আজ খানাপিনা ছিল। অধিক
রাত্রে খানাপিনা শেস হইলে তাহারা ও খাওয়া-দাওয়া সারিয়া
তাহাদের অন্য দুই-একজন দোস্তের সঙ্গে একটু ফুর্তি করিতে
বাহির হইয়াছিল, এক্ষণে বাড়ী ফিরিবার পথে এই বিপত্তি।
তাহাদের একজনের নাম রহিম, অপরজনের নাম ইমামবক্স।
টমাস সাহেবের কাছে তাহারা দশ বছর চাকরী করিতেছে।
ইচ্ছা হইলে ধর্মাবতার টমাস-সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিতে
পারেন!
তাহাদের কথ! শেষ হইলে, ইন্সপেক্টর গম্ভীরকণ্ঠে কহিল—
এতনা রাতমে অউর কভি মৎ টু ডন ! জমাদার ! ছোড় দে ও
দোনোকো এ-দফে !
মুক্তি পাইয়া খানসামা দুইটা উৰ্দ্ধশ্বাসে অদৃশ্য হইয়া গেল।
ইন্সপেক্টর পুনরায় বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে যাইবে
এমন সময় অদূরে মোটর-গাড়ীর শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই
দেখা গেল দুইখানি মােটর বিদ্যুদেগে তাহাদের অভিমুখেই
আসিতেছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ী দুইখানি আসিয়া সার হাব্বাটের
বাড়ীর দরজায় দাঁড়াইল। প্রথম মোটরগানি হইতে ক্ষিপ্রপদে
যিনি নামিলেন, ইন্সপেক্টর তঁহাকে দেখিয়া সসম্ভ্রলে তাহার
সম্মুখে আসিয়া সেলাম করিয়া দাড়াইল !
তাহাকে দেখিয়া ডেভেনহ্যাম সাহেব বলিলেন—সিনা !
খবর কি বল ?

রেশমী ফাস
৩৪
পিছন হইতে শব্দ হইল—হ্যাল্লো, ডেভেনহাম !
হ্যাল্লো, ডক্টর ! তুমি যে ?
সার হাব্বাটের অসুখের খবর শুনে এসেছি। তুমি কিছু
জানাে না ?
জানি না। তবে এখনই জানবাে। সিনা, ব্যাপার কি ?
ইন্সপেক্টর তখন সকল ঘটনা খুলিয়া বলিল। সার হাট
যে জীবিত আছেন—তাহাও সে জানাইল ।
ডেভেনহ্যাম সাহেব উপরে উঠিতে উঠিতে বলিলেন—আধ
ঘন্টা আগে অামার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে :
গেলেন। বার বার রিং করলুম—কোন জবাব পেলুম না।
তাই, ছুটে আসছি ! ডক্টর গ্রীনকে ফোন করে তুমি খুব বুদ্ধির
কাজ করেছো, সিনা।
গ্রীন সাহেব বলিলেন—কিন্তু এ রকম আশ্চর্য ব্যাপার
কোথাও শুনিনি। প্রহরী-বেষ্টিত পুলিস-কমিশনারের ঘরে
আততায়ী নির্বিঘ্নে প্রবেশ করে তাকে আক্রমণ ও আহত
করে নিরাপদে বেরিয়ে চলে গেল—এ যে উপন্যাসের চেয়েও
আশ্চর্য ব্যাপার !!
সার হাব্বাটের ঘরে গিয়া দেখা গেল, তিনি পূৰ্ব্বাপেক্ষ।
কথঞ্চিৎ সুস্থ হইয়াছেন একজন ভৃত্য তাহাকে জল পান
করাইতেছে ! তখনাে তিনি উঠিতে পারেন নাই বটে কিন্তু
কিয়ৎকার পূর্বের তাঁহার সেই মুমূষু অবস্থা কাটিয়া গিয়াছে ।
ডাক্তার নাড়ী দেখিলেন ; বুক পরীক্ষা করিলেন; তারপর
নিজের ব্যাগ হইতে একটা উত্তেজক ঔষধ বাহির করিয়া তাহা
কমিশনারের মুখে ঢালিয়া দিলেন।
;

রেশমী কাস
ঔষধ খাইবার পনেরো মিনিটের মধ্যে সার হাট উঠিয়া
বসিলেন।
ক্রমে রাত্রি শেস হইয়া গেল। পূৰ্ব্ব গগনে ধীরে ধীরে
আলাের আভাস দেখা দিতে লাগিল। রাত্রি শেষের শীতল
বাতাস বহিয়া সিয়। ঘরের মধ্যে উত্তেজিত লোকগুলির উপর
স্নিগ্ধ পরশ বুলাইয়া দিয়া গেল।
আরও দুই একবার ঔষধ খাইবার পর সার হাট সম্পূর্ণ
সুস্থ হইয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। তারপর ক্রোধে উচ্চকণ্ঠে
চীৎকার করিয়া উঠিয়া বলিলেন—উঃ! সয়তান-বেটারা আর
একটু হলেই আমায় একেবারে শেষ করেছিল আর কি--
শুয়ােরের বাচ্চারা !
এই বলিয়া তিনি গলায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। ফাসের
দাগ তঁাহার গলা কাটিয়া বসিয়াছে । সহসা বলিয়া উঠিলেন—
এর প্রতিশােধ চাই ! হলদে পােকাগুলােকে আমি এমন শিক্ষা
দেব যা তারা জীবনে ভুলবে না !
ডেভেনহ্যাম, আজই
সহরের সমস্ত চীনা-পল্লী যেন বিধ্বস্ত করে ফেলা হয়।
সন্দেহজনক যাকে পাওয়া যাবে তাকেই যেন হাজতে এনে
পােরা হয়। পরের ব্যবস্থা আমি করব।
ডেভেনহাম সাহেব একবার বলিতে চেষ্টা করিলেন যে, সে-
কাজটা কি ভালাে হইবে? নির্বিচারে সকল চীনা-অধিবাসীর
বাড়ী তল্লাস করিলে প্রকৃত অপরাধী কি ধরা পড়িবে ?
কিন্তু কমিশনর সাহেব তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না।
যে ডেপুটি কমিশনরের এলাকার মধ্যে চীনা-পল্লীগুলি অবস্থিত
ছিল, ফোন করিয়া তাহাকে তাঁহার আদেশ জ্ঞাপন করিলেন।

রেশমী স
•
শুধু বলিয়া দিলেন—যেন কোন স্ত্রীলোকের উপর জুলুম
না হয় ।
গ্রীন সাহেব একটা কাগজে তাহার ব্যবস্থা পত্র লিখিয়া দিয়া
কহিলেন—দেখুন, সার হাট! চীনাদের অপনি ধ্বংস করুন
বা যাই করুন, আমার আপত্তি নেই। দুটী বিষয়ে আমার
আপত্তি আছে। প্রথম আজ সারাদিন আপনি বেরুতে পাবেন
; দ্বিতীয়, এই ওষুধটি খাওয়া সম্বন্ধে অাপনি অবহেলা করতে
পারবেন ন!। এখন আমি চল্লাম।
নিশ্চয়, উক্তার, নিশ্চয় ! তোমার আপত্তি আমি মানবো।
অনেক ধন্যবাদ !
কমিশনরের সহিত করমর্দন করিয়া গ্রীন সাহেব প্রস্থান
করিলেন ।
তখন সার হার্বাট আর এক দফা ক্রোধে ফাটিয়া পড়িলেন।
অপদার্থ ! সমস্ত সার্জেন্টগুলো অপদার্থ !! ডেভেনহ্যাম, যে-
কজন কাল রাত্রে আমার বাড়ী পাহারা দিচ্ছিল, তাদের
চাকরী গেল এবং এই ইন্সপেক্টর, কি নাম তােমার ? সিনা ;
উত্তম ।এই ইন্সপেক্টার সিনা আজ থেকে সহকারী-কমিশনরের
পদে উন্নীত হল। সাহসী ছোকরা! ঠিক সময়ে ও না এসে
পৌছলে, এতক্ষণ আমার জন্যে তােমাদের কবরের ব্যবস্থা করতে
হ’ত ! আচ্ছা, এখন তােমরা যেতে পারে। সিনা, তুমি
তােমর কয়েকজন বিশ্বাসী সহকারী নিয়ে আজ আমার এখানেই
থাকো ! আমার শরীর ভাল নয়—কি জানি, হয়ত আমার
ওপর আবার আক্রমণ হতে পারে।
ডেভেনহ্যাম সাহেব আর দু’একটা প্রয়োজনীয় কথার পর

রেশমী স
৩৭
বাছী পাহারা দিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া বাকী লােকজন
লইয়। প্রস্থান করিলেন।
সেদিন সহস। চীন। পাড়ায় বিসম হুলুস্থুল পড়িয়া গেল।
কথা নাই—বার্তা নাই, সহসা একদল পুলিস আসিয়া এক-একটা
চনার বাড়ীতে ঢুকিয়া সারা বাড়ী তছনছ করিয়া দিন্না কয়েকজন
চীনাকে বাধিয় লইয়| প্রস্থান করিতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে সারা পাড়ায় হৈ হৈ রব উঠিল। চীনা
স্ত্রীলোকের দল এ-বাড়ী হইতে ও-বাড়ী ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে
লাগিল। লোকগুলা প্রাণ ভয়ে পলায়ন করিতে গিয়া ধরা
পড়িতে লাগিল।
কয়েদীর গাড়ী বোঝাই ভুইয়া চীনারা দলে দলে থানায়
অসিতে লাগিল। সারা দিন ধরিয়া চীনা-পল্লীতে সে এক
মহামারী কাণ্ড চলিতে লাগিল।
চীনা-পড়ার মধ্যে ন্যানকিং রেস্তরা বলিয়া একটি হােটেল
ছিল। তাহার ম্যানেজার ধরা পড়িল ; স্বত্বাধিকারী ধরা
পড়িল ; এমন কি সেখানে বসিয়া কয়েকজন বাঙালী যুবক
পানাহার করিতেছিল তাহাদেরও চালান দেওয়া হইল।
একটা অন্ধকার বাড়ীতে পুলিস প্রবেশ করিয়া অনুসন্ধান
করিয়া দেখিতে পাইল—একটি ক্ষুদ্রাকার ঘরের ভিতর জনকয়েক
লােক,—তাহাদের মধ্যে একজন পেশােয়ারী, একজন হিন্দুস্থানী,
একজন এ-দেশী মুসলমান ও বাকী কয়জন চীনা বসিয়া টাকা
ভাগ করিতেছে। তাহাদের পিছনে কয়েকটা কাটা পেরেক
দিয়া-আঁটা কাঠের বাক্স রহিয়াছে। এরা নিশ্চয় চাংলীর দল

রেশমী ফাস
৩৮
স্থির করিয়া জীম-বেগে পুসি তাহাদের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া
তাহাদের গ্রেপ্তার করিল।
চ!ংলীর দল নাই হোক, তাহারা যে দল, তাহাও বড় সহজ
দল নহে। বহুকাল ধরিয়া পুলিসের চক্ষু এড়াইয়া সেই দলটি
বিদেশে অহিফেন ও কোকেন আমদানী রপ্তানীর গুপ্ত ব্যবসা
করিতেছিল—এতদিনে হঠাৎ ধরা পড়িয়া গেল। অনুসন্ধানের
ফলে পরে প্রকাশ পায় যে সমস্ত ভারতবর্ষ, ব্ৰহ্মদেশ, চীন, জাপান
ও আমেরিকার বহুস্থানে তাহাদের নিয়োজিত লােক আছে
বিশবৎসর ধরিয়া তাহার এই ব্যবসা চালাইয়া আসিতেছে।
এতদিন বহু চেষ্টা করিয়া ও তাহাদের সন্ধান পাওয়া যায় নাই,
কারণ পুলিসের মধ্যে তাহাদের লোক ছিল, পুলিসের গতিবিধি
সম্বন্ধে পূৰ্ব্বাহেই তাহারা সংবাদ পাইয়। সাবধান হইত। এবার
এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণের খবর তাহারা পায় নাই।
একটি চীনা অডডয় এক বড় মজার ব্যাপার ঘটিল। সার্জেন্ট
অক্সহেড বারোজন সিপাহী লইয়া সেই অভিড়ায় হানা দিয়াছিল।
অজ্ঞার ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিল—ঘরের ভিতর ন্যূনাধিক
বারোজন চীনা মেঝের উপর নিস্পন্দ হইয়া পড়িয়া আছে ।
ঘরের ভিতর বিশ্রী গন্ধযুক্ত ধোয়া কুণ্ডলী পাকাইতেছে !
সর্জেন্ট একজন সিপাহীকে উদ্দেশ করিয়া কহিল—এরা
সকলেই ডাকাত। বাধে এদের।
• লিপাহীরা অসাড়-অনড় চীনাদের লইয়া টানাটানি করিতে
লাগিল। কোন সাড়া শব্দ নাই। একজন সিপাহী ভীত মুখে
আসিয়া সার্জেন্টকে জানাইল—সাব ! ইলােক সব ম গিয়া !
মর গিয়া ?

রেশমী ফাস
হাজুর !
গােরা-পুলিস তখন নিজে অগ্রসর হইয়া আসিয়া চীনারা
সত্যই মরিয়া গিয়াছে কিনা তাহা পরীক্ষার জন্য একটা চীনার
পশ্চাৎদেশে সজোরে এক লাথি মারিল।
লাথি খাইয়া চীনার নেশা ছুটিয়া গেল। সে উঠিয়া রক্তচক্ষু
উন্মীলিত করিয়া ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া রহিল। তখন
নিদ্রিত চীনাদের ঘুম ভাঙাইবার জন্য সেই প্রক্রিয়। চলিতে
লাগিল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই গোরার বুটের প্রসাদে চীনারা
নেশা মুক্ত হইয়া চৈতন্য লাভ করিল !
তখন সার্জেন্ট অক্সহেড বজ্রগর্জনে কহিল—কে তোমরা ?
এখানে কি করছ ?
একজন চীন। হাতজোড় করিয়া ভাঙাভাঙা ইংরাজীতে কছিল
—আমরা ভগবানের শিষ্য । এখানে ভগবানের নাম করতে
করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।
ভগবানের শিষ্য ! মিথ্যা কথা !
চীনা কহিল—মিথ্যা নয়। মহামান্য চাংলী আমাদের গুরু।
আমরা মিথ্যা বলি না।
চাংলী তোমাদের গুরু ? সে কোথায় ?
চীনা সসম্ভ্রমে কহিল—তিনি ওঘরে নিদ্রা যাচ্ছেন।
রিভার বাগাইয়া ধরিয়া সার্জেন্ট পার্শ্বের কক্ষের দ্বার এক
ধাক্কায় খুলিয়া ফেলিল। দেখা গেল, ঘরের মধ্যে একজন
বৃহদাকার লম্বা চওড়া চীনা অকাতরে ঘুমাইতেছে! সার্জেন্ট
গিয়া তাহাকে ঠেলিয়া তুলিল এবং নিমেষের মধ্যে তাহার হাতে
হাতকড়া দিয়া তাহাকে বাঁধিয়া ফেলিল।

রেশমী কাস
৪ ০
তারপর অন্য চীনাদের বঁধিয়া সার্জেন্ট অহেড নিজের
কৃতিত্বে পুলকিত অন্তরে দুইখানা ট্যাক্সী ডাকিয়া তাহাতে সেই
চীনাগুলাকে তুলিয়া থানা অভিমুখে রওনা হইল।'
ডেভেহমি সাহেব তাহার অপিস কামরায় বসিয়া কাজ
করিতেছিলেন। সহসা ঘরের মধ্যে কাহার প্রবেশের শব্দ পাইয়া
মুখ তুলিয়া দেখিলেন, সার্জেট অক্সহেড স্মিতমুখে ঘরের মধ্যে
আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।
খবর কি, সার্জেন্ট ।
সেলাম করিয়া গর্বিত কণ্ঠে অক্সহেড কহিল—চালীকে
গ্রেপ্তার করা হয়েছে !!
ডেভেহাম সাহেব লাফাইয়া উঠিলেন।
বল কি ? কে ধরলে ? কোথায় ? কেমন করে ? ..
তাহার প্রশ্নের উত্তরে সার্জেন্ট সকল ঘটনা বিবৃত করিল।
শুনিয়া ডেভেনহাম সাহেব হতাশ হইয়া পড়িলেন। যে
চাংলীকে ধরিবার জন্য আজ চীন-রাজশক্তি ব্যাকুল, যাহার
অত্যাচারে সারা দেশ জর্জরিত, -সে যে চীনা পল্লীর অন্ধকার
ঘরে চণ্ডু খাইয়া ঝিমাইবার পাত্র নহে, তাহা তিনি ভালাে
করিয়াই জানিতেন। মুখে বলিলেন আচ্ছা, নিয়ে এসাে
চাংলীকে এই ঘরে।
ৱিমিযের মধ্যে সার্জেন্ট অক্সহেড চাংলীকে ঘরে লইয়া
আসিল।
তাহার দিকে বারেক দৃষ্টিপাত করিয়া ডেভেলহ্যাম সাহেব
মুখ ফিরাইলেন। টেবিলের উপর আসল চাংলীর ছবিওয়াল।
-

রেশমী বাস ৪১ কাগজ খানা তখনো পড়িয়াছিল ; তাহার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করিয়া তঁার সম্মুখে দণ্ডায়মান সেই স্থূলোদর চীনাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—তোমার পেশা কি? লোকটা আমতা আমতা করিতে লাগিল। বুঝেছি, তোমার চণুর আজ্ঞা আছে। পয়সা নিয়ে জাত ভয়েদের চণ্ডু খাওয়াও। কেমন, নয় ? লােকটা চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। তােমার নাম কি ? লোকট। এইবার কথা কহিল ; বলিল—আমার নাম, চাংলী । ডেভেনহ্যাম সাহেব হাসিয়া বলিলেন—নামটা বদলে ফেলে।। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর বিপদে পড়বে। অক্সহেড । একে ছেড়ে দাও! তরুণের বন্দীদশা ও সার হাব্বাটের মত ডেভেনহ্যাম সাহেব উত্তেজিত ও ভীত হইয়া শত্রু-নিপাতের চেষ্টায় নিমগ্ন থাকুন, আমরা ইতিমধ্যে বিখ্যাত সমুদ্রগড়ের ততোধিক বিখ্যাত। রাণীর সহিত পরিচিত হই। সমুদ্রগড়ের বর্তমান রাণী রাজার দ্বিতীয় পক্ষ। প্রথম পত্নীর মৃত্যুর পর রাজা শোকে অধীর হইয়া রাজ্য-শাসন ছাড়িয়া সাগর- পারে যাত্রা করিলেন। সেইখানে কয়েক বৎসর অতিবাহিত করিয়া, পত্নীশোক প্রশমিত হইলে দেশে ফিরিবেন, এইরূপ ইচ্ছা। কিছুদিন ভেনিসে থাকিয়া সুইজারল্যাণ্ড ঘুরিয়া রাজা প্যারীতে উপনীত হইলেন। জগতের বিলাস-কেন্দ্র প্যারী; ।

রেশমী কাস
82
পৃথিবীর সৌন্দৰ্য-সার প্যারী ; সভ্যতার আদর্শ স্থল 'প্যারী।
রাজা প্যারী দেখিয়া বিমােহিত হইলেন। তারপসেখানকার
কোন এক অভিজাত বিলাস-কুঞ্জে তথাকার বনাচের আসরে
বর্তমান রাণীকে দেখিলেন এবং তাহার সহিত পরিচিত
হইলেন। রাণী তখন অষ্টাদশী ।
শুধু রূপ ও যৌবনের
প্রাচুর্যেই নয়—নৃত্যগীত ও মনোহরণের ক্ষমতায় তিনি প্রাচীন
কালের উৰ্বশীর অভিনব সংস্করণ বলিলে ও অতিশয়ােক্তি হয় না।
মুগ্ধ হইতে রাজার অধিক সময় লাগিল না।
পরদিনই তিনি ইন্দিরা দেবীর পিতার সহিত আলাপ করিয়া
সমস্ত পরিচয় অবগত হইলেন। ইন্দিরার পিতা বিহারের
একজন বিখ্যাত রাজার নিকট-আত্মীয়। পূর্বে অবস্থা হয়ত
রাজার নিকটাত্মীয়ের অনুরূপই ছিল, এখন কিন্তু শুধু নামই সার
—ভিতর অন্তঃসারশূন্য ! পৈত্রিক বিষয়ের শেষ কপর্দকটি
পৰ্যন্ত মন্টিকালোর জুয়ার আডডা প্যারীর মদের আড্ডায়
নিঃশেষিত হইয়াছে; এখন ঋণ করিয়া দিন চলে। স্ত্রী-বিয়ােগের
পর তিনি আর বিবাহ করেন নাই; পুত্র-কন্যা লইয়া সম্প্রতি
প্যারীতে আসিয়াছেন—কী একটা গুপ্ত-ব্যবসায় ব্যপদেশে ।
পুত্রটি একে অপদার্থ তায় চিররুগ্ন ; সুতরাং তাহার দ্বারা বিশেষ
কোন-আশা নাই। এখন একমাত্র ভরসা এই রূপসী ও বিদুষী
কন্যা ইন্দিরা। মেয়েটি যদি এখানে কোন ধনবান স্বামী শিকার
করিতে পারে তবেই রক্ষা, নতুবা কপালে কি আছে তা একমাত্র
ভগবানই জানেন।
খবরবাদ লইয়া সমুদ্রগড়-অধিপতি জানিতে পারিলেন যে,
ইন্দিরীর রূপ-গুণে মুগ্ধ হইয়া প্যারীতে ‘তাহাদের অনেক বন্ধু

রেশমী কাস
৪ ৩
গেলেই সমুদয়
জুটিয়াছে। তাহারাই তাহার পিতাকে প্রায়ই অর্থসাহায্য
করে। রাজা বিচক্ষণ ব্যক্তি ; নিমেষেই বুঝিয়া লইলেন, এই
নারী-রত্নকে লাভ করিতে তাহার বিশেষ বেগ পাইতে হইবে না।
তিনি একদিন সুবিধা মতাে ইন্দিরার পিতার কাছে তাহার
আবেদন পেশ করিলেন।
ইন্দিরার পিতা কিন্তু প্রথমে সম্মত হইলেন না। তিনি
রাজাকে বুঝাইলেন, কন্যার বিবাহ হইয়া
পাওনাদারগণ তাহাকে চাপিয়া ধরিবে। অবিলম্বে তাহাদের
সে ঋণ পরিশোধ করিতে না পারিলে তাহারা তাহাকে নিষ্কৃতি
দিবে না। কন্যার বিবাহ তিনি অমুক দেশের অমুক এক মহা
ধনবান্ রাজার সহিত ঠিক করিতেছেন ; সেই রাজ-জামাতা
কন্যাকে বিবাহ করিয়া তাহার সকল ঋণ পরিশোধ করিয়া দিবে
এরূপ প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়াছে। অবশ্য সমুদ্রগড়ের রাজাও
যদি সেরূপ ব্যবস্থা করেন তাহা হইলে তাহার হাতে কন্যাকে
অৰ্পণ করিতে তাহার আপত্তি নাই।
তখন অনেক দরদস্তুর চলিল। হিসাব করিয়া দেখা গেল
ইন্দিরার পিতার ঋণ পঞ্চাশ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। রাজা
তাহাকে দেউলিয়া আদালতে নাম লিখাইতে বলিলেন এবং
অঙ্গীকার করিলেন যদি ইন্দিরাকে পত্নীরূপে লাভ করে তাহা
হইলে তাহাকে গােপনে দুই লক্ষ টাকা দিবেন। আর বাৎসরিক
পঞ্চাশ হাজার টাকার বৃত্তি ব্যবস্থা করিবেন।
অনেক কণা-মাজার পর পঞ্চাশ হাজার টাকা বৃত্তি বাহাত্তরে
উঠিল। তাহার কয়েকদিন পরেই প্যারী সহরে বিদ্ধ
হিন্দুমতে ইন্দিরা দেবীর সহিত সমুদ্রগড়ের রাজার বিবাহ

রেশমী স
সুসম্পন্ন হইল। তাহার পর সমুদ্রগড়ের রাজা কয়েকদিনের
মধ্যেই রাণীকে সঙ্গে লইয়া স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
কিন্তু এ বিবাহ সুখের হইল না। কিছুদিন পরে রাজা
আবিষ্কার করিলেন যে তিনি জীবনে একটি অসংশোধনীয়
ভুল করিয়াছেন। তঁাহার প্রিয়তমা তরুণী ভাৰ্য্যা রূপসী ও বিদুষী
বটে কিন্তু হিন্দুধর্মের পাতিত্যের আদর্শ তাহাকে এতটুকুও
স্পর্শ করে নাই।
বিলাস-ব্যসনে ব্যয় তাহার অসাধারণ। প্রমোদ-কাননের
ভােগ-বিলাসে তাহার যতটা সময় কাটে তাহার শতাংশের
একাংশ ও স্বামীর সাহচর্যে যাপিত হয় না। স্বামীর কোন
সংবাদ লওয়া বা তাহার সেবা করা তাহাও রাণী নিজ
কর্তব্য বলিয়া গণ্য করেন না। স্বামী যদি কোন অনুযােগ বা
অভিমান প্রকাশ করেন, তাহা হইলে এ-কথা স্ত্রীর বলিতে বাধে
না যে বৃদ্ধ বয়সে যুবতী-নারীকে বিবাহ করিবার পূর্বে সকল কথা
স্বামীর ভাল করিয়া ভাবিয়া দেখা উচিত ছিল।
তাহার উপর দগ্ধ ক্ষতের মুখে লবণের প্রলেপ ! প্যারী হইতে
রাণী কর্তৃক আমন্ত্রিত হইয়া তাহার দুই জন পুরুষ-বন্ধু আসিয়া
উপস্থিত হইল। তাহার! প্যারীর সামরিক বিভাগে কাজ করিত।
রাণীর নিমন্ত্রণ পাইয়া সহসা সুদূর কালা-আদমীর দেশে ছয়মাসের
ছুটি লইয়া আসিল এবং রাজপ্রাসাদে থাকিয়া রাজার খরচে
চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় উপভােগে রাণীর সহিত আমোদ-আহলাদে
দিন কাটাইতে লাগিল। রাণীর সমস্ত সময় এখন তাহাদের
সঙ্গেই অতিবাহিত হয়, রাজা একেবারেই পাত্তা পান না।
অনুবােধ, উপরােধ, অভিমান, অনুযােগ সমই বিফল হইল।

রেশমী দাস
৪ ৫
ছয় মাসের ছুটী ফুরাইলে প্যারীর বন্ধু দুটী স্বদেশে ফিরিল -
বটে কিন্তু রাজার ভাগ্য ফিরিল না। রাণী জে করিয়া কলিকাতায়
আসিলেন এবং কলা-অাদর্শীদের বর্জন করিয়া শ্বেতাঙ্গ-সমাজের
সহিত মেলামেশা করিয়া পান-ভোজন-নাচ ইত্যাদির আয়ােজন
করিয়া প্রাসাদ গুলজার করিয়া তুলিলেন।
এই সময় সহসা তাহার আর একটি নূতন অবদারে রাজা
উত্ত্যক্ত হইয়া উঠিলেন। রাণী কহিলেন—আমি মহারাণী ! আমার
বয়-পেজ (ছাে-চাকর ) চাই। যে-কেউ হলে চলবে না ;
সন্ত্রান্ত-বংশের শিক্ষিত ছেলে হওয়া চাই।
তাগাদার আর বিরাম নাই। রাজা দেখিলেন, ব্যবস্থাটা
তঁাহার কাজে লাগিতেও পারে। এই অবসরে রাণীর গতিবিধির
উপর একজন গােয়েন্দা নিযুক্ত করিতে পারা যাইবে। বহু
অনুসন্ধান করিয়া তিনি দরিদ্র অথচ জমীদারবংশীয় মণিলালকে
আবিস্কার করিলেন এবং তাহাকেই নূতন পদে বহাল করিলেন।
মণিলালের বয়স বিশ বছর—সুশ্রী ও শিক্ষিত। রাণী আপত্তি
করিলেন না বরং রাজার পছন্দ দেখিয়া তাঁহাকে তারিফ
করিলেন। রাজা মণিলালকে কার্যে নিযুক্ত করিবার পূর্বে
কিভাবে গোয়েন্দাগিরির কাজ করিতে হইবে তাহা গোপনে
তাহাকে ভাল করিয়া শিখাইয়া দিলেন।
কিন্তু কোন ফল হইল না। বরং উল্টা হইল। মণিলাল
রাণীর মোহিনী-চক্রে পড়িয়া একেবারে মঘিল। রাণী তাহাকে
নিজের ইচ্ছার দাস করিয়া লইল। সে রাণীর এরূপ বশীভূত
হইয়া পড়িল যে রাণীর উপর গোয়েন্দাগিরি করিবার ছলে
রাজার উপর গেয়েন্দাগিরি করিয়া রাণীকে সাবধান করিয়া দিত।
১

রেশমী কাস
৪৬
মণিলাল তখন রাণীর মােহে উন্মাদ ! রাণীর অঙ্গুলি হেলনে সে
তখন রাজাকে হত্যা করিতে পারিত, নিজেকে হত্যা করিতে
পারিত—এরূপ শোচনীয় হার অবস্থা ।
ইহাই রাণীর পূর্ব ইতিহাস।
মুখে
সেদিন রাণীর অপেক্ষাকৃত সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়াছিল ।
নিদ্রাভঙ্গের পর সাজ-সজ্জার উদ্যোগ হইতেছে এমন সময় সংবাদ
আসিল রাজা তাহার সহিত দেখা করিতে চান ; অধিঘণ্টার
মধ্যেই তিনি এখানে আসিবেন। রাণী যেন প্রস্তুত থাকেন।
বিরক্তিতে রাণী ইন্দিরার ভুরু যুগল কুঞ্চিত হইয়া উঠিল ।
এমন মনােহর প্রাতঃকাল, এই সময় ওই কদাকার বৃদ্ধের সঙ্গ
কল্পনা করিয়া রাণী বিরক্তি বােধ করিলেন। সাজ-সজ্জা সমাপন
করিয়া একটা ক্লান্তির ভাব আনিয়া রাণী সােফায় বসিয়া
রাজার আগমন প্রতীক্ষ করিতে লাগিলেন।
ক্ষণকাল পরেই রাণীর বিশ্রামাগারে রাজ আসিয়া প্রবেশ
করিলেন। আষাঢ়ের মেঘের মতাে গম্ভীর মুখ, চালচলন ও কথা-
বার্তায় অন্তরের উদ্বেলিত ক্রোধ যেন ফাটিয়া পড়িতেছে। ঘরে
প্রবেশ করিয়াই দাসীকে ঘর হইতে চলিয়া যাইবার ইঙ্গিত করিলেন,
দাসী প্রস্থান করিলে রাজা নিজ হাতে দ্বার বন্ধ করিলেন।
রাণী অপাঙ্গে রাজার মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া মনে মনে
শঙ্কিত হইল ; বুঝিল, আজ সত্যসত্যই রাজা রাগান্বিত হইয়াছেন।
তিনি তাহার সম্মুখে বসিতেই রাণী মুখ ফিরাইয়া লইলেন।
গম্ভীরকণ্ঠে রাজা কহিলেন—আমি তোমার সঙ্গে দু’একটা
বিষয়ে কথা কইতে চাই। অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় কথা।

রেশমী স
৪ ৭
রাণী তাহার স্বভাবসুলভ গ্রীবা ভঙ্গী করিয়া কহিলেন—অ ! ·
তোমার প্রয়োজনীয় কথা তাে অনেক শুনেছি। আবার সেই
বকুনি!!
রাজা মাথা নাড়িলেন। মুখে তঁাহার কঠিন দৃঢ়তার রেখা।
কহিলেন—হ্যা, আবার সেই বকুনি! কিন্তু এবার সে বকুনি
যাতে তুমি অগ্রাহ্য না কর, তার ব্যবস্থা আমি করব ! তােমার
ব্যবহার অামার অসহ্য হয়েছে।
রাণী গ্রীব। উত্তোলন করিয়া কহিলেন—তোমার এই তিরস্কার
শুনতে আমি মোটেই রাজী নই।
রাজা ক্ষিপ্তকণ্ঠে বলিলেন—তিরস্কারের দিন পেরিয়ে গেছে,
এখন চাবুকের দিন এসেছে। বোধ করি, সেই ব্যবস্থাই আমায়
করতে হবে।
অসহ্য বিস্ময়ে রাণী চৎকার করিয়া উঠিলেন—কি ! কি
বললে ?
রাজার মাথায় তখন আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছে ; রাণীর মুখের
কাছে মুখ লইয়া গিয়া কহিলেন—চাবুক, চাবুক ! শুনতে
পেয়েছো ?
সহসা রাজার মুখের প্রতি চাহিয়া রাণী মনে মনে সত্যই
ভীত হইয়া পড়িলেন ; স্তম্ভিতভাব ধীরে ধীরে অপসারিত করিয়া
মৃদু তীক্ষ কণ্ঠে কহিলেন—বটে! এতদূর স্পর্ধা ?
—স্পর্ধা! কার স্পর্ধা ? আমার না তোমার ? আমার
অর্থে নিজের বাপ ভাইদের নিত্য নিয়মিত পালন করছ—সে
ধরি না। কিন্তু আমার পূর্ব-পুরুষের উপার্জিত অর্থ দিয়ে যে
এমন দুহাতে নিৰ্বিচারে তুমি তোমার বিলাস প্রবৃত্তি চরিতার্থ

রেশমী ইস
৪৮
করছ—তার কি কৈফিয়ৎ আছে ? তার উপর আমি তােমার
স্বামী, আমার প্রতি কর্তব্য তো দূরের কথা তােমার দয়া মা রাও
নেই, আমার চোখের ওপর তুমি অন্যপুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার
করছ—এর কি জবাব তুমি দেবে ? অনেক সহ্য করেছি কিন্তু
আর নয়। এখন থেকে রাজপ্রাসাদে অর্থ দিয়ে ক্রয় করা বাদীর
মতাে তুমি থাকবে ; তার বেশী মৰ্যাদার যােগ্য নও তুমি !
অতি হীম, অতি নীচ, অতি ছোট ! তােমার অনেক অত্যাচার
সহ্য করেছি কিন্তু মণিলালের মৃত্যু আমার সহ্যের বাঁধ ভেঙে
দিয়েছে। আজ থেকে
রাজার কথা শেষ হইল না ; অধীর আগ্রহে রাণী বলিয়া
উঠিল—মণিলাল ? কি হয়েছে তার ? বল, বল ?
মণিলাল খুন হয়েছে ! একটা বাগান-বাড়ীর মধ্যে তার
মৃতদেহ পাওয়া গেছে। কে তার বুকে ছুরি বসিয়ে তাকে হত্যা
করে রেখে গেছে। আমার বিশ্বাস, এ-মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী।
যে রাত্রে তােমার গলা থেকে মাল চুরি গেছে সেই রাত থেকে
মণিলালকে কোথাও দেখতে পাওয়া যায় নি। আমার দৃঢ় ধারণা
তােমার কোন ষড়যন্ত্রে সে লিপ্ত ছিল, তারপর শক্তহস্তে বেচারা
প্রাণ দিয়েছে।
রাজ। ক্ষিপ্ত সিংহের মতাে পদচারণা করিতে লাগিলেন।
রাণী মৌনমুখে সােফায় বসিয়া রহিলেন—মুখে তাহার অপরাধের
কালিমা, অতিশয় স্পষ্ট ভাষায় দীপ্যমান।
কয়েক মিনিট নীরবে কাটিয়া যাইবার পর দ্বারে করাঘাত
হইল। রাজা হকিলেন—কে ?
বাহির হইতে শব্দ আসিল-মহারাজ ।

রেশমী কাস
৪৯
কণ্ঠস্বরে রাজা বুঝিলেন, তাহার বিশ্বস্ত প্রাইভেট সেক্রেটারী
দেখা করিতে চায়। দ্বার খুলিয়া প্রশ্ন করিলেন—কি চাই?
মহারাজ। গোয়েন্দা বিভাগের বড় সাহেব মিঃ ডেভেনহ্যাম
এসেছেন। তিনি এখুনি মহারাণীর সঙ্গে দেখা করতে চান।
রাজা বিস্মিত কণ্ঠে বলিলেন—রাণীর সঙ্গে না আমার সঙ্গে ?
আজ্ঞে না। মহারাণীর সঙ্গেই তিনি দেখা করতে চান।
বল্লেন--জরুরী দরকার ।
• রাজা কহিলেন—আচ্ছা, পাঠিয়ে দাও।
সেক্রেটারী প্রস্থান করিল । রাজা তখন আপন মনেই
বলিলেন—আসতে বৈকি! এইবার পুলিস আসিবে ; আর ও কত
কে আসবে ! আমার বরাতে এখনও কত দুর্ভোগ আছে তার
;
ঠিক কি ?
পুলিসের নাম শুনিয়। রাণীর ভাবান্তর ঘটিল ; ভয়ে ও
উৎকণ্ঠায় তাহার সমস্ত দেহ মৃদু মৃদু কঁপিতে লাগিল ; রাজাকে
তিনি কি বলিতে গেলেন, কিন্তু কণ্ঠ দিয়া স্বর ফুটিল না।
ইত্যবসরে মিঃ ডেভেনহ্যাম সাহেব ঘরে প্রবেশ করিলেন।
তিনি নিজেই সাবধানে দ্বার বন্ধ করিয়া প্রথমে রাণী পরে রাজার
দিকে মাথা নত করিয়া অভিবাদন জানাইয়া একখানি চেয়ার
অধিকার,করিয়া বসিলেন।
কয়েক মুহূর্ত ঘরের মধ্যে কাহারাে মুখে কোন কথা নাই।
রাণী মুখ নীচু করিয়া বসিয়া—রাজার দৃষ্টি সম্মুখের দেওয়ালের
উপর নিবদ্ধ। উপায়ান্তর না দেখিয়া মিঃ ডেভেনহ্যাম কথা
আরম্ভ করিলেন ; কহিলেন—আপনাদের বিশ্রম্ভালাপে ব্যাঘাত
ঘটালাম। অত্যন্ত দুঃখিত। মাপ করবেন। আমাদের কর্তব্য
।

রেশমী ফাস
বড় কঠোর ! রাজা-বাহাদুর আছেন, ভালোই হয়েছে। কথাবার্তা
আপনার সামনে হওয়াই ভালাে। মাপ করবেন মহারাণী, অমি
আপনাকে দু’একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।
রাণী মুখ তুলিয়া বলিলেন-বলুন।
সেদিন রাত্রের চুরি সম্বন্ধে রাজা-বাহাদুরের বক্তব্য আমরা
শুনেছি। এখন আপনি কি জানেন, বলুন।
রাণী মৃদুকণ্ঠে উত্তর দিলেন—সবই তাে শুনেছেন। আমি
স্ত্রীলােক! আমি আর কি জানবাে, বলুন !
আপনি স্ত্রীলােক, তা জানি, কিন্তু এ চুরি সম্বন্ধে আপনিই
যে সব-চেয়ে বেশী জানেন, তা-ও জানি। তাই আপনার কাছে
এসেছি ! আপনার বাবাকে আমি বহুদিন থেকে জানি; তিনি
যে এখানে এসেছেন, তাও আমি শুনেছি ; তার সঙ্গে আপনার
অনুচর মণিলালের দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছিল, তা-ও আমি
জানি। আমার মনে হয়, মণিলালের মৃত্যুর জন্যে আপনি
কতক পরিমাণে দায়ী। এখন যদি সবকথা খুলে বলেন, তাহলে
আমাদেরও কাজের সুবিধা হয়, আর আপনাদেরও বারবার
বিরক্ত করতে আসি না।
রাণী কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকিবার পর চোখ তুলিয়া সাহেবের
করিলেন। সে দৃষ্টিতে এক সঙ্গে ভয়, নিরাশা,
বিদ্বেষ, বেদনা ও ক্রোধ প্রকাশ পাইল। কহিলেন—অনেক কথাই
আপনি জানেন। বাকি যা-কিছু সমস্তই আপনাকে বলছি ;
কিন্তু শপথ করুন, আর কোনদিন আমাদের বিরক্ত করতে
আসবেন না।
সাহেব মৃদু হাসিয়া বলিলেন—অঙ্গীকার করতে পারি না
প্রতি দৃষ্টিপাত

রেশমী ফাস
কিন্তু কথা দিলাম, বিশেষ প্রয়োজন না হলে কখনাে আপনাদের
বিরক্তি উৎপাদন করতে আসবাে না।
রাজা মনে মনে ক্রোধে ফাটিয়া পড়িতেছিলেন, কিন্তু মুখে
সে-কথা প্রকাশ না করিয়া কহিলেন—সাহেব যখন নিজে
এসেছেন, তখন সব-কথা না শুনে উনি যাবেন না। বল, যা
তোমার বলবার আছে—বল।
রাণী কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিলেন—বলব আর কি!
উনি তাে সবই জানেন।
মিঃ ডেভেনহ্যাম বলিলেন—না। সব আর কি জানি।
আপনার বাবা যে কেন লুকিয়ে এখানে এসেছেন তা তাে
জানি না।
বাবা এখানে এসেছিলেন—আমার গলার মুক্তোর মালা
গাছটা নেবার জন্যে।
রাজা ভয়ানক চমকিয়া উঠিলেন।
মিঃ ডেভেহাম মৃদু
হাসিয়া বলিলেন-তারপর ?
বাবার কিন্তু এতে খুব বেশী দোষ নেই। প্যারীতে
আমাদের একজন পাঞ্জাবী বন্ধু জুটেছিল, সে নাকি পাঞ্জাবের
কোন নেটিভ-ষ্টেটের রাজার ভাই। বহুদিন থেকে এই মুক্তোর
মালাটার উপর তার লােভ ছিল। আমার বিবাহ হয়ে যাবার
পর সে বাবাকে এই বলে ভয় দেখাতে আরম্ভ করলে যে তিনি
যদি আমাকে রাজী করিয়ে ঐ মুক্তোর মালাটা এনে তাকে
না দেন তাহলে সে আমার নামে কলঙ্ক রটনা করবে। তার
ফলে রাজা আমাকে ভাগ করবেন এবং বাবার মাসােহারা বন্ধ
হয়ে যাবে। বাবা প্রথমে রাজী হন নি ; তখন লােকটা

রেশমী ফাস
বাবাকে টাকার লোভ দেখাতে লাগলাে। দশ হাজার, বিশ
হাজার, পঞ্চাশ হাজার শেষে এক লাখ টাকার লােভে ভুলে
বাবা আমাকে ক্রমাগত চিঠি লিখতে লাগলেন ; শেষে এইখানে
এসে উপস্থিত হলেন। তবুও আমি রাজী হই নি। শেষ পর্যন্ত
বাবা সেই পাঞ্জাবীটার পক্ষ হয়ে আমার নামে কলঙ্ক রটন।
করবেন বলে ভয় দেখাতে লাগলেন, মহারাজকে আমার
বিরুদ্ধে যা চিঠি লেখা হবে তার খসড়া একদিন এনে দেখালেন।
তখন আমি অত্যন্ত ভয় পেয়ে বাবার কথায় রাজী হলুম এবং তার
নির্দেশ মতে। মণিলালকে মাল। অপহরণের কাজে নিযুক্ত
করলুম।
রাজা বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া এই ভীষণ
বিচিত্র কাহিনী শুনিতে লাগিলেন ; তাহার মুখ দিয়া সহস।
বাহির হইল—তুমি ! ইন্দিরা !! কী ভয়ানক !!!
মিঃ ডেভেনহ্যামের মুখে একটুকুও চাঞ্চল্য নাই ; একাগ্রমনে
তিনি রাণীর কথাগুলি অন্তরের মধ্যে গাঁথিয়া লইতেছিলেন ;
শুধু কহিলেন—বলুন ! থামলেন কেন ?
রাণী বলিয়া চলিলেন—প্রথমে স্থির হয়েছিল—উৎসবের
পর আমি মালাটী গােপনে বাবার নিকট পাঠিয়ে দিয়ে স্নানের
ঘরে যাব, পরে ফিরে এসে যখন সাজ সজ্জায় ব্যস্ত থাকবে
সেই সময় হঠাৎ চীৎকার করে উঠব—চোর চোর বলে। লােক
জন রাজা এলে ব’লব—মুখােস পরা দুটী লােক, জোর করে
আমার গলা হ’তে : মালাটী নিয়ে গেল। এ যুক্তিটী সকলের
মনােমত না হওয়ায় পরে স্থির হ’ল যে নাচ-ঘরের পিছনে
বাগানে যে বিরাম-কুঞ্জ আছে, সেখানে গিয়ে আমি অপেক্ষা
;

রেশমী ফাস
ক’রব এবং মণিলাল তখন ওই বারান্দার কোণে লুকিয়ে
থাকবে।
আমার কাছ থেকে মালাগাছটি নিয়ে পিছন দিয়ে
নেমে গিয়ে বাগানের পাঁচীল ডিঙিয়ে বাবা যে সাঙ্কেতিক
স্থানে অপেক্ষা করবেন সেখানে গিয়ে তাকে সেটি দিয়ে আবার
তৎক্ষণাৎ ফিরে আসবে। মণিলাল ফিরে এলেই মহা-
রাজের কাছে ছুটে গিয়ে জানাবো যে আমার গলা থেকে মালা
কে ছিনিয়ে নিয়েছে ! তখন চারিদিকে খোজাখুজি পড়বে এবং
‘শেষে মালাটা চুরি গেছে—এই কথা সবাই জানবে। দাদা
ইতিমধ্যে মহারাজের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং সে-রাত্রে
নিমন্ত্রিতও হয়েছিলেন। মহারাজ জানতেন—আমার বাবা
প্যারীতে আছেন। বাবার আদেশমত দাদা এসে পৰ্যন্ত আমার
সঙ্গে সঙ্গেই রইলেন—পাছে শেষ পর্যন্ত আমি রাজী না
হই,—এইজন্যে। যথাসময়ে নির্বিঘ্নে মালাগাছটি গলা থেকে
খুলে মণিলালের হাতে দিলুম ; মণিলাল ও তীরের মতাে
অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি আর দাদা উদ্বিগ্ন-চিত্তে দাড়িয়ে
রইলুম,—মণিলাল ফিরে এলেই আমি রাজাকে মালা-চুরির কথা
জানাবাে। কিন্তু মণিলাল আর আসে না। আধ ঘণ্টা গেল,
এক ঘণ্টা হয়ে গেল—মণিলালের দেখা নেই। এদিকে খবর
এলাে রাজা আমার খোঁজ করছেন। তখন আমি দাদার পরামর্শ
মতাে বাগানের বিরামকুঞ্জে বসলুম এবং দাদা ছুটে গিয়ে রাজাকে
মালা-চুরির খবর দিলে। তার পরের কথা সবই আপনারা
জানেন। একদিন যে আমার কেমন-ক’রে কেটেছে তা
ভগবানই জানেন। জানি, আমি যা করেছি, তাতে আমার
স্বামীর কাছে আমি ক্ষমার অযােগ্যা; কিন্তু তবুও তার সামনে
;

রেশমী ফাস
৫৪
আজ অকপটে সমস্ত কথা বলে আমি অন্তরের মধ্যে অনেকখানি
শান্তি অনুভব করছি।
একজন অপরিচিত বিদেশীর সম্মুখেই সমুদ্রগড়ের মহারাণী
বালিকার ন্যায় উচ্ছসিত হইয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। লজ্জায়,
অপমানে, দুঃখে রাজা মাথা নীচু করিয়া বসিয়া রহিলেন।
মিঃ ডেভেনহ্যাম মিষ্ট স্বরে বলিলেন—অাপনি যা বল্লেন
সমস্ত সত্য বলে আমি গ্রহণ করলুম।
মহারাণী, আপনি
যে এমন অকপটে আমার কাছে সমস্ত কথা খুলে বল্লেন,তার জন্যে
আমার আন্তরিক ধন্যবাদ গ্রহণ করুন। রাজা বাহাদুর, আপনার
লজ্জিত হবার কোন কারণ নেই। মানুষের জীবনে এরূপ ঘটনা
আশ্চৰ্য্য নয় ! আপনি আমাকে একজন বিদেশী পুলিস-অফিসা
মনে করে দুঃখিত হবেন না, আমাকে আপনার একজন শুভানু-
ধ্যায়ী মনে করে আমাকে ধন্য করুন। জেনে রাখুন, আমার
দ্বারা আপনার বা মহারাণীর কোন অনিষ্ট কোন দিন
হবে না।
আমাকে আপনি বাঁচালেন। বলিয়া রাজা উঠিয়া আসিয়া
সাহেবের সহিত করমর্দন করিলেন।
সাহেব বলিলেন—আপনি শুনে সুখী হবেন যে, আপনার
অলঙ্কার উদ্ধারের জন্য আমি স্বয়ং তদন্ত আরম্ভ করেছি। আর
শুনে দুঃখিত হবেন যে—এই বহুমূল্য অলঙ্কারের জন্য শুধু
মণিলাল নয়, আমার দু’জন বিশ্বাসী পুলিশ কর্মচারী শক্তহস্তে
প্রাণ দিয়েছে এবং আমার প্রিয়তম সহকারী তাদের হাতে বন্দী ।
আরও হয়ত অনেক ভীষণ ঘটনা ঘটেছে সে সব সংবাদ এখন
পাই নি। তবে শুনেছি—আরও দুজন এই সম্পর্কে নিহত

রেশমী কাস
০
হয়েছে। এ খবর আমি পেয়েছি—যার কাছে এখন মুক্তোর
মালা আছে-
রাজা ও রাণী একসঙ্গে প্রশ্ন করিলেন—কার কাছে ?
মিঃ ডেভেনহ্যাম মৃদু হাসিয়া বলিলেন—স্বনামধন্য চীনা-
ডাকাত চাংলীর কাছে !!
রাজ। কহিলেন—বলেন কি ? তাহলে সেদিন যাকে ধরা
হয়েছিল—
সে সম্পূর্ণ নির্দোষ । তাকে আজ-কালের মধ্যেই মুক্তি
দেবো। আচ্ছা, আজ তাহলে আসি। যাবার আগে এই শুভেচ্ছা
জানিয়ে যাই—আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে মনোমালিন্যের
সৃষ্টি হয়েছিল, এখন থেকে তার অবসান ঘটুক। নমস্কার !
সাহেব বাহির হইয়া গেলেন।
তখন রাণী উঠিয়া আসিয়া অশ্রু-প্লাবিত নেত্রে এবং অনুতাপ
বিগলিত স্বরে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য রাজার সম্মুখে দাঁড়াইয়া ধীরে
ধীরে রাজার পায়ের উপর নিজের মস্তক ন্যস্ত করিলেন।
৭
বহুক্ষণ অজ্ঞান হইয়া থাকিবার পর ধীরে ধীরে তরুণ চোখ
মেলিয়া চাহিল।
সৰ্ব্বাঙ্গে তাহার দারুণ বেদনা। মাথার ভিতর ঝিম্ ঝিম্
করিতেছে! কিসের তীব্র নেশার প্রতিক্রিয়ায় হাত পা অবশ
হইয়া গেছে বহু চেষ্টা করিয়াও সেগুলিকে সবল করিতে পারা
যাইতেছে না।

রেশমী ফাস
এমনি করিয়া অবশ-অনড় অবস্থায় আরও কয়েক ঘণ্টা
কাটিয়া গেল। ক্রমশঃ দেহে স্বল্প একটু বল লাভ করিয়া তরুণ
ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল।
কী সর্বনাশ !
তাহার হাত পা শিকল দিয়া বাঁধা।
উঠিবার উপায় নাই। শৃঙ্খল একটি দেওয়াল-সংলগ্ন কড়ার
সহিত বন্ধ। উঠিলেও চলিয়া যাইবার উপায় নাই।
যে ঘরটিতে তরুণ বসিয়া আছে তাহা মাটীর নীচের ঘর
হইবে। যেমনি অন্ধকার তেমনি শীতল। মাথার উপরে ছােট
একটি গহ্বর দিয়া ক্ষীণ আলাের রশ্মি ঘরের ভিতর আসিয়া
পড়িয়া তাহাকে কিয়ৎ পরিমাণে আলােকিত করিয়াছে ; অন্য
কোন গবাক্ষ বা আলাে আসিবার পথ নাই। ঘরের ক্ষুদ্রাকার
দরজাটি অনেক উচুতে; একটি কাঠের সিড়ি বাহিয়া ওঠা-
নামা করিতে হয়।
বসিয়া বসিয়া তরুণ আগাগােড়া সমস্ত ঘটনা ভাবিয়া
দেখিতে লাগিল—
সেই বাগান-বাড়ী ! নীচের ঘরে মৃত যুবক। উপরে
পৈশাচিক মৃত্যুর সেই তাণ্ডব লীলা !
ধীরে ধীরে তাহার মনে পড়িল কেমন করিয়া পিছন হইতে
চাংলী ও তিন চারিজন দস্যু ছুটিয়া আসিয়া নিমেষে তাহাকে
বাঁধিয়া ফেলিল ; তারপর চাংলী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া
মুক্তার মালাটা লইয়া আসিয়া তার সম্মুখে ধরিয়া বলিল-জবর
জিনিষ, না ? তারপর একজন লােক আসিয়া তাহার নাকের
উপর একটা রুমাল চাপিয়া ধরিল। এক মিনিট ; পরক্ষণেই সব,
অন্ধকার !!

রেশমী ফাস
ছবির মতাে দৃশ্যটি তরুণের মানস-পটে ভাসিয়া উঠিল
সে এখন চীনা দস্যুর বন্দী। হয়ত এইখানেই তাহার জীবনের
পরিসমাপ্তি ঘটিবে। তরুণ গভীর অচ্ছিন্ন অন্তরে বসিয়া মৃত্যুর
প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।
কিয়ৎকাল পরে ঘরের উপরে একটা শব্দ হইল। পরক্ষণেই
দরজা ঈষৎ উন্মুক্ত হইতেই একটি ক্ষীণ আলোর রেখা ঘরে
প্রবেশ করিল। ক্রমশঃ দ্বার সম্পূর্ণ খুলিয়া গেল ; ঘরে প্রবেশ
করিল লণ্ঠন হাতে একজন চীনাম্যান ; তাহার পিছনে পিছনে
আরও দুইজন। প্রত্যেকের হাতে এক একখানা প্রকাণ্ড ছোরা,
আলােয় তাহা চক্ চক্ করিতেছে।
তরুণের সারা দেহ যেন হিম হইয়া গেল। বােধ হয় তাহার।
তাহাকে হত্যা করিতে আসিয়াছে। চীনাগুলা অগ্রসর হইয়া
আসিয়া লণ্ঠনটা তাহার মুখের উপর ফেলিয়া পৰ্যবেক্ষণ করিয়া
দেখিল ; একজন দুর্বোধ্য চীনা ভাষায় কী বলিয়া তাহার পিঠে
সজোরে এক লাথি মারিল। তারপর দরজা দিয়া অার এক ব্যক্তি
প্রবেশ করিল। দুই হাতে তাহার দুই’টি কানা-ওঠা থালা, একটা
থালায় কতকগুলা ভাত, আর একটায় খানিকটা জল রহিয়াছে।
সে পাত্র দুইটা তরুণের সম্মুখে নামাইয়া রাখিয়া প্রস্থান করিল।
তখন অপর দুইজনের মধ্যে একজন ভাঙা ভাঙা ইংরাজীতে
কহিল—এই গােয়েন্দা ! ঐ তাের খাদ্য ! খেয়ে ফ্যা!
তরুণ তাহার হাতের বন্ধন দেখাইয়া বলিল—খাৰ কেমন
করে ?
চীনাটা গরুর মতাে অদ্ভুত ভঙ্গী করিয়া কহিল—এমনি করে
মুখ দিয়ে খা। সেই জন্যেই তাে থালায় করে জল দিয়েছি ।

রেশমী ফাস
৫৮
করিল।
এই কথার পর দুজনে তরুণকে উদ্দেশ করিয়া খুব খানিকটা
হাসাহাসি করিল, পরে দ্বার বন্ধ করিয়া প্রস্থান করিল।
তাহার প্রস্থান করিলে তরুণ সেই অন্ন-পাত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত
যেমন নােংরা থালা তেমনি জঘন্য অন্ন। দেখিয়া
তরুণের গা গুলাইয়া উঠিল। তখন তাহার তৃষ্ণায় প্রাণ বাহির
হইবার উপক্রম হইয়াছিল। অতি কষ্টে নীচু হইয়া থালা হইতে
সে খানিকটা জল পান করিল। বহুক্ষণ পরে জল খাইয়া অনেকটা
সুস্থ বােধ করিল এবং উঠিয়া দাঁড়াইয়া শরীরের অলিন্য ভাঙিয়া,
পুনরায় যথাস্থানে উপবেশন করিল। বাহিরে আবার দ্বার
খোলার শব্দ হইল।
এবারে একসঙ্গে অনেকগুলি চীনা ঘরে প্রবেশ করিল।
প্রত্যেকের হাতে এক এক খানা বড় ছােরা! তরুণ ভীত
বিস্মিত নেত্রে তাহাদের পানে তাকাইয়া রহিল।
একটা চীনাম্যান অগ্রসর হইয়া একটানে তরুণকে দাড়
করাইয়া তাহার হাতের শিকলটা খুলিয়া দিয়া দুই হাতে হাত কড়া
লাগাইয়া দিল। আর একজন তাহার পায়ের বাঁধন খুলিয়া দিল।
তখন প্রথম চীনাটা তাহার মাথায় একটা বিরাশী সিকা
ওজনের চাটি মারিয়া কহিল-চল!!
অসহ ক্রোধে তরুণের সারা দেহ আগুন হইয়া উঠিল
হইল, এক পদাঘাতে এই শয়তান বেটাকে শােয়াইয়া দিই।
কিন্তু হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া এস্থলে সুবিবেচনার কাজ নয়
ভাবিয়া তরুণ নীরবে এ অপমান সহ্য করিল।
উদ্যত-ছােরা লইয়া সেই চীনাগুলো—তরুণের চারিপার্শ্বে
ঘিরিয়া তাহাকে সে ঘর হইতে অন্যত্র লইয়া চলিল।
; ইচ্ছা

রেশমী ফাস
উপরে উঠিয়া কয়েকটা ঘর পার হইয়া তরুণকে একটা
• অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ঘরে আনিয়া হাজির করা হইল। ঘরটা
অতিশয় নােংরা ; ভিতর হইতে চণ্ডু ও পচা খাদ্যদ্রব্যের দুর্গন্ধ
বাহিরে বহুদূর পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ভিতরে প্রবেশ
করিয়া তরুণ দেখিল, এক পাশে একটা বেঞ্চিতে বসিয়া কয়েকটা
* চীনাম্যান নিম্নস্বরে কথা বলিতেছে ; অপরদিকে একটা চওড়া
টুলের উপর বসিয়া দুবৃত্ত চাংলী একমনে চণ্ডু সেবন করিতেছে।
তাহার সম্মুখে আর একটা টুলের উপর কতকগুলা কাগজ-পত্র
সাজানাে। লোকগুলা তরুণকে টানিয়া আনিয়া চাংলীর সম্মুখে
দাঁড় করাই যেন প্রহরীরা কয়েদীকে বিচারপতির সম্মুখে
অনিয়া হাজির করিল।
একবার মুখ তুলিয়া তরুণকে দেখিয়া লইয়া চাংলী পুনরায়
নিবিষ্টচিত্তে ধূমপানে নিমগ্ন রহিল ।
নিমগ্ন রহিল। তরুণ স্থির হইয়া অপেক্ষা
করিতে লাগিল।
কয়েক মিনিট পরে চাংলী পুনরায় তরুণের প্রতি দৃষ্টি
নিক্ষেপ করিল। কী ক্রুর বিষাক্ত দৃষ্টি ! দাঁতের মাড়ি বাহির
করিয়া হাসিয়া সে বলিল-“কি গাে, সখের গােয়েন্দা-মশাই !
তােমার গোয়েন্দাগিরির সখ মিটেছে ? যাই হােক, তোমার
ওপর আমার বিশেষ রাগ নেই। কারণ আমি জানি, তুমি
আমার পিছনে লাগনি ; তুমি ঘুরছিলে—মুক্তোর মালার জন্যে !
কিন্তু বাপু, তােমার সাহেব বড় বদ-লােক, আর তাছাড়া
লােকটার আস্পর্ধাও কম নয়—আমার পিছনে নিজে লেগেছে,
আবার কয়েকটা
কুকুর
লেলিয়ে দিয়েছে। যাক্, তাদের শেষ
করে দিয়েছি, মায় তােমাদের বড় সাহেবকে পৰ্যন্ত ! কিন্তু
।
T

রেশমী ফাস
তাতেও তােমার সাহেবের চৈতন্য হয় নি। কাল চীনে
পাড়া থেকে অনেক চীনে ধরে নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে
আমার একজন অনুচরও ধরা পড়েছে। এখন, যদি আমার
লােককে তোমার সাহেব ছেড়ে দেয়, তবেই তুমি ছাড়ান পাবে,
নচেৎ তোমার সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক আজই আমি ঘুচিয়ে
দেবাে।
কথা বলিতে বলিতে চাংলীর চোখ দিয়া যেন আগুন
ঠিকাইয়া পড়িতে লাগিল। তরুণ সভয় চিত্তে মৌনমুখে দাঁড়াইয়া,
রহিল। সহসা চাংলী হাকিল—লি-ফুং। সঙ্গে সঙ্গে একটা
দীর্ঘাকৃতি চীনা-দানব সেলাম করিয়া দাঁড়াইল।
চাংলী কহিল--কে-কে ডেভেনহ্যামের কাছে कि
নিয়ে গেছে ?
আজ্ঞে, কৰ্ত্ত, ফুলিং আর লীচাং।
আচ্ছা যাও ! শোন বাঙ্গালী গোয়েন্দা ! আমার এই দু’জন
অনুচরকে দিয়ে তােমার সাহেবের কাছে পত্র পাঠিয়েছি।
তাতে লিখেছি যে, যদি পত্রপাঠ আমার ধৃত অনুচরকে ছেড়ে
দাও এবং পত্রমারফৎ অঙ্গীকার কর যে ভবিষ্যতে আর কখনাে
আমার পিছনে লােক নিয়ােজিত করবে না, তবেই তােমার
প্রিয় গোয়েন্দাকে তুমি জীবন্ত ফেরত পাবে। এখন এই পত্রের
উত্তরে তােমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তবে আমার বিশ্বাস,
তুমি নিরাপদেই এ যাত্রা ফিরে যাবে। কারণ তােমার সাহেব
নিশ্চয়ই আমার অনুচরকে আটকে রেখে তােমার জীবনকে
উৎসর্গ করবে না। এখন অপেক্ষা কর, ওরা আসুক ফিরে।
বেশীক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইল না। কিছুক্ষণ পরেই একজন

রেশমী ফাস চীনাম্যান হফাইতে হাঁফাইতে একেবারে চাংলীর সম্মুখে আসিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল। কি খবর লীং চ্যাং ? খবর ভাল নয় কৰ্ত্তা! ফুলিং ধরা পড়েছে। ধরা পড়েছে মানে? তােমরা ডেভেহ্যাম সাহেবকে চিঠি দিয়েছিলে ? চিঠি নিয়ে থানার ফটকের ভেতর ঢুকতেই মারমার শব্দে কয়েকজন বাঙালী আর গােরা পুলিশ আমাদের দিকে ছুটে এলাে। আমরা যত বলি যে আমরা ডেভেনহ্যাম সাহেবের সঙ্গে দেখা ক’ব, তারা ততই আমাদের নিয়ে টানা হেঁচড়া করতে লাগলাে। ফুলিং এর কাছ থেকে একজন বাঙালী-পুলিস জোর করে চিঠি কেড়ে নিয়ে সেখানা পড়ে তাকে মারতে শুরু করলে। আমাকেও বাদ দিলে না। আর একজন গোরা পুলিসকে সম্বােধন করে বল্লে—এদের জন্যই আমাদের তিন বন্ধু প্রাণ দিয়েছে, মারাে এদের। মার খেয়ে ফুলিং অজ্ঞান হয়ে যায় আমি অজ্ঞান হবার ভান করে পড়ে থাকি। তখন তারা আমা- দের একটা ঘরে বন্ধ করে রাখে। সেখান থেকে আমি কোন- রকমে পালিয়ে এসেছি, কিন্তু কৰ্ত্তা, ফুলিংএর অবস্থা ভালাে নয়। সে বোধ হয় বাঁচবে না। ঘটনা শুনিয়া চাংলী ক্রোধে কঁপিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে কতক পরিমাণে প্রকৃতিস্থ হইয়া ইংরাজিতে তরুণকে সকল কথা বর্ণনা করিয়া কহিল—তােমার ভাগ্য খারাপ! আমি তোমায় ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমার ফুলিং-কে তারা মেরে ফেলবার যােগাড় করেছে, সুতরাং রেশমী সি তোমার নিস্তার নেই। তোমার সহযােগীদের পাপে তুমি ম’রবে ! চাংলী দুইজন সহচরকে ইঙ্গিত করিতেই তাহারা আসিয়া দিক হইতে তরুণকে চাপিয়া ধরিল। চাংলী কহিল— কি করতে হবে, তা জানো? অাচ্ছা যাও। কাল সকালে ওর দেহটা ডেভেনহ্যাম-সাহেবের বাড়ী ভেট পাঠাতে হবে—যাও। তরুণের মাথার মধ্যে তখন অসংখ্য পতঙ্গ ঘুরিয়া বেড়াই- তেছে। আকাশের মেঘ তাহার চোখের সম্মুখে নামিয়া আসিয়াছে—পায়ের নীচে ভূমিকম্প হইতেছে। সে চলিয়াছে। ঘর পার হইল—তারপর সিড়ি ! সিড়িগুলা ফেদ দুলিতেছে। নীচে নামিয়া আর একটা ঘর—ক্ষুদ্র কক্ষ ! কিন্তু এখনো কি তরুণ বঁচিয়া আছে ? কাল তাহার মৃতদেহ ডেভেহ্যাম-সাহেবের কাছে যাইবে !! তরুণের মনে হইল যেন তাহার মাথার ওপর হইতে অজস্র বরফ গলিয়া সারা দেহ ভাসাইয়া দিতেছে। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া লােকদুইটা তাহাকে মাটিতে ফেলিয়া তাহার পা দুইটা দৃঢ় বন্ধনে বাঁধিয়া দিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া প্রস্থান করিল। তাহারা প্রস্থান করিতেই তরুণ উঠিয়া বসিল। না, সে এখনাে বঁচিয়া আছে। কিন্তু তাহাকে উহারা এমন ভাবে ফেলিয়া রাখিয়া গেল কেন? না খাইতে দিয়া তাহাকে কি মারিবে ? কিম্বা, নেপথ্যে তাহার জন্য অন্য কোন ভীষণতম আয়োজন হইতেছে ? বেশীক্ষণ ভাবিতে হইল না। সহসা ঘরের কোণের দিকে কি একটা শব্দ শুনিয়া তরুণ ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল,একটা ডালা-খােল A রেশমী সি D ঝুড়ির ভিতর হইতে খস খস শব্দ হইতেছে। তরুণ দেখিয়াছিল, লোক দুইটা চলিয়া যাইবার সময় ওই ঝুড়িটার ডালা খুলিয়া দিয়া গিয়াছিল। ক্ষণেক পরেই তরুণ যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার দেহের রক্ত জমিয়া যেন হিম হইল। তাহার হাত পা কাপিতে লাগিল। প্রথমে শুধু মাথা—তারপর ফণা উদ্যত করিয়া প্রকাণ্ড কালো একটা বিষধর সর্প সেই ঝুড়ির ভিতর হইতে ধীরে ঋীরে তরুণের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। তাহার মৃত্যুর জন্য এ-কী অভাবিত বীভৎস আয়োজন! হাত বঁধা, পায়ে শৃঙ্খল, নিরুপায় ! তাহাকে চোখ চাহিয়া মৃত্যুকে বরণ করিতে হইবে ? পূৰ্ব্বজন্মে সে কী এতই পাপ করিয়াছিল যে অজি তাহার পরে বিধাতার এই নিষ্ঠুর অভিশাপ ! সাপটা মন্থর গতিতে তরুণের দিকে অসিতে লাগিল। প্রাণ- পণ চেষ্টা করিয়া ও তরুণ এতটুকুও সরিয়া যাইতে পারিল না। দেহ তাহার অসাড়-নিস্পন্দ হইয়া গিয়াছে। অন্য কোন মৃত্যু দাও, ভগবান ! তাহার জন্য অন্য কোন মরণের ব্যবস্থা কর। মৃত্যুকে সে ভয় করে না; কিন্তু এ কী অস্বাভাবিক যন্ত্রণাময় মৃত্যু! হে ভগবান! তরুণকে সর্প- দংশনের ভীষণ যন্ত্রণা হইতে অব্যাহতি দাও! তাহার অস্তিম-সময়ের এই আকুল আকুতি পরমেশ্বরের চরণে পৌছাইল কিনা, কে জানে। সাপটা আরও কিছুদূর অগ্রসর হইয়া তরুণের নিকটে উপস্থিত হইয়া ফোস করিয়া ফণা বিস্তার করিয়া দাঁড়াইয়া মাথা নাড়িতে লাগিল। তরুণের দুই শ্রান্ত চক্ষু তাহা দেখিয়া ধীরে ধীরে মুদিয়া আসিল।

বিষধর সর্পের ক্রুদ্ধ গর্জন ঘরের মধ্যে ঝঙ্কত হইতেছে। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে তরুণ তাহার দংশনের অপেক্ষা করিয়া আছে। মৃত্যুর আশঙ্কায় ঘরের বাতাস পর্যন্ত যেন অসাড়-নিস্পন্দ ! পৃথিবীতে অালো নাই—আতঙ্কে তরুণের নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া যাইতেছে । সাপটা বােধ হয় আরও খানিকটা অগাইয়া আসিয়াছে। নিকটে আসিয়াছে যে তরুণ স্পষ্ট তাহার সান্নিধ্য অনুভব করিতে পারিতেছে। এইবার—হইয়া গেছে। এমন সময় সহসা একটা শব্দ হইল,—কী একটা ভারী পদার্থ যেন মাটিতে পড়িল। তরুণ নিস্পন্দ হইয়া কিয়ৎকাল বসিয়া রহিল। সাপটা কি তাহাকে দংশন করিয়াছে ? কৈ না। কিন্তু তাহার ফোস ফোস শব্দ অর তাে শোনা যাইতেছে না। সাপটা চলিয়া গেল নাকি? ধীরে ধীরে তরুণ চোখ মেলিয়া চাহিল। চাহিয়া দেখিল- সাপটা চলিয়া যায় নাই, তাহারই দেহের একান্ত সন্নিকটে মাটিতে অসাড় হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। তাহার উদ্যত ফণ। মাটির উপর লুটাইয়া পড়িয়াছে। সাশ্চর্য্যে তরুণ দেখিল, ছােট্ট একটি সুতীক্ষাগ্ৰ তীর তাহার ফণায় বিদ্ধ ? অত্যাশ্চর্য ঘটনা !! বিহ্বল-নেত্রে দ্বারের দিকে ফিরিয়া তরুণ দেখিল, দ্বার খুলিয়া ঘরের ভিতর আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, একটি চীনা-বালিকা,! বয়স পনের ষােল হইবে। মুখে তাহার অপরূপ মমতার ছায়া। হাতে তাহার চীন-দেশের তীর ছুড়িবার একটি কারুকার্যখচিত ধনুক। নিমেষে তরুণ বুঝিল, রেশমী গস এই বালিকার হাতের অব্যর্থ সন্ধানে মৃত্যু তাহাকে স্পর্শ করিতে আসিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়াছে। বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে সে এই বিদেশী মেয়েটির মুখের পানে তাকাইয়া রহিল। ত্রস্ত হইয়া মেয়েটি একবার দ্বারের বাহিরে দৃষ্টিপাত করিল ; তারপর অঙ্গুলি-সঙ্কেতে তরুণকে নীরব থাকিতে ইঙ্গিত করিয়া তাহার নিকটে আসিয়া পায়ের বাঁধন খুলিয়া দিতে লাগিল। প্রথমে পায়ের, পরে হাতের বন্ধন খােলা হইলে, মেয়েটি ক্ষিপ্র পদে দ্বারের কাছে চলিয়া গেল। মুখ বাড়াইয়া বাহিরে ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া তরুণকে হাতছানি দিয়া আহ্বান করিল এবং তাহাকে অনুসরণ করিতে ইসারা করিল। তরুণ নির্বাক হইয়া মেয়েটির পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল। সেই ঘর পার হইয়া, সংকীর্ণ একটা পথ অতিক্রম করিয়া মেয়েটির পিছনে পিছনে সে চলিতে লাগিল। বাড়ীর সমস্ত নীচের তলাটাই অতিশয় অন্ধকার, ভাঙা-চোরা ও সঁাৎ-সেঁতে। তাই নীচে কেহই থাকে না। উপরের লােকেরা নেশায় গল্পে তখন এমনই মজগুল যে নীচের তলার এই বিচিত্র নাটকের কিছুমাত্র তাহারা জানিতে পারিল না। তখন ভাের হইয়াছে। বাহিরে পশু-পক্ষীর কলগুঞ্জন শােনা যাইতেছে। মুক্তির প্রত্যাশিত আনন্দে তরুণ চঞ্চল হইয়া উঠিল। বহু ঘর পার হইয়া মেয়েটি বাড়ীর পিছন দিকের একটি দ্বারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। সেই দ্বার খুলিয়া তরুণের চোখে চোখ রাখিয়া তাহাকে বাহির হইয়া যাইতে ইঙ্গিত করিল। দ্বার খুলিতেই বাড়ীর বাহিরের সুবিস্তীর্ণ পথরেখা তরুণকে রেশমী কাস অনন্দে উদ্বেল করিয়া তুলিল। পরক্ষণেই কৃতজ্ঞ চিত্তে ১ তাহার জীবন ও মুক্তি-দাত্রী তরুণীর প্রতি তাকাইল। তাহাকৈ সে প্রাণের অকৃত্ৰিম কৃতজ্ঞতা জানাইতে চায়। কিন্তু ভাষা নাই; তাহার অন্তরের ধন্যবাদ এই মেয়েটিকে জানাইতে পারে এমন ভাষা নাই। মেয়েটি নতনেত্রে দাড়াইয়া আছে। দাড়াইয়া থাকিবার ভঙ্গিটি পৰ্যন্ত তাহার কী সুন্দর, কী লাবণ্য-ব্যঞ্জক !! কিন্তু আর দেরী করিবার অবসর নাই ; বিলম্বে বিপদ ঘটিতে পারে। ক্ষিপ্র পদে তরুণ দ্বার পার হইয়া পথের উপর গিয়া দাড়ােইল। পিছন ফিরিয়া আর-একবার সে মেয়েটির প্রতি দৃষ্টিপাত করিল। চোখেচোখী হইতেই মেয়েটি স্নান ও মৃদু একটু হাষিয়া, মাথা নোয়াইয়া তরুণকে তাহার শেষ অভিবাদন জ্ঞাপন করিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল । মুহূৰ্ত্তমাত্র! পরক্ষণেই তরুণ দৌড়াইতে আরম্ভ করিল। হাত পা যে তাহার এমন করিয়া আবার কোনদিন সচল হইয়া উঠিবে তাহা সে ভাবে নাই। ছুটিয়া চলিতে তাহার অত্যন্ত অরাম বােধ হইতেছে। এই ট্যাক্সী ! সবুর ! চালাও ! ওধার নেই। ইধার। হঁ্যা। চালাও, জোরসে ! হাওয়ায় তরুণের চুল উড়িতেছে! কিন্তু ট্যাক্সীর গতি কি মৃদু ! তাহার ইচ্ছা হইতেছিল, জগতের সমস্ত স্পীড-রেকর্ড ভঙ্গ করিয়া তাহার মােটর ছুটিয়া চলুক। জোরসে চালাও ! আরাে জোর ! দেখিতে দেখিতে গাড়ী পুলিশ স্টেশনে আসিয়া প্রবেশ রেশমী কাস ৬৭ করিল ; তরুণ গাড়ী হইতে লাফ দিয়া নামিয়া ডেভেনহাম- সাহেবের ঘরের দিকে ছুটিল ! কিন্তু এ কি! সাহেবের ঘরের ভিতর হইতে একটা চীনাম্যান বাহির হইয়া আসে কেন ? সাহেব কোথায় ? চীনাম্যান প্রথমে তরুণকে দেখিতে পায় নাই; যখন দেখিতে পাইল, তখন অস্ফুট একটা হর্ষধ্বনি করিয়া ইংরাজীতে বলিয়া উঠিল—এ কি ! তরুণ, তুমি ? বেঁচে ফিরে এসেছে তাহ'লে ? ঈশ্বরকে সহস্র ধন্যবাদ । এই বলিয়া চীনাম্যান সবেগে তরুণকে আলিঙ্গন করিল। তরুণ প্রথমটা বিস্মিত হইয়া গিয়াছিল, কথা শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া সে বলিল—এখন আর অন্য কোন কথা নয়। শীগগির বেরিয়ে চলুন, ট্যাক্সী নীচে দাড়িয়ে আছে। জনকয়েক সার্জেন্টকে আর একখান মোটরে আমাদের পিছনে আসতে যেতে যেতে কথা হবে। দেরী করলে ফল হবে না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মিঃ ডেভেনহ্যামের আদেশে অভিযান প্রস্তুত হইল। তিনখানা মােটরে উদ্ধশ্বাসে চাংলীর গুপ্ত গহ্বর-এর উদ্দেশ্যে ছুটিল। ট্যাক্সীতে বসিয়া তরুণ এক নিঃশ্বাসে সংক্ষেপে সাহেবকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলিয়া, শেষে কহিল এতক্ষণে তারা বােধ হয় পালিয়েছে। কিন্তু যদি ধর। পড়ে তাহলে মেয়েটির সম্বন্ধে আপনাকে বিবেচনা করতে হবে। সে বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকূতে পারে। ! তার কোন অনিষ্ট হবে না। তরুণ ট্যাক্সী চালককে নির্দেশ করিতে করিতে বহু পথ অতিক্রম করিয়া, বহু জনবিরল ও কর্মমুখর পল্লী অতিক্রম করিয়া বলুন।

রেশমী চাস ৬৮ ; এক পরিত্যক্ত পল্লীর একটি সরু গলির মধ্যে প্রবেশ করিল চাংলীর অডবাড়ীর সদর দ্বার কোন দিকে তাহা সে জানিত ; খুঁজিয়া বাহির করিবার সময় ছিল না। সে লোকজন লইয়া বাড়ীর পিছনের দরজার সম্মুখে উপস্থিত হইল। মিঃ ডেভেনাম তখন অনুচরদিগকে বাড়ী ঘিরিবার আদেশ দিলেন। কয়েকজন বাড়ীর সম্মুখে, কয়েকজন বাড়ীর উত্তর- দক্ষিণে এবং কয়েকজন পিছনের অংশে পাহারা দিতে লাগিল। খিড়কী-দ্বার বন্ধ ! মিঃ ডেভেনােম হরনাম সিংকে পাঁচল ডিঙাইয়া ভিতরে নামিয়া দ্বার খুলিয়া দিতে আদেশ করিলেন । হরনাম সিং যেমন শক্তিমান, তেমনি কৰ্ম্মঠ। পাঁচীল ডিঙাইতে, সঁতার কাটিতে, লাঠি খেলিতে এবং অপরাপর দৈহিক শক্তির পরিচায়ক কার্যে তাহার সমকক্ষ সহযােগীদের ভিতর অতি অল্পই ছিল। আদেশ পাইবামাত্র সে নিমেষের মধ্যে পাঁচীল এর উপর উঠিয়া নীচে নামিয়া পড়িল। দ্বার খােলা হইলে সকলে মিলিয়া সাবধানে ও সন্তর্পণে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নাই; চারিদিক নিস্তব্ধ। তরুণ পথ দেখাইয়া সকলকে লইয়া অগ্রসর হইল। প্রত্যেকের হাতেই গুলিভরা উদ্যত পিস্তল। সকলের অন্তরে আশু ও অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের আশঙ্কা। ধীরে ধীরে নীচের তলা হইতে সকলে মিলিয়া উপরে উঠিল। কিন্তু তবুও জন প্রাণীর দেখা পাওয়া গেল না। মিঃ ডেভেনহাম তরুণের দিকে চাহিলেন। তরুণ হতাশাব্যঞ্জক মুখ- ভঙ্গী করিল। সকলে বুঝিল—পিঞ্জর শূন্য! শিকার পলাইয়াছে, ঘরের মেঝের উপর শ্বেতবর্ণের কি একটা জিনিষ পড়িয়া

রেশমী ফাস
আছে এবং তাহারই উপর ঝুকিয়া পড়িয়া একজন চীনালোক
অস্ফুট কণ্ঠে কী যেন বলিতেছে ।
সহসা পিছনে পদ শব্দ শুনিয়া লােকটি মাথা তুলিয়া
চাহিল সে সবিস্ময়ে দেখিল, তিন-চারিটী পিস্তল একেবারে
তাহার মস্তকের উপর উদ্যত! দেখিবামাত্র তরুণ চিনিল—
লােকটি আর কেহ নয়, কুরকৰ্ম্মা দস্যু-দলপতি চাংলী ! তরুণের
ইঙ্গিতে দুইজন সিপাহী গিয়া তাহার দুই হাত চাপিয়া ধরিল,
একজন মুহূর্তের মধ্যে তাহার হাতে হাতকড়া লাগাইয়া দিল।
মিনিট কয়েকের মধ্যে চাংলী নিরাপদে বন্দী হইল ।
উঠিয়া দাঁড়াইয়া বিষম ভাবে অল্প একটু হাসিয়া জামার
হাতায় চোখ দুইটা মুছিয়া চাংলী কহিল—দুৰ্বলতাই পাপ !
আর সেই পাপেই মৃত্যু! মুহূর্তের জন্য দুৰ্বলতার বশীভূত
হয়েছিলাম বলেই তােমরা আমায় আজ ধরতে পারলে !
তারপর অঙ্গুলি সঙ্কেতে পায়ের নীচে দেখাইয়া কহিল—এ
অামারই মেয়ে। স্বহস্তে ওকে হত্যা করেছি। কিন্তু জানিতাম
—ওর প্রতি আমার এতখানি স্নেহ ছিল। কিছুতেই ওকে
ছেড়ে যেতে পাচ্ছি নে। গিছলাম, কিন্তু আবার ওকে দেখবার
জন্যে অসতে হ’ল, সেই অবসরে তোমরা
তখন সকলে সবিস্ময়ে দেখিল—একটি চীনা তরুণী রক্তাপ্লত
দেহে মাটির উপর লুটাইতেছে ; যেন একটি ক্ষীণাঙ্গী কপােতী
শ্যেন কর্তৃক দংশিত হইয়া রক্তাপ্লত ছিন্ন কণ্ঠে আকাশ হইতে
ধূলায় পড়িয়াছে ।
অতি করুণ মৰ্ম্মব্দেী দৃশ্য ! সকলে।
মমতায়—দুঃখে অভিভূত হইল।
তরুণ ক্ষিপ্রপদে সোয়েটার পাশে আসিয়া মাটিতে হাটু গাড়িয়া
}
}
;

রেশমী।
৭ ০
বসিল, তারপর তাহার নিস্পন্দ শীতল দেহ কোলের উপর তুলিয়া
পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া হতাশ হইয়। পুনরায় তাহাকে মেঝের
উপর শোয়াইয়া দিয়া পাশের চাদরখানি দিয়া তাহার সর্বাঙ্গ
আবৃত করিয়া দিল।
মিঃ ডেভেনহ্যাম অনুমানে সমস্ত ব্যাপার বুঝিয়া লইয়াছিলেন,
এইবার মাথার টুপী খুলিয়া মাথা নীচু করিয়া মৃতার প্রতি শ্রদ্ধা
প্রদর্শন করিলেন। তাহার দেখা দেখি অন্য সকলেই সেইরূপ
করিল। তাহা দেখিয়া চাংলী কহিল—সাহেব ! তোমাদের
ধন্যবাদ ! কিন্তু জানাে না—আমার এই মেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা
করেছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করলে আমি কারুকে নিষ্কৃতি দিই
না—নিজের মেয়েকেও না। এই,—এই কালো বাঙালীটার
জন্যেই আজ আমার মেয়ে প্রাণ হারালাে এবং আমি ধরা
পড়লাম। একবার ছাড়া পেলে আমি ওকে
চাংলীর ক্রুদ্ধ গর্জনে সমস্ত ঘর যেন কাপিয়া উঠিল
মিঃ ডেভেনহাম সঙ্কেত করিতেই সিপাহী দুইজন তাহাকে
ঘরের বাহিরে লইয়া গেল। বাহির হইতে চাংলী কহিল—
সাহেব ! আমার মেয়ের শেষ সৎকার যেন হয় ! এটুকুও কি
তােমার কাছে আশা করতে পারি না ?
—নিশ্চয় পারো। আমি এখুনি একজন চীনা পুরুত অানিয়ে
শবের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ! কিন্তু চাংলী, তােমার চেয়ে
আমাদের সেই মুক্তার মালাটায় বেশী প্রয়ােজন। সেটা কোথায়
রেখেছে। বল।
উন্মাদের মত চাংলী বিকট অট্টহা করিয়া উঠিল—মুক্তোর
মালা নেবে ? হা হা হা হা !!! নিৰ্বে তােমরা, মােদের

রেশমী ফাস
৭১
সাধ্য কি আমার কাছ থেকে সে জিনিষ আদায় করতে পারাে।
কোন আশা নেই, বন্ধু, সে মালা এখন অনেক দূরে চলে গেছে !
কালকের মধ্যে তাকে নিয়ে যাবো, অার ও, আরও দূরে !
এই কথা বলিয়া চাংলী পিছন ফিরিয়া ঘরের মধ্যে দৃষ্টিপাত
করিয়া অশ্রু ভারাক্রান্ত কণ্ঠে কহিল—বিদায়, মাগো; তাের সঙ্গে
জনের মতো বিদায় ! পারিস যদি, স্বর্গ থেকে তাের এই নিষ্ঠুর
পিতাকে ক্ষমা করিস্ মা !
শেষের দিকে কণ্ঠস্বর ভাঙিয়া পড়িল। তখন সকলে মিলিয়া
তাহাকে লইয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।
সহরে সেদিন চঞ্চলতার আর অবধি নাই। সকলের মুখেই
এক কথা–চাংলী ধরা পড়িয়াছে ! এতদিন লােকে যা অসম্ভব
ও অসাধ্য বলিয়া জানিত
আজ সেই
অসম্ভব সম্ভব
হইয়াছে ! এতদিন পরে আজ কলিকাতার পুলিশ অফিসারদের
মুখে স্বল্প আত্মপ্রসাদের হাসি দেখা দিয়াছে ; এতদিন তাহাৱা
নিজেদের অকৃতকার্যের লজ্জায় যেন ম্রিয়মাণ হইয়াছিল।
কাগজে কাগজে চাংলীর ফটো ; বড় বড় হরফে তাহার
বিচিত্র জীবনেতিহাসের মর্মকথা !! চীন ও ভারত গভর্ণ-,
মেন্টের মধ্যে নানাবিধ গােপনীয় টেলিগ্রামের বিনিময় হইতেছে।
চাংলীকে লইয়া এখন কী করা হইবে ? চীন কনসলের চিহ্নিত
মােটরখানা প্রায়ই আখ দুদিন ধরিয়া লালবাজারে যাতায়াত
করিতেছে।

রেশমী ফাস ৭২ একজন মাত্র লােক, খর্বাকৃতি, শীর্ণকায় লােক,তাহাকে লইয়া দুইটী প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড রাজশক্তির উত্তেজনার আর অন্ত নাই ! চীন গভর্ণমেন্ট চাংলীকে চাহিলেন। ভারত সরকার জানাইলেন—চাংলী ভারতে যে অপরাধ করিয়াছে তাহার বিচার এখানে আগে শেষ হউক, তারপর তাহাকে তাহার দেশীয় রাজ- শক্তির হাতে সমর্পণ করা হইবে। চাংলীর বিচার করিবার জন্য এখানে একটি বিশেষ ট্রাইবিউন্যাল গঠিত হইল এবং বিচারের দিনক্ষণ ধৰ্য্য হইল। চাংলীর নিকট হইতে মুক্তামালার সন্ধান বাহির করিবার জন্য একদিন তাহার উপর অনেক উপরােধ-অনুরােধ ও নির্যাতন করা হইল, কিন্তু কোন ফল হইল না। চাংলীর নিকট কোন কথাই পাওয়া গেল না। মিঃ ডেভেনহাম তখন স্বয়ং তাহার সহিত আসিয়া দেখা করিলেন। তিনি দেখা করিলেন সম্পূর্ণ অন্য ভাবে ; অর্থাৎ অন্যান্য পুলিশ অফিসার যেরূপ ঘৃণা ও অবজ্ঞার সহিত দেখা করিতেছিল, চতুর মিঃ ডেভেনহ্যাম সাহেব একেবারে তাহার উল্টা পথ ধরিলেন। তিনি আসিয়া চাংলীর সহিত প্রথমে করমর্দন করিলেন এবং জানাইলেন যে, তাহাকে এভাবে অটক করিয়া রাখা হইয়াছে তাহাতে তিনি অতীব দুঃখিত; কিন্তু পুলিশের কর্তব্য বড়ই কঠোর ! তাহার জন্য চাংলী যেন কিছু মনে না করে। চাংলী কহিল তােমার সৌজন্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু দশ-বারােজন সহকারীর পর এখন তুমি নিজে এলে ? তা এসে, কিন্তু কোন ফল হবে না। ক্তার মালা বা আমার রেশমী ফাস অনুচরদের সংবাদ আমায় কেটে টুকরাে করে ফেলেও অমি ব’ব না। মিঃ ডেভেনহ্যাম জিব কাটিয়া বলিলেন—ন! না, সে-সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করতে চাই না। ক্ষমতা থাকে, আমরা মুক্তোর মালা খুঁজে বার করবাে। আমি অন্য কথা জানতে এসেছি। কি কথা ? তুমি কেমন করে ওই মুক্তোর মালার সন্ধান পেলে ? রাণীর বাপের সঙ্গেই বা পরিচয় হ’ল কোথায় ? আর বাগান-বাড়ীতে মণিলাল লােকটি নিহত হ’লই বা কেমন করে এবং কার দ্বারা —এই কথাগুলো জানতে চাই। আশা করি, এই কথাগুলি ব’লতে তোমার আপত্তি হবে না। কিছুক্ষণ চিন্তা করিবার পর চাংলী কহিল-না, এ-কথাগুলাে ব’তে আমার আপত্তি নেই। তারপর বিস্তারিত ভাবে সে যাহা সাহেবকে জানাইল, তাহার সংক্ষিপ্ত মৰ্ম্ম এই- রাণীর পিত। এখানে আসিয়া এক ধনবান পাঞ্জাবী ব্যবসা- দারের নিকট মুক্তাহারের কথা বলে ; বলে যে, তাহারা দুইজনে মিলিয়া (রাণীর পিতা আর সেই পাঞ্জাবী ভদ্রলোক ) সেই মুক্তার মালা বিক্রয় করিবে। মুক্তার মালার কথা শুনিয়া পাঞ্জাবীর অত্যন্ত লােভ হয়। কিন্তু নিজে অত দর দিতে সক্ষম না হওয়ায় একজন চীনা রত্ন-ব্যবসায়ীর নিকট যাইবার প্রস্তাব করে এবং রাণীর পিতাকে লইয়া পরদিন তাহার কাছে যায়। চীন হইতে পলাইয়া আসিয়া চাংলী উক্ত চীনা মহাজনের বাড়ীতেই ছিল। তাহার সাশ্রয়দাতার সহিত উল্লিখিত পাঞ্জাবী ও রাণীর পিতার ৪ রেশমী ফাস ৭৪ যে সকল কথা হয়, পাশের ঘর হইতে চাংলী সব শোনে। তারপর ঐ মুক্তার মালাটি নিজে সংগ্রহ করিবার সঙ্কল্প করে। চীনা মহাজনের সহিত পরামর্শ করিয়া সে ঘটনার দিন রাত্রে চারিজন অনুচর লইয়া ঘটনাস্থলে যায় এবং পিছন হইতে গলায় ফাস দিয়া রাণীর পিতাকে হত্যা করে। হত্যার পর অনুচরগণ মৃতদেহ লইয়া চলিয়া যায়। চাংলী একাকী মণিলালের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু রাণীর সহিত তার পিতার যে একটি সাঙ্কেতিক বন্দোবস্ত ছিল, চাংলী তাহা জানিত না। মণিলাল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া পাচীল হইতে অন্ধকারে চাংলীকে দেখিয়া সেই সাঙ্কেতিক শব্দটি উচ্চারণ করে। কিন্তু চাংলী তাহার কোন উত্তর দিতে পারে নাই। মণিলালের সন্দেহ হওয়ায় সে কাছে আসিয়া বুঝিতে পারে যে সে ব্যক্তি রাণীর পিতা নহে; তখন সে আবার লাফ দিয়া বাগানের পঁাচীল অতিক্রম করিবার চেষ্টা করে। চাংলী তাহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, এবং শিকার হাতছাড়া হয় দেখিয়া, তাহার পথরােধ করিয়া তাহাকে হত্যা করিবার চেষ্টা করে। মণিলাল ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া পঁাচীল ডিঙাইবার চেষ্টা না করিয়া রাস্তা দিয়া দৌড়িতে আরম্ভ করে ; চাংলীও তাহার অনুসরণ করে। কিছুদূর ছুটিয়া মণিলাল এই আখ্যায়িকার প্রধানতম ঘটনাস্থল সহরতলীর পূৰ্ব্বকথিত বাগান-বাড়ীর কাছে আসিয়া উপস্থিত হয়। চাংলী তাহরি বিশ ত্রিশ হাত পিছনে ছিল। এমন সময় আর এক ঘটনা ঘটিল। উক্ত বাগান-বাড়ীর কর্মচারী বাড়ী ফিরিতেছিল, সহসা তাহাদের বাড়ীর প্রাচীরের ধারে একজন লােককে ওরূপ ব্যস্ত ভাবে অসিতে দেখিয়া তাহার মনে ভীষণ সন্দেহ উস্থিত হয়। t রেশমী ফাঁস ৭৫ সে ছুটিয়া গিয়া কোন কথা না বলিয়া একেবারে মণিলালকে জড়াইয়া ধরে। চাংলীকে দেখিতে পায় নাই। মণিলাল এক বিপদ হইতে পলাইতে গিয়া অর এক বিপদে পড়িয়া বিব্রত হইয়া উঠিল। সে লোকটির বাহুবন্ধন হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইবার জন্য প্রাণপণে টানাটানি করিতে লাগিল। চাংলী তাহাদেরই অনতিদুরে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া ব্যাপারটি মনোযোগের • সহিত নিরীক্ষণ করিতেছিল। ধস্তাধস্তি করিতে করতে একসময়ে মণিলালের হাত হইতে মুক্তার মালাটি মাটিতে পড়িয়া যায়। তাহা দেখিতে পাইবামাত্র কর্মচারীটি ক্ষিপ্রহস্তে মালাটি কুড়াইয়া লয় এবং মণিলালকে ছাড়িয়া দিয়া নিজেই সরিয়া পড়িবার উদ্যোগ করে। তাহা বুঝিতে পারামাত্র মণিলাল তাহাকে জাপটাইয়া ধরে এবং দুজনে আবার কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করিতে থাকে। সেই সময় হরেন্দ্র সেই পথে অসিম পড়ে। তাহাকে দেখিয়াই কৰ্ম্মচারীটি ভীত হইয়া এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করিয়া লাফাইয়া বাগানের ভিতর পড়ে এবং মণিলাল ও তাহাকে অনুসরণ করে। পরক্ষণেই অন্ধকারাবৃত অংশ দিয়া চাংলীও বাগানে প্রবেশ করে। প্রবেশ করিয়া , চাংলী দেখিল, উভয়ে নীচেকার একটি ঘরে ঢুকিল। চাংলী সন্তর্পণে অগ্রসর হইয়া ঘরের পিছনের জানালার নীচে দাড়ায় এবং তাহার ফাক দিয়া তাহাদের উপর লক্ষ্য রাখে। ভিতরকার লােকদুটীর কথাবার্তা বুঝিতে না পারিলেও এটুকু মংলী স্পষ্টই জানিতে পারে যে বাগানের কর্মচারীটি, মণিলালের সহিত রফ করিবার চেষ্টা করিতেছে। মণিলাল ব্যগ্র কণ্ঠে তাহার প্রতিবাদ করিয়া পুনঃপুনঃ শিরশ্চালনা করিতেছে। কর্মচারীটি

রেশমী ফস
৭৬
তখন সেই মহামূল্য কণ্ঠহারের নেশায় উন্মাদ হইয়া উঠিয়াছে ;
তাহার দুইচোখ দিয়া আগুন বাহির হইতেছে। কথা কহিতে
কহিতে সে সহসা ঘরের বিছানার ভিতর হইতে একখানা
বৃহদাকার ছােরা টানিয়া বাহির করিয়া চোখের পলক ফেলিতে
না ফেলিতে তাহা মণিলালের বুকে আমূল বসাইয়া দিল।
তারপর ছুরি লুকাইয়া রাখিয়া তাড়াতাড়ি তাহার মৃতদেহ
সম্মুখের ইজি চেয়ারের উপর বসাইয়া কণ্ঠহারটি হস্তগত করিয়া
যেমন বাহির হইতে যাইবে সেই সময় দ্বার ঠেলিয়া উপরের
মুন্সেফ বাবুটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেন। তিনিও গলার
আওয়াজ পাইয়া সন্দেহ বশতঃ নীচে নামিয়া আসিয়াছিলেন এবং
দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া সমস্ত কথাই শুনিয়াছিলেন। মুন্সেফ,
সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া কর্মচারীকে ভয় দেখাইতে লাগিলেন।
শেষে ভাগ দিবার অঙ্গীকার করিয়া মুক্তার মালাটি লইয়া তিনি
ভিতরে চলিয়া গেলেন। ভাের হইয়া আসিতেছে দেখিয়া চাংলী
তখন বাগান হইতে সরিয়া পড়ে এবং অজ্ঞায় গিয়া দুইজন
অনুচরকে মুন্সেফ ও কর্মচারীর আকৃতি বর্ণনা করিয়া তাহাদের
উপর লক্ষ্য রাখিবার জন্য পাঠাইয়া দেয়। পরদিন রাত্রে আরও
জনকয়েক অনুচর লইয়া চাংলী সেই বাগান-বাড়ীতে আসে।
তারপর সেখানে যা কিছু ঘটনা ঘটে,—তাহা পাঠকবর্গ সবিশে
অবগত আছেন।
মিঃ ডেভেনােম সমস্ত কথা মন দিয়া শুনিলেন। তারপর
অন্যান্য নানা বিষয়ে চাংলীর সহিত আলাপ আলােচনা করিয়া
বাহির হইয়া আসিলেন।
৬

কয়েকদিন ধরিয়া অবিশ্রান্ত উত্তেজনা, শারীরিক পরিশ্রমের পর অত্যন্ত অবসাদে তরুণের সমস্ত দেহ সেদিন ভাঙিয়! পড়িয়াছিল। কয়েকদিন ধরিয়া আহার নাই, নিদ্রা নাই, বিশ্রাম নাই, তাহার উপর মায়ামমতাহীন শত্রুদের হাতে নিষ্ঠুর নির্যাতন ! মানুষের শরীর কতক্ষণ আর এ অত্যাচার সহ্য করিতে পারে ? সেই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ার ফল শীঘ্রই দেখা দিল। চাংলী গ্রেপ্তার হইবার পরদিন সকালে যখন অধিক বেলায় তরুণের নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন তাহার সারা দেহে দারুণ বেদনা; মাথা যেন খসিয়া পড়িতেছে। গায়ের উত্তাপও স্বাভাবিক নয়। ধীরে ধীরে সে বিছানার উপর উঠিয়া বসিল। এ সময় জ্বর স্থায়ী হইলে তাে চলিবে না—তাহার এখনাে অনেক কাজ বাকী । প্রথমতঃ, চাংলীর বিচারের সময় তাহার উপস্থিতি অপরিহার্য ; দ্বিতীয়তঃ, হরেলকে আজিকার মধ্যেই হাজত হইতে বাহির করিয়া তাহাকে মায়ার কাছে পৌছাইয়া দিতে হইবে। হাজতে হরেন্দ্রের অসুখ করিয়াছে। সেখানে তাহার সেবা- শুক্রয়া কিরূপ হইতেছে তাহা তরুণ জানে না। যদি অসুখ -ড়িয়া থাকে ? তরুণ অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইয়া পড়িল। সে যে মায়ার কাছে অঙ্গীকার করিয়া আসিয়াছে—হরেন্দ্রকে সে সুস্থ শরীরে মায়ার কাছে ফিরাইয়া আনিবে। সে প্রতিজ্ঞা কি সে রক্ষা করিতে পারিবে না ! মায়ার কথা স্মরণ করিয়া তরুণ মনে মনে একটি অনির্বচনীয় স্নিগ্ধতা মুভব করিল ! অসামান্য মেয়ে এই মায়া ! তাহাকে

রেশমী ফাস
৭৮
,
;
ভগ্নীরূপে লাভ করিয়া তরুণ নিজেকে গৌরবান্বিত মনে
করিয়াছে।
মায়ার পত্রখানি এখনাে তাহার টেবিলের উপর পড়িয়া
রহিয়াছে। মায়া লিখিয়াছে—
দাদা ; কাল ভ্রাতৃদ্বিতীয়।। এই দিন আমাদের বাঙালী
মেয়েদের একটী পবিত্র স্মরণীয় দিন। এই দিনে এতদিন পৰ্যও
নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যহীন মনে করিতেছিলাম ; কিন্তু ভগবানের
আশীর্বাদে সে দুঃখ আমার দূর হইয়াছে। কাল আপনি অবশ্য
অবশ্য সন্ধ্যার পর আসিবেন। কালিকার শুভদিনে আমাদের
পবিত্র সম্পর্ককে পাকা করিয়া লইয়া ধন্য হইব। ইতি
;
আপনার স্নেহধন্যা মায়া।
পত্রখানি কাল আসিয়াছে। আজ সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ।
এ নিমন্ত্রণ তরুণকে রক্ষা করিতেই হইবে। শুধু নিমন্ত্রণ
রক্ষাই নয়, আজ তাহার প্রতিজ্ঞাও পালন করিতে হইবে। একটি
অপরিচিতা তরুণীর নিকট হইতে সে যে স্নেহ ও ভক্তি অর্জন
করিয়াছে, তাহার মর্যাদা রক্ষা করিয়া তরুণ সেই মেয়েটির
জীবনের চরম দুঃখকে দূর করিবে।
মায়া আজিকার উৎসব-অনুষ্ঠানে তরুণের জন্য, যত
সহকারেই আয়ােজন করুক, তাহার মনু যে স্বামীর আকস্মিক
বিপদে অনুক্ষণ আৰ্ত্ত হইয়া আছে—তাহা তাে তরুণের অবিদিত
তাই আজিকার এই সান্ধ্য উৎসবে মায়া প্রকাশ্যে, *
প্রফুল্লচিত্ত থাকিলেও মনে মনে সে যে স্বামীর বিরহে অধিকতর
বেদনাতুর হইয়া উঠিবে—তাহা তরুণ নিশ্চিত জানে।।
নাই।
,

রেশমী ফাস
৭১
তাই তরুণ স্থির করিয়াছে যে আজ সন্ধ্যার সময় একা না
গিয়া হরেন্দ্রকেও তাহার সঙ্গে লইয়া গিয়া মায়ার উৎসবকে সে
পরিপূর্ণ সার্থক করিয়া তুলিবে। কিন্তু আজই তাহার দেহ এমন
করিয়া তাহার সহিত অভদ্র ব্যবহার শুরু করিল।
তরুণ উঠিয়া বসিয়া ভৃত্য রামচরণকে ডাক দিল।
রামচরণ তাহার বহুদিনের বিশ্বাসী ভৃত্য। সেই তরুণের
আত্মীয় স্বজনহীন গৃহের সমস্ত কিছু ব্যাপারের তদন্ত করে।
গৃহস্থলীর কাজ-কর্মে রামচরণ সিদ্ধহস্ত।
সে আসিলে তরুণ তাহার হাতে এক টুকরা কাগজ দিয়া
কহিল—চরণ, একবার ডাক্তার বাবুর কাছে যাও ! রাত থেকে
জ্বরবোধ কছি ।
ডাক্তার বাবু বলিতে রামচরণ তাহাদের প্রতিবেশী ডাক্তার
রঞ্জিত মুখােপাধ্যায়কেই বুঝিল। রঞ্জিত তরুণের বন্ধু ! প্রয়োজন
হইলে সেই তাহার চিকিৎসা করে।
পত্র খানি হাতে লইয়া রামচরণ কহিল—জর বেশী হয়েছে
নাকি ?
; বেশী নয়।
বেশী হলেই বা করছি কি! এতেও জ্বর হবে না তো কিসে
হবে। নাওয়া খাওয়া শিকেয় উঠলল—সারা দিন টো টো
করে ঘুরে বেড়ান ;• মানুষের শরীরে একি সহ্য হয় ? কতদিন
ধরে বছি বাবু
তরুণ হাসিয়া তাহাকে থামাইয়া বলিল—আচ্ছা লেকচার
দিও পরে। এখন যাও; নইলে রঞ্জিত আবার বেরিয়ে যাবে।
রামচরণ বিড়বিড় করিয়া বকিতে বকিতে বাহির হইয়া

রেশমী ফাস
গেল। তরুণ সেদিনের সংবাদপত্র খানা তুলিয়া পুনরায় শুইয়া
পড়িল ।
মিনিট দশেকের মধ্যেই রঞ্জিত আসিয়া উপস্থিত হইল।
পরীক্ষা করিয়া বলিল—কিছু না! এর জন্যে আবার ওষুধ কি !
স্রেফ ক্লান্তি—অত্যধিক পরিশ্রম জনিত দেহের অবসাদ 'এক
কাপ গরম দুধ তােমায় চাঙ্গা করে দেবে, তার সঙ্গে ফেঁাটা
দশেক ভাইনাম গ্যালিসাই—অবশ্য যদি তােমার আপত্তি
থাকে। আর এই পিল দুটো; এখন একটা আর
সন্ধ্যায় একটা ; আর দুপুর বেলা এক গ্লাস hot lemonade
(গরম নেবুর জল )—ব্যাস, কাল সকালে তুমি যেমন ছিলে,
তেমনি।
তরুণ হাসিয়া কহিল-কাল সকালের জন্যে অপেক্ষা করবার
সময় নেই; আজ বিকেলের মধ্যেই আমি যেমন ছিলাম তেমনি
হ’তে চাই ; তার জন্যে যা ওষুধ দেবার তাই দাও!
অজি বিকেলের মধ্যেই। তার মানে কি ?
মানে হচ্ছে—বিকেলে আমায় বেরুতেই হবে।
জরুরী কাজ! তা ছাড়া রাত্রেও নিমন্ত্রণ আছে।
বিকেলে বেরুতে তুমি পারবে; কিন্তু আমার মনে হয় রাত্রের
নিমন্ত্রণটা বাদ দিতে পারলেই ভালাে হয় !
অসম্ভব! আজকের নিমন্ত্রণে আমায় যেতেই হবে।
ডাক্তার চোখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল-তাই নাকি! এমন
জরুরী নেমন্তন্ন ! আচ্ছা, আমার এই বড়ি খেলেই হবে! চল্লাম
এখন। কাল সকালে আসবাে! গুড-তে !
গুড-ডে !
;
অত্যন্ত

রেশমী হাস
ডাক্তারের নির্দেশ অনুসারে পথ্য ও ঔষধ বড়ি খাইয়া তরুণ
অনেকটা সুস্থ বোধ করিল। তাহার জ্বর ছাড়িয়া গেল।
গায়ে বেদনারও উপশম হইল। সে তখন একখানা ট্যাক্সী
আনাইয়া গায়ে একখানা মােটা চাদর জড়াইয়া ডেভেনহ্যাম
'সাহেবের সহিত দেখা করিবার জন্য বাহির হইল ।
তাহাকে দেখিয়া সাহেব আদর করিয়া বসাইলেন; তরুণের
অসুস্থ শরীরের কথা শুনিয়া দুঃখ প্রকাশ করিলেন এবং অসুস্থতা
সত্ত্বেও সে বাড়ীর বাহির হইয়াছে বলিয়া অনুযােগ করিলেন।
তরুণ কহিল—আজ বেরুতাম না। কিন্তু একটা অত্যন্ত
জরুরী কাজে এসেছি আপনার কাছে।
আমার কাছে ! কি কাজ, বল।
তরুণ কছিল—হরেন্দ্রের স্ত্রীর কথা তাে আপনাকে বলেছি।
বেচারী যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে একাকী কত কষ্টের মধ্যে দিন
যাপন করছে, তা বলে শেষ করা যায় না। তার কাছে আমি
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছি—যত শীঘ্র পারি হরেন্দ্রকে তার কাছে ফিরিয়ে
আনবাে। আজ হরেন্দ্রের স্ত্রী আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে। তাই
-আমি মুনে করছি, আজ একা না গিয়ে, হরেন্দ্রকে সঙ্গে করে
নিয়ে যাবাে। সেইজন্যে আপনার কাছে এসেছি !
মিঃ ডেভেনহাম ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন-বুঝেছি। হরেন্দ্র
যাতে আজকেই ছাড়ান পায় তুমি আমায় তার ব্যবস্থা করতে
বলছ! কিন্তু আমি কি তা পারি, তরুণ ? তাতে বে-আইনী
করা হবে যে। তাছাড়া, মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত
.

রেশমী ফাস
তরুণ জোর দিয়া কহিল—তা আমি জানিনে। হরেন্দ্রকে
আজ মুক্তি দিতেই হবে আপনাকে! আপনি ইচ্ছে করলে
পারেন!
তরুণের কথা শুনিয়া মিঃ ডেভেনহাম একটু হাসিয়া
বলিলেন—ছেলেমানুষ ।
তারপর একজন সার্জেন্টকে ডাকিয়া সার হাটের ঘরে
দেখা করিবার জন্য পত্র পাঠাইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক
আসিল। মিঃ ডেভেনহ্যাম তাহার সহিত দেখা করিতে চলিলেন।
আধ ঘণ্টা পরে হরেন্দ্র মুক্তি পাইল।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। মায়া সমস্ত দিন ধরিয়া
পরিশ্রম করিয়া তরুণকে খাওয়াইবার জন্য আয়োজন করিয়া
তাহার অপেক্ষায় বসিয়া আছে। প্রথম যখন তাহার স্বামী
হঠাৎ পুলিসের কবলে পড়ে তখন সহায়-সম্বলহীন মায়া কি যে
করিবে তাহা ভাবিয়া কিছুই ঠিক করিতে না পারিয়া শুধু
তাহার অন্তরের আকুল কাকুতি ভগবানের চরণে নিবেদন
করিয়াছে !
এমনি সময় ভগবানের আশীর্বাদের মতাে তরুণ আসিয়া
দাড়ায় ! তাহাকে পাইয়া সেই দিগন্ত-বিহীন অন্ধকারের মধ্যে
মায়া ক্ষীণ আশার আলোেক দেখিতে পায়। তরুণকে নিজের
অগ্রজের পদে অভিষিক্ত করিয়া সে অনেকখানি আশান্বিতা
হইয়াছে।
সহসা তাহার চিন্তাসূত্র ছিন্ন করিয়া ডাক আসিল-কৈ,
মায়া কোথায় গেলে ?
।

রেশমী ফাস
এই যে দাদা, যাই।
মায়া ত্বরিত পদে অগ্রসর হইয়া আসিয়া তরুণকে অভ্যর্থনা
করিয়া ভিতরে লইয়া গেল। সম্মুখের খোলা দাওয়ার ওপর
আসন বিছাইয়া দিয়া কহিল—দাদার শরীরটা তাে তেমন ভাল
দেখাচ্ছে না। অসুখ-বিসুখ করেছে নাকি ?
সহাস্যে তরুণ কহিল—করেছিল। এখন সম্পূর্ণ ভাল আছি।
কিন্তু মারা, একটা কথা আছে।
কি কথা দাদা ?
আমার একটি বন্ধু, শুধু বন্ধু নয়—অামার ছোট ভাই-এর
মতাে সে—আমার সঙ্গে এসেছে। তাকে বাইরে দাড় করিয়ে
রেখেছি! আমার ইচ্ছ। সে-ও আজ আমার সঙ্গে এইখানে
নেমন্তন্ন গ্রহণ করুক !
মায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরব হইয়া কহিল—বেশ তাে
দাদা! আপনার বন্ধু যখন, তখন এর মধ্যে আর কথা কি আছে।
তাকে ডেকে আনুন।
শুধু তাে ডেকে আন্‌লেই হবে না। তাকে তােমায় খাতির
করতে হবে। আমি তাে ঘরের লােক, আমায় যত কর আর না
কর—তাকে বিশেষ যত্ন করে নিজে দাড়িয়ে থেকে খাওয়াতে
হবে। তাহলে তাকে আনি ডেকে ?
মায়া নীরবে ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি দিল। তরুণ হাসিমুখে
বাহির হইয়া গেল ।
কিছুক্ষণ পরে বন্ধুটিকে লইয়া সে যখন পুনরায় ভিতরে
আসিল, তখন মায়া সেখান হইতে সরিয়া গিয়া ঘরের মধ্যে
দ্বারের আড়ালে দাড়াইয়াছে।

রেশমী কঁসি
৮ ৪
তরুণ হাঁকিল-কই, মায়া গেলে কোথায় ?
তারপর বন্ধুটিকে উদ্দেশ করিয়া কহিল—জানো ভাই
ভগ্নীটি আমার অতিশয় লাজুক ! অতিথি সৎকারে মােটেই পটু
নয়। কই, মায়া বেরিয়ে এসাে।
ধীরে ধীরে অবগুষ্ঠি মায়া বাহির হইয়া আসিয়া অতিথিকে
উদ্দেশ করিয়া প্রণাম করিল। ওধার হইতে সশদে হাসিয়া
তরুণ কছিল—ময়া, আমার বন্ধু প্রণাম গ্রহণ করেন না।
সঙ্গে শেক-হ্যাণ্ড, (করমর্দন ) করতে হয়।
এই বলিয়া সহসা অগ্রসর হইয়া আসিয়া সে মায়ার একখানা
হাত টানিয়া লইয়া পার্শ্বস্থিত বন্ধুটির দক্ষিণ করের সহিত যুক্ত
করিয়া দিল।
তরুণের এই আকস্মিক আচরণের জন্য মায়া মােটেই প্রস্তুত
ছিল না; সে শীর্ণ-বিবর্ণ মুখে তাহার হাত টানিয়া লইতে গেল
কিন্তু পারিল না। দেখিল, অতিথি-মহাশয় বেশ শক্ত করিয়াই
তাহার হাতখানি ধরিয়া আছেন ।
মুহূৰ্ত্তমাত্র!
পরক্ষণেই সেই হাতের উপর চোখ পড়িতেই সে চকিত
হইয়া উঠিল। তারপর অতিথির স্মিত-প্রফুল্ল মুখের পানে।
নিমেষের জন্য দৃষ্টিপাত করিয়া মায়া তাহার বুকের উপরেই চেতনা
হারাইয়া পড়িল।

১১
চাংলীর বিচারের দিন ।
আদালতের বাহিরে অসম্ভব জনসমাগম হইয়াছে। আদালতের
বিশেষ অধিবেশনে বিশেষভাবে তাহার বিচার হইবে। বিচারকগণ
বিশেষভাবে নির্বাচিত।
আদালতে দর্শকের মঞ্চে সেদিন জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ।
শুধু নিমন্ত্রিত ব্যক্তি, কার্ড দেখাইয়’ প্রবেশাধিকার পাইতেছেন।
কিন্তু সেই নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণের সংখ্যাই সেদিন এত অধিক যে
গ্যালারিতে তিল ধারণের স্থান ছিল না। আদালতের বাহিরে
সে এক বিরাট ব্যাপার ! গাড়ীতে মানুষে একাকার
পথের উপর যেন সমস্ত পৃথিবী ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। বিচার
দেখিতে দূর-দূরান্তর হইতে লােক আসিয়াছে। হিন্দু, মুসলমান,
ইহুদি, পার্শী, মগ, বার্মিজ, জাপানী, মাদ্রাজী, সাহেব, বাঙালী
—সর্ব সম্প্রদায়ের লােক আদালত প্রাঙ্গণে সমবেত হইয়া সমস্ত
স্থানটিকে কোলাহলে—উন্মাদনায় আলােড়িত করিয়া তুলিয়াছে!
বেলা এগারটায় বিচার আরম্ভ হইবে। সকাল আটটা
হইতেই আদালতের সম্মুখের পথ-ঘাট বন্ধ। বেলা বাড়িবার
সঙ্গে সঙ্গে লােকসংখ্যাও বাড়িয়া চলিল,-ক্ৰমে এমন হইল যে
পুলিসে আর ট্রাফিক চালনা করিতে সক্ষম হইল ন—সেই
উত্তাল-উদ্বেলিত জনসমুদ্রকে আয়ত্ত করিবার সকল চেষ্টা
তাহাদের স্রোতের মুখে তৃণখণ্ডের মতই ভাসিয়া গেল। তখন
আদালতের বাহিরের গণ্ডগোল আরও বাড়িয়া উঠিল।

রেশমী ফাস ৮৬ আদালতের ভিতরে সেদিন অত্যন্ত কড়া পাহারা! ভিতরে যাহারা প্রবেশ করিয়াছিল সকলেই রুদ্ধ নিঃশ্বাসে বিচারের প্রতীক্ষা করিতেছিল! সকলেই ঔৎসুক্যে ও কৌতূহলে উদগ্রীব হইয়া পড়িতেছে। এবার ওধার হইতে কদাচিৎ নিম্ন কণ্ঠের ফিস্ ফিস্ শব্দ কিম্বা কোন পুলিস-পাহারার জুতার শব্দ শ্রুত হইতেছিল। উপর ওয়ালার আদেশ ছিল, আদালতের ভিতরে, কিম্বা বাহিরে কোথাও কোন চীনামান যেন দাড়াইয়া না থাকিতে পায় ; ত্রিসীমানার মধ্যে তাহাদের দেখিতে পাওয়া মাত্র, যেন তাহাদের গ্রেপ্তার করিয়া আটক করিয়া রাখা হয়। আদালতের দ্বারে দ্বারে সতর্ক পাহারা। ভিতরের একটি দ্বার দিয়া বিচারকগণ, সরকার পক্ষের উকিল এবং সাক্ষিপণ গমনাগমন করিবেন, এইরূপ স্থির ছিল। ডেভেহাম সাহেব ও তরুণ দশটা বাজিবার পরেই আদালতে উপস্থিত হইলেন। সাহেবের মুখ অতিশয় গম্ভীর! তরুণও খুব বিচলিত ছিল না। সিড়ি দিয়া উঠিতে উঠিতে ডেভেহাম সাহেব মৃদুকণ্ঠে তরুণকে বলিলেন—যতক্ষণ মকদ্দমা না শেষ হয়ে যাচ্ছে তত- ক্ষণ আমার শান্তি নেই। এ পর্যন্ত দলের কাউকে ধরতে পারলুম না। চাংলীর উদ্ধার করবার জন্যে তারা যে গােপনে চেষ্টা করছে—এ নিশ্চিত। কিন্তু আমরা তার কিছুই করতে পারছি না। দুজনে উঠিয়া নির্দিষ্ট কাায় প্রবেশ করিলেন। মিঃ ডেভেনহ্যাম একটা চুরুট ধরাইয়া সেদিনকার খবরের কাগজ খানা সম্মুখে ধরিয়াছেন, এমন সময় আদালী আসিয়া সেলাম করিয়া জাইল—জজ সাহেবেরা উপস্থিত। 1

রেশমী কাস
}
তরুণকে সঙ্গে লইয়া সাহেব বিচার-গৃহে প্রবেশ করিলেন।
সকলেই সমাগত। সকলের মুখেই গভীর চিন্তার রেখা! বিচারক
তিন জনেই স্ব স্ব আসনে আসিয়া বসিয়াছনে, প্রত্যেকের মুখেই
অাশঙ্কার ছায়া।
তরুণ মিঃ ডেভেনামের পাশে বসিয়া চারিদিক দেখিয়া
লইল, তারপর তাহার সতর্ক দৃষ্টি গ্যালারির উপর পড়িতেই সে
চমকিয়া উঠিল। আর একবার ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া সে
ভৈভেনহ্যাম সাহেবকে চুপি চুপি কহিল-গ্যালারীতে একটা
চীনা মেয়ে মানুষ রয়েছে দেখছি। কিন্তু কেমন করে এলো?
কোন চীনালোককে এর মধ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না—এই
রূপই তাে আদেশ ছিল।
—নিশ্চয়।
ডেভেনহ্যাম সাহেব তরুণের ইসারা অনুসরণ করিয়া চাহিয়া
দেখিলেন, সত্যই তো! একটি চীনা মহিলা গ্যালারীর এক কোণে
বসিয়া একখানা সংবাদ পত্র পাঠ করিতেছে ! তাহার পরণে
বহুমূল্য রঙীন রেশমের পোষাক, মাথায় ইংরেজ মহিলার টুপী, মুখে
ভেইল! ডেভেহাম সাহেব বিস্মিত হইলেন। চাপরাশীকে
ডাকিয়া গ্যালারীর দ্বাররক্ষীকে ডাকিয়া আনিবার আদেশ
দিলেন।
রক্ষী আসিয়া হাজির হইল । সাহেব কহিলেন—একটি •
চীনা মহিলা গ্যালারীতে ঢুকেছে, জানাে ?
রক্ষী ঘাড় নাড়িয়া কহিল—আজ্ঞে হ্য!! জানি বৈকি।
—টিকিট দিয়েছিল নিশ্চয়। কোন টিকিট দিয়েছিল,
সেখানা বার করে দিতে পারে ?

রেশমী ফাস
৮৮
রক্ষী বিনা বাক্যে তাহার হাতের তাড়া হইতে একখানি
টিকিট বাহির করিয়া সাহেবের হাতে দিল। সাহেব তাহাকে
স্বস্থানে ফিরিয়া যাইবার আদেশ দিলেন। সে চলিয়া গেল।
তখন ডেভেনহ্যাম সাহেব উঠিয়া ভিতরে গিয়া যে কৰ্ম্মচারী
কার্ড ও টিকিট বিতরণ করিতেছিল তাহার কাছে গেলেন এবং
হাতের টিকিটখানি দেখাইয়া প্রশ্ন করিলেন—এ টিকিট কার
নামে দেওয়া হয়েছে, তা বলে দিতে পারাে ?
কর্মচারী টেবিলের উপরকার মোটা খাতাখানা উল্টাইয়া
দেখিয়া বলিল—আপনার নামে, স্যার!
আমার নামে? অসম্ভব !!
আজ্ঞে হ্যা। এই যে আপনার নাম ।
কিন্তু আমি যে দশখানা নিয়েছিলাম, সেগুলো আমি বিতরণ
করেছি নিজের হাতে, তার মধ্যে এ নম্বর ছিল না।
কেরাণী বিনীতভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল—তা ঠিক। কিন্তু
তারপর আপনি একখানা পত্র দিয়ে একটি মুসলমান ভদ্রলােককে
পাঠিয়েছিলেন—তার হাতে আপনার নামে আর একখানি কার্ড
দেবার জন্য। এ সেই কার্ড।
মনে মনে ডেভেনহ্যাম সাহেবের বিস্ময়ের আর অন্ত রহিল,
! কহিলেন—সে চিঠিখানা ফাইলে আছে ?
আজ্ঞে আছে বৈকি; বলিয়া কেরাণী ফাইল হইতে একখানি
চিঠি বাহির করিয়া সাহেবের হাতে দিল। বিস্ময়-বিস্ফারিত
নেত্রে তিনি দেখিলেন, তাহারই অফিসিয়াল চিঠির কাগজ,
তাহারই হস্তাক্ষর এবং নীচে তাঁহারই স্বাক্ষর—একেবারে
হুবহু !!! এরূপ অদ্ভুত জাল তিনি আর-কখনাে দেখেন নাই।
.

রেশমী ফাস
-
নিজের হস্তাক্ষর নকল করা হইয়াছে অথচ তিনি নিজেই ধরিতে
পরিতেছেন না—অন্যের কি কথা!!
অবাক হইয়া তিনি পত্রখানি দেখিতেছেন এমন সময় সহসা
এজলাস হইতে একটা গোলমাল শােনা গেল ! ডেভেনহ্যাম
সাহেব বিস্মিত হইয়া দেখিলেন তরুণ ছুটিতে ছুটিতে তাহার
দিকেই আসিতেছে।
ব্যাপার কি তরুণ ?
যা ভয় করেছিলাম, তাই ! চাংলী পালিয়েছে।
বল কি ।
আদালতে আনবার জন্যে যখন তার কুঠরীর দরজা খােলা
হয়তখন দেখা গেল, সে নেই। তার কম্বলের বিছানার ওপর
একখানা চিঠি পড়ে আছে
ডেভেনাম সাহেব দ্বিতীয় কথা না বলিয়া এজলাসের দিকে
ছুটিলেন। আদালতের কর্মচারী-মহলে তখন ছুটাছুটি ব্যস্ততার
আর অবধি নাই। দর্শকের দল কানাঘুষায় ব্যাপারটা অনুমান
করিয়া নিম্নস্বরে কলরব করিতেছে। চারিদিকে যেন একটা
এস্ত অভিভূত ভাব ।
ডেভেনহ্যাম সাহেবকে দেখিয়া প্রধান ট্রাইবিউল বৃদ্ধ
বিচারপতি গ্ৰীয়ার সাহেব উঠিয়া দাঁড়াইয়া কম্পিত কণ্ঠে কহিলেন
--মিঃ ডেভেনহাম ! আসামী পালিয়েছে-
ইহার অধিক কথণ তাঁহার মুখ দিয়া বাহির হইল না।
কপিতে কাপিতে তিনি চেয়ারে বসিয়া পড়িলেন।
ডেভেহ্যাম সাহেব, মিঃ গ্ৰীয়ারের অতখানি বিচলিত ভাব
দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। নিকটে গিয়া তাহার হাত হইতে

রেশমী ফাস চাংলীর পত্রখানি লইয়া পাঠ করিতে লাগিলেন। পত্র পাঠ শেষ, হইতেই তিনি বুঝিতে পারিলেন, কেন গ্ৰীয়ার সাহেব ওরূপ ভীত হইয়া পড়িয়াছেন। পত্রে লেখা ছিল- প্রিয় ডেভেহাম ! আমাকে বঁধিয়া রাখিবে মনে করিয়াছিলে ? ফাসী কাষ্ঠে ঝুলাইবার সাধ ছিল বােধ হয় ! কি স্পর্ধা তােমার !! অম্মাির কেশাগ্র স্পর্শ করিতে পারে—এমন ক্ষমতা তােমার বা তােমাদের ভারতীয় পুলিশের নাই। আমি চলিলাম—সাধ্য থাকে ধরিও। আজ আমাকে বিচার করিবার যে ধৃষ্টতা তােমাদের হইয়াছিল তাহার জন্য তােমাকে কিছু বখশিষ দিব। 'যে বৃদ্ধ প্রধান বিচারপতি অামাকে ফাঁসী কাষ্ঠে লটকাইবার জন্য বিশেষ সাজসজ্জা করিয়া আসিয়াছে, অামার ফাঁসীতেই সে আজ মরিবে । ইতি তােমার অতি প্রিয় । “চাংলী।” পত্র পড়িয়া ডেভেনহাম সাহেবের মুখ লাল হইয়া উঠিল। কিছুক্ষণের জন্য তাঁহার মুখ দিয়া বাক্য নির্গত হইল না। তারপর মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করিয়া লইয়া, সম্মুখর ভিড় সরাইয়া অগ্রসর হইয়া জনসঘকে উদ্দেশ করিয়া আদেশ করিলেন-আদালত-ঘরের সমস্ত দ্বার বন্ধ করে দাও। 'ক্ষণের জন্যে কেউ ঢুকতে বা বেরুতে পাবে না। জেল, সুপারিনটেনডেন্ট, কৈ ? বলিদানের পাঁঠার মতাে কাপিতে কাঁপিতে সুপারিনটেনডেন্ট কিছু রেশমী ফাস আসিয়া হাজির হইল। তাহার প্রতি তীক্ষ দৃষ্টিপাত করিয়া কঠোর কণ্ঠে মিঃ ডেভেনহাম কহিলেন—আপনাকে আমি বিশেষভাবে বলেছিলাম—আপনার সমস্ত শক্তি ওই কয়েদীর প্রতি নিযুক্ত থাকুক ! তবুও সে পালিয়ে গেল। যাক্, আপনার কথা পরে হবে ; কাল যারা ওই পলায়িত আসামীর পাহারায় ছিল তাদের প্রত্যেককে এখুনি হাতে হাতকড়ি দিয়ে হাজতে বন্ধ করুন! নিশ্চয় কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যে অপরাধী তাকে এর জন্যে চরম শাস্তি গ্রহণ করতে হবে। ডেভেনহ্যাম সাহেবের মূর্তি দেখিয়া বিচারপতি হইতে আরম্ভ করিয়া পেয়দা পৰ্যন্ত সকলেই সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। রাগে তাহার কপালের পাশে শিরাগুলা ফুলিয়া উঠিয়াছে ! সমস্ত মুখ রক্ত বর্ণ ! ওষ্ঠদ্বয় পরস্পর দৃঢ়-সন্নিবদ্ধ !—সারা দেহ ঘেরিয়া যেন ক্রুদ্ধ সিংহের বিক্রম বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িতেছে। উত্তেজিত দর্শকবৃন্দকে উদ্দেশ করিয়া তিনি হাঁকিয়া বলিলেন—ভদ্র- মহোদয়গণ ! আপনার। অনর্থক কলরব করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবেন না। আমি এইমাত্র যে আদেশ দিলাম—অত্যন্ত প্রয়োজনবোধেই সে আদেশ আমায় দিতে হয়েছে; তাতে আপনাদের কোন ভয় নেই, ইংরাজের আদালতের ভিতরে দাড়িয়ে যারা নিরপরাধ তাদের কোন শঙ্কা নেই, শুধু অপরাধীকে খুঁজে বার করবার জন্যই মিঃ ডেভেহাম মিঃ ডেভেনহ্যাম !! দ্বিতীয় বিচারপতি টন্ সাহেবের ব্যাকুল আহ্বানে তাহার বাক্যস্রোতে বাধা পড়িল। ফিরিয়া দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিলেন- মিঃ টস? কি বলছেন,

রেশমী ফঁস
"একবার চট করে
এদিকে আসুন ;
গ্ৰীয়ার সাৰে
মূচ্ছা গেছেন !!!
সেকি ! বলিয়া ডেভেহ্যাম সাহেব একলাফে গ্ৰীয়ার
সাহেবের কেদারার কাছে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন,
গ্ৰীয়ার সাহেবের মাথাটি এক ধারে হেলিয়া পড়িয়াছে ; চোখ
দুটী মুদ্রিত ; হাত দুইটী কেদারার দুই পাশে ঝুলিয়া পড়িয়াছে ।
মিঃ ডেভেনহ্যাম ক্ষিপ্রগতিতে তঁাহার নাড়ী দেখিলেন,
তারপর বুকের উপর হাত রাখিলেন। আরও নীচু হইয়া
তাহার মুখের পানে তাকাইতেই তাহার নজরে পড়িল, গ্ৰীয়ার
সাহেবের গলদেশের চতুপাশ ঘেরিয়া একটি অতি সূক্ষ্ম রেশমের
ফাস ! নিমেষেই বােঝা গেল—এ মূৰ্ছা আর ভাঙিবে না।
ডেভেনহাম সাহেব তখন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া স্তম্ভিত জনসঘকে
উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন—প্রধান বিচারপতি মিঃ গ্ৰীয়ার নিহত
হয়েছেন ।
১২
মিঃ ডেভেনহামের আদেশ অনুসারে গ্রীয়ার সাহেবের দেহ
স্থানান্তরে পাঠানাে হইল। তারপর চলিল অাদালতে উপস্থিত
সমস্ত লােকদিগকে সার্চ করিবার পালা। কিন্তু সন্দেহজনক
কোন কিছুই পাওয়া গেল না।
বিশেষ করিয়া গ্যালারীর সেই চীনা-রমণীকে গ্রেপ্তার করিবার
জন্য যে-সকল সার্জেন্টদের পাঠানাে হইয়াছিল, তাহাদের
পরিশ্রমের শেষ রহিল না। সমস্ত আদালত-বাড়ী তাহারা
।

রেশমী ফাস
"
এব্রার দুইবার তিনবার ধরিয়া তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান
করিল কিন্তু সেই চীন-রমণীর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না।
সার্জেন্টদের এই ব্যর্থতায় ডেভেহ্যাম সাহেব দ্বিগুণ উত্তেজিত
আবার তাহাদের খুজিতে পাঠাইলেন। আবার তাহারা বিফল
হইয়া ফিরিয়া আসিল। তখন ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তি দিবার
অদেশ দিয়। তিনি গাড়ী করিয়া পুলিস-আপিসে আসিয়া নিজের
ঘরে প্রবেশ করিলেন ।
আপিসে আসিয়া তিনি কাহারাে সহিত বাক্যালাপ করিলেন
না। সােজ। নিজের ঘরে প্রবেশ করিয়া পাইপ ধরাইয়া নিজের
চিন্তায় মগ্ন রহিলেন। কেহ তাহার সহিত কোন কথা কহিতে
আসিবার সাহসও করিল না।
আজিকার ঘটনায় ডেভেনহাম সাহেবের স্বভাবতঃ শীতল
মস্তিষ্ক অতিশয় উত্তপ্ত হইয়! উঠিয়াছিল ! এরূপ ঘটনা ও নিজের
এরূপ পরাজয় তাহার জীবনে তিনি কখনো ভোগ করেন নাই।
শুধু সে জন্যে ও নয়, অন্য আর একটি কারণে ও তাহার ক্ষোভ
এবং দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। আদলত হইতে বাড়ী আসিবার
সময় অনেক অনুসন্ধান করিয়া ও তিনি তরুণকে খুঁজিয়া পান :
নাই। গোলমালের মধ্যে সে কোথায় অদৃশ্য হইল। তাহার
বিনা অনুমতিতে সে যে কোথাও চলিয়া যাইবে—এমন ছেলে
তরুণ নয়। তবে ? শেষে, ঐন্দ্রজালিক চাংলী কি তাহাকেও
ধরিয়া লইয়া গেল ? কে জানে!
সকালের ঘটনাটি তিনি আগাগােড়া আর একবার ভাবিয়া
দেখিলেন। চাংলী যে নিজের মুক্তির জন্য একবার শেষ-চেষ্টা
করিবে তাহা তিনি জানিতেন এবং তাহা জানিতেন বলিয়াই
=

রেশমী ফাস
তাহার জন্য ভাল করিয়া প্রস্তুত হইয়াছিলেন। কয়েদ ঘরগুরি
যে অংশ সর্বাপেক্ষা সুদৃঢ় সেই অংশেই তিনি চাংলীকে আবদ্ধ
করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাহার ঘরের আশে পাশের কোন
ঘরে কোন কয়েদীকে রাখিতে দেন নাই। চাংলীকে পাহারা
দিবার জন্য কোন ভারতীয় সিপাহী রাখেন নাই-বাছাই করা
ইউরোপীয় সার্জেন্ট নিযুক্ত করিয়াছিলেন
কিন্তু এত সব সতর্কতা সত্ত্বেও কয়েদী অদৃশ্য হইল ! শুধু
অদৃশ্যই নয়, তারপর আদালতের ভিতর অসিয়া যাহা করিল
তাহা যেমন অভূতপূৰ্ব তেমনি লজ্জাদায়ক! দুইশত সতর্ক
প্রহরীর মধ্যে, অসংখ্য পুলিস-অফিসারগণের চোখের সম্মুখে
এজলাসে বসিয়া প্রধান বিচারপতি শক্তহস্তে নিহত হইলেন
এবং সে শত্রু নিরাপদে পলাইয়া গেল—ইহার চেয়ে লজ্জার
কথা আর কি হইতে পারে ?
তারপর তরুণ ! তরুণের কথা মনে হইতেই তিনি ব্যাকুল
হইয়া উঠিলেন। কোথায় তরুণ? কে তাহাকে বলিয়া দিবে ?
এমন সময় দ্বারে মৃদু করাঘাত হইল। সাহেবের মুখ দিয়া
বাহির হইল—তরুণ ! ফিরে এলে ?
মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন—তাহার আদালী দ্বারে দাড়াইয়া ।
সে সেলাম করিয়া জানাইল, একটা ট্যাক্সী-ড্রাইভার এক খানা
জরুরী রােকা আনিয়াছে। সে নিজে তাহা সাহেবের হাতে
দিতে চায়। অন্য কাহাকেও দিবে না।
ডেভেনহাম সাহেব বিস্মিত হইয়া লােকটিকে আনিতে আদেশ
দিলেন। ট্যাক্সী-ড্রাইভার ঘরে প্রবেশ করিয়া সুদীর্ঘ এক সেলাম
কবিয়া হাতের কাগজ খানি সাহেবের হাতে দিল।
.

রেশমী ফাস এক টুকরা কাগজে এক ছত্র লেখ!। কিন্তু সেই সামান্য লেখাটি পাঠ করিয়াই সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তাহাতে লেখা ছিল- গ্ৰীয়ার সাহেবের হত্যাকারিণীর অনুসরণ করিলাম। কোথায় যায় জানি না ! তরুণ মিঃ ডেভেহাম তখন তাহাকে জিজ্ঞাসা বাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। এক ঘণ্টা ধরিয়া প্রশ্নের পর প্রশ্ন করিয়া তিনি লোকটির নিকট হইতে যাহা জানিলেন তাহার মস্মার্থ এইরূপ দেখা গেল সম্মুখের গাড়ী হইতে একটী চীনা স্ত্রীলোক গঙ্গার তীরে নামিয়া একখানি নৌকাতে উঠিয়া বসে। আমাদের গাড়ীখানি তথায় উপস্থিত হইলে—বাবুটী গাড়ী হইতে নামিয়াই আমাকে এই পত্রখানি দিলেন এবং বলিয়া দিলেন—এখনি আপনার নিকট দিবার জন্য । এজন্য তিনি দশ টাকা বখশিসও দিয়াছেন। সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, বাবুটী তাহার পর কি করিল ? তিনি তারপর একজন সাহেবের সঙ্গে কথা বলিতেছিলেন। তা দেখেই আমি গাড়ী নিয়ে চলে এলাম। সাহেব আর কোন প্রশ্ন না করিয়া ড্রাইভারকে বিদায় দিলেন। ; আদালতে প্রবেশ করা অবধি তরুণ একটি বিষয়ে নিজেকে নিয়ােজিত রাখিয়াছিল ; প্রথম হইতেই সে চীনা-স্ত্রীলােকটির উপর নজর রাখিয়াছিল। চাংলীর পলায়নের খবর দিয়াই তরুণ ডেভেনহ্যাম সাহেবের পিছু পিছু ছুটিয়া আদালতে আসিয়া প্রবেশ রেশমী স করিল এবং ডেভেনহ্যাম-সাহেব যখন অন্য কাজে নিজেকে ব্যাপ্ত রাখিলেন, সে তখন গ্যালারীর একটি বিশেষ অংশে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করিল। দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াই দেখিল, স্থান শূন্য। চীন। স্ত্রীলােকটি সেখান হইতে অদৃশ্য হইয়াছে। তরুণ যাহ! আশঙ্কা করিতেছিল তাহাই ঘটিল নাকি ? শেষ অবধি রমণীটি কি পলাইল ? তরুণ অতিমাত্রায় চঞ্চল হইয়া ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। সহসা তাহার দৃষ্টি পড়িল বিচারকের আসন মঞ্চের দিকে। চতুর্দিকে গণ্ডগােল ও বিশৃঙ্খলা। কেহ কাহারাে দিকে নজর দিতেছে না। সকলেই নিজ নিজ প্রাণের আশঙ্কায় ত্রস্ত বিচলিত। সেই হট্টগােলের মধ্যে তরুণ দেখিল, কয়েক জনের পশ্চাতে প্রধান বিচারপতির আসনের পিছন দিকে একটি রঙীন গাউনের , প্রান্ত ভাগ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো অদৃশ্য হইয়া গেল। তরুণ চমকিয়া উঠিয়া সেই দিকে ধাবমান হইল । প্রধান বিচারকের খাসকামরা ও এজলাসে বসিবার আসন- মঞ্চের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র দ্বার আছে। বিচারপতি অবসর কালে .ঐ দ্বার দিয়াই খাস কামরায় যান এবং ঐ পথেই স্বীয় আসনে আসিয়া বসেন। দ্বারের উপর একটি পরদা টাঙানো আছে। ভীড়ের ভিতর দিয়া স্ত্রীলােকের পরিচ্ছদের অংশ দেখিয়া করুণ প্রাণপণে সেই দিকে ছুটিয়া গেল। গিয়া দেখিল, মঞ্চে কেহ নাই, শুধু পিছনের পরদাটা বিপুল বেগে দুলিতেছে এবং তাহারই পিছনে চকিতের ন্যায় কে যেন ছুটিয়া যাইতেছে। মুহুৰ্ত্তমাত্র ! তরুণ বিহ্বল হইয়া একবার পরদার দিকে আর একবার গ্রীয়ার সাহেবের আসনের দিকে দৃষ্টিপাত করিল।

রেশমী কাস
১৭
দেখিল, শ্রীয়ার সাহেব কি রকম যেন হইয়া গেছেন—ধীরে ধীরে
তাহার মাথাটি হেলিয়া পড়িতেছে ! তঁাহার কণ্ঠ বেড়িয়া অতি
সূক্ষ্ম একটি রেশমের ফঁাস।
এক নিমেসেই তরুণ ব্যাপারটি বুঝিতে পারিল। তারপর
আর অন্য কোন দিকে মন না দিয়া সে পদ।ট। দুছাতে ঠেলিয়া
দিয়া ঘরের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল।
ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, তাহার অপর প্রান্তের
প্রান্তের দ্বার বন্ধ
রহিয়াছে ! তাহা হইলে অপরাধিনী কোন্ পথে পলাইল ?
এদিক ওদিক অনুসন্ধান করিয়া তরুণ দেখিল, ঘরের অন্য প্রান্তে
অবস্থিত বাথরুমের দ্বার ঈং উন্মুক্ত। সে ঘরে প্রবেশ করিয়া
দেখিল, ঘরের যে পথ দিয়া মেথর গমনাগমন করে সেই পথের
দ্বার খোলা। সে তখন সেই দিকে ধাবিত হইল।
কল ঘরের পিছনে মেথরের উঠা নামা করিবার ঘোরানাে
সিড়ি। সেই সোপান-শ্রেণী যেখানে শেষ হইয়াছে, সে-স্থানটি
আদালতের সংলগ্ন হইলেও, অত্যন্ত আবর্জনা পূর্ণ ; সেখানে মেথর
বা ঝাড়ুদার ভিন্ন অন্য কেহ যাতায়াত করে না। সেই অপরিষ্কত,
প্রাচীরের ধারে পথে বাহির হইবার একটি ছোট দরজা অাছে।
তরুণ দেখিল, সে দরজাটি খােলা এবং তাহা পার হইয়া সেই
চীনা-স্ত্রীলােকটি ক্ষিপ্রপদে বাহির হইয়া যাইতেছে। চীৎকার
করিয়া লােক জড় করিলে হয়ত কাজ হইতে পারে ; হয়ত ঐ
স্ত্রীলোকটিকে ধরা যাইতে পারে। কিন্তু তরুণ নিশ্চিত জনিত,
.আসল কাজ তাহাতে সিদ্ধ হইবে না। তাহাকে ধৃত করিয়া
টুকরা টুকরা করিয়া কাটিয়া ফেলিলেও তাহার মুখ দিয়া কোন
কথা, বাহির করা যাইবে না; এদিকে তাহার বিরুদ্ধে প্রমাণ
•

রেশমী ফাস
১৮
•
সংগ্রহ করাও সহজ হইবে না। তাই তরুণ সে চেষ্টা না করিয়া,
তাহাকে অনুসরণ করিবার মনস্থ করিল ; তারপর যাহা করিবার
তাহা পরামর্শ করিয়া স্থির করিবে। সে ক্ষিপ্র পদে সিডি
দিয়া নামিয়া চলিল।
তরুণ যখন খোলা দরজা দিয়া রাস্তায় উপস্থিত হইল, তখন
স্ত্রীলােকটি একটি মোটর গাড়ীতে উঠিয়া বসিল ; গাড়ীখানি
দেখিতে দেখিতে তীর বেগে ছুটিতে আরম্ভ করিল।
ভাগ্যক্রমে সম্মুখেই একখানা ট্যাক্সী পাওয়া গেল।
লাফ
দিয়া তাহার উপর তরুণ চড়িয়া বসিয়া, ড্রাইভার কিছু বুঝিতে
পারিবার অাগেই, সে গাড়ীতে ষ্টার্ট দিয়া শক্ত করিয়া ঈীয়ারিং
ধরিয়া গাড়ীর গতি হুহু করিয়া বাড়াইয়া দিল।
এইবার শিথ ড্রাইভার দুর্বোধ্য ভাষায় কি একটা বলিয়া
তাকে বাধা দিবার উদ্যোগ করিল। তরুণ তখন একটা হাত
পকেটের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া একমুঠা টাকা বাহির করিয়া
সেগুলা ড্রাইভারের কোলের উপর ফেলিয়া দিয়া কহিল—আমি
পুলিশের লোক! ঐ সামনের গাড়ীতে একজন খুনী আসামী
পালাচ্ছে, ওকে ধরতেই হবে। তুমি আমায় বাধা দিও না।
পুলিশের কাছে তুমি অনেক পুরস্কার পাবে।
ব্যাপার বুঝিয়া ও অর্থলােভে সন্তুষ্ট হইয়া শিখপুঙ্গব নিরস্ত
হইল। তরুণ গাড়ীর গতি আরও বাড়াইয়া দিল। গঙ্গার তীরের
'ফাকাস্রাস্তা দিয়া দুইখানা মােটর নক্ষত্ৰবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে—
যেন তাহারা বাজী খেলিতেছে। কলিকাতা সহরের উপর দিয়া,
এত জোরে গাড়ী চালাননা পুলিশের নিষেধ। আজ সেই নিষেধ
এরূপভাবে অমান্য হইতে দেখি পথের মােড়ে মােড়ে

রেশমী ফাস
কনেষ্টব-সার্জেন্টদের দল রােষ-কায়িত লােচনে গাড়ী দুইটার
প্রতি তাকাইতেছে এবং তাহাদের নম্বর টুকিয়া লইতেছে।
দেখিতে দেখিতে তাহারা খিদিরপুর ডক-এর কাছে আসিয়া
উপস্থিত হইল। সম্মুখের গাড়ীখানি পঞ্চাশ-ষাট হাত আগে
ছিল। সহস। সেখানি থামিয়া গেল এবং রমণী ক্ষিপ্রপদে গাড়ী
হইতে অবতরণ করিয়া জাহাজ-ঘাটের দিকে ছুটিয়া চলিল।
সে-স্থানে পৌছিয়াই তরুণ গাড়ী হইতে নামিল এবং ছুটিয়া
গিয়া লক্ষ্য করিল, রমণী ঘাটে নামিয়া একখানি শাদা রঙের
পানীর উপর উঠিয়া বসিল। নিমেষে পানসীখানি ঘাট ছাড়িয়া
দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হইল।
তরুণ ফিরিয়া আসিয়া নিজের নােট বই হইতে পাতা
ছিড়িয়া তাহাতে একছত্র লিখিয়া সেখানি ট্যাক্সি ড্রাইভারের
হাতে দিয়া কহিল—এই চিঠিখানি সোজা পুলিশ আপিসে নিয়ে
যাবে এবং নিজে পুলিশের খোদ কৰ্ত্তা ডেভেনহ্যাম-সাহেবের
হাতে এই পত্রখানি দেবে। এ-কাজে অবহেলা করাে না ;
তোমার নম্বর আমার কাছে রাখলাম। পরে যাতে তােমার।
ভাল হয়, সে ব্যবস্থা আমি করব।
• ড্রাইভার সেলাম করিয়া চিঠি লইয়া গাড়ীতে উঠিয়া বসিল।
তরুণ ফিরিয়া পুনরায় ঘাটের দিকে যাইল। জেটির গায়ে একখানি
মােটর-লাঞ্চ দাড়াইয়া ছিল। তরুণের ইচ্ছা, যদি কোন রকমে
ঐ লাঞ্চখানা পাওয়া যায়, তাহা হইলে সে অনায়াসেই ওই সুদূর
যাত্রী নৌকাখানার অনুসরণ করিতে পারে।
জেটির উপর উপস্থিত হইয়া সে দেখিল, তাহার পরিচিত
ও ডেভেনাম-সাহেবের বন্ধু মিঃ ডেন দাঁড়াইয়া অন্য একটি

রেশমী ফাস
সাহেবের সহিত কথা কহিতেছেন। মিঃ ডেন খিদিরপুর ডকের
বড় সাহেব। তরুণ তাহার শরণাপন্ন হইল।
তরুণের কথা শুনিয়া ডেন সাহেব বলিলেন—আমার যতটুকু
সাধ্য আমি আপনাকে সাহায্য করব। এক বিষয়ে আপনার
অদৃষ্ট ভাল। মোটর লাঞ্চখানা অামারই। চলুন এই মুহূর্তেই
ওদের অনুসরণ করি।
দুইজনে ক্ষিপ্রপদে অগ্রসর হইয়া লাঞ্চে উঠিলেন। সাহেব
নিজেই লাঞ্চ চালাইতে সুরু করলেন। কয়েক মিনিট পরেই
দূরে অগ্রগামী পানসীখানি দেখিতে পাওয়া গেল। সাহেব
লঞ্চের গতি আরও বাড়াইয়া দিলেন। তাহা দেখিয়া তরুণ
তঁাহাকে গতি হ্রাস করিতে অনুরোধ করিল। সাহেব বলিলেন
—কেন! চল না ওদের গিয়ে ধরে ফেলা যাক।
তরুণ কহিল—না, তাতে ফল হবে না, ওদের দল আছে।
চাংলীর দল। সেই দলের কাছে ওরা যাচ্ছে বােধ হয়। এখন
ওদের ধ’রলে সেই দলের সন্ধান পাওয়া যাবে না। তার চেয়ে
ওদের অনুসরণ করে ওদের আড্ডা দেখে আসি, পরে দলবল
নিয়ে আক্রমণ করব। এখন ওরা না জানতে পারে যে কেউ
ওদের পিছু নিয়েছে।
সাহেব কথাটা বুঝিলেন ; বুঝিয়া, মােটর বােটের গতি
মৃদু করিয়া দিলেন এবং বােটের মধ্যকার একটি চামড়ার
রাক্স হইতে দূরবীণ বাহির করিয়া তরুণের হাতে দিলেন।
দূরবীণ পাইয়া তরুণ মহা খুসী হইল। ঠিক এই বস্তুটিই সে ।
তখন কামনা করিতেছিল। একটু আড়ালে বসিয়া দূরবীণের
সাহায্যে সে নৌকাখানির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল।

রেশমী ফাস
১০১
নৌকার দাড়ি ছয়জন প্রাণপণ শক্তিতে বাহিয়া যাইতেছে।
নৌকাখানি এ-দেশীয় পন্সিী নয়।
হয়ত কোন বিদেশী-
ব্যবসাদারের সখের তরণী। মাঝিগুলিও হিন্দুস্থানী নয়।
চট্টগ্রামী মুসলমান কিম্বা মগ হইবে। নৌকার মধ্যস্থলে বসিয়া
রমণীটি এক একবার পিছনে চাহিতেছিল, তারপর উত্তেজিত
ভাবে মাঝিদিগকে কি আদেশ দিতেছিল।
এই সময় দূর হইতে দম্ করিয়া তোপের শব্দ অসিল,
অর্থাৎ শহরের সমস্ত বাট বন্ধ হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে তরুণ
দেখিল দক্ষিণ দিক হইতে একখানি মোটর লাঞ্চ নৌকার দিকে
অগ্রসর হইয়া আসিতেছে এবং নৌকাখানিও তাহার গতি হ্রাস
করিয়া দিয়াছে। ক্রমে নৌকাখানি লঞ্চের গায়ে লাগিল এবং
নৌকা হইতে রমণীটি ক্ষিপ্র পদে লঞ্চের উপর উঠিলে লাঞ্চের
মুখ ঘুরাইয়া নক্ষত্ৰবেগে সমুদ্রের দিকে ছুটিল। তরুণের অনুরোধে
ডেন-সাহেবও তাহার বেটের গতি বাড়াইয়া দিলেন।
গাঙে তখন জোয়ার আসিয়াছে; প্রতিকূল স্রোত ঠেলিয়া
অগ্রসর হওয়া সহজ ব্যাপার নহে। কিন্তু ডেন সাহেব পাক।
মাঝি। এ-অঞ্চলে তিনি বহুবার লাঞ্চ চালাইয়া যাতায়াত
করিয়াছেন। সুতরাং তিনি কখনো ঘাটের নিকট দিয়া কখনো
মাঝ-গঙ্গার উপর দিয় পূর্ণ বেগে এবং সুকৌশলে লাঞ্চ ঢালাইয়া
শীঘ্রই আগের লাঞ্চখানির কয়েক গজ পিছনে রহিলেন। দেখা
গেল লাঞ্চখানি তখন প্রকাণ্ড একখানা বিদেশগামী মনোয়ারী
জাহাজের গায়ে ভিড়িতেছে।
পিছনের লাঞ্চ দেখিয়া জাহাজের আরােহী ও সেই রমণীর
বিশেষ সন্দেহ হইয়াছিল। তাহারা ঘন ঘন এই দিকে দৃষ্টি

রেশমী ফাস ১০২ নিক্ষেপ করিয়া পরস্পর কি বলাবলি করিতেছিল। দূর হইতে । তরুণ জাহাজের আরােহীদের এই ভাবান্তর দেখিয়া বলিল— দেখুন, আমি এক কাজ করি। হালের নীচে যে ছােট খুবরি-টা রয়েছে আমি ওর মধ্যে ঢুকি। আপনি খুবরিটার সামনে একখানা কম্বল চাপা দিয়ে দিন। তারপর আপনি বোট নিয়ে জাহাজের সামনে দিয়ে যাতায়াত করুন, ওরা দেখুক যে বােটের মধ্যে আপনি ছাড়া আর দ্বিতীয় ব্যক্তি কেউ নাই । সাহেব ব্যাপার বুঝিয়া লইয়া তরুণের কথায় সম্মত হইলেন। তরুণকে লুকাইয়া রাখিয়া তিনি মোটর-বেট লইয়া সেই নােঙর করা জাহাজের পাশে গিয়া দাড়াইলেন। লাঞ্চের অন্যান্য ব্যক্তিগণ তখন জাহাজের উপর উঠিয়া রেলিংএর ধারে দাঁড়াইয়া ডেন- সাহেবের লাঞ্চ-এর গতিবিধি নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। ডেন সাহেব জাহাজের উপরকার দর্শকদের উদ্দেশ করিয়া বলিলেন-আমি খিদিরপুর উ-এর ম্যানেজার এবং পোর্ট কমিশনারের একজন কমিশনার। এ জাহাজ পরশু উক্ থেকে বেরিয়েছে তা জানি এবং এখানে এসে আবার খারাপ হয়ে গেছে তাও জানি। আমি জানতে চাই, জাহাজ সারাবার জন্যে ড থেকে মিস্ত্রীরা এসে কাজ করে গেছে কিনা। এ-জাহাজের কাপ্তেন কোথায় ? আমি তার সঙ্গে কথা কইতে চাই। উপরের লোকগুলা এতক্ষণ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে লাঞ্চের ভিতর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখিতেছিল অন্য কোন লােক তাহার মধ্যে আছে কিনা। যখন দেখিল যে অন্য কেহ নাই তখন একজন ছুটিয়া গিয়া কাপ্তেনকে ডাকিয়া আনিল। চীন-যাত্রী জাহাজ। কাপ্তেন জাপানী। সাহেবের প্রশ্নের ।

রেশমী চাস উত্তরে জানাইল, মিস্ত্রীরা আসিয় অজিকার কাজ সারিয়া গিয়াছে। কাল সকালে আবার আসিবে। কাজ অল্পই বাকী আছে। আশা করা যায় কাল দুপুর নাগাদ তাহারা জাহাজ চালাইতে সক্ষম হইবে । সাহেব গম্ভীরভাবে কাপ্তেনকে জানাইলেন যে, যত শী পারা যায় তাহারা যেন জাহাজ সরাইয়া লইয়া যায়, কারণ এরূপ অস্থানেজাহাজ থামাইয়া রাখা বে-আইনি। তবে কিনা, এই জাহাজের মালিক তাহাদের পুরণে। খরিদ্দার তাই। অন্য কেহ হইলে, তাহাদের ফাইন করা হইত। কাপ্তেন সসমে জানাইলেন যে আগামী কাল তাহাদের জাহাজ নিশ্চয় এ-স্থান ত্যাগ করিবে। সাহেব তখন লাঞ্চ ঘুরাইয়া উত্তর-মুখে হইলেন। দূরে পশ্চিমাকাশে সূৰ্য্য অদৃশ্য হইল । একটা বঁাকের মুখ ঘুরিতেই তরুণ বাহির হইয়া আসিল, কহিল–থাক, অনেক দরকারী খবর জানা গেছে। ভাগ্যে অপ- নাকে পেয়েছিলাম তাই। ওঃ! আপনাকে কত যে ধন্যবাদ সাহেব হাসিয়া বলিলেন-থাক্ ! আগে তোমার কাজ উদ্ধার হােক তারপর। এখন কি করবে ? আমি এখন এখানে নেমে যাবে। তীর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে অন্ধকারে সাতরে ওই জাহাজের ওপর উঠবে।। একলা ? ক্ষেপেছে নাকি ? অজ্ঞে না। আমি প্রকৃতিস্থ-ই আছি। এ-ছাছা আর কোন উপায় নেই। অজি রাত্রে জাহাজে উঠে আমায় ওদের ওপর নজর রাখতেই হবে। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে এই যে—যদি জাহাজ ওরা এখুনি ছেড়ে দেয়—তাহলেই সর্বনাশ !

রেশমী কাস
১০৪
না, সে-বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। আমি ঐ
জাহাজ খানার ইতিবৃত্ত জানি। ওর মালিক আমাদের অনেক
দিনের মাশুল পাওনা রেখেছে। তাই ওখান সারিয়ে দিতে
আমরাও দেরি করছি। ইচ্ছে করলে, কাল মিস্ত্রীদের বলে
দিলে--পাচদিন ওর যাওয়া বন্ধ রাখতে পারি।
তরুণ কছিল—অাজ রাতে তো আর চালাতে পারবে না।
তাহলেই হোল। আমি এইখানেই নামি। আপনি এককাজ
করুন। সােজা ডেভেনহ্যাম-সাহেবকে গিয়ে খবর দিন। তিনি
সদল বলে এসে উপস্থিত হলে যা করণীয় তাই করা যাবে।
ইতিমধ্যে আমি জাহাজে উঠে ওদের ওপর লক্ষ্য রাখি।
সাহেব কহিলেন—বেশ তবে তাই হোক। এই নাও,
এই রবারের টুপীর মধ্যে তােমার ও আমার এই পিস্তল দুটো
ভ’রে দড়ি দিয়ে টুপীর মুখ বন্ধ করে সঙ্গে রাখাে। আমি যথা-
সম্ভব শীঘ্ৰ মিঃ ডেভেনহামকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসছি। ইতিমধ্যে
খুব সাবধানে থাকবে। কোন রকম হঠকারিতা করে নিজের
অনিষ্ট করে না।
সাহেবের শুভকামনায় তরুণের চিত্ত অর্দি হইল।
তাহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া, পিস্তলের মােড়কটি
নিজের হাফু-প্যান্টের বেল্টের সঙ্গে বঁধিয় জলে নামিয়া পড়িল।
সাহেব নক্ষত্র বেগে কলিকাতা অভিমুখে রওনা হইলেন।
(म

গভীর অন্ধকার রাত্রি। নদীর উভয় পারে নানা জাতীয়
কারখানার বৈদ্যুতিক অলাের রশ্মি নদীর জলে প্রতিফলিত
হইতেছে। মাথার উপরে অসংখ্য তারা উঠিয়াছে। তাহারাও
নদীর জলে তাহাদের ছায়া ফেলিয়াছে। প্রকাণ্ড জাহাজখানা
নেশায় অচৈতন্য দানবের মতাে যেন নির্জীব হইয়া পড়িয়া
আছে। নদীর জলে তাহার বিরাট কালাে ছায়া। জাহাজের
নীচের তালার কক্ষগুলি হইতে নানা-প্রকারের শব্দ হইতেছে ;
সারেঙ্গ-খালাসীর দল নিজেদের নৈশ-আহার সমাধা করিয়া
তাহাদের তৈজসপত্র পরিষ্কার করিতে ব্যস্ত। খােলা ডেক।
জনশূন্য। তাহারই এক-প্রান্তে একটা শূন্য-গর্ভ মদের-পিপার
মধ্যে তরুণ বসিয়া বসিয়া শ্রান্তিতে ঝিমাইতেছে।
এমনি ঝিমাইতে ঝিমাইতে আরও একঘণ্টা কাটিয়া গেল।
ক্রমে নীচেকার শব্দ কমিয়া আসিল, সমস্ত জাহাজময় নিস্তব্ধতা
বিরাজ করিতে লাগিল। তরুণ বুঝিল, নাবিকগণ বিশ্রাম করিতে
যে যাহর স্থানে প্রস্থান করিয়াছে।
তখন সে পিপার ভিতর হইতে বাহির হইল। পিস্তল
বাগাইয়া ধরিয়া গুড়ি মারিয়া এদিক ওদিক ঘুরিয়া নীচে নামিবার
সিড়ি খুঁজিতে লাগিল। একে উন্মুক্ত নদীবক্ষ, তাহার
ওপর হুহু করিয়া বাতাস বহিতেছে। তরুণের ভিজা পরিচ্ছদ
শােভিতঙ্গে কাঁপুনি ধরিল ।
সিড়ি পাইয়া সাহসে ভর করিয়া সে একেবারে নীচে
নামিয়া গেল। সম্মুখেই বয়লার। তাহা হইতে ঈষৎ উজপ

রেশমী ফাঁস । বাহির হইতেছে। তরুণ বয়লারের গা ঘেসিয়া আরও অধি ঘণ্টা বসিয়া থাকিয়া নিজের পরিচ্ছদ-আদি শুষ্ক করিয়া লইল ; তারপর উঠিয়া তাহার অনুসন্ধান শুরু করিল। নীচের তলায় থাকে খালাসীর দল। তাহাদের তখন নাসিকা গর্জন শুরু হইয়াছে। দ্বিতলে উঠিয়া তরুণ দেখিল—সম্মুখেই একটি ছােট ঘর—শূন্য। বােঝা গেল, এ-ঘরে কেহ থাকে না। মাল বোঝাই হয়। তাহার পাশের ঘরের দরজায় লেখা কাপ্তেন। এ-পাশের ঘর গুলি বাহির হইতে তালা বন্ধ। ভিতরে মাল বােঝাই! তরুণ ত্রিতলে উঠিল। ত্রিতলে ঘব বেশী নাই। ফাঁকা স্থানই বেশী। প্রয়ােজন হইলে এখানেও মাল রাখা যাইতে পারে। পিছন দিকে স্নান-এর ঘর, পর পর দুটী তিনটি সারাঁধা। সহসা খট্‌ করিয়া শব্দ হইতেই তরুণ নিমেষে পাশের স্নানাগারের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল এবং দ্বার ঈষৎ উন্মুক্ত করিয়া সম্মুখের দিকে দৃষ্টি সঞ্চারিত করিল। দেখিল, ওধারে একটি ছােট ঘরের দ্বার খুলিয়া একটি চীনাম্যান বাহির হইয়া নীচে নামিয়া গেল। তরুণ আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠিল । কিছুক্ষণ পরে সেই চীনাটা পুনরায় উপরে উঠিয়া আসিল। তরুণ দেখিল, প্রকাণ্ড একটা গালায় করিয়া খাদ্যদ্রব্য লইয়া লােকটা সেই ছােট ঘরেই প্রবেশ করিল। তরুণ তাহার গুপ্তস্থান হইতে বাহির হইয়া অতিসন্তর্পণে রেলিংএর ধার ঘেঁসিয়া সেই কক্ষের দিকে অগ্রসর হইল। দ্বারের বাহিরে দাড়াইয়া কাণ পাতিয়া সে শুনিবার চেষ্টা করিল, ভিতরে কোন কথাবার্তা হইতেছে কি না। কিন্তু না ; ঘর নিস্তব্ধ। তরণ সাহস অবলম্বন করিয়া ধীরে ধীরে দরজাটি ঠেলিয়া ঘরের রেশমী ফাস • ভিতরে উকি মারিয়া দেখিল—শূন্য ঘর, জন-প্রাণী নাই। সে তখন সেই ঘরের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল। যাহা অনুমান করিয়াছিল, তরুণ দেখিল, ঠিকই তাহাই। সেই ঘরের মধ্য দিয়া অন্য আর-একটি কক্ষে যাওয়া যায় এবং সম্মুখেই তাহার দ্বার। দরজা ঠেলিয়া দেখিল বন্ধ নাই ; দ্বার খোলাই আছে। ভিতরে চীনাম্যানের দুর্বোধ্য কিচির মিচির ঘরটিকে মুখর করিয়া তুলিয়াছে। দুইটী ঘরের মধ্যে কাঠের পার্টিশান। তরুণ যেখানে দাঁড়াইয়া- ছিল সেখানকার পার্টিশানের মধ্য দিয়া অপর ঘরে দৃষ্টি চালনা করিবার মত ফাক আছে। সেই ফঁাকের মধ্যে চোখ রাখিয়া সে রুদ্ধ-নিঃশ্বাসে ভিতর-কার লোকগুলিকে দেখিতে লাগিল। চাংলী বসিয়া আছে সবার পিছনে একটা উচু গদীর উপর। তাহার সম্মুখেই একটি খােলা কৌটার মধ্যে সেই মুক্তার মালা ! চাংলীর মুখে নিশ্চিন্ততার বিজয়-উল্লাস। আহার সমাপ্ত করিয়া সকলে তখন শুইয়া পড়িয়াছিল। কেবল একা চাংলী বসিয়া সম্মুখের আর একটি অনুচরের সহিত কথা- বার্তা বলিতেছিল। ক্রমে সেই অনুচরটির হাই উঠিতে লাগিল। তাহা দেখিয়া চাংলী হাসিয়া তাহাকে পা দিয়া ধাক্কা মারিতেই সে গড়াইয়া ঘরের এক প্রান্তে চলিয়া গেল এবং সেই খানেই লম্বা হইয়া শুইয়া নাক ডাকাইতে সুরু করিল। ঘরের মধ্যে উগ্র চণ্ডুর গন্ধ পাট- শানের ফাক দিয়া বাহির হইয়া আসিতেছে। চাংলী তখন আর-একবার কণ্ঠহারটিকে নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিল, তারপর সেটিকে কৌটায় বন্ধ করিয়া সবার অলক্ষ্যে ঘরের

রেশমী ফাস
১০৮
গাত্র-সংলগ্ন একটি ক্ষুদ্র গহ্বরের মধ্যে রাখিয়া গহ্বরের দ্বার রুদ্ধ
করিয়া দিল। তরুণ আপনমনে হাসিল। চাংলী মনে করিতেছে
—কেহই কিছু দেখিতে পাইল না, সবাই ঘুমে অচেতন। কিন্তু
জানিতে পারিল না, সেই মুহূর্তে বাহিরে তাহার সর্বনাশ
ঘনাইয়া আসিতেছে।
কিন্তু একাকী তরুণ কি করিবে ? যদিও সে দেখিল, সেখান
হইতে সরিয়া গিয়া চাংলী তাহার নিজের বিছানায় শুইয়া কিছু
ক্ষণের মধ্যেই ঘুমাইতে আরম্ভ করিল, তথাপি সে ঘরে ঢুকিয়া
ওই মুক্তার মালা চুরী করিতে সাহসী হইল না। দশ-পনের জন
চীনা শুইয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একজন কেউ জাগিয়া
উঠিলেই হইল। তাহা হইলে মুক্তার মালা তাে দূরের কথা,
নিজের প্রাণ লইয়া ফিরিয়া যাওয়াই অসম্ভব হইবে।
ভাবিতে ভাবিতে তরুণ ধীরে ধীরে ঘর ছাড়িয়া ডেকের উপর
আসিল। কাল সকালেই হয়ত তাহার! জাহাজ ছাড়িবে।
তখন তাহাদের সঙ্গে এমনি লুকাইয়া থাকিয়া অনাহারে অনিদ্রায়
সে কতদিন ঘুঝিবে ? একমাত্র ভরসা ডেন সাহেব যদি
মিঃ ডেভেনহ্যামকে খবর দিয়া থাকেন এবং তাহারা যদি
সময় মত আসিয়া পড়েন, তবেই। কিন্তু রাত্রিও বেশী বাকী
নাই। দ্বিপ্রহর বহুক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়াছে।
তরুণ শ্রান্ত পদে উপরে উঠিতেই সহসা তাহার কাধের উপর
বিরাট এক চড় আসিয়া পড়িল। তরুণ উলিয়া পড়িল।
পরক্ষণেই উঠিয়া দাঁড়াইয়া পিস্তল উদ্যত করিতেই সে দেখিল
তাহার সম্মুখে সহাস্য মুখে দাড়াইয়া, মিঃ ডেভেনহ্যাম !!
তুরুণকে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ কষিয়া সস্নেহ কণ্ঠে সাহেব

রেশমী ফাস বলিলেন-তোমায় যে ফিরে পাবাে তরুণ, এ-অাশা আমার ছিল ! তারপর খবর কি বল । ডেভেনহ্যাম সাহেবের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া প্রথম কয়েক মুহূৰ্ত্ত তাহার মুখ দিয়া কথা সরিল নং-আনন্দে সে এমনি অভি- ভূত হইয়া পড়িয়াছিল। তারপর প্রকৃতিস্থ হইয়া ক্ষিপ্রকণ্ঠে “সে সকল-কথা সাহেবের কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করিল। শুনিয়া সাহেব বলিলেন—সাহসী ছেলে ! তোমায় নিয়ে আমার নাচতে ইচ্ছে করছে ! তরুণ কহিল—চিঠি পেয়েছিলেন। নিশ্চয়। খুব বুদ্ধি খাটিয়েছিলে। ঘাটে এসে নিরাশ হয়ে চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই—মিঃ ডেন গিয়ে হাজির। আর কি শুনবে বল ? একা এসেচেন ? ডেন সাহেব আসেন নি ? নিশ্চয় এসেছে। শুধু কি সে-ই। সঙ্গে এক ডজন সার্জেন্ট ও তাদের উপযুক্ত এমুনিশান। চল, তাদের ওপরে আনি। তখন দুই জনে নোঙর-এর কাছে গিয়া দাড়াইলেন ; ডেভেন- হ্যাম সাহেবের ইঙ্গিত পাইতেই নীচের মোটর-লাঞ্চ হইতে একে একে সার্জেন্ট-দের দল নোঙর বাছিয়া উপরে উঠিয়া আসিতে লাগিল। সব শেষে আসিলেন—ডেন সাহেব। সবাই স্থির হইয়া দাড়াইলে ডেভেনহাম সাহেব সকলকে তাহাদের কর্তব্য বুঝাইয়া দিলেন। স্থির হইল, তরুণ অগ্রে অগ্রে গিয়া দরজা দেখাইয়া দিবে, তারপর সকলে মিলিয়া এক যােগে চীনাদের আক্রমণ করিবে। প্রথমে তাহাদের আত্মসমর্পণ করিতে বলা হইবে। তাহা যদি হয় ভালই।

রেশমী ফাস নতুবা যুদ্ধ অনিবাৰ্য। তখন সকলে নিঃশব্দ পদবিক্ষেপে তরুণের পিছনে পিছুনে চলিল। অকাশে-বাতাসে তখন রাত্রি শেসের শীতল স্তব্ধতা। দূরে পরপারের কোন কারখানার কুলি-ব্যারাক হইতে কোরাস সঙ্গীতের বেলা সুর ভাসিয়া আসিতেছে। নিথর জলের উপর থাকিয়া থাকিয়া ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হইতেছে। মধ্যে মধ্যে জলের ভিতর হইতে দুই একটা মাছ বা জল জন্তু লাফাইয়া জলের উপর ভিতেছে। ধীরে ধীরে অভিযান নিদ্রিত চীনাদের ঘরের সম্মুখে গিয়া দাড়াইল। মিঃ ডেভেনহাম তখন তরুণকে ইসারা করিতেই সে সরিয়া আসিয়া সবার পিছনে দাড়াইল। তারপর দম করিয়া লাথি মারিয়া দ্বার খুলিয়া দিতেই নিদ্রিত চীন- গুলা হত চকিত হইয়া উঠিয়া বসিল। চাংলী সৰ্ব্বাগ্রে উঠিয়া দাঁড়াইল। তখন চীনারা সভয়-বিস্ময়ে দেখিল একেবারে কতকগুলি বন্দুকের নল ঘরের উন্মুক্ত দ্বার দিয়া তাহাদের প্রতি উদ্যত! ভয়ে বিস্ময়ে চীনাগুলা বিহ্বল হইয়া ফ্যালফ্যাল করিয়া চাইলীর আদেশ অপেক্ষায় তাকাইয়া রহিল। মিঃ ডেভেনহ্যাম পিছন হইতে চীনা ভাষায় বলিলেন—সকলে, আত্মসমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের মরণ নিশ্চিত। ঘরের মধ্যে পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা। কাহারাে মুখে কোন কথা নাই। সকলেই নিশ্চল হইয়া বসিয়া আছে। শুধু পিছন দিকে সবার আড়ালে চাংলী ধীরে ধীরে এক পাশ হইতে আর এক পাশে সরিয়া যাইতেছে। তরুণ সবার পিছনে দাড়াইয়া লক্ষ্য রাখিয়াছিল, মুক্তাহার

রেশমী কাস
;
যে গহ্বরটির ভিতর ছিল, সেই গুপ্ত গহ্বরের প্রতি। সে দেখিল,
ধীরে ধীরে এক খানা হাত সেই গহ্বরের দ্বার খুলিবার চেষ্টা
করিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে পিস্তলের গিয়ার টিপিল ।
অবৰ্থ লক্ষ্য। ক্রুদ্ধ গর্জনে গুলি সেই হাত ভেদ করিল।
ডেভেনহ্যাম সাহেব বলিলেন-বৃথা চেষ্টা। পারবে না।
তার চেয়ে, আত্মসমর্পণ কর।
চাংলী কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল হইয়া দাড়াইয়া রহিল ; তারপর
সহচরদিগকে উদ্দেশ করিয়া কি বলিয়া উঠিল। তাহার কথা
শেষ হইবার সঙ্গেই চীনাগুলা লাফাইয়া উঠিয়া যে যাহার পিস্তল
বাহির করিতে লাগিল।
তখন উভয়পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল। সেই অবসরে
চাংলী মুক্তার মালাটি লইবার আর একবার চেষ্টা করিল, কিন্তু
তরুণ একাগ্র হইয়া সেই দিকে চাহিয়াছিল,—ফলে চাংলী
পুনরায় আহত হইল।
এ পক্ষের দুই জন সার্জেন্ট সজ্যিাতিক আহত হইল।
যুদ্ধ
শেষ হইলে, ঘরে ঢুকিয় হতাহতদের নির্বিচারে বাঁধিয়া ফেলা .
হইল এবং তাহাদের দেহ অনুসন্ধান করিয়া পিস্তল-ছােরা প্রভৃতি
যাহা পাওয়া যাইল বাহির করিয়া লওয়া হইল। তরুণের লক্ষ্য
সে-সব দিকে ছিল না। সে ছুটিয়া গিয়া সেই গহ্বর খুলিয়া
ফেলিয়া কণ্ঠহারটি বাহির করিয়া লইল এবং তাহা ডেন-সাহেবের
জিম্মায় রাখিল।
ডেভেনহাম সাহেব সহসা চীৎকার করিয়া উঠিলেন—তরুণ,
চাংলী কৈ ?
সে কি এর মধ্যেই আছে।

রেশমী ফাঁস
১১২
তখন অনেক খোঁজা খুঁজি হইল কিন্তু চাংলীকে পাওয়া
গেল না। শুধু দেখা গেল, সেই ঘরের এক কোণে খানিকটা
স্থান ফঁাক হইয়া রহিয়াছে ; সেখান দিয়া উকি মারিয়া দেখা
গেল—সেই ফাকের নীচে বিস্তৃত জলরাশি আন্দোলিত হইতেছে।
হয় ত যুদ্ধের সময় চাংলী এই স্থান দিয়াই লাফাইয়া পড়িয়াছে।
কাপ্তেনকে ডাকিয়া আনা হইল। সকল কথা শুনিয়া সে
বেচারা তো ভয়ে বিবর্ণ হইয়া উঠিল। প্রচুর ঘুস খাইয়া সে এই
চীনাগুলকে শান্তিপ্রিয় ব্যবসাদার মনে করিয়া তাহাদের জাহাজে
তুলিয়াছিল। কাপ্তেনকে সঙ্গে লইয়া সমস্ত জাহাজ তন্ন তন্ন
করিয়া অনুসন্ধান করা হইল, কিন্তু চাংলীকে পাওয়া গেল না।.
ভাের হইলে, দুইখানা লাঞ্চে অাহত চীনাদের সঙ্গে লইয়া
অভিযান কলিকাতা অভিমুখে ফিরিল। ডেভেনহ্যাম সাহেব
বলিলেন—এত ক'রে ও সে-লােকটাকে ধরতে পারলাম না।
আফশােষ রয়ে গেল। যাক্, মুক্তোর মালাটা যে পেয়েছি
এই যথেষ্ট।

উপসংহার কলিকাতা সহরে আর একবার হুলুস্থূল পড়িয়া গেল। নগরের সমস্ত কাগজে খবর বাহির হইল বঙ্গোপসাগরের উপর ভীষণ যুদ্ধের পর চাংলীর দল ধরা পড়িয়াছে। দুৰ্ব্ব ও চাংলী সে-যুদ্ধে ভবলীলা সাঙ্গ করিয়াছে। অসমসাহসী তরুণ গুপ্তের জন্যই এই অসম্ভব সম্ভব হইয়াছে। বড় বড় অক্ষরে তরুণের নাম কাগজে কাগজে ছাপা হইল। অজস্র অভিনন্দন-জ্ঞাপক চিঠি ও টেলিগ্রামে তাহার টেবিল ভরিয়া উঠিল। খুব সংক্ষেপে বিচারকার্য শেস হইল। যাহারা বাচিয়াছিল, প্রত্যেককেই গুরুতর দণ্ডে দণ্ডিত করা হইল। তাহাদের মধ্যে একজন সরকার-পক্ষের সাক্ষীরূপে এজাহার দিল । কেমন করিয়া চলী জেল হইতে পলায়ন করিয়াছিল এবং কি করিয়া প্রীয়ার সাহেব নিহত হইলেন, এই প্রশ্নদ্বয়ের উত্তরে সে যাহা বর্ণনা করিল তাহা যেমন বিচিত্র তেমনি কৌতূহলোদ্দীপক।. প্রথমে সে জেলখানা হইতে চাংলীর পলায়নের কথা বলিল। তাহাদেরই দুই সহচর নিশিন ও চাংসি জেলখানা হইতে চাইলীকে উদ্ধারের ভার লইল। চাংসির উপর ভার পড়িল জেল সুপারিন- টেণ্ডেন্টের নিকট হইতে কয়েদ-ঘরের চাবি গোপনে লইয়া তাহা হইতে মোমের ছাঁচ তুলিয়া লইবে এবং নিশিন বাকী বন্দোবস্ত করিবে। কয়েক দিন ক্রমান্বয়ে চেষ্টার পর চাংসি একদিন রাত্রে বিষাক্ত বাষ্প প্রয়ােগ করিয়া নিদ্রিত সুপারিনটেন্টেকে অজ্ঞান করিয়া সোহার কাৰ্য উদ্ধার করিল। এদিকে নিশিনও কোন

রেশমী কাস
১১৪
সুযােগ সুবিধা করিতে না পারিয়া—বিচারের একদিন পূর্বে সে,
এক সার্জেন প্রহরীর ঘরে দেখা করিল। তাকে টাকার লােভ
দেখাইয়া কিছুতেই যখন রাজী করিতে পারিল না তখন নিশিন
কোনও কৌশলে তাহাকেও বিষাক্ত গ্যাস প্রয়ােগে অজ্ঞান করিয়া
আপন পলায়ন পথ পরিষ্কার করিয়া লইল। সার্জেন্ট সে কথা
প্রকাশ করিল না।
তাহার পর স্থির হইল বিচারের পূর্বদিন শেষ রাত্রে যে কোন
উপায়ে হােক কাজ শেষ করিবে। কয়েদীর ঘরে যে লােকটী
প্রত্যহ চাংলীর খাবার লইয়া যাইত সে প্রত্যহ খাবারের থালাটী
কয়েদ-ঘরের কিছুদূরে নামাইয়া বিড়ি ধরাইয়া লইত। সেদিন
এই সুযোগে খাবারের থালার মধ্যে আমরা একটী সাঙ্কেতিক
চিহ্ন চাংলীর নিকট পাঠাই। সেই সাঙ্কেতিক চিহ্ন পাইয়া
চাংলী পলাইবার জন্য প্রস্তুত থাকে।
সেদিন শেষ রাত্রেদলের তিনজন লুকাইয়া জেলখানায়
উপস্থিত হইল! স্থির হইল চাংলীর ঘর হইতে প্রায় বিশ হাত
দূরে আর একটী কয়েদীর ঘরের সম্মুখে যে প্রহরী পাহারায়
থাকিবে—তাহাকে ফঁস লাগাইতে হইবে। সেই গণ্ডগােলের
মধ্যে অন্য সকলে যখন ব্যস্ত হইয়া পড়িবে—সেই সুযােগে
চাংলীকে উদ্ধার করা হইবে ।
ঘটনাও ঠিক তাহাই হইল। একজন ভারতীয় প্রহরীকে
যখন স লাগান হইল—সে হঠাৎ চীৎকার করিয়া উঠিল ।
সেই সময় চাংলীর ঘরের সম্মুখে চারজন প্রহরীর মধ্যে তিন জন
ছুটিয়া যাইল—একজন বসিয়া রহিল। নিদ্রায় তাহার চক্ষু
তখন বুজিয়া আসিতেছিল।

রেশমী ফাস এই সুযোগে নিশিন ও চাংসি দৌড়াইয়া সেই প্রহরীর নিকট উপস্থিত হইয়। পিছন হইতে কাপড় দিয়। চাংসি তাহার মুখ ও চোখ বাঁধিয়। ফেলিল। লোকটা বোধ হয় অতিরিক্ত মদ্য পান করিয়াছিল। সে বিশেষ কিছু বলিল না। নিশিন নকল চাবি দিয় চাংলীকে উদ্ধার করিয়া পলাইল। চাংসি তখন লোকটার মুখের কাপড় খুলিয়া দিয়া অন্ধকারে কিছু দূরে দাড়াইয়া রহিল। প্রহরী তিনজন ফিরিয়া আসিল। বোধ হয় নিদ্রিত মনে করিয়। সেই সার্জেন্টকে কোন কথা না বলিয়া তিন জনে অন্য কথা কহিতে আরম্ভ করিল। সেই সময় কেহই সন্দেহ করিল –চাংলী পলাইয়াছে। তারপর চাংলীর কথা। জেল হইতে পলাইয়া চলীর সাহস বাড়িয়া গেল। সে স্থির করিল প্রধান বিচারপতিকে সেই ফাসী দিয়া ভারতবর্ষ ত্যাগ করিবে। তখন সব বন্দোবস্ত হইল। নিশিন একজনকে দিয়া একখানা নিমন্ত্রণ পত্র চুরি করাইল এবং ডেভেহ্যাম সাহেবের সহি অবিকল নকল করিয়া কার্ড খানা চালীকে দিল। সহি নকল করিতে নিশিন অদ্বিতীয়। যথাসময়ে চাংলী ও চীনা রমণীর ছদ্মবেশে আদালত গৃহে সেই কার্ড লইয়া প্রবেশাধিকার পাইল । এদিকে চার পাঁচখান। মােটর গাড়ী বন্দোবস্ত করিয়া রাখা হইল—নিরাপদে চাংলীর পলাইবার জন্য । যখন তরুণ গুপ্ত চীনা রমণীকে সন্দেহের চক্ষে দেখিয়া সেভেন হাম সাহেবকে খবর দিল ও কাহার দেওয়া কার্ড লইয়া এই চীনা রমণী প্রবেশ করিল এই সমস্ত অনুসন্ধান চলিতেছিল সেই সুযোগে চাংলী সেন হইতে ঐয়ার সাহেবের খাস কামরায় প্রবেশ রেশমী ঈস ১১৬ করিল। পর্দার পার্শ্বেই সাহেব বসিয়া ছিলেন। কাজেই ফঁস পরাইতে চাংলীকে বিশেষ অসুবিধায় পড়িতে হইল না। দুঃসাহসী চীনাদের এই সমস্ত যড়যন্ত্রের কথা শুনিয়া উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইলেন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত কাহারও মুখে কোন কথা বাহির হইল না। তাহার পরের ঘটনা তরুণ প্রকাশ করিয়া বলিল । বিচার শেষ হইলে, সকলের সাক্ষাতেই ডেভেনহ্যাম সাহেব, তরুণকে আলিঙ্গন করিলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বলিলেন—এখানে আজ যারা উপস্থিত হয়েছেন, সবাই শুনুন। এই ভয়ানক বিপদ- সঙ্কুল অভিযানের যা কিছু কৃতিত্ব তা এই তরুণ গুপ্তের একার প্রাপ্য। তার সাহস ও বুদ্ধির সাহায্যেই আমরা কৃতকাৰ্য্য হতে সক্ষম হয়েছি। সমুদ্রগড়ের রাজা ও রাণী উভয়েই আদালতে উপস্থিত ছিলেন, তাহারা আসিয়া তরুণকে অভিনন্দিত করিলেন। শেষ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Reshmi Phas

Author
Not Available
Title
Reshmi Phas
File name
Reshmi Phas
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2009/07/16
Publisher
Sarat Chandra Chakraborty And Sons, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Reshmi Phas- Story
DLI number
551453
Barcode
4990010021137.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
aG3OujUxiH0
Download PDF

Reshmi Phas