Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Nagendra-nandini

Singha, Lalitmohan · 2010/03/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নগেন্দ্র-নন্দিনী
শ্রীললিতমােহন সিংহ
১৩৩
বরেন্দ্র লাইব্রেরী
বুকসেলার এও পাবলিশার
২০৪নং কর্ণওয়ালিশ জট, কলিকাতা।
মূল্য বার আনা

প্রকাশক
গ্রীবরেন্দ্রনাথ ঘােষ
বুকসেলার এণ্ড পাবলিশার
২০৪ নং কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট,
কলিকাতা ।
কান্তিক বেস
২২, সুকিয়া স্ত্রীট, কলিকাতা।
শ্রীশম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
কর্তৃক মুজিত।

উপহার
শ্রীgsterx48
মাগsqয় পু
যৗছ বেশ ফল ঝোল
&} থা%ি, পরে

No text on this page.

নগেনন্দিনী প্রথম পরিচ্ছেদ আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে উইলিয়াম বেষ্টি এদেশের শাসনকর্তা। সে কালে, বাঙ্গলার সর্ব অঞ্চলেই দস্যু তস্করের বড়ই প্রাদুর্ভাব। নন্দীগ্রাম নামে নামে একটা গ্রাম আছে। সেখানে এক ঘর জমিদার বাস করিতেন। জমিদার বাবুর নাম হরনাথ দত্ত। তাহার দুই পুত্র, জ্যেষ্ঠ রমানাথ ও কনিষ্ঠ নগেন্দ্রনাথ। হরনাথ বড় বিচক্ষণ লােক ছিলেন। তিনি দুই পুত্রের মধ্যে তাঁহার যাবতীয় সম্পত্তি সমান ভাগে বিভক্ত করিয়া দিয়াছিলেন, কারণ তিনি জানিতেন, ভবিষ্যতে, তাঁহার মৃত্যুর পর, দুই ভ্রাতার মধ্যে সম্পত্তি লইয়া কলহ বাধিতে পারে। পিতা বর্তমানেই, রমানাথের বিবাহ হইয়াছিল। নগেন্দ্রের বয়স অল্প থাকায়, হরনাথ তাহার বিবাহ দিয়া যাইতে পারেন নাই। রমানাথ ও নগেন্দ্রের মধ্যে বাল্যে বিশেষ সত্তাবই ছিল। তবে চিরদিন সমান যায় না। ভবিষ্যতে যে মনােমালিন্য হইতে না পারে, তাহার নিশ্চয়তা কি?

নগেন্দ্র-নন্দিনী
•
পিতার মৃত্যুর পর, রমানাথের উপরেই বিষয় সম্পত্তির
তার পড়িল। কারণ নগেন্দ্রনাথ তখন নাবালক মাত্র। সম্পত্তির
সে কি বুঝিবে ? পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লাফালাফি
ছুটাছুটি করিয়া, কাহার বাগানে বড় বড় লাল লাল পেয়ার
হইয়াছে, তাহার সন্ধানে ঘুরিয়া, তাহার দিন কাটিত ।
গ্রামের মধ্যে একটী পাঠশালা ছিল। পাঠশালার গুরু
ভবানী দত্ত। গুরুগিরিতে
গুরুগিরিতে তাহার যথেষ্টই খ্যাতি ছিল ।
পাশাপশি ৫ামের ছেলেমেয়েরা, তাহার নাম শুনিলে ভয়
কাপিত। ভবানী দত্তের সংসারে দুই কন্যা ; জ্যেষ্ঠার নাম সখী ,
বেদগ্রামে তাহার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। কনিষ্ঠা নন্দিনী,
তখনও অবিবাহিত। পিতার নিকটেই থাকিত। লােকে বলত,
নন্দিনী তাহার কন্যা নহে, পালিত কন্যা মাত্র। একদিন ভবানও
পথে একটা অসহায় কন্যা পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া, দয়াপরশ
হইয়া তাহাকে তুলিয়া আনিয়া স্বীয় গৃহে স্থান দেন। সেই কষ্ট।
কালক্রমে নন্দিনী আখ্যা পায়। লােকে যাহাই বলুক, নন্দিনী
ভবানীকেই পিতা বলিয়া জানিত। ভবানী দত্তও হক
নিজ কার মতই দেখিতেন। নগেন্দ্র ভবানীদত্তের পাঠশালায়
পড়িতে আসিয়া নন্দিনীর সহপাঠী হল। নগেন্দ্রনাথ গুরুমহাশয়কে
কাকাবাবু বলিত। গুরুমহাশয়ও নগেন্দ্রকে পুত্রসম স্নেক
করিতেন।
2

নগেন্দ্র-নন্দিনী
দৈবক্রমে নন্দিনীর পিতার মৃত্যু হইল। রমানাথ দেখিলেন—
ভ্রাতার শিক্ষক, পিতার বন্ধু, ভবানী
ভবানী দত্ত মারা গিয়াছেন।
আপাততঃ নন্দিনী নিরাশ্রয়া। তিনি দয়াপরবশ হেতু, স্বজাতী
কন্যাকে, স্বীয় গৃহে স্থান দিলেন। তাহাতে কাহারও আপত্তি
রহিল না। সকলে ভাবিল, নিরাশ্রয় আশ্রয় পাইল। নন্দিনীর
ভগিনী-বাড়ী হইতে অবশ্য লােক আসিয়াছিল, কিন্তু রমানাথ
নন্দিনীকে পাঠান নাই। কেন—জানি না। তবে সে সময়
বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন, “ভবানী কাকা মৃত্যুশয্যায় নন্দিনীর
ভার আমার উপর দিয়া গিয়াছেন। ইহার ভার আমার উপর
রহিল। তোমাদের চিন্তা করিবার কোন কারণ নাই।”
পর আর লােক আসে নাই। তবে মধ্যে মধ্যে ননিন
ভগিনী সখী, নন্দিনীর তত্ত্ব লইত এবং মধ্যে মধ্যে আসি।
তাহাকে দেখিয়া যাইত।
কালক্রমে নন্দিনীর বিবাহের ফুল ফুটিলে, নগেন্দ্রনাথের
সঙ্গেই তাহার বিবাহ হইয়া গেল। সেও আজ বহুদিনের কথা-
বিবাহের দশ বৎসর পরে এই আখ্যায়িকার আরম্ভ।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ বর্ষাকাল। জলভারাক্রান্ত নবীন নীরদমালা, অসীম নীলাকাশ ছাইয়া আছে। শ্বেতপক্ষ বিস্তার করিয়া, বলাকাগণ উৎফুল্লচিত্তে আকাশমার্গে শ্রেণীবদ্ধভাবে উড্ডীন হইয়া, নববর্ষার নবীন মেঘ পুকে অভিনন্দন করিতেছে। মন পবন সংস্পর্শে, প্রফুল্লকমল- শশাভিত স্বচ্ছ হ্রদ-বারি, সক্ষোভিত হইতেছে। গুরু রবে মেঘ ডাকিয়া উঠিল। গর্জনশীল ঘনশ্যাম হইতে, বিদ্যুৎ দীপ্তি পাইতে লাগিল। ক্রমে রাত্রি হইল। নন্দিনী শয়ন কক্ষে বসিয়া বসিয়া, শ্রাবণের এই বর্ষণমুখর সূচিভেদ্য মসীময়ী রজনীর শােভা দেখিতেছে। কখন বৃষ্টি পতনের টুপ, টাপ, ঝুপ, ঝাপ শব্দ একমনে শুনিতেছে। কথন অন্যমনস্কভাবে সচকিতে দরজার পানে চাহিয়া লইতেছে। তাহাকে দেখিলে বােধ হয়, সে যেন কোন আগন্তুকের অপেক্ষা করিতেছে। এমত সময়ে গৃহমধ্যে নগেন্দ্রনাথ আসিয়া প্রবেশ করিলেন। নন্দিনীর মুখমণ্ডল হর্ষোজল হইয়া উঠিল। নগেনাথ বলিলেন, “কি না—এখনও বসিয়া আছ। নিদ্রা যাও নাই ?

নগেন্দ্র-নন্দিনী
;
নন্দিনী বসিয়াছিল, উঠিয়া দাড়াইল ; বলিল—আজ তমার
• স্নাসিতে বিলম্ব হইল কেন?”
নগেন্দ্রনাথ বলিলেন—“কার্যে ব্যস্ত ছিলাম।”
হাসিয়া নন্দিনী বলিল—“আচ্ছা তুমি কি করিতেছিলে যদি
বলিয়া দিতে পারি ?
নগেন্দ্রনাথ মৃদু মৃদু হাসিয়া উত্তর করিলেন-“আচ্ছা বল
দেখি।”
নন্দিনী-“বলিয়া দিলে আমাকে তুমি কি দিবে?”
নগেন্দ্রনাথ গম্ভীরভাবে বলিলেন—“অর্ধেক রাজত্ব আর তিন
কন্যা দান করিব।
নন্দিনী-“না সত্য করিয়া বল না-আমাকে কি দিবে ?
নগেন্দ্রনাথ নন্দিনীকে ডাকিলেন। ডাকিয়া তাহার গণ্ডের
নিকটে স্বীয় ওষ্ঠ লইয়া গিয়া বলিলেন-“এই দিব।”
নন্দিনী নগেন্দ্রের হাত ছাড়াইয়া, দূরে সরিয়া গিয়া,
রাগতভাবে বলিল, “যাও।”
“তবে যাই বলিয়া নগেন্দ্রনাথ দরজার পানে যাইতেছিলেন।
নন্দিনী ডাকিল-“শােন। কোথায় যাইতেছ ?”
নগেন্দ্র“তুমি যে যাইতে বলিলে।”
নন্দিনী-না আর যাইতে হইবে না।”
নগেন্দ্র-“তাহা হইলে বল, আমি কি করিতেছিলাম।”

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নন্দিনী—“দুই জন ভদ্রলােকের সহিত গল্প করিতেছিলে, না?”
নগেন্দ্র-“তুমি জানিলে কি প্রকারে ?”
নন্দিনী -“আমি কাছারী ঘরের খিড়কীর ফাক দিয়া একবার
দেখিয়া আসিয়াছি।”
নগেন্দ্র হাসিলেন। হাসিয়া বলেন-“আজ এত তাগিদ কেন?
“আছে। দেখবে ? দেখ।” বলিয়া নন্দিনী একখানি পত্র
নগেন্দ্রের হস্তে দিয়া বলি, “আজ এই পত্রখানি দিদির নিকট
হইতে আসিয়াছে।”
নগেন্দ্রনাথ পত্রখানি খুলিয়া পড়িতে লাগিলেন।
“স্নেহের নন্দা -আজ কতদিন তোমাকে দেখি নাই। তােমাকে
দেখিতে বড়ই ইচ্ছা হয় ; তুমি বোধহয় আমাকে ভুলিয়া গিয়াছ
কেন, বর পাইলে স্ত্রীলােক সকলকে ভূলিয়া যায় ? পূৰ্বে তােমার
পত্র পাইতাম, “গ কাল তুমি একখানাও পত্র দাও না কেন ?
তুমি একবার আসিবে ? শ্ৰীনাথ ‘মাসী মাসী’ বলিয়া ডাকে।
শ্রীনাথ কে—জান? আমার খােকাবাবু। তােমার সহিত অনেক
কথা আছে। তুমি আসিলে সকল কথা বলিব। নগেন্দ্র ও তুমি
কেমন আছ ? তোমরা আমার আন্তরিক স্নেহাশীৰ্বাদ জানিবে ।
আমার দেবর
সুরেশকে তােমাকে আনিতে পাঠাইলাম।
আসিতে ভূলিবে না।” ইতি
তােমার বড় দিদি
৬

নগেনন্দিনী পত্র পাঠাৰুে নগেন্দ্রনাথ বলিলেন-“সুরেশ ত আসিয়াছে। তুমি যাইবে নাকি?” নন্দিনী হাসিয়া বলিল-“হুজুরের হুকুম হইলে দাসী যাইতে পারে * নন্দিনীকে পাঠাইতে নগেন্দ্রের অভিমত ছিল না। কিন্তু নন্দিনী কিছুতেই ছাড়িল না। নগেন্দ্রনাথ অগত্যা বলিলেন- তাহা হইলে কল্য প্রাতে যাও। দিনও ভাল আছে।” বলিয়া মন্দ্র গৃহ ছাড়িয়া কাছারীতে গমন করিলেন। এবং কল্য প্রাতে পাল্কী প্রস্তুত থাকিবার আজ্ঞা দিয়া, আবার কক্ষে ফিরিয়া আসিলেন। নন্দিনী বলিল--“তুমি যাইবে না।” নগেন্দ্রনাথ বলিলেন, “না—তুমি যাও। আজ কাল বৈষয়িক কাজে বড় ব্যস্ত আছি।” নগেন্দ্রনাথকে সঙ্গে যাইবার জন্য নন্দিনী অনেক অনুরােধ করিতে লাগিল। “কল্য প্রাতে যাহা হইবার হইবে । আজি রাত্রি হইয়াছে নিদ্রা যাও।” বলিয়া নগেন্দ্রনাথ শরন করিলেন। অল্পক্ষণ মধ্যে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হইলেন। ৭ তৃতীয় পরিচ্ছেদ। রজনী গভীরা। আকাশ ঘাের কাল মেঘে ছাইয়া আছে। পেচক গম্ভীর আরাবে ডাকিয়া উঠিল। নগেন্দ্রনাথ নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাইতেছিলেন ; হঠাৎ তিনি মুখ বিকৃতি করিয়া উঠিলেন নিদ্রাবস্থায় হাত তুলিয়া যেন কাহাকে কি বলিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখিতেছিলেন। কি স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, তাহা আমরা জানি। কারণ প্রাতে তিনি নন্দিনীকে স্বপ্ন সম্বন্ধে বলিতেছিলেন—আমরা শুনিয়াছি। সেই অদ্ভুত বিস্ময়কর ও ভীতিপ্রদ স্বপ্ন বিবরণ শুনিলে শিহরিতে হয় । স্বপ্ন বিবরণ এইরূপ। “নগেন্দ্রনাথ ও নন্দিনী নৌকারােহণে যেন কোথায় যাইতেছেন। বেলা অধিক হওয়ায়, রন্ধন করিবার নিমিত্ত, তাহারা এক স্থানে নৌকা বাধিলেন। যে স্থানে নৌকা বধিলেন, সেই স্থান হইতে সমুদ্র অতি নিকটে। সুতরাং সেই স্থানের নদীর প্রসারণও অধিক। এক কূল হইতে অন্য কূল, অতি অস্পষ্টরূপে দৃষ্টিগােচর হয়। তীরােপরি, অসংখ্য অরণ্যজাত বৃক্ষ রাজি জন্মিয়া রহিয়াছে। নৌকায় বন্ধনের সমস্ত উপকরণই পৰ্যাপ্ত ছিল, কেবল, যে সকল আনাজ সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন,—দেখিলেন প্রায় সমস্তই শুকাইয়া গিয়াছে।

নগেন্দ্র-নন্দিনী আনাজ লইয়া আনিবার মানসে নিকটবর্তী কোন গ্রামের অনুসন্ধানে তীরােপরি আরােহণ করিলেন। কিয়দ্র গমন করিলে—দূরে একটা গ্রাম দেখিতে পাইলেন। অত্যল্পকাল মধ্যে গ্রামে প্রবেশ করিলেন। অনতিবিলম্বে আনাজ পুত্র লইয়া তীরে ফিরিয়া আসিলেন। দুর হইতে, গভীর জলকল্লোল শুনিতে পাইয়াছিলেন। নদীর তীরে আসিয়া দেখিলেন—ঘাের গর্জনে, মহাবেগে, উত্তাল তরঙ্গে, নদীতে জোয়ার আসিয়াছে। ঐরূপ জোয়ার সাধারণতঃ দৃষ্টিগােচর হয় না। উদ্দাম জলস্রোতে, তাহার তরণীখানীর কাছি ছিড়িয়া গেল। তরণী উল্কা বেগে ছুটিয়া চলিল। উত্তাল তরঙ্গে একবার উর্দ্ধে উঠিল, একবার নামিল, আবর্তে ঘুরিল। হঠাৎ ঈষৎ কাৎ হইল, তারপর অসীম জমধ্যে নিমজ্জিত হইল—আর উঠিল না। আবার দেখিলেন—এক তীব্র জ্যোতিৰ্ময়ী রমণী মূর্তি দূরে—জলমধ্য হইতে উঠিল, হস্ত সঞ্চালন, করিয়া এক অবােধ্যভাষায় নগেন্দ্রকে কি বলিল। নগেন্দ্রনাথের কিছুই বােধগম্য হইল না। সেই উত্তাল তরঙ্গময়ী নদীবক্ষ হইতে, সেই জ্যোতির্ময়ী রমণী মূর্তি অন্তৰ্হিতা হইল।” এ দৃশ্য দেখিয়া, নগেন্দ্রনাথের নিদ্রাভঙ্গ হইল। দেখিলেন, গৃহ অন্ধকার। ভাবিলেন, বোধ হয় আমি সাগরগর্ভে নিমজ্জিত রহিয়াছি। তাহার ভয় সঞ্চার হইল। তাহার ভয় সঞ্চার হইল। গাত্ৰ দিয়া দে নির্গত হইতে লাগিল। চক্ষু খুলিয়া নগেন্দ্র-নন্দিনী ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরিয়া আসিল। স্বপ্ন বৃত্তান্ত স্মরণ হস্ত দ্বারা অনুভবে জানিলেন—পার্শ্বে নিদ্রিতা যুবতী, ভার্যা শয়ন করিয়া আছে। যদ্যপি তাহার মানসিক উদ্বেগ কিঞ্চিৎ উপশমতা প্রাপ্ত হইল, তথাপি তিনি উঠিয়া বসিলেন। বসিয়া আলােক প্রজ্জ্বলিত করিলেন। আলােক সাহায্যে দেখিলেন- নন্দিনী নিদ্রিতা। মুনর মুখখানির চতুর্দিকে কুঞ্চিত অলকদাম আসিয়া পড়িয়াছে। দুই ওষ্ঠের সংযােগ স্থলে, ওষ্ঠের বিচ্ছেদ হেতু, মুক্তার ন্যায় দুই একটা দ দেখা যাইতেছে। চক্ষু অর্ধ-নিমী- লিত। পদ্মপলশলে'চন যুগলােপরি মনােহর যুগল শােভা পাইতেছে। কি সুন্দর। হঠাৎ কেন, কোন অজ্ঞাত আশঙ্কায়, নগেন্দ্রের বিশাল হৃদ কাপিয়া উঠিল । এক দৃষ্টে, অনেকক্ষণ সেই নিদ্রিম মুখখানি প্রতি চাহিয়া রহিলেন। চাহিয়া চাহিয়া অনেক দেখিলেন। সুতঃশর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া আলোক নিভাইলেন ও শয়ন করিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
পরদিন প্রাতে পাল্কী প্রস্তুত হইল। দ্বারবানেরা মস্তকে লাল
লাল পাগড়ি জড়াইয়া, মােটা মােটা বংশ দণ্ড হতে লইয়া, পায়ে
নাগরা জুতা পরিয়া গোঁফে তা দিতে দিতে, মম্ মম্ করিয়া হাজির
হইল। তারা বিদেশে যাইবে কি আনন্দ! দাসী গালে দোক্তা
পান টুসিয়া পুটলী বগলে উপস্থিত হইল, যেন তীর্থ-পথের-যাত্রী।
মে বিদায়ের সময় ঘনাইয়া আসিল। নন্দিনী নগেন্দ্রনাথের
নিকট বিদায় লইতে গেল। নগেন্দ্রনাথ নন্দিনীর হস্ত ধরিয়া
শকিলেন-“না।”
নন্দিনী বলিল -“কি ?”
নগেন্দ্রনাথ-“তােমাকে পাঠাইতে আমার মত ছিল না।
কেন—জানি না। তবে যখন যাইতেছ, যাও কিন্তু
কিন্তু দেখিও
সাবধানে যাইও।”
নন্দিনী রহস্য করিয়া বলিল, “সে ভয় করিও না, তােমার
নন্দা তােমার চরণ দর্শন না করিয়া মরিবে না।”
নগেন্দ্রের চক্ষু সজল হইয়া উঠিল। গত রাত্রের স্বপ্ন বিবরণ
মনে পড়িল, প্রাণ কাঁপিয়া উঠিল ।
নগেন্দ্র বলিলেন-“ছিঃ। ও কথা মুখে আনিতে নাই

নগেন্দ্র-নন্দিনী
।
মনে
নন্দিনী মনে মনে লজ্জিত হইল। নগেন্ত্রের সজল চক্ষুর
পানে চাহিয়া ভাবিল-বড়ই অন্যায় করিয়াছি। প্রকাশ্যে
বলিল-“নাথ! তুমি অমঙ্গল চিন্তা করিতেছ কেন?”
নগেন্দ্রনাথ ব্যাকুল কণ্ঠে বলিলেন-“কি জানি না-আমার
মনে কেন এ চিন্তা জাগিতেছে, বুঝিতে পারিতেছি না।
হইতেছে—ষেন তুমি আর ফিরিয়া আসিবে না।”
নন্দিনী বলিল-“ও সকল কথা মনে স্থান দিও না। আমি
তেছি—আবার ফিরিয়া আসিব।
এমন সময়ে দাসী আসিয়া খবর দিল-“পাল্কী প্রস্তুত
হইয়াছে।
নগেন্দ্রনাথ বলিলেন-“তবে যাও।”
স্বামীর পদধূলি মন্তকে লইয়া নন্দিনী বলিল—“আসি।”
নন্দিনীকে বক্ষে তুলিয়া ধরিয়া, তাহার রাঙ্গা ওষ্ঠে নগেন্দ্রনাথ
চুম্বন করিলেন। তাহার পর নন্দিনী ধীরে ধীরে গৃহ হইতে
বাহির হইয়া গেল। বাহির হইয়া গিয়া পাল্কীতে উঠিল। পাল্কী
চলিয়া গেল।
নগেন্দ্রনাথ বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন। যদি নন্দিনী
ফিরিয়া না আসে, তাহা হইলে কি হইবে ! তাহা কখন হইতে
পারে ? অপ্ন কখন সত্য হয়। নন্দিনী ফিরিয়া আসিবে বই কি।
ভাগ্যলক্ষ্মী, অলক্ষিতে বসিয়া বুঝি ঈষৎ হাস্য করিলেন।
১২

পঞ্চম পরিচ্ছেদ নন্দীগ্রাম হইতে বেদগ্রামে যাইতে হইলে, স্থলপথে ও জল পথে যাইতে হয়। নন্দীগ্রাম হইতে নন্দিনী পাঁচ ক্রোশ পথ পাল্কীতে গেল। তাহার পর নৌকায় আরােহণ করিল। নৌকা ছাড়িয়া দিল। নন্দিনী নদীর শােভা দেখিতে দেখিতে চলিল। দেখিল, দুই তীরে শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তরােপরি শ্যামল ঘন- সন্নিবিষ্ট বনরাজি। বনরাজি। পাতায় পাতায়, শাখায় শাখায়, উদ্ধে জড়াজড়ি করিয়া, মন্দিরের শােভার অনুকরণ করিতেছে। কোথাও উহার নিম্ন দিয়া, বৃক্ষের ফাকে ফাকে, আঁকিয়া বাকিয়া সরু পথ কোথায় চলিয়া গিয়াছে। দূরে উন্নত শীর্ষ অশ্বথ, বট, দেবদারু ঝাউ বৃক্ষ দাড়াইয়া আছে। বৃক্ষ দাঁড়াইয়া আছে। কত প্রকারের পাখী- টীয়া, চন্দন, ময়না, বুলবুল, দোয়েল, শ্যামা, নীলকণ্ঠ কেহ বৃক্ষোপরি, কেহ বৃক্ষতলে বসিয়া, সেই নির্জন ছায়াযুক্ত স্থানীকে কূজন মুখরিত করিতেছিল। এই সকল শােভা দেখিতে দেখিতে নন্দিনী চলিল। সূৰ্য্য দেব অন্ত গেলেন। সন্ধ্যার ছায়া নদীর জলে পড়িল। নদীর জল কাল হইল। মাঝিরা সমদিন আহার করে নাই; তাছাড়া আজকাল জলদস্যুর বড়ই উপদ্রব, অন্ধকার হইয়াও

নগেনন্দিনী
আসিতেছে। সুতরাং আর তাহারা অগ্রসর হইতে স্বীকৃত হইল
তীরে নৌকা বাঁধা হইল। যে স্থানে নৌকা বাঁধা হইল, সেই
স্থানে নিবীড় অরণ্য। শাল, মহুযা, খর্জুর, তাল, অশ্বত্থ প্রভৃতি
অসংখ্য বৃক্ষ জন্মিয়া রহিয়াছে। ক্রমে সন্ধ্যার ছায়া সেই নির্জন
স্থানেও নামিল। বৃক্ষতলে কাল কুম্ফটিকার সৃজন করিল।
ঝি ঝি পােক পূরবী রাগিণীতে তান ধরিয়া বসিল।
তখন রাত্রি
এক প্রহর হইয়াছে। নৌকায় সকলে
আহারাদি সম্পন্ন হইয়াছে। কেহ নিদ্রা যাইতেছে, কেহ শয়ন
করিয়া আছে ; কেহ হুকা টানিতেছে কেহ গল্প করিতেছে।
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর হইল। তখন সকলে নিদ্রা গিয়াছে ।
আর কাহারও সাড়া শব্দ নাই। কেবল নন্দিনী জাগিয়া আছে।
নৌকার কামরার গবাক্ষ খুলিয়া দিয়া, প্রকৃতি দেবীর অপরিসীম
গাভীৰ্য্য উপলব্ধি করিতেছিল। জলের কল কল্ ছল ছল্ ধ্বনি,
মনযােগ সহকারে শুনিতেছিল। হঠাৎ তীরােপরি মানব-কণ্ঠ
সভুত স্বর যেন শুনিতে পাওয়া গেল। বােধ হইল, যেন তীরে
বহু জনসমাগম হইয়াছে। নন্দিনী ভীতা ও সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল,
গবাক্ষ দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। তথাপি ঐ আবার শব্দ। শব্দ
যেন নিকটতর হইতে লাগিল, এইবার আরও নিকটে বােধ
হইল। নৌকায় কেহ আরােহণ করিলে, নৌকা যেরূপ হেলিয়া
উঠে, হঠাৎ নৌকাখানি সেইরূপ হেলিয়া উঠিল। মনে হইল
১৪

নগেন্দ্র-নন্দিনী
যেন কেই নৌকায় আরােহণ করিল। আবার আর একজন,
অপুর আরও একজন। এইরূপে বহুলােক নৌকায় উঠিতে
লাগিল। নন্দিনী ভয়ে কঁপিতেছে, দাসী নিদ্রিতা ছিল, নন্দিনী
তাহাকে উঠাইল।
দাসী বলিল, “কি হইয়াছে
নন্দিনী-“বােধ হয় দস্যু নৌকা আক্রমণ করিয়াছে।”
দাসী ভয়—বিহ্বলতা হেতু কাদিতে কাদিতে বলিল—“এখন
উপায়।”
নন্দিনী কি বলিতে যাইতেছিল, এমন সময়ে নৌকা মধ্যে
মহা গণ্ডগােল উপস্থিত হইল।
“দ নৌকা আক্রমণ করিয়াছে।” বলিয়া সকলে চিৎকার
করিয়া যে যেদিকে পাইল, পালাইল। কেহ জলে ঝাপ দিল।
কেহ তীরে উঠিয়া পলাইল । কেহ নিদ্রিতের ভাণ করিয়া পড়িয়া
রহিল। দস্যগণ সুযােগ বুঝিল। যে কক্ষে নন্দিনী ছিল, সেই
কক্ষের দ্বার ঠেলিয়া দেখিল-দ্বার ভিতর হইতে রুদ্ধ রহিয়াছে।
তাহারা পুনঃ পুনঃ দরজায় ঘা দিতে লাগিল, কেহ দরজা খুলিল
তখন তাহারা চীৎকার করিয়া বলিল-“ভিতরে কে
আছে? শীঘ্ৰ কপাট খােল। তবুও কেহ সাড়া দিল না বা
কপাটও খুলিল না। তাহারা পুনঃ পুনঃ কপাটে আঘাত করিতে
করিতে কপাট ভাঙ্গিয়া গেল, দ্বার উন্মুক্ত হইল।

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নন্দিনী এতক্ষণ ভয়ে কাঁপিতে ছিল। যেমনি কপাট ভাজি
গেল অমনি সে মুচ্ছিতা হইয়া পড়িল। দস্যগণ কক্ষে প্রান
করিল। দস্যু সর্দার নন্দিনীর দাসীকে দেখিয়া বলিল “তুমি কে?”
নন্দিনীকে দেখাইয়া দাসী বলিল-“আমি ইহার
পরিচারিকা।”
দস্যু সর্দার বলিল-“ইনি কে?”
দাসী ভয়বিজড়িতকণ্ঠে বলিল—ইহার নাম নন্দিনী।
নন্দীগ্রামের জমিদার নগেন্দ্রনাথের স্ত্রী।”
দস্যু সর্দার-“ইনি কি মূচ্ছিতা?”
দাসী বলিল-“হ্যা।”
দ্য সর্দার বলিল—“তবে এতক্ষণ ইহার মুচ্ছ। ভঙ্গ কর নাই
কেন?” বলিয়া নন্দিনীর মস্তক স্বীয় অনুরােপরি সংস্থাপিত
করিয়া, চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগিল।
নন্দিনীর মুচ্ছা ভঙ্গ হইল, চেতনা ফিরিয়া আসিল।
সর্দারের পানে চাহিয়া ক্ষীণ কণ্ঠে বলিল-“তুমি কে?”
সর্দার বলিল—“আমার পরিচয়ে লাভ? আমি দ্য
সর্দার।”
নন্দিনী-আমার মূচ্ছা ভঙ্গ করিলে কেন?”
সর্দার-দোষ কি?
নন্দিনী-দোষ কিছুই নয়, আমার প্রাণে লাভ ?”

নগেন্দ্র-নলিনী সর্দার-“লাভ ক্ষতি জানি না, তবে রক্ষা করিতে হয় তাই করিয়াছি। নন্দিনী নীরব হইল। নন্দিনী প্রকৃতিস্থ হইলে, সর্দার বলিল- চল। নন্দিনী-*কোথায় ? সর্দার-“বুঝিতে পারিতেছ না—আমাদের সঙ্গে যাইতে হইবে।” নন্দিনী কাঁদিতে লাগিল। চক্ষে দর দর ধারা বহিতে লাগিল, নগেন্ত্রের কথা মনে পড়িল। হায়! এ কি হইল। ১৭, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের রাজত্ব কালি বাঙ্গালা দেশের সর্বত্রই দস্যু তস্করের বডই প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল। তাহারা কত লােকের প্রাণ বিনষ্ট করিয়া, বিষয় সম্পত্তি লুণ্ঠন করিয়া, জীবিকা নিৰ্বাহ করিত, তাহার ইয়ত্তা নাই। সেকালে দস্যগণ গভীর অরণ্যমধ্যে লুকাইয়া বাস করিত। সুযােগ পাইলেই, এমন কি সামান্য ধনরত্নের লােভে, মনুষ্যের প্রাণ বিনাশ করিতে কুষ্ঠিত হইত না। তাহার। গভীর অরণ্যে, পরিত্যক্ত জীর্ণ দুর্গে, বাস করিত। সুবর্ণরেখা নদীর পশ্চিম তটে গভীর জঙ্গল জন্মিয়া আছে। এই ভীষণ অরণ্য মধ্যে একটী দুর্গ আছে। দুর্গট বৃহৎ ও প্রাচীন। দুর্গের প্রায় এক ক্রোশ অন্তর হইতে চতুর্দিকে বৃত্তাকারে পরিখা রহিয়াছে। দুর্গের পূর্বদিকে একটা দ্বায় আছে। ঐ দ্বার দিয়া দুর্গ মধ্যে প্রবেশ করিতে হয়। উক্ত দ্বার অতিক্রম করিলে, আর একটা পরিখা দৃষ্টিগােচর হয়। ঐ পরিখা ভয়ানক গভীর ও প্রশস্ত। ঐ দ্বিতীয় পরিখায় প্রবেশ করিতে হইলে, একটা সিংহদ্বার দিয়া যাইতে হয়। দ্বারটা বৃহৎ বৃহৎ প্রস্তর যারা নির্মিত।

নগেনন্দিনী দ্বারের উভয় দিকে ছয় সাত হস্ত পরিমিত প্রশস্ত প্রস্তর নির্মিত প্রাচীর চলিয়া গিয়াছে। উক্ত দ্বার অতিক্রম করিলে, অসংখ্য বৃক্ষ সমাচ্ছন্ন এক ভূখণ্ড দেখিতে পাওয়া যায়। বিভাগের পরে আর একটী পরিখা দেখিতে পাওয়া যায়। পরিখা পার্শ্বে অত্যুচ্চ মৃত্তিকা স্থপ। ঐ স্তুপ এত উচ্চ যে উহার উপরে আরােহণ করিলে, বহু দূরের দৃশ্য দৃষ্টিগােচর হয়। ঐ স্থানটীর পরে আর একটা পরিখা ও ভুখণ্ডে উপনীত কওয়া যায়। ঐ স্থানে একটা সুবিস্তৃত নীল তােয়পূর্ণ দীর্ঘিকা বিদ্যমান রহিয়াছে। দীর্ঘিকার জল কাকচক্ষুবৎ নিৰ্ম্মল । দীঘিার এক পার্শ্বে অট্টালিকা শ্ৰেণী। অট্টালিকা শ্রেণী বহু পুরাতন ও জীর্ণ। পূর্বে বলিয়াছি, সে সময়ে দগণ গভীর অরণ্যে, পরিত্যক্ত জীর্ণ দুর্গমধ্যে, বাস করিত। এই দস্যগণ নন্দিনীকে উপরােক্ত দুর্গমধ্যে লইয়া গেল। এই বৃহৎ দুর্গটী এমনই সুচারু রূপে নির্মিত, বা এমনই দুর্ভেদ্য বনরাজির মধ্যে অবস্থিত যে, বাহির হইতে হঠাৎ কেহ, এখানে দুর্গ আছে বলিয়া মনে করিতে পারে না। এই দুর্গা মহারাষ্ট্রীয়দিগের এই প্রদেশের একটা প্রধান সেনানিবাস ছিল, বলিয়া শুনিতে পাওয়া যায়। দুর্গটী পরিত্যক্ত হইলে, উহা দ্য ও তস্করের লীলাকেতন রূপে পরিণত হয়। হয়। এই সকল দুর্গ থাকিতে কি-না বিদেশী আসিয়া

নগেনন্দিনী
আমাদের দেশে রাজত্ব করে। একদিন এই সকল দুর্গ বাংলার
মেরুদণ্ড ছিল। আজ বাংলার সে দিন নাই। সে রামও
নাই, সে অযযাধ্যাও নাই। বৃহৎ বৃহৎ তােপ পূর্বের স্মৃতিচিহ্ন
স্বরূপ বেকার পড়িয়া আছে। এই প্রসঙ্গে, একটা গল্প মনে
পড়িল।
কোন ধনী জমিদারের এক সুন্দরী, রূপসী, প্রেয়সী, প্রেয়সী
ছিল। জমিদার মহাশয় স্ত্রীকে যথেষ্ট ভালবাসিতেন। স্ত্রীর হস্তে
যাবতীয় ধন সম্পত্তি গচ্ছিত থাকিত। স্ত্রীর পৈতৃক বংশে সকলে
গরীব থাকায়, জমিদার বাবুর স্ত্রী গােপনে তাহাদিগকে
কিছু কিছু সাহায্য করিতেন। এই সংবাদ, জমিদার বাবুর কর্ণে
বিষবৎ প্রবেশ করিলে, পত্নীকে ডাকিয়া বলিলেন-“বাল্পের চাবি
কাটিটা আমাকে দাও—যা কিছু দেখিতে পাইতেছ সকলই
তােমার, কেবল চাবি কাটিটা আমার।
আমাদেরও সেই দশা। এ দুর্দশার কথা আর কত বলিব।
ভাগ্যে আরও কত কি আছে—কে জানে ?

ময়ী। সপ্তম পরিচ্ছেদ দিনমণি অনেকক্ষণ অস্তাচলে গিয়াছেন। পৃথিবী অন্ধকার- রাত্রি হইয়াছে। পক্ষী-কূজন-মুখরিত—বনাণী প্রায় নিস্তব্ধ। মধ্যে মধ্যে কোকিল সাড়া দিতেছে। চত্রদেব আকাশে সমাসীন। একটা নির্জন অট্টালিকার নির্জন কক্ষে, একটী সপ্তদশ বর্ষীয়া অনিন্দ্যসুন্দরী রমণী ওষ্ঠে অঙ্গুল সংস্থাপন করিয়া, গভীর চিন্তায় মগ্ন। যুবতীর রূপ শরৎ কালী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মেঘস্তর হইতে আগত সূৰ্য্য-রস্মির ন্যায় কোমল,প্রাণমিগ্ধকারী। পলাশের ন্যায় আকৰ্ণ বিস্তৃত নয়ন যুগল নিৰ্ম্মল সরােবরের ন্যায় টল টল করিতেছে। তন্মধ্যে ভ্রমর সদৃশ চক্ষু শশাভা পাইতেছে। ই ধনুর ন্যায় বঙ্কিম যুগল কি মনােহর ! তাম্বুলাগ রঞ্জিত বিদাধর কি প্রাণােমাদকারী। কর্ণে কুণ্ডল বসন্ত মলয়ান্দোলিত লতার ন্যায় দুলিতেছে। কুঞ্চিত অলকদাম পৃষ্ঠে, কপােলে, কর্ণে, স্কন্ধে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। মধুমাসে, পূর্ণচন্দ্র মেঘান্তরাল হইতে যেমত উকি মারে, তাহার আননখানি মুখােপরি সমস্ত কেশদাম হইতে সেইরূপ উ কি মাৰিতেছে, হাসিতেছে, শােভা পাইতেছে। কখন ঈষৎ হস্ত সঞ্চালনে, হস্তস্থিত কঙ্কণ রিশি রিশি টিণি টিণি শব্দ করিয়া উঠিতেছে। কখন মন্তকান্দোলন বশত, হেমমেখলা দুলিয়া

নগেন্দ্র নন্দিনী
উঠিতেছে। যুবতী আকাশ পাতাল ভাবিতেছে। চিন্তার শেষ
নাই—সীমা নাই—অন্ত নাই। কখন আনমনে বলিতেছে
“আর কি দেখা হইবে না।” রাহুর করাল গ্রাসে পতিত চন্দ্রের
ন্যায় মুখমণ্ডল মলিন হইল। এই যুবতী নন্দিনী।
নানা চিন্তা করিতে করিতে নন্দিনী নিদ্রামগ্না হইল।
যে দিন দস্যগণ নন্দিনীকে চুরি করিয়া আনিয়াছিল, সেই দিন
হইতে আজ পর্যন্ত, দ্য সর্দার নন্দিনীর প্রতি কোন অত্যাচার,
বা এমন কোন ব্যবহার করে নাই, যাহাতে সে ভয় পাইতে পারে।
দ্য সর্দার ভাবিল—এত তাড়াতাড়ি কেন? নন্দিনী ত আর
পলাইয়া যাইতে পারিবে না। এখন তাহার মন চঞ্চল হইয়া
আছে। এ সময় কোন কথা বলা উচিৎ হইবে না। দুই এক
দিন অতিবাহিত হােক, সে আপনা হইতেই বশ্যতা স্বীকার
করিবে। তাই, এতদিন দস্যু সর্দার কিছু বলে নাই। অদ্য রাত্রে,
সুযােগ বুঝিয়া নন্দিনীর কক্ষে প্রবেশ করিল। দেখিল,
নন্দিনী শয়ন করিয়া আছে--নিদ্রা যাইতেছে। নন্দিনী
অনিন্দ্যসুন্দরী রূপবতী যুবতী। কুসুমভারাক্রান্তা কুসুমিতা
লতির ন্যায়, যুবতীর দেহও যৌবন ভারগ্রস্ত। তােয়ারা-
জাত বর্ষার নব-নীরদমালার ন্যায়, যুবতীর দেহ যৌবনপরিপূর্ণ।
বর্ষার নদীর ন্যায়, তাহার দেহ-কুলে যৌবন ছাপাইয়া উছলাইয়া
উঠিতেছে। দেহ যৌবন-রসে যােলকলায় পরিপূর্ণ। দস্যু সর্দার

নগেন্দ্র-নন্দিনী
অনিমেষলােচনে সে রূপরাশি দেখিতেছিল। দেখিতে দেখিতে
তন্ময় হইয়া গেল। ভাবিল-কি করি। তাহার নিদ্রাভঙ্গ
করিব কি না—এইরূপ মহাসমস্যায় পড়িল। শেষে স্থির
হইলনিদ্রাভঙ্গ করা যাউক।
যে সময় নন্দিনী স্বপ্ন দেখিতেছিল। দেখিতেছিল—সে ও
নগেন্দ্রনাথ এক রমণীয় উপবন মধ্যে বিচরণ করিতেছে। উপবনে
পৃথিবীর যাবতীয় পুষ্প ফুটিয়া রহিয়াছে।
শিখী পুচ্ছ তুলিয়া
নাচিতেছে, পাপীয় পঞ্চম স্বরে তান তুলিয়া গান করিতেছে।
সে বনে কোকিল নাই। উপবন মধ্যে একটি বিস্তৃত জলাশয়ে
পদ্ম, শ লুক, ফুটিয়া রহিয়াছে। সুন্দর সুন্দর শ্বেতবর্ণ হংস
সকল ভাসিতেছে, খেলিতেছে, সাঁতার দিতেছে। কোথাও
ঝরণা হইতে ঝুর ঝুর শব্দে জল পড়িতেছে। নগেন্দ্র ও নন্দিনী
ঘুরিয়া ঘুরিয়া অনেক পথ বাহিত করিলেন। ক্লান্তি বশতঃ
নন্দিনী পথের এক পার্শ্বে উপবেশন করিল। নগেন্দ্রনাথ জল
আনিতে গেলেন।
এমন সময় কে, একজন অপরিচিত পুরুষ, মস্তকে পুষ্পের হার,
হস্তে, কটিদেশে, গলে, সর্বাঙ্গে পুষ্পভরণ ; নন্দিনীর সম্মুখে
আসিয়া দাড়াইলেন। তাহার হস্তে ফুল ধনু! সেই আগন্তুক
পুষ্প কম্মুকে শর যােজনা করিয়া নন্দিনীর প্রতি নিক্ষেপ
করিলেন, কিন্তু শর নন্দিনীর শরীরে বিদ্ধ হইল না। নন্দিনীর

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নিকট হইতে দুই হস্ত দূরে আসিয়া পড়িল। তখন সেই
স্বপ্নদৃষ্ট পুরুষ, নন্দিনীর নিকটে আসিয়া, তাহার হস্ত ধারণ
করিলেন; নন্দিনীর নিদ্রাভঙ্গ হইল। চক্ষু খুলিয়া দেখিল,
দেখিয়া চিনিল-দস্ত সর্দার।
নন্দিনী সজোরে হস্ত ছাড়াইয়া লইয়া বলিল-“আপনি এত
রাত্রে এখানে কেন! আমাকে কেন উঠাইলেন ?
দ্য সর্দার হাসিয়া বলিল—“কেন, দোষ হইয়াছে ?”
সে হাসি নন্দিনীর বড় বিরস বলিয়া বােধ হইল, বড় ভাল
লাগিল না। নন্দিনী সদর্পে বলিল-“বোধহয় জানেন
পরস্ত্রীর অঙ্গ স্পর্শ করা মহাপাপ।”
সর্দার পূর্ববৎ হাসিতে হাসিতে বলিল, “পাপ, পূণ্য, কিছুই
জানি না-কেবল জানি, তুমি আমার বন্দী।”
নন্দিনী বলিল-মানি, আমি আপনার বন্দী, কিন্তু আমার
মন নয়।
দস্যু সর্দারের নিকট, এই সকল বাক্য, উন্মাদের প্রলাপের মত
বােধ হইল। মানুষের মন, পাপ কাৰ্যে নিযুক্ত থাকিলে, ঐরূপই
হইয়া থাকে। তখন পাপ, পণ্য, বিচার করিবার ক্ষমতা থাকে—
। সর্দারের তাহাই হইল, সর্দার নন্দিনীর প্রতি হস্ত প্রসারণ
করিয়া কহিল—“সুন্দরী। তুমি দুৰ্বলা রমণী। তােমার ঐরূপ
আস্ফালন শােভা পায় না। তুমি আমারই হইবে।”
২৪

নগে নন্দিনী
মন্দিনী মাথায় অনেক বুদ্ধি ধরে—তাহাতে সর্দার কেন,
অনেককেই তাহার নিকট হার মানিতে হইবে। নন্দিনী বুঝিল—
ইহার সহিত বাক্যালাপ বৃথা। এ বিপদে, কোপ প্রকাশ করিলে
কোন কাৰ্যই সিদ্ধ হইবে না, কৌশলের প্রয়ােজন। এই
স্থির করিয়া, নন্দিনী স্বীয় কোপােব মন্ত্রবৎ দূর করিল। সহাস্য
মুখের ভাণ করিয়া, কটাক্ষ হানিয়া, বলিল-“সর্দার, দেখিতেছি,
সত্যই তুমি আমাকে ভালবাস, তখন আর গােপন করিয়া
কি হইবে। আমিও তােমাকে ভালবাসি।”
হঠাৎ মেঘ গর্জন করিলে, মনুষ্য যেমন চমকিত হইয়া উঠে,
সর্দারও সেইরূপ চমকিত হইল। সে স্বর্গ হাতে পাইল।
নন্দিনীর মুখপানে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল। নন্দিনী বলিতে
ছিল—“আমি অনেক পুরুষ দেখিয়াছি, কিন্তু, তােম র মত এমন
বলবান, সুন্দর, ও সুগঠিত দেহ বিশিষ্ট পুরুষ, কখন দেখি নাই।”
আবার সেই কটাক্ষ! সর্দার বিল—বুঝি সত্যই হইবে।
তাহার আশ্চর্য কি ? স্বীয় দেহের প্রতি একবার চ কত দৃষ্টি
বুলাইয়া লইয়া, বলিল—“তাহা হইলে আর বিলম্ব কেন?”
নন্দিনী-“সর্দার, তুমি পূর্বে আমার একটা কথা রাখিবে?
স্বকার কর।”
সর্দার-“কি কথা? হাঁ রাখিব, বল কি করিতে হইবে?”
নন্দিনী-“তাহা হইলে, তুমি আমার সহিত সাত দিন সাক্ষাৎ

নগেনন্দিনী
করিতে পারিবে না। সাত দিন গত হইলে, তােমায় আমায় আবার
সাক্ষাৎ হইবে ”
সর্দার বলিল-“কেন?”
নন্দিনী-“কেন, তা বলিতে পারিব না, আমার কথা তুমি
রাখিবে, কি-না বল?
সর্দার বিল-সত্যই নন্দিনী তাহাকে ভালবাসে, এ বিষয়ে
বিন্দুমাত্রও সংশয় নাই। সাত দিবস মাত্র ত নয়। সাত দিন
দেখিতে দেখিতে অতিবাহিত হইবে। মন ক্ষুন্ন করিয়া কাজ
কি? যদি সাত দিন পরে সে আপনা হইতেই ধরা দেয়।
সে স্থানে আর অধিক বিলম্ব করা নিষ্প্রয়ােজন ভাবিয়া, সে স্থান
পরিত্যাগ করিয়া গেল। যাইবার সময় বলিয়া গেল--“আমি
এখন চলিলাম-সাত দিন পরে, তােমার সঙ্গে এইখানে সাক্ষাৎ
নলিনী বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল-এখান হইতে পলাইয়া
বাইবার কি কোন উপায় নাই ?

অষ্টম পরিচ্ছেদ
পূৰ্ব অধ্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে যে, দুর্গমধ্যে একটা সরসী আছে।
সরসীর চতুর্দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃক্ষ জন্মিয়া রহিয়াছে। সেই ক্ষুদ্র
ক্ষুদ্র বৃক্ষগুলি এত ঘন-সন্নিবিষ্ট যে, দূর হইতে সেইস্থানে সরসী
আছে, বলিয়া বােধ হয় না। সরসী-জলে, পদ্ম, শালুক, নানা প্রকার
জলজ ঘাস, জন্মিয়া রহিয়াছে। সরােবর তটে, একধাবে, একটী
বহু পুরাতন, জীর্ণ প্রস্তর নির্মিত ঘাট রহিয়াছে। সেই জীর্ণ
ঘাটের সােপানােপরি, নন্দিনী বসিয়া আছে। বসিয়া বসিয়া
ভাবিতেছে। আকাশ পাতাল ভাবিতেছে, তাই ত কি হইবে?
ছয় দিন অতিবাহিত হইয়া গেল, কোন উপায়ই ত হইল না :
আর যে একদিন মাত্র আছে, কি হইবে ! কেমন করিয়া জগতের
সম্মুখে এ কাল মুখ দেখাইব? সে ত কোন উপায় খুঁজিয়া পায়
নাই। হায়! আজ সে কোথায়, আর আমি কত দূরে। যদি
আজ সে আমার নিকটে থাকিত। কিন্তু সে ত নাই। তবে ! তবে
কি হইবে। হঠাৎ নন্দিনীর বদন গম্ভীর হইল। কপােলর ঘর্ম
শুষ্ক হইল, কেন ! নন্দিনী—তােমার মস্তক দুলিতেছে-কেন?
কি সঙ্কল্প করিয়াছ? সােপান বাহিয়া ধীরে ধীরে বাপী
সন্নিকটে নামিতেছ কেন? ওঃ বুঝিয়াছি, তুমি মরিবে ?
২৭

নগেন্দ্র-নন্দিনী
ডুবিয়া মরিবে ! তাই মর-ডুবিয়া মর। তবে পাকাপিতেছে
কেন? কি। পিছাইয়া আসিলে যে! সে দিনের কথা আজ
মনে পড়িয়াছে ? স্বামীকে বলিয়া আসিয়াছিলে না, 'তােমার
নন্দিনী তােমার চরণ দর্শন না করিয়া মরিবে না।
তবে আবার কাদিতেছ কেন? মরা হইল না বলিয়া ?
সারা জীবন ধরিয়া কাদিতে আসিয়াছ, কাঁদ। দুঃখের জ্বালা
চক্ষুর জলে একদিন নিভিয়া যাইবে।
নন্দিনী কাদিতেছে। জলে পাদস্পর্শ করিয়া, সােপানে বসিয়া
বসিয়া কঁদিতেছে। সে কান্নার বিরাম নাই। এমন সময়
সােপানােপরি, একজন মনুষ্য আসিয়া দাঁড়াইল। অতি ধীরে
সন্তর্পণে, পা টিপিয়া টিপিয়া, সােপান বহিয়া অবতরণ করিতে
লাগিল। নলিনী জানিতেও পারিল না। ক্রমে সেই মনুষ্য,
নন্দিনীর পার্শ্বে আসিয়া দাড়াইল। তবুও নন্দিনীর জ্ঞান
নাই। সে শােকশেল কাতরা -অনাথিনী অশ্রু
অশ্রু বিমােচন
করিতেছে।
যে ব্যক্তি নন্দিনীর নিকটে আসিয়া দাড়াইল, সে ব্যক্তি
একজন দস্য। নলিনীকে এতক্ষণ গৃহ মধ্যে দেখিতে না
পাইয়া, দস্যগণের মধ্যে মহা কোলাহল পড়িয়া গিয়াছিল।
চারিদিকে দম ছুটিয়াছে। এই বৃদ্ধ দম্যও, নন্দিনীর অনুসন্ধান
করিতে করিতে, এখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।

নগেনন্দিনী আকাশে চাঁদ উঠিয়াছে। বৃদ্ধ দম্ভ নন্দিনীর পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার ছায়া, সােপান বাহিয়া জলমধ্যে নিপতিত হইল। ছায়া দর্শনে, নন্দিনী ভীত হইয়া চমকাইয়া উঠিল । পশ্চাতে চাহিয়া দেখিল, এক ব্যক্তি দাড়াইয়া আছে। অস্পষ্ট চন্দ্রালােকে চিনিতে পারিল না। নন্দিনী বলিল-“কে? কে তুমি?” দ্য বলিল—“আমার নাম গােবিন্দ।” নলিনী—কেন—কি জন্য আসিয়াছ?” গগাবিন্দ চন্দ্র স্নেহ কোমল স্বরে বলিল, “মা তােমাকে দেখিয়া আমার দয়া হইতেছে। আমি তােমার উপকার করিব।” নন্দিনী—একথা শুনিয়া চমকাইয়া উঠিল, বলিল, “উপকার। কি উপকার আমার করিবে ?” গগাবিন্দ—“তােমাকে এ স্থান হইতে মুক্ত করিয়া দিতে পারি।” আজ ছয় দিন, নন্দিনী কোন উপায়ই খুঁজিয়া পায় নাই। আজ একি ! নন্দিনী আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল-“আমাকে মুক্ত করিয়া দিবে, কেন? গােবিল-“মা-“আমাকে তােমার পিতার ন্যায় ভাবিও আমি অন্য কিছুই প্রত্যাশা করি না। আমি দ্য, সত্য। যাবৎ- জীবন সুবৃত্তি করিয়া, আজ বৃদ্ধ হইয়াছি। কখন কোন রমণীর

নগেন্দ্র-নন্দিনী
প্রতি অত্যাচার করি নাই। স্নেহবশতঃ আমি তােমাকে
মুক্ত
করিয়া দিতে চাই। আরও শােন ! আমার এক কন্যা ছিল।
তােমার মুখখানি দেখিয়া, আজ তাহার কথা মনে পড়িল। চায়।
সে কত দিন।” বলিয়া বৃদ্ধ দ্য গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিল।
নন্দিনী চমকাইয়া উঠিল, বলিল—“তােমার কন্যা! সে
কোথায় ?
দ—“জানি না, সে কোথায় আছে—তাহাকে দস্যগণ চুরি
করিয়া লইয়া গিয়াছিল, এই মাত্র আনিতাম।
নন্দিনীর অঙ্গ কাঁপিতে লাগিল। ঘন ঘন পাস বহিতে
লাগিল। কম্পিত কণ্ঠে বলিল—“পিতা—আমি তােমার সেই
অভাগিণী কন্যা।”
বৃদ্ধ আশ্চৰ্য্যাম্বিত হইল। বলিল-“তুমি জানিলে কি
প্রকারে ?”
নন্দিনী-আমি আমার স্বামীর মুখে শুনিয়াছি, যিনি
আমাকে লালিত পালিত করিয়াছিলেন, তিনি আমার পিতা
নহেন। আমি তাহাকে সে সময় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তবে
আমার পিতা কোথায় ? তিনি বলিয়াছিলেন, তােমার পিতা এখন
দমবৃত্তি করিতেছেন। তাহার বেশী আর আমি কিছুই
জানি না।”
গােবিন্দ বলিলেন-“মা সত্যই তুমি আমার কন্যা। তােমার

নগেন্দ্র-নন্দিনী
বিস্ফারিত চকুতে, প্রশান্ত বদনে, তােমার মায়ের সাদৃশ্য দেখিতে
পাইতেছি।” বলিয়া গােবিন্দচন্দ্র নন্দিনীকে ধীয় বক্ষে টানিয়া
লইয়া, স্নেহভরে তাহার কপােল চুম্বন করিলেন। নন্দিনী
কাঁদিতে লাগিল। বৃদ্ধের চক্ষুতেও জল দেখা দিল।
নন্দিনী বলিল—“আমার মা কোথায় ?
গােবিন্দচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন,—সে নাই। আজ
বহুদিন মারা গিয়াছে।”
নলিনী কাদিতে লাগিল। গােবিন্দচন্দ্র বলিল-“মা, এখানে
আর বিলম্ব করিও না। তােমাকে কমধ্যে দেখিতে না পাইয়া,
সকলে তােমার অনুসন্ধান করিতেছে। কোথায় কে আসিয়া
পড়িবে, এখন কক্ষে ফিরিয়া যাও। কল্য প্রাতে, তােমার সহিত
আমার সাক্ষাৎ হইবে।” বলিয়া বৃদ্ধ গােবিচ কাল বিলম্ব
না করিয়া চলিয়া গেলেন। নন্দিনী কঁদিতে কাঁদিতে ধীর
পাদ-বিক্ষেপে কক্ষে ফিরিয়া গেল।

নবম পরিচ্ছেদ
দ্য কর্তৃক নলিনী অপহৃত হইয়াছে, এ সংবাদ লােকমুখে
নগেন্দ্রনাথ শুনিতে পাইলেন। তাহার প্রাণে বড়ই আঘাত
লাগিল। যে পত্নীকে, তিনি প্রাণের অধিক করিয়া ভালবাসিতেন,
সেই স্ত্রী আজ দ্য হন্তে নির্জাতিতা। বুক ফাটিয়া প্রাণ বাহির
হইয়া যাইতে চাহিল। বিদায়ের দিন,নন্দিনী যে সকল মর্মভেদী কথা
বলিয়া গিয়াছিল—আজ তাহ শেলের মত বুকে বিন্ধিতে লাগিল।
ভাবিলেন--কি করিয়াছি। যাহা হারাইয়াছি, তাহা আর পাইব
কেন তাহাকে যাইতে দিলাম। যে রত্ন হারাইয়াছি, সহ।
সাগর খ জিলেও আর মিলিবে না এমনটা কার ছিল? এমন
রূপবতী, গুণবতী, স্ত্রী কে—পাইয়াছে? নগেন্ত্রের মনে কত
পুরাতন কথা হৃদয়ে জাগরূপ হইল। সেইদিন রাত্রে, যে ভয়ঙ্কর
স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, তাহা তাহার মনে আদৌ ছিল না । আজ
তাহা মনে উদয় হইল। শরীরে রােমাঞ্চ দিয়া উঠিল। একটু
ভাবিয়া আর লবিতে পারিলেন না। বসিয়া পড়িলেন।
বিবরণ ভূলিতে চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। কিন্তু ভুলিবার
ক যতই চেষ্টা করিতেছিলেন, ততই আপনা হইতেই তাহার মনে

নগেন্দ্র নন্দিনী জাগিয়া জাগিয়া উঠিতেছিল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন । চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল। গৃহের পানে চাহিয়া দেখিতে পারিলেন না। ভয়ে ভয়ে গৃহের পানে চাহিলেন। বােধ হইল গৃহের সমস্তই যেন তাহাকে গ্রাস করিতে আসিতেছে। গৃহের প্রত্যেক স্থানে নন্দিনীর কত স্মৃতি জড়িত। ভাবিলেন-হায়। এই গৃহে একদিন নন্দিনী ছিল। একদিন রাত্রে এই শয়ন কক্ষে বসিয়া কত কথা হইয়াছিল—আজ মনে হইল। একদিন নগেন্দ্র নাথ নন্দিনীকে কোন কারণ বশতঃ পদাঘাত করিয়াছিলেন। নন্দিনী খাটের বাজুতে মাথা রাখিয়া বসিয়া বসিয়া কঁদিতেছিল। মনে হইল যেন সে বসিয়া বসিয়া কাঁদিতেছে। নগেন্দ্রনাথ ডাকিলেন—না। সে দিন নন্দিনী সে আহ্বানে উঠিয়া •াড়াইয়াছিল, আজ উঠিল না, বসিয়াই রহিল। কেন? নগেন্ত্রের তন্দ্রা ভঙ্গ হইল। বুঝিলেন এ নন্দিনী নয়, ইহা তাহার বিভীষিকা। দেখিলেন—খাটের বাজুর নিকটে নন্দিনী নাই—কেবল বড় বড় অক্ষরে লিখা রহিয়াছে ‘নন্দিনী। মনে পড়িল সেই দিন নন্দিনী মাথার কাঁটা দিয়া বসিয়া বসিয়া নিজের নাম লিখিয়াছিল। নগেন্দ্রনাথ অপলক নেত্রে সেই দিকে চাহিয়া রহিলেন। নন্দিনীর ছল ছল্ চকু মনে পড়িল। তাহার চক্ষু জলে ঝাপসা হইয়া আসিল। আর দেখিতে পাইলেন না। তখন মানস-নেত্রে সেই অপূৰ্ব্ব রূপ লাবণ্যবতীকে দেখিতে লাগিলেন। মনে হইল যেন নগেনন্দিনী । নন্দিনী কথা কহিতেছে। পথ দিয়া কোন স্ত্রীলােক মল বাজাইয়া চলিয়া গেল-মনে হইল যেন নন্দিনী হাসিতেছে। এইরূপ নানা চিন্তা করিতে করিতে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। দূরে -নারিকেল বৃক্ষ হইতে রৌদ্র সরিয়া গেল। গৃহ অন্ধকার হইল। অঙ্গণের মধ্যে রােপিত কামিনী কুঞ্জ হইতে দোয়েল তাহার সঙ্গীকে দেখিতে পাইয়া ডাকিয়া উঠিল। নগেন্দ্র ভাবিলেন-আমার সঙ্গী কোথায় ? দূরে কোন প্রতিবাসীর গৃহ হইতে শঙ্খধ্বনি শােনা গেল। নগেন্দ্র বুঝিলেন-সন্ধ্যা হইয়াছে। আবার মনে হইল নন্দিনী থাকিলে সেও শঙ্কধ্বনি করিয়া প্রতিবাসীদিগকে সাড়া দিত। আজ কে এই সাঁঝের বেলায় সন্ধ্যা মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিতে আসিবে? নগেন্দ্রনাথ সেই খানে সেই ভাবে বসিয়া ভাবিতে ছিলেন-ভাবিতেই লাগিলেন। ৩৪ দশমপরিচ্ছেদ ভাের হইল। প্রথমে কাক ডাকিল তারপর কোকিল ডাকিল। বৃক্ষের নিম্নে জমাট বাঁধা অন্ধকার সরিয়া গেল। পূর্ব গগন লােহিত বর্ণে রঞ্জিত হইল। ক্রমে বৃক্ষের পশ্চাৎ হইতে সূর্য্যদেব দেখা দিলেন। সমস্ত জগৎ আলােক পাইয়া হাসিতে লাগিল। বেলা এক প্রহর হইল। নন্দিনী স্বীয় কক্ষে বসিয়া, কল্য সন্ধ্যার ঘটনা সম্বন্ধে মনােমধ্যে আলােচনা করিতেছিল। ইনিই আমার পিতা! তবে তিনি দস্যুবৃত্তি করিতেছেন কেন? এতদিন আমার কোন সংবাদ লন নাই কেন? আমার মা কেমন ছিলেন ? তাহাকে ত দেখি নাই। এইরূপ নানা প্রকার চিন্তা করিতিেছল, এমন সময়ে কক্ষ দ্বার মুক্ত হইল। মুক্ত দ্বার দিয়া গােবিন্দচত্র আসিয়া প্রবেশ করিলেন। বলিলেন, “মা—আমি আসিয়াছি।” নন্দিনীর মস্তক তখন চিন্তার স্রোতে আলােড়িত। কোন উত্তর দিতে পারিল না। নীরবে বসিয়া রহিল। গােবিন্দচন্দ্র নন্দিনীর এইরূপ ভাবান্তর লক্ষ্য করিয়া বিস্মিত হইলেন। মুহুর্ত মধ্যে সে ভাব দূর করিয়া বলিলেন-“মা এখানে অধিক্ষণ বিলম্ব করা অনুচিত। এক কাজ কর।” ৩৬

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নন্দিনী বলিল, “কি ?”
গাে-“আমার সঙ্গে আইস।
নন্দিনী-“আমাকে দস্যরা দেখিতে পাইবে যে?”
গাে-“সে চিন্তা করিও না—তুমি আমার সঙ্গে চলিয়া
আইস
নন্দিনী দ্বিরুক্তি না করিয়া উঠিয়া দাড়াইল। গােবিন্দ দত্ত
প্রদর্শিত পথে চলিতে লাগিল। গােবিন্দচন্দ্র বড় বিচক্ষণ ব্যক্তি।
কক্ষ হইতে বাহির হইয়া গৃহের পশ্চাৎ দিকে গেলেন। সেদিকে
নিবীড় অরণ্য সে ধারে প্রায় কেহ যাতায়াত করিত না।
পথ ধরিয়া গমন করিলে কেহ দেখিবার সম্ভাবনা সুতরাং
সেই পথে চলিলেন। গুপ্তপথ গােবিন্দচন্দ্র জানিতেন সুতরাং
অতি অল্প
সময়ের মধ্যে গুপ্ত-পথ ধরিয়া নন্দিনীকে লইয়া
প্রথম পরিখা পার হইলেন।
এমন সময় একজন দ্য সেই পথে যাইতেছিল। গােবিন্দ
চন্দ্রকে সে চিনিত এবং নন্দিনীকে সে যে চিনিত না এমন নয়।
কারণ যে দিন নন্দিনীকে বন্দিনী করিয়া লইয়া আসিবার কালে
যে কয়জন দ্য ছিল সেও তাদের মধ্যে ছিল। দ্য সর্দারের
আজ্ঞা ছিল-“যাহাতে নন্দিনী দুর্গের বাহিরে পলাইয়া না যায়-
সে বিষয়ে সকলে সতর্ক থাকিবে।” সে তাহা শুনিয়াছিল।
সুতরাং নন্দিনীকে গােবিন্দচন্দ্রের সহিত যাইতে দেখিয়া তাহার

নগেনন্দিনী সন্দেহ জন্মিল। দষকে দেখিয়া নন্দিনী বড়ই ভীতা হইল। ভাবিল-বােধ হয় আর যাওয়া হইল না। কিন্তু গােবিন্দচন্দ্র মপি কিঞ্চিৎ শঙ্কিত হইয়াছিলেন তথাপি অগ্রসর হইয়া চলিতে লাগিলেন। দ্য হাকিয়া বলিল -“গোবিন্দ দাড়াও।” গগাবিন্দচন্দ্র ফিরিয়া দাড়াইলেন, মুখ বিকৃতি করিয়া বলিলেন- “কেন ? কি জন্য দাড়াইব?” দস্যু—“তুমি এই স্ত্রীলােকটাকে কোথায় লইয়া যাইতেছ ?” গােবিন্দচন্দ্র গম্ভীর স্বরে উত্তর করিলেন-“আমার যে স্থানে ইচ্ছা লইয়া যাইব। তােমাকে সকল কথা খুলিয়া বলিতে পারি দস্য-“এইরূপ বিশ্বাস ঘাতকতা করিবার উদ্দেশ্য। গােবিন্দচন্দ্ৰ পূৰ্ববং গম্ভীরভাবে উত্তর করিলেন-“উদ্দেশ্য অতি মহৎ-তােমাকে বলিব না।” দস্য-“তাহা হইলে আমিও তােমাকে পথ ছাড়িয়া দিতে পারি না। গােবিন্দের চক্ষুতে অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। ক্রোধ সীমা ছাড়িয়া উঠিল। গােবিন্দের দেহে অসীম বল। গােবিন্দ দম্যকে পদাঘাত করিলেন। সে পদাঘাত দ্য দ্য সহ্য করিতে পারিল না। ভূমির উপর লুটাইয়া পড়িল। এই সুযােগে গােবিন্দচন্দ্র ৩৭

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নন্দিনীকে লইয়া শীঘ্রই সে স্থান হইতে সরিয়া পড়িলেন।
অত্যল্পকালমধ্যে দুর্গ ছাড়াইয়া নদীর তীরে আসিয়া পৌছিলেন।
নন্দিনী বলিল-“পিতা, এখন কোথায় যাইব?”
গগাবিন্দচন্দ্র বলিলেন, “মা-তােমার এখানে অধিকক্ষণ
তিষ্ঠান উচিত নয়। তুমি শীঘ্রই এ স্থান হইতে চলিয়া
যাও।”
নন্দিনীর চক্ষে জল আসিল, বলিল—“কোথায় যাইব ?
হাত নাড়িয়া নদীর অপর পার দেখাইয়া, গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন,
“নদী পার হইয়া ওপারে যাও।”
নন্দিনী-“কি প্রকারে নদী পার হইব?"
গাে-“সে বন্দোবস্ত, আমি পূর্বেই করিয়া রাখিয়াছি।
ঐখানে নৌকা প্রস্তুত আছে-নৌকায় আমার বিশ্বস্তলােক
আছে। সে যেখানে লইয়া যাইবে—সেইখানে যাইও। কোন
ভয় করিও না।”
নন্দিনী-“আপনার সঙ্গে আবার কিরূপে সাক্ষাৎ হইবে ?
গাে-“কল্য প্রাতে আমার সহিত তােমার সাক্ষাৎ হইবে।
যদি সাক্ষাৎ না হয়, তবে সেই লােকটীর সাহায্যে আমার
সংবাদ পাইবে,” বলিয়া চলিতে লাগিলেন। যে স্থানে নৌকা
বাধা রহিয়াছে, সেই স্থানে আসিয়া পৌছিলেন। নৌকার
সমীপবর্তী হইয়া তাকিলেন-মােহনলাল *

'
।
নগেনন্দিনী
নােকার ভিতর হইতে উত্তর আসিল- “যাই।”
এক ব্যক্তি নৌকা হইতে নামিয়া আসিল। নিকটে আসিলে
গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন,-“শীঘ্র, খুব সতর্কে, নন্দিনীকে লইয়া
ষাও। কল্য প্রাতে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও। যদি
সাক্ষাৎ না হয় তাহা হইলে আর সাক্ষাৎ হইল না জানিবে,
আর অধিক বিলম্ব করা নিষ্প্রয়ােজন। আমরা আসিবার
কালে একটী দ্য আমাদিগকে দেখিয়াছে। বােধহয়, এ সংবাদ
রাষ্ট্র হইয়াছে। আমার ভাগ্যে কি আছে জানি না” বলিয়া
গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন।
মােহনলাল অতি ব্যগ্রকণ্ঠে বলিল—“তবে আপনার
ফিরিয়া যাইয়া আর কাজ কি? আপনি পলাইয়া আসুন।”
গােবিন্দচন্দ্র বর্জগম্ভীর স্বরে বলিলেন-“জানিও মােহনলাল।
গােবিন্দ দত্ত এখনও এত কাপুরুষ হয় নাই যে, দোষ করিয়া
তাহার প্রায়শ্চিত্ত ভােগ করিতে ভয় পায়।
মােহনসাল আর দ্বিরুক্তি করিল না, নৌকা খুলিয়া দিল।
গােবিন্দও দুর্গে ফিরিয়া গেলেন।

একাদশ পরিচ্ছেদ
দিন দিন করিয়া, কতদিন কাটিতে লাগিল। কত মাস
গেল, বৎসর গেল । কতদিন অতিবাহিত হইয়া গেল, তবুও
নন্দিনী ফিরিল না । নগেন্দ্রের মনে শান্তি নাই, ভাবিয়া ভাবিয়া
শরীর ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। আর শরীর ভাল থাকে
আজ জর হয়, কাল মাথা ধরে। কোন দিন আহার করেন,
কোন দিন অনশনে কাটান। বাটীর সকলে হার অবস্থা
দেখিয়া বড়ই কাতর হইল। নগেন্দ্রের মাতা পুত্রের এইরূপ
অবস্থা দেখিয়া, বিবাহের ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। নগেন্দ্রনাথ
ঐ সংবাদ পাইয়া মাতাকে ডাকিয়া বলিলেন,-“মা, যে নন্দিনী
গিয়াছে, সে নন্দিনীর স্থান কেহ পূরণ করিতে পারিবে না।
আমি বিবাহ করিব না,-বৃথা চেষ্টা করিও না।”
নগেন্দ্রের মাতা কঁদিতে লাগিলেন। কেহই তাহার মত
ফিরাইতে পারিল না। নগেন্দ্রের নিকটে আজকাল বিবাহের
কথা উত্থাপন করিলে, নগেন্দ্রের চক্ষু দিয়া অনর্গল অশ্রু বাহির
হয়। সেই অশ্রুজল, মাতার বক্ষে শেলের মত বিন্ধিতে থাকে।
মাতাও কাঁদেন।
পুত্রের দুঃখ সই করিতে না পারিয়া মাতাঠাকুরাণী প্রাণ
৪০

নগেনন্দিনী মাতার মৃত্যুর ত্যাগ করিলেন । কয়েক মাস পরেই, জ্যেষ্ঠ সহােদর রমানাথও ইহলােক পরিত্যাগ করিয়া চলিলেন। নগেন্দ্রনাথ হৃদয়ে দারুণ শােক পাইলেন। তাহার আর শান্তি কোথায় ! প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়তরা পত্নী হারাইলেন, স্নেহময়ী মাতা ছাড়িয়া গেলেন, জ্যেষ্ঠ সহােদর শােকসাগরে ভাসাইয়া চলিয়া গেলেন। নগেন্দ্রনাথের সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মিল। বিতৃষ্ণা হইতে বৈরাগ্য, আসিয়া দেখা দিল। তিনি ভাবিলেন- জগতে শান্তি কোথায়! কি করিলে শান্তি পাইতে পারেন ? কি করিবেন-কি করিলে শাস্তি পাইবেন, এই একমাত্র ধ্যান। একদিন নিশীথে তিনি নিদ্রা যাইতেছেন, নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন দেখিলেন-“যেন তিনি কোন তিমিরাবৃত রজনীতে ভ্রমণ করিতেছেন। অকস্মাৎ আকাশমণ্ডল জ্যোতিপূর্ণ হইল, সেই জ্যোতিঃপূর্ণ আকাশমণ্ডল ক্রমশঃ সূৰ্য্যমণ্ডলের আকার ধারণ করিল। সেই সূর্যমণ্ডল মধ্যে যেন শত সূর্য উদয় হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হইল। আবার সেই মণ্ডল মধ্যে এক শুভ্রকান্তি পুরুষচ্ছায়া প্রত্যক্ষবৎ আভাসমান হইল। প্রত্যক্ষ পরিধানে গৈরিক বসন, গলে শুভ্র পুষ্পহার, মস্তকে দীর্ঘ জটা, হন্তে কুমণ্ডল। সেই দৃষ্ট পুরুষচ্ছায়া তাহার সমীপবর্তী হইতে ক্রমে নিকটে, তারপর আরও নিকটে আসিলেন। নগেন্ত্রের মন্তক আপনা হইতেই ভক্তিভাবে নত হইল, তিনি পুরুষ ছায়া লাগিল।

নগেনন্দিনী
নমস্কার করিলেন। তখন ঋষিপ্রকৃতি পুরুষায় জিজ্ঞাসা করিলেন,
“বৎস, তুমি কি চাও?”
তিনি বলিলেন—শাস্তি।”
পুরুষছায়া বলিলেন—“শ্রীকৃষ্ণের চরণে, মন সমর্পণ কর।
সংসার, নন্দিনী, সব—ভুলিয়া যাও। শান্তি পাইবে। সংসারে
থাকিলে শান্তি পাইবে না।” বলিয়া ঋষিপ্রকৃতি পুরুষচ্ছায়
অদৃশ্য হইলেন।
নগেন্দ্রের নিদ্রাভঙ্গ হইল। চক্ষু খুলিয়া দেখিলেন, কোথাও
কিছুই নাই—গৃহ অন্ধকার।
৪২

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
নগেন্দ্রনাথের এক ভ্রাতুস্পুত্র ছিল। তাহার নাম শচীন্দ্র।
শচীন্দ্রের হস্তে সমস্ত বিষয়সম্পত্তির ভার অর্পণ করিলেন।
শচীনাথ সমস্ত বিষয় সম্পত্তির মালিক হইয়া বসিল। যখন
নগেন্দ্রনাথ সন্ন্যাসী বেশে পথে বাহির হইলেন, তখন শচীন্দ্রনাথ
কঁদিতে লাগিল-“কাকাবাবু। এ অসময়ে আমাকে সংসার
সমূদ্রে ফেলিয়া কোথায় যাইতেছেন।”
নগেন্দ্রনাথ বলিলেন, “বাবা, দুঃখ করিও না। তুমি এখন
বালক নও। বিষয়সম্পত্তি, সব বুঝিতে পারিবে।
প্রতি অটল বিশ্বাস রাখি, কোন বিপদই তােমার সম্মুখীন হইতে
পারিবে না।
শচীন্দ্রনাথ কঁদিতে লাগিল, নগেন্দ্রকে প্রনাম করিয়া
বলিল-“আপনার স্নেহের ঋণ পরিশােধ করিতে পারিলাম না।”
নগেন্দ্রনাথ চলিয়া যাইতেছিলেন, কি ভাবিয়া ফিরিয়া
দাড়াইলেন। শচীকে ডাকিয়া বলিলেন-“শচীন, তােমাকে
একটা কাজের ভার দিয়া যাইব, বলিয়া মনে করিয়াছিলাম,
তাহা তুমি সম্পন্ন করিতে পারিবে ?
শচীন্দ্র সজল নয়নে বলিল, “কি? বলুন, যথাসাধ্য চেষ্টা
করি।”

নগেনন্দিনী
নগেন্দ্রনাথের চক্ষু দিয়া অনর্গল জল পড়িতে লাগিল। তিনি
বালকের ন্যায় দিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ কাদিলেন,
ক্রমে শােকবেগ কিছু উপশম পাইলে, হৃদয়ে স্থির আসিলে,
বলিলেন-“উদ্যানের মধ্যে যে প্রশস্ত ভূমি পড়িয়া আছে, ঐ
স্থানে একটী সরােবর খনন করাইও। আমি পাঁচ বৎসর পরে,
যদি বাঁচিয়া থাকি, ফিরিয়া আসিয়া প্রতিষ্ঠা করিব। যদি উক্ত
কাল অতিবাহিত হইয়া যায়, তাহা হইলে তুমি সরােবর প্রতিষ্ঠা
করিও, আর সােপানােপৰি মৰ্ম্মর নগেন্দ্র-নন্দিনী
সরােবর, মোদিত করিয়া দিও” বলিয়া তিনি সে স্থানে আর
দাড়াইলেন না, চলিয়া গেলেন।
শচীন্দ্রনাথ কাঁদিতেছিল, আরও কঁদিতে লাগিল।
নগেন্দ্রনাথ চলিয়া গেলেন, কিন্তু পরদিন আবার পূর্ব দিবসে
ন্যায় ৰ্য্য উঠিল, পক্ষী ডাকিতে লাগিল, বৃক্ষে পুষ্প ফুটিল,
সৌরভ আকাশ বাতাস ব্যাপিয়া ছুটিল। গন্ধে মৌমাছির
আনাগােনা করিতে লাগিল—পৃথিবী হাসিতে লাগিল। কিছুই
অভাব নাই। সব আছে—কেবল নগেন্দ্র ও নন্দিনী নাই ।
৪

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ পূৰ্ব্বে কথিত হইয়াছে যে, মােহনলাল নন্দিনীকে লইয়া নদীর অপর পারে গেল। মােহনলালের নদীর অপর পারে গৃহ আছে। সে গৃহে মােহনলাল ও তাহার কন্যা হৈমবতী থাকিত। হৈমবতী বিবাহিতা, তাহার বহুদিন বিবাহ হইয়াছে। মােহন লাল নন্দিনীকে স্বীয় গৃহে লইয়া গেল। নন্দিনীকে দেখিয়া হৈমবতী বিস্মিত হইল, বলিল—“তুমি কে ভাই?” নন্দিনী বলিল—“আমি নন্দিনী। হৈমবতী—“তােমাদের বাড়ী কোথায় ?” নন্দিনী বলিল-নন্দীগ্রাম।” হৈমবতী-“তুমি এখানে কি প্রকারে আসিলে?” নন্দিনীর চক্ষু সঞ্জল হইয়া আসিল, আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা সবিস্তারে বলিল, বলিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। হৈমবতী স্নেহা কণ্ঠে বলিল- “তুমি কাদিতেছ কেন ভাই ?” নন্দিনী কাতরম্বরে বলিল—“ভাই। যখন আমি তার কাছে বদায় লই, সেই সময় বলিয়াছিলাম ‘নন্দিনী তােমার চরণ দর্শন করিয়া মরিবে না। ৪৫

নগেনন্দিনী
হৈমবতী—সে জন্য তুমি দিও না। আবার সাক্ষাৎ হইবে,
আমার মন বলিতেছে।
এই কথা শুনিয়া নন্দিনা কঁদিতে দিতে বলিল,-“আমি
কিছুই চাহি না, কেবল ( তিনি কেমন আছেন) এ সংবাদটুকু
আমাকে আনাইয়া দাও।”
হৈমবতী দেখিল, নন্দিনী শশাকে বড়ই কাতরা। সস্নেহে
বলিল,-“ভাই, কোন চিন্তা করিও না। অদ্যই তােমার স্বামীকে
পত্র লিখিতেছি।” বলিয়া কাগজ, লেখনী ও মসীপাত্র লইয়া
আসিল।
নন্দিনীকে বলিল-*লেখ, কি লিখিবে।”
আজ নন্দিনী কি পত্র লিখিতে পারে? কি করিয়া লিখিবে
কি বলিয়াই বা সম্বােধন করিবে? কত দীর্ঘ দিন পরে—আবার
স্বামীকে (স্বামী) বলিয়া ডাকিবে। নন্দিনীর হৃদয় উদ্বেল হইয়া
উঠিল, বলিল—“তুমি লিখিয়া দাও।”
নন্দিনীকে শােকে কাতর দেখিয়া হৈমবতী বলিল-“বল কি
লিখিব ?”
নলিনী-"তােমার যাহা ইচ্ছ। লিখিয়া দাও।”
হৈমবতী পত্র লিখিতে বসিল। অনেক ভাবিয়া চতিয়া

নগেনন্দিনী
পত্র লেখা সমাপ্ত
কাটিয়া কুটি একটা ক্ষুদ্র পত্র লিখিল ।
হইলে নন্দিনীকে পড়িয়া শুনাইতে লাগিল।
হরিশপুর
শ্রীচরণকমলেষু
পরম পূজনীয়—প্রিয়তম! বহুদিন হইল তােমাকে ছাড়িয়া
চলিয়া আসিয়া যে, দুঃখ কষ্টে পড়িয়াছিলাম, তাহা আর কি
বলিব। আমি আপাততঃ এইখানেই আছি। তুমি কেমন আছ?
সংবাদ দিবে। কাল বিলম্ব না করিয়া পত্র পাঠ চলিয়া আসিতে
ভুলিও না। ইতি-
তােমার সেবিকা
নন্দিনী।
পত্র পাঠ সমাপ্ত হইলে, নন্দিনীকে জিজ্ঞাসা করিল “কেমন
হইয়াছে?”
নন্দিনী বহুদিন স্বামীকে পত্র লিখে নাই, আজ কতদিন পরে
পত্র লিখিতেছে। পত্ৰ শুনিয়া তাহার চক্ষে জল আসিল, অঞ্চলের
প্রান্তে চক্ষু মুছিয়া বলিল-“বেশ হইয়াছে, তবে একটা কথা
লিখিতে ভুল করিয়াছ।
হৈমবতী “কি ?
নলিনী-“আমার যে গুরু, সেই স্বামীকে আমার প্রণাম
৪৭

নগেনন্দিনী
জানাও নাই। পত্র শেষে লিখিয়া দাও দাসীর অসংখ্য প্রণাম
জানিবে।
হৈমবতী ভাবিল, এত স্বামী ভক্তি। পর্ব শেষে নন্দিনীর
কথামত লিখিয়া দিল। এমত সময়ে গৃহ মধ্যে মােহনলাল
আসিয়া প্রবেশ করিল। তাহার মুখমণ্ডল অতিশয় বিমর্ষ বলিয়া
বােধ হইল। তাহাকে একাকী আসিতে দেখিয়', নন্দিনী বলিল,
“পিতা কোথায়?”
মােহনলাল মস্তক অবনত করিয়া কহিল-“তিনি দ্য হস্তে
বন্দী।”
নন্দিনী চমকাইয়া উঠিল, বলিল,-“কেন?”
মােহনলাল গদগদ কণ্ঠে বলিল, “মা, তিনি তােমাকে মুক্ত
করিয়া দিয়াছেন, এই তাহার অপরাধ।”
নন্দিনী হৃদয়ে ব্যথা পাইল । আজ তাহার জন্য পিতা
দশ্য হন্তে বন্দী।
কেন পিতা আমাকে মুক্ত করিয়া দিলেন ?
মুক্ত না করিলে ত পিতার সহিত সর্বদা সাক্ষাৎ হইত! তবে
কেন পলাইয়া আসিলাম ?
নন্দিনী কাদিতে দিতে মােহনলালকে বলিল -“আপনার
নিকট আমি বহু ঋণপাশে আবদ্ধ। আপনি আমার যথেষ্ট
উপকার করিয়াছেন-আমাকে আশ্রয় দিয়াছেন। আমার জন্য
আর একটি কাৰ্য্য করিতে পারেন কি ?”
৪৪

নগেনন্দিনী
সহানুভূতি সূচক স্বরে মােহনলাল বলিল-“মানুষ মানুষকে
আশ্রয় না দিলে কে আশ্রয় দিবে মা? বল কি করিতে হইবে?”
নন্দিনী-“আপনি পিতাকে মুক্ত করিয়া আনিতে পারেন
কি?”
মোহনলাল—“মা, গােবিন্দচন্দ্র আমার যে উপকার করিয়াছেন,
তাহা জীবনে ভুলিব না। তাহার জন্য যা করিতে হয় তাহার
জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিব—তবে তােমার ও আমার অদৃষ্ট।”
বলিয়া মােহনলাল গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন।
তারপর আবার বলিতে লাগিলেন—“তুমি নির্বিঘ্নে অবস্থান
কর—আমি এখন চলিলাম।” বলিয়া কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া,
যেখানে গােবিন্দচন্দ্র বন্দী অবস্থায় রহিয়াছেন সেই স্থানের উদ্দেশ্যে
চলিয়া গেলেন।
৪৯

চতুদশ পরিচ্ছেদ রাত্রিকাল। গােবিন্দচন্দ্র একটা অন্ধকার নির্জন কক্ষে বন্দী রহিয়াছেন। উন্মুক্ত বাতায়ন দিয়া দিগন্তের পানে শূ নয়নে চাহিয়াছিলেন। দেখিলেন—আকাশে চন্দ্রদেব হাসিতেছেন। পৃথিবী জ্যোৎস্নাময়ী, তবে জ্যোৎস্না বড়ই মলীন বলিয়া তাহার বােধ হইতেছিল। দীর্ঘ দীর্ঘ শাল বৃক্ষশ্রেণী বাতাসে নড়িয়া উঠিল। তিনি শিহরিয়া উঠিলেন। ভাবিলেন—এতদিন বনে, এলে, নিশীথ রাত্রে একাকী পরিভ্রমণ করিয়াছি-একদিনের অন্তও ভয় পাই নাই। আজ প্রাণ কাপিয়া উঠিল, কেন? স্মরণ হইল-শুনিয়াছি, মানুষ মৃত্যুর পূব্বে বিভীষিকা দেখিয়া থাকে। বুঝি আমারও তাই হইল। চক্ষে জল আসিল, আজ যে পৃথিবীর আলােকে, বাতাসে, জলে, বাঁচিয়া আছি, কল্য তাহাকে ছাড়িয়া যাইতে হইবে। সেই বিরহের অনুভবে, তাহার শ কাপিয়া উঠিল। কন্যার কথা মনে পড়িল। স্ত্রীর কথা মনে হইল। তিনি কঁদিতে লাগিনে। আবার মনে ভাবিলেন-আমি কঁদি কেন? যে হৃদয়ে পত্নী শােক সহ করিয়াছি, সে হৃদয় কি এতই দুর্বল? কখনই না। এ হৃদয়কে পাষান করিব। সকল দুঃখ বিসর্জন দিব। এইরূপ নানা চিন্তায় মগ্ন। এমন সময়ে গবা পথে এক ব্যক্তি আসিয়া দাঁড়াইল। গােবিন্দ চন্দ্র জানিতেও পারিলেন না। এমন সময় ধীক কে ডাকিল, “গােবিন্দ সর্দার? ৫০ নগেন্দ্র-নন্দিনী গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন-“কে? উত্তর আসিল-অমি মােহনলাল।” গগাবিন্দচন্দ্র আশ্চৰ্য্যাম্বিত হইলেন, বলিলেন, “মােহনলাল ! এত রাত্রে এখানে ! কিরূপে আসিলে? মােহনলাল বলিল—“কেহ জানে না। আমি গােপনে এখানে আসিয়াছি। গােবিন্দচন্দ্র-“কেন, কি জন্য এখানে আসিয়াছ ?” মােহনলাল-“সর্দার, শুনিলাম আপনি বন্দী রহিয়াছেন বাধা দিয়া গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন, “নন্দিনী কোথায় ? গােবিন্দচন্ত্রের আসিল, তাহা অন্ধকারে মােহনলাল দেখিতে পাইল ন'। বলিল, “ঐ খানেই শছে। মা আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া যাইতে আমাকে আদেশ করিয়াছেন, সেই জন্য এখানে আসিয়াছি।” গােবিন্দচন্দ্র গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন। কেন জানি না। বােধহয় কল্য তাহার মৃত্যু আশু সম্ভাবনা, এই ভাবিয়া। তারপর বলিতে লাগিলেন- “তুমি আসিয়াছ, ভালই হইয়াছে। তুমি যে এ সময় আসিবে, তাহা আমার খুব বিশ্বাস ছিল। যাক, নন্দিনীকে বলিও-আমি মৃত্যুর জন্য কাতর নহি। পলাইতে পারিতাম, আমার সে ক্ষমতা আছে, তবে পলাইব না। এই পত্রখানি ০১

নগেনন্দিনী
নন্দিনীকে দিও” বলিয়া মােহনলালের হস্তে একখানি পত্র
দিলেন।
মােহনলাল বলিল, “আপনি কি তাহা হইলে যাইবেন না,
মনস্থ করিয়াছেন?” গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন, “হ্যা,তাই।* মােহনলাল
অনেক অনুরােধ করিতে লাগিল।
গােবিন্দচন্দ্র ধীরকণ্ঠে বলিলেন, “মােহনলাল-তুমি গৃহে
ফিরিয়া যাও। আমি যাইব না।”
মােহনলাল কাদিতে লাগিল। গভীরস্বরে গােবিন্দচন্দ্র
ডাকিলেন-“মােহনলাল, তুমি বালকের মত কাদিতেছ কেন ?
ফিরিয়া যাও। আমি যাইব না।
মােহনলালের চক্ষুর জল আরও বেগে বহিতে লাগিল।
তখন গােবিন্দচন্দ্র সবেচনে বলিলেন-“তুমি গৃহে ফিরিয়া
যাও বন্ধু। এখানে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কাদিয়া আর আমার
চিত্ত অস্থির করিও না। পূর্বের সৌহার্দ সব ভুলিয়া যাও।”
মােহনলাল অপূর্ণনয়নে কাতর কণ্ঠে বলিল—“সে সৌহার্দ
কিরূপে ভুলিব ?”
দৃঢ়কণ্ঠে গােবিন্দচন্দ্র বলিলেন-“ভুলিতে হইবে—কি
করিবে? অদৃষ্ট!”
মােহনলাল কোন উত্তর দিল না, নীরবে কাঁদিতেছিল।
গােবিন্দচন্দ্র মােহনলালকে নীরব থাকিতে দেখিয়া বলিলেন, “তকে

নগেন্দ্র নন্দিনী
বিলম্ব করিয়া কাজ কি? তুমি ফিরিয়া যাও। আমার এই
শেষ কথা রাখ।”
এতদিন মােহনলাল গােবিন্দচন্দ্রের সকল কথাই রক্ষা করিয়া
আসিয়াছিল, আজ তাহার জীবনের শেষ মুহূর্তে একথা রাখিতে
পারিবে না? এই তাবিয়া মােহনলাল সে স্থানে আর দাড়াইল
, চলিয়া গেল। যাইবার সময় বলিয়া গেল—“তবে চলিলাম।”
গগাবিন্দচন্দ্র চক্ষু মুছিলেন। ভাবিলেন-সারা জীবন পাপ
করিয়াছি, এতদিনে প্রায়শ্চিত্ত আরম্ভ হইয়াছে।
নানা চিন্তা করিতে করিতে দেখিতে দেখিতে ভাের হইয়া
গেল।
সকাল হইলে গােবিন্দচন্দ্রের কক্ষে দুইজন দ্য আসিয়া
প্রবেশ করিল। শৃঙ্খলাবদ্ধ গােবিন্দচন্দ্রকে তাহারা দ্য সর্দারের
নিকটে লইয়া গেল। দস্যু সর্দার গম্ভীর স্বরে ডাকিল
“গগাবিন্দচন্দ্র।” দৃঢ়স্বরে গােবিন্দচন্দ্র উত্তর করিলেন; কি ?
পূৰ্ব্ববৎ সর্দার বলিল—“তুমি সেই রমণীটিকে মুক্তি দিয়াছ?”
গগাবিন্দচন্দ্ৰ-হা
সর্দার। “কাহার আজ্ঞায়?”
গগাবিন্দ। “আজ্ঞা । কিসের জন্য। আমি নিজে ইচ্ছায়,
হতে, তাহাকে মুক্ত করিয়া দিয়াছি।”
সর্দার। “জানিতে না যে, ইহার পরিণাম ভীষণ হইবে।
০৩

নগেনন্দিনী
গােবিন। তা আবার জানতাম না। জানিয়া শুনিয়াই ত
এ কাৰ্য্য করিয়াছি।”
সর্দার। “তাহা হইলে এখন বল, তুমি কি চাও? মুক্তি না
গগাবিন্দচন্দ্র ধীরকণ্ঠে বলিলেন—“শাস্তি।”
সর্দার। “গােবিন্দচন্দ্র তুমি কি চাও? বল, আমি দিতেছি।
তুমি তাহাকে আনিয়া দাও।”
গােবিন্দচন্দ্রের চক্ষু আরক্ত হইল। রেষদীপ্ত কণ্ঠে বলিলেন,
“সর্দার-যে তাহার রক্ষাকর্তা তাহার সম্মুখে এইরূপ কথা বা
তােমার শােভা পায় না।”
সর্দারের রােষবহ্নি পূৰ্ব্ব হইতেই জ্বলিতেছিল আরও জ্বলিয়া
উঠিল, বলিল, “তাহা হইলে তুমি কে আনিয়া দিবে না।”
গােবিন্দ চন্দ্র দৃঢ় স্বরে বললেন—কখন না”
সর্দার--“তবে তাহার প্রায়শ্চিত্ত ভােগ কর।”
গগাবিন-“এ পাপী তাহাতে বিচলিত নয়।”
সর্দারের চক্ষু আরক্তিম হইয়া উঠিল। ক্রোধে সৰ্বাঙ্গ
কঁপিতে লাগিল, হস্তস্থিত বর্ষা গােবিন্দের বক্ষে আমূলে বসাইয়া
দিল। গােবিন্দচন্দ্র “না” বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন।
তারপর সব শেষ, সব নীরব। পাপীর রক্তে ধরাতল ভাসিয়া
গেল, ক্রমে জনতা নীরব হইয়া আসিল।
3

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
যখন মােহনলাল কঁদিতে দিতে বাড়ী ফিরিয়া গেল, তখন
বেলা এক প্রহর হইয়াছে। নন্দিনী বাটীর সম্মুখের দ্বারে,
মােহনলালের অপেক্ষায় দাড়াইয়াছিল। এমত সময়ে মােহনলাল
আসিয়া উপস্থিত হইল। নন্দিনী বলিল—“আপনি একা কেন ?
পিতা কোথায় ?”
মােহনলাল সজলনেত্রে বলিল—“তিনি আসিলেন না।
বলিয়া আর কি বলিতে যাইতেছিল, বলিতে পারিল না। নিরুদ্ধ
ৰাস্পবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল, চক্ষু সজল হইল। মােহনলালের
ঐরূপ ভাবান্তর লক্ষ্য করিয়া নন্দিনী শিহরিয়া উঠিল, বলিল,
“কেন আসিলেন না? তাহার কি হইয়াছে ?”
মােহনলাল শােকবেগ সংযত করিয়া বলিল, “মা, তুমি ত
শুনিয়ায়, তিনি শত্রু হস্তে বন্দী। তাহাকে আসিবার জন্য অনেক
অনুরােধ করিলাম, তিনি আসিলেন না।”
নন্দিনী—“কেন?”
মােহনলাল কেনর উত্তর কি দিবে ? তাহার চক্ষে জল
আসিতেছিল, সেস্থানে আর দাড়াইল না।
*হা জানি না-তোমাকে এই পত্রখানি দিয়াছেন।”
বলিয়া পত্ৰখানি নন্দিনীর হস্তে দিয়া চলিয়া গেল। নন্দিনী
সাগ্রহে পত্র পড়িতে লাগিল।
cica

নগেন্দ্র-নন্দিনী
দুর্গ কক্ষ
কালরাত্রি
আজ আমি বন্দী। আমার অপরাধ, তােমাকে মুক্ত করিয়া
দিয়াছি। যখন আমি তােমাকে দুর্গের বাহিরে লইয়া আসিতে
ছিলাম, সে সময় যে দস্যু আমাকে দেখিয়াছিল, সে দসর্দারের
কানে এই কথা তুলিয়াছে। যাহা হউক সে জন্য আমি দুঃখিত
নহি জানবে। আমি এ স্থান হইতে পলাইয়া যাইতে পারিতাম
ও এখনও যাইতে পারি। কেহ বিন্দুমাত্র জানিতেও পারিবে
, কিন্তু আমি পলাইব না। যদি জিজ্ঞাসা কর কেন? তাহা
হইলে বলিব—আমার হৃদয় দুর্বল নহে। দোষ করিয়াছি, তাহার
শান্তি লইতে কুণ্ঠিত নহি। জানি কল্য প্রাতে আমার মৃত্যু
নিশ্চিত, তবুও চোরের মত পলাইব না। জীবনে যে কত অপকর্ম
করিয়াছি—তাহার ইয়ত্তা নাই। এক্ষণে ফল ভােগ করিতে হইবে,
সেজন্য কাতর নই।
যাক তােমাকে একটা কথা বলি। যদি কোন দিন তােমার
সহিত সাক্ষাৎ হয়, তাহা হইলে সে কথা বলিব মনে করিয়াছিলাম,
বহুদিন হইতেই হৃদয়ে সে ইচ্ছা ছিল। আজ সে আশা পূর্ণ
হইতে চলিল।
মা! তুমি আমারই কন্যা। তখন তুমি দুই বৎসরের শিশু।

এমন নগেন্দ্র-নন্দিনী তুমি, তােমার প্রসূতি, ও আমি গগনে গােপালনগর- তােমার মাতুলালয় যাইতেছিলাম। সঙ্গে কিছু টাকা কড়ি ও তােমার মাতার শরীরে যথেষ্ট অলঙ্কার ছিল। কারণ তােমার মাতামহ ধনী লােক ছিলেন। ধনীর কন্যা পিত্রালয়ে আসিতেছে, এ সংবাদ চতুর্দিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িয়াছিল। তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। আমরা একটি সুদীর্ঘ ও নীবিড় বন পার হইতেছিলাম। দুই ধারে বন, মধ্যে অপ্রশস্ত পথ। সময় কতকগুলি লােক হাতে মােটা মােটা লাঠি আমাদের নিকট হইতে প্রায় পঞ্চাশ হস্ত দূরে আসিয়া দাঁড়াইল। ইত্যবসরে গােযানেয় পশ্চাৎদিকের ঢাকনা খুলিয়া ফেলিয়া নামিয়া, গাড়ীর বিপরীতাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। যে পথে আসিয়া- ছিলাম, সে পথ ধরিয়া আর গমন করিলাম না। বহুদূর গমন করিবার পর, একটি পুষ্করিণী দেখিতে পাইলাম। তখন চাঁদ উঠিয়াছে। তােমার মাতা ধনীর কন্যা। কখন পথ হাঁটে নাই। সুতরাং তাহার ক্লান্তি আসিল। পুষ্করিণীর সােপানে বসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলাম। পুষ্করিণী হইতে শীতল বারি লইয়া আসিলাম, সে পান করিল, কিঞ্চিৎ কপােল সিঞ্চন করিল। হঠাৎ দূরে যেন কাহাদের কোলাহল শুনিতে পাইলাম। ভাবিলাম বুঝি দস্যগণ আমাদের অনুসন্ধানে আসিতেছে। ভয় হইল, সেখানে আর অধিকক্ষণ তিষ্ঠিতে পারিলাম না। সে স্থান ৫৭

নগেনন্দিনী
হইতে অবিলম্বে পলাইলাম। কিছুদূর গমন করিলাম, তবুও
কোলাহল নিকটে বােধ হইতে লাগিল। আমরা শেষে দৌড়াইতে
লাগিলাম, দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া শেষে যখন বনের অপর প্রান্তে
আসিয়া পৌছিলাম, তখন তাহাদের কোলাহল আর শােনা
গেল না। হঠাৎ তােমার মা কঁদিয়া উঠিল। বলিল—
আমার মেয়ে ? তখন আর কি বলিব খুঁজিয়া পাইলাম না।
বিশ্ব সংসার অন্ধকার দেখিলাম। মনে হইল, চন্দ্র সমস্ত আকাশ
জুড়িয়া উষ্কাবেগে বৃত্তাকারে ঘুরিতেছে।
ঘুরিতেছে। মাথায় হাত দিয়া
বসিয়া পড়িলাম। তখন আর কি করিব । যদি তােমার
সন্ধানে গমন করি, তাহা হইলে তােমার জননীকে কোথায়
একা রাখিয়া যাইব। পরন্তু তোমার মাতাকে
সঙ্গে লইয়া
অনুসন্ধান করিতে যাওয়াও বিপজ্জনক । আগত্যা ফল্য তােমার
সন্ধান হইবে এইরূপ আশ্বাস দিলাম। যে স্থানে আমরা গিয়া
পৌছয়াছিলাম, সে স্থানে মনুষ্যের বসতী নাই। দূরে একটা
জীর্ণ ও পুরাতন শিব মন্দির দেখিতে পাইলাম। মন্দর মধ্যে
শিব লিঙ্গ নাই, ঘরের কপট ও নাই। কি করিব ভয়ে ভয়ে
অন্ধকারেই রাত্রি কাটাইলাম। পরদিন সেই স্থানে তোমার
মাতাকে রাখিয়া সেই পুণীর নিকটে তােমার অনুসন্ধানে গমন
করিলাম।
কিন্তু বৃথাই হইল। হতাশ হয়ে ফিরিয়া আসিলাম।
as

নগেন্দ্র-নন্দিনী
তােমার মাতা কাদিতে লাগিলেন। সে স্থানে আর অধিক
তিষ্ঠাণসুবিবেচনা মনে করিলাম না। এ পর্যন্ত কাহারও আহার
হয় নাই। সুতরাং গ্রামের অনুসন্ধানে গমন কমি। গ্রামও
পাইলাম। গ্রামে আসিয়া আবার তােমায় অনেক অনুসন্ধান
করিলাম কিন্তু তােমার কোন সংবাদ পাইলাম না। পরদিন গৃহে
ফিরিয়া গেলাম। দুই দিবস পরে তােমার মাতা মারা গেলেন।
মনে বড় অশান্তি জন্মিল। সংসার পরিত্যাগ করিয়া পথে বাহির
হইলাম।
যে পথে দস্যগণের সহিত সাক্ষাৎ হইয়াছিল, সেই পথ
ধরিয়া যাইতেছিলাম। একদল দস্যও সে পথে যাইতেছিল।
তাহাদের সহিত আলাপ হইল। তাহাদের দলে দলভুক্ত হইলাম।
তুমি আশ্চর্য্য হইলে বােধ হয়—আমা? এইরূপ মতিচ্ছন্ন ধরিয়াছিল
কেন? বােধ হয় জান না। যদি কোন দিন তােমার অনুসন্ধান
করিতে পারি—এই আশায় দস্যুদলে দলভুক্ত হইলাম। এই রূপে
বহুদিন গেল। কিন্তু তােমার সন্ধান পাই নাই। যাহা হইবার
তাহা হইয়াছে সেজন্য দুঃখ করিও না। অদৃষ্টের লিখন খাইবে
তাহ না হইলে রামচন্দ্র—যিনি নারায়ণের অংশ
তিনি সীতা হারাইবেন কেন? সকলই কগানের দোষ। তাহা
না হইলে পােড়। মাছ কখন জীবিত হইয়া জল মধ্যে পলাইতে
পারিত না, অভিমনুও যুদ্ধে মারা যাইত না। যা তােমার
সহিত আর সাক্ষাৎ হইল না। সুখের বিষয় এই যে তােমাকে

নগ-নন্দিনী
জীবনে আর একবার দেখিতে পাইলাম। তুমি শীঘ্র ঐ স্থান
পরিত্যাগ করিয়া যাইবে। কারণ আমাকে মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত
করিয়াও তাহারা ক্ষান্ত হইবে না। নিশ্চয় তাহারা তােমার
অনুসন্ধান করিবে। মা ! তবে বিদায়-আশীৰ্বাদ করি তুমি
স্বামীর চরণতলে নির্বিঘ্নে ফিরিয়া যাও। আর কি আশীর্বাদ
করিব, স্ত্রীলােকের ঐ আশীৰ্বাদই ভাল। ইতি।
তােমার হতভাগ্য পিতা।
পত্র পাঠ সমাপনান্তে নন্দিনীর চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল।
ক্রমে শােক বেগ অসহ্য হইল। মুচ্ছিত হইয়া ভূমির উপর
লুটাইয়া পড়িল।

কি না? ষােড়শ পরিচ্ছেদ রজনী গভীর ও ভীষণা। আকাশমণ্ডল ঘাের কৃষ্ণবর্ণ মেঘ পুঞ্জে ছাইল। গ্রাম, মাঠ, বন, নদী, পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইল। কচিৎ বাতাসের প্রবল তাড়না হেতু মেঘপুঞ্জের দ্রুত সঞ্চালনে তাড়কাবলি মুহূর্তের জন্য নয়ন পথে পড়িয়া আবার অদৃশ্য হইল। শোঁ শোঁ শব্দে বায়ু গর্জিতে লাগিল। মৰ্ম্মর ধ্বনি আরম্ভ হইল। এই ভীষণা রজনীতে নন্দিনী একাকী এই নির্জন বন-প্রদেশে। অন্ধকারে পথ লক্ষ্য হয় না। ধীরে ধীরে চলিয়াছে। কখন কোন শব্দ হেতু পশ্চাৎ পানে ফিরিয়া দেখিতে লাগিল, কেহ আসিতেছে নন্দিনীর হৃদয় ভয় শূন্য। আজ আর প্রাণের মায়া নাই। নগেন্দ্রনাথ গৃহত্যাগী হইয়াছেন, পত্রে জানিতে পারিয়া সে আজ পথে বাহির হইয়াছে। আজ নন্দিনী মরিবে সংকল্প করিয়া গৃহ ত্যাগ করিয়া পথে আসিয়া দাঁড়াইল। আজ শৃগালের উচ্চররে, বায়ুর বিক্ষুব্ধ গর্জনে, বৃক্ষের মর্মর ধ্বনিতে, ভয় নাই। মাথার উপর পেচক গম্ভীর আরাবে ডাকিয়া উঠিল। ও: কি। নন্দিনী তােমার ভয় নাই। তুমি চলিয়াছ -কোথায়? শৃগালের শব্দ শুনিলে না। তবু যাইতেছ। তােমার ভয় পাইতেছে না! পদে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃক্ষ, লতা, কাটা, বাধা দিতেছে, তথাপি বৃক্ষের বাধা, লতার বিসর্পি বন্ধন, কঁাটার যাতনা, উপেক্ষা করিয়া আজ চলিয়াছ—কোথায় ? ৩১ নগেন্দ্র-নন্দিনী হঠাৎ বন-মধ্যে মড় মড় করিয়া শব্দ হইল। নন্দিনী শিহরিয়া উঠিল। মুহূর্তের মধ্যে ভীষণ গর্জনে ঝড় আসিয়া দেখা দিল। প্রথমে পট পটু তারপর মূষল ধারে বৃষ্টি নামিল। শৃগাল বিবরে লুকাইল, পতঙ্গ পত্রের আড়ালে আশ্রয় লইল, চন্দ্রমা মেঘের মধ্যে আশ্রয় খুজিয়া লইল, কিন্তু নন্দিনী নিরাশ্রয়া। তাহার সমস্ত দেহ জলসিক্ত হইল, শীতে থর থর কপিতে লাগিল। বর্ষনশীল ঘোর তমােময়ী মেঘপুঞ্জ হইতে সৌদামিনী প্রকাশিল । গুরু গুরু রবে মেঘ গর্জন করিয়া উঠিল। নন্দিনী ভাবিল-“বুঝি জীবন বেলা শেষ হইয়া আসিয়াছে। আর বিলম্ব নাই। হায়। সে কোথায় আর আমি কত দুরে। তাহার সঙ্গে জীবনে বােধ হয়, আর সাক্ষাৎ হইল না।” নন্দিনী সারা জীবন কাদিয়াছে- এখনও কাদিতে লাগিল। ক্রন্দনের বিরাম নাই। আর অল আর বিরাম মানিতে চাহে না। শােকবেগ উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পচালনেরশক্তি কোথায় -অন্তর্হিত হইয়া গেল। নন্দিনী বসিয়া পড়িল। বসিয়া বসিয়া কাদিতে লাগিল। এদিকে বৃষ্টি থামিরা গেল, ঝড় হ্রাস পাইল। মেঘও কাটিয়া গেল। সেই মীম আকাশ হইতে চন্দ্রদেব দেখা দিলেন। নীলগগণ চন্দ্রালােকে স্নাত হইয়া হাসিতে লাগিল। চন্দ্রালােকে দেখিতে পাওয়া গেল, আশ্রয়হীনা নন্দিনী পথিপার্শ্বে ধূল্যবলুষ্ঠিতা লতিকার ন্যায় ধুলায় লুষ্ঠিত।

= সপ্তদশ পরিচ্ছেদ পুরী যাইবার প্রশস্ত পথ । পথের ধারে বৃক্ষশ্রেণী। দূরে- ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড় শ্রেণী চলিয়া গিয়াছে। কাকড় বিছান পার্বত্য পথ। এই পথের পার্শ্বেই নন্দিনী মূৰ্ছিতা অবস্থায় পড়িয়াছিল। ক্রমে ভাের হইল। পথভ্রমণজনিত শাস্তি হেতু নন্দিনীর দেহ অবসন্ন, চক্ষু কোটরাগত। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়িতেছে। বােধহয় নন্দিনীর আসন্ন কাল সমুপস্থিত। নন্দিনী চক্ষু বুজিয়া আছে। তন্দ্রাবস্থায় তাহার মনে হইল—যেন একটা প্রকাণ্ড শ্বেত হস্তী ধীরে ধীরে তাহাকে শুণ্ডে করিয়া পৃষ্ঠে তুলিয়া, কোথায় লইয়া চলিল। হস্তী চলিয়াছে, তারপর বহুদূরে এক মনােহর কুঞ্জ মধ্যে তাহাকে নামাইল। নন্দিনীর তন্দ্রা ঘাের কাটিয়া গেল। বােধ হইল যেন তাহার মস্তক এক টী কোমল স্থানে রক্ষিত হইয়াছে। চাহিয়া দেখিল, কাহার জানুপরি তাহার মস্তক সুযত্নে রক্ষিত হইয়াছে। নন্দিনী পাশ ফিরিয়া চাহিতে দেখিল, একটা গুম্ফ শ্বযুক্ত সন্ন্যাসী ধীরভাবে তাহার মুখপানে চাহিয়া আছেন। সন্ন্যাসী নন্দিনীকে ঈষৎ নড়িতে এবং চক্ষুন্মীলন করিতে দেখিয়া ডাকিলেন- "নন্দা ?” সে স্বরে নন্দিনী চমকাইয়া উঠিল, বলিল-“কে? কে আপনি ?”

নগেনন্দিনী
সন্ন্যাসী নন্দিনীর মুখপানে স্থীর দৃষ্টিতে চাহিয়া, ধীরকণ্ঠে
বলিলেন-“না-আমি।*
নন্দিনী অধিরভাবে বলিয়া উঠিল—“কে? কে তুমি? বল।
বল কে তুমি?”
मामी বলিলেন, “না—আমি। আমাকে চিনিতে
পারিতেছ না। আমি তােমার স্বামী। উত্তেজিত কণ্ঠে নন্দিনী
বলিল, “কে। স্বামী। নন্দার স্বামী ! প্রভু।
সন্ন্যাসীর চক্ষু সজল হইয়া উঠিল। এই সন্ন্যাসী নগেন্দ্রনাথ।
পূৰ্বে উক্ত হইয়াছে, তিনি সন্ন্যাসী বেশে গৃহ ত্যাগ করিয়া যান।
তিনি পুরী যাইতেছিলেন। তাঁহার সঙ্গী সন্ন্যাসীগণ অগ্রে গমন
করিলে তিনি পশ্চাৎ যাইতেছিলেন। পথে নন্দিনীকে পড়িয়া
থাকিতে দেখিয়া, এই ছায়াযুক্ত নির্জন স্থানে
আসেন।
নন্দিনীর মৃত্যুকাল আসন্ন। নন্দিনী দিতে লাগিল।
সে কান্নার বিরাম নাই। আজ কত দিন পরে, স্বামীকে পাইয়া
ক্ষত হৃদয় উছলাইয়া উঠিতে লাগিল। নগেন্দ্রনাথও কাদিতে
ছিলেন। অপূর্ণ নয়নে তন্ময়চিত্তে নন্দিনীর মুখপানে চাহিয়া
দেখিতেছিলেন—“তাহার সেই না।”
নন্দিনীর শােকবেগ উপশম হইলে, বলিল, “প্রভু, আপনার
এ বেশ কেন?
E

নগেন্দ্র-নন্দিনী
নগেন্দ্রনাথ কি বলিবেন?
মহা গণ্ডগােলে পড়িলেন।
নন্দিনী নগেন্দ্রনাথকে নীরব থাকিতে দেখিয়া বলিল-“আমাকে
বলিলে না। আমি তার জিজ্ঞাসা করিতে আসিব না।”
নগেন্দ্রনাথের চক্ষু সজল হইয়া উঠিল। সব খুলিয়া বলিলেন ।
নন্দিনী হাসিল ।
বহুদিন সে হাসে নাই-আজ একবার হাসিল। যেন
ঘোর তমমাময়ী রজণী কাটিয়া চন্দ্রোদয় হইল। যেন অন্ধকারের মধ্য
হইতে আলােক ছটা দেখা দিল। নগেন্দ্রনাথ বহুদিন সে হাসি
দেখেন নাই-- আজ তন্ময়চিত্তে সে হাসি দেখিতেছেন ?
নন্দিনী বলিল-প্রভু, বলিয়াছিলাম তােমার নন্দ। তােমার
এর দর্শন না করিয়া মরিবে না। মনে আছে?”
নগেন্দ্রনাথ মৃদু স্বরে বলিলেন, “আছে।”
নন্দিনী বলিল—“আমার আসন্নকাল উপস্থিত। আমি আর
অধিকক্ষণ বাচিব না।”
নন্দিনীর মুখে এই কথা শুনিয়া, তাহার প্রাণ কাপিয়া
উঠল। চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল। নন্দার ওষ্ঠে, গণ্ডে,
বক্ষে, সে জল পড়িল । নন্দা বলল, “প্রভু—সারা জীবন কাদিয়া
কাটাইয়াছি। আর কঁাদিও না। তােমার হাসি-মূখ দেখিয়া
ম'র। তােমার পদরেণু 'আমার মাথায় দাও' বলিয়া নগেন্দ্রের
চরণের প্রতি হস্ত প্রসারণ করিল। নগেন্দ্রনাথ পদদ্বয় বাড়াইয়া

নগেনন্দিনী
তারপর বলিতে
দিলেন। নন্দিনী মস্তকে পদধূলি লইল।
লাগি “আমি চলিলাম-মনে দুঃখ করিও না। আমার বড়
সাধ ছিল, তােমার চরণ দর্শন করিয়া মরিব। সে সাধ আজ
মিটিল। আমার আর কোন দুঃখ নাই। তুমি আর কঁাদিও
না। আমাকে শান্তিতে মরিতে দাও। তােমার হাসিমুখ দেখিয়া
মরি
নগেন্দ্রনাথ কেবল কাদিতেছিলেন, কোন কথা বলিতে
পারিলেন না। বহুবার কথা বলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু
বাক্যক্তি হইল না। যাহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, তাহার
কথা বলিবার শক্তি কোথায়? এদিকে নন্দার ঘন ঘন শ্বাস
বহিতে লাগিল। নগেন্দ্রনাথ বুঝিলেন, নন্দার আর বিলম্ব নাই
বহু শােকবেগ দমন করিয়া নগেন্দ্রনাথ
ডাকিলেন, “না।” আর কিছুই বলিতে পারিলেন না।
নিরু বাম্পবেগে তাহার কণ্ঠ রুদ্ধ হইল। তাহার বক্তব্য বল
হইল না, কেবল চক্ষু দিয়া জল পড়িতে লাগিল। ক্ষীণকণ্ঠে
নন্দিনী উত্তর দিল, “প্রভু আর কিছুই বাহির হইল না।
চক্ষু দিয়া বারি ঝরিভে
ঝরিতে লাগিল। হঠাৎ নিমেষ মধ্যে
চক্ষুর আল থামিয়া গেল। চকু স্থির, নিস্তব্ধ হইল। নগে
বুঝিলেন-সব শেষ হইয়াছে।

উপসংহাৰ
নলিনী বহুদিন মারা গিয়াছে, নগেন্দ্রনাও কোথায় চলিয়া
গিয়াছেন। নগেন্দ্রনাথের উদ্যান মধ্যে সরােবর খনন হইয়াছে
সরােবরের জল নীলাকাশের মত অচ্ছ। জলে পদ্ম শালুক
ফুটিয়াছে। সােবরের চারি পাড়ে মখমলের মত কোমল তৃণে
"আচ্ছাদিত। তাহার মধ্যে মধ্যে তাল নারিকেল বৃক্ষ দাড়াইয়া
আছে। উদ্যানের মধ্যে কত ফুলের কেয়ারী। সােপানশ্রেণী
মার্বেল প্রতৰ নিৰ্মিত। সােপানােপরি মঞ্চের উপর মাধবীলতার
ছাউনি। কোথাও উচ্চ বেদীর উপর সিংহের, ব্যারে, পরীর
মৃত্তি রহিয়াছে। সন্ধ্যা তখন হয় হয়। একটা সন্ন্যাসী এই
উদ্যানে ঘুরিয়া ফিরিয়া সমস্ত পরিদর্শন করিয়া বেড়াইতে
ছিলেন। শেষে সবােবরের সােপানােপরি যে, বৃহৎ মার্বেল
প্রস্তর নির্মিত একটা স্তম্ভ আছে, সেই স্থানে আসিয়া পৌছিলেন।
শুয়ে বড় বড় অক্ষরে কি লিখা আছে, তাহা পড়িতে লাগিলেন।
নগেন্দ্র নন্দিনী সরােবর
এই সরােবর বাঙ্গালা ১৩৩ অব্দে নন্দীগ্রামের জমিদার
শ্ৰীযুক্ত বাবু নগেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয়, ও তাহার প্রিয়তমা পত্নী
“নন্দিনীর পূণ্য মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠা করিলাম।
ঐশচীনাথ দত্ত।
১৩৩ অকের ১৪ বৈশাখ
নন্দীগ্রাম।

নগেনমিনী,
পড়িয়া, সন্ন্যাসী গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন। ধীরে ধীরে
করে নিয়ে আসিয়া বসিলেন। বলিয়া দিতে লাগিলেন।
অনেকক্ষণ কাদিলেন। কেন কাদিতে ছিলেন, বলিতে পারি না।
অনেকক্ষণ স্তম্ভের পানে চাহিয়া চাহিয়া দেখিলেন। তন্ময় চিতে
দেখিতেছিলেন। সে অক্ষরে কি ছিল, তাহা সন্ন্যাসীই জানেন।
নন্দিনীর মৃত্যু হইয়াছে, নগেন্দ্রনাথ ত অনেক দিন কোথায়
চলিয়া গিয়াছেন। তবে সন্ন্যাসী কাদিতেছেন কেন? এষে
কেবল স্মৃতিমাত্র।
সন্ন্যাসী, নগেন্দ্র ও নন্দিনীকে বােধ হয় চিনিতেন। সন্ন্যাসী
কঁদিতে কাদিতে সেখান হইতে উঠিলেন। ধীরে ধীরে সােপান
বাহিয়, এল সন্নিকটে গমন করিলেন।
মুখ হও প্রক্ষালন
করিলেন, কিন্তু কালে পদ স্পর্শ করিলেন না। কেন—জানিনা।
তাহার পর অন্তের নিকটে আসিয়া বসিলেন। বসিয়া সন্ধ্যাহিক
করিতে লাগিলেন।
সন্ধ্যাহিক সমাপনান্তে, দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া
ৰ-গভীরশ্বরে চিৎকার করিয়া ডাকিলেন—‘নন্দিনী।
উত্তর দিল না। তিনি উদ্যান হইতে বাহির হইয়া চলিয়া
গেলেন কোথায় ? ফোনে।
সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

Nagendra-nandini

Author
Singha, Lalitmohan
Title
Nagendra-nandini
File name
Nagendra-nandini
Text
OCR done
Citation
1928
Published
2010/03/19
Publisher
Barendra Library, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
79
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Singha, Lalitmohan
DLI number
511229
Barcode
4990010018396.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
aLUMH7vSwDu
Download PDF

Nagendra-nandini