Makardah Saraswat Library, Howrah
Tatinir Bichar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
তটিনীৱ বিচার
সামাজিক নাটক
শ্রীশচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
পাঁচসিকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ হইতে
শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য্য দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০৩১১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
তটিনীর বিচার নাটক
যারা অভিনয় দিয়ে
ফুটিয়ে তুলেছেন,
‘তটিনীর বিচার’
। দেরই করকমলে
অর্পণ করলাম।
No text on this page.
অল্-ইণ্ডিয়া-রেডিওর (কলিকাতা ষ্টেশন ) নাট্যবিভাগের অধ্যক্ষ
শ্ৰীযুক্ত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এই নাটকের নামকরণ করেছেন।
এই নাটক মঞ্চস্থ করা সম্ভবপর করেছেন কল্যাণীয় শ্ৰীমান বিদ্যাধর
মল্লিক।
এই নাটকের গান রচনা করেছেন সু-কবি শৈলেন রায় ; গানে সুর
সংযােজনা করেছেন সুরশিল্পী তুলসী লাহিড়ী, নৃত্য পরিকল্পনা করেছেন
নৃত্যশিল্পী ললিত গোস্বামী।
এদের সকলের সাহায্য নাটকখানিকে সাফল্যম করেছে। সকলের
কাছেই আমি ঋণী রইলাম।
নীত
চীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
৮৪১২ গ্রে ঠুট
কলিকাতা
No text on this page.
—চরিত্র ডক্টর ভােস বসন্ত সমর প্রসিকিউসন কাউন্সেল শ্ৰীঅহীন্দ্র চৌধুরী শরতীন বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীজহর গাঙ্গুলী শ্ৰীসন্তোষ সিংহ তারা ভট্টাচাৰ্য শ্রীনৃপেন চক্রবর্তী ঐবিজয়কার্তিক দাস ডিফেন্স কাউন্সেল জজ টক্সিকোলজিষ্ট পুলিশ ইস্পেক্টর প্রভাত... :: সৌরীণ ঋতুসীবর্তী হেমেন অমর হরিশ তটিনী ললিতা কৃষ্ণভামিনী হরমােহিনী কলিকা প্রতিভা নলিনী। হিমানী বিজয় মুখােধ্যার শ্রীবেচু সিডনী শ্রীনবদ্বীপ 3ণর শ্রীজ্যোৎকুলার মুখােপ্যায় শ্রীসুধাংশু মিত্ত শীতীন দাস মতী রাণীবালা শ্ৰীমতী পদ্মাবতী শ্ৰীমতী রাজলক্ষ্মী (বড়) শ্ৰীমতী সুহাসিনী শ্ৰীমতী ঊষা দেবী শ্ৰীমতী সাবিত্রী দেবী শ্ৰীমতী জ্যোতি শ্ৰীমতী গৌরী দেবী
No text on this page.
তটিনীৱ বিচার
প্রথম পর্ব
সাহেবী ধাঁচের একটি হােটেলের নিভৃত কামরা। গ্রাউণ্ড, গাসের পার্টিশান।
সুইং হাফডাের। দেয়ালে ছবি। মাঝে খাবার টেবিল =বিধবে টেবিল
ক্লথ। টেবিলের ওপরে ভাসে ফুল। চারিদিকে | দুয়ার
ঠেলিয়া একটি তরুণ প্রবেশ করিলতার পিছনে
একটি তরুণী।
তাহার হাতে একখানা বই
আর একখানা খাতা। তরুণের সাহেব।
পােষাক, তরুণীটির বাঙা, পরিচ্ছদ।
তরুণের নাম বস আর
তরুণীর টিনী
মন খুলে কথা কওয়া যাবে।
বসন্ত। বেশ নিরিবিলি ঘরটি।
দাও তােমার বই আর খাতা।
তটিনীর হাত হইতে বই আর খাতা লই
মালিক সমেত এগুলাে আজ রাত নটা অবধি আমার কাছেই
থাকবে।
তটিনীর বিচার
তটিনী। ওগুলাে তুমি চিরদিনের মত রেখে দিতে পার—কিন্তু
মালিককে মাত্র একটি ঘণ্টা।
বসন্ত। Fixed up for the rest of the night, eh?
তটিনী। হঁ !
তটিনী আশির সামনে গিয়া দাঁড়াইয়া কেশ বেশ ঠিক
করিতে লাগিল। বসন্ত বিস্ময় প্রকাশ করিয়া তাহার
দিকে ফিরিল।
মা আজ সকাল সকল বস্ট ফিরতে বলেছেন।
বসন্ত তটিনীর চিবুক নড়িয়া কহিল ।
বসন্ত। এখকার খুকীদের মায়ের কথা শুতে নেই।
তটিনী। জানি, তা না শুনলে থােকারা খুবই খুসী হয়।
বসন্ত। সত্যি তটিনী, মায়ের আঁচল যতদিন তােমাদের ঢেকে রাখবে...
তটিনী। ততদিন তােমরা বেপরােয়া আমাদের অপমান করতে
পারবে না। না ?
ও অপবাদ দিয়াে না তটিনী। আমরা তােমাদের পূৰী ।
পূজো করতে পেলেই ধন্য হই।
তটিনী'। হু।
তটিনী চেয়ারে বসিল
তটিনী। শৈলেশ সেনকে চেন?
কে শৈলেশ সেন ?
তটিনীর বিচার
০
তটিনী। আমাদের সঙ্গে পড়ে।
বসন্ত। হাঁ, হাঁ, চিনি বৈকি! Is that lucky dog your latest
fancy?
তটিনী।
সে আজ আমায় অপমান করেছে।
বসন্ত। শৈলেশ আমারাে বন্ধু। কিন্তু তােমার জন্যে তার সঙ্গেও
আমি ডুয়েল লড়তে পারি।
তটিনী। তাকে বলল যে, নােংরামাে আর রসিকতা এক নয়।।।
দুয়ের প্রভেদ যখন বুঝবে, তখন যেন রসিকতা করতে এগিয়ে আসে।
বসন্ত। কিন্তু শৈলেশ তাে খাসা ছেলে।
utati A vulgar buffoon. I hate him!
বসন্ত। আমায় তুমি বড্ড বেশী খুসী করলে সৃষ্টিনী
তটিনী। মানে ?
বসন্ত। তােমার দু-চোখে যত তরুণের ছায়া পড়ৰে সবাই যাতে
তােমার ঘৃণার পাত্র হয়, তাইত আমি চাই।
তটিনী। কেন?
বসন্ত। বিনা দ্বন্দ্বে তোমাকে জয় করতে পারব বলে ।
তটিনী। Dont be too sura!
বসন্ত। তাহলে ?
তটিনী। বল তাহলে? ?
বসন্ত। তাহলে এমন কেউ আছে যাকে তুমি ঘৃণা কর না?
তটিনী। থাকতেও পারে !
* বসন্ত। দেখতে কেমন ?
r
তটিনীর বিচার
তটিনী। তােমার মতাে সুন্দর নয়।
বসন্ত। টাকা পয়সা ?
তটিনী। তােমার তুলনায় কিছুই নেই।
বসন্ত। বিদ্যে বুদ্ধি ?
তটিনী। ইংরিজিও ভাল জানে না।
বসন্ত। তাহলে প্রাংশুলভভ্য ফলে লােভাং উদ্বাহুরিব বামন—তার
ধৃষ্টতা কেন ?
তটিনী। প্রজাপতির নির্বন্ধ বলা তাে যায় না। হয়ত তাকেই
বিয়ে করতে হবে।
বসন্ত। Never! কোনমতেই আমি তা হতে দেব না।
বসন্ত উঠিয়া দাড়াইল
তটিনী। দান করবার যার অধিকার আছে, তিনিই দেবেন।
তােমার মতামত বিবেচ্যও নয়, বিচাৰ্য্যও নয়।
7981 But I can stab him, I can shoot him, I can
send him to the dogs !
উত্তেজিত হইয়া টেবিল চাপড়াইতে লাগিল। টিলী ..
খিলখিল করিয়া হাসিল
তটিনী। দেখলে কত সহজে তুমি তেতে ওঠ।
বসন্ত। যুদ্ধের ঘােড়া বাজনা শুনলেই মেতে ওঠে। আর আমরা
তেতে উঠি প্রণয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর সন্ধান পেলে।
দুরে সরিয়া গেল।
৪
তটিনীর বিচার
তটিনী। হাঁ, ছায়ার সঙ্গে লড়তে চাও, এমি বীর তােমরা !
বসন্ত। ছায়া ! তাহলে ব্যক্তিটির অস্তিত্বই নেই বল ?
তটিনী। আজও চোখে দেখিনি।
বসন্ত। My God! তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছিলে! বয় !
বয় প্রবেশ করিল
হুইস্কি !
বসন্ত ছুটি।
বয় চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল।
ধরিয়া নীচু গলায় কহিল
দেখাে, আউর লিকার।
বয় চলিয়া গেল। তটিনীর কাছে ফিরিয়া আসিয়া
কহিল
আমি তােমাকে বলে রাখচি তটিনী, ঠাট্টা করেও তুমি এ সব কথা বলে।
না। মমরিয়া হয়ে কোনদিন হয়ত ভয়ানক একটা কিছু আমি
করে ফেলব।
তটিনী। মােটেও ভয় পেলুম না।
বয় প্রবেশ করিল। হুইস্কি ও সােড়া মিশাইয়া দিল।
ছোট গ্লাসে লিকার ঢালিল। লিকারের গ্লাসটি বসন্ত
হাতে তুলিয়া লইল।
বসন্ত।
কেন ?
তটিনী। ভয়ানক কিছু করবার মত সাহস তােমার নেই।
বসন্ত। যাকগে, একটুখানি লিকার। তটিনী ?
৫
তটিনীর বিচার
তটিনী। আমি কি ওসব খাই ?
বয় চলিয়া গেল
বসন্ত। But this is specially meant for Ladies.
,
তটিনী। আমি লে-এ-ডি নই।
বসন্ত। কিন্তু তুমি প্রগতিশীল। You should have no
Scruples.
তটিনী। থাম, থাম, অত বাজে বােকো না।
বসন্ত লিকারের গ্লাসটি উচু করিয়া ধরিল
বসন্ত। It is a pity you refuse it! আমি যখুনি এই
লিকার দেখি, তখুনি আমার মনে হয়
| ৫৫
তটিনীর দিকে চাহিয়া চুপ করিল
কি মনে হয় জান তটিনী ?
তটিনী। তােমার মনের খবরে আমার কি কাজ ?
বসন্ত। মনে হয় কোন তরুণীর গােলাপী অধর নিংড়ে যেন এ বার
করা হয়েছে। তাই এর স্বাদ মিঠে, এর রঙ গােলাপী, এর নেশায়
গােলাপী আমেজ।
তটিনী। Excuse me. I must be off now !
বলিতে বলিতে তটিনী উঠিয়া দাড়াইল। বসন্ত তাহার
হাত ধরিল
বসন্ত। You must not !
তটিনীর বিচার
তটিনী। আমি এসব দেখতে অভ্যস্থ নই।
উঠিয়া তটিনীকে বসাইয়া দিল
বসন্ত। আহা! বােস, বােস। জান, তােমার জন্য এ-সবই আমি
ছাড়তে পারি? বয় !
বসন্ত গ্লাস
তটিনী বসিল। বয় প্রবেশ করিল।
দেখাইয়া কহিল
Drink নেহি মাংতা হায়। লে যাও।. I shall go dry !
বয় চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল
দেখাে দোঠো আইসক্রীম ! গােলাপীওয়ালা।
বয় চলিয়া গেল
Now, pray, look nice, তুমি যা পছন্দ করাে না, আমি তা কোন
কালেও করব না।
তটিনী। চল এবার উঠি
বসন্ত। বাঃ আইসক্রীম আনতে গেছে যে। আইসক্রীমের রঙ
গােলাপীও হয়, স্বাদও মিঠে বটে; কিন্তু স্পর্শটা ঠাণ্ডা বলে আমেজ
আনে না...Excuse me Tatini, এক শ্রেণীর মেয়েও ঠিক
ওই রকম।
তটিনী। কি রকম ?
৭
তটিনীর বিচার
বসন্ত। সুহাসিনী, সুমধুরভাষিনী, but cold, as cold
as ice-বরফের মত ঠাণ্ডা তাদের প্রকৃতি আর সেই কারণে যেন
তাদের পরশও।
২. তটিনী। তাই নাকি।
বসন্ত। দুএকটীর সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্টতাও ছিল।
তটিনী। এখন ?
বসন্ত। এখন সব সাইডিংয়ে পড়ে রয়েছে। শুধু মেইন লাইনটা
খােল রেখেচি তুমি আসবে বলে।
তটিনী। বলতে একটুও লজ্জা হচ্ছে না?
বসন্ত। I have been always frank with yon, cota pente
তােমার কাছে লুকোতে পারি না।
তটিনী। আইসক্রীম তত খাওয়া হােল। এবার চল।
বসন্ত। কেন, এত তাড়া কিসের ?
তটিনী। আমায় যে আজ দেখতে আসবে ।
বসন্ত। মানে।
তটিনী। মা আমার বিয়ে দিচ্ছেন।
বসন্ত। Really!
.
তটিনী। হাঁ। হবু বরের বাপ আজ এসে আমাকে দেখে যাবেন।
বসন্ত। Then I must order for a cocktail ! বয়।
উঠিয়া দরজার দিকে যাইতে উদ্যত হইল,
তটিনী। একটু আগেই যে বল্লে ওসব আর ছোবে না।
৮
তটিনীর বিচার
বসন্ত ফিরিয়া আসিয়া কহিল
বসন্ত। ও। ভুলে গিয়েছিলুম তটিনী। সত্যি এরই মাঝে তা
ভুলে গিয়েছিলুম।
তটিনী। এমনি ভুলের পর ভুলই ত চলবে ? চল, এবার যাই।
বসন্ত। বােস, বােস। এ বিয়ে ফস্কে গেলেও তােমাকে চিরকুমারী
থাকতে হবে না।
তটিনী। কে জানে?
ট
আগাইয়া গেল।
বসঃ
তটিনী উঠিয়া কয়েক পা
কুর্ণিশ করিয়া কহিল :
• বসন্ত। আমি আগে থেকেই আর্জি পেশ করে রাখচি।
তটিনী। Pooh !
তটিনী একদিকে সরিয়া গেল।
বসন্ত দৌড়াইয়া তাহার
কাছে গেল।
বসন্ত। কেন, আমাকে বুঝি পছন্দ হয় না ?
তটিনী। যাকে পছন্দ হবে, তাকেই বিয়ে করতে হবে ?
বসন্ত। তাই করাই উচিত। কেননা এ-ব্যাপারে পােষাকী আর
আটপৌরে দুই-ই চলে না।
তটিনী। চালাতে জানলেই চলে ।
বেসন্ত। তাই নাকি।
তটিনী। তােমার যখন সন্দেহ রয়েছে, তখন তুমি মােটেও মডার্ণ,
তটিনীর বিচার
নও। বৃথাই হাটকোট পর, মিছেই বান্ধবীদের নিয়ে হােটেলে এস।
তােমার মনে চেপে রয়েছে অতীতের জগদ্দল পাথর। কালের গতির সঙ্গে
তাল রেখে তুমি এগুতে পারবে না।
বসন্ত। কিন্তু আমি যা পারি তা আরও চমকপ্রদ।
তটিনী। কি পার, শুনি?
বসন্ত। এখান থেকে সােজা তােমাকে আমার বাড়ী নিয়ে যেতে
পারি। বলতে পারি, বৌ এনেচি, বরণ করে ঘরে তােল ।
তটিনী। তা তুমি পার না।
বসন্ত। কেন?
তটিনী। তুমি বামুণ আর আমরা কায়েত।
বসন্ত। দেহের ব্যবধান ঘােচাতে পারি আর জাতের ব্যবধান
পারি না?
তটিনীকে বাহুপাশে বঁধিল। তটিনী মুখ তুলিয়া
তাহার দিকে চাহিল।
বসন্ত। অমন করে কি দেখছ ? কি ভাবচ ?
তটিনী। ভাবচি, you are irresistible! দুর্ণিবার তােমার
আকর্ষণ।
বসন্ত। স্বীকার করচ ।
তটিনী। হাঁ। তােমাকে ধরা না দিয়ে উপায় নেই।
বসন্ত আনন্দে অধীর হইয়া দুবাহু উর্দ্ধে তুলিশ।
বসন্ত। হুররে! হুররে!
১০
তটিনীর বিচার
বাহিরে বহুকণ্ঠে ‘হুররে, হুররে’ প্রতিধ্বনিত হইল।
দরজা ঠেলিয়া চারজন তরুণ ও দুইজন তরুণ প্রবেশ
করিল।
প্রভাত। বাজী মাৎ। আমারই জিৎ। খাইয়ে দাও। খাইয়ে দাও।
পরেশ। আমিও বলেছিলুম। দাও খাইয়ে।
নলিনী। তটিনীর নাকি বাড়ীতে জরুরী কাজ ছিল !
প্রভাত। এই ত জরুরী কাজ।
কলিকা। বসন্তবাবুও শুনেছিলুম রােজ সন্ধ্যেয় বিলিয়ার্ড খেলেন।
বসন্ত। আজ্ঞে অভিযােগটা না শুনলে অপরাধ কবুল করি কি করে
বলুন।
নন্দ। বাবা, ডুবে ডুবে জল খাও তুমি !
বসন্ত। ডুবে জল খেলে ফুলে ঢােল হয়ে ভেসে উঠতে হয়। তাই
সজ্ঞানে সে কাজ আমি করব না। তবে প্রেম-পারাবারে হাবু-ডুবু খেতে
• খেতে একটি মুক্তোর সন্ধান আমি পেয়েছি।
নলিনী। বসন্তবাবুর সেই মুক্তোটি দেখবার সৌভাগ্য কি আমাদের হবে?
বসন্ত। আজ্ঞে না। দেখলেই হয়ত নােলক করে নাকে পরতে
বন, নলিনী দেবী।
কলিকা। আমরা কি সেকেলে মেয়ে যে নাকের ডগায় মােলক
ঝুলিয়ে পুরুষের চিত্ত দুলিয়ে দিতে চাইব ?
বসন্ত। ঠিক, ঠিক, কলিকা দেবী। চিত্তের চেয়ে বিত্তের
কেই যে আপনাদের ঝোঁক বেশী, তা আমি জানি। কিন্তু সে-কথা
থাক। অসময়ে এই অভিযানের অর্থ কি ?
1
১১
তটিনীর বিচার
প্রভাত। আমরা ছটার শাে’তে মেট্রোয় গেছলুম। পথে বেরিয়ে
আমাদের তর্ক হােলো তােমাকে নিয়ে। আমি বল্লুম তুমি এখানেই আছ,
ওরা বলে, না। পূরাে পেট ডিনার বাজী।
পরেশ। আমিও তােমাকে সমর্থন করেছিলুম।
প্রভাত। কৈ হে ডিনারের অর্ডার দাও।
পরেশ। And some drink.
বসন্ত। তাহলে তােমরা ডিনারে বােস। আমাদের বিদায় দাও।
প্রভাত। তা হয় না। তােমাদেরও খেতে হবে।
বসন্ত। আমরা এইমাত্র খেয়ে উঠচি।
নন্দ। আবার খাবে।
বসন্ত। পাগলামাে কোর না। এস তটিনী ।
নলিনী। তটিনীকে আমরা তাে ছেড়ে দিতে পাচিনে।
তটিনী। আমার ভাই বাড়ীতে জরুরি কাজ আছে।
কলিকা। দুটিতে বেশ ত বসেছিলে। আমরা এলুম বলেই না চলে
যাচ্ছ। ললিতাকে খবরটা পৌছে দোব ?
তটিনী। ললিত! ললিতা আবার কে ?
কলিকা। বসন্তবাবু, তটিনীকে ললিতার কথা বলেন নি ?
প্রভাত। আমি ভেবেছিলুম এখানে বসন্তর পাশে ললিতাদেবীকেই
দেখতে পাব।
বসন্ত। ললিতার আর থাকবার অধিকার নেই—কেননা তটিনী অ'র
pft we are engaged-engaged for marriage.
হেমেন। Engaged !
১২
তটিনীর বিচার
5163** i This is a news !
হেমেন। বড় সুখী হলুম তটিনী দেবী।
নন্দ। তাহলে ডিনারটা ওরাই দিচ্ছেন।
নলিনী। Congratulations Tatini.
.
কলিকা। Congratulations বসন্তবাবু।
প্রভাত। আমরা তাহলে আজ থেকে এখন থেকেই উৎসব শুরু করে দি।
হেমেন। A dance, Nalini, let's have a dance !
নন্দ। তটিনী-বসন্তর মিলন শুভ হােক।
নলিনী। সুন্দর হােক্।
কলিকা। সার্থক হােক্।
নাচের বাজনা বাজিল
প্রভাত। ওই ওদের নাচের বাজনা বেজে উঠল, আমরাই কি
fycat74 ? Pray, dont keep us waiting Nalini:
পরেশ। এই টেবিলে।
নন্দ। হাঁ, হাঁ, নলিকে ওই টেবিলে তুলে দাও। টেবিলে তুলে দাও।
-
১ম ও চতুর্থ নলিনীর দুইবাহু ধরিয়া টেবিলে তুলিয়া
দিল। নলিনী সেই টেবিলের ওপরই নালিতে লাগিল।
ইমন। গান। একখানা গান।
পরেশ + তটিনী দেবী গাইবেন কি ?
তটিনী। মাপ করবেন, আমাকে এখুনি যেতে হবে।
নলিনী,। আমিই গাইব। কিন্তু you must join the chorus
তটিনীর বিচার
নলিনী গান শুরু করিল।
নলিনীর গান
পুষ্পধনুর ইঙ্গিতে হায়, হারাণে। হিয়ার বনে
মন দেয়া-নেয়া খেলা চলে নিরজনে।
মায়ামৃগ যেন রচিতে ছলনা ছায়া,
বঁধা পল নিজে একি রে প্রেমের মায়া।
কোরাস
(দুজনে রচিল মিলন-স্বর্গ ধূলিতলে রমণীয়,
(দুজনার কাছে বন্দী দুজনে প্রিয়তমা আর প্রিয়।
অাখির মিলনে সারাদিনযামী ক্লান্ত না হয়ে অখি
আঁখির কুলায়ে চলে গাে আঁখির পাখী
দুজনে কূজনে একটি গানের কলি
অনাহত সুরে বারে বারে যায় বলি
দুজনে রচিল মিলন-স্বর্গ ধূলিতলে রমণ।য,
কোরাস {
দুজনার কাছে বন্দী দুজনে প্রিয়তমা আর প্রিয়।
১৪
তটিনীর ঘর
কৃষ্ণভামিনী বসিয়া একখানি বই পড়িতেছিলেন, ঘড়িতে রাত
এগারটা বাজিল। তটিনী প্রবেশ করিল। কৃষ্ণভামিনী
বিরক্তি প্রকাশ করিয়া বলিলেন।
কৃষ্ণভামিনী। কোথায় যাস, কি করিস, কিছুই আমি বুঝি না।
তটিনী। তােমাকে কি বােঝাব মা, আমি নিজেই কিছু বুঝতে
পারি না।
তটিনী টেবিলের ওপর বই আর খাতা রাখিল।
কৃষ্ণভামিনী। তারা তােকে দেখতে এসেছিল। ফিরে গেল।
তটিনী। বয়েই গেল।
কৃষ্ণভামিনী। ছিঃ ছিঃ ছেলের বাপ নিজে এসেছিলেন। মেয়ের
এখন বিয়ে দেব না বলে বিদেয় করে দিলুম। ডেকে এনে অপমান
করলুম !
অটিন ভালােই হয়েছে। এখাে আর কখনাে হবে না।
কৃষ্ণমিনী। ছেলেটি বড় ভালাে ছিল।
টিনী। ঢের ভালাে ছেলের সাথে আমার আলাপ আছে, মা।
কৃষ্ণভামিনী। তাই নাকি?
অটিনী। হ্যা।
কৃষ্ণভামিনী। দ্যাখ খুকী, আর পড়াশুনােয় তাের কাজ নেই।
১৫
তটিনীর বিচার
তটিনী। পড়াশুনাে ছেড়ে দিয়ে কি করব, শুনি ?
কৃষ্ণভামিনী। কেন, বে-থা করে ঘর-সংসার করবি ?
তটিনী। কাকে বিয়ে করব ?
কৃষ্ণভামিনী। শােন কথা। রােজ কত ভালাে ভালাে ছেলের
খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তটিনী। বদরের খবর পাওয়া যাচ্ছে, মা, বরের নয়। বিয়ে আমি
করব না।
কৃষ্ণভামিনী। বিয়ে তুই করবি নে ?
তুটিনী। না।
কৃষ্ণভামিনী। বিয়ে করবি নে আর রাত দিন একপাল ছেলের সঙ্গে
হৈ-হৈ করে ফিরবি ?
তটিনী। ওদের সঙ্গে যত মিশচি মা, ততই ত বুঝতে পারছি ওদের
কাউকে বিয়ে করলে কি দুর্ভোগেই দিন কাটাতে হবে।
কৃষ্ণভামিনী। আমিও বলি না ওদের কাউকে তুই বিয়ে কর।
তটিনী। তাহলে কাকে বিয়ে করব বল ! যাদের চিনি তারা
অযােগ্য আর যাদের চিনি না তাদেরই বা যােগ্য বলে মনে করি কি করে ?
শেষটায় কোন দিন
বন থেকে বেরুবেন টিয়ে
সােনার টোপর মাথায় দিয়ে
আর আমি ছুটে গিয়ে তারই গলায় বরমাল্য পরিয়ে দেব,-এ কি
তুমি চাও?
কৃষ্ণভামিনী। যত অনাছিষ্টির কথা।
তটিনীর বিচার
তটিনী। তার চেয়ে এক কাজ করা যাক মা। ও বেথা পড়ে
থাক। তােমাকে ছেড়ে থাকতে আমি পারব না। আর তুমিও কিছু
আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। তাই এই ভাবেই আমরা সুখে
শান্তিতে দিন কাটিয়ে দি।
কৃষ্ণভামিনী। আমার অদৃষ্টে সুখও নেই, শান্তিও নেই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া গা চলিয়া গেলেন।
তটিনী। সুখ ! সুখ যেন একটা বাঁধা ফরমুলা দিয়ে পাওয়া যায়।
উঠিয়া ড্রেসিং টেবিলের সাম বাড়াইয়া চুল খুশিতে
লাগিল আর গুনগুন করিয়া গান গাহিতে লাগিল।
তটিনীর গান
০
ওগাে পল্লবিনী সঞ্চারিণী
বনের লতা
ফুলে ফুলে জাগে একি চঞ্চলতা
ওগো বনের লতা।
আজি তাের মৰ্ম্মর গানে
কোন পথহারা পথিকেরে টানে
দক্ষিণ সমীরণে ভেসে এল কার বারতা
ওগো বনের লতা।
১৭
তটিনীর বিচার
তাের শাখে শাখে জ্বলে ওঠে
কুসুম শিখা
প্রেম-দীপের লিখা
কার লাগি আরতির ছন্দে
ফোটে ফুল প্রেমধূপ গন্ধে
প্রণামী কুসুম ভারে কার পায়ে হবি প্রণতা
ওগাে বনের লতা
গাহিতে গাহিতে দরজা বন্ধ করিয়া দিল। শাদা
আলােটা নিভাইয়া বেগুনী আলো জ্বলিয়া দিল। কম
গলা ছাড়িয়া গাহিতে লাগিল । গান শেষ হইবার মুখে
জানালার শার্শিতে খটখট শব্দ শুনিল। সেইদিকে
চাহিয়া আবার গান গাহিল,আবার শব্দ হইল।
গান শেষ করিয়া তটিনী শাদা আলােটা জ্বালিয়া দিল।
জানালায় একটি মানুষের মাথার ছায়া দেখা গেল।
সে একখানা চিঠি দেখাইল। তটিন, জানালার কাছে
গিয়া চিঠি লইয়া আবার জানালা বন্ধ এরিয়া দ্বিল।
টেবিলের কাছে দাঁড়াইয়া চিঠি পড়িল। চিঠিখানা
টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া ফেলিল। ফিসয়া চুল
বাঁধিল, ড্রয়ার হইতে ব্যাগ বাহির করিল। ১কটা
ওভারকোট গায়ে পড়িল। দুয়ারের দিকে গিয়া দুয়ার
খুলিল। টেলিফোন বাজিল ।
রিসিভার ,তুলিয়া
লইল।
১৮
তটিনীর বিচার তটিনী। হ্যালাে ! বসন্ত ? হ্যা, আমি তটিনী। ভালাে নাচ আছে ? তা কি হবে ? বলতে তখন ভুলে গিয়েছিলে ? জান ত বল্লেও যেতে পারতুম না। য়্যা? ও। বরের বাপ কনের দেখা না পেয়ে ফিরে গেছেন। হ্যা, ভালাে হয়েছে বৈকি! না, না, এখন শােবনা। আমি একটু বেরুচ্ছি। হঁা জরুরি দরকার। কোথায় তা বলব না। এত রাতে বলচ ? তুমিও ত নাচ দেখতে হােটেলে নিয়ে যেতে চাইছিলে। তােমার সঙ্গে যাওয়া দোষের নয়? তা একা যাওয়া তাে আরও নির্দোষ। বলুম যে কোথায় যাচ্ছি তা কাউকে বলতে পারব না। না, তােমাকেও না। বেশত যাও না। কাল শােনা যাবে কেমন চি দেখলে ? বান্ধবী নিয়ে যাবে ? বেশ ত। I dont care to know who it is হ্যা, হঁ্যা, হঁ্যা। কৃষ্ণভামিনী আসিয়া দুয়ার কাছে লড়াইল। তটিনী রিসিভার রাখিয়া দিয়া দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল । কৃষ্ণভামিনী। এত রাতে আবার কোথায় বেরুচ্ছিস। তটিনী। একটু কাজ আছে মা। ঘণ্টাখানেকের মাঝেই ফিরে আসব। কৃভামিনী। না, না, এখন তাকে কিছুতেই বেরুতে দেব না। তটিনী। আমাকে যেতেই হবে। কৃষ্ণভামিনী।' যেতেই হবে! তটিনী! খুব জরুরি কাজ। কৃষ্ণভামিনী। কি তাের কাজ তুইই জানিস। কিন্তু একবার কি ভবেও দেখবি না লােকে কি বলবে—আমি কেমন করে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকব ?
তটিনীর বিচার
তটিনী। তােমাদের সময়ে আমাদের নত বয়সের মেয়েদের বাইরে
কোন কাজই থাকত না, কিন্তু আমাদের থাকে। সে কাজে সাড়া না
দিয়ে আমরা পারি না। তুমি একটু ভেবে দেখ মা। যদি বুঝতে পার,
তাহলে দুঃখও পাবে না, দুশ্চিন্তাও দূর হবে।
কৃষ্ণভামিনী। এ বয়েসে ও-সব আমি ভাবতে পারি না আর
ভাবতেও চাই না | রাত কটা হােলাে দেখিচিস্?
তটিনী। কতদিন এর চেয়েও বেশী রাতে বায়ােস্কোপ দেখে ফিরিচি।
এখন ত সবে এগারটা।
তটিনী বাহির হইয়া চলিয়া গেল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
নারী প্রগতি-সঙ্ঘ
একটি অধাে অন্ধকার ঘরে চারিটি যুবক বসিয়া আছে।
আধা ময়লা তাদের পােক। চারিটি টাইপ।
সমর। রাত এগারটা বেজে গেছে এখনও সে এলো না।
হরিশ। আমি জান্তুম সে আসবে না।
সমর।
অমর তটিনীকে চিঠি দিয়ে এসেচ ত ?
অমর। হাঁ। এই তাে দিয়ে আসছি।
হরিশ। তিন মাসের মাঝে সে এমুখখা হয়নি। আজও হয়ত
আসবে না।
অমর। শুধু বসন্তর সঙ্গেই ঘুরে বেড়ায়।
তটিনীর বিচার
সৌরীন। গাটছড়াও তারই সাথে বাঁধবে।
অমর। I tell you Samar, she is a ſlirt.
হরিশ। আমাদের কোন কাজেই সে লাগবে না।
সমর। কিন্তু তাকে আমরা সহজে ছাড়তেও পারি না।
মায়ের হাতে অনেক টাকা।
অমর। দেখ শৈলেশদা যদি বুঝিয়ে শুনিয়ে কাজ আদায় করতে পারে।
হরিশ। শৈলেশদার সাথে তার আলাপই হয়নি। তিনি যে দলপতি
হয়েছেন, তাও হয়ত জানে না।
দরজায় শব্দ হইল।
তটিনী। ( বাহির হইতে ) May I come in?
সমর লাফাইয়া উঠিয়া কহিল
সমর। আসুন, আসুন, আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছি।
তটিনী প্রবেশ করিল। সকলে উঠিয়া নমস্কার করিল।
তটিনীও প্রতিনমস্কার করিল।
অমর। অনেকদিন পর এদিকে এলেন।
তটিনী। হাঁ, আসবার কোন দরকার হয়নি। আজ এলুম কতগুলো
কথা বলে যেতে। .
সমর। আমাদের নেতাকেই বলবেন।
তটিনী। আমি তাে শুধু আপনাকেই চিনি সমরবাবু। তিনি
আবার কে ?
তটিনীর বিচার
নতুন সভাপতি নির্বাচন করিচি।
অমর। আমরা
কাজের লােক।
দুয়ার ঠেলিয়া শৈলেশ প্রবেশ করিল
হরিশ। ওই যে তিনি এসেচেন।
শৈলেশ ও তটিনী পরস্পর পরস্পরের দিকে চাহিল ।
সৌরীন। ইনিই আমাদের নেতা।
সমর। ইনিই তটিনী দেবী।
শৈলেশ। বসুন।
তটিনী। আপনি এখানে থাকবেন জানলে আমি আসতুম না।
আমাকে কেন ডেকেচেন সমরবাবু?
সমর। ওঁরই আদেশে ডেকেচি।
তটিনী। ওঁকে আমি চিনি না।
অমর। উনিই আমাদের নেতা ।
তটিনী। ওঁর নেতৃত্বে চলতে আমি চাই না।
সমর। কিন্তু আপনি যে শপথ নিয়েছিলেন।
তটিনী। শপথ নিয়েছিলুম নারীর উন্নতি যাতে হয় তাই আমি
করব। তার বেশী কিছু নয়।
সৌরীন। তাও আপনি করছেন না।
তটিনী। কি করে জানলেন?
হরিশ। আপনার চালচলন দেখে।
সৌরীন। ফ্যান্সী আর ফ্যান দেখে।
২২
তটিনীর বিচার
তটিনী। নারীকে যারা শ্রদ্ধা করতে জানে না, নারী-প্রগতি-স্য
গড়ে তােলা তাদের কাজ নয়। আর নারীর উন্নতি পুরুষের দয়ার ওপরও
নির্ভর করে না।
সমর। কিন্তু যেদিন এই সম্বে আপনি যােগ দিয়েছিলেন, সেদিনও
এটা পুরুষের প্রতিষ্ঠিত সদ্য জেনেই ত যােগ দিয়েছিলেন।
তটিনী। সেদিনের কথা ছেড়ে দিন। সেদিন এ সব কথা ভাল
করে বুঝতুম না। আজ আমি জেনে যেতে চাই আপনাদের মতামত
নিয়েই কি আমাকে জীবন চালাতে হবে ?
সমর। হাঁ, তাই হবে।
তটিনী। কেন ?
সমর। নইলে আপনার জীবন আমরা দুৰ্ব্বহ করে তুলব।
সৌরীন। আর তা করবার শক্তিও আমাদের আছে।
তটিনী। বেশ ! সেই শক্তিরই পরিচয় আপনারা দেবে ।
তটিনী বেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। কিছুকাল
সবাই চুপ করিয়া রহিল।
সমুর। এর একটা কিছু বিহিত করা দরকার।
অমর। এমনি করে আমাদের অগ্রাহ্য করবে।
সৌরীন। বসন্তই মেয়েটাকে মজিয়েছে।
হরিশ। বসন্তকেও শিক্ষা দিতে হবে।
শৈলেশ। বােস তােমরা।
সকলেই বসিল। সকলেই কিছুকাল চুপ করিয়া রহিল।
তটিনীর বিচার
তটিনীর কথা শুনে তােমরা ক্ষুব্ধ হয়েচ। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই
বুঝতে পারবে তটিনী ও-কথা বলতে পেরেচে কেবল আমরা কর্মহীন বলে।
কাজই হচ্ছে একটা সদ্যের প্রাণ। আমাদের কোন কাজ নেই, তাই
এই সম্বও আজ জীবিত নেই। শুধু যে কাজই নেই, তা নয়—কৰ্তব্য কি
তাও আমাদের জানা নেই। তাই আমার মতে নারী-প্রগতি-সঙ্ঘের
আর সার্থকতা নেই।
সমর। কিন্তু সমাজের অর্ধাংশ যদি পঙ্গু হয়ে থাকে, তাহলে কি
দেশের ক্ষতি হয় না।
শৈলেশ। ভুলে যাও কেন সমর যে পুরুষরাই আজ পথ চলতে
পারছে না।
অমর। আজ চলতে পারছি না বলেই যে, চিরদিনের জন্য পথ ছেড়ে
সরে দাড়াব, তারও কোন কারণ খুঁজে পাই না।
শৈলেশ। সমর আমাকে মুক্তি দাও। তােমাদের নেতৃত্ব করবার
দায় থেকে অব্যাহতি দাও। নারী-প্রগতি-সজ্যের নেতৃত্ব করতে যেদিন
নারী এগিয়ে আসবে সেইদিন সত্যিকারের সঙ্ঘও হবে, নারী প্রগতিও
হবে। তার আগে নয়।
সমর। একান্তই যদি বােঝা বলে মনে করেন, তাহলে নেতৃত্ব
ত্যাগ করুন।
শৈলেশ ।
বেশ।
তােমাদের কাছে ৩ামি বিদায় নিয়ে
চলে যাচ্ছি।
কেহ কোন কথা কহিল না। শৈলেশ উঠিয়া দাড়াইল ।
সকলের মুখের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
২৪
তটিনীর বিচার
তারপর দ্রুত প্রস্থান করিল। সকলে সেইদিকে চাহিল।
তারপর সকলে সমরের দিকে
সৌরীন। শৈলেশদাও সরে প’ল।
সমর। যার ইচ্ছে সরে পড়ক। আমাদের পথ আমরা ছাড়ব না।
অমর। আমাদের মত আমরা বদলাবে না।
হরিশ। কিন্তু তটিনীকে ছেড়ে দিলে টাকা কোথায় পাব?
সমর। তটিনীকে আমরা ছাড়ব না।
সৌরীন। জোর করতে গেলেও তাকে আমরা পাব না।
অমর। কিন্তু তাকে আমরা চাই।
সমর লাফাইয়া উঠিল
সমর। কে বল্লে আমাদের কাজ নেই। আজ থেকে এখন থেকেই
আমাদের কাজ সুরু। এস অমর আমার সঙ্গে।
অমরের হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া গেল
হরিশ। আমরা এখানে বসে বসে কি করব ।
সৌরীন। কাজও নয় সদ্যও নয়—ওদের আসল কথা তটিনী।
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল
ললিতার ঘর
কলিকা। তটিনী, তটিনী করে সবাই যেন ক্ষেপে উঠেছে।
ললিতা। সত্যি বলচি, ভাই কলি, তার এই ছলনা, তার এই প্রবঞ্চনা
অসহ্য হয়ে উঠেছে।
কলিকা। ক্লাস থেকে বেরিয়ে সােজা হােটেলে গেছে। আমরা
যেতেই পালাতে চায়।
ললিতা। । . আমি যদি জান্তুম, তাহলে ওর সঙ্গে নাচ দেখতে যেতুম না।
কলিকা। বসন্ত মনে করে তার যখন টাকা আছে, তখন সে যে-কোন
মেয়েকে হেলায় জয় করতে পারে।
ললিতা। এটো পাতার মত আজ সে আমাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবে
আর আমি প্রতিবাদও করতে পারব না? নিরালা ঘরে বসে শুধুই কাঁদব ?
কলিক। আমাদের এই দুর্বলতার সুযােগ নিয়েই ত ওরা আমাদের
বুকের পাঁজর গুড়িয়ে দিয়ে যায়।
ললিতা। শুধু লােকলজ্জার ভয়ে আমাদের চুপ করে থাকতে হয়।
কলিকা। আর ওই তটিনীই বা কেমন মেয়ে ? আমি তাকে
বল্পম তােমার কথা। জয়ের গৌরবে যেন তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
ললিতা। বসন্তকে জয় করবে তটিনী।
কলিকা। মনে করে পৃথিবী জয়ের অধিকারিণ সে ।
ললিতা। আমি জানি আমি গরীব। আত্মীয়-স্বজন সহায়-সম্পদ
কিছুই আমার নেই। তবুও তাের গা ছুয়ে আমি বলচি, কলি, তুটিনীর
ভালবাসা আমি ব্যর্থ করে দেব।
২৬
তটিনীর বিচার
কলিকা। আমি যদি তটিনী হতুম, তাহলে বসন্তকে কখনাে
Encourage করতুম না।
ললিতা। দিনের পর দিন কানের কাছে কেবলই বলেচে, ভালবাসি,
ভালবাসি, ভালবাসি। এই তার ভালবাসার পরিচয়।
কলিকা। Engagementও হয়ে গেছে।
ললিতা। মিথ্যে। মিথ্যে। আমি বলচি তা মিথ্যে। বসন্তর শা,
এ বিয়েতে মত দিতে পারেন না। তিনি গোঁড়া হিন্দু। তাঁদের মতে
মুণের সাথে কায়েতের বিয়ে হতে পারে না।
কলিকা। কিন্তু বসন্ত যখন announce করলে, তটিনী তো
corrtradict করলে না। চুপ করে রইল।
ললিতা। তটিনী ত বসন্তর মাকে জানে না, তাই ভাবলে তার বরাত
বুঝি খুলে গেল।
কলিকা। নাও এবার শুয়ে পড়। যে-কোন সাহায্যের দরকার
হবে আমার কাছে তুমি পাবে।
কলিকা বাহির হইয়া গেল। ললিতা দুয়ার বন্ধ করিয়া
দিল। ড্রয়ার খুলিয়া বসন্তর ফটো বাহির করিল।
চুপ করিয়া দেখিতে লাগিল
ললিতা। ভগবান! • মুখে বার শিশুর সারল্য দিয়েচ, মনে কেন
তার দিয়েচ এত ছলনা, এই কপটতা।
দুই হাতে মাথা গুজিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল
২৭
বসন্তর ঘর
মাথায় ব্যাণ্ডেজ বঁধা বসন্ত অৰ্ধশায়িত অবস্থায়
রহিয়াছে, ভােরের রােদ আসিয়া ঘরে পড়িয়াছে।
বসন্ত আর তার মা হরনােহিনী
বসন্ত। এবার আমি বিয়ে করব, মা।
হরমােহিনী। তবু ভাল ছেলের এতদিনে সুমতি হ’ল। শ্যামবাজারের
সেই মেয়েটি শুনিচি:
বসন্ত। অজ কুচ্ছিত, মা, অজ কুচ্ছিত !
হরমােহিনী। বলিস কিরে ?
বসন্ত। ঠিকই বলচি মা।
হরমােহিনী। তাহলে হাটখােলার...
বসন্ত। না, না, না, হাটখােলায় ছেলের বিয়ে দিয়াে না মা।
হরমােহিনী। কেন রে !
বসন্ত। ছেলেকে হারাবে। বীরেনটা পাগল হয়ে গেল, জান না••
দিন রাত বৌ-এর কাছে বসে থাকে।
হরমােহিনী। মাকে দেখে না ?
বসন্ত। দেখবে কি মা, তােমাকে বলতে লজ্জা করে, রাত-দিন বৌ-এর
মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
হরমােহিনী। তাহলে কাজ নেই বাবা সেখানে বিয়ে করে।
২৮
তটিনীর বিচার
বসন্ত। মেয়ে আমি ঠিক করিচি, না। পদ্মফুলের মত রং।
নিরিমিষ তরকারী যা বাঁধে...
হরমােহিনী।
ছেলে আমায় লােভ দেখাচ্ছেন।
বসন্ত। তুমি তাে জান নিরিমিষ তরকারী আমি কত ভালবাসি।
হরমােহিনী। হঁ্যা। সেই জন্যেই রোজ হোটেলে গিয়ে মুরগী খাস।
তা বাইরে যা করতে হয় কর। আর নিরিমিষ তরকারী তাের বৌ
রাঁধতে পারুক আর নাই পারুক, তাের যখন পছন্দ হয়েচে••
বসন্ত। না, না, আমার পছন্দ বড় কথা নয়। তোমারও মত
থাকা চাই। আমি সারাজীবন বিয়ে না করে থাকব, তবু তােমার
অমতে কাউকে বিয়ে করব না। জান তো মা, তুমি ছাড়া সংসারে আমার
আর কেউ নেই।
হরমােহিনী। তােকে পেয়েই ত সব দুঃখু ভুলে আছি বাবা।
বসন্ত। আমরা দুজনে মিলে তােমাকে এমন সুখে রাখব না:••
হরমােহিনী। তােদের ঘরসংসার তোরা গুছিয়ে নে। তার বাড়া
সুখ আমার নেই।
মা চলিয়া গেলেন। তটিনী প্রবেশ করিল।
বসন্ত। এস, এল তটিনী এস।
তটিনী। আবার উঠচ কেন ? শুয়ে থাক।
বসন্ত। এত ভােরে তুমি আসবে, তা মনে করিনি তটিনী।
তটিনী। এ খবর পেয়েও না এসে থাকা যায় ! কে একাজ করলে?
বসন্ত। ললিতাকে পৌছিয়ে দিয়ে ফিরচি, এমনি সময় পিছন থেকে
তটিনীর বিচার
তারা আক্রমণ করল। লােকগুলাে এসেছিল মুখােস পরে। তাই
তাদের চিনতে পারলুম না।
তটিনী। আমি বলে দিতে পারি কার এই কাজ ।
বসন্ত। তােমারই কোন প্রেমিকের। একজন ত স্পষ্ট বলেই ফেল্লেন
তােমার পিছু পিছু যেন না ঘুরি।
তটিনী। তােমার বন্ধু শৈলেশেরই এই কাজ ।
9370 1 You dont mean it.
তটিনী। Surc, 1 do,
বসন্ত। চুলােয় যাক। স্যাঙাতরা একেবারে সাবাড় করে দিলে
বিয়ে হবার আগেই তুমি বিধবা হতে।
তটিনী। যা তা বল কেন ?
বসন্ত। তবে একটা উপকার তারা করেছে। ঘায়েল করেছে বলেই
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তােমাকে কাছে পেয়েছি।
তটিনী। আহা! আর কখনাে যেন আমি তােমার কাছে
বসি নি।
হরমােহিনী (নেপথ্যে )। দাঁড়িয়ে রইলি কেন সংএর মত। যা না
০
এগিয়ে।
বসন্ত। মা আসছেন।
তটিনী নামিয়া দাঁড়াইল। পরিচারিকা চা ও জলখাবার
লইয়া প্রবেশ করিল। পিছনে হরমোহিনী
মা, এই মেয়েটি কেমন বল ত !
০
তটিনীর বিচার
হরমােহিনী। খাসা মেয়ে। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে।
তটিনী প্রণাম করিল
সুখে থাক, মা, সুখে থাক।
পরিচারিকা চলিয়া গেল
বসন্ত। বৌ করে ঘরে আনবে ?
তটিনী বসন্তর দিকে দৃষ্টি হানিয়া জানালার কাছে
চলিয়া গেল
হরমােহিনী। আগে বােঝ তােকে পছন্দ করে কি না।
বসন্ত। তা না বুঝেই কি তােমার মত জানতে চাইছি।
হরমােহিনী। শােন মা !
তটিনী মায়ের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। হরমোহিনী
তাহার চিবুক ধরিয়া কহিলেন ।
আসবে মা আমার ঘরে ?
তটিনী মুখ নীচু করিল
এসে আমার ঘর আলাে করে তেল।
বসন্ত। কিন্তু মা, তােমরা বামুন আর ওরা কায়েত।
হরমােহিনী। ওমা, তাই নাকি।
বসন্ত। হঁা ওরা বােস।
হরমােহিনী। তবে কি করে বিয়ে হবে ?
বসন্ত। আজকাল তাও হয় না।
তটিনীর বিচার
হরমােহিনী। নে, নে, আর তামাসা করিস নে। এখন খেয়ে নে
দিকিনি। তুমিও না কিছু মুখে দাও। আমি দেখে আসি হরিয়া
বাজারে গেল কিনা।
খানিক দূর আগাইয়া গিয়া আবার ফিরিয়া আসিল
একটা কথা বলে যাই না। রাগ করাে না। লেখাপড়া শিচো শেখাে।
কিন্তু একটু সাবধানে থেকো। তােমার সােমত্ত বয়েস, ব্যাটাছেলের
সঙ্গে এত মেলামেশা ভাল নয়। তােমার বাপ মা আছেন তো ?
বসন্ত। আমারই মত খুব ছেলেবেলায় ওর বাবা মারা গেছেন।
হরমােহিনী। তুই চুপ কর না। তােমার মা তােমাকে যেখানে
সেখানে যেতে দেন ?
তটিনী। আপনি কি আপনার ছেলেকে দিনরাত ঘরের মধ্যে বন্ধ
করে রাখেন?
বসন্ত। এইবার দাও জবাব।
হরমােহিনী। ফের তুই কথা কইচিস! আমার ছেলেকে আমি
ঘরে বন্ধ করে রাখি না সত্যি। কিন্তু আমার যদি মেয়ে থাকত, তাহলে
তাকে আমি যেখানে সেখানে যেতে দিতুম না। ছেলে বিপদে পলে
বিহিত কিছু করতে পারি, কিন্তু মেয়ে...
তটিনী। বিহিত করবার বুদ্ধি ছেলেদেরই থাকে না? আমরাও পারি
আমাদের রক্ষা করতে।
হরমােহিনী। পারলেই ভাল। তােমাকে দেখে ভাল লাগল তাই
সাবধান করে দিয়ে গেলুম।
হরমােহিনী চলিয়া গেল
তটিনীর বিচার
বসন্ত। মা এখন যাই বলুন, মত তাকে দিতেই হবে।
তটিনী। কিন্তু ওঁর মনে দুঃখ দিয়ে আমরা কি সুখ পাব ?
বসন্ত। আমাদের সুখ বাইরের কোন কিছুর অপেক্ষা রাখে না।
ওসব কিছু ভেব না। খেয়ে নাও।
তটিনী। এই ত চা-টা খেয়ে এলুম।
বসন্ত। কিছু মুখে দাও, নইলে মা ভাববেন তুমি রাগ করেচ।
তটিনী। যাদের মা নেই, তাদের হয়ত কিছুই নেই।'
বসন্ত। সত্যি তটিনী, অবুঝ হলেও মায়েরা আশ্চৰ্য্য মানুষ।
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল
নারী-প্রগতি সম্পন্ন
অমর। আশ্চৰ্য্য মানুষ এই বসন্ত।
সমর। মুগ্ধ হবার মত কি দেখলে ?
অমর। সত্যি শক্তি ধরে।
সমর। আমরাও তাকে ঘায়েল করিচি।
অমর। ভুলাে না আমরা দুজনা, তাকে আক্রমণ করিছিলুম-আর
সে ছিল একা।
সমর। তােমার যে দরদ উথলে উঠল।
অমর। দরদ নয়।
সমর। তবে ?
অমর। আমি বলছি যা হয়েচে হয়েছে। ওদের পিছনে আর নয়।
তটিনীর বিচার -- সমর। তার মানে ? অমর। তটিনী আর বসন্ত যা ইচ্ছে হয় করুক, আমাদের কি ? সমর। ভুলে যাও কেন তটিনী আমাদের সম্বকে অগ্রাহ্য করেছে আর তা করেচে বসন্তর প্রেরণায়। তাই তাদের দুজনকেই শাস্তি দিতে হবে। অমর। কিন্তু সঙ্ঘেরই যে আর অস্তিত্ত্ব রইল না। সার। কে বলে নেই ? অমর। শৈলেশদা ননদিন যা বলে গেলেন তাই ঠিক। আমাদের কোন কাজ নেই, কর্তব্য সম্বন্ধেও স্পষ্ট কোন ধারণা নেই । তাছাড়া সব চেয়ে মজার কথা, সজ্যের সঙ্গে একটীও নারীর 'আজ যােগ নেই। তাই সঙ্ঘেরও.কোন আবশ্যকতা নেই। তােমার ওই শৈলেশদারও অব্যাহতি নেই। অমর। তার মানে ? সমর। সাজা তাকেও পেতে হবে। অমর। তুনি একা সবাইকে সাজা দেবে? এত বড় শক্তি নি তুমি ! সমর। ও। তুমিও তাহলে আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ ? অমর। হ্যা, তাই যাব। সমর। কেন ? অমর। তােমার সঙ্গে আমার না আছে মতের মিল না আছে মনের। সমর। কাল রাত অবধি ত ছিল। অমর। কাল ঝোঁকের মাথায় যা করেছিলুম আজ শান্ত সূয়ে ভেবে দেখলুম তা অন্যায় হয়েচে। লতের কথা শুনিয়ে আমরা শুধু যে দশ- - 39 তটিনীর বিচার জনকেই ঠকাচ্ছি, তা নয়—নিজেদেরও ঠকাচ্ছি। এই প্রবঞ্চনার মাঝে আমি আর থাকতে চাই না। সমর। বেশ তুমিও সরে পড়। একা আমি ধুনি জেলে বসে থাকি। আমি স্থির জানি একদিন আসবে, যেদিন দলে দলে সমাজ-সেবিকা এখানে এসে সমবেত হবে। অমর। সমাজ-সেবিকা না এলেও কিছু এসে যায় না, শুধু তটিনী এলেই তুমি খুশী হও। সর। সাবধান অমর । উঠয়! অমরের মুখোমুখি ঈড়াইল । অমর। আরাে আত্ম-প্রবঞ্চনা করবে তুমি! লালসার দাবীকে ডেকে রাখবার জন্যেই তুমি আজ বড় গলায় নারী-প্রগতি সজ্যের দাবী প্রচার করচ। যদি কখনো সেদিন আসে, যেদিন তটিনী তােমার করায় হবে, সেদিন সদ্য, সমাজ, সবই লালসার পাঁকে তলিয়ে যাবে-এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ! সমর। যাও, যাও, তােমাকে আর তত্ত্বকথা শােনাতে হবে না। দরজায় শব্দ হইল, দুইজনেই সেইদিকে চাহিল। ব্যাগ লইয়া ডাঃ ভোস প্রবেশ করিল। অদ্ভুত চেহারা। ভােস। How are you boys! হাঃ! হা! ! সমর। বসুন ডাক্তার বাবু, বসুন। ভােস। কোন খবর না পেয়ে নিজেই এলুন। একটা resp){১nsibility রয়েচে ত। হাঃ! হাঃ! হাঃ!
তটিনীর বিচার
অমর। আমি চলুম সমর।
cotti One minute ! May I examine your wounds
before
you go?
ডাক্তার ভােস উঠিলেন
Dr. Bhisc. I am
9793 l Thank you very much,
quite all right.
অপেক্ষা না করিয়া চলিয়া গেল। ডাক্তার সমরের
দিকে চাহিয়া কহিল ।
ভােস।
What's amiss ? বন্ধুটি যে চটেই লাল। হাঃ! হাঃ।
হাঃ! হাঃ!
সমর। ডাক্তারবাবু, আপনার উপকার ভুলতে পারব না।
ভােস। তবুও ভাল, কথাটা তুমি বল্লে । তােমার বন্ধুটি ত এমন
ভাব দেখালেন যে তিনি আমাকে চেনেনই না। হাঃ! হা! হাঃ! I
have never found such an ungrateful patient.
চেয়ার টানিয়া বসিল
ওই অত রাতে অমন যত্ন করে dress করে দিলুম, পুলিশ হাঙ্গামা থেকে
বাঁচিয়ে দিলুম—আর এই তার প্রতিদান ! হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। পুলিশ হাঙ্গামা !
ভােস। শুধু একটিবার যদি থানায় ফোন করে দিতুম !
তটিনীর বিচার
ডাক্তার আবার উঠিল । দুয়ারটা বন্ধ করিয়া দিল ।
ফিরিয়া আসিয়া সমরের সামনে দাড়াইয়া কহিল
এখন দাও ত দাদা, বখরাটা।
সমর। আপনি বলছেন কি ডাক্তারবাবু !
ভােস। হাঃ! হাঃ! হাঃ! সাত বছর শিকাগােয় ছিলুম, হােল্ড
আপ কাকে বলে জানি। তিন ভাগের এক ভাগ দিলেই খুসী হয়ে যাব।
সুবােধ ছেলের মত তাই দিয়ে দাও, দাদা।
সমর। আপনি ভুল করচেন ডাক্তারবাবু।
ভােস। ভুল ? হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
ব্যাগ খুলিয়া একখানি খবরের কাগজ বাহির করিয়া
কহিল
পড়ে দ্যাখ দাদা, ওই লাল পেন্সিলে দাগ দেওয়া খবরটা। মুখোস পর।
দুইটি ভদ্ৰযুবকের কীর্তি। রাত দুটোর সময় রামলাল-মতিলাল শেঠের
পকেট হইতে পাঁচ হাজার টাকার নোেট লইয়া উধাও।
সমর কাগজথানি লইয়া আগ্রহভরে পড়িতে লাগিল।
তারপর কহিল
সমর। কিন্তু এত আমরা নই ডাক্তারবাবু।
69771 I admire your pluck but at the same time I
demand my share of the booty. হাঃ! হা! হা! হা!
সমর। আপনার কি করে সন্দেহ হল যে একাজ আমরাই কৱিচি।
ভােস। পড়লে না? রাস্তার মােড়ে দুটি হিন্দুস্থানী সন্দেহক্রমে
তটিনীর বিচার
.
যুবক দুটিকে challenge করে। ফলে ধ্বস্তাধ্বস্তি ঘুসাে-ঘুসি হয়। হিন্দু-
স্থানীদের চোখে ধূলাে দিয়ে যুবকরা পালিয়ে যায়। And again I
admire your pluck and courage. হাঃ ! হাঃ! হাঃ!
সমর। আপনাকে আমরা কি করে বােঝাব যে আমরা ওকাজ
করিনি।
ভােস। আমি কিন্তু পুলিশকে সহজেই বােঝাতে পারি যে, তােমরাই
ও কাজ করেচ। হাঃ! হাঃ! হাঃ।
সমর। আপনি বিশ্বাস করুন ডাক্তারবাবু।
ভােস। সাত বছর শিকাগােয় ছিলুম, Gangsterদের কলা-কৌশল
ortfa sta i Out with the mony, I say.
গর্জিয়া উঠিয়া টেবিলে ঘুসি মারিল।
কি হে ছােকরা, কাঠ হয়ে দাড়িয়ে রইলে যে !
সমর। টাকা নিলে আমি আপনাকে দিয়ে দিতুম।
ডাক্তার উঠিয়া দাড়াইল
ভােস। হু। সােজা আঙুলে ঘি উঠবেনা দেখচি। I must
ring up the police !
দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল
সমর। ডাক্তারবাবু!
ডাক্তার দুয়ারে হাত দিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল। সমর
দৌড়াইয়া গিয়া তাহার পা জড়াইয়া ধরিল।
আপনার পা ছুয়ে বলচি আমরা ওসব করিনি।
তটিনীর বিচার
6771 Gangsters can never be cowards. for the
সাত বছর থেকে আমি তা বুঝেছি। Get. up young man, I
believe you. ওঠ, ওঠ।
সমরকে ভুলিল
সমর। আপনি বিজ্ঞ লােক সবই বুঝতে পারেন।
Cothi Seven years' experience at Chicago. : !
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
টেবিলের কাছে আসিয়া ব্যাগটা টেবিলের ওপর
রাখিল।
তারপর, রামলাল-মতিলালের টাকা ত নাওনি শুনলুম। Then how
clid you receive those wounds?
সামর। আপনার কাছে বলতে লজ্জা করে ।
ভােস। I see: There is romance ii. it. প্রণয়ঘটিত
ব্যাপার। হাঃ ! হাঃ! হাঃ!
সমর। ঠিক তা নয়।
cotol There must have een a girl in it.
সমর। সত্যি কথা বলতে কি সেই মেয়েটির জন্যেই এই ব্যাপারে
আমাদের লিপ্ত হতে হয়।
. ভােস। হতেই হবে। আমার অনুমান মিথ্যে হতে পারে না।
Seven years experience at Chicago. হা! হা! হা! হাঃ ।
Now let us hear the story.
তটিনীর বিচার
a
সমর। আপনি যা ভেবেছেন, তা নয়। মেয়েটি আমাদের দলে
ছিল। নারী-প্রগতির সহায়তায় আত্মনিয়ােগ করবে বলে সে প্রতিজ্ঞা
করেছিল। কিন্তু একটি খারাপ লােকের খপ্পরে সে পড়ে।
আমরা মেয়েটিকে রক্ষা করবার জন্যই সেই লােকটাকে শিক্ষা দিতে
গিয়েছিলুম।
'ভােস। আর নিজেরাই শিক্ষা নিয়ে ফিরে এলে। হাঃ! হাঃ!
হাঃ! হাঃ! Never niincl. It Ivas after all :oble
attempt.
সমর। মেয়েটির মায়ের হাতে টাকা পয়সা বেশ আছে।
ভােস। I am not interested in girls. হাঃ! হাঃ! হাঃ
হাঃ! And now to business. যাও তাে ছােকরা, চট করে তােমার
মায়ের কাছ থেকে শ’ কয়েক টাকা নিয়ে এস ত।
সমর। আমার ত সংসারে কেউ নেই ডাক্তার বাবু।
ভােস। বাড়ীঘর কোথায় ?
সমর। চাল-চুলাে কিছুই নেই।
ভােস। খাও কি করে ?
সমর। এতদিন চঁাদা তুলে চালিয়েচি। এখন তাও প্রায় অচল
হয়ে উঠেছে।
ভােস। কি বলে উঁদা তুলতে?
সমর। নারী-প্রগতি সঙ্ঘের কথা বলে।
ভােস। ভেবে ভেবে চমৎকার স্যাটি গড়েচ ত ! A bcvy, (of
beautiful girls! legs and limbs ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
স
৪ ০
তটিনীর বিচার
সমর। কিন্তু কিছুই করতে পারলুম না !
তােস।
কেন ?
সমর। লােকে আর বিশ্বাস করে না। বলে নারীর প্রয়াস ছাড়া
নারী-প্রগতি হয় না ।
ভােস। Exactly. তা এখন কি করবে ?
১মর। তাই ত ভাবচি......
ভােস। ভাবচ কি করে মেয়েটির মায়ের টাকা হাত করা যায় ?
হাঃ! ঃ ! হাঃ হাঃ!
সমর। আজ্ঞে ঠিক তা নয়।
ভােস। Not altogether a bad idea, টাকা চাই ই। হাঃ।
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। টাকা নইলে কোন কাজই ত হয় না।
ভােস। আমি ডলারের দেশ থেকে এসেচি, টাকার নৰ্ম্ম বুঝি।
Will you join hands with me?
1997 i Honour bright, I will,
ভােস। কিন্তু ওসব প্রগতি-ট্রগতি ছাড়তে হবে।
সমর। পেশা হিসেবে আজও ওটা ধরে রেখেচি, নেশা অনেক
আগেই ছুটে গেছে।
ভােস। You are a clever young illan. খাসা ছেলে।
সমরের দুই কঁাধে দুইহাত রাখিল
৪১
তটিনীর বিচার
তােমাকে আমি মানুষ করে তুলব। সাত বছর শিকাগোর থেকে যা
শিখে এসেছি, সব তােমায় শিখিয়ে দোব, প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে
পারবে—আর হয়ত সেই মেয়েটিকেও বশ করতে পারবে বার মায়ের হাতে
অনেক টাকা। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ।
হাসিতে হাসিতে সমরের পিঠ চাপাইতে লাগিল।
যবনিকা পড়িল।
৪২
দ্বিতীয় পর্ব
বাগান-বাড়ীর বারান্দা
বন্তর বাগান বাড়ীর বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসন্ত
আর তটিনী বসিয়া আছে।
তটিনী। সেই শৈলেশকে তুমি নেমন্তন্ন কল্লে কেন ?
বসন্ত। তােমার ভুল ভেঙে দোব বলে। আমি যদি নিজের চোখেও
দেখতুম তাহলেও বিশ্বাস করতুম না যে শৈলেশ একাজ করেচে .
তটিনী। আর ললিতা? তাকে কেন নেমন্তন্ন কল্লে ?
বসন্ত। বেচারা একটি কান্তর বিরহে প্রাণান্ত হতে চলেছে। তাই
শৈলেশের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। Fle may carry
her safely to a port.
তটিনী।
Is shc in such a state that any port is now
safe for her ?
বসন্ত। To be frank, darling, most of the old maids
are like that,
তটিনী। তাই নাকি ?
রান্ত। রাগ করােনা তটিনী। তুমি কিছু সে রকম কুমারী নও।
তটিনী। আমি বুঝি ভিন্ন হয়ে গেলুম !
৪৩
তটিনীর বিচার
"বসন্ত। You are an idol of a perfect woman.
ofGot! A passed master of flattery you are !
বা তাহার হাত
মৃদু আঘাত করিতে উদ্যত হইল ।
ধরিয়া ফেলিল।
বসন্ত। তােমাদের এই হালফ্যাসানের কলারওলা ফুল-হাত
ব্লাউজগুলাে আমি দু’চোখে দেখতে পারি না।
তটিনী। আর ষ্টার্চ দেওয়া তােমাদের ওই কড়া সার্টগুলাে?
বান্ত। মনে করেচ খুব মায়া আছে ? এখুনি খুলে ছুড়ে ফেলতে
পারি।
উঠিয়া দাঁড়াইয়া সার্ট খুলিয়া ফেলিতে উদ্যত হইল।
তটিনী, থাক, থাক, কর কি ।
বসন্ত থামিয়া তাহার দিকে চাহিল।
বসন্ত। তুমি পার ?
তটিনী হাসিতে হাসিতে দুইহাতে মুখ ঢাকিল। বসন্ত
স্থির হইয়া, বসিল। তটিনী মুখ তুলিয়া চাহিল।
বসন্তও তাহার দিকে চাহিয়া রহিল।
তটিনী। অমন করে চেয়ে চেয়ে কি দেখচ বলত ?
বান্ত। দেখচি সূর্য্যি বেচারা কি ভুলেই না পড়েছে। তােমার
মুখকে পদ্ম মনে করে অস্তে যাবার আগে নিজের লালিমা উজাড় করে,
ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে তােমার গালে।
৪৪
তটিনীর বিচার
তটিনী। তুমি না scienceএর student?
বসন্ত। তাইত সূর্যের এই ভুল ধরতে পারলুম ! তােমার মত
literatureএর student হলে ত কাব্যের ঝঙ্কার তুলে বলতে পারতুম
ও মুখ পঙ্কজ হেরি
ধৈর্য ধরিতে নারি
সুধাদানে কর ধন্য
ক্ষুধিত এ অভাজনে।
তটিনী। কবিতা হল না !
বসন্ত। কাজের ভণিতা হলাে তাে? বনিতা তাতেই বশ !
বসন্ত উঠিয়া বাহুবেষ্টনে তটিনীকে বাধিল ।
তটিনী। আঃ, ছাড়, ছাড়। শৈলেশ আর ললিতা আসছে।
দেখতে পাবে।
798! Just the thing they need an example to follow.
তটিনী উঠিয়া দাঁড়াইল।
তটিনী। আমি চলুম।
বসন্ত। কোথায় ?
তটিনী। ঘরে। I cant stand that man.
বসন্ত।
Or.the woman ?
তটিনী। না, না, ওর কি অপরাধ?
বসন্ত। একদিন ও যে আমার সঙ্গে প্রেম জমিয়ে তুলতে চেয়েছিল ।
৪৫
তটিনীর বিচার
তটিনী। তুমি নিজেই যাকে সাইডিংয়ে সরিয়ে রেখেচ, তাকে
আমার কিসের ভয়?
তটিনী চলিয়া গেল। বসন্ত দাড়াইয়া পঁড়াইয়া তাহাকে
দেখিল ।
বসন্ত।
Marvellous !
সিগারেট ধরাইল। চেয়ারে বসিল। শৈলেশ আর
ললিতা প্রবেশ করিল।
*
আরে এস, এস !
শৈলেশ। পথে এর সঙ্গে দেখা হল। দুজন মিলে বাগানটা খুজে
বার করলুম।
বসন্ত। খুবই কষ্ট হয়েছে। বােস। বােস ললিতা।
শৈলেশ। দূর থেকে যেন তটিনী দেবীকে দেখলুম এখানে?
বান্ত। হঁ্যা, তিনিই ছিলেন। এখুনি আবার আসবেন।
ললিতা। আমি এলুম বলেই কি তটিনী দেবী চলে গেলেন ?
শৈলেশ। না। হয়ত আমি এলুম বলে।
বসন্ত। Dont get sentinental. গেছে কি কাজে, এখুনি
আসবে। ওইত আসছে।
তটিনী কাছে আসিতেই শৈলেশ উঠিয়া দাড়াইল এবং
নমস্কার করিল। তটিনী প্রতি-নমস্কার করিল।
তটিনী, এই ললিতা।
তটিনী। আপনার ইস্কুল আজ ছুটী ?
শুটিনীর বিচার
ললিতা। হঁ্যা, রাসপূর্ণিমার ছুটা।
তটিনী। আজ রাসপূর্ণিমা ?
বসন্ত। বাঃ চমৎকার হয়েছে ত ! আমাদের উৎসব আজ বেশ
জমবে।
৩
শৈলেশ। তটিনী দেবী, আপনার কাছে আমার একটি নিবেদনা আছে।
বসন্ত। ভাল কথা শৈলেশ, তুমি নাকি তটিনীর অপমান করে ?
শৈলেশ। আনি সেদিনকার সেই ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইছি।
তটিনী দেবী।
1918 Make it up Tatini, please inake it up
শৈলেশ। সেদিন কথাগুলাে কেন যে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, তা
আজও ভাল করে বুঝতে পারছি না। কিন্তু তার জন্য আমার আফশােনের
শেষ নেই।
তটিনী। আপনার সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে। একবার
একবার ।
আসবে আমার সঙ্গে ?
শৈলেশ। নিশ্চয়। E:::use me!
তানীর সঙ্গে শৈলেশ চলিয়া গেল।
বাস্ত। আমি ভেবেছিলুম তুমি আসবে না।
ললিতা। কেন ?
বসন্ত। তটিনী রয়েছে বলে ।
ললিতা। তবে নেমন্তন্ন করে পাঠালে কেন ?
বসন্ত। শৈলেশের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব বনে।
৪৭
তটিনীর বিচার
ললিতা।
তেমন দরকার হলে শুধু শৈলেশ কেন, রমেশ, যােগেশ,
মহেশ যে-কোন লােকের সঙ্গে নিজেই আমি আলাপ জমিয়ে তুলতে পারি।
বসন্ত। তাই নাকি।
ললিতা। দেখলে ত, আলাপ জমিয়েই তােমার সামনে এসেছি। আর
তুমি জান তােমার সঙ্গেও আমার পরিচয় তৃতীয় ব্যক্তির সাহায্যে হয়নি।
বসন্ত। তটিনীকে কেমন দেখলে ?
ললিতা। বেশ !
বসন্ত। ওর এমন আশ্চর্য একটা শক্তি আছে যে, ওকে কিছুতেই
উপেক্ষা করা যায় না।
ললিতা। আমাকে যেমন যায় ?
বসন্ত। তােমাকে ত আমি উপেক্ষা করিনি।
ললিতা। শুধু দূরে ঠেলে ফেলে দিয়েছ।
বসন্ত। তুমি আমায় ভুল বুঝাে না ললিতা। নব-যুগের ছেলেমেয়ে
আমরা, প্রেমে sentimentএর ধার ধারি না। জীবনে সঙ্গী বা সঙ্গিনী
নিৰ্বাচনও করি উদ্ভ্রান্ত হয়ে নয়, বিচার করে, বিবেচনা করে।
ললিতা। তােমার বিচারে আমি অযোগ্যা সাব্যস্ত হলুম কেন
জানতে পারি ?
বসন্ত। নিশ্চয় পার।
ললিতা। বল, শুনি।
বসন্ত। তুমি আর আমি বিরােধী প্রকৃতির লােক। তুমি শান্ত আমি
চঞ্চল ; তুমি বিশেষ একটা নীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত, : আমি কোন
নীতিকেই বরদাস্ত করতে পারি না ; তুমি ধৰ্ম্ম মান, আমি তা মানি না।
।
৪৮
তটিনীর বিচার
কাজেই তােমার সঙ্গে আমার মিলন হলে, তুমি বা আমি কেউ সুখী
হতুম না।
ললিতা। মানুষের মতের আর মনেরও পরিবর্তন হয়, একথা তুমি
মান না ?
বসন্ত। মানি। কিন্তু ইস্কুল মাষ্টারি করে করে তােমার মত আর
মন এমন হয়ে গেছে যে, এখন তার পরিবর্তন সম্ভবপর নয়।
ললিতা। তােমার মতে আমি হচ্ছি একটা hard boiled egg ?
বসন্ত। না, না, ঠিক তা নয়...তবে:••••
ললিতা। No apology, please.
ললিতা উঠিয়া দাড়াইল।
বসন্ত। উঠচ কেন, বােস।
শৈলেশ ও তটিনী ফিরিয়া আসিল।
শৈলেশ। জান বসন্ত, তটিনী দেবীর মার্জনা আমি পেয়েছি।
তটিনী। কিন্তু মনে রাখবেন ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সামনে আর
আমাকে অপ্রস্তুত করবেন না।
শৈলেশ। Never in iny life !
তটিনী। আপনি বসুন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন, ললিতা দেবী ?
বান্ত। ওর বড় মাথা ধরেছে।
তটিনী। আসুন, আমি মাথা টিপে দিচ্ছি।
ললিতা ম্লান হাসিয়া কহিল
ললিতা। না, না, ও কিছুই নয়।
তটিনী। এক কাপ গরম চা এনে দেব ?
০২
তটিনীর বিচার
ললিতা। চা আমি খাই না।
শৈলেশ। দুটো Genaspirin ট্যাবলেট ?
ললিতা। আপনারা অকারণে ব্যস্ত হবেন না।
শৈলেশ। তাইত। ওঁকে কি করে একটু রিলিফ দেওয়া যায়।
তটিনী। I have an idea! ঝিলে নৌকো করে খানিক বেড়ালে
ওঁর মাথা ধরা ছেড়ে যেতে পারে।
7981 Just the thing! Gotay Boat 57715 I Come on
Sailesh, we will have a boat race.
শৈলেশ। চলুন ললিতা দেবী। তটিনী দেবীকে আমরা আজ রেসে
হারিয়ে দেব।
তটিনী বসন্তর দিকে চাহিল, বসন্ত ললিতার দিকে।
71 Come on! Come on comrades!
সকলে চলিয়া গোল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
নারী-প্রগতি সঙ্ঘ
como l We are comrades from now on!
সমর। আপনার আশ্রয় যখন পেয়েছি, তখন জীবন আমার ব্যর্থ হবে
, জানি।
ভােস। জীবনে সফল হতে হলে, অর্থাৎ যাকে বলে successful
man, তাই হতে হলে মন থেকে স্নেহ, মায়া, দয়া সবই বিসর্জন দিতে হয়।
তটিনীর বিচার
দুঃখীর দুঃখ দূর করা, দুঃস্থকে অভাব থেকে মুক্ত করা, নিজের অন্নের ভাগ
অপরকে দিয়ে তৃপ্তি অনুভব করা হয়ত ভাল কাজ—কিন্তু সে আমার নয়,
তােমার নয়, ভােগীর নয়, লােভীর নয়। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। কার সে কাজ?
ভােস। কার কাজ ? Well, সংসারকে যারা মায়া বলে জেনেচে,
যারা বুঝেচে পাপের ফলে মানুষ পৃথিবীতে জন্মেচে, প্রতিদিন যারা পূণ্য
সঞ্চয় করে সেই পাপ ক্ষয় করতে চায়, পরপারে যাবার জন্যে যারা পা
বাড়িয়ে রয়েছে, ওসব কাজ তাদের। তােমারও নয়, আমারও নয়। বুঝলে ?
সমর। আমরা•••আমরা তাহলে কি করব?
ভােস। আমরা শক্তি অর্জন করব। শক্তির মূলাধার Motive
• force হচ্ছে টাকা। এই টাকা আমরা হাজারে হাজারে লাখে লাখে
কোটিতে কোটিতে সংগ্রহ করব।
সমর। বলেন কি, অত টাকা।
' ভােস। Dollar এর দেশ থেকে এসেচি কিনা, Sky-Scraper
এর দেশ থেকে এসেছি কিনা।
সমর। একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?
ভােস। একটা কেন, একশটা জিজ্ঞাসা করতে পার।
সমর। আপনি নিজেও ত খুব বেশী টাকা রােজগার করতে
পারেননি।
ভােস। সবে ত বছরখানেক দেশে ফিরেছি। শিকাগােয় সাত
বছর ছিলুম। Millionaie দেখলুম, Multimillionaie দেখলুম,
Gangster দেখলুম, Rackateer দেখলুম-অদ্ভুত experience নিয়ে
তটিনীর.বিচার
ফিরে এলুম। এখানে field খুজে বেড়াচ্ছি। জমি পেলে তবে ত ভিত
গাঁথব।
সমর। আমাকে দিয়ে আপনি কি করতে চান।
ভােস। তােমার কাজ ? হঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ। you shall be
my worthy lieutenant. নিজে যা করতে পারব না, তাই তােমাকে
দিয়ে করাব। I shall make a man of you! কিন্তু সব কাজে প্রশ্ন
তুলাে না। আমার ওপর বিশ্বাস রেখাে। আর একটা কথা। Put of
those shabby clothes. হাল ফ্যাসানের সুট ব্যবহার কোরাে।
Dress well. Look smart. Make love with pretty girls,
Visit places of amusements, Get a car—A very big
motor car. Lct people think you are earning by
thousands,
সমর। কিন্তু অত টাকা পাব কোথায় ?
ভােস। আমি শিকাগাে থেকে ডাক্তারী শিখে এসেছি, প্রেসক্রিপসন
মত ওষুধেরও ব্যবস্থা করি।
হাসিতে হাসিতে পকেট হইতে একতাড়। নােট বাহির
করিয়া সময়ের সামনে ধরিল।
এই নাও। সব তােমার। দরকার হলে আরাে চেয়ে নেবে।
সমর নােটগুলো লইয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
আমাকে যতটা গরীব মনে কর, দেখতে পাচ্ছ, তত গরীব আমি নই।
ব্যাগটা লইয়া বাহির হইয়া গেল। সমর তাহার
দিকে চাহিয়া রহিল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বাগান-বাড়ীর বারান্দা
ললিতা আর শৈলেশ আগাইয়া আসিতেছে।
শৈলেশ। কি ভাবছেন ?
ললিতা। ভাবচি নৌকো থেকে ওরা জলে পড়ে গেল কেমন করে ।
শৈলেশ। Law of gravitation, মাধ্যাকর্ষণের ফলে।
ললিতা। আমরা ত বেশ ছিলুম।
ললিতা বেতের চেয়ারে বসিল।
শৈলেশ। তার কারণ আমরা balance হারাইনি।
ললিতা। ডুবেও ত যেতে পারত!
শৈলেশ। ডুবেই ওরা আছে—অবশ্য জলে নয়। আর জানেন
ললিতা দেবী, কখনাে কখনাে ভাসবার চেয়ে ভােবায় বেশী সুখ পাওয়া যায়।
ললিতা। কিন্তু তটিনী বেশ ভয় পেয়েছিল। আমার মুখ দিয়ে
যখন গেল, আমি দেখলুম ওর চোখে তখনাে ভয় রয়েছে। আপনিও
দেখেছেন নিশ্চয় ?
শৈলেশ। আজ্ঞে না,।
ললিতা। আপনি ত ছিলেন আমারই পাশে দাড়িয়ে।
শৈলেশ। তা ছিলুম। কিন্তু এক জায়গায় দাড়িয়ে আমরা সব সময়
একই জিনিষ দেখতে পাই না। আপনার দৃষ্টি যার মুখে, তার চরণকালই
হয়ত আমার ধ্যানের বিষয় হয়ে ওঠে। দেখুন, আজকের আগে আমি
তটিনীর বিচার
ভাল করে কখনাে বুঝিনি সুন্দরীর গায়ে জড়ানাে নীল সাড়ী জলে ভিজে
কি রূপই ছড়িয়ে দেয়।
ললিতা। আমি একবার দেখে আসি তটিনী কেমন আছে।
ললিতা চলিয়া গেল।
শৈলেশ। চলে নীল সাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি
পরাণ সহিত মাের।
অপূৰ্ব্ব !
শৈলেশের গান
করে তরুণ-তরুণী তরণী বিহার
যমুনার নীল জলে
চতুর কানাই ডুবালাে সে তরী
লীলা গাহনের ছলে
টলমল তনু অথির চরণ
বৃষভানু কিশােরী
যৌবন ভার বহিতে না পারি
জলেতে লুটালাে মরি
জলে পড়লাে গাে !
চতুরের সনে করিতে পীরিতি
রাধারাণী জলে পড়লাে গাে !
৫৪
তটিনীর বিচার
আহা, সােনার কমল সন্তরি চলে
যমুনার নীল নীরে
সে যে কমলিনী নয় কমলিনী রাধা
চেয়ে দেখ ওঠে তীরে
সে যে সিক্ত সজল সুনীল বসন
অঙ্গে দিতেছে টানি
তার অরুণ বরণ অঙ্গ চুমিয়া
কঁদিছে বসন খানি
যেন অঙ্গ-লাবণি উছলে পড়ে
ও তনু কমলে মধু টলমল
অঙ্গ লাবণি উছলি পড়ে
সে যে মােহনিয়া চঁাদ সুনীল মেঘের কোলে
সে রূপ হেরিতে লাখ মদনের
উতলা হৃদয় ভােলে।
বেড়াইতে বেড়াইতে অন্য দিকে চলিয়া গেল। তটিনী
প্রবেশ করিল। তার পরণে পা-জামা, গায়ে সিল্কের
পাঞ্জাবী। খোলা চুল। মাথায় নীল রুমাল বঁাধা,
হাতে একটা ক্রিসেনন্থিমাম। বসিবার জায়গার
কাছে আসিয়া সে ফুলটি মাথায় গুজিবার চেষ্টা করিতে
লাগিল। শৈলেশ ধীরে ধীরে পিছনে আসিয়া
তটিনীর বিচার
দাঁড়াইল। তটিনীর হাতের ফুলটি পড়িয়া গেল।
সে ফুলটি তুলিয়া লইতে নীচু হইল।
শৈলেশ। May I help you?
তটিনী। আপনি!
শৈলেশ ফুলটি তুলিয়া লইয়া কহিল ?
শৈলেশ। আপনি।
তটিনী। আপনি ভেবেছিলেন ললিতা ?
C1621* ! No, I thought a fairy had come down from
the sky above,
Olcati A fairy in Pyjama and Punjabi !
খিলখিল করিয়া হাসিয় উঠিল।
শৈলেশ। বেশ মানিয়েছে।
তটিনী। না মানালেও উপায় নেই। বসন্তকে বললুম ভিজে কাপড়ে
কতক্ষণ থাকবে। একখানা ধুতি দাও। তা এখানকার ওর ওয়ার্ডরােবে
ধুতি একখানাও নেই। জানালার পর্দার চেয়ে এ ঢের ভাল মনে করে
এই-ই পরে ফেলুন। বসন্ত নৌকো চালাতে কিছু জানে না।
শৈলেশ। আনাড়ী মাঝির নৌকোয় চাপা বিপজ্জনক।
তটিনী। আমি কি জান্তুম ?
শৈলেশ। এই বার ত জানলেন !
তটিনী। ভাগ্যিস আপনারা নৌকো নিয়ে গেলেন। নইলে ডুবেই
যেতুম।
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। ফুলটি আপনার মাথায় পরিয়ে দিতে দেবেন ?
তটিনী। দিন না।
শৈলেশ ফুলটি পরাইতে লাগিল। ললিতা দূরে
দাঁড়াইল।
শৈলেশ। এ সৌভাগ্য যে আমার হবে তা ভাবিনি।
তটিনী। আপনি না থাকলে আজ ডুবেই মরতুম ।
শৈলেশ। এ কি তারই পুরস্কার !
তটিনী। না, কৃতজ্ঞতার পরিচয়।
ললিতা কাছে আগাইয়া আসিয়া কহিল
ললিতা। তটিনী দেবী এখন হয়ত বেশ সুস্থ হয়েছেন!
তটিনী। আসুন, আসুন। শৈলেশবাবুকে আমি একটু খাটিয়ে
নিলুম।
' ললিতা। আপনার চন্দ্রমল্লিকাগুলাে দেখছিলুম। সুন্দর ফুল ।
তটিনী। শৈলেশবাবু, এনে দিন না ওঁকে।
শৈলেশ। কোথায় তা ত জানি না।
তটিনী। ওই যে ওদিকটায় গেলেই দেখতে পাবেন।
শৈলেশ চলিয়া গেল।
শৈলেশবাবু লােকটি বেশ। মেয়েদের ফাই-ফরমাস খাটতে খুব তার
উৎসাহ! Quile harmless !
ললিতা। আপনারা ত একসঙ্গেই পড়েন?
তটিনীর বিচার তটিনী। হঁ্যা। বেশ ভালাে ছেলে। first class পাবেই। ললিতা। বেশী দিন আর ভালাে থাকবে না। তটিনী। আপনি মাষ্টারি করেন, তাই ছেলে দেখলেই তার merit বুঝতে পারেন। আপনার মাথা ধরা সেরে গেছে ? ললিতা। হাঁ। তটিনী। আপনি বসুন, শৈলেশবাবু ফুল আনতে গেছেন। ললিতা। বসন্ত কোথায় পালালো? তটিনী। সে কিচেনে ঢুকেচে। Fowl এর ভাল একটা preparation নাকি তার জানা আছে। খেয়ে দেখলেই ওস্তাদি বুঝতে পারবেন। ললিতা। Fowl আমি খাই না। তটিনী। সে কি! ললিতা। হুঁ। তটিনী। ও জানে ? ললিতা। কে ! তটিনী। বসন্ত ? ললিতা। না জানবার কথা নয়। তটিনী। না, না, নিশ্চিন্ত থাকবার কথাও নয়। আমি বলে আসি। তটিনী চলিয়া গেল। ললিতা। গাছে না উঠতেই এক কঁদি, গিন্নিপানা এরই মাঝে সুরু। শৈলেশ চন্দ্রমল্লিকা হাতে লইয়া আগাইয়া আসিল। শৈলেশ। তটিনী দেবী চলে গেছেন? ৫৮
তটিনীর বিচার
ললিতা। হাঁ, আপনি আসচেন জেনেও।
শৈলেশ। এই নিন আপনার চন্দ্রমল্লিকা।
ললিতা ফুলটি লইল।
ললিতা। কেমন, সুন্দর নয় ?
শৈলেশ। সুন্দর!
ললিতা। দেখুন, দেখুন, পাপড়ির সঙ্গে পাপড়ির কি আশ্চর্য মিলন।
শৈলেশ। হাঁ।
ললিতা। কি ভাবছেন বলুন ।
শৈলেশ। ওই যে! পাপড়ির সঙ্গে পাপড়ির কি আশ্চর্য মিলন !
জানেন ললিতা দেবী, বটানিতে ওকে বলে Inflorescence, গাঁদা ফুল,
আনারস এমন কি চালতাকেও ওই একই জাতের বলা চলে।
ললিতা। চালতা !
শৈলেশ। হাঁ, চালতা।
ললিতা তাহার দিকে চাহিল, তারপর ফুলটি ফেলিয়া দিল।
শৈলেশ। আপনি এখানেই থাকবেন ত? বসন্তর সঙ্গে আমার
জরুরি কাজ আছে।
• তা। তটিনীর সঙ্গে নয় ?
শৈলেশ। আমি এখুনই আসছি।
বসন্ত প্রবেশ করিল।
।
বসন্ত। তুমি একা বসে আছ ? শৈলেশ কোথায়?
ললিতা। তােমারই নাম করে তটিনীর খোজে গেছে।
তটিনীর বিচার
বসন্ত। শৈলেশকে কেমন লাগল?
ললিতা। চমৎকার। নানা বিজ্ঞানে জ্ঞান আছে দেখলুম।
বসন্ত। সে কি! সে যে literatureএর student.
ললিতা। তাইত বিজ্ঞান সম্বন্ধে কথা কইবার অধিকার তারই
সবচেয়ে বেশী ।
বসন্ত। আমি ওদের নিয়ে আসি।
ললিতা। বেশ!
বসন্ত। যাব আর আসব। তােমাকে বেশীক্ষণ একা থাকতে হবে না।
বসন্ত চলিয়া গেল।
ললিতা। সবাই মিলে বুঝিয়ে দিচ্ছে, I am an unwelcomeguest.
একা ফেলে কাজের ছলে চরকির মত সব ঘুরচে। I must get away.
উঠিয়া দাড়াইল। শৈলেশ আসিল। ললিতা যে
ফুলটি ফেলিয়া দিয়াছিল, তাহা কুড়াইয়া লইল।
শৈলেশ। ফুলটা আপনি ফেলে দিয়েছেন!
ললিতা। আপনি তুলে নিলেন কেন?
শৈলেশ। গাছ থেকে আমিই তুলে এনেছিলুম বলে।
ললিতা। সত্যি করে বলুনত, আমার হাতে দিয়ে কি অলিখুলী,
হয়েছিলেন ?
শৈলেশ। নিশ্চয়! ফুল আপনাদেরই হাতে মানায়।
ললিতা। দিন তবে।
শৈলেশের হাত হইতে ফুলটী লইয়া কুটিকুটি . করিয়া
ছিড়িয়া ছড়াইয়া দিল।
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। ওকি করলেন?
ললিতা। ঠিক কাজই করলুম। তটিনীর ইঙ্গিতে আপনার দেওয়া
ও-ফুল ছিল আমারই লাঞ্ছনার পরিচয়।
বেগে চলিয়া গেল।
শৈলেশ। শুনুন, শুনুন, ললিতা দেবী, শুনুন:
শৈলেশও তাহার পিছনে পিছনে গেল, অন্য দিক দিয়া
বসন্ত প্রবেশ করিল, পিছনে তটিনী। বসন্ত হাত দিয়া
শৈলেশদের দিকে দেখাইয়া কহিল
বসন্ত। Look the fun, Tatini. Look the fun!
তটিনী। ওকি! ওরা অমন করে ছুটে চলেছে কোথায় ?
বসন্ত। লুকোচুরি খেলচে !
তটিনী খিল খিল করিয়া হাসিল
A very rapid progress! Almost galloping. f 79 ?
তটিনী।
চল ওদিকে। আমাদের দেখলে লজ্জা পাবে।
মঞ্চের পুরােভাগে অগ্রসর হইতে হইতে কহিল
বাত। বেচারা শৈলেশকে কোন মেয়েই সইতে পারে না, শুধু
ললিতাই পারল।
দুইজনেই পাশাপাশি একখানা বেঞ্চে বসিল।
আচ্ছা তটিনী, আমরা আর কতদিন পৃথক থাকব?
তটিনী।: বাঃ রে ! দিনের মাঝে পাঁচ-ছয় ঘণ্টাই ত আমরা একসঙ্গে
থাকি।
তটিনীর বিচার
বসন্ত। তুমি মত দাও আমি বিয়ের সব ব্যবস্থা করে ফেলি।
তটিনী। তােমার মায়ের যে অমত রয়েছে।
বসন্ত। মাকে আমি রাজী করাবেই। বল, তাই করি ?
তটিনী। তােমার যা ইচ্ছে।
তটিনী মুখ নীচু করিল। বসন্ত আঙ্গুল দিয়া তাহার
চিবুক তুলিয়া ধরিয়া কহিল ।
বসন্ত। দুষ্ট! তােমার বুঝি ইচ্ছে নেই ?
তটিনী। আমি আরাে অপেক্ষা করতে পারি।
বসন্ত। আমি আর পারি না।
তটিনী হাসিল, সেই হাসির সহিত কণ্ঠ মিলাইয়া একটা
পাপিয়া ডাকিল।
obati You are charming, spring!
তটিনী চারিদিকে চাহিল।
:
।
বসত। আজ রাস পূর্ণিমা, তটিনী।
তটিনী। চুপ কর। কথা
ক’য়াে না। এই জোছনায় ঢাকা
পৃথিবীর দিকে চুপ করে চেয়ে থাক।
বসন্ত। আমার চোখে, আমার মনের পটে, শুধু তােমারই ছবি ফুটে
ওঠে তটিনী। যেদিকে চাই শুধু তােমাকেই দেখি।
আবার পাপিয়া ডাকিল। তটিনী কোন কথা
কহিল না। যেন ভাবাবিষ্ট হইয়াই গান শুরু করিল।
সে গান খুব নীচু হইতে উচ্চে আরও উচ্চে উঠিয়া
৬২
তটিনীর বিচার
থামিয়া গেল। গান শেষ হইলেও দুজনাই চুপ
করিয়া রহিল।
তটিনীর গান
আকাশেতে ছিল চাদ বনতলে মল্লিকা
স্বপনবাসরে চলে দুজনার
নয়নে নয়নে লিখা
আকাশের চাদ বনের মল্লিকা।
মল্লিকা বলে, “আমারে যেওনা ভুলি”
চাদ চেয়ে রয় আবেশে নয়ন তুলি
নিশীথের চাদ একে দেয় চুমে
কুসুমের ললাটিকা
আকাশের চঁাদ বনের মল্লিকা।
চাদ বলে, “এস আকাশে রচিব নীড়”
মল্লিকা বলে, “রচিব-স্বর
ধূলিতলে ধরণীর”।
সেথা দুইজনে দুজনার লাগি
রচিব স্বপন সারা নিশি জাগি,
চঁাদ আর মধু মল্লিকা রচে
মিলনের গীতিকা।
আকাশের চাদ বনের মল্লিকা।
তটিনীর বিচার
বসন্ত। আজ সারা রাত আমরা এই ভাবেই কাটিয়ে দেব।
তটিনী। এই! তােমার অতিথিদের কোন খবর নেওয়া হচ্ছে না।
তারা কি ভাবছে বলত ?
বসন্ত। আমাদের কথা ভাববার অবসর তাদের নেই।
তটিনী। চল, দেখি তারা কোথায় আছে, কি করচে।
বসন্ত। কিচ্ছু ভেবাে না। এতক্ষণ আমরা যা করছিলুম, তারাও
পরমানন্দে তাই করচে।
তাহারা পিছন দিকে গেল, মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
ললিতার ঘর
ললিতা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে আর কলিকা বসিয়া আছে।
কলিকা। যা খুসী তাই করছে, কেউ বাধা দিচ্ছে না।
ললিতা। বা কে দেবে! দুজনারই রয়েছে শুধু বিধবা মা।
টাকারও অভাব নেই। তাই দুলাল আর দুলালী ঢলাঢলি করচেন।
কলিকা। এতে যে আমাদের শুধু নিন্দার ভাগী হতে হবে।
ললিতা। করুক ওদের যা ইচ্ছে তাই। কিন্তু আমাকে এভাবে
অপমান করৰার অর্থ কি ? তােকে বলব কি, কলি, এমন জঘন্য ব্যবহার
করল আমার সঙ্গে যে, আমার প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল ছুটে সেখান
থেকে চলে আসি। আসতেও হােললা তাই। কে এক শৈলেশ ওদের
বন্ধু, সে আবার মনে করে আমি তার প্রেমের প্রত্যাশী ! ছিঃ ! ছিঃ !
৬৪
তটিনীর বিচার
!,
কলিকা। তুমি ভাই ওদের দলে মিশাে না। শেষটায় একটা
scandal ছড়িয়ে পড়ক আর তােমার চাকরিটি বাক।
ললিতা। ওদের সঙ্গে মিশবে না এটা ঠিক, তবে আমিও বুঝিয়ে
দোব আমি সহজ মেয়ে নই। বসন্ত বলে আমি বড় শান্ত মেয়ে। কিন্তু
আমার আর একটা দিক সে আজও দেখেনি। সে ভাবছে সব মেয়েই
তটিনীর মত কোকেট, তটিনীর মতাে shameless flirt ; আমি তাকে
বুঝিয়ে দেব যে আজকার দিনে এমন মেয়েও জন্মেছে who is as
hard and as sharp as a steel bayonet.
ঘরের মাঝে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
একদিন জানিয়েছিলে, ভালােবাসি। তা যে মিথ্যে ছিল, তাও না হয়
বােঝালে। কিন্তু কি অধিকার আছে তােমার মনে করবার, যে তুমি
ইচ্ছে করলেই তােমার বন্ধুকে তােমার যায়গায় বহাল করতে পার ?
তােমাকে পেলুম না বলে তােমার বন্ধুর কাছে করব আত্মসমর্পণ !
আমার ভালবাসার এত বড় অমৰ্যাদাও তুমি করতে পারলে !
পর্কিং সিয়া একখানা চিঠি দিল।
পরিচারিকা। আপনার এই চিঠি দিদিমণি। একটী বাবু দিয়ে
গেলেম।
ললিতা চিঠি খান খুলিয়া পড়িল।
ললিতা ভাই কলি, এ চিঠির অর্থ কি ?
কলিকা চিঠি পড়িতে লাগিল।
কলিকা। কাল বিকেল পাঁচটায় উপরের ঠিকানায় যদি উপস্থিত
থাকেন, তাহলে আপনি উপকৃত হবেন। নাম নেই দেখছি।
৬৫
তটিনীর.বিচার
ললিতা। কে লিখেচে ? আজকেই এ চিঠি কেন পাঠালে ? সেই
শৈলেশ কি ?
কলিকা। যেই হােক, যে কারণেই লিখুক, তুমি যেয়াে না।
ললিতা। না, আমি যাব। হয়ত এমন কেউ যে আমার কাটা
উপড়ে ফেলতে আমাকে সাহায্য করবে। আমি যাব, যব, নিশ্চয় যাব ।
অন্ততঃ দেখে আসব লােকটি কে।
মগ্ন ঘুরিয়া গেল।
তটিনার ঘর
পরিচারিকা ঘর গুছাইতেছে, তটিনী দুয়ারের কাছে দাঁড়াইল।
পরিচারিকা। ওমা, কে গাে !
তটিনী ঘরে ঢুকিল ।
তটিনী। কিলা, ভূত দেখলি নাকি ?
পরিচারিকা। দিদিমণি, তুমি ! আমি ভেবেছিx ব্যাটাছেলে
কেউ...
তটিনী। আরে! তুই-ও তাহলে ব্যাটাছেলের স্বপন দেখিস?
পরিচারিকা। কি পােষাক। মাগাে !
তটিনী। মা কোথায় রে, ঘুমিয়েছে নাকি!
পরিচারিকা। ঘুম কি আছে তােমার নেগে?
তটিনীর বিচার
তটিনী। যা ঢের কাজ হয়েছে। এবার যা দিকিনি।
পরিচারিকা। ওই গাে মা এসেছেন।
কৃষ্ণভামিনী আসিয়া দরজার কাছে দাড়াইল।
তটিনী। মা, তুমি ঘুমােও নি?
মা কোন কথা কহিল না।
।
ওকি ! চিন্তে পারচনা নাকি!
কৃষ্ণভামিনী। দিন দিন কি হয়ে যাচ্ছিস বল ত? ও আবার কি
পােষাক তাের ? এর পরে কোন দিন গোঁফ লাগিয়ে পথে বেরুবি !
তটিনী। জলে পড়ে গেছলুম, মা। হয়ত মরেই যেতুম ।
কৃষ্ণভামিনী। যা তা বলবি তুই ।
তটিনী। সত্যি মা। এক ভদ্রলােক টেনে তার নৌকোয় তুল্লেন,
তাই তােমার মেয়েকে আবার দেখতে পেলে। নইলে এতক্ষণ খবর পৌঁছে ,
যেত। আর তুমি কেঁদে কেটে পাড়ার লােকদের ঘুমুতে দিতে না।
কৃষ্ণভামিনী ফের ওই সব কথা কইরি
তটিনী। সত্যি মা ডুবে যেতুম ।
কৃষ্ণভামিনী। জানিনা কত দুঃখ আমার কপালে আছে।
তটিনী মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল ।
।
তটিনী। মা তােমার দুঃখ এবার দূর করব। এবার আমি বিয়ে
করব।'
কৃষ্ণভামিনী। বিয়ে আর তাের হয়েছে !
তটিনীর বিচার
তটিনী। সত্যি বলচি মা। আর পড়াশুনাে করব না। বিয়ে করে
ঘর-সংসারে মন দোব।
কৃষ্ণভামিনী। তাহলে তাদের খপর দি ?
তটিনী। খপর কাউকে দিতে হবে না। চুপি চুপি বিয়ে হবে। আর
হিন্দুমতেও নয়।
কৃষ্ণাভামিনী। হিন্দুর মেয়ে বিয়ে হবে অহিন্দু মতে। তুই বলিস কি !
তটিনী। হােলােই বা।
কৃষ্ণভামিনী। না, তা হবেনা, হতে পারে না।
তটিনী। কেন হতে পারে না শুনি?
কৃষ্ণভামিনী। এ বংশে ও সব অনাচার কোন দিন হয়নি।
তটিনী'। এ বংশের কোনাে মেয়ে কোনােকালে এম-এ পড়েছিল ?
কোনদিন পাচীলের বাইরে উকি মেরে দেখেছিল পৃথিবী কেমন করে
চলছে ?
কৃষ্ণভামিনী। এম-এ পড়ে তুই যেন সকলের মাথা কিনে নিয়েচিস !
যতসব অনাচার, অহি, আচরণ, অসভ্য ব্যবহার।
তটিনী। অসভ্য ব্যবহার কি তুমি দেখলে ?
কৃষ্ণভামিনী। এইত দেখচি চোখের সামে, পাজামা আর পাঞ্জাবী:
পরে রাত দুপুরে কোথা থেকে তুই এলি ? এইত,শুনচি হিন্দু, মুসে তুই
বিয়ে করবিনে।
তটিনী। আমি তােমাকে বলচি মা, তােমার ওই আচার অনাচারের,
ধৰ্ম্ম অধৰ্ম্মের কোন ধার আমি ধারিনা। আমি নিজে যা ভালাে বুঝব,
তাই আমি করব—কারু নিষেধ শুনবনা।
৬৮
তটিনীর বিচার
কৃষ্ণভামিনী। আমি যদি তাের নিজের মা হতুম, তাহলে তুই আজ
আমাকে এমন কথা বলতে পারতিস না। এমি নির্মম ব্যবহার করে তাের
বাপ আমার বােনকে মেরে ফেলে। আর তুই যদি আজ তাের মাসিকে
মেরে ফেলতে না পারিস, তাহলে সেই বাপেরই যে সন্তান, তার পরিচয়
কেমন করে দিবি?
তটিনী। কি বল্লে মা! তুমি কি বল্লে ? তুমি আমার মা নও!
দুইজনে স্তব্ধ হইয়া রহিল। তারপর তটিনী ধীরে
ধীরে মায়ের কাছে আসিল, কৃষ্ণভামিনী তাহার
মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিল।
কৃষ্ণভামিনী। গর্ভে ধরিনি বলেই কি তুই আমায় মা ডাকা ছেড়ে
দিবি, খুকী ?
তটিনী। তুমি আমার মা নও, মায়ের বােন--তা আগে কেন
বলনি ?
কৃষ্ণভামিনী। তাের মা হয়ে থাকবার লােভে রে খুকী, তাের মা •
হয়ে থাকবার লােভে।
-সরিয়া গি টেবিলে ভর দিয় দাড়াইল ।
তটিনী। এই বাড়ী, ঘর, বিষয়-সম্পত্তি কিছুই আমার নয়?
কষ্ণভামিনী। আমারও নয় মা। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন
আমার। তারপর.....
তটিনী। তারপর ?
কৃষ্ণভামিনী। আমার এক দেওরের ছেলের। তাইত তার সঙ্গেই
তাের বিয়ে দিয়ে এ সংসারে তােকেই প্রতিষ্ঠা করে রেখে যেতে চাই।
তটিনীর বিচার
তটিনী। আমার মা দেখতে কেমন ছিলেন ?
কৃষ্ণভামিনী। ফোটো তত তাের সাম্নেই রয়েছে।
তটিনী। ওই আমার মায়ের ফোটো! কোনদিন তুমি বলনি !
তাড়াতাড়ি একখানি ফোটো দেওয়াল হইতে
খুলিয়া লইয়া
আমার মা! আমার মা !
ফোটোখানি দেখিতে লাগিল, তাহার চোখ দিয়া
জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
আমার মা কতদিন আগে মারা গিয়েচেন ?
কৃষ্ণভামিনী। প্রায় উনিশ বছর আগে। তখন তুই আট মাসের
মেয়ে।
তটিনী। তারপর ?
কৃষ্ণভামিনী। তারপর কি ?
তটিনী। আমাকে সব কথা খুলে বল। আমার মায়ের কথা, আমার
বাবার কথা।
কৃষ্ণভামিনী বিহুৰ বসিয়া কহিল,
কৃষ্ণভামিনী। সে সব কথা বলতে কি আমার ভালাে লাগে ?
তটিনী। তবুও বল মা।
কৃষ্ণভামিনী চুপ করিয়া শূন্যে দৃষ্টি ভাসাইয়া চাহিয়া
রহিল।
৭০
তটিনীর বিচার
।
তটিনী। বল।
কৃষ্ণভামিনী। প্রায় উনিশ বছর আগেকার কথা। সেদিন সন্ধ্যে
থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। তাের মেসসা এই ঘরে বসে ভাগবত পড়ে আমাকে
শােনাচ্ছিলেন। রাত তখন প্রায় দশটা। বাইরে একখানা গাড়ী এসে থামল।
তটিনী।
কে এল মা ?
কৃষ্ণভামিনী। এত দুর্যোগে কে এল তাই বলা কওয়া করছি, এমন
সময় তােকে বুকে চেপে ধরে ঘরে ঢুকল তাের মা। দু’বছর পরে দেখা।
তার চেহারা এমন হয়ে গেছে যে আমি চিন্তেই পারলুম না।
তটিনী। তারপর, মা, তারপর ?
কৃষ্ণভামিনী। তাের মেসে বল্লেন, ওগাে দেখচ কি, ওবে আমাদের
শৈল ! ওকে ধর। ও কাপচে। আমি ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলুন।
সে কথাটিও কইল না। তােকে আমার কোলে তুলে দিল। তুই তখন
শীতে হিম হয়ে গিয়েছিলি। আমি আগুন জ্বেলে তােকে লেক দিতে
লাগলুম। তাের মেসসা শৈলকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। সেই যে
শুলাে, আর উঠল না! তাের মেসসা বড় বড় ডাক্তার এনে দেখালেন।
কেউ কিছু করতে পারল না !
কৃষ্ণভামিনী আঁচল দিয়া চোখ ঢাকি। তটিনীও
চুপ করিয়া বসিয়া রহিল, তাহারও দুর্গা বহিয়া
জল পড়িতেছে।
তটিনী। আর আমার বাবা?
কৃষ্ণভামিনী। তার কথা তুই আমায় জিজ্ঞাসা করিসনি খুকী।
এইটুকু দয়া তুই কর।
৭১
তটিনীর বিচার
তটিনী। আমার মায়ের উপর খুবই বুঝি পীড়ন করতেন?
কৃষ্ণভামিনী। মানুষ যে মানুষকে এমন পীড়ন করতে পারে, তা
আমি জান্তুম না, মা। সংসারে সে চিনত শুধু টাকা দরকার হলে
টাকার জন্য সে মানুষও খুন করতে পারত। তাের মা থাকতে ওই রকম
কি একটা মামলায় সে-পড়েও ছিল। কিন্তু প্রমাণের অভাবে সে খালাস
পায়। খালাস পেয়ে আরাে দুর্দান্ত হয়ে উঠল। তারপর বোধ হয় আবার
কোন কাণ্ড করে প্রাণ বাঁচাবার জন্যে গা-ঢাকা দিল।
তটিনী। আর আমার মা ?
কৃষ্ণভামিনী। যতদিন পারা যায়, তাের মা তারই পথ চেয়ে স্বামীর
ভিটোতই পড়ে রইল। শেষে অভাব অনাটন সইতে না পেরে এখানে
চলে এল। তাের মা চিরদিনের জন্যে চলে
চলে গেল, তোর বাপ
আজও এলোনা !
তটিনী,। সেই বাপের মেয়েকে তুমি বুকে করে মানুষ করে তুল্লে ?
কৃষ্ণভামিনী। না। মানুষ করে তুলুম আমার বােনের মেয়েকে।
তটিনী মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল ।
তটিনী। তুমিই আমার মা, আমার সত্যিকারের মা। কিন্তু মা, সব
জেনে শুনেও তুমি এত বড় ভুল কেন করলে ?
কৃষ্ণভামিনী। কি ভুল করিচি?
তটিনী। কেন আমাকে লেখাপড়া শেখালে, কেন এই সব বিলাসের
উপকরণ যােগালে, কেন আমায় বুঝতে দিলে ইচ্ছে মত চলবার ফেরবার,
টাকা-পয়সা খরচ করবার অধিকার আমার আছে ?
৭২
••
তটিনীর বিচার
কৃষ্ণভামিনী। তুই কি বলচিস খুকী ?
তটিনী। যদি দুবেলা শুধু দু-মুঠো ভাত দিতে আর উঠতে বসতে
বকুনি দিতে, তাতেই আমার ভাল হােতাে।
কৃষ্ণভামিনী। তাতেই তাের ভাল হােত !
তটিনী। হয়ত হােতাে। হয়ত তার ফলে আমার দেহে আমার বাবার
যে রক্ত রয়েছে, তা এতটা উষ্ণ হয়ে উঠতে পারত না।
কৃষ্ণভামিনী। ও-কথা তুই বলিসনি, খুকী। ভাল করে বুঝতে
পারি না বলে আমার ভয় হয়।
তটিনী। তােমাকে কখনাে বলিনি, কিন্তু নিজে অনুভব করে বিস্মিত
হয়েচি, মা, উচ্ছঙ্খলতা আমায় টানে, অনাচার আমাকে লােভ দেখায়,
পাপ যেন হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকে।
কৃষ্ণভামিনী। ওরে না, না, না।
তটিনী। তােমার কথা ভেবে আমি নিজেকে সামলে চলি। সামলে
চলি আর কেবলই ভাবি কেন এমন হয়। আজ বুঝতে পারলুম অনাচ
বাপের রক্ত আমার শিরায় শিরায় কলুষ ঢেলে দিয়েছে বলেই মন আমার
নীচু পানে ধেয়ে যায়।
কৃষ্ণভামিনী। তুই ত কোন অন্যায় কাজ করিসনি, খুকী ?
তটিনী। না। তা করিনি। কেন করিনি? ইচ্ছের অভাবে নয়
জেনাে। তােমার পরশ, তােমার প্রভাব, তােমার স্নেহ, তােমার
ভালবাসা, রক্ষা কবচের মত আমাকে বাঁচিয়ে রেখেচে মা।
কৃষ্ণভামিনী। চিরদিনই তাই রাখবে, খুকী।
তটিনী। কিন্তু আমি ত আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি না, মা। আমায়
তটিনীর বিচার
একটা কিছু করতে হবে একটা কিছু আকস্মিক...একটা কিছু
decisive...
টেলিফোন বাজিল, তটিনী সেই দিকে চাহিয়া দেখিল ।
আবার বাজিল। তটিনী গিয়া রিসিভার তুলিল।
বসন্ত ? হঁ্যা, বল।
শুনিয়া একবার চমকাইয়া উঠিল।
আঁ! মা মত দিয়েছেন!
উত্তেজনায় কাপিতে লাগিল, চোখ দিয়া তাহার জল
পড়িতে লাগিল।
আtি..আমি•••এখন কিছু বলতে পারব না..না.•••••••
আবার শুনিতে লাগিল।
ওগে না, না, এসাে না। তােমার পায়ে পড়ি তুমি এসাে না শুনবে
না ?...কিন্তু এলেও আমার দেখা পাবে না। না..না..
আবার শুনিতে লাগিল।
কাদচি কেন ?..কাদচি..কাদচি...কাদতে হয় বলে:• জীবনে হাসি আর
কান্না আলাে আর আঁধারের মত ঘুরে ফিরে আসে বলে। এতদিন শুধুই
হেসেছি, আজ থেকে কান্নার পালা শুরু।
আবার শুনিল ।
কাল..'কাল সব খুলে বলব...আজ আমি পারছি না ।.. আমায়
তুমি মাপ কর।
৭৪
তটিনীর বিচার
রিসিভার রাখিয়া দিয়া শক্ত করিয়া চাপিয়া ধরিয়া
কাদিতে লাগিল। কৃষ্ণভামিনী উঠিয়া তাহার কাছে
গেল। তাহার পিঠে হাত দিয়া কহিল ।
কৃষ্ণভামিনী। কে ফোন করছিল রে! সেই ছেলেটি ?
তটিনী মায়ের গলা ধরিয়া করাইয়া কাঁদিয়া উঠিল ।
কাদিসনে খুকী। হিন্দুমতে যদি বিয়ে না-ই হতে পারে, তাহলে
যে-কোন মতে তােরা বিয়ে কর। আমি বাধা দেব না, আশীৰ্বাদই করব।
দে, তাকে ফোন করে দে। সে এখানে আসুক।' আমি তাকে
একবার দেখি ।
তটিনী। ও-কথা এখন থাক মা।
সরিয়া গিয়া আবার মায়ের ফোটো তুলিয়া লইয়া $খিত
লাগিল।
কৃষ্ণভামিনীর কাছে আগাইয়া আলি।
তটিনী। আমার বাবার চেহারার সঙ্গে আমার কি খুব মিল আছে।
কৃষ্ণভামিনী। সেই কতকাল আগে তাকে দেখেছিলুম। চেহাবা
আমার ভাল মনে নাই।
তটিনী। যদি হঠাৎ কোনদিন এসে আমাকে নিয়ে যেতে চান, তুমি
কি আমায় ছেড়ে দেবে?
কৃষ্ণভামিনী। বােস, বােস, আমার কোলের কাছটিতে বােস, মা-।
* টানিয়া লইয়া কাছে বসাইল। আঁচল দিয়া চোখ মুছাইয়া
দিল।
হারে, ছেলেটি বেশ সুন্দর ত ?
",
৭৫
তটিনীর বিচার
।
তটিনী উঠিয়া সঁাড়াইয়া কহিল ।
তটিনী। আমার বাবা আমার কোন খবর নেননি?
কৃষ্ণভামিনী। ও-কথা কি তুই আজ ভুলবিনে !
তটিনী। ভুলতে যে পিরচিনে..ভুলতে পারচিনে মা.. আমি
ভুলতে পারচিনে...
ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
কৃষ্ণভামিনী। যারা তােক ছেড়ে গেল, তারাই হঠাৎ এতাে বড়
হয়ে উঠল যে, তাদের কথা তুই আর কিছুতেই ভুলতে পারছিস নে ?
তটিনী। জীবনের এই পরিচয়••একি ভােলা যায়, মা? আমার
বাআমার মায়ের মৃত্যুর কারণ, আমার বাবা একজন criminal,
আই; কে ফাকি দেবার জন্য আজ ফেরারী। আমার এই পরিচয় পাওয়া-
মাই ভুলে যাব ! বড়লােকের মেয়ে জেনে যারা আমার সঙ্গে মিশত,
সম্রান্ত বংশের সন্তান জেনে যারা আমাকে সম্রম করত, আজ আমি কোন
* তাদের সাম্নে গিয়ে দাড়াক।
।
ছুটিয়া মায়ের কাছে গিয়া।
সত্যি করে বলত মা, তােমার বােনকে যে পীড়ন করে মেরে ফেল্ল,
তারই সন্তানকে যখন তুমি বুকে করে রাখতে, তখন তােমার বুক কি
জ্বলে পুড়ে যেত না?
কৃষ্ণভামিনী কোন কথা কহিল না।
৭৬
তটিনীর বিচার
জবাব দিতে তােমার ভয় হচ্ছে। ভয় নেই মা। আমি তােমার স্নেহের
অমৰ্য্যাদা করবনা। আমি বুঝি, আমার জন্যে তােমাকে মুখ বুজে কত
সইতে হয়েছে। আমি বুঝি মা, আমি তা বুঝি।
মাকে আদর করিতে লাগিল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
নারী-প্রগতি সঞ্জ
ললিতা আর ডাক্তার ভেস।
ভােস। আমি বুঝি না, এ তাচ্ছিল্যে কত ব্যথা তা আমি বুলি।
কিন্তু কি করব মা? তােমরা বাঙালীর মেয়ে, তােমাদের যে বুক ফটে
তবুও মুখ ফোটে না। কান্নাই হােল তােমাদের চরম প্রতিবাদ।
হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
ললিতা মুখ নীচু করিয়া শুনিতেছিল, ডাক্টরের হাসি
শুনিয়া চমকাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
ভয় পেলে নাকি?
ললিতা। হ্যা। ..অ করে আপনি হাসবেন না।
ভােস। হা! হা! হা! হা! সরল লােকের এই সহজ হাসি ।
তুমি সইতে পারনা? বোস মা, বােস, বােস।
ললিতা বাসল।
হাঁ, মেয়ে দেখে এলুম ওদেশে। শিকাগােয় সাত বছর ছিলুম কিনা ।
মেয়ে নয়ত আগুনের শিখা। যে ফিল্ডে ফেলে দাও দেখবে প্রতি
৭৭
তটিনীর বিচার ‘দীপ্তি! লেখা পড়ায় বল, খেলা ধূলােয় বল, সেবা শুশ্রুষায় বল, কাজ- কৰ্ম্মে বল, পুরুষের পিছনে কোথাও পড়ে থাকবার পাত্রী নয়। এমন কি Gangstarদের দলে যাও, দেখবে বিদ্যুত বরণী সব বিদুষী। হাঃ! হা! হা! হা! ললিতা। ও-কথা থাক। এখন আমাকে আপনি যে সাহায্য করবেন বলেছিলেন তার কথাই বলুন। ভােস। অন্যায়ের প্রতিকার যদি করতে চাও, তাহলে তাদের মত হও। তা যদি না পার, তাহলে যাও ঘরের কোণে ঘােমটা টেনে বসে কগে। ললিতা। প্রতিকারই ত আমি চাই। ভোস। এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়ে যাবে না? ললিতা। তাহলে এত সহজে এগিয়ে আসতুম না। ভােস ব্যাগ খুলিয়া একখানি কাগজ বাহির করিল। নে। তবে সই কর কলম তুলিয়া দিল। ললিতা। কি লেখা আছে ?' ভােস। তুমি গ্রাজুয়েট। পড়তে জান, পড়ে খ। ললিতা পড়িয়া দেখিল। ললিত! না, না, এতটা আশা আমি করিনা। আমি শুধু প্রতি- শাধ চাই। ভােস। আশারও অতিরিক্ত অনেক কিছু পাবে। সই কর। ললিতা। কিন্তু এই টাকা? . 1. ৭৮
তটিনীর বিচার
ভােস। এখনত দিতে হচ্ছে না! বিয়ের পর সব কিছু যখন
তােমার আয়ত্তে আসবে, তখন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মত একটা শুভ
কাজে ওই সামান্য টাকা Only Ten Thousand Rupees দিতে
তােমার বাধবে না। সই কর।
ললিতা কলম লইল।
ললিতা। কিন্তু এতে তু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা লেখা নেই?
ভােস। তার কারণ আছে।
ললিতা কলম রাখিয়া দিল।
ললিতা। না, আমি সই করব না। আর আপনার সাহায্যও অমি
চাই না।
ললিতা উঠিয়া দাড় হল
দাড়াইল
ভাস। সাহায্য না চাও ভালােই। কিন্তু সই তােমা।
করতেই হবে।
ললিতা। যে শ্রেণীর মেয়ে মনে করে আপনি আমাকে ডে, ১
পাঠিয়েছিলেন, ঠিক সে শ্রেণীর মেয়ে আমি নই। সই আমি করব না।
ভােস। সই না করলে, --কাল সকালে এই খবরটি সারা সহরে
রটে যাবে।
ব্যাগ খুলিয়া আর একখানি কাগজ বাহির কন্দ্রিয়
ললিতার সাম্নে ধরিল। ললিতা কাখানা ছিনাইয়
লইয়া কহিল।
ললিতা। ' এই খবর ছাপা হবে ।
ভােস। হ, ভাল করে পড়ে দ্যাখ। কাল রাত বারােটার সঃ
তটিনীর বিচার
একটি শিক্ষিত বাঙালী তরুণীকে মত্ত অবস্থায় ময়দানের নিকট ঘুরিয়া
বেড়াইতে দেখিয়া পুলিস তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়াছে। অনুসন্ধানে জানা
গিয়াছে তরুণীর নাম ললিতা চ্যাটার্জী। সে নাকি স্থানীয় কোন
বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী।
ললিতা। নিন। এতে আমার ভয় পাবার কিছু নেই।
ভােস। তাই নাকি।
ললিতা না। কারণ প্রথমত রাত বারােটার অনেক আগেই
আমি বাের্ডিংয়ে গিয়ে হাজির হব, আর দ্বিতীয়ত পুলিসের কর্তারাও
প্রতিবাদ করবেন যে সংবাদ সত্য নয়।
{} ভােস। নাঃ। তােমার সাহস আছে। বুদ্ধিও আছে। এখন
সড়ি কর।
ললিতা। বল্লুম ত সই আমি করব না। আমাকে যেতে দিন।
ভােস তাহলে রাত বারােটায় ময়দানে মত্ত অবস্থায় ঘুরে
রোতে ইচ্ছে হচ্ছে ?
ডাক্তার ব্যাগ খুলিল।
ললিতা। নাঃ অসহ!
দুয়ারের দিকে অগ্রর হইল। ডাক্তার শুধু চাহিয়া
দেখিল। তারপর একটা হাইপােডমিক সিরিঞ্জ বাহির
করিল। ললিত দুয়ার খুলিবার চেষ্টা করিল কিন্তু
পারিল না। বাহির হইতে বন্ধ। দ্রুত ফিরিয়া
আসিয়া কহিল
জার খুলে দিতে বলুন।
তটিনীর বিচার
ডাক্তার চাহিয়া দেখিল, কোন কথা কহিল না। একটা
ainpule হইতে সিরিঞ্জ ওষুধ ভরিতে লাগিল।
আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না? দোর খুলে
দিতে
বলুন
ভােস। আগে সই কর।
ললিতা কোন কথা না বলিয়া ছুটিয়া গিয়া দরজায় আঘাত
করিতে লাগিল। ডাক্তার তাকে ধরিয়া টানিয়া
আনিল ।
আমি না বলা পর্যন্ত দোর কেউ খুলে দেবে না। তুমি দোর খুলতে চেষ্টা
করবে আর সেই অবসরে এই hypodermic syringeটা তােমার পিঠ
বিধিয়ে দোব, পিষ্টনটি ঠেলে দেব, আর পাঁচ মিনিটের মাঝে এ সুধ
তােমার রক্তের সঙ্গে মিশে তােমাকে মাতাল করে দেবে। তােমাণে তখন
একখানা গাড়ীতে করে নিয়ে রাত বারােটার সময় ময়দানে ছেড়ে দিয়ে
আসব, আর একটা সার্জেন্টকে তােমার খবরটা দিয়ে আসব । রাত
কাটাবে হাজতে আর তিনদিনের মাঝে মনেও করতে পারবে না এই ঘটল
চেষ্টা করলেই মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
ললিতা শুনিতেছিল আর ভয়ে কাঁপতেছিল।
ললিতা। উঃ ! এতৃবড় ভয়ানক লােক আপনি।
ভােস। এ তােমাদের য়ুনিভার্সিটির শিক্ষা নয়, শিকাগাের শিক্ষা।
সাত বছর, সেখানে ছিলুম কিনা হাঃ হাঃ! হাঃ ।
সিরিঞ্জ লইয়া ললিতার দিকে অগ্রসর হইল।
ললিতা। ওকি!
৮১
তটিনীর, বিচার
costal Only a subcutenous thrust will produce the
desired effect. হাঃ! হাঃ! হাঃ!
আরাে কাছে গেল।
ললিতা। না, না, না।
ভােস। না, না, না ?
ললিতা। না, না, না।
ভােস।, Well, I am giving you the last chance, সই কর।
ললিতা। দিন কলম। আমি সই করচি।
ভােস। That's like a good girl ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
কলম দিল। ললিতা তাহা লইয়া সই করিল।
ললিতা। এবার আমি যেতে পারি ?
কাগজখানা ভজি করিতে করিতে
ভােস । Most certainly you can.
ললিতা। তাহলে দোর খুলে দিন।
6941 Tarry a little, girl, Tarry !
কাগজখানা ব্যাগে বন্ধ করিয়া রাখিল।
সই যখন করেচ, তখন আর তােমার ভয় কি! টাকাটা তােমার স্বামীর কাছ
থেকে আমরাই আদায় করে নােব। সে কায়দ। আমাদের জানা আছে।
দরজায় গিয়া সাঙ্কেতিক শব্দ করিল। ফিরিয়া আসিতে
আসিতে কহিল
But beware. Don't you run to the Police. পুলিসে গিয়ে
কিছু লাগিও না। তাতে বড় সুবিধে হবে না। বুঝলে?
৮২
তটিনীর বিচার
সমর প্রবেশ করিল।
ওহে, ললিতা দেবীকে পৌছে দিয়ে এস। আর তুমি মা, এই ছেলেটিকে
চিনে রাখ। You will find him very helpful. .
সমর নমস্কার করিল।
ললিতা। আমি একাই যেতে পারব।
ভােস। A brave girl you are. হাঃ! হাঃ! ঘঃ !
এ!
ললিতা চলিয়া গেল ।
Follow her, you fool. থানায় যায় কিনা দ্যাখ। সােজা যদি
যায়, ভাববার যদি অবসর নেয়, তাহলে কখনাে আর যাবে না।
Go, go at once!
সমর চলিয়া গেল।
এক নম্বর সমর, দুই নম্বর এই ললিতা, this is far safer anel
better than to commit a murder. A hypodermic syringe
is a better weapon than a revolver !
সিরিঞ্জ-এর পিষ্টন ঠেলিয়া ওষধ ফেলিয়া দিতে লাগিল ;
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
৮৩
হােটেল
বসত তটিনীর অপেক্ষায় থাকিয়া থাকিয়া অধীর হইয়া
পায়চারি করিতেছে। তটিনী প্রবেশ করিল।
বসন্ত। আধঘণ্টার ওপর তােমার জন্যে অপেক্ষা করচি।
তটিনী। হ্যা, আমার আসতে দেরি হয়ে গেল।
বসন্ত। আজকের দিনেও তুমি দেরী করতে পারলে?
তটিনীকে বসিবার জন্য চেয়ার ঠেলিয়া দিল
আঢ়ি তু বিকেল থেকেই ঘড়ি দেখচি। আটটা আর বাজেনা।
তটিনী বসিল।
মা কি সহজে মত দ্যায়। আরাে ফ্যাচাঙে ফেল বুড়াে এটর্নীটা এসে। সে
বলে বসল বাবা উইল করে গেছেন। তাতে নাকি লিখে রেখে গেছেন
আমি যদি বর্ণাশ্রম মেনে না চলি, তাহলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরা-
ধিকারী হতে আমি পারব না। এটী ভাবলে সম্পত্তির ললাভে আমি
আমার এই রত্নটিকে ফেলে দোব।
তটিনী। তােমার বাবার সম্পত্তি তুমি পাবে না !
বসন্ত। আরে, নাইবা পেলুম। হাত পা রয়েছে, দেহের শক্তিরও
অভাব নেই, খেটে খাব। এটনীকে তাই শুনিয়ে দিলুম।
তটিনী। মা কি বল্লেন ?
বসন্ত। মা ত বৃন্দাবন চলে গেলেন!
৮৪
তটিনীর বিচার তটিনী। তবে যে তুমি বলে তিনি মত দিয়েছেন? বসন্ত। হঁ্যা, তিনি বলেচেন কর তাের যা ইচ্ছে তাই, আমি বৃন্দাবন চলে যাই। চলেই যখন গেলেন, তখন আমার ইচ্ছেমত কাজ আমি করবই। আর দেখ তটিনী, দাম না দিয়ে কোন ভালাে জিনিস পাওয়া যায় না। আমি যে তােমায় নােব, তার একটা দাম দোব না? বর্ণা- শ্রমের দাবী আমার অন্তরের দাবীর চেয়ে বড় হয়ে উঠবে কিসের জন্য ? মা রাগ করে চলে গেছেন, কতদিন তিনি আর রাগ করে থাকবেন? বিয়ে হয়ে গেছে শুনলেই নাতীর মুখ দেখবার জন্যে উতলা হয়ে ছুটে আসবেন। তটিনী অন্যদিকে মুখ ফিরাইল। , না, লজ্জার কথা নয়, সত্যি কথা। মা রাগ করে থাকবেন বৃন্দাবনে-- দুটো দিন যিনি আমায় ছেড়ে থাকতে পারেন না। তটিনী। এরকম বিয়েতে তােমার বাবারও স্পষ্ট নিষেধ রয়েছে। বসন্ত। সে নিষেধ লঙ্ঘন করলে সাজার যে ব্যবস্থা তিনি করে গেছেন, আমি তা মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। তটিনী। কিন্তু আমার জন্যে তুমি যে তােমার পৈত্রিক সম্পত্তি হারাবে তা হতে পারে না। বসন্ত। তটিনী এসব তুমি কিছু ভেবােনা। শুধু ভাব, আমরা দু'জন দু’জনকে চাই। আমাদের কাছে এর চেয়ে বড় কথা আর কিছু নেই। তটিনী। জীবনে এর চেয়ে অনেক বড় কথা আছে। তােমার বাবার নিষেধ, তােমার মায়ের অমত। তা ছাড়া:••••• বসন্ত। তা ছাড়া ? বল ? ৮৫
তটিনীর বিচার
তটিনী। আমার দিক থেকেও এমন কতগুলাে কারণ দেখা দিয়েছে,
যার জন্যে.••
বসন্ত। যার জন্যে ?
তটিনী। যার জন্যে আমাকে আমরণ কুমারীই থাকতে হবে।
বসন্ত। মানে ?
তটিনী। এর মানে খুবই সহজ।
বসন্ত। আজ তুমি বলচ তােমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয় ! তটিনী,
তুমি ত ঠাট্টা করচ না ?
তটিনী। না।
বসন্ত। এতদিন পরে একথা তােমার মুখে শােনবার জন্যে আমি ত’
প্রস্তুত ছিলুম না।
তটিনী। এতদিন আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে, এইভাবে একথা
তােমাকে একদিন বলতে হবে ।
বসন্ত। কি হয়েছে, আমাকে সব খুলে বল।
তটিনী।
সে কথা আমি মুখ ফুটে বলতে পারব না।
বসন্ত। মুখ ফুটে যা বলতে পারবে না, তার মাঝে নিশ্চয়ই লজ্জার
কিছু লুকিয়ে আছে !
তটিনী। হ্যা আছে। এতখানি লজ্জা রয়েছে যে, আমি মুখ তুলে
তােমার দিকে চাইতেও পারি না।
বসন্ত। তােমাকে বলতে হবে তা কি।
তটিনী। তোমাকে কেন, পৃথিবীর কাউকে আমি সে কথা বলব না,
আমি তা বলতে পারব না।
৮৬
তটিনীর বিচার বসন্ত। তাহলে এতদিন কেন আমাকে নিয়ে খেলা করলে ? তটিনী। বিশ্বাস কর, আমি তােমাকে নিয়ে খেলা করিনি। বসন্ত। খেলা করনি! তিলে তিলে তুমি আমার মনে কামনা জাগিয়েচ, পলে পলে ইন্ধন যুগিয়ে কামনার সেই আগুনকে লেলিহান করে তুলেচ, আর আজ যখন দেখচ যে আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি—তখন দূর থেকে বিদায় নেবার ছল খুজছ তুমি! কানের কাছে মুখ নিয়ে বার বার gfa fe qafar you are irresistible, you are simply charming, you are wonderful ! বলনি এসব কথা ? তটিনী। আজও তেন্নি করে ওসব কথা আমি বলতে পারি। বসন্ত। আজও তাই বলে সােহাগ কাড়াতে পার, পারনা * বিয়ে করতে। তটিনী। না। তা পারিনা। বসন্ত। Just like the rest of you. A shamelessny soulless, sinful flirt ! তটিনী। উঃ ! তটিনী দুই হাতে মুখ ঢাকিল। বসন্ত চাহিয়া দেখিল, তারপর ছুটিয়া তটিনীর কাছে গেল, তটিনীর কানের কাছে মুখ লইয়া মৃদু কণ্ঠে কলি বসন্ত। তটিনী! ওকথা আনার মনের কথা নয়। আমি তােমাকে তা মনে করি না, আমি তা মনে করতে পারি না। তুমি আমাকে বিশ্বাস কর, তুমি শুধু বল, আমাদের বিয়ে সম্বন্ধে তুমি যা বলে, তাই তোমার শেষ কথা নয়। ৮৭
তটিনীর বিচার
তটিনী। তাই আমার শেষ কথা।
বসন্ত। তাহলে তােমার শেষকথা সত্যি কথা নয়।
তটিনী। সত্যি কথা কি ?
বসন্ত। সত্যিকথা এই যে, তুমি আমাকে ভালবাস না। কোনদিনই
ভালবাসনি।
তটিনী কোন কথা কহিল না। মাথা নীচু করিয়া কাটা
দিয়া খাবার নাড়িতে লাগিল।
বয় !
বয় প্রবেশ করিল
হুইস্কি
তটিনী মুখ তুলিয়া বসন্তর দিকে চাহিল। বসন্ত কাটা
লইয়া টেবিলের উপর আঘাত করিতে লাগিল।
হুইস্কি ঢালিয়া দিল—সোড ঢালিতে উদ্যত হইল।
পানি মৎ দেও।
বয় গ্লাসটা টেবিলের উপর রাখিল। তটিনী উঠিয়া
দাড়াইয়া কহিল
তটিনী। আমি এখন বাড়ী যাব ।
বসন্ত। যাও।
গ্লাসটা নিঃশেষ করিয়া পান করিল। তটিনী অগ্রসর
হইল।
আর দেখে যাও তােমার অভাব পূর্ণ করবার জন্য আগ্রহভরে আমি কি
তুলে নিলুম।
তটিনী স্থির হইয়া দাড়াইয়া রহিল
তটিনীর বিচার
বসন্ত। ঔর দেও।
বয় আবার ঢালিয়া দিল। তটিনী একটু কাছে আসিল।
বসন্ত দ্বিতীয় পাত্রও শেষ করিতে করিতে কহিল
জ্যায়দা দেও।
বয় আবার ঢালিল। বসন্ত গ্লাস তুলিতেই তটিন। ছুটিয়া
গিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল
তটিনী। ওগো, না, না, আর তুমি খেয়ােনা।
বসন্ত তটিনীর দিকে চাহিয়া দেখিল। তারপর এমন
করিয়া হাসিয়া উঠিল যে তটিনী খানিকটা ভয় খানিকটা
বিরক্তিতে দূরে সরিয়া গেল। বসন্ত গ্লাস৷ আবার
শেষ করিরা নামাইতে নামাইতে কহিল
বসন্ত। ফিন দেও।
বয় আবার ঢালিতে লাগিল। বসন্ত তটিনীর দিকে
চাহিয়া কহিল
গাছের গােড়া কেটে জল ঢেলে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাও? মায়াবীর
জাত বলে তাও পারবে ভেবেচ মায়াবিনী ? পারবে না...আমি বলচি তা
পারবে না।
তটিনী ডুকাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
Pour it...Pour more.of it...all of it...let the bottom of
the bottle be parallel to the roof,
তটিনী ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। বসন্তর মাথা টেবিলের
ওপর ঢলিয়া পড়িল।
যবনিকা পড়িল ।
তৃতীয় পর্ব
বসন্তর ঘর
বসন্ত বসিয়া আছে। বসিয়া বসিয়া, মদ্যপান করিতেছে আর সিগারেট খাইতেছে।
ললিতা প্রবেশ করিল। তাহার বেশের আজ অনেক বেশী পারিপাট্য।
বস। এই যে এসেচ !
লাতি। গাড়ী পাঠিয়েছিলে কেন ?
বসন্ত। গাধা পাঠালেই কি খুশী হতে? বােস।
ললিতা তবুও বসিল না
Excuse me!
মদের গ্লাস ও বােতল নীচে নামাইয়া রাখিতে রাখিতে
কহিল
I did'nt remember that you were a school mistressma
custodian of morals ! বলতে পারবে না তােমাকে সম্মান দেখাইনি।
সরিয়ে রাখলুম।
ললিতা। কিন্তু এসব তুমি করচ কি ?
বসন্ত। বাপের সম্পত্তির সদ্ব্যবহার.. হিন্দুয়ানি বজায় করে। বর্ণাশ্রম
ভাঙ্গিনি, সমাজে বিপ্লব আনিনি, মহাপুরুষদের বিধি নিষেধ নিয়ে প্রশ্নও
তটিনীর বিচার
কিছু তুলিনি। নিজের ঘরে, নারী বিবর্জিত হয়ে, কারণ করে পরমানন্দ :
লাভ করচি। দোষ দিতে পারবে না !
ললিতা। আশ্চৰ্য্য লজিক তােমার।
ললিতা তাহার মুখােমুখি বসিল। বসন্ত তাহার দিকে
চাহিয়া রহিল, তারপর যেন হতাশ হইয়া মাথা নাড়িয়া
কহিল
বসন্ত। Once a
Once a school tcacher, always a school
teacher! যাক সে কথা। এখন শােন, কেন তােমায় ডেকেচি।
গ্লাস তুলিতে হাত বাড়াইল। ললিতার দিকে চ'ইিতেই
চমকাইয়া হাত তুলিয়া লইল।
২
:Excuse me.
হাতে হাত বসিতে বসিতে
কদিনেই এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে মুঠোর মাঝে একটা গ্লাস না থাকলে
হাতটা কেমন খালি খালি লাগে। But I must conquer it.
টেবিলের ওপর ঘুসি মারিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ললিতা
জিজ্ঞাসু নয়নে তাহার দিকে চাহিল
Yes, I must,
দূরে সরিয়া গেল। দু-চার পাক ঘুরিয়া আসিয়া
কহিল
এইবার কথাটা বলি। মাতালের মাতলামাে মনে করােনা।
seriously thinking of getting married.
I am
তটিনীর বিচার
বসিল। টেবিলের ওপর দুই হাতের ভর রাখিয়া
কহিল
বিয়ের জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে উঠেছি, ললিতা।
ললিতা। সে আর এমন নতুন খবর কি ?
বসন্ত। না, খবরটা অবশ্য নতুন নয়।
তবে • •
চেয়ারে পিঠ দিয়া হেলিয়া বসিল।
পুরােণােকেই ঝালিয়ে নিয়ে একটা কথা জানতে চাইছি।
সহসা সামনে ঝুকিয়া টেবিলের ওপর রাখা ললিভার
একটা হাত চাপিয়া ধরিল ।
Will you marry me?
ললিতা। আজ জিজ্ঞাসা করচ আমি তােমাকে বিয়ে করব কিনা!
7781 Is it such an absurd proposal ?
ললিতা। তটিনীর কি হলাে ?
বসন্ত। ভার কথা থাক, তােমার কথা বলাে।
ললিতা। আমার জবাব নির্ভর করছে ওই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।
73781 Tatin: has refused
iny
hands.
ললিতা। একথাও আমাকে বিশ্বাস করতে বল ?
বসন্ত। সে স্পষ্ট বলেছে আমাকে বিয়ে করবে না।
ললিতা। আজ যদি তােমাকে ডেকে পাঠায় ?
বসন্ত। ডাকবে না আমি জানি।
তটিনীর বিচার
ললিতা। তার কথা না হয় মানলুম, তুমি জান। কিন্তু তােমার
নিজের মনের কথা ? তুমি কি ভুলতে পেরেচ তটিনীকে ?
বসন্ত। ভুলতে তাকে আমি কোন দিনই পারব না।
ললিতা। তবে ?
বসন্ত। তুমি বলচ কি ললিতা? সে আমাকে উপেক্ষা করে সরে
দাড়াল, আর আমি তাকে ভুলব !
চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইল
ত্যাগ ! ত্যাগের দম্ভ দেখিয়ে গেল। কোন মানে ছিল না তার ও কম
করবার। ত্যাগ ! আমিই যেন কোন ক্ষোভ না রেখে তা করতে
পারতুম না ! আমিই যেন প্রস্তুত ছিলুম না আমার পৈত্রিক সম্পত্তি ছেড়ে
তার পাশে দাড়াতে। সে আমায় তা করতে দিলে না। কেন দিলে না
জান? আমাকে সে কোন দিনই ভালবাসত না বলে ।
একবার ললিতার দিকে চাহিল, একবার নীচের গ্লাস
আর বােতলের দিকে।
Excuse me ললিতা, তােমার সামনে খাব না।
বোতল আর গ্লাস তুলিয়া লইল।
আমি বলচি সে আমায় ভালবাসত না। তা যদি বাসত, তাহলে সব ভুলে
আমাকেই সে চাইত, আমার বিষয় সম্পত্তি রইল কি গেল, তা নিয়ে সে
মাথা ঘামাতাে না। ত্যাগের দম্ভ ! ত্যাগ !
অন্য ঘরের দিকে চলিয়া গেল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
তটিনীর স্কুল-আপিস
তটিনী আর শৈলেশ। তটিনী লিখিতেছে শৈলেশ
চুপ করিয়া বসিয়া আছে।
তটিনী। ত্যাগ ! আমার জন্যে সে তার বিষয়-সম্পত্তি ত্যাগ করবে।
শৈলেশ। সে তার উদারতার পরিচয়ই দিয়েছিল।
তটিনী। কিন্তু সে অবস্থায় আমি যদি তাকে বিয়ে করতুম, তাহলে
চিরদিনের জন্যে আমি কি তার কাছে ছােট হয়ে থাকতুম না?
শৈলেশ। কিছু মনে করবেন না, তটিনী দেবী। আমার যেন মনে
হচ্ছে নিজের ওপর অযথা জোর করতে গিয়ে নিজেই আপনি ভেঙে,
পড়চেন।
তটিনী।
ভেঙে কেন পড়ব বলুন! পুরুষকে পাবার সাধনা ছাড়াও
নারীর করবার অনেক কিছু আছে। পুরুষকে পেতে হবে বলেই কি,
নিজেদের ছােট করে তাদের পেতে হবে ? Companion 576,
comrade চাই একথা সত্যি,কিন্তু নিজেকে ছােট করে নীচু করে কাউকে
প্রভু বা স্বামী করতে চাই না। সমান হয়ে যে আসে আসুক। কিন্তু
উচু থেকে হাত বাড়িয়ে যে আমাকে ভালােবাসা দিতে চাইবে, আমি
তাকে হেসেই বলব, good bye, love !
শৈলেশ । দেখুন, বলা আমার ঠিক নয়। কিন্তু না বলেও থাকতে
পারছি না। আপনার কথাগুলো শুনতে বেশ লাগল। কিন্তু ওর
৯৪
তটিনীর বিচার ভেতর থেকে বেরিয়ে পল যেন একটা complexexcuse me, an inferiority complex! যে ত্যাগ করে তার মনে এ মতলব কখনাে থাকে না যে সেই ত্যাগ দিয়ে সে নিজেকে ভালবাসার পাত্রীর চোখে বড় করে তুলবে। সে ত্যাগ করে তার নিষ্ঠার, তার একাগ্রতার, তার ঐকান্তিকতার পরিচয় দিতে। বসন্তও তাই চেয়েছিল। Of course I hold no brief for Basanta. আমি শুধু বলতে চাই যে বিচারে যেন আপনি ভুল না করেন। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল বসন্তৱ বৰ বসন্ত আর ললিতা বসন্ত। তুমি ভুল করচ, ললিতা। পুরুষ নারীকে চায়, এটা সত্য কথা—কিন্তু বিশেষ কোন নারীকে না হলে তার যে চলেই না, এ কথ: সত্য নয়। তটিনীর বদলে তুমি আমার জীবনে এলে, জীবন যে আমার ব্যর্থ হবে এ কথা মনে করবার কোন কারণ নাই। আসল কথা বসন্ত আর তটিনী নয়, আসল কথা হচ্ছে man and woman, নর আর নারী। affoli You are brutally frank. বসন্ত। So I am. এখন কথাটাকে বেশ সহজ করে নাও ত । আমি জীবনের একটা সঙ্গিনী চাই। অনেকদিন ধরে আমি তাই খুঁজে বেড়িয়েচি। দুটী তরুণী আমার মনকে নাড়া দিয়েছে। তাদের একজন তটিনীর বিচার তুমি আর একজন তটিনী। যে কোন কারণে তটিনীর আকর্ষণ এক সময় বেশী হয়ে ওঠে। সেই সময়ে আমি তটিনীর সঙ্গই বেশী করে চাই, and ultimately I proposed to marry her. FFE 67 states বিয়ে করতে রাজী হােল না। সে যখন রাজী হােল না, তখন আবার তােমার দিকে ফিরে চাইলুম। দেখলুম তুমি অবিবাহিতই রয়েচ। বুঝলুম বিয়ে করবেই না, এমন কোন পণও তােমার নেই। এ অবস্থায় আমি যদি তােমার পাণিপ্রার্থনা করি, তাহলে তা কি তােমার বিচারে অন্যায় হয়, বিশেষ করে যখন তােমাকে আমাকে এক সঙ্গেই হােক আর পৃথক ভাবেই হােক, একদিন ঘর বাঁধতেই হবে ? মঞ্চ ঘুরিয়া গেল। তটিনীর স্কুল-আপিল তটিনী আর শৈলেশ তটিনী। পুরুষকে নিয়ে ঘর বাঁধতেই হবে এ কথা ছেলেবেলা থেকে শুনে শুনে এমনি অভ্যস্থ হয়ে পড়ি যে, ঘর না বাঁধাই একটা ট্রাজেডি বলে ধরে নি। প্রথম যৌবনের যত কিছু কল্পনা, কামনা, সবই ওই ঘরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। তারপর সেই ঘর সত্যিই একদিন হয়। তারপর হঠাৎ একদিন দেখা যায় যে, ইট-কাঠের ঘরই হয়েচে সৰ্বস্ব, আর সুখ, শান্তি, স্বস্তি, জীবনের আদর্শ চার দেয়ালের মাঝে চাপা পড়ে রয়েছে। শৈলেশ। কিন্তু স্বেচ্ছায় সব ছেড়ে একটা প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টারী করেই কি আপনার জীবনের আদর্শ পূর্ণ হবে?
তটিনীর বিচার তটিনী। দেখুন শৈলেশবাবু, আমাদের একটা গৰ্ব ছিল যে শিক্ষা আমাদের আর আপনাদেরও আধুনিক করে তুলেছে। কিন্তু এই কদিনেই বুঝতে পেরেছি যে we are not sufficiently modern ! ! শৈলেশ। প্রগতির পথে আরও দ্রুত আপনি এগুতে চান । তটিনী। চাই। কিন্তু তার জন্যে পা দুটোকে শক্ত করে নিতে চাই। হােটেলে খাওয়া, নাচের জলসায় হানা দেওয়া, কি আপনার সততা class friendকে নাকে দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে বেড়ানাে, এসব ত অনেকদিন ধরেই চলছে। ভেবে দেখলে মনে হয় রকমফের হলেও সেই Adam-Eveএর পর থেকেই সৃষ্টির সব তরুণ-তরুণী এমনি একটা কিছু কিছু উপলক্ষ্য করে একে অন্যের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠতে চেয়েছে। যুগে যুগেই চলেচে শুধু রােমিও-জুলিয়েটের নকল-নবিশী! Modernism তাহলে এর মাঝে কোথায় রইল ? শৈলেশ। আপনি আমাকে বিস্মিত করে তুলেন। তটিনী। আরাে বিস্মিত হবেন, যেদিন সকল রকমে imodern হয়ে আমি আপনাকে দেখা দেব। শৈলেশ। সে রূপের আভাস কি আজ পেতে পারি ? তটিনী। না। সে রূপ আরােপ করা যায় না, অর্জন করতে হয়। জামার কাট, শাড়ীর রঙ, হিলের হাইট, স্কেটিং, স্কিইং, ফ্লাইং কোন কিছু দিয়েই তার পুরাে রূপ প্রকাশ করা যায় না—সে রূপ সৃষ্টি করতে হয় সাধনা দিয়ে। আগে সেই সাধনা আমাকে করতে দিন। আমি ছিলুম একটা পরগাছা। আপনারা এতদিন পরগাছার রূপ দেখে মুগ্ধ হতেন। মাটিতে আমার শিকড় ছিল না বলে আমি হাওয়ায় দোল খেতুম। কিন্তু ত
তটিনীর বিচার
একদিন আপনাদের সকলের অজানায় আমাকে ঘিরেও ঝড় উঠল।
সেই ঝড়ে আমি মাটিতে পড়ে গেলুম, বাস্তবের পরশ পেলুম। এইবার
হয়ত সত্যিকারের মডার্ণ হতে পারব। ততদিন অপেক্ষা করে থাকুন না
শৈলেশ বাবু।
শৈলেশ। আপনি তাহলে আশা দিচ্ছেন ?
তটিনী। মাপ করবেন, শৈলেশবাবু।. কথাটা পুরােণাে অভ্যাস মত
বলে ফেলেছিলুম। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলুম যে আমার ভবিষ্যৎ
অন্ধকার মনে করে আপনি মিছে দুঃখ পাবেন না।
বাহিরে ঘণ্টা বাজিল ;
শৈলেশ। আর বুঝি থাকা চলবে না?
তটিনী। না, আমার ক্লাশ আছে। আবার আসবেন।
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বসন্তৰ ঘর
বান্ত ললিতাকে বাহুপাশে বাধিয়া বসিয়া আছে। ললিতার
একখানি হাত বসন্তর হাতে।
বসন্ত। বিয়ে হয়ে গেলেই আমরা হানিমুনে বেরুবাে।
ললিতা তাহার দিকে চাহিল।
কোথায় জান? কার্শিয়াং। তুমি কখনাে ওদিকে গ্যাছ.?
ললিতা মাথা নাড়িল ।
৯৮
তটিনীর বিচার
p
নিরালায় আমরা দুটিতে এক পাহাড়ে পাশাপাশি বসে থাকব। আমাদের
পায়ের কাছ দিয়ে মেঘমালা দুলে চলে যাবে। হয়ত তােমাকে দেখে থমকে
দাড়িয়ে যক্ষদূত মনে মনে ভাববে এই ত সেই কান্তা যার পরিচয় :
তন্বী শ্যামাশিখরিদশনা পবিম্বাধরােষ্ঠী •
মধ্যে ক্ষমা চকিতহরিণী প্রেক্ষনা নিম্ননাভিঃ
শ্রেনীভারাদলসগমনা স্তোকনাস্তনাভ্যাং
যা তত্র স্যদ যুবতীবিষয়ে সৃষ্টিরাদ্যেবধাতু।
ললিতা উঠিয়া দাঁড়াইল। বসন্ত তাহাকে জোর করিয়া
পাশে বসাইবার চেষ্টা করিতে করিতে কহিল
আহা, শােন, শােন, এক বাঙালী কবি এর কি চমৎকার তর্জমা করেচেন
ক্ষীণ তনুখানি, হিরণবরণ, অধর বিম্বয়,
পীনপয়ােধর ঈষৎ নমিত, শ্রোনীভারে ধীরে যায়,
কৃশ কটিতট, সূক্ষ্মদর্শন, চকিত হরিণী-দৃষ্টি,
নাভি সুগভীর, সে যেন বিধির প্রথম যুবতী-সৃষ্টি।
ললিতা। যাও।
বসন্ত গ্লাস তুলিবার পর ললিত উঠিয়া দ্রুত চলিয়া
গেল। বসন্ত তাহার :
দিকে চাহিয়া দেখিল । তারপর
কহিল
বসন্ত। মিথ্যেকে যত বেশী মােহন করে তুলতে পারব, ততই পারব
ললিতার মত মেয়ের মনােরঞ্জন করতে। মন্দ কি! তাই চেষ্টা
করেই দেখি।
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল ।
ভােসের চেম্বার
আধা অন্ধকার ঘরে বসিয়া সমর নোট গণিতেছে—কতগুলি গণিয়া থামিল।
সমর। টাকা! এই টাকাই অযােগ্যকে যােগ্য করে, দুৰ্বলকে
শক্তিমান করে। এই টাকাই আমি সঞ্চয় করব, হাজারের পর হাজার,
দশ বিশ পঞ্চাশ হাজার, লাখ, দুলাখ•••
আবার মাথা নত করিয়া গুণিতে লাগিল। নিঃশব্দে
ভোস আসিয়া পিছনে দাঁড়াইল, দাড়াইয়া কিছুকাল
দেখিল।
তারপর হাসিয়া উঠিল
ভোস। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ! নেশা ধরিয়ে দিয়েচি। এইবার
তােমাকে দিয়ে কাজ হবে।
সমর। টাকাগুলাে কি আপনি রেখে দেবেন ?
ভােস। দাও I never refuse inone5', হাঃ! হাঃ! হাঃ!
টাকাগুলাে লইয়া পকেটে রাখিল।
তারপর তােমাদের সেই তটিনীর কোন খবর পেলে ?
সমর। মহেন্দ্র মিত্র নামে এক উকীল ছিলেন। তটিনী তাঁরই মেয়ে।
ভােস। মহেন্দ্র মিত্র ! এক মহেন্দ্র মিত্রকে আমি জান্তুম। তার ত
মেয়ে ছিল না।
সমর। কিন্তু আমি যে সে বাড়ীটা চিনি।
তটিনীর বিচার
#
ভােস। বাড়ীটা চেন! কিন্তু বাড়ী চিনলেই ত বাড়ীর মেয়েদের
91797 ayat statt att aY I Usually I ain not interested in girls.
কিন্তু কিছুদিন থেকে কেন যেন এই তটিনী সম্বন্ধে সব কথা জানতে আমার
ইচ্ছে হচ্ছে।
আচ্ছা, leave it to me, তারপর আর সব কাজের
খবর বল ত ? How are you getting on with Lalita ?
সমর। কাল কি ভেবে যেন এখানে এসেছিল। আপনাকে না
পেয়ে চলে গেল।
ভোস। আবার আসবে, আবার আসবে। এমন জাল ফেলিটি
যে আসতেই হবে। হাঃ! হাঃ! হাঃ !
সমর। Advance Bankএর ম্যানেজার আমাদের চিঠি পেয়ে খুব
ভড়কে গেছে তার কেরাণীদের কাছে শুনে এলুম। মনে হচ্ছে আমাদের
দাবী সে পূর্ণ করবে।
ভােস। দ্যাখ, Black-nail যেমন আর্ট, তেমি science. যাকে
Blackmail করবে তাকে দূর থেকে লক্ষ্য করবে। তার ওপর যে
reaction হয় তা ভারী উপভােগ্য। নাটক দেখবার আনন্দের মত
তাতে আনন্দ পাওয়া যায়। আর এর scienceএর দিক হচ্ছে চুলচেরা
fastaga fr 1 Psychological momentlico 975 FJ6 ft you
are successful—চুপ করে বাড়ী বসে থাক, টাকা তােমার মুঠোর
ভিতর চলে আসবে।--হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। দেখুন, এ-সব শুনে আমার কেমন ভয় হয়।
ভােস। ভয় ?
সমর। আজ্ঞে হঁ্যা।
তটিনীর বিচার
ভােস। আর লজ্জাও হয় বােধ হয় ?
সমর। তাও হয়। ভদ্রলােকের ছেলে, জীবনের একটা বড় আদর্শ
নিয়ে কাজে বেরিয়েছিলুম। আর আজ কোথায় নেমেচি তাই ভাবছি।
ভােস। কিন্তু দৃণা, লজ্জা, ভয় এ তিন থাকতে নয়। ছাড়তে
পার সব হবে, না পার কিছুই হবে না, হা! হা! হা! হাঃ!
সমর। কিন্তু সৎপথে থেকেও ত টাকা রােজগার করা যায়।
ভােস। যায় নাকি !
সমর। আমরা পড়েচি Honesty is the best policy.
ভােস। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ! Honesty is the best
policy! Honesty ! llonesty !
পায়চারী করিতে লাগিল। থামিল, সমরের কাছে
গিয়া ধীরে ধীরে কহিল
৫
*
আচ্ছা, গঙ্গার ধারে ফুটপাথের ওপর কাপড় বিছিয়ে যারা একটী একটি
করে চাল ভিক্ষে মেগে দিন গুজরাণ করে, তারা যে কোনদিন dishonest
ছিল, অসৎ জীবন যাপন করেছিল, তার কোন প্রমাণ দিতে পার ?
সমর চুপ করিয়া রহিল। ডক্টর মাথা নাড়িয়া কহিল
পার না।
আবার একটু ঘুরিয়া সময়ের সামনে আসিয়া কহিল
আচ্ছ। বি-এ, এম-এ পাশ করা তাজা তকতকে যে সব ছেলে মেয়ে
চাকরির উমেদারি করে ঘুরে ঘুরে হয়রাণ হয়ে আত্মহত্যা করে শিক্ষিতের
দুৰ্ব্বহ জীবনের অবসান করেছে, তারা কি কেউ dishonest ছিল ?
১০২
তটিনীর বিচার
সমর। না, না।
ভােস। এই তুমি ! তুমি ত অসৎ জীবন যাপন করনি। তুমিও ত
কেতাবী বুলি বিশ্বাস করে সৎ আর সাধু হয়ে থাকতে চেয়েছিলে, তুমিত
dishonest নও, তবু তােমার কেন এই দুর্গতি ?
সমর। আজ্ঞে ভেবে তা কোনদিন বুঝতে পারিনি।
ভােস। বুঝতে পারনি, না, তােমাদের ওই কেতাবী বিদ্যে তােমাদের
তা বুঝতে দেয়নি। কিন্তু আমি বুঝিয়ে দোব। শিকাগোের শিক্ষা অামার,
জলের মত সাফ বুঝিয়ে দেব।
সমর। আজ্ঞে তাই দিন।
ভােস। টাকার এত অভাব কেন জান? কাজের এত অভাব কেন,
জান ? টাকা জায়গায় জায়গায় জমে রয়েছে বলে। ধনী তার সিন্দুকে
সাতটা তালা দিয়ে বন্ধ করে রেখেচে টাকা, ব্যাঙ্কার তার vaultএ
রেখেচে তাল তাল সােনা, টাকা সে আগাম করে Capitalistকে—
তােমাকে নয়, আমাকে নয়, তােমার আমার মত কোন লােককে নয়।
Inequality in
distribution of inocy.
Distribution চাই, টাকার বাটোয়ারা চাই, চারিয়ে দেওয়া চাই এই
This is the probllern of probleins ! এই সমস্যার
সমাধান করতে আমি চাই। যদি লেলিন হতুম, ষ্ট্যালিন হতুম, হিটলার
বা মুসােলিনী হতুম, তাহলে টাকা চারিয়ে দেওয়ার অন্য ব্যবস্থা আমি
করতে পারতুম। কিন্তু আমি যখন তা নই, তা যখন হতে পারি না,
তখন যা আমার আয়ত্তে রয়েছে, তাই করব। ছলে, বলে, কৌশলে
এই টাকা আমি চারিদিকে চারিয়ে দোবােGangsterরা যেমন করে
ime1]•••৷৷ileven
টাকা।
তটিনীর বিচার
দেয়, Rackateeরা যেমন করে দেয়, Blaclianailরা যেমন করে দেয়।
আমার মতে এ পাপ নয়, অন্যায় নয়, অধৰ্ম্ম নয়—এ হচ্ছে আমাদের
বাঁচবার প্রয়াস। 1 am carriel away youngmail. এখন ললিতার
খবর কি বল দেখি? সেই টাকা—সেই টাকা ?
সমর। তার সেই টাকা সত্যিই নিতে হবে ?
ভােস। হবে বৈ কি!
সমর। এই ভাবে আমাদের বাঁচতে হবে !
ভােস। বাঁচবার অন্য উপায় যখন নেই, তখন বাঁচতে চাইলে এই-ই
করতে হবে।
সমর। বলেন কি ।
ভােস। ভয় যদি পাও, তাহলে ফিরে যাও। এখনও ফিরতে
দোব। কিন্তু এর পর আর দোৰ না। চাও, যেতে?
সমর। এ পথে যখন এগিয়েছি তখন আর ফিরতে পারি কোথায় ?
ভােস। আমি জানি! আমি জানি, তুমি ফিরতে পারনা। বাঘের
বাচ্চা যতক্ষণ না রক্তের স্বাদ পায়, ততক্ষণ হিংস্র হয়না। কিন্তু একবার
স্বাদ পেলে আর রক্ষা নেই।
পকেট হইতে একতাড়া নােট বাহির করিয়া দেখাইল ।
This is blood. And you have tasted. it. ffato gra 44168
না আমি জানি, আমি জানি। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
১০৪
বসন্তর ধৱ
বসন্ত আর হরসুন্দরী
হরসুন্দরী। তুই যদি কিছুই করবিনে, তাহলে মিছে আমাকে
টেলিগ্রাম করে আনালি কেন বলত?
বসত। তবে যাও ফিরে। বৃন্দাবনে গিয়েই বসে থাক। ছেলের
আর বিয়ে দিয়াে না। আমার কি ! তােমার শ্বশুরকুলই জল পাবে না,
স্বামীর ভিটেয় প্রদীপ জ্বলবে না। আমার কি !
হরসুন্দরী। ওই সব কথা বলে তুই বুঝি আমার মত আদায় করে
নিবি যাতে সেই কায়েতের মেয়েকে বিয়ে করতে পারিস ?
বসন্ত। সেই কায়েতের মেয়ের বয়ে গেছে তােমার এই গাধা-ছেলেকে
বিয়ে করতে! এবার খাঁটী বামুনের মেয়ে। কান্যকুঞ্জ থেকে যেমন
নিষ্কলঙ্ক এসেছিল তেমনিই রয়েছে। লেখাপড়া শিখে একটু যা দোষ করে
ফেলেচে। তা চাদেরও ত কলঙ্ক থাকে। এই মেয়েকেই বিয়ে করতে
চাই। রাজী থাকত বল।
হরসুন্দরী। তা এসব আমাকে আগে বলতে হয়। মদনমোহর
কাছে ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকতুম, তাই ত তিনি ভাের সুমতি দিলেন।
এখন আর অমত কিসের ? একদিন গিয়ে আশীর্বাদ করে আসি।
বসন্ত। হাঁ, হাঁ পুরুত ডাকো, পাজি দ্যাখাে, হাঁচি টিকটিকীর বিচার
শেষ কর। কিন্তু অগৌনে, চটাপট, ঝটাপট।
১০৫
তটিনীর বিচার
হরসুন্দরী। তাের যখন সুমতি হয়েছে, তখন আর দেরী নয়।
হরসুন্দরী চলিয়া গেল।
বসন্ত চাহিয়া দেখিল
বসন্ত। ছেলেকে কত ভালবাস! ছেলে যে আত্মবলি দিচ্ছে তাও
বােঝ না অভাগী ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া টেবিলের কাছে গেল। তটিনীর
ফোটোর এলবামখান তুলিয়া দেখিল।
ঠোটের এ হাসি যেন বিদ্রুপ বলে মনে হচ্ছে ! কিন্তু আমি ত তােমায়
ত্যাগ করি নি, তটিনী। ত্যাগ তুমিই করলে আর বিদ্রুপও করচ তুমি !
এ্যালবামখানা খুলিয়া উল্টাইয়া রাখিল। তারপর
ললিতার ফোটো বাহির করিল।
আমার হৃদয়ে তােমার জায়গা ললিতা অধিকার করল, তাই এখানেও 'এই
য়্যালবামেও তােমার স্থান ললিতাই দখল করুক।
বসিয়া ললিতার ফটো এ্যালবামে রাখিল। তারপর
এ্যালবামখানা দুই হাতে ধরিয়া দেখিতে লাগিল।
এই ললিতা, আমার ভাবী স্ত্রী, আমার চিরজীবনের সঙ্গিনী! ০ my
God, what a poor substitute is this !
টেবিলের উপর তাহার মাথা নুইয়া পড়িল। মঞ্চ
দুরিয়া গেল
১০৬
তটিনীর বাের্ডিংয়ের ঘর
তটিনী গান গাহিতেছে। নলিনী প্রভৃতি বসিয়া তাহাই শুনিতেছে
তটিনীর গান
জলের লেখা সে হায়
চকিতে মিলায়ে যায় !
গানের কমল মাের
ঝরে যায়
বেদনায় ।
এ যে শুধুরে আঁখির জল
খসে-পড়া ফুলদল।
এ যে বালুকার নীড় না গড়িতে
ভাঙ্গে হয়।
তাই গানের কমল নাের
ঝরে যায়
বেদনায় !!
নি শেষ হইতে নলিনী কহিল
নলিনী। নিজেকে তুমি যেন আজ ধরা দিতে চাইছ তটিনী। বেদনার
বিষ যেন তােমার বুকের ফাটল দিয়ে চুইয়ে বার হতে চাইছে।
১০৭
তটিনীর বিচার
তটিনী। তাই নাকি নলিনী।
নলিনী। তােমার গান শুনে তাই মনে হচ্ছিল।
তটিনী।
মন অনেক সময় প্রতারিত হয়।
নলিনী। তা সত্যি। আমাদের মনে হােত তুমি প্রজাপতি হয়েই
থাকবে।
.প্রতিভা। আমরাও শুনতুম তটিনী মিত্তির রাণীর মত য়ুনিভার্সিটির
ছেলেদের ওপর আধিপত্য করে।
তটিনী। এখন চেয়ে দ্যাখ যে শেয়াপােক সেই শেয়াপােকাই
রয়েছি।
নলিনী। তুমি যে মাষ্টারি করতে আসবে একথা কদিন আগে কে
বলতে পারত ?
তটিনী। মাষ্টারির চেয়ে ভালাে কাজ আর নেই !
নলিনী'। দূর ! এও আবার একটা কাজ ? অসহ্য ড্রাজারি।
তটিনী। না, না, বেশ কাজ।
প্রতিভা। এ কথা কেন বলচ বলত?
তটিনী। নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায় পরের কাজে।
প্রতিভা। কিন্তু কবিরা বলেন কেবলমাত্র প্রিয়তমের কাছেই নিজেকে
বিলিয়ে দিয়ে জীবনকে সার্থক আর সফল করে তােলা যায়।
তটিনী। তা হয়ত খায়। কিন্তু জীবনে সকলে যে একটি করে
প্রিয়তম পাবেই এমন ব্যবস্থা কোন কালের কোন কবিই করতে পারেন
নিজেরাও অনেকে পাননি-কল্পনার প্রিয়তমাকে নিয়েই কাব্য
রচনা করে গেছেন। আমি বলটি প্রিয়তমের বংশীধ্বনি শােনবার সৌভাগ্য
নি ।
১০৮
তটিনীর বিচার
যাদের হয়নি, ঘর বাঁধবার সুযােগ যারা পায়নি, তারা যদি মাষ্টারি করে,
তাহলে শান্তিতেই তারা দিন কাটাতে পারে ।
নলিনী। ঘর বাঁধবার কথায় মনে পড়ে গেল, তটিনী। ললিতা বে ঘর
বঁধছে।
তটিনী। শুনিচি।
নলিনী। তুমিও শুনেচ ?
তটিনী। হ্যা। নেমন্তন্নও পেয়েছি।
নলিনী। কে নেমন্তন্ন করলে, ললিতা ?
তটিনী। না। বসন্ত।
নলিনী। বসন্ত !
তটিনী। Shocked হলে যে !
নলিনী। বসন্ত বিয়ে করছে বলে তার বিরুদ্ধে আমার কোন
অভিযােগ নেই—কিন্তু তােমাকে নেমন্তন্ন করলে কি করে ?
তটিনী। আমার চেয়ে বড় বন্ধু তার নেই বলে !
afiniti I must say, you are a puzzle to me!
তটিনী খিল খিল করিয়া
নলিনী চলিয়া গেল।
হাসিল
প্রতি। নলিনী ও রকম করে চলে গেল কেন?
তটিনী। এক নময় ও ভেবেছিল বসন্তর সঙ্গেই আমার বিয়ে হবে।
ঘটনাচক্রে তা হােলল না। সে বিয়ে করছে। আর তার বিয়েতে যােগ
দেবার জন্যে আমাকে নেমন্তন্ন করেছে। এইটেই ও সইতে পারছে না।
তটিনীর বিচার
প্রতিভা। তুমি পারছ ?
তটিনী। দেখতেই ত পাচ্ছ আমি হা হতােস্মি বলে কপালে করাঘাত
করচিনে, সহজ ভাবেই খবরটা প্রচার করচি।
প্রতিভা। নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যাবে না ?
তটিনী। না। বসন্ত মাঝে মাঝে বড় ছেলেমানুষী করে বসে।
And I want to avoid a scene.
তটিনী বাহির হইয়া গেল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বসন্তৱ বাগান
শৈলেশ। বিয়ে তাহলে করলে বসন্ত?
বসন্ত । না করলে ঠকতুম। কেননা তাহলে এই মুক্তোর মালা হয়ত
তােমার মত বাঁদরের গলাতেই দুলত।
শৈলেশ ও বসন্ত একদিকে সরিয়া গেল
কলিকা। মাষ্টারি এবার শেষ তাহলে?
নলিনী। দূর ! শেষ হবে কেন। এখন প্রেমের পাঠশালায় গুরুগিরি
চলবে।
কলিকা। গুরুগিরি না শাকরেদী ?
ললিতা ।.. শােন্ ভাই, তােদের একটা কথা বলি।
তাহার। অন্যদিকে সরিয়া গেল।
১১০
তটিনীর বিচার
বসন্ত। সে আসবে না। আমি জান্তুম। তবুও তাকে না জানিয়ে
থাকতে পারলুম না। হয়ত ভেবেচে আমি তাকে আঘাত করবার জন্যই
আসতে লিখেচি। কিন্তু শৈলেশ তা সত্য নয়।
শৈলেশ। না, না। তটিনী তা মনে করেনি। শুভেচ্ছা জানিয়ে
পাঠিয়েছে।
ললিতা কাছে আসল.
ললিতা। আপনাদের তটিনী দেবী বুঝি সময় করে আসতে
পারলেন না ?
শৈলেশ। আজ্ঞে, আসবার তার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শরীরটা অসুস্থ
হয়ে পড়ল বলে আসতে পারলেন না।
ললিতা। কি অসুখ, মৰ্ম্মপীড়া নয় ত ?
ডাক্তার ভােস প্রবেশ করিলেন, সঙ্গে সমর।
ভােস। হাঃ! হাঃ হাঃ! হাঃ !
ললিতা। আসুন, আসুন ডক্টর ভােস। কি সৌভাগ্য আমার ।
ডক্টর ভােস। বিলক্ষণ ! এমন দিনেও আসব না ? হাঃ! হা! হা!
ললিতা। My husband-Doctor Bhose.
60471 Late of Chicago,
বসন্ত। ও। কতদিন, সেখানে ছিলেন ?
ভােস। সাত বছর। Varied experience হাঃ! হা! হা! হা!
ললিতা। ইনি হচ্ছেন মিঃ শৈলেশ সেন, বাংলায় এম-এ পড়েন।
কিন্তু বিজ্ঞানে এর আশ্চৰ্য্য জ্ঞান। আর মেয়েদের অকারণে অপমান
করতে ইনি অদ্বিতীয়।
১১১
তটিনীর বিচার
ভােস।
ও কাজটি করবেন না মিঃ সেন।
ওদেশে গেলে বিপদে
পড়বেন।
ললিতা। ওঁকে উপদেশ দেওয়া বৃথা। চলুন ডক্টর ভােস, আমার
বান্ধবীদের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দি।
ত:হ’র হাত ধরিল।
ভােস। বান্ধবী! শিকাগাের তরুণীরাও আমাকে দেখলে ঘিরে
দাঁড়াত। বলত ফরচুন বলে দাও, ম্যাজিক দেখাও, বেদান্ত শােনাও।
হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ।
তাহারা পেছন দিকে চলিয়া গেল। সমরও তাহাদের
পিছনে যাইতেছিল। শৈলেশ তাহাকে ডাকিল।
শৈলেশ। সমর !
সমর ফিরিয়া আসিল।
চিন্তেই পার না যে।
সমর। দলত্যাগীর সঙ্গে কথা বলা যে নিষেধ, দলত্যাগ করে তাও কি
ভুলে গেছ ?
চলিয়া যাইতেছিল
বসন্ত। শৈলেশ ! শৈলেশ ! ডাকত ওই ভদ্রলােককে।
শৈলেশ। সমর ! সমর !
সমর ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল কিন্তু ফিরিয়া আসিল না ।
ও আসবে না।
১১২
তটিনীর বিচার
বসন্ত। ওকে কখনাে দেখিনি, কিন্তু ওর গলার স্বর যেন শুনেছি।
সেদিন রাতে যারা আমায় আক্রমণ করেছিল, আমার বিশ্বাস ও তাদেরই
একজন।
শৈলেশ। বল কি !
বসন্ত।
I am almost sure,
শৈলেশ । আর আজ এসেচে নেমন্তন্ন খেতে।
বসন্ত। চল না কাছে গিয়ে দেখি ।
পিছনের দিকে চলিয়া গেল। নলিনী, কলিকা প্রভৃতি
আগাইয়া আসিল।
কলিকা। ললিতার ভাগ্য ভাল।
নলিনী। ভাগ্যের কথা বলিসনি, হাতের কায়দার কথা বল।
কলিকা। হাতের কায়দা কিয়ে, নলি ?
নলিনী। গাঁথবার আর টেনে তােলবার। ললিতা 'অতবড়
কালাটাকে গাঁথল আবার টেনেও তুল্ল। তটিনী ত পারল না।
কলিকা। তটিনী নিজেই সরে দাঁড়িয়েছে।
নলিনী। নিজেই সরে দাড়িয়েছে। সকাল, সন্ধ্যে, রাত বারোটা
পৰ্য্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে থাকত। পারলে না তাই ত সরে দাড়াল। আমার
নাম করে তাকে বলিস, আমি এই কথাই বলিচি।
ডাক্তার ভোস, ললিত আর সমর আগাইয়া আসিল
ভােস।
অনেক আশা করে এসেছিলুম, তটিনীর দেখা পাবাে।
b
তটিনীর বিচার
ললিতা। তটিনী কি আমার বাড়ীতে আর কোনদিন পায়ের ধূলো
দেবে? কি বলিস নলি ?
নলিনী। তুমি যা করে !
ভােস। কি করেচে ললিতা ?
নলিনী। বসন্তকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
ললিতা। না, ডক্টর ভােস। আমি দূরেই সরে ছিলুম। পরের
জিনিস কেড়ে নেবার প্রবৃত্তি আমার কোনদিনই ছিল না।
ভােস। কেড়ে নিলেও দোষ নেই। কেননা Nothing is unfair
in love and war, হাঃ! হাঃ! হাঃ!
নলিনী। ঠিক, ঠিক দাদু !
ভােস। দাদু !
কলিকা। আপনাকে দেখেই দাদু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।
ভােস। দাদু। অবশেষে দাদু ! : Well, half a loaf is better
than bread, তাহলে শালী সম্বােধন শােনবার জন্যে তৈরী
হয়ে থাক।
নলিনী। না, না, দাদু ও-সব রসিকতা এ যুগে চলে না।
ভােস। দাদুটাও যে সেকেলে ভাই।
ললিতা। ওরে নলি, শুধু কথা কাটাকাটি না করে দাদুকে একখানা
গান শুনিয়ে দে।
ভােস। উত্তম প্রস্তাব।
নলিনী। একখানা প্রেমের গান গাইব দাদু ?
ভােস। নিশ্চয়, নিশ্চয়। Love is supreme !
no
১১৪
তটিনীর বিচার
নলিনী প্রতিভা গান শুরু করিল।
নলিনী-প্রতিভার গান
এবার যে গান গাইতে হবে
মিলন-রাগে
যে গান শুনে গােলাপ জাগে
অরুণ বরণ অাখির আগে।
এবার সে গান গাইতে হবে
মিলন-রাগে।
যে গান গেয়ে চাতক চলে
মেঘের দেশে
নদীর যে সুর সাগর জলে
স্বপ্নে মেশে
মনের যে গান মনের লাগি
স্বপন অাঁকে
এবার সে গান গাইতে হবে
মিলন-রাগে।
গান শেষ হইবার মুখে মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বসন্তর বাগান-বাড়ীর ঘর
বসন্ত ধীরে ধীরে প্রবেশ করিল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়া পড়িল।
ফ্রেম হইতে ফোটো খুলিল। ললিতার ছবি রাখিয়া দিল।
তটীনীর ছবিখানা তুলিয়া লইয়া কহিল
বসন্ত। শুভেচ্ছা জানিয়েছ, তটিনী। কিন্তু তুমি জাননা, যেদিন
তােমাকে হারিয়েছি, সেই দিন থেকেই আমার জীবন অশুভ হয়ে উঠেছে।
দুয়ারে করাঘাত হইল। সেইদিকে চাহিয়া দেখিল—
আবার করাঘাত হইল। তাড়াতাড়ি ফোটো দুখানা
ড্রয়ারে রাখিয়া উঠিয়া গিয়া দুয়ার খুলিয়া দিল। ললিতা
প্রবেশ করিল।
ললিতা। পালিয়ে এলে কেন ? . আর এসেই বা দোর বন্ধ করেছিলে
কেন ?
বসন্ত। এত গােল আমি আর সইতে পারছিনা। আমার শ্বাস বন্ধ
হবার উপক্রম হয়েছে।
ললিতা। কিন্তু আজত সে কথা বলে চলবে না।
ললিতা নিজের চেহারা দেখিবার জন্য টেবিলের কাছে
গেল। কেশ বেশ ঠিক করিয়া লইল। ফ্রেমখানা
তুলিয়া লইয়া বসন্তর দিকে চাহিল।
আমার ফোটো কি হােল ? ফ্রেম থেকে কে খুলে নিল?
ড্রয়ার খুলিয়া তটিনীর ফটো লইয়া
তটিনীর ফটো এখানে কি করে এল !
১১৬
তটিনীর বিচার
বসন্তর দিকে অগ্রসর হইয়া কহিল
ওই ফ্রেমে আমার ফোটোর যায়গায় এই ফোটো তুমি রাখবে ? আজকের
দিনে !
ফোটোখানা টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া ফেলিল ।
বসন্ত ছুটিয়া আসিয়া তার হাত চাপিয়া ধরিল।
বসন্ত। ও কি করলে তুমি !
ললিতা। যদি পারতুম, তাহলে তােমার বুকের ভেতর তটিনীর যে
ছবি রয়েছে তাও এমি করে ছিড়ে ফেলতুম ।
বসন্ত কিছুকাল তাহার মুখের দিকে চুপ করিয়া চাহিয়া
থাকিয়া তাহার হাত ছাড়িয়া দিয়া কহিল
বসন্ত। আশ্চর্য লােক তুমি !
ললিতা। খুবই আশ্চৰ্য্য বলে মনে হচ্ছে, না? বিয়ের রাতেই অন্য
এক নারীর ফোটো তুমি পূজো করবে আর আমি পতি দেবতার সেই পুণ্য
কাজ পরমানন্দে চেয়ে চেয়ে দেখব !
বসন্ত। দেখতে না পার, সরে যাও।
ললিতা। চমৎকার! এক প্রহরেই এই রূপান্তর! কিন্তু ডাকলেই
ছুটে আসব আর হাঁকিয়ে দিলেই চলে যাব, তেমন মেয়ে আমি নই।
শালগ্রাম সামনে রেখে যে অধিকার দিয়েচ, সে অধিকার তুমি ত ইচ্ছে
করলেই কেড়ে নিতে পারনা।
বসন্ত। সেই অধিকারের গরব নিয়েই তুমি থাক, আমাকে কখনো
বিরক্ত করাে না। যাও, আমাকে একটু একা থাকতে দাও।
১১৭
তটিনীর বিচার
ললিতা। আজ তা পারবে না।
বসন্ত। তুমি কি চাও, কি পেলে তুমি খুশী হও বলল।
ললিতা। এতদিন যারা আমায় উপেক্ষা করেছে, উপহাস করেছে,
আজ, অন্ততঃ আজ, তােমাকে পাশে নিয়ে তাদের সামনে আমি মাথা উচু
করে দাড়াতে চাই।
বসন্ত। কে তােমাকে উপেক্ষা করেচে, উপহাস করেছে ?
ললিতা। তুমি, তটিনী, শৈলেশ, তােমাদের দলের সকলে। আমার
অপরাধ আমি মাষ্টারি করতুম, আর তটনীর গরব সে ছিল ধনীর দুলালী।
আজ চাকা যখন ঘুরে গেছে, তখন•••
বসন্ত। তখন ভাবচ সকলকে দলে, পিষে, গুড়িয়ে দেবার অধিকার
তােমার আছে ?
ললিতা। হাঁ, তাই আছে !
কলিকা ছুটিয়া আসিল।
কলিকা। ভাই ললিতা, তােমার বাড়ীতে চোর এসেচে।
ললিতা। ও! তাের মন চুরি গেছে ? কে করলে!
কলিকা। না, না! সে চুরি নয়। সত্যিকারের চুরি। আমার
নেকলেস, প্রতিভার মুক্তোর কলার আর হিমানীর হীরের দুল পাওয়া
যাচ্ছেনা।
ললিতা। সে কি !
কলিকা। প্রতিভা ত কেঁদেই ফেলেচে। আর আমরাও কেউ এমন
বড়লােক নই যে এ ক্ষতি হাসিমুখে সইতে পারব।
১১৮
তটিনীর বিচার
ললিতা। ওগাে, এখন আমরা কি করব ?
বসন্ত। বসে বসে জটলা করব।
ললিতা। চোর ধরব না ?
বসন্ত। চোর ধরা দেবার জন্যে বসে রয়েছে কিনা।
কলিকা। চেষ্টা করলে এখনাে হয়ত ধরা যায়। শৈলেশবাবু বাইরে
যাবার সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।
ললিতা। চল, শৈলেশবাবুকে নিয়ে তুমি যা হয় একটা কিছু কর।
আমাদের বিয়ের দিনে এ ক্ষতি ওদের হতে দেবনা। আয় কলি।
তাহারা অগ্রসর হইল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বসন্তর বাগান
সকলে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। ডাক্তার ভোস
একটা টেবিলে তাস লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছেন।
শৈলেশ। আপনারা কিছু ভাববেন না। বসন্ত এলেই আমরা
পুলিসে খবর দোব।
ভােস। অমি চোর সােজা এসে বলবে, আমি হাজির আপনারা
আমাকে গ্রেফতার করুন। হাঃ হাঃ! হাঃ!
**
ললিতা, কলিকা, বসন্ত প্রবেশ করিল।
এই যে ললিতা, এদিকে যে ভয়ানক কাণ্ড হয়ে গেছে।
১১৯
তটিনীর বিচার
ললিতা। শুনেই ত ছুটে এলুম। কি করা যায় বলুন ত ?
শৈলেশ। করবার আর কি আছে, পুলিসে খবর দিন। বসন্ত চল
আমরা থানায় ফোন করি।
বসন্ত। There is nothing else to do. .
তাহার দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল।
ভােস। Onc minute gentlemen!
তাহারা ফিরিয়া দাড়াইল।
কাকে কান নিয়ে গেছে শুনেই কানে হাত দিয়ে না দেখে, কাকের পেছনে
ছােটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
শৈলেশ ছুটিয়া তাহার কাছে আসিল, কহিল
শৈলেশ। আপনি কি বলতে চান ?
ভােস। চুরি আদৌ হয়েছে কিনা সেইটেই আগে দেখে নিন।
শৈলেশ। হয়নি মানে !
কলিকা। আমার নেকলেস ?
প্রতিভা। আমার মুক্তোর কলার ?
হিমানী। আমার হীরের দুল ?
ভােস। আর শৈলেশ বাবুর cuff-links ?
শৈলেশ। আমার cuff-links !
ভােস। দেখুন না চেয়ে।
শৈলেশ। তাইত !
কলিকা। আশ্চর্য !
১২
তটিনীর বিচার
নলিনী। তাজ্জব ব্যাপার!
ভােস। এইবার ঠিক বলেচ নলিদি, তাজ্জব, magic, চুরি নয়।
ললিতা। চুরি নয় !
ভােস। নিশ্চয়ই নয়। শিকাগাের বড় বড় পার্টিতে এরকম practical
joke হতে দেখিচি। হাঃ! হাঃ! হা! হা!
শৈলেশ। থামুন মশাই! ওরকম করে হাসবেন না। এখন বলুন
জিনিষগুলো কি হয়েচে।
ভােস। ব্যস্ত হবেন না। এই ঘরেই আছে। না বলিয়া পরের দ্রব্য
লইলে চুরি করা হয় যদিও, তবুও যারা যা নিয়েছেন, তাঁরা যে তা চুরি
করেন নি, একথা আমি হলফ করেই বলতে পারি।
বসন্ত। হেঁয়ালী রেখে একবার স্পষ্ট করে সব বলুন। পুলিসে খবর
দিতে অকারণ দেরী হয়ে যাচ্ছে।
ভােস।
At your service my host.
উঠিয়া বাউ করিল
Now, Ladies and gentlemen আপনারা যে যা নিয়েছেন, তা
কেউ চুরি করবার মতলবে নেননি—রগড় করবার জন্যেই নিয়েছেন।
কাজেই আমি যদি আপনাদের কাছ থেকে সেগুলাে বার করে দি, তাহলে
আশা করি আপনারা আমাকে অপরাধী করবেন না।
নলিনী। আমাদের কাছ থেকে বার করে দেবেন!
ভােস। আর রহস্য কেন, নলিদি। ব্যাগটা খুলে হিমিদির হীরের
দুল দুটো বার করে দাও ত।
১২১
তটিনীর বিচার
নলিনী। ব্যাগ আমি খুলচি। কিন্তু মনে রাখবেন you have
made a serious allegation against me.
ব্যাগ খুলিয়া
একি!
একেবারে নির্বাক হইয়া গেল। মেয়েরা তাহাকে
ঘিরিয়া দাঁড়াইল।
হিমানী। এই যে আমার হীরের দুল !
নলিনী। আমায় এমন করে অপমান করতে কে এ কাজ করলে।
এই নাও হিমানী তােমার দুল। বিশ্বাস কর এ কাজ আমি করিনি।
হিমানী। তুমি কেন নেবে ভাই, তুমি কেন নেবে?
**167** 1 Now Doctor Bhose or whoever you may be
আপনি কি করে জানলেন যে নলিনীদেবীর ব্যাগে হীরের দুল আছে
Will yon explain it ?
ভােস'। Shall I?
শৈলেশ। You have got to do it. .
ভােস। কেমন করে জানলুম, য়্যা? ঠিক যেমন করে জানলুম
আপনার পকেটে প্রতিভাদির মুক্তোর কলারটা রয়েছে।
শৈলেশ। আমার পকেটে।
দুই হাত দুই পকেটে দিয়া
My Lord !
Got7 l Out with it Sir, out with it,
শৈলেশ নির্বাক হইয় কলারটি বাহির করিয়া ধরিল।
এই নাও প্রতিভাদি তােমার মুক্তোর কলার।
১২২
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। বসন্ত আমি ভাই কিছুই বুঝতে পারচিনে।
ভােস। পুলিসে খবর দিলে কি ফ্যাসাদেই পড়তেন, বলুন ত
শৈলেশবাবু ?
ললিতা। কলির নেকলেসটা।
কলিকা। হ্যা আমার নেকলেস ?
ভােস। তুমি হচ্ছ FIostess ললিতা। তােমার এই যড়যন্ত্রে যােগ
দেওয়া ঠিক হয়নি। নেকলেস সুন্দরীর কণ্ঠেই শােভা পায়—ওই পামপটে
কেন সেটা রেখে দিয়েচ ? হাঃ! হাঃ! হাঃ!
মেয়েরা ছুটিয়া গেল।
ললিতা। এই যে কলি তাের নেকলেস সত্যিই এখানে।
ভােস। Now সমর, তােমার বুক পকেটে শৈলেশবাবুর cuff-links
রয়েচে, ফিরে দাও, নইলে, you will be handcuffed.
শৈলেশ। তুমি নিয়েছিলে !
সমর। স্বীকার করতে পারি, যদি তুমি স্বীকার করে প্রতিভাদেবীর
মুক্তোর কলার তুমি চুরি করেছিলে।
দুজন দুজনার দিকে চাহিল।
নলিনী। কিন্তু দাদু আপনাকে বলতেই হবে এ ভােজবাজী কেমন
করে দেখালেন।
ভােস। সেটা ভােজের টেবিলেই বলব। এখন বড় ক্ষিধে পেয়েছে।
ওঃ যা, আর একটা জিনিস যে রয়ে গেছে আমার পকেটে।
নলিনী। কি দাদু, কি ?
১২৩
তটিনীর বিচার
ললিতা। আপনার পকেটে আবার কি লুকোনাে রয়েচে ডক্টর ভােস?
ভােস। এই টায়রার মালিক কে বলত ?
নলিনী। আমি নই।
কলিকা। আমিও নই।
ভােস। প্রতিভাদি, তুমি ?
প্রতিভা। না দাদু।
ভােস। ও হাে হাে হাে ভুলেই গেছলুম। এটা যে আমিই এনেছিলুম
ললিতাকে উপহার দেবাে বলে। এস এস ললিতা, এস।
ললিতার কাছে গিয়া পরাইয়া দিল ।
ললি। চলুন ডক্টর ভােস, ডিনারে চলুন।
নলিনী। ভােজবাজীর ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে কিন্তু।
ভােস। বলব বৈকি ! কিন্তু বুঝতে একটু দেরী হবে। কেননা সে
হচ্ছে শিকাগোের পাচ !
যবনিকা পড়িল।
১২৪
চতুর্থ পর্ব
তটিনীর বাের্ডিংয়ের ঘর
তটিনী বসিয়া বসিয়া গান গাহিতেছে।
তটিনীর গান
ও তাের দুখের পূজায় আসবে যদি নয়ন ভরে জল
একা তুই গান গেয়ে চল, গান গেয়ে চল।
হারানাে তাের মনের পিছে
চাসনে ফিরে চাসনে মিছে
ও তাের ঝরা ফুলের গন্ধে মাতাল মনের বনতল।
কৃষ্ণভামিনী প্রবেশ করিল।
কৃষ্ণভামিনী। খুকী!
তটিনী মুখ ঘুরাইয়া দেখিয়া লাফাইয়া উঠিল।
তটিনী। মা ! তুমি এসেচ ! বােস মা।
মাকে জড়াইয়া ধরিল।
কৃষ্ণভামিনী। বাড়ী চল, খুকী।
তটিনী। তুমি বােস মা, তুমি বােস।
ধরিয়া বসাইল।
১২৫
তটিনীর বিচার
কৃষ্ণভামিনী। আজ তােকে বাড়ী নিয়েই যাব। অত বড় বাড়ীতে
একা থাকতে আমার যে কষ্ট হয় তাও তুই বুঝবিনে? যে কদিন আমি
আছি, তুই আমার কাছেই থাকবি। আমি মরে গেলে যেখানে ইচ্ছে
থাকিস। আমি ত আর দেখতে আসব না।
তটিনী। আমি ত বােজই তােমায় একবার করে দেখে আসি মা।
* কৃষ্ণভামিনী। তাতেই কি আমি শান্তি পাই? তুই চলে আসিস
আর আমার মনে হয় যেন সংসারে আমার কেউ নাই, কিছু নেই।
আমি যে কুড়িটা বছর তােকে নিয়েই সব ভুলে ছিলুম মা।
তটিনী। জানি তােমার কষ্ট হয়। কিন্তু জীবনে এমন অনেক কাজ
কি করতে হয় না মা, যাতে দুঃখ আছে, ব্যথা আছে? আজও তুমি
আমাকে, যদি বুকে করেই রাখ, সংসারের সকল তাপ থেকে তুমি যদি
তােমার আঁচল ঢাকা দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েই চল, তাহলে নিজের পায়ে
ভর দিয়ে আমি যে কোনদিনই দাড়াতে পারব না। সেই কি আমার
তালাে হবে মা?
কৃষ্ণভামিনী। দ্যাখ ত কি চেহারা হয়ে গেছে। এই খাওয়া,
এই ভাবে থাকা, সকাল বিকেল এই খাটুনী—এ কি তাের
সহ হয় ?
তটিনী। তুমি বল আমি রােগা হয়ে যাচ্ছি। আর এখানকার
সবাই আমাকে দেখে বলে আমি হাতীর বাচ্চা! তুমি এসেচ শুনলে
সবাই হাতী দেখতে ছুটে আসবে !
কৃষ্ণভামিনী। তা আসুক। এখানে তাের থাকা হবে না ।
তটিনী। তুমি কি ভাবচ আমি রাগ করে চলে এসেচি ?
তটিনীর বিচার
কৃষ্ণভামিনী। আমি কিছু ভাবিনে। আমি শুধু তােকে নিয়ে যেতে চাই।
তটিনী। মা। তুমি ব্যথা পাবে জানি। তবুও আমাকে বলতে
ইচ্ছে আমি কোথাও যাব না। সারা জীবন এই কাজ নিয়েই পড়ে
থাকব। আমি যখন তখন বেরিয়ে যেতুম, ছেলেদের সঙ্গে পিকনিকে,
পার্টিতে, খেলার মাঠে আমােদ করতুম—তুমি পছন্দ করত না।
কৃষ্ণভামিনী। আমার ভয় হােতত। তাের ভবিষ্যৎ ভেবেই আমি,
ভয় পেতুম। তাই বলতুম ওসব কাজ ভাল নয়।
তটিনী। ঠিক করতে মা। আজ আমি নিজেই বুঝিচি ওর মাঝে
কিছু নেই। ও-সব যারা করে, তারা আমােদ পায়, ফুর্তি পায় কিন্তু
জীবনের সত্যিকারের পরিচয় কখনাে পায় না। তারা হাওয়ায় ভাসে,
সাবানের বুদ্বুদের মত নানা রঙও ধরে, আবার বুদ্বুদের মত ফেটেও যায়,
জাগ্রত নারী-সমাজে তাদের আর ঠাই থাকে না।
কৃষ্ণভামিনী। অত কথা আমি কোনদিন ভাবিনি—শুধু তাের
কথাই ভেবেচি।
তটিনী। হয়ত ভাবনি। কিন্তু যারা মেয়েদের লেখাপড়া শেখায়
তারা তা কেন শেখায়? শেখায় যাতে তারা শক্তি অর্জন করতে পারে,
অবিচারে অনাচারে সায় না দিয়ে যাতে তারা জীবনের ঝড়-বাদলে মাথা
তুলে দাঁড়াতে পারে। আমার মা••
গলা কঁপিয়া গেল, চোখে জল দেখা দিল। কৃষ্ণভামিনী
তাহাকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া কহিল
কৃষ্ণভামিনী। ও-কথা থাক মা।
তটিনী। সে কথা আমি ভুলতে পারচিনি মা। অত্যাচারে,
১২৭
তটিনীর বিচার . অনাচারে, গৃহহারা হয়ে তােমার আশ্রয়ে এসে তাকে মরতে হলাে— এ আমি কেমন করে ভুলে থাকব ? আমার বাবার নির্মম ব্যবহারের প্রতিবাদটুকুও হয়নি, আর আমি তাই জেনে-শুনে, নিশ্চিন্ত মনে হেসে, গেয়ে, নেচে বেড়াব এই কি তুমি আশা কর? কৃষ্ণভামিনী।' তাের বাবা চলে যাবার চার মাস পরে তুই জন্মেছিস। আজ তুই তার কি করবি? তটিনী। আজ আমি তার কি করব! যুগ যুগ ধরে মেয়েরা লেখা পড়া শিখেও এ প্রশ্নের জবাব ঠিক করতে পারছে না। অসহায়ের মত আশ্রয় খুজছে, প্রতারিত হচ্ছে, জীবন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, আর বুক চাপড়ে বলচে প্রতিকার, প্রতিকার আমি কি করে করব ? কিন্তু প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা করতে না পারলে, শিক্ষা কোন কাজে লাগবে, মা ? দুদিনের হাসি, গান, উৎসব, আমােদ ত নারীর সারা জীবন সার্থকতায় ভরে দিতে পারবে । আর তা পারবে না বলেই আমি মেয়েদের জীবনে বাস্তবতার পরশ এনে দিতে চাই। যে শিক্ষা হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে বেড়াবে না, মনে এনে দেবে নারীর স্বাতন্ত্র্যবােধ, স্বাধিকারবােধ, সেই শিক্ষার প্রচার আমি করতে চাই। অনেক দুঃখু নিয়ে তুমি আমাকে বড় করে তুলেচ মা, আরাে বড় হতে আমায় দাও। তাতে তােমার, আমার, সব শিক্ষিত নারীর মঙ্গল হবে, মা। কৃষ্ণভামিনী। তা এ সব কি তুই আমার কাছে থেকে করতে পারিস ? আমি কি তােকে বাধা দেব? তটিনী। না মা। বাধা তুমি দেবেনা, আমি জানি। কিন্তু মা দেব-বিগ্রহকে ড্রয়িং-রূমেও রাখা যায়, তবুও আমরা তাকে প্রতিষ্ঠা করি। ১২৮
তটিনীর বিচার
মন্দিরে ; ঘরে বসেও ভগবানকে ডাকা যায়, তবুও আমরা ছুটে যাই তীর্থে ।
ঠিক সেই কারণে এইখানেই আমাকে থাকতে হবে না। নইলে আমি
যা চাই তা পাব না।
কৃষ্ণভামিনী আঁচলে চোখ মুছিল ।
এই দ্যাখ মা তুমি কঁদট।
তাহাকে আদর করিতে করিতে
না, না, মা, আমি যােগিনী হব না, গেরুয়া পরব না, রুদ্রাক্ষের মালা হাতে
বাঁধব না। সে সাধনা নয় মা, সে সাধনা আমার নয়। আমি রােজ
গান গাই মা, কবিতাও লিখি, ফুল এখনও ভালবাসি, এখনও মেয়েদের
নিয়ে টেনিস খেলি-তুমি ভেবােনা মা, কিচ্ছু তুমি ভেবােনা।
মাকে আদর করিতে লাগিল । মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
বসন্তর বাগান-বাড়ীর ঘর
বসন্ত কাগজ পড়িতেছিল। টেবিলের ওপর মদের
প্লাস, সােডার সাইফেন। ললিতা প্রবেশ করিল
বসন্ত। বাইরে যাচ্ছ ?
ললিতা। হা ।
বসন্ত। পোষাক বদলে যাও।
ললিতা। কেন?
বসন্ত। কোন ভদ্রলােকের স্ত্রী ও-রকম পোষাক পরে না।
ললিতা। আমিই না হয় ফ্যাসান সেট করলুম।
বসন্ত। But dont you see that you look like a vulgar
varnp ?
১২৯
৯
তটিনীর বিচার
ললিতা। Vamp !
বসন্ত। অবিকল
ললিতা। কিন্তু তটিনী যেদিন পাজামা আর পাঞ্জাবী পরে নেচে
নেচে বেরিয়েছিল, সেদিন ত তাকে vulgar vamp বলে মনে হয়নি।
বসন্ত। তটিনী ।
ললিতা। হঁ্যা, হঁা তােমার তটিনী।
বসন্ত। তটিনীকে সেদিন সুন্দর মানিয়েছিল।
ললিতা। আর আমার দিকে চেয়ে দেখতেও তোর ঘৃণা হচ্ছে ।
দুয়ারের দিকে অগ্রসর হইল।
বসন্ত। শােন।
উঠিয়া পকেট হইতে একখানা চিঠি বাহির করিল।
এই চিঠির আর্থ কি ?
ললিতা চিঠিখানা লইয়া কহিল
ললিতা। হঁা, এই টাকাটা দিতে হবে ।
বসন্ত। দশ হাজার টাকা ওইভাবে দিয়ে দিতে হবে ?
ললিতা। না দিতে চাও, ফল ভােগ করবে।
বসন্ত। তুমি বলছ কি ললিতা ! যার নাম পৰ্য্যন্ত কখনাে শুনিনি,
তারও দাবী এইভাবে পূর্ণ করব !
ললিতা। তুমি নাম জাননা বলেই কি তার এই পাওনা টাকা মারা
যাবে? টাকা আমি নিয়েছিলুম, বিয়ের পর তােমার কাছ থেকে চেয়ে
নিয়ে শােধ করে দেব বলে। আমি ধার করেছিলুম, দলিল তাদের
কাছেই কাছে।
তটিনীর বিচার
বসন্ত। এ টাকা আমি দোবনা।
ললিতা। কেন?
বসন্ত। আমাকে ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে কেউ একটা
পয়সা নিতে পারবে না। আশ্চর্য, লোকটা আমাকে ভয় দেখিয়েছে।
ললিতা। দেনা অস্বীকার করে বীরত্ব জাহির করতে চাও বুঝি ?
ভালো লােককেই বিয়ে করেছিলুম।
বসন্ত। আমাকে কেন বিয়ে করেচ বলতে পার ?
ললিতা। তােমাকে ভালােবাসি বলে নিশ্চয় নয় !
বসন্ত। তবে ?
ললিতা। বিজয়িনী হব বলে। দ্বন্দ্বে তটিনীকে পরাজিত করব বলে।
বসন্ত। শুধু কি এই কারণে ?
ললিতা। না। আরাে কারণ আছে।
শৈলেশ। (নেপথ্য হইতে) আসতে পারি বসন্ত ?
ললিতা। আসুন শৈলেশবাবু।
শৈলেশ প্রবেশ করিল ।
আপনি এসে পড়েছেন, ভালােই হয়েছে। আপনার বন্ধু জানতে চাইছেন...
বসন্ত। আমি কিছু জান্তে চাইনি।
ললিতা। আপনার বন্ধু জানতে চাইছেন আমি তাকে বিয়ে করিচি
কেন? আপনি বলতে পারেন কেন ?
শৈলেশ।. আজ্ঞে, আপনার মনের কথা আমি কি করে জানব?
ললিতা। বিয়ে করবার তিনটে কারণ আছে।
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। ও-সব কথা আমার সাম্নে না বলাই কি ভালাে নয় ?
ললি। না, না, গােপন করবারও কিছু নাই ।
বসন্ত। বল, কি কারণে বিয়ে করেছিলে।
ললিতা। তিনটে কারণে। এক, তটিনী পরাজিত হবে বলে। দুই,
ভালো খেতে পরতে পাব বলে। আর তিন, ইচ্ছে মত খরচ করবার
জন্যে টাকা পাব বলে।
শৈলেশ। আপনি ঠাট্টা করছেন।
ললিতা। না।
শৈলেশ। বিশ্বাস হয় না।
ললিতা। কেন? বড় বড় কথা বলে মিথ্যেকে মনােরম করছি
বলে ?
শৈলেশ। ও-সব ভেবে কে আবার বিয়ে করে ?
ললিতা। মেয়ের বিয়ে দেবার আগে আপনার সমাজের মা-বাপ কি
চায় বলুন ত ? বরের বাপের বাড়ী আছে কিনা, বর চাকরী করে কিনা,
মেয়ে তার ইচ্ছে মত কাজ করতে পারবে কিনা? বলুন করে কিনা ?
শৈলেশ। হাঁ, তা-ই করে।
ললিতা। ভালােবাসার প্রশ্ন তার মাঝে থাকে না, তা মানেন ?
শৈলেশ চুপ করিয়া রহিল।
বলুন, চুপ করে রইলেন কেন?
শৈলেশ। আগে থাকে না। But it grows later on.
ললিতা। বাজে কথা। তবুও তা মেনে নিচ্ছি তর্কের খাতিরে।
আমার মা-বাপ নেই। বিয়ের ব্যবস্থা আমাকেই করে নিতে হয়েছে।
তটিনীর বিচার
তাই আমিও যখন দেখলুম আপনার বন্ধুর টাকা আছে, বাড়ী ঘর বিষয়-
সম্পত্তি আছে, আধুনিকতার বাই আছে, তখন তাঁকেই আমি টার্গেট
Pipa and I shot right through the bull's eyes.
শৈলেশ। কিন্তু আপনি ওঁকে ভালও বাসেন।
ললিতা। হাঁ, ভালােবাসতুম। স্বীকার করচি আমি ভালােবাসতু।
কিন্তু আমার সে ভালােবাসাও পায়ে দলে পিষে ফেলেচে-শুধু একা নয়,
ওর তটিনীকে সঙ্গে নিয়ে। মুখের কথায় সে ভালােবাসা ত আর ফিরে
আসবে না। পারে আসতে ?
শৈলেশ। পারে বৈকি। ভুল কিছু চিরস্থায়ী হয় না। ভালােবাসা
ধীরে ধীরে জেগে উঠে এই ভুল ভেঙে দেয়।
ললিতা। ভালােবাসা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে না, শৈলেশবার ?
ভালােবাসা আসে ঝড়ের গতি নিয়ে। ঘূণী হাওয়ার মত মানুষকে তা
মাটি থেকে তুলে নেয়। যখন ফেলে দিয়ে যায় তখন তার এতটুকুও
অবশিষ্ট রেখে যায় না। যাক এসব কথা আপনাদের বােঝানাে যাবে না।
সে চেষ্টাও আমি করব না। আমি চলুম। আপনারা বসুন।
খানিকটা অগ্রসর হইয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া কহিল
কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলে না?
বসন্ত। প্রয়ােজন মনে করিনি।
ললিতা। আমি যাচ্ছি তটিনীকে নেমন্তন্ন করতে।
7981 No, no, you mustn't do that.
উঠিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিল ।
১৩
তটিনীর বিচার
ললিতা। তুমি আমায় বাধা দেবে?
বসন্ত। হাঁ, তাই দোব।
ললিতা। বাধা দেবার কোন অধিকার নেই তােমার।
বসন্ত। অধিকারের কথা নয়, ভদ্রতার কথা।
ললিতা। একটা মাতালের মুখে ভদ্রতার কথা শােভা পায় না।
বসন্ত আর শৈলেশ অভিভূতের মত দাঁড়াইয়া রহিল।
ললিত বাহির হইয়া গেল। বসন্ত গ্লাসটা তুলিয়া লইয়া
কহিল
বসন্ত। দুঃখ কোরাে না শৈলেশ। বােস।
শৈলেশ বসিল
শৈলেশ। জীবনের এইটেই বড় ট্রাজেডি বসন্ত যে, যাকে চাওয়া যায়,
তাকে পাওয়া যায় না।
বসন্ত। তার কারণ কি জান?
শৈলেশ। কারণ হচ্ছে পাবার জন্য যে সাধনার দরকার তা আমরা
করতে পারি না।
বসন্ত। নারীর হৃদয় জয় করবার সাধনা বড় বিচিত্র। মান,
অভিমান, মিনতি, কাকুতি কিছুই যখন কাজে লাগে না, তখন বলপ্রয়ােগই
বিধেয়। অবশ্য যদি জয়ী হতে চাও।
শৈলেশ। তুমি বর্বর যুগের কথা বলচ বসন্ত।
বসন্ত। বৰ্ব্বরতাকে পেছনে ফেলে মানুষ আজও এগুতে পারে নি।
বসন্ত আবার গ্রাস মুখে তুলিল। মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
১৩৪
ডক্টর ভােসের ল্যাবরেটরী
আধা অন্ধকার ঘরে ডাক্তার ভোস একটী S;}ifit
lampএর ওপর একটা tast tube ধরিয়া বসিয়া
আছেন। পিছনে সমর দাড়াইয়া একাগ্রচিত্তে তাহাই
দেখিতেছে।
ভােস। ওই ফুটচে। টগবগ, টগবগ ! মৃত্যুর দূত সব বাইরে
আসবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। Crystalisel হয়ে ওরাও মুমূষু
ছিল। নবজীবনের আনন্দে কলরব করছে—টগবগ, টগবগ। ব্যস।
ব্যস! ব্যস্!
Test tubeটা সরাইয়া লইয়া সমরের দিকে চাহিল
একি, তুমি ! তুমি এখানে কখন এলে? কেন এলে?
Test tube রাখিয়া দিয়া উঠিয়া সঁাড়াইল
সমর। আমি লুকিয়ে ছিলুম।
ভােস। You were spying on me!
সমর। না, না।
ভােস। তবে আমাকে না বলে তুমি কেন এখানে এলে ?
সমর। আপনার অনুমতি চাইতে সাহস পাই নি।
ভােস। তাই তারও চেয়ে দুঃসাহসের কাজ তুমি করলে ?
সমর। শুধু কৌতুহলের বশে।
ভােস। আমার ক্ষতি করবার উদ্দেশ্যে নয় ?
তটিনীর বিচার
.
সমর। আজ পর্যন্ত কোন অবিশ্বাসের কাজ আমি করিচি?
ভোস। না। তা করনি।
সনর। তাহলে কৌতুহলের বসে এই যে অন্যায় কাজ করে ফেলিচি
তা কি আপনি মার্জনা করতে পারেন না ?
ভােস। মার্জনা ? হাঃ! হা! হা! স্নেহ, মায়া, দা, ক্ষমা এই
সব শব্দের অর্থ অভিধানে আছে অভিধানেই থাক। আমার মনে ওদের
স্থান নাই। তুমি আমার শাকরেদ, আমার অনেক বিদ্যা তােনা শিখিয়েছি।
কিন্তু আমার শ্রেষ্ঠ বিদ্যা তােমাকে আমি শেখাব না। আর যদি কখনাে
শেখাই তােমাকে বেঁচে থাকতে দেব না। বল, শিখতে চাও ?
সমর। না।
ভােস.। Covard । Coward ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। কিন্তু জীবনের বিনিময়ে ও শিক্ষা নিয়ে আমার লাভ ?
ভােস। লাভ তােমার কিছুই নাই, কিন্তু আমার আছে।
তােমার ওপর expriment করে আমি দেখতে চাই, এতদিন আমি
যা চেয়েছি তা পেয়েছি কি না। Come on ! Be ready !
Test tube হইতে একটা crucibleএ ঢালিয়া
সামান্য কয়েক ফোটা। স্বাদ নেই, গন্ধ নেই, say only half a
drachmn !
Crucible লইয়া 51
Swallow it! টুক করে খেয়ে ফেল, স্বাদ নেই, গন্ধ নেই,•••and let
me note the result. come on! come on!
সমর তাহার পদতলে লুটাইয়া পড়িল।
১৩৬
তটিনীর বিচার
সমর। আপনাকে আমি বাবার মত শ্রদ্ধা করি, ভক্তি করি, আপনি
আমাকে বাঁচান।
ভােস। বাবা! বাবা ! কেউ কখনাে ডাকেনি। তাই বুঝিনে
ও ডাক শুনলে মানুষের মন কেন নরম হয়ে যায়। যাদের যায়, তাদের
যায়। আমি ওতে টলিও না, গলিও না। কিন্তু তবুও তোমাকে ক্ষমা
করলুম। ওঠ ।
সমর উঠিয়া পাই
সমর। আমি শুধু চোখেই দেখেচি। কি করলেন কিছুই ত
বুঝি নি।
ভোস। আচ্ছা আগে তােমার বুঝিয়ে দি। আনো ওই
মাইক্রোসকোপ !
সমর একটা মাইক্রোস্কোপ আনিয়া পাখি
আচ্ছা দাড়াও আমি অ5ে
এই slide পরিয়ে দিলুম। দ্যাখ।
দেখে নি।
slide o
হ্যা, দ্যাখ এইবার ।
নজে উঠিয়া ভুইল।
সমর দো,
কি দেখছ ?
সমর। অগণ্য বীজাণু চলা-ফেরা করছে।
ভােস। এই ক্ষুদ্র slideএ অগণ্য অসংখ্য বিভিন্ন জাতীয় বীজাণ্ড।
দেখ তাদের মধ্যে কত বৈচিত্র্য কত পার্থক্য। ঠিক যেমন একটা পৃথিবীর
১৩৭
তটিনীর বিচার
মাঝে অসংখ্য মানুষ চলা-ফেরা করে। চেয়ে দেখ কতগুলাে সবল আর
কতগুলাে দুৰ্বল।
সমর। হঁা, হঁ্যা, কতগুলাে নড়তে পারছে না, শুধু কাপচে, সবলগুলাে
তাদের ঠেলে চলতে পারছে না।
ভােস। ঠিক যেমন আমাদের এই পৃথিবীতে দুৰ্বলরা, তামসিকতায়
জড় মানুষরা শক্তিমানদের, প্রগতিশীলদের এগুতে দিচ্ছে না।
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সমর। যেগুলাে সবল ছিল সেগুলােও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ভােলা। তাই হবে। বলত এখন কৰ্ত্তব্য কি ?
সমব। কার কৰ্ত্তব্য ?
ডক্টর। তােমার, আমার, সকল চিন্তাশীল লােকের।
সমর। আমি জানি না।
ডক্টর। জান না?
অন্যদিকে গিয়া একটা dropperএ করিয়া
liquid আনিল।
আচ্ছা, এইবার দেখা যাক।
৭
Slide খুলিয়া dropper হইতে এক ফোঁটা
slideএ ফেলিয়া
এইবার !
Microscope পরাইয়া
এইবার দেখ।
সমর। একি ।
১৩৮
তটিনীর বিচার
ডক্টর। বল কি দেখচ ?
সমর। দুৰ্বলগুলো কঁপছিল, কিন্তু এখন•••
ডক্টর। বল এখন?
সমর। এখন স্থির হয়ে গেছে।
ভােস। হাঃ! হাঃ! হাঃ! মরে গেছে।
সমর। সব মরে গেছে ?
ভােস। দ্যাখ এখনই সব কুঁকড়ে যাবে, cruimpled হয়ে যাবে,
গুড়াে হয়ে যাবে। আর সবলগুলো অবাধে চলা-ফেরা করবার যায়গা
পাবে, প্রয়ােজনীয় খাদ্য পাবে।
সমর। দুৰ্বলগুলাের চিহ্নও নেই, সবল গুলাে মনের আনন্দে চলা-
ফেরা করছে।
ডক্টর। করচে ত !
সমর। হুঁ।
ভােস। সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। পৃথিবীর বুকেও এমনি অসংখ্য
দুৰ্বল, অক্ষম, অযােগ্য মানুষ রয়েছে। তাদেরও•••
সমর উঠিয়া দাড়াইল
সমর। তাদেরও কি এইভাবে আপনি মেরে ফেলবেন ?
ভােস। যদি পারি, তাতে পৃথিবীর মঙ্গলই সাধিত হবে ।
হাঃ! হাঃ! হাঃ! !
১মর দুই চক্ষু কপালে তুলিয়া পিছু হটিতে লাগিল
ওকি হে !
তটিনীর বিচার
সমর। আপনার সামনে দাড়াতে আমার ভয় হচ্ছে। আপনার
দিকে চেয়ে দেখতেও আমার সাহস হচ্ছে না। আপনার প্রভাব বড়
ভয়ানক, আপনি কি মানুষ !
ডক্টর তাহা দিকে অগ্রসর হইল
ভােস। আমি মানুষ, শুধুই মানুষ, কিন্তু অতি-মানুষ হবার সাধনায়
আমি আত্মনিয়ােগ করিচি। আনি সাফল্যলাভ করব, জয়মাল্য পাব,
শ্রেষ্ঠ মানবহিতৈষী বলে মানুষের ইতিহাসে আমি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকব।
সমর। ওই আপনার সাধনা। মানুষেকে মেরে ফেলবার ওই
বিষ আবিষ্কার করে সমগ্র মানবজাতিকে আপনি ধ্বংস করতে চান !
ডক্টর। না, না, ওই বিষকে আমি অমৃতে রূপান্তরিত করিচি।
আমারই নির্দেশে সেই রূপান্তরিত বিষ মানুষকে অণর করে রাখবে,
টুক করে একটুখানি খাবে, আর মৃত্যুঞ্জয়ী হবে। তুমি মূখ তাই বিশ্বাস
করে খেতে পারলে না। That was an Elixir of life!
সমর। Elixir of life !
ভােস। হ্যা, হ্যা, Elixir of life! 2\in astounding
discovery! বৃদ্ধ যৌবন ফিরে পায়, রুগ্ন পূর্ণস্বাস্থ্য লাভ করে,
কুৎসিত কুরূপা নারী, অপ্সরার মত সুন্দরী হয়। Elixir of life
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
১৪০
বসন্তৱ বাগান বসন্ত আর শৈলেশ বসিয়া আছে। ললিতা প্রবেশ করিল বসন্ত। আচ্ছা তুমি কি ভদ্র পােষাক পরবে না স্থির করে ? শৈলেশ। না, না, ওর কথায় আপনি মন খারাপ করবেন না। You look splendid madam! ললিতা শৈলেশের কাছে আসিয়া কহিলা। । ললিতা। আজ আর সান্ত্বনার প্রয়ােজন নাই। শৈলেশ। আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ললিতা। বেশ পারচেন। সেই বাগানের কথা মনে নেই। তটিনীর অনুরােধে দয়া করে সেদিন একটা চন্দ্রমল্লিকা এনে দিলেন। মনে রাখবেন, তটিনীর অনুরােধে। তাতে অনুকম্পা বই কিছু ছিল না। সেদিন তা করতে আপনি লজ্জিত হন নি। কেননা সেদিন আপনি জান্তে, আমি ছিলুম সামান্যা এক স্কুল-টিচার। শৈলেশ। আপনি আমাকে ভুল বুবেছিলেন। ললিতা। না, না, আপনি ঠিক কাজই করেছিলেন। গরীব স্কুল- টিচার আমি, কেন সেদিন নির্লজ্জের মত সেখানে গিয়েছিলুম? না ছিল সম্পদের দাবী, না ছিল ভালবাসার দাবী। চলুন ওইখানটায় আমরা বলি। একটা অসনে গিয়া বসিল ১৪১
তটিনীর বিচার
সেদিন যা উচিৎ হয়েছিল, আজ তা অনুচিৎ। এই কথাটাই শুধু
মনে রাখবেন।
পাশের টিপয়ে রক্ষিত টে হইতে সিগারেট লইল।
সিগারেট ?
শৈলেশ। No thanks, খাই না।
ললিতা নিজেই তাহার দুই ঠোর ভিতর একটা
চাপিয়া ধরিল।
ললিতা। Help me pleasc. .
শৈলেশ থতমত খাইয়া দিয়াসলাই ধরাইল। বসন্ত
উঠিয়া আসিয়া ললিতার মুখ হইতে সিগারেট লইয়া
ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল ।
বসন্ত। This is scandalous :
ললিতা লাফাইয়া উঠিয়া তাহার সামনে দাড়াইয়া কহিল
ললিতা। কিন্তু একটি কুমারীকে হােটেলে নিয়ে গিয়ে তার ঠোটের
সামনে লিকারের গ্লাস তুলে দেওয়াও কম scandalous ছিলনা। তাও
তুমি করেছিলে।
বসন্ত সরিয়া গেল। ললিতা আবার একটা সিগারেট,
ধরাইল। বসন্তর দিকে একরাশ ধোঁয়া ছড়াইয়া
শৈলেশের দিকে ফিরিল।
Are you shocked?
১৪২
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। না, না।
ললিতা সিগারেটটা ফেলিয়া দিল ।
ললিতা। তবে শুনুন। সেদিনকার সেই বাগানের কথাটাই আগে
শেষ করেন। সেদিন Inflorescence, Law of gravitation এবং
আরাে নামা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আলােচনা করছিলেন, পাছে আমি আপনার
কাছে প্রেম নিবেদন করি সেই ভয়ে:••it was very clever of you.
কিন্তু একটিবার কি আপনার মনে হয়েছিল যে একটি নারীর মনােভাব না
জেনে তার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করা ভদ্রলোকের কাজ নয়, বৰ্ব্বরের
কাজ ? সেদিন অকারণে আপনি আমায় অপমান করেছিলেন। শুধু যে
আপনিই তা করেছিলেন, তা নয়—তটিনী, এমনকি আজ যিনি আমার
স্বামী, তিনিও। আমি গরীব বলে আমাকে সেদিন তা সইতে হয়েছিল।
আর আজ ? আজ যদি আমি প্রতিশােধ নিতে চাই, তাই বুঝি
অমার্জনীয় অপরাধ হবে ?
তটিনী আর সমর আসিয়া দাড়াইল ।
শৈলেশ। ওই দেখুন কে এসেছেন।
ললিতা। আসুন, আসুন মিস মিটার। আসুন সমরবাবু।
আগাইয়া গিয়া তটিনীর হাত নিজের হাতে লইল ।
আমি জান্তুম আপনি আসবেন।
বসন্তর কাছে গিয়া
মিস তটিনী মিটার, মিঃ চ্যাটার্জী—আমার স্বামী।
বসন্ত। তােমার না জানবার কথা নয় যে আমরা দুজনে বিশেষ
বন্ধু।
১৪৩
তটিনীর বিচার ললিতা। তটিনী দেবী আজ আমার guest. আর আমি যতক্ষণ না introcluce করে দিই ততক্ষণ কোন যুবতীর সঙ্গে আমার স্বামীর আলাপ করায় বাধা ঘটতে পারে। না তটিনী দেবী ? তটিনী। আপনি বেশ মজার কথা কইতে পারেন। ললিতা। আগেও পারতুম। কিন্তু তখন গরীব ছিলুম বলে • আপনারা তা কানেই তুলতেননা। মিন মিটার আপনি বসুন। সমর- বাবুকে একটা কাজের ভার দিয়ে আমি এখুনি আসছি। সমরকে লইয়া চলিয়া গেল। তটিনী। তােমার শরীর ত তেমন ভাল নেই। বসন্ত। না বেশ আছি । শৈলেশ। দুদিন আপনার ওখানে যেতে পারিনি। তটিনী। হ্যা। আমি ভাবলুম আপনার হােল কি। বসন্ত। তােমার মা ভাল আছেন ত ? তটিনী। শরীর বেশ ভালই আছে। মন খারাপ হয়েছে আমি সন্ন্যাসিনী হব বলে। ' বসন্ত। সন্ন্যাসিনী । তটিনী। মায়ের আমার সেই ভয়ই হয়েছে। শৈলেশ। জীবনের যে ফিলজফি আপনি ধরেচেন, তা হয়ত একদিন আপনাকে সন্ন্যাসিনী করেই তুলবে। তটিনী। মন্দ কি সনাতনীরা একটা দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবেন। **77* lixcuse me, I will join you in a minute. বাহিরে চলিয়া গেল। ১৪৪
তটিনীর বিচার
বসন্ত। তটিনী।
তটিনী মুখ তুলিয়া তাহার দিকে চাহিল।
এ ব্যবধান কি কিছুতেই ঘােচানাে যায়না?
তটিনী। তােমার আমার বন্ধুত্বে কোন ব্যবধানই ত নেই।
বসন্ত। আমার মনে হচ্ছে তটিনী একটা করে দেয়াল যেন
তােমাকে আমাকে পৃথক করে রেখেছে। আমি তােমাকে দেখতে পাচ্ছি,
কিন্তু তােমার অনুরাগের উষ্ণ পরশ পাচ্ছিনে।
তটিনী হাত বাড়াইয়া দিল।
তটিনী।
IIold it.
বসন্ত হাত চাপিয়া ধরিল। তারপর ধীরে ধীরে হাত
ছাড়িয়া দিল।
বসন্ত।
It is all over now! all over! সব শেষ!
ঘুরিয়া দাড়াইল। তটিনী তাহার কাছে, দাড়াইয়া
কহিল
তটিনী। আমাদের বন্ধুত্ব আমরণ অটুট থাকবে।
বসন্ত। বন্ধুত্ব ! তােমার কাছে আমি কি শুধু তাই চেয়েছিলুম ?
তটিনী। কিন্তু আজ তার বেশী কিছু দেবার উপায় আমার নেই।
তােমারাে নেবার অধিকার নেই।
বসন্ত। কেন ?
তটিনী। খুবই সহজ কথা, ললিতা রয়েছে বলে।
বসন্ত। ললিতা রয়েছে বলে। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য স্মরণ
করিয়ে দিচ্ছ।
১৪৫
তটিনীর বিচার তটিনী। ভাল করচিনা কি ? বসন্ত। হচিরদিনই আমার ভালাে তুমি দেখে এসেচ। আমারই ভালাে হবে জেনে তুমি আশা দিয়ে দিয়ে আমার দাবীকে বড় করে তুলেচ, আমারই ভালো হবে জেনে আমার ভালবাসার কোনই মূল্য তুমি দিতে চাওনি। আমারই ভালাে হবে জেনে আমার সুখশান্তি চিরজীবনের জন্যে তুমি হরণ করে নিয়েচ। আজ যখন এসেচ, তখন দেখে যাও কী ভালােই আমার হয়েছে। প্রচুর অর্থ নিয়ে, মনােরমা ভাৰ্য্যা নিয়ে কী সুখেই আজ আমি রয়েটি। তটিনী। তুমি বিশ্বাস করাে তােমার ভালাে হবে জেনেই এ কাজ আমি করিনি। বসন্ত। একদিন তােমাকে চেয়ে চেয়ে দেখতুম আর আমার মনে হােত বিশ্বের সমস্ত লাবণী দিয়ে যেন তােমার অঙ্গ গড়ে উঠেছে। আজ দেখচি তুমি পাষাণী, পাষাণী। এতদিন চেষ্টা করেও তােমার হৃদয়ের পাথর- ফলকে একটি রেখাও আমি একে দিতে পারিনি। তটিনী। ওগাে না, না, অমন করে তুমি ও-কথা বলােনা। আমার দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে আমাকে তুমি সঙ্কল্পহার করােনা। বসন্ত তটিনীর দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। বসন্ত। আমি পারি। এই মুহূর্তেই পারি। তুমি দুৰ্বল, তুমি কাপচ, তুমি টলচ, এই মুহূর্তেই পারি তােমাকে আমার বুকে টেনে নিতে... তটিনী। ওগাে না, না, না। ১৪৬
তটিনীর বিচার
বসন্ত। ভয় নেই। আমি তা করবনা। তােমাকে, শুধু তােমাকে
কেন, কাউকেই আমি সঙ্কল্পহারা করবনা। থেকো তুমি স্বার্থপরের মত
শুধু তােমার সঙ্কল্পকেই সম্বল করে আর চেয়ে চেয়ে দেখে আমি কেমন করে
ছুটে যাই জাহান্নামের পথে।
বসন্ত ঘুরিল, তটিনী বসিয়া পড়িল, বসন্ত টেবিলের
সামনে দাঁড়াইয়া মদ্য পান করিল। শৈলেশ প্রবেশ
করিল
Sailesh, please see that she is confortable here.
বসন্ত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল ।
শৈলেশ। আপনার কি অসুখ করেছে ?
তটিনী। না, ওর কথা ভাবচি। ওর কি হয়েছে শৈলেশবাবু ?
শৈলেশ। বিয়ে করে ও সুখী হয়নি।
তটিনী। দুঃখের কথা।
শৈলেশ। এ দুঃখ ওকে পেতে হােতনা যদি...
তটিনী। যদি আমি ওকে বিয়ে করতুম ?
শৈলেশ। Exactly so. .
ললিতা প্রবেশ করিল ।
ললিতা। শৈলেশবাবু, please dont make a monopoly ol
my guest. সমর বেচারা ওঁর সঙ্গে কথা কইবার জন্যে হাপিয়ে উঠছে।
তটিনী। আমরা যে একসঙ্গেই এলুম !
ললিতা। সেই সঙ্গসুখের স্বাদ পেয়েছে বলেইত বেচারা আরাে উতলা
হয়ে উঠেছে।
।
১৪৭
তটিনীর বিচার
তটিনী। কোথায় তিনি?
ললিতা। বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাে দেখে এলুম।
শৈলেশ। Let him rot there!
ললিতা। দেখুন মিস মিটার, আমার বাড়ীতে পা দিয়েই আপনি
jealousy জাগিয়ে তুলেছেন।
শৈলেশ। অবিচার করবেননা মিসেস চ্যাটার্জী।
ললিতা। আসুন মিস মিটার অন্তত আমার বাড়ীটা দেখে আসবেন।
চলুন শৈলেশবাবু।
তিন জনেই চলিয়া গেল। একটু পরে বসন্ত প্রবেশ করিল।
বসন্ত। ' I see there is no one here। সবাই সরে পড়েছে।
ভালােই হয়েছে। আমার জীবন সঙ্গিনীর সঙ্গে নিরিবিলি আলাপ করবার
সুযােগ পাওয়া গেল।
যে টেবিলে মদ ছিল সেইখানে গিয়া দাঁড়াইল।
একপাত্র পান করিল তারপর বসিয়া পড়িল ।
You are excomunicated Basanta-poor Soul! No
body cares to keep your company. Neither your wife nor
yonr friends. কিন্তু কেউ তােমাকে ব্যথা দিতে পারবেনা--মদ যতক্ষণ
আছে ততক্ষণ নয়।
ললিতা, তটিনী, সমর, শৈলেশ প্রবেশ করিল। ললিতা ও
তটিনী এক আসনে বসিল,সমর ও শৈলেশ পৃথক আসনে।
ললিতা। অপমানের জ্বালা ভোলা বড় শক্ত। প্রতিদিনকার অপমান
আমার অন্তরে দাগ রয়েছে।
১৪৮
তটিনীর বিচার
বসন্ত। তাই ভেবেচ যে পাল্টা অপমান করে সেই জ্বালা জুড়ােবে।
ললিতা তাহার দিকে চাহিল, কিন্তু কোন জবাব
দিল না ।
ললিতা। কিন্তু কী অপরাধ আমি করেছিলুম?
বসন্ত। জয়ী ত হয়েচ, আর কেন সে-সব কথা !
ললিতা। আমি জানি জিতেও আজ আমি পরাজিত। সেদিনও
আমি উপহাসের পাত্রী ছিলুম আজও আমি তাই।
উত্তেজনায় উঠিয়া দাড়াইল ।
শৈলেশ। কে আপনাকে উপহাস করছে ?
ললিতা। আমি যদি নির্লজ্জের মত ওর পিছু পিছু ঘুরতু, তাহলে
বুঝতুম উপহাসই আমার প্রাপ্য। কিন্তু আমি ত তা করিনি।
করিচি ?
বসন্তর কাছে গিয়া কহিল
বসন্ত। এই সব শােনাবার জন্যেই কি এদের ভুনি আজ নেমন্তন্ন
করেচ?
ললিতা। শুধু এদেরই শােনাতে চাই না। পৃথিবীর সকল লােককেই
শােনাতে চাই তােমাদের কীর্তি।
বসন্ত। তােমার অভিযােগ শুনে সবাই ছুটে আসবে আমাকে শাস্তি
দিতে, না ?
ললিতা। শাস্তি তােমার পাওনা কিনা সে বিচার তারাই করবেন।
আমি শুধু আমার অভিযােগ প্রকাশ করব। আমি ছিলুম গরীব এক
১৪৯
.
তটিনীর বিচার স্কুল-টিচার। বড়লােকের ঘরণী হবার কল্পনা আমার কখনাে ছিলনা। বামন আমি চাদ ধরবার দুরাশায় কখনাে হাত বাড়াইনি। আমার অজানায়, আমার না-চাওয়ায়, জীবনের এক মধু-রাতে চাদের অজস্র কিরণ আমার গায়ে এসে পড়ে আমাকে উতলা করে তুল্লে। আমি তা উপভােগ করবার জন্যে আকুল হয়ে উঠলুম। আমার বয়স, আমার অভিজ্ঞতা, শাঠ্যের সঙ্গে আমার পরিচয়ের একান্ত অভাব, আমাকে বুঝতেই দেয়নি যে আমার ভাগ্যাকাশের সে চঁাদ মায়া-মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু বুঝতে বেশী দেরী হল না। হঠাৎ যা এসেছিল, হঠাৎই তা চলে গেল। চারিধারে নেমে এল ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে পথ নির্দেশ করতে গিয়ে প্রতি পদে আমি হোঁচট খেয়েচি আর চারিদিক থেকে ভেসে এসেছে আমাকে লক্ষ্য করা উপহাসের কল-হাস্য। আমি নীরবে তা সহ্য করিচি, অপমানের বােঝায় আমার মেরুদণ্ড নুয়ে পড়েছে তবুও আমি তা সহ্য করিচি। আজ কি বলিবে কি করিবে বুঝিতে না পারিয়া এদিক। ওদিক চাহিয়া আবার শুরু করিল। আজ জয় মিথ্যে জেনেও, যারা আমাকে উপহাস করেছিল তাদের বলি, সমাজ আর আইন যে জয়টীকা আমার ললাটে পরিয়ে দিয়েছে, তা মুছে দেবার শক্তি কারু নেই--না স্বার্থত্যাগে মহীয়সী ওই তটিনী দেবীর, না, পরদুঃখকাতর ওই শৈলেশের, না নিরাশ্রয়ের আশ্রয়দাতা আমার পরমারাধ্য, ওই পতি দেবতার। বেগে বাহির হইয়া গেল। সকলে কিছুকাল স্তব্ধ হইয়া রহিল। ১৫০
তটিনীর বিচার
শৈলেশ। এখন ওঁকে একটু শান্ত করা দরকার। বসন্ত' যারে
একবার ওঁর কাছে ?
7781 I dont care to,
তটিনী। আমিই যাচ্ছি। ওঁর কোন কথাই আমাকে বিধবে না।
সমর। হয়ত আমার কথাই শুনবেন, আমিই যাই।
সমর চলিয়া গেল
শৈলেশ। এমন মুখরা স্ত্রীলােক আমি কখনাে দেখিনি।
তটিনী। পাষাণের বাঁধ ভেঙে ঝরণা যখন নেমে আসে, তখন তা
মুখরাই হয়। নীরবে এতদিন যে ব্যথা ও সয়েচে, লাঞ্ছনার যে আঘাত ও
পেয়েচে, মুখরা না হলে ও ত তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারত না।
উঠিয়া ঘরে চলিয়া গেল।
শৈলেশ। চল বসন্ত আমরা বাগানে গিয়ে একটু বসি।
9781 Leave me alone with my wine! Please leave
me !
শৈলেশ বাহিরে যাইতে উদ্যত হইল। সমর প্রবেশ
করিল।
সমর। শৈলেশদা, মিসেস চ্যাটার্জি তােমাকে ডাকচেন।
দুই জনেই চলিয়া গেল।
বসন্ত। সবাই সান্ত্বনা দিতে চায় ওকে। তাের দিকে কেউ ফিরেও
• চায়না রে হতভাগা। তাের সান্ত্বনা শুধু এই মদ,
তটিনীর বিচার
মদ ঢালিয়া লইল। তটিনী প্রবেশ করিল।
তটিনী। এ কি করচ তুমি ?
বসন্ত। দেখচ ত জীবনের সঙ্গিনীরূপে কাকে আজ আমি পেয়েছি।
তটিনী। কিন্তু দোষ ত ওর নয়।
বসন্ত। ওর দোষ নয় ?
তটিনী। না, ওর একটি অভিযােগও মিথ্যে নয় ! সত্যিই ওকে
নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতুম। তুমি, আমি, তােমার বন্ধু ওই শৈলেশ,
সবাই। তুমি ওকে কেন বিয়ে করলে? আর করলেই যদি তাহলে
ওকে ওর পাওনা কেন দিলে না ?
বসস্ত। কেন দিলুম না? দিতে কেন পারলুম না জান?
তটিনী। কেন ?
বসন্ত। তােমারই জন্যে। তােমাকে যে ভালােবেসেছে, আর কাউকে
সে ভালােবাসতে পারে না। তােমার পরশ যে পেয়েছে, আর কারুর পরশ
সে সইতে পারে না।
তটিনী মুখ ঘুরাইয়া দাঁড়াইল।
সজল চোখে ও কাতরতা কেন তটিনী। মানুষ বেঁচে থেকেও কঙ্কালে
পরিণত হয়। বিশ্বাস না হয় আমার দিকে চেয়ে দেখ।
কেহ কোন
দুজনাই চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল।
কথা কহিল না। শৈলেশ প্রবেশ করিল।
শৈলেশ। বসন্ত, ললিতা দেবী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তােমার ভাই
একবার সেখানে যাওয়া দরকার।
তটিনীর বিচার
বসন্ত। আমাকে দেখলেই আরাে অসুস্থ হবেন।
তটিনী। একবার দেখেও আসতে পার না কি হয়েছে ?
বসন্ত। ও ! স্বামীর কর্তব্য। বেশ।
ধীরে ধীরে চলিয়া গেল ।
শৈলেশ। জীবনে এরা কখনাে শান্তি পাবে না।
সমর প্রবেশ করিল ।
সমর। শৈলেশদা, ললিতা দেবী বড় বেশী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
তটিনী। ডাক্তারকে খবর দিনা সমরবাবু।
সমর। ডাক্তার আসবার আগেও একটা খারাপ কিছু হতে পারে।
তটিনী। ওকি কথা সমরবাবু!
শৈলেশ। সমর তুমি কাপছ কেন ?
সমর। আমি...আমি কারু অসুখ দেখলে বড় নার্ভাস হয়েপড়ি।
শৈলেশ। তুমি বােস। তুমি ঘামচ সার।
সমর। আমি..আমি ডাক্তার নিয়ে আসি।
চলিয়া গেল। ধীরে ধীরে বসন্ত প্রবেশ করিল।
ললিতা দেবী কেমন আছেন?
বসন্ত কোন কথা কহিল না। ধীরে ধীরে তটিনীর
সামনে যাইয়া জিজ্ঞাসা করিল
বসন্ত। তুমি জানতে চাইলে না?
তটিনী। বল, কেমন আছেন।
তটিনীর বিচার
বসন্ত।
পারচ জিজ্ঞাসা করতে ? আশ্চর্য !
ফিরিয়া গিয়া মদ ঢালিয়া লইল, মদ খাইয়া কহিল
শৈলেশ, ললিতা মারা গেছে।
শৈলেশ। বল কি ?
এক সঙ্গে
তটিনী। যা !
বসন্ত। ওই তটিনী জানে।
তটিনী বিস্মিত হইয়া চাহিয়া রহিল। শৈলেশ ছুটিয়া
বসন্তর কাছে গিয়া কহিল
শৈলেশ। তুমি বলচ কি বসন্ত !
বসন্ত। আমি বলচিনে। মরবার আগে সে-ই বলে গেছে, তটিনী
জলে গুলে তাকে কি খাইয়েছে, যাতে তার সর্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে গেছে।
শৈলেশ। তটিনী ?
বসন্ত। হঁ্যা, হঁা, ও-নাম আমার ভুল হয় না, তটিনী! তটিনী !
তটিনী পড়িয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে যবনিকা পড়িল ।
১৫৪
পঞ্চম পর্ব
সেশন কোর্ট
কোর্ট রুম যেমন সাজানো থাকে তেম্নি সাজানো। আসামীর স্থানে তটিনী
বসিয়া আছে। সাক্ষীর যায়গায় বসন্ত। যবনিকা উঠিবার
পূর্বেই বসন্তর কণ্ঠস্বর শোনা যাইবে।
বসন্ত। না, না, না, আমি তা বিশ্বাস করিনি। আমি তা বিশ্বাস
করিনি। সে ছিল ভীষণ হিংশুটে। তটিনীর ওপর তার বড় বেশী রাগ
ছিল। সব সময়েই সে বলত সে প্রতিশােধ নেবে।
প্রসিকিউটার। যে প্রশ্ন করা হচ্ছে তারই জবাব দাও।
বসন্ত। কিন্তু প্রশ্নের জবাব দিলেই ত তটিনীকে জানা যাবে না ।
তটিনী এ অপরাধ করতে পারে না, কোন অপরাধই সে করতে পারে না,
চাদে কলঙ্ক থাকতে পারে কিন্তু...
জজ টেবিল চাপড়াইলেন।
জজ। কবিত্ব করবার যায়গা এ নয় ।
যে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তার
জবাব দাও।
বসন্ত। কিন্তু আমার কোন কথাই কি আপনারা শুনবেন না?
আমি যে শপথ নিয়েছি, যা জানি আমি সবই বলব। আমি জানি তটিনী
নির্দোষ। তটিনী নির্দোষ ! তটিনী নির্দোষ !
১৫৫
তটিনীর বিচার
প্রসিকিউটার। কবে থেকে জানলে তটিনী নির্দোষ?
বসন্ত। অনেক দিন থেকে জানি। অনেকদিন আমরা একসঙ্গে
পড়েচি।
প্রসিকিউটার। তবে ললিতার মৃত্যুর দিন তটিনীকে অপরাধী
বলে প্রচার করেছিলে কেন?
বসন্ত। সেদিন আমি সুস্থ ছিলুম না। আমি সেদিন মদের নেশায়
ললিতার কথা সত্য মনে করেছিলুম। আমি ভুল করেছিলুম। আজ
আমার সে ভুল ভেঙ্গে গেছে।
প্রসিকিউটার। আজও কি নেশা করে এসেচ ?
বসন্ত। সেইদিন থেকে মদ ছুইনি। তাইত আজ বলতে পারছি
যে ললিতা প্রতিশােধ নেবার জন্যে মরবার সময়ও মিথ্যে বলেছিল।
ললিতা কি ছিল আপনারা জানেন না, আমি জানি।
প্রসিকিউটার। এখনও কি তটিনীকে পাবার আশা তুমি রাখ ?
বসন্ত। রাখি। এ জন্মে যদি না পাই পরজন্মে তাকে নিশ্চয়ই পাব।
প্রসিকিউটার। আচ্ছা, সেই আশাতেই বেঁচে থাক। যাও।
বসন্ত। আমার সব কথা বলা হয় নি। তটিনীর ললিতার ওপর
রাগ থাকতে পারে না, রাগ পাকবার কোন কারণ নেই—কেননা তটিনী
নিজে আমাকে
জজ। ওকে নিয়ে যাও।
একজন তাহাকে ধরিল
বসন্ত। কিন্তু আমার যা বলবার আছে, তা বলা হয়নি। আমি কেন
তটিনীর বিচার
সে-কথা বলতে পারব না? কেন আপনাদের বুঝিয়ে দোব না যে, তটিনী
নির্দোষ•••তটিনী নির্দোষ•••তটিনী:..
তাহাকে টানিয়া নামাইয়া লইয়া গেল।
প্রসিকিউটার। এইবার বাধ্য হয়ে আমাকে বড় অপ্রিয় একটি কাজ
করতে হবে। আসামীর বৃদ্ধা মাকে কয়েকটী প্রশ্ন করতে হবে।
তাহার ইঙ্গিতে কৃষ্ণভামিনীকে দাড় করান হইল।
তটিনী। মা ! মাগাে !
দুই
মুখ ঢাকিল
প্রসিকিউটার। ওই আপনার মেয়ে।
কৃষ্ণভামিনী। না। আমার বােনের মেয়ে।
প্রসিকিউটার। আপনিই ওকে মানুষ করেছেন?
কৃষ্ণভামিনী। ওর যখন বয়েস সাত মাস, তখন থেকে।
প্রসিকিউটার। ওকে পড়াতেন আপনি?
কৃষ্ণভামিনী। হা।
প্রসিকিউটার। মা-বাপ ?
কৃষ্ণভামিনী। মা ওকে সাতমাসের রেখে মারা যায়। আর ওর
বাপ ওর জন্মের চার মাস আগে থেকেই নিরুদ্দেশ।
প্রসিকিউটার। ওর বাপ সম্বন্ধে আপনি কি জানেন ?
কৃষ্ণভামিনী। শুনিচি সে লােক ভাল নয়।
১৫৭
তটিনীর বিচার
।
প্রসিকিউটার। আর কি শুনেছেন?
কৃষ্ণভামিনী। শুনিচি সে ফেরারী
প্রসিকিউটার। বেশ। এইবার বলুন ত আপনার পালিতা কন্যাটি
কোন প্রকৃতির মেয়ে ।
কৃষ্ণভামিনী।' এমন মেয়ে আমি আর দেখিনি।
প্রসিকিউটার। এমন ভালাে মেয়ে, না এমন খারাপ মেয়ে ?
কৃষ্ণভামিনী। ভালাে মেয়ে।
প্রসিকিউটার। আচ্ছা আপনার এই ভালো মেয়েটি সন্ধ্যার আগে
বাড়ী ফিরত ?
কৃষ্ণভামিনী। কোন কোনদিন ফিরত।
প্রসিকিউটার। বেশী দিন তাহলে বাইরেই থাকত ?
কৃষ্ণভামিনী। বেশী রাত কখনাে থাকত না।
প্রসিকিউটার। দু’ একদিন ? ·
কৃষ্ণভামিনী। বায়ােস্কোপ দেখতে যেদিন যেত, সেদিন একটু দেরী
হােত।
প্রসিকিউটার। বায়ােস্কোপে আপনি নিশ্চয় যেতেন না।
কৃষ্ণভামিনী। না।
প্রসিকিউটার। তাহলে বায়ােস্কোপের নাম করে আর কোথাও যেত
কিনা তা আপনি বলতে পারেন না ?
কৃষ্ণভামিনী। আমি ওর কোন কথা অবিশ্বাস করি না।
প্রসিকিউটার। আচ্ছা, প্রবীণা হয়েও আপনি ওর এই সব উচ্ছজ্বলতা
সমর্থন করতেন কেন?
-
১৫৮
তটিনীর বিচার
কৃষ্ণভামিনী। সমর্থন করতুম না !
প্রসিকিউটার। শাসন করতেন ?
কৃষ্ণভামিনী। কখনাে কখনাে।
প্রসিকিউটর। কেন শাসন করতেন ?
কৃষ্ণভামিনী। ওর জন্যে আমার ভয় হােত বলে।
প্রসিকিউটার। সেই ভয়ের জন্যেই কি পড়াশুনাে বন্ধ করে দিলেন?
কৃষ্ণভামিনী। । ও নিজে ছেড়েচে।
প্রসিকিউটার। কেন ছাড়লে তা বলেচে কিছু ?
কৃষ্ণভামিনী। অনেকবার বােঝাতে চেয়েছে কিন্তু আমি বুঝতে
পারিনি।
প্রসিকিউটার। কি বােঝাতে চেয়েছে বলুন ত শুনি?
কৃষ্ণভামিনী। ও যেদিন শুনলে ওর বাপ ফেরারী, সেইদিনই ও বলে
ও আর পড়াশুনাে করবে না।
প্রসিকিউটার। কেন করবে না ?
কৃষ্ণভামিনী। ও বলে, ওর যেন মনে হয় উচ্ছজ্বলতা
টানে, অনাচার ওকে লােভ দেখায়, পাপ ওকে হাতছানি দিয়ে
ডাকে।
“প্রসিকিউটার। ব্যস! ব্যস! আর আপনাকে বিরক্ত করব না।
কৃষ্ণভামিনী। কিন্তু আমার মেয়ে !
প্রসিকিউটার। মেয়ের অপরাধের বিচার হবে।
কৃষ্ণভামিনী। আমি যে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না ও
এ-কাজ করেছে।
ওকে
তটিনীর বিচার
তটিনী। বিশ্বাস কর মা, বিশ্বাস কর, এ-কাজ আমি করিনি।
তােমার স্নেহের, তােমার শিক্ষার কোন অমৰ্যাদা আমি করিনি।
একজন লােক তাহাকে নামিতে ইঙ্গিত করিল।
কৃষ্ণভামিনী। আমি কখনাে ভাবিনি, কখনাে ভাবতে পারিনি যে,
এমন যায়গায় এমন অবস্থায় তােতে আমাতে কখনাে দেখা হবে।
বলিতে বলিতে নামিয়া গেল।
প্রসিকিউটার। এবার আমরা Post mortem পরীক্ষায় কি প্রকাশ
পেয়েছে তাই বলব।
একজন বৃদ্ধ লােক ডকে উঠিল।
মৃতা ললিতা দেবীর দেহ আপনি Post mortem তদন্ত করেছিলেন?
ডাক্তার। আজ্ঞে হাঁ।
প্রসিকিউটার। কোন জানা অসুখে কি এই মৃত্যু ঘটেছে?
ডাক্তার। না কোন রােগের পরিচয় আমরা পাইনি।
প্রসিকিউটার। আপনার কি মনে হয় স্বাভাবিক কোন কারণে এই
মৃত্যু হয়েছে ?
ডাক্তার। না। তাও হয়েছে বলে মনে হয়না।
প্রসিকিউটার। কোনরূপ বলপ্রয়ােগের চিহ্ন কিছু পেয়েছেন?
ডাক্তার। না।
প্রসিকিউটার। তবে মৃত্যু কিরূপে হােলাে ?
ডাক্তার। মৃতার পাকস্থলীতে একপ্রকার দ্রব পদার্থ পাওয়া গেছে
১৬০
তটিনীর বিচার
যা কোন মানুষের পাকস্থলীতে থাকে না। মৃত্যু তাই থেকেই হয়েছে বলে
আমাদে; বিশ্বাস।
-59.... Was that a poison ?
ডাক্তার। আমাদের বিজ্ঞানে জানা যত বিষ,আছে তার একটাও
এ নয়। আমাদের বিজ্ঞানে বিষ পরীক্ষার যত বিধি আছে তার কোন
বিধি দিয়েই এ বিষ নিরূপণ করা যায়নি।
Then how did you ascertain that it had a
poisonous effect ?
ডাক্তার। মৃতার পাকস্থলীতে যে দ্রব পদার্থ পাওয়া গেছে তার পরিমাণ
এক ড্রামেরও কিছু বেশী হবে। তাই থেকে দশ ফোটা একটা গিনিপিগকে
খাইয়ে দেখা গেছে যে দশমিনিটের মাঝে মারা গেছে। বিশ ফোটা একটা
ঘােড়াকে খাইয়ে দেখা গেছে যে ঘােড়াটা চার ঘণ্টায় মারা গেছে।
প্রসিকিউটর। মানুষ আর পশুর ওপর ওই বিষ কি একই রকম
কাজ করেচে ?
ডাক্তার। মৃত.গিনিপিগ আর ঘােড়র stomach আর heait,
kidney এবং লিভারে যে প্যাথলজিকাল change দেখা গেছে, ঠিক
সেই বিকৃতি পরিলক্ষিত হয়েছে মৃতা ললিতার stornach, heart, kidney
আর liverএ। কাজেই এ সিদ্ধান্ত অসঙ্গত নয় যে, মৃতার পাকস্থলীতে
যে দ্রব পদার্থ পাওয়া গেছে, তা বিষাক্ত আর তাই তার মৃত্যুর কারণ।
প্রসিকিউটর Thank you Doctor, we dont want to
detain you any longer. .
।
।
ডাক্তার নামিয়া দাড়াইল
১৬১
তটিনীর বিচার প্রসিকিউটার। My Lord arid Gentlemen of the Jury! আমাদের জীবনে এমন একটা দিন যে আসবে, তা আমরা কখনাে ভাবিনি। কখনাে ভাবিনি যে ভদ্ৰপরিবারের একটী শিক্ষিত তরুণীর বিরুদ্ধে এই ধরণের একটী জঘন্য, এইরূপ নিৰ্ম্মম একটা হত্যাকাণ্ডের অভিযােগ আমাদের উপস্থিত করতে হবে। অভিযুক্তা তটিনী মিত্র সম্মানের সঙ্গে বি-এ পাশ করে এম-এ পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সে অনাস পেয়েছিল, কিন্তু অনারেবল জীবন যাপন করতে সে অভ্যস্থ হয়নি। পরের অন্নে প্রতিপালিত হয়েও, পরের আশ্রয়ে বাস করেও সংযম, শিষ্টাচার, শালীনতা সব বিসর্জন দিয়ে ছাত্রীর অনুচিত জীবন যাপন করতে সে লজ্জাবােধ করেনি। তটিনী। আমার বিরুদ্ধে যদি বিষপ্রয়ােগের অভিযােগ আনা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সম্বন্ধে আমার যতটুকু অপরাধ তাই বলুন। আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন কি ভাবে যাপন করিচি, তা আপনি জানেন না, সুতরাং আপনার ইচ্ছামত আপনার প্রয়ােজন মত আপনি তাতে রং ফলিয়ে বিচারকে বিকৃত করবার চেষ্টা করবেন না। তা করবার কোন অধিকার আপনার নেই। প্রসিকিউটার। বিশ বছরের একটি যুবতীর ব্যক্তিগত জীবন বাপনের যে বর্ণনা আমরা পেয়েছি, তা শুনে আমাদের সকলকেই লজ্জায় অপােবদন হয়ে থাকতে হয়। ছাত্র বন্ধুদের সঙ্গে হােটেলে হানা। দেওয়া, রাত বারােটা পর্যন্ত, কখনাে কখনাে তারও বেশী রাত একাধিক তরুণ বান্ধবের সঙ্গে নির্জন বাগানে আমােদ-প্রমােদ, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত্রে ঝিলে নৌ-বিহার, শহরের বাইরে জনমান'বিহীন প্রান্তরে মদ্যপায়ী তটিনীর বিচার বান্ধবদের সঙ্গে সমারােহের পিকনিক যদি শিক্ষিত ভদ্রবংশজাত কোন কুমারীর পক্ষে লজ্জার, নিন্দার, দুঃখের কারণ বলে বিবেচিত না হয়, তাহলে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, অদূর ভবিষ্যতে বাংলার শিক্ষিত সমাজে ব্যভিচারের বন্যা বয়ে যাবে। সেই দুর্দিন যাতে না আসে, তারই ব্যবস্থা আপনাদের করতে হবে। একা তটিনী মিত্র বা তার স্বল্প-সংখ্যক সহচরীর এই জীবন যাপন বিধি an exception, বিশেষ ব্যতিক্রম মনে করে যদি আপনারা এই ব্যাপারের গুরুত্ব সম্বন্ধে উদাসীন থাকেন, তাহলে সমাজের প্রতি দেশের প্রতি আপনাদের যে কর্তব্য আছে তা পালন না করবার অপরাধে আপনারাও অপরাধী হবেন। আপনারা আপনাদের কন্যাদের, আপনাদের ভগ্নীদের শিক্ষিত করতে চান, করুন। আপনারা চান তারা স্বাধীনা হােন, নিজেদের পায়ে ভর দিয়ে দাড়াতে তারা অভ্যস্থ হােন, ভালাে কথা। তাতেও আমরা কেউ আপত্তি করব না। এমন কি আপনাদের মধ্যে যারা মনে করেন মেয়েরা শিল্পানুরাগিনী অর্থাৎ নৃত্যগীত-পটিয়সী হলেই প্রতি সংসারে আনন্দের মেলা মিলবে, তাদের সঙ্গেও আমাদের বিরােধ নেই। কিন্তু আমরা প্রতিবাদ করবাে, আমরা বিরুদ্ধাচরণ করবাে, আইনের সমস্ত শক্তি নিয়ে আমরা রুখে দাড়াব, তখন, যখন দেখব আপনাদের লাইসেন্স নিয়ে, আপনাদের চোখে ধূলাে দিয়ে, আপনাদের অভিভাবকত্ব অগ্রাহ্য করে, ৬তির ভবিষ্যাজননীরা তটিনী মিত্রের মত হীন কাজে লিপ্ত হয়েছে, উচ্ছ ঙ্খলার অপরিহার্য পরিণতি ক্রিমিন্যাল মনােবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে উঠেছে।
তটিনীর বিচার ওই তটিনী মিত্র, ওই সুশিক্ষিতা সুরূপা এবং আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি সুদক্ষ অভিনেত্রী তটিনী মিত্র প্রণয়ের প্রতিদ্বন্ধিনী ললিতা চ্যাটার্জীকে বিষপ্রয়ােগে হত্যা করবার দুৰ্ব্ব দ্ধি কোথা থেকে পেল? তার শিক্ষা থেকে নয়, তার সমাজ থেকে নয়, তার পারিবারিক পরিবেষ্টনী থেকেও নয় -সে তা পেল তার সংযমবিহীন, ভাবনাবিহীন, নীতিধৰ্ম্ম বিহীন জীবন যাপনের ফলে। ডিফেন্স। আমার পরম পণ্ডিত বন্ধুবর এই মামলা উপলক্ষ্য করে আমাদের বর্তমান সমাজ সম্বন্ধে যে বক্তৃতা দিলেন, তা উপাদেয় সন্দেহ নাই, কিন্তু এ ক্ষেত্রে একেবারে অবান্তর। শ্ৰীমতী তটিনী মিত্রের বিরুদ্ধে যে · অভিযােগ উপস্থিত করা হয়েছে, সে সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য শুনতেই আমরা এখানে এসেছি। আমরা জান্তে চাই, আমরা বুঝতে চাই শ্ৰীমতী মিত্র সত্যই অপরাধী কিনা। affetta My Lord, I am comming to that point presently. তটিনী মিত্র যে অসংযত জীবন যাপন করেছে তা সাক্ষী সমর সেন, শৈলেশ সেন, বসন্ত চ্যাটার্জী এমন কি তটিনী মিত্রের মাতৃঘসা শ্ৰীযুক্তা কৃষ্ণভামিনী দেবীর সওয়াল জবাবে তা প্রকাশ পেয়েছে। তটিনী। না, তা পায়নি। তারা শুধু বলেছেন, আমি ছাত্রবন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতুম, বায়ােস্কোপে যেতুম, পিকনিক করতুম । কিন্তু...কিন্তু•• প্রসিকিউটর। My Lord! I cat proceed if I am always interrupted in this way. জজ। তােমার জবানবন্দী আমরা পরে শুনবাে। Dont, interrupt the proceedings ! dings ১৬৪ তটিনীর বিচার ওঠে। প্রসিকিউটার। জীবনে যে সংযম অভ্যাস করেনি, লালসাকে সে বশ করতে পারে না। লালসার দাবী সংযমের অভাবে সর্বগ্রাসী হয়ে নারীর স্বাভাবিক লজ্জা, প্রকৃতিগত কুণ্ঠা, সংস্কৃতিজাত হিতাহিত বিবেচনা, পাপ-পুণ্যের, ধৰ্ম্ম-অধৰ্ম্মের সীমারেখা বিচারের শক্তি সকলই লােপ পায় তখন, নারী যখন লালসার লেলিহান শিখারূপে জ্বলে ওঠে। বসন্ত চ্যাটার্জি যখন তটিনী মিত্রকে প্রত্যাখ্যান করে ললিতাকে বিবাহ করে, তটিনী মিত্র তখন ক্ষিপ্তপ্রায় হয়ে ওঠে। প্রতি- পালিকা মাতৃম্বসার আশ্রয় সে ত্যাগ করে স্বেচ্ছাচারের অধিকতর সুযোগ পাবার আশায়। সেই সুযােগ সে কাজেও লাগায়। গােপনে সে বিষ সংগ্রহ করে। তারপর সরলা ললিতা যখন পূৰ্ব্ব বন্ধুত্ব স্মরণ করে, তাকে নিমন্ত্রণ করে, আদর-আপ্যায়ন দিয়ে তাকে প্রীত করতে চায়, তখন বন্ধুত্বের অবমাননাকারিণী বিশ্বাসঘাতিনী ওই তটিনী মিত্ৰ পূৰ্ব্ব প্রণয়ীকে আপন আয়ত্তে আনবার অভিপ্রায়ে সংগৃহীত সেই বিম সুকৌশলে প্রয়ােগ করে। তটিনী। না, না, আমি তা করিনি, আমি তা করিনি। কোন কথা সত্য নয়, সত্য নয়•••সত্য নয়। প্রসিকিউটার। একবার আপনারা ভেবে দেখুন কতবড় কৃতঘ্নতা, কতখানি নিষ্ঠুরতার পরিচয় ও দিয়েছে। অভাগী ললিতা, পিপাসায় শুষ্কক ললিতা, স্বামীর প্রতি অনুরক্তা নারীকে পরম আত্মীয় জ্ঞানে তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে এক গ্লাস জল চেয়েছিল, আর দয়া-মায়া বিহীনা ওই দানবী সেই দর কতল জলে মিশিয়ে দিল তীব্র বিষ। সেই বিষ অভাগীর শিরায় শিরায় যেন তরল আগুনের স্রোত বইয়ে দিল, স্বামীর কাছে শেষ
তটিনীর বিচার
বিদায় নেবার অবসরও সে পেলনা। শুধু বলে গেল জলের বদলে বিষ
তাকে কে দিয়েছিল।
তটিনী মুচ্ছিত হইয়া পড়িল।
তটিনী। মা গাে!
fucpantl My Lord! My learned friend has almost
killed her by his cruel words !
651 Somebody run for a Doctor at once !
co 79 I My Lord! I am a man of medicine. May
I be permitted to attend her ?
জজ। Do it.
ডাক্তার ভােস তটিনীকে পরীক্ষা করিতে লাগিল।
কৃষ্ণভামিনী। আমাকে একবার দেখতে দাও, ওগাে, আমাকে
একবার দেখতে দাও।
কাহারও অনুমতির অপেক্ষা না রাখিয়া চলিয়া গেল।
ভােস। জল ! জল ! একগ্লাস জল!
জুরী এবং জজ ব্যতীত আদালতের সকলে উত্তেজিত
হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে।
591 We adjourn the hearing till to-morrow.
জজ উঠিলেন। তারপর জুরীরা। তারা শঞ্চ ত্যাগ
করিতে লাগিলেন, সেই সময় মঞ্চ ঘুরিয়া গেল।
১৬৬
তটিনীর বিচার
ভােসের ল্যাবরেটরী
অন্ধকার প্রায় ঘরে সমর বসিয়া আছে। তাহার মুখে
চোখে দারুণ ভয়ের ভাব। ধীরে ধীরে ডা: ভোর
প্রবেশ করিল। ধীরে ধীরে তাহার সামনে আসিয়া
দাড়াইল ।
ভােস। Get up! Get up you murderer !
সমর চমকাইয়া উঠিল ।
সমর। আমি নই, আমি নই ডক্টর ভােস, আমি নই।
ভােস। তুমি নও! তুমি নও ! হাঃ! হাঃ! হাঃ! হাঃ!
সাঁড়াশীর মত দুই বাহু বাড়াইয়া তাহার গলা ধরিল।
সমর। আপনি কি বলছেন ?
ভােস। British pharinacopiaয় যে বিষ নেই, সেই বিষ তটিনীর
কাছে কি করে এল ?
সমর। আমি তা কি করে বলব? আমি ত ডাক্তার নই ।
ভােস। ডক্টর ভােস জানে কেমন করে তােমাকে দিয়ে তা বলাতে
চল।
সমর। কোথায় ?
ভােস। আপাততঃ পুলিসে। তারপর দাড়াবে আসামীর কাঠগড়ায় ।
তারপর..তারপর ফাসী কাঠে ঝুলবে..হাঃ হাঃ! হাঃ হাঃ!
সার জার্মার বউট লাগচে। বড় লাগছে আমার ।
ভােস। লাগছে ?
১৬৭
তটিনীর বিচার
সমর। হাঁ, আমি ভাল করে নিশ্বাস নিতে পারচি নে। আমার
লাগচে।
ভােস। আর আমার ইচ্ছে করছে তােমার কণ্ঠনালী ছিড়ে ফেলতে।
কিন্তু আমি তা পারছি না। কেন পারচি না জান?..পারছি না তুমি
তাহলে পুলিসে, আদালতে, তােমার অপরাধ স্বীকার করতে পারবে না
বলে। আর তুমি তা স্বীকার না করলে যে সৰ্ব্বনাশ আমার হয়ে যাবে,
সর্বহারা আনিও তা সইতে পারব না।
সমর। আমি কিছু স্বীকার করব না। আমার বিরুদ্ধে কোন
প্রমাণ নেই, আমাকে কেউ সন্দেহ করে না, আমি স্বীকার করব না,
আমি স্বীকার করব না।
ভােস। তুমি তােমার অপরাধ স্বীকার করবে না আর নিরপরাধিনী
তটিনী তােমার অপরাধে ফাসীকাঠে বুলিবে ?
সমর। হােক তার ফঁাসী। আমার কি ? তটিনী আমার কে ?
ভােস। তটিনী তােমার কেউ নয় আমি জানি। কিন্তু তুমি জান
তটিনী আমার কে?
সমর। কে।
ভােস। এমন কিছু যাকে বাঁচাতে তােমার মত দশটা শয়তানকে ।
আমি গলা টিপে মেরে ফেলতে পারি। করব তাই ?
সমর। না, না।
ভােস। স্পষ্ট কথা শােন। সাজা তােমাকে নিতেই হবে। হয়
আমার কাছে না হয় আদালতে। আদালতের বিচারে প্রাণদণ্ডের
পরিবর্তে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরও হতে পারে। কিন্তু আমার বিচারে
১৬৮
তটিনীর বিচার
তোমার একমাত্র দণ্ড মৃত্যু। গলা টিপে তােমাকে আমি মেরে
ফেলব।
সমর। কি কুক্ষণেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ।
ভোঁস। তার চেয়ে বল, কি কুক্ষণেই লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে বিষ
তৈরী করতে দেখেছিলে।
সমর। আমি বিষ দিইনি, বিষ আনি দেখিনি, সবই আপনার
কল্পনা, নিছক কল্পনা।
ভােস। কল্পনা ! তবে তুমি কঁপিচ কেন ? হাতে করে যখন
বিষ নিয়েছিলে তখন হাত কেঁপেছিল। যখন বিষ জলে ঢেলেছিলে, তখনাে
হাত কেঁপেছিল। বিষাক্ত জল যখন সে পান করল, তখনাে তুমি কেঁপে
উঠেছিলে। তারপর থেকে দিনরাত তুমি ভয়ে ভয়ে কঁাপচ। {
তুমি বেঁচে থাকবে ততক্ষণ তােমার দেহ তােমার মন এমনি করে কাপবে ।
মুহূৰ্তকাল তুমি স্থির হয়ে থাকতে পারবে না।
সমর। আচ্ছা তটিনীর কি সত্যিই ফাসী হবে ?
ভােস। তার নির্দোযিতা প্রমাণিত না হলে, তাই হবে।
সমর। ফঁাসী হবে ! ফাসী হবে! তটিনীর ফাী হবে ।
ভােস। হাঁ, হাঁ তটিনীর ফঁাসী হবে। যদি তুমি অপরাধ স্বীকার
কর।
সমর। কিন্তু সে যে নির্দোষ।
ভােস। আদালতে তুমিই বলে এসেচ তটিনী দোষী।
সমর! কিন্তু আমি জানি কে দোষী ।
ভােস। আমিও জানি।
তটিনীর বিচার
সমর। ফাসী হবে! তটিনীর ফঁসী হবে ! আমি যদি তাকে
বাঁচাতে চাই...
নিজের গলায় হাত দিয়া আর্তনাদ করিয়া শিখাইয়া
গেল। ভােস তাহার কাছে গিয়া কহিল
ভােস। অমন করে চেঁচিয়ে উঠলে কেন ?
সমর। তাকে বাঁচাবার জন্যে আমি যদি আমার অপরাধ স্বীকার
করি তাহলে আমারও যে ফাসী হবে !
ভােস। কৃতকর্মের সাজা কেন তুমি নেবে না ?
সমর। সাজা! ফার্সী! না, না, না, আপনি যান, আপনি যান
আমার সামনে থেকে। আমায় কোন কথা জিজ্ঞাসা করবেন না। আমি
কিছু জানি না, আমি কিছু বলব না। চলে যান এখান থেকে।
ভােস। যাব। কিন্তু একা নয়—তােমাকেও সঙ্গে নিয়ে।
সমর। কোথায় ? কোথায় নিয়ে যেতে চান আমাকে ?
ভােস। আগে থানায়, তারপর আদালতে, তারপর ফাসীমঞ্চে•••
তারপর কোথায় জান ? •••তারপরতারপর নরকে দুজন একসঙ্গে
হাত ধরাধরি করে হাঃ! হা! হা! হাঃ!
মঞ্চ অন্ধকার হইয়া যাইবে। পরে যখন আলো জ্বলিবে
তখন দেখা যাইবে কোর্ট রুমে আসামী পক্ষের
কাউনসেল বক্তৃতা করিতেছেন
ডিফেন্স। শ্ৰীমতী তটিমী মিত্র যে অতি দুশ্চরিত্রা তরুণী, তাই
বােঝাবার জন্যে আমার বিজ্ঞ বন্ধু প্রেসিকিউসন কাউনসেল কাল দীর্ঘ
১৭০
তটিনীর বিচার এক বক্তৃতা করেছেন। আমি কালই আপনাদের কাছে নিবেদন, করেছিলুম যে, সে বক্তৃতা যেমন অবান্তর তেমনি হাস্যকর। শ্ৰীমতী তটিনীর অপরাধ যেন কোন প্রমাণেরই অপেক্ষা রাখে না এমনই একটা ভাব দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, যারা ছাত্র-বন্ধুদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করে, তারা লালসার তাড়নাতেই তা করে। আর তাই শেষে খুনােখুনি ব্যাপারে লিপ্ত হয় ! এই উক্তির মাঝে যুক্তি যে আদৌ নেই, তা দু'বার বলবার অপেক্ষা রাখে না। বসন্ত চ্যাটার্জি শ্ৰীমতীকে পাবার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছিল, সব বাধা-বিঘ্ন অগ্রাহ্য করেও সে শ্ৰীমতীকে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা সবাই জানি শ্ৰীমতী তটিনী তাকে বিবাহ করতে রাজী হলাে না। বসন্তর কাকুতি মিনতি, কান্না কিছুই তটিনীকে সঙ্কল্পহার করতে পারল না। এখন, আপনারাই বলুন লালসায় ক্ষিপ্তা কোন নারী কি এমন অবিচলিত শক্তি নিয়ে, এমন দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে, নিজের সঙ্কল্প অটুট রাখতে পারে ? শ্ৰীমতী তটিনী বসন্তকে ভালােবাসতেন। কিন্তু তবুও কেন তাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন ? রাগে নয়, ক্ষোভে নয়, অভিমানভরেও নয়। প্রত্যাখ্যান করলেন দুটি কারণে। প্রথমতঃ তিনি শুনলেন যে তাকে বিয়ে করলে বসন্ত তার পিতৃ-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন। দ্বিতীয়তঃ নিজের বাপের পরিচয় পেয়ে তিনি মনে করলেন একটা হীন প্রকৃতির ক্রিনিনালের কন্যা হয়ে তিনি সম্রান্তবংশের একটি যুবককে বিয়ে করে তাকে লােকচক্ষে হেয় করতে পারেন না। আপনারাই ভেবে দেখুন লালসায় ক্ষিপ্ত কোন নারী এইরূপে প্রিয়তমের মঙ্গল কামনায় নিজে দুঃখকে বরণ করে নিতে পারে কিনা? আমি জানি তা পারে না। আপনারাও 'তাই-ই জানেন। ১৭১ তটিনীর বিচার অথচ প্রােশিকিউসনের পরম পণ্ডিত কাউনসেল এই লালসার অস্তিত্ত্ব প্রমাণ করবার জন্যে অকারণে হোটেল, পিকনিক, বােট excustion প্রভৃতি কথা এনে শ্রীমতী তটিনীর প্রতি আপনাদের বিরূপ করে তুলতে চেয়েছেন। আপনার সাক্ষী শৈলেশ সেনের মুখে শুনেছেন তটিনী তাকে বলেচেন রােমিওজুলিয়েটের নকল-নবিশী তিনি করতে চান না, তিনি চান নারীর অসহায় অবস্থার প্রতিকার করতে। মডার্ণ ইজনের নামে সমাজে আজ যা চলেছে তার মাঝে উত্তেজনা থাকলেও, মােহ থাকলেও, নারীর মুক্তিপথের হদিশ যে তাতে পাওয়া যাবে না একথা শ্ৰীমতী তটিনীই বুঝেচেন-বুঝেছেন, তথাকথিত ওই মডার্ণ ইজমে কিছুকাল মত্ত থেকে। যদি ওই মডার্ণ ইজমে কোন দোষ থাকে, সে দোষে তটিনী বা তার সমশ্রেণীর তরুণীরা দোষী নয় –দোষী সেই সব তরুণীর অভিভাবকরা যারা বিয়ের বাজারে মেকী চালাবার লােভে আধুনিকতার প্রকৃত রূপের সন্ধান না রেখে মেয়েদের নাচিয়ে, গাইয়ে, বায়ােস্কোপে বয় ফ্রেণ্ডসদের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে মনকে চোখ ঠেরে নিশ্চিন্ত রয়েছেন। তাঁর ভাবনা-বিহীন বলেই তাদের মেয়েরাও হাওয়া-শাড়ী পরে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। তটিনী মিত্র সে শ্রেণীর মেয়ে নয়। তটিনী মিত্র নিজের পথ নিজে বেছে নেয়, নিজের সাধনা দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, অনাগত ভবিষ্যতের সমস্ত দায়িত্ব মেয়েরা যাতে বহন করতে পারে, তার জন্য সমগ্র নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে চায়। তটিনী মিত্রর আবির্ভাবে আমাদের লজ্জিত হবার কারণ নেই, উৎফুল্ল হবার, আশান্বিত হবার, উদ্বদ্ধ হবার কারণ আছে। প্রেসিকিউটার। যেহেতু আমরা দেখলুম সে মানুষও খুন করতে পারে। ১৭২ তটিনীর বিচার ডিফেন্স। যে তটিনী মিত্রের পরিচয় আমরা পেলুম, আপনারা বিবেচনা করে দেখুন, সেই তটিনী মিত্র মানুষের অমঙ্গলজনক কোন কাজ করতে পারে কিনা। ক্রিমিনাল বলে নিজের বাপকে পর্যন্ত যে মনে মনে মার্জনা করতে পারেনি, মাসির অপরিসীম স্নেহ যাকে নিজের সাধনা পথ থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি, সেই তটিনী মিত্র প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কাউকে খুন করবে, এ কথা কে বিশ্বাস করবে ? প্রেসিকিউটার। বিশ্বাস তারাই করবে, যারা তার অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে। ডিফেন্স। হাঁ, সেই প্রমাণই আমরা চাই। ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়ায় যে বিষের সন্ধান পাওয়া যায় না, শহরের সেরা এক Toxicologist যে বিষের নাম পৰ্য্যন্ত স্থির করতে পারেন নি, তটিনী মিত্রের মত একটি অনভিজ্ঞ তরুণী সে বিষ কেমন করে কোথা থেকে সংগ্রহ করল, এ তথ্য প্রেসিকিউশন আমাদের দিতে পারেন নি। তারপর Toxicologistএর অজানা এই বিষ ঘােড়া আর গিনিপিগের মৃত্যু ঘটিয়েছে বলে যে মানুষেরও মৃত্যু ঘটাবে তা কে বলতে পারে? আর সব চেয়ে বড় কথা, তটিনী মিত্র যে ললিতা দেবীর হাতে কোন সময় জলের গ্লাস তুলে দিয়েছিল—তাতে বিষ মেশানাে ত পরের কথা—তাও কেউ দেখেছে বলে শােনা যায়নি। একমাত্র ললিতা দেবী মৃত্যুর পূর্বে তটিনীর নাম করে গেছেন। কিন্তু • তা করবার কারণ যে আছে, তা বসন্ত চ্যাটার্জীর, কলিকা দেবীর এবং শৈলেশ সেনের সওয়াল জবাবে প্রকাশ পেয়েছে। সুতরাং তটিনী মিত্রের বিরুদ্ধে অভিযােগ উপস্থিত করবার কোন সঙ্গত কারণ যেমন আমরা খুঁজে পাইনি, তেমন আপনারাও খুজে পাবেন না। আর অকারণে কাউকে ১৭৩ তটিনীর বিচার দণ্ড দেবার জন্যেও আপনারা ও—আসনে বসেন নি। আমার মক্কেল শ্ৰীমতী তটিনী মিত্রের জীবন-মরণ মান-সম্ভ্রম সবই নির্ভর করছে আপনাদের ন্যায় বিচার এবং সুবিবেচনার ওপর। যােগ্য বিচারকদের হাতে সমর্পণ করে আমি আসন গ্রহণ করলুম। কোর্ট কিছু কাল স্তব্ধ রহিল। জজ। Gentlemen of the Jury। আপনারা ও-আসনে বসেছেন অভিযুক্তা তটিনী মিত্র অপরাধী কিনা তাই স্থির করবার জন্য। অপরাধী কোন নর বা নারী যদি নিরপরাধ সাব্যস্ত হয়ে অব্যাহতি লাভ করে সমাজে স্বাধীন ভাবে বিচরণ করবার সুযােগ পায়, তাহলে সমাজের অমঙ্গল সাধিত হয়। আবার নিরপরাধ কোন নর বা নারী যদি অভিযুক্ত হয়ে । আপনাদের সম্মুখে উপনীত হয়, তাহলে তার নির্দোষিতা ঘােযণা করাও , আপনাদেরই কাজ। না করলে আইনের মর্যাদাহানি হয়। শ্ৰীমতী তটিনী মিত্রের বিরুদ্ধে যে অভিযােগ আনীত হয়েছে, তার গুরুত্ব আপনারা অবশ্যই উপলব্ধি করেছেন। আপনাদের বিচার করে দেখতে হবে সে সত্যই অপরাধী কিনা। তার চরিত্র, তার দৈনন্দিন জীবনযাপন বিধি আপনারা অবগত হয়েছেন। আপনারা আপনাদের ঘরে গিয়ে বেশ ভাল করে আলােচনা করে দেখুন, আপনারা এ সম্বন্ধে একমত হতে পারেন কি না। জুরীরা উঠিয়া দাড়াইল এবং এক এক করিয়া বাহির হইয়া গেল। জজও উঠিয়া চলিয়া গেল। ১৭৪
তটিনীর বিচার
কোর্ট স্তব্ধ। ডাক্তার ভােস সমরের ঘাড় ধরিয়া লইয়া ,
কোর্ট রুমে প্রবেশ করিল।
ভােস। যদি মানুষ হও, এইখানে দাড়িয়ে সব কথা স্পষ্ট বল ।
যদি বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে নিজের অপরাধ স্বীকার কর।
সমর। আমায় ছেড়ে দিন, আমার বড় লাগছে ।
কর্মচারী। কে আপনারা? কি করচেন এখানে ?
সমর। শৈলেশদা। আমাকে বাঁচান, বাঁচান আমাকে এই ঘাতকের
হাত.থেকে।
শৈলেশ আগাইয়া আসিয়া কহিল
শৈলেশ। ছেড়ে দিন ওকে!
কর্মচারী। কি করচেন, ওর মুখ যে শাদা হয়ে উঠেছে।
ভােস। কিন্তু লজ্জায় আপনাদের মুখ এখনাে রাঙ্গা হয়ে ওঠে নি ।
নিরপরাধিনী একটি বালিকাকে এনে আপনারা আজ বিচারের প্রহসন
করচেন আর প্রকৃত অপরাধী গা ঢাকা দিয়ে সেই প্রহসন দেখচে। তাও
লজ্জায় আপনাদের মুখ লাল হয়ে উঠছে না।
কৰ্মচারী। এটা আদালত। স্থির হয়ে যদি বসতে পারেন তাহলে
এখানে থাকুন, নইলে আপনাদের এখানে থাকতে দেব না।
ভােস। স্থির হয়ে কেমন করে থাকব? আমি যে জানি বিচারের
নামে কত বড় অবিচার এখানে হতে চলেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি
নিরপরাধিনীর দু’গাল বেয়ে অশ্রুবারা গড়িয়ে পড়ছে, আমি যে হত্যাকারীর
সন্ধান পেয়েছি।
১৭৫
তটিনীর বিচার
বসন্ত। হত্যাকারীর সন্ধান পেয়েছেন? কোথায় সে ?
বলুন
কোথায় সে ?
ভােস। তাই বলতেই এখানে এসেছি। কোথায় জজ, কোথায়
জুরী, কোথায় দণ্ডধারী সব মহাপুরুষ?
বসন্ত। আপনি জানেন, তটিনী অপরাধী নয়? তটিনী, তটিনী:..
শৈলেশ। বসন্ত। স্থির হও ভাই।
বসন্ত। দিন রাত যে এই প্রার্থনাই আমি করচি, তটিনীর নির্দোষিত
প্রমাণিত হােক।
শৈলেশ। তটিনী যে অপরাধী এ কথা ত কেউ বলে নি। একটু
স্থির হও ভাই।
বসন্ত। কিন্তু ওই জুরী। এখুনি ওরা এসে পড়বে। ওরা এসে
যদি বলে তটিনী অপরাধী, তাহলে কোন প্রমাণই ত কাজে লাগবে না।
ওই তারা আসছে, শৈলেশ, ওই তারা আসছে।
জুরীরা প্রবেশ করিল। তাহারা আসন গ্রহণ করিল।
ওদের মুখ দেখে বােঝবার উপায় নেই, ওদের মনে কি আছে। ওরা
মানুষ না পাথরের মূর্তি।
জজ প্রবেশ করিল। সকলে উঠিয়া দাঁড়াইল। জজ
আসন গ্রহণ করিল। সকলে বসিল।
জজ। Foreiman of the jury ! আপনাদের অভিমত শুনতে
optagy 65 I Are you unanimous in your verdict ?
ফোরম্যান উঠিয়া সঁাড়াইল
১৭৬
তটিনীর বিচার
ফোরম্যান। Yes my Lord !
জজ।
What is it?
ভােস। For God's sake dont pronounce your verdict
yet. হুজুর, ধর্মাবতার অপরাধীর সন্ধান আমি পেয়েছি।
জজ। কে আপনি?
ভােস। আমার পরিচয় অবশ্যই পাবেন। কিন্তু তার আগে প্রকৃত
অপরাধীর দিকে আপনারা চেয়ে দেখুন। আইনকে ফাকী দিয়ে অপরাধী
পালিয়ে যাচ্ছিল, আমি আমার বজ্রমুষ্টি দিয়ে তাকে ধরে এনেছি।
ওর অপরাধ ও স্বীকার করবে। ওকে সেই সুযােগ দিন।
প্রেসিকিউটার। ধর্মাবতার। এ সময়ে বিচারে এরূপ বিপ্ন উপস্থিত
আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়।
ডিফেন্স। আমরা সুবিচার চাই, সত্যের প্রতিষ্ঠা চাই, সময় সংক্ষেপ
করতে চাই না। We would pray for a re-trial.
জজ। আমরা এদের বক্তব্য শুনতে চাই।
ভােস। এইবার এইখানে দাড়িয়ে সত্য কথা বল। বাঁচতে চাও
ত সত্য কথা বল।
কাঠগড়ায় তুলিয়া দিল।
জজ। বল, কি জান তুমি।
ভােস। বল, তটিনী বিষ দিয়েছিল ?
সমর। না।
ভােস। কে বিষ দিয়েছিল? তুমি ?
সমর। হঁ্যা।
১৭৭
তটিনীর বিচার জজ। তুমি বিষ দিয়েছিলে? সমর। জলে, আমি বিষ মিশিয়েছিলুম Elixir (of life জেনে। আমি শুনেছিলুম ওই ওষুধ রুগ্নকে সুস্থ করে, কুরূপাকে সুন্দরী করে, তাই ললিতা দেবীকে আমি ওই ওষুধ দিয়েছিলুম। কিন্তু আজ যখন শুনলুম বিনা অপাধে তটিনী দেবীর ফাসী হতে চলেছে তখন আমি আর নিজের পাপ লুকিয়ে রাখতে পারলুম না। তটিনী দেবীকে আমি অনেক দিন থেকে জানি, ওঁকে আমি শ্রদ্ধা করি, ওঁকে আমি মনে মনে ভালােবাসি, তাই আমার অপরাধের জন্য ওঁকে আমি মরতে দিতে পারি না। আমার জীবন দিয়ে ওঁকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। শাস্তি আমারই প্রাপ্য, ওঁর নয়। দণ্ড আমারই প্রাপ্য, ওঁর নয়। হুজুর ! ধর্মাবতার ! আমার অপরাধের শাস্তি আমাকে দিন। ডকের রেলিংয়ে মাথা রাখিল। প্রেসিকিউটার। My Lord'! এই ব্যক্তির উক্তি যে সত্য তার কোন প্রমাণ নেই। ভােস। প্রমাণ আমি দোব। জজের টেবিলের দিকে অগ্রসর হইল। এই Capsule ধর্মাবতার! এই Capsuleএ যে বিষ আছে ললিতার stomachএ সেই বিষ পাওয়া গেছে। যে কোন Toxicologist পরীক্ষা করে দেখলে এই Capsuleএ সেই বিষই পাবে। প্রেসিকিউটার। কোথাও যে বিষ পাওয়া যায় না, British Pharmacopiaয় যে বিষের উল্লেখ নেই, সে বিষ আপনি কোন যাদুবলে, ১৭৮ তটিনীর বিচার সংগ্রহ করলেন, জানতে পারি ? আপনার মুখের কথায় আমরা তা বিশ্বাস, করতে পারি না, প্রমাণ চাই। ভােস। প্রমাণ ! প্রমাণ ! আচ্ছা, আচ্ছা সে প্রমাণ আমি দোব। এই বিষ নিয়ে আমি একটা বড় experiment করছিলুম। Red Indianদের ধারণা ছিল যে, এই বিষকে অমুতে রূপান্তরিত করা যায়। দেশে ফিরে আমি রাতের পর রাত experiment করে দেখছিলুম বিষকে অমৃতে পরিণত করা যায় কিনা। সমর একদিন লুকিয়ে আমার experiment দেখে। পাছে বিয়ের কথা তার মুখ দিয়ে বার হয়ে পড়ে, সেই ভয়েই আমি তাকে বােঝাই যে ওটা আসলে Elixir of life. সমর তাই-ই বিশ্বাস করে, আর ললিতার প্রতি সহানুভূতিবশতঃ তাকে সুরূপা করবার অভিপ্রায়ে এর ক্রিয়া না জেনে এই বিষ তাকে খাওয়ায়। ফল আপনারা অবগত আছেন। তটিনীর কাছে গিয়া মাগাে ! ক্রিমিনাল বাপের সন্তান বলে তােমার মনে যে ঘৃণা হয়েছে, তা দূর করে দেবার আর কোন উপায় নেই, কিন্তু তুমি যে নিরপরাধ, সেই প্রমাণ আমি দিয়ে যাচ্ছি। জানি, জীবনে তুমি তােমার ক্রিমিনাল বাপকে মার্জনা করতে পারবে না। কিন্তু তার জন্য যদি দু’ফোটা চোখের জলও ফেল, তাতে তােমার কোন ক্ষতি হবে না, অথচ তার অভিশপ্ত আত্মা শান্তি পাবে। তটিনী। আপনি কে ? তাহার দিকে চাহিয়া দেখিল তারপর কহি ভোস। A criminal. ১৭৯ তটিনীর বিচার জুরাদের দিকে চাহিয়া Now gentlemen of the jury! তটিনী বিষ দেবে! ব্রিটিশ ফারমাকোপিয়ায় যে বিষের পরিচয় নেই, সেই বিষ তটিনী কোথায় পাবে ? সে বিষ রয়েছে আমার Iron safcএ, সে বিষ রয়েছে ললিতার stomach, সে বিষ রয়েছে ওই হুজুরের টেবিলে স্থাপিত ছােট্ট ওই Capsuleএ। সেই বিষ সমর আমার কাছ থেকে চুরি করেছিল, তটিনী নয়! সে বিষ সমর জলে মিশিয়েছিল, তটিনী নয়। আর সে বিষের ফলে কত আকস্মিক মানুষের মৃত্যু হয়, তার প্রমাণ দোষ বলে সেই বিষ আরও একটি Capsuleএ ভরে এনেচি। এই সেই বিষ,-এই আমি মুখে ফেলে দিলুম। Capsule মুখে ফেলিয়া দিল। সকলে চীৎকার করিয়া উঠিল ; উঠিয়া দাড়াইল। সবাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখুন, এই বিষের কাজ কত দ্রুত। Gentlemenof the jury, মাত্র দু’মিনিট সময় আছে। G51 Get a doctor, a doctor! ভােস। No doctor can save me, my Lord. আইনকে ফাকি দিয়ে বেরিয়েছি, কিন্তু মৃত্যুকে আর আমি কঁকি দিতে চাই না। আর সময় নেই। Nov gentlemen of the jury, pronounce you verdict. দয়া করে বলুন তটিনী নিরপরাধ । এখনও শােনবার শক্তি আছে। বলুন, মরবার আগে শুনে যাই—তটিনী, আমার তটিনী, নিরপরাধ, বলুন, বলুন আপনারা is she guilty. or not guilty; বলুন, বলুন, guilty or not. guilty ? ১৮০
তটিনীর বিচার
ফোরম্যান তড়াক করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল
ফোরম্যান। Not guilty !
ভােস। হঁ্যা, হঁা, হঁ্যা, Not guilty! Not guilty ! 5775743
তটিনী, আমার মাতৃহারা কন্যা তটিনী নিরপরাধিনী! নিরপরাধিনী !
মা ! মাগাে।
তটিনী। বাবা! বাবা!
ডক্টর ভােস তটিনীর দিকে অগ্রসর হইল কিন্তু তাহার
শরীর বাঁকিয়া নুইয়া পড়িল। কেই ধরিবার আগেই
তাহার প্রাণহীন দেহ লুটাইয়া পড়িল।
যবনিকা পড়িল।
--রঙমহল- প্রথম অভিনয়—শনিবার, ২৪শে ডিসেম্বর, ১৯৩৮ নাট্যাধ্যক্ষতা যােগেশ চৌধুরী প্রযোজনা শ্রীরঘুনাথ মল্লিক ব্যবস্থাপনা- ঐবিদ্যাধর মল্লিক মঞ্চাধ্যক্ষ শ্রীপূর্ণ দে । সঙ্গীত-রচনা- শৈলেন রায় সুর-সংযােজন- শ্রীতুলসী লাহিড়ী সঙ্গীত পরিচালনা শ্রীরাধাচরণ ভট্টাচার্য নৃত্য-পরিকল্পনা---- শ্ৰীললিত গোস্বামী নাট-য়ন্ত্রণ শাসন্তোষ সিংহ শ্ৰীরতীন বন্দ্যোপাধ্যায় স্মা- শ্ৰীকালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় ( ১নং) জ্যোকুমার মুখােপাধ্যায় বাদ্য-শিল্পীগণ-- শীঘণ্টেশ্বর প্রামাণিক, শ্ৰীকালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় ( ২নং) শ্রীকমল বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীসুধীর দাস শ্ৰীবসন্তকুমার গুপ্ত হরিপদ দাস শ্ৰজিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী যতীন্দ্রনাথ মিত্র
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.