Makardah Saraswat Library, Howrah
Prantattwa
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রাণতত্ত্ব
No text on this page.
প্রাণতত্ত্ব
শ্রীরথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'
isis
॥
বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়
২, বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ত্রীট, কলিকাতা
প্রকাশক-পুলিনবিহারী সেন
বিশ্বভারতী, ৬৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা
২০১১
প্রথম প্রকাশ কাতিক, ১৩৪৮
পুনর্মুদ্রণ শ্রাবণ, ১৩৫১
মুদ্রাক-প্রভাতকুমার মুখপাধ্যায়
শান্তিনিকেতন প্রেস, শান্তিনিকেতন
ভূমিকা আমরা যে কত বড় জগতের মধ্যে বাস করছি, সেই বিপুল বিশ্বের মধ্যে আমাদের এই ঘরােয়া পৃথিবীর স্থান কতটুকু তা আমরা জেনেছি ইতিপূর্বে লােকশিক্ষা গ্রন্থমালার “পৃথ্বী-পরিচয়” পড়ে। আকারহীন বাষ্পপুঞ্জ গাঢ় হােতে হােতে কেমন করে কঠিন হয়ে ধীরে ধীরে এই পৃথিবীতে পরিণত হলাে, তার পরিচয়ও পেয়েছি। পৃথিবীর উপরের স্তরটা যখন ঠাণ্ডা হয়ে ঘন হয়ে উঠল তখন জল ও স্থল মােটর উপর দু' ভাগে হােলাে তা বিভক্ত; জলই বেশি, ডাঙার ভাগ কম। ঠিক কোন সময়ে এবং কেমন করে এই মরুভূমি শ্যামল তরুগুল্মে আচ্ছাদিত ও জীবজন্তুর প্রাণযাত্রায় চঞ্চল হয়ে উঠল, আর দিগন্তব্যাপী জলরাশি বিচিত্র জীবের বর্ণচ্ছটায় হােলল রমণীয়, তা ঠিক বলা যায় না ; তবে এইটুকু বলা যায় যে, হঠাৎ এক মুহূর্তে এই প্রাণলােকের সৃষ্টি হয়নি, জড় জগৎ যেমন যুগ-যুগ ধরে গড়ে উঠেছে, জীব- জগতের ইতিহাসও সেই রকম । গাছপালা জীবজন্তুর মধ্যে আমরা এখন যে বৈচিত্র্য দেখতে পাচ্ছি গােড়ায় তা ছিল না। অতি সহজ থেকে এর উৎপত্তি, বহু যুগ ধরে এর ক্রমবিকাশ এবং এখনাে এই সৃষ্টির ক্রিয়া অব্যাহত। এই বইতে পৃথিবীর ইতিহাসের মাত্র একটি দিক নিয়ে আলােচনা করব-সে হচ্ছে প্রাণতত্ব।
০ প্রাণী আছে নানা রকমের। অণুবীক্ষণেও দেখা যায় না এমন জীবাণু থেকে আরম্ভ করে গাছগাছড়া, হাতিঘােড়া, মানুষ পর্যন্ত বিচিত্র তার আকার, বিভিন্ন তার প্রকৃতি। এদের সম্বন্ধে ভালাে করে জানবার জন্য নানা শাখা-বিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে- ব্যাকটিরিয়া সম্বন্ধে ব্যাকটিরিওলজি ( Bacteriology), উদ্ভিদ সম্বন্ধে বটানি (Botany), জন্তুদের বিষয়ে (zoology)। আমাদের জ্ঞান দিনে দিনে এতই বাড়ছে যে, এতেও কুলােচ্ছে না। আরাে অনেক খণ্ড খণ্ড করে আলােচনা করতে হচ্ছে, যেমন দেহ সংগঠন সম্বন্ধে অ্যানাটমি (Anatomy ), শারীরক্রিয়া সম্বন্ধে ফিজিওলজি (Physiology), জ্বণতত্ত্ব আলােচনার এম্বায়ােলজি ( Embryology ), পােকামাকড়দের বিষয় নিয়ে এন্টোমলজি (Entomology), পাখিদের কথা নিয়ে অনিথােলজি (Ornithology); তার পর জীবের ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে এভলুশন ( Evolution), তাদের বংশানুক্রম জানবার জন্য হেরিডিটি ( Heredity) ইত্যাদি। আর বেশি নাম করব না, এর থেকেই বােঝা যাবে, কেবল প্রাণীদের সম্বন্ধেই আমাদের কত জানবার আছে—এতই বিস্তার লাভ করেছে আমাদের জ্ঞান। কিন্তু এই রকম খণ্ড খণ্ড ভাবে আলােচনা করবার আগে জীবজগৎ সম্বন্ধে সমগ্রভাবে চিন্তা করে দেখলে ক্ষতি নেই, পরে এক-একটি বিষয়ে বিশেষভাবে মনােনিবেশ করা যেতে পারে। প্রাণজগতকে সমগ্রভাবে দেখে যে-বিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে তাকেই আমরা প্রাণতত্ত্ব বলছি। প্রাণতত্ত্ব নিয়ে যখন আলােচনা করি তখন কত রকমের প্রাণী আছে, তাদের প্রত্যেকের বৈশিষ্ট্য কী, তা আলােচনা করি না, তা করেন বটানিস্ট ( Botanist ), arafat ( Zoologist) a1 ustacertarafsi ( Anthropologist) প্রাণীবিং জানতে চান প্রাণীদের উৎপত্তি কী করে হােললা, তাদের বংশের ধারা চলছে কী উপায়ে, তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনাে যােগ আছে কি না। তাকে প্রথমেই যার উত্তর খুঁজতে হয় সে বড় কঠিন প্রশ্ন,-প্রাণ বলতে কী বোেঝায়। প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব কোনাে প্রাণীবিং এখনো দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না, তবে এই কঠিন সমস্যার আলোচনায় অবতীর্ণ হবার পূর্বে জীবের প্রকৃতি কী, তাদের মধ্যে প্রকৃতিগত মিল কী আছে, প্রভেদই বা কোথায়, এই সব বিষয়ের আলােচনা করে দেখা যেতে পারে। আমাদের চারিদিকে যে জীবলােক, সেখানে আমরা সাধারণত কী দেখতে পাই। দেখি যে, জীবমাত্রেই সচল ও সচেতন না হােলেও প্রত্যেকেই ক্রিয়াশীল, জন্ম থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এক মুহূর্ত তাদের স্থিতি নেই। অবিশ্রাম চলছে তাদের দৈহিক পরিবর্তন, প্রতিক্ষণে তারা বেড়ে চলেছে একটা নির্দিষ্ট সীমায় না পৌছা পর্যন্ত। বাড়বার জন্য সর্বদা থােরাকের দরকার—খােরাক সংগ্রহের ঐকান্তিক চেষ্টায় আপনার পরিবেষ্টনের সঙ্গে সর্বদা চলে যােঝযুঝি ; বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে প্রজননের আকাঙ্ক্ষা হয় প্রবল এবং এই আকাক্ষার মধ্যে থাকে অমরত্বের প্রয়াস। জগতের রঙ্গমঞ্চে এই যে প্রকাণ্ড একটি নাটকের অভিনয় অবিশ্রাম চলেছে, দর্শক হিসাবে তা দেখবার কিছু চেষ্টা করা গেছে এই বইতে। ৩ শান্তিনিকেতন ১৫ই কার্তিক, ১৩৪৮ শীরথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
No text on this page.
সূচীপত্র
। এ
১৪
৫
০ ০ ০
প্রাণের লক্ষণ
জীবকোষ
দেহক্ৰিয়াত ( জন্তুর )
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব ( উদ্ভিদের )
প্রজনন
জীবের বংশানুক্রম
জীব-সমাজ
জীবের ক্রমবিবর্তন
.
•••
১০ ৬
:২৪
শেষ কথা
No text on this page.
প্রাণতত্ত্ব
No text on this page.
প্রাণের লক্ষণ । বিচিত্র এই জীবজগৎ। যে-জীবাণু মানুষের রক্তে আয় নিয়ে ম্যালেরিয়া সৃষ্টি করে, তা এত ছোটো যে অনায়াসে একটি- মাত্র রক্তকণিকার ( blood corpuscle) মধ্যে ঢুকে সে বাসা বাঁধতে পারে। এক ফোটা রক্তের মধ্যে আন্দাজ ? ཞཙན།ཤ রক্তকণিকা পাওয়া যায়—তাহলেই বােঝা যাবে এক-একটি রক্ত- কণিকা কত ছােটো। ম্যালেরিয়ার জীবাণু নিশ্চয় আরাে ছােটো তা না হেলে রক্তকণিকার মধ্যে ঢুকে থাকে কী করে। চেয়ে আরাে ছােটো জীবাণু আছে বিস্তর। এই তো গেল ছােটোর কথা। পৃথিবীতে অতি বৃহং জন্তুর যুগ অবশ্য চলে গেছে-সেই যুগের ডাইনােসর ( Dinosaur) বা ম্যামথ-এর ( Mammoth) কথা ছেড়ে দিলেও বর্তমানে সমুদ্রে যে তিমি পাওয়া যায় তার এক-একটা লম্বায় ৯৫ ফিটেরও বেশি। এই রকম একটি তিমির ওজন প্রায় ১৫০ টন, অর্থাৎ ৪০০০ মনেরও অধিক। সমুদ্রের জলের নিচে কত রকম অদ্ভুত জীবজন্তু বাস করে, যারা দেখেছে তারাই তা বলতে পারে। ডাঙার জীবজন্তুর মধ্যেও রকমারি কম নয়। একবার কোনাে বটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা ঘুরে এলে জীবনলীলার বৈচিত্র্য দেখে আমাদের মন
প্রাণতত্ত্ব
কৌতূহলে ভরে ওঠে। কোনাে বিজ্ঞানী গণনা করে দেখেছেন যে
পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির জীব আছে আড়াই লক্ষ ।
১. প্রাগৈতিহাসিক যুগের অতিকায় জন্তু ডাইনােসর
আমরা এদের সকলকেই জীব বলি কেন। জড়পদার্থের সঙ্গে
এদের কী পার্থক্য। অঙ্গ প্রত্যঙ্গহীন ক্ষুদ্রতম জন্তু যে অ্যামিবা
( Amoeba ), আর জটিল শারীরিক সম্পন্ন যে মানুষ এই
উভয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত কোনাে যােগ যে থাকতে পারে, সহজে
তা মনে হয় না। নটে শাক আর তালগাছ, পুকুরের পুটিমাছ
আর সমুদ্রের তিমি, মশা আর হাতি, ইদুর আর মানুষ, এরা সবাই
জীব, সকলেরই প্রাণ আছে। ইট, পাথর বা একটুকরা লােহার
সঙ্গে এদের তফাত কোথায়। এদের প্রাণ আছে অন্যদের প্রাণ
নেই বললে কিছু বলা হােলাে না, প্রাণের লক্ষণগুলি কী। প্রথমেই
প্রাণের লক্ষণ বলতে ইচ্ছে করে ইটপাথর জড়পদার্থ, অর্থাৎ চলতশক্তিহীন; আর প্রাণীরা নড়েচড়ে বেড়াতে পারে; কিন্তু তালগাছ কি চলাফেরা করতে পারে। তাহলে তাে ঠিক জবাব দেওয়া হােলাে না, আরাে ভালাে করে ভেবে দেখতে হবে। তলিয়ে দেখলে দেখব প্রাণীমাত্রেরই তিনটি বিশেষ লক্ষণ আছে : (১) আঘাত পেলে তারা সাড়া দেয়। (২) তারা বাইরের থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে সেই খাদ্য পরিপাক করে শরীরের নিত্য পরিবর্তন ঘটাতে থাকে। (৩) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তারা বাড়তে থাকে এবং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ভাগ করে আরাে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করে। অভিঘাতের প্রত্যুত্তর চিমটি কাটলে চেঁচিয়ে উঠি, আগুনের ছেকা লাগলে হাত টেনে নিই, ঠাণ্ডা লাগলে হাঁচতে থাকি, আফিম খেলে ঝিমােই- এ সবই বাইরে থেকে নানারকম অভিঘাতের রকমারি সাড়া বা প্রত্যুত্তর। শরীরের সাড়া দেবার এই প্রণালীর সঙ্গে আমাদের ইচ্ছাশক্তির যােগ নেই। সহজেই তার প্রমাণ পাই ; চেয়ারে বসে পা বােলানাে অবস্থায় কেউ যদি হাঁটুর ঠিক নিচে একটা ঘা মারে তবে ইচ্ছে করি বা না করি আমার পা লাথি মারবার প্রাণতত্ত্ব মতে ভঙ্গীতে সামনের দিকে লাফিয়ে উঠবে। যতবার এই- রকম আঘাত করা যাবে ততবারই লাফাতে থাকবে। আঘাত সব সময় প্রত্যক্ষ না হতে পারে। চারদিক থেকে আমরা কত রকম অভিঘাত অগােচরে পাই তা খেয়াল করিনে, অনেক বিষয় আমাদের সহজে জানবার উপায় নেই। আলো- অকার, ঠাণ্ডা-গরম, জল-হাওয়া, আবহাওয়ার বা ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের দেহের যে নিগুঢ় সম্বন্ধ তা কতকটা আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু যে-জমিতে বাস করি, সেটা জল শুকননা, সমুদ্র থেকে তার উচ্চতা কতটা, তার মাটির গুণাগুণ কী এই সব পারিপার্শ্বিক অভিঘাতে আমাদের শরীর কী রকম সূক্ষ্মভাবে প্রত্যুত্তর দিচ্ছে, তা কি আমরা প্রত্যহ অনুভব করি। মানুষের কথা এতক্ষণ বললুম কিন্তু এমন প্রাণী নেই যে বাইরের অভিঘাতে কোনাে না কোনাে সাড়া না দেয়। অ্যামিবার একটি সেলের (cell) কোনােখানে যদি পিন দিয়ে সামান্য খোচা দেওয়া যায় তো সে তার দেহ খুনি সংকুচিত করে ফেলে। লজ্জাবতীলতার যে-কোনো জায়গায় জ্বালানো দেশলাইয়ের কাঠি মুহুর্তের জন্য যদি ধরা যায় তবে একটু পরেই পাতাগুলি মুড়তে আরম্ভ করে এবং ক্রমশ পাতার ডালগুলি মুয়ে পড়ে। ব্যাঙের পায়ের একটি পেশী ( muscle) কেটে বের করে দুদিকে টেনে বেঁধে রেখে যদি এক প্রান্তে বৈদ্যুত প্রবাহ চুইয়ে দেওয়া যায় তবে তৎক্ষণাৎ সেটা অন্যদিকে সিটকে টেনে নেয়।
প্রাণের লক্ষণ চোখে দেখতে না পেলে যে সাড়া দিল না সে ভুল করলে চলবে না। লজ্জাবতীলতার উদাহরণ দিলুম কারণ তা সকলেরই পরিচিত এবং তার সাড়া দেওয়া পরখ করা সহজ বলে ; কিন্তু প্রত্যেক গাছই উত্তেজনা পেলে সাড়া দিয়ে থাকে। লজ্জাবতীর মতাে তাদের সকলের পাতা নাড়বার কলকবজা নেই, তাই তাদের সাড়া দেওয়া আমরা চোখে দেখতে পাই না, সাড়া যে দেয় তা জানতে গেলে আমাদের অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখতে হবে। সবচেয়ে ভালাে দেখা যাবে জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে। অপঘটন (Katabolism) ও উদঘটন (Anabolism) আমরা খাই বল পাবার জন্য ; চলে ফিরে, হেসে কেঁদে, কথা কয়ে, বই পড়ে প্রতি মুহুর্তে সেই বল ক্ষয় করতে থাকি। সঞ্চিত শক্তি সম্পূর্ণ ক্ষয় হবার আগেই আবার আহারের চেষ্টা দেখতে হয়। একদিকে শক্তি সঞ্চয় অন্য দিকে সেই শক্তি ক্ষয় করা, একেই এক হিসাবে জীবনধারণ বলা যেতে পারে। উপার্জন করি ব্যয় করার জন্য, ব্যয় করি বলেই আবার উপার্জন করতে হয়। শক্তি আমাদের কাছে নানান স্মৃতি নিয়ে প্রকাশ পায়। সূর্য থেকে আলাে আর উত্তাপ এই দুই শক্তি পৃথিবীতে এসে পড়েছে। আকাশে বৈদ্যুতশক্তি রয়েছে, বাজ পড়লে আমরা তার প্রকোপ প্রাণতত্ত্ব অনুভব করি। উপযুক্ত প্রণালী আবিষ্কার করতে পারলে বিজলি- বাতি জ্বালানাে, ট্রাম-রেলগাড়ি চালানাে এমন কি পৃথিবীতে যত কিছু কলকবজা আছে সবই চালাবার মতো যথেচ্ছ পরিমাণ বৈদ্যুতশক্তি আমরা আকাশ থেকেই আহরণ করতে পারি। আলাে উত্তাপ বিদ্যুৎ ছাড়াও শক্তির পরিচয় দেখি চুম্বকের আকর্ষণ করার ক্ষমতায়, মৌলিক পদার্থের রাসায়নিক ক্রিয়ার মধ্যে, পৃথিবীর মহাকর্ষণশক্তিতে। এ সবই হােললা প্রকাশের বিভিন্ন রূপ, একই শক্তি নানারূপে আমাদের কাছে ধরা দিচ্ছে। সেইজন্য, আশ্চর্য হবার কিছুই নেই যদি এক শক্তিকে অন্য শক্তিতে পরিবর্তন হােতে দেখি। সর্বদাই তা ঘটছে এবং আমরা ইচ্ছা করলেই সেই রকম পরিবর্তন ঘটাতেও পারি। কয়লার আগুন দিয়ে জল গরম করছি এঞ্জিন চালাবার জন্য, উত্তাপশক্তি তাতে চলৎশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বিদ্যুৎ দিয়ে আলো জ্বালাই। পেট্রোল পুড়িয়ে মােটরগাড়ি চালাই। এক শক্তিকে যেমন অন্য শক্তিতে পরিবর্তন করা যায় তেমনি তাকে সঞ্চয় করে লুকিয়ে রাখাও চলে-লােহার সিন্দুকে টাকা পুরে রাখার মতাে। সামান্য একটু বারুদের মধ্যে কত শক্তি লুকানাে আছে তার প্রমাণ পাই যখন দেখি বন্দুকের গুলি অতি অল্প সময়ের মধ্যে দু-চার মাইল অতিক্রম করে চলে যায়। প্রত্যেক যৌগিক পদার্থের মধ্যে এই রকম চাপা শক্তি লুকানাে আছে। কোনাে কারণে যখন তাদের যৌগিক অবস্থা ভাঙা যায় তখনই পাওয়া যায় তাদের শক্তির পরিচয়। একটা প্রাণের লক্ষণ উদাহরণ দিলে কথাটা পরিষ্কার হবে। আঙুর প্রভৃতি ফলের রসে গ্লুকোজ (glucose) ব'লে যে চিনি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় তার রাসায়নিক গঠন হচ্ছে 06 H2 0% । এই চিনির একটি অণুর (molecule) মধ্যে ৬ ভাগ কার্বন, ১২ ভাগ হাইড্রোজেন ও ৬ ভাগ অক্সিজেন আছে। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে হাওয়া থেকে অক্সিজেন ফুসফুসের মধ্যে নিচ্ছি, সেই অক্সিজেন রক্তের ভিতরে যাচ্ছে। অক্সিজেনের গুণ এই যে, সে যে-কোনাে পদার্থের সংস্পর্শে আসে তার সঙ্গে মেলবার চেষ্টা করে। গুকোজ খেলে পেটের ভিতর বক্তের অক্সিজেন ঐ চিনির ৬ ভাগ কার্বনকে ছিনিয়ে নিয়ে কার্বন-অক্সিজেন মিশ্রিত কার্বন ডাই-অক্সাইড (c02) গ্যাস তৈরি করে। বাকী থাকে দু-ভাগ হাইড্রোজেন (H,) ও একভাগ অক্সিজেন (o), তার থেকে কয়েকটি জলের অণু (H, ০) প্রস্তুত হয়। চিনির প্রত্যেক অণুকে এইভাবে ভাঙা ও গড়ার মধ্যে অনেকখানি শক্তির উদ্ভব হয় নিশ্চয়ই। চিনি খেয়ে সেই শক্তি আমরা ব্যবহার করি আমাদের শরীর গরম রাখবার জন্য বা অন্য কাজে। কাজের সুবিধার জন্য সংকেত ব্যবহার করা বিজ্ঞানে খুব প্রচলিত। অঙ্গারগ্যাস বা কার্বন-ডাই-অকসাইড গসি এতবড়াে কথা সদা ব্যবহার না করে c) বলা বা লেখা কি সুবিধাজনক নয়। রাসায়নিক প্রব্যের সাংকেতিক চিহ্নের আর-একটি মন্ত সুবিধা-দেখলেই বােঝা যায় তার ভিতর কী কী মৌলিক পদার্থ কত পরিমাণে আছে। যেমন co, দেখলেই জানতে পারি অরিগ্যাসের প্রত্যেক অণুতে একটি কার্বন C ও দুটি অক্সিজেন 0; পরমাণু আছে। ৭ প্রাণতত্ত্ব আমরা যেসব জিনিস খাই তার প্রত্যেকটায় কতখানি উত্তাপশক্তি লুকানাে আছে তা পরিমাপ করা শক্ত নয়। সেই বস্তুগুলি খেলে শরীরে যে উত্তাপ জন্মায় তাও মাপ করা যায়। সুক্ষ্মভাবে মেপে দেখা গেছে এই দুইয়ের মধ্যে নিখুত সামঞ্জস্য তাহলে দেখা যাচ্ছে জন্তুরা কোনাে অবাস্তব উপায়ে শক্তি সংগ্রহ করে না, তারা নড়াচড়া চলাফেরা দৌড়াদৌড়ি যা-কিছু শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম করে তার উপযােগী শক্তি কতকগুলি খাদ্যবস্তু থেকে সংগ্রহ করে। গাছপালা খাবার জন্য নড়েচড়ে বেড়াতে পারে না, তাই তাদের অন্যরকম উপায় অবলম্বন করতে হয়। তাদের যা-কিছু খাদ্য তারা মাটি থেকে নেয়। মাটি থেকে যেসব আহার্য পায় তা জন্তুদের খাদ্যের মত তৈরী জৈব পদার্থ (protein, carbohydrate বা fat) নয় যাকে অক্সিজেন দিয়ে ভাঙলেই রাসায়নিক শক্তির উদ্ভব হােতে পারে। উদ্ভিদের পদ্ধতি এই : মাটিতে যেসব ধাতব পদার্থ আছে, জলের সঙ্গে গুলে তা উপরের দিকে পাতার তার ভিতর টেনে তােলে। সেখানে পাতার চার পাশের হাওয়াতে যে অঙ্গারপদার্থ (কার্বন) আছে সুর্য- রশ্মির সাহায্যে তার সঙ্গে মিশিয়ে কার্বোহাইড্রেটের ন্যায় জটিল জৈব পদার্থ তৈরি করে জমিয়ে রাখে। শক্তিব্যয়ের প্রয়ােজনের সময় এই জটিল বস্তুগুলিকে আবার অক্সিজেন দিয়ে ভেঙে ফেলে। এই রকম ভাঙা ও গড়া ক্রমাগত চলে। তাকেই আমরা অপঘটন ও উদঘটন বলেছি।
প্রাণের লক্ষণ
জন্তুর প্রােটিন কার্বোহাইড্রেট প্রভৃতি কতকগুলি জটিল জৈব
পদার্থ নিয়েই পুষ্টির কাজ শুরু করে আর উদ্ভিদ সহজ খনিজ পদার্থ
নিয়ে তাকে গােড়ায় জৈব পদার্থে পরিণত করে, তারপরে করে
ভাঙাচোরা। মােটের উপর জীবমাত্রেরই শরীরের মধ্যে অবিরাম
ভাঙা ও গড়া (অপঘটন ও উদ্ঘটন) চলতে থাকে, যখন গড়ার
ভাগ বেশি চলে তখন সে বাড়তে থাকে, ভাঙার ভাগ বেশি
হােলে তখন হয় তার ক্ষয়।
জীবের এই যে অপঘটন এবং উদঘটনের ক্ষমতা, জড়ের মধ্যে
তা দেখা যায় না। তর্ক ভােলা যেতে পারে যে মিছরির দানা তো
জীবেরই মতাে বাইরে থেকে খােরাক সংগ্রহ করে নিজের
আয়তন বাড়াতে
পারে।
সত্যই স্ফটিক (crystal)
জাতীয় দ্রব্যের বাড়বার এই ক্ষমতা জীবধর্মের এত কাছাকাছি
আসে যে প্রাণতত্ত্ববিদেরা এক-এক সময়ে মনে করেছেন,
জীবনপ্রণালীই হয়তাে স্ফটিকীকরণের-ক্রিস্টেলিজেশনের
( crystallisation) একটা রূপান্তর। কিন্তু মিছরির দানা
বাড়ে ক্রমাগত বাইরের যােগে, জীবকোষ বাড়ে ভিতর থেকে।
(Growth ), faetera ( Multiplication )
ও প্রজনন (Reproduction)
খাদ্য থেকে জীব যে কেবল শক্তি সঞ্চয় করে তা নয়, তার
বাড়বার উপাদানও সংগ্রহ করে। বৃদ্ধির মূল কথা হচ্ছে ব্যয়ের
চেয়ে আয় বেশি হওয়া। কেবল জীবনরক্ষার জন্য যেটুকু খেলেই
প্রাণতত্ত্ব চলে বাড়বার জন্য আমাদের তার চেয়ে বেশি খেতে হয়। প্রাণীমাত্রেরই উৎপত্তি একটিমাত্র অতি ক্ষুদ্র জীবকোষ (cell) থেকে। সেই একটি সেল থেকে দুটি, দুটি থেকে চারটি এই রকম বাড়তে বাড়তে লক্ষ লক্ষ জীবকোষের সমষ্টিতে আমাদের দেহ গড়ে উঠেছে। মানুষের বেলায় একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির আয়তন তার আদিম বীজকোষের তুলনায় ১৫, ৩০০,০০০ গুণ বড়াে। সেই একটি জীবকোষকে বিশ-পঁচিশ বছরের মধ্যে তাহলে কতখানি বহুগুণিত হােতে হয়েছে। জীবকোষের নিজেকে দ্রুত ভাগ করবার ক্ষমতা লক্ষ্য করলে আশ্চর্য হােতে হয়। প্যারামেসিয়াম ( Paramecium ) নামে প্রােটোজোয়া (Protozoa) জাতীয় জীবাণুর সেল এক ইঞ্চির এক শত ভাগের বেশি লম্বা নয়। তার একটিমাত্র জীবাণু নিয়ে এক বাটি জলের মধ্যে যদি ছেড়ে দেওয়া যায় তবে সাত দিন পরে গুণতি করলে দেখা যাবে সেই একটি থেকে ১০লক্ষ জীবাণু জন্মেছে। চোখে দেখা যায় না এমন জীবাণুদের কথা ছেড়ে দিলেও অনেক জাতের পােকামাকড় আছে যারা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। দেয়ালি পােকার কথা আমরা সকলেই জানি। দেয়ালি পােকার একটিমাত্র জননীর যত সন্তানসন্ততি হয় তারা যদি সকলেই বেঁচে থাকত এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারত তবে দু-তিন মাসের মধ্যে ভারতবর্ষের ৩০ কোটি লােককে চাপা দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা তাদের পক্ষে কিছুমাত্র অসম্ভব হােত না। সেল বাড়ে নিজেকে ভাগ করে করে। বেলুনের মতাে প্রাণের লক্ষণ ফুলে উঠে’ ক্রমাগত তার নিজের আয়তন বাড়িয়ে যায় না, খেয়ে পুরােপুরি পুষ্টিলাভ করলেই সে নিজেকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। খণ্ডগুলি আবার নিজেদের ভাগ করতে থাকে, এই রকমে খুব দ্রুত তাদের বৃদ্ধি চলে। তা যদি না হােত তাহলে আমরা সকলেই এক-একটা মস্ত ফুটবলের মতাে হতুম, হাত-পা নাক-কান কোনাে অঙ্গপ্রত্যঙ্গই বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারত না। জীবনের ধর্ম বাড়া, কিন্তু তাই যদি একমাত্র সত্য হােত তাহলে কী ব্যাপার বঁড়াত, সেটাও একটা ভাববার বিষয়। আমরা সব তালগাছ ছাড়িয়েও উচু হয়ে উঠতুম, আমাদের নাক বলত হাতির শুড়ের চেয়ে লম্বা হব, হাত বলত কৈলাস পাহাড় থেকে পাথর কুড়িয়ে আনব, কয়েকদিনের মধ্যেই পৃথিবীতে আর স্থান সংকুলান হােত না। তাই বাড়ার সঙ্গে আছে থামা। জীবনপ্রণালীতে বাড়া এবং ঠিক সময়ে থামা, দুইই প্রয়ােজন। খুব নিচের স্তরের জীবজন্তু নিজেকে দু-ভাগ করে প্রজনন- ক্রিয়া সম্পন্ন করে। এ-স্থলে বৃদ্ধির সঙ্গে প্রজননের বিশেষ তফাত নেই। অ্যামিবার একটা সেল পূর্ণবয়স্ক হােলেই নিজেকে দু-ভাগ করে। বাচ্ছা-সেলটি তখন আবার বড়ো হােতে থাকে, সম্পূর্ণ পরিপুষ্ট হােলেই ভাগ হয়ে চারটে হয়ে যায়। এদের কোনাে অবয়ব নেই, এরা যে-সে রকমে ভাগ হােতে পারে, কিন্তু উচ্চস্তরের জীবের পক্ষে এত সহজ উপায়ে বংশরক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই প্রজননের কাজে এদের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ এই দুই শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। শরীরের মধ্যে দুটিমাত্র সেল ভার ১১ প্রাণতত্ত্ব নিয়েছে প্রজনন-ক্রিয়ার। পুরুষের শরীরের একটি জননকোষ (germ cell) স্ত্রীর শরীরের অন্তঃস্থিত ডিম্বকোষের ( eggse ur to ২. অ্যামিবার বিভাজন নিম্নস্তর জীবের -যৌন জনন-প্রণালী cell) সঙ্গে যেই মিলিত হয় অমনি সেই ডিম্বকোষটি বাড়তে থাকে এবং ভাগ হােত থাকে অ্যামিবার সেলেরই মতাে। এই রকমে সৃষ্টি হয় নূতন প্রাণী। প্রজননের ইচ্ছা জীবমাত্রেই অন্তনিহিত। এই উপায়ে বংশ- বৃদ্ধি করার চেষ্টার মূলে রয়েছে মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়া, নিজেকে অমর করা। বাড়বার ক্ষমতা হােললা গােড়াকার কথা। কিন্তু বাড়ার সীমা নিদিষ্ট থাকাতে এক জায়গায় এসে সব থেমে যায়, প্রাণের লক্ষণ জীবন তা মানতে চায় না, সে যে অসীমের পিয়াসী, মৃত্যুকে সে অতিক্রম করবেই। নিজেকে আর বাড়াতে না পেরে সে যেন তখন সন্তানসন্ততির মধ্য দিয়ে নিজেকেই নতুন করে সৃষ্টি করে। উচ্চস্তরের জীবের মধ্যে এই সৃষ্টিকার্য একাকী হয় না, দুজন না হলে বংশরক্ষা হয় না। স্ত্রীকে পুরুষের সাহায্য নিতে হয়, পুরুষকে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হােতে হয়। প্রকৃতি পুরুষের লীলা এইখানেই—তার বিরােধে, তার মিলনে। ১৩
জীবকোষ
জীবকোষের দেহ
অধিকাংশ জীবকোষ খুব ছােটো, এত ছােটো যে খালি-চোখে
নজরে পড়ে না। এইজন্য অণুবীক্ষণ আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত
জীবের শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞান খুব সীমাবদ্ধ ছিল।
১৬৬৭ খ্রীস্টাব্দে Hooke নামে একজন ইংরেজ বৈজ্ঞানিক
উদ্ভিদের একটুখানি অংশ অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখবার চেষ্টা
করেছিলেন। তিনি দেখলেন অসংখ্য চৌকো চৌকো বাক্স
পাশাপাশি ইটের মতাে সাজানাে। তার ধারণা জন্মাল সব
জীবকোষই চৌকো বাক্স বা ঘরের মতাে তাই তার নাম দিলেন
সেল কথাটার আসল মানে হচ্ছে দেয়াল দিয়ে ঘেরা
ছােটো কুঠরি। উদ্ভিদ পরীক্ষা না করে তিনি যদি কোনাে জন্তুর
দেহাংশ দেখতেন তাহলে তার ভিতর এই রকম বাক্স-চেহারা সেল
ঠার নজরে পড়ত না, কেননা জন্তুদের অধিকাংশ জীবকোষের
দেয়ালের মতো খােলস নেই, তাদের আকৃতিও সব সময়ে চৌকো
নয়। সে যাই হােক, মােট কথা অণুবীক্ষণ না হলে জীববিজ্ঞান
বেশি দূর অগ্রসর হােত না।
এই যন্ত্রটির যত উন্নতি হচ্ছে এই
বিষয়ে আমাদের জ্ঞানও তত প্রসার লাভ করছে। ভালো
অণুবীক্ষণের ভিতর দিয়ে যেকোনাে জিনিস হাজার গুণেরও বেশি
১9
জীবকোষ
বড়ো করে দেখতে পাওয়া যায়। খুব অল্প জিনিসই আছে যা
এখন আমাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। অণুবীক্ষণ দিয়ে
কেবল যে সেলের উপরিতলের চেহারা দেখতে পাই তা নয়, তার
ভিতরে যেসব অতি সূক্ষ্ম অবয়ব রয়েছে তাদের বিষয়েও সুস্পষ্ট
ধারণা করতে পারি।
এর থেকে মনে করা
চ
ঠিক নয় যে সেল মাত্রই
আমাদের ইন্দ্রিয়গােচর
নয়; সে এমন একটা
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম
বিজ্ঞানীরাই কেবল যন্ত্র
সাহায্যে দেখতে পান।
সদ্যোজাত পাখির ডিম
যাতে ভাবী প্রাণের
সঞ্চার হয়নি, একটি
৩. জন্তুদের সেলের বহুগুণিত
অখণ্ড জীবকোষ।
সেল মাত্রেরই প্রধান
ক. সেনটোসোম খ. কোষকেন্দ্রিক
হচ্ছে
খানিকটা
গ. সাইটোপ্লাজম ঘ, হাওয়া-ভরা বুদবুদ
হড়হড়ে জেলির মতো উ. কোষকে চ, পাতলা আবরণ
জিনিস যার নাম প্রােটোপ্লাজম (protoplasm)। অণুবীক্ষণ
দিয়ে প্রােটোপ্ল্যাজম ভালাে করে দেখলে তার ভিতর দেখতে
পাব :
নমুনা।
প্রাণতত্ত্ব . (১) খানিকটা স্বচ্ছ জলীয় অংশ যার নাম সাইটোপ্লাজম (cytoplasm ), (২) তার মধ্যস্থিত বিন্দু-আকার কোষকেন্দ্র (nucleus)। (৩) তারই পাশে আরাে ক্ষুদ্র তারার মতাে দেখতে একটি বিন্দু—সেনট্রোসােম (centrosome)। সাধারণত উদ্ভিজ্জ সেলে সেটাসেম দেখতে পাওয়া যায় না। (৪) কোষকেন্দ্রের মধ্যে ধুলাের কণার মতাে কখনাে বা পাকানাে দড়ির মতো কতক গুলি ক্ষুদ্রকায় বস্তু যার নাম Cupcatcate ( chromosome ) (৫) এই সব পদার্থ আবদ্ধ করে রাখে যে খােলস- (cel wall)। গাছগাছড়ার সেলেই কেবল শক্ত পুরু খােলস দেখা যায়। উল্লিখিত সেলের বস্তুসমষ্টির মধ্যে কোষকেন্দ্র হচ্ছে সবচেয়ে প্রধান বস্তু। সাধারণত এর আকৃতি গােল বা ডিমের মতাে। খুব ভালাে করে দেখলে কোষকেন্দ্রের মধ্যেও আবার খুব ছােটো ছােটো সরষে-দানার মতো দুটি নিউক্লিওলাই (nucleoli ) দেখতে পাওয়া যায়। এই দুটি একমুহূর্তও স্থির থাকে না, শুধু তাই নয় এদের আকৃতিরও সর্বদা পরিবর্তন হয়। সেল সাধারণত এত ছােটো যে এদের প্রায় ২৫০ টা পর-পর এক লাইনে সাজালে এক ইঞ্চি মাত্র জায়গা জোড়ে। কিন্তু এইটুকু পরিধির মধ্যে তারা এক-একটি পরিপূর্ণ জগৎ। ছােটো পৃথক ও স্বাধীন ভাবে জীবন যাপন করার পূর্ণমাত্রায় জীবকোষ ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু যখন তারা অনেকে একত্রে মিলে একটি প্রাণী গড়ে তােলে তখন সৈন্যদলের মতে। তারা দলবদ্ধভাবে সুনিপুণ শৃঙ্খলার সঙ্গে চলতে পারে। আমাদের শরীরের সঙ্গে ইটের তৈরী ঘ বাড়ির উপমা সহজেই মনে আসে, কিন্তু উপমাটা ঠিক খাটে না। কেননা বাড়ির ইটগুলি জড় বস্তু, একটা ইটের সঙ্গে আর- একটার কোনাে পার্থক্য নেই, কিন্তু যে-বস্তু দিয়ে ৪. উদ্ভিদের সেলের বহু গুণিত নমুনা মানুষের শরীর গড় তার কোষকে খ, ফাকা জায়গা প্রত্যেকটিই জীবন্ত এবং গ. সাইটোপ্লাজম পুরু আবরণ বৈশিষ্ট্যযুক্ত। প্রত্যেক সেলের পৃথক সত্তা আছে যেমন বলা হােলাে, তার কোনাে একটি অবয়ব সম্বন্ধে তা বলা যায় না। অর্থাৎ সেল পৃথকভাবে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু তার কোনাে অংশ তা পারে তাহলে দাড়াচ্ছে জীবনের আসল ভিত্তি হােলাে সেল। যে-কোনাে বড়ােগোছের প্রাণীর শরীরে কত সেল আছে শুনলে আশ্চর্য বােধ হবে। মানুষ খুব বড়াে জন্তু নয়—তবু একটি মানুষের রক্তের ভিতর ১৫,০০,০০০ সেল আছে, তার মগজ ১৭
প্রাণতত্ত্ব
২,০০০,০০০,০০০ সেল দিয়ে তৈরী আর তার শরীরে সর্বসমেত
থাকতে পারে, ১,০৩,
৩,০০,০০ সেল।
প্রত্যেক জীবের মধ্যে এত কোটি কোটি সেল সুশৃঙ্খলভাবে
এক নিয়মে চলে, এ বড়ো সহজ কথা নয়। একটি সাম্রাজ্য চালনা
৫. সেলের আকৃতি নানাবিধ হােতে পারে। কয়েক রকম নমুনা
করা এর কাছে কত তুচ্ছ। কিন্তু আরাে আশ্চর্যের বিষয় এই
যে, এতবড়ো জগতের অধীশ্বর হয়েও জীব অধিকাংশ সময়ে
সে-বিষয়ে সচেতন নয়, তার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে এই রাজকার্য
চলতে থাকে।
জীবকোষ বিভাজন ও প্রজনন প্রাণতত্ত্বের একটি গােড়াকার কথা হােললা প্রাণীই প্রাণীর জন্মদাতা, অর্থাৎ কোনাে জীব আপনা থেকে জন্মাতে পারে না, বা জড়পদার্থের সংমিশ্রণে তাকে গড়া যায় না, জীব থেকেই জীবের সৃষ্টি হয়। এই সৃষ্টির প্রণালী-বিভাজন। এককোষী জীবেরা বংশবৃদ্ধি করে খুব সহজে। পূর্ণ বয়স প্রাপ্ত হােলেই তারা নিজেকে দু-ভাগ করে। বিভক্ত অংশটি বড়াে হয়ে উঠলেই তারা আবার নিজেদের দু-ভাগ করে ফেলে—দুটি থেকে চারটি, চারটি থেকে আটটি, আটটি থেকে যােলােটি এই রকম করে ক্রমাগত বেড়ে যায়। মা’র শরীরের অভ্যন্তরে অণ্ডকোষের একটিমাত্র সামান্য সেল এই প্রণালীতে সংখ্যা বৃদ্ধি করেই আমাদের এতবড়ো শরীর গড়ে তােলে। ভাগ হবার সময় জীবকোষের ভিতরে অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই সময় কতক্ষণ স্তব্ধভাবে থাকার পর সাধারণত সে গােলাকার হবার চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে কোষ- কেন্দ্রিকা দুটি অদৃশ্য হয়ে গিয়ে তাদের জায়গায় কোষকেন্দ্রের ভিতর কালো কালো গুড়ো দানার মতাে কতকগুলি বস্তু ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। ক্রমশ সেগুলি গায় গায় লেগে সরু মতো আকার ধারণ করে এবং অস্থির প্রাণতত্ত্ব হয়ে ঘুরে বেড়ায়। একটু পরে আবার স্থির হয়ে জোড়া লেগে অপেক্ষাকৃত মােটা এবং ছােটো ছােটো কয়েকটা কাঠির আকারে দু-দিকে লাইন দাড়ায়। এইগুলি ক্রোমাে- করে সােম। ক্রোমােসােমের নাম আমাদের মনে রাখতে হবে। প্রজনন প এবং বংশানুক্রম ব্যাপারে ক্রোমােসােম এইগুলির বিশেষ ক্রিয়া দুই হাজার গুণেরও অধিক বড়াে লক্ষ্য করার প্রয়োইন ক'রে দেখান ক. মানুষের সেলে ৪টি থাকে আছে। ক্রোমােসােমলি থ, ব্যাঙের সেলে ২৬টি সুস্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষকেন্দ্র গলে গিয়ে সাইটোপ্ল্যাজমের সঙ্গে মিশে যায় । কোষকেন্দ্র বলে তখন আলাদা কিছু থাকে । তার পরিবর্তে সেলের দুই মেরুতে দুটি তারার মতাে বস্তু দেখা দেয় এবং সেই তারা দুটিকে খুটি করে সরু সুতাের একটা লাটিমের মতাে জিনিস (spindle ) ক্রমশ গড়ে ওঠে। এই লাটিমকে সমান দু-ভাগে ভাগ করে মাঝখানে ক্রোমােসােমগুলি লাইন করে দাড়ায়। পরিবর্তনের সুত্রপাত থেকে এই অবস্থায় পৌছতে ৮ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। এতক্ষণ বিভাজনের জন্য সেল নিজেকে প্রস্তুত করছিল মাত্র, এইবার আসল বিভাজনের প্রক্রিয়া শুরু
জীবকোষ
৭. সেলের বিভাজন-প্রণালী
জন্তুর দেহকোষ দেখে নকশা করা
ক. সেন্টোসােম খ. কোষকে গ. কোষকেন্দ্রিকা দ. ক্রোমোসোম
3. ক্রোমোসোমগুলি ভাগ হয়ে দুই লাইনে দাড়িয়েছে চ. ক্রোমােসোমের দুই ভাগ
দুই মেরুর দিকে সরে গেছে ও সেলের কোমর সরু হােতে আরম্ভ করেছে-
বিভাজনের পূর্ব অবস্থা
-
প্রাণতত্ত্ব হয়। ক্রোমোেসােমগুলি দু-ভাগ হয়ে ডবল লাইনে তথন দাড়ায়। লাটিমের সুতােগুলি ক্রোমােসসামের এক-একটি লাইনকে তাদের দিকের তারার কাছে যেন টানতে থাকে, লাইন দুটির মাঝে ফাক বাড়তে বাড়তে দু-দল ক্রোমােসােম ও দুটি তারা সেলের দুই মেরুতে গিয়ে জড়াে হয়। যখন ভিতরে এই ব্যাপার চলছে সেলের বাইরের আকারেরও পরিবর্তন হােতে থাকে। সেলের বাইরেকার খােলস (cell wall) হঠাৎ অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং নানাদিকে ঠেলাঠেলি করে শেষে কোমরের কাছটা সংকুচিত করতে থাকে। কোমর সরু হােতে হােতে সেলের দুই অংশ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই রকম করে পূর্ণ- বয়স্ক একটি সেলের শরীর ভেঙে দুটি বাচ্ছা-সেল এতক্ষণে তৈরি হয়। সম্পূর্ণ বিভিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রোমােসােমগুলি অনেক সময় মিলিয়ে যায় এবং কোষকেন্দ্র আবার গড়ে ওঠে। উল্লিখিত প্রণালীতে একটি থেকে দুটি সেল জন্মাতে সব সমেত আধঘণ্টা আন্দাজ লাগে। নৃতন বাচ্ছা-সেলদের মধ্যে কোষকেন্দ্র গড়ে উঠতে আরাে প্রায় দু-ঘণ্টা লেগে যায়। সেলের বিভাজন-প্রণালীর যে-বিবরণ দেওয়া গেল সাধারণ পাঠক যদি তার সব কথা মনে না রাখেন তবে ক্ষতি নেই। এই প্রণালীর মধ্যে মুখ্যভাবে একটি বিষয় বিশেষ লক্ষ্য করবার আছে। বিভক্ত হবার আগে সেল চেষ্টা করে তার ভিতরকার বস্তু-অংশকে নানা উপায়ে উলটেপালটে খুঁটে ফেলবার। খাবার আগে শিশি ঝাকিয়ে আমরা যেমন ওষুধ ২২ জীবকোষ ভালো করে ঘুলিয়ে নিই, তেমনি সেলও তার প্রাণবস্তু মাখামাখি করে মিশিয়ে নেয়। তার পর যখন ভাগ হয় একেবারে নিক্তির ওজনে সমান ভাগে ভাগ হয়। এত কাণ্ডকারখানার মধ্যে বিশেষ লক্ষ্য করবার বিষয় হচ্ছে এই যে, ক্রোমােসােমগুলি সংখ্যায় ডবল হয়ে গিয়ে বিভাজনের অনতিপূর্বে অর্ধেক একটি তারার দিকে, বাকি অর্ধেক অন্য তারার দিকে, মাতৃকোষের দুই সীমান্তে জড়ো হয়। এইভাবে মাতৃকোষের শরীরবস্তু উত্তরাধিকারসূত্রে সন্ততিদের মধ্যে সমানভাগে বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়। প্রােটোপ্লাজমের সমগ্র প্রথমে ওলটপালট হয়ে মেশা, পরে সমান দুই ভাগে ভাগ হওয়া—বিভাজন-প্রণালীর এই হােলাে সারমর্ম এবং আমাদের এই কথাটাই মনে রাখলে চলবে। প্রাণবান ও জড় বস্তুর বৃদ্ধির মধ্যে এইখানে মস্ত তফাত। একটা বাড়ি বড়ো করে তুলতে গেলে ক্রমাগত একটার পর একটা ইট সাজাতে হয়। বাইরে থেকে বস্তুপুঞ্জের যোগে তার আয়তন বৃদ্ধি হয়। কিন্তু প্রাণীমাত্রেই নিজের বুদ্ধিসাধন করে ভিতর থেকে।
প্রাণতত্ত্ব
এককোষী থেকে বহুকোষী জীবের উৎপত্তি
গাছপালা জন্তুজানােয়ার ইত্যাদি সব রকমের জীবই অতিশয়
ক্ষুদ্র সেলের সমষ্টি। একটা বাড়ি যেমন হাজারাে ইট দিয়ে তৈরী,
তার প্রত্যেক ইট যেমন আলাদা করে গাথা, কিন্তু সব মিলেই তবে
গােটা দালান; আমাদের শরীর তেমনি কোটি কোটি সেল দিয়ে
গড়া। তারা প্রত্যেকটি প্রাণবান কিন্তু তাদের সকলের সমষ্টিতে
গঠিত হয় সম্পূর্ণ একটি নূতন এবং ভিন্ন প্রাণী। একই রকমের ইট
সাজিয়ে তৈরী প্রত্যেক বাড়িতে যেমন বিভিন্ন রকমের ঘর থাকে,
প্রাণীদেরও তেমনি হরেক রকম অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আছে, কিন্তু সকলেরই
মূলে
সেই
সেল।
এককালে সামান্য আচ্ছাদনের নিচে মানুষ বাস করত, ক্রমশ
চালা ঘর, পাকা দালান, উচ্চ অট্টালিকা গড়ে উঠল।
প্রাণীর ক্রমবিকাশও সেই রকম সামান্য থেকে ; একটিমাত্র সেল
থেকে তার উৎপত্তি, পরে দেখা দিয়েছে এত বিচিত্র রূপের
সৃষ্টি। আদিম অবস্থার জীব কী রকম ছিল তার নমুনা
সৌভাগ্যবশত পৃথিবীতে এখনাে রয়ে গেছে। সোঁতার ধারের
শ্যাওলাপড়া ঘােলা জলের একটি ফোটাকে অণুবীক্ষণ দিয়ে
দেখলে সহজেই নজরে পড়বে তার ভিতর কতকগুলি জীবাণু।
তাদের কোনাে নির্দিষ্ট আকৃতি নেই, হড়হড়ে নালের মতাে
পদার্থ। এই জীবাণুর নাম অ্যামিবা, এর কোনাে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই,
জীবকোষ একটিমাত্র কোষকেন্দ্র সমেত ফোটা প্রােটোপ্ল্যাজম। বিশিষ্ট ইন্দ্রিয়ের অভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস খাওয়া-দাওয়া সব কাজই তাকে অতি সহজ উপায়ে সারতে হয়। এমন কি, জনন- ক্রিয়ার উপায়ও সরল ; বংশ- বৃদ্ধির দরকার হােলে নিজেকে দুখানা করে ফেললেই তার চলে। অত্যন্ত সহজ জীবন-যাপন বলতে হবে। সেইজন্য অ্যামিবা গ আদিম অবস্থাতেই থেকে গেছে, জীবজগতের সবচেয়ে নিম্নস্তরে ৮. অ্যামিবা তার স্থান। একটিমাত্র কোষ ক. সাইটোপ্লাজম খ. কোষ- নিয়ে তার দেহ, বেশি বড়ো গ. খাদ্যদ্রব্য রাখার হেতে পারে না। বিশেষ গত ঘ. হাওয়া ভরা গত কাজের জন্য বিশেষ অঙ্গ নেই বলে জীবনসংগ্রামে পটুতার অভাব। পৃথিবীর আনাচেকানাচে কোনােরকমে সে বেঁচে আছে। এই রকম অ্যামিবার মতাে নগণ্য হয়ে থাকা বেশি দিন চলে না, উন্নতি চাই। উন্নতির প্রথম ধাপ হচ্ছে বড়াে হওয়া। বড়ো কী করে হওয়া যায় তার পরীক্ষা চলতে লাগল জীব- ইতিহাসের গােড়াতেই। দেখা গেল , কেবল আকার বাড়িয়ে বিশেষ লাভ নেই, তাতে বলবৃদ্ধি হয় না। তা ছাড়া একটিমাত্র কোষ কতই বা বড়াে হবে। কেবল সংখ্যা বাড়িয়ে যে বড়ো প্রাণতত্ত্ব হওয়া যায় না, সমবায়ের দ্বারা যে বলবৃদ্ধি হয় এই তথ্যটির উপলব্ধি যেই হােললা তখন থেকেই আসলে জীবজগতের উন্নতি শুরু। পথ খুলে গেল হাজারাে চেষ্টার। অ্যামিবার পরের ধাপেই দেখি কয়েক ব্যাকটিরিয়া ( Bacteria)। তারাও এক কোষী জীব । ০০০০০ ০০০০০ pso শ্রেণীর oooo অনেক সময় দেখা যায় তারা নিজেদের সুবিধার ৯. কয়েক রকম ব্যাকটিরিয়া জন্য দলবৃদ্ধি করেছে সেল পর-পর জুড়ে ; তারা তখন পৃথকভাবে না থেকে কয়েকটিতে মিলে একসঙ্গে বিচরণ করে। কয়েক শ্রেণীর ব্যাকটিরিয়া সেইজন্য দেখতে যেন একহারা মালা বা এক টুকরা শিকলের মতাে। অ্যামিবার মতাে আর-একটি জলজীব—ভলভক্স (volvox)- অন্য উপায়ে বড়ো হবার চেষ্টা করেছে, সেলগুলিকে এলােমেলাে জটলা পাকিয়ে। ব্যাকটিরিয়ার মতাে এদের প্রত্যেক সেলের স্বাধীন সত্তা নেই অথচ তেমন বন্ধনও নেই। একত্রে জড়াে হয়ে থাকার কোনাে বিশেষ সুবিধার আভাস পেয়েই যেন তারা একত্রে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা দেহ গড়ে তুলেছে। অ্যামিবা, ব্যাকটিরিয়া, ভলভক্স প্রভৃতি একেবারে নিম্নস্তর . ২৬
জীবকোষ
ছাড়িয়ে শ্যাওলা ও ছাতা জাতীয় সবজির গঠন পরীক্ষা করলে
দেখতে পাব . তাদের দেহে বেশ বাঁধন ধরেছে, ভলভক্সের
মতাে যেমন-তেমন
জটলা আর নয়,
পাকা গাঁথনির
ইটের মতাে এদের
সেলগুলি কৌশলে
সাজানাে। এমন
পু
কি, সেলগুলি সব
ভলভক্স
এক রকম আর
. জননকোষ
ডিম্বকোষ
নেই, তাদের মধ্যে আকৃতি ও প্রকৃতির ভেদ দেখা দিয়েছে।
ধাপে ধাপে যতই উচ্চস্তরে উঠব সেলদের মধ্যে জাতিভেদের
পরিচয় আরাে বেশি করে পেতে থাকব। যে-অঙ্গের যে বিশেষ
কাজ সেই অঙ্গের কোষগুলিও সেই কাজের উপযােগী হবার চেষ্টা
করে ক্রমাগত। তার জন্য নিজেদের গঠনের অনেক পরিবর্তন
করে নিতে হয়। গাছের বিভিন্ন অঙ্গের কোষ অণুবীক্ষণ
দিয়ে দেখলে দেখতে পাব কাঠের বা ছালের বা পাতার
সেলের বাইরের চেহারার মধ্যে কোনাে সাদৃশ্য নেই, ভিতরের
গঠন অবশ্য সকলেরই এক।
অতি ক্ষুদ্র অ্যামিবার মতাে একটি এককোষী জীব থেকে ক্রমশ
এত বিচিত্র এবং অপেক্ষাকৃত বৃহৎ জীবজন্তুর সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু বড়াে হবার কতকগুলি অসুবিধা আছে। এক একটি সেল
২৭
প্রাণতত্ত্ব
ক্রমবিবর্তনের সর্বপ্রথম ধাপে
অ্যামিবা
১১. নানাপ্রকার সামুদ্রিক জীব
নিম্ন প্রাণীর সহজ সূত্রপাত থেকে জটিলতার পথে প্রগতি
২৮
জীবকোষ নিজেতেই নিজে সম্পূর্ণ। তাকে কোনাে এক জায়গায় ঘা দিলে সমগ্র দেহে তার সাড়া পড়ে যায়। কিন্তু এইরকম অনেকগুলি সেল মিলে যখন একটি দেহ গঠন করে তখন সেলদের পরস্পরের মধ্যে যােগসূত্র কিছু না থাকলে বাইরে থেকে কোনাে অভিঘাত সমগ্রভাবে সে অনুভব করবে কী করে। কয়েকটি সেল হয়তাে খাবার সংগ্রহের ভার নেয় কিন্তু সেই খাদ্য শরীরের অন্য সেলগুলির মধ্যে পৌছয় কী করে। অনেককে নিয়ে কারবার করতে গেলেই রাস্তাঘাট, হাটবাজার, পােস্ট- টেলিগ্রাফ কত কিছুর দরকার পরস্পরের সম্বন্ধ রক্ষার জন্য । এক কথায় এ-রকম ব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে কলেবর-বন্ধন (organisation)। একত্রে থাকতে গেলেই সংঘবদ্ধ হওয়া চাই। এককোষী ছেড়ে জীবজগতে যেই বহুকোষী প্রাণীর আবির্ভাব হােত লাগল তখনই কলেবর-বন্ধনের দিক থেকে দেখতে পাই : (১) দৈহিকক্রিয়া ও জননক্রিয়ার মধ্যে প্রভেদ। জীবন যাপনের দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম চালাবার উপযােগী এক শ্রেণীর সেল ও গুটিকতক সম্পূর্ণ অন্য শ্রেণীর সেল যারা প্রজননে ব্রতী। (২) পরস্পরের মধ্যে যােগসূত্র রক্ষার জন্য একটির সঙ্গে আর-একটি সেলের ধারাবাহিক বন্ধন। নানারকম তন্তু, নালী ও উপনালী শরীরের এই আঙ্গিক যােগ রক্ষা করে। (৩) উল্লিখিত শারীরিক যােগাযােগ ছাড়াও চেতনার যােগ। চেতনাশক্তি সমস্ত শরীরময় ছড়িয়ে দেবার ব্যবস্থার জন্য নার্ভমণ্ডলীর (nervous system ) সৃষ্টি।
প্রাণতত্ত্ব অ্যামিবাজাতীয় এক কোষী জীব ছাড়া অন্য সমস্ত প্রাণীর শরীর বহুকোষে গঠিত বলা হয়েছে। প্রত্যেকটির সেলের স্বতন্ত্র সত্তা আছে, এমন কি মূল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও তারা প্রত্যেকে বেঁচে থাকতে পারে। অথচ এতগুলি আধা-স্বাধীন সেলের সমষ্টিতে গড়া যে-প্রাণী তারও আবার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব আছে। এই ব্যক্তিত্ব এত সুস্পষ্ট যে, একই মায়ের সন্তানের মধ্যে প্রত্যেকে বিভিন্ন। চেতনাশক্তির অভিব্যক্তি না হেলে এইভাবে এক স্বাতন্ত্রকে নির্ভর করে দ্বিতীয় স্বাতন্ত্র্য সম্ভব হােত না। এতগুলি সেল একত্রে ধরে রেখে এক নিয়মে এক ইচ্ছার বশে চালনা করার প্রয়ােজনে চেতনাশক্তি ও তার বাহন বােধনাড়ীতন্ত্র উদ্বুদ্ধ । অ্যামিবার মত নগণ্য এককোষী জীব থেকে কালক্রমে কী করে জীবজগতের চুড়ামণি মানুষ গড়ে উঠল সেই ইতিহাসের কথা জীববিজ্ঞানের প্রধান বক্তব্য। সহজ ক্ষুদ্র দেহ নিয়ে আরম্ভ করে ক্রমশ কী করে বৃহত্তর ও জটিলতর জীব ধাপে ধাপে দেখা দিতে লাগল তার প্রগতির সবিশেষ ইতিহাস এই স্বল্পায়তন বইয়ের মধ্যে বিবৃত করা সম্ভব নয়, সেইজন্য যেসব সাধারণ প্রণালী বা নিয়মে এই কমােন্নতি হয়েছে মােটামুটিভাবে তারই আলােচনা করা যেতে পারে। যতদিন পর্যন্ত এককোষী জীবেরা নিজেদের কেবল দু-ভাগ করা ছাড়া বংশবৃদ্ধির অন্য উপায় উদ্ভাবন করেনি, ততদিন প্রাণীদের মধ্যে বৈচিত্র্য বিশেষ দেখা দেয়নি পৃথিবীতে। যখন থেকে জীবকোষ স্ত্রী-পুরুষ দুজনের মিলনে বংশবৃদ্ধি হােতে শুরু করল তখন থেকে প্রাণী জগতের দ্রুত উন্নতির পথ সহজ হােলাে। একটি সেলকে ঠিক সমান ভাবে দু-ভাগ করলে খণ্ডদুটি জনয়িতার হুবহু নকল হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যে-স্থলে জনক-জননী দুটি পৃথক ব্যক্তি থেকে সন্তানের জন্ম, সে স্থলে জন্মদাতাদের সঙ্গে সন্তানের ঐকান্তিক মিল থাকতে তাে পারেই না, সন্তানদের পরস্পরের মধ্যেও একজনের সঙ্গে আর-একজনের যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। জীবজগতে এত বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্য উদ্ভবের মূল কারণ সেইজন্য মনে হয় যৌনপ্রণালীতে বংশবৃদ্ধি। বৈচিত্র্যপ্রকাশের সাধারণভাবে যে-কারণ উল্লেখ করা হােলাে তা সত্য হােলেও আমাদের জানতে বাকী থেকে যায় জীবজন্তুর শরীরের এত রকমের বিশেষ বিশেষ ইন্দ্রিয়, অবয়ব, যন্ত্রাদি কী করে সৃষ্টি হােলাে। পৃথিবীর আদিম অবস্থায় জলজন্তুই কেবল ছিল, কেননা ডাঙা তখনাে জেগে ওঠেনি। অ্যামিবা অতিক্রম করে একাধিক কোষবিশিষ্ট জলজীব যখন দেখা দিল তারা স্থিরভাবে জলে না ভেসে কোনো একদিকে জল ঠেলে যেতে চেষ্টা করতে লাগল। সেই অবস্থায় তাদের সামনের দিকের সেলগুলি খাবারের সন্ধান সব-প্রথমে পেতে লাগল এবং বিরুদ্ধ অবস্থার সঙ্গে সব-প্রথম তাদেরই সংঘর্ষ হােতে লাগল। সামনের দিকের সেলগুলি কাজেই খাবার সংগ্রহ করা, শত্রুকে এড়ানাে বা দমন করা, দিক নির্ণয় করা প্রভৃতি আবশ্যক কাজগুলির ভার নিয়ে নিজেদের বিশেষভাবে তার উপযােগী করে তােলবার চেষ্টা করতে প্রাণতত্ত্ব উঠল । লাগল। এই চেষ্টার ফলে জীবদেহের মস্তিষ্ক আশে আস্তে গড়ে প্রথমে আহার্য বস্তু ভিতরে নেবার জন্য মুখগহ্বর ও গলনালী, পরে চোখ-কান প্রভৃতি বাহেন্দ্রিয়গুলি এবং সঙ্গে সঙ্গে মগজ দেখা দিল। পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিন্নতা বা পরিবর্তন অনুসারে জীবদেহের এই সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্যও বৃদ্ধি পেতে লাগল। প্রয়ােজনবােবে লেজ, ডানা, হাত, পা প্রভৃতি বহিরঙ্গ এবং পাকস্থলী, অন্ত্র, ফুসফুস, হৃদয় প্রভৃতি বিভিন্ন অন্তরঙ্গগুলি প্রকাশ হােলো। জীবদেহের সেল-সমষ্টিকে একটি রাষ্ট্রসেনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আধুনিক যুদ্ধে নানা প্রকারের ফৌজ নিযুক্ত হয় ; আকাশযুদ্ধে বিমানবাহিনী, জলযুদ্ধে নৌবহর, ডাঙায় ট্যাঙ্ককোর, অশ্বারােহীদল ও পদাতিক বাহিনী, খাবার সরবরাহের জন্য রশদ- বিভাগ, রাস্তাঘাট বানাবার জন্য মাইনাস ও স্যাপাস ইত্যাদি নানা কাজের জন্য বিভিন্ন প্রকার ফৌজের ব্যবস্থা আছে। আমাদের শরীরের সেলের রাজত্বেও এই ধরনের ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। এক-এক রকমের সেল দলবদ্ধ হয়ে এক-একটি অঙ্গ বা যন্ত্র তৈরি করে তুলেছে। কাজের ভার তারা সেই কাজের উপযােগী হবার জন্য নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ফেলতে চেষ্টা করে। মাংস- পেশীর সেলগুলি খুব সরু লম্বা হােলো তাদের বিশেষ কাজের সুবিধার জন্য ; রক্তের সেলের লম্বা হবার প্রয়ােজন নেই বলে তারা চাকা-চাকা থাকল রক্তপ্রবাহে চলাচলের সুবিধার জন্য ।
জীবকোষ জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্য এবং সেই সঙ্গে কাজের ভাগাভাগি এই প্রণালীতে গড়ে উঠেছে। জীবজন্তুর ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসের প্রত্যেক অধ্যায় বিজ্ঞানী- দের কাছে এখন সুস্পষ্ট। ধাপে ধাপে কী প্রণালীতে, কেমন করে, যুগ যুগ ধরে ক্রমশ প্রগতির পথে জীবনধারা এগিয়ে চলেছে তার সমস্ত সুত্র তাদের জানা হয়ে গেছে। প্রাক্ যুগে অ্যামিবার ন্যায় প্রােটোজোয়া, ব্যাকটিরিয়া ও অন্যান্য এককোষী জীব নিয়ে জীবজগৎ শুরু হয়। ক্রমশ ভলভক্স, স্পঞ্জ, স্পাইরােগাইরা, জেলিমাছ, সামুদ্রিক অ্যানিমােন প্রভৃতি খুব সাদাসিধা অথচ একাধিক-কোষী জলজীবের উৎপত্তি হয়। এই সব জীবে মস্তিষ্ক বা অন্য বিশেষ ইন্দ্রিয়ের কোনাে চিহ্ন দেখা দেয়নি। ক্রিমির মতাে এক রকম চ্যাপটা পােকার ( fat worm) মস্তিষ্কের সুত্রপাত হয় এবং রাউণ্ড ওয়ার্মে (round worm) রক্ত ও অন্ত্রনালীর অল্পস্বল্প ইঙ্গিত দেখা যায় । বহুকাল পর্যন্ত এই সব ক্ষুদ্র জলচরের পৃথিবীর বিস্তৃত জলরাশি প্রাণময় করে রেখেছিল। এদের কোনাে কোনাে জাতের মধ্যে অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সূচনা পরবর্তী কালে দেখা যায় বটে কিন্তু একটি বিশেষ দেহাংশের অভাব থাকাতে এই জাতীয় জীবমাত্ৰকেই invertebrate অর্থাৎ মেরুদণ্ডহীন বলা হয়। জলের মধ্যে দ্রুত চলাচলের প্রয়ােজনের তাড়নায় মাছদের মধ্যে প্রথম শিরদাড়া দেখা দিল। শিরদাড়া হবার পর থেকে প্রাণীদের আরাে তাড়াতাড়ি উন্নতির পথ যেন খুলে গেল।
প্রাণতত্ত্ব তাদের মধ্যে তখন কেউ কেউ জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে পড়ল। জলের মাছ থেকে ডাঙার সরীসৃপ একটি ধাপমাত্র, সহজেই এই পরিবর্তন হােতে পেরেছিল। এখনাে কয়েক রকম মাছ দেখা যায় যারা ডাঙার উপর দিয়ে কোনােমতে চলে যেতে পারে। টিকটিকি-গিরগিটি জাতের জন্তুরাই প্রথমে পৃথিবীর জমি দখল করে রাজত্ব বিস্তার করে। ছােটো গিরগিটি আর প্রকাণ্ড ডাইনােসর একই জাতের। এরা ডাঙা জমি অধিকার করেই ক্ষান্ত হােলাে না, আকাশে ওড়বার চেষ্টাও করতে লাগল। সরীসৃপের পরেই তাই পাখি সৃষ্টি হােতে দেখা যায়। হাতের বদলে ডানা তৈরি করে ফেলে তার স্বচ্ছন্দচিত্তে বিমানবিহারী হয়ে পড়ল। এদিকে ডাঙার জন্তুদের মধ্যে স্তন্যপায়ী জাতের সৃষ্টি হয়ে, ক্রমােন্নতির পথে তারা একটা বড়ো রকম ধাপ এগিয়ে গেল । কুকুর, ঘােড়া, গােরু, বাঁদর প্রভৃতি জন্তুদের আবিভাব হােলাে। তারপর জন্তুজানােয়ার থেকে ক্রমশ মানুষ কী করে গড়ে উঠল, মানুষের কাছে সে একটা গুরুতর তথ্য হােলেও এ-কথা বলতেই হবে যে, খুব হাল আমলেই এটা হয়েছে এবং ক্রমবিবর্তনের লক্ষ লক্ষ যুগব্যাপী ইতিহাসে সে একটি অতি নগণ্য অধ্যায়। জদের উল্লিখিত পারায় ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ভিদ-জগতও ক্রমশ গড়ে উঠেছে। এদের বেলাতেও সামান্য ও সহজ রকমের আরম্ভ থেকে ক্রমে ক্রমে অভিনব জটিলতার সৃষ্টি হয়ে গাছপালার এত বৈচিত্র্য হয়েছে। ৩৪ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব (জন্তুর ) আমিবা বা ব্যাকটিরিয়ামের দেহগঠন বােঝা সহজ। এই জাতীয় জীবের একটিমাত্র সেল; খাওয়াদাওয়া, নিশ্বাসপ্রশ্বাস, জীবনধারণের যাবতীয় কার্যপ্রণালী, বিশেষ কোনাে যন্ত্রের বিনা সাহায্যে অতি সহজ উপায়ে তারা চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ক্রমবিবর্তনের ফলে উচ্চাঙ্গের জীবজন্তুদের দেহ যন্ত্রবহুল হয়ে পড়েছে—শরীরচালনার প্রত্যেক কাজের জন্য বিশেষ বিশেষ অবয়ব বা যন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে। শরীরের গঠন এবং তার অন্তর্গত প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যপ্রণালী ভালাে করে বুঝতে গেলে অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি জানা দরকার। দেহবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম আলােচনার ভিতর প্রবেশ না করে শরীরচালনার মােটামুটি নিয়মগুলি বােঝবার আপাতত চেষ্টা করা যাক। এই উদ্দেশ্যে মানুষের শরীরের উদাহরণ অধিকাংশস্থলে দিলে বােধ করি অন্যায় হবে না। জন্তুর শরীরে যে-সব যন্ত্র আছে মানুষেরও তা মােটামুটি আছে, উপরন্তু মানুষের বেলায় কতক বিষয়ে ( বিশেষত নার্ভমণ্ডলীর ) অনেক উন্নতি দেখতে পাওয়া যায়। এই অধ্যায়ে মানুষের শরীরক্রিয়া সম্বন্ধে যে আলােচনা করা যাবে উন্নতশ্রেণীর মাত্রে তার অধিকাংশ বিবরণ বা নিয়ম খাটবে। উদ্ভিদের দেহতত্ব সম্পূর্ণ পৃথক—তার বিষয় পরে বলা হবে।
প্রাণতত্ত্ব সঞ্চলন জড় বস্তুর সঙ্গে জীবের একটি প্রধান পার্থক্য হচ্ছে এই যে জীব সচল। গাছপালা বাদ দিলে চলাফেরাটাই অন্য প্রাণী মাত্রের বিশিষ্ট লক্ষণ বলা যেতে পারে। জন্তুদের সেইজন্য নড়াচড়ার উপযােগী নানা রকম অঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। মাছের লেজ, পাখনা, মায় সমস্ত শরীরের গঠন জলের মধ্যে দ্রুত সন্তরণের বিশেষ উপযােগী। আকাশে ওড়ার পক্ষে পাখির ডানার কী চমৎকার গড়ন তা আমরা এখন বেশ বুঝতে পারছি। উড়ন্ত জাহাজের ( aeroplane) যতই উন্নতি হচ্ছে তার চেহারা ভূতই পাখির শরীরের অনুরূপ হয়ে আসছে। ডাঙার জন্তুরাও বড়াে কম যায় না; ঘােড়া, কুকুর, হরিণ বেশ দ্রুত ছুটতে পারে ; দুটিমাত্র পা নিয়ে মানুষও ইচ্ছে করলে তাদের সঙ্গে অনেকটা পাল্লা দিতে পারে। এদের তুলনায় গাছপালা নিতান্ত স্থাণু, কিন্তু তাদের একেবারেই যে গতিবিধি নেই তা নয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সবসুদ্ধ নড়তে না পারলেও গাছের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যে নড়ে বেড়াতে পারে, তা কোনাে লতার বেয়ে ওঠবার প্রণালী লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারা যাবে। জীবদের চলবার কৌশল নানাবিধ : (১) শামুক চলে টেনে টেনে, শরীরের মাংসপেশীর একবার সংকোচন ও পরে প্রসারণের দ্বারা। সাপেরও চলার প্রণালী ঐ-রকম। যাদের পা আছে তারা ঠেলে চলে। শক্ত মাটিকে ভর দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব { lever) করে ঠেলে এগিয়ে যায়। সেইজন্য যেখানে ভালো লিভার পাবার উপায় নেই, যেমন জলের মধ্যে বা নরম কাদার উপর, তারা চলতে পারে না। (৩) জল ঠেলে মাছ চলে। এতেও লিভারের দরকার, কিন্তু তরল পদার্থে লিভার কম পাওয়া যায় বলে ঠেলবার অঙ্গ গুলি চওড়া করতে হয়েছে। দাড়ের মতাে একবার ডাইনে আর- একবার বাঁয়ে ঠেলা মেরে মাছ সাঁতার কাটে। (৪) দু-দিকে সমানভাবে ঠেলা মেরে চলা; যেমন চলে জলের মধ্যে কচ্ছপ পায়ের সাহায্যে, আকাশে পাখি বা প্রজাপতি ডানায় ভর করে। চলাচলের জন্য যেমনই ব্যবস্থা থাক না কেন, ঠেলা মারার দরকার ; সেটা করতে গেলে শরীরে এমন সেল থাকা চাই যা রবারের মতাে সহজে ছােটো বড়াে হােতে পারে। জন্তুদের দেহের এই সংকোচনশীল মাংসল অংশকে পেশী ( muscle) বলে। পেশী দু-রকমের হয় : (১) স্বায়ত্ত পেশী ( Voluntary muscle)—এর সেল- গুলি সুতাের মতাে সরু ও এক ইঞ্চির বেশি লম্বা নয় । মানুষের হাতের বাইসেপ ( biceps) পেশী পাঁচ লক্ষ আন্দাজ এই শ্রেণীর সেল দিয়ে তৈরী। সেলগুলি একসঙ্গে গায়ে গায়ে জড়িয়ে থাকে বলে মাংসপেশী দেখতে যেন পাকানাে দড়ির মতাে। স্বায়ত্ত পেশীর সংকোচন প্রসারণ আমাদের ইচ্ছাধীন। এদের কাজ হচ্ছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হাড়গুলিকে দরকার মতাে নাড়ানাে। ৩ প্রাণতত্ত্ব নাড়াবার সুবিধার জন্য পেশীর একদিক একটা হাড়ে, অন্য দিক অন্য হাড়ে আটকানাে থাকে। যখন যেদিকে সংকুচিত হয় তখন সেই দিকে হাড়কে টেনে আনে। জন্তুজানােয়ারের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যা কিছু চালনা উক্ত প্রণালীতে হাড় ও মাংসপেশীর সহযােগে হয়। আমাদের শরীরে কম করে দুশাে স্বায়ত্ত মাংসপেশী আছে। এই শ্রেণীর মাংসপেশীর খুব তাড়াতাড়ি ছােটো বড়ো হবার ক্ষমতা দেখা যায়। মগজ থেকে হুকুম পেলেই এরা মুহূর্তের মধ্যে যেমন সংকুচিত হােতে পারে তেমনি আবার দ্রুত প্রসারিত হেতে পারে। আমাদের শরীরের কোনাে কোনাে স্বায়ত্ত মাংস- পেশী এক সেকেণ্ডের মধ্যে অনায়াসে তিনশাে বার অর্থাৎ ঘন্টায় ১০,৮০,০০০ বার ছােটো-বড়ে হােতে পারে । মানুষের তৈরী খুব কম যন্ত্রই আছে যার গতি এত দ্রুত। (২) অনায়ত্ত পেশী -( Involuntary inuscle ) এদের বিশেষ গুণ এই যে, এদের চালনা করবার জন্য দেহীর ইচ্ছাশক্তির প্রয়ােজন হয় না—নিজে থেকেই তারা সংকুচিত ও প্রসারিত হােতে পারে। গতিও এদের অপেক্ষাকৃত ধীর। এই পেশী- গুলির ব্যবহার শরীরের অন্তরিন্দ্রিয়সমূহে, যাদের নড়াচড়া আমাদের প্রত্যক্ষগােচর নয়। পাকস্থলী, অন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র প্রভৃতি দেহযন্ত্রের যে স্পন্দন ( rhythmic movements ) তা আমাদের সম্পূর্ণ অগোচরে চলতে থাকে। শরীরের ভিতরের এই সব কলকবজা চলে দ্বিতীয় শ্রেণীর অনায় মাংসপেশীর সাহায্যে।
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব শ্বাস-প্রশ্বাস জীবমাত্রেরই জীবন ধারণের জন্য শক্তির দরকার, সেই শক্তি যে- কোনাে উপায়েই হােক না কেন জুগিয়ে দেয় অক্সিজেন। হাওয়াতে অক্সিজেন আছে অফুরন্ত পরিমাণে। খ জীবদের পক্ষে গ এই অত্যাবশ্যকীয় গ। পদার্থটি সেইজন্য ট ঝ এ হাওয়া থেকে ল + নেওয়াই খুব সুবিধা। S & জন্তুদের শরীরের •ধ্যে হাওয়া প্রবে- শের দ্বার নাকের দুই গর্ত। গর্ত দুটি নাকের শেষ- ১২. মানুষের শরীরের ভিতরের কয়েকটি প্রধান ইন্দ্রিয় ভাগে গলার কাছে ক. অন্ননালি খ. ফুসফুস (স্বাদিকের থলি) গ, ঘ, এসে মিশেছে ঝ, হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ঙ. ডায়াফ্রাম চ. পাকস্থলী একটি মােটারকম ছ, পেটের গহর জ, ক্ষুদ্রান্ত্র এ. বুকের গম্বর ট. ফুসফুসের বাইরের আবরণ, পুরার গহর নালিতে। ড. বৃহৎ অন্ত্র 6. অ্যাপেণ্ডিকস শ্বাসনালি (trachea) ঔ ব্যাসের পাইপের মতাে এবং গলার কাছ থেকে সােজা নেমে গেছে ফুসফুসে । হৃদয়ের একটু পিছনে দুই পাশে এই ঠ, যকৃত প্রাণতত্ত্ব ফুসফুসের দুই থলি। ফুসফুসের নিকটবর্তী হয়ে শ্বাসনালিকে সেইজন্য দু-ভাগ হােতে হয়েছে এই দুটো থলির সঙ্গে যুক্ত হােতে। উপনালি দুটিকে ব্রঙ্কাই (bronchi) বলে। ব্রঙ্কাই উপনালি অসংখ্য বার ভাগ হয়ে অত্যন্ত সরু সরু সূক্ষ্মনালির জালিতে ফুসফুসের ভিতর ছড়িয়ে গেছে এবং শেষ হয়েছে alveoliতে। ফুসফুসের ভিতরটা স্পঞ্জের মতাে। তার ফোপরা মাংসপিণ্ডের সর্বত্র অসংখ্য শিরা-উপশিরা নালি-উপনালি জালের মতো alveoli গুলিকে আবৃত করে রেখেছে। রক্তবাহী শিরা এবং ধমনী সেখানে যুক্ত হয়েছে হৃদয় থেকে। তাদের সূক্ষ্ম নালির পাশাপাশি অবস্থিত শ্বাসনালির শেষ সীমান্তগুলি। শিরার দ্বারা আনীত দূষিত রক্ত ফুসফুসের হাওয়া থেকে অক্সিজেন নিয়ে তাজা হয়ে চলে যায় ধমনীতে। লাল রক্তকণিকার মধ্যে যে লাল রং আছে- হেমমাগ্লোবিন (haemoglobin)—তার অক্সিজেন গ্রহণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা। রক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই- অক্সাইড গ্যাস পরিত্যাগ করে। শ্বাস নেবার সময় অক্সিজেন ফুসফুসের ভিতর ঢােকে, রক্ত তা নিয়ে যে co) পরিত্যাগ করে, নিশ্বাসের সঙ্গে সেটা নাক দিয়ে বেরিয়ে যায়। শিরার দ্বারা আনিত রক্তে co, অধিক থাকে এবং alveoliর বায়ুতে ০ অধিক থাকে। ফুসফুসের মধ্যে এই দুই গ্যাসের বিনিময় হয়। শ্বাসবায়ুতে শতকরা ২০ ভাগ ০ থাকে আর ০৪ ভাগ con থাকে, এই বিনিময়ের ফলে শ্বাস বায়ুতে ১৬ ভাগ ০ এবং ৪ ভাগ c0) হয়ে যায়। নাক থেকে ফুসফুস পর্যন্ত হাওয়া যাবার পথ রয়েছে বটে কিন্তু ৪ ০
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
প্রতিনিয়ত সমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস চলে কী করে। হৃদ্যন্ত্রের মতাে
ফুসফুসের আপনা থেকে স্পন্দনের কোনাে ব্যবস্থা নেই।
হাওয়া আমাদের টেনে নিতে হয়, আপনা থেকে ফুসফুসে
টোকে । পাঁজরের হাড়গুলি নরম বলে তাদের গায়ে
যে মাংসপেশী লাগানাে আছে তাদের সংকোচন বা প্রসারণের
সঙ্গে সমস্ত পাঁজর সংকুচিত বা প্রসারিত হয়। পাজরের হাড় এমন
একটু বাঁকাভাবে সাজানাে ও পেশী গুলির বন্ধন এমন কৌশলে যে
( কথাটা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে) মাংসপেশীর
সংকোচনেই আমাদের বুক ফুলে ওঠে, প্রসারণে নয়। বুক
ফোলালেই নাক দিয়ে হাওয়ার টান পড়ে, তাকেই শ্বাস নেওয়া
বলি । এ ছাড়া আর এক উপায়ে বুক ফোলানাে যায়। বুকের
গহ্বর ও পেটের গহ্বরকে পৃথক করে রাখে মধ্যে একটি পাতলা
ও গম্বুজাকৃতি মাংসের পর্দা (diaphragm)। এই পর্দার গায়ে
যে-সব পেশী আছে তারা পর্দাটার আকার পরিবর্তন করতে পারে।
এই পরিবর্তনের ফলে যখন বুকের ভিতরকার আয়তন বেড়ে
যায়, তখন শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসের ভিতর হাওয়া ঢুকতে চায়।
এই দু-রকম প্রণালীর সাহায্যেই আমরা শ্বাস নিই। স্ত্রীলােকেরা
বেশির ভাগ পাজরের সাহায্যে শ্বাস নেয়, পুরুষরা ডায়াফ্রাম
দাবিয়ে সেই কাজ করে।
শ্বাসের সঙ্গে যে-হাওয়া আমরা ফুসফুসের ভিতর টেনে নিই
তা সব সময় পরিষ্কার নির্মল হাওয়া নাও হতে পারে।
আকাশের হাওয়াতে ধোয়া, ধুলাে, ব্যারামের বীজ কত কিছু
৪১
প্রণত থাকে। সেগুলি ফুসফুসের রক্তের সঙ্গে মিশলে ক্ষতি করতে পারে। দূষিত হাওয়া ফুসফুসে ঢােকবার আগে তাকে শােধন করে নেবার জন্য নাকের মধ্যে ব্যবস্থা রয়েছে। নাকের ভিতরে চুল আছে, তার কাজ হচ্ছে ধুলাের কণা আটকে দেওয়া। নাকের ভিতরট। তা ছাড়া সর্বদা ভিজে ও চটচটে থাকে তাতেও ধুলাে প্রভৃতি যে-সব ক্ষতিকর পদার্থ হাওয়ার সঙ্গে চলে আসে সেগুলি আটকে যায়, ফুসফুসে ঢুকতে পারে না। এই জন্যই মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে ডাক্তাররা বারণ করেন, নাক দিয়ে নিশ্বাস নিলে হাওয়ার দোষ অনেকটা কেটে যায়। হৃৎস্পন্দন ও নিশ্বাসপ্রশ্বাস এই দুটির কাজ নিয়মমতাে চলা জন্তুদের পক্ষে এতই প্রয়ােজনীয় যে, আমরা এই দু-রকম র্য- প্রণালীকে জীবনেরই লক্ষণ বলে ধরে নিয়েছি। মানুষ বেঁচে আছে কি মরে গেছে জানতে গেলে প্রথমেই নাড়ী টিপে বা বুকে হাত দিয়ে দেখি এই দুটি কাজ চলছে কি না। কথায় বলে— যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ । রক্তপ্রবাহ রক্তের সঙ্গে আমাদের সকলেরই যথেষ্ট পরিচয় ; কিন্তু জন্তুদের শরীরে কেন এত রক্ত থাকে, তার কী কাজ, সে-বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা সকলের না থাকতেও পারে। রক্তের যে প্রয়ােজন আছে, রক্ত না থাকলে কোনাে জন্তু যে বাঁচতে পারে না তাও আমরা বুঝি। ম্যালেরিয়া রােগ ধরলে তার জীবাণু রােগীর রক্ত খেয়ে ৪২ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব ফেলে, রােগী ক্রমশ দুর্বল হােতে থাকে। তখন কুইনিন ওষুধ দিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণুকে মারবার চেষ্টা করতে হয় রােগীকে বাঁচাবার জন্য। জন্তুর শরীরে রক্ত থাকলেই কেবল হয় না, সব সময়েই তার প্রবাহ থাকা চাই। রক্তের প্রবাহ বন্ধ হােলেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটে। শরীরের মধ্যে রক্তপ্রবাহকে চালিয়ে রাখবার জন্য অনেক গুলি যন্ত্র আছে। ফুসফুস, হৃদয়, যকৃৎ, কিডনী প্রভৃতি দেহের ভিতরের প্রায় সব যন্ত্রগুলিকেই এই কাজে সাহায্য করতে হয়। যন্ত্রগুলি নিয়ে যেন একটা মস্ত কারখানা দেহের মধ্যে চলছে, কোথাও রক্ত পরিষ্কার হচ্ছে, কোথাও পাম্প হচ্ছে, কোনাে যন্ত্র তার ময়লা টেনে নিয়ে শরীর থেকে বের করে দিচ্ছে, রক্তের শ্বেত কণিকা কোনােটা তার খাদ্য জোগান দিচ্ছে, ইত্যাদি। সকলেই ব্যস্ত এই সঞ্জীবনী শক্তিধারা শরীরের সর্বাংশে অবিকৃত- ভাবে যাতে প্রবাহিত হয়। রক্ত যে লাল কালির মতাে রঙিন পদার্থ এটা মনে ১৪. লাল রক্তকণিকা করলে চলবে না। এর তরল অংশ প্রায় জলেরই মতাে, বিশেষ কোনাে রঙ নেই। সেই বর্ণহীন জলীয় অংশে ভাসছে অসংখ্য ৪ ৩ সাণতত্ত্ব রক্তকণিকা তার কতকগুলি সাদা, বেশির ভাগই লাল রঙের। এই দ্বিতীয় প্রকারের সেলগুলির রং থেকেই রক্ত লাল দেখায়। লাল রক্তকণিকা ( red corpuscles) দেখতে গােল গােল চাকির মতো, তারা এত ছােটো যে তাদের ৩৫০ এক লাইনে সাজিয়ে রাখলে মাত্র এক ইঞ্চি জায়গা জোড়ে । সাদ। রক্তকণিকাগুলি (leucocytes) আর একটু বড়ো। অণুবীক্ষণের সাহায্যে রক্তকণিকা অনায়াসে গোনা যায় । এক বিন্দু ( এক cubic millimeter) রক্তে প্রায় দশ হাজার সাদা ও পঞ্চাশ লক্ষ লাল কণিকা থাকে। এত অসংখ্য পরিমাণে লাল রক্তকণিকা থাকাতেই রক্তের রং অত লাল। শরীরের মধ্যে রক্তের একটি প্রধান কাজ হচ্ছে সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রত্যেক সেলের কাছে খাদ্য পৌছে ১৫, রক্তপ্রবাহ ধমনীর নালি-উপনালির মধ্যে রক্ত- দেওয়া এবং তাদের পরিত্যক্ত কণিকার সারি দ্রষ্টব্য অপ্রয়ােজনীয় অংশ নিষ্কাশন করা। লাল রক্তকণিকা বিশেষভাবে এই কাজে ব্রতী। সেগুলি পাকস্থলী থেকে খাদ্যরস যেমন বহন করে আনে, সেই সঙ্গে ফুসফুস থেকে অক্সিজেনও সঞ্চয় করে আনতে পারে। লাল রক্তকণিকার প্রােটোপ্লাজমের ভিতর হেমমাগ্লোবিন ( haemo- ৪৪ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব globin) নামে এক রকম লাল রং ভরা থাকে। পূর্বেই বলেছি হেমােগ্লোবিনের হাওয়া থেকে অক্সিজেন নেবার বিশেষ ক্ষমতা আছে। শাসের সঙ্গে যখন ফুসফুসে হাওয়া ঢোকে সেই সময় রক্তের লাল সেলগুলি অক্সিজেন সঞ্চয় করে এবং প্রবাহকালে শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সেই অক্সিজেন জোগায়। তারা যে co, ত্যাগ করে রক্তের লাল কণিকাগুলিই আবার তা বহন করে এনে ফুসফুসের ভিতর ছেড়ে দেয়। ফুসফুস নিশ্বাসের সঙ্গে সেই গ্যাস বাইরে বের করে দেয়। সাদা রক্তকণিকার সম্পূর্ণ অন্য রকম কাজ। তারা পাহারা- ওয়ালার কাজ করে, শরীরের মধ্যে কোনাে শত্রু ঢুকলেই তাদের আক্রমণ করে ধ্বংস করবার চেষ্টা করে । ঘরে বাইরে মানুষের নানান শত্রু তাে আছেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভীতিকর হােলো অদৃশ্য শত্রু। হাওয়াতে, জলে, মাটিতে, খাদ্যদ্রব্যে আশেপাশে সর্বত্র অসংখ্য রােগবাহী ব্যাকটিরিয়া রয়েছে। এদের দুটি-একটিও আমাদের শরীরে বাসা বাধলে যথেষ্ট অনিষ্ট করতে পারে। কোনো কাটা ঘা বা নাক, মুখ, চোখ, ফুসফুস প্রভৃতির পাতলা আবরণের ভিতর দিয়ে যখনি এদের কেউ রক্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে তৎক্ষণাৎ সেই অঞ্চলের সাদা রক্তকোষ চারদিক থেকে ছুটে এসে এদের মেরে ফেলবার চেষ্টা করে। সব সময় এই যুদ্ধে সাদা রক্ত- কণিকাগুলির জিত হয় না, এরা হার মানলেই আমাদের বিপদ ; কলেরা, বসন্ত, নিউমােনিয়া, ধনুষ্টংকার প্রভৃতি ব্যাকটিরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। এই সব শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা প্রাণ'তত্ত্ব করবার জন্য সাদা রক্তকোষ অহরহ সজাগ ভাবে পাহারার কাজ করে ; দক্ষ সেনার মতো লড়াই করতে তারা সর্বদাই অভ্যস্ত। শরীরে রক্তের কাজ ঠিকমতাে চলতে থাকে যদি সর্বদা নদীর জলের মতাে তার প্রবাহ থাকে। প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের ভিতর স্রোত যাতে বয়ে যেতে পারে তার জন্যে দু-রকম নালি আছে ; আর রক্তের স্রোত বহমান রাখবার জন্য এই দুই শ্রেণীর নালি যােগ গ করে মাঝখানে রয়েছে হৃদযন্ত্র। অঙ্গার গ্যাস এবং পরিত্যক্ত TEL 1iHiRiLT: HTI অন্যান্য দ্রব্য বহন করে এনে শিরাগুলি হৃদযন্ত্রে ময়লা রক্ত ঢুকিয়ে দেয়। হৃদ্যন্ত্রের গড়ন চ একটি ডবল (double-acting) পাম্পের মতাে। সব সময়ই শরীরে রক্ত- সে ধুকধুক করে ও একদিকে চলাচলের প্রণালী শিরা থেকে ময়লা রক্ত টেনে ক. ফুসফুল নেয়, অন্য দিক থেকে ভালো গ. যকৃৎ অন্ত্রনালি কিডনী চ. মাংসপেশ রক্ত ধমনীর মধ্যে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। চলাচলের পথে সে দু-বার হৃদয়ে ঢোকে। শিরার ময়লা রক্ত হৃন্দ্রের দক্ষিণার্ধের নিকটবর্তী ফুসফুসে যায় ঘ. উ, ৪৬ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব সে কী সংস্কারের জন্য। অক্সিজেনে পূর্ণ হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সেই রক্ত হৃদ্যন্ত্রের বামার্ধে ফিরে আসে। হৃদয় তখন এই অক্সিজেন- পরিপুষ্ট রক্ত পমনীর ভিতর দিয়ে শরীরের সীমান্ত অবধি ঠেলে পাঠিয়ে দেয় । হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য ও বন্ধ হলে চলে না, তাকে অহরহ পাম্প করতে হচ্ছে রক্তের প্রবাহ বজায় রাখবার জন্য। রকম জোরে পাম্প করে তার প্রমাণ পাই যখন কাটা ঘা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরােতে দেখি। তার জোর কম বেশি হচ্ছে কিনা মাপতে পারা যায় হাতের নাড়ী টিপে দেখে। সুস্থ দেহে হৃদ্যন্ত্র মিনিটে প্রায় পঁচাত্তর বার ধুকধুক করে। শরীরের কোনাে পরিবর্তন হােলেই হৃৎস্পন্দনেরও ব্যতিক্রম হয়। নাড়ী দেখে সেইজন্য ডাক্তার ও কবিরাজেরা ঠিক ধরতে পারেন শরীরের তখনকার অবস্থা কী রকম। ‘খাওয়া দরকার শরীরের পুষ্টির জন্য’–এ রকম কথা প্রায়ই আমরা বলে থাকি, কিন্তু পুষ্টি বলতে কী বােঝায় কেউ যদি হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে তবে মুশকিলে পড়তে হয়। খাদ্যের দ্বারা শরীরের কী কী প্রয়ােজন সাধন হয় জানলে তবেই পুষ্টির সঠিক অর্থ আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে। (১) খাবার জিনিস থেকে শরীরের সেল শক্তি আহরণ ৪৭ প্রাণতত্ত্ব করে। শক্তির প্রয়ােজন হয় দুটি কারণে কাজ করার জন্য এবং শরীর সবসময় সমভাবে গরম রাখার জন্য। (২) খাবার দরকার বৃদ্ধির জন্য। শরীরের কোনাে অংশ বাড়তে গেলে সেখানকার সেলের সংখ্যা বাড়াতে হয়। একটা থেকে দুটো সেল হেলেই নতুন সেলটির জন্য অতিরিক্ত খােরাক দরকার। যে-যে পদার্থে সেল তৈরী সেই সব পদার্থ ই মাপমতাে জোগান দেওয়া চাই। সেইজন্য বাড়তি বয়সে বেশি খেতে হয়, বুড়ো বয়সে কম খেলেও চলে। (৩) পাওয়া দরকার শরীরের নিত্যনৈমিত্তিক ক্ষয়পূরণের জন্য। আমাদের শরীরে সেলের কিছু কিছু ক্ষয় সব সময়েই হয়। যে-সেলগুলি মরে যায় তাদের জায়গায় নূতন সেল তৈরী করতে হয়। তা ছাড়া শরীরচালনার কাজে দেহবস্তুর ক্ষয় হয় যথেষ্ট। অপঘটনের ফলে শরীর যে-সব বস্তু ঘাম, প্রস্রাব প্রভৃতির ভিতর দিয়ে প্রতিনিয়ত পরিত্যাগ করে তাও পূরণ করা দরকার। যে-প্রয়ােজনগুলির কথা উপরে বলা গেল, সেই প্রয়ােজন-সাধন যে-সব আহাৰ্যবস্তুর দ্বারা হয় তারাই শরীরকে পুষ্টি দিতে পারে। আহাৰ্যবস্তু ছাড়াও আর-একটি জিনিস দরকার-জল। আমাদের শরীর যে-উপাদান দিয়ে গঠিত তার অর্ধেকের বেশি হচ্ছে জল। গায়ের চামড়া ও ফুসফুস দিয়ে এবং প্রস্রাবাকারে ক্রমাগত জল বেরিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতিপূরণের জন্য মানুষকে দিনে অন্ততপক্ষে দু-সের জল খেতে হয়। এই ক্ষতিপূরণ ছাড়া শরীরের পুষ্টির কাজেও খানিকটা জল লাগে। ৪৮ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব শরীরের পােষ্টাইয়ের জন্য যে সব জিনিস খেতে হয় মােটামুটি তিন শ্রেণীতে তা ভাগ করা যেতে পারে :- ১ কার্বোহাইড্রেট-শ্বেতসার। ২ ফ্যাট-স্নেহপদার্থ। প্রােটিন-যে-খাদ্যবস্তুতে নাইট্রোজেন আছে। ভাত, আলু, এরারুট, বার্লি, চিনি প্রভৃতি খাবারগুলি কার্বো- হাইড্রেট শ্রেণীতে পড়ে। ঘি, তেল, চর্বি প্রভৃতি স্নেহপদার্থমাত্রই ফ্যাট শ্রেণীভুক্ত। এই দুই শ্রেণীর পদার্থ ই কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে তৈরী। কার্বন ও হাইড্রোজেন থাকাতে এরা অক্সিজেনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে শরীরে উত্তাপ জোগায়। বায়ু থেকে সেই অক্সিজেন আমরা শ্বাসনালির দ্বারা গ্রহণ করি। দুটি খাদ্যবস্তু আমাদের শরীরে ইন্ধনের কাজ করে এবং শরীর গরম রাখার সাহায্য করে। তৃতীয় শ্রেণীর খাদ্য এদের থেকে একটু তফাত। তাদের ভিতর কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তাে আছেই কিন্তু তার সঙ্গে শরীরের খুব প্রয়ােজনীয় আর-একটি জিনিস—নাইট্রোজেন আছে। প্রােটিন প্রধানত ৫ (কার্বন), o ( অক্সিজেন ), [I (হাইড্রোজেন) ও N ( নাইট্রোজেন) এই চারটে সামগ্রী দিয়ে তৈরী, কিন্তু এ ছাড়াও তার ভিতর অল্পবিস্তর থাকে আয়রন, ফসফরাস ও সালফার—তিনটি ধাতব পদার্থ। প্রােটিনের গঠন অত্যন্ত জটিল। সব রকম আমিষ খাদ্যে প্রােটিন আছে প্রচুর পরিমাণে, ডিমের সাদা অংশ নিছক প্রােটিন। নিরামিষের মধ্যে প্রাণত মুগ, ছােলা প্রভৃতিডাল, বরবটি, সীম, কড়াইশুটি এই সব খাদ্যে প্রােটিন পাওয়া যায়। প্রােটিনকেও পােড়ানাে যায়, কিন্তু শরীরের মধ্যে প্রােটিনের প্রধান কাজ হচ্ছে সেলের সারপদার্থ সরবরাহ করা। সেলের প্রােটোপ্লাজম জিনিসটা বেশির ভাগই প্রােটিন, কাজেই আমাদের প্রােটিন না খেলে চলে না। আমরা ঘি তেল প্রভৃতি যে স্নেহপদার্থ খাই সেগুলি পাকস্থলী এবং অন্ত্রের মধ্যে জারক রসঘটত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলে গ্লিসেরিণ ( glycerine) ও কতকগুলি এসিডে ( fatty acids) পরিণত হয়। রক্ত প্রবাহ এইগুলিকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নিয়ে গেলে সেখানে পুনরায় নৃতন করে ফ্যাটে পরিবর্তিত হয়। প্রােটিন বস্তুগুলির ও পেটের ভিতর গিয়ে নানান পরিবর্তন হােতে থাকে। এই অপঘটন প্রণালীর শেষ ফল হচ্ছে অ্যামিনাে- এসিড ( amino acid)। যে কোনাে প্রােটিন বস্তুই খাই না কেন তাদের জটিল রাসায়নিক যৌগিক গঠন ভাঙতে ভাঙতে পরিণামে কয়েক রকম এমিনাে এসিডে গিয়ে দাড়ায়। এদের রাসায়নিক গঠন তেমন জটিল নয়—রক্তের মধ্যে সহজেই প্রবেশ করতে পারে এবং আমাদের দেহ গঠন বা মেরামত করার কাজে এরাই সাহায্য করে। জল ও এই তিন শ্রেণীর খাবার ছাড়াও শরীরের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য আরাে কয়েকটি জিনিসের দরকার আছে। অল্প পরিমাণে হােলেও সােডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনিসিয়াম প্রভৃতি ধাতব পদার্থ শরীরে প্রবেশ করা চাই। জল এবং সাধারণ খাবারে এই দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব তবে সব জিনিস যেটুকু থাকে তাতেই আমাদের চলে যায়। বিশেষ কারণে এর মধ্যে কোনাে একটি ধাতুর অভাবের দরুন স্বাস্থ্যহানি হােলে চিকিৎসকেরা অনেক সময়ে ওষুধ হিসাবে বেশি করে সেটা খেতে দেন। তখন আমরা এই ধাতব জিনিসগুলির প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করি। আর-এক শ্রেণীর খাদ্য-ভিটামিন-সম্বন্ধে কয়েক বছর থেকে বিজ্ঞানী মহলে খুব আলোচনা ও অনুসন্ধান চলছে দেখা যায়। আমাদের শরীরের পুষ্টির জন্য ভিটামিনের যে বিশেষ প্রয়ােজন সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই কিন্তু এদের কী ধরনের রাসায়নিক গঠন তা এখনাে ঠিক জানা যায়নি। শরীরে এদের কী কাজ তাও সঠিক বলা যায় না—তবে দেখা গেছে ভিটামিনের অভাবে স্বাস্থ্যের নানারকম অঘটন ঘটে। ভিটামিন না হােলেও চলে না, অথচ দরকার যৎকিঞ্চিৎ পরিমাণে। সেটুকু পাঁচমেশালি খাবার থেকেই যথেষ্ট পেতে পারি, সাধারণত পেয়েও থাকি তাই। শরীরের প্রয়ােজনের দিক থেকে যদিও খাদ্যবস্তু প্রধানত তিন শ্রেণীতে ভাগ করে দেখানাে হয়েছে, খাবার সময় আমরা কিন্তু সব রকম মিলিয়েই খেয়ে থাকি। খাবার হজম করা ও শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে পুষ্টি সঞ্চার করার জন্য যে-সব যন্ত্র রয়েছে তাদের কাজ হচ্ছে এই নানাবিধ জটিল খাদ্যবস্তু বিশ্লেষণ করে এমন সাদাসিধে প্রকরণে আনা যা শরীরের সেল সহজেই গ্রহণ করতে পারে এবং নিজের প্রয়ােজনমতো বস্তু সেই গুলি থেকে গড়ে নিতে পারে।
প্রাণতত্ত্ব এই ভাঙার কাজ চিবােনাের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়। সারের অণুগুলি ভাঙতে লালার সাহায্য লাগে। লালার ভিতর এমন একটি জারক পদার্থ আছে যা দ্রব্যগুণবজিত শ্বেতসারের পরমাণুগুলিকে ভেঙে দ্রব্যগুণান্বিত চিনি করে ফেলতে পারে। ভাত বা আলু যতই কেন চিবিয়ে সূক্ষ্ম করে ফেলি তার কণাগুলি ভাত বা আলু আকারে আমাদের রক্তের ভিতর প্রবেশ করে তার সঙ্গে গুলে যেতে পারে না, কিন্তু চিনি (বিশেষত গ্লুকোজ চিনি) সহজেই যায়। সব শ্বেতসারই গ্লুকোজ (glucose) আকারে রক্তে গিয়ে পৌছায়। মুখের ভিতর খাবার চিবােনাে দরকার দুটি কারণে। প্রথমত, দু-পাটি দাত খাবারের শক্ত দানাগুলি ভেঙে লালার সঙ্গে মিশিয়ে নরম এবং হড়হড়ে করে দেয় তাতে খাদ্যবস্তু সহজেই গলনালি দিয়ে পেটের ভিতর নেমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত খাবারের মধ্যে যে অংশ শ্বেতসার তার সঙ্গে লালার ওতপ্রােতভাবে সংমিশ্রণে চিনিতে পরিণত করবার যে রাসায়নিক প্রক্রিয়া তা ভালো করে হােতে পারে। গ্লুকোজ আকারে যে চিনি রক্ত গ্রহণ করতে পারে মুখের ভিতর কেবল লালার সাহায্যে সে-চিনি তৈরি হয় না; লাল কেবল প্রথম ধাপ এগিয়ে দেয়, রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় পেটের ভিতর গিয়ে। মুখ থেকে খাবার যখন পেটের মধ্যে গিয়ে পড়ে তখন সেখানে হজমী রস প্রধানত হাইড্রোক্লোরিক এসিড় (hydrochloric acid) তৈরি হয়ে জমে আছে-লাল খাবারের যে অংশগুলিকে ভাঙতে পারেনি এই তীব্র এসিড সেই সব খণ্ডগুলি নিয়ে তাদের ভেঙেচুরে ফেলতে শুরু দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব করে। ভাত, আলু প্রভৃতি শ্বেতসার খাদ্যের যে-অণুগুলি চিনি হবার অর্ধেক পথ এগিয়েছে সেগুলিকে পুরােপুরি গ্লুকোজে পরিণত করতে তখন দেরি হয় না। পেটের ভিতর গিয়ে এসিডের সংস্পর্শে প্রােটিনের দানাগুলিরও নানারকম পরিবর্তন ঘটতে থাকে। কেবল হাইড্রোক্লোরিক এসিড এই কাজ করতে সমর্থ নয় তাই তার সঙ্গে অন্য পাঁচ রকম জারক পদার্থও মিশ্রিত থাকে। মুখ থেকে আরম্ভ করে পৌষ্টিকনালির প্রত্যেক অংশেই (পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি) নানারকম জারক রস নির্গত হয়ে খাবারের সঙ্গে মেশে। অনেকগুলি enzyme দিয়ে জারকরস প্রস্তুত। এদের কাজ হচ্ছে খাবারের বিভিন্ন অংশ নিয়ে তাদের পরমাণুর জটিল কায়িক গঠন ভেঙে সহজ করে দেওয়া। যে-প্রণালীতে এই ভাঙা-চোরার কাজ হয় তা বর্ণনা করতে গেলে রসায়ন বিদ্যার সাহায্য নিতে হবে। তাতেও কুলােবে না, কেননা এখনাে আমরা সমস্ত ঘটনা পুরোপুরি জানি না। এইটুকু আমাদের জানলেই আপাতত চলবে যে খুব সামান্য একটুখানি এনজাইম অনেকখানি রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটাতে পারে, কিন্তু এনজাইমের নিজের কোনাে পরিবর্তন হয় না। তা ছাড়া জানা গেছে প্রত্যেক এন- জাইমের এক-একটি নির্দিষ্ট কাজ থাকে। লালার ‘টায়ালিন’ এনজাইম শ্বেতসারের কণাকে গ্লুকোজ করার একটি ধাপ এগিয়ে দিতে পারে মাত্র। তখন অন্য কোনাে একটি এনজাইম আর- এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এইজন্য হজম-প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে অনেকগুলি এনজাইমের দরকার। প্রােটিনের পরমাণু সাধারণত প্রাণতত্ত্ব খুব জটিল বলা হয়েছে পূর্বে। একে ধাপে ধাপে ভেঙে সহজ পদার্থে পরিণত করতে অনেক পরিশ্রম ও পেপসিন প্রমুখ অনেক এনজাইমের প্রয়ােজন। প্রােটিন হজমের ব্যাপারে এনজাইমের কাজের শেষ পরিণতি হচ্ছে অ্যামিনাে-এসিড ( amino acid )। প্রােটিন-বস্তুর এটি খুব সহজ মৌলিক অবস্থা-এই অবস্থায় অন্ত্রনালির গা দিয়ে অনায়াসে তা রক্তের ভিতর প্রবেশ করতে পারে। ডিম, মাছ বা মাংস প্রভৃতি আমিষ খাদ্যদ্রব্যে যে প্রােটিন আছে তাকে অ্যামিনাে-এসিডে পরিণত করা সহজ কিন্তু নিরামিষ প্রােটিনের গঠন বেশি জটিল, সেইজন্য তা হজম করা আমাদের পক্ষে অপেক্ষাকৃত কঠিন। বাইরে থেকে নানারকম খাদ্যবস্তু নিয়ে পুষ্টির উদ্দেশে তাকে ভেঙেচুরে রক্তের ভিতর গ্রহণােপযুক্ত করে ভােলার জন্য আমাদের শরীরে যে যন্ত্রশ্ৰেণী আছে তার সাধারণ নাম পৌষ্টিকনালি। তার স্থানে স্থানে নানান যন্ত্র অবস্থিত থাকলেও মুখ থেকে আরম্ভ করে মলদ্বার পর্যন্ত একটা ধারাবাহিক নালি চলে গেছে—তাই এই যন্ত্রপ্রণালীর নামে নালি কথাটার নালি কথাটার ব্যবহার ন্যায়সংগত। পৌষ্টিকনালির অংশ বিশেষে কোথাও সরু, কোথাও মােটা, কোথাও থলের মতাে কিন্তু নালির ধারাবাহিকতা কোথাও নষ্ট হয়নি। মুখের গহ্বর থেকে পেট পর্যন্ত খাবার নামে যে-গলনালির ভিতর দিয়ে সেটা এক ফুটের কিছু কম লম্বা হবে। ঢোক গেলবার সময় যে কোনো বস্তু এর ভিতর ঢুকে পড়ে তখন তার গায়ে জড়াননা পেশীর এমন ধরাবাহিক ভাবে সংকোচন ও প্রসারণ ক্রিয়া ৫৪ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব হােতে থাকে যে সেই বস্তুকে ঠেলে ঠেলে পেটের দিকে নামিয়ে নিয়ে যায়। শরীরের ভিতরে যে-সব যন্ত্র আছে তাদের অনেকেরই এইরকম স্বাধীন ভাবে ছান্দিক গতি আছে। রক্তপ্রবাহ, হৃৎকম্পন, পাকস্থলী ও অন্ত্রনালির সংকোচন প্রসারণ প্রভৃতি দেহক্রিয়াগুলি চলে মাংসপেশীর ছান্দিক গতির সাহায্যে। গলনালি বা অন্ত্রনালির ভিতর দিয়ে খাদ্যবস্তু দফায় দফায় ঠেলা মেরে যে-ভাবে এগােয় যেন এয়ােপােকার চলার মতাে। পাকস্থলী, সাধারণ কথায় যাকে আমরা পেট বলি, একটা ছোেটা থলে—তার ভিতর প্রায় দু-সের তরল জিনিস ধরতে পারে। এর দু-দিকে দুটো মুখ—উপরের মুখ দিয়ে গলনালি থেকে খাবার নেমে এসে তার ভিতরে ঢােকে ও নিচের দিকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় অন্ত্রনালিতে। অন্তত ঘণ্টাখানেক লাগে পেটের ভিতর খাবার পাক হােতে। এসিড এবং অন্যান্য জারক রসের সঙ্গে যাতে ভালো করে সংমিশ্রণ হয় পেটের ভিতর খাবারগুলিকে নিয়ে এই সময়ের মধ্যে নানারকম নাড়াচাড়া চলতে থাকে। পাকস্থলী ভিস্তির মশকের মতাে অসাড় একটি থলি নয়- তারও সংকোচন-প্রসারণের ক্ষমতা আছে। খাবার জিনিস কিছু ভিতরে গিয়ে পড়লেই পাকস্থলীর পেশীগুলি চঞ্চল হয়ে ওঠে তাদের ছান্দিক সংকোচন-প্রসারণের ফলে খাবারের দলাগুলি ওলটপালট খেয়ে ভালাে করে জারকদ্রব্যের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে যায়। এতে রাসায়নিক ক্রিয়ার সাহায্য করে; ঘণ্টাখানেকের মধ্যে খাদ্যদ্রব্যের অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। ঘি তেল প্রভৃতি প্রাণতত্ত্ব তৈলাক্ত বস্তু ছাড়া আর-সব জিনিসেরই কায়িক জটিলতা ভেঙে সহজ করে ফেলা হয়। মেহজাতীয় বস্তু হজম করা পেটেরও কাজ নয়, সে হয় পরে অন্ত্রে গিয়ে। পেটের যেটুকু কাজ তা শেষ হলেই খাদ্যবস্তু চলে যায় অন্ত্রনালিতে। তার আগে যেতে পারে না, কেননা পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে বেরবার পথে একটি দরজা আছে। যতক্ষণ খাবার হজম হয় এই দরজা বন্ধ থাকে তার পরেই খুলে যায়। অন্ত্রনালিকে আমাদের দেহ থেকে বের করে যদি টেনে ধরা হয় তবে লম্বায় হবে ২৫ ফিট। বেশ কৌশলের সঙ্গে ভাজ করে এতখানি লম্বা নল তলপেটের গহ্বরে অল্প জায়গার মধ্যে রাখা থাকে। এই নলের ২০ ফিট পর্যন্ত সরু—তাকে সেইজন্য ক্ষুদ্রান্ত্র (small intestine) বলে। শেষের দিকের ৫ ফিট মােটা, তাই সেই অংশের বৃহদন্ত্র (large intestine) নাম দেওয়া হয়েছে। বৃহদন্ত্র শেষ হয়েছে মলদ্বারে । পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে ইঞ্চি চারেক পরেই ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিতর দুটো সরু নালি ঢুকেছে শরীরের দুটো প্রধান গ্ল্যাণ্ড থেকে। এই দুটি প্ল্যাণ্ড, যকৃৎ (liver) ও অগ্ন্যাশয় ( pancreas), পরিপাক- ক্রিয়ায় প্রধান সহায়ক যন্ত্র। যকৃতের মধ্যে খুব তিতাে রস সব সময়েই প্রস্তুত হয়ে থাকে। সেই পিত্তরস জমা হয় ঐ নলের মুখে একটি ছােটো থলে, পিত্তাশয়ের (gall_bladderএর) মধ্যে। ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিতর দিয়ে যখন খাবার চলে যেতে থাকে পিত্তাশয় থেকে পিত্তরস বেরিয়ে এসে সেই খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। যকৃৎ থেকে দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব যেমন পিত্ত বেরয়, তার পাশেই অগ্ন্যাশয় থেকেও অন্যরকম বস ঐ সময় বেরিয়ে খাবারের সঙ্গে মেশে। এরা জারক রস-পাক স্থলীর ভিতর যে-সব এনজাইম খাবার হজম করায়, তার চেয়ে এদের হজম শক্তি উগ্রতর। শরীর থেকে পাকস্থলী বাদ দিলেও খাবার হজম করা সম্ভব কিন্তু এই দুটি যন্ত্র না থাকলে চলে না। পূর্বেই বলেছি ঘি, তেল প্রভৃতি স্নেহপদার্থ যা খাই তা তেমনই প্রায় থেকে যায় পাকস্থলী পর্যন্ত। ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে পিত্তের সঙ্গে সংস্পর্শে এলে তবে তার পাক শুরু হয়। কোনাে কারণে পিত্তরসের অভাব হহলে ঘি বা তেলের রান্না আমাদের পক্ষে হজম করা কঠিন। বিশ-ফিট ব্যাপী লম্বা ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিতর দিয়ে খাবার চলতে থাকে দমকে দমকে। ক্ষুদ্রান্তের পেশীর সংকোচন সমতালে হয় না সেইজন্য খাদ্যবস্তু সমভাবে নেমে যেতে পারে না, ফুটখানেক ধরে একই জায়গায় চাপাচাপি চলে কয়েক মিনিটের জন্য তার পর ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয় আর-এক ফুট, সেখানে আবার চাপাচাপি চলতে থাকে। অর্থের এই ধরনের সংকোচন-প্রসারণকে পেরিস্টলসিস (peristalsis) বলে । কোনাে কারণে অন্ত্রের মধ্যে খাদ্যবস্তুর এইভাবে চলনের বাধা ছন্দ ভঙ্গ হােলেই আমাদের শূলব্যথা ধরে। খাবারের দলগুলাে ক্ষুদ্রান্ত্রের ২০ ফিট এগিয়ে যেতে লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা। চলার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রান্ত্রের গা দিয়ে খাবারের পােষ্টাই অংশ রক্ত গ্রহণ করতে থাকে। পড়ে থাকে অপাচ্য অংশ যা শরীর থেকে শেষে বেরিয়ে যায় মল আকারে।
প্রাণতত্ত্ব খাবার হজমের ব্যাপার খুব সােজা নয় দেখা যাচ্ছে। তার আরম্ভ মুখ থেকে, শেষ হয় বৃহদন্ত্রে গিয়ে। তার মধ্যে কত রকম রাসায়নিক প্রক্রিয়া। রীতিমতাে একটা রাসায়নিক ল্যাবরেটরি। কিন্তু এত কলকারখানার ব্যবস্থা সত্ত্বেও আমাদের হজম খুব সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। হৃৎপিণ্ড প্রভৃতি শরীরের অন্য অনেক যন্ত্রের মতো জন্তু জানােয়ারের পাকযন্ত্র অত কার্যকরী নয়। খাওয়া যায় তার পােষ্টাই অংশ সম্পূর্ণভাবে রক্ত গ্রহণ করতে পারে , পরিত্যক্ত মলের মধ্যে কিছু তবু থেকে যায়। বিশেষত উদ্ভিজ্জভােজী জন্তুদের মলের মধ্যে অনেকখানি পুষ্টিকর দ্রব্য অবশিষ্ট থাকে, তাই গােরুর সার মাটির উর্বরাশক্তি বাড়াবার জন্য আমাদের এত কাজে লাগে। ক্ষুদ্রান্ত থেকে বেরিয়ে মল (তখন আর তাকে খাবার বলা যায় না—খাবারের পােষ্টাই অংশ ততক্ষণে রক্তের ভিতর চলে গেছে। গিয়ে পড়ে বৃহদন্ত্রে। অন্ত্রের এই মােটা নালি প্রথমে ডান দিক দিয়ে উপরে ওঠে, তার পর পাকস্থলীর নিচে দিয়ে বয়ে মােড় ফিরে নিচের দিকে মলদ্বারে নেমে যায়। এটা দেখতে যেন জাহাজ-বাধা রশার মততা, গায়ে ঢেউখেলানাে পাক। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ অন্ত্রের সন্ধিস্থলে অ্যাপেণ্ডিক্স (appendix) নামে একটি ছােট্ট আঙুলের মতাে অংশ তার গা থেকে ঝুলে থাকে। এই থলেটির কী কাজ এখনাে ঠিক জানা নেই—ডাক্তাররা এক সময় মনে করতেন যে কাজ তত কিছুই নেই বরং মাঝে মাঝে ফুলে উঠে মানুষের প্রাণসংশয় ঘটায় তাই সুযােগ পেলেই সেটা কেটে বের দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব করে দিতেন। এখন বিশেষ কারণ ছাড়া অত সহজে কাটতে চান —কেননা এর প্রয়ােজনীয়তা কিছু আছে বলেই মনে করেন। মল জমা করে রাখা ছাড়া বৃহদন্ত্রের বিশেষ কোনাে কাজ নেই। সম্পূর্ণ কেটে বাদ দিলেও মানুষ স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকতে পারে পূর্বে ধারণা ছিল তবে এখন জানা গেছে অল্পস্বল্প হজমের কাজ এখানেও চলে। বিশেষত ব্যাকটিরিয়ার কাজ বেশির ভাগ এখানেই হয় । হজমের কাজে অন্ত্রনালিতে অবস্থিত ব্যাকটিরিয়া যথেষ্ট সাহায্য করে। তা ছাড়া এই জায়গা থেকে রক্ত টেনে নেয় তার প্রয়ােজন মতাে জল—তাই ক্ষুদ্রান্তের তরল খাদ্যসামগ্রী বৃহদন্ত্রে অগ্রসর হােতে হােতে ক্রমশ কঠিন হয়ে মলে পরিণত হয় । বৃহদন্ত্রের ভিতর দিয়ে মল বেশ ধীরগতিতে অগ্রসর হয়, ৫ ফিট যেতে লাগে প্রায় ১২ ঘণ্টা। এর মধ্যে নানারকম ব্যাকটিরিয়া জন্মাবার সুযােগ পায়। এখানে নাড়াচাড়া তেমন নেই, জায়গাটা বেশ গরম, প্রচুর খাবার, ব্যাকটিরিয়াদের ভারি সুবিধা। এইজন্য মলের মধ্যে আমাদের পরিত্যক্ত খাদ্যবস্তু অপেক্ষা মরা ব্যাকটিরিয়ার ভাগ বেশি। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে এই সব ব্যাকটিরিয়া অনেক সময় রক্তের মধ্যে ঢুকে আমাদের ব্যামযা বাধিয়ে দেয়। খাওয়ার অত্যাচার না করা, প্রতিদিন সময় মতো মলত্যাগ করা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বিশেষ দরকার। খোজ করলে দেখা যায় মানুষের অধিকাংশ অসুস্থতার মূল কারণ-পাকযন্ত্রের বিকার।
প্রাণতত্ত্ব
আবর্জনা ত্যাগ
আমরা প্রত্যহ যে স্কুল পদার্থ খাই বা জলীয় বস্তু পান করি
তার সমস্তটা শরীরের কাজে লাগে না, আংশিকভাবে গ্রহণ
করি মাত্র আগে বলা হয়েছে। বাকি অংশ কী হয়, কোথায়
যায়।
মল ছাড়াও আরাে যে-সব অনাবশ্যক পদার্থ বের করে
দেওয়া হয় (আপনা থেকে কিছু বেরয় না মনে রাখতে হবে,
বের করে দিতে শরীরকে চেষ্টা করতে হয় ও তার জন্য কল
কৌশল লাগে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে co2 গ্যাস, জল, ও মুন
ইউরিয়া ( Urea)। এইগুলি ধরে রাখলে অল্পক্ষণেই শরীর
বিযিয়ে ওঠে। গন্ধক, ফসফরাস প্রভৃতি কয়েকটা ধাতব বস্তু
আছে যেগুলি শরীরে জমলে ততটা ক্ষতি করে না, কিন্তু
এগুলিকেও বের করে দেওয়া দরকার। বেশি জমতে দিলে
এগুলিও শরীরে বিষের কাজ করতে পারে।
con বাষ্পীয় বলে এর নিঃসরণের কাজ ফুসফুস করে।
অন্যগুলি জলীয় বা জলে গুলে যায় তাই এরা বেরয় প্রস্রাবের
সঙ্গে। বৃক্ক বা কিডনী ও লিভার এগুলিকে শরীর থেকে বের
করে দেবার কাজে সাহায্য করে। অন্ত্রের গা থেকে পুষ্টিকর
সামগ্রী রক্তপ্রবাহে চলে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে যায়।
পুষ্টির কাজ হয়ে গেলে অপঘটনের ফলে
রক্তের মধ্যে
co, গ্যাস জমে
এই দূষিত রক্ত তখন ফুসফুসে
ওঠে।
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব ফিরে গিয়ে সেখানকার হাওয়ায় c02 গ্যাস ছেড়ে দেয়। নিশ্বাসের সঙ্গে তখন এই অপকারক গ্যাস বাইরে বেরিয়ে আসে। co2 বের করে দেবার জন্য রক্তকে ছুটতে হয় ফুসফুসে, অন্যান্য আবর্জনা ত্যাগ করার জন্য তাকে যেতে হয় কিডনী ও ও A কেন IS চ যকৃতে। যকৃতের অনেক গুলি কাজের মধ্যে রক্ত- শােধন একটি প্রধান কাজ। রক্তের সঙ্গে যে এ সব আবর্জনা-বস্তু লিভারে ১৭. শরীরের আবর্জনা নিষ্কাশনের আসে তার মধ্যে অামাে- কয়েকটি যন্ত্র নিয়া (ammonia ) ক. ভায়াফ্রাম খ. ধমনী প্রধান। আমােনিয়া গ. পেটের গহর ঘ, মুত্রনালির মুখ প্রোটিন অপঘটনের ফলে ৬. শিরা চ. মূত্রথলি ছ, মূত্রনালি জ, কিডনী। প্রস্তুত হয় ও এই বস্তুটি ঝ, সুপ্রারিনাল গ্ল্যাণ্ড ঞ, ইউরেন্থ। শরীরের বিশেষ ক্ষতিকর। বেশিক্ষণ বা বেশি মাত্রায় আমােনিয়া রক্তের মধ্যে থাকলে বিষের মতাে কাজ করে। যকৃৎ অ্যামােনিয়ার বিষ মেরে দেয়। তার এমন একটু পরিবর্তন করে দেয় যে তখনকার তাে তা শরীরের ক্ষতি করতে পারে না। সেই অবস্থায় প্রাণতত্ত্ব কিডনীর মধ্যে নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারে। কিডনী কিডনী দুটি যকৃৎ-ফেরত সমস্ত আবর্জনা নিয়ে নেয় এবং সেগুলির আরাে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বের করে দেবার ব্যবস্থা করে। পেটের গহ্বরে দু-দিকে দুটো কিডনী,-তার ঘ থেকে দুটো নল নেমে আসে মূত্রথলি (bladder) বলে একটা থলেতে। চ কিডনীতে প্রস্রাব তৈরি হয়ে অষ্টপ্রহর ক্ষীণ ধারায় নল বেয়ে এই থলির মধ্যে ১৮, ত্বকের গঠন জমতে থাকে সেটা ক. মরা সেল খ. জীবন্ত সেল গ. স্পর্শ অনুভবকারী নার্ভের শেষাংশ ভরতি হেলেই আমাদের ঘ, নার্ভের শাখাবিশাখা ৬. রক্ত প্রস্রাব ত্যাগের হ চলাচলের নালি চ. ঘামের গ্ল্যাও % সুস্থ অবস্থায় প্রত্যহ ২৪ ঘণ্টায় মানুষ সাধারণতঃ প্রায় ১২ সের প্রস্রাব ত্যাগ করে। এই ১২ সের প্রস্রাবের ভিতর জল ছাড়া ৪৫০ গ্রেন ইউরিয়া, ২২৫ গ্রেন মুন ও ১৫০ গ্রেন অন্যান্য দ্রব্য থাকে। বাকি ৯৬% জল। শরীর থেকে এতখানি জল যদি ক্রমা- দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব গত বেরিয়ে যায় অন্তত ততখানি জল খেয়ে আমাদের সেটা পূরণ করা নিশ্চয় দরকার। প্রস্রাব ছাড়া জল-নিকাশের অন্য পথও আছে। ফুসফুস দিয়ে নিশ্বাসের সঙ্গে সর্বদা বাষ্প-আকারে জল বেরিয়ে যায়। নাকের সামনে কাচের টুকরা ধরলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আমাদের সমস্ত শরীর দিয়েও জলনিকাশ হয়, চামড়ার গায়ে ছােটো ছােটো অসংখ্য ছিদ্র আছে- সেগুলিকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। প্রত্যেক ছিদ্রের নিচে একটা করে থলের মতাে গ্ল্যাণ্ড আছে—এই গ্ল্যাও- গুলির কাজ হচ্ছে রক্ত থেকে জল শুষে নেওয়া। সেই জল চামড়ার ছিদ্রগুলি দিয়ে ঘাম হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঘামের মধ্যেও স্বল্পপরিমাণ ইউরিয়া ও নুন থাকে—ইউরিয়া থাকার দরুন ঘামে দুর্গন্ধ। প্রস্রাব বেশি পরিমাণে ও ঘাম অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে শরীর থেকে ক্রমান্বয়ে আবর্জনা বের করে দিচ্ছে। জলের সাহায্যে সেটা করতে হচ্ছে কেননা ইউরিয়া প্রভৃতি আবর্জনা জলে সহজে গুলে যায়, গ্যাস নয় বলে con র মতাে ফুসফুসের দ্বার দিয়ে তাদের নিকাশের সম্ভাবনা নেই। প্রস্রাবের পরিমাণ বা তার ভিতর ইউরিয়া ও অন্যান্য বস্তুর পরিমাণ সব সময় ঠিক থাকে না। জল বেশি খেলে বা ঠাণ্ডা- বর্ষার দিনে প্রস্রাব বেশি হয়। পরিশ্রম বেশি করলে ইউরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। কেননা তখন শরীরের সেলগুলির মধ্যে সংগঠন ও অপঘটনের কাজ দ্রুত হােতে থাকে। অসুস্থ অবস্থায় প্রাণতত্ত্ব যকৃৎ ও কিডনী ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না—তাই তখন প্রস্রাব কমে আসে। প্রস্রাব বন্ধ হেলেই ডাক্তারদের দুশ্চিন্তা। অপ্রয়ােজনীয় বা পরিত্যাজ্য বস্তু অবিলম্বে বহিষ্কৃত করবার এই সব নানান উপায় ও কৌশল শরীরের মধ্যে আছে। মধ্যে কোনােটা যদি কিছুক্ষণ ঠিক ভাবে কাজ না করে তাহলে ব্যারামের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে একটা কোনাে যন্ত্র বিকল হহলে অন্যগুলি কিছুক্ষণের জন্য কাজ চালিয়ে নিতে পারে কিন্তু বরাবর তা পারে না। শরীরে দূষিত বস্তুর অত্যাধিক্য হােলে মৃত্যু ঘটতে পারে। নাৰ্তমণ্ডলী এতক্ষণ আমরা জন্তুজানােয়ারদের নড়াচড়া, নিশ্বাসপ্রশ্বাস, খাওয়াদাওয়া প্রভৃতি বাইরে থেকে সহজবােধ্য বিষয়ের আলােচনা করেছি। এখন আরাে ভিতরের খবর নিতে হবে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার কী কাজ, শরীর-চালনায় কার কী প্রয়ােজন খণ্ডভাবে দেখেছি—কিন্তু বাকি রইল জানবার এদের কাজ দেখছে কে, এদের পরস্পরের যােগাযযাগ-সাধন হচ্ছে কী করে, কী নিয়মে সমস্ত যন্ত্র চলছে, চালনার হুকুম কোথা থেকে আসছে, কে সেই হুকুম বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, হুকুম-কর্তার কাছে বহির্জগতের বার্তাই বা পেচছে কী করে। এসব বিষয় বুঝতে গেলে একটু গােড়া ঘেষে সেলের কথা আবার পড়তে হবে। সেলের প্রােটোপ্লাজম তার পরিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধে যথেষ্ট ৬৪
দেহক্রিয়াত
জাগ। তার এই স্বভাব প্রােটোপ্লাজমকে জড়বস্তুর তুলনায়
বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। বাইরের যে-কোনাে রকম সংস্পর্শে এলেই
তার কিছু পরিবর্তন ঘটে, আঘাত মাত্রেরই সে প্রত্যুত্তর দিতে
আঘাত যেখানেই লাগুক তার সমস্ত বস্তুপিণ্ডের ভিতর
দিয়ে একটা ঢেউ চলে গিয়ে তাকে কাপিয়ে তােলে। আঘাতের
গ
ক
ঘ।
১৯. ত্বকের নিচে চার রকম নার্ভ-সীমান্ত
ক. ব্যথা অনুভূতির খ. ৩ গ. স্পর্শ অনুভূতির
ঘ. তাপ অনুভূতির
মাত্রা অতিরিক্ত হােলে প্রােটোপ্লাজমের আমূল পরিবর্তন ঘটে
এমন কি মৃত্যুও হােতে পারে।
বাইরে থেকে সর্বদাই নানাপ্রকারের আঘাত সেলের উপর
যষিত হচ্ছে। আলাে, ইলেকট্রিসিটি, উত্তাপ, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ
প্রাণতত্ত্ব
কোনাে সেল,
কত রকম শক্তির সঙ্গে তাকে যােঝাবুঝি করতে হয়। সব,
শক্তির সম্বন্ধে সব সেলের সমান অনুভূতি নয়।
আলাের আঘাত যেমন অনুভব করে তীব্র গন্ধ তাকে তেমন
বিচলিত করে না। জন্তুদের শরীরের এক-এক অংশে এমন
কতকগুলি সেল একত্র হয়েছে যাদের বিশেষ বিশেষ আঘাতে
সাড়া দেবার ক্ষমতা আছে। চোখের সেলগুলি আলাের রশ্মি বেশি
করে অনুভব করে, কানের ভিতরের সেলগুলি শব্দের আঘাতে
সাড়া দেয়। এক এক বিষয়ে বিশেষ ক্ষমতাবান সেলের সমষ্টি নিয়ে
যে-সব যন্ত্র শরীরে ছড়ানাে রয়েছে তাদেরই ইন্দ্রিয় বলে থাকি।
ইন্দ্রিয়ের ভিতর দিয়ে আমাদের বাইরের জগতে পরিচয় ঘটে।
আলাের জগতের পরিচয় পাই চোখের দ্বারা, শব্দ-জগতের সন্ধান
আসে কানের ভিতর দিয়ে।
এই সব বিশিষ্ট সেলের কী রকম আশ্চর্য অনুভবশক্তি-
দু-একটা উদাহরণ দিলে তা স্পষ্ট হবে। মানুষের চোখ খুব উচু-
দরের ইন্দ্রিয় নয়, অনেক জন্তু যে-আলােতে দেখতে পায়, আমরা
সে-আলােতে দেখতে পাই না। তবু তার ক্ষমতা সম্বন্ধে প্রশংসা
করে থাকা যায় না। ছােটো একটি পাত্রে যদি ৪৬০,০০০,০০০
মিলিগ্রামের এক-ভাগ অংশ ড্রেয়বস্তু থাকে তবে আমাদের নাক
তা অনায়াসে টের পায়।
গাছপালা বা জন্তু জানােয়ারের অনুভবশক্তি আছে, সে না
হয় মানলুম কিন্তু অনুভব করবার প্রণালী সম্বন্ধে অনেক কথা
জিজ্ঞাস্য থেকে যায়। এক-এক রকম সেলের বিশেষ বিশেষ
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব ক্ষমতা আছে জেনেছি কিন্তু এদের অনুভূতি আমাদের জ্ঞান- গােচর কী করে হচ্ছে এবং অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত করবার কোননা ব্যবস্থা আছে কি না এই বিষয় অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। পূর্বে বলা হয়েছে, শরীরের প্রত্যেক সেলের সঙ্গে পাশের সেলের আঙ্গিক যােগ আছে ; যে-কোনাে একটি সেলে আঘাত এসে পৌছলে তার ধাক্কা চলে যায় অন্য সব সেলে। এই ধাক্কা | মাংসপেশীর সঙ্গে নার্ভ-সেলের যােগ তাড়াতাড়ি বহন করে নিয়ে যাবার জন্যে শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে এক জাতের সরু লম্বা সেল যাদের বিশেষ কাজই হচ্ছে টেলিগ্রাফের তারের মতাে বার্তা বহন করা। এইগুলিকে নার্ভ- সেল বলে, সুতাের মতাে পরম্পর গাঁথা হয়ে এরা সমস্ত অঙ্গ- প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে জালের মতাে। শরীরের যে-কোনাে
প্রাণতত্ত্ব
জায়গায় আঘাত লাগলে তার কম্পন এরা বয়ে নিয়ে যায় সর্বত্র।
বেশ দ্রুতই বহন করে, মিনিটে ৪ মাইল গতিবেগে। জাহাজ,
রেল, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন প্রভৃতি মানুষের তৈরী কলকবজাগুলি
একটা রাজত্ব চালাতে যে-রকম রাজকার্যে সাহায্য করে, আমাদের
শরীরে নামগুলীও সেই রকম শরীরচালনার কাজে সাহায্য
করে। কোটি কোটি সেল এক সুত্রে বেঁধে রাখা সম্ভব হােত
নার্ভ-সেলের সাহায্য বিনা।
পিঠের মেরুদণ্ডের ভিতর বরাবর নলের মতাে গর্ত আছে।
এর ভিতরটা অসংখ্য নার্ভ-সেলে ভরা। এই সেলগুলি দেখতে
যেন সলতের মতাে। এরা স্বতন্ত্র নয়, একটির সঙ্গে
আর-একটি গাঁথা সরু তারের মতাে। একগাছা ইলেকটিক
কেবলের (cable) মধ্যে যেমন বহুসংখ্যক তার পােচ্ছা-
বাঁধা, মেরুদণ্ডের ভিতরে তেমনি নার্ভ-সেলের মােটা গােচ্ছ।
আছে। পেটের কাছ থেকে বেরিয়ে সেই নার্ভ-গুচ্ছ মাথার
মগজের মধ্যে চলে গেছে। নার্ভের তারগুলি এত সরু, দশটি মিললে
তবে একগাছা চুলের মতাে মােটা দেখায়। শিরদাড়ার নিচের
দিকে এর অধিকাংশ গােচ্ছ ঢুকেছে বলেছি, তারা এসে জুটেছে
সেখানে নানা অঞ্চল থেকে। শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সীমান্ত
থেকে তারা টেলিফোনের তারের মতো বার্তাবহরূপে চলে আসছে
এবং এক সঙ্গে তাল পাকিয়ে শিরদাড়ার গর্তের ভিতর দিয়ে উঠে
চলে যাচ্ছে মগজের মধ্যে। সেখানে গিয়ে আবার ছড়িয়ে যায়।
মগজের মধ্যে এক-একটি অংশ এক-এক রকমের বার্তা গ্রহণের
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব উপযােগী। পা থেকে যে নার্ভের তার এসেছে সেগুলি এক জায়গায়, পাকস্থলী থেকে যা এসেছে সেগুলি অন্য জায়গায়, এই রকম ভাগ হয়ে যথাস্থান তারা বেছে নেয়। মগজটা যেন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ (telephone exchange )—নানাদিক থেকে শরীরের সব অঞ্চল থেকে সেখানে খবর পৌছায়। সেই খবর পেয়েই কী করতে হবে তখুনি আবার তার থেকে হুকুম চলে যায়। এই হুকুমও নার্ভ বহন করে নিয়ে যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, তারা সেই অনুসারে কাজ করে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ডান হাতের একটা আঙুলের ডগায় আগুনের ছেকা লাগল। আঙুলের ডগায় যে-নার্ভগুলি চামড়ার নিচেই ছড়ানাে রয়েছে তারা। তখুনি সেই খবর নিয়ে গেল মেরুদণ্ডে বা মগজে। সেখান থেকে হুকুম গেল হাতের পেশীর কাছে—“হাত সরিয়ে নাও”। মুহুর্ত বিলম্ব না করে হাতের পেশীগুলি এমন সংকুচিত হলাে যে, হাত লাফ দিয়ে আগুন থেকে সরে গেল। আগেই বলেছি নার্ভ খবর নিয়ে যেতে পারে মিনিটে চার মাইল। হাতের আঙুল থেকে মেরুদণ্ড বা মগজ পর্যন্ত মাত্র কয়েক ফিট, এইটুকু পথ যাতায়াত করতে এক সেকেণ্ডেও লাগে না। আগুনের তাপ-লাগা ও হাত- সরানাের মধ্যে সময়ের কোনাে ব্যবধান আছে বলে আমরা ধারণা করতে পারি না কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যেই এত খবরাখবর হয়ে গেছে। ইন্দ্রিয় থেকে খবর বয়ে আনা এবং মগজ থেকে ইন্দ্রিয়ে খবর পৌছে দেওয়ার কাজ একই নার্ভ করে না তাহলে গােলমাল বেধে যাবার সম্ভাবনা, একই ধরনের কিন্তু দুই ভিন্ন প্রকৃতির নার্ভ প্রাণতত্ত্ব সেইজন্য আছে। এক রকম নার্ভের ভিতর দিয়ে আঘাতের ঢেউ বা কম্পন এক দিকে চলে, দ্বিতীয় প্রকারে উলটো দিকে যায় । তাদের গঠনের আর কোনাে পার্থক্য নেই। এই দু-রকম নার্ভই অহরহ ব্যস্ত থাকে, অসংখ্য আঘাতের ঢেউ ইন্দ্রিয় থেকে মগজে তারা বয়ে নিয়ে যায়, মগজ তার সাড়া দিয়ে যথােচিত কর্তব্য পালনের আদেশ ফিরে পাঠায়। মানুষের গড়া কোনাে টেলিফোন- প্রণালী এত বেশি কাজ করে না। শরীরে অনেক রকম ইন্দ্রিয় আছে। নাক, কান, চোখ প্রভৃতি বাহেন্দ্রিয়ের সঙ্গেই আমাদের পরিচয় বেশি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে নার্ভ সমস্ত জায়গায় তার জাল বিস্তার করে রেখেছে। শরীরের প্রত্যেক অবয়বের এমনকি প্রত্যেক সেলেরই ক্ষমতা আছে খবর পাঠিয়ে দেবার । পেটের নার্ভ খিদে পেলে বা বদহজম হােলে মগজকে খবর দেয়। এইগুলিকে আভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয় বলা যেতে পারে, চোখ-কান যেমন বাহেন্দ্রিয় । বাহেন্দ্রিয়গুলি দূরের বা বাইরের খবর এনে দেয়, আর আভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়গুলি শরীরের আপন নিজস্ব খবর নার্ভকেন্দ্রে পাঠায়। বাহেন্দ্রিয় (১) স্পর্শ। চামড়ার পর্দা দিয়ে শরীর আগাগোড়া মােড়া, এটা অসাড় আবরণ নয়, জীবন্ত সেল দিয়ে তৈরী। চামড়ার সেলগুলি ঠাণ্ডা-গরম তত অনুভব করেই, স্পর্শবােধ তাদের বিশেষত্ব। মােলায়েম স্পর্শে তারা যেমন আরাম পায় কঠিন বা উগ্র
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
কোনােরকম জিনিসের সংস্পর্শে তেমনি ব্যথা অনুভব করে।
“অনুভব করা বা “ব্যথা পাওয়া কথাগুলি ঠিক এইভাবে আমাদের
এক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয়। বাইরের যে-কোনাে বস্তু
সেগুলিকে স্পর্শ করলে তারা সাড়া দেয়, নার্ভ সেই সাড়া মস্তিষ্কে
নিয়ে গেলে পর “অনু-
ভূতি সেখানে হয়। এক
টুকরা মখমল-কাপড়
গায়ের চামড়ায় কোথাও
ঠেকলে সেখানকার সেল
যে-রকম সাড়া দেয়,
একটা পিন ফুটে গেলে
সাড়াটা বিপরীত হয়।
সাড়ার রকমারিতে মস্তিষ্ক
ঘ।
বুঝতে পারে স্পর্শ কেমন
হােলাে= আরামের না
২১, চামড়ার ভিতরকার গঠনের আর
একটি নকশা
শরীরের চামড়ার ক. তেল প্রস্তুত করার প্ল্যাণ্ড খ. চুলের মুলাংশ
সাড়া দেবার শক্তি সর্বত্র গ, ঘামের গ্ল্যাণ্ড ঘ. চবির পর্দা
সমান নয়, হাতের তেলােতে পিন ফোটালে যত ব্যথা লাগে
অন্য জায়গায় তত না লাগতে পারে। সব অঙ্গে আমরা সমান
ঠাণ্ডা বােধ করি না। মুখের সেলগুলি ঠাণ্ডা সম্বন্ধে অনেকটা
অসাড়, কিন্তু গরম সম্বন্ধে নয়; মুখের কাছে তাত আমরা সহ
কষ্টকর।
৭১
প্রাণতত্ত্ব করতে পারি না। সব জায়গায় স্পর্শবােধও সমান নয়। কিন্তু বেদনা অনুভব করার শক্তি সর্বত্রই ছড়ানাে। ঠাণ্ডা, গরম, স্পর্শ ও ব্যথার যে-চারটি বােধশক্তি চামড়ার বিশেষভাবে আছে বলা হােলাে এর প্রত্যেকটির অনুভূতির জন্য চার রকম বিভিন্ন সেলের সমষ্টি দায়ী। যে-সেলগুলি ঠাণ্ডা লাগলে চট করে সাড়া দেয় সেগুলির গরমে বিশেষ পরিবর্তন ঘটে না। দেহের সর্বত্র এই চার রকমের সেলই ছড়ানাে আছে, তাই সব জায়গাতেই এই চার রকম অনুভব শক্তিও কম বেশি রয়েছে। (২) ঘ্রাণ। যে-অভিঘাতে নাকে গন্ধ পাই বা জিবে স্বাদ অনুভব করি, রাসায়নিক অভিঘাতে তার উৎপত্তি। আলো, উত্তাপ প্রভৃতি অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির বিষয়গুলি বাস্তবজাতীয়, কিন্তু গােলাপফুলের গন্ধ নাকে যখন পৌছায়, সেই অনুভূতির মধ্যে রাসায়নিক প্রক্রিয়া জড়িত। নাকের পিছনে দুটি তিনকোণা গর্ত আছে, তার ভিতর ঘােরালাে-পেঁচালাে নানারকম ধােপ। এই সব খােপের গায়ে যে-সেল আছে তারা কতকগুলি রসায়ন (chemicals) সম্বন্ধে খুব সচেতন। এই রসায়নের বিন্দুমাত্র সংস্পর্শে তার খবর পাঠিয়ে দেয় মগজে এবং তারই ফলে আমরা গন্ধ অনুভব করি। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের কণা ভিন্ন রকম অভিঘাত দেয়, তাদের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার তফাতে। গন্ধবস্তুমাত্রেরই পরমাণুগুলি জল বা স্পিরিটজাতীয় দ্রব ও তরল পদার্থে গােলা অবস্থায় নাকে যাওয়া দরকার। নিছক শুকনাে জিনিসের গন্ধ আমরা পেতে পারি না, যেটুকু পাই তার কারণ ৭২
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
হচ্ছে হাওয়ার এবং নাকের ভিতরকার ভিজে বাষ্পকণা
তাদের কতক অংশ দ্রব করে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে পৌছে দেয়।
এইসব দ্রব্যের পরমাণুর অভিঘাতের বৈচিত্র্য এবং প্রকোপ
অনুসারে আমরা গন্ধের তারতম্য বােধ করি।
(৩) স্বাদ। স্বাদ অনুভব করার বিশিষ্ট সেলগুলি জিব
এবং মুখগহ্বরের গায়ে সাজানাে থাকে। মানুষ চার রকমের
স্বাদ অনুভব করতে পারে টক, মিষ্টি, তিতাে ও নােনতা; এই
চার রকম স্বাদের জন্য চার রকম পৃথক ধরনের সেল আছে।
সাধারণত স্বাদ বলতে আমরা যা বুঝি সেটা ঘ্রাণ ও স্বাদ মেশানাে
একটা অনুভূতি। নাক টিপে বন্ধ রেখে যদি আমরা কোনো
জিনিস খেতে চেষ্টা করি তখনই বুঝতে পারব ভ্রাণের সঙ্গে স্বাদ
কতটা জড়িত। এই রকম ভাবে খেলে চকোলেট ও সন্দেশ বা
এক টুকরা আপেল ও পেঁয়াজের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য বুঝতে
পারব না। সর্দিতে নাক বন্ধ থাকলে সব খাবারই এইজন্য
বিস্বাদ বােধ হয়।
(৪) শব্দ। শব্দ অনুভব করার বিশেষ অঙ্গ হােলো কান।
হাওয়ার কম্পনে শব্দের উৎপত্তি। এই কম্পনের ঢেউগুলি যখন
কানের উপর গিয়ে ধাক্কা মারে তখন আমাদের মগজ শব্দ অনুভব
কান অত্যন্ত জটিল যন্ত্র। বাইরে থেকে আমরা কান
বলে যে-অঙ্গটুকু দেখি তা সম্পূর্ণ নয়। সেটা কেবল একটা
চোঙের মতাে, তার কাজ শব্দের ঢেউগুলিকে ধরে সরু নল দিয়ে
ভিতরে পৌছে দেওয়া মাত্র। কানের আসল যন্ত্রপাতি থাকে
৭৩
প্রাণতত্ত্ব লুকিয়ে মাথার ভিতরে, খুলির হাড়ের অন্তরালে। এত পেলব এই যন্ত্র যে হাড়ের আবরণের মধ্যে তাকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। কানের তিনটি অংশ। ক। বহিরঙ্গ (trumpet)—শব্দ ধরবার জন্য মাথার দু- দিকে বেরিয়ে থাকে যে-অংশ চোঙের মতাে। অধিকাংশ জন্তুর কানের এই অংশটি ঘােরানাে ফেরানাে যায়, তাতে তারা ইচ্ছামতাে যে-দিক থেকে শব্দ চ আসে সেই দিকে কান ফেরাতে পারে ; তাতে করে কেবল যে ভালাে শুনতে পায় তা নয়, শব্দের দিক নির্ণয় ২২. কান করার ভারি সুবিধা হয়। ক. মধ্যাঙ্গের সূক্ষ্ম হাড়-সমষ্টি খ. আভ্যন্তরীণ অঙ্গ মানুষের চেয়ে কুকুর, বেড়াল গ. আভ্যন্তরীণ অঙ্গের সরু নল প্রভৃতির এই কারণে শব্দের ঘ. শামুকের মতাে পেঁচালাে নাংশ ঙ. ইউসটাকিয়াল টিউব অনুভূতি বেশি তীক্ষ। কিন্তু চ, পা মানুষের কানের বহিরঙ্গের সঙ্গে সে-রকম কোনো মাংসপেশীর যােগ নেই যাতে ইচ্ছামতাে তাকে নাড়াতে পারা যায়। কদাচিৎ কোনাে ব্যক্তির এই ক্ষমতা দেখলে সাধারণের কৌতুক বােধ হয়। খ। মধ্যাঙ্গ (middle ear)। বহিরঙ্গ যেখানে সরু হয়ে শেষ হয়েছে ভিতরের দিকে, সেখানে নালির পথ অবরােধ করে একটি ৭৪
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
পাতলা পর্দা আছে। এই পর্দার অপর দিকে কানের মধ্যাঙ্গ।
এখানে বিশেষ কোনাে যন্ত্র নেই, গুহার মতাে গর্ত মাত্র অবস্থিত।
তার এক দিকে পাতলা পর্দা। ভিতরদিকে কানের আসল যন্ত্রপাতি।
মধ্যাঙ্গের গর্তটা সেইজন্য একটা খােল বা ঢােল বাদ্যযন্ত্রের মতাে।
খােলের চামড়ার পর্দায় চাটি মারলে যেমন তার কম্পন সমস্ত
যন্ত্রটিকে কাপিয়ে ধ্বনিত করে তােলে, আমাদের কানের পর্দারও
সেই কাজ। হাওয়ার কম্পন এসে লাগে পর্দার উপর, পর্দা তাতে
কেঁপে উঠে তার কম্পনের ঢেউগুলিকে চালিয়ে দেয় সরু সরু
তিনটি হাড়ের ভিতর দিয়ে আভ্যন্তরীণ অঙ্গে, যেখানে কানের
আসল কলকবজা থাকে। কোনাে কারণে পর্দাটি ফুটো হােলে
লােকে কম শােনে, শব্দ এসে আঘাত করলেও তাকে কাপাতে
পারে না, কাজেই ভিতর-কানে শব্দের ঢেউ পৌছায় না।
গ। আভ্যন্তরীণ অঙ্গ (inner ear )। এর চেহারা
কতকটা শামুকের মতে, একটা নলকে নানারকম করে পেঁচিয়ে
যেন জড়পুটুলি করা। নলটি কোথাও সরু, কোথাও মােটা।
নলের ভিতরে জলীয় রস ভরা আছে। পর্দার কম্পনে এই জল
কেঁপে উঠে আঘাত করতে থাকে নলের গায়ের স্নায়ুমণ্ডলীকে।
স্নায়ুগুলি আঘাতের খবর বহন করে মগজে যেমন পৌছে দিতে
থাকে আমরা অমনি শব্দ অনুভব করতে থাকি। আঘাতের
প্রকোপ যেমন কম বেশি হয়, শব্দও তেমনি ক্ষীণ বা জোরালো
বলে আমাদের মনে হয়। শকের ঢেউ যত দ্রুত তালের হয়
আমরা তত চড়া সুর শুনি।
৭৫
প্রাণতত্ত্ব শব্দের অভিঘাত গ্রহণ করে মগজে তা পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া কানের আভ্যন্তরীণ অঙ্গের আর-একটি বিশেষ কাজ আছে। এই অঙ্গের সাহায্যে আমাদের শরীরের ব্যালান্স (balance), ভারসাম্য, আমরা ঠিক রাখতে পারি। আমরা এক মুহূর্তও সমানভাবে দাড়িয়ে থাকতে পারতুম না, কানের এই অদ্ভুত যন্ত্রটি থাকলে। আলাের ঢেউ শব্দের ঢেউ অপেক্ষা হাওয়ার ভিতর দিয়ে দ্রুত গমন করে। সেইজন্য বিদ্যুতের চমকানি আমরা আগে দেখতে পাই, তার খানিকটা পরে বজ্রের আওয়াজ আমাদের কানে এসে পৌছায়। (৫) দৃষ্টি। দর্শনেন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখের নকল করেছি আমরা ছবি তােলার ক্যামেরায়। চোখের ভিতর যে-সব কলকবজা আছে তার প্রত্যেকটির যথাযথ প্রতিরূপ আমরা দেখতে পাব ক্যামেরাতে। তাই যারা ছবি তােলায় অভ্যস্ত তারা চোখের কার্যপ্রণালী সহজেই বুঝতে পারবেন। চোখের প্রধান অঙ্গ দুটি—সামনের দিকে একটি স্বচ্ছ কাচের মতাে লেন্স যার ভিতর দিয়ে আলােক- রশ্মি প্রবেশ করে ও পিছনে একটি পর্দা যার উপর তার ছাপ গিয়ে পড়ে। বাইরের জিনিস থেকে সূর্যের রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে চোখের উপর যখন এসে পড়ে, লেন্স সেই রশ্মিগুলিকে সংকুচিত করে নিয়ে পিছনের পর্দার উপর ফেলে। বাইরের দৃশ্যের প্রসার যত বিস্তৃতই হােক চোখের সামনে লেন্স থাকাতে সুবিধা এই যে, চোখের পর্দার অল্প পরিসর সত্ত্বেও তার উপর ৭৬
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
সমস্ত দৃশ্যটার ছাপ পৌছায়। ক্যামেরাতেও ঠিক অনুরূপ ব্যাপার
ঘটে। ক্যামেরার লেন্স যে-দৃশ্যের দিকে মুখ করা থাকে তার
ঠ
গ
ক. চোখের পাতা
খ. আইরিস
গ. কণিয়া
স, লেন্সের সামনের জলভরা অংশ
উ, লেন্সের পেশী
চ. লেন্স
ছ, জ, চোখের নার্ভ-সীমান্ত
ঞ. রেটিনা
৪. কোরয়ড পর্দা
ঠ. স্বচ্ছ জেলির মতাে পদার্থ-ভরা গহর
ঝ. রে
একটি ছােট্ট প্রতিবিম্ব গিয়ে পড়ে ফিল্মের উপর। যে-সব
ক্যামেরায় পিছন দিকে ঘষাকাচের ব্যবস্থা আছে আমরা তার
উপর সেই প্রতিবিম্ব ইচ্ছা করলে দেখতে পারি।
চোখের ভিতর আলো ঢােকবার ব্যবস্থার জন্য এই কয়েকটি
অঙ্গ আছে :
৭৭
প্রাণতত্ত্ব
ক। চোখের পাতা (eye-lid)। চোখের পাতার কাজ হােলো
বাইরের আঘাত প্রতিরােধ করা। চোখের পাতার চামড়ার
নিচে পাতলা রবারের পাতের মতাে একটি জিনিস আছে তাকে
বলে কার্টিলেজ (cartilage)। চোখের পাতা খুব জোরে
বন্ধ করলে চারদিকের মাংসপেশীগুলির সংকোচনে কার্টিলেজ গুলি
বেশ শক্ত হয় ও আঘাত প্রতিরােধ করবার ক্ষমতা বাড়ে।
খ। গ্রন্থি ( glands)। চোখের পাতার ভিতরের দিকে
ছােটো ছােটো গ্রন্থি থাকে। সে-সব গ্রন্থি থেকে ক্রমাগত এক
রকম জলীয় পদার্থ বের হয়। সর্বদা ভিজে থাকার দরুন চোখের
পাতা খুব সহজে ওঠানামা করতে পারে এবং ধুলাবালি কোনাে
রকম ময়লা গেলে সহজে ধুয়ে বের করে দিতে পারে।
কর্ণিয়া (cornea)। পূর্বেই চোখের সঙ্গে ক্যামেরার
বাক্সের তুলনা করা হয়েছে। দুইয়েরই বেলা দেখি যে, চারদিক
বন্ধ, কেবল সামনের দিকে গােল একটি জানালার মতাে আলাে
প্রবেশ করবার পথ আছে। এই পথ শক্ত এবং স্বচ্ছ আবরণ দিয়ে
ঢাকা। এই আবরণটির নাম কণিয়া।
আইরিস বা ডায়েফ্রাম ( iris or diaphragm)।
কর্ণিয়ার ঠিক পিছনেই আর-একটি পদ থাকে, এই পদটি স্বচ্ছ
নয়। ব্যক্তিভেদে তার নানাপ্রকার রং হােতে পারে। তারাে
মাঝখানে একটি গােল ছিদ্র পথ। এই পর্দার নাম আইরিস বা
ডায়োম। আইরিসের রং অনুসারে কালো, কটা, নীল ইত্যাদি
নানা রঙের চোখ দেখতে পাওয়া যায়।
৭৮
দেহক্রিয়াত
ঙ। চোখের তারা (pupil)। আইরিসে যে-ছিদ্রটির কথা
বলা হােললা তাকে বলে চোখের তারা।
চোখের তারা প্রয়ােজনমতো ছােটো বড়াে করার ব্যবস্থা
আছে। কম আলােতে বা দূরের জিনিস দেখতে হােলে চোখের
তারা বড়াে হয়, আবার বেশি আলােয় বা কাছের জিনিস দেখবার
বেলা ছােটো হয়।
চ।
লেন্স (lens)। চোখের তারার পিছনে থাকে লেন্স।
মাংসপেশীর সংকোচন প্রসারণে লেন্সের আকৃতির পরিবর্তন হয় ।
এই প্রক্রিয়ার দ্বারা লেন্সের শক্তি বাড়ানাে কমাননা হয়। কাছের
জিনিস দেখবার বেলা লেন্সের শক্তি বাড়ে ও দূরের জিনিসের
বেলা কমে।
ছ। চোখের পর্দা ( retina)। বাইরের ছবি প্রতিফলিত
হয় চোখের পিছন দিককার পর্দার উপর। এই পর্দার গায়ে
অসংখ্য সূক্ষ্ম নার্ভ জাল বিস্তার করে থাকে। সেগুলি চোখের
পিছনে একত্রিত হয়ে অপটিক নার্ভ (optic nerve) গঠিত হয়।
এই নার্ভটি চোখের সঙ্গে মগজের যােগ রক্ষা করে। যা-কিছু
জিনিস আমাদের চোখের সামনে এসে পড়ে তার থেকে আলাের
রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে অনবরত চোখের পর্দার উপর ধাক্কা দেয়।
পর্দা সেই অভিঘাত অপটিক নার্ভের সাহায্যে মগজে পাঠায় এবং
তারই ফলে আমরা নানাবিধ ছবি দেখি। চোখ মেলে যতক্ষণ
থাকি ততক্ষণ ছবি দেখার বিরাম নেই মুহুর্তের জন্যও।
৭৯
প্রাণতত্ত্ব * মগজ বাহেন্দ্রিয়ের কাজ হচ্ছে বাইরের অভিঘাত গ্রহণ করা। নার্ভের কাজ হচ্ছে সেই অভিঘাত বহন করে নিয়ে যাওয়া মগজে। এখন আমাদের জানতে বাকি মগজের কী রকম গঠন ও তার ট কী কাজ। শ মগজকে সাধারণ কথায় মাথার ঘি চ ব'লে থাকি। ঘিয়ের মতাে তরল ন পদার্থ কিন্তু তা নয়। গ প নরম হােলেও তার বিশেষ আকার ভ ত খ ফ আছে এবং এমন ২৪, মানুষের মাথার ভিতরের গঠন চমৎকারভাবে তার ক. শ্বাসনালি খ. স্বরনালি গ. গ্লোটিস (glottis) ভাজগুলি গুছিয়ে ঘ. জিব ৬. প্যালেট (শক্ত ) . মুখগহ্বর ছ. নাকের গত জ, নাকের গহ্বর , spheroidal রাখা যে, অনেক sinus frontal sinus ট. olfactory lobe খানি বস্তু খুব ঠ. মগজ ৪. পিটিউটরি গও ঢ. ৪rd ventricle অল্প জায়গায় 04. cerebellum 3. 4th ventricle et. Statifestar দ, মেডুলা ধ, প্যালেট (নরম ) ন. epiglottis teta afaa 1743 প, শিরদাড়ার হাড় ফ, spinal cord. ধরানাে থাকে। মােটর উপর মগজ দু-ভাগে বিভক্ত, সামনের পিণ্ডটা বড়ো, ৮০ দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব পিছনেরটা ছােটো। মগজের এই দুই অংশে আমাদের মনের অধিষ্ঠান; ভাবনা চিন্তা যা কিছু মানসিক প্রক্রিয়া এইখানে তার উৎপত্তি। মগজের সেলগুলি এত পেলব, তাদের এত নানারকমের কাজ করতে হয়, আর তাদের গঠনপ্রণালীও এত জটিল যে, তাদের অতি সাবধানে রাখতে হয় খুলির মােটা আবরণের মধ্যে। মগজকে দু-ধরনের কাজ করতে দেখা যায়। তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ হচ্ছে প্রতিবতী ক্রিয়া (reflex action)। হাতে ছেকা লাগলে হাত সরিয়ে নেওয়ার ভিতর কোনাে চিন্তার কথা নেই, এ কেবল বাইরের অভিঘাতের সঙ্গে সঙ্গে সহজ প্রত্যুত্তর। কিন্তু কঠিন কাজ হচ্ছে যেখানে বিচারশক্তি খাটাতে হয়, যেখানে স্মরণশক্তির প্রয়ােজন। প্রতিবতী ক্রিয়ার উৎপত্তি মগজের নিচের দিকটাতে। এমন কি মেরুদণ্ডের ভিতর যে নার্ভবস্তু আছে সেখান থেকেই বেশির ভাগ প্রতিবর্তী ক্রিয়ার জন্ম। মেরুদণ্ডের ভিতর নার্ভবস্তু আসলে মগজেরই অংশবিশেষ কিন্তু বুদ্ধি-বিচারশক্তির উৎপত্তিস্থল মগজের উপরের ও সামনের অংশে। সেখানকার অসংখ্য সেল আমাদের স্মৃতিমন্দির। ইন্দ্রিয়- গুলি বাইরের জগত থেকে যা কিছু অনুভূতি সংগ্রহ করে আনে তার কিছু কিছু জের এখানে থেকে যায়। মগজের খােপে খোপে সেগুলি পুজি করে সাজিয়ে রাখা থাকে, যাতে দরকার মতাে যখন ইচ্ছে কাজে লাগানাে যায়। স্মৃতিভাণ্ডারে সযত্নে রক্ষিত পূর্বসঞ্চিত অভিজ্ঞতার উপর আমাদের বুদ্ধিবিচারশক্তি প্রতিষ্ঠিত। প্রতি দিন, প্রতি ঘণ্টা, প্রতি মিনিটে অজস্র ঘটনা আমাদের ৮১
প্রাণতত্ত্ব
ইন্দ্রিয়গােচর হচ্ছে। সারাজীবন ধরে তার কত স্মৃতি মগজে
জে রাখতে হয় তার হিসাব করা অসম্ভব। একটা সদর
আপিসের কাজ চালাবার জন্য কত কেরানী, কত ফাইল, কত
খতিয়ান প্রভৃতির বিপুল আয়ােজন রাখতে হয়। মাথার খুলির
মধ্যে একটুখানি জায়গায় তার চেয়ে বেশি ছাড়া কম কাজ চলে
; এই জটিল কাজ চালাবার খুব সহজ অথচ সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা
রয়েছে।
৮২
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
(উদ্ভিদের )
হয়নি।
পূর্বেকার কয়েক অধ্যায়ে কেবল জন্তুদের শরীর চালনা সম্বন্ধে
আলােচনা করা গেছে। গাছপালার বিষয় কিছু উল্লেখ করা
জন্তুদের দৈহিক গঠন গাছের তুলনায় জটিল। কিন্তু
এই দুই শ্রেণীর প্রাণীর জীবন-প্রণালীর মধ্যে মূলত বিশেষ পার্থক্য
নেই। সমস্ত প্রাণীরই শরীর-গঠনের ভিত্তি হচ্ছে জীবকোষ।
বাইরে থেকে দেখলে গাছ ও জন্তুর মধ্যে যে তফাত প্রথমেই
নজরে পড়ে সে হচ্ছে : গাছপালা নড়তে পারে না, জন্তুজানােয়ারের
অবাধ গতি। তাদের জীবনধারার এই যে মূল বৈশিষ্ট্য-এর
ভিতরেই কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে তাদের অধিকাংশ
পার্থক্যের।
গাছ এক জায়গায় মাটির ভিতরে শিকড় চালিয়ে দাড়িয়ে
থাকে। এক চুলও তার এদিক-ওদিক যাবার উপায় নেই।
তাই হাত-পা’র মতাে কোনাে চলাফেরার অঙ্গ তার গড়ে ওঠেনি।
তাকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়, যেখানে আছে সেখান থেকেই।
মাটির তলায় সে ছড়িয়ে দেয় জালের মতাে বিস্তর শিকড় ।
মাটিতে যা খাবার পায় শিকড় তাই শুষে নেয়, খাদ্যের
৮৩
প্রাণতত্ত্ব
উপকরণগুলি জলে গােলা না হােলে শুষে নিতে পারে না। তাই
মাটিতে রস থাকা দরকার। মরুভূমির মতাে একেবারে নীরস
জমিতে সেইজন্য গাছপালা জন্মায় না।
মাটি থেকে গাছ খাদ্যের যে উপকরণগুলি সংগ্রহ করে তা
হচ্ছে নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P) ও পােটাসিয়াম (k)। এই
তিনটে প্রধান, তবে অল্প-স্বল্প পরিমাণে নিতে হয় আরাে
কয়েকটা ধাতববস্তু, যেমন লােহা (re. ), গন্ধক (s. ),
ম্যাগনিসিয়াম ( Mg.), ক্যালসিয়াম (ca. ), ইত্যাদি।
জলের সঙ্গে শিকড়ের ভিতর ঢুকে এই খাবারগুলি উপরে
উঠতে থাকে, ডালপালা পেরিয়ে একেবারে পাতার মধ্যে
গিয়ে পড়ে।
গাছের পাতার সঙ্গে কতকটা আমাদের পেটের সঙ্গে তুলনা
করা যায়। পেটের ভিতর জন্তুরা তৈরী খাবার নিয়ে সেটা
ভেঙেচুরে শরীরের রক্তপ্রবাহে গ্রহণ করার উপযুক্ত করে তােলে।
পাতার কিন্তু কাজ আরাে বেশি। সে তৈরী খাবার পায় না,
তাকেই খাবার তৈরি করে নিতে হয়। পাতাগুলি গাছের যেন
পাকশালা। গাছের খাবার সামগ্রী পাক করার জন্য কাঠ বা
কয়লার বদলে পাতা ব্যবহার করে সূর্যকিরণকে। কিন্তু শিকড়
যে-উপাদানগুলি পাতার কাছে পাঠায় কেবল তা দিয়ে বলকারক
উপাদেয় খাবার প্রস্তুত হয় না। যে-জিনিসটার প্রধান অভাব
রয়ে যায় তা হচ্ছে অঙ্গার। মাটি তা দিতে পারে না। পাতা
এই জিনিসটি সংগ্রহ করে অভিনব উপায়ে-হাওয়া থেকে।
৮৪
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব শুনে প্রথমটা বিশ্বাস হয় না, হাওয়া থেকে কী করে খাবার জিনিস আসবে, বিশেষত অঙ্গার। কিন্তু সত্যই হাওয়াতে বিস্তর অঙ্গার আছে, co, গ্যাসের আকারে। প্রতি আড়াই হাজার ঘনফুট হাওয়াতে ১ ঘন ফুট co, গ্যাস আছে। আমাদের মনে থাকবার কথা, জন্তুজানােয়ার হাওয়ার অক্সিজেন নিয়ে নিশ্বাস কেলবার সময় co-গ্যাস হাওয়ায় ছেড়ে দেয়। বাতাসে সেটা জমা হয়, গাছের পাতা তাকে ব্যবহার করে। পাতার তলার দিকে ছােটো ছােটো গর্ত আছে, আমাদের গায়ের চামড়ায় যেমন ঘাম বেরােবার অসংখ্য বিদ থাকে। গর্তের মুখগুলি দরকার মতাে খােলে বা বন্ধ হয়। দিনের বেলায় পাতার ভিতর হাওয়া ঢেকে এই দরজা দিয়ে। হাওয়ার অঙ্গার নিয়ে রান্না চড়ে, যেই সুর্যের আলো এসে পড়ে পাতার উপর। C, E, ০, N, P, A, Fe, s, প্রভৃতি সব মালমসলা তখন পাতার ভাড়ার ঘরে রয়েছে মজুত। রান্নার জোগাড়ের অভাব কিছু নেই, তাই খাবার যা প্রস্তুত হয় বেশ উপাদেয়, কেবল গাছের নয় আমাদের পক্ষেও তা মুখরােচক। আলু, পটল, বেগুন, কপি প্রভৃতি সবজি, আম, লিচু, কাঠাল প্রভৃতি ফল যখন খাই তখন পাতার রান্নার সুস্বাদ উপভােগ করি। পাতার ভিতর খাবার যেমন প্রস্তুত হােতে থাকে তার পুষ্টিকর রস গাছের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নেমে চলে যায়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেটা ব্যবহার করে নিজেদের পুষ্টির জন্য। উদবৃত্ত যা থাকে তা গাছ ফেলে দেয় না-পুজি করে রাখে শিকড়ে, ফলে, বীজে। জন্তুরা সেই তৈরী খাবারগুলি খেয়ে প্রাণধারণ করে। ৮৫
প্রাণতত্ত্ব
শিকড় থেকে পাতায়-পাতা থেকে আবার শিকড়ে, দুটি
প্রবাহ চলতে থাকে দিবারাত্র গাছের মধ্যে। খাবারের কাচামাল
ওঠে উপর দিকে, পাকামাল নামে নিচের দিকে।
এদের বয়ে
নেবার জন্য পৃথক দু-শ্রেণীর নালি আছে। এক শ্রেণীর নালি থাকে
ছালের নিচেই কাণ্ডের বাইরে-পিঠে, অন্য নালিগুলি ভিতরে।
রসপ্রবাহের নালি যেন আছে বােঝা গেল, কিন্তু স্রোত বয় কী
impunr: Win
Titoruial
গ
২৫, গাছের গুড়ির ভিতরের গঠন
ক. ছাল ( cortex) খ. কাঠ (woodcells) গ. মজ্জা (pith)
করে। জন্তুদের শরীরে রক্তপ্রবাহ চালাবার জন্য রয়েছে হৃদ্যন্ত্র ।
গাছের তাে বন্ধ
হৃদ্যন্ত্র নেই পাম্পের কাজ করবার জন্য
জলস্রোত উপরদিকে উঠতে পারে না আপনা থেকে। অথচ
অনেক বনস্পতি আছে তিন-চার শ’ ফিটেরও উচু, এত উপরে
জল ওঠে কী করে। এ একটা বিষম সমস্যা। বিজ্ঞানীরা নানা
৮৬
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব কৌশলে এর মীমাংসার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু দেখা গেছে পদার্থ- বিজ্ঞানের কোনাে আইনই খাটে না এক্ষেত্রে। আচার্য জগদীশ- চন্দ্র যে যুক্তি দিয়েছেন তা তবু বিশ্বাসযােগ্য। তিনি বলেন, আমাদের হৃদ্যন্ত্র যেমন একবার সংকুচিত হয় আবার প্রসারিত হয় তেমনি গাছের প্রত্যেক সেলেরই এইরকম অল্পবিস্তর অনায়ত্ত কম্পন আছে। তাতেই পাম্পের কাজ হয় ; একটা সেল তার নিচের সেলের রস নিয়ে উপরের সেলে ঠেলে তুলে দেয়। প্রত্যেক সেলই যেন একটা পাম্প। ক্ষুদ্রকায় হােলেও অসংখ্য পাম্পের জোরে বসপ্রবাহ চলতে থাকে এবং গাছের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত তা উঠে যায় । জন্তুজানােয়ারের যেমন বৈচিত্ৰ্য-এককোষী অ্যামিবা একদিকে আর জটিল অবয়ববিশিষ্ট মানুষ আর-এক প্রান্তে, গাছগাছড়ার মধ্যেও ঠিক তেমনি বৈচিত্র দেখা যায়। শ্যাওলা জাতীয় সবজির শরীরের গঠন খুব সাদাসিধে, কয়েকটি সেলের সমষ্টি মাত্র। বর্ষাকালে ময়দা, পাউরুটি প্রভৃতিতে যে-ছাতা পড়ে (ব্যাঙের ছাতাও সেই জাতীয় উদ্ভিদ) তারও গঠন জটিল নয় ; তার পর কতরকম শাকপাতা, ঘাস ও ছােটোখাটো গাছ দেখা যায় যারা তাদের দু-চারটে সবুজ পাতা দিয়ে মাটির উপর একটু শ্যামলতার আমেজ বুলিয়ে দিয়েই খালাস; তা ছাড়া বনবাদাড়ের শাল, শিমুল, সেগুন প্রভৃতি বিশাল মহীরুহও আছে। উদ্ভিদজগতে ক্রমবিবর্তনের নিচের ধাপে যে-সব গাছগাছড়া তাদের ছেড়ে দিলে উচ্চস্তরের যত রকম গাছ আছে তাদের ৮৭ প্রাণতত্ত্ব শরীরগঠনের চারটি প্রধান এবং অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ দেখা যায়: (১) কাণ্ডগুড়ি এবং ডালপালা নিয়ে দেহের কাঠামাে, যার উপর গাছের আকৃতি নির্ভর করে এবং যা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ধারণ করে রাখে। এই কাঠামাের প্রধান বস্তু হচ্ছে কাঠ। সেটা একেবারে নিরেট অসাড় জিনিস নয়। সরু, লম্বা এবং কঠিন- আবরণে আবদ্ধ সেলসমূহে তা তৈরী। তার বাইরে থাকে বল্কল। (২) পাতা-গাছের সবুজ আচ্ছাদন ; সূর্য রশ্মি ধরবার জন্য যে-অংশ পাখা মেলে দেয় আকাশে। পাতার গড়ন এমন চিতালে এবং ডালে এমন নিপুণ ভাবে তা সাজানাে যাতে প্রত্যেক পাতাই যথাসম্ভব সূর্যকিরণ পেতে পারে। (৩) শিকড়—মাটি কামড়ে ধরে দেহঘষ্টি খাড়া রাখে, এবং মাটি থেকে জল ও খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে উপর দিকে পাঠিয়ে দেয়। (৪) ফুল ও ফল-এর প্রথমটি গাছের জননেন্দ্রিয়। ফুলের মধ্যে কলকৌশল বিস্তর, তার সবিশেষ বর্ণনা এখানে সম্ভব নয়। এইটুকুই এখন জানলে চলবে যে ফুলের বাহরূপ (পাপড়ির ভাজ, রঙের বাহার, মিষ্টি গন্ধ) এবং ভিতরের গঠন (স্ট্যামেন, পিস্টীল প্রভৃতি যাবতীয় অঙ্গ) সব-কিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য জননক্রিয়ায় সাহায্য করা। জন্তুজানােয়ারেরা চলাফেরা করতে পারে বলে প্রয়ােজন মতাে স্ত্রী-পুরুষে মিলিত হােতে তাদের কোনাে বাধা নেই। গাছ তা পারে না সেইজন্য জননের কাজে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। brbr ২৬. ফুল-পাতার বৈচিত্র্য
প্রাণতত্ত্ব
পােকামাকড়কে রঙের বাহারে, গন্ধের মাদকতা, মধু-র
মিষ্টি
আস্বাদের লােভ দেখিয়ে নিয়ে আসে ফুলের কাছে, তাদের দাড়ি-
গোঁপে হাতে-পায়ে মাখিয়ে দেয় পুংরেণু। সেই রেণু স্ত্রী-অঙ্গে
লেগে জন্ম দেয় বীজের। গাছ স্থাণু ব'লে জননক্রিয়া সম্পন্ন করার
জন্য এত ছলনা তাকে অবলম্বন করতে হয়েছে।
ও ,
২৭. ফুলের বিভিন্ন অংশ পৃথক করে দেখানাে
ক. পাপড়ি খ. স্ট্যামেন গ. পিটিল ঘ. ওভারির অভ্যন্তর
স্থাণু বলেই আবার সন্তান পালন করে তােলার নানান কৌশল
করতে হয় তাকে। মানুষের কথা বাদ দিলেও অন্যান্য সমস্ত জন্তুই
ঘুরে ফিরে খাবার সংগ্রহ করে বাচ্চাদের বড়ো করে তােলে,
তার পর ছেড়ে দেয় তাদের নিজেদের চরে খেতে।
গাছ যদি
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব । ৩ একই জায়গায় নিজের আওতায় ক্রমান্বয়ে বীজ ফেলতে থাকে তবে তার অধিকাংশই মরে যায় প্রয়ােজনমতো মাটির রস, হাওয়া ও আলাে না পেয়ে, চারা হয়ে বড়ো হবার সুযােগ পায় তেমন। নিজের কাছ থেকে দূরে বীজ ছড়িয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করতে হয় তাকে। অনেক দূরে যাতে ভেসে যেতে পারে তারজন্যে জলের ধারের গাছের ফল হালকা খােলস দিয়ে মােড়া থাকে (যেমন নারকেল ); শুকনাে ডাঙার উপর যে-গাছ জন্মায় তার কোনাে বীজে পাখা আছে উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়বার জন্য (যেমন শাল ), কারাে আছে তুলাের মতাে ওয়াে, সহজে হাওয়ায় ভেসে বেড়াবার জন্য (যেমন শিমুল, কাশ)। ছড়াবার কৌশল অনেক, কিন্তু যতই হােক পরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর, তাই ভয়ে ভয়ে গাছ প্রয়ােজনের অতিরিক্ত বীজ তৈরি করে। হাজার হাজার বীজের মধ্যে অন্তত দুটো চারটেরও ফাকা জায়গায় ভালাে মাটির সন্ধান মিলতে পারে। ধরে নিলুম সরস মাটিতে পড়ে বীজ থেকে চারা জন্মাল, তাদের শিকড় যতদিন না গজায় তারা খাবে কী। পাখিরা উড়ে গিয়ে খাবার জুটিয়ে এনে বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়। কিন্তু বীজের সঙ্গে মুল গাছের আর সম্পর্ক থাকে না যেই সে খ'সে যায়। কচি চারা যাতে জন্মাবামাত্র খাবারের অভাবে মরে না যায়, তারই ব্যবস্থা করার জন্য গাছ তার বীজের মধ্যে অনেকখানি করে খাবার ভরে দিয়ে তবে তাদের ছেড়ে দেয়। বীজ বা ফলের ভিতর গাছ যে খাবার ভরে দেয় আমরা চুরি করে প্রায়ই সেই খাবার খেয়ে ফেলি।
প্রাণতত্ত্ব তাহলে দেখা যাচ্ছে গাছ ও জন্তুর জীবনপ্রণালীর পার্থক্যের, গােড়াকার কথা—গাছ স্থাণু, জন্তু সচল। এই মূলগত পার্থক্যের, কথা মনে রাখলে তাদের শারীরিক গঠন, খাবার সংগ্রহের প্রথা, বংশবৃদ্ধির উপায় প্রভৃতি সবই তলিয়ে বুঝতে পারব। এই কথাটা মনে রেখে এখন দেখা যাক উদ্ভিদ ও জন্তু এই দুই প্রধান জীবশ্রেণীর মধ্যে কী কী বিষয়ে মিল ও কোথায় পার্থক্য আছে : (১) গাছের ডানা, লেজ, হাত পা প্রভৃতি চলাফেরার কোনাে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই। মাংসপেশীও নেই। বরং রয়েছে অনড় শিকড়, মাটি কামড়ে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকার জন্য। (২) খাবার হজম করার জন্য পাকস্থলী, যকৃৎ প্রভৃতি যন্ত্র- প্রণালী গাছের দরকার নেই। জন্তুর এগুলি দরকার কারণ সে খায় তৈরী জটিল খাদ্য। সেই খাদ্য এই সব যন্ত্রের সাহায্যে ভেঙে চুরে অক্সিজেন দিয়ে পুড়িয়ে তবে শরীর গ্রহণ করতে পারে। যে-সব সহজ ধাতব জিনিস গাছের আহার্য তা পােড়ানাে যায় না, পােড়াবার দরকার হয় না। গাছের খাদ্য-বস্তুর ভিতর সুপ্ত শক্তি বিশেষ নেই। তাকে সেইজন্য বাইরে থেকে অন্য উপায়ে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়। (৩) সুপ্ত শক্তিবিশিষ্ট খাবার থেকে জন্তুরা শরীর ধারণ করে। গাছ শক্তি লাভ করে সূর্যরশ্মির শক্তি আহরণ করে। এই দিক থেকে দেখলে গাছ শক্তি-সঞ্চয়কারী, জন্তু অপচয়কারী। বাইরে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে গাছ যে-সব বস্তু গড়ে তােলে জন্তু তা খেয়ে নষ্ট করে।
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
(৪) সূর্যকিরণের দ্বারা খাবার প্রস্তুত করার ব্যাপারে
উদ্ভিদকে সাহায্য করে পাতার সবুজ রং ( chlorophyll )।
এই রঙের অদ্ভুত ক্ষমতা, আলাে থেকে শক্তি আহরণ করা।
জন্তুদের শরীরে এই সবুজ রঙের মতাে কোনাে পদার্থ নেই।
(৫) জন্তুর প্রধান প্রয়ােজন খাবার ; অন্নের ব্যবস্থা তাদের
জীবনের প্রধান চিন্তা। কিন্তু গাছের প্রধান চিন্তা মনে হয়
সূর্যের আলাে সংগ্রহ ; তারজন্যে সে কত চেষ্টাই না করে। মাটি
ছেড়ে যেখানে
আলো বেশি পাবার
সম্ভাবনা তার দিকে
উপায়,-পাতাগুলি
চিতােলে
মেলে দিয়ে আলো
ধরবার কত ফন্দি।
(৬) নিশ্বাসপ্রশ্বাস
ফেলার ব্যবস্থা গাছ
২৮. পাতার নিচে হাওয়া ঢােকার
'ও জন্তু দু’য়েরই
গর্ত (ক )
আছে। কিন্তু প্রণালীর তফাত। এই কাজের জন্য জন্তুর বিশেষ
অঙ্গ হচ্ছে-নাক ও ফুসফুস। গাছ প্রায় সারা দেহ দিয়ে প্রশ্বাস
নেয়।
প্রত্যেক পাতার তলায় অসংখ্য বিদ আছে তার মধ্যে
দিয়ে হাওয়া ঢুকতে ও বেরােতে পারে। জহুরা সারাক্ষণ কেবল
প্রাণতত্ত্ব
O2 নেয় ও CO2 বের করে দেয়। গাছ রাত্রে অর্থাৎ অন্ধকারেই ,
কেবল এই কাজ করে, দিনমানে অর্থাৎ সূর্যের আলােতে ঠিক তার
উলটো প্রণালী চলে। তখন কেবল co) সে গ্রহণ করে এবং
02 বাতাসে ফিরিয়ে দেয়। গাছ এইজন্য রাতের বেলায় হাওয়া
দূষিত করে, দিনে করে শােধন।
(৭) গাছের ফুসফুস, হৃদয়, রক্ত, মাংসপেশী—এ সব
কিছুই নেই। এই সব অবয়বের কাজ অন্য উপায়ে কী করে
গাছের বেলায় সম্পন্ন হয় তা আগেই বলা হয়েছে।
(৮) উদ্ভিদ ও জন্তু, এদের সেলের আকৃতি সম্পূর্ণ বিভিন্ন।
গাছেল সেলে সেলুলােজের (cellulose) কঠিন আবরণ
থাকে, তারা অপেক্ষাকৃত বড়াে ও
চৌকোণ। উদ্ভিদের চৌকোণা বাক্সর
মতাে সেল অণুবীক্ষণে প্রথম ধরা
পড়ে, তার থেকেই cell কথাটার
উৎপত্তি।
অথচ জন্তুদের জীবকোষ
একেবারেই সেলের
সেলের মতাে দেখতে
নয়। তাদের সাধারণত কঠিন
আবরণ নেই।
(৯) বংশধৃদ্ধির প্রণালীর বিভিন্নতা
সম্বন্ধে আগে বলা হয়েছে-পুনরাবৃত্তির
২৯, উদ্ভিদ-সল দরকার নেই।
(১০) সবশেষে যে-পার্থক্যের কথা বলছি সেটা বড়
৯৪
দেহক্ৰিয়াতত্ত্ব
রকমের। গাছ ও জন্তুর মধ্যে এই বিষয়ে খুব অনেকখানি
ব্যবধান।
আমরা জন্তুদের বেলায় দেখি তাদের অনেকরকম ইন্দ্রিয়
আছে। ইন্দ্রিয়গুলির মগজের সঙ্গে যােগ নার্ভমণ্ডলীর মধ্য দিয়ে।
গাছের এসব কিছুরই বালাই নেই। তাদের না আছে নাক,
কান, চোখ, না আছে নামণ্ডলী, না আছে মগজ। সেইজন্য
তাদের চিন্তা, স্বাধীন ইচ্ছা বা বিচারশক্তি তাে নেই-ই, তারা
শুনতে বা দেখতে পায় না, আঘাত অনুভব করে কি না তাও
সন্দেহ। এই বিষয় জন্তুরা উদ্ভিদজগতকে অনেক অতিক্রম করে
গেছে। বাইরের ঘাত-প্রতিঘাতে গাছপালার জন্তুদের তুলনায়
কতখানি সাড়া দিতে পারে সেই বিষয় আচার্য জগদীশচন্দ্র নতুন
অনেক অথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। তঁার সব কথা মেনে
নিলেও জন্তুদের মতােই যে গাছের চেতনা আছে, এ-কথা
স্বীকার করবার কোনাে কারণ নেই। গাছের নার্ভ বা মগজের
মতাে কোনাে দেহাংশ আছে বলে কখনাে কোনাে প্রমাণ
পাওয়া যায়নি। লজ্জাবতী লতা যে সাড়া দেয় হয়তাে তা সম্পূর্ণ
রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলে, জ্ঞানত সে ব্যথা অনুভব করে বা
শাস্তিবােধ করে এরূপ কোনাে প্রমাণ নেই। সজীব প্রাণীমাত্রেরই
মননশক্তি আছে, আমরা এখনাে একথা স্বীকার করতে
পারি না।
৯৫
প্রজনন ; জীবকোষ মাত্রই অমর। একটিমাত্র ব্যাকটিরিয়ামকে যদি যথেষ্ট খাদ্য ও উপযােগী আবহাওয়ার মধ্যে ছেড়ে রাখা যায় তবে সে ক্রমাগতই সংখ্যায় বাড়তে থাকে। জীবকোষ দিয়ে আমাদের শরীর গঠিত; জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, জীবেরাও তাহলে কেন অমর নয়। বহুকোষী জীবের জীবকোষ কি তাহলে অন্য রকম, তাদের বাড়বার বা বেঁচে থাকার কি তাহলে সীমা আছে তা নয় ; প্রত্যেক জীবকোষেরই নিজেকে ভাগ করে ক্রমাগত বেড়ে যাবার ক্ষমতা আছে। কিন্তু বহু জীবকোষ যখন একত্রে মিলে একটা ভিন্ন জীবদেহ গড়ে তােলে তখন তাদের সম্মিলিত জীবন চালনার জন্য নানান জটিল অবয়ব ও যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়। সমবায় প্রণালীতে জীবনযাত্রা তখন চলে। অসুস্থতা, জরা বা মৃত্যুর কারণ ঘটে তখনই যখন সহযােগের অভাব ঘটে, সমবায়ের কোনাে এক কেন্দ্রে কিছু গলদ হয়। হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে রুগীর মৃত্যুর পরও সেই হৃদ্যন্ত্রের এক অংশ নিয়ে ল্যাবরেটরিতে রেখে দেখা গিয়েছে তার জীবকোষগুলিকে অনেকদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা যায়। তার থেকে প্রমাণ হয়, হৃদ্যন্ত্রে ব্যক্তিগত জীব- কোষগুলির বার্ধক্য বা মৃত্যুর কারণে তা বন্ধ হয়নি—সমবেত জীবনযাত্রায় কোনাে ব্যাঘাত ঘটেছিল।
প্রজনন প্রত্যেক জীবকোষ ব্যক্তিগতভাবে অজর-অমর হােলেও বহুকোষী জীবমাত্রেরই মৃত্যু যে অনিবার্য এ-কথা আমরা সুনিশ্চিত জানি। তার কারণ, সমবেত কলেবর-বন্ধনের প্রকৃষ্ট উপায় এখনাে পর্যন্ত সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু কোনাে প্রাণীই মরতে চায় না। সশরীরে নিজেকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারবে বলে অমর হবার অভিনব উপায় সে উদ্ভাবন করেছে। এরীরের বিশেষ কয়েকটি সেলের উপর ভর দিয়েছে নতুন করে তারই অনুরূপ আরাে জীব গড়ে তোলবার। যেন নিজের গ শরীরের অংশ -খ থেকে গড়া সন্তান- ৩০. পুরুষ-জননেন্দ্রিয় সন্ততির ভিতর ক. প্রসটেট গ্ল্যাও দিয়ে নিজেকে অমর খ. টেসটিস বা শুক্রাশয় করার প্রয়াস। গ. ইউরেথা বা মূত্রনালি অ্যামিবা প্রভৃতি ঘ. ব্ল্যাডার বা মূত্রথলি খুব নিম্নশ্রেণীর এককোষী জীবদের প্রজনন অতি সহজ উপায়ে হয় আগে বলা হয়েছে। তাদের স্ত্রী-পুরুষভেদ তাে দূরের কথা দেহ কোষ ও জননকোষের মধ্যেও কোনাে প্রভেদ দেখা যায় না।
প্রাণতত্ত্ব তারা বংশবৃদ্ধি করে নিজেকে কেবল দু-ভাগ করে। এই সহজ উপায়ে বিভাজন থেকে শুরু করে স্ত্রী-পুরুষ মিলন-ঘটিত জটিল প্রজনন-প্রণালী পর্যন্ত বহুবিধ মধ্যবর্তী প্রণালী দেখতে পাওয়া যায়। মনে হয়, প্রকৃতি যেন বংশবৃদ্ধির প্রণালী নিয়ে ক্রমাগত অসংখ্য পরীক্ষা করে চলেছে, কিছুতেই সন্তোষজনক প্রকৃষ্ট উপায় আবিষ্কার করতে পারছে না। সমান দু-ভাগ হওয়া ছাড়াও সেক্স-বিযুক্ত বিভাজনের আরাে রকমারি প্রণালী লক্ষ্য হয়। কয়েক রকম জীব আছে যাদের সেলে অনেকগুলি কোষকেন্দ্র থাকে। ভাগ হবার সময় কোষকেন্দ্রগুলি প্রত্যেকটি আলাদা হয়ে গিয়ে অনেক গুলি সেল প্রস্তুত করে । একটি থেকে দুটিমাত্র সেল না হয়ে অনেকগুলি সেল একসঙ্গে তৈরি হয়। আর কয়েকটি নিম্নস্তরের জীব তাদের দেহকোষ থেকে মাঝে-মাঝে ক্ষুদ্রকায় কুঁড়ির মতাে বাচ্ছা সেল (bud উৎপন্ন করে। দেহকোষের কোনাে কোনাে পরিবর্তন হয় না, তাই আকার যেমন তেমনই থেকে যায় । মস (moss ), ফার্ণ ( fern), ছাতা (fungus ) প্রভৃতি নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদের মধ্যে দেখা যায় তাদের শরীর থেকে কয়েকটি সেল তফাত হয়ে গিয়ে ‘স্পোর’ (spore) বীজাণুতে পরিণত হয় এইগুলি দেখতে ছােটো বীজের মততা, কিন্তু বীজ যে-উপায়ে জন্মায় এদের উৎপত্তি অত জটিল নয়। উচ্চশ্রেণীর উদ্ভিদের স্ত্রী-পুরুষ ভেদ এবং সংগম-ঘটিত বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকলেও তাদের অনেকেই সেক্স-সম্পর্ক-বিবর্জি প্রজনন বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা একেবারে হারায়নি দেখা যায়। আমরা সেই ক্ষমতা ব্যবহার করি যখন কোনাে গাছের ডাল কেটে কলম লাগিয়ে নতুন গাছ তৈরি করি। সেক্স-ঘটিত বংশবৃদ্ধির মূল ঘটনা হচ্ছে : উচ্চশ্রেণীর মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ জাতিভেদের ব্যবস্থা; পুরুষের ক্ষুদ্র জার্ম-সেল ও স্ত্রী- দেহাভ্যন্তরে অপেক্ষাকৃত বড়ড়া জার্ম-সেল প্রস্তুত হওয়া ; এবং এই দুই জার্ম-সেলের মিলে-মিশে-যাওয়া থেকে একটি নতুন জীব গড়ে ওঠা। বংশবৃদ্ধির এই প্রণালী উচ্চশ্রেণীর জীবে নানান কৌশল ও নিপুণতার চরম সীমায় পৌচেছে বটে কিন্তু নিম্নশ্রেণীর মধ্যেও তার একটু সুত্রপাত দেখা যায়। সেক্সের কোনাে লক্ষণ নেই অথচ দুটো দেহকোষ না মিশলে বিভাজন শুরু হয় না, এরকম উদাহরণ অনেক আছে। পুরুষদের প্রধান জননেন্দ্রিয় শুক্রাশয় (testes)। এর ভিতর পাশাপাশি দুটি বীচির মতাে গ্ল্যাণ্ড আছে। গ্ল্যাণ্ডের ভিতরকার স্তরের সেলগুলির কাজ হচ্ছে ক্রমাগত ভাগ হয়ে অসংখ্য নতুন সেল তৈরি করা। সেগুলি দেখতে ব্যাঙাচির মতাে কিন্তু এত ছােটো যে, অণুবীক্ষণ ছাড়া দেখা যায় না। এই সেলগুলি জননকোষ ( sperms), pefits পুরুষ-জার্মসেল। এরা শুক্রাশয়ের গ্ল্যাণ্ড দুটির ভিতর যথেচ্ছ সন্তরণ করে বেড়ায়। শুক্রাশয়ের সঙ্গে দুটি সরু নল দিয়ে মূত্রনালির ( urethra ) যােগ আছে। প্রয়ােজনের সময় স্পার্মসেলগুলি নল বেয়ে ইউরেথার ভিতর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রাণতত্ত্ব মেয়েদের শরীরে অন্যরকম ব্যবস্থা। তাদের প্রধান জননেন্দ্রিয় ওভারিদ্বয় (ovaries)। তল পেটের ভিতর ছােট্ট দুটো গ্ল্যাণ্ড। তাদের ভিতর নিদিষ্ট সময়ে (পুরুষদের মতো সব সময়ে নয় ) একটি করে (পুরুষদের মতো অসংখ্য নয় ) ডিম্বকোষ অর্থাৎ স্ত্রী-জামসেল প্রস্তুত হয়। মেয়েদের ডিম্বকোষ পুরুষদের জনন- কোষের তুলনায় অনেক বড়াে। ওভারির ভিতর ৩১. স্ত্রী-জননেন্দ্রিয় ডিম্বকোষ তৈরি হয়ে ক. ডিম্বনালি খ. ইউটেরাস বা জরায়ু, গ. ওভারি বা ডিগ্ন্যাণ্ড ঘ. যােনি পূর্ণতা লাভ করলেই তা নলের ভিতর দিয়ে জরায়ুতে এসে নামে। জরায়ু খুব শক্ত রবারের মতাে চামড়ার থলে, সাধারণ অবস্থায় ৩” মাত্র লম্বা প্রয়ােজনমতাে যথেচ্ছ বড়ো হােতে পারে। স্ত্রী-পুরুষের সংগমকালে পুরুষের অসংখ্য স্পার্মসেল স্ত্রী-যােনি দিয়ে প্রবেশ করে জরায়ুর ভিতর ঢোকে। সেখানে স্ত্রীর ডিম্ব- কোষ প্রস্তুত থাকে এদের অভ্যর্থনার জন্য। স্পার্মসেল গুলি জরায়ুতে প্রবেশ করেই লেজ নেড়ে সাঁতার কেটে ছুটে আসে ডিম্বকোষের দিকে। এদের মধ্যে প্রথম যেটি তাকে স্পর্শ করতে পারে তারই হয় জয়, তাকেই দেয় সে ভিতরে ঢুকতে।
প্রজনন ঢোকামাত্র ডিম্বকোষের বাইরেকার পর্দার এমন পরিবর্তন ঘটে যে, অন্য পুরুষকোষগুলি আর ঢুকতে পায় না। ডিম্বকোষের মধ্যে ঢােকবার সময় স্পার্মসেল লেজটি খসিয়ে যায় বাইরে। সে তার গন্তব্য- স্থানে পৌছে গেছে, সাতার কেটে ছােটাছুটি করার আর তার দরকার নেই। মানুষের বেলায় প্রতিমাসে নির্দিষ্ট দিনে একটি করে ডিম্বকোষ স্ত্রী- ৩২. স্ত্রী ও পুরুষ জার্মসেল অ, স্ত্রী-ডিম্বকোষ জ, পুরুষের স্পামসেল নি, কোষকেন্দ্রিক। ক, ক্রোমোসােম নকোষকেন্দ্র স, সাইটোপ্লাজম লােকের ওভারিতে তৈরি হয়ে জরায়ুর মধ্যে স্পার্মসেলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। কোনাে জন্তুর তিন মাস, কোনাে জন্তুর ছ' মাস, কারাে বা বৎসরান্তে একবার ডিম্বকোষ জন্মায়। যদি কোনাে কারণে সেই সময় পুরুষ-স্পার্মসেলের সঙ্গে মিলন না হয় তবে দু-চার দিনের মধ্যেই স্ত্রী-ডিম্বকোষ শুকিয়ে মরে যায়। আবার যথা-ঋতুতে আর-একটি প্রস্তুত হয়। পুরুষ ও স্ত্রী-সেলের মিলনের পরমুহূর্ত থেকে ডিম্বকোষের মধ্যে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এতক্ষণ সে নির্জীব ১০১
প্রাণতত্ত্ব
অবস্থায় ছিল, এখন তার ভিতরে কাজের ভিড় বেধে যায়, সে
মহা ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
পুরুষ-জাসেলের প্রায় সবটাই কোষকেন্দ্র, তাতে
সাইটোপ্লাজম নেই বললেই
স্ত্রী-জার্মসেলের মধ্যে
ঢােকবার পর তার কোষকে
আরাে বড়ো হোতে থাকে এবং
খানিকটা বড়ো হয়ে স্ত্রী-জাম--
হয়।
সেলের কোষকেন্দ্রের সঙ্গে
একেবারে মিশে যায়। প্রথমেই,
অর্থাৎ পুং-জামসেল তার ভিতর
জরায়ুর ভিতর জ্বণ
প্রবেশ করার
ক. প্ল্যাসেন্টা, খ. জ্বণ
পূর্বেই, সে
গ. নাড়ী, ঘ, ডিম্বনালি তাড়াতাড়ি সাধারণ প্রণালীতে
দু-একবার ভাগ হয়ে নেয়। সমান ভাবে ভাগ হয় না; একটি
করে বাচ্ছা-সেল নিজের শরীর থেকে বের করে দেয়।
এগুলিকে পােলার বডি (polar body) বলে । প্রথম
পােলার বডি নিজেকে ভাগ করে দুটো হয়। শেষেরটি
এত নিস্তেজ যে, সে আর ভাগ হােতে পারে না। তিনটি
পােলার বডিই খানিক বাদে মরে যায়, এরা কোনাে কাজে
লাগে না।
এদের তৈরি করার একমাত্র উদ্দেশ্য মাতৃকোষ থেকে
অর্ধেক পরিমাণ ক্রোমােসোম-বস্তু বের করে দেওয়া। পুং ও
স্ত্রী-জাসেল মিলনের সময় উভয়েরই কোষকেন্দ্রে নিদিষ্ট সংখ্যার
১০২
প্রজনন
অর্ধেক মাত্র ক্রোমােসােম বর্তমান থাকে। ঐ দুটির মিলনের
পর জাতিগত নিদিষ্ট সংখ্যা পূর্ণ হয়। তারপর যা কিছু
ঘটে সাধারণ বিভাজনের পর্যায় অনুসারে। একটা থেকে
দুটো, দুটো থেকে চারটে ক্রমাগত ভাগ হয়ে সেল বাড়তে
থাকে। এই রকম ভাগ হবার প্রণালীর বিষয় পূর্বে বর্ণনা করা
হয়েছে। তিন সপ্তাহের মধ্যে ডিম্বকোষ সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে
বড়াে
হয়ে
যায় যে, জ্বণ বলে।
তখন থেকেই তাকে
চিনতে পারা যায়।
-খ
-গ
মানুষের বেলায়
শরীরের প্রায় সব
অঙ্গপ্রত্যঙ্গই পাচ
সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট
ফুটে ওঠে। তখনাে
৩৪. উচ্চশ্রেণীর গাছের জননেন্দ্রিয়
কিন্তু সমস্ত জ্বণটা
ক. স্ট্যামেন, প, পিটিল, গ, ওভারি
” ইঞ্চির বেশি বড়াে হয়নি। দু-মাস পরে পুরাে ১” ইঞ্চি হয়।
তখন থেকে তাকে চিনতে পারা যায় মানুষের জ্বণ বলে।
আরাে সাত মাস লাগে পুরােপুরি শিশুর মতাে হােতে। ন’ মাস
পর মায়ের জরায়ুর মধ্যে আর থাকা চলে না, শিশুর জন্ম হয়।
গাছগাছড়া যে-উপায়ে বংশবৃদ্ধি করে তার সঙ্গে উপরােক্ত
প্রণালীর মূলগত পার্থক্য নেই। তাদের জননেন্দ্রিয় অন্য রকম
হােলেও জননক্রিয়া-প্রণালী একই ধরনের। তারাও বিশেষ
১০৩ :
প্রাণতত্ত্ব
কয়েকটি সেলের উপর ভর দিয়েছে, এই কাজটির জন্য।
গাছের সমস্ত জননেন্দ্রিয় ফুলের মধ্যে অবস্থিত। উচ্চশ্রেণীর
গাছমাত্রেরই স্ত্রী-পুরুষ
আছে। তবে অধিকাংশ
ক্ষেত্রে একই গাছের একই ফুলের মধ্যে স্বী
পুরুষ
ইন্দ্রিয় দুই পাশাপাশি থাকে। ফুলের পুরুষ-জননেন্দ্রিয় হচ্ছে
স্ট্যামেন (stamen ), সরু ডাটার উপর একটি ছােট্ট পুটলি
যার ভিতর পাউডারের মতাে গুড়া ভরা। পাউডারের মতো
জিনিসটা হােলাে রেণুপ্রত্যেক রেণুকণা একটি পুরুষ জার্ম-সেল।
faza (pistil) ফুলের স্ত্রী-জননেন্দ্রিয়, তার তিনটি
মােটামুটি অংশ : (১) কমণ্ডলুর মতাে দেখতে ওভারি, যার
ভিতর বীজ জন্মায়, (২) তার থেকে একটা ডাটা উঠেছে,
স্টাইল (style ), (৩) যার মাথায় চ্যাপটা ঠুলির মতো
স্টিগমা (stigma)। স্টিগমার উপরটা ভিজে চটচটে থাকে।
বাতাসে উড়ে এসেই হােক বা মৌমাছির পায়ের রোয়ায়
লেগেই হােক রেণুকণা যখন স্টিগমার উপর এসে পড়ে তখন তার
চটচটে গায়ে সে আটকে লেগে থাকে। এর মধ্যে কোনাে-একটি
রেণুকণা সুতাের মতাে লম্বা হয়ে তার শুড় চালিয়ে দেয় নিচে
ওভারির ভিতর । সেখানে স্ত্রী-ডিম্বকোষ তৈরি থাকে। তার
সঙ্গে রেণুকণা মিলে গিয়ে, যেমন জন্তুদের বেলায় শিশু গড়ে ওঠে,
তেমনি গাছের ওভারির মধ্যে বীজ জন্মায়। প্রত্যেক বীজের
মধ্যে একটি ছােট্ট চারাগাছ লুকানাে থাকে, সরস মাটিতে
পড়লে বীজের খােলস ফাটিয়ে সে মাথা জাগিয়ে ওঠে এবং
• ১০৪
প্রজনন বাড়তে বাড়তে ক্রমশ তার পিতামাতার মতোই বড় গাছ হয়ে ওঠে। জননপ্রণালীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ মােটামুটিভাবে দেওয়া গেল। এর ভিতর লক্ষ্য করবার বিষয় হচ্ছে : (১) নিম্নস্তরের গাছ বা জন্তুদের বংশবৃদ্ধি সাধারণ বিভাজন- প্রণালীতে কেবলমাত্র ভাগ হয়ে হয়। (২) উচ্চস্তরের জীবমাত্রেরই স্ত্রী পুরুষ ভেদ আছে। দুজনের সংগমে তবে সন্তান জন্মায়। সাধারণ দেহকোষ এই জননক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট নয়। বিশেষ অঙ্গের বিশেষ কয়েকটিমাত্র সেল এই কাজে ব্রতী। তাদের সেইজন্য জননকোষ বা জার্ম-সেল নাম দেওয়া হয়। (৪) পুরুষের একটি এবং স্ত্রীর একটি—এই দুটিমাত্র জনন- কোষের মিলনে নূতন প্রাণীর সৃষ্টি হয়। দু-দিক থেকে—দুটি জার্ম সেল থেকে—শিশুর উৎপত্তি, সেইজন্য সে তাদের অর্থাৎ পিতামাতার দুজনের কাছ থেকেই সমানভাগে উত্তরাধিকার পায়। জনক জননী নিজেদের শরীর-মনের সমস্ত বৈশিষ্ট্য একটিমাত্র জননকোষের মধ্যে নিহিত করে দান করে সন্তানকে। কী করে দৃষ্টির অগােচর এতটুকু একটি জননকোষের মধ্যে এতখানি এবং এত রকমের ভাবী সম্ভাবনা ভরা থাকে তার বিষয় পরে আলােচনা জীবের বংশানুক্রম ঘরে ছেলেপিলে জন্মাবামাত্র মেয়েমহলে হুল্লোড় বেধে যায় নবজাত শিশু কার মতাে দেখতে হােলে । বাপের মতাে টিকোলো নাক, না মায়ের মতো ডেবা-ডেবা চোখ, তা নিয়ে পিসিমা দিদিমায় তুমুল তর্ক বেধে যায়। এর থেকে আর-কিছু হােক, এইটে প্রমাণ হয় যে, আমরা সকলেই ধরে নিয়ে থাকি জনকজনয়িত্রীর সঙ্গে সন্তানসন্ততির ঘনিষ্ঠ-সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কেন এমন সাদৃশ্য থাকবে, তার কারণ কী, কোনাে সাদৃশ্য থাকলেই বা দোষ কী, সে-বিষয় সন্তোষজনক জবাব পাওয়া বংশানুক্রমিক সাদৃশ্য ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। সব প্রথমে বােধ হয় ইংলণ্ডে ড্যালটনই ( Dalton) এ-বিষয়ে অনুসন্ধান করতে আরম্ভ করেন কতকগুলি বংশের ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করে। পুরুষানুক্রমিক নাক, মুখ, চোখ, প্রভৃতি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের মাপ-জোখ তিনি মিলিয়ে দেখেন। এ-রকম মাপ তুলনা করে দেখে, বংশানুক্রমের কোনাে নিয়মে পৌছানাে যায় কি না পরীক্ষা করা তার ইচ্ছা ছিল। ড্যালটন প্রভৃতি বিজ্ঞানীদের এ-রকম চেষ্টাসত্ত্বেও গত শতাব্দীতে বংশানুক্রম সম্বন্ধে জ্ঞান নিতান্ত ভাসা-ভাসা ছিল। তথ্য অনেক সংগ্রহ হয়েছিল জীবের বংশানুক্রম বটে কিন্তু ভিতরকার রহস্যের সন্ধান তখনাে মেলেনি। জীবতত্তবিদেরা এই বিষয় জানবার জন্য যখন বিশেষ চেষ্টা করেছেন অথচ ঠিক করে কিছুই ধরতে পারছেন না তখন দুটি বড়াে রকমের আবিষ্কারের ফলে অনিশ্চয়তার আবছায়া অনেকটা ঘুচে গেল । অণুবীক্ষণের ইতিমধ্যে খুব উন্নতি হয়েছে। জার্মানিতে ভাইসমান ( weismann) অণুবীক্ষণ দিয়ে সেলের ভিতরে দৃষ্টি চালালেন। সেলের ভিতরকার যত সূক্ষ্ম কলকবজা আছে একে- একে তাদের সব সন্ধান পেতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, কোষ- কেন্দ্রের মধ্যে দড়ির মতাে পাকানাে খানিকটা ঘন পদার্থ আছে। সেল যখন বিভক্ত হয় তখন সেটা আর জট পাকানো থাকে না, বিচ্ছিন্ন হয়ে ঐ ঘন পদার্থ কোষকেন্দ্রের দুই মেরুতে জোড়ায়- জোড়ায় দাড়িয়ে যায়; কখনাে দড়ির মত, কখনাে কাঠির মতাে, কখনাে আবার ফুটকির মতাে। সেলের এই পদার্থগুলির নাম দিলেন ক্রোমােসােম। মানুষের শরীরের যে-কোনাে অংশের সেল অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলে, দেখতে পাব তার ভিতরে ৪৮টি ক্রোমাে- সােম আছে। একই জাতীয় জীবের মধ্যে ক্রোমোেসােমর সংখ্যার কখনো ব্যতিক্রম হয় না। জাতিভেদে সংখ্যার তারতম্য হয় বটে কিন্তু প্রত্যেক জাতির বিশেষ একটি সংখ্যা নিদিষ্ট থাকে। নিচে তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া গেল : উদ্ভিদ বাধাকপি-১৮ কুকুর-২২ ভুট্টা-২ ঘােড়া-৩৮ ১০৭
প্রাণতত্ত্ব
উদ্ভিদ
ধান-২৪
গােরু-১৬
তামাক- ৪৮
৫৪
গম-৪২
মাষ-৪৮
সাধারণ ভাবে সেল নিজেকে যখন ভাগ করে, বিভাজনের
অনতিপূর্বে ক্রোমােসােমগুলি তার ভিতর ডবল হয়ে যায়। ভাগের
সময় অর্ধেকগুলি একটি বাচ্ছা সেলে ও বাকি অর্ধেক অন্যটিতে
চলে যায়। বিভাজনের পূর্বে ডবল হয়ে যাওয়া ও পরে সমান
দু-ভাগে বিভক্ত হওয়ার ফলে বাচ্ছা সেলে ক্রোমােসােমের সংখ্যা
ঠিক থেকে যায়। জাতিগত নিদিষ্ট সংখ্যার সেজন্য কখনাে
কম-বেশি হয় না। কাজেই মাতৃকোষে যত ক্রোমোসােম থাকে
সন্তান-কোষেও ঠিক ততগুলিই থাকে।
স্ত্রী-পুরুষ সংগমঘটিত বিভাজনের প্রণালীতেও ক্রোমোেসােমের
সংখ্যা ঠিক থাকে, তবে অর্ধেক আসে পৈতৃক জননকোষ থেকে,
বাকি অর্ধেক মাতৃক ডিম্বকোষ থেকে।
ভাইসমান অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখে চাক্ষুষ প্রমাণ পেলেন যে,
বাপ-মা দুজনের কাছ থেকে শিশু সমান ওজনে উত্তরাধিকার
পায়। এর থেকে আরাে জানা গেল যে, ভাবী শিশুর যাবতীয়
উত্তরাধিকার ক্রোমােসােমের মধ্যেই নিশ্চয় নিহিত থাকে।
জনকজননী সন্তানকে যা-কিছু দিতে চায় এই ক্রোমােক
সােমের ভিতর দিয়েই দিতে হয়। ভালাে অণুবীক্ষণ দিয়ে
Sob
গ
ঘ
s:on -
গ
ঙ
৩৫. (ক) মিথুনঘটিত বিভাজন
১.২.৩, ডিম্বকোষ প্রস্তুত হচ্ছে পুং-জাম সেলের সঙ্গে মিলনের জন্য
৪. পুং-জামসেল ডিম্বকোষে প্রবেশ করছে ৫. ঢোকার পর তার লেজ খসে
গেছে ৷ ইতিমধ্যে ডিম্বকোষ সাধারণ বিভাজন-প্রণালীতে ৩টা ছোটো বাচ্ছা-
সেল (polar bodies) প্রস্তুত করেছে।
ক. কোষকেন্দ্রিকা খ. সেন্টোসেম গ. ক্রোমোসোম ঘ. পোলার বডি
. পুং-জামসেল
চ
f
- চ১
।
১২
৩৫. (খ) মিথুনঘটিত বিভাজন
৭. পু ও স্ত্রী-জামসেলের কোষকেন্দ্র পরস্পর কাছাকাছি আসছে
৯, ১০. তারা মিশে গিয়ে আবার ভাগ হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ১১. ১২. ভাগ
হয়ে দুটি সেলের উৎপত্তি। এর পর এই রকম ভাগ হােতে হোতে প্রাণ গড়ে উঠবে।
নকশাগুলিতে ক্রোমোসোমের সংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি বিশেষ দ্রষ্টব্য।
খ. সেন্টোসেম চ. চ. পুং ও স্ত্রী-কোষকে
জীবের বংশানুক্রম দেখলে আবার দেখা যায় যে, প্রত্যেক ক্রোমােসােমেরও বিন্দু বিন্দু ভাগ আছে। সেই দেখে ভাইসমান অনুমান করলেন যে, জীবের প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, এমন কি, শরীরের প্রত্যেক বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য ক্রোমােসােমের এই বিন্দুগুলি দায়ী। বিন্দুর ও হয়তাে থাকে অণুবিন্দু যা অণুবীক্ষণেও ধরা পড়ে না। কোনো-একটি লােকের চুল কালাে না কটা হবে, নাক টিকোলাে না খেদা হবে, স্থির করে ক্রোমােসােমের মধ্যেকার কোনাে অণুবিন্দু। এই হোলাে ভাইসমানের মতবাদের সারমর্ম । কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে বংশানুক্রম সম্বন্ধে আর-একটি আবিষ্কার এর চেয়ে আরাে বেশ পরিষ্কার করে সব বুঝিয়ে দিল । প্রায় একশ' বছর হয়ে গেল অস্ট্রিয়ার একটি নগণ্য শহরের খ্রীস্টানী মঠে মেণ্ডেল ( Mendel) নামে একজন পাদ্রী ছিলেন। তিনি মঠের পিছনে ছােট্ট একটুখানি বাগানে কয়েকটা মটরশুটির গাছ নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। সেই পরীক্ষার ফল ১৮৬৫ খ্রীস্টাব্দে কোনাে বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তখনকার বিজ্ঞান-জগতে মেণ্ডেলের পরীক্ষা নিয়ে কোনো আলােচনাই ওঠেনি। তার কাজ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞা তঁাকে খুবই পীড়া দেয় এবং তার ফলে শীঘ্রই তার মৃত্যু হয়। মেণ্ডেলের সেই প্রবন্ধ তার পরেও বহুকাল চাপা পড়ে ছিল। অতি আশ্চর্যের বিষয়, ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে য়ুরােপের বিভিন্ন দেশে তিনজন বিভিন্ন বিজ্ঞানী মেণ্ডেলের প্রবন্ধ একই সময় খুঁজে পান। ১১১ প্রাণতত্ত্ব তারা তৎক্ষণাৎ এর মূল্য উপলব্ধি করেন এবং মেণ্ডেলের পথ অনুসরণ করে নানারকম জীবজন্তু নিয়ে পরীক্ষা শুরু করে দেন। সেই সব পরীক্ষার ফল মেণ্ডেলের মতবাদের সত্যতা সম্বন্ধে কোনাে সন্দেহ রাখল না। মেণ্ডেলের এই আবিষ্কার, যার চলতি নাম হয়ে গেছে মেণ্ডেলিজম, কী ব্যাপার এখন বুঝতে চেষ্টা করা যাক। মেণ্ডেলিজমের গােড়াকার কথা হেলাে জৈব-ব্যক্তিত্ব কতক- গুলি গুণের সমবায়মাত্র। এই গুণগুলি (যাকে মেণ্ডেলিয়ান পরিভাষায় unit character বা factor বলা হয় ) প্রাণীর শরীর ও মনের ভিতর দিয়ে প্রকাশ পেয়ে তার ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তােলে। কিন্তু গুণগুলি তার নিজস্ব সম্পত্তি নয়, এগুলি সে তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পায়। মেণ্ডেলিয়ানরা প্রত্যেক unit characterকে অখণ্ডনীয়, অপরিবর্তনীয় বলে মনে করেন ও এই ব্যক্তিগত বিশিষ্ট গুণ গুলির অনন্ত সত্তা আছে তারও প্রমাণের চেষ্টা করেন। জার্ম-সেলের মধ্যেকার ক্রোমােসােম মেণ্ডেলিয়ান factor- গুলি প্রকাশের ভার নিয়েছে। ক্রোমােসােম ক্ষুদ্র হােলেও তারও ভাগ আছে, অসংখ্য বিন্দু সমাবেশে এক একটি ক্রোমােসােম গঠিত ক্রোমােসােমের প্রত্যেক অংশকণা এক একটি পৃথক মেণ্ডেলিয়ান গুণ-প্রকাশের জন্য দায়ী। বংশানুক্রমের আদিম আধার ক্রোমাে- সােমের এই ক্ষুদ্রাংশগুলিকে আধুনিক পরিভাষায় জীন (gene) বলে। মেণ্ডেল কড়াইটির গাছ নিয়ে তার বাগানের এক কোণে ১১২ জীবের বংশানুক্রম পরীক্ষা শুরু করেন। পাঁচরকম বীজ লাগিয়ে দেখেন কোনাে জাতের লতা লম্বা, কোনােটা খাটো ; কারাে ৩টি পাকলে হলদে হয়, কারাে সবুজই থেকে যায়; জাতবিশেষে ফুলের রং নানারকম হয়। তিনি প্রথম পরীক্ষা করলেন লম্বা জাতের সঙ্গে খাটো জাতের সংমিশ্রণ করে। লম্বা লতার ফুল থেকে রেণু নিয়ে খাটো লতার ফুলের পিষ্টিলে লাগিয়ে দিলেন। সেই ফুল থেকে যে-বীজ হােলাে পৃথক করে তুলে পরের বছর পুতে দেখলেন, সব চারাই লম্বা জাতের হােলাে। এদের বীজ আবার পোঁতা হােলে তৃতীয় বছরে তিন ভাগ লম্বা ও একভাগ খাটো গাছ জন্মাল। চতুর্থ বছরে খাটো গাছের বীজ থেকে কেবল খাটো কিন্তু লম্বা গাছ থেকে পুনরায় তিন ভাগ লম্বা ও এক ভাগ খাটো গাছ জন্মাতে দেখা গেল। মেণ্ডেল-বর্ণিত এই ঘটনাটি নিম্নলিখিতভাবে ছক কেটে দেখানাে যেতে পারে বােঝবার সুবিধার জন্য । খাটো ১ম পুরুষ X T খ ২য় পুরুষ - T T - न ল ল ৩য় পুরুষ T । ল কড়াইশুটি গাছের অন্য সব গুণ (যেমন শুটির রং, ফুলের রং ইত্যাদি) নিয়ে পরীক্ষা করে মেণ্ডেল ঠিক ঐ একই রকম বংশানু- ক্রম দেখলেন। এর থেকে উনি সাব্যস্ত করলেন যে, দুটি মিশ্রণবিমুখ ১১৩
প্রাণতত্ত্ব
T
গুণের মধ্যে একটির জোর বেশি। কড়াইশুটির মধ্যে প্রবল।
( dominant ) গুণ হচ্ছে-দৈর্ঘ্য, শুটির হলদে রং, ফুলের লাল
রং। খর্বতা, শুটির সবুজ রং, এবং ফুলের বেগুনি রংকে
দুর্বল ( recessive) গুণ বলা যেতে পারে। পৃথক দুটি গুণ
মিশ্রণের ফলে দ্বিতীয় পুরুষের সন্তানদের তিন ভাগ বাইরে থেকে
প্রবল গুণান্বিত দেখালেও কেবল এক ভাগই খাটি প্রবল, অন্য
দুভাগ নিশ্চয়ই মিশ্র প্রকৃতির ধরে নেওয়া যেতে পারে। যে দুটি
গুণ মেশানাে হয় তাদের যদি ক ও খ সংজ্ঞা দেওয়া যায় তাহলে
সংমিশ্রণের ফল এভাবে লেখা যেতে পারে :
ক+খ = ক+২ কখ+থ*
এদের মধ্যে ক২ ও খ-এর বংশধরেরা বরাবর ক ও খ
থেকে যায় । কিন্তু কখ-দের পরস্পর মিলনের ফলে পুনরায়
ক+২ কখ+খ অনুসারে সন্তান হয়।
এই হিসাবমতাে ভাগ হবার কারণ কী। মেণ্ডেল অনুমান
করলেন যে, এর সঙ্গে নিশ্চয়ই জামসেলের কোনােরকম
যােগাযোেগ আছে। লম্বা কড়াইশুটির জামসেলে এমন একটা
কিছু আছে যাতে তার বীজ থেকে উৎপন্ন লতাকে লম্বা করে
তােলে। জার্মসেলের মধ্যে সেই পদার্থটি কী, কিভাবে তা কাজ করে,
সে-বিষয়ে মেণ্ডেল বিশেষ কিছু কিন্তু জানতে পারেননি।
ভাইসমানের পরবর্তীকালের আবিষ্কার এর ভিতরকার রহস্য
আমাদের বেশ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। মেলে কেবল
* ক2 লেখবার অর্থ, জনক ও জননী উভয়ের কাছ থেকেই এরা ক-গুণ
পেয়েছে। কাজেই দ্বিগুণ অনুপাতে এই গুণ তাদের মধ্যে বর্তমান।
১১৪
জীবের বংশানুক্রম এইটুকুমাত্র অনুমান করেছিলেন যে, প্রত্যেক জীব যে-সব দৈহিক ও মানসিক গুণ নিয়ে গঠিত তার প্রত্যেকটি গুণ ফুটিয়ে তােলবার জন্য জননকোষের কোনাে-একটি অংশের বিশেষ দায়িত্ব আছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুটি গুণ মিশে যখন সন্তান জন্মায়, তাদের মধ্যে দুটোই সমানে বর্তমান থাকে। প্রবল গুণটি দুর্বলটিকে চাপা দিয়ে রাখে মাত্র, সেইজন্য প্রথম পুরুষে সব সন্তানদেরই প্রবল গুণান্বিত বলে মনে হয়, দুর্বল গুণটি প্রকাশ পেতে পারে না। দ্বিতীয় পুরুষের সন্তানদের মধ্যে গুণ দুটি পৃথক হয়ে দেখা দেয়। যে-নিয়মে পৃথক হয় একটু আগে বলা হয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষের মিলনে সন্তান জন্মায়। দুই না হােলে সৃষ্টি হয় না। প্রাণীবিজ্ঞানে সেইজন্য দুই সংখ্যার বিশেষ মর্যাদা। প্রাণীসৃষ্টির ভিত্তি হােলাে ‘দুই’-য়ে। সেইজন্যই মেণ্ডেলিয়ান বংশানুক্রমে অঙ্কশাস্ত্রের নিয়ম এসে পড়েছে। বংশানুক্রম ব্যাপারটাই সংখ্যা নিয়ে কারবার। তার শুরু স্ত্রী ও পুরুষ ছুটির মিলন থেকে। সেই মিলনের ফলে দুটি জার্ম-সেলের ওতপ্রােতভাবে সংমিশ্রণ, তৎপূর্বে সেল দুটির ভিতরে কয়েকটি নিদিষ্ট সংখ্যার ক্রোমােসােমের দ্বিগুণ হয়ে আবার অর্ধেক ভাগ হয়ে যাওয়া,প্রভৃতি বংশবৃদ্ধির যাবতীয় প্রণালীর মধ্যেই দ্বিত্বের খেলা। মেণ্ডেল গাছ নিয়ে পরীক্ষা করে যে-নিয়ম বের করেছিলেন, চেষ্টা করলে আমরা কেবল যুক্তি ও অঙ্কের সাহায্যে হয়তাে ঐ নিয়মটিতে পৌছাতে পারি। ধরা যাক, একটি গােয়ালে এক পাল গােরু আছে যার অর্ধেক গুলাে লাল আর বাকি অর্ধেক কালাে। বাইরের কোনো গােরুর ১১৫ প্রাণতত্ত্ব 2 সঙ্গে তাদের মিশতে দেওয়া হয় না, নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট মেশামেশি করতে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় আকস্মিকতার নিয়মানুসারে ধরা যেতে পারে একটা কালাে বড় কোনােবার কালাে কোনােবার লাল গােরুর সঙ্গে পালে মিশবে। তেমনি কোনাে লাল বড় একবার লাল একবার কালাে গােরুর সঙ্গে পালে মিশবে। তাহলে কালাে গােরুর বাছুরদের মধ্যে হবে অর্ধেক কালাে ও অর্ধেক দোআঁশলা। তেমনি লাল গাের বাছুরদের মধ্যেও হবে অর্ধেক পুরাে লাল ও বাকি অর্ধেক মিশােল। যদি ধরে নেওয়া যায় যে, সর্বসমেত ৪০০ বাছুর জন্মেছে তাহলে : কালাে গােরুদের ২০• বাছুরের মধ্যে ১০০ কা+১০• কালা লাল ১০০ কালা +১০০লা মােট ৪০• বাছুরের মধ্যে ১••কা+২০০কা-লা+১০০লা অর্থাৎ কা + ২ কা-লা + লা কড়াইশুটির গাছ নিয়ে পরীক্ষার ফলে মেণ্ডেল ঠিক এই নিয়মেই উপনীত হয়েছিলেন। লাল ও কালাে রং এই দুটো গুণ মেশালে কী হয় দেখলুম এখন যদি ঐ গাের পালের মধ্যে কতকগুলি সাদা গােৰু এসে পড়ে তবে কী হয় । তাহলে হিসাব এই রকম দাড়ায় : কালাে ষাড় লাল ষাড় সাদা ষাড় কালাে গােরুর বাছুর কা কাল কাসা লাল কালা লা লা-সা সাদা সা-কা সা-লা সা মােট-কা+২কা-লা+লা+২লা-সা+সা+২কা-স ১১৬
জীবের বংশানুক্রম
অর্থাৎ ৯টা বাছুরের মধ্যে ১টা খাটি সাদা, ১টা কালাে, একটা
লাল এবং বাকি সবগুলি দোআঁশলা।
দুই, তিন বা ততােধিক গুণ মেশালেও বংশপরম্পরায় তারা
বীজগণিতের উৎপাদকের মতােই মিশ্রণবিমুখভাবে চলতে থাকে
৩৬. সাদা ইদুরের সঙ্গে সাধারণ মেটে রঙের ইদুর
মেশাবার ফলাফল
দেখে মেণ্ডেল ধারণা করলেন যে, প্রত্যেক গুণের পৃথক সত্তা আছে
এবং অধিকাংশ সময়েই তারা পরস্পরবিরােধী। কড়াইশুটির
লম্বা ও খাটো গুণ যদি পৃথক সত্তাৰান ও মিশ্রণবিমুখ না হােত
১১৭
প্রাণতত্ত্ব
তবে তারা বংশানুক্রমে কখনই অ্যালজেবরার সংখ্যার মতাে
নিয়ম মেনে চলত না। তারা তাহলে মিশে যেত ; প্রথম
পুরুষ থেকেই আরম্ভ করে বরাবর মাঝারি রকমের গাছ জন্মাত।
মিশে যায় এ-রকম গুণ নিশ্চয়ই অনেক আছে, তাদের বেলায়
মেণ্ডেলের আইন খাটে না।
মেণ্ডেলের মতবাদ নিয়ে আলােচনার সময় একটি ভুল ধারণা
হওয়া আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক, সে-বিষয় সাবধান হওয়া
অত্যন্ত প্রয়ােজন। মেণ্ডেলের আইন কেবলমাত্র কোনাে
একটি বিশেষ গুণ সম্বন্ধেই প্রযােজ্য, ব্যক্তিবিশেষ সম্বন্ধে নয়।
আমরা যদি মনে ভাবি যে, একটা কুকুর ও একটা শেয়াল মেশালে
তাদের দ্বিতীয় পুরুষের বাচ্ছাদের মধ্যে একটা শেয়াল, একটা
কুকুর ও দুটা শেয়াল কুকুরের মাঝামাঝি কোনাে জন্তু জন্মাবে,
তাহলে সেটা নিশ্চয়ই হাস্যকর ব্যাপার হবে। যে-কোনাে প্রাণীর
মধ্যে হাজার হাজার গুণ আছে, তারই যে-কোনাে একটি গুণ
সম্বন্ধে মেণ্ডেলের আইন খাটে। যেমন, একটি মেয়ে যার কটা চোখ,
তার সঙ্গে যদি বিয়ে দেওয়া যায় যে-পুরুষের চোখ কালাে, তবে
তাদের বংশধরদের মধ্যে কটা ও কালাে চোখের সংখ্যা
ভাগে দেখতে পাওয়া যাবে, এ-বিষয়ে সন্দেহমাত্র নেই। কিন্তু
তাই বলে মনে করলে চলবে না, একজন নিগ্রোর সঙ্গে একটি
চীনে মেয়ের বিয়ে দিলে তাদের বংশধরদের মধ্যে ৩ ভাগ
নিগ্রো ও ১ ভাগ চীনে হবে।
মেণ্ডেলের আবিষ্কার অনুসরণ করে গত চল্লিশ বছর ধরে,
১১৮
জীবের বংশানুক্রম পৃথিবী জুড়ে বহু বিজ্ঞানী নানান পরীক্ষা করে কেবল যে এই মত- বাদের সত্যতা প্রমাণ করেছেন তা নয়, আরাে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন। তার মধ্যে একটি বিষয় সকলেরই জানা উচিত। পূর্বে বলা হয়েছিল, এক-একটি জাতির সেলে ক্রোমাে- সােমের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে, ব্যক্তি অনুসারে তাদের সংখ্যার কোনাে বদল হয় না, কিন্তু কথাটা যে একেবারে সর্বাঙ্গীণ সত্য, তা নয় ; প্রত্যেক জাতির মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষের সেলের পার্থক্য আছে। স্ত্রীলােকদের শরীরের সেলে কোনাে একটি ক্রোমােসােম ডবল- যাত্রায় থাকে । যে বিশেষ রকমের ক্রোমােসােম পুরুষে মাত্র একটি অথচ স্ত্রীলােকে দুটি করে থাকে তাকে x-ক্রোমােসােম নাম দেওয়া হয়েছে। ডিম্বকোষে দুটি X-ক্রোমােসােম (xx ) একত্ৰিত হোলেই তার থেকে যে জ্বণ জন্মায় তার মেয়েলি প্রকৃতি হয়। আর পুরুষ জন্মায় সেই ডিম্বকোষ থেকে যাতে মাত্র একটি -ক্রোমােসােম (x) আছে। পুরুষ ও স্ত্রীলােকের সেলের মধ্যে আর একটি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বলা হয়েছে পুরুষদের কেবলমাত্র একটি x-ক্রোমােসােম থাকে কিন্তু অনেক সময় তার সঙ্গে আর একটি ভিন্নাকৃতির ক্রোমােসােম যুক্ত থাকতে দেখা যায়। এর নাম y-ক্রোমােসােম। এইটি কখনাে স্বীলােকের সেলে পাওয়া যায় না। জীবকোষে যুত ক্রোমােসােম থাকে তার মধ্যে x ও y এই দুটি ক্রোমোেসােম স্ত্রী-পুরুষ ভেদের জন্য দায়ী, তাই এই দুটিকে সেক্স ক্রোমােসােম (Sex chromosomes) বলা হয়।
প্রাণতত্ত্ব তবে x ও y-ক্রোমােসােম দুটি কেবল যে সে গুণেরই আধার তা নয়—এদের মধ্যে অন্যান্য গুণের জীন (Genes) বর্তমান থাকে। তাই আমরা দেখতে পাই কতকগুলি গুণ : আছে যা কেবল স্ত্রীলােকেই বতায়, পুরুষের মধ্যে সেই গুণগুলি কখনাে দেখা যায় না। আবার পুরুষের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় না। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা ভালাে বােঝা যাবে। মানুষের একটা অদ্ভুত ব্যারাম হয়, তার ডাক্তারী নাম হিমােফিলিয়া (haemophilia)। এর লক্ষণ,-শরীরের যে-কোনাে অংশ থেকে রক্তস্রাব হােলে তা ৰন্ধ হােতে চায় না। সাধারণ মানুষের রক্ত শরীর থেকে বেরােলেই যেমন জমে চাপ বেঁধে যায়, এই রুগীদের তা হয় না, তাদের রক্তের দানা বাঁধবার ক্ষমতা নেই আশ্চর্য এই যে, মেয়েদের কখনাে এই রােগ হয় না। অথচ এই ব্যারাম যে-বংশে আছে তার স্ত্রীলােকেরা নিজেরা রােগমুক্ত হােলেও তাদের পুরুষ-সন্তানদের মধ্যে রােগটি তারা চালিয়ে দেয়। এইরকম গুণগুলিকে সেইজন্য সেক্স-জড়িত গুণ বলা হয়। হিমােফিলিয়া ছাড়া এই ধরনের স্ত্রৈণ গুণের আরাে অনেক উদাহরণ আছে। বংশানুক্রমের অন্ধিসন্ধি যতই আমরা জানতে পারছি, কৃষি- বিজ্ঞানের উন্নতি ততই সহজ হয়ে আসছে। খুব সুবিধা হচ্ছে, নতুন রকম গাছগাছড়া যারা তৈরি করতে চেষ্টা করে এবং গােরু, ঘােড়, কুকুর প্রভৃতি জন্তুজানােয়ারের উন্নতির জন্য যারা চেষ্টা করে, ১২০ জীবের বংশানুক্রম তাদের পক্ষে। প্রত্যেক বছরেই নাসারিওয়ালারা আমাদের কত রকম নতুন ধরনের ফুলগাছের আবিষ্কারের কথা জানিয়ে দেয়। গত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে জন্তুজানােয়ারের উন্নতিও বড়ো কম হয়নি। মেণ্ডেলিজমের সাহায্য-ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব হােত । গাছগাছড়া ও জন্তুদের উন্নতির জন্য মেণ্ডেলিয়ান নিয়ম প্রয়ােগ করেই বিজ্ঞানীরা ক্ষান্ত হননি, মানুষের সমাজেও তার পরীক্ষা করতে তারা উদ্যত হয়েছেন। বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাদের সমাজের কী ক'রে ক্রমশ উন্নতি করা যায় সে-বিষয় গবেষণা করবার জন্য সুজননবিদ্যা ( Eugenics) নামে বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার সৃষ্টি হয়েছে। এই বিষয়ে আন্দোলনের ফলে অনেক প্রগতিশীল দেশে আইন পাশ হয়েছে। তাতে, যে- সব রােগ বংশপরম্পরায় চলতে থাকে তার প্রকোপ কমাবার জন্য রুগীরা বিবাহ করলেও যাতে সন্তান না জন্মায়, গভর্নমেন্ট থেকে তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। যতদিন এসব বিষয়ে সঠিক আমরা জানতুম না সে এক কথা ছিল। এখন আমরা যখন জানি কোন্ রোগ বা দোষগুলি বংশানুক্রমিক, কোন্গুলি তা নয়, তখন এ-বিষয়ে নিশ্চেষ্ট থাকা অনুচিত। সব দেশেই আইন করে জন্মগত রুগ্নসন্তান জন্মাতে দেওয়া বন্ধ করা উচিত। কেবল রােগ নয়, কয়েকরকমের বুদ্ধিহীনতা, উঞ্ছবৃত্তির প্রবণতা, পাগলামি প্রভৃতি স্বভাবের দোষগুলিও বংশপরম্পরা চলতে থাকে। এই সব দুর্বলতা সমাজের বুকে রাখা কোনােক্রমেই বাঞ্ছনীয় নয়। মানুষের মধ্যে মেণ্ডেলিয়ান বংশানুক্রমের কয়েকটি উদাহরণ ১২১
প্রাণতত্ত্ব
পিছনের পাতায় দেওয়া যাচ্ছে। এর দৃষ্টান্ত আমাদের ঘরে-ঘরেই
আছে। এই তালিকা থেকে বােঝা যায়, বাপ-মার যদি কালাে,
চোখ থাকে তবে ছেলেপিলেদের অধিকাংশ কালাে চোখ হােলেও
কখনাে-কখনাে কটা চোখও দেখা যাবে। কিন্তু বাপ-মা দুজনেরই
যদি কটা চোখ হয় তবে সব ছেলেপিলেদের কটা চোখ হােতে
বাধ্য। চুল সম্বন্ধেও তাই,যাদের সােজ। চুল তাদের ছেলেপিলে-
দের কেবল সােজা চুল হয়।
এর ব্যতিক্রম নেই। চোখ ও
চুল সম্বন্ধেই কেবল উদাহরণ দেওয়া হােললা, কিন্তু মানুষের
আরাে বিস্তর গুণ মেণ্ডেলিয়ান বংশানুক্রম খতিয়ে বের করা
হয়েছে।
১২২
চোখ ও চুলের বৈশিষ্ট্য অনুসারে মানুষের বংশানুক্রম*
জনক বা জননী
৮
X
সােজা চুল
X
সন্তান
কালাে চোখ-কোকড়া চুল কালাে চোখ-কোকড়া চুল = সব ঐ অথবা কটা চোখ এবং সােজা চুল
= সব কালাে চোখ (}কটাও হতে পারে)
এবং সব কিংবা অর্ধেক সােজা চুল
= সব কালাে চোখ ( কটাও হতে পারে)
-সােজা চুল
এবং সব সােজা চুল
কোকড়া চুল xকটা চোখ-কেঁকড়া চুল সব কিংবা অর্ধেক কালাে চোখ ;
সব কিংবা কোকড়া চুল
-সােঙ্গা চুল।
= সব কিংবা অর্ধেক কালাে চোখ ;
সব কিংবা অর্ধেক কোকড়া চুল
= সব কিংবা অর্ধেক কালাে চোখ ;
-সােজা চুল X
সব সােজা চুল
কটা চোখ-কেঁকড়া চুল xকটা চোখ-কোকড়া চুল = সব কটা চোখ ; সব কিংবা কোঁকড়া চুল
x
-সােজা চুল
; সব কিংবা কোকড়া চুল
-সোজা চুলস
; সব সােজা চুল
* C.B. Davenport:47 Heredity in Relation to Eugenics 1967 The
জীবের বংশানুক্রম
জীব-সমাজ . জীবের উৎপত্তি, ক্রমবিবর্তন ও বৈচিত্র্য ; তাদের শরীর-গঠন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ, আহার-সংগ্রহ ও তার থেকে শক্তি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা; জীবকোষ, জীবকোষের বিভাজন ও বৃদ্ধি ; জীবের বংশানুক্রম প্রভৃতি অনেক গুলি বিষয়ে আলােচনা করা গেছে পূর্ব কয়েক অধ্যায়ে। বিজ্ঞানীরা এর প্রত্যেক খুটিনাটি বিষয়ে এত খবর সংগ্রহ এবং এত জ্ঞান-উপার্জন করেছেন যে, সেই জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে পাঠকের কাছে ধরা একখানি ছছাটো বইয়ের কাজ নয়। জীবতত্ত্বের সামান্য এক-একটি বিষয় নিয়ে সারা-জীবন চর্চা করলেও তা শেষ করা যায় না। তথ্যসংগ্রহের জন্য এমনি করে খণ্ডভাবে অনুসন্ধান বা বিচার করার প্রয়ােজন যেমন আছে, মাঝে-মাঝে সমগ্র ভাবে দেখাও দরকার, তা না হলে জীবনলীলার আসল রহস্য কখনো বুঝতে পারব না। জীবনপ্রণালী টুকুৰাে টুকরো করে আমরা ইতিপূর্বে আলােচনা করেছি, এখন চেষ্টা করা যাক জীবজগতের সমগ্ররূপ দেখবার। পৃথিবীতে জীবের উৎপত্তি হয়েছিল সম্ভবত সামান্য একবিন্দু জীবকোষ থেকে। লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে ক্রমবিবর্তনের ফলে এখন জীব-সমাজ নিষ্ঠুর। পৃথিবী ছেয়ে গেছে বিচিত্র উদ্ভিদ ও জন্তুজানােয়ারে। তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ কখনাে মধুর, কখনো পরস্পরের মধ্যে এই যোগাযােগ ছাড়াও পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে সম্বন্ধ, তাও কখনাে অনুকুল, কখনাে বিরুদ্ধ। সমবায়- অসহযােগ, অনুকুলতা-প্রতিকূলতা প্রভৃতি যে সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে জীবজগৎ গড়ে উঠেছে সে-বিষয় বিশেষভাবে চর্চা যে-বিজ্ঞান করে তাকে বলা হয় ইকলজী ( Ecology)। এমন কোনাে জীব নেই যে সম্পূর্ণ নিজের উপর নির্ভর করে একা বাঁচতে পারে। প্রত্যেক প্রাণীর জীবন আরাে পাঁচটা প্রাণীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ-বিষয় জন্তুজানােয়ারের চেয়ে উদ্ভিদ তবু অপেক্ষাকৃত স্বাধীন। তারা অন্যের বিনা-সাহায্যে বাতাস ও মাটি থেকে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে নিজেদের শরীর গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু খাবারের অন্য জন্তুদের নির্ভর করতে হয় অন্য জন্তুর উপর এবং শেষ পর্যন্ত উদ্ভিদেরই উপর। তবে উদ্ভিদ কি সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর। সে খাবার না হয় পেল মাটি ও হাওয়া থেকে, কিন্তু তার মৌমাছি না হলে যে বীজ জন্মায় না। বীজ ছড়াবার জন্যেও যে তাকে পাখিদের সাহায্য নিতে হয়। অনেক জন্তু আছে যারা একা থাকতে ভালােবাসে, কিন্তু তাদেরও পাঁচরকম ব্যাকটিরিয়া না হহলে জীবনধারণ করা চলে না। পৃথিবীর স্বল্প পরিসরের মধ্যে হাজার-হাজার রকমের প্রাণী বাসা বেঁধেছে।
প্রাণতত্ত্ব কাছাকাছি থাকতে থাকতে তাদের পরস্পরের মধ্যে নানাপ্রকার নিবিড় সম্বন্ধ দাড়িয়ে গেছে। সমগ্র প্রাণী জগতের কথা যদি ভাবি, দেখতে পাই যে, যেখানেই প্রাণের সাড়া আছে সেখানেই উদ্ভিদ আহার্য প্রস্তুত করতে রত। নিরামিষভােজী জন্তুরা তাদের প্রস্তুত সেই খাদ্যসামগ্রী খেয়ে ফেলে, আমিষভােজী জন্তু অন্য জন্তুদের খায় এবং ব্যাকটিরিয়া উদ্ভিদ এবং জন্তু উভয়কেই ব্যবহারে লাগায়। সবুজ শাকপাত থাকলে পৃথিবী নিপ্রাণ হবে পরমুহূর্তেই। এবং ব্যাকটিরিয়া না থাকলে গাছপালা-জন্তুজানােয়ারের মৃতদেহের পুঞ্জীভূত পে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বে ধরণী দু-চার দিনেই। উদ্ভিদ-জন্তু- ব্যাকটিরিয়া এই তিনের অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ ধারণ করে রেখেছে সমগ্র প্রাণীজগৎকে। এই বৃহৎ পটভূমি ছেড়ে যদি আরাে সংকীর্ণ ক্ষেত্রে নামি তাহলে দেখতে পাই, কোনো-একটি জাতি কোনাে বিশেষ স্থানে প্রাধান্য লাভ করে। কোনাে-কোনাে মাঠে কেবল ঘাসই জন্মায়, ছােটোনাগপুরের শুকনো পাথুরে মাটি শালবনে ছেয়ে ফেলেছে। বাংলার খাল বিল ডােবা কচুরিপানাতে ভরে গেছে। অবস্থা- বিশেষে এক-একটি জাতের উদ্ভিদ বিস্তৃতভাবে যে ছড়িয়ে পড়ে তার কারণ—উদ্ভিদের সূর্যকিরণ ও জলের উপর একান্ত নির্ভর। যে-অবস্থায় যে-জায়গায় যে-গাছ সবচেয়ে বেশি জল ও আলাে সংগ্রহ করতে পারে তার প্রতিপত্তি হয় সেখানেই। জন্তুদের সমাজ আরাে জটিল। সেখানে দেখি, ছাগল, ভেড়া, ১২৬ জীব-সমাজ গােরু প্রভৃতি একদল নিরামিষাশী জাবরকাটা জন্তু গাছপালা ধ্বংস ক'রে জীবনধারণ করছে, আর আমিষাশী হিংস্র জন্তুরা পরস্পরকে খেয়ে নিজেদের বাঁচাচ্ছে। তার পর আছে এক জাতের পরজীবী যারা এই দু-দলকেই শশাষণ করে বেঁচে থাকে। এবং সবশেষে রয়েছে সেই জীবগুলি যারা ভাগাড়ে বাস করে, তারা উদ্ভিদ ও জন্তু উভয়ের মৃতদেহ থেকে নিজেদের আহার সংগ্রহ করে। আমিষভােজী জন্তুদের আহারের ধারা ( food-chains ) অনুসারে ভাগ করা যায়। মানুষ যখন ছাগমাংস খায়—সে একধাপ পেরিয়ে ঘাস খায় বলা যেতে পারে। ঐ মানুষ যখন পােকামাকড়-খেকো পাখি খায় তখন সে দু-ধাপ পেরিয়ে ঘাস খায় । হিসাব করে দেখা গেছে যে, সমুদ্রের ‘ক’ ( Cod ) মাছ এক সের ওজনের হােতে গেলে তাকে দশ সের পরিমাণ “ওয়েলক” (Whelk) মাছ খেতে হয় ; এক সের ওয়েলকের শরীর পুষ্টির জন্য দশ সের পরিমাণ সামুদ্রিক কীটের প্রয়ােজন; এবং সমুদ্রের তলায় যে পাক জমে থাকে তার দশ সের পাক খেয়ে এক সের কীট পুষ্ট হয়। কাজেই আমরা যখন কয়েক ফোটা কড মাছের তেল ( Cod Liver Oil) খাই তখন ধরে নিতে পারি যে সমুদ্রের হাজার সের ( ২৫ মন ) জীবাণুর মৃতদেহ ও সামুদ্রিক গাছগাছড়া পচা পাকমাটির নির্যাস খাচ্ছি। পৃথিবীর যেখানেই উদ্ভিদ ও জন্তুশ্রেণী একত্রে বাস করে, তাদের মধ্যে খাদ্য-খাদক ছাড়াও নানা রকম সম্বন্ধ থাকে। খাপছাড়া বিশৃঙ্খলভাবে তারা একত্র বাস করে না। যারা এই শৃঙ্খলার মধ্যে
প্রাণতত্ত্ব
নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পারে, তারা খসে পড়ে। এই রকম
অনেক পরিবর্তন ও বাছাইয়ের পর তাদের একটি সমাজ গড়ে .
আবার এক-একটি সমাজের মধ্যে তার অধীন প্রত্যেক
শ্রেণীর জীব অন্য শ্রেণীর জীবের সঙ্গে এমন বন্ধনে আবদ্ধ যে
তাদের পরস্পরের সম্বন্ধের একটুও নড়চড় হবার উপায় নেই,
তাহলেই বিপ্লব বেধে যায়। একেই প্রকৃতির সাম্যনীতি (Balance
of Nature) বলে। মানুষ এই সাম্যভাব মাঝে-মাঝে তার
নির্বুদ্ধিতার দরুন ভাঙতে চেষ্টা করে এবং তার ফলে তাকে অশেষ
যন্ত্রণা ভােগ করতে হয়। দু-একটা উদাহরণ দিলে কথাটা পরিষ্কার
হবে। অস্টেলিয়াতে পূর্বে খরগােশ ছিল না। সেখানকার
গাছপালা, জন্তুজানােয়ার সবই ভিন্ন প্রকৃতির,-অন্য কোনাে দেশের
সঙ্গে তাদের তুলনা হয় না। ইংরেজরা যখন সেখানে গিয়ে বাস
করতে আরম্ভ করল, তখন তাদেরই একজন শখ করে কয়েকটা
পােষ খরগােশ যুবােপ থেকে আমদানি করে। এখন খরগোশে
অস্টে লিয়া ছেয়ে গেছে। তারা সেখানে এত শীঘ্র বংশবৃদ্ধি
করছে যে, সেখানকার গভর্নমেন্ট লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ করেও
তাদের ধ্বংস করতে পারছে না। তাদের দৌরাত্মে চাষবাস
কঠিন হয়েছে।
কয়েক
আমাদের দেশেও সম্প্রতি এ-রকম ঘটনা ঘটেছে।
বছর আগে শৌখিন ফুলগাছ হিসাবে কচুরিপানা (Water
Hyacinth) কেউ কলকাতায় আনিয়েছিল বিদেশ থেকে।
লােকে আট আনা, এক টাকা দাম দিয়ে এই সুন্দর ফুলগাছ কিনে
১২৮
জীব-সমাজ বাড়িতে রাখতে আরম্ভ করল। দেখতে দেখতে কয়েক বছরের মধ্যে সমস্ত বাংলাদেশ কচুরি পানায় ছেয়ে গেল। এখন আইন করে, অনেক টাকা খরচ করে গভর্নমেন্ট থেকে চেষ্টা হচ্ছে বাংলার খাল-বিল-নদীগুলিকে এই উৎপাত থেকে রক্ষে করতে। কচুরি- পানা চাষীদের পরম শত্রু হয়ে পড়েছে। দেশটাই উচ্ছন্ন যাবে এ-আপদ বিদায় করতে না পারলে। নিজেদের দেশে এরা এত বাড়তে পায় না, নতুন জায়গায় গিয়ে বেড়ে যায় কেন। নিজের দেশে অন্য গাছপালা জন্তু- জানােয়ারের সঙ্গে তাদের বােঝাপড়া হয়ে গেছে। সেখানে এমন সব শত্রু আছে যারা তাদের দাবিয়ে রাখে। সেখানকার প্রাকৃতিক জগৎ সবাইকে নিয়ে সামঞ্জস্য রেখে চলে, কাউকে অতি বাড় বাড়তে দেয় না। নতুন জায়গায় প্রচলিত সহজীবিদের থেকে দূরে এসে সামাজিক বন্ধনের বাইরে সে যথেচ্ছাচারী হয়ে পড়ে। স্বাধীনভাবে বেড়ে যাবার বাধা দেবার কেউ নেই। নতুন জায়গায় এলে কোনাে-কোনাে জীব বাড়বার যেমন সুযােগ পায়, তেমনি কারাে পক্ষে উলটোটাও হােতে পারে। নতুন জায়গায় এমনি প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে পারে যে, তার পক্ষে জীবন ধারণ করাই হয় অসম্ভব। আমেরিকার ক্যালিফর্ণিয়া প্রদেশে আরব থেকে ভালাে খেজুর গাছ নিয়ে লাগানাে হয়েছিল। সেখানকার আবহাওয়ায় গাছ বেশ ভালাে জন্মাতে দেখে, সেখানে মস্ত বড়ো-বড়াে খেজুরের বাগান করা হােলাে। গাছবড়াে হােলো, কিন্তু দুঃখের বিষয় ফল ধরল না। তখন বাগানের মালিকরা প্রাণতত্ত্ব গভর্নমেন্টের শরণাপন্ন হলেন। গভর্নমেন্ট একজন জীবতত্ত্ববিদকে অনুসন্ধানের কাজে লাগালেন। তিনি অনুসন্ধান নিতে আরব- দেশে এলেন। তাঁর গবেষণার ফলে বােঝা গেল যে, যে মাছি আরবদেশে খেজুর ফুলের মধু খাবার উপলক্ষে রেণু নিয়ে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে মিশিয়ে বেড়ায়, সেই মাছি ক্যালিফর্ণিয়াতে নেই। কয়েকটা সেই মাছি তখন আরব থেকে এনে সেখানে ছেড়ে দেওয়া হােলাে। দু-এক বছরের মধ্যে প্রচুর খেজুর ধরতে আরম্ভ করল। উদ্ভিদ ও পােকার মধ্যে সহযােগের এটি একটি চমৎকার উদাহরণ। প্রাণীজগতে ব্যষ্টি ও সমাজগত বিরােধের দিকটাই আমাদের নজরে বেশি করে পড়ে। ডারউইন এই দিকটা “সত্তারক্ষার প্রয়াস” (struggle for existence) নাম দিয়ে অনেক নজির দেখিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, এই হিংস্র প্রবৃত্তি, এই খাওয়া- খাওয়ির ভিতর দিয়েই জীবের কমােন্নতি হচ্ছে। যারা অপটু, যারা ক্ষীণদেহ তারা সহজেই মরে যায়, বলিষ্ঠ ও পটুরাই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। সমগ্রভাবে দেখলে জীব-সমাজের প্রকৃতি কিন্তু ঠিক এরকম নয়, বলতেই হবে। মারামারি-কাটাকাটি যে নেই তা নয়, যথেষ্টই আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে অন্যদিকও দেখতে পাওয়া যায়; পরস্পরের সহযােগের দৃষ্টান্ত জীবজগতে বিরল নয়। আমাদের যেটা মনে রাখতে হবে সেটা হচ্ছে এই ; স্থানীয় আবহাওয়া ও জল-মাটি প্রভৃতি পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুসারে এক-এক জায়গায় গাছপালা জন্তু জানােয়ার নিয়ে এক-একটি ১৩০ জীব-সমাজ বিশিষ্ট সমাজ গড়ে ওঠে, তাদের পরস্পরের মধ্যে যেমন লড়াইয়ের অন্ত নেই, তেমনি এটাও সত্য যে, তারা পরস্পরের মধ্যে নানা- বিধ সহযােগসুত্রে গ্রথিত। সেই মৈত্রীসম্বন্ধ আছে বলেই জীবসমাজ শৃঙ্খলা রেখে বরাবর চলতে থাকে—তার বিশেষ পরিবর্তন হয় না, যেটুকু পরিবর্তন হয় তা মন্থরগতিতে এবং ধারাবাহিক উন্নতির দিকে।
জীবের ক্রমবিবর্তন ছিল। গোঁড়া খ্রীস্টানরা মনে করেন ইতিহাসের গােড়ার দিকে কোনাে- এক শুভদিনে—তার তারিখ পর্যন্ত বাইবেলে লেখা আছে—ভগবান জিহােবা কয়েকটি প্রাণীর নমুনা সৃষ্টি করে পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে আদিম নরনারী ‘আদম’ ও ‘ঈভ’ এদের সন্তানসন্ততিতে ক্রমশ জগৎ ভরে গেল। হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, সৃষ্টির পূর্বে ঘাের তমসার মধ্যে হিরণ্যগর্ভ থেকে ব্রহ্মার জন্ম হয়। তপস্যার ফলে ব্ৰহ্মার এক- এক অবয়ব থেকে এক-এক জীবের সৃষ্টি হয়। আর বেশি উদাহরণ দেবার প্রয়ােজন নেই—এ বিষয় নিঃসন্দেহ যে, সব দেশেই, সব জাতি এবং ধর্মের মধ্যেই, যেন কোনাে অলৌকিক উপায়ে হঠাৎ সব সৃষ্টি হয়ে গেল এই ধরনের বিশ্বাস চলন ছিল । মানুষ মানুষ-অবস্থাতেই যেন প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল। বিজ্ঞান এই অন্ধবিশ্বাসের মূলে কঠিনভাবে আঘাত দিয়ে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে আমাদের সনাতন চিন্তাধারাই একেবারে বদলে দিয়েছে গত শতাব্দীর মধ্যে। ভগবানের এক ফুয়ে সব সৃষ্টি হয়ে গেল এ-কথা বিশ্বাস না করে আমরা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি যে, এখন যে-গাছপালা যে-জন্তুজানােয়ার পৃথিবী অধিকার করে আছে, বহু লক্ষ বছরের ক্রমবিবর্তনের ফলে তবে তারা গড়ে জীবের ক্রমবিবর্তন উঠেছে। পরিবর্তন জীবের ধর্ম। আজ যাকে মানুষ ব'লে দেখছি সে কত পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যে এই রূপ নিয়েছে তার ঠিক নেই। তার ইতিবৃত্ত সংগ্রহ করলে দেখব যে, কোনাে- এক সময় বনমানুষ এবং তারও আগে বানরের মতাে তার চেহারা যদি আরাে পিছিয়ে খবর নিতে থাকি তবে শেষ পর্যন্ত অ্যামিবার মতাে একটি অতি সহজ ও ক্ষুদ্র এককোষী জীবে গিয়ে পৌছতে হবে। সহজ থেকে জটিল, জটিল থেকে জটিলতর রূপের ধারাবাহিক ক্রমােন্নতি—এই বিশ্বাসকে বিবর্তনবাদ বলা ছিল। ক্রমবিবর্তন বিংশশতাব্দীর একেবারে নতুন একটা কল্পনা এমন কি, বিজ্ঞানীরা এ-বিষয় ভাবতে শুরু করার আগেই পুরাকালের তত্ত্বজ্ঞানীরা এর মূল তত্ত্ব নিয়ে অনেক আলােচনা করে গেছেন। ভারতবর্ষের দর্শনশাস্ত্রে এই মতবাদের আভাস পাওয়া যায়। পরে গ্রীসে প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রভৃতি মনীষিরা সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা এই দিক থেকে দিতে চেষ্টা করেছেন। তবে তাদের ভাবধারার মধ্যে বিবত নবাদ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি। এই মতবাদ সম্বন্ধে প্রথম স্পষ্ট ধারণা দেখতে পাওয়া যায় ইংলণ্ডে বেকন, ফ্রান্সে দেকার্টে ও জর্মানিতে ক্যান্টের লেখার ভিতর। বিবর্তনবাদ তাহলে আকস্মিক একটা কল্পনা নয় দেখতে পাচ্ছি ; তবে ডারউইন এবং ওয়ালেস যখন যুবরাপের বিদ্বানদের কাছে সেটা উপস্থিত করলেন ১৮৫৯ খ্রীস্টাব্দে, তা নিয়ে এত হৈ-চৈ, বাদ- প্রতিবাদ হােলা কেন।
প্রাণতত্ত্ব বিবর্তনবাদ সম্বন্ধে দুটো বিষয় পরিষ্কার মনে রাখতে হবে। একটা হচ্ছে ঘটনা, আর অন্যটা হচ্ছে মত। পৃথিবীতে পরিবর্তন হচ্ছে, এক জাতি থেকে অন্য জাতির উৎপত্তি হচ্ছে, জলজন্তু থেকে সরীসৃপ, সরীসৃপ থেকে পাখি, পাখি থেকে ক্রমশ স্তন্যপায়ী জন্তু, এই সব ঘটনার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে, সে-বিষয় কোনাে তর্কই উঠতে পারে না। জীব বিবর্তনশীল, তার প্রারম্ভ অত্যন্ত সহজ প্রাণীরূপে, যুগ যুগ ধরে পরিবর্তন হতে হতে এক থেকে বহু, এবং বহুরও ধারাবাহিক ক্রমােন্নতি—ঘটনা হিসাবে একথা বিশ্বাস করার এখন আর উপায় নেই। তত্ত্বজ্ঞানীরা যেটা আন্দাজ বা অনুমান করতেন, বিজ্ঞানীরা তা প্রচুর প্রমাণের দ্বারা সুনিশ্চিত করে দিয়েছেন। কিন্তু ঘটনা প্রমাণ করা আর সেই ঘটনার উপর নির্ভর করে একটা মতবাদ গড়ে তােলা, এক জিনিস নয়। ক্রমবিবর্তনের ঘটনাসমূহ সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেও ডারউইনের অভিব্যক্তিবাদ সম্বন্ধে আমরা মনে সন্দেহ পােষণ করতে পারি। ক্রমবিবর্তন কী করে হয়, কেন হয়, কোন্ দিকে তার গতি, এই সব প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য ডারউইন, ওয়ালেস এবং অন্ত অনেক বিজ্ঞানীরা নানান সময় নানান মতবাদ প্রচার করেছেন। এর মধ্যে ডারউইনই সব-প্রথম অজস্ব প্রমাণসহ একটি সর্বাঙ্গ- সুন্দর সন্তোষজনক মতবাদ উপস্থাপন করেন। তখন য়ুরােপের অবস্থা এমন বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক মতবাদ গ্রহণ করার অনুকূল হয়- নি, খ্ৰীষ্টীয় সৃষ্টিতত্ত্বে লােকের অন্ধ বিশ্বাস তখনাে সম্পূর্ণ রয়েছে। তাই ঘােরতর প্রতিবাদের আন্দোলন উপস্থিত হােলো।
জীবের ক্রমবিবর্তন ডারউইনকে যথেষ্ট লাঞ্ছনা ভােগ করতে হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত তিনি ওয়ালেস, হাকৃশ্লি, হেকেল, মিল প্রভৃতি কয়েকটি খুব উপযুক্ত চেলা পেয়েছিলেন। এদের সাহায্য না পেলে সন্দেহ হয়, ডারউইনের মতবাদ এত শীঘ্র এমন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারত কি না। আমাদের পক্ষে এখন কল্পনা করা শক্ত, এই মতবাদ তখনকার সমাজে কতখানি বিপ্লব এনে দিয়েছিল। কেবল যে বিজ্ঞানীদের নাড়া দিয়েছিল তা নয়, গত শতাব্দীর সমস্ত চিন্তার ধারাই বদলিয়ে দিয়েছিল এই বিবর্তনবাদ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য প্রভৃতি মানুষের সকল প্রকার চিন্তাক্ষেত্ৰই এই মতবাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিল। এমন কি, এক দল সমাজতত্ত্ববিৎ বলেন, ডারউইন তার অভিব্যক্তিবাদে জীবনসংগ্রাম ও যােগ্যতমের উদবর্তনের উপর যে ঝোক দিয়েছিলেন তারই ফল ১৯১৪ খ্রীস্টাব্দের যুবােপীয়ান মহাযুদ্ধ। কে বলতে পারে ১৯৪০-এর জগব্যাপী যুদ্ধের পিছনেও এই মতবাদের প্রভাব আছে কি না। ডারউইন ও ওয়ালেস যে-বিবর্তনবাদ খাড়া করেছিলেন, তার যুক্তির পশ্চাতে ছিল কতকগুলি প্রমাণ। তারা দুজনেই নানান দেশ ঘুরে নানান অবস্থায় গাছপালা ও জীবজন্তুর দৈনিক জীবনপ্রণালীর ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষণ করে দেখেছিলেন জীবমাত্রই পরিবর্তনশীল। যতই আত্মীয়তা থাক না কেন, এক প্রাণীর সঙ্গে অন্য প্রাণীর কিছু তফাত আছেই । পৃথিবীতে অসংখ্য জীব একত্রে ঘেঁষাঘেঁষি বাস করছে।
প্রাণতত্ত্ব অথচ আহার্য বস্তু পরিমিত। কাজেই প্রয়ােজনমতো যথেষ্ট খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকা কারাে পক্ষেই খুব সহজ নয়। প্রাণীমাত্রকেই জীবনসংগ্রামে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়। আহার সংগ্রহ ব্যাপারে পরস্পরের মধ্যে রেষারেষি তত আছেই, প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিকুল হােলে যে-সব বাধা দিতে থাকে তার সঙ্গে তাকে যােঝাবুঝি করতে হয়। জীবন- ধারণ করতে এই যে অহরহ সংগ্রাম, তাতে এক ব্যক্তির যদি একটুখানিও বিশেষত্ব তাকে কোনাে বিষয় অন্যদের চেয়ে উৎকর্ষ দেয়, তবে তার জোরে অন্যদের হার মানিয়ে সেই ব্যক্তি বেশি বংশবৃদ্ধি করার সুযােগ পায়। যে-বৈশিষ্ট্যের দরুন সে সুবিধা পেল, তার বংশধরদের মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য আরো ফুটে ওঠা বিচিত্র নয়। অল্পস্বল্প তফাত গুলি এইরকম বাড়তে বাড়তে এত বেশি তফাতে গিয়ে দাড়ায় যে অনেক সময় মূল থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ গ্রহণ করে। নতুন-নতুন জাতি এইরকম করে সৃষ্টি হয়। পরিবর্তনের আরম্ভ অতি সূক্ষ্মভাবে হয় ও তার প্রগতি অত্যন্ত ধীরপথে চলে। একটি জাতি থেকে অন্য জাতির উৎপত্তি হােতে হাজার-হাজার বছর লেগে যেতে পারে। যে-নিয়মে এই ক্রমবিবর্তন হয় তাতে বােঝা যায় বিচ্ছিন্নভাবে বড়াে রকমের কোনাে পরিবর্তন হঠাৎ হয় না ( অন্তত ডারউইনের এই মত, সব প্রাণ-বিজ্ঞানী বিশেষত মেণ্ডেলিয়ানরা এ-কথা সমর্থন করেন না), পরিবর্তন ধীরগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার মধ্যে অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা দেখা যায় । ১৩৬ জীবের ক্রমবিবর্তন আগেই বলা হয়েছে ডারউইন, ওয়ালেস প্রভৃতি বিজ্ঞানীরা ক্রমবিবর্তন সম্বন্ধে অনেক প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলি কী ধরনের প্রমাণ একটু দেখা যাক। ভূ-পরিচয় থেকে প্রমাণ ভূ-বিজ্ঞান থেকে আমরা জানতে পারি পৃথিবীর সমতল ভূমি তৈরি হয়ে উঠেছে স্তরে স্তরে । পাহাড় থেকে পলি এনে নদীর জল একটি স্তর বিছিয়ে দিয়ে যায় প্রতি বছর। স্তর বছর বছর যতই উচু হােতে থাকে, তলার দিকে তার উপর চাপ পড়ে। নিচের মাটি তাই ক্রমশ শক্ত হয়ে জমে পাথরে পরিণত হয়। ভূ-বিজ্ঞানীরা এক-একটি স্তরের প্রকৃতি ও গুণবিচার করে সঠিক বলতে পারেন সেই সেই স্তরের বয়স কত। নানা জায়গার স্তর পরীক্ষা করে পৃথিবীর ক্রমবিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস তার খাড়া করতে পেরেছেন। তারা দেখেছেন পৃথিবী গড়ে ওঠবার ইতিহাসে দু-চার হাজার বছর কিছুই না ; তাদের হিসাব করতে হয় যুগ ধরে। যে-যুগে পৃথিবীর যে-স্তর তৈরি হয়েছে সেই যুগে যে-সব প্রাণী বেঁচে ছিল তাদের কিছু না কিছু চিহ্ন সেই শুয়ে থেকে গেছে। অনেক বছর ধরে মাটির নিচে পোতা থাকলে গাছের গুড়ি মানুষ সেনােজোয়েক AINULUI RECENT IUWINII BESTEUSTOCENE 53 MPLIOCENEN MIOCENE ///// {{}}sossif}}গ CRETACEOUS পাখি আধুনিক) প্ল্যাসেন্টাওয়ালা জন্তু ফুলওয়ালা গাছ পাখির পূর্ব পুরুষ মেসােজোয়েক JURASSIC VOOOOOOOO OTRIASSIC স্তন্যপায়ী জন্তু oooooo 00000 PERMIAN সরীসৃপ ARBONIFEROUS ঘন জঙ্গল থেকে কয়লার উৎপত্তি নানান উদ্ভিদ নানান জলঞ্জীব উচ্চশ্রেণীর কীট SILURIAN প্যালিওজোয়েক মাছ মেরুদণ্ডবিশিষ্ট জলজীবের সূত্রপাত ORDOVICIAN CAMBRIAN শামুক সামুদ্রিক কীট এককোষী জলঙ্গীর আরকেওজোয়েক কালক্রম অনুসারে সাজানাে পৃথিবীর বিভিন্ন যুগের স্তর বাঁ-দিকে : মহাযুগের নাম। ডানদিকে : যে-গুরে বে-প্রাণীর ফসিল পাওয়া গেছে তাদের নাম
জীবের ক্রমবিবর্তন
বা জন্তুর হাড় পাথর হয়ে যায়। এই রকম পাথর-হয়ে-যাওয়া জৈব
পদার্থকে ‘ফসিল’ ( fossil) বলে। পুরাতন যুগ থেকে আরম্ভ
করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত
পৃথিবীর বিভিন্ন
যে-সব জাতীয় প্রাণীর
ফসিল পাওয়া গেছে তা
যদি পর পর সাজিয়ে রাখা
যায়, তবে তাদের মধ্যে
বেশ ধারাবাহিকতা লক্ষ্য
হবে। বর্তমান যুগের যে-
কোনাে গাছ বা জন্তুর
পূর্বপুরুষের ইতিহাস যদি
মাটির স্তরের ভিতর অনু-
সরণ করে যাওয়া যায়,
৩৮. ফসিল (fossil )
এক-এক
ভৌগােলিক যুগ পিছিয়ে তাদের চিহ্ন পাব, দেখব তার রূপ
পরিবর্তন হয়ে গেছে। যার গঠন এখন জটিল পূর্ব-যুগে তার গঠন
অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। নানান জাতীয় জীবের নানান সময়কার
এত শিলীভূত চিহ্ন বিজ্ঞানীরা সংগ্রহ করেছেন যে, তার
থেকে বেশ জোরের সঙ্গে বলতে পারেন, যুগ-যুগ ধরে প্রাণীর
যে ক্রম-বিবতন চলেছে তার মধ্যে কোথাও বিচ্ছেদ নেই।
ডারউইনের সময়েও বিচ্ছেদের যে-সব সূত্রগুলি নিখোজ (missing
প্রাণতত্ত্ব links ) ছিল পরবর্তীকালে তার অধিকাংশই খুঁজে পাওয়া গেছে। মানুষ, ঘােড়া, হাতি প্রভৃতি সবরকম প্রসিদ্ধ জন্তুদেরই ক্রম- বিকাশের ইতিহাস মাটির তলা থেকে সংগ্রহ করা গেছে। বানর কিংবা বনমানুষ থেকে কী করে মানুষ গড়ে উঠল, মানুষেরও একটু-একটু করে বদল হয়ে কেমন উন্নতি হয়েছে তার প্রমাণ ধাপে-ধাপে পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে থেকে গেছে। মাটির নিচে থেকে যত এইরকম চিহ্ন বেরােচ্ছে, বড়ো-বড়ো মিউজিয়ামে সেগুলি সযত্নে রাখা হচ্ছে। সেগুলি মিলিয়ে পরীক্ষা করে দেখলে জীবজন্তুর ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস বেশ গড়ে তােলা যায়। দেখা যায়, গােড়ায় আরকেজোয়েক (archaeozoic) যুগে জীবের সবে জন্ম হয়েছে ; তখন আমিবার মতাে এককোষী জীবেরই চিহ্ন কেবল পাওয়া যায় । তার পর প্রােটেরােজায়েক (proterozoic) যুগে বহুকোষী জীবের মধ্যে নানারকম পােকামাকড় দেখা দিয়েছে। অরভােভিসিয়ান (ordovician) ও সিলুরিয়ান ( silurian) যুগে শিরদাড়াওয়ালা মাছ জন্মেছে এবং অন্য জল- জন্তুর চিহ্নও দেখা যায় । তারও অনেক পরে মেশােজোয়েক (mesozoic) যুগ হচ্ছে সরীসৃপদের যুগ। এবং সবশেষে সেনােজায়েক (cenozoic) অর্থাৎ বর্তমান যে-যুগ, এই যুগের আরম্ভ হােতে পাখি ও দুগ্ধপায়ী জন্তু ; ঘাস, বাঁশ ও অন্যান্য ফুল- ওয়ালা গাছগাছড়া ইত্যাদি যে-আধুনিক প্রাণীজগতের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ট পরিচয় তার খোঁজ পাই। এত রকমের প্রাণীর উৎপত্তি হােতে কী বিস্তীর্ণ সময় লেগেছে, আমাদের পক্ষে ধারণা করা ১৪ ০ জীবের ক্রমবিবর্তন কঠিন। মানুষের ইতিহাসের কালপরিক্রম হিসাব করতে যে-যুগের কল্পনা করি তাতে কুলােয় না—প্রাণীর ক্রমবিকাশের ইতিহাসে এক-একটা যুগ, যাদের নাম করা গেছে একটু আগে, লক্ষ লক্ষ বছর হিসাবে চলে। ভৌগােলিক প্রমাণ পৃথিবীর এক-এক অঞ্চলে এক-এক বিশেষ ধরনের জীবজন্তু দেখতে পাওয়া যায়। স্থানবিশেষে জীবশ্রেণীর এই রকম বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে কী করে। বিশেষ দেশের বিশেষ আবহাওয়ার গুণে এই রকম হয়, তা সম্পূর্ণ বলা যায় না। প্রত্যেক বাগানেই কত ফুল ও ফলের গাছ থাকে যা বিদেশ থেকে আমদানি। চীন দেশ থেকে আমাদের দেশে লিচু এসেছিল, গােলাপ ইরান থেকে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউকালিপ্টাস্ ( Eucalyptus) গাছ এসেছে এবং আমাদের দেশে এগুলি সর্বত্র সহজেই জন্মাচ্ছে। কাজেই কেবল আবহাওয়ার গুণে জীব- জন্তুর বিশেষত্ব প্রকাশ পায় তা ঠিক নয়। পৃথিবীর ইতিহাসের সঙ্গে জীবের ইতিহাস জড়িত। অধিকাংশ মহাদেশগুলি এখন যেমন পরস্পর যুক্ত, পুরাকালে তা ছিল না। তারা বিচ্ছিন্ন ছিল, এক-একটি মহাদ্বীপের মত, যেমন এখনাে অস্ট্রেলিয়া রয়েছে। চারদিকে সমুদ্রে ঘেরা তাই এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে জীবজন্তুদের চলাচল সম্ভব হােত না। সেইজন্য বিভিন্ন মহাদেশের ১৪১ প্রাণতত্ত্ব জীবশ্রেণীর ক্রমবিকাশ বিভিন্ন ধারায় অগ্রসর হয়েছে। বিভিন্ন দেশের জীবজন্তুর ক্রমবিবর্তনের ইতিবৃত্ত সেই সেই দেশের মাটির তলায় থেকে গেছে। বিজ্ঞানীরা এই টুকরাে-টুকরো ইতিহাস একত্রে মিলিয়ে দেখে ক্রমবিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে কোথাও বিচ্ছেদ নেই, সমগ্র একটা ছবি আমাদের সামনে ধরে দিতে পেরেছেন। দেহগঠন থেকে প্রমাণ যে-কোনাে দুই বা ততােধিক শ্রেণীর জীবজন্তুদের দেহ যদি তুলনা করে দেখা যায় তবে দেখতে পাব তাদের গঠনের মধ্যে মিল আছে। বাইরের চেহারায় সাদৃশ্য না থাকলেও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাঠামাের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য প্রকাশ পায়। ঘাস ও বাঁশ যে এক-জাতীয় উদ্ভিদ তা তাদের পাতা, ডাটা, ফুল ও বীজের গড়ন থেকেই ধরা পড়ে। তেমনি বেড়ালের চেয়ে সিংহ অনেক বড়াে জানােয়ার হােলেও তাদের দেহগঠন থেকে তারা যে এক- জাতের সহজেই বােঝা যায় । জাতিগত মিল তাে আছেই, বিভিন্ন জাতির মধ্যেও শরীরগঠনে মূলগত খুব পার্থক্য নেই। তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবয়বগুলি ভালাে করে দেখলে সাধারণভাবে একটা ঐক্য লক্ষ্য হবে। জীবজন্তুর পরস্পরের মধ্যে যদি কোনো ঐতিহাসিক যােগ না থাকে তবে এই রকম ঐক্য থাকবে কেন। বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যে-সব চিহ্ন (vestigal organs ) ১৪২ জীবের ক্রমবিবর্তন জীবজন্তুর শরীরে থেকে গেছে তার থেকে বিবর্তনবাদের আর- একটি খুব প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা ৩৯, মানুষের পূর্বপুরুষ ফসিল অবলম্বনে চেহারা অনুমান করা যেতে পারে : তিমিমাছ বা সাপের পা ; মানুষের তৃতীয় চোখ, অ্যাপেণ্ডিক্স ও লেজ ; গুহাবাসী জন্তুদের চোখ ; উড়তে পারে না এমন অনেক পােকার ডান। ব্যবহার অভাবেই হােক বা অন্য যে-কোনাে কারণে হােক, এই অঙ্গগুলি লােপ পেলেও তারা নিজেদের কিছু না কিছু চিহ্ন রেখে যায় শরীরে। মানুষের লেজ এখন নেই কিন্তু মেরুদণ্ডের শেষভাগে এক টুকরা ১৪৩ প্রাণতত্ত্ব হাড় দেখে বােঝা যায়, এক সময় তার লেজ ছিল। ক্রমবিবর্তনের ফলেই এই সব অঙ্গ লােপ পেতে বসেছে মেনে নেওয়া ছাড়! অন্য কোনাে কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না । ণতত্ত থেকে প্রমাণ মার পেটে জন্তুরা যতদিন জ্বণ অবস্থাতে থাকে, তাদের দেখতে সব এক রকম। যে-কোনাে জন্তুর প্রাণ প্রথম অবস্থায় দেখে তা মানুষ না বেড়াল, মুরগি না সাপ, কী হয়ে জন্মাবে বলা যায় । হৃণমাত্ৰই প্ৰথমটা মাছের মতাে দেখতে যেমন বড়াে হােতে থাকে ক্রমশ তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। বিবর্তনবাদ মানলে সহজেই বুঝতে পারব কেন জ্বণের এই রকম পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আমরা এখন জানি, যে-জন্তুদের নাম করলুম তাদের সকলেরই পূর্বপুরুষ ছিল মাছের মতাে কোনাে জলজন্তু। তাদের জাতীয় ইতিহাসের ক্রমবিকাশ জ্বণের ক্রমবৃদ্ধির মধ্যে প্রতিফলিত হােতে দেখা যায় । চার রকম প্রমাণের উল্লেখ করা হােলে মাত্র। বিবর্তন বাদের সমর্থনের জন্য আরাে অনেক প্রমাণ খুজে পাওয়া শক্ত নয় তবে যেটুকু বলা হােলাে তার থেকেই বেশ বােঝা যাবে, জীব- জগতের বৈচিত্র্য ক্রমবিবর্তনের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। আকস্মিক ভাবে কোনাে জীব এসে পৃথিবীতে উপস্থিত হয়নি। ১৪৪ জীবের ক্রমবিবর্তন ক্রমবিবর্তন সম্বন্ধে মতবাদ জীবপ্রকৃতি সব সময়ই বদলাচ্ছে, কেউ একভাবে বেশিদিন থাকে না-এ-কথা মেনে নিলেও প্রশ্ন ওঠে ক্রমবিবর্তন কেন হয়, কী করে হয়। বিবর্তনের প্রণালী কী। ব্যক্তিগত ক্রমবিকাশের সঙ্গে জাতিগত পার্থক্যের সম্পর্ক কী। এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এক কথায় হয় না। বিজ্ঞানীদের মধ্যেও এ-বিষয়ে মতৈক্য নেই, নানা মুনির নানা মত। লামার্ক { Lamarck) থেকে আরম্ভ করে হাল আমল পর্যন্ত কত রকম মতবাদ যে সৃষ্টি হয়েছে তার ঠিক নেই। এই পরস্পরবিরােধী বহু মতবাদের জঞ্জালের মধ্যে না গিয়ে চেষ্টা করা যাক বুঝতে প্রাণবিজ্ঞানীরা যে সব যুক্তি বা সত্যের উপর নির্ভর করে তাদের মতবাদ খাড়া করেছেন সেগুলি কী । যে-সত্যের উপর সব মতবাদেরই ভিত গড়া হয়েছে, সে হচ্ছে : জীবমাত্রের পরিবর্তনশীলতা। কোনো জীব আর- একটি জীবের হুবহু অনুকরণ নয়। ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে এই যে অল্পবিস্তর প্রভেদ, বংশপরম্পরায় বংশপরম্পরায় সেগুলি বাড়তেই থাকে, তাতে কখনাে বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে আবার কখনাে লােপ পেয়ে যায়। এই ভেদপ্রণালী চলতে চলতে বংশধরদের মধ্যে ক্রমশ যখন অনেকখানি প্রভেদ দাড়িয়ে যায়, তখন আমরা তাদের ভিন্ন জাতি বলে স্বীকার করে নিই। লমার্কের মতে, যে-সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিত্য ব্যবহারে লাগে ১৪৫
প্রাণতত্ত্ব
ঘটে।
তার উন্নতি হতে থাকে, ব্যবহার না হহলেই অবনতি
জিরাফের গলা
লম্বা হয়েছে, গলা বাড়িয়ে
গাছের পাতা খাবার চেষ্টায় । মানুষ দ্বিপদী হবার পর
থেকে লেজ ব্যবহারে অসুবিধা বলে তার এই অঙ্গটি লােপ
পেয়েছে। কথাটা ঠিক, কিন্তু একটু গোল বাধে এক জায়গায়।
ব্যবহার বা না-ব্যবহারের দরুন অথবা পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুণে
ব্যক্তিবিশেষের জীবদ্দশায় যে-সব পরিবর্তন ঘটে, সেগুলি কি
তার সন্তানে গিয়ে বর্তায়। ভাইসমান প্রমুখ একদল বিজ্ঞানী
সােপাজিত ( acquired) গুণ বংশানুগত হয় না মনে করেন।
তা সত্য হােলে, পুরুষানুক্রমে ইদুরের লেজ যদি ক্রমাগত কেটে
দেওয়া যায় তবে সেটা ছােটো হােতে হােতে কয়েক পুরুষ বাদে
একেবারে লুপ্ত হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তা তাে হয় না।
লামার্কের মতবাদ ডারউইনও বিশ্বাস করতে পারেননি।
ডারউইন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অবলম্বন করে তার নিজস্ব মতবাদ
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
যে-প্রাকৃতিক ঘটনাটি ডারউইনের মনকে সবচেয়ে বেশি
ভাবাবিষ্ট করেছিল, সে হচ্ছে জীবের ক্রমাগত সংখ্যাবৃদ্ধির চেষ্টা।
এমন অনেক গাছ আছে যার একটি গাছেই লক্ষাধিক বীজ জন্মায়।
মশা, মাছি, উই, পিঁপড়ে—এদেরও কম ডিম হয় না।
যদি ফুটত এবং সব বংশধরই বাঁচতে পেত, তবে আর-কোনাে
জীবের স্থান হােত না পৃথিবীতে, সব জায়গা ছেয়ে ফেলত এরাই।
এরা খুব শীঘ্র বংশ বৃদ্ধি করতে পারে ; এদের কথা ছেড়ে যাদের
সব ডিম
১৪৬
জীবের ক্রমবিবর্তন খুব কম সন্তান জন্মায় তাদের কথাই ধরা যাক না কেন। হাতি প্রায় একশ’ বছর বাঁচে। এই দীর্ঘ জীবনের মধ্যে গড়পড়তা তাদের ছ'টার বেশি বাচ্ছা হয় না দেখা গেছে। একজোড়া হাতির সব বংশধরকে যদি বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হােত তবে পাঁচশ' বছরের মধ্যে ১,৫০,০০,০০০ হাতির জন্ম হােত। হাতি তাে কখনাে দেখতে পাওয়া যায় না, তবে তারা কোথায় যায়। নিজেদের মধ্যে রেষারেষি এবং অন্যান্য জীবজন্তুর সঙ্গে প্রতিযােগিতায় তার অধিকাংশই বাঁচতে পারে না। সংখ্যা যত বাড়ে, খাবার কম পড়ে, প্রতিযােগিতা হিংস্ররূপ ধারণ করে। সত্তা রক্ষার এই প্রয়াসে যারা উতরে যায় তাদের নিশ্চয়ই কিছু বিশেষ গুণ আছে যার জোরে অন্যদের পরাভূত করে তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে। সেই গুণগুলি বংশানুক্রমে উৎকর্ষ লাভ করতে থাকে। কারণ, যাদের বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে, তারাই সংগ্রামে সবচেয়ে ভালাে যুঝতে সক্ষম, ধরে নেওয়া যেতে পারে। একেই ডারউইন বলেছেন যােগ্যতমের উবর্তন (survival of the fittest)। সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে জীবনসংগ্রাম বাড়ে; জীবনসংগ্রাম যতই বাড়ে প্রাকৃতিক নির্বাচন ( natural selection) ততই জোরে কাজ করে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আর-একটি ব্যাপার যৌন নির্বাচন। জন্তুজানােয়ারের মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষ যেমন- তেমন ভাবে মেলে না, তারা পরস্পরকে পছন্দ করে বাছাই করে নেয়। সেই সব পুরুষেরই চাহিদা বেশি যারা জীবন- ১৪৭ প্রাণতত্ত্ব সংগ্রামে যুঝতে পারে ভালাে। যৌন নির্বাচন ও প্রাকৃতিক নির্বাচন পরস্পরবিরােধী প্রণালী নয়, একটি আর-একটির অঙ্গ। এই রকম বাছাইয়ের ফলে ধীরে-ধীরে একটি ধারা অবলম্বন করে জীবজন্তুর পরিবর্তন এবং উন্নতি হােতে থাকে। এই হােলাে খুব সংক্ষেপে ডারউইনের ক্রমবিবর্তন সম্বন্ধে বিশেষ মতবাদ ( Darwin's Theory of Natural Selection ), অনেক বছর পর্যন্ত এই মতবাদের বিরুদ্ধে খাটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ কিছু বলতে সাহস করেনি। তার প্রধান কারণ ডারউইনের প্রত্যেক যুক্তির পিছনে ছিল ঝুরি-ঝুরি প্রমাণ। সেইজন্য তার কোনাে কথার প্রতিবাদ করতে কারাে সাহস হয়নি যথেষ্ট বিরুদ্ধ প্রমাণ সংগ্রহ না করে। আর-একটা কারণ, সৌভাগ্যবশত তিনি অনেকগুলি কৃতী ও গুণী চেলা পেয়েছিলেন। তারা এই মতবাদের সমর্থনে নানা দিক থেকে প্রচুর মালমসলা সংগ্রহ করে এ-কে প্রতিষ্ঠিত রাখবার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। প্রথম আঘাত এসে পড়ল মেণ্ডেলের আবিষ্কার থেকে। মে=ে লিয়ানরা কেবল যে বংশক্রম সম্বন্ধে লামাকের মতবাদ অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিলেন তা নয়, ডারউইনের ধীরপন্থায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের কল্পনাকে সত্য বলে মানতে চাইলেন না। তারা বহু পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করে দেখলেন যে, পরিবর্তন (variation) সব সময়েই যে একটি ধারা অনুসারে ( continuous ) হয় তা নয়। বিচ্ছিন্নভাবে যখন-তখন হঠাং বড়ো রকমের পরিবর্তন ( discontinuous variation) হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। ১৭৮ জীবের ক্রমবিবর্তন ডে-ব্রীজ (De Vries) তার বাগানে, অল্প সময়ের মধ্যে এমন সব নতুন ধরনের গাছ সৃষ্টি করতে পারলেন যে, উদ্ভিদতত্ত্ববিদরা তাদের নতুন জাতিত্ব স্বীকার করে নতুন নামকরণ করতে বাধ্য হলেন। ডে-ব্রীজ উচ্চকণ্ঠে আস্ফালন করে বলতে লাগলেন,-“ডারউইন- মতবাদীরা মনে করেন যে, যে-কোনাে একটি গুণের ক্রমবিবর্তন হােতে হাজার হাজার বছর লাগে, আর আমি আমার ফুল- বাগানের ল্যাবরেটরিতে চোখের সামনে বিবর্তনের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে দিলুম।” ডে-ভ্ৰীজের বিশ্বাস, এই রকম আচমকা পরিবর্তনের সাহায্যে জীবজগতের উন্নতি এত শীঘ্র সম্ভব হয়েছে। তাই তার মতবাদের নাম দিলেন Mutation Theory। ডে-ভীজের আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্রমবিবর্তন নিয়ে নানারকম পরীক্ষা ( experimental evolution) করার হুজুক লেগে গেল। গাছপালা, পােকামাকড়, জন্তুজানােয়ার কিছুই বাদ পড়ল না, সকলের উপরই অত্যাচার চলতে লাগল। আমেরিকায় টাওয়ার ( Tower) এমন একটি ঘর তৈরি করলেন যার ভিতর ইচ্ছামতাে শীত গ্রীষ্মের আবহাওয়া সৃষ্টি করতে পারা যায়। গরম দেশের জীবজন্তু তার ভিতর ভরে, ঘরটা খুব ঠাণ্ডা রেখে, দেখতে লাগলেন তাদের কোনাে পরিবর্তন হয় কি না, এবং হােলে সেই পরিবর্তন বংশানুক্রমে স্থায়ী হয় কি না। ঐ সময় এই ধরনের যত পরীক্ষা হয়েছিল তার মধ্যে মাছি নিয়ে মর্গান ( Morgan) যে পরীক্ষা করেছিলেন তা খুব বিস্ময়কর। তিনি কেবল যে ইচ্ছামতাে এদের শরীরে নানারকম ১৪৯ ১১ স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পেরেছিলেন তা নয়, তিনিই প্রথম স্ত্রী-পুরুষভেদের অন্তনিহিত কারণ আবিষ্কার করেন। ডারউইনের মতবাদ অপ্রমাণিত করবার জন্যই এত উৎসাহ- সহকারে প্রাণবিজ্ঞানীরা পরিবতনপ্রবণতা এবং বংশানুক্রম সম্বন্ধে নানান পরীক্ষা করতে মেতে ওঠেন। কিন্তু কয়েক ধরে এই বিষয়ে পরীক্ষা চলতে থাকলে ফলাফল বিচারের সময় দেখা গেল, লামার্ক এবং ডারউইন কাউকেই একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। লামাকের মতে ব্যক্তিগত জীবনের স্বােপার্জিত গুণ বংশানুক্রমে প্রবর্তিত হতে পারে। পরীক্ষার ফলে প্রমাণিত হলাে যে, কোনাে-কোনাে ক্ষেত্রে এইরূপ স্বােপার্জিত গুণ জার্ম-সেলের এমন পরিবর্তন ঘটায় যে, সেই গুণগুলি বংশানুক্রমে স্থায়ী হয়ে যায়। এটাও দেখা গেল, ডারউইনের বিরুদ্ধবাদীরা যে স্বতঃপ্রসূত আকস্মিক পরিবর্তনের (mutation) উপর এত ঝোক দিয়েছিলেন, তা অনেক সময় ঘটতে দেখা যায় সত্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ক্রমবিবর্তনের প্রগতি ডারউইনের বিবৃত প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধীর মন্থর গতিতেই চলে। ক্রমবিবর্তন সম্বন্ধে বাদ-প্রতিবাদের ইতিহাস বিচার করে দেখলে দেখা যায়, গত অর্ধশতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস একবার একদিকে আবার অন্যদিকে ক্রমাগত দোল খাচ্ছে। কখনাে লামার্ক-ঘেঁষা মত বেশি চলে, কখন ডারউইনের প্রতিপত্তি প্রবল হয়ে ওঠে, কখনো বা ডে-ভ্ৰীজ, বেটসন প্রভৃতি ১৫০
জীবের ক্রমবিবর্তন
আধুনিকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ-বিষয়ে আমাদের
মনে হয়, কোনােদিকেই অতি বিশ্বাসের প্রয়ােজন নেই, সত্যঘটনা
যে-দিকেই সাক্ষ্য দিক না কেন আমাদের তা গ্রহণ করা উচিত।
হাল আমলে অনেক প্রাণবিজ্ঞানী মধ্যপথ-অবলম্বী।
এই প্রসঙ্গে আর-একশ্রেণীর মতবাদীদের কথা বলা দরকার।
তারা সকলেই বিবর্তনবাদী কিন্তু ডারউইন, হাকলি, হেকেল
প্রভৃতির মতাে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক নিয়মের উপর তারা নির্ভর
করতে পারেন না। যে-ভাবে ক্রমবিবর্তন হয়ে পৃথিবীতে এত
বিচিত্র জীবজন্তুর জগৎ গড়ে উঠেছে, সে যে কেবল প্রাকৃতিক
নির্বাচনের মতাে অন্ধ অচেতন নিয়মে হয়েছে, তা তাদের
বিশ্বাস হয় না। প্রাকৃতিক নির্বাচনের গতির ঠিক নেই,
উন্নতির দিকেও যেতে পারে, অধােগতির দিকও নিতে পারে।
তবে ক্রমবিবর্তন কেবলমাত্র উন্নতির সূত্র ধরে এতকাল চলেছে
কেন। তাই এর ভিতর তারা অন্য রকম কোনাে প্রেরণা,
কোনাে শক্তির পরিচয় দেখতে পান, যার বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা
দেওয়া চলে না মনে করেন। যারা এইভাবে প্রাণীজগতের
অভিব্যক্তির উপর ঐশ্বরিক প্রভাব অনুভব করেন তাদের
প্রাণৈকান্তবাদী (vitalists) বলা হয়। এরা অন্যদের বস্তু-
তান্ত্রিক বা যন্ত্রবাদী ( mechanists ) বলে অবজ্ঞা করেন।
খুব সম্প্রতি এই দুই ভাবধারার সমাবেশের চেষ্টা করেছেন
দক্ষিণ আমেরিকার জেনারেল ম্যাটস ( General Smuts )
তঁার মতবাদ ‘হােলিজম (Holism) নামে প্রসিদ্ধি লাভ
প্রাণতত্ত্ব করেছে। তার বিশ্বাস, পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য একটা ঐকান্তিক চেষ্টা প্রকৃতির অন্তরে নিহিত আছে। সেই প্রেরণার বশেই জীবজন্তুরা উন্নতির ধাপে-ধাপে অগ্রসর হচ্ছে পূর্ণতার দিকে।
শেষ কথা
বইয়ের শেষ অধ্যায়ে পৌছানাে গেল। ভূমিকায় যে-
বিষয়ে কেবল প্রশ্ন তুলেই খালাস পাওয়া গিয়েছিল, এখন অত
সহজে নিষ্কৃতি নেই। প্রাণ ব্যাপারটা কী, তার আলােচনার
সময় হয়েছে । এই মৌলিক প্রশ্নের বিচার আর এড়িয়ে যাবার
উপায় নেই।
প্রাণের বিশেষ লক্ষণ বা গুণের কথা পূর্বে বলা হয়েছে,
এখন আর-একবার স্মরণ করে দেখলে ক্ষতি নেই।
(১) অজৈব পদার্থ নির্বিকার, নিশ্চল। জীবমাত্রেই সচল
ও পরিবর্তনশীল। গাছের চলাচলের ক্ষমতা না থাকলেও সে স্থির
নয়। তার ডগা ঠেলে আকাশের দিকে ওঠে, তার ফুলের
পাপড়ি ফুটে’ ঝরে পড়ে, লতা ঘুরেঘুরে গাছের ডালপালা বেয়ে
কতদিকে যায় ছড়িয়ে।
(২) জৈববস্তু বাইরের আঘাতে সাড়া দেয়। আঘাত
যেমন নানাবিধ, সাড়া দেবার প্রণালীরও বৈচিত্র্য যথেষ্ট।
আমরা মৃদু গরমে পাই আরাম, অতি গরমে পাই কষ্ট।
অল্পস্বল্প ঠাণ্ডায় আমাদের চনমনে করে তােলে, অতি শীতে ঘুম
আসে।
(৩) বৃদ্ধি জীবমাত্রেরই লক্ষণ। বৃদ্ধি হয় ভিতর থেকে,
প্রাণতত্ত্ব বস্তুপিণ্ডযােগে বাইরে থেকে নয়। বৃদ্ধির জন্য বাইরে থেকে আহার্য বস্তু নেওয়া হয় সত্য, কিন্তু তাকে ভেঙেচুরে নিজস্ব করে নিয়ে তবে শরীরের পােষ্টাই ও বৃদ্ধির কাজে লাগানাে হয়। (৪) জীবেরাই কেবল নিজেকে ভাগ করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ ছাড়াও বংশবৃদ্ধির আরাে অভিনব এবং সুনিপুণ উপায় তারা আবিষ্কার করেছে স্ত্রী-পুরুষের সংঘােগে। (৫) সব শেষে আছে মৃত্যু। জীব থেকেই জীবের উৎপত্তি জড় ও জৈব প্রকৃতির মধ্যে যে-সব পার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হলাে তার মধ্যে বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা প্রাণীদের অসামান্য প্রতিপত্তি দিয়েছে। জীব থেকেই কেবল জীবের উৎপত্তি সম্ভব। কোনাে জীব আপনা হতে বা কোনাে জড়বস্তু থেকে জন্মাতে পারে । কেবল তাই নয়, যে-কোনাে জীবের জন্মের ধারা বেয়ে যদি পিছন দিকে খোজ নিয়ে চলি, তৰে যেতে-যেতে কোথাও বাধা পাব না, সূত্র কোথাও ছিন্ন হবে না, পেীছাব গিয়ে একেবারে আদিসৃষ্টির সমুখে। জীবনের ধারা অবিচ্ছিন্ন। ১৫৪ শেষ কথা জীবজগতের ব্যাপ্তি জীবের সৃষ্টি হয়েছিল খুব সহজ এবং সূক্ষ্ম দেহ নিয়ে। ক্রমবিবর্তনের ফলে ক্রমশ তাদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে জটিলতা ও বৈচিত্র্য। ক্রমবিবর্তন-ইতিহাসের খুব প্রাক্কালেই উদ্ভিদ ও জন্তু পৃথক হয়ে যায়। তার পর এই দুই মহাজাতি থেকে কত না জাতি, উপজাতির সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে সর্বত্র তারা ছড়িয়ে রয়েছে, কোথাও ফাক নেই। ডাঙার উপর এক বিন্দু জায়গা কোথাও নেই যেখানটা কোনাে না কোনাে জীব অধিকার করে নেই। সমুদ্রের অতল গভীরেও বিচিত্র জীবজন্তু। হাওয়ায় অসংখ্য জীবাণু ভেসে বেড়ায়। বেলুনের সাহায্যে আকাশের খুব উচু স্তর থেকে হাওয়ার নমুনা নিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় ৭ মাইল উপরেও যথেষ্ট জীব চলাফেরা করে। সবচেয়ে গভীর সমুদ্র ৭ মাইলের বেশি গভীর নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর উপর নিচে ১৪ মাইল ব্যাপী জীবের লীলাভূমি। পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য গ্রহ উপগ্রহে কোনােরকম প্রাণীর সন্ধান এখনাে পর্যন্ত সঠিক পাওয়া যায়নি। প্রথম সৃষ্টি বিন্দুপ্রায় একটিমাত্র সেল থেকে জীবলােকের সৃষ্টি, বিজ্ঞান একথা প্রমাণ করেছে। কিন্তু সেই আদিম সেল জন্মাল কী করে, প্রাণতত্ত্ব এই প্রশ্নের নিঃসন্দেহ জবাব বিজ্ঞান এখনাে নিতে পারেনি। কী রকম ঘটনাচক্রে জীব-সেল সৃষ্টি হয়েছিল তা জানবার কোনাে উপায় নেই। যে-বিষয় সঠিক না জানা যায় সে-বিষয় বিজ্ঞান নীরব, আন্দাজ করে কোনাে কথা বলা তার কর্তব্য নয়। সেইজন্য আদিম সৃষ্টির বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের ভার বিজ্ঞানীরা তত্ত্বজ্ঞানীদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা সেই সুযােগে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করতে মন দিয়েছেন ; নানারকম রাসায়নিক বস্তুসংযােগে জৈব বস্তু প্রস্তুত করতে পারেন কি না চেষ্টা দেখছেন। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সফল হােলে জীবষ্টির রহস্য ল্যাবরেটরির টেবিলেই মীমাংসা হয়ে যাবে, অনুমান বা তর্ক-বিতর্কের আর প্রয়ােজন হবে না, তাদের এই দুরাকাঙ্ক্ষা। আদিম জীব-সেল পৃথিবীতে কী করে জন্ম গ্রহণ করেছিল সে- বিষয় কিছু সিদ্ধান্ত না হলেও যেটুকু আন্দাজ করা যায় তাতে মনে হয় দুটি সম্ভাবনা আছে । (১) অন্য কোনাে গ্রহ থেকে উল্কাপাত জীবকণাকে এনে দিয়েছে পৃথিবীতে। ঘটনাটা অসম্ভব না হােলেও এটা সম্পূর্ণ আন্দাজের কথা। আমাদের জানবার বা পরীক্ষা করবার উপায় নেই। এবং যদি সত্য হয় তবু জীব কী করে প্রথম সৃষ্ট হলে সে প্রশ্ন, প্রশ্নই থেকে যায়। (২) বেশি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, পৃথিবী যখন সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়নি, তখন তার তপ্ত জলরাশির মধ্যে কোনাে-এক সময় এমন অবস্থা উপস্থিত হয়েছিল যখন সেলের প্রােটোপ্ল্যাজমের মতাে ১৫৬ শেষ কথা ; কোনাে জৈব-বস্তু দানা বাঁধবার সুযােগ পেয়েছিল। তখনকার মহাসমুদ্রের জলে প্রচুর পরিমাণে ছিল ধাতব পদার্থ ; আকাশের বাষ্পীয় চাপ ও জলের উত্তাপ এমন ছিল যাতে রাসায়নিক ক্রিয়া খুব সহজে হয়। এই অবস্থায় জৈবিক প্রােটিনবস্তু হঠাৎ তৈরি হওয়া বিচিত্র নয়। পৃথিবীর ইতিহাসের যে-অবস্থা- চক্রে এইরূপ প্রােটিন প্রস্তুত হবার এত সুযােগ ঘটেছিল তা পুনরায় ঘটবার সম্ভাবনা নেই। বিজ্ঞানীরা অবশ্য খুবই চেষ্টা করেছেন কৃত্রিম উপায়ে এই ঘটনা সম্ভব করবার। একেবারে যে তারা নিষ্ফল হয়েছেন তা নয়। কয়েকটি ধাতব পদার্থ, জল ও অ্যামােনিয়া থেকে আমাদের শরীরে যে ইউরিয়া (urea ) বা অ্যামিনাে-এসিড ( amino-acid) হয়, তার মতাে জিনিস তারা ল্যাবরেটরিতে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এইরকম পরীক্ষা করতে করতে হয়তাে একদিন সেলের প্রােটোপ্লাজমই বা তৈরি হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে জৈববস্তু সৃষ্টি করতে যে উদ্যত হন, এতটা সাহস তাদের কী করে আসে। তার একটু কারণ আছে। জীবজন্তুর দেহক্রিয়ার সঙ্গে মানুষের গড়া কলকবজার স্বভাবের অনেকখানি মিল আছে। আমরা জানি, মােটর-এঞ্জিনকে পেট্রোল খেতে দিতে হয়, পেট্রোল পুড়িয়ে সে যে-শক্তি আহরণ করে তার জোরে চাকা ঘােরে। জীবজন্তুর বেলাও বেলাও ঠিক তাই। খাদ্যসামগ্রীকে অক্সিজেন দিয়ে পুড়িয়ে যে-শক্তি সঞ্চয় করে তারই জোরে সে ১৫৭ ১২ প্রাণতত্ত্ব চলাফেরা কাজকর্ম করে। মােটরে পােড় তেলের বাষ্প পাইপ দিয়ে বের করে দিতে হয়। আমাদেরও শরীর থেকে পরিত্যক্ত । খাদ্যবস্তু নিষ্কাশিত করবার নানা উপায় আছে। এই দিক থেকে দেখলে, জীবজন্তুর শরীর যে-কোনাে মেশিনের সঙ্গে নিখুত ভাবে তুলনা করা চলে। প্রত্যেক বিষয়ে মিল আছে। তফাতের মধ্যে আমাদের শরীরের মতাে এমন উৎকৃষ্ট মেশিন মানুষ এখনাে তৈরি করতে পারেনি। তার বিশেষত্ব হচ্ছে, কখনাে বেগড়ালে শরীরের ভিতরই এমন ব্যবস্থা আছে যে, সে নিজেই নিজের মেরামত করে নিতে পারে অনেকখানি। কিন্তু মেশিন বেগড়ালে এঞ্জিনিয়ারের দরকার-তার নিজের ক্ষমতা নেই সংশােধন করে নেয় নিজেকে। আমাদের শরীরের সঙ্গে কলকৰজার এই আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখে একদল বিজ্ঞানী মনে করেন যে, জীবমাত্ৰই মেশিন ছাড়া আর কিছু নয়। জীবনপ্রণালী কেবলমাত্র কেবলমাত্র বস্ত-বিজ্ঞানের নিয়মের দ্বারা চালিত। এদের সেইজন্য যন্ত্রবাদী বলা হয়। অন্য- পক্ষে প্রাণৈকান্তবাদীরা বিশ্বাস করেন যে, আমাদের দেহ বাইরে থেকে যতই কেননা যন্ত্র বলে মনে হােক, জড়প্রকৃতির নিয়মে ধরা পড়ে না এমন একটা কিছু শক্তি তার ভিতর আছে। সে কেবল কলের পুতুল হােতে পারে না, কোনাে নৈসর্গিক শক্তি নিয়ে সে জন্মেছে। এই রকম কোনাে প্রাণশক্তি—যাকে বার্গশে। ( Bergson ) “elan vital বলেছেন—বিশাস না করলে জীবের জটিল জীবনপ্রণালী আমাদের কাছে অবােধ্য। দৈহিক ১৫৮ শেষ কথা ক্রিয়া যন্ত্রবৎ চালিত হয় মানছি, তার প্রত্যেক অঙ্গত্যঙ্গের কার্যকলাপ রাসায়নিক বা বৈদ্যুতিক মাপকাঠিতে যাচাই করাও হয়তাে সম্ভব; কিন্তু আমাদের মনের গতিবিধি কি কোনো রাসায়নিক নিয়মে ধরা পড়ে ; আমাদের চিন্তা বা ইচ্ছাশক্তিকে কি কোনাে ল্যাবরেটরির নিক্তিতে ওজন করা যায়। প্রাণৈকান্তবাদী বলেন, জড়জগতের যা-কিছু নিয়ম এ পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি তার দ্বারা জীবনের গূঢ় রহস্য তলিয়ে বােঝা কখনই সম্ভব নয়। জড়বিজ্ঞান ও প্রাণবিজ্ঞান কখনই এক হােতে পারে না। প্রাণীরা যেভাবে বাড়ে ও সন্তানের জন্ম দেয়, তাদের যে-রকম সর্বদা পরিবর্তন ও ক্রমবিবর্তন হয়, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে যেমন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ পায়, তাদের যেমন বুদ্ধি, জ্ঞান বা স্মরণশক্তি দেখা যায়-এর কোনাে বিষয়টিই জড়বিজ্ঞানের গণ্ডির মধ্যে আসে না। জীবনরহস্য বােঝবার আর-একটি গুরুতর বাধা আছে। সেই কথাটি বলে এ-বিষয়ে আমাদের বক্তব্য শেষ করব। আমরা নিজেরা জীবশ্ৰেণীয়, আমাদের মননশক্তি জীবজগৎ অতিক্রম করে যেতে পারে না। আমাদের বুদ্ধি বা বিচারশক্তি সেখানে সীমাবদ্ধ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ বিষয়ই আমরা মাপতে পারি। জীবন বা প্রাণ কী, এই প্রশ্নের শেষ উত্তর সেইজন্য বিজ্ঞান কখনাে দিতে পারবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে যে আসামী, সেই-ই বিচারক। সুবিচার হবার সম্ভাবনা দুরূহ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.