Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Putul Niye Khela Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
২৩
GAR BH WASIFU?
O, CHITRASENPUR, HOWRAH
**?
পুতুল নিয়ে খেলা
. }
।
18 AZY
শ্ৰীঅন্নদাশঙ্কর রায়
ভি. এম. লাইব্রেরী
কলিকাতা
একক
এগােপালদাস মজুমদার
ডি এম লাইব্রেরী
২ কর্ণওয়ালিস ইট
কলিকাতা
দ্বিতীয় সংস্করণ
অগ্রহায়ণ ১৩৫১
দাম আড়াই টাকা
এখভতচন্দ্র রায়
গৌরাঙ্গ প্রেস
৫ মিণি দাস লেন, কলিকাতা
GAR BH'WAJA
দ্বিতীয় সংস্করণের ভুমিকা
“পুতুল নিয়ে খেলার এই সংস্করণে বহু অংশ বাদ দেওয়া
হয়েছে বইটিকে আরাে হালকা করতে। ভুলে গেলে চলবে না
যে এর নাম খেলা।
নভে ১৯০৪
অন্নদাশঙ্কর রায়
Tiislili,
{| ৭ |
LIBRARY
০
CHITRASENPUR
HOWERAM
No text on this page.
মনােহরন রায় সােদর প্রতিমেষু
No text on this page.
GAR BHAWANIPUN
O. CHITRASENPUR, HOWRAH
পুতুল
নিয়ে খেলা
৫), ৫
(! "।
1 IBRARY
-9
No text on this page.
Gay
Unrnrf
| S}}},
Q
IBRARY
CHITRASENPUR.
-~9
পূর্ণিয়া প্যাক্ট
HOWRAH
১
‘আগুন নিয়ে খেলা’র নটোরিয়া সােম ব্যালার্ড পিয়ারে জাহাজ
ভিড়লে তল্লাস করে দেখল তার নামে এসেছে একখানা তার ও তিনখানা
চিঠি।
তার করেছে কুণাল-ললিত-কল্যাণ। “Welcome to India
and us ” বিলেত যাবার আগে সােম কুণাল-ললিতার বিয়ে দিয়ে
গেছল। ইতিমধ্যে তাদের একটি ছেলে হয়েছে আর তারা সেই ছেলের
নাম রেখেছে বন্ধুর নামানুসারে ‘কল্যাণ'। বন্ধুপ্রীতির এহেন নিন
দুভ বলে সােমের চোখ সিক্ত কল সুখে।
একখানা চিঠি কোন এক লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী, লােম
ওবানা কোপদৃষ্টিতে ভস্ম করল। অন্য একখানা চিঠি তার তৃতীয়
প্রিয়ার, সেই যিনি যতেন মনের মিলনই হচ্ছে স্থায়ী মিলন, দেহের
মিলনে কেবল গনি ও অবসাদ। তাঁর স্বভাৰ বায়ুনি, অভিজ্ঞতাও
বাড়েনি। মলাৰ বৰ মায়াপুরী থেকে চুরি করা ভাব ও চোরাই
ভাষা নিয়ে তিনি পুৱা পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়ে এই কথাটি বিশদ করেছেন যে
বেলা জানে তার তরুণ তার কাছে একদিন ফিৰে, লালমণি রাজপুত্র
আনবে রাজকন্যা পদ্মাবতীর ৰাতি পদ্ম, রাজকন্যার কানে কানে বলে,
অমি যে পর চেয়েছিৰে, ৰাজকন্যা, সে পদ্ম আমার বুকেই ফুটে আছে,
আমি সন্তু লগ জুরে অৰে তার সন্ধান পেলাম।
# চিঠিগাল পড়ে তার ক্রোধ ও অপমানের পরিসীমা রইল না।
মিৰ ৰি কে তুমি।
৪ পুতুল নিয়ে খেলা “দাদা, সুদীর্ঘ তিন বছর পরে সুদূর বিদেশ থেকে জয়ী হয়ে তুমি ফিরেছ, ভগবান তােমাকে নীরােগ ও নিরাপদ রেখে আমাদের মনস্কামনা পূর্ণ করেছেন। তোমার সঙ্গে কবে দেখা হবে এখন সেটা দিন গুণে বলা যায়। আশা করি পথে কোথাও নামবে না, সােজা এখানে চলে আসবে, সােমবারে পৌছনাে চাই। পৌছে যা দেখবে তার জন্যে তােমাকে তৈরি থাকতে সাহায্য করা আমার উচিত। সেইজন্যে লিখছি যে একখানা বেনামী চিঠি পেয়ে বাবা যারপরনাই লজ্জিত বিমর্ষ ও বিরক্ত হয়ে রয়েছেন। চিঠিখানা আমাকে পড়তে দিলেন না, ছােট মা-কেও না। গভীরভাবে বলেন, খারাপ চিঠি। আমরা তাঁকে কত বুবিয়ে বন্ধুম যে দাদার কোনাে শক্ত তার নামে কঙ্ক আরােপ করেছে, নইলে বেনামী লিখত কেন? বাবা বক্সেন, যে সব খুটিনাটি দিয়েছে সে সব কথনাে বানানাে হতে পারে না, তার এক আনাও যদি সত্য হয় তবে অমন ছেলের মুখদর্শন করলে পাপ হবে। চিঠিখানা তিনি তার দুই একজন উকীল বন্ধুকে দেখিয়ে পরামর্শ চাইবেন। কেমন করে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে তুমি কাকে নিয়ে কোথায় বেড়াতে গেছলে। এতে অন্যায়টা যে কী ঘটল আমি তাে তা ধির কতে পারলুম না। স্বাধীন দেশের স্বাধীন চাল আমাদের কল্পনায় বাইরে, তাই আমরা তার কদৰ্থ করে থাকি। ওরাও তাে আমাদের বৈধব্যকে সন্দেহের দৃষ্টিতে কলুষিত দেখে, আমাদের পক্ষে যা সহজ ওদের চক্ষে তা কুটিল। কার পরামর্শে জানিনে, বাবা তােমার জন্যে অপেক্ষা না করে কাগজে এক বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে বসেছেন। তার কাটিং তােমাকে পাঠালুম। তার উত্তরে বােজ তিনখানা চারখানা করে চিঠি আসছে। গােৰাৰ বলে দিনাজপুরের এক ভদ্রলােক তত সশরীরে ও সবান্ধবে সে শহরে পূর্ণিয়া প্যান্ট কোথায় বাসা নিয়ে দুবেলা এ বাড়ীতে হাজিরা দিচ্ছেন। অধম আমিও দু’চারখানা চিঠি পেয়েছি এই বিজ্ঞাপন সম্পর্কে। আমাদের থার্ড মুন্সেফের স্ত্রী সেদিন ছােট মা’কে ও আমাকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে তােমার একচোট নিন্দা শুনিয়ে দিলেন ও দিব্য সপ্রতিভ ভাবে প্রস্তাব করলেন যে তার মেজ মেয়েটির সঙ্গে তােমার বিয়ে দিলে তােমার চরিত্র শােধরাতে পারে। = বিজ্ঞাপনটি এই WANTED a handsome, educated and accomplished hayastha bride for a graduate educated in London University, aged 25, of excellent health and very fair complexion being the eldest son of a District Judge For details write to J K SHOME, District Judgc, Purnea সােম একবার পড়ল, দুবার পড়ল, তিনবার পড়ল। বাবা কি ভুলে গেছেন যে তার রংটা বেশ একটু কালাে। না ধরে নিয়েছেন যে তন বছর বিলেতবাসের পুণ্যে কালাে রং কটা হয়। স্বাস্থ্য অবশ্য তার গর্ব কর মততা, কিন্তু বরের স্বাস্থ্যের জন্যে কোন্ মেয়ের বাপ মাথা বামান ? আর কী ইংরাজীজ্ঞান। Being কথাট। এখানে বসিয়ে দেবার ফলে মানে দাড়ায় এই যে, ছেলেটির স্বাস্থ্য ভালাে ও রং ধবধবে, যহেতু সে একজন জেলা জজের প্রথম কুমার । সােম চটুবে কি হাসবে ঠিক করতে পারল না। বিয়ে করতে তার মনিচ্ছা নেই, কিন্তু বিয়ের আগে সে তার ভাবী বধূকে তার জীবনের মাদি পর্ব নিরালায় শােনাতে চায়—এই তার ন্যূনতম দাবী। শুনে যদি ময়েটি বলে, অন্যায় কিছুমাত্র হয়নি, অমন অবস্থায় পড়লে আমিও তাই পুতুল নিয়ে খেলা ফতুম, তবে সােম মেয়েটির রূপ, বিদ্যা ও গুণীত্ব নিয়ে চুল চিরবে না, মেয়েটি কায়স্থ না হয়ে কলু কি কামার হলেও সােমের দিক থেকে আপত্তি থাকবে না। মােট কথা, বাবা যদি তার ন্যূনতম দাবী স্বীকার করে তাকে ঐ দাবী পেশ কবার স্বাধীনতা দেন তবে সে রূপ গুণ জাতি ইত্যাদির বিবেচনা করে উপর ছেড়ে দেবে। তিন বছর ইংলণ্ডে কাটিয়ে প্রেম সম্বন্ধে সে এই সিদ্ধান্ত করেছিল যে ওটা অন্য দশটা ধুয়ার মত একটা ধূয়া। Libury, quality, world peace, disarmament, ইত্যাদির মতাে ওটাও একটা তরুণ- তুলানাে বুলি। আগে শাট মণ ঘি পুড়বে, তারপর বাধা নাচবেন। প্রথমত ব্যাঙ্কে যথেষ্ট সঞ্চয়, দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্যকর পল্লীতে বাড়ী না থােক বাসা, তৃতীয়ত মূল্যবান আসবাব ও বাসন—ন পক্ষে এতখানি ঘি পুড়লে বিবাহের যজ্ঞানল জ্বলবে। আর যে প্রেম বিবাহান্ত নয় সে প্রেম হয় একপ্রকার সখ, নয় একটা মনােবিকার। সাবধানী ইংরাজ ও দুটোকে চল্লিশ হাত দূরে রেখে পথ চলে। অলস ধনী ও মাথা পাগলা বােহিমিয়ান এই দুই মণ্ডলীতে ঐ দুই সঙ্গী আবদ্ধ। এ ছাড়া একটা নতুন মণ্ডলীর উদ্ভব হয়েছে, তাতে প্রেম হচ্ছে শনি রবিবারের খেলাধুলায় সামিল, প্রসাধনের অঙ্গ। ওকে প্রেম বন্ধে মানে হয় না, ও পরিমিত দেহচর্চা। মশুলীটা ব্যবসায়ব্যস্ত নাগরিক নাগরিকার। ওদের মন্ত গুণ এই যে ওরা ধুয়া ধরে নিজেদের ভােলায় না, বুলি আওড়ে থকে ভােলায় না। ওরা বােঝে না তত্ত্ব, বােঝে তথ্য। সােম এই গুলীকে আপনার করেছিল। এরা কাজের সময় করে কাজ, উক্ত সময়ে কৰে পরস্পর বিনােদন। অন্তরে এরা কেউ কারুর নয়, অন্যথা হতে এরা নারাজ। এদেরই জন্যে মহাকবি "কপিকা রচনা করেছেন। চি, করে পা ছুয়ে প্রণাম করতেই বা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তাঁর নয়নে আনন্দা। মুখে গভীর হয়।
পূর্ণিয়া প্যাক্ট কত কী জিজ্ঞাসা ঝতে পারতেন, কিন্তু প্রবল আনন্দের বেলায় তুচ্ছ কথাই মুখে আসে।—“পথে কোনাে অসুবিধা হয়নি তাে?” সােম বল, “অসুবিধা যা হবার তার এখনাে বহু বাকী। এত বড় দেশে একটানা রেলপথযাত্রা শেষ হয়েও ভ্রান্তির তৃষ্ণা রেখে যায়। কী গরম।” “ওমা, গরম কাকে বলছ, দাদা, সুমিত্রা প্রস করে বল, এখন তাে শীত পড়তে আরম্ভ করেছে।” “বিলেত ফোদের,* জাহবীবাবু সবজান্তার ভঙ্গীতে বল্লেন, “প্রথম প্রথম তাপবােধটা কিছু প্রখর হয়ে থাকে, মা।” বাবায় অসাক্ষাতে সুমিত্রা বা, “কই আমার জন্যে কী এনেছ, দেখি বাক্সের চাবী।” তেমনি পাগলীই আছে। ওর জন্যে সােযের আয়ে সাবধান অন্তঃস্রোত চক্রাকারে ঘূৰছিল, মােহানা পাচ্ছিল না। ওকে খুশী করে ওর ব্যথা ভােলানাের জন্যে সমম বল্ল, “তাের জন্যে এনেছি একটা নতুন রকমের ফাউন্টেন পেন। তা দিয়ে অন্য কিছু লিখতে নেই, লিখতে হয় শুধু প্রেমপত্র।” “ও," বলে সুমিত্রা নিজেই গেল পালিয়ে। কিন্তু বেক্ষণের জন্যে নয়। এসে সােষের পায়ের কাছে এক তাড়া চিঠি ঝুপ করে ফেলে দিল। তার কাছে লেখা সােমের বিয়ের প্রস্তাব। বঙ্গ, “দাও না, দাদা, চাবীটা। দেখি আমার বিলিতী বৌ-দিদির ফটো।” এই ৰাৰ সােবকে বসূতে হলে, “যা, কিন্তু না ভাই না বােন কেউ ওখান থেকে নড়বার নাম কল না। মাঝখান থেকে হাজির হলেন তাদের বিমাতা—কানাই বলাইয়ের মা। তিনি এতক্ষণ ঠাকুম্বরে ছিলেন, সেখানে যে তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিলেন, তার চিহ্ন ছিল আর ফলােল। কল্যাণ ফিরে এলাে কোন অচিন্তনীয় বিদেশ থেকে, কি ভাৱ কাৰাই আর ফিরবে না, সে গেছে ৰি-গতে।
৮ পুতুল নিয়ে খেলা সােম তাকে প্রণাম করলে তিনি “বাবা কল্যাণ-”বলে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তারপর এলেন সস্ত্রীক ও ত্রিকন্যক গােষ্ঠবাবু। সােম আড়চোখে একবার মেয়ে তিনটিকে দেখে নিল। না রূপসী, না স্বাস্থ্যবতী, না সবা, না সপ্রতিভ। ঐ ভীতসন্ত্রস্ত মূঢ় মেয়ের পালকে সর্বদা তাদের মায়ের মুখপানে নিবন্ধদৃষ্টি দেখে সােমের হাসি পেয়ে গেল। সে হাসি আবাে দুর্দম হলাে মাটির স্বভাবকাপন গােপন করবার আয়াস দেখে। আর গােষ্ঠবাবুর চক্ষুবক। এখন যে মানুষকে দৃষ্টিসুত্রে সুড়সুড়ি দেয় আর কথাগুলি যেন কাতুকুতু। এরা এতদিন জাহ্নবীবাবুকে, তার জীক, তার কন্যাকে তার পুরাতন ভৃত্য নিধিরামকে, তৎপত্নী নারীকে তােষামােদ করে প্রলােভন দেখিয়ে সােমের বৈলাতিক লীলারহস্য উদঘাটন করবেন বলে শাসিয়ে কিছুতেই কাৰ্যোদ্ধার করতে পারেননি, কারণ মেয়েগুলি বিজ্ঞাপন মাফিক ‘landsome, educated and becomplished' নয়, তাদের একমাত্র যোগ্যতা-তারা কাজকন্যা। সােম কোনােমতে হাসি চেপে বহুকষ্টে বলতে পারুল “দেখুন, বিজ্ঞাপন দিয়েছেন বাবা, দেশশুদ্ধ লােক জেনেছে যে তিনিই মালিক, আইনত যদিও আমি সাবালক। আর ওদেশে আমি হয়ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছিলুম, এদেশে আমি পুনষিক। আমার কাছে আবেদন পেশ করে আমাকে লজ্জা দেবেন না।” গোষ্ঠবাবু তখন নাক মুখ ঘুরিয়ে ঢােক গিতে গিতে বল্লেন, “আ- আ-আমি স-স-সব স-অ-ব স-অ-ব জজ-জ-আনি। আ-আ-আ-* গােষ্ঠগৃহিণী স্বামীর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে সগর্বে বজেন, প্রষ্ঠেত আমার ভাই। চমক দমন করে সােম সুধাল, “কোন প্রদ্যোত ? এতে সি?” “সেই।”
পূর্ণি প্যাক্ট সােমের মনে পড়ছিল পেগী ও সে যেদিন ম্যানবিয়ের থেকে লণ্ডন প্রত্যাবর্তন করে সেদিন আয় থেকে প্রদ্যোত সিং ফিরছিল। সেই যে সােমের বাবাকে বেনামী চিঠি লিখেছে ও গােষ্ঠবাবুর গোষ্ঠে গল্প করেছে সোমের এ বিষয়ে সন্দেহ রইল না। কিন্তু দু বছর আগের ঘটনা মাস খানেক আগে জানানোর কী কারা ঘটল? কারণট। সম্ভবত এই যে শিকারকে বন্দুকের গুলীর গতিসীমার মধ্যে আতে হলে চারিদিকে তুমুল সােরগােল করে তাকে খেদিয়ে নিয়ে আতে হয়। সােমের প্রত্যাবর্তন প্রাক্কালে জাহ্নবীবাবুর কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা উপস্থিত হলে সােমের প্রত্যাবর্তনমূহুর্তে সেই অবস্থার সুযােগ নিয়ে গােষ্ঠবাবু হানবেন প্রাজাপত্য বাণ এক এক করে তিন গুলী, তার একটা না একটা লাগবেই। জন্তুর প্রতি কী উদাৰতা। তার যে গুলীটাতে খুসী সেই গুলীটাতে মরবে— তার সামনে wide choice জাহ্নবীবাবু কিন্তু ইতিমধ্যে প্রথম ধাক্কা সামলে উঠেছিলেন। বিজ্ঞাপনের সাড়া পাওয়া গেছল আসমুদ্র থেকে। ভারতবর্ষে যে এমন সব জায়গা আছে আর এ সব জায়গায় যে বাঙালী কায়স্থ আছে পূর্ণিয়ার জেলা জজ অত জানতেন না। কুম্ভোড কলিয়ারি, মঙ্গলদই, রেহাবাড়ী, মৌলবী বাজার, মহেজাদারাে, তেজগাঁও, নওগাঁ, আকিয়াব পাের্ট ব্লেয়ার, কোলাবা, নেলাের, ভূসাওল, খাণ্ডোয়। যে সব জায়গার নাম জানতেন সেগুলিও সংখ্যায় কম নয়। কলকাতা থেকে এসেছে উনপঞ্চাশখানা দরখাস্ত। কাজেই হাজার দুর্ণাম বটুলেও ছেলের পাত্রীর অভাব নেই, এর জন্য তিনি নিজেকেই অভিনন্দন করলেন। কেমন লােকের ছেলে। পাত্রী দেখতে বেরােলে ওর সঙ্গে দেশ দেখাও হয়, তীর্থ করা হয়। কিন্তু জাহ্নবীবাবুর ছুটি ছিল না। তিনি ছেলেকে ডাক দিয়ে বল্লেন, “তুমি তাে দেশভ্রমণ ভালােবাসাে বলে জান্তুম। পরের দেশ পুতুল নিয়ে খেলা পুপুরূপে পৰ্যবেক্ষণ করলে। এবার নিজের দেশটার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নাও। চাকরীর নিকট সম্ভাবনা তত নেই, ঘরে বসে কবে কী। ততদিনে সােমেরও শান্তি মােচন হয়েছিল। করবার মতাে কাজও ছিল না হাতে। ৰা, “বে আজ্ঞে।” জাহ্নবীবাবু আলবােলার নল মুখে পুরে খানিক ভূড় ভূড ভূড জুড় আওয়াজ করলেন। বল্লেন, “কুড়ে কলিয়ারি, মলদই, নান্দিয়ায় পাড়া, ভাওয়ালী, মাউজংসন, কুকিচেরা, ঢেঙ্কানাল, মেমিও, তুলসীয়া—এসব না না দেখলে ভারতবর্ষের দেখলে কী।” সােম মাথা চুলকাতে চুলকাতে বল্ল, “তা তাে বটেই।” “ডিব্ৰুগড থেকে পণ্ডিচেরী পৰ্যন্ত একটা দৌড় দাও।” জাহবীবাবু যেন নিজে এমন একটা দৌড় দিয়ে অভিজ্ঞ হয়েছেন এইরূপ ভঙ্গীতে বলেন, তারপর পণ্ডিচেরী থেকে রাওলপিণ্ডি।” পিণ্ডির কথায় মনে পড়ল গা। তারপর ওলপিণ্ডি থেকে গয়া হয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসাে।” সােম বস, একখানা Indian Bradshaw কেনা হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ। তারপর ঐ সব প্রসিদ্ধ স্থানে—কুতোড় কলিয়ারিতে, মাউ জংসনে, ঢেঙ্কানালে—কোন কোন হােটেলে উঠতে হবে তাদের ঠিকানা “হােটেলে উঠতে হবে না, আবীবাবু আরাম কেদারায় শায়িত অবস্থা ছেড়ে ছিন্নগুণ ধনুকের মতাে পিঠ সােজা করে বসে বলেন, “এসব জায়গায় আমাদের জাতীয় ভদ্রলােক রয়েছেন, তাদের বাড়ী আতিথ্য বীকার করাতে লজ্জার কিছু নেই।” সােম ডাবল মন্দ না। রেলের পাথেয় জোটাতে পারলে বছর খানেকের মতাে অন্নের ভাবনা থেকে মুক্তি।
পূর্ণিয়া প্যাক্ট ১ সব আগে কোন খানে যাবে স্থির কতে না পেরে সােম দিনের পর দিন টাইমটেবল ও মানচিত্র অধ্যয়ন করে কাটালাে। তার ছােট মা একদিন তার কাছে এসে বসে সেই শীতাঙ্গ কালে তাকে পাখা করতে লাগলেন। সোম ব, “মা, তুমি কি কিছু বলবে?” তিনি বল্লেন, “মানুষের জীবন। কোন দিন আছে, কোন দিন নেই। নলিনীদলগত জলের মতাে তরল। কানাই তিনি রুদ্ধ কষ্টে আর একবার বলেন, “কানাই”, তারপর কাপড়ে মুখ ঢাকলেন। সােম সান্ত্বনা দিয়ে বঙ্গ, “সাত বছর হয়ে গেল, কানাই কি এতদিন অন্য কোনাে মায়ের কোলে জন্ম নেয়নি ভাবছ? ও কি তােমার কান্নার জন্যে কেয়ার করে ? যার কেয়ার করে তাদের কথা ভাবাে-আমার কথা, বলাইয়ের কথা। “বলাই, ছােট মা চোখ মুছে বলেন, “তােমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে চেয়েছিল, কলেজের কর্তারা আসতে দিল না, টেই, এগজামিনের আর দেরি নেই বলে।” “তা হােক, আমিই ওর সঙ্গে দেখা করবাে এখন।” নােম ৰয়। “মানুষের জীবন,” হােট মা আবার শুরু করলেন, “মানুষের জীবন অতিশয় চপল। তােমার বাবা তাই আমাকে বলছিলেন যে আসছে বছর যখন তিনি পেন্সন নেবেন তখন তার সময় কাটুবে কেমন করে? নাতি নাতনীর সঙ্গে খেলা করার বয়স হলাে, কিন্তু কই নাতি নাতনী ?” সােম বুঝল। যেন বােঝেনি এমন ভাব দেখিয়ে বঙ্গ, “কেন আমার দুই দিদির সাত ছেলে মেয়ে। তাদের দুই একটিকে আনিয়ে নিতে বাধা কী ?” “পাগল ছেলে।” মা বলেন, “তা কি কখনাে হয়। ওদের নিজেদের বাড়ী আছে, এদের ঠাকুমা ঠাকুরদাদারা ছেড়ে দেবে কেন?” “তা তো বটেই। সােম বিয়ের মতাে মাথা নাড়তে নাড়তে বা, ১২ পুতুল নিয়ে খেলা । “তা তাে বটেই। তা হলে আমাকেই নাতি নাতনী তৈরি করবার ফরমাস নিতে হয় দেখছি। এদিকে যে বাবা আমাকে অশ্বমেধের ঘােড়র মতাে কুম্ভোড কলিয়ারি ডিব্ৰুগড় ফরাক্কাবাদ পাঠাচ্ছেন।” “তুমি বাবা আমার কথা শোনাে,” মা বল্লেন, “অত ঘুরতে হবে না। উনি কেবলই খু! খুঁং করছেন, কোনাে পাত্রীই ওঁর বৌমা হবার যােগ্য বলে ওঁর মনে হচ্ছে না, তাই ঐ সব সৃষ্টিছাড়া জায়গায় পাওয়া গেলেও যেতে পারে ভাবছেন। অত বাছলে তুষের সঙ্গে সঙ্গে ধানও যাবে ফেলা। আমি বলি তুমি দুটি কি তিনটি মেয়ে দেখােকাশীরটি, শ্যামবাজারেরটি আর ঐ দেওঘরেরটি। ও নাকি সুন্দর বীণা বাজায়, সাক্ষাং বীণাপাণি।” “আর কাশীর মেয়েটি ?” “কাশীরটি হলাে ওঁর বন্ধু দাশরথি মিত্তির মশাইয়ের ভাই-ঝি। উনিও ছিলেন ডিষ্ট্রিক্ট জজ, এখন পেসেন নিয়ে কাশীবাস করছেন। এরও ইচ্ছা কাশীতে বাড়ী করেন। দুই বন্ধুর দুবেলা দেখাশােনা হবে বিশ্বনাথের মন্দিরে আর দশাশ্বমেধ ঘাটে।” “দাশরথিবাবুর নাম শুনেছি। শ্যামবাজারের মেয়েটি কার ভাইঝি?” “কার ভাইঝি জানিনে, কিন্তু ভবনাথবাবুর মেয়ে, বি-এ পা, কোন বিষয়ে নাকি ফা হয়েছে। ভবনাথবাবু তাকে এম-এ পড়াতে চান না, বলেন এ-এ পাস্ মেয়ের বর পাওয়া যাবে না, এক আই-সি-এস ছাড়া। আর আই-সি-এই বা এত আসে কোখেকে।” “তা আমিও তাে বি-এর চেয়ে বড় নই। আমাকে ভবনাথবাবু মেয়ে দিতে যাবেন কেন?” “পাগল ছেলে। কিসে আর কিসে। বিলেতের বি-এ আর এদেশের বি-এ। তােমাকে পাবার জন্যে তার কত আগ্রহ। বিলেতফেরৎ কৃতী পুত্রকে জাহ্নবীবাবু মনে মনে ভয় কতেন সে যদি পূর্ণিয়া প্যাক্ট বেঁকে বসে, সেইজন্যে সােজাখুজি আদেশ করতে পারেন না। অনুরােধ করতেও তার পিতৃসম্মানে বাধে। মনােগত অভিপ্রায় সংকেতে বােঝানাে ছাড়া কী উপায়। এসব বিদ্রে গৃহিণীর সাহায্য নিতেও তিনি কুষ্ঠিত। পাছে কেউ ফ করে ঠাওরায় যে দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর কথায় তিনি ওঠেন বসেন, তিনি ণৈ, সেইজন্যে তিনি সে বেচারির সঙ্গে ভালাে করে কথাই কন্ না। পাছে এমন অপবাদ রটে যে তিনি প্রথমার চেয়ে দ্বিতীয়াতে অবিক অনুরক্ত সেই আশঙ্কায় তিনি সে বেচারির সঙ্গে লােকদেখানাে কঠোর ব্যবহার করেন। বিধবা কন্যাকে যতসব বাহারে শাড়ী কিনে দেন, সধবা স্ত্রীকে কিনতে দেন তার সাদাসিধে সংস্করণ। সে বেচারির যদি কোনাে সখ থাকে সেটা গেটে সুনিত্রার সৌজন্যে। তিনি সুমিত্রার কোনােকিছু তারিফ করলে সুমিত্রা তখনি প্রস্তাব করে, “মা, তােমাকে এটা দিই?” তিনি আপত্তি করেন, “না, না, তা কি হয় ? আমি বুড়ো মানুষ, আমার গায়ে এটা মানাবে কেন?” সুমিত্রা তাঁকে জোর করে পরিয়ে দিয়ে বলে, “চমৎকার মানিয়েছে। আজ আমরা মুনসেফ বাবুদের বাড়ী বেড়াতে যাবে।” সােম এ সব জাত। তাই ছােট মা তাকে যা বলেছেন তা যেন তার বাবার বক্তব্য নয় এই ভাণ করে বাবার সামনে গিয়ে পায়চারি করতে লাগল। জীবাবু চোখের চশমা নাকে নামিয়ে তার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালেন। সােম বঙ্গ, ভারি ভাবনায় পড়ে গেছি। কোনখান থেকে যাত্রার করি স্থির করতে পারছিনে। আগে যাব পূব মূখ লালমশির হাট, না আগে যাবে পশ্চিম মূখে লাহেরিয়া সাই—একেই বলে উভয় সংকট। ‘ই। কিছুক্ষণ চিন্তার ভাণ করে জাহ্নবীবাবু বল্লেন, “সর্বসিদ্ধিপ্রদ কাজধাম। সেইখান থেকে যাত্রারম্ভ হলে । দেওঘরও পুণ্য শঠ।
১৪
পুতুল নিয়ে খেলা
যিনি বিশ্বের তিনিই বৈদ্যনাথ। কালীঘাটের কালীও জাগ্রত দৰঙ্গ।
তােমরা তাে প্রায়শ্চিত্ত করবে না। দেৰদৰ্শনে প্রায়শ্চিত্ত আপনা থেকে
হয়, তাও করবে না ?”
সােম শশব্যন্তে বা, “নিশ্চয় করবাে। কেন করবো না। তবে
শুনছি দেবদর্শনের সঙ্গে আরাে কী দর্শন করতে হবে।”
“আমিও তােমাকে তাই বৰ-বৰ কছিলুম।”
“আমার অনিচ্ছা নেই। তবে আমার একটি ত আছে।”
“ব্ৰত আছে।”
“আজ্ঞে । ব্ৰত আছে। আমার নিজের কোনাে পছন্দ অপছন্দ নেই,
আপনারা যাকে পছন্দ করবেন আমি তাকেই বিয়ে করব। কিন্তু
জাহ্নবীবাবু কান খাড়া করে বইলেন।
“কিন্তু বিয়ের আগে তাকে আমি গােপনে কিছু বলতে চাইব।”
“কী বলবে?”
“বলব আমার নিজের ইতিহাস।”
“না, না, না, না।” তিনি ক্রমাগত মাথা নাড়তে থাকূদেন এম
দেওয়া কলের পুতুলের মতাে, আর গ্রামােফোনের রেকর্ডের মতো তাঁর
মুখ থেকে ছুটতে থাকল, না, না, না, না।
“বেশ। আমি বিয়ে করব না।”
“আহা, আমাকে বলতে দাও।তােমার স্ত্রীকে তুমি গােপনে কিছু
বলবে, এতে কার কী আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু সেটা বিয়ের আগে
নয়, বিয়ের পরে।
“ন, বাবা।”
“কেন, অন্যটা কী বন্ধু ?”
অন্যায় এই যে, বিয়ের পরে যদি ও কথা শোেনাই ভূৰে নে হয়ত
করলে তলে আমি বিয়েই কম না
পূর্ণিয়া প্যান্ট
“আহা-হা-হা। অমন কথা কোনাে হিন্দু স্ত্রী বলতে পারে? বিলেত
গিয়ে তুমি ক্রিশ্চান হয়ে এসেছ দেখছি।”
“বেশ। আমি বিয়ে করব না।”
“ই।” তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। বলেন, “আমাদেরই দোষ।
ভালাে চাকরীর মােহে ছেলেগুলােকে বিলেত পাঠাই, চাকরী আর হয় না,
হয় শুধু শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর।”
সােমের ইচ্ছা হলাে বলে, আমি তাে স্কলারশিপ নিয়ে গেছি। কিন্তু
ঐ আগুনে ইন্ধন দিয়ে কী হবে।
“এখন বুঝতে পারছি,” জাহ্নবীবাবুর আবিষ্কার গৌরবে বলেন, “কেন
লােকে ছেলেকে বিলেত পাঠাবার আগে বিয়ে দিয়ে রাখে। দাশরথি
তাই করেছেন, দৈবকীও তাই বলেছেন। আমি আমাদের সিবিলিয়ান
কবির ভাষায় ভাৰ লুম, ‘চাকরী না করে বিয়ে করা গােক ভেড়ার ধর্ম।
এখন দেখছি চাকরীও হলাে না, ধৰ্ম্মও গেল।”
সােম আর সেখানে গডাল না। শ্রোতার অভাবে জীবাবু
অগত্যা তুষ্ণভাব অবলম্বন করলেন।
লাদাকে জিনিষপত্র বাছাদা কতে দেখে সুমিত্রা সকৌতুহলে
সুল, "কোথায় আগে যাওয়া স্থির করলে ?”
সােম ব, “বাজপুতানায়। সেখানে এতােগুলাে মহারাজা মহারাণা
মহারাও আছে, কেউ না কেউ আমাকে প্রাইভেট সেক্রেটারী বাথবে।
চাকরী ব্যর উপজীবিকা সরকারী প্রফেসারী ছাড়া কি তার নান্তি
গতিরন্যথা ?
“লে কি, দাদা, সুমিত্রা বজ, “আমরা যে আশা করেছিল তুমি বৌ
অাতে ৰে
সােম হেসে বল, “আমি কি দিব্যি দিয়ে বলছি যে রাজপুতানাজ সে
পুতুল নিয়ে খেলা পেলে আনব না? কে জানে কোন রাজপুতানী আমার শৌর্যে মুগ্ধ হযে স্বয়ম্বব হবে।” “বা কী মজা। বাজপুতানী বৌদি আসবে। নাম তার মীরাবাঈ কি তারাবাঈ। দাদাব শ্বশুরে পাকানাে গোঁফ কানের কাছে চুলের সঙ্গে বাবা। দাডিতে সি থি কাটা, দুদিকে দুই চাপা ফুল গোঁজা। নাম হয়ত তলােয়ার সিং। কী মজা ।” সুমিত্রা তালি দিতে দিতে ছোট মা’ব কাছে গিয়ে খবরটা দিল। তিনি ছুটলেন স্বামীর কাছে। বল্লেন, “ওগাে শুনেছ ? ছেলে যাচ্ছে রাজপুতানা, চাকবীর খোঁজে। ওদেশে নাকি বাঈঙ্গী বিয়ে ক'ব।” “কী বিয়ে করবে ? কী বিন্তে কববে?” “বাঈজী।” “কুষ্মণ্ডটাকে বলে। চাকরীর জন্যে অতদূর যেতে হবে না। সরকারী চাকরীব আশা আছে।” ছােট মা সােমের কানে একথা পৌছে দিলে সােম বং, “সে চাকরী যখন হবে তখন হবে। ততদিন বসে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করতে প্রবৃত্তি হয় না।” তিনি তখন স্বামীর কানে ওকথা তুলেন। স্বামী বল্লেন, “ওর ভাবী স্ত্রীকে ও যদি কিছু নির্জনে বলতে চায় তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।” সােম এর উত্তরে ছােট মা’র মারফৎ বল্ল, “যাকে ওকথা নির্জনে বব সে ভাবী স্ত্রী হতে অস্বীকৃত হতে পারে।” ছােট মা’র মধ্যস্থতায় বাবা বল্লেন, “মেয়ে অস্বীকৃত হলে কি আসে যায়? কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। কর্তা অর্থ বকর্তা ও কন্যাকর্তা।” ছােট মা’র মধ্যস্থতায় সোম এর উপর মন্তব্য করল, “তবে বার্তা কন্যাকৰ্ত্তার পাণিগ্রহণ করুন। মন্ত্রপাঠপূর্বক নারীবর্ষণ আমার দ্বারা হবে না।”
পূর্ণিয়া প্যাক্ট
এ ঘর ও ঘর করতে কতে ছােট মা পড়লেন হাফিয়ে। বাপও
ছেলের মুখ দেখবে না, ছেলেও বাপের মুখে দাড়াবে না। ছােট মা
সুমিত্রাকে ডেকে এনে বল্লেন, “আমি আব পাৰিনে। তুমি হও এদের
'টেলিফোন।”
সুমিত্রা বল, “বাহবা বাহবা বেশ।”
সুমিত্রা কানে শুল, “ওকে বল্, ও যা ববে তা শুনে মেয়ে যাতে
বিয়ে করতে অস্বীকৃত না হয় তার ব্যবস্থা করা যাবে।”
মুখে বল্ল, “বাবা বলছেন, তােমর কাহিনী শুনে মেয়ে রাগ করবে
ক, উল্টো ভাববে যার কলঙ্ক আছে সেই চাঁদ, তাকে বিয়ে না করলে
কাকে বিয়ে কব, জোনাকিকে ?”
সােম জেরা করল। বস্তু, “বাবা কখনাে অমন কথা তাের সাক্ষাতে
বলেন নি। বাবার নাম করে মিথ্যা বলি ?”
তখন সুমিত্রা আর কী করে, সত্য বন্ন।
সােম বন্ধু, মেয়ের আন্তরিক স্বীকৃতি না পেলে শেখানাে স্বীকৃতি
কোন কাজে লাগবে ?”
সুমিত্রার দ্বারা পল্লবিত হয়ে বাবার কানে উঠল, “দাদা বলছে
তােতাপাখীর মতাে যে মেয়ে না বুঝেসুঝে ‘হ' বল্বে দাদা তার
অভিভাবককে বেশ বুঝেসুঝে ‘না’ বল্বে।”
বাবা চটেমটে বল্লেন, “কী। বলেছে কল্যাণ ও কথা।”
তখন সুমিত্রা ডালপালা ছেটে মূল উক্তিটি আবৃত্তি করল।
বাবা বল্লেন, “জিজ্ঞাসা কর আন্তরিক স্বীকৃতি যদি পায় তবে বিয়ে
কবে তাে? না, অন্য ওজর আপত্তির আশ্রয় নেবে?”
সুমিত্রার আর ভালাে লাগছিল না টেলিফোন হতে। যাতে কল্পনার
দৌড় নেই সে কি খেলা ?
১৮ পুতুল নিয়ে খেলা দাদাকে বল্ল, “কথােপকথনের এই শেষ। তিন মিনিট উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় টেলিফোন-গার্ল সতর্ক কবে দিচ্ছে।” সােম বল্ল, “আন্তরিত স্বীকৃতিব পিছনে কী প্রকার মনােভাব রয়েছে সেটাও ধৰ্ত্তব্য। তা যদি হয় করুা, কিম্বা সংশােৰনেচ্ছা, কিম্বা ব্যবসায় বুর্কি-অর্থাৎ আমাকে বিয়ে করলে কত সুবিধা তাই নিয়ে হিসাবীয়ানা, কিম্বা (১n'sin-মর্থাৎ পুরুষমানুযের ইতিহাস ও ছাড়া আর কী হবে, তবে আমার বিদায়।” বাবাকে দাদার শেষ বার্তা দিয়ে সুমিত্রা বল্ল, “এবার দাও তােমার শেষ বার্তা। টেলিফোনের সমন অতিক্রান্ত হয়েছে।” জাহ্নবীবাবুর ইচ্ছা কছিল বতে, আমার মাথা আর ওর মুণ্ডু। কিন্তু শেষ বার্তারূপে ঐ বাক্যটির উপযােগিতা ওঁকে সন্দিগ্ধ কল। ছেলে যদি টং হয়ে রাজপুতানা চাল যায় ও বাঈজীকে ঘরে আনে—কিছুই বলা যায় না, আজকালকার ছেলে-তবে নিজের ইহকাল ও পূর্বপুরুষের পরকাল দুই এক সঙ্গে খাবে। অমন খনি| ওর মুখরােচক হওয়া সম্ভব, কিন্তু ওর মুখে বাডিযে দেওয়া কি সঙ্গত ? চিন্তা করে বল্লেন, “পুত্রববের নিকট আমার শেষ নিবেদন এই যে, উনি আপাতত কাশী দেওঘর প্রভৃতি দু চার স্থলে পরীক্ষা করে দেখুন ওর প্রিন্সিপ্ন, আমার পলিসীল থেকে কোন অংশে কার্যকরী ও ফলপ্রদ।” সােম ভেবে দেখল পিতা প্রকারান্তরে তার লঘিষ্ঠ দাবী মেনে নিয়েছেন, অতএব পিতার গরিষ্ঠ দাবী-কাশী দেওঘর ইত্যাদিতে প্রিন্সিপ্লের পরীক্ষণ-অসংকোচে স্বীকার করা যায় । অল্পে সন্তুষ্ট হলে চাকরী যে কোনােদিন যে কোনােখানে জোটে, এক শ টাকার হেড, মাষ্টারী দুপ্রাপ্য নয়। কিন্তু যে মেয়ে তাকে অকুণ্ঠিতচিত্তে গ্রহণ করবে তার সন্ধানে যাত্রা কবা তত কঠিন যাডভেঞ্চার।
পুর্ণি প্যাক্ট
রাত্রে বাবার পাশে বসে খাবার সময় সােম বল্ল, “কাশী যাৰ স্থির
কলুম।”
জাহ্নবীবাবুব মুখভাবে সুখের লক্ষণ ছিল না। তিনি বল্লেন, “যাবার
আগে একটা তার কবে দিও দাশরপিকে। ঠিকানা ভেনুপু।”
তার সঙ্গে কথাবার্তা জন্ম না। সুমিত্রার সঙ্গে যখন দেখা হলাে
সােম বল্ল, “সুমি, রাজপুতানার জন্যে বাক্স বিছানা বেঁধে শেষে চলুম
কাশী ।”
"কেন যে ওখানে যাচ্ছ, দাদা। ওখানে তােমার হবে না।”
“তুই কেমন করে জালি?”
“তাের যেমন ভীষ্মের মতাে প্রতিজ্ঞা তুমি ভীষ্মের মতো আইবুড
থেকে যাবে।”
“সেও ভালাে, তবু ঠকিয়ে বিয়ে করব না।”
“তুমি কি সত্যি অন্ধ, না অন্ধতার ভাণ কছ, না বিলেত যারা যায়
তারা সবাই এমনি?”
“তাের কী মনে হয় ?”
“আমার মনে হয় তুমি সত্যি অন্ধ। নইলে তুমি কখনাে ধরে নিতে
না যে কোনাে মেয়ে তােমার কাহিনী শুনে বাস্তবিক শক পাবে। নেহাৎ
যদি অপােগও না হয়।”
“তুই আমার কাহিনী কী জানিস ? আমার আসল কাহিনীর প্রদ্যোত
সিং-ই বা কী জানে। বাবা আমাকে যতটা খারাপ বলে জানেন আমি
তার বেশী খারাপ এবং সে জন্যে অনুতাপ করিনে।”
“বুঝেছি। কিন্তু তাতেও তােমার স্ত্রী শক্ পেতে। না, যদি বিয়ের
পরে জানত।”
“তার মানে তুই বলতে চাস যে নারীর মন স্বভাবত অসাড়। আমি
কিন্তু নারীকে পাষাণী বলে ভাবতে আজো প্রস্তুত হইনি, সুমি। ওইটুকু
পুতুল নিয়ে খেলা নােমান্টসিজম এখনাে আমার চিত্তে অবশিষ্ট, মানুষের শরীরে যেমন যাপেণ্ডিক্স।” “আমি বল্তে চাইনে যে আমরা পাষাণী। আমরা কাজের লােক, আমরা খুদ কুঁডে। যা পাই তাই নিই ও তাই দিয়ে রান্না চড়াই। স্বামী কুষ্ঠবােগী হলেও আমরা তাকে দোষ দিইনে, সমাজকেও দুষিনে, কঁদি অদৃষ্টের কাছে, তাও স্বামীকে খারিজ করবার জন্যে নয়, স্বামীর কুশলের জন্যে। জগতে এক পক্ষকে সয়ে যেতে হয়, আমরা সেই সহিষ্ণু পক্ষ। নইলে কোনাে পক্ষেই শান্তি থাকতাে না, এক পক্ষ হতে বুনন ওল আর অপর পক্ষ হতাে বাঘা তেঁতুল।” সােম হাল। বল্ল, “বুনন ওলের নায়িকা বাঘা তেঁতুল। জগতে যখন আমি আছি তখন সেও আছে। সে শক্ পাক বা না পাক, তার মধ্যে ঝাঁজ, থাকবে, প্রাণ থাকবে। নারী তাে কত আছে, আমার সবর্ণ হলে কাকে ছেড়ে কাকে বিয়ে করবে? এ সব কথা বাবা বুঝবেন । তাই তার সঙ্গে করতে হলাে এমন একটা প্যাক্ট যে আমার দিক থেকে রইল না কোনাে প্রতিশ্রুতি অথচ তার আদেশ অনুযায়ী চলুম “ও। এই তােমার মতলব?” সুমিত্রা কৌতুক কলরােলে গৃহ মুখরিত করুশ। ছােট মা ছুটে এলেন। সােম বল্ল, “এই চুপ, চুপ, চুপ।” ছােট মা বল্লেন, “বলল, বলল, কী নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছিল। “জানাে না বুঝি? দাদা কাশী যাচ্ছে একটি বাঘা তেঁতুলের খোঁজে। আমি বলি অতদূর যেতে হবে না থার্ড মুন্সেফের মেয়ে নন্দরাণী থাকতে।” ছােট মাও হাসলেন। চলে যেতে যেতে বল্লেন, “নন্দরাণীর মাটি সেই জাতের।”
LuKASENPUR 'BAY 0। {।' * শিবানী KOWRATE কাশীতে বাড়ী করায় বিপদ আছে। পরিচিত, অপরিচিত, অৰ্দ্ধ পরিচিত, পরিচিতের পরিচিত, অপরিচিতের পরিচিত, অর্ধ পরিচিতের পরিচিত, যিনিই সদলবলে তীর্থ করতে আসেন তিনিই দিব্য সপ্রতিভ ভাবে গাড়ী থেকে স্থাবর ও অস্থাবর পোটলা-পুটলি নামিয়ে গাভােয়ানকে বিদায় করতে করতে হতভম্ব দাশরথি বাবুকে জিজ্ঞাসা করেন, “দেখুন, এটা কি দাশরথি বাবুর বাড়ী ? দাশরথি বাবু প্রশ্নকর্তার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ও ঘােমটা-দেওয়া পুটুলিগুলির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাডেন। বলেন, “আজ্ঞে হ্যা। এইটেই দাশরথি বাবুর ছত্র। আমিই দশখি।” প্রশ্নকর্তা বিনয়াবনত হয়ে একটি নমস্কার করেন। তারপর পোঁটুলা- পুটুলির দিকে ফিরে উচ্চকণ্ঠে বলেন, “প্রণাম করে। প্রণাম করাে। ইনিই সেই প্রসিদ্ধ জজ সাশরথি বাবু।” দাশরথি বাবু এর পর কেমন করে এতগুলি ভক্তকে তাড়িয়ে দেন ? অন্দরে গিয়ে গিন্নীকে ডাকেন, “ওগাে যাদুমণি।” যাদুমণিকে খুলে বলতে হয় না। তিনি সম্বােধনের সুর থেকে আন্দাজ করেন যে বাড়ীতে অভ্যাগত এসেছে। অর্ধেক জীবন কোথায় রাউজান কোথায় হাতিয়া কোথায় জাজপুর কোথায় জামুই এইসব দুর্গম জায়গায় কাটুল, একটিও অভ্যাগত এলাে না। এখন কাশীতে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে লাখে লাখে এসে সঞ্চিত অর্থটুকু খুটতে খুটুতে নিঃশেষ করে দিল। হায়, এমন দিন গেছে যেদিন তারা মাছ খেতে পানু নি, ২২ পুতুল নিয়ে খেলা সপ্তাহে দুদিন হাটে মাছ পাওয়া যায়। মাছ না খেয়ে মিষ্টি না খেয়ে বছরের পর বছর যা বাঁচালেন কাশীতে বাড়ী করে পরকে পাঁচরকম খাইয়ে তার অবশিষ্ট থলি না। সাবে কি যাদুমণির দাঁত দিয়ে বিষ ক্ষরিত হয়? দাতও আক্ৰহীন, অধরের অবগুণ্ঠন মানে না। যাদুমণি ঝাল দিয়ে লঙ্কামরিচের গুডাে ছিটিয়ে দেন। দু দিন বাদে অভ্যাগতেব তীর্থদর্শন ফুরিয়ে যায়, পোলাপুটলি বাড়ী ছেডে গাড়ীতে ওঠে। তবু দাশরথি বাবুর ছত্রে লােকাভাব ঘটে না। তারও পুণ্য হয়, লােকেরও ধর্মের জন্য অর্থ দিতে হয় না। এই ধারায় জীবন প্রবাহ বইছিল কাশীতে। এদিকে দাশরথি বাবুর দেশে মুর্শিদাবাদে তার ভ্রাতুপুত্রী শিবানী মাসে অব ইঞ্চি করে বাড়তে বাড়তে চোদ্দ বছর বয়সে লম্বায় চওড়ায় চৌকষ হয়ে উঠছিল। শিবানীর বাড দেখে তার বাবা মৃগেন্দ্র বাবুর ব্লাড প্রেসার যাচ্ছিল বেডে। ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাবার জন্য দাশরথি বাবু শিবানীকে আনিয়ে নিয়ে নিজের কাছে রাখলেন। উদ্দেশ্য এই যে কাশীতে যখন এত বাঙালীর আসা যাওয়া, শিবানীকে দেখে তাদের কারুর পছন্দ হতে সময় লাগবে না। যাদুমণি দেওরের উপর প্রসন্ন ছিলেন না, কারণ দেওর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃজায়ার অনুগত না হয়ে নিজের স্ত্রীর অনুগত। তবু শিবানীকে পাত্রস্থ করার দায়িত্ব নিলেন শুধু অতিথিদের উপর যে খরচটা হচ্ছে সেই খরচটাকে সার্থক বলে মনে করতে। অপব্যয় নয়, প্রয়ােজনীয় ব্যয়, দেওরের হিতার্থে। ভাই হয়ে ভাইয়ের এমন উপকার কলিযুগে আর কে কোথায় করেছে ? কার ভাইঝিকে দেখবার জন্যে দেশশুদ্ধ মানুষ কাশীতে এসে অতিথি হচ্ছে ? কে এই ভ্ৰাহবংসল কলির দাশরথি এবং কে তঁার সী? অতিথিদেরও এতে মুখ রক্ষা হয়। তাঁরা আশ্রয়ের বাচক হয়ে আসেননি, তারা মেয়ে দেখতে এসেছেন, মেয়ে দেখে অনুগৃহীত করতে।
শিবানী গাজীৰ্যের ভাণ করে শিবানীকে যাচাই করেন, বিস্ময়ের ভাণ করে মন্তব্য করেন, “ৰ। স্তাবক আজ কালকার বাজাবে এমন পাত্রী দেখা যায় না।” কথা দিয়ে যান বাড়ী পৌছেই চিঠি লিখে দিনক্ষণ স্থির করবেন। তারপর তাগাদা দিলেও চিঠি লেখেন না। তবু দাশরথি বাবু অভ্যাগতকে বিশ্বাস করেন, তারা যখন গাড়ী থেকে গোষ্ঠীসমেত নামেন ও দু চার কথার পর বান, “দাশরথি বাবু, আপনার সেই প্রসিদ্ধ ভাইঝিটিকে দেখতে কাশীতে এলুম” তখন দাশরথিবাবু অন্দ প্রবেশ করে গৃহিণীকে ডাক দেন, “ওগাে মাদুমণি।” যাদুমণি বিদুষী না হলেও নারী, ইনটুইশন তার জন্মগত ও মর্মগত। তিনি সবই বোঝেন, তবু মনকে প্রবাের দেন এই বলে, “জীবনে যত মাছ হলো না খাওয়া তাদের দাম মিছে ভাতে যাওয়া। টাকা জমিয়ে কী হবে? সঙ্গে যাবে?” পাড়ায় থাকতেন এক সিবিল সার্জনের স্বী-অবসর প্রাপ্ত। (দ্বী অবসর প্রাপ্ত নন, সিবিল সার্জন স্বয়ং অবসর প্রাপ্ত।) মহিলাটি মহিলা মহলের মােড়ল। শিবানীকে কেউ পছন্দ করছে না শুনে দু চারটে টোটকা বাৎলে দিলেন। বল্লেন, “বিজ্ঞানের অসাধ্য কী আছে ? আর বিজ্ঞান খাটে না কোন বিষয়ে ? মেয়ে দেখানাে কাজটি বৈজ্ঞানিক ভাবে করে দেখুন, ফল অবশ্য পাবেন।” তিনি ফী দাবী করেন না, পাড়ার মহিলারা তাকে ধরাধরি করে নিজ নিজ বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে তাঁর নির্দেশমত দর্শনীয়া কন্যার প্রসাধন করেন। (টীকা।-ধরাধরি করা এখানে দ্ব্যর্থ বাচক।) “ও শাড়ী পরলেই হয়েছে। মরি মরি কী রুচি। খোঁপাট। অমন কুকুর ল্যাজের মতাে হলাে কেন শুনতে পারি? ব্রোচটা ওখানে বসবে , বিশ বেমানান দেখায়।” সিবিল সার্জনের স্ত্রীর টোটুকা অনুসারে দ্রৌপদীর মতাে প্রতিদিন ২৪ পুতুল নিয়ে খেলা দুবেলা শাডী বলাতে বল্লতে শিবানী একটা পুতুলের মতাে অসাড় হয়ে উঠল। তার মাথার চুলও ক্রমাগত খােলা হচ্ছে, বাঁধা হচ্ছে, তৈলাক্ত হচ্ছে, ধৌত হচ্ছে। তার হাত পায়ের নখ ঘসা হয়, কাটা হয়, পালিশ করা হয়, রঙীন করা হয়। তবু ফল পাওয়া যায় না। গাঙ্গুলী গৃহিণী বলেন, “সবুরে মেওয়া ফলে। বিজ্ঞান তত ভােজবাজি নয় যে দেখতে দেখতে বীজ থেকে গাছ গজিয়ে সেই গাছে আম ফলবে।” বেনারসী শাড়ীতে ফল হয় না, সুতরাং কাশ্মীরী শাড়ী পরে। কাশ্মীলীতে ফল হয় না, অতএব বােম্বাই শাড়ী পররা। তাতেও ফল হয় , মাদ্রাজী শাড়ী পরে। কে এক অর্বাচীন টিপ্পনী কবলেন, “তার মানে একশােটা গুলী মারলে একটা লেগে যাবে। তা হলে বিজ্ঞান আর কী হলাে।” গাঙ্গুলী গৃহিণী সিডিশনের গন্ধ পেযে জলে উঠলেন। বল্লেন, “হয়েছে। হয়েছে। মা মাসিমার চেয়ে তুমি বেশী জানাে দেখছি। তবে তুমিই সবাইকে পরামর্শ দাও। আমরা তা হলে এখান থেকে উঠি।” বলা যত সহজ ওঠা তত সহজ নয়। গাঙ্গুলী গৃহিণী রথের পথে পুরীর জগন্নাথ মূর্তির মতাে দুলতে থাকলেন, কেউ তাঁকে তুলে নিয়ে এগিয়ে দেবার উদ্যোগ করল না। বােঝা গেল তাঁর প্রতিপত্তি-বিজ্ঞানের প্রতিপত্তি-অস্তমিত হয়েছে। যার পরামর্শে ফল হয় না তাকে মােড়ল বলে মাতে কেউ প্রস্তুত নয় । শিবানীকে দেখে যাদের অনুমান হয় যে ওর বয়স উনিশ কুড়ি তারা মুখ। তার দেহে এখনাে লাবণ্যের বন্যা আসে নি। তার সর্বাঙ্গ ভরে উঠে ঢল ঢল করে নি ও দুকূল ছাপাতে উদ্যত হয় নি। সে হচ্ছে সেই জাতীয় লতা যার বৃদ্ধি দ্রুত ও ঘন হলেও যে পুষ্পিত হবার কোনাে লক্ষ দেখায় না।
শিবানী ২৫ প্রৌঢ়া একটি রাঙা টুকটুকে বৌ মা পেলে খুসী হ, তাঁদের পক্ষ শিবানী যথেষ্ট কমনীয় নয়, কচি নয়। আর যুবকরা চান শ্ৰীসম্পন্ন বয়ঃপ্রাপ্তা তরুণী বধূ, শিবানীকে তাঁরা ছ’ সেরা বেগুনের মতাে একটা অপরূপ পদার্থ জ্ঞান করেন। তার রং ময়লা। কালাে মানুষদের দেশে সেটা তার এক মস্ত অপরাধ। কিন্তু সেজন্যে সে নিজে চিন্তিত নয়, চিন্তিত তার বাবা মৃগেন্দ্র, মা সৌদামিনী, তার জেঠামশাই দাশরথি । কেবল তার জ্যেঠাইমা যাদুমণি বলেন, “পাঁচটা ছেলেমেয়ের মধ্যে সব কটাই ধলা হবে এ তােমার ইংরেজের দেশে হয় কি না বলতে পারিনে, কিন্তু কালা ধলা দুই না থাকূলে ভগবানের সৃষ্টি একাকার হয়ে যেত।” একথা যখন তার মুখে তাঁর স্মরণে তখন তার পাতের কথা। চিন্তা করতে, উদ্বিগ্ন হতে, বিরক্ত হতে শিবানী জানে না। তাকে যে যা করতে বলে সে তাই করে, তবু খাটুনির চাপে তার বাড থামে না। ওজন কমাবার জন্যে তার ভােজন কমানাে হয়, কিন্তু শরীর তার যেন মনসা সিজের ছাড। পড়াশুনা তার সাধ্যমতাে করেছে। মেয়ে ইস্কুলে ক্লাস-ওঠা বাড়ীতে সিডি-ওঠার চেয়ে সােজা, দেশে ফোর্থ ক্লাস অবধি উঠেছিল। তারপর কাশীতে এসে দু' বেলা সাজতে ও সাজ, খুলতে ব্যাপৃত থাকায় ইস্কুলে হাজিরা দেবার সময় নেই বলে ভর্তি হয়নি। দাশরথি বাবুর একমাত্র দুহিতা-যিনি প্রকৃতপক্ষে বিধবা হলেও কলেজে কুমারী বলে আখ্যা—তারই কাছে শিবানী মুখে মুখে ইংরেজী কথােপকথন শিখছে। তাকে গান শেখানাের জন্য সপ্তাহে তিন দিন একজন আসেন-ওস্তাদ নন, কারণ ওস্তাদের ধৈর্যের সীমা আছে, যদিও অন্যের ধৈর্য্যের সীমা সম্বন্ধে ওস্তাদ হচ্ছেন নাস্তিক। এই যার মােটামুটি পরিচয় সে যে সােমের মধ্যে পাত্রের উপযুক্ত নয় তা কি দাশরথি বাবুরা জানতেন না ? জাতেন। তবে সম্বন্ধ করলেন কেন? কারণ দাশরথি বাবুর এক ছেলে বিলেত ঘুরে এসেছে, আর এক পুতুল নিয়ে খেলা ছেলে বিলেতে সাত বছর থেকে Accountancy শিখছে, মেয়েকেও তিনি বিলেত পাঠাবার কল্পনা করেছেন—যদি সে সরকারী স্কলারশিপ পায়। কাজেই দাশরথিবাবুর ভাইঝিকে যে বিয়ে করবে তার স্বীভাগ্য যাই হােক শ্যালক ও শ্যালিকাভাগ্য গৌরবময়। শ্যালক ও শ্যালিকা সম্পদই তার যৌতুক। আর স্ত্রীও তত কঁচামাল, তাকে দিয়ে যা বানাবে সে তাই ববে। নিজের হাতে গড়ে নাও। কোনাে আফশােষ থাকবে না। সেই তাে গার্হস্থ্য স্বরাজ। আজকাল ঘরে ঘরে এত দাম্পত্য অশান্তি কেন? লােকে পরের হাতে তৈরি মেয়ে বিয়ে করে বলে। সব পরমুখাপেক্ষী। কাজেই সােমকে শিবানীর বর করতে দাশরথি বাবুদের দ্বিধা ছিল না, তাঁরা মনে মনে বছিলেন, উপযুক্ত নয়। তবে উপযুক্ত করে নাও। শত শত ভদ্রলোেক যাকে দেখে না-পছন্দ করুলেন সােম যে তাকে পছন্দ করবে এতটা ভরসা তাদেব ছিল না। তবে এ সব ভদ্রলােক আসলে হচ্ছেন কশাই, ওঁরা দাশরথিবাবুকে প্রকারান্তরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পণ কত দেবেন। দাশরবিবাবু প্রকারান্তরে বলেছিলেন, এক পয়সাও না। এমন সব শ্যালক শ্যালিকা থাকতে পণ? দাশরথিবাবু ক্রমশঃ বুঝলেন যে পণ অনুসারে পছন্দ। তবু তার মতাে মানী ব্যক্তি পণের কড়ি নিয়ে দরদস্তুর করবেন এ কি কখনাে সম্ভব ? আর কৃপাও তিনি কম নয়। সব দিক থেকে খতিয়ে দেখলে সােমের মতাে পাত্রই তঁার আশার স্থল। জাহ্নবীবাবুও দাশরথিবাবুর কথা ঠেলবেন না, যদি তার ছেলের দিক থেকে কোনাে আপত্তি না থাকে। দাশরথি বাবু মনে মনে একটা প্রকাণ্ড বক্তৃতা মুসাবিদা কবুলেন, যেন জুরির প্রতি জজের চার্জ। বাবা কল্যাণ, তােমরা নব্য তরুণ, তােমরা ভাবী ভারত, তােমরা পণ নিতে পারে না। কী চাও তোমরা? রূপ ? দেহের রূপ যে দেহের চেয়েও নশ্বর। বিদ্যা ? দুজনের মধ্যে শিবানী २१ একজন বিদ্বানই যথেষ্ট, নইলে বিরােধ অনিবাৰ্য। ডিগ্রী? হায়রে দেশ। ডিগ্রীর মােহ এখনাে মুছল না। ভেবে দেখ কল্যাণ, পৃথিবীতে শাশ্বত যদি কিছু থাকে সে হচ্ছে বনেদিয়ানা। আমরা বনেদি বংশ, কুলীন। আমাদের এভশনের জন্যে বহু শতাব্দী লেগেছে। এ বাড়ীর মেয়ে কেবলমাত্র জন্ম স্বত্বে এত বাঞ্ছনীয় যে চন্দনকাঠের বাক্সের মতাে রঙীন প্রলেপের অপেক্ষা রাখে। না। বাজারের মেয়ে হলে doী- shmentsআবশ্যক থাকত। তােমরা গৃহশ্রী৷ চাও না নটী চাও? ৩ সােম দাশরথি বাবুর পরিচয় পেয়ে রেলষ্টেশনের প্লাটফর্মের উপর ছুয়ে প্রণাম করতেই তিনি একেবারে গলে গেলেন। বল্লেন, “থাক, থাক, হয়েছে, হয়েছে। নিজের বিলেতফেরৎ ছেলেও তাকে সকলের সাক্ষাতে এমন মর্যাদা দেয় নি। ষ্টেশন থেকে বাড়ী পর্যন্ত তার বাত্তি হলাে না—ইত্তেজনায়। তারপর হাঁক দিলেন, “ওগাে যাদুমণি।” যাদুমণি বেরিয়ে আসতেই সােম তাঁকে একটি ভূমিষ্ঠ প্রণাম ঠুকে দিল। নিও হতবাক। সােম এদিকে একবার থেকে প্রণাম করতে লেগেছে। বাড়ীতে দুইতিনজন অভ্যাগত ছিলেন, তাঁরাও বাদ গেলেন না। দাশবথিবাবুর বিধবা মেয়ে কুমারী কাননবালা মিত্র চোখে চশমা এঁটে ঐ পথ দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন, যেন সােমকে দেখতেই পাচ্ছিলেন না-সােম তার পায়ের কাছে ঢিপ করে প্রণাম করলে তিনি প্রথমে চকিত ও পরে এন বিনম্রভাবে নমস্কার করলেন যে পাঠক ওখানে উপস্থিত থাকলে পাঠকের মনে হতাে মিস মিত্র ঐ নমস্কারের মহলা দিয়ে আসছিলেন পর থেকে তার শশাবার ঘরের আয়নার সম্মুখে। কৌতুহলী হয়ে শিবানী সিড়ি দিয়ে নেমে আসছিল, পাছে সােমের ভত্তির আবেগ সাগর লহরীর মত সেই মান্য বালিকার চরণে চুর্ণ হয় এই আশঙ্কায় যাদুমণি বিশ্র একটা নিৰে বাক্যের দ্বারা সেই বালিকাকে ২৮ পুতুল নিয়ে খেলা স্বস্থানে স্তম্ভীভূত করে দিলেন। দেখেশুনে সােমও তার ভালাে-ছেলেমির বেগ সম্বরণ করল। কে একটি চাকর এসে তাকে পাখা করতে লাগল। যাদুমণি বলেন, “বােসসা, বাবা বােসো।” দাশরথি বল্লেন, “তােমাকে দেখেছিলুম মুন্সীগঞ্জে তখন তুমি চার পাঁচ বছরেরটি।” যাদুমণি আপত্তি করে বলে, “না, না, আমার রবি তখন কোলে, আর এ ছেলে তখন হামাগুড়ি দিচ্ছিল।” দাশরথিবাবু বলে “সে কী বরে হয়। স্বামী স্ত্রীতে এই নিয়ে ঘােতর বচসা উপস্থিত। দুজনেই স্মৃতি-সমুদ্র মন্থন করে কার কখন চোখ উঠেছিল, হাম হয়েছিল, কাকে কোনখানে বঁকড়াবিছেতে কামড়েছিল, ভূতে পেয়েছিল, কে কোন বার গলায় মাছের বঁটা আটকে প্রায় পটল তুলেছিল—এই সকল অলিখিত তথ্য উদ্ধার করতে থাকলেন। বাড়ীর বুড়ী ঝি-বুড়ী ঝিদের নাম যা হয়ে থাকে তাই অর্থাৎ মােক্ষদা-তর্কের মােড ফিরিয়ে দিয়ে বল্ল, “ঠিক মায়ের মতো দেখতে তেমনি চোখ, তেমনি ভুরু, তােমার” যাদুমণি বল্লেন, “তুই ভারি মনে রেখেছি মােদা। অবিকল বাপের মতাে মুখ, যেন ঠাকুরপাে নিজেই এসেছেন এত কাল পরে। হাঁ বাছা, তােমার বাবার খবর দিলে না যে? ভালো আছেন তােত ? তােমার নতুন মাকে আমি দেখিনি। বেশ ভালাে ব্যবহার করেন তো? নতুন ভাইবোেন ক’টি ?” দাশরথি বল্লেন, “আহা, এক সঙ্গে এতগুলাে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে কেন?” এই বলে তিনি নিজেই আর একটি প্রশ্ন জুড়ে দিলেন। “ওহে, লণ্ডনে ধূর্জটির সঙ্গে তােমার দেখাসাক্ষাৎ হতাে ?” সােম ধূর্জটির নাম শুনেছিল, কিন্তু চেহারা দেখেনি। বল, “লওনের মত বিরাট শহরে পাঁচ শশা বাঙালী ছাত্র কে কোথায় ছিটকে পড়েছে, সকলের সঙ্গে সকলের দেখা হওয়া অসম্ভব। তাঁর ঠিকানাই জানতুম না।”
শিবানী সােম আসবে এই খবর পেয়ে শিবানীকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল, অন্যের কাছে পরীক্ষা দেবার তার দরকার ছিল না। সােমের পৌছানাের পর আবার সাজ সাজ রব উঠল। ধূর্জটির স্ত্রী এই বাড়ীতেই থাকেন, ববির স্ত্রী নােদায়। ধূর্জটি তিন বছর আগে একবার দেশে এসে স্ত্রীকে দেখা দিয়ে গেছল, ফলে তার একটি থােকা হয়, সেই খােকাটিকে বুকে করে তার বিরহবেদনার উপশম হচ্ছিল। শিবানীকে সাজানাের ভার তাঁরই উপরে পড়েছে—কাননবালার কলেজ থাকায় তিনি এ বিষয়ে দায়িত্ব বিরহিত। তিনি এসব বােঝেনও না, বুঝতে চাও না। ভালাে ছেলেরা যেমন টেরি কাটে না, সাবান মাখে না, সৌখীন শােষাক পরে না কাননবালারও তেমনি কেশ আলুথালু বসন এলােমেলাে ধরণ অগােছালাে। আবার সাজ সাজ রব উঠল। এবার এসেছে বিলেতফেৰ্তা পাত্র, পাড়ার পরােপকারিণীদের দ্বারে ডাকাডাকি করতে হলাে না, তাঁরা সাজ সাজ রবাহূত হয়ে নিজেরাই সেজেগুজে সমুপস্থিত হলেন। গাঙ্গুলীগিল্পী সেবার অপমানের কথা ধৰ্ত্তব্য মনে করুলেন না, তবে এবার মাদুরের উপর আসন না নিয়ে একখানা প্রশস্ত মজবুত চেয়ারে আসীন হলেন, যদি আবার অপমানিত হন তবে গাত্রোত্থানের জন্য পরমুখাপেক্ষী হবেন না। এবার শিবানীর সঙ্কট এত বিষম যে তাঁকে উপেক্ষা করবে কি সকলে তাঁকেই সঙ্কটের তারিণী ভেবে স্তুতি করতে সুরু করে দিল। সােম ঘুণাক্ষরে জানত না যে এত বড় একটা আয়ােজন চলেছে শুধু তারই মনােহরণের জন্যে। সে আরাম করে সারা দুপুর জুড়ে নিদ্রা দিল। কে একটি ছােট ছেলে তার শশাবার ঘরে ঢুকে ছুটাছুটি করে তাকে যখন জাগিয়ে তুঃ তখন পাঁচটা বাজে। চোখ মুখ ধুয়ে সে বসবার ঘরে গিয়ে দেখে দাশরথিবাবু সপার্বদে তার প্রতীক্ষা করছেন। “এই যে, কল্যাণ। বসাে, কেমন ঘুম হলাে। এতক্ষণ তােমার কথা এদের বলছিলুম।
৩০ পুতুল নিয়ে খেলা একেবারে মনে হয় না যে বিলেত থেকে ফিরেছ। কী ভক্তি কী বিনয় কী স্বদেশপ্রীতি—আমি তাে ভয়ে ভয়ে ছিলুম প্যান্ট কোট পর সাহেবকে কী খাইয়ে কোথায় বসিয়ে আদর আপ্যায়ন করব।” সমাগত অবসরপ্রাপ্তগণ নাকেব উপর চশমা চড়িয়ে সােমকে পৰ্যবেক্ষণ করতে প্রবৃত্ত হলেন। দুবছর বিলেতে থেকে তার গায়ের রং যতটা ফরসা হয়েছিল এই কয় দিনেই প্রায় ততটা ময়লা হয়েছে। তার চামভাব নীচে যে বিদেশী প্রভাব উহ ছিল টেলিস্কোপ বা মাইক্রোস্কোপেও তার পাত্তা পাওয়া যায় না, চশমা তাে ছার। কাপড় চোপড় বাঙালীর মতে দেখে তারা চশমা খুলে রাখলেন। কতকটা হতাশ সুরে বল্লেন, “না, আদৌ মনে হয় না যে বিলেত প্রত্যাগত।” তবু তাঁরা সে দেশ সম্বন্ধে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে চল্লেন। সােম সাধ্যানুসারে উত্তর দিতে থাকল। তার অন্য দিকে হুশ ছিল না। হঠাৎ এক সময় পর্দা সরিয়ে দুই তিন জন মহিলা একটি বালিকাকে ঘরের ভিতর জোরে ঠেলে দিলেন। পর্দা ছেড়ে দিলেন। বালিকাটি দুই হাতে একটি ট্রে ধরে তীরের মতাে সােজা সােমের দিকে এগিয়ে এলাে। সােম যদি হঠাৎ উঠে তার হাত থেকে ট্রে-টি তুলে নিয়ে নিকটবর্তী টিপয়ের উপর না রাখত তবে টাল সামলাতে না পেরে সে হয়ত সােমের গায়ে চা ঢেলে দিত। সােমকে একটি সরল চাহনি অর্পণ করে সে নত মুখে দাঁড়িয়ে কী যেন স্মরণ করতে চেষ্টা করল। যেন তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই-এই করতে হবে, শেখানাে কর্তব্য ভড়কে গিয়ে ভুলে গেছে। সােম যে হঠাৎ তার হাত থেকে ট্রে-টি কেড়ে নেবে এমন সম্ভাবনার জন্যে তাকে কেউ প্রস্তুত করে দেয়নি। সে যে ভূমিকায় অভিনয়ের তালিম পেয়েছিল তাতে কেউ ট্রে ছিনিয়ে নিলে ধন্যবাদ দিতে হয় এটুকু উল্লেখ ছিল না। তাকে তদবস্থা দেখে কারুর করুণা উপজাত হওয়া দূরে থাকুক সােম ছাড়া সকলের কোপ উক্তি হলাে, অভিনেতা পার্ট ভূলে গেলে শিবানী অডিয়েন্সের যা হয়। দাশরথিবাবু চোখ পাকিয়ে বলে, “নমস্কার করে। মেয়েটি বার-এক চোখ মিট মিট করে শশব্যস্তভাবে নমস্কার কবল। তখন সােম তার দশা হৃদয়ঙ্গম করে তার উপর থেকে সকলের মনােযােগ ছাড়িয়ে নিল। বৃদ্ধ কুমােহন বাবুর কাছে ট্রেশুদ্ধ টিপয়টি স্থাপন করে করষোডে বল্প, “আগে বয় প্রাচীন।” কুঞ্জবাবুর মঙ্গোলীয় নয়ন যুগল বিনা নেশায় ঢুলু ঢুলু। তিনি যুগপৎ বিস্মিত ও সস্মিত হলেন। কিছু না বলে একটি রসগােল্লা তুলে নিয়ে টপ, করে মুখে ফেলে দিলেন। দুই ঠোট একত্র হয়ে “আঁপপ” বলে একটা শব্দ সৃষ্টি করল। তারপর গণ্ডদ্বয়ের স্ফীতি প্রশমিত হলো ও চোখের কোণ থেকে খানিকটে জল ঝরে গেল তখন দাদা বল্লেন, “বেশ বানিয়েছে তাে। একটা মুখে দিয়ে দ্যাখ না, দাশরথি।” অতঃপর সুসজ্জিতা অন্য কয়েকটি মেয়ে ঘরে যতগুলি ভদ্রলােক ছিলেন ততগুলি থালা হাতে করে প্রবেশ করলেন ও সকলের হর্ষ বর্ধন করলেন। সােম এতক্ষণে টের পেয়েছিল যে এই সব সজ্জন তাকে পরীক্ষা করতে আসেননি, এসেছেন পরীক্ষাধীনার পক্ষীয় হয়ে পরীক্ষককে তােঘামােদ করতে। কিন্তু কোনটি পরীক্ষাণীনা? একটি না সব কটি ? কেউ তত কারুর চেয়ে কম সাজেনি। যেন সকলের জীবনে আজ পার্বণ। হয়ত প্রত্যকেই ভাবছে সােম কী মনে করে তাকেই পছন্দ করবে। বলবে, দেখতে এসেছিলুম বটে শিবানীকে কিন্তু পছন্দ হলে আমার (জ্যোৎস্নার মনে মনে) জোৎস্নাকে, (লিলির মনে মনে) লিলিকে, (শান্তিলতিকার মনে মনে) শান্তিলতিকাকে। কিন্তু মরীচিকার মত ঐ সকল মায়াললনা কোথায় মিলিয়ে গেল। সােম দেখল, সেই সর্ব প্রথম মেয়েটি (সেইটি শিবানী বুঝি) তথনাে তেমনি নতমুখে দাড়িয়ে আছে—নিশ্চল প্রতিমার মতাে। সুরূপা নয়, বেশ বা তার পক্ষের সঙ্গে অসমঞ্জস, যেন তার নিজের নিত্যকার নয়।
পুতুল নিয়ে খেলা কেবল দীঘল ঘন চুল এলায়িত হয়ে তার মধ্যে যা কিছু লাবণ্য যােজনা করেছে। মেয়েটির মুখভার বড সরল। মনে হয় এ মেয়ে রূপকথা শুনে তার প্রত্যেকটি কথা বিশ্বাস করে। তার বাড়ানাের ভঙ্গী ঋজু, সরল। মনে হয় এ মেয়ে আরাম কেদারায় বই হাতে করে লালিতা নয়, খাটুতে সােম নরম সুরে বল, “বন।” মেয়েটি সত্যিই বল। হুকুম যে। হুকুমের অবাধ্য হতে জানে না। ওদিকে দাশরথিবাবুরা মেয়েটার স্পর্ধা দেখে রুষ্ট হলেন। কিন্তু পাণ্টা হুকুম করলেন না। ভদ্রতার খাতিরে সােম দুটো একটা প্রশ্ন করল। দাশরথিবাবু বল্লেন, “অতবার ওকে আপনি আপনি বলছ কেন বাবা। ও তােমার অনেক ছােট। কাঙ্গালীবাবু বলেন, “সব দিক দিয়ে।” সরোজিনীবাবু বল্লেন, “লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামী ছাত্রের সঙ্গে আমাদের ওই পল্লীবালিকার তুলনা হয়। তবে ইনি যদি ওকে নিজ গুণে গ্রহণ করেন—যদি ওর নিগুণতা গ্রাহ্য না করেন—তবে দুই জেলা জজের পারিবারিক সংযােগ বড়ই হৃদয়গ্রাহী হবে।” চাটুভাষণ সমানে চঞ্জ। পরদিন যাদুমণি প্রসঙ্গটা তুনে। বল্লেন, “কেমন লাগল, বাছা, শিবানীকে ?” সােম গত রাত্রে ভেবে রেখেছিল এর উত্তর। মেয়েটি এমন অবােধ যে ওকে প্রবঞ্চনা করা নিতান্ত সহজ এবং সেইজন্যে সর্বথা পৰিহাৰ্য। ওকে বিয়ে না করুলেই চুকে যায়, কিন্তু বিয়ে করতে সােমের অনিচ্ছা ছিল । বরং ওর প্রতি সােমের প্রগাঢ় মমতা বােধ হচ্ছিল। কে জানে শিবানী কার হাতে পড়বে, শাশুড়ী দেবে ছক, ননদ করবে চিলেকোঠায় বন্দী, স্বামীটি গােপালের মতাে সুবােধ, প্রতিবাদ করবে না। ওর মতাে অবােধ মেয়েরাই তাে অত্যাচারকে আমন্ত্রণ করে। বল্প, “ভালােই লেগেছে। তবে “তবে?” “তবে আমার একটি এত আছে।” “ও মা পুরুষ মানুষের কী ব্রত।”যাদুমণি তাঁর কন্যা কাননবালার দিকে তাকিয়ে সােমের দিকে ফিরে তাকালেন। কাননবালা উৎকর্ণ ভাবে ছিলেন। বাক্য প্রক্ষেপ করলেন না। সােম বল, “আমার এত এই যে যার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হবে তার সঙ্গে আগে একবার আমি নির্জনে কথা বলতে চাই। কথাবার্তার পরে স্থির করব তাকে বিয়ে করব কি না।” “কী বল্পে।” যাদুমণি যেন হালুম হালুম করতে লাগলেন বাঘিনীর মতাে। “কী বল্লে তুমি। নির্জনে কথাবার্তার পর বিয়ে করবে কি না ভেবে দেখবে। ওগাে শুন্ছ। খুকীর বাবা। ডাক দেখি খুকী তাের বাবাকে। যাদুমণি গজরাতে থাকলেন। দাশরথিবাবু এক পায়ের একপাটি চটি বৈঠকখানায় ফেলে এলেন। উৰ্গশ্বাসে বল্লেন, “কী হয়েছে? কী? কী?” যাদুমণি ততক্ষণে স্মৃতির সঙ্গে কল্পনা মিশিয়েছেন এবং সেই মিশ্র সামগ্ৰীকে সােমের উপর আরােপ করে আবােরা কুপিত হয়েছেন। বল্লেন, “তােমার বন্ধুর ছেলে বলছেন তােমার ভাইঝির সঙ্গে আগে নির্জনে কথা বলবেন কি আর-কী করবেন, পরে বিয়ে করবেন কি আর-কী করবেন। ভাইঝি, না বাঈজি—কী দেখতে আসা হয়েছে কাশতে?” দাশরথিবাৰু লতি অপদ অপমানিত সােমকে ইঙ্গিতে বল্লেন, এসে আমার সঙ্গে। বৈঠকখানায় পাশে বসিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা ৩৪ পুতুল নিয়ে খেলা করলেন, “বিষম বদরাগী মানুষের পাল্লায় পড়েছিলে। আমি জানি উনি তিলকে বাড়িয়ে তাল করেছেন। আমাকে বলল তােত আসল কথাটা।” তখনাে সােমের হৃৎকম্প হচ্ছিল। অপমানে তার বাবােধ হয়েছিল। সে দুই হাতে মুখ ঢাকূল। এই সময় কাননবালা এসে দাশরথিবাবুর কাছে আসন নিলেন। “বললা বাবা, বলল। আমাকে তােমার বাবার মতাে মনে করতে পাবনা। তবু, সােম নির্বাক। “কী হয়েছে, তুই বল্ না খুকী।” খুকী বল্লেন, “হয়েছে যা তার জন্যে এই ভদ্রলােকের কাছে আমাদের মাফ চাওয়া উচিত। স্বাধীন দেশের স্বাধীন মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশাব অভ্যাস বশত যদি ইনি বলেই থাকেন যে শিবানীকে বিয়ে কবেন কি না স্থির করবার আগে একবার ওর সঙ্গে নির্জনে আলাপ করতে চান—যা ওদেশের একটা অতি নির্দোষ রীতি-তবে অন্যায় কিছু বলেননি। যে-কোনাে মডান যুবক তাই বলে থাকতেন ও যে-কোনাে মডার্ন মেয়ে তাই প্রত্যাশা করে থাকত।” দাশরথিবাবু শেষ পর্যন্ত শুলেন কি না সন্দেহ। একমনে ও দুই হাতের দশ আঙুলে দাডি বুরুষ করতে লাগলেন। যৌবনে ব্রাহ্মভাবাপন্ন ছিলেন। ভাৰ গেছে, প্রভাব আছে ও পরিপুষ্ট হয়ে আননভূমিতে কানন রচনা করেছে। বহুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বল্লেন, “যে সমাজে বাস কতে হচ্ছে সে সমাজের রীতি মান্য করতে হয়। নইলে তাের আমি পুনরায় বিয়ে দিইনি কেন?” সােম আড় চোখে কাননবালার মূখে তাকিয়ে দেখল তিনি সামসিন্দুর বদনে কী যেন ধ্যান করছেন। নিশ্চয়ই তাঁর লােকান্তরিত স্বামীর অরূপ নয়।
শিবানী “আমার স্ত্রীর কথায়,” দাশরথিবাবু বলতে লাগলেন, “তুমি কিছু মান কোরাে না, কল্যাণ। এদেশে যা সম্ভব নয়, তা ওদেশ থেকে ফিরে সম্ভব করতে চাও তাে আর-এক পুরুষ অপেক্ষা করাে। আমরা সেকেলে মানুষ, আমাদের উপর অধীত বিদ্যার প্রয়ােগ না করে আমাদেরকে শান্তিতে মরুতে দাও।” “কিন্তু, সােম উম্মার সহিত বল্ল, “আমি যা সম্ভব করতে চাই তা এমন কিছু নয়, একটু বাক্যালাপের নিভৃত অবকাশ।” “না, না,” দাশরথিবাবু দাডি নাড়লেন। “তুমি যে শুধু বাক্যালাপই করছ একথা পরে পাড়ার লােক বিশ্বাস করবে না।” “আপনার ভাইঝির মুখে শুনেও বিশ্বাস করবে না?” “না হে না। ওদের মধ্যে যারা দুর্মুখ তারা ও মেয়ের যাতে অন্যত্র বিয়ে না হয় সেই চেষ্টা করবে, বেনামী চিঠি লিখে পাত্র ভাঙিয়ে নেবে। ওদেরও তত বিবাহযােগ্যা মেয়ে আছে। এক যদি তুমি কথা দেও যে শিবানীকে পরে বিয়ে করবে তবে লােকনিন্দা আমরা সামলে নিতে পারব, যদিও এত বড বনেদী বংশের পক্ষে ওটা যেন বনস্পতির পরগাছা বনম্পতিরই মতাে দীর্ঘজীবী। আরো তত ছােট ছােট ভাইঝি আছে, ওদেরও একদিন বিয়ে দিতে হবে। না, হবে না?” কাননবালার পাতুর মূখ যেন এই কথাটি বন্দুতে চাইছিল যে, ঐসব আগত অনাগত শিশুদের বিয়ে হবে না বলে আমারও ভালাে করে বিয়ে হলাে না। সােম বঙ্গ, “কথা আমি দিতে পারব না নিভৃতে কথা বলার আগে। আপনাকে অহেতুক লােকনিন্দাভাজন কতেও আমার রুচি হবে না । অতএব বিদায়।” “সে কী হে। তুমি এখনি উঠবে। যা।”
পুতুল নিয়ে খেলা “যা অসম্ভব তার জন্যে আমি আর-এক পুরুষ কেন আর-এক ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে পারবাে না।” "সে কী হে। যা।” “যেতে হবে আমাকে সম্ভবের সন্ধানে—কুন্তোড কলিয়ারি, নানিয়ার পাড়া, লালমণির হাট, ভূসাওল, কোলাবা। একশাে সাতচল্লিশটা ঠিকানায় খোঁজ করতে হবে সম্ভবকে। এক জায়গায় বসে থাকলে চলে?” দাশরথিবাবু বুদ্ধি ধার করবার জন্যে অন্দরে উঠে গেলেন। ডাকলেন, “ও যাদুমণি।” স্বামীস্ত্রীতে যতক্ষণ ধরে বুদ্ধি দেওয়া নেওয়া চল ততক্ষণ বৈঠকখানায় সােম ও কাননবালা ছাড়া আর কেউ ছিল না। কাননবালা সােমের দিকে না তাকিয়ে বল্লেন, “বাস্তবিক, লােকনিন্দাকে এতটা ভয় করা অনুচিত।” সােম কাননবালার দিকে বিশেষ করে তাকিয়ে বল্ল, “লােকনিন্দার ভয়টা গৌণ। ভয় মুখ্যত আমাকে।” কাননবালা ঘাবড়ে গেলেন। সাহস সঞ্চয় করে বল্লেন, “কেন, আপনি কি বাঘ না ভালুক যে আপনাকে ভয় করতে হবে ? এই তাে আমি নিভৃত বাক্যালাপ কছি নির্ভয়ে।” কপট গাম্ভীর্যের সহিত সােম বল্ল, "সাবধান, মিস মিত্র। একাকিনী নারীর পক্ষে পুরুষ হচ্ছে বাঘ ভালুকের চেয়ে ভয়াবহ। কারণ বাঘ যদি আঁচড় দেয় তবে সে আঁচড একদিন শুকাতে পাবে। কিন্তু আমি যদি হাতখানি ধরে একটু নেড়ে দিই তবে সে ব্যথার চিকিৎসা নেই।” নার্ভাস হাসি হেসে মিস্ মিত্র বক্সেন, “মডান ইয়ং ম্যানদের অহঙ্কার দেখে এমন হাসি পায়। যেন আমরা কাচের পুতুল যে না পেলে ভেঙে গুড়িয়ে যাবে।” সােম তেমনি গম্ভীর ভাবে বঙ্গ, “একবার নাড়া দিয়ে দেশৰ নাকি?”
শিবানী
“বেশ তত। দেখুন না।” কাননবালা মুচকি হেসে চোখ নামালেন।
সােমের সহসা স্মরণ হলাে যে, না, আগুন নিয়ে খেলা আর নয় ।
যথেষ্টবার প্রেম করা হয়েছে। এবার করতে হবে বিয়ে।
দাশরথিবাবু যেন আবৃত্তি করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। “তােমার
কথাই রইল, কল্যাণ। শিবানী ও তুমি এই ঘরে বসে নির্জনে কথাবার্তা
কইবে, আর তিন পাশের তিন ঘরে থাকব আমি, খুকীর মা ও যুকী।”
সােম বিরক্তি দমন করে ঈষৎ ব্যঙ্গের সুরে বল্ল, “তিন দিকের দরজা
বন্ধ থাকবে, না খােলা থাকবে ?”
“খােলা থাকবে।”
“তা হলে আর নির্জন কী হলাে?”
“না, না, বন্ধ থাকবে।”
“কোন্ দিক থেকে বন্ধ থাকবে—বাইরের দিক থেকে না ভিতরে
দিক থেকে ?”
দাশরথিবাবু বল্লেন, “তাই তাে। তাই তাে। ওগাে যাদুমণি।”
আবার অলরে চনে।
পাঠ মুখস্থ করতে করতে দাশরথিবাবুর পুনঃ প্রবেশ।
“বাইরে থেকে বন্ধ থাকবে।”
“বাইরে থেকে যে বন্ধই থাকবে সারাক্ষণ তার স্থিতা কী।
“তুমি তাে ভারি সন্দেহী লােক হে।”
“কে সন্দেহী লােক তা নিয়ে তর্ক করতে চাইনে।” সােম উঠে
পাড়ালাে। "আচ্ছা, আসি।”
“য়া।” দাশরথিবাৰু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বল্লেন, “। বসাে,
বসাে। আমার কথাটার সবটা শােনাে আগে। তুমি বলছ, স্থিরতা
কী? আমি বলছি, আমি প্রতিশ্রুতি দিলুম।”
তিনি বলেন,
৩৮
পুতুল নিয়ে খেলা
“আপনি তত দিলেন, আপনার স্বী?”
“আমার স্ত্রী পতিপ্রাণা।”
তাই হলাে। শিবানীকে সােমের সঙ্গে রেখে তিন দিকে তিন দরজার
আড়ালে পাহারা দিলেন কেবল ওঁরা তিন জন না, ওঁদের বৌ, ওঁদের
দাসী মােক্ষদা এবং আরাে অনেকে। সােমকে শুনিয়ে শুনিয়ে দরজাগুলাে
সশব্দে বন্ধ হলাে। ক্রমশ গােলমাল থেমে এলাে। কিছুক্ষণ ফিসফিসানি
চল্ল। তারপর সব চুপ। সকলে কান পেতে রইলাে সােম-শিবানী
সংবাদ শুনতে।
সােম বল্ল, “শিবানী।” তার পর পাঁচ মিনিট স্তব্ধ থেকে ওঁদের
উৎকৰ্ণতাকে ক্ষুরধার কবুল।
সােম বল্ল, “শিবানী, একটি দরজা খােলা আছে। চলাে আমরা
পালাই।”
ওঁরা কাশলেন। কাশীর কাশি, মহাকাশি।
সােম বল্ল, “ওঁরা সবাই ঐ তিন ঘরে বন্ধ, কে আমাদের আটকাবে ?
এই যে, ধরো আমার হাত। ধরলে তাে? চলো।”
কপাটের খিল খসিয়ে টান মেরে হুড মূড করে ওঁরা এসে সােমের
ঘাডে পড়লেন। সে দুষ্ট তখনাে তেমনি ভাবে যথাস্থানে উপবিষ্ট,
শিবানীও তার থেকে তেমনি দূরে।
প্রথমে মুখ ফুটুল যাদুমণির। তিনি বিনা গৌরচন্দ্রিকায় বলেন,
“ছােটলােকের ব্যাটা, বেজন্মা ।”
দশরথি ইস্কুলে একটি মাত্র গালাগালি শিখেছিলেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত
ঐ ছিল তার সম্বল। এমনি তাঁর একনিষ্ঠতা। বল্লেন, “Donkey,
monker, robber."
মিস মিত্র আমতা আমতা করে বল্লেন, “হৃদয়হীন, উদাসীন।”
বৌমা শিবানীকে হিড়হিড করে টেনে নিয়ে গেলেন। মােক্ষ
শিবানী
স
বল্প, “ছু হয়ে ঢােকে, ফাল হয়ে বেলােয়। কাল যখন এসে পেরণাম
করুল আমি ভাব সােনার চাদ ছেলে। ওমা, এর পেটে এত ছিল।
আগুনমুখাে, ভ্যারা।”
সােম এ সবের জন্য এক বকম প্রস্তুত হয়েই ছিল। বস্তু, “প্রতিশ্রুতি
এমনি করে রাখতে হয়।”
দাশরথিবাবু ধমক দিয়ে বল্লেন, “যাও, যাও, সাধু পুরুষ। প্রতিশ্রুতির
যােগ্য বটে।”
যাদুমণি তাড়া দিয়ে বলেন, “ভাগ, ভাগ, আমার বাড়ী থেকে।
নইলে—
“নইলে ?”
“নইলে পুলিশ ডাকব।”
“তবে তাই ডাকুন। আমি সহজে গা তুছিনে।” এই বলে সােম
একটা চুরুট ধরালাে। এই লােকগুলির উপর তার ভক্তির লেশমাত্র
অবশিষ্ট ছিল না।
ঘরে পুলিশ ডাকলে কেলেঙ্কারির একশেষ হবে। দাশরথিবাবু
গিন্নীকে বল্লেন, মেজাজ ঠাণ্ডা করতে। সােমকে বল্লেন, “ভদ্রলােকের
ছেলে, মানে মানে বিদাও হও।”
সােম বন্ধ, অপমানের কী বাকী রেখেছেন ? কেন চোরের মতাে
সরে পড়বাে? ডাকুন পুলিশ, একটা এজাহার লেখাই, পাড়ার লােক
ভিড করুক, একটা বক্তৃতা দিই। বলি সবাইকে ডেকে নির্জন ঘরে কী
করেছি”
“কী করেছ।” দাশরথিবাবু আঁৎকে উঠলেন।
“কী করেছি তা আপনার ভাইঝিকে জিজ্ঞাসা করুন।”
দাশরথিবাবু মেজের উপর ধপ করে বসে পড়লেন। মােদা পাখা
নিয়ে ছুটে এলাে। মিস মিত্র চিৎকার করে “ম্মেলিং সল্ট* হেঁকে এ
৪০
পুতুল নিয়ে খেলা
ঘর ও ঘর করতে থাকলেন। যাদুমণি এক ঘটি জল এনে স্বামীর মাখা
উজাড় করলেন। মােক্ষাকে বঙ্গেন, “তুই আমার হাত পাখাটা দিনে
যা, আরাে জল নিয়ে আয়।”
সােম পায়ের উপর পা রেখে নির্বিকারভাবে চুরুট ফুকতে থাকল।
যেন ফোটোর জন্যে post করছে ।
* BHAWAHIFT HITRASENPUR HOWRAH r 18 TASY 0 সুলক্ষণ। কাশীতে এক বনেদী বংশের এইরূপ সর্বনাশ সাধন করে বাঙালী Casaaoya কল্যাণকুমার সােম দেওঘরে উপনীত হলেন। তাকে নিতে এসেছিল সত্যেনবাবুর মেজ ছেলে শুভ্র আর সত্যেনবাবুদের বাড়ী আজ্ঞা দিয়ে থাকে একটি যুবক, তার ভালাে নাম যে কী তা কেউ জানে না, ডাক নাম মাকাল। মাকালকে সােম একদা চিত। আই-এতে দু' বছর একসঙ্গে একঘরে বসেছিল, এই পর্যন্ত। এতদিনে উভয়েরই আকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অবস্থা হরে দরে সেই একই জনেই বেকার। মাকাল জিজ্ঞাসা করল, “চিনতে পারছেন?” “পারছি বৈকি,” সােম বল্ল, “কিন্তু আপনি কেন? “তুমি’র কী হয়েছে ?” মাকাল খুসী হয়ে বঙ, “বাপবে, তােমরা হলে বিলেত ফেরং। তােমাদের সঙ্গে এক রাস্তায় হাঁটতে পারা আমাদের মতাে অস্পৃশ্যদের সৌভাগ্য।” শুভ্র ছেলেটি স্কুলে পড়ছে। সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের মতাে তার মুখ- মণ্ডল। তার জীবনে প্রভাতকাল। শুভ্রকে দেখে সােম দীর্ঘশ্বাস ফেল্প। ইচ্ছা করলে ঐ বয়সের স্ত্রী পাওয়া যায়, কিন্তু ইচ্ছা করলে ঐ বয়সকে ফিরে পাওয়া যায় না। যৌবন আনে ক্ষমতা, কৈশোের দেয় । ক্ষমতার নেশায় শ্রীকে থাকা যায় ভুলে, কিন্তু নেশার ফাঁকে হঠাৎ একদিন ৪২ পুতুল নিয়ে খেলা তার উপর দৃষ্টি পড়লে ক্ষমতাকে নিয়ে সান্ত্বনা পাওয়া যায় না। তাই ব্রজের গােপবালক চিরদিন আমাদের প্রতি পেয়ে আসছে, কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণকে আমরা চিনিনে। বয়ঃ কৈলােরকং বয়। সত্যেনবাবু, বাতে পঙ্গু অবস্থায় সােমকে অভ্যর্থনা কবুলেন। “তুমি এসেছ দেখে বড় আনন্দ পেলুম। আমাদের এ দিকে তােমার মতাে কৃতী কাচাড় যুবকের আসা একটা event বুলুকে তােমার পছন্দ হােক বা নাই হাে তাতে কিছু আসে যায় না, তােমার আসাটাই আমার পক্ষে ধন্বন্তরীর আগমন।” ভদ্রলােক বলে চল্লেন-বলা ছাড়া তাঁর করণীয় আর কী ছিল? “ইমােরােপ। ইয়ােরাপের আকর্ষণ আবাল্য আমাকে অস্থির করেছে, কিন্তু এ জন্মে হয়ে উঠল না, যাওয়া হয়ে উঠল না। মা বুলু, শুনে যাও তাে মা।” আঠারাে উনিশ বছর বয়সের একটি সুগঠিত সুমধ্যমা তরুণী সােমকে একটি নমস্কার করে ব, “কী বাবা।” “সেই পুরােনােমােটা ছবির বই দুটো একবার আতে পারে, মা ? ইনি দেখবেন। সেই যে ১৮০৪ সালের ছাপা, ইংরেজী ও ফরাসী দুই ভাষায় মুদ্রিত।” “বুঝেছি,” বলে বুলু বই আনতে গেল। সত্যেনবাৰু নিম্ন স্বরে বল্লেন, “আমার বড় মেয়ে সুলক্ষণ। এরই কথা তােমার বাবাকে লিখেছি।” মােটা মােটা দু’ থানা ভলুম বুলু একা বয়ে আনছে দেখে সােম ছুটে যেতে দ্বিধা কল না। “দিন, দি, আমার জন্যে আনা বই আমাকে দি। এ কি অবলা জাতিৰ কৰ্ম্ম।” সুলক্ষণার মৃদু আপত্তি নােম গ্রাহ করল না। সত্যেনবাবু খুব হেসে বল্লেন, “অবজাতিকে অবত্র কোনাে না সুলক্ষণা হে। তুমি নিজেই দেখে এসেছ ওঁরা সমুদ্র সৎরে পার হচ্ছেন, আকাশেও ওঁরা উজ্জীন। আর আমাদের এই বুলুর বীণাখানি দেখবে এখন।” ১৮০৪ সালে ইংলণ্ডে মুদ্রিত সেই গ্রন্থে পটের মতে রংচঙে ছবির চূড়াছডি। নানা দেশের নানা বেশভূষাধারী মানুষের প্রতিকৃতি ও বর্ণনা। সেকালের যানবাহন তৈজস আসবাব ইত্যাদির অনুকৃতিও ছিল। সত্যেনবাবু সােমের মনােযােগ ভঙ্গ করে বলেন, “আমার সংগ্রহে এর চেয়ে পুরাতন চিত্রপুস্তকও আছে, কল্যাণ। দেখবে তুমি ক্রমে ক্রমে। এখানে থাকা হবে তােত কিছুদিন ?” “সেটা গৃহস্বামীর ইচ্ছাধীন।” “বেশ, বেশ, তােমার যতদিন খুশী ততদিন থাকো। তােমাদেরই জন্যে তাে এ বাড়ী করেছি। আমার স্ত্রী নেই, আমারও থাকা না থাকা সমান। তান শুনতে শুনতে প্রাণটা আছে বীণার তারে বাঁধা। তুমি স্পিরিচুয়ালিজম বিশ্বাস করে তােত ? “আজ্ঞে, না।” “বিশ্বাস যখন করাে না তখন তােমাকে বােঝানাে অসম্ভব কী পথ্যের উপর আমি বেঁচে আছি।” ভদ্রলােকের চলৎশক্তি নেই, কিন্তু বলৎশক্তি বিলক্ষণ। বব কতে ভালােবাসেন বলে যেকেউ একটু মন দিয়ে বা মন দেবার ভাণ করে তার কাছে এক ঘণ্টা বল সেই তার বয়ঙ্গের মতাে প্রিয় হলো। মাকাল এদের অন্যতম। ভদ্রলােক যৌবনে কবিতা লিখতেন। শিশুপাঠ্য পুস্তকে কবি শব্দের সংজ্ঞা দেওয়া আছে, “কবি—যে কবিতা লেখ।” অতএব সত্যেনবাবু ছিলেন কবি। তারপরে একটি মহকুমা শহরে এম্-এ বি-এ উকীলরূপে তাঁর আবির্ভাব ঘটুল। বাগ্মিতা ও বিদ্যা প্রথম কয়েক বছর রজতপ্রসু হলাে না। রজতের অভাবে ৪৪ পুতুল নিয়ে খেলা বন্ধনগৃহে ইন্ধনের অভাব হলে গৃহিণী একদিন কবিতার পাতাগুলির দ্বারা সে অভাব দূর করলেন। এমন সময় রাজায় প্রায় বাধল দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা। সব উকীল জমিদারের মুঠাম। একা সত্যেন রক্ষা করেন প্রজাদেব স্বত্ব। তাঁর সঙ্গে যােগ দিলেন এক কানা মােক্তার। প্রজারা নিজেদের মধ্যে চঁাদা কবে মামলার খবচা জোগালাে আড়াই বছর। সত্যেন উকীল ও সফরাজ হােসেন মােক্তার পকেট ও জেব বােঝাই করে আব পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরতে পারলেন না, গাভী কিনে ফেল্লেন। আর বাড়ী ফিরে কি আরাম আছে—মহকুমা শহরের বাড়ী। হােসেন চল্লেন হজ করতে। সত্যেন দালান দিলেন দেওঘরে। জমিদারের সঙ্গে বিবাদ করে ওকালতী করা যায় না। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সংসারও তার বিস্বাদ বােধ হলো। আড়াই বছরে উপার্জন যা করে- ছিলেন তা পঞ্চাশখানা গ্রামের পচিশ হাজার কৃষকের সঞ্চয় ও ঋণ। তার সুদের সুদে পুরুষানুক্রমে বীণা বাজানাে যায়। # যৌবনে যখন তিনি কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর তখন থেকেই তিনি অনুকরণ করে আসছিলেন। অবশ্য সদরে। অন্দরে তার কণ্ঠস্বর তার স্বকীয় । তবে সােমের আগমনে তাঁর সার অলর একাকার হয়ে গেছে। মাকাল যা বর্ষাধিক কালের সাধনায় লাভ করতে পারল না সােম শুধুমাত্র বিলিতী ডিগ্রীর জোরে তাই দখল করল। সােমের জন্য রান্না করল স্বয়ং বুলু। পাতা পড়ল বিশেষ একটি ঘরে। পর্বতকে মহম্মদের কাছে বয়ে নিয়ে যাওয়া হলাে। সেখানে তিনি যে পথ্য গ্রহণ করলেন বলা বাহুল্য তা স্পিরিচুয়ালিজম নয়। “ওরে বুলু,” তিনি খেতে বসে বল্লেন, “তাের হাতের অদ্ভুত ভূন যে ফুরিয়ে এলাে আমার। বাবা কল্যাণ, আশা করি অমৃতকে তুমি অম্বত বলবে।” সােম বঙ্গ, “আর-একটু ঝােলাত পেলে মন্দ হতাে না।
সুলক্ষণা ৪৫ সত্যেনবাবু ব্যস্ত হয়ে রবীন্দ্রেতর স্বরে বল্লেন, “আর-একটু, আর- একটু ঝােল দিয়ে যা তােত এঁকে।” রাত্রে সঙ্গীতের জলসা। হিন্দী ও বাংলা গানের ওস্তাদদের পালা সাদ হলে সুলক্ষণা শ্রোতৃমণ্ডলীকে নমস্কার করে বীণা হাতে নিল। চতুর্দিকে ধ্বনিয়ে উঠল, ঝন ঝন ঝন। বীণাবাদনের দ্বারা সে একটি মায়াময় পবিমণ্ডল সৃজন করতে থাকল। যেন আদেশ দিল "Let there be light” অমনি আলােকের জন্মরহস্যে পূৰ্বদিক উদ্ভাসিত হলাে। তারপর হুকুম করল, “Let there be a firmament,* অমনি প্রকাশিত হলাে মহাকাশ। গান বাজনার ভালােমন্দ সােম বােঝে না, সঙ্গীতে তার প্রবেশ নেই। সেই যে তার এক বন্ধু প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামের গ্যালেরীতে লম্বমান আলেখ্যরাজি সম্পর্কে বলেছিল, “এ আর কী দেখব? এর একটা অন্যটার মতন। হুবহু এক।” তেমনি রাগ- রাগিণী সম্বন্ধে সােমেরও পার্থক্যবােধ ছিল না, ওসব হুবহু এক। তা সত্বে সঙ্গীতের সনােহন সরীসৃপকেও বশ করতে পারে, সােম তাে মানুষ। সুলক্ষণা যেন তাকে মন্ত্র পড়ে বন্দী করল। বীণাবাদনের সঙ্গে জড়িয়ে বীণাবাদিনীকে সােম অসামান্য রূপলাবণ্যবতী অপ্সরা জ্ঞানে পুরস্কার স্বরূপ তার হৃদয় নিক্ষেপ করল। চেয়ে দেখল সত্যেনবাবু, চোখ টিপে মাথা নেডে তারিফ করছেন, মাকাল ঢুলু ঢুলু, ফটিকবাৰু প্রবােধবাবুরা হাত দিয়ে উরুর উপর তাল ঠুকছেন। সুলক্ষণা বাদন সারা করে আবার একটি নমস্কার করে বীণা নামিয়ে রাখল। সকলে গর্জে উঠলেন, সাধু সাধু সাধু। প্রশংসা বাক্যের কোলাহলমুখর হটস্থলী ত্যাগ করে সােম বাইরে নক্ষত্র সভামণ্ডপের নীচে গিয়ে দাড়ালাে। তার মনে হতে লাগল সে অমন একটা ব্ৰত গ্ৰহণ ৪৬ পুতুল নিয়ে খেলা না করলেই পারত, কে তাকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল। এই মেয়েটিকে স্বীরূপে পাবার প্রস্তাব আজই করা যায়, সত্যেনবাবু তাে তাই প্রত্যাশা করছেন। বিয়ের পরে কোন মেয়ে স্বামীকে ভালাে না বাসে যদি স্বামীর ভালােবাসা পায় ? সােম তাকে খুব খুব খুব ভালােবাসূবে, তার বীণা শুনে তার কোনাে খুৎ মনে আবে না। খাবার সময় সত্যেনবাবু জিজ্ঞাসা করছেন, "কি হে। বুলুর তানালাপ তোমার কেমন লাগল তা তাে বল্পে না ?” সােম শুধু বলতে পারুল, “আমি মুগ্ধ হয়েছি।” তার তখন একমাত্র চিন্তা তার ব্রতের কী হবে। “ওরে বুলু, শােন, ইনি কী বললেন। তাের শিক্ষা সার্থক। তুমি বােধ হয় জানাে না, কল্যাণ, ওকে আমি শান্তিনিকেতনে দিয়েছিলুম। কবি বড় মেহ করতেন। ওকে স্বহস্তে একটি কবিতা লিখে দিয়েছেন, দেখবে এখন।” প্রতিভা ও সাধনা বিয়ের বাজারে না বিকালে সাধক হয় না ও কথা থেকে সােম এই সিদ্ধান্ত টেনে বের করল। তখন তার অন্তুর বিষিয়ে উঠল প্রতিবাদের তীব্র তাড়নায়। ব্যঙ্গোক্তি তার মুখের প্রান্তে টলমল করুল। সে বলতে চাইল, বীণা বােধ করি এত ভালাে করে বাত যদি না তার উপর ঘটকালির ভার থাকত। কিন্তু তাতে সুলক্ষণা আঘাত পাবে। আনন্দদামিনীকে আঘাত করতে সােমের মুখ ফুটল না। নােমর মােহ অপগত হলাে। সে ভাবল, মেয়েদের কনুশীলন বিবাহান্ত। বিবাহের পরে কাব্য ভােলা হয় শিকায়, ৰীণা জমা হয় মালগুদামে। বিবাহের দু' বছর পরে শিবানী যা সুলক্ষণাও তাই- গৃহিণী এবং জননী। এদের যে কোনাে একজনকে নিয়ে সুখে দুঃখে খুহকোণে জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। তবে কেন খুলনার বেলায় এতে ব্যতিক্রম হবে? না, হৰাৰ কোনাে কারণ নেই। ফুৰে না।
সুলক্ষণা ৪৭ পরদিন সত্যেনবাবুকে তার ব্রতের কথা বলবে-ববে করছে এমন সময় তিনি আপনি প্রস্তাব কবুলেন, “যাও তােমরা, বুড়ো মানুষের কাছে বসে থেকো না। একটু বেড়িয়ে এসাে।” সােম শুভ সুলক্ষণা ও মাকাল বেড়াতে বেরলল। সমের আশা হলাে যে মাকাল ও শুভ্র একটু দূরে দূরে হাঁটুবে ও নিজেদের মধ্যে গল্প কবতে থাকবে। সােম শুনতে পেলাে মাকাল শুভ্রকে বল্ছে, “আমি রেস খেলি তার আসল কারণ কী জানাে? জীবনের সর্ববিধ প্রকাশে আমার সমান আগ্রহ।” শুভ্র তা নিয়ে তর্ক করছে। ছেলেমানুষী তর্ক—নীতিবচন আওডে হিতাহিতের ভাগবাটোয়ারা। মাকালের সৰ্ববিধ প্রকাশে সমান আগ্রহ যে খাটি মাকাল তা প্রতিপন্ন করছে পােষাকে। তার পরনে টেনি ট্রাউজার্স, কোটের বদলে ড্রেসিং গাউন, হাটের বদলে পশমের টুপি। তার পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি। সােমের হাসি পেলাে। সে সুলক্ষণাকে বল্ল, “সান্ধ্যভ্রমণের পক্ষে ওরূপ পােষাকের বিশেষ কোনাে উপযােগিতা আছে কি?” সুলক্ষণা মৃদু হেসে বল্ল, “ওর বিশ্বাস উনি রবীন্দ্রনাথের অনুবর্তন করছেন। মহাকবি জুততা ভেঙে চটির মতাে করে পায়ে দেন, পরেন পায়জামা ও চড়ান আলখাল্লা। তাঁর টুপিরও মাকালদা নকল করেছেন। আপনি শুনলে অবাক হবেন যে মাকালদা ঐ পােষাকে কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছেন।” সােম অশ্য অবাক হলাে না। সবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কবি তার পরিচ্ছদের প্যারডি দেখে কী বল্লেন ?” “কী আর বলবেন? বােধ হয় ভালেন যে সব হয়েছে, দাড়িটি হয়নি।” সােম কয়েক বছর আগে শান্তিনিকেতনে গেছল। তখন সুলক্ষণা ওখানে ছিল কি না, থাকলে সােম তাকে দেখেছে কি না তাই নিয়ে ৪৮ পুতুল নিয়ে খেলা কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলাে। ততক্ষণে মাকালরা অনেকদূর গেছে। ইচ্ছাপূৰ্ব্বক কি অন্যমনে তা কে বলবে ? “আপনার সঙ্গে, সােম চলতে চলতে বল্ল, “নির্জনে আমার কিছু কথা ছিল। এতক্ষণ যে কথাবার্তা হচ্ছিল সেও নির্জনে, তবু সেটা নির্জনে বলে সুলক্ষণার খেয়াল ছিল না। “নির্জনে” শব্দটার প্রয়ােগে সে সহসা সচেতন হয়ে সচকিত ভাবে এদিক ওদিক চেয়ে দেখল। পুরুষ মানুষের সঙ্গে সে কতবার কথা কয়েছে, কিন্তু এক ঝাঁক পাখীর মধ্যে একটি পাখীর মতাে। শান্তিনিকেতনে মেলামেশা ঝাঁকে বদ্ধ থেকে, তাই বাড়ীতেও মেলামেশার সময় ঝাঁক না থাকলে ফাক বােধ হয়, গা ছম ছম করে। যে মেয়েটি এতক্ষণ বেশ সপ্রতিভ ছিল তার ব্যবহারে কেন আড়ষ্টভাব সােম তা বুঝতে পারল না। কিন্তু লক্ষ করল। বক্তব্যটাকে এমন মানুষের গ্রহণযােগ্য করবার জন্যে সে নীরব থেকে নিজের মনে বহু বার মহলা দিল, মােলায়েম করল। বল্প, মুলক্ষণা দেবী, আপনাদের বাড়ীতে আমি কেন অতিথি হয়েছি তা হয়ত জানেন, অন্তত অনুমান করেছেন। আপনাকে আমার কেমন লাগল আপনার বাবা প্রকারান্তরে এই প্রশ্নই করেছিলেন, আমি যে উত্তর দিয়েছি আপনি তা শুনেছেন। এখন আমাকে আপনার কেমন লাগল এই আমার জিজ্ঞাস্য।” স্বলক্ষণ তার সপ্রতিভ ফিরে পেলাে, কিন্তু ভাবা ফিরে পেলাে । এবার পা নয়, লা। “বুঝেছি, সুলক্ষণা দেবী, সােম বড়, আপনার ছিল বীণা, সেই
সুলক্ষণা
৪৯
দিল আপনার পরিচয়। আমার ত তেমন কিছু নেই, আমি আপনার
অপরিচিত। অপরিচিতকে কেমন আর লাগবে।”
সুলক্ষণার কুষ্ঠিত দৃষ্টি থেকে এর অনুমােন পেয়ে সােম বলে গেল,
‘আপনার পরিচয় বীণাতে, আমার পরিচয় বাণীতে। বীণা চেয়েছিল
জনতা, বাণী চায় বিজনতা। এখন বুঝলেন তাে কেন নির্জনে কিছু
কথা ছিল ?”
‘নির্জনে শুনে সুলক্ষণা আবার চমকালাে। কিন্তু এবার সে
ঔৎসুক্য বােধ করছিল। সােমের পরিচয় বিজ্ঞাপনে যা পড়েছিল তার
বেশী কী হতে পারে শােনা যাক। সে কি শিকারী, না সে বাঁশী বাজায়,
বা সে খুব বেড়িয়েছে ও বেড়াতে ভালােবাসে।
সােম বল্ল, “সুলক্ষণা দেবী, আমি গুণী নই। গানবাজনার সারে
গামা ও পটু গালের ভাঙ্কোডাগামা এদের মধ্যে কে কার মামা জানিনে
সূছেন ? তবে কেউ কারুর মামা নয়। বাঁচা গেল। গামার কথায়
মনে পড়ল আমি পালােয়ান নই। পালের কথা যখন উঠল তখন
বলি গােষ্ঠ পাল হয়ে থাকলে দেওঘরের বল কি করে গিরিডিতে
ফতুম, সেই হততা আমার পরিচয়। খুব হাসছেন। তা বলে মনে
কবেন না যে আমি হাস্যরসিক। লেখকও নই, অভিনেতাও না।
আর হাসাতে যদিও পারি হাতে তেমন পারিনে। ভাবছেন, হয়ত
দীনি। না সুলক্ষণা দেবী, বিধাতা ও তার বিধানের উপর আমার
আক্রোশ কি অভিমান কি সংশয় কি অশ্রদ্ধা নেই।”
এ পর্যন্ত এসে সােম হঠাৎ থাল। সুধালাে, “শুনতে আগ্রহ বােধ
করলে বলুন, বন্ধ করি।”
সুলক্ষণা সজভাবে ব, “না।”
সােম দুষ্টুমি করে বল্ল, “শুনবেন না? ত হলে বন্ধ করি।”
সুলক্ষণা আবার তেমনি সলজ্জভাবে ব, “না।”
পুতুল নিয়ে খেলা
“কোনটা না ? শােনাটা, না বন্ধ করাটা ?”
নাছােড়বান্দার হাতে পডেছে, খুলে বলা ছাড়া গতিরন্যথা। কিন্তু
কথাটা যেই তার মুখ ছেড়ে রওনা হলে মনটা অমনি লজ্জায় মাটিতে
মিশিয়ে গেল।
সােম হৃষ্ট হয়ে বল্ল, “বেশ, এখন আমার সাত খুন মাপ। তবে খুন
আমি হিসাব করে দেখতে গেলে ছয় বার করেছি”
সুলক্ষণা “উঃ” বলে উঠে থকে ভালাে। তার পাংশু মুখে
আতঙ্কের নিশান।
সােম হেসে বল্ল, “ভয় নেই, আপনাকে খুন করব না। খুন খারাবি
জীবনের মতাে ত্যাগ করেছি, সুলক্ষণা দেবী।”
এতক্ষণে সুলক্ষণার ঠাহর হলাে যে খুন করা অর্থে অন্যকিছু বােঝায় ।
নিজের মুগ্ধতায় অজিত হওয়ায় আবার তার মুখে রক্ত সঞ্চার হলাে। সে
অস্বস্তির স্বরে বল্ল, “ও।”
সােম বল্প পরিহাস ভরে। “আপনাকে সবই বিশ্বাস
কানাে যায় দেখছি। যেমন অকস্মাৎ বল্লেন ‘উঃ তেমনি অবলীলাক্রমে
বলেন, ওঃ। এবার আমি যদি ঘােষণা করি যে আমি লােকটা
কেবল যে নিগুণ তাই নয় আমি রীতিমতাে চরিত্রহীন তা হলে
আপনি বােধ করি তৎক্ষণাৎ বলবেন ই। কেমন ?”
সুলক্ষণা নিরুত্তর।
“কিন্তু, সােম গম্ভীরভাবে বস্তু, "এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা যার জন্য করা
গেল সেটা ও ছাড়া আর কিছু নয়, সুলক্ষণা দেবী।”
“বুঝতে পারলুম না, সুলক্ষণা উভ্রান্ত হয়ে ।
“বছিলুম, সােম সভয়ে বল্ল, “আমি চরিত্রহীন।”
“ছি,* সুলক্ষণা বিরক্ত হয়ে বঙ্গ, “ তা বল্বেন না।”
“বিশ্বাস করলেন না?” সােম কাতৰ ৰূরে সুধালাে।
t
old a. স্বলক্ষণা “না।” সুলক্ষণা দৃঢ় “কিন্তু, সােম অযোগের সুরে বল্প, “পরেআমাকে দোষ দেবেন না এই বলে যে আমি আপনার বুকে সত্যাচরণগুনি।” সুলক্ষণা বাস্তবিক বুঝতে পারছিল না। ছিল না। সপােষে বল, “বুঝতে পাছিনে, কল্যাণবাবু।” সােম হাল ছেড়ে দিয়ে বল্ল, “চলুন, ফেরা যাক। বিয়ে যে আমাকে কবেন সে ভরসা আমার নেই। খামখা আপনাকে আমার বিশ্বাসভাগী করি কেন?” সুলক্ষণা বিমনা হয়ে রইল, বাড়ীতে কার সঙ্গে কথা কইল না সহজে। সত্যেনবাবুর মনে ধোঁকা লাগল। মাকালকে ডাকিয়ে গােপনে তদন্ত করলেন। সে বল্ল, “ওদের মধ্যে কী নিয়ে আলাপ হলাে, কি আলাপ একেবারেই হলােই না, তা তাে আমি জানিনে। আমার কি স্বার্থ বলুন, কেন চরবৃত্তি করব ?” মাকালের মতাে মহা ভক্তের মুখে এমন রূট বিদ্রোহের কথা সত্যেন- বাবু এই প্রথম শুনলেন। কিছু একটা ঘটেছে, বেশ একটা রহস্যময় ঘটনা, বােমহর্ষকও হতে পারে, এই সন্দেহ পঙ্গুকে একান্ত অসহায় বােধ করালাে। এমনিতেই তিনি বিষম অভিমানী মানুষ, অভ্যস্ত ভক্তি শ্রদ্ধার এক ছটাক কম পড়লে তার চক্ষু ক্রমশ জলাশয় হয়ে ওঠে, কেউ যদি তার বাগ্মিতার প্রতি অমনোেযােগী হলাে অমনি তার কণ্ঠস্বরে আর্দ্রতা উপস্থিত হয়। আর প্রতিবাদ যদি কোনাে হতভাগা কোনাে কথার করুল তবে তিনি এক নিমেষে হতাশন। “আমি মূর্খ ? আমি মূঢ় ? আমি অকৰি ? আমি অতরুণ ? এই তো তােমা-না, না, আপনার —মনােগত ধারণা? এই তত? এই ত? ধিক, পিতৃমণী পিতৃক ব্যক্তির প্রতি ঈদৃশ অনাস্থা, অশ্রদ্ধা, অশিষ্টতা, অর্বাচীনতা।
পুতুল নিয়ে খেলা গুরুদেবকে সেদিন আমি টেলিগ্রাম করে আপত্তি জানিয়েছি, জানিয়েছি যে তিনি বুদ্ধদেব বসুর প্রশংসা করে আমাদের দফাটি সেরেছেন, ঐ সর্বনেশে ছােরার সুখ্যাতিতে সর্বনেশে ছােরাদের সংখ্যা ও প্রতিপত্তি যে কতখানি বেড়ে গেছে তার দৃষ্টান্ত তুমি—না, না, আপনি।” মাকাল যে তার সমবয়সীদের মতাে দুর্বিনীত দুর্নীত ও দুঃশীল নয় এর দরুণ তার জন্যে সত্যেনবাবুর হৃদয়ের এক কোণে একটু জায়গা ছিল। তিনি তাকে কিছু স্নেহ করতেন। তাই তার ঐ অনাত্মীয়ের মতাে উক্তি যেন পাহারাওয়ালার “ভাগ যাও, হামকো কুছ মং পুছাে’র মতাে তার কানে ও প্রাণে বাজল। তিনি মুখে রুমাল চেপে ক্রন্দনবেগ রােধ করলেন। তাঁকে প্রকৃতিই কবুতে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেল। সে রাত্রেও বীণাবাদনের অপেক্ষাকৃত ঘরােয়া বন্দোবস্ত ছিল, তা বিগডালে । সত্যেনবাবু শুভ্রকে একান্তে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাের দিদির সঙ্গে কল্যাণবাবুর কথাবার্তা কী হয়েছে রে?” “তা তাে আমি,” শুভ্র ঢােক গিলে বল্ল, “বলতে পাব না আমি মাকালদার সঙ্গে তর্ক করতে করতে ওদের সঙ্গ ছেড়ে অনেকদুর এগিয়ে গেছলুম, ফেরবার সময় ঠিক ততখানি পেছিয়ে পড়তে বাধ্য হলুম।” বােনের বিমনাভাব, বাপের কাতরতা, সােমের বিস্ময়, মাকালদার মৌন—এত কাণ্ডের পরে শুভ্ররও মনে হতে লাগল যে কিছু একটা ঘটেছে, বেশ একটা রহস্যময় ঘটনা, যােমাঞ্চকরও হতে পারে। দিদিকে একাকিনী পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “দিদি ভাই, কী হয়েছে?” দিদি বঙ্গ, “আমিও তাই জানতে চাই তাের কাছে, যদি তুই জানি।” সােমের সঙ্গে তার তেমন আলাপ হয়নি। তবু সে সঙ্কো কাটিয়ে } সুলক্ষণা সামকে চুপটি করে বসে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞাসা করল, “কল্যাণবাবু, আপনি কি জানেন কী হয়েছে?” “কী হয়েছে ? সােম শুদ্রর প্রশ্নের পুনরুক্তি করল। “আপনি জানেন না ?” “তুমি জানালেই জাব।” “বা রে, আমি নিজে জানতে এলুম যে।” “তাই বল। আমি এতক্ষণ ধরে ভাবছি কার কাছে জানতে চাইলে স্বান্ত পাবাে। আচ্ছা, একটা কাজ করলে হয় না? আমরা সবাই দি সমবেত হয়ে যে যতটুকু জানি ততটুকু বলি।” শুভ্র উৎফুল্ল হয়ে সম্মতি দিল। বল্ল, “তা হলে গ্র্যাণ্ড হয়। বাউণ্ড, টবল কনফারেন্স।” সে গেল সভা ডাকতে। সভা বল। সত্যেনবাবু প্রথম বক্তা। তিনি বল্লেন, “বুলু মাকে কেমনতর মান্না দেখে কী যেন একটা ভাব বেণুবনে দখিন হাওয়ার মতাে আমার ৰ্ম্মে গুঞ্জরিত হতে থাকুল। মাকালকে ডেকে বল্লুম, হা হে কী হয়েছে বতে পারাে? তা তিনি চোখ রাঙিয়ে তর্জন করে বল্লেন, আমি কি গুপ্তচর ? অমন তাড়না পেয়ে আমি তাে বেত্রাহত কুক্কুরের মতাে কে করে উঠলম। অজ্ঞান হয়ে যাবার মতাে হয়েছিল, সামলে নিতে পেরেছি এই ঢের।” মাকাল তাঁর ভ্রম সংশােধন করল না। মজনুর মতাে দেওয়ানা হয়ে দেশে দেশে বেড়াবে কি না এই তার তখনকার চিন্তা। তার মতাে বকার যুবকের যাহা দেওঘর তাহা হিমাচল। তবে দেওঘর অঞ্চলে তার বাবা খানকয়েক বাড়ী করে গেছেন, সে দেওঘর ছাড়লে ভাড়াটা ঠকমতো আদায় হবে কি না এই সন্দেহ থেকে দেওয়ানা হওয়া নিয়ে দ্বিধা।
৫৪ পুতুল নিয়ে খেলা বব কি “দেখ মাকাল,” সত্যেনবাবু তাকে সম্বােধন করে বল্লেন, “তুমি আমার পুত্ৰপ্ৰতিম, আমি তােমার পিতৃবয়সী না হই মাতৃবয়সী। অমন তেরিমেরি করে তেড়ে আসা তােমার কাছে প্রত্যাশা করিনি। অত্যাধুনিক সাহিত্যিকদের ও দোষ একচেটে বলে জানতুম।” * মাকাল এবার যথার্থ উত্তপ্ত হয়ে বল্ল, “অতিরঞ্জনের দ্বারা সুলক্ষণাব নিকট আমাকে লঘু করবেন না। তিনি অন্যকে বিয়ে কতে পারেন কিন্তু, বন্ধ না করতে কতে বলে ফেল্প, “আমার মানসী।” সত্যেনবাবুর মেয়ে মাকালের মানসী এ কথা শুনে তিনি পঙ্গু না হয়ে লম্ফ দিয়ে ধৃষ্টের চুল চেপে ধতেন। অধুনা অদৃষ্টের উপর অভিমান থাকলে করুলেন, কিন্তু তাই করে ক্ষান্ত হলেন না, কঁপতে কাঁপতে বক্সেন, "তবু যদি ডিগ্রী থাকৃত, ওদেশী না হােক এদেশী। বড় মুখে ছােট কথা সইতে পারা যায়, কিন্তু ছােট মুখে বড় কথা।” মাকাল বেপরােয়া ভাবে বল্ল, “A man's a man for that ” সত্যেনবাবু পরাস্ত হয়ে আর্ত স্বরে বজেন, কল্যাণ, তােমার সাক্ষাতে ঐ মূখ আমার কন্যার কাছে প্রেম নিবেদন করছে তুমি সহ করছ। তুমি কি শিশুপাল ?” সােম বল, “নিজে প্রেমিক না হলেও প্রেমিককে আমি বড় বলে মৰ্যাদা দিয়ে থাকি। মাকালের নিবেদন আমার নিবেদনের চেয়ে বড়। সুলক্ষণা যদি ছােটকে অগ্রাহ্য করে বড়কে বরণ করেন তবে আমি সাহলে বরযাত্রী হবাে।” সত্যেনবাবু চোখ বুজে শুয়ে পড়লেন। সােম সুলক্ষণার দিকে চেয়ে দেখল সে মাথা নীচু করে দুই এক ফোটা চোখের জল ফেলছে। অপমানে তার কর্ণযুল আরও। পরদিন সত্যেনবাবু শােক কাছে বসিমে চাপা স্বরে বলেন, “আল কী সুলক্ষণা ছেলেমানুষি করেছ বলল দেখি। তােমার সঙ্গে মাকালের তুলনা। ওটা যে গ্রাজুয়েটই নয়, আধখানা মানুষ। “কিন্তু, সােম বল্ল, “ওর বিষয় সম্পত্তি যা আছে তা অনেক গ্রাজুয়েটের নেই এবং হবে না।” “তা ছাড়া,” সত্যেনবাবু চুপি চুপি বলেন, “ও রেস্ খেলে।” “রেস খেলা,” সােম বক্স, ক্যান্সার সদৃশ অসাধ্য ব্যাধি নয়। সুলক্ষণার চিকিৎসায় সাতে পারে।” “অনিশ্চিতের মধ্যে ঝাঁপ দিতে যাব কেন? তুমি বিদ্যায় বিত্তে ও চরিত্রে কেবল মাকালের কেন দেশের সহস্র সহস্র যুবকের উর্ধে। তােমাকে না দিয়ে ওকে মেয়ে দিতে কোন মেয়ের বাপের দুর্মতি হবে?” “বিদ্যার ও বিত্তের বিষয় হয়ত ঠি। কিন্তু চরিত্রে যে আমি মাকালের তথা দেশের সহস্র সহস্র যুবকের উর্জে এর কি আপনি কোনাে প্রমাণ পেয়েছেন ? না আপনার চারিত্রিক মান কৌমার্যের দাবী মানে না ?” “কী বল্পে?” সত্যেনবাবু কানের গােডা বগডালেন। “অর্থাৎ লােকে যাকে চরিত্রহীন বলে আপনি কি তাকে সচ্চরিত্র বলেন?” সত্যেনবাৰু তিক্ত স্বরে বলেন, “ও প্রশ্ন কেন উঠল?” সােম অকুণ্ঠিত ভাবে বন্ধ, “এইজন্য যে আমি লৌকিক অর্থে চরিত্রহীন।” “যা তা বােলল না, কল্যাণ।” সত্যেনবাবু অবিশ্বসের হাসি হাসলেন। “আমি জানি তােমরা অত্যাধুনিকরা আমাদের ক্ষ্যাপাবার জন্যে অযথা দুবৃত্ততার ভাণ করে থাকে। আমাদের সময় আমরা বিধবা বিবাহের জয় দেখিয়ে গুরুজনকে জব্দ কভুম।” সােম ব, “আপনি বিশাস করুন না করুন আমার নউ কৌমার্যের সংবাদ আমি সময় থাৰুতে জানিয়ে রাখ।”
পুতুল নিয়ে খেলা “ওহহ।” বলে সত্যেনবাবু যেমন ছিলেন তেমনি বইলেন, তাঁর মুখে কপাট পড়ল না, চোখে পলক পড়ল না। আকস্মিক পক্ষাঘাত যেন র সকল অঙ্গ অসাড় করে দিল। “ও কী।” বলে সােম চেঁচিয়ে উঠল। বলে সােম চেঁচিয়ে উঠল। শুভ্র সুলক্ষণা ও বাড়ীর চাকর বাকর ছুটে এলাে। কিছুক্ষণ ঝাড় ফুকের পর সত্যেনবাবুর হাঁ বুল ও চোখ বন্ধ হলাে। সােম এতক্ষণ ভাবছিল কাশীর দাশরথিবাবুব দোসর জুটল নাকি? সে যেখানে যায় সেখানে শনির অভিশাপ বহন করে নিয়ে যায়। সে ওঠবার উদ্যোগ করলে সত্যেনবাবু তা দেখে ইসারায় জানালেন, বােস। ইসারায় অন্যান্যদের জানালেন ঘর থেকে যেতে। ভাঙা গলায় বল্লেন, “চারিত্রিক আদর্শ অনুচ্চ হলে পত্নীর মৃত্যুর পর আবার বিয়ে করে থাকতুম।” সােম বিনীতভাবে বঙ্গ, “কিন্তু সেটা তাে চরিত্রের নয় প্রেমে পরকাঠা।” সত্যেনবাবু খুসীর ক্ষীণ হাসির সঙ্গে বল্লেন, “চরিত্র ও প্রেম ভিন্ন নয়, বাবাজি। তােমরা যতই আধুনিক বলে বড়াই করাে না কেন তােমরা এই সহজ সত্যটা উপলব্ধি করেনি। আমার স্ত্রীর প্রতি অনুরাগ তত তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ফুরিয়ে যাবার কথা, কায়াহীনের প্রতি কিসের অনুরাগ ? আর তিনি যখন এ বাডীতে নেই ও প্রত্যাবর্তন করবেন না তখন অন্য কেউ তার স্থান পূরণ করলে তার আপত্তির কী হেতু থাকতে পারে ?” “কিন্তু তাঁর স্মৃতি,” নােম ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বল, “আপনার মন থেকে এক দণ্ড অভহিত হয় নি। অন্যকে স্পর্শ করতে গেলে সেই ব্যতি মাৰে চাবুক।” “ঠিক বলেছ, বাবাজি,” তিনি পৃষ্ঠপােষকের মতাে বল্লেন, “কিন্তু শুধু তাই নয়। সৃতি লােপ পেলেও তিনি ওপারে বলে আমার প্রতীক্ষা কতে থাবে। আমি যে স্পিরিচুয়ালিজম মানি। ওপারে যেন তিনি বাপের স্বাণা বাড়ীতে আছেন আর এপারে আমি অন্য স্ত্রী সঙ্গ কছি-হােক না সে বনিতা, নাই বা হলাে সে পণ্য খ্রী—ছি ছি ছি। না, আমার চারিত্রিক আদর্শ এত নীচ নয়।” সােম এটা ওটার পর এক সময় বল্ল, “তা হলে আমি ককাতা চম কাল। এখানকার কাজ তাে হলাে না।” সত্যেনবাবু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “হলো না কী রকম?” “আমি যে চরিত্রহীন। উত্তর দিল সােম। “আহা,” সত্যেনবাবু সর্বজ্ঞের মতাে বল্লেন, “বিলেত জায়গাটাই অমনি। সেখান থেকে চরিত্র নিয়ে ক’ জন ফিরতে পেরেছে ? তুমি তাে তবু স্পষ্ট কবুল করলে।” “আমি,” সােম উঠতে উঠতে বল্ল, “এই কথাটাই আপনার কন্যাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বলেছিলুম।” “কী সর্বনাশ !” সত্যেনবাবু চোখ বুজে গা এলিয়ে দিলেন। তারপর ক্রমাগত মাথা নাড়তে থাকলেন। অক্ষুটম্বরে উচ্চারণ করতে থাকলেন, রুদ্র যতে দক্ষিণমুখং তেন মা পাহি নিত্যম্ । সােম সেখানে দাড়ালাে না । সত্যেনবাবু যে সাধু ও ভণ্ডের অপরূপ সমাহার এই আবিষ্কারের পর সােমের সুলক্ষণাকে বিবাহ করবার বাসনা শিথিল হয়ে এলাে। সুলক্ষণাও হয়ত তাই। সােম যাত্রার আয়ােজন করল। হতভাগ্য মাকালের বিষয় তার মনে ছিল। সােম চলে গেলে মাকাল হত অাৰাৰ এ বাড়ীতে প্রবেশ পাবে আর পাবে আদর। সে যে সচ্চরিত্র। একবার সুলক্ষণার সনে সাক্ষাৎ করার জন্যে নােম শুভ্রর কাছে আবেদন পেশ কল। “তােমার দিদিকে জিজ্ঞাসা করে তাে তাঁর সঙ্গে কখন লেখা হতে পারেনি।”
পুতুল নিয়ে খেলা শুভ্র ঘুরে এসে ব, “এখনি। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।” সুলক্ষণা শুভ্রর জন্যে কি কার জন্যে একটা পুলােভার তৈরি করছিল। সেলাই রেখে সােমকে নমস্কার কল। “বসুন।” শুভ্রকে মিষ্টি করে বল্ল, “তুমি গিয়ে বাবার কাছে বসতে পারে।” সােম ইতস্তত করে বল্ল, “সেই কথাটার কী হলাে জাতে পারি ?” সুলক্ষণা সেলাইয়ের থেকে চোখ না তুলে বল্ল, “অবশ্য।” তার পর ধীরে ধীরে বলতে লাগল, “আমার মা নেই, ভাই বড় হলে যেখানে কাজ পাবে সেখানে যাবে, বাবার সেবার ভার আমাকেই বইতে হয়। বিয়ের দায়িত্ব কি এই অবস্থায় নেওয়া উচিত ?” সােম একটু বিস্মিত হয়ে কয়েক মিনিট চুপ করে থাকল। তারপরে ব, “যদি ভেবে চিন্তে এই স্থির করে থাকেন তবে আমাকে ও প্রশ্ন করা বৃথা। আর যদি আমার উত্তর শুনলে আপনার স্থির করা সুকর হয়, তবে বলি, নােগীর শুশ্রুষা নাসের কাজ, আপনি নাসের ট্রেনিং পাননি বােধ করি। পর ধর্ম সব সময়েই ভয়াবহ।” "কিন্তু,” সুলক্ষণা বল্ল, “বাইরের নাম কি আপনার লােকের মতাে হবে ? মমতা যে শুক্রবার প্রধান উপাদান।” সােম হেসে বল্ল, “বনের পাখীও পােষ মেনে আপনার হয়, নাসততা নারী।” সুলক্ষণা ঠাট উল্টিয়ে বল্ল, “তার মানে নাস হবে এ বাড়ীর গৃহিণী। এই তাে ?” সােম বঙ্গ, এই।” সুলক্ষণা ফুটভাবে বল্ল, “না, তা হতে পারে না, কল্যাণ বাবু। আমার মায়ের স্থান অন্ত্রের অধিকারে আসতে পারে না।” “Bow sentmental।” লোেৰ বদ অভরে। মশা কুখন পূর্বক সােমকে নিয়শ করে ব, অ-বিয়োগের
অলকণা
গুরুদেব যে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেননি তিনিও তাহলে
সেন্টিমেন্টাল ?”
সােম হাসতে হাসতে বল্প, “গুরুদেবই দেখছি নাটের গুরু। অন্য
সকলে গড্ডলিকা।”
“দেখুন,” সুলক্ষণা উন্মা গােপন করে বন্ধু, “গুরুদেবের নিন্দা কানে
বড় বাজে।”
“কিন্তু, সােম বুঝিয়ে দিল, “আমি তাে গুরুদেবের নিন্দা করিনি ,
করেছি শিষবৃন্দের নিন্দা।”
“আপনার চেয়ে,” সুলক্ষণা উন্মা প্রকাশ করে বল্ল, “আমার বাবা
বয়সে অনেক বড়, চরিত্রেও। তাঁর বিচার আপনি না করলে পারতেন।”
সােম থ হয়ে রইল।
“আর কিছু বলবেন?” সােম প্রশ্ন কবুল।
“না।” সুলক্ষণা যেন সশব্দে কপাট দিল।
“আমি,” সােম যথেষ্ট বিনয়ের সহিত বল্প, “এমনি বেশ ভালােমানুষ।
কিন্তু কোনাে মেয়ের উপর যদি ও যখন রাগ করি তবে ও তখন আমি
রাবণ। আমার ইচ্ছা করে তাকে সীতার মতাে লুট করে নিয়ে
সুলক্ষণা এর উত্তরে কাঁপতে কাঁপতে উঠে গিয়ে আলমারির একটি
দেরাজ থেকে বের করলে একটি ছােরা। সােমকে দেখিয়ে বল্প, “এই
আমার উত্তর।
সােম একটু ভড়কে গেছল। সামলে নিয়ে বন্ধু, “ব্যবহার জানেন
“সেটার পরীক্ষা নির্ভর করছে আপনার ব্যবহারের উপর।”
“নিশ্চিন্ত থাকুন। রাবণের ব্যবহারের মূলে ছিল প্রেম। লােকট
সীতাকে এত ভালােবাসতাম অন্তঃপুরে না পরে অশােক বনে ছেড়ে
পুতুল দিয়ে খেলা দিয়েছিল। অন্য কারুর প্রতি এমন অনুগ্রহ করেনি। আমার নেই প্রেম। হবেও না।” এই বলে সােম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। সুলক্ষণা তার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল । কী ভাবল সেই জানে। বল, “আপনার কিছু একটা ব্যথা আছে। তা বলে আপনাকে বিশ্বাস করা যায় না। মার্জনা অবশ্য করতে পারি—কিন্তু বিবাহের প্রতিষ্ঠা মার্জনার উপর নয় বিশ্বাসের উপর।” “মার্জন, সােম হেসে বল্ল, “কে চায়? কল্যাণকুমার সােম মার্জনাৰ চেয়ে গঞ্জনা পছন্দ করেন। তারপর বল্ল, “আচ্ছা, উঠি।” সুলক্ষণা কোনােমতে নমস্কার করল। সােমেব প্রস্থানের পর চাপ কামার আবেগে ভেঙে পড়ল। শুভ্র দিদির পড়ার ঘরে গিয়ে দেখল দিদি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কঁদছে। তার টেবিলের উপর একখানা ছােরা। এক সেকেণ্ডের জন্যে শুভ ভয়ে বিস্ময়ে দ্বিধায় থমকে দাড়ালাে। তারপর কী মনে করে ছােৱাখানাকে খপ করে তুলে নিয়ে দৌড় দিল। এক নিঃশ্বাসে বাবার ঘরে পৌছে হাঁপাতে হাঁপাতে বল্ল, “বাবা, দিদি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল।” সত্যেনবাবু একসঙ্গে এতগুলাে চমক কোনো দু’দিনের ভিতর পানি এর আগে। ক্রমশ তার অভ্যস্ত হয়ে আসছিল। তিনি আচ্ছন্নের মতাে বলেন, “দেখি কত কঁদাতে পারে।” শুভ্রর পিছু পিছু সুলক্ষণাও ছুটেছিল। সে তার বিপৰ্যন্ত কেশবেশ নিয়ে পাগলীর মতাে ঘরে ঢুকল। বল, “না, বাবা, আত্মহত্যা নয়।” “তবে কী? তবে কী। “আত্মহত্যা নয়। সত্যি বলছি।” “তবে কেন ঐ ছােরা ?” সুলক্ষণার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আত্মরক্ষা।”
সুলক্ষণা সত্যেনবাবু ও শুভ্র দুজনেই চীৎকার করে প্রতিধ্বনি করলেন, প্রশ্ন- সূচক স্বরে। শুভ্রর রাগ হচ্ছিল তার অত বড় একটা আবিষ্কার ভেস্তে যাওযায়। সত্যেনবাবু তাে মনে মনে প্রলয়নাচন নাচ ছিলেন সােম-রস পান করে। সত্যেনবাবু হুকুম করলেন, “আন্ ওর মুণ্ডুটা পেডে।” শুভ্র বল্প, “শুধু মুণ্ডু কেন ? ধডটাও।" সােম তার জিনিষপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। যে শুভ্র তার সঙ্গে মাথা সােজা করে কথা বলতে ভরসা পেতাে না সেই গিয়ে তার গায়ে হাত রেখে বল্ল, “আনুন।” সােম আশ্চর্য হয়ে সুধালল, “কী ব্যাপার ফেরারী আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারায় হঠাৎ যে আনন্দ হয় শুভ্র সেই আনন্দের পীডন গাম্ভীর্যের দ্বারা প্রতিহত করে বল্ল, “ব্যাপার সত্যেনবাবু ন্যায়ের সঙ্গে করুণা মিশ্রিত করে হাকিমী ভঙ্গীতে জিজ্ঞাসা করলেন, “তােমার কী বলবার আছে?” সােম কিছু বুঝতে না পেরে সুলক্ষণার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালাে। সুলক্ষণা ততক্ষণে লজ্জায় মরে গেছে। কেমন করে যে সমস্ত বৃত্তান্ত বাবার কাছে আবৃত্তি করবে, তাই তাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলেছিল। সে সােমের চাউনির পথ থেকে নিজের চাউনিকে সরিয়ে নিল। সত্যেনবাবু একটা মস্ত বক্তৃতার পঁয়তারা কষছিলেন মনে মনে। শুভ্র ভাবছিল হুকুম পেলে সােমের পিঠে কোন লাঠিখানা ভাঙবে। ওসব অপ্রিয় কর্তব্য চাকরকে দিয়ে করাতে নেই, হাজার হােক সােথ ভদ্রলােকের ছেলে বিলেত ফেরৎ । সত্যেনবাবুর বক্তৃতা শুরু হলাে। “পাপিষ্ঠ”, তিনি সােমকে সােধন, পুতুল নিয়ে খেলা করলেন, “পাপিষ্ঠ, সন্ত্রান্ত বংশে তােমার জন্ম, শিক্ষা তােমার সাধারণের দুপ্রাপ্য, তুমি সেই শিক্ষার ক্ষেত্রে কৃতী। কিন্তু চরিত্রে তুমি ছাগল- ( ছাগলের সংস্কৃত স্মরণ করে) হ্যা, চরিত্রে তুমি ছাগ, তুমি অজ।” এই পর্যন্ত বলে তিনি চেয়ে দেখলেন কোনাে এফেক্ট উৎপন্ন হলাে কি না। সােম বিস্ময়বিমূঢ়ভাবে ভাবছিল সকালে সত্যেনবাবুর সঙ্গে যখন কথাবার্তা হয়েছিল তখন তাে তিনি তার চরিত্রহীনতার স্বীকৃতি শুনে ক্রুদ্ধ হনি, বিলেতফেৰ্তাদের অমন হয়ে থাকে বলে প্রকারান্তরে অনুমােদন করেছিলেন। তবে সুলক্ষণাকে ওকথা বলেছি বলায় তিনি আঘাত পেয়েছিলেন বটে। সেই অপরাধে এই দণ্ড ? তাকে কল্পনার অবকাশ না দিয়ে আপনি সত্যেনবাবু তার অপরাধের চার্জ তাকে শােনালেন। বভেন, “আমার বাড়ীতে অতিথি হয়ে আমার কন্যার উপর প্রশস্ত দিবালােকে বলপ্রয়ােগ—হে পাপিষ্ঠ, নারীধর্ষণের ইতিহাসে এমন অঘটন ঘটেছে বলে শুনিনি কি পডিনি, উকীল হিসাবে এমন মামলা পাইনি। ওরে আন্ তাে পীনাল কোড়ােনা। দেখি কোন ধারায় পড়ে—৩৫৪ কি ৩৭৪। না, পুলিশে দেবে না, কেলেঙ্কারীতে কাজ নেই। বলল, তুমিই বলল, পাপিষ্ঠ প্রবর, ঘনােয়া সাজার মধ্যে কোনটা তােমার উপযুক্ত।” সােম ইতিমধ্যে ছােরাখানাকে লক্ষ করে কতকটা আঁচতে পেরেছিল তার অপরাধ। সাজা? তার ইচ্ছা করুল বলে, আপনার মেয়েটিকে আমাকে দিন, উনিই আমার শান্তিরূপিণী, সারাজীবন অবিশ্বাসের কারাকক্ষে আমাকে কয়েদী করে রাখবেন। সুলক্ষণা যে পিতার নিকট তার নামে নালিশ করেছে এতে তার সন্দেহ ছিল না। “পাষণ্ড।” সত্যেনবাৰু তলনী উদ্ভত করে তর্জন করলেন। “লিখ। আমি তােমার বাবা জাহ্নবীবাবুকে। তিনি যদি তােমার উপর ই প্রয়ােগ করতে অসত হন, যদি তােমাকে এই মেয়ের সনে জোর করে লক্ষণ বিয়ে না দেন, তবে তােমার বল প্রমােগের সাজা দিতে অক্ষম সেই জেলা জজকে অকর্মণ্য বলে জাব। জাব যে তিনি সেই পণ্ডিতের মত ভণ্ড যিনি বলেছিলেন, আমার ছেলে মাকড় মেরেছে ? মাকড় মাবুলে থােকড় হয়।” মামলার বাম শুনে সােম তত ফেল্প হেসে। শুভ্রও হলাে নিরাশ কোথায় “শালা, হিয়াসে নিকলাে” বলে দু ঘা বসিয়ে দেবে, না নিজেই ববে শালা। সবচেয়ে বিস্মিত হলাে স্কুল ণা। এত তম্বির পর এই তামাসা । তাকে সােমের কাছে এমন হাস্যাস্পদ কবার প্রয়ােজনটা কী ? না, তারবিবাহ। সােমের মতাে পাত্র যেন আর হয় না। চেষ্টা করিলে কেষ্টা ছাড়া কি ভৃত্য মেলে না আর ? সব শিক্ষিতা মেয়ের মততা তারও ছিল স্তব স্মৃতির ক্ষুধা। কেউ তাকে ‘মানসী’ বলুক, ‘সাকী’ বলুক, বলুক Eternal Feminine- তবে তাে সে করবে বরদান। সে কি দেবে বরণমালা? না। সে দেবে বরমাল্য। কেউ কি তার বর হবে? না। সকলে হবে তার বরপ্রার্থী, তাদের একজন হবে তার বরপ্রাপ্ত। এমন যে সুলক্ষণাবার বীণবাদন একদিন দেশবিত হতে বাধ্য যার চরণে এখনি মাকালের মতাে কত অকর্মা দুবেলা পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছে তাকে একদিন সােমের চেয়ে নিষ্কলুষ অথচ সােমেরই মতাে কৃতকর্মা কেউ কি দেবে না অৰ্য? সে অপেক্ষা করবে। সুলক্ষণা বল্ল, “আসুন, কল্যাণবাবু, আপনাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসি। অমন সাজা আপনাকে পেতে হবে না, কারণ আপনার বিরুদ্ধে ঐ অভিযােটা সম্পূর্ণ আনুমানিক। আমি যে এই প্রহসনের সূত্ৰধার নই তা আপনি বিশ্বাস করতে পারেন, কল্যাণবাবু।”
৪
অমিয়া
“এই, তােমার নাম কী ?”
“আমার নাম কল্যাণ। তােমার ?”
থােকা হেসে লুটোপুটি খায়। হি হি হি হি। হা হা হা হা। তারপর
আবার জিজ্ঞাসা করে,
“এই, তােমার নাম কী ?
“আমার নাম কল্যাণ। তােমার ?
খােক আবার হেসে গড়াগড়ি যায়। হাে হাে হাে হাে । তারপর
আবার সেই প্রশ্ন--
“এই, তােমার নাম কী ?
“আমার নাম কল্যাণ।” সােম হাল ছাড়ে না। “তােমার ?”
“আমার নামও কল্যাণ।” খােকা আঁত বের করে চোখ অর্ধেক বুজে
আধাে আধাে ভাষায় বলে।
সােম তাকে কোলে টেনে নিয়ে আদর করে। বলে, “আমাদের
দু জনের এক নাম। না ?”
“খা। তােমার বাবার নাম কি কুণাল ?”
সােম এই লজিকের কাছে হার মাল। বস্তু, “না।”
তখন খােক জিজ্ঞাসা করল, “তবে ভােমার নাম কল্যাণ হলাে
কেন?”
এর আর উত্তর হয় না। সােম বঙ্গ, “তুমিই বলাে না, আমার নাম
কল্যাণ হলাে কেন।”
অমিয়া
খােকা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ভাবল। জানালা দিয়ে দেখল একটা
পায়রা। ভাবনা তুলে দৌড়ে পালিয়ে গেল, “ধর ধ” করতে কতে।
ওহে তােমার ছেলেটা তাে ভয়ানক তুখােড়।” কুণালকে ঘরে
ঢুকতে দেখে সােম বঙ্গ, “প্রথমে আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিল, তারপর
আমাকে লজিকে হারিয়ে দিল।”
পুত্রের কৃতিত্বে কুণাল বিনীতভাবে গৌরব বােধ করল। বল্ল, “আগে
এক পেয়ালা খাও। ওর দুষ্টমির গল্প অষ্টাদশ পর্বেও শেষ হবার নয়,
ধীরে ধীরে শুনাে পরে।”
আদর্শ স্বামী। স্ত্রীর মলাঘব করবার জন্য একটা আস্ত ঐে বয়ে
এনেছে—ওর মতাে ক্ষীণকায় ব্যক্তির পক্ষে ঐ এক গন্ধমাদন।
ললি এলাে খাবার হাতে করে। সে কত কী তৈরি করেছে,
সমস্ত তার নিজের হাতের। সােম বল্ল, “জানাে ললিতা, তােমার ছেলেটা
কী সাংঘাতিক সেয়ানা। ও ছেলে বড় হলে মােক্তার হবে দেখাে।”
“হ।” ললিত অভিমান করে বল্ল, “সেই আশীর্বাদ কোৰাে।
মােক্তার। মােক্তার না দারােগা।”
“কেন, মােতার পছন্দ হলাে না? কুণাল যদি মাষ্টার না হয়ে
মােকার হত তা হলে কি তুমি তাকে নিরাশ করতে ?”
“যাও।” ললিতা ধমক দিয়ে ব, খাও, খাও, বিলেতফের্কা
বক্তিয়ার। বাপ মােকার হলে ছেলের উকীল হওয়া উচিত। বাপ
উকীল হলে ছেলের ব্যারিষ্টার হওয়া দরকার।”
কুশাল ফোড়ন দিল, “নইলে এভশন কিসের ?”
“সত্যি।” ললিতাটা স্বভাৰত সীরিয়াস। বক্স, মেয়ে বি-এ পাস
হলে লােকে জামাই খোজে আই-সি-এস। কেন?”
“ওটাও কি হলাে এভশন ?” বঙ্গ সােম।
“নিশ্চয়। পারিবারিক মর্যাদার এভশন। তারপর কী মনে
পুতুল নিয়ে খেলা করে ফিক করে হাসল। বল্ল, “ভবনাথ বাবু যে এ বাড়ীতে ধয়া দিতে দিতে ‘ভবধাম’ ছাড়তে বসেছেন, তার একটা গতি করে।” “বাস্তবিক, কুণাল ইতস্তত করতে করতে বল, “তােমাকে বলতেও কেমন-কেমন লাগে, অথচ একই প্রােফেশনের লােক, আমাদের অল বেঙ্গল টীচার্স এসােসিয়েশনের পাণ্ডা।” “আমি জানি,” সােম গম্ভীরভাবে বল্প। “ভবনাথবাবু বাবাকেও চিঠি লিখেছেন। কী যেন তার মেয়েটির নাম ? অমিয়া।” “হ্যা, অমিমা। অমিয়ার একখানি ফোটোও পাঠিয়েছেন।” “তা হলে,” ললিতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “বলল তােমার পছন্দ হয়েছে কিনা। হু, হ, বলতেই হবে।” “হায়।” সােম কপট ক্ষোভ ব্যক্ত কল, এই ত দুনিয়ার রীতি। তােমরা বিয়ের আগে পুরাে দু বছর প্রেম করলে। আমাদের কি প্রাণে সাধ আহলাদ নেই, রস কষ নেই ?” ললিতা ভুরু কপালে তুলে বন্ধ, “হয়েছে। ভবনাথবাবুর মেয়ের সঙ্গে প্রেম। জানাে, ও বাড়ীতে একখানা মাসিকপত্র পাবার বাে নেই ? পাঠ্যপুস্তক ব্যতীত বইও যদি পাও তবে সে স্বামী বিবেকানন্দের বই।” “ভবনাথবাবু, কুণাল তার স্বাভাবিক নম্রতার সহিত বড়, “ডিসিপ্লিনেরিয়ান বলে নামডাক আছে। আর-এক যুগের মানুষ। এ কালের মহাস্বাধীন ছাত্ররাও তাঁর চোখের দিকে তাকালে একেবারে ভিজেবেড়ালটি।” “অথচ, সােম বঙ্গ, “এই ভবনাথবাবু মেয়ের বিয়ের জন্য তাঁর প্রাক্তন ছাত্রবয়সীর বাড়ীতে ধা দিতে দিতে ইহধাম ছাড়তে বসেছেন। “ইহধাম নয় গাে”, ললিতা শুধরে দিয়ে বল, “ভৰনাথবাবুর ভয় মৰ ভৰধাম। তাই ছাড়তে বসেছেন।”
बपिना “স্কুলের বই লিখেই, কুণাল বল্ল, “ভবনাথ বাবু তিন তিনটে ভবধাম বানিয়ে ফেল্লেন কলকাতায়, পুরীতে, দার্জিলিঙে।” “ভেবে দেখ, কল্যাণদা,” ললিতা বল্ল, “অমিয়াকে তিনি একটা না একটা বাড়ী দেবেনই। বাকী দুটোতেও তুমি বিনাভাড়ায় থাকতে পাবে। ভবধামে যত দিন আছে বাড়ীওয়ালাকে খুব ফাকি দিলে। আর আমরা,” সে মাথা দুলিয়ে সহাস সকরুণ স্বরে বল্প, “আমরা তােত ভগবানের চেয়ে ওকেই বড় বলে মানি। যেহেতু ভগবান যদি অবতাররূপে কলকাতায় বাসা করেন তাঁকেও বাড়ীওয়ালার গঞ্জনা শুনতে “তা হলে,” সােম বল, “দাঁড়ায় এই যে বাড়ীওয়ালাকে ফাকি দেবার জন্যে বাড়ীওয়ালা শ্বশুর চাই। শশুকন্যার প্রেম সংসারী মানুষের পক্ষে অনাবশ্যক।” “প্রেমিক প্রেমিকাকে,” ললিতা বল্ল, “রেল কোম্পানী কনসেসন টিকিট দেয় না, গয়লা দেয় না খাঁটি দুধ, মুদি তাগাদা দিতে ছাড়ে না, ধােপা ছাড়ে না তাগাদা দেবার কারণ দিতে। নােগবীজাণুরা তেমনি আশ্রয় করে, পাগলা কুকুরে তেমনি তাড়া করে, মােটরওয়ালা তেমনি চাপা দেয়।” সােম কুণালকে ফি ফি করে অথচ ললিতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বল, “বিয়ের পর ললিতা বিজ্ঞ হয়েছে দেখতে পাচ্ছি। আগে হলে বিয়েই কত না, অন্তত তােমাকে।” “যাও,” বলে ললিতা গোসা করে থালা ও ট্রে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। খবর পেয়ে ভবনাথবাবু স্কুল থেকে ‘ভবধামে’ ফিরলেন না, সােজা এলেন সােমকে দেখতে। বাশরি মাধ। আধখানা কথা মুখে রাখেন। বলেন, “দেখে এলে ?”
পুতুল নিয়ে খেলা
সােম বল্ল, “আয়ে?”
“ইউরােপ দেখে এলে ?”
“আজ্ঞে ।”
"কোনটা ভালাে? ওদেশ না এদেশ ?”
“আজ্ঞে এদেশ।”
"ঠিক বলেছ।” যেন ক্লাসে ছাত্রের উত্তর শুনে পিঠ চাপড়ে দিলেন।
“ঠিক। কেন এদেশ ভালাে ? (যেহেতু) এদেশ আমাদের দেশ। এই
দেশেতেই জন্ম (আমার) এই দেশেতেই মরি। কোন বিষয়ে) অনাস ?”
“ইংরেজীতে।”
"বেশ, বেশ। আমার অমিয়াও সেই (বিষয়ে) অনার্স। ভালাে
মেয়ে। বাঁধতে জানে। (কী কী) খেতে ভালােবাসাে?”
“আজ্ঞে হ্যা। খেতে ভালােবাসি।”
"( কী কী খেতে ?”
“আজ্ঞে হ্যা। খেতে আর ওতে।”
তিনি বিষম কটমট করে তাকালেন। “কী বলে ? (আবার)
"আজ্ঞে, খেতে ভালােবাসি।”
“কী খেতে?”
“চানাচুর।”
“চানাচুর? রােসস, (অমিয়াকে। জিজ্ঞাসা করে দেখি। চানাচুর ?
(রােসাে) জিজ্ঞাসা করে দেখি। আর কী খেতে ভালােবাসে?”
“আলুর দম।”
“ই। ওদেশে মেলে না। আলুর দর কি রকম?”
সােম মুস্কিলে পড়ল। কোনদিন আলু কেনেনি। বড় একটা
এক পেনী করে।”
बमित्रा
“পেনী তাে আনা। এত।”
“আজ্ঞে।”
“ওদেশ ভালাে নয়। Plan living নেই। (সুতরাং ) High
thinkng নেই।”
সােম মনে মনে বল্প, তাই কেউ Translation ও Essay
Writing এর বই লিখতে পারে না।
ভবনাথবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এরােপ্লেন ?”
“এবােপ্লেন কী? দর কত ?
“না। চড়েছ ?”
“আজ্ঞে না।”
“আহা! (ওটা) বাকী রেখে এলে।”
“হবে একদিন।”
“না, না। বিয়ের পরে (হতে পারে না।
Crash PTICE
(বৌ বিধবা হবে)।”
ভবনাথবাবু চিন্তা করে বলেন, “গান ?”
“আজ্ঞে ?”
“ভালােবাসাে ?”
আয়।”
“অমিয়া (গান) জানে। শ্যামা সঙ্গীত। ওর নাম কী? ঐ মুসলমান?”
“কোন মুসলমান ?”
“ইসলাম। • নজরুল ইসলাম। ওর গান- ভবনাথবাবু ঘাড়
নাড়লেন)।”
গানেন অর্ধভােজন। কে জানে
“কেন আবার মুসলমান।
কী খায়।
পুতুল নিয়ে খেলা
সােম মনে মনে বল্প, আমিও তাে ওদেশে ও জিনিস খেয়েছি, অতি
উপাদেয় গব্যপদার্থ, পঞ্চগব্যের অতিরিক্ত যষ্ঠ গব্য। শুনেছি স্বামীজিও
খেতেন।
এতক্ষণ কুণাল চুপ করে ছিল। মানুষটি সে মুখচোরা, কুণে,
সংকোচশীল। ভবনাথবাবু তাকে বলেন, “একে (নিয়ে) একদিন
আমাদের ওখানে (এসস)।”
“যে আজ্ঞে।”
“তােমার স্ত্রীও (আনুন)।”
“জঁকে বলবাে।”
“আর সেই বাচ্চাটা (কোথায়)? (তাকে ত) দেখছিনে?”
“খেলা করছে।”
“উহু। (সব সময়) খেলা ভালাে নয়। একটু একটু এবি সি ডি শিখুক।”
“মােটে তিন বছর বয়স।
“বলাে কী। তিন বছর নষ্ট করেছে। আচ্ছা উঠি। কাল রাত্রে
ওখানেই ( খাওয়াদাওয়া হবে। আসি।” তিনি নমস্কারের প্রতিনমস্কার
কলেন।
ভবনাথবাবু প্রস্থান করলে ললিতা ছুটে এলাে। “কি কল্যাণদা।
খর পছন্দ হলাে ?
“শবের পছন্দ হলাে কি না তাই ভাবছি।”
কুণালের মুখ ফুটেছিল। সে বল, “ভয় পেয়ে গেছে তাে?”
“ভাবছি এই বাঘার সঙ্গে ইয়ার্কি খাটবে না। দাগুবাবুকে যা করে
রেখে এসেছি আর সত্যেনবাবুকেও করেছি যেমন জব্দ।”
ললিতা ও কুণাল এক জিজ্ঞাসা করল, “সে কেমন ?”
সােম বর সমস্ত কথা। শুনে ললিতা ব, “অমন একটা পণ করা
সত হয়নি। ও যে ভীম হবার পণ।”
অমিয়া ৭১ "কিন্তু তুমিই বলো, কুণাল যদি দুশ্চরিত্র হততা ও তুমি যদি না জেনে তাকে বিয়ে করতে তবে কি তােমাদের অহরহ মনে হতাে না যে তার চেয়ে ভীষ্ম হওয়া ছিল ভালাে।” কুল লজ্জিত ও ললিতা কুপিত ভাবে পরস্পরের দিকে তাকালাে। যেন যদি’ নয়, সত্যি। তারপর ললিতা শুষ্ক হাসির সঙ্গে বল্ল, “তবু ভীম হবার চেয়ে সে ভালাে।” “কিন্তু কে চায় ভীষ্ম হতে। আমি আমার পণের মতাে স্ত্রী পেলে রূপগুণ নিবিচারে তৎক্ষণাৎ বিয়ে করি। প্রেমফ্রেম বাজে-কেবল সময়ক্ষেপ ও হৃদয়যন্ত্রণা। এবার প্রেমের পক্ষ নিয়ে ললিতা লড়াই করল। তখন সােম বঙ্গ, “তুমিই তাে বলেছ প্রেমিক প্রেমিকা God's chosen people নয়, রেন কোম্পানী তাদের কনসেসন টিকিট দেয় না ইত্যাদি।” “কিন্তু” ললিতা বল্ল, “তুমিও তত বলেছে তােমার প্রাণে কি সাধ আদ নেই, রসকষ নেই। তুমি দেখছি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলাও।” “যাক, কুণাল থামিয়ে দিয়ে বল্ল, “ঝগড়া করে কাজ নেই। ভবনাথবাবু প্রেমেরও বিরােধী, পণেরও। কল্যাণ ওর কাছে কথাটা কী ভাবে পাড়ে তাই দেখব আমরা।” পরদিন ভবনাথবাবু তাঁর একমাত্র জীবিত পুত্র মনুর হাতে তার স্বরচিত গ্রন্থের এক সেট উপহার পাঠালেন। একখানির নাম "Intelligent Chuldren's ide to English Grammar and Idiom' তার ভূমিকায় আছে, “The authoi begs to acknowledge with fervent appreciation the labour of love bestowed by his beloved eldest daughter M188 Amiya Bose, B. A, student ૧૨ পুতুল নিয়ে খেলা আর একখানির নাম, “i000 Unseen Passages by Bhubanath Bose, B, A, Head master of Institution ( 29 yeals' experience ), author of • • (২৯ খানা কেতাব) and Miss Amiya Bose, B A (Hons ). তৃতীয় একখানা বইয়ের নাম “Easy conversations at Home and School”, সেটার উৎসর্গ পড় এইরূপ—To my dutiful eldest daughter Miss Amıyakana Bose on ber passing the Matriculation Examination in the First Division এতদিন যে সােম অমিয়কণার মতাে বহু বিজ্ঞাপিত পাত্রীর পরিচয় পায়নি এই এক আশ্চর্য্য। এক IntelligCut Children's Guide এই ইতিমধ্যে ৭০০০ খানা বিক্রী হয়েছে। মনু বল্প, “লােকে স্বদেশ ফেলে বিদেশী কিনবে কেন ? Masfieldএর দফা রফা। ম্যাকমিলান বাবাকে কত offer করেছে জানেন ?” শুনে সােম মনুকে একটা সিগ্রেট offer করল। মনু কি তা নিতে পারে। ভবনাথবাবু জানতে পারলে তার দফা রফা। সােম বল্ল, “আমি কি আপনার বাবাকে বলতে যাচ্ছি ? নিলেন, খেলেন, ফুরিয়ে গেল।” একজন বিলেতফেৰ্তা তাকে সমকক্ষ ভেবে সিগ্রেট নিতে বলছেন, গৌরবে তার বুক ফুলে উঠেছিল, সে একটা নিল, নিয়ে টান দিতেই তার মাথা ঘুরে গেল নেশায় এবং দম্ভে। দুদিন পরে হয়ত এই শালা হবে, খাতির করে কথা বলবে কেন? সে যা তা বতে সুরু করে দিল। সােমও তাকে প্রশ্রয় দিল। জিজ্ঞাসা করল, “অমিয়কণা কি আপনার বড়, না ছােট ?” “হ্য-বড়! দেড় বছরের বড় আবার বড়। ওর নাম অমিয়কণা কবে হলাে? সে আমার জন্মের বহু পরে।” কী রকম?”
অমিয়া
“ওকে আমরা টুলী বলেই ডাকতুম। যদিও ভালাে নাম শুভঙ্করী।
স্কুলে নাম লেখাবার সময় হেড মিসূট্রেস বল্লেন, ও নাম রাখলে কেউ
বিয়ে করবে না। তিনিই নামকরণ করলেন অমিয়কণা। তারপর সে
নাম সংক্ষেপ করা হয়েছে, আজকাল আবার লম্বা নাম কেউ পছন্দ
করে না।”
“লম্বা নাকের মতাে।”
“হ্যা বলেছেন। আমার নাম ছিল জগদানন্দ বই। আমি
ওটাকে ছেটেকেটে করেছি জগদা বসু। তবু সকলে আমাকে মধু
বলেই ডাকে।”
“আমি কিন্তু জগদা বলে ডাকব।”
“সৌভাগ্য।”
“দেখুন জগদাবাবু, আপনি তাে ধবৃতে গেলে আমার বন্ধুই—কেমন ?”
“নিশ্চয়, নিশ্চয়। আপনিই আমার only best friend, মাইরি।”
“নি, আর একটা সিগ্রেট নি। না’ বলবেন না। বিলিতী নয়,
ইটালিয়ান। অনেক যত্নে এনেছি কাষ্টএর চোখে ধূলাে দিয়ে।”
মনু শ্রদ্ধায় ভক্তিতে গদগদ হয়ে বল্প, “তা হলে দিন্। আপনার
মতাে বন্ধুর মহার্ঘ দান মাথায় করে নিই।”
সােম মনুর কানের কাছে মুখ নিয়ে সুর নামিয়ে বন্ধ, দেখুন
জগদাবাবু, জগদাবাবু কেন বলি, জগদা, বন্ধুর জন্যে একটা কাজ
করে দিতে হবে।”
জগদা তড়িৎ স্পৃষ্টের মতাে কান সরিয়ে নিল। পর মুহূর্তে কানটা
আলাে একটুখানি বুকিয়ে ব্যগ্রভাবে বল্ল, “হুকুম করুন।”
“দেখ, শােম ইতস্তত করে বল্ল, “তােমাকে আমি বিশ্বাস না করলে
একথা বলতুম না ?
“আমি শপথ করছি,” জগদা দুই চোখে আঙুল দুইয়ে বল, “যদি
৭৪
পুতুল নিয়ে খেলা
বিশ্বাস রক্ষা না করি তবে আমার দুই চোখ—হ্যা, দুই চোখ কানা হয়ে
যাবে।”
“ছি, ছি,” সােম বল্ল “শপথ কে চায়। মনের জোর।”
“হ্যা। মনের জোরে আমার সঙ্গে কজন পারে। জানেন আমি
একটা ভূতুডে বাড়ীতে তিন রাত ছিলুম। তেরাত্রিবাসের পর আমার
চেহারা যা হয়েছিল যদি দেখতেন তবে আমাকেই ভূত বলে
ঠাওরাতে।”
“বেশ, বেশ। অমনি মনের জোর চাই।” কিছুক্ষণ পরে সােম বল,
“আজ আমি আপনাদের ওখানে যাচ্ছি। আপনার দিদিকে দেখব।
কিন্তু শুধু দেখলে তাে হবে না। একটু কথাবার্তা কওয়া দরকার তার
*এই কাজ। আচ্ছা,
আচ্ছা, আমি
“না, অত সােজা নয়। আমি চাই নির্জনে কথা বলতে। ঘরে অন্য
কেউ থাকবে না, বাইরেও কেউ আডি পাবে না।”
মনুর মুখ শুকিয়ে সরু হয়ে গেল। সিগ্রেট খসে পড়ল তার দুই
আঙুলের ফাক দিয়ে। বাড়ী তাে ওর নয়, বাড়ী ওর বাবার, ওর মা’র।
তাঁদের কাছে কেমন করে অমন প্রস্তাব কবে ? দিদিকে বলতে পারে,
কিন্তু দিদিও তাে মালিক নয়।
সােম বল্ল, “কি ভাই, পাবে না ?”
‘আমাকে মাফ কবেন,” জগদা অত্যন্ত কাতরভাবে বল।
আমাদের বাড়ীতে আশ্রিত অভ্যাগত নিয়ে যােলাে সতেরাে জন মানুষ,
নিভৃত স্থান কোথায় পাবো? তাছাড়া who is to bell the cat?
সােম ভেবে বক্ত, “আচ্ছা, এমন হয় না? আমার বন্ধু ও তাঁর স্ত্রী
যদি তােমাকে ও তােমার দিদিকে নিমন্ত্রণ করেন তােদা আসবে?
“আমরা তাে আসতে উৎসুক ও উচ্চত। কিন্তু বাবা বলেন, মন্তু
वधिमा ৭৫ চুপি চুপি বল্ল, “এদের বিবাহ অসিদ্ধ। এদের একজন বামুন, আর একজন কায়স্থ। এঁদের সন্তান হচ্ছে বর্ণসঙ্কর, দোআশলা। এদের বাড়ী নিমন্ত্রণ গ্রহণ অসম্ভব।” সােমের ক্রোধে বাগরােধ হলাে। নিমন্ত্রণ গ্রহণ অসম্ভব। সােম লক্ষ করেছিল যে ভবনাথবাবু চা ছুলেন না। অথচ নির্বিকারমুখে নিমন্ত্রণ করে গেলেন। নিমন্ত্রণ গ্রহণ অসম্ভব। অথচ দৌড়াদৌডি, ধরাধরি, ধন্না—এসব সম্ভব। ওঃ এই ভবনাথটাকেও শিক্ষা দিতে হবে দাশরথি ও সত্যেনের মতাে। “আচ্ছা, তা হােক,” সােম বল্ল, “নিমন্ত্রণ গ্রহণ নাই করলে। এমনি বেড়াতে আসূতে দোষ কী? এই যেমন তুমি আজ এসেছে।” “তাও,” মনু বল্প, “আপনার জন্যে। কিন্তু আপনার জন্যে দিদি তাে আসতে পারে না।” “ই।” অনেক ভেবে সােম একটাও ফন্দী বের করতে পারল না। মনুকে বল্প, “আচ্ছা, ভাই জগদা, আমার জন্যে তােমার দিদি না আসুন, তুমি কিন্তু এসাে কাল এই সময়।” সােম বন্ধ, “গুড ইভনিং, নমস্কাৰ। এই যে, আসতে আজ্ঞা হােক,” বলে যে সুপার-ভদ্রলােকটি সােমাদিকে অভ্যর্থনা করলেন তাঁর নাম দ্বিজদাসবাবু, ভবনাথবাবুর কনিষ্ঠ। হাসিখুসি মানুষটি, বাটোয়ারায় তার ভাগে পড়েছে হাসি আর তার দাদার ভাগে পড়েছে রাশি অর্থাৎ রাশভারি। “আসুন, এইখানে বসুন। আহা, ওখানে কেন, এখানে। হেঁ হেঁ হে। ডাবের জল খাবেন, না ঘােলের সরবৎ খাবেন ? হলেই বা শীতকাল। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। কিছু খাবেন না, তা কি হয় ? এক পেয়ালা চা চা যে কোনাে সময় খাওয়া যায়, বাড়ীতে খেয়ে এসেছেন বলে এখানে খাবে , ও কি একটা কথা হলাে, বুলবাৰু?”
পুতুল নিয়ে খেলা সােমের বন্ধু বলে কুণালেরই খাতির বেশী। ভবনাথবাবুদের ধারণা কুণাল যা বলবে সােম তাই করবে। কুণালের পছন্দ নিয়ে সােমের পছন্দ। তাই কুণালকে খামােখা দুটি ছােট মেয়ে দুই পাশ থেকে দুই সখীর মতাে পাখা করতে সুরু করে দিল। হিমেল হাওয়া লেগে সে বেচারার ইনফ্লুয়েঞ্জা হবার দাখিল। এমনিতেই তাে বােগা মানুষ। পড়ে পড়ে চোখদুটির মাথা খেয়েছে, অশােকপুত্র কুণালের মতােই অন্ধ- চশমা খুলে নিলে। সােমাদি যে ঘরে বসলেন সেটার সীলিং ছাড়া কোনােখানে একটুও ফাক ছিল না। দেয়ালে দেয়ালে লম্বমান ফোটো পট তৈলচিত্র—ভবনাথ পরিবার, দশমহাবিদ্যা, অমিয়কণা, স্বামীজি, পরমহংসদেব, দিল্লী দরবার, আশুতােষ মুখুয্যে, মহাত্মা গান্ধী, ইত্যাদি ইত্যাদি। নতুন ধুতীর উপরে মিলওয়ালাদের নামাঙ্কিত যেসব দেবদেবীর ছবি থাকে সেগুলিও বাদ যায়নি। মেজের উপর একটি বৃহৎ পালঙ্ক-ভবনাথবাবুর বিবাহের যৌতুক হবে। আলমারি সিন্দুক বাক্স পেটরা ইত্যাদি ছাড়া টেবল চেয়ার তাে আছেই, নইলে সােমাদি বসবেন কেমন করে? একটুখানি জায়গায় একটা ফরাস পাতা ছিল। তার উপর ছিল একটি হামোনিয়াম। সােম ললিতার কানে কানে বল্প, “এ বাড়ীর জামাই হলে বাড়ীভাড়া বাঁচতে পারে, কিন্তু প্রাণ বাঁচবে বলে বােধ হচ্ছে না।” ললিতা সােমের কানে কানে ব, “প্রাণের যিনি অধিক তিনি যদি থাকেন তবে প্রাণ গেলে ক্ষতি কী।” ভবনাথবাবু তাঁর গৃহিণীকে ও অপরাপর কন্যাদেরকে চালন করে আলেন, কেৰল অমিয়া রইল রিজার্ভে। এদের সবাই কুণালকে ও ললিতাকে নিয়ে ব্যস্ত, সােমের প্রতি দৃষ্টি নেই কারুর। বেচারা নােম অভিমনে না হয়ে উঠল। ভাল, কে এ বাড়ীতে এই মুহূর্তে সব অমিয়া ৭৭ প্রধান মানুষ? কে এই সম্বর্ধনার নায়ক? কার একটা কি না’র উপর এদের আয়ােজনের সার্থকতা অথবা ব্যর্থতা নির্ভর করছে? সে আমি। ওরা সকলে মিলে কুণালকে ও ললিতাকে সমক্ষণ কথা কওয়ালাে। বেচারা কুণাল যতবার বলে, “কল্যাণ যে বকোমধ্যে হংসােযথা হয়ে রইল, বক্ক কছি বলে আমরা যেন বক, সােম ততবার একটা রহস্যময় হাসি হাসে। প্রতিকণা, জ্যোতিঃকণা, নীহারকণারা তা দেখে চমৎকৃত হয়। ভবনাথবাবু বলেন, “কুণালবাবু, আপনার উপর এ বাড়ীর যা কিছু আশাভরসা। (আপনি কল্যাণের) অভিন্নহৃদয় বন্ধু।” ভবনাথের ভবার্ণবের তরণী বলেন, “ললিতা মা থাকতে আমি তাে এক রকম নিশ্চিন্ত হয়ে আছি। তােরা কেউ নিয়ে যা তােত থােকামণিকে। ও ঘরে সমস্ত সাজানাে রয়েছে, যেটা ওর পছন্দ হয় সেইটে ওর হাতে দে। যাবে না? মা মণিকে ছেড়ে যাবে না ? চলাে তা হলে তােমার মাকেও নিয়ে যাই। এসাে মা ললিতা, গরীবের বাডীতে যখন পা দিয়েছ তখন দেখতে হবে সমস্ত।” মনু কোথায় গেছল। এসে সােমের পিছনে দাড়িয়ে সােমের চোখ টিপে ধল। ভবনাথবাবুর তা দেখে চোখ উঠল টাটিয়ে। তিনি তাে জাতেন না যে মনু সােমের বন্ধু। বাবা যে ওখানে বসেছেন তাড়াতাডিতে মনুর ওদিকে নজর পড়েনি। সে যেন হঠাং সাপ দেখে লাফ দিয়ে পালালাে। সােম পিছন ফিরে দেখল কেউ নেই। সে একটু আশ্চৰ্য্য হয়ে কাৰ্যকারণ অনুধাবন করল। দ্বিজদাস বাবু চায়ের তত্ত্ব নিচ্ছিলেন। ভৃত্যকে বল্লেন, “খ, ব্যাটা, ওখানে রাখ,। ব্যাটা উরুক। সাতদিন ধরে ট্রেনিং দিচ্ছি, বিলেতফেরৎ জেন্টলম্যানকে কেমন করে গ দিতে হয়।” দ্বিজদাসের হাসির মূখখাসখানা এত অল্পেতে আলগা হয়ে আসে, তা কে ভেবেছিল।
৭৮ পুতুল নিয়ে খেলা ভৃত্যটির সদ্য পদোন্নতি হয়েছে। ছিল বাগানের মালী। হয়েছে খানসামা। পাগডীর উপর একটা B হরফ আঁটা। অর্থাৎ বােস সাহেবের খানসামা। পান খেয়ে দাতগুলিকে পাকা রঙে রাঙিয়েছে, হাতের তেলাে কোদাল ধরতে অভ্যস্ত বলে সেখানে বড় বড় কড়া। উৰ্দিটা কার কাছ থেকে ধার করে এনেছে, গায়ে ঢিলে হয়েছে। হাতের আস্তিন বার বার শুটোতে হচ্ছে। দ্বিজদাসবাবু আবার মুখােস এটে বল্লেন, “হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। শীতকাল। কড়া হয়েছে ? আর একটু দুধ দেবে? চিনি খান না? সব ঠিক আছে ? হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। ওরে ব্যাটা নন্দুরাম, যা যা, আরাে দু পেয়ালা নিয়ে আয়, ঝট করে—দাদার জন্যে, আমার এলাে।” ভবনাথ বল্লেন, “এত দেরি (হচ্ছে কেন?” চায়ের নয়, অমিয়ার। বিজদাস বল্লেন, “ওরা তাে এখনাে ওকে যথেষ্ট সক্রিত বলে মনে করতে পারছেন না বিলেত ফেরৎ জেন্টলম্যানের পক্ষে।”—ওঁরা মানে দ্বিজদাসের উনি। গৌরবে বহুবচন। মনু পা টিপে টিপে কখন এসে সােমের কাছে বসেছিল। ভবনাথ হুকুম করলেন, “যা তাে মন্ত্র। মনুকে যেতে হলাে না। অমিয়াকে দরজার কাছে পৌছে দিয়ে কে একটি মহিলা ঘােমটা টেনে দিয়ে ঝপ করে সরে গেলেন। গিয়ে একটু আড়াল থেকে উকি মারলেন। সুপ্রসিদ্ধ অমিয়া বােস ফরাসের উপর বসলেন। পা দুটিকে ভঁজ করে বাঁ দিকে রেখে ডান হাতের উপর ভর দিয়ে সামনে ঝুকে পড়লেন। বাঁ হাতটি কখন উঠে অবনত মূখের চিবুক সূলগ্ন হলাে, কখনাে নেমে উরুর উপর সংস্যত রইল। পা উঁৰ অধ্যােজামী। ভুলেও সােমের অভিমুখ হলাে না।
অমিয়
সােম লক্ষ করল যে অমিয়ার চোখে চশমা নেই, মুখ নিটোল, শরীর
সুঠাম। রং মলিন শ্যাম। ত্বক মসৃণ তৈলাক্ত।
তবে প্রাণের চাঞ্চল্য নেই, আছে একটা নির্জীব জড়তা তার
প্রকৃতিতে। যাই নেই তার চলনে চাউনিতে নডনে চডনে ভঙ্গীতে
স্থিতিতে। সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে। তার বিদ্যা তাকে মুক্তির স্বাদ
দেয়নি। পাহারা ও ডিসিপ্লিন মিলে তার স্বভাবকে নিষ্পিষ্ট ও শিষ্ট
করেছে। তার বিশিষ্টতার অবশিষ্ট নেই।
সােমের তত কথা বলবার কথা নয়, কথা বলার ভার কুণালের উপর।
কুণাল ইতস্তত করে বল্প, "মিস বােস, ইনি আমার বন্ধু মিষ্টার কে-কে
সােম।”
অমিয়া বাইকে একবার নমস্কার করেছিল।
নমস্কার করেছিল। সােমকে একান্ত
ভাবে নমস্কার করে আবার নতমুখী হলাে। না একটু হাসি, না একটা
চাউনি। সােম এতক্ষণ বুদ্ধি আঁটছিল। বস্তু, “হাউ ডু ইউ ডু ?”
অমিয়া পিতার দিকে তাকালাে। পিতা কন্যাকে উৎসর্গ করে
"Easy Conversations এর বই লিখেছেন। কিন্তু কাজের বেলায়
দু টু।
সােম যেন কোনােদিন বাংলা বলে না, যেন কত বড় ইব।
TH, "I've been reading your book, M188 BoBe How
wonderful to meet the author of a book one's been
reading 1
মিস্ বাে নীরব, নিস্পল। তার বাবা তার দিকে সংকেত করে
বলেন, "Writing another
"But, Miss Bose, how on earth do you manage to
write ga
কি বােস আবার পিঅর মুখের পানে চাইলেন।
৮০
পুতুল নিয়ে খেলা
Oh, somehow,* পিতা কন্যার হয়ে উত্তর দিলেন।
সােম কুণালের দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “Is she deaf
ol is she dumb ?
ভবনাথবাবু চটুতে পারেন না, অথচ চটবার কথা। সহিষ্ণুভাবে
বল্লেন, “No, no, not deaf and dumb Only shy"
দ্বিজদাস এতক্ষণ বিলেতফেরতের বিশুদ্ধ ইংরেজী শুনে তাজব
বােধ করছিলেন। ভ্রাতুপুত্রীর সম্বন্ধে সাহেবের ওরূপ ধারণা তাঁকে
লজ্জা দিল। তিনি বলে উঠলেন, “she is a Lakshmi girl,
although learned like Saraswati"
যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেও একটু উসখুস করছিল। একেবারে
পাষাণ তাে নয়।
সােম হাসি চেপে বড়, Then she ought to marry
Vishnu man
ভবনাথ দ্বিজদাসের উপর চটলেন। সে কেন ফপরদালালি করতে
যায়। দিক এখন এর জবাব।
জবাব দিতে না পেরে দ্বিজনাথ দাদার দিকে কাতর দৃষ্টিপাত
করলেন। দাদার মুখটা বিরক্তিতে বিকৃত। যেন ওল খেয়েছেন।
এই সময় ভবনাথ গৃহিণী সদলবলে প্রবেশ কলেল।
তিনি বলেন, “একটু গান হােক?”
ভবনাথ ফরমাস করলেন, “তনয়ে তারকা তারিণী।”
অমিয়া হারমােনিয়ামের আওয়াজ দিয়ে আরম্ভ করলাে।
CHA TEI,"Pleusi, Aliss Busi', cuu', I simply can't
Bland that instrument
মিস বােস ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাজনা থামালেন। তাঁর শরীর
কাপতে থাকুল। বিজস বৌদিদিকে বল্লেন, “আমি তাে বলেছি।
অমিয়া ১ একটা পিয়ানাে ভাড়া করতে। যাহা হামোনিয়াম তাহা পিয়ানাে, হিন্দী হরফ শেখার মতাে একটা দিন লাগে শিখতে।” ভবনাথ গৃহিণী বুঝতে পারেননি ইংরেজীতে সােম কী বল। দেনের কথা শুনে আন্দাজে বুঝলেন। সােমকে অনুনয় করে বল্লেন, "ই বাবা। অত ধরলে চলবে কেন ? আমরা গরীব বাঙালী গৃহস্থ। পিয়ানাে কোথায় পাবদা বলল? তবে তুমি যদি বলল যৌতুকের জন্যে একটা কিবাে এখন। না জানি কোন দু পাচশাে টাকা না নেবে।” সােয় এক প্রকার কৃত্রিম স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বল্ল, “আপনি- ভাবছেন—আমি——mean করিনি। l meanut—তার মানে আমি mean করেছিলুমহামোনিয়াম বাদ্যে যন্ত্রো—আমার কানে- যন্ত্রণা করে।” দ্বিজদাস দোভাষীর কাজ কবুল। বল্ল, “বৌদিদি, উনি বলছেন, হার্মেনিয়ামটা না বাজিয়ে অমনি গান করলে উনি শুনবেন।” ভবনাথ এর উত্তর দিলেন। বল্লেন, “দ্বিজুটা বড় বাড়াবাড়ি (কছে)।” দ্বিজদাস চুপ। আড়াল থেকে বিজদাস গৃহিণী টিপে টিপে হাসছিলেন। হামোনিয়ামের প্রথম আওয়াজ বাড়ীশুদ্ধ মানুষকে এই ঘরে চুটিয়ে এনে ফুটিয়েছিল—সাপখেলানাের বাঁশীর সুরের মততা, ভালুক নাচানাের ডুগডুগির বােলের মতে। হঠাৎ বাজনা থেমে যাওয়ায় চারিদিক থেকে অস্বস্তির গুঞ্জন উঠল। সব কথা লিখতে গেলে মহাভারত হয়। সংক্ষেপ করি। অমিয়ার মা তাকে বলেন, “তুই অমনি গান কর।” জমিদার বুক দুড় দুড় কছিল। যেন হামোনিয়ামটাকে নােম তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। গানটাকেও হয়ত তার গলা থেকে ছিনিয়ে নেবে। হয়ত বলবে, "I can'', simply can't stand that
পুতুল নিয়ে খেলা
noise
আরম্ভ কৰুতে তার ভরসা হচ্ছিল না।
আরম্ভ যদি বা কল
তবু আরম্ভই হয়ত শেষ এই আশঙ্কায় সে কেবলি হোঁচট খেতে থাকল।
সােম তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে বল্ল, “Fine। Fine।”
সত্বেও অমিয়ার আত্মবিশ্বাস উজ্জীবিত হল না। কয়েকটা কলি ডিঙ্গিয়ে
কোনােমতে সে সমে এসে ঠেকল।
সােম যখন বক্স, “Eueo” তখন সে তার করুণ চোখ দুটি তুলে
নিঃশব্দ মিনতি নিবেদন করল। 6771 TA, "Alrght Thank you,
Miss Bus
ফেরবার পথে ললিতা বঙ্গ, “শুনলে তাে রান্নার অধিকাংশ অমিয়ারই
হাতের। এমন মেয়ে দৈবে মেলে। যেমন বিদ্যায়, তেমনি স্বাস্থ্যে,
তেমনি গানে, তেমনি বন্ধনে।”
সােম ব, “বন্ধনের ভাব অন্যের উপর দিয়ে পরিবেশনটা যদি স্বহস্তে
করতেন তবে আমি ক্রন্দন করতুম না। কিন্তু ঐ নন্দুরাম খানসামা
কুণাল বল্ল, “বিলেতফেরতের যথােপযুক্ত সংকারের জন্যে ওরা চেষ্টার
কী করেননি।”
“সংকারই বটে,” সােম বক্স, “তবে তুমি ও ললিতা তত বিলেত
ফেরং নও, তােমাদের সংকার অমন ভাবে হলাে কেন জানাে ?
“জানি, কুণাল সখেদে বন্ধ।
“রক্ত গরম হয়ে ওঠে না ?”
ওঠা উচিত নয়।”
“ছে ললিতা। তােমার স্বামীটি একটি অপদার্থ।
“যে দেশে,” ললিতা বন্ধ, প্রত্যেকেই এক একটি পদার্থ সেদেশে
একটি অপদার্থ থাকলে মন্দ হয় না। তুমিও যদি একটি অপদার্থ হতে
আমি তােমার বােন বলে গর্ব অনুভব করতুম, কল্যাণদা।”
অমিয়া ৮৩ “কেন, আমি অন্যায়টা কী করেছি।” “অমন ওরাং ওটাংএর মত ইংরিজী আওড়ালে অমিয়া কেন যে কোনাে বাঙালীর মেয়ে বিপৰ্যন্ত হয়। ওর গানটাকে খুন কলে তুমি।” “তুমি ভাবছ ওর গান আরাে ভালাে ওরালেই ও আর্টিষ্ট হতাে ?” সােম হাসল। “আটিষ্ট ছিল সুলক্ষণা, ওর ধাত আলাদা।” “গানে কাচা হলে কী হয়, কত বই লিখছে।” “বই লিখছে বলে কি ও একজন intellectual? ললিতা, আমি একটি চাষানী পেলে বিয়ে করতে রাজি আছি, যদি পণের বাধা না থাকে। ললিতা, আমার কান্না পায় শিক্ষিতা মেয়েদের এ দেখে। ভেবে দেখ ললিতা, অন্য কোনাে সভ্য দেশে কি এমনটি সম্ভব ? বি-এ পাস করা বিদুষী মেয়ে পুত্তলিকার মতাে ফরাসটার উপর জড়সড় হয়ে বসে রইল। কেন গেল সে গান করতে? কেন সে দৃপ্তকণ্ঠে বল্ল না যে আমি গান জানিনে, আমি যা জানি তাই জানি—তারই দ্বারা আমার বিচার হােক।” “আজকাল,” ললিতা বন্ধু, “শুধু শিক্ষার বিচারের উপর নির্ভর করে কোনাে বিবাহযােগ্যা মেয়ের অভিভাবক নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। দেশের হাওয়া বদলেছে। শশুর শাশুড়ীরাও চান যে বৌ গান করুক বা না করুক অন্তত জানুক। জানুক বা না জানুক অন্তত জানা।” “কুসংস্কার। কুসংস্কার। সােম ক্ষিপ্ত হয়ে বল, “একটার পর একটা কুসংস্কার এদের চিত্ত দখল করছে, আর এরা ভাবছে ওরই নাম শিক্ষা, ওরই নাম সভ্যতা। আমি বর্বর হতে চাই, ললিতা। আমি সাঁওতাল মেয়ে বিয়ে করবাে।” “তা হলে, কুণাল হেসে বল্প, “আমরা তােমার বাড়ী খাবাে না। খেতে দেবে সাপৰি গোসাপ।” “ মানে,” শােৰ বৰু, তুমি আমার প্রতি সেই ব্যবহার করবে
৮৪
পুতুল নিয়ে খেলা
যে ব্যবহার করছেন ভবনাথ তােমার প্রতি। ভবনাথত্ব দেখছি
আপেক্ষিক।”
“সেই জন্যেই, কুণাল বল্ল, “রক্ত গরম হয়ে ওঠা উচিত নয়।
সাঁওতালরাও যাদের হনুমান বলে তাদের প্রতি আচরণে ভবনাথবাবুর
মত। সাঁওতালের মেয়ে হনুমান বিয়ে করছে এমন গল্প ওদের মধ্যে
বহুল প্রচলিত।”
“অতএব,” ললিতা হাসতে হাসতে বল্ল, “এই বিলিতী হনুমানটির
বিয়ের আশা ছেড়ে দিলে ভুল করবাে, সাঁওতালের মেয়ে থাকতে।”
পাশের বাড়ীতে টেলিফোন ছিল। অনুমতি নিয়ে সােম ডেকে বল্প,
“দ্বিজদাসবাবুর সঙ্গে কথা বলতে পারি? আমি কল্যাণকমার সােম।
কল্যাণকুমার দ্বিজদাসকে স্মরণ করছেন এত লােকের মধ্যে। দ্বিজদাস
খেতে খেতে উঠে ছুটে এলেন। “হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। Good night,
মিষ্টার সােম।”
সােম বল্ল “আপনাকে বিরক্ত কম বলে মাফ চাই।”
“না, না, না, না। বিরক্ত কিসের ?
“আজ আমি আপনাদের ওখানে সবাইকে জালাতন করেছি সেজন্যে
আপনাদের সকলের কাছে আমি মার্জনাপ্রার্থী।
“হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। সকলেই আপনার ব্যবহারে মূ। মই তাে
আপনাকে পূজা করছে। এমন অমায়িক নিরহঙ্কার ভদ্রলােক বিলেত
কের্তাদের ভিতর কেন, B N 4. দের ভিতরও দেখা যায় না।”
“ধন্যবাদ। এখন একটা জরুরি কথা আছে।”
জরুরি কথা। জরুরি কথা।”
“আজ্ঞে হ্যা। আমি বিশেষ কাজে ঐ রাস্তা দিয়ে ট্যাথিতে করে
যাচ্ছি।
অমিয়া
“নামবার সময় হবে না।”
“আচ্ছা।”
“মিস বােস যদি দয়া করে এক মিনিটের জন্ঠে ট্যাক্সিতে আমার সঙ্গে
দেখা করেন আমি তাকে কিছু বলবাে।”
“হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। অনায়াসে। স্বচ্ছন্দে।”
“ধন্যবাদ, মিষ্টার দ্বিজদাস।”
“আর লজ্জা দেবেন না।”
ট্যাক্সি যখন “ভবধামের সামনে দাড়িয়ে ধ্বক ধ্বক ভক ভক কবুল
তখন রাত এগারােটা। গায়ে একখানা শাল জড়িয়ে অমিয়া এসে
ট্যাক্সির দরজার কাছে দাড়ালাে।
“সে কী! আপনি দাঁড়িয়েই থাকবেন। তা হয় না।” ইংরেজীতে
এই কথা বলে সােম দরজাটা খুলে দিল—দিতে দিতে ব, "এক্সকিউজ,
মী। গায়ে গলাে ?”
“না, না বলে যন্ত্রচালিতের মতাে অমিয়া উঠে এলাে। কোনাে
অন্যায় বা অশােভন কাজ করছে কিনা ভাববার সুযােগ পেলােনা।
পিছনে একটু ব্যবধানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্বিজদাস, মনু, নীহাৱকণা, নন্দুয়াম
( তখন সে খানসামার সাজ খুলে ফেলেছে) ও অন্যান্য জনকয়েক।
ভবনাথবাবুর মাথা ধরেছে, তিনি নামেননি।
সােম যেন নিমেষের মধ্যে ছোঁ মেরে অমিয়াকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে
গেলাে। ওঁ সাক্ষীগােপালের মতাে দারুভূত হয়ে থাকলেন। যখন
ওঁদের সংজ্ঞা ফিল তখন দ্বিজদাস বল্লেন, “কই, টেলিফোনে তাে অমন
কোনাে কথা হনি। কানে কি আমি কম নি? কাকে এখন আমি
বােঝাবাে কী।”
ভবনাথবাবু আকাশ থেকে পড়লেন। যাতে ছাদ থেকে না পড়েন
পুতুল নিয়ে খেলা
সেজন্যে বাড়ীর একটা কামরায় তাঁকে বন্দী করা হলাে। তিনি হুকুম
করলেন পুলিশে খবর দিতে। কিন্তু গৃহিণী ও হুকুম নাকচ করলেন।
দ্বিজদাসকে তাঁর দাদা নিৰ্বাসন দণ্ড দিলে তার বৌদিদি তাকে পাঠালেন
কুণালের ওখানে।
মন্থর মনে পড়ল যে তার বন্ধু প্রস্তাব করেছিল তার দিদির সঙ্গে
নির্জনে বাক্যালাপ করতে। এখন একথা সে মার কাছে খুলে বন্ধু।
মা বল্লেন, “বেড়ে কেষ্ট। ঘটে একটু বুদ্ধি ছিল না যে মা'কে ওকথা
আগে বলি। বয়স যতই বাড়ছে লক্ষ্মী ততই ছাড়ছে, তিন বছর আই-এ
ফে-করা ছেলের আর কত বুদ্ধি হবে।”
মনু বকুনি সইতে না পেরে বাইসিকে চড়ে গৃহত্যাগী হলাে। দিদিকে
যদি উদ্ধার করতে পারে তবেই সে গৃহপ্রবেশ করবে। নতুবা
নতুবা কী ?
‘ভবধাম’ যখন লণ্ডভণ্ড তখন ট্যাক্সিতে অমিয়াকে সােম সম্পূর্ণ
সপ্রতিভ ভাবে বলছে, “Grand Hotlএ এর আগে কোনােদিন ঘানি,
গেছেন, মিস্ বােস?” (পরিষ্কার বাংলায়।)
অমিয়া তখনাে স্বপ্ন দেখছে। এই তত তার স্বপ্নের রাজপুত্র।
বিলেতফেরৎ, Grand Hotel-এ নিয়ে যায়। সে সলরে বড়,
“না।” চেয়েছিল সে বাইরের দিকে।
“তবে আপনি জীবনের কিছুই দেখেননি, মিস বােস। আপনার
জীবনেরও আরম্ভ হয়নি।”
স্বপ্নে কথা বলতে লজ্জা কিসের? অমিয়া বল, “না।”
দৈবক্রমে সেদিন ছিল Gala night. সােম সাভারের ফরমাস
দিয়ে অমিয়াকে ব, “ভয় নেই। নিষিদ্ধ মাংস খেতে হবে না। কিন্তু
মুঝিল এই দুৰী বঁটা নিয়ে।
এত আলাে, এমন বাজনা, এরূপ নাচ—আমি কেমন দিশাহারা হয়ে
অমিয়া ১৭ পড়েছিল। এত সাহেব মেম সে একত্র দেখেনি। সস্ত্রীক গুটি কয়েক ভারতীয়বােধ হয় পশী কি গুজরাটি—তাদের মধ্যে ছিটানাে। সােম অবালো, “নাচবেন?” অমিমা সবেগে ও সভয়ে ঘাড় নাড়লল। সােম বল্ল, “ও কিছু নয়। আধঘণ্টা অভ্যাস কলে দুরস্ত হয়ে যাবে।” অমিয়া কাদো কাঁদো স্বরে বল্ল, “না।” তখন সােম একটা লেকচার দিল। “মিস্ বােস্, আপনারা শিক্ষিতা মেয়েরা এমন ক্ষীণজীবী কেন ? কত ইংরেজী বই পড়লেন, প্রাণে কেন স্বাধীনতার হাওয়া লাগলাে না। ভাবছেন দেশ স্বাধীন হলে তারপরে ব্যক্তি স্বাধীন হবে- এ যেন গাড়ী আগে চলে ঘােডা পরে চলবে। স্বাধীন মানুষের দেশই হচ্ছে স্বাধীন দেশ-চলন্ত ঘােড়ার গাড়ীই হচ্ছে চলন্ত গাড়ী।” অমিয়ার তখন তর্ক করবার অবস্থা নয়। সে যে কী করেছে, কার সঙ্গে এসেছে, এ সব ক্রমে ক্রমে তার ঠাহর হল। স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয় সে গোঁড়া হিন্দু বাড়ীর আইবুড় মেয়ে, এসেছে এ কোন নরকে। কেন তার মতিচ্ছন্ন হলাে ? না, তার তত এতে মতি ছিল না। ক্রমে স্মরণ হলাে, মিষ্টার সােম তাকে গাড়ীতে উঠিয়ে এক দৌড়ে এখানে এনেছেন। কেন তিনি এমন কাজ করলেন? কেন তিনি বাবার অনুমতি নিলেন না? অন্তত তার নিজের সম্মতি ? সােম লক্ষ করল অমিয়ার দুই গাল বেয়ে অশ্রু জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তবু সে লেশমাত্র শব্দ করছে না। সােম ব্যঙ্গ করে বন, “সাবালিকা শিক্ষিতা তরুণী বটে। গ্রাজুয়েট এবং গ্রন্থকত্রী।” অমিয় অস্ফুট স্বরে ব, “আমাকে বাড়ী নিয়ে চলুন।” “সে কী। এখলাে খাওয়া হয়নি যে।”
পুতুল নিয়ে খেলা
অমিয়া ফিস্ ফিস্ করে বল্ল, “খাবাে না।”
“না খান। খাওয়া দেখুন।
অমিয়া ফি ফিস্ করে আর্তভাবে বল্ল, “বাড়ী যাবে।”
“বাডী তাে আপনার আলাদিনের বাড়ী নয় যে আপনার অসাক্ষাতে
উড়ে যাবে। আমি আপনাকে অভয় দিচ্ছি, আপনার বাড়ী পুড়ে যাবে
, পড়েও যাবে না।”
অমিয়া কাতর স্বরে বল্প, “দয়া করুন।”
“দয়া? দয়া তাে আপনারই কবার কথা। আপনার বাড়ী খেয়ে
এলুম, তার ঋণ শােধ করূতে দিন্।”
অমিয়া তবু ব, “খাবাে না। যাব।”
“আপনারা নিমন্ত্রণ করলেন, আমি নিমন্ত্রণ রক্ষা করলুম। আমার
নিমন্ত্রণ আপনি রক্ষা না করলে বুঝব আপনারা আমাকে হেয়জ্ঞান
করেন। সেটা কি ভালাে ?”
অমিয়া তর্ক করলাে না, শুধু বল, “বাবাে।”
অগত্যা সােম ফরমাসী খাবারের দাম চুকিয়ে দিয়ে অমিয়াকে নিয়ে
ট্যাক্সিতে উঠল। বল, “বাড়ীও থাকবে, বাড়ীর মানুষও থাকবেন,
জীবনের দৈনন্দিন প্রক্ৰম থাকবে অক্ষুন্ন। থাকবে না একমাত্র আজকের
এই রাতটি, রাত্রের একটি ছােট ঘণ্টা আর সেই ঘণ্টায় যে কয়টি কথা
বলতে পারত একটি অচিন তরুণ সেই কয়টি কথা। অমিয়া দৈবী, এখন
সময় আছে। ট্যাক্সিকে ঘুরতে বলব?”
বাড়ী পৌছে কী দেখবে তাই এতক্ষণ অমিয়ার কল্পনা অধিকার
করেছিল, বিপরীত যাত্রার প্রস্তাব সেখানে প্রবেশ পেলাে না। আমি
এ ভাবে বল, “না, না।”
ট্যাক্সি ছুটতে লাগল। চুটুতে লাগল পথের পাশের বাতি। এতে
লাগল সময়। সুযােগও দুইতে লাগল।
অমিয়া
সােম বন্ধু, “আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল—নির্জনে। সেটা
অ-বলা অইলে বিয়ে রয় অ-করা। সেই জন্যে আপনাকে নির্জন স্থানে
নিয়ে গেছলুম—যেখানে জনতা সেইখানে নির্জনতা। আপনি নিজের
বিয়ে নিজের হাতে ভাঙলেন। এর পর যদি আপনার বাবা আসেন
বাড়ী চড়াও করে ঝগড়া বাধাতে কিম্বা যা আদালতে মামলা করতে
তবে আর কি ভাঙা বিয়ে জোড়া লাগবে ? অমিয়া, এখনাে সময় আছে।”
অমিয়া কেঁদে উঠল। উত্তর দিল না।
গাড়ী এসে বারান্দায় লাগল। অমিয়াকে নামিয়ে দিয়ে সােম বন্ধ,
“হকাও।
ললিতা ও কুণাল বাইরের ঘরে রাত জাগছিল। তাদের সঙ্গে
মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন দ্বিজদাসবাবু। কোন মুখে তিনি বাড়ী
ফিরবেন? জিজ্ঞাসা করছিলেন, “কর্ণরােগের কোনাে স্পেশ্যালিষ্টের নাম
করতে পারেন? একবার দেখাই আমার বাঁ কানটা। মিষ্টার সােম
আমাকে কী বল্লেন আর আমি কী শুনুলুম।” এমন সময় সােম কপাটের
কড়া নাড়ল।
বল্প, “কুণাল, জেগে আছ হে ?” দ্বিজদাস ভাবছিলেন
আর-কেউ। কুণাল বল্ল, “বাচা গেল।”
সােম কুণালকে কী বলতে বলতে ঘরে ঢুকে দেখে—দ্বিজদাস।
তিনিও সােমকে দেখে চমকালেন। ললিতা বল্ল, “কই, অমিয়া কই ?
ওকে কোথায় রেখে এলে ?”
সােম নির্বিকার ভাবে ৰঙ, “ওঁর বাপের বাড়ীতে।”
যাওয়া হয়েছিল কোথায় ?” সুধালেন দ্বিজদাস।
“রসাতলে।” বর সােম।
দ্বিজদাসের কেমন ধারণা বাড়িয়ে গেছল যে তিনি কানে কম
শােনেন। রসাতল নামে কোনাে পাড়া তাে কলকাতায় নেই। ওটা
করা যােত ।
পুতুল নিয়ে খেলা “রসা রােডে এমন কী কাজ ছিল এত রাত্রে আর অমিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?” তিনি সবিস্ময়ে বল্লেন। “ওকথা জানি আমি আর জানেন অমিয়া। তৃতীয় ব্যক্তির নিকট প্রকাশনীয় নয়।” ললিতা সাভিমানে বল্ল, “আমরাও শুতে পাবাে না ?” কুণাল তাকে ইসারায় বল্ল, চুপ চুপ। দ্বিজদাসবাবু অত্যন্ত দমে গেছলেন। পরের বাড়ীতে অত বড় একজন বিলেতফেৰ্ত্তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে সাহস হবে কেন ? তা ছাড়া লােকটিও তিনি গােবেচারি, মার্চেন্ট আপিসের কেরাণী। সােমের উপর তঁার অখণ্ড বিশ্বাস ছিল, অমন জেন্টলম্যান কি কখনাে অন্যায় কাজ করতে পারে? এত । তিনি নিজের কানকে দোষ দিচ্ছিলেন, এখন দিলেন নিজের নীচ মনকে। দ্বিজদাস উঠতে যাচ্ছিলেন, সােম তার দিকে একটা সিগ্রেট বাড়িয়ে দিয়ে বল, “আপনারা তাে আমাদের বাড়ীতে বা আমাদের হােটেলে চা পয্যন্ত খাবেন না। আমাদের ঋণশােধ হয় কী উপায়ে ?” পরম আপ্যায়িত বােধ করে দ্বিজদাস বসে পড়লেন। নিলেন সিগ্রেট। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ। কাল বল্ল, “ডাবের জল কিম্বা ঘােলের সবং নেই, কিন্তু এক পেয়ালা চা হােক। কী বলেন দ্বিজদাসবাবু?” “না ভাই, অসময়ে আর কেন ও সব ?” “চা তাে যে কোনাে সময় খাওয়া যায়।”—এটা দ্বিজদাসেরই বচন। বিজদাস বনে, “অনেকটা মুর যেতে হবে, তাও পদব্রজে। শীতের হাওয়ায় হি হি কৰবার আগে শরীরটাকে একটু-হেঁ হেঁ-করা ভালাে।” ললিতা গেল চা তৈরি করতে। এমন সময় খােলদা, দরজা খােলদা।” ঘন ঘন কড়া নাড়া। দুঙ্গ দুড়ম কিল, দড়াম চড়াম লাথি। কেমন অতিথি এৱা ? বিলাস
অমিয়া
ঠক ঠক করে কাপতে লাগলেন। সােম ললিতা কুণালের জন্যে উদ্বিগ্ন
হলাে। পুলিশ নয় তাে ?
কুণাল দরজা খুলে না দিলে ভবনাথবাবু দরজা ভাঙতেন। “এই
যে কুণাল। এ মেয়ে আমার নয়। (এর) জাত ইজ্জং গেছে।
ভধামে { এর) ঠাই নেই। (একে) তােমার এখানে দিতে এলুম।”
ভবনাথের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, তার মেয়ে, তার চাকর। কুণাল বল্ল,
“আসুন, আপনারা দয়া করে বন একটু।”
ভবনাথ বল্লেন, “না। (তার) দরকার নেই।”
ললিতা কখন এসে ভবনাথপত্নীর হাত ধরেছিল। কান টানলে
যেমন মাথা আসে তেমনি পত্নীকে টালে পতি। বসবার ঘরে দ্বিজদাসকে
আবিষ্কার করে ভবনাথ জ্বলে উঠলেন। “ভাই (হয়ে) তুই ( এই )
চক্রান্তে লিপ্ত ?” লক্ষ করলেন ভাইয়ের হাতে অর্ধদগ্ধ সিগ্রেট। “ক্যাল
ওটা”, বলে ভাইয়ের হাতের উপর কষিয়ে দিলেন এক মা। সিগ্রেটটা
ছিটকে সােমের পায়ের কাছে পড়ল। সােম তার সিগ্রেটটাকে তারিক
করে টাছিল, ভবনাথের নাকের অদূরে ধোঁয়া ছাড়ল।
“কী সায়েব, ভবনাথ বলেন সােমকে, “গ্র্যাণ্ড হােটেলে ঘাড়ের মাথার
ডানা কেমন লাগল? ক’ বােতল খুল্লেন ?”
“সেটা আপনার কন্যাকে জিজ্ঞাসা করেননি ?” বল্ল সােম।
“যেমন দেব তেমনি দেবী।” (ওর গায়ের গন্ধ শুকেই (বুকেছি।
কী পড়েছে পেটে। ওয়াক”
অমিয়ার চোখ খরগােসের মতো লাল। সে আবার চোখ মুছল।
“দিব্যি এ্যাও হােটেলী গন্ধ।” ভবনাথ বলতে থাকলেন। “যে
মানুষের নাক (আছে) সেই বুঝবে।"নাক দিয়ে ৩ ৩ করে
কলেন। তার বাবা নাকের অস্তিত্ব সপ্রমাণ হলাে।
ভবনাথপত্নীও বিল অমিয়া কিছু খেয়েছে। তিনি একটা
পুতুল নিয়ে খেলা প্রায়শ্চিত্তের প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু ভবনাথ বল্লেন, “প্রায়শ্চিত্ত কোনাে কাল সকালে, আজ রাত্রে আমি ও মেয়েকে বাড়ীতে জায়গা দিচ্ছিনে, কে জানে কাল ঘুম থেকে উঠে ওর মুখ দেখৰ সৰ আগে।” সােম অমিয়ার অবস্থা দেখে সীনিকের মতাে হাসছিল। মনে মনে বছিল, “না খেয়ে এই। খেলে এর বেশী কী হত? বাড়ী যাব, বাড়ী যাবাে। কোনটা তােমার বাড়ী ? ওটা না এটা ? ওঠো এখন এই বাড়ীতে। কাল তােমাকে সত্যি সত্যি খাইয়ে আবাে।” ভবনাথবাবু বল্লেন, “আসি তা হলে, কুণাল । ও মেয়েকে ( কোনাে ) আৰ্যসন্তান গ্রহণ করবে না। দেখাে যদি তােমাদের সঙ্কর সমাজে (ওকে) পাত্রস্থ করতে পারাে।” ভবনাথবাবু সত্যিই গা তুল্লেন। সেই সঙ্গে অমিয়াও। হঠাৎ একটা পতনের শব্দ হলাে। সকলে চেয়ে দেখল অমিয়া তার বাবার পায়ে পড়ে মাথা খুড়ছে। তার মা তাকে তােলবার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। ভবনাথ বছিলেন, “যেমন কর্ম তেমনি ফল।” GIU (C7 FAQE TA, "I challenge you-I challenge you to provi যে উনি এ্যাও, হােটেলে গিয়ে কিছু মুখে দিয়েছেন?” দ্বিজদাস একান্তে কালকে বল্লেন, “আমি তাে ভেবেছিলুম বলা নােছ।” ভবনাথের ধারণা পৃথিবীতে একমাত্র তিনিই রৌরসের অধিকারী। সােমকে রাগান্বিত দেখে তিনি ভাবলেন, তাই তাে, এ তাে সামান্য লােক নয়। তিনি তােলাতে তােৎলাতে বল্লেন, “এ-এ-একই কথা। ধা-দ-ভ্রাণেন অন্ধভােজন।” সােম যত না চটেছিল তার বেশী চট্রর ভাণ কছিল। ব, “Darun your ফ্রাণেন। আপনি কোনােদিন ভােজনের বদলে মা করে স্কুলে গেছেন ? You old bully
অমিয়া
ভবনাথবাবু পিছু হটতে লাগলেন। তার স্ত্রী এসে মাঝখানে
দাঁড়ালেন। ইংরেজী buly কথাটা তার কানে গুলীর মতাে শােনালাে।
দ্বিজনাথও অবলার সাহস দেখে সাহস পেলেন, সােমের দুটো হাত পিছন
থেকে চেপে ধরলেন।
কুণাল বয়, “ছি, ছি, এ কী করছ, কল্যাণ ?”
লগিতা গিয়ে অমিয়াকে ধরাধরি করে তুল্ল।
সােম বক্স, “ও মেয়েকে রেখে যেতে চান রেখে যান। কিন্তু কাল
খোঁজ করলে ওর পাত্তা পাবেন না। শেষকালে খবরের কাগজে
Amiya, come back' ছেপে পুরস্কার ঘােষণা করতে হবে।”
চকু বিস্ফারিত করে ভবনাথ বল্লেন, “য়া।”—তার বদনের ব্যাদান
তাঁর নয়নের বিস্ফারের সঙ্গে ম্যাচ, করল।
সােম তার অনুকরণ করে বঙ্গ, “হ্যা।” তখন ভবনাথবাবু একহাতে
অমিয়ার হাত ধরে অন্য হাতটা গিন্নীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বল্লেন,
“তুমি থেকে যেময়াে না। তােমার জন্যে (কাগজে) বিজ্ঞাপন দিতে
(আমার) লজ্জা করবে।”
সােম ভেবেছিল আপদ চুকেছে, ভবনাথবাবুরা যেমন অপরিচিত
ছিলেন তেমনি অপরিচিত হয়ে গেছেন। পরদিন রবিবার, শােম
ললিতাদের বেড়াতে নিয়ে যাবার উদ্যোগ করছে, বারম্বার তাগিদ দিয়ে
বলছে, “ললিতা, দেশে এত বড় নারীজাগরণ ঘটল, তবু তােমাদের
মেয়েলি কাপড় পরার সময় সংক্ষেপ হলাে না।
হেনকালে এর আবির্ভাব।
সােথ একটু আশ্চর্য হয়ে ৰয়, কী বন্ধু, কী মনে করে ?”
মও একটু আশ্চর্য হয়ে বল্ল, আমাকে যে আ আসতে
বলেছিলেন।”
১৪
পুতুল নিয়ে খেলা
৩
“ওঃ ঠিক ঠিক। বাড়ীর ওঁরা আসতে দিলেন?”
“আমার আসা যাওয়ার উপর কর্তৃত্ব করা, মনু স্পর্ধাভরে বড়,
“বুঝলেন দাদা, শিবের অসাধ্য।”
“নাও, নাও, সিগ্রেট নাও। তারপর ওদিকের খবর কী?”
“খবর তাে আপনিই ভালাে জানেন। গ্র্যাণ্ড, হােটলে গেলেন,
আমাকে নিলেন না। আমাকে নিলে কি এত কথা উঠত?”
“যা বলেছ।” সােম মনে মনে বল্ল, তােমাকে নিলে কথা উঠত
বটে, কিন্তু কথাটাও উঠত না।
“যাক, ও সব দুদিন বাদে থেমে যাবে।” মনু মুরুব্বিয়ানা ফলিয়ে
গম্ভীরভাবে বল্ল, “অমন হয়ে থাকে, সংসার করতে গেলে অমন একটু
আধটু শুনতে হয়, সইতে হয়। তারপর বল্ল, “বড় পিসীমা বাবাকে
সেই কথা বােঝাচ্ছিলেন আজ সারা সকাল।”
“বাবা বুঝলেন?”
“বােঝা তাে উচিত। বিয়ে যখন ধরুতে গেলে হবেই তখন দুদ্দিন
আগে বরের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া ও হােটেলে খাওয়া খুব একটা গহিত
কাজ নয়। অন্তত আমরা তরুণরা তাে তাই বুঝি।”
“তরুণরা কী বােকেন,” সােম প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গের স্বরে বঙ্গে, “তা তাে
দেখতেই পাচ্ছি। তরুণীরাও কি তাই বােঝেন ?”
“তরুণীদের কথা যদি বল্লেন," মনু মাতব্বরের মতাে বা, “আমাদের
যুব-সমিতিতে আমরাই তরুণী সেজে বসে আছি। জগদা বন্ধু, জ্যোৎ
দত্ত, সান্ত্বনা পাল এ সব নাম আমাদেরই।”
“জগদা কেটে জগদম্বা কলেও তােমাৰুে তরুণী বলে ভ্রম হবে না,
বন্ধু। এখন বলাে দেখি তােমার দিদি কী বুঝলেন?”
“দিদির একটা স্বতন্ত্র মন আছে নাকি? বাবা যা বুঝবেন ও তাই
-বুঝবে। যা করবেন বাবা ও করবে তাই।”
घमिना “ধন্য ধন্য অমিয়া বস্তু। কিন্তু তুমি যে, বন্ধু, আমার সঙ্গে ওঁর বিয়ে দিয়ে দিলে দুদিন বাদে, তুমি তাে ওঁর বাবা নও, তােমার নির্দেশ উনি মাবেন কেন?” মনু বিস্মিত হল। বিস্মিত ও জিজ্ঞা। সােম বল্ল, “অর্থাৎ তােমার বাবা যে দুদিন বাদে আমার সঙ্গে ওঁর বিয়ে দেবেন এ তুমি কার কাছে জানতে পেলে ?” “দেখবেন আমার কথা ফলে কি না।” মনু বল্প সাহঙ্কারে। “আহা।” সােম বল্ল, “তুমি যত বড জ্যোতিষী হও না কেন, এই সােজা জিনিসটা তত বােঝে যে আমার মত একটা চরিত্রহীন যুবককে তােমার দিদি স্বেচ্ছায় বিয়ে করবেন না? এবং এটা তােত বিশ্বাস করতে পারে যে আমিও অনিচ্ছুককে বিয়ে করতে অনিচ্ছুক ?” মনু হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ সােমকে নিরীক্ষণ করল। “কী নিরীক্ষণ করছ?” সােম বল্ল, “চরিত্রহীন কি না তা কি চেহারায় লেখা আছে ? তুমি কি জ্যোতিষের সঙ্গে সঙ্গে সামুদ্রিকও জানাে ?” “যাঃ।” মনু উড়িয়ে দিল সােমের কথা। “যাঃ। আপনি কখনাে চরিত্রহীন হতে পারেন। “ধনাে যদি হয়ে থাকি?” “তবে, মনু গভীর হয়ে গেল। তবে অবশ্য বিয়ে হতে পারে না।” পারে না তাে?” সােথ বন্ধু, “আমিও তাই বলি। তাই আমার সিদ্ধান্ত। এখন তুমি যেমন করে পাননা প্রসঙ্গটা তােমার দিদির কাছে পাড়লে ওকে একটা সুযােগ দেওয়া হয়। কে জানে হয়ত তিনি আমাকে যেমনটি পাচ্ছেন তেমনটি নিতে ইচ্ছুক হবেন আর তিনি যদি ইচ্ছুক হন তবে আমি তাকে আবার একদিন লুট করে নিয়ে সােজাখুজি বিয়ে করে ফেল। তারুণ্যের প্রথম সূত্র হচ্ছে গুরুজনকে—middle manainate করা।”
পুতুল নিয়ে খেলা মনুর তখন মাথা ঘুরছিল। সে প্রথমে ঠাওরেছিল ওটা ঠাট্টা, তারপর ওটা একটা কল্পিত সমস্যা। ওটা-ঐ চরিত্রহীনতাটা—যে সত্য তা কি মনু বিশ্বাস করতে চেয়েছিল? কিন্তু সত্য ওটা। বড় কুৎসিত সত্য। দিদির কাছে ঐ কুৎসিত প্রসঙ্গ পাড়বে কেন সে ? সে সবেগে মাথা নেড়ে বল্ল, “না, না, না, না, না,।” সােম যে লুট করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে, শেষের এ কথা তার কানে ঢুকল না। সে গােড়ার কথাটা নিয়ে মাখা নেড়ে বলতে থাকল, “না, না, না, না, না।” সােম বুঝল উল্টো। বল্ল, “আচ্ছা, না হয় লুট করব না। প্রাজাপত্য বিবাহ যদি সম্ভব হয় তবে রাক্ষস বিবাহ কে চায়? কিন্তু গােড়ার কথাটা জরুরি। দিদিকে বলা চাইই।” মনু বল্ল, “না।” “কী ? বলা উচিত নয় ?” “উচিত বৈ কি।” “তবে?” “আমি বলতে পারবাে না।” সােম চুপ করে থাকল। তারপর ললিতাকে ডাক দিয়ে বঙ্গ, তােমার কিন্তু বড় দেরি হচ্ছে। কুণালটার হলে কী? লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখছে না তাে ?” বলবে না বলে গেল মনু, কিন্তু বাড়ী পেীছে তার প্রথম কাজ হলাে মা’র কাছে হাজিরা দেওয়া, মাকে বন্ধ, কাল তাে তুমি আমাকে খুব বকে দিলে আগে তােমাকে ও কথা জানাইনি বলে। আজ কী জেনে মা এনে জিভ, কালেন। তার ধারণা ছিল কল্যাণ ছেলেটা একটু বেরকম সাহেব, কাল তাঁর মেয়ের সনে সাহেবী ব্যবহার করেছে, অমিয়া হােক না কেন তা অসামাজিক। আজ তিনি নিঃসন্দেহ বুঝলেন যে সাহেব নয়, লম্পট। তার উদ্দেশ্য ছিল অমিয়ার ধর্ম নাশ করা। যেই একথা মনে আসা অমনি সুর করে কেঁদে ওঠা। কাল মেয়ের গান শুতে যে সকল লােক জড হয়েছিল আজ মায়ের কান্না শুতেও সেই সকল লােক এলাে। ওরা সুধায়, “কী হয়েছে, টুলীর মা ?” টুলীর মা বলেন, “ওগো আমার কী হবে গাে। ওরে আমার টুলী বে।” কাঁদতে কাদতে আছাড় খেয়ে পড়েন। তাঁর দুঃখ দেখে সকলের চোখে জল। ছােট মেয়েরা বলে, “কেঁ না মা কেঁদ না।” অথচ তারা নিজেরাই কেঁদে আকুল। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে এ পর্যন্ত টুলী ছাড়া অন্য কেউ চোখের জল ফেলেনি, টুলীর মা’ও বড় জোর গম্ভীর হয়ে রয়েছিলেন। হঠাৎ এই অকান্নার অর্থ কী। কেউ কাউকে এর উত্তর দিতে পারে না। সকলে ভাবে টুলীর মা বড় চাপা প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু শেষ পৰ্যন্ত সামলাতে পারলেন না। আশ্রিত যারা ছিলেন তারা শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন, “টুলীর মা’র মতাে দুঃখিনী ক’জন আছে ? আমরা তাে দেখিনি বা শুনিনি।” আত্মীয় ধারা ছিলেন, তারা বলেন, “কেঁদে কী হবে, টুলীর মা, (বা দিদি, বা মাসীমা, বা কাকীমা) লােয় ডালােয় বিনেটা ভাে হয়ে যাক।” টুলীর মা অবােধ মানেন না। “ওগাে আমার দুঃখের অবধি নেই গগা। আমার টুলী রে।”—কাদতে কাঁদতে বিষম খান। সবাই যখন তাঁর কায়ার জালায় উত্ত্যক্ত তখন ভবনাথ ও বিজল প্রায়শ্চিত্তের বিধান নিয়ে ফিরলেন। দুই ভায়ে আগের মতাে সৌহার্শ। কাল সােমের হাত চেপে ধরে ছিলাস ভবষের প্রাণ না-হাক মান রক্ষা করেছেন। ল লমান ভাই।
১
পুতুল নিয়ে খেলা
“কী হয়েছে, টুলীর মা? কী হয়েছে।”
টুলীর মা এতক্ষণ কথাটা বহু কষ্টে চেপে রেখেছিলেন সব আগে
স্বামীকে শােনাবেন বলে। আধখানা ভেঙে বল্লেন, “শুধু খাওয়া
নয় গাে ।”
“কী বলছ ?”
“ওগাে শুধু খাওয়া নয় গাে !”
ভবনাথ দ্বিজনাথের দিকে তাকালেন। ভূতে পেয়েছে নাকি? ওঝা
ডাকানাে দরকার মনে করাে ?
“ওগাে শুধু খাওয়া নয়। ওটা সাহেবী কাপড় পরা গুণ্ডা গাে।
আমার কী হবে।”
(তার পরে সহজ স্বরে)
কলকাতায় তত বেশ শান্তিতে ছিলুম। কিন্তু *
আবার নােমান ভাবে)
“টেগার্ট সাহেব চলে গিয়ে কত রাজ্যের গুণ্ডা যে এসেছে, আর
কলকাতায় তিষ্ঠান যায় না, তুমি এখান থেকে চলল।”
ভবনাথ বিরক্তি প্রকাশ করে বল্লেন, “টেগার্ট সাহেব বিলেত চলে
গেছেন (বলে) আমিও বিলেত চলে যাবে। বলে কী হে দ্বিজু।”
“বৌদি, দ্বিজদাস দোভাষীর কাজ করলেন, “দাদাকে কোথায় চলে
যেতে বলছ? ভেঙে বলল।”
“কাণী গাে কাশী। তােৰা সৰ যা এখান থেকে। যা তােরা।
দ্বিজদাস তাদের খেদিয়ে নিয়ে গেলেন। তবু দুটো একটা লেপটে
থাকল।
“ওগাে শুধু খাওয়া নয়। নাতি হবে।”
অনাথ ল দিয়ে বলেন, “কী?”
বিশাল কশমাম ভাবে বলেন, “কক কী
অমিয়া ভবনাথ দাপাদাপি করে বেড়ালেন। হাতে লাগলেন, “আমার বন্দুক। আমার বন্দুক। আমার বন্দুক।” তার গৃহিণী সহসা প্রকৃতিস্থ হয়ে দ্বিজদাসকে বল্লেন, “দাড়িয়ে দেখছ কী, ঠাকুরপাে? টুলীকে সরাও। নইলে তারই উপর গুলী চবে।” টুলীর উপর গুলী। একথা ভাবতেই দ্বিজদাস আঁৎকে উঠলেন। দাদার সম্মুখীন হয়ে বল্লেন, “দাদা, লুঠি তত ভাণ্ডার, মারি তত গণ্ডার। আসুন গুণ্ডা মারতে যাই।” দাদা বল্লেন, “কিন্তু বন্দুক ?” “না না, বন্দুক ঘাডে করে বেনােলে ধরে নিয়ে যাবে। আপনি মাবেন কিল আমি মারবাে লাথি, তা হলেই মরে যাবে।” “উহু। আমি ( মারব) লাথি, তুমি ( মারবে) কিল।” “বেশ, তাই হবে।” দু ভাই ট্রামে চডে খুন করতে চল্লেন। ট্রামের অন্যান্য আরােহী কেমন করে জানবে যে এরা দু জন হবু খুনে ও গবু খুনে। হায় । কত খুনে যে নিরীহ ভদ্রলােকের বেশে নিরীহ ভদ্রলােকের পাশে বসে কাৰ্যসিদ্ধির উপায় চিন্তা করতে করতে কাৰ্যস্থলে যায়। কিন্তু খুনের কাছ থেকেও ট্রাম কোম্পানী টিকিটের পয়সা চায়। এদের অতটা খেয়াল ছিল না। হড় হড় করে নামিয়ে দিল। শুভকর্মের মতাে অশুভকর্শেও বহু বিয়। পায়ে হেঁটে যাবার বাধ্যতায় ভবনাথবাবুর উৎসাহ মন্দীভূত হলাে। অতখানি হাঁটুলে লাথি জোর থাকবে না। বিদাসটা মনের সুখে কিলােবে, চড়াবে, তােবে, চিষ্টাৰে, আর তিনি মারবেন মাত্র গােটা কয়েক দুর্বল লাথি। “না,” তিনি ঘাড় নেড়ে বলেন, “আমি (মারবাে) কিল-চড়, তুই (মারিস)লাখি।” দ্বিজদাস কাৰ্যকারণ বিনির্ণয় না করতে পেরে আশ্চর্য হলেন। বল্লেন, “যে আনে।
পুতুল নিয়ে খেলা
কুণালের বাড়ীতে পৌছে তারা দেখলেন পাখী উড়ে গেছে।
বাড়ী খালি।
ভবনাথ বল্লেন, “এখন কী করা যায়, দ্বিজু।”
দ্বিজদাস বল্লেন, “তাই তাে।”
ভবনাথ বল্লেন, “পার্কে গিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক।”
দ্বিজদাস বল্লেন, “সেটা ভালাে।”
অশুভকর্মেও এত বিপ্ন। অশুভকর্মের সঙ্কল্প আর টে কে কই?
ভবনাথ এতক্ষণ চিন্তার অবকাশ পেলেন। তখন দ্বিজদাস ভয়ে বল্লেন,
“দাদা, ভেবে কি দেখেছেন ?”
“কী ?”
“আপনার ও আমার ফাসি কি দ্বীপান্তর হলে আমাদের স্ত্রীপুত্রকন্যার
কী দশা হবে?”
ভবনাথ বল্লেন, “ই।”
“আমি বলি,” দ্বিজদাস ভয়ে ভয়ে প্রস্তাব করলেন, “আগে একবার
বিয়ের জন্যে শাসানাে যাক্। তাতে যদি ফল না হয়—
“তা হলে ?”
“তা হলে গুঞ্জ' লেলিয়ে দিতে হবে।”
“ঠিক বলেছ। কণ্টকেনৈব কণ্টক। গুণ্ডার পিছনে গুণ্ডা।”
বিশ্রাম করে দুই ভাই আবার কুণালের ওখানে চল্লেন। এবার
দেখলেন আলাে আছে।
“দ্যাখাে, তুমি যদি ও মেয়েকে বিয়ে না করে দ্বিাসের সােমকে
‘আপনি’ বলতেও অভিরুচি হলাে না।
“বিয়েই তাে করতে চাই।” নােম ।
“তবে? ভিস নদে রেগে বুঝি বা ঘা।
অমিয়া
১০১
“তবে তার আগে জানতে চাই তিনি আমাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক
কি না।”
“একশাে বার ইচ্ছুক।” দ্বিজদাস হিষ্টিরিয়াগ্রন্তের মত হাসতে
হাসতে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপতে কাপতে বল্লেন।
“আমি চরিত্রহীন একথা তিনি শুনেছেন ?”
“শুনতে হবে না। জেনেছেন।”
“তার মানে?”
“তার মানে তােমার কাজের দ্বারাই তােমার পরিচয়, ওহে
ন্যাকারাম।”
ভবনাথ জুড়ে দিলেন, “ওহে নারকী।”
সােম বল্ল, “আপনারা এ সমস্ত কী সাজেষ্ট করছেন?”
দ্বিজদাস বিশ্রী হেসে একটা অশ্লীল উক্তি করলেন। তা শুনে সােম
ততা হতবাক। ভবনাথকেও লজ্জিত বােধ হলাে। ভাগ্যক্রমে ললিতা
ওখানে ছিল না। কুণাল পলায়ন কল।
দ্বিজদাস তাগাদা দিলেন। বল্লেন, “কি হে সুন্দর, বিদ্যাকে এখন তুমি
ছাড়া আর কে বিয়ে কবে? বিদ্যা রাজি না হয়ে পারে ?”
সােম বল্ল, “কী করে আপনারা জানলেন? বলেছেন তিনি ও কথা ?”
“বলতে হয় না, বলতে হয় না। “Men may lie, but
circumstances cannot আমি যে সেদিন জুরর হয়ে স্বকর্ণে শুনে
এসেছি।”
এর উত্তরে কী বলতে পারে? সােম চুপ করে রইল।
দ্বিজদাস পুনশ্চ প্রশ্ন করলেন, “বলল ও মেয়েকে বিয়ে করবে কি না।”
“যদি তিনি নিজ মুখে বলেন ও আমি নিজের কানে শুনি যে আমার
চরিত্রহীনতা সত্বেও তিনি আমাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক তবেই আমি
তাকে বিবাহ করব, নতুবা নয়।”
১২
পুতুল নিয়ে খেলা
সােমের এই উক্তির পর দ্বিজদাস ও ভবনাথ পরস্পরের মুখ চাওয়া-
চাওয়ি কবুলেন। ভবনাথ বল্লেন, “আচ্ছা।”
তখন দ্বিজদাসও বল্লেন, “আচ্ছা।”
তারা সােমকে তাদের বাড়ী নিয়ে গেলেন। ডাকা হলাে অমিয়াকে।
সে কেঁদে কেঁদে চোখের এক ফোটা জল অবশিষ্ট রাখেনি, কলঙ্কের উপর
কলঙ্ক তাকে অসাড় করে তুলেছে। প্রিয়তম পিতামাতার কাছ থেকে
বারম্বার অপমান ও অবিচার পেয়ে তার মনটা হয়ে উঠেছে কঠিন। তার
নােখ চেপেছে সে বিয়ে করবে না।
সােম বল্ল, “অমিয়া দেবী, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল
নিভৃতে। এখানে সুষােগ না পাওয়ায় যেখানে সুযােগের অন্বেষণে
আপনাকে নিয়ে গেলুম সেখানে আপনি স্থির থাকলেন না। আজ যেমন
করে হােক আমার সেই কথাটা আপনার কানে পড়েছে। এখন যদি
আপনি আমাকে বিয়ে করতে আন্তরিক ইচ্ছা প্রকাশ করেন তবে আমি
আপনাকে সাধ্যানুসারে সুখী কবার দায়িত্ব নেবাে।”
অমিয়া বল্ল, “না।”
তা শুনে ভবনাথ চমকে উঠে ধমকে দিলেন। "না কী। হ বল।”
বিজদাস প্রতিধ্বনি করলেন, “হাঁ বল।”
অমিয়া
তবু বন্ধ,
“না।”
ভবনাথ হুকুম করলেন, “বেতখানা নিয়ে আয় তত রে।” বিজদাস
ইশারা
করলেন।
বেত এলাে।
বনাথ বেত নাচিয়ে বল্লেন, “ব, হা।”
অমিয়া বল, “না।”
ভবনাথ বেত লাগাবেন এমন সময় সােম সেটা কেড়ে নিয়ে বিনা-
বাক্যব্যয়ে ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফে।
t CHITRASENPUR, HOWRAL প্রতি 1.1 & BHAWANIPU. GAR 'IBRARY -9 ক্রওয়েল বােডে সােম কদাচ যেত, কিন্তু যখনি যেত দেখত অত্যন্ত বেশীরকম সাহেব, অতীব নির্লজ, একটি ছেলে অম্লানমুখে স্বদেশ নিন্দা কবৃছ। এই ভারতবর্ষীয় পুরুষ মিস মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে বা তর্ক করতে সােমের প্রবৃত্তি হতাে না, তবু কৌতুহলপন্ন সােম তার নামটি জেনে রেখেছিল। বীরেন দত্ত। এই মহাপ্রভুর সঙ্গে পরে যে ভারতবর্ষের কালাে মাটিতে কোনাে দিন সাক্ষাৎ হবে সােম তা কল্পনা করেনি। ইনি কেমন করে সােমের ঠিকানা পেলেন বলা যায় না, কিন্তু একদিন সকাল বেলা কুণালকে অকালে জাগিয়ে তুল্লেন ও পাছে সে ইংরেজী না বােঝে এই জন্যে তাকে হিন্দীতে সমঝিয়ে দিলেন যে সােম তাঁর আদ্যি কালের বন্ধু এবং সােমকে তিনি নিতে এসেছেন। বাড়ীর মালিক যে কে তা তিনি জাতেও চাইলেন না, বাড়ীর মালিকের অনুমতি চাওয়া তাে দূরের কথা। সােজা হুকুম করলেন “ড্রাইভার, টু, যাকে সা’বকা সব, চীজ, লে আও।” কে একটা লােক তার শােবার ঘরে ঢুকে তার সুটকেস ইত্যাদি নিয়ে টানাটানি কছে দেখে সােমের চক্ষুঃস্থির। লােকটা একটা সেলাম ঠুকে বল্ল হিন্দীতে—“হুজুরের এই কটা জিনিস না আরাে আছে?” যাক, চোর নয়। কিন্তু কে তাও তাে বােঝা যায় না। নােম বাইরে গিয়ে কুণালের খোঁজ করুন। শুনতে পেল সে নিজের শােবার ঘরে ললিতাকে বলছে, কল্যাণের বড়লােক বন্ধু বি-আর ভাট, বার- যাট-ল, তাকে নিতে এসেছেন। সেই ভালাে। আমাদের মতাে গরীব লােকের দ্বারা তার তেমন আদর আপ্যায়ন হচ্ছে না, হতে পারে না।”
১০৪
পুতুল নিয়ে খেলা
ললিতা বলছে, “তুমি তা হলে যাও, কল্যাণকে জাগাও। ব্যারিষ্টার
সাহেবকে বসতে বলেছ তাে?” কুণাল বছে, “তিনি তাঁর মােটর
গাড়ীতেই বসা পছন্দ করলেন।”
সােম তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে ভাবল, কে এই বি-আর ভাই ?
কবে ইনি আমার এমন প্রবল প্রতাপ বন্ধু হলেন? কুণাল-ললিতাকে
এখন কী বলে খুসী করা যায় ?
এমন সময় কুণাল ডাকল, “কল্যাণ। ও কল্যাণ।”
“ভিতরে এসাে।”
“মিষ্টার বি-আর ডাটু, বার-য়্যাটু-ল, তােমাকে নিতে এসেছেন।
শীগগির তৈরি হয়ে নাও। সাহেব গাড়ীতে বসে অপেক্ষা
করছেন।”
“কে এই ভদ্রলােক? তােমার কোনাে মুরুব্বি বুঝি ?”
“সে কী হে। তােমার অত বড় বন্ধু, তার লােক এসে তােমার
জিনিসপত্র নামাচ্ছে দেখতে পেলুম।”
“তুমি তত ভারি সরলবিশ্বাসী হে! ভদ্রলােক যদি ছদ্মবেশী
বাটপাড় হয়ে থাকেন? আমার জিনিসগুলাে হয়ত ইতিমধ্যে মােটর
করে সরে পড়েছেন।”
“। তােমার বন্ধু নেই ও নামের ?”
“কই? মনে তাে পড়ছে না? অন্তত আমি তাে তাঁকে খবর
দিইনি যে আমি কলকাতা এসেছি ও এ বাড়ীতে উঠেছি।”
কুণাল ছােট্ট মানুষটি। বুক ঠুক করে ছুটুল। সােমও তৈরি হতে
লাগল। কিছুক্ষণ পরে কুণাল ফিরে এলাে। এক গাল হেসে বল্প, “না,
ভাগ বেন কেন? দিব্যি পাইপ টানতে টানতে কী একটা বিলিতী সুর
গুন গুন করছেন। আমাকে দেখে বনে, ‘সােম সাবকে সেলাম দে।
ভেবেছেন আমি বাড়ীর চাকর।”
প্রতিমা
সােম চটে বক্স, “এত বড় আম্পর্ধা। তুমি তাকে দু কথা শুনিয়ে
দিলে না কেন?”
“চাকর বলে ভুল করা অসম্ভব নয়। বুঝলে হে? ওঁরা ইব
মানুষ, ওঁদের চাকরদের উদ্দিন বাহার আমার এই ছেড়া পাঞ্জাবীর চেয়ে
বুঝলে হে। আর আমার এই বেমেরামত চটি । হাঁ করে ধূলাে
গিলে খায়।”
সােম তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে নীচে নেমে গিয়ে দেখল চেনা
চেনা ঠেকছে। কিন্তু কোথায় কবে চেনা তা মনে পড়ছে না।
"Bullo cal We meet after an age in a strange
land, don't we?"
সােম মনে মনে বল্প, তুমি কে বট হে।
"Well’, ptero acea, "for the life of me I can't
of a filthier buman habitat then North
Calcutta. Ugh 1"
তখন সােমের স্মরণ হল ইনি সেই পুরুষ মিস মেয়াে, ক্রমওয়েল
রেডের বীরেন দত্ত। বালিকাবিবাহের এত বড পুংশক্র কলিতে অবতীর্ণ
হননি। চোদ্দ বছর বয়সের দুধের মেয়ের কাছে কী করে যে মানুষ
একটু প্রেম বা একটু সাহচৰ্য্য আশা করতে পারে তা ইনি for the
life of me বুঝতে পারতেন না। একেবারে পাশব না হলে কেউ
অমন মেয়ে বিয়ে কতে পারে? এর মতে মেয়ের বয়স পঁচিশ না হলে
তার বিয়ে বেআইনী হওয়া উচিত।
ইংরাজীতে বলেন, “তুমি এ পাড়ায় থাকলে আমাদের শুদ্ধ মান যায়।
মা ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তাই আমি নিজেই চলে এলুম তােমাকে
নিতে। For goodness sake আর দেরি কোরাে না। Ugh ।”
এই বলে তিনি বাঁ হাতের আশ্বিন থেকে মাল বের করে নাকে দিলেন।
conceive
পুতুল নিয়ে খেলা পরের ছেলের জন্যে কোনাে মা’র এতখানি উৎকণ্ঠা পুরাণে অথবা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই। সােম• এর মধ্যে একটা নতুন রােমান্সের ইঙ্গিত পেলাে। ব, “তা হলে অবশ্য দেরি করা উচিত নয়। দাড়াবে এক মিনিট ?” ললিতাকে বল্ল, “বােধ হয় ওর বােন টোন কেউ আছে, তাই। তােমরা কিছু মনে কোনাে না, ললিতা। আমি পুনযিক হয়ে দিন দু’ তিনের মধ্যে ফিবাে।” ললিতা বল্ল, “প্রার্থনা করি যেন তােমাকে ফিতে না হয়। অনেক কাণ্ড করেছে, আর কেন ? এবার ঐ ভীষ্মের পণটি ভেঙে ভালােমানুষের মতাে বিয়ে করা।” “ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমি যেখানে যাই সেখানে নােমাষ্ণ ঘটাই। জীবনটাতে একটু নুন মাখিয়ে না দিলে ঐ আলুনী তরকারিটা কার মুখে রােচে? জগতের boredom লাঘব করুতেই আমার জন্ম। “যাক তুমি এ বাড়ী থেকে গিয়ে আমাদের নির্ভাবনা কবুলে। ভবনাথবাবু ও দ্বিজদাসবাবু আজ তােমাকে আক্রমণ করতে আবেন ভেবে কাল রাত্রে আমাদের ভালাে ঘুম হয়নি, কল্যাণদা।” “আমার ক্ষমতার উপর তােমাদের তেমন আস্থা নেই দেখছি। ভৰনাথ ও দ্বিজদাস আজ এলে তাঁদের ঠ্যাঙানাের জন্যে আমি যে বৃহৎ লাঠিগাছটি কিনে এনেছি সেটি তাঁদের হাতে উপহার দিয়ে বােলাে, পিঠে উপহার দেবার সুযােগ হলাে না। যেন কিছু না মনে করেন। পথে যেতে হে বীরেন দত্ত বস্তু, “বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। এদের দেখে দেশ সাহেব বলেও তা বােধ হলাে না?”
bd প্রতিমা ১০৭ rg “তৰু ঔৱা গীর এ বারন বল্ল সােম। *বেকারmust not be chasers.' “হা-হাআআ।” লিলিতধল । “যা বলেছ। তােমার কথাগুলাে এমন রসিকতাপূর্ণ। কাজগুলােও তেমনি।” “কিন্তু আমিও একরকম বেকার। তা বলে উত্তর কল্কাতা। Ugh," “তুমি দেখছি মলেও নিমতলা ঘাটে আসবে না।” “ওকথা ভাবিনি,” ডাটু গভীরভাবে বল্ল, “কিন্তু ভাবনার বিষয় বটে।” মিসেস ডাটু এসে সােমকে অভ্যর্থনা করে ড্রইং রুমে বসালেন। ছেলের মতাে তিনি দেশদ্বেষী নন। অন্তত একুশটা বুদ্ধমূর্তি ঐ একটি ঘরে ধ্যানস্থ। দাম যে অনেক দিয়েছেন তার সন্দেহ নেই। তবে তাদের মধ্যে কোনটি আসল কোনটি নকল তার বিচার করেননি। যদিও সােমের দৃষ্টি বুদ্ধমূর্তির অন্তরালে কার অন্বেষণরত তবু মিসেস ডাটু মনে করলেন সে দৃষ্টি বুদ্ধমূর্তির প্রতি প্রশংসমান। বল্লেন, “বুডটা দেখছেন?” চমকে উঠে সােম বঙ্গ, "। তারপর উচ্চারণটাতে অস্পষ্টতা এনে ব, “বৃদ্ধা দেখছি।” “ভালাে বুড়? “শুধু বৃদ্ধা। ঐ প্রশ্নের এই উত্তর মিসেস ডাটএর বােধগম্য হলাে না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “জিনিসপত্র সঙ্গে করে এনেছ তাে?” “আরে হা।” *এই তাে ভালাে ছেলের মতাে। আমরা তােমার ধরতে গেলে আপনার নােক-আমাদের বাড়ী থাকতে অন্যত্র উঠবে কেন?
১৮
পুতুল নিয়ে খেলা
“ঠি।”
*তােমার কথা আমি বীরেনের কাছে অনেক শুনেছি। এতদিন
পরে তােমাকে দেখে তাই তেমন নতুন ঠেকছে না, যেন চেনা মানুষের
সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হলাে ! না? তােমার কী মনে হয় ?
“আমারও অবিকল তাই মনে হচ্ছে।”
“তুমি নাকি ওদেশে খুব খ্যাকশিয়াল শিকার করতে ?”
“আজ্ঞে, তা তত কমই।”
“আর তােমার নাকি তিনটে কুকুর ছিল ?”
“ছিল-ট, ডি ও কারি।”
“তুমি নাকি একবার বলেছিলে যে তুমি বন্য বরাহের মাংস খেতে
ভালােবাসাে ?”
“ভালােবাসি বৈ কি।”
“আর হকি খেতে খেতে তােমার নাকি পা ভেঙেছিল ?”
“সে হাড় এখনাে জোড়া লাগল না।”
এমনি করে মিসেস ডাটু যত উদ্ভট প্রশ্ন করেন মুখে মুখে বানিয়ে,
সােমও তার প্রত্যেকটির উত্তর দেয় প্রত্যুৎপন্নমতির সহিত। উত্তর দেয়
আর আড় চোখে দরজাগুলাের দিকে তাকায়। এ বাড়ীতে কি তরুণী
নেই? নিরন্তপাদপ দেশ থাকতে পারে, কিন্তু তরুণীবর্জিত ইঙ্গবঙ্গ
পরিবার আছে? কোথায় তুমি রমলা, না বেলা, না ভায়ােলেট, না
প্যাসী, না লীনা, না মিনা, না রিনা। দেখা দাও, দেখা দাও।
বীরেন দত্ত উত্তর কলকাতা থেকে ফিরে বাথ, নিতে গেছল। প্রবেশ
#19 Ta, "Do you know, Mummy, how awful the stench
was |
# THA, "I know, I know, wasn't it awful po
সােম উসখুস করছিল। তার মনে হচ্ছিল তাও আর একবার
প্রতিমা স্নান করা উচিত, নইলে এরা তাকে ধাডের মতাে অশুচি জেনে অস্বস্তি বােধ করবেন। যেন সে নর্দমা থেকে এসে ড্রইং রুমে বসেছে। ইংরেজীতে মাতাপুত্রে যে সব কথা হলাে তাতে সােমের মনােযােগ ছিল না। সে ক্রমে ক্রমে নিজের গায়ের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে লাগল। যেন সত্যিই তার গায়ে নর্দমার গন্ধ। এত দিন তার গন্ধবােধ সক্রিয় ছিল না বলে টের পায়নি, এখন দূরে এসে সুদে আসলে টের পেয়েছে। লণ্ডনের East End থেকে West EndএBow থেকে May fairএ-এলে যেমন সভ্য জগতে ফিরেছি ভেবে হর্ষ হয় এবং সেই সঙ্গে সভ্যমানুষের সমাজে নিজেকে অসভ্য ভেবে লজ্জা করে, এও কতকটা তেমনি। সােম চাইল স্নান করতে। মিসেস ডাই বল্লেন, “কিন্তু বেশী দেৰি কোৱাে না, কী তােমার ক্রিশ্চান নাম ? "কল্যাণ।” “বেশী দেরি কোনাে না, কলিন। এখনি ব্রেকফাষ্ট দেবে। বীরেনের আবার কোর্টে যেতে হবে কিনা।” বীরেন বস্তু, “সােম, তুমি কেমন করে সময় হত্যা করবে ?” সােম নিরাশার সহিত বল, “ঘুমিয়ে।” মা বল্লেন, “না, না, তা কেন? আমরা যাব দোকানে। কলিন যাবে আমাদের সঙ্গে। কোনাে আপত্তি আছে ?* সােম ‘আমরা' কথাটা শুনে উৎফুল্ল হয়ে বল্ল, “কিছুমাত্র না।” বীরেন পাইপ মুখে ব, "Lucky fellow। খাটুনি যে কাকে বলে তা তুমি জালে না।” সােম ৰক্ত, অর্থাৎ বার লাইব্রেরীতে বসে আড্ডা দেওয়া যে কাকে বলে তা আমি জাননুম না।”
১১০ পুতুল নিয়ে খেলা *Well। আমার মতাে বাচ্চা ব্যারিষ্টারের ও ছাড়া আর কী করবার আছে? বুড়ােরা যতদিন না মরেছে আমরা ততদিন ব্রীফহীন থাকতে বাধ্য।” “অন্যের মােকদ্দমার শুনানীর সময় উপস্থিত থাকলে তাে হয়।” Terribly boring। বিক্র একঘেয়ে। বড় বড় ব্যারিষ্টার আজ্ঞা দিয়েই বড় হয়েছেন, যেমন ভালাে ভালো ছাত্রেরা না পড়েই ফাই ঢং ঢং করে ব্রেকফাষ্টের ঘণ্টা বাজল। টেবলে সােমের ডান দিকে যিনি বলেন মিসেস ডাটু তার পরিচয় দিলেন, “আমার ছােট মেয়ে প্রতিমা, এই বছর সােসাইটিতে বেরিয়েছে।” সম্ভাষণ বিনিময়ের পর প্রতিমা বনে, "I am so sorry 1 couldn't meet you when came along ( ভুল ইংরেজী) প্রতিমার মা এর উপর টিপ্পনী কাটলেন, “Baby had such a beastly headache." প্রতিমাকে দেখে সােমের মনে যে বিপুল আনার উদ্রেক হয়েছিল তার বেবীর মাথাব্যথার সংবাদে তা সম্পূর্ণ তিৰােহিত হলাে। এ মেয়ে তা হলে বিবাহিত। কিন্তু দুই এক কথার পর জানা গেল এই বিশ একুশ বছর বয়সের মেয়ের নিজেরই ডাকনাম বেবী। বাঁচা গেল। সােম বেবীর মাথাব্যথায় একান্ত ভাবনার, ভাব দেখিয়ে সমবেদনা জানালে বেবী ইংরেজীতে বলেন, “সেরে গেছে। যাক, আবার বাঁচা গেল। এতিকে বিধাতা খুৱী করে গড়েছিলেন, তাঁর অভিপ্রা ছিল এ মেয়ে সুন্দরীই থাকে। কিন্তু পড়েছে শক্ত হাতে। আর্ট হওয়ার শিক্ষা প্রতিমা ১১১ পেয়ে স্মার্ট হওয়াকেই মােক্ষ জ্ঞান করেছে। যে হতে পারত সুকেশী তার কেশ তৎকালীন ফ্যাসান বদলে যাওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়ছে, মুরগীর ছানার রোয়ার মতাে। বাঙালীর মেয়ের পক্ষে যে যার পর নাই ফরসা তাকে নিষ্ঠার সহিত পাউডার মাখতেই হবে এবং ঘামে যদি তার খানিকটা ভেসে যায় তবে সঙের মতাে দেখাতেই হবে। মেয়েটি নােগা। তার বুকের হাড়গুলাে ফুটে বেরােচ্ছে। সেই দৃশ্য উদঘাটন না করলেই নয়। তাই ব্লাউস্ হয়েছে বেহায়া। আর কিবা ইংরেজী। অনর্গল বলতে পারে বটে, কিন্তু অর্গল থাকলে হয়ত বিশুদ্ধি থাকতাে। "Fellinside the water।” কিন্তু তার কী দোষ। যেমন শিক্ষা তেমনি সংসর্গ। সোমের হাতে পড়লে দুদিনে ঠিক হয়ে যেত। সােম তাকে শাসাত না, শেখাত না, শুধু হাে হাে করে হেসে উড়িয়ে দিত তার ভুল ইংরেজী, তার স্মার্ট আচরণ, তার নকলনবিশী। উপহাসই এই রােগের একমাত্র দাওয়াই। শুধু এই বােগের কেন, সব রােগের। কথায় কথায় হাসতে হবে প্রতিমাকে যদি পত্নীরূপে লাভ করে। কিন্তু ততদিন অপেক্ষা না করে সােম আজকেই ব্রেকফাষ্ট টেবলে হেসে ফেল্প অন্যমনস্কভাবে। ভাগ্যক্রমে ঠিক তখনি একটা হাসির কথা উঠেছিল। মিসেস ডাটু আশা করছিলেন যে সকলেই তাঁর কথায় হেসে সায় দেবে। কাজেই সােম ধরা পড়ে গেল না। মিসেস ডাটু ভাবলেন ছেলেটার বসবােধ আছে। নইলে কেউ তাে তার হাসির কথায় এমন প্রাণখােলা হাসি হাসে না। “জাননা, মা, বীরেন বল, “সােম কত বড় একজন হাস্যরসিক?” হাঁ, আমার মনে আছে। (সােমকে) তুমি নাকি Punchএ লেখা দিতে ? “এ লে লেখা ছাপাও হতাে।”
১১২ পুতুল নিয়ে খেলা “কই, প্রতিমা বল্ল, “নাম পড়েছি বলে তাে স্মরণ হয় না?” “সেটা আপনার স্মরণের দোষ নয়। লেখাগুলাে বেনামী।” Wasn't that-cute ?* প্রতিমা বল। “হাস্যরসিকের বন্ধু হয়ে বিপদ আছে।” বীরেন বঙ্গ, “কোনদিন আমাকেই সকলের হাস্যম্পদ করে আঁকবে।” শুধু তােমাকে কেন, তার মা বল্লেন, “আমাকেও, বেবীকেও।” প্রতিমা আতঙ্কের ভাণ করে বল্ল, “My goodness। Go away, Mr Shome, go away।” “আপনাকে অভয় দিচ্ছি,” সােম বল্ল, “আপনাকে দেখে নিজে হাসতে পারি, কিন্তু আপনাকে দেখিয়ে পরকে হাসাবাে না।” “নিজে হাসবেন, কেউ জানতেও পারবে না, সে তাে আরাে ভয়ঙ্কর। না, মা ?” “ভয়ঙ্কর বৈ কি। অতি ভয়ঙ্কর। কলিন যাতে না হাসে তােমাকে তেমনি ব্যবহার কতে হবে, বেবী।” “ই। আমার খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই। I am not one of those goody goody girls 1 I am a bad girl' “শােনন মেয়ের কথা।” মিসেস্ ডাট নতুন মানুষের কাছে অমন দুষ্টমির অনুমােদন করলেন না, তা ওঁর গলার স্বরে ব্যক্ত হলাে। ঠোটে লিপষ্টিক ঘষে, পায়ে হাইহীল জুতাে পরে, হাতে ব্যাগ ধরে প্রতিমা চল তার মার সঙ্গে সওদা করতে, Hall and Anderson এর দোকানে। সােম হলাে সাথী। সাখীর কর্তব্য এক্ষেত্রে মাত্র একটি—যে মেয়ে একদিন তার স্ত্রী হতে পারে সে মেয়ে কী কী কিতে ভালােবাসে ও কৃত দাম দিয়ে। নােম তার এই কর্তব্যকে অতিমাত্রায় গুরুতর বলে গ্রহণ করে। বােমালের প্রভাষক চক্ষুষ্মন্ পুরুষমাত্রেই যা করে থাকে। নতুবা ঋণং কথা প্রাণ যাবে।
প্রতিমা ১১৩ Hall and Andersonএর দোকানে ওরা যে সকল ব্যবহার্য ও প্রদর্শনীয় বস্তু মূল্য দিয়ে আহরণ করলেন সে সকল বহন করাও হলাে সােমের অতিরিক্ত কর্তব্য। সংখ্যায় বড় অল্প বা ভারে নিতান্ত লঘু নয় সেগুলি। একখানা একশাে টাকার নােট বা ফু দিয়ে উড়িয়ে দিলেন, আর একখানারও প্রায় অন্তিম দশা উপনীত হলাে। বা প্রস্তুত পাওয়া গেল না তেমন দ্রব্যের অর্ডার দিয়ে ওঁরা সে যাত্রা ক্ষান্ত হলেন এবং হলেন নিক্রান্ত। তখন মিসেস ডাট বল্লেন, “চলাে দেখি নতুন কোনাে বুঢ়া এসেছে কি না।” মিস্ ডাটু বল্লেন, “Oh, Buddha। শুবেন, মিষ্টার সােম, মা নাকি স্বপ্ন দেখেছেন যে তিনি শত বুদ্ধমূর্তি সংগ্রহ করলে বীরেন হাইকোর্টের জজ হবে।”—বড় ভাইকে এরা দাদা বলেন না। ওটা স্মার্ট নয়। সােম বল্ল, “আপনি কি স্বপ্নে বিশ্বাস করেন, মিসেস্ ডাই ?” “করি, কলিন। তােমরা বলবে ওটা একটা কুসংস্কার, কিন্তু there ale more things in Heaven and Earth- “যা বলেছেন। চলুন তবে বুদ্ধের সন্ধানে।” এবার কেনা হলাে স্ফটিকের বুদ্ধ। প্রতিমা বল্ল, “wliat a sweet little thing। এটি থাকবে আমার ড্রেসিং টেবলের উপর।” মা বল্লেন, “না, না। একালের মেয়েগুলাের ধর্মাধর্ম জ্ঞান নেই এটি হচ্ছে কলিনের প্রতি তার বন্ধুর মায়ের প্রথম উপহার।” সােম মুখে ধন্যবাদ দিয়ে মনে মনে বড়, আশা করি দ্বিতীয় উপহার হবে বুঢ়া নয়, তরুণী। “Now,” প্রতিমা বল্ল, “আপনাকে কি আমি হিংসে করবে না, মিষ্টার সােম?
১১৪
পুতুল নিয়ে খেলা
কে জানে, সােম কথাটাকে একটু রহস্যময় করে বল, “এ জিনিস
হয়ত একদিন আপনারও হবে।”
মিসেস ডাটু বুঝলেন। প্রতিমাও। তার গালের রং ঠোটের
রঙের সঙ্গে মিশ খেলল। ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কী করে?”
“বাঃ। কোহিনুর হীরে ইংলণ্ডের রাজার হতে পারে আর এই
স্ফটিক বুদ্ধ আপনার হতে পারে না? সুন্দর জিনিস মাত্রেই হাত
বদলায়।” মনে মনে জুড়ে দিল, সুন্দরী নারীও।
অমন উত্তর অবশ্য মা বা মেয়ে প্রত্যাশা করেন নি। ভাবলেন
উত্তরটা অকপট। ভিন্ন হলেন।
অগত্যা সােম একছড়া মালা কিল—এক প্রকার সবুজ পাথরের।
মালা সমেত হাত দুটিকে জোড় করে ও ভঙ্গীপূৰ্ব্বক ঘুরিয়ে মুদ্রার মতাে
করে বল্ল, “অয়ি ঈর্ষান্বিতা, গ্রহণ করুন।”
প্রতিমা বিলােল কটাক্ষপাত করে চক্ষুতারকাকে উৰ্দ্ধচারী কল।
তারপর নিম্নগামী করে মৌনে দ্বারা সম্মতি জ্ঞাপন করল।
“আহা, কেন তুমি অত খরচ করে ও সব কিছ, কলিন ? বেবীর
জন্যে অমন অপব্যয় করা এই ডিপ্রেসানের দিনে সঙ্গত নয়।”
“আপনিও তাে, সােম বল্ল, “আমার জন্যে কিছু কম খরচ করলেন
, মিসেস ডাই।”
“সে কথা স্বতন্ত্র। বুড ঢ আমি কিতুমই, যাকেই দিই না কেন।”
সােম মনে মনে বল্প, তরুণীকে আমি দিতুমই, যাই কিনি না কেন।
antoni 46 foal Ta, "Mummy, do I look too funny po
Ti 6A, "No, darling, you don'l".
তখন ঢােমকে প্রতিমা বন্ধ, "Thank you ever so much
সােম বঙ্গ করে ব, "Please,*তারপর ব্যাখ্যা করে বল্ল, “জার্মানীতে
সেবার গেছলুম। আমি যতবার বলি “Thanks ওরা ততবার খুলে
প্রতিমা ১১৫ Please', আর আমি যতবার বলি Please’ ওরা ততবার বলে, Thanks ভারি মজার। না ?” প্রতিমা যাথাটাকে চক্ষের নিমেষে তিনবার নেড়ে বল্ল, “সত্যি।” মিসেস টু বল্লেন, “জার্মানরা ইংরেজী বলে তা হলে?” “বলে বটে, কিন্তু আমাদের মতাে যত্বের সহিত নয়। ওদের ভয়ানক বদ দস্তুর নিজের ভাষাটাকেই সব আগে শেখে ও সবাইকে শেখাতে চায়। পরের ভাষাকে ভাবে পরের ভাষা। এরকম উল্লুক এদেশে বেশী নেই, এইজন্যে আমাদের এমন প্রগতি।” মিসেস ডাটের সন্দেহ হলাে, সােম হয়ত পরিহাস করছে। কিন্তু বিলেতফেরৎ কি কখনাে ও নিয়ে পরিহাস করতে পারে ? প্রতিমা ভাবুকের মতাে ভাব দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, জার্মানরা একটু বােকা, নয়?” “একটু কেন, খুবই। এই দেখুন না প্যারিস থেকে মেয়েদের ও লণ্ডন থেকে ছেলেদের পােক আনিয়ে নিতে কতই বা লাগে। তবু ওরা ভালাে পােক পাবে না। পরবে স্বদেশে তৈরি খাদির মতাে বিশ্রী বিরুচিকর বস্তু। আমরা কেমন বুদ্ধিমান, ল্যাঙ্কাশায়ারের লােককে তাঁতী বানিয়ে ছেড়েছি।” প্রতিমা আগের মতাে মাথা দুলিয়ে বল্ল, “বান্তবিক।” সােমের খাতিরে বীরেন সকাল সকাল ফিরল। টেনিসের চারজন যাতে হয় তার জন্যে সঙ্গে করে আনল যাকে তিনি তার বাগদত্তা, মিস্ কমলা সেন। কমলার উচ্চারণ কলা। যেমন রমলার উচ্চারণ বলা। এক দিকে কলা ও বীরেন, অন্য দিকে প্রতিমা ও সােম। তুমুল সংগ্রাম। মান দিয়ে টানাটানি। সােম প্রতিমাকে বলে, “জিতিয়ে ১১৬ পুতুল নিয়ে খেলা দেবব।” বীরেন কলাকে বলে, “জিতিয়ে দেব।” শেষ পর্যন্ত জয় হলাে সােমদেরই। তবে টায়টোয়। পর পর তিন দিন টেনিস খেলায় জিতে সােম ও প্রতিমা পরস্পরের অন্তরঙ্গ হয়ে উঠল। সােম হেসে বক্স, “মিস ডাটু, এবার আমরা টুর্ণামেন্টে খেলব।” প্রতিমা খুসী হয়ে বল্ল, “তা হলে তাে এ জন্মে কোনাে খেদ থাকে না।” বীরেন এ কথা শুনে বল্ল, “অত গৰ্ব্ব ভালাে না। অতি দর্পে রাম মারা গেছলেন।” কলা শুধরে দিয়ে বল্ল, “রাম নয়, রাবণ।” সােম বল্ল, “আপনি দেখছি রামায়ণখানা পড়ে মনে রেখেছেন, মিস্ সেন।” মিস্ সেন বল্লেন, “হাঁ, নােমেশ, ডাটের রামাইয়ানা ও মাহাবারাটা আমি ধর্মগ্রন্থের মতাে পাঠ করেছি।” সােম বন্ধু, “রামায়ণ ও মহাভারত ধন্য হলাে।” তারপর কথা চল টেনিসকে অবলম্বন করে। দেশী বিলাতী জাপানী খেলােয়াড়দের চুলচেরা সমালােচনা, তাদের ফর্ম, তাদের ষ্টাইল, তাদের ড্রাইভ, তাদের টী-ওয়ার্ক, তারা কে কাকে হারাবে, কয় গেমে হারাবে ইত্যাদি। এরাই যে তাদের ভাগ্যবিধাতা সে বিষয়ে এদের কারুর সংশয় ছিল না। মিসেস ডাটুও মাঝে মাঝে মন্তব্য পেশ করছিলেন। তিনি যে নিজে একজন টেনিস খেলােয়াড় তা নয়। তাঁর স্বামী বেঁচে থাকতে সামাজিকতার অঙ্গ হিসাবে টেনিস খেলাটাও তার জানা ছিল। স্বামী গেছেন, কিন্তু ভড় যায় নি। রাখবার মধ্যে রেখে গেছেন একখানা বাড়ী, সেটাৰ গুণ এই যে সেটা বন্ধকমূক্ত। তার একটা পাশে ভাড়াটে বসিয়ে ভাড়ার টাকায় কায়ক্লেশে এদের দিন গুজরান হয়। বীরেন যে বিয়ে প্রতিমা ১১৭ । করতে পারছে না ওই তার কারণ। আগে প্রতিমার বিয়েটা হয়ে যাক, তার পর বীরেনের বিয়ে। সেইজন্যে প্রতিমার বিয়ের জন্যে বীরেনের এমন চাড়, এতটা গরজ। পাত্রের খোঁজে সে উত্তর কলকাতার মাটী মাডায়। নইলে প্রতিমার প্রতি যে তার বিশেষ স্নেহমমতা তার লক্ষণ দেখা যায় না। পরের বােনকে যত তােয়াজ করে নিজের বােনকে তার আধুলি কি সিকি কি দুয়ানিও না। তার বেলায় করে সর্দারী, কমলার বেলায় করে খিদমৎগারী। একটি আমেরিকান মহিলার গল্প সােমের মনে পড়ছিল। বিধবা হযে তিনি তার স্বামীর লাইফ ইনশিওরেন্সের টাকা যা পেলেন তাতে তাঁর ও তাঁর বিবাহযােগ্যা দুই মেয়ের অতি কষ্টে দু বছর চলতে পারে। তিনি করলেন কী, না সহরের সবচেয়ে বড় হােটেলে মাস দুয়েকের মধ্যে সমস্ত টাকাটা ফুকে দেবার সঙ্কল্প করলেন। আত্মীয়রা বল্ল, “পাগল।” বন্ধুরা বল, “আমরা চাকরী জুটিয়ে দিচ্ছি, অমন করে আত্মহত্যা কোনাে ।” বিধবার কিন্তু এক কথা। মাস দুয়েক যেতে না যেতে দেখা গেল বড় মেয়েটি বাগদত্তা হয়েছে- যার বাগদত্তা তিনি এক নিযুতপতি। (অবশ্য নিযুত সংখ্যক নারীর ।) বড় মেয়ের চেষ্টায় ছােট মেয়েও তেমনি পাত্রে পড়ল। তখন বিধবার আহলাদ দেখে কে? তিনি বছর দুয়েক চাকরী করলেন কিন্তু নিযুতপতিদের শ্বাশুড়ী কি সােসাইট থেকে সরে বনবাস করতে পান? তাঁর উপর সমাজের তাে একটা দাবী আছে ? কে একজন লক্ষপতি তাকে বিয়ে করে জাতে উঠল। বন্ধুরা ব, “সাবা।” আত্মীয়রা বল্প, “এবার আমাদেরও একটা কিনারা করাে।” বিধবাটিনা, না, সধবাটি—বল্লেন, “আমি জানতুম যে আমার মেয়ে দুটি রূপসী, কেবল একবার নিযুতপতিদের চোখে পড়লে হয়। তাই সর্বস্ব পণ করে নিযুতপতিদের চোখের মুখে তুলে ধলুম। যদি ব্যর্থ হতুম তবে ১১৮ পুতুল নিয়ে খেলা ভিক্ষা ছাড়া আমাদের অন্য গতি ছিল না—অথবা ভিক্ষার সামিল চাকরী।” হায়, দেশটা আমেরিকা নয়। তাই কোনাে মাভােয়ারী শেঠের বদলে বেকার সােমকে পালাতে হয়। এরা আই-সি-এস আই-এম- এএর আশায় আশায় থেকে নিরাশ হয়েছেন। একে তাে তাদের সংখ্যা তাদের আশপথবর্তিনীদের সংখ্যার অনুপাতে ক্ষীণাতিক্ষীণ, তার উপর তারা আজকাল ডেপুটী মুন্সেফের মেয়ে বিয়ে করে। (“They deserve no better".) তাদেব চেয়ে যে কোনাে বেকার বিলেতফেৰ্তা ভালাে। অবশ্য যদি তার পৈত্রিক সম্পত্তি থাকে। সােমের বাবার বিজ্ঞাপনটা এরা পড়েছিলেন। যে কাগজে সে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল সে কাগজ যদিও এদের চোখে পড়ে না তবু কে একজন হিতৈষী বন্ধু তার একটা কাটিং এদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনে লিখেছে কায়স্থ পাত্রী চাই। মিসেস ডাটের মনে পড়ল তাঁর পিতৃকুল মাতৃকুল ও ওরকুল তাে কায়স্থ। অতএব তার মেয়েও কায়স্থ। আর মেয়ে যে সুন্দরী শিক্ষিতা ও কলাবতী এ বিষয়ে কোন জননীর দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব ঘটে, অন্তত তার বিয়ের বেলায় ? “You want the best brides ? We have them” বিলাতী দোকানদারদের এই জাতীয় বিজ্ঞাপনের পশ্চাতে যে আত্মপ্রত্যয় উহ্য থাকে বিবাহযােগ্য মেয়ের মা’দের মনেও থাকে তাই। তবে তারা বিজ্ঞাপন নাও দিতে পারেন। মিসেস্ ডাটু একদিন আচমকা বল্লেন, “জাত জিনিসটা খুব যে বেশী খারাপ তা আমি মনে করিনে, যাই কেন বলুক না ওরা ( অর্থাৎ ইউরােপীয়রা)।” সােম একটু আশ্চর্য হয়ে বল্ল, “কেন বলুন তাে?” “জাত না থাকলে তার জায়গায় আর-একটা কিছু থাকে, এই যেমন ক্লাস। আমরা ইদবর একটা ক্লাস হয়ে উঠেছি, সেটা ভালাে নয়।
প্রতিমা ১১১ আমি তাে বলি, Back to the caste, তুমি শুনে সুখী হবে, কলিন, যে এ বাড়ীর আমরা এখনাে কায়স্থ আছি-রক্তে। এ বাড়ীর আমরা পাশ্চাত্যকেও নিয়েছি, প্রাচ্যকেও ছাড়িনি।” সােম মনে মনে বল্প, প্রাচ্যকে যে ছাড়েননি তার প্রমাণ আপনার স্বপ্নে বিশ্বাস, আপনার বুভ ঢা, আপনার নিজের হাতের দেশী আমিষ রান্না। কিন্তু জাত ? আপনার দুই মেয়ে কি অন্য জাতে পড়েনি? তা সত্ত্বেও আপনারা যদি কায়স্থ হন্ তাে তাতে আমার সুখী হবার কী আছে ? বল্ল, “হ্যা। জাত জিনিসটা রেখে মস্ত সুবিধে। আমিও ওর চেয়ে সুবিধের কিছু না পেলে ওটা দিচ্ছিনে, মিসেস্ ডাটু।” এর পর মিসেস ডাই সােমের বাড়ীর প্রসঙ্গ পাড়লেন এবং পৃষ্ঠ- পােষকীয়ভাবে মাথা নোয়ালেন ও তুল্লেন। প্রতিমার সঙ্গে নিভৃত আলাপের সুযােগ খুজতে খুঁজতে সােম একদিন তা পেল। বােকাটা জাল না যে সুযােগ সে দৈবক্রমে পেল না, পেল না তার পুরুষকারের দ্বারাও। পেল মিসেস ডাটের গােপন অনুগ্রহে তথা আগ্রহে। সিনেমার বক্সে । “মিস ডাই,” সে ঘটা করে বল্ল, “আমি যে এতদিন আপনাদের ওখানে থাকলুম সে কি শুধু টেনিস খেলার জন্যে ?” মিস ডাটু বিবাহ-প্রস্তাবের প্রতীক্ষায় ছিলেন। আরম্ভের সুরে তার হৃদয় নৃত্যের জন্যে চরণ তুল'। তিনি বিস্ময়ের ভাণ করে বল্লেন, “আপনার অন্য কোনাে উদ্দেশ্য ছিল নাকি?” ছিল না? “ছিল ? “এত বার যে আপনি ও আমি পার্টনার হলুম তা কি শুধু খেলাক্ষেত্রে আবদ্ধ বইৰে?”
পুতুল নিয়ে খেলা
“যান্।”
যাবােই তাে, কিন্তু যাবার সময় কি একলাটি যাববা?”
“আপনি ভারি দুষ্ট, মিষ্টার ব্যাড ম্যান।”
“আপনিও তাে বলে থাকেন আপনি ব্যাড গা।”
“But fancy taking me away! O Mummy 1"
“থাক, থাক, মা’কে ডাকবেন না। বড় বেরসিক তাে।”
*But do tell me, কোথায় আমাকে নিয়ে যাবেন ?”
“আপনার শ্বশুরবাড়ী।”
“ও মা, সেই পূর্ণিয়া না পুরুলিয়া। কোথায় সেটা, মধ্যপ্রদেশে?
“বেশী দূর না, বেহারে।”
“সেখানে কি সভ্য মানুষের বাসের সব সুবিধা আছে, দক্ষিণ
কলকাতার মতাে ?”
“না। কিন্তু কোনাে সুবিধা না থাকলেই বা কী। সুবিধার চেয়ে
যা বড় তা আছে—মেহ মমতা।”
প্রতিমা ঠোট উল্টিয়ে বল্ল, “যেখানে creature comforts নেই
সেখানে বিংশ শতাব্দীই নেই। আমি সেই বর্বরযুগে ফিরে যেতে
চাইনে যে যুগে মানুষ যােডার গাড়ীতে চড়ত, কেৰােসিনের আলােয়
পড়ত, কুয়াের জল খেত—যে যুগে ছিল না টকি।”
সােম হতাশ হয়ে বল্প, “তা হলে আমি আজ রাত্রেই
চলুম
।”
“সে কী। কোথায়?”
“জানিনে কোথায়,—কুন্তোড় কলিয়ারি কি নান্দিয়ার পাড়া কি
ডুমৰাওন।”
“কেন, শিকার করতে ?”
“হ্যা, শিকার করতে। তবে বাঘ শিকার নয়, বৌ শিকার।”
প্রতিমা নির্বাক।
প্রতিমা
১২১
সােম বকে গেল, “হ্যা। বৌ শিকার। একটি বীণাপাণি কি
লক্ষ্মীরাণী কি জ্যোৎস্নাময়ী-বর্বর যুগের মানুষের বর্বর যুগীর নাম—যদি
পাই তবে আমি ছেডেই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলােক।”
“মিষ্টার সােম। মিষ্টার সােম। কী আপনার রুচি। আপনার
উচিত হচ্ছে না আমার পাশে বসা।”
“তাই তাে, সােম বল্ল, “আপনারা এ যুগের ব্রাহ্মণ, বৰ্ব্বরের স্পর্শ
বাঁচিয়ে চলাই আপনাদের একমাত্র ভাবনা। আমার খেদ কেবল এই যে
বৰ্ব্বরের চেয়েও বর্বর আছে—যেমন সাঁওতাল—তাদের প্রতি আমার
বন্ধুদের তেমনি অবজ্ঞা যেমন আমার বন্ধুদের প্রতি আপনাদের।”
প্রতিমা দেখল সােম ঠাট্টা করছে না। তখন বল, “মিষ্টার সােম
আপনি ঠাট্টাও বােঝেন না?”
“কোনটা ঠাট্টা ?”
“বান্। আমি বলবাে না।”
“আপনি বর্বরের দেশে যেতে প্রস্তুত আছেন ?”
প্রতিমা চক্ষু নত করল। হঠাৎ তার ব্যাগটার প্রতি তার
মনোেযােগ একান্ত হলাে। সেটাকে নিয়ে সে লােফালুফি করতে থাকল।
“আপনি সভ্যতার সব সুবিধা না পেলে সেখানে টিকে থাকতে
পারবেন?”
প্রতিমা একবার সােমের সঙ্গে চোখাচোখি করল। তারপর ব্যাগ
নিয়ে তেমনি লােফালােফি।
সােম ব, “খুব খুশী হলুম। কিন্তু
প্রতিমা চকিয়ে উঠল।
“কিন্তু, সােম বক্স। “আমার পরিচয়ের এক স্থানে একটু কালিমা
প্রতিমার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।
১২২
পুতুল নিয়ে খেলা
“ওটুকু, সােম বল্ল, “আমার পরিচয়ের গায়ের আঁচি। আমাকে
গ্রহণ করলে ওটুকু স্বীকার করতে হয়।”
দৃশ্যের দিকে দু’জনের কারুর লক্ষ ছিল না। গানের দিকে ছিল না
ওদের নিজেদেরই জীবনে এসেছে একটি সংকট মুহূর্ত। নায়ক
নায়িকার সংকটে ওরা বিমনা হলাে না। প্রতিমা হলাে উন্মনা, সােম
হলাে বায়।
“মিস্ ডাটু, যাকে বলে slip তা আমার জীবনে ঘটেছে।”
“Bh?”
“আমি সত্যিই ব্যাড, ম্যান্।”
"You don't mean it, do you ?"
“আমি যা বলছি তার মানে তাই।”
"No It can't be It can't be
*আপনি বিশ্বাস না করলে আমি কী করব বলুন।”
"I can't believe it. Fancy-Oh!” বলে প্রতিমা দুই
হাতে মুখ ঢাকুল ও মাথাটা নাড়তে থাকল। বলতে থাকল, “Oh! Oh ।
Ob 1"
সােম তার কানে কানে বল্ল, “চুপ, চুপ। পাশের বক্সের ওরা কী
ভাববে।”
প্রতিমা ক্ষিপ্তের মতে বল্প, “You have broken my heart.
You have You have"
সােমটা বােক। যদি বলত, হা, আমি আপনার হৃদয়টিকে ভেঙে
চুরমার করেছি তা হলে প্রতিমা গৌরব বােধ করত। ভয় হৃদয় কাৰ্ব না
গৌরবের সামগ্রী ?
ব, “কিন্তু, মিস্ ডাটু, আপনিও তত ব্যাঙ, গাল।”
না। আমি নই, আমি সে অর্থে নই।”
প্রতিমা
১২৩
“সে অর্থে হলেও কি আমি অপরাধ নিচ্ছিলুম ? আমি তােত সেই
অর্থ ই বুঝেছিলুম।”
“ভুল, ভুল, আপনার বােঝবার ভুল।” প্রতিমা রুমাল দিয়ে চোখ
মুছতে মুছতে বল্ল, “o Mummy।”
সােম চঞ্চল হয়ে বল্ল, “ছি, ছি, মা’কে এসব কথা ববেন কেন ?
আপনি তাে নাবালিকা নন্।”
মাকেই যদি না বলবে তবে তার নাম বেবী হলাে কেন?
সােম টের পেল যখন মিসেস ডাটের মুখমণ্ডল বিষাদের ছায়াঙ্কিত
দেখল। যেন মুখমণ্ডল নয়, silhouette
তিনি বল্লেন, “কলিন, তােমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
সােম জাত কী সে কথা। “বলুন।”
“কলিন, তুমি আমার ছেলের বন্ধু, ছেলের মতাে। তােমাকে বিশ্বাস
করলে বাড়ীতে জায়গা দিতুম না। তুমি নিজেই বলল তুমি কি
বিশ্বসের যােগ্য ?”
“কেন, আমি কি কোনাে জিনিস চুরি করেছি ?”
“না।”
“কাউকে ঠকিয়ে কোনাে জিনিস আত্মসাৎ করেছি ?”
“কারুর প্রতি গর্হিত আচরণ করেছি ?”
“না।”
“তবে?”
“তবে—তবে তুমি যে বেবীর হৃদয়টিকে অমন কথা বলে smash
করলে সেটা কি ভজনােচিত হলাে?”
“যা সত্য তাই বলেছি, এখন না বলে পরে তা জানাজানি হলে।”
১২৪
পুতুল নিয়ে খেলা
“তেমন জানাজানিতে,” মিসেস ডাটু বল্লেন, “কিছু এসে যেত না।
বিয়ের আগে কার স্বামী কী করেছেন তা কি কোনাে স্ত্রী ঘাঁটুতে যায় ?
ওসব হয়ত তােমার ইউরােপে সম্ভব, কিন্তু আমরা ভারতীয় হিন্দু কায়স্থ,
আমাদের আদর্শ সীতা ও সাবিত্রী।”
“এতেই বা কী এসে যায় ?” সােম দুঃসাহসিক প্রশ্ন করল।
কী এসে যায় ? কলিন, কী এসে যায় ? How daro you ask
that question? How dare you go
সােম থতমত খেয়ে বল্ল, “আমি ভালাে মনে করেই ও প্রশ্ন করেছি।”
“না, না। অমন প্রশ্ন ভালাে নয়। বিয়ের পরের কথা এক, বিয়ের
আগের কথা অন্য। কোর্টশিপের সময় অমন কথা permissible নয়,
ওতে একটা বিশ্বস্ত হৃদয় ভীত চকিত ভগ্ন হয়। ও কথা শুনূলে যাদের
হিষ্টিরিয়া নেই তাদেরও হয় হিষ্টিরিয়া, আর যাদের আছে তাদের নিয়ে
তাদের মা’দের কী যন্ত্রণা।”
তিনি বলতে লাগলেন, “না, কলিন, না। তুমি বিলেতফেরৎ, you
ought to know better তুমি যে একটা বাবুর মতাে ব্যবহার
করবে তা আমরা কেউ কল্পনা করতে পারিনি তুমি আমাদের বিশ্বাসের
মৰ্যাদা রাখলে না।”
“তা হলে, সােম প্রস্তাব করল, “আমাকে বিদায় দি আমি
আসি।”
সে কী?”
“আমি যে ব্যবহার করেছি তার শান্তি এ অঞ্চল থেকে নির্বাসন।”
“না, না, তার দরকার নেই। তােমাকে আমরা তৈরি জিনিসটি
ভেবে নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম। তুমি তা নও। এর প্রতিকার তােমাকে
তৈরি করে নেওয়া।”
সােমর ধারণা ছিল সােমই প্রতিমাকে তৈরি করবে। তা নয়,
প্রতিমা ১২৫ প্রতিমা ও তার মা সােমকে তৈরি করতে উদ্যত। ইঙ্গ-বঙ্গ ফেরদের উপর সােমের উৎকট অবজ্ঞা অবশেষে শ্লাঘায় পরিণত হবে। বিচ্ছেদ ঘটবে তার পিতৃ-পিতামহের সমাজের সঙ্গে, সংস্কারের সঙ্গে। তার মাসীমা পিসীমারা তার স্ত্রীর ভাষা বােঝবার জন্যে বেণী গাঙ্গুলীর ই-বঙ্গ অভিধান কিবেন। “ভারতীয় হিন্দু কায়স্থ হয়ে সে ধুতী পরতে পাবে না, পাছে তার বাবুর্চি খানসামা মশালচি তাকে বাবু মনে করে ও নিজেদের মধ্যে বাবু বলে উল্লেখ করে। এ বাড়ীতে ধুতী একটা ফ্যান্দী ড্রে। অথচ সােম বিলেতেও ধুতী পরে এসেছে। “মিসেস ডাটু, সােম বঙ, “একা আমাকে তৈরি করে আপনাদের কী হাতযশ হবে ? যদি পারতেন আমার মা-বাবাকে ভাই-বােনকে কাকী-মামী-মাসী-পিসীকে কাকা-মামা-মেসাে-পিসেকে তৈরি করতে তবেই জানতুম আপনাদের হাতের গুণ। আমাকে বিদায় দি, আমি আসি।” মিসেস ডাটু কী ভাবলেন। বল্লেন, “বুঝেছি, বুঝেছি তুমি যা mean কবুছ। ওঁরা পৌত্তলিক, ওঁদেরকে তাে সদলবলে দীক্ষিত করতে পারিনে, কাজেই একা তােমাকে দীক্ষিত করে কী হবে। কিন্তু ও সব আজকাল উঠে গেছে। চাও তত হিন্দু মতেই তােমাদের বিয়ে হবে, শালগ্রাম সাক্ষী করে। “বিয়ের মত নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই,” সােম বল্প। “আমি চাই বিয়েতে মত। আপনার মেয়ের কি তা আছে?” "নেই আবার,* মিসেস ডাটু এতক্ষণ বাদে হাসলেন। “আমি যা বলেছি তা সত্বেও ?” “তার জন্যে,” মিসেস ডাটু করুণার সহিত বল্লেন, “তােমাকে ক্ষমা প্রার্থনা কতে হবে, কলিন।” “কেন ?
১২৬
পুতুল নিয়ে খেলা
“সেইটেই ফম্।”
“আমি এর চেয়ে সত্যকে বড় বলে জানি। তাই সত্যের
বিরােধী হলে ফ মানিনে।”
মিসেস ডাঢ় জীবনে এত বড় শক পানি। সােম যদি বত, আমি
নাস্তিক, ভগবান মানিনে, কিম্বা আমি ফ্রীথিঙ্কার, ধর্ম মানিনে, কিম্বা
আমি স্বৈরাচারী, নীতি মানিনে, কিম্বা আমি কমিউনিষ্ট, পরের
সম্পত্তিতে পরের অধিকার মানিনে, তা হলে তিনি হাসতেন, কিম্বা
অনুমােন করতেন, কিম্বা উপদেশ দিতেন, কিম্বা চটতেন। কিন্তু ফম
মানিনে। তার মানে জেন্টলম্যান নই, সভ্য মানুষ নই, উলঙ্গ
নরখাদক।
মিসেস ডাঢ় মূচ্ছ যেতেন, কিন্তু এক বাড়ীতে দু’জন মুচ্ছাবােগী হলে
কে কাকে দেখাশুনা করবে। তিনি আর একটি কথা না বলে সােমের
দিকে আর একটি বার না চেয়ে সােমকে cut করলেন (অর্থাৎ কাটলেন
, উপেক্ষা করলেন)।
বিদায় না নিয়ে চোরের মতাে সরে পড়া যায় না। সােম বীরেনের
প্রতীক্ষায় বসে বসে “Good Housekeeping” পড়তে থাকল।
বীরেন এসেই বল্ল, “শুনবে একটা সুখবর? কমলাদের ওখানে
তােমার আজ নিমন্ত্রণ।
“কিন্তু, সােম বল্ল, “আমি যে এখনি চলে যাচ্ছি।”
“সে কি হে। কোথায় ?
“জানিনে কোথায়। জানি যাচ্ছি।”
বীরেন মুখ ভার করে মা’র কাছে গেল। দেখল যে মা'ও মুখ ভার
করে সেলাই করছেন। “মা, সােম কেন যাচ্ছে?
মা জ্বলে উঠে বল্লেন, “He is no better than a cannibal.
প্রতিমা
১২৭
বীরেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। “No better
than what ?”
মা পুনরুক্তি করলেন। বীরেন ধপ করে বসে পড়ে ভাবল, সােম
মানুষের মাংস খায়। এ কি কখনাে হতে পারে। মা’কে কি বাঁচি
পাঠাননা আবশ্যক?
“সে ফ মানে না।”
“কী-কী মানে না ?”
“ফমে বিশ্বাস করে না সে।”
“ফর্মে বিশ্বাস করে না।” বীরেন উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করল।
“তবে ঠিকই বলেছনরখাদকের অধম।”
চল্প সে সােমের কাছে কৈফিয়ৎ দাবী করতে। বল্ল, “তুমি নাকি
ফর্মে বিশ্বাস করাে না ?”
“সত্যের সঙ্গে সংঘর্ষ না বাধলেই করি, বাধলে করিনে—* এই
হলাে সােমের কৈফিয়ৎ।
বীরেন ব্যঙ্গ করে বন্ধ, “তুমি দেখছি সাক্ষাৎ মহাত্মা গান্ধী। কেবল
পােষাকটা অন্য রকম।”
“তা হলে আসি ?”
“আরে থামে, থামাে। ঠাটাও বােঝ না। বলছিলুম ওসব সত্য
টত্য আমাদের মুখে সাজে না, গান্ধীর মতাে fanaticদের দলে আমরা
নেই। ফর্ম টাকে সর্বদা সব অবস্থায় বাঁচিয়ে তার পরে অন্য কথা, সত্য
বা শিব বা সুন্দর।”
“তােমার সঙ্গে তর্ক করতে ইচ্ছা নেই, সােম বল্ল, “আমাকে শুধু
একবার সকলের কাছে বিদায় নিতে দাও।”
বীরেন গভীরভাবে বন্ধ, "বেশ।” সােমকে উরে নিয়ে ছেড়ে
দিল ও নিজে কমলার বাড়ী গেল।
১২৮
পুতুল নিয়ে খেলা
মিসেস্ ডাটু বল্লেন, “যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হও
U6 I shall be ever so happy"
সােম বল্ল, “আপনিও কি আমাকে নাকে খং দিতে বলেন?”
প্রতিমা বল্ল, “আমার নিজের বার কী থাকতে পারে ? মা’র যা
বক্তব্য আমারও তাই।”
“আপনার স্বাধীনতা তা হলে চিন্তারও নয় বাক্যেরও নয় ?
চলাফেরার ?” বল্ল সােম।
মিসেস্ ডাটু বল্লেন, “তুমি তােত অত্যন্ত বেয়াদব হে! তুমি কি মনে
করাে যে তার মা’র অনুমতি না নিয়ে সে চলাফেরাও করে?”
সােম অপ্রতিভ হয়ে বল্ল, “তা হলে তার স্বাধীনতা কিসে? ক্ষিদে
পেলে খাওয়াতে, না ঘুম পেলে শশাওয়াতে ? না শাডী দেখলে
কেনাতে ? না রেকর্ড, বাজিয়ে শােনাতে ?”
“না, ওর সভ্য মানুষ হবার সত্যিই সম্ভাবনা নেই,” মিসেস্ ডাটু
মেয়ের দিকে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন। “ও আর আসবে না।”
প্রতিমা বিচলিত হয়ে বল্ল, "Will you really never বলতে
বলতে কেঁদে ফেল্ল।
সােম হেসে বল্ল, “কাদার স্বাধীনতা তত আছে বলে মনে হয়।”
প্রতিমা কঁদতে কাঁদতে তর্জনী উচিয়ে কোপ ব্যঞ্জনা করল। তার
মা বল্লেন, “তুমি এখন যেতে পারে।”
“আপনারও কি সেই অভিলাষ ?” সােম সুধালাে প্রতিমাকে।
“ও ছাড়া আপনি আর কী প্রত্যাশা করেন ?”
সােম অম্লানবদনে বঙ্গ, “আমি প্রত্যাশা করি যে আপনি আমার
সঙ্গে আসবেন।”
“কী? কী ?”—মিসেস ডাটু চেয়ার ছেড়ে উঠলেন।
©o my।”—প্রতিমাও দাড়ালাে।
প্রতিমা
১২৯
"কোই হ্যায়?” মিসেস্ ডাচ্ চিৎকার করুলেন।
“আবদুল।” প্রতিমা ডাক দিল।
তিন তিনটে দাড়িওয়ালা ভৃত্য হুড়মুড়িয়ে এসে হাজির হলাে ও
হুজুর’ বলে সেলাম ঠুকে হাঁপাতে লাগল।
সােম বল্ল, “লােক জড় করবার কী দরকারটা ছিল? আমি তাে
একে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলুম না। ইনি আমাকে আশা
দিয়েছিলেন।”
মিসেস ডাটু বল্লেন, “চোপ। এখন মানে মানে বেরিয়ে যাও।”
“যাবােই তাে। কিন্তু এতগুলাে পার্শ্বরক্ষী তাে আমি চাইনি,
চেয়েছি একটিমাত্র পার্শ্ববর্তিনী।”
প্রতিমা গালে হাত দিয়ে বল্ল, “That beuts me।”
মিসেস ডাটু বল্লেন, “বীরেন থাকলে গলাধাক্কা দিয়ে নীচে রেখে
আত। আবদুল, আবু ও মামুদ সাহস করবে না। কিন্তু সাহস
জোগাবে। আমিই ও কাজ করি।”-এই বলে তিনি সােমের ঘাড়ে
হাত তুলেন।
সােম হেসে একটি bow করল–প্রতিমাকে। মিসে ডাটের
হাতটাকে নিজের হাত দিয়ে আস্তে হটিয়ে দিল।
ব, “ফ এর চূড়ান্ত হয়েছে। এইটুকু চাক্ষুষ করবার জন্যে এতক্ষণ
অপেক্ষা করা। এখন তবে আসি।”
1 ।।)
BHAWANIPUN
LIBRARY
GAR
min
**৭
HOWRAH
০
CHITRASENPUR.
৬
মায়া
আবার উত্তর কলকাতা।
ললিতা সকৌতূহলে জিজ্ঞাসা করল, “কই, মেম বৌদিকে আলে না?”
সােম বসে পড়ে বল্ল, “আসল মেমের চেয়ে নকল মেমে নাকাল বেশী।
খেলেন একটা চুমম, না বল্লেন একবার ডার্লিং, সূর্যমুখী ফুলের মত
তার একই লক্ষ্যমা’র মুখ।”
কুণাল বস্তু, “ললিতার যে মা ছিলেন না সে আমার ভাগ্য।”
ললিতা বল, “আমার মা থাকলেও তােমার স্ত্রী-ভাগ্য একই
হতাে।”
সােম বল্প, “প্রতিমার মা না থাকলে আমার স্ত্রী-ভাগ্য একই হতে
কি না সে বিষয়ে কিন্তু আমার সন্দেহ থাকল।”
সােমের মে-ফেয়ার কাহিনী শেষ হলে ললিতা বল্ল,-“ভালাে কথা,
কে একজন কেষ্টবাবু তােমার খোঁজ নিতে এসে ফিরে গেছেন, বলে
গেছেন তােমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে।”
“কেষ্টবাবু?”
“বল্লেন শুধু কেষ্ট মামা বল্লেই তুমি চিনবে।”
“তাই বলতে হয়—কেষ্ট মামা। হঁা, কেষ্ট মামা। চা বাগানের
কেউ মামা। হোদল-কুংকুতের মতাে চেহারা না?”
ললিতা বল্ল “আহা, কী মাতুল-ভাগ্য।”
কুণাল আড়চোখে সােমের দিকে চেয়ে বয়, "নবাণাং মাতুল।”
মায়া ১৩১ সােম বল্ল, “তার মানে আমিও একটি হোল-কুংকুৎ। বেশ, বন্ধু, বেশ। তবু যদি আপন মামা হতেন।” ললিতা বল্ল, “হেদল-কুংকু না হলে কোথাও বৌ জোটে না কেন? বিয়ের ফুল ফোটে না কেন?” সােম বল্ল, “তােরা কেউ পাবি নে গাে ফোটাতে ফুল ফোটাত।” এই বলে দার্শনিকের মত অন্যমনস্ক হয়ে গেল। মামার সঙ্গে তাঁর মেসে গিয়ে দেখা করলে তিনি বলেন, “এই যে ভজা।” একমূখ পান চিবােতে চিবােতে তখন তাঁর অসামাল অবস্থা। আর কিছু বলতে পারেন না। এই যে ভজা।” ও নাম অনেক দিন বাতিল হয়েছে। সােম একটু বিরক্ত হলাে। “তারপর? কবে ফিলি?” “মাস দেড়েক আগে।” “হু। কোথায় চাকরী হলাে? না, হয়নি ?” সােম বিমর্ষভাবে বল্ল, “কোথায় আর হলাে ? বিলেত থেকে যা পুঁজি এনেছিলুম তাও ফুরিয়ে এলাে।” “হবে, হবে। যেমন দিনকাল। একটু সবুর করতে হয়। প্রােফেসারি কবি ঠিক করলি? “জুতাে সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ যাতে দু পয়সা আসে তাই করতে রাজি আছি।” তারপর মনে মনে জুড়ে দিল, তবে হবে না মুচি, হবাে , হবে না, যদি না পাই মুচিনী। “হা-হা-হা-হা। তেমনি ছেলেমানুষ আছি। ভজগােবিন্দ পরমানন্দ বলে তােক ক্ষ্যাপাতুম মনে পড়ে। তাের মতাে অত বড় স্কলার। বংশের গৌরব। দ্যাখ, ও সব কাজ আমার মত লক্ষ্মীছাডার। কোন কাজে হাত না দিয়েছিল। অবশ্য তুই সবটা ইতিহাস জানিলে।
১৩২ পুতুল নিয়ে খেলা মাইনিং, প্লান্টিং, মােটর ইমপাের্টিং। শেষে এই দারুণ ট্রেড ডিপ্রেসান। এবার খুলেছি বিয়ের ব্যবসা।” “কী। শেষকালে— “কেন রে । এতে শক পাবার কী আছে। দেশের লােক খেতে পায় না বলে কি মেয়ের বিয়ে ছেলের লেখাপড়া বন্ধ রাখবে? একটাও আঁতুড় ঘর কি স্কুল খালি হয়েছে বলতে পারি? তুই একটি বিয়ে কর না। লক্ষ্মী যদি অন্তঃপুরে আসেন তােত জীবনের সব দিক দিয়ে আসেন। পয়মন্ত দেখে বিয়ে করলে জীবনের lalf the battle “বিয়ে করতে কি আমার অনিচ্ছা? কিন্তু “না, না, ও সব কিন্তু টিন্তু শুনব না। চল, চল, আমার আপিসে চল।” মামার আপিস কর্পোরেশন স্ট্রীটে। কামরার বাইরে লেখা- MR. CARR, HINDU MARRIAGE BROKER. মামা কোট ও ভেষ্ট খুলে গােল চেয়ারে বসে এক চক্কর ঘূরে নিলেন। তারপর ভাগনের দিকে একটি চুরুট বাড়িয়ে বল্লেন, “Sorry, couldn't offer you a cigarette দেশের লােকের সেন্টিমেন্টটাকে খাতির করতে হয়। আর বিলিতী সিগ্রেট কি প্রকাশ্যে কেবার যাে আছে?” সােম পকেট থেকে তার ইটালিয়ান সিগ্রেটের কে বের করে মামার সামনে ধরুল। তিনি চোরের মতো ইতস্তত করতে করতে খপ করে মূখে পূরলেন। বল্লেন, “Thank you. কতকাল পরে।” সােম বল্ল, “দেশের মন্ত পরিবর্তন হয়েছে, তা অস্বীকার করতে পারিনে। কিন্তু বিয়ের বাজারট- মায়া “আমাদের সমাজ,” তিনি সিগ্রেটটা ধরিয়ে এক টান দিয়ে বল্লেন, *কোন brand বল তাে?” "সিগ্রেটের আবার brand কী?” সোম বল্প, “যেমন স্বীরত্ব দুলাদপি তেমনি “বােয়েছি ( বুঝেছি)। বেড়ে লাগছে। আশা করি স্বদেশী নয়?” “না, ইটালিয়ান। নেপলসে কেনা।” “তাই বল।” পিঠ পিঠ কয়েক টান দিয়ে সেটাকে নিবিয়ে নিজের কেসে তুলে রাখলেন। এক সঙ্গে এক রাশ ধোয়া ছেডে শুকতে শুকতে বল্লেন, “ধোঁয়ারও কেমন মিষ্টি গন্ধ দেখেছিস?” তার পর তার মনে পড়ল কী বলতে যাচ্ছিলেন। “হ্যা—আমাদের সমাজ যদিও এক জায়গায় দাড়িয়ে নেই তবু পশ্চিম মুখখা হতে হতে কোনাে দিন মা পেরিয়ে বিলেত পৰ্য্যন্ত—ম্যাটল্যান্টিক পেরিয়ে আমেরিকা অবধি—যাবে কি না আল্পাই জানেন। আমরা আজ কাল কেউ থাকি আকিয়াবে, কেউ করাচীতে, কেউ নেলােরে, কেউ ফতেপুর সিক্রীতে। আমাদের ছেলেমেয়েদের কোর্টশিপ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে না হয় ধরেই নিলুম, কিন্তু হওয়া কি geographically সম্ভব ? দৈবাৎ কার সঙ্গে কার চোখের দেখা ও চোখের দেখায় প্রেম হয়ে যেতে পারে বটে—অন্তত বাংলা নভেলে তাে তাই লেখে ও তাই পড়ে মেয়েগুলাে পৰ্য্যন্ত বছে কিন্তু গ্রেট মেজরিটীর কথাটা ভেবে দ্যাখ, ভজগােবিন্দ।” আবার সেই মান্ধাতার আমলের নাম। সােম ব্যঙ্গ করে বল, “গ্রেট মেজরিটীর জন্যে গ্রেট থিকার প্রয়ােজন। যেমন আপনি।” “নেহাৎ ভুল বলিনি, ভা,” তিনি আর একবার চক্কর দিলেন। “যে কাজটি আমি করছি সেটি এক হিসাবে social service বােগ্য যােগেন যােজয়েৎ। যার যেমনটি পাত্র বা পাত্রী চাই তাকে ঠিক তেমনটি জোগাড় করে দিই। তাের বাবা তাের জন্যে নিজের চেষ্টায় জোর ১৩ পুতুল নিয়ে খেলা একশােটি সম্বন্ধ পাবেন, কিন্তু আমার সাহায্য নিলে এক হাজারটি। Scope কত বেড়ে গেল হিসাব করে দ্যাখ। কে জানে হয়ত সাতশাে সাতাত্তর নম্বর সম্বন্ধটি সব দিক থেকে নিখুত হত। দুই পক্ষের কারুর মনে কোনাে ক্ষোভ থাকত না, প্রজাপতির স্বহস্তের নির্বন্ধ।” সােথ বল, "প্রজাপতির স্বহস্তের মহিমা অপার। আমার কিন্তু প্রাণান্ত হতাে হাজারটি পাত্রীকে স্বচক্ষে দেখতে ও স্বকীয় উপায়ে পরীক্ষা করতে।” কেষ্ট মামা কান দিলেন না। হাঁটু জোড়াকে সবেগে ঠোকাঠুকি করতে করতে বল্লেন, “মুস্কিল এই যে লােকে এখনাে এ সব বিষয়ে এক্সপার্টের সাহায্য নিতে শেখেনি। হয় নিজেরা যা তা একটা করে বসে, নয় আনাড়িকে লাগিয়ে দেয়। তাতে পয়সা কি বাঁচে ভাবছি ? যা, ধীরে ধীরে আমার পসার জছে। কয়েক ঘর বাঁধা ক্লায়েন্ট হয়েছেন, ষষ্ঠী যাদের ঘরে বাঁধা। হারে তাের নামটা রেজিষ্ট্রী করে রাখব?” “না। না।” সােম সাতকে বল্ল। “আপনার খাতা দেখে বষ্ঠী কোন দিন না আপনি এসে ধন্না দেন।” “নামটা থাক না? বিয়ে তাে কেউ জোর করে দিচ্ছে না। ইচ্ছে হয় না করি। কিন্তু মাঝে মাঝে তােকে ডাক দেবব্য, মেয়ের বাপের ঠিকানা দেবাে। তুই যতদিন হাতে থাকবি ততদিন আমার লাভ। বিয়ে করলে তাে হাত থেকেই গেলি। আমি কি তা বুঝিনে?” টেলিফোনে ডাকল। *Hallo Yes, I am Mr Carr বলুন কী করতে হবে। মেয়ের বিয়ে দিতে চান ? সে তাে আনন্দের কথা। শুভস্য শীঘ্রমশাস্ত্রেই বলেছে। মেয়েটির রং কেমন? । পতনা? হ। পণ যৌতুক মিলিয়ে কত দান কতে চান? মােটে। ই। । । আপনারা ? ৫। কোন শ্রেণী ? । Alright, Pll fix you up, আজ সৰু
पाया
১৩৫
আগে খবর দেবাে। আপনার ফোন নম্বরটি কত? দু। ০, K
Thank you."
নম্বরটা টুকে নিয়ে গুণ গুণ করে গান করতে করতে বেল
টিপলেন।
“পিয়ন, সত্যবাবুকো সেলাম দো।” ঐ একটি মাত্র পিয়ন, ঐ একটি
মাত্র কেরাণী।
সত্যবাবু কেরাণী এলেন। চশমা কপালে তােলা। ধুতীর উপর
শার্ট, তার কলার নেই, তবু ঘাডের উপর একটি stud আছে। প্রৌঢ়,
বােগা, ছাঁ-পােষা মানুষ।
“সত্যবাবু, বামুনদের রেজিষ্টারখানা নিয়ে আসুন।”
সত্যবাবুর তথাকরণ। কেষ্টবাবু রেজিষ্টারের দুই তিন জায়গায় লাল
পেনসিলের দাগ দিলেন। তার পর ফোন তুলে নিলেন।
“৫৩২১ (অপ্রকাশ্য)। IIallo, শরৎবাবু বাডী আছেন ? আমি
মিষ্টার কর, ম্যারেজ ব্রোকার, যাকে বাংলায় বলে ঘটক। এই যে
শরৎবাবু। একটি ভালাে পাত্রী পেয়েছি। রং ধরতে গেলে ফসাই।
ম্যাটিকে স্কলাশিপ পাবার আশা আছে। দেওয়া নেওয়া এই
আজকালের বাজারে—আপনারও তাে জানা আছে। একবার দেখতে
চান ? কখন যাবেন বলুন? আমাকে যেতে হবে? বেশ তত। আমি
আরাে হাজার খানেকের জন্যে বলে দেখতে রাজি আছি। যদি আমার
কমিশনটা ভুলে না যান। শতকরা একটাকা মাত্র।”
সােম ৩ছিল আর মনের রাগে হাসছিল।
“এই হচ্ছে, বাবাজি, আমার কাজ।” কেষ্ট মামা আর-এক চক্কর
দিয়ে দু চার বার হাত তুলে স্যাণ্ডে করলেন—বিনা ডাম্বেলে। “তা তুই
তৈরি থাকি। কলকাতা ছাড়িসনে। সত্যবাবু, কায়স্থদের রেজিষ্টারখানা
নিয়ে আসুন দেখি।”
পুতুল নিয়ে খেলা দিন চারেক পরে সােম পেল কেষ্টমামার চিঠি। লিখেছেন, মায়া মেয়েটির নাম। পিকেটিং করে ছ মাস জেল খেটে ফিরেছে। পাছে আবার ওদিকে ওর মতি যায় সেই ভয়ে বাপ মা ওকে এই মাসেই পাত্রস্থ করতে ব্যর্থ। বড়লােক। তাের সঙ্গে যদি হয় তবে আমরাও হবে কুটুম্ব। তুই সােজা আমার আপিসে চলে আসিস, আমি তােকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবাে। ভবানীপুরে কুমারী মায়া মল্লিকের বাড়ী। মামা ও ভাগ্নে সেই বাড়ীতে পৌছে বৈঠকখানার পথ খুঁজে পেলেন —এমনি বিরাট ব্যাপার। একজন বলে, “কাকে চান্ ? ওঃ। যান, ওইদিকে যা। আর একজন বলে, “কিসকো মাংতে হেঁ। বগমে তল্লাস কী জিয়ে।” তৃতীয় একজন বলে, “আরে, কুমাডে যাউছ ম।” ( কোথায় যাচ্ছ ?) মহা বিভ্রাট। কেষ্ট মামা বলেন, “এ বাড়ীর একটা নিজস্ব ডাইরেক্টরী থাকা দরকার।” সােম বল্ল, “এবং এক সেট ভাষা শিক্ষার বই।” এই সময় কে একজন সাহেবী পােষাক পবা ভদ্রলােক হন্ হন্ করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। কেষ্ট মামা তার পথ রােধ করে জিজ্ঞাসা করলেন, “মশাই, বাংলা বােঝেন ?” দেখছেন না, মশাই, আমি ডাক্তার ? ছাড়ন, ছাড়ন, পথ ছাড়ুন। ভদ্রলােক যে patient ন তার গতির দ্বারা তা প্রমাণ হলাে। একজন নরসুন্দর সেই পথ দিয়ে হেলে দুলে চলেছিলেন। কেষ্ট মামা বলেন, “ও ভাই সাহেব, বলি তুমি তাে সবাইকার দাড়িগোঁফের খবর রাখাে। এ বাড়ীতে ফটিকবাবু বলে কাউকে চেনাে?* “কৌ ফটিকবাবু ? যিসকী লড়কী গান্ধীমায়ী বন্ গই?” “ঠিক ঠিক, সাহি।”
মায়া ১৭ “ও ক্যা?” নরসুন্দর আঙুল দিয়ে কাকে বা কোন জিনিসকে নির্দেশ করলেন তিনিই জালেন। কেষ্ট মামা ও সােম সেই দিকে গিয়ে দেখেন গারাজ। “নরসুন্দরের চাতুরীর প্রবাদ আছে। তারই একটা দৃষ্টান্ত আজ প্রত্যক্ষ করা গেল।”—সােম বল্ল। “ব্যাটাকে আবার দেখলে চড় দিয়ে দাত উড়িয়ে দেবাে। আমার সঙ্গে ইয়ার্কি।” বলে কেষ্ট মামা দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফুলতে থাকলেন। সেই গারাজের লােক তাঁদের একটা সিডি দিয়ে উপরে যাবার পরামর্শ দিল। বক্স, বাবুরা নীচে নামেন না। কার যে কোন মহল তা উপরে খোঁজ করলে পাত্তা পাওয়া যাবে। ফটিকবাবু বল্লেন, “আপনারা সােজা তেতালায় চলে এলেন না কেন ? আমরা তাে ভেবে আকুল। ইনিই পরম কল্যাণীয় কল্যাণ ? দেখে সুখী হলুম। ওদেশ থেকে কবে আসা হলাে ?” সােম এর উত্তর দিল। অমনি আরাে কত মামুলি প্রশ্নেরও। কেষ্ট মামা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মুরুব্বিয়ানা ফলাতে থাকলেন। দেখতে দেখতে বাবুর মােসাহেবদের মুখ ছুটুল। তাদের একজন জিজ্ঞাসা কলেন, “বলুন দেখি, সা, ওদেশের ঝি-চাকর কি এই দেশ থেকে গিয়ে বসবাস করছে, না আফ্রিকা থেকে? কী বল্লেন ? ওরাও সাহেব ? যা। ঝি চাকর সাহেব মেম!” আর একজন সবজান্তার মতাে মন্তব্য করলেন, “কেমন ? আমি বলিনি ও কথা ? সিনেমায় যা দেখায় তা নেহাৎ যা তা নয় হে। ওদের সমাজের জলজলে ছবি।” সােম বা, “আপনি, ওঁর চেয়ে আরাে ভুল কলেন।” তাই নিয়ে সােমকে অনেকক্ষণ বকবক করতে হলাে। এক পেয়ালা চায়ের অভাবে তার গলা যখন শুকিয়ে এসেছে তখন তিনটে চাকরের
১৩
পুতুল নিয়ে খেলা
ছয় হাতে খাদ্যদ্রব্য বােঝাই করে তাদের পিছু পিছু এলাে মায়া। সে
জেলে ছয় মাস কাটিয়েছে বলে কায়া তার শীর্ণ শুষ্ক রুগ্ন নয়। বরঞ্চ
তার নিটোল অঙ্গ অনাবশ্যক মেদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেনি।
তার চক্ষু অসাধারণ দীপ্ত। কিন্তু চপল নয় তার চরণ। আপনি সে
সংহত, কিন্তু ঢেউ ওঠে তার চতুর্দিকে।
চাটুকারেরা বলাবলি কল, “আগুনের ফুলকি। জেলে মন পড়ে
আছে।”
“জানাে না বুঝি সার্জেন্টের ঘােডার সামনে গিয়ে দাড়িয়েছিল।”
“শুধু দাড়ায়নি, লাগাম টেনে ধরেছিল।”
“নাম মায়া, কিন্তু প্রাণের মায়া নেই।”
"কিসের মায়াই বা আছে? ঐশ্বর্যের ? গৃহের ?”
“যা বলেছ, এমনটি দেখা যায় না।” “নক অনেক হয়েছে, কিন্তু
আসলের ধার দিয়েও যায় না।”
মহিলাকে সম্মান প্রদর্শন করবার জন্যে সােম আসন ছেড়ে দাড়ালাে।
মায়া তার কাছে এসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বৈলাতিক সম্ভাষণ
কল ও তার পাশের চেয়ারে বসল।
সােম বল্ল, “আপনি ও আমি প্রায় এক সময়েই বাড়ী ফিরেছি, যদিও
এক জায়গা থেকে নয়।”
মায়া বল্ল, “কদিনের জন্যে ফেরা আমার। আবার তােত যাচ্ছি।”
ফটিকবাবু আপত্তি জানিয়ে বলেন, “তাের না হয় প্রাণের মায়া নেই,
আমাদের তাে সন্তানমায়া আছে।
চাটুকারগণ ব্যস্ত হয়ে গুঞ্জন করল। সেই সঙ্গে ভুঞ্জনটাও চলছিল
পরিপাটীরূপে।
“আমিও, লােম হেসে ব, “ঘুরে আসব ভাবছি। কাজ কর্মের
ৰাজাৰ যেমন মলা, শিমেন্টের ভাত থাকতে ঘরের ভাত খাই কেন?
মায়া
তবে ছুটন্ত ঘােড়ার সুমুখে ঝাপিয়ে পড়তে সত্যি বলছি আমার সাহসে
কুলােবে না।”
“আমি বুঝি দুবেলা তাই করে বেড়াই ?”
“দুবেলা দূরে থাক, জীবনে একবারও আমি পারব না।”
“আমিও কি দ্বিতীয়বার পিরবাে ভেবেছেন ? আর লােকে যতটা
বাড়িয়ে বলে ততটা নয়।”
চাটুকারে বল্লেন, “কী বিনয়।” “সাধে কি লােকে বলে
গান্ধীমায়ী।”
কেষ্টমামা এতক্ষণ খাদ্যবস্তুর প্রাদ্ধ করছিলেন।
সব
কথা
শশানেননি। একটা কিছু বতে হয়, তাই বল্লেন, “ঘােডায় চড়তে
পারাে তাে, মা ?”
মায়া বিষম অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নীচু কবুল। ফটিকবাবু বঙ্গেন, “ওর
দোষ নেই, আমিই ও শিক্ষা দিইনি।”
মােসাহেবরা বল্লেন, “তাতে কী?”
এবার তোক দেবার পালা সােমের। সে বল্প, “ঘােড়ায় চড়তে
যে সে পারে, আমিও। কিন্তু ছুটন্ত ঘােড়ার- সুমুখে ঝাঁপিয়ে
পড়তে পারতেন বিলেতের সাফ্রেজেটরা আর পাবেন বাংলার
আপনি।”
মায়া কৃতজ্ঞ হয়ে লজ্জা চেপে বল্ল, “এটা কিন্তু অত্যুক্তি।”
সেদিন কথাবার্তা হলে প্রচুর, কিন্তু কেউ কারুর নতুন বা গভীর
কোনাে পরিচয় পেল না। ওঠবার সময় “সােম বঙ্গ, “আমার বন্ধুদের
বাড়ী একদিন চা খেতে আন।”
মাৱা বল, “দেখলেন না, চা আমি খাইনে? অভ্যাস গেছে, আবার
কলে আবার বেও।”
“তা হলে এমনি বেড়াতে আসুন। এত বড় বীরাঙ্গনার দর্শন পাবার
১৪০ পুতুল নিয়ে খেলা জন্যে ওরা সবাই আগ্রহ বােধ করবে। না করলে ওদের উপর আমি এমন রাগ কবুবাে।” কেষ্টমামা ভরা পেটে বল্লেন, “বাস্তবিক, আমার এত বড় কারবার, কত পাত্রী নাড়াচাড়া করতে হয়, কিন্তু ওরা সবাই অঙ্গনা, কেউ বীর নয়। এতদিনে কুমারী মায়া মল্লিক আমার ব্যবসায়ী জীবন সার্থক করলেন। ওরে ভজা, তুই আর দ্বিধা করিসূনে, আমি জাহ্নবীদাকে লিখি যে ছেলের পছন্দ হয়েছে, ছেলের মামারও-মা তত নেই, ধরে নিতে হয় যে মামাই এক্ষেত্রে মা, দুগ্ধাভাবে ঘােলং দদ্যাৎ—এখন ছেলের বাপ হ’ বল্লেই বাকী থাকে মিষ্টান্নং ইতরে জনাঃ।” মােসাহেবরা বল্লেন, “সে আমরা জানি আর জানেন ফটিকদা।” ফটিকবাবু বল্লেন, “ফটিক শুধু চান সঠিক খবর যে তার বড় মেয়ে মায়া ঘােডার পায়ে না পড়ে মানুষের হাতে পড়েছে।” মায়াকে নােম একান্তে বল্ল, “তা হলে ?” মায়া চোখ নামিয়ে বল্ল, “আচ্ছা।” “আসুন কেষ্টমামা,” সােম পা বাড়িয়ে বল্ল, “ওসব পরে হবে। মায়া দেবীকে যে জেলে যেতে দেওয়া হবে না অন্তত কিছুদিন এই আপাতত যথেষ্ট।” পথে কেষ্টমামা সােমকে ভৎসনা করলেন। “তুই কেন দেরি করছি, বল তাে? আমি কারবারী মানুষ, আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে অমন মাল আমি কোনদিন নাড়াচাড়া করিনি, বিশ্বাস হলাে ? দেখলি তাে কত বড় বাড়ী, তিন তিনখানা মােটর, ঝি চাকর অগুণতি, মােসাহেবই বা কত। অর্ধেক রাজকন্যা, না, অর্ধেক রাজত্ব—ফটিকবাবুর অংশের আট আনা তুইই তাে একদিন পাবি, ওঁর যদি ইতিমধ্যে পুত্রসন্তান না হয়।” “জমিদার বুঝি ?”
মায়া ১৪১ “নয় ? দেশ ওদের রংপুর জেলায়। এক তামাক থেকে ওদের আয় কত। আমার ক্লায়েন্ট, তা না হলে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাের মতাে বহু যােগ্য পাত্রের দরখাস্ত পেত। তােকে কি এতটা সমীহ কত রে ভজা ?” সােম বল্ল, “আমি দরখাস্তই করতুম না।” মামা বল্লেন, “সেই ভজাই আছি। সংসারের তুই বুঝি কী? সংসার কেবল একটি অক্ষে ঘুরছে—নাম তার টাকা। সেই টাকার জন্যে মানুষ না কছে কী! আর তুই কবিনে বিয়ের দরখাস্ত। যাক, তােকে দরখাস্ত করতে বলা হচ্ছে না। আমি একরকম সব গুছিয়ে এনেছি। এখন তাের মত হলেই আমি কমিশন যা পাবাে তুই নাই বা জালি। ওসব কনফিডেনশিয়াল।” “কিন্তু, সােম বল্প, কংগ্রেসী মেয়ে আমি বিয়ে করতে চাইলেই বাবা অমনি রাজি হয়ে যাবেন ওটা তােমার ভুল ধারণা, কেষ্টমামা। ওকে এখনাে সরকারী চাকরী করে খেতে হয়, সরকারী পেন ওর শেষ বয়সের ভরসা, আর আমাকেও সরকারী চাকুরে করবেন বলে ওঁর তদ্বিরের ত্রুটি নেই।” কেষ্টমামার উৎসাহের তেজ মুহুর্তে নিবে গেল। ট্যাক্সিও মেসের নিকটবর্তী হয়েছিল। তিনি নেমে পড়ে বল্লেন, “গুড বাই, ভজা।” মায়া বলেছে আসবে। কিন্তু সত্যি আসবে কি না, এলেও সােমের সঙ্গে তার সম্বন্ধ নিবিড়তর হবে কি না, যে পুরুষ সরকারী চাকরী পেলেও পেতে পারে তাকে বিয়ে করবে কি না, বিয়ে করলে কংগ্রেসের কাজ সম্পূর্ণ ত্যাগ করবে কি না এইরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সােম পৌছে গেল। ললিতাকে বল্ল, “কাকে দেখে এলুম ও ডেকে এলুম জানাে? মায়া মল্লিক।
১৪২
পুতুল নিয়ে খেলা
ললিতা থমকে দাঁড়ালাে। বল্ল, “সর্বনাশ।
মেয়েকে সালাতে
পারবে?”
“তুমি চেনাে ওকে?”
“সাক্ষাৎভাবে না হােল্ক পরােক্ষে।”
“আমার তাে বিশেষ শ্রদ্ধা হলো ওর উপর। দেখা যাক তােমার
কী হয়।”
ললিতা বল, “তুমি যাকে বৌ করবে সেই হবে আমার বৌদিদি,
তাকেই করবাে ভক্তি। কিন্তু মায়া মল্লিক কি বৌমানুষের মতাে ঘরে
চুপ করে থাকবে ?”
সােম বল্ল, “কে বলছে তাকে গৃহলক্ষ্মী হতে। সে যা হতে চায়
তাই হােক, মেকী না হলেই হলাে। ভণ্ডামি ছাড়া আমি বােধ হয়
আর সব সইতে পারি, ললিতা।”
“কী জানি বাপু, আমি অত বুঝিনে। মেয়েমানুষকে মেয়েমানুষের
মতাে না দেখলে আমার মাথা বিগড়ে যায়।”
কুণাল বল্ল, “কল্যাণ যা বলছে তা তােমার প্রতিপক্ষের কথা নয়
গাে, তােমারই কথা। মেয়েমানুষ যদি খাঁটি হয় তবে মেয়েমানুষই
থাকে, দেখতে যারই মতাে হােক। ঘােমটার আকার মেপে যদি
নারীত্ব নির্ণয় করতে হতাে তবে তুমিই তােমার ঠাকুরমার চেয়ে
নারীত্বে খাটো হতে।”
“যাও”, বলে ললিতা তর্কে ভঙ্গ দিল।
ললিতা তর্কে ভর দিল। “শােনন, ললিতা,
শােনন, সােম তাকে ডাক দিয়ে ফিরিয়ে বল, “আমার একটু উপকার
করতে হবে। মায়ার সঙ্গে যাতে আমার নিভৃত আলাপ হয় তার
কৌশল তােমরা চিন্তা করে। তার সঙ্গে যদি আসেন কোনাে মহিলা
তবে তাঁকে নিয়ে যেতে হবে জুলিয়ে পাশের বাড়ীতে। আর
যদি কোনাে পুরুষ আসেন তবে কুণাল যেন তাঁকে জমিয়ে রাখতে পারে।
.
মাযা ১৪০ কুণাল বন্ধ, ওবাডীর গল্প-দাদাকে নিমন্ত্রণ করলে ভাবনা থাকে । ভদ্রলােক যা তিব্বতের গল্প করেন, না শুনলে বিশ্বাস করবে না, শুনলেও বিশ্বাস করবে না।” ললিতা বঙ, “মায়াকে ও তােমাকে এক ঘরে রেখে যাওয়া সম্ভব হলেও সঙ্গত কি না তাই প্রশ্ন। হয়ত তুমি আদর করে কিছু বলবে আর সে অমনি তােমার জিব, উপড়ে নেবে।” সােম বল্ল, “না, না, যতটা শুনেছ ততটা অবসিক সে নয় । রসের নিবেদন স্থান কাল ও নিবেদকের ব্যক্তিত্ব অনুসারে সাড়া পায়। আমি পটীয়ান ব্যক্তি, আমার জিব, আস্ত থাকবে, ভয় নেই।” মায়ার সঙ্গে এলে তার বােন ছায়া আর তাদের অভিভাবক রূপে এলেন তাদের বাড়ীর সরকার মশাই। সরকারের যা বিদ্যার দৌড় তিব্বত তার মানসিক ভূগােলে দেশ কি পৰ্বত তার ঠিক নেই। গল্প- দাদা তাকে বৃথাই শশানালেন যে, “মশাই, আমার তিব্বতী বন্ধু বিদেশে যাবার সময় তার বৌকে আমার কোলে বসিয়ে দিয়ে বল্লেন, ভাই, তােমারও।” সরকার খাপ্পা হয়ে বল্ল, “আপনি বুড়ো মানুষ, আপনার মুখে এসব কী কথা। নামঃ রামঃ।” দাদা বল্লেন, “ওহে, ওটা যে পঞ্চপাণ্ডব ও এক দ্রৌপদীর দেশ। যা হােক সরকারকে নীচে আটকে রাখা গেল। এদিকে ছায়া কি সহজে দিদির কাছ থেকে নড়তে চায়? বছর তেনাে চৌদ্দ বয়স তার, দিদির স্বেচ্ছাদাসী। এমন দিদি কার আছে? ললিতা তাকে পরিশেষে খােকা-কল্যাণের দ্বারা আকর্ষণ করল। খােকার কী জানি কেন তাকেই পছন্দ হলে বেশী। “এসাে, এসাে, এত বােগা হয়ে গেছ কেন? তুমি বুঝি খুব পড়াে? তােমার চোখে এই বয়সেই চশমা ইত্যাদি পাকা পাকা কথা বলে থােকা তাে নিয়ে গেল তার শাড়ী ধরে টেনে।
১৪৪ পুতুল নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “মায়া দেবী। জেলে কি আপনি সত্যি আবার যেতে চান্ ?” মায়া বন্ধু, কী করবাে বলুন। জেলের বাইরে আমি বন্দিনী, জেলেই আমি মুক্ত। বাড়ীতে আমি নিজের হাতে এক গ্লাস জল খাবাে তার যাে নেই—দশটা চাকর হাঁ হাঁ করে ছুটে আসবে। লেখাপড়া করতে চাই, দু বেলা আধ ডজন প্রাইভেট টিউটার হাজিরা দেন। কোথাও যাবাে-সঙ্গে লােক লস্কর, হৈ চৈ, উপদেশ, পরামর্শ, তােষামােদ। জেলে আমি গােটাকয়েক নিয়ম মেনে নিশ্চিন্ত, নিঝঝাট।” “কিন্তু, মায়া দেবী”, সােম ব্যথার ব্যথীর মতাে বল্ল, “জেল তােত কারাে চিরদিনের নয়। এমন দিন আসবই যে দিন মেয়েরা দলে দলে তীর্থযাত্রীর মতাে কারার পথ ধরবেন না। তখন আপনার কী গতি হবে ?” "সেটা ভাবিনি।” “সেইটে ভাবুন।” দেখুন, বাইরে যতক্ষণ থাকি দেশের কত দাবী। চাই অন্ত্র, চাই স্বাস্থ্য, চাই মুক্ত বায়ু,—কিন্তু এ চাওয়া মেটাবে কে? আমারই কানে এসে বাজে, প্রাণে পীড়া লাগে, কিন্তু কী আমার ক্ষমতা। মােটে তাে দু খানি হাত।” সােম হেসে বল্ল, "হাত রাখেও যেমন মারেও তেমনি। দু খান হাত নিয়েই ইউরােপের লােক যা লড়াই করছে তা বনের চতুষ্পদের অসাধ্য। আপনিও কী করবেন কে জানে।” “সত্যি।” মায়া বল, ক্ষমতা যার অল্প মমতা তার বেশী হওয়া উচিত নয়—ভগবানের ভূল।” “ভগবান তাে এও চেয়েছেন, সােম বা, “যে, মমতা যাদের কে
মায়া
১৪৫
তারা বইবে ঘরে আর ক্ষমতা যাদের বেশী তারা বইবে বাইরের
ঝুকি। মেয়ে পুরুষে ঐ যে অধিকারীভেদ ওটা মালে তত ভগবানের
ভুল ধতে হয় না।”
“কিন্তু কই, মায়া এদিক ওদিক চেয়ে বল্ল, “ছায়া কোথায় গেল ?”
“তিনি, সােম বল্ল, “এখনি নিরাপদ দূরবর্তিনী।” তারপর বিনা
ভূমিকায় বল্ল, “আপনার সঙ্গে আমার একটু নিভৃত আলাপের আবশ্যক
আছে।”
মায়া সচকিত ভাবে বা, “ছায়া থাকলে ভালাে হতাে না ?”
“কিছু মাত্র না। Two is company, three is a crowd."
মায়া চুপ করে বসে দেয়ালে কুণাল-ললিতার ফোটো নিরীক্ষণ করণে
মন দিল।
সােম বন্ধ, “মায়া দেবী, জেলে আবার নাই গেলেন ?”
মায়ার চুডিগুলাে ককনিয়ে উঠল। কিন্তু মুখ ফুটু না।
“জেল আপনার যে কারণে ভালাে লাগে ঘরও ভালাে লাগবে সেই
কারণে, অধিকন্তু বাইরের সঙ্গে তার যােগ থাকবে অবারিত।”
“সে তাে এখনও আছে,” মায়া কড়া সুরে বল।
“এখন যা আছে,” সােম সহিষ্ণুভাবে বন্ধ, তাতে আপনার প্রকৃত
কর্তৃত্ব নেই, আছে প্রভূত মান। যা হতে পারে তা ঠিক এই
জিনিস নয়।”
মায়া সশব্দে হেসে বল্ল, “সােজা কথায় বলুন। অত আকার ইঙ্গিত
কেন? আমি কি কালা, না আপনি বােবা?”
“এই তাে চাই।” সােম হৃষ্ট হয়ে বস্তু, “আমার গৃহিণী হবেন?*
“আপনার কাছে কী পাবাে?” মায়া ফস করে জিজ্ঞাসা করল।
আর বাই পান টাকা দিয়ে যেসব সুবিধা কেনা যায় সেসব
পাবেন না।
১৪৬ পুতুল নিয়ে খেলা “বাচা গেল। তারপর ?” “পাবেন একটি পরিশীলিত বিদগ্ধ মন। বহুদেশ দর্শনে যার যাবতীয় কোণীয়তা—angularities-ঘর্ষিত হয়েছে।” “অমন মনের প্রতি আমার লােভ আছে। তারপর ?” “তারপর। কী, আপনি কেবল মন নিয়ে সন্তুষ্ট নন্ এত বড় আধ্যাত্মিক দেশের নারী হয়েও ?” মায়া অপ্রতিভ হয়ে নীরব রইল। “জাতে যখন চাইলেন তখন শুনুন। অবশ্য না জানতে চাইলেও শােনাতুম।” মায়া উৎকর্ণ হয়ে আরক্তবর্ণ হলাে। সােম বঙ্গ, “আর পাবেন একটি অনুশীলিত অভিজ্ঞ দেহ।” মায়া শিউরে উঠল। “শিউরে উঠলেন যে বীরাঙ্গনা। দেহ কথাটা এতই অশ্লীল ? যদি বলতুম পাঁচ বছর ধরে অম্বলের ব্যারামে ভুগছি, এদিকে মাথা ধরাও অনিত্য জীবনে নিত্য সত্য, পায়ে বাত, পিঠে বিষফোড়া তা হলেও তােত সেই দেহের কথাই হতাে। কিন্তু আপনি শিউরে উঠতেন কি? ব্যাধিজীর্ণ বিষাক্ত দেহ বলিনি, বলেছি অনুশীলিত অভিজ্ঞ দেহ।” মায়া জিজ্ঞাসা করল, “তার মানে ?” সােম থেমে থেমে বল্ল, “দেখুন, প্রথমে আমার কাছে সত্য করুন যে আমার মত সামান্য প্রাণীকে—আমি ঘােড়ও নই, সার্জেন্টও নই- বাধা দেবেন না, আমার কথার মাঝখানে উঠে যাবেন না, ছায়াকে ডেকে নির্জনতাকে জনতায় পরিণত করবেন না।” কী সাংঘাতিক শপথ। মায়া মৃদু হেসে শপথ পাঠ করল। “এরূপ ক্ষেত্রে করমর্দনের ও কিঞ্চিৎ পানের বিধি আছে। আপনি কি অন্তত করমর্দনও করেন না ?”
মায। ১৪৭ মায়া ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। সােম তাতে এমন বিপুল ঝাকানি দিল যে বালাতে চুডিতে জলতরঙ্গ বাজল। সােম তর্জনী আস্ফালন করে বা, “সত্য রক্ষা করবেন, ভুলবেন না।” মায়া টিপে টিপে হাসতে থাকল। “মায়া দেবী, সােম সাড়ম্বরে আরম্ভ করল, “মেয়ে পুরুষে তফাৎটা বাস্তবিক কিসের? আত্মার নয় নিশ্চয়। আপনার আত্মা স্ত্রী আত্মা আর আমার আত্মা পুরুষ আত্মা এ আমি অস্বীকার করি, আপনিও “আমিও অস্বীকার করি।” সােম হাসি মুখে বল, “একটা উদাহরণ দিই। মা বাপ যখন স্থির করেন যে এই বেলা বিয়ে না দিলে নয়, মেয়ে সেয়ানা হয়েছে, নইলে লােকে নিন্দে করবে তখন কি পিতামাতা বা সমাজ কন্যার আত্মার পরিণতি পরখ করেন ? আত্মা তাে অজরামর। না মনের পরিণতির খবর নেন ? বর্ণপরিচয় পড়া বােকা মেয়ের বাপ ও ম্যাট্রিক পাস করা বুদ্ধিমতীর বাপ কেউ কি কারুর চেয়ে কম ভাবনায় পড়েন পাত্রস্থ করা নিয়ে ? বিয়েটা তাে আগে হয়ে যাক, তারপর যত খুসী পাস করুক, একথা কি যত্র তত্র শশানেননি, মায়া দেবী ?” মায়া মুচকে হেসে বল্ল, “শুনেছি।” “তবে?” মায়া ভাবতে লাগল আনত আননে। “ভাবছেন কি মায়া দেবী, সােম বন্ধু। “নি একটা সিগ্রেট নি। নেবেন না? বিলিতী নয়, ইটালিয়ান। দোষ হবে না। মাৱা দৃঢ়ভাবে ব, “না।” কিন্তু নােম বঙ্গ, আমার কথাটি সুনােয়নি, নটে গাছটি মুড়ােয়
১৪৮
পুতুল নিয়ে খেলা
নি। বছিলুম দেহই হচ্ছে বিয়ের মূল উপকরণ। দেহ মানে তরুণ
তরুণীর দেহ।”
“বুঝেছি,” মায়া বল্প। কিন্তু মানিনে।”
“জানিনে আপনি কী মানেন। হয়ত অলঙ্কার, হয়ত বস্তু, হয়ত
সানাই, হয়ত মন্ত্র।”
“এগুলাের কোনােটা নয়।”
“তবে?”
“মনের মিল।”
“ঐটে, সােম বল্ল, “আধুনিকদের কুসংস্কার। মনের মিলই যদি
বিয়ের কারণ হয় তবে চোখের আড়াল হলে এত বেদনা কেন ? বিরহ
তবে নিরর্থক। মনের মিল বিয়েরই বা কারণ হবে কেন ? দুই পুরুষ
বন্ধুতে দুই মেয়ে বন্ধুতে মনের মিল লক্ষ করা যায়। তারা কি
বিয়ে করে ?”
মায়া পরাজিত হয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল।
তার আর ভালাে লাগছিল না এই বক্তৃতা, কিন্তু কথা দিয়েছে
সবটা শুনবে।
বিজেতা বক্স, “দেহ, দেহ, দেহ। সংস্কৃত কবিরা তা মানতেন।
আপনি কবি না হতে পারেন, কিন্তু সংস্কৃত হবেন না কেন? সংস্কৃত
হয়েও আধুনিক থাকা যায়।”
বিজিতা বক্স, “আমি উঠি ?”
“না, না, বন। এখনাে একটা শব্দের মানে বলা হয়নি। অভিজ্ঞ
দেহ'। দেহের মানে বলেছি। বাকী আছে অভিজ্ঞ।”
ছায়া অনেকক্ষণ গেছে, ফিরছে না কেন? সরকার মশাইয়ের
দরকার মায়াকে ওঠবার তাগাদা দেওয়া। কিন্তু তিনি তিব্বতের গল্প
শুনে চীনের সেচুয়ান প্রদেশের বিপ্লবকাহিনীতে মনােনিবেশ করেছেন।
यांना ১৪১ একজন মুসলমান বণিক তার একমাত্র কন্যা ও বহু সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা সমেত গল্পদাদার Consulateএ উপস্থিত হয়ে বলেন, জনাব, জান বাঁচান। অবশ্য চীনা ভাষায়। যেহেতু মুসলমানটি হিন্দুস্থানের ন, চীনের। দাদা তাদের দুজনকে ও তাদের সােনার ঘড়াগুলিকে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখলেন যে চীনে ব্যাটারা তাঁর দাডিটি দেখতে পেল না। বিপ্লবের অন্তে বণিক বল্লেন, সাহেব—দাদার তখন সাহেবী পােক, Consulate এর বড়বাবু—যে উপকার করলেন তার বিনিময়ে আপনাকে কী দেব ? দাদা বল্লেন, কিছুই দিতে হবে না। বণিক বল্লেন, তা কি হয় ? আপনি আমার এই কন্যারত্নটিকে গ্রহণ করে তার সঙ্গে আমাকে ও আমার সােনার ঘডাগুলিকেও হিন্দুস্থানে নিয়ে চলুন , চাকরী আপনাকে করতে হবে না। দাদা হচ্ছেন গোঁড়া কায়স্থ, এখন যেমন, তখন তেমনি। বণিককে বল্লেন, আমার যে দেশে একটি আছেন। বণিক দাড়ি নেডে বল্লেন, অধিকন্তু ন দোষায়—অবশ্য দেব ভাষায় নয়। বণিক ও কন্যা দুজনেই দাদাকে কত কাকুতি মিনতি করলেন, কিন্তু দাদার নাম গৌরীশঙ্কর। হঠাৎ একটা গুরুভার পতনের শব্দ শুনে প্রকারের হলাে কম্প, দাদা দিলেন লক্ষ। কুণাল ক্ষণবিলম্ব না করে উপরে ছুটলাে। “কী হলাে,” “কী হলাে” বলে ওদিক থেকে ললিতা ছায়া ও পাশের বাড়ীর জন কয়েক বেরিয়ে এলেন। কুণাল দেখল সােমের চেয়ারটা চারটে পায়া তুলে দিয়ে ছটফট করছে, সােম ডিগবাজি খেতে খেতে দূরে গিয়ে পড়ছে। মেজেতে কয়েক ফোটা রক্ত। মায়া মূর্তির মতাে দাডিয়ে খােলা চোখে ধ্যান করছে। কুণাল সােমকে উঠিয়ে তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বল্ল, কী হয়েছে, কল্যাণ ? কী হয়েছে?” ।
পুতুল নিয়ে খেলা
সােম কথা বলতে পারছিল না। মায়ার দিকে তাকিয়ে কষ্টের হাসি
হাল।
“কী হয়েছে, কল্যাণদা, কী হয়েছে ?” একই প্রশ্ন ললিতার মুখে।
সােম মাথা নেড়ে জানাতে চাইল কিছুই হয়নি।
পাশের বাড়ীর মহিলারা বল্লেন, “ওঁকে ও ঘরে নিয়ে শুইয়ে দি,
ডাক্তারের জন্যে আমরা ফোন করছি।”
ছায়া দিদির কাছে গিয়ে দিদির গা ঘেসে দাড়ালাে। দিদি বড়,
“চল, যাই।”
ললিতা কতকটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। গম্ভীর স্বরে মায়াকে
ব, “ও কী। কিছু মুখে দিয়ে যাবেন না?”
মায়ার রাগ হচ্ছিল ললিতার উপর, সে কেন মায়াকে সােমের সঙ্গে
একা রেখে গেল। উত্তর দেওয়া প্রয়ােজন বােধ করল না।
করে নেমে গিয়ে মােটরে চেপে বস্। ছায়া ললিতাকে নমস্কার করল।
ব, “আসবেন একদিন আমাদের দিকে।” খােকা-কল্যাণকে চুমু
খেয়ে বল্ল, “তুমিও এসাে, জ্যাঠামশাই।”
গাডী যখন চল্প ছায়া জিজ্ঞাসা করল, “দিদি, কী হয়েছিল বলাে তাে?”
“কিছু না।”
“কিছু হলাে না তাে মিষ্টার সােম গড়াগড়ি যাচ্ছিলেন কেন ?”
“আমি জানিনে। তুই ছেলেমানুষ, তাের জানার দরকার ?”
“ছেলেমানুষ বৈকি, তুমি ওঘরে ছিলে, তুমি জাননা না কী রকম।”
“বেশ, জানি তত জানি। তুই আমাকে জেরা করবার কে?”
“বলাে না ভাই, সমীটি।
মা দৃঢ়তার সহিত বা, “না।”
ছায়া যদি চুপ কবুল সরকার মাই মুখ খুলেন। “কিসের শব্দ রে
মা? আমি তাে ভাবলুম বােম ফাটল না কী হলাে।
মায়া
মায়া বল্ল, “মিষ্টার সােম চেয়ারশুদ্ধ পড়ে গেলেন, তারই শব্দ,
সরকার কাকা।
“আহা। পড়ে গেলেন। লাগেনি তাে?”
“যার লাগে সেই জানে। আমি কেমন করে বলবাে?”
“আহা। বড় ভালাে ছেলেটি।”
“ভালাে না আর কিছু।”
সরকার মশাই চুপ করলেন।
ওদিকে গল্পদাদা কুণালকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, “চোট লাগেনি তাে ?”
“লেগেছে একটু।”
“পরিতাপের বিষয়। আমারও একবার অমন হয়েছিল। আমি
তখন সিকিমে। চেয়ারে বসে চিন্তা করছি। পা দুটি দিয়েছি তুলে
টেবিলটার উপর। একটু দোল খাচ্ছি পা দিয়ে টেবিলটাকে ঠেলে,
চেয়ারের পিছনদিকের পায়া দুটোর উপর ভর দিয়ে। দোল খাচ্ছি আর
ভাবছি। ভাবছি আর দোল খাচ্ছি। আরাম লাগছে। হঠাৎ
শুনি দুড়ুম করে একটা আওয়াজ। বন্দুকের নয়। চেয়ারের। আমার
পিঠটা ফুটবলের মতাে ঢপ করে পড়ল, আবার উঠল, আবার পড়ল।
পা দুটো বাদুড়ের মতাে উপরের দিকে তােলা। নামূল যখন তখন
আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলুম আমি উঠে দাড়িয়েছি। ডিগবাজিখাওয়া
জাপানী পুতুলের মতাে।”
দিন দুই পরে সােম মাথায় ফেটি বেঁধে অর্ধশয়ান অবস্থায় কুণাল ও
ললিতাকে বৃত্তান্তটা আনুপূর্বিক শশানাচ্ছিল।
ললিতা শুনে বল্ল, “যেমন কর্ম তেমনি ফল। আমি কি তােমাকে
সাবধান করে দিইনি ?
১৫
পুতুল নিয়ে খেলা
সে বল্ল, “আমি তাে ওকে আদরের কথা বলিনি, আদরও করিনি।
আমি বছিলুম, নারীদেহ আমার নিকট অজ্ঞাত রাজ্য নয়, আমি
দেশাবিষ্কারক,। অমনি আমার কপাল টিপ করে নারীহন্তের অশিক্ষিত
পটু এক ঘুষি। দেশ আবিষ্কারক আমি ভূপৃষ্ঠ আবিষ্কার করলুম।
“বেশ হয়েছে।”—বল্প ললিতা।
“তুমি সবাইকে নাকাল করলে, কিন্তু মায়া তােমাকে হটিয়ে দিল।”
বল্প কুণাল।
“ইংরেজের ইতিহাস, সােম বক্স, “তুমি পড়েছ ও পডিয়েছ। তার
কোনােখানে দেখেছ ইংরেজ কোনাে যুদ্ধে হেরেছে? আমিও তেমনি
অপজিত। মায়ার হাতের মার তাে আমার জয়ের মালা। হার যদি
তাকে বললা তবে সে আমার সােনার হার।”
“তুমিও ও রকম হার পরবে কি গাে ?” ললিতা সুধালাে তার
স্বামীকে।
“প্রিয়ে, তােমার কাছে যে হার মানি সেই তাে আমার জয়।” কুণাল
দিলীপকুমার রায়ের শরণ নিল।
সােম বল্ল, “এই দুদিন ভেবে কী ঠিক করেছি জানাে ?”
কুণাল বল্ল, “থটু রিডি তে শিখিনি, অপরের ভাবনা কি উপায়ে
জানবাে?”
সােম ঘােষর
"তবে শােননা। আমি পাচ বছরের জন্যে
লােকান্তরিত হবে।”
কুণাল ও ললিতা সচমকে বল্ল “কী। “কী।
“ভয় নেই” সােম আশ্বাস দিল, “আত্মহত্যা যে নয় তা পাঁচ বছর
পরে ভাতে পাবে। আত্মগােপন।”
“না”?* কুণাল বড় অবিশ্বাসের অয়ে।
“অসঙ্গতি-প্রত্যয়ের ভয়ে।
মম
কঠিন কিছু নয়। পাঁচ বছর তােমরা আমার ঠিকানা পাবে না,
না—এই তাে ব্যাপার। আমার কথা যদি জিজ্ঞাসা করে আমি
আসল ও নকল দুই দেখেছি, দেখে দেখে মরীয়া হয়ে উঠেছি।”
“কিন্তু তুমি যাবে কোথায় শুনি ? সুন্দরবনে ?”
কুণালের এই জিজ্ঞাসার উত্তরে সােম জানালে সে যাবে সাঁওতাল
কোল ভীল কুকি নাগা জৈন্তিয়া খাসি চাকমা গানজা খােল গােল জুয়াদের
ট্রাইবে বীরত্বের অন্বেষণে' পাচ বছর পরে যখন সে ফিবে তখন
তাকে জীবিত দেখে তার বাবা এত উল্লসিত হবেন যে তার অর্ধাঙ্গিনী
জন্মপরিচয় সন্ধান করবেন না।
তু
অতিরিকু আনন্দবাজার,” “টেলিগ্রাফ, বাবু, নয়া টেলিগ্রাফ,” “তাজ
খবর। গান্ধীমামী গ্রেপ্তার।”
কুণাল একখানা কিল। বেচারা দেশের জন্যে ত্যাগ করবে
করছে সকাল বেলা দুটি ও বৈকালে কোনাে কোন দিন একটি শসা।
কুমারী মায়া মঞ্জিক। আবার ছয়স। “এ” কান-মায়া
মল্লিকের অস্পষ্ট প্রতিকৃতি। মায়া মল্লিকে ক্ষিপ্ত জীবনচরিত
সেই ফুটন্ত জলজ পলিলোগাম ধরীর বিরুণ এক
কিন্তু ও সং কিছু নয়। ভিক্টেটা হয়ে ঘরে বসে,
}
এই লেখকেব ছােট গল্পেব বই
১০
প্রকৃতির পরিহাস
যৌবন জ্বালা
(যন্ত্র)
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.