Bally Sadharan Granthagar
Srimati Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ตู)
No text on this page.
नी ना भ जप मा व
लाल
नि गन के पक्ष म ।। कन
२०
প্রথম সংস্কৰণ
শ্রাবণ ১৩৫৩
প্রকাশক
দিলীপকুমাব গুপ্ত
সিগনেট প্রেস
১০।২ এলগিন বােড়
কলকাতা ২০
প্রচ্ছদপট
সত্যজিৎ রায়
মক
প্রভাতচন্দ্র বা
শ্রীগৌবাঙ্গ প্রেস
৫ চিন্তামণি দাস লেন
প্রচ্ছদপট মদ্রক
গসেন এন্ড কোম্পানি
৭।১ গ্রান্ট লেন
বাঁধিযেছেন
বাসন্তী বাইন্ডিং ওযাকস
৬১।১ মির্জাপব স্ট্রিট
সর্বস্বত্ব সংবক্ষিত
দাম দুটাকা চারআনা
No text on this page.
No text on this page.
সাধারণ ও স্বাভাবিক কোনাে মানুষের মারা যেতে যতটা সময় নেওয়া উচিত, সকলেরই মনে হচ্ছিল, রমেশকাকা তার চেয়ে অনেকখানি বেশি নিয়ে ফেলছেন। মনে-মনে সকলেরই ধৈর্যচ্যুতি হচ্ছিল। সুদীর্ঘ জীবনের নানান অবিবেচনার মতাে এও যে শেষ একটি পরম অবিবেচনার কাজ সেবিষয়ে কারাে মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। এলামাসি বেলামাসিদের নতুন হলদে চামড়ার সুটকেশে গরম কাপড়- চোপড়গুলাে ইতিমধ্যেই গােছানাে শেষ, দার্জিলিঙের হােটেলে আগামী পনেরাে তারিখ থেকে ঘর বুক করাও হয়ে গেছে। এখন রমেশকাকা কি করেন কে জানে। অথচ অত বড় একটা ধনী লােক; বিদ্যায়, সম্মানে, নামডাকে কোনাে অংশে কম না; তাঁর ভাইঝি হয়ে জন্মগ্রহণ করাও যে একটা সৌভাগ্য ও সুবিধা, একথাও অগ্রাহ্য করার নয়। লকেট, বকেট, অতুল, পুতুল, সকলেই নিশ্বাস রােধ করে প্রতীক্ষা করে আছে কখন যবনিকা পড়বে। গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস, কলেজের পড়া বােধ হচ্ছিল সবই অকিঞ্চিৎকর। ঐ সব তুচ্ছ জিনিসের চাইতে অনেক গুরুতর মনে হচ্ছিল রমেশকাকার জীবন-নাট্যের এই পরিসমাপ্তি। পরিবারের মামা, দাদা, মেশােমশাইরা বারংবার দরজার কাছে মুখ বিষয় করে অস্থিরভাবে আনাগােনা করছিলেন। কিন্তু চিরদিনের অভ্যাস মতাে সকলের সুখ-সুবিধাকে অবহেলা করতে রমেশকাকা যেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এমতীর সারা দেহমন অসীম ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল। দীর্ঘ পল্লবিত চোখ দুটিকে রমেশকাকার পাণ্ডুর মুখের উপর স্থির রেখে একভাবে সে আইসব্যাগটাকে ধরে বসে আছে। চোখের কোণে-কোণে অবসাদের ঘন ছায়া, ঘনকুঞ্চিত চুলের রাশি অযত্নে পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে, শ্যামল প্রশান্ত ললাটে বিরক্তির ছায়ামাত্র নেই। তবু সে বড় ক্লান্ত। রমেশকাকার নিক্রমণের সঙ্গে-সঙ্গে তার জীবনেরও প্রাচীন ও সদঢ় ভিত্তি যে স্খলিত হয়ে পড়বে একথা ভাবারও তার অবসর হয়নি। পাঁচদিন গত হয়েছে। এখন সন্ধ্যা। বাইরে অকাল বরিষণের ঘনঘটা। রমেশকাকা চোখ মেললেন, কাকে যেন খুজছেন। পাশের ঘরে পিয়ানাের ধারে বসে এলামাসি বেলামাসিরা তখন আসন্ন দার্জিলিঙ যাত্রার কথা আলােচনা করছিলেন। কোনাে কালে মিলির আক্কেল হবে না। দার্জিলিঙে গিয়ে হােটেলে থাকা সেকি সােজা কথা! সঙ্গে যাব বললেই যাওয়া গেল আর কি! ওর মেয়েদের কথা ভাবলে অবশ্য মেয়েদের মন ভারি না হয়ে পারে না। কিন্তু অমন নির্লজ্জভাবে পেড়া- পেড়ি করলে রঢ় উত্তর না দিয়েও তাে উপায় নেই! পাশের ঘরে আবার রমেশকাকার এই অবস্থা। অতি কষ্টে ধৈর্য ধরে এলামাসি বেলামাসি তাড়াতাড়ি এঘরে এলেন। মিলিও উঠে এসে দরজার কাছে অপ্রসন্ন মুখে দাঁড়াল। রমেশকাকার জীবনযাত্রা সব সময় সুনীতিসম্মত না হলেও তাঁর উইলখানা অকিঞ্চিতকর নয়। শেষ হয়ে আসছিল। শ্রীমতীর শান্ত মুখচ্ছবি দৃষ্টিপথে ধরা পড়তেই রমেশকাকার দুই চোখ শেষবারের মতাে কোমল হয়ে এল, সুস্পষ্ট দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, “শ্রীমতী, নিজেকে কখনাে ফাঁকি দিস না।” তারপর একটি দীর্ঘনিশ্বাসের সঙ্গে রমেশকাকার জীবনে যবনিকা নেমে এল। আত্মীয়স্বজনেরা যাঁরাঁর কর্তব্যপালনে তৎপর হয়ে উঠলেন তক্ষনি। প্রয়ােজনীয় যা-কিছু ব্যবস্থা, সব হয়ে গেল; শােকের উচ্ছাসে আর পরলোকগতের প্রশংসায় বাড়ি মুখর হয়ে উঠল।
এতদিনে নিশ্চিন্ত হলেন এলামাসি বেলামাসি। তাহলে আর দিন বাররা! শ্রাদ্ধশান্তি হয়ে গেলে, উইল পড়া হয়ে গেলে, চেঞ্জে যাবার আর কোনাে বিঘা থাকবে না। এখন মিলির একট, সবদ্ধি হলেই হয়। দাদাকে যখন বিয়ে করেছিল তখনই মিলির ভাবা উচিত ছিল সব কথা। যথেষ্ট বয়সও হয়েছিল তখন, জানা উচিত ছিল সকলের অবস্থা সমান হয় না। সারা জীবনটা ঐ একভাবে কাটিয়ে দিল মেয়েটা কি পেলাম না, কে আদর করল না, কোথায় আমায় ডাকল —এই করে-করে। এককালে তাে কনভেন্টেও পড়েছে, তব, কি জানে যে অসন্তুষ্ট মানুষ সুখী হয় না কখনাে? এমন কত কথা এলামাসি বেলামাসির মনে এসে জমা হতে থাকে। কিন্তু মিলির কোনাে সদ্ধিই যদি না-থাকে, ওকে কে বােঝাবে? একমাত্র উপায় এ-ক’দিন শােকে মুহ্যমানা থেকে, শ্রাদ্ধের পর রাত্রিবেলা মিলির অগােচরে সরে পড়া। হল এণ্ডাসন থেকে এরই মধ্যে আবার গরম গেঞ্জিগুলি কিনে আনতে হবে। কি সুন্দর গেঞ্জিগুলি, হাতে গলায় সর, একট, লেসের মধ্যে দিয়ে শাদা রিবন চালানাে। সদশ্য, অথচ আধাবয়সী মহিলাদের ঠিক উপযােগী। ছােটখাটো নানান দুশ্চিন্তা টেনে এনে প্রধান দুশ্চিন্তাটাকে সবাই আড়াল করতে চেষ্টা করলেও, প্রতি পলে, প্রতি পদে তা এসে প্রত্যেকের মনের শান্তি নষ্ট করে দিচ্ছে শ্ৰীমতীর কি হবে? মরণ- কালে আত্মীয়স্বজনের দিকে দকপাত না-করে শ্রীমতীকে শেষ ক'টি অর্থহীন কথা বলে রমেশকাকা তাে প্রাণত্যাগ করলেন। এখন রমেশ- কাকার ছায়াচ্যুত শ্ৰীমতীর কি ব্যবস্থা হবে? যদি তিনি কর্তব্যজ্ঞান রহিত হয়ে, আত্মীয়স্বজনকে লন করে, উইলে শ্রীমতীকেই-না, না, সে হতে পারে না। দীর্ঘজীবনে রমেশকাকা বহুবার সন্ধি হারিয়েছেন, যেমন শ্রীমতী প্রসঙ্গে, প্রায় কুড়ি বছর আগে। কিন্তু কদাচ কর্তব্যজ্ঞান হারাননি। আত্মীয়স্বজন ভগবানের দান। শ্ৰীমতীর মতাে যারা পথিবীর উপসর্গ, তাদের সঙ্গে তুলনাই হয় না। শ্ৰীমতীর খোঁজে এলামাসি বেলামাসি রান্নাঘরের দিকে চললেন। সিক্ত চুল আলগােছে বাঁধা, পরনে কালােপেড়ে তাঁতের শাড়ি, শ্যামল শীতে ভাঁড়ারঘর পরিপূর্ণ করে শ্রীমতী রাশিরাশি তরকারি কুটছিল। “শাদাসিধে রান্না দিচ্ছিস তাে শ্ৰীমতী? সবারই কিন্তু নিরামিষ। ঠাকুরচাকর কেউ এ-ক’দিন মাছ-টাছ খাবে না। মনিবের প্রতি একটা শেষ কর্তব্য তাদেরও আছে, এটুকু তাদের শিখতে হবে। তুই এদিকে একটু নজর রাখিস কিন্তু।” সিদ্ধকণ্ঠে সবুজ বনানীর অন্তরালে মর্মানির মতাে, শ্ৰীমতী বলল, “সকলের জন্যই নিরামিষ দিয়েছি, মাসিমা।” এলামাসি বেলামাসি আসল কথাটা আর পাড়তে পারেন না। ছােট- খাটো অনেক প্রসঙ্গ তুলতে হয়। এলামাসিই শেষে বলেন, “আর দুদিন পরে আমরা তাে যে যার নিজের সংসারে চলে যাব। তুই কি করবি, কিছু ভেবেছিস শ্ৰীমতী?” শ্ৰীমতী নীরব। “তুই তাে জানিস, রমেশকাকার সঙ্গে আসলে তাের কোনাে সম্পর্ক নেই। তােকে তিনি মানুষ করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বি.এ. পাশ করেছিস, গান-বাজনা শিখেছিস, কাজকর্ম জানিস; যা-কিছু করা যায় সবই তিনি করেছেন, যদিও তাঁর কোনাে বাধ্যবাধকতা ছিল না। আর তুই কি আশা করিস তাঁর কাছে ?” প্রশান্ত দুটি চোখ তুলে শ্ৰীমতী স্নিগ্ধকণ্ঠে বলল, “আর কি আশা করব, মাসিমা ? তিনি তাে দেওয়া-নেওয়ার বাইরে চলে গেছেন, আর কি আমি আশা করব ? টাকা-পয়সা? আমার নিজের দায়টুকু বইবার সামর্থ্য আমাকে তিনি দিয়ে গেছেন।” ৪ বেলামাসি উদগ্রীব হয়ে বলেন, “কি দিয়েছেন তােকে? ছেলেপুলে নেই, তাই কাকিমার গয়নাগুলাে সব তােকেই দিয়েছেন বুঝি? সে তাে ঢের টাকার হবে!” শ্ৰীমতীর ঠোঁটের কোণে মদ, একটুখানি হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। “না, মাসিমা। আপনাদের তিনি কোনােভাবে বঞ্চিত করেননি। আমাকে স্বাবলম্বী হতে বলে গেছেন। বলে গেছেন জীবনে কখনাে কারাে কাছে যেন হাত না পাতি।” এলামাসি বেলামাসিরা উঠে পড়েন, অপ্রসন্ন গলায় বলেন, “তাের ছেলেবেলায় তিনি যদি বলতেন একথা তবে তাের কি গতি হত বলতাে? এত যে গর্ব করছিস ?” শ্ৰীমতীর মনের ভাব যে-কোনাে আশ্রিতের পক্ষে অযােগ্য এবিষয়ে কারাে মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না। দুদিন ইস্কুলমাস্টারি করলেই রমেশকাকার পয়সায় কেনা ঐসব মিহি তাঁতের কাপড়ে সেজেগুজে গলাবাজি করা ঘুচে যাবে, দেখে নিও। সকলের মনেই কিঞ্চিৎ বিশখলা দেখা দেয়। কথাবার্তা অসতর্ক হয়ে পড়ে। সবাই অসহিষ্ণভাবে এই এগারােটা দিন কবে শেষ হবে তার প্রতীক্ষা করেন। বিকেলের দিকে আবার শ্রীমতীর খোঁজ পড়ে। লকেট বকেট ভাঁড়ার- ঘর থেকে ডেকে নিয়ে আসে তাকে। “মা ডাকছেন শ্ৰীমতীদি। আর ক'দিন নিরামিষ খাওয়াবে? প্রাণ যে হাঁপিয়ে উঠল।” শ্ৰীমতী লকেটের চেয়ে কয়েক মাসের বড়, কিন্তু ‘দিদি' শব্দের ব্যবধান অলঘেয়। সেই অর্থে লকেট এখনাে নাবালিকা। খাটো-খাটো কোঁকড়া চুল দুলিয়ে, শ্রীমতীর গলা জড়িয়ে ধরে, কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “কেন ডেকেছেন জানাে? শুভেন্দ, আসছে আজ রাত্রিতে, তার সব ব্যবস্থা করতে হবে, ঘর ঠিক করে রাখতে হবে, খাবার আয়ােজন করতে হবে। তােমার গা শিরশির করছে না, ভাই?”
শ্ৰীমতী হেসে বললে, “গা শিরশির করবে কেন বল তাে?”
“শুভেন্দকে তুমি দেখনি তাহলে। সাক্ষাৎ একটি রাজপুত্র! মা-মাসিমা
দুজনে ওর সঙ্গে সমান প্রেমে পড়েছেন বলে মনে হয়। সত্যি
শুভেন্দকে চেনাে না তুমি?”
“নাম শুনেছি। দাদাবাবুর বন্ধুর ছেলে না?”
“আরে হ্যাঁ। রমেশদাদুর বন্ধুর ছেলে, তার উপরে ব্যারিস্টার। কাল
যে দাদুর উইল পড়া হবে! শুভেন্দ, আসছে শুনে পুতুল কি কাণ্ড
করছে জানাে না?”
লকেট সবিস্তারে সেই কাহিনী বলতে বসল।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা শুভেন্দ, পৌছল এসে। এলামাসি বেলামাসির পক্ষপটে আচ্ছন্ন হবার আগে শ্রীমতী তার নবদূর্বাদল শ্যামশােভন রপখানা একবার দুর থেকে দেখবার সুযোেগ পেয়েছিল। কিন্তু সংসারের আবর্তে তখনই তাকে আবার ডুবে যেতে হল। শুনেছিল পরদিন প্রাতঃকালে রমেশকাকার পুরােনাে লাইব্রেরিতে শুভেন্দ, খসখসে পর, কাগজে লেখা উইলখানির রহস্য উদ্মাটন করবে। কিছুমাত্র ব্যাকুল হবার সুযোেগ ছিল না শ্রীমতীর। এ-বাড়িতে ভাের হতেই কাজের চাকা ঘুরতে আরম্ভ করে, শ্রীমতী তাতে তেল যােগায়। এলামাসি ব্যস্তভাবে এসে বলেন, “ওরে শ্রীমতী, ছােড়দাদুর কাণ্ডখানা দেখ দিকিনি। বলা নেই, কওয়া নেই, হট করে এসে উপস্থিত। সারা জীবনটা কেবল তাে আমােদ করে কাটালেন। জানিস তাে, ওর ছেলেমেয়েগুলােকে পর্যন্ত মানুষ করলেন একরকম রমেশকাকাই। কোনদিন একটা কুটো ভাঙলেন না, খেলাধুলাে, সিনেমা থিয়েটার, গানের মজলিস আর তাশের আড্ডা করে-করে জীবনটাই কাটিয়ে দিলেন। এখন উইলের নাম শুনেছেন, অমনি দিব্যি এসে উপস্থিত। কোনাে- দিনও একটা দায়িত্ব ঘাড়ে নিলেন না, যত ভাবনা-চিন্তা সব এর-ওর ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে মাঝখান থেকে সরে পড়লেন; আর এখন বলেন কিনা রমেশকাকার সম্পত্তিতে ওঁরই দাবি সব থেকে বেশি, কেন না উনি হলেন সব থেকে নিকট আত্মীয়। কি করা যায় এখন বল তাে?”
শ্ৰীমতী বললে, “ছােড়দাদু, কোথায়? চা-টা খেয়েছেন?” হস্তপদে বেলামাসিও ভিজে চুল হাতে জড়াতে-জড়াতে এসে জল চৌকিতে বসে পড়েন। “শনলি তাে শ্ৰীমতী! লােকটা চিরকেলে বদমায়েস। কী না করেছে, কী না খেয়েছে। তাই নিয়ে লজ্জিত হওয়া দূরে থাক, আবার গর্ব করে বেড়ায়। আমাদের কে বলে কিনা হামবাগ! আমাকে বলে কিনা অত পতিসেবা না করে যদি হতভাগার ইয়েতে দুটো লাথি কষিয়ে দিতাম নিজের এবং জগতের উপকার হত! উঃ! ওর সঙ্গে একঘরে বসাও একরকম অসম্ভব! আর সেই ভাের থেকে একটা শাদা জুতােয় পা গলিয়ে লাইব্রেরিতে ইজিচেয়ারে শুয়ে দিব্যি আরামে একটার পর একটা সিগারেট পােড়াচ্ছে। আর গুনগুন করে কি সব থিয়েটারি গান গাইছে।” শ্ৰীমতী আবার জিগগেস করল, “এক পেয়ালা চা দেওয়া হয়েছে তাে?” এমন সময় লকেট খবর নিয়ে এল, “মা, শুভেন্দ, কিন্তু সবাইকে লাইব্রেরিতে ডাকছে।” এলামাসি বেলামাসি শ্ৰীমতীর প্রশ্নের কোনাে উত্তর না-দিয়েই প্রস্থান করলেন। নিজের ছােট পুবমুখী ঘরখানিতে গিয়ে মাটিতে আসন পিড়ি হয়ে বহুদিন পরে শ্রীমতী তার জিনিসপত্র গুছােতে বসল। এ-বাড়িতে তার পুরােনাে স্থানটি খলিত হয়েছে। কত বছরের স্মৃতি এই ঘরটিতে পুঞ্জীভূত। ঘরের কোমল সবুজ দেয়ালগুলিও যেন কানে- কানে বলে, “একটুও কাঁদলে না, শ্ৰীমতী! ছি! কি কঠিন তুমি! তােমার পাট যে এবার উঠল। একটুও ভাবনা হচ্ছে না, শ্ৰীমতী?” কতকালের পরােনাে স্টিল ট্রাঙ্কটার ডালা খুলে তার উপর সে বুকে পড়ে। এই ট্রাঙ্ক তার মায়ের ছিল। ভিতরকার জিনিস সব রমেশের ৮ দান। বছরে-বছরে অযাচিতভাবে দুই হাত পণ করে কত দিয়েছেন। সে সব শুধুই কি জিনিস? তারপর চোখের সামনে দেখল ধীরে-ধীরে বন্ধ হয়ে গেল নিশ্বাস, প্রাণস্পন্দন থেমে গেল। নিজের হাতে ফুল দিয়ে সে খাট সাজিয়ে দিয়েছে। দাহ করে যারা ফিরে এল তাদের স্নানের জল আর গেলাশ ভরে সরবত তৈরি করে দিয়েছে, তব, কেন বুকের ভিতরটা একবার তার হাহাকার করে ওঠে না। কেন মনে হয় —আমার সব গেছে, বিশ্বব্রহণ্ডে আমার আর নিজের বলতে কেউ নেই। তব, কেন রমেশ চৌধুরীর স্নেহ দিয়ে কানায় কানায় মন ভরা থাকে? বিষমুখে মিলি এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। “আসন মামিমা, এইখানে বসুন।” মুখখানা হাঁড়ি করে মিলি বলে, “তুই এতও পারিস শ্ৰীমতী। ওরা নিচের ঘরে বসে তাের-আমার সর্বনাশ করছে তা জানিস? এলাদি বেলাদি কে কবে রমেশকাকার জন্য কি করলেন শুনি? এখন একবার ভাবখানা দেখ, ওঁদেরই যেন জমিদারি। বেশ হয়েছে ছােড়দাদ, এসে। বলছেন—তােরা হলি রমেশের ভাইঝি, আমি সাক্ষাৎ খুড়ে। দেখিস , ততাদের কিছু দিয়ে যায়নি, সব আমার নামে লিখে গেছে। সে কি আর জানে না আমার কত খরচ! জানিস শ্ৰীমতী, ছােড়দাদুর সটকেশ খুলে লকেট-বকেরা দেখেছে একটা হইস্কির বােতল ছাড়া ওতে কিছু নেই। এলাদি বেলাদি তাে রেগে টং। আমাকে লাইব্রেরিতেই ঢুকতে দিল না ওরা। এলাদি বললেন, তােমার গুণধর স্বামীটি তাে উপস্থিতই আছে, তােমার আবার নাক ঢােকাবার দরকার কি? এমন কথা কোথাও শুনেছিস? আসলে রমেশকাকা ওঁকেই বেশি ভালাে- বাসতেন বলে ওদের সব হিংসে। কত কাপড় তাের রে শ্রীমতী, কতদিন ধরে না-জানি জমিয়েছিস।” ভরা মনে শ্রীমতী বলে, “বছরে-বছরে নববর্ষে, পুজোর সময়, বড়দিনে, নিউ-ইয়ারে, সরস্বতীপুজোয়, দোলে, যখন-তখন নানা ছতাে করে এসব আমায় দিয়েছেন। কতবার বলেছি আমার অত কিছু দরকার নেই দাদাবাব, অত দেবেন না আমাকে। হেসে বলেছেন, জানিস না, দরকারির চেয়ে অদরকারির দাম ঢের বেশি। মিলি বলে, “ট্রাঙ্কটা বড় সেকেলে, তাের মা'র বুঝি ? মা-কে তাের নিশ্চয় মনে নেই, কতটুকু বা ছিলি তখন। আমার কিন্তু পদ্মদিদিকে বেশ মনে আছে। কী রুপ ছিল তার। হাঁটু অবধি কালাে কোঁকড়া চুল, পদ্মফলের মতাে গায়ের রঙ, তুই তার কিছুই পাসনি, শ্ৰীমতী। চোখ দুটি ছিল সত্যি কান পর্যন্ত টানা, কাজল দিয়ে তার উপরে খানিকটা আবার টেনেও রাখত পদ্মদিদি। কপালে লম্বা করে একটা কাজলের টিপ পরত। জিগগেস করলে বলত, নইলে যে রুপ দেখে লােকে নজর দেবে। “মনে আছে পুজোর সময় একবার আমরা সব এই বাড়িতে জড়াে হয়েছি, সবে আমার বিয়ে হয়েছে তখন। বিজয়ার দিন সকালে একটা ঠিকে গাড়ির মাথায় এই ট্রাঙ্কটা চাপিয়ে, তােকে কোলে করে পদ্মা- দিদি এসে উপস্থিত থান পরা, দােনা হাত খালি, দেখে আমরা তাে অবাক! শুনলাম স্বামী মারা গেছে, শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে চলে এসেছে। আক্কেল দেখে সবার চক্ষ স্থির! তিনকলে যার কেউ নেই, কি বলে সে চলে এল ? এবাড়ির সঙ্গে তার কি সত্যি আবার কোনাে সম্পর্ক ছিল নাকি। রমেশকাকার স্ত্রীর কোন এক দর-সম্পকীয় বােনের তাে মেয়ে। তা হলে কি হয়, এক ডালা রুপ নিয়ে—তুই তখন কোলে এসে উঠলেন। কতই বা বয়স তখন, বড় জোর পচিশ। কত লােকে কত কথা বললে তা নিয়ে। কিন্তু রমেশ কাকা তাে কখনাে কাউকে কেয়ার করতেন না, বললেন আমার কাছে যখন আশ্রয় নিয়েছে, ও এখানেই থাকবে। তা ছাড়া, দিস ইজ নান, অফ ইয়াের ডার্ন বিজনেস?” ১০ হাত থেকে কখন রেশমী কাপড়খানা খসে পড়ে গেছে। মদ্ধকণ্ঠে শ্রীমতী বললে, “তারপর কি হয়েছিল, মামিমা ? দাদাবাব, আমার সঙ্গে সব বিষয়ে খােলাখুলি আলােচনা করতেন, কিন্তু মা'র নাম করলেই গম্ভীর হয়ে যেতেন।” “সে এক কাণ্ডরে শ্রীমতী! রমেশকাকা তাের জন্য রেখে দিলেন বাঙালী ঝি, আর পদ্মদিদিকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য এক মেম টিচার। সে কি আর পদ্মদিদির ধাতে সয়। মাত্র এক বছর সে ছিল এ-বাড়িতে, সেই এক বছরেই রমেশকাকাকে জালিয়ে পুড়িয়ে অর্ধেক চুল পাকিয়ে দিয়েছিল। তারপর হঠাৎ পালিয়ে গেল। শুনেছি অ্যাকট্রেস বলে বেশ নাম করেছিল, নাম বদলে এখনাে সিনেমা অ্যাকটিং করে, মা-মাসির পাট নেয়। দেখতেও ছিল খাসা, গলাও ছিল চমৎকার। ও কি তাের মখ অমন শাদা হয়ে গেল যে? তুই জানতিস না তাের মা বেচে আছে?” ২(৬৩) ১১
No text on this page.
লাইব্রেরিতে একটা পিন পড়লে শােনা যায়। দেয়ালভরা বইয়ের রাশি। সারা জীবন ধরে বেছে-বেছে রমেশকাকা এগুলি সঞ্চয় করেছেন। মেঝেতে ছাই রঙের গালচে পাতা। খাশ পাশিয়া থেকে আনিয়েছিলেন। চামড়াবাঁধানাে আরামকেদারা, রমেশ- কাকার কত শখের জিনিস। কোথাও একট, অলঙ্কারের বাহুল্য নেই, মর্মরের নারীমতি নেই। খােলা জানলা দিয়ে প্রভাতকালের রােদ এসে ঘরটিকে ভরে দিয়েছে, কিন্তু প্রাণে কোনাে সাড়া জাগাতে পারছে । দেয়ালের সারি-সারি বই নির্বাক নিষ্পন্দ। উপস্থিত মানুষ ক’টির হদয়ে শান্তি নেই, রক্তস্রোতে স্বাচ্ছন্দ্য নেই। এলামাসি বেলামাসি রমেশকাকার পুরোেনাে মেহগনির লিখবার টেবিল ঘেষে পাশাপাশি দুখানি কাঠের চেয়ারে সােজা হয়ে বসেছেন। অন্তরে ঝড় বইলেও শৈশবের শিক্ষা ভুলে যাওয়া তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। ঈষৎ প্রসন্নতাও ফুটে উঠেছে তাঁদের মুখে, কারণ মিলিকে আজ তাঁরা উইল শােনা থেকে বঞ্চিত করতে সফল হয়েছেন। তবে মিলির স্বামী, এলামাসি বেলামাসির দাদা, তাঁর ক্লিষ্ট অসন্তুষ্ট সৌন্দর্য নিয়ে রমেশকাকার প্রিয় আরামকেদারায় শােভা পাচ্ছেন। তাঁর পাশে রমেশকাকার অশান্তিকর কাকা হাতের সিগারেট পাশের ট্রেতে নামিয়ে রেখে গভীর চিন্তায় মগ্ন। বেলামাসি রুষ্টচিত্তে দেখলেন টালিগঞ্জের আত্মীয়স্বজনরা যাঁরা জীবন- কালে কোনােদিনও রমেশকাকার সঙ্গে কোনাে সম্বন্ধ রক্ষা করেননি, কাকপক্ষীর মুখে খবর পেয়ে আজ এসে উপস্থিত। বেলামাসি মনে-মনে হাসলেন। টাকার কি গুণ! শুভেন্দ, এসে লিখবার টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার হাতে রমেশ- কাকার পুরােনাে উইলখানা। কুড়ি বছর আগে রমেশকাকা এই উইল করিয়েছিলেন, তারপর কোনােদিনও পরিবর্তনের কারণ খুঁজে পাননি। 'শুভেন্দ, উইল পড়ল না। সংক্ষেপে বলল, “জ্যাঠামশাই তাঁর প্রত্যেকটি সাবালক আত্মীয়কে পাঁচশাে টাকা করে আশীর্বাদী দিয়েছেন। আর এ-বাড়িখানা এবং বাকি সম্পত্তি দিয়ে গেছেন রামকৃষ্ণ-মিশনকে। এই নিন উইল, আত্মীয় বলতে যাঁদের বােঝাবে উইলেই তাঁদের নাম লেখা আছে। আর বলতে ভুলেই যাচ্ছিলাম, এই লাইব্রেরির সমস্ত বই তাঁর স্নেহের পাত্রী শ্রীমতীকে তিনি দিয়ে গেছেন।” শনে কারাে মুখে কথা সরে না। সমস্ত সম্পত্তি শেষে রামকৃষ্ণ- মিশনকে! তাঁরা ভালাে লােক হতে পারেন কিন্তু কাকিমার গয়নাগাঁটি, এই সব দামী-দামী আসবাব, গালচে, বাতি, এসব নিয়ে সাধসজ্জনদের কোন কাজে লাগবে? জলের দরে বিকিয়ে দেবেন যে! রমেশকাকাকে এমন পরামর্শ কে দিল? নীরবতা ভঙ্গ করে অবশেষে মিলির স্বামী অমরেশ কাষ্ঠ হেসে বললেন, “আমারই তা হলে জিত। গত বছর রমেশকাকা আমার বাইশ হাজার টাকার ধার শােধ করে দিয়েছিলেন। বিস্তর কটকথা বলতেও ছাড়েননি! তব, আমারই জয় হল শেষ পর্যন্ত! যাই মিলিকে সুখবরটা দিয়ে আসি। কেউ কিছু না-পেয়ে তােমাদের সব হদয় ভেঙে গেছে শুনে নিশ্চয় সে মনে শান্তি পাবে।” অমবেশ উঠে পড়েন। এলামাসি বেলামাসি ঝড়ের মতাে মুখ করে শ্রীমতীর সন্ধানে চললেন। টালিগঞ্জের আত্মীয়দের দিকে তাকিয়ে শুভেন্দ, জিগগেসু করল, ১৪ “শ্রীমতী মেয়েটি কেমন বলুন তাে? এই আলাদীনের ধনবইয়ের রাশি নিয়ে সে করবে কি?” “কে জানে মশাই! আমি হলে তাে বেচে দিতাম। পাঁচ-সাতশাে তাে নিশ্চয় উঠত, বিমর্ষ-মুখে টালিগঞ্জ উত্তর দিলেন। টালিগঞ্জের গহিনী বললেন, “শ্রীমতী খাসা মেয়ে! রমেশমামার কি যত্নটাই না করেছে। ঐসব এলা-বেলরা দেখতেই ঐ, আসল কাজে ফাক্কা! আমি শ্ৰীমতীকে বলে দেব কয়েকটা শিশি-বােতলওয়ালা ডেকে পাঁচআনা সের দরে সব বই বেচে দিতে। পাঁচ-সাতশাে, কি গাে! পাঁচ- সাত হাজার উঠে যাবে।” শুভেন্দ, হতাশ হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার শ্যামল রুপকে একট, প্লন দেখায়। কোথায় গেলেন জ্যাঠামশায়! সম্পত্তি বিলিয়ে দিলেন; লাইব্রেরির বইগুলি পর্যন্ত দান করে দিলেন। জীবন কাটালেন পড়াশুনাে নিয়ে, অথচ একটা বই লিখে গেলেন না যাতে অমন অগাধ পাণ্ডিত্যের একট- খানি অংশও লিপিবদ্ধ হয়ে অমরত্ব লাভ করবে! দেহের সঙ্গেই যে- বৈদগ্ধ্যের অবসান কে জানে তার কোনাে মল্য আছে কিনা! শুভেন্দ, সংকল্প করল শ্ৰীমতী মেয়েটিকে জানতে হবে। ওদিকে দোতলায় কোণের ঘােট ঘরে এলামাসি বেলামাসি ঝড়ের মতাে প্রবেশ করে স্তম্ভিত। “কি হয়েছে শ্রীমতী? মিলি, তুমি নিশ্চয় কিছু, বলেছ ওকে! এখন আমাদের মন ভালাে না, তুমি বাছা আর গােলমাল পাকিও না বলছি!” মিলি অপ্রসন্নকণ্ঠে বলে, “কী তােমাদের কথা! আমি আবার কবে কিসের গােলমাল পাকালাম! কথায়-কথায় ওর মা'র কথা উঠল, তাই। বিশেষ কিছ, এমন বলিনি, সবাই তাে সে-কথা জানে বলেই জানতাম, কিন্তু ” . বেলামাসি অসহিষ্ণভাবে বাধা দেন। “তুমি থাম তাে মিলি! শ্রীমতী, ১৫ তুই নিশ্চয় উইলের কথা জানতিস, জেনেও এতদিন গােপন করেছিস!” এতক্ষণে শ্ৰীমতীর কণ্ঠে ভাষা ফিরে এল। ক্লান্ত গলায় বলল, “আমি শুধু জানতাম দাদাবাব, আমাকে কিছু দিয়ে যাবেন না। আর কিছু কখনাে জিগগেস করিনি।” “রমেশকাকা তাঁর বিষয় সম্পত্তি সমস্ত রামকৃষ্ণ-মিশনকে দিয়ে গেছেন, তুই সত্যি জানতিস না? কুড়ি বছর ধরে তাঁর ছায়ায়-ছায়ায় বাস করেছিস, তাঁর এই মনের কথাটা তুই জেনে নিসনি বলতে চাস? তবে তা হতেও পারে! জানলে কি আর দিনরাত অমন সেবা করতে পারতিস?” খুশি হওয়ার চেষ্টা করে বেলামাসি সহসা বললেন, “রসবােধ আছে বেশ! আমাদের প্রত্যেককে পাঁচশাে টাকা করে দিয়ে গেছেন! তােকে দেননি। তােকে দিয়ে গেছেন লাইব্রেরির ঐ বইগুলাে। বেচে কিছুদিন খেতে পারবি?” বিস্ময়ে দুই চোখ বড় করে শ্রীমতী বললে, “সমস্ত বই! আমাকে দিয়ে গেছেন দাদাবাব ?” এতক্ষণে তার দুই গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। চোখের জল মুছবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না-করে একষ্টে তাকিয়ে রইল সে। অধরপ্রান্ত কোমল হয়ে এল। “আমি বই ভালােবাসি, তাই দাদাবাব, আমাকেই সব বই দিয়ে গেছেন।” তার মনে হতে লাগল একটু আগে বুকের মধ্যে যে-হাহাকার করে উঠেছিল, যে-অপার শুন্যতায় ভরে গিয়েছিল মন, সে-সবই অকিঞ্চিত- কর। দাদাবাবর এমন স্নেহ যে লাভ করেছে হদয়ে তার কোথাও এতটকু ফাঁকা নেই। এলামাসি বললেন, “বই দিয়ে করবি কি? কে কিনবে বই? তাও যদি গল্পের বই হত!” মুম্বকণ্ঠে শ্রীমতী লল, “সারা জীবন ধরে পড়ব, বিক্রি করা কেন? ও কি বেচবার জিনিস।” । ১৬ “রাখবি কোথায়? বাড়ি তাে রামকৃষ্ণ-মিশনের! বাড়ি, বাগান, ফার্নিচার, যা আছে সব স্বামীজীরা নিয়ে নেবেন। তাের বই রাখবি কোথায় শনি?” খােলা দরজার বাইরে থেকে শুভেন্দ, বলল, “যদি ঠাঁই না জোটে, আমার বাড়ি রয়েছে, সেখানে রাখা যায়। কিন্তু শ্ৰীমতী দেবী নিজে কোথায় যাবেন, কি করবেন, ভেবেছেন কিছু?” শ্রীমতী উঠে, চোখ মুছে শুভেন্দুকে বসবার আসন দিল। কাছে থেকে দেখল তার নবদূর্বাদল শ্যাম শােভন মূর্তিখানি। তার মেঘমন্দ্রঘরে কোমলতার আভাস শুনতে পেল। শুভেন্দও.কাছে থেকে দেখল শ্রীমতীকে। এই সেই মেয়ে যার জন্য রমেশ-জ্যাঠামশাইকে কত নিন্দা সইতে হয়েছে। জ্যাঠামশাইয়ের নিজ হাতে গড়া এই সেই শ্রীমতী যার ব্যবহার আশ্রিতের মতাে নয়। কিন্তু ঐ গ্রীবাভঙ্গিটুকু? না, তার সবটা তাে জ্যাঠামশাইয়ের হাতে গড়া নয়। খানিকটা সে সঙ্গে এনেছিল। এ যে মাতৃগর্ভ থেকে আনা। রক্তস্রোতে গােপনে বয়ে আসা। আবার মক্ত ললাটের নিচে কালাে দুই চোখে ও কিসের দীপ্তি? না, ওর সেই সুশ্রী দুর্বল মায়েরও সাধ্য ছিল না একে তৈরি করা। ও নিজেই বিকশিত হয়েছে। শুভেন্দ, আবার সেই প্রশ্ন করল, “আপনি এখন কি করবেন স্থির করেছেন?” শ্রীমতী সহজভাবে বলল, “কেন, কাজ করব।” শুভেন্দর প্রশ্ন তব, শেষ হয় না : কি কাজ, কোথায় কাজ, শিখেছে শ্ৰীমতী? হাজার-হাজার মেয়ে বি. এ. পাশ করে। তারা কোথায় কাজ পায় ? এলামাসি-বেলামাসির এতটা ভালাে লাগে না। চমৎকার ছেলে শুভেন্দু, কি সুন্দর দায়িত্বজ্ঞান! কিন্তু শ্রীমতীর জন্য ওর, আবার অত কিসের ভাবনা? আমরা সবাই কি মরে গেছি? তবু, বড় ভালাে ছেলেটি, ১৭ কি কাজ লকেট যদি—পুতুল যদিনা! হবার থাকলে হবেই, চেষ্টারও এটি থাকবে না। বেলামাসি কথা পাড়লেন, “কিছু, যদি মনে করিস শ্ৰীমতী, তাে একটা কথা বলি।” “কি কথা মাসিমা, কিছু মনে করব কেন?” “দ্যাখ, আমার ননদ চারশীলাদিকে “জানিস? ঐ যে দার্জিলিঙে থাকেন, প্লেন্স-এ এলেই মাথা কেমন করে। তুইতাে চিনিস ওঁকে। চারশীলাদি একটি সঙ্গিনী খুঁজছেন। নিজের মেয়ের মতাে কাছে- কাছে থাকবে, দেখা-শােনা যত্ন-উত্ন করবে। বই-টই পড়ে শােনাবে, সেবা- টেবা করবে। তুই খুব পারবি। দেখেছি তাে, রমেশকাকার জন্য কি না করলি তুই! তা একশাে টাকা মাইনে দেবেন, কোনাে খরচ নেই। আমি তাে বলি তাের বেশ ভালােই হয়। বলিস তাে আজই খবর নিই। দার্জিলিঙের মতাে জায়গায় থাকতে পারাটাই তাে একটা ভাগ্যের কথা।” শুভেন্দু বলল, “কিন্তু উনি যদি আরও পড়াশুনা করতে চান তা হলে-” এলামাসি বাধা দিয়ে বললেন, “আর পড়ে কি হবে, শ্ৰীমতী? এইবার সবাইকে দেখিয়ে দে রমেশকাকা তােকে কেমন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন! এই তাে একটা সুবর্ণ সুযোেগ !” শান্তকণ্ঠে শ্ৰীমতী বলল, “আপনারা তাই যদি ভালাে মনে করেন, আমার কোনাে আপত্তি নেই।” কথাটা যেন উঠবামাত্র পাকাপাকি হয়ে গেল। শুভেন্দ, ব্যারিস্টার মানুষ, এত দ্রুত সিদ্ধান্ত ওর ভালাে লাগে না। শ্ৰীমতীকে বলে,. “একট, ভেবে উত্তর দিলে পারতেন। জীবনে বড়-বড় সংকল্পগুলাের ভালােমন্দ আগে বিচার করে তবে মন স্থির করতে হয়। বড়লােকের সঙ্গিনী হওয়া যত সহজ মনে করছেন তত সহজ নয়।” ১৮ এলামাসি মদ, হেসে বললেন, “বড়লােকের সঙ্গিনী ও তাে চিরকালই হয়ে আছে। রমেশকাকা কি গরীব লােক ছিলেন নাকি?” শ্ৰীমতী ক্লান্তভাবে বলল, “ন্য, মাসিমা, আমি মন স্থির করেছি। আপনি আপনার ননদকে চিঠি লিখে দিন।” “ভালােই হল একদিক দিয়ে। তুই আমার সঙ্গেই তাহলে যেতে পারবি। আমরাও যে ক'দিন বাদেই দার্জিলিঙ যাচ্ছি। লকেটরা তাে আজও বেরােল কি সব কিনতে-টিনতে! ওদের নিয়ে কোথাও যাওয়াই একটা ঝকমারি। তুই থাকলে সুবিধাই হবে।” “বেশ তাই যাব।” শুভেন্দ, একট, ক্ষমকণ্ঠে বলল, “আপনার বইয়ের ভার আমি নিলাম। বেছে কয়েকখানা সঙ্গে নিয়ে যাবেন নিশ্চয় ? বাদবাকি আমি যত্ন করে রেখে দেব।” বিদায় নিয়ে শুভেন্দ, চলে গেল। এলামাসি বেলামাসি শ্রান্তভাবে শ্ৰীমতীর খাটের উপর বসলেন। “চমৎকার ছেলে শুভেন্দু। খালি একট, যেন বেশি কথা বলে। ভগবান যেন ওকেই বিশ্বব্রহণ্ডটা চালাবার ভার দিয়েছেন।” বলতে বলতে নিজের অজান্তেই শ্ৰীমতীর খােলা বাক্সের উপর চোখ পড়ে। “কত কাপড় জমিয়েছিস রে শ্রীমতী। দার্জিলিঙে তাের কাজ দেবে। এই সবই কি রমেশকাকার দেওয়া ?” হেসে শ্ৰীমতী বলল, “আমার যা-কিছু দেখছেন, যেখানে আমার যা- কিছু আছে, সবই তাঁর দেওয়া।” বাক্সের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে শ্রীমতী কাপড়-চোপড় গুছিয়ে রাখতে লাগল। “যেখানে যখন গেছেন আমার জন্য জিনিস নিয়ে এসেছেন, কাশ্মীর থেকে এই খােদাই-করা বাক্স, জয়পুর থেকে এই মিনে-করা ফল, সুরাট থেকে শাড়ি, মাইশাের থেকে চন্দনকাঠের কৌটো। যেখানে যা ভালাে পেয়েছেন এনে দিয়েছেন। পাওয়ার সাধ আমার মিটে গেছে।” বলতে-বলতে শান্ত শ্রীমতী যেন ১৯ প্রগলভা হয়ে ওঠে : “বলতেন, ভালাে জিনিসের যত্ন করতে হয়, সম্বর জিনিসকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হয়। কিন্তু বেশি আসক্ত হয়ে পড়িসনে কখননা। যে-জিনিস এক কথায় দান করে ফেলতে পারবি , সে জিনিসকে কাছে ঠাঁই দিবি না। কেমন সুন্দর কথা, না, মাসিমা?” মিলি কখন আসর থেকে উঠে গেছে কেউ টের পায়নি। ফিরে এসে এতক্ষণে আবার সে নিচু মােড়াটিতে বসল। চোখে-মুখে একটা আত্ম- প্রসাদের ছাপ। “আমরাও দার্জিলিঙ যাচ্ছি। রমেশকাকার পাঁচশাে টাকা নিয়ে আমরাও দশদিনের জন্য ঘুরে আসব। আমার রিনিমাসিমার বাড়ি আছে জাপাহাড়ে, থাকব সেখানেই। অবাক হচ্ছ নাকি? তােমরা ছাড়া আর যেন কাউকে দার্জিলিঙ যেতে নেই, না? উনি, আমি, নেলি আর ডলি, চারজনেই যাচ্ছি। নেলি ডলি বড় হল, ওদের তাে এখন একটা চান্স দেওয়া আমাদের কর্তব্য। “বেশ তাে বাপ, চান্স দাও না তাদের। কিন্তু দাদার বিষয়বুদ্ধিটা দেখে অবাক না হয়ে পারি না। যেই হাতে টাকাটা এল, অমনি, এলা- বেলা যাচ্ছে, অতএব আমাদেরও যাওয়া চাই। তার চেয়ে, মিলি, দু- একটা ধার-টার শােধ করে দিলে ভালাে হত না?” মিলি বলে, “জানি না বাবা, ধার-টারের কথা।” একে-একে সকলে প্রস্থান করেন। বেলা বাড়ে। রমেশকাকার গহস্থালী শ্ৰীমতীকে আহান করে—এস, এস, জন্মমৃত্যুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে শ্রীমতীও নিচের তলায় নেমে যায়। ২০ ৪ ঝড়ে-ওড়া পাখির মতাে যে যার উড়ে গেল। অবশেষে একদিন চাকর- দাসীকে বিদায় দিয়ে, সদর দরজায় তালা দিয়ে, শ্ৰীমতী চাবিগাছি তুলে দিল শুভেন্দর হাতে। পরােনাে চাকর-দাসীকে বিদায় দেওয়া কি জিনিস যে দেয়নি সে বােঝে না। আশৈশব যাদের উপর নির্ভর করা যায়, ছেলেবেলায় যাদের হাতে গড়াননা জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটে, যাদের কাচাকাপড় পরে, যাদের পাতা বিছানায় শুয়ে, যাদের হাতের রান্না খেয়ে, ব্যথা পেলে যাদের গলা জড়িয়ে ধরে কেদে, রাগ হলে যাদের উপর অত্যাচার করে, আনন্দ হলে যাদের সেই আনন্দের অংশ দিয়ে তিলেতিলে বড় হওয়া যায়, টাকা দিয়ে তাদের বিদায় করার মধ্যে কত যে দুঃখ শ্ৰীমতী আগে কোনদিন সে-কথা কল্পনাও করতে পারেনি। শুভেন্দ, তাকে নিজের গাড়ি করে শিয়ালদা স্টেশনে নিয়ে এসে এলামাসি-বেলামাসির হাতে সমর্পণ করল। ততক্ষণে শ্রীমতীর সিক্ত চক্ষপল্লব শুকিয়ে গিয়েছে, পাংশ, মখচোখ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। রেলগাড়ির কামরায় মালপত্রসহ তাকে তুলে দিয়ে শুভেন্দ, লকেট, আর পুতুল, দুজনকে দােক্স চকোলেট উপহার দিল। বাজের ঢাকনিতে লাল রিবন দিয়ে আঁকা বিড়ালাক্ষী সুন্দরী। এলামাসি বেলামাসি তৎক্ষণাৎ গলে জল হয়ে গেলেন। রিবন-বাঁধা মেমসাহেব দেখে অদর ভবিষ্যের কি যেন সুখস্বপ্নে ডুবে গেলেন তাঁরা। তাড়াতাড়ি শ্রীমতীকে জিগগেস করলেন, “আমাদের জন্য লুচি-তরকারি এনেছিস তাে? জানিসই তত তাড়াহুড়োতে খেলে আমাদের শরীর খারাপ হয়। কাল সকালের জন্য ডিমসিদ্ধ এনেছিস? আমরা কিন্তু টি-মাখন ছাড়া কিছুরই ব্যবস্থা করতে পারিনি। এই লটবহর সামলানােই এক ব্যাপার। তা ছাড়া টিফিন-ক্যারিয়ার দেখতে এমন বাঙালী-বাঙালী লাগে, বিশ্রী। কখনাে নিয়ে বেরই না।” লকেট আর পুতুলের কলকণ্ঠের বিরাম নেই। “শুভেন্দদা, তুমিও এস নিশ্চয়। যেই ছুটি হবে নিশ্চয় নিশ্চয় আসবে।” শুভেন্দু হেসে উত্তর দেয়, “নিশ্চয়, নিশ্চয় আসব। হােটেলে জায়গা হবে তাে? যা তােমাদের লটবহর।” বকেট আর অতুল নিজেদের অনাবশ্যকতা উপলব্ধি করে শ্রীমতীর কাছে সানা খোঁজে। তাদের সঙ্গে কথা বলে শ্রীমতীরও মনটা লঘ, হয়ে আসে। কণ্ঠস্বর পুনরায় সহজ হয়। ট্রেন ছাড়বার আগে শুভেন্দু একবাব শ্রীমতীকে বলেছিল, “শিলিগুড়ি থেকে আপনাদের মােটরে যাওয়া উচিত ছিল। বােজ ট্রেন লেট হচ্ছে, কাল বিকেল হয়ে যাবে পৌছতে।” তার উত্তর দিলেন এলামাসি, বললেন, “মােটরে যাব কি! মােটরে যে আমাদের মাথা ঘােরে।” বকেটও এতক্ষণে কথা বলার সুযােগ পেয়ে বলল, “হ্যাঁ, মােটরও যেমন পাক খেয়ে-খেয়ে উপরে উঠতে থাকে, মা আর মাসিমার মাথার মধ্যেও পাক খেতে থাকে।” অতুলও গলা যােগ করল, “আবার ফিরবার পথেও মােটর যেমন পাক খেতে-খেতে নিচে নামতে থাকে, মা আর মাসিমার মাথার মধ্যেও পাক খেয়ে-খেয়ে শেষটা ভিরমি যান।” এর বেশি বিদায় সম্ভাষণ করা হল না, ট্রেন ছেড়ে দিল। যতক্ষণ দেখা যায় লকেট আর পুতুল শুভেন্দর উদ্দেশ্যে এসেন্স-মাখা গােলাপী রুমাল ওড়াল। তারপর মাসিক পত্রিকা, চকোলেট আর মুগঞ্জনে মনােনিবেশ করল।
বেলামাসি শ্ৰীমতীকে কাছে ডেকে বসালেন, বললেন, “দে তাে এইখানটা একট, টিপে। প্যাক করে শিরাটা টেনে ধরেছে। ভালাে করে পা উঠিয়ে বােস না শ্ৰীমতী। চারশীলাদির কাছে তুই ভালােই থাকবি। ওঁর স্বামী বছর আষ্টেক হল মারা গেছেন, বেশ ভালাে অবস্থাতেই রেখে গেছেন। চার শীলাদির মেয়ে মিনিকে দেখেছিস কখনাে ? কি রপ ছিল যে তার এককালে! আসবে শুনছি, দেখিস তাকে। ওকে দেখে তুই অনেক শিখতে পারবি। দেখবি বিয়ে-থা না করেও মানুষ বেশ জীবনটা উপভােগ করতে পারে। তাের স্বাস্থ্য ভালাে, লেখাপড়া শিখেছিস, নাই বা বিয়ে করলি। রমেশকাকাও নিশ্চয়ই এই কথাই বলতেন। বিয়ে করে তাের মা'র কি সুখটা হয়েছিল বল তাে? বেশ আছিস, আর ও-সবের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করিস না।” মুখ তুলে বেলামাসির মুখের উপর উন্মুক্ত দৃষ্টি স্থাপন করে শ্রীমতী বলল, “মাসিমা, আমার মা কোথায় আছেন?” কামরাশদ্ধ সকলে যে-যার কাজ ফেলে বেলামাসির উত্তরের প্রতীক্ষা করে রইল। বেলামাসি মহা মুশকিলে পড়ে গেলেন। এলামাসি হাতের কাগজখানা নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, “শ্রীমতী, তুমি মনে করবে তােমার মা নেই।” মা নেই। মা নেই। মা তাে ছিল না কখননা। কোনাে শৈশবের স্মৃতি কোনাে কোমল-নয়না মাকে জড়িয়ে থাকে না তাে। ক্লান্তিতে সহসা মন তার ভরে যায়। এলামাসি তখন বেলামাসির দিকে একট, কুটি করে সে-রাতের মতাে শুয়ে পড়ার প্রস্তাব করেন। গাড়ি যখন দার্জিলিঙে পৌছল সত্যিই তখন বিকেল হয়ে এসেছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, চারদিকে অসময়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
এলামাসি বেলামাসির চিত্ত হােটেলে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে গরম চায়ের জন্য ব্যাকুল। তারই মধ্যে আবার শ্রীমতীকে চারশীলাদির বাড়ি পৌছে দিতে হবে। সকলেই বিরক্তি বােধ করে। চারশীলাদির বাড়ির সামনে রাস্তার উপর একফালি বাগান, সেখানে অজস্র বিলিতী ফলের বাহার, দরজার উপর পল্পিত লতা উঠেছে, শাদা দেয়াল, সবুজ দরজা- জানলা, লাল টিনের ছাদ। দেখে শ্রীমতীর ভালাে লাগে। সদর দরজায় নেপালী বেয়ারা থাকে, তার জিআয় শ্ৰীমতীকে দিয়ে এলামাসি-বেলামাসিরা হােটেলাভিমুখে চলে গেলেন। বড় দেরি হয়ে গেছে। বাক্স-বিছানা নামিয়ে তখনাে দাঁড়িয়ে আছে কুলি মেয়েটি। শ্রীমতী তাকে পয়সা দিয়ে বিদায় দিতে যাচ্ছিল, বেয়ারা বাধা দিয়ে জানাল, বাক্স-বিছানা ঘরে তােলা কুলির কাজ, বেয়ারার কাজ নয়। অবশেষে কুলির সাহায্যেই বাক্স-বিছানা ঘরে তােলা হল। মাঝখানে লাল গালিচা-মােড়া প্যাসেজ, তার ওপারে বসবার ঘর থেকে চারশীলাদি বেরিয়ে এলেন। শ্ৰীমতীকে দেখে কিঞ্চিৎ অপ্রসন্নকণ্ঠে বললেন, “এসে পৌঁছলে তাহলে দেরি দেখে আমি ভাবছিলাম কি হল!” শ্ৰীমতী তাঁর পায়ের ধুলাে নিয়ে শান্ত গলায় বললে, “ট্রেন বড় দেরি করে এল মাসিমা। আমরা সােজা স্টেসন থেকে আসছি।” আচ্ছা, তুমি বাছা। এখন তােমার ঘরে যাও, বেয়ারা দেখিবে দেবে। হাত-মুখ ধুয়ে বসবার ঘরে এস। কয়েকজনকে চা খেতে বলেছি, দেরি কোরাে না। কাজে-কমে সময়মতাে যারা চলে না, কখনাে তারা কৃতকার্য হয় না।” গরম জল দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে মনে হচ্ছিল ছােট লােহার খাটখানিতে বিছানাটি পেতে, সাত-আট ঘণ্টা পড়ে-পড়ে ঘুমােল বুঝি তার ক্লান্তি ঘুচবে। কিন্তু চারুশীলাদি অপেক্ষা করে রয়েছেন, তিনি কি মনে করবেন। একখানা ফিকে সবুজ রেশমী-শাড়ি বের করে সে পরল, গাঢ় সব পশমের বােনা একটা জামা গায়ে দিয়ে, কোঁকড়া চুলের মধ্যে I দিয়ে দাের চিরুণী চালিয়ে, মুখে একট, পাউডার মেখে প্রস্তুত হল। আর তাে দেরি করবার কোনাে কারণ নেই, ধীর পদক্ষেপে বসবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল শ্ৰীমতী। দরজায় লাল মখমলের পর্দা ঝলছে, তার ধারে-ধারে সােনালী ঘুণ্টি লাগান। চারশীলাদির তীক্ষ দৃষ্টি তখনি আবিষ্কার করে ফেলল তাকে। “এস, ভিতরে এস। এত লজ্জার কোনাে মানেই হয় না, শ্ৰীমতী।” শ্রীমতী তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চারশীলাদির বয়স বছর বাষট্টি হবে। এখনাে যত্নে বিন্যস্ত চুলের প্রাচুর্য দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। শাদা-কালােয় মেশানাে মাথাভরা একরাশি চুল। মিহি শাদা জর্জেটের থান পরা, শাদা জর্জেটের কার কার্যকরা জামা, শাদা কাশ্মিরী কোট। চোখে পর, কাঁচের বিনা- ফ্রেমের চশমা। দীর্ঘ চেহারার মানুষটি, কোথাও যেন একটু দুর্বলতা বা অবসাদ নেই। কক্ষে আরও ছয়টি প্রাণী, চায়ের অতিথি। চারশীলাদি পরিচয় দিলেন তাদের কাছে। “এই যে শ্রীমতী, যার কথা বলছিলাম।” হাত তুলে শ্ৰীমতী নমস্কার করল তাঁদের। ছ'জোড়া প্রবীণ চক্ষ, বিজ্ঞভাবে নিরীক্ষণ করল তাকে। চারুশীলাদির সামনে নিচু কাশ্মিরী টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম। ডিমের খােলার মতাে মিহি পেয়ালা পিরিচ, ছােট-ছােট রপাের চামচ, হাতলে বেটে বামন খােদাই করা, রেশমী বালিশে মােড়া ভারি পাের চা- দানী, সক্ষম সচের কাজ-করা দুধ ট্রের আবরণ। দেখে চোখ জড়িয়ে যায়। মনে পড়ে দাদাবাব, এই রকম ভালােবাসতেন, সক সুন্দর শিল্পের স্ত্রী। চমক ভেঙে শনল চারশীলদি বলছেন, “শ্রীমতী, আমি চা ঢালি, তুমি ঔদের দাও।”
পরিবেশনে এটি হয় না। কিন্তু সে মনে-মনে ভাবে আধারের তুলনায় আহার্যের পরিমাণ যেন অপ্রচুর। সােফার কোনা থেকে মেমসাহেব আকৃতির প্রৌঢ়া শ্যেনদৃষ্টিতে যেন তার হাতের আহার্য পর্যবেক্ষণ করছেন। শ্রীমতীর বুক দুর-দুর, করে। কি জানি, গহকার্যে নিপুণ তার হাত দুখখানি কেন যেন আজ শিথিল হয়ে আসছে। শ্ৰীমতী এবং চায়ের আগমনে কথার সত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বহ, চায়ের আসরের অভিজ্ঞ অতিথিরা ছেড়া সততা আবার জোড়াতালি দিয়ে দেন। মেমসাহেব তাঁর জাননায়ারের লােমগুলােকে ঈষৎ সরিয়ে শ্ৰীমতীকে বসবার জায়গা করে দেন। শ্রীমতীর হাতের চা ততক্ষণে হিম হয়ে গেছে। প্রৌঢ়া মহিলাটি সুন্দরী কিনা সে ঠিক ধরতে পারে না। মুখে পাটকিলে পাউডারের প্রলেপ, ঠোটে একট রঙের ছােপ, চোখের কোলে নীলচে ছায়া, লেস আর ইল্যাস্টিকে ছিপছিপে শরীরটি অাঁটসাঁট সমুদ্রের ঝিনুকের অন্তরের মতাে হালকা গােলাপী আভার জর্জেট শাড়ি, গলায় এক ছড়া মুক্তো, কানেও দুটি ছােট-ছােট মুক্তো, মণিবন্ধে হীরে-বসানাে হাতঘড়ি, শুকনাে আঙুলে সদশ্য হীরের একজোড়া আংটি। সুন্দরী না-ই বা বলে কেমন করে। তাঁর কোলে রাখা বেড়াল- মুখাে হ্যান্ডব্যাগের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে-মনে শ্রীমতী প্রশংসা -করে পাবে না। চারুশীলাদিও সেইদিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বললেন, “রিনি ডার্লিং, তুমি তাে কতবার বারণ করেছিলে, এবার শ্রীমতীর সঙ্গে আলাপ করে দেখ দিকিনি মত বদলায় কিনা।” নামটা চেনা-চেনা শােনায়। এই বােধ করি মিলিমামিমার রিনিমাসি। মহিলা দুইঞ্চি লম্বা দু'ইঞ্চি চওড়া, মিহি শাদা এক বখণ্ড বেড়াল- মুখাে থলি থেকে বের করে, সঙ্গে তা দিয়ে ঠোঁটের কোনা মুছে ফেললেন; খুবই সাবধানে মুছলেন, যাতে ঠোঁটের কারুকার্যে হাত না- পড়ে। তারপর গােলাপী পালিশ লাগানাে নখর-শােভিত আঙুল দিয়ে কালাে একটি চশমার খাপ বের করলেন। অতঃপর মাল আর চশমার খাপ বেড়ালমুখাে থলিতে তুলে রেখে সদশ্য নাসিকার উপর চশমাটি বসিয়ে গভীর মনােযােগ সহকারে শ্ৰীমতীর সঙ্গে আলাপে নিবিষ্ট হলেন। অপর পাঁচজন অতিথির মধ্যে দুটি মহিলা আর তিনটি পুরুষ, তাঁরা তৎক্ষণাৎ নিজেদের কথাবার্তা বন্ধ করে দর্শকমণ্ডলে পরিণত হবেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “এর আগে তুমি কি কাজ করতে ?” শ্ৰীমতী স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, “গত বছর বি. এ. পাশ করেছি, তারপর থেকেই দাদাবাবুর শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ল, তাঁরই দেখাশুনাে করতাম।” “তবে তাে তােমার কোনাে রকম ট্রেনিংই নেই? দেখ, চারুশীলা, দিল। কোথায় যেন কলেজ খুলেছে ডােমেস্টিক সায়েন্সের; সে-সব ট্রেনিং -নিয়েই কাজে ঢোকাটাকে আমি মােস্ট ডিজাস্টাস মনে করি। তুমিও দেখে নিও।” চারশীলাদি কাশ্মিরী কোটের গলার বােম আটতে-অটিতে বললেন, “তােমার পপেটকে তাে কত রকম ট্রেনিং দিলে, সেই বা কি কাজের হল বল দেখিনি।” রিনিমাসি নাক টেনে বললেন, “তােমার কোনাে কমনসেন্স নেই। পপেট বেচারীর শরীর মােটে ভালাে না, কে না-জানে! তাছাড়া কাজ করবার এমন কি দরকারটাই বা তার পড়েছে শুনি। এই নিয়ে ঘাের তর্ক শুরু হয়ে যায়। শ্রীমতীর চোখ দুটি ফুমে ঘুমে জড়িয়ে আসে। হাত-পা বরফের মতাে ঠাণ্ডা লাগছে। নেপালী বেয়ারা এসে চায়ের সরঞ্জাম সরিয়ে ইলেকট্রিক হীটার লাগিয়ে দিয়ে গেল। বাইরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ঘরের মধ্যে চারদিকে পর্দা টানা। গােলাপী দেয়ালে গােলাপী শেড় লাগানন বাতির স্তিমিত আলাের ৩ (৬৩) ছায়া পড়েছে। একটা ঘরােয়া স্বাচ্ছন্দ্যের, কোমল আরামের পরিবেশ। কিন্তু শ্রীমতীর মন এসব থেকে দুরে বাইরে কোথাও নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ডাক্তার সেন তাকেও তাঁদের আলাপ-আলােচনার মধ্যে জড়াতে চেষ্টা করেন। “তােমাদের কলকাতার খবব বললে না? শুনেছি সেখানে আহার, আচ্ছাদন আর আশ্রয় ছাড়া আর সবই আজকাল মিলছে? চাকর-বাকর নাকি লােপ পেয়েছে দেশ থেকে? দোকানদাররা ধর্মঘট করছে রােজ?” গ্রীমতী এর কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না। তার উপর ভদ্রলােকের ধরন দেখে মনে হয় উক্ত অবস্থার জন্য ব্যক্তিগতভাবে শ্ৰীমতীকেই তিনি দায়ী বলে সন্দেহ করছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজ মাহাত্মে বহুক্ষণ হল ক্ষমাও করেছেন। সুখের বিষয় বা কোনাে উত্তরের প্রতীক্ষা করেন না, আপন মনে বলে যেতে থাকেন, “আমার মতে তােমরা মিসম্যানেজ করছ। আমি তাে বলি ঘরকন্নার পাট তুলে দাও। সবাই হােটলে থাকা অভ্যাস কর। ব্যস! চাকর আর র্যাশনের প্রবলেম সলভড়! সারাদিন তখন বই পড়বে, সিনেমা দেখবে, সাজবে-গুজবে, লাইফ এনজয় করবে।” জীবনযাত্রার এমন সহজ একটা পা বাতলে দিলেন, শ্রীমতী তব, কোনাে কথা খুজে পায় না। মিসেস মালিক, বলে আবেকজন সহসা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “পীকিং অভ সার্ভেন্টস' চাকব ক্লাশটা লােপ পেলে তাে বাঁচা যায়। হরদম তাদের আবদার লেগে আছে, মাইনে বাড়িয়ে দাও। প্রতিমাসে একদিন দুদিন ছুটি দাও। খাওয়া পছন্দ হয় না। দোষ করলে কি বললে একেবারে হা-হা কাণ্ড। এর শেষ যে কোথায় ভাবতে গা শিউরে ওঠে। যদি বা একটা ভালাে চাকর জোটে তাে পাঁচজন বন্ধুবান্ধব মিলে নানান লােভ দেখিয়ে তাকে ভাগিয়ে নেবে।” মিসেস বাসও যােগ করলেন, “সাহেবদের আমলে বাছারা জব্দ ছিলেন, ২৮ তখন তাে সব সেলাম ঠোক। আর তাে খাও! তব, তাই ওদের ভালাে আগত।” টিপনি কাটলেন মিস্টার বাস, “উইক গভর্নমেন্ট হলে যা হয়। যত সব হতচ্ছাড়া গরীব আর ইল্লিটারেটদের দেখবে মুখ খুলে গেছে, অথচ সত্যিকারের মেরিট যাদের আছে তারা কোথাও পাত্তা পাবে না। আমাদের সুকেশের অবস্থাটাই দেখ না। দিল্লীতে ফ্যা-ফ্যা কয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা, আজে-বাজে কত লােক ভালাে চাকরি পাচ্ছে, আর ওর বেলাতেই মাইনর জব।” হােস্টেস হিসাবে চারশীলাদি ক্ষধ চিত্তগুলিকে শান্তি দানের চেষ্টা করলেন, “সমান বললেই তাে আর সমান হয় না সবাই! ভগবান কিছু বড়লােক গরীবলােক আগে থেকেই সষ্টি করেননি। বড়লােকেরা যেমন নিজেদের তেমনি পুর্বপুরুষদের চেষ্টায় বড়লােক হয়েছে। তাদেরই বা কে হতে বারণ করেছিল শনি! তা না, গরীব হয়ে যেন আমাদের মাথা কিনে নিয়েছেন! ওরা খেতে পায় না অতএব সকলের পাঁচ পােয়া চাল বরাদ্দ। রিডিকুলাস!” সহসা প্যাসেজে একটি ছােটখাট প্রভঞ্জনেব সাড়া পড়ে গেল। বিচলিত বামাকন্ঠ, ব্যতিব্যস্ত ভৃত্যসম্প্রদায়, বিক্ষিপ্ত দ্রব্যসম্ভার, উৎক্ষিত কুরুবংনি। কক্ষস্থ সকলের মধ্যে চোখে-চোখে কি কথা হয়ে গেল। চারশীলাদির মুখখানা আসন্ন ঝড়ে রূপ ধারণ করল যেন। ধীরে- ধীরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বাইরে বিদায় সম্ভাষণ শােনা গেল, কে যেন নিষ্ক্রান্ত হয়ে যায়, এবং এক রমণীমতি প্রবেশ করে। কেই তীক্ষ। কলকণ্ঠে বলে, “কি মা, ও রকম শকড হচ্ছ কেন? একই খুশি হও।” বুকে জড়ানন কুকুর বাচ্চাকে সম্বােধন করে বলে, “বােব দেখ, তুই ছাড়া আর কেউ আমাকে দেখে খুশি হয় না। মা, আমি ফ্যামিশড়! চা, স্যাণ্ডউইচ যা আছে দাও! তােমার একমাত্র সন্তানকে দেখে একটু আনন্দ প্রকাশ করলেই বা?” রমণী সােফার কুসনগুলিকে গুছিয়ে জায়গা করে বসে পড়ে। চারশীলাদি বেয়ারাকে চা আর খাবার আনতে ফরমায়েশ করে সােজা হয়ে বসে বলেন, “দেখ মিনি! জীবনটা একটা হিউজ জোক নয়। মানুষ হয়ে জন্মাবারও একটা উদ্দেশ্য আছে।” মিনি এক গাল হেসে বলল, “আছে নাকি মা! স্টাফি ওল্ড মা। আমার মতে জীবনটা সত্যি একটা হিউজ জোক! আমার মতেও তাই, আর ডাক্তার সেন আর মিস্টার বাস, আর শচীনমামার মতেও তাই!” চামচ দিয়ে চা নাড়তে নাড়তে মিনি ষড়যন্ত্রকারীর দৃষ্টিতে সেন, বাস, আর শচীনমামার দিকে তাকাল। যেন আদেশ পেয়ে অতিথিরা একে-একে উঠে দাঁড়ালেন। “চারশীলা, মিনি, বাইরে এমন ফাউল ওয়েদার! আর থাকা নয়। এবার পালাই।” তাঁদের বিদায় দিয়ে চারশীলাদি ফিরে এলেন। এতক্ষণে তাঁকে ক্লান্ত দেখায়, মনে হয় বাস্তবিকই বাষট্টি বছর বয়স হয়েছে তাঁর। ক্লান্ত দেহকে চেয়ারে নামিয়ে চারশীলাদি বললেন, “তুমি আমার পাটিটা নষ্ট করে দিলে, মিনি।” শনে মিনির আর ধৈর্য থাকে না, বলে, “ওঃ, তােমার মােন্ডি ও পাটি! সত্যি ভালাে লাগে মা? এখন আমি যদি একটা পাটি দিতাম- ভালাে লাগে না মিনি। না, মনে আমার শান্তি নেই। থাক সে কথা, এস শ্ৰীমতীর সঙ্গে তােমার আলাপ করিয়ে দিই। শ্ৰীমতী, এই আমার মেয়ে মিনি। খবরের কাগজে আর্ট ক্রিটিসিজম করে।” *শ্রীমতী? ওহহা। তােমার সেই কম্প্যানিয়ন? বেচারা শ্ৰীমতী। কপ্যানিয়ন হওয়া কি সােজা কথা ভেবেছ? তােমাকে গম্ভীর হতে হবে, সৎ হতে হবে, জীবনে উদ্দেশ্য থাকতে হবে, তােমার যা যা বয়স হতে হবে! ওর ওল্ড শ্রীমতী।”
এতক্ষণে শ্রীমতী ভালাে করে মিনিকে দেখল। কোনাে মায়াবলে যেন পলায়মান যৌবনের অঞ্চল প্রান্তটি ধরে রেখেছে। আকর্ণ বিস্তৃত টানা- টানা চোখের কোলে গভীর কালিমা। বাঁশির মতাে নাক, তার দুই পাশে বলিরেখা ঠোঁটের কোনা পর্যন্ত টানা। প্রাণের অতৃপ্তিকে চাপা দিতে পারেনি পুষ্প-পেলব অধরের নিপণ প্রসাধন। জীবনে কখনন শ্ৰীমতী অমন সুন্দর কপাল অমন ধনুকের মতাে ভুরু দেখেনি। যেন ঝরে পড়ার মখে গােলাপ ফল। বেশবাস সাজ-সজ্জায় একটা অযত্ন, একটা তাচ্ছিল্য, একটা শিথিলতা। জামার লাল রঙের আদি উজ্জলতা চলে গিয়েছে। শাড়িখানাও ঘাের লাল রঙের, তাতে ইস্ত্রি নেই। আঙুর- গুচ্ছের মতাে কোঁকড়া চুল মাথায় এলােমেলাে। শ্ৰীমতীর মনে হল, দাদাবাব, বলতেন, সুন্দর জিনিসের সেবা করতে হয়, কিন্তু কখনাে পুজো করতে নেই। যার এত রপ, জীবন তার বুঝি ধন্য হয়ে যায়। “কি? মনে ধরেছে?” বাঁকা হাসিভরা চোখে মিনি তাকাল তার দিকে। শ্ৰীমতী বড় অপ্রস্তুত বােধ করল। এর সঙ্গে সে কি কথা বলতে পারে? একটু পরেই চারশীলাদি ক্লান্তস্বরে বললেন, “আমি শুতে যাচ্ছি। শরীর ভালাে লাগছে না, রাতে আর খাব না কিছু। শ্ৰীমতী, সব দেখেশুনে নিয়ে খেও। কাল থেকে তােমার ডিউটি শুরু হবে। আর মিনি, আজকের মতাে ক্ষান্তি দাও।”
No text on this page.
৫ দিন কুড়ি-বাইশ কেটে গেছে। চারশীলাদি তাঁর ভাঁড়ারের চাবি আর সমস্ত সংসারের ভার শ্রীমতীর হাতে তুলে দিয়েছেন। দার্জিলিঙের ঘরকন্না শ্রীমতীকে নতুন করে শিখতে হয়েছে। ঝড়ের মতাে এক-একদিন মিনি এসে তার বুকের রক্তে দোলা দিয়ে যায়। “ঘরকন্না তােমার ভালাে লাগে শ্রীমতী? মনে হয় না জীবনটাকে বথা নষ্ট করে ফেলছ ? দেখ, আমার শাড়ির পাড়টা এইখানে কতটা খুলে গেছে, একট, সেলাই করে দেবে? এক্ষনি আমাকে বেরােতে হবে কিন্তু। পারও বাপ, তুমি!” গানের সুর গুনগুন করতে-করতে শ্ৰীমতীর মনে নিভৃত কক্ষের দরজায় এক-একবার সে যেন টোকা দিয়ে যায়, কানে কানে যেন নিঃশব্দ গলায় বারবার বলে, ও শ্রীমতী, এ তুমি করছ কি? বাজারের ফর্দ লিখে ধােবার হিসেব মিলিয়ে জীবনটাকে নষ্ট করছ? কতরার তাকে রমেশ চৌধুরীর শেষ কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোথায় কত রাত্রিতে বাজনা শুনে আসে, নতুন প্রকাশিত গােছ- গােছা ইংরিজি বই হাতে করে যখন-তখন বাড়ি ফেরে, শ্ৰীমতীর কর্মরত হাত দুখখানির দিকে কেমন যেন কটাক্ষ করে, নীরব ভাষায় বলে যেন, শেষে কি সত্যি নিজেকে ফাঁকি দিলি শ্ৰীমতী? খাঁচার পাখির মতাে শ্রীমতী ডানা ঝাপটায়, হিমালয়ের নৈর্ব্যক্তিক দুশি তাকে শাস্তি দিতে পারে না। বেড়াতে যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে এলামাসি বেলামাসি মাঝে মাঝে উকি মেরে যান। গৃহকত্রীর আদেশে শ্ৰীমতী তাদের বৈঠকখানায় বসিয়ে, হীটার জেলে দেয়, চা আর চীজ- টোস্ট করে খাওয়ায়। ছােট মােড়াতে পা দুখানি তুলে দিয়ে, শাদা আলােয়ানে আবত হয়ে চারশীলাদি তাদের নানান কুশলপ্রশ্ন করেন। সকেটরা আসে না কখনন, দুর থেকে মাঝে-মাঝে রঙিন রমাল নাড়ে, পথে দেখা হলে সাদর সম্ভাষণ করে। ব্যস। রাত্রে শােবার আগে চারশীলাদির জন্য নিজের হাতে শ্রীমতী ওভালটিন করে নিয়ে যায়। পেয়ালা হাতে হীটারের পাশে আরামকেদারায় তিনি বসে থাকেন, রুপাে বাধানাে নরম বুশ দিয়ে তাঁর রেশমী চুল বশ করে দিতে হয়। ক্লান্তস্বরে তিনি সংসারের সারাদিনের প্রতিটি খুটি- নাটির সংবাদ নেন। অনর্গল কথা বলে যান, কতকটা স্বগত, কতকটা শ্ৰীমতীকে উদ্দেশ করে। শ্রীমতী কি বলবে? কিছুই বলে না। মিনি এখনাে ফেরেনি শ্ৰীমতী? খেয়ে নিয়ে তুমি শুয়ে পড়বে নাকি? রাত তত কম হল না! সদর দরজা খােলা থাকবে ? তাই থাক। চাকরদের বেশিক্ষণ কিন্তু বসিয়ে রেখ না, গােলমাল করবে আবার। জানােই তাে, আজকাল পক্ষীরাজ ঘােড়া মেলে তাে ভালাে চাকর মেলে । বরং এক কাজ কর, কাপড় ছেড়ে, চুল বেধে আমার এই গরম ড্রেসিং গাউখানা গায়ে দিয়ে তুমি বৈঠকখানার সােফাতেই শুয়ে থাক; এলে তুমিই দরজা খুলে দিও। দেখেশুনে না-দিলে কি আর খাবে? যা পিটপিটে মেয়ে। আমার জীবনে আর কোনাে শাতি নেই, শ্রীমতী। তাই ভাবি, তােমার মা থাকলে তাঁর কোনাে ভাবনাই থাকত না, তুমি বেশ নিজেরটা গুছিয়ে নিতে পার। মিনি আবার ঐ এক ধরনের। কাজকর্মও তাে করছে, ঘুরে ফিরেও বেড়ায়-তাই বলে আবার ঘুরে বেড়ায় বলে যেন মনে কোনাে না ও কাজ করে না—এখন ছুটিতে আছে, তাই! আর না-বেরিয়েই বা পারে কি করে, আজ এখানে চায়ে, কাল ওখানে লাঞ্চে, কেউ না কেউ ডাকছেই। খুব পপুলার মেয়ে কে লেকচার, কোথায় বাজনা, সবাই এসে ডেকে নিয়ে যাবে-নির গানের গলাও খাশা। শুনাে একদিন। কিন্তু কখন শুনবে? পায়ে যেন ওর পাখা বাঁধা, এক মিনিট স্থির হয়ে বসতে পারে না। কি যে আমি করব ওকে নিয়ে, কিছু বলতে গেলে আবার ফোঁস করে উঠবে। মা হওয়া কি কম শাস্তি! বিয়ের এত ভালাে-ভালাে সম্বন্ধ এসেছিল, এখনাে আসে; তা কাউকে পছন্দই হয় না। কিছুদিন ধরে আবার ঐ শুভেন্দ, ছেলেটির সঙ্গে ভাব হয়েছে, দুজনেরই এক বিষয়ে ইন্টারেস্ট কিনা। আজ তাে শুভেন্দুর আসবার কথা, সেই জন্যই বােধ করি দেরি হচ্ছে। গেছে হয় তাে কোথায় তার সঙ্গে। তাতে এবেলারা মােটেই খুশি হবে না! ঐ যে অপগণ্ড দুটি মেয়ে আছে, তাদের নিয়ে ওদের যত রাজ্যের ভাবনা! এই তাে মাত্র বি.এ. পড়ে, ওরা জানেই বা কি বােঝেই বা কি? কোন দিক দিয়ে যে ওরা শুভেন্দুর মতাে ছেলের যােগ্য তা তাে জানি না। শ্ৰীমতীর মন কথার স্রোতে কোথায় ভেসে যায়। মা থাকলেও শ্ৰীমতীর জন্য সে ভাবত না। কিন্তু কোথায় তার মা? চারশীদি হয়তাে জানতে পারেন। কিন্তু খােলাখুলি প্রশ্ন করতে পারে না। কে যেন তার মুখ বন্ধ করে দেয়। শুভেন্দ, এসেছে? মিনি আর শুভেন্দুকে একসঙ্গে ভাবতে চেষ্টা করে, পারে না। দুজনের এক ইন্টারেস্ট? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মনে হয় দুজনের দুই ভিন্ন জগৎ।তারা কি করে এক হবে? কানে যেন শুভেন্দর মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরের ক্ষীণ একটা প্রতিনি জেগে ওঠে। কেন যেন মনটা তার হাকা লাগে। চারশলাদির চুল চিরে দুভাগ করে দুটি পরিপাটি বেণী বেধে তারপর দুফালি নীল রিবন বেধে দেয়। চারশীলাদি শুয়ে পড়েন। এতক্ষণে দুটি। আলো নিবিয়ে বিদায় নিচ্ছে, চারুশীলাদি বললেন, “তুমি এখন কি কম?” শ্ৰীমতী প্রসন্নকণ্ঠে উত্তর দেয়, “আপনি নিশ্চিত হয়ে ঘুমিয়ে পন, আমি বসবার ঘরে বসে একট, বই পড়ি না হয়, মিনিদি এলে এক সঙ্গে খেয়ে-দেয়ে তবে শােব।” চারুশীলাদি খুশি হয়ে ক্লান্ত চোখ দটি বন্ধ করেন। নিজের ছােট কালাে বাক্সখানা খুলে একখণ্ড ব্রাউনিং বের করে নিয়ে শ্ৰীমতী নিচে গেল। চাকরবাকরদের বসিয়ে রেখে মিছিমিছি আর কষ্ট দেওয়া কেন? মিনি এলে সে নিজেই খাবার গরম করে দিতে পারবে। রাত্রি অনেক হয়েছে। পড়ায় মন বসে না। কোলেব বই কোলে পড়ে থাকে, শুন্যদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবনার স্রোতে মন তার কোথায় ভেসে যায়। কেন ঘােরে সংসারের চাকা? চারশীলা- দির সচ্ছল সংসারের চাকাই বা কি উদ্দেশ্যে ঘােরে? মানুষ কেন জন্মায়? সাধ, মহাপুরুষরাই বা কেন? পৃথিবীটাকে তাে একতিলও বদলাতে পারেনি কেউ। লেখাপড়া-শেখা মানুষরা কি মুখ্যদের চেয়ে সত্যি ভালাে হয় ? বহুদিন পরে শ্রীমতী প্রাণভরে ভগবানকে ডাকতে পারল : দাদাবাব, বললে, তােমাকে ডেকে কোনাে লাভ নেই, ডাকের অপেক্ষায় তুমি তাে থাক না। তােমার সাড়া পাই না, প্রমাণ পাই না, আছ কি নেই তারও কোনাে নিশ্চয়তা নেই। তব, পথিবীর উপর আমার বিশ্বাস যেন স্থির থাকে। যেন বিশ্বাস করতে পারি এ-জীবন মঙ্গলম, এ-জন্মের নিশ্চয়ই নিগুঢ় কোনাে উদ্দেশ্য আছে। কত এলােমেলাে কথা মনে পড়ে। বেড়ে চলে রাত। বাইরে পায়ের শব্দ শুনে উঠে সে দরজা খুলে দিল। লাল শাড়ি পরা, লাল গরম ভারকোট গায়ে মিনি, তার সঙ্গে শুভেন্দই বটে। এক ফালি আলাে এসে শুভেন্দুর মুখে পড়েছিল, মুখখানি একটু পাণ্ডুর মনে হয় তার। একজোড়া চোখের তীব্র চাহনি শ্ৰীমতীর মুখের উপর নিবদ্ধ হয়। নমস্কার করে শুভেন্দু, জিগগেস করল, “কেমন আছেন শ্রীমতী দেবী? কাজ এখনাে ভালাে লাগছে?” কথার মধ্যে কোথায় একটা শানিত ছুরি লুকিয়ে ছিল। এ তাে সেই শুভেন্দ নয়। সে ছিল বক্সের মতাে কঠিন, কুমের মতাে কোমল। শ্ৰীমতীও নমস্কার করে, বলে, “ভালােই লাগছে।” মিনি অস্থিরভাবে ডাকে, “এস শুভেন্দ, কফি খেয়ে যাও। শ্রীমতী চমৎকার কফি করে। ভিতরে এস, বড় শীত লাগছে।” কিন্তু শুভেন্দ, বাইরে থেকেই বিদায় নেয়, “না, আজ চলি। কাল আবার দেখা হবে। শ্ৰীমতী দেবী বাড়িতে কাজকর্ম করবেন, আমরা বাহিলে বেড়াতে যাব। কিন্তু তােমার ঐ ক্ষরতােলা জুতাে পায়ে দিয়ে নয়।” মিনি হেসে বলে, “আচ্ছা, সে দেখা যাবে। চল শ্ৰীমতী, ক্ষিদে পেয়েছে।” খেতে বসে বলে, “দেখ শ্ৰীমতী, রাঁধা-বাড়া, বাজার হিসেব, চাকর তাড়ানাে, একটা জিনিস জীবন থেকে যদি ছেটে ফেলতে না পার তাহলে আর সুখী হতে পারবে না।” শ্ৰীমতীর ঠোঁটে মদ, হাসি খেলে যায়, বলে, “ওসব যদি আমি ছছটে ফেলি মিনিদি, তােমারই অসুবিধা হবে সব চেয়ে বেশি।” “রাবিশ! তােমার কোনাে একটা ক্রিয়েটিভ কাজ করা উচিত। আচ্ছা, শুভেন্দকে তােমার কেমন লাগে ?” শুভেন্দকে শ্রীমতী কতটুকু চেনে? কি করে বলবে কেমন লাগে? বললে, “ভালােই লাগে।” ভালাে লাগতে হলে চেনবার দরকার হয় না। চিনলেই বরং বেশি ভালাে লাগে। মিনি বললে, “বেশ স্মার্ট, ব্যারিস্টারিতে এরই মধ্যে খুব নাম করেছে। ভারি কালচার্ড', জানাে শ্ৰীমতী, ঢের পড়াশুনা করেছে। তবে ওসব লােকের একটা মুশকিল হচ্ছে যে সব জিনিসই যাচাই করে নিতে চায়। ওর মনেমনে সব জিনিসেরই একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা আছে। ওসব লােকের ঐ একটা অসুবিধে।”
শ্রীমতী অবাক হয়ে শােনে। “ও, ভালাে কথা,” কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যায় মিনির, “শ্রীমতী, তােমার একটা চিঠি এসেছিল আজ সকালে। ভুলে আমার চিঠির সঙ্গে দিয়ে গিয়েছিল ওরা, সারাদিন আমার ব্যাগে-ব্যাগেই দুরছে।” লাল হ্যাণ্ডব্যাগ খুলে চাবি, রমাল, লিপস্টিক, চ্যাপ্টা পাউডার- কৌটো, কাগজের কুচি, আরেকটা রুমালের ভিড় সরিয়ে ফিকে নীল রঙের একটি পুরে খাম বের করে মিনি শ্ৰীমতীকে দেয়। লেফাপায় অপরিচিত হাতে শ্ৰীমতীর নাম-ঠিকানা লেখা। কেমন একটা মদ, সুগন্ধও যেন শ্রীমতী অনুভব করল। খাওয়া শেষ করে মিনি উঠে পড়ে। দরজা জানলা বন্ধ করে, আলাে নিবিয়ে শ্রীমতী নিজের ঘরের আশ্রয়ে পৌছায়। কম্পিত হাতে খুলে ফেলে খামখানা। মাত্র একটি পাতায় চার-পাঁচ ছত্র চিঠি কল্যাণীয়াস,তােমার অভিভাবকের মৃত্যুতে তুমি এখন আশ্রয়হীনা। অতএব তােমার সময় ভার গ্রহণ করা আমি আমার কর্তব্য মনে করি। তুমি পত্রপাঠ আমার কাছে চলে আসবার ব্যবস্থা করে নিম্নলিখিত ঠিকানায় চিঠি দেবে। ইতি—আশীর্বাদিকা তােমার মা, পসনা দেবী। মা! শ্ৰীমতীর মা। শ্ৰীমতীর রুপসী মা, যার গানের গলার তুলনা নেই। মা এতদিন পরে তাকে মনে করেছেন। কর্তব্য? কে বলেছে কর্তব্যের কথা? শেষ জন্মদিনে তার একুশ বছর পূর্ণ হয়েছে, আর তাে কারাে কোনাে কতব্য নেই। শ্ৰীমতী নিজেই এখন নিজের কী। রমেশ চৌধুরী শ্ৰীমতীকে স্বাবলম্বী হতেই তাে শিখিয়ে গেছেন। মাথা উচু করে শ্রীমতী ছাদের নিচে ছােট গবাক্ষর দিকে তাকিয়ে মইল অনেকক্ষণ। পরে চিঠিখানা কুচিকুচি করে ছিড়ে ফেলে, ক্লান্ত- ভাবে শুয়ে তখনই গভীর ঘুমে ডুবে গেল। ভাবতে পারেনি এই চিঠি নিয়ে পরদিন কত অশান্তির সৃষ্টি হবে। ৩৮ পরদিন সকালে শ্ৰীমতীর ভাঁড়ারঘরের কাজ শেষ হয়ে গেছে। মিনি স্নান সেরে, সাজসজা করে প্রাতরাশ করতে বসেছে। টেবিলের শেষ- প্রান্তে চারশীলাদি যুগপৎ তার আহার পর্যবেক্ষণ এবং বেলা সাড়ে ন'টায় খাওয়ার তিক্ত সমালােচনায় নিবিষ্ট আছেন। শ্ৰীমতীকে দেখে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করবার কথা ভেবে মিনি বললে, “কি শ্রীমতী! দিব্যি যে ভালােমানুষটি সেজে রইলে! কাল কে তােমাকে অমন গন্ধমাখাননা চিঠিখানা লিখল, মাকে বলেছ?” হাল্কা সুরেই কথাটা মিনি তুলেছিল, পরিণামের কথা ভেবে দেখেনি। কিন্তু শ্ৰীমতীর প্রসন্ন মুখখানি সর্যাস্তের বহুক্ষণ পর দিগন্ত যেমন বিবর্ণ হয়, তেমনি হঠাৎ শাদা হয়ে গেল। চেয়ারের পিছন দিক ধরে, মিনির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে, সে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চঞ্চল হয়ে উঠলেন চারশীলাদি। আত্মসংবরণ করে শ্রীমতী চলে যাবার উদ্যোগ করতেই কর্কশ গলায় বললেন, “কার চিঠি, শ্রীমতী?” শ্ৰীমতী নিরুত্তর। “এখানে আমিই তােমার অভিভাবিকা। আমার প্রশ্নের একটা উত্তর দেওয়া তাে তােমার উচিত।” শান্ত গলায় শ্রীমতী বলল, “আমার একুশ বছর বয়স পূর্ণ হয়েছে, মাসিমা। আমি নিজেই এখন আমার অভিভাবিকা।” “কি আশ্চর্য শ্ৰীমতী! তােমাকে কত নম্র বলে মনে করেছিলাম। তােমার চিঠি আমি দেখতেও চাইনি। কে লিখেছে বললেই তাে মিটে যায়।” শ্ৰীমতী সংক্ষেপে বললে, “না। আমাকে মাপ করবেন।” উত্তেজনায় চারশীলাদি উঠে দাঁড়ালেন, কোল থেকে চশমার খাপখানা ঠক করে মাটিতে পড়ে গেল। নিচু হয়ে খাপটা শ্ৰীমতী তুলে রাখল টেবিলে। চোখে-মুখে চাপা কৌতুক নিয়ে মিনি অপেক্ষা করছে—কি হয়! এমন সময় রঙ্গমঞ্চে শুভেন্দন প্রবেশ। হাওয়ায় একটা অস্বতি অনুভব করে অবাক হয়ে শুভেন্দ, প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার তাকাল। মিনি বললে, “দাঁড়িয়ে রইলে যে? মা’র আরেকটি গেডেস ধলায় বিলুণ্ঠিত। টুকরােগুলি কুড়িয়ে দেবে না ?” চারুশীলাদি ধৈর্য হারিয়ে, “ভালাে লাগে না, মিনি,” বলে নিষ্ক্রান্ত হলেন। শুভেন্দ, মদ, হেসে একটা চেয়ার ঠেসে বসল। শ্ৰীমতীকে জিগগেস করল, “ব্যাপার কি বলন তাে?” শ্ৰীমতী কোনাে উত্তর দেবার আগেই মিনি সহাস্যবদনে বললে, *শ্রীমতীকে কে যেন কাল এক চিঠি লিখেছে। এত মােটা খাম, আকাশের মতাে নীল চিঠির কাগজ, তাতে গােলাপ-গন্ধ মাখা! শ্রীমতী কাল রাত্রে দরজা-জানলা এটে সেটির পাঠোদ্ধার করেছে, অথচ আজ কিছুতেই তার রহস্যটি খুলে বলছে না! মা এদিকে চিরটা কাল একাই সমাজকে ঠেকা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, এমন উচ্ছখল আচরণ তিনি সইবেন কেন? বিশেষ করে শ্রীমতীর কাছ থেকে, যে আজ মাসখানেক হল মা’র বদ্ধ বযেসের আদর্শ হয়ে বিরাজ করছিল! ওরে শ্ৰীমতী, তাের অমন সুখের চাকরিটা গেল। তুই এখন কববি কি?” শ্ৰীমতী কিছু বলল না দেখে শুভেন্দ, বলল, “কেন, একটা প্রাইভেট চিঠি দেখার মাসিমারই বা কি অধিকার আছে যে তার জন্যে তাঁর চাকরি যাবে? ও রকম চাকরি তাহলে না-করাই ভালাে।” মিনি কোনাে বিষয়ে নিজের বক্তব্য শেষ হয়ে গেলে আর তাতে বেশিক্ষণ মননানিবেশ কবতে পারে না। উঠে গিয়ে সাইডবাের্ডের চৌকো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওভারকোট পরতে পরতে বলল, “আগাগােড়া ভুল বুঝেছ বন্ধ। আসলে শ্ৰীমতীর নৈতিক জীবনে মা’র যত না ইন্টারেস্ট আছে, শ্ৰীমতীর উদ্ধত আচরণে ক্ষোভ হয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি। আমি পর্যন্ত কত অছিলা অজুহাতে মাকে এড়িয়ে-এড়িয়ে চলি, আর ও মা’র মাইনে-করা কম্প্যানিয়ন, ওর পরমাত্মাটাকে পর্যন্ত মা ভাড়া নিয়েছেন, ও বলে কিনা না, বলব না? একি মা কখনাে সহ্য করতে পারবেন।” ৪০ শুভেন্দ, তাকিয়ে দেখল শ্রীমতীর শ্যামল মুখশ্রীতে কিসের যেন ছায়া পড়েছে। হাত দুখানি অনাবশ্যকভাবে দঢ়মুষ্ঠিতে চেয়ারটিকে আশ্রয় করে রয়েছে। কিন্তু শ্ৰীমতীর গ্রীবা এখনাে নমিত হতে দেখল না। শুভেন্দু সহজভাবে হেসে তাকে আশ্বাস দিল, “কুছ পরােয়া নেই, শ্ৰীমতী দেবী। বাক্সপ্যাঁটরা বাধন গিয়ে। আপনার এখানকার কাজ সাতদিনও টিকবে না, তাই নিয়ে বকেট আর অতুল বাজি ধরেছিল। তাছাড়া বেলামাসির পালা শেষ হয়েছে। এবার এলামাসির পালা। আপনার চাকরি-নম্বর-টু-ও ঠিক হয়ে রয়েছে। দামােদর নদীর ধারে চাঁপডাঙা গ্রামে, মেয়েদের নতুন হাইস্কুলে। এলামাসির বান্ধবী মিস বিশ্বাস সেখানকার হেডমিস্ট্রেস। অঙ্ক কষাতে হবে আপনাকে, আরো বাংলা-টাংলা কি সব পড়াতে হবে। যান না একবার হােটেলে এলা- মাসির মন ভালাে করে দিয়ে আসুন। চারশীলা দেবী ছুটি দেবার আগেই নিজেই ছুটি নিয়ে সরে দাঁড়ান। চলাে মিনি, রােদে বেশি হাঁটতে পারব না বলে দিচ্ছি।” মিনির সঙ্গে শুভেন্দ, বেরিয়ে গেল। এতক্ষণে শ্রীমতীর মনে পড়ল তার সঙ্গে একটি কথাও আজ বলা হয়নি। বাবুর্চিকে রান্না বুঝিয়ে দিয়ে শ্রীমতী সত্যিসত্যিই এলামাসির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। ৪১
No text on this page.
এবার শ্রীমতী দড়ি-দড় কেটে সত্যি-সত্যিই সংসার সাগরে পাড়ি দিতে চলল। চারশীলাদি তাকে ধরে রাখবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না। মানুষের উপর বােধহয় তাঁর শেষ বিশ্বাসটুকুও চলে গিয়েছিল। এক গাল হাসি আর বগলে টেনিস র্যাকেট নিয়ে মিনি শ্রীমতীকে সী-অফ করতে স্টেশনে এল। এলামাসি-বেলামাসিরা আগেই নেমে গিয়েছিলেন, চারুশীলাদির সংসারের হিসাব-নিকাশ গােছগাছ করতে তাকে আরও দুদিন থেকে যেতে হল। এর মধ্যে মিলিমামি এসে একদিন তাকে রিনিমাসিমার বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে সবাই অনাবশ্যকভাবে বহ, সানাবাক্য বললেন। চারশীলাদিকে অমরেশ ড্যাম-ডেল্পট আখ্যা দিতেও কুণ্ঠা- বােধ করলেন না। কিন্তু সব শেষে তাঁরাই আবার উৎসুকভাবে পবোল্লিখিত নীল চিঠির সম্বন্ধে প্রশ্নাদিও করতে ছাড়লেন না। চিঠির প্রসঙ্গ শ্ৰীমতীর মনে এতদিনে ক্লান্তি এনে দিয়েছিল। সে সহজেই তাঁদের বলতে পারল, ও একজন মেয়ের লেখা চিঠি। তারাও মনে ভেবে নিলেন--শ্ৰীমতী আমাদের মিথ্যা কথা বলে ফাঁকি দিল। যে শ্ৰীমতী জীবনে কখনাে মিথ্যা কথা বলেনি! সন্ধ্যাবেলা একদিন মিনিও এসে ক্ষমাভিক্ষা করেছিল, শ্রীমতীর চাকরি ঘুচিয়ে দেবার অনিচ্ছক কারণ তাে সে নিজেই! হাতে রুপালী কাগজে মােড়া এক বাক্স চকোলেট; উদারভাবে বাক্সটা শ্ৰীমতীর দিকে ধরে ৪ (৬৩) ৪৩ দিয়ে মিনি বলেছিল, “বেচে গেলে শ্ৰীমতী। কবরের দরজা খুলে দিলাম, তােমার উচিত আমাকে বকশিশ দেওয়া।” শুভেন্দ, ভালাে-মন্দ কোনাে কথাই বলেনি। একবার প্রশ্নও করেনি, অনুযােগও করেনি, বলেনি, “একি শ্ৰীমতী, তােমার এতটকু ধৈর্য নেই! একটুখানি বাধা পেয়েই অমনি রণে ভঙ্গ দিলে!” উড়ে গেল শ্রীমতীর দুদিনের নীড়! ছােট শাদা শােবারঘরের উত্তরের জানলায় সবুজ কম্বলের পর্দা, পর্দা সরালেই দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়ের রেখা চোখ জুড়ে থাকত। শ্ৰীমতীর বুকের ভিতরে কি যেন সাড়া দেয়। মনে হয় জীবনে এসব ছােটখাট সংঘর্ষের কোনাে অর্থ নেই, কোনাে মূল্য নেই। শুভেন্দু যদি একবার শুধু জিগগেস করত, তবে তাকে বুঝিয়ে বলা যেত এর মধ্যে রাগ-অভিমানের কোনাে কথা নেই। আমার অন্তর যে শিকল মানে না, কেমন করে থাকি। কিন্তু, হায়, শুভেন্দ, একবারও জানতে চাইলে না। ট্রেন ছাড়বার পাঁচ মিনিট আগে শুভেন্দও স্টেশনে এসে পৌছল। এসেই মিনিকে বলল, “বাঃ! তুমি দেখছি দিব্যি ডিউটিফল হয়ে উঠেছ! তুমি স্টেশনে এসেছ শুনে আমার অলস মনকে বললাম, ছি! তােমারও কি কোনাে কর্তব্য নেই। তাই এলাম দেখতে। শ্রীমতী দেবী, কিছু ভয় নেই, নিশ্চিন্ত মনে দামােদর নদের তীরে চলে যান, আমরা এদিকে চাকরিনম্বর-gি খুজে রাখি।” কিছু বলা হয় না, ট্রেন ছেড়ে দেয়। মুখে বাড়িয়ে বহুক্ষণ পর্যন্ত দেখে মিনি ও শুভেন্দ, হাসিমুখে স্টেশনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শ্রীমতীর জীবনে আরেক অধ্যায়ের শেষ হয়। কলকাতায় এসে এলামাসির অনুরােধে শ্ৰীমতী তার বাড়িতেই উঠল। পরিচিত ঘরবাড়ি, চেনা মানুষের ভিড়। কিন্তু তব, কোথায় যেন ৪ একটা সক্ষম পরিবর্তন হয়েছে। মনের পুরাতন ভিতগুলিতেই ভাঙন ধরেছে, বুঝতে পারে। লকেট-বকেটকে সঙ্গী করে একবার রমেশ চৌধুরীর শূন্য বাড়িখানি দেখে এল। দরজা জানলা বন্ধ, সদর দরজায় তালা দেওয়া। শ্ৰীমতী জোর করে মন থেকে দুর্বলতাকে দূর করে দেয়। মানুষই যদি চলে গেল, বাড়ির আবার কোন আকর্ষণ। সারি-সারি বন্ধ জানলার দিকে তাকিযে তব, যেন হহ করে ওঠে মন। দীর্ঘ কুড়ি বছরের আকর্ষণ কি সহজে ছেড়া যায়। মাঝে-মাঝে মনে হয় লকেটও যেন বদলিয়ে গেছে। কচি মুখের সেই লাবণ্য আর নেই। জিগগেস করতে বাধে। কারাে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখে অনধিকার প্রবেশ করতে নেই। দিবারাত্র তাদের বন্ধুরা আসছে যাচ্ছে, তাদের কাবাে সঙ্গে শ্ৰীমতীর চেনাশােনা হল না। বকেট ছাদের ঘরে পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ত। শ্রীমতী তব তাকেই ডেকে নিয়ে একদিন শুভেন্দর বাড়ি গেল, লাইব্রেরি থেকে কতগুলি বই বাছাই করে নিয়ে এল। সে বাড়িতেও চাকরবাকর ছাড়া আর কেউ নেই। তারা তাে বলল শুভেন্দ, দু-চার দিনের মধ্যেই ফিরছে। কিন্তু শ্রীমতী হয়তাে তার আগেই কর্মস্থলে চলে যাবে। এলামাসির সংসার মেসিনের মতাে চলে, ঘড়ি-ধরা সেই নিয়মকানুনের মধ্যে শ্রীমতী কোনাে কাজই খুজে পায় না। মিস বিশ্বাসের চিঠি এলেই তাকে রওয়ানা হতে হবে। শুয়ে বসে এখন শুধ, সেই চিঠির অপেক্ষা করা। দার্জিলিঙ থেকে এতদিন পরে ফিরে এলামাসি তার পর্বতপ্রমাণ সংসার-কাজের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছেন। সন্ধ্যেবেলা একদিন শ্ৰীমতীকে ডেকে বললেন, “ওরে শ্রীমতী, বুড়ো না হলে বুড়াে হওয়ার দুঃখ বােঝা যায় না! জানিস, আমাকে একটু যে পরামর্শ দেবে এমন একটা লােক নেই। তাের মেশােমশাইকে তাে আর ঠিক মানুষের মধ্যে গােনা যায় না। সময় মতাে স্নানের জলটি, ঠিকমতাে খাবারটি পেলেই ৪৫ এ-সংসারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হল। একা আমি এদিকে ভেবে- ভেবে মরি।” শ্ৰীমতী উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “কেন মাসিমা, কি হয়েছে?” “এই লকেটকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল। এত যত্ন কবে লেখাপড়া শেখানাে হচ্ছে, সব দিক দিয়ে আর পাঁচটা মেয়ের যুগ্যি যাতে হয়। অথচ ওর জন্যই আমার যত অশান্তি।” এলামাসি একবার শ্রীমতীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন, চমৎকার ছেলে ঐ শুভেন্দ! বিয়ে হওয়া না-হওয়া যার যেখানে লেখা আছে। সে তাে জানা কথা, তব, চেষ্টা তাে করতে হয়। না! তাকে আমার মেয়ের পছন্দ নয়। ঐ যে অতন, বলে ছেলেটি আসে, তাকে ওর মনে ধরেছে। অথচ আমি মা হয়ে কি করে মত দিই বল? বাপ একটা কানাকড়ি রেখে যায়নি। বিধবা মা আছে, আবার একটা ছােট বােনও আছে, বিয়ে হয়নি। থাকার মধ্যে ঐ ব্যাঙ্কের চাকরিটা। কত আর পায়? শ'চারেক বড় জোর! অথচ মেয়ে কিছুতেই বুঝবে না! তুই-ই বল না, আমি মা, আমি কি ওর সুখ-দুঃখ বেশি বুঝি না? মা-বাপের মতাে হিতৈষী কে আছে বল ?” শ্ৰীমতী নীরব। এলামাসি বলে যান, “ওকে একট, বুঝিয়ে বলিস, শ্রীমতী। আমরা চিরকাল ওর ভালােটা চিন্তা করেই কাজ করি। ও সংসারের কতটুকু জানে? গরীবের ঘরে ভালােবাসাই বা টিকবে ক'দিন? ওসব চোখের ভালােবাসা। শুভেন্দুর মতাে ছেলের সঙ্গে কি তুলনা হয় ওর? তুই একট, নিরিবিলি ওকে বলিস কিন্তু।” শ্ৰীমতী ধীরে ধীরে বলল, “মাসিমা, ওর ওপর জোর করাটা কিন্তু উচিত হবে না। কুড়ি বছরের কোনাে মেয়ে নিজের সুখ-দুঃখ নিজে যতখানি বুঝবে, পৃথিবীতে আর কারাে পক্ষে তা সম্ভব নয়। ছেলেটিকে আপনার পছন্দ না হয়, এখন কিছু বলবেন না। লকেট, আসছে s বছর বি. এ. পাশ করবে, তারপর বিয়ের কথা ভাববার ঢের সময় থাকবে। দেখুন না ততদিনে ওর মত বদলায় কিনা। জোর করতে গেলেই উল্টো ফল হবে।” এলামাসি তীক্ষ দৃষ্টিতে এই সঙ্কোচহীনা মেয়েটির মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। শেষে বললেন, “কি জানি, তাের কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ওদিকে চারশীলাদি তাে নিজের আধবুড়াে মেয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। দার্জিলিঙে থাকতে কিছু, শনলি-নলি নাকি? চারশীলাদির কথা শুনে তাে মনে হত শুভেন্দ, একরকম ওঁদের বাড়িতেই দিন কাটায়। এখন খালি গাঁট- ছড়াটা বাঁধলেই হল। আমার কিন্তু বিশ্বাস হয় না। আরে, লােকে তাে ওদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে ঐ মিনিটিকে শুভেন্দর পিসিম্য ঠাওরাবে। আর যায়ই বা কেন শুভেন্দু অত ঘন-ঘন ওদের বাড়ি। কি করে সেখানে? তুই তাে সবই জানিস।” শ্ৰীমতী সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। এলামাসিও নাছােড়বান্দা। অবশেষে তাকে চারশীলাদির কথারই পুনবত্তি করতে হয়, “মিনিদি আর শুভেন্দুবাবুর এক ধরনের ইন্টারেস্ট কিনা, তাইতে দুজনের মধ্যে বেশ ভব।” এলামাসি কাষ্ঠহাসি হেসে বললেন, “চারশীলাদি তােকে তাই বুঝিয়েছেন বুঝি? আচ্ছা আহাম্মক তাে তুই। পুরষমানুষের জীবনে একটা বই দুটো ইন্টারেস্ট থাকে না। তবে হ্যাঁ সে আর তুই জানবি কি করে!” হাঁড়িমুখ করে এলামাসি গাত্রোখান করলেন। কাটল আর একটা দিন। লকেটুকে কিছু বলা হয় না। সন্ধ্যেবেলা যখন অতন, এল, শ্রীমতী তাকে একট, নজর করে দেখে নিল। সুশ্রী ছেলেটি, স্বল্পভাষী, গম্ভীর, শ্ৰীমতীর ভালাে লাগল ছেলেটিকে। লকেটের জন্য দুঃখ হয়। ভালােবাসা সত্যি হলে নিশ্চয়ই তার একটা শক্তিও থাকবে। নিজের পথ সে তাহলে নিজে কেটে দেবে, সংসারে ৪৭ কোনাে এলামাসির সাধ্য নয় তাকে ঠেকাবে। রাত্রে শুয়ে-শুয়ে শ্রীমতী ভাবে জীবনের কাছ থেকে সকলে কখনাে এক জিনিস কামনা করে না। যা নইলে একজনের জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়, আর একজনের কাছে তা অকিঞ্চিৎকর। প্রত্যেক মানুষের মনে-মনে নিজের একটা মাপকাঠি থাকে, একজনেরটা দিয়ে আর একজনের চলে না। মা-বাবা কি করে বুঝবেন মেয়ে কিসে সখী হবে ? পরদিন সকালে মিস বিশ্বাসের চিঠি এল। বেলা একটায় একটা লােকাল ট্রেন আছে, সেটা ধরাই ভালাে। পরদিন রবিবাব, সব দেখে শুনে নিতে পারবে। সােমবার থেকে কাজ আরম্ভ। যেটুকু গােছগাছ বাকি ছিল শ্রীমতী নিশ্চিন্ত মনে সেটুকু সেরে নিল। ভেবেছিল একা একাই স্টেশনে চলে যাবে, শেষ মুহূর্তে ঘণ্টা দুইযের জন্য বইখাতা তুলে রেখে বকেট তার সঙ্গ নিল। বেশ ছেলে বকেট। লােকের সামনে মূক ও বধির, একা থাকলেই মুখে খই ফোটে। শ্ৰীমতীর সঙ্গে অনর্গল বকে যেতে লাগল। অনেক আশ্বাস দিল তাকে। ভয় কি? চাকরি ভালাে না-লাগলে সে যেন নিশ্চয-নিশ্চয চলে আসে। মিস বিশ্বাসকে গােড়া থেকেই জানিয়ে দেওয়া উচিত যে চালাকি-টালাকি চলবে না। বকেটের মুখেই খবর পাওয়া গেল শুভেন্দ কাল এসে পৌচেছে, মিনিদিও। সে উঠেছে বেলামাসির বাড়িতে। প্রতিশ্রুতি দিল, ওরা সবাই দল বেধে বকেটের পরীক্ষার পরই শ্রীমতীর নতুন বাড়িতে বেড়িয়ে আসবে। সকালের গাড়িতে যাবে, সধ্যাব গাড়িতে ফিরবে। শ্রীমতী যেন খুন্তি কড়াই রেডি রাখে। শ্ৰীমতীর মনে হল বকেটের বিদায়-সম্ভাষণে কোথাও কোনাে খত নেই, সৌহদ্য দিয়ে ভরপুর। মাত্র ঘণ্টা তিনেকের পথ। দেখতে-দেখতেই যেন শেষ হয়ে গেল। ছোট s স্টেশনটিতে ট্রাঙ্ক সটকেশ বিছানা নিয়ে নেমে পড়ে শ্রীমতী ইতস্তত তাকাতে লাগল। অস্পষ্ট একট, আশা হয়তাে ছিল, কেউ আসবে স্টেশনে, বলবে, “আসন। আপনি এসেছেন বলে আমরা খুশি হয়েছি।” তাকিয়ে দেখল শুন্য স্টেশন, কয়েকটা কুলি এদিকে-সেদিকে ঘরে-ঘর করছে। তাদের কাছে শুনল স্টেশনের পিছনেই মেয়েদের স্কুল, গাড়ি লাগবে না, পাঁচ মিনিটের পথ। প্রৌঢ় স্টেশনমাস্টারও বেরিয়ে এসে নমস্কার করে জানালেন যে সকালে স্কুলের হেডমিস্ট্রেস এসে নতুন টিচারের কথা বলে গেছেন। কোনাে ভাবনা নেই, কুলিরা সব জানে। পুনরায় নমস্কার করে তিনি আবার তাঁর কুঠরির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কুলিরাই শ্ৰীমতীকে উৎসাহ দেয়, সাগ্রহে পথ- প্রদর্শকের পদ গ্রহণ করে। ছােট শহরের ছােট রাজপথ, ধুলায় ধসর। দুই ধারে ঘাস জন্মিয়ে গেছে, ধলায় ঘাসের সবুজ রঙ চেনা যায় না। পথের পাশে বাবলা গাছ, তাও ধলায় বিবর্ণ। একটু এগিয়ে গিয়ে স্কুলে যাবার পথটি যেখানে আলাদা হয়ে গিয়েছে, সেখান থেকে আর ধুলাে নেই, চারদিক শ্যামল সবুজ। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া লাল ইটের একতলা লম্বা ইস্কুল। পিছনে আমবাগান, তার ওপাশে ছােট-ছােট বাড়ি, কুলিরা বললে টিচারদের কোয়াটাস। আজ শনিবার, একটায় ছুটি হয়ে গিয়েছে, স্কুলবাড়িটা তালামারা। স্কুলবাড়ি ঘরে কুলিরা আমবাগানের দিকে চলল। কোথাও শ্রীমতী জনমানুষের সাড়া পেল না। বেলা সাড়ে-চারটের শুকনাে রােদে কেউ বাইরে নেই। কুলিরা মনে হল সর্বজ্ঞ, তারা ঠিক চিনে নির্দিষ্ট ঘরের সামনে এসে বিছানা-বাক্স নামাল। পরিষ্কার, পরিপাটি, প্রাণহীন। গাছপালার বাহুল্য নেই, কাটছাঁটা চারদিক। সামনে সর, বারান্দা, একটা বড় ঘর, একটা ছােট ঘর, একটা গানের ঘর। সব দূরজা জানলা খােলা, ঘরের লাল মেঝেতে রােদ লুটিয়ে পড়েছে। ? } বড় ঘরে কুলিরা জিনিসপত্র নামিয়ে রেখে, পয়সা গুনে নিয়ে বিদায় নিল। কিন্তু নির্বান্ধব শ্ৰীমতীকে একেবারে ত্যাগ করে গেল না, যাবার সময়, মিস বিশ্বাসকে খবর দিয়ে গেল। স্নানের ঘরে বালতি করে জল রাখা ছিল, শ্ৰীমতী হাতমুখ ধুয়ে ক্লান্তি দূর করল। প্রথমেই সদর দরজা ছাড়া আর সব দরজা বন্ধ করে নিজের চারদিকে একটা আৱ, রচনা করতে চেষ্টা করছিল। মনে করল পরে হাতুড়ি পেরেক যােগাড় করে সব দরজা জানলাতে সবুজ পর্দা- গুলি ঝুলিয়ে দেবে, দেয়ালে দু'-একখানি ছবি টানিয়ে দেবে। আসবাবের বাহুল্য না-থাকলেও ঘরগুলি একেবারে শূন্য নয়। বড় ঘরে একটা তক্তপােশ রয়েছে, জলচৌকি আছে, আলন আছে। সব সস্তা কাঠের তৈরি কিন্তু কুশ্রী বলা চলে না। ছােট ঘরে এমন কি ছােট একটি টেবিল, দুখানা চেয়ার, একটা ডেক-চেয়ার পর্যন্ত আছে, আর একটা দেয়াল-আলমারি। যায় থেকে ছােট একটি আরশি বের করে জানলার উপর রেখে সংক্ষেপে প্রসাধন সেরে নিল শ্রীমতী। বিছানা খুলে তক্তপােশের উপর পরিপাটি করে পেতে রাখল। কোমল সবুজ আচ্ছাদনটি ঐটুকুতেই ঘরের শােভা যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্দাগুলি এই মুহর্তে কোন কাজে লাগবে না, তাই দুখানি সবুজ টেবিলের চাদর বের করে শ্রীমতী টেবিল আর জলচৌকিটা ঢেকে দিল। দরজার কাছে শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখে অতিশয় শীর্ণকায়া এক মহিলা-যৌবন গেছে, বিরল হয়ে এসেছে মাথার চুল—এক হাতে পেয়ালা-পিরিচ, অপর হাতে ছােট একটা চা-দানি নিয়ে ইতস্তত করছেন। খুশি হয়ে তাঁকে ঘরে ডেকে আনল শ্রীমতী। অপরিচিতার জন্য মনে করে নিজের হাতে তৈরি চা এনেছেন, কৃতজ্ঞ না-হয়ে পারা যায় না। মহিলা চেয়ারের কিনারায় সােজা হয়ে বসলেন, শুকনাে মরে ৫০ গলায় বললেন, “বা, ঘরটির একেবারে চেহারা ফিরিয়ে দিয়েছেন যে। এ-ঘর যে এমন হতে পারে সবিতা থাকতে কে বলতে পারত।” শ্ৰীমতী জিগগেস করলে, “আপনিই কি মিস বিশ্বাস ?” মহিলা জিব কেটে সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, “না, না, আমি মিস বিশ্বাস নই। মিস বিশ্বাস সন্ধেবেলা আসবেন। আমার নাম সুবর্ণ অধিকারী, স্কুলের নিচের ক্লাশে বাংলা আর ইতিহাস পড়াই। আবার টিচারদের খাওয়া-দাওয়ার দেখা-শোনাও করি। সবিতা ঘােষ ছিল এখানে আর এক টিচার, তার জায়গাতেই আপনি এলেন।” চা খেতে-খেতে মিসেস অধিকারীর মুখে অনেক কথা জানা হয়ে গেল। বােডিং খােলার কথা আছে দু’বছর বাদে, তখন এ-ব্যবস্থা উঠে যাবে। সুবৰ্ণ দেবীকে আর খাওয়া-দাওয়ার তদারক করতে হবে না। এখন এগারােজন টিচার স্কুলের কম্পাউণ্ডে নিজের-নিজের বাড়িতে বাস করেন, কিন্তু রান্নাবান্না হয় একসঙ্গে, মিসেস অধিকারীর বাড়ির সংলগ্ন বড় রান্নাঘরে। চাকর রয়েছে কয়েকটি, তাছাড়া তিনটে ঝি, ফাইফরমাস খাটার জন্য ছােকরা চাকর আর দরওয়ান। স্কুল কর্তৃপক্ষই তাদের ব্যয় নির্বাহ করেন। চাকররাই ঘর পরিষ্কার করে, টিউবওয়েল থেকে জল বয়ে এনে স্নানের ঘরে দিয়ে যায়। তবে রান্নার লােকের মাইনে আর নিজেদের খাওয়ার খরচ টিচাররাই চাঁদা করে চালিয়ে থাকেন। শ্ৰীমতী যেন না ঘাবড়ায়, তাকে টাকাটি গুণে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে হবে না। অবশ্য একটা জলের কুজো, দুখানা কাঁচের গেলাশ, পেয়ালা পিরিচ প্লেট চামচ ইত্যাদি কিছু-কিছু জিনিস এখন তাকে কিনে নিতে হবে। ও হ্যাঁ, আর একটি ঝাঁটা ও গােটা দুই ঝাড়ন। নইলে চাকরদের অসুবিধা হয়। রান্নাঘরের টিফিন-ক্যারিয়ারে করে যথাসময়ে খাবার পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অন্য জিনিসপত্রগুলিও মিসেস অধিকারীকে টাকা দিলে তিনি কিনে দিতে পারেন। শুনে শ্ৰীমতীর আম লাগে। “সবই নিজের-নিজের বাড়িতে বসেই হয়ে যাবে কাল সঙ্গে কারাে দেখাশুনাও কি হয় না এখানে। বাড়ির জন্য মন কেমন করে না ওদের কারাে ?” মিসেস অধিকারী উঠে পড়েন। বলেন, “বাড়ি আবার কোথায়? এই তাে বাড়ি। এখনাে ছেলেমানুষ আছেন বলে ও-কথা বলছেন। নিজের রােজগারের চালাঘর আর শাকভাতই সব চেয়ে ভালো। শ্রীমতীকে বুঝি বাপ-মা ভাই-বােন বাড়ি-ঘর ছেড়ে আসতে হয়েছে?” শ্ৰীমতী ব্যস্ত হয়ে বলে, “না, না, আমারও এখানেই বাড়ি-ঘর হবে, আমারও নিজের মানুষ নেই, বাড়িও নেই। তবে একা-একা কি আর বাড়ি হয়, তাই বলছিলাম।” মিসেস অধিকারী বললেন, “একা থেকে শান্তিতে থাকাই সব থেকে ভালাে, আরেকটু বয়স হােক, বুঝবেন।” সুবর্ণ অধিকারী চলে গেলে শ্রীমতী কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে থাকে। তারপর স্নানের ঘর থেকে চায়ের সরঞ্জাম ধুয়ে দেয়াল-আলমারিতে তুলে রাখে, রাত্রে ঝি এসে নিয়ে যাবে। বাইরের প্রখর রৌদ্র নিস্তেজ হয়ে এসেছে। এরই মধ্যে শ্রীমতী দেয়ালে দু-একটা পেরেক আবিষ্কার করে ফেলে। রঙিন ফুলের ছবি দেওয়া একটা ক্যালেণ্ডার সেখানে ঝুলিয়ে দেয়, তাকে দু-চারখানা বই সাজিয়ে রাখে। হলদে রঙের পােড়া মাটির ঘটিতে জল ভরে বাইরে থেকে আমের সবুজ পল্লব এনে সাজিয়ে রাখে। টেবিলের উপর বসিয়ে দেয় প্রিয় কালাে ঘড়িটাকে। কাজ শেষ হলে ডেক-চেয়ারে বসে নিজের ঘরের শােভা নিজেই দেখে। ভাবে-বাড়ি। বাড়ি কাকে বলে? ইট কাঠের দেয়াল দিয়ে কি বাড়ি তৈরি হয়? তবে তাে রেল-স্টেসনও বাড়ি হত। হয় কেন? ভাবতে চেষ্টা করে এই তাে আমার বাড়ি। গর্বে বুক ফুলে ওঠে, মনে মনে বলে, আমি নিজে অর্থ উপার্জন করে এই আমার বাড়িটিকে সুন্দর করে রাখব। চেয়ারে কুশন পাতব। কে বসবে? কেন, এগারােজন টিচার আছে, তারা? আমি ছাড়া আরও দশজন। আমার দশজন বন্ধ। তারা সবাই বসবে। আজ আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি, কাল সকালে সকলের সঙ্গে আলাপ করে আসব। কিন্তু তারা এল না কেন? সে নতুন এসেছে, তাকে দেখার কৌতুহলও কি নেই? হয়তাে তারাও ক্লান্ত, বেলা একটা অবধি কুল পড়িয়ে ক্লান্ত। এমনি করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সন্ধ্যায় মিস বিশ্বাস এলেন, বারান্দা থেকে তীক্ষাকণ্ঠে ডাকলেন, “মিস চৌধুরী! আসব ভিতরে?” মেমেদের মতাে গলা, মেমরা বাংলা বললে যেমন শােনায়। “একি অন্ধকার কেন? মন খারাপ করছেন বুঝি? আমরা হলাম কাজের মানুষ, মন খারাপের আমাদের সময় কোথায় ? উঠে পড়ুন, উঠে পড়ন।” বসে-বসে শ্ৰীমতীর তন্দ্রা আসছিল, সচকিত হয়ে উঠে সে তাড়াতাড়ি আলাে জালিয়ে দিল, অপ্রতিভভাবে মিস বিশ্বাসকে অভিবাদন করে বসাল। দোহারা ফর্সা মানুষটি, বছর পঞ্চাশেক বয়স হবে, সবে, সচতুরা, আধুনিকা। কানে মক্কোর টপ, গলায় সােনার ক্রস ঝলছে, হাত ঘড়ি, হ্যান্ড ব্যাগ, টর্চ। মিস বিশ্বাস বেলামাসিদের কুশল প্রশ্ন করেন। সহপাঠিনী তাঁরা, পুরােনাে বন্ধু। বন্ধুর কথায় গলা একটু কোমল হয়ে আসে। “আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে না তাে মিস চৌধুরী? অসুবিধা হলেই আমাকে বলবেন। সুবর্ণ এসে চা দিয়ে গেছে? এখানকার সব বন্দোবস্ত শুনলেন তাে? সবর্ণ বেশ ভালােই চালায়, ভারি সুগহিনী, তবে কিনা টাকা-পয়সা বেশি ওর হাতে না-দেওয়াই ভালাে। কিন্তু ওর সঙ্গে সবাই আমরা ভালাে ব্যবহারই করে থাকি, জীবনে বেচারী দুঃখও পেয়েছে অনেক। স্বামী নেয় না, ছেলেপুলে নেই। ফলে মেজাজটা কি রকম তিতিয়ে গেছে। ওর কথা শুনে আবার মন-টন খারাপ করবেন না যেন।”
ঘর সাজানাে দেখে মিস বিশ্বাস খুব খুশি। বলেন, “এসব কাজের চেয়ে বিয়ে-থা করে আরামে থাকলেই আপনার ভালাে হত না কি? দিব্যি আরেকজনের উপার্জন দিয়ে নির্বিবাদে জীবনটা কাটাতে পারতেন।” শ্ৰীমতী প্রবল আপত্তি জানায়। তার কাজকর্মের কথা জিগগেস করে। মিস বিশ্বাস সব বুঝিয়ে বলেন, কাজ তেমন বেশি না, আবার নেহাত কম বললেও ভুল হবে। উপরের ক্লাশে তাকে অঙ্ক শেখাতে হবে আর সেই সঙ্গে বাংলা পড়াতে হবে। প্রতিটি কথা সে মন দিয়ে শােনে, কিছুতেই কাজের এটি ঘটতে দেবে না। রাত হয়ে আসে, মিস বিশ্বাস বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। জানিয়ে গেলেন জায়গাটা নির্জন হলেও নিতান্ত মরভূমি ন্য। দামােদরের তীরভূমি ভারি সুন্দর। শহরে কয়েকজন অতিশয় সজ্জন বাসিন্দাও আছেন। মহিলা সমিতি, লাইব্রেরী, শিশুমঙ্গল প্রতিষ্ঠান, সবই আছে। শ্রীমতীকেও সে-সব কিছুর ভাগ নিতে হবে। শ্ৰীমতীর ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। দাদাবাব, এত কাজের কথা শুনলে কত খুশি হতেন। মিস বিশ্বাস চলে গেলে অনেকক্ষণ তেমনি বসে রইল শ্ৰীমতী। দাদাবাব, কোথায় গেলেন? দেহের সঙ্গে সব শেষ হয়ে যায়? কোথাও তিনি নেই? যদি কোথাও থাকেন তব, কেমন করে শ্রীমতীকে তিনি স্মরণ করবেন। তাঁর কাছেই সে শিখেছে স্মৃতির আধার হল মানুষের মন্তিক। সে তাে পড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর শ্রীমতীকে তিনি স্মরণ করবেন কি দিয়ে ? ঝি এসে টিফিন-ক্যারিয়ারে খাবার, সঙ্গে নতুন সব বাসনপত্র দিয়ে গেল। চাকর এসে কুজো ভরে জল দিয়ে গেল। জীবনে এই প্রথম একাকিনী এক বাড়িতে তাকে রাত্রিযাপন করতে ৫;
পরদিন রবিবার। ঘুম ভেঙে চোখ মেলেই শ্রীমতীর মনে পড়ে সে একা। জনহীন কোনাে দ্বীপে বাস করতে এসেছে। কোথায় যেন পড়েছিল, মানুষের হৃদয়ের চতুর্দিকে নীল জলরাশি বেষ্টন করে আছে। সবাই আমরা সেই জলে ঘেরা দ্বীপ। কখনাে দক্ষিণ বাতাসে আর এক দ্বীপের খবর যদি এসে পৌছয় সে বড় সৌভাগ্য। শ্ৰীমতী উঠে পড়ে আগের দিনের তােলা ঠাণ্ডা জলে স্নান সেরে নেয়। সময়মতাে চা-টোস্ট এসে পৌঁছয়। ক্রমে সকলের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। মিস বিশ্বাস সঙ্গে করে তাকে সেক্রেটারির বাড়িতেও নিয়ে গেলেন। স্থানীয় কোনাে উচ্চপদস্থ সরকারী চাকুরের শিক্ষিতা পত্নী। অতিথি-সৎকারে তিনি সক্ষা। শ্ৰীমতীকে আদর করে বসালেন, উপদেশ বর্ষণও করলেন কিছু-কিছু। এখানে নাকি দু-একজন ছাড়া কোনাে টিচার বেশিদিন থাকে না। ছােট শহরে মন বসে না হয়তাে। আমােদ-প্রমােদের হয়তাে ঘাটতি এখানে। কাজে অনুরাগ আসলে ক’জনেরই বা থাকে। শ্ৰীমতী মনে- মনে সঙ্কল্প করল : আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ করব। দুপুরে আহারান্তে শ্রীমতী এলামাসি বেলামাসিকে চিঠি লিখতে বসে। কোথাও কোনাে এটি রাখতে ভালাে লাগে না, তাই চারশীলাদিকেও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ছােট একখানি পত্র লিখতে হল। তারপর বহুক্ষণ কলম ধরে নিশ্চলভাবে বসে থেকে অনেক কষ্টে আরেকখানা চিঠিও সে লিখে ফেলল। ভাষা খুজে পায় না, মনের কথাটা গুছিয়ে বলতে হিমশিম লাগে। অপরিচিতা মাকে কেমন করে চিঠি লিখতে হয় জানে । মা বলে ডাকতে সংকোচ লাগে, সম্বােধন লেখে কেবল শ্রীচরণেষ ভাবে ‘তুমি’ লিখবে না ‘আপনি লিখবে? ‘তুমি’ বলাই ভালাে। লেখে, ‘তুমি শুনে সুখী হবে আমি বাস্তবিক আশ্রয়হীনা নই। আমার চাকরি আছে, থাকবার বাড়ি আছে। আমার জন্য চিন্তা কোরাে না। তুমি যেতে বলেছিলে বলে হদয় আমার কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ৫৫
No text on this page.
যা ছিল নতুন, দুদিন পরে সেই হয়ে দাঁড়াল পুরােনাে। শ্রীমতী ঘুম থেকে উঠে ঠাণ্ডা জলে স্নান সেরে নেয়। ছােট বাড়িখানিকে গুছিয়ে রেখে, মিস বিশ্বাসের পরামর্শ অনুসারে দরজায় তালা লাগায়। তারপর সাড়ে-দশটার সময় স্কুলের বড় হলঘরে গিয়ে অন্যান্য শিক্ষয়িত্রীদের সঙ্গে একত্র সার বেধে দাঁড়ায়। সামনে সারি-সারি দাঁড়িয়ে মেয়েরা। পরিপাটি করে বেণী-বাঁধা চুল, পিন দিয়ে আটা শাদা শাড়ি-নইলে মিস বিশ্বাস অসন্তুষ্ট হবেন। তেল চকচকে মুখ, নির্বিকার ভাবলেশহীন জোড়-জোড়া চোখ, শাসাসিধে বাঙালী ঘরের মেয়ে। সরল মন কৌতুহলে ভরা। সেই সার বেধে দাঁড়িয়ে প্রত্যহ কোনাে এক নৈব্যক্তিক ভগবানকে উদ্দেশ্য করে, অতি দ্রুত উচ্চারণে গুটি কতক নৈব্যক্তিক প্রার্থনা তাদের জানাতে হয়। অটট উৎসাহ মিস বিশ্বাসের। স্বয়ং ভগবানকে ধরে-বেধে, গড়ে-পিটে, সকল ধর্মের ও সকল মতের পক্ষে গ্রহণীয় করতে পেরে প্রার্থনার সময় তাঁর মুখে একটা গভীর প্রশান্তি বিরাজ করে। প্রার্থনার শেষ কথা ক’টি উচ্চারণ করেই, তিনি পাশের টেবিলে রাখা ছােট ঘণ্টাটি টিপে দেন, একই নিশ্বাসে বিশদ্ধে ইংরিজিতে মেয়েদের ক্লাশে যেতে আদেশ করেন। সঙ্গে-সঙ্গে স্কুলের কাজ শ, হয়ে যায়। শ্ৰীমতী মনে-মনে মিস বিশ্বাসের কর্তব্যপরায়ণতাকে শ্রদ্ধা করত, ৫৭ ভাবত কুড়ি বছরেও আমি অমনটি হব না। এমন কোন সমস্যার কথাই সে কল্পনা করতে পারে না যার কাছে মিস বিশ্বাস পরাস্ত হবেন। মেয়েরা শ্ৰীমতীকে ভালােবেসে ফেলেছিল। তার চুল বাঁধা, তার কাপড় পরা, তার কথা বলার ধরন মেয়েরা সবাই অনুকরণ করত। রােজ তাকে গােলাপ 'কি গন্ধরাজ ফুল উপহার এনে দিত—সেগুলির বন্ত এত ছােট যে ফুলদানিতে রাখা যেত না, কিন্তু শ্ৰীমতী সে-কথা উল্লেখ করতেও লজ্জা বােধ করত। মেয়েরা শ্ৰীমতীর ক্লাশে মনোেযােগ দিয়ে তার পড়ানাে শােনে, বিদ্যায় অনুরাগ ছিল বলে নয়, শ্ৰীমতীকে ভালাে লেগেছিল বলে। অন্যান্য টিচারদের সঙ্গে তার দুদণ্ডের দেখাশােনা হত কি হত না। দিনের পর দিন সে একা ঘরে খায়, একাকী বাস করে। টিচাররা প্রায় সবাই তার বয়ােজেষ্ঠা, শ্ৰীমতীকে একটু সন্দেহের চোখে দেখা তাঁদের পক্ষে স্বাভাবিক। মিস বিশ্বাস মাঝে-মাঝে কোমল ঘরে তাকে সতর্ক করে দিতেন—“দেখবেন মিস চৌধুরী, মেয়েদের সঙ্গে বেশি মেলা- মেশা করবেন না, তাতে ডিসিপ্লিন থাকে না। হাসি গল্পের অত প্রশ্রয় দেবেন না যেন, ওতে মােরাল খারাপ হয়ে যায়। শেষটা আর মানবে না দেখবেন।” একদিন বললেন, “মেয়েরা অত ফল দেয় কেন আপনাকে? বারণ করে দেবেন, অন্য টিচারদের মনে একটা বিদ্বেষ জন্মাতে পারে। ওদের বাড়ি-টাড়ি না গেলেই ভালাে। ওরা হল অল- টাউনের মেয়ে, ওদের হালচালই আলাদা, আমাদের মতাে যারা করে খাই, আমাদের ওরা কখনাে বেশি শ্রদ্ধা করে না। অন্তত ওদের বাড়ির লােকেরা করে না। বহুদিন টিচারি করে এটকু শিখেছি। লেখাপড়ার জন্য ওরা সত্যি কেয়ার করে না কিছু। তবে বিয়ের জন্য দরকার হয় খানিকটা, তাই কুলে আসে। সতর্ক হয়ে চলবেন। নিজের মান নিজের হাতে, মনে রাখবেন।” ৫৪ সতর্ক হয়ে চলবে শ্রীমতী? সকালে উঠে জানলা খুলে পর্দা সরিয়ে নীল আকাশে সূর্যের আলো দেখলে শ্রীমতীর প্রাণ এখনাে নেচে ওঠে। এখনাে তার রােমাঞ্চ হয় নিমের শাদা ফল ঘরে উড়ে এলে। শালিখের ডাক শুনতে-শুনতে উদাস হয়ে যায়। সতর্ক হওয়া কি তার পকে সহজ? স্কুলের শেষে বিকেলে এক-একদিন হাতমুখ ধুয়ে, জলখাবার খেয়ে, পরিষ্কার একখানি শাড়ি পরে শ্রীমতী ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায়। মিস পাল আর মিস নাগও তাঁদের বাড়ি থেকে বেড়াতে বেরােন, পথে সাক্ষাৎ হয় তিনজনের। হয়তাে সাহস করে নদীর দিকেও বেড়াতে যান কোনােদিন। নদী পর্যন্ত যান না, যদি দুষ্ট লোেক কিছু বলে। বলা কিছু আশ্চর্যও নয়! গেল বছরের আগের বছর কে একটা বাজে লােক স্বয়ং মিস বিশ্বাসের পেছ, নিয়েছিল! লােকটার সাহস ভেবে শ্ৰীমতীর অবাক লাগে। যদি মিস বিশ্বাস কিছু বলতেন তাকে, যদি খব বকতেন ? মিস নাগ আর মিস পাল চোখ কপালে তুলে বলেন, “কক্ষনাে কথা বলতে নেই রাস্তার ললাকের সঙ্গে। কোন সুযোেগে কি করবে তার কি ঠিক আছে ? কখনাে একা বেরােবেন না, জানেন তাে সাবধানের মার নেই।” ফেবার পথে দরজাব কাছ থেকেই তাঁরা বিদায় নেন, শ্রীমতীর শত অনুরােধেও ভিতরে এসে বসেন না। না, রাত হয়ে গেছে, সাড়ে-ছটা বেজে গেছে, কাজকর্ম আছে। আলাে জেলে, সবুজ পর্দায় ঘেরা স্নিগ্ধ ছায়াময় ঘরখানিতে শ্রীমতী একা-একা বসে থাকে। মেয়েদের টাস্কের খাতাগুলি দেখে রাখে, পরিপাটি করে লাল-নীল পেনসিল দিয়ে কাটাকুটি করে, তখন আবার একট, মায়া লাগে, বেশি করে নম্বর দিয়ে দেয়। যথাসময়ে টিফিন-ক্যারিয়ারে ভরে রান্নাঘর থেকে খাবার আসে, } ৫১ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ভালাে রান্না। ভালােই লাগে শ্ৰীমতীর। ভালাে লাগবার আশ্চর্য ক্ষমতা তার। কাজকর্ম সেরে, খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে শ্ৰীমতী নিজের ঘােট বারান্দাটিতে চেয়ার টেনে বসে। মাঝে-মাঝে রান্নাঘরের ঝি-চাকরেরা কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে তাকে দেখে একটু দাঁড়ায়, দুটো কথা বলে যায়! শ্রীমতী ভাবে আমার যদি সমবয়সী কেউ থাকত, এখানে বসে আমার সঙ্গে সে কথা বলত। মিস সেন প্রায় তার সমবয়সী, কিন্তু কেন যেন শ্ৰীমতীকে তাঁর ভালাে লাগে না। কখনাে শ্ৰীমতীর বাড়িতে আসেন না তিনি। শ্রীমতী ভাবে একদিন নিজেই তাঁর বাড়ি গেলে কেমন হয় ? খুশি হয়ে শ্রীমতী শুয়ে পড়ে। পরদিন কিন্তু প্রার্থনার আগে মিস সেন আর কিছুতেই শ্ৰীমতীর দিকে দৃষ্টিপাত করেন না। চিঠির তাড়া হাতে করে মিস বিশ্বাস প্রবেশ করলেন একটু পরেই। অপঠিত চিঠির একটা মনােরম শিহরণ আছে, জীবনে সে এই প্রথম অনুভব করল। “এই নিন মিস সেন আপনার চিঠি, মিস পাল, মিসেস অধিকারী, মিসেস মুখাজি এইসব আপনাদের পােস্টকার্ড। মিস চৌধুরী, আপনার যে একেবারে এক সঙ্গে তিনখানি চিঠি। লাকি গাল। চিঠি নিয়ে শ্রীমতী মিস সেনের কাছ ঘেষে যায়, তিনি সরে দাঁড়ান। সময় নেই, যে-যার ক্লাশে চলে যান, বন্ধুত্ব পাতানাে আর হয় না। অবসর সময়ে ফাঁক পেয়ে শ্রীমতী চিঠি খুলন্স। লকেট লিখেছে, “আমরা ছ'সাতজন রবিবারে তােমার অতিথি হব, শ্ৰীমতীদি। আমার গরি মন খারাপ। ইতি।” দ্বিতীয় চিঠি লিখেছেন স্কুলের সেক্রেটারি : প্রিয় মিস চৌধুরী, আগামী শনিবার আপনি আমাদের সঙ্গে চা খেলে সখী হব। আমার মেয়েরও একান্ত ইচ্ছা আপনি আসেন... ইত্যাদি।
হাতের লেখা থেকেই চিনতে পারে শেষ চিঠিখানি কার। “কল্যাণীয়াস, তােমার প্রতি আমার কোনাে কর্তব্য নেই, সে-কথা মেনে নিলাম। আমার প্রতিও তােমার কি কোনাে কর্তব্য নেই? আমার এখন প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স হল, মাঝে-মাঝে বড় নিঃসঙ্গ বােধ করি, স্বাস্থ্যও খুব ভালাে নয়। তুমি আমার একমাত্র নিকট আত্মীয়া, তােমার সঙ্গ চাওয়া কি আমার পক্ষে অস্বাভাবিক? তােমার জীবন তুমি গুছিয়ে নিয়েছ, তুমি সুখী হও আশীর্বাদ করি। কিন্তু আগামী গ্রীষ্মের ছুটিটা যদি আমার কাছে কাটিয়ে যাও, তােমার মাকে তুমি কত সুখী করবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। ইতি— কোথায় যেন ব্যথা বাজে। শ্রীমতীর চোখের দৃষ্টি এমন করে ঝাপসা হয়ে আসে কেন? একবার সে কাছে গেলেই যে খুশি হয়, কেমন করে শ্ৰীমতী তাকে প্রত্যাখ্যান করবে? এই পথিবীতে দাদাবাব, ছাড়া কাকে সে সুখী করেছে? দাদাবাবুরও চলে যেত তাকে ছাড়া, তাকে তাঁর সত্যিকারের প্রয়ােজন তাে ছিল না। কিন্তু শ্ৰীমতীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই দাদাবাবুর চিত্ত আনন্দে ভরপুর হয়ে যেত। এখন আর কে খুশি হয়? দাদাবাব, বলতেন, “মরে গেলে একেবারে শেষ হয়ে যায় রে। আরেকটা জীবন আছে সেখানে এখানকার সব ফাঁকি-ফাঁকা ভরে যায় একথা বিশ্বাস করিস না। ওসব উইশফল, থিঙ্কিং। কিছু নেই, কিছু নেই, চোখ বুজলেই সব শেষ। কেউ যদি বলে তুমি এস, তুমি আমার চোখের সামনে দাঁড়ালেও আমার আনন্দ, শ্রীমতী তাহলে কি বলবে? তার সমস্ত অন্তরাত্মা তখুনি যে পরাজয় স্বীকার করে বসে। লকেটকে তৎক্ষণাৎ লিখে দিল, নিশ্চয় আসবে, একদিন কেন, যতবার খুশি। সকালের ট্রেনে এস, দুপুরে দামােদরের স্রোতে স্নান করতে পারবে, আমি মিস বিশ্বাসকে বলেছি, তােমাদের জন্য রাজভােগ তৈরি করে রাখব। সারাদিন থেকে বিকেলে চা খেয়ে, ছটার ট্রেনে তােমরা } ০ কলকাতা ফিরে যেও। মিস বিশ্বাস লিখতে বলেছেন এলামাসিও যেন নিশ্চয় আসেন। সেক্রেটারিকেও সহজ উত্তর পাঠানাে হল, একদিন পরে, মিস বিশ্বাসের অনুমতি নিয়ে। মিস বিশ্বাসের উৎসাহ যেন টগবগ করে ফুটে ওঠে : “সেক্রেটারির বাড়ি যাবেন বৈকি। ওটা হল একটা প্রিভিলেজ। বুঝলেন মিস চৌধুরী, কতগুলি ডিউটি আর কতকগুলি প্রিভিলেজ এই নিয়েই জীবন আমাদের।” এমন সারগর্ভ উপদেশ দান করে মিস বিশ্বাসের মন খুশি হয়ে যায়। তবে যাবার সময়ে মিস চৌধুরী যেন দরওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে যান। কখনাে কোথাও একা যেতে নেই। তৃতীয় চিঠির উত্তর দেওয়াই কঠিন। কত কথার ভিড়ে তার কণ্ঠরােধ হয়ে আসে, কিন্তু লিখতে গিয়ে কলম সরে না। শেষ পর্যন্ত সে ছােট একটি স্বীকৃতি শুধু জানাল : শ্রীচরণেষু, গ্রীষ্মের ছুটিতে তােমার কাছে যাব। মা'র কাছে যাব, আমি মা'র কাছে যাব। এত উত্তেজনা কোনােদিন সে বােধ করেনি। কলম হাতে দেয়ালের দিকে দৃষ্টিহীন চোখে তাকিয়ে বহুক্ষণ সে বসে রইল। শনিবার বিকেল সাড়ে-চারটার সময়ে ফিকে নীল সুতির শাড়ি পরে, দরওয়ান সঙ্গে নিয়ে শ্রীমতী ধলােভরা পথ ভেঙে, সেক্রেটারির বাড়িতে গেল। সেক্রেটারি মহাশয়া স্বামী আর কন্যাকে নিয়ে গাড়িবারান্দাতেই অপেক্ষা করছিলেন, অভিবাদন করে ঘরে নিয়ে বসালেন। ঘরের দেয়ালে সারিসারি বিলিতী ছবি টাঙানাে, কোণে কোণে পিতলের পাত্রে লতাগুল্ম। নীল গদি-মােড় চেয়ারে বসে, মিহি সুশ্রী পেয়ালাতে চা পান করতে-করতে চায়ুশীলা-মাসিমার কথা মনে পড়ে। চারুশীলা- মাসিমা কিন্তু তার চিঠির উত্তর দেননি।
সেক্রেটারি মহাশয়ার স্বামী কেকস্ট্যান্ড কাছে টেনে নিয়ে গদি দেওয়া নিচু মােড়াতে বসলেন। স্বামী-স্ত্রী দু'জনইে শ্ৰীমতীকে কুল এবং স্কুল পরিচালনা সম্বন্ধে শত-শত প্রশ্ন করলেন। তার সারমর্ম এই যে শ্রীমতী ছেলেমানুষ, সে উপলদ্ধি না করলেও, মিস বিশ্বাস সুবিধার লােক নন। হেডমিসট্রেস হওয়া কি সােজা কথা? তার জন্য একটা ব্যাকগ্রাউণ্ড চাই, শুধ, ইংরিজি বুলি দিয়ে সেটা হয় না। তা ছাড়া হেডমিসট্রেস হতে হলে পাঁচজনের পরামর্শ নিয়ে সেই মতাে তিনি কাজ করবেন, সব সময় কেবল নিজের বিচার বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে থাকাটা খুব বাঞ্ছনীয় নয়। শ্ৰীমতীর কি মনে হয়? কি আর মনে হবে তার! সে আশ্চর্য হয়ে শােনে। বারবার মিস বিশ্বাসের কর্মকুশলতার প্রশংসা করতে চেষ্টা করে। তাঁরা সেদিকে দকপাত করেন না। কথায়-কথায় অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ জানতে চান শ্ৰীমতীর কাছে। মিস বিশ্বাসের সঙ্গে কোথায় তার পরিচয় ? কে তার অভিভাবক? রমেশ চৌধুরীর নাম শুনে কিছুটা তাঁরা প্রসন্ন হলেন। রমেশ চৌধুরীকে কে না জানে? শ্রীমতীর মনের ব্যাকগ্রাউণ্ডে তার সুশ্রী, সঙ্গীহীনা মা বুঝি মুখ টিপে হাসলেন। অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে শ্রীমতী ফিবে এল। আলাে জালাল না, বাইরে বসল না, ইচ্ছা করল না বই পড়ে কি খাতা দেখে। অনেকক্ষণ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকল। উঠল সেই চাকর যখন খাবার নিয়ে এল তখন। আলো জেলে, হাতমুখে জল দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিল। তারপর পিক,উইক পেপার্স নিয়ে খানিকক্ষণ পড়ার চেষ্টা করে অধিক রাত্রে অবশেষে ঘুমাতে গেল। কাল ওরা ছ'সাতজন আসবে। ভুলে গেলে চলবে না। স্টেশন থেকে মিস বিশ্বাস আর শ্রীমতী দুজনে অতিথিদের নিয়ে এলেন। এলামাসি, বেলামাসি, লকেট, বকেট-পরীক্ষার বেড়ি থেকে তার পা খসে গেছে—অতুল, মিনি আর শুভেন্দ।
মিস বিশ্বাস প্রথমে তাদের নিয়ে গেলেন নিজের সুপ্রশস্ত সুসজ্জিত বসবার ঘরে, বসিয়ে চা আর গরম নিমকি খাওয়ালেন। তারপর স্কুল, স্কুলের বাগান, বাগানের পাশে টিচারদের ছােট-ছােট বাড়ি একে-একে সব দেখানাে শেষ হলে অবশেষে অতিথিরা শ্রীমতীর বাড়ি পৌঁছলেন। দুপরে শ্রীমতীর বারান্দায় নিমগাছের ছায়া পড়ে, নিমফুলে ছেয়ে থাকে বারান্দাটি। সেখানে সবুজ গালচে পেতে দিল শ্রীমতী। বসবার ঘরে ফল সাজিয়ে রেখেছিল অতিথিদের জন্য। এলামাসি বেলামাসির বসা হয় না, মিস বিশ্বাস তাঁদের ধরে নিয়ে যান। বাকিরা শ্ৰীমতীর কুশলপ্রশ্ন করে, কি-কাজ, কেমন কাজ, সেক্রেটারি খুব রুপসী কিনা, মিস বিশ্বাস কি বিষম অত্যাচারী? শ্ৰীমতী হাসিমুখে উত্তর যােগায়। মিনি শুনে বলে, “গ্রেশাস, শ্ৰীমতী! আউট অফ দি ফ্রাইংপ্যান, ইন্ট দি ফায়ার! মা'র চেয়ে মিস বিশ্বাস কোন দিক দিয়ে ভালাে বল দিকিনি?” এতক্ষণ পরে শুভেন্দ, ঠোঁট খুলল, “অন্তত শ্ৰীমতীদেবীর চিঠিপত্র- গুলি নিরাপদ আছে তাে?” দার্জিলিঙের সেই নীল চিঠির কথা কেউ ভুলতে পারেনি। লকেট, বকেট, অতুল সবাই জানতে চায় সেই নীল চিঠির রহস্য। পুতুল মামার বাড়ি গেছে, সেখানে কে এক সােত্র আছে। মামী অতিশয় চতুমা, হয়তাে শিগগিরই বিয়ের বাদ্যি বাজবে। মিনিদির খবরের কাগজের চাকরিটি নেই। একমাসের ছুটি নিয়ে, তিন মাস সে আপিস যায় না। একি মামাবাড়ির চাকরি যে থাকবে! শ্রীমতী তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে মিনিদির কি আশ্চর্য রপ! যৌবন যাই-যাই করেও যেন যেতে পারছে না। অনিন্দ্য তার গৌরকান্তি। নিমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মুখে আলো এসে পড়েছে, কোমল দেখাচ্ছে মুখখানি। গােপনে একবার শুভেন্দকেও সে দেখে নিল। নবঘনশ্যাম শােভন। কোথাও দুর্বলতার লেশ নেই। কিন্তু শুভেন্দর } চোখে এখনাে সেই কৌতুকের ছায়া। শ্ৰীমতীর বাড়ি-ঘর কাজ-কর্ম দেখে শুভেন্দু কৌতুক বােধ করছে। মিস বিশ্বাসের প্রস্তাব মতে, নদীর ধারে আজ চড়িভাতির আয়ােজন হয়েছিল। রান্নাঘর থেকে রেধেবেড়ে নিয়ে, নদীর তীরে পিকনিক। সবাই খুশি। দেখতে-দেখতে দিন কেটে যায়। ক্লান্ত হয়ে বিকেলে বাড়ি ফিরে, হাত- মুখ ধুয়ে, চা খেয়েই স্টেশনে যেতে হয়। চারদিকে ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। কলকাকলিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন নিচু প্ল্যাটফর্ম জেগে উঠল যেন। ট্রেনের সময় হয়ে গেল। ওরই মধ্যে এক ফাঁকে শুভেন্দ, শ্রীমতীকে শান্তকণ্ঠে জিগগেস করে, “যা খুজছিলে, পেয়েছ এখানে?” শ্ৰীমতী নীরবে মাথা নাড়ে, আর কোনাে কথা হয় না। কলকাতার দল হাসিমুখে রুমাল নেড়ে চলে গেল। বাড়ি ফেরার পথে টের পায় কি ক্লান্ত সে হয়েছে। মিস বিশ্বাস জিগগেস করলেন, “ঐ যে বেলার ননদের মেয়ে মিনি, ও কি ঐ শভের সঙ্গে এনগেজড ?” শ্ৰীমতী নীরবে মাথা নেড়ে শুধ, অস্বীকার করতে পারল। আড়চোখে মিস বিশ্বাস একবার শ্রীমতীর মুখখানি দেখে নিয়ে বললেন, “মেয়ে তাে নয়, বাঘিনী। ওরা সবাইকে আন্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।” শ্ৰীমতী তথাপি নীরব। মিস বিশ্বাস আরেকবার আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, “একট, ফাইট করবেন না? ঐ শুভেন্দকে দেখে মনে হয় সত্যি ওর জন্য ফাইট করা যেতে পারে। আমার বয়েসটা যদি পচিশ বছর কম হত তবে দেখতেন।” মিস বিশ্বাসের হাসির প্রতিধ্বনি করে শ্রীমতী বলে, “মিনিদির এমন রপ, ও কিন্তু আপনাকে হারিয়ে দিত।” স্নেহমাখা ধরে মিস বিশ্বাস বললেন, “আজ আর পড়াশনাে করবেন ৫ , মিস চৌধুরী, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ন।” শ্ৰীমতীর বুকখানা কানায় কানায় ভরে গেল যেন। পৌছে দিয়ে মিস বিশ্বাস চলে গেলেন। এলােমেলাে অসংলগ্ন চিন্তা- গুলি শ্রীমতী গুছিয়ে নিতে বসে। সারাদিন এত হৈচৈ, তব, কোথায় একটা শূন্যতা থেকে গেছে। কিন্তু এখন এ-সময় অসহিষ্ণভাবে কে দরজার কড়া নাড়ে। খিল খুলতেই বিসন্ত বেশবাস উদভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে একটি মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। ভয়ার্ত-গলায় জিগগেস করল, “সবিতাদি কোথায়?” শ্ৰীমতী বসতে দিল মেয়েটিকে, শান্তভাবে বলল, “তিনি তাে এখানে নেই, আমি তার জায়গাতে নতুন এসেছি। তুমি কে?” মেয়েটি বিঢ়ের মতাে শ্রীমতীর দিকে তাকিয়ে থাকে, বলে, “আমি সীতা। আমার কথা কেউ আপনাকে বলেনি? আমি পাশের বাড়িতে থাকি। আমার স্বামী এখানকার মস্ত জমিদার। কেউ বলেনি আপনাকে ? আমার স্বামী আমাকে ভালােবাসেন না। পাড়ার লােকে আমাকে নিয়ে পরিহাস করে। আমার জা-রা, ননদরা আমাকে দেখে দুঃখ করে।” মেয়েটি চুপ করল। শ্রীমতী বললে, “তুমি চলে যাও না কেন?” আমি তাে কাজ করতে জানি না। চোদ্দ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল। একট, লিখতে পড়তে জানি, আর একট, রান্নাবান্না। সবিতাদি বলেছিলেন আমাকে কাজ শিখিয়ে দেবেন।” চকিতে দরজার দিকে তাকিয়ে ভীতকণ্ঠে বললে, “আমি যাই। মিসেস অধিকারী আসছেন।” কথা শেষ না হতে-হতে মেয়েটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মিসেস অধিকারী ঘরে এসে বললেন, “আপনার এ মাসের টাকাটা নিতে এলাম মিস চৌধুরী। আচ্ছা, ও কে বেরিয়ে গেল, জমিদার- বাড়ির বৌটি, না? একটু সাবধানে থাকবেন মিল চৌধুরী। ওদের পরিবারে নানান গােলমাল, ও বৌয়ের মাথার ঠিক নেই, ওসবে নাক -ঢোকানােই ভালাে।”
শ্রীমতী বললে, “ওর মনে যদি কোনাে দুঃখ থাকে সেটা কি দুর করতেও চেষ্টা করব না?” “দুঃখ প্রত্যেকের মনেই থাকে মিস চৌধুরী, পথিবীতে কারাে সাধ্য নেই সেসব দুর করবার।” টাকা নিয়ে মিসেস অধিকারী চলে গেলেন। খােলা দরজা দিয়ে আম- বাগানের পিছনে জমিদারবাড়ির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল শ্ৰীমতী। একটানা সারাদিনের হৈ-চৈ গেছে তার মধ্যেই একটুখানি আড়াল পেয়ে লকেট বলেছিল, “আমার কিছু ভালাে লাগে না, শ্রীমতীদি। অতন, সম্বন্ধে মা এত আনরিজনেবল যে চুপ করে আর সহ্য করা যায় না। তার এ-বাড়ি আসা বন্ধ হয়ে গেছে, জানাে? আমার সঙ্গে পথে-ঘাটে আড়ালে দেখা হয়। বকেট, ওদের বাড়ি গিয়ে খবর আনে। মা জানতে পারলে মেরে ফেলবেন। কি করব বল তাে?” লকেট তার প্রায় সমবয়সী। মায়া হয় ওর কথা শুনে। বিজ্ঞের মতাে বলে শ্রীমতী, “আমি যদি সত্যি কাউকে ভালােবাসতাম, আর অন্য কোনাে আপত্তির কারণ যদি না-থাকত, অমন একশাে মা আমাকে বেধে রাখতে পারত না। কেন হতাশ হও লকেট? পড়াশনাে শেষ কর, একুশ বছর বয়স হােক, তখনাে যদি অতনকে এইরকম ভালােবাস তােমার মা তোমাদের কি করতে পারবে?” “মা বলেন আমার সঙ্গে কোনাে সম্পর্ক রাখবেন না।” “বড় কিছু লাভ করতে চাইলে তার জন্য বড় ত্যাগও স্বীকার করতে হবে ভাই!” লকেট কেদে ফেলল, বলল, “আমি যে শক্ত হতে পারি না, শ্ৰীমতীদি।” বসে-বসেমিত ভাবে আমার এসব পরামর্শে না-জানি কত অশান্তির সূচনা হয়। সে অশান্তি আমাকে সইতে হবে না, সইবে আরেকজন। শুভেন্দল কি পরামর্শ দিত ? ৬৭ রাত গভীর হয়ে আসে। শ্রীমতী উঠে শুতে যায়। এমনি করে দিনের পর দিন কাটে, সপ্তাহ কাটে, মাস কাটে। তারপর একদিন গ্রীষ্মের অবকাশও কাছে এগিয়ে এল। গভীব রাত্রি না হলে শ্ৰীমতীর একট, চিন্তা করবারও অবসর মেলে না। কিন্তু বিছানায় শুয়ে যেই বধ করল চোখের পাতা অমনি রাশি-রাশি চিন্তা এসে মাথার মধ্যে বাসা বাধল। পরশ, স্কুল বন্ধ হয়েছে। সেইদিনই সন্ধ্যাবেলা বাক্স-প্যাঁটরা বেধে টিচাররা যে যার বাড়ি চলে গেছেন। বাড়ি নেই বলে যাঁরা শ্ৰীমতীর কাছে গর্ব করতেন তাঁরাও একটা কৈানাে আশ্রয় খুজে নিয়ে বিদায় নিলেন। মিস বিশ্বাস গেলেন পরদিন সকালে। স্কুল, স্কুলের বাগান, চাকরদের ঘর, রান্নাঘর, টিচারদের ঘরদোর পরিদর্শন শেষ করে তাঁর ভাইয়ের বাড়ি চলে গেলেন তিনি। শ্রীমতী তাঁকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এল। শ্ৰীমতী কোথায় যাবে, কবে যাবে অনেকবার তিনি জিগগেস করেছেন। অবশেষে সে তাঁকে সংক্ষেপে বলেছে, “কলকাতায় যাব, কাল দুপুরের গাড়িতে।” ট্রেন ছাড়বার পর্বমহর্তে সহসা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মিস বিশ্বাস তাকে ছােট একটি চুমাে খেলেন। শ্রীমতীর চিত্ত কোমলতায় পূর্ণ হয়ে গেল। মুহর্তে একবার মনে হল মিস বিশ্বাসকে মনের কথাগুলি বলবে, এমন কি তার মায়ের কথাও। কিন্তু সে মুহতটি চলে গেল, বলা হল না। ঘর গুছিয়ে রেখে দরজা জানলা বন্ধ করে পরদিন সে কলকাতা রওনা হল। চাবি দিয়ে এল মিসেস অধিকারীর কাছে। মিসেস অধিকারীর যাবার জায়গা নেই, ছুটিটা তাঁর চাঁপাডাঙাতেই কাটবে। তাঁর সমবয়সী ভাইঝি নৃলিনী সকালে এসেছে দু-তিনটি ছেলেপুলে নিয়ে, ছুটিটা পিসীর কাছে থেকে যাবে। মিসেস অধিকারী দরজা অবধি সঙ্গে এলেন, বিদায়কালে বলে দিলেন কলকাতা থেকে শ্রীমতী যেন নিশ্চয়- নিশ্চয় তাঁর জন্যে একখানা নােমওয়ালা তােয়ালে আর একটা বড় কাঁচি নিয়ে আসে। পরে টাকা দেবেন, এমাসে অতিথি আসাতে বড় টানাটানি। হাওড়ায় শ্রীমতীর মা তাকে নেবার জন্য পরােনাে নেপালী চাকর পাঠিয়েছিলেন। ট্যাক্সি করে সে তাকে টালিগঞ্জে মায়ের বাড়িতে নিয়ে এল। মায়ের বাড়ি কি তারও বাড়ি নয়? বাড়ি দেখে গর্ব হল, হলদে রঙের ছােটো দোতলা, সামনে বাগান, বাগানে বকুল গাছে ফুল ফুটেছে। সবুজ ঘাস, লাল কাঁকরের পথ। ট্যাক্সি থেকে নেমে শ্রীমতী দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতেই জরিপাড় শাদা শাড়ি-পরা আধবয়সী এক নারী পাশের বসবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাকে আলিঙ্গন করে ঠাণ্ডা দুই ঠোঁট দিয়ে তার মুখেচুম্বন করলেন। পরােনাে হাতির দাঁতের মতাে তাঁর গায়ের রঙ, আবেণী- সংবদ্ধ কুঞ্চিত কেশদামে রপোেলীর ছটা বড় একটা চোখে পড়ে না। কোমল দোহারা শরীর, নিখুত ভুর, ঈষৎ কোটরগত আকর্ণ-বিস্তৃত চোখ, যেন বড় বেশি চকচকে, চোখের কোণে ঘন নীল ছায়া পড়েছে। চোখে কাজল টানা, ঠোঁট দুটি বড় বেশি পাতলা, অসন্তুষ্ট, ব্যথিত। দু'হাত দিয়ে কাঁধ দুটি ধরে, একটু দূরে সরিয়ে তীক্ষষ্টিতে শ্ৰীমতীকে আপাদমস্তক তিনি নিরীক্ষণ করলেন। সে প্রণাম করবার সুযোেগও পেল না। গলার ভেতর কি একটা বেদনা টনটন করে উঠল। বিস্ফারিত চোখ মেলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শ্রীমতী।
পদ্মাসনা নিজেই প্রথমে কথা বললেন, “সত্যিই কি তুমি শ্ৰীমতী? আমার সেই দেড়বছরের খুকুকে কৈ কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না! লেখা- পড়া শিখিয়ে রমেশ চৌধুরী তাকে অন্য মেয়ে বানিয়ে দিয়েছে। এস, ঘরে বসবে এস, বেলা হয়ে গেছে, ক্লান্ত হয়েছ। বস, চা এনে দেবে এক্ষনি, তারপর স্নান খাওয়া। আমি তােমার মা, আমার বাড়ি তােমার-ও বাড়ি।” শ্ৰীমতী চোখ তুলে দেখে বসবার ঘরের পর্দা ধরে আরেকজন আধবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে। শ্যামলা গায়ের রঙ, মােটাসােটা দেখতে, মাথায় এলােখোঁপা বাঁধা, পান খেয়ে দুই ঠোঁট কালাে। “কি দেখছ শ্রীমতী? আমার নাম মতিরানী, আমি তােমার মায়ের কুড়ি বছরের পুরােনাে বন্ধ, কাজেই তােমার মাসিমা হই। অবিশ্যি তােমার মায়ের নামডাক হবার পর থেকে এ-বাড়িতে আমার আদর অনেকখানি কমে গেছে। তব, ভাবলাম এখন দু’জনেই রিটায়ার করেছি, এখন আর ওসব পুরোেনাে কথা কেন, যাই গিয়ে পদ্মার বি. এ.-পাশ মেয়েটি কেমন দেখে আসি।” শ্ৰীমতীর মায়ের মন কঠিন হয়ে উঠল। তিনজনে বসবার ঘরে এসে নরম গােলাপী কুশনের উপর বসলেন। মতিরানী শ্রীমতীর শ্যামল স্নিগ্ধ রপ, শাদাসিধে বেশ, অলঙ্কার- বিহীন মাধুরী মনােযােগ দিয়ে দেখে বললেন, “হাসি পায় রে পদ্মা, শেষটায় তাের মেয়েও বি. এ. পাশ করল! উনত্রিশ সালে সেই লক্ষ্যে যাবার কথা মনে পড়ে তাের? সেবার তুই” পদ্মাসনা বাধা দিয়ে বললেন, “তুমি এবার বাড়ি যাও মতিরান্তী, মেয়ে এখন স্নানটান করবে।” মতিয়ানী উঠে পড়ে কাষ্ঠ হেসে বললেন, “পুরােনাে দিনের সে-সব কথা তােমার শুনতে ভালাে না লাগলেও, তােমার বি, এ,-পাশ মেয়ের মজা নগতে পারে।” ৭০ মতিরানী চলে গেলেন। মায়ের জন্য শ্রীমতীর হদয় করুণায় বিগলিত হল। মায়ের দিকে ফিরে বললে, “মা তােমার বাড়িটি আমার ভালাে লেগেছে।” পদ্মাসনা বললেন, “মুখ্য, মা’র সঙ্গে থাকতে রাজী হলে না, তব, যে বাড়িটি ভালাে লেগেছে সে আমার সৌভাগ্য। তবে আমি ম'লে তুমি এ-বাড়ি পাবে কিনা সন্দেহ। অনেক টাকায় বন্ধক রাখা আছে।” তারপর মায়ের সঙ্গে কি কথা আলােচনা করবে শ্ৰীমতী? তার কণ্ঠ রােধ হয়ে আসে, চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে মাকে ‘মা’ বলে ডাকবার জন্য। কিন্তু মা বললেন, “শ্রীমতী তােমার গয়না-গাঁটি, ভালাে কাপড়-চোপড় -থাকলে আমায় বলবে। আমার বন্ধুবান্ধবের সামনে গর্ব করে তােমাকে যেন দেখাতে পারি। আচ্ছা, তােমার গায়ের রঙটা এত কালাে হয়ে গেল কি করে? ছেলেবেলায় আমি তাে খুব সাবধানেই রেখে- ছিলাম। সরষের তেলটুকু কোনােদিন গায়ে ছোঁয়াতে দিইনি। তারপর এরা নিশ্চয় আর যত্ন নেয়নি, একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে তােমার রঙটা।” কি একটা গভীর আকুলতা শ্রীমতীর চিত্তে জাগে। ধরা গলায় বলে, “না, মা। তাঁরা আমাকে বড় ভালােবেসে, বড় যত্ন করে মানুষ করেছিলেন। কোথাও কোনাে এটি রাখেননি। এটি সব আমার নিজের। আমার রঙটাই কালাে।” জীবনে এই প্রথম শ্রীমতী তার কালাে রঙ নিয়ে কুণ্ঠিত হল। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “রঙ দিয়ে কি হবে মা? কতরকম কাজ শিখেছি তাঁদের বাড়িতে, সেলাই শিখেছি, রান্না শিখেছি, লেখাপড়া শিখেছি”—পআ বাধা দিয়ে উঠে পড়েন, “চল তােমাকে স্নানের ঘর দেখিয়ে দিই।” স্নান করতে গিয়ে রমেশ চৌধুরীর মুখখানি মনে করে শ্রীমতী প্রাণ- ভরে কাঁদল। ৭১ স্নান সেরে শােবার ঘরে এসে দেখে মা একখানি গােলাপী মাদ্রাজী শাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। “এইটে পর শ্ৰীমতী। তােমার জন্য কিনে রেখেছিলাম। খাবার পরই দেখবে আমার সব বন্ধুর দল তােমাকে দেখতে আসবে-পদ্মাসনার আবার বি. এ.-পাশ মেয়ে! জানাে, ওরা আমাকে হিংসা করে। আমার রুপ আছে তাই ওদের চেয়ে নাম-ডাকও বেশি, তার উপরে মেয়ে আমার বি. এ. পাশ করেছে।” শ্ৰীমতী কৃতজ্ঞচিত্তে মায়ের দেওয়া এই প্রথম উপহার হাতে নিয়ে বলল, “কি সুন্দর শাড়ি। আমার খুব ভালাে লেগেছে। এই রঙের জামাও আছে আমার। মা, বি. এ. পাশ করাটা আর এমন কি! অমন হাজার মেয়ে বি, এ. পাশ করে। সকলে তারা চাকরী পর্যন্ত পায় না। ওতে কোনাে বাহাদরীই নেই!” পদ্মা সেকথার উত্তর না-দিয়ে বলেন, “আমার বন্ধুদের সব কথা চুপ করে তুমি শুনে যেও। সব কথা বিশ্বাস কোরাে না। আবার মনের কথা কাউকে বলতেও যেও না। ওরা প্রকৃত তােমার শুভাকাঙ্খী কিনা সন্দেহ। এখন কাপড় পরে নিচে এস। রান্না তৈরি।” মা নিচে নেমে গেলেন। শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শ্ৰীমতী নিজের মুখখানি অনেকক্ষণ ধরে দেখল। এই তাে সেই চিরপরিচিত মুখ, তার কত দিনের সঙ্গী। ছেলেবেলা থেকে এই মুখ সে জানে, ছােট থেকে বড় হতে দেখেছে। তিলগলি, ঠোঁটের কোণের সেই টানটি তার কত চেনা, কানের পাশে কোঁকড়া চুলের গছি দুটি কত পরিচিত। আজ মনে হল তার মুখের রঙ বড় কালাে। তার অমন সুন্দরী মায়ের মেয়ের অযােগ্য। আয়নার সামনে সাজানাে প্রচুর প্রসাধনের সামগ্রী রয়েছে। তাড়াতাড়ি সে গালে একট ক্রীম লাগিয়ে, পাউডার মেখে নিল, ঠোটে একট, রঙ, চোখে সরু করে সমা টেনে দিল। আবার মুখখানি দেখল ভালাে করে। তারপর স্নানের ঘরে গিয়ে সাবান দিয়ে মুখ ৩ ধয়ে একট, শুধ, পাউডার মেখে, কপালে একটা কুমকুমের টিপ পরে, নিচে নামল। খাবার টেবিলে তিনটি জায়গা করা। বিলেতী বেশধারী অতিশয় কায়দাদুরস্ত, অতিশয় সুদর্শন একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি তৃতীয় আসনে বসে ছিলেন। পদ্ম পরিচয় করিয়ে দিলেন, “নমস্কার কর শ্রীমতী, ইনি আমাদের ডিরেক্টর ছিলেন, মিস্টার নাগ। এই আমার মেয়ে, পরেশ। কেমন লাগছে?” মিস্টার নাগ বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকপর্ণ চোখে শ্রীমতীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, “স্ট্রেঞ্জ! কে বলবে এত বড় মেয়ে তােমার। গানটান শিখেছ মা?” শ্ৰীমতী বললে, “চলনসই গােছের। কিন্তু আমি খুব ভালাে রাঁধতে পারি, একদিন খেয়ে দেখবেন। মা, আমি কিন্তু একদিন রান্না করব।” মা বললেন, “তবেই হয়েছে। আমার গােমমশটিকে তুমি দেখছি তাড়িয়ে ছাড়বে! এস, বেলা হয়ে যাচ্ছে।” মজলিসিলােক এই মিস্টার নাগ। বহু বৎসর ইউরােপে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কত আশ্চর্য গল্প করতেই যে পারেন! শ্রীমতী সব কুণ্ঠা ভুলে গিয়ে অকপট চিত্তে হাসতে পারল তাঁর সামনে। আহারাতে বসবার ঘরে মজলিস বসল। পান, সিগারেট এল। মিস্টার নাগ শ্ৰীমতীকে জিগগেস করলেন, “টিচারি করতে তােমার ভালাে লাগে, শ্ৰীমতী?” শ্ৰীমতী বললে, “খুব ভালাে লাগে। আমাদের মিস বিশ্বাস খুব ভালাে লােক। আমাদের মেয়েরা খুব ভালাে মেয়ে, পড়াশুনায় খুব ভালাে নয়, কিন্তু মানুষ খুব ভালাে। চাঁপাডাঙাও খুব ভালাে জায়গা।” মিস্টার নাগ দুই ভুরু, কপালে তুলে বললেন, “হিয়ার! হিয়ার। ভালাে লাগবার এমন অদ্ভুত ক্ষমতা আজকাল সচরাচর দেখা যায় না!” শ্ৰীমতী লজা পেয়ে নীরব হল। পদ্মা বললেন, “সবই না হয় ভালাে বুঝলাম, কিন্তু টাকা দেয় বড় ৭৩ কম। ওতে কি করে হয় তােমার? জীবনে কি কোনাে শখসাধ নেই ?” শ্ৰীমতীর বুকের ভেতরটা একটু কঠিন হয়ে আসে। “ওতেই আমার বেশ চলে যায়, মা। মাসকাবারে আমার কত পয়সা আরাে বাঁচে। মাঝে-মাঝে বইটই কিনি। কি সুন্দর গালচে কিনেছি জানাে মা।” মিস্টার নাগ বললেন, “কয়াের ব্যাঙও মনে করে গােটা পৃথিবীটাই সে পেয়ে গেছে। তােমার কি কোনাে উচ্চাভিলাষ নেই, বলছ? চাঁপা- ডাঙায় তুমি কি সবই পেয়েছ বলতে চাও ?” শ্ৰীমতীর চোখের সামনে থেকে এক পলকে সেই সাজানাে ড্রয়িংরুমে যেন মুছে গেল। কোনাে এক বাঁশঝাড়ের পিছনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। শুনতে পায় কানের কাছে শুভেন্দর জলদগম্ভীর স্বর : “যা চেয়েছিলে পেয়েছ এখানে?” শ্রীমতী মাথা নাড়ে। যেটুকু পাওয়া যায় তার চেয়ে আরেকটু বেশি -চাইলে চাওয়ার কি বা সার্থকতা! শুভেন্দর শ্যাম সুন্দর মুখ- খানি মনে পড়ে। মিস্টার নাগ বলেন, “অন্য লাইনের প্রস্পেক্টস অনেক বেশি শ্ৰীমতী। ত্রিশ বছর পরে রিটায়ার করবার সময় এলে দেখবে মাইনে হয়তাে একশাে টাকা বেড়েছে। বড় জোর একশাে টাকা, তার বেশি নয়। টিচারি করা একটা ড্রাজারি, একটা থ্যাঙ্কলেস টাস্ক।” শ্ৰীমতী সজোরে এ-কথার প্রতিবাদ করে, “না, না, কক্ষনাে ড্রাজারি নয়। আমি এতেই আনন্দ পাই। মেয়েরা আমাকে সত্যি ভালােবাসে। ব্যাকলেস হবে কেন?” আলােচনা ওখানেই বন্ধ হল। আরাে অতিথির সমাগম হল ক্রমে। মায়ের বধুরা সব শ্ৰীমতীকে দেখতে আসছেন। শ্রীমতী তাঁদের মিষ্টি কথায় আপ্যায়ন করে। কখন এক সময় অতিথির পদ ত্যাগ করে সে এ-বাড়ির মেয়ে হয়ে যায়, নিজেও বুঝতে পারে না। এক কথায় অতিথিদের বর্ণনা দেওয়া যায় না। তাঁদের মান বয়স, ৭৪ নানান অবস্থা, নানান স্বভাব, নানান বেশভূষা। কিন্তু থিয়েটারের কিম্বা সিনেমার সঙ্গে সকলেরই একটা যােগসূত্র আছে। বেশ লাগে এদের। পচিশ যার বয়স সেও যেমন সুন্দরী, যার পয়তাল্লিশ সেও তেমনি। ভগবান যাকে সুন্দরী করে গড়েননি, সেও নিজেকে নিখুত চেষ্টায় রুপবতী করে তুলেছে। শ্রীমতী মন্ধ হয়। তাঁদেরও ভালাে লাগে অহঙ্কারী পদ্মাসনার কোমলম্বভাব শ্যামলী কন্যাটিকে। মতি- বানীও দেখা গেল এসেছেন। “কি গাে শ্ৰীমতী? তুমিও সিনেমা করবে নাকি? তাহলে ভাব করে নাও আমার সঙ্গে। জানাে, আমিই তােমার মাকে অ্যাকটিং শিখিয়ে- ছিলাম, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম সবার সঙ্গে। সেসব কথা পদ্ম হয়তাে ভুলে গেছে।” মতিরানীর পাশে যিনি বসেছিলেন, যৌবন তিনি অতিক্রম করেছেন, সত্যিকারের সুন্দরীও বলা যায় না, কিন্তু চোখে-মুখে একটা ছাপ আছে, চলনে-বলনে একটা বিশিষ্টতা আছে, যা তাঁকে সকলের থেকে পথক করে। উঠে এসে তিনি শ্রীমতীর পাশে বসলেন। সেই একই কৌতহল সকলের মনে! “তােমার নিজের কাজ তােমার ভালাে লাগে শ্ৰীমতী?” শ্ৰীমতী বলে, “খুব ভালাে লাগে। আপনি?” হেসে মহিলাটি নিজের নাম বললেন। আরে, তাইতাে! এই যশস্বিনী অভিনেত্রীকে কে না জানে! শ্রীমতী চিনতে পারল। মতিরানী বলেন, “কি দেখছ, শ্ৰীমতী? উনিও বি. এ. পাশ। অ্যাক- ট্রেসদের বিরুদ্ধে তােমার যা বলবার আছে এখন বল। উনি তার উপযুক্ত জবাব দেবেন।” শ্ৰীমতী মাথা উচু করে বলে, “অ্যাকট্রেসদের বিরুদ্ধে আমার তাে কিছু বলবার নেই। মানুষকে আনন্দ দিতে পারা তাে সৌভাগ্যের কথা। তাছাড়া আমি নিজেও অ্যাকট্রেসের মেয়ে।” ৬ (৬৩) ৭৫ পাশের বিখ্যাত মহিলাটি শ্ৰীমতীর পিঠে সস্নেহে হাত রাখলেন। বহুদিন পরে পদ্মার প্রাণ আজ কানায় কানায় ভরে উঠল। “বলিনি তােমাদের? আমার মেয়ের মতাে মেয়ে আছে!” রাত্রে বিছানায় শুয়ে শ্রীমতীর মনে পড়ে মায়ের মুখখানি। ভাবে আমার দুঃখিনী মাকে সুখী করতে হবে। কি বা পেয়েছেন আমার মা এই পৃথিবীতে? অমন রুপ যাঁর, তাঁর কত সুখী হওয়া উচিত ছিল। কি সুন্দরী মা আমার! আমাদের এখন তিনপুরুষ কালাে চেহারা হলেও দোষ নেই। ঘুম আসে না। মনে পড়ে ছুটির আগে বেলামাসির চিঠি। লিখেছেন- পুতুলের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আষাঢ় মাসের পাঁচ তারিখে। সেই গুণবান পাত্রটির সঙ্গেই। শুভেন্দর কবে সুখি হবে তার জন্য কতদিন আর বসে থাকা যায়। তাছাড়া ছােট বােন এলার মেয়ে লকেটকেও তাে একটা চান্স দেওয়া উচিত। বিয়েতে তােমার আসা চাই, তুমি অনেক কাজের ভার নেবে ইত্যাদি। এলামাসি লিখেছেন—ছটিতে শ্রীমতী কি করবে, কোথায় যাবে এ- বিষয়ে কিছু জানায়নি কেন? লকেটকে নিয়ে পেরে ওঠা দায়। সাজপােশাক একরকম ছেড়েই দিয়েছে, কোথাও যেতে চায় না, দিন- রাত বই নিয়ে গুম হয়ে বসে থাকে। কিছু বললে বলে, আসচে বছর বি. এ. পরীক্ষা, তার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ব্যাপার দেখে এলামাসিরও খুব মন খারাপ। তাছাড়া পরীক্ষার আগেই লকেটের একুশ বছর পূর্ণ হবে। ঐ ছােকরা কি কুমন্ত্রণা দেবে কে জানে! হয়তাে শেষ অবধি বাপ-মাকে ‘ডিফাই করবে। এলামাসি কিছুতেই তা সহ্য করবেন না দরকার হলে লকেটকে ঘরে তালাচাবি দেবেন। মুশকিল হয়, বকেটকে দিয়েও বিশ্বাস নেই। সেও আজকাল লকেটের পক্ষ নিয়ে } অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা বলতে শুরু করেছে। সামনে পুতুলের বিয়ে। বিয়েবাড়ির গােলমালে কি হয়, কে জানে! শ্রীমতী একবার এলে ভালাে হয়। ইত্যাদি আর শুভেন্দ? মিনিদির চিঠিতে শুভেন্দুর খবর ছিল। কি নাকি একটা বই লিখবার চেষ্টায় আছে শুভেন্দ, কোনাে একটা নীরস বিষয় নিয়ে, আইন-টাইন হবে। তার দেখা পাওয়াই দায়। মিনিদি এর মধ্যে আবার দার্জিলিঙ ঘরে এসেছে। বােধহ শ্ৰীমতীর ব্যবহারেই শক পেয়ে তাঁর মা আরাে ইমপসিবল হয়ে উঠেছেন। সাতদিনের বেশি দার্জিলিঙে থাকা অসম্ভব। শুধ, মিনিদি তাঁর মেয়ে বলে, আটদিন ছিল। তাছাড়া এবার দার্জিলিঙটাও ভালাে লাগছিল না। রেগেমেগে একটা বিয়েই করে ফেলবে কিনা ভাবছে। শ্রীমতী ভাবে দেড়মাস ছটির পাঁচ সপ্তাহ মায়ের কাছে থেকে শেষ সপ্তাহে বেলামাসির কাছে যাবে। বেশ হবে—পুতুলের বিয়ে। বিয়ে- বাড়ি ভালােই লাগে তার। এখনাে এলামাসি-বেলামাসিকে মায়ের মনে আছে। তাঁদের সঙ্গে তেমন সম্ভব ছিল না, তাঁরা নাকি চিরকাল বন্ড অহঙ্কারী। তার চেয়ে তাঁদের ভাজ মিলি অনেক ভালাে, যদিও ঘটে বুদ্ধিশুদ্ধি আদৌ নেই, এবং স্বামীটি একটি লক্ষীছাড়া। সকলের সব খবরই মায়ের জানা আছে। এত খবর মা পেলেন কোথায় ? কেন, শ্ৰীমতীর সঙ্গে কি ছােটদাদা- মশায়ের আলাপ হয়নি? যত সব থিয়েটার স্টডিয়ােতে তাঁর আনাগােনা, তাই বলে একেবারে নির্গণ নন। স্টেজ সাজাবার, সীন ডিজাইন করার কাজে বেশ নাম করেছেন। মাসে একবার অন্তত এখানে এসে চা খেয়ে যান। শ্ৰীমতীর জীবনের মােটামুটি সব খবরই তাঁর কাছ থেকে শােনা। আর দুঃখের সময়, বিপদের সময়, অমন একটি বন্ধু পাওয়া যায়। ৭৭ আশ্চর্য লাগে তার। ছােট দাদামশায়কে শৈশব থেকে দেখে এসেছে, অথচ মায়ের খবর কখনাে জিগগেস করবার কথা মনে হয়নি। এই লােকটির বিষয়ে এতদিন সে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল, হঠাৎ তাঁকে ভালাে লাগল। ক্রমে রাত্রি বাড়ে। শ্ৰীমতীর চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। দরে কাদের ঘড়িতে দুটো বাজল। ৭৮ ৮ শ্রীমতীর জীবনের সুর তাল কেন সব সময়ে ঠিক থাকে না? রমেশ চৌধুরীর স্নেহের নীড়ে বাস করে স্বাধীনতাকে কত না মধুময় মনে হয়েছিল, স্বাবলম্বী হওয়াকে মনে হয়েছিল কত গৌরবের, এখন কেন মাঝে-মাঝে তাল কেটে যাচ্ছে! যে পরের বাড়ির পাঁচজনের কাছেও কত সহজে প্রিয় হয়ে উঠেছিল, নিজের মায়ের বাড়িতে সে কেন প্রিয় হতে পারছে না? সে যখন আগ্রহের সঙ্গে মায়ের কাছে চাঁপাডাঙা হাইস্কুলের গল্প করে, মা পদ্মকলির মতাে একখানি শুভ্র সুন্দর হাত দিয়ে কপালে এসে-পড়া নিজের কোঁকড়া চুলগুলি সরিয়ে দিয়ে ক্লান্তভাবে বলেন, “তারপর কি হবে? মিস বিশ্বাসকে কি ওরা পেনসন দিয়ে তােমাকে হেডমিস্ট্রেস করে দেবে?” শ্ৰীমতী হেসে বলে, “পাগল হলে মা? আমাকে কি করে হেডমিস্ট্রেস করে দেবে? আমি যে সব চেয়ে নতুন টিচার, আমার উপরে বি. এ. পাশ করা বি. টি. পাশ করা আরাে সাতজন রয়েছেন। জানাে মা?” পদ্মা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলেন, “এ একশাে টাকার গণ্ডি ছাড়াতে তােমার তাহলে জীবন কেটে যাবে শ্ৰীমতী। আমার মতাে যখন বয়স হবে, শরীর মন ভেঙে পড়বে, যখন ইচ্ছে করবে কোথাও পালিয়ে যাই, বড়-বড় গাছের ছায়ায় ফুলের গন্ধে ভরা কোনাে একটা আশ্রয়ে, তখনাে তােমাকে চাকরি করতে হবে, পালাবার পথ পাবে না।” ৭১ শ্ৰীমতী এ-কথায় বরং উৎসাহ পায়, বলে, “তবে চাঁপাডাঙায় আমার কাছে এখনি তােমার চলে আসা উচিত। স্কুলের কম্পাউন্ডে সেখানে বড়-বড় আম গাছ। আমার বারান্দায় নিমগাছের ছায়া পড়ে। তােমার জন্য রাশি-রাশি ফল গাছ লাগাব, হাসনাহানা, বেলফুল, মাধবীলতা পুতব! যাবে মা, সত্যি যাবে?” পদ্মা শিউরে উঠে চোখ বুজে বলেন, “তােমার চাঁপাডাঙায় আমি একদিনও থাকতে পারব না!” শ্ৰীমতী মায়ের ব্যথিত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পদ্মা বলে যান, “এত ছােট তােমার নজর শ্রীমতী। এতটা বয়স হয়েছে, কিন্তু চোখ তােমার ফোটেনি। তাই দিনের পর দিন, মানুষের চোখের আড়ালে ঐ একঘেয়ে কাজ করে-করে, মনে ভাবছ কি সুখেই আছি। নিজের জীবনটা নষ্ট করে ফেলছ, বােঝ না কেন? আমাকে দেখ, একদিন বিখ্যাত সুন্দরী বলে আমার নামডাক ছিল। আয়নায় তাকিয়ে দেখি আজ তার আর কিছু বাকি নেই। চুল উঠে গেছে, পেছন দিকের দু- তিনটে দাঁত নড়ে গেছে, স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। কিন্তু একদিন জীবনটা আমার সার্থক হয়েছিল।” দুহাতে মুখ চেপে পদ্ম কেদে ফেলেন, “কিছু বাকি নেই শ্ৰীমতী, সব গেছে।” শ্রীমতী দু'হাতে মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, “কিছু নেই কেন বলছ মা? আমি তাে আছি। আমার চোখে তােমার মতাে সুন্দরী কেউ নেই।” পদ্মা হাত নামিয়ে, চোখ মুছে, সােজা হয়ে বসলেন। শুকণ্ঠে বললেন, “সত্যি তুমি আছ। কিন্তু তােমার এই দুঃখিনী মায়ের জন্য কি-ই বা করতে পার, তুমি? একশাে টাকা রােজগার করে আমার মেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে! জাননা, গােমেশকে আমি পঞ্চাশ টাকা মাইনে দিই, আয়া পচিশ, বাহাদুর ত্রিশ টাকা পায় ?” শ্রীমতী নীরব হয়ে যায়, গাল লাল হয়ে ওঠে, গলার কাছে একটা শিরা দপদপ করে। ৮০ মা সেদিকে দৃষ্টিপাতও করলেন না। বললেন, “ঐ যে আমাদের ডিরেক্টরের সঙ্গে তােমার আলাপ করিয়ে দিলাম, উনি আমার পুরােনাে বধ বলে তােমাকে একটা চান্স দিতে রাজী আছেন। তােমার রঙটা শ্যামল হলেও নাক চোখ তাে ভালােই, একট, মেক-আপ দিলে ছবিতে সুন্দর দেখাবে। গানটানও তাে কিছু কিছু শিখেছ। আজকালকার ভালাে ফিল্মে সকলের কিছু গান গাইতেও হয় না।” শ্ৰীমতী প্রাণপণে মাথা নেড়ে বলে, “না, না মা, ও আমাকে দিয়ে হবে ।” পদ্মার মুখে কঠিন হয়ে উঠল, “কেন? লজ্জা হয়? ঘণা হয়? পয়সা দিয়ে সিনেমা দেখতে যাও, আর যারা ফিল্ম তৈরি করে, তাদের দ্বাণা কর? কি আর বলব তােমাকে আমার মেয়ে আমাকে ঘণা করে, আমার বলবার কি আছে বল?” এমন করে কেউ কোনােদিন শ্ৰীমতীর হদয় মন্থন করেনি। বুকটা টনটন করে ওঠে ব্যথায়। আকুল হয়ে মায়ের হাত দুখানি জড়িয়ে ধরে বলে, “না মা, তুমি ভুল বুঝছ। তােমার মতাে আমার আর কেউ নেই। তুমি সুখী হও আমি তাই চাই।” পলকে চোখে-মুখে হাসি ফুটল পদ্মার, “তাহলে রাজী আছ তাে?” উত্তর দিতে ঠোঁট কেপে যায়। ধীরে-ধীরে শ্রীমতী বলল, “একট, সময় দাও মা, এখনই উত্তর চেও না।” অপ্রসন্নকণ্ঠে পৰ্মা বলেন, “বেশ তাই হােক!” মা আরাে কত প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন, গােপনে শ্ৰীমতীর অন্তরে বিন্দ-বিন্দ চোখের জল জমা হতে থাকল। এমনি করে সময় কেটে যায়। পুরোেনাে জীবনের একটানা সেই দিন- গুলি যেন কোন অতীতের ইতিহাস। রােজ পদ্মাসনার কোনাে না ৮১ কোনাে বান্ধবী তার সঙ্গে আলাপ করে যায়। এক পাড়াতেই বাড়ি। মৌমাছির মতাে তারা গুনগুন করে, মুখে মধু আর দেহ হল নিয়ে আসে। এরা কেন আসে? কেন আমার রুপসী মাকে কেউ ভালােবাসে না? কেন ওরা হিংস্য করবে? কি আছে আমার বেচারী মায়ের যার জন্য এই অনুচ্চারিত শত্রতা? আমি আমার মাকে সখী করব, শ্রীমতী মনে-মনে সঙ্কল্প করল। একদিন সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ মাকে সে জিগগেস করল, “মা, আমার বাবা কেমন ছিলেন ? অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন পদ্মা। কি হবে তাঁর কথা জেনে ? যখন ওর সাতমাস বয়স সেই তখন অকস্মাৎ একদিন তাঁর মত্যু হল। না, এমন কিছুই ছিলেন না তিনি। সত্যি কথা বলতে কি, পদ্মাসনার মতাে সুন্দরী স্ত্রীর কোনাে অংশেই মােগ্য ছিলেন না। মােটা, বেটে কালাে দেখতে, কোনাে একটা সওদাগরী অফিসের বড়বাব ছিলেন, আসাতে শতিনেক টাকা ঘরে আনতেন। সাতাশ বছর বয়সে পদ্মা বিধবা হলেন। ভাগ্যহীনা পদ্ম! পাঁচ বছর বয়সে বাপ-মরা বেচারী পমা! এলা-বেলার কি বা রুপ ছিল, তাদেরও অমন সুপাত্রের সঙ্গে বিরে হল, আর সুন্দরী পদ্মাসনার কপালে জুটল কিনা মার্চেন্ট অফিসের বড়বাব! শ্রীমতী কোমলম্বরে জানতে চায়, “বাবা তােমাকে ভালােবাসতেন?* বিরক্ত লাগে। “তা বাসবেন না? ও-বাড়িতে যে অমন রাজরানীর মতাে বৌ কস্মিনকালেও আসেনি তা নিয়ে গর্ব কি কম ছিল? পছন্দ করে কম দাম দেখে রঙিন শাড়ি-টাড়িও এনে দিতেন মাঝে-মাঝে। কিন্তু এখানে কোনােমতেই বিয়ে হওয়া উচিত হয়নি।” পদ্মার মায়ের কোনাে বুদ্ধি ছিল না, আর দুদিন অপেক্ষা করলে নিশ্চয়ই ভালাে পাত্র জুটে যেত। রমেশ চৌধুরীর স্ত্রী পদ্মার মায়ের একরকম মাসতুতাে বােন, এমন কিছু দূর সম্পর্কও বলা যায় না, তিনিও যদি বেচে থাকতেন ২ বােনবির অমন একটা যা-তা বিয়ে হতে দিতেন না তিনি। “আচ্ছা মা, বাবা নিশ্চয় আমাকেও খুব ভালােবাসতেন, না? কি বলে ডাকতেন?” “খুকুমা বলতেন, আবার কি বলবেন, তােমার সাতমাস বয়সে তাে মারাই গেলেন। তারপর আরাে এক বছর বহু কষ্টে ওদের সংসারে শত অভাব অনটন গোঁড়ামির মধ্যেও রয়ে গেলাম আমি। হঠাৎ একদিন কি একটা নিয়ে যেন, এখন মনেও নেই, ঝগড়াঝাঁটি হল খুব। তােমাকে কোলে নিয়ে জন্মের মতাে ও-বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম। এখন শুনছি বিশেষ কেউ নেইও, সব মরে-ঝরে পরিষ্কার! তােমার আবার এসব নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন বুঝি না।” শ্ৰীমতী জানলা দিয়ে রাস্তার আলােমাখা বকুলগাছটার দিকে তাকিয়ে তার মােটা বেটে স্নেহশীল কালাে বাবার কথা ভাবে। মরে গিয়ে মানুষ সত্যি যদি আবার জন্মায়, তবে এতদিনে হয়তাে বড় হয়ে আবার কলেজে-টলেজে পড়ছেন, হয়তাে আর কোনাে দেশে, বিলেতেই হয়তাে। এ-জমে কি সত্যি অনেকে তাঁকে ভালােবাসে? পদ্মা পুরােনাে প্রসঙ্গ তুললেন, “সেদিনের কথাগুলি ভালাে করে চিন্তা কর শ্রীমতী। আমার কথামতাে চললে তুমি সুখীই হবে। আমি তােমার মা হয়ে কখনাে তােমাকে অসুখী করতে চাই না।” , মায়ের মনে আর সে কষ্ট দেবে না। বলবে না-রুপ নিয়ে, যশ নিয়ে কই তুমি তাে সুখী হওনি, মা? পযশ নিয়ে কেউ কি কখনাে সখী হয়? যাক সে-কথা। একা বসে ভাবে, চল্লিশ বছর পার হয়ে গেলে ক’জনে তখনাে সুখী থাকতে পারে? এলামাসি, বেলামালি, চারশীলাদিদি, মিলিমামিমা, অমরেশবাবু কে বা সুখী? আর রমেশ চৌধুরী? এদের পাশে তাঁর মুখখানাও মনে পড়ে। তিনি তাে সুখী ছিলেন। তারপর ছাৈটদাদু? অনেকে তাঁকে দুষ্টলােক বলে, কিন্তু তাকে দেখে তাে মনে হয় অতিশয় সুখী তিনি। লকেট-বকেট ৮৩ কি সুখী? মিনিদি, শুভেন্দ, আমি, কে সুখী? যারা সখ আশা করে তারা সখী বই কি। ঘুম এসে চিন্তার জাল ছিড়ে দেয়। পরদিন সকালে উঠে দেখে আকাশ মেঘে ঢাকা। চায়ের টেবিলে মাকে না দেখে শ্রীমতী তাঁর শােবার ঘরে গেল। ঘরের দরজায় নেপালী আয়া বসে আছে। বলল, মাইজী অসুস্থ। উদ্বেগ নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দেখে ফিকে সবুজ বালিশে মাথা রেখে ফিকে সবুজ বিছানাতে, ফিকে সবুজ চাদর গায়ে মা এলিয়ে পড়ে আছেন, মেঘের মতাে এলিয়ে পড়েছে চুলের রাশি। ক্লান্ত চোখ দুটিকে আরাে বড় দেখাচ্ছে, চোখের কোণে কালি। অখির পায়ে শ্রীমতী মায়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াল। ঝকে পড়ে বলল, “কি হয়েছে মা?” “বুকটা কি রকম করছে, শ্ৰীমতী। মাঝে-মাঝে এরকম হয়, ব্যস্ত হয়াে না।” “না না, আমি ডাক্তার ডাকি?” “ভাকায় এসে কি করবে? ড্রেসিং টেবিলের ওপর ঐ বড়ি আছে, একটা খাইয়ে দাও। বলছি তাে, এরকম আমার হয়। এর একমাত্র ওষুধ সম্পূর্ণ বিশ্রাম আর দুর্ভাবনার হাত থেকে মুক্তি। আমার এবার মই ভালাে, শ্ৰীমতী। আর বেশি বেচে থাকা মানে আরাে কষ্ট পাওয়া। সারা জীবনটাই কষ্ট পেয়ে গেলাম। ঐতাে একশাে টাকা পাও তুমি, ওতে তাে আর মায়ের সেবা চলে না। আমার জন্য চিন্তা কোরাে শ্ৰীমতী। ভাগ্যে যা ছিল তাই তাে হবে।” শ্ৰীমতী কি বলবে ভেবে পেল না। “মাগো, আমি এক বছরের কন্যা সই করেছি, একটা বছর আমাকে সেখানেই থাকতে হবে “বেশ তাে, এক বছর পরে গেলেই চলে এস। নিজের মায়ের কাছে আসবে, তাঁর আশ্রয়ে থাকবে, তার সেবা করবে, এর চেয়ে ভালাে আর কি হতে পারে? জলে তাে পড়বে না। এলা-বেলারা নিশ্চয়ই মহা গােলমাল করবে, তােমাকে কত কি বােঝাবে। আমার দিকটা কোনাে- দিনও ওরা চিন্তা করেনি, এখনাে করবে না। তােমার মন ভাঙবে তাে?” “মা, নিজে যেটা ভালাে বুঝব চিরকাল সেইটা করতে দাদাবাব, শিখিয়েছিলেন। আমাকে মাঝে-মাঝে বলতেন, একা এসেছিস, একা যাবি, আবার মন ঠিক করতে দোকার কি দরকার? বেশ কথা না, মা?” মা অপাঙ্গে শ্ৰীমতীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। “তুমি কি রমেশ চৌধুরীর প্রতিধনি? তােমার নিজস্ব কিছু নেই ?” শ্ৰীমতীর চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে। “না মা, মাঝে-মাঝে তাঁর সঙ্গেও আমার মতে মিলত না। ভারি খুশি হয়ে তখন আমার সঙ্গে তর্কে মেতে যেতেন। অদ্ভুত সব যুক্তি উপস্থিত করতেন, যে-সব খণ্ডাতে আমাকে দস্তুরমতে বেগ পেতে হত এক-একদিন।” চোখ বুজে পদ্ম ফিরে শুলেন। “যাঁরা মরে গেছেন তাঁদের সঙ্গে তােমাকে নিয়ে কি করে আব লড়াই কবব বল? তুমি যাও, স্নানটান কর গিয়ে। একবার গােমেশকে দিয়ে মিস্টার নাগকে খবর দিও। মাঝে- মাঝেই এরকম হার্টের দোষ হচ্ছে, বিষয়-আশয় যেটুকু আছে তার তাে একটা ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। আমার গহনাগুলি ছাড়া তুমি কিছুই পাবে না, শ্ৰীমতী। ঋণের জন্য এ-বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে। যেমন টাকা রােজগার করেছি, দু'হাতে খরচও করেছি। ভেবেছিলাম রমেশ চৌধুরী তােমার নামে সম্পত্তি লিখে দিয়ে যাবে। সে যে এমন করবে তা তাে ভাবিনি।” “মা, থাক ওসব কথা এখন, তুমি ভালাে হয়ে ওঠ। আমার জন্যে একটুও ভেব না তুমি। দাদাবাবুর কাছে কিছুই কি আমি শিখিনি? ৪৫ তুমি ভেব না মা। তােমাকে একট, দুধ এনে দিই কেমন? না খেলে যে বল হয়ে যাবে।” ব্যসমস্তভাবে শ্ৰীমতী মিস্টার নাগকে একখানি চিঠি লিখে পাঠাল। পরে মিস্টার নাগ এসে কাগজপত্র নিয়ে বসলেন। পদ্মাসনা একট, সুস্থ বােধ করছিলেন, নিচে নেমে এসে আরাম কেদারায় বসলেন তিনিও। শ্ৰীমতী রেফ্রিজারেটর থেকে ঠাণ্ডা দুধ এনে তাতে লেবুর রস আর চিনি মিশিয়ে খেতে দিল মাকে। পদ্মাদেবী স্নেহভরে শ্রীমতীর পিঠে হাত বুলিয়ে হেসে বললেন, “ও পরেশ, মেয়ে যে তােমাদের রূপালী পর্দাকে একটা চান্স দিতে রাজী হয়েছে। ইস্কুলে ওর একটা বছর পরে গেলেই ও বড়াে মায়ের কাছে চলে আসবে। আমার দুঃখও 'ঘুচবে।” মিস্টার নাগ নির্বাক বিস্ময়ে মিয়মানা শ্ৰীমতীর মুখের দিকে তাকালেন। চেষ্টা করে একটু হেসে বললেন, “তােমার দুঃখ ঘােচাবে এমন কারাে সাধ্যি নেই, পদ্ম। তবে তুমি যে অতিশয় বুদ্ধিমতী সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।” গম্ভীর মুখে পুনরায় তিনি কাগজপত্রে মননানিবেশ করলেন। মিস্টার নাগ চলে গেলে বহুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন মা-মেয়ে দুজনে। তারপর পদ্মা বললেন, “কারাে কথায় কান দিয়াে না, শ্ৰীমতী। মনে রেখাে মায়ের চেয়ে যার টান বেশি তার নাম ডান। কিন্তু আমার আবার কে কেমন করছে, যাই গিয়ে শুয়ে পড়ি। গােমেশকে ও-বেলা হালকা রকমের রাঁধতে বল। রান্নাঘরে যাবার দরকার নেই তােমার, এখানেই ডেকে পাঠিয়ে বলে দাও।” মাকে ঘরে পৌছে দিয়ে, শ্রীমতী ঘর অন্ধকার করে দিল, পাখা খুলে দিল, দরজা ভেজিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে অন্ধকারে চুপচাপ পথের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। একটু পরে ছােট একখানি গাড়ি গেটের কাছে দাঁড়াল এসে। চালকের ৬ আসন থেকে যে আধবয়সী সুবেশা মহিলা নেমে এলেন শ্রীমতী তাকে চেনে। বিখ্যাত সুনয়নী বন্দ্যোপাধ্যায়কে না চেনে কে? তার উপর মায়ের বাড়িতে সেই প্রথম দিনের মেহস্পর্শ তার পক্ষে ভােলা অসম্ভব। নিচে গিয়ে স্নান হেসে সুনয়নীকে বসাল শ্ৰীমতী। “মায়ের শরীর আজ ভালাে নেই। আমার বড় ভাবনা হচ্ছে।” “আমি তােমার কাছে এসেছি, শ্রীমতী। এস, কাছে বস। পরেশ নাগের কাছে শুনলাম তুমি নাকি কাজ ছেড়ে চলে আসবে পদ্মার কাছে? নাকি অভিনয় করবে! তবে না তােমার কাজটি তােমার ভারি ভালাে লাগে ?” অতিকষ্টে ঢােক গিলে শ্রীমতী বলল, “আমার মা’র হার্ট খুব খারাপ। তাঁর যত্ন দরকার, বিশ্রাম দরকার। আমার একশাে টাকায় তাে চলবে না। আরও যে অনেক টাকা চাই। নইলে মা'র বড় কষ্ট হবে।” উক্ত দষ্টি শ্ৰীমতীর চোখের উপর নিবদ্ধ করে সুনয়নী বললেন, “প জীবনে বহ, লক্ষ টাকা রােজগার করেছে, তার কি কিছুই নেই?” “রোজগারও করেছেন দু'হাতে খরচও করেছেন। এ-বাড়িও বন্ধক দেওয়া, বিক্রি হয়ে যাবে। আমি ছাড়া মা’র কেউ নেই।” সুনয়নী মকণ্ঠে বললেন, “পদ্মার বিষয়-আশয়ের কথা না হয় ছেড়ে দিলাম। ওর হার্ট যে এত খারাপ বলছ, তুমি কি করে জানলে? ডাক্তার এসেছিলেন?” “না। আজ আসেননি। কিন্তু মা'র ওরকম মাঝেমাঝেই হয় বললেন।” সুনয়নী দেবী উঠে এসে শ্রীমতীর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন, “নিত্য আসি যাই, কই আমি তাে একথা কখনাে শুনিনি!” তারপর গভীর কণ্ঠে বললেন, “শােনাে শ্রীমতী, জীবনটা ফেলে দেবার জিনিস নয়। এর ভালাে-মন্দর জন্য তােমাকেই দায়ী হতে হবে। ভালাে করে না-ভেবে তুমি কিছুই স্থির কোরাে না। আর আমাকে দিয়ে কোনােদিনও যদি ৮ কোনাে কাজ হয়, একখানা চিঠি পাঠিয়ে দিও, আমি আসব।” বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তােমার মতাে আমার একটি মেয়ে আছে; শ্রীমতী। সে সুখে সংসার করছে। তাকে আমি পনেরাে বছব দেখিনি। কিন্তু তা নিয়ে আমার কোনাে দুঃখ নেই। তুমিও যেন আমাব মতাে ব্যস হলে মনকে বলতে পার, কিছু পেয়ে থাকি আর নাই পেয়ে থাকি, আমার কোনাে দুঃখ নেই।” শ্ৰীমতীর চোখের জল বাধা মানে না। কোমল কণ্ঠে বলে, “না-বুঝে আমি কোনাে কাজ করতে চাই না। আপনাকে আমি চিরদিন মনে রাখব। দরকার হলে অরণ করব বই কি।” এদিকে পম্পা বেশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেন। শ্রীমতীকে সঙ্গে করে মিস্টার নাগদের স্টুডিও দেখিযে আনলেন একদিন। বাড়িতে মস্ত রুটি দিয়ে বহ, হীরকোজ্জল অতিথির সঙ্গে শ্রীমতীব পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেদিন সে মা'র কাছে ফিকে নীল সিফনের শাড়ি, স, একছড়া আসল মুক্তোর মালা উপহাব পেল। বড় আলমারি খুলে নিজের কাপড় গহনার রাশি থেকে মেয়ের উপযুক্ত জিনিস সঙ্গে নির্বাচন করে দিলেন পদ্মাসনা। আমতী সেদিন রানাঘরে গিয়ে নিজে মাংসের কাবাব কবেছিল, গােমেশের ঢাকাই পরটা তৈরি কবা দেখেছিল। গড়াে মসলা দিয়ে ছােট-ঘােট বেগুনের চাটনি বানানাে হল, মনের মতাে করে বাড়িঘব সাজানাে হল। পমার অভিজ্ঞতা আর সুচি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল শ্রীমতী। ছাদের উপর ঘােট ঘরে গিয়ে বিশাল ট্রাক থেকে পদ্মা সেদিন সুন্দর সুন্দর পর্দা, গালচে, ফুলদানি বের করে এনেছিলেন। সন্ধ্যেবেলা জন পঞ্চাশেক অতিথি এলেন। শাদা জর্জেটে সুন্দর মানিয়েছিল সুনয়নী দেবীকে। মতিরাণীও এসেছিলেন, রবাহত হয়ে। ৫৮ শ্ৰীমতীর শত অনুরােধেও পদ্মা তাঁকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠাননি। বেগুনি বেনারসন পরে হাসিমুখে মতিরাণী শ্রীমতীর সঙ্গে নিজে থেকেই অতিথি সেবায় মেতে উঠলেন। পদেবী একটি কথাও বললেন না তাঁর সঙ্গে। কিন্তু তাতেও মতিরাণীর আনন্দের স্রোতে ভাটা পড়েনি। শেষ অতিথিকে বিদায় দিয়ে পদ্মাদেবী শ্রীমতীর সঙ্গে বসবার ঘরে এসে ক্লান্ত দেহে বসে পড়লেন। “কত রাত হয়ে গেল শ্ৰীমতী! যাক ভালােভাবেই শেষ হল পাটি। সত্যি তুমি চমৎকার খাবার করতে পার, সবাই তারিফ করেছে। গােমেশটাও একটা রত্ন। বন্ধ হলে কি হবে, আমি সন্দেহ করি পরেশটা পারলে ওকে ভাগিয়ে নেয়। আর মতিরাণীর কাণ্ডটা দেখলে? একটুও যদি আত্মসম্মান থাকে! দিব্যি এসে কাজে লেগে গেল, কতই যেন আপনার লােক! নিশ্চয় খেয়ে-দেয়ে গেল ?” “না, মা, উনি একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছিলেন, আমি তাই দুটো কেকের বাক্স ভরে খাবার দিলাম, বাড়ি গিয়ে স্নান করে খাবেন।” “তােমার যত বাড়াবাড়ি শ্ৰীমতী! ওসব লােককে বেশি আস্কারা দিলেই মাথায় চড়বে। সাজের বহরটা দেখলে তাে? ভদ্রসমাজের উপযুক্ত দুটো কথাও বলতে পারে না। তবু আসা চাই।” ব্যথিত হয়ে শ্রীমতী বলল, “আহা বেচারা বড় একা। ওঁর যে কেউ নেই। খুব কিন্তু খাটতে পারেন, একটুও বিরক্ত হন না। বললেন, তুমি নাকি যখন প্রথম এসেছিলে ওঁর অবস্থা বেশ ভালাে ছিল, উনিও এক দিয়ে সকলের সঙ্গে তােমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সত্যি মা, ঔর মনটা খুব ভালাে!” “আর হাসিও না বাপু! সে-পার্টির কি না ছিরি। যত সব আজেবাজে দ্বিতীয় শ্রেণীর লােক এনে জড়ো করেছিল। আমার বেশ মনে আছে। ও নিজেও তাে ঐ ক্লাশেরই মানুষ, তাই এখন আর কেউ পৌছে না।” মতী নীরব হয়ে থাকে। ৮৯ পদ্মা জিগগেস করলেন, “কিছু খেয়েছ তুমি? যা হয় কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড় গে। গােমশ এ-সব গুছিয়ে রাখবে, ওর অভ্যাস আছে।” দুটি শেষ হয়ে এল। পুতুলের বিয়ের তারিখ এগিয়ে আসছে। পদ্মার তেমন আগ্রহ ছিল না। “তােমার মাকে যারা নিমন্ত্রণ করে না, তাদের বাড়ি যাবার তােমার দরকার আছে কি?” শ্ৰীমতী কিন্তু শশানে না, “না মা, আমাকে যেতেই হবে, নইলে তাঁরা দুঃখিত হবেন। তাঁদের মনে আমি কিছুতেই কষ্ট দিতে পারব না।” “আমার কাছে এতদিন থেকে গেলে একথা জানলে তারা সব কি বলে শুননা! না কি সেখানে গিয়ে আর অভিনেত্রী মায়ের কথা স্বীকারই করবে না ? শ্ৰীমতী মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, “পরশ, রওনা হব ভাবছি, বিয়ের আর পাঁচদিন বাকি। অনেক রকম কাজ থাকবে। গােপন করা আমার স্বভাব নয় মা, ওঁরা নিশ্চয় জিগগেস করবেন কোথায় ছিলাম। আমিও বলব। তাঁরা যে খুশি হবেন না তা জানি।” মা সংক্ষেপে বললেন, “বেশ, তাই যেও।” অল্পক্ষণ নীরব থেকে জিগগেস করলেন, “বেলার মেয়েকে কি দেবে?” শ্রীমতী বললে, “কিনে দেব একটা কিছু ব্যাগট্যাগ।” মা বললেন, “আমার একটা কথা রাখ, শ্ৰীমতী, আমি একজোড়া মুক্তোর কানের ফল দেব, তাই দিও। আমার জিনিসও যা, তােমার জিনিসও তাই। তুমি অস্বীকার করলে বড় দুঃখিত হব।” শ্রীমতী বলে, “বেশ।”
সকালের দিকে শ্রীমতী বেলামাসির বাড়ি এসে উঠল। “এই তাে শ্ৰীমতীদি! বেশ মেয়ে যা হােক, বলা নেই কওয়া নেই, বেমালুম ডুব মারলে! কোথায় যাওয়া হয়েছিল শুনি?” পুতুল শ্ৰীমতীকে হাত ধরে কাছে বসায়। বেলামাসি বেশ বাঁকা চোখেই তাকালেন তার দিকে। “যাক, তব, যে এলে সেই ভাগ্যি! একা আমি কোন দিক সামলাই বল তাে? এলা তাে তার একগয়ে মেয়ে নিয়েই ব্যস্ত, তার কাছে কি কোনাে সাহায্য পাওয়া যায় ?” “এই তাে মাসিমা, আমি এসে পড়েছি, বলন কি করতে হবে? আচ্ছা, টালিগঞ্জ থেকে ওঁরা সব আসেননি? মিলি-মামিমা আর নেলি-ডলি এল না?” “বিয়ের দিন সবাই আসবে দেখ। কাজের বেলা কারাে টিকিটি দেখা যায় না। তবে আমার বৌদি বিয়েটা ঠিক করে দিয়ে মস্ত উপকার করেছেন একথা মানতে হবে। জামাই দস্তুরমতাে ভালাে ছেলে, হাজার টাকা মাইনে পায়, বালিগঞ্জে নিজেদের বাড়ি আছে, বাপ-মা কেউ নেই। এমন পাত্র কি সব সময় মেলে? এই যে একটা ফর্দ করছিলাম, একটু দেখ তাে, কিছু, বাদসাদ দিইনি তাে? বাপ-মা নেই, কাজেই বরের পক্ষের কোনাে চাহিদাই নেই। বর তাে আমার মেয়ে পেলেই খুশি! ফর্দে যেগুলিতে দাগ দেওয়া আছে সেগুলি যােগাড় হয়ে গেছে, বাকিগুলাে ৭ (৬৩) আজই তুই একবার অতুলের সঙ্গে গিয়ে কিনে দে। তাের মেশােমশাই তত একবার কেনা জিনিসের দিকে পর্যন্ত তাকিয়ে দেখেন না, তা আবার ফর্দ দেখবেন। তাছাড়া চাকরদের তাে জামাকাপড় দেওয়া উচিত, রেডিমেড কিনে আনিস। খাওয়া-দাওয়ার ফর্দটা তােতে-আমাতে আজ রাত্রে বসে করে ফেলব এখন। ভালাে করে জলখাবার দেব, পাত পাড়া তাে বে-আইনী।” শ্ৰীমতীর মনেও বিয়েবাড়ির হাসিখুশি প্রবেশ করেছে। হেসে বলল, “পঞ্চাশজনের বেশি জলখাবারও বে-আইনী মাসিমা, তবে মেশােমশাই কি সামান্য আইনকে ডরাবেন?” মহুর্তে শ্রীমতী কাজের সাগরে ডুবে গেল। পরদিন সন্ধ্যাবেলা ঘন সবুজ শাড়ি পরে, সবুজ পান্নার মালা দুলিয়ে, দুই কানে ফলের পাপড়ির মতাে দুই সবুজ পাথর পরে, সটকেশ হাতে মিনিদি এসে উপস্থিত। “ও কি রে শ্রীমতী, তুই বেচে আছিস নাকি? শুভেন্দ, তাের খবর জানতে চাইছিল, আমি আবার তাকে বলেছি তুই কবে মরে গেছিস।” শ্রীমতী হেসে ফেলল। বেলামাসি কন্ধ হয়ে বললেন, “ও কি রকম অলক্ষণে কথা মিনি? শ্ৰীমতী না-থাকলে এই বিয়েবাড়ির কি অবস্থা হত বল তাে? তুমি তাে বাছা কুটোটি ভাঙবে না।” মিনি হ্যান্ডব্যাগ থেকে ছােট একটা পাউডার বাক্স বের করে সযত্নে নাকের ডগায় একটু পাউডার লাগিয়ে বলল, “ডার্লিং আশ্চ! কে না জানে কাজ করতে গেলে তােমার-আমার দুজনেরই শরীর খারাপ হয়?” বেলামাসি বিরস বদনে উঠে গেলেন। শ্রীমতী পুতুলের নতুন তােয়ালে আর বিছানার চাদরে দে-দেখ অক্ষরে নাম লেখা শেষ করে, সেগুলিকে গুণে ফর্দ করে, বাক্সবন্দী করে ফেলে। মিনিদি সপ্রশংস নয়নে তাকিয়ে থাকে।
“আহা, “দেখ, শ্ৰীমতী, তােকে আমি একটা ভালাে সার্টিফিকেট দিয়ে দেব। তুই কৃতজ্ঞতার পাত্রী হয়ে যাবি।” কখন শুভেন্দ, এসে নীরবে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছে। শ্ৰীমতীকে দেখিয়ে মিনি তাকে বলল, “ভুল বলেছিলাম বন্ধ, সে মরেনি।” শুভেন্দ, জিগগেস করল, “তারকা-মহলে কেমন লাগল শ্রীমতী দেবী?” শ্রীমতী কি বলবে, নীরব হয়ে থাকে। ঘরে এসে শুভেন্দ, মিনির পাশে আসন গ্রহণ করল। রহস্যটা খুলেই বল না, শুভেন্দ। শ্ৰীমতী, ছুটিতে এতদিন তুই কোথায় ছিলি বল তাে? নিশ্চয় নীল চিঠির পর থেকে ধাপে-ধাপে তুই সর্বনাশের পথে নামছিস?” কিন্তু মিনির রঙ্গরসে কারাে মুখে হাসি ফুটল না। শ্রীমতী ঠোঁট চেপে বসে আছে, শুভেন্দর দৃষ্টি গম্ভীর। কিন্তু বিয়েবাড়ির নানান গােলযােগেও চাপা রইল না কথাটা। কৌতুহল কারাে কম না। এলামাসি বললেন, “তুমি কি পাগল হয়েছ শ্রীমতী? পদ্মার সঙ্গে তােমার কি সম্বন্ধ? দেড়বছরের মেয়েকে দিব্যি ফেলে রেখে চলে গেল, কুড়ি বছরের মধ্যে একবার দেখতে এল না পর্যন্ত, এখন তার আবার কিসের দাবী? রমেশকাকাকে কি ভুলে গেলে তুমি?” শান্ত গলায় শ্রীমতী বলে, “না মাসিমা, মা তাে কোনাে দাবীর কথা বলেননি। বয়েস হয়ে গেছে, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে, আমি ছাড়া তাঁকে দেখবার কে আছে বলুন?” কথা শুনে বেলামাসি রেগে গেলেন, “পদ্মার স্বভাব কি আর বদলাবে? হাঙ্গামাটকু এড়িয়ে সুবিধাটক বজায় রাখতে চিরকাল ওস্তাদ। কি ভেবেছিস তোের একশাে টাকা দিয়ে তুই পদ্মার মতাে স্বগের পাখি পুষেবি? তাছাড়া মিস বিশ্বাস একবার এ্যাকট্রেসের নাম শুনলে কদিন তাের চাকরি থাকে দেখব।” শ্রীমতী কোনাে প্রতিবাদ করে না। ঘরের কোনা থেকে মিনি ও শুতে, মনােযােগ দিয়ে কথােপকথন শুনছিল। শুভেন্দর দৃষ্টিতে বিদ্রুপের ছায়া, মিনি প্রকাশ্যভাবে সন্তুষ্ট। বলিহারি তাের মনের জোর শ্ৰীমতী! আমাকে একবার ঐ পদ্মার কাছে নিয়ে যাবি তাে?” লকেট-বকেট, অতুল-পুতুল উৎসাহের সঙ্গে শ্রীমতীর পক্ষ সমর্থন করে। বেশ করেছে গিয়েছে। নিজের মায়ের কাছে আলবৎ যাবে। কেন যাবে না? ইত্যাদি। কেবল শুভেন্দ, কোনাে মত প্রকাশ করে না। বিয়ের দিন ছােটদাদামশাই এসেছিলেন চমৎকার এক সেক্সপীয়র-গ্রন্থ উপহার নিয়ে। “দেখ, পুতুল, এই বইটা মাকে দেখিয়ে নিবি-কোন- কোন নায়িকা ভদ্রসমাজে অচল, আর ঠিক তাদের মতাে হতে চেষ্টা করবি।” শ্ৰীমতীর প্রতি অর্থপণ দৃষ্টিপাত করেন, কিন্তু কুশলপ্রশ্ন ছাড়া আর কিছু বলেন না। নিবিঘে বিবাহ সম্পন্ন হল। সকেট শ্রীমতীর কানে-কানে বলল, “আমাকে তােমার মতাে হতে শিখিয়ে দাও শ্রীমতীদি। অতন, আমাকে হীরে বসানাে আংটি দিয়েছে, কেউ জানে না। পুতুলের বিয়ে দেখে আমার বিষম সাহস বেড়ে যাচ্ছে। দেখাে আমার মনেও কত জোর আছে।” সমালােচনাকে শ্রীমতী ভয় করে না, কিন্তু মায়ের সম্বন্ধে এ মন্তব্য খচ করে বুকে লাগে। মক্কোর কানের ফল পুতুলকে নির্জনে দিল। পুতুল খুব খুশি, আনন্দের সঙ্গে উপহার নিল, সগর্বে সকলকে দেখাল ভালাে হত, বেলামাসি বললেন, “নিজের পয়সায় শস্তা কিছু, কিনে দিলে ঢের শ্ৰীমতী। এলামাসি বললেন, “পুতুল তুমিই বা কি বলে নিলে?” পুতুল মুক্তো দুটি কানে পরে বলল, “বাঃ, কি সুন্দর দেখাচ্ছে, দেখ!” শ্ৰীমতী ছােট একটি দীর্ঘনিশ্বাস বুকে চেপে ম একটু হাসল। ১৪ বিবাহের পরদিন চলে গেল পুতুলরা। অতিথিরাও বিদায় নিলেন। এলামাসির বাড়ি গেলেন। বেলামাসি শয্যা নিলেন। মিনিদি মন ভালাে করবার জন্য পুতুলরা যাবার ঠিক আগে সিনেমা দেখতে চলে গেল। শ্ৰীমতী একা সেই ভাঙা হাট গুছােতে বসল। কখন শুভেন্দ কাছে এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্য করেনি। “পুতুলরা চলে গেল একট, আগে, আপনার সঙ্গে দেখা হল না।” তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল শ্রীমতী। শুভেন্দ, সেকথার ধারও ঘেষল না, নীচু গলায় বলল, “শ্রীমতী, তুমি অভিনয় করবে স্থির করেছ?” সােজা হয়ে বসে শ্ৰীমতী বললে, “কে বলেছে?” “সেটা বড় কথা নয়, কথাটা সত্যি কিনা তাই জিগগেস করছি। অভিনয় করার তুমি কি জাননা, বল তাে?” “না জানলে শিখে নেওয়া যায়। অভিনয় করা কি পাপ নাকি? আপনি সিনেমা দেখতে যান না?” কার কথার প্রতিধনির মতাে শােনাচ্ছে না? শ্ৰীমতী সঙ্কোচে কুকড়ে গেল। “অভিনয় করা পাপ নয়, এবং মাসে আমি অন্তত বার-তিনেক সিনেমা দেখি।” চতুর ব্যারিষ্টার শুভেন্দুও মনের কথা গুছিয়ে বলতে পারছে না, নিরভিমানা শ্রীমতীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। “পাপ সেটা নয়, কিন্তু নিজেকে এক্সপ্লয়েটেড হতে দেওয়া পাপ। এরপরেও তুমি আর স্বাধীনতার গর্ব কোরাে না কোনােদিন। বােলাে যে তুমি স্বাবলম্বী!” দরজার কাছ থেকে ছােটদাদামশায় বলেন, “কি জালা! শুভেন্দ, তুমি এই নিয়ে ঝগড়াঝাটি করবে জানলে তােমাকে কখনােই এসব বলতুম । ভাবলাম, তুমি যদি একটু বুঝিয়ে বল। এদিকে তুমি এসে— ক্ষকণ্ঠে শুভেন্দ, বললে, “বুঝিয়ে বলার কি আছে? আমি আবার বুঝিয়ে কি বলব?” তারপর নতমুখে ধীরে-ধীরে চলে গেল।
No text on this page.
১০ ছুটি শেষ হয়ে গেল। চাঁপাডাঙার ঘন সবুজ নিমগাছের ছায়ার তলায় ফিরে এল শ্রীমতী। আসবার দিন বাক্স গুছিয়ে, ছােট সবুজ হােন্ডলে বিছানা বেধে রেখে, কাউকে কিছু না বলে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। মা লক্ষ-লক্ষ প্রশ্ন করলেন। শেষে বললেন, “দেখ শ্রীমতী, ঐরকম একটি বরও কি এত লেখাপড়া শিখে, এত সযােগ পেয়েও জোটাতে পারলে ? তােমার দৃষ্টি কোথায় থাকে বল তাে? এদিকে চলে তাে যাচ্ছ, পরেশের সঙ্গে একটা পাকাপাকি কথা বলে গেলে হত না?” শ্ৰীমতী বুঝিয়ে বলেছে চাঁপাডাঙায় তার একবছর পূর্ণ হতে এখনাে অনেক বাকি, পরেশবাবুর সঙ্গে এখনই কি আর কথা বলা যেতে পারে, ইত্যাদি। তারপর মায়ের শীর্ণ গালে ছােট্ট একটি চুমাে খেয়ে সে বিদায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু ছুটি শেষে অন্তরে কিসের এমন শূন্যতা সে বােধ করে! বাড়িঘর ছিল না, আপনার জন ছিল না, মা কোথায়, জানতাে কোনােদিন। সব পেয়েও এত কেন শুন্য লাগে দশদিক সে ভেবে পায় না। ট্রেন সন্ধ্যাবেলা চাঁপাডাঙা পৌছাল। স্কুলের টিচাররা কেউ-কেউ ফিরেছেন এরই মধ্যে, তাঁদের ঘরে আলাে জলছে। মিসেস অধিকারী শ্ৰীমতীর ঘর খুলে, ধুয়ে-মুছে, আলাে জেলে তারই প্রতীক্ষা করে ছিলেন। বুকের মধ্যে যে হিম তুষার ক'দিন ১৭ থেকে জমাট বেধেছিল-সহসা গলে তা জল হল। মিসেস অধিকারীর মুখখানি শ্ৰীমতীর হঠাৎ যেন বড় ভালাে লাগল। “কেমন ছিলেন বলন। আপনার ফরমায়েস ভুলিনি। ঐ ঘােট সটকেশটা খলন, দেখুন কেমন ভালাে কাঁচি আর লােমওয়ালা তােয়ালে এনেছি। ওগুলি আপনাকে আমার উপহার।” কৃতজ্ঞতায় মিসেস অধিকারীর চোখ ছলছল করে উঠল। দুবার কেশে ধরা গলায় অনভ্যস্ত আবেগে শুকনাে সেই খরখরে গলায় বললেন, “আচ্ছা, বেশ লােক তাে আপনি। নিন, এখন উঠন, স্নানের ঘরে জল দুলিয়ে রেখেছি, মুখ-হাত ধুয়ে ফেলুন। পরান এখনি গরম লুচি তরকারি নিয়ে আসবে, আর দেরি করবেন না।” ট্রেনের কামরায় স্তিমিত আলােতে বসে শ্ৰীমতী মনেমনে ভেবেছিল- আমার মন খারাপ, বাড়ি গিয়ে স্নান করে শুয়ে পড়ব। কারাে সঙ্গে দেখা করব না, কোনাে কাজ করব না, কিছু খাব না। এসে দেখে মিসেস অধিকারী তার মন খারাপ করবার পথটি নিপুণভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন। স্নান সেরে ফসা কাপড় পরে গরম লুচি তরকারি খেয়ে নিল। মিসেস অধিকারী পাশের চেয়ারে বসে হাসিমুখে বিয়ে-বাড়ির গল্প শুনলেন, নীলনলিনীর নির্বুদ্ধিতার কাহিনী আদ্যোপান্ত বিস্তৃত করলেন। অনেক রাত্রে তিনি যখন কাঁচি, তােয়ালে গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নিলেন ঘুমে শ্রীমতীর চোখ জড়িয়ে এসেছে। পরদিন সকালে স্কুল খুলল। দলে-দলে মেয়েরা তাদের প্রিয় শ্রীমতীদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, রাশি-রাশি ফলে ঘর ভরে গেল। কোথাও একটু ফাঁকা রইল না। কিসের অভাব তার? এই তাে সুখে বুক ভরে যাচ্ছে। অভাব তার কোনােদিন ছিল না, আজও নেই। তবু তাে বছর পরে গেলে চলে যেতে হবে, রুগ্ন মায়ের ভার নিতে হবে গিয়ে। ছােট একট, নিঃশ্বাস পড়ে। চোখ বুজলেই রমেশ চৌধুরীর মুখখানি ভেসে ওঠে। শাদা আন্দির ১৮ পাঞ্জাব আর মিহি শান্তিপুরী ধুতি পরা, পায়ে লাল বিদ্যাসাগরী চটি, শাদা হয়ে আসা এলােমেলাে চুল। কুড়ি বছর ধরে ঐ মানুষটির কত কাছে কাছে সে থেকেছে। তাঁর প্রতিটি ভালাে-লাগা মন্দলাগার কথা সে জানত। সেই পণ্য সঙ্গলাভ করে কোনােদিনও শ্রীমতী কোনাে সঙ্গের অভাব বােধ করেনি। মা নেই, বাবা নেই, ভাইবােন নেই, তব, মনে হয়নি ভালােবাসার লােক নেই। মনকে বলে আমাকে দিয়ে সত্যিকারের কোনাে প্রয়ােজন তাঁর ছিল না। সুখী মানুষ ছিলেন তিনি, তাঁর ধন ছিল, মান ছিল, বিদ্যার সম্ভার ছিল, কোনাে অভাব তাঁর ছিল না। কিন্তু সত্যি কি অভাব ছিল না? স্ত্রী মারা যাওয়ার পরও কি কোনাে অভাব বােধ করেননি? আচ্ছা, মা তাঁকে কি করে ফেলে রেখে চলে গেলেন? দাদাবাবুর কাছে তারা দুজনেই যদি থাকত, তবে কেমন হত? রমেশ চৌধুরীকে আর পাকে সে একসঙ্গে কল্পনা করতে পারে না। শুভেন্দুর কথাগুলি স্মরণ করে মনে-মনে তার রাগ হয়। দুখিনী মায়ের ভার নিতে চাওয়ার মধ্যে অন্যায়টা কোথায় ? শুভেন্দ, কি জানে যে আমার যদি অনেক টাকা থাকত অভিনয় করবার তাহলে প্রয়ােজনই হত না। কিন্তু কেমন করে আমি অভিনয় করব? স্কুল-কলেজে মাঝে- মাঝে গেফি একে রাম-লক্ষণ সাজা ছাড়া কখনাে তাে অভিনয় করিনি! মনে পড়ে কি একটা তেলচিটে কালাে রঙ দিয়ে গোফ আঁকা হত, সাতদিন ধরে সে রঙ ভালাে করে উঠতই না। মিস বিশ্বাস এলেন : “কই মিস্ চৌধুরী, মুখখানি শকননা কেন? ছুটিতে শরীর ভালাে ছিল না বুঝি?” শ্ৰীমতী হেসে বলে, “ছিল বই কি। শেষ ক'টা দিন বিয়েবাড়ির অনিয়ম গেল। তাই হয়তাে অমন দেখাচ্ছে।” মিস বিশ্বাস একবার তার দিকে তীক্ষ দৃষ্টি হেনে সংবাদ সংগ্রহ করতে বসলেন। বেলার মেয়ের কোথায় বিয়ে হল, ঘটকালী করে বিয়ে না পছন্দ করে বিয়ে ? এবার মেয়েরই বা কি খবর? এরা সবাই মিলে মতীরই বা একটা বিয়ে দেয়নি কেন? সেই সচতুরা মেয়েটির সঙ্গে সুদর্শন যুবকটির বিয়ে এখনাে যদি ঠিক না হয়ে থাকে তবে আর কোনােদিনও স্থির নাও হতে পারে মন্তব্য করলেন অবশেষে। শ্ৰীমতী আবার একট, স্নান হাসল, “আপনি কি আমাকে এখান থেকে তাড়াতে চান মিস বিশ্বাস, যে আমার বিয়ের জন্য এত ব্যস্ত হচ্ছেন?” মিস বিশ্বাস তখন অন্য কথা পাড়লেন। এখানকার কাজ শ্ৰীমতীর ভালাে লাগছে তাে? কারণ শিগগিরই সেক্রেটারির বাড়ি মিটিং হবে, আসছে বছরের কর্মপদ্ধতি তৈরি হবে, কে থাকবে কে থাকবে না, নতুন টিচার আনতে হবে কিনা, স্থির হবে সে দিন। শ্ৰীমতী নির্বাক। মিস বিশ্বাস বিস্মিত হয়ে তার বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে কি বুঝতে চেষ্টা করলেন। “শ্রীমতী, তুমি আমার মেয়ের বয়সী। সত্যি কথা বল দিকিনি, নিশ্চয় তােমার মনে কোনাে একটা দুর্ভাবনা আছে। আমি কাল থেকে লক্ষ্য করছি। এস, আমার কাছে এস।” সহসা শ্ৰীমতীর মনের বন্ধনগুলি ঢিলে হয়ে যায়। ধীরে-ধীরে দুই চক্ষ, লাবিত হয়, দুই বিন্দ অশ্র, গণ্ড বেয়ে কোলের উপর পড়ে। মিস বিশ্বাস বললেন, “মনের দুর্ভাবনার কথা বজনের কাছে গােপন করা একরকমের স্বার্থপরতা। তুমি সব কথা খুলে বল আমাকে।” নিজেই উঠে এসে কাছে বসলেন তিনি। সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যাকালে শ্রীমতী জীবনে এই প্রথম তার মনের বার আর কারাে কাছে উঘাটিত করল। রমেশ চৌধুরী ছিলেন তার অন্তর- লােকবাসী, তাঁকে কিছু বলবার কখনাে প্রয়ােজনই হয়নি। তিনি চলে গেলে আর কাকেই বা সে বলতে পারত? শুনে মিস বিশ্বাস বহুক্ষণ নীরবে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শ্ৰীমতীর এই পরম সমস্যার কে সমাধান করে দেবে? ১০০ অনেকক্ষণ পর মিস বিশ্বাস দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “তােমার মায়ের শরীর যে সত্যি অত খারাপ তুমি ঠিক জানাে? এতদিন তাে তাঁর বেশ চলে যাচ্ছিল। তুমি যদি কাছে না-যেতে তবে কি হত? জীবনে এত টাকা তিনি উপার্জন করেছেন, করেছেন কি সে-সব দিয়ে? নামকরা রুপসী অভিনেত্রী, নিশ্চয় তাঁর বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই। আমার ধারণা তুমি মনের মধ্যে ব্যাপারটাকে অযথা বড় করে তুলেছ। আমার কিছুই বলা উচিত হয় না জানি, কিন্তু তােমার মা যখন কোনােদিনও তােমার প্রতি নিজের কর্তব্য করেননি, তােমার উপর কোনাে দাবীই তাঁর থাকতে পারে না।” শ্ৰীমতৃী ব্যাকুল হয়ে বলে, “না, না, আপনি ভুল বুঝবেন না, মা কোনাে দাবী করছেন না। মা তাে ইচ্ছে করে আমাকে অনাদর করেননি। প্রথমে অনেক বছর বড় কষ্টে তাঁর দিন গেছে। মতিরাণী বলে এক অভিনেত্রী তখন তাঁকে কত সাহায্য করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। মা তখন কি করে একটি ছােট শিশুর ভার নেবেন! আর পরে যখন আমি দাদাবাবুর কাছে লেখাপড়া শিখে মানুষ হচ্ছি তখন আনেননি এই মনে করে যে মা তাে আমাকে অত ভালাে করে শিক্ষা দিতে পারতেন । মা আমাকে সব কথা বুঝিয়ে বলেছেন। এখন মায়ের শরীর ভেঙে পড়েছে, আর অভিনয় করেন না, টাকাপয়সাও ফরিয়ে এসেছে, বাড়িটা পর্যন্ত বন্ধক দেওয়া, এসময় আমার কি কর্তব্য না তাঁর ভার নেওয়া ?” মিস বিশ্বাস কোমল স্বরে বললেন, “তােমার মাকে কি তুমি এখানে তােমার কাছে এনে রাখতে পারবে না, শ্ৰীমতী? আমি বললে কর্তৃপক্ষ থেকে কোনাে আপত্তি উঠবে না। এখন তাে আর অভিনয় করেন না তােমার মা, এখানে তার কথা কেই বা জানে? দেখ শ্ৰীমতী, আমি খৃষ্টান, এসব বিষয়ে আমাদের একটু অন্য ধরনের মতামত, মােট কথা তােমার মা যখন রিটায়ার করেছেন, এখানে চলে আসতে তাঁর কোনাে সংকোচের কারণ নেই। তুমি তাকে সেকথাই লিখে দাও। এখানকার ১০১ জলহাওয়া তত খারাপ নয়, চুপচাপ জায়গা, রন্ন মানুষের উপযােগী। তােমার উপার্জনে শাদাসিধেভাবে দুজনের কুলিয়ে যাবে। আর আসছে বছর তােমার মাইনে তাে দশটাকা বাড়বে শুনছি।” চাঁপাডাঙা আসতে মায়ের সংকোচ বােধ হতে পাবে মনে করে শ্রীমতীর ঠোঁটে একট, কৌতুকের হাসি দেখা দিল। মাথা নেড়ে মিস বিশ্বাসকে বলল, “আমার মাকে আপনি দেখলে বুঝতেন এখানে তাঁকে আনা যায় । তাঁর জগৎ আলাদা। টালিগঞ্জ ছেড়ে এক পা তিনি নড়বেন না। গােমমশ, আয়া, বাহাদুর ছাড়া একদিনও চলবে না তাঁর, এখানে নিয়ে এলে একদিনে হাঁপিয়ে উঠবেন।” মিস বিশ্বাসের মুখ থেকে সহানুভূতির ছায়া আস্তে-আস্তে মিলিয়ে গেল। “তাহলে বল তিনি স্বার্থপর, নিজের সুখের জন্য তােমাকে অকাতরে বলি দিতে প্রস্তুত আছেন। আর তুমি তব তারই প্রশ্রয় দেবে? কি জানি শ্ৰীমতী, আমরা ছেলেবেলা থেকে শিখে এসেছি নিজের জীবনের ভালাের জন্য নিজেদেরই জবাবদিহি করতে হবে, অনন্য কেন চালাবে আমাকে? কি জন্য? শ্ৰীমতী হতাশকণ্ঠে বললে, “মা আমাকে চালাতে চেষ্টা করবেন কেন? আর কোনাে উপায়ে বেশি টাকা রােজগার করা যায় বলে মনে হচ্ছে না, তাই অগত্যা অভিনয় করার কথা ভাবছিলাম।” মিস বিশ্বাস ব্যথিত চিত্তে উঠে দাঁড়ালেন। “যা ভালাে বুঝবে তাই করবে। বাইরের লোেক এ-বিষয়ে কে কি বলতে পারে? কিছু মনে কোনাে । ঐ শুভেন্দুও কি এসব কথা জানে? সে কিছু বলেনি?” শ্ৰীমতীর হদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। রম্বকণ্ঠে কেবল মাথা নাড়ে, শুভেন্দ, জানে সব কথা। মিস বিশ্বাস বলেন, “আচ্ছা, তবে আসি। আমি আর কি পরামর্শ দিতে পারি তােমাকে?” দরজার কাছে একবার থেমে বললেন, “এ-সব কথা চাপা থাক এখন, কারাে সঙ্গে আলােচনা করে কাজ নেই। কমিটি ১০২ তােমাকে আসছে বছরের কথা জিগগেস করলে যা ভালাে মনে কর সেই কথাই বােলাে। চলি আজ।” গাছ থেকে টপটাপ জল পড়ছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কি একটা আর্দু সগন্ধে ভরে গেছে ঘর। শ্রীমতী নিশ্চল হয়ে বসে থাকে বহুক্ষণ, নিজের বক্ষের স্পন্দন নিজে যেন শুনতে পায়। সিক্ত চোখের পাতা আপনিই কখন শুকিয়ে গেল। উঠে আলাে জেলে, চোখে-মুখে জল দিয়ে শ্রীমতী বাংলা রচনার খাতা দেখতে বসল। হদয়াবেগ বিলাস মাত্র, তার জন্য সময় দেবে এত সময় তার কোথায়? সে-রাত্রিতে শ্রীমতী স্বপ্ন দেখল মিনিদির সঙ্গে শুভেন্দর বিয়ে হচ্ছে। লাল ওভারকোট পরে, হ্যাণ্ড- ব্যাগ কোলে, মিনিদি বিয়ের আসনে বসেছে, শুভেন্দর মাথায় এতাে বড় টোপর। চারশীলা মাসিমার আদেশে পরতঠাকুর বশ-শার্ট গায়ে দিয়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন। শ্ৰীমতী যেন মায়ের কাছ থেকে চেয়ে এনেছে গজমতির মালা, উপহার দিতে হবে! পরদিন বিকেলের ডাকে পুতুলের চিঠি এল, সে কত সুখী ভাষায় ব্যক্ত করা তার পক্ষে অসম্ভব, তবে সে ফে কোনােরপে এর যােগ্য নয় একথা সে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করে। দু-তিনদিন হল তাদের চারশীলা পিসিমা হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গিয়েছেন, মিনিদিকে শুভেন্দুদা দার্জিলিঙ নিয়ে গিয়েছিল, একদিনের জন্য শেষ দেখা হল । খবর পেয়ে বেলামাসি আর তাঁর নির্বক স্বামী দুজনেই দাজিলিঙ গিয়েছেন। মিনিদি বেচারার ভাই-বােনও কেউ নেই, এবার সে বড়ই একা পড়বে, ইত্যাদি। খােলা চিঠিখানা পড়ে রইল টেবিলে। শ্রীমতী ভাবতে বসল। এমনি করে একদিন তাহলে মৃত্যু আসে! যে আজ ছােটখাট তুচ্ছ জিনিস নিয়ে এত চিন্তা করছে বসে, কাল সে কোথায় চলে যায়। দার্জিলিঙের বাড়ি শুন্য হয়ে গেল। পুরােনাে চাকরগুলি দুদিন পরে আর কোথাও চলে যাবে হয়তাে। চারশীলাদির কাঠের আলমারিতে থাকে-থাকে শাদা ১০৩ সিল্কের শাড়ি সাজানাে, প্রত্যেকটির সঙ্গে ম্যাচ-করা জামা, মাল। আলমারির নিচে দেরাজে সারি-সারি শাদা জুতাে, কালাে জতাে। গয়নার দেরাজে হীরের আর মুক্তোর আংটি আর মালা। কোনাে একটি জিনিসের একটু এদিক-ওদিক হবার যাে নেই। শাড়ির একটি ভাঁজ তাঁর নষ্ট হত না কখনাে। ও-সব নিয়ে মিনিদি আজ কত না বিব্রত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে মিনিদির কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করে। আচ্ছা, মিনিদি এখন কি করবে? এবার হয়তাে শুভেন্দর সঙ্গে বিয়ে হবে তার। শুভেন্দর সঙ্গে শ্রীমতীর কি বা সম্বন্ধ ? তার মনের কথা বােঝবার জন্য সে এতটুকু চেষ্টা কোনােদিন করল না। তবু কানে বাজে শুভেন্দর মেঘমন্দ্র ঘর। “আর তুমি স্বাধীনতার গর্ব কোরাে না, কোন দিন বােলাে না যে তুমি স্বাবলম্বী।” শ্রীমতী গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। দরজার কাছ থেকে মিস নাগ ও মিস পালের কণ্ঠস্বর শােনা গেল। “নতুন খবর শুনেছেন মিস চৌধবী? আমাদের মিস সেনের যে বিয়ে। এবার স্কুল-বাড়িতে রসুনচৌকি বসবে দেখবেন।” শ্ৰীমতী খুশি হয়ে বলে, “বাঃ, খুব সুখবর তাে। কার সঙ্গে বিয়ে, কবে বিয়ে? মিস সেন তাহলে চললেন আমাদের ছেড়ে। ওঁকে আমার ভারি ভালাে লাগে কিন্তু।” “আরে সেই কথাই তাে বলতে এলাম। কাণ্ডটা একবার শুনুন। বিয়ে হচ্ছে এখানকার ছেলেদের হাইস্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে, তারা আপনাদের মিস বিশ্বাসের মতােই খান! বিয়ে হবে রেজিস্ট্রি-অফিসে, কলকাতায়। তবে এখানে ফিরে এসে নাকি আমাদের একটা ভােজ দেবেন।” শ্ৰীমতী মুহর্তের মধ্যে মিস সেনের বিপুল সুখের এক কণা যেন লাভ করল। “বা, বেশ তাে! ওদের বিয়েতে একটি ভালাে জিনিস দিতে হবে, তাই না?” ১০৪ ?
মিস ও মিস পাল অবাক হয়ে শ্ৰীমতীর দিকে তাকালেন। “আচ্ছা সত্যি মিল চৌধুরী, আপনি আশ্চর্য লােক। মিস সেন আপনার সঙ্গে এ্যাদিনের মধ্যে কটা কথা বলেছে যে তার বিয়ের কথা শুনে একেবারে আহাদে আটখানা হয়ে গেলেন? তার উপর বিধমীর সঙ্গে বিয়ে! কি জানি, আমাদের তাে বাপ, এসব ভালাে লাগে না। শুনেছি এই মিস সেনই একদিন বাপ-মা’র সঙ্গে ঝগড়া করে, তাঁদের পছন্দ-করা ভালাে পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন। তারপরেই তাে এখানে কাজ নিয়ে চলে আসা। এখন সেই বিয়েই তাে করলি, অথচ বাড়াবাড়ি তবে করলি কেন?” শ্ৰীমতীর হদয় তীৱ সৰ্যালােকে কোমল ফুলের পাপড়ির ময়ে সঙ্কুচিত হয়ে গেল। বাক্স খুলে কলকাতা থেকে আনা নীল রাংতায় মােড়া চকোলেট বের করে সে অতিথি সৎকার করল। বিয়ের বিষয়ে আর কোনাে প্রশ্ন উচ্চারণ করতে পারল না। মিস নাগ ও মিস পাল চলে গেলে পর বারান্দায় কার মদ, পায়ের আওয়াজ শােনা গেল। আস্তে পর্দা সরিয়ে প্রবেশ করলেন মিস সেন, তাঁর চোখ দুটি দূর আকাশের তারার মতাে উজ্জল। মদ, হেসে দুহাত বাড়িয়ে শ্রীমতীর হাত জড়িয়ে ধরলেন, “আপনি আমাকে অভিনন্দন জানাবেন না মিস চৌধুরী? মিস বিশ্বাস ছাড়া আর কেউ শুভেচ্ছা জানাল না আমাকে। আপনিও না ? শ্ৰীমতী তাকে দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরল: “কত যে খুশি হয়েছি। মিস্টার বােসের প্রশংসায় মেয়েরা তাে পঞ্চমখ, শুনলাম এখানকার নাইটকুলের জন্য কত খাটেন ভদ্রলােক, আর চমৎকার নাকি ফুটবল খেলেন? আচ্ছা, এত কথার এক বর্ণ জানতুম না আমরা। বসন, একট, মিস্টিমুখ করতে হবে। ঘরে আর কিছু নেই, সামান্য একটু চকোলেট দিতে পারলাম।” মিস সেন তৃপ্তির হাসি হাসলেন, “কি সুন্দর আপনার এই সবুজ ১০৫ চেয়ারটা? জানেন, মিস চৌধুরী, নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না। দেখুন কেমন চুনিমণির আংটি দিয়েছেন, উনি তাে বড়লােক/নন খুব, তাই ছােট আংটি দিয়েছেন, দুনিয়াতে এমন আর একটি খুজে বার করুন দেখি।”,একটু থেমে, “আমার মা-বাবার মত নেই মিস চৌধুরী, তাঁদের দুঃখ দিতে বিষম কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সেই সঙ্গে আনন্দ রাখবার জায়গা পাচ্ছিনে। এত কথা কাকে যে বলব একটা লােক খুজে পাচ্ছিলাম না, হঠাৎ আপনার কথা মনে হল। আপনি আমার সমবয়সী, আমার মনের কথা আপনি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। অথচ কাউকে না-বললে • দম আটকেই মরে যাব।” খ্রীমতীও হাসিমুখে বললে, “দেখবেন, আমাদের ভােজটা আগে হয়ে যাক, তার আগেই দম আটকে কাজ নেই।” হঠাৎ ছায়া পড়ল মিস সেনের মুখে, একট, নীরব থেকে জিগগেস করলেন, “আচ্ছা, মিস চৌধুরী, জীবনে বড় দুঃখ কি বড় সুখ কখনাে পেয়েছেন? মানুষ তারপর একট, বদলে যায়, তাই না?” শ্ৰীমতী বললে, “কেন বলুন তাে?” “কি জানি, এই আমাকেই দেখন না, লােকের সঙ্গে ভালাে করে মিশতেই পারতাম না, খালি মনে হত কে কোথায় কি মনে করল! আজ আমার সংকোচের বেড়া উড়ে গেছে, দেখুন আপনার কাছে কেমন ছুটে এলাম।” সেই তৃপ্তিভরা হাসিমুখ দেখে শ্রীমতীর মনে হল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের নিত্য সহচর যে নিদারুণ নৈঃসঙ্গ সে মাঝে-মাঝে পরাজয় স্বীকার করে। শ্ৰীমতীর মনের ব্যথা লঘু হয়ে গেল। ভাবল, আজকাল আমি ছােট জিনিসকে সত্যি বড় করে দেখতে শুরু করেছি। প্রতিটি দিন যদি নির্ধারিত সময়ে প্রতিদিনের দাবী নিয়ে এসে উপস্থিত হত, পথিবী কবে একটা বিশাল পাগলাগারদ হয়ে উঠত তাহলে। এরপর কদিন ধরেই শ্ৰীমতীর বারবার মনে হতে লাগল কথাটা। ১০৬ অনেক ভেবেচিন্তে মিনিদিকে একখানা চিঠি লিখে দিল। ভাবল মিনিদি এখন দুঃখে আচ্ছন্ন, পরে কোনােদিন হয়তাে বলবে, “ওরে শ্রীমতী, তাের ব্যবহারেই শক পেয়ে মায়ের এমনটা হল!” নাঃ, মনে শান্তি নেই। একসঙ্গে অনেকগুলি চিঠি লিখে ফেলল, মাকে, বেলামাসিকে, পুতুলকে। ছুটির শেষে ফিরে আসার আগে মতিরাণী আদর করে মাংসের সিঙাড়া ভেজে এনে খাইয়ে গিয়েছিলেন, ঠিকানা দিয়েছিলেন, বার-বার করে বলে দিয়েছেন চিঠি লিখতে। আজ মনে পড়াতে তাঁকেও চিঠি লিখল একখানি। এর আগেও তাে কত সময় তার হাতে থাকত, বালিশের ওয়াড়ে, টেবিলের চাদরে সক্ষম সেলাই দিয়ে সে ফল তুলত, তখন কাউকে চিঠি লিখবার প্রয়ােজন বােধ করত । কেউ লিখলে উত্তর দিত এইটুকু মাত্র। আজ আর সেলাই নিয়ে সময় কাটে না। মতিরাণীকে চিঠি লিখতে বসে ভাবল লিখে দেয়, “মাসিমা, আপনি আমার মায়ের দেখাশুনা করবেন। মায়ের শরীর ভালাে না, একা-একা থাকেন, আপনার জন কেউ তাঁর কাছে নেই। তারপর মনে হল পদ্মাসনার কুঞ্চিত নাসা, তাঁর বিদ্রুপভরা কথা। পদ্মাসনা মতিরাণীকে সত্যি ভারি ঘণা করেন। সেই যে বেগুনি শাড়ি পরে, অনিমন্ত্রিত অতিথি হয়েও, ঘর্মাক্ত কলেবরে মতিরাণী পদ্মার বাড়ির পার্টিতে খেটে দিয়ে গিয়েছিলেন, আর কেউ হলে করত? অনেক ভেবেচিন্তে লিখল, “মাসিমা, এখানে এসে বারবার আপনার কথা মনে পড়ে। আপনার তৈরি সিঙাড়ার স্বাদ আমার মুখে লেগে আছে। যখনই মনে হয় মায়ের কথা, সেই সঙ্গে মনে হয় আপনার কথা।” ইত্যাদি। সে চিঠি মতিরাণী বহুদিন বালিশের তলায় রেখে দিয়েছিলেন, বন্ধুদের কাছে গর্ব করে দেখিয়েছিলেন, দেখ পদ্মার মেয়ের সঙ্গে আমার কত ভাব। পদ্মাই না-হয় আজকাল পৌছে না। মিনিদির চিঠির উত্তর সে আশা করেনি, কিন্তু তার চিঠিই প্রথমে এল। ৮ (৬৩) ১০৭ শ্ৰীমতীর চিঠি পেয়ে তার ভালাে লেগেছে, সে আশা প্রকাশ করেছে যে শ্ৰীমতীর মনে মায়ের আচরণে যে ব্যথা লেগেছিল সেট এতদিনে মুছে গেছে। কে জানে, হয়তাে শ্রীমতীর আচরণের শক সহ্য করতে না পেরেই মা স্বর্গে গেলেন। এখন মিনিদি কিছুদিন দার্জিলিঙের বাড়িতে থাকবে। শুভেন্দ, চার-পাঁচদিন থেকেই চলে গিয়েছে। বেলামাসিরা আছেন আরাে কিছুদিন। শ্রীমতী যেন এখুনি কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে আসে, কারণ সময়মতাে চা-টা পাওয়া যায় না ইত্যাদি। • এর মধ্যে এক রবিবার লকেট বকেট এসে উপস্থিত। শ্রীমতী তখুনি তাদের নিয়ে মিস বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করিয়ে আনল। মিস বিশ্বাস হাসিমুখেই তাদের সমাদর করলেন, শ্রীমতীকেও দুটি কথা বললেন, কিন্তু মনের কথা দুজনের আর কখনাে হল না। সাগ্রহে মিসেস অধিকারী লকেট-বকেটের খাবার আয়ােজন করতে লাগলেন, শ্রীমতীর আর কোনাে কাজ রইল না। লকেট-বকেটকে ঘরে এনে বসাল, সােজাসুজি জিগগেস করল, “আমাকে দেখতে এসেছ না আর কোনাে উদ্দেশ্য আছে ?” বকেট, বললে, “আমি তােমাকে দেখতে এসেছি। লকেটের উদ্দেশ্য আছে।” লকেট বললে, “আমার একুশ বছর পূর্ণ হল, শ্রীমতীদি। এখন আমি সাবলিকা।” হেসে ফেলল শ্রীমতী, “সাবালিকা হয়েছ, তা এখন আমাদের কি করতে হবে?” লকেট কৃত্রিম বিরক্তি দেখিয়ে বলল, “আহা, কিছু বােঝ না যেন! জানাে এখন আমি ইচ্ছা করলেই রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করতে পারি।” শ্ৰীমতী বললে, “লকেট, এত তাড়াতাড়ি কিসের ভাই! এমন করে পাওয়ার মতাে যে জিনিস আর একট, না-হয় প্রতীক্ষা করলে তার জন্য! দুটো দিন সময় দাও না, বি. এ. পরীক্ষাটা সামনে, পরীক্ষাটা হয়ে যাক, ১০৮ সেটুকু অপেক্ষা করতে পারবেই। তারপরও যদি এলামাসির মত না হয়, তখন না-হয় যা করতে হয় কোরাে।” বকেট, আড়চোখে একবার লকেটকে দেখে নিয়ে শ্রীমতীকে বললে, “তুমি তাে মিথ্যা কথাকে ঘৃণা কর, কিন্তু আমরা আজ কি বলে তােমার এখানে এসেছি জানাে? বলেছি তােমার এখানে চায়ের পার্টি, তুমি চিঠি লিখেছ, সে-চিঠি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। নইলে মা-ও হয়তাে সগে এসে উপস্থিত হতেন, ব্যস, লকেটের গস কুকড়! তাছাড়া, আমার একটা পরামর্শও আছে, তুমি সামনে ছিলে না তাই সাহস করে বলতে পারছিলাম না। মাকে এড়িয়ে সােজা বাবার কাছে আপীল করলে কেমন শ্ৰীমতী উৎসাহিত হয়ে উঠল, “ঠিক বলেছ! মেসােমশাইকে দলে টানাে! লকেট তুমি গিয়ে বলতে পারবে না?” লকেট বললে, “বাবা কখনাে কোনাে কিছুতে থাকেন না, তাই তাঁকে কিছু বলবার সাহসই হয়নি। তবে মা কি আর নিজের দিকটা বলেননি তাঁকে। তব, একবার বলতে পারি, বলেছি তাে আজকাল আমার ভারি সাহস হয়েছে।” বকে খুশি হয়ে বললে, “হবেই তাে, অত টোমাটো সস খেলে সাহস বাড়বে না? আমার মনে হয় বাবা খুব রিজনেবল লােক, তাছাড়া কে জানে পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে সব বিষয়েই ভালাে হয়।” শ্ৰীমতী বললে, “হয়ই তাে ভালাে।” লকেট বললে, “ঢের ভালাে, ঢের ঢের ভালাে।” সমস্যা সমাধান করে তিনজনে বাকি দিনটুকু মনের আনন্দে কাটাল। মিসেস অধিকারী কত কি যে তৈরি করে পাঠালেন! বকেট বলল, : “এতদিনে বােঝা গেল শ্ৰীমতীদি কেন চাঁপাডাঙা ছেড়ে নড়ে না, এত সব যােগাবে কে?” বিকেলের গাড়িতে ওরা চলে গেল। সন্ধ্যাবেলা শ্ৰীমতীর মন আনন্দে ১০৯ কানায় কানায় ভরা সেদিন। মিস সেন এসে খানিকক্ষণ গপ করে গেলেন। তাঁর জন্য নতুন-নতুন জামা সেলাই করে দিচ্ছে সে, মিস সেনের আহাদ আর ধরে না। বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। সলজ্জভাবে বললেন, “মিস্টার বােসের বাড়ি চুনকাম হচ্ছে, দরজা-জানলায় নতুন রঙ লাগানাে হচ্ছে। সুন্দর বাগান আছে বাড়িতে, কত বিলিতী ফলের গাছ আছে। আগে ওখানে মিশনারী সাহেবরা থাকত, কি সুন্দর বাগানই করেছিল তারা।” মিস সেন অনর্গল বকে যান, শ্ৰীমতী মনােযােগ দিয়ে শােনে। বিয়ের পরও মিস সেন পড়াতে আসবেন বলেছেন। মিস্টার 'বােস তাে দশটা থেকে চারটে কাজে ডুবে থাকেন, মেয়েদের স্কুল বসে সাড়ে দশটায়, সাড়ে-তিনটেতে ছটি, কোনাে অসুবিধা হবে না। কিসে মানুষ সুখী হয় কে বা জানে। মায়ের ক্লিষ্ট রপের কথা মনে পড়ে শ্রীমতীর। জীবনে একদিনের জন্যও সুখী হতে পারেননি বােধ করি। সুখী হবার একটা যদি কোনাে ধরাবাঁধা উপায় থাকত, কত সহজ হত জীবন, পদ্মাকে তাহলে শ্রীমতী এখুনি সুখী করে দিত। কিন্তু পদ্মকে সুখী করতে হলে এই স্কুলের কাজ ছেড়ে তাকে টালিগঞ্জের সেই ছােট হলদে বাড়িতে উঠে যেতে হবে। পরেশ নাগের সুপারিশে কোনাে একটা ভালাে স্টুডিওতে অনেক উজ্জ্বল আলাের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে হবে। সে কি পারবে? হয়তাে পারবে না। পরেশ নাগ হতাশ হবেন, পদ্মা অসন্তুষ্ট। না, শিখতে হবে অভিনয়, শিখতে হবে সাজসজ্জা, শিখতে হবে পাঁচজনের সঙ্গে মেলামেশা। কিন্তু তাতেও যদি সখী না হন পদ্মা! তাহলে? কিন্তু চেষ্টা সে করবেই। তার মানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, ওই হলদে বাড়িতে লেসের পর্দার আড়ালে, গােমেশের উৎকৃষ্ট রান্না খেয়ে তবে মাকে সুখী করতে হবে। নিমগাছের ছায়াচ্ছন্ন শান্তস্নিগ্ধ এই দিনগুলিকে মনে হবে স্বপ্ন। মিস বিশ্বাসের কণ্ঠস্বরটি অতি থেকে মুছে যাবে, মিস সেনের মুখখানি আর তার মনে থাকবে ১১০ , মিসেস অধিকারীর যত্ন থেকে চিরদিন বঞ্চিত থাকতে হবে। তীক্ষ- কণ্ঠে মেয়েরা আর ডাকবে না, “শ্রীমতীদি, ঘরে আসব?” শ্ৰীমতীর হাসি পেল ভেবে, আমি কি পাগল হলাম! কাজ ছেড়ে দেব বলে দখ না করে, এর সঙ্গে দেখা হবে না, ওর কথা শােনা হবে না বলে আক্ষেপ করতে বসেছি। কাজ কি কখনাে কারাে জন্য পড়ে থাকে? যে-কাজের চাকা হাতে করে তারও মত্যু আছে, কিন্তু কোনাে কাজই তাই বলে থেমে থাকে না। এ-জগতে এমন কেউ নেই যে অপরিহার্য। পরলােক বলে কিছু আছে কিনা তারই বা নিশ্চয়তা কি? এদিকে এ- পথিবীরও আমাদের দিয়ে সত্যিকারের কোনাে প্রয়ােজন নেই! আশ্চর্য! প্রয়ােজন কাউকে দিয়ে নেই ? রমেশ চৌধুরীর পুরােনাে একটা কথা মনে পড়ল। শ্রীমতী যদি কখনাে কাজের অছিলা করে কোথাও বেরতে না চাইত অমনি বলেছেন, “ওরে, তােকে ছাড়াও কাজ চলবে রে। যীশ মরে গেল, মহম্মদ মরে গেল, রামচন্দ্র মরে গেল, বিবেকানন্দ মরে গেল, তব, পথিবীটা দিব্যি চলল, আর তুই একদিন বাড়ি না-থাকলে সংসারটা ঠেকে থাকবে, তাও কি কখনাে হয়?” ভাবল তাহলে শুভেন্দকে দিয়েও পথিবীর কোনাে প্রয়ােজন নেই। শুভেন্দু, না-জন্মালেও কোনাে ক্ষতি হত না! শুভেন্দর নবদবাদলের মতাে স্নিগ্ধ শ্যাম-শােভন রপেরও কোনাে মূল্য নেই! শুভেন্দর মধুর গম্ভীর কণ্ঠস্বর থেমে গেলেও ক্ষতি নেই কোনাে! শুভেন্দর ধনুকের মতাে ভুগলের নিচে নীলােৎপল দুই চোখের দীপ্তি নিষ্প্রভ হলে এসে যায় না কিছ! শুভেন্দর বজ্রের মতাে কঠিন, কুসুমের মতাে কোমল, হদয়ের স্পন্দন থেমে গেলেও সংসার চলবে! কি আশ্চর্য! তবু, সংসার চলবে! যে শুভেন্দর দেহ ধারণ করেছে বলে পৃথিবীটা আজ তার চোখে অর্থময় সে না-থাকলেও কিছু ক্ষতি হত ১১১ । সর্ষের আলাে ান হত না, দক্ষিণ বাতাস শুধ হত না, ঘন সবুজ বনানীর অন্তরাল থেকে মর্মরধ্বনি নীরব হত না! তব, দিন হত, জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতাে রাত, পাখিরা গান গাইত, গাছে ফল ফুটত, ভ্রমর গুঞ্জন করত! কোনাে কাজ বন্ধ হত না, কোনাে অভিপ্রায় ব্যর্থ হত না! হায় কেন আমি তাকে ভালােবাসি! মিস সেন ডাকলেন, “শ্রীমতী! কি মিষ্টি তােমার নামটি! আর আপনি বলব না তােমাকে, আর ‘মিস চৌধুরী বলে ডাকব না। তুমি যে আমার বন্ধু! যখন আনন্দ হয় ভাবি শ্রীমতীকে গিয়ে বলে আসি। যখন দুঃখ হয় ভাবি শ্রীমতীকে জানাতে হবে। ভাগ্যিস তুমি এসেছিলে শ্রীমতী, ভাগ্যিস তুমি ভুল করে আর কোথাও, অন্য কোনাে দেশে জন্মাওনি। যদি জন্মাতে বিলেতে, বা আফ্রিকায়, তাহলে? যদি একশাে বছর আগে বা একশাে বছর পরে জন্মাতে কি সর্বনাশটাই হত বল তাে! তুমিও আমাকে ললিতা বলে ডেক, কেমন?" শ্ৰীমতী হেসে বলল, “মিস্টার বােস বুঝি তােমাকে তাই বলে ডাকেন? আচ্ছা, আমিও না-হয় তাই বলব।” ললিতার কথা ফরােয় না। হেসে বলে, “কি আর করা! নিজের বাসন- কোসন নিজেই কিনছি দেখেশনে। ওবাড়ির হালচাল যদি দেখ ভাই! সুরেন বলে একটি পুরােনাে চাকর আছেন, তিনিই বাড়ির গিন্নী। কোনাে দুটো পেয়ালা বা প্লেট একরকম নয়। রান্নাঘরের প্রত্যেকটা বাসন তােবড়ানাে, কালাে, বিশ্রী! খুন্তি নেই, সাঁড়াশী নেই, ভাবতে পার? বাসন মােছা ন্যাকড়াগুলির যা ছিরি! আমি ভাই সব খুটিয়ে দেখে এসেছি, ভদ্রলােক যখন কাজে বেরিয়ে গেছেন, তা তােমরা মন্দ বল আর যাই কর। কি কিনতে হবে না হবে আমার তাে জানা দরকার।” শনে সত্যি খুশি হল শ্রীমতী। এতে তার মনের মতাে কথা। বলে, “বেশ, আমি তােমাকে কি উপহার দেব ভেবে মরছি। তা একসেট ডেকচি দিলেই তাে হয়। তাই না? পাঁচটা ডেকচি থাকবে-ভাত রাঁধা থেকে ডিম সেদ্ধ সবই চলবে তাতে। কিন্তু মিস্টার বােস ভােজ না-খাওয়ালে কিছু পাবে না।” ললিতা বারবার অঙ্গীকার করে, নিশ্চয় মিস্টার বােস ভােজ খাওয়াবে। খাওয়াবে না তাে কি। সে চলে গেলে শ্রীমতীর মনে হয় এই আমি কত ভেবে স্থির করলাম জীবনটার কোনাে মানেই হয় না, সংসারটা কিছু নয়, আবার এই আমি মহা খুশি হয়ে ললিতা সেনের সংসার পাতার সাহায্য করতে যাচ্ছি। আশ্চর্য! আকাশে বর্ষার মেঘ জমা হচ্ছে। রােজ বৃষ্টি হয়। সেই অনিবার বারি- বিপাতে শ্রীমতীর হদয়ে এক নতুন শক্তি সঞ্চারিত হতে থাকে। মনে হয় চারদিকের এই প্রকাণ্ড বিশ্বজগৎ পড়ে আছে, কারাে সঙ্গে তার অন্তরের কোনাে যােগাযােগ নেই। নিজের অন্তর তারই একান্ত আপনার। মা আছে, বন্ধ আছে, ভালােবাসার লােকও আছে, কিন্তু শ্ৰীমতী তাদের কে ? ১১৩
No text on this page.
৮১ শ্ৰীমতী ভেবেছিল শুধ, কাজ দিয়ে বুঝি মনটাকে ভরে রাখা যায়। কাজের বেলায় দেখল তাতে ফাঁক ভরে না। তব, নিজের চারদিকে একটা সজীব কাজের পরিবেশ সে সৃষ্টি করে তুলেছে। সকালে খাতা দেখা, সান খাওয়া; সারাদিন পড়ানাে। বিকেলে গা ধুয়ে, চা খেয়ে আজকাল আর বেরােনাে যায় না, একটানা বর্ষা চলছে। ঘরে বসে সে তখন ললিতা সেনের নতুন রেশমী জামাতে নিখুত করে ফল তােলে। মাঝে-মাঝে সততা ফরিয়ে গেলে ছাতা মাথায় বেরােতেই হয়। স্টেশনের পিছনে ছােট্ট মনিহারি দোকান, সেখান থেকে রঙ মিলিয়ে সততা কিনে আনে। “আপনার সেই ঘাের লাল রঙটা কবে আনিয়ে রেখেছি, তা দিদিমণি আর আসেনই না।” দোকানী পরিচিত হাসি দিযে অভ্যর্থনা জানায়। “যা বৃষ্টি ব্রজলাল। বেরােবার জো কি আছে? কই দেখি তােমার সুতাের বাক্স। আমার ডেকচির সেট এনেছ ?” ব্রজলাল সগর্বে এনে দেখাল ঝকঝকে ডেকচির ভিতরে ডেকচি বসানাে, পুরাে একটা সেট। ব্রাউন কাগজে মুড়ে রেখেছে। “আমিই পেীছে দেব দিদিমণি মাস্টারবাবুর বাড়িতে, বিয়ের পর যেদিন ফিরে আসবেন সেদিন হলেই তাে হবে? আহা মাস্টারবাবু, বড় ভালাে লােক, ওরকম সচরাচর দেখা যায় না।” ব্রজলালের মুখেও প্রশংসা ধরে না। সুতাে বেছে নিয়ে শ্রীমতী বলল, “এই সুতাে চারটে নিলাম। আর ১১৫ সত্যিই ডেকচি তুমি পৌছে দিলে আমারও সুবিধা হবে। সঙ্গে আমি একটা চিঠি দিয়ে দেব, সেটি নিতে ভুলাে না কিন্তু। ললিতা আমার বন্ধ কিনা।” ললিতা আমার বন্ধু। বন্ধু বলতে শ্রীমতীর বুক যেন সুখে ভরে গেল। বন্ধুর মতাে কি বা আছে জগতে? আত্মীয়স্বজনরা না চাইতেই থাকে, চেষ্টা করে তাদের লাভ করতে হয় না, কিন্তু বন্ধুদের যােগাড় করে নিতে হয়, তাদের হদয় জয় করতে হয়। ললিতা আমার বােন হলে তাকে পেতে আমার কোনাে কৃতিত্বের প্রয়ােজন হত না, সে এমনি আমার জীবনে জটে যেত। মনে হত না তাকে পাওয়ার মধ্যে এত তৃপ্তি থাকতে পারে। আপন মনে সবুজ পাতার নক্সা তােলে শ্রীমতী, মুখে মদ, হাসি লেগে আছে। শুভেন্দুর কথা ভাবছিল। শুভেন্দু ইচ্ছে করে ভুল বুঝল তাকে। এদিকে সপ্তাহে তিনবার চিঠি আসে নীল পর খামে, ঈষৎ গােলাপ- গন্ধ মাখা। ঘরে ফিরে সেই একই কথা লেখেন পদ্মাসনা। আমার শরীর তেমন ভালাে যাচ্ছে না। তােমার বছর কবে শেষ হবে তারই আশায় ব'চে আছি। পরেশ খুব ভালাে সুযােগ দেবে তােমাকে। মা থাকতে তােমার কোনাে ভাবনা নেই। শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে ললিতা সেনের বিয়ে হয়ে গেল, কলকাতায় এক 'রেজিস্ট্রি অফিসে। শ্রীমতীর ছুটি নেই, সঙ্গে যেতে পারল না। তার বদলে ললিতার বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে দিল, সঙ্গে যাবে যে ছােট সটকেশ সেটিও। “কি মেয়ে রে তুই ললিতা। এত সাবান, তেল, কীম, পাউডার, এসেন্স দিয়ে করবি কি? মিস্টার বােস বেচারীর মাথা ঘুরিয়ে দিবি দেখছি। ভদ্রলােক ছেলে ঠেঙিয়ে জীবন কাটান। কৃত্রিম বিস্ময়ে দুই চোখ বড় করে ললিতা জবাব দেয়, “কি বলিস। ১১৬ ও তাে কিছুই নয়, ওটকু লাগবে না? তুই যেন কি? পাউডারও মাখিস বােধ করি তুই ?” শেষ মুহুর্তে ললিতার সঙ্গে মিস বিশ্বাস নিজেই গেলেন কলকাতায়। পড়ে রইল তাঁর সারাদিনের সহস্র কাজ। কোথাও একট, এটি নেই তাঁর কাজে। যদি ওঁর মতাে একটুখানিও হতে পারতাম! শ্রীমতী ছােট্ট একট, নিঃবাস ফেলল। পুতুলের গুছনাে বিয়ের কথা মনে পড়ল। কত সুখী হয়েছে পুতুল। ললিতাও হবে, নিশ্চয়ই হবে। মিস্টার বােসের মতাে লােক হয় না, সবাই তাে একথা বলে। কেন তারা সুখী হবে না? বাধা দিয়ে ললিতার বাবা-মা অন্যায় করেছেন। যেমন অন্যায় করছেন এলামাসিও। বাবা- মা’দের ভালােবাসা কি গভীর, কিন্তু সময়ে-সময়ে কি সাংঘাতিক। বাইরে তাকিয়ে দেখল শ্রাবণ শেষে শরৎকাল কখন নিঃশব্দ চরণে এসে আমবাগানকে অধিকার করেছে। গাছের পাতায়-পাতায় ও কিসের শিহরণ, শ্ৰীমতী এতদিন লক্ষ্য করেনি! মিস্টার বােসের বাড়ি গিয়ে সবাই মিলে আনন্দ করে বিয়ের ভােজ খেয়ে এল। ললিতা তাদের আদর করে বসাল, তার চোখ দুটি তারার মতাে উজ্জ্বল। মিস্টার বােসের দীর্ঘ, শ্যামবর্ণ, সুগঠিত দেহে স্বাস্থ্যের আভা লেগে আছে। মদ, হাসি নিয়ে তাদের কত আপ্যায়ন করলেন ভদ্রলােক। মিস পাল আর মিস নাগও গিয়েছিলেন। বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে শতমুখে প্রশংসা করলেন তাঁরাও। অনেক রাত্রে মিস্টার বােস কোথা থেকে তিনখানা ঘােড়ারগাড়ি জুটিয়ে এনে তাদের পৌছে দিলেন। ক্লান্ত দেহ আর প্রসন্ন মন নিয়ে শ্রীমতী সেরাত্রে শুয়ে পড়ল। মনে-মনে বার বার বলল ওরা সখী হােক, ওরা সুখী হােক, ওরা সুখী হােক। কিন্তু চোখে আর ঘুম আসে না। ঘুরে ফিরে উৎসব-বাড়ির কথা মনে ১১৭ পড়ে। মিস্টার বােসের মা-বােনরা সত্যি উদার। আদর করে ললিতাকে তারা গ্রহণ করেছেন। ললিতার মা-বাবা একখানা চিঠি পর্যন্ত লেখেননি। সন্ধ্যাবেলা ললিতার সতেরাে বছরের ছােট ভাইটি চুপিচুপি কয়েকঘণ্টার জন্য এসেছিল। মিস্টার বােস দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। শ্ৰীমতী লক্ষ্য করেছিল কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তাঁর চোখ দুটি সেই মুহূর্তে। তারপর রাত্রের ট্রেনে চলে গেল ছেলেটি, কিন্তু ললিতার চিত্তে কোথাও যদি একটুখানি ব্যথা লুকিয়ে থাকবার স্থান থাকে, সেটুকুও কানায়-কানায় ভরে গিয়েছিল। শ্ৰীমতী মনকে বােঝাল রাগ পুষে রাখতে নেই, দুঃখকে আঁকড়ে ধরে বাঁচিয়ে রাখতে নেই। উঠে পড়ে আলাে জেলে শুভেন্দুকে একখানা চিঠি লিখতে বসল। প্রীতিভাজনেষ, তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ। ভুলকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় , সেইজন্য এই চিঠি। অভিনয় করবার আমার কোনাে শখ নেই। অভিনয় করতে কেউ আমাকে জোর করেনি। তবে কেন করব? তুমি আমার প্রশ্ন মায়ের কথা জানাে, তাঁর সেবার ভার গ্রহণ করতে হলে যা-যা করা আমার প্রয়ােজন আমাকে সমস্তই করতে হবে। আমার একশাে টাকা মাইনের চাকরিতে কুলােবে না। কেন তুমি এক্সপ্লয়টেসনের কথা তুললে? আমার যে কত দুঃখ হয়েছে বলতে পারি না। আশা করি ভালাে আছ। ইতি - ছােট একখানি শক চিঠি। মধুর কথা কততাই হয়তাে বলা যায়, শ্রীমতীর তার একটিও মনে পড়ল না। খাম বন্ধ করে, ওপরে ঠিকানা লিখল কলকাতার। সেখানে সে আছে কিনা, পৌছবে কিনা এ-চিঠি তার হাতে, কে জানে। কিন্তু এখন সে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমােত যেতে পারে। পরদিন কমিটি মিটিং। তার আগে মিস বিশ্বাস একবার এলেন। শ্ৰীমতী ১১৮ বসবার জায়গা দিতে যাচ্ছিল, তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “একটুও সময় নেই, মিস চৌধুরী। আমি মিটিংএর কথা জিগগেস করতে এসেছিলাম। আপনি তাহলে সত্যিই আসছে বছর আর থাকবেন না? মন ঠিক করে ফেলেছেন?” শ্ৰীমতী নিচু গলায় বললে, “আমার থাকবার কোনাে উপায় নেই, মিস বিবাস। আমি ইচ্ছে করে চলে যাচ্ছি না।” ললিতা চায়ে নিমন্ত্রণ করেছিল, আর সময় নষ্ট করার জো নেই, অন্যমনস্কভাবে শ্রীমতী প্রস্তুত হতে গেল। মাঝপথে মিস পাল আর মিস নাগের সঙ্গে দেখা। “বেশ আছেন মিস চৌধুরী! নােজ নেমন্তন্ন! কই আমাদের যে বড় ডাকে না।” শ্ৰীমতী হেসে বলে, “আমি নিশ্চয় তাহলে আপনাদের চেয়ে ভালাে, তাই বেশি ডাকে।” মিস পাল বললেন, “আপনার বন্ধু, সেই জমিদার বাড়ির মাথা-পাগলা বৌয়ের কাণ্ডখানা শুনেছেন? কাল রাত্রে সে ট্রেনে চেপে পালাবার চেষ্টায় ছিল। কি সাহস বলুন তাে? একবর্ণ লেখাপড়া জানে না, হাতে মাত্র একটি টাকা, কতখানি বুকের পাটা বলন।” শ্ৰীমতী উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। “কি হল বেচারীর ?” “কি আর হবে? তার স্বামী দেখতে পেয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে এনেছেন। ও নাকি মহা কান্নাকাটি করেছে! এখন মন গলেছে স্বামীর, ওকে সঙ্গে করে কলকাতা নিয়ে যাচ্ছেন, নাকি লেখাপড়া শেখাবেন। আমি হলে অমন স্বামীর মুখ দেখতাম না।” শ্ৰীমতী কোনাে উত্তর দিতে পারে না। কিন্তু মনটা আবার তার খুশি হয়ে ওঠে। ১১৯
No text on this page.
১২) আরও কাটল কিছুদিন। শুভেন্দু সে চিঠির উত্তর দেয়নি, পেল কি পেল না তাও বােঝা গেল না। তবে লকেট লিখেছে। বাবাকে বকেটই বলেছে সব কথা, তব, শেষ মহতে লকেটের একটু কেমন যেন, ঠিক ভয় নয়, তবে নার্ভাস লাগছিল। বাবা বলেছেন, “এত কথা আগে বলিসনি কেন? ডাক ওকে।” বকেট, লকেটকে ডেকে আনে। বাবা অবাক হয়ে বলেন, “আহা ওকে কেন? ও না পরীক্ষার পড়া করছে, কিছু খায় না, কোথাও যায় । সেই ছােকরাকে ডেকে আনতে বলছিলাম।” লাফাতে-লাফাতে তখনি কোথা থেকে যেন অতনুকে ধরে নিয়ে এল বকেট। বাবা তাকে সামনে বসিয়ে হাতে একটা সিগারেট গজে দিয়ে, তার বয়স, স্বাস্থ্য, বিদ্যা, চাকরি, মাইনে ও সিগারেটটা না-খাওয়ার কারণ কি জানতে চাইলেন। অতন, বললে, “ও আমি খাই না। শেষ পর্যন্ত বাবা বলেছেন, এপ্রিল মাসে পরীক্ষা, জুন মাসে বিয়ে। মা এতক্ষণ একেবারে নীরব। তবে রাগ করেননি কারণ রাত্রে এসে অনেক আদর করে গেছেন। ভালােই হল। এলামাসির মনেও এবার শান্তি হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য, আমাদের ভালােবাসা, বন্ধুত্ব এসব অনেক সময়ে তাে প্রকৃত নয়ই, রাগ- গুলােকে পর্যন্ত বিশ্বাস করা যায় না। আপত্তিগুলির ওপর পর্যন্ত নির্ভর করা যায় না। আমার অনুভূতি বােধহয় তেমন গভীর নয়, তাই সহজে বিচলিত হই না আমি। রাগে অন্ধও হই না, আহাদে গলেও ১২১ যাই না। ছােটবেলায় মা, বাবা, ভাই-বােন কাউকে পাইনি তাই কি এমনটি হলাম? মনে পড়ে রমেশ চৌধুরীর কোমল কৌতুকময় মুখখানি, পুরােনাে চাকর-দাসীদের সেবা। সগর্বে মুখ তুলে জানলা দিয়ে অস্তমান সূর্যের শেষ রশ্মিরেখার দিকে তাকিয়ে ভাবে, কোনাে দিনও আমার কোনাে অভাব ছিল না, এতদিন পরে কি আমার অভাবের কথা মনে করবার সময় হল ? মিসেস অধিকারী দশটা টাকা ধার করতে এলেন। শীর্ণ দুই গালে তখনাে চোখের জলের দাগ রয়েছে। কথা বলতে ঠোঁট কাঁপছে তখনাে। শ্ৰীমতী তখনি তাঁকে দশ টাকা দিয়ে জিগগেস করল, “কোনাে বিপদ ঘটেছে, মিসেস অধিকারী? আমি কি কিছু করতে পারি ?” মিসেস অধিকারী মাথা নাড়লেন। চলে যাওয়ার উপক্রম করে কি মনে করে ফিরে এসে শ্রীমতীর আরাম চেয়ারে বসেই পড়লেন। মিনিট দুই চুপ করে থেকে বললেন, “বলুন তাে মিস চৌধুরী, দুষ্ট লোেককে ক্ষমা করলে কি অন্যায় হয়? অনুতপ্ত দুষ্ট লােক নয়, বিপদে পড়েছে এমন দুষ্ট লােক?” শ্ৰীমতী তাঁর পাশে বসে আস্তে আস্তে বলল, “আপনার ক্ষমা করতে ইচ্ছে করে?” মিসেস অধিকারী চোখ মুছলেন : “অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল, বশর- বাড়ির লােকের কাছে তেমন প্রিয়ও হতে পারিনি। আমার স্বামী আমাকে গােড়াতে নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেন, কিন্তু পরে আমাকে আর ভালাে লাগত না। আমিও চুপ করে থাকবার মেয়ে ছিলাম না। ভীষণ ঝগড়াঝাঁটি হত। শেষটা চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। বিধবা বড় ননদেরই অনেকটা কারসাজি। কতদিন হল চলে এসেছি! ভাইরা আশ্রয় দিলে না, কত দুখে দিন কাটিয়েছি। বন্ধুর মধ্যে ঐ আমার সমবয়সী ভাইঝি নীলনলিনী আছে। কেমন যেন বই পাতাতেই জানিনা আমি। আজ আবার দুমাস থেকে ঐ বড় ননদ চিঠি লিখেছেন, ১২২ আমার স্বামী আজকাল তাঁকেও টাকাপয়সা দেন না, বয়েস হয়ে গেছে নিজেও কিছু করতে পারেন না, খাওয়া-পরা চলে না। কি করি, কিছু কিছু করে টাকা পাঠাচ্ছি। আমারই দিন চলা দায়, ওদিকে লাইফ ইনসিওরের টাকাটাও না দিলেই নয়, শেষ পর্যন্ত আপনার কাছে হাত পাততে হল। তবে আর মাত্র তিনটে কিস্তি দিতে হবে, তারপর একসঙ্গে অনেকগুলি টাকা পেয়ে যাব। ভাবছি এখানে একখানা ছােট্ট ঘর করে ননদকে এনে রাখব। আমারও তাে বয়েস হয়ে যাচ্ছে, কারাে জন্য কিছুই করতে পারলাম না। ওকে এখানে এনে রাখলে কেমন হয়?” শ্ৰীমতী বলে “বেশ তাে এনে রাখবেন, কিন্তু খরচ চালাতে পারবেন তাে ?” মিসেস অধিকারী বললেন, “আমার ননদ চমৎকার ক্রশের কাজ, ছাচের কাজ জানেন। মিস বিশ্বাস বলছিলেন এখানে একটা কাজ ঠিক করে দিতে পারবেন। তাহলেই চলে যাবে দুজনের। সারা জীবনটাই ভাই বােডিংএ কাটালাম, নিজের একটা বাড়ির শখ মাঝে-মাঝে হয়।” শ্ৰীমতী অন্যমনস্ক হয়ে যায়। ভাবে, কি আশ্চর্য মানুষ মিস বিশ্বাস, ঠিক যেখানটিতে দরকার সেইখানেই আছেন। ভাগ্যিস এখানে কাজ নিয়ে এসেছিলাম নইলে তাে দেখতে পেতাম না। মিসেস অধিকারী উঠে পড়লেন। “মনটা বড় খারাপ হয়ে গিয়েছিল মিস চৌধুরী, কেন জানি পুরােনাে কথাগুলি একটি-একটি করে মনে পড়ছিল। একবার ভালােবেসে কেউ যদি দুরে সরে যায় তার মতাে দুঃখ আর এজগতে নেই। জানেন, বিয়ের পর প্রথম রােজ-যাকগে, কেন যে ভাবি ওসব কথা।” মিসেস অধিকারী চলে গেলে শ্রীমতীর মনে হয় এই জীবনটা একখানি ছায়াচিত্র, শ্রীমতী তার দর্শকমাত্র। ছবির মানুষদের সুখদুঃখে হেসে- কেদে আকুল হই, কিন্তু ওরা আমার কে? কার সঙ্গে আমার কি বা স? মায়ের সঙ্গেই বা কি? যদি ঐ মা না হয়ে, আর কেউ অন্য রকমের চেহারা নিয়ে তার সামনে দাঁড়াত এসে, বলত, “ওরে আমিই তাের মা, আমিই তােকে পেটে ধরেছিলাম, আমার জন্য কি করবি বল ?” শ্ৰীমতী তখনি বলত, “মাগাে, আমি তােমার সেবা করব, তােমাকে সখী করতে চেষ্টা করব।” সে তার মা-মানুষটিকে ভালােবাসে না, ভালােবাসে মা-চিন্তাটিকে। মাকে ভালােবাসা কর্তব্য, তাই বুঝি তার মনে হয় মাকে ভালােবাসি। একদিন সে রমেশ চৌধুরীকে ভালােবাসত। তিনি মনে গেলে, আর কাউকে বাসে না। কারাে সঙ্গে তার হদয়ের যােগ নেই। সে একলা এসেছিল, একলা যাবে। হদয়ের নৈঃসঙ্গ তার কেউ ঘুচাতে পারবে না। পরদিন বিকেলে পরেশ নাগের টেলিগ্রাম এল, শ্ৰীমতীর মায়ের স্ট্রোক হয়েছে, টেলিগ্রাম পাওয়ামাত্র সে যেন চলে আসে। নীরবে সুকেশ গুছিয়ে, স্কুলের খাতাগলি গােছা করে হাতে নিয়ে শ্রীমতী মিস বিশ্বাসের বাড়ি গেল। নিঃশব্দে মিস বিশ্বাসের হাতে এগিয়ে দিল টেলিগ্রামটি। মিস বিশ্বাস চকিতে সেটি পড়ে নিয়ে, শ্ৰীমতীর হাত ধরে টেনে তাকে পাশে বসালেন। আজকে হটার ট্রেন ধরলে তুমি সেখানে ন'টার মধ্যে পৌছে যাবে, শ্রীমতী। একা যেতে পারবে, মা কাউকে সঙ্গে দেব? ছুটির জন্য ভেব না।” মত। ধীরে-ধীরে বলল সে একা যেতে পারবে। টেশন থেকে ট্যায়ি নিয়ে নেবে বরং। “না, না, অত রাত্রে এক ট্যাক্সিতে যেও না। তার চাইতে বাস ভালাে। সাবধানের নাম মেই। কিসে কি হয় কে জানে।” ফত বা মনে হল রেলগাড়ির কামরাতে বসে। পরের স্টেশনে একজন ঢ়া প্রবেশ করলেন। শ্রীমতীর সিথির দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “বিয়ে-টিয়ে করনি, খুব ভালাে কাজ করেছ। কোথায় যাচ্ছ, মা ?” শ্ৰীমতী সংক্ষেপে উত্তর দেয় মায়ের অসুখ, স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতা যাচ্ছে। “ওমা, তুমি মাস্টারণী বুঝি? মায়ের সেবার কি অন্য লােক নেই, ভাইবােন নেই তােমার?” শ্ৰীমতী মাথা নাড়ে। প্রৌঢ়া কৃপামিশ্রিত দৃষ্টিপাত করেন। “ওমা, সে কি কথা, বিয়েথাও করলে না, ভাইবােনও নেই, বাপও নেই, মাও চলল। তারপর তােমার অবস্থাটা কি হবে?” শ্ৰীমতী নিরুত্তর থাকে। কে যেন তার কণ্ঠরােধ করে দেয়, টনটন করে ওঠে বুকটা। যে শ্রীমতী একলা এসেছিল, একলা যেতে প্রস্তুত, তার আবার মা মরে গেলে কি হয় ? যে ছ'মাস আগেও জানত না মাকে, কি হয় তার মা না-থাকলে? শ্ৰীমতীর মায়ের মতাে মা যার, মায়ের মৃত্যুতে তার আবার দুশ্চিন্তা কিসের? তব থেকে-থেকে মন বলে, হায়-হায় তবে তুমি কাকে সুখী করবে? রাত্রি নটার পর ট্রেন কলকাতায় পেছিল। চারদিক অন্ধকার করে বৃষ্টি নেমেছে। এই বৃষ্টিতে টালিগঞ্জ ! ভাবে কে আবার আমাকে নিতে আসবে? আমাকে নিতে আসবার লােকের কি দরকার? দেখ দাদাবাব, আমাকে কেমন একা চলতে-ফিরতে শিখিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজেই পারি। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের গেটের কাছে পৌছবার আগেই রমেশ চৌধুরীর ছােটকাকা এগিয়ে এসে শ্ৰীমতীর হাত থেকে তার ঘােট সটকেশটা টেনে নিলেন। এ কি হল শ্রীমতীর? দুই চক্ষ, লাবিত করে অশ্রু, নামল কেন? ছােটদাদামশাই ব্যস্তসমস্তভাবে আধময়লা একখানা নস্যির গন্ধমাখা মাল এগিয়ে দিলেন। অন্যদিন হলে কিছুতে নিতে পারত না। আজ দুহাত বাড়িয়ে সেই মাল নিয়েই সে চোখ মুছল। ১২৫ বাইরে একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলছে। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে পৌছতে- পৌছতে দুজনেই ভিজে গেল। “ছােটদাদ, মা এখন কেমন আছেন?” “চল দেখবে চল, অত ব্যস্ত হবার কিছু নেই দিদিমণি, কালই হয়তাে দেখবে, কথা বলতে পারছে পা।” “মা কি কথা বলতেও পারেন না, ছােটদাদু? কে আছে তার কাছে? আয়া ?” “হ্যাঁ, আয়া আছে, নার্সও আছে, আবার মতিরাণীও আছে। সেই তাে আমাকে আর পরেশকে খবর দিল।” মতিরাণী মায়ের কাছে আছেন। শ্ৰীমতীর চিত্ত কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হল। “তুমি উদ্বিগ্ন হয়াে না দিদিমণি, ডাক্তারবাব, বলেছেন পদ্মা এ-যাত্রা সামলিয়ে উঠবে খুব সম্ভব। তবে হয়তাে চলে-ফিরে বেড়াতে পারবে । তােমাকে সত্যি-সত্যিই এবার মায়ের ভার নিতে হবে, শ্ৰীমতী। তার জন্য মনকে প্রস্তুত কর। এবার সবাইকে দেখিয়ে দাও রমেশ চৌধুরী তােমায় কি পদার্থ দিয়ে তৈরি করেছে।” শ্ৰীমতী মুখ তুলে বললে, “আমি ভয় পাই না, ছােটদাদ।” ছােটদাদামশায় সন্দেহে তার পিঠে হাত রাখলেন।
টালিগঞ্জের সেই হলদে রঙের বাড়িখানির সামনে ট্যাক্সি যখন দাঁড়াল তখনাে টিপটিপ করে বষ্টি পড়ছে। উপরে পদ্মার ঘরে স্থিমিত আলাে আলােকিত শুন্য সিড়িটা অন্ধকারের দিকে উঠে গেছে। চুপচাপ চারদিক নিঃসাড়। সমস্ত বাড়িখানি যেন বর্ষারাত্রির কানে ফিসফিস করে বলছে, “শব্দ তুল না, এ-বাড়িতে একজনের বড় অসুখ।” গাড়ির শব্দে সিড়ি দিয়ে মতিরাণী নেমে এলেন, শ্ৰীমতীকে আলিঙ্গন করে বললেন, “কোনাে চিন্তা কোরাে না, শ্ৰীমতী। ও এখন ঘুমােচ্ছে, নাইট-নার্স আছে পাশে। তুমি একবার দরজার কাছ থেকে দেখে নিচে এস, খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়। শরীরের অযত্ন কোরাে না। নিজেকে নিজে না-দেখলে আর কে দেখবে? এস আমার সঙ্গে।” ছােটদাদামশায় বসবার ঘরে চৌকির উপর বসে রইলেন। মতিরাণীর সঙ্গে কম্পিত পায়ে শ্রীমতী মায়ের নােগশয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সবুজ শেড লাগানাে আলাের মুখ ফেরানাে, একটুখানি সােনালী আভা পদ্মাসনার মুখে এসে পড়েছে। শ্রীমতী চেয়ে দেখল মায়ের মুখে সেই ক্লিষ্টভাব আর নেই, তার বদলে মুখময় একটি কোমল দুর্বল ভীর, নির্ভরশীলতা ছড়িয়ে পড়েছে। পদ্মাসনার সেই তীক্ষ তেজ কোথায়? কে তাকে এমন শান্ত করে অসহায়ভাবে শুইয়ে রেখেছে এখানে। বস্তচ্যুত ফলের মতাে পড়ে আছেন পদ্মাসনা; কপালের উপরে দু- একগছি কোঁকড়া চুল। নিমীলিত দুই চোখে, চোখের কোলে সুদীর্ঘ ১২৭ পল্লবের নীল ছায়া পড়েছে, ধনুকের মতাে দুই ভুরু, ঠিক যেন তুলি দিয়ে অকা। এখনাে তার মা কি সুন্দর! কি অপরুপ সুন্দর! শ্ৰীমতী একবার ঢোঁক গিলে, মায়ের মুখের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। বারবার মনে-মনে অঙ্গীকার করল, তােমাকে আমি কখনাে ত্যাগ করব না। তােমার কোনাে ভাবনা নেই, আমি তােমাকে সারিয়ে তুলব। মাগাে, যতদিন আমি আছি তুমি একা থাকবে না। চকিতে মতিরাণীর দিকে একবার ফিরে তাকালাে শ্ৰীমতী। ছি ছি, আমি নিজের কথা নিয়েই মশগুল। মতিরাণীও তাে আছেন, অনাদত যতিরাণীও তাে আগাগােড়া কাছে-কাছে রয়েছেন। আরাে যেন সহাস গেল বুকে। নিচের ঘরে সুনয়নী দেবীর সঙ্গে ছােটা, বসে কথা বলছেন। নিচে নামতেই তিনি ছুটে এলেন। “তােমার মায়ের খবর নিতে এসেছিলাম, শ্ৰীমতী। এখন অনেকদিন তােমাকে মায়ের সেবা করতে হবে, শক্তি সঞ্চয় কর।” কাছে এসে আদর করে বললেন, “আমরাও আছি শ্ৰীমতী, মনে রেখ তুমি একলা নও, আমরা সবাই আছি, ভয় কোরাে না।” সুনয়নী দেবী বিদায় নিলেন, কিন্তু ছােটদাদামশায়কে মতিরাণী ছাড়লেন না, তাঁকে খেয়ে যেতে হল। মতিরাণী নিজেও আর বাড়ি গেলেন না, শ্ৰীমতীর ঘরেই রইলেন রাত্রিতে। মতিৰাণী ঘুমিয়ে পড়লেও ৰহণ শ্রীমতীর ঘুম এল না চোখে। বিনিদ্র মস্তিকে চিন্তার অবিরল মিছিল চলেছে। ডাবল, এই তাে আমার সমস্যার সমাধান হয়ে গেল আজ। জমিদারবাড়ির সেই বোঁটি, অসেস অধিকারী সবাই নিজের নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছে, সে-ই বা পাবে না কেন? মা ভাল হয়ে যাবেন কিন্তু আর মাকে ছেড়ে বাওয়া যাবে না। আজ সত্যিই তাকে দিয়ে মায়ের বড় প্রয়ােজন। না, আর তার মনে কোনাে দ্বিধা নেই। ১২৮ সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। গভীর নিশীথে শুভেন্দর চিন্তা এসে আর তার নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না। তার গােপন হদয়ে সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরের শেষ প্রতিধ্বনি একেবারে নীরব হয়ে যাক। রমেশ চৌধুরী কি পদার্থ দিয়ে শ্রীমতীকে তৈরি করেছিলেন এবার তার পরীক্ষা হােক। জোর করে দুই চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে সে সব-কিছু ভুলতে চাইল। ঘম আসক। ঘুম নেমে আসক তার অপরিসীম শান্তি আর সাক্ষনা নিয়ে। তব, তার বন্ধ চোখের অবাধ্য অশ্র, বালিশকে সিক্ত করল।
No text on this page.
১৪ সংসারেরও যে রাষ্ট্রনৈতিক দিক আছে সেকথা এইবার বােঝা গেল। সকালে গােমেশ এসে জানিয়ে গেছে, একদিকে নার্স মেমসাহেবের হকুম, আরেক দিকে মতিরাণীদিদির সর্দারি, মাঝখানে সে যায় কোথায়? আয়া এসে নালিশ করে গেছে, আজ পনেরাে বছর ধরে সে মেমসাহেবের কাজ করে এসেছে, আর এতদিন বাদে কি তাকে কোথাকার এক নার্সের কথায় উঠতে বসতে হবে! মতিরাণী সকালে উঠে চা না-খেয়েই বাড়ি চলে গেছেন, স্নানটান সেরে একট বেলায় আসবেন, অগত্যা শ্ৰীমতীকেই সমস্যা ভঞ্জন করতে হয়। উপরন্তু কাল রাত্রের তরুণী বাঙালী নার্সটিও তার কপিল নয়ন থেকে বিদ্যৎ হেনে জিগগেস করে বসল, এই সব উজবুক দিয়ে রােগিনীর কাজ কি করে চলতে পারে। একটু গরম জল চাইলেও যদি ঠিকমতাে পাওয়া না-যায়, তবে ইত্যাদি। দেখতে-দেখতে বেলা আটটা বাজল। দিনের নার্স এসে পেছিল ঠিক ঘড়ি ধরে। শ্ৰীমতী যেন হাতে চাঁদ পেল। প্রৌঢ়া, ফিরিঙ্গি মহিলা, মুখে প্রসন্নতার আভা। শ্রীমতীকে দেখে তার হাসি ধরে না, সস্নেহে তাকে অভয় দিলেন, সঙ্গে করে উপরে নিয়ে গেলেন। রাত্রের নার্সটি তৎক্ষণাৎ তার হােট সটকেশ হাতে নিয়ে উঠে বিদায়ের জন্য তৈরি হল। রাত্রি জাগরণে তার মুখখানি ক্লান্ত দেখাচ্ছে, শ্রীমতার মায়া হল দেখে। কোমল স্বরে জিগগেজ করল, চা-টা কিছু দেবে কি না, সংক্ষেপে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেল নাসটি। আজুও পদ্মার কোন পরিবর্তন হল না। ডাক্তারবাব এলেন গেলেন, ওষুধ-পথ্য নির্দেশ করে দিলেন। নার্সের নাম মিসেস স্পেন, মনােযােগ দিয়ে সব কথা শুনে নিপুণ হাতে কাজে লেগে গেলেন তিনি। মতিরাণী ফিরে এসে গৃহস্থালীর ভার নিলেন। শ্রীমতী কি করবে? তার তাে হাতে কোন কাজ নেই। কেউ ডাকে না তাকে, সে যেন প্রায় প্রয়ােজনের বাইরে। বার-বার অকারণে উপর-নিচ করে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কতবার ভাবল মতিরাণীকে বলে, মাসিমা, আর আপনি কষ্ট করবেন না, এবার আমার হাতে ছেড়ে দিন। কিন্তু বলি-বলি করেও বলা হল না, মতিরাণীর মুখ দেখেই বােঝা যাচ্ছে যে বিপদের সময় সহায়ত্রা দিতে পেরে তিনি অশেষ আনন্দ পাচ্ছেন! সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার তার নেই। এর মধ্যে একসময় সে মিস বিশ্বাসকে ছােট একখানি কৃতজ্ঞতাপর্ণ চিঠি লিখে দিল, মায়ের অবস্থা জানিয়ে। ললিতাকে কিছু বলে আশা হয়নি, তাকেও লিখতে হল একটা পােস্টকার্ড। তারপর জানলার ধারে দাঁড়িয়ে চুপচাপ পথের দিকে তাকিয়ে রইল। আজও আকাশে মেঘের ঘটা, শ্ৰীমতীর মন উদাস হয়ে যায়। কোনাে কি উদ্দেশ্য আছে, এই ঘন নীল মেঘ, পত্রপল্লবে এই শ্যাম সবুজের বিন্যাস, এই গাছতলায় জমে থাকা ফুলের সৌরভের ? কোনাে কি অর্থ আছে, সুন্দরী পদ্মার জীবনের? আছে কি? কোন কালে পর কালাে বেটে স্বামী মরে গেছেন, তাঁর জীবনেরই বা কি অর্থ ছিল? চমকে দেখে দুত পায়ে সিড়ি বেয়ে নেমে আসছেন মিসেস স্পেন, “এস তাে ডার্লিং আমার সঙ্গে। তােমার মা চোখ মেলেছেন, বােধরি তােমাকেই খুঁজছেন।” পদে মায়ের ঘরে এসে দাঁড়াল মী। গভীর ব্যথাপণ চোখে ১৩২ পক্ষ তাকালেন, একবার চেষ্টা করলেন কথা বলতে, ঘর ফুটল না, বড়-বড় দুই বিন্দ অশ্রু, পম্মার গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে দুই বাহ, দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল শ্ৰীমতী, কানের কাছে মুখ নিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, “মাগাে, কেন ভাবছ? এবার তুমি ভালাে হয়ে যাবে। এই দেখ আমি কাজকর্ম ফেলে ছুটে এসেছি তােমার কাছে, তুমি কেমন ভালো না-হও দেখব।” বলতে বলতে চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল, “আর আমি তােমাকে ফেলে যাব না, মা। এখন থেকে তােমার কাছে থাকব, কেমন?” মা নির্বাক, শ্ৰীমতীর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, আর চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। মিসেস স্পেন শ্রীমতীকে মদ হাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শাদা মাল বের করে পদ্মার চোখ মুছিয়ে দিলেন। তারপর জানলা খুলে দিতেই আলাে এসে ঘর ভরে দিল। কখন মেঘ কেটে গিয়ে গান একট, রােদ উঠেছে আকাশে। মতিরাণী এসে সেই কখন থেকে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, অনুমতি -পেলে অহঙ্কারী পদ্মার ঘরে প্রবেশ করার সাহস পাচ্ছেন না। সেদিকে চোখ পড়তেই পাের মুখ হঠাৎ কেমন একটু অপ্রসন্ন হয়ে উঠল। ব্যাকুল হয়ে উঠল শ্ৰীমতী। মিসেস স্পেন বলছিলেন, “দেখ ডার্লিং, তােমার মা আজ কত ভালাে আছেন। এ ক'দিন নিস্পন্দ অচেতনভাবে কেটেছে, সুখ দুঃখ কি রাগ কোনাে কিছুরই বােধ ছিল না। তবে আমার মনে হয় ঐ যে লেডি, উনি এখানে না-এলেই রােগিনীর পক্ষে ভালাে।” মতিরাণী ইংরিজি জানেন না। কি বুঝতে কি বুঝলেন, কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে পা এগিয়ে এলেন ঘরের মধ্যে : “কি বলছে মেমসাহেব, আমি বাপ বুঝিঝি না। তবে পম্পা যে এবার শিগগিরই সেরে উঠবে, সে দেখেই বােঝা যাচ্ছে। তাই না পদ্মা, আর তুমি উঠে বসলেই আমারও ছুটি।” পদ্মার ভুরু, আরও কুঞ্চিত হল। বিৱত শ্ৰীমতী মতিরাণীকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসে। “ওঃ! রােগীর ঘরে আমি যে যাই মেমের তাতে আপত্তি আছে বুঝি? তা, সেকথা স্পষ্ট করে বললেই হত।” এতক্ষণে মতিরাণীর কাছে স্পষ্ট হল ব্যাপারটা। ছি, ছি, শ্রীমতী এর মধ্যে কি করবে? সসঙ্কোচে সে তাঁর অভিমান ভাঙতে চেষ্টা করল, “না, মাসিমা, সে কথা কেন। ঘরে কারাে না-যাওয়াই নাকি ভালাে, ডাক্তারবাব, বলছিলেন। মা কেমন যেন সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তাই- এত সহজে কেউ কি ভুলাতে পারে? “তােমার মাসিমাকে একেবারে বােকা ভেবেছ নাকি, শ্ৰীমতী? আমি সবই বুঝি। কতব্য-কাজ যা বুঝি করতে চেষ্টা করি, তা সে যদি ওদের ভালাে না লাগে, কাল থেকে আর আসব না।” মতিরাণীর মুখ লাল হয়ে ওঠে। হাত ধরে অনেক করে শ্রীমতী তাঁকে বােঝাল, “মাসিমা, আমার কিন্তু আপনাকে খুব ভালাে লাগে। আপনি না-এলে আমার কত যে কষ্ট হবে বলতে পারি না। কাজটাজ না হয় আমি করে নিলাম, কিন্তু আমার কাছে আপনার বধেরও অনেক মূল্য যে।” মতিরাণীর সরল মন তৎক্ষণাৎ গলে জল। “মানিক, মুখে বললেই কি আর আমি তােমাদের ছাড়তে পারি।” কত লােক পাের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে। জানলে কত না খুশি হতেন পদ্মা! শ্রীমতী ভাবে, তবে আমি এদের ভুল বুঝেছিলাম? আমার মাকে এরা সত্যি তাে ভালােবাসে! তবে এরা পদ্মার রপ গণ দেখেই মথ। এত কষ্টের মধ্যেও পদ্ম শত্ৰ গন্ধরাজ ফুলের মতাে শয্যায় পড়ে আছেন। কিন্তু আর কি কখনাে তিনি গান গাইবেন? অকারণে শ্রীমতী বারবার মায়ের ঘরে ঘরে যায়। ঘনপল্লবে ঘেরা দুটি মদিত চক্ষর ১৩৪ দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারে না। খাটের পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করে পদ্মার বক্ষের স্পন্দন। মিসেস সেন পাশে বসে পশমের জামা বুনছেন, কোমল নয়নে তাকিয়ে দেখেন তিনি। কিন্তু মতিরাণী আর উপরে আসেন না। শ্রীমতী নিচে গিয়ে তাঁর কাছে দুদণ্ড সান্ত্বনা খোঁজে। “অনেক লােকের এরকম হয় আবার সেরেও যায়, না মাসিমা ? মায়ের কি আর এমন বয়েস? আসছে বছর পঞ্চাশ পরবে, সে কি আবার একটা বয়স নাকি? নিশ্চয় দেখতে-দেখতে উঠে বসবেন, না মাসিমা ?” কারাে মন যুগিয়ে কথা বলা মতিরাণীর স্বভাবে নেই। বলেন, “কি জানি শ্ৰীমতী, আমার পিসিমার চল্লিশ বছর বয়সে ঐরকম হয়েছিল, ব্যস দু-সপ্তাহেই খতম! অনেকে আবার চার-পাঁচ বছর কি তারাে বেশি বেচে যায়। ঐ একভাবে বিছানায় পড়ে থাকে। হয়তাে একটু ভালাে হয়, জড়িয়ে দু'একটা কথাও বলে, তবে উঠে বড় একটা বসে না।” মতিরাণী পরিশ্রম করতে পারেন, মনের ব্যথা দূর করতে পারেন না!
No text on this page.
১৫ আরও গেল কিছুদিন। সেদিন পরেশ নাগ এসে শ্ৰীমতীকে নিচে ডেকে পাঠালেন। খাবার ঘরের টেবিলের উপর কাগজপত্র ছড়াননা, পদ্মার সক ব্যাঙ্কের হিসাব একপাশে রয়েছে। পরেশ নাগ সস্নেহে শ্ৰীমতীকে বসতে বললেন। “দুজনে বসে একট, পরামর্শ না-করলে চলে না যে শ্ৰীমতী। তােমার মায়ের এই তাে সব হিসাব। কত লক্ষ টাকা রােজগার করেছে পদ্মা, আশ্চর্য যে তার কিছুই রাখতে পারেনি। খেয়ে-দেয়ে বেড়িয়ে কাপড়-গয়না কিনে বিশেষ কিছু আর নেই। তুমি ছেলেমানুষ শ্ৰীমতী, এখন আমােদ করে বেড়াবার বয়েস, তােমাকে এসব কথা বলতে আমার কত যে খারাপ লাগছে। অথচ না বলেও উপায় নেই, তুমি ছাড়া আর পলায় আপন বলতে কে বা আছে! এই দেখ তিনটি ব্যাকের খাতা, সবই প্রায় তলায় ঠেকেছে এসে। অথচ এই অসুখে, নার্স ওষুধ ভাতারেই দিনে দশােটাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।” শ্ৰীমতীর পাড়ুর মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল-কণ্ঠে বললেন, “অমন ভাবে তাকিও না, মা। আমরা এখনাে বেচে আছি। পদ্মা একদিন আমার কোম্পানিকে গরু- লক্ষ টাকা এনে দিয়েছে। তার অসুখে চিকিৎসার জন্য কোম্পানি থেকে আমরা সামান্য হাজার খানেক টাকা দিতে ইচ্ছে করি। ঋণশােধ এতে হবে না। হয়তাে সমসাময়িকভাবে বিপদ কিছুটা কাটবে এইমাত্র। তারপর ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে। ডাক্তার বলেছেন এরকম কেস দীর্ঘকালের ব্যাপার। তােমাদের কি নিকট আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব ১৩৭ কেউ নেই এসময়ে যাদের কাছে সাহায্য পাওয়া যেতে পারে? তােমাকে আমি কাজ একটা দিতে পারি এক্ষনি, কিন্তু গােড়াতে কতই বা পাবে তুমি! তার উপর সারাদিন বাড়ি না-থাকলে পদ্মার কাছেই বা কে বসবে? গােমেশ, আয়া, বাহাদুর ওরা হচ্ছে বাড়ির শৌখিন ব্যাপার, এসবেতে টাকা লাগে মেলা। বাড়িটা এদিকে বন্ধক দেওয়া, যদিও এখন কিছুদিন তারা কিছু বলবে না, আমাদের জানাশােনা লােক, মায়াদয়া কিছু আছে এখনাে। আমার পরামর্শ শােনাে, মা। এখনি তােমার কোনাে কাজে ঢােকা ঠিক হবে না, চাঁপাডাঙার কথাও তােমাকে ভুলে যেতে হবে। আমি বলি বাড়ির এই একতলাটা ভাড়া দিয়ে দাও, ঐসব শৌখিন চাকর-টাকর ছাড়াও, একটা ভালাে বাঙালী চাকর রাখ, তাতেই চলে যাবে। এমন সাজানাে বাড়ি, আমি পাঁচশাে টাকাতে আমার এক বিশেষ বন্ধুকে ভাড়া দিয়ে দিতে পারি। এখুনি কিছু ব্যস্ততা নেই। অবসর মতাে তুমি ভেবে দেখ। ঐ হাজার টাকা আর পম্মার সামান্য যা ব্যাঙ্কে আছে, তা দিয়ে দিন দশ-পনেরাে বেশ স্বচ্ছন্দে চলে যাবে।” কি বলবে শ্রীমতী ভেবে পেল না। কত আপনার নােক মনে হয় এই পরেশ নাগকে। বিদায় নেবার সময় বললেন, “আত্মীয়-বন্ধ কেউ থাকলে এখন একটু খবর দিলে ভালাে হয়, শ্ৰীমতী। বিপদের দিনেই তাে বহুদের স্মরণ করতে হবে।” পরেশবাব চলে গেলেন। শ্রীমতী তার পরেও বহুক্ষণ সেইখানে বসে রইল স্তন্ধ হয়ে। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কে আছে তাদের? চোখ বুজলেই রমেশ চৌধুরীর মুখখানি মনে পড়ে। আর কেবা আছে! ভগবানের উপর এলামাসি বেলামাসিদের অগাধ বিশ্বাস। সখের সময়ে অতটা মনে না-করলেও, বিপদে পড়লে বা দুঃখ-কষ্ট পেলে সর্বদা তাঁরা ভগবানকে স্মরণ করে থাকেন। বহুবার বলতে শুনেছে ডাকলেই তিনি সাড়া দেন। অথচ এখন পর্যন্ত সেরকম কোনাে সাড়া সে অনুভব করেনি। উপরন্তু রমেশ চৌধুরীর আরেকটি কথাও ভুলবার নয়। ১৩৪ “বিপদ হলেই ডাকবি কি রে? এতদিন তাে কিছু না বলতেই তােকে বেশ সুখে ও নিরাপদে রেখেছিলেন, এখন আবার তাঁকে তাঁর কর্তব্য শেখাবি নাকি?” মতিরাণী এসে পাশে বসলেন। “অত কি ভাবছ, শ্ৰীমতী? আমি তােমার মাসি হই না? আমার বাড়িতে মেলা জায়গা, থাকবার লােক নেই। তােমরা কেন এই গােটা বাড়িটা দুটো ফ্ল্যাট করে ভাড়া দিয়ে আমার কাছে এসে থাক না?” “তাকি কখনাে হয় মাসিমা ?” “হবে না কেন? আমার উপরতলাটা তােমাদের ছেড়ে দেই আমি। মােট মানুষ আজকাল অত উপর-নিচ ভালােও লাগে না। তােমাদের মতাে তােমরা থাকবে, আমার মতাে আমি। কেন হবে না? এ-বাড়িটা থেকেই তােমাদের তাহলে মাসে হাজার টাকা আয় হতে পারে। বেশ চলে যাবে দুজনের। আমাকে পর ভেব না তুমি, শ্ৰীমতী।” শুনে শ্রীমতীর চোখ জলে ভরে এল। ছােটদাদামশাই ইতিমধ্যে এলামাসি বেলামাসিদের কাছে পদ্মার অসুখের কথা জানিয়ে এসেছেন, তাঁরা কেউ দেখতে আসেননি। মুখে সহানুভূতি পাঠিয়েছেন। এমন কি ছেলে-মেয়েরাও চিঠিপত্র লেখেনি কেউ। চোখ ফেরাতেই মতিরাণীর কাজল-মাখা সস্নেহ দুটি চোখের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হল। এত অবজ্ঞা সয়েও পৰ্মার উপকার করতে তিনি বদ্ধপরিকর হয়েছেন! খয়েরের দাগ লাগা পরিপুষ্ট হাত দিয়ে শ্রীমতীর হাত ধরে বললেন, “তােমরা ছাড়া আমার কেউ নেই, শ্ৰীমতী। কোন কালে, কত দুঃখে সবাইকে ছেড়েছুড়ে এসেছি। আমার বাড়িঘর টাকা- পয়সা সব আজ হয়েছে, কিন্তু কে ভােগ করবে? আপনার মানুষ কেউ নেই। তুমি ভাবছ আমি তােমাদের দয়া করছি? তা নয়, শ্রীমতী, আমার শুন্য ঘরগুলাে সব খাঁ-খাঁ করে, দয়া করে তােমরা এস।” দুই হাতে চোখ ঢেকে মতিরাণী নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। ১০(৬৩) ১৩৯ বাহাদুর একখানা চিঠি দিয়ে গেল, মিনিদি লিখেছে : “বেলাপিসির কাছে শুনলাম তােমার মায়ের অসুখের কথা। একটি ভালাে নার্সের ব্যবস্থা করে পত্রপাঠ চলে এস। টাকার জন্য কি ভাবনা? মায়ের ব্যাঙ্কের খাতা এখন আমার হয়েছে, কত দরকার অসঙ্কোচে আমাকে জানাবে। গীটগী একটা বিষম নইস্যানস শ্রীমতী, ওসব নিয়ে জড়িয়ে পড়তে নেই।” কিন্তু রমেশ চৌধুরী শ্ৰীমতীকে শিখিয়েছিলেন—সুস্থ শরীর থাকতে কারাে কাছে এ-জীবনে হাত পাতিস না শ্রীমতী। আর স্বাস্থ্য যদি ভেঙে ৰায় তাহলে এক বুদ্ধি করে মরে যাস। তাহলে আর হাত পাতবার কথাই উঠবে না। অসুখের কথাটা পুতুলের কানেও গিয়েছে। তার শ্বশুরবাড়ির সরকার- মশায় একখানি চিঠি নিয়ে এলেন। পুতুলও লিখেছে উপযুক্ত ব্যবস্থা করে শ্রীমতীদি যেন চলে আসে। এ-বিপদে যেন তাদের সহানুভূতি জানে, আর যদি কিছু, দরকার হয় তবে যেন পুতুলের স্বামীকে একট, জানায়। বিকেলে ললিতা আর মিস্টার বােস এসে উপস্থিত হলেন। শ্রীমতীর বকখানি আনন্দে ভরপুর হল। মিস্টার বােস বারবার বললেন, “গ্রীমতী দেবী, আমরা থাকতে নিজেকে একলা মনে করবেন না। মা একট, ভালাে হলেই, ওঁকে চাঁপাডাঙায় নিয়ে আসুন। পাঁচজনে মিলে ওঁকে সুস্থ করে তােলা যাবে।” শ্ৰীমতী শুনে গান একট, হাসল, “মা নাসারলেও আপনাদের দেখে নিজের মনের অসুখগুলাে সব সেরে গেল, মিস্টার বােস।” ললিতা বেশি কিছু বললে না, শুধ, মিথষ্টিতে শ্রীমতীর দিকে তাকিয়ে রইল। ললিতা আজকাল কি সুন্দরী হয়ে উঠেছে। ১৪০ সন্ধ্যাবেলা চা-খেয়ে তাঁরা বিদায় নিলেন, রাত্রের ট্রেনেই ফিরে যেতে হবে। কাজের চাপ রয়েছে। রাত্রের নার্স তার বিমর্ষ মুখ আর ছােট সটকেশটি নিয়ে যখন উপস্থিত হল, তখন আবার আকাশ কালাে করে বৃষ্টি নেমেছে। মিসেস স্পেনের জন্য শ্রীমতী রিক্সা আনিয়ে দিল। মেঘাচ্ছন্ন নৈশ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলে ললিতারা আজ আমার জন্য কত না ভিজবে। উপরে গিয়ে দেখে এল রাত্রের নার্সের কোনাে কিছুর প্রয়ােজন আছে কিনা। এই প্রাণীটি নিজের চারধারে সর্বদা একখানি অদৃশ্য অন্তরাল রচনা করে রাখে, সেটা ভেদ করে কারাে প্রবেশাধিকার যেন নই। কতােবার চেষ্টা করেছে শ্ৰীমতী, উপযাচিকা হয়ে ভাব করতে গেছে, ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে প্রতিবার। আশ্চর্য মেয়ে! পা টিপেটিপে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখল ঘুমিয়ে আছে পদ্ম। তাঁর ক্লান্ত মুখ থেকে বয়সের ভার শক্ত ফলের মতাে হালকা হয়ে ঝরে পড়েছে। আবার যেন পদ্মা ছেলেমানুষ হয়ে গিয়েছেন। নিদ্রিতা মায়ের দিকে তাকিয়ে শ্ৰীমতীর মনে হল মা-মেয়ের আসন বিনিময় হয়েছে। সে আজ তার মায়েরও মা। ১৪১
No text on this page.
১৬ রাত কম হয়নি। নীরবে নিচে এসে দেখে রান্নাঘরের বারান্দায় কুরুক্ষেত্রের আয়ােজন চলেছে। ক্ষদ্ধ মতিরাণীর প্রবন্ধ প্রতিদ্বন্দী কখ গােমেশ। শ্রীমতী যেতেই দুই পক্ষই তার কাছে কেদে পড়ল। পুনরায় শান্তি স্থাপন করতে কম বেগ পেতে হল না তাকে। রাগ করে মতিরাণী -খেয়েই বাড়ি চলে গেলেন। গােমেশ উদ্ধতভাবে জানালে, এ-বাড়ির কে কত্ৰী তারই যখন স্থির নেই, এ-ক্ষেত্রে একটা ভালাে ব্যবস্থা না-হলে সে একমাসের নােটিশ দিতে বাধ্য হবে। পাড়া-প্রতিবেশী বহ, লােকে তাকে বেশি মাইনেতে চলে যেতে সাধ্যসাধনা করে। গােমেশের আরও কিছু হয়তাে বলবার ছিল, হেনকালে শ্রীমতীর পাশে নিঃশব্দে এসে যে-মানুষটি দাঁড়াল, তার সগম্ভীর মুখের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করেই অপরাধীর মতাে গােমেশ সড়-সড় করে রান্নাঘরে গা-ঢাকা দিল। শুভেন্দু! শ্রীমতীর মুখে কথা ফুটল না। নিঃশব্দে ঘরে এসে দাঁড়াল দু’জনে। মুখােমুখি দাঁড়িয়ে কারাে চোখে পলক পড়ে না। “তােমার দুশ্চিন্তার অংশ আমাকে দেবে, শ্ৰীমতী? আমার এত কালের একাকীত্ব দূর করে দেবে?” শুভেন্দর গলায় আবেগের কম্পন! যেন আশা করা যায় না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শ্রীমতী, তারপর কাঁপা গলায় ধীরে-ধীরে বলল, “মিনিদি?” ১৪৩ মিনিদি? শ্ৰীমতী, তুমি কি পাগল হলে? আমার বন্ধু, আমার মনের কথা সে জানে। এতদিন ধরে আমার জীবন তােমার প্রতীক্ষাতেই ছিল। অনেক সময় মনে হত দুরাশা। স্বপ্ন আমার ফলবে না। সেরকম মানুষ হয় না পথিবীতে, ফলের মতাে যে কোমল অথচ বিদ্যতের মতাে যার শক্তি। তারপর তােমার সঙ্গে যেই পরিচয় হল তখনি আমি চিনতে পেরেছি। আমার মন বারবার বলেছে-সে মেয়ে তুমি। আমার অনেক এটি আছে, কতবার ক্ষমা করতে হবে আমাকে। ভুল করব, অন্যায়ও হয়তাে করব, কিন্তু তুমি ছাড়া আর কে বুঝবে আমাকে শ্ৰীমতী?” এতক্ষণ গ্রীক কণ্ঠে ভাষা ফিরে এল। বললে, “তােমার মুখে এ-কথা শুনে আমার জীবন সার্থক হয়েছে। তুমি আমাকে ধন্য করেছ। কিন্তু ভেবে দেখেছ সব কথা? জানাে, আমার মা হয়তাে চিররণা থাকবেন, হয়তাে দীর্ঘদিন শয্যাগত থাকতে হবে তাঁকে। তাঁর অর্থ সম্পদ কিছু, নেই, আপনার জন বলতে এক আমি। আমার সঙ্গে এই দায়িত্বের অংশ নিতে পারবে তুমি? সে যে বিষম বােঝা হয়ে উঠবে।” শুভেন্দু তার চোখ থেকে চোখ সরাল না, “জানাে না তুমি, না-ভেবে কখনাে আমি কিছু করি না? তােমার মায়ের কথা আমি ভেবেছি। তােমাকে যে-ভার বহন করতে হবে সে-ভার আমারও। সে-অধিকার যদি আমাকে দাও আমি সুখী হব। আর কিসের ভয় শ্রীমতী? আমি ছাড়া কে আছে তােমার, বল তাে? আমার অত বড় বাড়িতে কি তােমার মায়ের স্থান হবে না? আমার মা বে'চে নেই, তােমার মা আমারও মা। দুজনের মিলিত সুখে তাঁকে আমরা সুখী করব। পারব না?” শ্ৰীমতীর দুই চক্ষ, প্লাবিত করে কখন অশ্রর বন্যা নামল। স্বর্গ আছে কিনা কে জানে? কে জানে, ভগবানের অস্তিত্ব আছে কি নেই? জীবনে তব, মাঝে-মাঝে অবাঙমানসগােচর কোন সুখের স্বর্গলােক থেকে পরিপূর্ণ একটি ফুলের মতাে খসে পড়ে নিটোল এক-একটি মুহত। ইচ্ছে করে তাকে চিরকাল বকে করে রাখি, কিন্তু হায়, পথিবীর হাত- ১৪৪ দিয়ে তাকে ধরা যায় না। অপরুপ এই মহতটিতে শ্রীমতীর হদয় আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। কারা যেন তার নম্রশিরে আজ তাঁদের আশীর্বাদের অদশ্য হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। দেহে মনে রােমাঞ্চিত হওয়ার এই সুখ সে তাে কখনাে জানত না। এ-মহর্তটি আর কখনাে ফিরে আসবে না জীবনে, কিন্তু যা বলা হয়ে গেল, শােনা হয়ে গেল, কোনােদিনও কি ম্লান হবে তার মাধুর্য ? গুল পৃথিবীর দুঃখ আর তার কি করতে পারে? শ্ৰীমতী শুভেন্দুকে মায়ের কাছে নিয়ে গেল। রাত্রের নার্স অন্ধকারে সরে গেল একপাশে। স্নিগলায় শ্রীমতী ডাকল, “মা।” নিস্তব্ধ কক্ষের কোনায় কোনায় মদ, গুঞ্জরণ হল মা, মা, মা। শুভেন্দু, এমন মধুর ডাক আর শােনেনি। চকিত হয়ে উঠলেন পদ্মা, মস্তিষ্কের জড়তা একট, কাটল বুঝিহদয়ের তুষার বুঝি গলল। জড়িত কণ্ঠে বললেন, “কি, মা।” শুভেন্দু এগিয়ে এসে এই ছােট সংসারটির হাল ধারণ করল। “আজ থেকে আমাকে আপনার পুত্র বলে মনে করবেন।” নিস্ফল প্রয়াসে দুর্বল দক্ষিণহস্ত শুভেন্দুর দিকে প্রসারিত করতে প্রবল চেষ্টা করলেন পদ্মা, বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল শুভেন্দু, ও শ্রীমতী। পদ্মার মুখে কোমল একটি প্রসন্নতা আলাের মততা ছড়িয়ে পড়ল। নিচে এসে শুভেন্দু, নিতান্ত বেরসিকভাবে বললে, “ঐ গােমেশটি স্বয়ং দ্রৌপদী হলেও, ওকে আমাদের মিস্টার খানের বাড়ি উপঢৌকন স্বরুপ পাঠানাে যাক। আমার রাজেন ওকে দেখুলেই ভিরমি যাবে।” ১৪৫ রাত বাড়ে দুজনের কথা আর ফরােয় না। মিনিদির কথাও উঠল। বাড়িঘর বিক্রি করে সে বিলেতে বসবাস করবার সংকল্প করেছে। আহা মিনিদি। মন চায় সবাই সুখী হােক। দরজায় মদ, শব্দ উঠল। অনুতপ্ত মতিরাণী ফিরে এসেছেন। সচেতুরা তিনি, দেখেই বুঝলেন। নীরবে সরে যাচ্ছিলেন, শ্রীমতী তাঁকে ডেকে ফেরাল, “মাসিমা, চলে যাবেন না, আমাদের আশীর্বাদ করুন।” মতিরাণী তখন হেসে-কেদে আকুল হয়ে গেলেন। ভুল করে শ্রীমতীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আর শুভেন্দর মুখচুম্বন করলেন। পরদিন বাড়িতে উৎসবের হাওয়া বইতে লাগল। সবাই খবর পেয়ে আসছেন দলে-দলে। সবাই খুশি। বিকেলের দিকে এসে পৌছলেন এলামাসি, বেলামাসি, তাঁদের স্বামীরা, অতুল, লকেট, বকেট ও শেষে মিস বিশ্বাস। ছােটদাদামশায় অসংলগ্নভাবে অসংযত ভাষায় আপ্যায়ন করে বেড়াচ্ছেন অতিথিদের। আড়াল বুঝে শ্ৰীমতী একবার মিস বিশ্বাসের কানে-কানে জানাল, “আমি এ-বছরের শেষ পর্যন্ত থাকব কিন্তু।” মতিরাণী কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। এখন এসে দরজার পর্দা সরিয়ে উপস্থিত অভ্যাগতদের নিবেদন করলেন যে তিনি অতিথিদের মিষ্টিমুখের আয়ােজন করেছেন। তখন অতুল ও বকেট, ফড় তুলে সােজা হয়ে দাঁড়াল। এবার তাদের পালা।
No text on this page.
No text on this page.