Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Gitay Paramatmatattwa O Muktibad

Debshrmma, Harikishor · 2010/03/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

গীতায়
পরমাত্মতত্ত্ব
মুক্তিবাদ।
শ্রীহরিকিশাের দেবশর্ম। রায়
বিৱচিত।
কুমিল্লা টিচারস এণ্ড কোং কর্তৃক
প্রকাশিত।
১৩৩৪ ব্য, আশ্বিন।
সৰ্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
মূল্য ৰার অনা।

Printed by-Lalit Chandra Choudhury
At the Sinha Press,
COMILLA.

ম!
চির শান্তিধামে তুমি করিছ বিরাজ।
মন চায় সদা তােমা করিতে পূজন,
কিন্তু, কোথা পাব মাগাে ! পূজার সম্ভার ?
অস্থি, মজ্জা, দেহ, প্রাণ, সব তব দান,
ধারণা বাসনা আদি প্রেরণা তােমার ;
আমার বলিতে মাতঃ ! কিছু নাই ভবে।
তব প্রেরণার ফল (এই) ক্ষুন্ড গ্রন্থখানি,
লহগাে আপনি ; হিম-কণা নেয় যথা
জলধির জল। করগাে আশিস, যেন
ভগবদ্ গাথা, উদ্দীপিত করে সবে,
ভগবৎ-প্রেমে।
তোমার অতি স্নেহের
ভোলা।

No text on this page.

নিবেদন ধৰ্ম্মাং পরতরং নাস্তি। ধৰ্ম্ম হইতে উচ্চতর আর কিছুই নাই। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড একই ধৰ্ম্ম সূত্রে গাঁথা। ইহা স্বরূপতঃ জানিয়া আৰ্য্য ঋষিগণ নানা প্রকারে সর্বসাধারণ্যে ধৰ্ম্ম কাহিণী প্রচার করিয়া গিয়াছেন। ধৰ্ম্ম গ্রন্থের অভাব নাই । প্রাচীন আৰ্য ঋষিগণের পদানুসরণ করিয়া বৰ্ত্তমান সুধী মণ্ডলী পৰ্মতত্ত্ব বুঝাইবার জন্য নান ভাবে কত শত শত গ্রন্থ প্রচার করিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। তথাপি যেন তাহাতে সৰ্বসাধারণের প্রবেশ করিবার সুবিধা হইতেছে না। অনুসন্ধান করিলে গৃহে গৃহে বহুল পরিমাণে ধর্ম গ্রন্থাদি দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু গৃহস্বামীকে জিজ্ঞাসা কর, বলিবে, “বাবা “যে কঠিন ভাষা ও যে প্রকাণ্ড কলেবর ! ইহা কি ঠ করিয়া বুঝা যায় ? না পাঠ শেষ করা যায় ?” কথাটী একপক্ষে ঠিক। কেন না, যে গ্রন্থ পাঠে বিশেষ কঠিন বলিয়া বােধ হয়, তাহার পাঠ শেষ করিতে ও অফুরন্ত মনে হয় ; সুতরাং তাহা পাঠ করিতে প্রবৃত্তি জন্মে না। ধর্ম গ্রন্থের ভাব কঠিন, তদুপরি দুর্বোধ্য ভাষা ও প্রকাণ্ড কলেবর দেখিলে নৈরাশ্য উপস্থিত হইবেই। নৈরাশ্য আসিলে সাধারণতঃ সহজ বিষয়ও কঠিন হইয়া দাড়ায়। প্রথমতঃ সংস্কৃত গ্রন্থাদিতে সৰ্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নাই দ্বিতীয়তঃ বঙ্গভাষায় যে সকল গ্রন্থ ভাষান্তরিত হইয়া এবং যে সকল সংগ্রহ গ্রন্থ নানা সংস্কৃত গ্রন্থ মন্থন করিয়া প্রকাশিত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই সৰ্বসাধারণকে প্রবেশাধিকার দিতেছে না। গ্রন্থগুলি অতি উৎকৃষ্ট হওয়া স্বত্বেও সৰ্বসাধারণের মন আকর্ষণ করিতে { yo সরল না পারিয়া বহু স্থানে সুধু আলমারার শোভাই বর্ধন করিতেছে । ভাবে বলিলে একথা সকলেই স্বীকার করিতে বাধ্য। ধর্ম ! যাহার অধিক জগতে আদরের বস্তু নাই, অথচ সকলেই ধর্মতত্ত্ব জানিবার জন্য উৎসুক হওয়া স্বত্বেও তাহার আস্বাদন পাইতেছে না ইহাই তাহার অপেক্ষিক কারণ। মহামহিমান্বিত পণ্ডিত মণ্ডলী তাহাদের গভীব গবেষণার মধ্যদিয়া মার্জিত ভাষা ও বিষয় বিস্তার দ্বারা সৰ্বসাধারণকে তত্ত্বজ্ঞান প্রদাণের চেষ্টা পাইতেছেন ; সৰ্বসাধারণ তাহাতে উপকৃত হইবে মনে করিয়া বহু বহু গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াও কাৰ্যতঃ পূৰ্বোক্ত কাৰণে বিফল মনােরথ হইয়া ঐ সকল গ্রন্থ দ্বারা আলমারার শোভা বর্ধন করিতে বাধ্য হন। আমার মনে হয় সৰ্বসাধারণ কোন কঠিন বিষয়েও যেরূপ সরলভাবে ও সহজ ভাষায় তাহাদের মধ্যে ভাব বিনিময় করিতে পারে, কৃতবিদ্য পণ্ডিত মণ্ডলী ইচ্ছা সত্বেও উচ্চশিক্ষার ভাব প্রবাহে ত প সরলভাবে সাধারণ ভাষা ব্যবহার করিতে নাপারায় দীন পিপাসুগণের তৃষ্ণা নিবারিত হইতে পারিতেছে । এই ভাব আমি অনুভব করিতে পারিয়াছি বলিয়াই প্রকাশ করিতে সঙ্কুচিত হইতেছি না। প্রাণে আবেগ থাকা সত্বেও গ্রন্থ কলেবর ও ভাষা বিন্যাস দেখিয়া ভাব পালাইয়া গিয়াছে। ইহাই আমার বর্তমান পুস্তিকা লিখিবার ও প্রকাশ করিবার মূল কারণ। আজকাল দেখা যাইতেছে, প্রমাণের বড়ই অদর ! যেহেতু কোনও কথা পারিলেই, কেন? প্রমাণ কি ? ইত্যাদি প্রশ্ন উপস্থিত হয়। গুরু কাণে মদিয়া সরিয়া পরিলেন, শিষ্য উদগত চিত্তে ঐ মন্ত্রের ধ্যান ধারণায় রত রহিল এই প্রকার লোক বর্তমানে অধিক দৃষ্টিগোচর হয় না সুতরাং সাং সম্বন্ধে প্রমাণাদি দৰ্শাইয়া ধৰ্ম্ম কি এবং কেনইবা ধৰ্মচরণ করিতে হইবে ইত্যাদি সাধারণ ভাষায় ব্যক্ত ০ করার চেষ্টা করিয়াছি। পাছে গ্রন্থ কলেবর বৃহৎ হইয়া উঠে তজ্জন্য বহু বিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা না করিয়া সুধু মূল তত্ত্বেরই অনুসরণ করতঃ যাহাতে ইহা পাঠে বিষয়গুলি সহজে বােধগম্য হয় এবং সুধী মণ্ডলী কৃ ত বৃহৎ কলেবর গ্রন্থ নিচয় অধ্যয়নে প্রাণের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়। উঠে, তজ্জন্য বিশেষ প্রয়াস পাইয়াছি। যাহাতে সামান্য শিক্ষিত ব্যক্তিও এই মহাতত্ত্বের সহিত জাগতিক পদার্থ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের একাত্ম সম্পর্ক অনুভব করিতে পারেন, আমি শুধু তং প্রতিই বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে চেষ্টা করিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে যদি আমরা এই মহাতত্ত্বের সহিত আমাদের কি সম্বন্ধ তাহা সকলেই জানিতে পারিতাম, তবে এই সংসারের অবস্থা অন্য রূপ হইয়া পঁড়িাইত। দেশময় দুঃখ, কষ্ট, শোক, তাপাদি অভাব অভিযোগের হাহাকার রোল উঠিত না। মহাতত্ত্বের সন্ধান পাইরা সাহাতে নশ্বর স্কুল জগতের অশিয়ে মানব অনাদি অনন্তের উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করিয়া তুলিতে পাবে এবং তদনুসন্ধান জন্য আৰ্য ঋষি ও প্রবীণগণের অমূল্য বৃহদায়তন গ্রন্থাদি অধ্যয়নের স্পৃহা বর্ধিত হইয়া শান্তি ধামের সন্ধান লইতে পারে, এই অভিপ্রায়েই এ অধম এ হেন অসমসাহসিক কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে বাধ্য হইয়াছে। ধর্ম গ্রন্থ মধ্যে “গীতা” সৰ্বোচ্চস্থান অধিকার করিয়াছে। গীত। বিশ্বতােমুখী গ্রন্থ সুতরাং ইহাতে জাগতিক সমস্তভাব বিদ্যমান রহিয়াছে ; তন্মধ্যে পরমাত্মতত্ত্ব ও জীবের মুক্তিসাধন এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের প্রধান আলােচ্য বিষয়। জহুরীর চক্ষে যেমন হার, বলয়, অনন্ত, কুণ্ডল প্রভৃতি বিভিন্ন আকৃতির পদার্থ এক স্বর্ণ ভিন্ন অন্য রূপ প্রতীয়মান হয় না, ব্রহ্মবাদীর জ্ঞান নেত্রেও তেমন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নানা রূপ লয়- পাপ্ত হইয়া একই ব্ৰহ্মণত্বায় প্রকটিত হয়। গীতায় এই মহান্ পরমাত্ম তত্ত্ব ফুটাইয়া দিয়া সৰ্ব্বজীবের মােক্ষ প্রাপ্তি কল্পে যে উদার উপদেশ ;

| প্রদত্ত হইয়াছে, এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে তাহারই আভাষ দিতে প্রয়াস পাইয়াছি। এই ক্ষুদ্রগ্রন্থ পাঠে যদি কাহারও কোন উপকার সাধিত হয়, তবেই সেবকের কাৰ্য্য সফল হইবে । পরিশেষে কৃতজ্ঞতার সহিত জানাইতেছি যে, বিক্রমপুর কাচিয়াইল নিবাসী সুহৃদবর শ্ৰীযুক্ত যদুনাথ মুখােপাধ্যায় মহাশয় গ্রন্থাদি সাহায্য ও সাময়িক আলােচনা দ্বারা উৎসাহিত ও মুদ্রাঙ্কন ব্যয়ভার গ্রহণ না করিলে বিশেষতঃ অত্রস্থ ভিক্টোরিয়া কলেজের খ্যাতনামা অধ্যাপক, Philosophy of VishnaviReligion gratis 67831 atstats শ্ৰীযুক্ত গিরীন্দ্র নারায়ণ মল্লিক এম, এ, মহােদয় কপা পুৰ্ব্বক স্থানে স্থানে সংশােধন করিয়া না দিলে, এই গ্রন্থ সৰ্বসমক্ষে উপস্থিত হইত কিনা সন্দেহ ; এজন্য সর্বান্তঃকরণে তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম। ইতি- ১৩৩ বাং। নিবেদক আশ্বিন। হরিকিশাের দেবশর্মা।

গ্রন্থ-সূচী। পৃষ্ঠা ৬৫ বিষয়। পৃষ্ঠা | বিষয় অর্চনা জন্মান্তর যুক্তি সংশয় পরমাত্ম চৈতন্য নির্ণয় বিশিষ্ট চিন্তা ৬ অদ্বৈতবাদ প্রমাণ আলােচনা পরমাত্মার স্বরূপ কীর্তন মায়াবাদ পরমাত্মা সৎস্বরূপ যুক্তি প্রয়ােগ পরমাত্মা চিৎস্বরূপ সদসৎ নির্ণয় পরমাত্মা আনন্দ স্বরূপ লয়তত্ত্ব ১৯ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ সৃষ্টিতত্ত্ব ২০ মােটামােটা সৃষ্টির ক্রম বিকাশ ত্রিগুণ প্রসঙ্গ সংশয় অপনােদন পরমাত্ম-চৈতন্য-প্রতিষ্ঠা ৪৫ ধৰ্ম্ম সমন্বয়ে গীতা প্রাণ, প্রেতাত্মা, জীবাত্মা ও মনােবৃত্তি ও যােগ পরমাত্মার পার্থক্য ৪৭। জ্ঞানযােগ দেহান্তে আত্মার বিচার ভক্তিযােগ দেহান্তরিত আত্মার বিচার ও কৰ্ম্মযােগ ৫৪ ৭০ ৭৪ ৪২. বেদার্থ ৮১ ৮৭ ৮৯ ৯২ শুদ্ধি পত্র ชะ পংক্তি অশুদ্ধ ১৭ ৪৮ ১৮ হৃদয় স্থাপিত গুণা দ্বিতম্ মদার্পণ ১৮ উদরস্থ বা নাভিস্থ স্থগিত। গুণান্বিতম । মদর্পণম্। প্রসঙ্গ। ৭২ ৭৫ ৭ যন্তং। মদার্পণ তন্তুতে মদর্পণম্। তত্ত্বতে। ১২ প্রাপ্তি স্থান ১। গ্রন্থকারের নিকট-কান্দিরপাড়, পােয় কুমিল্লা, জিঃ ত্রিপুরা। ২। টিচার্স এণ্ড কোং রাজগঞ্জ) পােঃ জিঃ তথা। আশুতােষ লাইব্রেরী-কলিকাতা ৫নং কলেজ স্কোয়ার । চট্টগ্রাম ও ঢাকা। মূল্য ৭০ বার আনা। ৪।

অর্চনা।
অচিন্ত্য তা ব্যক্ত স্থাণু ব্যাপ্ত চরাচর।
অখিল ব্ৰহ্মাণ্ড পতি! সৰ্বগুণাকর।
সৰ্বগুণ তােম। মাঝে লীন আছে জানি।
নিগুণ নির্লিপ্ত ভাবে ভজে তত্ত্ব জ্ঞানী।
তুমি জ্ঞান তুমি কৰ্ম্ম সৰ্ব্ব ধৰ্ম্ম হও।
সৰ্ব্ব জীব পূজা তুমি সৰ্বভাবে লও।
না কর বঞ্চিত তারে দয়া বিতরণে।
যে তােমায় ধ্যান করে কায়-মন-প্রাণে ।
জ্ঞানী শান্তি লভে তােমা অভিন্ন জানিয়া
ভক্ত শান্তি পায় তব প্রেমেতে মাতিয়া ।
কৰ্ম্মি সমর্পিয়া কৰ্ম্মফল তােমা পদে।
শান্তির ক্রোড়েতে বাস করে নিরাপদে।
জ্ঞান, ভক্তি, কৰ্ম্ম যাহা শান্তির সােপান।
বিশ্ব মুর্তি ধরি তুমি দিতেছ সন্ধান।
বিশ্বরূপে করিলে স্বরূপ প্রকাশ।
হতনা তােমার লীলা কিছুতে প্রকাশ।
তাই বিরূপী প্রভাে! প্রণমি তােমারে ।
জ্ঞান, ভক্তি, কর্ম দাও পেতে পরাবরে।

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও প্রভাে! তুমি নিত্য, সত্য, অনন্ত জ্ঞান, আনন্দ স্বরূপ। তােমার অনন্ত জ্ঞান, আনন্দ স্বরূপ অবিচ্ছেদে বিশ্বরূপে প্রকাশিত। বিশ্ব না থাকিলে কে তােমায় খুঁজিয়া পাইত ? তুমি সৰ্বব্যাপী সুতরাং নিরবয়ব, তােমায় খুঁজিয়া পাই না, তাই তােমার স্বরূপ বিশ্বরূপকে কায়মনােবাক্যে পূজা করিয়া প্রাণ শীতল করি । প্রভাে! তোমায় বিশ্ব হইতে পৃথক্‌ করিয়া খুজিয়া পাইনা, তুমি বিশ্বময়, চিন্ময়, জ্ঞান স্বরূপ, অনাদি, অনন্ত। তুমি বিশ্বকে ধারণ করিয়া আছ বলিয়া ধৰ্ম্ম নামে পরিচিত। তুমি ধরিয়া না রাখিলে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভব ও স্থিতি হইত না। জাগতিক সমস্ত ক্রিয়া কলাপ তােমার একই অনির্বচনীয় নিয়মে চলিতেছে। তুমি বিশ্বের বীজ, তুমি আছ বলিয়াই জগৎ ক্রিয়াশীল হইয়া বৰ্ত্তন আছে। তুমি বিশ্বস্রষ্টা ও পালক। আবার যে স্থলে তােমার নিয়মের অপলাপ হইতেছে, তথায় তুমিই নিয়ন্তা স্বরূপে আত্ম প্রকাশ করিয়া ধ্বংস লীলা দ্বারা তােমার ( ধৰ্ম্মের) সত্ত্বা বজায় রাখিতেছ ; এইরূপে সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের খেলা খেলাইয়া পরিণামে বিশ্ব সংসার তােমাতেই লয় করিতেছ। তাই তুমি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা পাতা, সংহৰ্ত্তা ও লয়কর্তা। . তুমি সকলের শুভাশুভ প্রতিনিয়ত অনিমিষ নয়নে সমভাবে পর্যবেক্ষণ করতঃ অশুভ দূর করিয়া শুভ সংস্থাপন করিতেছ। তুমি অসীম, • আমরা ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ জ্ঞানে তােমার ধারণা করিতে পারি না। তুমি •

মুক্তিবাদ।
সর্বজীবের গতি, ভরণ কর্তা, সর্বময় প্রভু ; শুভাশুভ দ্রষ্টা
ভােগস্থান, রক্ষক, হিতকর্তা, স্রষ্টা পাতা, সংহর্তা, আধার
বীজ ও তানাদি বলিয়া গীতা তােমার সেবকগণকে জানাইয়া
দিয়াছেন -
গভির্ভ। প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণা.সুহৃৎ।
প্রবঃ প্রলয়ঃ স্থানং প্রিনিং বীজমব্যয়ম্।
গী ৷৯৮ শ্লোক।
প্রভো! তুমি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে• ওতপ্রােত ভাবে জড়িত
তাছ, তুমি অশরীরী । তােমাকে চৰ্ম্ম চক্ষে পৃথক মূর্তভাবে
প্রত্যক্ষ করিতে পারি না। তােমার অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত
শক্তি যাহ। বিশ্ব সংসারে প্রতি নিয়ত উদ্ভাসিত রহিয়াছে,
সীমাবদ্ধ নেত্রে, সীমাবদ্ধ জ্ঞানে তাহার কিছুমাত্র উপলব্ধি
করিতে পারি না। আকাশ পাতাল জুড়িয়া তােমার অনন্ত
শক্তি, অনন্ত জ্ঞান, ছাইয়া রহিয়াছে। চিন্তা করিলে প্রাণ
আতঙ্কে অভিভূত হয়। প্রভাে! তুমি আত্মত্যাগ করিয়া
স্বকীয় স্বরূপে এই বিশ্ব গড়িয়াছ। তােমারই জ্ঞান গতিমা
বিশ্ব সগর্বে প্রকাশ করিতেছে। তুমি অচিন্ত্য, অব্যক্ত।
বিশ্ব জগতের ক্রিয়। কলাপে তােমার স্বরূপ প্রকাশ না পাইলে
তুমি চিরকাল অপরিচিত থাকিতে। তুমি বিশ্বরূপে স্ব প্রকাশ
করিয়াছ, তাই, তােমাকে না পাইয়া তােমর বিশ্বরূপকে
নমস্কার! শত শত নমস্কার !!

d
গীতার পরমাত্মতত্ত্ব ও
প্রভো! তুমি ত্রিগুণাত্মক পঞ্চভূতরূপে আবির্ভূত হইয়া
বিশ্ব জগৎ নির্মাণ করতঃ কত কি জীব সৃষ্টি করিয়াছ কে
তাহার ইয়ত্তা করিবে ? জীবজগতে তােমার অপূর্ব সৃষ্টি
মানুষ। মানবের দেহাবয়ব : ও অন্তরিন্দ্রিয়াদি অপরাপর
প্রাণী সমূহ হইতে উন্নত বিধায় তাহার সমস্ত জাগতিক
প্রাণীকে ইচ্ছামত চালাইয়া সকলের উপর প্রাধান্য বিস্তার
পূৰ্ব্বক তাহাদের সুখ সুবিধার পথ প্রশস্ত করিতেছে ।
তাহার। শারীরিক ও মানসিক শক্তিবলে নানাপ্রকার উন্নতি
করিয়াও মনে করিতেছে, কৈ মদের জ্ঞান বিজ্ঞান ? ' কৈ
আমাদের বল বিক্রম ? আমাদের তো কিছুই নাই !
হে বিশ্ব ! তুমি ব্যতীত আমার তাে কিছুমাত্র অস্তিত্ব নাই !
তোমারই আকাশ, বায়ু, তেজ, জল ও মৃত্তিকা সংগ্রহ করিয়া,
তােমার উৎপন্ন ফল মূল শস্যাদি ভক্ষণ করিয়া জীবজগৎ জীবিকা
নিৰ্বাহ ও কাৰ্য কৌশল দেখাইতেছে। হে বিশ্ব ! তােমার
অসীম জ্ঞান ভাণ্ডার খুলিয়া রাখিয়াছ। তােমার উৎপন্ন
জিনিষাদি দ্বারা মনােহর গৃহাদি হওয়ায়, তাহাতে মানব মনের
সুখে বাস করিতেছে, এবং তােমার উৎপন্ন স্বর্ণ রৌপ্যাদি
সংগ্রহ করিয়া মুদ্রা ও নানাবিধ সুখ সম্ভোগের খেলনায়
পরিণত করতঃ দেশ বিদেশে ব্যবসায় বানিজ্য চালাইয়া পরম
সুখে কাল কাটাইতেছে । বস্তুতঃ তােমারই স্থলের, তােমরই
জলের, তােমারই তেজ ও আকাশের সহায়তায় দ্রুতগামী
রেল, জাহাজ, ব্যোমযান, তাড়িত বার্তাবহ প্রভৃতি বহু বহু

মুক্তিবাদ।
কল কারখা। বসাইয়া সুখ সুবিধার প্রসার বৃদ্ধি করিতেছে
ও বাহাবা নিতেছে। কিন্তু একটু চিন্তা করিলেই দেখিতে
পায়, তােমারই জল, স্থল, তেজ, বায়ু, ও আকাশের এবং তাহা
হইতে সংগৃহীত পদার্থের সহায়তায় মানবজীবনের সৃষ্টি,
স্থিতি ও লয়ের সম্পূর্ণ কাৰ্য্য চলিতেছে। জ্ঞান বিজ্ঞান সব
তােমায় ভরা। মানবের নিজস্ব বলিবার কিছুই নাই, সকলই
তােমার। সকলই তােমার, এই ভাবনায় যখন হৃদয় আপ্লুত
হয়, তখন মানব বিস্ময়ে ও ক্ষোভে, আত্মহারা হইয়া নিজের
অস্তিত্ব খুঁজিয়া পায় না। জল, স্থল, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ,
পাতাল সকলই তুমি ! তােমাকে বাদ দিলে আমার বলিবার
কিছুই থাকে না। তাই বিশ্বরূপ ! তােমায় নমস্কার ! শত
শত নমস্কার !!!
?
সংশয়-একি ? আবার দৃষ্টি শক্তির সাহায্যে প্রত্যক্ষ
করিতেছি, বিশ্ব ! তুমি কিছুই করিতে পারছে না। কৈ
তােমার পঞ্চ জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয় ? কৈ তােমার অন্তঃকরণ ?
কোথায় তােমার প্রাণ ? তােমার যে কিছুই নাই। যাহার
কর্মশক্তি জ্ঞানশক্তি কিছুই প্রত্যক্ষ হইতেছে না, তাহাকে
এইভাবে নমস্কার ? কি লজ্জার কথা ! এহেন অচেতন পদার্থকে
এইরূপ অযাচিত ভাবে সম্মান দেখাইয়া নমস্কার দেওয়া কি
মানবের পক্ষে শােভনীয় ? মানব জ্ঞান বিজ্ঞানে শীর্ষস্থান
অধিকার করিয়াছে, মানব কেন অচেতনের আরাধনায় রত

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
;
থাকিবে ? মানব কেন অচেতন পদার্থকে সম্মান দেখাইবে ?
বুঝিলাম তুমি কিছুই নও; সব ফুসফাস !!!
বিশিষ্ট চিন্তা :—মানব! তােমার দাম্ভিকতা ছারিয়া
দাও। কোথায় তােমার জ্ঞান, কোথায় তােমার শক্তি ?
দেখিতেছ কি, ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র কীটও আবশ্যকীয় স্বীয় জ্ঞান
সাহায্যে কি প্রকারে জীবন যাত্রা নির্বাহ করিতেছে ? হস্ত
পদ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্ব, কর্মক্ষেত্র, চিন্তাক্ষেত্র, জ্ঞান বিজ্ঞান
সুখ-দুঃখানুভূতি একই রূপ থাকিয়াও নর নারীতে যে অপূৰ্ব্ব
সৃষ্টি-বৈষম্য রহিয়াছে, তাহার কারণ চিন্তা করিয়াছ কি ?
ভাবিয়াছ কি সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের কারণ ? কাহা কর্তৃক
এই প্রভেদের উৎপত্তি বলিতে পার কি ? পার কি তােমার
নিজ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কারণ নির্দেশ করিতে? পার কি
তােমার শরীরের একটী নােম উঠাইয়া তাহা পুনঃ যথাস্থানে
পূৰ্ব্ববৎ সন্নিবেশ করিতে ? তুমি বিশ্বের পদার্থ দ্বারা রেল,
জাহাজাদি প্রস্তুত করিয়া জলে, স্থলে শূন্যমার্গে বিচরণ করিতে
পার, এই তােমর আস্পর্ধা! বল দেখি, যাহা দ্বারা তুমি
তােমার কাৰ্য-কুশলতা দেখাও তাহার কোষ্টী তােমার ?
তোমার বলিতে কিছুই নাই। অজ্ঞান ! তােমার দয়া নাই,
মায়া নাই, তপস্যা নাই, ভক্তি নাই, মাত্র আছে
তােমার অহঙ্কার! তুমি অনধিকারী! এই নিগুঢ় তত্ত্ব কোথায়
পাইবে ? তােমার এ গুঢ় তত্ত্ব পাওয়া দূরে থাকুক, বুঝাইয়া
দিলেও আয়ত্ব করিতে পারিবে কিনা সন্দেহ। আয়ত্ব করিতে
খoa ,
**.***
* }।
৭। + ১

মুক্তিবাদ।
৭
।
পারিলে তােমা দ্বারা সত্যের অমৰ্যাদা ঘটিবে। তাই
গীতা অনধিকারী সমীপে তত্ত্ব কথা প্রকাশ করিতে নিষেধ
করিয়াছেন :-
ইদন্তে গতিপক্ষায় নাস্তায় কম নন।
নাশুশ্রুষবে বাচ্যং ন চ মাং যােইভ্যসূন্নতি।
গী ১৮৬৭ শ্লোক।
নাই।
• এh
## * * * * * এ
যাহার তপস্যা বা গাঢ় অভিনিবেশ নাই, শ্রদ্ধা নাই, যে
আত্মসুখে রত, অন্যের জন্য চিন্তা ভাবনা কিম্বা অন্যকে
সহায়তা করিতে যাহার চিত্তে আগ্রহ জন্মে না, এবং যে ব্যক্তি
পরদোষ অন্বেষণকারী, তাহার আধ্যাত্মিক চিন্তার অধিকার
এমন কি তদ্রুপ ব্যক্তি দ্বারা বৈষয়িক কোন কাৰ্যও
সুচারুরূপে নিৰ্বাহ হয় না; ইহা অতি সত্য কথা। তাই
শ্রদ্ধা সহকারে মনঃসংযােগ করিয়া দেখ, এই দৃষ্টতঃ অচেতন
জগতের মূলে কি এক অপূৰ্ব্ব পদার্থ রহিয়াছে, যাহার আশ্রয়ে
স্থল সৃষ্টির বিষয়ীভূত, জড় জগতের মধ্য দিয়া অনন্ত শক্তি
ও অনন্ত জ্ঞানের কাৰ্য্য চলিতেছে। মানব ! তুমি কোন
পদার্থ নিজে সৃষ্টি করিয়া তাহা হইতে কোন কিছু উদ্ভব
করিতে পারিতেছ না। নিজ হইতে কোনও জ্ঞান
বিজ্ঞানের সূত্র উদ্ধ
উদ্ভাবন করিতে পারিতেছ না, সকল স্থল
সূক্ষ্ম জ্ঞান বিজ্ঞানই এই অচেতনবৎ বিশ্ব হইতে কুড়াইয়া
লইতেছ। এই বিশ্বের আকৃতি প্রকৃতি কোন কিছু ব্যতীত

प
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
তােমার জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল দ্বার রুদ্ধ । তােমার জ্ঞান
বিজ্ঞানের মূলীভূত সকল পদার্থ, এমন কি তােমার জ্ঞানটীও
এই স্থল বিশ্ব হইতে কর্জ করা। এই যে তুমি আমি
অামি” বলিতেছ, এই আমি কে? এই আমি কোথা হইতে
আসিল ? তাহা কি তুমি নিজ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছ ?
কিছুই তােমার নিজস্ব বা স্বাধীন সত্ত্বা হইতে গড়িয়া লইতে
পর নাই। তবে এই সকল আসিল কোথা হইতে ? কোথা
হইতে আসিল, তাহা প্রমাণ দ্বারা স্থির কর ; নতুবা তােমার
নিরেট পাষাণ হৃদয়ে বিশ্বাস স্রোত বহিবে না। তুমি এই
সকল বিষয়ে অজ্ঞ, তদুপরি শ্রদ্ধা ও সংশয় তােমাকে
আকড়াইয়া ধরিয়াছে। তুমি সত্যের সন্ধান কোথায় পাইবে ?
us, ৭
মনে রেখ :
জ্ঞাপন সংশষ্মা বিনশ্যভি!
নায়ঃ লােকেই স্তি না পৰো সুখং সশয়া নয় ।
aী ৪৪• শোক
গুরূপদিষ্ট অর্থে অনভিজ্ঞ, গুরু বাক্যে শ্রদ্ধাহীন সংশয়িত
চিত্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি নাশ পায়, সংশয়াত্মার ইহলােক নাই,
পরলােক নাই, এমন কি, তাহার সাংসারিক সুখও নাই।
অতএব সংশয় ছারিয়া শ্রদ্ধা সহকারে সত্যের অনুসন্ধান
কর। আর্য ঋষিগণ তােমার জন্য প্রভূত জ্ঞান ভাণ্ডার
রাখিয়া গিয়াছেন। শ্রদ্ধা সহকারে মনােভিনিবেশ পুৰ্ব্বক
১২ । খ
.

মুক্তিবাদ।
।।।।।।।
* * * *
প্রমাণ সাহায্যে তাহ। স্থির কর। তাহা হইলে সত্যের সন্ধান
পাইয়া মন দৃঢ় হইবে।
প্রমান আলম : - অৰ্য ঋষিগণ প্রমাণ প্রধানতঃ
চারি প্রকার বলিয়া বৰ্ণন করিয়াছেন। (১) প্রত্যক্ষ, (২)
অনুমান (৩) উপনন (3) শাব্দ বা আপ্ত বাক্য (ঋষি
বাক্য)। যে বস্তু বা বিষয় জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সাহায্যে অবগত
হওয়া যায় তাহাকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ বলে। যেমন চক্ষু দ্বার।
নানারূপ দর্শন করা যায়। অনুমান্ত ও উপমান প্রত্যক্ষ
প্রমাণের অনুগামী, অর্থাৎ যে বিষয় প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বার।
স্থিরীকৃত না হয় তাহার অনুমান বা উপমান অবস্থা নাই ;
সুতরাং প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে অনুমান ও উপমান প্রমাণ
প্রদর্শন করা চলে না। সময় সময় প্রত্যক্ষ প্রমাণও সত্যে
পরিণত হয় না। যথা--মরীচিকা, দিভ্রম ইত্যাদি। যেহেতু
প্রত্যক্ষ প্রমাণেও সর্বদা সত্যের উপলব্ধি অসম্ভব হইয়া দাড়ায়,
তৎস্থলে অনুমান ও উপমান প্রমাণকে বাদ দিয়া রাখাই সঙ্গত।
বাকী রহিল শব্দ বা অপ্ত বাক্য। শব্দ বা আপ্তবাক্য
কি ? যে বাক্য ঋষিগণ অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানিগণ হইতে প্রাপ্ত,
কাপ্ত বা ভ্ৰম প্রমাদ শূন্য বাক্য ; এবং যে একই বাক্য
একে অন্যে আলােচনা না করিয়া বিভিন্ন স্থান হইতে উচ্চারিত
হয় তাহ। শব্দ বা আপ্ত বাক্য। এ বাক্য অতীব সত্য।
ইহা অবিশ্বাস করিলে, চলিবে না। এই বাক্য সম্ভাবিত
প্রত্যক্ষানুভূতি রূপ যুক্তি দ্বারা সপ্রমাণিত করিতে পারিলে
তাই,
২

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
অতি দৃঢ় ও অকাট্য হইয়া বিমল জ্ঞানের উদয় হয়। আমরা
জানিয়াছি, আৰ্য ঋষিগণের ন্যায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন
ব্যক্তি একই মহাবাক্য উচ্চারণ করিয়া গিয়াছেন
“আদিতে পরমাত্ম চৈতন্য ভগবান ব্যতীত
আর কিছুই ছিল না। তিনি এই বিশ্ব সংসারের
স্রষ্টা, পাতা, সংহ ও লয়ক। সমস্ত ব্যাপার
তঁাহার ইচ্ছায় নির্বাহ হইতেছে। তিনিসৰ্বব্যাপী
অনন্ত শক্তি,অনন্ত জ্ঞান, ও অনন্ত মহিমাম।”
ইহা অকাট্য সত্য বলিয়া স্বীকার কর। তােমার সামান্য
যুক্তিতেও দেখিতেছ, মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান এমন কি মানুষ
নিজেই এক অব্যক্ত শক্তিমূলে কলের পুতুলের ন্যায় কৰ্ম্ম পরবশ
হইয়া চলিতেছে। নিজে ইচ্ছা করিয়া কিছুই করিতে
পারিতেছে না। মানুষের স্থল শরীর তন্ন তন্ন করিয়া বিভাগ
করিয়া দেখিলে অচেতন জড় পদার্থ ভিন্ন আর কিছুই
পাইবে না। অথচ এই অচেতন জড় পদার্থ সমষ্টি কি
এক অনির্বচনীয় শক্তিবলে বলীয়ান হইয়া চলা ফিরা ও
জ্ঞান বিজ্ঞানের কত কাৰ্য্য করিয়া যাইতেছে। নিশ্চয় জানিও
এই অচেতন জড় পদার্থের ভিতর দিয়া এক অনির্বচনীয়
ঐশ্বরিক শক্তির আবির্ভাব হইয়া এই জড় জগৎকে যন্ত্রবৎ
চালাইতেছে। তাই হৃদয়ে দৃঢ়রূপে অঙ্কিত করিয়া রাখিও :-
ঈশ্বরঃ সব্বভূতানাং হৃদ্দেশেইঞ্জ ন ভিতি।
ভ্রাম সৰ্ব্বভূতানি মন্ত্র প্রাক্কানিমান্না
গী ২৮৬

মুক্তিবাদ
১১
হে অর্জুন! ইশ্বর দেহরূপ যন্ত্রে আরূঢ় জীবগণকে
মায়াবশে স্ব স্ব কর্মে প্রবর্তিত করাইয়া সৰ্ব্বভূতের হৃদয়ে
অবস্থান করিতেছেন।
তুমি জ্ঞান বিজ্ঞানে অতি শিশু ; দুগ্ধ পােষ্য বালক।
সত্য নির্ধারণে ,অসক্ত ; অথচ তুমি মনে করিতেছ, তােমার
অগাধ জ্ঞান ! যেমন দুগ্ধ পােয্য শিশুকে মাতা ঝিনুক
সাহায্যে দুগ্ধ পান করাইয়া থাকেন, কিন্তু শিশু মনে করে
ঝিনুকই তাহাকে দুগ্ধ জোগায়। তাই শিশুকে “দুধ খাবে”
বলিলে শিশু সরল প্রাণে ঝিনুক ধরিয়া মুখে ঢাশিয়া দেয়,
কিন্তু দুগ্ধ পায় না। শিশু জানে না যে মায়ের অঙ্গলি
সঙ্কেতে ঝিনুক দুগ্ধ জোগাইতে সমর্থ, নতুবা ইহার কোনও
সামর্থ্য নাই। তদ্রুপ তুমিও মনে করিতেছ এই দৃশ্য স্থল
জগৎই সমস্ত কাৰ্য নিৰ্বাহ করিতেছে, কিন্তু জাননা যে,
কোন এক অনির্বচনীয় পরমাত্মশক্তি পেছনে থাকিয়া
চালাইতেছে বলিয়া এই দৃশ্য স্থল জগৎ কাৰ্য পরবশ হইয়া
চলিতেছে, নতুবা ইহা অসার অপদার্থ। যে ভ্রান্তি বশে
আমরা এই পরমাত্ম শক্তির মহিমা হৃদয়ে বদ্ধমূল করিতে
পারি না তাহাকে মায়া বলিয়া আৰ্য ঋষিগণ আখ্যা
দিয়াছেন।
মায়াবাদ-মায়া পরমাত্ম চৈতন্য বা পরব্রহ্মের সৃষ্টিরূপে
প্রকাশ হইবার পূর্বাভাস বা ইচ্ছাশক্তি। ইহাকে অব্যক্তা
শক্তি বা পরিণামিনীশক্তি বা মায়া বলিয়া আৰ্যঋষিগণ

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও বলিয়াছেন। সৃষ্টির এই পূর্বাভাস অবস্থায় ব্রহ্ম কারণ ব্রহ্ম বা সদ্ ব্ৰহ্ম বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছেন নির্দিষ্ট হইয়াছেন। সৃষ্টির অবস্থায় সেই সদ্ ব্ৰহ্ম কাৰ্য-ব্ৰহ্ম হইলেন। শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য তঁাহার শুদ্ধাদ্বৈতবাদ স্থাপন করিবার জন্য মায়াকে তাজ্ঞান বলিয়াছেন। তুহি। সৎ ও নয় অসৎ ও নয় ; সৎ অসৎ হইতে ভিন্ন মত একটা কিছু মায়া শব্দে বাচ্য হইয়া থাকে । নিগুণ ব্রহ্মে এই অবস্থা লীন থাকে। কালক্রমে যখন ইহার বিকাশ ইইবার ইচ্ছাবস্থা বা উন্মুখাবস্থা হয়, তখনই নিগুণ ত্রহ্ম হইতে জগৎ সৃষ্টি সূচনা হয় ; এই সূচনা উন্মুখ নিগুণ ব্ৰহ্ম সগুণ ব্রহ্মনামে পরিলক্ষিত হন । এই মায়াবস্থা ব্ৰহ্ম হইতে ভিন্ন নহে, ব্রহ্মেরই পাদৈক ভাব। এই ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সত্তাদি ত্রিগুণের অভিব্যক্তি হইয়া থাকে। তাই মায়া ত্রিগুণাত্মিকা। বিভিন্ন গুণের একত্র সম্মিলন হইলেই এক নূতন ভাব সৃষ্টি করে, এবং মূল গুণের পরিচয় পাওয়া যায় না। এজন্য ত্রিগুণ লক্ষণ যুক্ত জীব ব্রহ্মকে জানিতে পারে না। মায়ার মােহিনী শক্তিতে জগৎকারণ সৎ পদার্থের জ্ঞান না হইয়া অস্থায়ী স্থল অসৎ পদার্থকেই স্থায়ী সৎ পদার্থ বলিয়া ভ্রম জন্মায়। মায়ার এমনই অঘটন ঘটন পটীয়সী শক্তি। এ মায়া রাজ্য অতিক্রম করা তাতীব দুঃসাধ্য। যে ভাগ্যবান ব্যক্তি কায়মনােবাক্যে পরমাত্ম * শ্রীধর স্বামী প্রভৃতি মুনি প্রমুখ রিশিষ্ট-দ্বৈত বাদীগণ সগুণ পরমাত্মচৈতন্যের পক্ষপাতী। এ সম্বন্ধে পশ্চাৎ আলােচিত হইয়াছে।

মুক্তিবাদ
পরব্রহ্মের আরাধনা করিয়া কৃতমনােরথ হইয়াছেন, তিনিই মাত্র
এই দুস্তরা মায়া দূরীভূত করিতে পারিয়াছেন। ভগবান
বলিয়াছেন -
দৈী যে গুণমঃী মমমা দুরত্যা।
মামেব খে প্রপদ্য ও মান্না নেতা অৱস্তিতে।
গী ৭৪
আমার (এই ত্রিগুণময়ী ) দৈবী মায়া নিশ্চয়ই দুস্তরা,
যাহারা আমাকে ভজনা করে, তাহার। এই মায়া রাজ্য
অতিক্রম করিতে পারে।
মায়ার শক্তি দ্বিবিধ। (১) আবরণ (২) বিক্ষেপ।
এই শক্তিতে আবদ্ধ হইয়া মানব পরমাত্ম শক্তিকে জানিতে
পারে না। অবরণ শক্তি জগৎকে জীব ও পরমাত্মার মধ্যে
দাড় করাইয়া আবরণ রূপে পরমাত্ম শক্তিকে ঢাকিয়া রাখে ;
অর্থাৎ আমরা জড় জগৎ হইতেই সমস্ত কাৰ্য্য হইতেছে
বলিয়া মনে করি, কিন্তু ইহার পেছনে যে এক মহাশক্তি
রহিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারি না; এবং বিক্ষেপ শক্তি মূলে
এই স্থল জগৎকেই পরমাত্মশক্তি রূপে ধরিয়া লই; অর্থাৎ
জগৎ (nature) ই সব করিতেছে মনে করি ইহার পশ্চাৎ যে
অন্য মহাশক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহা বুঝিতে পারি না।
অব্যক্ত পরমাত্ম চৈতন্য অবিনাশী। ত্রিকালে ইহার
নাশ বা ক্ষয় নাই। ইহা স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা বিশিষ্ট। ইহা
••

১৪
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
জড় জগতের . ন্যায় পরতন্ত্র অর্থাৎ অন্য পদার্থের আশ্রিত
নহে। আর্য ঋষিগণ এক বাক্যে বলিয়াছেন, পারমার্থিক
ভাবে এই স্কুল জগতের স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নাই। ইহা
অসৎ অপদার্থ। মাত্র ব্যবহারিক ভাবে ইহা বিদ্যমান।
অসৎকে সৎ পদার্থ জ্ঞান করা মায়ার কাৰ্য। আমরা মায়া
দেখিতে পাই না। মায়ার প্রভাব বুঝিতে হইলে আমরা
স্বপ্নের অবস্থা দ্বারা কতক উপলব্ধি করিতে পারি। জাগ্রত
অবস্থার ন্যায় স্বাপ্নবস্থাতেও আমরা সমস্ত বিষয় সত্য
বলিয়া মনে করি, কিন্তু জাগ্রত হইবা মাত্র সমস্ত স্বপ্ন বৃত্তান্ত
বাঁধিত হইয়া যায়। তদ্রুপ ব্ৰহ্ম জ্ঞান রূপ জাগ্রত ভাব
প্রাপ্ত হইলে জগৎভ্রম দূয়ীভূত হইতে পারে, নতুবা নহে।
আমরা জগৎ প্রত্যক্ষ করিতেছি, আমরা কি করিয়া বলিতে
পারি যে এই স্কুল পরিদৃশ্যমান জগতের সত্তা নাই ? সত্তা
থাকিলে তাে আমরা উহাকে ব্যবহারিক ভাবে পাইতাম
মা । জগৎ অসৎ অপদার্থ, এ কথার মধ্যে কি গুঢ় সত্য
নিহিত রহিয়াছে, তাহা আমাদিগকে তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতে
হইবে। যুক্তিহীন হইলে আমরা কিছুতেই ইহাতে আস্থা
স্থাপন করিতে পারিব না; কারণ পূজ্যপাদ ঋষিগণই
উপদেশ দিয়াছেন :-
কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত ন কর্তব্য বিনির্ণয়।
মুক্তিহীন বিভাৱে ধৰ্ম্মহানি প্রজাতে।
বৃহস্পতি।

মুক্তিবাদ মাত্র শাস্ত্রবাক্য আশ্রয় করিয়া কর্তব্য নির্ণয় করা অনুচিত কারণ যুক্তিহীন বিচার দ্বারা ধৰ্ম্মহানি হইয়া থাকে। সুতরাং শাস্ত্র বাক্য যুক্তি দ্বারা ঐক্য করিয়া লওয়া আবশ্যক। যুক্তিপ্রয়োগ যুক্তি আলােচনা করিতে যাইয়া কেহবা জল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করতঃ বৃথা তর্ক বলে অন্যের মত খাইয়া স্বমত প্রতিষ্ঠা করিতে চাহে ; কেহবা বিতণ্ডার আশ্রয়ে নিজ মত স্থাপন করিতে না পারিলেও অন্যের মত খণ্ডন করিবার জন্য বৃথা অযৌক্তিক বাগারস্থর করিয়া থাকে। তাহা করিও না। সত্য নির্ধারণাৰ্থ “বাদ” ব্যবহার আশ্রয় করিও। অর্থাৎ সর্বদাই সত্যের প্রতিষ্ঠা হউক এই অভিপ্রায়ে জয় পরা- জয়ের আকাক্ষা বর্জন করিয়া মনােভিনিবেশ পূৰ্ব্বক আবশ্য- কীয় ও সম্ভাবিত যুক্তি সহকারে সংশয় অপনােদন করিবে। নতুবা বক্তার কি উপদেষ্টার বাক্য কাৰ্যকারী হইবে না এবং নিজেও সত্য উদ্ধার করিতে পারিবে না। যখন দেখিবে বাদ প্রতিবাদে তােমার চির সঞ্চিত চিস্তাস্রোত অনুপযুক্ত পথে ধাবিত হইতেছে, তখন উপযুক্ত পথের অবস্থা জানিবার জন্য আবশ্যকীয় তথ্য সংগ্রহ করিবে। তবেই তােমার মনে দৃঢ়ত আসিবে। মনে দৃঢ়তা না আসিলে কি আধ্যাত্মিক কি বৈষয়িক কোন কাৰ্যই সুচারু রূপে সম্পন্ন হইতে পারে না। অতএব শাস্ত্র বাক্য উপযুক্ত বা প্রতিবাদের ভিতর দিয়া ঐক্য করিবে। তবেই সত্যের সন্ধান পাইবে মূলজিনিষ চিনিতে পারিলে সংশয় আপনা হইতেই তিরােহিত হইবে।

১৬ গীতায় পরমাত্নতত্ত্ব ও পদার্থ জ্ঞান না জন্মিলে সুধু, শব্দ দ্বারা ঐ পদার্থ সম্বন্ধে মনের দৃঢ়তা জন্মে না। যে ব্যক্তি কখনও কমলা লেবু দেখিয়া বা ব্যবহার করিয়া তৎ সম্বন্ধে জ্ঞানােপাৰ্জন করে নাই, তাহাকে কমলা লেবু শব্দ জানাইয়া দিলেও সেই ব্যক্তি কমলা লেবু সম্বন্ধে বিশিষ্ট সার্থাৎ অপরােক্ষ জ্ঞান না থাকায় তৎ সম্বন্ধে তাহার মনের দৃঢ়তা জন্মিতে পারে না। সেইরূপ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব সম্বন্ধে ও বাদ প্রতিবাদ দ্বারা মূল সত্তার জ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত শুধু নাম দ্বারা তং বিষয়ে মনের দৃঢ়ত জন্মিতে পারে না। সুতরাং আধ্যাত্মিক তত্ত্ব বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞানি- গণের উপদেশ মনােভিনিবেশ পূৰ্ব্বক শ্রবণ করিবে, এবং উপযুক্ত যুক্তি সাহায্যে বিচার করিয়া মনন করিবে, তৎপর তৎসম্বন্ধে ধ্যানপরায়ণ হইবে। তবেই সত্য উদ্ধার করিতে পারিবে। এইরূপ অভ্যাস করাকেই শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন বলে। এই নিয়মে অভ্যস্থ না হইলে আধ্যাত্মিক তত্ত্বে মনের দৃঢ়তা জন্মিতে পারে না। সদসৎ নিভু আমরা সত্য ও মিথ্যা দুটী শব্দ ব্যবহার করি। এই সত্য মিথ্যাকে স্থায়ী, অস্থায়ী বলিয়াও বলা যাইতে পারে। সত্য মিথ্যা নির্ধারণ করিবার উপায় কি? এ সম্বন্ধে আৰ্য ঋষিগণ বহু প্রমাণের অবতারণা করিয়া গিয়াছেন। তন্মধ্যে যে বস্তু বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতে থাকিবে না, তাহা সৎ বা সত্য পদার্থ নহে। যে বস্তু বর্তমান

মুক্তিবাদ।
১৭
।
wr
•
ভূত ও ভবিষ্যতে স্থির থাকে, কোনকালেই যাহার ক্ষয় বা
রূপান্তর হয় না তাহাই সত্য, তাহাই সৎ পদার্থ।
সদসৎ নির্ণয়ে স্মরণ রাখিতে হইবে যে, যে পদার্থ সৃষ্টি
হইতেছে, তাহা অপেক্ষা কৃত' বহুকাল স্থায়ী বা জীবিত
থাকিলেও অমর অর্থাৎ ত্রিকাল ব্যাপী হইতে পারে না,
কারণ যে পদার্থ ত্রিকাল ব্যাপী, তাহার উৎপত্তি তার্থাৎ
সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। জগতে আমরা যাহা কিছু দেখিতে
পাই, তাহা সকলই সৃষ্ট পদার্থ ; তাহাদের ধ্বংশ অবশ্যম্ভাবী ;
সুতরাং জগতে ' কোন দৃশ্য পদার্থই সত্য বা সৎ পদার্থ
সংজ্ঞায় পতিত হইতে পারে না।
যে জিনিষ মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের সমাবেশ থাকা দৃষ্ট
হয়, তাহার ঐ ঐ পদার্থ পৃথক্ করিয়া লইলে জিনিষটী বিলুপ্ত
হয় ; সুতরাং বিভিন্ন পদার্থে গঠিত কোন পদার্থ সত্য বা
সৎ নহে। কারণ তাহার স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নাই ; কয়েকটী
পদার্থের মিশ্রণে উৎপন্ন। যেমন হরিদ্রা ও চুণ একত্র মিশ্রিত
করিলে রক্ত বর্ণের উৎপত্তি !য়, এবং হরিদ্রা ও চুণের অংশ
বৃথক করিয়া ফেলিলে রক্তবর্ণ পদার্থ টিী তিরােহিত হইয়া
যায়। যেমন সপ্তবর্ণ একত্র মিশ্রণে সাদা বর্ণের উৎপত্তি হয়,
এবং 'সপ্তবর্ণ পৃথক করিলে সাদা বর্ণের বিলােপ সাধন হয়।
আমরা পশ্চাৎ দেখিতে পাই যে, দৃশ্য জগৎ নানা পদার্থের
মিশ্রণে উৎপন্ন, সুতরাং অস্থায়ী অসৎ পদার্থ ।

Sb.
গীতায় পরমাত্মতত্ত্বও
;
আমরা জল বুদ্বুদ দেখিতে পাই। তাহা এই আছে,
এই নাই ; এজন্য ইহা সত্য বা সৎ পদার্থ নহে। কারণ
তাহার স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নাই; অন্য পদার্থ সমুদ্ভূত এবং
সমুদ্ভূত পদার্থেই পুনঃ 'লয় প্রাপ্ত হয়। ইহা ধ্বংশশীল।
ইহাতে আমরা এই বুঝিলাম যে, যে বস্তু অন্য কারণ বস্তু
হইতে উদ্ভূত হয়, তাহার লয় অনিবাৰ্য, সুতরাং তাহা অসৎ
পদার্থ। বিশ্বময় যত কিছু পদার্থ দেখিতে পাই সকলই
এইরূপ। ইহাতে আর একটা বিষয় দেখা যায় যে, যে বস্তু
যে কারণ হইতে উদ্ভুত, সেই বস্তু লয় হইলে তাহার কারণ
বস্তুতে পরিণত হয়। অর্থাৎ কারণই কাৰ্যরূপে অবস্থান্তর
প্রাপ্ত হয়। এস্থলৈ বুদ্বুদ রূপ কার্যের কারণ জল। বুদ্বুদ
রূপ কাৰ্য্য জল কারণ হইতেই উদ্ভব হয় এবং লয় হইলে
জলেই অর্থাৎ তাহার কারণ বস্তুতেই পরিণত হয়। এ সম্বন্ধে
আরও পরিস্কারভাবে আমাদিগকে বুঝিতে হইবে।
আমরা নিত্য ব্যবহাৰ্য্যরূপে ঘটী, বাটী প্রভৃতি ব্যবহার
করিয়া থাকি। এই সকল জিনিষের কারণ
জিনিষটী লয় পাইলে অর্থাৎ ঐ ঐ জিনিষের আকৃতি টুকরা
টুকরা করিয়া ভাঙ্গিয়া দিলে ঐ ভগ্ন খণ্ড সকলকে কেহ ঘটী,
বাটী বলিয়া মনে করে না। যে জিনিষটী যে ধাতুতে নির্মিত
সেইটী সেই ধাতু বলিয়াই মনে করিয়া থাকে। ইহাতে দেখা
যায় যে, জিনিষটী প্রস্তর নির্মিত হইলে তাহার আকৃতি
অবসানে পুনঃ প্রস্তরই বলা যায়। সুতরাং ঘটী, বাটী ইত্যাদি

মুক্তিবাদ। ; সৎ বা সত্য পদার্থ বলিয়া বলা যাইতে পারে না। এস্থলে প্রস্তরই সৎ বা সত্য পদার্থ বলিতে হইবে। আবার যখন বিবেচনা করিয়া দেখি যে ঐ প্রস্তরগুলি মাটী হইতে উদ্ভব হইয়াছে, উহা মাটীরই রূপান্তর মাত্র ; (কারণ প্রস্তর খণ্ড গুলিকে বিশেষরূপে গুড়াইয়া দিলে তাহা মাটীতে পরিণত হয়। তখন প্রস্তর খণ্ডগুলিকে সৎ বা সত্য পদার্থ বলা যায় , এবং ঐ প্রস্তরগুলি উহার কারণ সত্তা মাটীতেই লয় প্রাপ্ত হয় ; সুতরাং এস্থলে মাটীই সৎ বা সত্য পদার্থ বলিতে হইবে। এইরূপ জগতের যাবতীয় স্থল পদার্থ লয় হইয়া তাহাদের স্বীয় স্বীয় কারণ পদার্থে পরিণত হইয়া থাকে। লতত্ত্ব : লয়তত্ত্ব পৰ্যালােচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, দ্বিবিধ প্রকারে লয় কাৰ্য্য সাধিত হইয়া থাকে। (১) স্বজাতিয় লয় (২) বিজাতিয় লয়। দুটী পদার্থ সম- ধর্মাবলম্বী হইল এ কী অতীর সহিত মিলিয়া সম্পূর্ণভাবে একত্ব প্রাপ্ত হয় ; পশ্চাৎ ঐ দুটীকে পৃথক করা যায় না। যেমন জলবিম্ব জলে লয় পাইলে উভয়ই সমধর্মাবলম্বী বলিয়া তাহা পৃথক করা যায় না; এইরূপ লয়কে স্বজাতির লয় বলে। কিন্তু যে পদার্থ অন্য পদার্থে লয় হইলে পুনঃ অবস্থান্তরের মধ্য দিয়া লীন পদার্থের স্বরূপ প্রকাশ পায় তাহাকে বিজাতিয় লয় বলে। যেমন জল বাষ্পকারে বায়ুতে লয় পায়, কিন্তু অবস্থান্তর হইলে উক্ত বাস্প, কুয়াসা, বৃষ্টি ইত্যাদি রূপে পুনঃ স্বীয় প্রকৃতি জলরূপে পরিণত হয়।

২০
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
এইরূপ লয়কে বিজাতিয় লয় বলা যায়। আমরা পশ্চাৎ
দেখিতে পাইব যে, জীব প্রলয় সমাগমে স্বীয় সাধনা বশে ব্রহ্ম
স্বরূপত্ব না পাইলে নিজ প্রকৃতি লইয়া পুনঃ সৃষ্টি হয় ; ব্রহ্মে
স্বজাতির লয় পাইতে পারে না। ইহাই বিজাতির লয় ।
কিন্তু যে জীব সাধনা বশে ব্রহ্মা স্বরূপত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহাকে
আর পুনঃ সৃষ্টি সময়ে দেখা দিতে (জন্মগ্রহণ করিতে)
হয় না। পরব্রহ্মে স্বজাতিয় লয় প্রাপ্ত হয়। বিজাতিয় লয়
হইলে পুনঃ সৃষ্টি অনিবার্য।
সৃষ্টিতত্ত্ব অতি গুঢ় সুতরাং অতি প্রয়ােজনীয় বিষয়।
সৃষ্টিতত্ত্ব ভগবৎ শক্তির অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত কৌশল জ্ঞাপক।
এই তত্ত্ব যিনি কিঞ্চিত্রও হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছেন
তিনি ধন্য হইয়াছেন। আর্য ঋষিগণ এই তত্ত্ব জানিতে
পারিয়াছিলেন বলিয়াই জগতে শীর্ষস্থানীয় হইয়া গিয়াছেন।
আমরা এক্ষণে তাঁহাদের তানুমােদিত সৃষ্টিতত্ত্বের যৎকিঞ্চিৎ
আলােচনা করিব।
সৃষ্টিতত্ত্ব : - সদসৎ বিবেচনায় সর্বদেশীয় ঋষিগণ
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সকল স্কুল পদার্থ অসৎ উপদেশ দিয়া সৰ্বমূল
“একই কারণ” বলিয়া সমস্বরে প্রচার করিয়া গিয়াছেন।
সকলেই বলিয়াছেন “একমেবাদ্বিতীয়ম,”। এই মহাবাক্য
অনুসরণ করিতে গেলে বিশ্ব জগৎ যে অসৎ (স্বাধীন সত্তাহীন)
তাহা প্রমাণ করিতে হইবে। বিশ্ব অসৎ পদার্থ প্রমাণ
করিতে হইলে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে কতক আলােচনা করা আবশ্যক

যুক্তিবাদ
কিন্তু এ সম্বন্ধে নানা ঋষিগণ মূল ঠিক রাখিয়া নানাপ্রকার
উপদেশ দিয়াছেন। কেহবা বলিয়াছেন—অনাদিকারণ
ভগবান সৃষ্টি করিতে ইচ্ছা করিয়া দৃশ্য জগতে যত কিছু
আছে সেই সমস্ত একই সময়ে সৃষ্টি করিয়াছেন। কেহবা
বলিয়াছেন—-ভগবান সপ্তাহ কাল ধরিয়া সৃষ্টি কাৰ্য
করিয়াছেন। কেহবা বলিয়াছেন—ভগবৎ ইচ্ছাতেই জগৎ
সৃষ্টি হইয়াছে সত্য, কিন্তু তিনি একই সময়ে কি এক সপ্তাহে
সৃষ্টি কাৰ্য্য সমাধা করেন নাই কিন্তু তাহারই নিয়মাধীনে
অনন্ত কালের মধ্য দিয়া এই দৃশ্য জগৎ ক্রম বিকাশ
পাইয়াছে। যিনি যে ভাবেই সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়া থাকুন
কেন, সকলেরই মূল এক “একমেবাদিভীষ্মম”।
ভগবান ইচ্ছামাত্র একই সময়ে কিম্বা সপ্তাহ কালে জগৎ সৃষ্টি
করিয়াছেন ইহা অস্বীকার করিলে তাহার সৰ্ব্বশক্তি মত্তার
অপলাপ করা হয়, এজন্য আমরা এ বিষয়ে মীমাংসা করিতে
অসক্ত। যাহারা ক্রম বিকাশ উপদেশ দিয়াছেন তাহাদের
মধ্যে কেহবা আকাশ ও বায়ুর উল্লেখ না করিয়া স্থল ভূত
তেজ, জল ও ক্ষিতি এই তিনের উল্লেখ করতঃ পরমাত্ম
চৈতন্যের আশ্রয়ে ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি হইতে দৃশ্য জগতের
ক্রম বিকাশ হইয়াছে বলিয়া উপদেশ দিয়াছেন। ইহাই
ত্রি কৃত প্রকৃতি বলিয়া উল্লেখ আছে । কেহবা
পরমাত্ম চৈতন্যাশ্রয়ে ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি হইতে মহতত্ত্ব,
* ছান্দোগ্য উপনিষদ শ্বেতকেতু উপাখ্যান।
৫

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
মহতত্ত্ব হইতে অহঙ্কার তত্ত্ব ; অহঙ্কার তত্ত্ব হইতে পঞ্চতন্মাত্র
এবং পঞ্চতন্মাত্র হইতে পঞ্চমহাভূতের উৎপত্তি উপদেশ দিয়া-
ছেন। পঞ্চদশীকার শ্রীমদ্ ভারতীতীর্থ বিদ্যারণ্য মুনি তত্ত্ব
বিবেকে সৃষ্টিতত্ত্ব এই ভাবে ব্যাখা করিয়াছেন। যথা :-
(১) পরমাত্ম চৈতন্য বা পরব্রহ্মের প্রতিবিম্ব স্বরূপ
ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতির নির্মল সত্বগুণ হইতে মায়া ; 'ও মায়াকে
বশীভূত করিয়া চৈতন্য ঈশ্বর শব্দে ;
(২) ঐ প্রকৃতির মলিন সত্ত্বগুণ হইতে অবিদ্যা, ও
অবিদ্যাশ্ৰিত চৈতন্য প্রাজ্ঞ বা জীব শব্দে অভিহিত করিয়াছেন
(৩) প্রকৃতির তম প্রধান গুণাংশ হইতে পঞ্চ মহাভূত ;
(৪) প্রত্যেক মহাভূতের সত্ত্বাংশ হইতে বিভিন্ন রূপে
পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং পঞ্চ মহাভুতের সত্ত্বগুণ সমষ্টি হইতে
অন্তঃকরণ;
(৫) প্রত্যেক পঞ্চ মহাভূতেয়
রজঃ গুণাংশ হইতে
বিভিন্নরূপে পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ; এবং পঞ্চ মহাভূতের রজঃ
গুণের সমষ্টি হইতে পঞ্চপ্রাণ ;
(৬) এবং পঞ্চভূতের পঞ্চীকরণ হইতে এই পরিদৃশ্যমান
বিচিত্র জগৎ সৃষ্টি হইয়াছে। *
জগৎ অসৎ অপদার্থ প্রমাণ করিতে হইলে ক্রম বিকাশ
তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়া ক্রম অসারতা দর্শাইতে পারিলে, জগতের
* পঞ্চদশী ১ম পরিচ্ছেদ ১৭, ১৯—২২, ২৭ শ্লোক

মুক্তিবাদ। } স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্ত্বাহীনতা যেরূপ সহজে বােধ গম্য হইতে পারে, ভগবৎ ইচ্ছানুযায়ী সৃষ্টি প্রলয় হইতেছে বলিলে, জগতের অসারতা সম্বন্ধে মনের ততদুর দৃঢ়তা স্থাপন হইতে পারে না; সুতরাং আমরা জগতের ক্রম বিকাশ পৰ্য্যায় ধরিয়া তাহার অসারতা প্রমাণ করাই শ্রেয় মনে করিলাম। সৃষ্টির ক্রম বিকাশ: সৃষ্টি সূক্ষ্ম হইতে স্কুলে পরিণত হইয়াছে। আৰ্য ঋষিগণ তাই অনুলােম ক্রমে সূক্ষ্ম হইতে স্কুল সৃষ্টির ক্রম উপদেশ দিয়াছেন। আমরা সেই পন্থা অবলম্বন না করিয়া তাহাদেরই প্রদর্শিত বিলােম ক্ৰম অবলম্বন পূৰ্ব্বক সৃষ্টি তত্ত্বের মূল অনুসন্ধান করিতেছি, অর্থাৎ মূল পরমাত্ম চৈতন্য হইতে ক্রম বিকাশের দিকে চিন্তা না করিয়া স্কুল জগৎ হইতে ক্ৰমে সূক্ষ্মে উপস্থিত হইবার চেষ্টা করিতেছি ; কারণ আমাদের মনে হয় স্কুল জগতের সঙ্গে আমাদের চাক্ষুষ ঘনিষ্ট সম্বন্ধ থাকায় আমরাও স্কুল বুদ্ধি সম্পন্ন, সুতরাং স্কুল পদার্থ আশ্রয়ে ক্রমে উপরের দিকে সূক্ষ্ম উঠিতে চেষ্টা করিলে একটু সহজে বােধগম্য হইবে এবং স্কুল হইতে ক্রমে সূক্ষ্ম উঠিতে পারিলে তাহার কারণগুলিও ক্রমে সুস্পষ্ট হইয়া যাইবে। পরে সূক্ষ্ম হইতে স্কুলের পরিণতি চিন্তা করিতে আয়াসসাধ্য হইবে না। কারণ আশ্রয় অভাবে সূক্ষ্ম হইতে স্থলে পৌছা বড়ই কষ্টসাধ্য। তাই প্রণম্য আৰ্য ঋষিগণের পাদপদ্ম অচ্চন পূৰ্ব্বক তাহাদেরই প্রদর্শিত বিলােম ক্রম অনুসরণ করিলাম।

২৪
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
উপরে যে পঞ্চভূত অর্থাৎ আকাশ, বায়ু, তেজ, অপ (জল)
ও ক্ষিতির প্রসঙ্গ করা হইয়াছে, সেগুলি কিরূপ পদার্থ তাহা
আমাদিগকে অনুসন্ধান করিতে হইবে; অর্থাৎ ভূতগুলি
স্বাধীন সত্তা বিশিষ্ট স্থায়ী পদার্থ কিনা। যদি স্থায়ী:সংজ্ঞায়
পতিত হয় তবে তাহারা সৎ, নতুবা অসৎ পদার্থ বলিয়া
মনে করিতে হইবে ; এগুলি অসৎ পদার্থ প্রমাণিত হইলে
সৎ পদার্থের অন্বেষণে তামাদিগকে আরাে কতদূর অগ্রসর
হইতে হইবে।
ইতঃপূৰ্বে ইউরােপীয় বৈজ্ঞানিকগণ পঞ্চভূত স্থলে
তাহাদের নবাবিষ্কৃত যন্ত্রাদি সাহায্যে ৭০ টী ভূত (পরমানু)
বা মূল পদার্থের কল্পনা করিয়া: ভারত প্রসিদ্ধ পঞ্চভূতকে
চিরতরে বিদায় দিয়াছিলেন। যাহা হউক ভাগ্য ক্রমে
পণ্ডিতাগ্রগণ্য Sir Villian Crooks বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কোন
একই অজ্ঞাত কারণ হইতে সমুদ্ভূত বলিয়া স্থির করিয়াছেন,
এবং ইংলণ্ডের সর্বপ্রধান বৈজ্ঞানিক Lord Calvin
Necksla Tesla প্রভৃতি পণ্ডিতগণও সেই ধ্বনির পােষকতা
করিতেছেন বলিয়া সৰ্ব্বদেশেই সাড়া পরিয়া গিয়াছে যে
ভারতীয় মনীষিগণ (যে কোনও অজ্ঞাত কারণ (পরব্রহ্ম)
হইতে জাত পঞ্চভূতের উপদেশ দিয়াছেন তাহাই সত্য।
প্রকৃত পক্ষে ভারতের আর্য ঋষিগণ বহুপূর্বে একই অব্যক্ত
অনাদি (পরব্রহ্ম) কারণই পঞ্চভূতের মূল বলিয়া নির্দেশ
করতঃ জগৎ সৃষ্টির মূল উদঘাটন করিয়া গিয়াছেন। *
* আৰ্য ঋষিগণ পদার্থ সমূহের যে অবস্থাকে পঞ্চমহাভূত বলিয়া

মুক্তিবাদ। ২৫ পঞ্চভুত ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুং ও ব্যোম মধ্যে আকাশ ও বায়ু অদৃশ্য পদার্থ অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই আকাশ ও বায়ু দর্শন করা যায় না। তেজ, অপ ও ক্ষিতি প্রকৃত পক্ষে সূক্ষ্ম (অদৃশ্য) পদার্থ হইলেও ঐ ঐ পদার্থ ঘনীভূত হইলে দৃশ্য পদার্থে পরিণত হয়। আকাশ অত্যন্ত সূক্ষ্ম পদার্থ এবং ঘনীভূত হয় না বলিয়া কোন অবস্থাতেই তাহা দেখা যায় না বা পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বার: উপলব্ধি করা যায় না। বায়ু আকাশ হইতে কম, সূক্ষ্ম এবং ঘনীভূত হবার স্বভাব আছে বলিয়া বর্ণন করিয়া গিয়াছেন তাহাতে সকল গুলি মহাভূতই অতি সুক্ষ্ম সুতর: দর্শন যোগ্য নহে। স্থল মৃত্তিকা ক্ষিতি নহে; ক্ষিতির স্থল পরিণাম । সমুদ্র জল বনাক্ত, তাহাতে লণ দেখা যায় না দৃষ্টতঃ পরিস্কার জল বলিয়া বোধ হয়, কিন্তু ঐ জল। তাপ সংযােগে বাম্পাকারে উড়াইয়া দিলে তাহার লবণাংশ ঘনীভুত হইয়া পাত্রে সংলগ্ন থাকে। সমুদ্র জলের এই লবণাংশ ক্রমে ঘনীভুত হইয়। অন্যান্য কারণে সময় ক্রমে বৰ্ত্তমান। কার মৃত্তিকায় পরিণত হইয়াছে। প্রস্তর স্বর্ণ রৌপ্যাদি খনিজ পদার্থ ও মৃত্তিকারই অবস্থান্তর মাত্র। এই মৃত্তিকার পুর্বাবস্থা বা সূক্ষ্ম।বস্থাকেই আৰ্য ঋষিগণ ক্ষিতি শব্দে বাবহার করিয়াছেন। তদ্রুপ সুল জল ও অগ্নিকে মহাভৃত অপ ও তেজ বলিয়া গণ্য করা আর্য ঋষি- গুণের অভিপ্রেত নহে। জল ও অগ্নির পূর্বাবস্থাকেই অপ ও তেজ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন; নতুবা সাধারণ মৃত্তিকা ও জলে যে বহুল পরিমাণে যৌগিক পদার্থ বিদ্যমান রহিয়াছে তাহা ত্রিকালজ্ঞ আৰ্য্য ঋষিগণের অজ্ঞাত থাকিবার কোনও কারণ নাই। সূৰ্য্য কিরণ আতসী প্রস্তর সংযোগে কেন্দ্রিভূত হইয়া ঘন হইলে দৃশ্য অগ্নির উৎপত্তি হয়, সুতরাং সূর্য কিরণ অগ্নির কারণ। যাহা হইতে এই ব্যকিরণ তেজ প্রাপ্ত হইয়াছে তাহাকেই, আৰ্য ঋষিগণ মহাভুত তেজ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। সুতরাং পঞ্চ মহাভুত প্রত্যেকেই ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নহে। ৪

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
তাহার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি কিন্তু দর্শন করিতে
পারি না। তেজ বায়ু অপেক্ষা কম সূক্ষ্ম বা তরল এবং
ঘনীভূত হইবার স্বভাবাপন্ন বসিয়া তাহা স্পর্শ ও দর্শন করিতে
পারি। জল তেজ অপেক্ষা কম সূক্ষ্ম ও ঘনীভূত হইবার
স্বভাবাপন্ন বলিয়া তাহ৷ দর্শন, স্পর্শ ও আস্বাদন করিতে
পারি। তদ্রুপ ক্ষিতিও সুলাবস্থায় পরিণত হওয়ায় তাহা
আমরা কঠিন স্কুল বস্তু রূপে ব্যবহার করিতেছি। সুতরাং
আকাশ হইতে ক্ষিতি পৰ্য্যন্ত ক্রমে তরলতার হ্রাস অর্থাৎ
ঘনীভূত অবস্থার ক্রম বৃদ্ধি অনুভব করিতেছি। এক্ষণ
সমধিক কঠিন মৃত্তিকা কি পদার্থ স্থির করিয়া তাহা হইতে
ক্রমে সূক্ষ্ম ভূতের অবস্থাদি চিন্তা করিব।
স্থূল মৃত্তিকা (ক্ষিতি পরিণাম) পরীক্ষায় দেখা যায়
তাহাতে আকাশ, বায়ু, তেজ ও জলের ভাগ রহিয়াছে। যুক্তি
বসে এই চারিটী পদার্থ পৃথক করিলে মৃত্তিকার অস্তিত্ব লােপ
হয়। মৃত্তিকা যৌগিক পদার্থ সুতরাং সত্য বা সৎ পদার্থ
এজন্য মৃত্তিকায় উৎপন্ন যাবতীয় পদার্থ সৎ পদার্থ
বলা যাইতে পারে না। মৃত্তিকাদি সমুদয় পদার্থ সৎ পদার্থ
হওয়ায় তাহারা সৃষ্ট পদার্থ এবং তাহাদের ধ্বংশ বা লয়
অবশ্যম্ভাবী।
জল (অপ পরিণাম ) বিশ্লেষণ করিলে দেখিতে পাই যে
তাহাতে তেজের অংশ আছে, কারণ ধূম তেজের কাৰ্য। ধূম
শীতল করিলে জলে পরিণত হয় সুতরাং জল তেজের পরিণতি ।
নহে।

মুক্তিবাদ।
২৭
;
;
তদ্রুপ তেজে ও বায়ুর অংশ আছে ; যেহেতু আকাশে বায়ুর
অপ্রতিহত প্রবল গতিই উষ্ণতা বা তেজ উৎপাদন করে।
পক্ষান্তরে বায়ু না থাকিলে তেজ কাৰ্য্য বন্ধ হইয়া যায়।
অতএব বায়ু তেজের কারণ অর্থাৎ তেজ বায়ু সমুদ্ভূত। যেহেতু
আকাশ না থাকিলে বায়ুর উৎপত্তি, স্থিতি ও সঞ্চালনের
অসদ্ভাব হয়, তদ্ধেতু আকাশই বায়ুর কারণ বলিতে হইবে।
সুতরাং আকাশ হইতে বায়ু ; বায়ু হইতে তেজ ; তেজ হইতে
জল ; জল হইতে মৃত্তিকার আবিভাবসিদ্ধ হইল। মৃত্তিকা
হইতে আকাশ পৰ্য্যন্ত পর্যালােচনায় আমরা দেখিতে পাই
যে, আকাশের অভাবে বায়ু ; বায়ুর অভাবে তেজ ; তেজের
অভাবে জল; জলের অভাবে মৃত্তিকার উৎপত্তি অসম্ভব।
একটীর অভাবে অন্যটীর স্থায়ীত্ব বা স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নাই
সকলগুলিই তাহাদের স্বীয় স্বীয় কারণের আশ্রিত। অতএব
মৃত্তিকা হইতে বায়ু পৰ্যন্ত অসৎ বা অস্থায়ী পদার্থ প্রমাণিত
হইল তাহাদের ধ্বংশ বা লয় অনিবার্য ; সুতরাং এই সকল
মহাভূত সৎ পদার্থ নহে।
বাকী রহিল আকাশ। এক্ষণ আকাশ কি পদার্থ তাহা
বিবেচনা করিতে হইবে। পরমাত্ম চৈতন্যকে আর্য ঋষিগণ
নিগুণ, নিৰ্বিশেষ, পূর্ণ, অনন্ত প্রভৃতি আখ্যায় আখ্যায়িত
করিয়াছেন। সবিশেষ বস্তু সগুণ : গুণ থাকিলেই তাহার
ব্যভিচার আশঙ্কা করা যায় এবং তাহার অসম্পূর্ণত্ব প্রতীয়মান
হয় ; যেহেতু নিরতিশয় সত্বগুণ, রজঃ ও তমঃগুণ অভাবে
•

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
•
অপূর্ণতার পরিচায়ক। পরন্তু গুণাদি না থাকিলেও পূর্ণ
স্বরূপের হানি হয় ; তদবস্থায় পরমাত্ম চৈতন্যে কোন গুণ নাই
একথা বলা যায় না। প্রকৃত পক্ষে পরমাত্ম চৈতন্যে সমস্তগুণাদি
রহিয়াছে, কিন্তু লীনাবস্থায় আছে বলিয়া গুণ সকল পরমাত্ম
চৈতন্যে স্বীয় স্বীয় গুণকার্য্যের প্রভাব বিস্তার করিতে পারে
। যেমন বায়ুতে লীন বাষ্প। বাষ্প যতক্ষণ বায়ুতে
লীনাবস্থায় থাকে ততক্ষণ বাষ্পের নিজগুণ বিকাশ করিতে
পারে না এবং বাষ্প বায়ুতে লীনাবস্থায় আছে বলিয়া, বায়ুর
স্বকীয় ভাবের ও পরিবর্তন হয় না। কালক্রমে বাষ্প জল
রূপে পরিণত হইলেও বায়ু পূৰ্ব্ববৎ একই ভাবাপন্ন থাকে।
পরমাত্ম চৈতন্যে, তদ্রুপ সত্ত, রজ, তমগুণ লীন আছে
বলিয়া তাহার (পরমাত্ম চৈতন্যের ) নির্বিকারত্বের ব্যাঘাৎ
হয় না। গুণ আত্মপ্রকাশ করিলেই যে পদার্থের ভিতর
দিয়া আত্মপ্রকাশ করে তাহা সগুণ পদার্থ হয়। সগুণ
পদার্থের গুণ স্থানান্তর হইতে প্রাপ্ত সুতরাং সগুণ পদার্থ সৎ
পদার্থ নহে। আর্থাৎ সৃষ্ট পদার্থ ও ধ্বংশশীল। আকাশ
সগুণ, কেননা তাহাতে শব্দ গুণ পরিলক্ষিত হয়। অতএব
আকাশ গুণযুক্ত সৃষ্ট পদার্থ। আকাশে শব্দগুণ না থাকিলে
কোনও পদার্থ হইতে শব্দের স্মরণ হইত না। সুতরাং
পরমাত্ম চৈতন্যের ন্যায় আকাশ সর্বব্যাপী হইলেও আকাশ
গুণযুক্ত বলিয়া পরমাত্ম চৈতন্য নহে। প্ররমাত্ম চৈতন্য নিগুন
নিৰ্বিশেষ আকাশ সগুণ সবিশেষ। অতএব মৃত্তিকার কারণ

মুক্তিবাদ।
জল ;
•
জলের কারণ তেজ ; তেজের কারণ বায়ু ; বায়ুর
কারণ আকাশ এবং আকাশ ও গুণান্বিত হওয়ায় সৃষ্ট পদার্থ
প্রতিপন্ন হইল। এই আকাশ যে অতি সূক্ষ্মতম কারণ
হইতে উদ্ভব হইয়াছে তাহাই পরমাত্ম চৈতন্য । পরমাত্মা
চৈতন্য অনাদি, অনন্ত, নিগুণ ও নির্বিশেষ বিধায় কোনও
সংজ্ঞাধীন হইতে পারে না; সুতরাং ভাষা দ্বারা এই মহান
তত্ত্ব প্রকাশ করা যায় না। এই বস্তু মাত্র উপলভ্য বিষয়
সুধু বােধসৌকৰ্য্যার্থে ভগবান, ঈশ্বর, মহেশ্বর প্রভৃতি নাম
ব্যবহৃত হইয়া থাকে ।
গুণকাৰ্য বিশ্লেষণ দ্বারাও যে পঞ্চ মহাভূতের স্বাধীন
স্বতন্ত্র সত্তা নাই অর্থাৎ সৃষ্ট পদার্থ তাহা পঞ্চদশীকার শ্রীমদ
ভারতী তীর্থ বিদ্যারণ্য মুনি তাহার গ্রন্থে অতি সরলভাবে
প্রমাণিত করিয়াছেন। যথা :-
প্রতিনিধ্বিয় শব্দেবান্নৌ বীসীভিশনম।
অনুষ্ণাশীতসংস্পর্শে বহ্নৌ ভূগুভূও ধ্বনি।
উস্পর্শ প্রভারূপং লে চল চলু ধ্বনি।
শীতস্পর্শ শুকুরূপং সে। মাধুর্যমীৱিতম।
ভূমৌ কড়কড়া শব্দ কাঠিন্য স্পর্শইষ্যতে।
নীলাদিকং চিত্ররূপং মধুৱামুদিকে সঃ।
সুৱভীর গন্ধে দ্বেী গুণাঃ সম্যগ, বিবেচিতা |
পঞ্চদশী ২ পৱিচ্ছেদ ৩শ্লোক।
আকাশের কেবল শব্দ মাত্র গুণ অর্থাৎ প্রতিধ্বনি।

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ; বায়ুতে শব্দ ও স্পর্শ উভয় গুণ অর্থাৎ বায়ু সঞ্চালনে বীসি বীসি শব্দ এবং অনুষ্ণ ও অশীতল স্পর্শ অনুভব হয়। অগ্নিতে শব্দ স্পর্শ ও রূপ এই তিনগুণ অর্থাৎ ভূগু ভূগু শব্দ, উষ্ণ স্পর্শ ও প্রকাশরূপ। জলে শব্দ, স্পর্শ, রূপ ও রস এই চারি গুণ, অর্থাৎ চুলু চুলু শব্দ, শীতল স্পর্শ, শুক্ল রূপ ও মাধুৰ্য রস। মৃত্তিকায় শব্দ, স্পর্শ, বিচিত্র রূপ, মধুরাদি রস ও গন্ধ ; এই প্রকার গুণ দ্বারা পঞ্চ মাভূতের প্রভেদ বিবেচনা করা যায়। * উল্লিখিত বচনে আম" এই পাইলাম যে, আকাশের মাত্র এক গুণ, প্রতিধ্বনি বা শব্দগুণ। তৎপর আকাশে বায়ু সংযুক্ত হওয়ায় বায়ুর নিজ গুণ স্পর্শ ও আকাশের শব্দ গুণ প্রাপ্ত হইয়া বায়ু ‘স্পর্শ ও শব্দ এই দুই গুণে গুণান্বিত হইল। তৎপর বায়ুতে তেজ সংযুক্ত হইল, তাহাতে তেজের নিজ গুণ প্রকাশ (রূপ), এবং বায়ু হইতে প্রাপ্ত দুই গুণ শব্দ ও উল্লিখিত বচনে পঞ্চভূতের প্রত্যেকেরই এক একটা স্বতন্ত্র গুণ রহিয়াছে বলিয়া প্রমাণিত হইতেছে ; তদ্ভিন্ন আকাশের গুণ বায়ুতে, বায়ুর গুণ তেজে, তেজের গুণ অপে, অপের গুণ ক্ষিতিতে পর্যাপ্ত হওয়ায় গুণ বৃদ্ধি বিবেচনায় ক্রম বিকাশ সমর্থন করিতেছে। পঞ্চভূতের স্বতন্ত্র গুণগুলি যে কারণ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহাদিগকে পঞ্চতন্মাত্র কহে। যথা শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ তন্মাত্র। এই পঞ্চতন্মাত্রগুলি যে কারণ হইতে উদ্ভব হইয়াছে, তাহাকে অহঙ্কার তত্ত্ব এবং অহঙ্কার তত্ত্ব যে কারণ হইতে উদ্ভব হইয়াছে, তাহাকে মহতত্ত্ব বলে । মহতত্ত্ব ত্রি গুণাত্মিক। প্রকৃতির সাম্যাবস্থার প্রথম বিচ্যুতি। এই তত্ত্ব, তত্ত্ব- ।

মুক্তিবাদ স্পর্শ এই তিন গুণে গুণযুক্ত হইল। এইরূপ ক্রমে তেজে অপ এবং অপে ক্ষিতি সংযােগ হওয়ায় ক্রম বিকাশে জল চারি গুণে (শব্দ, স্পর্শ, রূপ ও রস) এবং মৃত্তিকা পাচ গুণে (শব্দ স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ ) গুণান্বিত হইল। যেহেতু আমরা মৃত্তিকার গন্ধগুণ আকাশ, বায়ু, তেজ ও জলে ; জলের রস বণ আকাশ, বায়ু, ও তেজে ; তেজের (রূপ) প্রকাশ গুণ আকাশ ও বায়ুতে এবং বায়ুর স্পর্শ গুণ আকাশে উপলব্ধি করি না তদ্ধেতু ইহাই প্রমাণিত ভূত সকল ক্রম বিকাশ পাইয়া পর পর ক্রমে গুণ বৃদ্ধি হইয়াছে। এবং যেহেতু কারণ বস্তুর গুণ কাৰ্যে পৰ্য্যবস্তি হয় তদ্ধেতু আকাশ রূপ কারণের গুণ বায়ুতে, বায়ুরূপ কারণের গুণ তেজে ; হয় যে, এই জ্ঞানিগণ ভিন্ন অন্যের অনুভব করা সম্ভবপর নহে। আমরা মানব দেহকে ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড বলিয়া থাকি। দেহ তত্ব পৰ্য্যালোচনায় এই ভাব কিঞ্চিৎ পরিমাণে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারা যায় । সুষুপ্তি অবস্থাকে প্রকৃতির সাম্যাবস্থা বা পরব্রহ্ম ভাব বলা যাইতে পারে। সুষুপ্তি হইতে জাগ্রত হইব। মাত্র এক অনির্বচনীয় সাম্যভাব পরিলক্ষিত হয় এবং পর মুহুর্তেই অহং ভাব জন্ম। এই জাগ্রত অনির্বচনীয় ভাবকে মহত্তত্ত্ব এবং পর মুহুর্তের অহং ভাবকে অহঙ্কার তত্ত্ব বলা যাইতে পারে । অহং'ভাব হইতে ইদিয়াদির জ্ঞান জাগ্রত হয়। এই অবস্থা পঞ্চতন্মাত্র স্থানীয়। ইন্দ্রিয় জ্ঞান হইতে একাদশ ইন্দ্রিয় দ্বারের স্ফুরণ হইয়া থাকে। তৎপর ইহাদের বৈষয়িক স্কুল ক্রিয়া অর্থাৎ পঞ্চভৌতিক ক্রিয়ার বিকাশ পায়। সৃষ্টিতত্ত্বের প্রথম স্তরও এইরূপ। ••

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
তেজরূপ কারণের গুণ জলে ; জলরূপ কারণের গুণ মৃত্তিকায়
পর্যবসিত হইয়াছে। ক্রমবিকাশে গুণ সকল ক্রমে বৃদ্ধি
পাইলে সকল ভূতেই সমস্ত গুণ পরিলক্ষিত হইত।
অতএব আকাশ হইতে বায়ু ; বায়ু হইতে তেজ ;
হইতে জল ; জল হইতে মৃত্তিকার উৎপত্তি বা ক্রমবিকাশ
প্রমাণিত হইল।
ক্রম বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গুণ বৃদ্ধি বিবেচনায় আমরা
যে একটী নিগুঢ় তত্ত্বের সন্ধান পাইতেছি, সেই তত্ত্ব সকল
তত্ত্বের সরি।
যে তত্ত্ব বিঠনে সৃষ্টি, স্থিতি, লয় সমস্ত অসার
হইয়া পরে ও যে তত্ত্ব বিদ্যমান আছে বলিয়া অনন্ত জ্ঞান,
অনন্ত তেজ, অনন্ত শক্তি আদি সমন্বিত পরিদৃশ্যমান বিশ্ব
ব্ৰহ্মাণ্ড প্রত্যক্ষ করিতেছি, সেই মহাতত্ত্ব পরমাত্ম চৈতন্য
এ স্থলে নিহিত রহিয়াছে। প্রকৃতির রজঃ গুণােদ্ভূত এই
পঞ্চভূতেই আমরা একটা নিত্য চৈতন্যের ভাব জাগ্রত রহি-
য়াছে বলিয়া জানিতে পারি। চৈতন্য ভাব না থাকিলে
ভূত পঞ্চকের ক্রম বিকাশ ও তৎ সঙ্গে সঙ্গে গুণ বৃদ্ধি হইত
; অচেতনবৎ একটী পদার্থ অন্যটীর সঙ্গে মিলিত হইবার
কোনও কারণ নাই। এবং যে চৈতন্যভাব নিত্য জাগ্রত
থাকায় এই গুণান্বিত ভূত সকল ক্রম বিকাশ পাইয়া পরি-
দৃশ্যমান বিচিত্র জগৎ নিৰ্মাণ করিয়াছে তাহাই পরমাত্ম
চৈতন্য জানিও।
পরমাত্ম চৈতন্যে যখন স্পন্দনানুভূতি হয়, তখন সমস্ত

মুক্তিবাদ লয় প্রাপ্ত গুণ সৃষ্টির সূচনা করে। পরমাত্ম চৈতন্য বা পরব্রহ্মের এই অবস্থাকে কারণ ব্ৰহ্ম, বা সব্ৰহ্ম বা প্রকৃতি বলা যায়। এই অবস্থা ইন্দ্রিয়ের অগ্রাহ, মাত্র উপলভ্য বিষয়। এজন্য প্রকৃতি ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয় নহে। আমরা যে দৃশ্য জগৎকে প্রকৃতি বলিয়া মনে করিয়া থাকি তাহা প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির স্কুল পরিণাম। প্রকৃতির স্থূল পরিণাম। পরব্রহ্মে ঐ স্পন্দনানুভূতিকে ইচ্ছাশক্তি ও বলা যায়। এই স্পন্দন বা ইচ্ছা শক্তির সূচনা হইলেই ব্রহ্মে লীন গুণত্রয়ের কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। কাৰ্যারম্ভ হইলেই গুণত্রয়ের পরিমানানুসারে ও তুমুল আন্দোলনে সূক্ষ্ম তরল আকাশ হইতে ক্রমে স্কুল ভূত দেখা দেয় এবং সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, গ্রহ নক্ষত্রাদির সৃষ্টি করে। তৎপর পৃথিবীপৃষ্ঠের ন্যায় অপর গ্রহাদিতেও নানাপ্রকার বিচিত্র জীব জন্তুর বিকাশ হইয়া থাকে। ইহাই ষ্টি, বৈচিত্রের কারণ। এ পর্যন্ত আমরা পরমাত্ম চৈতন্যের আশ্রয়ে আকাশ, বায়ু, তেজ, অপ ও ক্ষিতির ক্রম বিকাশ তত্ত্ব আলোচনা করি- লাম। ক্ষিতি সৃষ্টির পর মনুষ্য পৰ্যন্ত ক্রম সৃষ্টি বিকাশ সম্বন্ধে Mr. larwin এর প্রবন্ধ অনেকেই অবগত আছেন। Mr. Darwin অধিক দিনের লােক নহেন, তিনি সৃষ্টি সম্বন্ধে যে গবেষণা করিয়াছেন তাহা প্রশংসাৰ্হ ; কিন্তু তাহার মত এ ভারতে নূতন নহে। তাহার মত প্রকাশের বহু বহু শতাব্দি পূৰ্ব্বে ভারতের আর্য ঋষিগণ এই ধ্বনি করিয়া ৩৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও গিয়াছেন। বৃহৎ বিষ্ণু পুরাণে আমরা জীব জগতের ক্রম বিকাশ দেখিতে পাই যথা :- জলজ। নব লক্ষাণি স্থাৰৱা লক্ষ বিংশতি। রুময়ে রুদ্রসঙ্খ্যক: পক্ষিন দশ লক্ষকম্ । ত্রিংশ ব্লক্ষাণি পশতুলক্ষাণি মানুষ। সর্বঘােখি পৱিত্যজ্য শ্ৰহ্মঘানিং ততোভ্যগৎ | অপিচ- স্থাবরাম্রিংশ ল চ জলজো নৰ কক্ষ। কমিজা দশলক্ষক্ষ লক্ষচ্চ পক্ষিনঃ ॥ পশবে বিংশ ক্ষশ্চ ভুলক্ষ মানবাঃ। এতে ভ্রমণ কৃত্বা দ্বিজত্বপজায়তে । ইতি কৰ্ম্ম বিপাক। বৃহদ্বিষ্ণুপুরাণের শ্লোকের শেষ ছত্রে সর্বযােনি পরিত্যা: করতঃ ব্রহ্মযােনি প্রাপ্ত হয় এবং কৰ্ম্মবিপাকের উদ্ধ শ্লোকের চতুর্থ চরণে এই সকল যােনি ভ্রমণ করতঃ বিজ প্রাপ্ত হয় বলিয়া উপদেশ রহিয়াছে। গরুড় পুরাণে বিকাশের আভাষ পাই। যথা : চশীতিক ক্ষাণি চতুর্ভোশ্চ জব । অণ্ডজঃ স্বেজাশ্চৈব উদ্ভিজ্জাশ্চ জৱামুজাঃ একবিংশতি লক্ষাণি অণ্ডজঃ পরিকীর্তি। স্বেদজা তথৈবােক্তা উদ্ভিজ্জাও প্রমাণ । জরায়ুজশ্চ ভাবস্তে। মনুষ্যাদ্যাশ্চ জম্ভব। সর্বেষামেব জন্তু মানুষ সুদুর্লভ।

মুক্তিবাদ।
একমত।
ইহাতেও দেখা যায় জীব চারি শ্রেণীতে বিভক্ত। স্বেদজ,
অণ্ডজ, উদ্ভিজ ও জরায়ুজ। এবং সর্বশ্রেণীর জীব মধ্যে
মনুষ্য জন্ম সুদুলভ। “সর্বেষামেব” ও “সুদুলভ” শব্দ দ্বারা
পুরাণকার ক্রম বিকাশের ইঙ্গিত করিয়াছেন।
ইহাতে
স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে মনুষ্য জন্ম ক্রম বিকাশে প্রাপ্ত এবং
ইহাই স্কুল সৃষ্টিতে দুল্ল ভ জন্ম । শ্রেণীগত যােনি গণনায়
পুরাণকারগণের সাধারণ মতদ্বৈধতা , থাকিলেও ৮৪ লক্ষ
যােনি এবং সৃষ্টির ক্রম বিকাশ সম্বন্ধে একমত।
আমাদের দেশে যে দেহতত্ত্বের গান প্রচলিত আছে,
তাহাতেও আমরা জানিয়াছি, চৌরাশী।লক্ষ যােনি ভ্রমণ
করিয়া মানবদেহ পাওয়া গিয়াছে। আমরা উল্লিখিত
শ্লোকেও স্থাবর সৃষ্টি হইতে ব্রাহ্মণ সৃষ্টি পর্যন্ত চৌরাশী লক্ষ
যােনির পরিচয় পাই। এই চৌরাশী লক্ষ যােনির ইতিবৃত্ত
দেওয়া সাধ্যাতীত। পাঠক ইচ্ছা
সঙ্গে
M: Daruvin এর সৃষ্টিতত্ত্ব মিল করিয়া দেখিতে পারেন ।
মনুষ্য দেহে যে সকল ইন্দ্রিয় দেখিতে পাই তত্তলনায়
অন্যান্য জীবে ইন্দ্রিয়াদির তেমন উংক পরিলক্ষিত হয় না।
কিন্তু পশু জগতের ইন্দ্রিয়াদি পৰ্যালােচনা করিলে ক্রম
বিকাশই সমর্থিত হয়। আমরা এক্ষণ দেহেন্দ্রিয়াদি সহ
মানব-সৃষ্টি বিষয়ে আলােচনা করিব।
মানবদেহে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত, পদ,
বা, পায়ু ও উপস্থ দেখিতে পাই। সাধারণ ভাবে এগুলিকে
করিলে পুরাণ

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ইন্দ্রিয় বলে, বাস্তবিক এ গুলি ইন্দ্রিয় নহে, ইন্দ্রিয় দ্বার। যে শক্তি থাকায় ঐ সকল দ্বার কৰ্ম্মপরবশ হইতেছে ঐ শক্তিকে ইন্দ্রিয় বলে। এই সকল ইন্দ্রিয় মধ্যে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও ত্বক এই পাঁচটি দ্বার দ্বারা আমরা দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণ, আস্বাদন ও স্পর্শানুভব করিয়া থাকি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বার বহির্বিষয়ের জ্ঞান জন্মাইয়া দেয় এজন্য ইহাদিগকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলে। হস্ত, পদ, বাক, পায়ু ও উপস্থ ইন্দ্রিয় দ্বার দ্বারা তারা যথাক্রমে গ্রহণ, গমন, কথন, ত্যাগ ও আনন্দ অনুভব করিয়া থাকি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বার কৰ্ম্ম সাধক তরাং এই সকল কর্মদ্বার—অভিমানী শক্তিকে কৰ্ম্মন্দ্রিয় অর্থাৎ হস্তেন্দ্রিয়, পদেন্দ্রিয়, বাগেন্দ্রিয়, গুহেন্দ্রিয় ও উপস্থ ইন্দ্রিয় বলিয়া উক্ত হইয়া থাকে। এই উভয় বিধ ইন্দ্রিয় অন্তঃকরণ দ্বারা চালিত হইলে স্বীয় স্বীয় কাৰ্যপরবশ হইতে পারে। অন্তঃকরণ দ্বারা চালিত না হইলে তৎনিহিত শক্তি কার্যক্ষম হইতে পারে না ; অর্থাৎ ইন্দ্রিয়া- দির শক্তি থাকা স্বত্বেও তাহারা অন্ধ বলিয়া বিবেচিত হয়। অন্তঃকরণ দ্বারা উভয়বিধ ইন্দ্রিয় চালিত হয় বলিয়া অন্তঃ- করণকে উভরিন্দ্রিয় বলে। আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণও বলেন যে, যেস্থানে কোন কিছুই নাই তথায় বিনা কারণে কিছুই উৎপত্তি হইতে পারে ay (out of nothing. nothing is grown.), 91 অতি সত্য কথা। আর্য ঋষিগণ এই বিষয় বিশেষরূপে •

মুক্তিবাদ।
৩৭
অবগত ছিলেন বলিয়াই তঁাহারা স্কুল সৃষ্টির কারণ অনুসন্ধান
করিতে যাইয়া সূক্ষ্মাদপিসূক্ষ্ম পরমাত্ম ব্রহ্মতত্বে উপনীত
হইতে পারিয়াছিলেন। তাহারা প্রতি পদার্থের বীজ অনু-
সন্ধান করিতে করিতে সৰ্বমূল ব্ৰহ্মবীজে উপনীত হইয়া-
ছিলেন। আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ স্থূল ভূতের উপাসক ;
তাহাদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্ৰহ্মতত্বে যাইবার আশা করা যায়
। যাহা হউক আমরা যে সকল স্কুল ইন্দ্রিয় দেখিতে
পাই, সেই সকল উৎপত্তি হইবার শ্যই কোন কারণ বা
বীজ রহিয়াছে। বিনা কারণে বা বীজে কোন কার্যের
উদ্ভব হইতে পারে না। আমরা ইছাও জানিয়াছি যে,
কাৰ্য্যে যে যে গুণ প্রকাশ পায় তাহা তৎকারণে না থাকিলে
প্রকাশ পাইতে পারে না। অনুসন্ধান করিতে গেলেই
কার্যে কি গুণ আছে তাহা দেখা আবশ্যক। কাৰ্যে যে গুণ
দেখিতে পাই তাহা তাহার কারণ হইতেই প্রাপ্ত ; এজন্য
আমরা কারণটী সহজে বাহির করিয়া লইতে পারি। এক্ষণে
আমরা অব্যক্ত ইন্দ্রিয়াদির কারণ বা বীজ অনুসন্ধান করিব।
আমরা জানিয়াছি পরমাত্ম চৈতন্য পরব্রহ্ম হইতেই এই
স্থূল বিশ্বের উৎপত্তি হইয়াছে। ব্রহ্ম কারণ না থাকলে এই
বিশ্ব সৃষ্টির হেতু ছিল না। এক্ষণে আমরা দেখিতে পাইব
যে তদ্রুপ সূক্ষ্ম কারণ না থাকিলে চক্ষু কর্ণাদিও স্থলরূপে
প্রকাশ পাইতে পাতি না ; অর্থাৎ স্থল চক্ষু কর্ণাদি ও সূক্ষ্ম
কারণ সঞ্জাত। দর্শনেন্দ্রিয় পৰ্যালােচনায় আমরা জানিতে
;

৩৮ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও পাই, দর্শনেন্দ্রিয় বাহিরের বস্তুকে দেখাইয়া দেয় অর্থাৎ প্রকাশিত করে। চক্ষে প্রকাশক ভাবাপন্ন কোন পদার্থ না থাকিলে তদ্বারা দর্শন করা যাইতে পারিত না। যেহেতু কারণের গুণ কার্যে প্রকাশ পায় তদ্ধেতু তেজরূপ কারণের গুণ তৎকাৰ্য্য চক্ষুতে প্রকাশ পাইয়াছে, অর্থাৎ চক্ষু তেজ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে ; সুতরাং চক্ষু তেজের স্থল পরিণাম। শ্রবণেন্দ্রিয় পৰ্যালােচনায় জানিতে পারি, ইহা দ্বারা মানব বাহিরের শব্দ গ্রহণ ঋরে। শব্দ আকাশের গুণ ; অতএব শ্রবণেন্দ্রিয় আকাশ সঞ্জাত। ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা আমরা গন্ধ অনুভব করি, ক্ষিতি গন্ধগুণ যুক্ত, অতএব ঘ্রাণেন্দ্রিয় ক্ষিতি হইতে উৎপন্ন। রসনেন্দ্রিয় দ্বারা আমরা বস্তুর রস আস্বাদন করি। অপ (জল) রসগুণ যুক্ত অতএব রসনেন্দ্রিয় অপ হইতে উৎপন্ন । তদ্রুপ বায়ুর স্পর্শগুণ থাকায় স্পর্শেন্দ্রিয় বায়ু সঞ্জাত। পুনঃ কর্মেন্দ্রিয় হস্ত দ্বারা আমরা গ্রহণ করিয়া থাকি। বায়ুর অপর গুণ গ্রহণ। হাত ইচ্ছামত গ্রহণ করিতে পারে তাতএব হস্ত বায়ুর স্থল কাৰ্য। ‘পদ দ্বারা আমরা গমনাগমন করিতে পারি। পদে শক্তি না থাকিলে চলাফেরা এমন কি আমরা দাড়াইয়া থাকিতে পারি না অতএব শক্তি অর্থাৎ তেজই পদ- ইন্দ্রিয়ের কারণ। বাগি ন্দ্রিয় দ্বারা আমরা শব্দ উচ্চারণ করি। আকাশ শব্দ গুণ- যুক্ত ; অতএব আকাশই বাগিন্দ্রিয়ের করণ। পায়ু ইন্দ্রিয় দ্বারা আমরা মল ত্যাগ করিয়া পাকস্থলী পরিষ্কার করিয়া I"। de prone tasties মুক্তিবাদ। অতএব থাকি। জল ধৌত করিয়া পরিষ্কার করা গুণযুক্ত। অপ পায়ু-ইন্দ্রিয়ের কারণ। উপস্থ ইন্দ্রিয় বীৰ্য্যধারক। ক্ষিতি বীৰ্য্যগুণ যুক্ত ; অতএব ক্ষিতি উপস্থের কারণ। সুতরাং পঞ্চ মহাভূতের বিভিন্ন গুণ হইতে উভয়বিধ জ্ঞান ও কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হইয়াছে। সত্ত্বগুণের ক্রিয়া, বিচার, সুখানুভূতি ইত্যাদি রজঃগুণের ক্রিয়া কৰ্ম্ম প্রবৃত্তি, সাহস ইত্যাদি অতএব পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় পঞ্চভূতের সত্ত্বগুণ হইতে এবং পূঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় পঞ্চভূতের রঙ্গণ হইতে উৎপন্ন হই- য়াছে । এইরূপ পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সত্ত্বগুণ সমষ্টি হইতে অন্তঃকরণ উৎপন্ন হইয়াছে। অন্তঃকরণ অবস্থা ভেদে দুই প্রকার বুদ্ধি ও মন। অন্তঃকরণের চিয়াত্মিকা অবস্থাকে বুদ্ধি এবং সংশয়ত্মিকা অবস্থাকে মন বলে সুতরাং মন কাম ক্রোধাদি নীচ প্রবৃত্তির জনক। পুনঃ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় পঞ্চকের রজগুণ সমষ্টি হইতে প্রাণের উৎপত্তি হইয়াছে। প্রাণ অবস্থা ভেদে প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যাণ (পাঁচ প্রকার ) বলিয়া কথিত হয় । নাসাস্থ বায়ু প্রাণ, গৃহস্থ বায়ু অপান, হৃদয়স্থ বায়ু সমান, কণ্ঠস্থ বায়ু উদান, এবং সর্ব শরীরস্থ বায়ু ব্যাণ বলিয়া পরিচিত। অতএব সমস্ত স্কুল জগৎ এবং সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়াদি মনপ্রাণ পঞ্চ মহাভূত সঞ্জাত সিদ্ধ হইল। উল্লিখিত পঞ্চভূতের তুমুল আন্দোলনে ও গুণত্রয়ের ন্যূনাধিক পরিমাণে বিশ্বে নানাগুণ যুক্ত নানাবিধ আকৃতি প্রকৃতির পদার্থের উদ্ভব হইয়াছে। ইহাই আৰ্য ঋষিগণের ৪০ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও দু সিদ্ধান্ত। আর্য ঋষিগণ এই পঞ্চভূতের ন্যূনাধিক মিলনকে পঞ্চীকরণ নাম দিয়া এইরূপ উপদেশ দিয়াছেন যথা :- দ্বিধা বিধায় চৈকৈকং চতুৰ্দা প্রথম পুন: স্ব:ইনু দি ইয়: শৈর্ষেজ মা; পঞ্চ পঞ্চতে ॥ ইতি পঞ্চদশী তত্ত্ববিবেক ২৭ শ্লোক। আকাশাদি প্রত্যেক পঞ্চভূতকে প্রথমতঃ দুই দুই অংশে বিভাগ করিয়া পশ্চাৎ সেই দুই দুই অংশের এক এক অংশকে চারি চারি খণ্ড, বরিয়া স্বীয় স্বীয় অর্ধ অংশ পরি- ত্যাগ পূৰ্ব্বক অন্য চারি ভূতের প্রথমােক্ত অর্ধ অর্ধ অংশে সেই চারি অংশের ‘ক এক অংশ যােগ করিলে সকল ভূত প্রত্যেকেই পঞ্চ প হইল। যথা--পঞ্চীকরণ চিত্র। আকাশ বায়ু ক্ষিতি আকাশ • বায়ু, v০ o0 go ০ ০ go ক্ষিতি ০ go ইহা দ্বারা দেখা যাইতেছে যে, যে পদার্থে যে ভূতের অংশ অধিক পরিমাণে পরিবে ঐ পদার্থ তৎগুণ সম্পন্ন বলিয়া প্রতীয়মান হইবে। অর্থাৎ যে পদার্থে আকাশের ভাগ অধিক তাহাতে আকাশে যে যে গুণ আছে ঐ ঐ গুণ ক্রিয়া অধিক মাত্রায় প্রকাশ পাইবে। এই রূপ অন্যান্য ভূত • : ১ ১ ১ ১ ০ y০ • 3 y০ ০

মুক্তিবাদ।
৪১
}
সম্বন্ধেও ধরিতে হইবে। উপরে যে হিসাব দেওয়া গেল
সুধু
সেই নিয়মানুযায়ীই পদার্থ সৃষ্টি হইবে তাহা নহে, মাত্র
বুঝিবার সুবিধার জন্য ইহা দেখান হইল। প্রকৃত পক্ষে
পঞ্চভূত ও ত্রিগুণের অনন্তরূপ পরিমাণ বৈষম্যে এই অনন্ত
সৃষ্টি দেখা দিয়াছে। এই সৃষ্ঠি ক্রমানুসারে চতুর্দশ ভূবন ও
জগতে নানা প্রকার জীবের সৃষ্টি হইয়াছে ও হইতেছে।
একই পরমাত্ম চৈতন্য হইতেই যে এই অনন্ত বৈচিত্রময়
জগতের উদ্ভব হইয়াছে তদ্বিষয়ে গা সংক্ষেপে নানা স্থলে
ধ্বনি করিয়াছেন। যথা :-
অহং সুস্য জগ তঃ প্র ভবপ্রলম্নস্তথা।
৭ অঃ ৬ শ্লোক।
আমি সৰ্ব্ব জগতের সৃষ্টি ও সংহার কারণ।
জং মং সর্বভূতানাং বিদ্ধি পার্থ সনাতন।
৭ অঃ ১০ শ্লোক।
হে পার্থ ! আমাকে সকল ভূতের বীজ বলিয়া জানিও।
ময়। ততমিকং সৰ্ব্বং জগদব্যক্ত মুনিনা।
৯ অঃ ৪ শ্লোক।
আমা কর্তৃক অব্যক্ত মূৰ্ত্তিতে এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত
রহিয়াছে।
অহং সর্বস্য ভবো মন্ডঃ সৰ্ব্বং প্রবক্ততে।
গী ১০৮ শ্লোক।

৪২ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও আমি সমস্ত জগতের উৎপত্তি হেতু এবং আমা হইতেই সমস্ত প্রবর্তিত হয়। যুচ্চাপি সৰ্ব্বভূতান:ং বীভrং ভদহমন। ন ভদস্তি বি ও স্যান্ময়া ভূতং চরাম্। ১০ অঃ ৩৯ শ্লোক। হে অর্জুন! যাহা সৰ্ব্বভূতের বীজ তাহা আমি। আম ব্যতীত এই চরাচরে আর কিছুই নাই। সংশয় তপনে' - এক্ষণে দেখিতেছি আমরা ক্ষীণ ধারণাবশে যে বিশ্ব জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয়াদি অভাবে কিছুই করিতে সক্ষম নহে বসিয়া বলিয়াছি, পরমাত্ম চৈতন্যের অভি- ব্যক্তিরূপ সেই বিশ্বই সকল ইন্দ্রিয়ের সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের আধার। বিশ্বে যেমন ইন্দ্রিয়াদি জ্ঞান বিজ্ঞান থাকা সত্তেও আমরা দৃষ্টতঃ প্রত্যক্ষ করিতে পারি না, তেমন পরমাত্ম চৈতন্য ও ইন্দ্রিয়াদি জ্ঞান বিজ্ঞান সহ সমস্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে বলিয়া আমরা বাহ্য দৃষ্টিতে তাহা অনুভব করিতে পারিতেছি না। যখন আমরা ইন্দ্রিয়াদির ক্রিয়া অন্তর্মুখী' করিতে শিখিব, তখন দেখিব একই পরমাত্ম চৈতন্যে সমস্ত অন্তর্নিহিত রহিয়াছে। একমেবাদ্বিতীয়ম,' ই সত্য বা সৎ বস্তু। * পাঠক! বিষয় বিস্তৃতি ভয়ে অতি সংক্ষেপে সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা কর। গেল। ইহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলে অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত কোকিলেশ্বর ভট্টাচাৰ্য্য বিদারত্ন M. A. প্রণীত ‘উপনিষদের উপদেশ” শীর্ষক গ্রন্থে সৃষ্টিতত্ত্বের বিস্তৃত আলোচনা সহজে আয়ত্ব করিতে পারিবেন।

মুক্তিবাদ। ৪৩ যেহেতু নিরাকার অব্যক্ত পরমাত্মচৈতন্য পরব্রহ্ম হইতে আকাশাবধি ক্ষিতি পৰ্যন্ত আলােচনায় ক্রমেই তরল হইতে কঠিন পদার্থে উপনীত এবং গুণক্রিয়ার ক্রম প্রসারতা অনুমিত হয় এবং যেহেতু উদ্ভিদ জলচর পশু পক্ষী মানব যে কোনও বিভাগ পরীক্ষায় আকৃতি প্রকৃতির ক্রমােন্নতি পরিলক্ষিত হয়, এমন কি পশু হইতে মনুষ্য পৰ্য্যন্ত যে সকল জন্তু রহিয়াছে তন্মধ্যে কোন কোন পশুতে মনুষ্যের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, বুদ্ধিবৃত্তি আদির সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়, সাহাতে ঋষি বাক্যের সত্যতাই প্রমানিত করে। এই পৃথিবী কতকগুলি বিস্তৃত ভূমি খণ্ডের সমষ্টি মাত্র। প্রত্যেক দুখণ্ড অগাধ সমুদ্র জল রাশি দ্বারা বিচ্ছিন্ন। এক ভূমি খরে যে উদ্ভিদ, জলচর, স্থলচরাদি জীব দেখিতে পাই সূৰ্য কেন্দ্র হইতে সম সূত্রের অন্য ভূখণ্ডেও ঠিক তদ্রপ জীবজন্তুর সদ্ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। ঐ সকল জীব জন্তু সমুদ্র উল্লঙ্ঘন করিয়া এক ভূখণ্ড হইতে অন্য ভূখণ্ডে গিয়াছে বা প্রেরিত হইয়াছে এরূপ কষ্ট কল্পনা অসঙ্গত। সুতরাং বিভিন্ন ভূখণ্ডে বিভিন্ন ভাবের ক্রমােন্নতির মধ্য দিয়া জগৎ বৰ্ত্তমানাবস্থায় পরিণত হইয়াছে, ইহাই স্বীকার করিতে হইবে। বিশেষতঃ যে কোন স্থানেই আদি সৃষ্টি হইয়া থাকুক, সেই স্থলেই আকাশাদি পঞ্চভূতের ক্রম বিকাশ না পাইলে এই বিচিত্র সৃষ্টি হইবার অন্য কোনও সুযুক্তি পাওয়া যাইতেছে না। সুতরাং উল্লিখিত পুরাণকার মুনি গণের উপদিষ্ট ক্রমভিব্যক্তি প্রসঙ্গ আমরা মান্য করিতে বাধ্য।

৪৪
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
ক্রমাভিব্যক্তিতে সৃষ্টি ক্রিয়া মানব পৰ্যন্ত পর্যবসিত
হইয়াছে, মানব হইতেও উন্নত ও অবনত স্তরের সৃষ্টি হয় নাই
একথা আমরা স্বীকার করিতে পারি না। কারণ, আৰ্য ঋষিগণ
প্রেতাত্মা সম্বন্ধে আমাদিগকে : যে উপদেশ দিয়াছেন, তাহা
এক্ষণে পাশ্চাত্য জগতের প্রধান গবেষণার বিষয় হইয়া
দাড়াইয়াছে। পাশ্চাত্য জগতের বর্তমান পণ্ডিত মণ্ডলী
সুধু প্রেতাত্মা স্বীকার করেন এমত নহে, তঁাহারা প্রেতাত্মার
সাহায্যে বহু লুকায়িত বিষয় উদ্ধার করিয়াছেন ও করিতেছেন
স্থানে স্থানে প্রেতাত্মার চেহারা (ফটো) লইতেছেন।
যেহেতু দেহান্তরিত মাত্মা বা প্রেতাত্মা এবং প্রেত জগৎ
আমরা স্বীকার করি তদ্ধেতু আৰ্য ঋষিগণের উপদিষ্ট দেবতা
ও দেব লােকাদি আমরা স্বীকার করিতে বাধ্য। আমাদের
অজ্ঞানাচ্ছন্ন সীমাবদ্ধ ক্ষুদ্র বুদ্ধি তথায় পৌছিতে পারে না
এজন্য আমরা নিরুদ্বেগে ঐ সকল জগতের অস্তিত্ব অস্বীকার
করি। যতদিন না আমরা গুণত্রয়ের কাৰ্য্য তৎসহ একই
সূত্রে গাঁথা বুঝিতে পারিব, যতদিন না আমরা তত্ত্বজ্ঞানের
অধিকারী হইতে পারিব, যতদিন না আমরা জগৎময় পরমাত্ম
চৈতন্য উপলব্ধি করিতে শিখিব ততদিন আমাদের সর্বপ্রকার
অভাব অভিযােগ রূপ নরক যন্ত্রনা ভােগ করিতেই হইবে।
এক্ষণে আমরা অব্যক্ত পরমাত্ম চৈতন্যের অবস্থাদি যাহাতে
কতক পরিমাণে হৃদয়ঙ্গম করা যাইতে পারে তদনুসন্ধানের
চেষ্টা পাইব।

মুক্তিবাদ।
৪৫
পরমাত্ম চৈতন্য প্রতিষ্টা-পরমাত্ম চৈতন্য জড়
জগৎ হইতে পৃথক এই জ্ঞান দৃঢ় করণার্থ জগতের যে কোনও
পদার্থ আলােচনায় দেখিতে পাই যে, প্রত্যেক পদার্থ কতগুলি
কারণ পদার্থের সমষ্টি মাত্র। ঐ সকল কাবণ পদার্থের
কোনটীতেই এমত ভাব পরিলক্ষিত হয় না যে ঐ সকল কারণ
পদার্থ তাহাদিগ হইতে অতিরিক্ত আকৃতি প্রকৃতির কোন
পদার্থ সৃষ্টি করে ; যেহেতু কারণ পদার্থে ঐ রূপ কোন ভাব
নাই অথচ ঐ সকল কারণ পদার্থে অন্য আকৃতি প্রকৃতির
পদার্থ সৃষ্টি হইতেছে। তদ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন হয় যে, যে
সকল কারণ পদার্থ দ্বারা জিনিষটী প্রস্তুত হইল ঐ সকল
কারণ পদার্থের অতিরিক্ত কোন শক্তি বলেই
নূতন
জিনিষটী
সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা জানিয়াছি আকাশে বায়ুর অপ্রতিহত
গতিতেই তেজীউৎপত্তির কারণ, কিন্তু আকাশ অথবা বায়ুতে
এমন কোন শক্তি পরিলক্ষিত হয় না যাহাতে তেজ উৎপত্তি
হইতে পারে।
যে শক্তি পেছনে আছে বলিয়া এই দুই
পদার্থের সংযােগে তেজের উৎপত্তি হয় তাহাই পরমাত্ম
চৈতন্য বা পরব্রহ্ম জানিও।
আমরা নিজের বেলায় সকলেই “আমিত্ব” বােধ করিয়া
থাকি ইহা চির বিদিত। এই আমি কি পদার্থ তাহার ভাব
উপলব্ধি করিতে পারিলেও আমরা পরমাত্ম চৈতন্যের স্বরূপ
বুঝিতে পারি। আমাদের হাত, পা, চক্ষু কর্ণ প্রভৃতি পৃথক
পৃথক রূপে আমি শব্দ বাচ্য নহে। এমন কি হস্ত পদাদি

৪৬
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
সম্বলিত সমস্ত শরীরটীও আমি নহে। কারণ যাহাকে
আমরা মৃত্যু বলি সেই অবস্থায় আমাদের হস্ত পদাদি
সম্বলিত সমস্ত দেহে আমিত্ব বােধ থাকে না। যে পদার্থ
শরীর আশ্রয় করিয়া থাকায় আমিত্ব বােধ জন্মে তাহাই
আমি বা জীব বা জীবত্মা জানিও।
জীবিতস্থায় কোনও আঘাৎ প্রাপ্ত অথবা অপর কর্তৃক
প্রহৃত হইলে শরীরে যে যাতনা অনুভব হয় তাহাকে সাধা-
রণত আমাদের শরীর কষ্ট পায় বলিয়া মনে করি কিন্তু
বাস্তবিক পক্ষে এইরূপ কষ্ট শরীরের নহে তাহা আত্মার বা
; যেহেতু কেহ অপরকে কোনও প্রশংসা বা নিন্দা
করিলে তিনি যে সুখ বা কষ্ঠানুভব করেন তাহা তাহার
শারীরিক অবস্থা জনিত নহে, শরীরাভ্যন্তরে যে চৈতন্য
পদার্থ থাকায় ঐরূপ সুখ বা দুঃখের অনুভূতি জন্মে সেই
চৈতন্য পদার্থ ই জীব বা জীবাত্মা বলিয়া জানিও।
জীবের ; যেহেতু
আমাদের শরীরাভ্যন্তরে যে চৈতন্য থাকায় আমরা
কাৰ্য পরবশ হইয়া আছি ঐ চৈতন্যের কোনও বিশিষ্ট নাম
নাই। আমরা মাত্র সাংসারিক কার্যাদি চালাইবার সুবিধা
জন্য চৈতন্যাশিত প্রতিদেহকে রাম, শ্যাম, ইত্যাদি নামাঙ্কিত
করিয়া থাকি। আমাদের বিভিন্ন দেহে বিভিন্ন নামানুযায়ী
বােধ নাই। বিভিন্ন দেহী সকলেই “আমিত্ব” বােধ করিয়া
থাকি ; এই “আমি” খুজিয়া দেখিলে আমাদের দেহাভ্যন্তরস্থ

মুক্তিবাদ।
৪৭
মাত্র চৈতন্যটুকু ভিন্ন আর কিছুই পাই না। এই “আমি”
চৈতন্যই জীব বা জীবাত্মা বলিয়া জানিও।
পরমাত্মচৈতন্য:- উল্লিখিত সমস্ত জীবচৈতন্যই
“আমি” শব্দে বাচ্য হওয়ায় তাহারা এক জাতীয় অর্থাৎ ব্যষ্টি
দেহে অবস্থান করে বলিয়া পৃথক বােধ জন্মায় বস্তুতঃ একই
চৈতন্য পদার্থ। এই জীব চৈতন্যই সমষ্টি ভাবে পরমাত্ম
চৈতন্য হয়। জীব চৈতন্য ব্যষ্টি দেহাভিমানী হওয়ায় তাহা-
দের শক্তি ও জ্ঞান অনন্ত না হইয়া সীমাবদ্ধ ভাবে কাজ
করে। আমাদের দেহাবস্থিত চৈতন্য সহ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপী
যে একটী চৈতন্য শক্তির কাৰ্য্য অপ্রতিহ ভাবে প্রতিনিয়ত
চলিতেছে বলিয়া প্রত্যক্ষ করিতেছি তাহা পরমাত্ম চৈতন্য
বলিয়া জানিও।
প্রাণ, প্রেতাত্মা, জীবাত্মা ও পরমাত্মায় পার্থক্য
প্রেতাত্মার গতিবিধি অালোচনা দ্বারাও আমরা
জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য জানিতে পারি। জীবাত্মা
দেহান্তরিত হইলে তাহাকে প্রেতাত্মা বলে, অর্থাৎ একই
পদার্থ দেহে অবস্থিতি কালে জীবাত্মা এবং দেহান্তরিত হইলে
প্রেতাত্মা বলিয়া কথিত হয়। প্রেতাত্মাকে সময় সময় জীব
দেহে আবিষ্ট হইতে দেখা যায়। প্রেতাত্মা যখন জীব দেহ
অধিকার করে, তখন সেই দেহাভ্যন্তরস্থ জীব প্রকৃতির
কাৰ্যাদি বন্ধ করিয়! প্রেতাত্মার প্রকৃতি অনুযায়ী কাৰ্য্য
করাইয়া থাকে। প্রেতাত্মার আগমনের পূর্বে যে ব্যক্তি

৪৮ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ; যে প্রকৃতি সম্পন্ন ছিল, সে ব্যক্তি প্রেতাত্মা আশ্রিত হওয়া মাত্র ভিন্ন প্রকৃতি প্রাপ্ত হয় ; তার্থাৎ প্রেতাত্মা দেহাভ্যন্তরস্থ আত্মা হইতে বিশুদ্ধ প্রকৃতির হইলে ঐ প্রেতাশ্রিত ব্যক্তি সহসা বিশুদ্ধ ভাবাপন্ন এবং প্রেতাত্ম। নিকৃষ্ট প্রকৃতির হইলে নিকৃষ্ট ভাবাপন্ন কাৰ্যাদি করিয়া থাকে । ইহার কারণ এই যে, প্রেতাত্মা দেহাশ্রিত জীবকে অধিকৃত বা বশীভূত করিয়া নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী কাৰ্য্য করিতে থাকে । দেহস্থ ইন্দ্রি- যাদি সমস্তই প্রেতাত্মার অভিপ্রায়ানুযায়ী কাৰ্য পরবশ হয়। ইহাতে আমরা চারিটী বিষয় পরিজ্ঞাত হই। (১ম) ইন্দ্রিয়ের স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নাই ; অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলি নিজে কাৰ্য করিতে অক্ষম, তাহারা পরাধীন। যখন যে জীব দেহরাজ্য অধিকার করিয়া বসে, ইন্দ্রিয়গুলি ঐ জীবের প্রকৃতি অনুযায়ী কাৰ্য করিতে বাধ্য হয়। (২য়) জীব বলিয়া একটী স্বতন্ত্র পার্থ দেহীরূপে বিরাজ করে, নতুবা প্রেতাত্মা কখনই দেহের প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাৰ্য করিতে সক্ষম হইত না, এবং ঐ প্রেতাত্মার বহির্গমনে ঐ দেহ পুনৰ্বার পূর্ব প্রকৃতি মতে কার্যক্ষম হইতে পারিত না। যেহেতু একই দেহের ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা দেহের স্বাভাবিক কার্যকলাপ স্থাপিত রাখিয়। অন্য রূপ কাৰ্য করিতে দেখা যায় এবং তৎপর প্রক্রিয়া বিশেষ দ্বারা প্রেতাত্মার অধিকার বিচ্যুত করিলে ঐ দেহেই পূৰ্ব্ব জীব প্রকৃতির সমাবেশ হইয়া পূৰ্ব্ববৎ স্বীয় প্রকৃতি অনুযায়ী,কাৰ্য্য করিতে থাকে। (৩য়) প্রাণ জীবাত্মা হইতে

মুক্তিবাদ।
৪৯
বৃথক পদার্থ। আমরা দেখিতে পাই যে, দেহে জীবাত্মার
কাৰ্য্য চলিবার কালে এবং ঐ দেহে প্রেতাত্মার অবস্থান
কালে উভয় সময়েই প্রাণ বায়ুর কাৰ্য একই রূপ চলিতে
থাকে, কোনও রূপ ব্যতিক্রম হয় না। সুতরাং জীবাত্মা
ও প্রেতাত্মা উভয়ই প্রাণ বায়ু হইতে ভিন্ন। (৪র্থ) জীবাত্মা
প্রেতাত্মা ও প্রাণ, পরমাত্মা হইতে পৃথক। কারণ জীবাত্মা
প্রেতাত্মা বা প্রাণ না থাকিলে ব্যক্তিগত অভাব পরিলক্ষিত
হইতে পারে, জাগতিক চৈতন্য অভাব হইতে পারে না কিন্তু
সৰ্বমূল পরমাত্মার অভাব হইলে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের বিলােপ
সাধন হয় সুতরাং জীবাত্মা, প্রেতাত্মা, এাণ ও পরমাত্ম চৈতন্য
অবস্থা বিশেষে বিভিন্ন হয়। যে মহাচৈতন্যের উপর বিশ্ব
ব্রহ্মাণ্ডের স্থায়ীত্ব নির্ভর করিতেছে, অর্থাৎ যে অনির্বচনীয়
পদার্থ হইতে আকাশাবধি স্কুল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি
হইয়াছে তাহাই পরমাত্ম চৈতন্য জানিও।
আর্য ঋষিগণ জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রভেদ ঘটাশ্রিত
বায়ু ও মুক্ত বায়ুর দৃষ্টান্ত দ্বারা অতি সুন্দররূপে বুঝাইয়া
দিয়াছেন। আমরা দেখিতে পাই ঘটাশ্রিত বায়ু ও মুক্ত
বায়ু একই পদার্থ কিন্তু মুক্ত বায়ুর অনন্ত বিস্তার বলিয়া
তাহার যেরূপ ক্রিয়া শক্তি আছে, স্বল্প পরিমিত ঘটস্থ বায়ুর
তদ্রুপ ক্রিয়াশক্তি নাই। এইরূপ 'পরমাত্ম চৈতন্য ও দেহা-
বচ্ছিন্ন চৈতন্য একই পদার্থ হইলেও জীবচৈতন্য যে কাল
পর্যন্ত স্বল্প পরিমিত দেহাধিকার করিয়া থাকে ততকাল
৭

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও পৰ্যন্ত তাহার অনন্ত শক্তি ও অনন্ত জ্ঞান প্রাপ্ত হইবার কোনও কারণ নাই। এজন্য আৰ্যঋষিগণ দেহাবচ্ছিন্ন চৈতন্যকে জীবাত্মা নামে অভিহিত করিয়া অনন্তমুক্ত পর- মাত্মচৈতন্য হইতে পৃথক করিয়া বুঝাইয়াছেন। যে অনন্ত শক্তি, অনন্ত জ্ঞান, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জুড়িয়া অবস্থিতি করিতেছে, যাহার বাধা বা বিরাম নাই তাহাকে পরমাত্মচৈতন্য জানিও। আমরা দেখিতে পাই যে জাগ্রতাবস্থায় আমাদের ইন্দ্রিয় সকল কাৰ্য-পরশ থাকে। নিদ্রা হইলে তাহাদের কাৰ্য্য থাকে না কিন্তু অন্তঃকরণ জাগ্রত থাকে ; নতুবা আমরা স্বপ্ন দেখিতে পাইতাম না। সুযুপ্তি অবস্থায় অন্তঃকরণের কাৰ্যও বন্ধ থাকে নতুবা আমরা ঐ সময়ও স্বপ্ন দেখিতে পাইতাম। স্বপ্নাবস্থায় ইন্দ্রিয় কার্য এবং সুষুপ্তি অবস্থায় অন্তঃকরণের ; * ঘটাবদ্ধ বায়ু পৰ্যালােচনায় আমরা দেখিতে পাই যে যদি ঘটে কোন প্রকার গন্ধ থাকে তবে তংস্থিত বায়ু ঘট বিনাশের পর মহ বায়ুতে মিলিতে গেলেও ঐ গন্ধের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পায় না। যত কাল পর্ষ, গন্ধাশিত বায়ু বহু বিস্তৃত হইয়া অনন্ত বায়ু সাগরে মিলিত না হয়, তত সময় পর্যন্ত সেই ঘটাশ্রিত বায়ু যেমন ঘটের অভ্যন্তরস্থ গন্ধ বহন করে, দেহাবচ্ছিন্ন জীবাত্মা ও তদ্রুপ দেহেন্দ্রিয়াদির দোষ গুণ লইয়া দেহ পরিত্যাগ করে বলিয়া দেহান্তরিত আত্মাকে পরমাত্মায় লয় হইতে কতক সময় অপেক্ষা করিতে হয় কারণ যে পর্যন্ত জীবাত্মা কৰ্ম্ম দ্বারা, আসক্তিরূপ গন্ধ দূর করতে না পারে ততকাল পরমাত্মা লয় হইতে পারে না। ইহাকেই বিচার কাল বলে।

মুক্তিবাদ। তৎসময় কাৰ্য্য বন্ধ হইয়া যায় বলিয়া ঐ ঐ ইন্দ্রিয়াদি দেহ ছাড়িয়া একেবারে চলিয়া যায় না, চলিয়া গেলে জাগ্রত হইয়া পুনঃ ইন্দ্রিয় কাৰ্য্য ও অন্তঃকরণ কাৰ্য্য পাইতাম না। যেহেতু স্বপ্নাবস্থায় ইন্দ্রিয় কাৰ্যগুলি অন্তঃকরণে এবং সুষুপ্তি অবস্থায় ইন্দ্রির কার্যাদি সহ অন্তঃকরণ প্রাণে লয় পায় সুতরাং জাগ্রত হইলে প্রাণে লীন অন্তঃকরণাদি পুনঃ দেখা দেয়। জীবাত্মার অবস্থাও এই রূপ। মৃত্যুর অব্যবহিত পুৰ্ব্বে ক্রমে ক্রমে সমস্ত ইন্দ্রিয় কাৰ্যগুলি বন্ধ হয়। পৰ্যন্ত অন্তঃকরণের সুখ দুঃখ অনুভূতি থাকে। তৎপর কতক সময় অন্তঃকরণের অনুভূতিও থাকে না মাত্র প্রাণ থাকে। তৎপর প্রাণ আত্মায় লয় পায় ; আত্মা দেহ ত্যাগ করিলেই জীব মৃত বলিয়া পরিগণিত হয়। প্রাণ আত্মায় লীন হইবার অবস্থা আমরা বুঝিতে পারি না। যে ব্যক্তির ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণের কাৰ্য্য বন্ধ হইয়া যাওয়ার পরেও আরােগ্য লাভ করে, তাহার আরােগ্যের সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃকরণ ও ইন্দ্রিয়াদি পুনঃ কাৰ্য পরবশ হয় অর্থাৎ ফিরিয়া পায়। ইন্দ্রিয় গুলি দেহ পরিত্যাগ করিয়া একেবারে চলিয়া গেলে পুনঃ পাওয়া যাইত না। যেহেতু আরােগ্য লাভের সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃকরণ ও ইন্দ্রিয় কার্য পুনঃ প্রাপ্ত হইতে দেখা যায় । সুতরাং ইহা সুনিশ্চিত যে প্রথমতঃ বােগীর ইন্দ্রিয় কাৰ্য অন্তঃকরণে লয় পায় তৎপর অন্তঃকরণ এই সকল ইন্দ্রিয় কাৰ্য্য লইয়াই প্রাণে লয় পায়, তৎপর প্রাণও গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ; অন্তঃকরণ আত্মায় লয় পায় ; তৎপর আত্মা প্রাণসহ অন্তঃকরণ ও ইন্দ্রিয় কার্যাদি লইয়াই দেহ পরিত্যাগ করিয়া থাকে। বায়ু যেমন পুষ্প হইতে গন্ধ বহন করে তােপ মৃত্যু কালে জীবাত্মা ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য, মন, প্রাণ প্রভৃতি সহ স্থূল দেহ ছারিয়া সূক্ষ্ম বা লিঙ্গ দেহে আবদ্ধাবস্থায় অবস্থিত থাকে। আত্মা যে সময় অন্য স্থূল দেহ গ্রহণ না করিয়া কেবল মাত্র লিঙ্গ দেহে অধিষ্ঠান করে ; সেই সময় জীবাত্মা প্রেতাত্মা বলিয়া অভিহিত হয়। ইহাও স্পষ্ট প্রমাণিত হইয়াছে যে জীবাত্মা দেহে অবস্থিত কোন পদার্থ কিন্তু দেহ হইতে পৃথক, সুতরাং সর্বব্যাপী পরমাত্মা হইতেও পৃথক। আমাদের অপরি মার্জিত জ্ঞানে দেহাবস্থিত, বিষয় ভোগ রত এবং দেহান্তর- গামী আত্মার অনুভব করিতে পারি না। গীতা স্পষ্ট বাক্যে বলিয়াছেন :- মমৈবাংশা জীব লােকে জীবভুতঃ সনাতন। মনঃ ষানীনিয়াণি প্রকৃতি স্থানি কর্মতি । শীরং যদধাগোভি বচ্চপ্যৎ ক্রামভীশ্বর। গৃহীত্নৈতানি সংঘাতি বায়ুগন্ধা নিবাশয়াৎ। উক্ৰমিং স্থিভংবাপি ভুঞানং বা গুণান্বিত বিমুভা নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তিজ্ঞান চক্ষুষঃ | গীতা ১৫৭৮১০ শ্লোক। আমারই অংশভূত লােকপ্রসিদ্ধ সনাতন জীব প্রকৃতিতে লীন মন ও পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে সংসার ভােগাৰ্থ আকর্ষণ দেহ স্বামী এই জীব যখন এক (দহ ছারিয়া অন্য মুক্তিবাদ। জ্ঞান চক্ষু দেহ অবলম্বন করে তখন বায়ু যেমন পুষ্প হইতে সূক্ষ্ম গন্ধাংশ গ্রহণ করিয়া নেয়, জীবাত্মাও সেই রূপ পূৰ্ব দেহ হইতে সুক্ষ্ম মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়গণকে লইয়া গমন করিয়া থাকে। দেহান্তর গামী, দেহে অবস্থিত এবং বিষয় ভােগর এই জীবকে বিমুঢ় ব্যক্তিগণ দেখিতে পায় না কিন্তু যাহাদের জন্মিয়াছে তাহারাই দেখিতে পায়। আমরা জানিয়াছি জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। আমরা ইহাও জানিয়াছি যে, জীবাত্মা ও পরমাত্মা মূলতঃ একই পদার্থ হইলেও জীবাত্মা দেহত্যাগ সময়ে ইন্দ্রিয়াদি আকর্ষণ করে বলিয়া ঘটাশ্রিত গন্ধযুক্ত বায়ুর ন্যায় ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য হইতে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পরমাত্মায় লয়, পাইতে পারে না। ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য্য হইতে মুক্ত হইবার উপযুক্ততা লাভ করিতে জীবকে কতক কাল অপেক্ষা করিতে হয় । দেহান্তে আত্মাৱ বিচাৰ :--আমরা জানিয়াছি ঘটাকাশ যেমন মহাকাশের অংশ, জীব চৈতন্যও তেমন পরমাত্ম চৈতন্যের অংশ। • যেহেতু পরমাত্ম চৈতন্য অবিনাশী সুতরাং তাহার অংশ জীবাত্মা বা জীব চৈতন্যও অবিনাশী। জীবাত্মার অবিনাশিতা সম্বন্ধে সৰ্ব্ব দেশীয় ঋষিগণ এক মত দেহান্তে আত্মা দেহাবচ্ছিন্ন সময়ের পাপ পূণ্যানুসারে বিচার- ধীন হয় বলিয়াও তাঁহারা সমস্বরে কীৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু বিচারপন্থা সম্বন্ধে তাহারা একমত হন নাই। আমরা জানিয়াছি জীব দেহ পরিত্যাগ সময়ে ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য, মন,

৫৪
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
প্রাণ লইয়া প্রস্থান করে ; সুতরাং জীবমানের কার্যকলাপ
সংস্পর্শে যে পাপ পূণ্য সংঘটিত হয় তাহা লইয়াই প্রস্থান
করে সন্দেহ নাই। জীবচৈতন্য ঐ প্রকার কার্যাদি না
লইয়া মুক্তাবস্থায় দেহ পরিত্যাগ করিলে বিমল পাত্র মধ্যস্থ
বায়ু যেমন পাত্র বিনাশে মুক্ত বায়ুতে অনায়াসে মিলিয়া
একত্ব প্রাপ্ত হইতে পারে তদ্রুপ অাসক্তি পরিশূন্য জীবাত্মাও
পরমাত্মচৈতন্যে সর্বতোভাবে মিলিয়া একত্ব লাভ করিবে
তাহাতে অনুমাত্রও সংশয় নাই। কিন্তু বায়ু পাত্ৰাভ্যন্তরস্থ গন্ধ
বহন করিলে যেমন তাহাকে কতক সময় পর্যন্ত মুক্ত বায়ুতে
সর্বতােভাবে মিশিবার জন্য অপেক্ষা করিতে হয়,
আসক্তি
সম্পন্ন জীবচৈতন্যকেও তদ্রুপ ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য, পপি, পূন্য
লইয়া যায় বলিয়া পরমাত্মচৈতন্যে মিশিবার জন্য কতক
সময় অপেক্ষা করিতে হয়।
পাপ পূণ্যের পরিমানুসারে
সময় ও স্থানের নিরূপণ হইয়া থাকে। এই সময় ও স্থান
নিরূপণই ভগবৎ বিচার।
দেহান্তৱিত আত্মার বিচার ও জন্ম। স্তর।
বিচারালােচনায় আমরা জানিতে পাই কেহবা বলিয়াছেন
১। দেহান্তরিত সমস্ত অাত্মা প্রলয় সমাগম পৰ্যন্ত
নিরলম্বভাবে থাকিবে এবং একই সময়ে একত্রে সকলের
বিচার হইয়া পাপ পূণ্যের অবস্থানুসারে দণ্ডিত বা পুরস্কৃত
হইবে। (২) কেহ বলেন জীব দেহান্তরিত হইবার পর
ক্ষণেই পাপ পূণ্যানুসারে আত্মার বিচার হইয়া অনন্ত নরক

মুক্তিবাদ। } বা অনন্ত স্বর্গের ব্যবস্থা হইয়া থাকে। (৩) কেহবা বলেন আত্মার দেহাশ্রিত কালের কাৰ্যোন্নতিমূলে মুক্তাবস্থা প্রাপ্ত হইতে না পারিলে কৃত পাপ ও পূণ্যের পরিমানানুযায়ী নরক ও স্বর্গ ভােগ ক্রমে মুক্তাবস্থা লাভ করিবার উপযুক্ত হওয়া জন্য আত্মার জন্ম জন্মান্তর গ্রহণ করিতে হয় এবং কাৰ্য পরম্পরায় আসক্তি ত্যাগ করিতে পারিলে পরব্রহ্মে স্বজাতিয় লয় হয়। জন্মান্তর যুক্তি :- উল্লিখিত তিনটী মতের সামঞ্জস্য করা অসম্ভব হইলেও যুক্তি মূলে সুমীচীনতা বিচার করা অসঙ্গত হইবে না। আমরা জানিয়াছি ন্যায় সঙ্গত ভাবে যুক্তি প্রদর্শন পূৰ্ব্বক সন্দেহ ভঞ্জন না করিলে ধৰ্ম্মহানি হইয়া থাকে “যুক্তিহীন বিচারেতু ধৰ্ম্মহানিঃ প্ৰজায়তে”। সুতরাং এই মত ত্রয়ের মধ্যে কোটী সমীচীন ও গ্রহণীয় তৎ সম্বন্ধে আমরা আলােচনা করিব। ১ম স্থলে আমরা দেখিতে পাই মানব জীবিতকাল মধ্যে হয় (১) কিছু পাপ কিছু পূণ। অথবা (২) সম্পূর্ণ পাপ সম্পূর্ণ পূণ্য করিয়া থাকে কিম্বা (৩) পাপ পূণ্য কিছুই করে না। এই অবস্থ।ত্রয়ের ভিতর দিয়া মানবকে জীবন যাত্রা শেষ করিতেই হইবে। যেহেতু দেহ ত্যাগের পর প্রলয় সমাগম পৰ্যন্ত বিচার প্রত্যাশায় নিরলম্ব ভাবে অবস্থান করিতে হইলে যিনি কিছু পাপ কিছু পূণ্য করিয়াছেন, কিম্বা সম্পূর্ণ পাপ বা সম্পূর্ণ পূণ্য কাৰ্য্য করিয়াছেন অথবা পাপ পূণ্য কিছুই করেন নাই এই প্রকার সকল শ্রেণীর

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
দেহান্তরিত আত্মাকে প্রলয়কাল পর্যন্ত হাজতে কাল কাটাইতে
হয়। অর্থাৎ ভগবৎ
বিচারে সম্পূর্ণ
পূণ্যাত্মা এবং
ঘােরতর পাপী উভয়কেই বিচার প্রত্যাশায় একই ভাবে
প্রলয় কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হয়। অনন্তকালের
তুলনায় প্রলয় সমাগম অল্প সময় হইলেও অত্যল্প মানব
জীবন কাল তুলনায় অল্প সময় নহে।
অত্যল্প মানব জীবনে
যে পাপ বা পূণ্যকৃত হয় তজ্জন্য প্রলয় সমাগম পর্যন্ত অপেক্ষা
করাই অতীব কঠিন শাস্তি।
এই শাস্তি পূণ্যাত্মাকেও
ভোগ করিতে হয়। ভগবান্ যাহাকে ধৰ্ম্ম বলি তঁাহার এই
প্রকার বিচার ন্যায়সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না। তৎপর বিচার
হইয়া স্বর্গ ও নরক ভােগের পর আত্মা কি অবস্থায় থাকিবে
তাহার ব্যবস্থা নাই। এই মতে আত্মার ভগবানে লয় বা
জন্মান্তরের ব্যবস্থা না থাকায় অবিনশ্বর জীবাত্মাকে বায়ুভূত
নিরাশ্রয় না হইয়া অনন্তকাল কৰ্ত্তনের উপয়ান্তর নাই।
সুতরাং ইহা যুক্তিযুক্ত মত বলিয়া গ্রহণ করিতে আমাদের
আশঙ্কা হয়। আত্মার পুনর্জন্ম না হইলে লােক বৃদ্ধির সঙ্গে
দঙ্গে নূতন আত্মার সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী। আধুনিক বিজ্ঞানও
এই মতের বিরােধী, সুতরাং জন্মান্তর বাদ অপরিহার্য্য।
২য় মত স্থলে যাহারা কিছু পাপ কিছু পূণ্য করে তাহাদের
( খুব সম্ভব ) পাপ পূণ্য কাটাকাটী হইয়া অত্যল্প পাপ
থাকিলেও তাহাকে নিরবচ্ছিন্ন পাপীর ন্যায় অনন্ত নরকে
কিম্বা অত্যল্প পূণ্য থাকিলে সম্পূর্ণ পূণ্যাত্মার ন্যায় অনন্ত স্বর্গে

মুক্তিবাদ। থাকিতে হইবে; কারণ অনন্ত স্বর্গ বা অনন্ত নরক ব্যতীত অন্য ব্যবস্থা না থাকায় পূণ্য কার্যের জন্য স্বর্গভােগ ঘটিলে পাপানুষ্ঠানের ফলভােগ এবং পাপানুষ্ঠান জন্য নরক ভােগ করিতে হইলে পূণ্যকাৰ্য জন্য স্বর্গভােগ বাধিত হয়। সুতরাং সম্পূর্ণ পূণ্যকৰ্ম্মার সহিত যৎকিঞ্চিৎ পূণাকৰ্ম্মার কিম্বা সম্পূর্ণ পাপকারীর সহিত যৎকিঞ্চিৎ পাপকারীর কোনই প্রভেদ থাকে না। বিশেষতঃ যাহারা পাপ পূণ্য কিছুই করে নাই (যেমন দুগ্ধপােয্য বালক) তাহাদের আত্মার জন্য কোন ব্যবস্থা নাই। এরূপ মনুষ্য বিচারককেও লােক চক্ষে অত্যন্ত নিগৃহীত হইতে হয়। হইতে হয়। জন্মান্তর ব্যবস্থা না থাকায় এস্থলেও বিজ্ঞান বিরােধী নিত্য নূতন চাত্মার সৃষ্টি কল্পনা করিতে হয়। অতএব এই মতও আমরা যুক্তিসঙ্গত বলিতে পারি না। (৩) য় মত স্থলে আমরা গীতার উপদেশ আলােচনা করিব। গীতা জানাইয়াছেন যে (১) জীব দেহাবচ্ছিন্ন কালের কৰ্ম্ম দ্বারা দেহান্তে মােক্ষ- পদ লাভ করিতে পারে । যথা:- কর্মজং বুদ্ধিমুক্তাহি ফং ভ্য। সীমিন। জন্মবন্ধ বিনির্মুক্ত পদ' গচ্ছন্ত্য মম, ॥ গী ২৫১ শ্লোক। জ্ঞানী মনীষিগণ কৰ্ম্মফল ত্যাগ করিয়া দেহান্তে জন্মবন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করতঃ নিরুপদ্রব মােক্ষপদ প্রাপ্ত হন। ৮ ৫৮ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও - পুনঃ- এষা ব্ৰাহ্মী স্থিতি: পার্থ নৈনা প্রাপ্য বিমুহ্যতি। হিস্যামস্তকাহেপি নিক্মাণ স্বচ্ছত। গী ২৭২ শ্লোক। ব্ৰহ্মজ্ঞান এইরূপ। ইহা প্রাপ্ত হইলে আর মােহাভিভূত হইতে হয় না। মৃত্যু সময় পর্যন্ত এইভাব রক্ষা করিতে পারিলে দেহান্তে ব্ৰহ্মনিৰ্ব্বাণ অর্থাৎ মােক্ষ প্রাপ্ত হইতে পারে । (২) জীব সাধনাবশে সশরীরে মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হয়। যথা- কাম ক্রোধ বিমুক্তানাং ভাং ঘভচেসাম,। অভিভাে এক্ষণিং বৰ্ত্ততে বিদিতামাম, গী৫।২৬ শ্লো। কামন। ক্রোধ বিমুক্ত সুতরাং সংযতচিত্ত তত্ত্বজ্ঞানী সন্ন্যাসীগণ উভয় লােকেই (দেহান্তে ও জীবমানে) ব্ৰহ্ম- নিৰ্ব্বাণ প্রাপ্ত হন। পুনঃ যুন্নেবং সদাশং যোগী নিহত মানস । শান্তি নির্বাপৱমং মৎসংস্থাগধি গচ্ছতি ॥ গী ৬১৫ শ্লো। মনকে সমাহিত করিয়া অর্থাৎ সর্বপ্রকার আসক্তি ত্যাগ করিয়া নিরুদ্ধচিত্তয়ােগী আমাতে অবস্থিতিরূপ নির্বাণ শান্তি জীবমানেই প্রাপ্ত হন। পুনঃ -

মুক্তিবাদ।
সর্কভূতস্থিতং যে মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিত।
সথা মানােহপি সযােপী মন্নি বক্ততে |
গী ৬৩১ শ্লো।
যিনি আমাতেই সৰ্ব্বভূত স্থিত জানিয়া একত্ববােধে
(আমাকে) আরাধনা করেন, তিনি যে কোনও অবস্থায়
( জীবমানে ও দেহান্তে) আমাতেই অবস্থান করবেন।
মর্মার্থ --যিনি কৰ্ম্মফল পরিত্যাগ পূর্বক অনাসক্ত হইয়া
একাগ্রচিত্তে এক পরব্রহ্ম ব্যতীত অন্য (অসৎ অপদার্থ হেতু)
কিছুরই সত্তা উপলব্ধি করেন না, তিনি ইহ জন্মেই মােক্ষ
বা জীবন্মুক্তি প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ দেহাশিতকালের কাৰ্যো-
মুতিমূলে মুক্তিলাভ সঙ্গত হয়।
জীব (১)ম কল্পের মুক্তিলাভ করিবার উপযুক্ত প্রাপ্ত
না হইলে দেহাবচ্ছিন্নকালের
পরিপােষিত ভাবমূলে
স্বর্গ
নরকাদি ভােগ করিয়া পুনঃ জন্মান্তর গ্রহণ করে এবং যে
পর্যন্ত জীব ফলাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক মুক্তিলাভ করিবার
উপযুক্ত প্রাপ্ত না হইতে পারে ততকাল পর্যন্ত জন্ম জন্মান্তর
গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। যথা-
যং যং বাপি স্মরন, ভাবং ত্যজত্যস্তে কলেবরম।
ভং মেবৈহি কৌন্তেয় সদা ভাব ভাবিত ||
গী ৮৬ শ্লো।
মৃত্যুকাল পর্যন্ত যিনি যে যে ভাব বা আকাঙ্ক্ষা

৬৫
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
পােষণ পূর্বক দেহত্যাগ করেন, সেই সেই ভাবে অনুরক্ত
চিত্ত ব্যক্তি ঐ ঐ ভাব লইয়া জন্মান্তর গ্রহণ করে।
জীবমানে অনাসক্তচিত্ত ও ফলাকাঙক্ষা বজ্জিত হইতে না
পারিলে পূণ্য কৰ্ম্মানুষ্ঠানকারী ফলাকাঙ্ক্ষীর স্বর্গপ্রাপ্তি
হইলেও পূণ্য কৰ্ম্মের ফল স্বরূপ উপযুক্তকাল স্বর্গসুখ
ভােগান্তে পুনঃ জন্ম পরিগ্রহ করিতে বাধ্য হয়। যথা
তে ত্বং ভুক্তা স্বর্গলোকং বিশাল
ক্ষীণে পূণ্যে মক্তলোকং বিশস্তি।
এবং এমী ধর্মম পন্ন
গতাগতং কামকাম লভস্তে ॥
গী ৯২১ শ্লো।
স্বৰ্গকামী বিপুল স্বর্গ সুখ ভোগ করিয়া পূণ্য ক্ষায়
পুনঃ মর্ত্যলােকে জন্মগ্রহণ করে; এইরূপ কামনা সিদ্ধি-
মূলক বেদের কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠানকারী সকামী স্বর্গ ও
সংসারে পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করিয়া থাকে ।
এইরূপ কাৰ্যানুষ্ঠানের ফলে
যান্তি দেবব্রত দেবা পিতৃন্ যাপ্তি পিতৃতাঃ
ভূভানি যান্তি
ভুভেজা শান্তি
মদানি
নােহপিমা।
গী ৯২৫ শ্লো।
.
দেব যাজিগণ দেবলােক প্রাপ্ত হন পিতৃপরায়ণ ব্যক্তিগণ

মুক্তিবাদ। পিতৃলােক প্রাপ্ত হন, ভূতারাধনাকারীগণ ভূতলােক এবং আমার আরাধকগণ আমাকেই প্রাপ্ত হন। জীবমানে যে ব্যক্তির যে কাৰ্যে আসক্তি থাকে; মৃত্যু- কাল পর্যন্ত তদ্ভাবে ভাবিত হইলে জীব ঐসকল ভাব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। সুতরাং কামনা পরায়ণ হইয়া সৎকাৰ্য্য করিলে তাহার ফল স্বরূপ স্বর্গসুখ ভােগান্তে, (কামনা পরি- ত্যাগ করিতে না পারায়) পুনঃ পুনঃ জন্ম জন্মান্তর পরিগ্রহণ করিতে হয়। কারণ অবিনাশী জীব নির্বিশেষে নিষ্কাম হইতে না পারায় এক জাতীয় হইলেও গুণাতীত সুতরাং নিষ্কাম পরব্রহ্মের সহিত সর্বতােভাবে মিলিবার উপযুক্ত হয় না। কাজেই জীবের পুনর্জন্ম গ্রহণ ব্যতীত গত্যন্তর নাই । সৃষ্টি সংঙ্কল্পাত্মক ; অর্থাৎ কামনা বা ইচ্ছাই, সৃষ্টির কারণ ; সুতরাং কামনা সমূলে উৎপাটিত না হইলে জীবকে পুনঃ পুনঃ সংসারে জন্ম- গ্রহণ করিতেই হইবে। এজন্যই আমরা গীতার উপদেশে পাইয়াছি যে, কামনা পরবশ হইয়া পূণ্যকাৰ্য করিলে তাহার ফল স্বরূপ ঐ কার্যের অনুপাতে কতক সময় স্বর্গভােগ ঘটিয়া থাকে কিন্তু ঐ সময় অন্ত হইলেই কামনা ধ্বংশ না হওয়ায় জীবকে পুনঃ জন্মগ্রহণ করিতে হয়। যেহেতু সৰ্ব্বদেশীয় ঋষিগণ দেহান্তরিত আত্মার পৃথক অস্তিত্ব ও অবিনাশিতা স্বীকার করেন এবং দেহ পরিত্যাগকালে ইহ সংসারে কৃত কৰ্ম্মের সুকৃতি দুষ্কৃতি বহন করিয়া নেয় ও. বিচারাধীন হয়

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
বলিয়া স্বীকার করেন, তদ্ধেতু সরল প্রাণে, নিবিষ্টমনে একটু
চিন্তা করিলেই ইহা উপলব্ধি করা যাইতে পারে যে, দেহান্তরিত
অবিনাসী ও সকামী আত্মার জন্মান্তর ব্যতীত গত্যন্তর নাই;
সুতরাং আত্মার পুনর্জন্ম গশাস্ত্রীয় বা কাল্পনিক নহে। আমরা
এ বিষয়ে আর অধিক আলােচনা করিতে ইচ্ছা করিনা,
এক্ষণে দেখিব যে, যে পরমাত্মচৈতন্য বা পরব্রহ্ম সৰ্বমূল,
যিনি এক ও অদ্বিতীয়, ফাহাকে ছারিয়া দিলে বিশ্ব ব্রহ্মা-
ণ্ডের কল্পনা করাই চলে না সেই মহান্ কে কি কি ভাবে
আমরা ধারণা করিতে পারি।
পরমাত্ম চৈতন্য নির্ণয় তিনি কে ? কোথায়
তাহার অবস্থিতি ? গীতা অতি সংক্ষেপে ও সরল ভাষায়
তাহা আমাদিগকে জানাইয়া দিয়াছেন।
সকতঃ পানিপাং তৎ সৰ্ব্বতােহক্ষি শিরেমুখ
সব্বত মিশ্লাক সমাবৃত্য তিষ্টভি
সৰ্বেন্নি গুণাভাস: সর্বেচ্ছিন্ন বিবর্জিজ।
অসত্তং সব্বভূচ্চৈব নিগুণং গুণাচ।
বহিষ্ণ ভূভামরং চরমেব চ।
মুক্ষ্মাদবিজ্ঞেয়ং দুৱস্থ চান্তিকে চ ভণ্ড |
গী ১৩১৩-১৫ শ্লো
তঁাহার হস্ত, পদ, চক্ষু, শির, মুখ, কর্ণ সর্বত্র সমভাবে
বিদ্যমান। তিনি সমস্ত আবৃত করিয়া বিরাজ করিতেছেন।
তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয় সমূহে আত্ম প্রকাশ

মুক্তিবাদ মান। করিয়াছেন অথচ ইন্দ্রিয় বিহীন। তিনি আসক্তিশূন্য হইয়াও সমস্ত পদার্থ ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। তিনি নিগুণ অথচ গুণ পালক। তিনি সমস্ত পদার্থের অন্তরে বাহিরে বিরাজ- স্থাবর জঙ্গম সমস্তই তিনি। তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বলিয়া অবিজ্ঞেয়। তিনি অজ্ঞানের পক্ষে দূর হইতেও অতি দূরে জ্ঞানীর পক্ষে নিকট হইতেও সন্নিকটে অবস্থান করিতেছেন। অহো ! কি প্রাণ জুড়াণ মধুর তাব! কি মধুর ভাষা ! ভক্ত ভিন্ন ইহার সন্ধান কে পাইবে ? আমরা এ পর্যন্ত আলােচনায় জানিয়াছি পরমাত্মচৈতন্য পরব্রহ্ম ভিন্ন সৎপদার্থ বলিবার আর কিছুই নাই। আবরণ ও বিক্ষেপরূপে জগৎ আমাদের চক্ষে সৎপদার্থ বলিয়া পরি- গৃহিত হইতেছে। এই আবরণও বিক্ষেপরূপ জগতের ধারণা উন্মলীত করিবার জন্য আমরা এক্ষণ পরব্রহ্মের স্বরূপ চিন্তা করিতে চেষ্টা করিব। অদ্বৈতবাদ: আঋষিগণ নিত্য পরমাত্মচৈতন্যকে “একমেবাদ্বিতীয়ম” বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। এক এবং অদ্বিতীয় অর্থাৎ সেই পদার্থ সর্ব প্রকার ভেদ ও পরি- চ্ছেদ মুক্ত। সে পদার্থে ভেদ অর্থাৎ স্বগত, স্বজাতীর ও বিজাতীয় ভেদ থাকা দৃষ্ট হয় সেই পদার্থ “এক” সুতরাং অদ্বিতীয় হইতে পারে না। মনুষ্যে যেমন হস্ত পদাদি, বৃক্ষে যেমন শাখা প্রশাখাদি বিবেচনায় স্বগত (নিজ শরীর গত) ৬৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ভেদ ( বিভিন্নতঃ ):দৃষ্ট হয়, মনুষ্যে যেমন স্ত্রী, পুরুষ, নপুং- সকাদি ও বৃক্ষে যেমন নানা জাতীয় বৃক্ষাদির বিভিন্নতায় স্বজাতীয় ভেদ দৃষ্ট হয় ; এবং মনুষ্য ও পশুতে, বৃক্ষ ও পক্ষ্যাদিতে যেমন বিজাতীয় ভেদ দৃষ্ট হয়, পরমাত্মচৈতন্যে তদ্রুপ স্বগতঃ স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ দৃষ্ট হয় না। পর- মাত্ম চৈতন্য সর্বদা একরূপ, অদ্বিতীয় তর্থাৎ তাহার অনুরূপ অন্য কিছু সম্ভবে না। এইরূপ তিনি সর্বপ্রকার পরিচ্ছেদ শূন্য। পরিচ্ছেদ বলিতে আমরা স্থান পরিচ্ছেদ, কাল পরি- চ্ছেদ ও বস্তু পরিচ্ছেদ বুঝিতে পারি ! স্থান পরিচ্ছেদ অর্থে এস্থানে আছে অন্য স্থানে নাই, কাল পরিচ্ছেদ অর্থে একালে আছে অন্য কালে নাই, এবং বস্তু পরিচ্ছেদ অর্থে এ বস্তুতে আছে অন্য বস্তুতে নাই এইরূপ বুঝায়। পরমাত্ম চৈতন্য এরূপ পরিচ্ছেদ বা বিভিন্ন স্বভাবাপন্ন নহেন। তিনি সর্বদা একরূপ ও সর্বত্র সমভাবে বিরাজ করিতেছেন। তাই তিনি সর্বপ্রকার ভেদ পরিচ্ছেদ বিহীন। মুক্ত পরমাত্ম চৈতন্য জড় বস্তুর অতীত এবং ভেদ পরিচ্ছেদ বিহীন হওয়ায় তাহাকে চর্মচক্ষে দেখিবার উপায় নাই। তাই ভগবান অর্জুনকে বলিয়াছেন --- ন তু মাং শক্যসে দুষ্ট,মনেবৈ চক্ষুষা। দিব্য দামি হে ক্ষুঃ পশ্যমে যােগমৈশ্বর। গী ১১৮ শ্লো। যেহেতু তুমি চৰ্ম্ম চক্ষু দ্বারা আমার স্বরূপ দেখিতে মুক্তিবাদ। । পাইবে না, এজন্য তোমাকে জ্ঞান চক্ষু প্ৰদান করিতেছি ; তুমি আমার অসাধারণ ঘটন-ঘটন সামর্থ্য দর্শন কর। মাত্মার স্বরূপ কী:- যেহেতু পরমাত্ম চৈতন্য নিরাকার অর্থাৎ সর্বব্যাপী সুতরাং চক্ষের প্রত্যক্ষীভূত নহে। এজন্য তাঁহাকে কোন উপাধির অধীন করা চলে না ; তাঁহার একমাত্র স্বরূপ যাহা জ্ঞান বিজ্ঞানরূপে প্রকাশিত তদ্বারাই উপলব্ধি করা যাইতে পারে , বলিয়া আৰ্য ঋষিগণ উপদেশ করিয়াছেন। স্বরূপ কি ? যে বস্তুর আকৃতি নাই তাহাকে বুঝিতে হইলে ঐ বস্তুর কি গুণ, তাহার ভাবাভাব ও প্রকৃতি দ্বারা সেই বস্তুটীর উপলব্ধি মাত্র সিদ্ধ হয়। যেমন “বায়ু”। বায়ু নিরবয়ব। বায়ুকে উপলব্ধি করিতে হইলে তাহাতে কিগুণ আছে, তদ্বারা কি কাৰ্য্য হইতেছে এবং তাহার প্রকৃতি কি, তালােচনায় বায়ুকে উপলব্ধি করিতে পারা যায়; অর্থাৎ বায়ু গতিশীল, অস্থির, স্থিতি স্থাপক, গন্ধ- বহ, ব্যাপক, সঙ্কোচক, অনুষ্ণাশীতলস্পর্শাত্মক ইত্যাদি ভাব- দ্বারা তাহার উপলব্ধি করিতে পারা যায়। অতএব এই সকল অবস্থাকে বায়ুর স্বরূপ বলে। পরমাত্ম চৈতন্য নিরাকার নির্বিকার। তাহার স্বরূপ কি তৎবিষয়ে অনুসন্ধান করিলে দেখিতে পাই, আৰ্য ঋষিগণ তাহার স্বরূপ সৎ, চিৎ ও আনন্দ বলিয়া উপদেশ দিয়াছেন। আমরা দেখিব এই সৎ, চিৎ ও আনন্দ কি। পরমাত্মা সৎসুক ---সৎ শব্দের অর্থ সর্বকালে أيل গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও যাহার ক্ষয় নাই। এই অক্ষয় পদার্থ বুঝিতে হইলে আমা- দিগকে ক্ষয়শীল পদার্থের আলােচনা করিতে হইবে । ক্ষয়- শীল পদার্থ ব্যতীত যাহা বাকী থাকিবে তাহাই অক্ষয় সৎ পদার্থ। দৃশ্য জড় জগৎ এবং তাহার কারণ ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু ও আকাশের অনিত্যতা সপ্রমাণিত হইয়াছে। একদিন একদিন সমস্ত পদার্থেরই ক্ষয় হইবে। পঞ্চভূতাত্মক বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড ক্ষয় হইয়া গেলে, যদি আর উৎপত্তি না হয় তবে এই পরিদৃশ্যমান জগতের পুনরাবির্ভাব সম্ভবে না। যেহেতু আমরা দৃশ্য জগৎকে ব্যবহার মতে পাইতেছি সুতরাং ইহা কোনও অব্যক্ত ও অজ্ঞাত কারণ হইতে সৃষ্টি হইয়াছে। যে অব্যক্ত কারণ হইতে এই ক্ষয়শীল বিশ্ব জগতের উদ্ভব হই- যাছে সেই কারণও ক্ষয়শীল হইলে উৎপত্তি বন্ধ হইয়া যাইত। অতএব সেই অব্যক্ত মূল কারণ অক্ষয় সৎ পদার্থ। যিনি এই অবস্থা স্বীকার না করিবেন এবং বলিবেন যে, জগৎ অনন্তকালই পরিবর্তনের সহিত ব্যক্ত থাকবে, তাহাকেও এই স্কুল সৃষ্ট পদার্থের কারণ আছে স্বীকার করিতে হইবে; যেহেতু out of notling) শূন্য অর্থাৎ অভাব হইতে স্কুল বিশ্বের উৎপত্তি হইয়াছে বলা যাইতে পারে না এবং সেই কারণটী কি তাহাও তিনি বলিতে পারিবেন না। সুতরাং এই অব্যক্ত কারণ অবিনাশী অর্থাৎ সৎ সিদ্ধ হইল। পরমাত্মা চিৎ স্বরূপ-পরমাত্ম চৈতন্য “চিৎ” স্বরূপ। চিৎ শব্দের অর্থ জ্ঞান। জ্ঞান অনন্ত ; কারণ কেহই জ্ঞানের ।

মুক্তিবাদ
অন্ত সীমায় পৌছাইতে পারেন নাই। মানব যে জ্ঞান সঞ্চয়
করে, বিশ্ব জগতের কাৰ্য কলাপই তাহার একমাত্র কারণ।
বিশ্ব জগতের কাৰ্যকলাপ মানবের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয়ী-
ভূত না হইলে তাহার কোন জ্ঞান লাভের সম্ভাবনা ছিল না ;
এই হেতু বিশেষতঃ এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের
মধ্যে যে অনন্ত জ্ঞান-কাৰ্য্য চলিতেছে তাহা মানবের ধ্যান
ধারণার অতীত ; এই জ্ঞানের অন্ত নাই। যেহেতু মূল
কারণ পরমাত্ম চৈতন্য ভাবে এইসমস্ত জ্ঞান প্রকাশিত
হইত না সুতরাং পরমাত্ম চৈতন্য পরব্রহ্ম ‘চিৎ' স্বরূপ সিদ্ধ
হইল।
পরমাত্মা আনন্দ স্বরূপ:-পরমাত্মা “আনন্দ স্বরূপ”।
আনন্দ শব্দের অর্থ প্রীতি। মানব আত্ম (নিজ) প্রতি নিরতিশয়
প্রীতি ভাবাপন্ন। যদিও উৎকট ঐন্দ্ৰিয়িক দুঃখভােগে দ্বেষ
বশতঃ কখন কখনও আত্মাতে ধিক্কার উপস্থিত হয়, তথাপি
আত্মা পরম প্রীতির আস্পদ নহে বলা যাইতে পারে না,
কারণ কোন সময়ে কাহারও এইরূপ ইচ্ছা হয় না যে আমি
অসুখী হই; বরং জীব মাত্রেই অভিলাষ করে যে আমি
সৰ্ব্বদা সুখে থাকি ও চিরজীবী হই। পুত্র মিত্ৰাদি প্রতি
যে প্রীতি তাহাও আত্মার্থ কারণ যদি তাহা আত্মার্থ না
হইত তবে পুত্ৰ মিত্ৰাদিতে ও উদাসীনে সম প্রীতি হইত।
কিন্তু নিজের প্রতি যেপ্রীতি হয়, তাহা পুত্র মিত্ৰাদি নিমিত্ত
নহে; যেহেতু পুত্রাদির সহিত বিচ্ছেদ সম্ভাবনা হয়, কিন্তু
•

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও অতএব আপনার প্রতি প্রীতির বিচ্ছেদ সম্ভবপর নহে। আমাতে (আত্মাতে) যে প্রীতি হয় তাহা পরম প্রীতি ; সুতরাং আত্মা (জীব ) পরমানন্দ স্বরূপ। যেহেতু আমিই জীবাত্মা এবং জীবাত্মাই সমষ্টি ভাবে পরমাত্ম চৈতন্য বা পর- ব্ৰহ্ম বলিয়া জানিয়াছি সুতরাং পরমাত্ম চৈতন্য পরম আনন্দ স্বরূপ সিদ্ধ হইল। যথা- ইমাক্স পানন্দ পরপ্রেমাস্পদং যতঃ। মা ন ভূবং হি ভূসমিতি প্রেমাত্মনীতে। তৎ প্রেমাত্মার্থমন্যত্র নৈবমন্যার্থমত্মনি। অভস্ত পৱমেনে পরমানন্দতাত্মনঃ । পঞ্চদশী ১ম অধ্যায় ৮৯ শ্লো। পতিতে পত্নীর যে প্রীতি, তাহা পতির প্রয়ােজনার্থ নহে, পত্নীর আত্ম প্রয়ােজনে। পত্নীর আত্মার প্রয়ােজন না থাকিলে পতিতে প্রীতি উৎপাদন করিতে পারে না। এইরূপ পুত্রকন্যা ধনাদিতে সুখানুভব আত্মার প্রীতির জন্য; সুতরাং আত্মাই পরম প্রীতির আম্পদ। যেহেতু আত্মা বা জীব এবং পরমাত্ম চৈতন্য একই বস্তু সুতরাং পরমাত্ম চৈতন্য পরমা- নন্দ স্বরূপ । অতএব পরমাত্ম চৈতন্য “সচ্চিদানন্দ” স্বরূপ সিদ্ধ হইল। তাই পরনজ্ঞানী অদ্বৈতাগ্রগণ্য শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য্য গাহিয়াছেন :-

মুক্তিবাদ
মনে সুব্ধ্যহাৱ চিত্তানি নাহ,
ন চ শ্রোজিষ্মে ন চ ঘ্রাণনেত্রে।
ন চ ব্যোম ভুমির্ণভতজো নবায়ু
চ্চিদানন্দরূণঃ শিবােহং শিববাহম।
ন চ প্রাণ সংজাে নচৈ পঞ্চ বায়ু,
র্ণ বা সপ্তধাতুর্ণ বা পঞ্চকোষা।
ন বাক পাণিপাদংমচোপছপায়ু,
চদানন্দরূপঃ শিবােহং শিবােহম,
নমে দ্বেষবাগো নমে লােভমােহহ,
মদোনৈব মে নৈব মাৎসর্শ ভাব।
ন ধৰ্মো ন টার্থে ন কামো নমােক্ষ,
চ্চিদানন্দরূপঃ শিববাহং শিববাহম, #
ন পূণ্যং ন পপং ন সৌখ্যং ন দুঃখ,
= মম্রো ন তীখং ন বেদ ন যজ্ঞাঃ
অহ: ভােজনং নৈব ভোজ্যং নভােক্তা,
চিদানন্দরূপ: শিৰােহং শিববাহম,
ম মৃত্যুৰ্ণশঙ্কা নমে জাতিভেদ,
পিতানৈৰ মে নৈৰ মাভা চ জন্ম।
ন বন্ধু মিত্রং গুরুর্নৈব শিষ্য,
চ্চিদানন্দ রূপঃ শিলােহং শিবােহম,

৭০
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
অহং নির্বিকল্পে। নিৱাকার রূপাে,
বিভূজ্বাচ্চ সৰ্বত্ৰ সৰ্ব্বেন্দ্রিয়ানাম।
নাসঙ্গতংনৈৰ মুক্তিৰ্ণমে,
চ্চিদানন্দরূপঃ শিববাহঃ শিবাহম।
জ্ঞানপন্থীর ভাব এইরূপে পরব্রহ্মে স্থিতি ও পরব্রহ্মে
পর্যবসিত হয়। এক পরব্রহ্ম সৰ্বমূলাধার বলিয়া জ্ঞানপন্থী
ব্রহ্মের পরম ভাবের পরবর্তী অস্থায়ী ব্যবস্থাকে অসৎপদার্থ
মনে কবেন।
জ্ঞানপন্থী অদ্বৈতবাদী ‘ব্ৰহ্ম সত্যং জগৎ
মিথ্যা জীবে ব্রহ্মব না পরঃ বলিয়া জানেন। এই ব্রহ্ম
তাহাদের মতে নিরাকার, নির্বিকার, অব্যক্ত সুতরাং মন,
বুদ্ধির অগােচর, উপাধি বজ্জিত ; কোন বিশেষণে বিশেষিত
করা যায় না মাত্র সৎ, চিৎ, আনন্দ স্বরূপ। অদ্বৈত বাদীর
ইহাই ধ্যান ধারণা।
বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী শ্ৰীধর স্বামী প্রমুখ
মূনিগণের মতে ব্ৰহ্ম সৰ্ব্বমূলাধার বটেন কিন্তু নিগুণ নহেন,
সগুণ এবং জীব ব্রহ্ম নহে কিন্তু ব্ৰহ্ম পরতন্ত্র। ব্ৰহ্ম জগতের
স্রষ্টা ও উপাদান ; জীবের নিয়ন্তা ইত্যাদি। যেমন বন
বলিলে বৃক্ষ সমষ্টি, মাঠ বলিলে ক্ষেত্র সমষ্টি, সভ৷ বলিলে
লােক সমষ্টি বুঝায়, বৃক্ষ মাঠ ও লােক সরাইয়া লইলে বন,
মাঠ বা সভার অস্তিত্ব লােপ হয় ; অর্থাৎ বৃক্ষ, ক্ষেত্র, লােকই
বন, মাঠ ও সভা আকারে প্রতিভাত হয়, ব্রহ্মও তদ্রুপ সগুণ
জগদাকারে অভিব্যক্ত হইয়াছেন। গুণ ও আকৃতি সরাইয়া

'মুক্তিবাদ ৭১ দিলে ব্রহ্মের স্বরূপ বন্ধ হইয়া যায়। যেমন শক্তি ও শক্তি- মান পৃথক করা যায় না, তদ্রুপ গুণ ও আকৃতি হইতে ব্রহ্ম পৃথক করা চলে না। সুতয়াং ব্ৰহ্ম সগুণ ও সাকার। দ্বৈত- বাদীগণ নিরাকার নিগুণ ভাব মন, বুদ্ধি ও বাক্যের অতীত বলিয়া ধ্যান ধারণার অবিষয় হেতু ব্ৰহ্ম নিগুণ নিরাকার স্বীকার করেন না। যেহেতু বিশ্বজগৎ গুণে উৎপত্তি, গুণে স্থিতি এবং গুণেই লয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে এবং গুণাশ্রিত হইয়াই এইরূপ পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের আবর্তনে চক্রাকারে ঘুরিতেছে এবং জগৎ ভিন্ন জ্ঞান ও কর্মের স্ফুরণ অসম্ভব তদ্ধেতু সগুণ সাকার আরাধনীয় । যেহেতু ক্ষীণদশী মানুষ, সগুণ সাকার ভাব ব্যতীত অন্যভার উপলব্ধি করিতে অক্ষম তাই তাহারা ব্রহ্মের নিগুণ নিরাকার ভার আমলে আনেন না। মনুষ্যের মন স্বভাবতঃ গুণ ও আকৃতি লইয়াই ব্যস্ত তাই দ্বৈতবাদীগণ মরে স্বাভাবিক ধ্যান ধারণার মধ্য- দিয়াই সগুণ সাকারের আরাধনা করিয়া ব্ৰহ্মপদ লাভ করি- বার বিশিষ্ট পন্থা বলিয়। কীৰ্ত্তন করেন। আমরা জানিয়াছি ইন্দ্রিয়াদির পরিচালক মন। মন একইসময়ে একাধিক বিষয়ের ধ্যান ধারণা করিতে পারে না ; সুতরাং মন যতক্ষণ বহির্বিষয়ে আবদ্ধ থাকে ততক্ষণ তাহার অন্তৰ্বিষয়ের ভাবনা বন্ধ থাকে। বাহ্য জগতে আমরা রূপ দর্শন করি। রূপ দেখিলেই রূপ দেখিলেই তাহা জানিবার জন্য মনে স্পন্দন হয়। এই স্পন্দন বা প্রবৃত্তিই ভাষারূপে অভি-

৭২
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব
ব্যক্ত হয়। এই স্পন্দন বা প্রবৃত্তিকে ভাষা বা নাম বলা যায়,
সুতরাং নাম রূপ জ্ঞাপক। ব্ৰহ্মসত্তা নাম দ্বারা প্রকাশিত।
নাম সরাইয়া নেও ব্ৰহ্ম সত্তার উপলব্ধি বন্ধ হইয়া ব্রহ্ম
জ্ঞানের দ্বার রুদ্ধ হইবে । তাতএব রূপারাধন। হেয় নহে।
রূপারাধনাই ব্ৰহ্মজ্ঞানের প্রকৃষ্ট উপায়, তাই দ্বৈতবাদীগণ
সগুণ সাকার ব্রহ্মের উপাসক। প্রকৃত পক্ষে সর্বশক্তিমান
পরব্রহ্মে সকল অবস্থাই সম্ভব; তাই গীতায় সাধকের
প্রকৃতি ও সামর্থ্যানুযায়ী পরব্রহ্ম ভগবানের উভয়বিধ সগুণ
সবিশেষ ও নিগুণ নির্বিশেষ ভাব প্রতিপাদন করা হইয়াছে।
ভগবান বলিয়াছেন :—( সগুণ সাকার বাদ স্থলে।)
t
অবজানভি মাং মূহু মানুষীং তনুমাশ্রিত
পং ভাবমজানস্তো মম ভূত মহেশ্বম্।
গীতা ১১১ শ্লো।
মূঢ়গণ আমার সর্বভূত মহেশ্বর স্বরূপ পরমভাব বিদিত
হইতে না পারিয়া আমার মানব মূর্তিতে অবজ্ঞা প্রদর্শন
করিয়া থাকে। পুনঃ --
পত্রং পুষ্পং ফলং ভােয় যে মে ভক্ত্যা প্রচ্ছতি
অহং ভক্তপহৃতমশামি প্রতাত্মনঃ ।
ঘৎ কৰােষি যদশাসিযজ্জহােসি দা»ি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তে তৎ কুরুষ মদাপণ ।
গী ৯২৬-২৭।

মুক্তিবাদ।
যিনি ভক্তির সহিত আমাকে পত্র, পুষ্প, ফল বা জল
প্রদান করেন, আমি সেই সকল শুদ্ধচিত্ত ভক্তগণের প্রদত্ত
তৎসমুদয় প্রীতির সহিত গ্রহণ করি। অতএব হে কৌন্তেয় !
তুমি যাহা কিছু কর, যাহা আহার কর, হােম কর, দান বা
তপস্যা কর তৎ সমস্তই অমাতে সমর্পণ কর।
ময্যাবশ্য মনে যে মাং নিভাযুক্তা উপিসতে।
শ্রদ্ধা পৱয়ােপেস্তে মে যুক্তাতমা মতাঃ |
গীতা ১২২ শ্লো।
যিনি একাগ্রচিত্ত ও পরম শ্রদ্ধান্বিত হইয়া আমার সগুণ
স্বরূপের আরাধনা করেন, আমার মতে তিনি শ্রেষ্ঠ যােগী।
পুনঃ নিগুণ নিরাকার স্থলে ভগবান বলিয়াছেন -
যেক্ষরমনিৰ্দেশ্যমব্যক্তং পর্ষপিসতে।
সৰ্বত্ৰগমচিন্ত্য কুটস্থমজলং বম্।।
সংনিম্নমনিদয়গ্রাম সর্বত্র সমবুদ্ধঃ ।
তে প্রাপ্তবওি মামেব সর্বভূতহিতে ভাঃ ॥
গীতা ১২।৩-৪ শ্লো।
যাহারা ইন্দ্রিয়গ্রাম নিরােধ করিয়া এবং সর্বত্র সমবুদ্ধি
সম্পন্ন ও সৰ্ব্বভূতহিতে রত থাকিয়া অনিৰ্দেশ্য, অব্যক্ত
সর্বত্র বিদ্যমান, চিন্তার অতীত, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব (নিগুণ
নিরাকার ) অক্ষর (নিত্য) স্বরূপের আরাধনা করেন তাহারা
আমাকেই প্রাপ্ত হন। ইত্যাদি
ইহ সংসারে সকল মানবের সম সামর্থ্য ও অধিকার

৭৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও সম্ভবে না। সুতরাং সকলেই যাহাতে তদভিমুখী হইয়া শান্তিলাভ করিতে পারে, তজ্জন্য গীতা বিভিন্ন গুণান্বিত প্রকৃতি ও সামর্থ্যানুযায়ী উপাসনার উপদেশ প্রদান করিয়াছেন। আমরা এ পর্যন্ত আলােচনায় মােটামােট পাইলাম যে (১) পরমাত্ম চৈতন্য বা পরব্রহ্মের স্পন্দন বা ইচ্ছাশক্তি হইতে সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়াদি ও স্কুল জগৎ আবিভূত হইয়াছে। পরমাত্ম চৈতন্য বাদ দিলে সূক্ষ্ম ও স্থূল জগৎ টিকিতেছে না ; বিশ্বজগৎ পরব্রহ্মের প্রতিচ্ছায়া মাত্র। (২) পরমাত্ম চৈতন্য অব্যক্ত, অচিন্ত্য, ইন্দ্রিয়াদি অগ্রাহ্য মাত্র উপলভ্য বিষয়। (৩) পরমাত্ম চৈতন্য ভেদ পরিচ্ছেদ বিহীন। সৎ, চিৎ, আনন্দ স্বরূপ। (৪) জীবাত্মা দেহাতিরিক্ত চৈতন্য পদার্থ এবং পর- মাত্মার অংশ। (৫) ইন্দ্রিয়দ্বার দিয়া বহির্বিষয় অন্তরে প্রবেশ করতঃ তান্তঃকরণের অবস্থান্তর জন্মায়, এবং জীব অন্তঃকরণ সংযােগে ইন্দ্রিয় কার্যে লিপ্ত হইয়া বিষয়ের দোয গুণ আকর্ষণ করে। (৬) জীবাত্মা দেহান্তরিত হইলে ঐ দোষ, গুণ, সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়াদি সহ বহন করিয়া নেয়। (৭) প্রলয়ে সমস্ত জীব স্বীয় স্বীয় স্বভাব লইয়া পরব্রহ্মে , মুক্তিবাদ বিজাতীর লয় হয়, এবং সৃষ্টি সময়ে ঐ ঐ স্বভাবানুযায়ী কাৰ্য্য সম্পাদন জন্য বিভিন্ন দেহ ধারণ করিয়া পুনরাগত হয়। (৮) জীবাত্মা দেহাশ্ৰিত থাকিয়া কাৰ্য পরম্পরায় পর- ব্ৰহ্মে লীন হইবার শক্তি উপার্জন করে। যে পৰ্যন্ত ঐ শক্তি না জন্মে তৎকাল পর্যন্ত জন্ম জন্মান্তর গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। (৯) পরমাত্ম চৈতন্য উপলব্ধি জন্য এই বিশ্বে ওতপ্রােত ভাবে মিলিত অনন্তশক্তি, অনন্তজ্ঞান ও অনন্ততেজের চিন্তা করা আবশ্যক। যেহেতু রূপাদি না থাকিলে সমস্ত জ্ঞানের দ্বার বন্ধ হইয়া যাইত, সুতরাং রূপারাধনা ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভের উৎকৃষ্ট পন্থা। (১০) জীাত্মা দেহে অবস্থান কালে যেরূপ গুণাশ্রিত থাকিয়া বিষয় ভােগ করে, তৎপ্রকৃতি অনুযায়ী উপাসনাই আত্মােন্নতির প্রকৃষ্ট উপায় । ত্রিগুণ প্র ঙ্গ : আমরা জানিয়াছি পরব্রহ্মে স্পন্দন বা ( সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমঃ ) ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি হইতে বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড সমুদ্ভুত। বিশ্ব সংসার পৰ্যালােচনায় আমরা দুটী জগতের সন্ধান পাই। একটী বাহ্য জগৎ অপরটী অন্তর্জগৎ বা মনােময় জগৎ। বাহ্য জগৎ না থাকিলে যেমন মনােময় জগতের চিন্তা ভাবনাদি কাৰ্য্য বন্ধ হয়, তদ্রুপ মনােময় জগৎ না থাকিলেও বাহ্য জগতের অস্তিত্ব লােপ হয়; সুতরাং উভয় জগৎ কাৰ্য্য ওতপ্রােতভাবে মিশ্রিত থাকিয়া একই গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও নিয়মে চলিতেছে। দৃশ্য জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় যে নিয়মে চলিতেছে, মনােময় জগতের সৃষ্টি স্থিতি, লয়ও সেই নিয়মে নিয়ন্ত্রিত হইতেছে। সত্ত্বাদি গুণই তাহার কারণ। সাদি গুণ মধ্যে যে পদার্থে যে গুণ অধিক পরিমাণে বিদ্য- মান বৃক্ষ হউক, পশু হউক, পক্ষী হউক কিম্বা মনুষ্যই হউক, সকলের মধ্যেই ঐঐ গুণ স্বীয় স্বীয় ক্রিয়া সমভাবে উৎপাদন করিবে। তাই জীব জগৎ লইয়া বিশ্ব সংসারে তাঁহার অলঙ্ঘনীয় নিয়মে ত্রিগুণ ক্রিয়া পরিচালিত হইতেছে। মানব জগৎ পৰ্যালােচনায় কভক ব্যক্তিকে স্বভাবতঃ রাগদ্বেষাদি উগ্রবৃত্তিহীন, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যবাদী সদ্বিবেচক, পর- হিতৈষী, জ্ঞান চর্চায় তানুরক্ত ইত্যাদি গুণযুক্ত ; কতক ব্যক্তিকে উগ্ৰকৰ্ম্মা, উগ্ৰস্বভাবম্বিত, ক্রোধী, অসমসাহসিক অাসক্তি পরায়ণ ইত্যাদি এবং ত্যপর কতক ব্যক্তিকে আলস্য পরায়ণ, নিদ্ৰাপ্রিয়, সদসৎ বিবেক বিমূঢ় ইত্যাদি ভাবাপন্ন দেখা যায়। ইহাদিগকে ক্রমে সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তাম- সিক প্রকৃতি সম্পন্ন বলা যায় ! এই ত্রিবিধ প্রকৃতি সম্পন্ন লােকের আহারপ্রিয়ত, চিন্তাস্রোত, কর্মক্ষেত্র, প্রভৃতিও প্রভেদ থাকা দৃষ্ট হয়। আমরা প্রত্যেক প্রকৃতি মনােযােগ পূৰ্ব্বক অধ্যয়ন করিলে দেখিতে পাই যে, শিক্ষা দ্বারা ঐ সকল প্রকৃতি সমূলে দূরীভূত হয় না। প্রকৃতি শিক্ষা দীক্ষা বিধ্বস্ত করিয়া নিজগুণ প্রকাশ করে, তাই শিক্ষিত লােকও অত্যন্ত ক্রোধী, কুটীল, পরপীড়ক ইত্যাদি হইতে দেখা যায়।

মুক্তিবাদ। ৭৭ } এজন্য শিক্ষা দ্বারা মৌখিক নম্রতা, সাধুতা প্রভৃতি প্রকাশ করিলেও কাৰ্যতঃ স্বীয় প্রকৃতি দমনে সমর্থ হয় না; এজন্য সংসারে কেহবা স্বভাবতঃ নম্র, বিনয়ী, সত্যবাদী, পরহিতৈষী, কেহবা উগ্ৰস্বভাব, দাম্ভিক, পরপীড়ক, কেহবা নিদ্রালসা পরায়ণ, কৰ্তব্যজ্ঞান বজ্জিত হইয়া থাকে। তদ্রুপ আহারেও কেহবা নিরামিশ প্রিয়, কেহবা মাংসাশী, কেহবা পূতিগন্ধময় পর্য- ষিত দ্রব্যাদি ভক্ষণে তৃপ্তিলাভ করিয়া থাকে। একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ একইরূপ উপদেশ পাইয়াও সম পারদর্শিতা লাভ করিতে সক্ষম হয় না। যেহেতু বিভিন্ন প্রকৃতিমূলে চিন্তাস্রোত, কৰ্ম্ম কুশলতা, মনােবৃত্তি, শিক্ষা ও আহারাদির প্রভেদ সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়, তদ্ধেতু জ্ঞান- চর্চা, উপাসনাদির বৈলক্ষণ্য হওয়াও স্বাভাবিক। যাহার যেরূপ কৰ্ম্ম ও জ্ঞান চর্চ্যাদি প্রকৃতি সঙ্গত হয়, তাহাকে তদনুরূপ শিক্ষা ও উপদেশাদির ব্যবস্থা না করিয়া সৰ্ব্ব- সাধারণকে একই প্রকার জ্ঞানােপাসনাদি উপদেশ ও কাৰ্য্য প্রণালী শিক্ষা দিলে, তদ্বারা তাহাদের উপকার সাধিত না হইয়া বরং অপকার সাধিত হইয়া থাকে; তাই গীতা গুণানুগত প্রকৃতি অনুসরণের পক্ষপাতী। ত্রিগুণা প্রকৃতির দুর্দমনীয় সামর্থ্য সম্বন্ধে ভগবান, বীরচূড়ামণি অর্জুনকে বলিয়াছেন :- সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রতেজ্ঞানবানপি। প্রকৃতিং যাক্তি ভূভানি নিগ্রহ কিং করিষ্যভি। গী ৩৩৩

৭৮
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
জ্ঞানবান ব্যক্তিও স্বীয় প্রকৃতির অনুরূপ কাৰ্য করেন,
প্রাণিগণ নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসরণ করে, হে অর্জুন !
তুমি প্রকৃতি নিগ্রহ করিতে পারিবে না। যেহেতু প্রকৃতি
নিগ্রহ সহজ নহে সুতরাং
শ্রেয়ান স্বধর্মো বিগুণঃ পৱৰ্মাৎ অনুষ্ঠিভা।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পৱৰ্ম্মো ভয়াবহঃ ||
গী ৩৩৫
সুন্দররূপে অনুষ্ঠিত পর ( ভিন্ন প্রকৃতি গত) ধর্ম অপেক্ষা
সদোষ স্বধৰ্ম্ম শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মে নিধনও শ্রেয়ঃ, কিন্তু পরধর্ম
ভয়াবহ। এজন্য স্বীয় প্রকৃতির আবর্তে পরিয়া-
যজন্তে সাত্বিকা দেবান যক্ষ রক্ষাংসিরাজ।
প্ৰেভা ভূতগণাংশ্চন্যে যজন্তে তামসা না: ।
গী ১৭৪
সত্ত্ব গুণান্বিত ব্যক্তিগণ দেবতাগণকে, রজঃ গুণান্বিত
ব্যক্তিগণ যক্ষ, রাক্ষসাদির এবং তমঃ গুণান্বিত ব্যক্তিগণ,
ভূত প্রেতের আরাধনা তৎপর হইয়া থাকে। তাই ভগবান
অর্জুনকে জানাইয়া দিয়াছেন ?
সে স্বে কর্মন্যভিৱতঃ সংসিদ্ধিং লভতেন।
গী ১৮৪৫
মানুষ নিজ নিজ প্রকৃতিগত কর্মে নিষ্ঠাবান হইয়া সিদ্ধি-
লাভে সমর্থ হয়। পুনঃ

মুক্তিবাদ।
৭৯
7
স্বকৰ্মণ ভমভ্যর্জ্য সিন্ধি বিন্দভি মানব।
গী ১৮৪৬
মনুষ্য স্বীয় প্রকৃতিগত কৰ্ম্ম দ্বারা তাহাকে অর্চনা করিয়া
সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকে। পুনঃ-
স্বভাবনিয়তং কৰ্ম্ম কুন্নাগোভি কিন্বিষম্ |
গী ১৮৪৭
প্রকৃতি বিহিত কৰ্ম্ম করিলে পাপভাগী হইতে হয় না।
তাই স্বজন বধ-ভয়-বিল বৈরাগ্য প্রাপ্ত অর্জুনকে ভগবান
স্পষ্টবাক্যে স্মরণ করাইয়া দিলেন—
যদহঙ্কাৱমাশ্ৰিত্য নযােস্য ইতি ম্যসে।
মিথৈব ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিত্ত্বাং নিক্ষ্যেভি।
স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধ স্বেন কৰ্ম্মণা।
কংনেচ্ছসিযহাৎ কৱিষাসবশােহপি ভৎ।
গী, ১৮৫৯-৬০
হে অর্জুন! তুমি অহং অভিমানে যুদ্ধ করিবে না বলিয়া
যে মনে করিয়াছ, তাহা নিশ্চয়ই মিথ্যা, কারণ তােমার স্বীয়
রজঃ গুণ প্রকৃতি তােমাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাইবে।
কৌন্তেয় ! সাময়িক মােহ বশতঃ যাহা করিতে ইচ্ছা করি-
তেছ না, তােমার প্রকৃতিজাত কৰ্ম্মবশে অবশ হইয়া তাহা
তােমাকে করিতে হইবে। সুতরাং প্রকৃতি অনুকুল উপা-
সনাদি না করিলে লােক সিদ্ধিলাভ করিতে সক্ষম হয় না।
এই গীতার উপদেশ। এই উপদেশ ধর্ম ও কর্ম জগৎ

bro গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও বেড়িয়া সৰ্বসাধারণের জন্য এক। এই স্বাভাবিক উপদেশ জগতের সর্ব পদার্থে ওতপ্রােত ভাবে মিলিত রহিয়াছে। ইহাই একমাত্র জ্ঞান। যিনি এই জ্ঞান লাভ করিতে পারিয়াছেন, তিনিই বেদজ্ঞ বলিয়া গীতা মুক্তকণ্ঠে জানাইয়া দিয়াছেনঃ- উদ্ধমূলমধশাখমশঙ্খং প্লাহুৱব্যম। ছন্দাংসিযস্যর্ণানি যবেদ স বেদবিৎ | গী ১৫১ পরমাত্ম চৈতন্য যাহার মূল, পরিদৃশ্যমান বিশ্বের নানা- বিধ সৃষ্টি যাহার শাখা প্রশাখা এবং অনন্ত জ্ঞান বিজ্ঞান যাহার পত্র পল্লব এমত অশ্বত্থ বৃক্ষরূপ অস্থায়ী অথচ প্রবাহ- রূপে বৰ্তমান বিশ্বকে যিনি অবগত আছেন, তিনিই বেদবিদ, বা বেদজ্ঞ। বোর্থঃ-বেদ অর্থ জ্ঞান। এই বিশ্ব সংসারে যে অনন্ত জ্ঞান ছাইয়া রহিয়াছে, তাহাই বেদ। এই বেদ বা * এই শ্লোকে অস্থায়ী (অসৎ ) বিশ্বকে প্রবাহ রূপে স্থায়ী বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ এই যে যদিও বিশ্বজগৎ অস্থায়ী অসৎ পদার্থ হউক কিন্তু যিনি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরমাত্ম শক্তি হইতে পুনঃ পুনঃ উদ্ভব হইয়া তাহাতেই লয় হইতেছে বলিয়া অবগত আছেন, তাহার ক্ষে বিশ্ব জগৎ প্রবারূপে বর্তমান রহিয়াছে। এই সৃষ্টি ও লয় প্রবাহের অবস্থা এবং তৎ কারণ ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতির মূল পরব্রহ্মক্তে, যিনি, জানিতে পারিয়াছেন তিনিই বেদবিদ- মুক্তিবাদ ৮১ ; **** । . ‘। অনন্ত জ্ঞান একই পরমাত্মশক্তির বিকাশ। ইহা ব্যক্তি বিশেষের চিন্তার উদ্ভাবিত ফল নহে। তাই বেদ নিত্য ও অপৌরুষেয় ; অর্থাৎ ভগবৎ প্রেরিত বলিয়া আৰ্য ঋষিগণ কীৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। এই অনন্ত জ্ঞানের, অংশিক তত্ত্ব আৰ্য ঋষিগণ পরম্পরায় সংগৃহিত হইয়া বর্তমানে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হইয়াছে ; আমরা সেই গ্রন্থকে বেদ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি। বাস্তবিক পক্ষে অনন্ত জ্ঞানের ইয়ত্তা করা অসম্ভব, এজন্য জ্ঞান বা বেদ অপৌরুষেয়। ইহা কিছুমাত্র অতিরঞ্জিত বা সংশয়াত্মক কথা • হে। গীতা বিশ্ব সংসারের অবস্থাদি অবলম্বনে অতি সংক্ষেপে ও সরল ভাষায় এই মহাতত্ত্ব জানাইয়া দিয়াছেন; তাই গীতা বেদ। ৪র্ক্স সমন্বয়ে গীতা :- ভগবদগীত বিশ্বতােমুখী বা সাৰ্বজনীন গ্রন্থ। গীতায় সার্বজনীনত্ব অতি সুন্দর ভাবে পরিস্ফুট হইয়াছে। ইহাতে সঙ্কীর্ণতার লেশমাত্রও নাই ; এজন্য ইহা পৃথিবীতে অদ্বিতীয় গ্রন্থ বলিয়া সমস্ত সুধী মণ্ডলী কর্তৃক পরিগৃহীত হইয়াছে। আবাহমান কাল ধরিয়া গীতার ব্যাখ্যা করিলেও তাহা শেষ হইবার নহে; কারণ গীতার শাশ্বত সনাতন ভাব বিশ্বের জ্ঞান-গরিমার সঙ্গে ওতপ্রােত ভাবে জড়িত। যেহেতু বিশ্বের জ্ঞান-গরিমা ব্যাখ্যা করিয়া শেষ করিতে পারে এমত লােক জন্মাইতে পারে না, সুতরাং গীতার ব্যাখ্যাও নিঃশেষে বর্ণন করা যাইতে পারে না। এই প্রকৃতিজাত ধৰ্ম্মে রাজা, প্রজা, ধনী, ০ ১১

৮২
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
দরিদ্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডী নাই, জাতিত্বের বা সম্প্রদায় বিশেষের
কথা নাই, সাকার নিরাকারের উৎকর্ষ অপকর্ষতা নাই।
স্বীয় প্রকৃতি জানিয়া যাহাকে যে ভাবে ডাকিয়া শান্তি বােধ
কর, শ্রদ্ধার সহিত তাহাকে ডাক; সমস্ত ডাক সেই একই
অনির্বচনীয় সর্বশক্তিমান ভগবানে পৌছিবে। এরূপ ভেদ
ও সাম্প্রদায়িকতা বিহীন উদার বাক্য আর কোথায় আছে
জানি না। *
তাই ভগবান গীতায় বলিয়াছেন—
যে যােযাং চাং ভং ভক্তঃ শ্রদ্ধাচ্চিতুমিচ্ছভি।
ভস্য স্যালাং শ্রদ্ধা জামেব বিধাম্যহম।
সতা শ্রদ্ধা মুক্তস্তস্যাৱাধনমীহত।
লভতে চ ভঃ কামায়ৈব বিহিভান
হি তান।
গী ৭২১২২
যে যে ভক্ত যে যে দেবতা শ্রদ্ধার সহিত অর্চনা করিতে
ইচ্ছা করে আমিই তাহাদের শ্রদ্ধা সেই সেই দেবতায় দৃঢ়
করিয়া দেই।
* আমরা জানিয়াছি এক পরব্রহ্ম ব্যতীত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্য কোন
সং বস্তু নাই; স্কুল, সুক্ষ্ম সকলই তঁাহার বিভূতি। সেই একই পরমাত্ম
চৈতন্য হইতেই সমস্ত সম্প্রসারিত এবং তাহাতেই সমস্ত পর্যাপ্ত
হইতেছে । সুতরাং নিজ নিজ প্রকৃতির আয়ত্বাধীনে শ্রদ্ধা পূৰ্ব্বক
যে, যে দেবতার অর্চনা করিয়া ফলপ্রাপ্ত হয় তাহাও সেই সব্বশক্তিমান
পরমাত্ম চৈতন্যেরই দান।

মুক্তিবাদ (তদনুসারে) তাহারা শ্রদ্ধার সহিত তাহাদের অভীষ্ট- দেবকে আরাধনা করিয়া যে ফল প্রাপ্ত হয় তাহাও আমা কর্তৃকই প্রদত্ত হইয়া থাকে। ভগবান ভক্ত অর্জুনকে অতি পরিষ্কার ভাবে জানা- ইয়াছেন:- যেইপ্যন্যদেব ভক্ত যস্ত শ্রদ্ধমান্বিতা। তেহপি মামেব কৌন্তেয় জ্যবিধিপূর্বকম, ॥ গী ৯২৩ । হে কৌন্তেয়। যে সকল ভক্ত আমাকে পূজা না করিয়া শ্রদ্ধার সহিত অন্য দেবতা ভজন করেন, তাহা অবিধিপূর্বক হইলেও তাহারা আমাকেই ভজনা করিয়া থাকেন এইরূপ উদার বাক্য আর কোথাও আছে কি ? প্রকৃত ধৰ্ম্মে সংকীর্ণতা নাই, কারণ ধর্ম এক ভিন্ন দ্বিতীয় নাই। আমরা বুঝিতে না পারিয়া দেবতান্তর অর্চনা করিলেও সৰ্বা- তর্যামী তাহা জানিতে পারেন। জানিতে পারেন যে, তাহারই ভক্ত তাহাকে খুজিয়া পাইতে অসমর্থ, তাই তাহারা নিজ নিজ প্রকৃতির আয়ত্মাধীনে তাহাদের অভীষ্টদেবকে ডাকিতেছে। অনন্তনামী মহাপুরুষ সেই ডাক গ্রহণ করেন এবং ভক্তের অক্ষাভক্ষানুযায়ী কৰ্ম্মফলের বিধান করিয়া দেন। জগতবাসি !. হিংসা দ্বেষ পরিত্যাগ পূর্বক বিশ্বময় তাঁহার বিভূতি জানিয়া প্রাণ ভরিয়া তােমার অভিস্পীত ৮৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও দেবকে ডাক, সেই ডাক সর্বশক্তিমান একই ভগবানে স্পর্শ করিবে। কারণ তিনি ভিন্ন জগতে আর কিছুরই অস্তিত্ব নাই। এক পরমাত্ম চৈতন্য পরব্রহ্মই বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন প্রণালীতে উপাসিত হইতেছেন। শ্রদ্ধা সহকারে আকুল প্রাণে তাঁহাকে ডাক এবং প্রতিনিয়ত তাহারই কাৰ্য বলিয়া সমস্ত কাৰ্য্য করিয়া যাও বাঞ্ছিত ফল লাভ করিবে, পাপ, তাপ দূরে পলায়ন করিবে, নিজে ধন্য হইবে, সংসার ধন্য করিবে আসক্তি ও ফলাকাঙক্ষা ছারিয়া তােমার অভিষ্ট দেবকে ডাক। তুমি যে সম্প্রদায় ভূক্তই হওনা কেন ভগবৎ কৃপা লাভে বঞ্ছিত হইবে না। আমরা জানিয়াছি জীব পরব্রহ্মের অংশ, মাত্র উপাধি- ঘটিত প্রভেদ। ঘটস্থিত বায়ু ও মুক্ত বায়ুতে যেমত মূলতঃ প্রভেদ নাই জীবাত্মা ও পরমাত্মাতে তদ্রুপ প্রভেদ নাই। আমরা জন্মান্তর বাদে ইহাও জানিতে পারিয়াছি যে জীবাত্মা দেহে অবস্থান কালের আসক্তিবশে শুভাশুভ কাৰ্যাদি লইয়া দেহ পরিত্যাগ করে, এবং ঐ ঐ কাৰ্য জন্য দেহান্তে বিচার হইয়া তদনুযায়ী ভােগ প্রাপ্ত হয়। ভােগান্তে জীব জন্মান্তর গ্রহণ করতঃ কৰ্ম্ম ( সাধনা) করিয়া বিশুদ্ধ হওনান্তর পরব্রহ্মে লীন হয়। দেহান্তরিত আত্মার শুদ্ধাশুদ্ধ অবস্থা বিবেচনায় স্বর্গ বা নরক ভােগ করিতে হয়, এজন্য দেহান্তরিত আত্মাব তৎ- কালীন অবস্থাকে প্রেতাত্মা বা ভােগদেহ বলে, প্রলয়ের পূর্ব পর্যন্ত যেসকল জীব বিশুদ্ধ হইতে পারে না, ঐ সকল জীব মুক্তিবাদ ৮৫ নিজ স্বভাব লইয়াই প্রলয় কালে ব্ৰহ্মসত্তায় বিজাতীয় লয় পায় এবং পুনঃ সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ প্রকৃতি সহ প্রাণিরূপে আবির্ভূত হয়। জীব এইরূপ বিষয়াসক্ত হইলে তাহাকে দুর্গন্ধাশ্রিত বায়ুর ন্যায় মুক্ত পরব্রহ্মে সৰ্ব্বতােভাবে লয় প্রাপ্ত হইতে না পারিয়া সংসারে পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করে, এ সম্বন্ধে গীতা জানাইয়াছেন যে- সভূতানি কৌন্তে প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম, কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদে বিসৃজাম্যহম। = গী ৯৭ হে কৌন্তেয় ! প্রলয় কালে সমুদয় ভূতগণ আমার ত্রিগুণ- ময়ী প্রকৃতিতে লয় প্রাপ্ত হয়। সৃষ্টি কল্পে আমি পুনৰ্ব্বার তাহাদিগকে সৃজন করিয়া থাকি। সেই সকল সৃষ্টজীব কল্পান্তে যে যে ভাব লইয়া লয় পাইয়াছিল সেই সেই ভাব লইয়াই পুনরাগত হয়। প্রতি স্বামবষ্টভ্য বিহুজামি পুনঃ পুন। ভূতগ্রাম মিমং কুসুমবশ: প্রকৃততর্কশাৎ । গী ৯৮ আমি স্বীয় মায়ায় অধিষ্ঠান করিয়া জন্মান্তরীণ কাৰ্য্য জন্য স্বভাব বশে এই সকল কর্মাসক্ত ভূত সমূহকে বারম্বার সৃষ্টি করি। সুতরাং জন্মান্তর গ্রহণ রহিত করিতে হইলে জীবকে আকাক্ষা বা আসক্তি পরিত্যাগ করিতেই হইবে । ভােগ লিপসা পরিত্যাগ করিয়া নিষ্কাম হইতে না পা-িলে ৮৬ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও জীব কিছুতেই পরিশুদ্ধাবস্থায় দেহ পরিত্যাগ করিতে পারে না। গীতা আমাদিগকে জানাইয়া দিয়াছেন। ইহৈব তৈজিত সর্গো যেষাং সাম্যেস্থিতং মন । নির্দোষং হি সমব্রহ্ম তস্মাদুহ্মণিতে স্থিতাঃ ॥ গী ৫১৯ t যাহাদের মন সমতায় অবস্থিত, তাহারা এ জীবনেই সংসার জয় করিয়াছেন, যেহেতু ব্ৰহ্ম সৰ্ব্বত্র সমভাবাপন্ন এবং দোয রহিত সুতরাং তাহাৱাও ব্ৰহ্ম প্রাপ্ত হইয়াছেন। চিত্ত সমতায় স্থির করিতে পারিলে কাজেকাজেই আকাক্ষা বা আসক্তির লোপ করা হয়। তদবস্থায় চিত্ত নির্বিকার ভাবাপন্ন হইয়া নির্বিকার ব্ৰহ্ম সত্তায় পরিণত হইয়া থাকে। সুতরাং চিত্তের সমতা স্থাপন বা আসক্তি বর্জনই ব্ৰহ্ম- প্রাপ্তির প্রধান সােপান। পুন :- কামক্রোধবিমুক্তানাং যতীনাং ভচেতসাম, অভিভাে ব্ৰক্ষনিক্মাণং বৰ্ত্ততে বিভিনাম। গী ৫২৬ কাম, ক্রোধ, বিমুক্ত, সংযতচিত্ত আত্মতত্ত্বজ্ঞ সন্ন্যাসী- দিগের উভয় লােকেই ব্রহ্মে লয় প্রাপ্তি ঘটে। এ স্থলেও আমার কামনা বর্জিত সুতরাং সংযত চিত্তের কথাই পাইতেছি। চিত্ত হইতে কামনা দূর করিতে পারিলেই তাহা সংযত বা সমতা প্রাপ্ত হইয়া নির্বিকারত্ব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। সুতরাং নির্বিকার পর ব্রহ্মের সত্তার সহিত

মুক্তিবাদ।
৮৭
মিলিয়া একত্ব প্রাপ্ত হইবে তাহাতে কিঞ্চিত্রও সন্দেহ
নাই।
মনােবৃত্তি ও যোগ-গীতা আমাদিগকে বলিয়া
দিয়াছেন যে জীবাত্মা ইন্দ্রিয়াদি সহযােগে বিষয় সুখে
অনুরক্ত হয়। যথা,
শ্রোত্রং চক্ষুঃস্পর্শনঞ্চ সনং ঘ্রাণমেবচ।
অধিষ্টায় মনশ্চায় বিষয়াউপসেবতে
গী ১৫৯
জীবাত্মা কর্ণ, নেত্র, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক এই সকল
ইন্দ্রিয় ও মনকে আশ্রয় করিয়া বিষয় সুখ উপভোগ করে।
ইন্দ্রিয়াদি মধ্যে মন প্রধান। মনের ইঙ্গিতে অন্যান্য ইন্দ্রিয়
পরিচালিত হয়, নতুবা অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের স্বাধীন স্বতন্ত্র ক্ষমতা
নাই। সুতরাং মনকে বশীভূত করিতে পারিলে অপরাপর
ইন্দ্রিয়গুলি আপনা আপনি সংযত হইবে। মনের প্রধান
ক্রিয়া আসক্তি বা আকাঙ্ক্ষা। কিসের আকাঙ্ক্ষা ? ফলের
আকাঙ্ক্ষা। আকাক্ষা হইতে কৰ্ম প্রবৃত্তি জন্মে অর্থাৎ
আকাক্ষা হইতে কর্মের ও কৰ্ম্ম হইতে ফলের উৎপত্তি হইয়া
থাকে। কোন কৌশলে মনকে অপরাপর বিষয় হইতে দূরে
রাখিতে পারিলে মন বিষয়াক্ত হইবার সুবিধা পায় না
সুতরাং অনাসক্তচিত্তে শুভাশুভ কোনরূপ অভিলাষ জন্মিতে
পারে না; এবং চিত্ত নির্বিকার অবস্থায় অবস্থান করে।

bro
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
জীব সর্বদা এই অবস্থাপন্ন থাকিতে পারিলে ইহ সংসারেই
ব্ৰহ্ম সত্তায় পরিণত হয়। জীব এই সুযােগে দেহত্যাগ
করিতে পারিলেও ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য মুক্তবস্থা প্রাপ্ত হইয়া
ব্ৰহ্ম সত্তায় লয় হয়। যেহেতু তদবস্থায় নির্বিকার অর্থাৎ
গুণাতীত হয় বলিয়া আত্মাকে বিচারাধীন হইয়া স্বর্গ নরক
ভােগ বা জন্মান্তর গ্রহণ করিতে হয় না, অন্তঃকরণের
অাসক্তিই জীবের বন্ধনের ও বিচারাধীন হইবার কারণ,
কোনও কৌশলে অর্থাৎ যােগবলে মনের আসক্তি দূর করিতে
পারিলে জীব অনাসক্ত সুতরাং নির্বিকার ভাবে দেহত্যাগ
করতঃ স্বীয় স্বরূপ ব্ৰহ্ম সত্তায় স্বজাতীয় লয় প্রাপ্ত হয়।
যে উপায়ে মনুকে বিষয়াসক্তি হইতে দূরে রাখা যাইতে
পারে সেই কৌশলটী কি তাহা আমাদিগকে দেখিতে হইবে।
আমরা দেখিতেছি তীব্র আসক্তি থাকা সত্ত্বেও, মন একই
সময়ে একাধিক বিষয়ে লিপ্ত হইতে পারে না; সুতরাং
পঞ্চকন্মেন্দ্রিয়ের কোনও একটি ইন্দ্রিয় ভােগ্য বিষয়ে মন
লিপ্ত থাকিলে অন্য চারিটি ইন্দ্রিয় ভােগ্য বিষয় হইতে
মন দূরে অবস্থিত থাকে। এইরূপ যদি মনকে সকল
ইন্দ্রিয়ের বিষয়াসক্তি হইতেই সর্বাংশে সরাইয়া লইয়া
নির্বিকার ব্ৰহ্ম সত্তায় স্থাপন করা যায়, তবেই মনের
নির্বিকারত্ব প্রাপ্ত হেতু ব্ৰহ্মপ্রাপ্তি ঘটে। এই কৌশলই
যােগ শব্দে বাচ্য। মনের বিষয়াসক্তির তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে
মন একই সময়ে একাধিক বিষয়ে আসক্ত হইতে পারিবার

মুক্তিবাদ। ৮১ । ক্ষমতা না থাকাই জীবের প্রতি ভগবৎ কৃপার অপরিসীম দয়া ও আকর্ষণ, ইহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। সর্বশক্তিমান পরমকারুণিক ভগবান জীবকে প্রকৃতি গুণে মায়ামুগ্ধ করিয়াও মনের একত্বে স্থিতির ব্যবস্থা রাখিয়া মায়ামুক্ত করতঃ মোক্ষ প্রাপ্তি কল্পে তিনটি প্রশস্ত যােগপন্থা উন্মুক্ত করিয়া রাখিয়াছেন। জ্ঞানযােগ, ভক্তিযােগ এবং কৰ্ম্মযােগ। সামর্থ্যানুসারে মানব ইহার যে কোন পন্থায় যোগযুক্ত হইতে পারিলেই পরমার্থ লাভে সমর্থ হইতে পারে। যােগপন্থা এয়ের প্রত্যেকটীই মােক্ষপ্রদ আমরা যখন যে কোনও কাজ করি তাহতেই জ্ঞান ভক্তি ও কর্মের সত্তা রহিয়াছে। কারণ জ্ঞান না থাকিলে কর্ম প্রবৃত্তি জন্মে না, কর্মে ভক্তি বা আসক্তি না থাকিলেও কর্ম- সাধনে তৎপরতা জন্মে না সুতরাং কর্মে জ্ঞান ও আসক্তি (ভক্তি) রহিয়াছে।# এই জ্ঞান, ভক্তি কি কৰ্ম্ম পরমাত্মায় পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হইলেই যোগযুক্ত বলা যায়। : জ্ঞান দ্বিবিধ ; পরােক্ষ ও অপরােক্ষ। শাস্ত্রাদি অধ্যায়ন ও গুরু বাক্য শ্রবণে ভগবৎ সত্তায় বিশ্বাস স্থাপন করাকে পরােক্ষ এবং ব্ৰহ্ম সত্তা স্বয়ং উপলদ্ধি করাকে অপরােক্ষ জ্ঞান কহে। আত্মবিহীন দেহকে যেমন আমরা * ঈশ্বরে বা গুরুজনে মনের ধ্যান ধারণাকে ভক্তি এবং ইন্দ্রিয় ভোগ্য বিষয়ে ধ্যান ধারণাকে অাসক্তি বলে সুতরাং উভয়ই অন্তঃকরণের বৃত্তি বিশেষ।

৯৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও পরিত্যাগ করি, অপরােক্ষ জ্ঞানী স্কুল জগৎকে তদ্রুপ পরি- ত্যাগ করিয়া ব্ৰহ্ম সত্তায় অহংসত্তা মিশাইয়া দেন। জ্ঞান- যোগীর অহং ভাব পরিত্যক্ত হয় বলিয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত পদার্থে ব্ৰহ্মদর্শণ করেন। তাহার চক্ষে, জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে ব্ৰহ্ম ব্যতীত আর কিছুই পরিলক্ষিত হয় না। এই অবস্থাকে “সৰ্ব্বং খন্বিদং ব্ৰহ্ম ” ভাব বলা যায়। এই জ্ঞান অতি উচ্চ, তাই জ্ঞান প্রশংসা স্থলে ভগবান বলিয়াছেন— শ্রেয়া দ্রব্যমন্না, ঘাজ, জ্ঞানষ গুপ সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে ॥ অথৈবংসি সমিন্ধৈাইগ্নিভস্মসাৎ কুরুতেইজ্জন। জ্ঞানাগ্নিঃ সৰ্ব্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথ। ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্ৰমিহ বিদ্যতে। ভৎ স্বয়ং যোগ সংসিদ্ধ কালেমানি বিন্দত। গীঃ ৪৩৩৩৭-৩৮ শ্লোক। হে অর্জুন! দ্রব্যময় যজ্ঞ অপেক্ষা জ্ঞান যজ্ঞ শ্রেষ্ঠ, যেহেতু হে পার্থ ! সমস্ত কৰ্ম্মই জ্ঞানের অন্তভূক্ত। হে অর্জুন যেরূপ প্রচণ্ড অগ্নি কাষ্ঠ সমূহকে ভস্মসাৎ করে, সেইরূপ জ্ঞানগ্নি সমস্ত কর্মকে ভস্মসাৎ করে। ইহলােকে জ্ঞানের ন্যায় পবিত্র আর কিছুই নাই। যোগসিদ্ধ ব্যক্তি যথা সময়ে তাহ স্বীয় আত্মাতেই অনুভব করিয়া থাকেন। জ্ঞান যােগী সৰ্ব্বদা সৰ্বত্ৰ সম ভাবে ব্ৰহ্মদর্শন ও ব্ৰহ্মভাব পরিপােষণ করেন বলিয়া তিনি স্বয়ং ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হযথা * Wor

মুক্তিবাদ
৯১
ব্ৰহ্মাৰ্পণং ব্রহ্মহবিব্রহ্মাগ্নেী ব্ৰহ্মণ হুতম্।
বৈ তেন গন্তব্যং ব্রহ্ম কর্ম সমাখিনা ।
গীঃ ৪২৪ শ্লোক।
অর্পণ (হাতা ব্ৰহ্ম, ধৃত ব্ৰহ্ম, অগ্নিব্ৰহ্ম, হােমব্রহ্ম,
এইরূপ যিনি ব্রহ্মরূপ কৰ্ম্মে সমাহিত হন তিনি ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত
হন অর্থাৎ তিনি নিজেও ব্ৰহ্ম হইয়া যান।
জ্ঞান যােগের যােগা বিশুদ্ধাদ্বৈতবাদী সকল পদার্থের
অস্থায়িত্ব অনুভব করিয়া এক ব্ৰহ্ম, সত্তা ভিন্ন অন্য কোন
অস্থায়ী বস্তুর অনুরাগী নহেন। জ্ঞানযােগীকে যদিও কর্ম
করিতে হয় কিন্তু ঐ কর্ম দ্বারা তিনি আধদ্ধ হন না। যথা :-
যােগসংস্কৰ্ম্মাণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়।
ভাঙবং ন কর্মাণি নিবপ্লন্তি ধনঞ্জয় ॥
গী ৪৪১
হে ধনঞ্জয়! যোগবলে যিনি সমস্ত কৰ্ম্ম ভগবানে অর্পণ
করিতে পারিয়াছেন এবং আত্মতত্ত্ব জ্ঞান দ্বারা যাহার
সৰ্ববিধ সংশয় ছিন্ন হইয়াছে, কৰ্ম্ম সকল তাহাকে আবদ্ধ
করিতে পারে না। যেহেতু জ্ঞানী যে কোন কাৰ্য্য করিলেও
তাহাতে কৰ্ম্ম বন্ধন প্রাপ্ত হন না। তাহাদের ব্রহ্ম প্রাপ্তি
বা মােক্ষ লাভ হয়।
লভন্তে প্রহ্ম নিব্বানন্বষয়ঃ ক্ষীণ কলুষাঃ।
ছিন্নদ্বৈধা তাত্মানঃ সৰ্ব্বভূতহিতে ভা।
গীঃ ৫২৫ শ্লোক।

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও যাহাদের পাপক্ষয় ও সংশয় ছেদন হইয়াছে, যাহারা চিত্তকে সংযত করিতে পারিয়াছেন এবং সৰ্ব্বভূত হিতে রত রহিয়াছেন, এতাদৃশ ঋষিগণ ব্ৰহ্মনিৰ্বাণরূপ মােক্ষ লাভ করেন। সুতরাং যােগযুক্ত সমদর্শী, জ্ঞানী, জীবদ্দশাতেই ব্ৰহ্ম স্বরূপত্ব লাভ করিয়া থাকেন। যথা : সৰ্ব্ব ভূমাত্মানং সৰ্ব্বভূতানি-চাক্মনি। ঈক্ষতে যােগমুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শন। যে মাং পশ্যতি সর্বত্র সর্ব ময়ি পশ্যতি। ভস্যাহং ন প্রণশ্যামি স জমে ন প্রণশ্যতি || গীঃ ৬২৯-৩০ শ্লোক। যােগে সমাহিত চিত্ত, সর্বত্র সমদর্শী যোগী আত্মাকে সৰ্ব্ব- ভূতে এবং সৰ্ব্বভূত আত্মাতে দর্শন করেন। যিনি আমাকে সৰ্ব্বভূতে এবং সৰ্ব্বভূত আমাতে দেখিতে পান, আমি তাহার পরোক্ষ হইনা এবং তিনিও আমার পরােক্ষ হন না। অর্থাৎ তদ্রুপ যােগী জীবদ্দশাতেই মােক্ষপদ বা মুক্তিলাভে সমর্থ হন বা ব্রহ্ম স্বরূপত্ব প্রাপ্ত হন। ক্তিযোগ-রজোগুণ সমৃদ্ভব মানবজীবনে, জ্ঞানযােগ সাধনা অতীব কষ্ট সাধ্য। যিনি জন্মান্তরীণ সুকৃতি বশে ও কঠোর যােগাবলম্বনে রজোগুণ সমূলে উৎপাটিত করিতে পারিয়াছেন, তিনিই জ্ঞানযােগের যযাগী হইতে পারেন। জগতে অধিকাংশ মনুষ্য এই যােগে যােগযু ক্ত হইতে পারি- মুক্তিবাদ = তেছেন না, তাই ভগবান ভক্তি যােগের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া বলিয়াছেন :- কোেহধিকতরস্তেষামব্যাসক্তচেতসাম্। অব্যক্তা হি গভিদুঃখং দেহবভিৱপ্যতে || গীঃ ১২৫ নিগুণ, নির্বিকার পরব্রহ্মে আসক্ত চিত্ত ব্যক্তিগণের অতিশয় ক্লেশ হইয়া থাকে ; যেহেতু দেহধারী নিগুণ ব্রহ্মভাব নিরতিশয় ক্লেশে লাভ করিতে পারেন। তাই ভগবান দেহধারীর পক্ষে গুণ, সাকার উপাসনার বিশিষ্টতা উপদেশ দিয়াছেন – মাবেশ্য মনাে যে মাং নিত্যমুক্তা উপভে। শ্রদ্ধা পৱম্রোপভাস্তে মে মুক্তম মতা: | গীঃ ১২২ অামাতে মনােনিবেশ করিয়া, মদনিষ্ঠ হইয়া, ভক্তিসহকারে যাহারা আমার সগুণ স্বরূপের আরাধনা করেন, তাহারাই শ্রেষ্ঠ যােগী বলিয়া আমার অভিমত। প্রকৃত পক্ষে আমরা নিরবচ্ছিন্ন নিন নিরাকার ব্ৰহ্ম- সত্তার উপলব্ধি করিতে পারি কি? পারি কি সমস্ত জাগ- তিক ভুল পদার্থের সত্তাহীনতা উপলব্ধি করিতে ? পারি কি সকল পদার্থে ব্ৰহ্মভাব স্থাপন করিতে ? না পারিলে তাহারই স্বরূপ মূর্তিতে আমাদের আশ্রয় লইতে হইবে। মূর্তি ও ব্রহ্মে প্রভেদ নাই, যেহেতু মূর্তভাব বন্ধ করিয়া দিলে ব্ৰহ্মভাবের ৯৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও ৩: • ফুরণ হইতে পারে না। ব্ৰহ্মসত্তায় মন স্থির করিতে হইলে মূৰ্ত্তিই প্রধান সাধন। আমরা বিশ্ব সংসারের কাৰ্য কলাপ দেখিয়া ভগবান অশেষ কল্যানগুণের আধার বলিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য হই। আমা সাকার হইতে জ্ঞান, শক্তি, দয়া, মায়া, প্রেম, ভক্তি ইত্যাদি সংগ্রহ করিতে পারি বলিয়াই ভগবানে অশষবিধ ক্ষমতার আরােপ করিতে পারি সুতরাং স্থূলরূপ ধরিয়া ভগবৎ শক্তির চিন্তা করাই স্বাভাবিক। রূপ সরাইয়া লইলে নিরবচ্ছিন্ন অভাব আমাদের মনে উপ- স্থিত হয়। পিতা, মাতা গুরুজনকে ভক্তি করিতে দেখিয়া আমরা ভক্তির ভাব আয়ত্ব করিতে পারিয়াছি ; দীন দুঃখীকে সহায়তা করিতে দেখিয়া দয়ার ভাব ধারণা করিতে পারি- ছি। এইরূপ সকল ভাব আমরা সংসারের স্থলবস্ত হইতে সংগ্রহ করিয়াছি। সংসারে স্কুলবস্তুর অভাব হইলে ঐ সকল ভাব আমাদের মনে জাগ্রত হইবার কোনও কারণ ছিলনা। যেখানে সােহং জ্ঞানযােগী অদ্রুৈত বাদী উপস্থিত, তথায় উপাসনা আরাধনার স্থান থাকা দৃষ্ট হয় না। যেভাবে পিতা, মাতা ও সন্তান নাই, দীন, দুঃখী ও সহায়ক নাই, গুরু ও শিষ্য নাই, ভগবান ও ভক্ত নাই, যেভাবে সমস্তই ব্ৰহ্ম ; ব্ৰহ্ম ব্যতীত আর কিছুই পরিলক্ষিত হয় না তথায় উপাসনা আরাধনার স্থান কোথায় ? আমরা গৃহী। গৃহীর উপাসনা আরাধনা ব্যতীত আত্মপ্রসাদ জন্মিতে পারে না; সুতরাং মূর্তি সাহায্যে ভগবৎ দর্শন পাইতে চেষ্টা করাই

মুক্তিবাদ।
গৃহীর পক্ষে যুক্তি সঙ্গত হইবে। এইভাব নিরবচ্ছিন্ন দৃঢ়
করিতে পারিলেই আত্মশান্তি বা মােক্ষপ্রাপ্তি হইতে পারে ।
আমরা সর্বদা “আমিত্ব” লইয়াই ব্যস্ত। আমার পিতা,
আমার মা, আমার ভ্রাতা, ভগিনী, স্ত্রী, পূত্র, কন্যা,
বান্ধব, ঘর বাড়ী, দ্রব্যসামগ্রী; সকলই আমার। সকল
আমিত্বের উপর “দেহ আমি” ছারিয়া আমরা তিষ্ঠিতে পারি
কৈ ? এই আমিত্বের ভিতর সুখন্বেষণ করিতে যাইয়া
আমরা দুঃখসাগরে নিমজ্জিত হইতে চলিয়াছি।
চলিয়াছি। যতই
আমিত্বের প্রসার বৃদ্ধি করিতেছি, ততই দুঃখের অপরিসীম
বােঝা আমাদের স্কন্ধে চাপিতেছে। তাই পরম কল্যাণ
গুণাধার এই অহং ভাবের ভিতর দিয়াও যাহাতে আমরা
দুঃখ জলধির পর পারের সন্ধান পাইয়া শান্তি ধামের আশ্রয়
পাইতে পারি তাহার পথ প্রসস্ত করিয়া পাপী তাপীকে
ডাকিয়া বলিয়াছেন :-
মন্ম ভব মক্তো মযাজী মাং নমস্করু।
মামেবৈশাসি মুবৈমাত্মানং মৎ পরায়ণঃ |
গী ৯৩৪
তুমি মদগত চিত্ত হও, মদ্ভক্ত ও মদুপাসক হও। আমাকে
প্রণিপাত কর। এইরূপে আমার শরণাপন্ন হইলে, আমাকেই
পাইতে পারিবে।
ভক্তি যােগের মােগী পরমাত্মা পরব্রহ্মকে সাক্ষাৎ প্রভু
মনে করিয়া কর্তব্যপরায়ণ বেতনভােগী ভৃত্য যেমন সতত

৯৬ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও প্রভুর আদেশ পালন করাই প্রধান কাৰ্য মনে করে ; প্রভুর তুষ্টিতেই সন্তুষ্ট হয়; প্রভুর লাভেই লাভবান মনে করে ; ভক্ত তদ্রুপ ভগবানের কাৰ্য বলিয়া সমস্ত কৰ্ম্ম করিয়া আত্মপ্রসাদ, উপভােগ করেন। দেহেন্দ্রিয়াদি যাহা ভক্ত পাইয়াছে তাহাই তাহার বেতন। এই বেতন দিয়া প্রভু ভক্তের অহংয়ত্ব ক্রয় করিয়া রাখিয়াছেন, ভক্ত এই মনে করিয়া তৎ- কাৰ্য্য সাধনে ব্যস্ত। কোন কাৰ্য তাহার নিজের নহে। ভক্ত খাওয়া লওয়া, চল ফিরা, আচার ব্যবহার, সমস্ত কাৰ্য ভগবৎ কাৰ্য বলিয়া উপলব্ধি করেন। প্রভু হইতে পৃথক ভাবে আছি, আমি প্রভু নহি, আমি সেবক; শুধু এই ভাবেই ভক্ত আমিত্ব” হৃদয়ে পােষণ করেন। ভক্তহৃদয়ে সংকীর্ণতার লেশ মাত্রও স্থান পায় না। ভক্ত হৃদয় কোমল, অপরাধীর দণ্ড দিবার ভাব তাহার মনে উদয় হয় না। সমস্তই ভগবৎ বিভূতি বলিয়া বিশ্ব জগৎ তাহার কৰ্ম্মক্ষে। ভক্তের “আমি” অহঙ্কার বজ্জিত। প্রভুর সেবা করিবার জন্যই ভক্ত “আমিত্ব” টুকু বজায় রাখিয়াছে। অহংটুকু না রাখিলে প্রভুর কাৰ্য কে করিয়া দিবে ? তাই ভক্তের অহং টুকু নিজস্ব ; অন্য সকলই প্রভুর। অহো ! ভক্ত হৃদয়ের কি মধুর ভাব! ভগবান, ভক্তের কামনা, বাসনা জানিতে পারেন। ভগবান ভক্তকে মন্ত্র দিয়াছেন :- যৎ কৱােষি যদাসি যজ্জহােষিদদাসিযৎ। যৎ তপস্যসি কৌম্নে ভৎ কুক্ষ মদাপম | = গী ৯২৭

মুক্তিবাদ।
হে কৌন্তেয় ! তুমি যাহা কিছু কর, যাহা আহার কর,
হােম কর, দান কর কিম্বা তপস্যা কর, তং সমস্তই আমাতে
সমর্পণ কর।
কেন ? তাহা হইলে কি হইবে ।
শুভাশুভফলৈৱেবং মােক্ষ্যসে কৰ্ম্মবন্ধনৈঃ।
সন্ন্যাস যোগযুক্তাত্মা বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।
গী ৯২৮
তাহা হইলে তুমি কৰ্ম্মের শুভাশুভ ফল বন্ধন হইতে
মুক্ত হইতে পারিবে এবং সন্ন্যাস যােগসম্পন্ন সুতরাং বিমুক্ত
হইয়া আমাকে লাভ করিতে পারিবে। কারণ :-
সমােহহং সর্বভূতেষুন মেদেমোহস্তিন প্রিয়।
ষে ভজন্তি তু মাং ভক্তা ময়ি তেতেষুচাপাহম, ॥
---
গী, ৯২৯
আমি সৰ্ব্বজীবে সমভাব সম্পন্ন সুতরাং আমার দ্বেষ্য
কিম্বা প্রিয় নাই ; পরন্তু যাহারা ভক্তি পূৰ্ব্বক আমাকে ভজনা
করেন, তাহারা অামাতেই থাকেন এবং আমিও সর্বদা সেই
সকল ভক্তে বিরাজ করি।
তাই ভক্ত নিজ ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র অহং ভাব বজায় রাখিয়াও
প্রভু ভিন্ন কিছুই দেখে না, কিছুই করে না এবং যাহা কিছু
করে সকলই প্রভুর তরে করে বলিয়া সতত ধ্যান ধারণা
রক্ষা করিয়া থাকে, তাহার অন্তঃকরণ বিষয়ে আসক্ত
হইবার অবকাশ পায় কৈ ? ভক্ত, স্ত্রী, পূত্র, ধন, মান, রাজ্য

১৮
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
==
সম্পদ প্রভুর তৃপ্তার্থে নামে মাত্র ভােগ করে বলিয়া কিছুতেই
আসক্ত হইয়া, নিজস্ব করিয়া তােলে না। এমন কি ভক্ত
ব্ৰহ্মপদ, বিষ্ণুপদ কিছুই চাহে না; চাহে মাত্র প্রভুর সেবা
করিতে ভক্ত স্বকীয় প্রাণকেও প্রভু কাৰ্যে বলিদান করিতে
কিঞ্চিত্র ভীত বা সঙ্কুচিত হয় না।
ভক্ত প্রভু লইয়াই সদাসর্বদা ব্যস্ত। ভক্তের আত্মা
দেহত্যাগ কালে ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্য কিছুই লইয়া যাইবার
কারণ নাই; সুতরাং দেহান্তে ভক্তজীবকে বিচারাধীন
হইতে হয় না বলিয়া ভক্ত মােক্ষ প্রাপ্ত হয়। ভগবান ভক্ত
দাসকে নিজ সত্ত্বায় মিশাইয়া লন। ভগবান বলিয়াছেন ।
ভক্ত্য! মানজানাতি যাবান ঘস্তাস্মি ভবতঃ।
ভভো মা: 'ভতে জ্ঞাত্বা বিশদভ ভদনন্তৱম ।
গী ১৮৫৫
ভক্ত আমার সর্বব্যাপী ও সচ্চিদানন্দ ভাব সম্পূর্ণরূপে
জানিতে পারেন এবং আমাকে স্বরূপতঃ জানিয়া আমাতেই
প্রবেশ করেন; অর্থাৎ লয় প্রাপ্ত হন।
ভগবান ভক্তের কল্যানার্থ আরও বিশেষ ভাবে বলিয়াছেন :-
মন্মনা ভবক্ত মদ্যজী মং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সভ্যং তে প্রতি জানে
প্রিয়ােইসিমে।
সর্ব পৰ্মা পৱিত্যজ্য মামেকং শরণং ভক্ত।
অহং ত্বং সপাপেভ্যো মােক্ষয়্যিামি মা শুচঃ ॥
গী ১৮৬৫-৬৬

মুক্তিবাদ।
হে অর্জুন! তুমি মত চিত্ত হও, আমারই ভজনশীল
হও, আমাকে প্রণিপাত কর ; তাহা হইলে আমাকেই প্রাপ্ত
হইবে; ইহা আমি তােমাকে প্রতিজ্ঞা পূৰ্ব্বক বলিতেছি,
কারণ তুমি আমার অতীব প্রিয়। তুমি অপর সমুদয় ধর্মের
অনুষ্ঠান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক মাত্র আমার শরণাগত হও আমি
তােমাকে সর্বপাপ হইতে বিমুক্ত করিব। অতএব শােক
করিও না।
কৰ্ম্মযােগ আমরা দেখিলাম, জ্ঞানযােগী ও ভক্তিযােগী
উভয়ের চরমসীমা একই স্থানে সন্নিবিষ্ট। এক্ষন কর্মযােগীর
অবস্থা কি তাহা বিবেচনা করিব। আমরা প্রত্যক্ষ দেখি-
তেছি, মানব নিঃশেষে কৰ্মত্যাগ করিতে পারিতেছে না;
জাগ্রত অবস্থায় সমস্ত ইন্দ্রিয়াদি কাৰ্যে ব্যস্ত থাকে। কাৰ্য্য
না করিয়া কেহ ক্ষণকালও তিষ্ঠিতে পারে না; এমন কি
নিদ্রাবস্থায় বহিরিন্দ্রিয়াদির কাৰ্য্য বন্ধ থাকিলেও স্বপ্নে
মনেন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য চলিতে থাকে। কৰ্ম্ম জন্যই স্থূল দেহের
নির্মাণ। অশেয়বিধ অশান্তির কারণ হইলেও কর্মত্যাগ
করিলে শরীরযাত্রাও নিৰ্বাহ হইতে পারে না। তাই
ভগবান বলিয়াছেন :-
নিম্নতং কু কৰ্ম্ম প্ৰং কৰ্ম্ম জ্যােহ্যকৰ্ম্মনঃ।
শরীযাত্রাপি চ তেন প্রসিধ্যে কৰ্মণ ॥
গী ৩৮
তুমি নিয়ত কর্মের অনুষ্ঠান করিবে, যেহেতু কৰ্ম্ম না

১০০
গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
করা অপেক্ষা কর্ম করা শ্রেয়ঃ । কৰ্মত্যাগ করিলে তােমার
শরীর যাত্রাও নিৰ্বাহ হইতে পারে না।
কৰ্ম্মই বন্ধনের হেতু ; সুতরাং কৰ্ম্ম করিয়াও যাহাতে
বন্ধন না ঘটে এজন্য ভগবান বলিয়াছেন।
যজ্ঞর্থাৎ কৰ্ম্মােহন্যত্র লােকোইয়ং কর্মধন্ধন
তদর্থং কৰ্ম্ম কৌন্তেয় মুক্ত সমাচর |
গী ৩৯
;
যজ্ঞ অর্থাৎ ভগবৎ প্রীত্যর্থ ভিন্ন অন্য কাৰ্যে লােকের
কৰ্ম্মবন্ধন ঘটে ; অতএব হে কৌন্তেয়। তুমি ভগবৎ প্রীত্যর্থ
নিষ্কাম হইয়া কৰ্ম্ম কর ।
নিষ্কাম হইয়া কৰ্ম্ম করিলে কি হইবে, তাহাও ভগবান
জানাইয়া দিয়াছেন :-
তস্মাদ সভং কার্যং কৰ্ম্ম সমাচর।
অসক্তোহ্যাভ কৰ্ম্ম পৱমাগােতি পুরুষ।
গী ৩১৯
;
অনাসক্তভাবে কাৰ্য করিলে পুরুষের পরম ( মােক্ষ)
লাভ ঘটে ; অতএব তুমি আকাক্ষা রহিত হইয়া কর্তব্য
জ্ঞানে কাৰ্য কর। কারণ :
ব্ৰহ্মণ্যাথা কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ভক্ত। কৱোভি ।
লিপ্যতেন সপাপেন পদ্মপত্রমিবাস।
গী ৫।১০
ব্রহ্মে কৰ্ম্মফল সমৰ্পণ করিয়া, আসক্তি পরিত্যাগ পূর্বক

মুক্তিবাদ
১০১
যে ব্যক্তি কৰ্ম্ম করে, পদ্মপত্রের জলের ন্যায় তাহার কর্মে
লিপ্ত বা বন্ধন হয় না। প্রকৃত পক্ষে ঃ-
অনাশ্রিভঃ কর্মফলং কাৰ্যং কৰ্ম্ম করােতি যঃ ।
স সন্ন্যাসী যােগী চ ন নিৱগ্নির্মচাক্রিয়ঃ ।
যং সন্ন্যাসমিতি প্ৰাহুর্ভোগং ভং বিদ্ধি পাব।
ন হসন্যস্তসঙ্কল্পা যােগী ভবতি কচ্ছন।
গী ৬১-২
কৰ্ম্মফলের আকাক্ষা না করিয়া অবশ্য কর্তব্যবােধে যিনি
কৰ্ম্ম করিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত যােগী ; ফলাকাঙ্ক্ষী
সাগ্নিক বা নিরগ্নিক তপস্বী, যােগী পদ বাচ্য নহেন।
হে পাণ্ডব! পণ্ডিতগণ যাহাকে সন্ন্যাস বলেন, তাহাই যােগ
বলিয়া জানিও, কারণ যিনি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করিতে পারেন
নাই, তিনি কখনও কর্মযােগী হইতে পারেন না।
সুতরাং কৰ্ম্মফলত্যাগী কৰ্ম্মযােগীর অবস্থান সন্ন্যাসী বা
জ্ঞানীর সমতুল্য।
যেহেতু কৰ্ম্মফুল নিজ করায়ত্ব নহে, লােক ইচ্ছা করিলেই
তদনুরূপ ফল পাইতে পারে না; তদ্ধেতু কৰ্ম্মফল ফলদায়
অৰ্পণ করিয়া অনাসক্ত ভাবে কৰ্ম্ম করিতে পরিলে কর্মবন্ধন
হইতে পারে না বলিয়া অন্তঃকরণ মলমলিন হয় না; সুতরাং
জীব নিরুদ্বেগে অনাসক্ত অবস্থায় দেহ পিঞ্জর পরিত্যাগ
করতঃ জন্ম জন্মান্তর ভোগের দায় হইতে অব্যাহতি পায়।
ইহাই কৰ্ম্মযােগীর লক্ষণ। এই যােগে যােগযুক্ত হইলে

১০২ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও যে মনের আসক্তি কোথা হইতে আসিবে ? যাহার আকাঙ্ক্ষা নাই, তাহার কৰ্ম্ম করিলেও উদ্বেগগ্রস্থ হইবার কারণ নাই। ভাল হউক, মন্দ হউক ফলাকাঙ্ক্ষাই উদ্বেগের মূল। কার্যে উদ্বেগ নাই, তাহাতে বন্ধনও নাই, তাহার বিচারাধীন হইবার কোনও কারণ নাই ; সুতরাং তদ্রুপ দেহান্তরিত জীবের স্থানান্তরে থাকিবার কারণ না থাকায় ব্রহ্মে লয় বা মােক্ষ প্রাপ্তি ঘটে। ইহাই দয়াময়ের বিধান। গৃহী থাকিলে মানবজগৎ ক্ষণকালও তিষ্ঠিতে পারে না, অথচ গৃহীকে মােক্ষলাভ করিতে হইবে এজন্য দয়াময় এই বিধান করিয়া জানাইয়াছেন - ভপস্বিতভ্যাধিকো যােগী জ্ঞানিভ্যাহপি মােহধিক। কল্পিভ্যশ্চাধিকো যােগী ভস্মযােগী ভবাঞ্জন গী ৬৪৬ ( ফলাকাঙ্ক্ষী সাগ্নিক) তপস্বী হইতে কৰ্ম্মযােগী শ্রেষ্ঠ, পরােক্ষ ) জ্ঞানী হইতেও কৰ্ম্মযােগী শ্রেষ্ঠ ; ( ফলাকাঙক্ষী ) কৰ্ম্মী হইতেও ( ফলত্যাগী) কৰ্ম্মযােগী শ্রেষ্ঠ ; তাতএব হে অৰ্জ্জুন! তুমি ফলাভিলাসত্যাগী কৰ্ম্মযােগী হও। কর্মযােগী হইলে কি হইবে তৎ সম্বন্ধে ভগবান বলিয়াছেন- বেদেষু যজ্ঞে তপঃ সু চৈব দাযেৎ পুণ্য ফল প্রষ্টি। অভ্যেতিতৎ সমিদং বিঘি যােগী পরং স্থানমুপৈতি চাদ্যমগী ৮২৮ ;

মুক্তিবাদ
১০৩
বেদে, যজ্ঞে, তপস্যায় ও দানে যে সকল পূণ্যফল শাস্ত্রে
বিহিত আছে, কৰ্ম্মযােগী সেই সকল ফল অতিক্রম করিয়া
জগতের কারণ স্বরূপ স্থান (ব্ৰহ্মত্ত্ব ) প্রাপ্ত হন।
যেহেতু রজঃগুশােদ্ভব মানবহৃদয় আসক্তির সুখভবন ;
সুতরাং গৃহী মানবকে স্বীয় প্রকৃতি অনুযায়ী আরাধনা করিয়া
আসক্তি দুর করতঃ মােক্ষ প্রাপ্তির চেষ্টা করিতে হইবে।
মানব ! দেখিলে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অবস্থা! দেখিলে মানব
জীবনের পরিণাম ? এ হেন জীবন লইয়া কতই আস্পর্ধা,
কতই অহঙ্কার, কতইনা কল্পনা জল্পনা করিতেছ। কল্পনার
দাস হইয়া নিত্য জাগ্রত স্বপ্ন দেখিতেছ, সঙ্গে সঙ্গে
দুরাকাঙ্ক্ষার প্রসার বৃদ্ধি করিতেছ। আত্মতত্ত্ব অবহেলা
করিয়া অনিত্য দেহকে নিত্য মনে করিতেছ। ইন্দ্রিয়
তাড়নায় আত্মহারা হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে পরহিংসা, পরদ্বেষ,
পরস্বাপহরণ, আত্মকলহ, পরনিন্দা, মিথ্যা কথন প্রভৃতি
অশেষবিধ পাপানুষ্ঠান নিত্য নৈমিত্তিক কার্যে পরিণত
করতঃ অর্থ ও বাহুবলে লােক সমাজে প্রাধান্য বিস্তার
পূৰ্ব্বক আত্মগােপন করিতেছ। তুমি ঐশ্বৰ্য্য ও পদমর্যাদা
গর্বে স্ফীত হইয়া যে প্রতারণা অন্যকে করিতেছ বলিয়া
আত্মশ্লাঘা উপভােগ কর, নিশ্চয় জানিও তাহা আত্ম প্রতারণা
মাত্র। সাংসারিক ক্ষণভঙ্গুর সুখ যেমন অদূর ভবিষ্যতে
দুঃখেরই হেতু হইয়া দাড়ায়, তােমার কৃত পরহিংসাদিও অদূর
ভবিষ্যতে আত্মকৃত ব্যাধিতে পরিণত হইতে চলিয়াছে।

১০৪ গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও n ar আত্মবােধ-বিস্মৃতিবশে এই সকল কাৰ্য্য করিয়া তোমার নিজকেই অধঃ হইতে অধস্তন প্রদেশে বিচালিত করিতেছ । এই আত্মগােপন আত্মসংহার মাত্র। সাগর জল যেমন সাময়িক ভাবে বাস্পাকারে বায়ুমণ্ডলে লীন হইয়াও সময়ক্রমে আত্মপ্রকাশ করতঃ জলরূপে পরিণত হইয়া পুনঃ সাগর জলেই প্রবেশ করে, কিছুতেই স্বকীয় অবতার বিলােপ সাধন হয় , তােপ তােমার নিজকৃত পরপীড়নাদিও সময়ে আত্ম প্রকাশ করিয়া তােমাকে আক্রমণ করিবে ; তােমাকে আক্র- মণ না করিয়া কিছুতেই তৎসমন্তের বিলােপ সাধন হইবে না। আত্মবঞ্চক ! বিচারের কাল সমাগত প্রায়। সর্বদ্রষ্টার সমক্ষে আত্মগােপন চলিবে না। ভগবানে আত্মসমর্পণ করিয়া আত্মদোষ পৰ্যালোচনা কর এবং তাহা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করিতে অভ্যাস কর। যখন আত্মদোষ সর্বসমক্ষে সরলভাবে প্রকাশ করিতে পারিবে, দেখিবে, তােমাকে পাপ স্পর্শ করিতে পারিতেছেনা। ইহাই পাপ হইতে পরিত্রাণের একতর উৎকৃষ্ট উপায়। চৌরাশীলক্ষ যােনি ভ্রমণান্তর অতি সাধের মানব জীবন লাভ করিয়া যে দুষ্কাৰ্যে রত হইয়াছ, তাহার দণ্ডভােগ করিতে যে কত নরক যন্ত্রণা ভােগ ও জন্ম জন্মান্তর গ্রহণ এবং অসহনীয় আত্মগ্লানি ভােগ করিতে হইবে তাহা কল্পনারও অতীত। অতএব দুষ্কাৰ্য পরিত্যাগ করতঃ সর্বকল্যাণকারী গীতার উপদেশ অনুসরণ কর। যাহার যে, প্রকৃতি তাহা উপলব্ধি করিয়া তদনুযায়ী সাধন মার্গের অনু- * . * * * '';

মুক্তিবাদ। সরণ কর, সিদ্ধকাম হইবে। প্রথমতঃ স্থিরকর যােগত্ৰয় মধ্যে তুমি কোৰ্টী অবলম্বন করিতে সমর্থ। তােমার সামর্থ্য তুমি যেমন বুঝিতে পারিবে, অন্যে তেমন পারিবে না। যখন দেখিবে তুমি কোন কাৰ্যই আসক্তি পরিশূন্য হইয়া করিতে পারিতেছ না, যখন দেখিবে তােমার অভীষ্ট দেবের উপাসনা করিতে বসিলে অভ্যস্থানুযায়ী মুখ হইতে প্রার্থনা মন্ত্রাদি অনর্গল ভাবে বাহির হওয়া সত্বেও তােমার মন বিষয় চিন্তায় নিবিষ্ট হইয়া স্থানান্তরে বিচরণ করিতেছে, নিশ্চয় জানি, বিষয়ে পূর্ণাসক্তি থাকায় তখন পর্যন্ত তােমার উপাসনার ফল ফলিতেছেনা। অভ্যাস করিতে করিতে যখন দেখিবে কৰ্ম্মফলে তােমার স্পৃহা দূরীভূত হইয়াছে, উপাসনায় বসিলে ত্রিজগতের সমস্ত ইন্দ্রিয়বিষয় তােমার মানস পট ছারিয়া পলায়ন করিয়াছে, তখন জানিও তােমার মন সংযত হইয়াছে, তুমি কৰ্ম্মযােগের যােগী হইয়াছ। যখন তােমার সনস্ত কৰ্ম্ম তােমার অভীষ্ট দেবের কৰ্ম্ম বলিয়া হৃদয়ে বদ্ধমূল হইবে, যখন স্ত্রী, পুত্র, পরিবার, বন্ধু, বান্ধব, স্বদেশী, বিদেশী, সকলের কাৰ্য তােমার অভীষ্টদেবের কাৰ্য বলিয়া নিরুদ্বেগে সমভাবে করিয়া যাইতে পারিবে, যখন তােমার আত্মদেহও তােমার অভীষ্টদেব প্রীতিতে বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হইবে না, তখন জানিবে, তুমি ভক্তিযােগের যোগী হইতে পারিয়াছ। যখন অভ্যাস বশে তুমি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে পরমাত্ম চৈতন্য পরব্রহ্ম ব্যতীত অন্য সত্তা উপলব্ধি করিতে পারিবে না, তখন “সৰ্ব্বং- #worterawn

গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও
ঘটিবে।
=
খল্বিদং ব্ৰহ্ম” বলিয়া তুমি সম্যক্‌-দর্শন লাভ করিতে পারিবে ;
তখন জানিবে তুমি জ্ঞানযােগে সিদ্ধিলাভ করিয়াছ। অতএব
বিশেষ প্রণিধান পূৰ্ব্বক স্বকীয় সামর্থ্য স্থির করিয়া শাস্ত্রানু-
মােদিত পথে অগ্রসর হও। শাস্ত্র বিগর্হিত পথে চলিও না,
তাহাতে অনর্থপাত
গীতাউন্মুক্তভাবে জানাইয়া
দিয়াছেন
মঃ শাস্ত্রবিধিমুজ' বৰ্ততে কামচাৱতঃ।
স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখন পৱাং গতিম।
ভচ্ছাং প্রমাণ'তে কার্ষাকার্মা ব্যবস্থিত।
জ্ঞাত্না শাস্ত্র বিপ্লনােক্তং কর্মকমিহাহসি।
গী ১৬২৩-২৪
যে ব্যক্তি শাস্ত্র বিধি উল্লঙ্ঘন পূর্বক স্বেচ্ছানুসারে কাৰ্য্য
করে, সে তত্ত্ব জ্ঞান, শান্তি, সুখ ও পরম গতি প্রাপ্ত হয় না।
অতএব কর্তব্যতা নির্ণয় জন্য শাস্ত্রই তােমার প্রমাণ। সুতরাং
শাস্ত্র বিধি অবগত হইয়া কাৰ্যে প্রবৃত্ত হও।
শাস্ত্রোপদেশ কোথায় পাইবে ?
ভদবিদ্ধি প্রণিপাতেন পবিপ্রশ্নেন সেবা।
উদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিন দর্শিন 4 গী ৪৩৫
জ্ঞানিগণকে প্রণিপাত, প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং সেবা দ্বারা
সেই জ্ঞান লাভ কর। তত্ত্বদর্শী জ্ঞানিগণ তােমাকে উপদেশ
দিবেন। সুতরাং জ্ঞানলাভ করিতে হইলে তত্ত্বজ্ঞানীর
অনুসরণ কর; তবেই মর জগতে অমরত্ব লাভ করিতে
পারিবে।
সমাপ্ত।

শ্রীহরিকিশাের রান্ন বিদ্যাবিনােদ বিৱচিত গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” সম্বন্ধে কতিপয় অভিমত। = স্বনামধন্য দার্শনিকাগ্রগণ্য মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত দুর্গাচরণ সাংখ্যবেদান্ততীর্থ মহােদয় লিখিয়াছেন :- শ্ৰীযুক্ত হরিকিশাের রায় মহাশয়প্রণীত “গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” নামক ক্ষুদ্রকায় পুস্তক খানি আমি যত্নসহকারে পাঠ করিয়াছি গ্রন্থকারের বহুদশি ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাইয়াছি। পুস্তক পাঠে বেশ বুঝিতে পারা যায় যে হরিকিশাের রায় মহাশয় একজন ভাব- প্রবণ লােক ; সেই জন্য তিনি যেখানে যাহা সুন্দর দেখিয়াছেন, উত্তম বলিয়া বুঝিয়াছেন, সেখান হইতেই তাহা উপাদেয় বােধে আদর পূৰ্ব্বক পুস্তক মধ্যে সন্নিবেশিত করিয়াছেন। ভগবদগীতাকে উপলক্ষ্য করিয়া অরাপর গ্রন্থ হইতে যথেষ্ট পরিমাণে পুস্তকের উপাদান সংগ্রহ করিয়াছেন। ঐ সকল উপাদান সংগ্রহের জন্য তিনি যে প্রকার যত্ন উৎসাহ ও উদ্যম পোষণ করিয়াছেন তাহা বড়ই প্রশংসনীয়। যাহারা তত্ত্বানুসন্ধানে তৎপর আশা করি তাহারা রসাস্বাদন করিয়া তৃপ্তি লাভ করিবেন। সুপ্রসিদ্ধ দার্শনিক “গীতায় ঈশ্বরবাদ” প্রভৃতি প্রণেতা শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত বেদান্তরত্ন, M. A. লিখিয়াছেন :- শ্ৰীযুক্ত হরিকিশাের রায় বিরচিত “গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” পাঠ করিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গীতাকে কেহ কেহ Bible . of ৭ * • ।

। humanity বলিয়াছেন। ইহা অতিশয়ােক্তি নহে। বস্তুতঃ গীতার মত সার্বভৌমিক গ্রন্থ জগতে বিরল। এই গীতার যতই আলােচনা হয়। ততই মঙ্গল। নানা জন নানাভাবে নানা ভাষায় এই গীতা সম্বন্ধে আলােচনা করিয়াছেন বটে, কিন্তু তারা গীতার বিষয়ে বক্তব্য নিঃশেষিত হয় নাই। অদুর কালে নিঃশেষিত হইবে তাহারও কোন সম্ভাবনা দেখি না। শ্ৰীযুক্ত হরিকিশাের রায় মহাশয় এই গ্রন্থে গীতার উপদিষ্ট প্রায় সকল তত্বেরই বিবরণ করিয়াছেন। তাহার সে বিবরণ সংক্ষিপ্ত হইলেও প্রায়ই সরস ও শিক্ষাপ্রদ হইয়াছে। প্রমাণনির্ণয়, সৃষ্টিতত্ত্ব, পঙ্কীকরণ, ক্রমবিকাশ ( পাশ্চাত্যের যাহাকে evolution বলে ), জন্মান্তর, কোন কিছুই উপেক্ষিত হয় নাই; তথাপি তাহার মুখ্য লক্ষ্য পরমাত্মচৈতন্য প্রতিষ্ঠা এবং কি পন্থার অনুসরণ করিলে সেই পরমাত্মতত্ত্বের সহিত একীভূত হওয়া যায় তাহার অনুসন্ধান। প্রসঙ্গতঃ তাহাকে কৰ্ম্মযােগ, জ্ঞানযােগ ও ভক্তি- যোগের আলোচনা করিতে হইয়াছে। হরিকিশাের বাবুর আলােচনা তজিজ্ঞাসুর বেশ উপাদেয় বােধ হইবে। এই গ্রন্থের ভূয়: প্রচার দেখিলে আমি আনন্দিত হইব। ত্রিপুরাধিপতির রাজপণ্ডিত মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত বৈকুণ্ঠ- নাথ তর্কভূষণ লিখিয়াছেন :- দ্বিজশ্রেষ্ঠ শ্ৰীযুত বাবু হরিকিশাের রায়ের বিরচিত গীতায় “পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” গ্রন্থখানা সমালেচনা করিয়া সবিশেষ আনন্দিত হইলাম। সৃষ্টিতত্ত্ব ও মুক্তিতত্ত্ব পড়িয়া (ব কিরূপ আনন্দ লাভ করিয়াছি তাহা বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভবপর নহে। যাহারা ভক্ত বিশ্বাসী ও জনবান হারা যেন ঘরে ঘরে এই পুস্তক রাখিয়া নির্জনে একাকী বিশ্বাসের সহিত প্রত্যহ কিঞ্চিৎ পাঠ করেন । সময়ে এতঃসৃত অমৃতধারায় যে দেশ # বিত হইবে ! বলই পুনরুক্তি মাত্র। (বরাহ নগর } ‘সাধনা-সমর”-আশ্রম-স্বামী লিখিয়াছেন : পরমাত্মা’ ও ‘মুক্তি” এই দুইটি শব্দের প্রচলন বাঙ্গালা দেশে খুব কম। ইন দ্বারাই বুঝা যায় এ দেশের লোক ঐ দুটা তত্ত্বের সন্ধান খুব কমই রাখে। শ্ৰীযুক্ত হরিকিশোর শৰ্ম্মা রায় মহাশয় কর্তৃক লিখিত “গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” নামক স্বল্পায়তন পুস্তক পানি যদি এদেশের শিক্ষিত জনসাধারণ শ্রদ্ধার সহিত পাঠ করেন, তবে পূর্বোক্ত অভাব কথঞ্চিৎ দূর হইতে পারে। ইহাতে সচ্চিদানন্দ স্বরূপ আত্মার কথা, প্রেতাত্ম, জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য প্রভৃতি বহু জ্ঞাতব্য বিষয় সহজ বোধ্য ভাষায় আলাে- চিত হইয়াছে। আশা করি এই পুস্তক পাঠে পরমাত্মা ও মুক্তি সম্বন্ধে অনেক কথাই পাঠকগণের অবগতিযােগ্য হইবে। ধীমান্ শ্ৰীযুক্ত রামগতি সরকার সাংখ্য-বেদান্ত-স্মৃতিতীর্থ M, A. B. L. উকীল, হাইকোর্ট, কলিকাতা লিখিয়াছেন :- শ্ৰীযুক্ত হরিকিশাের শৰ্ম্মা রায় বিরচিত “গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” নামক গ্রন্থ পাঠ করিয়া অপরিসীম আনন্দ অনুভব করিলাম। গীতার মত দুরূহ গ্রন্থ ভারতে কেন সমস্ত জগতে দুর্লভ। এই দুর্বোধ্য গ্রন্থের প্রতি পাদ্য বিষয়গুলি গ্রন্থকার অতিশয় সরল ও আল ভাষায় পাঠকের সম্মুখে • উপস্থিত করিয়াছেন। যাহারা গীতার টীকাদি না পড়িয়া গীতার প্রকৃত অর্থ সংক্ষে বুত চান, তাঁহাদের পক্ষে এ খানা অতি উপাদেয় গ্রন্থ। বৰ্ত্তমান গণ অার একটা বিশেষত্ব এই যে গ্রন্থকার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হিন্দু- দর্শ.নর : ' কথাগুলি বিবৃত করিয়া গ্রন্থ বুঝিবার পক্ষে সহজ উপায় প্রদর্শন করিয়াছেন। প্রমাণতত্ত্ব, মায়াবাদ, সদসংবিবেক, সৃষ্টি ও লয়তত্ত্ব, পঞ্চীকরণ, জন্মান্তরবাদ, অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, ত্রিগুণবিচার, জীবাত্ম- পরমাত্মতত্ত্ব বিচার, জ্ঞানযােগ, ভক্তিযােগ, কৰ্ম্মযোগ প্রভৃতি কঠিন বিষয়গুলি সংক্ষিপ্ত অথচ সরলভাবে বিবৃত হওয়ায় গ্রন্থখানা অতীব আদরের জিনিষ হইয়াছে। আমরা এরূপ পুস্তকের বহুল প্রচার কামনা করি। পেন্সন প্রাপ্ত অধ্যাপক শ্রীযুক্ত দ্বিজদাস দত্ত, M. A. A. R. A. B লিখিয়াছেন :- Pondit Hiri Kishore Riy has done a great service to the country by punishing hij book on Poramatma Tattwa in the Gita in these days of inaterialism and hypocritical sanctiuning'. We recoin nen the Book to all earnest seekers of the true religion. ৫ চট্টগ্রাম কলেজের খ্যাতনামা অধ্যাপক শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, M. A. লিখিয়াছেন :- - I have gwe thorough Sjt Harikishore Roy's cute পরমত্মহত্ত্ব ও মুক্তিবাদ”, The title of the book seems to be । rather misleading, for I find the author has modestly touched upon every important topic of Kindon Philosophy in a clear and unostentations style. He has succeeded in avoiding everywhere learned details and polemics which so often mar books of the kind. It will serve its purpose as a good Guide book to the study of Indian Philosoply and Religion and we can safely recoinmend it to the public, who are eager to know the basic truths of our Philosoply. ত্রিপুরা ভিক্টোরিয়া কলেজের বিদ্যারত্ন M. A. লিখিয়াছেন :- অধ্যাপক শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র শ্ৰীযুক্ত হরিকিশোর রায় মহাশয় প্রণীত “গীতায় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” নামক গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া পরম প্রীতিলাভ করিলাম। গীতা সর্বধৰ্ম্ম- সমন্বয়ের অপূৰ্ব গ্রন্থ। সেই মহাগ্রন্থ অবলম্বনে শ্রীযুক্ত রায় মহাশয় এই উপাদেয় নিবন্ধ রচনা করিয়াছেন। গ্রন্থ সূচনায়, যে মহদুদ্দেশ্যে তিনি এই কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, তাহা বলিয়াছেন। আমার মনে হয় তিনি সে উদ্দেশ্য সাধনে সম্পূর্ণ সফলকাম হইয়াছেন। আত্মা, প্রেতাত্মা ও পরমাত্মা মুক্তি, লিঙ্গদেহ, ত্রিবৃংকরণ, পঞ্চীকরণ, প্রভৃতি হিন্দু দর্শন শাস্ত্রের অতি জটিল দুর্বোধ্য বিষয়গুলি সংক্ষেপে প্রাঞ্জল ভাবে বিবিধ দর্শনের মতবাদ অনুযায়ী তুলনামূলক আলােচনা করিয়া সৰ্ব্বদর্শনশিরােমণি শঙ্করাবতার আচাৰ্য শঙ্কর প্রবর্তিত অদ্বৈত বেদান্ত-মায়া-বাদের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠাপিত করিয়াছেন। বর্তমান যুগে হিন্দুধর্ম ও দর্শনের দিকে অনেকেরই দৃষ্টি পড়ি- আছে, কিন্তু মূল গ্রন্থ পাঠ বহু যত্ন ও সময় সাপেক্ষ। শ্ৰীযুক্ত রায় মহাশয় বিরচিত নিবন্ধের ন্যায় গ্রন্থের সাহায্যে তত্ত্বজিজ্ঞাসু পাঠকগণ দর্শন শাস্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষ নুহের সহিত সহজে পরিচিত হইতে পারিবেন বলিয়া আশা করি। অলমতিবিস্ত:ণতি। অলমতিবিস্ত:ণতি। ১১৪ বা ২০ কার্তিক । স্বনামধন্য কলিকাতা হাইকোর্টের উকীল শ্ৰীযুক্ত অখিলচন্দ্র দত্ত M. L. C. লিখিয়াছেন :- শ্ৰীযুক্ত হরিকিশাের রায় প্রণীত ‘ গীয় পরমাত্মতত্ত্ব ও মুক্তিবাদ” পাঠে প্রীত হইলাম। ইহাতে সৃষ্টিতত্ত্ব প্রমুখে পরমাত্মচৈতন্যের প্রতিষ্ঠা যেরূপ সুন্দর ভাবে প্রমাণিত হইয়াছে, প্রমাণ মূলে জন্মান্তর বাদও তদ্রুপ সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। কঠিন দার্শনিক যুক্তি গুলি অতি সরল ভাষায় বিবৃত করিয়া জ্ঞান, ভক্তি ও কৰ্ম্মযােগ মূলে যে মুক্তিবাদ লিখিত হইয়াছে তাহা মর্মস্পশী। গ্রন্থকার দেব দেবী কিম্বা সাম্প্রদায়িক ধর্মের নাম না করিয়া বিভিন্ন ধৰ্ম্মমতের সামঞ্জস্য করতঃ সনাতন ধর্মের যেরূপ সুন্দর প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন, তাহা প্রকৃতই গবেষণাযােগ্য। বর্তমান স্কুল কলেজে ধর্মতত্ত্ব আলােচনার স্থান থাকিলে ইহা সর্বধর্মাবলম্বীর পক্ষে পাঠ্যরূপে নির্দিষ্ট হইতে পারিত সন্দেহ নাই। আশা করি এইরূপ গ্ৰন্থ সৰ্ব্ব সমাজে সমাদৃত ও গৃহীত হইবে। ৫:১১.২৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Gitay Paramatmatattwa O Muktibad

Author
Debshrmma, Harikishor
Title
Gitay Paramatmatattwa O Muktibad
File name
Gitay Paramatmatattwa O Muktibad
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2010/03/3
Publisher
Kumilla
Language
Sanskrit
Pages
128
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epic
Keywords
Gitay Paramatmatattwa
DLI number
511065
Barcode
4990010018247.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
aHNUId5Zcmt
Download PDF

Gitay Paramatmatattwa O Muktibad