Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Khuro Khuri Ed. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
খুড়াে খুড়ী
ঢাকা, উয়ারী, কালচার হাউসে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী
১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮ সন।
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
মুল্য । আনা মাত্র
sses seeeeee
প্রকাশক
শ্ৰীনিকুঞ্জবিহারী দাশগুপ্ত
পার্শনে এসিষ্টেন্ট,
কালচার হাউস, উয়ারী, ঢাকা।
Beerensenos perecederoso
ভাকা-
নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে,
শ্রীকালাচঁাদ বসাক দ্বারা মুদ্রিত।
{ পরিচয় )
রমেশ রায়
পুরুষ
হরেন্দ্রের জ্যাঠতুতো ভাই।
মৃগগন্দ্রের কাকা।
হরেন্দ্র রায়
৮ ।
মৃগেন্দ্র রায়
ফণীকর
দৌলৎ পাল
বিধু
স্ত্রী
মালতী ধর
}
০০০
খুড়তুতাে জ্যাঠতুতাে বােন।
নলিনী ধর
দীনময়ী
হিরন্ময়ী রায়
০ ০ ০
মালতী ও নলিনীর খুড়ী।
মৃগেন্দ্রের বয়স্কা কুমারী পিসী।
দীনময়ীর দাসী।
৬ ০ ০
•••
No text on this page.
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
দীনময়ীর বৈঠকখানা। অন্যান্য আসবাবের মধ্যে সেখানে একটি
trick chair রহিয়াছে, তার সামনের দিকের কিনারায় বসিলে
পড়িয়া যাইতে হয়। দীনময়ী, মালতী ও নলিনী ঘরে
রহিয়াছে। দীনময়ী সােফায় ঘুমাইতেছে, মালতী ও
নলিনীও ঘুমাইতেছে, কিন্তু যবনিকা উঠার সঙ্গে
সঙ্গেই তারা জাগিয়া উঠিল। মালতী হাই তুলিল।
নলিনী। তুই যে দিদি হাঁ করেই আছিস্?
মালতী। তাই নাকি? তবু তাে নাক ডাকাই না!
নলিনী। আর আমিই বুঝি ডাকাই ?
মালতী। যে নাক ডাকায় সে কি আর তা জানতে পারে।
বাবা! কি শব্দ! মনে হয় ধােপাবৌয়ের গাধাটা
বুঝি ডাকছে।
২
খুড়াে খুড়ী
নলিনী। দেখ, আর ওকথা তুলিস্ না।
এ আমার বিশ্বাস
হয় না। সামাজিক এবং প্রাণীর পর্যায়ে আমি
এতটা নেবে যেতে পারি তা আমার বিশ্বাস হয় না।
মালতী। তা বলতে পারি না, তবে স্বর পর্যায়ে তুই যে অনেক
উঠে গেছিলি তা নিশ্চয় করে বলা যায়।
দীনময়ী । ( ঘুমের মধ্যে) কে কোন্ পৰ্য্যায়ের লােক তার বিচার
হয় না।
নলিনী। কি, খুড়ীমা ?
দীনময়ী। দুধওয়ালা ভারি খারাপ দুধ দেয়। (দুই মেয়েই
হাসিয়া উঠিল )
নলিনী। হাঁ করিয়া স্বপ্ন দেখছে !
( দুজনের কথাবার্তা চাপা গলায় হইল, মাঝে মাঝে উভয়ে
দীনময়ীর দিকে চোখ ফিরাইয়া দেখিতেছিল ঘুমাইতেছে
কি না)
মালতী। আচ্ছা নলিনী, ফণীবাবুর চিঠি কবে থেকে পাস না ?
নলিনী। কাল থেকে নয়।
মালতী।
ওঃ! ভারি কষ্টের কথা ।
নলিনী। আজ আসবে কি না কে জানে?
মালতী। আমার কাছে জিজ্ঞেস করে লাভ ?
নলিনী। তােক জিজ্ঞেস কচ্ছিলুম না। আমাকেই জিজ্ঞেস
কচ্ছিলুম, তােকে জিজ্ঞেস করবার অন্য কথা আছে,
মৃগেন বাবুর চিঠি কবে থেকে পাস্ না ?
খুড়াে খুড়ী
মালতী। বেশী দিন থেকে নয়। তাকে আবার কবে দেখব
কে জানে। আচ্ছা নলিনী, (নলিনী উঠিয়া পা টিপিয়া
দীনময়ীর দিকে চাহিয়া trick chair এ গিয়া বসিল)
কাউকে না জানিয়ে মৃগেন বাবু আর আমার যদি
বিয়ে হয়ে যায় তাহলে খুব ভীষণ একটা কিছু হয় ?
নলিনী। শুধু আমাকে জানিয়ে।
মােলতী। হা, তােক তাে বটেই। কিন্তু বাবা যখন তার সম্বন্ধে
আপত্তি তুলছেন, আর আমাকে তার আধা বুড়াে
বন্ধুর হাতে সপে দিতে যাচ্ছেন, আর মৃগেন বাবুর
কাকাও যখন তার উপরে চালাতে চাচ্ছেন শ্ৰীমতী
চন্দনাকে—
দীনময়ী। (এখনাে ঘুমে) চন্দনা, তার রংটি তােত কিছু মন্দ না।
( চাপা গলায় উভয়ে খুব হাসিয়া লইল)
নলিনী। একেই বলে লােকে বিড়ালী ঘুম, না ?
মালতী। ওঃ, বিড়াল সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না, বিড়াল
আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না।
নলিনী। বিশেষতঃ বুড়াে বিড়াল—অর মৃগেন বাবুর পিসীর মত
বুড়াে ছুড়ি--আজও বিয়ে হয়নি—সে হচ্ছেনা কিন্তু।
মালতী। আমিও না। কিন্তু ওর কাকায় তাে চায় সেই ময়না,
, চন্দনা মেয়েটার টাকার সঙ্গে ওকে বিয়ে দিতে।
তাই যদি হয় আমি কি করব ? আমি তাে আর
কাউকে বিয়ে করতে পারব না।
খুড়াে খুড়ী
নলিনী। আচ্ছা, মৃগেন বাবু তােকে বিয়ের কথা কিছু বলেছে,
দিদি, (trick chair হইতে অন্য আসনে গিয়া উঠিয়া বসিল)
কারু মত না নিয়েই ? ঐ রকম মানুষকেই আমি
ভালবাসি।
মালতী। বেশ, তুই আর ফণী বাবু তাই কচ্ছি না কেন?
ততাদের দিয়েতে এইটুকু রােমান্স অসম্ভব নয়, আর .
ফণী বাবুর কাকাতাে আর তােদের বিয়ের বিরােধী
নয়।
নলিনী। এত তাড়া কিসের ? ওর কাকা বৰ্ম্মা থেকে আসলেই
হবে। লুকিয়ে বিয়ে করতে গেলে উপহার টুপহার
পাওয়া যাবে না—আমােদ আহ্লাদ, খাওয়া পরা
হবে না—তাতে করে বিয়ের অর্ধেক মজাই নষ্ট
হয়ে যাবে।
দীনময়ী। (এখনাে ঘুমে ) একটা যেমন তেমন বামুনকেও মাসে
দশটাকা বেতন দিতে হয়।
নলিনী। ঐ! খুড়ীমা আছে নিজ চিন্তা নিয়ে।
মালতী। (উঠিয়া সরিয়া গিয়া) না, বিয়ের কোনাে লক্ষণ
দেখছিনা—মৃগেন বাবু যা মাসিক খরচ পায়, তাতে
তাে আর পােষাবে না—অনুমতি না নিলে তাও বন্ধ
করে দেবে।
নলিনী। (উঠিয়া মালতীর কাছে গিয়া) দেখ, দিদি, মৃগেন বাবুর
কাকা চন্দনা পাখীর সঙ্গে তার বিয়ে দিতে প্রাণপণ,
খুড়াে খুড়ী
চেষ্টা করবে ; কাজেই তাের আশা খুব কম। তাের
প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে যে বুড়াে তার নাম না কি
বলি ?
মালতী । দৌলত পাল।
নলিনী।
তা বুড়াে প্রেমিকই মন্দ কি ?
মালতী। না, না, বুড়াে আমি দেখতে পারি না।
নলিনী। এটি তাে স্বতন্ত্র।
এমন ধনী।
মালতী। এই পালটাকে আমি ঘৃণা করি। সে যখন তখন
আমার দিকে দৃষ্টি হানে, রাগে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে
যায়। আচ্ছা, মৃগেন বাবু এখানে যদি আমার সঙ্গে
দেখা করতে আসে তাহলে খুড়ীমা কোনাে আপত্তি
করবে কি ?
নলিনী।
করবে না সে আশা করিস না।
মালতী। খুড়ীমাকে সন্মত করবার কোনাে উপায় করতে
পারিস্ কি ?
দীনময়ী। (উঠিয়া সরিয়া আসিয়া হাই তুলিয়া) কি রে, তােরা কি
করছিস্? (মেয়েরা চকিয়া উঠিল) খুব গরম না ?
নলিনী। খুব ঘুমিয়ে উঠলে, খুড়ীমা ?
দীনময়ী। না—না—মােটেই ঘুমাইনি তাে। চোখটা একটু
বুজেছিলুম মাত্র। তােদের চন্দনা ময়না এসব
শুনিছি আমি। (পিয়ন দরজায় ঘা দিল) ওঃ! পিয়ন
এসেছে। আমার কোনাে চিঠি থাকলে আমার
কাছে পাঠিয়ে দিস।
(নিষ্ক্রান্ত)
খুড়াে খুড়ী
মালতী। খুড়ীমা লােক ভালাে বটে, তবে মৃগেন বাবুর সম্বন্ধে
ওর এত আপত্তি কেন বােঝা যায় না। (জানালার
কাছে গিয়া) আমার মত দুঃখী কেউ নেই।
( চিঠি লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ)
নলিনী। চিঠি। চিঠি!
মালতী। চুলােয় যাক চিঠি! আমার কাছে কেউ লিখে না।
নলিনী। জ্যাঠা মশায় লিখেছেন, এই নে। ( চিঠি ছুড়িয়া দিল।
মালতী। দেখি। ( চিঠি লইয়া বসিল )
নলিনী। আমার একটা রয়েছে—ফণীবাবু লিখেছে-( উভয়ে
চিঠি খুলিয়া পড়িল) ওঃ! ওঃ !
মালতী। কি হয়েছে ?
নলিনী। (উঠিয়া চিঠী নাড়িয়া ঘরময় নাচিতে লাগিল) এখানে
আসছে—আজই--এখনই--
মালতী। (স্নান ভাবে) তা আসছেই তাে ঠিক ; কিন্তু আমি
এত নাচতে পারি না।
নলিনী। কি বলছিস্ তুই ? ( বসিল)
মালতী। দৌলত পাল! সেই কথাই বলছি আমি! বাবা
লিখেছেন শোন—“মালভী, আমাদের পুরানাে বন্ধু
দৌলত পাল আমার কাছে বিবাহের প্রস্তাব করিয়া-
ছেন। তিনি পরশু বিকালে আমাদের বাড়ী
যাইতেছেন, তাঁহাকে রীতিমত আদর অভ্যর্থনা
করিস।
সামান্য বয়সের কথাটা ছাড়িয়া দিলে এমন
খুড়াে খুড়ী
উপযুক্ত পাত্র আর কোথাও পাওয়া যায় না। (উভয়ে
মুখভঙ্গী করিল ও হাসিল) তাঁহার ধন সম্পত্তি পদমর্যাদা
সকল মেয়েরই কামনার বিষয় হওয়া উচিত। ইতি
তাের বাবা।” (উঠিয়া রাগের স্বরে) ঐ, শুনলিতাে ?
আমাকে বিক্রীর বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। বাবাকে
জানি। কি ভীষণ—কি অদ্ভুত! (চিঠি ছুড়িয়া ফেলিয়া
মাটিতে পদাঘাত)
নলিনী। ( চিঠি কুড়াইয়া) রাগিস্ না দিদি। আজকেই আসছে
তাহলে।
মালতী। যে দিন খুসি আসুক। আমি ওকে বিয়ে করবো না,
বিয়াল্লিশটা বাবা এলেও না—অদ্ভুত গােল ফুটবলটা।
ওকে আবার কেউ বিয়ে করে। (রাগিয়া পায়চারি )
ওঃ! ( হঠাৎ থামিয়া) অদ্ভুত কথা! ( পায়চারি) আচ্ছা,
মন্দ কি! হাে না ? ভালইতে। (পায়চারি )
নলিনী। দিদি, নিজে নিজে কি বিড় বিড় কচ্ছিস্? পাগল
হলি নাকি ?
মালতী। (নলিনীর কাছে গিয়া) দেহ্ নলিনী, আমাকে সাহায্য
করবি ? হঠাৎ এখন মনে হলাে লােকটা আমার
প্রেমে অমন পাগল, ওকে অতি সহজেই বােকা
বানানাে যাবে।
নলিনী। যা খুসি বানাস্ ওকে, আমার সাহায্য পাবি।
মালতী। দেখ, খুড়ীমা মৃগেন বাবুর কাকাকে চেনে না, এখন
৮
খুড়াে খুড়ী
দৌলত বাবুকে সেই কাকা বানিয়ে তাকে দিয়ে
খুড়ীকে বললে কেমন হয় যে আমাদের বিয়েতে ওর
মত আছে। তখন তাে মৃগেন বাবু এখানে আসতে
পারে।
নলিনী। জ্যাঠা মশায় যদি দৌলৎ বাবুকে মৃগেন বাবুর কথা
বলে থাকে ?
মালতী। বলেনি বাবা তা আমি জানি। ওর নামই মুখে আনে
না। বেশ হবে না ?
নলিনী। তাের প্রেমিকের জন্যে এতটা দৌলৎ বাবু করতে
যাবেন কেন ? এই সােজা পানি লােকটিকে।
মালতী। ( চিন্তিতভাবে ) না—( হঠাৎ কি মনে হওয়ায় ) ,
মনে হয়েছে, আমি তাকে বল্ব মৃগেন বাবু তাের
প্রেমিক।
নলিনী। ওঃ! বুঝলুম।
মালতী। তুই ভাণ করবি যে দুঃখে কষ্টে তাের মাথা কিছু
খারাপ হয়ে গেছে।
নলিনী। না, এ পারব না।
মালতী। লােকটা যদি যা বলি না করে তবে (গম্ভীর ভাবে )
তার হব না বদ্ধ।
নলিনী। কিন্তু আমার ফণীবাবু যদি শােনে তাের মৃগেন বাবুর
সঙ্গে আমার ভাব তাহলে কি বলবে ?
মালতী। সে পরে দেখা যাবে। (দরজায় ঘা)
খুড়াে খুড়ী
উভয়ে। ঐ এসে পড়েছে।
মালতী। বােধ হয় দৌলৎ বাবুই! (দরজার দিকে দৌড়িয়া গেল।
হাঁ, সেই। (নলিনীর নিকট আসিয়া)
নলিনী। হাল ছেড়ে দিসনা কিন্তু।
মালতী। তুই ঠিক থাকবি তাে ?
নলিনী। থাব, ভয় নেই।
মালতী। (দৌড়িয়া নলিনীকে ঠেলিয়া দিয়া) তাের মাথা কিছু
খারাপ না হওয়া পর্যন্ত ওকে দেখা দিস্ না—এখন
দৌড়ে যা। (উভয়ে নিষ্ক্রান্ত )
(জনা দৌলৎকে নিয়া আসিল)
বসুন।
জনা। এদিকে আসুন।
ঠাকরুণ একটু কাজে
আছেন।
দৌলত। ওঁদের মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় না ?
জনা। কোটির সঙ্গে ?
দৌলত। কোটির সঙ্গে ? কটি আছে এখানে ?
জনা। মাত্র দুটি।
দৌলত। দুটি ! নাম কি তাদের ?
জনা। মালতী আর নলিনী।
দৌলত। হা! মালতী, মালতী-সেই নাম। গিয়ে বল
আমি দেখা করতে চাই।
জনা। কি নাম বলব ?
!
১০
খুড়াে খুড়ী
দৌলত। দৌলত পাল। (জনা নিান্ত) পথে ছাতাটা হারিয়ে
এলুম। দাসীটা বেশ। (trick chair এ বসিল)
বেশী দেরী করবে না হয়ত মালতী আসূতে। রীতিমত
তার প্রেমে পড়ে গেছি—নইলে গাড়ীতে ছাতা ফেলে
আসতুম না। জীবনে আর একবার ছাতা ভুলে
ফেলে এসেছিলুম—যখন হিরন্ময়ীর কাছে মনের কথা
খুলে বলতে যাচ্ছিলুম। হিরন্ময়ীই ছিল আমার
জীবনের প্রথম প্রেয়সী, ছাতার পিছনে ছুটাতেই
তাকে হারিয়েছিলুম—মনের কথা বলবার সুযােগ
আর হয়নি। হিরন্ময়ী এখনাে এ মর জগতে আছে
কিনা কে জানে। আজ আবার তার কথা মনে
আসছে। যাক, এখন মালতীর কথা—তাকে—
(চেয়ারের একটু সম্মুখে আসিয়া বসাতে উন্টিয়া মেঝেতে
পড়িয়া গেল )
( মালতীর প্রবেশ, সে আসিয়া দৌলতকে ধরিয়া তুলিল)
মালতী। কি বছিলেন দৌলৎ বাবু ?
দৌলৎ। ( উঠিয়া ) হা, হাঁ, বলছিলুম—
মালতী। কেমন আছেন ?
দৌলৎ।
বেশ ভালো।
মালতী। বসুন। ( মালতী trick chairএ বসিতে গেল, দৌলৎ
তাড়াতাড়ি আসিয়া তাহাকে বাধা দিল )
দৌলৎ। ( মালতীকে সােফায় বসাইয়া) না, না, এখানে বসে না।
খুড়ে খুড়ী
১১
মালতী। খুড়ীমার আসতে একটু দেরী হবে।
দৌলৎ। সে তত ভালাে কথা।
মালতী। তবে আমিই যথাসাধ্য আপনার অভ্যর্থনা করছি।
আপনার আগমনের উদ্দেশ্য শুনতে পারি কি ?
দৌলৎ।
জানাে না ?
মালতী। না।
দৌলৎ। (স্বগত) ওর বাবা তাহলে লেখেননি দেখছি।
(প্রকাশ্যে ) এই--এ্যা—তােমাকে দেখা আর কি!
মালতী। এ আমি বিশ্বাস করি না। আমরা কোনাে উদ্দেশ্য
রয়েছে।
দৌলৎ। এসেছিলুম এই জন্যে———
মালতী। হকি জন্যে ?
দৌলৎ। আন্দাজ করতে পারছ না ?
মালতী। না ।
দৌলৎ।
(স্বগত) বলে ফেলি। ( trick chair এ বসিয়া একটু
সম্মুখ দিকে তাহা টানিয়া, প্রকাশ্যে ) দেখ, আমি বল্তে
যাচ্ছিলুম-যে—কিছুদিন যাবৎ আমি-আমি
তােমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, তুমি তুমি তা লক্ষ্য
মালতী। হাঁ, দৌলৎ বাবু।
দৌলৎ। আমিও তাই মনে করেছি। তােমাকে আজ বলতে
এসেছি, তােমাকে আমি কতখানি-
খুড়াে খুড়ী মালতী। ( দুষ্টামি করিয়া) ওঃ, দৌলৎ বাবু। দৌলৎ। তবে তােমাকে সরলভাবে জানাচ্ছি তুমিই আমার প্রথমা নও- মালতী। না ? দৌলৎ। ঈর্ষা এনােনা মনে, এখন আমার মন আমি জানতে পেরেছি—তখন জানতে পারিনি। (স্বগত) বেশ বলিছি কিন্তু। মালতী। হিরন্ময়ী—সুন্দর নামটি, না? (যেন ঈর্ষা হয়েছে এই ভাবে মালতী মুখ ফিরাইল, দৌলৎ তাহার ইৰ্যা দূর করিবার উদ্দেশ্যে সন্মুখে ঝুকিয়া যেই কথা বলিল অমনি উন্টটাইয়া পড়িল) আঃ ? মালতী নামটিও তাই মালতী-(দৌলৎকে জড়াইয়া ধরিয়া তুলিল) ও দৌলৎবাবু! লাগেনি তাে ? সে থাক্গে। ( দৃঢ়ভাবে ) এই চেয়ারটা এখান থেকে সরানাে উচিত। (মালতী দৌলৎকে তার পাশে আসিয়া বসিতে আহ্বান করিল) মালু, মালু—এই নামে ডাতে তােমার আপত্তি নেই তাে ? মালতী। না। দৌলৎ। (বাহুদিয়া জড়াইয়া) তুমি আমার ? মালতী। তােমার। দৌলৎবাবু একখানা গান শুনিয়ে আমার প্রাণ ঠাণ্ডা কর । দৌলৎ। আচ্ছা, শােন। দৌলৎ।
খুড়াে খুড়ী ১৩ (গান) রূপ যৌবনে লাগলে ভাটা প্রেমের তরী বাওয়া দায়। ভাঙ্গা তরী পাল পায় না জখম হয় মাঝ দরিয়ার । খাবি খেতে খেতে সেটা ডুবে পরে মরে। নৃতন প্রেমের নবীন পাত্সী ভাসে তারি পরে ॥ ( উৎফুল্ল ভাব দেখাইয়া) চমৎকার ! এলুম! দেখলুম ! জয় করলুম ! মালতী। ওঃ ! একেবারে যে ‘লুমের’ ছড়াছড়ি। এখন ঠক ঠকা ঠক্ আরম্ভ না হলে হয়। দৌলৎ। ওঃ! আমি- মালতী। এত ভালবাসেন আমাকে ? দৌলৎ। প্রমাণ করবার সুযােগ দাও। তােমার জন্যে আমি মানুষের যা সাধ্যায়ত্ত তা সব করতে পারি। মালতী। ওঃ, বীরশ্রেষ্ঠ। দৌলৎ। আমার সঙ্গে কেউ পারবে না। মালতী। খুসি হলুম। আমার জন্যে আপনি কিছু করেন আমি তাই চাই। দৌলৎ। একবার শুধু বল- ===
১৪
খুড়াে খুড়ী
মালতী। শুনুন। দুজন দুস্থ প্রেমিক প্রেমিকাকে আপনার
সাহায্য করতে হবে।
দৌলৎ। বল, বল, তােমার জন্যে সব করতে পারি।
মালতী। আমার খুড়তুতাে বােন নলিনী আমার খুব আদরের।
দৌলৎ। তার চাইতে আদরের আছে আমার কাছে।
মালতী। বাধা দেবেন না
দৌলৎ। হাঁ, দেবই—সামান্য একটু বাধা-(দুই হাতে তার গাল
চাপড়াইয়া দিল) কেমন, হয়েছেতাে?
মালতী। নলিনীর একটি প্রেমিক আছে। তার এক কাকা
জিদ করেছেন যে মৃগেনবাবু-নলিনীর প্রেমিক আর
কি-জানেন না ?
দৌলৎ। জানতুম না, এখন জালুম।
মালতী। তার কাকা জিদ করছেন তাকে এক ধনী কন্যা বিয়ে
করতে হবে। ভয়ঙ্কর কথা নয় ? আর মৃগেনববুির
খুড়া খুড়ী পিসীরা সব নলিনীকে তার সঙ্গে দেখাও
করতে দেয় না--
দৌলৎ। ( তাড়াতাড়ি ) , বুঝছি, তােমার খুড়ীর কাছে গিয়ে
এখন আমি নলিনীর সঙ্গে তার বিয়েতে মত দিই
এই তুমি চাও ?
মালতী। (দ্রুত) হাঁ, বুঝলেন তাে? কিছুক্ষণের জন্যে
আপনি কাকা সাজুন, এবং খুড়ীমাকে গিয়ে বলুন যে
আপনার আপত্তি নেই, মৃগেন এখানে আসতে
খুড়াে খুড়ী পারে, আপনার টাকা পয়সা তাকেই আপনি দিয়ে যাবেন। দৌলৎ। ( মালতীর দিকে সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়া) ঠিক বুঝলুম বলতে পারিনা--আবার বলবে ? ( মালতী ধীরে ধীরে তার উক্তিটি আবার বলিল) এ্যা! না, এ হবে না আমাকে দিয়ে। মালতী। সত্যি সত্যি তাে নয়—শুধু ভাণ করতে হবে। দৌলৎ। ওঃ! শুধু ভাণ -তা, না, এ পারব বলে তাে মনে হয়—শেষে মুস্কিলে পড়তে হবে। মালতী। (উঠিয়া অভিমানপূর্ণ সুরে) আমি ভেবেছিলুম আপনি আমাকে ভালবাসেন। দৌলৎ। এ! তাই তাে বাসি, তবে নলিনীকে তাে বাসি না। মালতী। (রাগিয়া) তাহলে আপনি—এই বুঝি বীর আপনি! আপনি ভাল লােক নন্, আপনার সঙ্গে আমার কোনাে কথাই নেই। (সরিয়া গেল) দৌলৎ। (উঠিয়া অনুসরণ করিল) ওঃ, যেওনা, যেওনা। মালতী। (ফিরিয়া) আমাকে ভালবাসলে নলিনীকেও আপনার ভালবাসতে হবে। আপনি তাে বলেছেন আমি যা বলি করবেন। (সরিয়া যাইতে লাগিল) দৌলৎ। ( অনুসরণ করিয়া ) , কিন্তু তুমি যে চাও আমাকে গল্প বলতে বল্ছ- খুড়াে খুড়ী মালতী। (আবার ফিরিয়া আমি বল্লে পরীর গল্পও আপনাকে বলতে হবে। যা বলি তাই করুন, নতুবা ফিরে গিয়ে বাবাকে জানিয়ে দিন, আমি আপনাকে প্রত্যাখ্যান করলুম। এই আপনার ভালবাসা ? (কৃত্রিম রাগে মাটিতে পদাঘাত করিয়া পায়চারি । দৌলৎ। আঃ! কি সুন্দর ! যা বলে না করলে হারাতে হবে একে। ( প্রকাশ্যে ) আচ্ছা, মালু, কি করতে হবে বল। মালতী। আমার আমার বােন নলিনীকে আপনি ভালবাসেন? বলুন। দৌলৎ। (অত্যন্ত মুস্কিলে পড়িয়া) হাঁহ-বাসি—একে ছাড়া আর কাউকে কোনােদিন ভালােই বাসিনি। মালতী। (বিস্ময়ে চক্ষু বিস্মরিত করিয়া ) কিবলছেন আপনি ? দৌলৎ। (মনে হওয়ায়) এ্যা?-না—তা নয়। মালতী। এখন, শুনুন। আপনাকে এইটুকু করতে হবে— আপনার নামটি বদলাতে হবে কিছুক্ষণের জন্যে আপনাকে রায় মশায় সাজতে হবে। দৗলৎ। রায় মশায় ? মালতী। আমার বােন নলিনীর মাথা একটু নষ্ট হয়ে গেছে দুঃখে—তার জন্যে যদি এটুকু না করেন- দৌলৎ। মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। কাছে এলে ভয়ের কারণ নেই তাে? -
খুড়াে খুড়ী
১৭
মালতী। না, মনটা একটু বিকল হয়ে গেছে শুধু এটুকু না
করলে আপনি আমাকে কিছুতেই পাবেন না।
দৌলৎ। (স্বগত—সরিয়া গেল) রায় মশায়। কি অদ্ভুত!
মালতী। এই নামেই আপনি খুড়ীমার সঙ্গে দেখা করবেন,
আর বলবেন বিয়েতে আপনার মত আছে-আর
তখন
দৌলৎ। আর তখন—এখন পারি কি? (মালতীর নিকটে
চুম্বনােদ্যত)
মালতী। না, মৃগেনবাবুকে তার দয়িতাটিকে গ্রহণ করতে
এখানে আসতে না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন—-
আর তখন
দৌলৎ। কি ?
মালতী। তখন হয়ত আপনি পারেন। (মুখ ফিরাইল—ফ্যাকাশে
মুখ এবং খােলা এলােমেলো চুল লইয়া নলিনীর প্রবেশ)
{ আমােদ এবং বিস্ময় অনুভব করিয়া} এই আমার
খুড়তুতে বােন।
দৌলৎ। (স্বগত) মরুকগে খুড়তুত বােন! (ফিরিয়া নলিনীকে
দেখিয়া-প্রকাশ্যে ) বেচারি! বেচারি !
মালতী। নলিনী, এই দৌলৎবাবু।
নলিনী। (শূন্য স্বরে শূন্য দৃষ্টিপাত করিয়া) দৌলৎ! দৌলৎ!
সম্পদে দৌলতে কিবা আসে আর যায়,
তারে নিয়ে সুখী হব গাছের তলায় ।
১
খুড়াে খুড়ী
দৌলৎ। (মুখ ফিরাইয়া) ও।
মালতী। (দ্রুতগত) হাসি যে
হাসি যে ফেটে পড়তে চায়।
( প্রকাশ্যে ) নলিনী, শান্ত।
দৌলৎ। (স্বগত) মেয়েটীর ভারি খারাপ অবস্থা দেখছি।
মালতী।
মনে আছেতাে, ভাই, ইনিই দৌলৎবাবু ? (দৌলৎকে
ইঙ্গিত করিল-নলিনীর কাছে যাইতে)
দৌলৎ। ( মালতীর প্রতি কিছু যেন বলতে চাচ্ছে !
নলিনী। (দৌলতের নিকটে গিয়া) আপনার গায় মণিমুক্তা
ঝুলছে না যে?
দৌলৎ। ( মালতীর প্রতি ) কি বলছে ও?
মালতী। বলছে—“আপনার গায় মণিমুক্তা ঝুলছে না যে?”
দৌলৎ। এর মানে ? ওঃ, দৌলৎ নাম বলে।
মালতী। হাঁ, বলছে দৌলৎ বাবুর ধন দৌলৎ কই ?
দৌলৎ। এ এ্যা—অনেক সময়ই কি এ রকম থাকে ?
মালতী। হাঁ—ওর একটু উপকার করবেন তত ?
নলিনী। (দালতের কাছে জানুপাতিয়া বসিয়া) কৃপা কর, কৃপা
কর, ওহে দয়াময়, পড়ুক অভাগী পরে নয়ন সদয়।
ওগাে, ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও, আমার প্রিয়েরে
ফিরিয়ে দাও। (পা জড়াইয়া ধরিল)
দৌলৎ। নিশ্চয়, নিশ্চয়। ওঃ, আমার পায় যে চিমটি
কাটছে।
নলিনী। (উঠিয়া কাঁদ কাঁদ সুরে) দৌলৎ, শােন, আমার
খুড়াে খুড়ী প্রিয়েরে ফিরিয়ে দাও, নইলে তােমার মণিমুক্তা সৰ নষ্ট হবে- দৌলৎ। (স্বগত) ওঃ, অভিশাপ দিচ্ছে। নলিনী। এ সুন্দর দেহটি শিয়াল কুকুরের খাদ্য হবে- দৌলৎ। ওঃ, দুষ্ট মেয়ে ! নলিনী। তােমার পার্থিব অস্তিত্বের চিহ্নমাত্র থাকবে না। (সমুচ্চ উন্মত্ত হাসি হাসিয়া নিষ্ক্রান্ত। (এতক্ষণ কথাবার্তার সময় নলিনীর মুখ যখন দৌলতের দেখিবার কথা নয় তখনই তাহাতে হাসি ও কৌতুকের দীপ্তি, অন্য সময় পাগলের লক্ষ্য। নলিনী নিষ্ক্রান্ত হইলে দৌলৎও মালতী সেই দিকে তাকাইয়া রহিল। মালতী। ভারি কষ্টের কথা নয় ? দৌলৎ। বেচারি যাবার সময় যেন একটু ভালাে হয়ে গেছে দেখলুম। মালতী। এত খারাপ তাে আর তাকে কখনাে আমি দেখিনি। দৌলৎ। কিন্তু ঐ রায় মশায়ের কথা—তার সম্বন্ধে তাে আমি কিছুই জানি না। মালতী। খুড়ীমাও তাে জানেন না। দৌলৎ। তারপর তােমার খুড়ীকেও জানি না। মালতী। মৃগেন বাবুর কাকায় ওতত জানেন না। দৌলৎ। আচ্ছা, দেখা হলে কি বলতে হবে আমাকে? মালতী। বলবেন—( অনুকরণ করিয়া) দেখুন, আমার ভাই-
२०
খুড়াে খুড়ী
দৌলৎ।
পাের বিয়ে নিয়ে আমি মিছামিছি এতদিন আপত্তি
করেছি। তার সঙ্গে মালতীর-না, না—আপনার
ভাসুরঝির বিয়েতে আমার মত আছে। এইভাবেই
চালিয়ে যাবেন, দেখবেন খুড়ীমাই আপনার কথা
জুগিয়ে দেবেন।
ওঃ! তাহলে এই ভাবেই চালিয়ে যাব, আর
খুড়ীমাই আমার সাহায্য করবেন ? খুড়ীমার খুব
দয়া বলতে হবে।
মালতী। হ, হাঁ, খুব ভালাে মানুষ তিনি। এখন আমি যাই,
তাকে গিয়ে বলি আপনি এসেছেন।
(সম্মুখের দরজায় ঘা)
দৌলৎ। এখনাে যেওনা, যেওনা। (অল্প ভয়ে তাহাকে অনুসরণ
করিয়া তাহার হাতে ধরিয়া ফিরাইয়া আনিল) আমি কে
ঠিক জানি না যে এখনাে-
মালতী। আপনি রায় মশায়।
(ভৃত্য ফণীকরকে সঙ্গে নিয়া আসিল)
ফণী। এ! ভালাে আছেন ? মৃগেন
মালতী। হাঁ, ভালাে! পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি-ইনিই রায়
মশায়, মৃগেন বাবুর কাকা।
দৌলৎ। ভালাে তাে? ভালাে তাে? (স্বগত—সরিয়া গেল।
এই আরম্ভ করে দিলুম।
খুড়াে খুড়ী:
২১;
ফণী । (বিস্মিত) মৃগেনের কাকা। এখানে ?
আপনার :
সঙ্গে? তাহলে সব ঠিক হয়ে গেছে।
মালতী। হাঁ, ঠিক হয়ে গেছে-উনি খুড়ীমার সঙ্গে দেখা
করতে অপেক্ষা করে আছেন।
দৌলৎ। হ, খুড়ীমার সঙ্গে দেখা করতে অপেক্ষা করে আছি।
ফণী। বাঃ! মৃগেন শুনে ভারি খুসি হবে। আপনিও
মালতী। (চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া) না! আমি নই-নলিনী
খুসি হবে।
ফণী। এ? ওঃ! হাঁ, হাঁ, আপনি সুখী হয়েছেন শুনে
সেও সুখী হবে।
মালতী। ( এলােমেলাে ভাবে বলিতে লাগিল ) , হাঁ, আপনিও
খুসি হবেন, আমি খুসি হয়েছি বলে, আমিও খুসি হব
সে খুসি হয়েছে বলে, সে খুসি হবে এ খুসি হয়েছে
বলে।
দৌলৎ। (স্বগত) আমি এর বাইরে, কারণ আমি তাে খুসি
হইনি।
ফণী। নলিনী কোথায় ?
মালতী। (দ্রুত) ওঃ, ভারি অসুস্থ সে। না, রায় মশায় ?
দৌলৎ। ওঃ, খুব।
মালতী। আপনি এসেছেন ভালােই হয়েছে—আপনাকে
দোকানে পাঠাতে হচ্ছে একটা ওষুধ আনতে—এই
এক শিশি-এক শিশি ওডিকলােন মাথায় দিবার
জন্যে।
খুড়ে খুড়ী ফণী। মাথা গরম হয়েছে। ওঃ! যাই, নিয়ে আসি। হাঁ, ভালাে কথা, মৃগেন তার ভালােবাসা জানাচ্ছে- মালতী। ( ইঙ্গিত করিয়া) নলিনীকে ? ফণী। (ফিরিয়া আসিয়া) আপনাকে। মালতী। হাঁ, তা আমাকেও বটে। (দৌলতের প্রতি) বেশ লােক, না ? দৌলৎ। হাঁ, বেশ লােকই তাে বটে, সকলেই যখন তাকে ভালবাসে। (ফণীর প্রতি) আপনি তার বন্ধুলােক- ভারি দুঃখিত হলুম কালকের খাওয়ায় আপনি বান নি। ফণী। কই, মৃগেন তাে আমাকে যেতে বলেনি। দৌলৎ। বলেনি? ভারি ভােলা মন তার। তবে আপনাকে সে খুব ভালবাসে। বলে যে তা—তা-আপনার নামটা না কি ? নাম আমার কিছুতেই মনে থাকে না। মালতী। ( হঠাৎ বাধা দিয়া) ফণী কর। দৌলৎ। হাঁ ঠিক, ফণী কর। (স্বগত) কি যে বলছি মাথামুণ্ডু কিছুই ঠিক নেই। যাক, চলে যাচ্ছে তাে। ( ফণী দরজার দিকে গেল, মালতী খুসি হইয়া তাহার অনুসরণ করিল) ফণী। কিন্তু আমাকে যেতে হচ্ছে ওডিকোলােনের জন্যে, হায়, বেচারি নলিনী ! মালতী। হাঁ, যান। দেবেন মিত্তিরের দোকান দোকান থেকে
খুড়াে খুড়ী
আনবেন, মাত্র তিন মাইল ব্যবধান আর কি! ওর
জিনস ভালাে।
ফণী। এটা? আচ্ছা। ওঃ! মৃগনের কাকা ? ওকে
বলতে হচ্ছে। (নিক্রান্ত)
(জনার প্রবেশ)
জনা। দিদিমণি, আপনার খুড়ীমা ডাকছেন। আমি বল্লুম কে
একজন দেখা করতে এসেছেন, তিনি বল্লেন—নিয়ে
আয়।
মালতী। (জনান্তিকে) নাম বলিনি তাে ?
জনা। না, না, তা বলিনি। না বলতেই যে বলে দিলে তুমি।
(নিক্রান্ত)
দৌলৎ। ওঃ! মালু, এখনাে যেওনা, খুড়ীমা সম্বন্ধে কিছু
বল আমাকে।
মালতী। ও, তিনি মাঝে মাঝে একটু অদ্ভুত হয়ে পড়েন।
ওঁর কথায় কথায় তখন সায় দিয়ে যাওয়া দরকার।
দৌলৎ। ওঃ, তাই নাকি! বেশ, কথায় কথায় সায় দিয়েই
যাব।
মালতী। (দরজার দিকে গিয়া) যাই, বলি গিয়ে। (দরজায়
ফিরিয়া) সাহসে বুক বাঁধুন, রায়, মশায়। বীর
প্রেমিকের কথা মনে রাখবেন। (হাসিয়া নিষ্ক্রান্ত)
দৌলৎ। মনে হচ্ছে গােল পাকিয়ে তুলবাে-এ ব্যাপার হাতে
২৪
খুড়াে খুড়ী
: নেওয়াই ঠিক হয়নি। (দীনময়ীর প্রবেশ) { স্বগত }
ঐততা, এখনি সুরু করতে হবে !
দীনময়ী। (অগ্রসর হইয়া) রায় মশায়, আপনাকে দেখে খুসি
হয়েছি। আমার ভাসুরঝি বল্লে, কতক তার জন্যে
কতক আপনার ভাইপাের জন্যে আপনি এসেছেন।
পৃথিবীটা তে। এই ছেলে ছােকরাদের জন্যে, আমরা
তােত এখন ধীরে ধীরে সব গুটিয়ে নেবার জন্যে প্রস্তুত
হয়ে আসছি। ( Trick chairএ বসিতে উদ্যত, দৌলৎ
দৌড়িয়া গিয়া trick chair সরাইয়া নিল)
দৌলৎ। মাপ করবেন, এতে বসবেন না।
(দীনময়ী অন্যত্র বসিল)
দীনময়ী। বুঝলুম ভাইপাের প্রতি আপনার ভালােবাসা
আপনার মত বলিয়ে দিয়েছে।
দৌলৎ। (দ্বিধার সহিত) হঁহুঁ।
দীনময়ী। রায় মশায়, আপনার বােনের এক চিঠি পেয়েছি,
তিনি অবিশ্যি আপনার এখানে আসার কথা
কিছু বলেননি, তিনি আজকেই আমার সঙ্গে দেখা
করতে আসছেন—লিখেছেন। জানেন তাে এ বিষয়ে
আমাদের মতের সঙ্গে ওঁর মতের কোন দিন মিল
হয়নি, আর পরিষ্কারই বােঝা যাচ্ছে, আপনার মত
পরিবর্তনের কথা তাঁকে জানান নি।
দৌলৎ। (স্বগত) মত পরিবর্তন?
খুড়াে খুড়ী
২৫
দীনময়ী। তিনি এলে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা হতে
পারবে।
দৌলৎ। হাঁ, এ বিষয়ে অনেক আলাপাদি হতে পারবে বৈকি।
কিন্তু আমার যে এক্ষণি সহরে ফিরা দরকার। (উঠিল।
দীনময়ী। না, না, তা বলবেন না। (হাত ধরিয়া বসাইল) আচ্ছা,
চন্দনারা কি বলছে ?
দৌলৎ। (স্বগত) ঐ রে, অদ্ভূত হতে চলছে। এখন কথায়
কথায় সায় দিয়ে যেতে হবে। (প্রকাশ্যে ) চন্দনারা
কি ভাবে নিচ্ছে-ওঃ, বেশ ভালাে ভাবেই।
দীনময়ী। তার উপর খুব হঠাৎ এসে পড়েছে এটা নিশ্চয়।
দৌলৎ। হাঁ তাই, এ ধাক্ক। সে সামলাতে পারে নি।
দীনময়ী। (শঙ্কিত) ওঃ, আপনি কি বলছেন সে মারা গেছে ?
দৌলৎ। হাঁ, হাঁ, তাই। (স্বগত) যা খুসি বলে যাই।
দীনময়ী! (চিন্তিত ও দুঃখিত ভাবে) তা হলে তাে সব বাধা দূরই
হয়ে গেছে।
দৌলৎ। তা জানি না।
দীনময়ী। আপনার ভাইপাের বিয়ের কথা বলছি।
দৌলৎ। ওঃ! হাঁ, ঠিক, ঠিক!
দীনময়ী। আপনার ভাইপােকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন না
কেন ?
দৌলৎ। জানেন, আপনি তা কি ভাবে দেখবেন সে তত
জানতুম না।
?
২৬।
খুড়ে খুড়ী
দীনময়ী। ওঃ ঠিক! এখনি আসতে তার করে দেব তাকে।
(উঠিল)
দৌলৎ। (শঙ্কিত) এ্যা? না, না, কিছুতেই না, সে বাড়ী
আছে বলে মনে হচ্ছে না। ( উঠিয়া স্বগত) চালাচ্ছি
তাে মন্দ নয়—চন্দনার ব্যাপারও তত কাটিয়ে
দিয়েছি।
দীনময়ী। এখন আপনার জন্যে একটু জল খাবার আনাই ?
একটু চা এবং আর কিছু ? (সরিয়া গেল।
দৌলৎ। ধন্যবাদ। (স্বগত) চা তো লঘু জিনীস, আর কিছুটীও
অস্পষ্ট! ( প্রকাশ্যে) আর কিছু চলতে পারে।
দীনময়ী। চলুন ও ঘরে।
দৌলৎ। খুসি হলুম। (দীনময়ী নিষ্ক্রান্ত ) চালাচ্ছি তো বেশ।
(নিষ্ক্রান্ত)
( মৃগেন্দ্র এবং ফণীর প্রবেশ। অন্য দিক হইতে
মালতীর প্রবেশ)
মৃগেন্দ্র। এ বাজে কথা ফণী, এখানে তিনি আসতেই
পারেন না।
ফণী ।
বাঃ! আমার সঙ্গে যে আলাপ পরিচয় পর্যন্ত হয়ে
গেল, উনি বল্লেন আমাকে নিমন্ত্রণ করবার জন্যে তিনি
তােমাকে বলেছিলেন।
মৃগেন্দ্র। মিথ্যা কথা।
মালতী। (পিছনে) কুখ। (নিকটে আসিল )
ফণী ।
খুড়ে খুড়ী
মৃগেন্দ্র। মালতী! (তার নিকটে গেল।
মালতী। চুপ! জোরে কথা কও না।
মৃগেন্দ্র। কি ব্যাপার? বলি, কাকা বাবু এসেছেন নাকি
এখানে!
মালতী। এসেছেন এবং আসেন নিও। বেশ গােলমাল
পাকিয়ে তুলেছি, আমাকে সাহায্য না করলে এথেকে
বেরুতে পারব না, তুমি কি জন্যে এসেছ ?
মৃগেন্দ্র। আমাকে দেখে খুসি হওনি তাহলে?
মালতী। না, তুমি সব মাটি করে দেবে।
এই, ওডিকোলােন নিয়ে এসেছি। নলিনী কেমন ?
মালতী। ওঃ! নলিনীর কিছু হয়নি। শুনুন—ঐ ব্যাটা
দৌলৎ পাল আমার সঙ্গে ওর নিজের বিয়ের প্রস্তাব
করতে এসেছে, আমি তার কাছে স্বীকৃত হয়েছি এই
সর্তে, যে সে নিজকে তােমার কাকা বলে চালিয়ে
বলবে, যে আমাদের বিয়েতে তার কোনাে মত
নেই।
কিন্তু আপনি দুজনকে বিয়ে করতে পারেন না।
মালতী। তা জানি, তাইতাে আমি তাকে বলেছি যে মৃগেন বাবু
নলিনীর ভালবাসার পাত্র।
ফণী।
মৃগেন নলিনীর ভালবাসার পাত্র ? তাহলে আমার
সম্বন্ধে কি ?
মালতী। আর—এখন আপনারা দুজনেই উপস্থিত-বেশ
ফণী।
খুড়াে খুড়ী
জটিল হয়ে উঠেছে ব্যাপার। তােমাকে চলে যেতে ।
হবে, মুগেন বাবু, তুমি আবার এলে কেন এখানে?
মৃগেন্দ্র। জানাে তে, আমাদের পিসী বরাবর আমাদের পক্ষেই
ছিলেন, তাকে বলেছি এখানে এসে সব পরিষ্কার
করতে, তিনি এখনি এসে পড়বেন।
মালতী। ( হতবুদ্ধি হইয়া যাও, এখনি পথে আটকাও গিয়ে।
মৃগেন্দ্র। অসম্ভব।
মালতী। কি করব এখন তবে? যাই, নলিনীর সঙ্গে পরামর্শ
করি গিয়ে। তােমরা এখানেই থাক।
দীনময়ী। (বাহির হইতে) মালতী, মালতী!
মালতী। (কাণাকাণির সুরে) ঐ খুড়ীমা ! (পা টিপিয়া যাইতে
যাইতে বলিল) কথা বলতে সাবধানতােমার পিসীর
কথা কিন্তু খুড়ীমাকে কিছুই বলল না। ( নিষ্ক্রান্ত)
ফুণী।
(দীনময়ীর প্রবেশ)
দনীময়ী। মেয়েরা গেল কোথায় ? (ফণীকে দেখিয়া তার নিকট
গেল ) আঃ, ফণী, কেমন আছ?
ভালাে। আপনার সঙ্গে মৃগেনের পরিচয় করিয়ে
দিচ্ছি। ওঁর কাকা নাকি, এখানে এসেছেন, তা
শুনে সেও এসে উপস্থিত হয়েছে এই আশা করে,
যে তাতে তাড়াতাড়ি হয়ত সব গােলমাল মিটে যেতে
পারে।
খুড়ে খুড়ী
মৃগেন্দ্র। (নিকটে আসিয়া) হাঁ, তাই আমি এসেছি।
দীনময়ী। তােমাকে দেখে খুসি হলুম, বাবা। অবিশ্যি তােমার
কাকা যা বল্লেন তারপর সব গােলমাল চুকেই যাবে।
তা চন্দনার বাধা তাে গেছে। (মৃগেন ফণী উভয়ে
উভয়ের মুখের দিকে হতবুদ্ধি ভাবে চাহিল। বেচারির
মৃত্যুতে সব বদলে গেছে এতটা আশা করতে পারি
নাই আমরা। তােমরা বস, আমি ওদের খোঁজ
করি। (ডাকিল) নলিনী! নলিনী! ( নিষ্ক্রান্ত)
( ফণী, মৃগেন উভয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল)
মৃগেন্দ্র। চন্দনা মরেছে ? অদ্ভুত! কাকাবাবুর সঙ্গে যে
আজ সকালেও তাকে নিয়ে বচসা হয়ে গেল আমার।
তিনি বল্লেন আজকেই তিনি এ সম্বন্ধে এক চিঠি
পেয়েছেন—তাইতাে পিসিমা আসছেন এখানে।
আমার নতুন কাকায় যে সব গােলমাল করে তুল্লে ।
(দৌলতের প্রবেশ)
(স্বগত) ঐ সে, চুপ! চুপ ! তাের পরিচয় করিয়ে
দিচ্ছি-কথায় সায় দিয়ে যা।
দৌলৎ। (স্বগত) জল খাবার তত খাওয়া গেল, এখন
মৃগেনের পিসি আসবার আগেই ভাগতে হয় ।
( যাইতে উদ্যত )
(তাহাকে থামাইয়া) রায় মহাশয়, আমার কাজ সেরে
এসেছি, আপনার সঙ্গে এর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি-
ফণী।
ফণী ।
খুড়াে খুড়ী
(ঢগেনের দিকে ফিরিয়া ; দৌলৎ সরিয়া পড়িবার চেষ্টা
করিল, ফণী ফিরিয়া তাহা দেখিল এবং তাহাকে সঙ্গে করিয়া
আনিল । ইনি হলেন আপনারি ভাইপাের একবন্ধু।
দৌলৎ। ফিরিয়া নমস্কার করিয়া তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে অগ্রসর
হইল, ফণী মৃগেনের সঙ্গে গেল এবং তাহাকে আবার ফিরাইয়া
আনিল) ওঁর নাম কি ?
ফণী। (মৃগেনের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়া) মানিক।
দৌলৎ। এ্য, বেশ, বেশ ! আসি তবে। (যাইতে উদ্যত, সেই
সময় দীনময়ীর প্রবেশ )
দীনময়ী। (দৌলৎকে আটকাইয়া) কোথা যাচ্ছেন ? খুসি হলুম
-আপনার ভাইপাের সঙ্গে কথা বলে সব ঠিকঠাক
করে ফেলছেন দেখে।
দৌলৎ। (স্বগত—বিস্মিত) আমার ভাইপাে !
মৃগেন্দ্র। (দৌলতের বাহু ধরিয়া টানিয়া জনান্তিকে) কি বলেন
সাবধান, আমি মৃগেন্দ্র রায়।
দৌলৎ। আপনি মৃগেন্দ্র রায় ? তাহলে আমি কে ?
(জনার প্রবেশ
জনা। মিস্ রায় এসেছেন! (দীনময়ী অগ্রসর হইয়া গেল।
হিরন্ময়ীর প্রবেশ, দীনময়ীর সঙ্গে তার অভিবাদন
ইত্যাদি। দৌলৎ সরিয়া হিরন্ময়ীর দিকে পিছন
দিয়া রহিল। মালতী এবং মৃগেন এইভাবে চালাইয়া
যাইতে তাহাকে ইঙ্গিত করিল। দৌলতের মুখে
এবং ভাবভঙ্গীতে আতঙ্ক, মুখ লুকাইবার চেষ্টা।
।
দৌলৎ।
খুড়ে খুড়ী
(বগত) মৃগেনের পিসি। খেয়েছে। (চলিয়া যাইবার
চেষ্টা, মৃগেন ও মালতী তাহাকে আটকাইল)
দীনময়ী। মিস্ রায়, আপনাকে দেখে ভারি খুসি হলুম।
আপনার ভাইও আগেই এসেছেন। এখন তাহলে
আর কোনাে গােলমাল নেই।
হিরন্ময়ী। আমার ভাই ? তিনি তাে বাড়ীতে।
দীনময়ী। তাহলে তিনি লুকিয়ে আপনার আগেই এসে
পড়েছেন। (দৌলৎকে দেখাইল)
হিরন্ময়ী। (মুখ তুলিয়া দৌলতের দিকে চাহিয়া ) আমার ভাইয়ের
মত তত দেখাচ্ছে না, তিনি এত মােটা নন্। এ
লােকটা ভণ্ড! ( নিকটে গিয়া দৌলতকে ধরিয়া ঘুরাইল)
দৌলৎ বাবু!
দৌলৎ। হিরন্ময়ী! (trick chairএ বসিয়া তৎক্ষণাৎ উন্টিয়া
পড়িয়া গেল, হিরন্ময়ী মূচ্ছিত হইয়া পড়িবার উপক্রম, ফণী,
নলিনী, দীনময়ী, দৌড়িয়া আসিয়া তাহাকে ধরিল, মালতী
এবং মৃগেন বিস্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।
* *
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
( দৃশ্য।-হমেন্দ্র রায়ের বাড়ী। বিধু দুইজনের
উপযুক্ত খাবার সাজাইতে প্রবৃত্ত)
বিধু। কর্তা তাে কাল সকালে দাদাবাবুকে গালাগালি দিয়ে
কয়দিনের জন্যে কোথায় চলে গেলেন। আর হিরণ
ঠাকুরুণ কোথেকে রাত্রে কালাে মুখ করে এলেন,
সকালেও উঠছেন না। বলছেন অসুখ করেছে।
এখন আমি সব না দেখলে সংসার চলবে কি করে ?
( যাত্রীর উপযুক্ত পােষাক ও জিনস পত্র লইয়া রমেশ রায়ের
প্রবেশ। তার বয়স চল্লিশ পঞ্চাশের মাঝামাঝি, খুব হাসি-
খুসি ভাব)
রমেশ। বিধু, আমি তো এলুম বড় ক্ষুধা পেয়েছে, খাবার
টাবার তৈরী হয়েছে তাে?
বিধু। ( চমকিয়া) ওমা! বড় বাবু যে! আমাকে যে একেবারে
চমকে দিয়েছিলেন, খাবার তাে তৈরীই আছে এখানে।
দুজনের উপযুক্ত রয়েছে—আপনার চলবে আশাকরি।
রমেশ। কৰ্ত্তা কয়েকদিনের জন্যে কোথায় গেছেন। এ!
পূর্বের সূৰ্য্য এরপর পশ্চিমে উদয় হবে দেখচ্ছি।
বিধু। আর ঠাকরুণও অসুস্থ, নীচে নামবেন না।
উলটপালট হয়ে গেছে।
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। কিছু ভয় নেই, বিধু, আমি আবার সব ঠিক করে
দিচ্ছি।
বিধু।
তা আপনি এসেছেন যখন-তখন দেবেন বৈকি!
রমেশ। আমার ঘর ঠিক আছেতাে?
বিধু।
হাঁ, আছে বৈকি। হিরণ ঠাকরুণ বলেন—ও সব
সময় ঠিক করে রাখতে হবে, কারণ বড় দাদা কখন
এসে পড়েন তার কিছুই বলা কওয়া নেই।
রমেশ। আচ্ছা, যাও তুমি। (বিধু নিষ্ক্রান্ত) হরেন্দ্র কোথায়
কি করতে গেল—জরুরি কাজ কিছু হবে। হিরণের
আবার হলাে কি! অদ্ভুত কথা ! যাক, এদের
ভিতরকার ব্যাপারে আমি হাত দিতে চাই না, আমি
হলুম ভবঘুরে মানুষ, ঘরের ধার ধারি না। হঠাৎ
কখন এসে দুই একদিন বিশ্রাম করে যাই। এবারও
বেশী দিন ওদের কষ্ট দোব না। খাওয়া যাক।
খাইতে প্রবৃত্ত, বিধু আরাে খাবার নিয়া আসিল) হাঁ, হাঁ,
আরও লাগবে বৈকি—পেটে আগুন জ্বলেছে।
বিধু।
হাঁ, আরো চা কেইক নিয়ে এলুম।
রমেশ! ( খাইতে খাইতে) আচ্ছা, তােমার কর্তা কখন গেলেন?
বিধু। কাল সকালে, বড়বাবু।
রমেশ। কোথায় ?
বিধু।
জানিনা; হিরণ ঠাণকে বােয়ানা করে এসে দেখি
তিনি নেই।
•
৩৪
খুড়াে খুড়ী
বিধু।
রমেশ। সে আবার কোথায় গেছিল ?
আমি ষ্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলুম দাদা বাবুর
কাছে-তার বেশী আমি জানি না। কালরাত্রে
যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন দেখলুম ওঁর কেমন
কেমন অবস্থা। দাদাবাবু বল্লেন “বিধু ওঁকে যত্ন
করি, বড় আঘাত পেয়েছেন।”
রমেশ। কি আঘাত ?
বিধু। জানিনা ! উনি নিজের ঘরে গিয়ে ঐ যে দরজা লাগিয়ে
শুয়েছেন আর দেখিনি তাঁকে। তিনি বল্লে ওঁকে
কেউ যেন বিরক্ত না করে।
রমেশ। মৃগেন জানেতে যে হরেন বাড়ী নেই ?
বিধু। না, সকালে ওঁদের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া হয়-দাদাবাবুর
বিয়ের কথা নিয়ে। দাদাবাবু বােধ হয় সেই ঝগড়ার
কথা মনে করেই, ঠাকরুণকে দরজায় পৌছিয়ে দিয়েই
রাত্রের জন্য অন্য কোথায় চলে গেছে। কৰ্ত্তা যে বাড়ী
নেই তা ওঁর জাবার কথা নয়। ঠাকরুণ একবার
বলেছিলেন শুনেছিলুম কৰ্ত্তা কোথায় আছেন জানলে
টেলি করে দিতেন।
রমেশ। হা, ভালাে কথা মনে হলাে—গড়ীতে একটা খুব
মূল্যবান ছাতা পেয়েছিলুম-রূপাের বাটে সােণার
কাজ করা, তাতে নাম ঠিকানও লেখা আছে—একটা
টেলি করে দিতে হচ্ছে—একটা ফারম দেগে।
খুড়াে খুড়ী নিচ্ছি। বিধু। ( যাইতে যাইতে) আছি। রমেশ। আর-বিধু বিধু। বলুন- রমেশ। আমার জিনীসপত্র গুলাে আমার ঘরে নিয়ে যা। বিধু। (সব লইয়া নিষ্ক্রান্ত। রমেশ। (খাইতে খাইতে ) বিয়ে নিয়ে ঝগড়া! ব্যাপারটা কি তা জানি। মৃত বিরাজ বাবুর একমাত্র মেয়ে চন্দনার সঙ্গে মৃগেনের বিয়ে দিতে চায় হরেন, মৃগেন বাবাজী অন্যত্র প্রেমে পড়েছে সে খবরও আমার জানতে বাকী নেই। আমি মৃগেনের পক্ষই নােব সে তত জানা কথা। হরেনটার চিরকাল ভীষণ টাকার লােভ। এদিকে হিরণটা কোথায় গিয়ে কালকে কি রকম আঘাত পেয়ে এল, ব্যাপারটা কিছুই বুঝছি না। তবে আমি এসেছি, একদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে আশা করি। (টেলিগ্রাফের ফারম লইয়া বিধুর প্রবেশ) বিধু। এই ফারম, বড়বাবু। রমেশ। ( লইয়া) তুই এখন যেতে পারিস এসব নিয়ে। (রমেশ টেলি লিখিতে প্রবৃত্ত, বিধু খাবার জিনীস গুছাইতে লাগিল। আমি এসেছি হিরণকে জানিয়েছিস্? বিধু। হাঁ, আমি খবর পাঠিয়েছি, বড়বাবু। রমেশ। এখন কেমন, সে একটু ভালো তাে?
*-*
খুড়াে খুড়ী
বিধু।
বােধ হয় ভালােই।
পটলি বল্লে এখনই নীচে
নাববেন।
রমেশ। ওঃ! তাহলে জেগেছে ?
বিধু। পটুলি বলছে-
রমেশ। পটুলি কে ?
বিধু। ওঁর নিজের নূতন দাসী। সে বলে আমিই তাকে
জাগিয়েছি।
রমেশ। তুই ? কি করে ?
বিধু। হঠাৎ হয়েছে বড়বাবু, আমার হাত থেকে আপনার
ব্যাগ লাঠি সব পড়ে গিয়ে সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে ভীষণ
শব্দ হয়েছিল—তাই -
রমেশ। এ ! কি ? এত অসাবধান!
বিধু। হাঁ বড়বাবু, আমার নিজেরি ভারি বিরক্তি হয়েছিল,
তবে বেশী কিছু হয়নি, শুধু আপনার ব্যাগের মধ্যে
একটা দেশলাইয়ের বাক্স জ্বলে গিয়ে, আপনার
অলষ্টারটীর একটা ছেদা হয়ে গেছে।
রমেশ। এ! এ ! কি ?
বিধু।
তা রিপু করা যাবে হােধ হয়, বড়বাবু-
রমেশ। )
( বিরক্ত হইয়া) রিপু ! রিপু ! হিরণ এসে তােকে যা
বলবার বলবে। (উঠিয়া পড়িয়া) 209, Hariraja's
Lane.” নেতাে, এই টেলিটা পাঠিয়ে দে।
বিধু।
বারাে কথার বেশী হয়েছে নাকি বড়বাবু ?
৪ খুড়াে খুড়ী রমেশ। হাঁ, কুড়ি কথা হয়েছে। বিধু। তাহলে তাে বেশী ফিস্ লাগবে। রমেশ। থাগে। যা চাই লিখে যাই আমি, পরে একটা নােট ফেলেদি, যা ফেরৎ দিবার দেয়, যেন সব জানতুন এই ভাবই দেখাই আমি। (নােট ও টেলি লইয়া বিশ্ব নিষ্ক্রান্ত ; হিরন্ময়ীর প্রবেশ) আঃ! হিরণ, কেমন আছিস? বেশ হাসিখুসি ত ? হিরন্ময়ী। (বসিয়া—আবেগহীন ভাবে) বেশ হাসি খুসিটুসি নই- একটু মাথা ধরেছে। রমেশ। আর কোথায়ও ধরেনি তত ? মনে টনে ? হিরন্ময়ী। (স্বগত) কি অদ্ভুত ! জানবার তাে কথা নয়। (প্রকাশ্যে ) হঠাৎ কোত্থেকে এসে উপস্থিত হলে ? রমেশ। কেন- ( বিধু পুনঃ প্রবেশ করিয়া সমস্ত লইয়া নিষ্ক্রান্ত) হিরন্ময়ী। এমন ভবঘুরে মানুষ, তাই রমেশ। তাইতাে এ প্রশ্ন বাহুল্যমাত্র। ভালাে কথা, হরেন মৃগেনের কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল কাল সকালে ? সেইবা কোথায় গেল? আর তুইই বা কেন স্টেশনে গেলি, আর কোথেকে রাত্রির আঘাত পেয়ে ফিরলি ? কি রকম আঘাতটা শুনি? হিরন্ময়ী। (স্বগত) বলব না। আমার প্রথম প্রেমের কথা এরা কেউ জানে না। (প্রকাশ্যে ) মৃগেনের তাে অন্যত্র
খুড়াে খুড়ী
মন বসেছে জানাে, দাদাও তার জিদ ছাড়ছে না।
দাদাও ক্ষেপে গিয়ে বল্লে যে মৃগেনের মাসহারা
বন্ধ করে দেবে, সেই টাকা কোনাে হাসপাতালে
পাঠিয়ে দেবে—উইলেরও সে রকম সৰ্ত্ত আছে জানাে।
মৃগেন আমাকে এসে ধরলে, আমিও তার সঙ্গে সেই
খুড়ী দীনময়ী ঠাকরুণের বাড়ী গিয়েছিলুম
রমেশ। কোনো ফল হয়েছে ?
হিরয়ী। তা না, আমি যাবার আগে তারা একটা ছলনার
শরণাপন্ন হয়েছিল—আমি গেলে তা-তা—বেরিয়ে
পড়ল—আমি টের পেলুম দাদা এখনাে বিয়ের
বিরােধী। কাজেই আগের চেয়ে অবস্থা বরং আরাে
খারাপ। (স্বগত—অনেকটা আরাম পাইয়া) যাক্,
বাঁচা গেছে।
রমেশ । আমার মনে হচ্ছে তােমার না যাওয়াই উচিত ছিল।
মেয়েদের ব্যাপারে মেয়েরা হাত না দিলেই ভালাে।
হিরন্ময়ী। (নম্র ভাবে আমি তাে ভালাের জন্যেই দিয়েছিলুম।
রমেশ। আমার ঘর ঠিক আছে শুনলুম, আমি উপরে যাচ্ছি।
হিরন্ময়ী। আছতাে ? খাবার কথা বলতে হবে।
রমেশ। হাঁ, আশা তাে করি।
( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
(মৃগেন্দ্রের প্রবেশ, সে সাবধানে চারিদিকে চাহিল, এদিক
সেদিক চাহিয়া দরজায় ফিরিয়া ইঙ্গিত করিল)
যুগেন্দ্র। বেশ। এখানে নেই। এস।
খুড়াে খুড়ী (ফণী, নলিনী ও মালতীর প্রবেশ) ফণী। বাগানে ঢুকবার পথটি তাে বেশ মজার। মৃগেন্দ্র। (অর্থপূর্ণ ভাবে ) হাঁ, সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। মালতী। ওঃ! মৃগেন বাবু, আমার ভারি ভয় করছে। মৃগেন্দ্র। আরে সাহস ধর। সম্মুখে এসে কাকা বাবুকে জয় করে নেওয়ার তােমার ফন্দীটি চমৎকার। আমাদের রায় পরিবারের লোকদের বশকরা খুব সহজ, তাদের রক্তের মধ্যেই বশীভূত হবার বীজ রয়েছে, কাকা বাবুও খুব সম্ভব কাবু হবে! (ফণী এবং নলিনী পিছনে চুমু চুমির চেষ্টা করিতেছিল) এই, থাম্ তােরা! ফণী । ওর চোখে কিছু রয়েছে। মৃগেন্দ্র। হাঁ, তুই। মালতী। কিন্তু, তােমার কাকার জন্যে কতক্ষণ অপেক্ষা করে থাকব? মৃগেন্দ্র। এখনি নামবে, আমার ডেকে পাঠানাে ঠিক হবে না; তা ছাড়া আমি বাড়ীতে আছি জালে তােমার সফলতার পথে বিঘ্ন উপস্থিত হবে। (নলিনীকে চুম্বন- রত ফণীর প্রতি) আবার । ( মালতীকে চুম্বন করিল এবং দরজার দিকে গেল) এখন ফণী, চল আমরা সরে পড়ি। ফণী। (দরজায়) নলিনী, মনেরেখাে, দুজনেই চেষ্টা কর পরে একদিনেই বিয়ে লাগিয়ে দেওয়া যাবে।
খুড়াে খুড়ী
( উভয়ে দরজার কাছ হইতে মালতী-নলিনীর প্রতি হস্ত
চুম্বন করিল, সেই সময় বাহিরে রমেশের উচ্চ কাসি শােনা
গেল, ফণী, মৃগেন দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল, মেয়েরা ভীত
হইয়া গেল )
রমেশ। ( বাহিরে ) হিরণ !
মেয়েরা। ঐ তিনি।
মালতী। ওঃ! ভারি ভয় করছে ; উনি এলে আমি দৌড়ে
পালাব। (সুর বদলাইয়া) আমাকে কেমন দেখাচ্ছে ?
সব ঠিক আছে তাে?
নলিনী। চমৎকার দেখাচ্ছে। আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
ঠিক আছেতাে সব ?
মালতী। হুঁ, ঠিক আছে। ( দুজনেই আয়নার সম্মুখে দাড়াইয়া চুল
পােষাক ঠিক করিতে লাগিল )
( কথা বলিতে বলিতে রমেশের প্রবেশ)
রমেশ। হিরণ! আমি শীগগীরই বেরিয়ে পড়ছি আবার,
ভারি মুস্কিল! (মেয়েরা চম্কিয়া উঠিল, মালতী নলিনীর
হাত ধরিয়া এক কোণে ভীত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এই
দৃশ্য জুড়িয়া তাহারা পরস্পর সংলগ্ন হইয়া রহিল, এবং যেন
এক সেই ভাবে নড়াচড়া করিল) যাবার আগে হিরণের
সঙ্গে দেখা হলে হততা! (ফিরিয়া মেয়েদের দেখিয়া )
মাপ করবেন ! আমি জানতুম না যে—যে—বেশ
দিনটি করেছে না ? (স্বগত) এরা কে ? হিরণের
খুড়াে খুড়ী ৪১ বন্ধু হবে হয়ত ; অভ্যর্থনা করা দরকার। (প্রকাশ্যে ) আপনারা বসূবেন না? নলিনী। না, আমরা ক্লান্ত হইনি। রমেশ। চা-টা কিছু মালতী। ( ঠিক নলিনীর মত সুরে) না, আমরা তৃষ্ণার্ত হইনি। রমেশ। ভারি সুন্দর দিন। উভয়ে। হ—ভারি- রমেশ। একটুও মেঘ নেই আকাশে উভয়ে। একটুও নেই— রমেশ। (স্বগত) কিন্তু আমার অবস্থাতে মেঘাচ্ছন্ন ! বেশ সুন্দরী মেয়ে দুটি। মালতী। (ভয়ে ভয়ে নলিনীকে আঁকড়াইয়া খাকিয়া সম্মুখে অগ্রসর হইয়া) আশা করি আমাদের ক্ষমা করবেন। রমেশ। ও কথা বলবেন না। আমার বােনকে জানিয়ে দিচ্ছি- মালতী। আপনার কাছেই আমাদের কাজ নলিনী। ( মালতীর প্রতি জনান্তিকে। আমরা ওকে ভয় করছি এ কথা বুঝতে দিনা। মালতী। আমরা এসেছি- রমেশ। ওঃ! বুঝলুম- মালতী। রায় মশায়, আমরা- রমেশ। (স্বগত) বাঃ! আমাকে চেনে দেখছি।
৪২ খুড়াে খুড়ী মালতী। আমাদের অবস্থাটা একটু রমেশ। ওঃ, মাপ করবেন, বসবেন না আপনারা ? উভয়ে। থাক, আমরা ক্লান্ত হইনি। রমেশ। দেখুন, আমার সময়টা একটু মূল্যবান, যদি অনুমতি করেন- মালতী। আপনার একটু সময় নষ্ট করব। বাধা পাব জেনেই এসেছি সত্য- রমেশ। ওঃ! না, না। তা কেন, আমি মালতী। আজ্ঞে, আপনি ঠিক বুঝছেন না, আপনার উৎসাহ পেলে রমেশ। অবিশ্যি, অবিশ্যি, নিশ্চয় মালতী। আপনি অত্যন্ত ভদ্র ! রমেশ। না, না, এ শুধু উৎসাহ দেওয়া মাত্র। মালতী। দেখুন, আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি— রমেশ। ওঃ! তাই নাকি! মাপ করবেন—বসবেন না? উভয়ে। থাক, এখন একটু ক্লান্ত হয়েছি বটে। (একই চেয়ারে বসিল, রমেশ অন্য একটি চেয়ার অগ্রসর করিয়া দিল, মালতী তাহ টানিয়া আনিয়া অন্যটিতে লাগাইল। উভয়ে এক সঙ্গে উঠিল এবং উভয় চেয়ারে বসিল) রমেশ। বাড়ী খুব দূরে নাকি ? মালতী। না, না, ভেবেছিলুম জানেন, আমাদের বাড়ী রামগঞ্জ।
৪
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। (স্বগত—একটু পরে) বাঃ! মৃগেন যাকে ভালবাসে
তার বাড়ীও যে সেইখানে। (প্রকাশ্যে) আপনারা
আমাকে একটু খবর দিতে পারেন। রামগঞ্জের
দীনময়ী ঠাকরুণকে চেনেন আর তার ভাসুরঝিকে ?
আমার একটা ছােকরা ভাইপাে আছে, ব্যাটা নাকি
তার কাকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই মেয়েটার সাথে খুক
প্রেম চালাচ্ছে।
মালতী। (অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে) আমি—এ্যা—আমি আমার
খুড়ীমার সঙ্গেই থাকি, আমিই সেই মেয়ে।
রমেশ। (স্বগত) ওঃ রে ! এই ব্যাপার। (প্রকাশ্যে ) তাহলে
এখানে এসেছ এখন
উভয়ে। (উঠিয়া উভয়ে সংলগ্ন হইয়া রমেশের দিকে অগ্রসর হইয়া
আসিল, সারা দৃশ্য জুড়িয়া তাহাদের হাত পরস্পর জড়াইয়া
ছিল) আপনাকে দেখতে।
রমেশ। (একটু পিছাইয়া) আমাকে দেখতে ?
উভয়ে। ( অগ্রসর হইয়া) ।
রমেশ। (স্বগত) মজা মন্দনা। ওরা আমাকে হরেন বলে
মনে করছে। তাদের ভুল ভাঙ্গবে না। দেখি
মৃগেনটার কিছু উপকার করতে পারি কি না! (দয়ার
সহিত অগ্রসর হইয়া) তাহলে তুমি—তাহলে
মালতী। মালতী ধর, ভারি দুঃখী আমি? ( ফিরিয়া নলিনীর বী
কাঁধে মাথা রাখিয়া কাঁদিয়া উঠিল)
৪৪
খুড়াে খুড়ী
।
রমেশ। (একটু জোরে যেন খুব ব্যাকুল হইয়াছে সেই ভাবে) থাক,
থা! কাদা ঠিক নয়। এ সব কেন—এখানে-
(স্বগত) ব্যাপারটা ভালাে হচ্ছে না আমার ! বলে
ফেলি আমি কে! (কোমল সুরে প্রকাশ্যে ) কেঁদো না,
কেঁদোনা। ( মালতীর পিঠ চাপড়াইয়া দিল) থাম।
থাম! মৃগেন সুন্দর ভালাে ছেলে-লােকে বলে
তাকে নাকি তার কাকার মতই দেখতে ।
নলিনী। (হঠাৎ মালতীর কাঁধের উপর দিয়া কথা বলিল ) তাই
আমারাে তাই মনে হয়। (তাড়াতাড়ি পিছাইয়া)
মাপ করবেন—মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে ।
রমেশ। (অত্যন্ত খুসি হইয়া) ওঃ মাপ চাইতে হবে না! তােমার
সরলতা প্রশংসনীয়। তুমিও তােমার খুড়ীমার সঙ্গে
থাক কি ?
নলিনী। দিদি, আমার পরিচয় দে।
মালতী।
এ আমার খুড়তুতাে বােন নলিনী।
রমেশ। খুসি হলুম। কেমন আছ, নলিনী ? তুমিও তােমার
খুড়ীমার সঙ্গে থাক বুঝি? তা আমি মৃগেন হলে
তােমাদের দুটিকেই ভালবেসে বসতুম।
নলিনী। ওঃ! আপনি খুব ভালো মানুষ। জানেন, আমরা
আপনাকে ভারি ভয় কচ্ছিলুম। ( উভয়ে হাসিল)
রমেশ।
(মেয়েদের সঙ্গে হাসিয়া উঠিয়া) আমাকে ভয় কচ্ছিলে?
হাঃ হাঃ! কেন ?
খুড়াে খুড়ী ৪৫ মালতী। ভেবেছিলুম-আপনি কড়া মানুষ, আমাদের দেখে বিরক্ত হবেন। রমেশ। (স্বগত) একটু কড়াই হতে হচ্ছে—নইলে সম্মান রাখা যাবে না! ( প্রকাশ্যে ) তাহলে আমার ভাইপাে আর তুমি উভয়ে উভয়ের প্রেমে পড়েছ ? এখন কি ফল হবে আশা কর ? মালতী। সে জানি না। নলিনী। আপনার উপরই তা নির্ভর করছে। মালতী। আজ্ঞে, ওঁর দোষ ততটা নয় যতটা আমার দোষ। রমেশ। (স্বগত) মেয়েদের রকমই এই! ( তার দিকে তাকাইয়া) মেয়েটাকে আদর করতে ইচ্ছা হচ্ছে। আমার ভাইটিও নিশ্চয় তাই করত। রায় পরিবারের লােক তাে ! মালতী। (তার পাশে গিয়া) একবার ভেবে দেখবেন- রমেশ। হাঁ, দেখব বৈ কি! মালতী। আমার দিক হতে মুখ ফেরাবেন না রমেশ। না, ফেরাব না। ভয় নেই। নলিনী। ( মালতীর প্রতি জনান্তিকে) বেশ চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু। রমেশ। (স্বগত) কি করব জানি। আমি অনিচ্ছাসত্ত্বে আমার সম্মতি দেব এবং একে এর খুড়ীর কাছে পাঠিয়ে দিব—তারপর হরেন ফিরে এলে তাকেও সেখানে পাঠাব। আমি একবার মত দিয়ে দিলে তার তা - -- খুড়াে খুড়ী পাকা করা ছাড়া আর কোনাে উপায় থাকবে না। (সে নিকটে গিয়া নলিনীকে এবং মালতীকে চেয়ারে বসিতে ইঙ্গিত করিল এবং নিজের চেয়ার টানিয়া নিকটে বসিল-- উভয়ের মধ্য স্থানে, পরে দৃঢ়ভাবে বলিল) বুঝছ তাে- ( উভয়ে ব্যাকুল ভাবে তার দিকে ফিরিল) আমি- (থামিয়া গিয়া স্বগত) এ অবস্থায় তারা কি বুঝছে তারাই জানে। ( প্রকাশ্যে ) দেখ, মৃগেনের কাছ থেকে যখন প্রথম এই কথা শুনলুম, আমার তখন ভীষণ রাগ হয়েছিল,—আর তা স্বাভাবিকও তােমরা স্বীকার করবে, কারণ তােমাদের সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতুম না; কিন্তু এখন মালতী। (ব্যগ্রভাবে ) বলুন ? নলিনী। (উত্তেজিত ভাবে) বলুন! হাঁ—এখন- রমেশ। (খুসি হইয়া) ওঃ! তাই। উভয়ে। হাঁ, তাই। (তারা তাদের চেয়ার তার চেয়ারের আরাে নিকটে টানিয়া আনিল) রমেশ। বেশ, বেশ! (এখন তিন জনই খুব কাছাকাছি। আরে খুড়তুতাে জ্যাঠতুত বােন আছে ? তােমাদের খুড়ীমা কি বিবাহিত ? আরে তােবা! কি বলছি! মালতী। কিন্তু আপনি বলছিলেন “এখন”- রমেশ। ওঃ! হ! এখন অবিশ্যি অন্য কথা। মালতী। ওঃ !
খুড়াে খুড়ী
৪৭
রমেশ। বেশ ভালাে লােক আমি, না ?
মালতী। তাহলে আপনি মত দিচ্ছেন।
রমেশ। জোর দিয়া ) , দিচ্ছি। যাও, বাড়ী গিয়ে তােমার
খুড়ীমাকে জানাও মৃগেনের কাকা সম্মতি দিয়েছে
এবং এ সম্বন্ধে গিয়ে শীঘ্রই তাঁর সঙ্গে আলাপ করবে।
(তাহারা রমেশের কাছে গিয়া দাড়াইল, রমেশ দুই বাহু দিয়া
দুই জনকে জড়াইয়া ধরিল) কেমন ! হলােত! এখন
তাে আমরা খুসি হলুম? কোনাে দুঃখ নেই তাে আর ?
মালতী। ( লজ্জিত মুখে) কাকাবাবুর স্নেহচ্ছায়ায় এসে সব দুঃখ
দূর হয়ে গেছে।
নলিনী। ভবিষ্যৎ কাকাবাবুর !
মালতী। হাঁ, তাই!
রমেশ। তা আত্মীয়তাটা পূর্ব থেকেই হয়ে গেলে ভালাে।
কাকাবাবুটিকে পচ্ছন্দ হচ্ছে তাে?
মালতী। হাঁ, ওরি মত কিনা-
'রমেশ। (স্বগত) মত তার বেশী নয়।
মালতী। এখনি আপনার প্রতি মায়া হচ্ছে—মনের ভাব কি
করে বুঝাব জানি না।
রমেশ। কেন, চেষ্টা করতে দোষ কি?
মালতী। কি করে ?
রমেশ। আমাকে আদর করে।
নলিনী। ( জনান্তিকে) তাতে আর দোষ কি? (রমেশ দুজনকে
দুই বাহু দিয়া জড়াইয়া আদর).
৪৮
খুড়াে খুড়ী
নলিনী ও মালতীর গান)
স্বপন আমার সফল আজিকে,
সাধনা সফল আজি!
আমি পাব তাকে যাকে
দেহ মন প্রাণ সঁপেছি ।
সারাটি জীবন বিরলে বসিয়া
রচেছি গােপনে যে মায়া ডোর,
বিধির কৃপায় বুঝিবা তাহাতে
পড়েছে ধরা মম মন-চোর!
(দৌলৎ পালকে লইয়া বিধুর প্রবেশ, যাহা দেখিল
তাহাতে দৌলৎ বিস্মিত)
দৌলৎ। ( বিধুর প্রতি) আমি একটু পর আবার আসব।
বিধু। (রমেশের চেয়ারের পিছনে) দৌলৎবাবু এসেছেন।
( বিধু নিষ্ক্রান্ত, সকলে চকিয়া উঠিল)
দৌলৎ । আমার দিকে চাইবেন না। আমার দিকে চাইবেন
, আমি কেউ নই।
রমেশ। এ ! না, অবিশ্যি নয়। এআমি-আমি-
(মালতীর দাঁত পরীক্ষার ভাণ করিয়া) আমি—এস-এর
দাঁত পরীক্ষা করছিলুম।
দৌলৎ। এ্যা? হা, হ—আমিও এ সব করিছি—বর্তমানে
আমি-আমি টেলি পেয়ে
রমেশ। টেলি? ওঃ! হাঁ ! আপনার ছাতি ?
খুড়াে খুড়ী ৪৯ দৌলৎ। হাঁ, আমারি ছাতি। আমার খুব প্রিয় জিনীসটি, তাই এক্ষণি এসে পড়েছি। রমেশ। বিধুর উচিত ছিল আপনাকে তা দিয়ে দেওয়া। আমার জিনীসপত্রের সঙ্গে আছে, নিয়ে আসছি। মাপ কর মালতী, নলিনী দৌলৎ। মালতী, ঢুকেই তােমাকে দেখেছি আমি। রমেশ। (ফিরিয়া) এ। ( ফিরিয়া) এ! এই ভদ্রলােকটি কে ? মালতী। আমার বাবার একজন বন্ধু । রমেশ। (দৌলতের প্রতি উচ্ছসিত ভাবে) বেশ! আপনাকে দেখে ভারি খুসি হলুম। আমরা সবই আপন লােক দেখছি। আমি এর কাকাবাবু ! দৌলৎ। (স্বগত) এর কাকাবাবু? কে লােকটি ? নলিনী। অন্ততঃ শীগগীরই তা হবেন। দৌলৎ। ( নলিনীর দিকে ফিরিয়া) তুমি এরি মধ্যে এতটা ভালাে হয়ে গেছ দেখে সুখী হলুম। মৃগেনবাবুর সেই বােক। বুড়াে কাকাটা খুব সম্ভব অনুতপ্ত হয়ে নলিনী। (দ্রুত) হাঁ, তিনি অনুতপ্ত হয়েছেন। রমেশ। ( বিরক্ত হইয়া ):মশাই, আপনি কেতা- মালতী। উনিই যে রায়মশায়—মৃগেনবাবুর কাকা! দৌলৎ। ( মাথায় হাত দিয়া) ওরে! হিরণের ভাই- কালকের কথা জানে কিনা কে জানে মেয়েদের ? ।
খুড়াে খুড়ী
প্রতি) আমাদের দুজনের মধ্যে একটুও সাদৃশ্য নেই।
( উভয় মেয়ের অসংযত হাসি)
রমেশ। (অর্থহীন ভাবে হাসিতে যােগ দিয়া) রহস্যটা কোথায়
বুঝলুম না।
মালতী। এই জায়গায়, বাবা চান দৌলৎবাবুর সঙ্গে আমার
বিয়ে দিতে --
রমেশ। কি অদ্ভুত কথা !
দৌলৎ। আপনি যেই হােন্ না কেন, একথা বলবার আপনার
কোনাে অধিকার নেই।
রমেশ। তোমরা মাপ কর।
মালতী। আপনি জিদ করছিলেন চন্দনার সঙ্গে মৃগেনবাবুর
বিয়ে দেবেন, কাজেই তা ঠেকাবার জন্যে
নলিনী। দৌলৎবাবুকে আমরা আপনি বলে চালিয়েছিলুম :
রমেশ। (ঘৃণার সহিত দৌলতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া) কি!
এটাকে আমি বলে চালিয়েছিলে ?
দৌলৎ। আমি বলে রাখছি, আমাকে এটা বলতে দেব না
আমি।
যে কাজ আমি ভালই চালাচ্ছিলুম, কিন্তু
আপনারি বােন
রমেশ। ( দৃঢ় ভাবে ) মশায়, আমার বােনের সম্বন্ধে আবার
কি ?
দৌলৎ। কিছু না। সে ছিল আমার প্রথম প্রেয়সী, গতকল্য
তার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ—দুজনেই তাতে
বিপর্যস্ত
খুড়াে খুড়ী রমেশ। ওঃ! ওঃ! তাহলে আপনাকে দেখেই আঘাত পেয়ে এসেছিল কাল! এতে অবিশ্যি আমি আশ্চর্য্য হচ্ছি । (লাঠি লইয়া) এখন তােমরা তাড়াতাড়ি খুড়ীকে তার করে এই খবরের জন্যে প্রস্তুত করে রাখ। মালতী। কিন্তু মৃগেন বাবুর যে এখানেই আমাদের সঙ্গে দেখা দেবার কথা। রমেশ। বেশ, তাহলে তার করে দিয়ে ফিরে এস। দৌলৎ- বাবু, আপনি একটু অপেক্ষা করলে ভৃত্য আপনার ছাতা এনে দেবে। আসি তবে, নমস্কার। দৌলৎ। নমস্কার। তাহলে একটু বসি। ( বসিলরমেশ নিষ্ক্রান্ত ) মালতী। (নলিনীর প্রতি জনান্তিকে) এখানে অপেক্ষা কর্! উনি হয়ত মৃগেনবাবু সম্বন্ধে আমার উপর রাগ করে আছেন। বাবার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত একে প্রত্যাখ্যান করা চলবে না। (নলিনী নিষ্ক্রান্ত, মালতী দৌলতের নিকটে আসিয়া তার বাহুতে ধরিল ; দৌলৎ তাহার হাত ঝাড়া দিয়া ফেলিল) ওঃ! আপনি আমার উপর রাগ করেন নি ? দৌলৎ। আমি কারাে সঙ্গে কথা বলছিনা। মালতী। এ সবের মানে কি ? দৌলৎ। তুমি নিজে কি ভাবছ?
খুড়াে খুড়ী মালতী। কাল বল্লেন আপনি আমাকে ভালবাসেন, এমন সব গােপন কথা আমাকে বল্লেন যা প্রেমিক ছাড়া কেউ বলতে পারে না, আপনি আমার মন চুরি করলেন- আমাকে কত কিছু বলে আদর করলেন। এখন কিনা দৌলৎ। তুমি ভাবছ আমার সঙ্গে যা তা ব্যবহার করবে ? মালতী। আমি তাে কারু সঙ্গে যা তা ব্যবহার করতে যাচ্ছি । বলুন, আপনি আজও আমাকে কালকের মত ভালবাসেন কিনা ? দৌলৎ। এখনই স্বচক্ষে যা দেখলুম তারপরও? মালতী। (স্বগত) ওঃ, তাই! ( প্রকাশ্যে ) আপনার ঈৰ্য্যা হয়েছে, না ? দৌলৎ। তা অসম্ভব কি! আমিও তো মানুষ। (স্বগত) মেয়েটাকে আমার বিয়ে করতেই হবে দেখছি। মালতী। দৌলৎ বাবু, আমার সঙ্গে ছেলেখেলা করতে পারবেন না। দৌলৎ। সে দেখা যাবে। মালতী। কালকের কথা মনে করবেন। আমার এমন বন্ধু বান্ধব আছে যারা আপনাকে রেহাই দেবে না। দৌলৎ। কালকের কথা ভুলব না। কাল তােমার জন্যে অনেক করেছি। মালতী। আর এখন সব ভুলে যেতে চান ?
খুড়ে খুড়ী
দৌলৎ। (তাহার হাত দুটি ধরিয়া) না, না, তা চাই না, তবে
আমি একটু ভাবপ্রবণ, মনটা বড়ই বিপর্যস্ত হয়ে
গেছে।
মালতী। তাহলে আমাকে আর হেলা করবেন না ?
দৌলৎ। না, মালতী—জানাে তাে আমার বয়স নেই, রূপ নেই,
তবে আমার মনে সহজেই লাগে, যখন রায় মশায়ের
বাহু বেষ্টনের মধ্যে তােমাকে দেখলুম
মালতী। ওঃ, সে তো শুধু রহস্য !
দৌলৎ। তাই নাকি? তাহলে আমিও একটু রহস্য করেনি ?
মালতী। দেখুন, দৌলৎ বাবু
দৌলৎ। ক্ষতি কি রহস্য—(ধরিয়া আদর)
মালতী। আমি যাই এখন, নলিনী অপেক্ষা করে আছে।
দৌলৎ। (দরজায়) আমাদের ভাব হয়ে গেল তাে ?
মালতী। হাঁ। (স্বগত) এখন বাবার সম্মুখে পড়তে আর
ভয় নেই। ( নিম্ফন্তি )
দৌলৎ। (একা) বেশ মেয়ে! ওঃ, কালকের মতই তো
জমিয়ে আনছিলুম। হিরন্ময়ী কালকে যে আমাকে
চিনে ফেলেছিল সে ভালােই হয়েছিল, নইলে আমি
যে কি করে বসলুম জানি না।
হিরন্ময়ী। ( বাহিরে ) তাের কর্তা বাড়ী এলে বলি, বিধু।
দৌলৎ। হিরন্ময়ীর স্বর, ওর মন না জানা পৰ্য্যন্ত ওর সম্মুখে
যাওয়া হবে না। ওঃ! ঐ সে আসছে-( যাইতে
৫৪
খুড়াে খুড়ী
উদ্যত—হিরন্ময়ী প্রবেশ করিবামাত্র দৌলৎ টেবিলের আড়ালে
লুকাইল)
হিরন্ময়ী। আজ সকালে আমি কোনাে কিছুতেই মন দিতে
পারব না। (দরজার কাছে গেল ) বড়দা! ( দরজা
খুলিল) চলে গেছে বােধ হয়। (দৌলৎ হামাগুড়ি দিয়া
হিরন্ময়ীর দৃষ্টির বাহিরে গেল ) দৌলৎ বাবুর সামনে
পড়লে আমি যে এতটা কাবু হয়ে পড়ব তাতে
ভাবিনি কখনাে। (দৌলতের ফটো বাহির করিয়া আদর,
দৌলৎ তাহা দেখিয়া নীরব প্রেম প্রকাশ করিতে লাগিল )
আগের চেয়ে কত পরিবর্তন হয়েছে মুখের। তবু
সেই সুমধুর ভাবটি কি আমি ভুলতে পারি ! ওঃ ।
তুমি কি আমাকে আগের মত এখনাে ভালবাসতে
পারবে!
দৌলৎ। (মাথা তুলিয়া) পারব ! ( হিরন্ময়ী চীৎকার করিয়া
দৌলতের দিকে ধাবিত হইয়া তার বাহুর মধ্যে মুচ্ছিত হইয়া
পড়িল, তাহার ভারে দৌলৎ তাহাকে নিয়া চেয়ারে বসিয়া
পড়িল)
হিরন্ময়ী। আমি কোথায় ?
দৌলৎ। তােমার দৌলতের বাহুতে।
হিরন্ময়ী। একি স্বপ্ন !
দৌলৎ। না, সত্যি চেয়ে দেখ—আমি সেই হারাণাে মানুষ।
হিরন্ময়ী। (এখনাে তার বাহুতে কেন হারিয়েছিলে ?
দৌলৎ। ভুল পথে গেছিলুম, এখন ঠিক স্থানে ফিরে এসেছি।
খুড়াে খুড়ী ৫৫ হিরন্ময়ী। বল আমাকে এখনাে ভালবাস? দৌলৎ। বাসি, হিরণ! বাসি! হিরন্ময়ী। তাহলে আমি তােমারই আবার তার বাহুতে ধরা দিল ) দৌলৎ। আমাকে দেখে একটুও নিরাশ হওনি তাে? হিরন্ময়ী। ( প্রথম ফটোর দিকে পরে তার দিকে চাহিয়া) হাঁ, তােমার একটু পরিবর্তন হয়েছে—তােমার চুল এখন একটু বেশী কালাে হয়েছে। দৌলৎ। (স্বগত) ভারি মুস্কিল তাে! ( প্রকাশ্যে ) তুমিও হিরন্ময়ী। বয়স ত আর কারু কমের দিকে যায় না, দৌলৎ বাবু, আপনারও নয়, আমারাে নয়। ( মৃগেন্দ্রের প্রবেশ, সে দৌলৎ ও হিরন্ময়ীকে একত্র দেখিল ; অন্যদের ইঙ্গিতে করিল ; ফণী ও মেয়েদের পা টিপিয়া প্রবেশ) দৌলৎ। আমাকে বাবু টাবু ডেকো না-আপনিও ডেকো না, হিরু, আগের মত ডাবে! ডাবে—মার- মৃগেন্দ্র ফণী উভয় মেয়ে ( এক সঙ্গে কথা সম্পূর্ণ করিয়া দিল) দুল !!
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
দৃশ্য। প্রথম অঙ্কের অনুরূপ। সময় অপরাহ্ন। যবনিকা উঠিতেই
জনা প্রবেশ করিল, তাহার হাতে ফুল লইয়া সে টেবিলের উপর
সাজাইয়া রাখিতে লাগিল। দরজার দিকে তার পিঠ।
জনা। দিদিমণিরা কোথায় গেছিল কে জানে। ঠাকরুণকে
এত রাগতে আর কখনাে দেখিনি।
( মালতী, মৃগেন, নলিনী এবং ফণীর প্রবেশ )
মালতী। খুড়ীমা কোথায় ?
জনা। ওমা ! চমকে দিয়েছে যে।
মালতী। খুড়ীমা কোথায় ?
জনা। ঘুমুচ্ছেন ; কেউ যেন বিরক্ত না করে বলে শুয়েছেন।
মালতী। আমার কোনাে টেলি পেয়েছেন ?
জনা। পেয়েছেন।
মালতী। কিছু বলেছেন?
জনা। হাঁ, বলেছেন।
মালতী। (ব্যগ্র ভাবে) কি ?
জনা। বলেছেন-আবার তারা বােধ হয় আমাকে বােক?
বানাতে চাচ্ছে।
মৃগেন্দ্র। সে হােক্ গে। দেখা করতে হবেই। পাঠিয়ে দাও
মালতী।
খুড়াে খুড়ী
মালতী। হঁ জনা, যা, বল গিয়ে আমরা এসেছি।
জন। যাচ্ছি।
( নিষ্ক্রান্ত)
মালতী। ঘুম থেকে জাগালে ওঁর খারাপ মেজাজ যে আরাে
খারাপ হয়ে যাবে।
মৃগেন্দ্র। আমার সম্বন্ধে তার মনে হয়ত কোনাে বিরুদ্ধ ভাব
নেই। কাকার মত হয়েছে শুলে ওঁর রাগ থাকবে
। তুমি বল্ গিয়ে যে কাকার মত্ হয়েছে।
মালতী। হাঁ, তাতে হয়েছে।
মৃগেন্দ্র। কিন্তু মত যে হয়েছে তা কিন্তু আমার উপলদ্ধি
হচ্ছে না।
নলিনী। ওর সঙ্গে দেখা হলেই উপলদ্ধি হবে।
মালতী। হাঁ, তার সঙ্গে আগে কেন তুমি আমাকে পরিচিত
করে দাওনি, সেজন্য তােমার সঙ্গে আমার ঝগড়া
আছে।
মৃগেন্দ্র। আমার তাে-
মালতী। আর কিছু বলে দরকার নেই তােমার। এমন ভালো
লােক তিনি।
নলিনী। বাস্তবিক বেশ লেগেছে ওঁকে আমার। চমৎকার
মানুষ!
ফণী। আরে মৃগেন, ওদের দুজনকে যে তাের কাকা একেবারে
মুগ্ধ করে ফেলেছে।
মৃগেন্দ্র। তা আর আশ্চর্য্য কি? আমার অদৃষ্ট এখন সুপ্রসন্ন
বলতে হবে।
খুড়াে খুড়ী
স্বগেনের গান)
অমল মধুর প্রেম পারাবার
উছলে বিরহ-দগধ প্রাণে !
শত ইন্দ্ৰ ধনু হাসির ছটায়,
লীন হৃদি-তম উজল বর্ণে!
সলাজ চাহনি মধুর বাণী,
পিপাসু প্রাণে প্রেম নিঝরিণী
এস প্রথম প্রেম কিরণ রেখা
মম হৃদয় পূরব কোণে,
আমি তােমা লাগি আছি যে চাহিয়া
অধীর তৃষিত প্রাণে !
( দীনময়ীর প্রবেশ)
মালতী। ওঃ খুড়ীমা, তােমার ঘুম নষ্ট করিনি তাে ?
দীনময়ী। করেছিসইতাে। ( সকলে শঙ্কিত হইয়া তার দিকে
চাহিল ) প্রথমতঃ তােরা কাল আমাকে নিয়ে যে
খেলাটা খেলি তা আমি এখনাে ভুলতে পারিনি।
তারপর আমাকে না বলে সহরে গেলি, লজ্জার মাথা
খেয়ে রায় মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করলি, এসব আমি
সহ্য করতে পারব না। তাের বাবার কাছে সব
জানিয়ে আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি।
মালতী। কিন্তু খুড়ীমা, দৌলৎ বাবুর সঙ্গে যে আমার বিয়ে
সেততা তুমি নিশ্চয় চাইতে পার না।
খুড়ে খুড়ী
মৃগেন্দ্র দেখুন, আমার কাকার যখন মত হয়েছে তখন আমার
প্রতি আশা করি আপনার কোনাে বিরাগ নেই।
দীনময়ী। মালতীর বাবার প্রধান আপত্তির কারণ দূর হতে
পারে, কিন্তু আমার প্রতি তার আদেশ ছিল, তুমি
এখানে যাতায়াত না কর—সে কথা আমি ভুলতে
পারি না।
মালতী। আমি সে রকম আদেশ মানতে চাই না। ভারি তাে !
( উচ্চে কাঁদিয়া উঠিল )
দীনময়ী। (তার নিকট গিয়া) শান্ত হ, মা, যা উচিত তাই
বলিছি আমি। তবে এখন মৃগেনের কাকার যখন
মত
হয়েছে তখন তাের বাবারও মত করাতে পারব
আশা করি।
মালতী। ওঃ! খুড়িমা ! ( দীনময়ীকে জড়াইয়া ধরিল)
(জনার প্রবেশ )
জনা। একটি ভদ্রলােক দেখা করতে এসেছেন।
দীনময়ী। কে ?
জনা। বল্লেন-“বলাে--রায় মশায় এসেছেন।”
দীনময়ী। বলেছিলেন তাে আসবেন, বেশ লােক।
নলিনী। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবেন তা তাে ভাবিনি।
দীনময়ী। আমার সঙ্গেই তার আগে দেখা হওয়া উচিত, আমি
সমস্ত অবস্থা আগে বুঝে তাদের ডাকব। তাের
সব এখন বাগানে যা তাহলে।
৬০ .
খুড়াে খুড়ী
ফণী।
মালতী। ( সকলে বাহির হইয়া যাইতেছে) দেখো, খুড়ীমা, ওঁর
সঙ্গে ভাব করে বসাে না।
মৃগেন্দ্র। ঠিক, রায় পরিবারের লােকেরা মেয়েদের সাথে ভাব
করে নিতে দেরী করে না।
( মালতী ও মৃগেন নিষ্ক্রান্ত)
নলিনী। লােকটি খুব ভালাে বাস্তবিক।
( হাসিয়া) চুপ কর ! বৰ্ম্মা থেকে আমার কাকা এসে
তােমার খুড়ীমার সঙ্গে প্রেমে পড়বে আমি এই আশা
করে আছি।
( ফণী ও নলিনী নিষ্ক্রান্ত )
জনা। ভদ্রলােকটিকে নিয়ে আসব ?
দীনময়ী। হাঁ, নিয়ে আয়। (জনা নিষ্ক্রান্ত) কেমন যেন ভয়
ভয় করছে।
(নিষ্ক্রান্ত)
(জনার সঙ্গে রমেশের প্রবেশ)
'জনা। এখানে একটু অপেক্ষা করুন, ঠাকরুণ এখনি
আসবেন।
রমেশ। আচ্ছা।
(স্বগত) মেয়েটি বেশ। ( প্রকাশ্যে ) এই
দেখ, এখানে এস, পালিও না। তােমার নাম কি ?
জনা।
জনা।
রমেশ। বেশ নামটি তে। পৌরাণিক গল্প আছে।
জনা। তা পুরােনাে লােকে পুরােনােই মনে করে বাবু।
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। এতে ভারি অন্যায়। তােমাকে পুরাণাে মনে করা
অসম্ভব। তােমার ভালবাসার মানুষ হলে আমি তো
তা কখখনাে বলতুম না।
জনা।
(দুষ্টামির হাসি হাসিয়া) তা সম্ভব বাবু।
রমেশ। তা তুমি বেশ সুন্দরী। এই নাও। ( হাতে কিছু দিল
এবং মুখে চুম্বন করিল) (জনা নিষ্ক্রান্ত) এলুম তাে।
কিন্তু হরেনকে সঙ্গে আনিনি। সে ফেরেনি, ভাবলুম
সব এসে খুলে বলে যাই মেয়েদের। কিন্তু বুড়ীকে
কি বলি? দেখা যাক।
দেখা যাক। মুস্কিল দেখি বেড়েই
চলে। মৃগেনকে নিশ্চয় এতক্ষণে তারা বলেছে-
সেও ভেবে নিয়েছে সব ঠিক হয়ে গেছে, আমি যে
হরেন নই তা তাে আর তারা জানে না। মৃগেনও
নিশ্চয় ভেবে নিয়েছে হরেনই মত দিয়েছে। কারণ
আমি এসেছি সে খবর মৃগেনও রাখে না শুলুম।
তা কি করব । মেয়েদের কান্না সইতে পারিনা
আমি-কাকা সেজে তাকে শান্ত করতে হয়েছে-
আর এমন দুইটি মেয়েকে ভালাে না বেসে থাকা
যায়! দুই ছেড়া দেখলেতাে আগুনই হয়ে উঠত।
হাঃ হাঃ হাঃ।
(দীনময়ীর প্রবেশ)
দীনময়ী। নমস্কার, রায় মশায়।
রমেশ। নমস্কার।
খুড়াে খুড়ী
দীনময়ী। বসুন। ( উভয়ে বসিল) আপনাকে দেখে বাস্তবিক
খুব খুসি হয়েছি। ওরা আগেই জানিয়েছিল যে
আপনি আসবেন।
রমেশ। ঘঁ, হ—
দীনময়ী। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবেন ভাবিনি।
রমেশ। আরাে তাড়াতাড়ি সম্ভব হলে আসতুম।
দীনময়ী। আপনার কাছে যে তারা
গেছে তা আমি
জানতুম না।
রমেশ। তা—তা-আপনাকে ছাড়াই আমাদের বেশ
চছিল বিস্মিত দৃষ্টিতে দীনময়ী তার দিকে চাহিল
মাপ করবেন—আমি বলতে চাচ্ছিলুম এ সব
ব্যাপারে মেয়েদের সঙ্গে আর কেউ উপস্থিত না
থাকলেই ভালাে।
দীনময়ী। আপনার ভাইপাে উপস্থিত ছিল তাে?
রমেশ। আমার ভাইপাে ? বােধ হয় না। থাকলে এতটা
মজা হতো না।
দীময়ী। মজা? মজা, রায় মশায় ?
রমেশ। আমি বলতে চাচ্ছিলুম এত মধুর হয়ে উঠতাে না।
জানেন তাে ব্যাটা আমাকে এতদিন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে
এসেছে।
দীনময়ী। তা ঠিক। আপনি যে এত সহজে সে সব
ভুলে-- উঠিল)
খুড়ে খুড়ী রমেশ। (উঠিল) গেলুম, তার কারণ আপনার ভাসুরঝি। তাকে দেখার মানে তাকে ভালবাসা, তাকে ভালবাসার মানে বােকা বনা। আমি তাকে দেখেছি এখন বােকাও বনেছি। (স্বগত) হাসি ঠাট্টার মধ্যেও অনেক সত্য থাকে ; ( প্রকাশ্যে ) আপনি এ কথা নাও জানতে পারেন, কিন্তু আমরা রায় পরিবারের লােকেরা অতি সহজেই মুগ্ধ হয়ে যাই— দীনময়ীর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়া) সুন্দর মুখ দেখলে আমরা সেটুকু না জানিয়ে পারিনা। তা আপনাকে বাস্তবিক ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। দীনময়ী। (একটু পিছাইয়া) আপনার প্রশংসার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। রমেশ। ( অনুসরণ করিয়া) প্রশংসা ? মােটেই নয়। কম করে বলেছি ! (স্বগত) একে চুমাে খাওয়া উচিত বলে বােধ হচ্ছে, আমার ভাইটিতে তাই করতে। ( প্রকাশ্যে ) দেখুন, আপনাকে আমার বেশ ভালাে লেগেছে। 'দীনময়ী। (স্বগত) আশ্চৰ্য ব্যাপার! রমেশ। আমার কোনাে সন্দেহ নেই যে আমরা দুটিতে একত্রে বেশ সুখে থাকতে পারব। দীনময়ী। ( বাধা দিয়া) বাস্তবিক—রায় মশায়— রমেশ। হাঁ, ঠিক—আপনি আর হিরন্ময়ী বােনের মত হবেন- দীনময়ী। বােন!
৬৪
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। হাঁ, আমার বােন কিনা, তাই।
দীনময়ী। (স্বগত) ভারি যে মুস্কিলের অবস্থায় পড়লুম !
রমেশ। খুড়ী আছেন, ডবল খুড়ী হবেন।
দীনময়ী। (গাম্ভীর্যের সহিত) মাপ করবেন, আপনার প্রস্তাব
আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে হচ্ছে।
রমেশ। { বিস্মিত ) কি, প্রত্যাখ্যান করছেন ?
দীনময়ী। আমার বৈধব্য শেষ পর্যন্ত আমি রক্ষা করেই চব
মনে করেছি।
রমেশ। (শঙ্কিত-স্বগত) কি গােলমাল বাঁধিয়ে তুললুম !
( প্রকাশ্যে ) ওঃ! আপনি ভুল বুঝেছেন বলে মনে
হচ্ছে। আমি আপনার ভাসুরঝির সঙ্গে আমার
ভাইপাের বিয়ের কথাই ইঙ্গিত করছিলুম।
দীনময়ী।
( অভিভূত ) ওঃ! ওঃ! মাপ করবেন, রায় মশায়।
ওঃ, আপনি না জানি আমার কথা কি ভাবছেন?
রমেশ। যা প্রথম দেখেই ভেবেছিলুম-চমৎকার একটি
সুন্দরী! ( উভয়ে মাথা নােয়াইল)
দীনময়ী। তবে এ বিষয়ে মেয়ের পিতার উপরই নির্ভর করছে
তবে তাঁর মত্ হবে আশা করি।
রমেশ। তারা হয়ত সহর থেকে এখনো ফেরেনি ?
দীনময়ী। হা! হাঁ, ফিরেছে। তারা বাগানে—আপনার
ভাইপােও! তাদের ডাকব? মত দেওয়ার পরতে
বােধ হয় তার সঙ্গে আপনার দেখাও হয়নি ?
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। না, তা হয়নি। (স্বগত) আমাকে দেখে তার কি
রকম অবস্থা হবে ভাই ভাবছি।
দীনময়ী। বাগানে গিয়ে তাকে আপনার নিকট পাঠিয়ে দিচ্ছি।
রমেশ। বেশ, বেশ!
বেশ, বেশ! (দীনময়ী নিষ্ক্রান্ত) ছােকরাটাকে হাত
করে নিতে হবে—পরে দেখা যাবে হরেণের মত
পাওয়া যায় কিনা! হাঃ! হাঃ! ষড়যন্ত্র বেশ
পেকে উঠছে। সব যখন জাবে তখন হরেন কি
বলবে ? ( দ্রুত মৃগেনের প্রবেশ, রমেশকে দেখিয়া সে
স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইল) { অগ্রসর হইয়া } কেমন আছিসরে
মৃগেন ?
মৃগেন্দ্র। আ-আপনি ভালাে তাে, বড় কাকা ?
( প্রণাম
করিল )
রমেশ। আমাকে দেখে একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেছিস, না?
মৃগেন্দ্র। না, তা নয়। আমি—আমি ভেবেছিলুম পশ্চিমে
কোথায়ও আছেন।
রমেশ। হাঁ, তাই ছিলুম।
মৃগেন্দ্র। (এখনাে বিস্মিত) আপনার কথা তাে আমার মনেই
হয়নি।
রমেশ। তা হবার কথাও নয়।
মৃগেন্দ্র। এখানে এলেন কেন বুঝছি না।
রমেশ। বাঃ! তাের কাকা
মৃগেন্দ্র। তাতে কি হয়েছে ?
= খুড়াে খুড়ী রমেশ। বুঝলি না ? তাের বিয়েতে মত দিতে এলুম যে ! মৃগেন্দ্র। (বিস্মিত) আপনি !! কিন্তু তাতে তাে কিছু হবে না। রমেশ। সে দেখা যাবে। মৃগেন্দ্র। দেখা যাবে ? কি দেখা যাবে ? রমেশ। শােন্ আমার কথা। আজ সকালে যখন মেয়েরা আমাদের বাড়ী গেল- মৃগেন্দ্র। ( আতঙ্কিত) তখন আপনার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল। রমেশ। হাঁ, ওরা ভেবে নিয়েছিল আমি হরেন, আমিও আমার সে ভুল ভাঙ্গাতে পারিনি। সুন্দরী মেয়েরা। তাের কপাল ভাললারে, তাের কপাল ভালো। (লাঠি দিয়া মৃগেন্দ্রকে খোঁচা দিল ) মৃগেন্দ্র। ( লাঠি ঠেকাইয়া) থামুন ! রমেশ। নে, থালুম। (আবারও বুকে খোঁচা দিল ) মৃগেন্দ্র। থামুন না। ( দৃঢ় ভাবে) ওরা ভাবছেন আমি কাকা বাবুর সম্পত্তি পেয়েছি রমেশ। কে বলেছে তাদের ? আমি বলিনি। মৃগেন্দ্র। কিন্তু তাদের আপনি ভাবতে দিয়েছেন। রমেশ। সে আলাদা কথা। দেখ, তুইও তাদের তাই ভাবতে দে, পরে কি করা যায় দেখা যাবে। হরেন আজ বিকেলে বাড়ী ফিরবে খবর দিয়েছে। তখন তাকে সব বলব, তােদের কি অবস্থায় ফেলেছি বুঝিয়ে
খুড়াে খুড়ী
৬৭
দেব। বুঝিয়ে দেব এথেকে বেরিয়ে আসবার মাত্র
একটি পথ আছে, সে হচ্ছে তার স্বীকৃতি।
মৃগেন্দ্র। তিনি তা দিচ্ছেন না।
রমেশ। জানিনা। আচ্ছা, দেখা যাবে।
( বাহিরে মেয়েদের হাসি শােন গেল )
মৃগেন্দ্র। ঐ তারা আসছে। (সরিয়া গেল )
রমেশ। আমার পরিচয় দিসনে এখনাে।
(মেয়েদের এবং ফণীর প্রবেশ)
মেয়েরা। আঃ! কাকাবাবু! (তাহারা দৌড়িয়া আসিয়া তার
হাত ধরিল)
ফণী
ঐ ।
মৃগেন্দ্র
রমেশ। (খুসি হইয়া) তােমাদের ঈর্ষা হচ্ছে, ঈর্ষা হচ্ছে, না ?
নলিনী। এত শীৰ্গীর এসে পড়বেন ভাবিনি।
মালতী। খুড়ীমার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে ?
নলিনী। সব ঠিকতাে ?
রমেশ। হাঁ, সব ঠিক। (মেয়েরা দৌড়িয়া তাদের প্রেমিকের
কাছে গিয়া আজাদ জানাইল )
নলিনী।
চমৎকার হয়েছে, না? রায় মশায়, এর পরিচয়
দিচ্ছি—ইনি হচ্ছেন শ্রীযুক্ত ফণী কর মশায়।
রমেশ। ভারি খুসি হলুম। তােমার ও কপাল ভালো!
কন্ গ্র্যাচুলেটু করছি।
} :
৬৮ খুড়ো খুড়ী মালতী। (দৌড়িয়া রমেশের কাছে আসিয়া) আচ্ছা, কাকাবাবু, আপনি টেনিস্ খেলেন ? রমেশ। না—তা- আর- নলিনী। (তার বাঁ হাত ধরিয়া) সে হােক গে, এসে দেখবেন আসুন। ( হাসি ঠাট্টার সহিত উভয়ে তাহাকে টানিয়া নিয়া নিন্তি ; মুগেন, ফণী নিরাশ ভাকে দাড়াইয়া রহিল ) ফণী। আমাদের যেন বাদই দিয়েছে । মৃগেন্দ্র। হাঁ, আর কাকাকে ভর্তি করে নিয়েছে। ফণী। তবে বেশ আমুদে লােকটি, তুই যে তাকে কেন অতটা কড়া বলিস্ তার কারণতাে বুঝলুম না। মৃগেন্দ্র। মুখ দেখে কি সব সময় অন্তরের কথা বলা যায় । চল। বেশীক্ষণ ওঁকে ওদের সঙ্গে রাখা যায় না। ( উভয়ে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত) ( হিরন্ময়ী ও দৌলতের প্রবেশ, দৌলতের এক হাত হিরন্ময়ীর হাতে, অন্য হাতে ছাতি। জনা তাহাদিগকে নিয়া আসিয়াছে। জনা। ওঃ, আমি ভেবেছিলুম ঠাকরুণ এখানে। আপনার বসুন—আমি বলছি গিয়ে। (দৌলতের দিকে trick chair অগ্রসর করিয়া দিয়া নিষ্ক্রান্ত) দৌলৎ। (Trick chair এর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া) না, এতে নয় । ( অন্য আসনে গিয়া বসিল) ফণী ।
খুড়াে খুড়ী হিরন্ময়ী। ভারি খারাপ লাগছে। দৌলৎ। কেন ? হিরন্ময়ী। তােমার সঙ্গে আসাতে নির্লজ্জতা প্রকাশ পাচ্ছে, বিশেষতঃ এত তাড়াতাড়ি। দোলৎ। ( উঠিয়া হিরণকে ধরিয়া নিয়া সােফায় বসাইয়া নিজে পাশে বসিল) এখানে এসে বস, দুজনে একসঙ্গেই নির্লজ্জতা প্রকাশ করা যাক। এ করতেই হবে-কাজেই যত শীঘ্র হয় ততই ভালো। (দীনময়ীর প্রবেশ, অভিবাদন) বােধ হয় আমার প্রতি রেগে আছে। একটু ধরতে। এটা। (হিরণকে ছাতি দিল) (অগ্রসর হইয়া দীনময়ীর প্রতি) ঠাকরুণ, আমরা—এ্যা—অর্থাৎ আমি এসেছি -এ-আমার কালকের ব্যবহারের জন্যে ক্ষমা চাইতে। দীনময়ী। বলে যান, মশায় ! দৌলৎ। কিন্তু আসল কথা কি—( হিরণের প্রতি জনান্তিকে) আমাকে একটু সাহায্য করন—( প্রকাশ্যে ) আর সেটা আপনার ভাসুরঝিরই ফন্দী—আমি দুর্বল- তার দরুণ স্বীকার করে নিয়েছিলুম যেযে—আমি সব বুঝিয়ে বলেছি হিরণকে হিরন্ময়ী। (তিরস্কারের সুরে) দৌলৎ বাবু। দৌলৎ। মাপ করবেন মিস্ রায়কে—যাকে আমি—আমি— (কি বলিৱে শিখাইবার জন্য হিরণের দিকে একটু ফিরিল।
৭০ খুড়াে খুড়ী হিরন্ময়ী। (প্রন্ট করিল) ঘনিষ্ঠ ভাবে চিতুম। দৌলৎ। (জনান্তিকে) ঠিক, ঠিক। (প্রকাশ্যে ) যাকে—যাকে —আমি পূর্বেই ঘনিষ্ঠ ভাবে চিতুম—কয়েক বৎসর আগে—আপনি তা জানেন কি না বলতে পারি না। মালতীর পিতা চেয়েছিলেন মালতীকে-মালতীকে আমি বিয়ে করি—কিন্তু-কিন্তু বলেছি তাে-এর সঙ্গে আগেই—আগেই—অনেক আগেই আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল—তাই-তাই- হিরন্ময়ী। ( জনান্তিকে) এই সুযােগে সেই পরিচয় ঝালিয়ে নিলুম। দৌলৎ। (জনান্তিকে) হাঁ, ঠিক। ( প্রকাশ্যে ) এই সুযােগে সেই পরিচয় ঝালিয়ে নিলুম—এখন—এখন আমরা আমাদের-এ- দীনময়ী। আপনাদের—এ! দৌলৎ। হাঁ, তাই। কিন্তু ( হঠাৎ ) আপনি জানলেন কি করে ? ( হিরণের প্রতি জনান্তিকে) কি বলি ? হিরন্ময়ী। লজ্জিত ভাবে একটু অগ্রসর হইয়া) সেই বন্ধুত্বকে পরিণয়ের রঙে রাঙিয়ে দিতে চাই। দৌলৎ। ( প্রশংসা করিয়া) চমৎকার ! দীনময়ী। ওঃ! বুঝলুম ! কিন্তু দৌলৎ বাবু, মালতীর পিতার কাছে আপনার জবাব কি দৌলৎ। (দ্রুত) সে ভেবে রেখেছি। কিছু ক্ষতি পূরণ করতে ?
খুড়াে খুড়ী
৭১.
-
আমি বাধ্য।
কি বল, হিরণ-আমি—আমি—
আমার উকীলের বাড়ী গিয়েছিলুম—আজ সকালে
ঠিক করে এসেছি মৃগেনের সঙ্গে যেদিন মালতীর বিয়ে
হবে সেদিন দশ হাজার টাকা তাদের আমি দেব,
কাজেই অর্থের দিক থেকেও মালতীর পিতা এখন এ
বিয়েতে আপত্তি করবেন না।
হিরন্ময়ী। অবিশ্যি জানেন আমার ভাইত আর অমত
করছেন না-
দীনময়ী। হাঁ, হ, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।
হিরন্ময়ী। দেখা হয়েছে ?
দীনময়ী। হাঁ, আজ বিকেলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে
এসেছিলেন-তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে খুশী হয়েছি।
হিরন্ময়ী। দাদার বুদ্ধি শুদ্ধি লােপ পেয়েছে দেখছি—আমাদের
সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে
দীনময়ী। ওঁরা সব বাগানে—টেনিস্ খেলছে-তাদের সঙ্গে
যােগ দেবেন, দৌলৎ বাবু ?
দৌলৎ। কিন্তু উপযুক্ত পােষাক নিয়ে যে আসিনি।
দীনময়ী। মিস্ রায়, আসুন আমার ঘরে। সব বিষয়ে আলাপ
( নিষ্ক্রান্ত)
হবে।
হিরন্ময়ী। যাচ্ছি।
দৌলৎ। যাও, যাও, হিরণ। (ঠেলিয়া দিল, এবং দরজায় তার
হাত হইতে ছাতা লইল) এটা নিয়ে যাই, দরকার হতে
१२
খুড়াে খুড়ী
পারে। দেরী হবে না আমার, (দরজায় ) আসি তবে।
(দুইদিকে দুইজন নিক্রান্ত)
( জনা হরেন্দ্রকে নিয়া প্রবেশ করিল )
জনা।
ঠাকরুণ হয়ত বাগানে গেছেন। কি নাম বলব ?
হরেন্দ্র। (স্বগত) ওদের সকলের সামনে নাম প্রকাশ না
করাই ভালাে। ( প্রকাশ্যে ) নাম থাকূগে; বলল
একজন ভদ্রলােক এসেছেন! (জনা নিষ্ক্রান্ত) বিধুর
কাছ থেকে আমার বাড়ীর কথা শুনেছি,আজ সকালে
নাকি সেখানে প্রেমের হাট বসেছিল। মৃগেনটাকে
এখন কাণে ধরে নিয়ে যাব—সম্ভব হলে আজই
চন্দনার সঙ্গে বিয়ে করিয়ে দেব। তারপরই আমার
অভিভাবকত্বের শেষ হবে—বাঁচা যাবে !
(জনার প্রবেশ)
জনা। মাপ করবেনঠাকরুণ বাগানে নয়, তিনি বােধ হয়
আর একটি মহিলার সঙ্গে তার ঘরে আছেন।
হরেন্দ্র। মহিলাটির নাম কি ?
জনা। হিরন্ময়ী।
হরেন্দ্র। (স্বগত) যা ভেবেছিলুম! হিরণ এখানে ? ব্যাপার
কি ? সারা পরিবারটিই দেখছি আমার বিরুদ্ধে
ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে! (প্রকাশ্যে ) যাও, খবর দাওগে।
জনা। যাচ্ছি আজ্ঞে। কি নাম বল্ব ?
খুড়াে খুড়ী
হরেন্দ্র। চুলােয় যা নাম, আমার নাম নেই। যা বলি কর।
- জনা নিষ্ক্রান্ত) মেয়েটা বােকা ! এখনাে হিরণের
সঙ্গে দেখা করতে চাই না। পরে তাকে আক্কেল
দেওয়া যাবে। তাদের মাথার উপর কি বাজ উদ্যত
হয়ে আছে তারা তাে জানে না। সচরাচর আমি
রাগি না, কিন্তু ওরা এখন আমার সম্মুখে এলে
আমি-আমি-
(দীনময়ীর প্রবেশ)
দীনময়ী। নমস্কার। আমার কাছে আপনার কি প্রয়ােজন ?
হরেন্দ্র। আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে আপনার উপর এই
অত্যাচারের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তবে
অবিশ্যি আমাদের পরস্পর নাম জানা আছে।
( দ্বিধায় সহিত) আসল কথা কি—আমার একটি
ভাইপাে আছে—সে-সে-
দীনময়ী। বলুন, সে আর আশ্চৰ্য্য কি! আমারো একটি
ভাসুরঝি আছে।
হরেন্দ্র। তাই—তাই। তারা উভয়ে উভয়কে ভালবাসে।
দীনময়ী। (স্বগত) এ্যা—এ আবার কে ?
হরেন্দ্র। আজ বাড়ী পৌছেই আমি এখানে চলে এসেছি,
তাড়াতাড়ি গােপনে বিয়ে হয়ে যায় কি না সেই ভয়ে।
দীনময়ী। (স্বগত) ও রে । বৰ্ম্মা থেকে আসছে। নিশ্চয়
ফণীর কাকা। ( নিকটে গিয়া প্রকাশ্যে ) এখন বুঝলুম
৭৪
খুড়াে খুড়ী
আপনি কে। আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়াতে ভারি
খুসী হলুম।
হরেন্দ্র। হাঁ, আমার জন্যে খুব অস্থির হয়ে আছে নিশ্চয়
ছােরাটা।
(হৈ চৈ করিতে করিতে নলিনীর প্রবেশ)
দীনময়ী। আয় মা, তাের ভবিষ্যৎ খুড়শ্বশুরের সঙ্গে তোর
পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। হরেন্দ্রের প্রতি) মশায়, এই
আমার ভাসুরঝি, আপনার ভাইপাে আর এ উভয়ে
উভয়কে ভালবাসে।
নলিনী। ওঃ! আপনিই কাকা ? সে ভারি খুসি হবে,
আপনার কথাই বলে সব সময়—আপনাকে অবিশ্যি
কখনাে দেখেনি—হরেন্দ্রের মুখের খুসির ভাব বিস্ময়ে
ডুবিয়া গেল। তবে আপনার ভালবাসার মূল্য সে
বােঝে বেশ। (দীনময়ীর কাছে গেল )
হরেন্দ্র। (স্বগত) কি বকছে মেয়েটা ? দেখেনি আমাকে
কখনো? এখনি তার চর্ম চক্ষে আমি দৃশ্যমান হয়ে
উঠব।
দীনময়ী। দেখ, কেমন, আজই তিনি এসে সহরে পৌঁছেচেন,
পৌছেই এখানে রওনা হয়ে এসেছেন।
ওঃ ।
কোথায় পাওয়া যাবে তাকে তা তিনি বেশ জানতেন
দেখছি।
হরেন্দ্র। (স্বগত) এমন অদ্ভুত মেয়েলােকও তাে দেখেনি
কখনাে !
খুড়াে খুড়ী
৭৫
নলিনী। যাই, ওকে বলি গিয়ে আপনি এসেছেন। শুনে কত
সুখী হবে।
( নিষ্ক্রান্ত)
দীনময়ী। মেয়েটি বেশ, না?
হরেন্দ্র। হাঁ, বাস্তবিক মেয়েটি বেশই–মিছামিছি লজ্জা নেই
—আবার বাড়াবাড়িও কিছু নেই, স্বভাবটি বেশ
মধুর এবং স্বাভাবিক।
দীনময়ী। আপনার কাছে ভালাে লেগেছে শুনে সুখী হলুম।
হরেন্দ্র। { স্বগত) এর কাছে চন্দনাকে লাগে না। কিন্তু
( সুর বদলাইয়া) এর টাকা নেই যে, কাজেই কোননা
লাভ নেই। ( দৃঢ় ভাবে ) না! চন্দনাকেই বিয়ে
করতে হবে ওকে, নইলে তার টাকা সব আমি কোনাে
হাসপাতালে পাঠিয়ে দেব ।
ফণী এবং নলিনীর প্রবেশ, ফণী আসিয়া হরেন্দ্রকে প্রণাম
করিল। নলিনী দীনময়ীর কাছে রহিল।
ফণী। আঃ! কাকা বাবু! এতদিনে ফিরে এলেন দেশে।
হরেন্দ্র।
(শূন্য দৃষ্টিতে তাকাইয়া) কি বছ তুমি ?
ফণী। কি বলছি ? কেন, আপনার কথাই বলছি।
হরেন্দ্র। তাই তাে বােধ হচ্ছে। কিন্তু তুমি কেহে, বাপু?
ফণী। কেন, আপনার ভাইপাে !
হরেন্দ্র। তুমি !
৭৬
খুড়াে খুড়ী
নলিনী। হাঁ, উনিই তাে!
হরেন্দ্র। নাগাে, সে নয় !
দীনময়ী। আপনাকে নিশ্চয় বলছি সে-ই আপনার ভাইপাে !
হরেন্দ্র। (ফণীর দিকে চাহিল, পরে দীনময়ীর দিকে চাহিয়া কষ্টে
ক্রোধ সংবরণ করিয়া) দেখুন, আপনাকেও নিশ্চয় বলছি
সে তা নয়। (রাগে পায়চারি
ফণী । ( নলিনীর প্রতি জনান্তিকে মাথা ছু ইয়া) সর্দিগৰ্ম্মি !
দীনময়ী। ( ফণীর প্রতি) আসা অবধিই ওঁকে এ রকম অদ্ভুত
দেখছি।
ফণী। কাকাবাবু !
হরেন্দ্র। কাকা কাকা করােনা বলছি। তুমি কি মনে কর
আমি আমার নিজের ভ্রাতুস্পুত্রকে চিনি না ?
ফণী। নিশ্চয় চেনেন না !
হরেন্দ্র। (রাগিয়া) কি ? নিশ্চয় চিনি না ?
দীনময়ী। না! আগে যখন দেখেন নি তখন কি করে
চিনবেন ?
হরেন্দ্র। ঠিক বলেছেন, আগে কখনাে দেখিনি তাকে
( ফণীর দিকে তাকাইয়া) আর কখনাে না দেখলেও
আমার কিছুই যায় আসে না।
ফণী। (একটু বিরক্ত হইয়া) আপনি আসাতে আমার দুঃখই
হচ্ছে বলতে গেলে।
হরেন্দ্র। বলতে গেলে আমার তাই হচ্ছে, মশায়। আমার
খুড়াে খুড়ী বলিনি। ভাইপাে কোথায়! আপনারা জানেন, মশায়, সে এখানেই আছে ! ফণী। হাঁ, আমি এখানে আছি তা আমি জানি বৈ কি! হরেন্দ্র। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি। দেখুন তো, মশায়, আপনার নামটা কি ? ফণী। কাকাবাবু, যা তা বলবেন না। হরেন্দ্র। আপনার নাম কি ? নলিনী। ( ভীত হইয়া) বলনা তােমার নাম- হরেন্দ্র। (রাগিয়া) নাম বলবেন মশায় ? ফণী । ( নিকটে আসিয়া) নিশ্চয়-ফণী কর । হরেন্দ্র। (সােজা দাঁড়াইয়া) ঐ ত! আমার ভাইপাের কি নাম মনে করেন ? ফণী। জানি না। আমার ভাইপাের নাম হচ্ছে মৃগেন্দ্র রায়। ( খুব খুশি হইয়া) ফণী। ওঃ, বাজে কথা! (রাগিয়া হরেন্দ্র ফণীর দিকে ফিরিল ) মৃগেনের কাকাতাে এখানেই রয়েছেন। হরেন্দ্র। আমি যে এখানে আছি তা আমি জানি। ফণী। তার প্রকৃত কাকার কথা বলছি। হরেন্দ্র। ( শাসাইয়া) আমি কি তবে? তার দালাল ? দীনময়ী। মশায়, রাগবেন না। হরেন্দ্র। মাপ করবেন মহাশয়া ; আমি জোর করে শুধু এই
৭৮
খুড়াে খুড়ী
কথাটুকু বলতে চাই যে এই যুবকটির আমি কাকা
নই !
নলিনী। আপনি বৰ্ম্মা থেকে আসছেন না ?
হরেন্দ্র। জীবনে যেখানে যাইনি সেখান থেকে আসছি বৈ কি।
ফণী। তাহলে আপনি আমার কাকা হতে পারেন না।
হরেন্দ্র। তা পারি বলে তাে আমারাে মনে হয় না।
দীনময়ী। আপনার নামটা কি জিজ্ঞেস্ করতে পারি কি ?
হরেন্দ্র। জানেন না ?
দীনময়ী। দাসী তাে বল্লে আপনি তাকে বলেন নি কিছু।
হরেন্দ্র। (স্বগত) ওঃ, কি বােকা আমি! (প্রকাশ্যে) ভারি
দুঃখিত হলুম, আমার নাম হরেন্দ্র রায়, আপনার
ভাসুরঝির সঙ্গে আমার ভাইপাের বিয়ের প্রতিবন্ধকতা
করতে এসেছি আমি।
ফণী। ওঃ, আপনার মাথা খারাপ ! (হরেন্দ্র রাগিয়া তার দিকে
ফিরিল, উভয়ে উভয়ের দিকে তাকাইয়া রহিল।
দীনময়ী। (নলিনীর প্রতি জনান্তিকে ) লােকটা ঠগ, কিছু মেরে
নিতে এসেছে।
দেখুন, মশায়—আপনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান,
নইলে ভালাে হবেনা।
নলিনী।
ওঃ! আমার যে বডড ভয় করছে।
ফণী । ( জনান্তিকে) চুপ কর নলিনী! (হরেন্দ্রের নিকটে আসিয়া )
মশায়, আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি যে মৃগেলের প্রকৃত
ফণী ।
খুড়াে খুড়ী
৭৯
দৌলৎ।
কাকা এই বিয়েতে মত দিয়েছেন, আপনার কৌশলে
কোনাে কাজ হলাে না! (পরস্পর পরস্পরের দিকে
বিদ্রুপপূর্ণ হাসি )
হরেন্দ্র। ওঃ! তিনি মত দিয়েছেন?
আমার কৌশলে
কোনাে কাজ হবেনা, না ? সে দেখা যাবে - যখন
ছােকরা তার টাকা চাবে তখনই দেখা যাবে ঠগকে !
( রঙ্গিন রুমাল কোমরে বাঁধিয়া জামার আস্তিন গুটানাে
অবস্থায় এক হাতে টেনিস্ র্যাকেট এবং অন্য হাতে ছাতা
লইয়া দৌলতের প্রবেশ )
এ-সব কয়টা বল দেয়ালের বাইরে
ফেলেছি—আর কাচের জানালা ভেঙ্গেছি গােটা দুই
তিন।
ওঃ! আপনাকেই দরকার, দৌলৎ বাবু।
দৌলৎ। ( নিকটে আসিয়া) কেন ?
ফণী। রায় পরিবারের আপনি অন্তরঙ্গ বন্ধু তাে? (হরেন্দ্র
বিস্মিত)
দৌলৎ। হাতা- হাঁ - বলা যায় বৈ কি।
ফণী। মৃগেন্দ্রের কাকাকে আপনি চেনেন ?
দৌলৎ। হ।
ফণী। (হরেন্দ্রকে দেখাইয়া) ঐ ভদ্রলােকটি কে?
দৌলৎ। জানি না। উনি কি নিজকে চিনেন না? (হরেন্দ্রের
সম্মুখে র্যাকেট আস্ফালন ; হরেন্দ্র চমকিত )
হরেন্দ্র। আমাকে চিনবে ? কি করে ? পরিবারের বন্ধু!
ফণী ।
৮০ খুড়াে খুড়ী জীবনে তাে একে কখনাে দেখিনি আগে! লােকটা প্রবঞ্চক। দৌলৎ। আমি বলছি—আপনি যেই হােন্ না কেন, একথা বার আপনার কোনাে অধিকার নেই। ফণী। ইনি মৃগেন্দ্রের কাকা কি ? দৌলৎ। তাতে মনে হয়না, এখনি যে তাকে বাগানে রেখে এলুম-তামাক ফুকে ফুকে দিলদার গল্প কচ্ছেন। বেশ মজার আমুদে লােক কিন্তু । হরেন্দ্র। এ সমস্যার একমাত্র মীমাংসার উপায় হচ্ছে এই লােকটিকে ডেকে আনা এবং দেখা কে এসে এখানে আমি বলে পরিচয় দিচ্ছে। সে তো সহজেই হয়, আর মৃগেন- হরেন্দ্র। তাকে এখনাে ডাকতে চাইনা আমি। ওর সঙ্গে জারি জুরি খাটবে না—ওর কাকার সঙ্গে ওর বেশ ভাব হয়ে গেছে দেখছি। ( ফণী ও নলিনী নিষ্ক্রান্ত ) হরেন্দ্র। ( হঠাৎ স্বগত) এ ধাধার উত্তর পেয়েছি। ঐ গাধা রমেশদাটা এসেছে ! দীনময়ী। ( যাইতে যাইতে) হিরন্ময়ীরও আসা উচিত। হরেন্দ্র। আপনাকে অনুরােধ করছি তাকে এখনাে কিছু বলবেন না, তার সঙ্গে সময়মত আমার বােঝাপড়া ফণী। - ফণী। হবে।
খুড়াে খুড়ী
দীনময়ী (স্বগত) ভয়ঙ্কর ব্যাপার দেখছি! কে জানে
লােকটি কে? ( নিষ্ক্রান্ত)
হরেন্দ্র।
দৌলৎ সরিয়া যাইতেছিল, তাহাকে বাধা দিয়া) না, না,
আপনি না
দৌলৎ। ও, আমার সঙ্গে প্যাচ খেলতে চান ?
হরেন্দ্র। না মশায়, তবে পরিবারের বন্ধুটিকে আমার দরকার
হতে পারে।
দৌলৎ। কি দরকার মশায় ?
হরেন্দ্র। (লাঠি কাপাইয়া) সে সময় মত হবে।
(সিগারেট ফুকিতে ফুকিতে রমেশের প্রবেশ)
রমেশ। (হাত বাড়াইয়া) এ্যা! হরেন যে! কেমন আছ ?
হরেন্দ্র। গাধা কোথাকার!
দৌলৎ। উভয়ে উভয়কে চেনে যে।
হরেন্দ্র। এখানে এসে আবার কি গােলমাল বাঁধিয়ে বসেছ।
রমেশ। গােলমাল ? আমি! প্রতিভার খেলা বল, হরেন।
হরেন্দ্র। (দৌলৎকে দেখাইয়া) এই লােকটা কে ?
দৌলৎ। আমি বলে দিচ্ছি—কেউ যে আমাকে লােকটা
বলবে এ আমি সইতে পারব না।
হরেন্দ্র। আমাদের পরিবারের বন্ধু বলে নিজকে চালাবার
ধৃষ্টতা ওর আছে।
রমেশ। বাঃরে! দৌলৎকে চেন না—বেশ লােক দৌলৎ।
এসততা দৌলৎ, তােমাকে আমার ভাইয়ের সঙ্গে
পরিচিত করিয়ে দিচ্ছি।
খুড়াে খুড়ী
দৌলৎ। (স্বগত } ও, এরা ভাই! (হরেন্দ্রর প্রতি) তাহলে
আপনি মৃগেনের একজন কাকা?
হরেন্দ্র। বলিনি আপনাকে সে কথা ?
দৌলৎ। আরাে জোরে বলেননি কেন ? (বসিল)
হরেন্দ্র। মৃগেনের বিয়েতে তুমি আমার মত দিচ্ছ এ সবের
মানে কি ?
রমেশ। আমি দিইনি। আমি আমার মত দিয়েছি, তারাও
তাতে বেশ সুখী হয়েছে বলছি তােমাকে!
হরেন্দ্র। এ সব ঠাট্টা রেখে কাজের কথা বলতাে। জানােত
আমার মত না হলে ও বিয়ে করতে পারে না, আমি
এ বিয়েতে মত দিচ্ছি না, আমার ইচ্ছা চন্দনার সঙ্গে
ওঁর বিয়ে হয়।
রমেশ। হরেন, একটু ভেবে দেখ—
দৌলৎ। হাঁ, হরেন, ভেবে দেখ—( হরেন ডাকাতে হরেন্দ্র রাগিয়া
দৌলতের দিকে গেল, দৌলৎ ব্ল্যাকেট ঘুরাইল, হরেন্দ্র আরাে
রাগিয়া গেল এবং মূক ভঙ্গীতে রমেশকে নালিশ
জানাইল)
রমেশ। এ জি করাে না, হরেন। এ মেয়েটিকে দেখনি
এখনাে—চমৎকার মেয়ে—এমন চক্ষু—এমন হাসিটি
-যে ইচ্ছা হয়—ইচ্ছা হয়—কি ইচ্ছা হয় সে আর
নাই, বল্লম।
হরেন্দ্র। (একটু খুসি হইয়া) এতটা? এ্যা?
।
{
খুড়াে খুড়ী
দৌলৎ। হাঁ হরেন, এতটাই ! ( সমস্ত আবার পূর্ববৎ হইল। দৌলৎ
আমরা আমােদ পাইল)
হরেন্দ্র। (ভীষণ দৃষ্টিতে দৌলতের দিকে চাহিয়া রমেশের প্রতি)
দেখ আমি মন স্থির করে ফেলেছি—আমি বলছি
চন্দনাকেই মৃগেনের বিয়ে করতে হবে !
দৌলৎ। (জোর দিয়া) আরি আমি বলছি চন্দনাকে সে কখখনাে
বিয়ে করবে না। আর তুমি যদি তার নিজের টাকা
তাকে না দাও, তাকে আমিই আমার উত্তরাধিকারী
করে ফেলব!
হরেন্দ্র। (মূক বিস্ময়ে রমেশেষ দিকে তাকাইয়া দৌলতের কাছে গেল)
দেখুন, মশায়, আপনার মত একটি সুগােল ফুটবল
এসে আমার পারিবারিক ব্যাপারে হাত দেবেন এ
আমি সইতে পারি না। সে তো আর আপনার
আত্মীয় নয় !
দৌলৎ। (উঠিয়া) না! কিন্তু শীগগীরই হবে, কারণ তােমার
বােনকে আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।
হরেন্দ্র। কি। (রমেশ দীর্ঘকালস্থায়ী সমুচ্চ হাসি হাসিয়া উঠিল,
হরেন্দ্র ক্রোধ সংবরণ করিতে পারিল না, খুব আমােদ পাইয়া
দৌলৎ আবার বসিল) {ক্রোধে ফাটিয়া পড়িয়া} এ—এ
অদ্ভূত—আমি-আমি-আমি কিছুতেই এ হতে দেব
না !
দৌলৎ। তােমাকে কেউ জিজ্ঞেসও করবে না, আমরা সাত
জনেরও বেশী।
৮৪
খুড়াে খুড়ী
রমেশ। তা ঠাট্টা থাক্ হরেন, হিরণকে ডেকে আনা উচিত
তোমার।
হরেন্দ্র। আব না! (দৌলৎকে দেখাইয়া) এই লােকটা যাই
করুক না কেন আমি তার ধার ধারি না।
দৌলৎ। ধার না ? তাহলে চুলােয় যাও—তারা যদি আমার
উপদেশ আর টাকা লয় তাহলে তােমাকে ছাড়াই
তাদের চলবে।
রমেশ। কেমন, হরেন! এর উপর কথা আছে ?
হরেন্দ্র। হাঁ, এর উপর কথা নেই মানতে হবে।
দৌলৎ। (হরেন্দ্রের প্রতি) তুমি ভারি বােকা, ভায়া।
রমেশ। আর মেয়েটিকে দেখলে কথা আরাে বন্ধ হয়ে যাবে।
সে আমাদের পরিবারের বাইরে থাকবে তা কিছুতেই
হতে পারে না—আমাদের একজনকে তাকে বিয়ে
করতেই হবে।
দৌলৎ। হাঁ, একজনকে করতেই হবে—তবে কোটি তাই
ঠিক করতে হবে। (ছেলেপিলেদের মত গণিয়া যাইতে
লাগিল) “ইনি মিনি মেনা মাে, ই পিকায় লেট হিম
গাে” ( হরেন্দ্রকে ভীষণ ভাবে পিছন দিকে ঠেলিয়া দিল এবং
আন্তরিক ভাবে হাসিতে হাসিতে বলিতে গেল) তুমি বাদ
পড়ে গেলে হরেন!
মেশ। যাওতো, ভাই দৌলত, সকলকে ডেকে আনতে
দৌলৎ। যাচ্ছি রমেশের প্রতি জনান্তিকে trick chair দেখাইয়া)
...
-
খুড়াে খুড়ী
ওটাতে ওকে বসতে দিন-(কাল্পনিক টেনিস্ খেলিতে
খেলিতে নিষ্ক্রান্ত)
হরেন্দ্র। ( রাগিয়া) এ হতে পারবে না! তুমি কিম্বা আর কেউ
যে আমাকে বােকা বানাবে সে হবে না। যা বলেছি
তার আর অন্যথা হবে না! নিশ্চয় বছি-আমি-
রমেশ। আরে, একটু দাড়াও না।
(মৃগেন এবং মালতীর প্রবেশ—প্রত্যেকে দৌলতের একটি
হাত ধরিয়া, দৌলৎ তাহাদিগকে ছাড়িয়া বসিতে গেল।
হরেন্দ্র। এই ভাবেই বুঝি তুমি আমার অভিভাবকত্ব মেনে
চছ, না ?
মৃগেন্দ্র। তা কাকা বাবু, দেখছাে তাে, আমি
রমেশ। (হরেন্দ্রের প্রতি রেখে দাও, এ আমারি দোষ!
হরেন্দ্র। (রমেশের প্রতি জনান্তিকে) তুমি চুপ থাক ! মেয়েটি
বেশ সুন্দরী না? (মৃগেনের প্রতি) এই বিদ্রোহের
শাস্তি কি ? (লাঠি তুলিয়া)
দৌলৎ। ওকে মেরাে বলছি, হরেন।
হরেন্দ্র। তা—তা— রমেশের প্রতি) তা একে ক্ষমা করতেই
হবে দেখছি। (মৃগেনের প্রতি) দ্যাখ, পাজি ছোড়া,
এই সুন্দরী মেয়েটিকে আমার সঙ্গে দেখা করাতে
নিয়ে গেলি না কেন?
মৃগেন্দ্র। তুমি যে কাকা বাবু, তার কথা তুলতেই
হরেন্দ্র। আরে বােকা, এমন মেয়ের কি অন্য কোনাে
সার্টিফিকেট দরকার পড়ে ? এসাে তাে, মা।
খুড়াে খুড়ী
দৌলৎ। ( মালতীর প্রতি) তুমি হলে কিন্তু যেতুম না।
( ভয়ে ভয়ে মালতী অগ্রসর হইল ).
হরেন্দ্র। দেখ–দেখ রমেশের দিকে চাহিয়া) তুমি তুমি কি
বলতে চাও?
মালত। বড় বড় বিস্তৃত চোখ দুটি তার দিকে তুলিয়া) জানি না,
কাকা বাবু।
হরেন্দ্র। ( সম্পূর্ণ অভিভূত হইয়া তাহার হাত ধরিয়া) যাক, যাক,
আর বলার দরকার নেই। যা বলতে চাচ্ছ, সবই ঐ
চোখে বলা হয়ে গেছে। ( মালতীকে মৃগেনের কাছে
নিয়া গেল ) মৃগেন—(নলিনী ও ফণী প্রবেশ করিয়া পিছনে
দাড়াইল) অনুমতি দিলুম।
মৃগেন্দ্র। (খুসি হইয়া) কাকা বাবু ! (প্রণাম করিল)
হরেন্দ্র। দাঁড়া! দৌলৎ বাবুর কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের
কারণ আছে।
মালতী। দৌলৎ বাবু।
দৌলৎ। (উঠিয়া তার নিকটে গিয়া) হাঁ, মালতী-আমি-আমি
হিরন্ময়ীকে বিয়ে করছি কিনা—তাই-তাই—তােমার
প্রতি এবং তােমার পিতার প্রতি আমার কিছু
কৰ্তব্য আছে, সেই কর্তব্যের দায় থেকে উদ্ধার পেতে
তােমাকে আমি দশ হাজার টাকা দান করলুম।
মালতী। ওঃ! দৌলৎ বাবু।
খুড়ে খুড়ী
৮৭
(দীনময়ী এবং হিরন্ময়ীর প্রবেশ)
হিরণয়ী। দাদা, তাহলে তুমি এখানে ?
হরেন্দ্র। হাঁ, সম্পূর্ণ এখানে।
হিরন্ময়ী। আর তুমিও, বড়দা ?
রমেশ। হাঁ, সম্পূর্ণ।
হিরন্ময়ী। তাহলে দাদা, (মালতী এবং মৃগেনের দিকে চাহিয়া )
তুমি মত দিয়েছ ?
হরেন্দ্র। হাঁ, মত দিয়েছি, আর তুমিও বুড়াে বয়সে বােকা
বতে যাচ্ছ শুনছি।
দৌলৎ। (দ্রুত হিরন্ময়ীর কাছে গিয়া) এ কথা বলছেন কেন ?
বিয়ে করাটা কি বােকা বনা?
হিরন্ময়ী। বােকা না বনার চেয়ে বােধ হয় বনাই ভালাে, তা
বয়স যাই হােক না কেন। (দীনময়ীর প্রতি) আমার
বড় ভাই হরেন্দ্র রায়কে আপনার সঙ্গে পরিচিত
করিয়ে দিচ্ছি।
দীনময়ী। যে ভুল করেছিলাম তার জন্যে আপনার কাছে ক্ষমা
চাচ্ছি। এবার আপনিই আসল কাকাতাে ?
হরেন্দ্র। হাঁ, সে সম্বন্ধে আর কোনাে সন্দেহ নেই।
দীনময়ী। আশা করি সমস্ত ব্যাপারটা স্বপ্ন কি আর কিছুতে
পর্যবসিত হবে না।
ফণী। তা যাতে না হতে পারে সেই জন্যে আমি প্রস্তাব করছি,
বিয়ে দুটি যত শীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন হয়ে যাক!
৮৮ খুড়াে খুড়ী । মৃগেন্দ্র। সাবাস! প্রথমই নিমন্ত্রণ করছি মালতী। আমাদের খুড়ােদের মৃগেন্দ্র। আর আমাদের খুড়ীদের- মিলন গান। ঘাের প্যাচের মিলন হলাে ঘুচে গেল সকল লেঠা, এবার চাই মােরা আছে যত খুড়ো খুড়ী কাকী কাকা! সবাই মিলে গাইবাে মাের সবার মিলন গান, আমোদের তুফান বইবে মেতে উঠবে সবার প্রাণ। যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.