Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kripabindu

2010/02/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কৃপার্ব

No text on this page.

পা-বিন্দু
গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী
ঐ চিন্ময়ী ব্ৰহ্মচারিণী মাজীর অনুমতিফ্রমে
তাহার লিখিত ভূমিকা-সহ সত্য-সম্ম-কর্তৃক
প্রকাশিত
সত্যব্রত মই
জামতাড়া, সাঁওতাল পরগণা
ই, আই, আর, সে-লাইন
১৩
ভিক্ষা ।

No text on this page.

মেনাৰায়ণ প্রণতি যং ব্রহ্মাররুণেন্দ্র রুদ্রমরুন্তি দিব্যৈঃ শুর- বেদৈঃ সাঙ্গপদক্রমােপনিষদৈর্গায়ন্তি যং সামগঃ । ধানাবস্থিত তদতেন মনসা পশ্যন্তি যং যােগিনে। যস্যান্তং ন বিদুঃ সুরাসুরগণা দেয় তস্মৈ নমঃ। বন্দনা বন্দেহং সত্যব্রতম্। ভেদাতীতং শ্রমগুরুম্ ॥ নিত্য পূর্ণ নিরাভাষ। স্বাত্মসংহিতম্ ॥ পূজা হে সনাতন ধর্মরক্ষক গুরাে : হে সত্য ! তােমারই রােপিত মুক্তি-বীজ, তােমারই আগােঘাশব- বারি সিঞ্চনে আজ নব কুসুমিত। সৰ্বজীব হৃদয়েশের পূজার জন্য এ আয়ােজন তােমারই। এইবার তুমি স্বকীয় মহিমায় আপনার পূজা আপনি গ্রহণ করিয়া তােমাতে বিশ্বের প্রীতি হউক। প্রীত হও।

এই পুস্তিকার প্রপ্তিস্থান- সত্যব্রত মই জামতাড়া। এমন প্রাণকৃষ্ণ নন্দন এই পুস্তক-মুদ্রাঙ্কণের ব্যয় ভার বহন করিয়া সত্য-সমের কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছে। ২। শ্ৰীপ্রাণকৃষ্ণ নন্দন ৩২নং শ্যামবাজার স্ট্রীট, পােঃ বাগবাজার, কলিকাতা।

ভূমিকা কাদিত। এ জীবনের প্রথম ভাগে এক অজ্ঞাত অচিন্ত্য বস্তু পাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া, দেব-দেবী মানবের নিকট কত কাতর প্রার্থনা করিয়াছি। সংসারের সমস্ত পদার্থ ই অসার, আত্মীয় স্বজন সকলই পর, বলিয়া তখন বােধ হইয়াছিল। সম্বন্ধময় জগতে থাকিয়া আমার মনের গতি সম্বন্ধ ছাড়াইয়া কেবলই ধাইত। জগৎসংসারের কিছুই আমার ভাল লাগিত না, কোন্ এক অজানা দেশের অজানা বস্তুর লাগি প্রাণ সৰ্ব্বদাই প্রাণের সে শূন্যতা, হৃদয়বিদারক সে বেদনা, আমা-হেন বিদ্যা-হীনার পক্ষে বর্ণনাতীত ; যার দেওয়া এ ভাব একমাত্র তিনি তাহা জ্ঞাত; লােক সমাজে তখন অন্তঃসলীল হইয়া তাহা মানুষের অগােচরে বহিয়া চলিয়াছিল। এই অবস্থায় একদিন পরম শুভ মুহূর্তে শ্রীমৎ সত্যব্রত সরস্বতী স্বামীজীর দর্শন পাইলাম । সে দিনের অপূৰ্ব মহিমা বাক্যে প্রকাশ করা যায় না । তখন আষাঢ় মাসের শেষভাগ, বর্ষাতে ধরণী শিক্ত কিন্তু আমার মন-প্রাণ সেই বস্তু পাইবার ব্যর্থ প্রয়াসে মরুভূমির মত শুষ্ক উত্তপ্ত। ঘনীভূত বিষাদে আমার হৃদয় সমাচ্ছন্ন। আহা, তঁার কি করুণা! সেই গুরুদেবকে আপনার হইতেও আপনার বলিয়া লাভ করিতেই, যেমন অরুণােদয়ে পৃথিবী উত্তরােত্তর আলােকিত হয়, আমারও আঁধার জীবন সেইরূপ ক্রমে ক্রমে উদ্ভাসিত হইতে লাগিল। যেন সেই অজানা দেশের কোন্ মহান পুরুষ এত দিনের বাঞ্ছিত বার্তা আমাকে দিতে আসিয়াছেন, 'যেন সেই অজানার পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত ৭।

[ ২ ] করিয়া নিজালয়ে আমাকে লইয়া যাইতে আসিয়াছেন ,--এমন কত কি ভাব সে সময়ে মনে উদয় হইয়াছিল। যে আশা কখনও জাগে নাই, যাহা আনিবে বলিয়া কখনও ভরসা হয় নাই, সহসা সেই আশা- ভরসার উৎসাহে উদ্যমে যেন মন তােলপাড় হইতেছিল। সে আজ অনেক দিনের কথা, তবু নিত্য নূতন বলিয়া প্রতিভাত হয়। স্বামীজী চরণ তুলিয়া আসনে উপবেশন করিলেন। আহা, সে কি অপরূপ মধুময় রূপ ! ন-মেঘ-বরণ, কমল-নয়ন যুক্ত যুগল,সহায় ওষ্ঠাধর, মুক্তাভ শুভ্র দন্তপাতি, উদার ললাট, ব্রহ্মচর্য-মাধুৰ্য-বিভাসিত মুখ। কিবা সে রক্তিম অর্ধচন্দ্র-নখা-শােভিত সুকোমল চরণযুগল, কিবা সে আকাশবৎ বিশাল বক্ষস্থল আপাদমস্তক যে কান্তি দেখিলাম তাহা এ বিশ্বের নয় -দেখিতে দেখিতে সেই অজানা দেশের আনন্দে মন-প্রাণ ভরিয়া উঠিল । আমি সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন- “ঠাকুরাণী (তিনি এই সম্বােধন করিতেন। আপনি কি চান?” আমার কত কি বলিবার থাকিলেও কিছুই বলিতে পারিলাম না। পরে, যেন আমার মনের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন- “সন্ন্যাস চান ? বলেন, তাহাও দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু ভার আপনার উপর। নিজেকে বিচার করিয়া বলুন, আপনার সন্ন্যাসের অবস্থা হইয়াছে কি না।” আমি কিছুক্ষণ নিরবে থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম-“স্বামীজী ! জীবের কোন্ অবস্থায় সন্ন্যানের অধিকার জন্মে ?” গুরুদেব বলিলেন- “বিষয়-সম্বন্ধ সম্যকরূপে নাশ হইলে তবেই সন্ন্যাসের অবস্থা হইয়াছে বুঝিতে হইবে।” আমি বলিলাম-“দয়া করিরা আমায় কিছু সময় দিন, সন্ন্যাসের অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছি কি না ভাবিয়া দেখি।” গুরুদেবের দর্শণ লাভের কিছু দিন পূর্ব হইতেই আমি সন্ন্যাস লইবার [ ৩ ] অন্য ছটফট করিতেছিলাম। যাই, যাই, পালাই, পালাই, এইরূপ একটা ভব আমাকে সারাক্ষণ উদ্ব্যস্ত করিয়া তুলিত। এখন, স্বামীজীর কথায়, সময় লইয়া, ভাবিতে লাগিলাম। নিজেকে বিচার করিয়া দেখিলাম, এখনও আমার মধ্যে কত সংশয়, কত বাসনা , কত ক্রটি। নিজেকে দেখিলাম, আর লজ্জিত হইলাম। যদি অবস্থা বিবেচনা করিবার ভার আমার উপর না দিয়া গুরুদেব আমায় নিজের মুখে বলিয়া দিতেন যে আমার সন্ন্যাসের অবস্থা হয় নাই, তাহা হইলে আমাকে ঠিক পথে সামলাইয়া রাখিতে পরে তাঁহাকে বেগ পাইতে হইত। জ্ঞানীর পক্ষে এক কথাই যথেষ্ট, কিন্তু অজ্ঞানীকে বুঝাইতে হইলে নানা উপায় অবলম্বন করিতে হয়। সে যাহা হৌক, গুরুদেবের নিকট যখন পুনরায় উপস্থিত হইলাম তখন তাহার চরণে নিবেদন করিলাম-“আমি সে বিষয়ে ভাবিয়া দেখিলাম, আমি সে অবস্থা হইতে এখনও অনেক দূরে। কিন্তু আমি জন্মাবধি যাকে পাইবার জন্য চাতকিনীর ন্যায় তৃষিতা রহিয়াছি তার অমৃতবিন্দু হইতে একবিন্দু দানে আমায় তৃপ্ত করিবেন ?” তিনি বলিলেন-“সে জন্য ভাবনা কি, মা ? তাঁর দয়া হইলে ও-সব দোষ কোথায় পালাবে, টেরও পাবেন না। আপনাদের সাধন-সম্পদ আমার নিকট গচ্ছিত রহিয়াছে, সে-সকল গ্রহণ করুন। আপনি যাকে চাচ্ছেন তিনি ত স্বয়ং রস-সিন্ধু-তিনি যে আমাদেরই, আমরাও যে তার!” তাঁর অযাচিত দয়ায় গুরুদেব যে যে সাধন প্রণালী প্রদান করিলেন তাহা আমি নতশিরে তৃপ্ত অন্তঃকরণে গ্রহণ করিলাম। পরে, তিনি দেশান্তরে থাকার কালে তাহার পত্রগুলি আমার নৈরাশ্যের মধ্যে শান্তিবারি বর্ষণ করিয়া আমার জীবন ধন্য করিয়াছিল। গুরুদেব দীন-হীন ভাবে আমাদের নিকট নিজেকে প্রকাশ করিতেন; পত্রাবলীরও স্থানে স্থানে সে ভাব দেখা যায় ; তাহাতে যেমন তাহার নিজের মাহাত্ম প্রকাশ পাইত, [ ৪ ] তেমনি আমাদেরও অহং নাশ হইত। তার যে সকল বাক্য আমার নিজের জীবনে সত্যরূপে উপলব্ধি করিয়া ফল পাইয়াছি, তাহাই সাবক-সাধিকার সহায়তা-কল্পে এই পুস্তিকায় প্রকাশ করিবার সঙ্কল্প হইল। ইহাতে যদি কাহারও উপকার বা আনন্দ লাভ হয়, তবে তাহারই জয় হইবে,-- আমিও ধন্য হইব। ওঁ সত্যমেব জয়তে। ইতি চিন্ময়ী প্রথম পরিচ্ছেদ কথা; শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! অদ্য ৩রা শ্রাবণ নিরাপদে আসিয়া এখানে পৌছিয়াছি। আরও কয়েকদিন যদি থাকিয়া আপনাদের সহিত আলােচনা করা যাইত, তাহা হইলেও বাসনার তৃপ্তি হইত না। কারণ তাঁর কথা অনন্ত, তার নাম অনন্ত, অনন্তকাল ধরিয়া তাঁর নামের, তাঁর গুণের, কেহ শেষ করিতে পারে নাই। এবং যেহেতু ভগবান, ভক্ত, ভাগবত, একই গুরু, কৃষ্ণ, বৈষ্ণব, একই কথা ; সেইজন্য ভক্তদেরও সীমা নাই, আপনারাও ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত। তবে যে কয়দিন আপনাদের সহিত আলােচনা করা গিয়াছে, তাহাই এ সকল হতভাগ্যদের পক্ষে যথেষ্ট—ইহাও ঠাকুরের দয়া। মণিরত্নাদির মধ্যে যেমন কোহিনুর শ্রেষ্ঠ, আপনাদের সহিত আলাপও জীবনের সকল আলাপের, সকল সঙ্গের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তাঁর কাছে বলিবেন ও দেখিবেন যেন তার দয়ার ভুক্তাবশিষ্ট প্রসাদ এদিকে, এসব কাঙ্গাল- দের ভাগে, এক-আধ-ফোটা পড়ে। এ সকল সাধু-বেশীদের ভক্তি নাই, তবে তার কেহ প্রিয়ভক্ত যখন তাহার ঠাকুরের কাছে আত্মনিবেদন করে, ইহারা শুধু দূর হইতে তাহাই দেখে, এবং আশা করে যে, যে রশ্মিচ্ছটা ঠাকুরের নিকট হইতে আসিয়া তাহাদের কপালে পড়িয়াছে তাহারই দুই একটি যদি কখনও প্রতি- ফলিত হইয়া মাথায় আসিয়া লাগে,শুধু এইটুকুতেই ইহারা ধন্য মনে করে। ইহারা এত দূরে।

২
কৃপা বিন্দু
আরাধিতাে যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ?
নারাধিতে যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ?
অন্তবহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ?
নান্তবহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ ?
বিরম বিরম কিং তপস্যামু বৎস!
অর্থাৎ-হরির আরাধনা করিতে তপস্যা ইত্যাদির দরকার কি?
আবার আরাধনা না করিলেই বা তপস্যার দরকার কি ? অন্তরে
বাহিরে যদি হরি নাই থাকে, তাহা হইলেই বা তপস্যার দরকার
কি? বৎস, ক্ষান্ত হও, তপস্যার দরকার নাই, ইত্যাদি। এবং পরে
আছে যে, (নারদের প্রথম সাধনকালে তাঁহাকে যে উপদেশ দিয়া
ছিল তার সারমর্ম )বৎস! যাও মহাদেবের নিকট যাইয়া ভক্তি
শিক্ষা করিয়া আসিয়া তারপর সাধনা কর। ভক্তিবিহীন সাধনা
এবং রসবিহীন চৰ্বিত আখের ছােবড়া একই কথা।
দীন দুঃখীর আখের ছােবড়াই সার। হিংসা করিতেছি না,
শুধু দয়া রাখিতে বলিতেছি। যেন দৈবক্রমে তাচ্ছিল্যে এ সকল
জীবও এক-আধ-ফোটা পায়। বহু পূৰ্ব্ব-জন্মের সুকৃতি ছিল, তাই
আপনাদের সঙ্গ হইয়াছিল। আপনাদের এত আত্মীয় বন্ধুর মত মনে
হইয়াছে—আশ্চৰ্য্য! যত ভাবি, অবাক হই।
সকালে নিদ্রাভঙ্গ হইবার সঙ্গে সঙ্গে যে সকল ভাবনা প্রথমে
মনে উদয় হয় সেইগুলিই দিবসের প্রধান সংস্কার। তাহা ভাল হইলে
বাড়ান উচিত, মন্দ হইলে তৎক্ষণাৎ পরিত্যজ্য। সর্বাপেক্ষা উত্তম
শয্যাত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে ভগবানের নিকট বিশুদ্ধ প্রেমের জন্য প্রার্থনা
করা। ব্যাকুলতা না হইলে সাধক ভগবানকে লাভ করিতে পারে
। এত ব্যাকুল হইতে হইবে যে, তাহাতে সমস্ত সংসার লােপ
পাইয়া শুধু ভগবানের চিন্তাই প্রবল হইবে—অন্য কিছুই মনে
এই সকল

গুরু শিষ্যা পত্রাবলী থাকিবে না। ভগবান, ব্যতীত অন্য যাহা 'কিছু মনে আসিতে চাহিবে তাহাকে তৎক্ষণাৎ দূর করিয়া দিয়া আবার দ্বিগুণ উৎসাহে ভগবানের বিষয়ে চিন্তা, নাম, বা জপ করিতে হইবে। কায়মনাে- বাক্যে ভগবান ব্যতীত অন্য কিছুর ইচ্ছা বা চেষ্টা না হয়, দিবারাত্র কোন সময়েই যেন ভগবৎচিন্তার বাধা না হয়। হয় ধ্যানে, নয় জপে, নয় নামে, অথবা তৎসম্বন্ধীয় ক্রিয়া-কর্মে, চিন্তায়, সৎপুস্তক পাঠে, সৎসঙ্গে অতিবাহিত হয়, অন্য কোন চিন্তা বা ইচ্ছা যেন না আসে। লৌকিক আচার-ব্যবহার অমান্য করিতে নাই, কারণ তাহাও ঠাকুরের ব্যবস্থা। তাহার ইচ্ছা ব্যতীত গাছের পাতাও নড়ে না। সুতরাং মন খুলিয়া আরও একটু আলাপ যে হয় নাই, সেজন্য কোন দুঃখ হওয়া উচিত নয়। বস্তুতঃ তাহার দ্বারা আমাদের পরস্পরকে বন্ধুর মত ভাবিবার কোন ব্যাঘাত : হয় নাই,—ব্যাঘাত হইয়াছে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে, প্রকাশ্য আলাপে। যাহাই হৌক, তাহার ইচ্ছাই পূর্ণ হৌক। স্বাধ্যায়, ঈশ্বর-প্রাণিধান, নির্জনবাস, ও নিতান্ত অন্তরঙ্গ হইলে ভাবগােপন, এই কয়েকটী কথা খুব ভাল লাগে। আপনিও পরীক্ষা করিয়া দেখিবেন, ভাল লাগে অভ্যাস করিবেন। অত্র কুশল, আপনার নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু— প্রণাম পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া পরমানন্দ লাভ করিলাম। আপনার বাণী আমাদের নিকট বেদবাক্য বলিয়া মনে হয়। আশা করি, আপনার বাক্যে ক্রিয়া-কৰ্ম্মাদি এবং সর্ব অবস্থায় আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভরিয়া উঠিবে। দয়া করিয়া বাসনা পূরণ করিলে ধন্য হইব, এবং আশা করি, এ অশান্তির হাত ৪ কৃপা-বিন্দু হইতেও নিস্তার পাইব। আমার শতকোটী , ভক্তিপূর্ণ প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! আপনাদের বলিবার আমার কি আছে, তবে তার ইচ্ছায়, তাঁর হাতে, যেরূপে ব্যবহার করেন। তাঁর ইচ্ছায় তিনি যদি যথার্থ পাত্রে পরিবেশন করান, অভুক্ত ফিরাইবেন কি ? সব তাঁর দয়া, আপনারাও তাঁর প্রিয়, আপনাদের দয়া হইলে তিনিও মুখ তুলিয়া চাহিবেন। তাঁকে এমনভাবে ভাবিতে হইবে,—কাৰ্য্যদ্বারা, বাক্যে, মনে, সকল সময়ে, সকল অবস্থায়, তঁাকে না ছাড়ি; সুখ হােক, দুঃখ হােক, স্বর্গে থাকি, নরকে যাই, তাহার মােহন মূরতি যেন আড়াল না পড়ে। তৈলধারার মত অবিচ্ছেদে যেন ভক্তিরাশি, বিপুল প্রেমের ধারা, ঝরিয়া পড়িতে থাকে, তার ধ্যান, তার জ্ঞান, তাঁরই কাজে, তারই সেবায়, তাঁরই পূজায়, তাঁরই নামে, তাঁরই গানে, যেন সমস্ত কাজ, যেন সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভরিয়া উঠে; শরীর যেন তাকে ছাড়া আর কাহাকেও গ্রহণ না করে, চিহ্ন না নেয়। বাক্য যেন তার কথাই বলে, মন যেন তার কথাই ভাবে ; তিনি ভিন্ন জগতে আর কিছুই নাই ; তিনিই পূর্ণরূপে, পূর্ণভাবে, বিশ্ব নিখিল পূর্ণ করিয়া রহিয়াছেন, একথা কখনও যেন ভুল না হয়। অশান্তি কখন আসিবে ? সময় কোথায় ? মন যদি বিষয়ের বাহিরে, অনেক উপরে, সেই আনন্দময়ের আনন্দ-জ্যোতিঃ-সাগরে আনন্দের রসে ডুবিয়া থাকে, অশান্তির সাধ্য কি, মা, তাকে স্পর্শ করে ? যে মন দিয়া তার চিন্তা করি, জীবন-মন যাহার চরণে দিয়াছি, তাহা গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৫ আর যেন অন্য কাজে অর্পণ না করি। যাহা তাহাকে দিয়াছি তাহা যেন তাহারই থাকে, আবার যেন ফিরাইয়া না আনি। তাহার আসনে যেন আর কাহাকেও জায়গা না দিই। প্রাণ তাকেই যেন সমৰ্পণ করিতে পারি। এরূপ বল হওয়া চাই, ভরসা থাকা চাই। তার কাজে যেন আলস্য না হয়, জড়তা না আসে। সময় হইলে আলাে আপনি ফুটিয়া উঠিবে। কাটার আগা কারও সরু করিয়া দিতে হয় না। সব ঠিক হইয়া যাইবে। কিসের অশান্তি, কিসের অবসাদ, কিসের মায়া, কিসের মােহ, আমরা যে তাঁর, তিনি যে আমাদের বন্ধু। লক্ষ্য রাখিতে হইবে আমার দ্বারা কেহ যেন উদ্বিগ্ন না হয়, আমিও যেন কাহারও দ্বারা উদ্বিগ্ন না হই। তিনি নিজে যাহাদের ভার আমাদের উপর দিয়াছেন তাদের যেন অযত্ন না করি, এ যেন তারই কাজ, তারই কর্তব্য-নিয়ম, তাহা যেন ভুল না হয়। গীতায় আপনাদের ঠাকুরের কথা স্মরণ করুন। গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে শ্রীভগবান্ অৰ্জ্জুনকে বলিতেছেন— নিয়তং কুরু কৰ্ম্ম ত্বং কৰ্ম্ম জ্যায়ােহকৰ্ম্মণ। শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিধ্যেদকর্মণঃ ৪৮। যার্থাৎ কৰ্ম্মনােহন্যত্র লােকোহয়ং কৰ্ম্মবন্ধন। তদর্থং কৰ্ম্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর। ৯ | শ্লোকের অর্থ হল এই যে, তুমি নিয়ত অবশ্য-কৰ্তব্য কৰ্ম্ম কর, যেহেতু কৰ্ম্ম না করা অপেক্ষা কৰ্ম্ম করাই ভাল। বিশেষতঃ কৰ্ম্মশূন্য হইলে তােমার দেহ- যাত্রাও নির্বাহ হইবে না ॥৮॥ বিষ্ণুর আরাধনার্থ কৰ্ম্ম ব্যতীত অন্য কৰ্ম্ম করিলে এই লােক কৃপা-বিন্দু বন্ধন-দশা প্রাপ্ত হয়, অতএব হে কৌন্তেয় ! তুমি বিষ্ণু-প্রত্যর্থ নিষ্কাম হইয়া কৰ্ম্ম অনুষ্ঠান কর ॥ ৯। শ্রীভগবান অর্জুনকে যেরূপ কৰ্ম্ম করিবার উপদেশ দিয়াছেন ঐরূপ কর্মের অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে, তাহা হইলে শান্তিলাভ হইবে। এতে কোন সন্দেহ নাই। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যার পত্র- শ্ৰীশ্রীচরণেষু প্রণামপূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব ! আপনার পত্ৰ পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। কোন্ কোন্ সময় সাধনায় বসিবার প্রশস্ত সময়, দয়া করিয়া জানাইয়া বাধিত করিবেন। আপনার নিত্যকুশল প্রার্থনা করি। ভক্তি প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় - প্রথম অবস্থায় ক্রিয়াকর্মের পক্ষে ব্রাহ্ম মুহূর্তে, দ্বিপ্রহরে, সন্ধ্যায়, অর্ধরাত্রে, প্রশস্ত। রাত্রি চারিটার সময়ে উঠিয়া, স্নান ইত্যাদি সারিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া, সুস্থমনে শান্তভাবে ক্রিয়াকৰ্ম্ম করিবেন। নিশ্চিন্ত হইতে না পারিলে কাজ ভাল হয় না, ফল হয় না। দ্বিপ্রহরে সংসাবের কাজকর্ম শেষ করিয়া, বেশ সুস্থ হইয়া সাধনায় বসিতে হয়। এই সময়টা আসনে বসিতে একটু কষ্ট হয়, কারণ কৰ্ম্মে শরীর ক্লান্ত হয় ; তারপর বসিতে বসিতে অভ্যাস হইয়া গেলে আর কষ্ট হইবে না। সন্ধ্যার, সময়ে, অথবা পরে একান্ত সময়ে, যথাসম্ভব ক্রিয়াকর্ম করা উচিত। অর্ধরাত্র সময়টা সব সময় অপেক্ষা ভাল। সকলের খাওয়া-দাওয়া মিটিয়া গেলে, নিশ্চিন্ত হইয়া একটু বিশ্রাম করিয়া ।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭ বসিয়া গেলেন, আর কোন ভাবনা নাই, অতি নির্জন চুপচাপ,; এই সময় ডুব দিবার অতি সুন্দর সময়। যদি নিদ্রার ব্যাঘাত হয়, দিনে বরং খানিকটা সময় ঘুমাইয়া লইবেন,-দোষ নাই। ছয় ঘণ্টা ঘুমাইলেই যথেষ্ট। তাকে পাবার জন্য যে চেষ্টা বা কৌশল, তাতে দোষ নাই—নতুবা ব্রহ্মচর্য অবস্থায় দিবানিদ্রা অনিষ্টকর। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণামপূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং । গুরুদেব! মন কেবল ছটফট করে, এ সকল ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতে ইচ্ছা হয়। সর্বদাই যেন মনে হয় এ বিশ্ব-সংসার দুঃখেই ভরা। আর কি লিখিব। আপনার শ্রীচরণ কুশল প্রার্থনা করি। আমাদের ভক্তি অর্ঘ্য গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমগা নারায়ণায়- মা! ছটফটানি বেশ, তবে সে ছটফটানি তাঁকে ছাড়িয়া নয়, তাকে ধরিয়া হওয়া চাই। ত্যাগী হইয়া বাহির হওয়ার জন্য ছটফটানি কেন? ও-সব সময় হইলে আপনিই হইয়া যাইবে। কান টানিলেই মাথা আসে। গােড়া কাটিতে থাকিলে গাছ আপনি পড়িয়া যায় । সব কাজ অনিয়মে, যত্নের সহিত করিতে থাকুন। অনবরত তার সঙ্গে চিন্তায় বাস করুন। অষ্টপ্রহর তাকে সঙ্গী করিয়া, প্রাণ খুলিয়া প্রাণের কথা বলিতে থাকুন, সব সুন্দর হইবে, সব শান্তি হইবে। আপনি হয়ত ভাবিতেছেন, আমরা সংসারত্যাগ করিয়াই বুঝি সৰ্ব্ব-ত্যাগী হইয়াছি—তাহা নহে। অনেক খাটিয়া তবে কিছু পাওয়া কৃপা-বিন্দু গিয়াছে। তার জন্য ছটফটানি খুব থাকুক। আপনারা তার জন্য পাগল হইয়া যান; এতে আমার দিন দিন আনন্দ বরং বাড়িবে। আপনাদের তাকে পাবার জন্য যন্ত্রণা দিনে দিনে বাড়ুক। আমি তাহাই চাই। আশীৰ্বাদ করি তিনি আপনাদের তার প্রেমে পাগলই করিয়া দিন। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি-- শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব ! আপনার চিঠি পাইয়া অতিশয় সন্তোষলাভ করিলাম। মনটাই সব তাঁর পদে অৰ্পণ করিতে পারিতেছি না। চেষ্টা করি হয়ে উঠে না। উপায় কি ? দয়া করিয়া জানাইবেন। আপনার কুশল প্রার্থনা করি। আমার কোটী কোটী প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুকর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় মা! মনটা সব না দিলে কি হয় জানেন? কুলটা হয়! তঁাকে ব্যতীত অন্য পদার্থ চাহিলেই তাহাকে কুলটা বলে। কুলটার স্বামী লাভ হয় না। যত কিছুই করুন না কেন, যেন সব কাজের মধ্যে তার কাজ হইয়া উঠে। যত রকম অবস্থা থাকিতে পারে, সর যেন তাঁর দিকে ধায়। সব কাজগুলি যেন দড়ি, কৰ্ম্ম যেন জাল-খানা। আর সেই পরম পদার্থ যেন মাছ। দড়ি কমাইয়া টানিয়া আনার (কাজ করিয়া যাওয়ার) উদ্দেশ্য জাল তােলা, জাল তােলার উদ্দেশ্য মাছ ধরা। সব কাজ যেন ঐরকম উদ্দেশ্যে হয়। সকল কাজেই যেন তার দিকে, টানিতে থাকে। আপনারা পাগলামী করুন দোষ নাই, তবে ধীরে ধীরে, গোপনে, সাধন বিষয়ে লােকে গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী যেন না জানিতে পারে। মহান উদ্দেশ্যের কাৰ্য্য এমনভাবে করিতে হইবে ‘মন জানে আর আমি জানি অন্যে যেন না জানে। মা, বাহিরে লােক দেখান কিছু নয়,অতি গােপনে। একবার যদি কিছু লােকে জানিতে পারে তবে সব পণ্ড হইয়া যাইবে, সাধন ভজন সব চুলায় যাইবে। আমি ঐ ভয়ে এখনও লুকাইয়া থাকি, পলাইয়া বেড়াই,পাছে লােকে মাথা খায়, মান চাহিয়া বসি। যশ, মান, সব সাধনার অন্তরায়। মনের উদ্দেশ্য যত ঢাকা রাখিয়া কাজ করা যাইবে, উদ্দেশ্য তত সুসিদ্ধ হইবে, সন্দেহ নাই। লক্ষ্য ধরিয়া কাজে অগ্রসর হইতে থাকুন; যাহা সত্য তাহা আপনি ধরা দিবে কোন সন্দেহ নাই। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলে— প্রণাম পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্ৰ পাইয়া আনন্দিত হইলাম। সমাজের মধ্যে থাকিয়া সাধন ভজন করিতে গেলে কত লােকের কত রকম কথা শুনিতে হয়। মনটা যেন নিরুৎসাহ হইয়া যায়। কি উপায়ে এ সকলের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া যায় ? আপনি উৎসাহ দানে বাধিত করিবেন। কুশল প্রার্থনা করি। শত কোটী প্রণাম লইবেন। ইতি সেবিকা গুরুৱপত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় মা! লােকের কথা শুনিলে কাজ হয় না। যাহা কৰ্তব্য, কারও মনে দুঃখ না দিয়া করিয়া যাওয়াই উচিত। লােকের কথায় মনের দুর্বলতা আনা উচিত নয়। মনকে প্রস্তুত করাই সাধনা। কাটার ; ওঁ শান্তি ! ওঁ শান্তি ! কৃপা-বিন্দু জন্যই জুতা পায়ে দিতে হয়। জুতা প্রস্তুত করাই সাধনা। দুনিয়ায় কাটা চিরকালই থাকিবে। ঘরে বাহিরে সব জায়গায় কাটা। তাঁহার রসে ডুবিয়া যান, ঘর বাহির সব এক হইয়া যাইবে। তাঁর ভাবে যে যত ডুব দিবে সে তত সুখ পাইবে; ভাসিয়া সুখ নাই, ডােবাই সুখ- অনবরত ঐ নাম এবং নামের রসের ধারায় ডুব। ওঁ শান্তি.!! শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব ! আপনার আশীর্বাদ পত্র পাইয়া আনন্দ লাভ করিলাম। মনের মধ্যে কত কি উদিত হইতেছে,কত সংশয়, সন্দেহ ; এমন কি, মনে হয় কাজকর্ম সব ছাড়িয়া দিই। এ সব কেন হয়? দয়া করিয়া বুঝাইয়া দিবেন। শরীরও অসুস্থ, পরিশ্রমও যথেষ্ট করিতে হইতেছে। এই সব নানা রকম কত কি, আর কি লিখিব। কুশল প্রার্থনা করি। ভক্তি- পূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা ; ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা ! সাধনার প্রথম অবস্থায় অনেক কিছু শরীরে মনে আসিয়া দেখা দিবে। যাহা হয়ত জীবনে ভাবেনও নাই, এমন সব ব্যাপার মনে উদিত হইবে; কিন্তু তাতে ভয় নাই। ওতে যেন ভুলিবেন না। ওরা সব পালাবার পূর্বে অনেক মুখ খিচায়, মরবার পূর্কে মুখ বিকৃত করে, হাত পা ছোড়ে। ও সব সাধনার একটা অবস্থা। ভয়ের কারণ নাই। সময় হইলে সব পালাবে। তার নাম অষ্টপ্রহর কখনও ভুলিবেন না ।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ১১ পরিশ্রান্ত শরীর লইয়া কদাচ ঐ সকল প্রাণায়ামের কাজকর্ম করি- বেন না, শরীর দুর্বল হইয়া পড়িলে ও সকল ক্রিয়া-কৰ্ম্ম বােঝ- বিশেষ হইয়া পড়ে। পরিশ্রমের পর বেশ বিশ্রাম করিয়া পরে আসনে বসিতে হয়, তবে আর শরীর বিশেষ দুর্বল হইতে পারে । জপ ছাড়িতে নাই। ঐ নাম করিতে যদি কেহ মরিয়া যায় সেও ভাল। যত কষ্ট হােক, যত দুঃখ হক, নাম ছাড়া নয়। একটি গানের মধ্যে আছে—“দুখের বেশে এসেছ বলে তােমারে নাহি ডরিব হে।” এ সকল তঁার পরীক্ষা, প্রথম প্রথম সাধকদের উপর আসে, তাতে দোষ নাই। অসুস্থতার পরীক্ষায় যৌগিক প্রাণায়াম ইত্যাদির ক্রিয়া কমাইয়া বা বন্ধ করিয়া দিতে হয়, কিন্তু জপ, ধ্যান, পূজা, নাম, এ সকল মৃত্যুকাল পর্যন্ত করিতে হয়। প্রাণ যায় যাক্, যত কষ্ট হয় হােক, কিছুতেই ঐ নাম ভুলাইয়া দিতে পারিবে না। এমন দৃঢ়তা সাধনায় থাকিলে তার পরাজয় কেহ করিতে পারে না। তার সর্বত্র জয়। আস্তে আস্তে ধীরভাবে চলিতে হইবে, রাস্তা বড় অসমান। তাই বলি, মা, ধীরে ধীরে,—ব্যস্ত ধীরে,—ব্যস্ত হইলে চলিবে না। তবে প্রাণের জ্বালা থাকিবেই, তাহা কমিবে না। বরং কম খারাপ, বাড়াই ভাল। বস্তুতঃ অসুখ প্রথম অবস্থায় সাধন ভজনের বড় বিঘ্ন ঘটায়। তবে একটা মজা আছে,–এই সাধন ভজন করিতে থাকিলে, এবং কিছুকাল অভ্যাস করিতে পারিলে, অসুখে বড় একটা কিছু করিয়া উঠিতে পারে না। নাভির ধ্যান, ও তৎসহিত গুরু প্রদত্ত নাম বা জ্যোতিঃ ধ্যান করিলে অসুখ প্রায়ই কমিয়া যাইতে দেখা যায়। যম, নিয়ম (মহাব্রত) চলিতে থাকুক। ক্রিয়া কর্মের মধ্যেও ঐ নাম অবিরাম চলিতে বাধা না হয়। যে-কোন অবস্থায়, রােগ হােক, শােক হােক, দুঃখে বা অসুখে থাকি, স্বর্গে থাকি বা নরকে যাই, কৃপা-বিন্দু যেন নাম ভুল না হয়। জপ অতি উত্তম জিনিষ, মালা লইয়া, বা হাতে, কিম্বা শুধু মুখে হিসাব না করিয়া, জপ করিয়া গেলে দেখিতে পাই- বেন ইহার কি সুন্দর মহিমা। ভগবান গীতার দশম অধ্যায়ে বিভূতি যােগে বলিয়াছেন “যজ্ঞানাং জপ যজ্ঞােহস্মি” অর্থাৎ যজ্ঞ সমুহের মধ্যে আমি জপরূপ যজ্ঞ। এত ভরসা, এত আশ্বাসবাণী,এতেও কি সন্দেহ সংশয় যায় না, মা ? অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম পুরঃসর নিবেদন মিদং। গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া পরম প্রতি লাভ করিলাম। মন ও শরীর ভাল নাই ; কি করিয়া সাধন ভজন করিব ? তাতে আবার পরাধীনতা। আমার সখীর ও ঐ দুঃখ। অনুগ্রহ করিয়া উপদেশ দানে শান্তি দিতে ভুলিবেন না। আপনার দয়া থাকিলেই নিজেকে ধন্য মনে করিব। আপনার শ্রীচরণ এ দীনার প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা কুশল চাই। ওঁ নমাে নারায়ণয়- মা! শরীর থাকিলেই অসুখ হইয়া থাকে। শারীরিক অসুখের জন্য ভাবিয়া লাভ কি? তবে সাধনার কাজ কর্মের যা ব্যাঘাত,তা আর কি করা যায় ? যাঁহার কাজ তিনি যেমন যেমন করিলে ভাল হয় বুঝিয়া করিতেছেন। সকল কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখা, আর দুঃখ পাওয়া, একই কথা। কোন কিছুতেই কর্তা সাজা ভাল নয়। ঘরের কর্তারই যত মুস্কিল। যাহারা কর্তৃত্ব ছাড়িতে পারে তাহার বেশ খায়-দায় আর আমােদ করে, বেড়ায়, ঘােরে, আর গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী কর্তাকে বলে, ইহা দাও উহা দাও, আরও কত কি,-কর্তার কিন্তু মহা ফ্যাসাদ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া সমস্ত বন্দোবস্ত করিতে হয়। আবার দশ জনার দশ কথাও শুনিতে হয়। আমােদ আহলাদ মােটেই নাই,-রাত্রি দুটা পৰ্যন্ত হয়ত জমা-খরচই লিখিতেছেন। সুতরাং এমন কর্তৃত্ব নিয়ে কেন আমরা থাকি? যাহার পদে পদে দুঃখ, তাহাকে বরণ করিব কেন? কর্তৃত্ব করে দেখা গেছে বড় সুবিধা হয় না। কর্তৃত্বের কাজ ভাল ত হয়ই না,—এমন খারাপ হয় যে তখন মনে হয় এ না করাই ছিল ভাল। কর্তা ত আছেন, যাহা হয় তিনি করিবেন। অত আমাদের দরকারই বা কি? আনন্দের প্রাণ আনন্দ করিয়াই কাটাইব। কর্তার গরজ থাকে তিনি ভাবুন, আমাদের ওতে কি প্রয়ােজন? কিন্তু তাই বলিয়া আমাদের স্বাস্থ্যকে ত্যাগ করিলে চলিবে কেন? অতি যত্নসহকারে এবং সাবধানতা অবলম্বন-পূৰ্ব্বক কাজ করিলে সুফলের আশা নিশ্চয়ই করা যাইতে পারে। তীব্র সম্বেগানামাসন্ন, অর্থাৎ তীব্র বেগের সহিত যাহারা কাজ করিতে পারেন এবং কাজে যথেষ্ট উৎসাহ যাহাদের আছে ও তৎসহিত ব্যাকুলতা বৰ্তমান, শীঘ্রই তাহাদের ফল হয়,—এ কথা সকলেই ও সকল শাস্ত্রেই বলেন। আপনার ও আপনার সখীর প্রায় একই দুঃখ বুঝিতে পারিয়াছি। মা! বস্তুতঃ ত্যাগ বাহিরে নয়। স্বীকার করি, কোন তীর্থস্থানে যাইয়া বাস করিতে পারিলে এবং সংসার হইতে একটু দূরে সরিয়া থাকিতে পারিতে, কাজের অনেক সুবিধা হয়, মনও বেশ আনন্দে থাকে। কিন্তু মানুষের ইচ্ছায় তাহা হয় না। যাহা হইলে আপনাদের ভাল হইবে, যাহার উপর নির্ভর করিয়াছেন তিনিই তাহা অবশ্য ব্যবস্থা করিতেছেন। সময় হইলে ও-সকল আপনি দূর হইয়া যায়। প্রসবের সময়ের পূর্বে সন্তানকে গর্ভ-ত্যাগ করাইলে কদাচ ফল কুপা-বিন্দু ভাল হয় না। লােকের মনে কত কি হয়, কিন্তু তাহাকেই চিত্তের বিক্ষেপ বলে, এবং বিক্ষেপের দ্বারা মানুষের মনে অসন্তোষের উদয় হয়। অসন্তোষ ভাব উদয় হইলেই ঈশ্বরে নির্ভরতা ছুটিয়া যায়, সাধনার যৎপরােনান্তি অনিষ্ট হয়। আপনার যিনি সখী তাহাকে শান্ত হইতে বলিবেন, এবং জানাবেন যে, সময় হইলে, কখন কি সুবিধা হইয়া, কি হইয়া যাইবেন, অবাক হইতে হইবে! সময় না হইলে বিক্ষেপ দ্বারা শুধু অনিষ্ট হয়— উপকার কিছুই নাই। আপনারা ( গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের) ঐ শ্লোকটি পড়িবেন- অদেষ্টা সৰ্ব্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ। নির্মমাে নিরহঙ্কারঃ সমদুঃখসুখ ক্ষমী। ১৩ সন্তুষ্টঃ সততং যােগী যতাত্মা দৃঢ় নিশ্চয়। ম্যর্পিত মনােবুদ্ধিৰ্য্যো মে ভক্ত স মে প্রিয়ঃ ॥ ১৪। ঐ শ্লোকের অর্থ হল এই যে, সৰ্ব্বভূতেই যাঁহার অন্বেষ দৃষ্টি, মৈত্র- ভাব ও করুণা, এবং যিনি নিৰ্ম্মম, নিরহঙ্কার, সুখ-দুঃখে সমান ভাব ও ক্ষমাবান, আর যিনি সতত সন্তুষ্ট, সমাহিত চিত্ত, সংযতাত্মা ও দৃঢ় নিশ্চয় হইয়া আমাতে ভক্তিমত্ত হয়েন এবং মনােবুদ্ধি আমাতেই অর্পণ করেন, তিনি আমার প্রিয়। দেখুন এই সকল গুণ যাহাদের মধ্যে আছে বা হইবে, ভগবান তাহাদের প্রিয় মনে করেন বা করিয়া থাকেন। এ সকল গুণের অধিকারী হওয়া চাই, তবে প্রকৃত শান্তি। গীতার মত ঐরূপ অবস্থা না হইতে পারিলে মনে চঞ্চলতা বিনষ্ট হয় না । যত বিক্ষেপ আবরণ সমূলে বিনষ্ট হওয়া দরকার। ছাড়ি ছাড়ি, পালাই পালাই, এ-সকল ভাব ভাল নহে। তাহা অপেক্ষা শান্ত সমাহিত চিত্তে তার নাম ও কাজ করিলে আসলে কাজ হয়। অত্র কুশল, নিত্য কুশল চাই। ইতি- গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী শিষ্যাৱ পত্র- ঐশ্রীচরণ কমলে প্রণাম পূৰ্ব্বক নিবেদনমিং। গুরুদেব! আপনার আশীৰ্বাদ পত্র পাইয়া আনন্দিত হইলাম। পন্থানুযায়ী সাধনা করিয়াও মনে হইতেছে কিছুই বুঝি হইতেছে না। নিজেকে বড়ই ভাগ্যহীনা বলিয়া মনে হইতেছে। সর্বদা প্রাণে যেন কি একটা ব্যথা লাগিয়াই আছে। শান্তি দিতে ভুলিবেন না। শ্ৰচরণ কুশল প্রার্থনা, প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি.সেবিকা শুরুর পত্র--- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! আপনি ভাগ্যহীনা বলিয়া কেন নিজেকে মনে করেন, জানিনা। তাঁকে ডাকা, তার জন্য টান, সকলের হয় না। যাহাদের সে টান আছে তাহারা ধন্য। তিনি যদি না চান, তবে কি তার জন্য কারও মন টানে, তিনি টানেন তাইত মন টানে, নতুবা এ টান কিসের টান? প্রথমে একটু আধটু কষ্ট হয়। একটা কথা আছে, “যে করে আমার ক্লাশ, তার করি সর্বনাশ ; তবু যে না ছাড়ে আশ, তারে করি দাসের দাস।” এ পথের দুঃখ-কষ্ট অঙ্গের অলঙ্কার মনে করিতে হয়। তার হাত বড় কঠিন ; যে হাতে তিনি যাকে ধরেন তারই প্রথম একটু লাগে। সহিয়া গেলে পরে আর লাগে না। তিনি যে, আমাদের জোরের সহিত ধরিয়া রাখিয়াছেন, তার প্রমাণ ঐ যে, আমরা ব্যথা পাই। তার ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই হইতে পারে না, তিনি অন্তৰ্য্যামী। একটী কথা—“নয়ন তােমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমারে পায়না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গােপনে।” কিছু ভাবিতে হইবে না, কেবল যথাসাধ্য কাজ কৃপা-বিন্দু করিয়া যান, এবং সর্বদা সৰ্ব্বত্র স্বাধ্যায় (জপ), ঈশ্বর-প্রাণিধান করিয়া যান, তাহার নাম লইয়া রাস্তায় পড়িয়া থাকুন, তার দয়ার অন্ত নাই। মনে যাতে অশান্তি না আসিতে পারে তার চেষ্টা করুন। ঈশ্বর প্রাণিধান ও স্বাধ্যায় এই দুইটি ভাল করিয়া অভ্যাস করিতে পারিলেই রাস্তা খুলিয়া যাইবে। ব্যস্ত হইলে চলিবে না। শনৈঃ পন্থা, শনৈঃ পন্থা, শনৈঃ পৰ্বত লজঘনম ইত্যাদি অভ্যাস যাহা পারেন করিয়া যান, তবে আস্তে আস্তে হইবে, ব্যস্ত কি, মা ? যত কিছু কাজ-কর্ম সকলেরই উদ্দেশ্য ধ্যান। ধারণা, ধ্যান ও সমাধি, এ তিনের প্রায় রূপ এক। তবে ঘন আর পাতলা, এই যা প্রভেদ। ধ্যান পাকা হইবার জন্যই আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, দরকার। যদিও সমাধিই সাধকের উদ্দেশ্য,তথাপি যম, নিয়ম, এ-সকল বাদ দিলে সমাধিতে পৌছান যায় না। এ সকল সমাধিতে পঁহুছাবার সিড়ি। মাঝখানের সিড়িগুলি উত্তমরূপে পার হইয়া শেষ ধাপে পৌছিলে, তবে ছাদ পাওয়া যায়। এ-সকল ধাপে অবহেলা করিলে, কেহ ছাদে যাইতে পারে না। সুতরাং বেশ ধীরভাবে কাজ করিতে থাকিলে ক্রমে সমস্ত সুন্দর হইয়া উঠিবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আবার এই সকল ধ্যান ধারণার উদ্দেশ্য—চিত্তশুদ্ধি। চিত্তস্য শুদ্ধয়ে কৰ্ম্ম। চিত্তশুদ্ধি হইলে গােল চুকিয়া বায়, কিন্তু যতদিন না চিত্তশুদ্ধি হয় ততদিন একটু না একটু খিচ, থাকে। ঐ চিত্তশুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত অভাব দূর হয় না। আপনার সাধনার যা উপস্থিত বাঞ্ছনীয় পদার্থ তাহাকে প্রেম বলে কিন্তু প্রেম সহজে আসে না। যাহারা একটু-আধটু আভাষ পান, তাহা মিশ্রিত, নির্মল নহে। চিত্তশুদ্ধি হইলে এই প্রেম নিৰ্ম্মল হইয়া দেখা দিবে। যতদিন না তাহা হয় ততদিন প্রেম-লাভও সাধনা সাপেক্ষ। সাধন গাছের সুমিষ্ট ফলের নাম প্রেম। কিন্তু তাহা বাদ দিলে, সে ফুল আকাশ কুসুম হইয়া দাঁড়ায়, সুতরাং সাধকের কর্তব্য গাছকে অতি যত্নে গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী লালন পালন করা। একদিন, কাল পূর্ণ হইলে, ফল ফলিবেই ফলিবে, তখন সকল শ্রম সার্থক হইবে। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলেষু- প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া নিজেকে ধন্য মনে করিতেছি। সংসারে থাকিয়া সাধন কিছুই হইতেছে না বলিয়া মনে হয়, দিনরাত্রি খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি কৰ্ম্মস্রোতে যেন ভাসিয়া বেড়াইতেছি। শরীরও তত সুবিধা নাই। আপনার চরণ কুশল চাই। কোটী কোটী প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা : শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- = মা! অবশ্য সংসারে যখন অসুখ বিসুখ হয়, তখন এ সকল কাজ করিবার বড় একটা সময় পাওয়া যায় না। কিন্তু গুরুজন, অতিথি, বা অন্ধ-আতুর, এদের সেবা পথ্য ব্যবস্থাগুলিও নারায়ণের জন্যই ত! যে হেতু জীবে জীবে তারই অধিষ্ঠান। তারপর অজপা সাধন। যখন যে কাৰ্য্য করুন না কেন, মনে মনে দিনরাত ঐ নাম চলিবে। একেবারে কিছু হইতেছে না এমন ত নয়, তবে অভ্যাস দরকার। দিনমানে, ও রাত্রে নিদ্রা-ব্যতীত আর সব সময়-গুলি যদি একটানা জপেই কাটে, সেই বা কম সাধনা কি! যখন অপর কাজ কর্ম বেশী পড়িয়া যায়, তখন শুদ্ধ অজপা ধরিয়া থাকিতে হয়। যদি সময় একেবারেই না পাওয়া যায়, আর কোন ক্রিয়া-কৰ্ম্ম করিবার দরকার নাই; আবার যখন সময় পাওয়া ৰাইবে, তখন নিয়মিতভাবে ক্রিয়াকর্ম করিলেই হইবে। এই অজপা २ ১৮ কৃপা-বিন্দু যপের উদ্দেশ্য সেই পরম বস্তুকে সর্বদা স্মরণ করা এবং অন্য বিষয়কে মনােমধ্যে আসিতে না দেওয়া। ঐরূপ অভ্যাস করিতে থাকিলে কেন ফল হইবে না? চেষ্টা করুন, অবশ্যই ফললাভ হইবে। সংসারে থাকিয়া সাধন-ভজন করা কঠিন বলিয়া অনেকেরই ধারণা। একথা ঠিক সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। সংসার বাহিরে নয়, সংসার মানুষের মনে। সংসারযুক্ত মন যদি সাধন করিতে যায় তবে প্রথমে শক্ত লাগে, কিন্তু পরে সে সব ভাব আব থাকে না। সন্ন্যাসীই হৌক শর গৃহীই হোক, সংসার যাহারই মনে আছে তাহারই সাধন-ভজন কষ্টকর। কিন্তু সংসারে থাকিয়াও যদি কাহারও মনে সংসার থাকে, তবে তাহার আর ব্যাঘাত কিসের ? সন্ন্যাসী হইয়াও মনে সংসার থাকিলে তারই বা সাধন-ভজন সুখের কোথায় ? মন প্রথমেই সংসার-শূন্য হয় না, মন সহজে বশীভূত হয় না, ক্রমিক সাধনার দ্বারা বশে আনা যায়। যে অবস্থায় সর্বদা বাস করিতে হইবে সেই অবস্থার ভিতর থাকিয়াই সাধনা করা ভাল, সবই সহিয়া যায়, গােল থাকে না। কামনা-বাসনার হাত হইতেও নিস্তার পাওয়া যদিও সহজ কথা নয়, কিন্তু অভ্যাস করিতে করিতে ক্রমে সে-সব কমিয়া আসিতে থাকে ; যতদিন না নির্মুল হয় ততদিন বৃত্তিসকল বিচার-দ্বারা দমন করিয়া রাখিতে হয়। ইহার নামই নিয়ম। অত্র কুশল, নিত্য কুশল, ভরসা করি। ইতি শিষ্যা পত্র- ঐশ্রীচরণকমলেষু- প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া আনন্দিত হইলাম। শরীর অসুস্থ মনও অস্থির, বিষয় ছাড়িয়া ধ্যেয় গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী বস্তুতে মনােনিবেশ করিতে গিয়া, অথচ না পারিয়া, আমি সংসারও ধরিতে পারি না আবার ধ্যেয় বস্তুতেও লাগিয়া থাকিতে পারি না। নিত্য পূজা ক্রিয়া-কৰ্ম্মাদি কিছু বাদ দিলে কেমন হয় ? দয়া করিয়া বুঝাইয়া দিবেন। শ্ৰীচরণ কুশল প্রার্থনা, প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা! শরীর অসুস্থ থাকিলে কাজকর্ম বেশী করা ভাল নয়। মন অস্থির থাকিলে নিত্য পূজা, জপ, ধ্যান, প্রাণায়ামাদি এ সকলে উপকার বই অপকার নাই। তারপর শরীর শরীর করিয়া ব্যস্ত হইলেও কোন কাজ হয় না। শরীর মাত্রেই রােগ আছে। আপনার হয়ত বেশী, কিন্তু সেজন্য ভাবিয়া আর কি হইবে? যাহা কৰ্তব্য, করিয়া যাইতে থাকুন। শরীর সুস্থ যদি নাই হয় তাতে কিছু যায় আসে না। শরীর স্থায়ী নয়, চিরদিন থাকিবার জিনিষ নয়। যত্নেও যাহা থাকে না, তাহার জন্য শােক করিয়া লাভ কি? যখন অসহ্য যন্ত্রণা হইবে তখনও তার নাম করিয়া, ধ্যান করিয়া, তাহার দিকে চাহিয়া সমস্ত সহ করিবার চেষ্টা করিবেন। ক্রমে সব সুখের হইয়া যাইবে। অভীষ্টতে লক্ষ্য পৌছিলেই শান্তি হইবে। সংসারে সুখ কোথাও নাই, মনের মিল অস্থায়ী, আপন বলিয়া কিছুই ধরিয়া রাখা যায় না, সকলই চলিয়া যায়। এ দেহ চিরস্থায়ীও নয় ; আবার যে কয়দিন শরীর আছে, তাহাও হয়ত রােগ-শােকে জরা- জীর্ণ হইয়া থাকে। কেবল সুখে থাকা যায় যতক্ষণ পরমেশ্বরের সহিত সম্পর্ক রাখা যায়। জীব যতক্ষণই তঁহার সহিত সংযুক্ত থাকে ততক্ষণই সুখ বা আনন্দ পায়। অন্য সমস্ত সময়ই দুঃখ ও অতৃপ্তি। দুঃখের হাত ২০ কৃপা-বিন্দু হইতে আমাদের ত্রাণ পাইতে হইলে, তাহার একমাত্র উপায় ঐ সকল নিয়ম পালন করা, যাহা বলা হইয়াছে। তার পদে মন অষ্টপ্রহর লগ্ন রাখিয়া, ক্রমে সেই ভাবে ভাবিত হইয়া, যতদিন না তাহাতে মিশিয়া যাওয়া যাইবে ততদিন সুখ বা অনিন্দ কোথায় ? ক্ষণভঙ্গুর দেহাদি সুখ ও আপাতমনােরম ইন্দ্রিয়-সুখাদিতে অভিরুচি না রাখিয়া ক্রমে তার হইয়া যাওয়াই সৰ্বসুখের সন্ধান পাওয়া। আর সমস্তই বৃথা, একমাত্র ঐ বস্তুই সত্য। তাই বলিয়া যেন কর্তব্যে অবহেলা করিবেন না। সংসারের কাজ যাহা হয় করিয়া যান। কর্তব্য পালন করিয়া কাহারও অবনতির আশঙ্কা নাই। বরং কর্তব্যের অবহেলা করিলে নানা অশান্তিতে কৰ্ম্মের ব্যঘাত হইতে পারে। সমস্ত সময়ে নাম জপ করিয়া যাইতে হয়। জপে অরুচি আসে, তাহার ঔষধ জপই, জানিবেন। ধরিয়া থাকুন, কালে ফল বুঝিতে পারিবেন। এই যে দেখা-শুনা ছাড়াছাড়ি, এসব ফঁাকি, এ দুনিয়ার কদিন । সমস্তই স্বপ্ন, ঘুমের ঘােরের খেয়াল। সেই স্থানে যদি মিলন হয়, সেই দেখাই দেখা। কোটী কল্পান্তেও তার শেষ নাই। প্রেমময়ের আনন্দ ধামের সেই আনন্দই আনন্দ। যত লােকেদের “আপনার” বলিয়া জানেন, সকলকে বলিয়া রাখিবেন যেন সেই দেশে যায়। তাহা হইলে বিচ্ছে কোথায় ? চির আনন্দ, চির মিলন। ওঁ শান্তি। ওঁ শান্তি । ওঁ শান্তি ।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। দীক্ষা গুরু ও শিক্ষা গুরু ভিন্ন, শুনিতে পাওয়া যায়। অনেক লােকে দুইই করেন, তাহাও দেখা গিয়াছে। এ সম্বন্ধে কি করা দরকার জানাইবেন। শ্রীচরণ কুশল প্রার্থনা করি। অামার শতকোটী ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র-- ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা, দীক্ষাগুরু ও শিক্ষাগুরু বিভিন্ন প্রকার পদ, সে কথা আছে, কিন্তু তাহাতে কিছুই যায় আসে না। আসল কথা ভববন্ধন হইতে যিনি উদ্ধার করিবার জন্য টানিতে থাকেন, বা ডাকেন, ঐ একজনের কথায় যতটা উপকার হয়, নানাজনার মতে ততটা হয় । তাহাতে অনেক সময় হয়ত গােলমালও হইয়া যায়। যতদিন না গুরুর সহিত সাক্ষাৎ হয়, অথবা যতদিন না তঁহার মত জানিতে পারা যায়, ততদিন গুরুদত্ত ক্রিয়াদি যথাযথভাবে পালন করা কর্তব্য। সন্দেহ হইলে গুরুর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া মীমাংসা করিয়া ফেলা সাধকের প্রয়ােজন। অবশ্য গুরুর দেওয়া যে সকল কাজ যেমন ভাবে তিনি করিতে বলিয়াছেন, অন্য লােকেও সেইপ্রকারই বলিতে পারে, এবং বলাও কৃপা-বিন্দু স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলিয়া দুনিয়ার লােকের কথা শুনিতে হইবে, এমন কথা নাই। যদি গুরুদেব কোন কোন বিষয় একটু এদিক ওদিক করিয়া, অদল-বদল করিয়া দেন, তাহা যদি ভাল নাও লাগে, তথাপি সেই সকল কাৰ্য্যই পালনীয়। এক মতে থাকিয়া কাজকৰ্ম্ম করিলে সাধকের উপকার হয়। এটা ছাড়িয়া ওটা ধরিলে অগ্রসর হওয়া দূরের কথা, আরও পিছাইয়া যায়। যাঁহাকে গুরুরূপে বরণ করিবে তাহাকে গুরুজ্ঞানেই আত্মসমর্পণ করা উচিত। নানা মুনির নানা মতে পড়িয়া সুফল হয় না। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণ কমলেষু প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দিত হইলাম। শিক্ষার ও দীক্ষার জন্য শাস্ত্রে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা আছে কি না, এবং উভয়ের মধ্যে বৈশিষ্ট্য কি? ইহা জানিতে বাসনা হয়। শ্রীচরণ কুশল প্রার্থনা করি। আমার কোটী কোটা প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়-- মা! শিক্ষার ও দীক্ষার জন্য স্বতন্ত্র গুরু শাস্ত্রে ব্যবস্থা আছে- কিন্তু যাঁহার নিকট দীক্ষাগ্রহণ করা যায়, এবং যাহার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করা যায়, উভয়ের বিশিষ্টতা যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও, দীক্ষার পর অন্য শিক্ষাগুরু করা ঠিক নয় বলিয়া অনেকের বিশ্বাস। অবশ্য দীক্ষা ব্যাপারটা বাহির হইতে দেখিয়া কানে ফুই মনে হইতে পারে। কিন্তু দীক্ষা কেবলমাত্র কানে ফু নয়। ঐ ফু দেওয়ার গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী মধ্যে কত মূল্য আছে তাহা একদিন নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিবেন, এবং তাঁর দয়া হোক যেন সত্বরই আপনি তাহা জানিতে পারেন। আমাদের দেশের প্রচলিত রীতি এই যে, যিনি কানে ফু দিলেন সেই পৰ্যন্তই তাহার সঙ্গে সম্বন্ধ, কিন্তু তাহা নহে। বাস্তবিক ধরিতে গেলে গুরুর সহিত জন্ম-জন্মান্তরীন সম্বন্ধ বৰ্তমান। যাহা হৌক সে অনেক কথা, এখন চিঠিতে তাহা সব বলা সম্ভব নয়। আসল কথা এই যে, যখনই যাহা করিবেন তাহা যেন গুরুকে জানাইয়া করিবেন না। গুরুরূপে যাহাকে বরণ করা হয়, শুধু তাহারই বাক্য পালনীয়। যদি অন্য কিছু করিতে হয় তবে তাহা তাঁহাকে জানাইয়া, মত লইয়া, করা কর্তব্য। আবার তিনি যদি সন্তুষ্ট হইয়া মত দেন তবেই, নতুবা নহে। এরূপ অনুগতভাব না থাকিলে উন্নতি হয় না। স্কুলের ছাত্র যেমন পড়াশুনা, যাহা কিছু শিক্ষা, সমস্তই মাষ্টারের হাতে প্রাপ্ত হয়, অন্য কোথাও নহে; সেই রকম গুরু ও ধৰ্ম্মজগতের একমাত্র মাষ্টার। যদি বলেন স্কুলের ছেলেরা যদি বাহির হইতেও কিছু শিক্ষা করে, সেটা কি শিক্ষা হইবে না? সে কথায় বলি, বিদ্বান্ ত সকলে সমান নয় ; বাহিরের কোন লােকে যদি বলে, পৃথিবী গােল নহে, আর ছাত্র যদি সেই শিক্ষা নেয়!—সে ছাত্রকে এক মাষ্টারে শিক্ষা দিলেও তাকে মনের মত গড়িয়া তুলিতে পারিবেন না। তিনি কিভাবে শিষ্যকে চালাইবার ইচ্ছা করিয়াছেন তাহা তিনিই বুঝিবেন—শিষ্যকে আস্তে আন্তে গড়িয়া তুলিবেন। যদি শিষ্য তাহার কথা ভাল করিয়া না শুনেন, তবে উন্নতি হইবে কেমন করিয়া ? যদি বলেন আর একটি মাষ্টার আমার ভালর জন্য হয়ত কিছু বলিলেন, আমার বিশ্বাস তার প্রতিও কিছু হইল; তিনি কি আমার ক্ষতি করিবেন ? তাহার উত্তরে একটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপরটা আপনার নিকট পরিষ্কার হইবে। ;

২৪
।
কৃপা-বিন্দু
যেমন, আপনি গাছের আম পাড়িয়া খাইবেন। আপনি জানেন
না, আম বাগান কোথায়। যিনি জানেন তার কাছে গেলেন
( তিনি যেন আপনার গুরু)। তারপর তিনি বলিলেন “বাপু,
একটা কঞ্চি আন’ ত” তার হয়ত দরকার একটা আঁকড়শী
তৈয়ার করিয়া আম পাড়িতে শিখাইয়া দিবেন। আপনি বাঁশবনে
গিয়া কঞ্চি কাটিতে লাগিলেন, এমন সময় অন্য একজন লােক
( সেও আম বাগানের খবর জানে) দেখিল ও বলিল—“ওহে কৰ্ত্তা
আম খাইবেন ত বাঁশবনে কেন ?” আপনি হয়ত জানেন না কেন
বাঁশ বাগানে আসিয়াছেন, সুতরাং আপনারও মনে হইতে পারে,
“তাইত ঠিক কথাই ; আমি আম খাইব, আমাকে বাঁশ বাগানে
কেন গুরুদেব পাঠালেন। তিনি আমবাগান হয়ত চেনেনই না ”
আপনি সেই লােকটীর সঙ্গে গেলেন। সে জিজ্ঞাসা করিল—“বাপু
গাছে চড়িতে জান ?” আপনি হয়ত জানেন না--বলিলেন “না।”
তিনি তখন গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “তাইত গাছে চড়িতে জান না,
তবে কি হবে? আচ্ছ। গাছে চড়া শেখ, তারপর তােমাকে আম
বাগানে লইয়া যাইব।” এই রকমে নানা লােকের পরামর্শে সন্ধ্যা
হইয়া পড়ে, আর আম খাওয়া হয় না।
আপনার পক্ষে যদি গাছে ওঠার চেয়ে বাঁশবাগানে কঞ্চি আনা
সােজা হয়, তবে আপনাকে তাহাই করিতে হইবে। কিন্তু মজা এই
যে, সংসারে দুইজন লােকের এক মন হয় না। যাহাতে আপনাদের
ভাল হইবে তাহাই সর্বাগ্রে কর্তব্য। আপনাদের মনে আঘাত
দিয়াও যদি উপকার হয় তাহাই করিতে হইবে। অপর পক্ষে
যাহাতে আপনাদের অনিষ্ট হইবে এমন কোন কাজই করা যাইতে
পারে না।
অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দ লাভ করিলাম। আমার মনে হয় এ সংসারই দুঃখের কারণ। সংসার ত্যাগ করিয়া দূরে চলিয়া গেলেই বােধ হয় শান্তি পাওয়া যাইতে পারে। শ্রীচরণের কুশল জানিতে বাসনা। কোটি কোটি প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা, ত্যাগ কি বাহিরে! মনের ত্যাগই ত্যাগ। অবস্থা না হইতে সৰ্বত্যাগী হইবার কি দরকার ? কঁচা ঘায়ের চটা টানিয়া ছাড়ান ঠিক নয়, তাতে রক্ত পড়ে। তাকে সকল ভার দিন না; নিজের হাতে খানিকটা ধরিয়া রাখিয়াছেন কেন ? আপনার যাহাতে ভাল হয় তিনি তাহাই করিবেন। আপনার এত ভাবনা কেন? আপনার শুধু তাকে চাই। সমস্ত কাজ, সমস্ত চিন্তা, সমস্ত ক্রিয়া- কৰ্ম্ম, পূজা, হােম, সব কিছুর উদ্দেশ্য ঐ এক কথা। তোমাকে চাই সৰ্বরূপে, সৰ্ব্ব কৰ্ম্মে, অষ্টপ্রহর, সদা-সর্বদা ঐ প্রার্থনা,--তােমাকে চাই, আর কিছু চাই না, হরি! তাকে দূরে নহে, নিজের ভিতরে জানিয়া, সকল সময়ে স্মরণ রাখিবেন। যাহা কিছু কাজ, হাত পা করুক; মনটা সৰ্ব্বক্ষণ তৈল- ধারার মত অবিচ্ছেদে তাহার উপর ঝরিয়া পড়িতে থাকুক, নতুবা শান্তি কোথায় ? কোথায় ? যখনই অশান্তি আসিবে, জানিবেন মন তাহাতে নাই, অমনি তাহাকে বলিবেন—“একি ঠাকুর। আমার সব নিলে কই ?” তাহাকে সুখ দুঃখ দুই দিতে হয়, নইলে শান্তি কৃপা-বিন্দু পাওয়া যায় না। তবে অভ্যাস চাই, একদিনেই হয় না। অভ্যাস করিতে করিতে হইয়া আসে। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- চরণ কমলেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিং। গুরুদেব। আপনার পত্র পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। মালায় হিসাব রাখিয়া জপ করিয়া কি প্রকারে ভগবানকে লাভ করা যায় ? এবিষয়ে আমার সন্দেহ হইতেছে, দয়া করিয়া আমায় বুঝাইয়া শান্তি দিবেন। শ্ৰীচরণ কুশল প্রার্থনা করি, আমার শতকোটী প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা গুরু পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়-- মা, মালা জপ ভাল, মন্দ নয়। হয়ত কাজ নাই, ক্রিয়াকর্মেরও সময় নয়, অন্য কিছু করিতে ভাল লাগে না, ঐসময় মানুষ শুধু মনে মনে জপ করিয়া নিবিষ্ট হয় না, যেন হাতে একটা কাজ পেলে হয়। তখন তাকে একগাছা মালা দিলে থাকে ভাল। প্রথম অবস্থায় মালা-জপের সংখ্যার হিসাব থাকা সুবিধা। হিসাব করিয়া করিলে জপ করিবার ইচ্ছা ততটা না থাকিলেও, জপের হিসাব বাকী পড়িয়া যাইবে, পরে আবার খাটুনী বাড়িবে, এই চিন্তায় জপ বাদ পড়েনা,এই সুবিধা ! নতুবা জমা-খরচের দরকার কি? সর্বক্ষণ অবিশ্রান্ত জপ করিতে করিতে তাহার সহিত আলাপ হইয়া যায়, তাকে আর পর বলিয়া, দূর বলিয়া, মনে হয় না। যেখানে তার নাম, তিনিও সেখানে, একথা সর্বাপেক্ষা সত্য। তিনি যদি অনবরত আপনার সঙ্গী হইয়া থাকেন (কারণ জপ করিলে বাধ্য গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ২৭ হইয়া তার সঙ্গে থাকিতে হইবে) ঐ ভাবে অনেকদিন থাকিতে থাকিতে, আপনার মনের কথা জানিতে জানিতে, একদিন তিনি হয়ত কি করিবেন তিনিই জানেন। সব তার ইচ্ছা। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণ কমলেষু প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব । আপনার পত্ৰ পাইয়া আনন্দিত হইলাম। আমরা যে ভগবানকে চাই, তিনি কি আমাদের চান? ভগবান কি আমাদের ন্যায় অধমের সঙ্গে মিশেন ? এবং তাঁহার ভালবাসায় মানুষ স্বাধীন না পরাধীন হয়, জানিতে ইচ্ছা হইতেছে। শ্রীচরণ কুশল চাই, প্রণাম কোটী কোটী গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা রুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা! আমরা যে সকলেই ভাগ্যবান্। তাকে ভুলে কতলােক সংসারে আছে, তারা ত তাকে চায় না, তারা ধন-জন, বিষয়-বৈভব চায়। তার দয়ার অন্ত নাই, তাই তিনি আমাদের টানছেন। এ যে তারও গরজ,-আমরা না হলে যে তার হৃদয় শূন্য ! যথার্থ ভক্তের সঙ্গে ছাড়া তার যে জুড়াইবার স্থান নাই, তাঁর যে প্রেম করা পােষায় না। এতে অধীনতা কোথায় ? তার প্রেমে যে সব স্বাধীন, সব সুন্দর, হইয়া উঠে, তার সঙ্গে যার প্রেম হয়েছে সে জানে যে তাতে কত মধু, কত রস। বেদ বলেছেন, “সস বৈ স”-তিনি রস স্বরূপ। “না জানি কত মধু শ্যাম নামে আছে গাে। আবার নামের পরশে যার ঐছন করিল গাে, অঙ্গের পরশে কিবা হয়।” ভাসাভাসি নয় একদম রূপ সাগরে ডুব দেওয়া ! তিনি তাঁর ভক্তের জন্য হৃদয়-পুরের কপাট খুলে ২৮ কৃপা-বিন্দু রেখে আশাপথ চেয়ে আছেন। আমরা যদি হাতখানা তুলে ধরি আর বলি “কোথায় হে প্রাণবল্লভ! হৃদয়স্বামী! তুলে নাও, জীবন মন চরণে দিমু।” আর কি তিনি থাকতে পারেন? আমার ঠাকুর যে প্রেমের কাঙ্গাল। লাথি মারলেও বলেন “ভক্ত রে! পায়ে কি তাের লাগলাে?” এমন ঠাকুর ছেড়ে কোথায় যাব? লােকে বােঝেনা তাই মিথ্যা রসশূন্য আখের ছােবড়া চিবিয়ে মরে, আর গাল বেয়ে রক্ত পড়ে। এই যে প্রেমময়ের অনন্ত মধুর রসের ধারা, একবার একটু যারা আভষি পেয়েছেন তাঁরা মহাভাগ্যবান। তাদের পায়ের দাস হয়ে থাকতে সাধ হয়, তাঁদের কোটি কোটি প্রণিপাত। এ ভাগ্য আপাদেরও আছে। আমিও ভগবানকে ধন্যবাদ দিচ্ছি যে, তারই জনের সঙ্গে তিনি আলাপ করিয়া দিলেন। সংসারে সত্য আর কি আছে ? সত্য পদার্থ একমাত্র ভক্ত আর ভাগবত। আপনার ভাবে তাকে যে চায়, সে যে আমায় কিনে নেয়। তার কাছে যে যেতে চায় সে যে আমার সহযাত্রী, সে তাে আমার পর নয়। সংসারে এসে জন্মাবার পর হতে যাদের সঙ্গে সম্বন্ধ হয়েছিল তারা আজ আমার কেহই নয়। আজ যাকে আপন বলে জেনেছি, তাকে যাঁরা চান, তাদের সম্বন্ধে মনে হয় যেন আমরা সবাই এক পরি- বারের। কি পবিত্র কি আনন্দময় সে পরিবার। তার ভক্তের সঙ্গ তিনি করিয়ে দেন, আর আমাদের ধর্গ করেন। ধন্য যারা সংসারে থেকেও ভগবানকে চান। দুই মণ বােঝ। মাথায় করিয়া যাহরা উপর-দিকে চাইতে পারেন, বাহাদুরী তঁাদেরই। আমরা তাকে পাবার জন্য সংসার ছেড়ে এসে যদি তার নাম না করি, ললাকে যে, মুখে ছাই দেবে। সমস্ত দিনরাত্রি তাকে তৈলধারার মত অবিচ্ছেদে ভাববেন। একা মন খুলে তার কাছে কাদবেন। বিরহে, অদর্শনে, ছটফট করবেন। জল-ছাড়া মাছের মত ভাব হলে * গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী . তার দেখা পাওয়া যায়। একথা সতত সত্য, মনে রাখবেন। তঁাকে দূরে নয়, ললাটে ভাববেন। সেই জ্যোতির্ময় সচ্চিদানন্দ প্রেমময়কে প্রাণের সব কথা বলবেন। “কায়েন মনসা বাচা” তাকে সব রকমে পূজা করবেন। তার সঙ্গে যদি আমরা মিশতে চাই তবে সৰ্বরূপে আমাদের নির্দোষ হতে হবে। সর্বপ্রকারে পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক, তার মিলনের যােগ্য, হতে হবে। নইলে সে মিলনে সুখ নাই। অসমানে প্রেম হয় না। তারও কতকগুলি নিয়ম আছে। সাধন করার সঙ্গে সঙ্গে সে সব অবশ্য পালনীয়, নতুবা ফল বড় দেরীতে হয়। অত্র কুশল, আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! অাপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দলাভ করিলাম। আর কতকাল এ সংসারে থাকিয়া দুঃখ ভােগ সাধনপথে থাকিয়াও দুঃখের এখনও অবসান হইল না? কতকালে হইবে দয়া করিয়া বুঝাইয়া দিবেন? শ্রীচরণ কুশল প্রার্থনা করি। আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা করিব ? ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা! এই পৃথিবী দুঃখময়, অন্ততঃ ভারতের দর্শনকারগণের এই রকমই মত। দুঃখের অভাব কি? সবই দুঃখ। এই দুঃখের হাত হইতে নিস্তার পাওয়ার নামই মােক্ষ। সাধন-ভজন ত ঐ জন্য। কি হইলে এই দুঃখের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া যায়, এখন তাহা কতক না বােঝ গিয়াছে এমন নয়। কি করিলে যে হয় তাহা আপনিও জানেন। সেরূপ চেষ্টা করিলে বােধ হয় সহজেই কাজ হইতে পারে। তবে যদি ; কৃপা বিন্দু বলেন—সে ইচ্ছা হয় না; কেননা একটি কথা আছে “গুরু কৃষ্ণ বৈষ্ণব তিনের দয়া হ’ল, একের দয়া না হইতে সব ছারে-খারে গেল!” সেই এক কে? মন! মনের দয়া হ'লেই হয়। তার প্রতি টান বাড়লেই খুব শীঘ্র হয়। তীব্রসগােনামাসন্নঃ,-তীব্র বেগশালী সাধক শীঘ্র কাজ উদ্ধার করেন। শাস্ত্রবাক্য আপ্ত, তাই সত্য। সুতরাং দেখা যাইতেছে যতটা টান, ততটা কাজ, ততটাই শান্তি! তারপর সময় সাপেক্ষ। আজ যে ছেলের জন্ম হল, তার মা যদি-দুঃখ করে, “সকলের ছেলে রােজগার করে আনে, আমার ছেলেই করেনা,”-এ ত সে রকম কথা ! কাজ আরম্ভ করিয়াই, অথবা কিছুদিন করিয়া, ছাড়িয়া, আবার ধরিয়া, তার মধ্যেও সংসারী যেটুকু সময় পায় তাহাতে হৈ হৈ করিয়া,—এমনভারে সাধন করিয়া শান্তি পাওয়া শক্ত। মেয়েরা সামান্য যে পঞ্চমীর ব্রত করে, তাহাও কত বৎসর করিতে হয়, যদি বাদ যায় তা আবার গােড়া হইতে আরম্ভ করিতে হয়। মুক্তির রাস্তা কি পঞ্চমীর ব্রতের চেয়েও সােজা মনে হয়? তারপর যে কাজই করুন না কেন, কথা আছে “মন্ত্রম্ বা সাধয়েম, শরীরং বা পাতয়েম”; অর্থাৎ মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পতন ; তবে, হইবেই কাজ উদ্ধার । আপনাকে যে আমি একা বছি এমন নহে, সাধক মাত্রেই ঐ এক কথা বলেন। সাধনায় তীব্র বেগ না থাকায় সাধক দুর্দশায় পড়িয়া হাবুডুবু খায়। কোথায় কোন্ অন্ধকারে পড়িয়া কাদা ঘটিয়া, শামুক কুড়াইয়া, মনে করিতেছে এই বুঝি মণিমাণিক্য! প্রায় সকলেই ঐ দুর্দশায় পড়ে। একাগ্রতার সহিত তাঁর প্রতি টান থাকিলে তবে অগ্রসর হয়। মরি বাঁচি ধরিয়া থাকিতে হইবে। যা হয় হােক, না হয় না থােক, পথ ছাড়িব । মহাপুরুষেরা বলিয়াছেন বহু সাধনায় তবে সিদ্ধি। যাহাদের সেই বেগ আসিয়াছে তাহাদের শীঘ্র হয়। সেই অবস্থার জন্য নিয়মমত ভক্তি ও নিষ্ঠা আয় করিয়া রাস্তায় পড়িয়া থাকিতে হয়, তারপর গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী তার ইচ্ছা। দিন যায়, কই আসে না, বয়স শেষ হইয়াই আসিতেছে, ক্রমে বৃদ্ধ হইয়া পড়িতে হইবে। বসন্তে মধু সংগ্রহ করিয়া রাখিতে পারিলে, বর্ষায় কষ্ট হইবে না। আলস্য বশতঃ এখন বসিয়া আমােদ করিলে, বর্ষায় উপবাস। সময় মতই সময়ের কাজ করা উচিত। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণ কমলেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া সবিশেষ আনন্দ লাভ করিলাম। কত চেষ্টা করি, তথাপি ধ্যানের মূর্তি প্রকাশিত হয় না। একটা অভাব লাগিয়াই আছে, তাহাকেও দূর করিতে পারি না। দয়া করিয়া শান্তি দিতে ভুলিবেন না। চরণ কুশল চাই। আমার শতকোটী প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়--- মা! ধ্যানের মুর্তি না আসার কারণ অস্থিরতা। চিত্তের স্থিরতা ব্যতীত ধ্যান হয় না। যাহাতে চিত্ত স্থির হয়, আপনাকে তাহাই করিতে হইবে। অশান্তিতে বাস করিলে চিত্ত স্থির কিরূপে হইতে পারে ? এ অশান্তি কিসের ? অসন্তুষ্টি হইতে অশান্তি আসে। অশান্তির অন্য কোন কারণ নাই। আপনি কেন অসন্তুষ্ট তাহা একবার ভাবিয়া দেখিলে ভাল হয়, তাহা হইলে বােঝা যাইবে গলদ কোথায়। অবশ্য লােকে যাহা ‘চায় তা যদি পায়, অসন্তোষ আসিবে কেন? চাহিলে অথচ না পাইলে, তবেই অসন্তোষ হয়। এক কথায়, অভাব অসন্তোষের বীজ। অভাব কিসের ? অর্থ ইত্যাদি মানুষ যাহা চায় তাহার যে টানাটানি পড়িয়াছে এমন নয়। সংসারের মুখেও. ত অভিলাস নাই। তবে কৃপা-বিন্দু অভাব কোথায় ? যাহার যাহা কামনা তাহা পাইলেই বা কি হইবে, সে সকল বস্তুতে কি যথার্থ সুখ প্রদান করিতে পারিবে ? যদি তাহা মনে হইয়া থাকে তা ভূল, একমাত্র ভগবানকে না পাওয়াই অশান্তির মুল। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলে— প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব। আপনার পত্র পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। সময়ে সময়ে যেন উৎসাহ-হীন হইয়া পড়ি এবং আমার কিছুই লাভ হইল না বলিয়া মনে হয়। সাধক ভগবানকে লাভ করিলে কি অবস্থা প্রাপ্ত হয়, দয়া করিয়া লিখিয়া জানাইবেন। শ্ৰীচরণ কুশল চাই। আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণতি গ্রহণ ইতি সেবিকা ওঁ নমাে নারায়ণয়- মা, সাধক ভগবানকে যখন লাভ করে তখন তাহার অবস্থা গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে বলা আছে; অথবা দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে স্থিত-প্রজ্ঞের বিষয়ে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, তাহার উত্তর আপনার নিকট আলােচনা করিলেই আপনি আপনার জিজ্ঞাস্য বিষয় বুঝিয়া লইতে পারিবেন। অর্জুন উবাচ স্থিত প্রজ্ঞস্য কা ভাষা সমাধিস্থ কেশব। স্থিতধীঃ কিং প্রভাষেত কিমাসীত ব্ৰজেত কিম্। ৫৪।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী শ্রীভগবান উবাচ প্ৰজহাতি যদা কামান্ সৰ্বান্ পার্থ মনােগতা। আত্মবােত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞশুদোচ্যতে । ৫৫। দুঃখেরুদ্বিগ্নমনাঃ সুখে বিগতস্পৃহঃ। বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীমুনিরুচ্যতে ॥ ৫৬ ॥ যঃ সৰ্বত্ৰানভিয়েহস্তত্তপ্রাপ্য শুভাশুভ। নাভিনন্দতি ন দেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত ॥ ৫৭। অর্জুন বলিলেন-হে কেশব! স্থিত-প্রজ্ঞ পুরুষের লক্ষণ কি ? তিনি কিরূপ কথা কহেন, কিরূপে থাকেন, এবং কিরূপে গমন করেন ভগবান কহিলেন—হে পার্থ ! যােগী ব্যক্তি যখন নিজ মনােগত সমুদয় কামনা ত্যাগ করতঃ আত্মাতে স্বয়ং তুষ্ট হয়েন, তখন তিনি স্থিত-প্রজ্ঞ বলিয়া উক্ত হন। যিনি দুঃখে অনুদ্বিগ্ন, সুখে স্পৃহাশূন্য এবং আশক্তি-ক্রোধ-ভয়-শূন্য অন্তরে থাকেন, সেই মুনিই স্থিত- প্রজ্ঞ। যিনি সকল বিষয়েই মেহন্ত, যিনি শুভাশুভ ফল-লাভে আনন্দিত বা বিষাদিত হন না, তাহার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ( তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ)। ভগবান-প্রাপ্ত সাধকের লক্ষণ এই স্থিতপ্রজ্ঞের মত জানিবেন। আপনারও ঐ অবস্থা লাভ হইলে তবে শান্তি। দুঃখের বিষয়, মানুষ শান্তির অপেক্ষা ক্ষমতার আদর বেশী, ৫. করে। মানুষ মনে করে একটা কিছু দেখাইতে হইবে,—এমন একটা করিয়া ফেলিব, দুনিয়া অবাক হইয়া যাইবে। তাহা হয় না, তাই দুঃখ। অথবা যত শীঘ্র সিদ্ধাবস্থা আশা করে তত শীঘ্র হয় না, সুতরাং দুঃখ । আমাদের কি লক্ষ্য সেটা সমস্ত দিন মনে রাখিয়া জপ করিয়া যাওয়া, না ভােলা, এবং সেই রকমে নিজেকে গড়িয়া তােলা দরকার, তাহা হইলেই ৩৪ কৃপা-বিন্দু শান্তি হইতে পারে ( অবশ্য ক্রমে ক্রমে)। নিজেকে ভাল করিয়া গঠন না করিয়া কেবলমাত্র সামান্য কাজকর্মের দ্বারা অল্প অয়াসে সেই অবস্থা লাভ করা যায় কি ? এই চােখের সামনে মহাপুরুষ জগদ্বন্ধু,—কি সাধনা, কত চেষ্টা করিয়া ঐ অবস্থা লাভ করিয়াছেন। আপনি তার বাহিরের মান সম্মান সব ভুলিয়া যান, তাঁর ভিতরটা দেখুন। বাহিরটা দেখুক যাহারা দোকানদার, বিজ্ঞাপন যাহাদের ব্যবসায়। তিনি কি পাইয়াছেন তাই দেখুন। গীতাতেই অনেকটা শান্তি পাইবেন। ঋষিরা যেমন যেমন নিয়ম বলিয়া দিয়াছেন ও যে-সকল কাজের যেমন ফল লিখিয়াছেন, তাহা সত্য; আমরা অনেকেই তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। ছাড়িয়া দিলে কোন কাজ হয় না, নিয়মে কাজ করিয়া যাইলে তবে ফল হয় । নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। বলহীন বীৰ্য্যহীন, তেজোহীন, তামসিক যাহারা, জানিবেন তাহারাই কেবল ভ্যানর ভ্যানর করে, আর কিছু করে না। অত্র কুশল, আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্ৰীশ্ৰীচরণকমলেষু গুরুদেব! প্রণাম গ্রহণ করিবেন। আপনার চিঠি পাইয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। যাহাকে জানি না, বা দেখি নাই, তাহাকে কি ভালবাসা যায় ? ভগবান আছেন এই শুনিতে পাই, তাঁহার সহিত আবার সম্পর্ক পাইব কেমন করিয়া ? যম-নিয়মের বাংলা অর্থ করিয়া পরিষ্কার বুঝাইয়া দিলে কৃতার্থ হইব। নাড়ী শুদ্ধি করিতেছি। কঠোরতা যতদূর সাধ্য করিতেছি। কিন্তু আমার হৃদয় ভক্তিহীন। বাহিরে চটক, ভিতরে কিছুই নাই।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৩৫ আর কি লিখিব। আপনার শ্রীচরণ কুশল প্রার্থনা করি। শতকোটী প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় মা! লিখিয়াছেন যাঁহাকে জানিনা তাহাকে কি ভালবাসা যায় ? যাকে চিনিনা তাহার সঙ্গে আবার সম্পর্ক পাইব কেমন করিয়া ? একথা সত্য, কিন্তু সত্যই কি তঁার অস্তিত্ব আমরা দেখিতে পাই না ? তার ভালবাসা জীবনের প্রত্যেক অনুতে কি জড়াইয়া নাই। একটুখানি ভাবিলে কি বুঝা যায় না, তার মধুরতা কত? এই যে স্ত্রী-পুত্রাদির ভালবাসা, এই যে সংসারের এত আনন্দ সুখ, এ সব-কি মানুষের প্রস্তুত ? এ-সব আসে কোথা হতে ? তারই মধুরতার সামান্য ভাব এই সকল! আপনি এ কথা বেশ করিয়া, ভাবিবেন, তখন তাঁকে প্রাণের টানে ভালবাসিয়া ফেলিতে বাধ্য হইবেন। অমনভাবে নিজেকে অবিশ্বাস করিবেন না, বা অপবিত্র মনে করিবেন না। লিখিয়াছেন বাহিরে চটক, ভিতরে কিছুই নাই। এটা সত্য কথা নয়-বাহির বলিয়া যে পদার্থ টা আছে সেটা শরীর, সেটার দাম সিকি পয়সাও নহে। যাহা কিছু মূল্য সে ঐ ভিতরটার। একটা মানুষ কি চালাকি ব্যাপার ? আপনার ভিতরে সবই আছে, নতুবা আপনার সৃষ্টি হইত না। কঁাধে গামছা রাখিয়া লােকে যেমন গামছা খোজে, আপনারও যেন কতকটা তাই। বস্তুত আপনার ভিতরেই রহিয়াছে। ভক্তি আপনার নাই বলিতেছেন, কিন্তু নির্জনে অন্য সকল চিন্তা দূরে ফেলিয়া রাখিয়া, তঁাকে সম্মুখে ভাবিয়া এক বার নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিয়াছেন কি, আপনার কৃপা-বিন্দু মন সেই অজানার বিষয়ে কিছু বলে কি না? আমি নিয়মানুসারেই জানিয়া বলিতেছি—নিশ্চয়ই বলে । আপনার মন আপনাকে নিশ্চয়ই বলে ভক্তি আছে। সংসারের কতকগুলি আইন আছে তাহার বাহিরে যাইতে পারেন না। আপনিও নিয়মাধীন, সুতরাং তাহার চিরন্তন নিয়নানুসারে আপনার ভক্তি থাকিতেই হইবে। তবে হয়ত সে ভক্তি তেমন বিকাশ হয় নাই ; ভক্তি আছে তবে অনুশীলন অভাবে তাহা ভাল বাড়ে নাই, এই পৰ্য্যন্ত। বটগাছের যে সামান্য বীজটিকে আজ তুচ্ছ বলিয়া মনে হইতেছে তাহা বস্তুতঃই কি তুচ্ছ করিবার জিনিষ ? সে যদি উপযুক্ত জল বায়ু পায়, সেকি একটা প্রকাণ্ড বটগাছে পরিণত হইবে ? এই জল বাতাস সর্বদাই আছে। আপনি ইচ্ছা করিলেই তাহা ধরিয়া লইতে পারিবেন। তার দয়ার অন্ত নাই; তাঁর কৃপা- বাতাস সর্বদাই বহিতেছে ; তাহার কৃপাবৃষ্টি সৰ্ব্ব জায়গায় পড়িতেছে ; নতুবা তাকে দয়ার স্বরূপ বলিবে কেন ? তার চক্ষে সব সমান,ছােট বড় কিছুই নাই। আপনি তাহার দয়া লইতে চেষ্টা করুন, পৃথিবী আনন্দময় হইয়া যাইবে। নিজেকে ঘৃণিত পদার্থ কেন ভাবিবেন ? আপনার জীবন বা দেহ কি আপনার নিজের ? আপনার কি অধিকার আছে তাহাকে ঘৃণিত ভাবিবার? ও-সব ভাব একেবারে ছাড়িয়া দিন। “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ।” আমরা সকলেই অমৃতের সন্তান, আনময়ের লীলার অংশ, অমৃতের অধিকারী ; আমরা কেন অবসাদগ্রস্থ হইব? খুব দূরের জিনিষ, আর খুব কাছের জিনিষ, দেখা যায় না; দেখিতে হইলে কতকগুলি উপায় অবলম্বন করিতে হয়। চক্ষের একেবারে কাছে থাকিলেই ত দেখা যায় না; কিন্তু তিনি আরও কাছে, নয়নে নয়নে বলিলে যাহা বুঝায় এত কাছে, তাই তাহাকে সহজে ধরা যায় না। •• গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী নতুবা তিনি আমাদের প্রত্যেকের সর্বাঙ্গ ভূষিত করিয়া সৰ্ব্বদা বর্তমান আছেন। একথা একবার অতি সুন্দররূপে নিবিষ্ট চিত্তে চিন্তা করিয়া দেখিবেন। ভক্তি বলিয়া যে পদার্থ, আপনার তাহার অভাব নাই; যাহার প্রাণ বলিয়া একটা পদার্থ আছে তাহার ভক্তি নাই, একথা আমি বিশ্বাস করি না। আপনি আপনার সঙ্গীদের ভালবাসেন না কি ? ভালবাসাটা কি ? সে টানটা কি অলীক ? তাহার কি কোন একটা অর্থ নাই ? মানুষ যে পা দিয়া তীর্থ বা দেবস্থানে গমন করে, সেই পা-ই ত আবার তাহাদিগকে অস্থানে লইয়া যায়। ভালবাসা বা ভক্তি সম্বন্ধেও তাই। যে ভালবাসাটা চারিদিকে বিষয়-আসয়ে ছড়াইয়া পড়িয়া অযত্নে খুলা মাখিতেছে, তাহা ভগবানের দিকে লাগাইয়া দিলে উজ্জ্বল হইয়া উঠিবে । ভগবানের জন্য ভক্তি বা ভালবাসা নূতন তৈয়ারী হইয়া আসে না। যে ভালবাসার আস্বাদ পাইয়াছেন সেই ভালবাসা তাকে দিলে তার নাম ভক্তি। তাকে সেই ভালবাসা দিতে শিখুন। তাঁকে সকল কাজের সঙ্গী করিয়া লইলে দেখিতে পাইবেন যে, তাঁকে দিলে আর ফিরে আসে না। এ পরাণ তঁাকে ভালবাসে না একথা একেবারেই সত্য নয়। নির্লিপ্তভাবে কাজ করিবার চেষ্টা করুন। পরের সংসারে, পরের উপর কর্তৃত্ব করিতে গেলে, কর্তা তাহা সহ্য করিবেন কেন? তাই দুই এক ঘা মাঝে মাঝে খাইতে হইতেছে, কাজেই কষ্ট পাইতেছেন। সংসারে যাহা করিবেন শুধু কাৰ্য্যের খাতিরে, নিজের কোন লাভের আশায় নহে। এই ভাবে করিলে শান্তি পাইবেন। কর্তৃত্ব ছাড়িলে সুখ আছে, নতুবা নয়। সুখ দুঃখ মানুষের মনে। বাহিরের কতকগুলি অবস্থার উপর যাহাকে নির্ভর করিতে হয় সেই দুঃখ পায়। নিজের মনকে তাঁর কৃপা-বিন্দু দিকে লইয়া যাইয়া সেইদিকেই বেশী বেশী থাকিবার চেষ্টা করুন। বহির্জগতের কোন কিছুতে আশা, বা ভােগের ইচ্ছা, রাখিবেন না নিজের কোলে পরের জিনিষ টানিয়া লইলে তাহার মার খাইতে হয়। সত্যসত্যই যদি সংসার তাঁর ভাবে ভাবি তার করিয়া লওয়া যায়, তবে সংসারটি যথার্থ ধর্মের সংসার, আনন্দের সংসার, হইয়া দাড়াইবে । শান্তিকে তাহা হইলে আর খুজিয়া বেড়াইতে হয় না--শান্তি নিজে চির সঙ্গী হইয়া বাস করে। তারপর এক কথা, খুব বেশী কঠোরতা অভ্যাস করিবার দরকার নাই। খুব কিছুই ভাল নয়,খুব বিলাসিতা বা খুব কঠোরতা, অতি নিদ্রা বা অনিদ্রা, অতি ভােজন বা অল্প ভােজন। আতিশয্য-পরায়ণ ব্যক্তি ভাল যােগী হইতে পারে না। যাহা রয় সয় তাহাই ভাল, আপনি সন্ন্যাসীদিগের মত কঠোরতা অভ্যাস করিবেন না, বা চেষ্টাও করিবেন না। শুধু নিজের কাজগুলি যথানিয়মে যাহাতে হয় ও স্বাস্থ্য বজায় থাকে, সেইদিকে দৃষ্টি রাখিয়া চলিলেই ঠিক হইবে। বাকী সব যেমন চলিতেছিল তেমনই চলিবে। অজপা ছাড়িবেন না—অষ্টপ্রহর ঐ চলুক। রাত্রে কাণের মধ্যে যে শব্দ হইতে থাকে ওটা ভাল। এইবার ক্রমে নাড়ীশুদ্ধি হইয়া আসিবে । এবং নাড়ীশুদ্ধি হইলেই প্রাণায়ামের অধিকার জন্মিবে। নাড়ীশুদ্ধি যত ভাল হইবে প্রাণায়াম তত সুন্দর নির্দোষ ও শীঘ্ৰ কাৰ্যকরী হইবে। নাড়ীশুদ্ধিই সমস্ত নিশ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যের গােড়াপত্তন। সেই জন্যই এইটা যাহাতে সৰ্বাঙ্গসুন্দর হয় তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। পাকা সাধকদেরও মত তাই। ও সব, ঠিক আছে—অগ্রসর হইতে থাকুন—আপনা আপনিই হইয়া যাইবে। কোন মূর্তির ত্রাটক এবং সঙ্গে সঙ্গে ধ্যান করিতে থাকিলে প্রথম প্রথম এক এক অংশ আসে আবার হয় ত কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু ক্রমে অভ্যাস করিতে করিতে পূর্ণ অবয়ব দেখিতে পাওয়া যায়। এবং গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী যম- পরে সেই মূর্তিকে জ্যোতির মধ্যে বসাইয়া দেওয়া সহজ হয়। যাহারা শুধু জ্যোতির ধ্যান করে তাহাদের অবশ্য অন্য মূৰ্তির দরকার নাই। যম, নিয়ম প্রভৃতি অষ্টাঙ্গ যােগের কয়েকটী কথা বাংলা করিয়া লিখিয়া দিতেছি— যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি, এই আটটি যােগের অঙ্গ। -অহিংসা-সত্যাস্তেয়-ব্ৰহ্মচৰ্যাপরিগ্রহ যমাঃ । এতে জাতিদেশকাল-সময়ানবচ্ছিন্নাঃ সাৰ্বভৌমা মহাব্ৰতম্। অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য, অপরি গ্রহ-—এই পাঁচটি যম, এই সকল সৰ্ব্বদা সর্বত্র সকল কাজে পালন করিলে মহাব্রত পালন করা হয়। সকল পূজার, সকল ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের, সকল ব্রতের শ্রেষ্ঠ এই মহাব্রত,ইহা ঠিক ঠিক পালন করিলে মানুষ দেবতা হয়। অহিংসা —কায়-মনন-বাক্যে কাহারও মনে, শরীরে, কোনরূপ কষ্ট দেওয়া অহিংসা ; কেবলমাত্র প্রাণীবধ না করাকেই অহিংসা বলে না। সত্য -সংসারে একমাত্র সত্য কি ? তিনি। সুতরাং তাকে ছাড়া মনে অন্য কিছুর স্থান না দেওয়াই সত্য পালন। এ ছাড়া সর্বপ্রকার মিথ্যা হইতে ভিন্ন থাকা, মিথ্যা কথা, মিথ্যা চিন্তা, এমন কি অসরল সত্য পৰ্য্যন্ত। ইহারই নাম সত্য পালন করা । অস্তেয়—যাহা নিজের নহে তাহাতে লােভ না হওয়া। নিজের কি ? সংসারে কোন পদার্থই নিজের নহে। সুতরাং সমস্ত বিষয় হইতে মনকে তুলিয়া লইতে হইবে, কোন পর-দ্রব্যে মনে-মনেও যেন ভােগের ইচ্ছা না হয়। ব্রহ্মচর্য্য সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে ব্রহ্মচর্য রক্ষা হয় না। শ্রবণ, কীর্তন, কেলী, প্রেক্ষণ, গুহভাষণ, সঙ্কল্প, অধ্যবসায়, ও ক্রিয়া নিষ্পত্তি-মৈথুন বিষয়ে এই অষ্টপ্রকার ভাব ত্যাগ করাকে ব্রহ্মচর্য বলে।

৪০ কৃপা-বিন্দু অপরিগ্রহ——যাহা গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য প্রয়ােজন তাহা ব্যতীত অন্য কোন দ্রব্য নিজের জন্য জমা করিয়া না রাখা, বা নিজের বলিয়া মনেও না করা। সংসারে যদি অনেক জিনিষ থাকে, তা পরের জন্য, নিজের ব্যবহারে তা নাইবা হল । নিয়ম -সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বর-প্রণিধানানি নিয়মঃ শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায়, ঈশ্বর প্রণিধান, এইগুলি নিয়ম। শোচ-মৃত্তিকা এবং সলিলাদি-দ্বারা বাহ শৌচ। কোন প্রকার অপবিত্র (ঈশ্বর ব্যতীত অন্য ) চিন্তা না করার নাম আভ্যন্তরীণ শৌচ। সন্তোষ~-অল্পে সন্তুষ্ট থাকা। তিনি যে অবস্থায় যেমন রাখেন, মহাসুখে অথবা দুঃখে, রােগেই হৌক, শােকেই হৌক, সৰ্ব্বদা সন্তুষ্ট থাকা। তপস্যা -আসন প্রাণায়ামাদি যে সকল কার্য চিত্তের নির্মলতা- সাধক তাহার অভ্যাস-জনিত যে কষ্ট স্বীকার, মনকে বশীভূত করিতে হইলে প্রথম প্রথম যে সকল অসুবিধা বা কষ্টভােগ করিতে হয়, তাহাকে তপস্যা বলে। নতুবা অনর্থক দেহকে কষ্ট দেওয়া বা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কিছু করাকে তপস্যা বলে না। যথা- চিত্তপ্রসাদকারিণঃ প্রাণায়ামসমাদয়ঃ । তদভ্যাস ভবস্য চ দুঃখস্য সহনং তপঃ ॥ প্রাণায়াম আসনাদি চিত্তের প্রসাদ করায় এবং ইহাদের অভ্যাস জনিত যে দুঃখ তাহা সহ করাই তপস্যা। স্বাধ্যায়-প্রণবাদি পবিত্রাণাং স্বাধ্যাম্বরা জপ উচ্যতে। অথবা মােক্ষ শাস্য সদৈবাধ্যয়ণং হি সঃ ॥ প্রণবাদি (ওঁ) পবিত্র মন্ত্রের দ্বারা এবং সৎধৰ্ম্ম-গ্রন্থাদি পাঠ করাকে স্বাধ্যায় বলে। ঈশ্বর প্রণিধানদেহস্থ (ললাটস্থ ) ঈশ্বরের দ্বারা প্রেরিত হইয়া যেন গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৪১ সমস্ত কাৰ্য করা হইতেছে, কোন কিছুই যেন তার ইচ্ছার ব্যতিক্রমে হইতেছে না, তিনি যেন হৃদয়ে বসিয়া সব করিতেছেন, সৰ্ব্বদা সৰ্ব্বচিন্তায় এবং সর্বকার্যে এইরূপ ভাবনার নাম ঈশ্বর প্রণিধান। আসন—“স্থির সুখাসন” এই আসনকে আয়ত্ত করিতে হইবে। আসন-সিদ্ধ না হইলে যতক্ষণ ইচ্ছা বসিয়া কাজ করা যায় না। পা ট টন্ করে । আসনসিদ্ধির উপায়—-“অনন্ত আকাশ আমি”, এইরূপ ভাবনা করিতে করিতে গা ছাড়িয়া দিলে আসন শীঘ্রই সিদ্ধ হয়। তাই বলিয়া মেরুদণ্ড যেন না বাঁকে। যাহা যাহা বলা গেল তাহা পালন করার নাম তপস্যা। এ সমস্ত পালন করিলে আনন্দ পাবেন। নিয়ম পালন প্রথমটা একটু কষ্টকর একটু অভ্যাস না হলে এবং নিয়মমত কাজ না করলে ভাল লাগবে না। এসব নিয়মগুলি মনে রাখবেন, ভগবানের আদেশ। সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ পবিত্র না হয়ে কেহ তার কাছে যেতে পারে না। গেলেও সে সুখ পায় না। অত্র কুশল, আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা। ইতি শিষ্য পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলেষু সবিনয় নিবেদনমিং। গুরুদেব! আপনার চিঠি না পাইয়া অত্যন্ত দুঃখিত আছি। আপনাকে যেন গৌরাঙ্গদেবের মত মনে হয়। তিনি যেমন তার নামে ভাবে ডুবিয়া গিয়াছিলেন আপনিও ঠিক যেন তাই। আমি অতি তিমিরান্ধ, দুর্বল, ললাকের সঙ্গ করিলে যেন মনটা আরও খারাপ বােধ হয়। আহারাদির নিয়ম সম্বন্ধে দয়া করিয়া জানাইয়া কৃতার্থ করিবেন। অনেক বিষয়ে জানিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সব সময়ে বলিতে

৪২
কৃপা-বিন্দু
মনে থাকে না । এ সংসারে কেবল দুঃখই বােধ করিতেছি। দুঃখই বা
কত প্রকার আছে ? এখন ভাগবত পড়িতে পারি কি না লিখিবেন।
আপনার নিত্য কুশল প্রার্থনা করি। আমরা একপ্রকার আছি।
শতসহস্র প্রণতি গ্রহণ করিবেন।
ইতি সেবিকা
ওঁ নমাে নারায়ণায়
এতদিন পরে এখানে আসিয়া পৌছিয়াছি। কলিকাতা আসিবার
পর হইতেই স্থানের কোন বিশেষ স্থিরতা না থাকায় ঠিকানা দিতে পারি
নাই। যাহা হউক এখানে বােধ হয় কিছুদিন থাকিতে হইবে।
এ স্থানটি বেশ সুন্দর। একেবারে সমুদ্রের উপরে ও অতি
নির্জন। ঘরে বসিয়া সমুদ্রের ঢেউগুলির খেলা দেখা যায়।
দুঃখের বিষয় এখানে অভাব খালি অন্নবস্ত্রের। আহার কেবল ভাত
ভাত ভাত, অন্য কিছুই নাই ; তবে যারা মৎস্যাশী তাদের খুব
সুবিধা। চারিদিকে জঙ্গল, জলে কুমীর, ডাঙ্গায় বাঘ-এদেশে এদেরই
রাজত্ব।
আসল কথা কিন্তু অন্যরকম। দেশে দেশে কোন প্রভেদ নাই--
ঠাকুর সর্বত্রই। নানা দেশে নানা ভাবে সেই তারই প্রকাশ, আমাদের
শুধু ভেদ দৃষ্টি দূর হয় নাই বলিয়াই বুঝিতে গােল করি। কোন জায়গায়
সুখী হই, আবার কোন জায়গায় দুঃখী হই। ডুৰ না দিলে এ ভেদদৃষ্টি
যায় না। জানিবার আর কিছু নাই—এখন কেবল ডুব মারা।
এক ডুবে :
গৌরাঙ্গদেবের মত এক কণাও হয় নাই। কণা হইতে পারিলেও
জীবন ধন্য বােধ হইত। আবার ডুবইবা এখন কোথায় দিয়াছি-
জলই নজরে পড়ে না, ত ডুবিব কোথায় ?

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৪৩ হয় ; লোক সঙ্গ যত অল্প হয়, ভাল। লােক সঙ্গে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়, সময় নষ্ট তাতে মন থাকে না—বিষয়ে মন যায়। কথা খুব কমাইয়া দিবেন। নিতান্ত দরকার না হলে কথা বলিবেন না। হাত দিয়া যখন কাজ করিবেন, মনে তখন জপ, চিন্তা, বা তার অস্তিত্ব ললাটে ধ্যান করিবেন, ভাবিবেন সৰ্ব্বদা তার দ্বারাই সব হইতেছে, তিনিই সব করাইতেছেন। তিনি দূরে ন, শরীরেই, ললাটদেশে। আপনি নিজেকে দুৰ্ব্বল, তিমিরান্ধ মনে করিবেন না। তার জন্য যে ব্যাকুল হয়, কাদে, তাকে যে চায়, তিনি তাকে ভুলে থাকেন না। আপনি জানিয়া রাখুন তিনি আপনার খবর রাখেন, এসব কথা পরে টের পাইবেন, এখন নয়। তার চোখে ঘুম নাই, তাঁর দুই চক্ষু ললাটে জ্যোতি রূপে বৰ্ত্তমান, ভুলিবেন না। কিসের মােহান্ধ ! নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করিবেন। তার সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছে, তার গৌরবে আমার গৌরব, আমি কি কম ?”—এই মনে করিবেন। যে সকল বস্তু আহার করিলে পুষ্টি হয়, যেগুলি স্নিগ্ধ, মননজ্ঞ, প্রীতি প্রদ, অথচ দুষ্প্রাপ্য নয়, তাহাই যােগীদের পক্ষে ব্যবস্থা। মিতাহার নিতান্ত দরকার। উপবাস, বা যােগের আরম্ভে একাহার, এ সকল উচিত নয়। শরীরকে ক্লেশ দিবেন না। তবে একাদশীর উপবাস করিলে, সমস্তদিন অন্য কিছু না করিয়া খালি সমাধির চেষ্টা করা খুব ভাল। উপবাসের দিনও খৈ দুধ ঐ রকম কিছু খাইতে হয়। প্রাণায়াম অভ্যাসের পর উপবাসাদি হইবে, এখন নয়। উপবাস খারাপ হইলেও, একপ্রহর ক্ষুধা সহ করিলে কোন দোষ হয় না। একবারে ভরা পেট আহার না করিয়া, অল্প অল্প অনেকবার আহারই প্রশস্ত। গীতায় আহারাদির যেমন ব্যবস্থা আছে তাহাই প্রশস্ত। ভাজাভুজি বেশী কেন, মােটেই না খাইলে ভাল হয়। যােগশাস্ত্র পড়িয়া, এবং অভ্যাস করিয়া, যা বুঝিয়াছি, তার দয়ায় | * ' কৃপা বিন্দু তাই লিখিলাম । এ ছাড়া আসল কথা যােগ দর্শনে আর বিশেষ কিছু আছে বলিয়া মনে হয় না। এইগুলি পালন যদি ঠিক ঠিক করিতে পারেন তবে সমাধিলাভ আপনার করতলগত। কৰ্ম্ম করিলেই তার ফল অবশ্যম্ভাবী। এ সব কথা বিশ্বাস করুন। দুঃখ ত্রিবিধ-—আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক। মানসিক দুঃখ সন্তোষের অভাব । মনের ক্ষোভই অসন্তোষের কারণ। ভাগবত পাঠ করিবার বাসনা হইয়াছে তাহা মন্দ নহে। কিন্তু ভাগবত বড় শক্ত পুস্তক। চিত্তশুদ্ধি না হইলে তাহার রস গ্রহণ করা অসম্ভব। চিত্তশুদ্ধি না হইলে ভাগবতের প্রেমের কাহিনী শুধু কামের কাহিনী বলিয়া মনে হইবে। ভাগবত পাঠের সময় হইয়া থাকিলে, জানাইবেন; যাহা প্রতিবন্ধক জানাইলাম, এজন্য মনে কিছু করিবেন না। তাহার উপর নির্ভর করিয়া, সুখ-দুঃখ বা লােকের গঞ্জনার দিকে লক্ষ্য না করিয়া, কাহাকেও দুঃখ না দিয়া, আপনার কাজ করিরা যানতাঁর দয়া হইলে সব মঙ্গল হইবে, ইহার অধিক সত্য কথা আর নাই। ক্রমে তাঁহার দিকে টান পড়িলে সংসারের সামান্য ব্যাপার আর দৃষ্টিগােচর থাকিবে না, যাহাতে টান বাড়ে তাহাই করিতে হইবে; তাহার উপর সমস্ত ছাড়িয়া না দিলে, সৰ্ব্ব অবস্থায় সন্তুষ্ট হইতে না শিখিলে, টান প্রখর হয় না। অত্র মঙ্গল। আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলেষু গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া পরমানন্দ লাভ করিলাম। জ্যোতির ধ্যান কেমন করিয়া অভ্যাস করিতে হয় ? নামে ও জপে কি গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৪৫ পার্থক্য, জানাইয়া বাধিত করিবেন। আমার শতকোটী প্রণতি গ্রহণ করিবেন। পুঃসময়ে সময়ে জপের হিসাব রাখিতে ইচ্ছা হয় না। ইতি সেবিকা। = শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়-- মা! ধ্যানের পূর্বে প্রথমে মধ্যে দৃষ্টি স্থাপন করিবেন। চোখের পলক খুলিবেন না। ক্রমে চক্ষু হইতে জল পড়িবে ও আপনা হইতেই চক্ষু মুদ্রিত হইয়া যাইবে ; দিনে জ্ব হইতে জ্যোৎস্নাই দেখা যাইবে, রাত্রে তাহা না থাকিবারই কথা। ধ্যান করিবার পূর্বে অন্যান্য ক্রিয়া সারিয়া লইবেন। চক্ষু বন্ধ হইলে জ্যোতি দর্শনের ইচ্ছা ও চেষ্টা করিবেন। প্রথমে নানাবিধ আলাে দেখিতে পাইবেন, নানা রকম ফোটা ফোটা, লম্বা লম্বা, নীল হলুদে লাল। সেগুলিকে নিজের মধ্যে আটকাইয়া রাখিবার চেষ্টা করিবেন। মন বিক্ষিপ্ত হইলে ঐ সকল আলাে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়া থাকে, মন স্থির হইলে সব এক জায়গায় স্থির হইয়া জ্যোতিরূপ ধারণ করিবে। কাজকৰ্ম্ম করিতে করিতে মন স্থির হইবে। মনে রাখিবেন, ঘন্ সাধন তন্ সিদ্ধি—যাহা সাধন তাহাই সিদ্ধি। অথবা সাধনার চেষ্টার নামই সিদ্ধি। এই জ্যোতি ধারণা করিতে হইলে সূর্যের দিকে চাহিয়া দেখিবেন ; সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া পরে চক্ষু বন্ধ করিলে বুঝিতে পারিবেন, জ্যোতি কত সুন্দর চেষ্টা করিতে করিতে এই ভাবটি আসিবে। জপের কোন বাঁধা নিয়ম না থাকাই ভাল। নাম ও জপের ভিতরে কোন পার্থক্য নাই। নাম উচ্চৈস্বরে, জপ মনে মনে। হাতে হিসাব নাই বা রহিল,--সাক্ষী কি হইবে! তার নামের আবার হিসাব ৪৬ কৃপা-বিন্দু কি? সকল সময়ে কাজে কর্মে আহারে বিহারে অনবরত জপ চলিতে পারে। হাতে কাজ হোক—মনে মনে জপ চলুক। শুইতে গিয়া ঐভাবে জপ চলিতে থাকুক, নিদ্রা ভঙ্গে আবার আরম্ভ হোক। মন কি এখনও কেমন কেমন করে! মন কি চায়—মুক্তি না বস্তলাভ ? এবং এখনকার অবস্থায় ইহার মধ্যে প্রভেদই বা কি? কি কি দূর হইলে এবং আরও নূতন কি কি আসিলে আমরা তেমন অবস্থা লাভ করিতে পারি, ভাবিয়া দেখিতে হয়। যাহা দূর করিতে হইবে তাহা দূর করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা, এবং যাহা বাড়াইতে হইবে তাহার জন্য খাটা। যাহাতে সেটা ভাল অভ্যাস হয়, এই কথা। তার পর তার মনে যা আছে, তাই। আজ এই পর্যন্ত। অত্র কুশল, আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি তৃতীয় পরিচ্ছেদ শিষ্যাৱ পত্র- ঐশ্রীচরণকমলেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিং। গুরুদেব! অাপনার পত্র। পাইয়া অতিশয় আনন্দ লাভ করিলাম। মায়া এখনও গেল না। ভবে এসে কেবল ঘুরে মলাম আর কবে কি হবে ? আপনার কুশল সংবাদ আশা করি। আমার শতকোটী প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা 1; শুরুর পত্র: ওঁ নমাে নারায়ণায়-- ম! মায়াটা বস্তুতঃ ভয়ানক জিনিষ, তাহাতে সন্দেহ নাই। এই মায়ার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়াই কঠিন। যাবৎ না সমস্ত কার্যের শেষ হয়, তাবৎ থাকিবেই। ইচ্ছা করিলেই মায়াকে দুর করিয়া দেওয়া যায় না। মায়া ভাল কি মন্দ, হিতকর কি অহিতকর, তাহার বিচার নিজে করিবেন। যে মায়ায় আকৃষ্ট হইলে মানুষ নামিয়া আসে, আসল কথা ভুল হইয়া যায়, সেই মায়া নিকৃষ্ট ; কিন্তু যে মায়ায় মানুষকে উন্নতির পথে লইয়া যায়, তাহা উৎকৃষ্ট। তবে ভগবান লাভ এই দুই মায়ারই অতীত। সে অবস্থা কখনও হঠাৎ পাইবার আশা করা যাইতে পারে বটে, কিন্তু ঘটিয়া উঠা প্রায়ই কাল সাপেক্ষ। মনে কত কি আসিয়া উকি ঝুকি মারিতে থাকে, তাহার শেষ নাই ; চিত্তশুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত এরূপ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। কাজকর্ম এবং নিয়মগুলি যথাযথ পালন করিতে • ৪৮ কৃপা-বিন্দু থাকিলে এসব কোথায় অদৃশ্য হইয়া যাইবে। তখন অভীষ্ট লইয়া এমন ব্যস্ত থাকিবেন যে অন্য বাহ্যিক বিষয়ে আর মনোেযােগ থাকিবেই না। ঐ জপ ও ঈশ্বর-প্রণিধান-দ্বারা সমস্ত সুন্দর হইয়া উঠিবে। লাগিয়া থাকুন হইয়া যাইবে। যদি কোন দুর্বলতা থাকে, তাহাতে ভয় পাইয়া হল্ ছাড়িলে চলিবে না। যাহা আছে থাকুক, কাজ করিতে করিতে সময়ে সব দূর হইয়া যাইবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তিনি যখন যে অবস্থায় রাখেন সেই অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিতে হয়। কারণ তিনি মঙ্গলময়, তাঁর ইচ্ছায় বা কার্যে আমাদের অমঙ্গল হয় না। বস্তুতঃ আমরা তার ইচ্ছায় চলিতেছি এবং পরিচিত হইয়াছি। তার ব্যবস্থায় আমাদের সবই মঙ্গল হইবে, যদি তাকে না ছাড়িয়া দিই। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব। আপনার পত্ৰ পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। এখানে মনটা ভাল লাগিতেছে না, শরীরও বিশেষ ভাল নাই, কৰ্মত্যাগ করিলে বিশ্রামে একটু মন ও শরীর ভাল হইবে বলিয়া মনে হইতেছে। কি করিব দয়া করিয়া বুঝাইয়া দিবেন। চরণ কুশল চাই। এ দীনার ভক্তিপূর্ণ প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিক। ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! শরীর যাহাতে রক্ষা পায় তার চেষ্টা করিবেন। শরীর ভাল না থাকার প্রধান কারণ মানসিক অশান্তি বা অসুখ। মন যেখানে গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৪৯ ব ভাল থাকে, সেখানে আর অন্য অসুখ থাকিতে পারে না। তবে সাধকের উচিত, যখন যেখানে থাকুক, সেইখানে থাকিয়াই যাহাতে মনের শান্তি বজায় রাখিতে পারে তাহার চেষ্টা করা। সকল অবস্থায় যদি ধ্যেয় বস্তুর সহিত সম্বন্ধ থাকে, তবে এ অশান্তি সহসা আক্রমণ করিতে পারে না। যাঁহাদের নির্ভর আছে তাহারা সকল অবস্থায় ও সকল স্থানে শান্তিভােগ করিতে পারে। সাধনা একটু পাকিলে আৱ বিপ্ন থাকে না। ইচ্ছা বা কামনার নাশ হইলে বস্তুলাভ হয়, সন্দেহ নাই। তবে এই বস্তু লাভ করিতে হইলে আবার দেখা যায়, কোন একটা কিছু আরাধ্যতে ইচ্ছার প্রবল প্রয়ােগ করিতে হয়, যে যে পন্থাবলম্বীই হোক না কেন। ঐ যে ইচ্ছার প্রবল প্রয়ােগ, ইহাই সাধনা। ইচ্ছার বিনাশ যতই ইচ্ছা করুন না, কিন্তু লক্ষ্য রাখিবেন যেন কৰ্ম্মের বিনাশ না হয়। সেই ধ্যেয় পদার্থের আকাঙ্ক্ষা ক্ৰমে প্রবল হইতে প্রবলতর হইতে থাকুক। কিন্তু তাই বলিয়া নিজ নিজ কর্তব্য কর্ম পরিত্যাগ না করিয়া, তাহা খুব একাগ্রতার সহিত করিয়া যাওয়াই ধৰ্ম্ম, এবং তাহাই উন্নতির হেতু। গীতা এ-কথাই বলেন সন্দেহ নাই; কৰ্ম্ম-সন্ন্যাস অপেক্ষা কৰ্ম্ম-যােগই যেন শ্রেয়। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দিত হইলাম। মানুষ কি লইয়া থাকে ? এখনও মায়া মােহ গেল না, কি করিয়া এই ভববন্ধন মােচন হইবে, দয়া করিয়া বুঝাইয়া দিবেন। শ্রীচরণ-কুশল প্রার্থনা করি। কোটী কোটী প্রণতি গ্রহণ করুন। ইতি সেবিকা S কৃপা-বিন্দু শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা! যাহাকে মায়া মােহ বলিতেছেন, তাহা মােহ হইলেও এখন জোর করিয়া ছাড়া যাইবে না—মনে মনে বিচার, ও ক্রমে স্থূল হইতে সূক্ষ্ম অনুভব করিতে থাকিলে, আপনিই সব ছুটিয়া যাইবে। তবে মনে করাইয়া দেওয়া চাই, নতুবা বিচার চলিবে কেন? ভুলিয়া যাইবেন যে! আস্তে আস্তে সব হইয়া যাইবে, তবে অনবরত চেষ্টার দরকার। মূৰ্ত্তি ধ্যানে যাহা আসে তাহাই ভাবনা করুন—সঙ্গে ভাব জুড়িয়া দিন। মন যত স্থির হইবে, ক্ৰমে মূর্তি তত প্রকাশিত হইবে। মানুষ কি লইয়া থাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন। যার বা ক্ষমতায় কুলায় সে তাহা লইয়া থাকে। কেহ স্থূল ও ভুল একসঙ্গে মিলাইয়া বসিয়া থাকে ; কেহবা ভুল নয়, শুধুই স্থূল ; কেহবা শুধু ভুল। সূক্ষ্ম ভাবরাজ্যে, কেহ আরও উপরে। তবে যার যাহা আছে তাই লইয়াই কাজ আরম্ভ করুক, ক্রমে অগ্রসর হইবে সন্দেহ নাই। আপনি ভয় পাইবেন না, আপনার ভাব কোন অন্যায় ভাব নয়, সাত্বিক তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে একটু অগ্রসর হইলে তখন আর ইহাতে আনন্দ পাইবেন না। ছেলেরা পুতুল লইয়া সুখী হয় ; বড় হইলে তখন অন্য কিছু চায়। আপনার একদিন গিয়াছে যখন ইহাতে শান্তি হইত। এখন অবস্থা উন্নত হইয়াছে, এখন সূক্ষ্মানুভব হইলে শান্তি কতকটা হইবে, কিন্তু তাহাও পূর্ণ নয়। আবার আরও সাধনা আছে। আস্তে আস্তে যাইতে হইবে, তঁার ইচ্ছা হইলে সব হইয়া যাইবে। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি-- গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু- প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দ লাভ করিলাম। মূৰ্ত্তি মােটেই প্রকাশ হইতেছে না, কি উপায়ে শীঘ্র মূর্তি প্রকাশিত হয় জানাইয়া শান্তি দিতে ভুলিবেন না। ইতি সেবিকা শুরুৱ পত্র-- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! মূর্তি দর্শন হয় না, তাহার কারণ অন্য কিছুই নয়, কেবল চিত্ত স্থির হইতেছে না বলিয়া। প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, এই তিনটি অবস্থা একই, প্রভেদ শুধু তারতম্য। এ-কথা আপনাদের জানা না আছে। এমন নয়। প্রত্যাহার অবস্থায় মূর্তি সহজে আসে না। প্রত্যাহার অর্থে মনকে গুটাইয়া আনিয়া কোন একটী কেন্দ্রে স্থির করিবার চেষ্টা করা। ক্রমে সেই চেষ্টা করিতে করিতে ধারণা হয়, অর্থাৎ মূর্তিতে চিত্ত অনেকটা স্থির হয়। তারপর ধ্যান হইতে আরম্ভ করিলে মন হইতে মূৰ্ত্তি সহজে সরিয়া যায় না। ধ্যান যখন খুব অগ্রসর হয় তখন তাহাকে সমাধি বলে। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, প্রত্যাহার ও সমাধিতে শুধু প্রভেদ এই যে, একটি পাতলা, অপরটি ধন,-যেমন দুধ ও ক্ষীর। মনের চঞ্চলতা যত কমিবে, ততই এ-সকলে চিত্ত স্থির হইবে। তারপর যখন দেখা যাইতেছে যে পুনঃপুনঃ শুধু দেখিয়া কোন ফল নাই, তাহাতে যন্ত্রণা বাড়ে ছাড়া কমে না, মনের চঞ্চলতা আসে কিন্তু স্থিরতা আসে না, তখন সে দেখায় কি লাভ ? বাহিরে যিনি কৃপা-বিন্দু আছেন তাহাকে বাহিরে পাইয়া যখন যথার্থ পাওয়া হয় না, তখন যাহাতে অন্তরে পাওয়া যায়, তাহার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমতীর কর্তব্য। কিরূপে মনের স্থিরতা আসে, কিরূপে চিত্ত শুদ্ধ হয় তাহা আপনাকে বলা হইয়াছে। মানসিক চঞ্চলতায় কি ক্ষতি হয়, এ-কথাও বলা হইয়াছে। এক্ষণে প্রাণপণে সেই সকল ক্রিয়া অনুষ্ঠান পালন করিয়া একাগ্রচিত্তে সাধন করিতে থাকিলেই সত্য প্রকাশিত হইতে থাকিবে, ও শান্তি আসিতে থাকিবে। ঔষধ অপেক্ষা কুপথ্য অধিক হইয়া পড়িলে রােগী দীর্ঘকাল ভােগে । অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু-~- প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। কোন চেতন মূর্তিতে যদি ভালবাসা হয়, তাহাতে দুঃখের নিবৃত্তি কি হইতে পারে ? বুঝাইয়া কৃতার্থ করিবেন। শ্রীচরণ-কুশল প্রার্থনা করি। এ দীনের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! ভালবাসা বা প্রেম যেখানে, প্রেমময়ও সেইখানে, কারণ তিনি ঘনীভূত প্রেম। এই টান যেখানেই হৌক তাহা সুন্দর ও আনন্দের। সাধারণ বা হেয় যে ভালবাসা, তাহার মধ্যেও তার প্রকাশ তাহাতে সন্দেহ নাই। বলিতে পারেন, তাতে দুঃখ যায় না কেন? পূর্ণ শান্তি মিলে না কেন? ঐখানেই আসল কথা—ওজনের পার্থক্য। কাহারও এক আনা প্রেম, বাকী পনর আনা বাজে ; সে এক আনা গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী শান্তি পায়। প্রেমকে ধরিয়া সাধনা করিতে হয়, যাহাতে এই যােল আনা প্রেম লাভ হয়। ঘণ্টায় ঝাটার কাঠি দিয়া মারিলে টিং টিং করে, মুগুর দিয়া ঘা দিলে জোর ঢং ঢং শব্দ হয় ; ঘণ্টা সেই একই। সেইরূপ বেশী কম কেবল ব্যবহার গুণে। আপনাদের ভালবাসা উচ্চ-অঙ্গের, তাহ সন্দেহ নাই। শুধু এই ভালবাসার সাধনা করিয়া যাইতে পারিলে ধন্য হইয়া যাইতে পারা যায়। সেই জন্য উহা পরিত্যজ্য নহে, উহা মূল্যবান। তবে একটা কথা আছে। ঐ যে স্কুলের উপর টান ওটা আস্তে আস্তে কমিলে ভাল । শ্রীরাধিকা একশত বৎসর সেজন্য কাদিয়া- ছিলেন। তিনি যখন কৃষ্ণময় হইয়া গেলেন, চতুর্দিক কৃষ্ণময় দেখিলেন, তখন তাঁহার বিরহ গেল, তিনি তখন ভাবে বিভাের। তন্ময়তা লাভ হইলে তবে পূর্ণ শান্তি। আপনারা উভয়েই প্রকৃতি- দেহ, আপনাদের ভয়ের কোন কারণ নাই, ধরিয়া থাকিলে বিফল হইবেন না। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণকমলেষু শতকোটী প্রণাম নিবেদনমিদং । গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া পরমানন্দ লাভ করিলাম। নাম ও রূপের উদ্দেশ্য কি? নামের মধ্য দিয়া কি প্রকারে ভাবের উদয় হইয়া জগতে মানবকে পরম পদের অধিকারী করে, এবং প্রেমের সাধনায় জ্ঞানের প্রয়ােজন আছে কি না, জানাইয়া বাধিত করিবেন। ইতি সেবিকা ৫৪ কৃপা-বিন্দু শুরুর পত্র ওঁ নমাে নারায়ণায় মা ! নাম ও রূপ এই দুইটি জিনিষ লইয়াই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। নাম ও রূপ বাদ দিলে স্থান গৎই লােপ পায়। নাম ভাষার একটা ক্ষুদ্র অংশ; রূপ অনন্ত ভাবের সামান্য প্রকাশ। ভাবও স্বয়ং নহেন ; ইনিও কিছুর প্রকাশ। ভাব যাহাকে প্রকাশ করে তাহাই প্রেম। প্রেম পদার্থ (যােলা আনা) অনেক দূরে। তাহার একটী আধটী ফিকী সৌভাগ্যক্রমে ভাবের ভিতর দিয়া নামরূপে আসিয়া সামান্য আভাস দেয়। অনেকের ধারণা যে, প্রেমের সাধনায় আবার জ্ঞানের দরকার কি? যখন মানব প্রেম-সাগরে ডুবিয়া যায় তখন আর বিচার কোথায় ? কিন্তু সে অবস্থা যতদিন হয় নাই, যতদিন এ করিব না ও খাইব না এ-সব বােধ আছে, ততদিন জ্ঞানও দরকার। জ্ঞানের দ্বারা অর্থাৎ বিচারের দ্বারা স্থূল সূক্ষ্ম বুঝিতে হইবে। স্কুল সর্বদা পরিবর্তনশীল, তাহাকে ধরিয়া রাখা যায় না, একথা ভালরূপ আলােচনা করিরা, মনে সে ধারণা বদ্ধমূল করিতে হইবে। অবশ্য স্থূল ছাড়িয়া সূক্ষ্ম ধরা কঠিন ব্যাপার। সেই স্থূলকে অবলম্বন করিয়া সূক্ষ্ম পঁহুছিতে সুবিধা, সুতরাং স্থূল পরিত্যজ্য নহে। তবে স্কুলের সঙ্গে ভাবের চাষ দিতে হইবে। কোন প্রীতিকর ঘটনা ঘটিলে, বা কোন কারণে আনন্দ পাইলে, যে ভাব অনুভূত হয়, শুধু সেই অনুভবটাকেই ধরিয়া রাখা, তাহারই দীর্ঘকাল আস্বাদন করা, ইহার নাম ভাবের সাধনা। ইহা খুব উচ্চ অঙ্গের সাধনা। অগ্রসর হইলে স্কুলে স্কুঙ্গে, ভাবে অনুভবে, কতকটা কি সম্বন্ধ, ও তাহাদের প্রাণ কোথায়, বুঝা যাইবে । অজপা অভ্যাস হইলে তবে এর অধিকারী গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী হয়। অধিকারী হইলে তবে সাধনা করিতে হয়, নতুবা ফল ভাল হয় না। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যার পত্র- ঐশ্রীচরণেষু- প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া সবিশেষ আনন্দ লাভ করিলাম। সন্ন্যাস লইবার জন্য মন বড় ব্যাকুল হইতেছে। উহা না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হইতে পারিতেছি না। আপনার অনুমতি চাই। শ্রীচরণ-কুশল প্রার্থনা করি। আমার কোটী কোটী প্রণাম গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা ওঁ নমাে নারায়ণায় মা । আপনাদের যে, সন্ন্যাস লইবার বাসনা হইয়াছে, উহা অন্যায় এ-কথা ঠিক বলা যায় না। সন্ন্যাসের বাসনা উত্তম, এ-কথা স্বীকার করিতেই হইবে। কিন্তু বাধা-বিপত্তি অনেক, এবং আপনাদের সাধনার নিতান্ত প্রথম অবস্থা বলিয়াও, অনেক চিন্তা করিয়া দেখা গেল, এখন সে ব্যবস্থা দিতে কেমন আটকায়। এখন সন্ন্যাস লইলে উপকার অপেক্ষা ক্ষতি বেশী। তারপর নিজের অবস্থায় সর্বদা অসন্তুষ্ট থাকিলে মন স্থির হইতে পারে না,আর এক মহা দোষ, ভগবানে নির্ভরতা কমিয়া যায়। এরূপ অবস্থায় আপনারাই বিবেচনা করিবেন। যাহাতে আপনাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি হইতে পারে এমন কোন কাৰ্য্যে অমত করা যায় না। আপনারা যাহাতে শীঘ্র শীঘ্র উন্নতি লাভ করেন, এটা যেমন আপনাদের ইচ্ছা, এ শরীরেরও কি তাহা নহে? যদি কোন শারীরিক বা মানসিক কষ্ট করিলে আপনাদের উন্নতি হয়, সে কৃপা-বিন্দু কষ্ট সহ করিতে যাহাতে আপনারা ইচ্ছক হন, তাহা আপনাদের হিতা- কাঙ্খীরও মত। কোন প্রকার মায়া-দ্বারা বশীভূত হইয়া কথা বলিবার মত অবস্থা এখন এ শরীরের নহে। যাহাতে সত্যলাভ হয়, তাহাতে যদি পৃথিবীর সকলের অমত হয়, তবুও তাহাতে ‘না’ বলিবার অভ্যাস নাই। মরিলে যদি ভাল হয়, আপনাদের সে পরামর্শ দিতেও কুণ্ঠিত হইব না। তথাপি সন্ন্যাদের অমত করিতেছি তাহার কারণ আছে। বস্তুতঃ সন্ন্যাসের কালাকাল নাই, স্ত্রী-পুরুষ ভেদ নাই, সকল সময়ে অনুমতিরও দরকার নাই। শুধু দিন কয়েক ধৈৰ্য্য অবলম্বন করুন, সব ঠিক হইয়া যাইবে। এখন নহে। অত্র কুশল, নিত্যকুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দলাভ করিলাম। ত্যাগী না হইতে পারিলে কোন কাজই হইতেছে না বলিয়া মনে হয়। দয়া করিয়া সন্দেহ ভঞ্জন করিয়া দিবেন। ইতি সেবিকা শুরুৱ পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! ত্যাগ ব্যাপারটা বিশেষ একটু শক্ত। ত্যাগী অবস্থাটা কঠিন হইতেও কঠিন। ত্যাগী বলিলেই ত্যাগী হওয়া যায় না। ত্যাগ কাকে বলে জানা-ও যেন শক্ত। সকলের নীচু ধাপ তমঃ,তেজো- বীৰ্য্যহীন, উৎসাহের অভাব, ম্যাদাটে (যেমন চিড়ার ভাত)। তারপর দ্বিতীয় ধাপ রজঃ,উৎসাহ, উদ্যম, কৰ্ম্ম, ইত্যাদি। তারপর সত্ত্ব- গুণ, সাম্য ভাব। তারপর ত্যাগ ; আগে ত্যাগ হয় না। আগে মানুষকে গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী সাত্বিক হইতে হইবে, পরে ত্যাগের কথা। ত্যাগ করিতেও হয় না,--কৰ্ম্ম করিয়া যাইতে হয়, ত্যাগ আপনিই আসে। কেবল মুখে ত্যাগ ত্যাগ করিলেই ত্যাগ হয় না। তমঃ বা রজঃ হইতে ত্যাগ হয় না। কর্মের দ্বারা সাত্বিক হইতে পারিলে তবে ত্যাগ হইবে, জানিবেন । এখনও কিছু ছাড়া হয় নাই--ত্যাগের “ত”ও নয়। লিখিয়াছেন মাত্র একটা বন্ধন আপনার আছে, আর কিছুই নাই। কিন্তু আপনি বিশেষ করিয়া ভাবিয়া দেখুন, আসলে কিছুই ছাড়া হয় নাই। বস্তুতঃ মানুষ যখন ভাবে আমি সব ছাড়িয়াছি, এইটুকু বাকী, তখন সে নিশ্চয়ই নিজের ভিতর-দিকে তাকায় নাই; অথবা তাকাইলেও দেখিতে পায় নাই। ত্যাগ বড় শক্ত কথা। আশীৰ্বাদ করি যেন যথার্থ ত্যাগী হইতে পারেন। অত্র কুশল, নিত্যকুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অতিশয় আনন্দিত হইলাম। সন্ন্যাস লইবার জন্য মন বড় অস্থির হইতেছে। কোন বাধা মানিতে ইচ্ছা হইতেছে না। এখন সন্ন্যাস দিলে কি ক্ষতি হইবে, দয়া করিয়া জানাইবেন। চরণ-কুশল প্রার্থনা করি। আমার ভক্তি-পূর্ণ প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা ললিতা! সন্ন্যাস সকলের জন্য ব্যবস্থা আছে সত্য, কিন্তু অধি- কারী অনুযায়ী তাহার কালাকাল আছে, অনেক দেখা-শুনার আবশ্যক আছে। সন্ন্যাস সহজ জিনিষ নয়, যেমন তেমন করিয়া ব্যবহার করা চলে না। যাহারা সন্ন্যাসের ঠিক ঠিক ব্যবহার না করেন তাহারা ৫৮ কৃপা-বিন্দু ঠকেন। সময় হইলে সন্ন্যাসের জন্য আটকায় না—আপনি হইয়া যায়। অসময়ে টানিয়া লম্বা করিতে গেলে ছিড়িয়া ফেলা হয়। খাম- খেয়ালী কোন কাজই করা ভাল নয়। তারপর, সন্ন্যাসী ব্যতীত অন্য কাহারও সন্ন্যাস দেওয়ার অধিকার নাই। সন্ন্যাসীও শিষ্যকে যথেষ্ট পরীক্ষা করিয়া সন্ন্যাস দিয়া থাকেন। সন্ন্যাসের অনুষ্ঠানটীও বিরাট ব্যাপার-২৩ দিনের কমে তাহার সকল অঙ্গপূর্ণ হয় না। একজন সন্ন্যাসী গুরু, এবং সন্ন্যাস লইবার মত স্থান, সময় ও সুবিধা কোথায় যে, ইচ্ছামত সন্ন্যাস গ্রহণ করা যাইতে পারিবে ? তারপর, ঘরের অবস্থায় ও বাহিরের অবস্থায় অনেক প্রভেদ আছে। ঘরে বসিয়া নিজ নিজ কৰ্ম্ম করিবার যেমন সুবিধা, বাহিরে ততটা নাই । ঘােরা-ফেরায় অনেক ঝঞ্চাট, সহিতে হয়,-অনাহার, অনিদ্রা, শীত, রোজ, বর্ষা, এ সমস্তই সর্বোপরি সহিতে হইবে লােকের গঞ্জনা ও অত্যাচার! ঘরে বসিয়া এই দুনিয়াটাকে যেমন যেমন মনে হয়, উহা ঠিক তেমন নহে। আপনারা মাতৃজাতি, সহজে দুৰ্বল, বয়স ও তেমন বেশী নহে, সংসারের অভিজ্ঞতা ঠিক ঠিক হয় নাই। এ অবস্থায় একটু না ভাবিয়া তাড়াতাড়ি কিছু করিয়া ফেলিবেন কি না, সেটা একটু ভাবিয়া দেখিলে ভাল হয়। শেষ কথা এই, ঘরে বসিয়া যে শিক্ষা হইতেছে তাহার বিপরীত কাজ করিয়া কি ফললাভ হইবে? নির্ভরতা থাকা চাই, সকল অবস্থায় সৰ্ব্বকালে তঁাহাতে অচল বিশ্বাস এবং ভক্তি রাখিয়া, যখনই যে অবস্থায় থাকুন না কেন, তাহা সহাস্য বদনে সহিয়া, সাধনা করিয়া যাইতে পারিলেই শীঘ্র কাজ হইবে। ঘরের বাহিরে, কি আছে ?—সবই নিজেদের ভিতরে বাহিরে যে কিছুই নাই, এমন কথা বলিতেছি না। কিন্তু বাহিরে যাহা লাভ হয় তাহা পাইবার অবস্থা ও সময় এখনও হইয়াছে ;

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী বলিয়া আমার মনে হয় না। সে সময় যখন হইবে তখন ঘর ছাড়াইয়া বাহির করিবার উপলক্ষ্যও জুটিবে। এখন ধীর ভাবে সকল অবস্থায় নিজেকে সন্তুষ্ট রাখিবার জন্য চেষ্টা করা উচিত। যম, নিয়ম ( অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য, অপরিগ্রহ, শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা ) এ সকল সুচারুরূপে পালন না হইলে চিত্ত শুদ্ধি হইতে দেরী লাগিবে। চিত্ত শুদ্ধি হইতে দেরী হইলে বস্তু লাভে দেরী হইয়া পড়ে। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি-- চতুর্থ পরিচ্ছেদ শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু- শতকোটী প্রণাম নিবেদনমিদং। গুরুদেব ! আপনার চিঠি পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। বহু জন্মের পূত তপস্যার ফলে আপনার চরণ দর্শন পাইয়া নিজেকে মহা ভাগ্যবতী মনে করিতেছি। কয়েকদিন হইল বন্ধুর ঘর চুরী হইয়াছে। সব আপনার কৃপা। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাকে লাভ করিবার পথে আসিয়াও তাকে ছাড়া মন কত কি বাজে বিষয় ভাবে। বলিতেও ভয় পাই, পাছে আপনার কৃপা হতে বঞ্চিত হই। চিত্তশুদ্ধির লক্ষণ কি ? এবং কি হইলে এ সকল দুর্দৈব যায় ? দয়া করিয়া জানাইবেন। আপনি আমাদের যে যজ্ঞানুষ্ঠান দিয়াছেন তাহা কোন্ সময়ে এবং কি নিয়মে করিলে ভাল হয়, কৃপা করিয়া জানাইবেন; এবং এ সম্বন্ধে কালাকাল বিচার কিছু আছে কি? সংসারে এক মুহূর্ত থাকিতে ইচ্ছা হইতেছে না। শ্রীচরণের কুশল প্রার্থনীয়। আমার শতকোটী ভক্তিপূর্ণ প্রণতি গ্রহণ করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় মা! গত কল্য আপনার চিঠি পাইয়াছি। আর একটু পরিষ্কার করিয়া লিখিবেন। চাপায় লাভ নাই; যাহা চাপা থাকিল তাহা চাপাই রহিল । মনের ভাব প্রকাশ করুন, খাঁটি হয় টিকিয়া যাইবে, পাকা হইবে আর ঝুটা হইলে নষ্ট হইবে, মরিয়া যাইবে ; এই রকম নিয়ম। ; ;

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী বন্ধুবান্ধবদের কাছে ( অবশ্য যাহারা কোন কথা প্রাণ গেলেও প্রকাশ করে না তাহাদের কাছে) সব কিছু প্রকাশ করিলে মন হাল্কা হয়, এবং খাঁটী জিনিষ বাড়ে, অখাটি কমিয়া যায়। তবে অন্য লােকের কাছে চুপ! নরোত্তম দাস বলেন, “আপন ভজন কথা, না কহিবে যথা তথা, ইহাতে হইবে সাবধান। না করিও কেহ ক্রোধ, না লইয়াে কেহ দোষ, প্রণমহু ভক্তের চরণ।” মনে করিবেন না সময় নষ্ট হইবে। ইহাও সাধনা বলিয়া জানিবেন। নিজেকে যখন প্রকাশ করা যায়, তখন নিজের ভিতরের খুতগুলি সব দেখা যায়, ক্রমে তাহাদের উপর ঘৃণা হয়, এবং নিজের ভিতরটা কদৰ্য্য বলিয়া মনে হয়। তাহাদের তাড়াইয়া তবে শান্তি হয়। এর নাম চিত্তশুদ্ধির আরম্ভ। আপনি জানিতে চাহিয়াছেন চিত্তশুদ্ধি হইয়াছে কি না? তার উত্তর দিতেছি।বৈষ্ণব বলেন, “হরিভক্তি হয় যদি, তবে হয় চিত্তশুদ্ধি, তবে যায় হৃদয়ের ব্যথা। যােগশাস্ত্র বলেন, চিত্তের অনেক প্রকার ভূমি আছে,ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত, মূঢ়, ইত্যাদি,-এবং শেষ দুই ভূমি, একাগ্র ও নিরুদ্ধ । একাগ্র ভূমিকা হইলে চিত্তশুদ্ধি হইয়াছে জানিতে হইবে। যখন ঐ চিন্তা, ঐ ধ্যান, ঐ জ্ঞান-অন্য কিছু ভাল লাগে না, অন্য কাজ করিতে সাধ যায় না, তখনই ভূমি একাগ্র এবং তখনই চিত্তশুদ্ধি হইয়াছে জানিতে হইবে। নারদ এ অবস্থা সম্বন্ধে বলেন-“ওঁ যৎ প্রাপ্য ন কিঞ্চিৎ বাতি, ন শােচতি ন দ্বেষ্টি—যে অবস্থা পাইলে মানুষ আর কিছুই চায় না, শােক করে না, দ্বেষ করে না, সুখী বা দুঃখী হয় না, বা কোন কাৰ্য্যে আসক্তি বা উদ্বেগ থাকে না। আবারগীতা বলেন-~- যাে ন হৃষতি ন দ্বেষ্টি ন শােচতি ন কাঙ্ক্ষতি। শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান যঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ ১২ অধ্যায় । --- কৃপা-বিন্দু মাঘ মাসের রাত্রে পুত্র-শােকাতুরা মায়ের শীত থাকে না। তার মন তখন শরীরে নাই। সেই রকম, মনে এমন টান আসিবে যে আর সব তুচ্ছ হইয়া যাইবে। যখন চিত্তশুদ্ধি হয় তখন অন্য পার্থিব সমস্ত পদার্থ ছােবড়া হইয়া যায়, রস থাকে না। যার যতটা পরিমাণ এই টান হইয়াছে, তার ততটা চিত্তশুদ্ধি হইয়াছে। আর কিছু বলিব না। বিচারের ভার আপনার, মিলাইয়া লইবেন। বদ্ধজীবের অবস্থা কি জানেন? একজন কবি বলিয়াছেন- কুসঙ্গে অন্য কথা সৰ্ব্বদা প্রবৃত্তি তথা সাধুসঙ্গ কাটা হেন জ্ঞান যদি দৈবে কভু হয় তবে যেন বিন্ধে গায় উষি-পুষি করিয়া প্রস্থান। . - আর ভক্ত জন কেমন জানেন? কবি বলেন- যে মুখেতে অবিরাম উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম সে না মুখ চন্দ্রের সমান দেখিতে শীতল করে হরিনামামৃত ঝরে সাধু নেত্রে চকোরের প্রাণ! আবার অপর জীবদের কবি, কি বলেন শুনুন হইয়া মায়ার দাস করি নানা অভিলাষ তাঁহার স্মরণ ভেবে দূরে। অর্থ লাভ এই আশে কপট বৈষ্ণব বেশে মিয়া বেড়াই ঘরে ঘরে আর এক কবি কলেন— মুখে কৰি হৃষীকেশ তাহে যদি সাধু দ্বেষ তৰে বক্র মুখ কেন নও।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী অগ্নি দিয়া হেন মুখ পােড়ালে না ঘােচে দুখ তাহে কৃষ্ণ কও বা না কও। অশুদ্ধ চিত্তে কেবল অহঙ্কারের রাজত্ব। “আমি” না মলে হবে । এ “আমি”র দ্বারা শুদ্ধি হবার নয়। তবে যদি সকলে দয়া রাখেন, তাঁর দয়া হয়, তবে। মূকং করােতি বাচালং পঙ্গুং লঘয়তে গিরিম্ । ক্ষিপ্রং ভবতি ধৰ্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিমাগচ্ছতি ॥ বােবায় কথা কয়, খোঁড়ায় চলে, পাপীকেও তিনি ধর্মাত্মা করিতে পারেন ; এই ভরসা, আর ভক্তজনের দয়া । সংসারে মন টিকে না—কোথায় যাবেন? বনে ? পাগলামী নয় কি? বনে গিয়ে কি হবে? হরি আছেন? আর ঘরে নাই ? বনে পশুরাও ত বাস করে, হরি পায় না কেন? একটা গান আছে মীরা বাঈয়ের- নিত নাহসে হরি মিলে ত জল-জন্তু হােই ফল-মুল খাকে হরি মিলে ত বাদুরা বাঁদরাই। তৃণ ভখনকে হরি মিলে ত মিলত মৃগী অজা স্ত্রী ছােড়কে হরি মিলেত বহুত বহা হৈ খােজা। দুধ পিয়েকে হরি মিলেত বহুত হৈ বৎস বালা মীরা কহে বিনা প্রেমসে নাহি মিলে নন্দলালা। অর্থাৎ রােজ নাইলে যদি হরি পাওয়া যেত, তাহলে মাছ প্রভৃতি 'জল জন্তু হরি পেত। ফল মূল খেয়ে পেলে বাদুড় বাঁদর এরা পেত। ঘাস খেয়ে পেলে ছাগলে হরিণে পেত। স্ত্রী ছাড়লেই হরি পেলে খােজারা পেত। শুধু দুধ খেয়ে হরি মিললে বাছুর শিশু আগে পেত। কিন্তু মীরা বলেন বিনা প্রেমে তাকে পাওয়া যায় না।

৬৪ কৃপা-বিন্দু শুধু বাহিরে বেড়িয়ে, ঘাের ছাড়া আর কিছু লাভ নেই। কচি গাছ বেড়া দিয়ে রাখতে হয়, নইলে ছাগলে খেয়ে যাবে। পরে, গাছ বড় হলে হাতী বাঁধা যায়। স্থির হতে হবে—সন্তোষ সাধন সর্বাগ্রে দরকার। তাকে যদি সবই দেওয়া হল,আবার অসন্তোষ নিজের জন্য রাখেন কেন ? তাও তাঁকে দিন, না। একে বলে “ওঁ শ্রীকৃষ্ণার্পনমস্তু”- সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম তাকে দেওয়া। ঈশ্বর প্রণিধান করুন, সব অশান্তি কমে যাবে। জানিয়েছেন বন্ধুর ঘর চুরি হয়েছে। বন্ধু কে? ঈশ্বরের প্রকাশ। বন্ধুর জিনিষ গুলি কি? সেও তার প্রকাশ। আচ্ছা চোর কে ? এও তারই প্রকাশ। তবে কি হল? একমাত্র তিনিই সব। সাপ হয়ে কামড়ায়, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ে। সবই আনময়ের আনন্দের লীলা, তিনি হৃদয়ে থেকে সব করছেন। সু বা কু কিছুই নেই। সবই আনন্দময়। সুখে এবং দুঃখে তাঁর প্রকাশ, তাই সুখ বা দুঃখ বলে একটা কিছু আছে, নইলে ও ত বাতিক। ঈশ্বর প্রণিধান করুন, ও সব কিছু নয়। লক্ষ্মী হয়ে এখন নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়ে একটু অগ্রসর হন, তারপর ও সব হবে, না হয় না হবে। সমস্ত কৃষ্ণাপনমস্তু ; এই কথা, কি বলেন । রাগ কবেন না। আপনারা বড় ভাল তাই যা তা বলি। পরকে কেউ কিছু বলে না—ঘরের লােকের সঙ্গে কোন্দল করে। আবার অভ্যাস ও খারাপ ; লােককে যা তা বলি। এই দেখুন, অহঙ্কার যায় না। আপনি ছটফট করেন, আর মাথা ঘামতে আরম্ভ হয় এই শরীরের । “তাের কি বাপু? তুই চুপ কর না?” তখন বলে, “ওরা সব আপনার, ওদের ছাড়া যায় না। আচ্ছা, আপনারা পরের ঘর করেন ত ? সে রকম সবাই পরের ঘর করে। পর (অর্থাৎ স্বামী) যদি মনের মত হয়, তবে ভালবাসা যায় , তাহলে পরের ঘরের সবাইকে ভাল লাগে, কেমন ? আপনারা সেই রকম “অামার পরের ঘরের”, তাই আপনাদের গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী } ; জন্য প্রাণ কাঁদে। এ যেন রক্তের টান, নাড়ীর টান, তাই এত বলি, তা কিছু মনে করবেন না। কিন্তু দেখবেন যেন ঘরের কথা অন্যকে বলবেন না, গ্রীষ্মকালে লেপ মুড়ি তার নাম ‘জর, আর ঘরের কথা বার করে তার নাম পর।” এই সব কথা অন্তরঙ্গ ব্যতীত বলতে নাই। ছােট বয়সে বিয়ে হলে, মেয়েটা ভয় পায়, চেঁচায়, হয় ত বলে “আমায় বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও”। কত কঁদে, মাথা খোঁড়ে, তাইবলে বড় হলে কি এমন থাকবে ? তা থাকবে না। তখন ভাইয়ের বিয়েতে নিতে এলে হয়ত বলবে “তাইত ভাই, একলা ঘর, শাশুড়ী বুড়াে মানুষ-” আসল কথা স্বামী ! সেই রকম, কঁচা ভক্তি যাদের, তার ভালবাসা বুঝতে পারে না চেঁচায়, আপত্তি করে। কিন্তু পরে ভক্তি পালে ঐ ভাব আর থাকে । আর কি বলব ? একটু স’য়ে থাকুন। তাঁকে সমস্ত পদার্থে, সমস্ত ক্রিয়ায়, সমস্ত অনুভবে, দেখতে থাকুন। ঈশ্বর-প্রণিধান অভ্যাস হোঁক। তখন সব শান্তি । মানুষ পূর্বে পূৰ্ব্বে যে কাজ করিয়াছে তার স্মৃতিগুলি ক্রমে সংস্কার হইয়া চিত্তে বদ্ধমূল হইয়াছে। সেই সব সংস্কার এক এক লােককে এক এক রকম করিয়া দেয়। আমরা বাল্যকাল হইতে শিখিয়াছি এটা গাছ, ওটা মাছ, ওটা ভাল এটা মন্দ, ইনি ধনী, উনি গরীব। কিন্তু যদি শিখিতাম, গাছেও তাঁর প্রকাশ, মাছেও তার প্রকাশ, তারই লীলা সব—হৃদয়ে তিনি বর্তমান থাকিয়া এই সমস্ত করিতেছেন--তাহা হইলে যে-কোন ঘটনা দেখি না তাঁর কথাই মনে করাইয়া দিত। ক্রমে “যাহা যাহা নেত্র পড়ে, তাঁহা তাহা কৃষ্ণ ঘুরে”—এই হইত। তখন কৃষ্ণময় সংসার দেখিতাম, কারণ সেইরূপ সংস্কার হইত। এখন ঐ রকম অভ্যাস করিতে হইবে, তবেই সংস্কার সাত্ত্বিক হইবে, এবং প্রাণ যাহা চায় তাহাই পাইবেন।

'৬৬ কৃপা-বিন্দু চিত্তশুদ্ধির রাস্তায় কখন কি হইবে, টেরও পাওয়া যাইবে না। এমন মনে করিবেন না যে, যাহারা ধর্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দেন সকলেই সিদ্ধ। এক- জনের ছেলে মরিলে অন্য লােকে বােঝায় সংসার অনিত্য, কে কার,-- ইত্যাদি। আবার যে বুঝায় তার যখন ছেলে মরে, সে তখন সেই রকমই মাথা খোঁড়ে, বুক ঠোকে, তখন যাকে সে বুঝাইয়াছিল সে আবার বােঝয় “সংসার অনিত্য, শােক বৃথা, ইত্যাদি। অনেক সময়ে এই ভাবেও ধৰ্ম্মের আদান প্রদান চলিয়া থাকে। আপনাদের যে ভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান দেওয়া হইয়াছে তাহা শুক্লাতিথি ও পূর্ণিমায় প্রশস্ত, অমাবস্যা বা কৃষ্ণাতিথিতে করা নিয়ম নয়। শক্তি-মন্ত্র হইলে কৃষ্ণপক্ষে প্রশস্ত। তবে আসল কথা ভক্তি। ভক্তির জোর থাকিলে তবে শুক্ল কৃষ্ণ আটকায় না। শাস্ত্রে বলে “ভক্তি যােগাত্ৰকারণম ' ভক্তিই পূজাদির প্রধান উপচার ও কারণ, তিথি বা অন্য কিছু নয়। তকে ও সব প্রথম প্রথম মানা ভাল। ফল ধরিলে ফুল আপনি ঝরিয়া পড়ে। চিত্তশুদ্ধি না হইলে প্রেম ভক্তি হয় না। একটা পদ ভাল লাগে লিখিলাম। ভাল জিনিষ একলা খাইতে নাই। চাই নবীন মেঘ পানে তুয়া কথা পড়ে মনে এলাইলে কেশ নাহি বাঁধি। ব্ৰন্ধন শালাতে যাই, তুয়া বধু, গুণ গাই ধূয়ার ছলনা ধরি কঁদি । মণি বা মাণিক নও আঁচলে বাঁধিলে র ও ফুল নও যে কেশে পরিবেশ। নারী না করিত বিধি তুয়া হেন গুণ নিধি লইয়া ফিরিতাম দেশ দেশ গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ' ৬৭ অগুরু চন্দন হতাম তুয়া সঙ্গে মাখা র’তাম, খসিয়া পড়িতাম রাঙ্গা পায়। • কি মাের মনের সাধ বামন হয়ে চাদে হাত বিধি কি সাধ পুরাবে আমার । এ সকল ভাব ভক্তির বিকাশ। বেশ সহজ ভজন। শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! গুরুদেব! আপনার কৃপালিপি যথাসময়ে পাইয়া পরমানন্দ লাভ করিলাম। এই অশান্তিময় সংসারের কোলাহলে সাধন-ভজন বুঝি আর হয় না। এত ঝঞ্চাটের মধ্যে থাকিয়া নিজেকে গড়িয়া ভােলা যেন অসম্ভব বলিয়া মনে হইতেছে। দয়া করিয়া ইহার উপায় নির্দেশ করিয়া দিলে কৃতার্থ হই। মাঝেমাঝে মনে হয় এই সংসার পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাই এবং ভিক্ষা-দ্বারা জীবন যাপন করিয়া তাহার ভজনা করি। এ বিষয়ে আপনার কি মত তাহা জানাইয়া অনুগৃহীত করিবেন। ইতি সেবিকা শুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- সাধনার প্রকৃষ্ট উপায় একলা থাকা। অর্থাৎ অবিরাম কৰ্ম্মের ভিতর অবিরাম বিরাম। বহু লােকের মাঝেও একা। নিজের ভিতর একটা দুর্গ প্রস্তুত করিয়া লইতে হইবে। যত গােলমাল, যত হাঙ্গামা সব বাহিরে থাকিবে, দুর্গের প্রাচীর ভেদ করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে পারিবে না। সংসার দুঃখময়, অত্যন্ত গােযােগ, বিপদ-আপদ পরিপূর্ণ। এখানে বাস করিতে হইলে ঐ দুর্গের আশ্রয়ে থাকিতে হয়। নতুবা এই সমস্ত ব্যাপারে সাধুকে চঞ্চল করিয়া তােলে।

কৃপাসিন্ধু স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধান দ্বারাই দুর্গ প্রস্তুত করিতে হয়। ব্যস্ত হইলে চলে না ; ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে হয়। নারদ বলেন- ওঁ সুখদুঃখেচ্ছালাভাদি ত্যক্তে কালে প্রতীক্ষমানে ক্ষশাৰ্দ্ধমপিব্যর্থ ন নেয়ম ॥ ৭৭। অর্থাৎ সুখ, দুঃখ, ইচ্ছ, লাভ, সমস্তই ভগবানের সমর্পিত। সাধকরা শুধু নীরবে সহিয়া যায়। সুখেও চঞ্চল হয় না, দুঃখেও হয় না। তারা বলে “ভগবান, তােমার ইচ্ছাই পূর্ণ হৌক”। সময় নষ্ট তারা করে না—সমস্ত ভগবানে অর্পিত কি না, তাই তাঁর নাম অনবরত জপ, আর কোন ঘটনা সম্মুখে আসিলে ঈশ্বর-প্রণিধান। ব্যস্ত ভাব যত দিন থাকিবে ততদিন তার উপরে ভাল নির্ভর হইল না বুঝিতে হইবে। মনকে আবার কেহ কেহ বােঝায়,বাপু, তুমি যদি নিজের ইচ্ছামত সখ করিতে যাও, তবে তােমার অদৃষ্টে সুখ কোথায় ? যাহা চাহিতেছ তাহা অমন লাফাইলে পায় না, শান্ত হইয়া থাক, দেখ তঁার কি সুন্দর লীলা। কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম ; সে এক রকম, অবার এক রকম নূতন ব্যাপার; এও সেই তিনি, সেও সেই তিনি ; চুপ করিয়া থানা, দেখনা মজা। তুই লম্ফ ঝম্ফ করিস না; আবার ভাবাভাবিই বা কেন ? যাহয় হোঁক, তাঁর নাম করিয়া, তার লীলা দেখিয়া, তার জন্যই সব কিছু করিয়া, স্রোতের শেওলার মত পড়িয়া থাক। গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকে শ্রীভগবান অর্জুনকে উপদেশ করিয়াছেন—' সন্তুষ্টঃ সততং যােগী যতাত্মা দৃঢ় নিশ্চয়। মধ্যর্পিত মনােবুদ্ধিৰ্যো মভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ । অর্থাৎ ক্ষমী, সদাতুষ্ট, যােগী, দৃঢ়ব্রতী, জিতেন্দ্রিয়, মদর্পিত মনােবুদ্ধি যে ভক্ত, সে মম প্রিয়। যে ক’দিন নিত্য কর্ম বাদ পড়ে, তার বদলে একটু ক্রিয়া বাড়াইয়া দিলে সমান সমান ত হইবেই, বরং বেশী হইতে থাকিবে। সময় # ! গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৬৯ কম থাকিলেও অন্য কাজের সময়ে মনে মনে জপ, ঈশ্বর-প্রণিধান, ভাল চলে। ও-সব পােষাকী ক্রিয়া নয় যে শুধু আসনে বসিয়া একা চক্ষু বুজিয়া করিতে হইবে। স্বাধ্যায় বা ঈশ্বর-প্রণিধান আটপৌরে ( সর্বদা ব্যবহারের )--যখন যেমন ভাবে ইচ্ছা ওদের ব্যবহার চলে। পরিশ্রমে, গলঘৰ্ম্মে, ওরা তখনও উপস্থিত। আবার আরামে শুইয়ে শুইয়েও ওদের পাওয়া যায়। এই দুইটি সাধনায় যে কত বাহাদুরী তাহার কি বলিব । আপনার ঠাকুর লইয়া একটু ঝগড়ার সম্ভাবনা আছে। আপনার কালার নিন্দা সাহস করিয়া কেহ করে না। ভারি বজ্জাত। কখ কার কি ক্ষতি করেন ঠিক নাই। এ পক্ষের তত ভয় নাই ;-সমুদ্রে শয্যা, শিশির দিয়া কি ক্ষতি করিবেন,তাই একটু ভাল করিয়াই নিন্দা করিব। পরের কাছে কুৎসা করা অভ্যাস নাই; কালার ঘরের লােকের কাছেই বলি। যদি হতভাগার একটু সংশােধন হয়। আপনার কালার আলায় টেকা ভার হইয়াছে—জানিবেন। অমন শয়তান, অমন দুরন্ত দুনিয়ায় নাই, জানিবেন। ওঁর যে কোন্টা ভাল তা জানিনা। রং ত, বাপ, ঘরে আসিলে ঘর অন্ধকার হয়। তাতে অষ্টাবক্র মুণির ছােট ভাই, তিনটি বাঁকা, আহা কি রূপের বাহার ! এদিকে চক্ষু টেরা,--ধন্য বাবা চেহারা তােমার,আবার ঐ পােড়া মুখে হাসেন! ঠোট দুটি লাল, চারিদিকে কালাে, যেন কেহ টীকা ধরাইয়া রাখিয়াছে। দাঁত যদি বাহির হয় সাদা সাদা, ঐ কালাে রঙের মাঝে মনে হয় ঈশান কোণের ঘাের মেঘে বিদ্যুৎ চমকিত হইতেছে, ভয় করে বুঝি বা বজ্র পড়ে । রূপের কথা আর কত বলিব, গুণেরও ত অন্ত নাই। এমন যে রাধা, একশ’ বছর কঁদালেন ঐ হতভাগা। নিজের মায়ের বুকে পাথর চাপালেন। অর্জুনের কণ্ঠে লেগে ক্ষত্রিয় বংশটাই লােপ; নিজের বংশে বাড়ি দিতেও কাউকে ;

; ৭০ কৃপাসিন্ধু রাখলেন না। অমন ভয়ানক লােক আর দুটি নাই। ওঁর হাসি দেখলে গা জ্বলে, আপনাদের ওসব লােক যেন এ-দিকে না আসে টাসে, ভাল হবে না,-ও-সব লােকের সঙ্গ সন্ন্যাসীরা করে না। তাকে বলে দেবেন; আমি আর বলব না; পুথি বেড়ে যাবে। তবে এ শরীরের মাংস খাইয়াছে, আপনি বৈদ্য ডাকিবার ব্যবস্থা করিবেন, তাই এত লেখা। অমন দুরন্ত বাঁদর ঘরে থাকিলে পাড়ার লােকের জন্য বৈদ্য ব্যবস্থা করিতে হয় বই কি। দেখুন, কর্তার যখন ইচ্ছা হইবে তখনই আপনারা ভিক্ষা করিয়া খাইবেন। আগে আর ওসব চঞ্চলতা কেন ? বলিলেই কি হইল? ভিক্ষা করিয়া খাইয়া সাধন-ভজন করিবার মত অবস্থা হইয়াছে কি? ঘরে হয় না, মাঠে হইবে ? জোর করিয়া কিছু করিবেন না যেন,—ও-সব কল্পনাও নয়। যখন যখন সন্ন্যাসী হইবার কথা মনে হইবে, নিজেকে মিলাইয়া দেখিবেন,হাত পা কতটা ছাড়িয়া দিয়াছেন ; নিজের স্বাধীন ইচ্ছা কতটা বাকি। নিজের ইচ্ছা যে দিন মােটে থাকিবে না, সেই দিন সন্ন্যাস—তার আগে নয়। সন্ন্যাসী আগে হইলে ঠকিতে হয়। কর্তা যাহা করিতেছেন ভালর জন্যই,—এই টুকুও বিশ্বাস কে কি হয় ? তবে বৃথা আর কষ্ট করিয়া কি হইবে ? তিনি যেমন করিয়া ভাল হয়, গড়িয়া-পিটিয়া তােলেন। ; আপনি কেন তাঁহাকে অবিশ্বাস করেন। তাঁর হাতে সব ছাড়িয়া দিন, নতুবা জ্বালা জুড়াইবে না। অত্র কুশল, আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি- শিষ্যাৱ পত্র- শ্ৰীশ্রীচরণেষু প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব ! আপনার পত্ৰ পাইয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম, ভরসা করিতেছি আপনার সাহায্যে এই ভবসিন্ধু পার হইব। আপনার বাক্য আমরা বেদবাক্য বলিয়া ;

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭১) ; মনে করি। বাস্তবিক আপনাদের সাধু-বাক্যের মধ্যেই যথার্থ সত্য বর্তমান রহিয়াছে ; তাই প্রাণপণে সে বাক্য পালন করিবার চেষ্টা করি ; এবং সেই সত্যবাণী বারবার পাইবার জন্য আপনাকে বিরক্ত করি। দয়া করিয়া আমাদের বন্ধুর সংবাদ দিবেন। ইতি সেবিকা গুরুর পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়— মা। গতকল্য আপনার চিঠী পাইয়াছি। আপনিও আপনার সখি আপনারা দুজনেই বেশ, তাই একজনকে রাধারাণী একজনকে ললিতারাণী বলিতে ভাল লাগে,আপনারা দুজনেই ধন্য। আবার আপনাদের সহিত পরিচিত হইয়া যেন ধন্য হইয়া গিয়াছি। আপনারা ভাগ্যবতী নিশ্চয়ই। আপনাদের সহিত যাহারা মিশে তাহারাও ভাগ্যবান। এ-সব কথার কথা নয়, সত্য কথা। পরপারে যাইবার সাহায্য করিবার লােক ভালই চিনিয়া লইয়াছেন, একে সাহায্য বলে বটে! সে কেমন জানেন, শ্রীগৌরাঙ্গদেব যখন সন্ন্যাসী হইয়া বাহির হইলেন, তার ঝুলি বইবার, তাকে সেবা যত্ন করিবার, অনেক লােক তখন জুটিয়াছিল। আপনার সাহায্যের জন্য কোন ভাবনা নাই। নাই। যে রাস্তায় চলিয়াছেন, ঝুলি বইবার লােকের ভাবনা হইবে না। তবে গদাধর প্রভৃতি শ্রীগৌরাঙ্গের ঝুলি বহিত অনেক আশায়। এক তঁাকে ভালবাসিত, আর পরকালের রাস্তা হইবে বলিয়া। কর্তার যতদিন ইচ্ছা, যেমন করিয়া যাহাকে দিয়া হৌক, ঝুলি বহন করাইবার সাহায্য তিনিই করাইবেন। গদাধরের যে আশা এ হতভাগ্যদের আশাও তাই। তবে শেষে মনে রাখিবেন ত ? সকলের ঝুলি বহন করিতে রাজি আছি। কিন্তু সেবক হিসাবে শেষে বেতন দিতে না-ভুলিয়া যান। ক ৭২ কৃপাসিন্ধু যাহারা পূজা করেন তাহাদের যদি সময় কম হয়, তবে ফুল তুলিবার একটা লােক চাই। কিন্তু সে-বেটা চিনির বলদ। নিজে পূজা করে না। ফুল পৌছাইয়া দিয়া সে হয় ত মাছ ধরিতে যায়। এ-সকল লােকের অবস্থাও তাই। নিজে বিশেষ কিছু করে না, অথবা পারেও না; পরের সাহায্য করিতে পারে, তাও ঐ রকমের। আপনার যাহা নিৰ্ম্মল তাহা অতি সুন্দর, জন্ম হইতেই আছে,তাহার এককণা পাইলেই ধন্য মনে করিব। কে কাহাকে টানিবে ? আপনার যিনি বন্ধু তিনি ভাল আছেন। তাঁর কি বােগ আছে ? খােসাটা মাঝে মাঝে বিগড়ায়,বন্ধু আপনার ভালই থাকেন। ঘরের চালের খড় নাই বটে, দু এক জায়গায় জলও পড়ে, কিন্তু ঘরের মালিক বেশ আছেন; খান দান আমােদ করেন, মজা লােটেন। আপনার বন্ধু এ গরীবেরও বন্ধু ; তবে দু’জনে বড় ঝগড়া; আপনার বন্ধুকে একটু বলিয়া দিবেন যেন মিলিয়া মিশিয়া থাকেন। আপনার বন্ধুর বড় অভিমান; আর সহজে তাকে পাওয়া যায় না; বড় পায়া-ভারী। কি করি বন্ধুলােক, বলাও যায় না কিছু। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি শিষ্যাৱ পত্র- শ্রীচরণেষু-- প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া বিমলানন্দ লাভ করিলাম। আপনি আমাদের যে নাম দিয়াছেন , আমরা কি তাহার যগ্যা? শ্রীগৌরাঙ্গদেবের সহিত তুলনা দিয়াছেন, এজন্য বড় লজ্জিত হইয়াছি। তঁাহার তুলনা কি মানবে সম্ভব! মন বড় চঞ্চল, কত বুঝাই তথাপি বােঝে না। আমাদের জন্য আপনি কত কিছু করিলেন, আমরা আপনার জন্য কি করিলাম? বড় দুঃখ রহিয়া গেল। ইতি সেবিকা গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭৩ হৱ পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! যাহা নাম দেওয়া গিয়াছে, আপনারা তাহার উপযুক্ত বলিয়াই ; নতুবা অন্যকে ও নাম দিতে ইচ্ছা করে না । ও নাম ত আর বলা অভ্যাস নাই, আপনাদের মত পাত্রী দেখিয়া ঐ নাম দিয়াছি, তবু ডাকা হয়। জিহ্বা খালি ভাল খাইতে চায়, আর কুকথা বলিতে চায়, রাধা নাম বলিতে চায় না। তাই তাকে সত্যকার রাধা দেখাইয়া দিলাম, তাতে যদি একবার বলে। কিন্তু তাও বলে না ; সম্বােধন যে কি বলিয়া করিতে হইবে, তাই ভাবে। এ জি এমন পাজি, তততধিক পাজি মন। কেন বাপু, বলালেই ত জিহবা বলে,-মনের দোষ দিলেই বা কি হইবে, বুদ্ধি যদি মনকে বলিতে বলে, মন কি হুকুম না শুনিয়া পারে। আবার ভাবিয়া দেখিলে বুদ্ধিরও দোষ নাই। তার যেমন শিক্ষা (সংস্কার) তেমনই করিবে ত! চিত্ত আবর্জনা পূর্ণ, বুদ্ধি সাত্বিক হইবে কেমন করিয়া? চিত্তশুদ্ধি না হইলে বুদ্ধি ভাল হইবে না। তারপর সর্বনাশ হইয়াছে ঐ “আমি”র দ্বারা। এই যে “আমি” “আমার” বােধ, সেই জন্যেই সব গেল। সব যেদিন “তুমি” “তােমার” হইবে, “আমি” ও “তুমি” হইবে, সেই দিন যদি জিহ্বা রাধা বলে ; নতুবা এ জীবন বৃথায় গেল। ভবে ভরসা, যারা সদ্যফোটা ফুলটির মত সুন্দর, নির্মল, পবিত্র,--তার প্রেমের যথার্থ পাত্র,তাদের দয়া “ক্ষণমিহ সজ্জন সঙ্গতিরেকা, ভবতি ভবার্ণব তরণে নৌকা। এই পবিত্রচিত্ত যথার্থ ভক্তদের সঙ্গ করিলে (ক্ষণকালও ) ভবপারের কাজ হয়। সেই ভরসাই ভরসা। নতুবা চিত্তে ভক্তিবীজ অঙ্কুরিত হওয়া অসম্ভব। সব শুকাইয়া আছে। আপনার ঠাকুর যেন দয়া রাখেন। শ্রীগৌরাঙ্গদেবের তুলনা করিয়া কিছু অন্যায় করা হয় নাই। যাহারা ৭৪ কৃপাসিন্ধু (ভক্তিতে মধুর ভাবে) সিদ্ধ তাহারা সকলেই গৌরাঙ্গ । আপনারাও তাই। সব ভিতরে রাধা,বাহিরে সাধারণ আবরণ। সেই রাধা কৃষ্ণ, কৃষ্ণ” করে, আর কাঁদে। বৃন্দাবনে এক শ’ বছর কেঁদেছিল । ওর কঁদতেই জন্ম। তবে সে কান্না বড় সুখের। “বাহিরে জ্বালা হয়, ভিতরে আনন্দময়, কৃষ্ণ প্রেমের অদ্ভুত চরিত”। সে সুখ ভক্তরাই জানেন। যদি একটু কান্নাও আসিত-পােড়া শুনা চোখে জলও নাই। কুমীরের কি কান্না পায়? যদি পায়, সে ত মায়া কান্না,মানুষ.খাইবার ফন্দী। মন বােঝে না তীর্থ করি, বৃথা কাজে ঘুরে মরি’ । সবই ঘরে আছে, সবই ভিতরে নিজের কাছে। ঈশ্বর-প্রণিধান চলিতে থাকুক, এবং অন্যান্য নিয়মগুলিও পালন হইতে থাকুক, আপনাদের চাষ-করা মই-দেওয়া ক্ষেত, সব হইয়া যাইবে। মন বােঝে না কেন? মনে স্থির জানিবেন, শুধু সন্ন্যাসে উপকার হয় না। চিত্তশুদ্ধি হইলে পরে সন্ন্যাস ব্যবস্থা। সন্ন্যাস চিত্তশুদ্ধি ব্যতীত হইলে পতিতাশঙ্কা আছে। টান যদি বাড়ে তবে সব হইয়া যাইবে। তার প্রতি টান যাহাতে বাড়ে তাই করিবেন। সর্বদা, প্রত্যেকটি কাজে, প্রত্যেকটি ঘটনায় ঈস্বর-প্রণিধান হোক, সব সুন্দর হইয়া যাইবে। আপনার দুঃখ হয় যে, এ শরীরের জন্য কিছু করিতে পারেন নাই। দুঃখ কি? যদি শেষকালে মনে রাখেন তাহা হইলেই হইবে। অত্র কুশল। আপনাদের নিত্যকুশল ভরসা করি। ইতি শিষ্যাৰ পত্ৰ- শ্রীশ্রীচরকণমলেষু- প্রণাম-পুরঃসর নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছি। 'ঠাকুর যদি আমাদের সন্ন্যাসী না করিয়া সংসারেই রাখিয়া দিলেন, তবে আর কি হইল? প্রাণায়ামের কাৰ্য্য আরম্ভ করা হইয়াছে, এ-বিষয়ে বিধি-নিষেধ আরও যাহা আছে গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭৫ তাহা দয়া করিয়া জানাইয়া বাধিতা করিবেন। রাজযােগ পড়িতে পারি কি না জানিতে বাসনা করি। মাঝে মাঝে ধ্যানের মূর্তি বদলায় কেন? অনুগ্ৰহ করিয়া জানাইবেন। আর একটা কথা নিবেদন করি। আমাদের স্বাস্থ্য এবং অল্প বয়স থাকিতে থাকিতে সন্ন্যাস লইলে ভাল হয় না কি? তারপর তীর্থ এবং বিদেশ ভ্রমণের জন্যও আমাদের মন সৰ্ব্বদাই চঞ্চল হইতেছে। কি করিয়া এই সকল সাধ পূর্ণ হইবে, সেই কথাই কেবল মনে হয়। ইতি সেবিকা শুভৱ পত্র- ওঁ নমাে নারায়ণায় মা! আপনার চিঠি পাইলাম। যাহারা সাধক তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? যে-কোন প্রকারে হোক ভগবান লাভ করা। উপায়ে ভগবান লাভ হইতে পারে তাহাই করিয়া যাওয়া উচিত। শুধু মনে মনে যদি ইচ্ছা প্রবল থাকে যে, আমার ভালবাসার বস্তুকে পাইতেই হইবে, তাহা হইলেই ত অনেকটা কাজ হইল। তারপর যা নিত্যকর্ম আছে তাহাতে প্রাণের সম্পূর্ণ সামর্থ্য দিয়া সম্পাদন করিয়া যাওয়া। সমস্ত দিন-রাত্রির সমস্ত চিন্তার দ্বারা, কাজে কর্মে সকল অবস্থায় ঐ পূজা চলিতে থাকুক। যাঁহার বােঝা তিনি বহিবেন। সন্ন্যাসী হইব, কি গৃহী হইব, অত চিন্তার দরকার কি? কোন কিছু নিজে চেষ্টা করিয়া ঘটাইয়া তুলিবার দরকার নাই। যাহা তিনি দয়া করিয়া, বুঝিয়া ব্যবস্থা করিয়া দেন, সেইভাবে চলাই, সেই ভাবে থাকাই মঙ্গলজনক। এ-সকল কথা মনে পড়াইয়া দিলাম মাত্র, যাঁহারা ভক্তিমতী তাহারা বুঝিয়া লইবেন। তবে অনেক সময়ে বড় বড় সাধকেরও ভ্রম বা অধৈর্য্যের সংঘটন হয়, তখন তাহাকে মনে পড়াইয়া দিলে অনেকটা ফললাভ হয়। যাহাকে পাইলে সকল পাওয়ার কৃপাসিন্ধু শেষ হয়, তাহাকে দীনাত্মা কোথায় পাইবে ? তাকে যে পায় সে পায়, অন্য লােকে কেবল সে কথা শােনে। প্রাণায়াম-দ্বারা ধ্যানের উপকার হয়। মন ক্রমে ধ্যানের উপযুক্ত হইয়া উঠে এবং ক্রমে মনের ময়লা নষ্ট হয়। কিন্তু যাঁহারা প্রাণায়াম অভ্যাস করিবেন, তাহাদিগকে খুব নিয়ম পালন করিতে হয়। যম, নিয়ম সাধন এবং পথ্যাপথ্য, পরিশ্রম ও বিশ্রাম, এ সবই খুব নিয়ম বাধিয়। করিতে হয়, নতুবা অসুখ বিসুখ হইয়া পড়ে। রাজযােগ পড়ুন তাহাতে আপত্তি নাই, তবে দেখিবেন যেন ভক্তির ব্যাঘাত না হয়। কেবল বলের দ্বারা, আত্মশক্তির উপর নির্ভর করিয়া, যাহারা যােগমার্গে যাইতে চায়, রাজযােগ যেন.তাহাদেরই জন্য। আরাধ্য দেবতা ছাড়িয়া দিয়া যােগ করা সম্ভবপর হইলেও, সকলের পক্ষে তাহা খাটে না। সেইজন্য আপনাকে ছয়-খানা দর্শন সম্বন্ধে কিছু বলা আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে বলিয়া মনে হয়। একবার কোন্ দর্শন কি বলিয়াছে জানিতে পারিলে তারপর আপনার যাহা ইচ্ছা হয় করিবেন, এবং একবার স্থির হইয়া গেলে, আর নূতন কোন মত শুনিলে সহসা লক্ষ্যের পরিবর্তন হইবে না। গীতা সমস্ত শাস্ত্রের একত্র সমাবেশ। গীতায় যাহা নাই, বেদে তাহা নাই, অর্থাৎ যাহা স্যার, যাহা সত্য, গীতার পূর্বে যত মত ছিল, গীতায় তার সব আছে। সেইজন্য গীতা ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে দর্শনশাস্ত্র সম্বন্ধে কতক জানা থাকা নিতান্ত দরকার। “গীতা সুগীতা কর্তব্যা কিমন্যৈঃ শাস্ত্র বিস্তরৈঃ”। অর্থাৎ গীতা উত্তমরূপে পড়া হইলে অন্য শাস্ত্রে কি আবশ্যক? যাই হোক, রাজযােগ এখন পড়িবেন না, বন্ধ, থাকুক। আগে পাতঞ্জল সম্বন্ধে জানিয়া লউন, পরে পড়িবেন দোষ হইবে । ক্রমে ক্রমে সব বলা যাইবে। ছয়খানি দর্শন ও গীতার কথা বলিতে অন্তত এক বৎসর কাল লাগিবে, বেশীও লাগিতে পারে। কাজকর্ম যেমন চলিতেছে চলুক, ।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭৭ এ সকল অবসর-মত পড়িয়া যাইবেন। পুনঃ পুনঃ পড়িতে হইবে নতুবা মনে থাকিবে না। আবার যেখানে যেখানে গীতার সহিত মিল আছে তাহা মিলাইয়া দেখিতে হইবে, তবে গীতা.বুঝা যাইবে। ধ্যান যাহা হইতেছে হৌক, তাহার জন্য কিছু মনে করিবেন না। মনের ভাবের ব্যতিক্রম হইলে মূৰ্ত্তি মাঝে মাঝে বদলায়। যে মূৰ্তি আসেন তাঁহাকে প্রণাম করিয়া তাহার কাছে আপন ইষ্ট দর্শনের অতিলাষ জানাইতে হয় । দেবতা সকলেই পুজণীয়, তাড়াই- বার চেষ্টা করিবেন না, আপনিই সরিয়া যাইবেন। যাহা গােলমাল লাগে জানাইবেন, যথাসাধ্য উত্তর দিবার চেষ্টায় থাকিব। অজপা জপ অভ্যাস হইয়া গিয়া থাকিলেও সাবধান থাকিতে হয়, যেন আবার না ছাড়িয়া যায়। মনটা যেন সেই শব্দে বা সেই চিন্তায় সর্বদা লগ্ন থাকে; অর্থাৎ অন্তরে যে জপ চলিতেছে মনটা তাহাতে যেন লাগিয়া থাকে। এসব অতি আনন্দের কথা, তবে আরও অনেক অগ্রসর হইতে হইবে ; এখানে আসিলেই হইল না, যতদিন বাঞ্ছিত বস্তু লাভ না হয়, ততদিন বিশ্রাম নাই, এই কথা মনে রাখিবেন। আর একটু অগ্রসর হইয়া ধ্যানটা আয়ত্ত করিয়া লইলেই নিশ্চিন্ত। ধীরে ধীরে সব ঠিক হইয়া আসিবে। মা, যৌবনে যােগিনী হইবার সাধ হইয়া থাকিলেও একবার ভাবিয়া দেখা উচিত সন্ন্যাস কাহার হয়। দেহের কি সন্ন্যাস হয়? দেহ মৃত হয়, পরিবর্তন হয়, পচে, গলে, সুতরাং দেহের আবার সন্ন্যাস কি ? আর সন্ন্যাস দিলেও তাহাতে দেহের লাভ কি ? দেহ ত জড়। সন্ন্যাস হয় দেহীর ; যে দেহী যুবাও নয়, বৃদ্ধও নয়, যে স্ত্রীও নয়, পুরুষও নয়, শুধু তাহারই সন্ন্যাস সম্ভব। যােগিনী যৌবনেও হওয়া চলে, বার্ধক্যেও চলে। দেহীর সহিত দেহকে জড়াইয়া ধরিতেছেন কেন? যৌবনে যােগিনী সাজা বেশ সুখকর, একটা সখ মিটান, একটা খেলার মত। * । ৭৮ কৃপাসিন্ধু কিন্তু সন্ন্যাসের উদ্দেশ্য ত তা নয়। দেহী যখন বােঝে আমি নিত্য, আমি শুদ্ধ, আমি বুদ্ধ, আমি মুক্ত,—তখনই তার সন্ন্যাস হয়। দেহাভিমান যতক্ষণ, ততক্ষণ সন্ন্যাস ত নয়, মা! “আমি দেহ, আমার যৌবন, আমি এই যৌবনে যােগী হইব” ইত্যাকার বিচার করার নাম দেহাভিমান। সুতরাং আপনিই বিচার করিয়া বলিয়া দিন আপনার সন্ন্যাস লইবার সময় হইয়াছে কি না। এ ভার আপনাকে দেওয়া গেল। তারপর বিদেশ ভ্রমণ করাও সন্ন্যাসের উদ্দেশ্য নয়। সন্ন্যাসীর পক্ষে বিদেশ বলিয়া কোন পদার্থ নাই। সন্ন্যাসীর “বসুধৈব কুটুম্বক পৃথিবীর সকলেই তার আত্মীয়। বিদেশে ঘুরিয়া প্রব্রজ্যা অবলম্বন করিয়া অনেক ফল হয়, অনেক কাজ হয়, কিন্তু আপনি এখন প্রব্রজ্যা করিলে যা ফল হইবে, আর কিছু দিন অপেক্ষা করিলে আরও ভাল ফল হইবে। পৃথিবীর যত স্থানই দেখুন, স্বর্গরাজ্য দেখিলেও মনে হইবে—এই ত! এতে আর কি আছে ? দূর হইতে যাহা শুনা যায় নিকটে গেলে সে বস্তু আর তেমন থাকে না। বিদেশ জিনিষও তাই, দূর হইতে শােনায় ভাল, কাছে গেলে আর তেমনটি থাকে না। সুতরাং বিদেশকে এখনও আশ্রয় করিবার সময় হয় নাই। সব দেশই যে দিন সুন্দর লাগিবে, বিদেশে বাস করার অবস্থা তখনই লাভ হইবে। আবার, সন্ন্যাসের জন্য প্রস্তুত না হইয়া সন্ন্যাস লওয়া যাইতে পারে । সন্ন্যাস বড় শক্ত নিয়মের বাঁধন এবং যথেষ্ট উন্নতি না করিয়া সস্ন্যাস লইলে গােলমাল হইবার সম্ভাবনা থাকে। 'বিদেশ ভ্রমণ করিবার দরকার যদি হয়, তবে ভ্রমণ করাইবার কৰ্ত্তা যিনি, তিনি সে ভার আপনিই গ্রহণ করিবেন। চিঠিতে অনেক অপ্রীতিকর কথার অবতারণা করিতে হইয়াছে। তা আমি স্বেচ্ছায় লিখি নাই, বাধ্য হইয়াই লিখিতে হইয়াছে। সেই সকলের জন্য আপনি আমাকে সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা করিবেন। আপনার সহিত গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ৭৯ দেখা হয়, এমন আশা করিলেও, কখন কিরূপে যে তাহা সম্ভব হইতে পারিবে তাহা বুঝি না। সাক্ষাৎকার যদি আবশ্যক হয়, হইয়া যাইবে, সন্দেহ নাই। সে জন্য এখন চিন্তা করিবেন না। আর অধিক লিখিলাম । আপনি নানাকারণ সকলের চাইতে সৌভাগ্যবতী। আপনাকে বুঝাইতে যাওয়া ধৃষ্টতামাত্র। সকল ভার আপনার উপরেই রহিল, যাহা হয় বুঝিয়া এবং সাবধান হইয়া করিবেন। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা। ইতি-- শিষ্যার পত্র- শ্রীশ্রীচরণেষু— প্রণাম-পূৰ্ব্বক নিবেদনমিদং। গুরুদেব! আপনার পত্র পাইয়া আনন্দিত হইলাম। দীক্ষা লইবার জন্য মাঝে মাঝে মনটা ব্যাকুল হইয়া পড়ে। এখন দীক্ষা নেওয়া উচিত কি না দয়া করিয়া জানাইবেন। মাঝে মাঝে তাকে প্রাপ্তি ছাড়াও আরও কত কি বাসনার উদয় হয় । চেষ্টা করি কিন্তু কিছুতেই সেগুলি বিনষ্ট হয় না। ইহার কারণ কি? জানাইলে ধন্যা হইব। ইতি সেবিকা ওঁ নমাে নারায়ণায়- মা! আপনার পত্ৰ পাইলাম। দীক্ষা ত লইবেন। জীবের জীবন যিনি দিয়াছেন ক্ষুধাও ত তারই ব্যবস্থা ; আবার আহারও তিনি দিয়াছেন। আপনার ভক্তি আছে এবং প্রাণের টানও রহিয়াছে ; সুতরাং দীক্ষা হইতে কতক্ষণ? ক্ষুধা হইলেই আহার পাওয়া যায়। তবে ক্ষুধা কতক পেটের ক্ষুধা, কতক আবার চক্ষুর ক্ষুধা । পেটের ক্ষুধায় সকলেই খায়, চক্ষুর ক্ষুধায় খাইলে পেট ছাড়িয়া বসিয়া আছে স্যাঁক’ ডাক্তার--বিভ্রাট বড় কম নয়। আবার কৃপাসিন্ধু আর এক কথা, ক্ষুধা যদি সত্য সত্যই পায়, বেশ ত! একটু দেরী করিতে পারা যায় না কি ? ক্ষুধা পাইলেও গৃহস্তেরা ধানটা রৌদ্রে দিয়া, ঘরটা ঝাট দিয়া, তারপর তেল মাখিয়া স্নান করে ; শেষে আহার। সে আহারটাই লাগে ভাল ; “উটার চচ্চড়ি আর ভাত হইলেও তিন থালা আধ ঘণ্টায় সাবাড়। আর মেজ বৌয়ের অনুমােধে অথবা তাকে খাইতে দেখিয়া ঘােট বৌয়ের যদি ক্ষুধা হয়, সে খাওয়া কেবল যন্ত্রণাদায়ক ; কোথায় আচার, কোথায় তেঁতুল, তারই কেবল খোঁজ। সর্বোপরি মনে রাখিবেন যাহার দেওয়া ক্ষুধা তারই দেওয়া আহার। সব তাকে বলুন, তিনি যা ভাল হয় করিবেন। কয়েক দিন আবার কৰ্ম্মের ফেরে আটক পড়া গিয়াছে। মরিলেও বুঝি সময় পাওয়া যাইবে না বলিয়া মনে হয়। অন্ততঃ এখনও কয়েক মাস এই ব্যবস্থা। তারপর আপনার দুষ্ট, ঠাকুরটীর ইচ্ছা হয়, ত ছুটি ; হয় ত, ঘানিকঁাধে আর চোখে ঠুলি। সমুদ্রের ধারে বাস করিবার সময় কয়েকটী ছােট সস্থ পাওয়া গিয়াছিল । খেয়াল হইল, কয়েকটী আপনাকে পাঠাইলাম। ঐ সঙ্গে একটী পিতলের ওঙ্কার আছে ; একখানি ঘােট গীতাও আছে। হরে দরে হাঁটু জল ; সবই পাগলামী ! তবে ঐ গীতায় শ্রীভগবান নবম অধ্যায়ে ২৬ শ্লোকে অর্জুনকে বলিয়াছেন- পত্ৰং পুষ্পং ফলং তােয়ং যাে মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি। তদহং ভক্তপহৃতমশ্নামি প্রতাত্মনঃ ॥ যারা তার কাছাকাছি তাদের সম্বন্ধেও তাই; উপহার সামান্য, অকিঞ্চিৎ- কর হইলেও তাহারা সুখী হন; পাগলামী ভাবেন না এই ত কথা? . তারপর সাতকাণ্ড রামায়ণ শুনিবেন? অর্থাৎ ষড়-দর্শন ওঁ গীতা, এই সাত। দর্শন শাস্ত্রের ও উপনিষদের মােটামুটি জ্ঞান না থাকিলে গীতা ভাল বােঝা যায় না। আপনারা গীতা পড়েন, অনেক কথা জিজ্ঞাসাও করিয়াছেন। সময় ও স্থানাভাবে বলা হয় নাই। চিঠিতে একে একে ; ।

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী ; বলিয়া যাইব, সেগুলি জানিয়া রাখিয়া গীতার সঙ্গে মিলাইয়া পড়িলে অনেকটা আনন্দ পাওয়া যাইবে, নিজের রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাইবে। সামনের সপ্তাহ হইতে বলা আরম্ভ করিব, কি বলেন? কখন্ কি হয় শরীরের গতিক বলা ত যায় না? শুভস্য শীঘ্রম্ । আগাছার বৃদ্ধি আছেই, ও ত জানা কথা; ভাল গাছটিই শুখায়। কাটা গাছের গােড়া পটিয়া দিলেও মরে না, দৈত্য সব রক্তবীজ! আজকাল সাধন ভজনের মধ্যে সাধন নিদ্রার, ভজন উদরের; দিনগত পাপক্ষয়। কলুর বলদের মত অনবরত ঘানি টানিতে হয়, সময় কোথায় ? ঘানি না টানিলে কলু ছাড়ে কই ? তাতে আবার চোখে ঠুলি। গরীবের এ-দশা হয়েই আসিয়াছে। নূতন কিছু বলিবার নাই, যে যত ডুব দিবে সে তত সুখ পাবে। ভাসিয়া সুখ নাই ; ডুবাই সুখ। এখন কেবল ডুব ; অনবরত নাম এবং নামের রসের ধারায় ডুব। অত্র কুশল ; নিত্য কুশল ভরসা। ইতি-- শিষ্যার পত্র- , শ্রীচরণেষু - প্রণামান্তে নিবেদন। গুরুদেব আপনার পত্ৰ পাইয়া সকল সংবাদ অবগত হইলাম এবং বিশেষ আনন্দিত হইলাম। আপনারা সন ও অতি ভাল, তাই আমাদের মত অধমার প্রতি এত করুণা। চতুভুজ নারায়ণের মূর্তি স্থাপনের একান্ত বাসনা ছিল; কিন্তু দৈবক্রমে তাহাতে বাধা পাওয়ায় আর হয় নাই। এসব কেন হয়? যা, সময় ত অনেক আছে পরে না হয় হবে। ইতি সেবিকা কৃপা-বিন্দু গুরুর পত্র- ও নামােনারায়ণায়-- মা! আপনার চিঠি পাইলাম। দেখুন, যাহারা তােক ভাল, দুনিয়া- শুদ্ধ তাহাদের কাছে ভাল। সেটা তাদের গুণ কি দোষ, সে-কথা জানিনা। কিন্তু যদি সে মন্দ লােকদেরও ভাল বলিয়া প্রশংসা করিয়া বেড়ায়, তাহা হইলে দুষ্টের বেশ মজাই, কেন না নিজের দোষ সে দেখিতে পায় না। পৃথিবীতে ত কেহ ভাল বলে না। আপনি একলাই একটু ভাল ভাল বলুন, তবু একটু আনন্দ হোক। মানুষের চক্ষুর ক্ষুধাই বিষম বিপত্তি, যখন দরকার নাই তখনও বলে খাই খাই, তারপর অসুখ। কেবল এক বিষয়েই এমন নয়, সকল ব্যাপারেই ঐ গােলমাল। মানুষ ক্ষুধায় খায়, খা; কিন্তু এত রকম ফোড়ন কেন? শীত লাগে কাপড় পরুক। তাতে এত রকম বাহার কেন ? চতুভুজ নারায়ণের মুর্তি স্থাপন করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, তাহাতে বাধা পড়ায় হয় নাই। ঐ সব তঁারই রসিকতা, নতুবা বাধা পড়িবে কেন? ঐ রসিকতায় দুনিয়া চলিতেছে, দিতে গিয়া দেয় না, দিয়ে আবার কাড়িয়া নেয়, ঐ ত মজা। আপনার ঠাকুর দিবা-রাত্রি ঐ কাণ্ড করিয়া বেড়ান -তাতে ভয় কি ? তবু একজন বলিয়াছেন “ঐ ভয়ে মুদি না আঁখি। আঁখি মুদিলে পাছে তারা হারা হঠে থাকি।” এত ভয় পাছে ভুলিয়া যাই, তাই 'দিবা-রাত্র নাম ধরিয়া থাকিতে হয়। জালের দড়ি হাত হইতে খুসিয়া গেলে যেমন জাল তুলিতে প্রাণ যায়, জলে নামিয়া সতের গণ্ডা ডুব মারিতে হয়, এও তেমনি। খবরদার যেন খেই না হারায়। প্রাণায়ামের সময়টা খুব সাবধান থাকা দরকার। আসল কথা চিত্ত শুদ্ধি, প্রাণায়ামে সাহায্য করে মাত্র। রাস্তায় চলিবার জন্য লাঠি যেমন একটা অবলম্বন, এও তাই ; নইলে ওটার কোন দরকার গুরু-শিখা পত্রাবলী । নাই। ওটা লইয়া যাহাতে আসল বস্তু লাভ করা যায় তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। আপনারা ব্যস্ত হইবেন না, তার ইচ্ছা ব্যতীত কোন কাজ হয় না। কেবল নিজেরা ব্যস্ত হইয়া নিজেদের অশান্তি আনা এবং সঙ্গে সঙ্গে তার উপর বিশ্বাস হারান এই লাভ। সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ে। তত যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাসি। অর্থাৎ ‘সুখ দুঃখ, লাভালাভ জয়-পরাজয় সমান করিয়া যুদ্ধ কর, এতে তােমার পাপ হইবে না। দেখুন সময় আর কতই বা আছে। বয়স কত? কতদিন এই পৃথিবীতে কাটিয়া গেল? আর কখন যাইতে হইবে তারই বা স্থিরতা কি? করিলাম কি ? এই যে সুখ, আনন্দ, এই যে সাংসারিক টান, প্রাণের জালা, ভালবাসা, এই গুলি সঙ্গে যাইবে কি? এর পরের অবস্থা ভাবিয়াছেন কি ? বােধ হয় ভাল করিয়া ভাবেন নাই। ভাবিয়া দেখিলে বেশ পরিস্কার বুঝিতে পারিবেন, কে কাহার। কাহার জন্য এ প্রাণের জালা? কেন? কি দরকার ? কি লাভ ? অতঃপর কি করিলে ভাল হয়, কি করিলে শান্তি পাওয়া যায়, পরে যদি সমস্ত পৃথিবী না থাকে, আপনি একলাই থাকেন, তখন কি লইয়া থাকিবেন? ভাবিয়া দেখিয়াছেন কি? সংসারের সমস্ত কাজ তার ভেবে কলে আর কোন গােল থাকে না। তুমিই সব, খেলতে দিয়েছ খেলচি, এসব আমার কিছুই নয়। তােমা খেলা ভাল করে খে; কেন না, তাতে তােমার সুখ হবে। কিন্তু ত এ খেলা; এতে ভুলব না। তুমি আমাকে শত ইন্দ্রের সম্পদই দাও, আর অষ্ট সিদ্ধিই দাও, আমি তােরই ; পথের ধুলায় আমাকে বসাও, কঠিন নিৰ্যাতন আমার জন্য ব্যবস্থা কর, যাই কর, তুমি আমারই ; তুমি নাথ, তুমি বন্ধু তুমি দয়িত, তুমিই আমার সর্বস্ব।

কৃপা-বিন্দু অন্তর থেকে যে প্রেমের উৎস খুলে গেছে তার প্রত্যেক বিন্দু যেন তােমার দিকে ধায়, এক বিন্দুও যেন অন্য দিকে না যায়। সে উৎস যেন চিরকাল ভােলা থাকে, সে উৎস বিশুদ্ধ কর, নির্মল কর, সুন্দর কর, আর কোন প্রার্থনা জানি না। তুমি আমায় শুদ্ধাভক্তি দাও, নির্মল প্রেম দাও, প্রেমের ব্যাকুলতা দাও। আমায় সব রকমে কাঙাল কর তাতে ক্ষতি নাই, কিন্তু যে প্রেমে সাধক অমর হয়, আমায় তার এক বিন্দু দান কর, আমি আর কিছুই চাই না। হে প্রাণস্বরূপ। হে বন্ধু! হে নাথ! তােমার নিকট আমাকে তুলে নাও, তােমার সহিত যাহাতে মিলন হয় তাহা কর । উদ্যমে ন হি সিধ্যন্তি কাৰ্যানি ন মনোেরথৈঃ। ন হি সুপ্ত সিংহ প্রবিশন্তি মুখে মৃগাঃ । চেষ্টা-দ্বারাই সমস্ত সিদ্ধি শুধু ইচ্ছা করিলেই সিদ্ধ হয় না। নিদ্রিত সিংহের মুখে কখনও হরিণ প্রবেশ করে না। উদ্যোগিনং পুরুষসিংহমুপৈতি লক্ষ্মী দৈবেন দেয়মিতি কাপুরুষ বদন্তি। দৈবং নিহত্য কুরু পৌরুষ আত্মশত্যা যছে কৃতে যদি ন সিধ্যতি কোহত দোষ। উদ্যোগী পুরুষসিংহের প্রতি লক্ষ্মী প্রসন্ন হন, কাপুরুষগণ অদৃষ্টের দোহাই দিয়া থাকে। দৈবকে হনন করিয়া আত্মশক্তিতে (নিজের ভিতরে যে ব্ৰহ্মশক্তি নিহিত আছে তাহা দ্বারা) পুরুষকার প্রদর্শন কর। যত্ন করিলেও যদি কাৰ্য্য সিদ্ধি না হয় তবে দেখ তােমার কাৰ্যে কুটী নিশ্চয়ই হইয়াছে। - পঞ্চম পরিচ্ছেদ। শিষ্যার পত্র- ঐশ্রীচরণকমলেষু ! প্রণাম-পূৰ্ব্বক সেবিকার নিবেদন এই যে, প্রাণা- মুম সম্বন্ধে জানিবার ইচ্ছা হইতেছে। ইহা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও মনােবৃত্তি সম্বন্ধে কিরূপ কাৰ্য্য করে এবং বস্তু লাভের কি সাহায্য করে , আনিতে ইচ্ছা হইতেছে। দয়া করিয়া জানাইয়া বাধিত করিবেন। চরণারবিকে প্রণাম। ইতি সেবিকা ওঁ নমেনারায়ণায়- মা! আপনার পত্রের উত্তরে জানাইতেছি, প্রচ্ছন্দনবিধারণাভ্যা বা প্রাণায়াম মন একাগ্র করিবার উপায়, সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি প্রাণের ( নিশ্বাস প্রশ্বাসের উপর নির্ভর করে বলিয়া, এবং মন ও প্রাণ পরস্পরের ঘােগ থাকায়, সমস্ত ইন্দ্রিয়বৃত্তি বােধ-দ্বারা প্রাণকে জয় করিতে পারিলে মনের একাগ্রতা জন্মে। একাগ্রতা জন্মিলেই যাহা চাই তাহা পাওয়া যাইবে। নামনাত্মা এবচনেন ললো, ন মেধয়া ন বহুনা এতেন মামবৈষ বৃণুতে তেন লভ্য তমৈষ আত্মা কৃণুতে অং স্বা।

কৃপা-বিন্দু।
যায় না ;
এই আত্মাকে ( আরাধ্যকে। অনেক বেদ অধ্যয়ণ দ্বারাও পাওয়া
অনেক শাস্ত্র শ্রবণ করিলেও পাওয়া যায় না। ইনি যাহাকে
কৃপা করেন, তাহার নিকটই স্বরূপ প্রকাশ করেন।
অত্র কুশল। আপনাদের নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি
শিষ্যার পত্র
চরণকমলেষু। প্রণাম-নিবেদনমিদং। গুরুদেব! প্রণব জপের
দ্বারা কি উপায়ে ধ্যান হইতে পারে তাহা সবিশেষ বুঝাইয়া কৃতার্থ
করিবেন। আপনার দেহ কিরূপ আছে ? আমাদের শতকো প্রণাম
গ্রহণ করিবেন।
ইতি সেবিকা
ওঁ নমােনারায়ণায় -
মা ! আপনার পত্ৰ পাইলাম । প্রণব জপের শক্তি সম্বন্ধে আপনাকে
জানাইতেছি-
প্রণববা ধনুঃ সনােহাত্মা
ব্ৰহ্মক্ষমুচাতে।
অপ্রমনে বেদব্যং
শরবতন্ময়াে ভবেত ।
অর্থাৎ প্রণব ধনু-রূপ, আত্মা শর-স্বরূপ, ব্ৰহ্ম তাহার লক্ষ্য।
চাঞ্চল্য-বিহীন হইয়া প্রণব জপ করিতে করিতে আত্মাকে জ্যোতিতে
ডুবাইয়া ফেলিবে। নিজেকে নিঃশেষ করিতে হইবে।
সকল বহির্মুখী ইন্দ্রিয়গুলিকে অন্তর্মুখী করিয়া মনে যােজনা করিলে,
ইহাই ধ্যান।
দিবা-রাত্র কোন সময়েই যেন অভীষ্ট-চিন্তার বাধা না
হয়। হয় ধ্যানে, নয় জপে, না হয় নামে, অথবা তৎসম্বন্ধীয় ক্রিয়াকর্মে

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী। ৮৭ চিন্তায়, সংসলে, সৎপুস্তক পাঠে সময় যেন অতিবাহিত হয় ; অন্য কোন চিন্তা বা ইচ্ছা মনে যেন না আসে। অত্র কুশল, নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি-- শিষ্যান্ন পত্র- শ্রীচরণকমলেষু। গুরুদেব ! আপনার পত্র পাইয়া পরম আন- দিতা হইলাম। মনপ্রাণ বড়ই আপনার শ্রীচরণ দর্শনেরজন্য ব্যাকুল ইতেছে। কি করিয়া ঐ অভয় পদ দর্শন করিব দয়া করিয়া জানাইবেন । এবং কতদিনে মুক্তি লাভ করিয়া আপনার করুণার অধিকারিণী হইয়া জীবন মন সার্থক কৰিব? মুক্তি কাহাকে বলে জানিতে ইচ্ছা হইতেছে ; অনুগ্ৰহ করিয়া লিখিয়া জানাইবেন। মনে হয় আপনার দয়া হইলে সৰ হইবে। আর কি লিখিব। শ্রীচরণ-কুশল প্রার্থনা করি। শতকোটা ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিবেন, এবং দয়া রাখিবেন। ইতি সেবিকা গুরু পত্র- ও নামােনারায়ণায়- মা ! আপনার চিঠি পাইলাম। একটা খবর আছে। হয় চৈত্রের শেষে, না: হয় বৈশাখের ১২ তারিখে ( কবে ঠিক বলা যায় না। একবার আপনার সখি-ঠাকুরাণীর দেশে যাইতে হইবে। এই রকম একটা কথাও দিয়াছি। কবে যাইব পরে জানিতে পারিবেন। আপনার খুব ইচ্ছা হইতে পারে; কিন্তু আপনার বুদ্ধির ত অভাব নাই কাজেই একটু শান্ত হইয়া থাকিতে হইবে। বিনা গােলমালে, বিনা বাধায়, শান্ত ভাবে যদি লেখা হয়, তবে বেশ। সেখানে থাকা কিন্তু দুইদিন কি তিন দিন খুব জোর। তারপর আবার চলিয়া আসিতে হইবে। সময় বড় কম কি না। আপনার মন হয় ত এখন হইতেই চঞ্চল হইল, নয় কি? আচ্ছা, এমন মন কেন ? একটু থামে না কি? এই বা কেমন কথা, বাপু ?

৮ কপা-বিন্দু •• খাওয়া-দাওয়া বেশ হিসাবে চালাইলেই ভাল হয়। সমই হিসাবে ভাল। হিসাবের কড়ি লােকসান হয় না। বেশী কথা বলিলে মন চঞ্চল হয়, আর একটা দোষ, অকারণ অনেক বায়ু খরচ হয়। ইত্যাদি কারণে সন্ন্যাসী যােগীরা বেশী কথা বলিতে রাজী নয়। তবে যােগ বা সন্ন্যাসী অর্থ এই পােড় কাঠনয়। এ-সকল কেবল দোকানদারী। কেবল রংচং, সাজ পােষাক। লাগিয়া থাকিতে পারিলে আর ভয় নাই। লাগিয়া থাকাই কাজ। যে যত লাগিয়া থাকিতে পারে সে তত সুখ পায় ; সে তত অগ্রসর হয়। মুক্তির অর্থ, সিদ্ধির অর্থ, ত ঐ। যে একেবারে ডুব মারিয়াছে আর আলাদা রয় না, সেই মুক্ত। লাগিয়া থাকবার চেষ্টা করার নামই সাধনা। যােগের অর্থও ঐ। একটার সঙ্গে অন্যটা লাগলে, তার নাম যােগ। যে লাগার পরে আর ছাড়াছাড়ি হয় না, বিষম জোড়া জুড়িয়া যায়, তার নামই সমাধি। যে সইতে পারে সেই জেতে। “যে সয় সে মহাশয়--যে না সয় সে নাশ হয়।” জানেন ত ? আপনারা স্বভাবতই ফুল, আর এসব বুড়া বয়সে যেন কাগজের ফুল তৈরী করবার চেষ্টা। একি ছাই হয় না! ঠাকুর যদি দয়া করেন ত অাপনাদেরই করুন। আমাদের মত যারা, তাদের আপনার দয়া করুন ; এই যথেষ্ট। আর অধিক কি লিখিব। অত্র কুশল। আপনার নিত্য কুশল ভরসা করি। ইতি-- শিষ্যার পত্র- শ্রীচরণকমলেষু। প্রণামান্তর নিবেদন। গুরুদেব! আপনার চিঠি পাইয়া পরমানন্দ লাভ করিলাম। সমাধি লাভের উপায় কি ? এবং সাধনা পথের বি কি কি ?

গুরু-শিষ্যা পত্রাবলী।
দয়া করিয়া বুঝাইয়া শান্তিদান করিবেন। আমার শত-কোটী প্রণতি
গ্রহণ করিবেন। চরণ-কুশল প্রাথনা করি।
ইতি সেবিকা
ওঁ নমােনারায়ণায় -
মা ! যােগশাস্ত্রে পতঞ্জলি বলেন -
শুন্য বাচক প্রণবঃ। ২৭।
তুপদর্থ ভবন। ২৮।
সেই যে ঈশ্বর, ওঁ ৰা প্ৰণৰ তঁাহার প্রকাশক। এই ওঁ বা প্রণবের রূপ ও
তাহার অর্থ ভাবনা ( অর্থাৎ নিজ ইঃ ধ্যান) সমাধি লাভের উপায় ।
কিরূপে সমাধি হয়?
তত প্রত্যকৃচেতনাধিগমােহন্তরায়াভাব। ২৯।
উহা হইতে, অর্থাৎ প্রণব জপ হইতে, অন্তদৃষ্টি লাভ হয় ও যােগ-বিগ্ন
সমুই নাশ হয়।
বিপ্ন কি কি ?
ব্যাধিস্ত্যানসংশয় প্রমাদালস্যাবিরতি ভ্রান্তিদর্শনা।
অলব্ধভূমিকত্বনবস্থিতত্বানি চিত্তবিক্ষেপান্তেইন্তরায়। ৩।
ব্যাধি = রােগ।
স্ক্যান= জড়তা-হেতু কর্মে অনিচ্ছা। সংশয়-সন্দেহ,
বা ঐরকম ভাব। অবিরতি=বিষয়-ভােগ-ইচ্ছা। আলস্য তামসিকতা-
প্রযুক্ত কর্মে অনিচ্ছা।
অন্ধভূমিকত্ব= সমাধি ভূমির অলাভ।
প্রমাদ =সমাধি সাধনার সর্বদা ভাবনা না করিয়া প্রমভাবে অন্য বিষয়ে
চিন্তা করা। ভ্রান্তি দর্শন =বিপৰ্যন্ত তত্ত্বজ্ঞান। অনবস্থিতত্ব-সমাধি ভূমি
লাভ করিয়া তাহাতে চিত্তের প্রতিষ্ঠা না হওয়া।
তার অস্তিত্বে নিজের অস্তিত্ব মিশিয়ে ফেলবেন। দুনিয়া দূরে, বাহিরে

কপা-বিন্দু।
পড়িয়া থাকিবে। আর সর্বদা তার নাম মনে ধ্বনিত হতে থাকবে।
দিতে হবে ; রূপ-সাগরে তলিয়ে যেতে হবে। তবে আনন্দ, শাড়ি
তঁাকে লাভ।
ওঁ শান্তি।
ও শান্তি ।
ওঁ শান্তি ।
সত্য-সক্সের আদেশে কৌমুদী গ্রেস হইতে ক্রীচণ্ডীচরণ গুপ্ত কর্তৃক মুদ্রিত
২৫৯১, অপার চিৎপুর রােড, কলিকাতা।
এঞ্জন্মিয়ী ব্রহ্মচারিণী মাতাজী কর্তৃক প্রকাশিত, এমতাড়া।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kripabindu

Author
Not Available
Title
Gurushisha Patrabali
File name
Kripabindu
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2010/02/8
Publisher
Satyabrata Math
Language
Sanskrit
Pages
106
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Gurushisha patrabali
DLI number
511171
Barcode
4990010018342.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
aVyk3sfx5oD
Download PDF

Kripabindu