Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Samrat Aurangajeb Ed.1

Ray,panchkori · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

পৰিষদ,

No text on this page.

সমাট ঔরঙ্গজেব
( জীবনী)
পাঁচকড়ি রায়
প্রণীত
কলিকাতা
১৬৬ নং বহুবাজার ষ্ট্রীট, বসুমতী ইলেটিক মেসিন
শ্রীপূর্ণচন্দ্র মুখােপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
১৩২
মূল্য ২ এক টাকা।

No text on this page.

সম্রাট ইরঙ্গজেব। প্রথম লহরী সিংহাসন-বিদ্রোহে। শান্তিপ্রিয় সম্রাট, শাজাহান যখন লােকললামভূতা সৌন্দর্য্যের রাণী মমতাজের প্রেমস্থতি, উদ্দীপ্ত করিয়া অগিরাব অনুপম সৌন্দৰ্য-বিমণ্ডিত তাজ- মহলে সেই দীপ্ত প্রভা চিবিবস্বান্ রাখিয়া, প্রেম-মাহাত্মের সমুজ্জ্বল লীলা প্রেম- লােলুপ জগদ্বাসীব চক্ষে মূৰ্ত্তিমাভাবে প্রকটিত করিয়া, আত্মগৌরবে-পরি- স্ফীত হইতেছিলেন , মনে করিতেছিলেন, কালের কঠোর নির্দেশে ভূবন বিমােহিনী প্রিম্নতমাকে হারাইয়াছি বটে, সে প্রেমের লহর-লীলায় আনন্দ প্লাবনের তুমুল উল্লাস এ জীবনে আবি স্পন্দিত হইবে না বটে, কিন্তু আমাব কালজয়ী তাজ, সে প্রেমের চিবদেদীপ্যমান প্রভা অতুলনীয় মরকত-মপির কারুকার্যে চির-বিবস্থিত কবিযা যুগযুগান্ত ধরিয়া প্রেমিক-প্রেমিকার সােৎসুক চক্ষে শারদীয় চন্দ্রমার রজতশুভ্র অমিষধারাবৎ প্রেম-কিরণমালা উল্লাসে উল্লাসে ঢালিয়া দিবে , এ প্রেম-স্মৃতির প্রীতি-দীপিতে সকলেরই প্রাণে পবিত্র ভালবাসা ধীরে ধীরে জাগিয়া উঠিবে। ভাবিতেছিলেন, আমি যে ভারত সম্রাট, শাশা শাজাহান আমিও বিশ্বজয়ী প্রেমের ভক্তিমান উপাসক মমতাজের প্রেমের পূত প্রভাবে পডিয়া, বিরহের আগুনে ধূপের মত পুড়িয়া পুডিয়া, নিজ হৃদয়ের প্রেমমাধুৰ্য সম্ভার দিগদিগন্তে ছড়াইতে সমর্থ হইয়াছি, তাহা আমার প্রেম স্মৃতির পুণ্যময় মন্দির তাজমহল-দর্শকের চিরদিন উপলব্ধি হইবে। সৌন্দৰ্য্যধ্যানমগ্ন সম্রাট শাজাহান যখন প্রেম-সৌরভে বিভাের হইয়া অপরাজ্যের অতি-মন্দির বাস্তবজগতে লােফলােন-গােচয়ে প্রতিষ্ঠিত করিতে ব্যস্ত ছিলেন, আর মুম্ষতা যখন অজ্ঞাতে অনায়াসে ধীরে ধীরে তার পরিণত ঔরঙ্গজেব। ; শরীরে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তার করিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে তাঁহার শত নর- পতি-শিরস্ত্রাণ-লুষ্ঠিত ময়ুর-সিংহাসন অধিকারের জন্য চারিটি লােলুপ দৃষ্টি সােৎ- সুকভাবে চাহিষ্য ছিল, সে সকল দৃষ্টি ব্যা-দৃষ্টির মত ক্ষুধার্ত রক্তপিপাসু-সিংহ- দৃষ্টির মত বল, বিক্রম, উৎসাহশালী—সর্পদৃষ্টির মত জ্বর কূট রাজনৈতিকত্ব- পূর্ণ --বাগ্নির মত অগ্নিস্রাবী ও বিপৰ্যয়কারী, এই লুব্ধ নেত্র-নিচয় আর কাহারও নহে? ময়ুর-সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী পরস্পর বিরােধী ভ্রাতৃ-চতুষ্টয়ের--শাহান্‌শা সম্রাট শাজাহানের চারি পুত্রের। সিংহাসন অশে পিতৃ-বিদ্রোহ মােগল-সাম্রাজ্যে নৃতন নহে। সাম্যনীতির চিরভক্ত সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে নূরজাহান-রূপ-মুগ্ধ সেলিম তরবারি ধারণ করিয়াছিলেন ; বিশ্ববিমােহিনী রমণীকটাক্ষচালিত সম্রাট জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনচ্যুত করিবার জন্য নব-যৌবনে বিপুল-বিক্ৰমে মস্তক উত্তোলন করিয়া- ছিলেন শাজাহান ; এক্ষণে সেই শাজাহানের বার্ধক্য-শিথিল বিকম্পিত মুষ্টি হইতে মােগল-সাম্রাজ্যের রাজদণ্ড সবলে ছিনাইয়া লইবার জন্য চারি পুত্র চারিদিক হইতে সবেগে প্রবাবিত হইলেন ; বিচঞ্চলা রাজলক্ষ্মী বহুদিন বীর তরবারির তীক্ষ্ণধারে প্রতিদ্বন্দ্বী-চতুষ্টয়ের ভাগ্য পরীক্ষা করিয়া অবশেষে বীরত্বে ও রাজনীতিজ্ঞতাতে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পক্ষসমর্থন করিলেন। ১৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দের সর্বপ্রথমে রাজকুমার-চতুষ্টয় কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। প্রজাহিতৈষী সম্রাট শাজাহান নিজ বার্ধক্যক্লিষ্ট অসমৰ্থ শরীরে রাজকার্যের বিশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা বুঝিয়া, কাবুল শাসনভারপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ দারাকে পার্শ্বাসন প্রদান করিয়া শাসনকার্য পরিচালন করাইতেছিলেন, অমাত্যগণ ও প্রজাপুঞ্জ ভঁহাকে ভাবী সম্রাট জানিয়া তাহার প্রতি সমধিক সম্মান প্রদর্শন করিত। দারায় প্রভূত পরিমাণে প্রজারঞ্জন ও হৃদয় আকর্ষণের শক্তি ছিল। সম্রাট শাজাহানের প্রাণগত ইচ্ছা ছিল, তিনি নিজমুখে প্রকাশ করিয়াছিলেম যে, তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র দারাই তাহার সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারী কি অপরাপর ভ্রাতাও সাম্রাজ্যের আশা বিসর্জন করেন নাই, তাহারাও সে আশা-লতিকাকে প্রসুনিত করিবার জন্য সষতনে আয়াস-বারি সেন করিতেছিলেন। চারি ভ্রাতাই তলে তলে ওমরাহ ও সেনাপতিগণকে দলভুক্ত করিয়া ধড়যন্ত্র চালাইতেছিলেন ; সম্রাটের নিভৃত অন্তঃপুরেও এ ষড়যন্ত্র প্রহেলিচুর অভাব ছিল না। সম্রাটের দুহিতা, জ্যেষ্ঠ বিদূষী সুন্দরী জাহানারা দারার •• ঔরঙ্গজে পক্ষে ও কনিষ্ঠা রােসেনা ঔরঙ্গজেবের পক্ষে অন্তঃপুর-ষড়যন্ত্র প্রধুমিত করিতে ছিলেন, ইহারা বিপত্নীক শাজাহানের সেবাচ্ছলে ভাতৃদ্বয়ের অভীষ্ট সাধনে স্বতঃপরতঃ যত্নবতী ছিলেন। সম্রাট শাজাহান নিজেই প্রতিদ্বন্দিতার উষয়- ক্ষেত্রে ভাতৃবিদ্বেষের বিষময় বীজ বপন করেন। মােগলরাজ্যে ম্যঠা- ধিকার প্রথা ছিল না। একের উপর স্নেহ-প্রবণতা ও প্রভুত্ব-প্রদান অপর ভ্রাতা সহ্য করিতে পারিবে কেন? কিন্তু স্নেহশীল পাতাহ কোন রাজ- কুমারকেই উপেক্ষা করেন নাই। রাজকুমারগণের ভ্রাতৃ-দ্বেষ উপলব্ধি করিয়া এবং তাহাদের সংঘর্ষে অচিরেই সিংহাসনের পাদমূল বিকম্পিত হইবে, এমন কি, অচিরে মােগল-সাম্রাজ্য বিধ্বস্ত হইবারও সম্ভাবনা দাড়াইবে কল্পনা করিয়া, শৌর্যবীৰ্য্যশালী কাৰ্যদক্ষ রাজকুমারগণকে বিভিন্ন প্রদেশের শাসনভার প্রদান করেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন, কাভারে সমাচ্ছন্ন হইলেই কুমারগণের এ বিদ্বেষভাব অপসারিত হইবে। আবার সৌভ্রাতৃপ্রেম জাগিয়া উঠিবে, কিন্তু সে ভাব বহুদিন তৈমুর-বংশ হইতে তিরােহিত হইয়া ছিল। প্রজাহিতৈষী সম্রাট শাজাহান দ্বিতীয় পুত্র উচ্ছ অল সুজাকে পাঁচ হাজারী মুনসফদার করিয়া বঙ্গদেশের শাসনভার প্রদান করেন। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বীরােচিত সাহসের পরিচয় পাইয়া তৃতীয় পুত্র কিশােবয়ৰু ঔরঙ্গজেবকে সম্রাট, অত্যন্ত ভালবাসিতেন, ঘঁহাকে তিনি দাক্ষিণাত্য-শাসন ও বিজয়ের ভার অর্পণ করেন। কনিষ্ঠ পুত্র মুরাদকে গুজরাটের শাসনকর্তার পদ প্রদান { করেন। ১৬৫ ৭ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট শাজাহান অসুস্থ হইয়া পড়িলেন । তাঁহার প্রতিনিধি- রূপে জ্যেষ্ঠপুত্র দারা রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। দারা এতদুর ক্ষমতা প্রিয় ছিলেন যে, শাজাহান নাম মাত্র সম্রাট, এ কথাও তাহার অস, পিতাকে জন্মের মত অন্তঃপুরে আবদ্ধ রাখিয়া আপনি অপ্রতিহত-প্রভাৰে রাজ্যশাসন ও বিলাস-লালসা চরিতার্থ করিবেন এরূপ আচরণ করিতে লাগিলেন। সম্রাটের পীড়া ক্রমশই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, একে প্রাচীন শরীর, তাহাতে প্রাণপ্রিয়তমা বেগমের শােক তাহাকে বড়ই কাতর করিয়াছিল। তাহার উপর পুত্রগণের অবশ্যম্ভাবী সংর্ঘষের অনির্দিষ্ট পরিণাম, ভ্রাতৃদ্বেষে অশ্বৰি তাহাকে জর্জরিত করিতেছিল। হঠাৎ একদিন রব উঠিল, সম্রাট শাজাহান মরজগতের মায়া পরিত্যাগ করিয়াছেন; রাজধানী দিল্লী ও আগ্রা নগরে ঔরঙ্গজেব। বন্ধু, উদার- * * মহা হুলস্থূল পড়িয়া গেল, প্রাসাদ-প্রাঙ্গণ তােরণদ্বার জনসঙ্ঘে পূর্ণ হইয়া গেল, রাজপথের দোকানপাট, কাছারী, দরবার বন্ধ হইল, সম্রাটের জন্য প্রজাপুঞ্জ কাদিতে লাগিল। আর্তের সুহৃদ, প্রজাবৎসল, বিপন্নের হৃদয়, সৌন্দৰ্যভক্ত, শান্তিপ্রিয় সম্রাট, শাজাহান আর ইহ-জগতে নাই, দেশময় তুমুল রােলে হাহাকার উঠিল। ভারতবর্ষের চতুর্দিকে এই সংবাদ ঝড়ের মত পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। শাজাহান প্রজাহিতৈষী সম্রাট ছিলেন, তাহার জন্য সাধারণ প্রজার প্রাণ ব্যাকুল হইল। সকলেই সমবেদনা প্রকাশ করিতে লাগিল, কিন্তু এই গভীর শােকের দিনে পিতৃবিয়ােগ-বেদনাকে তুচ্ছ করিয়া আনন্দ উৎ- সাহে, বীরত্বে ও প্রতিহিংসায় ভারত-সিংহাসনে আধিপত্য লাভের জন্য চারি তা প্রবল যুদ্ধোদ্যমে ব্যাকুল হইয়া রণসজ্জায় সুসজ্জিত হইতে লাগিলেন। জনরব সম্পূর্ণ মিথ্যা। সম্রাট শাজাহান নিরাপদে জীবিত,ধীরে ধীরে নিরা- 'মন্ন হইয়া তিনি স্বাস্থ্যলাভ করিতে লাগিলেন। শাজাহান আরােগ্য হইলেন বটে, রাজপুত্রগণ যথাসময়ে সে সংবাদ অবগত হইলেন বটে, কিন্তু প্রধুমিত বিদ্রোহাগ্নি নির্বাপিত হইল না, ধূ ধূ করিয়া বিপুল-বিক্রমে ভারতের শান্তিময় তপােবনে জ্বলিয়া উঠিল। বঙ্গদেশ হইতে সুজা, গুজরাট হইতে মুরাদ, দাক্ষিণাত্য হইতে ঔরঙ্গজেব বিপুল যুদ্ধসম্ভার সংগ্রহ করিয়া, অর্ধচন্দ্রাকৃতি পতাকা উড়াইয়া, চতুরঙ্গ-দলে ভারত প্রকম্পিত করিয়া দিল্লী আক্রমণে যাত্রা করিলেন। দারা রাজকীয় বিপুল সেনাদল ও রাজপুত বীরেন্দ্রবাহিনী সুসজ্জিত করিয়া, ভ্রাতত্রয়ের প্রতিরােধের জন্য প্রেরণ করিলেন। বীরহৃদয় আশু যুদ্ধোৎসাহে নাচিয়া উঠিল। ভাগ্যলক্ষ্মী যশের হিরন্ময় মুকুট লইয়া প্রতি দ্বন্দ্বি-চতুষ্টয়ের প্রতীক্ষায় রহিলেন। :

দ্বিতীয় লহরী বিদ্রোহে সুজা সম্রাট, শাজাহানের দ্বিতীয় পুত্র সুজা, যদিও সাহসী ও পরাক্রমশীল ; কিন্তু বাল্যকাল হইতে অতি উচ্ছল, বিলাস-প্রিয় ও যুদ্ধ-চাতুর্যে অনভিজ্ঞ ছিলেন। প্রথম যৌবনে রমণীর রূপ-মদিরার ও দূতক্রিয়ার তিনি প্রিয় উপাসক ছিলেন। তিনি কল্পনা করিতেন, তিনিই মােগলসাম্রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী ; তাহার ভােগলালসা চরিতার্থ করিবার জন্য শত শত অনুচর তাহার বাসনার ইঙ্গিত ঈষত্র অবগত হইয়া, নানা দিদেশ হইতে মনের মত সম্ভোগ- প্রসাদন নিত্য নূতন নিসর্গ-সুন্দরীগণকে প্রলােভনে ভুলাইয়া চয়ন করিয়া আনিত। তাহাতে তিনি বাঙ্গলার সুবাদার হইয়া বঙ্গদেশের স্বভাবসিদ্ধ প্রেম-প্রবণতায় মাতিয়া উঠিলেন। পার্বত্য-প্রাচীরে শৃঙ্খলিত ভারতের সৰ্ব্বাপেক্ষা কোমলতর প্রেমময় মৰ্ম্মর, বঙ্গে সুবাদার হইয়া তিনি বাঙ্গালায় হাটে রূপের ব্যাসাতি করিতে লাগিলেন কিন্তু শাহ সুজা বীর ছিলেন। প্রেমের তুমুল তুফানের ভীষণ ঘূর্ণিপাকে আলােড়িত হইয়াও তাহার বীরত্বের মর্যাদা কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয় নাই। বাঙ্গালার শান্তিময় বিরামকুঞ্জে সুন্দরী-কুসুম-সম্ভারে পরিবেষ্টিত, আস্তৃত, শায়িত, আলিঙ্গন-চুম্বনে বিমােহিত থাকিয়াও বীরসুলভদিল্লীর সিংহাসনে উপবেশনাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করেন নাই। সম্রাট শাজাহানের মৃত্যু-জনরব শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাহার প্রণয়-প্রস্ফু- টিত কমলিনীদলের সাদর আলিঙ্গন-পিয়াসা মুহূৰ্তমধ্যে প্রশমিত করিয়া,যে কোন অজ্ঞাত বৈদ্যুতিক শক্তিপ্রভাবে বিলাসের আলিঙ্গনপাশ ছিন্ন করিয়া, বীর-দন্তে নাচিয়া উঠিলেন। সেই বীরত্বের বিজলীতরঙ্গে দুর্গে, শিবিরে, নিস্তব্ধ পল্লীর জমীদারের ঘরে ঘরে সাজ সাজ বলিয়া বিপুল রণােদ্যমের এক অপূর্ব নব জাগরণের সাড়া পড়িয়া গেল। বঙ্গদেশের সমস্ত শক্তি কেন্দ্রীভূত করিয়া ভারত-সিংহাসন-জয় অবশ্যম্ভাবী জানিয়া, সাহাজাদা সুজা দিল্লীর পথে মহােল্লাসে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। হৃদয়ে আশা, শােণিতে উৎসাহ, মস্তিষ্কে ভ্রাতৃবিদ্বেষ, প্রাণে চিত্ত-বিমােহিনী বিলাসিনীকুলের বিলােল কটাক্ষ কল্পনা জোড়ে নানা ভাবের তরঙ্গ তুলিতে লাগিল।

৬ ঔরঙ্গজেব গুজরাট ও দক্ষিণাপথ হইতে মুরাদ ও ঔরঙ্গজেব তরবারি-বলে ভাগ্যের পথ পরিষ্কার করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া যুগপৎ বিক্রমে বিভিন্ন পথ দিয়া অগ্রসর হইতেছিল। রাজপ্রতিনিধি দারা সুশিক্ষিত বণনিপুণ অসংখ্য সম্রাট-সৈন্যকে অমিত- তেজা যােধপুরপতি যশােবন্ত সিং ও রণপণ্ডিত জয়পুরাজ জয়সিংহের নেতৃত্বে বিভিন্ন দিকে প্রধৃমিত বিদ্রোহাগ্নি সমূলে নিৰ্বাপিত করিবার ও ভ্রাতত্রয়কে বন্দী করিয়া আনিবার আদেশ প্রদান করিলেন। গুজরাট ও দাক্ষিণাত্য অপেক্ষা বাঙ্গলা দিল্লীর সন্নিকট। বীরবর সুজা প্রজলিত আশ্বাসে সৈন্ত-চালনা করিতেছিলেন। দিল্লীর সৈন্যও জয়সিংহের অধীনে সুজার প্রতিরােধের জন্য অগ্রসর হইতে ছিল। মধ্যপথে হিন্দুর পুণ্যতীর্থ বারানসীধামে ১৬৫৭ খ্রীষ্টাব্দের শেষ ভাগে উভয় সৈন্যের প্রথম সাক্ষাৎ হইল। রাজপুত-বীরত্ব-প্রভাবে মােগল বাদশাহগণ ভারত শাসন করিতেন। রাজপুত বীরেন্দ্রগণের উপর সৈন্য পরিচালনার ভার দিয়া ভীষণ রণক্ষেত্রেও মােগল সম্রাটগণ নিশ্চিন্ত মনে রঙ্গমহলে বিলাস-কৌতুকে মগ্ন থাকিতেন। আত্মপ্রাণে উপেক্ষা করিয়া দোর্দণ্ড প্রতাপে অকুতােভয়ে স্বজাতির বঙ্গে অস্ত্র- চালনা করিয়া, রাজপুত বীরেন্দ্রগণ মােগল সম্রাটের সিংহাসনতলে সহাস্যবদনে জয়ের হিরন্ময় মুকুট উপঢৌকন দিয়া ক্ষণিক প্রশংসার গৌরবে ধন্য হইতেন, দেশের মুখােজ্জল করিতেন ! অরিন্দম জয়সিংহ সেই সময়ে মােগল-সাম্রাজের একটি সুদৃঢ় স্তম্ভম্বরূপ ছিলেন। তিনি যে যুদ্ধে গমন করিতেন, সেইখানে মােগ- লের অর্ধচন্দ্রাঙ্কিত পতাকা সগৌরবে উডীন হইত। জয়সিংহ অযথা রক্তপাত নিবারণের জন্য সম্রাট সাজাহানের উপদেশমত সুজার নিকট সন্ধির প্রস্তাব করিয়া পাঠান। সুজাও এক প্রকার সন্ধির সমর্থন করিয়াছিলেন, কিন্তু সুলামাইন নামক একজন যুবক সেনাপতির উত্তেজনায় ৰণােন্মাদনায় উদ্ভ্রান্ত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার পিধানে বীর অসি আবার সশব্দে বিকম্পিত হইল। সেদিন প্রভাতে কুজঝটিকায় নদীবক্ষঃ আপ্লুত। সুৰ্য্যরশ্মিও কুজঝ- টিকার সমাচ্ছন্ন, সেই সময় জয়সিংহকে অপ্রস্তুত ভাবিয়া নদী পার হইয়া, সুজা সসৈতে জয়সিংহকে বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করি লেন। আজীবন বিলাসবৰ্জিত সুজার শরীরে যেন সিংহের অমিত বল কোন্ অনুপ্রেরণায় প্রবিষ্ট হইয়া, বিপক্ষ নাশে শক্তিশালী করিল। রণােন্মাদনায় ঔরঙ্গজেব। ৭ ; প্রমত্ত হইয়া, উন্মাদের ন্যায় অসংযতভাবে অশ্বপৃষ্ঠে তিনি সৈন্য পরিচালনা করিতে লাগিলেন। তঁাহার বীরত্ব দীপ্ত মুখমণ্ডল হইতে বিলাসের সকল কালিমা চিহ্নই অন্তর্হিত হইল। সৈন্যগণ অপূৰ্ব্ব রণােন্মাদনায় সুজার জন্য আত্মপ্রাণ তৃণজ্ঞান করিতে লাগিল। জয়সিংহ যুদ্ধশাস্ত্র-বিশারদ রণপণ্ডিত, তাহার যুদ্ধ-পাণ্ডিত্য বহু রণক্ষেত্রে জীবন সঙ্কটময় করিয়া উপার্জিত হইয়াছিল। তিনি সন্ধি প্রস্তাবনার ভিতরেও সুজার আক্রমণের জন্য প্রতি মুহূর্তে প্রস্তুত ছিলেন। স্থাণুর ন্যায় নিশ্চলভাবে সুজার প্রচণ্ড আক্রমণ-ঝটিকাতে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। সেই আক্রমণ ঝটিকা বেগ ঈষৎ প্রশমিত হইবামাত্রই এক অপূৰ্ব সৈন্যব্যুহ সুসজ্জিত করিলেন। দুই পার্শ্বে সুবৃহৎ কামানশ্রেণী ; কামান শ্রেণী রক্ষায় বল্লম ও তর- বারিধারী সহস্র সহস্র অশ্বারােহী এবং মধ্যস্থলে বন্দুকধারী মােগল ও তরবারি- ধারী রাজপুত সৈন্ত বিরাজিত রহিল। এইবার মহারাজ জয়সিংহ সবিক্রমে আক্রমণ করিলেন। কামানশ্রেণীর কালাগ্নিসদৃশ লােহিত গােলায় প্রতি মুহূর্তে শত শত সুজার সৈন্য ভূপতিত হইতে লাগিল। অশ্বারোহীদল সুযােগ বুঝিয়া সুজার সৈন্যের উভয় পার্শ্বে আক্রমণ করিল। সুজার সৈন্যগণ আক্রমণে অগ্রসর হইবামাত্র কামানের গােলায় বিধ্বস্ত হইল, জয়সিংহের অশ্বারােহীদল প্রবলবেগে সুজার সেনাদলকে আক্রমণ করিল, সুজার কামান শৃঙ্খলতার দোষে অত্যন্ত পশ্চাতে ছিল, সুতরাং সুজার গােলন্দাজসৈন্য অশ্বারােহী প্রতিরােধ করিতে পারিল না। দিবাবসানে সুজার সৈন্যগণকে অত্যন্ত ক্লান্ত বুঝিয়া মহারাজ রণনীতিজ্ঞ জয়সিংহ মধ্যস্থ পদাতিকদলকে নিষ্কোষিত অসি হস্তে আক্রমণ করিতে অনুমতি করিলেন, এতক্ষণ পর্যন্ত সুজার সেনাদল প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে ছিল, ক্লান্ত শরীরে শেষবারের নৃতন অপ্রতিহত প্রচণ্ড আক্রমণ সহ করিতে না পারিয়া রণে ভঙ্গ দিয়া যে যেদিকে পারিল, পলায়ন করিতে লাগিল। প্রচণ্ড প্রলয় ঝটিকাবেগে ধূলিরাশির ন্যায় জয়সিংহের আক্রমণে সৈন্যদল পলায়ন করিল দেখিয়া, শাহজাদা সুজাও : “য পায়তি স জীবতি” এই মন্ত্র স্মরণ করিয়া পৃষ্ঠ প্রদর্শনপূর্বক বায়ুবেগে বঙ্গদেশাভিমুখে প্লাবিত হইলেন। মহারাজ জয়সিংহ তাঁহার অনুসরণ করিলেন না, তিনি জানিতেম সুজাকে বন্দী করিলে দারার হন্তে তাহার প্রাণদণ্ড কে ঔরঙ্গজেব । অবশ্যম্ভাবী। বৃদ্ধ সম্রাট, শাজাহানও এ বিষয়ে তাঁহাকে গােপনে উপদেশ দিয়াছিলেন। জয়সিংহ বীর ছিলেন, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে ক্ষমা করিতে জানিতেন। সন্ধ্যার প্রাক্কালে যুদ্ধ অবসান হইল। বৃদ্ধ বয়সে ও যুবজনের অসাধ্য পরি- শ্রমে ক্লান্ত না হইয়া জয়সিংহ যুদ্ধক্ষেত্রের পরিণাম-মুমূয়ু ও আর্ন্তগণের শুষা ও হতাহত মৃতগণকে দেখিবার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। বিষাদিত চন্দ্ৰমালােকে যাহা দেখিলেন, তাহা বর্ণনাতীত ! হৃদয় বিদারণ ভয়া- বহ দৃশ্য ! শত শত মােগল রাজপুত। হস্তী অশ্বের মৃতদেহ স্তুপের পর পা- কারে সজ্জিত , কোথাও বা হস্তপদ-ছিন্ন-মুম্ষু কাতর কণ্ঠে জল চাহিতেছে, কোথাও বা কেহ তীব্র যন্ত্রণায় চীৎকার করিতেছে, প্রিয়জনকে ডাকিতেছে । কি ভীষণ ললামহর্ষণ মর্মভেদী মহা শ্মশানের দৃশ্য ! জয়সিংহ অনুচরবর্গকে জাতিবর্ণনির্বিশেষে শুশ্রুষা-সৎকারের ব্যবস্থা করিলেন । এইরূপে প্রথম দিনের যুদ্ধে বারাণসীর পুণ্যধামে মােগলের ভাগ্যলক্ষ্মী দারার প্রতি প্রসন্না হইলেন। সুজা পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল।

তৃতীয় লহরী বিদ্রোহে ঔরঙ্গজেব। ; বাল্যকাল হইতেই ঔরঙ্গজেব বীরত্বে, শৌর্য্যে, প্রতিভায় পুত্ৰ-চতুষ্টয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও পিতার সমধিক স্নেহপাত্র ছিলেন। অসীম অধ্যবসায়, বীরােচিত সাহস, কঠোর শ্রম-সহিষ্ণুতা, সেনাপতি-পদোচিত বণপাণ্ডিত্য, ইলামধৰ্ম্মে গভীর আস্থা, সঙ্কল্পসাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা, বিলাস-লালসাহীনতা এবং অসাধারণ বুদ্ধিচাতুৰ্য্য তাহার চরিত্রকে সমধিক সমুজ্জ্বল করিয়াছিল ; কেবল স্বয়ে ঔদার্য্যের অভাব এবং সন্দেহের বশবর্তিতা তাহার চরিত্রকে ক্ষীণপ্রভ করিয়াছিল। জীবনের উচ্চাভিলাষ তিনি অতি সংগােপনে হৃদয়মধ্যে সমাহিত রাখিতেন। অতি প্রিয়পাত্রগণের নিকটেও ভ্রমক্রমে গুপ্ত-অভিসন্ধি প্রকাশ করিতেন না; কূট-রাজনীতি-তত্বে, ষড়যন্ত্র-প্রহেলিকার বিকাশে তিনি অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন। গোঁড়া মুসলমান-সম্প্রদায়ের উপর তাহার প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল। হিন্দু অথবা বিভিন্নধর্মী সম্প্রদায়কে তিনি মর্মে মর্মে ঘৃণা করিতেন। নিজহৃদয়-নিহিত উচ্চাভিলাষ-পরিপূরণার্থ তিনি অকুতােভয়ে পৃথিবীর সর্বপ্রকার অসাধ্যসাধনে দৃঢ়সঙ্কল্প ছিলেন। সেই উচ্চাভিলাষের প্রবল বহ্নি হৃদয়ে আলাইয়া, পরম আয়াসে আজীবন প্রাণপণে ইন্ধন যােগাইয়া আমিত্মেছিলেন। সে প্রজ্জ্বলিত বহিতে বিমােহিনী সুন্দরীর প্রেমসুধাধারা বাম্পাকারে উড়িয়া যাইত। ভরতপুরের পাষাণ-দুর্গের মত মত ঔরঙ্গ জেবের পাষাণ-কঠোর-হৃদয়ে রমণী-কটাক্ষ প্রবেশ করিতে পারিত না, এই উচ্চাভিলাষ সার্থক করিবার জন্য তিনি সেই প্রচণ্ড বহ্নিতে ভ্রাতৃশােণিত আহতি দিতেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হন নাই। তাঁহার স্থিরসিদ্ধান্ত ছিল, বসুন্ধরা বীরভােগ্যা-মােগল-সাম্রাজ্যের সিংহাসনে জ্যেষ্ঠপুত্রের অনুবর্তন নীতিসঙ্গত নহে,-শান্তিপ্রিয় মুমুর্য সম্রাট শাজাহান অথবা বিধৰ্ম্মী দারা ইন্দ্রিয়- পরায়ণ মুজা, মদিয়া-বিছাের মুরাদ, ইহাদের কেহই সম্রাট হইবার উপযুক্ত নহে। আমি বীর-রাজদণ্ড পরিচালনে উপযুক্ত, আল্লা আমাকে বীর করিয়া পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন, এই তীক্ষ্ণধার তরবারির শৌর্য-প্রভাবে ভারতের সিংহাসনে আমার বসিবার পথ অচিরে উন্মুক্ত হইৰে চিরতুষার-মুকুটিত ঔরঙ্গজেব। অভ্রভেদী হিমাচলের তুঙ্গশৃঙ্গ হইতে সমুদ্রোক্ষ্মীচুম্বিত কন্যা-কুমারিকা পৰ্যন্ত সমস্ত ভারত আমার পদানত হইয়া থাকিবে। ঔরঙ্গজেব এইরূপ উচ্চাশা হৃদয়ের শােণিতে শশাণিতে পােষণ করিয়া দাক্ষিণাত্যের শাসনভার লইয়া শক্তিসঞ্চয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সম্রাটের পীড়া,দারার প্রতিনিধিত্ব, শাসনশৈথিল্য, সেনাপতি ও ওমরাহগণের বিভিন্ন ভাতার প্রতি পক্ষপাত, প্রতিদ্বন্দ্বী চতুষ্টয়ের সিংহাসনের আশা জনসাধারণের লােকমত প্রভৃতির প্রতি তাঁহার নেত্র কর্ণ সর্বদা সতর্ক থাকিত। ষড়যন্ত্রচতুষ্টয় কি ভাবে আবর্তিত-বিবর্তিত হইয়া, কাহাকে ডুবাইয়া কখন্ কাহার অনুকূলে, কখন কাহার প্রতিকূলে প্রবাহিত হইতেছে, কোন্ তরঙ্গের পর কোন্ তরঙ্গ-প্রবাহ আসিলে কে উন্নতির শীর্ষে আরূঢ় এবং কাহার আশা চিরতরে অতল সলিলে নিমজ্জিত হইবে, তাহা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যেন নখদর্পণে দর্শন করিতেন। বৃদ্ধ শাজাহানের মৃত্যুজনরব তাঁহার নিকট যেন মঙ্গল-আহ্বান বলিয়া বােধ হইল। মহােৎসাহে নিজসৈন্য সমাবেশ করিয়া, বিধর্মী দারাকে বিতাড়িত করিয়া, ধৰ্ম্মরাজ্য-সংস্থাপনে কৃতসংকল্প হইলেন। ইসলাম-ধৰ্ম্মের বিজয়-দুন্দুভি নিনাদিত করিতে--তিনি সৈন্যগণকে ধৰ্ম্মযুদ্ধে আহ্বান করিতেছেন ইত্যাদি অগ্নিাবী উৎসাহবাক্যে সৈন্যগণকে প্রবুদ্ধ, অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপ্ত করিয়া বীর- গর্ষে দিল্লীর পথে যাত্রা করিলেন। দুর্জয় সাহসে তিনি পঞ্চসহস্ৰমাত্র সৈ লইয়া দিল্লীর তথা উভয় ভ্রাতার অসংখ্য সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-অভিযান করিয়াছেন বুঝিয়া মনে মনে নিজেই হাস্য করিলেন। ঔরঙ্গজেব অদূরদর্শী ছিলেন না, এ অভিযানের স্রোত কোন্ পথ দিয়া প্রবর্তিত হইবে, তাহা তিনি দিব্যচক্ষে দেখিতে পাইতেছিলেন। তিনি জানিতেন, ধর্মোৎসাহী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুষ্টিমেয় লােক পৃথিবীর সর্বত্র মুসলমান পতাকা উদ্দীন করিতে পারে। ১৬৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বৈশাখ মাসে হিন্দুকীর্তি-বিমণ্ডিত উজ্জয়িনীনগরীতে খরস্রোতা সি। তীরে, তিনি শিবির সন্নিবেশ করিয়া কনিষ্ঠ মােরাদবক্সের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। তাঁহার মস্তিষ্কে কুট চক্রান্ত, শােণিতে লাভা- প্রবাহ, হৃদয়ে উচ্চ আশা, প্রাণের ভিতর বিজয়-দুন্দুভির নিনাদ যুগপৎ তরঙ্গায়িত হইতে লাগিল। দিল্পী হইতে দারাপ্রেরিত সৈন্যদল যােধপুরপতি বীরব যশােবন্ত সিংহ ও কাসেম খাঁর নেতৃত্বে সিজার অপর তটে শিবির সমা- বেশ করিয়াছিল। দুইদিকে দুই মহাবীর ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের ন্যায় অমিতবিম হৃদয়ে স্তব্ধ থাকিয়া সুযােগ প্রতীক্ষায় সলিল সিপ্রা নদীর খরস্রোতের ব্যব- ঔরঙ্গজেব। ধানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। যুদ্ধোন্মাদনায় বীর-হৃদয়ের উষ্ণ শশাণিত দ্বিগুণতর বেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল। মহাপ্রাণ রাজপুত-বীরেন্দ্র যশােবন্ত সিংহ ঔরঙ্গজেবের সৈন্যসংখ্যা অল্প দেখিয়া, উপেক্ষায় মনে মনে হাসিয়া তাহাকেই প্রথম আক্রমণে সুষােগ দিবেন স্থির করিয়া, নিশ্চেষ্ট রহিলেন, কিন্তু এই নিশ্চেষ্টর ফলে মােগলের ভাগ্য- রবি দারার ভাগ্য ছাড়িয়া ঔরঙ্গজেবের ভাগ্যচক্রে সমুল হইল।

। চতুর্থ লহরী। 0- বিদ্রোহে মুরাদ। ; সম্রাট শাজাহানের কনিষ্ঠ পুত্র গুজরাটের শাসনকর্তা মুরাদব অত্যন্ত সুরাপায়ী ও ইন্দ্রিয়াসক্ত ছিলেন। রাজকার্যের অবসরে প্রমপ্রফুর কমলিনীদলের মত রূপসীদলে সর্বদা পরিবৃত হইয়া, সিরাজীর ফোয়া- রায় অবিরত স্নাত হইতে তিনি বড় ভালবাসিতেন। সুন্দরীকুল-গরবিণী বেগম-উপবেগমগণকে লইয়া তিনি সর্বদা নানারঙ্গে মাতিয়া থাকিতেন। গতবাদ্যের অনাবিল নিঝরে, চারুহাসিনী নর্তকীর অধীমঞ্জীরশােভিত পদের রুনু ঝুনু তঁাহার কর্ণবিবরে যেন সুধাধারা ঢালিয়া দিত। তাহার অবাধ বিলাস-সমুদ্রে নিত্য নূতন সুখের তরঙ্গ উদ্বেলিত হইয়া, তাহার কর্মজীবনের সকল আশা ও কর্তব্য ভাসাইয়া দিত। তিনি যখন সম্রাট শাজা, হানের মৃত্যুসংবাদ শুনিলেন, সেই সময় তাহার প্রেমের সুরে সাধা, প্রাণের সুরে বাধা, আত্মবিনােদন বীণায় উলঙ্গবাহার রাগিণীর বিচিত্র আলাপ চলিতেছিল ; সঙ্গে সঙ্গে পাত্রে পাত্রে সিরাজীর গােলাপী নেশা ফিরিতেছিল। হাসি-চাহনীতে বিদুৎ হানিয়া, কয়েকটি মনােমমাহিনী সুন্দরী বক্ষের সমুন্নত মহিমা সগৌরবে বিকসিত করিয়া, মেহেদীরাগরঞ্জিত রক্তপদের নূপুরের ধ্বনির সহিত বাদ্যযন্ত্রের তাল মিলাইয়া, উলঙ্গবাহার রাগিণী বিকাশ করিয়া, চোকে মুখে, বুকে রূপের প্রভা ছড়াইয়া, রূপরঙ্গে হেলিয়া দুলিয়া নাচিতেছিল। আত্ম- বিস্বত মুরাদ সুন্দরীকুল পরিবৃত হইয়া নিৰ্ণিমেষ-চক্ষে সেই রসসায়রে ডুবিয়া সৌন্দৰ্য্যকলা উপভােগ করিতেছিলেন। শাজাহানের মৃত্যুসংবাদ শুনিবামাৰ তিনি হভরে-লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন, “তবে আর কি, এইবার আমি দিল্লীর সম্রাট।” তাঁহার মুখে এই কথা শুনিবামাত্র সুন্দরীগণ হাস্যমুখর-কণ্ঠে সম্রাটের জয়ধ্বনি করিল। রঙ্গকক্ষ হইতে সভায় আসিয়া মুরাদ অচিরে সম্রাট হইবেন সে কথা পরিষদগণকে বলিলেন ; ওমরাহ ও সেনানীগণ সেই কথা শুনিয়া তাহাকে দিল্লীর সম্রাট বলিয়া অভিনন্দন করিল। রাজধানীতে উৎসবের আন-নােল পড়িয়া গেল। মুরাদ রাজকোষ হইতে দরিদ্রগণকে অস্ত্র অর্থ দান করিলেন। তিনি যে দিল্লীর সিংহাসনে অচিরে উপবেশন করিবেন, সে বিষয়ে আর ঠাহী বিন্দুমাত্র সন্দেহ রহিল না। এ সম্ভাবনা নিতান্ত নিরর্থক নহে; কারণ, ঔরবে। মুরাদের অধীনে যত সৈছিল, সম্রাটের দুর্গ ভিন্ন অপর কোথাও তত সৈন্য ছিল না ; তাহার উপর তিনি যনিপুণ সেনাপতি। অতি শত্ৰ সিংহাসনে উপবেশনের জন্য তিনি সসৈন্যদিল্লী যাত্রা করিলেন। তাহার ধারণা ছিল, এক ঔরজেব ভিন্ন কেহই তাহার প্রতিবােধে সম্মুখীন হইতে সাহস করিবে না। সেই অসংখ্য বলদর্পিত সৈন্য উপযুক্ত বণসম্ভারে সুললিত হইয়া আশীটা কামান ও চারিসহ অশ্বরােহী সৈন্যে পরিবৃত হইয়া, বিসর্পিতগতিতে হেলিয়া দুলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। আশা-প্রলুব্ধ মুরাদ আত্মবিশ্বাসে এতদূর নিশ্চিত ছিলেন যে, যুদ্ধঅভিযানের সঙ্গে বিভিন্নখানে রূপসীগণকেও সঙ্গে লইয়া যাইতেছিলেন। উমিনীর গৌরবময় ক্ষেত্রে বিপক্ষ- দলের শিবির-চুড়ে পতাকামাল উডীন দেখিয়া তিনিও যুদ্ধ-বিক্রম প্রদর্শনের শিবির সরিবেশ সন্নিবেশ করিলেন।

পঞ্চম লহরী ভ্রাতৃ-সম্মিলনে। তরঙ্গময়ী সির উভয় তীরে সারি সারি অগণন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড শুভ্র শিবিরশ্রেণী সন্নিবেশিত। তীরে সমতল ভূমিতে মহারাজ যশােবন্ত সিংহের সেনাপতি কাসিম আলির, এবং পার্বত্য উপকুলে ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের অসংখ্য শিবির। বাসন্তী সন্ধ্যা-ধীর চন্দ্রমা যেন যুদ্ধ আয়ােজন দর্শনে অর্থবিকশিত হইয়া, অতি ধীরে বসন্ত-সমীরণের পুলক প্রবাহে মৃদুমন্দ হাসিয়াশির মত স্নিগ্ধরশ্মিমালা উল্লাসে উল্লাসে ছড়াইয়া দিতেছিল। সেই নিসর্গকিরণমালা মােগল-রাজপুত সম্মিলিত শিবিরনিচয়ের শীর্ষে সমুজ্জ্বল ভাতিতে বিবম্বিত হইতেছিল ; মৃদুমন্দ মলয়-হিল্লোলে উভয় শিবির- নিবদ্ধ পতাকা-নিচয় যেন আনন্দ-উৎসাহে প্রকম্পিত হইয়া পত পত, শব্দে উড়িতেছিল,—তাহার যেন যুদ্ধোদ্যমে ব্যাকুল, যুদ্ধসংঘর্ষ দেপিতে ব্যস্ত, উদ্যম- সমীরে হিল্লোলিত হইয়া, বীরেন্দ্রগণকে এই আসন্ন যুদ্ধে আহ্বান করিতেছে। সিও যেন আজ উল্লাসিনী। একে বসন্তের সন্ধ্যা~~ চমা মিলনে মলয়-পবনে প্রেম-গীতের নূতন লহর ছুটিতেছে,—তাহাতে বহুদিন পরে বিক্রমাদিত্যের পদরেণুপূত বীরত্ব রঞ্জিত তটে,আজ আবার ভারতের ভাগ্য- পরীক্ষা! সমবেত বীরেন্দ্রগণের রণােৎসাহে তাহার শীর্ণকায় যেন ঘন ঘন স্পন্দিত হইতেছে ;-বীরশােণিতের প্রবাহে অনুরঞ্জিত হইবার জন্য যেন সিও ব্যাকুলা। যুদ্ধের পূর্বরাত্রি। চতুর্দি নীরব-নিস্তব্ধ ; আকাশে চন্দ্রমা উপহাসের হাসি হাসিতেছে ;-যেন বলিতেছে, কয়দিনের জঙ্ক এ জয়-পরাজয় ? নার সংসারে, নশ্বর সিংহাসনে কে কবে কালজয়ী হইয়াছে ? শিবিরে সৈনিকদল কোথাও নিদ্রিত, কোথাও আক্রমণের কল্পনায় ব্যস্ত,—কোথাও নৃত্যগতের তরঙ্গে মােহিত,কোথাও সুন্দরীর কটাক্ষে ব্যথিত, কোথাও বিলাসে সমাহিত,কোথাও মদিরা ও গঞ্জিকার সেবায় উম্মত্ত,—কোল্পও কোন প্রিয়তমাকে শেষ-পত্র লিখিতেছে,কোন সৈনিক সৈনিক-যুবক।

ঔরঙ্গজেব। • " অস্ত্রে ধার দিতেছে। মধ্যে মধ্যে প্রহরীর পাহারার ভৈরব চীৎকার নৈশ- নীরবতা ভঙ্গ করিতেছে,সেই তালে কুকুর ও শৃগালদল তান দিয়া, ভীষণ আরাবে চতুর্দিক প্রতিধ্বনিত করিতেছে ;-কাল যুদ্ধ সুনিশ্চিত। ভাবী সম্রাট ঔরঙ্গজেব রাজপারিপাট্যহীন মােল্লালভ শুভ্র বসনে বরবপ সুশশাভিত করিয়া নিজ শিবির-প্রকোষ্ঠ হইতে নির্গত হইয়া, একাকী মুরাদের, শিবিরাভিমুখে অভিগমন করিলেন। তাহাকে একাকী বিপক্ষপক্ষের শিবিরাভিমুখে অগ্রসর হইতে দেখিয়া প্রহরীরা চমকিত হইল কিন্তু সেই স্পর্ধাদীপ্ত তেজোম মুক্তির নিকট অগ্রসর হইতে কেহই সাহসী হইল না। ঔরঙ্গজেব নিজ সৈন্য শ্রেণী ভেদ করিয়া, অবিচলিতভাবে মুরাদের বাহিনীর ভিতর প্রবেশ করিলেন। কেহই প্রতিরােধ করিতে অগ্রস হইল না—সকলেই বিভ্রান্তনয়নে পরস্পরের প্রতি চাহিয়া রহিল। সহসা সৈনিকভেরীর নিনাদে সাবধানতা সুচিত হইল ;-প্রহরী ও সৈগণ আজ্ঞা-প্রতীক্ষায় সতর্ক রহিল। মুরাদ স্বয়ংসিদ্ধ সম্রাট হইয়া যুদ্ধ আয়ােজন করিয়াছেন,-তাহার সঙ্গে যুদ্ধ-সম্ভারের সহিত প্রচুর বিলাস-উপকরণেরও অভাব ছিল না ;. যুদ্ধাভি, যানের সঙ্গে অনেকগুলি রূপের মানোয়ারী জাহাজ আসিয়াছে। যে সকল রূপসীকে তিনি প্রাণের সহিত ভালবাসিতেন, যাহাদের আলিঙ্গন-পাশে আবদ্ধ হইয়া তিনি মধুরাবেশে বিভ্রান্ত হইতেন, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুসম্ভব যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি সেই প্রিয়তমাগণকে ছাড়িয়া আসিতে পারেন নাই। প্রকাণ্ড পট্টবস্ত্ৰমণ্ডিত শিবিরে মুরাদ যুদ্ধের পূর্বনিশায় রঙ্গিণীগণকে লইয়া বিলাস-রঙ্গে হাবুডুবু খাইতেছেন। শিবিটী বহুমূল্য আবরণে পরিবেষ্টিত,-উৎকৃষ্ট কাশ্মীরী শালের পর্দা বিলম্বিত,রাশি রাশি পুপ- সম্ভারে সুসজ্জিত,—বিভিন্ন বর্ণের কারুকার্যখচিত পতাকা ও মসলিন আস্তরণে আস্তৃত, দীপাবলী-তেজে উজ্জীকৃত। স্নিগ্ধ দীপাবলী, পুষ্পসম্ভার, বহুমূল্য সুগন্ধ-প্রসাদন এবং কারুকার্যখচিত সুবর্ণাধারঃউৎকৃষ্ট প্রজ্বলিত ধূপ- সৌরভে সেই শিবির-প্রকোষ্ঠে এক অপূর্ব অমিয়গন্ধ তরঙ্গায়িত হইতেছিল। সেই বিভ্রান্তকারী সৌরভের মত্ততার সরে সঙ্গে বহুমূল্য সিরাজীর পাত্র সুন্দরীগণের হন্তে হস্তে ফিরিতেছিল। বিলােলকটাকে সুধা ঢালিতে ঢালিতে রঙ্গিণীগণ মুরাদকে সিরাজী-সুধায় পরিতৃপ্ত করিতেছিল। আলােকমালার জ্যোতি,-পুষ্পরাশির সুষমা-ভাতি,—বিলাসিনীগণের ঔরঙ্গজেব। বদ্যালঙ্কারের দীপ্তি,চটুল বিলাকটাক্ষের প্রীতি,উলে—মধুয়ে- সােহনে—বিনােদনে বিজলীর লহর খেলিতেছিল। বিলাস-পিয়াসার উদ্ভ্রান্ত হইয়া, লালসার ক্রীতদাস মুরাদ কখন সুধাপাত্রে, কখনও রঙ্গিণীর বদন-সুধাকরে মধুলােপওষ্ঠাধর স্পর্শ করিতেছিলেন, প্রবল উল্লাসে নৃত্য-গীতের উচ্ছাস বহিতেছিল। ঠিক সেই সময়ে শুভ্রবেশধারী ওরঙ্গজেব খােজা প্রহরীগণের প্রতিরােধ না মানিয়া, শিবিরের আদেশে উপস্থিত হইয়া, গম্ভীর-স্বরে বলিলেন, “জয়, সম্রাট মুরাদের জয় !” মুহূর্থে গীতবাদ্য বন্ধ হইল, ঋলিত-চরণে সিংহাসন হইতে উঠিয়া, মদিয়া- বিহবল মুরাদ সাদরে ঔরঙ্গজেবের অভ্যর্থনা করিলেন। বহিণীগণ অনিচ্ছায় তৎক্ষণাৎ শিবির পরিত্যাগ করিল। কুটিলচুড়ামণি ঔরঙ্গজেব আজ কি মধুর সরল হাসি হাসিতে- নে! কি সম্মানসহকারে মুরাদকে সম্রাট বলিয়া শতবার কুর্দিস করিতেছেন, আর আপ্রত্যয়ী মুরাদ অপূৰ্ব গর্বে গলিয়া যাইতেছেন। মুরাদের আমন্ত্রণে ঔরঙ্গজেব তৎক্ষণাৎ তাহার সহিত একত্রে ভােঙ্গন আরম্ভ করিলেন। ভােজনশেষে মদিরা ও কাফি আসিল, সঙ্গে সঙ্গে আবার রঙ্গিণীগণ আসিয়া রাজপুত্রগণের চিত্তবিনােদনের জন্য 'সুললিত-কণ্ঠে সুমিষ্ট হাসি মিলাইয়া গান ধরিল। সঙ্গীতাবসানে আবার নর্তকীগণ চলিয়া গেল। ঔরঙ্গজেব বুবপাত্রে মদিরা ঢালিয়া মুরাদের হস্তে দিয়া বলিলেন, “সম্রাট মুরাদ। আমার জীবন সার্থক, কালিকার যুদ্ধে তােমাকে ভারতের সম্রাট করিয়া আমার জীবন ধন্য করিব।” একমুখ হাসি হাসিয়া মুরাদ বলিলেন,“আপনার ন্যায় ভ্রা জগতে দুরন্ত আপনি একটু এই সুগন্ধি সুধা আস্বাদন করুন।” অধিকতর নম্রতার সহিত ঔরঙ্গজেব বলিলেন, “ক্ষমা কর, আমি ভােগ-বাসনা ছাড়িয়া ফকির হইয়াছি। তােমার মত বীরকে ময়ুসিংহাসনে বসাইয়া, ভারতে মুসলমান-রাজ্যের ভিত্তি অধিকতর সুদৃঢ় করিয়া, চিরদিনের মত পয়গম্বরের সেবায় মক্কায় যাত্রা করিব; জি, আর আমার অকাজা নাই।” মুরাদ। প্রিয় ভ্রাতা! আপনি যথার্থই ধর্মপ্রাণ । মৎ আমার জ আপনি এরূপ আত্মােৎসর্গ করিবেন কেন ?

ঔরঙ্গজেব। ১৭ ঔরঙ্গজেব। তাের জন্য করিব না তাে কাহার জন্য করিব? পয়গম্বরের আদেশ আমার শিরােধার্য। তুমি ভিন্ন আর কে তৈমুর-সিংহাসনে উপবেশনের উপযুক্ত? সুজা ভীরু, দারা কাফের। তােমার সাহস অপরিসীম, যশে ভারতপূর্ণ। তোমার সম্মুখে আমি তােমােদ করি- তেছি না । তোমার ললাটে সম্রাট-টীকা, বিশাল বক্ষ, দীর্ঘ বাহু, সর্বদেহ বীরত্বে অনুরঞ্জিত। তুমিই একমাত্র ভারত-সিংহাসনের উপযুক্ত। এই বলিয়া ঔরঙ্গজেব আর এক পাত্র মদ ঢালিলেন। মােরাদ। তবে কালবিলম্বে কাজ নাই, কালই আমরা যুদ্ধ-সাগরে ঝম্প প্রদান করিব। ঔরঙ্গ। আমি চিরজীবন ধৰ্ম্ম-চৰ্চা করিয়া আসিতেছি, ইসলামের নামে ফকির হইয়াছি, যুদ্ধনীতিতে আমি অনভিজ্ঞ। তুমি সাহস দিলে তােমার আজ্ঞা-পালনে আত্মনিয়ােগ করিব। আত্মাভিমানী মােরাদ এই প্রবঞ্চনাপূর্ণ তােষামােদে ও মদিরা-বিবশে আত্মগৌরবে লাফাইয়া উঠিলেন ,-বলিলেন, “ভ্রাতঃ । আপনি আমার শিক্ষায় কালে রণপণ্ডিত হইবেন। আমি এই অসির সাহায্যে পৃথিবী জয় করিতে পারি।” এই বলিয়া তিনি অসি উন্মুক্ত করিলেন। প্রদীপ্ত আলােক- তেজে তীক্ষার অসি ঝম করিয়া উঠিল। পরক্ষণেই শিথিলযুটি হইতে অসিখানি স্খলিত হইয়া ভূপতিত হইল। কষ্টে হাস্য সংবরণ করিয়া, ঔরঙ্গজেব মােরাদকে আর এক পাত্র মদ দিলেন ;-বলিলেন, “কল্য রণক্ষেত্রে, তোমার পার্শ্বে এ অনুচর উপ স্থিত থাকিবে।” ভ্রাতাকে বিদায় আলিঙ্গন দিবার উপক্রমে মাতাল মােরাদ খলিতপদে পতিত হইয়া ভূলুণ্ঠিত হইতে লাগিলেন। মনে মনে হাসিয়া ঔরঙ্গজেব মনে মনে বলিলেন,-“বীর বটে! বীর না হইলে কি কে এমন শূকরের মত গড়া- গড়ি যায় ?” ঔরঙ্গজেব বিদায় হইলেন। শিবির হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া ঔরঙ্গজেব গম্ভীরবদনে নিজ শিবিরাভিমুখে চলিলেন। তাঁহার ললাটে গাঢ়-চিন্তার রেখা সমঙ্কিত। মনের ভিতর নানা ভাবের প্রবল ঝটিকা বহিতেছিল; মানস-সরে নানা চিন্তার তরঙ্গ উঠিতে- ছিল। ঘাত-প্রতিঘাতে আশার উদ্বেগে তিনি মনে মনে বলিতে লাগিলেন, “দিল্লীর ময়ূর-সিংহাসনে কে বসিবে ? বিধর্মী দার, মা বার্ধক্যক্লিষ্ট পিতা ঔরঙ্গজেব। শাহা,–না বিলাসী কাপুরুষ সুজা,-না এই দুরন্ত মাতাল মােরাদ, এই দৃঢ়ব্রত সন্ন্যাসী ঔরঙ্গজেব? মােরাদ ! কাল প্রভাতে যুদ্ধ,- আজ তুমি বিলাসবিভাের ! তুমিই ভারতের সম্রাট হইবে ! যত দিন প্রয়ােজন-তত দিন তােমার দ্বারা কাৰ্যসাধন করিব ;-পরে পদাঘাতে তােমায় বিতাড়িত করিব। উঃ! পিতার হস্ত হইতে রাজদণ্ড কাড়িয়া লইতেছি। কাল যুদ্ধ --পিতৃ-বিদ্রোহ ! এই উজ্জয়নী হইতে দিল্লীর সিংহাসন পর্যন্ত রাজপথ ঔরঙ্গজেবের বীরত্বে শােণিত-রঞ্জিত হইবে, নচেৎ, ঔরঙ্গজেবের শােণিতে সিপ্রাসলিল অনুরঞ্জিত হইবে। না,-না,-ঔরঙ্গজেব ভারতের সম্রাট সুনিশ্চিত। এই ধৰ্ম্মার্থে ভূতাশায়ী মস্তকে আমি তৈমুরের মুকুট সগর্বে ধারণ করিব, নচেৎ আত্মনিবেদনে এ সাধনার সমাপি করিব। কাল যুদ্ধ --কি হয়—কি হয়-রণে জয় পরাজয়।”

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। নাই। জয় লক্ষ। ঔরঙ্গজেবের ভাগ্যে । ১৬৫৮ খ্রীষ্টাব্দে বৈশাখ মাসে উজ্জয়িনী-ক্ষেত্রে মােগলরাজপুতের ভীষণ সংঘর্ষ হইল। পূর্ব পরিচ্ছেদ বর্ণিত পরদিনের প্রাতে মহারাজ যশােবন্ত সিংহ সহসা দেখিলেন, ঔরঙ্গজেব প্রবল উদ্যমে নিজ সৈন্যগণকে সিপ্রানদী পার করিতে ছেন। সমস্ত রাত্রি পরিশ্রম করিয়া ঔরঙ্গজেব পৰ্ব্বতের উন্নত স্থানে কামান- শ্ৰেণীকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া সাজাইয়াছেন। ঔরঙ্গজেব নিজ কামানের অগ্নি-বর্ষণে বিপক্ষ পক্ষকে প্রতিরােধ করিয়া, নিজ সৈন্য পার করিবার জ যে ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, তাহা তাঁহার অদ্ভুত রণপাণ্ডিত্যের পরিচায়ক। মহারাজা যশােবন্ত সিংহও কামানশ্রেণী সুসজ্জিত করিতে ত্রুটি করেন ঔরঙ্গজেবের সৈন্যকে অতর্কিতভাবে নদী পার হইতে দেখিয়া তাহার কামানশ্রেণী হইতে প্রতি মুহূর্তে কালান্তক অগ্নিরাশি বর্ষিত মােগলসৈন্যগণকে গ্রাস করিতে লাগিল। কিন্তু ঔরঙ্গ- জেবের উদ্দীপনায়, আজ মােগলসৈন্থ বণমদে মাতােয়ারা,-তাহারা মৃত্যুকে তৃণজ্ঞান করিয়া, প্রবল গােলা-বর্ষণ বক্ষে ধারণ করিয়া যুগপৎ উৎসাহে ও প্রচণ্ড বেগে নদী পার হইতে লাগিল। ঔরঙ্গজেব পূর্ব হইতেই যশােবন্ত সিংহের সহযােগী কাসেম খাঁকে অর্থের দ্বারা বশীভূত করিয়া ছিলেন। কাসেম খা যুদ্ধক্ষেত্রে সসৈন্যে কাষ্ঠপুত্তলিকার মত দণ্ডায়মান রহিলেন এবং যখন প্রচণ্ডবিক্রমে যুদ্ধ চলিতেছে, সেই সময় তিনি গােলন্দাজ সৈঙ্গ ও বারুদ লইয়া পলায়ন করিলেন। সহযােগীর ব্যবহারে মহারাজ যশশবসিংহ অত্যন্ত বিপদে পড়িলেন; কিন্তু বিন্দুমাত্রও বিচলিত না হইয়া অমানুষিক বীরত্বে শত্রুগণের গতিরােধ করিতে লাগিলেন। ঔরঙ্গজেব দেখিলেন, তঁাহার নির্দেশমত ঠিক সময়ে কাসেম খা পলাইয়াছেন। তিনি মােরাদকে উত্তেজিত করিয়া বলিলেন, “যশােবন্তসিংহের বিক্রমে কোন সৈন্যই পার হইতে পারিতেছে না। সম্রাট স্বয়ং একবার সৈন্য-চালনা করিয়া দেখুন, আমি অপারগ হইয়াছি।” অভিমানদৰ্পী মােরাদ কতিপয়মাত্র সৈন্য লইয়া, সকল বাধা অতিক্রম করিয়া জয় জয় রবে নদী পার হইলেন। তাঁহার ঔরঙ্গজেব। সৈন্যগণ প্রভুকে এরূপ বিপদাপন্ন অবস্থায় অগ্রসর হইতে দেখিয়া প্রবলবিক্রমে নদী পার হইতে লাগিল। যশােবন্তসিংহের রণভাণ্ডার তখন বারুদ-হীন- তাহার কামান নীরব। তিনি কূল ছাড়িয়া ঈযৎ পশ্চাতে হটিয়া আসিয়া বিপক্ষপক্ষের প্রতীক্ষায় রহিলেন। মহােল্লাসে মােরাদ ও ঔরঙ্গজেব উভয়ে সেই সময় অবাধে নদী পার হইয়া বিপুলবিক্ৰমে একযােগে মহারাজ যশােবন্তসিংহের উভয় পার্শ্ব আক্ৰমণ করিলেন। অসমসাহসী রাজপুত সৈন্যগণ স্বজাতীয় গৌরব অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য চতুর্দিকে শক্ৰবেষ্টিত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে লাগিল। সপ্ত সহস্র রাজপুত-সৈন্য সেই দিন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিল। প্রিয় অনুচরগণকে হারাইয়া, বিপক্ষের প্রহারে নিজে জর্জ- রিত হইয়া, ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর সৈন্য লইয়াও যশােস্তসিংহ আরও তিন ঘণ্টা যুদ্ধক্ষেত্রে মােগলভাগ্য নিরূপণে আত্মােৎসর্গ করিলেন। মহারাজ শৌর্য্যে, বীর্য্যে, সাহসে রাজপুত-গৌরব হইলেও যুদ্ধ-চাতুর্যে ঔরঙ্গজেবের সমকক্ষ ছিলেন না। নচেৎ ভ্রাতৃ-সম্মিলনের অবসর না দিয়া তিনি উভয়কে একে একে সমূলে বিনষ্ট করিতে পারিতেন। তাহার বিক্রম সম্মুখযুদ্ধে আত্মপ্রাণ উৎসর্গে নিবেদিত হইলেও তিনি রণকৌশলে রণবিজয়ে সফলকাম হইলেন না। সন্ধ্যাকালে ঔরঙ্গজেব যেন নৈসর্গিক অনুপ্রেরণায় নূতন-বলে সৈন্য-চালনা করিতে লাগিলেন। ক্লান্ত মােগলগণের শরীরে বীরশােণিত দ্বিগুণতরভাবে প্রবাহিত হইতে লাগিল । সেই বীরত্বের প্রভাবে কাতারে কাতারে রাজ- পুত-সৈন্য যুদ্ধে প্রাণাহুতি দিল। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হইয়া, সান্ধ্য-আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া মহারাজ যশােবন্তসিহ পাঁচ শতমাত্র সৈন্য লইয়া .ণে ভঙ্গ দিলেন। গােধূলিসময়ে মােগলের ভাগ্য-লক্ষ্মী ঔরঙ্গজেবের উপর প্রসন্না হইলেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ পরাজয়ে দারা। মহারাজ যশােবন্তসিংহের পরাজয় ও পলায়ন-সংবাদ যথাসময়ে দিল্লীতে প্রচারিত হইল। ভগ্নদূতমুখে পরাজয়-বার্তা শ্রবণ করিয়া ময়ুর-সিংহাসন উপবিষ্ট দারা এক অনাহুত অজ্ঞাত ভয়ে কাপিয়া উঠিলেন, পরমুহূর্তেই আত্মসংবরণ করিয়া ক্রোধদীপ্ত-নয়নে রাগে ও ক্ষোভে স্পন্দিত হইয়া পাদপীঠে সরোষে পদাঘাত করিলেন । তাহার আয়ত লােচনদ্বয় হইতে ক্রোধাগ্নি যেন বিদ্যুতাগ্নির স্ফুলিঙ্গচ্ছটা বিকীর্ণ করিতে লাগিল। যুদ্ধোন্মাদনায় তাহার পিধানে সশব্দে তরবারি ঝন্‌ঝন্‌ করিয়া উঠিল। ক্রোধের মাত্রা ঈমং প্রশমিত হইলে গম্ভীরগৰ্জনে দীরা বলিলেন, “বুঝি- য়াছি,বুঝিয়াছি, আমি বালক নহি। আমি ভারতে সাম্রাজ্য পরিচালনে স্পর্ধা রাখি। আমার চক্ষে ধূলি দেওয়া যশােবন্তের বুদ্ধিতে কুলাইবে না। আমি মনে করিয়াছিলাম, তিনি রাজপুত! অর্থলােভে স্বদেশগৌরবে উপেক্ষা করিয়া, বীরত্বের মর্যাদা ভুলিয়া, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু-হস্তে পরাজয় স্বীকার করিবেন না । কিন্তু দেখিতেছি, টাকায় সব হয়। আচ্ছা, ঔরঙ্গজেব। খুব একচাল চালিয়াছ।” নতজানু হইয়া বিনয়ন-স্বরে দূত বলিল, “সম্রাট! আপনি মহারাজ যশােস্তসিংহের উপর অযথা দোষারােপ করিতেছেন, তিনি রাজপুত। তিনি এবং অন্যান্য রাজপুত-বীরেন্দ্রমণ্ডলী যুদ্ধক্ষেত্রে যেরূপ শৌৰ্য্য, বীৰ্য্য ও সাহস প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা বােধ হয় পৃথিবীর কোন যুদ্ধক্ষেত্রে এ পর্যন্ত প্রদর্শিত হয় নাই। যখন ভীরু কাসেম খ। সৈন্য ও বারুদ লইয়া পলায়ন করিল, মেঘ- রাশির ন্যায় মােগল-সেনা আসিয়া রাজপুতগণকে পরিবেষ্টন করিল, রণ- ক্ষেত্র যখন ধূম-ধূলা-সান্ধ্য অন্ধকারে গাঢ় হইতে গাঢ়তর ভাবে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল, তখনও মহারাজ কেবল রাজপুতবীরােচিত সাহসে অসির উপর নির্ভর করিয়া উন্মত্ত বিক্রমে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন ; রাজপুত-শােণিতে পর্বত, উপত্যকা, সিপ্রা-সলিল রক্তপ্রবাহে অনুরঞ্জিত হইল। অসংখ্য মােগল-সৈন্যে পরিবেষ্টিত ও অতি অল্পসংখ্য রক্ষিসৈন্তু মাত্র লইয়া মহারাজ যশােবন্ত ; ;

২২ ঔরঙ্গজেব। • ঔরঙ্গজেব ও মােরাদের সহস্র আক্রমণ উপেক্ষায় উড়াইয়া যুদ্ধ চালাইতে লাগি- লেন। পদতলে প্রিয়তম বীরেন্দ্রগণ হত, রক্ষী সৈন্ত ক্ষীণতর, বিপক্ষের জয়নাদে অম্বরতল বিকম্পিত ; কিন্তু তখনও পর্যন্ত মহারাজ অবিচলিত, মহারাজ যেরূপ পরাক্রম প্রদর্শন করিয়াছেন, অভ্রভেদী বিন্ধ্যাচল এবং কল্লোলিনী সি। তাহার সাক্ষী। অবশেষে আট সহস্ৰ সৈন্যের পাঁচ শতমাত্র অবশিষ্ট দেখিয়া অগত্যা মহারাজ যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিলেন । মর্মভেদী ক্ষোভে স্তব্ধ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া সার বলিলেন, “ধন্য মহা- রাজ যশােবন্তসিংহ ! ধন্য রাজপুতগণের বীরপণা! আচ্ছা, ঔরঙ্গজেব ! তােমার সমূচিত শিক্ষা আমি নিজেই দিব। সম্রাট-সৈন্যের অবমাননা করিয়া, প্রকাশ্যে রাজবিদ্রোহী হইয়া তুমি পৃথিবীর অপর প্রান্তে গেলেও রাজরােষের করল কবল হইতে অব্যাহতি লাভ করিতে পারিবে না।" দারা স্বয়ং যুদ্ধে যাইবেন বলিয়া তৎক্ষণাৎ সেনানিবৃন্দকে লক্ষাধিক সৈন্য সুসজ্জিত করিতে আদেশ প্রদান করিলেন । বহু দিন , দিল্লী নগরীতে বিলাস-শান্তির তরঙ্গ বহিতেছিল। সৈন্যগণ কেল্লায় মদিরাঘােরে ও বিলাসে বিভাের ছিল । তরবারিসমূহ বৈরী-শােণিতপানে পিয়াসা শান্তি করিতে না পারিয়া মরিচা অঙ্গরাগ সম্পন্ন করিতেছিল, কামানের বারুদ অভিমানে গলিতেছিল, বন্দুক অবিরত মনুষ্য প্রাণ উড়াইয়া দিতে না পারিয়া নিশ্চল প্রহরীর স্কন্ধে বিরাজিত ছিল, সাঙ্গীনরা সূৰ্য্যকরে বিভাষিত না হইয়া অন্ধকার কোষে নিবদ্ধ ছিল। সৈন্যগণ গুলি-সন্ধান ভুলিয়া রমণীকটাক্ষ-ঈক্ষণে ব্যথিত ছিল। হঠাৎ এরূপ প্রবল যুদ্ধোদ্যমে সকলেই সন্ত্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ও ভীত হইয়া পড়িল। উদ্দীপনার লেশমাত্র নাই, তথাপি সম্রাটের আজ্ঞা, বীরসাজে যুদ্ধে যাইতে হইবে, কামানের সম্মুখে দাড়াইয়া জয়-পরাজয় নির্ণয় করিতে হইবে। কাজেই একটা নবজাগরণের সাড়া পড়িয়া গেল। সকলেই রণসজ্জায় ব্যস্ত ; দিল্লীর জনকল্লোলে গৃহে গৃহে যুদ্ধকথা ভিন্ন অন্য কথা নাই। সকলেই অবশ্যম্ভাবী অনিশ্চিতের প্রতীক্ষায় বিল। এই লক্ষাধিক মহতী মােগলবাহিনী যুদ্ধজয়ী সুশিক্ষিত। সিংহাসনরক্ষী যােবর্গ বিভিন্ন দুর্গ হইতে দারার সমুন্নত পতাকামূলে শ্রেণীবদ্ধভাবে সমবেত হইতে লাগিল। দারা নিজে বীরবেশে সুসজ্জিত ইহয়া, রণদুর্মদ আরবীয় অশ্বে আরােহণ করিঙ্গা সৈন্থ-পরিচালনে অগ্রসর হইলেন। প্রথমে অশ্বথযুক্ত ;

ঔরঙ্গজেব। ২ = কামানশ্রেণী, পরে গােলন্দাজ-সৈন্য,তৎপশ্চাতে শাণিত সাঙ্গীন, বর্শা ও সমুজ্জ্বল বন্দুকধারী পদাতিক দল, পরে পতাকাবাহী ও তরবারি, রণকুশল রণদুৰ্ম্মদ অশ্বারােহীদল উন্মাদনায় বিভ্রান্ত হইয়া সেই বিরাটবাহিনী বলদর্পিতভাবে চলিতে লাগিল। বালসূৰ্য্যের স্বর্ণ-কিরণ—উন্নত সাব্দীনে,অশ্বারােহীর শিরস্ত্রাণে প্রতিফলিত হইয়া দার:{ প্রাণে নব আশার সঞ্চার করিতে লাগিল। তিনি মােরাদ ও ঔরঙ্গজেবের প্রতীক্ষায় সম্বল নদী-তীরে শিবির-সংস্থাপন করিলেন। মােরাদ ও ঔরঙ্গজেব জয়ােল্লাসে উৎফুল্ল হইয়া, দিল্লী-বিজয় অদূরবর্তী মনে করিয়া যুগপৎ সাহসে প্রচণ্ড বিক্রমে সসৈন্যে সম্বল-তীরে উপনীত হইলেন। বিলম্বে অসহিষ্ণু মােরাদ সেই দিনেই নদী-পার হইয়া মহারাজ যশােবন্তসিংহের মত দারার সৈন্যকে পরাভূত করিবার জন্য ক্লান্ত সৈন্যগণকে উদ্দীপ্ত করিতে লাগিলেন। কিন্তু রণ-কৌশলচতুর ঔরঙ্গজেব দেখিলেন, স্বয়ং দারা কর্তৃক পরি- চালিত এই অসংখ্য সৈন্যকে আক্রমণ করিবার জন্য নদী পার হইলে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইতে হইবে। সুতরাং তিনি সেই রাত্রেই দারাকে ভুলাইবার জন্য শুন্য শিবির ফেলিয়া নিঃশব্দে অন্ধকারে সসৈন্যে আগ্রার পথে প্রস্থান করিলেন ;- আগ্রার ৭৮ ক্রোশ দূরবর্তী শ্যামগড়ে যমুন-তীরে শিবির-সন্নিবেশ করিলেন। পরদিন প্রভাতে দারার সৈন্যগণ দেখিল, বিপক্ষ-শিবির শুন্য। ঔরঙ্গজেবের বুদ্ধিচাতুৰ্যে পরাজিত হইয়া বিস্ময়াপন্ন দারা সহচর সেনানীবৃন্দকে যথেষ্ট অনু- যােগ করিতে লাগিলেন এবং তৎক্ষণাৎ শ্যামগড়াভিমুখে অভিযান করিলেন । শ্যামনগরে উপনীত হইয়া উভয় সৈন্য পরস্পর সম্মুখীন হইয়া চারি দিন নিশ্চল স্থাণুর ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিল। কেহ কাহাকে আক্রমণের ছিদ্র খুঁজিয়া পাইলেন না। পঞ্চম দিবস প্রাতে দারা বিপক্ষ সৈন্যকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করিবার জন্য রণসমুদ্রে ঝম্প প্রদান করিলেন। সেই মহতী অনীকিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া সমভাগে রাজপুতরাজ রামসিংহ ও চত্তরশাল, দক্ষিণ- দিকে কালীউল্লা এবং মধ্যে স্বয়ং দারা সেনাপতিত্বের ভার গ্রহণ করিলেন। প্রবলবিক্রমে তিন বীর বিপক্ষবাহিনী ছিন্নভিন্ন করিতে লাগিলেন। রণসূচনার প্রথম ঘণ্টাতেই দারা বিজয়ী হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। ঔরঙ্গজেব পূৰ্ব্ব হইতেই সেনাপতি কালীউল্লাকে অর্থ দ্বারা বশীভূত করিয়া রাখিয়াছিলেন। অর্থভুক্ সেনাপতি যুদ্ধের অভিনয় করিয়া বিপক্ষ পক্ষকে অগ্রাহ করিতে লাগিলেন। তাহার সৈন্থশ্রেণী ঝটিকাবেগে তুলারাশির ন্যায় উড়িয়া যাইতে লাগিল। বিপক্ষপক্ষ তাহার সৈন্যদলকে সম্পূর্ণরূপে বিধস্ত করিল।

ঔরঙ্গজেব। ঔরঙ্গজেব সহসা দারার সৈন্যের দক্ষিণ পার্শ্ব প্রচণ্ড বিক্রমে আক্রমণ করি লেন। ঠিক সেই সময় একটি অদৃশ্য হস্তচালিত গুলিতে রাজপুত বীর রামসিংহ যুদ্ধক্ষেত্রে লুষ্ঠিত হইলেন। তাহার সৈন্য ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। রাজপুত বিক্রমে সৈন্থগণকে প্রবুদ্ধ করিয়া চত্বরশাল প্রাণপণে মুরাদ সৈন্যের সহিত অতুল বিক্রমে যুদ্ধ করিতে করিতে প্রাণ বিসর্জন করিলেন । অতঃপর দারার সৈন্ত উভয় দিক হইতে ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ সৈন্যদলে নিষ্পিষ্ট হইতে লাগিল। দারার সৈন্য অধিকাংশই অশ্বারােহী । দারার জন্য আজ তাহারা যে অমানুষিক বীরত্ব প্রদর্শন করিল, তাহা বীরত্বের: ইতিহাসে অতুলনীয়, সুবর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবার যােগ্য। ঔরঙ্গজেব ও মুৱাদের সৈন্যও আজ নির্ভীক, রণজয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সান্ধ অন্ধকারে দিনমণি লুকায়িত হইবার মুহূর্তে রণােন্মাদনার ঈষত্র অপসারণে উভয় পক্ষ চক্ষু মেলিয়া সহসা ভীষণ রণক্ষেত্রের চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিল । দেখিল, তাহা হৃদয়বিদারণ লােমহর্ষণ ভীষণ দৃশ্য ! ক্রোশের পর ক্রোশ ব্যাপিয়া; স্তুপের পর স্তুপাকারে, কোথাও পৰ্বতাকারে অশ্ব পদাতিক অশ্বারােহীর রক্তমণ্ডিত অসংখ্য মৃতদেহ ; রণভূমি মনুষ্য-রক্তে ও শবে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত। ওঃ! -- কি প্রলয় তাণ্ডব মহাশ্মশান । সেই নারকীয় দৃশ্য চাক্ষুষ দেখিয়া উভয় সৈন্য সম্মুখ যুদ্ধ বিস্মৃত হইয়া স্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল। উত্থিত তরবারি স্থির হইল। গুলীভরা বন্দুক নিস্তব্ধ হইল। এই সঙ্কটময় অবস্থার প্রতিমুহূর্তে বন্দী হইবার আশঙ্কা করিয়া এবং ঔরঙ্গজেব হস্তে অশেষ নি গ্রহের কল্পনা করিয়া পুত্র সহ দারা যুদ্ধ- ক্ষেত্র হইতে সিন্ধুদেশাভিমুখে প্ৰধাবিত হইলেন। দারাকে পলাইতে দেখিয়া বিপক্ষ সৈন্ত জয়ােল্লাস করিয়া উঠিল। দারার বিপুলবাহিনী রণে ভঙ্গ দিল। স্যামগড়ের ডায়লণ্ডই ঔরঙ্গজেবের দিল্লীর সিংহাসন লাভ। জয়ােল্লাসে মত্ত হইয়া ঔরঙ্গজেব ভ্রাতা মুরাদকে আলিঙ্গন পূৰ্ব্বক সৈন্যমণ্ডলীর সম্মুখে তাহাকে সম্রাট বলিয়া বারংবার সম্বর্ধনা করিতে লাগিলেন। মুরাদও সম্রাটগর্বে ও বীরত্ব-গৌরবে আনলে অধীর হইয়া নৃত্য-গীত-মদির প্রমত্ত হইয়া বিলাস-স্রোতে গা ভাসাইলেন। ঔরঙ্গজেব বিশ্বাসঘাতক কালী-উল্লাকে পরম সদরে সসম্মানে পুরস্কৃত করিলেন ।

সপ্তম লহী। = পুনরভ্যুদয়ে শাহজাদা সুজা। বারাণসীযুদ্ধে পরাজিত, লাঞ্ছিত, ও বিতাড়িত হইয়া, বীরবর সুজার আত্মা- ভিমানে বড়ই আঘাত লাগিল। প্রাণভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলাইয়া আসিয়া- ছেন, সে অপমানে তিনি যেন আত্মবিস্মৃত হইয়া পড়িলেন। ভদসৈন্য লইয়া, যুদ্ধাভিযানে, সম্পূর্ণ বিদ্ধস্ত হইয়া, বিষন্ন-মুখে উন্নত মস্তক অবনত করিয়া, সুজা রাজধানী রাজমহলে প্রবেশ করিলেন। দীপাবলী তেজে উদ্ভাসিত, রূপের শহরে স্পন্দিত, সঙ্গীতঝঙ্কার-মুখরিত, আনন্দস্রোত-প্রবাহিত রাজমহলের রঙ্গমহল যেন পরাজয়-প্রভাবে নিষ্প্রভ হইয়াছিল। সুজার পদার্পণে সে ভাব বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হইল না, বরং স্নানে গম্ভীরে মিশিয়া, মেঘাড়ম্বরপূর্ণ আকাশের গাম্ভীৰ্যপ্রহেলিকার সৃষ্টি করিতে লাগিল। সে ঘনঘটার ঘাের দেখিয়া, সভাস-সেনানীগণ অদূরবর্তী ভবিষ্যতের আশঙ্কায় মহা চিন্তাকুল হইলেন। শান্তিনিকেতন বঙ্গে আবার শান্তি বিরাজিত হইবে, না বিদ্রোহের ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি আবার দ্বিগুণতর তেজে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিবে, এই সম- স্যার মীমাংসায় সকলেই ব্যাকুল ,সাহা সুজাও তাহার সমাধান করিতে পারেন নাই। পরাজয়ের অবসাদে তিনি এরূপ বিহ্বল হইয়া পড়িলেন যে, তাহার শৌর্য-বীৰ্য্য-প্রতিভা সমস্তই প্রভাহীন হইয়া পড়িল। তিনি প্রায়ই উদাস-নয়নে অন্যমনস্ক ; বিলাস-পরায়ণতা তাহার নিকট হইতে অতি দূরে অবস্থান করিতেছিল। তাহার বীরত্ব যখন এরূপ অবসাদে নিপীড়িত, সেই সময়ে একদিন তাহার প্রিয়তমা বেগম প্যারীবানু তাহার মানসিক অবসন্নতা উপলব্ধি করিয়া, নানাপ্রকার উৎসাহপূর্ণ বাক্যে তাঁহাকে উদ্দীপিত ও অনুপ্রাণিত করিয়া তুলিলেন। সেই উদ্দীপনাপূর্ণ, বাক্যে যেন কোন্ মৃতসঞ্জীবনী শক্তিপ্রভাবে শাহজাদা সুজা দীপ্ত বীরত্বে কালিয়া উঠিলেন। তখনই মন্ত্রণাসভা আহত হইল সেই সভায় তিনি সেনানীগণকে একত্রিত করিয়া, বীরশােণিতসঞ্চালিনী, অতি তেজস্বিনী, হিণী বক্ততা করিলেন সে বক্তৃতাচ্ছটা আলাময়ী।

২৬ ঔরঙ্গজেব। তাহাতে সুযুক্তিপ্রয়ােগ যতদূর না থাকুক বীরত্বেরগর্বের যথেষ্ট ছিল। প্রবীণ মন্ত্রিগণ বার্ধক্যোচিত সুযুক্তি দেখাইয়া, সুজাকে যুদ্ধাভিযানে নিষেধ করিলেন। সেনানীবৃন্দ বলদর্পিত হইয়া, অসি স্পর্শপূর্বক শপথ করিয়া বলিল, “শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকিতে আমরা এবার রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিব না।” আপ্রত্যয়ী সুজা সদম্ভে বলিলেন, “এবার দিল্লীর বিপুল বাহিনীর সঙ্গে আমাদের সঘর্ষ নহে, তাহারা বিধ্বস্ত হইয়া সিন্ধুপারে যাইতেছে। এবার সেই বালক মুরাদ, আর ফকির ঔরঙ্গজেবের সহিত আমাদের যুদ্ধ। এবার আমাদের জয় সুনিশ্চিত। বিপক্ষবাহিনী যদি আল্লার অনুপ্রেরণায় পরিচালিত হয়, তথাপিও আমার বিপুল বাহিনীর অতুল বিক্রম সহ্য করিতে পারিবে না।” তখনই সমর-আজ্ঞা প্রচারিত হইল। উন্নত-পতাকামূলে সৈন্য সমবেত আরম্ভ হইল। বঙ্গের বিভিন্ন প্রদেশের রাজা ও ভূমিগণ নিয়মমত সৈন্য প্রেরণ করিতে লাগিলেন। তিন দিন মধ্যে রণদুৰ্ম্মদ পূৰ্ব্বাপেক্ষা দ্বিগুণতর বাহিনী সজ্জিত করিয়া, সাহান্ সুঙ্গা আবার দিল্লীর পথে যুদ্ধাভিযান করিলেন। রাজপুত-বীরেন্দ্র যশােবন্ত সিংহ উজ্জয়িনীতে কাসেম খাঁর বিশ্বাসঘাতকায় পরাজিত হইয়া, যুদ্ধক্ষেত্র হইতে স্বদেশাভিমুখে পলায়ন করিয়া ছিলেন, পাঠকের সে কথা স্মরণ আছে। বীরবর যশােবন্ত সিংহের তেজস্বিনী মহিষী রাজপুত-গৌরব রাণার কন্যা মহা গৌরবিনী, বীৰ্য্যবর্তী, বীরাঙ্গনা। মােধপুরমহিষী স্বামীর রণস্থল হইতে পলায়নবাৰ্তা শ্রবণ করিয়া, আত্মাভিমানে অলিয়া উঠিলেন ;-লাঞ্ছিত ক্লান্ত স্বামীকে দুর্গে প্রবেশ করিতে না দিয়া, তােরণদ্বার অবরুদ্ধ করিলেন ; দূতমুখে বলিয়া পাঠাইলেন, “কাপুরুষের জ যােধপুর-দুর্গ নির্শিত হয় নাই। আমার স্বামী সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হইয়া, রাজপুত নামে কালী দিয়া, শত্রুকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়া, শৃগা- লের ন্যায় ফিরিয়া আসিয়াছেন, এ কথা শুনিবার অপেক্ষা-প্ৰবলবিক্রমে সম্মুখসংগ্রামে আমার স্বামী প্রাণাহুতি দিয়াছেন, এ কথা শুনিলে সে বৈধব্য আমার অনেক সুখের বােধ হইত।” বীরাঙ্গনার ধিকারে মর্মাহত হইয়া ষশােস্ত সিংহ ক্ষমা ভিক্ষা করিলেন, কিন্তু রণরঙ্গিণী রাজী বলিয়া পাঠাইলেন, “আমার স্বামী যশােবন্ত সিংহ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন। কাপুরুষ। অমান্স ঔরঙ্গজেব। স্বামীর ছদ্মবেশে আমাকে ছবিতে অসিয়াছ? আমি রাজপুতবালা, কাপুরুষকে আত্মসমর্পণ করা অপেক্ষা-অনলে আত্মাহুতি প্রদান করিয়া শাস্তিলাভ করিব।” এ লাঞ্ছনা যশোবন্ত সিংহ সহ করিতে পারিলেন না, প্রচণ্ড-বিক্রমে অত্মোৎসর্গে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, পুনৰ্বার রাজপুতসৈন্ত সম্মিলিত করিয়া, তিনি বীরত্বের কীর্তি রাখিবার জন্য আবার মােগলবিদ্রোহে যাত্রা করিলেন। রাঙ্গীর তিরস্কার বাক্যে তাহার মৰ্ম্মে শেলাঘাত হইয়াছিল শিরায় শিরায় শােণিত- প্রবাহ দ্বিগুণতর বেগে ছুটিতেছিল। রাজপুত যােদ্ধগণের শরীরেও উদ্যম সঞ্চারিত হইতেছিল। যশােবন্ত সিংহ সৈন্যগণকে পূৰ্বগৌরব স্মরণ করাইয়া উদ্দীপিত করিতেছিলেন। বীরতেজে কয়েক দিনের মধ্যে সসৈন্যে আগরায় উপনীত হইয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে রাজা যশােবন্ত সিংহ যুগপৎ বিস্ময়ে ও ক্ষোভে আপ্লুত হইলেন। দেখিলেন, দারা বিধ্বস্ত, পলায়িত ; ঔরঙ্গজেব বিজয়ী। অচিরেই ভারতের রাজধানী দিল্লীর অধীশ্বর হইবেন! কুটনীতি ঔরঙ্গজেবকে তিনি সর্পসদৃশ ভয় করিতেন। একদিন যাহাকে উপেক্ষা করিয়াছেন, তাহারই সৌভাগ্য দেখিয়া তিনি ক্ষোভিত ও বিস্মিত হইলেন। অথচ ঔরঙ্গজেবের বিপুল বাহিনীর সহিত এক্ষণে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে, সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হইতে হইবে বুঝিয়া, তিনি সুযােগের অপেক্ষায় আগরার উপকণ্ঠে শিবির সন্নিবেশ করিলেন। এই সময় তিনি সংবাদ পাইলেন, বঙ্গদেশ হইতে সুজা দ্বিতীয়বার অভিযান করিয়াছেন। এই সংবাদে তাঁহার আশা হইল সুজার সম্মিলনে ঔরঙ্গজেবের উচ্ছেদ করিয়া, ভারত-সিংহাসনের ভাগ্য বিধান করিবেন, সাম্রাজ্যের হর্তাকর্তা হইবেন, ইহাই তাহার আন্তরিক অভিপ্রায়। ঔরঙ্গজেবের মিত্ৰবেশে একটি পরম শত্রু আগরায় আসিল। ;

অষ্টম লহরী মুরাদের পরিণাম। শ্যামগড়ের যুদ্ধে দারাকে পরাজয় করিয়া, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ সসৈন্তে মথুরা পর্যন্ত তাঁহার পশ্চাদ্ধাবন করিলেন ; বিজয় গৌরবে শ্যামগড়ের নামকরণ করিলেন, “ফতেবাদ।” সে দিন মধুরার শিবিরে আবার আনন্দের তুফান ছুটিল! ঔরঙ্গজেব সৰ্ব্ব-সৈন্যের সম্মুখে সবিস্ময়ে বারংবার মুরাদকে সম্রাট বলিয়া সংবর্ধনা করিলেন ; সামান্য সভাসদের ন্যায় আভূমি অবনত হইয়া, যুগলহস্তে বারংবার সেলাম দিলেন। আত্মগৌরবে স্ফীত মুরাদ সম্রাটের কল্পনা মনে জাগাইয়া স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করিতে লাগিলেন! গৌরব-মদিরার অহমিকায় তিনি অব্দি আত্মহারা। রণঙ্গে ক্লান্ত মুরাদ আজ প্রাণ ভরিয়া রূপ-মদিরায় তৃপ্ত হইবার জন্য একটি নাচ মজলীসের আয়ােজন করিলেন। রূপসীগণ যুদ্ধের কামান- গােলার অবিরত ভীষণ গর্জনে কম্পিত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিল ;-আজ গৌরবময় বিজয়-উৎসবে আনন্দের ফোয়ারা ছুটাইতে তাহারা বড় ব্যস্ত হইয়া পড়িল। ইন্দ্রিয়মুগ্ধকর ও উদ্দীপক সকল সামগ্রীই তথায় প্রচুর-পরিমাণে বর্তমান। মদিরাবেশে স্থলিতবসনে সূশ্ন আবরণ হইতে অঙ্গরাগ বিকাশ করিয়া সুন্দরীগণ যেন পদ্মবনে মলয়-সঞ্চালিত, তরঙ্গ-হিল্লোলে স্পন্দিত হংসী- ষুধের মত নাচিতেছেন। সেই বিলাস-সরােবরে কমলিনীদল বেষ্টিত রাজহংসের মত রসরাজ মুরাদ আনন্দে-অধীরে পুলকিত হইতেছেন। মরি! মরি! কি সুন্দর,-ইন্দ্রিয়মুগ্ধকর, সৌরভ-মাধুরী-বিচ্ছুরিত আন- ন্দের তুমুল রঙ্গ ছুটিতেছে! ফাটিক সামাদানে কি স্নিগ্ধ আমােদপূর্ণ দীপ- মালা ভাতি বিকীর্ণ করিতেছে। স্কুপের পর পাকারে পুষ্পরাশির কি। পরিমল গন্ধমদিৰ অমিয় সৌরভ বায়ুর তরঙ্গে খেলিতেছে। সর্বোপরি সুগন্ধ স্মতা বিলাসিনীগণের বালারের দীপ্তিতে,—চারুহাসিনীগণের আড়নয়নের ঔরঙ্গজেব। বঙ্কিম কটাক্ষে, চতুর্দিক বিভাসিত ; ফুল্লারবিন্দ সদৃশী প্রফুল্লমুখের মধুর মুচকি হাসিতে নৃত্যসভায় কি চমৎকার বিজলীর তরঙ্গই ছুটিতেছে। প্রেমােন্মত্ত শাহাজাদার চিত্ত ক্ষণে ক্ষণে বিমুগ্ধ হইতেছে, চক্ষের নিকট ফুল্লমুখীদের হাস্যময়ী মধুমূৰ্ত্তি হাসিতেছে। বিলাসিনীগণ আজ বিচিত্র ভূষণে-সূক্ষ্মবসনে-মনােমদ ভাবে সুসজ্জিত। আজ তাহার মুরাদের নিকট প্রেমাদরে পুরস্কৃত হইবে। কাহারও পীনােত পয়ােধরযুগল অনাবৃত-কেবল ফুলহারে আচ্ছাদিত; সুক্ষ্ম পেশােয়াজে ক্ষীণ কটিতট সুশশাভিত ; মেদিরাগরক্ত সুন্দর পদে সােনার নূপুর যেন তালে তালে ঝঙ্কার দিয়া অধীরভাবে প্রেমিককে ডাকিতেছে ! কোন মনােমােহিনীর সুচিকণ নীলবাস ফুটিয়া বৰ্ণ প্ৰভা বাহির হইতেছে, যেন নীলাম্বুবক্ষে পূর্ণচন্দ্র হাসিতেছে! কোন সুকেশিনীর কুঞ্চিত অলকদাম ললাটে-কর্ণপার্শ্বে, গ্রীবা- প্রান্তে-বিন্যস্ত হইয়া, প্রফুল্ল মুখখানিকে যেন মৃণালদলে আবদ্ধ করিয়া,চোখের বিজলীতে হীরকপ্রভা পরাজিত করিতেছে। কোনও শ্যামাঙ্গী মরালগ্রীবা উন্নত করিয়া, কর্ণকুণ্ডলের রত্নের দীপ্তির সহিত সমভাতিতে হাসিয়া, চাদধরা ফাদ পাতিতেছে। কোন শ্যামাঙ্গী কালাে কেশের রাশিতে চাঁদের হাসির মত হীরার হার পরিয়াছেন, কোন সুন্দরী কুঞ্চিত কেশদামে বেণী বিনাইয়া কেহ বা অলকা উড়াইয়া, মরালনিন্দিত ভঙ্গীতে হাসিয়া হাসিয়া মুরাদের সহিত গল্প করিতেছে; কর্ণকুণ্ডলের হীরকভাতির সহিত মুরাদের ঔৎসুক্য বেশ মিলিতেছে। কোনও পূর্ণলাবণ্যময়ী সতৃষ্ণদৃষ্টিতে মুরাদের দিকে চাহিয়া, হেমপাত্রে সুরাধারা ঢালিতেছে। মুরাদ আকণ্ঠ পুরিয়া সেই সুস্বাদে প্রমত্ত হইতেছেন। সুন্দরীগণ সকলেই রত্ন-ভূষণের উপর পুষ্পভরণা। ফুলরাণী সাজিয়া, ফুলের হাসি হাসিয়া, ফুলশরের সন্ধান করিয়া, কেশদামে ফুলের মালা জড়াইয়া,সুকোমলকণ্ঠে পুষ্পমালিকার স্নিগ্ধ প্রভা বিকাশ করিয়া, কেহ ফুলের পাখায় হাওয়া খাইতে হাওয়া খাইতে খাইতে, কেহ পুষ্পগুচ্ছ হইতে ফুল ছড়াইতে ছড়াইতে নাচিতেছে। পুস্পের সৌরভে-সিঞ্চিত সৌরভবারির সুগন্ধে-গন্ধদীপের সৌরভে-গন্ধমােদিত বিলাসিনীগণের অঙ্গের সৌরভে শিবিরের বায়ুমণ্ডল সৌরভময়। সুন্দরীগণ হাবভাব-কটাক্ষ তুবনমােহিনী। সুধাপ্রভাবে প্রমত্ত মুরাদ উন্মত্ত। রঙ্গিীগণ সপ্তসুরসম্মিলিত সুমধুর বীণাদি যন্ত্রে শিবির প্রতিধ্বনিত ;

ঔরঙ্গজেব। করিয়া, ততােধিক সুমধুর পরিমলবী, রমণীকণ্ঠের সহিত ঐক্যতানে মিলন করিতেছে। তান-লয় মিলাইয়া, নূপুরের প্রেমবিনােদন মৃদুমন্দ ভাষে বাদ্য- ঝঙ্কারকে পরাভূত করিয়া, অলঙ্কার-শিঞ্জিনীতে মনােমােহন করিয়া বিচিত্র অঙ্গভঙ্গিমায় নাচিতেছে। আর সােমে সােমে মুরাদকে কটাক্ষসম্পাত করি- তেছে। মরি, কি মধুর তান ! কি প্রাণমনােহারী সুর ! কি সুধাবর্ষি ধ্বনি ! কি সােহাগ-আবেগে অধীর লয়! কি চিত্তবিনােদন আদিরস সঙ্গীত। এই সুধামাখা হাসি-চাহনির লহরীর সহিত সিরাজী মদের ফোয়ারা প্রবলবেগে ছুটিতেছে। প্রত্যেক সুন্দরীর হস্তেই সুরাপাত্র। সুধা লালসার ক্রীতদাস মুরাদ প্রত্যেক সুন্দরীর পাত্র হইতে এক এক চুমুক মদ লইয়া, প্রত্যেককে আলিঙ্গন ও চুম্বনে পরিতুষ্ট করিতে লাগিলেন। উগ্র মােহন মাদকতায় বিহ্বল হইয়া, মুরাদ ক্ৰমে মােহাভিভূত হইলেন, তাঁহার সংজ্ঞা লােপ পাইয়া আসিল। মদিরারক্ত উদ্ভ্রান্ত-নয়নে তিনি সুন্দরীদের নৃত্যরঙ্গ দেখিতেছেন বটে, কিন্তু তাহার ভিতর অনুভূতির সঞ্চার নাই। সমবেত নৃত্যরত্ন সমাপ্ত হইলে, বিশেষ নৃত্য আরম্ভ হইল। দুইটি রঙ্গিণী মদিনাপাত্ৰ-হস্তে উলঙ্গবাহার দেখাইতে দেখাইতে নৃত্য করিতে লাগিল। লাজচ্ছটা-বিকশিত রক্তিম গণ্ডে, বিজলী-তরঙ্গিত প্রেম-উদ্ভাসিত নয়নে, মধুর হাস্যরঞ্জিত অধরে চুম্বনদানের জন্য ব্যগ্র হইয়া,মুরাদ স্বলিত চরণে গিয়া,সুন্দরী দ্বয়কে আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ করিলেন, অবিরত চুম্বনদানে ব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। তাঁহাকে রূপােল্লাসে ব্যস্ত হইতে দেখিয়া, অন্য রূপসীরা চতুর্দিক হইতে তাহাকে বেষ্টন করিল। চারুহাসিনীগণের চাদর মােহন ফাদে ধরা পড়িয়াছেন দেখিয়া, তিনি রঙ্গিণীদ্বয়কে লইয়া ভূতলশায়ী হইলেন। অকস্মাৎ সেই সময় রমণীবেশে সজ্জিত চারি জন প্রহরী সেই রূপপ্রভাময় রঙ্গ- কক্ষে প্রবেশ করিল; অতি ধীরে আলিঙ্গনবদ্ধ মুরাদের হস্ত-পদ রেশমী রুমালে আবদ্ধ করিল। কোথাকার প্রহরী ? এতক্ষণ যাহারা মুরাদের মুগ্ধচিত্তের প্রহরীতা করিতেছিল সেই সকল বিলাসিনীর মধ্যে রমণীবেশে সজ্জিত চারিজন প্রহরী । মুরাদ মনে করিলেন,রঙ্গিণীরা রঙ্গ করিতেছে। তিনি নিশ্চেষ্ট হইয়া তখনও রসভৃঙ্গরাজের মত অধসুধাপানে রত। প্রহরী চতুষ্টয় রুমালে হস্তপদ দৃঢ়বদ্ধ করিয়া প্রমত্ত মুরাদকে রঙ্গকক্ষের বাহিরে লইয়া গেল। সেই বন্ধন অবস্থায় তাঁহাকে হকিপৃষ্ঠে চড়াইয়া, সেলিমগড়ের পথে প্রেরণ করা হইল। সেই ঔরঙ্গজে , সময়ে সেলিমগড়ের পথে আরও তিনটি সুসজ্জি হস্তী প্রেরিত হইল। পাছে মুরাদের সৈন্যগণ রক্ষীসৈন্যগণকে বধ করিয়া তাহার উদ্ধাধন করে, এইজন্যই এইরূপ সাবধানতা। কুটবুদ্ধি ঔরঙ্গজেব কৌশলনীতিতে পরিপক ছিলেন ; সূক্ষ্মবুজিভাবে, তিনি চারিদিকের সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া, কৌশলজাল বিস্তার করিতে পারিতেন,এই জন্যই তাঁহার কৌশলজালের কোন সুত্র কখনও ছিন্ন হইত না, অভীষ্ট সিদ্ধ হইত-ই-হইত। মুরাদকে বন্দী করিয়া বিজয়ী ঔরঙ্গজেব তাঁহাকে গােয়ালিয়র-দুর্গে অবরুদ্ধ করিলেন। সঙ্গে রহিল কেবল মুরাদের প্রিয়তমা উপপত্নী সমরুলবাঈ। রাজনীতি ঔরঙ্গজেব মুকাদের রঙ্গিণীগণকে কাৰ্যোদ্ধারের জন্য যথেষ্ট পুরস্কৃত করিলেন। ।

নবম লহরী । নিষ্কণ্টকে সিংহাসনে। ঔরঙ্গজেব ফকিরি গ্রহণ, মা প্রয়াণ ও ধর্মের জন্য আত্মত্যাগের ভণ সুকৌশলে অপসাবিত কবিয়া, অকুতােভযে নিজে সম্রাট বলিয়া ঘোষণা কৰিলেন। মুসা- পকে বন্দী কবিয়া, মথুবা হইতে আগ্ৰাষ ফিবিষা, তিনি অতুলনীষ ইন্দ্রপুবী তুল্য আগ্রাব প্রাসাদে প্রবেশ করিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিত্ৰ সকলেই বিতাড়িত, প্রহরিগণ কেহই তাহাকে বাধা দিতে সাহস কবিল না । প্রাসাদে সম্মুখ-হবে প্রাপ্ত শিবিবে মুবাদ ও ঔৰঙ্গজেবেব উভয়পক্ষায় বিজষী সৈন্থগণ বীৰদৰ্পে অবস্থান কবিতে লাগিল। বঙ্গজেব স্বীষ পুত্র বীরবল মহম্মদকে কতিপঙ্গু অতি বিশ্বস্ত সৈনিক সহ বঙমহলে (প্রবণ কবিলেন। বৃদ্ধ সমাচ্ শাজাহান সেই সময মহদেব গবাক্ষ দিবা,প্রিয়তমা বেগম মমতাজের প্ৰেমসূতিৰ পুণ্যমৰ মন্দিৰ সিমই দর্শন কবি, অশ্রু প্রবাহে ভাসিতে- ছিলেন। সহস। তাহৰ শষাবিণী শাক চাদী জাহানাব আসিযা অত্যন্ত তী হইব। সংবাদ দিলেন, বিল্পী ঔবঙ্গজেব সসৈন্যে অগ্রিবি প্রাসাদে প্রবেশ বিছেন, শীঘ্রই বমহলে প্রবেশ কবিবেন। এ সংবাদে বৃদ্ধ শাজাহান বিন্দু- মাত্র বিচলিত হইলেন না, তিনি জানিতেন, বঙ্গজেব তাবই উপযুক্ত বীরপুল, কিন্তু তাহার এই ধাৰণা সম্পূর্ণ ভুল। তাহাকে সিংহাসন হইতে বিচ্যুত কবিয়া, নিজে হিন্দুস্থানের সিংহাসনে উপবেশন কবিষেন, ভাবতে মুসলমান-ধৰ্ম্মেব বিজধ্বজা উডাইবেন, ইহাই বঙ্গজেবেব আন্তবিক উদ্দেশ্য মান। আবরণে প্রচ্ছন্ন হইলেও এ ভাব এখন পবিস্ফুট হইয়া পড়িয়াছিল। কয়েক মুহূর্ত পবেই শাহাজাদীর কল্পিত ভৰ কাৰ্যে পরিণত হইল। শাই ৫াদা মহম্মদ সেনাগণকে লইয়া সম্রাট শাজাহানের কক্ষে প্রবেশ কবিলেন। ঔরঙ্গজেবের কুমনামা দেখাইয়া “সম্রাট, শাজাহান বন্দী” একথা তাহাকে শুনাইলেন। আরও বলিলেন, “আপনার শরীর দুর্বল, এ শরীব কঠোৰ গাজকাশে অবােগ্য, দায় বিধর্মী, সুজা বিলাসী, মােবাদ মাভাল এই জই আমার পিতা অধৰ্মৰক্ষাৰ্থ সাম্রাজ্যের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ কবিলেন। আপনি উহাকে সে অধিকার বঞ্চিত করিয়াছিলেন খলিষা, চিলি তরবারি ঔরঙ্গজেব। সাহায্যে নিজ ব্যায্য অধিকার হস্তগত করিতে বাধ্য হইয়াছেন। তজ্জন্য আপনি তাহার প্রতি কিছুমাত্র বিরক্ত হইবেন না, বরং উক্ত কাৰ্য্য আপনার অনভিপ্রেত হইবে না, ইহা তিনি আশা করেন। তাহার একান্ত ইচ্ছা, আপনি কিছু দিন এই রঙ্গমহলের সীমানার মধ্যে বিশ্রাম করিয়া আপনার ভগ্নস্বাস্থ্য পুনর্গঠিত করেন। এ বিষয়ে আপনার আদেশ তাহার শিয়ােধাৰ্য্য। বিরাট মােগল-সাম্রাজ্য শাসনের গুরুভার হইতে কিছু দিন আপনাকে অবসর দিয়া পিতৃদেব আপনার মহামূল্য জীবনের শেষভাগ নির্বাধ ভাবে ধর্মচর্চায় কাটাইবার সুযােগ আপনাকে দিতেছেন। এই বিশালৰাজ্য- শাসনের সকল প্রকার আয়াস, উদ্বেগ, অশান্তি এবং ক্লেশ কেবলমাত্র আপনার চরণে ঐকান্তিকী ভক্তি রাখিয়া, পিতৃদেব একাকী বহন করিতে স্থিরনিশ্চয় হইয়াছেন। তিনি বিনীতভাবে আপনার নিকট নিবেদন করিয়াছেন, ‘যুবরাজ দারা স্বধৰ্ম্মে আস্থাহীন এবং দাম্ভিক ; অবিমৃষ্যকারিতার ফলে তিনি রণে পরা- জিত হইয়া পলায়ন করিয়াছেন। শাহাজাদা সুজা ভােগী ও হঠকারী, তিনি পরিণামচিন্তার অভাববশতঃ হঠকারিতা দেখাইতে গিয়া সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হইয়া ছেন। বাদশাহজাদা মুরাদ বারাঙ্গনা ও সুরার সেবায় জীবন পণ করায় এক্ষণে শালিমগড় দুর্গের নিভৃত কক্ষে বিলাসতরঙ্গে নিমগ্ন। এ ক্ষেত্রে আপনার বিবেচ- নায় মােগল-সাম্রাজ্যের গুরুভারবহনে স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠ, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, অকাতর এমপরা- মণ, মহােৎসাহী, কুটনীতিজ্ঞ, প্ৰবগপ্রতাপ এবং বীরাগ্রগণ্য আপনার তৃতীয় কুমার দাক্ষিণাত্যবিজয়ী পিতৃদেব শাহজাদা ঔরঙ্গজেবই যে আপনার বিচনায় একমাত্র সুযােগ্য পাত্র বিবেচিত হইবেন, তাহাতে তিনি অণুমাত্র সন্দেহ করেন । সেই সন্দেহ করেন না বলিয়াই যাহা যাহা কৰ্তব্য, তাহার অনুষ্ঠানে তিলমাত্র অবহেলা করেন নাই।-এই কর্তব্যপালন জন্য অবশ্য তিনি চির- দিনই আপনার মেহাশীৰ্বাদভাজন হইবার সম্পূর্ণ যােগ্য, ইহাও তাহার আশা। তাহার যাহা যাহা নিবেদ্য ছিল, জাহাপনার রাজ-সন্নিধানে সমুদায়ই নিবেদন করিলাম। আপনার অবসরমত এই বিষয়ে আদেশ পিতৃ-সন্নিধানে যে নিশ্চয়ই প্রেরিত হইবে, তাহা তিনি বিদিত আছেন। এক্ষণে জাঁহাপনার চরণ- কমলে এই দাসানুদাসের সহস্র সহস্র কুর্ণীশ নিবেদন করিতেছি।” এইরূপ বক্তৃতার পর যুবরাজ মহম্মদ পিতামহের নিকট বিদায় লইলেন। পাছে সাজাহান তাহাকে তিরস্কার করেন, এই আশঙ্কায় উত্তরের অপেক্ষামাত্র করিলেন না।.

৩৪ ঔরঙ্গজেব। মহম্মদ চলিয়া গেলে সাজাহান কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া পার্শ্ববর্তিনী রাজ- কুমারী জাহানারাকে বলিলেন-“জাহানারা, তােমার আশঙ্কা নিতান্ত অমুলক নয়। এই চাতুৰ্য, প্রবঞ্চনা এবং কপটতা-পূর্ণ বাগ্‌জালের অন্তরালে নানা ভীষণ সংবাদ লুক্কায়িত আছে। সরল কথায় বুঝিতে হইলে এই লম্বা বক্তৃতায় স্পষ্টই সূচিত হইয়াছে যে, ঔরঙ্গজেবের কোনও চাতুরীতে দারার প্রবল বাহিনী বিধ্বস্ত হইয়াছে। কিন্তু কেন এমন হইল? দারার বিশ্বস্ত রাজপুত সেনাপতি গণ ত উৎকোচের বশীভূত হইবে না। একমাত্র কেরেবরাজ কালীউল্লাকে আমার সন্দেহ। সেই বােধ হয়, প্রথমেই রণে ভঙ্গ দিয়াছিল। তােমার বােধ হয় স্মরণ আছে, কাসেম খার প্রতারণায় যশােবন্তুসিংহ পরাজিত হন; তাহাতেই দারার বিপদের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এবারকার পরাজয় নিশ্চয়ই কালীউল্লার দ্বারাই ঘটিয়াছে। কাসেম ও কালীউল্লাই দারার সর্বনাশ করিল। দারা যখন পলায়িত, তথন তাহার বিপদের আরম্ভ মাত্র হইয়াছে। ঔরঙ্গজেব জীবিত প্রতিদ্বন্দ্বী কখনও ভালবাসে না। দারা জীবিত থাকিতে ঔরঙ্গজেব তাহাকে ছাড়িয়া দিবে, কদাচ এরূপ আশা করিও না। এখন আমাদের অবস্থাটা কিরূপ দাঁড়াইয়াছে, এক- বার বুঝিয়া লও। আমি পীড়িত ও দুর্বল। আগ্রার সৈন্যবল এখন ঔরঙ্গজেবের আয়ত্তাধীন নহে, এ কথা বলিতে পার না। ওদিকে মুরাদ শঠতায় পরাজিত বা কৌশলক্রমে হস্তগত হইয়া শালিমগড়ের দুর্গে বলীকৃত। সম্ভবতঃ মত্তা- বস্থায় তাহাকে বন্দী করিয়াছে ; নতুবা জীবিতদেহে সে পরাজয় স্বীকার করি- বার পাত্র নহে। সুজার সেনাপতিগণকে অর্থলােভে বশীভূত করিয়া বােধ হয়, সুজাকে ঔরঙ্গজেব পরাভূত করিয়াছে। কারণ, সুজার রণ-নৈপুণ্য, বীরত্ব ও সাহস পরাজয়ের মুখ দেখিতে প্রস্তুত নহে। চারিদিকের পথ পরিষ্কার করিয়া নিজ সৈন্য সহ মুরাদের সৈন্ত মিলিত করিয়া সম্ভবতঃ ঔরঙ্গজেব আগ্রার রক্ষিবাহিনীকে কোনও না কোনও কৌশলে আয়ত্ত করিয়াছে। আমাদের আর প্রকাশ্য বিরােধের উপায় নাই। সুজা পুনরায় সৈন্যসংগ্রহে বােধ হর ব্যস্ত। মুরাদ কারাগারের বাহিকে জীবিতাবস্থায় যে কখনও আসিবে, আমার আর বিশ্বাস হয় না। এখন ঔরঙ্গজেবের কাৰ্যে মৌখিক অনুমােদন করিয়া, তাহার বিশ্বাস উৎপাদন করিতে হইবে। তাহার সন্দেহ কতক পরিমাণে তিরােহিত হইলে, সুযােগক্রমে দারায় সাহায্য জন্য সৈন্ত ও অর্থ প্রেরণ করিতে হইবে। দারা প্রবল হইলে,এই চক্রি-চূড়ামণিকে পরাভূত করিয়া আমাদের উদ্ধারসাধন করিতে পারিবে। নতুবা গত্যন্তর দেখিতেছি না। তােমার এ বিষয়ে পরামর্শ কি? ( n ঔরঙ্গজেব। "এ । সাহজাদী জাহানারা এতক্ষণ বহু কষ্টে আত্মসংবরণ করিয়াছিলেন, এই প্রশ্ন শুনিয়া সেই তন্বীর নীলনলিনী সম লােচন ক্রমে কোকনদরুচি ধারণ করিল। দেখিতে দেখিতে শাহজাদীর সেই সিরাজদীপ্ত গােলাপী গণ্ডের অরুণিমা বদনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। নয়নয় হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হইতে লাগিল। ক্রোধে, ক্ষোভে, মনস্তাপে গণ্ডয় শিশির সিক্ত বিকচ কমলের শােভা ধারণ করিল। রাজকুমারী কুন্দবিনিন্দিত দন্তপাতি আর অধর দংশন করিয়া বহুকষ্টে পুনরায় আত্মসংবরণ করিলেন। একটি দীর্ঘ- নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া সাহজাদী বলিলেন-“জাহাপনার আদেশ শিরােধার্য। আমাদের এখন অার স্পষ্ট বিবােধ সাজে না। এখন রােশেনারার দৌত্য অবলম্বন করিয়া এই চীর চাল ছেদ করিতে হইবে। কিন্তু ব্যাপারটা একবার ভাবিয়া দেখুন! পিতার পীড়ার অবসর গ্রহণ করিয়া এই সয়তান কিরূপে “মক্কা শরিফে গমন করিয়া ফকিরী” লইয়াছে, এইবার বুঝিলেন ? बाई সহােদর দেবপ্রতিম উদারহৃদয় প্রেমিক ও ভক্ত এবং তত্ত্বজ্ঞানী দারাকে কি প্রতারণার কৌশলে দুইবার রণে পরাজিত করিয়া এখন তাহার জীবননাশের চেষ্টায় এই পামর প্রাণপণ করিয়াছে, তাহা ত আপনার আর বুঝিতে বাকী নাই। সেই প্রতারণাপূর্ণ কূটনীতির কৌশলে ঔরঙ্গজেব বীরবর সুজা ও মুরাদকে সিংহাসন হইতে সুদুরে অপসারিত করিয়াছে, তাহাও বুঝিলেন। সহিত দেখা করিতে আসিলে ক্ষিপ্ত ব্যাট্ৰিণীসমা তাতারিণীগণ কর্তৃক বন্দীকৃত হয়, সেই ভয়ে স্বয়ং না আসিয়া দূতস্বরূপ মহম্মদকে পাঠাইয়াছে। আপনার নিকট দূত কখনও বধ্য নহে, এ কথা সেই ধূর্ত যথেষ্ট অবগত আছে । নতুবা আমার সমক্ষে আপনার অবরােধ আদেশ মুরাদ কখনও কি প্রচার করিতে সাহসী হইত? কি বলিব প্রভু, অল্প। আমাকে নারী করিয়াছেন, নতুবা এই অস্বাভাবিক ভ্রাতৃদ্রোহিতা, পিতৃদ্রোহিতা এবং রাজদ্রোহিতার সমুচিত প্রতিফল একবার দেখাইয়া দিতাম। জাহাপনা পুনরায় অধর দংশন করিয়া আত্মসংবরণ করিলেন। সেই পিতৃপ্রাণ। রাজকুমারীর মর্মপীড়া সাহজাহার অবিদিত ছিল না; সম্রাট ধীরে ধীরে কুমারীর দক্ষিণ হস্তটি নিজের দিকে আকর্ষণ করিয়া বড়ই স্নেহে, বড়ই অদয়ে নিজের হন্তে রাখিয়া সেই মুর্তিমতী তেজস্বিতা, রাজভক্তি ও প্রতিভার দিকে নির্নিমেষনয়নে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিলেন। পরে অতি কোমল অথচ সমেহ বচনে বলিলেন, “জাহনার ভগবান্ সে সৌভাগ্য আমাকে দিলে কি আর এই বয়সে এইরূপ লানা ভােগ করিতে হয় ? দারা, সু, ঋজজেৰ ৩৬ ঔরঙ্গজেব। { মুরাদ আমার এই চারিটি পুত্ৰই দোষে গুণে গঠিত। সম্রাটপ্রবর পুণ্যকীর্তি আকবরের ন্যায় সকল দিক সামলাইয়া, সকল দিক দেখিয়া শুনিয়া এবং হৃদয় ও মস্তিষ্ক উভয় শক্তির সামঞ্জস্যে রাজ্যপরিচালন করিবার সামর্থ্য ইহাদের কাহ- ও নাই। সেই শক্তি আল্লা তােমাতে কিছু পরিমাণে দিয়াছেন; কিন্তু তােমার পিতামহী নুরজাহার মেহান্ধতা যদি তােমাতে না থাকিত, তােমাকে পুত্ররূপে পাইলে আমি বড়ই সুখী হইতাম। দেখ, আমার প্রতি অনুরাগাধিক্যে তুমি অনেক সময় ক্রোধে, ক্ষোভে, অসংষত বাক্য প্রয়ােগ করিয়া স্বীয় যন্ত্রণা প্রকাশ করিয়া ফেল; ইহাতে রাজকার্যের ক্ষতি হইয়া বসে। জানি, এই গৃহভিত্তিরও কর্ণ আছে, ঔরঙ্গজেবভক্ত রাজকুমারী রােশেনারার চক্ষু তােমার চতুর্দিকে ঘুরিতেছে-সংযত হইয়া কাৰ্য্য কর। সম্রাটের ক্রোধের অবসর নাই, জানিও। যাহা হউক, এখন কর্তব্য নির্ধারণ কর। স্থির ও সংষতচিত্তে কঠোর কৰ্তব্যসাধন কর। ভাবুকতাকে স্থান দিও না। ঔরঙ্গজেবের কাৰ্যে অনু- মােন করিয়া তাহাকে খেলাৎ ও উপঢৌকন রােশেনারার দ্বারা পাঠাইতে হইবে। এ বিষয়ে খাস দরবারে পরামর্শ করা যাইবে। আম দরবারে তাহার আলােচনার প্রয়ােজন নাই।* জাহানারা হাসিয়া বলিলেন, “মহম্মদ গমন করিলে পর জাহাপনা যে সম্পূর্ণ আত্মসংবরণ করিয়া স্বীয় বক্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলেন। এ দাসীর তাহা স্মরণ হয় না। সাজাহান কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া খাস দরবারে রাজকুমারীর সহিত বহুক্ষণ পরামর্শ করিলেন। পরে রােশেনারাকে ডাকিয়া দৌত্যভারাৰ্পণ করিলেন।

একাদশ লহরী বিজয়ীর শিবিরে। ত্রিযামার শেষ যাম এখনও অতীত হয় নাই। আগ্রার রাজপ্রাসাদের তােণ, বারে কৃষ্ণবসনা তিনটি সুন্দয়ী আসিয়া দেখা দিলেন। তাহাদের পশ্চাতে উন্মুক্ত কৃপাণ হস্তে একশত, প্রহরী কৃষ্ণবসনে আপাদমস্তক আবৃত করিয়া নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া ছিল। কৃষ্ণাবগুণ্ঠনে আবৃতবদন ও আবৃতদেহ প্রথমা সুন্দরী বস্ত্রান্তরাল হইতে একটি পাঞ্জা বাহির করিয়া তােরণস্থিত প্রহরীকে দেখাইবামাত্র সসম্ভ্রমে সে দ্বার ছাড়িয়া দিল। একশত তিনটি কৃষ্ণা মূর্তি সেই মসীভেদ্য অন্ধকার ভেদ করিয়া অদুরে দণ্ডায়মান একশত তিনটি কৃষ্ণবর্ণ ঘােটকে আরােহণ করিল। নিমেষমধ্যে অশ্ব ও আরােহী উভয়ের মূৰ্ত্তিই অন্ধকারের গর্ভে বিলীন হইল। আগ্রার বাহিরে মিলিত সৈন্যের সুশৃঙ্খল-সন্নিবিষ্ট শিবিররাজীতে বিজয়ী সৈন্য- বৃন্দের আনন্দোচ্ছ্বাস এখনও প্রশমিত হয় নাই। কোনও কোনও শিবিরে এখন হাস্থ ও গীতের রােল বিলক্ষণ শুনা যাইতেছিল। এই সকল শিবির চক্রের বহু দুরে একাদশটি শিবির সন্নিবিষ্ট ছিল। তাহারই কেন্দ্রদেশীয় শিবিরের ভিতর শান্তি ও নিস্তব্ধতা যেন মূর্তিমতী হইয়া বিরাজ করিতেছিল। সেই শিবির বিজয়ী ঔরঙ্গজেবের। উহার দশদিকে দশজন প্রধান সেনাপতির শিবিরবাহ। তাহার চারিদিকে দুর্ধর্ষ হাবশী রক্ষিবৃন্দ নগ্নতরবারি হস্তে ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের ন্যায় নিঃশকে দ্রুতপদে সঞ্চরণ করিতেছিল। এই শিবির- রক্ষিদলের অধিনায়ক, হঠাৎ একটি অস্ফুট ধ্বনি করিলেন। অমনি ছয় জন রক্ষী সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহারা কি যেন একটা অস্ফুট আদেশ প্রাপ্ত হইয়া সৈন্ত-শিবিরহের দিকে অগ্রসর হইল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, পূর্বোক্ত একশত তিনটি কৃষ্ণমূৰ্ত্তি সতে লইয়া রক্ষিগণ প্রত্যাবৃত্ত হইল। --রক্ষিনায়ক তখন তিনটি অবগুনবতীকে সঙ্গে লইয়া ঔরংজেবের শিবিরে প্রবেশ করিল; দেখিল, সেই আদর্শ আনুষ্ঠানিক মুসলমান তখন সপ্তম নমাজে যত। সত্ৰমে মস্তক অবনত করিয়া কৃষ্ণবসনা সুন্দরীত্রয়কে সেখানে রাখিয়া রক্ষিনায়ক নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করিল। নমাজ শেষ হইলে ঔরঙ্গজেব • ঔরঙ্গজেব । বলিলেন রােশেনার, অদ্য পাঞ্জা চাহিয়াছিলে কেন? ব্যাপারটা কি ? শুনিবা- মাত্র রােশেনারা অবগুণ্ঠন মােচন করিয়া সহাস্যে বলিলেন, “বড়ই কঠিন। বাদশাহ ত জাহানারার সহিত বহু পরামর্শ করিয়া এই পত্র, এই তরবারি আর এই রত্নরাজী ভেট পাঠাইয়াছেন। রাজ্যপরিচালনেঔরঙ্গজেবই যােগ্য ; তাহার প্রত্যেক কাৰ্য্যই তাহার অনুমােদিত, এই সকল কথা জানাইয়া বাদশাহ তাঁহার প্রিয় (?) পুত্র আওরঙ্গজেবকে বহু পুত্র আওরঙ্গজেবকে বহু আশীর্বাদ করিয়াছেন। এই ত বাহিক ব্যাপার । ভিতরের কাণ্ডটা বিজেতা ঔরঙ্গজেবের বুঝিতে বিলম্ব হইবে কি?” ঔরঙ্গজেবের ইঙ্গিতে রােশেনারার আদেশে অবগুণ্ঠনবতী সখীদ্বয় উপঢৌকন সকল সম্রাট-সমক্ষে উপস্থিত করিয়া অভিবাদনানন্তর সসম্ভ্রমে শিবির ত্যাগ করিয়া বহির্দেশে অপেক্ষা করিতে লাগিল। ঔরঙ্গজেব সেই মণিমুক্তাখচিত তরবারিটি হস্তে লইয়া পরীক্ষা করিতে করিতে বলিলেন--“আলমগীর” বা বিশ্ববিজেতা নামাঙ্কিত এ তরবারি যখন পিতৃদেব আমাকে দান করিয়াছেন, তখন আলমগীরই আমার বাদশাহী নাম হউক। পিতার আদেশ শিরােধার্য্য, অপ্ত হইতে ঔরঙ্গজেব আলমগীর বাদশাহ হইল।” রত্নরাজী হইতে কিঞ্চিৎ রত্ন লইয়া ঔরঙ্গজেব চারি দিকে ছড়াইয়া দিয়া বলিলেন, “পিতৃদত্ত এই রত্ন স্পর্শে মােগল সাম্রাজ্য সর্বত্র রত্নপ্রসূ হউক। তৎপরে পিতার সেই পত্রখানি পাঠ করিয়া সসম্রমে তাহা চুম্বন করিলেন। পত্রটি তখন স্বীয় উষ্ণীষে রক্ষিত করিয়া বলিলেন, “ইহাই আমার বাদশাহীর ফৰ্মান।” রােশেনারা নিঃশব্দে এতক্ষণ এই প্রহসন দেখিতে ছিলেন, এক্ষণে কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া বলিলেন-“ভাল, তাহার পর? এ সকল কথা ত পিতৃদেবকে বলিতে হইবে। ঐরূপ চাতুরীপূর্ণ একটা উত্তর পিতৃদেবকে দিলে হয় না। পিতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া একটা উত্তর প্রদান ঔরঙ্গ- জেবের পক্ষে কতক্ষণের কাৰ্য্য । প্রায় রজনী প্রভাত হয়, অন্ধকার থাকিতে রাজবাটীতে ফিরিতে হইবে। পাঞ্জা আমার নিকট রহিল। আগামী কল্য আসিয়া পরামর্শ করিব। গতিটা আরও ভাল করিয়া বুঝিয়া দেখি। এই বহিন থাকিতে ঔরঙ্গজেবের কেশ স্পর্শ কেহ করিতে পারিবে না জানিও।” ঔরঙ্গজেব তখন ভগিনীর মস্তকে হস্ত দিয়া সস্নেহে বলিলেন, “রোশেনারা, আমি আমি তােমার বুদ্ধিবলেই অ বাদশাহী লাভ করিতে সক্ষম হইলাম। তুমি আগ্রা না থাকিলে এই বিষম ষড়যন্ত্রের ঘুণাক্ষরও জানিতে পারিতাম না। সেই পিশাচিনী জাহানারার চেষ্টায় এত দিনে হর ত ঔরঙ্গজেবের মস্তক ঔরঙ্গজেব। ৩৯ দারার অসির কৃপায় ভূ-চুম্বন করিতে বাধ্য হইত। কিন্তু ভগিনী সাবধান। জাহানারা দৃপ্তসিংহিনী ; তাহার নিকট সর্বদা প্রাণ হস্তে করিয়া বাস করিতে হইবে, এ কথা স্মরণ রাখিও। ভগবান্ তােমার মঙ্গল করুন, ভগিনি, তোমার ঋণ কখনই ঔরঙ্গজেব শােধ করিতে পারিবে না জানিও। তৎপরে কিছুক্ষণ পরামর্শ করিয়া রােশেনারা ঔরঙ্গজেবের নিকট হইতে পত্রোত্তর লইয়া অন্তঃপুরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন।

দ্বাদশ লহরী। দারা ও সুজার অনুসন্ধানে। সম্রাট শাহজাহান এক্ষণে বন্দিদশায় অন্তঃপুরমধ্যে আবদ্ধ থাকিলেও পঞ্জাবের শাসনকর্তার নিকট গােপনে একটা পত্র পাঠাইলেন। তাতে তিনি দারার সাহায্য ও সৈন্য ও অর্থ প্রেরণ করিতে উক্ত শাসনকর্তাকে অনুরোেধ করিয়াছিলেন। রােশেনারা এ সংবাদ গােপনে জানিতে পারিয়া যথাকালে ঔরঙ্গজেবকে বিদিত করিতে কালবিলম্ব করিলেন না। তখন ঔরঙ্গজেব প্রকাশ ভাবে আপনাকে সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করিয়া আলমগীর পদবী গ্রহণ করিয়- ছিলেন। পঞ্চনদের সৈন্থসাহায্যে তথন দারা আবার ঔরঙ্গজেবের বাহিনীর সহিত আজমীরের পাৰ্ব্বত্যপ্রদেশে চারিদিন ধরিয়া ঘাের রণ করিলেন; এবারেও রণে গরাভূত হইয়া স্বীয় পত্নী, কন্যা ও কতিপয় অনুচর সহ আহম্মদাবাদের দিকে প্রস্থান করিলেন। পথিমধ্যে অনুচরবর্গ তাহাদের ধনরত্নাদি হরণ করিয়া পলায়ন করিল। আহম্মদাবাদে আসিয়া দারা দেখিলেন, সহরের দ্বার রুদ্ধ। তথা হইতে নানাস্থানে হতাশভাবে ভ্রমণ করিয়া ঔরঙ্গজেবের প্রেরিত দূতের হন্তে অবশেষে যুবরাজ দারা নিপতিত হইলেন। পথকষ্টে যুবরাজপত্নী অর্থেই দেহত্যাগ করিয়াছিলেন, সুতরাং তাঁহাকে আর শক্তহস্তে লাঞ্ছিত হইতে হয় নাই। কন্যাকে পত্নীর শবদেহের সহিত লাহােরে প্রেরণ করিয়া দারা আত্ম- - সমৰ্পণ করিলেন; তাহাকে তখন দিল্লীনগরীতে আনয়ন করা হইল। ধূলি- ধূসরিত দেহে ভিক্ষুকের বেশে তাহাকে একটি কদৰ্য্য হস্তিপৃষ্ঠে আরােহণ:করাইয়া নগরীময় ভ্রমণ করান হইল। নগরবাসী ও নগরবাসিনীগণ দারার দুর্দশা দর্শনে অজস্র অশ্রু বিসর্জন করিতে লাগিল। চারিদিকে হাহাকার ধ্বনি সমুখিত হইল। অবশেষে সহময় বিদ্রোহের সূচনা দেখিয়া ঔরঙ্গজেব মােল্লাদিগের দ্বারা দারার বিধর্মিত্ব প্রমাণ করিয়া শিরচ্ছেদের আদেশ প্রদান করাইলেন । সুতরাং সত্বরেই দারার ভবলীলা পরিসমাপ্ত হইল। দারার ছিন্নমুণ্ড ঔরঙ্গজেবের নিকট আনীত হইলে সেই চতুরচূড়ামণি কতই অবিসৰ্জন করিলেন। অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে দারার জ্যেষ্ঠপুত্র সুলেমানও গােয়ালীরের দুর্গে আবদ্ধ ও ক্রমে অন্তর্হত হইলেন। তাহার আত্মীয়স্বজন ও ধনরত্নাদি ধীরে ধীরে ঔরঙ্গজেব। ৪১ সুকৌশলে অপসারিত হইল। এইরূপে দারার স্মৃতি বিলুপ্ত করিয়া সম্রাট ঔরঙ্গ- জেব সুজার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। এ দিকে নুতন সৈন্য সংগ্রহ করিয়া সুজা পুনরায় আগ্রার দিকে আসিতে লাগিলেন। ঔরঙ্গজেব সেনাপতি মীরজুমলা ও শাহজাদা মহম্মদকে সুজার বিপক্ষে প্রেরণ করিলেন। মীরজুমলার আধিপত্য মহম্মদের অসহ বােধ হওয়ায় রাজকুমার খুল্লতাতের পক্ষ অবলম্বন করিয়া খুল্লতাতকুমারীর পাণিপীড়ন করিলেন। কিন্তু এই মিলিত সৈন্যও মীর জুমলার শিক্ষিত বাহিনীর সমকক্ষ হইল না। তিন সপ্তাহকালব্যাপী যুদ্ধের পর সুজা পরাস্ত হইয়া চট্টগ্রাম অভিমুখে পলায়ন করিলেন। মহম্মদ পুনরায় পিতার শরণাপন্ন হইলেও পিতা ঔরঙ্গজেব বিদ্রোহী পুত্রকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিলেন। কারাবাসেই মহম্মদের ভকারাবাসের অবসান হইল ; তাহাতেই তিনি স্বীয় পিতামহ শাহজাহানের কারাবাস-ব্যবস্থার মহা সন্তাপ হইতে অব্যাহতি পাইলেন। সুজা ব্ৰহ্মরাজের শরণাপন্ন হইলে পর মীর জুমলা অগত্যা বহু কষ্টে বঙ্গদেশে ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া ফিরিলেন। কিন্তু অল্পকাল পরেই দেহত্যাগ করিয়া ঔরঙ্গজেবের তিরস্কার হইতে অব্যাহতি পাইলেন। এ দিকে সুজা ও কন্যা দুইটি লইয়া ব্ৰহ্ম- রাজের বিরাগভাজন হইলেন। সেই বিরাগের পরিণাম বড়ই শশাচনীয় হইল। তাহা হইতেই সুজা ও তাহার কন্যায়ের নাম জগতের নাট্যশালা হইতে চির- অপসৃত হইল। এইরূপে দারা ও সুজার চিহ্ন লােপ করিয়া ঔরঙ্গজেব মুরাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। শেলিমগড় হইতে মুরাদকে গােয়ালিয়র দুর্গে প্রেরণ করা হয়। সেই দুর্গেই মুরাদের শেষ অঞ্চ অভিনীত হইয়াছিল ; কিন্তু তাহ যবনিকার অন্তরালে ; কেহই মুরাদকে গােয়ালিয়র দুর্গের বাহিরে আসিতে দেখে নাই। কিছুদিন পরে হঠাৎ দুর্গ কক্ষ হইতেও মুরাদের অন্তর্ধান লক্ষিত হইল। দুর্গের একটি সােপান-প্রস্তরের পরিবর্তন ব্যতীত দুর্গের কোনই পরিবর্তন কেহই দেখিতে পায় নাই। ইহাতেই দুর্গের বুক্ষিগণ সেই সােপান-প্রস্তরে কখনই পদার্পণ করিত না ; লম্ফ দিয়া অতিক্রম করিয়া যাইত ; কেহ কেহ বা দৈবাৎ পদস্থাপন করিলে হঠাৎ হটিয়া আসিয়া ক্ষমা চাহিত ও বহুত বহুত সেলাম জানাইত। সন্ধ্যার পরে অনেকেই তথায় আলােক ব্যতীত আসিত না। দিন পরে ঔরঙ্গজেব দারার রুধির-প্লাবিত ছিন্ন মুণ্ড, সুজার রুধিয়সিক্ত বক্ষ, মহম্ম- দের পিতামহ দ্রোহদগ্ধ অনুতপ্ত মলিন বদন এবং মুরাদের বিষজর্জরিত পরিম্নান বন-কমল কানার নেত্রে দেখিতে দেখিতে নিষ্কণ্টকে সিংহাসন বিরাজিত ৫

82
ঔরঙ্গজেব।
হইলেন। এইরূপে অনুসন্ধানকাৰ্য্য আপাতত স্থগিত থাকিল। ওদিকে সেনা-
পতি মীর জুমলা সুজার অনুসন্ধানে ব্যর্থ-মনােরথ হইয়া, আসাম-বিজয়ে
মনােনিবেশ করিলেন; কিন্তু আসামের অস্বাস্থ্যকর জলবায়ুর দোষে
ভগ্ন-স্বাস্থ্য হইয়া সত্বরেই তাহার বীরত্ব-কাহিনী-পূৰ্ণ-জীবনের যবনিকাপাত
করিলেন।
;

ত্রয়ােদশ লহরী। শাসন-বিপৰ্যয়ে। ঔরঙ্গজেব ১৬৫৯ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৭০৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সমগ্ৰ মােগলসাম্রাজ্যের একাধিপত্য করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি আকবর শাহ প্রতিষ্ঠিত শাসনপদ্ধতির সম্যক বিপর্যয় সাধন করিয়াছিলেন। ঔরঙ্গজেব মস্ত মাংস স্পর্শ করিতেন ; মুসলমান ফকীরগণের কঠোর নিয়ম সকল প্রতিপালন করিতেন। পাঁচবার স্কুলে সাতবার নমাজ করিতেন। সর্বদা শুদ্ধাচারে থাকিতেন। চিত্ত- সংযম, বিলাসহীনতা, সৎসাহস, আত্মনির্ভর, অনলস, কর্তব্যপরায়ণতা, বুদ্ধির প্ৰাৰ্য, নিরন্তর কাৰ্য্যতৎপরতা, রাজ্যের সকল বিভাগের সকল কার্য্যেরই পুখানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান, বীরত্ব, অটল প্রতিজ্ঞা, কষ্টসহিষ্ণুতা ও ধৈৰ্য্য প্রভৃতি রালোচিত নানা সদগুণে তিনি বিভূষিত থাকিলেও, কেবলমাত্র গোঁড়ামি ও বিশ্বাসহীনতা এবং সন্ধিগ্ধচিত্ততার দোষে এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনে বড়ই অপটুতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। তাঁহার স্থির বিশ্বাস ছিল, মহম্মদীয় ধৰ্মই প্রকৃত ধর্ম ; সুতরাং সেই ধর্মে অবিশ্বাসীমাত্রেই ধর্মের বিরােধী ; সুতরাং সম্পূর্ণ দাহ। এই বুদ্ধিতে তিনি হিন্দুদিগের মন্দিরসকল ভগ্ন করিতে লাগিলেন ; দেবমূর্তি সকল বিচূর্ণিত করিতে আদেশ দিলেন। হিন্দুদিগের তীর্থ যাত্রার উপর কর বসাইলেন; প্রত্যেক হিন্দু বা অবিশ্বাসীর উপর জিজিয়া নামক মাথট বসাইলেম ; হিন্দুগণের সহিত পূৰ্ববং আত্মীয়তা বন্ধ করিলেন তাহাদিগকে অবিশ্বাসের চক্ষে দেখিতে লাগিলেন; পদে পদে হিন্দুর অব- মাননা ও মুসলমানের প্রশ্রয় প্রদর্শিত হইতে লাগিল। সাজাহান ১৬৫৮ খৃষ্টাব্দের ৯ই জুন তারিখে মহুলে বন্দী হয়েন এবং তদবস্থায় ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারি দেহ ত্যাগ করিয়া প্রিয়তম মমতাজমহলের পার্শ্বে ই সমাহিত } ; এই ৮ বৎসর কাল মধ্যে সাজাহানেরও সমুদায় শাসনপতির বিপর্যয় সাধন হয়। সাজাহান মুক্তহস্ত ও সম্রাটোপযােগ উদারহৃদয় ছিলেন। তিনি ৰূন দিল্লি বা সাজাহানাবাদেয় ও আগ্রার সৌন্দৰ্যবৰ্ধন জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। রাজ্যমধ্যে সুখ ও শান্তিস্থাপন জন্ত প্রয়ােজনীয় ঔরঙ্গজেব। ৪৪ কর্মচারিবৃন্দের নিয়ােগ, শান্তিরক্ষক সৈন্তাদির সংস্থান এবং তাহাদের অবাধ গতিবিধির জন্য রাজ্যময় পন্থাদি নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। ঔঙ্গজেব এ সকল বিষয়ে অত্যন্ত মিতব্যয়ী ছিলেন। তিনি নিজ ব্যয় নির্বাহ জন্য টুপিতে জরীর কাৰ্য্য করিতেন ; তাহা অবশ্য বহুমুল্যে ওমরাহগণ ক্রয় করিতেন। রাজকোষ হহঁতে নিজ ব্যয় গ্রহণ করিতেন না; কিন্তু রাজপরিবারস্থ সকলেই উদ্দাম বিলাস-তরঙ্গে সৰ্ব্বদাই ভাসমান ছিলেন। সে ব্যয় অবশ্যই রাজকোষ হইতে গৃহীত হইত। ঔরঙ্গজেব সম্রাট হইয়াই প্রথমে আকবর প্রচলিত “ইলাহি সৌর বৎসর উঠাইয়া আরবী চান্দ্র মাস ও বৎসর প্রবর্তিত করিলেন। খৃষ্টাব্দে জিজিয়ার পুনঃ প্রবর্তনে হিন্দু প্রজাবৰ্গ বিরােধী হইয়া উঠিল। তাহারা সম্রাটের বিপক্ষে ধৰ্ম্মঘট করিতে আরম্ভ করিল। সম্রাট যেখানে যাইতেন, সেখানকার হিন্দুগণ দোকানপাঠ সব বন্ধ করিয়া দিত। দিল্লিতে এইরূপ ঘটায় সম্রাট বন-হস্তী সকল আনাইয়া হিন্দু প্রজাগণকে হস্তী-পদদলিত করিতে লাগিলেন। সম্রাট আগ্রার মন্দির সকল ভূমিসাৎ করিয়া, মন্দিরস্থ দেবমূর্তি সকল আনাইয়া, মসজিদের সােপানে গাঁধিয়া দিবার আদেশ দিলেন। তাহাতে ঐ সকল মূৰ্ত্তি মাড়াইয়া মুসলমানগণ মসজিদে নমাজ করিতে যাইবেন- এইরূপ ব্যবস্থা করা হইল। উদয়পুর, মােধপুর, বারাণসী, ও মথুরায়ও এই ব্যবস্থা হইল। এই কয়স্থলেই হিন্দুমন্দির ভাঙ্গিয়া তদুপরি মসজিদ নির্মিত হইল। হিন্দু সম্রাপ্তবংশীয়গণ পাল্কী প্রভৃতিতে আরােহণ করিয়া যাইলে মুসল- মান ওমরাহদিগের দ্বারা অবমানিত হইতে লাগিল। হিন্দুবণিকদিগের উপর অতিরিক্ত মাশুল ধাৰ্য্য হইতে লাগিল; হিন্দু তীর্থাদির উপর মাশুল বসিল। হিন্দু-মুসলমানের প্রতি ব্যবহারে এইরূপ ভেদ প্রদর্শনের অনিবার্য ফল যাহা টিবার তাহা ঘটিতে লাগিল। আদর্শ মুসলমান নরপতিরূপে তিনি মুসলমান প্রগণের সবিশেষ পূজাৰ্হ হইলেন; আর হিন্দু প্রজাবর্গের নিকট তিনি নিরতিশয় বিরাগভাজন হইতে লাগিলেন। তখনও ভারতীয় হিন্দু শক্তি অন্তর্হিত হয় নাই ; সুতরাং হিন্দুর অতি প্রিয় ধৰ্ম্মবলের উপর এই হস্তক্ষেপে সর্বত্রই বিশ্লোনলের চিহ্ন পরিলক্ষিত হইতে লাগিল। নার্ণাওলের সৎনামী সম্প্রদায়, রাজপুতনার রাজপুতগণ এবং মহারাষ্ট্রের মহারাষ্ট্রীয়গণ এই সকল ব্যবহারের প্রতিবাদে প্রস্তুত হইল। যখন মােধপুরের-মন্দিরসকল সম্রাটের আদেশে ভূমিসাৎ হইল এবং দেবমুর্তি দিল্লিতে আনীত হইল, যখন উদয়পুরের মন্দিররক্ষকগণ মন্দির ও দেবমূর্তি • ঔরঙ্গজেব ৪৫ রক্ষার জন্য সংগ্রামে প্রাণ-বিসৰ্জন করিলেন, যখন এইরূপে তিনশত প্রধান হিন্দু মন্দির চুর্ণীকৃত হইল, তথন মহাপ্রাণ রাজপুতকেশরী উদয়পুররাজ রাণা রাজসিংহ সম্রাটকে একখানি পত্র লিখিলেন। তাহাতে লেখা ছিল- “আপনার মহাপ্রাণ প্রপিতামহ সম্রাট মহম্মদ জালালউদ্দীন আকবর শাহ সসম্মানে ও নিরাপদে বায়ান্ন বৎসরকাল রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি ধর্মনির্বিশেষে প্রজাবৃন্দকে পালন করিয়াছিলেন। যীশু ভক্ত হউক, আর মুশা ভক্তই হউক, মহম্মদ ভক্তই হউক কিম্বা ব্রাহ্মণ ভক্ত হউক অথবা নাস্তিক হউক, সকলেই সমান রূপে তাহার অনুগ্রহভাজন ছিলেন। পরে আপনার পিতামহ প্রবল প্রতাপ জাহাঙ্গীর বাদশাহও বাইশ বৎসর কাল তাহার প্রজাবর্গের উপর তাহার অনুগ্রহ বিস্তার করিয়াছিলেন। তৎপরে আপনার পিতৃদেব বিখ্যাতকীৰ্ত্তি সম্রাপ্রবর শাহজাহা বত্রিশ বৎসর কালব্যাপী অপরিসীম দয়া ও ন্যায়পরতার ফলস্বরূপ প্রজাপালনে অক্ষয়কীৰ্ত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। এই একশত ছয় বৎসর মধ্যে ধর্মনির্বিশেষে প্রজাপালন দ্বারা বিপুল মােগলসাম্রাজ্যের সর্বত্র যে শান্তি স্থাপিত হইয়াছে, ধর্ম- বিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দ্বারা সে শান্তির ব্যতিক্রম সম্ভাবনা, আপনার ন্যায় তীক্ষবুদ্ধি, মেধাবী, সুপণ্ডিত, রণকুশল, অমিত সাহস এবং প্রবল পরাক্রান্ত নরপতির শাসনকালে কখনই আশা করা যায় না। উদয়পুরের রাজকর্মচারিগণ যাহা করিয়াছে, তাহা যে কখনই আপনার অভিপ্রেত ছিল না, সে বিষয়ে আমার অণুমাত্র সন্দেহ থাকিলে দিল্লিশ্বরকে এই অনুরােধপত্র লিখিয়া আমি কখনও বিরক্ত করিতাম না। কাফের সম্প্রদায় যদি দিল্লির জুমামসজিদের প্রতি এইরূপ অত্যাচার করিত এবং তজ্জন্য ইসলামী মন্দির রক্ষকগণ ধৰ্ম্মরক্ষাৰ্থ এইরূপে মন্দির দ্বারা তরবারি হস্তে বীরত্ব দেখাইতে দেখাইতে প্রাণ বিসর্জন করিতেন, তাঁহাদের সেই অপূৰ্ব্ব বীরত্ব কাহিনী শুনিয়া আপনার প্রাণে যে ভাবােদয় হইত সেই ভাব লইয়াই অদ্য আপনাকে এই পত্র লিখিতেছি ; সুতরাং ইহাতে সরল প্রাণের মবেদনা মাত্র আপনার রাজ সন্নিধানে নিবেদিত হইয়াছে নিশ্চয় জানিবেন যদি মােগলসম্রাজ্যের অঃ শান্তিভঙ্গ আমার তিল মাত্র অভিপ্রেত হইত, কখনই এই সামান্থ ব্যক্তি এই বিষয় লইয়া আপনার বহুমূল্য সময়ের অপব্যয়ে সাহসী হইত না। কিন্তু এই সকল কর্মচারিবৃন্দের অবিমৃষ্যকারিতা যে সাম্রাজ্যের প্রভূত ক্ষতিকারক তা আপনাকে কি আর বুঝাইয়া বলিতে হইবে ?” যে আট ভারতে একচ্ছত্ৰী মুসলমানসাম্রাজ্য স্থাপনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাহার স্থির ধারণা মুসলমান না হইলে অনন্ত নরকের পথ উন্মুক্ত ; প্রজা মুসলমান নাইলে তাহার ,

৪৬
ঔরঙ্গজেব।
পারলৌকিক পরিণাম বড়ই শােচনীয়, সেই দৃঢ় ব্রত মুসলমান সম্রাটের নিকট
এইরূপ বিজ্ঞতাপূর্ণ অমূল্য উপদেশ যে অরণ্যে রােদন হইবে মহারাণা বুঝিলে
আর এ বৃথা প্ৰয়াস করিতেন না। এই শাসন বিপর্যয়ের পরিণাম সুতরাং
অনিবাৰ্য্য হইল।

চতুর্দশ লহরী শিবাজী সংঘর্ষে । * * উদয়পুর হইতে একটা রাজপুত বংশ আসিয়া দাক্ষিণাত্যের, পশ্চিম প্রদেশে উপনিবেশ স্থাপন করে। জাহাগীর বাদশাহের রাজত্বকালে আহম্মদ নগরের নিজাম সরকারে একটী:মহারাষ্ট্রীয় সর্দার কর্ম করিতেন। তিনি উদয়পুর হইতে সমাগত সাহাজী ভেসলার সহিত নিজ দুহিতার বিবাহ দিয়াছিলেন। ১৬২৭ খৃষ্টাব্দে সাহাজীর একটী পুত্র হয়। তাহার নাম তিনি শিবাজী রাখিয়াছিলেন। বাল্যকাল হইতে শিবাজী অশিক্ষা লাভ করেন। সাহাজী বিজাপুররাজ্যের অধীনস্থ একজন জায়গীরদার ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের জন্মের ৮ বৎসর পরে ১৬২৭ খৃষ্টাফের মে মাসে শিবাজীর জন্ম হয়। যখন ঔরঙ্গজেব সিংহাসন লাভের জন্য আত্মীয় রুধির-স্রোতে ভাসমান, তখন শিবাজী পার্বত্য মাওয়ালী জাতিকে ধীরে ধীরে অস্ত্রশিক্ষা দিয়া দুর্ধর্য-বীরজাতিতে পরিণত করিতেছিলেন। এই মাওয়ালি জাতির সহায়তায় শিবাজী বিজাপুর-রাজের অধীনস্থ টোর্ণা দুর্গ হঠাৎ দখল করিয়া লইলেন। টোৰ্ণার পর রায়গড় ও সিংহগড় দুর্গ শিবাজীর আয়ত্তাধীন হইল। এই সংবাদ বিজাপুরপতি প্রাপ্ত হইয়া শিবাজীর পিতা সাহাজীকে কারারুদ্ধ করিলেন। শিবাজী মহা বিপদে পড়িলেন। একদিকে পিতা অদিকে মহারাষ্ট্রের ভাবী উন্নতি। সময়ে শাহজাহা-দুহিতা রােশেনার কক্ষনের পার্বত্য প্রদেশ অতিক্রম করিয়া দিল্লি যাইতেছিলেন। রােশেনারা চিরদিনই ঔরঙ্গজেবের পক্ষপাতিনী ; ঔরঙ্গজেব তখন দাক্ষিণাত্য বিজয়ে নিযুক্ত। দিল্লি হইতে রােশেনারা ভ্রাতার অনু- গমন করিয়াছিলেন। দাক্ষিণাত্য রােশেনারার স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকুল না হওয়ায়, উপযুক্ত রক্ষিবর্গ সমভিব্যাহারে লুষ্ঠিত রত্নাদি সহ রােশেনারাকে ঔয়জবে দিল্লি প্রেরণ করেন। তখন সাজাহান দিল্লির সিংহাসনে। ঔরঙ্গজেব তাঁহারই আদেশে ১৬৫৬ খৃষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্য বিজয়ে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। এই রত্ব ও খালানার সংবাদ পূর্ব হইতে পাইয়া শিবাণী স্বীয় মাওয়ালী সৈন্য সহ একটা গিরিশরুটে অপেক্ষা করিতেছিলেন। রক্ষিবর্গ উক্ত গিরিশরুটে একে একে প্রশ করিলে পর উহারা শিবাজীর সৈন্ত কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া পরাভূত ও তাহাদের ধন সাদি লুষ্ঠিত হইল। মাওয়ালীগণ শিৰিকা সহ বন্দীগণকে শিবাজীর ঔরঙ্গজেব। ৪ -” , টোর্ণা দুর্গে লইয়া গেল। রােশেনারা সেই দুর্গেই শিবাজী সমীপে নীতা হইয়া তৎ- কর্তৃক সসম্বমে, পুনরায় রক্ষিবর্গ ও রত্নাদিসহ পিতৃ সন্নিধানে প্রেরিত হয়েন। সেই টোৰ্ণাছুর্গে অবস্থানকালে রােশেনারা শিবাজীর মনুষত্ব, উদারতা এবং বীরত্ব দর্শনে তাহার প্রতি একান্ত অনুরাগিণী হইয়া অঙ্গুরীয় বিনিময় করেন। শিবাজী স্বধর্ম ত্যাগে কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় অগত্যা শাহজাদী ক্ষুঃ মনে দিল্লিতে ফিরিয়া যান। এই অনুরাগিণী রােশেনারার সাহায্যে শিবাজী সাহাঙ্গীর উদ্ধারসাধনে কৃতকার্য হয়েন। রােশেনারা শিবাজীর পত্র পাইয়া, শিবাজীকে লিখেন—শিবাজী যেন সাজা- হানের নিকট অধীনতা বিজ্ঞাপক পত্র প্রেরণ করেন। সাজাহান তাহাতে সন্তুষ্ট হইয়া বিজাপুরপতিকে সাহাঙ্গীর মুক্তি প্রদান করিতে বলেন। তাহাতেই সাহাজী কারামুক্ত হয়েন। ইহার পর ঔরঙ্গজেব সিংহাসনে অধিরােহণ করিলে শিবাজী বিজাপুরপতির সহিত মিলিত হইয়া মােগল সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব সেই “পার্বত্য মূষিককে শাসন করিবার জন্য সেনাপতির পর সেনাপতি প্রেরণ করেন। বিজাপুরের সেনাপতি আফজল খাঁর পতনের পর মােগল সেনাপতিমাত্রেই শিবাজীর সহিত অতি সতর্ক ব্যবহার করিতেন। মােগল সেনাপতিগণও এইজন্য বড়ই সাবধানে শিবাজী দমনে নিযুক্ত হইলেন। আফজল খা শিবাজীর শাসনে নিযুক্ত হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎকার করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করায় শিবাজী বস্ত্রাভ্যন্তরে জালিক বৰ্ম্ম ধারণ পূর্বক কেবল মাত্র ‘বাঘনখ' নামক অস্ত্র হস্ত মধ্যে লুক্কায়িত রাখিয়া আফজল খার সহিত একাকী সাক্ষাৎ করেন। আফজল খাঁ কিন্তু, শিবাজীকে গুপ্তভাবে পশ্চাৎ হইতে আক্রমণ করিবার ব্যবস্থা রাখিয়া শিবাজীকে একাকী নিরস্তু আসিতে বলেন। উভয়ে আলিঙ্গন বন্ধ হইলে শিবাজী যখন দেখিলেন-আফজল তাহার প্রাণ সংহারে উদ্যত, তখন তিনি আত্মরক্ষাৰ্থ অগত্যা ‘বাঘনখ’ ব্যবহার করিয়াছিলেন। তাহাতে আফজলের পঞ্চত্বলাভ ঘটে। শিবাজীর সৈন্যও বাহিরে অপেক্ষা করিতেছিল ; তাহারাও আফজলের সৈন্যকে প্রবলবেগে আক্ৰমণ করিয়া পরাভূত করে। এই ব্যাপারের পর মােগল সেনাপতি শায়েস্তা খাঁ যখন পুনানগর অধিকার করিয়া শিবাজীর বাটীতে অবস্থান করিতে থাকেন;" তখন তিনি আফজলের পরিণাম স্মরণ করিয়া অতি সাবধানে সময়ে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন; কিন্তু শিবাজী সসৈন্যে বরযাত্ৰিবেশে 'একটী বিবাহের মিছিলে যােগদান করিয়া শায়েস্তা খার .

ঔরঙ্গজেব। ৪৯ আবাসস্থল হঠাৎ আক্রমণ হঠাৎ আক্রমণ করেন। পলায়নকালে শিবাজীর তরবারির আঘাতে অঙ্গুলিহীন হইয়া শায়েস্তা খাঁ বহুকষ্টে প্রাণরক্ষা করেন। ইহার পর সেনাপতি দিলির খাঁ আসিয়া শিবাজীর দমনে প্রবৃত্ত হয়েন। তিনি দুর্গের পর দুর্গ দখল করিলেও শিবাজীর পরাজয় সাধন করিতে পারেন নাই। অবশেষে মহারাজ যশােবন্ত ও মহারাজ জয়সিংহ এ কার্যে নিযুক্ত হইয়া প্রবল মােগল- বাহিনী নিয়োগে শিবাজীর দুর্গগুলি একে একে হস্তগত করিতে লাগিলেন। যশােবন্ত ও জয়সিংহের সৈন্যবলের নিকট শিবাজীর অল্পসংখ্যক মাওয়ালী সৈন্য নগণ্য মাত্র বুঝিয়া নিরর্থক লােকক্ষয়ে শিবাজীর প্রবৃত্তি হইল না। তিনি ছদ্মবেশে মহারাজ জয়সিংহের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বলিলেন—“হিন্দুর সহায় হিন্দু। সম্রাট আকবর হিন্দু মুসলমান উভয়কে অপত্যনির্বিশেষে প্রতিপালন করিতেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব মুসলমান প্রজার পক্ষপাতী এবং হিন্দু প্রজার মহা বিরােধী। হিন্দুর তীর্থ, হিন্দু মন্দির, হিন্দু দেবতা, হিন্দুর প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম ধৰ্ম্ম মােগলের পদদলিত। হিন্দুর হিন্দুয়ানী রক্ষা করিবার জন্য তিনি সামান্য ব্যক্তি হইলেও একমাত্র ভবানীর অনুগ্রহের উপর নির্ভর করিয়া প্রবল মােগলের বিপক্ষে প্রাণপণ করিয়া দণ্ডায়মান হইয়াছেন। কিন্তু তাহার ক্ষুদ্ৰবল এই প্রবল শক্তির নিকট নগণ্য ও তুচ্ছ। মহারাজ জয়সিংহ সেই প্রবল শক্তির অধিনায়ক। ভারতবর্ষীয় প্রত্যেক হিন্দু অমিতবল জয়সিংহের দিকে কাতরদৃষ্টিতে স্বধৰ্ম্ম রক্ষার আশায় তাকাইয়া আছেন। হিন্দুর হিন্দুয়ানী রক্ষার ভার অন্ত সেই জয়সিংহের হস্তে দিয়া তাঁহারা নিশ্চিন্ত হইলেন। শিবাজী দমনে যুদ্ধের প্রয়ােজন নাই। মহারাজ যদি এই পবিত্র ভার গ্রহণ করেন, তিনি তাহার দাসানুদাস হইয়া তাহার আজ্ঞা প্রতিপালন করিবেন।” শিবাজীর এই অপূৰ্ব্ব সৎসাহস আত্মত্যাগ এবং স্বদেশ-হিতৈষিতা দর্শনে মহা- রাজ জয়সিংহ শিবাজীকে আলিঙ্গন করিয়া সাননে তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন। পরে নিজেকে বহু ধিক্কার দিয়া বলিলেন, যাহাতে আর হিন্দর প্রতি অত্যাচার না হয়, তাহা তিনি করিবেন; এবং শিবাজীর ন্যায় সুদক্ষ সেনাপতির দ্বারা মােগলের শক্তি আরও উপচিত হইবে এই আশায় তিনি সম্রাটের সহিত শিবাজীর মিলন করাইয়া দিলেন। জয়সিংহের চেষ্টায় শিফজী স্বীয় দুর্গাদি পুনঃ প্রাপ্ত হইলেন এবং পাঁচ হাজারী খেতাব প্রাপ্ত হইয়া শিৰাজী দিল্লির দরবারে আহুত হইলেন। স্বীয় পুত্র শঙ্কুণীর • চতুর শিবাজী ঔরঙ্গজেব। সহিত শিবাজী নিমন্ত্রণ রক্ষাৰ্থ দিল্লিতে উপস্থিত হইলেন। তথাকার দরবারে সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁহাকে সামান্য সেনাপতির আসন দান করায় ও অব জ্ঞার সহিত ব্যবহার করায় শিবাজী বিনানুমতিতে দরবার ত্যাগ করেন। ইহাতে সম্রাট তাহাকে স্বীয় আবাসগৃহে বন্দী করেন। পৌর্ণমাসী নামক সাধুভােজন ব্রতের উপলক্ষ্য করিয়া দিল্লিস্থ সাধুবর্গকে ঝকায় আঁকায় মিষ্টান্ন বিতরণ করেন। সেইরূপ দুইটি আবৃত ঝাঁকায় আরােহণ করিয়া শিবাজী গােপনে দিল্লিত্যাগ করেন। তঁাহার সিদ্ধ গুরু রামদাস স্বামী রােশেনারা প্রেরিত অশ্বত্ৰয় হয়া দিল্লির বাহিরে অবস্থান করিতেছিনে। শিবাজী শম্ভুকে লইয়া বাহিরে আসিবামাত্র রামদাস স্বামী উভয়কে লইয়া প্রস্থান করি- লেন। তাহারা নানা তীর্থ ভ্রমণ করিয়া অবশেষে মহারাষ্ট্রে প্রত্যাগত হইলেন মহারাষ্ট্রে আসিয়াই শিবাজী পুনরায় মােগলের বিপক্ষে অস্ত্রধারণ করিয়া অতি অল্পকাল মধ্যে সমুদায় মহারাষ্ট্রদেশ স্বাধীন করিয়া লইলেন। তখন শিবাজী স্বামী রামদাস কর্তৃক স্বাধীন নরপতিরূপে অভিষিক্ত হইয়া স্বাধীন হিন্দুরাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিলেন। মহারাজ জয়সিংহের মৃত্যু এবং রাজপুতগণের সহিত ঔরঙ্গ- জেবের সংঘর্ষ ঘটায় ঔরঙ্গজেব শিবাজী দমনে সফলকাম হইলেন না। উত্তরে সাতপুরা পৰ্ব্বতশ্রেণী, পশ্চিমে পশ্চিম ঘাটগিরি এবং পূর্বে কর্ণাটের সীমা পর্যন্ত সমুদায় ভূভাগ শিবাজীর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইল।

পঞ্চদশ লহরী সংনাম -দমনে। নালের সন্নিকটে সৎনামী নামক এক ধর্মসম্প্রদায় কৃষি কাৰ্য্যদ্বারা জীবিকা উপার্জন করিত। তাহাদের বেশভুষা আচার ব্যবহার সমুদায় স্বতন্ত্র ছিল। তাহারা কদাচ মিথ্যাকথা বা প্রবঞ্চনা জানি না। তাহাদের প্রতি ধৰ্ম্ম- পরায়ণ ছিল। সম্রাট তাহাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করায় এই সনামী সম্প্রদায় বিদ্রোহী হইল। অত্যাচারী রাজকর্মচারিবৃন্দকে পরাভূত করিয়া সৎনামীর দল নাথুল অধিকার করিল। তাহার ক্রমে চতুর্দিকের হিন্দুগণের সহায়তায় মােগলবাহিনীকে পরাজিত করিয়া দিল্লির ত্রিশ মাইলের কোল পর্যন্ত তাড়াইয়া দিয়া আসিল। তাহারা তখন নবাধিকৃত ভূভাগে হিন্দু স্বাধীনতা স্থাপন করিয়া হিন্দু রাজ-শাসন-প্রণালী প্রবর্তিত করিল। তাহাদের দেখাদেখি নিকট বী রাজন্যবর্গ ও স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করিতে লাগিলেন। এই ব্যাপার যথাকালে সম্রাটের কর্ণগােচর হইলে, ঔরঙ্গজেব আর কোনও সেনা- পতির উপর নির্ভর না করিয়া স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। তাহার বিপুল বাহিনীর সহিত ক্ষুদ্র সৎনামী-সম্প্রদায় বহুকাল প্রাণপণে ও অসীম বীরত্বসহকারে যুদ্ধ করিয়া অবশেষে একে একে সম্মুখ সংগ্রামে প্রাণত্যাগ করিয়া ইহলােকে অক্ষয় কীর্তি ও পরলােকে অনন্ত শান্তি অর্জন করিল। এই অদ্ভুতকর্মা বীর-সম্প্রদায়ের এক জনও পরাজয় স্বীকার করিয়া জীবন ধারণ করিতে স্বীকৃত হইল না। ঔরঙ্গজেব এই সম্প্রদায়ের অমানুষিক ধৈৰ্য্য, শৌর্য ও স্বদেশ এবং স্বধর্মনিষ্ঠা দর্শনে বিস্মিত হইয়া অবশিষ্ট সৎনামীগণকে ক্ষমা করিতে ইচ্ছুক ছিলেন; কিন্তু তাহারা ধর্মদ্রোহীর নিকট জীবনদানগ্ৰহণা- পেক্ষা সম্মুখসমরে দেহত্যাগ শ্রেষ্ঠতর বিবেচনা করিল। এই রূপে এই মহা- প্রাণ সৎনামী সম্প্রদায়ের বিলােপসাধন করিয়া সম্রাট রাজপুতানার দিকে শনােনিবেশ করিলেন। দাক্ষিণাত্যেই মহারাজ জয়সিংহের মৃত্যু ঘটে। মহারাজ যশােবন্ত সিংহকে সম্রাট' কাবুল শাসনে প্রেরণ করেন। তথায় ভঁহার মৃত্যু ফুটিলে হায় কতিপয় বিশ্বস্ত অনুচর রাজার পুত্রদ্বয়কে লইয়া আগ্রাভিমুখে ত্রা করেন। পখে আসিয়া অনুচরগণ শুনিলেন, সম্রাট যশোরে পুষকে ঔরঙ্গজেব - } আশ্রয়ে আনিয়া মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত ও ওমরাহ পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া আগ্রাতেই রাখিতে চাহেন। এই দুরভিসন্ধির কথা বিদিত হইয়া যশােবন্তের অনুচরগণ পুত্রদ্বয় লইয়া রাজপুতানা অভিমুখে প্রস্থান করেন। রাজপুতগণ তাহার সাহায্য জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। বিশেষতঃ মহারাজ রাজসিংহ এ বিষয়ে প্রধান উদ্যোগী হইয়া ঔরঙ্গজেব প্রেরিত একদল সৈন্যের পথরােধ করিবার জন্য রাজপুত সৈন্য নিয়ােগ করেন। একেত রাজসিংহ সম্রাটকে উপ- দেশ দিয়া পত্র লেখায়, ঔরঙ্গজেব সেই ধৃষ্ঠতার শাসনে কৃতসংকল্প ছিলেন । তদুপরি রাজসিংহের এই সৈন্য প্রেরণ বার্তা এবং রূপনগরের রাজকুমা- স্ত্রীকে মোগল সৈন্যের হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়া ঔরঙ্গজেবকে পত্নীলাভে তিনি বঞ্চিত করিয়াছেন অবগত হইয়া, অধিকতর অসন্তুষ্ট হইয়া রাজ সিংহ ও তাঁহার আত্মীয় বর্গের দমনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলেন। এদিকে মহারাজ যশােবন্তে, অনুচরবর্গ এই পুত্রদ্বয়কে লইয়া বড়ই বিপন্ন হইলেন। রাজসিংহের প্রেরিত সৈন্য আসিতে না আসিতে ঔরঙ্গজেব প্রেরিত অন্য একদল সৈন্য আসিয়া রক্ষি- গণের গতিরােধ করিল। তখন তাঁহার মহারাজ যশােবন্ত সিংহের পুত্রদ্বয়কে সন্ন্যাসী বেশে সজ্জিত করিয়া জয়সিংহের আশ্রয়াভিমুখে গােপনে প্রেরণ করিয়া কর্তব্যপালনে জীবন পণ করিলেন। তাহারা ঔরঙ্গজেবের সৈন্যগণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন ও দুইটা পটাবৃত শূন্য শিবিকার চতুর্দিকে ত্রিকোণ বৃহনির্মাণ করিয়া অপুৰ্ব্ব কৌশলে সেই বিপুল সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। আক্রমণকারিগণের সাধ্য কি সেই ব্যুহ ভেদ করে! একে একে রাজপুতবীরগণ, যে যেখানে দাঁড়াইয়া ছিলেন, সেই সেইখানেই দেহত্যাগ করিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে মুসলমানগণ অগ্রসর হইতে লাগিল। যখন দিবাবসনে শেষ রক্ষীবীর প্রাণ বিসর্জন করিলেন, তখন “আল্লা হাে আকবরধ্বনি করিয়া মােগলগণ আবৃত শিবিকায় লইয়া প্রস্থান করিল। কিছু দুরেই বাহকগণের কথায় তাহারা শিবিকা খুলিয়া শূণ্ঠ দেখিয়া পুনরায় যশােবন্তপুত্রদ্বয়ের অনুসন্ধানে ধাবিত হইল। কিন্তু পথিমধ্যেই রাজসিংহ-প্রেরিত সৈন্তের হস্তে পরাজিত হইয়া বিষন্ন বদনে আগ্রায় প্রত্যাবৃত্ত হইল। এ দিকে বিজয়ী রাজপুতগণ সম্মুখসমরে হত সেই ক্ষত্রিয়গণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া সত্বরে যশােবন্ত মহিষী ও পুত্রদ্বয়ের সাক্ষাৎলাভ করিলেন। তাহাদিগকে তখন তাঁহারী রাজসিংহের সমীপে আনয়ন করিলেন। মহারাজ-রাজসিংহ তাঁহাদিগকে কিছুদিন নিজ বসে রাখিয়া নিরাপদে যােধপুর প্রেরণ করিলেন। তখন উদয়পুর --- ঔরঙ্গজেব। , ও মােধপুরে “সাজ সাজ রব উখিত হইল। কারণ “সৎনামী” ও যশােবন্ত- দ্রোহী ঔরঙ্গজেব বিপুল সৈন্ত লইয়া রাজপুতনা দমনে যাত্রা করিয়াছেন, এই সংবাদ রাজসিংহ চরমুখে শ্রুত হইয়াছিলেন। মােগলসম্রাটের ক্রোধের আরও একটা কারণ ছিল; সম্রাট পূৰ্ব্ব প্রথানুযায়ী রূপনগর নামক ক্ষুদ্রাজ্যের অধি পতিরাজা বিক্রমসিংহের কন্যাকে বেগম শ্রেণীতে স্থান দিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন, রাজকন্যা এজনা রাজসিংহের সহায়তা প্রাধিনী হওয়ায়, রাণা রাজকন্যাকে মােগল সৈন্যের হস্ত হইতে উদ্ধার করেন এবং স্বীয় অন্তঃপুরে রাখিয়া দেন। এই অপমানের শােধ লওয়াও ঔরঙ্গজেবের আক্রমণের অন্যতর কারণ।

যােড়শ লহরী। '.. গুরু-শিষ্যে। মহারাজ জয়সিংহের ও যশােবন্তসিংহের দেহান্তে শিবাজী নির্বিবাদে রাজ্য বিস্তার করিতে লাগিলেন। ১৬৬৫ খৃষ্টাব্দে জয়সিংহের মৃত্যু ঘটে এবং শিবাজীও অভিষিক্ত হয়েন। সেই বৎসরই যুবরাজ মােয়াজ্জম দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েন। সম্রাট প্রথম পুত্র মহম্মদকে সুজার সহিত মিলিত হওয়া অপরাধে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাগারেই ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে মহম্মদের মৃত্যু ঘটে মহম্মদের জননী হিন্দুবংশীয়া ছিলেন। তাহারই দ্বিতীয় পুত্র মােয়াজ্জম সুতরাং এখন যুবরাজ হইয়া ছিলেন। রূপসিংহের দুহিতার সহিত সম্রাট ইহারই বিবাহ দেন , কিন্তু ইহাকে রাজপুত সমরে নিয়ােগ করিলে পাছে ইনি হিন্দু মাতামহ ও হিন্দু শ্বশুরকুলের আকর্ষণে রাজপুতগণের পক্ষাবলম্বন করেন, এই আশঙ্কায় সম্রাট তাহাকে দাক্ষিণাত্যে শিবাজী দমনে প্রেরণ করেন। সম্রাটের তৃতীয় পুত্র আজাম ১৬৫৩ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ; ইহার জননী পারস্যদেশীয় ছিলেন। তাহারই দ্বিতীয় পুত্র কুমার আকবরকেই সম্রাট রাজপুত দমনে নিজসঙ্গে লইয়া কারণ আকবর খাটি মুসলমান শােণিতজাত। ১৬৮০ ১৬৮০ খৃষ্টাব্দে ত্রয়েবিংশ- বর্ষে আকবর পদার্পণ করিয়াছিলেন। আকবর বীর হৃদয়, উদারপ্রাণ ও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। আকবরকে রাজপুত দমনে নিয়ােগ করিয়া সম্রাট বড়ই ভুল করিয়াছিলেন । রাজপুত শৌৰ্য্য ও সৌজন্যে মুগ্ধ হইয়া বীরবর আকবর রাজপুতের পক্ষপাতী হইয়া উঠিলেন ; কিন্তু যুবরাজ মােয়াজ্জম শিবাঙ্গীর বিপক্ষে বড়ই উদ্যম সহকারে যুদ্ধে নিযুক্ত হইলেও, সেই মহারাষ্ট্র কেশরীর কোনও ক্ষতি করিতে সমর্থ হইলেন না। বরং শিবাজী গােয়াপৰ্য্যন্ত নিজ সাম্রাজ্য বিস্তৃত করিয়া লইলেন এবং ইংরাজ কুঠী সুরাট লুণ্ঠন করিয়া চৌথ আদায় করিলেন । এমন কি মক্কাযাত্রী দুইটী শস্যপূর্ণ জাহাজও লুঠ করিয়া লইলেন। তাহার নেী- বহর সমুদ্রপথে আরবগণের বিভীষিকা উৎপাদন করিতে লাগিল। এদিকে শিবাজীসৈন্য তাঞ্জোর দখল করিয়া লইল। ১৬৮০, খৃষ্টাব্দে তাজোর-বিজয়। হয়। শিবাজীর রাজ্য বিস্তৃতির এই পরাকাষ্ঠার পর তিনি অধিকৃত ভূভাগে সুশাসনের ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। যান ।

ঔরঙ্গজেব। একদিন মৃগয়া ব্যপদেশে শিবাজী একটি অরণ্যে প্রবেশ করিয়া পশুপক্ষী কিছুই দেখিতে পাইলেন না। সেই বনে শিকারের কদাচ অভাব থাকে না, অথচ সে দিন এইরূপ ভাব দেখিয়া শিবাঙ্গী ক্রমেই গভীর বনে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, সেই গভীর প্রদেশে একটা শস্পমণ্ডিত বৃক্ষশূন্য ভূভাগ রহিয়াছে। সেই মাঠেই মৃত পশুপক্ষী আসিয়া আশ্রয় লইয়াছে। আনন্দসহকারে একটী মৃগের দিকে লক্ষ্য সন্ধান করিতে গিয়া শিবাজী যাহা দেখিলেন, তাহাতে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন! দেখিলেন সেই পশুব্যহের কেন্দ্রভাগে একটি সাধু ধ্যানস্তিমিত নয়নে উপবিষ্ট। তাহার নয়ন যুগল হইতে প্রেম প্রবাহ গও বহিয়া পতিত হইতেছে ; একটি পক্ষী তঁাহার বাহু অবলম্বন করিয়া সেই অশ্রুধারা পান করিতেছে। তখন আরও বিস্ময়ের সহিত শিবাজী দেখিলেন যে, তাহাকে দেখিয়া কোনও পশু বা পক্ষী কিছুমাত্র ভীত হইয়া ব্যুহ ত্যাগ করিল । নিকটে আসিয়া শিবাজী দেখিলেন, সেই সাধু আর কেহ নহেন—তাহারই গুরু রামদাস স্বামী। এই স্বামীজীয় সহিত বিপদে, অরণ্যে, শত্রু-পরিবেষ্টিত অবস্থায় তাহার প্রথম দর্শন হয়। সেইবার তাহারই ইঙ্গিতে তিনি পার্শ্বদেশ পার্বত্য পথ পার্বত্য পথ অবলম্বনে শক্র হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিয়া স্বামীজীর চরণে আশ্রয় গ্রহণ করেন, এবং তদবধি তাহারই আদেশ পালন করিয়া সকল বিপদ অতিক্রম করিয়া হিন্দুরাজত্ব স্থাপন করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। স্বামীজীর সমাহিত অবস্থা ও আশ্রিতবাৎসল্য দেখিয়া শিবাজী অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে দণ্ডবৎ প্রণত হইলেন। কিছুক্ষণ পরে স্বামী রামদাস নয়ন উন্মীলন করিলে পর শিবাজী বলিলেন,-“ক্ষাত্ৰধৰ্ম্ম পালন করিতে গিয়া কতই পশুবধ, কতই শত্রুবধ করিতে হইয়াছে ! আপনি চিন্তাতেও কাহারও হিংসা করেন না ; অহিংসা প্রতিষ্ঠায় আপনার নিকট জীবগণ বশীভূত ও আশ্রয় এবং অভয় প্রাপ্ত হইয়াছে। প্রভাে, এই সকল প্রাণিসংহার- কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইয়া না জানি কতই অপরাধ করিয়াছি ; তজ্জন্য অধীনের অপরাধ মার্জনা করিবেন। আমাকে এই শান্তিময় শ্ৰেস্কর পথের যাত্রী করিয়া দিন। আমি আপনার চরণে অন্য একান্ত শরণ লইলাম। তখন স্বামীজী তাহাকে মুক্তি পথের উচসাধনে দীক্ষিত করিলেন। শিবাজী দীক্ষিত ও কৃতার্থ হইয়া তৎক্ষণাৎ গুরুপাদপদ্মে সর্বস্ব দক্ষিণদান করিলেন। রামদাস কহিলেন “বৎস, আমি সন্ন্যাসী, রাজ্যে আমার প্রয়ােজন নাই ; তথাপি তোমার দান গ্রহণ করিলাম। অ্যু হইতে আমিই এই হিন্দু রাজ্যের স্বত্বাধিকারী হইলাম, কিন্তু তােমাকেই এই ৫৬ • ঔরঙ্গজেব। রাজ্য পরিচালনের প্রধান কর্মচারী নিযুক্ত করিলাম। আমারই আদেশ লইয়া তুমি সাবধানে এই কাৰ্য নির্বাহ করিতে থাক।” মহারাজ শিবাজী অগত্যা গুরু- নিয়োগে পুনরায় রাজকার্যে নিযুক্ত হইলেন বটে, কিন্তু আর যুদ্ধাদি প্রাণীবধকর কোনও কার্য নিযুক্ত না হইয়া, অবসর কালে ভবানীর রাতুলচরণদ্বয় চিন্তাতেই অতিবাহিত করিতেন। ১৬৮৩ খৃষ্টাফের ১৬ই জুন তারিখে তিপ্পান্ন বৎসর বয়সে ছত্রপতি মহারাজ শিবাজী স্বামী রামদাসের চরণে মস্তক রাখিয়া পৰমধামে গমন করিলেন। রহিল কেবল শম্ভোজী। তখন স্বামী রামদাস উত্তরখণ্ডে তীর্থ ব্যপদেশে প্রস্থান করিলেন; মহারাষ্ট্রে আর ফিরিলেন না। মহারাষ্ট্রের শান্তিও বিলুপ্ত হইয়া গেল।

সপ্তদশ লহরী। দিল্লির দরবারে। ; শিবাজীর পরােলোকপ্রাপ্তির সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া সম্রাট ঔরঙ্গজেব ঈষৎ হাস্য করিয়া প্রধান মন্ত্রীকে বলিলেন, “কাফর বা জাহান্ ফত।* অবিশ্বাসী বা কাফের জাহামে অর্থাৎ নরকে গিয়াছে। তৎপরে বলিলেন “এই পার্বত্য মুষি কটা কিন্তু উচ্চশ্রেণীর সেনাপতি ছিল। গত ঊনবিংশ বর্ষ ধরিয়া আমি ইহার বিপক্ষে ক্রমাগত সৈঙ্গ প্রেরণ করিয়াছি ; মহারাজ যশােবন্ত, দিলীরা, মহারাজ জয়সিংহ প্রভৃতি প্রধান প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করিয়াছি; অর্থ, সৈন্ত ও বুদ্ধি যায় যথেষ্ট করিয়াছি,তথাপি তাহার রাজ্য ক্রমাগত বর্ধিতই হইয়াছে। দুর্বল বৃদ্ধ স্ত্রী ও শিশুর বিপক্ষে সে কখনও অস্ত্রধারণ করে নাই; কি হিন্দু, কি মুসল- মান কোনও স্ত্রীলােকের প্রতি অসখ্যবহার করে নাই। লােকটাকে হাতে পাইয়া বাগাইতে পারিলাম না; ইহা কেবল প্রহরিগণের নির্বুদ্ধিতা দোষে ঘটে। মুসল- মান হইলে লোকটা শর্গমনের উপযুক্ত হইত; কিন্তু কাফেরের কাফের এই মূষিক জাহান্নমেই স্থান লাভ করিয়াছে কিন্তু আমার বিয়াম কই? আর এক কাফের আবার স্বাধীন হইবার মতলব করিয়াছে ; তবে এটা পাৰ্ব্বত্য মুষিক নয়, মরুভূমিবাসী শৃগাল। দেখি, সিংহের সহিত কতদিন লড়িতে পারে ?” সম্রাটের এই শৃগালটি” মহারাজ রাজসিংহ। এখন সম্রাট এই রাজ প্রবরের দমনে নিযুক্ত হইলেন। রাজপুতানা আক্রমণের পূর্বে সম্রাট দেওয়ানী আমে (বা সাধারণ দরবারে) এক বিরাট সভা করিয়া কৰ্তব্য নির্ণয় করিলেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব অধিকাংশ সময় সাজাহানাবাদ বা নূতন দিল্লীতে অতিবাহিত করিতেন। আগ্রায় কেবল শীতের কয়মাস থাকিতেন। এই নূতন দিল্লী অৰ্দ্ধচন্দ্রাকারে যমুনার দক্ষিণ কুলে নির্মিত হইয়াছিল। দিল্লী নগরীতে সম্রান্তগণের প্রাসাদের চারিদিকে সুন্দর সুন্দর উদ্যান ছিল। অসংখ্য সীৰ্ণ পথে দুইপার্শ্বে নাগরিকগণের আবাস ছিল। সামান্য পদাতিগণের কুটীর বংশ ও মৃত্তিকানিৰ্মিত এবং নিম্নতন কৰ্মচারিবৃন্দের আবাস মৃত্তিকা বা ইষ্টক নিৰ্মিত ছিল; কিন্তু সুভাসদ ও সওদাগরদিগের প্রসাদ মৰ্ম্মর নির্শিত ছিল ; তৎসহ উদ্যান, উৎস ও নিভৃত বৃক্ষবাটিকাসকল আবাসগুলি বেষ্টন করিয়া ঔরঙ্গজেব। শােভাসম্পাদন করিত। প্রধান দুইটা বক্সের সংযােগ স্থলে প্রকাণ্ড চৌরাস্তা ছিল। সম্রাটের দুর্গের ঠিক সম্মুখভাগে তাহ অবস্থিত ছিল। রাজপুত রাজন্যবর্গ এই স্থানেই শিবির সংস্থাপন করিতেন। তাহারা মােগলগণের গৃহে কখনই বাস করিতেন না। দুর্গের ভিতরে সম্রাটের প্রাসাদ ও মহল বা শুদ্ধান্ত ছিল। দুর্গপ্রাচীরের চতুর্দিকে পরিখা ছিল, এবং প্রাচীর সকল কামান শ্রেণীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। প্রাচীরের অষ্ট কোণে আটটী মিনার ছিল। তদুপরি প্রহরিগণ নিরন্তর প্রহরীর কাৰ্য্য করিত এবং চতুর্দিকস্থ ভূভাগ পৰ্য- বেক্ষণ করিত। রাজপ্রাসাদ শ্বেত, কৃষ্ণ এবং লােহিত মর্মরের অপূৰ্ব সমাবেশে ইন্দ্রপুরীবৎ নয়নাভিরাম ছিল। শুদ্ধান্ত বা রংমহলের শােভা অতি অপরূপ ছিল। দুর্গের মধ্যেই নানা দেশীয় শিল্পিগণ নানা প্রকার কারুকার্যখচিত দ্রব্যাদি প্রস্তুত করিত। সম্রাটগণ এই সকল শিল্পীর সমাদর করিতেন। চিত্ৰণ কাৰ্য্য বড়ই উন্নতি লাভ করিয়াছিল। এখনও দিল্লীতে হস্তীদস্তফলক ও কাচের উপর চিত্রিত মােগল সম্রাট ও বেগমগণের চিত্রাদি, অনলালিত্যে ও বর্ণ গৌরবে পাশ্চাত্য চিত্রকরগণের বিস্ময় উৎপাদন করে। নানাবিধ প্রস্তরের অপূর্ব সমাবেশ জালখচিত পর্দাগুলি রংমহলের দ্বারে দ্বারে যে শােভ-সম্পাদন করিয়াছে তাহা দেখিয়া মােগল স্থাপত্যের অতীত গৌরব দর্শকের হৃদয়ে বিস্ময় ও আনন্দের আবির্ভাব করে। সম্রাটের দেওয়ানি আম না দেখিলে তাহার সৌন্দৰ্য্য কেবল চিত্রসন্দর্শনে কিছু হৃদয়ঙ্গম হয় না। একবার দেখিলে দরবার হলের উপর যে আরবী-বয়েত লেখা আছে তাহা বাস্তবিকই সত্য বলিয়া বােধ হয় :- “যদি ভূলােকে কুত্রাপি স্বর্গ থাকে, তাহা এইখানে, তাহা এইখানে, এইখানে। দরবার হলে সম্রাট স্বীয় সিংহাসনে যথাকালে উপবিষ্ট হইলেন। তাঁহার পরিচ্ছদ :শুদ্র ও মহার্ঘ। তাহা রেশমী ফুলদার শ্বেত শাটিনের। তাহার চারিদিকে জরী ও নানাবর্ণের রেশমী সুতার কারুকার্য ছিল। জরীর তাজের উপর একটা প্রকাণ্ড কঙ্কা ভােলা ছিল। কার নিম্নে তিনটা বড় হীরক ও উপরে একটা বড় ফিরােজা বসান ছিল। কল্কার চুড়ায় সুন্দর ময়ূরপুরে গুচ্ছ ছিল। বড় বড় মুক্তার একছড়া হার সম্রাটের গলদেশ হইতে নাভিদেশ পৰ্য্যন্ত বিলম্বিত ছিল। সম্রাটের বর্ণ গৌর; ঈষৎ পীতাভ। নাসিকা উন্নত ও দীর্ঘ। নয়ন আয়ত, অৰ্ধাবৃত, তেজোদীপ্ত ও প্রতিভান্বিত। ললাট প্রশস্ত। শত্রু ও গুম্ফ মুসলমান প্রণালীতে কর্তিত। মখমল নির্মিত বহুমূল্য গদিমণ্ডিত *আশং এয়ারপো বয়ে নি কপি- ngint ঔরঙ্গজেব। ৫৯ মহার্ঘ্য রত্নখচিত ময়ূর-সিংহাসনে সম্রাট বীরাসনে উপবিষ্ট তাহার কটিদেশে একটী বহুমূল্য প্রস্তরখচিত ছােরা ছিল। তাহার বেগুনী রেশমী পাজামা পাঞ্জাৰী ধরণের। তাহার পাদুকা সিংহাসনের পাদপীঠে বিরাজমান ছিল। তাহা মুরদেশীয় জুতার অনুরূপ। জুতায় বহু হীরক কিরণ-বিস্তার করিতে- ছিল। পার্শ্বে ও পশ্চাতে জরীর কামদার তাকিয়া ছিল। মস্তকোপরি সবুজ রেশমী কারুকার্যখচিত রাজছত্র ; তাহার ঝালর মুক্তার এবং বাট হীরক- খচিত স্বর্ণের। সিংহাসনের দুইপার্শ্বে দুইজন চামরধারী ছিল। প্রত্যেক চামরের হাতল হীরকখচিত স্বর্ণনির্মিত। সম্রাটের বাম পাশ্বেই বহুমূল্য প্রস্তর- খচিত একটা তরবারি কোষবদ্ধ ছিল ; তাহার পশ্চাতেই বিচিত্র কারুকাৰ্য- শশাভিত একটী ঢাল শােভা পাইতেছিল। সিংহাসনটীর ময়ুরত্ৰয়ে ষট্‌পদ। পায়াগুলি খাঁটী সােনার। তাহার উপর চুণি, পান্না ও হীরার বাহার। পাঠান ও হিন্দুরাজগণের কোষাগার লুণ্ঠন করিয়া পুরুষানুক্রমে মােগল সম্রাট- গণ যে সকল রত্ন লাভ করিয়াছিলেন সম্রাট সাজাহান সেই সকল রত্ন দেখাইবার জন্যই এই ময়ূর সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন। সম্রাটের সিংহাসনের নিমেই একটা রৌপ্য রেলিংঘেরা বেদিকায় বহুমূল্য বিচিত্র পরিচ্ছদধারী ওম- রাহগণ উপবিষ্ট ছিলেন। তাহাদের বেদিকার উপরে জরীর একটী চন্দ্রাতপ খাটান ছিল ; তাহারও বহুমূল্য ঝালর। হলের প্রত্যেক স্তম্ভ বহুমূল্য শাটিন দ্বারা মণ্ডিত ছিল। সেই সকল শাটিনও ঈরীর কারুকার্যপশাভিত। সমুদায় দরবার-হলও চন্দ্রাতপে বিভূষিত। হতলও বহুমূল্য রেশমী বস্ত্রে মণ্ডিত ; তাহাতে নানাপ্রকার জরীর ফুল, ফল ও লতা পাতা অঙ্কিত। হলের বাহিরে রৌপ্য স্তম্ভোপরি একটী প্রকাণ্ড চন্দ্রাতপ টান ছিল। সেই চাপে অঙ্কিত ফুল ও ফল দেখিতে এরূপ স্বাভাবিক যেন চন্দ্রাতপটী একটা লম্ববান পুষ্পোদ্যান বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছিল। এ হেন সভায় বসিয়া সম্রাট ঔরঙ্গ- জেব মন্ত্রিবর্গ ও ওমরাহগণের সহিত পরামর্শ স্থির করিলেন-রাজপুতনাকে তিনদিক হইতে মােয়াজ্জম, আকাম ও আকবর দ্বারা আক্রমণ করা হইবে ; এবং সম্রাট স্বয়ং মহারাজ রাজসিংহের বিপক্ষে অভিযান করিবেন। ইহাতেই রাজপুতগণকে যথেষ্ট শিক্ষা দেওয়া হইবে। এইরূপে রাজপুতনা জয় করিয়া সম্রাট তৎপরে মহারাষ্ট্র শাসনে নিযুক্ত হইবেন। কর্তব্য নির্ণয়ের পর সভা- হইল। তখন দিলীতে “সাজ সাজ লােল পড়িল।

অষ্টাদশ লহরী ভ্রাতৃ সমাগমে। সম্রাট ঔরঙ্গজেব সভা ভঙ্গ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া প্রথমেই শাহাজাদী রােশেনারা মহল অভিমুখে যাত্রা করিলেন। সংবাদ প্রেরণ করিবামাত্রই রােশে- নার সসম্রমে সম্রাটকে নিজ নাচঘরে লইয়া গেলেন। তথায় ভিত্তিগুলি প্ৰকাণ্ড প্রকাণ্ড দর্পণ-মণ্ডিত ছিল। ছাদের নিম্নদিকও কাচমণ্ডিত থাকায় কেহ দণ্ডা- মান হইলে চারিদিকের ভিত্তি ও ছাদের নিম্নভাগে তাহার প্রতিবিম্ব দেখা যাইত। সেই গৃহে প্রত্যেক অসিন জরীর লতা পুষ্পশােভিত মখমলের গদী মণ্ডিত। সম্রাট উপবিষ্ট হইলে রোশেনারা জিজ্ঞাসা করিলেন—জাহাপনার এই অযাচিত অনুগ্রহ কোন্ সৌভাগ্য-ফলে?” ঔরঙ্গজেব বলিলেন, “যাহার শুভমন্ত্রণা ও সাহায্য বলে ঔরঙ্গজেব অদ্য অালমগীর বাদশাহ, তাহাকে একটা মহা শুভসংবাদ দিবার জন্যই এখানে আসা। ভগিনি শুনিয়া সুখী হইবে, আমাদের সেই মহাদুষমন্ পার্বত্য মূষিক শিবাজী কাফেরটা জাহান্নমে গিয়াছে ! সে এত দিনে মারা গিয়াছে।” রােশেনারা দণ্ডায়মান হইয়া কথাটা শুনিতে ছিলেন ; হঠাৎ নিকটবর্তী আসনে বসিয়া পড়িলেন; ললাটে, গণ্ড, গ্রীবায় ভয়ানক স্বেদনিঃসরণ হইতে লাগিল। ঔরঙ্গজেব ব্যস্ত হইয়া নিজ রুমাল লইয়া রােশেনারার ধর্ম নিম্মোচন করিলেন রােশেনারা হঠাৎ আত্মসংযম করিয়া বলিলেন,-“জাহাপনার কি স্মরণ নাই, এই পার্বত্য মুষিক একদিন এই সিংহিনীর বিপদে কিরূপ মনুষত্ব, উদারতা, সৌজন্য ও সন্ত্রম প্রদর্শন করিয়া তাহাকে তাহার পিতার নিকটে নিরাপদে প্রেরণ করিয়াছিল ? মােগল নরপতি হইলে সে এই শাহজাদীর বেগম ঘটাইত। এ হেন নরােত্তম যদি নরকে যায়, তবে তাহার পাদস্পর্শে সেই নরক ধর্গে পরিণত হইবে।” ঔরঙ্গজেব কর্ণে অঙ্গুলি দিয়া বলিলেন, “কি ভয়ানক! কি ভয়ানক। ভগিনীর সিরাজীর ঝোঁকটা এখনও কাটে নাই বােধ হয় ! কাহাকে কি বলিতেছ? যাক সেটা গিয়াছে, এখন বাকী আছে রাজসিংহ আর তাহার আত্মীয়গণ। ইহাদিগকে শাসন করিয়া মহারাষ্ট্রের দিকে যাইতে হইবে। বহি কি আমায় বেগম মহলে কিছুদিন পদার্পণ করিয়া রাজপুতানা ও মহারাষ্ট্রে বেড়াইয়া আসিবে ? তােমার ন্যায় মন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত এ কাৰ্য্য নিরাপদে সম্পন্ন কওয়া সুকঠিন। কি অভিমত তােমার ?”

ঔরঙ্গজেব। ৬১ এমন সময় হঠাৎ একজন বাদী আসিয়া সংবাদ দিল, জেবউন্নিসা ও উদিপুরী বেগম রােশেনারার দর্শনপ্রার্থিনী, অগত্যা রােশেনারা ব্যস্ত হইয়া উভয়কে নাচঘরে আনয়ন করিয়া আসন প্রদান করিলেন। তাহারা ঔরঙ্গজেবকে দেখিয়া কিঞ্চিৎ বিস্মিত হইলেম। ঔরঙ্গজেব-দুহিতা জেবউন্নিসা কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, “আমি কোথা পিসীমার দরদে দরদ জানাইতে আসিলাম, না, এখানে জাহাপনা হাজির।” ঔরঙ্গজেবের প্রিয়তমা মহিষী উদিপুরী পরিহাস করিয়া বলিলেন “জাহাপনা কি শাহজাদী রেশেনারা বিবি সাহেবের দরদের কথা জানেন, যে তুই দরদ দরদ করিতেছিস?” এমন সময় রাশেনারা আমার মাথাটা ঘুরিতেছে, একটা বাদীকে গুলাব আনিতে বলি।” বলিয়া গৃহ ত্যাগ করিলেন। তখন উদিপুরী ঔরঙ্গজেবকে শিবাজীর প্রতি রােশেনারার অনুরাগের কথা বলিয়া মাথাঘোরার কারণ নির্দেশ করিলেন। অমনি সময় বুঝিয়া জেবউন্নিসা বলিলেন, “জাঁহাপনা এখন বুঝিতেছেন, আপনি শত চেষ্টা করিয়াও কেন শিবাজীর কিছুই ক্ষতি করিতে পারেন নাই; আর কোন বলেই বা সে ব্যক্তি জাহাপনার হাতের মুঠার ভিতর হইতে পলাইয়া যায় ? জাহাপনা যদি মহারাষ্ট্র জয় করিতে যান, শাহজাদীকে সঙ্গে লইয়া গেলে সুবিধা হইবে না। যে হিন্দুকে ভালবাসে, তাহাকে লইয়া হিন্দুর অনিষ্ট করা কতদুর সঙ্গত, আপনি কি আর বুঝিতেছেন না ?” ঔরঙ্গজেব কোনও উত্তর না দিয়া কিছুক্ষণ নাচগৃহের গালিচার ফুলগুলি মনােযােগ সহযােগে দেখিতে লাগিলেন। পরে ** এইমাত্র শব্দ উচ্চারণ করিলেন। এমন সময় রােশেনারা মস্তকে গুলাব লাগাইয়া ফিরিলেন। একজন বাদী ইতি মধ্যে নাচঘরের সকল কথা গােপনে শুনিয়া রােশেনারাকে জানাইয়াছিল। রােশনারা হাস্যমুখে আসিয়া বলিলেন, “জাহাপনা, আমার দরদে দরদী হইয়া জেউন্নিসা আসিয়াছেন; আমার একটা দরদে যখন তাহার এত দরদ ; আমারও উচিত তাহার সকল দরদে সমান দরদ জানান। আমি জেবউন্নিসার এই ভালবাসায় বড়ই আপ্যায়িত হইলাম। বেগম সাহেবা উদিপুরীও এজন্য আমার শত শত নমস্কার গ্রহণ করুন। আমি এইমাত্র বলিতে যাইতে ছিলাম ; আমার তবিয়ৎ ভাল নাই। এই প্রকাণ্ড সমকালে পথ ক্লেশ সহন আমার পক্ষে অসম্ভব। বেগম সাহেবাই অনায়াসে জাঁহাপনার প্রধান শীরূপে সর্বদা সঙ্গেই যখন থাকিবে, তখন এই বাদীর অনুপস্থিতি ততটা অনুভূতি হইবে না। তবে জেবউন্নিসা ও উদীপুরী সাহেবার নিশ্চয়ই স্মরণ ঔরঙ্গজেব। আছে, বাঁদী রোশেনারা না থাকিলে, জাহানারা থাকিতে শাহজাদা ঔরঙ্গজেবের আলমগীর হইবার সম্ভাবনা কম ছিল। ঔরঙ্গজেব তৎক্ষণাৎ উঠিয়া রােশেনারাকে একটী আসনে বসাইয়া বলিলেন “ইহারা জানে না, কাহাকে কি বলিতেছ, বহি, তুমি কিছু মনে করিও না। আমি অন্যসময়ে আসিব। অনেক কথা রহিল। রােশেনারা ঈষৎ হা করিয়া বলিলেন “আর এদিকে যে বেগম সাহেবা রহিলেন।” তধন বেগম উদীপুরী ও জেবউন্নিসা এক একটা লম্বা সেলাম করিয়া “কই রহিলেন ?” বলিয়া ক্রোধভরে বিদায় লইলেন। বােশেনারা তখন এক টী সােফার উপর পড়িয়া প্রাণ ভরিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। বাম হস্তের অনামিকাস্থিত অঙ্গুরীয়টি বারম্বার কাতর নয়নে দেখিয়া দেখিয়া কতই না জানি, সঙ্কোচে অধরে স্পর্শ করিতে লাগিলেন। এদিকে নাচঘর ত্যাগ করিয়া জেবউন্নিসা অত্যন্ত ক্রোধ প্রকাশ করিয়া উদীপুরীকে বলিলেন, “এ অপমানের শাস্তি আমিই দিব জানিবেন। আপনাকে কিছুই করিতে হইবে না।” রােশেনারা তদবস্থায় সন্ধ্যা পর্যন্ত আহার নিদ্রা বন্ধ করিয়া পড়িয়া রহিলেন। কোনও বাদী নিকটে আসিতে সাহসী হইল না। সন্ধ্যার সময় সম্রাট আবার আসিলেন ; বলিলেন, “রােশেনারা আবার আসিলাম ; আমি তোমার জন্য বড়ই চিন্তিত হইয়াছি। আমি এই রাজপুরীতে সর্বদা সশঙ্কিত থাকি, আমি তােমাদের কথায় কিছু বলিতে চাহি না, তবে এই কথা বলিতে হইবে সে ব্যক্তি মুসলমান হইলে একজন বড়ই গৌরবের ওমরাহ হইবার যােগ্য ছিল। তুমি এই ভুজগীদ্বয়কে ঘাটাইয়া ভাল কর নাই। আমি তােমার গৃহে প্রহরী নিযুক্ত রাখিয়াছি।” রােশেনারাকে ঔরঙ্গজেব সত্যই স্নেহ করি- তেন, রােশেনারাও তাহা জানিত। ঔরঙ্গজেব জগতের সকলকেই অবিশ্বাস করিতেন, কিন্তু মােশেনারা ব্যতীত। রোশেনারা তখন বলিলেন “ভাই বিষকে ভয় নাই। জীবন এখন লক্ষ্য শূন্য, যদি জেবউন্নিসা বিষ প্রদান করে, আমার উপকারই করিবে।” ঔরঙ্গজেব তখন বলিলেন, “বহিন, এ জগতে ঔরজেবের হৃদয় খুলিবার একটামাত্র স্থান আছে ; তাহা হইতে বঞ্চিত করিলে, রােশনারা তােমার ভ্রাতাকে উন্মাদগ্রস্ত হইতে হইবে। ইহাতে মােগলসাম্রাজ্যের কি লাভ? তােমাকে আমি কিছুতেই হারাইতে পারি না। তােমার হৃদয়ের এই কথা যদি আগে জানিতে পারিতাম, তাহা হইলে শিবাজীকে মুসলমান করিয়া তােমা, হন্তে আনিয়া দিয়া, তাহাকেই প্রধান সেনাপতি করিতাম ;

ঔরঙ্গজেব। “ভাই, ওঁহাকে তুমি বুঝ নাই। বুঝিতে পারিলে তােমার দক্ষিণ বাহু হেলায় হারাইতে না। তিনি মিত্রভাবে আসিয়া, কেবল তোমার ব্যবস্থার দোষে শত্রু হইয়া কিরিয়াছিলেন। যাক, আমার জন্য ভাবিও না। আল্লার যদি ইচ্ছা হয়, এই রাজশাসনের গুর ভার হয়ত তোমাকে একাই বহন করিতে হইবে। তখন ঔরঙ্গজেব অগত্যা বিদায় লইলেন। প্রত্যুষ হইতে না হইতে ঔরঙ্গজেব শুনিয়া স্তম্ভিত হইলেন—শাহজাদী রোশেনারা হঠাৎ সর্পাঘাতে প্রত্যুষে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন। এ র্প কোথা হইতে কেমনে আসিল, সম্রাটের বুঝিতে বাকী রহিল না। ধুমধামের সহিত শাহজাদীর অন্ত্যষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হইল। সম্রাট ঔরঙ্গজেব কিন্তু একশত খােলার এবং আড়াইশত বাদীর গােপনে প্রাণদণ্ড করিলেন এবং একমাস কাল জেবউন্নিসা ও উদিপুরীর সহিত বাক্যালাপ করিলেন । তখন চারিদিকে সমর সজ্জা পড়িয়াছে, এই জন্য সম্রাট অগত্যা অন্যদিকে মন দিয়া বহুকষ্টে রােশেনারার শােক ভুলিলেন।

উনবিংশ লহরী। রাজসিংহ বিরােধ। মহা আয়ােজনের পর ঔরঙ্গজেব রাজপুত-শাসনে বহির্গত হইলেন। সর্ব প্রথমে পথ পরিষ্কারক সৈন্ত কোদালি কুড়ালি লইয়া গাছপালা কাটিয়া পথ বাঁধিয়া চলিল। সেই পথে তখন কামানবাহী শকটশ্রেণী টানিয়া বড় বড় ঘােড়। চলিতে লাগিল; তৎপরে দেখা দিল গােলন্দাজ সেনা। তৎপরে রাজ কোষাগার উষ্ট্র ও হস্তী পৃষ্ঠে বাহিত হইতেছিল। তাহার পর দপ্তরখানা- হিসাব পত্রের খাতা, হাতি গাড়ী প্রভৃতির উপর দেখা গেল। তৎপরেই সুপেয় পানীয় বাহী উদ্ভাদি চলিল। তারপর খাদ্য ভাণ্ডার আটা, ঘৃত, চাউল, শাকসবজী, ছাগ মেষ, হংস কুকুট প্রভৃতি বহন করিয়া শকটের পর শকট দেখা দিল। তাহাদের পশ্চাতেই পাচক বাবুর্চীগণ। তাহাদের পশ্চাতে তােষাখানা বা পােষাক আদির যান। তাহার পশ্চাতে মােগল অশ্বারােহী সেনা ছিল। এই বিভাগকে সম্মুখ করিয়া দ্বিতীয় বিভাগ আসিল। ইহা সম্রাটের বিভাগ। ইহার প্রথমেই ধূপ, ধূনা গুগগুল, মৃগনাভি প্রভৃতি গন্ধদ্রব্যপূর্ণ অগ্নি- কটাহবাহী উষ্ট্রের সারি। এই সকল জ্বলন্ত কটাহ চারিদিকে সুগন্ধ বিস্তার করিয়া আসিতেছিল। তৎপরে সম্রাটের শরীররক্ষক অশ্বয়ােহী সৈন্ত। তাহাদের কেন্দ্রস্থলে সম্রাট ঔরঙ্গজেব মণিরত্নাদি ভূষিত সুসজ্জিত শ্বেত অখে আরোহণ করিয়া চলিয়াছেন। তাহার মস্তকে ভুবনবিখ্যাত বহুমূল্য রত্ন শােভিত শ্বেতছত্র। সম্রাটের পশ্চাতে মুক্তার ঝালর শােভিত সূক্ষ্ম রেশমী বস্ত্রাবৃত হাওদার ভিতরে রূপের ছটায় চারিদিক আনন্দময় করিয়া, গজপৃষ্ঠবাহিনী ‘সুন্দরীসম্প্রদায় চলিয়াছেন। তাহাদের মধ্যমণিস্বরূপ হইয়া রত্নখচিত সুবর্ণ নির্মিত হাওদার উপর সওয়ার হইয়া, সম্রাটের প্রধানা মহিষী মােধপুরী বেগম, ( যুবরাজ মহম্মদ ও মােয়াজ্জামের জননী) তাহার পার্শ্বেই জর্জিয়াদে দারার ভূতপূৰ্বা ক্রীতদাসী এবং সম্রাটের প্রিয় বেগম উদীপুরী বেগম, তাহার পশ্চাতেই , সম্রাট দুহিতা দৃপ্তাফণিনীসদৃশ তেজোগৰ্ব্বদীপ্তা জেবউন্নিসা হস্তীপৃষ্ঠে চলিয়াছেন। বেগমগণের পশ্চাতে তাহাদের কুটুম্বিনী নারীরক্ষিবৃন্দ ও দাসীগণ অশ্বপৃষ্ঠে দলে দলে দেখা দিত্ব। তাহাদের পশ্চাতে আবার গােলন্দাজ সেনা। তাহাদের পশ্চাতে ঔরঙ্গজেব। বন্দুকধারী পদাতিক সৈন্য। সৰ্বশেযে ভৃত্য, কর্মচারী, মুটে মজুর, বাজিকর, নৰ্ত্তক নর্তকী, প্রভৃতি এবং তার রাশি ও মোটঘাট। সম্রাট এই বিপুল বাহিনী লইয়া উদয়পুরের দিকে অগ্রসর হইলেন; মােয়াজ্জাম দক্ষিণ হইতে আসিয়া রাজপুতানা আক্রমণ করিলেন। কাবুল সইতে সহজাদা আকবর রাজপুতানার উত্তর দিক আক্রমণ করিলেন এবং বঙ্গদেশের শাহজাদা আজাম রাজপুতানার পূৰ্বদিক আক্রমণ করিলেন। আজমীড়ে আসিয়া ঔরঙ্গজেবে ও আকবরে দেখা হইল। তাহারা পর্বতমালার মধ্যে তিনটী গিরিসঙ্কট লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইলেন। তাহার মধ্যে একটির নাম দোবাদি, অন্য দুইটীর নাম দয়েলবার। ও নয়ন। দোবারি পথে আকবরকে অগ্রসর হইতে আদেশ করিয়া, সম্রাট স্বয়ং মহারাণার মােগলবেশী চরের পরামর্শে নয়ন গিরিসঙ্কটের দিকে প্রস্থান করিলেন। রাজসিংহ সৈনাপত্যে মহাবীর নেপােলিয়ানের সমকক্ষ ছিলেন। তাহার ও ঘােধপুরের সৈন্যবল লইয়া সম্রাটের চারিটী বাহিনীর সহিত বেশীদিন যুদ্ধ করা যে অসম্ভব, তাহা মহারাণা বিলক্ষণ জানিতেন; এই জন্য তিনি সম্রাটের সহিত কেবল গিরিসঙ্কটেই যুদ্ধপ্রদানে কৃতনিশ্চয় হইয়াছিলেন। রাজসিংহ তাহার সৈন্যের এক ভাগ রাজকুমার জয়সিংহের অধীনে, দ্বিতীয়ভাগ দ্বিতীয় কুমার ভীমসিংহের অধীনে এবং তৃতীয়ভাগ স্বীয় অধীনে রাখিয়া, নয়ন গিরিসঙ্কটের দ্বারে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। আকবর উদয়পুরের উপত্যকায় প্রবেশ লাভ করিয়া বীরদর্পে উদয়পুরের সম্মুখে শিবির সন্নিবেশ করিলেন। এমন সময় হঠাৎ রাজকুমার জয়সিংহ আকবরের পঞ্চাশসহস্র মােগল সৈন্যের উপর পতিত হইয়া সমুদয় সৈন্ত শমন-সদনে প্রেরণ করিলেন। প্রাণ লইয়া আকবর গুজরাটাভিমুখে পলায়ন করিলেন। মােয়াজ্জম দক্ষিণাত্য হইতে আসিয়া রাজপুতনায় প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, কাকলীর গিরিসঙ্কট অতিক্রম করিলেই তাহাকে রসদশূন্য হইয়া মরিতে হইবে। মােয়াজ্জাম ভাল সেনাপতি ছিলেন, এইজন্য আর অগ্রসর হইতে না পারিয়া সেই স্থলেই রাজ- পুতের হস্তে কিছু কিছু লানা ভােগ করিতে লাগিলেন। তখন নিয়তি প্রেরিত হইয়া ঔরঙ্গজেব মহারাণার ছদ্মবেশী চরের পরামর্শে নন গিরিসঙ্কটে প্রবেশ করিলেন। উক্ত গিরিসঙ্কটে প্রবেশ করিয়া সম্রাট দেখিলেন, প্রবেশ ও নির্গমের উভয় পখই মহারাণার সৈন্যগণ কর্তৃক অবরুদ্ধ হইয়াছে। প্রবেশকালে ঔরঙ্গক্সেবের দ্বিতীয় বিভাগের সহিত প্রথম বিভাগের বিচ্ছেদ ঘটায় সম্রাট বেগমের মধ্যে উদীপুরী ও জেব-উন্নিসা ও রত্নাদি ও রসদ মহারাণার হস্তগত হইল। মহা ঔরঙ্গজেব। রাণ। এই সকল উদয়পুরে প্রেরণ করিয়া ঔরঙ্গজেব-দমনে নিযুক্ত হইলেন। এই গিরিসঙ্কটে অব সম্রাট সৈন্য রাজপুতগণের শিলা ও গােলাবর্ষণের প্রভাবে দলে দলে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া নয়ন-গিরিসঙ্কটকে থাৰ্মাপলিতে পরিণত করিলেন। অনাহারে অনিদ্রায় এবং দারুণ পিপাসায় সম্রাট সসৈন্যে মহাষাতনাপাইয়া অগত্যা মহারাণার নিকট পরাজয় স্বীকারপূর্বক মহারাণা প্রদত্ত সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়া সসৈন্যে জীবন ভিক্ষা করিলেন। এদিকে উদীপুরীও রূপনগরের রাজ- দুহিতার পরিচর্যা করতে বাধ্য হইয়া গর্বের পর্বতা লাভ করিলেন এবং মহারাণার সৌজন্যে জেবউন্নিসা সহ সম্রাটসকাশে পুনঃপ্রেরিত হইলেন। আজম- * শাহ ও অন্য একটি গিরিসঙ্কটে বিলক্ষণ লাঞ্ছনা: ভােগ করিয়া আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না। গিরিসঙ্কট হইতে বহির্গত হইয়া সম্রাট আবার উদয়পুর-আক্রমণ-প্রয়াসী হইয়া আজমের সৈন্যসহ মিলিত হইলেন; কিন্তু রূপনগর-রাজা বিক্রম সিংহ সসৈন্যে রাজসিংহের সৈন্যের সহিত মিলিত হইয়া আজামের সৈন্ত বিনাশ করিতে লাগি- লেন। শাহজাদা আজমকে পরাভূত করিয়া বিক্রম সিংহ মহারাণার করে যথাবিধি নিজ দুহিতা চঞ্চল কুমারীকে অর্পণ করিয়া নিজ জীবন সার্থক করিলেন। এইবার ঔরঙ্গজেব রূপনগরের রাজকুমারীর আশায় বঞ্চিত হইয়া ভীষণ বেগে পুনরায় রাজসিংহকে আক্রমণ করিলেন; কিন্তু মহারাণা বিখ্যাত মারবারী বীর দুর্গাদাসের সৈন্য সহ মিলিত হইয়া পুনরায় সম্রাটকে পরাজিত করিলেন। এই যুদ্ধে সম্রাটের বহু সােক্ষয় হইল ; তাহাদের যথাসর্বস্ব রাজপুতগণ লুণ্ঠন করিয়া সইল। পিতা পুত্রে তখন সম্রাট চিতােরে আশ্রয় লইলেন; কিন্তু সেখানেও সুবলদাস নামক রাজকর্মচারী সম্রাটের রসদের পথ বন্ধ করায়, দিল্লীশ্বর আজমিরে পলায়ন করিয়া চঞ্চলকুমারীর আশা জন্মের মত ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। তখন সুবলদাস আজামের সেনাপতি খা রহিলাকে এমন শিক্ষা দিলেন যে, উদয়- পুরের শতক্রোশের মধ্যে একটিও মােগল আর রহিল না। যশােবনু-মহিষী পঞ্চবিংশ সহস্র অশ্বারােহী সৈন্য প্রেরণ করিয়া রাণার সাহায্য করিলেন ; ইহাতে উপচিত বল হইয়া রাণা জমে সমুদায় রাজপুতানা হইতে মােগলগণকে বিতাড়িত করিলেন। বাবার দ্বিতীয় পুত্র ভীমহি গুজরাট আক্রমণ করিয়া মােগলসাম্রাজ্য ধ্বংস করিতে লাগিলেন। পীড়িত প্রজারা আসিয়া রাজসিংহের শরণাগত হইলে কমসিং জগত গুজরাটে হিন্দুরাজত্ব স্থাপনে ক্ষান্ত হইলেন।

ঔরঙ্গজেব। ৬৭ রাজমন্ত্রী দয়াল সাহা কিন্তু ছাড়িবার ছাত্র নহেন। তিনি জয়সিংহের সৈন্তের সহিত নিজ সৈন্স মিলাইয়া শাহজাদা আজামের সৈন্য নাশ করিতে লাগিলেন; চিতােরের নিকট আজাম একবারে হতসৈন্ত ও পরাজিত হইয়া পলায়ন করিলেন। চাৰিবৎসর ধরিয়া এইরূপ যুদ্ধ করিয়া সম্রাট পদে পদে লাহিত হইয়া, অগত্যা প্রকৃতই সন্ধি করিলেন। রাজসিংহ যাহা যাহা চাহিয়াছিলেন, ঔরঙ্গজেব তাহাতেই সম্মত হইলেন। সম্রাটের ধারণা হইল, আকবর রাজপুতের সহায় হইতে গিয়া পরাস্ত হইয়া পলায়ন করিয়াছেন। মােয়াজ্জাম প্রাণ ভরিয়া যুদ্ধ করেন নাই; এই জন্য তাহার এই লাঞ্ছনা পাইতে হইল। যাহা হউক রাজপুত শাসন করিতে আসিয়া সম্রাট বিলক্ষণ শিক্ষা লাভ করিয়া রাজপুতকেশরী রাজসিংহের বিক্রমের নিকট পরাভব মানিলেন। মহারাণা প্রতাপের পর মােগল এরূপ শিক্ষা আর কাহারও নিকট কখনও পায় নাই। অগত্যা জিজিয়া, যশোেবস্তের পুত্রদ্বয় এবং চঞ্চলকুমারী -এই কয়টির আশাই সম্রাটকে ত্যাগ করিতে হইল। ;

বিংশ লহরী। পিতা-পুত্রে পলায়মান আকবর শুনিলেন, তাহার পিতার সন্দেহ হইয়াছে যে, তিনি রাজ- পুতগণের সহায়তায় স্বাধীন ভাবে আপনাকে দিল্লীর সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করিয়া- ছেন ; ইহা জানিতে পারিয়া সম্রাট তাহার নামীয় এক জালপত্র রাজপুতগণের হস্তে ফেলিয়া দেন ; তাহাতে ধেন সম্রাট আকবরকে লিখিতেছেন, তিনি যেন রাজ- পূতগণের সহিত বাহ্যিক মিল করিয়া তাহাদের ভিতরকার সংবাদ সংগ্রহ করেন। কেহ বলে, সেই পত্র রাজসিংহের হস্তে পড়ায় তিনি আকবরকে সন্দেহ করিয়া বহু রাজপুত সৈন্য সহ আকবরকে আক্রমণ করিয়া হটাইয়া দিয়াছেন।* আকবর পিতার নিকট এইরূপে অবিশ্বাসী হইয়াছেন শুনিয়া এবং পিতার সহিত দেখা হইলে তাহার অনিবার্য ফল কারাদণ্ড বুঝিয়া গুর্জর দিয়া সমুদ্র উপকূলে উপস্থিত হইয়া জাহাজ যােগে মক্কাযাত্রা করেন। পরে পথে নানা বিপদের পর পারস্য, রাজের শরণ লাভ করেন। পারস্য রাজ তাহাকে অতি সমাদরে নিজ রাজ্যেই স্থান দান করেন। তদবধি মৃত্যুকাল পর্যন্ত সম্রাট আর আকবরের সাক্ষাৎ লাভ করেন নাই। উদয়পুরের যুদ্ধের পর আকবর গুর্জয়ের দিকে পায়মান হইলে সম্রাট যুবরাজ মােয়াজ্জামকে আকবরের পশ্চাৎ প্রেরণ করেন। মােয়াজ্জাম উপযুক্ত সতর্কতার সহিত কাৰ্য করিলে আকবর কখনই শিবাজী পুত্র শন্তোজীর আশ্রয় পাইতেন না এবং পরে বগনানার গিরিসঙ্কট অবলম্বনে সমুদ্রতীরে উপস্থিত হইয়া দুইটি জাহাজ ভাড়া করিতে পারিতেন না, এবং আকবরের জাহাজ মক্কটের ইমামের অধিকারের সন্নিকটবর্তী সমুদ্রে মগ্ন হইলে, যখন ইমাম সাহেব আকবরের উদ্ধার করেন, তখন মােয়াজ্জাম উপযুক্ত দূত সহ ইমামের নিকট জাহাজ প্রেরণ করিলে, ইমাম নিশ্চয়ই সেই জাহাজেই আকবরকে বন্দী করিয়া ভারতবর্ষে প্রেরণ করিতে পারি- তেন। তিনি কখনই পারস্তরাজের নিকট আকবকে প্রেরণ করিতেন না এবং মক্কটে জাহাজ প্রেরণ না করিলেও মােয়াজ্জাম যদি পারস্বরাজের নিকট দূত পাঠাইতেন,তাহা হইলে পারস্যরাজও আকবরকে বন্দী করিয়া সম্রাটের নিকট প্রেরণ করিতেন। তাহা না হইয়া আকবর পারস্যরাজের নিকট গিয়া ধর্মে ঔরঙ্গজেব। •• দীক্ষিত হইয়া, থােরাগানের শাসনকর্তারূপে সসম্মানে কাল কাটাইতে পারিতেন । এই সকল ব্যাপার কেবল মােয়াজ্জামের গাফিলতিতে ঘটিয়াছে ; সম্রাটের ইহা দৃঢ় ধারণা হইল। এই জন্য মােয়াজ্জামের উপর সম্রাটের সন্দেহ বাড়িল। এখন কেবলমাত্র আজমই সম্রাটের প্রিয়পাত্র রহিলেন, কিন্তু তাহার গণ্ডিবিধির দিকে লক্ষ্য রাখিবার জন্য তহবর খাঁ এবং ফিরােজ জঙ্গ নামক সেনাপতিদ্বয়কে সম্রাট নিয়োগ করিলেন। রাজপুতানার কাৰ্য শেষ হইলে ১৬৮৩ খৃঃ সমুদায় মােগল সৈন্য একত্রিত করিয়া মহারাষ্ট্র দমনে আওরঙ্গজেব দক্ষিণাত্য অভিমুখে প্রস্থান করিলেন। সম্ভোজী হিন্দু-স্বাধীনতা স্থাপনকারী- শিবাজীর পুত্র ; দ্বিতীয়তঃ শম্ভোজী এতদিন ধরিয়া দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তার কর্তৃত্ব অগ্রাহ্য করিয়াছেন ; তৃতীয়তঃ তিনি সম্রাটের বিদ্রোহী পুত্র আকবরকে আশ্রয় দিয়াছিলেন ; চতুর্থতঃ শম্ভোজী আকবরের প্রতি সম্রাটপুলের উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করায় অগত্যা আকবর, শম্ভোজীকে ত্যাগ করিয়া আওরাঙ্গাবাদে পলায়ন করেন। যদি শম্ভাজী আকবরকে আট- কাইয়া রাখিতেন, তাহা হইলে মােয়াজ্জাম আসিয়া অনায়াসেই আকবরকে হস্ত- গত করিয়া সম্রাটের করে সমৰ্পণ করিতে পারিতেন এই সকল অপরাধে সম্রাট শভোজী ও মারাঠাজাতিকে শাসন করা অত্যন্ত প্রয়োজন বােধ করিলেন। তখন ঔরঙ্গজেব নিজ বাহিনী, আজাম ও মােয়াজ্জামের সৈন্যের সহ মিলিত করিয়া মহারাষ্ট্র আক্রমণ করিলেন। ;

একবিংশ লহরী মহারাষ্ট্র দমনে। পড়িল। এইবার সম্রাট সাবধান হইলেন, যেন রাজপুতানার বিরোধের ন্যায় মহারাষ্ট্র বিয়ােধ তাহার শতচেষ্টা ব্যর্থ না করে। সম্রাট বাহানপুরে উপস্থিত হইয়া মহারাষ্ট্র বিজয়ের ভার স্বয়ং গ্রহণ করিলেন। প্রথমে তিনি মোয়াজ্জামকে মহারাষ্ট্রের পশ্চিম দিকে ও আজামকে পূর্বদিকে প্রেরণ করিয়া মহারাষ্ট্রের গ্রাম নগর লুণ্ঠন ও ধ্বংস করিতে আদেশ দিলেন। মারাঠাগণ নিজ নিজ গ্রাম ত্যাগ করিয়া খাস্তাদি লইয়া পার্বত্যপ্রদেশের আশ্রয় লইল। মােয়াজ্জাম সমুদায় কঙ্কনপ্রদেশ ধ্বংস করিয়াও একটা মারাঠা বা একটী পশুর মুখ দেখিতে পাইলেন না। খাদ্যাভাবে তাহার অশ্বগণ মরিতে লাগিল; সৈন্যসকলও বুসদের অভাবে অবসন্ন হইয়া অশ্বারােহিগণ পদাতির ন্যায় পদব্রজে অনাহারে অবসন্ন দেহে বহু কষ্টে ফিরিতে লাগিল। তখন মােয়াজ্জাম সমুদ্রতীরে গিয়া খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করি- লেন; কিন্তু পথে মারাঠাগণ ঘাস কাটিয়া লইয়াছিল, গ্রামসকল হইতে রসদ তুলিয়া লইয়াছিল, গবাদিকে পর্বতগুহায় লুকাইয়া রাখিয়াছিল। এ অবস্থায় যদিও মােয়াজ্জাম সমুদ্রতীরে আসিলেন, কিন্তু মারাঠাগণ শস্যের জাহাজসকল লুঠ করিয়া লইল। খাদ্যাভাবে মােয়াজ্জামের সৈন্য দলে দলে ধরাশায়ী হইতে লাগিল। দুর্গম পার্বত্যপথ, পার্বত্য নদী, দুরারােহ গিরিশৃঙ্গ, পৰ্বতগাত্রে লুকায়িত মারাঠাগণের প্রস্তর ও বর্ষানিক্ষেপ, খাদ্যাভাব, অস্বাস্থ্য জলবায়ু এতগুলি বাধা অতিক্রম করিয়া মােয়াজ্জামের বিপুলবাহিনীর অল্পসংখ্যক সেনাই সম্রাটের নিকট ফিরিয়া আসিল। ঔরঙ্গজেব মােয়াজ্জামকে উৎসাহিত করিয়া বলিলেন, “আমি তােমাকে শক্রবধে পাঠাইয়াছিলাম, পাথর ভাঙ্গিতে বা উপবাস করিতে পাঠাই নাই। পাহাড়ের সহিত যুদ্ধ বিফল।” বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার মুসলমান রাজয় মারাঠাগশের চৌধ যােগাইতেছে, এই ধারণা হওয়ায় তখন অগত্যা ঔরঙ্গ- জেব উভয় ভ্রাতাকে বিজাপুর আক্রমণে নিয়ােগ করিলেন। সম্রাট নিজে গােল কুত্তার দিকে অগ্রসর হইলেন। এই দুই রাকাই মুসলমান। মারাঠার সহিত যুদ্ধে লাভ কিছুই নাই; তাহাদের একটিও সৈন্ত যুদ্ধে মারা যায় না; তাহাদের খাদ্যেরও অভাব হয় না; তাহারা সম্মুখ সমরে অগ্রসর হয় না; তাহাদের দেশ ধ্বংস করি- 1. ,, ঔরঙ্গজেব। ৭১ লেও মারাঠাগণ শীঘ্রই পর্ণকুটীর নির্মাণ করিয়া লইয়া তাহাতেই বাস করে ; তাহারা বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার গ্রামগুলি লুণ্ঠন ও গ্রামবাসীদের নিকট চৌথ লইয়া নিজেদের ভাণ্ডার পূর্ণ করে। এস্থলে মারাঠাগণকে পেটে মারিবার জন্য সম্রাট অগ্ৰেই উক্ত দুইটা মুসলমান রাজ্যধ্বংসে মনােনিবেশ করিলেন। এ দিকে মােয়াজ্জামের সৈন্ত কঙ্কন ছাড়িয়া আসিবামাত্র শম্ভোজী তাহার দুর্দম অশ্বারােহী সৈন্য লইয়া মােয়াজ্জামের সৈন্তের পার্শ্বদেশ দিয়া খান্দেশ লুণ্ঠন করিয়া সম্রাটের পূর্ব-বাসস্থান বরহাণপুর লুণ্ঠন করিলেন। শম্ভোজী সেই সহরে আগুন লাগাইয়া দিলেন। তৎপরে মুসলমানের সৈন্যের রসদ নাশ করিবার জন্য সমুদায় প্রদেশে অগ্নি জ্বলিয়া দিয়া লুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। তখন মােগল সৈন্য গােলকুণ্ডার পথে অগ্রসর হইয়াছে ; সুতরাং শম্ভোজী অবাধে মােগলাধিকৃত দেশ লুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। এই সংবাদে ঔরঙ্গজেব একদল মােগল সৈন্য পাঠাইয়া দিলেন। তাহারা আসিয়া দণ্ঠনগরী ও প্রস্তরস্তুপ ব্যতীত কিছুই দেখিতে পাই না। আবার যেমনি তাহারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিল, অমনি শম্ভোজী পৰ্বতাশ্রয় হইতে বহির্গত হইয়া মােগল সৈন্যের পশ্চাদভাগ আক্রমণ করিয়া তাহাদিগকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। তাহারা রসদ অভাবে কষ্ট পাইয়া বহু কষ্টে সম্রাটের সহিত পুনর্মিলিত হইল। এ দিকে শন্তোজী সমুদায় প্রদেশ নিজা- ধিকারে আনিয়া শাসন করিতে লাগিলেন। মারাঠাদিগের রণকৌশল এইরূপ জন্ধুকলীলাময়। ঐরূপ বিপুল-বাহিনীর সহিত ক্ষুদ্র মারাঠা সৈন্য সম্মুখসমরে অগ্রসর হইলে মারাঠা সৈন্যের একান্ত বিলােপ অবশ্যম্ভাবী জানিয়া, মারাঠাগণ এইরূপ চাতুৰ্য্য অবলম্বনে ঔরঙ্গজেব সৈন্যের ধীরে ধীরে বিলােপসাধন করিয়াছিল। বিংশ বর্ষব্যাপী এই মহাসমরে মারাঠাগণ এই নীতি অবলম্বনে মােগলাধিকৃত নগরগুলি ব্যতীত সমুদয় প্রদেশ নিজাধিকারে রাখিতে সক্ষম হইয়াছিল। সুতরাং সম্রাটের মারাঠাদমন কেবল মােগল দমনে পরিণত হইয়াছিল। কখনও কখনও মােগল- গণ পূৰ্ব্ব হইতে সংবাদ পাইয়া মারাঠাধিকৃত পৰ্ব্বতপ্ৰদেশ আক্রমণ করিত, তখন মারাঠাগণ যদি দেখি যে, আক্রমণকারী সৈন্যাপেক্ষা তাহাদের সৈন্যসংখ্যা বেশী, তখনই কেবল মারাঠাগণ শত্রুকে বেষ্টন করিয়া তিন দিক হইতে আক্রমণ করিত, এবং পর্বতের দিক হইতে শত্রুর উপর ক্রমাগত প্রস্তর ও বর্শা নিক্ষেপ করিয়া শত্রুকে ব্যস্ত রাখিয়া অলক্ষিতে পার্শ্বদেশ দিয়া বেষ্টন দ্বারা সমূলে নির্মুল করিত। কখনও বা প্রবল মােগল অশ্বারােহী সৈন্যের সম্মুখে মারাঠ অখাবােহিদল ৭২ ঔরঙ্গজেব। পলানের ভাণ করিয়া তাহাদিগকে ছত্রভঙ্গ করিয়া, লুকায়িত মারাঠা বন্দুকধারী সৈন্যকর্তৃক দলেদলে বিনাশ করিতেন। এইরূপ প্রায় অদৃশ্য শত্রুর বিপক্ষে যুদ্ধ করা আর বায়ু বা জলের উপর অস্ত্রাঘাত একই কথা; ঔরঙ্গজেব বিলক্ষণ বুঝিয়া, অগত্যা গোলকুণ্ডা ও বিজাপুর আক্রমণেই অগ্রসর হইয়াছিলেন। বিজাপুর ও আহাম্মদনগরে মােগল সৈন্য সমরকেন্দ্র স্থাপন করিলে তথা হইতে বহির্গত হইয়া মহারাষ্ট্র দেশ উৎসশ্ন করা মােগলের পক্ষে সহজ হইবে—সম্রাটু ইহাই বুঝিলেন। আর বুঝিলেন, গােলকুণ্ডা ও বিজাপূর দমনই মহারাষ্ট্র দমনের প্রকৃষ্ট পন্থা।

দ্বাবিংশ লহরী বিজয়পুর-বজয়ে। বিজয়পুররাজ দেখিলেন, ঔরঙ্গজেবের বাহিনীর সহিত বেশীদিন সম্মুথ-সংগ্রাম করিতে পারিবেন না। এইজন্য রাজা দুর্গের বহির্ভাগস্থ প্রজাবৃন্দকে শস্যাদি- সহ বিজয়পুর দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করিতে আদেশ করিয়া বিজয়পুরের চারিদিকে বহু- দূর পর্যন্ত গ্রামসকল ধ্বংস করিয়াছিলেন। যখন মােগলেরা আসিয়া বিজয়পুর অবােধ করিল, তখন তাহারা রসদাভাবে মরিতে লাগিল। দুর্গের উচচ প্রাচীর হইতে বিজয়পুরের সৈন্যবৃন্দ মােলবাহিনীর উপর অবিরাম কামান দাগিয়া, এবং গুপ্তপথ নিশষােগে বাহির হইয়া মােগলদিগকে হঠাৎ আক্রমণ করিয়া বড়ই বিপন্ন ও ছত্রভঙ্গ করিতে লাগিল। এইরূপ দুই বৎসর পড়িয়া আজাম ও মােয়াজ্জাম বিজয়পুরের কোনই ক্ষতি করিতে পারিনে না। মােয়াজ্জাম ঔরঙ্গ- জেবকে এই সংবাদ প্রদান করায়,ঔরঙ্গজেব সেনাপতি ফিরােজজঙ্গকে লিখিলেন- “আমি দেখিতেছি যুবরাজ মােয়াজ্জাম রাজপুতগণের উপর জয়লাভ করিতে পারেন নাই । মােয়াজ্জামকে কঙ্কন প্রদেশে প্রেরণ করিয়াছিলাম ; সেইখানে মােয়াজ্জাম কেবল সৈন্য নষ্ট করিয়া বিফল মনােরথ হইয়াছেন। আবার আকবরের বিপক্ষেও সেইরূপ নিলতা দেখাইয়াছেন। এখন বিজয়পুরের সমরেও মােয়াজাম কেবল লােকক্ষয় করিতেছেন; এরূপস্থলে মােয়াজ্জমকর্তৃক হিন্দুর কোনও ক্ষতি হইবে না; হিন্দুর সহিত মােয়াজ্জামের যেন নিকট সম্বন্ধ এই ভাবই দেখা যাইতেছে। মােয়া- জ্জমের জননী ও পত্নী ক্ষত্রিয়া। মানব মাতুবংশেরই অনুসরণ করিয়া থাকে শুনা যায় । সুতরাং মােয়াজ্জাম থাকিতে একা আজাম যে কিছু করিয়া উঠিতে পারিবেন বোধ হয় না। এজন্য তােমার উপর গােলকুণ্ডা বিজয়ের ভার দিয়া আমি বিজয়- পুর বিজয়ে নিযুক্ত হইলাম। আমি বিজয়পুর ধ্বংস করিয়া যতদিন না ফিরি, তুমি অতি সাবধানে গোলকুণ্ডা অবরােধ করিবে। ছলে, বলে, কৌশলে শত্রুর মধ্যে গৃহবিচ্ছেদ বাধাইয়া, একপক্ষকে হস্তগত করিয়া অন্য পক্ষকে শাসন করিতে প্রাণপণ করিবে। গােলকুণ্ডা নগরের দুর্গ প্রবেশের কোনও গুপ্তপথ আছে আমি শুনিয়াছি; ইতিমধ্যে কৌশলে ও অর্থব্যয়ে সেই পথের সন্ধান করিয়া ।

৪৪ ঔরঙ্গজেব। রাখিবে। যেন কৰ্তব্যসাধনে কিছুমাত্র অবহেলা বা সতর্কতার অভাব না হয়। আমি সত্বরেই ফিরি, সাবধান, সাবধান! তৎপরে পাছে আবার ফিরােজ শত্রুর সহিত মিলিয়া যান, এই আশঙ্কায় বীরবর তহব খাকে বলিয়া গেলেন, ফিরােজজঙ্গের সহিত মিলিয়া মিশিয়া ছলে বলে কৌশলে যেমন করিয়া পার গােলকুণ্ডা দখল করা চাই। খুব হসিয়ার। আর তােমার উপর। তবে তুমি যে কর্তারূপ রহিলে কোনও প্রকারে ফিরােজকে ঘুণাক্ষরেও বুঝিতে দিও না। প্রাণপণ কর্তব্য পালন করিও, তবে ফিরােজের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখিও, যেন তােমাকে ঠকাইয়া শত্রুপক্ষকে সাহায্য করিয়া তােমার কর্তৃত্বের প্রতিহিংসা সাধন না করে। এইরূপে উভয়কে উভয়ের বিপক্ষে নিয়ােগ করিয়া ঔরঙ্গজেব বিজয়পুরে আসিলেন। তিনি আসিয়াই বিজয়পুরের চারিদিকে পরিখা খনন করিয়া পরিখ মধ্যে মােগল সৈন্য গােপনে রাখিলেন এবং নিকটবর্তী চারিদিকের গ্রামগুলি লুণ্ঠন করিয়া ধ্বংস করিলেন;-যাহাতে বিজয়পুরবাসী কোনও গুপ্ত দ্বার দিয়া গিয়া গুপ্তপথে শস্যসংগ্রহ করিতে না পারে। চারিদিকে সুড়ঙ্গ কাটিয়া তন্মধ্যে বাদ পূরিয়া দুর্গের প্রাচীর নষ্ট করিতে লাগিলেন। কিন্তু বিজয়পুর পতি প্রাচীরের ভিতর তিন সারি প্রাচীর গঠন করায় এবং প্রথম প্রাচীর বন মৃত্তিকা দ্বারা নির্মিত করায়, মেরামত অতিশয় শী হইতে লাগিল এবং দুর্গের কোনও ক্ষতি হইল না। ঔরঙ্গজেব তখন অন্য কৌশল করিলেন। পরিখার সম্মুখে অতি উচ্চ করিয়া মৃন্ময় প্রাচীর উত্তোলন করিলেন। প্রাচীরের পশ্চাতে সামান্ত মাত্র সৈন্ত পরিখা মধ্যে রাখিয়া চারিদিকের গ্রাম এমন ভাবে লুঠ করিতে লাগিলেন যে,তত্ৰত্য প্রজাগণ ধনপ্রাণ লইয়া পলায়ন করিল। ইহার ফলে দুবাসিগণ আর গুপ্ত পথেও শস্য সংগ্রহ করিতে সক্ষম হইলেন না'। এইরূপে এক বৎসর কাললতাপাতা, জীবজন্তু, এমন কি বৃদ্ধ ও শিশু পৰ্যন্ত উদরসাৎ করিয়া, দুর্ভিক্ষপীড়িত নর-নারী ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে পরাজয় স্বীকার করিল। তখন দুর্গদখল করিয়া ঔরঙ্গজেব বিজয় পুর নগর ধূলিসাৎ করিলেন। অপূর্ব সৌন্দৰ্য্যময় বিজয়পুর নগরী পেচক ও জম্বকের নগরী হইল। বিজয়পুর রাজকে কারাবাস দিয়া, নরনারীকে ক্রীতদাস করিয়া, বিজয়পুরের ধনরত্নাদি লুণ্ঠন করি, সম্রাট ঔরজেব আবার গােলখার দিকে ফিরিলেন। ৫ এয়ােবিংশ লহরী গােলকুণ্ডা অবরােধ। বিজয়পুর পতনের পর সম্রাট সত্বরেই গােলকুপ্তার দিকে অগ্রসর হইলেন। আসিবার পূর্বেই শুনিলেন, সম্রাটের অনুপস্থিতিতে ১৬৮৫ খৃষ্টাব্দে যুবরাজ মােয়াজ্জাম গােলকুণ্ডার অবরােধে যােগদান করিয়া গােলকুণ্ডাপতি আবুলহােসে- নের সহিত সন্ধিস্থাপন করিয়াছেন শুনিয়া সম্রাট অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া-মােয়াজ্জাম দাক্ষিণাত্যের মুসলমানগণের সহিত মিলিত হইয়া সম্রাটের বিপক্ষতাচরণ করিতে- ছেন, এই ধারণায় সঁহাকে কারারুদ্ধ করিলেন। মােয়াজ্জামের কারাদণ্ড দিয়া সম্রাট যােধপুরী বেগমের নিকট হাত মােচড়াইতে যােচড়াইতে বলিলেন, “গত চল্লিশ বৎসরের পরিশ্রম সব মাটী হইল। আর পারি না। ১৬৫৬ খৃষ্টাফে শাহজাহার অধীনে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়া ঔরঙ্গজেব এই গােল- কুতার দুর্গ জয় করিয়াছিলেন। তৎকালে আহম্মদনগর, বিজয়পুর ও গােলকুণ্ডা এই তিনটি রাজ্য ঔরঙ্গজেব বশীভূত করিয়াছিলেন। যাহা হউক এক্ষণে গােলকুণ্ডা ধ্বংসে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া সম্রাট কুলবার্গার দিকে তীর্থ যার ভাণ করিয়া অগ্রসর হইলেন; কিন্তু গােলকুণ্ডাপতি আবুলহােসেন স্পষ্টই বুঝিয়া- ছিলেন যে, গােলকুণ্ডার পতনই সম্রাটের অভিপ্রেত। আবুলহােসেন তখন সন্ধির কথা উল্লেখ করিয়া অতি কাতর ভাবে সম্রাটের বশ্যতাসূচক পত্র লিখিয়া পাঠাই- লেন; কিন্তু সম্রাট ছাড়িবার পাত্র নহেন, কথায় না ভুলিয়া তিনি ক্ৰমে গােল- কুণ্ডার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। আবুলহােসেনের চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার অশ্ব- রােহী সৈন্য দুর্গ প্রাচীরের বাহিরে আসিয়া মােগল ইঞ্জিনিয়ারগণের কাৰ্য্যে বাধা দিতে লাগিল। দুর্গমধ্যস্থ সৈন্যও ক্রমাগত পরিখা মধ্যস্থ মােগল সৈন্যের উপর অবিরত গােলা ও বােম বৃষ্টি করিতে লাগিল। মধ্যে মধ্যে দুর্গ সৈন্যগণ দুর্গ হইতে বহির্গত হইয়া মােগল সৈন্যকে আক্রমণ করিতে লাগিল। দুর্গে খাদ্য ও গােলা বারুদের অভাব ছিল না। ঔরঙ্গজেব শক্রর এই প্রবল আক্রমণ সহ করিয়াও ধীরে ধীরে সসৈন্তে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। দুর্গপরিখা বুজাইয়া ফেলিবার জন্য মৃত্তিকাপুর্ণ থলিয়ার প্রর্থম থলিয়াট সম্রাট স্বহস্তে শেলাই করিয়া দিলেন। মৃত্তিকা স্কৃপের উপর প্রাচীর-ভঙ্গকারী বৃহৎ বৃহৎ কামান হইতে মােগলেরা নিস্কর গােল- .

ঔরঙ্গজেব। বর্ষণ করিয়া আক্রমণ কারী দুর্গ-সৈন্যকে হটাইয়া দিতে লাগিল। গভীর রাত্রে সম্রাট স্বয়ং একদল বাছাই সৈন্য লইয়া দুর্গ-প্রাচীরে মই লাগাইলেন অবৱেধকারী সৈন্যের কত কাংশ দুর্গ প্রাচীরের উপর আরােহণ করিবামাত্র, প্রহরী কুকুৰসকল চীৎকার করিয়া উঠিল তখন দুর্গরক্ষিবৃন্দ আক্রমণকারিগণকে ভীষণ বেগে আক্ৰমণ করিয়া প্রাচীর হইতে নিম্নে ফেলিয়া দিল এবং মই সকল নষ্ট করিয়া দিল। এদিকে আক্রমণকারী সৈন্য রসদাভাবে কষ্ট পাইতে লাগিল। কারণ মােগল শত্রু শম্ভোগী আসিয়া গােলকুণ্ডার সাহায্য জন্য নিকটবর্তী গ্রাম সকলের শস্য লুণ্ঠন করিয়া লইলেন। মােগল সৈন্যের মধ্যে তখন মহামারী দেখা দিল। অন্নাভাবে ও পীড়ায় কাতর হইয়া বহু মােগলসৈন্য গােলকুণ্ডার সৈন্যদলে যােগ দান করিল। এই সময় বর্ষা উপস্থিত হওয়ায় মােগলদের কষ্টের পরিসীমা থাকিল না। তাহাদের পরিখা-সকল জলপূর্ণ হইল ; মৃত্তিকাপ সকল মূষলধারে বর্ষণবশতঃ ধুইয়া গেল। অবসর বুঝিয়া দুর্গস্থ সৈন্য আবার মােগল সৈন্যকে প্রবল বেগে আক্ৰমণ করিয়া বহু সৈন্য ক্ষয় করিল এবং অনেককে বন্দী করিল। এই সময় সন্ধির আশায় আবুলহােসেন বন্দিগণকে নিজ শস্যাগার ও রত্নাগার দেখাইয়া বলিলেন, “তােমা- দিগকে আমি দূতরূপে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করিতেছি ; এই সমুদায় শসা ও রত্ন সম্রাটকে আমি প্রদান করিতে প্রস্তুত। তিনি অবরােধ ত্যাগ করুন। বৃথা লােক- ক্ষর কি প্রয়ােজন? মােগলসৈন্য এই অজেয় দুর্গ দখল করিতে পারিবে না।” দূতগণ সম্রাট সমীপে আবুলহােসেনের প্রস্তাব নিবেদন করিলে, সম্রাট বলিলেন,- আবুল হােসেন যদি জোড়হস্তে আমার নিকট প্রাণভিক্ষা করে অথবা বন্দীদশায় আমার নিকট আনীত হয়, তখন আমি তাহাকে কিরূপ দয়া করিব, বুঝিয়া বলিব।” তৎক্ষণাৎ সম্রাট গােলকুণ্ডার পরিখা বুজাইবার জন্য পঞ্চাশ হাজার মৃত্তিকা পূর্ণ থলিয়া নিক্ষেপ করিলেন । কামান, বারুদ ও গােলায় যাহা হয় নাই, উৎকোচে তাহা সিদ্ধ হইল। ঔরঙ্গজেবের অর্থলােভে বশীভূত হইয়া বন্দী মােগলদের কেহ কেহ সম্রাটের রূপে দুর্গে প্রত্যাবর্তন করিয়া আবুলহোসেনের বিশ্বাসভাজন হইয়া দুর্গদ্বারের রক্ষিরূপে নিযুক্ত হইল। তাহারা এক গভীর রজনীতে নিঃশব্দে দুর্গার খুলিয়া রাখিল। তখন মোগলসৈন্য মুক্ত পার দিয়া নিঃশব্দে দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিয়া হঠাৎ দুর্গস্থ সৈন্যকে আক্রমণ করিল। হঠাৎ আক্রান্ত হওয়ায় দুর্গবাসিগণ শ্রেণীবদ্ধ হইয়া যুদ্ধ করিবার অবসর পাইল না ; যে যেখানে ছিল, সে সেই খানেই বীরের ন্যায় সম্মুখ সমরে দেহ ত্যাগ করিতে লাগিল। আবুল হােসেনের বিশ্বস্ত ঔরঙ্গজেব। ৭৭ অনুচর আরজক তখন একটি অশ্বের খালি পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া বারজন মাত্র অশ্বারােহী সঙ্গে লইয়া মােগলদৈন্য ভেদ করিয়া দুর্গের বাহিরে চলিয়া গেলেন। পরদিন তাহাকে অজ্ঞান অবস্থায় একটি নারিকেল বৃক্ষের তলদেশে মােগলের পাইল। তঁাহার দেহে সত্তরটি অস্ত্রাঘাত চিহ্ন ছিল। সম্রাট ঔরঙ্গজেব এই বীর বরকে চিকিৎসার দ্বারা আরােগ্য দান করিয়া নিজ সৈন্যের সেনাপতিত্বে বরণ করিতে চাহিলেন; কিন্তু আরজক বলিলেন “আবুল হােসেনের যে ব্যক্তি লবণ খাইয়াছে, সে আর অন্যের চাকরী গ্রহণ করিতে পারে না। তবে সম্রাট বুজকের পুত্রদ্বয়কে উচ্চপদ প্রদান করিলেন। এদিকে গােলকুণ্ডাপতি আক্রমণের ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া বেগমগণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বিদায় লইলেন। পরে দরবার গৃহে অবিচলিত চিত্তে উপবেশন করিয়া প্রতিপক্ষের প্রবেশাপেক্ষা করিতে লাগি- দেন। তখন রাত্রি প্রভাত হইয়া বেলা হইয়াছে। আবুল হােসেন ধীর ভাবে বাবুর্চিকে নিজ প্রাতরাশ আনয়ন করিতে হুকুম দিলেন। অবিচলিত ভাবে আহার সমাপন করিয়া মােগল সেনাপতিকে দরবার গৃহে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। সেনাপতি আসিলে বিশুদ্ধ পারস্য ভাষায় সেনাপতির সহিত সদালাপ করিয়া নিজ অশ্ব আনিবার হুকুম দিয়া, সেনাপতির সহিত গল্প করিতে করিতে শাহজাদা আজামের নিকট অশ্বারােহণে গমন করিলেন। অজাম সসম্মানে তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া সম্রাটের সহিত তাহার পরিচয় করিয়া দিলেন। সম্রাট তঁাহার সহিত রাজোচিত সম্মানের ব্যবহার করিয়া দুই চারি দিন পরে মহাসমারােহে দৌলতাবাদে প্রেরণ করিলেন। তথায় বিজয়পুরপতির সহিত আবুলহােসেন একত্রে বন্দীরূপে বাস করিতে লাগিলেন। গােলকুণ্ডার ধনাগার লুণ্ঠন করিয়া সম্রাট সত্তর লক্ষ মুদ্রা প্রাপ্ত হইলেন। এইরূপে গােলকুণ্ডার ধ্বংস হইল। বিজয়পুর ও গােলকুণ্ডার ধংসে উভয়রাজ্যের সৈন্যবৃন্দ মারাঠা দলে প্রবেশ করিয়া চারিদিকে সুঠপাঠ করিতে লাগিল। ইহাতে শভোজীর ক্ষতি না হইয়া বরং দুই রাজ্য অন্তর্হিত হওয়ায় তাহার অবাধ লুণ্ঠনের আরও সুবিধা হইল। এই উভয় রাজ্যের রাজন্যবর্গ অনেকটা স্বাধীন হইয়া মারাঠাদের সাহায্য করিতে লাগিল।

চতুর্বিংশ লহরী শভোজী-প্রয়াণে। বিজয়পুর ও গোলকুণ্ডা ধ্বংস করিলে শভোজীর শাসন অনায়াসেই ঘটিবে, সম্রাটের এই আশা বৃথা হইল দেখিয়া তিনি প্রবল বেগে পুনরায় মারাঠা দমনে নিযুক্ত হইলেন। সম্রাট মহীশূরের সীমানা পর্যন্ত সমগ্ৰদেশ অধিকৃত করিয়া শিবা- জীর শ্রাতাকে তাঞ্জোরে অবরােধ করিলেন। মারাঠাগণকে সমতল ক্ষেত্র হইতে বিতাড়িত করিয়া সম্রাট তাহাদিগকে পার্বত্য প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য করিলেন। এদিকে শন্তোজী একদিন একদল মােগল সৈন্যের উপর বিজয়লাভ করিয়া এক নিভৃত পৰ্বত গুহার সম্মুখস্থ লতামণ্ডপে একজন মাত্র বয়স্কের সহিত বিজয়ােৎসবের পানাধিক্যের অসতর্ক অবস্থায় অন্য একজন মােগল সৈনিকের দ্বারা ধত হইয়া, সম্রাট সমীপে নীত হয়েন। সম্রাট শন্তোজীর পিতৃ উচ্চা- রণ করায় এবং মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করিয়া তাহার দাসত্ব করিবার অনুমতি প্রদান করা, নির্ভীক শভোজী ঔরঙ্গজেবকে অপমানসূচক পরুষ বাক্যে উত্তর দান করেন, তাহার অঙ্গে নিষ্ঠিবন ত্যাগ করেন, ও পদাঘাত করিতে উদ্যত হয়েন। ইহাতে সম্রাটের আদেশে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থাতেই শভোজীর জিহ্বা ও হস্তপদাদি একে একে কর্তন করা হয়, তঁাহার চক্ষু উৎপাটন করা হয়, এবং টুকরা টুকরা করিয়া তাহার মাংস কৰ্ত্তন করিয়া তাহার শিরচ্ছেদ করিয়া তাহার প্রাণদণ্ড করা হয়, পরে তাহার অনুচরেরও সেই শাস্তি বিধান করা হয়। এই লােমহর্ষণ নৃশংস ব্যবহারের কথা শুনিয়া সমুদায় মারাঠা জাতি ভয়ানক উত্তেজিত হইয়া সম্রাটের মৃত্যুকাল পর্যন্ত এক মিনিটের জন্য সম্রাটকে বিশ্রাম লাভ করিতে দেয় নাই; বরং নিরন্তর বৈনিৰ্যাতন দ্বারা তাহাকে নিতান্ত বিপন্ন করিয়াছিল। অপর দিকে জাঠ জাতি আগরার চারিদিকে লুণ্ঠন করিতে লাগিল, এবং কাবুল হইতে প্রেরিত খাজনা লুঠ করিল। ইহাতে সম্রাট ক্রুদ্ধ হইয়া হুকুম দিলেন, কোনও হিন্দু পাকী চড়িতে পাইবে না, অথবা আরবদেশয় ঘােটকে আরাে হণ করিবে না। মারাঠাগণ তথন মােগল রাজ্যে এত লুঠপাঠ আরম্ভ করিয়াছিল বে, সম্রাট আলামকে একদিকে, ও অন্যদিকে ফিনােজজকে নারাঠা নমনে প্রেরণ করিলেন। অগত্যা কাঠ-শাসন জন্য সম্রাট মােয়াজ্জামকে কারামুক্ত করিয়া ঔরঙ্গজেব। ৭৯ সেইকার্যে নিযুক্ত করিলেন। যােধপুরী বেগমের মৃত্যু ঘটায় সম্রাট মাতৃহীন মােয়াজ্জামের প্রতি সদয় হয়েন এবং সেনাপতির অভাবে তাহাকেই জাঠ দমনে প্রেরণ করেন। এদিকে আজাম মারাঠা শাসনে সফল না হওয়ায় তিনি সম্রাটের সন্দেহভাজন হইলেন। পিতার পত্র পাইলেই আজামের মূখ বিবর্ণ হইয়া যাইত ; ভয় হইত আবার কি বিপদে পড়িতে হইবে। অবশেষে উদীপুরী বেগমের পুত্র কামবকসই সম্রাটের প্রিয়পাত্র হইলেন। কিছুদিন পরে মারাঠার পক্ষপাতী বলিয়া সন্দেহ হওয়ায়, হাকেও সম্রাট কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে তাঁহার প্রিয় বেগম উদিপুরীর অনুরােধে সত্বরেই কারামুক্ত করেন। এই সময়ে বিন্ধ্যাচলের উত্তরে জাঠগণ বিদ্রোহী হইয়াছিল ; রাজপুতগণ পুনরায় বিরােধী হইল; শিখগণ মুলতানে বিদ্রোহ পতাকা উড্ডীন করিল; বঙ্গদেশেও অশান্তি দেখা দিল। বিন্ধ্যা- চলের দক্ষিণে মারাঠাগণ সর্বত্রই গ্ৰামাদি লুণ্ঠন ও দগ্ধ করিয়া সমুদয় দাক্ষিণাত্য মরুভূমিতে পরিণত করিয়াছিল। তাহারা প্রকাশ্যভাবে সম্রাটের সৈন্যবৃন্দকে আক্রমণ করিয়া তাহাদের যথাসর্বস্ব কাড়িয়া লইতে লাগিল ; এমন কি সম্রাটকে পৰ্যন্ত বিদ্রুপ করিতে লাগিল। সম্রাটের ভাণ্ডার শূন্য হইল ; সৈন্যদের বেতন বাকী পড়িতে লাগিল; মােগল সৈন্য অর্থাভাবে ও খাদ্যভাবে দুর্বল ও সাহসহীন হইল। সম্রাটও অতিবৃদ্ধ ও দুর্বল হইয়া আহম্মদনগরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। তিনি স্বীয় পুত্রগণকে একে একে দূরে প্রেরণ করিলেন, পাছে তাহারাও তাঁহাকে শাহজাহার দশায় ফেলে। পুত্রগণ নিকটে আসিতে চাহিলেও তিনি আসিতে দিলেন না। ;

পঞ্চবিংশ লহরী। বিপদে অন্তিমে। লইলেন। এই সময়ে মারাঠাগণ ভীমানদীর উপত্যকায় সবিশেষ সফলতা লাভ করিল। মােগল সেনাপতি তহবর খ যুদ্ধে আহত ও পরাজিত হইলেন। সম্রাট স্বয়ং প্রবল মারাঠাবাহিনী কর্তৃক পরিবেষ্টিত হইলেন। তিনি বলিলেন, “আল্লার হস্তেই সমুদায় শক্তি ; মানবের হস্তে কিছুই নাই।” শাহজাদা কামবক্স কর্ণাটের যুদ্ধে কিছুই করিতে পারিলেন না। তিনি সেনাপতি জুলফিকার ধার সহিত কলহ করিলেন। এমন সময় মারাঠাগণ কামবক্সকে অবরােধ করিল। বহু কষ্টে জুলফিকার তাহার উদ্ধারসাধন করিয়া তাহাকে বইরামপুরীতে সম্রাটের নিকট দিয়া আসিলেন। সম্রাট শুনিলেন, গােয়াতে পর্তগীজগণ ও বােম্বাইয়ে ইংরাগণ নিজ নিজ রাজার নামে মুদ্রা বাহির করিয়াছে ; ইহাতে সম্রাট তাহাদের শাসন করিলেন। এ দিকে মারাঠা সেনাপতি শান্তাজী সম্রাটের একটি সৈন্যকে পরাভূত ও অন্য একটি সৈনকে প্রায় নির্মল করিলেন। হস্তী ও মালপত্র দখল করিয়া এ দিকে মােয়াজ্জামকে মুক্তিদান করায় আজাম মহা ক্রুদ্ধ হইলেন। এজন্য সম্রাট তাহাকে কাবুলের শাসনকর্তা করিয়া তথায় প্রেরণ করিলেন। ১৬৯৫ খৃষ্টাব্দে ভীমার বন্যায় সম্রাটের শিবির, আসবাব, অশ্ব, গবাদি, ও প্রায় দ্বাদশসহস্র সৈন্য ভাসিয়া গেল। এই সময়ে একজন মােগল সেনাপতি মারাঠা হন্তে বনী-ইলেন। ৩)। এই সকল বিপদে পড়িয়া সম্রাট মারাঠাগণের বিপক্ষে জেহাদ বা ধর্ম- যুদ্ধের ঘােষণা করিলেন; এবং প্রত্যেক মুসলমানকে হিন্দুর বিপক্ষে যুদ্ধ করিবার অন্য আদেশ করিলেন। তখন এক বিপুল মুসলমান বাহিনী সাতার অবরােধ করিল। শান্তা তখন স্বর্গারােহণ করিয়াছেন। আজামকে কাবুল হইতে আনিয়া সম্রাট এই অবরােধের ভার তাহার উপর অর্পণ করিলেন। শভোজীর ভ্রাতা মারাঠা রাজধানী সাতারা ত্যাগ করিয়া পার্বত্যপ্রদেশে আশ্রয় লইন। অবরােধ শেষ না হইতেই তিনি কালকবলে পতিত হইলেন। সাতারার দুর্গ প্রাচীর বারুদ বরা উড়াইয়া দিয়া মােগল সম্রাট স্বয়ং সাতারা দখল করলেন। সাতারার শাসনকর্তার বীরত্বে মুগ্ধ হইয়া সম্রাট তঁাহাকে একজন সেনাপতি করিলেন।

ঔরঙ্গজেব। ৮১ তৎপরেই আজাম পাণীয় দুর্গ অধিকার করিলেন। এই সকল বিজয়দর্শন করিয়া আজামের উপর সন্ত্রাটের আবার সন্দেহ হইল। তাহাকে তিনি উজ্জয়িনীয় বিজয়ে প্রেরণ করিলেন। তখন উজ্জয়িনীর বিধবা রাজমহিষী তারাবাই মারাঠার নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া আজামের সহিত তুমুল সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। আমি দুৰ্গসকল দখল করিলেই তারাবাই অমনি প্রচণ্ড বিক্রমে সেই সকল দুর্গ পুনরধিকার করিয়া সইতে লাগিলেন। একদল মারাঠা সৈন্যকে আজাম যেমন ছত্রভঙ্গ করিলেন, তারাবাই অমনি সেই সৈন্যদলকে পুনর্গঠন করিয়া লইলেন। এইরূপে তারাবাই সমুদায় দাক্ষিণাত্য বারম্বার লুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। এইরূপে ক্রমা- গত মারাঠাগণের সহিত নিষ্ফল সমর করিয়া ক্লান্ত দেহে সম্রাট আহম্মদনগরে ফিছিলেন। তথায় তাহার বারম্বার মূচ্ছা হইতে লাগিল। এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া আজাম পিতাকে বারম্বার পত্র লিখিয়া তাহার চরণদর্শনের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। অবশেষে অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া আজাম সিংহাসন অধিকারের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। এই সময়ে সম্রাট কামবক্সকে লিখিলেন “জীবনের জীবন, বৎস, শুন, এই সংসারে ক্ষণস্থায়ী আধিপত্য লাভ করিয়া মানব কেবল দুঃখই অর্জন করে। আমি আমার সাম্রাজ্যের প্রকৃত রক্ষক হইতে পারি নাই। আমার বহু মূল্য সময় বৃথা ব্যয়িত হইয়াছে। আমি একাকী আসিয়াছিলাম এবং একাকীই নিজ পাপের বােঝা সইয়া চলিলাম। যে দিকে নিরীক্ষণ করি- তেছি, সেই দিকে সেই সৰ্বশক্তিমানকেই দর্শন করিতেছি। আমি বহু পাপ করিয়াছি। জানি না তজ্জন্য আমাকে কি ভয়ানক যাতমা পাইতে হইবে। আমার সাম্রাজ্যের রক্ষকতা পরমেশ্বর আমার পুত্রগণের ওপ, অর্পণ করিয়াছেন।” পরে তিনি আজামকে লিখিলেন “আমার ভাগ্যে যাহাই ঘটুক না কেন, আমার জীবনতরী অাত অর্ণব জলে ভাসাইয়াছি। এখন বিদায় বিয়-বিদায়। এই সময় আকবর বিদেশে বর্গারােহণ করিলেন। মােয়াজ্জাম তখন কাবুলে। কামৰকে সম্রাট গতিক বুঝিয়া বিজয়পুরে পাঠাইয়া দিলেন। আজামকে দূরে রাখিবার জন্য ঔরক্তের তাহাকে মালব দেশে পাঠাইলেন। অবশেষে ১৭০৭ খৃষ্টাব্দের ৭ইলষ্ট তারিখে পঞ্চাশৎ বৎসর রাজত্বাবসানে বিশ্ববিজয়ী আলমগীর বাদশ পূতঃকালীন নমাজ যথাবিধি সমাপন করিয়া প্রশান্তভাবে মালা ধরিয়া আল্লাস’জপ করিতে করিতে দেহত্যাগ করিলেন। তখন তাহার বয়ঃক্রম ৯, 7 4 ৮২ ঔরঙ্গজেব। চান্দ্র বৎসর সতের দিন হইয়াছিল। তাহার পূর্বাদেশ মত তাহাকে দৌলতাবাদে মুসলমান পীরগণের পাশ্বেই বিনা আড়ম্বরে সমাহিত করা হইল। “আমার যে কোনও পুত্র সৌভাগ্যক্রমে আমার তক্ত তাউস পাইবে। সেই উত্তরাধিকারী রূপে আমার সাম্রাজ্যের রক্ষক হইবে। ইহাই তাহার উইলে লেখা ছিল। ইহার অবশ্য- ভাবী ফল --ভ্রাতৃবিবােধ। তাহা মােগল সিংহাসন আরােহণের মামুলি ব্যবস্থা। এবারও তাই ঘটিল। P मयांशु

No text on this page.

No text on this page.

Samrat Aurangajeb Ed.1

Author
Ray,panchkori
Title
Jibani
File name
Samrat Aurangajeb Ed.1
Text
OCR done
Citation
1918
Published
2009/09/11
Publisher
Purnachandra Mukhopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
89
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Bidrohe Murad
DLI number
513211
Barcode
4990010020210.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
aHtLhn3xCzo
Download PDF

Samrat Aurangajeb Ed.1